রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

প্রিয়তম – Romantic premer golpo in bengali

প্রিয়তম – Romantic premer golpo in bengali: অতঃপর সাদিফ ভাইকে আমার প্রিয়তম, আমার নেতাজি এবং আমার বর হিসেবে পেয়ে আমার জীবনটা এক নতুনত্ব লাভ করেছে। এই যেনো এক মহাসুখ! যেই সুখের কোনো ইতি নেই; আছে শুধু ভালোলাগা আর এক সমুদ্র ভালোবাসা।


পর্ব ১

ঘড়িতে বাজে মাত্র সকাল সাতটা। কিন্তু অতি কঠোর নিয়ম কানুন মেনে চলা আমার মা আমাকে টেনে হিঁচড়ে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিলেন। একে তো শীতের সকাল, তার উপর এখন জানুয়ারি মাস। এই মাসে শীত মামা যেনো তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে শীত প্রদান করেন। এতো শীত বুঝি কেউ সহ্য করতে পারে? আর মা তো এমন মা, সে আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে শান্ত হলেন না, বরং আমাকে এক প্রকার জোর করে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলেন।

আজ এতো সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠানোর দেওয়ার কারণটা আমার মাথায় আসছে না। অন্যান্য দিন সকালে জলদি ঘুম থেকে ডেকে দেওয়ার একটি কারণ ছিলো আর সেটি হলো আমার পড়ালেখা। কিন্তু, গতকালই তো মাত্র আমার অনার্স প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টার এর পরীক্ষা শেষ হলো। এরপর রেজাল্ট দিলে, তবেই আমি প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে ভর্তি হবো। আপাতত আমার আর কোনো চাপ নেই পড়ালেখার। তাহলে মায়ের আমাকে এতো সকালে ডেকে দেওয়ার কারণটা মাথায় আসছে না। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই সম্পূর্ণ মুখ যেনো অবশ হয়ে গেলো।

উফ…মেজাজটাই খারাপ লাগছে। এই শীতকালে আমি গরম পানি বেশি ব্যাবহার করি, তবে আজ আমার মাথা তার নিয়ন্ত্রন হারিয়েছে। সকাল থেকে মায়ের এমন কর্মকান্ড তার উপর ঠান্ডা পানির ঝাপটায় নিজের মুখের কোনো অনুভূতি পাচ্ছি না, সব কিছু মিলিয়ে আমার এখন বিরক্ত লাগছে। শুধু বিরক্ত না চরম বিরক্ত অনুভব হচ্ছে আমার। কোনো মতে হাত মুখ ধুয়ে, গায়ের উপর পাতলা চাদরটি মুড়িয়ে বেরিয়ে এলাম বাথরুম থেকে। বিছানার দিকে তাকাতেই আমি অবাক হলাম।

কারণ, সম্পূর্ণ বিছানা একদম ফিটফাট। মা সাধারণত এমনটা করেন না। আমার যাবতীয় সকল কাজ আমি নিজেই করি। তাহলে আমার বিছানা আজ মা গুছিয়ে দিলো কেনো? উত্তর জানা নেই আমার। চাদর দিয়ে আমি মুখ ঢেকে নিলাম, কারণ আমার প্রচন্ড শীত লাগছে। বিছানায় বসে কম্বল দিয়ে নিজেকে ঢেকে তাপ দেওয়ার প্রবল ইচ্ছে থাকলেও আমি আর বের করলাম না কম্বল। কারণ, মা এসে যদি আবারও এমন কান্ড দেখে আমার তবে আমাকে একেবারে মেরে চ্যাপ্টা করে দিবেন। তাই আপাতত চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে বসে রইলাম খাটে। অবশ্য বসে না, এক প্রকার ঝিমুচ্ছি আমি।
“শেফা! কি হলো তোর? এখনো ঘুমোচ্ছিস কেনো? আমি তোকে সেই কবে ডেকে দিয়েছি। আর তুই বসে বসে ঘুমোচ্ছিস!”

মায়ের এমন হুংকার শুনে আমি এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। মুখ থেকে চাদর সরিয়ে মাকে বললাম,

“না মা, আমি কেনো ঘুমোবো? ঘুম তো আমি চিনি না। আমি শুধু এটাই দেখছিলাম, মানুষ বসে বসে ঘুমায় কিভাবে। আর কিছুই না।”
আমার কথায় মা আমার কান টেনে ধরলো,

“আমাকে কথা শিখাতে আসবি না ফুল। ভুলে যাবি না তোর মা আমি।”
মায়ের কথায় আমি হালকা বিভ্রান্তিমূলক হাসি দিলাম। আমার হাসি দেখে না আবারো বলে উঠলো,
“নাস্তা তৈরি, খেতে আয়। রাফসান অপেক্ষা করছে খাবারের টেবিলে।”

মায়ের কথায় আমি মায়ের পিছু পিছু চললাম। আমার আদরের ছোট ভাইটা, মায়ের এই কড়া শাসন থেকে বেরুতে পারলো না। তার জন্যে আমার বড্ড আফসোস লাগছে। খাবারের টেবিলে গিয়ে দেখলাম রাফসান তার পাউরুটি ডিম সাবাড় করে নিয়েছে। আর এখন বসে দুধের গ্লাস শেষ করতে ব্যস্ত সে। আমাকে দেখা মাত্র আমার ভাই তার ফোকলা দাঁত দেখিয়ে একটা হাসি উপহার দিলো আমাকে। আর আমি, তার চোখের চশমাটা ঠিক করে দিয়ে নিজেই নাস্তা খেতে বসে পড়লাম।

আমার সকালের নাস্তা হলো পরোটা আর ডিমভাজি। মায়ের এতো কড়া শাসন আমাকে রুটি আর সবজি খেতে বাধ্য করতে পারলো না। আমি বুঝিনা সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্যে রুটির কিসের এতো উপকারিতা। এই যে মা এখনো আমাকে রুটি খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে ভাষণ দিচ্ছেন কিন্তু আমার এই ছোট্ট মনটা সেই দিকে মোটেও টানছে না। মায়ের কথা আমি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছি। নাস্তা খাওয়া শেষ করতেই মা আমাদের দুই ভাই বোন এর উদ্দেশ্যে বললো,

“একটু পরেই মিনি ট্রাক আসবে। আমি বাড়ির দারোয়ান আর মফিজের সাহায্য নিয়ে ভারী জিনিসপত্র সব ট্রাকে উঠিয়ে নিবো। তোমরা নিজের জামা কাপড় গুছিয়ে নাও।”

মায়ের কথা শুনে রাফসান হুর হুর করে চলে গেলো নিজের রুমে। আর মা গেলো রান্না ঘরে। আমি ডাইনিং এর চেয়ারে বসে আছি।

আজ সাত সকালে মা তাহলে আমাকে এই কারণেই ডেকেছে। ওহ শেফা! তুই এতো ভোলা মন কেনো রে? আজ যে ঘর বদলির দিন ছিলো, এই কথা আমি একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা এখন যে বাসায় আছি এটা মূলত ভাড়া বাসা। আমার জন্ম হওয়ার পর থেকেই আমি এই বাসায় আছি। আমার বাবা একজন আর্মি অফিসার ছিলেন। গত বছর বাবা শহীদ হয়েছেন। বাবার অনেক প্রিয় ছিলো এই বাসা। তবে এখন মা এই বাসা পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক।

এই বাসায় নাকি বাবার স্মৃতি মাকে বেশি পোড়ায়। কতো রাত যে মা, বাবার জন্যে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন সেটা আমি ভালো জানি। উপর দিয়ে মা যতোই নিজেকে শক্ত করে রাখুক, তবে ভেতর ভেতর মা বড্ড একা, নিজের প্রিয়তমকে ছাড়া। মায়ের মোবাইলে ফোন আসার কারণে আমার ধ্যান ভাঙলো। মোবাইল তুলে দেখি আমার বড় ভাই ইসলালের কল। আমি কল রিসিভ করতে যাবো অমনিই মা রান্নাঘর থেকে এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। আমি কানের মধ্যে আঙ্গুল গুঁজে দিয়ে নিজের রুমে চললাম।

ইসলাল ভাইয়া ঢাকায় থাকেন তার চাকরির সুবাদে। নিশ্চয়ই ভাইয়া এখন মাকে এই বাসা না ছাড়ার জন্যে আবেদন করবেন। আমার মা এক কথার মানুষ। ইসলাল ভাইয়ের কোনো কথা মা শুনবেন না। মা একবার যেটা মনের মধ্যে গেঁথে ফেলে, সেটা আর কেউ পরিবর্তন করতে পারবেনা। তাছাড়া, আমরা এখন যে বাসায় যাচ্ছি সেটা হলো আমার বড় খালার অন্য একটি বাড়ি।

বাড়িটি ছয় তলা বিশিষ্ট একটি বড় অট্টালিকা। আমরা সেই অট্টালিকার দুই তলার বাসিন্দা হবো। আমার মা আর জহুরা খালা দুইজন সৎ বোন। জহুরা খালা নাকি তার যৌবনকালে এক কৃষকের ছেলের সাথে পালিয়েছিলেন। তাই, আমার শ্রদ্ধেয় নানাভাই জহুরা খালাকে তার খানদান থেকে বাদ করে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে মায়ের সাথে খালার কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু আমার এইচএসসি পরীক্ষার সেন্টারে মাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জুমুর সাথে দেখা করিয়ে দিলে, তখন মা জহুরা খালাকে দেখতে পায়। এতো বছর পর দুইবোন একত্রিত হয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরেই ছিলেন। পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আমরা দুবোনকে আবারো জড়িয়ে ধরা অবস্থায়ই দেখে ছিলাম।

জুমু আর আমি আলাদা কলেজে পড়তাম। তাদের কলেজ আর আমাদের কলেজ শহরের দুই প্রান্তে অবস্থিত। আমাদের পরিচয় হয়েছিলো কোচিং এ। আমার বেশি ভালো বান্ধবী না থাকার কারণে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গিয়েছিলো সে। সেদিন থেকে হালকা পানি খেলেও আমরা একজন আরেকজনকে বলি। বাসা অনেক দূরে হওয়ার কারণে কেউ কখনো নিজেদের বাসায় যায়নি তখন। তাই, আমরা যে সম্পর্কে খালাতো বোন হই এই কথাটিও জানা হয়নি। তবে, সেদিন পরীক্ষার হলে মা আর খালা যেমন একজন আরেকজনের গলায় ধরে লেগে ছিলেন, তেমনি আমি আর জুমুও একজন আরেকজনের সাথে লেগে ছিলাম।

সেদিন আমি জেনেছিলাম দেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সাদনান সাদিফ আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের ভাইয়ের পাশাপাশি আমার খালাতো ভাই। কি কপাল আমার! এতো বড় একজন বিখ্যাত মানুষের আত্মীয় আমি, কথাটা ভাবতেই আমার মন নেচে উঠে। খালা আর জুমু এবং আমার আরেকজন খালাতো বোন ইতি আমাদের বাসায় অনেকবার এসেছিলো তবে আমার খালাতো ভাই কখনোই আসেনি আমাদের বাসায়।

খালা আমাদের এতদিন অনেক জোর করেছিলো তাদের বিল্ডিং এ ভাড়া থাকতে, যাতে খালা আমাদের বাসায় প্রত্যেকদিন আসতে পারে। মা প্রথমে রাজি না হলেও, পরে নিজের সিদ্ধান্তে নিজের সাথেই হেরে গিয়ে খালার বাসায় যাওয়ার জন্যে সিদ্ধান্ত নিলেন।

আমরাও গিয়েছিলাম দু একবার খালার বাসায়, তবে তখন আমার একমাত্র খালাতো ভাইকে দেখার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি আমার। কিন্তু হ্যাঁ! আমি সাদিফ ভাইকে দেখেছিলাম একবার, তাও আমাদের ভার্সিটিতে। আমি তখন রাফসান এবং জুমুকে নিয়ে ভার্সিটি গিয়েছিলাম ফরম পূরণ করতে। সেদিন কিছু একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো ভার্সিটিতে। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন সাদিফ ভাই। এই ব্যাপারটি বুঝতে সমস্যা হলো না তখন। কারণ, ভার্সিটিতে বড় বড় করে ব্যানার ঝুলে ছিলো..”আজকের প্রধান অতিথি, বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সাদনান সাদিফ”। ফরম পূরণ শেষে বের হতেই, এক বিকট শব্দের সাথে শুরু হয়েছিলো প্রচন্ড মারপিট।

এতো মানুষের ভিড়ে আমার হাত থেকে ছুটে গিয়েছিলো রাফসান আর জুমু। আমি অনেক কষ্টে একটা খালি দোকানের ভেতর নিজেকে আড়াল করেছিলাম। রাফসান আর জুমুর চিন্তায় সেদিন আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল আপনজনকে হারানোর কষ্ট হানা দিচ্ছিলো বারবার। যার কারণে আমার কান্নার বেগ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ জোরে কিছুর শব্দ শুনে আমি চমকিয়ে পেছনে ফিরেছিলাম। কিছু লোককে দেখেছিলাম যারা হাতে বড় ছুরি নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসছিলো। আতঙ্কে আমি কোথায় যাবো কিছুই বুঝছিলাম না। লোকগুলো আমার কাছে আসতেই, কেউ একজন তাদের খুব জোরেই ছুরি দিয়ে আঘাত করে। সাথে সাথেই লোকগুলো এক বিকট আর্তনাদ করে আমার সামনে লুটিয়ে পড়লো। এমন দৃশ্য আমার জীবনে প্রথম দেখেছিলাম।

চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে দেখি সাদনান সাদিফ নামক সেই নেতা মানে আমার খালাতো ভাই। যার পুরো সাদা পাঞ্জাবি রক্তে লাল ছিলো। এতো মানুষকে নিজের সামনে খুন হতে দেখে আমার সব কিছু ঝাপসা লাগছিলো। কান্নার ফলে আমার তীব্র মাথায় ব্যাথা করছিলো। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না তখন। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, সাদিফ ভাই কিছু আমার কাছে এসে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো তবে এর আগেই আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। চোখ খুলেই নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম নিজের রুমে।

আশেপাশে ছিলো মা, জুমু, ইতি আপু এবং রাফসান। মা আমাকে বকে, বাকি সবাইকে নিয়ে যখন রুম থেকে বের হয়ে গেলেন তখন আমাকে জুমু এসে জানিয়েছিলো আমি নাকি সাদিফ ভাইয়ার বাহুতেই অজ্ঞান হয়েছিলাম এবং সাদিফ ভাইয়া আমাকে কোলে করে গাড়ি পর্যন্ত তুলে দিয়েছিলো। ভাব যায় এইসব! এই লোককে দেখে যে কোনো মেয়েই ফিদা হয়ে যাবে। তবে সেদিন আমি উনাকে দেখে, আমার মনে উনার জন্যে শুধু ভয়ই জোগাড় করতে পেরেছি।

আগের কথা ভাবতেই আমার মন থেকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হলো। ব্যাগ গুছিয়ে বাহির হলাম রুম থেকে। ইতি মধ্যেই সব ফার্নিচার এবং জিনিসপত্র সব গায়েব হয়ে গেলো।
আমাকে দেখা মাত্র মা তাড়া দিতে লাগলো,

“ব্যাগ নিয়ে জলদি বের হয়ে যা। গাড়িতে গিয়ে বস। গাড়ি মিনি ট্রাক এর পিছু পিছু যাবে। তাই ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। রাফসান আর তুই যা এখন, তোদেরকে দিয়ে গাড়ি আমাকে নিতে আসবে আবার।”

মায়ের কথামতো আমি গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লাম।

মনটা বড্ড খারাপ লাগছে। এই বাসাকে বিদেয় দিতে আমার মোটেও ইচ্ছে করছে না। কিন্তু অনেক সময় নিজের প্রিয় জিনিস থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে হয়, প্রিয়জনের খাতিরে। সমস্যা নেই, আমার সাথে মা আছে এটাই অনেক। নতুন বাড়িকে আমি আমার মন মতো সাজিয়ে তুলবো, যেমনটা এতদিন আমার বাসায় ছিলো।


পর্ব ২

গাড়ি গিয়ে থামলো এক সুন্দর অট্টালিকার সামনে। গাড়ি থেকে নামতেই রাফসান দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। গাড়ি থেকে সব নামিয়ে রাখবো না নিজের ভাইকে আয়ত্বে রাখবো, কিছুই আমার মাথায় আসছে না। হঠাৎ করেই রাফসান রাস্তার দিকে দৌড় দিলো। অমনিই একটি কার অনেক জোরেই রাফসানের সামনে থেকে গেলো। আমি আমার হাতে থাকা ব্যাগ ফেলে দিয়ে আমি দ্রুত চললাম রাফসানের দিকে। আমার পৌঁছানোর আগেই গাড়ি থেকে নেমে এলো সাদিফ ভাই। উনি গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে পিছের গাড়ি থেকে কিছু কালো রঙের পোশাক পরিহিত লোক নেমে, সাদিফ ভাইয়ের পিছে দাঁড়ালেন। তাদের সবার হাতে বন্দুক আছে।

গাড়ি থেকে নেমে সাদিফ ভাই রাফসানকে কোলে নিয়ে নিলেন। আমি উনাদের কাছে আসতেই দিলেন এক বড় ধমক দিলেন আমাকে।

“এতো ছোট একটা বাচ্চাকে কেউ রাস্তায় ছেড়ে দেয়? আজ যদি বাচ্চাটার কিছু হতো? কোথা থেকে যে আসে এইসব মানুষ!”

আমাকে কখনোই কোনো অপরিচিত মানুষ এতো জোরে ধমক দেয়নি। এইভাবে রাস্তায় অপমানিত হবো বলে কখনোই ভাবিনি। রাফসান এখনো উনার কোলে। আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,

” রাফসান, তোমার মা কোথায়?”
সাদিফ ভাইয়ের প্রশ্নে রাফসান বললো…
“মা, আসবে একটু পরে।”
আবারো সাদিফ ভাই রাফসানকে বললো…
“ব্যাথা পেয়েছো কোথাও?”
উনার কথার উত্তরে রাফসান মাথা দুলিয়ে “না” বললো।

আমি রাফসানকে সাদিফ ভাইয়ের কোল থেকে নিয়ে নিলাম। তখনো সাদিফ ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি রাফসানের হাত পা ঝেড়ে দিলাম। আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার এক হাত দিয়ে ধরলাম রাফসানকে। সাদিফ ভাইয়ের সামনে আমার উচ্চতা অনেক ছোট। এই লোক এতো লম্বা কেনো! বাংলাদেশের ছেলেরা লম্বায় সচরাচর পাঁচ ফুট নয় বা দশ হয়।

কিন্তু, সাদিফ ভাইয়ের উচ্চতা ছয় ফুট মনে হচ্ছে। উনার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এতো উঁচুতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ঘাড় ব্যাথা করছে। সাদিফ ভাইয়া এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো রাফসানের সামনে। রাফসানের গালে হাত রেখে উনি বলে উঠলেন,
“বাই রাফসান। তোমার আপুকে নিয়ে আমাদের বাসায় যাও। খালা আসা পর্যন্ত আমাদের বাসায় বসে থাকো।”

কথাগুলো বলে উনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালেন,
“এই মেয়ে….নিজের ভাইকে সামলিয়ে রাখ। আপাতত যা আমাদের বাসায়। সেখানে বসে নিজের ভাইকে সামলিয়ে রাখ।”

কথা শেষ করে সাদিফ ভাই পিছে ফিরে এখন গার্ডকে কিছু বলতে যাবেন, এর আগেই দেখছিলাম জুমু আর ইতি আপু নামছে গাড়ি থেকে। আমাকে অবাক করছে সাদিফ ভাইয়ের ব্যাবহার। জীবনে আমার সাথে কোনো কথায় বলেননি, প্রথম দেখায় তুই তোকারি শুরু করে দিলেন। দেখে তো ভদ্র মানুষ মনে হয়, চেহারায় মারাত্মক পবিত্রতা বিদ্যমান। কিন্তু ব্যাবহার কেনো এতো খারাপ এই লোকের? তাছাড়া উনি রাফসানকে চিনে কিভাবে! আচ্ছা উনি কি আমাকেও চিনে? নাহ..চিনে না হয়তো। চিনলে কি কেউ তার আত্মীয়ের সাথে এইভাবে তুই তোকারি করে?

“জুমান, ইতি এদেরকে নিয়ে বাসায় যা। ছোট খালা আসলে তবেই এই বাসায় আসবি এদের নিয়ে।”
সাদিফ ভাই কথাগুলো বলে দ্রুত গাড়ির কাছে গেলেন। আমি সাদিফ ভাই এর দিকে আড়চোখে তাকালাম। কিন্তু, উনার দিক চেয়ে উনার রাগী মার্কা মুখ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। আমার মাথায় এটাই আসছে না, সাদিফ ভাই রাফসান আর মাকে চিনলে আমাকে চিনেন না কেনো? কি অদ্ভুত কর্মকান্ড। আমি ইতি আপু,

রাফসান এবং জুমু মিলে তাদের বাসায় গেলাম। সাদিফ ভাইদের বাসা অনেক বড়, ঠিক যেমন রাজা বাদশাদের মহলের মতো। প্রথমেই একটা বড় ফটক, মাঝখানে চিনা পাথর দিয়ে বাঁধায় করা বড় একটি রাস্তা, রাস্তার দুই পাশে সোডিয়াম লাইট আর সাথে আছে অসংখ্য নানান ফুলের গাছ। এই বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই মনটা একদম শান্ত হয়ে যায়। এইখানের প্রকৃতির ছোঁয়ায় যেকোনো অশান্ত মনকে শান্ত করতে মাত্র কিছু সেকেন্ড সময় নিবে। বাড়ির কথা আর কিই বা বলবো! সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা যেনো একদম নজর কাড়া। বাহিরের দিক যেমন সুন্দর, তেমন সুন্দর এই বাড়ির ভেতরের দিক। আমাদের বাসা থেকে এই বাড়ি মাত্র দশ মিনিটের পথ। তবে গাড়ি করে আসলে মাত্রই তিন কি চার মিনিটের মতো লাগে।

এই বাড়ি আমার মরহুম খালু থাকা কালীন করিয়েছিলেন। আসলে নানা ভাই যদি একটু ধৈর্য্য ধরে খালাদের সম্পর্ক মেনে নিতেন তাহলে শান্তিতে দুনিয়া ত্যাগ করতেন। খালা যখন পালিয়েছিল তখন খালুর পড়ালেখা শেষের দিকে ছিলো। পড়ালেখা শেষ করে খালু একটি ভালো চাকরি পান, এরপরই খালাদের জীবন বদলিয়ে যায়। আগের দিনে তো চাকরি পাওয়া এতো কষ্টদায়ক ছিলো না।

এরপর থেকেই খালু নিজের যোগ্যতা দিয়ে সফলতাকে নিজের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছিলেন। এইসব কাহিনী আমাদের খালা বলেছিলো
ভেতরে যেতেই খালা এগিয়ে এলো আমাদের দিকে। খালা বুকে জড়িয়ে নিলো আমরা দুই ভাইবোনকে। ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করে খালা চললেন রান্নাঘরে, আর আমরা বাকি সবাই গিয়ে বসলাম লিভিংরুমে। লিভিংরুমে সেট করা টিভিটা অনেক বিশাল বড়। সাথে অ্যাটাচ করা আছে বড় স্পিকার। এই বাড়ির প্রত্যেকটা জিনিসই সুন্দর।

যতবার এসেছি এই বাড়িতে, ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়িয়েছি সম্পূর্ণ ঘরে। শুধুমাত্র দ্বিতীয় তলার একটি রুমে যাওয়ার ভাগ্য হয়ে উঠেনি আমার। কারণ, ঐটা ঐ অসভ্য সাদিফ ভাইয়ার রুম। রূপে মানুষ যতোই সুন্দর হোক না কেনো, আসল রূপ তো মানুষের ব্যাবহার দিয়ে প্রকাশিত হয়। সাদিফ ভাইয়ের মন অপরিষ্কার সেটা বুঝতে আমার আর সময় লাগেনি। এই বাড়িতে আসার প্রায় এক ঘন্টা পরে মায়ের ফোন পেয়ে আমি, রাফসান আর জুমু তাদের গাড়ি করেই ঐবসায় গেলাম। জিনিস পত্র উপরে তোলা শুরু করে দিয়েছে। আমি যেতেই মা আমাকে এক ধমক দিলো,

“ছোট ভাইকে সামলিয়ে রাখার দায়িত্ব তোর ছিলো। সাদিফ ফোন করেছিলো আমাকে। ছেলেটা যদি গাড়ি কন্ট্রোল করতে না করতো তবে কি হতো?”

“মা…আপুর দোষ ছিলো না। আমি ভুলে দৌড় দিয়েছি। আপু আমাকে ঠিক সময় এসে বাঁচিয়ে নিতো, কিন্তু এর আগে সাদিফ ভাইয়া গাড়ি থামিয়ে ফেললো।”

রাফসানের কথায় মা এইবার রাফসানকে দিলো এক ধমক,
“তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া কোনো ছোট ছেলের কথা আমি বিশ্বাস করবো না। দোষ একান্তই শেফার ছিলো।”

আমি আর কিছু বললাম না। যেখানে আমাকেই দোষী বানিয়ে দিলো, সেইখানে আমার কিছু করার নেই। দোষ না করেও আমি দোষী হলাম, একমাত্র ঐ অসভ্য সাদিফ ভাইয়ের জন্যে আমি আজ মায়ের বকুনি শুনলাম। রাগে আমার পুরো শরীর গিজগিজ করছে। আমি আমার ব্যাগ আর রাফসানের ব্যাগ নিয়ে সোজা দুই তলায় উঠে গেলাম। আগের বাসাটা আমার অনেক প্রিয় হলেও, এই বাসাটাও আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। আমি বেছে নিলাম রাস্তার দিকের রুমটি। কারণ, চলন্ত গাড়ি আর মানুষের সমাগম দেখতে আমার অনেক ভালো লাগে। আস্তে আস্তে রুমের মধ্যে সব জিনিস আর কাপড় গুছিয়ে নেওয়া শুরু করলাম।

দুপুরের দিকে আমি, রাফসান আর মা খালার বাসায় গেলাম। যেহুতু, আজই বাসায় উঠেছি তাই আর রান্না করার মতো সুযোগ হয়নি। তাছাড়া, খালার নির্দেশ অবশ্যই যেনো খাবার তার বাসাতেই খাই। আপন মানুষ মানে আপন মানুষ। খালার সাথে দেখা হলো কতোদিনই বা হলো!

কিন্তু খালার আপ্যায়নে ঐ বাসাকে নিজের বাসায় মনে হয়। তাছাড়া ইতি আপু আমাকে জুমুর মতোই আদর যত্ন করেন। মোট কথা ঐ বাসা আমার অনেক প্রিয়। দুপুরের খাবার খেয়ে আবারো আমরা বাসায় এসে ঘর গুছানোর কাজে লেগে পড়লাম। উফ! মানুষ কিভাবে বছরে, মাসে ঘর বদলায় আল্লাহ্ জানে। এই অল্প বয়সে আমার কোমর ধরে গেলো জিনিসপত্র সব নাড়াচাড়া করতে করতে। কিন্তু, এইদিকে মা এখনো দিব্যি কাজ করে বেড়াচ্ছে। আমি কিছু জিনিস জোগাড় করে সন্ধ্যায় চা বানিয়ে নিলাম।

বিস্কুট আর চা দিয়ে কোনো রকমে সন্ধ্যার নাস্তা শেষ করলাম। কোমরে এখনো একটু চাপ অনুভব করছি। তবে, মাকে এই বিষয়ে কিছুই বলা যাবে না। মা এই ব্যাপারে কিছু জানলে আমাকে সেই তরিতরকারি নিয়ে ভাষণ দেওয়া শুরু করবেন। অনেক জায়গায় ব্যাথার স্প্রে খুঁজেছি। কিন্তু আমি অভাগার ভাগ্য স্প্রে জুটলো না। তাই, এখনো হঠাৎ হঠাৎ করে কোমরে চিনচিন করে ব্যাথা করছে। মুটামুটি সবকিছু গুছিয়ে রাতের খাবারের জন্যে খালার বাসার জন্যে রওনা দিলাম।

বাসায় তেমন ঠান্ডা অনুভব হয়নি কিন্তু, বাহিরে চরম পর্যায়ের ঠান্ডা পড়ছে। শীত যেনো শুধু আমার জন্যেই বেশি কঠোর হয়ে আছে। আমি আমার গায়ে থাকা সোয়েটার এর উপরে আরেকটি চাদর দিয়ে মাথা, মুখ সহ সব কিছু ঢেকে নিলাম। খালার বাসার ভেতর যাওয়ার আগেই আমার মনে হলো আমার জুতো ছিড়ে গিয়েছে। মাকে বাসার ভেতর যেতে বলে আমি নিচু হয়ে জুতো ঠিক করছিলাম। অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম,

আমার জুতো একদম ঠিক আছে। আমি যেই উঠতে যাবো অমনিই আমাকে কেউ একজন খুব শক্ত করে আমার মুখ এবং সম্পূর্ণ শরীর চেপে ধরলো। আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই আমার কানে শব্দ ভেসে এলো,

“গার্ড আমার বন্দুক নিয়ে আসো। বাসায় চোর ঢুকেছে!”
এমন কথা শুনে আমার বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম হলো।


পর্ব ৩

কেউ একজন আমাকে এমনভাবে চেপে ধরেছেন আমি নড়তে পারছি না। এক হাতে আমার গায়ে চেপে ধরে আছেন, অন্যহাতে আমার মুখ চেপে ধরে আছেন। যার কারণে আমি কিছু বলতেই পারছি না। কোন শয়তান আমাকে এইভাবে ধরেছে, সেটা একবার জানতে পারলে তার জীবন নিয়ে নিবো আমি। একদিকে আমার কোমরে ব্যাথা তার উপর কোন অমানুষ আমাকে এইভাবে চেপে ধরেছেন, কোমরের ব্যাথা আরো বাড়ছে এইভাবে বেশামাল ভাবে দাঁড়ানোর ফলে।
এইদিকে গার্ড এসে বললেন,

“এই নিন স্যার বন্দুক। এই চোর কবে ঢুকলো বাসায় সেটা লক্ষ্য করতে পারলাম না।”
আমার মাথার মেজাজ এখন একশো একশো। হঠাৎ করে মায়ের চিল্লানোর শব্দ আমি শুনতে পেলাম। মা এক প্রকার চেঁচিয়ে যাচ্ছেই,
“শেফা কোথায় তুই?”

মায়ের এমন কথায় উত্তর দিলেন একজন ছেলে,
“খালা! শেফা কোথায়? এইদিকে তো আমি দেখিনি।”
“আরে! এইযে তোর কাছে শেফা। তুই ওকে এইভাবে ধরে রেখেছিস কেনো বাবা?”
মায়ের কথা শুনে সাথে সাথেই ছেলেটি আমাকে ছেড়ে দিলেন।

আল্লাহ্ গো! মনে হলো আমি জানে বেঁচে গেলাম। ঠিক সময় যদি মা না আসতো, তবে আজ আমার ইন্নাল ইল্লাহ হয়ে যেতো। আমি এখনো এক ঘোরের মাঝে আছি। কেউ একজন আমাকে মুখ থেকে চাদর সরিয়ে নিলো। চোখ তুলে দেখি আমার সামনে মা, জুমু, ইতি আপু আর খালা দাঁড়িয়ে আছেন। ডান পাশে চোখ ঘুরাতেই দেখতে পেলাম সাদিফ ভাইকে। তাহলে আমাকে গরুর মতো চেপে ধরেছিলেন এই সাদিফ ভাই!

“আপনি কি অন্ধ নাকি? এইভাবে না জেনে শুনে কেউ এমন কাজ করে? আজ যদি ঠিক সময় মা না আসতো, তবে আমি তো অক্কা পেতাম। মানে, কী বলবো আর! সত্যি কথা যাচাই না করে আমকে বন্দুক দিয়ে মারতে প্রস্তুত ছিলেন আপনি। আর আপনিই নাকি দেশের সেরা রাজনীতিবিদ! আচ্ছা, কি দেখে সবাই আপনাকে সেরা নেতার স্থানে বসিয়েছে?”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আমি জুমুর হাত ধরে ভেতরের দিকে চললাম।
বাহিরে উপস্থিত সবাই শেফার এমন কথা শুনে স্তব্দ হয়ে আছে। আর সাদিফ, সে তো প্রচন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শেফার চলে যাওয়ার দিকে। এই মেয়ের এতো সাহস! যেখানে বিপক্ষ দলের বড় নেতা তাকে দেখলে মাথা নিচু করে সালাম দেয়, সেখানে এই মেয়ে তাকে কতো কথা শুনিয়ে দিলো! অদ্ভুত।

ভেতরে গিয়ে লিভিংরুমে সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। সাদিফ ভাইকে কথা শুনিয়ে আমার খুব শান্তি লাগছে। যেভাবে আমাকে সাদিফ ভাই চেপে ধরেছিলেন..এক মাত্র আল্লাহ্ এর কারণে আমি বেঁচে ফিরে এসেছি।

“এই মেয়ে”।
জুমুর এমন ডাকে আমি জুমুর দিকে ফিরলাম।
ভ্রু নাচিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কি হলো মেয়ে?”

জুমু সোফায় থাকা কুশন তার কোলে নিয়ে আমার দিক মুখ করে বলে উঠলো,
“তুই সাদিফ ভাইকে কিভাবে এতো কথা শুনিয়ে দিয়েছিস? আর ভাই কিভাবে তোর কথা চুপচাপ শুনে নিলো!”

“কেনো? আমি কি ভুল কিছু বলেছি? উনি আমাকে চোর ভেবে মেরে ফেলার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন। আর আমি উনাকে কিছুই বলবো না?”

আমার কথার উত্তরে জুমু আর কিছু বলতে পারেনি। কারণ, বাহিরের সবাই বাড়ির ভেতর চলে এলো। সাদিফ ভাইয়ের দিকে চোখ গেলো আমার। উনি কোনো দিক না তাকিয়ে সোজা উপরে উঠে চলে গেলেন মোবাইল কানে লাগিয়ে।

সাদিফ ভাই উপরে চলে যেতেই ইতি আপু আমার কাছে এলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“বাহ্ বাহ্! শেফা ফুল, আমি তোমার সাহসিকতার ভক্ত হয়ে গেলাম। সাদিফ ভাইকে এক নাগাড়ে এতো কথা কেউ কখনো শোনাতে পারেনি। ইনফ্যাক্ট আমার মরহুম বাবা পর্যন্ত আমার ভাইকে ভয় পেতো। আর তুই কিনা! হাহাহা, অনেক সাহসী তুই।”

“হ্যাঁ, ফুল। আমিও তোকে এই কথা বলছিলাম। আমার ভাইয়ের সাথে এমন উঁচু শব্দে কেউ কখনোই কথা বলেনি।”

জুমু এবং ইতি আপুর কথায় আমি মুচকি হাসলেও আমার মনে এক অজানা ভয়ে কেঁপে উঠলো। আমি নিজের অজান্তে সিংহের লেজে পা দিয়ে দিলাম না তো!

ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে আছে। এখন অপেক্ষা করছে সবাই শুধু মাত্র সাদিফ ভাইয়ের জন্যে। অবশেষে সাদিফ ভাই এলেন ডাইনিং রুমে। আমি ভুলেও উনার দিকে একবারও তাকালাম না। সামনে আমার সাথে কি ঘটনা হবে সেটা আল্লাহ্ ভালো জানেন। সবাই যে যার মতো ভাত গ্রহণ করছে। কিন্তু আমার মা জননী আমার পিছে লেগেছে আমাকে সবজি খাওয়ানোর জন্যে। আমি মায়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ ভাত খেতে লাগলাম।

“মা কোনো কথা বললে সেই কথা মেনে চলা প্রত্যেক ছেলে মেয়ের কর্তব্য।”
সাদিফ ভাইয়ের এমন ধমক শুনে আমি আড়চোখে উনার দিকে তাকালাম। তবে, উনি আমাকে ধমক দিয়ে আপন মনে খাবার চিবুচ্ছেন। এইদিকে আমার মা, আমার প্লেটে সবজির পাহাড় বানিয়ে নিলেন।

“দেখেছো আপা! এই মেয়েকে আমি এতদিন এতো জোর করেও সবজি খাওয়াতে পারিনি। আর আজ সাদি বাবার এক ধমক শুনে হুরহুর করে সবজি গিলছে।”
মায়ের কথায় খালা হেসে উঠলেন।

মায়ের কথায় খালা বললেন,
“হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। এক কাজ করিস প্রত্যেকদিন ফুলকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবি, এরপর সাদি ওকে ধমকিয়ে ঠিকই সবজি খেতে বাধ্য করবে।”

দুই বোনের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। শুধুমাত্র আমার আর সাদিফ ভাইয়ের মুখে হাসি নেই। থাকবেই বা কিভাবে! এই জল্লাদের কাছে মা আমাকে ঠিকই পাঠিয়ে দিবে মায়ের প্রিয় সবজি খাওয়ানোর জন্যে। আর এই সাদিফ ভাই তো মাথা নিচু করে গপগপ খেয়েই চললো। আর আমি সবজি নিয়ে বসে আছি। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, সাদিফ ভাই অনেক বেশি সুন্দর একটা ছেলে। যেমন ফর্সা, তেমন তার শরীরের গঠন আকর্ষণীয়। চুপিচুপি উনাকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম কিন্তু অমনিই সাদিফ ভাইয়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। ইসস…শেফা! তুইও না আর জায়গা পেলি না তাকানোর।

আমি দ্রুত নিজের প্লেটের দিকে নজর দিলাম। এতক্ষণ আমি বসে ছিলাম একদম সোজা হয়ে। কিন্তু, উনি উঠে যাওয়ার পরপরই আমি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। আমার অবস্থা দেখে সবাই হেসে উঠলো।

“কি গো আমার শেফা ফুল, আমার ভাইকে কেমন লাগলো?”
ইতি আপুর কথার উত্তরে জুমু বললো,
“কেমন লেগেছে ওর, সেটা তো ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। হাহা।”

“উফফ! আমার আপুরা, একটু কি চুপ করবে? মা আমার কাছে একটা প্রশ্ন আছে তোমার জন্যে। তুমি তো সাদিফ ভাইকে আগে দেখোনি, তাহলে আজ বাহিরে কিভাবে তুমি উনাকে চিনে গিয়েছো? আর উনিই বা আজ কিভাবে রাফসানকে চিনতে পারলো? সাদিফ ভাই তো আগে কখনোই আমাদের সাথে দেখা করেননি।”

“সাদিফ আমাদের বাসায় এসেছিলো তোর খালার সাথে। কিন্তু তুই ছিলি না বাসায়। আর তোর খালার সাথে দেখা হওয়ার দিনেই, আপা বাসায় এসে আমাদের সবার ছবি দেখিয়েছেন সাদিফকে। তাই, সে চিনতে পেরেছে আর আমিও তাকে আজ চিনতে পেরেছিলাম। পেয়েছিস তোর উত্তর? এইবার খাবার শেষ কর।”

মায়ের কথায় আমি প্লেটের দিকে তাকালাম।

আমার এখনো অর্ধেক খাবার বাকি। কিন্তু এই সবজি মাখা ভাত আমি আর খেতে পারবো না। তাই, নানা বাহানা দিয়ে ভাত আর খেলাম না আমি।

খাবার শেষে সবাই মিলে লিভিংরুমে বসলাম আবারো। মা এবং খালামণি তাদের নানা আলোচনা জুড়ে দিলো। বড় খালার একটাই দুঃখ উনার বড় ভাই মানে আমার মামা এখনো খালার মুখ দেখতে নারাজ। মা অনেক বুঝিয়েছিলেন মামাকে।

কিন্তু মামা বরাবরের মতোই তার সিদ্ধান্তে অটল থাকার পণ নিয়েছেন। সাদিফ ভাইয়াকে এইদিকে আসতে দেখে মা এবং খালা চুপ করে গেলেন। কারণ, সাদিফ ভাই নাকি এখনো জানেন না তার একটি মামা আছে। যদি জানেন, তবে সাদিফ ভাই গায়ের জোর দিয়ে হলেও মামাকে এই বাড়িতে খালার সামনে এনে হাজির করবেন। খালা এমনটা চান না। খালা চান মামা নিজ থেকেই এই বাড়িতে আসুক।

আমার মামা হলো মায়ের সৎ ভাই। মানে, বড় খালা আর মামা এক মায়ের সন্তান আর মা আমার নানার দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান। মামা মাকে তার নিজের বোনের মতোই আদর যত্ন করেন। আমরা তো সব সময় যায় মামার বাসায়। নানু এবং নানা মারা যাওয়ার পর মামা এবং তার পরিবার এই শহরে চলে এসেছেন। খালার সাথে মায়ের দেখা হওয়ার পর মা মামাকে অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু, মামা কখনোই খালার সাথে দেখা করার জন্যে রাজি হয়নি।

সাদিফ ভাইকে দেখলাম খালামণি থেকে বিদেয় নিয়ে চলে যেতে। এত রাতে এতো ফিটফাট হয়ে উনি কোথায় যাচ্ছেন আল্লাহ্ মালুম! কিন্তু মা উনাকে প্রশ্ন করায় সাদিফ ভাই গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন…
“মিটিং আছে খালামণি। আমাদের পলিটিশিয়ান এর জন্যে রাত দিন এক। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে,

যেগুলো রাতে করতে হয়।”
কথাগুলো বলে সাদিফ ভাই আর এক সেকেন্ড দেরী করেননি। ধুমধাম পা ফেলে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছেন। এই লোকটা এমন কেনো? উনার ভেতর কি আল্লাহ্ রস কষ দেননি? একটু হাসেন পর্যন্ত না। এইভাবেও কি মানুষ বেচেঁ থাকতে পারে?

বাকি সবার সাথে হালকা কথা বার্তা বলে আমি, মা এবং রাফসান বাসায় যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে পড়লাম।

বাসায় গিয়ে সবাই অল্প কাজ করা শুরু করেছি।

কারণ, এখনো অনেক কাজ বাকি বাসার। আজ রাতে মা এবং রাফসান আমার রুমেই থাকবে। কারণ, শুধুমাত্র আমার রুমটা আমি সুন্দর ভাবে সব গুছিয়ে নিয়েছি। বাকি সব রুম অগোছালো। সব কাজ শেষে মা এবং আমরা দুই ভাইবোন শুয়ে পড়লাম। বিছানার সাথে পিঠ লাগতেই আলাদা এক ভালোলাগা কাজ করে। কম্বল দিয়ে নিজেকে একদম মুড়িয়ে নিলাম। আহ্, শান্তি! দুনিয়ার সব সুখ একদিকে আর ঘুমানোর সুখ অন্যদিকে।


পর্ব ৪

গাড়ির শব্দ, সাথে নানা মানুষের কথার শব্দ শুনে আমার ঘুম ছুটে গেলো। চোখ অল্প খুলতেই আমার চোখ আবারো বন্ধ হয়ে এলো। কারণ, মা জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। যার জন্যে আমার চোখে ফালতু রোদ এসে কিলবিল করছে। অপর পাশ ফিরে চোখ খুললাম ভালো করে।

এইদিকে সূর্যের আলো নেই। বালিশের নিচ থেকে মোবাইল নিয়ে দেখি ঘড়িতে বাজে এখন সকাল ১০.৩৪। আমার পাশে ঘুমন্ত রাফসানের মুখে চুমু দিয়ে আমি উঠে পড়লাম। চুলে হাত খোঁপা করতে করতে সামনের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মা আবারও একা একা কাজ শুরু করে দিয়েছে, যেটা আমি মোটেও পছন্দ করি না। সামনের রুমে গিয়ে আমি মাকে দেখতে পেলাম না।

তবে, রান্নাঘর থেকে দুই জন মহিলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এই কণ্ঠ দুটি মা এবং খালার এটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। লিভিং রুমে পা রাখতেই একজন ছেলের কণ্ঠ শুনে আমি চমকে উঠলাম।
“এতো বড় মেয়ের গায়ে এতো ছোট পোশাক! তাও আবার সেই পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে আছিস আমার সামনে! লজ্জা শরমের কি কোনো অংশ আছে তোর মাঝে?”
এমন কথা শুনে পিছু ফিরতেই দেখি সাদিফ ভাই।

সে পিলারের সাথে হেলান দিয়ে তার বুকের সাথে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে। সাদিফ ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আমি আমার নিজের দিকে তাকালাম। রাতের পড়নে হাঁটু সমান প্যান্ট আর টিশার্ট আমার গায়ে। নিজের এমন অবস্থা দেখে নিজেই লজ্জা পেলাম।

দ্রুত এক দৌড় দিলাম নিজের রুমের দিকে। ছি! কি বাজে কান্ড হয়ে গিয়েছে এই মুহূর্তে। আমার এই অবস্থা কোনো ছেলেই দেখতে পেলো না এমনকি আমার নিজের বড় ভাইয়ের সামনে আমি কখনো এমন কাপড় পড়িনি। ইসলাল ভাই বাসায় এলে আমি এইসব কাপড় পড়িই না। কে জানতো এই লম্বা খাম্বা এই মুহূর্তে আমাদের বাসায় এসেছেন। মাও কেমন, উনার আদরের বোনের ছেলে এসেছে আমাদের বাসায়।

কথাটি আমাকে এসে বলে গেলে কি এমন হতো! এখন আমি নিজের মান সম্মান বেঁচে দিয়ে এসেছি ঐ নেতার কাছে। ধুর সকালটাই মাটি হয়ে গেলো। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এখন পানি নরমাল আছে। গতকাল তো মনে হলো আমি বরফ দিয়ে মুখ ধুয়েছিলাম। ফ্রেশ হয়ে একটা কামিজ সেট পড়ে নিলাম। ওড়না একদম ঠিকভাবে ছড়িয়ে দিলাম গায়ের উপরে। নাহলে এই বজ্জাত নেতা আবার উল্টো পাল্টা কথা বলে বসে থাকবেন।

রুম থেকে বের হতেই দেখি মা এইদিকে আসছিলো। আমাকে দেখা মাত্র নানা ভাষণ শুরু করে দিলো। আমি মায়ের সাথে কথা বলে ডাইনিং এ আসলাম। দেখি খালামণি একা বসে আছে। আমাকে দেখে খালা তার দুই হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো আর আমি গিয়ে ঠেকলাম খালার বুকে। চেয়ারে বসতেই মা আমাকে বললেন পূর্ব পাশের রুমের ব্যালকনিতে সাদিফ ভাই আছে। আমি যেনো তাকে ডেকে নিয়ে আসি। মায়ের মুখের উপর কথা বলার সাহস আমার নেই। তাই আমি ধীর পায়ে রুমের দিকে এগুলাম। রুমে যেতেই সাদিফ ভাইয়ের কথা আমার কানে ভেসে এলো,

“কাজ যদি করতে না চায়, তবে তাকে শেষ করে ফেলো। আর একবার আমাদের পরিকল্পনায় যে শামিল হয়ে যায়, তাকে সেই পরিকল্পনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। যদি সে কাজে রাজি না হয় তবে তাকে দুনিয়া থেকে বিদেয় দিয়ে দাও। বাকি সব ফারুক সামলিয়ে নিবে।”
কথা শেষ করে সাদিফ ভাই দ্রুত ফিরে গেলেন পিছে।

যার কারণে আমি আর পালাতে পারলাম না। নিজেকে এখন শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার।
অতি কষ্ট করে মুখ দিয়ে কিছু শব্দ বের করলাম,

“মা আর খালামনি ডাকছে আপনাকে নাস্তা করতে।”
সাদিফ ভাই আমার কাছে এসে আমার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চোখ বুলালেন।

“কী ব্যাপার ড্রেস পরিবর্তন করে নিয়েছিস? তুই কি ভেবেছিলি ঐসব পোশাক পড়ে আমার সামনে এসে হাজির হবি আর আমাকে কাবু করে নিবি? তোর চেয়ে উন্নত মেয়েরা আমার আগে পিছে ঘুরে। তবে একটা কথা কি জানিস কি? সাদিফের মনে জায়গা করে নেওয়া এতো সহজ না।”
কথাগুলো বলে উনি চলে যেতে নিল আমি বলে উঠলাম,

“আমার কোনো ইচ্ছেও নেই আপনাকে আমার ফ্যাশন দেখানোর। একটু আগের পোশাকটা আমার রাতের পোশাক ছিলো। আপনার মতো লোকের সামনে আমি আসতেও চায় না। আর আপনাকে কাবু করার কথা তো অনেক দূরের কথা।”

সাদিফ ভাইকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি চলে এলাম। আমার পিছু পিছু সাদিফ ভাই এলো। এই লোককে সবাই ভয় পাই, আর আমি এই নিয়ে পরপর দু বার তার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছি। এইবার নিশ্চিত উনি আমাকে ছাড় দিবেন না। নাস্তা খাওয়ার সময় আমি একবারও ভুলে সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকায়নি। কেমন যেনো ভয় করছে আমার।

নাস্তা শেষে সাদিফ ভাই চলে গেলেন উনার কাজে। আর খালা আমাদের বাসায় রয়ে গেলেন। জুমু এখনো ঘুম তার বাসায়। আর ইতি আপু তার ভার্সিটিতে। জুমু আর আমি একই ভার্সিটিতে একই বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করছি। মানে জুমু এবং আমি একই সাথে পড়ালেখা করি একই ক্লাসে। মা আর খালা কথা বলছেন, আমি বাকি রুমগুলো তৈরি করছি। একটু পরে রাফসান এসে আমার সাথে যোগ দিলো কাজে। আমার ভাই আমার জান, অনেক বেশি ভালোবাসি তাকে। কাজের ফাঁকে রাফসানকে একটা চুমু দিলাম। আমার চুমুর বদলে রাফসান আমাকে বিপরীত চুমু দিলো।

আমি হাসতেই রাফসান আমার কোল থেকে নেমে রুম থেকে চলে গেলো। আমি আবারো আমার কাজে লেগে পড়লাম। আবারো রাফসান রুমে এসে আমার হাতে একটা চকলেট ধরিয়ে দিলো। আমি চকলেট হাতে নিয়ে মুখে পুরে নিলাম। অর্ধেক চকলেট শেষ করে আমার মাথায় খেয়াল এলো রাফসান এই চকলেট পেলো কোথা থেকে?

“আমার পুচকু রাফসান, চকলেট কে দিয়েছে তোমাকে?”
আমার প্রশ্নে রাফসান চকলেট চিবুতে চিবুতে বললো,

“সাদি ভাই দিয়েছে। কাল রাতে ভাইয়া তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলো। আমাকে বলেছে যদি আমি ভাইয়ার সব কথা ঠিকভাবে জবাব দিতে পারি, তবে ভাইয়া আমাকে চকলেট দিবে। আমি উনার সব কিছুর উত্তর দিয়েছিলাম, তাই আমাকে ভাইয়া এই চকলেট দিলো।”

ওহ বাবা! এই লোক আমার সম্পর্কে জানার জন্যে আমার ভাইকে চকলেট দিয়ে হাত করে নিচ্ছে। কি সাংঘাতিক লোক উনি! ওহহ বুঝেছি আমার সম্পর্কে সব তথ্য নিয়ে এরপর সাদিফ ভাই আমাকে হেনস্তা করবেন। সাদিফ ভাইয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে আমি মোটেও ভালো করিনি। এখন আমার কপালে কি আছে আল্লাহ্ ভালো জানেন। তবে উনি আপনার সম্পর্কে কি কি জিজ্ঞেস করেছেন, এই কথাটি আমার জানতেই হবে।

আমি রাফসানের দুই বাহু ধরে আমার দিকে ফিরিয়ে নিলাম। রাফসান আমার দিকে তাকাতেই আমি তাকে বললাম,

“আমার সোনা ভাই, আপুকে বলো সাদিফ ভাই তোমার কাছে কি জিজ্ঞাসা করেছে আপুর সম্পর্কে।”
“শুধু জিজ্ঞেস করেছে, তুমি কি বাসায় কারো সাথে চুপি চুপি কথা বলো? আবার এটাও জিজ্ঞেস করেছে তোমার কোনো ছেলে বন্ধু আছে নাকি। আমি শুধু একটাই জবাব দিয়েছি আমার ফুল আপি অনেক ভালো মেয়ে। আপু কখনোই উল্টো পাল্টা কাজ করেনা।”
রাফসানের উত্তরে আমি বোকা বনে গেলাম।

কি ভেবেছিলাম আর সাদিফ ভাই কি প্রশ্ন করলেন! এই লোক কি তাহলে আমাকে পার্সোনাল ভাবে অ্যাটাক করার প্ল্যান করছেন? হুহু শেফা, এই লোক থেকে তুই যতো দূরে থাকতে পারবি তোর জন্যে সেটা ততোই ভালো হবে। সাদিফ ভাইয়ের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম। এতো বড় মানুষের সাথে লড়াই করার কোনো মানেই হয়না। আমি সব রুম মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছি। আর বড় ফার্নিচার আগে থেকেই মা সেটিং করিয়ে দিয়েছেন।

আমি আমার রুমে গিয়ে ব্যালকনির মধ্যে কিছু জায়গা তৈরি করে নিলাম। এইসব জায়গায় আমি আমার প্রিয় গোলাপ ফুল রোপন করবো। এই বাসায় মোট চারটি বেড রুম আছে। এর মধ্যে একটি আমার, অন্য একটি মা, রাফসান এবং অন্য একটি বড় ভাইয়ার। এক্সট্রা রুমটা আপাতত গেস্ট রুম হিসেবে রাখা হলো। তবে আমাদের তেমন কোনো আত্মীয় নেই। আমার বাবা আমার দাদার এক মাত্র সন্তান ছিলেন। সেই সুবাদে আমাদের তেমন কোনো আত্মীয় ছিলো না।

শুধু মামা, মামী আর দুইটি মামাতো ভাইবোন আছে। এরা আমাদের একমাত্র কাছের মানুষ ছিলেন। তবে এখন আপন মানুষের খাতায় যোগ হলেন আমার খালার পরিবার। আহা! এখন নিজেকে অনেক পরিপূর্ণ মনে হয়। ব্যালকনির কাজ শেষ করে লিভিংরুমে যেতেই কলিংবেলের শব্দ পেলাম। দরজা খুলতেই জুমু আর ইতি আপু আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই দুজনকে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি।

আমার নিজের বোনের না থাকার কমতি এই দুইজন পূরণ করে দেয়। আমরা সবাই মিলে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। মা এবং খালা আড্ডার মাঝেই সব রান্না করেছিলো। আর আমি এবং আমার বোনেরা মিলে শুধু গল্পই করেছিলাম। কিছুদিন পরেই রেজাল্ট দিবে আমাদের প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের। জুমু অনেক চিন্তায় আছে রেজাল্ট নিয়ে। তবে এর চেয়ে বেশি আমার চিন্তা হচ্ছে। কারণ, আমার রেজাল্ট উল্টো পাল্টা করলেই আমার মা আমাকে ঝাঁটা পেটা করবে। মনে মনে একটাই দোআ করছি, আমার রেজাল্ট যেনো ভালো হয়। বিকালের দিকে আমরা সবাই মিলে ছাদে উঠলাম।

যেহুতু আগে এই বিল্ডিং এর সাদিফ ভাইয়েরা থাকতেন, তাই উনাদের জন্যে ছাদে আলাদা করে জায়গা তৈরি করেছিলো। বাকি অন্যান্য ভাড়াটিয়া এইদিকে প্রবেশ করতে পারে না। এখন আমরা যেহুতু তাদের বাড়িতে ভাড়া থাকছি, তাই ছাদের এই পাশ শুধু আমরাই ব্যাবহার করতে পারবো। এই জিনিসটা আমার বেশ দারুন লেগেছে। এখন থেকে আমি ছাদে একাই দোলনায় বসে আরাম করতে পারবো।

আমাদের বিল্ডিং এর পিছে একটা বড় মাঠ আছে। ছোট থেকে বড় সব ছেলেরা মিলে নানা ধরনের খেলা করছে এইখানে। অনেক উঁচুতে ছাদ হওয়ায় সব কিছু একটু বেশি সুন্দর লাগছে। আর শীতকালে প্রকৃতি এমনিও অনেক ফুরফুরা থাকে।
“এই ঐ পাশ থেকে চলে আয়। ভাই জানলে হাড় ভেঙে দিবে।”
জুমুর এমন কথায় আমি উত্তর দিলাম,

“কেনো রে? হাড় ভাঙবে কেনো?”
“ভাই এইসব পছন্দ করে না। যেকোনো একটা ছেলে তোকে দেখলে সেই কথা ভাইয়ের কানে যাবে। এরপর ভাই পাবে তোকে।”

ইতি আপু কথাগুলো খুব দ্রুত বললো।
“তোমরা তোমার ভাইকে ভয় পাও ভালো কথা, তবে আমি কেনো উনাকে ভয় পাবো? তাছাড়া আমার দিকে ছেলে তাকালে আমার হাড় কেনো ভাঙবে? আজব কথাবার্তা না?”
আমার কথায় ইতি আপু এসে আমার মাথায় হালকা করে একটা চড় দিলো।
এরপর আমাকে নিজের সাথে জড়িয়ে বললো,

“আমার বাবুরে, ছোট মাথায় এতো চাপ নিস না। মাথা ব্লাস্ট হয়ে যাবে তোর।”
জুমু এসে আমার হাত টান দিয়ে নিয়ে চললো নিচের দিকে। আর ইতি আপু আসছে আমাদের পিছে পিছে। নিচের দিকে নামতে নামতে আমি ইতি আপু আর জুমুর কথার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আসলে এইখানে তাদের কথায় কিছু একটার রহস্যময় গন্ধ পাচ্ছি আমি।


পর্ব ৫

এই বাসায় এসেছি দশদিন হতে চললো। প্রায় প্রত্যেকদিন ইতি আপু আর জুমু এই বাড়িতে আসে। আমারও সময় ভালো কেটে যায়। নাহলে বাসায় সারাদিন আমি একা একাই থাকি। অনেক সময় বই পড়ি। আমি আবার রোমান্টিক বই পড়তে বেশি ভালোবাসি। নিজে তো কখনোই রোমান্টিকতা উপলব্ধি করতে পারিনি। তাই নিজে এইসব গল্পের বই পড়ে কল্পনায় ডুবে থাকি। আমার বয়সের সবাই দুই থেকে তিনটি করে প্রেম করছে।

আর আমি এখনো ছোট বাচ্চার মতো মায়ের কথায় উঠি আর বসি। আসলে বাবা আর্মি হওয়ার কারণে সব কিছু একটা ডিসিপ্লিন অনুযায়ী ছিলো। আর মা তো বাবার পথধারী। যদিও আমার এই বিশ বছরের জীবনে বাবাকে আমি তেমন একটা কঠোর ভাবে পায়নি, তবে ভাইয়া বাবার শাসনেই বড় হয়েছে।

একবার এই প্রেমের কারণে, বাবা ভাইয়াকে সেই মাইর দিয়েছিলো। এক মাইরে ভাইয়া একেবারে সোজা হয়ে গিয়েছে। এখন পর্যন্ত ভাইয়ার সাতাশ বছরের জীবনে ভাইয়া প্রেমের মুখ দেখলো না। আর আমি তো প্রেমের কথা চিন্তায় করতে পারি না। আমি প্রেমের বিষয়ে নিঃশ্বাস ফেলেছি, এই কথা মা জানলে আমাকে জিন্দা কবর দিবে। আমি বেঁচে থাকতে চাই, নিজের মতো বাঁচতে চাই, দুনিয়াটা উপভোগ করতে চাই।

তাই এই প্রেম ভালোবাসা থেকে আমি শত হাত দূরে আছি এখনো। তবে, আমার মনে যতো প্রেমের ভাবনা সব বিয়ের পরের জন্যে জমিয়ে রেখেছি। আমার অনেক ইচ্ছে, আমার বিয়ে ঠিক হলে জামাই আর আমি চুটিয়ে প্রেম করবো। উফফ.. গল্পে, উপন্যাসে যখন নায়িকা আর নায়ক রোমান্স করে তখন আমি সেই কাহিনীতে ডুবে যাই। নিজেকে নায়িকার স্থানে কল্পনা করে কতবার যে লজ্জায় লাল নীল হয়েছি সেটার কোনো হিসেব নেই। আমি আমার কল্পনার জগতেই ভালো আছি অনেক।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমার লাগানো গোলাপ গাছে পানি স্প্রে করছিলাম। তখনই জোরে সাইরেন এর শব্দ শুনতে পেলাম। বাহিরে উঁকি দিতেই দেখতে পেলাম প্রেসিডেন্টের গাড়ি। যা ভাবছিলাম তাই। সাদিফ ভাই প্রেসিডেন্ট এর গাড়ি। অবশ্য উনি কোনো প্রেসিডেন্ট না। তবে, এই দশদিনে আমি উনাকে যতোই চিনেছি উনি কোনো প্রেসিডেন্ট থেকে কম না।

সব কিছুই তার নিজের ইচ্ছে মতোই হতে হবে। কোনো একটু জিনিস উনিশ বিশ হলে পুরো ঘরকে মাথায় তুলে ফেলেন উনি। এই মানুষটার রাগের কথা আমি শুধু শুনেছিলাম। তবে নিজের স্বচক্ষে উনার রাগ দেখে আমার সব সাহসিকতা এক নিমিষে বের হয়ে গেলো। সেদিনের কথা, খালার বাসায় একজন কর্মচারী ভুল করে আমার উপর গরম ঝোল ফেলেছিলো। আমার কোনো ক্ষতিই হলো না,

তারপরও সাদিফ ভাই সিংহের মতো গর্জিয়ে উঠেছিলেন। সাথে সাথে উনার ম্যানেজারকে ডাকিয়ে, সেই কর্মচারীর হাতে একটি চেক ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আর স্পষ্ট ভাষায় গর্জে উঠে বলেছিলেন…..
“যে লোক সামান্য খাবার সার্ভ করতে পারেনা সেই মানুষ আমার বাসায় কাজ করতে পারবেন না। এখানে পর্যাপ্ত টাকা আছে আপনি শীঘ্রই নতুন কোন চাকরি খুঁজে নিবেন। আমার ফ্যামিলি মেম্বারের উপর কোনো গাফিলতি আমি কখনোই মেনে নিব না।”

ব্যস শেষ। কর্মচারী চেক নিয়ে নিজের রাস্তা মেপে চলে গেলো। কর্মচারী সাদিফ ভাইকে এতই ভয় পাই, সে একটু আকুতি করলো না তার চাকরির জন্য। পরে আমি জুমুকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তখন জুমু উত্তর দিয়েছিলো,

“ঐ কর্মচারী যদি তৎক্ষণাৎ কিছু বলতো, তাহলে সাদিফ ভাই তার এমন অবস্থা করতো ; সে দেশের যেকোন প্রান্তে যাক না কেনো, চাকরি সে পেতো না।”

সেদিন জুমুর কথায় আমি এক বড় ঢেঁকুর গিলেছিলাম। এই লোককে আমি যতো সহজ মনে করেছিলাম, সে তো পুরোই আগুনের গোলা।

আজ আমাদের বাসায় ইসলাল ভাই আসবে। ভাইয়া প্রায় দুই মাস ধরে ঢাকায় ছিলো। আজ বাড়ি আসবে ভাইয়া দীর্ঘ এক ছুটি নিয়ে। খালার বাসার সবাইকে নিমন্ত্রন করেছে আজ মা। যদিও উনারা প্রায় প্রতিদিন আসে আমাদের বাসায়, মা স্পেশালি দাওয়াত করেছেন সাদিফ ভাইকে। আজ আমাদের বাসায় মামাদেরও একসাথে দাওয়াত করেছিলেন মা। কিন্তু খালা আসবে শুনে মামা দাওয়াত ফিরিয়ে দিয়েছেন। এর জন্যে মা কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেললেন। মায়ের একটা স্বভাব কথায় কথায় কান্না করে। আমারও একই অবস্থা। আগে বাবা প্রায় বলতো,

“রুবি, তুমি কথায় কথায় এতো কান্না করো কেনো? তোমার এই কান্নার কারণে আমার মেয়েটাও এমন ছিঁচকাঁদুনে হয়েছে।”

বাবার এমন কথা শুনে মা আরো জোরে কান্না করতো। আর বাবা! সে তো ঘর কাঁপিয়ে হাসতো। অনেক মিস করি আগের সেই দিনের কথা। সারাদিন নানা কাজে কেটে গেলেও রাতের বেলা একলা ঘরে বাবাকে অনেক বেশি মনে পড়ে। বাবার কথা ভাবতেই মন থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এখন আমার কাজে লেগে যেতে হবে।

আপাতত এখন কাজ হলো ঘর মোছা। বাথরুম থেকে বালতি ভর্তি পানি আর একটা পুরাতন কাপড় নিয়ে নিলাম। আমার মা আবার কাপড় ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ঘর মোছা পছন্দ করে না। রাফসানের সাহায্য নিয়ে আমি একটা একটা রুম মোছা শুরু করে দিলাম। রাফসান অবশ্য আমাকে বালতি ঠেলতে সাহায্য করছে। লিভিং রুম মোছা শুরু করতেই কলিংবেল বেজে উঠলো।

আমি একদম পাক্কা ছিলাম এখন খালার বাসার মেয়ে মানুষ ছাড়া আর কেউ আসবে না। কারণ, আমার ভাই আসবে বিকেলে আর সাদিফ ভাই! সে তো আসবে নাকি তাও জানিনা। তাই আমি রাফসানকে পাঠিয়ে দিলাম দরজা খুলে দিতে। আর নিজে আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ঘর মুছতে। দরজা খুলতেই খালা, জুমু, ইতি আপুর কথার শব্দ শুনতে পেলাম। চোখ তুলে তাদের দিকে তাকাতেই আমার গাল জ্বলে উঠলো।

কারণ, খালার পিছে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ ভাই। সে এখনো আমার দিকে চেয়ে আছেন। ঘর মোছার আগে আমি ওড়না খুলে রেখেছিলাম। কে জানতো এই সাদিফ ভাই এই সময় বাসায় আসবে! আমার সবাই এগিয়ে আসার আগে আমি পালাতে চাইলাম। কারণ, মা যদি আমাকে সাদিফ ভাইয়ের সামনে ওরনা ছাড়া দেখে তবে আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। তাই, আমি দ্রুত বসা থেকে উঠে দৌড় দিলাম। কিন্তু আমি তো অভাগা, আমি যেদিকে যায় সেদিকেই আমার বিপদ হয়। মেঝে ভেজা থাকার কারণে আমি পা পিছলে পড়লাম একেবারে মেঝেতে।

মাগো মা! কোমর আমার গেলো বুঝি! আমাকে তুলতে দ্রুত জুমু, ইতি আপু এগিয়ে এলো। আমি কোমর ব্যাথায় মরে যাচ্ছি। আমার হাত ধরে আমাকে উঠিয়ে দাঁড় করালো জুমু আর ইতি আপু। খালা আর মা এসে আমার আমাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। আমি লজ্জা আর ভয়ে সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকায়নি। কিন্তু সাদিফ ভাইয়ের কথা শোনে উনার দিকে তাকাতে বাধ্য হলাম আমি।
“ব্যাথা কি বেশি পেয়েছিস? ডক্টর আনতে হবে?”

আমার উত্তর দেওয়ার আগে আমার মা আমাকে ধমকিয়ে উঠলো,

“সব সময় এমন করিস কেনো তুই? সাদির কথার উত্তর দে। ব্যাথা কি বেশি পেয়েছিস?”
“না মা, ঠিক আছি আমি। একটু গরম পানির ভাব দিলেই কোমরের ব্যাথা কমে যাবে। *
আমার কথার উত্তরে সাদিফ ভাই আমাকে চেঁচিয়ে বললেন,

“ফালতুমির একটা লিমিট থাকে। একটু আগে বলেছিস ব্যাথা পাসনি। এখন বলছিস কোমরে পানির ভাব নিলে ব্যাথা কমে যাবে! এইসবের মানে কি?”

সাদিফ ভাইয়ের এমন ধমকে আমি একেবারে চুপসে গেলাম। উনাকে কিছু না বলে আমি মাকে বললাম,

“শুধু কোমরে একটু ব্যাথা পেয়েছি মা। হট ব্যাগটা দাও, আমি লাগিয়ে নিই। দশ মিনিট লাগবে আমার ব্যাথা কমতে।”

কথাগুলো বলে আমি জুমুর সাহায্য নিয়ে আমার রুমে চলে এলাম। কিভাবে কথা বলে এই লোক। আমি যেনো তার বাসার কাজের মানুষ! মানুষের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা উনি মোটেও জানেন না। নাকি আমাকে উনি মানুষের লিস্টেই রাখেননি।
“তুই ঠিক আছিস বোনু?”

আমার কাঁধে হাত রেখে জুমু আমাকে প্রশ্ন করলো।
“হ্যাঁ, আছি। তোর ভাইয়া এমন কেনো, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবি? উনাকে রাগী মুড ছাড়া আমি কখনোই দেখিনি। রাফসানের সাথে কথা বলার সময় শুধু একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসেন। এইভাবে থাকলেও চলতো। কিন্তু, উনার যা স্বভাব দেখছি! দেখিস ভাই, তোদের কপালে ভাবী জুটবে না। কারণ, সাদিফ ভাই যা রাগী! উনার বউ উনাকে রেখে পালাবে সেটা একদম নিশ্চিত।”

আমার কথায় জুমু মুখে হাত চেপে হাসলো। আর হাসতে হাসতেই বলে উঠলো,
“আমার ভাইকে এখনো চেনার অনেক বাকি আছে তোর জানেমান। আমার ভাই এর হাজারটা ভালো দিকের মাঝে এই একটা খারাপ দিক, আর সেটা হলো ওর রাগ। ভাইয়ার এখন আসার কথা ছিলো না। কিন্তু মা জোর করার কারণে সে মিটিং শেষ না করে এইখানে এসেছে। তাই, তার মেজাজ খারাপ আরকি।”

আমি চুপ করে রইলাম। মিটিং তো আজকে ছিলো। কিন্তু, আমার সাথে উনার যতবার দেখা হলো ততবারই উনি এমন কটু কথা শুনিয়েছেন আমাকে। কিন্তু, তোকে তো আর এইসব বলা যাবে না জুমু। আমি এখনো হালকা ব্যাথা অনুভব করছি কোমরে। ইতি আপু আমাকে গরম পানির ব্যাগ এনে দিয়েছে। আমি সেই ব্যাগ কোমরের নিচে দিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম। আমার দুই পাশে ইতি আপু আর জুমুও বসে রইলো। দুইজনই চুপচাপ। কিন্তু আমি বুঝছিনা হঠাৎ কি এমন হলো যার কারণে এদের মুখ বন্ধ হয়ে আছে। এমনি এলে তো তিনজন মিলে কথার সাগর বানিয়ে ফেলি।
“কি ব্যাপার! আজ সবাই এতো চুপ কেনো? কিছু কি হয়েছে?”

আমার কথায় ইতি আপু আর জুমু সোজা হয়ে বসলো।
জুমু কিছুই বলেনি তবে ইতি আপু বললো,

“তুই পরের বার থেকে একটু সাবধানে কাজ করিস। আর বেশি তাড়াহুড়ো করে কোনো কাজই করার চেষ্টা করবি না। বুঝেছিস আমার কথা?”
আপুর কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বললাম। আমার হ্যাঁ বোধক উত্তর দেখে ইতি আপু আর জুমু উভয় আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

ইসস…কি যে শান্তি লাগে আপন মানুষদের সঙ্গ পেলে! একটু পরেই উঠে চলে গেলাম রান্নাঘরে। মা একা সব করবে নাকি! যদিও আমাকে খালা আর আপুরা মানা করেছিল কাজ করতে। তবে আমি ওদের কাজ করতে মানা করে দিয়েছি। অন্যান্য দিন হলে এই ব্যাথা নিমিষে চলে যেতো। কিন্তু কথায় বলে, শীতকালে ব্যাথা পেলে নাকি সেটা অন্যান্য দিনের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যাথা অনুভব হয়। আমি ঠোঁট কামড়ে ব্যাথা সহ্য করে বাকি কাজ করছি। অবশ্য জুমু আমাকে অল্প করে সাহায্য করছে। দুপুরের খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিলাম আমি আর জুমু মিলে।

মা সাদিফ ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। মা সাদিফ ভাইকে নিজের ছেলের মতোই আদর করেন যেমনটা খালা আমাকে আর রাফসানকে করেন আদর। খাবার টেবিলে সবাই বসেছে। আমি আর মা সবাইকে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছি। হঠাৎ করে সাদিফ ভাই উনার মোবাইল আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি কিছু না বলে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু সাদিফ ভাই নরম কণ্ঠে বললেন,
“চার্জ নেই আমার মোবাইলে। একটু চার্জে লাগিয়ে দিতে পারবি?”
আমি হালকা শব্দে বললাম, ” জ্বী পারবো।”

এরপর উনার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে আমি আমার রুমে সেটি চার্জে লাগিয়ে দিলাম।
সাথে সাথেই মোবাইলের লাইট জ্বলে উঠলো আর স্ক্রিনে ভেসে এলো একজন হাস্যোজ্বল মানুষের ছবি। নিজের গাড়ির সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন উনি। আরেকটু ভালো করে উনাকে পর্যবেক্ষণ করার আগেই লাইট বন্ধ হয়ে গেল মোবাইলের। আমি আবারো পাওয়ার বাটন চেপে মোবাইলের স্ক্রিনকে সজাগ করলাম।

দুই হাত বুকের উপর গুটিয়ে, চোখে কালো রঙের চশমা পড়ে মুখে এক অদ্ভুত হাসি ঝুলিয়ে রেখেছেন সাদিফ ভাই। মুখে রোদ পড়ার কারণে সম্পূর্ণ মুখ আরো চিকচিক করছে। আর সাদিফ ভাইয়ের মুখের হাসি দেখে আমি নিমিষেই উনার মাঝে হারিয়ে গেলাম। হাসিটা কেমন যেনো, কোনো দাঁত দেখা যাচ্ছে না। শুধু অদ্ভুতভাবে প্রসারিত হয়ে আছে উনার দুইটি গোলাপী ঠোঁট। কোনো গম্ভীর লোক হাসলে বুঝি এতই সুন্দর লাগে? আচ্ছা উনি কি সত্যিই হাসতে জানেন?

এই হাসিমাখা সাদিফ ভাইকে দেখে মনে এক অন্য রকম কিছু একটা অনুভব করলাম। আগে শুনেছিলাম মানুষকে বলতে…”দোস্ত আমি তার হাসির প্রেমে পড়েছি।”তাহলে ঐ হাসিটাও কি সাদিফ ভাইয়ার হাসির মতো স্নিগ্ধ! আবারো স্ক্রিনের আলো নিভে গেলো। আমি আবারো বাটন অন করতে যাবো অমনিই রাফসানের আওয়াজ ভেসে এলো,
“ফুল আপি্‌ আমাকে ভাত খাইয়ে দাও।”

রাফসানের কথা শুনে আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম ডাইনিং রুমে। সাদিফ ভাইয়ের প্লেট অর্ধেক খালি। এতো দ্রুত খাবার খান উনি! যুদ্ধে যাবেন নাকি? সেদিকে আমি পাত্তা না দিয়ে রাফসানের কাছে এগিয়ে গেলাম। রাফসানকে খাইয়ে দিচ্ছি আর বাকি সবার সাথে কথা বলছি। সবাই কথা বলছে, চুপ করে আছেন শুধু সাদিফ ভাই। মানুষ এতো চুপচাপ থাকে কিভাবে! আমি তো দুই মিনিট চুপ করে থাকলে মনে হয় এখনই দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো।

সাদিফ ভাই আমার দিকে যেই ফিরতে যাবেন আমি অমনি অন্যদিকে তাকালাম। মা এতো জোর করেও উনাকে আর ভাত খাওয়াতে পারলেন না। যতটুকু জানতে পারলাম, সাদিফ ভাই তেমন ভাত খেতে পছন্দ করেন না। তবে, বিরিয়ানী হলে উনি নিজেই সব সাবাড় করতে প্রস্তুত থাকেন, আর বাকি সময় শুধু বিদেশি সালাদ খেতে ভালোবাসেন। যাক এক দিক দিয়ে উনি আমার সাথে মিলে যায়।

আর সেটি হলো ভাতকে অপছন্দ করা। আমি নিজে মায়ের কেলানী খেয়ে এরপর ভাত মুখে দিই। সাদিফ ভাই উঠে গেলেন একটু আগেই। আমি রাফসানকে খাইয়ে নিজেও বসে পড়লাম খেতে। অল্প ভাত খেয়ে সব কিছু গুছিয়ে রাখছি রান্নাঘরে। সাথে সাহায্য করছে আমাকে মা। কাজ শেষ করে আমি রুমের দিকে এগোলাম। জুমু আর ইতি আপু আমার খাটে শুয়ে আছে। আমি টেবিলের উপর উঁকি দিলাম সাদিফ ভাইয়ের মোবাইল আছে নাকি দেখার জন্যে। কিন্তু না, মোবাইল নেই। আজিব! মোবাইল কি তাহলে চুরি হয়ে গেলো?

“ইতি আপু, এইখানে সাদিফ ভাইয়ের মোবাইল রেখেছিলাম। তোমরা কি দেখেছো সেটি কোথায় গেলো?”

কথাগুলো আমি আপুদের উদ্দেশ্য করে বললাম টেবিলের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে।
জুমু তার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
“ভাই এসে নিয়ে গিয়েছে একটু আগেই। মাকে বলতে শুনলাম, তার ফিরতে রাত হবে। কি যেনো এক জরুরী কাজ আছে।”
জুমুর কথায় আমি ছোট্ট করে “ওহহ” বললাম।

চেয়েছিলাম তো এক নজর সাদিফ ভাইয়ের ছবিটাকেই দেখতে। অদ্ভূতভাবে আকর্ষিত করেছে আমাকে উনার এই ছবি। ইসস..যদি আরেকবার ছবিটা দেখতে পারতাম! কি সুন্দর করে হাসেন উনি! ইচ্ছে করে দেখতেই থাকি শুধু।

পরক্ষণেই নিজের মাথায় একটা চড় দিলাম। ছি! শেফা, যে লোক তোকে এতো হেনস্তা করেছে তুই তার ছবি দেখার জন্যে ব্যাকুল হয়ে গিয়েছিস কিভাবে! নিজের বোকামির কারণে নিজেই নিজেকে খুব করে বকে দিলাম।


পর্ব ৬

বিকেল নাগাদ ভাই চলে এলো বাসায়। ভাইয়ার সাথে খালামনির পরিবারের সবার অনেকবার দেখা হয়েছে। এমনকি আমি তো এটাও শুনলাম সাদিফ ভাই আর আমার ভাই একই ভার্সিটিতে পড়েছিলো। তবে সাদিফ ভাই আমার ভাইয়ের চেয়ে এক বছর সিনিয়র ছিলো।

সবাই সবার কাছেই ছিলো, কিন্তু কেউ জানতো না সবাই কতটাই আপনজন আমরা। ভাইকে পেয়ে মা এক দফা কান্না করে নিয়েছে। ভাই মাকে এতো বোঝায় কান্না না করার জন্যে, কিন্তু মা সে কারো কথা শোনে না। ভাইয়ের গলা জড়িয়ে পাক্কা বিশ মিনিট কান্না করেছেন এইবার। অন্যান্য বার আরো বেশি সময় ধরে কান্না করে মা। তবে, এইবার খালা আর বাকিরা থাকায় একটু কম কান্না করেছে।

ভাই প্রত্যেকবার ঢাকা থেকে এলে আমাদের জন্যে কিছু না কিছু আনে। আর সেই জিনিস আমি নিজ দায়িত্বে ভাইয়ের ব্যাগ থেকে বের করে নিই। এইবারও এর উল্টো আমি হতে দিবো না। ভাইকে মা ভাত পরিবেশন দিলো টেবিলে। খালা এবং মা বসে ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। আর রাফসান, ইতি আপু এবং জুমু আমার রুমে বিশ্রাম করছে। আমি সেই সুযোগে ভাইয়ের রুমে গিয়ে ব্যাগ খুলে নিলাম। প্রথমের জিনিসগুলো আমার জন্যে এনেছে সেটি আমি খুব ভালো করে জানি।

তবে ভাইয়ার কাপড়ের নিচে আমি কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি। কাপড় সরাতেই দেখতে পেলাম একটি বক্স অনেক সুন্দর করে রঙিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো। তাতে বড় অক্ষরে লিখা আছে, “আমার জানের জন্যে”। এমন লিখা দেখে আমার মনের গোয়েন্দা জেগে উঠলো।”আমার জান” বলতে এইখানে ভাইয়ার জানকে বোঝানো হয়েছে এটা আমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি। ভাইয়ার জান মানে ভাইয়ের প্রেমিকা। কই এতদিন তো ভাইয়া আমাকে এই ব্যাপারে কিছুই বললো না। নিজের প্রেমিকাকে জান বলে ডাকছে অথচ নিজের বোনকে জানালো না এই ব্যাপারে। এটা কিছু হলো?

নাকি ভাইয়া এই ব্যাপারটা আমার আর মায়ের কাছে এই কথাটি লুকাতে চেয়েছে। ভাইয়া হয়তো ভাবছে সেই ক্লাস নাইনের মতো আবারো তাকে মাইর খেতে হবে! হাহাহা, তখন তো ভাইয়া ছোট ছিলো, তাছাড়া তখন ভাইয়ের পুরো ক্যারিয়ারই বাকি ছিলো। সেই ক্লাস নাইনের মাইরের ভয়ে, ভাইয়া এখনো তার প্রেমকে লুকিয়ে রেখেছে। ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর।

“ফুল! তুই খাটের উপর কি করছিস?”
ভাইয়ার এমন ডাক শুনে আমি কেঁপে উঠলাম।

আমি হাতে থাকা বক্স ভাইকে দেখিয়ে আমার এক ভ্রু নাচিয়ে ভাইকে বললাম,
“আমার জানের জন্য! বাহ্ ভাই বাহ্। তলে তলে এত কিছু করে ফেলেছো অথচ আমাকে কিছুই জানাওনি! কিন্তু কেনো?”

আমার কথায় ভাইয়া তার মাথা চুলকিয়ে বললো,
“আমার জান মানে তোর ভাবী। আসলে মায়ের ভয়ে তোকে জানায়নি। তুই দয়া করে মাকে কিছু জানাবি না এই ব্যাপারে।”

আমি হাতের বক্স বিছানায় রেখে কোমরে নিজের হাত চেপে ভাইকে বলে উঠলাম,
“তুমি কি এখনো সেই ক্লাস নাইনের দুরন্ত কিশোর, যার প্রেম করা বারণ ছিলো? এতো ভয় কিসের ভাই? তুমি এখন ম্যাচিউর একটা ছেলে। তো বলো, ভাবীটা কে?”
ভাইয়া তার মোবাইলে কিছু একটা চেপে আমার দিকে তার মোবাইল ফেরালো,

হিজাব পড়া একটা মেয়ে, খুবই মায়াময় তার চেহারা। শ্যামবর্ণ মেয়েটিকে দেখতে পুরোই মায়াবতী মনে হচ্ছে। আমি শুধু মেয়েটিকেই দেখতে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু পাশে চোখ বুলিয়ে আমার খাম্বা ভাইকেও দেখতে পেলাম। আমার ভাইয়ের পাশে ভাবীকে একদম পিচ্চি লাগছে দেখতে। লাগবে নাই বা কেনো? আমার ভাই যে এক নাম্বার খাম্বা। ঠিক সাদিফ ভাইয়ের মতো। এই যা! কি করলাম আমি এখন? এই ব্যাপারেও সাদিফ ভাইকে টেনে আনলাম? আর কিছু ভাবতে পারিনি এর আগেই ভাই আমার সামনে চুটকি বাজালো,

“দেখা হলো? মোবাইল তো দে।”
ভাইয়ের কথা শুনে আমি ভাইকে মোবাইল দিয়ে দিলাম। দাঁত কেলিয়ে আমি ভাইকে বলে উঠলাম,
“ভাবী তো একদম মা শাহ্ আল্লাহ্। তোমার পাশে অনেক ভালো লাগছে। তো ভাবী কি করে? চাকরী করে বুঝি?”

“আমার ব্যাচমেট ছিলো মহারানী। এখন তো পেশায় উনি ডাক্তার।”
ভাইয়া মুচকি হেসে বললো।
“বাহ্ বাহ্। ভালো অনেক। যতো তাড়াতাড়ি পারো মাকেও জানিয়ে দাও। বুঝেছো?”
আমার কথায় ভাই আমার মুখ চেপে ধরলো।

“একটা থাপ্পড় দিবো তোকে। মা যেনো এই ব্যাপারে কিছু না জানে। যা করবি সব তুই করবি। তুই কি তোর ভাইয়ের সাহায্য করবি না?”
আমি ভাইয়ার মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিলাম।

“সাহায্য তো করবো, তবে আমার পকেট যেনো ভরা থাকে।”
ভাই আমাকে হাত উঁচিয়ে আমার দিক এগিয়ে আসতেই আমি দ্রুত তার রুম ত্যাগ করলাম। ইসস! আমার ভাই প্রেম করছে চুপিচুপি।

আমিও যদি একখান প্রেম করতে পারতাম, তবে কি ভালো হতো! আরে ধুর লাগবে না প্রেম। আমি এমনিতেই ঠিক আছি। রুমে গিয়ে ঘুমন্ত ইতি আপু আর জুমুকে ডেকে দিলাম আমি। আমার জন্যে তারা বিরক্তবোধ করলেও পরে ইসলাল ভাইয়ের প্রেমের ভান্ডার ফাঁস করে দিয়ে তাদের মন জয় করে নিলাম আমি। তিন বোন মিলে কোমর দুলালাম আমরা। কেনো যেনো বিয়ে নামক এক রহস্যের সন্ধান পাচ্ছি আমি।

রাত নামতেই শীত যেনো হাজারগুণ বেড়ে গেলো। শীতের কাপড় পড়ে নিলাম আমি। সারাদিন এই শীতের কাপড় না পড়লেও, রাতের শীতে আমি গরম কাপড় পড়তে বাধ্য হই। সবাই মিলে নানা আলোচনা করছি আমরা। খালামনি ইতি আপুর জন্যে পাত্র খুঁজছেন। ইতি আপুর অনার্স শেষ হলে বিয়ের জন্যে হন্যে নামবেন মাঠে খালামণি। আহা! বিয়ে মানে সুখ আর সুখ। তবে, আমি কখনোই আপনজনের বিয়েতে শামিল হতে পারিনি। কিন্তু সামনে শুধু আমি বিয়ে আর বিয়েই দেখতে পারছি।

প্রথমে ভাইয়া অথবা ইতি আপুর বিয়ে এরপর জুমুর এরপর সবার শেষে আমার বিয়ে। আরে! আমি তো সাদিফ ভাইকে ধরলাম ই না। উফ! উনাকে যে বিয়ে করবে সে মেয়ে একেবারে জিতে যাবে। কিন্তু, সমস্যা হলো উনার হাসিমুখটা না দেখলে কোনো পরিবার তার মেয়ে উনাকে দিবেন না। একটা জিনিস বুঝছি না আমি। ঘুরে ফিরে আমি কেনো বারবার উনাতেই এসে থেমে যাচ্ছি? কি হলো আমার আজ!

আমার কল্পনার জগৎ থেকে ফিরে এলাম মায়ের ডাকে। মা নির্দেশ দিলেন সবার জন্যে কফি করে দিতে। আমি মায়ের নির্দেশ পালন করতে চলে গেলাম রান্নাঘরে। একটু পরে আমার সাথে সঙ্গ দিতে এলো জুমু। সে এসে রান্নাঘরের সেলফের উপরে বসে পড়লো। বয়ম থেকে বিস্কুট নিয়ে চিবুতে চিবুতে সে বললো,

“একটু আগে না সবার জন্যে এতো রকমের নাস্তা, আর চা বানিয়েছিস। এখন আবার কষ্ট করে কফি বানাচ্ছিস কেন?”

আমি মুচকি হেসে বললাম,
“শরীর গরম করার জন্যে। যা শীত পড়ছে, মনে হচ্ছে আমি নিজেই বরফ হয়ে যাবো।”
“গুড গুড। আমারও এখন তোর কথা শুনে ঠান্ডা লাগছে। তাড়াতাড়ি কফি বানিয়ে আমাকে উদ্ধার কর বোন।”

জুমুর এমন কথায় আমি উত্তর দিলাম,
“তোর এসব নাটক বন্ধ কর। এতক্ষণ তো দিব্যি
সোয়েটার ছাড়া ঘুড়ে বেরিয়েছিস। আর আমি এখন বলার সাথে সাথেই তোর ঠান্ডা লাগছে!”
আমার কথা শুনে জুমু আমার গালে চুমু দিয়ে চলে গেলো। মুখে কিছুই বললো না। এই মেয়েটা নিশ্চয় ঠান্ডায় পাগল বনে গেলো!

সবার সাথে কথা বলতে আর আড্ডা দিতেই রাতের সাড়ে দশটা বেজে গেলো। কলিং বেলের শব্দ শুনে মা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। আমি ভেবেছিলাম সাদিফ ভাই এসেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি আলী ভাই এসেছে। আলী ভাই হলো আমার ভাইয়ের একমাত্র প্রিয় বন্ধু। যদিও আমার ভাইয়ের আরো বন্ধু আছে। তার মধ্যে আলী ভাই, আমার ভাই যেদিন বাসায় আসবে সেদিনই আমাদের বাড়িতে হাজির হবেই।

আমাকে দেখে আলী ভাই মুচকি হাসলেন। আমিও তার হাসির বিপরীতে একটু হাসলাম। আলী ভাই অনেক রসিক দিলের মানুষ। মানুষকে নিমিষেই হাসাতে পারে। আলী ভাই এসে আয়েশ করে বসে পড়লেন সোফায়। মা উনাকে নাস্তা খাবে নাকি জিজ্ঞেস করেছিল। তবে উনি একেবারে ভাত খাবেন বলে জানিয়েছেন। আমি আর মা মিলে সব ঠিক করছি। সাদিফ ভাই আসবে নাকি আল্লাহ্ ভালো জানেন। এই লোককে আমি তার বাসায় গেলে প্রায় দেখিনা।

এতো কাজ তার! রাজনীতির পাশাপাশি উনার বাবার ব্যবসা সামলান। একটা লোক কিভাবে এতো কাজ করতে পারেন এটা আমার মাথায় আসছে না। অনেক কঠোর পরিশ্রম করেন এই সাদিফ ভাই। ধুর বাবা! আমি আবারো এই লম্বুর বিষয়ে চিন্তা করা শুরু করে দিলাম! নিজের কাজে নিজে বেশ লজ্জাবোধ করছি। আমি হঠাৎ উনার কথা এতো ভাবতে শুরু করলাম কেনো?

খাওয়ার টেবিলে সবাই বসেছে। শুধু আমি আর মা আবারো সবাইকে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছি। কলিং বেলের শব্দ শুনে আমি এগিয়ে গেলাম দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই সাদিফ ভাইকে দেখলাম। কালো রঙের জ্যাকেট আর গাঢ় নীল জিন্সে সাদিফ ভাইকে বড্ড মোহনীয় লাগছে। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তো উনি পাঞ্জাবী পড়েছিলেন। তাহলে কি উনি আবার বাসায় গিয়ে কাপড় পরিবর্তন করেছেন?
“কি ব্যাপার? সামনে থেকে সর।”

সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমি সামনে থেকে সরে গেলাম। আর সাদিফ ভাই ভেতরে এসে লিভিং রুমের সোফায় এসে বসে পড়লেন।
“আপনি খাবেন না?”

আমার প্রশ্নে সাদিফ ভাই সোজা হয়ে বসলেন,
” হুমমম, খাবো। তবে ভাত না, বরং তোকে।”

সাদিফ ভাইয়ের এমন উত্তরে আমার জগৎ ঘুরে গেলো। কি বললেন উনি এই মাত্র! আমি উনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সাদিফ ভাই হাহা করে হেসে উঠলেন। আমার যেখানে রাগ করার কথা সেখানে এই লোকের অট্টহাসি দেখে আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার যে আঁকাবাঁকা দাঁত আছে সেটি আমি এই প্রথম দেখলাম। সাদিফ ভাইয়ের সামনের দাঁতগুলো সমান কিন্তু ভেতরের দাঁতগুলো এলোমেলো। তবে, এতো সুন্দর কেনো? কেনো মানে কেনো?

“নাহ আমি ডিনার করবো না। দাওয়াত ছিলো খেয়ে এসেছি। এখন রাফসানের সাথে দেখা করতে এসেছি।”

মুচকি হেসে সাদিফ ভাই এই কথাটি বললেন।

আমি তার কথা শুনে চুপচাপ চলে আসলাম ডাইনিং এ। এই লোক দেখি সাংঘাতিক ফাজিল। তার উপর কি সুন্দর! আজকে উনার এতো সুন্দর রূপ দেখে আমি নিজেই ফিদা হয়ে গেলাম। খাবারের শেষে সবাইকে দই পরিবেশন করলাম। সবাই এখন লিভিং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। দই পরিবেশনের সময় দেখলাম সাদিফ ভাই আমার ভাই এবং আলী ভাইয়ের সাথে মুচকি হেসে কথা বলছে। লোকটা যে হাসতে পারে এই ব্যাপারটা আমি আজ ভালো করেই লক্ষ্য করেছি।

সবাইকে পরিবেশন করে আমি সোফায় বসে পড়লাম। মোবাইল চালানো শুরু করতেই আলী ভাইয়ের কন্ঠ শুনে উনার দিকে ফিরলাম।

“শেফা! তুই কবে থেকে দই খাওয়া শুরু করবি?”
আমি আমার গায়ের চাদর মাথায় পেঁচিয়ে তাকে জবাব দিলাম,
“আমি তো দই খাই না আলী ভাই।”

“খাস না জানি। কিন্তু খাওয়ার অভ্যাস কর। দই খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্যে অনেক ভালো।”
আলী ভাইয়ের এমন কথায় আমি শুধু অল্প হাসলাম।

ডান পাশে ফিরতেই দেখলাম সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। উনার দিকে চোখ পড়তেই আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম নিচে। কিন্তু তখনো সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেটি আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম। একটু পরেই আলী ভাই চলে গেলেন। ইতি আপু আর জুমু আজকে আমাদের বাসায় থাকবে।

তাই তারা আমার রুমে পোশাক পরিবর্তন করতে গেলো। ইসলাল ভাইয়ের ফোন আসায় সে চললো তার রুমের দিকে। আমি দইয়ের বাটি টেবিল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,
“আলী নামক ছেলেটি থেকে দূরে থাকবি। আর আমি বুঝি না, বাহিরের ছেলে বসে ছিল তোর সামনে আর তুই আরো সুন্দর ভাবে তার সামনে বসে ছিলি কিভাবে?”

আমি অবাক হয়ে উনাকে বললাম,

“উনি আমাকে ছোট কাল থেকেই চিনেন। আমাকে নিজের বোনের মতোই আদর করেন উনি।”
“বোন না কিসের মতো আদর করে সেটা আমি দেখেই বুঝেছি। শকুনের মতো তাকিয়ে ছিলো তোর দিকে। আমি মানা করেছি ব্যস! আর এইভাবে মাথায় কাপড় ছড়িয়ে নিজের সাদা মুখের উপর লাল নাকটাকে কি হাইলাইট করছিলি তুই? বিশ্বাস কর, তোকে দেখতে পুরোই বানরের মতো লাগছিলো।”
সাদিফ ভাইয়ের কথা শুনে মেজাজটাই খারাপ লাগলো আমার। এতো অপমান! শেষ পর্যন্ত আমাকে বানর ডাকলো এই লোক।

“আপনার কাছে হয়তো আমাকে দেখতে বানরের মতো লাগে। কিন্তু এখনো আমার পিছে কতো ছেলে ঘুরে সেটা তো আপনি জানেন না। আমি প্রেম করবো জানলে, শত ছেলে আমার পিছে লাইন ধরবে।”

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাদিফ ভাই এসে আমার হাত চেপে ধরলেন। আমি তার দিকে তাকাতেই রাগে তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দেখে আমার বুক ধুকধুক করে উঠলো।
“কোন ছেলে? নাম বল?”

সাদিফ ভাইয়ের প্রশ্নে আমি বললাম,
“কেউ না। আমি শুধু এমনি বললাম।”
এইবার উনি আমার হাত ছেড়ে দিলেন। সাদিফ ভাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খালামণিকে চেঁচিয়ে বললেন,
“মা, আমি যাচ্ছি। তুমি তৈরি হলে চলো আমার সাথে।”

উনার ডাক শুনে খালামণি চলে এলো। অতঃপর মা থেকে বিদেয় নিয়ে সাদিফ ভাই বেরিয়ে গেলেন আমাদের বাসা থেকে। আর খালা আমাকে আদর করে সাদিফ ভাইয়ের পরপর বেরিয়ে পড়লো।
আমি এখনো দইয়ের বাটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সাদিফ ভাইয়ের একটু আগের কাহিনী আমার এই ছোট্ট মাথায় প্রবেশ করছে না।


পর্ব ৭

আজ রাতে আমার আর ঘুম হবে না, এটি আমি একশত পার্সেন্ট শিউর। কারণ, ইতি আপু আর জুমু আমাদের বাসায় থাকলে আমরা রাতভর আড্ডা দিই। আগের বাড়িতেও আমরা অনেক আড্ডা দিতাম। কিছুক্ষণ আগের সাদিফ ভাইয়ের কথা আমি মাথা থেকে ঝেড়ে আইস্ক্রিম নিয়ে আমার রুমে এগিয়ে গেলাম। আপু এবং জুমু অলরেডি মুভি সিলেক্ট করে রেখেছে।

আমি দ্রুত আইস্ক্রিমের বাটি নিয়ে এগিয়ে গেলাম বিছানায়। এক লিটার আইস্ক্রিম আমি তিন ভাগ করে নিলাম। শীতের রাতে আইস্ক্রিম খাওয়ার মজাই আলাদা। এটা খেয়ে আমার গলা ব্যাথা করবে আমি জানি, কিন্তু তাতে আমার কি! আমি আইস্ক্রিম খাবো। মা অবশ্য জানেনা আমি এখন চুরি করে আইস্ক্রিম পাচার করছি। মা যদি জানতো এই কথা, তাহলে কবেই আমার মাথা ফাটিয়ে দিতেন।

তাই মাকে ঘুমানোর জন্যে পাঠিয়ে দিয়ে বাকি কাজ করেছি আমি একা। এরপর সুযোগ বুঝেই আইস্ক্রিম পাচার করে আমি রুমে নিয়ে আসলাম। আজ আমরা এ সালমান খানের একটা বিখ্যাত মুভি “তেরে নাম”দেখবো। এই মুভিটা আমার অনেক প্রিয়। যখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে ছিলাম, তখন থেকেই এই মুভি আমার নজরে আটকে গিয়েছে। ভারতের বিখ্যাত নায়ক সালমান খানের এই মুভিতে চুলের স্টাইলটা অনেক বেশি ভালো লাগতো আমার। কিন্তু এখন এই স্টাইল দেখলে আমার ভালো কম লাগে বরং হাসি বেশি আসে।

তবে এই মুভির কাহিনী আমার মনে এখনো জায়গা দখল করে আছে। এই মুভির হিরোইন এর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমার এখনো কান্না চলে আসে। তবে সালমান খান আর নায়িকার প্রেম কাহিনী আমার বেশ লাগে। আমি, ইতি আপু আর জুমু আমরা তিনজন মনের সুখে বসে মুভ দেখছি আর আইস্ক্রিম খাচ্ছি। আইস্ক্রিম খাওয়ার কারণে অলরেডি আমার গলা ব্যাথা শুরু হলো। তারপরেও আমি দমে যাবো না। আজ মুভি দেখে এই আইস্ক্রিমের বাটি আমি শেষ করবোই।
“এই দোস্ত ওড়নি গানটা আসলে কিন্তু আমরা দুইজন মিলে নাচবো।

জুমু আমার কাঁধে হাত রেখে বললো।
“আচ্ছা, নাচবো।”
আমি আইস্ক্রিম মুখে পুরে দিয়ে বললাম।

মুভিতে এখন সালমান খান নায়িকাকে নানা কাজ করার অর্ডার দেন, এই সিন চলছে। সালমান খানের সিগারেট ফুঁকার দৃশ্যটা আমার বেশ লাগে। ছেলেরা যখন সিগারেট ফুঁকে তখন এদের দেখতে আমার নায়ক নায়ক মনে হয়। তবে আমার ভাই সিগারেট দুই চোখেই দেখতে পারে না। অবশ্য সিগারেট খাওয়া ভালো না। এতে নানা রোগ হয়। নিজের মনের কথায় আমি নিজেই হেসে উঠলাম। সেই মুভির নায়কের সিগারেট খাওয়া থেকে আমি কই কই চলে গেলাম।

আল্লাহ্! আমার মত পাগল মানুষ দুনিয়ায় আর একটিও নেই। আমি আর জুমু মন দিয়ে মুভি দেখলেও ইতি আপু আপাতত মোবাইলে ফিসফিস করছে। আমরা দুইজন এই জিনিস বুঝেও না বুঝার ভান করে রইলাম। একটু পরে গান আসলেই, আমি আর জুমু দুইজন দুইটি ওড়না নিয়ে নায়িকার স্টাইল করার চেষ্টা করছি। জুমু আর ইতি আপু আমার বাসায় থাকলে এই মজা করার জিনিসটাই আমার বেশি পছন্দের। ইতি আপু এখন ফোন রেখে আমার আর জুমুর নাচের ভিডিও করছে। গান শেষ হলে আমরা দুইজন আবারও বসে পড়লাম ল্যাপটপের সামনে। নাচ করে হাপিয়ে গেলাম আমি। বাটিতে একটু উকি দিলাম আইস্ক্রিম আছে নাকি দেখার জন্যে।

কিন্তু আমি নিজেই তো একটু আগে চেটেপুটে বাটির সব আইস্ক্রিম খেয়ে নিলাম। গলা ব্যাথা করার কারণে আমি গলায় ওড়নাটা পেঁচিয়ে গলা বন্ধ করে দিলাম। আমি জুমু আর ইতি আপু এখন পুরোই মুভির ভেতর ঢুকে পড়েছি। অবেশেষে সেই মুহূর্ত চলে এলো যখন নায়িকা মারা যায়। এই দৃশ্য দেখে আমার চোখে জমা হলো নোনাজল। অনেক্ষণ যাবত নিজের চোখের পানি আড়াল করলেও সালমান খানের পাগল হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমি নাক টেনে কান্না করে দিলাম।

আমার কান্নার দিকে তাকিয়ে আছে জুমু আর ইতি আপু। আমার কান্না দেখে জুমু বিছানায় গড়াগড়ি করে হাসছে। আর ইতি আপু আবারও আমার ভিডিও করছে। আমি মুখে ওড়না চেপে ধরে চোখের পানি ফেলছি। আর জুমু এখনো হাসছে।
জুমু তার পেট চেপে ধরে বললো,

“আল্লাহ্, আর পারছি না হাসতে। এই বাচ্চা মেয়েটা মুভি দেখে কান্না করছে। এইখানে কান্নার কি হলো? গাঁধী মেয়ে।”
কথাগুলো বলে জুমু আবারও হেসে উঠলো।

আমি ওড়নায় নিজের নাক আর চোখের পানি মুছে জুমুর দিকে ফিরলাম।
“আমার খুব কষ্ট লাগে এইসব দেখলে। দেখলি না সালমান পাগল হয়ে গেলো। আর নায়িকাটা তো মারায় গেলো। আহারে, ওরা একসাথে হতে পারলো না।”

ইতি আপু ভিডিও করা বন্ধ করে আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলেন।
“আরে গাঁধী, তারা মুভিতেই এমন অ্যাকটিং করেছে। বাস্তব জীবনে তারা এখন কি করছে জানিস না! এইভাবে কান্না করার কি আছে!”

ইতি আপুর কথায় আমি নিজের চোখ মুছে কান্না থামানোর চেষ্টা করলাম।

“আমি কি করবো? ভালোবাসার মাঝে এইসব কষ্ট দেখলে আমার একদম ভালো লাগে না। কিন্তু এই মুভির বাকি সব সুন্দর। শুধু এই নায়িকার মরে যাওয়া আর নায়কের পাগল হয়ে যাওয়াটা মোটেও আমার ভালো লাগে না। তবে এর কাহিনী অনেক সুন্দর।”
কথাটি বলে আমার থামানো কান্না আবারও বেগপ্রাপ্ত হলো।
আর আমার কান্না দেখে জুমু এসে আমার মাথায় একটা চড় দিলো।

“ধুর বান্দর কান্না বন্ধ কর। এগুলো সব ভূয়া। আর তুই এই মুভি কি একবার দেখেছিস নাকি? তোর এটা প্রিয় মুভি। তার মানে এটা তুই আরো অনেকবার দেখেছিস। তাহলে এত কান্না করছিস কেনো?”
“যেমন তুই টাইটানিক মুভি দেখে কান্না করিস বারবার। আমারও এই মুভি দেখলে কান্না পায়।”
আমি বললাম রেগে জুমুকে।

জুমুকে কিছু বলতে না দিয়ে ইতি আপু এই চলমান মুভি বন্ধ করে দিলেন।
“অনেক হয়েছে। এইবার আমরা নাচ গান দেখবো। কিসব পাগল নিয়ে আমার মেলা বসেছে।”
ইতি আপু মাথায় হাত দিয়ে বললেন।

মুভি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে আমার কান্নাও থেমে গেলো। আমি দুইহাতে ভালো করে চোখের পানি মুছে এইবার নাচ গানে মন দিলাম। শুধু তাই নয় গানের তালে তালে আমি এখন নেচে চলেছি।
“দেখলে আপু এই মেয়ের কাহিনী! একটু আগে ইমোশনাল হয়ে একেবারে কান্না করে মরে যাচ্ছিলো। আর এখন সে কোমর দুলিয়ে চললো! কি যা তা অবস্থা!”
কথাগুলো বলে জুমু আমার দিকে রাগী চোখে তাকালো।

“আজিব! কান্না আসলে, কান্না না করে হা করে থাকব নাকি? তোদের মত পাথর হৃদয় না আমার।”
আমি গাল ফুলিয়ে বললাম।
“চুপ একদম বহুরূপী।”
জুমু আমার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালো।

এইবার আমিও তার কথার বিপরীতে অন্য কথা বললাম। অতঃপর বেজে গেলো আমাদের মাঝে তুমুল ঝগড়া। ইতি আপু অনেক কষ্ট করে আমাদের সামলিয়ে নিলেন। জুমু ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে নিজেই কম্বলের ভেতর ল্যাপটপ নিয়ে শুয়ে পড়লো। আমিও গাল ফুলিয়ে অন্য দিকে শুয়ে পড়লাম।

আরমাঝখানে ইতি অবাক চোখে এই দুই মেয়ের কান্ড দেখছে। ভালোতে এই দুই মেয়ে এতই ভালো যে নিজেদের কলিজা কেটে খাওয়াবে দুইজন দুইজনকে। আর ঝগড়া লেগে গেলে তো একেবারে লন্ডকান্ড বাঁধিয়ে দেয় এরা। আল্লাহ্ জানে তাদের এই রং ঢং কবে বন্ধ হবে! ইতির মোবাইলে ফোন আসলে সে মোবাইল নিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো।

রাগে আমার মাথা যাচ্ছে। এই জুমুর বাচ্চা তো একদম দুই নম্বর একটা মেয়ে। আমাকে বহুরূপী বলে কিভাবে? হ্যাঁ আমি একটু ইমোশনাল। খুব সহজে ভেঙে পড়ি সেটা বাস্তব জীবন হোক বা কোনো মুভি দেখে। কিন্তু আমি মেয়েটা অনেক ভালো। হু, আর কথা নেই এই জুম্বালিকার সাথে। জুমুকে মনে মনে বকে দিয়ে আমি কম্বল মুখের উপর দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।

ইতি ব্যালকনি থেকে এসে দেখে এই দুই মেয়ে দুইজনকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। কি আশ্চর্য কাজ কারবার এদের। কে বলবে এরা একটু আগে তুমুল ঝগড়া করেছে! ইতি ভালো করে শেফা আর জুমুর গায়ে কম্বল দিয়ে নিজে শুয়ে পড়লো শেফার পাশে।

সকালে ঘুম ভাঙলো আমার প্রত্যেকদিন এর নিয়মে। গলায় আমি বেশ চাপ অনুভব করছি। একটু পরেই বুঝতে পারলাম আমার টনসিলের সমস্যার কারণে গলা ব্যাথা শুরু হলো। আমি আমার গায়ের উপর থেকে জুমুর হাত সরিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। জুমুকে আমার পাশে দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছি। কিন্তু তার এই ঘুমন্ত মুখ দেখে আমার রাগ নিমিষেই চলে গেল। আমি জুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে পড়লাম বিছানা থেকে। ইতি আপু আর জুমু এখনো নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।

আমি গরম পানি করে নিলাম নিজের জন্যে। বাহিরে একদম আঁধার ছেয়ে আছে কুয়াশার কারণে। আমি চুলায় গরম পানি বসিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা এখনো ঘুম মনে হচ্ছে। আমি গলায় ওড়নাটা পেঁচিয়ে আছি সেই রাত থেকে। সামান্য ঢেঁকুর গিলতে কষ্ট হচ্ছে আমার এখন। গলার এমন অবস্থা হবে জেনেও আমি কাল রাতে আইস্ক্রিম খেয়েছি।

মা জানতে পারলে আমার রেহায় নেই। সাইরেনের শব্দ শুনে আমি মাথা নিচু করে তাকালাম। সাদিফ ভাইয়ের গাড়ি এবং সাথে উনার বডি গার্ডদের গাড়ি দেখতে পেলাম। সাদিফ ভাইয়ের কথা মাথায় আসতেই কাল রাতের কথা মনে এলো আমার। কেমন যেনো অদ্ভুত ব্যাবহার করেছিলেন উনি আমার সাথে। আমার জন্যে প্রেমের প্রস্তাব আসলে উনার কি! যত্তসব ঢং। আমি চললাম রান্নাঘরের দিকে।

মা জেগে যাওয়ার আগে এই গলা ব্যাথার কিছু করতে হবে। গরম পানি নিয়ে ভালো করে নিজের হাত মুখ ধুয়ে নিলাম আমি। এরপর গরমপানি আর লবনের মিশ্রন দিয়ে আমি গড়গড়া করে নিলাম। যদি একটু কমে যায় ব্যাথা তাহলে আমার জন্যে লাভ হবে। আমি ফ্রেশ হয়ে নিয়ে, আবারও রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্যে নাস্তা বানানো শুরু করলাম। একটু পরে আমার ভাই এলো রান্নাঘরে।
এসেই আমাকে নির্দেশ দিলেন,

“ফুল, গরম গরম এককাপ কফি দিবি? জগিং করে আমি অনেক ক্লান্ত।”
আমি ঘাড় বাঁকিয়ে আমার ভাইয়ের দিকে তাকালাম। সে এইমাত্র জগিং থেকে এসেছে, সেটি তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আমি চুলায় কফির পানি বসিয়ে আমার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললাম,

“দেখতে তো মা শাহ্ আল্লাহ্ ভালো আছো। শরীরটাও ফিট আছে তোমার। তাহলে এত জগিং করার কি দরকার তোমার? ! তাছাড়া এই শীতকালে ঘুম থেকে উঠো কিভাবে?”
“আমার চেয়ে সাদিফ ভাইয়ের শরীর আরো বেশি ফিট আছে। কিন্তু তাও সাদিফ ভাই জগিং করতে বের হোন। আবার ঘরেও ব্যায়াম করেন। উনার জন্যে কি বলবি তুই?”
আমি হাতের ইশারায় বললাম,

“উনার তো মাথায় গন্ডগোল আছে, তাই আরকি এইসব কাজ করেন।”
আমার পুরো কথা শেষ করার আগেই মা আমাকে চেচিয়ে উঠলেন….
“এই মেয়ে, ভাঙ্গা গলায় কথা বলছিস কেনো? গলায় কি হলো তোর?”
আয়হায়, মা এইবার আমাকে পেয়েছে। আমি মুচকি হেসে মাকে বললাম,
“ঠান্ডা পড়ছে অনেক। তাই হয়তো গলার শব্দ এমন শোনাচ্ছে। আমি আইস্ক্রিম ধরিনি মা।”
আমার কথায় মা এসে আমার পিঠে একটা চড় দিলেন।

“মিথ্যে আমার কাছে কেনো বলতে আসিস? যদি মিথ্যে বলতেই না পারিস। গতকাল আমি রেখেছিলাম আইস্ক্রিম ফ্রিজে। আজ সেটা গায়েব।”

“আহ মা, ওকে মারছো কেনো? ফুল, এইসব কানে নিস না তুই। ভাইয়ের জন্যে কফি বানিয়ে দে প্লিজ।”
ইসলাল ভাই আবেদনের সুরে বললেন।

“চুপ কর, তুই। দুইভাই বোন এইখান থেকে যা। আরেকটা কথা শুনলেই মাইর দিয়ে পিঠের ছাল তুলে দিবো। কফি আমি দিয়ে দিচ্ছি ইসলাল। ফুল রুমে গিয়ে সিরাপ খেয়ে নে।”

মায়ের কথায় আমি দ্রুত করে চলে এলাম রুমে। ইতি আপু আর জুমু ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। জুমু আমাকে দেখে মুখ বাকালো। আমিও তাকে মুখ ভেংচি দিলাম। ইতি আপুর সাথে কথায় লেগে যাওয়ার কারণে আমি আর সিরাপ খেলাম না। ভাবলাম এমনি ভালো হয়ে যাবে গলার অবস্থা।

কিন্তু কাশি উঠার কারণে গলার অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেলো। গরম কফি খেয়েও লাভ হয়নি। সিরাপ পর্যন্ত খেলাম, তাও গলার ভাঙ্গা শব্দের পরিবর্তন হলো না। সারাদিন কেটে গেলো আমার মায়ের বকুনি শুনে। বিকালের দিকে জুমু আর ইতি আপু চলে গেলো তাদের বাসায়। তারা চলে যাওয়ার দশ মিনিট পরে খালামণি ফোন করে আমার ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করেছিলেন।

গলার অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে আমি মায়ের সামনে তেমন যায়নি। আমার আজকের খাবার আমার দুই ভাই এনে দিয়েছিল আমার রুমে। মা রাগ করে আমার সাথে দেখা করতেই এলো না। আর আমি মায়ের ভয়ে মায়ের সামনে গেলাম না। ঘড়িতে রাত এগারোটা। ইসলাল ভাই এই মাত্র আমাকে ভাত খাইয়ে গেলেন। ভাইয়া রুম থেকে বের হতেই মা আসলো রুমে, হাতে উনার দুধের গ্লাস। মাকে দেখে আমি একটা ঢেঁকুর গিললাম। মা এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“এইভাবে ছেলেমানুষী করলে তো শরীর খারাপ আরো বেশি বেড়ে যাবে। আর কখনোই যেনো এইসব না খাস ঠান্ডাকালে। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে তোর টনসিলের বেশি সমস্যা হলে অপারেশন করতে হবে। আমার এইসব ভালো লাগে না ফুল। এখন এই গ্লাস আমার সম্পূর্ন খালি চায়।”

মায়ের এমন শান্ত কথা শুনে আমি চুপচাপ দুধের গ্লাসে চুমুক দিলাম। আর মা আমার মাথায় আস্তে করে বিলি কেটে দিচ্ছেন। বেশ শান্তি লাগছে আমার।

আসলে মা আমাকে যতই বকাবকি করুক, মা আমাকে তার নিজের থেকেই বেশি ভালোবাসেন। এই কথার আমি বারবার প্রমাণ পায়। মা আমাকে শুইয়ে দিয়ে রুম থেকে চলে গেলেন। আমার রুমে জ্বলছে হালকা লাল রঙের লাইট। গলা ব্যাথায় থাকার কারণে আমি কম্বলটা গলার সাথে লাগিয়ে দিলাম ভালো করে। হঠাৎ ফোনে কল আসায় আমি মোবাইল হাতে নিলাম। এই নাম্বারটি আমার অচেনা। অনেক্ষণ পরে আমি মোবাইল রিসিভ করলাম। ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলাম,

“আসসালমুআলাইকুম, কে?”
“যেই মেয়ে সামান্য একটা মুভি দেখে কান্না করে,
শীতকালে সেই মেয়ের আইস্ক্রিম খাওয়া মোটেই শোভা দেয় না। তার উচিত এই ঠান্ডায় বসে ফিডার খাওয়া।”

এমন পাগল মার্কা কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। আমি ভাঙ্গা গলায় আবারও বললাম,
“এই ভাই, কে আপনি? কিসব কথা বলছেন?”

“আমি সাদিফ। এই ঠান্ডায় আইস্ক্রিম খাওয়ার আগে নিজের ভাঙা গলার কথা একবারও মনে পড়লো না তোর? এইসব ন্যাকামো সিনেমায় সুন্দর লাগে। বাস্তব জীবনে এইসব একদম খাটায় না।

আমার বাসা এখন ঐ দুইজনের কাশির শব্দে মুখরিত হচ্ছে। খুব নায়িকা ভাবিস তোরা নিজেদের! সামনাসামনি পেলে একেবারে থাপড়িয়ে গাল লাল করে দিতাম। বেয়াদবের দল যত্তসব। আর কখনোই যেনো এইসব অভিযোগ না আসে তোদের বিরুদ্ধে। নাহলে তোর এই ভাঙা গলা আমি সত্যিকারে আরো ভেঙে দিবো। মেডিসিন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়।”

একনাগাড়ে রাগী কণ্ঠে কথাগুলো বলে সাদিফ ভাই ফোন রেখে দিলেন। আর আমি বেক্কলের মতো বসে আছি। মুভির কথা উনি জানলেন কি করে? তাছাড়া আমার যায় হোক, উনার কি সমস্যা? কিছু তো বলতেই দিলেন না। এর আগেই ফোন কেটে দিলেন। ইস, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি! খাবো না আমি ওষুধ আপনার এতে কি সাদিফ ভাই? আজ পর্যন্ত ভালো করে কথায় বললো না। আবার দেমাগ দেখাতে আসে। এইসব লোক নিজেদের কি ভাবে আল্লাহ্ বাকি জানেন।


পর্ব ৮

টানা তিন দিন আমার গলায় বেশ ব্যাথা ছিলো। এই তিনদিন আমার কেটেছে মায়ের বানানো তিতা একটা সিরাপ পান করে। কি বাজে এর স্বাদ! কিন্তু মায়ের মুখের উপর কথা বলার সাহস আমার আজ পর্যন্ত হলো না। অগত্য আমি সেই তিতা সিরাপ পান করে ছিলাম। এক দিক দিয়ে ভালোই হলো। এই সিরাপ খেয়ে আমার গলার অবস্থার বেশ ভালই উন্নতি হয়েছে। আজ আমাদের প্রথম বর্ষের ফলাফল দিবে। জুমু একেবারে সকাল থেকেই নামাজে দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহ্ এর কাছে তার শুধু একটাই দোয়া, ফলাফল যেনো মান সম্মত আসে। অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ আছে।

আর এই কারণ হলো সাদিফ ভাই। ভার্সিটিতে জুমুকে সবাই চিনে সাদিফ ভাইয়ের বোন হিসেবে। তাই, ফলাফল একটু খারাপ হলেই সাদিফ ভাই জুমুকে ছেড়ে কথা বলবে না। যার কারণে জুমু সকাল থেকেই দোয়া করে যাচ্ছে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে। এই জুমু আর ইতি আপু কিভাবে যে সহ্য করে সাদিফ ভাইকে! ভাগ্যিস আমার এমন রাগী কোনো বড় ভাই নেই। নাহলে আমার রক্ষে ছিলো না।

ফলাফল দিবে আজ আর আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আর আমার ভাইয়েরও আমার ফলাফলের দিকে নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ। আমার দুইভাই আর আমি মিলে দিব্যি “দারুচিনি দ্বীপ”দেখে চলেছি। অবশ্য মা একটু বাঁকা চোখে দেখে আছেন আমার দিকে। কারণ আমার মাঝে ফলাফলের কোনো চিন্তা মা দেখতে পাচ্ছে না। এই সাদিফ ভাই আর আমার মা দুইজন এক নৌকার মাঝি। এদের রাগ যেনো নাকের আগাতে থাকে। মায়ের দিকে আর নজর দিলাম না। আমি এখন টিভির দিকে মন দিয়েছি। দুপুরের দিকে ভার্সিটি যাবো। কারণ আমাদের ফলাফল দিবে ভার্সিটিতেই।

আমি আর আমার ভাই ভার্সিটি যাবো ফলাফল দেখতে। জুমুকে আমাদের সাথেই যাবে। যদিও সে আলাদা তাদের গাড়ি করে যেতে পারতো, তবে জুমু আমায় ছাড়া চোখে কিছু দেখে না। টিভি দেখার মাঝে আমার মা আমার দিকে এক প্লেট ভাত এগিয়ে দিলেন। আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম মায়ের দিকে।
“ভাত ছাড়া তুই এই বাড়ি থেকে বের হতে পারবি না। তোর ভাই তো জানিয়ে দিলো এসে খাবে। কিন্তু তুই এই কথা বললেও আমি তোর কোনো কথা শুনবো না। চুপচাপ ভাত খেয়ে নে।”

“আমি খাবো না ভাত। এমন করো কেনো মা? আমি ভাইয়ার সাথে বাসায় এসে খাবো ভাত।”
আমার কথায় মা আমাকে ইশারায় চড় দেখালেন।

“এই বয়সে মায়ের হাতের মাইর দিলে, ভালো লাগবে না তোর। ভাত গিলে নে।”
মায়ের কথায় আমি তাও নড়লাম না। রোবটের মতো বসে আছি।

“উফ মা, তুমি ফুলকে এমন করো কেনো? সে তো বলেছে আমার সাথে বাসায় এসে ভাত খাবে।”
“একদম চুপ কর ইসলাল। তোর বোন কেমন, সেটা তোর অজানা নয়। সারাদিন চলে যায় এই মেয়ের খাবারের দিকে কোনো জ্ঞান থাকে না। এই খাবার না খাওয়ার জন্যে কোনদিন তার উপর বিপদ আসে দেখিস।”

কথাগুলো বলে মা আমার পাশ থেকে রাফসানকে সরিয়ে দিয়ে নিজে বসে পড়লেন।
অগত্য মা আমাকে রাগী ভাবে ভাত খাইয়ে দেওয়া আরম্ভ করলেন। মা আমাকে এমনভাবে খাওয়াচ্ছে যার কারণে আমার মুখের চারপাশে ভাতে মাখামাখি হয়ে আছে।
আমাকে দেখে রাফসান হেসে উঠলো,
“ফুল আপু, তোমাকে দেখতে হাস্যকর লাগছে।”

রাফসানের কথায় আমি মুচকি হেসে আমার হাত দিয়ে মুখের পাশে লাগা ঝোল মুছে নিয়েছি। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, মাও মুচকি হাসছে। এই মা একদম পুরো সাদিফ ভাই। কিভাবে মুচকি মুচকি হাসে। এই হাসি দেখলে তাদের সাথে আর রাগ করে থাকা যায় না। মায়ের মুচকি হাসি দেখে আমার মনে শীতল হাওয়া বয়ে গেলেও আমি উপরে মাকে রাগ দেখাচ্ছি।

অবশেষে আমাকে এক প্লেট ভাত খাইয়ে আমার পাশ থেকে মা উঠেছে। খাওয়া শেষে আমি সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। আমার পেট এখন টইটুম্বুর জলাশয়ে পরিণত হলো। আর দশ মিনিট লিভিংরুমে কাটিয়ে আমি চললাম আমার রুমে। আমরা যাওয়ার পথে জুমুকে উঠিয়ে নিবো গাড়িতে। আমি একটা সেলোয়ার কামিজ পড়ে গায়ের উপরে একটা সোয়েটার পড়ে নিলাম। আমার পিঠ সমান চুলগুলো এলিয়ে দিলাম পিঠের উপরেই। আমি আসতেই আমার ভাই বেরিয়ে পড়লো আমাকে নিয়ে।

আমার ভাইয়ের মোটর সাইকেল আছে। ভাইয়া কার খুব কম চালায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গাড়ি চালায় আমার মা। এই বাড়িতে আসার পর আমাদের গাড়ির ড্রাইভারকে বিদায় করিয়ে দিলো মা। বের হওয়ার আগে জুমু বলেছে সে তার ভাইয়ের সাথে যাবে। তাই আমি আর আমার ভাই রওনা দিলাম ভাইয়ের মোটর সাইকেল করে। মোটর সাইকেল আমার বেশ লাগে। আমি সুন্দর করে বসে পড়লাম আমার ভাইয়ের পিছে। ভাইয়ের কাধেঁ হাত দিয়ে আমি আরাম করে বসলাম। জুমু ইতিমধ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। প্রায় বিশ মিনিট পরে আমরা পৌঁছালাম ভার্সিটি। মানুষের গিজগিজ করছে পুরো ক্যাম্পাস।

আজকে কি সব বর্ষের ছাত্র ছাত্রীর ফলাফল একসাথে দিবে নাকি! মোটর সাইকেল থেকে নেমে আমি আমার চুলগুলো ঠিক করা শুরু করলাম। আমার ভাই মোটর সাইকেল পার্ক করে আমার কাছে এলো। ভেতরে এগিয়ে যাওয়ার আগেই জুমুর ফোন এলো। আর সে আমাকে বললো অফিস রুমে আসার জন্যে। আমি আমার ভাইকে সে কথা জানালে আমার ভাই আমাকে প্রশ্ন করলো,

“ঐখানে কেনো? ফলাফল তো দেয় নোটিশ বোর্ডে। ঐখানে কি কাজ?”

আমি মাথা চুলকিয়ে বললাম।
“কিজানি ভাই, জুমু যেতে বললো সেখানে। হয়তো কোনো কাজ আছে।”
“আচ্ছা চল।”

কথাটি বলে আমার ভাই আমার হাত ধরে আমাকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। এতো মানুষ আমি ক্যাম্পাসে কখনোই দেখিনি। ভর্তি হওয়ার সময়েও এতো মানুষ আমি লক্ষ্য করলাম না। অনেক মানুষ পেরিয়ে আমি আর আমার ভাই পৌঁছালাম অফিসের সামনে এলাম। অফিসের সামনে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের পোশাক পড়ে। তাদের দেখে আমার ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেলো। আমি অফিস রুমের সামনে এসে আবারও ফোন দিলাম জুমুকে।

“কোথায় তুই? আমি অফিসের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি।”
জুমু আমার কথার বিপরীতে ফোনে বললো,
“ভেতরে আয় না আমার বোন। বাহিরে কি করছিস তুই?”
“আসছি বোন।”

ফোন কেটে আমি অফিস রুমে ঢুকলাম। আর ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সাদিফ ভাই, জুমু আর ভার্সিটির চেয়ারম্যান বসে আছে। সাদিফ ভাই বেশ ভাব করে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন। তার মানে বাহিরের কালো রঙের পোশাক পড়া লোকগুলো উনার বডি গার্ড! আমি চেয়ারম্যানকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।
আমার ভাইকে দেখা মাত্র চেয়ারম্যান স্যার বলে উঠলেন,
“আরে ইসলাল? লং টাইম নো সিন, ম্যান।”
স্যার আমার ভাইয়ের দিকে হাত এগিয়ে দিলেন।

আর আমার ভাই উনার সাথে হাত মিলিয়ে বললেন,
“ঢাকায় থাকি স্যার, চাকরির সুবাদে। আর এই হলো আমার বোন শেফা।”
“তোমার বোনকে চিনি আমি। তবে সাদিফের সুবাদে চিনতাম আগে আর এখন আরেকবার চিনলাম তোমার সুবাদে। দুই ভাই বোন বেশ ট্যালেন্টেড তোমরা। বসো বসো।”

ইসলাল ভাই বসলো জুমুর পাশে আর আমাকে অগত্য বসতে হলো সাদিফ ভাইয়ের পাশে। সাদা রঙের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে আর গলায় কালো মাফলার ঝুলিয়ে খুব ভাব নিয়ে বসে আছেন উনি। উনাকে আমি বেশিরভাগ সাদা রঙের পাঞ্জাবিতে দেখি।

অবশ্য একেক পাঞ্জাবির নকশা এক এক রকম হয়। চেয়ারম্যান স্যার অনেক্ষণ লেকচার দিলেন। আমি খুব কষ্ট করে আমি উনার এই প্যানপ্যান গুলো শুনছি। জুমুর মুখের দিকে একবার তাকালাম আমি। সে আপাতত হা করে স্যারের কথা শুনছে। অনেক্ষণ পরে স্যার পিয়নের মাধ্যেমে আমাদের ফলাফল জানালেন। জুমু আর আমি অনেক ভালো ফলাফল করেছি। জুমুর মুখে খুশির অন্ত নেই।

আমারও অনেক ভালো লাগছে ভালো ফলাফল করে। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে আমরা চারজন বেরিয়ে পড়লাম অফিস রুম থেকে। আমাদের পিছু পিছু আসছে সাদিফ ভাইয়ের বডি গার্ডরা। উফ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এতো কথা কিভাবে বলে এই প্রিন্সিপাল স্যার আল্লাহ্ ভালো জানেন। আমি গিয়ে জুমুর কাধেঁ হাত রাখলাম। জুমু নিজের মাথায় পেঁচিয়ে রাখা ওড়না খুলে গায়ের উপর দিয়ে দিলো। তার কান্ড দেখে আমি হেসে দিলাম।

“উফ ভাই, তুই এত ভয়ে ছিলি কেনো? তুই নিজেই তো জানতি, অনেক ভালো ফলাফল করবি। কারণ, তুই নিঃসন্দেহে একজন ভালো শিক্ষার্থী।”
আমার কথায় জুমু আমাকে ফিসফিস করে বললো,

“আমার ভয় ফলাফলকে নিয়ে না। তোর পিছে যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে সে আমাকে ভয়ের কারণ। ফলাফল উনিশ বিশ হলেই আমার অবস্থা খারাপ করতো সে।”

জুমুর উত্তরে আমি ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরলাম। সাদিফ ভাই এবং আমার ভাই আমাদের পেছনে আসছেন। আমার ভাই সামনে তাকিয়ে কথা বললেও সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার সাথে উনার চোখাচোখি হতেই উনি আমাকে চোখ রাঙালেন। আর আমি দ্রুত ঘাড় সামনে ফিরিয়ে নিলাম। এই লোক এমন কেনো? এইভাবে বাঘের মতো তাকাতে হয় বুঝি!

“তোর ভাইয়া এমন কেনো আমার মাথায় আসে না। উনাকে আমি খুব কম হাসতে দেখি। আমার ভাই তো আমাকে এমন চাপে রাখেন না। সাদিফ ভাইকে ভাই হিসেবে পেয়ে তোদের অবস্থা একেবারে ডাল।”

জুমু আমার কথায় শব্দ করে হাসলো,
“আমি তো বিয়ের পর চলে যাবো শ্বশুরবাড়ি। কিন্ত তোর অবস্থা কি হবে, ফুল?”
“কেনো তোর বিয়ে হবে। আমার বিয়ে বুঝি হবে না? আমি কি এতই অধম!”

আমার কথার উত্তরে জুমু কিছু বলার আগেই সাদিফ ভাইয়ের চিল্লানো আমার কানে প্রবেশ করলো,
“শেফা, সাইড করে হাঁট। এখন মানুষ বেশি। বেগতিক গাড়িও চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।”
সাদিফ ভাইয়ের চিল্লানো শুনে আমি জুমুকে ফিসফিস করে বললাম,

“দেখ কতো দরদি তোর ভাই। আমার কিছু হলে যেনো উনার অনেক কিছুই যায় আসে!”
“এই একটা তুই ঠিক কথা বলেছিস একেবারে। আমার ভাই সম্পর্কে অনেক কাহিনী জানা বাকি আছে তোর।”
জুমু মুচকি হাসলো কথাগুলো বলে।

আমি চুপচাপ করে রইলাম। কারণ, জুমু আর ইতি আপুর কথা মাঝে মাঝে আমার মাথার উপর দিয়ে যায়। আমার ভাইয়ের মোটর সাইকেলের দিকে আমি এগিয়ে যেতেই জুমু, ইসলাল ভাই আর সাদিফ ভাই একসাথে চিল্লিয়ে উঠলেন “ফুল” বলে। আমি তাদের চিল্লানো শুনে পেছনে ফিরতেই দেখি সাদিফ ভাই এক দৌড়ে আমার অনেক কাছে চলে এলেন। আর আমাকে উনার হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেন। অতঃপর অপর পাশ থেকে আসা দ্রুতগামী একটি অটো রিক্সার সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন সাদিফ ভাই। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে সাদিফ ভাই দৌড়ে সে রিক্সা চালককে ধরে ফেললেন। আমরা উনার পিছেই দৌড় দিয়ে সাদিফ ভাইয়ের কাছে গেলাম।

সাদিফ ভাইয়ের হাত দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। উনার পাঞ্জাবির হাত কুনুই পর্যন্ত বটে থাকার কারণে উনার হাতের চোট বেশ ভালো করেই দেখা যাচ্ছে। সাদিফ ভাই ঐ রিক্সা চালককে ধরে নিচে নামালেন। রিক্সা চালকের বয়স হয়েছে বুঝায় যাচ্ছে। আমার ভাই গিয়ে সাদিফ ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালো আর আশে পাশে তো উনার বডি গার্ড আছেন। একটা বড় জটলা পাকিয়ে গেলো এই স্থানে। সাদিফ ভাইকে রাগান্বিত হতে দেখে রিক্সা চালক বিনীত সুরে বললেন,

“মাফ করবেন সাহেব। আমার চশমার কারণে আমার আজ এই ভুল হলো। টাকার অভাবে চশমার পাওয়ার বাড়াতে পারছি না সাহেব।”
সাদিফ ভাই লোকটির কথা শুনে একদম শান্ত হয়ে গেলেন। উনার বডি গার্ডদের মধ্যে একজনকে বলে উঠলেন,

“উনার চশমার ব্যবস্থা করো আর উনাকে একটা সহজ চাকরির ব্যবস্থা করে দাও।”
লোকটি সাদিফ ভাইয়ের সামনে হাত জোর করে অনেক দোয়া করলেন উনার জন্যে। আমি সাদিফ ভাইয়ের এই রূপ দেখে অনেক অবাক হলাম। সাদিফ ভাই অনেক ভালো মানুষ! গার্ডটি বুড়া চালককে নিয়ে যাচ্ছে। আশে পাশের জটলা নেই এখন। সবাই সরে গিয়েছেন এইখান থেকে। সাদিফ ভাইয়ের সামনে মানুষ খুব কম কথায় বলেন। কারণ, এই লোকের ভয়ংকর রূপ সবার অজানা নয়। সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন বেশ রাগী চোখে।

কিন্তু সেদিকে আমি আমি খেয়াল করলাম না। সাদিফ ভাইয়ের হাত থেকে অনেক রক্ত ঝরছে। জুমু দ্রুত গিয়ে তার ভাইয়ের হাত ধরলো।

“ভাই, অনেক রক্ত বের হচ্ছে। চলো ডাক্তারের কাছে যায়।”
আমিও সাদিফ ভাইয়ের কাছে গেলাম। কারণ উনি ব্যাথা পেয়েছেন আমার কারণেই। আর উনার এই মায়াবী চেহারা দেখে আমার কেনো যেনো উনার জন্যে বড্ড মায়া লাগছে। আমি উনাকে বললাম,
“হ্যাঁ, সাদিফ ভাই। আপনি হাতের ড্রেসিং করিয়ে নিন। আপনার হাতের অবস্থা নাহলে খারাপ হবে।”
সাদিফ ভাই আমার হাত চেপে ধরলেন।

পাশে আমার ভাই অবাক চোখে দেখে আছে আমার দিকে।
“এতই যখন দরদ দেখাচ্ছিস, তবে দেখে চলতে পারিস না? রাস্তার মাঝে চোখ বন্ধ করে নয় চোখ খুলে হাঁটতে হয়। আমি ব্যাথা পেয়েছি আমি সহ্য করে নিবো। কিন্তু, তুই ব্যাথা পেলে আমি সহ্য করে নিতাম না। আর কখনো এই ভুল করবি?”
সাদিফ ভাই দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।

এমন চিল্লানো শুনে আমার চোখে পানি জমা হলো। আর আমি মাথা নিচু করে উনাকে নরম সুরে বললাম,

“দুঃখিত। আমি পরবর্তীতে খেয়াল রাখবো। আপনি দয়া করে হাতের ব্যান্ডেজ করিয়ে নিন।”
আমার কথা শুনে সাদিফ ভাই আমার মুখ তুলে ধরলেন উনার হাতে।
“এই ফুল, তুই ঠিক আছিস তো?”

সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমি এইবার চোখ তুলে উনার দিকে তাকালাম। সাদিফ ভাইয়ের নজরে এখন আমি কোনো রাগ দেখতে পাচ্ছি না। বরং দেখতে পাচ্ছি এক জোড়া মায়াময় চোখ। এই চোখের দিকে তাকিয়ে আমি অন্য কিছুর আভাস পাচ্ছি। কিন্তু সেটি কি! এটা আমাকে জানা নেই। তবে, সাদিফ ভাইয়ের এই নজর আমাকে উনার ব্যাপারে ভাবতে বাধ্য করে।


পর্ব ৯

আমার ভাই তার প্রেমিকা মানে আমার হবু ভাবীর সাথে দেখা করতে চলে গেলো, আমাকে এই দজ্জাল সাদিফ ভাই আর জুমুর কাছে রেখে। আমি ভাইয়ের মোটর সাইকেলে উঠতে যাবো অমনিই ভাইয়ের মোবাইলে ভাবীর ফোন আসে। আর আমার ভাই দৌড় লাগলো মোটর সাইকেল নিয়ে ভাবীর কাছে। ইসস কতো প্রেম। আর আমাকে রেখে গেলেন এই মানুষগুলোর কাছে।

ইসলাল ভাই সাদিফ ভাইয়ের সাথে কথা বলে নিয়ে নিজের গন্তব্যে রওনা দিলেন একটু আগেই। সাদিফ ভাই নিজের হাতের ড্রেসিং নিজেই করে নিলেন গাড়িতে বসে। জুমু থেকে জানলাম, সাদিফ ভাই প্রাথমিক চিকিৎসার সব জিনিস রাখেন গাড়িতে। নেতা মানুষ উনি, এইসব কাটাকাটির জন্যে উনার এইসব বক্সের দরকার হয়। উনি একটু শব্দ পর্যন্ত করলেন না, এতবড় ঘা ব্যান্ডেজ করার সময়। আমি নিশ্চিত, এই লোকের মাঝে কোনো অনুভূতির ফাংশান নেই।

গাড়িতে আমি, জুমু আর সাদিফ ভাই বসেছি পেছনে। আর ড্রাইভার সামনে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। সচরাচর সাদিফ ভাই ড্রাইভার নিয়েই বের হোন। আমি একপাশে বসলাম আর জুমু আমার পাশে এবং জুমুর পাশে বসেছেন দা গ্রেট সাদিফ ভাই। এই মানুষটাকে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। একটু কেমন যেনো উনি, বড্ড অন্যরকম। এইযে একটু আগে আমার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই কথার জবাব আর শুনেননি উনি। আমাকে প্রশ্নটি করে কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়েছি পড়েছিলেন গাড়ির দিকে।

আমি তখন অবাক চোখে উনার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমার সাথে সাথে আমার ভাই আর জুমুও সমান অবাক ছিলো উনার এই কান্ড দেখে। সাদিফ ভাইয়ের কর্ম কান্ড এমন অদ্ভুত কেনো, খোদা জানেন।

আরে ভাই আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি ঠিক আছি নাকি, কিন্তু আমার উত্তরের আগেই আমার কথা না শুনে গাড়ির সামনে হিরোর মতো দাঁড়িয়ে পড়লেন! মানে যা তা অবস্থা। ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেলো আমার। মুখের উপরেই সাদিফ ভাইয়া আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লম্বু কোথাকার।

কি ভাবে নিজেকে আল্লাহ্ ভালো জানেন। আজ তো ইচ্ছে করছিল উনার গলার মাফলার দিয়ে উনার গলাতেই পেঁচিয়ে ধরি। যখনই উনার মায়াময় চোখের দিকে তাকিয়ে আমি অন্য কিছু ভাবতে বাধ্য হয়ে যায়, অমনিই উনি আমাকে উনার আসল রূপ দেখিয়ে দেন। একে তো মেজাজ খারাপ এই লোকের জন্যে তার উপর ট্র্যাফিকের মাঝে গাড়ির হর্নের শব্দে আমার মাথা চলে যাচ্ছে।

আমি মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে আছি গাড়ির জানালা দিয়ে। চারপাশে টেম্পু, বাস, মোটর সাইকেল, কার সবই দেখা যাচ্ছে। আমার পাশের চেয়ে একটু দূরে একটা মোটর সাইকেল দেখে আমার খুব পরিচিত মনে হলো। পরক্ষণে আমি গাড়ির জানালা খুলতে গিয়ে বাঁধার সম্মুখীন হলাম। আমি জুমুর উদ্দেশ্যে বললাম,

“এই ভাই, তোদের এই দামী গাড়ির জানালা নামছে না কেনো?”
“কিজানি। দেখি আমি চেষ্টা করছি।”
জুমুর এমন কথায় আমাদের মাঝে নাক গলালেন সাদিফ ভাই।

“এই ভরা ট্র্যাফিকের মাঝে জানালা খোলার কি দরকার? যত্তসব আজাইরা কাজ।”
“আজিব তো! আমি আপনার সাথে কোনো কথা বলেছি? আমার দরকার আছে জানালা খোলার তাই আমি জানালা খুলতে চাই। জুমু চেষ্টা কর তো। ট্র্যাফিক ছুটে গেলে আমি তাকে হারিয়ে ফেলবো। এই ট্র্যাফিকে তো আর রাস্তার মাঝে নামা যাবে না। তাছাড়া গাড়ির দরজায় তো খুলবে না, যেইভাবে দাঁড়িয়ে আছে সব গাড়ি পাশাপাশি!”

আমি বেশ রাগ দেখিয়ে বললাম।
“কাকে দেখা লাগবে তোর এই মুহূর্তে? কে এতো
জরুরী তোর জন্যে?”
সাদিফ ভাই চিল্লিয়ে উঠলেন।

উনার এই চিল্লানো শুনেই তো আমার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এইবারও একই অবস্থা। আমার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। তাছাড়া জুমু তার হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরে আছে।

যার অর্থ হলো, এই মুহূর্তে আর কিছুই বলা যাবে না। সাদিফ ভাইয়ের সামনে আমি যতই বাহাদুরি দেখায় না কেনো! উনার এই গর্জন মার্কা কথা শুনলে আমার রূহ কেঁপে উঠে বারবার। যেই ভেবেছি মোটর সাইকেলে বসা মানুষটিকে আমি ফোন করবো, অমনিই সবুজ রঙের লাইট জ্বলে উঠলো আর মোটর সাইকেলটি হওয়া হয়ে গেলো। বড্ড মন খারাপ লাগছে আমার। অনেকদিন পরেই তাকে দেখলাম আমি। তারা এখন আগের মত আমাদের বাসায় আর আসেন না।

অবশ্য তারা পড়ালেখা নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকে। অনেক ভালো ছাত্র সে। আমি এক বুক আফসোস নিয়ে বসে রইলাম। বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই আমি নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। আর জুমুকে আমার সাথে নামিয়ে নিলাম। কারণ, আমার বাসায় একা একা ভালো লাগবে না। মা এবং রাফসান বেরিয়েছে মার্কেটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমি জুমুকে ঘরের চাবি দারোয়ান থেকে নিয়ে নিতে বলে দোকানের দিকে গেলাম।

কিছু চিপস কেনা লাগবে আমার। সাদিফ ভাই আছেন নাকি চলে গিয়েছেন, সে খেয়াল আমি আর রাখিনি। জল্লাদ লোক একটা! আমি বিল্ডিংয়ের পাশে থাকা দোকান থেকে চিপস আর কিছু চকলেট নিয়ে নিলাম। যদিও আমি কোমল পানীয় নিতে চেয়েছি, পরে গলার কথা ভেবে আমি সেদিকে আর আগায়নি। দোকানের টাকা চুকিয়ে আমি বিল্ডিংয়ের ভেতর প্রবেশ করলাম। পার্কিংয়ে সাদিফ ভাইয়ের গাড়ি বিদ্যমান। আজিব! মা নেই বাসায়। উনি কি করবেন এইখানে?

তার উপর আমাকে উনি আজ তার সাথে দেখা করতে দিলেন না। কতদিন পর দেখেছিলাম তাকে! যদিও আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা হয়। তারপরেও সামনাসামনি দেখার আলাদা একটা অনুভুতি থাকে। সাদিফ ভাইয়ের বডি গার্ডদের গাড়ি আমি দেখলাম না নিচে।

এক তলা অতিক্রম করতেই আমাকে কেউ দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলেন। আতঙ্কে আমার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো। কিন্তু আমার সামনে সাদিফ ভাইকে দেখে আমার ভয়ের ভাব একটু কমলো। সাদিফ ভাই আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছেন আর শক্ত করে আমার বাহু চেপে ধরলেন। সাদিফ ভাই রেগে একেবারে ফোঁস ফোঁস করে শব্দ করছেন। আমি তাকে কিছু বলার আগেই আমার কানে ভেসে এলো উনার কর্কশ শব্দ…
“আমি যতটুক জানি প্রেমের ধারে কাছে তুই নেই।

তাহলে আজ কাকে দেখার জন্যে তোর এতো আগ্রহ ছিলো? সে কে? আমি তোর নজর ফলো করে দেখেছি। তুই বাইকে বসা একটা ছেলের পানে চেয়ে ছিলি। কে ছিলো সেটা আমি অবশ্যই বের করে নিবো। সাথে তোর সাথে কি সম্পর্ক সেটাও জেনে নিবো।”

সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমার মাথায় যেনো বাজ পড়লো।

এই ছেলের নজর তো দেখি ঈগল পাখির নজর। কি তীক্ষ্ণ নজর হলে একটা মানুষ অন্য মানুষের নজর ফলো করতে পারে! কিন্তু, তার ব্যাপারে সাদিফ ভাই জানলে মোটেও ভালো হবে না।
আমি ভাঙা কণ্ঠে বললাম,
“কেউ ছিলো না। আমার বান্ধবী ছিলো।”

আমার কথা শেষ হওয়ার দেরী, কিন্তু সাদিফ ভাইয়ের আমার গাল ধরতে দেরী হয়নি। এমনভাবে উনি আমার গাল চেপে ধরলেন! মনে হচ্ছে গালের হাড় ভেঙে গালের মাংসে প্রবেশ করবে।

“মিথ্যা কথা! আমি মিথ্যা মোটেও সহ্য করতে পারি না। তোর চোখের নজর পরখ করতে আমার মোটেও ভুল হওয়ার নয়। তোর দিকে আমার নজর থাকে আর আমার নজর কখনোই ভুল থাকে না।”
আমি উনার কথা শুনে শিরশির করে কাঁপছি। এই কোন জমের হাতে পড়লাম আমি নিজেই বুঝছি না। এইদিকে আমার গালের অবস্থাও বেগতিক। আমার চোখে উনার চোখ পড়তেই উনি আমার গাল ছেড়ে দিলেন। তবে আমার দুইপাশে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন উনি।

আমি নিজের গালে হাত বুলিয়ে দেখছি, আদৌ আমার গাল বেঁচে আছে নাকি! স্পর্শ করে বুঝলাম গালের অবস্থা ঠিক আছে। এই শীতকালে সাদিফ ভাইয়ের ভয়ে আমি ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছি। এইসব কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। আমার এখন সাদিফ ভাইকে বেশ ভয় লাগছে। সাদিফ ভাই আমাকে আর কিছু বলার আগেই জুমুর আওয়াজ শুনতে পেলাম।

“ফুল, কোথায় তুই?”

আর এমন শব্দ শুনে সাদিফ ভাই আমার সামনে থেকে সরে গেলেন। আর আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম আমার বাড়ির দরজার দিকে। যেতে যেতে সাদিফ ভাইয়ের কণ্ঠ স্পষ্ট আমার কানে ভেদ করলো,
“সে যেই হোক না কেনো! তাকে আমি বের করেই ছাড়বো। উল্টো পাল্টা কিছু হলে তুই দায়ী হবি। আর আমার থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবি না।”

আমিও কম যায় না। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে উনার উদ্দেশ্যে বললাম,

” এতো বেশি গোয়েন্দাগিরি করবেন না নেতাজি। পরে দেখবেন আপনি নিজেই একটা গোলক ধাঁধায় আটকে পড়েছেন। আমার জন্যে কত দরদ আপনার! হুহ, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি।”

সাদিফ ভাই আমার দিকে এগিয়ে আসতে নিলেই আমি উনার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলাম।
আর এইদিকে সাদিফ শেফার এমন কথা শুনে না হেসে পারলো না। শেফা যদি আরেকটু সাদিফের দিকে তাকাতো, তাহলে সে সাদিফের বাঁকা দাঁতের হাসি দেখতে পেতো। সাদিফ নিজের মনে নানা কথা বলে নিচের দিকে চলে গেলো।

ঘরে ঢুকেই আমি জুমুকে চিপস আর চকলেট ধরিয়ে দিয়ে আমার রুমে গেলাম। ব্যালকনিতে গিয়ে আমি চুপি চুপি উঁকি দেওয়া শুরু করেছি। যা ভেবেছিলাম সেটাই হলো। সাদিফ ভাইয়ের গাড়ি চলে যেতে দেখা যাচ্ছে। উফ বাবা, বেঁচে গিয়েছি আমি আজ। নাহলে আমার অবস্থা খারাপ করে ফেলতেন উনি। আর এই ব্যাপারে উনি জানলে এক এলাহী কান্ড হয়ে যেতো। উনার যা রাগ! বাবাগো। আমি দ্রুত মোবাইল বের করে তাকে ফোন করলাম। অনেক্ষণ পর সে ফোন রিসিভ করলো,
“হ্যাঁ, ফুলি বলো।”

“তুমি কিছুদিন যাবত এই শহরে থেকো না। আমি ট্র্যাফিকে আজ তোমায় দেখেছিলাম। আর এই ব্যাপারটা সাদিফ ভাই লক্ষ্য করে নিয়েছেন। তাই আমাদের বেঁচে থাকতে হলে তোমাকে এই শহর থেকে একটু লুকিয়ে থাকতে হবে। নাহলে আমাদের পরিবারে এক যুদ্ধ লাগবে। সাদিফ ভাইকে তো চিনোই।”

“উফ বাবা! এই সাদিফ ভাই তো দেখি খুব চালু। অবশ্য উনাকে কে না চিনে। আচ্ছা, আমাদের পরিবারের জন্যে হলেও আমি নিজেকে লুকিয়ে রাখবো। ধন্যবাদ ফুলি, খবর দেওয়ার জন্যে। নাহলে আমাকে সে অনেক ভালই কেলানি দিতো।”

“হ্যাঁ ভাই। লোকটা তো এমনই। নাকের আগায় তার রাগটা তো থাকবেই। বিরক্তিকর লোক একটা। যখন তখন আমাকে ধরে শাসিয়ে নেন। আচ্ছা রাখছি। ভালো থেকো আর সাবধানে থেকো।”
ফোন রাখতেই আমার পিছে কারো অস্তিত্ব বুঝতে পারলাম। আর জুমু ভেবে আমি হাসিমুখে পিছে ফিরলাম। কিন্তু আমার হাসিমুখ নিমিষেই ফুস হয়ে গেলো। দরজায় দাঁড়িয়ে জুমু তার মুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার পিছে দাঁড়িয়ে আছেন সাদিফ ভাই।

আমার এখন জগৎ ঘুরছে। হায় হায় শেফা! তোর আর রক্ষে নেই। এই সাদিফ ভাই তোকে আজ কাঁচা চাবিয়ে খাবে। আমি এখন মনে মনে সূরা ইউনূস পড়া শুরু করলাম। আমি চোখ তুলে আরেকবার সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকালাম। চোখ পাকিয়ে দেখে আছে উনি আমার দিকে। আর আমি উনার এই নজর দেখে চোখ বন্ধ করে আল্লাহ্কে ডাকছি।


পর্ব ১০

সাদিফ ভাই আমার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে নিলেন টান দিয়ে। আমি এখনো মনে মনে দোয়া করছি। ভয়ে আমার আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। সাদিফ ভাই মোবাইল চেক করার পূর্বেই মোবাইলের আলো নিভে গেলো। যার কারণে সাদিফ ভাই মোবাইল আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
“লক খুল।”

মোবাইল আমার হাতে নিয়ে আমি আমার পেছনে লুকিয়ে নিলাম। আমাকে ভূতে পেয়েছে নাকি? উনাকে মোবাইলের লক খুলে দিবো!

আমার অবস্থা দেখে সাদিফ আমার দিকে বেশ রাগী ভাব নিয়ে তাকালেন। কিন্তু আমি কথা ঘুরানোর জন্যে উনাকে বললাম,

“আপনার গাড়ি চলে যেতে দেখেছিলাম আমি। কিন্তু, আপনি থেকে গেলেন কিভাবে?”
“ড্রাইভারকে পাঠিয়েছি কিছু জিনিস কেনার জন্যে। এরপর আবার উপরে আসলাম। আজ না আসলে তো তোর এইসব প্রেম কাহিনী আমি দেখতে পেতাম না। উত্তর পেয়েছিস তোর প্রশ্নের? এখন আমাকে মোবাইলের লক খুলে দে। নাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”

উনার কথা শুনে আমি মোবাইল আরো শক্ত করে চেপে ধরলাম। আর মাথা নিচু করে বললাম,
” আমার কোনো প্রেম নেই। তাছাড়া একটা মেয়ের কাছে তার মোবাইলের পাসওয়ার্ড খুঁজছেন, আপনার কি লজ্জা নেই কোনো?”

“জুমু, শেফা থেকে মোবাইলটা নিয়ে আমাকে সেটার লক খুলে দে। নাহলে তোদের দুইজনের অবস্থা আমি বারোটা বাজিয়ে দিবো।”

সাদিফ ভাই এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
উনার উক্তিতে জুমু দ্রুত হেঁটে আসলো আমার দিকে। অতঃপর আমার কানে কানে জুমু আমাকে বললো,

“আমার বোন, মোবাইলটা দিয়ে দে। আমি জানি তুই কোনো প্রেম করছিস না। কিন্তু, এখন যদি সাদিফ ভাইকে মোবাইল না দিস। তবে উনি আমাদের দুইজনের অবস্থা খারাপ করে দিবেন।”

জুমুর বক্তব্য শুনে আমি একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। আর নিজের মোবাইলের লক খুলে সাদিফ ভাইকে দিলাম। কিছুই করার নেই আমার। তাছাড়া একদিন না একদিন সত্যিটা উনার জানার কথায় ছিলো। তবে সে সত্যি উনি না হয় কিছুদিন আগেই জেনে নিলেন! আমার মনের ভাবনা কেটে গেলো সাদিফ ভাইয়ের চিল্লানো শুনে,

“জুরাইন কে? তার সাথে তো তোর অনেক লম্বা কল লিস্ট দেখতে পাচ্ছি।”
“ম..মাম..”

ভয়ের কারণে আমার মুখ দিয়ে কথা পর্যন্ত বের হচ্ছে না। তবে সাদিফ ভাই এসে আমার হাত চেপে ধরতেই আমি গড়গড় করে বলে দিলাম।

“মামার ছেলে।”
“কি? মামা? তোর মামা মানে তো আমার মামা। তাহলে শুধু তুই জানিস কিভাবে এই মামার কথা? কাহিনী করছিস আমার সাথে?”
সাদিফ ভাই চেঁচিয়ে উঠলেন।

“হ্যাঁ, ভাই। ফুল সত্যি বলছে। আমাদের মামা আছেন। তবে মামা আর মায়ের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। মায়ের বাবার সাথে পালিয়ে যাওয়ার কারণে মামা মাকে সেই যে বর্জন করেছেন আর কাছে টেনে নেননি। খালামণি অনেক চেয়েছিলেন মামাকে বুঝাতে। কিন্তু মামা খালামনির সাথে উল্টো রাগ করে এই বাড়িতে আসায় বন্ধ করে দিলেন। আর জুরাইন আমাদের মামাতো ভাই। সে আমাদের সাথেই পড়ালেখা করে তবে ভিন্ন ভার্সিটিতে।”

জুমুর সব কথা একেবারে সত্যি। তাই আমার মুখ দিয়ে আর কিছু বের করার দরকার পড়লো না। সাদিফ ভাই জুরাইনের নাম্বারে ফোন দিলো আমার মোবাইল থেকেই। সাদিফ ভাইয়ের মুখের নকশা এখন অন্যরকম। কি করতে যাচ্ছেন উনি আল্লাহ্ ভালো জানেন। সাদিফ ভাই মোবাইল কানে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি এখন কোথায়?”
ঐপাশ থেকে কি বললো সেটা শোনা গেলো না। কিন্তু সাদিফ ভাই আবারও বললেন,
“আমি সাদনান সাদিফ।”

ব্যস, শুরু করলেন সাদিফ ভাই নানান আলোচনা। আর জুরাইনের সাথে অনেক কথা বলে সাদিফ ভাই ফোন কেটে দিলেন। আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি, সাদিফ ভাই এখন আমাদের মামার বাড়িতেই যাবেন। আমার মোবাইল আমার হাতে ধরিয়ে সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,
“আমরা এখন মামার বাড়ি যাবো। আমার গাড়ি আসলেই বের হবো আমরা।”

কথাটা বলে উনি চলে গেলেন। আর আমি বিছানায় বসে পড়লাম। আল্লাহ্ কোন মসিবতে ফেলেছেন আমাকে! এই সাদিফ ভাই নামক মানুষটার মাথায় কি চলে, সেটি বুঝার ক্ষমতা এই ছোট্ট শেফার নেই। আমার পাশে বসে পড়লো জুমু। আমার দিয়ে তাকিয়ে জুমু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
“যাক, আজকে একটা রফাদফা হবে এই কাহিনীর। মামা নিজেকে ভাবে কি? আর তোর ঐ মামাতো ভাই! সে কেমন ছেলে? সে তো নিজের বাবাকে বুঝাতেই পারতো। কেমন মেয়েলী টাইপ এই ছেলেটা।”

আমি জুমুর কথায় মুচকি হাসলাম।

“জুরাইনের সাথে তোর অনেকবার দেখা হলো। কিন্তু তোরা দুইজন এমন করিস কেনো একজন অপরকে, এটা আমি বুঝে উঠতে পারিনা। তোরা কাজিন হোস, এটা ভুলে যাবি না বারবার। আর জুরাইন; মামাকে তার কোনো সিদ্ধান্তে বুঝাতে পারে না। কারণ মামা একরোখা মানুষ। মামাকে আজ দেখলে বুঝবি তুই।”

আমি আর জুমু নানান আলোচনা করছি। সাদিফ ভাইয়ের ড্রাইভার উনার আনানো জিনিসগুলো আমাদের বাসায় রেখে দিলেন। আর সাদিফ ভাই আমার মাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন আমরা মামার বাসায় যাচ্ছি। তাছাড়া উনি মাকে রাফসানকে নিয়ে উনাদের বাড়িতেই যেতে বলেছেন। আর আমার ভাই তো সেই যে ডেটিং এ গিয়েছে, এখনো আসার নাম নেই তার।

আমরা বের হতে হতে সন্ধ্যা নেমে গেলো। গায়ের উপর আমি আবারও একটা মোটা সোয়েটার পড়ে নিলাম। কেনো জানি আমার অতিরিক্ত শীত লাগছে। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট পরে আমরা মামার বাড়ির দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে নামলাম গাড়ি থেকে। অন্যসময় হলে আমি এক দৌড়ে মামা বাড়িতে চলে যেতাম। কিন্তু আজ কেনো যেনো মনে সায় দিচ্ছে না আমার। আমি চুপচাপ সাদিফ ভাইয়ের পেছনেই হাঁটছি। ভেতরের দিকে গিয়ে কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে দিলো জুরাইন।

সাদিফ ভাইয়ের সাথে সে হাত মিলিয়ে আমার কাছে এসে আমাকে এক পাশে ধরে জড়িয়ে নিলো। আমি জুরাইনের এমন কাজের বিপরীতে একটু করে হাসলাম। কিন্তু জুমু আর জুরাইন নিজেরা কোনো কথা বললো না। জুরাইন আমাদের নিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলো। ড্রয়িং রুমে মামা, মামী আর আমার ছোট্ট একটা বোন জারাভিকে দেখা যাচ্ছে। আমাকে দেখে জারাভি দৌড়ে আমার কাছে চলে এলো। জারাভির বয়স মাত্র ছয় বছর। আর সে এখন নার্সারিতে পড়ে।

আমি জারাভিকে কোলে নিয়ে সামনে তাকালাম। মামা আর মামী আমাদের দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। মামা দাঁড়িয়ে থাকলেও মামী এসে সাদিফ ভাইয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। বিনিময়ে সাদিফ ভাই মামীকে এক পাশ করে জড়িয়ে ধরলেন। আর জুমুও তাদের সাথে যোগ দিলেন। আমি অবাক চোখে দেখছি শুধু তাদের। মামার কথা শুনে উনারা তিনজন নিজেদের ছেড়ে দাঁড়ালেন।

“কেনো এসেছো তুমি এইখানে? তোমাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই সাদিফ।”
মামা কি বলে দিলো এটি! এখন সাদিফ ভাই কি করবেন? মামাকে চিল্লিয়ে উঠবেন নিশ্চয়। উনি চিল্লানো ছাড়া আর পারেই বা কি? কিন্তু আমাকে অবাক করে দিলো উনার শান্ত গলার স্বর…
“দেখুন মামা, আপনি বড়জন। আপনার রাগ করে থাকাটা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু মায়ের করা অপরাধটি অনেক বছর আগেই চুকে গিয়েছে। সেই ছোট কাল থেকেই মায়ের মুখে আপনাদের কথা, খালামনির কথা শুনে এসেছি। কখনো দেখতে পাবো বলে ভাবিনি।

কিন্তু আল্লাহ্ ফিরে দেখেছেন আমাদের দিকে। মা আগে প্রায় এমন কান্নাকাটি করতো আর অসুস্থ হয়ে পড়তো। কিন্তু খালামণিকে পাওয়ার পর মায়ের স্বাস্থ্য যেনো আগে থেকে অনেক ঠিক হয়ে গেলো। তবে আমার মায়ের চোখে এখনো আমি এক নীরব চাপা কষ্ট দেখতে পায়। আর এই কষ্টটা আপনার জন্যে পান, এটাও আমি দেখি। কিন্তু মাকে আপনার ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে মা কিছুই জানাতো না আমাকে।

আমার মা আপনার ব্যাপারে সবটাই জানতো। আমার রাগ সম্পর্কে মা খুব ভালো করেই জানে, তার ভাইকে আমি উল্টোপাল্টা কিছু বলে দিবো; হয়তো এই ভয়ে মা আমাকে আপনার ব্যাপারটি জানাননি। তবে আমার কাছে আপনার বিরুদ্ধে কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। আপনারা আপন ভাইবোন। মানুষ মাত্রই ভুল। আর এই ভুলকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কি এতটাই অপরাধ হবে? আমার বাবার উপর আপনাদের যতো রাগ, আমি সেটাও জানি। কিন্তু উনি এখন বেঁচে নেই।

আপনার বোনের দিকে তাকিয়ে আপনি আমার মাকে ক্ষমা করে দিবেন, দয়া করে। দুইদিনের দুনিয়ায় আমরা কে কতদিন বাঁচবো! পরে আফসোস করার চেয়ে এখন মিলেমিশে থাকাটা বড্ড শ্রেয় হবে, মামা।”

সাদিফ ভাইয়ের এমন কথা শুনে আমার মাথা ভনভন করছে। পাশে জুমু তার চোখের পানি মুছে নিয়েছে। মামীও মুখে আঁচল দিয়ে কান্নারত নজরে মামার দিকে চেয়ে আছে। আমার এমনি মানুষের কান্না দেখলে কান্না পায়, কিন্তু আমার আজ সাদিফ ভাইকে দেখে কান্না আসছে। কেনো যেনো এই মানুষটার নরম দিকটা আমাকে উনার উপর বেশ দূর্বল করে তুলে।

আমি জানি মামা কখনোই এমন কথা শুনে গলবেন না। সাদিফ ভাই অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছেন মামার দিকে। মামা উনার পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে নিলেন। পুরো ঘর এখন একদম চুপচাপ। জারাভি আমার কোল থেকে নেমে তার বাবার কাছে গিয়ে বললো,

” এই লম্বা ভাইয়ার কথাটি শুনো বাবা। আমরা বড় ফুফুর কাছে যাবো? যার গল্প তুমি আমাদের শুনাতে?”

মামা কিছু না বলে চুপ করে আছেন। সাদিফ ভাই মামার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“আসছি তাহলে। আপনি ভালো থাকবেন মামা। পারলে আমার মাকে ক্ষমা করে দিবেন। আমিও যদি কোনো ভুল করে থাকি তবে আমাকে মাফ করে দিবেন।”

উনি কথাটি বলে বিদায় নিয়ে নিলেন আর পেছন দিকে ফিরে হাঁটা শুরু করতেই, মামার কথা শুনে সাদিফ ভাইয়ের পা থেমে গেলো।

“দাঁড়াও সাদিফ। আমাকে নিয়ে যাও তোমার মায়ের কাছে। বড্ড কষ্ট দিয়েছি আমি আমার বোনকে। আমি ক্ষোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বোন আমাকে ক্ষমা করলেই হবে এখন।”
মামা কথাটি বলে দ্রুত এসে সাদিফ ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন। আর সাথে জুমুকেও জড়িয়ে নিলেন। সাদিফ ভাই মামাকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে হাসছেন।

উনার এই মুখখানা দেখে আমার বুকটা কেমন করে উঠলো। আমি অবাক চোখে সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। উনি চোখ খুলতেই আমি অন্যদিকে তাকিয়ে গেলাম। অতঃপর সবাই আর দেরী না করে বেরিয়ে পড়লো সাদিফ ভাইদের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমি ভেবেছিলাম, আমি মামার গাড়ি করে যাবো। কিন্তু এই সাদিফ ভাই এক প্রকার জোর করে আমাকে বসিয়ে দিলেন উনার পাশে। ছি! ভাবা যায় এইসব? ফাজিল, লোকটা বড্ড ফাজিল। সারা পথে আমি জুমুর গায়ের সাথে লেপ্টে ছিলাম।

মনটা আমার বুক থেকে বেরিয়ে যাবে, এতো জোরেই ধুকধুক করছে। কিন্তু আমি ঝিম কেটে রইলাম একেবারে শক্ত হয়ে। সাদিফ ভাইয়ের বাসায় আজ তিন ভাইবোনের মিলন মেলা হলো। মা, খালা, মামা তিনজন নিজেদের মনের কষ্ট সব ব্যক্ত করছে। জুরাইন এবং আমি দাঁড়িয়ে আছি একপাশে। ইতি আপু, জুমু নাস্তা তৈরি করছে সবার জন্যে। জারাভি এসে আমাকে বললো,

“ফুল আপু, পানি খাবো।”

জারাভির কথায় আমি ডাইনিং এর দিকে এগোলাম। এই ঘরটা এতো বড় কেন জানা নেই আমার। ডাইনিং রুমে গিয়ে আমি নিজেই হাঁপিয়ে উঠলাম।

গ্লাসে পানি ঢেলে আমি নিজেই আগে পান করে নিলাম। গ্লাস রাখতেই সামনে সাদিফ ভাইকে দেখতে পেলাম। উনাকে দেখে আমার মুখ থেকে পানি বের হতে নিলে আমি আবারও মুখ চেপে পানি গিলে নিলাম। আর সাদিফ ভাই আমার সামনে এসে আমার চেয়ারে হাত রেখে আমার দিকে ছোট ছোট চোখ করে বললেন,
“খুব ভালো করেই বেঁচে গিয়েছিস আজ। নাহলে তোর অবস্থা আজ আইসিইউতে থাকা রোগীর মতো করতাম আমি।”
আমি ভ্রু কুঁচকে উনাকে উত্তর দিলাম।

“কেনো? আপনার আমাকে নিয়ে এত সমস্যা কেনো?”
“কিজানি! জাস্ট ভালো লাগে তোকে এমন হেনস্তা করতে।”

কথাগুলো বলে উনি আমার সামনের চুলগুলো উনার আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে আবারও আমার মুখের সামনে এনে দিলেন। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে উনার দিকে তাকাতেই উনি আমাকে চোখ রাঙিয়ে চলে গেলেন। আর উনার এইসব কান্ড দেখে আমি আবারও পানি পান করলাম।

বুকটা আমার ধুকধুক করছে আবারও। সাদিফ ভাইয়ের এমন ব্যাবহারের রহস্য বের করতেই হবে আমার। এইসবের চক্করে আমি ভুলেই গেলাম আমি কেনো এসেছি এইখানে। ওহহ হ্যাঁ, মনে এসেছে। আমি জারাভির জন্যে পানি নিতে এসেছি। নিজের এমন ভুলে যাওয়া দেখে নিজের মাথায় একটা চড় দিলাম আমি। আমার কি করার! সাদিফ ভাইয়ের এমন সব কর্মকান্ড দেখে আমি আমাতেই থাকি না।


পর্ব ১১

মা এবং খালামণি মামাকে ফিরে পেয়ে যেনো হাতে আকাশের চাঁদ পেলো। এখন আমাদের পরিবার পুরোপুরি পূর্ণতা লাভ করেছে। মামা আর উনার পরিবার বেশিরভাগ সময় আমাদের বাড়িতে এবং সাদিফ ভাইয়ের বাড়িতে আসা যাওয়া করেন। কিন্তু, এখন যেহেতু আমার পড়ালেখা শুরু হলো; তাই মায়ের কড়া শাসনের কারণে আমি আর মামার বাসায় যেতে পারি না।

তবে মামার পরিবার আমাদের বাড়ি আসলেই, আমি মামার বাড়ির স্বাদ গ্রহণ করতে পারি। পড়ালেখার অনেক চাপ এখন। বলতে গেলে দম ফেলার সময় নেই একদম। তবে এত চাপের মাঝেও আমি আমার ভাইয়ের শুকনো মুখটা দেখতে পায় বেশ ভালো করেই। ইসলাল ভাইয়ের কি হলো ব্যাপারটা আমার বড্ড জানতে ইচ্ছে করে আমার। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাইকে। কিন্তু ভাইয়ের দিক থেকে আমি কোনো উত্তর পায়নি। তাছাড়া ভাই এখন এই শহরেই তার চাকরির ট্রান্সফার করিয়ে নিয়েছেন।

রাতের খাবার খেয়ে আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখছি। শীতের প্রকোপ এখন দিনের বেলায় অনুভব না হলেও, রাতের আকাশের বুকে কুয়াশার খেলা বেশ ভালো করেই অনুভব করা যায়। আমি আমার গায়ের সোয়েটার বেশ শক্ত করে আকড়ে ধরলাম। নিচে অনেক মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। রাতের বেলা ব্যালকনিতে এলে আমি রুমের লাইট বন্ধ করে দিই, সাথে ব্যালকনির আলো নিভিয়ে দিই। কারণ, রুমের লাইট জ্বালিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে রাস্তা থেকে স্পষ্ট সব দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমি মানুষের নানা কীর্তি উপভোগ করলাম। ক্লাস সকালে ক্লাস থাকায় আমি এগোলাম আমার রুমের দিকে।

গায়ের সোয়েটার খুলে আমি কম্বলের নিচে ঢুকে পড়লাম। মোবাইলের ভাইব্রেশনের শব্দ পেয়ে আমি কম্বল থেকে মাথা বের করে মোবাইল হাতে নিলাম। মোবাইলে স্পষ্ট আমার ভাইয়ের নাম দেখা যাচ্ছে। এতরাতে ভাইয়ের ফোন দেখে আমার বুক ধুকধুক করে উঠলো। কারণ, আমার ভাই গত দুইদিন ধরে বাড়ি নেই। ভাই তার বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে দুইদিন পূর্বেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো। আমি ভাইয়ের ফোন রিসিভ করে কানে লাগাতেই ভাইয়ের দ্রুত নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। চিন্তিত কণ্ঠে আমার মুখ দিয়ে বের হলো।

“হ্যালো, ভাই! কি হলো তোমার?”

কিন্তু ঐ পাশ থেকে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আর কিছুই না। আর এইদিকে আমি হ্যালো বলতেই আছি।
একটু পরে ভাই এক দমে বলে ফেললো।

“সাদিফ ভাই আসবে। তুই নিচে নাম। মা যেনো কিছুই টের না পায়।”

আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে ভাই ফোন কেটে দিলো। ব্যস, কথা শেষ? আজব তো! সাদিফ ভাইয়ের সাথে এই রাতে আমি কোথায় বা যাবো? তাছাড়া ভাইয়ের সমস্যাটাই বা কি? আমার ভাবনার মাঝে ফোন এলো সাদিফ ভাইয়ের। উফ, এই লম্বু কি চলে এলো নাকি? আমি ফোন না ধরেই দ্রুত উঠে পড়লাম। গায়ের উপর আবারও সোয়েটার জড়িয়ে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে নিলাম।

অতঃপর ঘরের স্যান্ডেল পড়েই আমি বেরিয়ে পড়লাম বিনা সংকোচে। তবে খুব সাবধানতা অবলম্বন করে। বারবার ঘুমের মাঝে এসে চেক করার অভ্যাস আমার মায়ের নেই। তাই এই ব্যাপারে আমি একেবারে নিশ্চিত। নিচে নামতেই দেখি সাদিফ ভাই গেটের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন।
আমাকে দেখে উনি দ্রুত এসে আমার হাত ধরলেন।
“জলদি চল। এতো আস্তে হাঁটছিস কেনো?”

“আরে আরে! কই নিয়ে যাচ্ছেন? কাহিনী কি? আমার ভাইয়েরই বা কি হলো?”
সাদিফ ভাই উত্তর না দিয়ে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে দিলেন আর নিজের এসে বসলেন ড্রাইভিং সিটে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সাদিফ ভাই এইবার মুখ খুললেন,

“তোর ভাইয়ের কিছু হয়নি। তবে হ্যাঁ, বিয়ে যখন করেছে, তবে কিছুদিন পর বাবা তো হবেই সে।”
সাদিফ ভাইয়ের কথা শুনে আমার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।

আমার ভাই বিয়ে করেছে? কবে, কখন? আমাদের তো কিছুই বলেনি ভাই এইসব ব্যাপারে। আমি সাদিফ ভাইকে অবাক হয়ে বললাম,

“বিয়ে? আমার ভাই বিয়ে কবে করেছে? আমরা তো কিছুই জানি না এই ব্যাপারে।”
সাদিফ ভাই আমার কথায় মুচকি হাসলেন।

“দুইদিন আগে প্রেমিকার সাথে পালিয়ে গিয়েছে তোর ভাই। আর গতকাল বিয়ে করেছে। মেয়ের পরিবার এখন ঝামেলা শুরু করলো, তাই এখন তোর ভাই আমাকে ফোন করে সব জানিয়েছে। তাছাড়া এইভাবে পালিয়ে বিয়ের দাওয়াত পরিবারকে জানানো হয় না। তাই তুই নিজেই এই ব্যাপারে জানিসনি। তারা একটি হোটেলে উঠেছিল। কিন্তু মেয়ের পরিবারের একজন তাদের জানায়, মেয়ের পরিবারের লোক ঐ হোটেলে আসছেন। তাই তোর ভাই আর ভাবী এখন একটি পার্কে লুকিয়ে আছে। আমরা যাচ্ছি তাদের উদ্ধার করতে।”

আমি হা করে উনার দিকেই তাকিয়ে আছি। উনার বলা কথাগুলো আমার মাথায় এখন নাচানাচি করছে। উনার মুচকি হাসি দেখবো! নাকি উনার বলা কথাগুলোর জন্য আমি চিন্তা করবো এটাই বুঝছিনা আমি। সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকাতেই উনার সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেলো। আমি নজর ফেরানোর আগেই সাদিফ ভাইয়ের নরম সুর শুনতে পেলাম।

“এইভাবে লুকিয়ে দেখার আলাদা মজা আছে তাই না! আমারও বেশ লাগে তোকে এইভাবে লুকিয়ে দেখতে। আগে তো ছোট ছিলি তাই আমার এমন চাহনির বহিঃপ্রকাশ করিনি।

এখন থেকে মাথায় অন্য চিন্তা নিয়ে ঘুরছি আমি। আমার চেয়ে ছোট হয়ে তোর ভাই বিয়ে করে নিয়েছে। আর আমি এখনো আড় চোখে তার কাজকর্ম উপভোগ করি। এইসব তো আর মানা যাচ্ছে না।”
“এক মিনিট। আপনি আমাকে লুকিয়ে দেখেন! তাও অনেক আগে থেকে? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি আমাকে আপনার খালাতো বোন হিসেবে চিনেন মাত্র দুই বছর ধরে। তাহলে?”
আমি হাত নাড়িয়ে উনাকে বললাম।

“বেশি পকপক করছিস না আজকে? কি! আমার উপর থেকে ভয় কমে গেলো বুঝি! একা আছিস আমার সাথে। কখন কি করে ফেলি; এই ভয় কি লাগে না তোর?”
সাদিফ ভাই সামনে তাকিয়ে বললেন।

আয়হায় আসলেই তো। আমি তো ভুলেই গেলাম, এই লোক সাদনান সাদিফ। উনি যেকোনো কিছু করে নিতে পারেন। আমি তাই উনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে চুপচাপ বসে রইলাম। কিন্তু আমি জানি আমার সাথে উনি কখনোই খারাপ কিছু করবেন না। উনি যতোই রাগী হোন না কেনো, উনার মাঝে কোনো চরিত্র দোষ আমি খুঁজে পায় না। শুধু অনেক বেশি এক রোখা আর রাগী এই সাদিফ ভাই।

“কি মুখ বন্ধ হয়ে গেলো? ভয় পেয়েছিস?”

কেমন করে যেনো কথাগুলো বললেন সাদিফ ভাই আমাকে। আমি বাহিরের দিকে তাকিয়ে উনাকে বললাম,
“নাহ, ভয় কেনো লাগবে? আমাকে আপনি কোনো ক্ষতি করবেন না, এই ব্যাপারে আমি বড্ড নিশ্চিত।”

“কেনো? তোর কথামতো আমি তো একজন নির্দয় মানুষ। আমি মারপিট করি, মিছিল করি। আরো অনেক খারাপ কিছু কথা আছে, যা আমার নামে বলেছিস তুই। তোর সব কথা আমার কানে আসে।”
উনার এমন কথা শুনে আমি টাস্কি খেলাম। আল্লাহ্! আমার এইসব তথ্য একমাত্র জুমুই জানতো। তার মানে এই মেয়ে সব কথা তার ভাইকে কবিতার মতো করে আবৃত্তি করে শোনায়! জুমুর বাচ্চা! তোকে আমি চিবিয়ে মারবো। মনে মনে এইসব ভাবলেও আমি মুখে বললাম,

“উম, মিথ্যে বলবো না। আসলে এইসব মারপিট আর ভেজাল আমার একদম ভালো লাগে না। তাই আরকি বলেছিলাম এইসব। তবে, আপনার যা ইচ্ছে করুন। আমার আর এইসব ব্যাপারে কিছু বলার নেই।”

“আমি যদি বিপরীতে না মাইর দিই, তাহলে আমাকেই তো এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হতো। নেতার দায়িত্ব পালন করা এতো সহজ না। এইখানে টিকে থেকে নিজের নাম কামাতে অনেক কষ্ট করতে হয়।”

সাদিফ ভাইয়ের কথা শুনে আমার মনে একটা চাপা কষ্ট অনুভব করলাম। উনার মুখে এই কথাগুলো আমি মেনে নিতে পারছি না। উনার মুখে শুধু বকা মানায়। এইসব আবেগী কথা নয়। বুকটায় কেমন করে উঠলো আমার।

“আপনি এইসব আবেগী কথা বলবেন না। ভালো লাগে না এতো কষ্টের কথা শুনতে।”
“কেনো? আমার কিছু হলে তোর কি? তোর কাছে তো আমার ভালো দিকের কোনো লিস্ট নেই।”
সাদিফ ভাইয়ের এই কথাটা, আমার মনে বড্ড নাড়া দিয়ে উঠলো।

আসলেই তো, উনার এই কষ্ট মার্কা কথা শুনে আমার কেনো এতো খারাপ লাগছে? আজ পর্যন্ত আমি উনার নামে সবটুকু খারাপ বুঝিয়েছি জুমুকে। তাহলে, কেনো আমার এতো কষ্ট হচ্ছে মনে! সাদিফ ভাইয়ের নামটি আমার মস্তিষ্কে যেনো একেবারেই সুপার গ্লু দিয়ে কেউ লাগিয়ে দিয়েছে। আমি কিছু বলতে যাবো, এর আগেই গাড়ি থেমে গেলো। আর সাদিফ ভাই আমাকে বললেন,
“গাড়িতে বসে থাক। আমি আসছি।”

উনি বেরিয়ে পড়লেন গাড়ি থেকে। আর আমি বসে আছি গাড়ির ভেতর। গাড়ি থেমেছে একটা পার্কের সামনে। এটা লোকাল পার্ক। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা এখানে মানুষের যাতায়াত করার দৃশ্য বিদ্যমান। আশে পাশে চোখ ঘুরাতেই একটু পরে দেখলাম, সাদিফ ভাই আসছেন। আর উনার পিছু আসছে আমার ভাই এবং আমার ভাবী। সাদিফ ভাই এসে আবারও ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লেন। আর বাকি দুইজন বসলো পেছনের সিটে। ভাবীকে দেখে আমি উনার দিকে আমার হাত এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম,

“অভিনন্দন ভাবী। আমি আপনার একমাত্র ননদ শেফা।”
ভাবী আমার হাতের সাথে হাত মিলিয়ে বললেন,
“আমি ইরা।”

“চিন্তা করবেন না ভাবী। আমার ভাই সব ঠিক করে নিবে। আপনার পরিবারকে মানিয়ে নিতে পারবে আমার ভাই।”
আমি বেশ ভাব নিয়ে বললাম।
“আরে না। কে বলেছে এইসব! আমি ইরার পরিবারের সাথে কোনো ডিল করতে পারবো না। যা করার সাদিফ ভাই করবেন।”

আমি আমার ভাইয়ের কথা শুনে বেক্কল হয়ে গেলাম। ভাবীও ভাইয়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আর আমার ভাই সে তার দাঁত কেলিয়ে যাচ্ছে। এই কেমন ছেলে আমার ভাইয়া। এতো ভয় পেলে তাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল কে! সাদিফ ভাই আমার ভাইয়ের কথার উত্তরে বললেন,
“খালাকে বুঝানোর দায়িত্ব আমার, তোর বড় ভাই হিসেবে। কিন্তু, ইরার পরিবারকে বুঝানোর দায়িত্ব তোর। কারণ, তুই তাদের মেয়েকে উঠিয়ে এনে বিয়ে করেছিস। তাই, তোর দায়িত্ব একটু বুঝিয়ে রাজি করানো উনাদের। এতো কঠিন কিছু না এই কাজ। ভালোবাসার মানুষের জন্যে সব করা যায়। এটা তো একেবারে ছোট্ট একটি কাজ।”

সাদিফ ভাইয়ের উক্তিতে আমার ভাই মাথা নাড়ালো।

আমি আবারও অবাক হলাম উনার এই কথায়। সাদিফ ভাইয়ের কথায় সব সময়ের মতো আমি এইবারও যথার্থতা খুঁজে পেলাম। কেনো যেনো এই ছেলের ব্যাপারে আমি অন্যরকম ভাবনা আনতে না চেয়েও নিয়ে আসি। সাদিফ ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু গুণ আছে যা অন্যকে উনার ব্যাপারে ভাবতে বাধ্য করবেই।

এইযে এখন আমি, আমার চির শত্রু মানে সাদিফ ভাইয়ের ব্যাপারে ভেবে চলেছি। মাথায় আমার অন্য চিন্তা আসছে শুধু। আর এই চিন্তা একান্তই সাদিফ ভাইকে ঘিরে। সাদিফ ভাইয়ের এইসব নানান ভালো কাজ আর কথাবার্তা আমার মনে বারবার এক অজানা অনুভূতির ইঙ্গিত জানান দেয়। ক্রমশই যেনো আমি এই অনুভূতির চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছি। কিন্তু, আমি ঠিক জানিনা এই অনুভূতির ফলাফল আমার জীবনে কি মোড় নিবে।

Romantic premer golpo in bengali


পর্ব ১২

আমাকে সাদিফ ভাই আমার বাসার সামনে নামিয়ে দিলেন। আমার ভাই কোনোমতে আমাদের বাসায় আসতে প্রস্তুত না। সে তার বউকে নিয়ে খালার বাসায় থাকবে। মায়ের প্রতি ভয়ের কারণে আমার ভাই আমাদের বাসায় আসতে নারাজ। অবশ্য সাদিফ ভাই আমাকে শুধু বাড়িতে ড্রপ করেননি বরং আমাকে বাসার ভেতর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছেন। আমি আজ এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলাম। সাদিফ ভাই আমাকে যখন বাসা অব্দি পৌঁছিয়ে দিলেন।

আমি দরজা বন্ধ করার পূর্বে উনাকে হাতের ইশারায় বিদায় জানালাম। আমার মুখে ছিলো তখন এক অন্যরকম হাসি। এই হাসিটা সাধারণত আমার লজ্জা পেলে আসে। কেমন যেনো আমার এই হাসিটা, একদম চাপা ধরনের। আমার এই কান্ড দেখে সাদিফ ভাই আমার হাত নাড়ানোর বিপরীতে একটা বাঁকা হাসি উপহার দিলেন। রাতের বেলা হওয়ার সুবাদে সাদিফ ভাইয়ের মুখের উপর শুধু সিঁড়ি ঘরের আলোটা পড়েছিল। এই স্নিধ আলোতে সাদিফ ভাইয়ের এই হাসি যেনো আমার মনে উথাল পাথাল সৃষ্টি করলো। সাদিফ ভাই তো আমাকে হাসি দেখিয়ে চলে গেলেন।

কিন্তু আমি এখনো কম্বলের নিচে ঢুকে উনার হাসির কথায় ভেবে চলেছি। আচ্ছা, শয়তান মানুষেরা হাসলে কি এতটাই সুন্দর লাগে? নাকি শয়তান মানুষ গুলো মাঝে মাঝে ভালো হয়! আমার এই সাদিফ ভাইটা একদম আমলকীর মতো। তেতো আবার সাথে মিষ্টি। কিছুক্ষণ তার তেতো ভাবটাতে মানুষ একেবারে মুখ কুঁচকে ফেলে, আবার একটু পরে তার মিষ্টি ভবাটাতে মানুষ হেসে উঠে। বড্ড অদ্ভুত এই সাদিফ ভাইয়ের স্বভাব। কিন্তু যেমনই হোক না কেন আমার মনে উনার জন্যে একটা নরম দিক অনুভব করতে পারছি। আচ্ছা, এক মিনিট আমি কি কোনমতে উনার হাসির প্রেমে পড়ে যায়নি তো!

এই কথাটি আমার মনে আসতেই আমি নিজের বুকের ধুকধুক ভাবটার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সাথে আমার চোখে একে একে ভেসে আসছে সাদিফ ভাইয়ের হাসিমুখ, আমার প্রতি উনার চিন্তাযুক্ত চাহনী আর আমার জন্যে উনার নিজের জীবন ঝুঁকিতে রাখার ঘটনাগুলো। আমার মনে এক অস্থিরতা শুরু হলো। আমার হাত পা একেবারে ঠান্ডা হয়ে আসছে। নিজের গলা পর্যন্ত আমার একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। আমি কম্বল থেকে বের হয়ে বাথরুমে গেলাম। আর সাথে সাথে মুখে ঠান্ডা পানির ছিটা দিয়ে নিজের শরীরের গরম ভাব কমাতে চেষ্টা করছি।

কিন্তু, এক অজানা আতঙ্কে আমার গায়ের গরম ভাব বেড়ে যাচ্ছে। আমি ঠান্ডা পানির কদর পর্যন্ত করছি না। অনবরত মুখে পানি দিয়ে যাচ্ছি। যতবার আমি মুখে পানি দেওয়ার জন্যে চোখ বন্ধ করছি, ততবার আমার চোখে ভেসে আসছে সাদিফ ভাইয়ের চেহারা। ইচ্ছে করছে চোখগুলো বের করে ফেলি। অনেকক্ষণ পরে নিজের মনের সাথে যুদ্ধতে হার মেনে আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। বিছানায় বসে তাওয়াল দিয়ে মুখ ঢেকে নিলাম আমি। কোনমতেই সাদিক ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি আমার মস্তিষ্ক থেকে যাচ্ছে না।

তাহলে কি আমার এই অস্থিরতার নাম প্রেম! না চাওয়া সত্বেও কারো প্রতি বারবার ভাবনাটায় কি আসলে প্রেম? শেষ পর্যন্ত আমি এই রাগী সাদিফ ভাইয়ের হাসির উপর, না না; শুধু হাসি না। শেষ পর্যন্ত কি আমি সাদিফ ভাইয়ের প্রেমে পড়ে গেলাম? এই কথাটি ভাবতেই মন থেকে একটা প্রশান্তি আর ভালো লাগার আবাস পেলাম। মাথায় কাজ করা বন্ধ করে দিলো আমার। একা একা নিজের সাথে কথা বলতে বলতেই আমি পাগল হয়ে যাবো! আসলেই কি আমি উনার প্রেমে পড়েছি! নাকি এটা আমার মোহ? এই ব্যাপারটা আমার অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। নাহলে আমার মন আর আমি এইসব অদ্ভুত উত্তেজনায় চাপা পড়ে অক্কা পাবো।

এখনের জন্যে ঘুমিয়ে পড়াটায় আমার জন্যে সবচেয়ে উত্তম হবে। আমি আমার নানান কথা মাথায় নিয়ে শুয়ে পড়লাম। সারারাত কেটে যাচ্ছে কিন্তু তারপরেও আমার চোখে ঘুম নেই। আজ মাথা থেকে “সাদিফ” শব্দটি যাচ্ছেই না। আমি এক প্রকার ছটফট করছি বিছানায়। ঘুমের কারণে চোখ বটে আসছে আমার কিন্তু আমার মন আমাকে ঘুমুতে দিচ্ছে না। সাদিফ ভাইয়ের নিষ্পাপ হাসি আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে আজ।
“ফুল! উঠে পড়। সাদিফ ডাকিয়েছে তাদের বাড়িতে।”

মায়ের শব্দ আমার কানে আসলেও আমি সেটাকে স্বপ্ন ভাবলাম। আর নিজে বলে উঠলাম,
“উফ, লম্বু খাম্বা! সারারাত আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছেন, আর এখন আবার আমাকে আপনার নাম শুনিয়ে কী আমাকে মারতে চাচ্ছেন?”
এইবার আমার মুখে পড়লো একটা চড়।

হুট করে চোখ খুলতেই আমি দেখলাম আমার সামনে মা দাঁড়িয়ে আছে। মাকে দেখে আমি নিজের রুমের দিকে চোখ বুলালাম। আল্লাহ্, আমি কি বলে ফেললাম এই মাত্র! মা আমাকে আজ ছাড়বে না।
যেটার ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হলো। মা আমার দিকে রাগ চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“কি বলেছিস? কোন লম্বু? কোন খাম্বা? তুই কি প্রেম করছিস?”

এই যা! প্রেমে পড়তে না পড়তেই কি মায়ের ধোলাইয়ের শিকার হবো আমি? কিন্তু, এইভাবে ধরা পড়ে গেলে আমার জীবনে আর প্রেমের মুখ দেখা হবে না। তাই আমি মাকে চিন্তিত হয়ে বললাম,
“আরে ধুর মা, আমি তো বাহিরে কারেন্টের খাম্বার কথা বলেছি। আজকাল বেশি লম্বা লাগে আমার কাছে এই খাম্বাটা। আমি এইসব দুই নম্বরের প্রেমে নেই মা। তুমি তোমার এই ভালো মেয়েকে সন্দেহ করছো?”
আমার কথায় মা আমাকে মারের ইশারা করলো।

“হয়েছে, নাটক বন্ধ কর। আসছিলাম তোর ভার্সিটি যাওয়ার জন্যে তোকে ডাকতে। কিন্তু সাদিফ খুব দ্রুত তাদের বাড়ি যেতে বললো। জলদি তৈরি হয়ে চলে আয় নাস্তার টেবিলে।”
মা আমাকে কথাগুলো বলে চলে গেলো। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। বুকে হাত বুলিয়ে আমি এগোলাম বাথরুমের দিকে। যাক, প্রেমের ব্যাপারে একটু গোয়েন্দাগিরির জন্যে কিছুটা সময় পেলাম আমি। আমি, মা আর রাফসান হেঁটে চলেছি সাদিফ ভাইয়ের বাড়ির দিকে।

পাশে রাফসান আমার হাত ধরে নাচানাচি করছে। এই বাড়ির উঠোনে কিছু অপরিচিত গাড়ি দেখা যাচ্ছে। মনে আমার অজানা ভয় হানা দিচ্ছে। নিশ্চয় ভাবীর বাড়ির লোকেরা চলে এলো। মা কিভাবে এই ব্যাপারে অভিব্যক্তি দিবে আমার সেটা মাথায় আসছে না। মনে মনে একটা কথায় আসছে আমার, ভাই যদি সবার সামনে মায়ের মাইরের শিকার হয়! ভেতরে ঢুকতেই একটু চিল্লাচিল্লি শোনা যাচ্ছে। লিভিং রুমে যেতেই আমার মনের ধারণা সঠিক হলো। বেশ কিছু অজানা লোক দেখতে পাচ্ছি।

তাদের মাঝে সাদিফ ভাইয়ের দিকেই আমার প্রথমে নজর পড়লো। লোকটা এই সকাল বেলা উঠেই পাঞ্জাবি পড়ে নিয়েছেন। কি সুন্দর করে মনোযোগ দিয়ে উনি অন্যদের কথা শুনছেন, আবার তাদের কথার বিপরীতে কিছু বলছেন। আমার ভাই, ভাবী, মামা, খালা, মামী সবাইকে দেখতে পাচ্ছি আমি আলোচনায়। মাকে দেখতে পেয়ে খালামণি মাকে টেনে নিয়ে গেল সেদিকে। মায়ের মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, আজকের বিষয় মায়ের মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। আমার পাশে জুরাইন, ইতি আপু আর জুমু এসে দাঁড়ালেন। আমরা চারজন মিলে বড়দের কাহিনী দেখছি।

“আমার ছেলে এমন ভুল করেছে এই কারণে আমি সত্যি দুঃখিত। কিন্তু এখন যখন তারা বিয়ে করে নিয়েছে, তাহলে এদের তো আর আলাদা করা যায় না। তারা নিজেরাও বাচ্চা না। তাই নিজের মনের সকল অভিমান দূর করে এদের মেনে নেওয়াটা আমি যৌক্তিক মনে করছি।”
মা খুব নরম সুরে ভাবীর বাড়ির লোকদের বললেন।

“এইভাবে বললেই কি হবে? আপনার ঘরের মেয়েকে যদি আমার বাড়ির ছেলে তুলে নিয়ে বিয়ে করে নেয়, তবে আপনি কি ঠিক এইভাবেই শান্ত হয়ে বসে থাকবেন?”
এই কথাটি একজন তরুণ বলেছেন। হয়তো, ভাবীর ভাই হবেন উনি! কিন্তু তার মুখের কথা শুনে সাদিফ ভাই বেশ জোরে চিল্লিয়ে উঠলেন,

“তার ব্যাপার কেনো এইখানে টানছেন? সে তো এই আলোচনায় আসার কথা নয়! তার ব্যাপারে আমি অন্য ছেলের মুখ থেকে কিছুই শুনতে চায় না। আপনি আত্মীয়ের সমান বলে আমি আপনাকে আজ কিছু বলছি না। ভবিষ্যতে শুধু আলোচনার কথা বলবেন। ইসলালের বোনের কথার প্রসঙ্গ যেনো না আসে। তাছাড়া, যে ঘটনা হয়নি; সে ঘটনা নিয়ে কেনো টানছেন? মূল কথায় আসুন। আপনার বোন নিজের ইচ্ছেতেই ইসলালের সাথে পালিয়েছে। কি ইরা, এটা কি সত্যি নয়?”
সাদিফ ভাইয়ের এমন উক্তিতে ভাবী মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বললো।
এই ঘটনা দেখে সাদিফ ভাই আবারও বললেন,

“দেখলেন তো! ব্যাপারটা এখন পানির মতো পরিষ্কার। তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়াটাই এখন উত্তম হবে। এতে আপনাদের বাড়ীর মেয়েও খুশি আবার আমাদের বাড়ির ছেলেও খুশি। তাছাড়া, তারা যখন দুজন দুজনকে ভালোবাসে, সেখানে আমরা বাম হাত না ঢুকালেই ভালো হবে। কারণ, তারা একসাথে সংসার করবে। আমরা তো আর তাদের সাথে সংসার করতে যাচ্ছি না!”

কথাগুলো বলে সাদিফ ভাই আমার দিকে তাকালেন। আমি যেহুতু উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম তাই উনার নজর বরাবর আমার চোখে এসে পড়লো। উনার নজরটা আমার চোখে নয় বরং আমার বুকের গভীরে এসে লাগলো। উফ, এই তীক্ষ্ণ চোখজোড়া! আমি মুচকি হাসলাম উনার দিকে তাকিয়ে আর উনি আমাকে হাতের ইশারায় সরে যেতে বললেন। উনার ইঙ্গিত আমি না বুঝতে পারলেও, ইতি আপু আমাকে বললেন,

“নেতাজি ইশারা দিয়েছেন। সরে পড় শেফা। নাহলে এসে তোর ঘাড় মটকে দিবে।”
“উফ, না। আমি সরবো না। আমি তো এই তীক্ষ্ণ চোখজোড়া দেখে নিজের মাঝে নেই আপু। এই নেতাজির হাসি আর চোখ এতো সুন্দর কেনো? এতো সুন্দর মানুষের মুখে কি তেতো কথা মানায়?”
আমি কথাগুলো বলে জুমুর গায়ে হেলান দিলাম। আর বাকিরা আমার দিকে হা করে আছে।
“কি? নেতাজির প্রেমে পড়িসনি তো তুই?”

জুরাইন আমাকে অবাক হয়ে বললো।
আমি তো চেয়েছিলাম প্রেমের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করতে। কিন্তু আমার প্রতি সাদিফ ভাইয়ের দরদ দেখে আর কোনো দরকার নেই আমার গোয়েন্দাগিরি করার। এই ছেলেরই প্রেমে পড়েছি আমি ব্যস। উফফ! ভাবা যায় এইসব?

আমি মুচকি হেসে বললাম,
“উম, হ্যাঁ। এই নেতাজির প্রেমে পড়েছি আমি। আহা, দেখছিস না কি সুন্দর করে হাসে, আবার আমার দিকে তাকায়। এই রাগী লম্বু নেতাজিকে আমার চাই ই চাই।”

আমার কথা শুনে ইতি আপু গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর জুরাইন এবং জুমু চিল্লিয়ে উঠলো,

“আল্লাহ্ গো! আজ সূর্য কোনদিকে উঠলো? এই দিনটাও কি আমাদের জীবনে আসার কথা ছিলো?”
তাদের চিল্লানো শুনে আলোচনায় মগ্ন সবাই আমাদের দিকে তাকালো। আর সাদিফ ভাই সে তো তার চোখ দিয়েই আমাকে রাগী মার্কা হুমকির ইশারা দিচ্ছেন। এই যাহ! আজই আমি উনার প্রেমে পাগল হলাম আর আজই উনি আমাকে রাগী চোখ দিয়ে ঝলসিয়ে দিচ্ছেন?

কিন্তু, উনার এমন নজর দেখে আমি আর সেখানে দাঁড়ালাম না। এক দৌড় লাগালাম ভেতরের দিকে। আমাকে একটু আগে উনি সতর্ক করলেন, কিন্তু আমি উনার সতর্ককে পাত্তা না দিয়ে বিরাট ভুল করেছি। আমার জন্যে কি শাস্তি অপেক্ষা করছে, আল্লাহ্ জানেন। আমার এই নিষ্পাপ প্রেম শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে না তো!


পর্ব ১৩

ভাবীর বাড়ির সবাই আমার ভাইকে মেনে নিয়েছেন। একটু আগেই সবাই একজন অপরকে মিষ্টি মুখ করিয়েছে। কিন্তু, এইসব দৃশ্য আমার স্বচক্ষে দেখার সুযোগ মিলেনি। কারণ একটাই, সাদিফ ভাই। আমাকে সাদিফ ভাই জুমুর রুমে লক করে রেখেছেন। উনি সবার সাথে আলোচনা শেষ করে আমার কাছে এসেছিলেন বেশ কিছুক্ষণ আগেই। কিন্তু আমি উনাকে রুমে ঢুকতে দিইনি।

যার কারণে উনি আমাকে রুম বন্ধী করে রেখেছেন। মানে আমার দরজা না খোলার কারণে, সাদিফ ভাই রুমের দরজা সামনে থেকে লক করে দিয়েছেন। আর আমি হয়ে গেলাম রুমবন্ধী। সবাইকে এত অনুরোধ করেছি দরজা খুলে দেয়ার জন্য, কিন্তু কেউ আমার মতো অসহায় মেয়েকে সাহায্য করেনি। অগত্য আমি রুমের ভেতর বসে ছিলাম। এই যে তিন চার মিনিট আগে জুমু এসে রুমের দরজা খুলে দিল। আর সে গড়গড় করে নিচের ঘটনা আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছে।

আজই প্রেমে পড়লাম উনার সাথে আর আজই উনি আমার সাথে এত খারাপ ব্যবহার করছেন! কিভাবে এই লোকের সাথে আমার ভবিষ্যৎ গড়বো আমি? আস্ত একটা খারাপ, এই সাদিফ ভাই। আমি চুপ করে জুমুর কথা শুনছি। নিচে এখন সবাই আপাতত বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছেন। ভাবীর পরিবারের সবাই দুপুরে খেয়ে যাবেন, এমনটাই শুনলাম জুমুর মুখ থেকে।

আমি এখনো নিচে নামার অনুমতি পায়নি। আর আশ্চর্য ব্যাপার হলো, মা আমাকে এই উৎসবে শামিল হওয়ার জন্যে একবারও আসলেন না আমাকে ডাকতে। হু, ছেলের বউ পেয়ে এখন নিজের মেয়েকেই চোখে দেখছেন না উনি। আমি বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছি। আমার পাশে জুমু পকপক করেই যাচ্ছে। তার কথায় আমি মাঝে মাঝে দু একটা হ্যাঁ/না করেই যাচ্ছি। মাথায় শুধু সাদিফ ভাইয়ের কথা ঘুরছে আমার। এই লোক এমন কেনো? এতো রসকষহীন কেনো উনি? এই লোককে আমি কিভাবে আমার মনের কথা বলবো,

এটাও আমার মাথায় আসছে না। হঠাৎ করেই ধুম করে দরজা খোলার শব্দ এলো। মাথা তুলে দেখি, সাদিফ ভাই। উনাকে দেখে আমি জুমুর হাত চেপে ধরলাম। কেনো যেনো ভয় লাগছে আমার। সাদিফ ভাইয়ের কথা না শোনার শাস্তি উনি আমাকে অবশ্যই দিবেন। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছে।
জুমু তার হাত থেকে আমার হাত ছুটিয়ে বললো,

“নিচে তো বেশ প্রেমে পড়েছি, প্রেমে পড়েছি করেছিলি। এইবার বুঝ মজা।”
জুমু শয়তানি হাসি দিয়ে আমাকে একা রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

আর এইদিকে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। কি করবো আমি এখন। সাদিফ ভাই ধীর পায়ে আমার দিকে আসতে নিলেই আমি দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম বিছানা থেকে। যেই পালাতে যাবো আমি, অমনিই সাদিফ ভাই আমার হাত চেপে ধরলেন। আমি উনার দিকে তাকাতেই পারছি না ভয়ে। সাদিফ ভাই আমার হাত মুচড়ে ধরলেন আর আমাকে টেনে উনার বুকের মাঝে নিয়ে নিলেন আমাকে। আমার পিঠ ঠেকালো উনার বুকের সাথে। সাদিফ ভাই আমার কানে ফিসফিস করে বললেন,

“এখন কই যাবি? তোর এতো সাহস আসে কিভাবে?”

যদিও আমার এখন ভয় লাগছে, তবে তার চেয়ে বেশি আমার এখন ভালো লাগছে; আমার নেতাজির এতো কাছে আছি বলে। তার বুকের ধুকধুক শব্দ আমার পিঠের মধ্যে অনুভব হচ্ছে। আমি যে উনাকে পছন্দ করি, উনি সেটা একদমই জানেন না। ইস, উনি যদি এই কথা জানে তবে কি উনি আমার উপর খুব হাসবেন? অবশ্য হাসারই কথা। আমি কি এমন মেয়ে, যার কারণে উনি আমাকে পছন্দ করবেন! এমনটা ভাবতেই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো নিমিষেই।

কিন্তু আমার ভাবনার ইতি ঘটলো সাদিফ ভাইয়ের কথায়।
“কি হলো রূপসী? এখন চুপচাপ কেনো তুই? একটু আগে তো আমার মুখের উপরেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলি। এখন তোর সব সাহস কই গেলো?”

উনার এইভাবে আমার কানের পাশে ফিসফিস করে কথা বলাটা আমার বুকের মাঝে টর্নেডো শুরু করে দিয়েছে। আমার এই মুহূর্তে ঠিক কি অনুভূতি হচ্ছে সেটা আমি নিজেই বুঝতে পারছি না। মাথাটা ভনভন করছে আমার। খুব কষ্ট করে সাদিফ ভাইকে বললাম,

“ছাড়ুন আমাকে। আমি আপনার নামে খালামণিকে বিচার দিবো।”
আমার কথা শুনে সাদিফ ভাই শব্দ করে হাসলেন।
“আহারে খুকি মেয়েটা! বিচার দিবে তার খালামণিকে। বিচার দিলে কি হবে? কিছুই হবে না বিচার দিলে। এই সাদিফকে শাসানোর সাহস কারো নেই।”

কথাটা বলে উনি আমার হাত আরেকটু মুচড়ে দিলেন। আমি ব্যাথায় “আহ্” শব্দ করতেই সাদিফ ভাই আমার হাত ছেড়ে দিলেন। আমি আমার ব্যাথা পাওয়া হাত নিজের অন্যহাত দিয়ে মালিশ করা শুরু করলাম। সাদিফ ভাই আমার বাহু ধরে উনার দিকে ফিরিয়ে আমার হাত উনার হাতে নিয়ে একটা চুমু দিলেন। এই ঘটনায় আমার এখন জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো। সাদিফ ভাই আমাকে চুমু দিলেন! এটা কি সত্যি কোনো ঘটনা নাকি আমার মনের ভুল? আমি আস্তে করে নিজের পিঠে একটা চিমটি কাটলাম, ঘটনা সত্যি নাকি স্বপ্ন সেটি জানার জন্যে।

উফ, জ্বলে উঠলো। তার মানে সাদিফ ভাই আমাকে সত্যিই চুমু দিলেন। আমি ভেবেছি উনি ভুলে আমাকে চুমু দিয়েছেন। কিন্তু উনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে না উনি ভুল কিছু করেছেন। আমার হাতে উনার হাত বুলিয়ে সাদিফ ভাই আহত কণ্ঠে বললেন,
“সরি, সরি। বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?”

ব্যাথায় চেয়ে বেশি আমি অবাক হয়েছি এখন। চোখের মাঝে সব ঘটনা যেনো স্বপ্ন হয়ে ভাসছে। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি উনার দিকে। মনে মনে আমার ভেতর সুখের হওয়া বয়ে চলেছে। চুমুতে কি সত্যি এতো ভালোলাগা থাকে? হাতে চুমু দিলেই যদি এমন অনুভূতি হয় তবে… ইস!

ছি, শেফা। সামান্য একটা চুমু থেকে তুই কিসব চিন্তায় ডুবেছিস! সাদিফ ভাই টের পেলে ঘাড় মটকে দিবে আমার। মনে মনে এইসব ভাবলেও আমি মুখে বলে উঠলাম,
“এতো বড় হাতি আপনি। আমার মতো চিকন মানুষকে এইভাবে চেপে ধরলে ব্যাথা পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না!”

আমার কথায় সাদিফ ভাই ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। উনি কিছু বলার আগেই আমি বেরিয়ে পড়লাম এই রুম থেকে। রুম থেকে বেরিয়ে আমি নিচে নামলাম। সবাই অনেক উপভোগ করছে মেহমানদের সঙ্গ। আমি গিয়ে এক পাশে দাঁড়ালাম সেখানে।

আমাকে দেখে ইতি আপু বলে উঠলেন,
“কিরে ঐদিকে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? এইখানে আয়! দেখ সবাই তোর কথা অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে।”

ইতি আপুর কথায় আমি সবার দিকে এগোলাম। সবার সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম, ভাবীর ভাই আছেন দুইজন। আর ভাবী একটা এক বোন। উনার দুই ভাই ভাবীর থেকে অনেক বড় বয়সে। কিন্তু এরা কেউ এখনো বিয়ে করেননি। তাদের ইচ্ছে উনাদের বোন মানে ভাবীকে সৎ পাত্রের হাতে উঠিয়ে দিয়ে তবেই দুই ভাই বিয়ে করবেন। কি ভালোবাসা বোনের প্রতি! আর এইদিকে আমার ভাই, তার কোনো হেলদুল নেই আমার ব্যাপারে।

সে কি সুন্দর করে বিয়ে করে নিয়েছে, তাও আমাকে না জানিয়ে। যাক, এখন সব কিছু মিটমাট হলো। ভাবীর দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাইটা বেশ চঞ্চল। ভাবীর ছোটো ভাইয়ের নাম ফাহিম, উনি এইবার মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিবেন। ভাবীর বড়ভাই একটু গম্ভীর প্রকৃতির। আমি সবার সাথে বেশ ভালো করে কথা বলছি। ভাবীর বাসা থেকে আজ কোনো মেয়ে আসেনি। শুধু ভাবীর চাচা, মামা, ভাবীর কিছু কাজিন, ভাবীর দুই ভাই এবং উনার বাবা এসেছেন। ভাবীর চাচা আর মামা বেরিয়ে গেলেন একটু আগে।

কিন্তু ভাবীর দুই ভাই, কাজিনেরা আর উনার বাবা থেকে গেলেন। আমরা মূলত তাদের সাথেই জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। কথার মাঝে দেখলাম সাদিফ ভাইকে আসতে। লোকটা বাহিরে যাবেন বুঝি! বেশ পরিপাটি হয়ে নিচে নেমেছেন একেবারে। আমি তো আমার প্রথম প্রেম মানে সাদিফ ভাইকে মন দিয়ে দেখছিলাম। কিন্তু মাঝে কাবাবের হাড্ডি হলো, ভাবীর ছোট ভাই।

“আমার বড় ভাইয়ের পক্ষ থেকে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। ভাইয়া আসলে আমার বোনকে নিয়ে খুব চিন্তা করছিলো। তাই না বুঝে তোমায় এইসব কথা বলেছিলো। তুমি কিছু মনে করবে না দয়া করে।”
আমি উনার কথায় মুচকি হাসলাম।

“সমস্যা নেই ভাইয়া। আমি বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা।”
আমার কথা শেষ হতেই আমার হাতে কারো ছোঁয়া পেলাম। হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম এটি সাদিফ ভাইয়ের হাত। কি হলো! উনি কি এখনো বাহিরে যাননি? আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাদিফ ভাই আমার হাত টেনে দিয়ে মেইন দরজার সামনে নিয়ে দাঁড় করালেন। আর বেশ রাগী কণ্ঠে বললেন,

“এই ছেলেপেলে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ তাদের সামনে যাবি না তুই। আমি এসে যদি শুনতে পায় তুই তাদের সাথে আড্ডা দিয়েছিস, তবে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”
উনার কথার বিপরীতে আমি বললাম,

“কেনো? সবাই তো আছে ঐখানে। আমি বসলে কি সমস্যা?”
“সবার সাথে তোর তুলনা হয় না। সাদিফ তার প্রোপার্টিকে শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। তোর হাসি কান্না সব শুধু আমি দেখবো। বাহিরের কেউ নয়। এখন রুমে বা রন্নঘরে গিয়ে বসে থাক।”

কথাগুলো বলে সাদিফ ভাই চলে যাচ্ছেন দ্রুত। আমার মুখ দিয়ে না চাওয়া সত্বেও কিছু শব্দ বেরিয়ে এলো।

“কেনো? আমি আপনার কথা মতো কেনো চলবো?”
আমার প্রশ্নে সাদিফ ভাই মুচকি হেসে বললেন,
“তুই আমার সম্পত্তি তাই।”

ব্যস কথা শেষ, আর কিছুই না বলে উনি বেরিয়ে পড়লেন। আর আমি গাধীর মতো হা করে উনার যাওয়ার পানে চেয়ে আছি।”উনার সম্পত্তি আমি!” কথাটা আমার কানে বাজছে বারবার। আচ্ছা সাদিফ ভাইও কি আমাকে পছন্দ করেন?


পর্ব ১৪

ঘরের সবাই এখন কাজে মহা ব্যস্ত। আজ ভাইয়া আর ভাবীর হলুদ করা হবে। অবশ্য বাড়ির ছাদ বড় থাকার সুবিধার্থে অনুষ্ঠান ছাদেই করা হবে। তাছাড়া ভাইয়া আর ভাবী আগেই বিয়ে করে নিয়েছে, তাই এখন ছোট করে একটা অনুষ্ঠান করে ভাবীকে আমাদের বাড়িতে উঠানোর পরিকল্পনা করছে সবাই। ভাবী এই এক সপ্তাহ উনার বাড়িতেই ছিলেন। তবে আজ সকালেই উনি এবং উনার পরিবার এসেছেন আমাদের বাসায় হলুদের অনুষ্ঠান উপলক্ষে।

হলুদ ছোট করে করলেও বিয়ের অনুষ্ঠান হবে শহরের বড় একটা কমিউনিটি সেন্টারে। হলুদের অনুষ্ঠানে শামিল হতে আমাদের, খালামনিদের এবং মামার পক্ষের বেশ মেহমান এসেছেন আমাদের বাসায়। মোটামুটি একটা জমজমাট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বাড়িতে। ইতি আপু, জুমু, জুরাইন আমরা বড়দের সাথে কাজে হাত লাগাচ্ছি। আমার ভাই এবং সাদিফ ভাই অনুষ্ঠান নিয়ে নানান আলোচনা করছেন লিভিংরুমে বসে। ভাবীর বাড়ির সবাই খাবার খাচ্ছে, আর মজা করছে শুধু।

অনেক মেয়ে সাদিফ ভাইয়ের আশে পাশে ঘুরঘুর করছে। এইসব দেখে আমার মেজাজ বড্ড খারাপ হয়ে গেলো। কিছু বলতেই পারছি না তাদের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। তবে এক দিক দিয়ে আমি বেশ নিশ্চিন্তে আছি। আর সেটি হলো, সাদিফ ভাই এইসব লুচু মেয়েদের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখেননি। এটাই আমার মনে এক বালতি শান্তি এনে দিয়েছে। চারদিকে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে।

মুরুব্বী মানুষেরা বসে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। বাকি সবাই কাজে মগ্ন। আজ আসল বিয়ে বাড়ির রূপ দেখছি আমি। বিয়ে বাড়ির এতো মজা আমি কখনোই ভালো করে উপভোগ করতে পারিনি। পারবোই বা কিভাবে! এতদিন তো পরিবারের কারো বিয়েই হয়নি। চারদিকে ঘুরে দেখে এখন আমি আর ইতি আপু মিলে মিষ্টি বানাচ্ছি। আমাদের বানানো মিষ্টি বেশ ভালো হয়। জুমু এবং জুরাইন বসে বসে পান সুপারি ঠিক করে নিচ্ছে। তারা দুইজন যেনো চির শত্রু! এতক্ষণ যাবত তারা একসাথে কাজ করছে কিন্তু তাদের মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হলো না। এরা এমন কেনো?

তাদের নিজেদের এতো মধ্যে এতো দ্বন্দ্ব কিসের, এটি জানতে আমার বড্ড ইচ্ছে করে। লাড্ডু বানানো শেষ করে আমি ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালাম। লাড্ডু বানানোর আগে আমি ওড়না বুকে আর কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন হাতে মিঠা লেগে থাকার কারণে ওড়না ধরতেই পারছি না। আমরা ঘরের একপাশের একটি রুমে বসে কাজ করছিলাম। ইতি আপু মিষ্টির দুইটি হাঁড়ি উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলেন। এইদিকে জুমু আর জুরাইন দুইজন পান সুপারির বোল নিয়ে চলে গেলো।

আমি দাঁড়িয়ে আছি ওড়না ঠিক করার জন্যে। কারণ, চারদিকে এখন নানান ছেলে আছে বাড়িতে। এইভাবে ওড়না দিয়ে তো তাদের সামনে যাবে না! কিন্তু হাতে মিঠা লেগে থাকার কারণে কিছু করতেই পারছি না। এইদিকে কোনো পানির ব্যাবস্থা থাকলে ভালই হতো। হাতটা ধুয়ে নিতে পারতাম। ইস, জুমু বা ইতি আপু থাকলেই কাজ হয়ে যেতো। কিন্তু তখন তো ওড়নার এমন বাজে অবস্থা আমি লক্ষ করিনি।

হাতে মিঠা লেগে চুপচুপ হয়ে আছে। এখন ওড়নায় হাত লাগালেই আমার সুন্দর ওড়না নষ্ট হবে। অগত্য আমি দাঁড়িয়ে আছি ইতি আপুদের অপেক্ষায়। রুম থেকে মাথা বের করে দু তিন বার ডাক দিলাম আপুদের। তবে এইদিকে আর কোনো পিচ্চি বা কোনো মানুষকে দেখতে পারছি না। কই গেলো সবাই? আমার এখন বেশ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আমি আরেকবার জোরে চিল্লিয়ে আপুদের ডাকলাম।
“কি হয়েছে ফুল?”

এমন পুরুষালী কণ্ঠ শুনে আমি ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আলী ভাই। উনাকে দেখে আমি বেশ ভড়কে গেলাম। আমি আমার মাথা সামনের দিকে ফিরিয়ে উনাকে বললাম,

“আপনি এইখানে?”
“হ্যাঁ, তোর শব্দ শুনেই তো আসলাম। কিছু প্রয়োজন আছে তোর?”
আলী ভাই শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন।

আমি একবারের জন্যে উনার দিকে সম্পূর্ণ শরীর ফিরিয়ে তাকায়নি। তাকাবোই বা কিভাবে! ওড়নার যা বেহাল দশা। আমি উল্টো দিকে ফেরানো অবস্থায় উনাকে বললাম,
“ইতি আপু বা জুমুকে ডেকে দিন, দয়া করে।”
এইবার আলী ভাইয়ের কণ্ঠ আমি আমার বেশ কাছ থেকে শুনতে পেলাম। মনে হলো উনি আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন।

“আমায় বল। আমি তোর সব কাজ করতে রাজি আছি।”
আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই একজনের রাগী কণ্ঠ ভেসে এলো আমার কানে। আর সে কণ্ঠ আর কারো নয় বরং আমার নেতাজির।
“কি হচ্ছে এইখানে?”
আলী ভাই অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,

“ক..কই কিছু না তো! ফুলের সাহায্য লাগছিলো। তাই ভেবেছি আমি একটু সাহায্য করি তাকে।”
“বেরিয়ে যাও এইখান থেকে। কি করতে যাচ্ছিলে সেটা আমার নজরের বাহিরে যায়নি। আমার খারাপ ব্যাবহার দেখার ভুল করো না। টিকে থাকতে পারবে না।”

সাদিফ ভাই বেশ রাগ নিয়ে কথাগুলো বললেন। কিন্তু আমার মাথায় এটি আসছে না, আলী ভাই আসলে করলেন কি? যার কারণে সাদিফ ভাই এতো রেগে আছেন! আলী ভাই চলে গিয়েছেন রুম থেকে ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম। সাদিফ ভাই এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। উনার রাগী মুখ দেখে আমার মাথা থেকে ওড়নার খেয়ালটা ছুটে গিয়েছে। আমি অবাক হয়ে উনাকে প্রশ্ন করলাম,
“কি করেছে আলী ভাই?”

আমার প্রশ্নে সাদিফ ভাই আমার সামনে এনে রাখা বেণীটি পেছনের দিকে দিয়ে দিলেন।
“পিঠ দেখিয়ে রাখলে, যে কেউ সেটি স্পর্শ করার চেষ্টা করবে। তবে এইখানে তোর দোষ নেই আমি জানি। আমার বিশ্বাস আছে তোর উপর। কিন্তু, সব দোষ ঐ আলীর। আমি বলেছিলাম না, ছেলেটি ঠিক নেই! আজ আমি না আসলে সে তোর খালি পিঠ স্পর্শ করতে দ্বিতীয়বার ভাবতো না। এখন বল কি প্রয়োজন তোর? কাউকে ডাকা লাগবে?”

সাদিফ ভাই আমার নজরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন। আমার এলোমেলো ওড়নার দিকে একবারও তাকাননি উনি। আলী ভাইয়ের কান্ডের কথা শুনে বেশ রাগ লাগলো আমার। আমি মাথা নিচু করে সাদিফ ভাইকে বললাম,
“হুম, ইতি আপু বা জুমুকে ডেকে দিলে হবে।”

“ওকে। আমি পাঠাচ্ছি তাদের। আর নিজের সবকিছুর খেয়াল নিজে রাখতে শিখ। একটা কাজ করার পূর্বে চারদিকে নজর দিয়ে রাখবি। সবাই সুযোগের অপেক্ষা খুঁজে মাত্রই।”
কথাগুলো বলে আমার মুখ উচুঁ করে ধরলেন উনি। আমি উনার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। কিন্তু সাদিফ ভাই আবারও আমাকে বললেন,

” হাঁড়ি দুইটি আমি নিয়ে যাচ্ছি। আর ইতিকে পাঠাচ্ছি।”
আমি উনার কথায় মাথা নাড়ালাম। আর উনি দুইহাতে দুইটি হাঁড়ি নিয়ে হনহন করে চলে গেলেন।
আমি অবাক হয়ে আছি আলী ভাইয়ের ব্যাবহারে।

কি পরিমাণ লুচ্চা এই আলী ভাই। তাকে তো আমি ভালই ভেবেছিলাম। কিন্তু কথায় বলে না…”চক চক করলে সোনা হয়না!”ঠিক তেমন এই আলী ভাই। যেমন ভদ্র চেহারা, তেমন তার ভেতরে এত শয়তানি চিন্তা। এই আলী ভাই থেকে দূরে থাকতে হবে। এখন তো সাদিফ ভাইকে আমার নায়ক মনে হচ্ছে।

নায়িকাকে যেমন নায়ক বাঁচাতে আসে ভিলেইন থেকে, তেমনি সাদিফ ভাইও এলেন আমাকে আলী ভাই থেকে বাঁচাতে। ইস, আমি তো নায়িকা হয়ে গেলাম রে! ইতি আপু আসতেই আমার ওড়না ঠিক করে দিতে দিতে বললেন,

“এই বেহাল দশা কিভাবে হলো তোর? ভাগ্যিস এই অবস্থায় বের হোসনি তুই। নানাবাড়ি দাদাবাড়ি সব বুঝা যাচ্ছিলো। এইভাবে বের হলে এতো তোর ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যেতো, ফুল।”
ইতি আপুর কথায় আমি হেসে উঠলাম।

“ভাই তুমি এত আদুরে কেনো? নানাবাড়ি দাদাবাড়ি! হাহা।”
কথাগুলো বলে আমি আবারও হাসলাম।
“হয়েছে থাম। বাহিরে চল, অনেক কাজ বাকি আছে।”

ইতির আপু আর আমি বেরিয়ে পড়লাম রুম থেকে। আমি প্রথমেই আমার হাত ধুয়ে নিলাম। হাতের মিঠা পরিষ্কার করতে অনেক্ষণ লাগলো আমার। মানুষ বলে পিরিতির আঠা লাগলে আর ছাড়ে না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে মিঠার আঠা লাগলে আর ছাড়ে না।

হাত ধুয়ে আমি মায়ের কাছে গেলাম। মা ভাবীকে কিছু শাড়ি আর গয়না দিলেন। এগুলো মূলত রাতের অনুষ্ঠানে পড়ার জন্যে দিয়েছেন ভাবীকে। এখন সবাই দুপুরের খাবার খাবে। দুপুরের খাবারের জন্যে ছাদে ব্যাবস্থা করা হয়েছে। রাতের খাবারটাও ছাদে পরিবেশিত হবে। একে একে সবাই ছাদে যাচ্ছেন খাবারের জন্যে। জুমু এবং জুরাইন দুইজন একসাথে দরজা দিয়ে বের হতে গিয়ে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেলো। আর এই কারণে জুমু জুরাইনের উপর চিল্লিয়ে উঠলো,

“চোখ কি হাতে নিয়ে হাঁটছো? নাকি সুন্দরী মেয়ে দেখলেই এইভাবে ব্যাবহার করো?”
জুরাইন হেসে উঠলো জুমুর কথায়।

“ইস, কি যে সুন্দর চেহারা! যে কেউ দেখলে প্রেমে না পড়লেও বমি তো করবেই মাস্ট।”
জুমু হাত বাড়িয়ে জুরাইনকে চড় দিতে গেলেই আমি হাত ধরে নিলাম।
“আমার প্রিয় ভাই বোনেরা, এইভাবে ঝগড়া করছিস কেনো বাচ্চাদের মতো? উপরে চল প্লিজ। আমার অনেক ক্ষুধা লেগেছে।”

জুরাইন ভাব নিয়ে জুমুর উদ্দেশ্যে বললো,
“আমার বোনের জন্যে ছেড়ে দিলাম। নাহলে আজ এই বিশ্ব সুন্দরীকে তার যোগ্যতা দেখিয়ে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়তাম।”

জুরাইন দৌড় দিলো কথাটা বলে। আর জুমু জুরাইনের পিছে দৌড় লাগলো। ইতি আপু আগেই চলে গিয়েছে ছাদে। তাই আমি অগত্য একা একা উঠতে লাগলাম সিঁড়ি দিয়ে। দুই ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করতেই দেখি আলী ভাই। নিচের দিকে নামছিলেন উনি। আমাকে দেখে সিঁড়িতে দাড়িয়ে পড়লেন আলী ভাই। আমি কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

সাদিফ ভাই আলী ভাইয়ের আসল রূপ আমার সামনে তুলে ধরেছেন। তাই এখন এই আলী ভাই নামক মানুষকে আমার বড্ড ঘৃণা হচ্ছে। আমি কিছু না বলে চুপচাপ উঠে যেতে নিলে আলী ভাই আমার পথ আটকে দিলেন। আমি এই জিনিসটা দেখে আরো ভয় পেয়ে উঠলাম। আমি আমতা আমতা করে উনাকে বললাম,
“স..সরুন আলী ভাই। আমার উপরে যাওয়া লাগবে।”

“তুই কি আমাকে ইগনোর করছিস?”
আলী ভাইয়ের কথায় আমি ভ্রু কুঁচকে নিলাম।
“আপনাকে আমার খেয়াল করার কি আছে? আর ইগনোর করারই বা কি আছে? আপনি আমার ভাইয়ের বন্ধু। আমার নিজের ভাইয়ের সমতুল্য।”

আলী ভাই কিছু একটা বলতে নিলেন। কিন্তু আমি উনাকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলাম।
“আপনি আমার সাথে কথা কম বললেই ভালো হবে। আমাকে যেতে দিন। যেতে হবে আমার।”
আমার উক্তিতে উনি এক বিন্দু নড়লেন না। আমি উনার এমন অবস্থা দেখে আমার মাথার বুদ্ধি খাটিয়ে বলে উঠলাম,
“সাদিফ ভাই?”

আমার এমন কথায় আলী ভাই সরে গেলেন আমার সামনে থেকে এবং পেছনে ফিরলেন।
ততক্ষণে আমি উপরের দিকে রওনা দিলাম। আর দ্বিতীয়বার ফিরে তাকায়নি আলী ভাইয়ের দিকে। ছাদে সবাই বেশ জমিয়ে খাবার খেয়ে চললো। সবাইকে দেখতে পেলাম কিন্তু সাদিফ ভাইকে দেখতে পেলাম না। আমি খালার পাশে খেতে বসে গেলাম। প্লেট ধুয়ে আমি খালার উদ্দেশ্যে বললাম,
“সাদিফ ভাই, কোথায়?”
খালা উনার মুখে ভাত পুরে দিয়ে বললেন,
“কাজে গিয়েছে বললো। রাতে একেবারে অনুষ্ঠানে আসবে।”

খালার উত্তরে আমি কিছুই বললাম না। এই কাজ আর শেষ হবে না উনার। দেখা যাবে উনার বিয়ের দিনেও উনি কাজে বেরিয়েছেন। ইস, তখন আমার যে কি অবস্থা হবে! আরো নানা কথা ভেবে আমি খাবারে মন দিলাম।

সন্ধার পরপর সম্পূর্ণ বিল্ডিং রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। আমরা সবাই দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম। মেয়েরা আজ হলুদ আর হালকা সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছে আর ছেলেরা পড়েছে হালকা সবুজ রঙের পাঞ্জাবি। আমি শাড়ি খুব কম সামলাতে পারি। তবে আমার শাড়ি পড়তে বেশ লাগে। সবাই তৈরি হয়ে ছাদের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম।

ছাদের রূপ এখন একেবারে পরিবর্তিত। কি সুন্দর করে সাজিয়েছে! চোখ ফেরানো দায়। আমার চোখ চারদিকের সৌন্দর্যের মাঝে খুঁজে চলেছে একজনকে। সে আর কেউ নয় আমার নেতাজি। উনাকে সেই দুপুরেই দেখলাম। আর কোনো খবর নেই উনার। কিন্তু আমার বেশি কষ্ট করতে হয়নি। ছাদের দরজার দিকে তাকাতেই দেখলাম নেতাজি আসছেন, হালকা সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পড়ে। উনার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতেই মন চাচ্ছে আমার। এমন হালকা রঙে উনাকে এতো সুন্দর লাগবে এটা আমি কখনোই ভাবিনি।

উনি উনার এলোমেলো দাঁত বের করে হাসছেন আর ভাইদের সাথে কথা বলেছেন। আশে পাশের মেয়েগুলো ঐদিকে রং ঢং করছে। উফ বাবা! এক একজন মেয়ে তো পেট বের করে রেখেছে সাদিফ ভাইকে দেখানোর জন্যে। আর আমি! পুরো শাড়িতে কমপক্ষে পঁচিশটি পিন লাগিয়েছি। কিভাবে পারে এরা নিজের শরীর দেখাতে! ছি ছি, তওবা। আমি মেয়েগুলোর থেকে চোখ ফিরিয়ে আবারও নেতাজির দিকে তাকালাম। নেতাজি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। আহা, মনটা দুলে উঠলো আমার।

আমি একটু মুচকি হাসলাম উনার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু উনি! আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে রইলেন। বাহ্! হাসির বদলে রাগ? এই সাদনান সাদিফের ভেতরে আসলেই রসকষ নেই একেবারে। অনুষ্ঠান এখন খুব জমছে। আমরা সবাই মিলে ধুম ফেলে দিয়েছি অনুষ্ঠানের। রাত বারোটার দিকে ভাবী এবং উনার পরিবার চলে গেলেন। তবে আমাদের অনুষ্ঠান এখনো আগের তালে চলছে। এখন অনুষ্ঠানের শেষের দিকে।

সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানে আমি যতবার সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়েছিলাম ততবার আমাদের চোখাচোখি হলো। কি দেখেন উনি আমার দিকে তাকিয়ে! আমি তো উনাকে পছন্দ করি, তাই তাকায় উনার দিকে। কিন্তু উনি কেনো তাকান? এই প্রশ্নটা যদি উনার কাছে করতে পারতাম! সবাই বেশ জোরে নাচানাচি করছে। আমি নাচ করে হাঁপিয়ে উঠলাম। সবাই নাচলেও সাদিফ ভাই নাচেননি।

আমি খাবারের টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে অল্প পানি পান করলাম। যেই গ্লাস রাখতে যাবো, অমনিই কোমরে কারো হাতের স্পর্শ পেলাম। পেছনে ফিরতেই দেখি সাদিফ ভাই। উনার চোখের রং এখন একদম বদলে গিয়েছে। আমি অবাক চোখে উনার দিকে তাকাতেই, উনি আমার গলায় উনার হলুদে রাঙা হাত দিয়ে ছুঁয়ে আমাকে বললেন,

“তোর যেসব স্থান দেখা যাবে, সেখানেই আমি আমার রঙ লাগিয়ে দিবো। নাচতে নাচতে কোমরের শাড়ি সরে গিয়েছিলো, সে খেয়াল হয়নি তোর? এতটা বেখেয়াল কেনো তুই?”

উনার হাত আমার গলায় লাগার ফলে আমার গলায় যেনো পাথর জমেছে। একটা অক্ষর বেরুচ্ছে না আমার মুখ দিয়ে। আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে সাদিফ ভাই আবার বললেন,

“শাড়িটা ঠিক কর। কে বলেছে তোকে শাড়ি পড়তে? আমি নিজেকে আর কিভাবে সামলিয়ে রাখবো? একে তো শাড়ি পড়েছিস, তার উপর কোমরের কালো কুচকুচে তিলটা দেখতে পেলাম একটু আগে। এইসব দেখে কি আমর মাথা ঠিক থাকে? যাক বাদ দে এইসব। আমি দাঁড়িয়ে আছি। কোমর ঢেকে ফেল।”

কথাগুলো বলে উনি অন্যদিকে ফিরে গেলেন।

আর এইদিকে আমি জমে পাথর হয়ে গেলাম। সাদিফ ভাই আমার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকেননি পুরো সময়, বরং উনি উনার চোখ দিয়ে আমাকে পুরো স্ক্যান করে নিয়েছেন। এই লজ্জা আমি কোথায় লুকিয়ে রাখবো? ভাগ্যিস উনিই ছিলেন, অন্য কোনো ছেলে দেখলে তো আমার এই মুখ দেখানো হতো না আর।
“কি ব্যাপার? জলদি কর।”

সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমি আমার কোমরের দিকে হাত রাখতেই ঠান্ডা হলুদের অস্তিত্ব পেলাম। সেই হলুদের উপরেই আমি শাড়ি টেনে নিয়ে শাড়ীর অন্য জায়গা থেকে পিন লাগিয়ে কোমর ঢেকে নিলাম।


পর্ব ১৫

সারারাত নাচানাচি করার ফলে আমার কোমর আর পায়ের অবস্থা বারোটা বেজে গেলো। তাছাড়া অনুষ্ঠান শেষ হলো একেবারে ভোরে। যার কারণে আজ সকালে সবাই গরুর মতো ঘুমিয়েছি। আমার ঘুম ভাঙলো একটু আগেই। আমার রুমে আমি, জুমু, ইতি আপু, জারাভি আমরা ঘুমিয়েছিলাম একসাথে। এখন বিছানায় শুধু আমি আর জারাভি আছি। বাকি দুইজনের দেখা নেই। ঘড়িতে দেখলাম এখন দুপুর একটা বাজে। আমি কামিজ আর তাওয়াল নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। দুপুর যখন হয়ে গেলো তাহলে এখন গোসল করে নেওয়াটা উত্তম হবে। খুব জলদি আজ গোসল সারলাম।

যেখানে আমি আধাঘন্টার আগে বাথরুম থেকে বের হই না, সেখানে আজ আমি পনেরো মিনিটেই গোসল সেরে নিলাম। কাপড় পড়ার সময় আয়নাতে হলুদে রাঙানো আমার কোমর দেখতে পেলাম। সাদিফ ভাই কাল আমার এই স্থানেই স্পর্শ করেছিলেন। আহা! এই কথাটি ভাবতেই আমার মনে সুখের দোলা দিয়ে উঠলো। কাল সাদিফ ভাই একটু বেশি কাছাকাছি ছিলেন আমার।

আমার দিকে কেমন কেমন করে যেনো উনি তাকিয়ে ছিলেন। উনার এই নজর আমার বেশ আকর্ষণীয় লাগে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত আমার ঢাল হিসেবে ছিলেন উনি। অবশ্য আমাকে নাচতে বা অনুষ্ঠান মন খুলে উপভোগ করতে মানা করেননি উনি। শুধু আমাকে ইশারা দিয়ে বার বার বুঝাচ্ছিলেন,

“শাড়ি খুলে গেলে, তোকে আমি মেরে ফেলবো।”

সাদিফ ভাইয়ের এই ইশারা আমার বেশ লেগেছে। উনার কর্মকান্ডের কথা ভাবতে ভাবতেই আমি তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হলাম। সবাই যে যেদিকে পারছে সেদিকে বসে নাস্তা করছে। সবাই হয়তো দেরী করে ঘুম থেকে উঠেছে! আমি চুলের তাওয়ালটা ভালো করে মুচড়ে বেঁধে নেওয়ার চেষ্টা করছি আমার চুলের সাথে। মাথা নিচের দিকে করে তাওয়াল দিয়ে চুল বাঁধছি আর মনের সুখে হেঁটে চললাম আমি। হঠাৎ কারো বুকের সাথে ধাক্কা লাগার ফলে আমি থেমে গেলাম।

যার সাথে ধাক্কার সম্মুখীন হলাম সে আমার দুইবাহু শক্ত করে ধরে নিয়েছেন। তাওয়ালে হাত রাখা অবস্থায় আমি মাথা উচুঁ করে তাকালাম। আমার সামনে সাদিফ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা রঙের সোয়েটারে খুবই সুন্দর লাগছে উনাকে। আমি উনার দিকে তাকিয়ে যেই মুচকি হাসি দিতে যাবো, অমনিই আমাকে উনি দিলেন এক ধমক,

“ঘরে এতো মানুষ, আর তুই এতো বেখেয়ালি হয়ে হাঁটছিস কেনো? আমার জায়গায় যদি অন্য কেউ থাকতেন, তবে কি হতো? স্টুপিড।”

উনার মুখের এমন কথা শুনে আমার মুচকি হাসি জানালা দিয়ে পালালো।
আমি ভালো করে চুলের সাথে তাওয়াল বেঁধে উনাকে বললাম,
“আজিব তো! আমি নাহয় বেখেয়াল হলাম। কিন্তু আপনি তো দেখে চলতে পারতেন। আপনি বেখেয়াল না হলে নিশ্চয় আমার সাথে এইভাবে ধাক্কা খেতেন না। তাই, আমাকে বকা দেওয়া যাবে না আর এই ব্যাপারে। কারণ, আমরা দুইজন সমান অপরাধী।”

সাদিফ ভাই আমার কথা শুনে উনার দুই হাত ভাঁজ করে উনার বুকের উপর রাখলেন। আর আমার দিকে এক ভ্রু উচুঁ করে তাকিয়ে বললেন,
“কে বললো আমি বেখেয়াল ছিলাম?”

“ওহ মা! আপনি বেখায়াল না হলে কি আমার সাথে এইভাবে আপনার এক্সিডেন্ট হতো?”
কথাটা বলে আমি আমার কোমরে হাত রাখলাম।
সাদিফ ভাই আমার মাথায় হাত দিয়ে জোরে হেসে বলে উঠলেন,
“বাচ্চা মেয়ে, কিছুই বুঝে না।”

উনি আমার চুলে হাত বুলিয়ে চলে যাচ্ছেন। যদি উনি বেখেয়াল না থাকেন, তাহলে কি ইচ্ছে করেই উনি আমাকে ধাক্কা দিলেন? আমি দ্রুত পেছনে ফিরে সাদিফ ভাইকে বলে উঠলাম,
“তার মানে, আপনি কি ইচ্ছে করেই আমাকে ধাক্কা দিলেন?”
আমার কথা শুনে উনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। আর ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে ফিরে বললেন,
“হয়তো!”

কথাটি বলে উনি মুচকি হেসে চলে গেলেন অন্যদিকে।
আহা! কি সুন্দর হাসি উনার। কিন্তু, আমাকে উনি ধাক্কা কেনো দিলেন ইচ্ছে করে? হয়তো আমাকে খেয়াল করে হাঁটার জন্যেই একটা শিক্ষা দিয়ে গেলেন! যাক, ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ রোমান্টিক মনে হলো। নিজের কথায় আমি নিজে হেসে উঠলাম।

সকালের নাস্তার বদলে মা আমাকে ভাত খাইয়ে ছাড়লেন। কোথায় ভেবেছিলাম বিয়ে বাড়ির পিঠে দিয়ে চা খাবো। কিন্তু, আমার মা আমাকে কাল রাতের হলুদে বেঁচে যাওয়া কাচ্চি খাইয়ে শান্ত হলেন। যদিও কাচ্চি আমার ভালোলাগে, তার পরেও এইভাবে নাস্তার বদলে ভাত আমি আশা করিনি। সবার সাথে দেখা করে আমি রুমে চলে এলাম। আমার সাথে এলো ইতি আপু এবং জুমু। রাফসান এবং জারাভি আমার বিছানায় বসে খেলছে।

সবাই বিয়ে নিয়ে অনেক উত্তেজিত হলেও, এই দুইজন তাদের খেলনা নিয়ে বসে বসে খেলা করছে। জুমু শুয়ে পড়লো বিছানায়। ইতি আপুর ফোন আসায় উনি ব্যালকনিতে চলে গেলেন। আর আমি বিছানার এক পাশে বসে পড়লাম। আমি বসতেই জারাভি আমার কোলে বসে পড়লো। আমি তাকে আদর করতে গেলে রাফসান এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। আমার ভাইটা এমনই। কোনো বাচ্চা আমার কোলে আসলে,

আমার ভাই থেকেও আমার গায়ের উপর উঠা লাগবে। এমনিতে তাকে ডেকেও আমি কোলে নিতে পারি না। জুমু আমাদের কান্ড দেখে হেসে উঠলো,

“আমার কাছে তো আয় কেউ!”
“তুমি তো শুয়ে আছো জুমু আপু। তুমি বসলে তোমার কোলে উঠবো আমরা।”
রাফসান বললো জুমুকে।

“আরে ভাই, বলিস না আর। কিভাবে উঠবো কাচ্চি খেয়ে আমার পেটকে কাচ্চির সাগর বানিয়ে ফেললাম আমি।”
জুমু বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো।

“এই জন্যেই তো বলি, কাল রাতে এতো খাবার বেঁচে গেলেও এখন সব খাবার গেলো কোথায়? এখন তার উত্তর পেলাম। এই মেয়ে সব খাবার নিজের পেটে পুরে নিয়েছে।”
জুরাইন ঘর কাপিয়ে হাসছে কথাটা বলে।

এইদিকে জুমু রেগে গেলো বেশ জুরাইনের কথায়। জুমু উঠে এক লাফে জুরাইনের চুল টেনে ধরলো। জুরাইন আর জুমু দুইজন লড়াই করছে। আর আমরা সবাই বসে দেখছি। জুরাইন হয়তো একটুও ব্যাথা পাচ্ছে না। কারণ, সে নানা কথা বলেই জুমুকে ক্ষেপিয়ে চললো।

আমি তাদের ঝগড়ায় তাদেরকে নানা কথা বলে উৎসাহ দিচ্ছি, আর পাশে জারাভি এবং রাফসান তালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। একটু পরে তাদের চেঁচামেচি শুনে ইতি আপু ব্যালকনি থেকে এসে তাদের থামালেন। জুরাইন রুম থেকে বের হয়ে গেলো আর জুমু তার পেছনে দৌড় লাগলো। আমি আর ইতি আপু আবারও হেসে উঠলাম তাদের কান্ড দেখে।

“এই দুইজন এমন কেনো? কি সমস্যা তাদের আল্লাহ্ জানে।”
আমি হেসে বললাম।
“আরে বলিস না আর। যখন দেখি তখনই এরা ঝগড়ায় লেগে থাকে।”
ইতি আপু আমার কথায় বললেন।

বিকালের দিকে আমরা তিন বোন ভাইয়ার বিয়ের জন্যে তৈরী হওয়া শুরু করলাম। পার্লারে যাওয়ার কথা থাকলেও, আমরা গেলাম না। কারণ, পার্লার থেকে আসতে অনেক দেরী হয়ে যাবে। আজও আমরা শাড়ি পড়ছি সবাই। আমরা তিন জনের শাড়ি একদম একই। খয়েরী রঙের শাড়িটিতে সাদা পাথরের কাজ আছে। আমরা সবাই মেকাপ করে শাড়ি পড়ে নিলাম।

সামান্য কিছু গয়না জড়িয়ে নিলাম গলায়, হাতে আর মাথায়। চুলগুলো ছেড়ে দিলাম পিঠের উপর। অতি অল্প সময়ে আমি তৈরি হয়ে নিলাম। উচুঁ জুতোগুলো পায়ে জড়িয়ে আমি আয়নায় নিজের শাড়ির সব দিক ভালো করে দেখছি। কোন দিকে পিন লাগানো হয়নি, সেটাই দেখছি আপাতত। সম্পূর্ণ শাড়ি একেবারে ভালো করে ঠিক করা আছে আমার। হাতে পার্স নিয়ে আমি রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম মায়ের রুমের দিকে। ভেবেছিলাম আমার সাহায্যর দরকার হবে মায়ের।

কিন্তু মামী, খালা আর মামী তিনজন তিনজনকে তৈরি হতে সাহায্য করছে। দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের কান্ড দেখলাম। কি মমতাময় এই বন্ধন তাদের! ভাগ্যিস, আমাদের পরিবারটা এক হলো। মামীরা আমাদের পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার পর মা এবং খালামনির হাসির পরিমাণ আরো শতগুণে বেড়ে গেলো। আমি তাদের কান্ড দেখে চলে এলাম রুমে। আপু এবং জুমু তৈরি একেবারে।

আমরা সবাই মিলে ড্রইংরুমে এলাম। জুরাইন, জারাভি, রাফসান তারা সবাই তৈরি হয়ে বসে আছে সোফায়। একটু পরে আমরা ভাই মানে দুলা সাহেব এলো। ভাইয়াকে দেখতে মারাত্মক লাগছে। আমরা সবাই মিলে কিছু ছবি তুললাম। এতজনের মধ্যে আমি আমার নেতাজিকে দেখতে পেলাম না। উনি কোথায় আল্লাহ্ জানে!
আমি জুমুকে প্রশ্ন করলাম,

“তোর ভাই মানে আমার নেতাজি কোথায়?”
জুমু আমার প্রশ্নে ভাব নিয়ে উত্তর দিল।
“আমার কাছে অনেকেই আমার ভাইয়ের খোঁজ করে। কিন্তু আমি কাউকে জবাব দিই না। তাই তোকেও জবাব দিতে পারছি না।”

জুমুর উত্তরে আমি বাঁকা চোখে তার দিকে তাকালাম আর হাতে চড় দেখালাম। জুমু আবারও ভাব নিয়ে বললো,

“ভাইয়া মিটিং এ। ইউ নো, আমার ভাই অনেক বেশি ব্যস্ত মানুষ!”
“হয়েছে ঢং বন্ধ কর। এতো ঢং করিস কিভাবে তুই? এই জন্যেই তো জুরাইন তোকে এতো পঁচায়।”
আমি নাক কুঁচকে বললাম জুমুকে।

আর আমার কথা শুনে জুমুর মুখ একদম কান্না মুখ করে ফেললো। আয়হায়, এই মেয়ে তো এখনই কান্না করে দিবে। তাই আমি জুমুর কাধেঁ হাত রেখে বললাম,

“দোস্ত, কান্না করবি না এখন দয়া করে। আমি তোর সাথে মজা করলাম জাস্ট।”
জুমু নরম কণ্ঠে বললো,

“তুই শুধু আমার পক্ষে থাকবি। ঐ কাক মার্কা জুরাইনের পক্ষে না।”
আমি মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বললাম তাকে।

ভাগ্যিস এখন জুরাইন ছিলো না এই রুমে। জুরাইন থাকলে এখন আবারও দুইজনের মধ্যে যুদ্ধ বেজে যেতো। আমরা সবাই মিলে সেন্টারে পৌঁছালাম। জমকালো আয়োজন করা হয়েছে সেন্টারে। বরের বোন হওয়ার সুবাদে আমি ভাইয়ের পাশেই আছি।

আর আমার পাশে জুমু এবং ইতি আপু আছে। চারপাশে ক্যামেরা ম্যান দেখা যাচ্ছে। যারা প্রতিনিয়ত আমাদের ছবি তুলে যাচ্ছেন। আমরা ভাইকে নিয়ে স্টেজে উঠলাম। অনেক্ষণ পর অনেক ছবি তুলে আমরা নিচে নামলাম স্টেজ থেকে। আমার চোখ শুধু সাদিফ ভাইকে খুঁজে চলেছে। ছেলেটা কোথায় আল্লাহ্ ভালো জানেন। একটু পরে ভাবীও চলে এসেছেন সেন্টারে। ভাবীকে নিয়ে আবারও সবাই স্টেজে উঠলাম। হাতের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত নয়টা তেত্রিশ বাজে।

এতো সময় হয়ে গেল, উনি এখনো এইখানে আসেননি। আলী ভাইকে দেখলাম আমার থেকে একটু দূরে। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কিন্তু আমি সেদিকে পাত্তা দিলাম না। সাদিফ ভাইয়ের জন্যে চিন্তা হচ্ছে আমার বেশ। আমি উনাকে ফোন করার জন্যে পার্স থেকে মোবাইল বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু শাড়ি পার্সের সাথে আটকে গেলো আর আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম শাড়ি আর পার্সকে আলাদা করার কাজে।

“আজও শাড়ি?”

হঠাৎ এমন কথা শুনে আমি দ্রুত পিছে ফিরলাম। বুকের উপর দুই হাত ভাঁজ করে সাদিফ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। উনাকে দেখে আমি হেসে উঠলাম। কালো রঙের উপর সোনালী জরি সুতোর কাজ করা পাঞ্জাবি পড়েছেন উনি। সব সময়ের মতো আজও উনাকে দেখে আমার মনের বারোটা বেজে গেলো। আমি মুচকি হেসে উনাকে বললাম,

“হ্যাঁ। আমি, জুমু এবং ইতি আপু একই ধরনের শাড়ি পড়লাম। আপনাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। একটু সাবধানে থাকবেন আপনি। অন্য মেয়েরা আপনার দিকে তাকালে আমার মোটেও ভালো লাগে না।”

আমার শেষ কথাগুলো হয়তো উনি আশা করেননি। তাই উনি গোল গোল চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করলাম “কি হলো”!
উনি আমার দিকে তাকিয়ে আমার পার্স নিজের হাতে নিয়ে আমার শাড়ি আর পার্স আলাদা করে দিলেন। আর বেশ ভাব নিয়ে আমাকে বললেন,

“আমার কথা বাদ দিয়ে নিজের চিন্তা কর। আজ যদি তোর শরীরের কিছু অংশ দেখা যায়, তবে সে স্থানে আমি খামচি দিয়ে আমার নাম লিখে দিবো। মনে থাকে যেনো কথাগুলো।”
এরপর উনি ধুম ধুম পা ফেলে চলে গেলেন আমার সামনে থেকে।

এইদিকে সাদিফের কানে শুধু শেফার কথা বাজছে। আর সাদিফের ঠোঁটে ঝুলছে তার অনেক দিনের আশা পূরণ হওয়ার খুশির হাসি। ঘাড় ঘুরিয়ে সে পিছে ফিরতেই দেখলো শেফা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। আবারও সে মুচকি হেসে তার বুকে হাত রাখলো।

কেমন ছেলে উনি! একটা মেয়ে একটা ছেলের তারিফ করা মানে, বিরাট ব্যাপার। কিন্তু উনার মাঝে ভাবনার কোনো পরিবর্তন দেখলাম না। উল্টো আমাকে কতো কথায় শুনিয়ে দিলো। ধুর, যা ইচ্ছে করুক উনি। আমি তো আমার মনের কথা খুব শীগ্রই উনাকে জানাবই। কারণ, আমি আমার নেজাতিকে হাত ছাড়া করতে চায় না। উনি যদি আমার প্রস্তাব নাকচ করে দেন? তাহলে তো আমার মান ইজ্জত সব ডুবে যাবে। উফ না শেফা, এই নেতাজি তোকে ভালোবাসতে বাধ্য হবেই। আল্লাহ্ ভরসা। নিজের মনের সাথে কথা বলে আমি ইতি আপুদের কাছে পৌঁছালাম। চারদিকে নজর ঘুরিয়ে আমি সাদিফ ভাইকে খুঁজছি। একটু দূরেই দেখলাম।

উনাকে দাঁড়িয়ে অন্য সব নেতার সাথে কথা বলতে। কিন্তু উনি সেই ঐপাশ থেকে এক নজরে আমার দিকেই তাকিয়ে রইলেন। আমাদের দুজনের মাঝে দুরত্ব অনেক থাকলেও আমাদের মাঝে কোনো মানুষ না থাকার কারণে খুব সহজে এই পাশ থেকে ওপাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এতই যখন তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে, তবে মুখ ফুটে কিছু বলেন না কেনো; নেতাজি? আপনি মুখে কিছু না বললেও আপনার চোখের ভাষা আমি বেশ বুঝতে পারি নেতাজি।


পর্ব ১৬

ভাইয়ের বিয়ের এক মাস কেটে গেলেও আমার মন থেকে এখনো ভাইয়ের বিয়ের রেশ কাটছে না। পরিবারের কোনো বিয়ে মানে এতো আনন্দ, এটা আমার কোনো কালেই জানা ছিল না। কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে সারাজীবন পারিবারিক বিয়েই উপভোগ করতে থাকি। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমি সাদিফ ভাইয়ের বেশ কাছাকাছি ছিলাম। সাদিফ ভাই লোকটা একটু রাগী হলেও বেশ যত্নশীল আমার প্রতি। উনি যখন সুন্দর করে হাসেন, কথা বলেন, ভ্রু নাচিয়ে আমাকে ইশারা দেন; উফ তখন আমার অনেক বেশি খুশি লাগে। ইচ্ছে করে উনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। আচ্ছা, উনাকে জড়িয়ে ধরলে ঠিক কেমন অনুভূতি হবে আমার?

আমি কি উনার এই শক্ত শরীরের স্পর্শ সহ্য করতে পারবো? নাকি এই স্পর্শের সুখে মরেই যাবো? জানা নেই আমার কিছুই। আমার ভাইয়ের বিয়েতে উনি আমাকে বেশ আগলিয়ে রেখেছিলেন। আলী ভাই অনেক সুযোগ খুঁজেও আমার কাছাকাছি আসতে পারেননি, একমাত্র আমার নেতাজির কারণে। বেশ ভালোই হলো, সাদিফ ভাই আমাকে আগলিয়ে ছিলেন। নাহলে এই আলী ভাই কি বলতো আমাকে আল্লাহ্ জানেন। আগে আলী ভাইয়ের চাহনী আমার কোনো রকম না লাগলেও, এখন আলী ভাইয়ের চাহনীতে আমি এক লালসার আকাঙ্খা দেখতে পায়। কেমন বিশ্রী লাগে উনার সেই নজর!

আলী ভাই এখন আমাদের বাড়ি এলে আমি রুম থেকেই বেরুই না। কারণ, সাদিফ ভাই চোখ রাঙিয়ে এই ব্যাপারে আমাকে বেশ সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে, উনি মানা না করলেও আমি নিজে থেকে এই আলী ভাই নামক লোকের সাথে কথা বলতাম না। আমার মনে ভাইয়ের বিয়ের রেশ না কাটলেও আমার পড়া লেখা শুরু হলো পুরো দমে। ভার্সিটির ক্লাস করেই এখন দিন কাটে আমার। আর ভার্সিটি থেকে বাসায় এলে তো মায়ের বকুনি আছেই। মায়ের কথা হলো, আমাকে একটা ভালো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে হবেই। কিন্তু আমার এইসবে কোনো মন নেই। আমার ইচ্ছে হলো, বিয়ে করবো আমার নেতাজিকে।

এরপর সারা দিন রাত উনার সাথে রোমান্স করবো। আহা, কতো সুখের জীবন হবে আমার। তবে আমার মতো অভাগী আর কে আছে! আমার মা আমাকে এক ফোঁটা ছাড় দেয় না এই লেখা পড়ার ব্যাপারে। কোথায় ভেবেছিলাম, এখন আমি আর নেতাজি রিকশায় বসে হওয়া খাবো আর রোমান্স করবো। কিন্তু আমি বসে আছি এখন পড়ার টেবিলে। বিকেলের ঘুম থেকে থেকে উঠে মাত্রই আমি পড়ার টেবিলে বসে পড়লাম। এই পড়ালেখা একদম ভালো লাগে না। কিছু করার নেই আমার এখন। অগত্য বসে বসে পড়ালেখা করছি আমি। আমার বাসায় ভিলেইন আছে আমার মা আর জুমুর বাসায় ভিলেইন হলো সাদিফ ভাই। এই দুইজন একেবারে হিটলার।

পড়ালেখার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেন না উনারা। পড়ার মাঝেই আমি ডুবে ছিলাম। চারপাশে আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে। বাহিরের আবছা আলো আমি জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ করেই ভাবী রুমে প্রবেশ করলে আমি জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রুমের দরজার দিকে তাকালাম। ভাবী হাসিমুখে আমাকে বলে উঠলো,

“রেডি হয়ে নাও ফুল। আমরা বের হবো এখন।”
আমি অবাক হয়ে ভাবীকে বললাম,
“কোথায় যাবো ভাবী, এই সময়ে?”
“আরে শুধু তুমি না। আমরা সবাই মিলে যাচ্ছি। মা এতক্ষণ তোমাকে জানায়নি তুমি পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়বে তাই। ইতি, জুমু, জুরাইন সবাই যাবে।”

ভাবী একটা সুন্দর হাসি দিয়ে কথাগুলো আমাকে বললেন।
“জুমু যাবে? কিন্তু আমাকে তো জুমু এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি।”
আমি বেশ মনোযোগ সহকারে ভাবীর কথা শুনে উনার কথায় বললাম।
ভাবী আমার গাল টেনে দিয়ে বললো,

“শুধু জুমু আর তুমি জানতে না। এখন জলদি তৈরি হয়ে নাও ফুল। দেরী করো না।”
কথাগুলো বলে ভাবী চলে গেলেন।

আর আমি খুশি মনে উঠে পড়লাম পড়ার টেবিল থেকে। আহা, বাহিরে বের হওয়ার মজাই আলাদা। আমি পড়ার টেবিল থেকে উঠে প্রথমে জুমুকে ফোন করলাম এরপর গেলাম নিজে তৈরি হতে। কই যাবো আজ, আল্লাহ্ ভালো জানেন। আচ্ছা আমার নেতাজি কি যাবেন আমাদের সাথে? কিজানি বাবা! উনি তো অনেক ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কারণ, সামনে ভোট হবে। নেতাজির কথা ভাবতে ভাবতেই আমি তৈরি হয়ে নিলাম। জুমু আর ইতি আপু উনাদের গাড়ি করে যাবেন। আর আমার ফ্যামিলি যাবে আমাদের গাড়ি করে। মামা ব্যস্ত থাকায় মামার বাসা থেকে শুধু জুরাইন যাবে। আর সে তো আসবে তার নায়ক ভাব নিয়ে, মোটর সাইকেল করে। ভেবেছিলাম কোনো পার্ক বা কোনো রেস্টুরেন্টে যাবো আমরা। কিন্তু এখন দেখছি আমরা যাচ্ছি ভাবীর এক আত্মীয়ের বাসায়। ভাবী থেকে শুনলাম অনেক দিন আগেই নাকি এইখানে আমাদের দাওয়াত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এই ব্যাপারটা আমার কাছে নিতান্তই গোপন রাখা হয়েছে।

আমার কোলে রাফসান বসে আছে। আমি আর আমার ভাই মিলে বাহিরের প্রকৃতি দেখছি। বেশ কিছুক্ষণ পর পৌঁছালাম আমরা ভাবীর মামার বাড়ির সামনে। ভাবীর আত্মীয়ের বাসাটা তাহলে উনার মামার বাসা। গাড়ি থেকে নামতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলী ভাই উনার মোটর সাইকেল নিয়ে। এই লোককে এইখানে আসতে বললেন কে? নিশ্চয় আমার ভাই?

আমি আলী ভাইকে দেখে ভাবীকে ফিসফিস করে বললাম,
“ভাবী, আলী ভাই এইখানে কেনো?”
“তোমার ভাই দাওয়াত দিয়েছেন। তোমার ভাইয়ের একমাত্র ভালো বন্ধু বলে কথা।”
ভাবী আমার প্রশ্নে উত্তর দিলেন।
আমি ভাবীর কথায় ছোট্ট করে বললাম,
“ওহহ।”

বিরক্ত একটা আমার ভাই। এই আলী ভাইকে তার দ্বিতীয় বউ বলতে মন চাচ্ছে আমার। এমন কেনো আমার ভাইটা! কথাগুলো ভেবে অল্প করে আলী ভাইয়ের দিকে চোখ দিলাম। এই যে সারলো! তাকিয়ে আছে উনি আমার দিকে শকুনের মতো। কি চায় উনি? আমি জুমুর সাথে লেগে হেঁটে চলছি। ভাবী আমাদের নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। আমার ভাই এবং আলী ভাই দাঁড়িয়ে আছেন জুরাইনের জন্যে। ভেতরে সবাই আমাদের বেশ ভালো করেই অ্যাপায়ন করলেন।

আমরা সবাই বসলাম লিভিংরুমে। বেশ মার্জিত ভাবীর মামা বাড়ী। ভাবীর মামার মেয়ে দুইজন আমাদের সাথে বেশ ভালো করেই মিশে গেলো। তাদের সাথে অবশ্য বিয়েতে অল্প আলাপ হয়েছিল। ভাবীর মামার ছেলে মেয়ে তিনজন। দুইজন মেয়ে আর একজন ছেলে। ভাবীর মামাও একজন নাম করা নেতা ছিলেন। তবে উনার মামা এখন অবসর নিয়েছেন।

আর উনার স্থানে দায়িত্ব পালন করে উনার ছেলে, মানে ভাবীর মামাতো ভাই। এসব কাহিনী আমরা ভাবীর মামাতো বোন সুরাইয়া থেকেই শুনতে পেলাম। বেশ জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার কথা হলেও, আমার মন বড্ড খচখচ করছে। কারণ; জুরাইন, আমার ভাই এবং আলী ভাই একটু আগেই আমাদের সাথে এসে আড্ডায় যোগ দিলেন। আর আলী ভাইয়ের অসহ্য চাহনী আমার মনকে বারবার নাড়িয়ে তুলছে।

আমি নিজেকে রাফসান দ্বারা আড়াল করে নিলাম। রাফসান আমার কোলে বসার কারণে আমার মুখ তেমন দেখা যাচ্ছে না। যাক, হাফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। ডাইনিং এ সবাই বসেছি নাস্তা করতে। তখনই ভাবীর মামী বলে উঠলেন,
“কি ব্যাপার, তোর বাবা এবং ভাইয়ের মিটিং এখনো শেষ হয়নি?”
উনার এমন প্রশ্নে ভাবীর অন্য মামাতো বোন জাকিয়া বলে উঠলেন,

“কিজানি মা। জিজ্ঞেস করে আসবো কি? তাছাড়া যার সাথে মিটিং করছেন উনি নিজেই তো আজকে আমাদের বাড়ির অতিথি। বাবা মিটিং শেষ হলে নিজেই উনাকে নিয়ে আসবেন ডাইনিং এ।”
আপুটার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সুরাইয়া আপু বললেন,
“এই যে চলে এসেছেন ভাই, বাবা আর নেতা সাহেব।”

আপুটার এমন কথায় আমি মাথা তুলে তাকালাম উপর দিকে। সাদিফ ভাই! সাদিফ ভাইও কি আসার কথা ছিল? উনারা তো বলছিলেন ভাবীর মামারা মিটিং করছিলেন কোনো এক নেতার সাথে। আর সে নেতাও নাকি এইখানের অতিথি। তাহলে ঠিকই আছে। তাছাড়া ভাবী থেকে জেনেছিলাম আমাদের তিন ফ্যামিলির সবাইকে দাওয়াত করেছিলেন ভাবীর মামা এবং মামী। সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে, উনি আমার দিকে ফিরতেই আমার সাথে উনার চোখাচোখি হয়ে গেলো। সাদিফ ভাইয়ের চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট।

আহারে বেচারা আমার নেতাজি। আমি চুপচাপ নাস্তায় মন দিলাম। নাস্তা শেষ করে সবাই আবারও লিভিংরুমে গিয়ে বসলাম। এইবার সাদিফ ভাই আমার পাশে বসলেন। আর এমন ভাবে বসলেন অন্যপাশ থেকে আলী ভাইকে যেনো দেখা না যায়। আমি আড় চোখে আমার নেতাজিকে দেখছি অল্প করে। উনি বসে বসে মোবাইল চালাচ্ছেন। আর আমি উনাকে দেখার পাশাপাশি সবার সাথে আড্ডা দিচ্ছি। একটু পরে জাকিয়া আপু এসে বললো,

“ছাদে আসুন সবাই। অনেক আনন্দ হবে।”

উনার কথা শুনে সবাই উঠে দাঁড়ালাম। আমি এগিয়ে চললাম জুরাইন, জুমু, রাফসান আর ইতি আপুর সাথে। ভাই, ভাবী, আলী ভাই আর সাদিফ ভাই আমাদের পিছু পিছু আসছেন। আমরা সবাই ছাদে উঠলাম। কিন্তু সাদিফ ভাইয়ের ফোন আসার কারণে উনি থেমে গিয়েছেন নিচে। উনাদের ছাদ অনেক সুন্দর রাতের বেলা হলেও অনেক সুন্দর লাইটের কারণে পুরো ছাদ দেখতে অনেক সুন্দর লাগছে। ছাদের একপাশে কিছুটা বাউন্ডারি দিয়ে একটা খেলনার স্থান বানানো আছে।

উপর দিয়েও খুব সুন্দর করে সেলিং বসানো। রাফসান খেলনা দেখে আমার হাত ধরে সেদিকে টেনে নিয়ে গেল। আর বাকিরা সবাই অন্যদিকে ঘুরে দেখছে। রাফসান একটা ফুটবল নিয়ে খেলা করছে। আর আমি দাঁড়িয়ে দেখছি। দূর থেকে আপু দুইটি, ইতি আপু, ভাবী, জুমু, জুরাইন সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আলী ভাইকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি আরেকটু উঁকি দিতেই একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো আমার কানে।

“আমাকে খুঁজছিস?”

আমি দ্রুত পেছনে ফিরলাম এমন কথায়। আমার ধারণায় ঠিক হলো। আলী ভাই ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। উনাকে দেখে আমার গলার পানি শুকিয়ে গেলো। আমি কিছু বলার আগেই উনি আমার হাত ধরে বলে উঠলেন,

“প্লিজ, আমাকে একটু দয়া কর তুই। আমি সেই অনেক আগে থেকেই তোকে ভালোবাসি। কিন্তু মাঝখানে এই সাদিফ এসে আমাদের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়ে দিলো। আমাকে ফিরিয়ে দিস না তুই, ফুল। আমি অনেক ভালোবাসি তোকে।”

এমন কথা শুনে আমার মাথা ফাঁকা লাগছে। যাকে আমি নিজের ভাই ভেবে এসেছি, সেই আমাকে আজ “ভালোবাসি” বলেছেন! আমি খুব চেষ্টা করছি নিজের হাত ছুটানোর জন্যে। কিন্তু পারছি না। এইদিকে চিল্লাতেও পারছি না, মান সম্মান হারানোর ভয়ে। হাজার হলেও এটা আমার ভাবীর আত্মীয়ের বাড়ি। এইখানে কোনো কাহিনী হলে আমাকে মা নিশ্চয় মেরে ফেলবেন। অগত্য আমি নিজের গায়ের জোরে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছি।

কিন্তু না, পারছি না। তাছাড়া এই আলী ভাই এখন আমার দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছেন। আমি ধীর গলায় রাফসানকে ডাকলে, সে আমার কাছে এসে আলী ভাইকে ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু শয়তান লোকটা আমার ভাইয়ের দিকে নজর না দিয়ে আমার দিকে মুখ এগিয়ে আনছে। হঠাৎ করেই দেখি, আলী ভাইয়ের ঘাড় চেপে ধরলেন সাদিফ ভাই। সাদিফ ভাই আলী ভাইয়ের ঘাড় ধরে এক কোণায় নিয়ে খুব জোরেই উনার নাক বরাবর একটা ঘুষি দিলেন। ব্যাথায় আলী ভাই চিল্লাতে চাইলে সাদিফ ভাই উনার মুখ চেপে ধরলেন,

“চুপ, একদম চুপ। অনেক আগে থেকেই মানা করিনি আমি, তার কাছ থেকে দূরে থাকার জন্যে? সাহস কি করে হয় তার হাত স্পর্শ করার? সে শুধু আমার। একমাত্র আমার অধিকার আছে তার উপর। এর চেয়ে বেশি খারাপ হতে বাধ্য করবি না আমায়। তাকে তুই নিজের বোনের চোখেই দেখবি আজকে থেকে।”

আলী ভাই সাদিফ ভাইয়ের মাইর খেয়ে একেবারে চুপ করে গেলেন। এইদিকে রাফসান সাদিফ ভাইয়ের মাইর দেখে তালি দিয়ে চিল্লিয়ে উঠলো। যার কারণে, বাকি সবাই এইদিকে আসছেন। আমি রাফসানকে ইশারায় চুপ করতে বললাম। আর সাদিফ ভাই এখনো আলী ভাইকে শাসিয়ে যাচ্ছেন। উনার কথা শুনে আমি আজ খুশির জোয়ারে ভাসছি। সাদিফ ভাইয়ের কথায় বোঝা যাচ্ছে আমাকে উনি পছন্দ করেন। আহা! সবার আওয়াজ শুনে সাদিফ ভাই, আলী ভাইকে ছেড়ে দাঁড়ালেন। ইসলাল ভাই, আলী ভাইয়ের নাকে রক্ত দেখে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“কি হলো, আলী তোর?”

আলী ভাইকে কিছু বলতে না দিয়ে সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,
“কিছু হয়নি তার। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলো,

তাই মাটিতে হোচট খেয়ে পড়লো। আর সাথে সাথে নিজের নাক ফাটিয়ে নিলো। পরবর্তীতে খেয়াল করে হাঁটবে, বুঝেছো আলী? আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে।”

কথাগুলো বলে সাদিফ ভাই আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন আর সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
“নিচে যাওয়া যাক এখন। অনেক ঘোরাফেরা করা হয়েছে।”

সবার উদ্দেশ্যে উনি কথাগুলো বললেও, সাদিফ ভাই আমার হাত চেপে আমাকে উনার সাথে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এইভাবে উনার হাত ধরাতে আমার মনের ভেতর ঢাক ঢোল বাজছে। কিন্তু এখন উনি রোমান্স করার জন্যে না, বরং আমাকে বকা দেওয়ার জন্যেই আমার হাত ধরেছেন। ভয়ে আমার গায়ে ঘাম ছুটে গেলো। সিঁড়ি ঘরে আসতেই সাদিফ ভাই আমায় দেওয়ালের সাথে ঠেকিয়ে দাঁড় করালেন।

আমি মাথা নিচু করে উনাকে বললাম,
“আসলে আমার কোনো দোষ নেই। এই আলী ভাইটাকে খুব বাজে লাগে আমার কাছে। আমি রাফসানের সাথেই খেলছিলাম। কিন্তু উনি এসে আমার সাথে অসভ্যতামী শুরু করলেন। বেশ খারাপ লোক উনি।”

ভেবেছিলাম বেশ বকা জুটবে আমার কপালে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সাদিফ ভাই আমার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন আর আমার দুই গালে উনার হাত দ্বারা স্পর্শ করে বললেন,
“এইসব ছোট লোককে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর তোমার কোনো সাফায় দেওয়ারও দরকার নেই আমাকে। তুমি কেমন মেয়ে আমি বেশ ভালো করেই জানি। আমি আছি তোমার পাশে। আমি থাকতে তোমার গায়ে সামান্য টোকা লাগতে দিবো না আমি।”

কথাগুলো বলে উনি আমার থেকে দূরে সরে গেলেন। আর তখনই বাকিরা সিঁড়ি ঘরে আসলেন। ইতি আপু সাদিফ ভাইকে বলে উঠলো,

“তোমরা এখনো যাওনি নিচে?”
ইতি আপুর প্রশ্নে সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,
“নাহ। তোদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।”

এই কথা বলে উনি নিচের দিকে নামতে লাগলেন। আর আমি এখনো হা করে তাকিয়ে আছি উনার যাওয়ার দিকে। সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত আমি উনার দিকে তাকিয়েই ছিলাম। কি সুন্দর করে মিথ্যা বললেন উনি! তাছাড়া আমাকে উনি একটা চুমুও দিয়ে দিলেন। অথচ কেউ টেরও পেলো না। জুমু এসে আমার হাত টেনে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার পা একটুও নড়ছে না।

একটু আগের ঘটনার কারণে আমার নিজেকে একদম ওজনহীন মনে হচ্ছে। উনি একজন ভালো নেতার পাশাপাশি একজন ভালো অভিনেতা বটে। নাহলে তখন আলী ভাইকে ঘুষি দিয়ে আর এখন আমাকে চুমু দিয়ে, উনি সবার সামনে এতো ভালো মানুষ সাজার অভিনয় কিভাবে করলেন? এই নেতাজি তো দেখছি, গভীর জলের মাছ!


পর্ব ১৭

আমি বসে আছি সাদিফ ভাইয়ের পাশে। সাদিফ ভাই উনার হাঁটুর উপর উনার হাত মুঠো করে রেখেছেন। বাকি সবাই লিভিংরুমে বসে কথা বলছে। আমি আড় চোখে সাদিফ ভাইয়ের দিকে তাকালাম। সাদিফ ভাই রেগে আছেন অনেক, এটি আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমি একদম চুপ করে রইলাম। আলী ভাইকে দেখলাম না আর এইদিকে আসতে।

হয়তো উনি চলে গিয়েছেন ছাদ থেকে নেমেই। কি একটা বাজে কান্ড হয়ে যেতো আজ! ভাগ্যিস সাদিফ ভাই ঠিক সময়েই এসেছিলেন। সাদিফ ভাই আমাকে রক্ষা করার ব্যাপারটা মনে আসতেই আমার মনে এলো সাদিফ ভাইয়ের দেওয়া চুমুর কথা। আহা! মনটায় নেচে উঠলো। আমি আমার কপালে হাত ছোঁয়ালাম, যেখানে উনি চুমু দিয়েছিলেন। আমি আনমনে হেসে উঠলাম উনার দেওয়া চুমুর অনুভূতি অনুভব করে।

আমার হাসি দেখে জুমু বলে উঠলো,
“কি হলো? তুই হাসছিস কেনো?”
জুমুর কথা শুনে আমি আমার হাসিমুখ বন্ধ করে, তাকে বললাম,
“কই হাসছি?”

“ঠোঁটে হাসি বন্ধ হয়ে গেলেও মানুষের চোখ দেখে বুঝা যায়, মানুষটি এখন হাসছে।”
জুমু চোখ ছোট ছোট করে আমাকে উত্তর দিলো।
জুমুর কথায় আমি এইবার চোখগুলো বড় করে ফেললাম।

“এই কি সমস্যা তোর? এইভাবে আমাকে হেনস্তা করছিস কেনো?”
“কই হেনস্তা করলাম? আমার ভাইয়ের পাশে বসে তোর মনে বেশ খুশি লাগছে, এই কথাটি আমি বুঝাতে চেয়েছি।”

জুমুর এমন কথায় আমার মাথা ভন ভন করে উঠলো। কি বলছে এই মেয়ে! এইভাবে সবার সামনে আমার রহস্য ভেদ করে দিবে নাকি এই মেয়ে? হায় হায়! ভাবী, ভাই, জাকিয়া আপু, সুরাইয়া আপু সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কি ভাবছেন উনারা আল্লাহ্ জানে।

আমি বিভ্রান্তিমূলক হাসি দিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম,

“তোর ভাই মানে তো আমার ভাই। আমি কেনো উনার পাশে বসে খুশি হতে যাবো?”
আমার এই কথায় সবাই যতটা না অবাক হলো, আমার এই কথা শুনে জুমু এবং ইতি আপুর চোখ একেবারে রসগোল্লার আকার ধারণ করলো। তারা দুজন চিল্লিয়ে উঠলো,

“তুই মনে কর আজ শেষ, ফুল। অনেক বড় ভুল করে ফেলেছিস বোন।”

তাদের কথা শুনে আমি জিহ্বায় কামড় দিলাম। আল্লাহ্ গো! আমি আজ কি বলে ফেললাম? যাকে আমি ভালোবাসি তাকেই আমি ভাই বানিয়ে দিলাম! ছি ছি! কি হবে এখন আমার? সাদিফ ভাই কি ভাবছেন? নিশ্চয় উনি আমাকে আর পছন্দ করবেন না! শেষ শেফা, তুই শেষ। আজকের পর থেকে সাদিফ ভাই তোকে আর পছন্দ করবেন না। বাহ্! কিভাবে নিজের ইজ্জত হারাতে হয়, এটা তোর চেয়ে ভালো কেউ জানে না শেফা। আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে রইলাম। সাদিফ ভাইয়ের কোনো অভিব্যক্তি আমি দেখতে পেলাম না। শেষ আমার সব।

সাদিফ ভাইয়ের সাথে আমার সংসার করা আর হবে না। এইসব কথা ভাবতেই আমার কান্না পাচ্ছে। আমাকে একান্তই “সরি”বলতে হবে সাদিফ ভাইকে। সাদিফ ভাইয়ের ফোন আসলে উনি আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেলেন। উনি যেতেই আমার পাশে এসে বসলো জুমু। আমার কাঁধে হাত রেখে সে আমাকে নরম সুরে বললো,
“মুখের অবস্থা এমন করে রেখেছিস কেনো?”

“তুই নিজের কানে শুনেছিস আমি উনাকে আমার ভাই বানিয়ে ফেললাম। কিন্তু তুই তো জানিস আমার জীবনে উনিই প্রথম ছেলে যাকে আমার অনেক বেশি ভালো লেগেছে। কিন্তু, দেখ আমার নিজ মুখে আজ আমি সব শেষ করে ফেলেছি।”

কথাগুলো বলতেই আমার গলা ধরে এলো। খুব কান্না পাচ্ছে আমার এখন। এইভাবে এখন কান্না করাটা এখন মোটেও ভালো দেখাবে না। তাই আমি টিস্যু দিয়ে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে নিলাম। জুমু আমাকে এক পাশে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,

“ইস, ছোট্ট মেয়েটা কান্না করছে। আরে আমার ভাইকে যাই বলিস না কেনো তুই, আমার ভাই তোকে ছাড়বে না। বুঝলি বোকা!”
আমি নরম কণ্ঠে জুমুকে প্রশ্ন করলাম,
“কেনো?”

“এই কেনোর উত্তর পরে পাবে ফুল। এখন ডিনার করতে চলো।”
ভাবী এসে কথাগুলো বললেন। একটু আগেই ভাবী এবং উনার মামাতো বোনেরা এইখানে ছিলেন। কিন্তু উনারা হয়তো ডিনার ঠিক করার জন্যে উঠে গিয়েছিলেন এইখান থেকে। ভাবীর কথায় সবাই উঠে পড়লো ডিনার করার উদ্দেশ্যে। সবাইকে দেখলেও আমি সাদিফ ভাইকে দেখলাম না ডিনারের টেবিলে। আমি ইতি আপুকে প্রশ্ন করলাম,

“আপু, তোমার ভাই কোথায়?”
“মিটিং আছে তার। চলে গেলো সে।”
ইতি আপু উত্তর দিলেন।
“এইভাবে! না খেয়েই?”

আমি অসহায়ভাবে আবারও আপুকে প্রশ্ন করলাম।
“সমস্যা নেই। মিটিং এ খেয়ে নিবে সে। তুই চিন্তা করিস না।”
ইতি আপুর কথায় আমি আর কিছু বললাম না। কেনো যেনো আমার অনেক মন খারাপ লাগছে। আমার মুখটা বেশি চলে। কোথায় কি বলতে হয় আমিই এটাই বুঝি না। সাদিফ ভাই কি আমার কথায় অনেক কষ্ট পেয়েছেন?

ভাই বললেই কি ভাই হয়ে যায়? উনি কি বোঝেন না, আমি উনার জন্যে কি অনুভব করি? এইসব নানা কথা ভাবতেই আমি আর ভাত খেতে পারলাম না। বেশ কষ্ট লাগছে মনের ভেতর। খাবারটা আমার গলা দিয়ে নামলো না আর। কিছুই ভালো লাগছে না আমার। সবার সাথে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ করে আমরা বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সবাই বেশ আনন্দ করলেও আমি আর আনন্দ করতে পারলাম না। সাদিফ ভাইয়ের কথা আমার মাথায় ঘুর ঘুর করছে। চিন্তা করছি বাসায় গিয়ে উনাকে একটা ফোন দিবো।

বাসায় এসে কাপড় ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মোবাইলটা নিয়ে অনেকক্ষণ চেষ্টা করলাম সাদিফ ভাইকে কল দেওয়ার। কিন্তু উনার নাম্বার “আউট অফ এরিয়া” বলছে। কোথায় আছেন উনি! এতক্ষণের জমা কান্না আমার চোখ বেয়ে পানি আকারে বের হচ্ছে। না চাওয়া সত্বেও আমি অনেক কান্না করছি। কারণ, একটাই; আমার প্রিয়তম আমাকে ভুল বুঝছে। নিজের কাছের মানুষের কাছে ভুল প্রমাণিত হলে, যে কারোই খারাপ লাগবেই। অতঃপর আমি বালিশে মুখ গুজে কান্না করে চললাম।

সাদিফ এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ ছিলো। সবে মাত্র সে গাড়িতে উঠলো বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এইসব মিটিং এ ফোন এলাও করে না। তাই সে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছিল। তার মোবাইল চালু করতেই সেখানে অনেকগুলো বার্তা এলো শেফার ফোন কলের। এই জিনিসটি দেখে অনেক বেশি ভয় পেলো সে। সাদিফ দ্রুত আগে ইতিকে ফোন দিলো। কারণ, এতো রাত পর্যন্ত শেফা জেগে থাকে না। ইতিকে ফোনে না পেয়ে সাদিফের মেজাজটাই খারাপ হলো। তাই সে এইবার জুমুকে ফোন দিলো। রিং বাজতেই জুমু দ্রুত ফোন তুললো,

“হ্যাঁ ভাই, বলো।”
“শেফার কি হলো রে? সে আমাকে অনেকগুলো ফোন দিয়েছে।”
সাদিফ চিন্তিত কণ্ঠে বললো।

“আরে ভাই! এই মেয়ে যা পাগল। তোমাকে ভাই বলার কারণে এই মেয়ে কান্না করে নিজেকে ভাসিয়ে নিলো।”

জুমু কথাগুলো বলতেই হেসে উঠলো।
আর জুমুর এই কথা শুনে সাদিফও হেসে দিলো।

“আসলেই মেয়েটা পাগল একেবারে। ভাই বললেই কি ভাই হয়ে যায়? আচ্ছা তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি আসছি।”

সাদিফ কথাগুলো বলে ফোন রেখে দিলো। শেফার কথা ভাবতেই সে হেসে উঠছে বারবার। আর মনে মনে চিন্তা করে নিলো, এই ব্যাপার নিয়ে শেফাকে বেশ জ্বালানো যাবে।

পুরো এক মাস দশ দিন কেটে গেলো। এর মাঝে সাদিফ ভাইকে আমি দেখিনি। শুধু রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছি উনার গাড়িকে। উনাকে ফোন দিলেও ফোন ধরেন না উনি। আমাদের বাড়িতেও উনি আসেন না। একেবারে বলতে গেলে আমার সাথে উনার কোনো যোগাযোগ হয়নি। মাঝখান দিয়ে আবার ভোট হলো। যার কারণে উনি আরো বেশি ব্যস্ত ছিলেন। এইবারও ভোটে উনি জয়ী হলেন।

এই ছেলে বলতে গেলে একেবারে হীরের টুকরো। কিন্তু এই হীরের টুকরো ছেলেটি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো, আমি জানিনা। পড়ালেখার চাপে এতদিন বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলেও, গতকাল মিড টার্ম পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে আমার ফাঁকা মাথায় একের পর এক আইডিয়া আসছে। আর সবচেয়ে ভালো আইডিয়া পেলাম, সাদিফ ভাইয়ের পলিটিকাল অফিসে যাওয়া। এইখানে গেলেই আমি উনার দেখা পাবো। জুমুকে ফোন করে সাদিফ ভাইয়ের অবস্থান জেনে নিলাম। আমার ধারণায় ঠিক হলো। উনি এখন অফিসে আছেন। আমি মাকে সামনের দোকানে যাওয়ার নাম করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সিএনজি নিয়ে সোজা চললাম উনার অফিসের উদ্দেশ্যে।

আজ উনার আর আমার এই ব্যাপারটা আমাকে পরিষ্কার করতেই হবে। ভাড়া চুকিয়ে আমি ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলাম। সবাই আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে। বেশ অসহ্য লাগছে আমার। উফ, এই নেতাজির রাগ ভাঙানোর জন্যে আমার আর কি কি করা লাগবে জানা নেই আমার। অফিসের ভেতর ঢুকতেই দেখি সাদিফ ভাই কিছু লোককে নিয়ে সামনের দিকেই আসছিলেন।

আমাকে দেখতে পেয়ে উনি উনার মুখের নকশা বদলিয়ে নিলেন। কিন্তু আমি সেদিকে তোয়াক্কা না করে উনাকে দেখছি। কি মনোরম আমার নেতাজি! উনি বাকিদের বিদেয় দিয়ে আমার হাত টেনে ধরে লিফটে উঠালেন আমাকে। আর আমি ঠিক কি অভিব্যক্তি দিবো বুঝছি না। সাদিফ ভাই আমাকে দেখে খুশি হলেন না বরং রেগে গিয়েছেন অনেক। উনার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারছি। উনার অফিস রুমে নিয়ে আমার হাত ছেড়ে দিলেন উনি আর আমার গাল চেপে ধরে আমাকে চিল্লিয়ে উঠলেন,

“এতো বড় সাহস তোর? বাসা থেকে এইখানে এতদূর এসেছিস কিভাবে?”

আমি মাথা নিচু করে বললাম,
“সিএনজি করে।”

উনি আমার এই কথা শুনে আরো রেগে গেলেন আর হাত উঠিয়ে চড় দিতে গিয়েও চড় দিলেন না আমায়। সাদিফ ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে আমি কান্না করতে লাগলাম। উনি আমার গাল চেপে ধরে আবারও বললেন,

“সিএনজি করে? চিনিস তুই এই রাস্তা? কিছু হয়ে গেলে কি হতো? দেশের অবস্থা কি এখন ভালো আছে! মানুষের ভেতরের অমানুষদের কি চেনা যায়? কেনো এসেছিস এইখানে! সেদিন তো বলেছিলি আমি তোর ভাইয়ের মতো। তাহলে? কি চায় এইখানে!”

কথাগুলো বলে উনি আমাকে ছেড়ে একটু দূরে দাঁড়ালেন। আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে কান্না করে চলেছি। সাদিফ ভাই আবারও চিল্লালেন আমাকে,
“কি হলো? কথা বলছিস না কেনো? ভাই আমি তোর? উত্তর দে।”

উনার এমন প্রশ্ন শুনে আমি দৌড়ে উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। আর কান্না মাখা কণ্ঠে বলে উঠলাম,
“নাহ, আপনি আমার ভাই না।”

সাদিফ ভাই আমাকে জড়িয়ে না ধরলেও আমার মাথায় হাত রাখলেন আলতো করে। আর নরম সুরে বলে উঠলেন,
“তাহলে, আমি কি তোর?”

উনাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় আমার মনের এমনিতেও বারোটা বেজে গেলো। এখন উনার এই নরম কণ্ঠ শুনে আমার সুখেই মরে যেতে ইচ্ছে করছে। তবে, উনার করা প্রশ্নের উত্তর আমি দিবো নাকি দিবো না; এই দ্বিধায় মরে যাচ্ছি আমি। পরে বললে বলবো, উনাকে আমি কি মনে করি। আগে উনার সাথে এই ভালোলাগার মুহূর্ত, বেশ ভালো করেই উপভোগ করে নিই।


পর্ব ১৮

মনে করেছি আমি সাদিফ ভাইকে আজ নিজের মনের কথা বলে দিবো। কিন্তু সেটি আর হলো কোথায়? যেই উনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের মনের কথা বলতে যাবো, অমনিই উনার কেবিনের দরজায় কেউ টোকা দিলো। আর উনি আমার দুই বাহু ছেড়ে দিয়ে আমাকে ইশারা করলেন সোফায় বসার জন্যে। আমার আর কি করার! নেতাজির কথা মতো বসে পড়লাম সোফায়। আর উনি বসে পড়লেন উনার জন্যে নির্ধারণ করা বড় চেয়ারটাতে। চেয়ারে বসেই উনি একটা বেল চাপলেন। বেলের শব্দ পেয়ে দরজার ঐপাশে থাকা মানুষটি প্রবেশ করলেন ভেতরে। সাদিফ ভাই লোকটির দিকে একনজর তাকিয়ে, মাথা নিচু করে কিছু একটা দেখতে লাগলেন টেবিলের উপরে রাখা কাগজগুলোতে। লোকটি আমার দিকে অল্প তাকিয়ে সাদিফ ভাইকে বললেন,
“স্যার, ম্যাডামের জন্যে ঠান্ডা অথবা গরম কিছু আনবো?”

সাদিফ ভাই উনার কথা শুনে মাথা তুলে একবার আমার দিকে তাকালেন আবার ঐ পিয়নের মতো লোকটির দিকে তাকালেন। হাতে থাকা ফাইলটি বন্ধ করে সাদিফ ভাই ঐ লোকটিকে বললেন,
“কফি আর চকলেট কেক হলেই চলবে। সামনের দোকানে যদি চকলেট পান, তাহলে এক বক্স নিয়ে আসবেন।”

সাদিফ ভাইয়ের কথায় লোকটি বেরিয়ে পড়লো। কফি আর চকলেট কেকের কথা মনে আসতেই আমার মুখে পানি চলে এলো। এই দুইটি জিনিস আমার অনেক মজা লাগে। ভাগ্যিস সাদিফ ভাই ভাত অর্ডার করেননি। এই কফি আর চকলেট কেক তো আমার জন্যে, সেটি আমি বুঝতে পারলাম। কিন্তু, উনি চকলেট কেনো আনতে বললেন; সেটি আমি বুঝতে পারলাম না। আমি আমার সামনে থাকা ম্যাগাজিন উঠিয়ে সেটি দেখতে মন দিলাম।

ম্যাগাজিন পড়ার ফাঁকে এক নজর উনাকেও দেখে নিয়েছি। নেতাজি আমার, মন দিয়ে কাজ করছেন। একটা জিনিস বুঝলাম না, উনি আমাকে যেতে বলছেন না কেনো? যেতে না বললে নেই। আমার তো এইখানে নেতাজির সাথে সময় কাটাতে বেশ লাগছে। ভ্রু কুঁচকে উনি এক একই ফাইল চেক করছেন। আর একটু পর পর পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করে কি যেনো লিখছেন। আমার দিকে উনি ফিরতে নিলেই আমি মাথা নিচু করে উনাকে না দেখার অভিনয় করি। এই লুকোচুরির খেলা বেশ লাগছে আমার।

কিন্তু আবারও ঐ পিয়ন লোকটি এসে আমার কাজের মধ্যে বাম হাত ঢুকিয়ে দিলো। সাদিফ ভাইয়ের ইশারায় লোকটি খাবারের ট্রে আমার সামনে থাকা টেবিলে রেখে, “স্যার, সামনের দোকান বন্ধ”কথাটি বলে চলে গেলেন। আমি খাবো নাকি খাবো না এই দ্বিধায় আছি। সাদিফ ভাইকে ছাড়া একা খেতে আমার একটুও ইচ্ছে করছে না। তাই ভাবলাম আমি উনাকে ডাকবো আমার সাথে একসাথে নাস্তা করার জন্যে। কিন্তু ট্রে এর দিকে তাকিয়ে দেখি এক কাপ কফি এবং চার পিস চকলেট কেক রাখা আছে। আমার একার জন্যে কি এতগুলো কেক! হবেই হয়তো। সাদিফ ভাইয়ের জন্যে হলে তো দুই কাপ কফি থাকতো। অগত্য আমি না খেয়ে বসে রইলাম।

“খাবারগুলো খেতে দেওয়া হয়েছে। বসে বসে দেখার জন্যে নয়।”
সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমি উনার দিকে ফিরলাম। উনি এখনো একই ভঙ্গিতে ফাইল চেক করে যাচ্ছেন। আমি উনার কথায় বললাম,
“আপনি খাবেন না?”
আমার দিকে না ফিরে সাদিফ ভাই উত্তর দিলেন…
“তুই শুরু কর। আমি আসছি।”

উনার জবাব পেয়ে আমি কফির কাপে চুমুক দিলাম। চকলেট কেক আমার প্রিয় হলেও আপাতত এখন এই জিনিসটি আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। আমি তাই মনের সুখে কফি পান করছি।
“কেকটাও খাওয়া শুরু কর।”

সাদিফ ভাইয়ের এমন নির্দেশ শুনে আমি অবাক চোখে উনার দিকে তাকালাম। উনি এখনো সেই আগের ভঙ্গিতে কাজ করছেন। আজিব তো! উনার দিকে যতবার দেখি, ততবারই তো দেখি উনি কাজ করছেন। তাহলে উনি আমার দিকে ফিরেন কবে? আমি কিছু না বলে কফির কাপ রেখে এক পিস কেক নিলাম। কেকটি সাবাড় করার পূর্বেই সাদিফ ভাই আমার পাশে এসে বসলেন। আমি হাসিমুখে উনাকে কেক নেওয়ার কথা বলার আগেই দেখি উনি আমার মুখের এঁটো কফি পান করছেন। আমি এই জিনিস দেখে খুব জোরেই বলে উঠলাম,
“এই না! এটা আমার এঁটো কফি।”

কিন্তু না! আমার কথা শুনে উনি থামলেন না। উল্টো এক চুমুকে সবটুকু খেয়ে নিলেন কফি। আমি হা করে তাকিয়ে আছি উনার দিকে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কি অভিব্যক্তি দিবো এখন। তাছাড়া সাদিফ ভাই কফির কাপ হাতে নিয়ে আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছেন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে আমার উনার এমন চাহনীতে। আমি কিছু বলতে নিবো এর আগেই সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,

“শুধু তোর এঁটো কফি খেয়েছি বলেই তোর চেহারার এমন বারোটা বাজিয়েছিস। তাহলে ভেবে দেখ; যখন আমার এই তৃষ্ণার্থ ঠোঁট তোর ঠোঁটের মাঝে প্রবেশ করে বড্ড জ্বালাতন করবে তোকে, তখন তোর কি অবস্থা হবে?”

সাদিফ ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে আমার গলায় কেক আটকে গেলো আর আমি কেশে উঠলাম। সাদিফ ভাই আমার অবস্থা দেখে আমার চেয়েও বেশি অস্থির হয়ে পড়লেন। উনি আমার পিঠ মালিশ করতে করতেই চেঁচিয়ে উঠলেন আমাকে,
“সামান্য এই কথা শুনেই তার গলায় খাবার আটকে যায়। আল্লাহ্ জানেন, বিয়ের রাতে আমার অবস্থা কি হবে!”

এইসব কথা শুনে আমার আরো মাথা ঘুরে উঠলো। হায় হায়! এই বেশিরম লোক বলে কি? আমি কোনো মতে নিজেকে শান্ত করে বললাম,

“কিসব বাজে বকছেন? লজ্জা করেনা বুঝি?”
“নিজের লজ্জা কোথায় লুকোবি এই চিন্তা কর। আমার লজ্জা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই তোর।”
কথাগুলো বলে উনি আমার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। আর প্লেট থেকে একপিস কেক নিয়ে নিজের মুখে পুরে নিলেন উনি।

“বাকি কেক সব শেষ কর। এরপরই এইখান থেকে যেতে পারবি।”
আমাকে এমন হুশিয়ারি দিয়ে উনি আমারও বসে পড়লেন উনার কাজে। প্রায় ত্রিশ মিনিট লাগলো আমার সব কেক সাবাড় করতে। সাদিফ ভাই নিজের মনের সুখে কাজ করছেন। আমি নিজের পার্স আর মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

“অনেক্ষণ হলো তো এসেছি। আমি যায় এইবার। মা নাহলে অনেক বকবে।”
“আর দশ মিনিট বস। আমি কাজটা শেষ করে নিই।”
সাদিফ ভাই বললেন।
“আমি একাই যেতে পারবো।”
আমি উনার কথায় জবাব দিলাম।

“তাহলে চড় তখন যেটা দিইনি, সেটা এখন উপভোগ করার জন্যে তৈরী কর নিজেকে।”
সাদিফ ভাইয়ের এমন কথা শুনে আমি সোফায় বসে পড়লাম আবার।

একটু পরেই ঐ লোকটি আবার এসে উনাকে বললেন,
“স্যার, আতিকুল্লাহ সাহেব চলে এসেছেন। মিটিং রুম তৈরি। এখন শুধু আপনার অপেক্ষা।”
“চা, নাস্তা দিন উনাকে। আমি বিশ মিনিট পর আসছি।”
সাদিফ ভাইয়ের নরম জবাব।
“স্যার, উনি তো কারো জন্যে অপেক্ষা করেন না।”

“না করলে চলে যেতে বলুন তাদের। আমার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজটি আগে করে আসি।”
কথাগুলো বলে উনি আমার কাছে এসে আমাকে হাত ধরে সোফা থেকে উঠিয়ে নিলেন।
“আমার জিনিসকে সাবধানে বাসায় পৌঁছিয়ে দেওয়াটা, আমার জন্যে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”
অতঃপর আমার হাত ধরে উনি সামনের দিকে এগোলেন।

বাহ্! আমি কতো ভিআইপি মানুষ। আমার জন্যে সাদিফ ভাই নিজের মিটিং ছেড়ে, শুধুমাত্র আমাকে বাসায় দিয়ে আসার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন! আমার নেতাজির রাগী মার্কা মুখ দেখে উনাকে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। লোকটার ঐ সামান্য কথায়ও কি রাগ করা লাগে? এই সাদিফ ভাইয়ের শিরা উপশিরায় রক্তের জায়গায় রাগ বাহিত হয় বলে আমার মনে হয়। বাসায় পৌঁছে আমি মায়ের কাছে অল্প বকুনি খেলাম।

কিন্তু, এই বকুনির কাছে সাদিফ ভাইয়ের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো একেবারে হেরে গেলো। মনে আমার বড্ড সুখ অনুভব হচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা রইলো আমার মনের কথা আমার প্রিয়তম, আমার নেতাজিকে জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই কাজের জন্যে একটা সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষা করতে হবে। উনাকে আমার মনের কথা যেমন তেমন ভাবে তো আর বলা যাবে না!

ভার্সিটি খুলতেই আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম পড়ালেখা নিয়ে। এতদিন ধরে নেতাজির সাথে আমার দেখা হলেও আমি আমার মনের কথা উনাকে জানাতে পারিনি। নানা কারণ যেনো আমাদের মাঝে চলে এসেছিল। এই সুবর্ণ সুযোগ কবে আসবে? এই সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায় আমি একেবারে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। এইদিকে ইতি আপুর বিয়ের কথাবার্তা একেবারে ফাইনাল। ইতি আপুর মনের মানুষের সাথেই উনার বিয়ে ঠিক করা হলো। ইতি আপুর হবু বর একজন ইঞ্জিনিয়ার।

গতকাল তাদের বাগদানের অনুষ্ঠান হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে অনেক সুযোগ খুঁজেছিলাম আমি নেতাজিকে নিজের মনের কথা বলার। কিন্তু, আমি অভাগী এমন কোনো সুযোগ পেলাম না। এখন তো রীতিমত আমার চিন্তা লাগছে। আদৌ কি আমি আমার মনের কথা উনাকে বলতে পারবো? আমি জুমুর রুমে বসে আছি। মাথায় আমার নানা কথা লড়াই করছে একসাথে। জুমু এসে আমার পাশে বসলো। আর জুমুর পিছে পিছে এলো জুরাইন।

জুরাইন জুমুকে চিল্লিয়ে বললো,

“তুমি কাল ইতি আপুর দেবরের সাথে এতো হেসে কথা বলেছিলে কেনো?”
“ফুল, এই ছেলেকে বলে দে; আমার সাথে আলগা পিরিত না দেখাতে। সেই কবে থেকে আমার পিছে লেগে আছে সে। আমি বুঝলাম না, আমার জন্যে তার কবে থেকে এতো চিন্তা হলো?”
জুমুর কথায় আমি জুরাইনকে শান্ত হতে বললাম।
কিন্তু জুরাইন শান্ত না হয়ে আরো চিল্লিয়ে উঠলো,

“নিজের পছন্দের মানুষ অন্য ছেলের সাথে কথা বললে, যে কারোই খারাপ লাগবে।”
কথাগুলো বলে জুরাইন জুমুর হাত চেপে ধরলো। জুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জুরাইনের দিকে। জুরাইন আমাদের আরো অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো,

“এতদিন নিজের মনের কথা মনে চেপে তোমায় অনেক আশকারা দিয়েছি। আজ তো জেনেই গিয়েছো আমি তোমায় ভালোবাসি। তাই, আজ থেকে শুধু একমাত্র আমি নামক এই ছেলের দিকে তুমি তাকাবে। মাথায় ঢুকেছে?”

জুরাইনের চোখে আমি সাদিফ ভাইয়ের চোখের মতো সেই বিষাক্ত নেশা দেখতে পাচ্ছি। তার মানে জুরাইন সত্যিই এতদিন ধরে জুমুকে পছন্দ করে এসেছে! অথচ এই ছেলে আমাকে এই ব্যাপারে কিছু বলেনি।

“কিসব পাগলামী করছো জুরাইন? তোমার মাথা ঠিক আছে?”
জুরাইন জুমুর এমন কথায় হেসে উঠলো,

“একদম ঠিক আছে, রূপসী। আমাকে ভালো না বেসে তুমি থাকতেই পারবে না। সময় নাও আমাকে ভালোবাসার। কিন্তু, শুধু আমাকেই ভালোবাসতে হবে তোমার। আর তুমি ভালো না বাসলেও, আমি তোমায় ভালোবাসি। এটাই আমাদের জন্যে অনেক।”

কথাগুলো বলে জুরাইন চলে গেলো। আর আমি চোখ কঁচলে নিজের চোখ মুছে নিলাম। এতক্ষণের ঘটনা কি আসলেই সত্যি ছিলো?

“ফুল? এই ছেলে এমনিতেই এমন জেদি। তার উপর আজ তার এই কথা শুনে আমার কেমন কেমন যেনো লাগছে। জুরাইনের আজ এই রূপ দেখে তোর আর আমার ভাইয়ের কথাটা প্রথমে আমার মাথায় এলো। আমাদের পরিবারের ছেলেগুলো এমন জেদি কেনো?”
জুমু অন্যমনস্ক হয়ে বললো।

“জানিনা আমি। তবে, জুরাইন তোকে নিজের মনের কথা বলেই দিলো। এখন আর তোর রক্ষে নেই। ইস, তোর ভাইও যদি আমায় এমন করে ভালোবাসিবলতো!”
“জানিনা, আমিও কিছু। আমি তো এটাও জানিনা, জুরাইনকে আমি ভালোবাসতে পারবো কিনা!”
জুমু আমার কথায় উত্তর দিলো।

“তুই ভালো না বাসলেও জুরাইন তোকে তার করেই ছাড়বে। আফটার অল, সে সাদিফ ভাইয়ের ভাই।”
আমার কথা শুনে আমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। আমরা দুইজনই এখন মাথাভর্তি চিন্তা নিয়ে বসে আছি। আমার চিন্তা হলো, সাদিফ ভাইকে কিভাবে নিজের মনের কথা বলবো! আর জুমুর কথা হলো, সে কিভাবে জুরাইনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিবে? আমরা দুইজনই এখন প্রশ্নের সাগরে ভাসছি। একটা সুবর্ণ সুযোগ আসলেই আমি আমার প্রিয়তমকে আমার মনের কথা বলে দিবো নির্দ্বিধায়, ঠিক জুরাইনের মতো।


পর্ব ১৯

ইতি আপুর বিয়ে উপলক্ষে আমার এখন তাদের বাড়ি বেশি থাকা হয়। খুব প্রয়োজন হলে আমি আমার বাড়িতে যায়। এই দুই মাসে জুমু আর জুরাইনের প্রেম জমে ক্ষির হয়ে গেলো। আর আমি এখনো বসে বসে সেই সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষা করছি। অবশ্য তিনবার গিয়েছিলাম আমি উনার সামনে উনাকে আমার মনের কথাটি বলার জন্যে।

কিন্তু, এক তিনবারই আমাদের কথার মাঝে উনার ফোন চলে আসতো, আর উনি ধপ ধপ পা ফেলে “আসছি “বলেই চলে যেতেন। ব্যস, আমার অপূর্ণ মুখের কথা অপূর্ণই থেকে গেলো। আজ ইতি আপুর হলুদ উপলক্ষে অনেক বিশাল আয়োজন করা হচ্ছে। আজ প্রোগ্রাম হবে সাদিফ ভাইদের বাড়িতেই। আমি ভেবেছিলাম অনেক বড় হলে হবে এই অনুষ্ঠান। কিন্তু ইতি আপুর ইচ্ছে,

উনাদের এই বিশাল বাড়িতেই উনার হলুদের অনুষ্ঠান করা হবে। জুমু ফিসফিস করে প্রেম করছে জুরাইনের সাথে। আর আমি বসে বসে তাদের কান্ড দেখছি। কি ভাগ্য তাদের! একে অপরকে মনের কথা জানিয়ে প্রেমে মগ্ন হয়ে গেলো তারা। আর আমি আগে প্রেমে পড়ে এখনো বাতাস খাচ্ছি। দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত লোকের উপরেই কি আমার মন আসার দরকার ছিল?

মাঝে মাঝে তো মনে হয় আমার আর উনার মাঝে কিছুই হবে না। মনটা আমার বেশ খারাপ। ইচ্ছে করছে বসে বসে কান্না করি। তবে মাথায় একটা পরিকল্পনা এলো আমার। আর সেটি হলো, আজ আমি সাদিফ ভাইয়ের মাঝের রাগকে জাগিয়ে তুলবো। জুরাইন যেমন জুমুর সাথে রেগে নিজের সব মনের কথা জানিয়ে দিয়েছিল তাকে। আমিও ঠিক এমনটাই করবো। এমনভাবে রাগিয়ে তুলবো উনাকে, যেনো উনি আমার উপর রেগে আমাকে উনার সব মনের কথা গড়গড় করে বলেন। আমি আমার মন খারাপের মাঝেই হেসে দিলাম। চারদিকে কাজের দ্রুততার হার বেড়ে চলছে। মা, ভাবী, মামী, খালা সবাই কাজে ব্যস্ত। ইতি আপু পার্লারে চলে গেলেন সেই সকালে।

জুমু আমাকে অনেক জোর করেছিল পার্লারে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু আমার মন খারাপ থাকার কারণে আমি যায়নি। আর আমার কারণে জুমুও পার্লারে যায়নি আর। এখনো বিকেল হতে ঢের দেরী। আমি তাই নিচে নেমে গেলাম। আপুর অনুষ্ঠানের জন্যে সন্ধ্যার দিকে তৈরি হলেই চলবে। নানান আত্মীয় স্বজনের কারণে সম্পূর্ন ঘর একদম মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে আছে। নিচে নামতেই জারাভিকে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে জারাভি হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকলো। আর আমি গিয়ে জারাভিকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার বোনটি অনেক আদুরে। আমাকে একটা চুমু দিয়ে জারাভি আমাকে বললো,

“ফুল আপু, আজ আমি অনেক লিবি দিবো।”

জারাভির কথায় আমি হেসে উঠলাম। এই মেয়ে এখনো লিপস্টিককে লিবি বলে। আমাকে চুমু দেওয়ার বিপরীতে আমি জারাভিকে চুমু দিয়ে বললাম,
“তাই? আমার পাকনা বুড়ি কি আজ অনেক সাজুগুজু করবে?”
আমার কথায় জারাভি মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ”বললো। আমি মেঝেতে বসে জারাভির সাথে বিভিন্ন কথা বলছি।

সাদিফ ইদানিং শেফার কাজকর্মে বড্ড সুখ খুঁজে পায়। শেফা নিজের মনের কথা সাদিফকে জানানোর চেষ্টা করছে, এটা সাদিফ বেশ বুঝতে পারে। ইচ্ছে করেই সাদিফ শেফাকে একটু জ্বালিয়ে নিচ্ছে। তাছাড়া, সাদিফ শেফার মনের কথা শুনে ঠিক সে মুহূর্তে শেফার সাথে কিভাবে ব্যাবহার করবে এটি তার মাথায় আসে না।

এতো মিটিং, কাজ সব সে একাই সামলায়। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটার মনের কথা শোনার পর সাদিফ নিজের মনকে সামলাতে পারবে কিনা সেটি সে জানেনা। তার ধারণা, সে এমন কিছু একটা করে ফেলবে তার ফুলের সাথে; যেটা তাদের দুইজনের জীবনেই একেবারে নতুন হবে। সাদিফ পিলারের সাথে হেলান দিয়ে এক নজরে দেখে আছে তার ফুলের দিকে। জারাভির সাথে খেলার মাঝে শেফার হাসি, চোখ বড় করে তাকানো, সামনের চুল ঠিক করার ব্যাপারগুলো বেশ উপভোগ করছে সে। সাদিফ তার খালার কারণে এতো দ্রুত তার ফুলকে নিজের করে নিতে পারছে না। কারণ, শেফার মা আগেই তাকে বলে দিয়েছিল; শেফাকে শিক্ষিকা হতেই হবে। সাদিফ নিজেও চাই শেফা যেনো শিক্ষিকা হতে পারে। তাই সে নিজেকে অনেক কষ্ট করে শেফা থেকে সামলিয়ে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে।

কারণ, সাদিফের কাছে তার ফুলকে নিজের করে নেওয়ার তীব্র চাওয়াটি বারবার নাড়িয়ে তুলছে তাকে। তাই সে শেফা থেকে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টায় থাকে। কিন্তু শেফার মোহে সে নিজেকে বারবার মোহিত করে নিয়ে, নিজেকে আয়ত্বে রাখতেই পারে না। এই যে এখন তার ইচ্ছে করছে শেফাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে তার সবটুকু দিয়ে আদর করে রাঙিয়ে দিতে। কিন্তু সাদিফ তার ওয়াদার দেওয়ালে আবদ্ধ হয়ে আছে। তাই সে তার ফুলকে দেখেই তার নজর জুড়িয়ে নিচ্ছে।

আশ পাশে নজর ফেরাতে দেখি সাদিফ ভাই পিলারের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আমার দিকে আছে। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে আমার দিকে তাকানো হলো এখন বেশি গুরুত্বপূর্ন কাজ। কিন্তু আমি সেদিকে আর পাত্তা দিলাম না। নিজে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে শুধু দেখতেই থাকবেন।

মুখে যেনো তার তালা দেওয়া! আমি জারাভিকে নিয়ে সেখান থেকে উঠে পড়লাম। মুখে কিছু না বললে; দেখাও লাগবে না আমাকে, নেতাজি। আপনি আপনার রাস্তায় ভালো থাকুন। এতো রাগ লাগছে আমার বলার বাহিরে। সবসময় আমার সাথেই এইসব উল্টো কাজ হওয়া লাগবে। আচ্ছা আমার কি কোনো মনে ইচ্ছে নেই? জুরাইন, ইতি আপুর জামাই সবাই কতো খোঁজ খবর নেই তাদের প্রিয়তমার। কিন্তু সাদিফ ভাই একটা রোবট। উনি শুধু উনার কাজ চিনেন।

শেফার এমন কাজে বেশ রেগে গেল সাদিফ। হঠাৎ এই মেয়ের কি হলো সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। শেফার পিছে পিছে যেতে নিলে, সাদিফের ডাক পড়লো বাহির থেকে। অগত্য সাদিফ বাহিরের দিকে চলে গেলো। কিন্তু তার মনে শেফার কাজের কারণে জমলো এক রাশ রাগ।
আজও আমি শাড়ি পড়লাম। তবে, গতবারের তুলনায় আমি বেশি তৈরি হয়েছি আমি আজ। আমার রূপের জাদুতেই আজ নেতাজিকে আমি কাবু করবো। ইচ্ছে মতো সেজে নিলাম আমি।

অন্যদিনের তুলনায় আমি বেশ ঢং করে কথা বলছি আর সবার সাথে বেশ হাসি দিয়ে একটু অন্যরকম ভাবভঙ্গি দিচ্ছি। যাতে যে কেউ আমার দিকে একবার হলেও তাকায়। হচ্ছেও সেটি, প্রায় ছেলেরা একবার হলেও আমার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু আমার এতে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারণ এরা সবাই আমাদের আত্মীয় মানুষ। এদের সবাইকে আমি আগে থেকেই চিনি। তবে আমার অভিনয় করাটা এখনো চালিয়ে যেতে হবে। কারণ নেতাজিকে আমি এখনো দেখতে পায়নি।

জুমুর পরিচিত ভার্সিটির কিছু বড়ভাই এসেছে। উনারা আবার সাদিফ ভাইয়ের অনুসারী। এই ছেলেগুলোর মধ্যে একজন ছেলে একটু বেশি আমার সাথে কথা বলছে। এইদিকে সাদিফ ভাইকে জেলাস করানোর জন্যে, আমি এখনো তাদের সাথে না পারতে কথা বলছি। নাহলে এইসব ছেলের সাথে আমি আমার বাপের জন্মে কথা বলিনি। এতক্ষণ ধরে রাবিব নামের এই ছেলের সাথেই আমি কথা বলছিলাম। আমাদের কথার মাঝে জুমু এসে আমাকে এক পাশে নিয়ে গেলো।

“কি করছিস আজ তুই?”
জুমু আমাকে রেগে বললো।
“কই? কি করছি আমি?”
আমি একটু অন্যরকম ভাব নিয়ে বললাম।

“ভুল করছিস কিন্তু। আমি জানিনা আমার ভাই আর তোর মাঝে কি হলো। কিন্তু ভাই এসেছে একটু আগে এইখানে। সে অলরেডি তোকে দেখছে, তোর ব্যাবহার লক্ষ্য করছে। ভাইয়ের মাথা খারাপ করিস না প্লিজ। ভাই কিন্তু ধরলে একেবারে মুচড়ে দিবে তোকে।”

জুমুর কথায় আমার টনক নড়লো। আমি মাথা ঘুরিয়ে পিছে ফিরতেই দেখি সাদিফ ভাই তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। সাথে সাথে আমি সামনে ফিরে গেলাম। উনার চোখ দিয়ে রাগ যেনো আগুন রূপে বের হচ্ছে। হায় আল্লাহ্! কি করে ফেললাম আমি এই? আজ সাদিফ ভাই আমাকে মেরেই ফেলবেন। আমি ভীত কণ্ঠে জুমুর উদ্দেশ্যে বললাম,

“ভাই, আমি তোর ভাইকে জেলাস করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখি কাহিনী উল্টে গেলো।”
আমার কথায় জুমু আমার হাত চেপে উত্তর দিলো,

“তোর জেলাসি আজ ভাই বের করবে। সহ্য করতে পারবি নাকি সেটা আল্লাহ্ ভালো জানেন।”
অতঃপর জুমু আমাকে টেনে স্টেজে নিয়ে গেলো। সম্পূর্ন অনুষ্ঠান আমার ভয়ে ভয়ে কাটলো। তার উপর রাবিব নামের ছেলেটি আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসে আছে।

আমার এখন নিজের চেয়ে এই ছেলের চিন্তা বেশি হচ্ছে। সবাই নাচ করলেও আমি বসে আছি চেয়ারে। সাদিফ ভাইয়ের দিকে যতবার চোখ গিয়েছে আমার ততবার আমাকে উনি উনার রাগী চোখ দেখি শাসিয়েছেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ যাবত আমি উনাকে দেখছি না। সাথে দেখছি না রাবিব এবং আরো কিছু ছেলেকে। এইবার আমার ভয় আরো বেশি বাড়তে লাগলো। মাকে বলে আমি বাড়ির ভেতর যাওয়ার জন্যে অনুমতি নিলাম।

কেনো যেনো আমার মন বলছে সাদিফ ভাই বাড়ির ভেতর আছেন। জুমু আমার সাথে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে সাথে নিইনি। আমি চাই না আমার অপমান জুমু নিজের চোখে দেখুক। ঘরে ঢুকতেই দেখি সাদিফ ভাই উনাদের লবিতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখা মাত্র উনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আর ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। উনার এই অবস্থা দেখে আমি দৌড়ে পালাতে নিলে উনি আমার হাত ধরে ফেললেন। আর আমি থেমে গেলাম।

ভয়ে আমার জান বেরিয়ে আসছে। সাদিফ ভাই আমাকে টেনে উনার বুকের সাথে লাগিয়ে নিলেন। আমি ভয়ে রীতিমত কাঁপছি। অনুষ্ঠানের জন্যে সবাই বাড়ির বাহিরে। বাড়ির ভেতর কেউ আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। আজকের ভুলের জন্যে আমার উনার কাছে মাফ চাওয়া উচিত। আমি মুখ খোলার আগেই সাদিফ ভাই আমার পেট চেপে ধরে আমাকে উনার সাথে আরো বেশি জড়িয়ে নিলেন। আর আমার কানে ফিসফিস করে বললেন,

“ঐ দুই টাকা দামের ছেলের সাথে কথা বলে আমাকে জেলাস করাতে চেয়েছিস তুই? কিন্তু কাহিনী কি হলো? সে এখন নাক ফাটিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে। আর তুই এখন আমার কাছে বন্ধী হয়ে আছিস। এখন বল কি করবো আমি তোকে?”

আল্লাহ্! রাবিবের নাক ফাটিয়ে দিয়েছেন উনি? তাহলে আমাকে কি করবেন, উনি এখন! ভয়ে আমি কান্নায় করে দিলাম। আর কান্নামাখা কণ্ঠে উনাকে বললাম,
“আমি জাস্ট, এমনিই আপনাকে জ্বালানোর জন্যেই এইসব করেছি। এ ছাড়া আমার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।”

“এখন আমি যে তোকে জ্বালাবো এটা সহ্য করতে পারবি?”
সাদিফ ভাইয়ের কথায় আমি উনার হাত চেপে ধরলাম, যে হাতে উনি আমার পেট চেপে ধরে আছেন।

“আমি আর কখনো এই ভুল করবো না।”

আমার কথা শুনে সাদিফ ভাই আমাকে নিজের দিকে ফেরালেন। আর কোমর জড়িয়ে ধরে বললেন,
“সাদিফ অপরাধী আর অপরাধের পক্ষে কখনোই থাকে না। তাই এইবার তোকেও শাস্তি পেতে হবে।”
ব্যস আমি শেষ। আল্লাহ্ কে ডাকছি আমি মনে মনে। চোখ খিচে আমি একেবারে বন্ধ করে রেখেছি। হঠাৎ গলায় কামড়ের অনুভব পেয়ে আমি চোখ খুলে তাকালাম।

সাদিফ ভাই আমার সামনে দাঁড়ানো নেই। উনি বর্তমানে আমার গলায় হামলা চালাচ্ছেন উনার ঠোঁট আর কামড় দিয়ে। এইদিকে ব্যাথা আর ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে আমি উনার ঘাড় চেপে ধরলাম। একটু পরে সাদিফ ভাই আমার গলা থেকে মুখ তুলে আমার চুলগুলো গলার একপাশে এনে দিলেন।

“আহারে! দাগ বসে গেলো। কিন্তু, আমার কিছু করার নেই। আমি আমার প্রিয়তমাকে এর চেয়ে কঠিন শাস্তি দিতে পারবো না। তবে, বিয়ের পর শাস্তি আরো ভয়ংকর হবে। চল এইবার।”
কথাগুলো বলে উনি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন আর আমি উনার পিছে পিছে হাঁটছি। একটু পরে উনি আবার থেমে আমাকে বললেন,

“সবার মতো আমি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে পারবো না। আমি সাদিফ আমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হবে একেবারে অত্যাধুনিক। বুঝছিস ফুল?”

এরপর উনি আবারও আমার হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন। আহা, আমার নেতাজি! কোথায় ভেবেছিলাম আমি উনাকে জেলাসিতে পুড়িয়ে মারবো, সেখানে উল্টো আমাকে উনি কামড়িয়ে শেষ করলেন। কিন্তু আমি বেশ খুশি হলাম উনার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে। কি ভেবেছিলাম আর কি হলো? যায় হোক, আমার নেতাজি সবচেয়ে সেরা।


পর্ব ২০ (অন্তিম)

সেদিনের পর থেকে আমি এক চমকের মাঝেই যেনো ছিলাম। আমি চিন্তা করেছিলাম আমার গলায় সাদিফ ভাইয়ের দেওয়া কামড়টা অনেকদিন স্থায়ী থাকবে। কিন্তু না, দুইদিনের দিন কামড়ের দাগ চলে গেলো। ইতি আপুর বিয়েতে সবাই অনেক আনন্দ করলেও আমার মন ভালো ছিলো না কেনো যেনো। সব কিছুই উলোট পালোট লাগছিলো আমার। সবার এতো প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে এসব দেখে আমার মাথাটায় পাগল পাগল লাগছিলো। সাদিফ আর আমার সম্পর্ক অন্য দুইজন প্রেমিক প্রেমিকার মতো রসালো না। আমাদের প্রেমের সম্পর্ক একেবারে অন্যরকম। মাও ইদানিং আমাকে খালার বাসায় যেতে দেয় না। তাছাড়া সাদিফ ভাই নিজেই আমার সাথে যোগাযোগ অনেক কম করেন। মাঝে মাঝে অনেক কান্না আসে।

আমার ভালোবাসাময় জীবনটাই এমন রসহীন কেনো, এটা জানতে আমার বড্ড ইচ্ছা করে। অন্যসব যুগলদের মতো আমার দিন ফোন প্রেমালাপ করে কাটে না। বরং কাটে, বইয়ে মুখ ডুবিয়ে। এইভাবে কি একটা সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? সাদিফ ভাই মানুষটাই বা কেমন। উনি নাকি আমাকে ভালোবাসে! ভালোবাসার মানুষের খবর না নিয়ে,
দিনরাত নিজের মতো ব্যস্ত থেকেও উনি আমাকে ভালোবাসেন কিভাবে? আজ এত মাস কেটে গেলো।

কোনো দিন আমাকে আমি কেমন আছি, এই জিনিসটাই ফোন করে জিজ্ঞাসা করেননি আমাকে উনি। আমি তাদের বাড়ি গেলেও উনি আমার সামনে আসেন না।

এতই যখন তার দুরত্ব ভালো লাগে উনার তাহলে আমার এত কাছে এসেছিলেন কেনো উনি? সারাদিন আমার এখন পড়ালেখা করে কেটে যায়। উনাকে দেখিনি অনেকদিন হলো। উনার গাড়ির সাইরেন শুনলে আমি এখনো দৌড়িয়ে সেই গাড়ি দেখার জন্যে ব্যালকনিতে অপেক্ষা করি। কিন্তু মহারাজার আমার প্রতি কোনো দয়া মায়া হয় না। উনি নিজের তালে বেশ ভালই আছেন। কিন্তু আমি উনাকে শান্তিতে থাকতে দিবো না, আমায় অশান্তিতে রেখে। এর একটা বিহিত করতেই হবে আমার। জুমু ইতি আপু উনারাও আমাকে সাদিফ ভাইয়ের কোনো সংবাদ দেন না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই মুখটা মলিন করে ফেলে তারা।

ভালো লাগছে আর এইসব কাহিনী। মাথায় কিছু পরিকল্পনা সেট করে, আমি নিজের সব বুদ্ধি দিয়ে একটা বড় প্ল্যান করলাম নেতাজির জন্যে। সন্ধ্যায় পড়া থেকে উঠে আমি রুম থেকে বাহির হলাম। ভাবী আর মাকে দেখলাম ডাইনিং টেবিলে বসে কি যেনো একটা করছে। আমি এগিয়ে যেতেই তারা তাদের কাজ বন্ধ করে আমার দিকে ফিরলেন। দুইজনের চেহারায় সমান বিস্ময়তার ছাপ। কেউ যেনো আমাকে এই মুহূর্তে আশা করেনি। আমি অবাক চোখে তাদের জিজ্ঞেস করলাম,

“কি হলো? এইভাবে কি দেখছো?”

ভাবী একটু থেমে হেসে উঠে আমাকে বললেন,
“কই কিছু না তো! এমনিই কথা বলছিলাম আমরা।”

ভাবীর কথার বিপরীতে আমি চেয়ারে বসে উনাকে বললাম,
“কিসের কথা আমাকেও একটু শোনাও দয়া করে!”
আমার কথা শেষ হতেই আমাকে মা ধমকিয়ে উঠলেন,
“বেশি কথা বলবি না ফুল। তুই বস, আমি চা করে আনছি।”
অতঃপর আমাকে চুপ করিয়ে মা চলে গেলেন। কিন্তু আমার গোয়েন্দা মনটা খচ খচ করছে। তাই আমি ফিসফিসিয়ে ভাবীকে আবারও প্রশ্ন করলাম্‌,

“কি হলো ভাবী কাহিনী? তোমরা কি নিয়ে কথা বলছিলে?”
“কি..কিছুনা তো। আমরা এমনিতেই কথা বলছিলাম আরকি।”
ভাবী উত্তরে আমি আবারও জবাব দিলাম,
“মিথ্যে বলবে না ভাবী। তোমার চোখ অন্য কথা বলছে।”

ভাবী এইবার একটা শুকনো ঢেঁকুর গিললেন। আর যেই উনি মুখ খুলতে যাবে, অমনি মায়ের পক্ষ থেকে ভাবীর জন্যে ডাক এলো। আর ভাবী মায়ের ডাকে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলো। আমি হাবলার মতো ডাইনিং টেবিলে বসে রইলাম। এইখানে আসলে কাহিনী কি হলো? নাস্তা সেরে আমি আমার রুমে চললাম। রুমে গিয়ে দেখি রাফসান আমার জন্যে অপেক্ষা করছে আমার খাটে বসে। আমাকে দেখতেই সে আমাকে তার হাতে থাকা একটা চকলেট এগিয়ে দিলো।

“ফুল আপু। এইটা তোমার জন্যে। কাল আমাকে সাদি ভাই দিয়েছিল। আর উনি এইখান থেকে তোমাকেও দিতে বলেছিলো। কিন্তু আমি পড়ালেখার চাপে ভুলে গিয়েছিলাম।”
রাফসানের কথায় আমি তার গালে একটা চুমু দিয়ে তার কোলে শুয়ে পড়লাম।
চকলেটের প্যাকেট খুলে আমি সেটাতে দুই তিন কামড় দিয়ে খাওয়া শুরু করে দিলাম। কিন্তু আমার মাথায় আসলো না, সাদিফ ভাইকে রাফসান কই পেলো? পরক্ষণে আমি রাফসানকে জিজ্ঞেস করলাম,

“সাদিফ ভাইকে পেয়েছো কোথায়? উনি কি আমাদের বাসায় এসেছেন?”
আমার কথায় রাফসান মাথা নাড়ালো।
“নাহ, তুমি ক্লাসে যাওয়ার পর আমি আর মা গিয়েছিলাম খালার বাসায়। সাদি ভাই শুধু শুয়ে ছিলেন। অন্যদিন তো আমাকে অনেক আদর করতেন।”
রাফসানের কথায় আমি সোজা হয়ে বসলাম। আর চিন্তিত কণ্ঠে তাকে আবারও প্রশ্ন করলাম..
“কেনো? সাদিফ ভাইয়ের কি হলো?”

রাফসান আমার হাত থেকে চকলেট নিয়ে সেটি তার মুখে দিয়ে বললো…
“কিজানি, ফুল আপু। আমি তো ছোট মানুষ। বুঝতে পারলাম না কি হলো।”
রাফসান খাট থেকে নেমে চলে গেলো। আর আমি পড়লাম এক মহা চিন্তায়। কি হলো আসলে উনার? আমাকে তো কেউ কিছুই বলেনি। বুঝলাম না ঠিক ব্যাপারটা। সাদিফ ভাইয়ের কথা আমার মাথায় এত বেশি জমা হলো, এখন মনে হচ্ছে আমার মাথা ফেটে যাবে। শত রাগ অভিমান দূর করে আমি ফোন লাগালাম উনার নাম্বারে। কিন্তু উনার নাম্বার বন্ধ বলছে।

তাই আমি এইবার জুমুর নাম্বারে ফোন দিলাম। জুমুর নাম্বার ব্যস্ত বলছে। আল্লাহ্ এই মেয়েটা! এতোমাস আগে জুরাইনকে সে চোখ দিয়ে দেখতেও পারতো না। আর এখন নিশ্চয় সে প্রত্যেকদিনের মতো জুরাইনের সাথে কথা বলছে। মোবাইল কোলে নিয়ে বসে আছি আমি। খালামণিকে ফোন দিতে গিয়েও দিলাম না। কেমন যেনো লাগবে উনাকে ফোন করে সাদিফ ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে আর ইতি আপুও উনার শশুরবাড়ি। ইতি আপুকে ফোন দেওয়াটা একেবারে বাজে সিদ্ধান্ত হবে।

তাই আপাতত ফোন হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। কিন্তু আজ আমার মনটা উনার জন্যে বেশ হাহাকার করছে। কেনো যেনো এখনই সাদিফ ভাইকে দেখার জন্যে আমার মন আনচান করছে। তাছাড়া উনার এইভাবে নিজেকে আমার কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়াটা মোটেই আমার কাছে সুবিধার লাগছে না। আমার মন বলছে নেতাজি এখন খালার বাসায় আছেন। আমি দ্রুত গায়ে ওড়না জড়িয়ে রুম থেকে বের হলাম। রুম থেকে বের হয়েই মায়ের মুখোমুখি হতে হলো আমাকে।

মা আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে আমাকে বলে উঠলো,
“কোথাও কি যাচ্ছিস?”
আমি দ্রুত বলে উঠলাম,
“হ্যাঁ, জুমু থেকে কিছু নোট নিতে হবে।”

কথাটা বলে আমি আর দাঁড়ালাম না। ধপধপ পা ফেলে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। পাঁচ মিনিটের মাথায় ঐ বাড়িতে আমি পৌঁছে গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই খালামণি আর ইতি আপুকে দেখতে পেয়েছি। তারা আমাকে দেখে দ্রুত জড়িয়ে ধরলেন। ইতি আপু আমার মুখে হাত রেখে বলল….
“ফুল, কেমন আছিস তুই?”

“আমি তো ভালই আছি। তোমার কি খবর? কখন এসেছো এই বাসায়?”
আমি ইতি আপুর প্রশ্নে বললাম।

“সবে মাত্র এলাম। আসলে ভাই..”
ইতি আপুকে বলতে না দিয়ে আমি আপুর কথায় বলে উঠলাম,
“আচ্ছা আমি পরে শুনবো তোমার কথা। এখন একটু জুমুর কাছে যায়। জরুরী কাজে এসেছি আমি।”

কথাগুলো বলে আমি দৌড় লাগালাম উপরের দিকে। পেছন থেকে খালামনির কথা আমার কানে ভেসে এলো,
“ফুল, আগে নাস্তা তো খেয়ে নে।”

কিন্তু আমি থামলাম না উনার কথায়। এক দৌড়ে উপরে এসে পৌঁছালাম। আমার ধারণায় ঠিক ছিল, জুমু ফোন কথা বলছে। আমাকে দেখা মাত্র সে তার কানের পাশ থেকে ফোন সরিয়ে বললো..
“ফুল তুই? বস বস। আজ অনেকদিন পর এই বাড়িতে এসেছিস।”

“আমি বসতে আসিনি। আমাকে একটা কথা বল। তোর ভাই এখন কোথায়?”
“ভাইয়া তো তার রুমেই আছে।”
আমার প্রশ্নে জুমু উত্তর দিলো।

“ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি উনার কাছে। তুই কথা বল জুরাইনের সাথে।”
“তুই কিভাবে জানিস আমি তার সাথে কথা বলছি?”
আমি জুমুর গাল টেনে বললাম,
“আমি সব জানি।”

এরপর গেলাম সাদিফ ভাইয়ের রুমে। উনার রুমের দরজায় কড়া না নেড়ে আমি সরাসরি দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম। রুমে ঢুকতেই সাদিফ ভাইকে দেখলাম গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে আছেন উনি সোফার উপরে। আমাকে দেখে যেনো বেশ চমকে উঠলেন উনি। আর আমার মাথায় আসছে না উনি এই গরমকালে কেনো চাদর জড়িয়ে রেখেছেন! কিন্তু আমার মাথায় এখন অভিমানের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। তাই আমি নির্দ্বিধায় বলা শুরু করলাম,
“আপনি কি আমাকে সত্যি ভালোবাসেন?”

আমার প্রশ্নে উনি চমকে উঠলেন। আমি উনার মুখের অবস্থা দেখেও না বুঝার ভান করে আবারও উনাকে বলতে শুরু করলাম,

“কি পেয়েছেন আপনি আমাকে? দুইদিন একটু ভালোবাসার কথা বলে আমার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিবেন? আসলে আপনি কি চান? আমাকে ব্যাবহার করে ফেলে দিতে চান?”
“মুখ ভেঙে দেওয়ার মতো কথা বলবি না শেফা।”
সাদিফ ভাইয়ের কড়া জবাব।

ইসস, দিনের পর দিন তার দেখা নেই। আর এখন আসছেন আমার মুখ ভাঙতে।

আমি আবারও উনার কথায় বলে উঠলাম,
“যে মানুষ দিনের পর দিন আমার কোনো খবর নেয় না, আমি কেমন আছি এটাই জানতে চাই না, সে নাকি আমাকে ভালোবাসে! হাহা, নেতাজি আপনি আমাকে বেশ হাসালেন। আসলে আপনি আমাকে শুধু ব্যাবহার করেছেন। আর কিছুই না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। আর এটাই চিরন্তন সত্য।”

আমার কথাগুলো সাদিফ ভাইয়ের উপর বেশ ভালই প্রভাব ফেললো। উনি গায়ের চাদর সরাতেই উনার উদোম শরীর দেখতে পেলাম আমি। মুহূর্তেই যেনো আমার সম্পূর্ণ দুনিয়া ঘুরা শুরু করলো। আমি নিজের কামিজ শক্ত করে চেপে ধরলাম উনার এমন শরীর দেখে। বুকটা বড্ড ধুকধুক করছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই সাদিফ ভাই আমার সামনে চলে এলেন।

আমি মুখ খোলার আগেই বেশ শক্ত করে উনি আমার বাহু চেপে ধরলেন। উনি আমাকে স্পর্শ করতেই আমার গায়ে মনে হলো আগুনের তাপ লাগলো। সাদিফ ভাইয়ের জ্বর! কিন্তু, কেউ আমাকে এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি কেনো? আমি আমার হাত ছুটিয়ে উনার কপালে আমার হাত ছোঁয়ালাম। ইস, কপাল পুড়ে যাচ্ছে। আমি উনার হাতে নিজের হাত রেখে বললাম,

“আপনার তো অনেক জ্বর। ডাক্তার দেখাননি আপনি? বসুন বসুন। দাঁড়িয়ে থাকবেন না।”
আমার কথায় উনার কোনো হেলদুল হলো বলে মনে হলো না। উনি উল্টো আমার ঘাড়ে বেশ শক্ত করে চেপে ধরলেন এক হাত দিয়ে, আর অন্য হাত দিয়ে উনি আমার গাল চেপে ধরলেন। আমার মনে হচ্ছে উনার রাগ এবং জ্বরের তাপে আমি আমি এখন ভস্ম হয়ে যাবো। আমি মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের করতে গেলেই, সাদিফ ভাই বলে উঠলেন,

“মা, খালা এসে বলবে আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে; তুই এখনো অনেক ছোট মেয়ে। আর তুই এসে বলবি আমি তোকে ভালবাসি না, ব্যাবহার করছি! আসলে তোরা কি চাস আমার কাছে? তোর থেকে দূরে থেকে আমার তোর চেয়েও বেশি কষ্ট লাগে। তুই আমাকে পছন্দ করিস কতদিন হলো? আর আমি তোকে পছন্দ করি কতো বছর হলো জানিস? চার বছর ধরে আমি তোকে পছন্দ করি।”

উনার এমন কথা শুনে আমার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। চার বছর মানে? উনার সাথে আমদের আত্মীয়তার কথা আমরা জানলাম সেই দুই বছর আগে। তাহলে কেমনে কি?
উনি আবারও দূর্বল কণ্ঠে বললেন,

“কি ভাবছিস? আমি কিভাবে এত আগে তোকে পছন্দ করেছি, এইটাই তো আসছে না তোর মাথায়; তাই না? কলেজ ড্রেস পড়ে দুই বেনী নাড়িয়ে কথা বলা আর হাসাহাসি করা এক রমণীর প্রেমে পড়েছিলাম আমি সেই চার বছর আগে। জুমুকে কোচিং থেকে নিতে আসার সময় দেখতে পেয়েছিলাম একদিন তোকে। তোর সেই হাসি, বেণী দুলানোর দৃশ্য আমার নজরে আটকে গিয়েছিল। পরে জানতে পারলাম তুই জুমুর বেস্ট ফ্রেন্ড। এরপর আর কি?

তোকে প্রায় দেখতে যেতাম কোচিং এ। দূর থেকে গাড়িতে বসে তোর সেই হাসিমুখ দেখতেই নেশা লেগে যেতো। যে নেশায় আমি আজ পর্যন্ত আসক্ত। জানিস সেদিন আমি কি পরিমান খুশি হয়েছিলাম, যেদিন আমি জেনেছি তুই আমার নিজের ছোট খালার মেয়ে! সেদিন মাকে জানিয়েছিলাম আমি তোকে আগে থেকে পছন্দ করি। মা খালাকে জানালে, উনি বললেন আগে তোর শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করতে হবে। এরপরই তোর মা তোকে বিয়ে দিবেন। আমরাও এই ব্যাপার মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু, বিপাক ঘটে আমার ক্ষেত্রে।

এইভাবে নিজের চোখের সামনে তোকে দেখা, তোর হাঁটাচলা, ভাবভঙ্গি দেখে আমার তো দম বন্ধ হয়ে যায় রে। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারি না। ইতির হলুদের দিন তোর গলায় চুমু দেওয়ার ব্যাপারটা মা জেনে যায়। আর এরপরই মা আমাকে বারণ করে তোর সাথে আমাদের বিয়ের আগে যেনো আর ক্লোজ না হই। তোর মা এই ব্যাপার জানলে নাকি খুব কষ্ট পাবেন। আমারও আর কি করার? তোর প্রেমে পড়ে নিজের হুঁশ বুদ্ধি সব হারিয়েছি আমি। এইযে এতো মাস তোর কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতে কি কষ্ট লেগেছে তুই জানিস? জানিস না। তুই শুধু নিজের কথা নিয়েই পড়ে আছিস।

তোর চিন্তায় আমার জ্বর চলে এলো। যে ছেলে এতো বড় একটা দল চালায়, সে ছেলে একটা পুচকি মেয়ের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লো! এইগুলো অন্যরা শুনলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। কিন্তু এই সাদনান সাদিফ তুই বলতেই শেষ।

‘দুই বেণী করা এক হাস্যোজ্জ্বল রমণীর প্রেমে আমি হয়েছিলাম দিশেহারা,
আজও তার জন্যে রেখেছি জমিয়ে সেই ভালোবাসা বুক ভরা।”

উনার কথাগুলো আমার কানে প্রবেশ করছে আর আমার মাথাটা ভনভন করছে। সাদিফ ভাইয়ের কথাগুলো আমার জন্যে এক স্বপ্ন স্বরূপ। আমি ড্যাবড্যাব করে উনার দিকে এখনো চেয়ে আছি। আর উনি উনার অসুস্থ চোখ জোড়া দিয়ে আমি দিকে চেয়ে আছেন। আমি কিছু ভেবে উঠার আগেই সাদিফ ভাই আমার কপালে চুমু দিলেন। আমি উনাকে যেই কিছু বলতে যাবো, অমনি উনি ধপ করে পড়ে গেলেন আমার সামনেই। আমার বুকটা যেনো এখনই ফেটে যাবে।

আমি দ্রুত বসে উনার মাথাটা আমার কোলে নিয়ে নিলাম। আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। চিল্লিয়ে কাউকে ডাকবো এই শক্তিটা পাচ্ছি না আমি। একদম চুপ করে আছেন আমার নেজাতি। মুখটাও বড্ড মলিন দেখাচ্ছে উনার। আর না! উনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন এই কয় বছর যাবত। আমাদের বিয়ের কথা এইবার আমি মা এবং খালাকে নিজেই বুঝিয়ে বলবো। নিজের মনে শক্তি জোগাড় করে আমি জুমু, ইতি আপু খালামণি সবাইকে ডেকে আনলাম।

প্রায় তিন ঘন্টা যাবত ডাক্তার সাদিফ ভাইয়ের চেকাপ করে বের হলেন উনার রুম থেকে। বাহিরে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি। মা, ভাবী, রাফসান, বড় ভাই সবাই এসেছেন ডাক্তার আসার আগেই। আমি এই তিনঘন্টা কিভাবে পার করেছি একমাত্র আমি ভালো জানি। কান্নার কারণে আমার মাথাটা বড্ড ব্যাথা করছে কিন্তু এখন এইসব মাথায় নিলে চলবে না।

“সাদিফ সাহেবের জ্ঞান ফিরেছে। আপনারা উনার সাথে দেখা করতে পারেন।”

ডাক্তারের বলা এই কথা শোনার সাথে সাথেই আমি ঢুকে পড়লাম সাদিফ ভাইয়ের রুমে। স্যালাইন লাগানো অবস্থায় উনি শুয়ে আছেন বিছানার উপর। আমি দ্রুত গিয়ে উনার পাশে বসে পড়লাম। উনার অন্য হাত ধরতেই উনি চোখ মেলে আমার দিকে তাকালেন। খুবই দূর্বল কণ্ঠে উনি আমাকে বললেন,

“এইভাবে কাঁদতে হয় বুঝি? আমি একেবারে ঠিক আছি। কান্না করিস না ফুল। তুই কান্না করলে আমার বুকে বড্ড কষ্ট লাগে।”

উনার এমন কথায় আমার চোখে জমে থাকা পানি আবারও গড়িয়ে পড়লো। আমি কান্নামাখা কণ্ঠে উনাকে বললাম,

“আচ্ছা আর কান্না করবো না। আপনি কিন্তু আমাদের এই ব্যাপার নিয়ে একেবারে চিন্তা করবেন না। আমি মা এবং খালাকে বুঝিয়ে বলবো আমাদের বিয়ের কথা। আমাকে আপনার থেকে আর দূরে থাকতে দিবো না আমি। আমি তো বিয়ের পরেও পড়ালেখা চালিয়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। আপনি দয়া করে এইসব ভেবে নিজের শরীর খারাপ করবেন না নেতাজি। আপনার কিছু হলে আমি মরে যাবো।”

কথাগুলো বলে আমি উনার বুকে মুখে গুঁজে কান্না করছি। আর উনি আলতো হাতে আমার পিঠ জড়িয়ে ধরলেন।

“বাহ্! আমরা তার জন্যেই আমার বোনের ছেলেকে দূরে থাকতে বলেছি। আর সে নিজেই তার বুকে এসে কান্না করছে।”

মায়ের এমন শব্দ শুনে আমি মাথা তুলে তাকালাম। পেছনে আমাদের দুইজনের পরিবার সবাই দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় আমার মাথা কেটে যাচ্ছে। সবাই কি ভাবছে এখন? যা ভাবার ভাবুক। আমি আমার নেতাজি থেকে আর দূরে থাকতে পারবো না। আমার চিন্তার মাঝে পরক্ষণে খালামণি বলে উঠলেন,

“মেয়ের জন্যেই আমাদের চিন্তা ছিলো। এখন যখন মেয়েই রাজি তাহলে আমার ছেলের বউকে আমরা খুব দ্রুত ঘরে তুলে নিতে চাই। এতে আমাদের ছেলে মেয়ে উভয়েই অনেক সুখী হবে। কি সাদি ঠিক বলেছি?”

“ঠিক, বেঠিক জানি না আমি। আমার বউ যখন বিয়েতে রাজি, তাহলে আমি এখনই তাকে বিয়ে করতে রাজি আছি। এইভাবে যদি আমার বউ আমার জন্যে আগে পাগলামী দেখাতো, তাহলে আমি সেই কবেই অসুস্থ হয়ে ঘরে বউ তুলতাম।”

সাদিফ ভাই এমন কথা বলে হেসে উঠলেন। উনার সাথে হেসে উঠলো পুরো পরিবার। আর আমি দেখছি আমার নেতাজির হাসি। যে হাসি দেখে আমি করে গিয়েও শান্তি পাবো। বড্ড ভালোবাসি আমি আপনাকে নেতাজি।

আমাদের বিয়ের সকল অনুষ্ঠানের পর আমি বসে আছি সাদিফ ভাইয়ের রুমে। এতদিন এই দিনটার অপেক্ষা করলেও আজ আমার মনটা ভয়ে কাঁপছে। কেমন যেনো অদ্ভুত অস্থির লাগছে আমার। আমি ঝিম মেরে বসে রইলাম বিছানার মাঝখানে। একটু পরেই এলেন সাদিফ ভাই। উনাকে দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।

আমাকে অস্থির হতে দেখে সাদিফ ভাই আমার কাছে এসে বললেন,
“খুব তো নাচছিলি বিয়ে করবি বলে। এখন তো দেখছি তুই ভয়ে কাঁপছিস। এতো কিসের ভয় ফুল? আমি তো আছি।”

“আপনি আছেন, এটাই তো আমার ভয় সাদিফ ভাই।”
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম।
আর উনি আমার কথা শুনে ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন।
“এখনো কি ভাই ডাকবি? বিয়ে করে নিয়েছি আমি তোকে।

সাদিফ ভাইয়ের এমন কথায় আমার মাথা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেলো। আমি অবাক চোখে উনার দিকে তাকালে উনি আবারও হেসে উঠলেন। আমি অদ্ভুতভাবে উনার হাসি দেখছি। কিছু বুঝে উঠার আগেই উনি আমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন।
“ভালোবাসি অনেক তোকে, ফুল।”

আমি উনার এমন কথায় উনার ঘাড় জড়িয়ে ধরে বললাম।
“আমিও আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসি, নেতাজি। আপনি আমার সাধের প্রিয়তম। আমার ভালোবাসা।”

আমার কথা শুনে উনার চোখ একেবারে চিকচিক করে উঠলো। উনি যেনো আমার এই কথাটা শোনার অপেক্ষা করছিলেন। আমার হাত টেনে উনি দ্রুত আমাকে উনার কোলে তুলে নিলেন। আর আমার কোমর আকড়ে ধরে বললেন,

“যতদিন জীবন আছে, রাখবো তোমায় এমন আগলিয়ে;
সারাজীবন ভালোবেসে যাবো তোমার প্রিয়তম হয়ে।”

অতঃপর সাদিফ ভাইকে আমার প্রিয়তম, আমার নেতাজি এবং আমার বর হিসেবে পেয়ে আমার জীবনটা এক নতুনত্ব লাভ করেছে। এই যেনো এক মহাসুখ! যেই সুখের কোনো ইতি নেই; আছে শুধু ভালোলাগা আর এক সমুদ্র ভালোবাসা।

লেখিকা: সালসাবিল সারা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “প্রিয়তম – Romantic premer golpo in bengali” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ। )

আরো পড়ূন – মানুষের মতো মানুষ – মায়ের ভালোবাসা