মানুষের মতো মানুষ – মায়ের ভালোবাসা

মানুষের মতো মানুষ – মায়ের ভালোবাসা: ছেলেটা প্রতিদিনই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে। ফেরার পথে পুলিশ তার কাছে ইয়াবা নামক নেশার ট্যাবলেট পেয়েছে। পুলিশ এর আগে ও একবার তাকে ইয়াবার সাথে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

মূলগল্প

লুবনাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে অফিসে আসলাম। আমাকে দেখে অফিসের বস নোমান সাহেব বিষণ্ণ গলায় বললো,

  • ছেলেটাকে এতো চেষ্টা করে ও মানুষ করতে পারলাম না। তুমি তো জানোই ছেলেটাকে নিয়ে আমার কতো আশা ছিল।

নোমান সাহেবকে আগে কখনো এতোটা ভেঙ্গে পরতে দেখি নি। ছেলে সম্পর্কে এমন কথা শুনে দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়ে বললাম,

  • শুনলাম গত সপ্তাহেই ছেলেটাকে বাইক কিনে দিয়েছেন। আপনিই তো বলেছিলেন, বাইক কিনে দেওয়ার শখ পূরণ করলে সব কথা মন দিয়ে শুনবে। হঠাৎ করে এখন আবার কি হলো?

নোমান সাহেব বরফ শীতল গলায় বললো,

  • বাইক কিনে দেওয়ার শখ পূরণ করার পর ছেলেটা এখন চুরি শুরু করেছে। গতকাল তার মায়ের গলার চেইন চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে। এতো আদরের একমাত্র ছেলেটা এখন চুরি শুরু করেছে, এটা ভেবে গতকাল সারাটি রাত ঘুমোতে পারি নাই।

আমি নোমান সাহেবের চোখের দিকে তাকালাম। তার চোখে একই সাথে ক্লান্তি এবং হতাশার স্পষ্ট ছাপ ফুটে রয়েছে। তিনি আমার খুব কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন,

  • প্রতিদিন এতো টাকা ইনকাম করছি, তারপরে ও মনে শান্তি নেই। যেই ঘরের সন্তান তার বাবার কথা শুনে না। সেই ঘরের বাবাদের মনে কখনোই শান্তি থাকে না।

আমার অফিস প্রতিদিন ছুটি হয় বিকেল পাঁচটায়। অফিস থেকে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে হসপিটাল থেকে মা ফোন দিয়ে বললো,

  • তাড়াতাড়ি করে মিষ্টি নিয়ে চলে আস। লুবনার ডেলিভারি একদম ঠিকঠাক মতো হয়েছে। তুই তো বাবা হয়ে গেছিস। ছেলে বাবুটা একদম তর মতো চেহারা পেয়েছে। দ্রুত চলে আস, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে তো।

মায়ের কথা শুনে শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক তৃপ্তি মাখা আনন্দ তৈরি হলো। প্রথম বার বাবা হওয়ার আনন্দটা পুরো হৃদয়ে অসম্ভব ভালো লাগা তৈরি করলো। এই ভালো লাগাটা শুধু তাদেরকেই বুঝানো যাবে যারা সন্তানের বাবা হয়েছে।

হাতে করে মিষ্টি নিয়ে এসে দেখি লুবনা কেবিনে শুয়ে আছে। মা ঠিক লুবনার পাশে বসে ছেলে বাবুটাকে কোলে নিয়ে দ্রুত গলায় কথা বলছে আর হাসছে। কিছুক্ষণ আগে জন্ম নেওয়া ছেলেটার সাথে মা এমনভাবে কথা বলছে মনে হচ্ছে ছেলেটা মায়ের সব কথা মন দিয়ে শুনছে। আমি মিষ্টির প্যাকেট গুলো নিচে রেখে বললাম,

  • দাও তো, একটু আমার কোলে দাও। ছেলেটাকে কোলে নেবো।

লুবনা শুয়া থেকেই বললো,

  • ছেলেটাকে ঠিক ভাবে কোলে নিবে কিন্তু, কিভাবে বাচ্চাদের কোলে নিতে হয় মা আপনি একটু দেখিয়ে দেন তো।
    সন্তানের প্রতি লুবনার এতো গভীর ভালবাসা দেখে আমি হেসে ফেললাম।

আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকি সেই বাড়ির মালিক সুবহান সাহেবের রুমে গেলাম মিষ্টি দিয়ে আসার জন্য। অন্যদিন আমাকে দেখলেই নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে কথা শুরু করে দেয়। আজকে একদম চুপচাপ দেখে খুব কাছে গিয়ে বললাম,

  • পুরো বাড়িটা একদম খালি লাগছে, আন্টি কোথায়? আপনার ছেলে রাতুলকে দেখছি না কেন?

সুবহান সাহেব কিছু একটা বলতে গিয়ে অস্বস্তিবোধ করতে করতেই বললেন,

  • রাতুলকে পুলিশ গতকাল রাতে ধরে নিয়ে গেছে। রাতুলের মা তাকে দেখতে থানায় গেছে, খুব সকালে গেছে এখনো আসে নাই।
    কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

আগ্রহ নিয়ে বললাম,

  • তার মানে গতকাল রাতে এই বাসায় পুলিশ এসেছিল?
  • না, পুলিশ এখানে আসে নাই। ছেলেটা প্রতিদিনই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে। ফেরার পথে পুলিশ তার কাছে ইয়াবা নামক নেশার ট্যাবলেট পেয়েছে। পুলিশ এর আগে ও একবার তাকে ইয়াবার সাথে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

আমি হতাশ চোখে তাকিয়ে বললাম,

  • রাতুল এই রকম ভয়াবহ নেশার সাথে মিশে যাওয়ার আগে টের পাননি?

সুবহান সাহেব করুণ গলায় বললো,

  • ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পুরো জীবনভর এতো টাকা উপার্জন করলাম। সে সন্তানটাই আজকে নেশা করে টাকা ওড়াচ্ছে! মাঝ রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন মনে হয় – অসৎ পথে উপার্জন করার শাস্তি হিসেবেই এমন ছেলে পেয়েছি। নয়তো এতো চেষ্টা করে ও ছেলেটাকে মানুষ মানাতে পারলাম না কেন?

এতটুকু বলেই সুবহান সাহেব কাঁদতে শুরু করলো। চোখে পানি দেখে আমার পুরো শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। আমি নির্বাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম।

হঠাৎ করেই চাকুরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পেপার জমা দিতেই অফিসের বস একই সাথে বিস্মিত এবং হতভম্ব হয়ে গেলো। থমথমে গলায় বললো,

  • তুমি সত্যিই চাকুরিটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছো? কিন্তু কেন? মাস শেষে বেতন, বছরে পাঁচ বার বোনাস। কোন কিছুই তো কম দেওয়া হচ্ছে না! তবু ও ছেড়ে দিতে চাইছো কেন?

আমি জোরালো গলায় বললাম,

  • মাস শেষে এতো টাকার কিছুই আমার প্রয়োজন নেই। চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করবো। বাবার রেখে যাওয়া ছোট একটি দোকান রয়েছে, দোকানটা চালু করবো।
    চাকুরি ছেড়ে দিয়ে দুপুরের আগেই বাসায় ফিরলাম। তাড়াতাড়ি চলে এসেছি দেখে মা বললো,
  • খুব তাড়াতাড়ি করে চলে আসলি যে?

আমি হাসিমুখে বললাম,

  • মা শুনো, চাকুরিটা আর করছি না। আজকে চাকুরিটা ছেড়ে চলে এসে এসেছি। ভেবেছি বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি চালু করে ব্যবসা শুরু করবো।
    লুবনা পাশের রুমে ছিল। আমার কথা শুনে ছেলেটাকে কোলে নিয়েই ছুটে এসে বললো,
  • হঠাৎ করে চাকুরি ছেড়ে দিয়েছ কেন? এখন আমাদের ছেলে হয়েছে। সংসারের খরচ বেড়েছে। এতো ভালো বেতনের চাকুরিটা ছেড়ে দোকান চালু করলে সংসার চালাবে কিভাবে?
    আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে থেকে সহজ গলায় বললাম,
  • সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবো বলেই চাকুরিটা ছেড়ে দিয়েছি। যে অফিসে চাকুরি করেছি সেখানের উপার্জিত অর্ধেকটা টাকাই অসৎ পথের। সেখানে ইচ্ছে করলে ও সৎ থাকা সম্ভব নয়। লুবনা জানো, সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে হলে আগে সন্তানের বাবা- মাকে সত্যিকারের মানুষ হতে হয়। যেই বাবার উপার্জিত টাকা অসৎ পথের, সেই বাবার সন্তান কিভাবে সৎ হবে? কিভাবে সত্যিকারের মানুষ হবে?

কথা শেষ হতেই ছেলেটা লুবনার কোলে কেঁদে উঠলো। আমি ছেলেটাকে কোলে নেওয়া শিখে গেছি। হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে কোলে নিতেই কান্না বন্ধ করে আমার হাতের আঙ্গুলটা চেপে ধরলো। আমি আঙ্গুলটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই মা এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললো,

  • সন্তান তার বাবার হাতটি ততোদিনই এভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, যতোদিন তার বাবা সঠিক পথে চলে।

মায়ের কথা শুনে হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে আরেকটি আঙ্গুল বাড়িয়ে দিলাম। আরেকটি আঙ্গুল বাড়িয়ে দিতেই লুবনা হেসে ফেললো। আমি জানি, লুবনার এই হাসির মতো প্রতিটা মায়ের হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন।

লেখক – মতিউর মিয়াজী

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “মানুষের মতো মানুষ – মায়ের ভালোবাসা” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অবহেলিত ছেলের ভালোবাসা – Koster valobasar golpo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *