রিলেশনশিপ

নিবেদিতা – Valobasar Romantic Premer Golpo Bangla

নিবেদিতা – Valobasar Romantic Premer Golpo Bangla: জহির মাত্রই বাসর ঘরে ঢুকলো। মায়া প্রথম বার জহিরদের বাড়ি বিয়ে খেতে আসলে ওদের যে ঘরটায় থাকতে দেয়া হয়েছিল সেই ঘরটাতেই আজ বাসর ঘর সাজানো হয়েছে।


পর্ব ১

~ “সবাইকে A, B, C, D তুই লিখে দিছস?”
মায়াবতী ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো চিকন কঞ্চির বেত হাতে রাখা আসাদ মাস্টারের দিকে। কোনোরকমের ঢোক গিলে মাথা উপর নিচে করে স্বীকার করল যে, সে’ই ক্লাসের সবাইকে লিখে দিয়েছে। মাস্টার মশাই এবার একটু জোরে ধমকে উঠে বললেন,
~ “এর আগেও তুই পরীক্ষার মধ্যে আরেকজনরে লিখে দিছস। অইদিনও কিছু বলি নাই। হাত পাত এখন।”

মায়া এবার মাথা তুলে অসহায় দৃষ্টিতে একবার স্যারের দিকে তাকালো। আরেকবার তাকালো সামনের ব্রেঞ্চগুলোতে বসে থাকা ওর সহপাঠীদের দিকে। সহপাঠীদের দৃষ্টিতে অপরাধবোধ। আজকে ওদের জন্য মায়াকে মাইর খেতে হচ্ছে। মায়া আবারো একবার মাষ্টার মশাই এর দিকে তাকিয়ে সাথে সাথে মাথা নিচু করে শেষ চেষ্টা করার ভঙ্গিতে বলল,
~ “স্যার? এমুন আর করমু না। মাফ কইরা দেন।”

আসাদ মাষ্টার মায়ার কথা শুনে হুংকার দিয়ে উঠলেন,
~ “হাত পাততে বলছি না তোরে?”

মায়া চমকে উঠে মাথা নিচু করে বুকে থু থু দিয়ে হাত পাতলো। স্যার পর পর দুইটা বেতের বাড়ি দিলো। বেশ জোরে জোরেই। মায়ার চোখের কোণায় পানি জমে গেলো। ও মাথা তুলল না। মাথা নিচের দিকেই দিয়ে রইলো। স্যার ধমকের সুরে নিজের জাগায় গিয়ে বসতে বললেন। মায়া মাথা নিচের দিকে দিয়েই নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো।

মাস্টার মশাই এবার উঠে এসে ক্লাসের সবাইকে ৩ টা করে বেতের বাড়ি দিলেন। মেজাজ তার বিগড়ে আছে। সারাবছর সময় ছিল; সারাবছরে ২৬ টা ইংরেজি বর্ণমালা শিখতে পারে নাই? তাও আবার ক্লাস টু এর স্টুডেন্ট। সারাবছর কি ঘোড়ার ঘাস কাটে সবাই? মায়া পারলে ওরা পারবে না কেন? মায়ারে কি ওর মা সোনা খাওয়ায়? আর বাকিদের মা কি তাদের গু খাওয়ায়? উফফ…..আর ভাবতে পারছে না আসাদ মাস্টার।

বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। আজ ইংরেজি পরীক্ষা ছিল মায়াদের। পরীক্ষা বলতে শুধু অই ইংরেজি বর্নমালা গুলোই লিখতে হবে। ছোট, বড় উভয় হাতেরই। নব্বই দশকের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এইটাই বুঝি ঢের কঠিন। ইংরেজি বর্ন মালা…এটা শেখা কি এতই সহজ?

আর সেজন্যই তো পুরো এক বছরেও শিখতে পারে নি। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর মায়া ফটাফট ছোট, বড় উভয় হাতের বর্নমালা লিখে যখন আরাম করে বসে ছিল তখন তার আশেপাশের সহপাঠীরা ওকে রিকুয়েষ্ট করল ওদেরও লিখে দেয়ার জন্য। মায়া খুশি মনে লিখে দিলো। এক এক করে ক্লাসের সবাইকে। মাস্টার মশাই ওদের রেখে গিয়েছিল চা খেতে। চা খেতে গিয়ে আড্ডায় মেতে ভুলেই গিয়েছিল ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার কথা। আড্ডা শেষে যখন আসল ছাত্রছাত্রীদের কাছে তখন দেখে এই অবস্থা। এমনিতেই আড্ডা দেয়ার সময় রাজনৈতিক আলাপ করতে গিয়ে তার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে। এখানে এসে আরো মেজাজ বিগড়ে গেলো মাস্টার মশাইয়ের। ফলস্বরূপ মায়া সহ ক্লাসের সবাইকে বেতের আঘাত পেতে হলো।

~ “মা….ও মা? কনে গেলা?”
~ “চিল্লাইস না। কাম করি।”
~ “খিদা নাগছে….ভাত দেও।”
~ “হাড়িতে আছে ভাত। খা গা।”

মায়া হাড়ি থেকে মাটির তৈরি প্লেট যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘হাংকি’; সেই হাংকিতে ভাত বেড়ে তরকারির পাতিলের ঢাকনা তুলতেই দেখে তরকারী নাই। সব জাগায় খুজে দেখলো কোথাও তরকারী, ভর্তা, ভাজি কিছুই নেই। আবার সে মাকে ডাকল,
~ “মা….ও মা?”
~ “আবার চিল্লাস ক্যা?”

~ “ভাত কি দিয়া খামু?”
~ “পানি ঢাইলা পিয়াইজ, মরিচ দিয়া খা। কিছু নাইকা আর।”
~ “সকালে যে পুটি মাছ মাইরা আনলাম। হেইডি ক?”
~ “মাছ ভাইজা রাখছিলাম। তোর মামা সব খাইয়া হালাইছে। এহন মরিচ দিয়াই খা মা।”

মায়া আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ দুইটা ভেজে রাখা শুকনো মরিচ ভাতের সাথে ডলে খেতে লাগলো। এটা আজ নতুন না। প্রায় সময়েই এভাবে শুকনা মরিচ পান্তা ভাতে মিশিয়ে খেতে হয় ওকে। বাবা মারা যাবার পর ধানের ক্ষেত থাকার বদৌলতে ভাতের অভাব না হলেও তরকারি, মাস~ মাংস, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অভাব লেগেই আছে।

ভোরে উঠেই মাছ ধরার ছিপ নিয়ে দৌড়ায় খালে কিংবা নদীতে। দুইচার টা মাছ যদি পায় তবে সেইটাই ওদের সারাদিনের আমিষের চাহিদা পূরন করে। মায়ার মা রেহেনা বেগম বাড়ির সামনেই সবজি গাছ লাগায়। সেখান থেকে সবজির চাহিদা পূরন করে। ২~ ৪ টা মুরগি পালে। গরু, ছাগল সব ছিল একসময়। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সেসব বিক্রি করতে করতে আজ আর নেই কিছুই।

খাওয়া শেষ করে মায়া বাইরে আসতেই ওর মা ডাকলো,
~ “অই মায়া?”
~ “কও”
~ “পরীক্ষা কি আরো আছে?”

~ “না…আর নাই।”
~ “বীনা খবর পাঠাইছে অগো বাইত্তে যাওয়ার নিগা। যাবি আইজকা?”
~ “আমি একা আর যাইতে পারুম না মা। আমার ভাল্লাগে না। তুমি গেলে যামু।”

~ “আমি কাম থুইয়া কেমনে যামু? ছেড়ি ডা অসুখ আলা গেন্দা পোলা নিয়া কাম করবার পারে না। হাশুরী, জামাইয়ে একশ একটা কথা হুনায়। যা মা। পোলাডারে কোলে কাহে নিয়া থাকলে মাইয়াডা কাম করা পারবো।”
~ “বিবেকের অসুখ? কি অইছে ওর?”
~ “জ্ব্র, ঠান্ডা, আমাশা…হারাদিনই নাহি কান্দে খালি।”

মায়ার মনটা খারাপ হয়ে গেলো বিবেকের জন্য। কিন্তু তারপরই বীনার শ্বাশুড়ির ব্যবহার মনে পরতেই বলল,
~ “হোউক অসুখ…তাগো বাইত্তে কি আর কেউ নাই? আমারই ক্যান যাওয়া লাগব পোলা রাখার লিগা? ঢং”
মায়া বিরক্ত হয়ে বাহির বাড়িতে চলে গেলো।

আজ পরীক্ষা শেষ। কোথায় একটু খেলাধুলা করবে বলে ভেবেছে। এখন শুনাচ্ছে বোনের বাড়ি যাওয়া লাগবে। বোনের বাড়িতে গেলেই বোনের শ্বাশুড়ি তার দিকে কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভালো করে কথা বলে না। একবার তো মেঝেতে হঠাৎ করে পানি পরে যাওয়ার অপরাধে গায়ে হাতও তুলেছিল বীনার শ্বাশুড়ি। বীনা প্রতিবাদের সুরে একটা কথাও বলতে পারে নি। বোনের কান্না দেখে শুধু নিঃশব্দে কান্না করেছিল।

পাশাপাশি বোনকেও বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল সেদিনই। আবারও সেই বাড়িতে যেতে হবে? উফফ….অসহ্য লাগছিল। আবার বোনের একমাত্র ছেলে বিবেকের অসুখের কথা মনে পড়তেই চোখ মুখে মেঘ নেমে এলো তার। বিবেকের মায়া ভরা মুখটা, আধো আধো কণ্ঠে কলিজা ডাকটা কানে ভাসতে লাগলো মায়ার। মায়া বিবেককে আদর করে কলিজা ডাকে বলে বিবেকও মায়াকে কলিজা ডাকে।

কলিজা তো ঠিকঠাক ভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। উচ্চারণ করে ‘কইজা’। কি যে মিষ্টি লাগে শুনতে…! গুলুমুলু গাল দুটো আচ্ছা করে টেনে দিতে ইচ্ছে করে। বিবেকের কথা মনে হতেই ওর মনটা বোনের বাড়ি যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠলো।
দৌড়ে আবার বাড়িতে এসে কোনোরকমে গোসল করেই কাঠের বাক্স থেকে নতুন গত ইদের জামাটা বের করল। মাথায় নারিকেল তেল লাগিয়ে সুন্দর করে চুল চিড়ুনী করল। ওদিকে রেহানা ঘর লেপার জন্য পিছন বাড়িতে কাদা মাটি তৈরি করতে ব্যস্ত। মায়া ঝটপট তৈরি হয়ে মায়ের কাছে এসে বলল,
~ “মা….২ টা ট্যাকা দেও।”

~ “হায় আল্লাহ…নতুন জামা ডা পরছস ক্যা? বীনা গো বাইত যাবি?”
~ “হ যামু। ট্যাকা দেও ছে তাড়াতাড়ি।”
~ “ট্যাহা পামু কনে? এমনেই যা মা।”

~ “দেও না মা। অইদিন না কত্তডি নারকেল বেচলা? অইখান থিকা দেও ২ টা ট্যাকা।”
~ “নারকল বেইচা যে কিস্তি দিলাম আর তোর মামার অষুধ কিনা আনলাম হেইডি কি ভুইলা গেছস? এত গাদি গাদি ট্যাকা পামু কনে? একটা বেইচা আরেকটা করন নাগে। আমার কি আর ট্যাকা টুকা অতো হাতে থাহে?”

মায়া আর কথা বাড়ালো না। সে নিজেও জানে মায়ের এত সামর্থ্য নেই তার সব আবদার পূরণ করার। ওর টুকটাক আবদার পূরণ করতেও মা বেশির ভাগ সময় ব্যর্থতা প্রকাশ করে। আর মায়ের এই ব্যর্থতার সময়গুলোতে সে বড্ড বেশি মিস করে তার বাবাকে।
আচ্ছা, বাবা যদি আজ থাকতো তাহলে বাবাও কি তার আবদার পূরনে ব্যর্থতা প্রকাশ করত? নিশ্চয়ই না…
মা তো ওকে বলেছে, বাবা নাকি ওকে ভীষণ ভালোবাসতো। চার বোনের মধ্যে মায়াকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো। ছোট্ট মায়ার মুখ যখন তার বাবা চাঁন~ মাহমুদ প্রথম দেখলো তখন সাথে সাথেই বলে উঠল,

~ “আমি আমার এই মাইয়ার নাম রাকলাম মায়াবতী। আমার এই মাইয়ার মুকখান মায়ায় ভরা। এই মায়া কাটানোর কুনো উপায়ই নাই। আমার ছুড মা।”
রেহানা মেয়েকে নিয়ে স্বামীর এমন আহ্লাদ দেখে বড্ড বিরক্ত হয়েছিলেন। তিন তিনটা মেয়ের পর একটা ছেলের আশা করেছিলেন এইবার। কিন্তু সেই আশারও গুড়ে বালি। এই মেয়ের নাম নাকি আবার মায়াবতী….! যত্তসব…!

মায়ার জন্মের পর রেহানা বেগম স্রেফ দায়িত্বের খাতিরে মায়াকে দেখাশোনা করত। সেখানে কোনো ভালোবাসা হয়তো ছিলই না। কেমন একটা দূর দূর ভাব ছিল। কিন্তু চাঁন মাহমুদের কলিজা ছিল যেন এই মায়াবতী। সবাই মায়াবতীকে সংক্ষেপ করে মায়া ডাকলেও ওর বাবা কখনো ওকে মায়া ডাকে নি। বাইরে থেকে এসেই উঠোনের মাথা থেকে ডাক পারা শুরু করতেন,
~ “মায়াবতী….? ওওওও মায়াবতী…? কই রে আমার মা?”

মায়াবতী তখনও যে খুব ছোট। সবে মাত্র বসা শিখেছে। উঠোনের পশ্চিম পাশের আম গাছটার ছায়ায় একটা মাদুরের উপর বসে সস্তা কিছু খেলনা নাড়াচাড়া করতে থাকতো। কখনো বা ময়লাযুক্ত খেলনা গুলো মুখে নিয়ে খেয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করতো। আর যখনই বাবার কণ্ঠ শুনতো অমনি আকুপাকু করে বাবাকে আশেপাশে খুঁজতো। বাবাকে দেখতে পাওয়া মাত্রই মুখে খুশির ঝিলিক নিয়ে হাত~ পা প্রচন্ড গতিতে নেড়ে বাবার কোলে উঠার ইচ্ছে প্রকাশ করত।

এখন আর সেসব ওর মনে নেই। অতো ছোট বেলার কথা কি আর মনে থাকে? বাবার কোনো সৃতিই আজ ওর মনে নেই। এমনকি বাবার চেহারা কেমন ছিল সেইটাও মনে করতে পারে না ও। এসব গল্প তো ও মায়ের কাছে শুনে। কেরোসিনের অভাবে যখন সন্ধ্যার দিকেই খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পরতে হয় তখন মা ওর মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বাবার গল্প শুনান। কখনো বা জ্যোৎস্না রাতে উঠোনের মাঝখানে ছেড়া মাদুর পেতে বসে মেয়ের সাথে স্বামীর গল্প করেন তিনি। কি যে ভালো লাগে এই মুহুর্ত টাতে মায়ার….! মা যখন গল্প করেন তখন বাবাকে ও চোখের সামনেই যেন দেখতে পায়।

ওর বাবা যখন মারা যায় তখন ও দুই বছরের বাচ্চা। দৌড়ে বাবার কোলে উঠতে পারতো তখন। আধো আধো কণ্ঠে মায়াবতী তার বাবাকে ‘বাব্বা’ বলে ডেকে আরো মায়া বাড়িয়ে দিতে পারতো। আর বাবাও তার মায়াবতী কন্যার মুখে একশ একটা চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিতো। বাপ~ বেটির আহ্লাদ দেখে যেমন জ্বলতো মা রেহানা বেগম তেমনই জ্বলতো বড় তিন বোন বীনা, রিনা, মিনা। চাঁন মাহমুদকে এলাকার সবাই চাঁন মিয়া বলে ডাকতো।

চাঁন মিয়া মারা যাবার সপ্তাহ খানেক আগে মায়াবতীর ভীষণ জ্বর হয়। জ্বরে গা পুড়ে যায় যায় এমন অবস্থা। সেই সাথে পাতলা পায়খানা। যন্ত্রণায় ছোট্ট মায়াবতী প্রচুর কান্নাকাটি করছিল। কান্নাকাটি করে বাড়ি মাথায় নিয়ে ফেলছিল। এত এত কান্নাকাটি সহ্য করতে না পেরে রেহানা মেয়ের গালে জোরেশোরে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল। চাঁন মিয়া তখন সবে মাত্রই ফসলের মাঠ থেকে কাজ সেরে এসে দুপুরের খাবার সামনে নিয়েছিলেন।

ছোট মেয়ের প্রতি স্ত্রীর এমন আচরণ দেখে সঙ্গে সঙ্গে সামনের খাবার সরিয়ে উঠে গিয়ে রেহানার কোল থেকে মায়াকে নিজের কোলে নিয়ে রেহানাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। রাগে কটমট করতে করতে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল ডাক্তারখানার উদ্দেশ্যে। মায়াবতী বাড়ির অন্যদের কাছে যতটা গুরুত্বহীন ছিল ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার বাবা চাঁন মিয়ার কাছে। এটা যেন বাড়ির অন্যসবাই বুঝেও বুঝতো না, দেখেও দেখত না।

সেই রাতে চাঁন মিয়া ঘুমন্ত মায়াবতীকে স্ত্রী আর উনার মাঝখানে রেখে শুয়েছিলেন। হারিকেন নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে স্ত্রীর বাহুর উপর আলতো করে হাত রেখে বলেন,
~ “একটা কতা কই বীনার মাও?”

~ “….নিশ্চুপ…..”
~ “আমি জানি আইজকা তুমার লগে অমন করার লিগা রাগাইয়া আছো আমার উপর। তয় কি করমু কও? আমার মায়াবতীর উপর কুনো অন্যায় আমার সইহ্য অয় না। তুমি কেমনে পারলা আমার এই অসুখ গেন্দা(বাচ্চা) মায়াবতীর শইলে হাত তুলবার?”
~ “….নিশ্চুপ…..”
~ “কি? কতা কইবা না? এম্নে চুপ কইরা থাকলে বাল্লাগে?”
~ “কি কমু? হুনতাছি তো। কইতে থাহো তুমি।”

~ “হুনো তাইলে কই….তুমরা যেরহম করো আমার মাইয়াডার লগে….! আমি মইরা গেলে মনে অয় ফালাইয়াই দিবা। ন্যা?”
~ “আজাইরা আ~ কতা, কু~ কতা না কইলে কি তুমার বাল্লাগে না?”

~ “হায়াত মউতের কতা তো কউন যায় না। একটা কতা কই হুনো….আমি কুনোদিন না থাকলে আমার এই ছুড মাইয়াডারে তুমরা হেলায় রাইখো না। আমি যেমনে কইরা ওরে বালোবাসি অমনে কইরাই বালোবাসবা, যত্নাত্তি করবা। এইডা কিন্তু আমার কইলজা বুচ্ছ? ওর লগে যহন তুমরা খারাপ আচরণ কর তহন আমার কইলজায় গিয়া অইগুলা তীর হইয়া বিন্দে। আমার মায়াবতী ডা যে আমার কাছে কি হেইডা তুমরা বুজবা না। ওরে কুনোদিন অযত্ন কইরো না।

~ “তুমি এমনে কইরা কইয়ো না গো। কান্দন আহে আমার। গুমাইয়া পরো।”
~ “গুম আইতাছে না। দেহো বীনার মাও…আমার মায়াবতী হুবুহু আমার চেহারা পাইছে। এইডা কি খেয়াল করছ? আমার অন্য মাইয়ারা একটাও আমার চেহারা পায় নাই। তারা খালি আমার এই কালা শইলের রঙ~ ডাই পাইছে। আর চেহারা পাইছে তুমার। আর মায়াবতী চেহারা পাইছে আমার আর শইলের রঙ পাইছে তুমার। তুমিই কও, ওর মুকের মিহি চাইলে মায়া ধরে না মনে? কও?”

রেহানা বেগম চুপ মেরে আছেন। স্বামীর কথাগুলোর মর্ম বুঝার চেষ্টা করছেন। তিনি আগেই খেয়াল করেছেন যে মায়া ওর বাবার চেহারা পেয়েছে। আর গায়ের রঙ তার নিজের মত পেয়েছে। অন্য তিন মেয়ের চেয়ে মায়া আলাদা এইটাও লক্ষ্য করেছেন তিনি। তবুও সহ্য হয় না এই মেয়েকে। এই মেয়ের দিকে তাকালেই ছেলের অভাবের কথা ভালো করে মনে হয় তার। আর সাথে সাথেই অসহ্য লাগতে শুরু করে মায়াকে। চাঁন মিয়া রেহানাকে চুপ থাকতে দেখে আবার বলেন,
~ “আমি জানি তুমার পোলার অভাব। একটা পুলা চাই তুমার।

তা সময় কি গেছে গা পুলা অউনের? আল্লাহয় দিলে অইবই একদিন। এই মেয়ার বেলায় পুলা চাইছিলা আল্লাহর কাছে। পাও নাই। তাই এত ক্ষোভ তুমার এই মাইয়ার উপর। তয় একটা সত্য কতা জানো কি? আমার মনডায় কয়….এই মাইয়া পুলাগো থাইকা কুনো অংশেই কম অইবো না। আল্লায় বাচাইয়া রাকলে ইন~ শা~ আল্লাহ আমি এই মাইয়ারে লেহাপড়া করামু। যতদুর করান যায় করামু। রক্ত বেইচা অইলেও করামু। গায়ের একখান মেয়াই অইবো আমার মায়াবতী। দেইখো তুমি।”


পর্ব ২

তার ঠিক সাত দিনের মাথায় টাংগাইল সদর থেকে টাংগাইল~ ময়মনসিংহ রোড ধরে বাড়ি আসার পথে রোড এক্সিডেন্টে মারা যান চাঁন~ মাহমুদ। টাংগাইল সদরে সে এসেছিল তার এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওনা টাকা ফেরত নিতে। টাকা নিয়ে ফেরার পথেই দুর্ঘটনা টা ঘটে। আর সাথে সাথেই মারা যান তিনি। তিনি মারা যাওয়ার ঠিক ২ সপ্তাহ পরে রেহানা বেগম বুঝতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা।

যথাসময়ে তিনি একটা পুত্রসন্তান প্রসবও করেন। জন্মের ঠিক ৬ দিনের মাথায় সেই পুত্রসন্তান আবার আল্লাহর কাছে চলেও যায়। একের পর এক আঘাত তিনি যেন সহ্য করে উঠতে পারছিলেন না। অসময়ে স্বামীকে হারিয়ে যেমন আর্থিক সংকটে পরেছিলেন। তেমনই অন্যান্য সমস্যাও চারিদিকে উঁকি দিচ্ছিল। স্বামী যখন মারা যায় তখন বড় মেয়ে বীনার বয়স সাত বছর মাত্র। বাকি ৩ মেয়ের বয়স যথাক্রমে ৫, ৪, ২। চার চারটা বাচ্চাকে নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা এই সহ্য বিধবা মহিলা কি রেখে কি করবেন সেটা যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

তার মধ্যে আবার এত আকাঙ্ক্ষার পুত্র সন্তান পাওয়ার পরে৷ তাকে আবার হারিয়ে ফেলার কষ্ট যেন জাহান্নামের আজাবের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না তার কাছে। পুত্র মারা যাওয়ায় প্রায় ২দিন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন তিনি। তাকে স্বান্তনা দেয়ার ভাষাও যেন ছিল না কারো।
রেহানার বিয়ে হয়েছিল তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে। চাঁন মাহমুদ আর রেহানা চাচাতো ভাই বোন ছিল। সেই হিসেবে রেহানার বাবার বাড়ি আর স্বামীর বাড়ি একই বাড়ি ছিল। স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র আধ~ পাগল ছোট ভাই রঞ্জুকে সাথে নিয়ে কোনোরকম সংসার সামলাচ্ছিল।

প্রায় আড়াই মাইল পথ হেটে সন্ধ্যার দিকে বীনাদের বাড়ি এসে পৌঁছায় মায়া। বাড়ির উঠোনে পা দেয়া মাত্রই বিবেকের গলা ফাটানো চিৎকার শুনতে পায় সে। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় নিয়ে ফেলছে বিবেক। আর বীনা বার বার ওর কান্না থামানোর জন্য এইটা সেইটা বলেই যাচ্ছে। এদিকে মায়া যে এসেছে সেইটা বীনা খেয়ালই করে নি। মায়া দুই~ তিন বার ‘বড় আফা’ বলে ডাক দিল বীনাকে। কিন্তু কান্নার আওয়াজের ভীড়ে বীনা সেই ডাক শুনতেই পেলো না। মায়া কাছে গিয়ে বীনার কাধে হাত রাখলো। বীনা পেছন ফিরে ওকে দেখতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল,
~ “আরে মায়া…! আইছস তুই?”

~ “হ আইলাম….মা কইলো বিবেকের অসুখ।”
~ “হ দেহোস না কেমনে কান্দে হারাদিন…! আমি সামলাবার পারি না। আর আছে একটা লাট~ সাহেবের বেডি। হারাডা দিন পাড়ায় পাড়ায় টইটই কইরা ঘুইরা বেড়ায়। না ধরে একটা সংসারের কাম, আর না ধরে আমার পুলাডারে। খালি থাইকা থাইকা কামের বুল ধরা হারে। এইডা এমনে করলা ক্যা, অইডা অমনে করলা ক্যা? মেজাজ ডা গরম কইরা হালায়।”
~ “হইছে বড় আফা…এহন বাবুরে হাত করাও। আমি হাত মুক দুইয়া আহি। পাও ডা বিষ অইয়া গেছে হাটতে হাটতে।”
~ “আহারে…আইচ্ছা যা যা।”

মায়া ওর কাপড়ের থলে টা ঘরের ভেতর রেখে বাড়ির পাশেই যে পুকুরঘাট সেদিকে গেলো। এতক্ষণে অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে। হাঁস~ মুরগি গুলো খাবার খেয়ে তাদের আস্তানায় আশ্রয় নিয়ে নিয়েছে। গরু, ছাগল গুলো জোরে জোরে ডেকে যাচ্ছে। তারা হয়তো বলতে চাচ্ছে, “আমাদের ঘরে ঢুকাচ্ছ না কেন? আর কতক্ষন বাইরে বেধে রাখবে?” কিন্তু তাদের ঘরে ঢুকানোর মানুষটাই যেন এই বাড়িতে নেই এখন।

১০~ ১২ টা পায়রা উড়তে উড়তে ওদের ওদের ছোট্ট ঘরটায় গিয়ে ঢুকলো। সংসারী পুরুষগুলো সারাদিন ফসলের মাঠে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ির দিকে ফিরছে। সেইসব মানুষগুলোর ভীড়ে বীনার স্বামী মানিককেও দেখা গেলো। তবে সে সারাদিন ফসলের মাঠে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া সংসারী মানুষগুলোর একজন না। সে এসেছে বউয়ের কাছ থেকে জুয়া’র টাকা নিতে। সন্ধ্যার পর বাজারের বড় বটগাছের নিচে যে চা~ স্টল টা আছে তার পাশের খোলা জায়গাটায় জুয়ার আড্ডা বসে। গত কয়েকদিন যাবত জুয়ায় হেরে যাচ্ছে মানিক। হারতে হারতে হাতের টাকাগুলোও শেষ হয়ে গেছে।

আসরের পরও জুয়া খেলতে বসেছিল। সেখানেও ৫ টাকা মাইর গেছে। এখন পকেটে আর একটা টাকাও নাই। মায়ার মত সেও বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দেখে বিবেক কান্না করছে আর বীনা কান্না থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। সে গিয়ে পাশের কুয়া থেকে পানি উঠাতে উঠাতে বীনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ “অই বিবেকেও মাও…২০ টা ট্যাহা দে ছে।”

বীনা মানিকের কথা যেন শুনতে পায় নি এমন ভান করে আগের মতই ছেলের কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। বার বার বুকের দুধ খাওয়াতে চাচ্ছে। কিন্তু বুকের দুখ মুখেই নিচ্ছে না বিবেক। হাত, পা, শরীর মোচড়া মুচড়ি করে কান্না করছে। বীনাকে পাত্তা দিতে না দেখে কুয়া থেকে উঠানো পানি দিয়ে পা ধুতে ধুতে মানিক বলল,
~ “কিরে….কতা কই কানে যায় না?”
~ “ও ও ও…বাজান আমার…. কান্দে না কান্দে না। এট্টু দুধ মুখে নেও বাজান।”
~ “অই ছেড়ি…বাজান বাজান বাদ দে। তোরে আমি কি কই?”

এমনিতেই ছেলের কান্নাকাটির অত্যাচারে অতিষ্ঠ বীনা। তারমধ্যে স্বামীর অনর্থক কথাবার্তা। সব মিলিয়ে যেন ওর ধৈর্যের সীমা অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পালা। বিরক্ত স্বরে বলল,
~ “এই ভর~ সন্দা বেলায় আইয়া আজাইরা প্যানপ্যানাইয়ো না ছে। দেহো না কান্তাছে?”
~ “কান্দা তো ওর স্বভাব। কোলে নিয়া রইছস ক্যা? আছাড় মাইরা ফালাইয়া দে।”
মানিকের কথা শুনে বীনার মুখে খুব কঠিন একটা কথা চলে এসেছিল। কিন্তু সে সেইটা প্রকাশ করল না। এই মুহুর্তে তার তর্ক কিংবা ঝগড়া কোনোটাই করতে ইচ্ছে করছে না। সে চুপচাপ আবার বাচ্চা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওদিকে মায়াও পুকুর থেকে হাতমুখ ধুয়ে চলে আসছে। মায়াকে দেখে মানিক বলল,
~ “আরে শালী যে…! কহন আইছ?”

~ “এট্ট আগেই আইলাম দুলাবাই। কেমুন আছুইন?”
~ “আছি বালাই। আইছ বালাই অইছে। থাইকা যাও কয়দিন।”
~ “হ দুলাবাই। থাকুম।”
মানিক এইবার বীনা উদ্দেশ্য করে বলল,
~ “বাবুরে মায়ার কুলে দিয়া ট্যাকা বাইর কর্ তাত্তারি। আমি এহনই যামু গা আবার।”
~ “দেখ ছে….আমি ট্যাহা পামু কনে? আমি কি কামাই করি?”

~ “মাইনষের খেতা (কাথা) শিলাইয়া যে ট্যাহা পাস অইহান থিকা ২০ টা ট্যাহা দে।”
~ “মাইনষের ট্যাহা শিলাইলে কি তারা হাত ভইরা ট্যাহা দেয়? দেয়’ই ২~ ৪ ট্যাহা। সংসারে নাগে না হেইগুলা? তুমি কি সংসারের নিগা ২~ ৪ ট্যাহা কামাই করছ কুনোদিন? কামাই তো করই না;আমি যাও ২~ ৪ ট্যাহা কামাই করি তাও নিয়া জুয়া খেলো।”
~ “এত কতা কিন্তু বাল্লাগতাছে না বাবুর মাও। ট্যাহা বাইর কর্ তাত্তারি।”
~ “হুরু…ট্যাহা নাই। যা আছিল বাবুর অষুধ আনছি।”

মানিকের যেন এবার মেজাজ চড়া হয়ে গেলো। সে হিংস্র জানোয়ারের মত বীনার কোল থেকে কিছু বুঝে উঠার আগে অসুস্থ বিবেককে টেনে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো মাটিতে। বিবেক জোরে একবার চিৎকার দিয়ে উঠে হুট করেই একদম শান্ত হয়ে গেলো। সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো বীনা এবং মায়া দুজনেই। মায়া চিৎকার দিয়ে উঠে বিবেকের কাছে গেলো। বীনা চেষ্টা করেও বিবেকের কাছে যেতে পারল না। তার চুলের গোছা টা মানিকের হাতে আটকা পরে গেছে। চুলে ভীষণ টান লাগছে। মুহুর্তেই চুলে আরো জোরে হেচকা টান অনুভব করল বীনা। চুলের মুঠো ধরে টানতে টানতে ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মানিক বীনাকে। বীনা চিৎকার করতে করতে বার বার বিবেকের কাছে যাওয়ার আকুতি মিনতি করছে।

~ “আমার বাপ টা মইরা গেলো। দেহো ও কান্তাছে না। চুপ মাইরা গেছে। ছাড়ো আমারে। আমার বাজানের কি অইলো? ও বাজান….আল্লাহ….আল্লাহ গোউউউউউ…!”
নাহ…! এত আকুতি মিনতি মানিকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ওদিকে মায়া অসহায়ের মত বিবেককে কোলে নিয়ে কান্না করেই যাচ্ছে। কি করা উচিত সেইটা মায়া বুঝে উঠতে পারছে না। ইতোমধ্যে বীনার শ্বাশুড়িও ছুটে এসেছে কোথ~ থেকে যেন। এই বাড়িটার আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই। একা এক জায়গায় একটা বাড়ি। অন্যান্য বাড়িগুলো বেশ দূরে দূরে। যার ফলে এতসব চিৎকার চেচামেচি এত সহজেই সবার কানে পৌঁছাবার নয়। মানিক বীনাকে টানতে টানতে ট্রাংকের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল,
~ “ট্রাংকের চাবি খুল।”

বীনা কান্না করতে করতে বলল,
~ “দেহো….১০ টা ট্যাহাই আছে। বাবুরে ডাক্তার দেহানোর নিগা রাইখা দিছি। অইডি ছাড়া আর এক পয়শাও নাই কা।”
~ “অইডিই দিবি তুই আমারে। তালা খুল।”
~ “না…অইডি দিয়া পারুম না।”

আচমকা জোরে একটা চড় বসালো বীনার গালে। তাল সামলাতে না পেরে চৌকির পায়ার কাছে গিয়ে পরলো বীনা। তারপর মুহুর্তেই ওর চোখ~ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। চোখের পানি মুছে ব্লাউজের ভেতরে রাখা চাবিটা বের করে মানিকের হাতে দিলো। ওদিকে ছোট মায়া ভয়ে জোরে জোরে কান্না করছে। বীনার শ্বাশুড়ি বিবেকের হাত পা সরিষার তেল দিয়ে মালিশ করছে, চোখে~ মুখে পানি ছিটাচ্ছে। কিন্তু নাহ….বিবেকের কোনো সাড়াশব্দ নেই। বীনা চাবিটা দিয়েই দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে বিবেকের কাছে এসে প্রথমে ওর নাকের কাছে হাত দিলো। নিশ্বাস চলছে। তার মানে বেচে আছে। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো বীনা। পরক্ষণেই ব্যস্ত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। বিবেক সাড়াশব্দ করছে না কেন?

বীনা বিবেকের বুকে তেল দিয়ে জোরে জোরে মালিশ করতে লাগলো। কুয়া থেকে বালতি ভরে পানি উঠিয়ে মাথায় পানি ঢালতে লাগলো। অতো উপর থেকে পরে মাথা ফুলে গেছে একদম। কিন্তু ফেটে যায় নি, রক্তও বের হয় নি। এমনিতেই অসুস্থ। তার মধ্যে এত বড় আঘাত সহ্য করতে পারে নি অই একটুখানি পিচ্চি শরীর। সেজন্যই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
হঠাৎ বীনা কি হল কে জানে? সে কান্না থামিয়ে, চোখ~ মুখের দৃষ্টি শক্ত করে বাচ্চা কোলে নিয়ে উঠে দাড়ালো। মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ “তোর কাপড়ের টুবলা ঘর থিকা নিয়া আয়।”

~ “ক্যা বড় আফা?”
~ “এত জ্যারা পারিস না। আনবার কইছি আন।”
মায়া ওর কাপড়ের থলে টা নিয়ে আসতেই বীনা মায়ার হাতটা ধরে সেই ভরা সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি থেকে বের হতে লাগলো। শ্বাশুড়ি দৌড়ে এসে বীনা হাত ধরে বলল,
~ “তুমার আবার কি অইলো? এহন কনে যাও আবার? পাগলামি কর ক্যা? বাবুরে দেও দেহি আমার কুলে।”

বীনা শক্ত গলায় বলল,
~ “ছাড়ুইন আমার হাত। খাইলাম না আফনের পুলার ভাত।”
~ “বেক্কেই এমুন পাগলামি করলে চলব? পোলাডা তো মইরা যাব। দেহি দেও ওরে।”
~ “পুলা মরলে আমার পুলা মরব। আফনেগো এইহানে কতা কউন লাগব না। দেহি ছাড়ুইন হাত।”

এটা বলেই বীনা হেচকা টান দিয়ে নিজের হাত ছাড়ালো। তারপর হনহন করে অর্ধমৃত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে, মায়ার এক হাত টানতে টানতে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। শ্বাশুড়ি পেছন পেছন কিছুদূর এসে এমন পাগলামি না করার জন্য আকুতি মিনতি করতে লাগলো। কিন্তু বীনা কোনো কথাই কানে নিলো না। সে তার মত চলতে লাগলো। শ্বাশুড়ি আর তাকে আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা না করে অসহায় দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো। ভেতরে প্রচন্ড অপরাধবোধ।
ওদিকে মানিক অনেক আগেই ট্রাংক থেকে টাকা বের করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে। তাই সে জানলোও না যে বীনা বাড়ি থেকে অইভাবে চলে গেছে।


পর্ব ৩

অই অন্ধকার রাতের বেলায় দুইটা বাচ্চাকে সাথে নিয়ে বীনা সাহস পেলো না একা একা প্রায় আড়াই মাইল পথ হেটে বাবার বাড়ি যাওয়ার। শ্বশুর বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই ছিল তার উকিল বাবার বাড়ি। সে সেখানেই গিয়ে উঠলো। বীনার উকিল বাবা বীনার দুঃসম্পর্কের চাচাশ্বশুরও লাগে। তার উকিল মা তো এই অসময়ে এমন অবস্থায় তাকে দেখে চমকে উঠলেন। বীনা সংক্ষেপে কাহিনি খুলে বললে ওর উকিল মা বাচ্চাটাকে তড়িঘড়ি করে কোলে নেন। কি রেখে কি করবেন তিনি যেন দিশা পাচ্ছেন না। বিবেকের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে একদম।

এখন ওর নিশ্বাসের সাথে গড়গড় করে শব্দও হচ্ছে। সারাশরীরে তেল মালিশ করলো, মাথায় পানি ঢাললো। জলপট্টি দিয়ে রাখলো কপালে। সারারাত বীনা আর বীনার উকিল মা বিবেকের জন্য না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলো। সকাল বেলা বিবেকের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হলেও খুব ভালো বলা চলে না। সকালের খাবার খেয়েই বীনা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হল বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

~ “যত যাই হউক….তুই এমনে কইরা আইতে পারোস না।”
রেহানা কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা অসন্তোষ নিয়ে ব্যথিত গলায় কথাটা বীনার উদ্দেশ্যে বললেন। মেয়েকে এভাবে চলে আসাকে তিনি এত সহজে হজম করতে পারছেন না। মেয়েদের জীবনে এরকম দুঃসময় আসবেই;তাই বলে স্বামীর ঘর ছেড়ে ওভাবে রাত~ বিরেতে বেড়িয়ে আসতে হবে? স্বামী যদি এর চেয়েও খারাপ হয় তবুও মেয়েদের মানিয়ে নিতে হবে, সহ্য করতে হবে। সংসার জীবনে মেয়েদের দেখেও না দেখার, বুঝেও না বুঝাও, শুনেও না শুনার ভান করা শিখতে হয়।

মেয়েদের এত কম সহ্যশক্তি থাকলে চলে নাহ। মেয়ের জামাইর ব্যবহারে অসন্তোষ হলেও তিনি মেয়ের এরকম কর্মকাণ্ড কিছুতেই মানতে পারছেন না। তিনি বার কয়েক চেষ্টা করলেন মেয়েকে বুঝিয়ে স্বামীর ঘরে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু মেয়ে তো সেইটা শুনলই না। উল্টো বলল যে,
~ “খালি আইজ না মা…আমি আর জীবনেও অই জানুয়ারের সংসারে যামু না। মইরা গেলেও না। তালাক আনমু ওর কাছ থিকা।”

রেহারা এইবার মেয়ের কথা শুনে বিগড়ে গেলেন। এতক্ষণ মেয়েকে তোতা পাখির মত বুঝানোর পর এমন কিছু মেয়ের কাছ থেকে শুনবেন আশা করেন নি। নিজেকে যেন আর কন্ট্রোল করতে পারলেন না তিনি। রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,
~ “এই বাইত্তে তোরে আর তোর পুলারে পালবো ক্যারা? আমার এই চাইরজনের পেট চালাইতেই নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তোগো কি খাইবার দিমু? পারুম না তোগো জায়গা দিবার। কষ্ট হইলেও জামাইর সংসারেই থাকা লাগব তোর।”

~ “দেহো মা…অইহানেও তুমার জামাই দুইডা পয়সা কামাই করে না। অই বাইত্তেও কারো কামাই খাই না আমি। এই বাইত্তেও কারো কামাই খাইবার নিগা থাকুম না। নিজে কামাই কইরা নিজেই খামু। আমি ঢাকা যামু গা। গার্মেন্সে চাকরী করুম। মাসে মাসে টাকা পাঠামু তুমাগো। তারপর খালি আমার পুলাডারে কষ্ট কইরা তুমরা দেইখো। আর কিছুই চাই না তুমাগো কাছে।”

রেহানা এবার টিটকারি দিয়ে বললেন,
~ “এহহ….আইছে আমার চাকরি আলা। তোগো চাকরি দিবার নিগা মাইনষে বইয়্যা রইছে। তাই ন্যা?”
~ “এত কতা কইয়ো না ছে মা। আলম ভাইয়ের লগে আমি কতা কমু নি। আলম ভাই’ই আমারে চাকরী জুগাড় কইরা দিব। তুমার এত চিন্তা করন লাগব না।”
~ “হুন বীনা হুন….আবেগ আর পাগলামি দিয়া জীবন চলে না। সোয়ামী হাজার ভাউতা, বদ হইলেও হে তোর সোয়ামী। তোর মাথার উপুর একটা বটগাছ। তোর বাপ~ ভাই নাই। থাকার মধ্যে আছেই অই জামাই ডা। আর হাজার অইলেও তুই মাইয়া মানুষ। কিয়ের চাকরী করবার চাস তুই? আর তারপরে চাকরী করস আর যাই করস…জামাই বাড়ি যাইয়া কর গা। আমার বাইত্তে অইসব চলব না। তোর এমুন পাগলামির জন্য পুলাডা বাপ হারাইব।”

~ “একটা কতা সুজাসুজি তোমারে কইয়া দেই মা…আমি অই ব্যাটার বাড়ি আর যামু না। এহন তুমি যুদি তুমার বাড়ি আমারে জায়গা না দেও সরাসরি কইয়া দেও। আমার পুলারে নিয়া আমি যেহিনে মন চায় যামু গা। তাও অই বাইত্তে যামু না। আর তুমাগো বাইত্তেও আমু না।”
রেহানা এবার চুপ হয়ে গেলো। সে বুঝলো হাজার বলেও লাভ নেই। আর মানিক যা করতেছে সেইটাও এক প্রকার বাড়াবাড়ি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় বীনার। বিয়ের আগে শুনেছিল মানিক মেট্রিক পাশ। প্রাইমারি স্কুলে নাকি সরকারি চাকরী হয়ে যাবে খুব তারাতারি। মানিকরা ৪ ভাই। চার ভাই’ই শিক্ষিত।

মেট্রিক পাশ দুইটা। একটা ইন্টার পাশ। আরেকটা বি.এ পাশ। এত ভালো ফ্যামিলি থেকে এই কালো মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসছে সেইটা যেন ভাবতেই পারছিলেন না রেহানা বেগম। এমন সোনার হরিণ কিছুতেই হাত ছাড়া করা যায় না। সবটা ভেবে খুব তারাতারিই বিয়ের কাজ সেরে ফেললেন তিনি। অভাবের সংসারে একটা সদস্য কমাতে পেরে তিনি যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছিলেন…! আল্লাহ আল্লাহ করে মেয়ে ৪ টার একটা ব্যবস্থা করে মরতে পারলেই হয়…!
বড় মেয়ের বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি কিছুদিন ভালোই চলছিল। আশায় ছিল জামাইয়ের সরকারী চকরি হবে। মেট্রিক পাশ করা ছেলে মানেই তো সোনার হরিণ।

কিন্তু সেই সোনার হরিণ এর আসল রূপ বেশিদিন মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে নি। আস্তে আস্তে তার আসল রূপ বের হল। সোনার হরিণ, সোনার সংসার টা দিন দিন বীনার কাছে নরক বলে মনে হতে লাগলো। এর মধ্যে বিবেক পেটে আসলো। দিনের পর দিন মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে বীনা। দেখেও না দেখার ভান করে থেকেছে, শুনেও না শুনার ভান করে থেকেছে। কি না করেছে অই সংসারে টিকে থাকার জন্য? দিনের পর দিন মেট্রিক পাশ করা অই শিক্ষিত ছেলের জুয়ার টাকা, নেশার টাকা বীনাকেই জোগাড় করতে হয়েছে। কোথায় সেই সরকারি চাকরি? কোথায় কি? কিচ্ছু নেই….কিচ্ছু না।

এসব অশান্তির কথা বাবার বাড়ির কাউকে কখনো বলে নি। এমনকি মায়ের সাথেও এসব আলাপ করতো না কখনো। বলার মধ্যে মেজো বোন রিনার সাথে মাঝেমধ্যে টুকটাক আলাপ করতো। কিন্তু এখন বীনার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রচন্ড জেদি স্বভাবের এই মেয়েটা দিনের পর দিন যে এতকিছু সহ্য করে ছিল কিভাবে সেইটা ভেবে বীনা নিজেই অবাক হয় মাঝেমাঝে।

বিবেকের বয়স মাত্র ২ বছর। এখনো বুকের দুধ ছাড়ে নি পুরোপুরি। বীনা শুক্রবার সকালেই বিবেককে মা আর ছোট দুইবোন মিনা ও মায়ার কাছে রেখে ঢাকার পথে পাড়ি জমালো। উদ্দেশ্য একটা চাকরী।
বীনা সরাসরি ওর ফুপাতো ভাই আলমের বাসায় গিয়ে উঠলো। আলম ভাই আর তার বউ শাহিদা দুজনেই গার্মেন্টসে কাজ করে। তাদের মাধ্যমেই গার্মেন্টসে ঢুকতে চায় বীনা।

এদিকে মিনা নিজেদের বাড়িরে খুব কমই থাকে। মিনার ছোট ফুপুর বিয়ে হয়েছে বেশ বড়লোক বাড়িতে। মিনাকে ওর ছোট ফুপু উনার কাছে নিয়েই রেখেছেন। মিনা ক্লাস ফোরে উঠবে এইবার। সারাদিন ফুপুর সংসারের কাজকর্ম আর রাতের বেলা একটু বই নিয়ে বসে। লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো না। বিয়ের প্রস্তাব আসে অনেক মিনার জন্য। গায়ের রঙ কালো হলেও চেহারার গঠন বেশ ভালোই। মন মত পাত্র পেলেই বিয়ে দিয়ে দেবে ওকে।

সেই হিসেবে এখন বাড়িতে থাকেই শুধু ছোট্ট বিবেক, মায়া, মায়ার মা আর আধ~ পাগলা মামা। রেহানা বেগমের অই একটা ভাই ছাড়া আর কেউ নেই। রেহানার বাবা~ মা দুজনেই কলেরায় অনেক আগে মারা গেছেন। ভাইটার বিয়ের বয়সও হয়েছে। কিন্তু এই আধপাগল ভাইকে কে বিয়ে করবেন সেইটা ভেবেই কূল পান না তিনি।
বীনা ঢাকা চলে যাওয়ার পর বিবেককে সামলানো মোটেও সহজ ছিল না। দুধের বাচ্চা….প্রথম ৮~ ১০ দিন তো সারাদিনই তন্নতন্ন করে মাকে খুজতো আর কান্না করতো। মায়ের কথা মনে পড়লেই যে কান্না শুরু করতো…! সেটা না থামাতে পারতো রেহানা আর না পারত মায়া।

অসহ্য যন্ত্রণা করত বিবেক প্রথম কয়েকদিন। কিন্তু যখন দেখলো হাজার খুজেও মাকে পাওয়া যাচ্ছে না তখন অভিমান করে ছোট্ট বিবেক মাকে খোঁজা বাদ দিয়ে দিলো। ভক্ত হয়ে উঠলো মায়ার। বিবেককে খাওয়ানো, গোসল করানো, সারাদিন কোলে রাখা, ঘুম পাড়ানো সব দায়িত্ব আপনা~ আপনিই গিয়ে পড়লো ১২ বছরের ছোট্ট মায়ার উপরে। মায়াও যেন সেসব দায়িত্ব হাসিমুখে পালন করা শুরু করল। বাড়ির পাশের খাল, খালে যখন পানি থাকে না তখন বাড়ি থেকে প্রায় হাফ মাইল দূরের নদী থেকে বিবেকের মলমূত্রের ন্যাকড়াগুলো বালতি ভর্তি করে মাথায় নিয়ে গিয়ে ধুয়ে আনতো। বিবেকের জন্য মায়াই যথেষ্ট ছিল। বিবেকের ঝামেলা কখনো রেহানাকে তেমন পোহাতে হয় নি।

শুধু যে বিবেককে সামলানো মায়ার কাজ ছিল তা কিন্তু না। বিবেককে সামলাতে হত, স্কুলে যেতে হত, হাটে যেতে হত হাট করতে, এমনকি ফসলের মাঠেও যেতে হত।
সূদুর বিলের ধারে ছোট ছোট অনেকগুলো চাষযোগ্য জমি ছিল ওদের। সেখানে প্রতিবছরই ধান হয়। মায়া আর মায়ার মামা রঞ্জু প্রতিবছর সেই ধানের জমি তৈরি করা, ধান বুনা, বিলের পানি বিল থেকে কলসি দিয়ে তুলে এনে ধানের ক্ষেতে দেয়া, ধান কাটা, ধান বাড়িতে আনার কাজ করত।

টাকার অভাবে একটা মানুষ রেখে যে কাজ করাবে সেই উপায়ও ছিল না। মায়া আর রঞ্জু দুজনের উপরই চাপ পড়তো। রঞ্জু তো একটু পাগলা টাইপের ছিল। তাই মাঝে মাঝে সে পাগলামি করে কাজে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু মায়ার সেই সুযোগ ছিল না। ছোট্ট এই নাবালিকা মেয়েটি এই ১২ বছর বয়সে যে অমানুষিক পরিশ্রম করে মায়ের সংসার টাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তা বলাই বাহুল্য।

রেহানা হাঁস পালতো। সেই হাসের জন্য পাটের বস্তা ভরে শামুক কুড়িয়ে আনতো বিলের ধার থেকে। একবার শামুক কুড়িয়ে বস্তায় ভর্তে ভর্তে একবারে ভর্তি করে ফেলছিল মনের অজান্তেই। এত বড় শামুক ভর্তি বস্তা কিভাবে মাথায় নেবে সেইটা যেন মাথায়ই ছিল না ওর। যখন বস্তা ভর্তি হয়ে গেলো। তখন যেন ওর হুশ হল। এত বড় বস্তা ও মাথায় নিয়ে কিভাবে বাড়ি যাবে? আর মাথায় তুলবেই বা কিভাবে? কেউ মাথায় তুলে দিলেও হয়তো কষ্ট করে হলেও বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করতে পারত।

মায়া আশেপাশে তাকালো…কাছাকাছি কেউই নেই ওকে সাহায্য করার জন্য। এদিকে এত কষ্ট করে কুড়ানো শামুক গুলার ফেলে রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। উপায় না পেয়ে বিলের ধারে একটা জাগায় বসে কান্না করতে লাগলো মায়া। প্রায় আধাঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর একজন লোককে মাছ ধরার জাল নিয়ে বিলের দিকে আসতে দেখা গেলো। সেই লোকটি আসতেই মায়া তাকে অনুরোধ করল মাথায় বস্তাটি তুলে দেয়ার জন্য। লোকটি অবাক হয়ে বলল,
~ “হায় আল্লাহ….তুমি এত বড় বুজা মাতায় নিবা কেমনে?”

~ “অম্নেই নিমু কুইতা কুইতা। আফনে একটু তুইলা দেন খালি।”
~ “তুমার বাপের নাম কি?”
~ “চাঁন মিয়া আমার বাপের নাম। আমি ছুড থাকতেই মইরা গেছে।”
~ “ওওওওওও….চাঁন মিয়া ভাইর মেয়া তুমি? ছোড ডা? কি জানি নাম হুনছিলাম তুমার…! মায়াবিনী নাকি মায়াবতী…! মনেও পরতাছে না।”

~ “মায়াবতী। আব্বায় নাকি আমারে মায়াবতী কইতো। এহন কেউ মায়াবতী কয় না। মায়া কয় বেক্কেই।”
~ “ও আইচ্ছা….তুমার বাপের লগে আগে খাতির আছিল মেলা। কত্ত গেছি তুমাগো বাইত্তে…! তুমার বাপে মরার পর আর যাই টাই না। তুমার মা রে কইয়ো আমার কতা। আমার নাম জসীম। তুমার মা খুব বালা কইরাই চিনে আমারে।”

~ “আইচ্ছা কমু নি চাচা। বস্তা ডা মাথায় তুইলা দেন। মেলা দূর যান নাগবো।”
~ “তুমি এইডা নিয়াপ্ল যাইবার পারবা না। আর কতক্ষন বহো। আমি কয়ডা মাছ ধইরা নেই। তারপর তুমারে নিয়া তুমাগো বাইত্তে যামু নি। মেলা দিন ধইরাই তো যাই না। আইজ না অয় গেলাম।”
কথাটা মন্দ লাগলো না মায়ার। যে অপেক্ষা করলো মাছ ধরা শেষ হওয়া পর্যন্ত।

প্রতি সপ্তাহে দুইদিন হাট ছিল। সেই হাটগুলোও তাও ২ মাইল দুরবর্তী স্থানে বসতো। কখনো ক্ষেতের ধান, কখনো সরিষা, কখনো গাছের নারিকেল বা সুপারি মাথায় করে নিয়ে সেই হাটে যেতো। পাক্কা বিক্রেতাদের মত করে দরদাম কষে ন্যায্য মূল্যে জিনিস বিক্রি করতো। এসব সময় গুলোতে কখনো রঞ্জু ওর সাথে থেকেছে, কখনো থাকে নি।
এভাবে নিষ্ঠুর বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে অল্প বয়সেই পৃথিবীর অনেক কিছুই শিখতে হয়েছিল মায়াকে।


পর্ব ৪

পঞ্চম শ্রেনীর গন্ডি পেড়িয়ে মায়া এবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে। রেহানা মায়াকে নিয়ে গেছে বাড়ি থেকে আড়াই মাইল দূরত্বে অবস্থিত এক হাই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়ার জন্য। হালকা আকাশী রঙ এর একটা বাটিকের থ্রি পিস পরেছে। উড়না দিয়ে আপাদমস্তক খুব ভালো করে ঢেকে রেখেছে। মাথার ঘোমটা টা সামনে কিছুটা নেমে এসেছে। একপ্রকার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণায়।

ভর্তির সময় কেরানি নাম বৃত্তান্ত জানতে চাচ্ছিল মায়ার কাছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক পাশের টেবিলে বসে চা খাচ্ছিল। মায়া নিজের নাম বলল,
~ “মায়াবতী সুলতানা।”
কেরানি চশমার উপর দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
~ “কি নাম বললা তোমার?
~ “মায়াবতী…. মায়াবতী সুলতানা আমার নাম।”

~ “”তোমার নাম মায়াবতী?”আবারো জিজ্ঞেস করলো কেরানি। যেন নাম শুনে তার বিস্ময়ের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে!
পাশ থেকে প্রধান শিক্ষক বললেন,
~ “বাহ…খুব সুন্দর নাম। দেখতে যেমন মায়াবতী। নামটাও মায়াবতী। তা তোমার নাম কে রাখছে মা?”
~ “আমার আব্বা রাখছিল।”

~ “তোমার আব্বার নাম কি?”
পিতার নাম জিজ্ঞেস করা হলে পিতার নাম বলল ‘চাঁন মাহমুদ’। পিতার নাম শুনে পাশে বসা প্রধান উৎসুকভাবে মায়াকে আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
~ “তোমার বাবার নাম চাঁন মাহমুদ?”

মায়া বিনীত ভাবে বলল,
~ “জ্বি সার।”
~ “তুমি কি জানো আমার নাম কি?”

~ “জ্বি না সার।”
~ “আমার নামও চাঁন মাহমুদ।”
প্রধান শিক্ষক হাসতে হাসতে বললেন। মায়া সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত উজ্জ্বল শ্যামলা গাত্রবর্ণের অর্ধবয়স্ক দাড়িওয়ালা এই মানুষটার হাসিটা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। আচ্ছা, তার বাবার মুখেও তো দাড়ি ছিল। তার বাবার গায়ের রঙ~ ও নাকি এমনই ছিল। তার বাবা যখন হাসতো তখন তাকেও বুঝি এত্ত সুন্দর লাগতো?

হাসার সময় তার বাবাও বুঝি এভাবে শরীর কাপিয়ে হাসতো? উনি হাসার সময়ও কি ঠিক এরকমই শব্দই হত? আচ্ছা, বাবার কপালের কাছেও ঠিক অইরকম একটা কাটা দাগ ছিল না? হ্যা ছিল তো…মা তো একবার বলেছিল যে, একাত্তরের গন্ডগোলের সময় একবার কিসের এক মিছিলে গিয়েছিল যেন।

সেখানে পুলিশের লাঠির আঘাত উনার কপাল বরাবর লেগেছিল। কপাল ফেটে রক্ত বের হয়েছিল। তারপর সেই কাটা দাগ আর যায় নি। আচ্ছা, দুইটা মানুষের মধ্যে এত মিল কিভাবে হয়? সামনের বসা মানুষটাই কি তার বাবা? হঠাৎ মায়া যেন কেমন আবেগী হয়ে উঠলো। প্রধান শিক্ষক এবার হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
~ “তা তোমার বাবা কি করে গো মা?”

এই প্রশ্ন শোনার পর মায়া যেন নিজের আবেগ আর দমাতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের পা জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। ঘটনার এমন আকস্মিকতায় কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। প্রধান শিক্ষক এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি ধড়মড় করে বলে উঠলেন,
~ “আরে কি হইছে কি হইছে? এমন করতেছ কেন?”

রেহানা মায়ার কাছে গিয়ে ওকে উঠানোর জন্য ওর বাহু ধরে টানতে লাগলো আর বলল,
~ “আরে অই মায়া…কি অইলো তোর…দেহি উঠ উঠ..!”
মায়া রেহানার হাত সরিয়ে নিয়ে স্যারের পায়ে মুখ গুজেই কান্না করতে লাগলো। আশেপাশে অন্যান্য শিক্ষক, কর্মচারীরা পাশাপাশি কিছু ছাত্র~ ছাত্রীও এসে জড়ো হল। মায়া এবার কান্না নিয়ন্ত্রণে এনে স্যারের পায়ে মুখ গুজেই অস্পষ্ট ভাবে বলে উঠল,
~ “আপনেই আমার বাবা….আপনেই আমার বাবা।”

অস্পষ্ট ভাবে বললেও বাক্যটা বুঝতে সমস্যা হল না কারো। স্যার বললেন,
~ “আচ্ছা মা..আগে উঠো দেখি।”
মায়া উঠলো। স্যার মায়াকে পাশের একটা চেয়ার টান দিয়ে এনে বসালেন। তারপর বললেন,
~ “এখন চোখটা মুছো তো দেখি।”
মায়া চোখ মুছলো নিচের দিকে মাথা দিয়ে। স্যার এবার রেহানার দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ “ওর বাবা কি বেচে নেই?”

~ “না মাষ্টার সাব….ওরে দুই বছরের ডা থুইয়া মইরা গেছে।”
স্যার এবার মায়ার কাধে হাত রেখে বললেন,
~ “বিয়ে করার ১৫ বছর পর আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে ২ টা জমজ পুত্রের বাবা হইতে পারছি। ওরা সামনের বছর হাই স্কুলে উঠবে। আমার কোনো মেয়ে নাই। আজ থেকে মায়াই আমার মেয়ে। মায়া..? তুমি আমারে বাবা বলে ডাকবা।”
তারপর উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্যে বলল,

~ “এই যে…সবাই দেখে রাখো…এইটা আমার মেয়ে। মায়াবতী।”
মায়ার হতভম্বের মত বসে আছে। কি হচ্ছে কিছুই যেন বুঝতে পারছে না। অসহায় দৃষ্টিতে একবার মায়ের দিকে তাকালো, একবার স্যারের দিকে তাকালো, একবার অন্য সবার দিকে তাকালো। তারপর আবার নিচের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করল। গাল গড়িয়ে চোখের পানি পড়ল। নিচু স্বরে বলল,
~ “আসলে সার, মায়ের কাছে আব্বার যেইসব বর্ননা হুনছিলাম তার বেশির ভাগই মিলা গেছে। এই দেহেন, আপনের কপালে কাটা দাগ। এইরহম দাগ আব্বারও নাকি আছিল। তাই না গো আম্মা?”

মায়া জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পাশেই দাড়িয়ে থাকা মায়ের দিকে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার নিচের দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করল,
~ “আসলে সার, আমি যে এমুন করমু তা আমি নিজেও ভাবি নাই। আপনারে দেইখা আব্বার কথা মনে হইলো। আর নিজেরে সামলাইতে পারলাম না। তাই অমনে কইরা কাইন্দা দিছি। আমার এহন কেমন জানি লাগতাছে। সবাই চাইয়া রইছে আমার দিকে। শরম লাগতাছে।”

স্যার ব্যাপার টা বুঝতে পেরে সবাইকে যার যার কাজে চলে যাওয়ার কথা বললেন। মায়াকে তার পছন্দ হয়েছে। মায়ার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে চান। মায়ার ভর্তির কাজ শেষ করে মায়া আর মায়াকে নিয়ে তিনি নিজের কক্ষে গেলেন। মায়া আর রেহানাকে টেবিলের অপর পাশে রাখা দুটো চেয়ারে বসতে দিলেন। মায়া+মায়ার ফ্যামিলি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানলেন। সব জেনে বললেন,

~ “মায়াবতী….তুমি আমারে আজ থেকে বাবা বলেই ডাকবা। তুমিই আমার মেয়ে। তোমার লেখাপড়ার ব্যাপারে যতরকম সাহায্য সহযোগিতা লাগে সব আমি করব বুঝতে পারছ? একদম নিজেরে অসহায় ভাববা না। তোমার এই বাবা যতদিন আছে দুনিয়ায় তুমি অসহায় না।”
রেহানার চোখ দিয়ে খুশিতে পানি বের হয়ে গেলো। সে খুশিতে বলল,
~ “যা…মাষ্টার সাব রে সেলাম কর পাও ছুইয়া।”

মায়া চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে স্যারকে পা ছুয়ে সালাম করলো। স্যারও মাথায় হাত দিয়ে দুয়া করে দিলো। তারপর বলল,
~ “ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়মিত ক্লাস করবা। আর ক্লাসের বাইরে প্রতিদিন আমি যখন সবাইকে প্রাইভেট পড়াই তখন তুমিও আইসা বসবা সবার সাথে। বুঝতে পারছ?”
মায়া উপর নিচে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো যে সে বুঝতে পারছে। মায়ার জীবনে এই দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে সারাজীবন।

বিবেককে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যা হলেই মায়ার সাথে পড়তে বসে যায়। কিছুক্ষণ পড়ে, কিছুক্ষণ দুষ্টুমি করে তারপর ঘুমিয়ে পরে। বিবেক ঘুমানোর পড়ই মায়া ভালো করে একটু পড়তে পারে। বীনা চাকরীতে যাওয়ার পর অভাব একেবারে না ঘুচলেও কিছুটা ঘুচেছে। বেতন তো বেশি না। মাত্র ৪০০ টাকা। এই ৪০০ টাকা থেকে নিজের থাকা~ খাওয়া খরচ বাবদ প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে বাড়িতে মানি অর্ডার করে পাঠায়। সেই ১০০ টাকার প্রায় পুরোটাই দেখা যায় বিবেকের পেছনে লাগে। সংসারের কাজে খুব একটা লাগাতে পারে না সেই টাকা।

পাশের বাড়ির জায়েদা ভাবি সেলাই কাজ জানে। পাড়ার মহিলাদের সালোয়ার~ কামিজ, পেটিকোট~ ব্লাউজ সব জায়েদাই বানিয়ে দেয়। জায়েদা যখন সেলাই মেশিন নিয়ে বসে তখন প্রায়ই মায়া জায়েদার কাছে গিয়ে বসে থাকে। কাটাকাটির ব্যাপারে, সেলাইয়ের ব্যাপারে এইটা সেইটা জিজ্ঞেস করে জানার চেষ্টা করে। ঠিক এই সময়টাতে জায়েদা মায়ার উপর চরম বিরক্ত হয়। সেই বিরক্তি টা প্রকাশ করতে না চাওয়া স্বত্ত্বেও প্রকাশ হয়ে যায়। মায়া বুঝতে পারে যে জায়েদা ভাবি বিরক্ত হচ্ছে;তবুও সে বেহায়ার মত সেখানেই পরে থাকে। ওকে সেলাই কাজ শিখতে হবে।

এত বিরক্তি প্রকাশ করার পরও মায়াকে এমন বেহায়ার মত পরে থাকতে দেখে একদিন জায়েদা ভাবি মুখ ফুটে বলেই ফেললো,
~ “আমি কাম করার সুময় এত প্রশ্ন করিস না ছে মায়া। কামে ভুল অয়।”

মায়া কোনো কথা নাই। কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে সেদিন বাড়িতে ফিরে এসেছিল। এরপর থেকে জায়েদা ভাবি কাজ করার সময় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতো। কোনো প্রশ্ন করত না। জায়েদা কিভাবে কি করতো সব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে রাখতো।

তারপর বাড়িয়ে এসে ব্লেড দিয়ে পুরোনো উড়না কেটে কেটে এটা সেটা বানানোর চেষ্টা করতো। সেলাই মেশিন ছিল না;তাই হাতেই সেলাই করত। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় একটু একটু করে বেশ ভালোই আয়ত্তে করে ফেলে সেলাই কাজ। আর কিছু পারুক বা না পারুক;পেটিকোট আর সালোয়ার~ কামিজ খুব ভালো করেই বানানো শিখে গেছে। এর মধ্যে একদিন বীনাকে চিঠি লিখে জানালো যে, সে সেলাই কাজ মোটামুটি শিখে গেছে। যত তারাতাড়ি সম্ভব ওর জন্য একটা সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করে দিতে।

পর্ব ৫

~ “এইযে আপা….আপনার চিঠি আসছে।”
আলনায় কাপড় গুছিয়ে রাখছিল বীনা। জহিরের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে জহির দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে।
~ “আরে জহির তুই.? আয় ভিতরে আয়। বয় এইখানে।”
জহির ভিতরে এসে বসলো। চিঠি টা বীনা নিলো। জহির জিজ্ঞেস করলো,
~ “কার চিঠি আপা?”

~ “মায়া পাঠাইছে।”
~ “এইটা আপনার কয় নাম্বার বোন?”
~ “সবার ছুটো ডা।”
~ “ওরা কেউ আসে না ক্যান এইখানে? খালি মাঝেমধ্য দেখি খালাম্মা আসে বিবেকরে নিয়া। আপনার বোনরা তো কেউ আসে না।”
~ “আরে আইছিল আইছিল। মিনা আর মায়া আইছিল একবার। তুই তখন ছুটিতে দেশে গেছিলি। তোর বাপের অসুখ করছিল।”
~ “অহ আচ্ছা।”

বীনা জহিরের সামনেই চিঠি টা খুলে পড়লো। চিঠি পড়তে পড়তে একবার ওর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গেলো। আবার হঠাৎ~ ই সেই উজ্জ্বলতা কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেলো। জহির খুব ভালো করে খেয়াল করছিল এইসব। তো, চিঠি পড়া শেষ হলে জহির বলল,
~ “নিশ্চয়ই একটা খারাপ সংবাদ, আর একটা ভালো সংবাদ আসছে?”
~ “ঠিক খারাপ সংবাদ না। তয় চিন্তায় পইরা গেলাম।”
~ “কি হইছে আপা?”

~ “মায়া দর্জি কাজ নাকি শিখছে…!”
~ “বাহ…এইটা তো খুব ভালো।”
~ “ভালো তো…কিন্তু সেলাই মেশিন কিনা দিতে কয়। অইটার টাকা পামু কই এহন?”
~ “ক্যান…? জমানো টাকা কি একটাও নাই?”

~ “১২০০ এর মত আছে। পুরা চাকরী জীবনের জমা অইডি।”
~ “তাইলে তো হইলই আপা। অইখান থেকেই কিনা দেন একটা সেলাই মেশিন। ২~ ৪ টাকা যদি এইখান থেকে আয় করতে পারে তাইলে নিজেদেরই লাভ।”
বীনা একটু গম্ভীর হয়ে কিছু চিন্তা করলো। তারপর চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জহিরকে বলল,
~ “আচ্ছা বাদ দে। তুই হঠাৎ বাসায় আইলি যে…!”

~ “আপনার হাতের রান্না খাইতে মন চাইছে আপা। ভাবলাম, দুপুরের খাবার টা আপনার বাসায়ই খাই।”
~ “হাহাহা…ভালো করছস। বইসা থাক। আমি হাতের কাজ গুলা সাইরা রান্নার বন্দবস্ত করি।”

জহির বীনাদের অফিসের নতুন সুপার ভাইজার। ৩ মাস যাবত এই ফ্যাক্টরিতে জয়েন করেছে। বয়স ২২~ ২৩ হবে। লম্বায় মাঝারি সাইজের। গায়ের রঙ ফর্সা। গোলগাল মায়াবী মুখ। থুতনিতে একগোছা এক আংগুলের সমান লম্বা দাড়ি আছে। ধার্মিক টাইপের ছেলে। ৫ ওয়াক্ত নামাজ সময়মত আদায় করে। চেহারায় একটা নূরানী ভাব আছে। জহিরের দিকে এক নজর তাকালেই যেন হৃদয়টা জুড়িয়ে যায়।

জহিরের সাথে বীনার প্রথম আলাপ ওদের ফ্যাক্টরিতেই হয়। এক কথা, দুই কথায় ভালোই খাতির হয়ে যায়। বীনার নিজের কোনো ভাই নেই তাই জহিরকে ভাই বানায়। সেই থেকে বীনার বাসায় জহিরের অবাধ চলাফেরা। ফ্যাক্টরিতে প্রতিদিন তো দেখা হয়’ই;তারপরেও আজকের মত মাঝে মাঝেই শুক্রবারে জহির বীনার বাসায় এসে হাজির হয় এক একটা অজুহাতে।

মায়ার নামে চিঠি এসেছে ঢাকা থেকে। বীনা চিঠি পাঠিয়েছে। বীনা চিঠির মূলভাব এই যে,
“তুই মাকে আর বিবেককে নিয়ে ঢাকা আয়। অনেক দিন ধরে তোদের দেখি না। এসে দিন সাতেক থেকে যা। আর সেলাই মেশিনও নিয়ে যা। এখন আমি বাড়ি যেতে পারব না। ছুটি নাই।”

মায়া চিঠির খামটা খুলতেই এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় ওর দুচোখ জুড়িয়ে গেলো। কারো হাতের লিখা বুঝি এত্ত সুন্দর হয়? এটা তো বীনার হাতের লিখা না। বীনা পড়াশোনা খুব একটা না জানলেও চিঠি টা মোটামুটি লিখতে পারে। গোছানো হয় না সেই চিঠি। ভাঙা ভাঙা শব্দ আর বাক্যের সমন্বয়ে লিখা সেই চিঠির মাধ্যমে শুধুমাত্র চিঠির মূল ভাব বোঝাতে সক্ষম হয়। এটা তো বীনার হাতের লিখা না। তাহলে কে লিখে দিয়েছে এই চিঠি বীনাকে?

কি সুন্দর গোটানো গোটানো অক্ষরে কি অদ্ভুত মমতা দিয়ে লিখেছে চিঠিটা…! হাতের লেখা গুলোকে মনে হয় দামি মুক্তার গয়না পরানো হয়। মুক্তার মতই ঝকঝক করছে। ইশ….কে লিখেছে চিঠিটা? কার হাতের লিখা? কার? ?

মায়ার বিস্ময় যেন কাটছেই না। খুব জানতে ইচ্ছে করছে হাতের লিখাটা কার?
হঠাৎ বাইরে কারো ডাকাডাকির শব্দ শুনতে পেলো ও। ওর মাকে কেউ ডাকছে। ও দরজার বাইরে বেরিয়ে এলো। লোকটি এখনো ডেকে যাচ্ছে,
~ “ও বীনার মাও…? বীনার মাও…? ?
~ “আরে….জসীম চাচা…! আফনে…!”
~ “কিবা আছো মা?”

~ “আছি চাচা ভালোই। আপনে ভালো আছেন? চাচী কেমনে আছে?”
~ “বেক্কেই বালাই আছি আমরা।”
~ “মা তো ধান ভাংগাবার গেছে চাচা।”
~ “কহন গেছে?”

~ “মেলাক্ষন ধইরা গেছে। আইয়্যা পরব নি। টুল নিয়া আহি। আফনে বহেন।”
মায়া একটা কাঠের মোড়া এনে জসীমকে দিল বসার জন্য। মিনিট বিশেক পর রেহানা আসলো। সারাশরীর ভর্তি ধানের তুষ। একটা ঢাকি ভর্তি করে তুষ ওয়ালা চাল নিয়ে এসেছে। উঠান থেকেই বারান্দায় বসে থাকা জসীমকে দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
~ “আরে জসীম ভাই যে…! কহন আইলেন?”

~ “বেশিক্ষন অয় নাই। আফনে হাত~ মুক ধুইয়া আহেন ভাবি। কতা আছে।”
~ “আইচ্ছা আফনে বহেন। আর অই মায়া? কয়ডা চাইল ঝাইড়া ভাত বহাইয়া দে তাত্তারি।”
~ “আইচ্ছা মা।”

মায়া গেলো কুলা নিয়ে চাল ঝাড়তে আর রেহানা গেলো হাত~ মুখ ধুতে। দুপুর বেলা;এখন গোসল করে ফেলাই ভালো ছিল। কিন্তু একজনকে বসিয়ে রেখে গোসল করাটা ভালো মনে করলেন না তিনি। ঝটপট হাত~ মুখ ধুয়ে একটা পিড়ি নিয়ে এসে বসল জসীমের সামনে। হাতে একটা পানের বাটিও আছে। পান বানাতে বানাতে বললেন,
~ “তা কি জানি কইবেন…?”

~ “একটা ভালো পুলা পাইছি মায়ার মাও। চরে জমিজমা মেলা আছে। পুলায় বিদেশ থাকে। কয়রা গেরামের পোলা। নদী পার হইয়া ৫~ ৭ মিনিট হাটলেই বাড়ি ওগো। বাড়িঘর বালাই। পুলাও একের পুলা বুঝছেন ভাবি?”
~ “বুঝলাম।”

~ “হ…পুলায় বিদেশ থিকা আইবো মাস খানেক পর। ভাবতাছি মায়ারে দিয়া কইলে বালাই অইবো। তুমার মেয়া ডাও মাশাল্লা। দুইজনরে জব্বর মানাইবো।”
~ “ভাইজান, মাইয়া যহন অইছে বিয়া তো দেন লাগবই। তয়, এহন আমার মায়ার বিয়া নিয়া কিছু ভাবতাছি না। মাইয়ারে লেহাপড়া করানোর মেলা শখ আছিল ওর বাপের। হে মরার আগে আমারে কইয়া গেছিল মাইয়ারে লেহাপড়া করাইতে। আর মায়ার মাথাও আপনেগো দুয়ায় মাশাল্লা ভাইজান।”
~ “ভাবি…মাইয়ার বয়স কিন্তু কম হয় না। ১৫~ ১৬ হইয়া গেছে।”

~ “তা হউক….অন্তত মেট্রিক পাশ না করাইয়া বিয়ার কতা আমি মাথায়ও আনমু না। মাইয়া মাত্র সিক্সে পরে। অই হিসাবে বিয়া আরো ৪~ ৫ বছর পর ভাইজান। এর মধ্যে হাজার ভালো পুলা আইলেও আমি রাজি অমু না।”
~ “দেহেন ভাবি…মাইয়ার বাপ~ ভাই নাই। ভালো বিয়া আইছে যহন রাজি না হওয়া কিন্তু বুকামি। এই মাইয়ার ডাংগর অইলে ক্যারা বিয়া করব?”
~ “যার কপালে আছে হেই বিয়া করব ভাই। অতো ভাবি না।”

এরপরেও অনেক বুঝালো জসীম রেহানাকে যাতে বিয়ের ব্যাপারে আগায়। কিন্থ রেহানার সেই এক কথা….স্বামীর শেষ ইচ্ছে উনি পূরণ করবেনই। যতদূর সাধ্য আছে নিজের সবটা দিয়ে হলেও শেষ ইচ্ছে পূরণ করবেন। মায়াকে কিছুতেই এখনই বিয়ে দেবেন না। অন্তত মেট্রিক পাশ…না না শুধু মেট্রিক না। আই.এ, বি.এ~ ও পাশ করাবেন মায়াকে। মায়া পুরো গ্রামের মধ্যে এক এবং একমাত্র মেয়ে হবে। মেয়ের মত মেয়ে।

মায়ার তুলনা মায়া নিজেই হবে। অনেক স্বপ্ন….অনেক স্বপ্ন মায়াকে নিয়ে। আল্লাহর রহমতে মায়ার মাথাটাও অনেক ভালো। ক্লাস ফাইভ অবদি ওদের সাথে ওদের প্রাইমারি স্কুলের এক শিক্ষকের ছেলে পড়ত। শিক্ষকের ছেলে হওয়ার সুবাধে পরীক্ষার হলে সব রকমের সুযোগ সুবিধা তো পেতই;তার উপর আবার আগাম প্রশ্নও পেতো। শিক্ষক বাবা ছেলেকে পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্ন নিয়ে দিতেন। এত কিছুর পরও রোল নং কখনো সেই ছেলের ১ হয় নি। বরাবরই মায়া ফাস্ট হতো আর সেই শিক্ষকের ছেলে সেকেন্ড হতো। এটা নিয়ে মায়ার মা মনে মনে কতই যে গর্বিত হতেন…!

তবে এই ফাস্ট গার্ল মায়ার একটা ঘটনা এখনও মনে পরলে প্রচন্ড হাসি পায়। সেইবার মায়া প্রথম শ্রেনী থেকে দ্বিতীয় শ্রেনীতে উঠেছে। প্রথম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আনতে স্কুলে গিয়েছে। প্রধান শিক্ষক মুখে মুখে রেজাল্ট বলে দিচ্ছেন। ফিল্ডে সব ক্লাসের সব ছাত্র~ ছাত্রীদের দাড়িয়ে আছে। আর শিক্ষক~ শিক্ষিকারা স্কুলের বারান্দায় চেয়ার ফেলে বসেছেন। সেখানে বসে খাতা দেখে দেখে এক এক করে সব ক্লাসের রেজাল্ট বলে দিচ্ছেন। প্রত্যেক শ্রেনীর ১ম ১০ জনের টোটাল মার্ক বলে দিচ্ছেন। আর বাকি ছাত্র~ ছাত্রীদের ক্ষেত্রে শুধু পাশ নাকি ফেল সেইটা বলছেন।

তো, বলতে বলতে এবার মায়াদের পালা। খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রধান শিক্ষক মায়ার নাম সবার শেষে ঘোষণা করে জানালেন যে, দ্বিতীয় শ্রেনীর ফাস্ট গার্ল মায়া। মায়ার টোটাল মার্ক সবার চেয়ে বেশি। মায়ার তো খুশিতে আর ধরে না। রেজাল্ট শুনার পর পরই দৌড়ে বাড়ি গেলো মাকে খবরটা দেবে বলে। মা তখন কাথা সেলাই করছিল। মায়া যতটা উৎসাহ নিয়ে রেজাল্টের খবর দেয়ার জন্য মায়ের কাছে ছুটে এসেছিল;আসার পর ঠিক ততটাই লজ্জা পেতে লাগলো। কি অদ্ভুত…! এত ভালো একটা খবর দিতে লজ্জা লাগবে কেন?

মায়া চুপচাপ এসে মায়ের পাশে বসলো। রেহানা মেয়ের দিকে না তাকিয়ে কাথা সেলাই করতে করতেই বললেন,
~ “কত পাইছস পরীক্ষায়?”
মায়া মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
~ “মা…আমি ১ অইছি।”

রেহানার চোখে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। ঝট করে মায়ার দিকে তাকালো সে। চোখের দৃষ্টিতে অগ্নি ঝড়ছে। মায়া তখনও লাজুক ভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই বুঝি মা ওকে খুশিতে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে।

রেহানা রাগান্বিত হয়েও যথেষ্ট শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
~ “কুলসুম…? কুলসুমের খবর কি?”

~ “কুলসুম পাশ করছে মা।”
রেহানা এবার যেন আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
~ “ও পাশ করছে তাইলে তুই ১ অইলি ক্যা? ওর মায় ওরে ভাত খাওয়ায় আর আমি কি তোরে গু খাওয়াই?”
মায়া এবার বিস্মিত হয়ে মায়ের দিকে তাকালো। মা এমন করছে কেন?

এত ভালো রেজাল্ট…! কই ওকে একটু আদর করবে সেইটা না করে বকাবকি করছে? মায়া পরিস্থিতির আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে বিস্মিত ভঙ্গিতে মাকে ডাকলো,
~ “মা…!”

রেহানা এবার ঠাস করে মায়ার গালে চড় মারলেন। মায়া তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পরে গেলো। রেহানা থামছেই না। ওকে উঠিয়ে আবারো চড় মারলো। মায়া ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে দিলো। ওর কান্না শুনে পাশের বাড়ি থেকে জায়েদা ভাবি ছুটে এলো। কি হয়েছে, কি হয়েছে?

অবশেষে শুনা গেলো মায়া ১ হওয়ার অপরাধে ওকে এভাবে মারা হচ্ছে…!
এবার জায়েদার অবাক হওয়ার পালা। কিন্তু ও অবাক হওয়া বাদ দিয়ে তারাতারি মায়াকে রেহানার কাছ থেকে সরালো। রেহানার চিৎকারে এতক্ষনে আশেপাশের কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। রেহানার কাছ থেকে মায়াকে সরাতেই রেহানা বলে উঠল,
~ “ওরে শিক্ষা দিতে দে তোরা। কুলসুম পাশ করে আর ও ১ পায়? ওরে আইজকা মাইরাই ফালামু।”

জায়েদা এবার একটু ধমকের সুরে বলল,
~ “আরব থামেন চাচি। পাগল হইছেন? ১ অওয়া মানে কি বুঝেন? ও কেলাসের সবার চাইয়া বেশি পাইছে। আর আপনি ওরে মারেন?”
~ “কিহ…! সবার চাইয়া বেশি পাইছে?” রেহানা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। জায়েদা বলল,
~ “হ.. সব্বার চাইয়া বেশি পাইছে। হের লাইগাই ও ১ অইছে। ১ অওয়া মানে ১ নম্বর হওয়া। নেন…মাইয়ারে না মাইরা দুধভাত খাওয়ান। আহারে ছেড়িডারে কতডি চড় দিছে….!”

ইশ…! মা কি অবুঝই না ছিলেন তখন…! সেদিন মারার পর কত্ত যে লজ্জা পেয়েছিলেন রেহানা নিজের এই বোকামির জন্য…! তারপর অনেক আদর করেছিল রেহানা মায়াকে। এর পর থেকে মায়া যতবারই ফাস্ট হয়েছে ততবারই অইদিনের ঘটনা টা মনে হয়েছে। আর সেইটা মনে হতেই নিজের অজান্তেই ফ্যাক করে হেসে দিয়েছে মায়া…!

পর্ব ৬

মায়া, রেহানা আর বিবেক সকাল ১০ টার দিকে ঢাকা যাওয়ার পথে রওনা হয়েছে। একগাদা জিনিসপত্র নিয়ে ভ্যান গাড়িতে চেপে হামিদপুর পর্যন্ত আসতে প্রায় দেড় ঘন্টা লেগে গেলো। হামিদপুর থেকে বাসে চড়ে টাংগাইল বাইপাস হয়ে ঢাকার দিকে যেতে হবে। ওদেরকে গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য রঞ্জু এসেছে। হামিদপুর এসে অনেক্ষণ যাবত বসে রইলো। কিন্তু ঢাকার বাস আসে না। মায়া বরাবরের মত থ্রি~ পিসের বড় উড়না দিয়ে মাথাসহ পুরো শরীর ঢেকে জড়সড় হয়ে রাস্তার পাশে কাপড়ের ব্যাগের উপর বসে আছে। আর কিছু লোক চলাচলের নাম করে ওর গায়ে ঘেষতে চাচ্ছে। দুই~ তিনবার ২~ ৩ জনের ধাক্কা লাগলো মায়ার শরীরে।

এক একবার ধাক্কা লাগে তো পরে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুই~ তিনবার এরকম দেখেও হঠাৎ করে লেগেছে ভেবে চুপ করে ছিল। কিন্তু এরপর যেন ওর সহ্য সীমা ছাড়িয়ে গেলো। চতুর্থ বারের মত কেউ একজন ঠিক আগের মত করেই মায়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর গায়ে ঘেষ দিয়ে যাচ্ছিল। মায়া যে’ই না তাকে ইচ্ছে মত ঝেড়ে দেয়ার জন্য উঠে দাড়ালো অমনিই রঞ্জু চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলল,
~ “আফা গাড়ি আইয়্যা গেছে….গাড়ি আইয়্যা গেছে। বোচকা বাচকি হাতে নে সব।”

মায়া এবার ঝাড়ি মারার কথা ভুলে গিয়ে তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পেছনের দিকের সিটে বসে পরলো ওরা। মায়া বসলো জানালার পাশের সিটে। বিবেক বসলো মায়ার কোলেই। যোহরের আজান যখন দেয় তখনও ওরা গাড়িতে। মায়ার নামাজ পড়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। ক্লাস থ্রি~ তে থাকাকালীন সময়ে মসজিদের হুজুরের কাছে যখন কুরআন শরীফ শিখতে যেতো তখন থেকেই নামাজ পড়া শুরু করেছিল। ইসলামের প্রতি মায়ার আগ্রহ বুঝতে পেরে মসজিদের হুজুর মায়াকে আরো বেশি বেশি উৎসাহ দিতো। উৎসাহ পেয়ে পেয়ে মায়া নামাজকে আরো আকড়ে ধরতে লাগলো।

সেই যে মায়া নামাজ পরা শুরু করেছিল এরপর থেকে কখনো নামাজ বাদ দেয়া তো দূরে থাক;কাজাও করে নি। আজ কি তবে যোহরের নামাজটা কাজা পরতে হবে? মায়ার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগলো। ইশ…! ঢাকার পথ এত বেশি কেন? এর আগের বার ও যখন এসেছিল তখনও এত দেরি হয় নি। আজ তবে পথ শেষ হচ্ছে না কেন? বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আসরের আজান দিয়ে দিলো। মাস দুয়েক আগেই বাসা পাল্টিয়েছে বীনা। নতুন বাসা টা ঠিকানা দেখে দেখে খুজতে গিয়েও কিছুটা দেরি হলো। মায়ারা যখন বাসায় পৌঁছালো তখন বীনা বাসায় ছিল না।

অফিসে ছিল। কিন্তু বাসার চাবিটা বাড়িওয়ালার ছেলের বউ আফরোজার এর কাছে রেখে গিয়েছিল। রেহানা, মায়া’রা বাসার গলিতে ঢুকতেই বাড়িওয়ালার ছেলের বউ তাদের বীনার ঘরের চাবি দিলো। চাবি দিয়ে রুমের দরজা খুললো মায়া। ঘরে ঢুকে লাইটটা জ্বালিয়ে দিলো। ছোট্ট একটা রুম। সেই রুমে একটা চৌকি, চৌকির সাথে লাগিয়ে দেয়াল ঘেষে রাখা একটা আলনা। আলনার পাশে চালের ড্রাম, একটা পানির ড্রাম। চৌকির নিচে একটা ট্রাংক, হাড়ি, পাতিল, জগ~ গ্লাস সব টিপটাপ করে গুছিয়ে রাখা। ঘরের আনাচে~ কানাচে টুকটাক অন্যান্য সাংসারিক জিনিসপত্র। ব্যস…! ছোট্ট একটা সংসার। একটা একলা মানুষের সংসার।

ওরা রুমে ঢুকে দরজা টা অফ করে দিলো। মায়া উড়না টা মাথা থেকে সরিয়ে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছে। একটু গোসল করতে না পারলে ভালো লাগবে না। মায়া মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে উঠে গেলো বাইরে। গোসলখানা কোন পাশে সেইটা এখনো জানে না সে। মায়া সরাসরি বাড়িওয়ালার সেই ছেলে বউ এর কাছে গেলো। বাইরে থেকে ডাকতে লাগলো,
~ ভাবি….ও ভাবি?
~ কে?

~ ভাবি আমি মায়া। অই যে বীনার বুইন।
~ অহ….
~ ভাবি…গুছলখানা ডা দেহাইয়া দেন এট্টু।
~ এখন তো গোসল করা যাবে না। দুপুর ৩ টার পর টিউবওয়েল থেকে পানি তোলা নিষেধ। টিউবওয়েলের শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়।

~ মেলা দূর থেইকা গাড়িতে কইরা আসছি। আইজকার মত টিবলডা খুইলা দেন ভাবি। এহন গুছল করবার না পারলে রাইতে ঘুমাইতে পারুম না।
ভাবি কিছু একটা ভাবলো। তারপর টিউবওয়েলের শিকলের চাবিটা এনে মায়ার হাতে দিলো। গোসলখানা কোন দিকে সেইটা ইশারা করে দেখিয়ে দিয়ে তিনি রুমে ঢুকে পড়লেন। মায়া গোসল সেরে যোহরের কাজা নামাজ সহ আসরের নামাজ টা পড়ে নিলো।

রাত ৮ টার দিকে বীনা বাসায় ফিরে দেখলো ওর রুমের দরজা খোলা। বুঝতে পারলো যে মায়ারা কেউ এসেছে। মায়ারা যখন প্রথম প্রথম ঢাকা এসেছিল তখনই বীনা রেহানা আর মায়াকে বলেছিল যে,
~ আমি অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই চাবি বাড়িয়ালির কাছেই রাইখা যাই। তুমরা যহনই আহো খালি বাড়িয়ালির কাছে পরিচয় দিয়া চাবি চাবা। দিয়া দিবো। আমি তো আর দিনে বাসায় থাকি না।

এরপর থেকে ওরা ঢাকায় আসলেই বীনার কথামতোই কাজ করে।
বীনা রুমে ঢুকতেই বিবেক ‘আম্মা’ বলে চিৎকার দিয়ে বীনার কোলে ঝাপিয়ে পরলো।
~ আম্মা…!

~ আমার বাবা টা রে…কখন আইছো তুমরা?
বিবেক দুইহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে সুর টেনে বলল সে,
~ মেলাক্ষন আগে।
~ মেলাক্ষন আগে আইছ? খাইছ বাবা?
~ হ.….খাইছি

~ আহারে আবার বাবা টা…কত্ত দিন পরে দেখলাম তুমারে।
বীনা বিবেকের সারামুখ চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলো। চুমু দিতে গিয়ে বুঝতে পারলো যে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। নিজের একমাত্র কলিজার টুকরা, বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে দূরে রেখে থাকাটা যে কি কষ্ট সেইটা যে থাকে সে’ই বুঝে। চুমুর পর্ব শেষ করে বীনা মায়ের দিকে তাকালো,
~ তুমাগো আইতে কষ্ট হয় নাই তো?

মায়া বলল,
~ কষ্ট অয় নাই মানে? আমি জীবনেও এত কষ্ট কইরা আহি নাই। এর আগের বার ঢাকায় আইতেও এত কষ্ট অয় নাই। তারপরে আবার নতুন ঠিকানা খুইজা বাইর করা কম ঝামেলা মনে করছ?
~ হাহাহা…হইছে বুঝছি। থাম এইবার। আমি রান্নার বন্দোবস্ত করি।
~ তুমার রান্দা লাগব না বড় আপা। আমি আর মা সন্ধ্যার সুময়ই রাইন্দা রাখছি।
~ হায় আল্লাহ। তোগো রান্তে কইছে কেরা?
~ কেউ কয় নাই। চূলা খালি গেলো তহন। তাই রাইন্দা থুইছি। পরে তুমরা যহন আহো তহন তো চূলার পারে ভীড় লাইগা যায়।
~ তা ঠিক।

এবার রেহানা বললেন,
~ তুই বয়….কতা কই তোর লগে। কতদিন ধইরা কতা কই না।
বীনা বসলো। রেহানা টুকটাক ভালোমন্দ কথা বললেন। তারপর আস্তে আস্তে আসল প্রসঙ্গ তুললো। রেহানা বললেন,
~ তোর জামাই বাড়ি থিকা লোক আইছিল ২ দিন আগে।
বীনা জামাই বাড়ির কথা শুনে প্রথমে চমকে উঠলো। পরে কপাল কুচকে বলল,
~ কেরা আইছিল?

~ তোর জামাই আর ওর ভাই সেজো ডা।
~ তোর জামাই, তোর জামাই করো ক্যা মা? অই বেডা কি এহনো আমার জামাই রইছে?
~ অইত্ত…অইলো একটা।
~ না….অইলো না মা। এরপর এইরহম কথা কইবা না সাবধান। এহন কও….ওরা আইছিল ক্যা?
~ তোর পোলা রে দেখবার আইছাল। মানিকের নাকি চাকরী অইছে সেনাবাহিনীতে। চাকরিতে যাইবো গা।

~ অই মাতাল শালারে চাকরী দিলো ক্যারা?
~ মাতাল মাতাল করিস না। ওর মতিগতি মেলা বদলাইছে আগের থিকা। আর অগো কি মানুষের অভাব আছে রে? বড় বড় কত মানুষ অগো গুষ্টিতে। সরকারি চাকরি। তোরে তহন কত কইরা কইলাম যে কষ্ট সইহ্য কইরা থাক। দিন আইবো একদিন। তুই তো হুনলিই না। তখন আমার কতা হুনলে এহন কত বালো অইতো বুঝতাছস?

~ হুরু মা…বদলোক কুনোদিন ভালো হয় না। চাকরীতে কয়দিন টিকে দেখমু নি।
~ বালো অয় রে….মানুষ কি সারাজীবন বদ থাহে?
~ আইচ্ছা…ভালো হইলে তো ভালোই।
~ একটা কতা কই মা?

~ কও…
~ ওরা তোরে আবার নিবার চায় রে মা। কত বছর অইয়া গেলো তোগো তালাকের। পোলাডা এহনও বিয়া করে নাই।
বীনা এবার একদম ক্ষেপে গেলো। চিল্লানি দিয়ে বলল,
~ অই বেডার হইয়া ছাফাই গাওয়ার জন্যে ঢাকায় আইছ তুমি?

~ ছাফাই গামু ক্যান? রাগিস না মা। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাইবা দেখ। চিল্লাচিল্লি না কইরা যা কই হুন আগে।
বীনা এবার চুপ করলো। রাগে ফুসতেছে। তবুও মায়ের অনুরোধে চুপ করে মায়ের সবটা কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিলো। রেহানা আবার বলা শুরু করলো,
~ দেখ….তালাক কিন্তু মানিক দিবার চায় নাই। তুই জোর কইরা জিদ দেহাইয়া তালাক নিলি। তোর পুলাডার কি হইব ভাবোস নাই। নানীর বাড়ি থাকা আর নিজের বাড়ি থাকা কি এক অইলো? নিজের বাড়ি, নিজের এলাকার জোরই আলাদা থাহে।

আর বাপ ছাড়া পোলাপান গো মাইনষে বালা চোখে দেহে ক? তুই হয়তো কামাই কইরা পুলার ট্যাহার চাহিদা মিটাবি। কিন্তু ট্যাহার কি সব? তালাক যহন নিছস ছুড আছিলি। বুঝতি কম। এহনো কি বুঝস না? তোর কপাল বালা দেইখা ওরা আবার আইছে তোরে ফিরাইয়া নিবার নিগা। তুই অমত করিস না মা। এই ছন্নছাড়া জীবন ছাইড়া জামাইর সংসারে ফিরত যা।

বীনার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে মায়ের কথা শুনে। মায়ের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,
~ মুখের থু থু মাটিতে ফালানোর পরে অই থু থু কি আর মুখে তুলা যায় মা?

পর্ব ৭

মায়ারা ঢাকায় আসার ঠিক দুই দিন পর শুক্রবার ভোরে মানিক আর মানিকের মা মরিয়মকে দেখা যায় বীনার বাসার সামনে…!
দরজায় খটখট শব্দ শুনে দরজা খুলতেই চোখ বড় বড় করে ফেলে বীনা। এত্ত ভোরে এখানে ওরা…! কিভাবে সম্ভব?
স্বপ্ন নয় তো এটা? ঘুমের ঘোরে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি? বীনা প্রচন্ড আশ্চর্যের সাথে কপাল কুচকে চোখ ছোট ছোট করে বলল,
~ আপনেরা…! আপনেরা এইখানে?

মানিকের মা মুখে লম্বা একটা হাসির রেখা টেনে বলল,
~ হ মা….কাইল রওনা দিছিলাম। আইতে আইতে রাইত অইয়্যা গেছিল। পরে মানিকের এক চাচার বাসায় আছিলাম।
~ তা আমার বাসায় আইছেন ক্যান? আর ঠিকানা পাইলেন কই?
~ অইদিন মানিক গিয়া তুমার মায়ের কাছ তনে নিয়া আইছে।

এতক্ষণে ওদের কথাবার্তা শুনে রেহানার ঘুম ভেংগে গেছে। মায়া ফজরের নামাজ পরে আবার ঘুমিয়েছিল। ওর ঘুম টা ভাংগে নি এখনো। ঘুমন্ত বিবেককে বুকে জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। মানিকের মায়ের এমন জবাব শুনে বীনা ওর মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ নতুন বাসার ঠিকানা কি তুমারে এইগুলা কইরা বেরানোর জন্যে দিছিলাম? জনে জনে তুমি আমার ঠিকানা দিয়া বেড়াও… না?

রেহানাকে কোনো উত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে মানিকের মা অনুনয় এর সুরে বীনাকে বললেন,
~ মা রে….মাতা গরম করিস না। আমাগো এট্টু ভিত্রে যাইতে দে।

বীনা রাগান্বিত দৃষ্টিতে মানিকের মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন ভিতরে আসতে চাওয়ার ঘোরতর অপরাধ…! এই অপরাধের শাস্তি যাবত জীবন কারাদন্ড…!
রেহানা পরিস্থিতি কিছু টা স্বাভাবিক করার জন্য হন্তদন্ত হয়ে মানিক আর মানিকের মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
~ হ…আপনেরা ভিত্রে আহেন। কুটুম মানুষ বাইরে দাড়াইয়া রইছে। মাইনষে কি কইবো?

মানিক আর মানিকের মা মরিয়ম বীনার দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রুমের ভিতরে ঢুকলো। সবার কথা শুনে মায়ার ঘুম ভাংগা ভাংগা ভাব। কিন্তু ভাংগে নি। রেহানা মানিক আর মরিয়মকে ২ টা মোড়া এগিয়ে দিলো বসার জন্য। ছোট্ট একটা রুম। চৌকি ফেলার পর জায়গা অর্ধেক টা ব্লক হয়ে গেছে। রেহানা এবার মশারী উচু করে মায়াকে ডাকতে লাগলো,
~ মায়া….? আরে অই মায়া? উঠ তাত্তারি। কুটুম আইছে।

কুটুম আসার কথা কানে যেতেই মায়া ধরমরিয়ে উঠলো। উড়না দিয়ে ফট করে পুরো শরীর ঢেকে নিলো। চোখ থেকে ওর ঘুম যেন নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো। মশারী ভেদ করে বাইরের দিকে তাকাতেই মানিক আর মানিকের মাকে দেখতে পেয়ে মায়া ভূত দেখার মত চমকে গেলো…! মায়া তারাতারি মশারী খুলে গুছিয়ে রাখলো। বিবেককে এক সাইড করে শুইয়ে দিলো। বীনা তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বীনার অগ্নিদৃষ্টি মানিক আর মরিয়মের দিকে। সে দৃষ্টিতে একবারের জন্যও পলক পরছে না। মানিক আর মরিয়ম আড়চোখে একবার বীনার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেয়। আবার তাকায়, আবার চোখ সরিয়ে নেয়। খুব অস্বস্তি লাগছিল মানিক আর মরিয়মের।

বেশ কিছুক্ষণ পর বীনা চোখের পলক ফেললো। ওর দৃষ্টি টা এবার দেয়ালে ঝুলানো আয়নার সাথে রাখা টুথব্রাশ আর টুথপেষ্ট এর উপর গেলো। ও নির্বিকার ভঙ্গিতে আয়নার সামনে গিয়ে টুথব্রাশ নিয়ে সেখানে টুথপেষ্ট লাগিয়ে রুমের বাইরে চলে গেলো। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে রুমে এলো।

এসে নিজের মত করে রান্নার বন্দবস্ত করতে লাগলো। এমন ভঙ্গিমায় সব কাজ করতে লাগলো যেন বাসায় বাইরের কেউ আসেই নি…! মানিক, মরিয়ম যতবার বীনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিল ততবার বীনা ওদের সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে। তবে মায়া, রেহানা তাদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণই করেছে। বীনা ভাত, আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি করলো। রান্না শেষে খাটের নিচ থেকে দুইটা কাচের প্লেট বের করে সেগুলোয় ভাত বেড়ে খুব শীতল কণ্ঠে মানিক আর মরিয়মকে খেতে আহবান করল। তারা খাওয়াদাওয়া শেষ করলে বীনা বলল,
~ খাওয়া হইছে, এখন আপনেরা যান।

মরিয়ম চমকে গিয়ে বললেন,
~ যামু মানে? আমরা কি খাওনের লিগা আইছি? যেই কামে আইলাম হেইডাউ তো অইলো না।
বীনা শান্তস্বরে চোখ বন্ধ করে উত্তর দিলো,
~ আপনেগো সাথে আমার কোনো কাজ বা কথা নাই। যান আপনেরা। দয়া কইরা যান।

বীনার এই ব্যবহারে এবার বেশ বিরক্ত হচ্ছে মানিক আর মানিকের মা। রেহানা সেইটা বুঝতে পারলেন। তিনি বীনাকে ধমক দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললেন,
~ এইবার কিন্তু বেশি বেশি হইয়া যাইতাছে বীনা। হেরা তোর মুরুব্বি। সম্মান দিয়া কতা ক। আদপ~ কায়দা তোরে কিছু হিকাই নাই আমি নাকি?
~ সবাই সম্মান পাওনের যোগ্য না মা। তুমি এইখানে কোনো কথা কইয়ো না।

রেহানা একমুহূর্ত ভাবল যে, এখন বীনার সাথে মাথা গরম করে কথা বলে লাভ নেই। এতে হীতে বিপরীত হবে। রেহানা বললেন,
~ হেরা কি কয় হেইডা তো আগে হুন। মাথা ঠান্ডা কর।

কথাটা রেহানা বীনার হাত ধরে অনুনয়ের সুরে বললেন। বীনা এবার মায়ের কথা না শুনে যেন পারলো না। সে চুপ করে বিছানার এক কোণে বসে পরলো। মানিক, মরিয়ম বিছানার উপরে উঠে বসে আছে। রেহানা ফ্লোরে বীনাকে ঘেষে মোড়ার উপর বসেছে। আর মায়া দরজার কাছে একটা মোড়ায় বিবেককে কোলে নিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে বসে সব কাহিনি দেখছে। মানিকের মা মরিয়ম বীনাকে উদ্দেশ্য করে কথা শুরু করলেন,
~ দেহো মা…ভুল তো মাইনষেরই অয়। আমার পুলাডাও ভুল করছে। তাই বইলা কি এইডার মাফ নাই? আর অহন ও বালো অইয়া গেছে মা। স্কুলে সরকারি চাকরী অইছে ওর।

~ আপনের পুলা যদি দেশের সরকারও হয় তাও আমি আপনের পুলার ভাত আমি খামু না। এরপরে আর কোনো কথা আছে আপনের?
~ বিবেকের কতাডাও কি ভাববা না মা তুমি?
~ ওর কথা আমি ভাবমু না তো ক্যারা ভাববো?
~ তাইলে যাইবার চাও না ক্যান?

~ আমার যাওয়ার না যাওয়ার লগে বিবেকের ভালো~ মন্দের কোনো সম্পর্ক নাই।
রেহানা এইবার বলে উঠলেন,
~ সম্পর্ক নাই তোরে ক্যারা কইছে?
~ মা তুমি চুপ থাকো। সম্পর্ক আছে কি না আছে সেইটা বুঝার বয়স আমার হইছে। আর যদি সম্পর্ক থাইকাও থাকে;তাও আমি যামু না। এতদিন আমার পুলারে আমি একলা মানুষ যহন করতে পারছি এখনো পারমু।

রেহানা এইবার ভেংচি কেটে বললেন,
~ এহহ…! মানুষ করোন আলি আইছে….! মাসে মাসে দুইডা ট্যাহা পাঠাইলেই কি দায়িত্ব শেষ অইয়া যায়? তুই ওরে মানুষ করলি কেমনে? ওর কুনো ঝামেলা তোর পোহান নাগছে? নাগে নাই। ওর যত ঝামেলা আছে সব আমি আর আমার মায়া পোহাইছে। মেলা করছি তোর আর তোর পুলার লাইগা। আর পারমু না। এহন যাগো জিনিস তাগো কাছেই গছাইয়া দিবার পারলে আমার শান্তি।

বীনা চুপ করে অবাক দৃষ্টিতে মায়ের পানে তাকিয়ে মায়ের কথা শুনছিল। রেহানা কথা শেষ করতেই বীনা বলল,
~ বেশ….তোমাগো কাছে আর দিমু না বিবেকরে। তোমাগো ওর ঝামেলা পোহান লাগবো না আর। ও আমার কাছেই থাকবো। এহন তো খুশি তোমরা? আর তো কোনো ঝামেলা রইলো না। তাই না?

রেহানা এইবার থতমত খেয়ে গেলেন…! তিনি যেটা ভেবে কথাটা বলেছিলেন সেইটা না হয়ে বরং তার উল্টোটা হয়ে গেলো। তিনি বললেন,
~ খালি উলটা বুঝবি না। তোর এই জিদ যে তোরে ধ্বংস করতাছে হেইডা কি বুঝতাছস?
বীনা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
~ আমি আর কোনো কথা শুনবার চাই না। তুমি কি এই লোক দুইটারে যাইতে কইবা? নাকি আমিই বাসা থিকা বের হইয়া যামু?

এরপরেও আর সেখানে থাকা যায় নাহ..! মানিক, মরিয়ম উঠে দাঁড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মানিক নিরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করে গিয়েছে…! বীনার এই অগ্নিমূর্তির সামনে কিছু বলার সাহস হয় নি ওর। শুধু বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বিবেকের হাতে একটা ১০০ টাকার নোট গুজে দিলো। ব্যাপার টা বীনার চোখ এড়ালো না। বিবেক টাকা হাতে নেয়ার সাথে সাথে বীনা হুংকার দিয়ে উঠে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ টাকা ফিরাইয়া দে বিবেক…!

বিবেক কোনো কথা না বলে ড্যাবড্যাব চোখে একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার তাকাচ্ছে তাকে যে টাকা দিলো সেই লোকটার দিকে। মায়ের অগ্নিদৃষ্টি দেখে ভয় পেয়ে সে নির্লিপ্ত ভাবে নোট টা আবার সেই অপরিচিত লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। মানিক এবার অসহায় দৃষ্টিতে একবার বীনার দিকে তাকালো। বীনা ছেলের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মানিক একবার বীনার দিকে তাকিয়ে আরেকবার রেহানার দিকে তাকালো। রেহানার সাথে মানিকের চোখাচোখি হয়ে গেলো। মানিক ইশারায় বলল বীনাকে বুঝাতে, শান্ত করতে। রেহানা বীনাকে ধমক দিয়ে বললেন,
~ দেখ বীনা… এহন কিন্তু বেশি অইয়া যাইতাছে। তুই কি থামবি?

~ তুমি চুপ করো মা। আমার ডা আমারে বুঝতে দেও।
~ তুই চুপ থাক ফাজিল মাইয়া।
রেহানা বীনাকে জোরে একটা ধমক দিলেন। তারপর মানিককে উদ্দেশ্য করে বললেন,
~ তুমি যাও বাবা। কিছু মনে কইরো না।

মানিক, মরিয়ম আর এক মুহুর্ত দেরি করলো না সেইখানে। বের হয়ে গেলো। বের হওয়ার পর পরই রেহানা রাগে ফসফস করতে লাগলেন…! মুখে যা আসছিল তাই বলেই বকাবকি করতে লাগলেন বীনাকে। ইচ্ছেমতো দোষারোপ করতে লাগলেন। বীনা বিছানার এক কোণে চুপচাপ একভাবে বসে ছিল সারাক্ষণ। এত বকাবকি, এত হৈ~ হুল্লোড় কিছুই যেন ওর কানে পৌঁছাচ্ছিল না।

বীনার এরকম ভাব দেখে রেহানা আরো রেগে গেলেন…! রেহানা মায়াকে বললেন,
~ অই মায়া….ব্যাগ গুছা ছে…বাইত্তে যামু গা। এই জাহান্নামে, এই নরপিশাচের লগে থাকা হারুম না। এহনই ব্যাগ গুছা।

বীনা এইবার চেতে গেলো। ধমকের সুরে বলল,
~ এত চিল্লাচিল্লি করতাছ ক্যা? এইডা তুমার দেশের বাড়ি না বুঝছ? এইখানে এত চিল্লাচিল্লি করলে বাসা থিকা বাইর কইরা দিবো। পরিবেশ বুইঝা কাজ কাম করোন লাগে। বুঝছ?

~ থাক তুই তোর পরিবেশ নিয়া….পইচা গইলা মর। আমার লগে তুই কতা কবি না। আরে অই মায়া, তুই এহনো বইয়া রইছস ক্যা? ব্যাগ গুছাবার কইলাম না?
~ ব্যাগ গুছাইয়া কি করবেন খালাম্মা?

দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে জহির প্রশ্নটা রেহানার দিকে ছুঁড়ে দিলো। রেহানা ভ্রু কুচকে জহিরের আপাত~ মস্তক একবার দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
~ আপনে আবার ক্যারা?
বীনা জহিরকে উদ্দেশ্য করে মুখ হাসি হাসি করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
~ আরে জহির…! ভিত্রে আয়।

মায়া বিছানার উপর দরজার উল্টো দিক মুখ করে বিবেকের সাথে দুষ্টমি করছিল। পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনে সে সংকোচিত হয়ে গেলো। মাথার ঘোমটা টা আরেকটু বড় করে টেনে চুপচাপ বিছানার অপর কোণে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলো। বীনা রেহানাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ এইডা আমার ভাই মা। আমাগো অফিসের সুপার ভাইজার। বড্ড ভালো পোলা মা। তুমারে দেখার জন্য সেই কবে থিকে ছটফট করতাছে….! কবে আইবা তুমি…! তুমি আইবা তুমি…! পাগল হইয়া গেছিল ও। হাহাহা…!”

বীনা তার মাকে জহির সম্পর্কে এটা সেটা বলছে ওদিকে জহিরের দৃষ্টি গিয়ে পরেছে বিছানার এক কোণে বসে থাকা মায়ার উপর। এমনভাবে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে যে মুখটা দেখার উপায়ও নেই…! এটাই বুঝি বীনা আপার ছোট বোন মায়া?

পর্ব ৮

মায়াকে দেখে জহির যেন ঘোরের ভেতর ডুবে গিয়েছিল..! এক ধ্যানে মায়ার দিকে তাকিয়ে হাজারো কথা ভাবছিল মনে মনে। ওদিকে মায়াও ঘোমটার নিচে থেকে ভাবছে যে, ~ তাহলে এই সেই লোক;যার হাতের লিখা এত্ত সুন্দর.?

যেদিন ওরা ঢাকায় আসলো সেদিন রাতেই মায়া বীনাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
~ আইচ্ছা বড়পা, তুমার চিঠি ক্যারা লেইখা দিছিল?

~ আমাগো অফিসের একটা পোলা। আমারে বইন বানাইছে। জহির নাম ওর।
ব্যস….আর কোনো কথা হয় নি জহির সম্পর্কে। মায়া ভাবতেও পারে নি জহির এই বাসায় আসবে। ইশ, কি যে অস্বস্তি লাগছে এখন ওর…! এই রুম থেকে বের হয়ে যেতে পারলে ভালো হত। কিন্তু সেই উপায়ও নেই।

ওদিকে রেহানার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের শব্দে ঘোর যেন ভাঙলো জহিরের।
~ আরে বাপজান…! বহেন বহেন…খাড়াইয়া রইছেন ক্যান?
~ উফ খালাম্মা…! আপনি আমারে আপনি আপনি করতেছেন ক্যান? আমি আপনের ছেলের মতোন। তুমি কইরা বলবেন।

~ আইচ্ছা বাপজান। বহো বহো….
জহির পা ঝুলিয়ে বসলো বিছানার উপর। রেহানা ওর সাথে টুকটাক কথা বলছে কিন্তু জহিরের দৃষ্টি অবাধ্যের মত বার বার মায়ার দিকে চলে যাচ্ছে। সে যেন কোনোমতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। রেহানা এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলো,
~ তা বাবা…খাইছ সকালে?

~ হুম খালাম্মা খাইছি। কিন্তু আপনি ব্যাগ গুছাইতে বললেন…! আপার মুখটাও কেমন থমথমে। কিছু হইছে?
~ না বাজান…কি অইবো? মায়ার স্কুল খুলা। হের লাইগা চইলা যাইবার চাইতাছি।
আসল ঘটনাটা চেপে গেলেন রেহানা। বাইরের কাউকে নিজেদের ভেতরের কথা বলার কোনো মানেই হয় না। জহির রেহানার উত্তর শুনে বীনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ সেলাই মেশিন কেনা হইছে আপা?

~ না, আইজকা তো শুক্রবার। ভাবছিলাম কাইলমা যামু মেশিন কিনবার।
~ তাইলে আজকেই চইলা যাইতে চায় ক্যান তারা?

~ বাদ দে। তুই মা’র লগে কথা ক। আমি বাজারে যামু।
~ না আপা। কি হইছে বলেন আমারে। আমি না আপনার ছোট ভাই?

বীনা কিছুক্ষণ ভাবলো। পরে আজকের ঘটনা সব খুলে বলল। সব শুনে জহির কোনো মন্তব্য করল না। শুধু গম্ভীর হয়ে বসে রইলো। একবার মনে হল যে, বীনা যা করেছে ঠিকই করেছে। আরেকবার মনে হল যে, বীনা যা করেছে ঠিক করে নি। ওর উচিত ছিল নিজের সংসারে ফেরত যাওয়া। অন্তত বিবেকের জন্য হলেও ফিরে যাওয়া উচিত ছিল। একটা সমাজ কোনোদিনই একটা বাবাহীন সন্তানকে, একজন ডিভোর্সি মায়ের সন্তানকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করতে পারে না। আর তাছাড়া, একজন মেয়ের জন্য সারাজীবন একা থাকাটাও অনেক বিপজ্জনক। নাহ….কিছু ভাবতে পারছে না জহির….! কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে বসে রইলো। তারপর বীনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি আপা?

~ বল,
~ আপনি আপনার সংসারে ফিরে গেলেই মনে হয় ভালো ছিল।
রেহানা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
~ ঠিক, ঠিক কইছ বাবা.. আমি এই কতাডাই হেই কহন থেইকা ওরে বুঝাবার চাইতাছি। বুঝে না ও।

বীনা বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে জহিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ তুই আমার লগে এই ব্যাপারে আর কথা কইস না। আর জানতে চাইছিলি না মা, মায়া যাইতে চায় ক্যান? এই জন্যেই যাইতে চায় গা কাম না সাইরাই।
জহির যেন এইবার মায়ার ব্যাপারে একটু কথা বলার সুযোগ পেলো। সে বীনাকে বলল,
~ আপনার বোন কি কাউরে দেখা দেয় না নাকি?
~ দেয় তো। দিবো না ক্যান? তবে একটু আলাদা ও। পুরুষ মানুষের সামনে অতো আইতে চায় না।

~ অহ আচ্ছা
জহির মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ তুমি কোন ক্লাসে জানি পড় মায়া?

মায়া মিনমিন করে জবাব দিল, “ক্লাস সিক্স।”
এতটা আস্তে উত্তর দিলো যে জহিরের কান পর্যন্ত উত্তরটা পৌঁছালোই না। অবশ্য না পৌঁছানোতে যে খুব একটা ক্ষতি হয়েছে এমনটাও না। জহির তো আগে থেকেই জানে মায়া কোন ক্লাসে পড়ে।
জহির আবারো জিজ্ঞেস করলো,
~ কোন পর্যন্ত লেখাপড়া করার ইচ্ছে আছে তোমার?

~ দেখি….
মায়ার কেন যেন জহিরের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাই জহির টুকটাক যতগুলা প্রশ্ন করেছে সবগুলোর উত্তরই হ্যা/হু এইসবের মাধ্যমে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাও জহির বেহায়ার মত ওর গায়ে পরে কথা বলতে চাচ্ছে। ব্যাপার টা বিরক্তিকর লাগছে মায়ার কাছে। ওদিকে বীনা বাইরে গিয়েছে সবজি, মাছ কিনতে। মায়া আর রেহানার সাথে টুকটাক কথা বলা, বিবেকের সাথে টুকটাক দুষ্টুমি করা;এসব করতে করতেই জুম্মার আজান দিয়ে দিলো। বীনাও বাসায় ফিরলো। জহির বীনাকে বলল,
~ আমি আসি আপা। পরে আবার আসমু নি।

~ আসি মানে? নামাজ পইরা আবার এইখানে আবি। দুপুরে আমাগো লগে খাবি।
~ আজ থাইক আপা।
জহিরের আপত্তি শুনে রেহানা বললেন,
~ মায়ের লগে এক মুঠ ডাইল~ ভাত খাবা বাজান। নামাজ পইরা আহো গা যাও।

জহির আর কোনো আপত্তি করলো না। সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। জহির চলে যাওয়ার সাথে সাথে মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো…! মনে হল যে, হাজার বছর কেউ ওর দম বন্ধ করে রেখেছিল। হাজার বছর দম বন্ধ করে রাখার পর আজই ছাড়া পেলো। কিছুক্ষণ প্রান ভরে নিশ্বাস নেয়ার পর হঠাৎ~ ই বীনার উপর ক্ষেপে উঠলো মায়া।
~ তুমার ভাই এত বেহানা ক্যান আপা? যতক্ষণ আছিল একটার পর একটা প্রশ্ন কইরাই যায়…কইরাই যায়…! দেহেই যে বিরক্ত হইতাছি। তাও বেহায়ার নাগাল কথা কইতে আহে। আর এই বেডারে আবার দুপুরে আমাগো লগে খাইতে কইলা?

~ হুর মায়া….জহির অনেক ভালো পুলা। তারে বেহায়া বেহায়া করিস না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরে, দাড়ি রাখছে, কুনো মাইয়ার দিকে চাইয়া দেহে না। আর আমারে কি কয় জানোস? কয়, আমি জানি অফিসে বুরকা পইরা যাই। নয়তো ফুল হাতা আলা জামা জানি পইরা যাই। মাথা জানি সবসময় ঢাইকা রাহি আরো কত কি…!
~ এত ভালো, অতো ভালো…তাইলে তুমার লগে এর পিরিত ক্যান হের? তুমি কি হের বউ?

~ চুপ থাক বেদ্দপ মাইয়া। কার লগে কেমনে কথা কউন লাগে হেইডাও বুঝোস না?
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো বীনা। মায়া এই কথা কিভাবে বলতে পারলো? নূন্যতম জ্ঞানও কি ওর মাথায় নেই? বীনা দাঁত কড়মড় করে বলল,
~ আমি ওর বইন। বুঝছস?

মায়া কোনো কথা বলল না। মুখে ভেংচি কেটে অন্য দিকে ফিরে তাকালো। অন্যান্য বাসার পুরুষ ভাড়াটিয়ারা গোসল সেরে যখন নামাজ পরতে গেলো তখন মায়া গেলো গোসল সারতে। গোসল সেরে নামাজও পরে নিলো। অন্যান্য বাসার পুরুষ ভাড়াটিয়ারা নামাজ থেকে ফিরতে শুরু করেছে। এখন নিশ্চয়ই জহিরও আসবে এই বাসায়? কিন্তু মায়ার এখন একদমই ইচ্ছে করছে না জহিরের সামনে পরতে।

তাই অন্য কোনো বাসায় যাওয়া যায় কিনা ভাবতে লাগলো। এর মধ্যে ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলো। বাড়িওয়ালার ছেলের বউ আফরোজার রুম থেকে কান্না আওয়াজ আসতেছে। মায়া বুকের ভেতর অনেকখানি সাহস সঞ্চয় করে অই রুমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ধীরে ধীরে অই রুমের দিকে পা বাড়িয়ে দেখলো আফরোজা বাচ্চার কান্না থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না কোনোভাবেই। একবার সোজা করে কোলে নেয়। একবার কোলের উপর শুয়িয়ে দেয়। একবার বুকের দুধ মুখে দেয়। কোনোভাবেই কিছু হচ্ছে না। বিরক্তিরে প্রায় কান্না করে দিলো দিলো ভাব। এমন সময় মায়া আফরোজাকে ডাক দিলো,
~ ভাবি?

আফরোজা মায়ার দিকে তাকাতেই বিরক্তিটা আরো হাজার গুন বেড়ে গেলো। বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করেও যেন ব্যর্থ হচ্ছে। সে কান্নারত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে কপাল কুচকে বলল,
~ তুমি…! তুমি এখানে?

মায়া মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বলল,
~ বাবুরে আমার কুলে দেন। কান্দোন থামাইতাছি।
এটা বলেই মায়া আফরোজার কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে আফরোজার কোল থেকে বাবুকে নিজের কোলে নিলো। আফরোজা শুধু বলল, “আরে আরে…কি করছ?”

এটা বললেও বিশেষ কোনো বাধা দিলো না। বাবুকে মায়া কোলে নেয়ার আফরোজা যেন হাফ ছেড়ে বাচলো…! বাসার সবাই সকালে খাওয়াদাওয়া করেই গিয়েছে ওর ননদের বাসায়। ওর ছেলে আসিফ একটু অসুস্থ বলে ও বাসায়ই রয়ে গেছে। বাসার সবাই যাওয়ার পর এতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকলেও এখন উঠেই কান্নাকাটি শুরু করেছে। শ্বাশুড়ি থাকলে সেই কান্না থামাতো বাবুর।

কিন্তু এখন একা একা এত চেষ্টা করেও কিছুতেই কিছু করতে পারছিল না আফরোজা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, মায়ার কোলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আসিফের কান্না থেমে গেলো। সে হাত~ পা নেড়ে খেলা করছে এখন। মাঝে মাঝে মায়ার নানারকম ভঙ্গিমার কথা শুনে ফোকলা হাসি দিচ্ছে। কি যে মিষ্টি দেখাচ্ছে আসিফকে..! আফরোজা আর মায়া মুগ্ধ হয়ে দেখছে সেই হাসি। হঠাৎ মায়াকে উদ্দেশ্য করে আফরোজা বলল,
~ কেমনে পারলা বোন? আমি এতক্ষণ যাবত ট্রাই করে হাফিয়ে গেছি…অথচ কান্না থামতেছে না! আর তুমি ২ মিনিটেই কি ম্যাজিক করলা যে কান্নাই থেমে গেলো..!
মায়া ঠোঁটের কোণায় সেই মিষ্টি হাসির রেখাটা টেনে বলল,

~ আমার ভাইগ্নারে দেখছেন না? ওরে ছুড বেলা থেইকা আমিই পালছি। আমিও তহন ছুডোই আছিলাম। তাও ওর যতরকম ঝামেলা আমারই পোহান লাগছে। অইখান থেইকাই বাচ্চা সামলাবার অভ্যাস হইয়া গেছে। এহন যেকোনো বাচ্চাই হাজার কানলেও আমার কাছে আইয়া ঠান্ডা হইয়া যায়। হাহাহা…!”
~ তোমার হাসিটাও খুব মিষ্টি বোন…! কি যেন নাম তোমার?
~ আমার নাম মায়াবতী। বেক্কেই মায়া কয়।

~ বাহ…মায়াবতী। আমি কিন্তু তোমাকে মায়াবতীই ডাকবো।
~ সত্যিই? আমারে কেউ মায়াবতী ডাকলে আমার খুব ভাল্লাগে। কিন্তু কেউ ডাকে না মায়াবতী। শুধু আমার আব্বায় নাকি ডাকতো। আর স্কুলের এক স্যার ডাকে।
~ আচ্ছা….আজ থেকে আমিও ডাকবো। খুশি?

মায়ার ঠোঁটের হাসির রেখাটা আরো বড় হল। সে খুশিতে যেন আত্নহারা হয়ে বলল,
~ হ হ…খুউউউউউব খুশি ভাবি।”
~ উফফ মায়াবতী…..! আমি তোমাকে নতুন করে কথা বলা শেখাবো। এভাবে তুমি কথা বলবে না। আমার মত করে কথা বলবে।
~ মানে?

~ আগে বল কয়দিন আছ ঢাকায়?
~ জানি না তো।
~ জানি না বললে তো হবে না। ঠিক আছে….১৫ দিনের আগে তুমি যেতে পারবে না। বুঝছ?
~ ক্যান ভাবি?

~ তোমাকে আমার ভালো লেগেছে তাই। তুমি ১৫ দিন থাকবা ঢাকায়। এই ১৫ দিন আমার সাথে গল্প করবা, আমার বাবুর সাথে খেলবা। ঠিক আছে?
মায়া ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আফরোজার দিকে। যেন তার কথাত আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না…! ওকে এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আফরোজা ওকে ডাকলো,
~ এই মায়াবতী? কি হল? বুঝো নি আমার কথা?

~ আপনে খুব সুন্দর কইরা কথা কন ভাবি।
~ হ্যা, আর এইরকম সুন্দর করে তোমাকেও কথা বলতে হবে। তুমি স্কুলে পড় না?
~ হ পড়ি। ক্লাস সিক্সে উঠছি।

~ পড়ালেখা শিখতেছ অথচ সুন্দর করে কথা বলতে শিখবে না;তা কি হয়? এত সুন্দর দেখতে তুমি, আজ বাদে কাল শিক্ষিতা হবে। তখন মানুষের সামনে এরকম করে কথা বললে মানুষ কি বলবে বল? এখন থেকেই আমার সাথে প্রেকটিস করে আমার মত সুন্দর করে কথা বলার। ঠিক আছে?
মায়া সবগুলা দাঁত বের করে উৎসাহের সাথে বলল,
~ আইচ্ছা ভাবি।

~ আইচ্ছা ভাবি কি? বল যে, আচ্ছা ভাবি। বল….
~ আচ্ছা ভাবি।

পর্ব ৯

সেদিন মায়া একবারে আসরের আজান দেয়া অবদি আফরোজার সাথে থাকলো। আসিফকে মায়া নিজেই ঘুম পাড়ালো। তারপর আফরোজার সাথে বসে বসে কত শত গল্পই যে করলো হিসেব নেই…!
নিজের জীবনের সুখ~ দুঃখের গল্প বলল, আফরোজার জীবনের সুখ~ দুঃখের গল্প শুনলো। আফরোজার বলা কথাগুলো ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। আফরোজার কথা বলার মাঝখানে আফরোজাকে থামিয়ে দিয়ে মায়া বলল,

~ জানেন ভাবি? আমাগো গেরামে__
মায়াকে থামিয়ে দিয়ে আফরোজা বলল,
~ আমাগো গেরামে মানে কি মায়াবতী? বার বার ভুলে যাও কেন তুমি?

বল, আমাদের গ্রামে…
~ আমাদের গেরা~ গ্রা মানে আমাদের গ্রা~ আ~ মে একটা বাইত্তে মানে বাড়িতে টিভি আছে। মাসে একদিন সিনামা হয়। সিনামার নাইকা রা যেমনে কথা বলে আপনিও অমনেই কথা বলেন। খুব সুন্দর শুনা যায়। খালি শুনতেই মন চায়…!
~ হাহাহা…শুধু শুনলেই হবে না। শিখতেও কিন্তু হবে। মনে রাখবা এটা সবসময়।

তারপর মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে আফরোজা মায়াকে জিজ্ঞেস করলো,
~ তোমার বিয়ে টিয়ে দেবে না?
~ বিয়া…..!
~ বিয়া না বিয়ে। দেবে না?
~ নাহ….মা কইছে লেখাপড়া করাইবো।

আফরোজা এবার কঠিন হয়ে বলল,
~ তুমি আমার সাথে কথা বলবে না। যাও এখান থেকে।
মায়া অবাক হয়ে গেলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আফরোজার দিকে তাকাতেই আফরোজা বলল,
~ তুমি পারোও না। আর চেষ্টাও করো না..!

~ ভাবি….হুট কইরা কি আর একদিনে সব পারা যায়?
~ একদিনে পারা যায় না। তাই বলে চেষ্টাও করবা না?
~ আমার শরম করে ভাবি।

~ আমার সামনে এত লজ্জা~ শরম পাওয়া লাগবে না আপনার। আপনাকে যা বলছি তাই শুনেন।
~ আচ্ছা ভাবি।
~ ওকে….এখন শুনো…তোমার আম্মাকে বলবা আমার সাথে এসে দেখা করতে। ঠিক আছে?
~ আচ্ছা ভাবি।

~ আমার বড় ভাই ৪ টা। ২ টা বিয়ে করেছে। দুইটা এখনো অবিবাহিত। সেজো ভাইয়ের জন্য পাত্রী খুজতেছে। আমাদের ৪ ভাইয়ের জন্য আব্বা ঢাকায় ৪টা বাড়িই করেছে। সব ফ্ল্যাট বাসা। ৪ টা বাড়িই ৩ তলা পর্যন্ত করেছে। সবগুলারই ছয়তলার ফাউন্ডেশন। আস্তেধীরে করবে। আমার শ্বশুরবাড়ির তুলনায় বাবার বাড়ির অবস্থা হাজার গুন ভালো। প্রেম করেছিলাম তোমার ভাই এর সাথে। তাই আব্বা বাধ্য হয়েছিলেন এই জায়গায় বিয়ে দিতে। তা না হলে এমন জায়গায় আমাকে কখনো আব্বা বিয়ে দিতো না। আমার সেজো ভাই সরকারি চাকরী করে অনেক বড় পোস্টে। মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতন। বুঝছ?

মায়া মাথা নেড়ে জানালো যে সে বুঝেছে। আফরোজা আবারো বলতে শুরু করলো। সেজো ভাইয়ের ব্যাপারে এত্ত এত্ত গল্প। সেজো ভাইয়ের গল্প শুনতে শুনতেই আসরের আজান দিয়ে দিলো। মায়া নামাজ পড়বে বলে সেখান থেকে উঠে চলে আসলো। কেমন যেন ওর অন্যরকম ভালো লাগছে আফরোজা ভাবির সাথে কথা বলে। বীনা আপা আগে যে বাসায় ভাড়া থাকতো সেই বাসায় বাড়িয়ালীর ধারের কাছেও যাওয়া যেতো না। সেই বাড়িয়ালী কখনো ভালো ব্যবহার করতো না ভাড়াটিয়াদের সাথে। এমন ভাব দেখাতো মনে হতো যে, ভাড়াটিয়ারা তার আশ্রয়ে আছে সেখানে। ভেতরে অহংকার ভর্তি ছিল।

অথচ আফরোজা ভাবি তার ঠিক উলটো। কত্ত সুন্দর করে আপন করে নিলো তাকে..! আর তারপর শুদ্ধ ভাবে কথা বলা শেখানোর কি প্রচেষ্টা তার..! কিন্তু ভাবির সামনে অমন করে নায়িকাদের মতো করে কথা বলতেই তো লজ্জা লাগে। আচ্ছা, বিবেকের সাথে একটু শুদ্ধভাবে কথা বলার প্রেকটিস করলে কেমন হয়? বিবেক নিশ্চয়ই খুব মজা পাবে…!

মায়া তারাতারি অজু করে নামাজ পড়ে নিলো। তারপর রেহানাকে বলল যে,
~ মা, বাড়িয়ালার পোলার বউ তুমারে দেখা করতে কইছে।
~ কিহহহ….ক্যান?
~ যাইয়াই দেহো…এহনই যাও।

রেহানা একটু আতঙ্কিত হলো। তার জানামতে সে কোনো উলটা পালটা কিছু করে নি যার জন্য ডেকে পাঠাবে। তবে কি মনের অজান্তেই কোনো ভুল টুল করে ফেলেছে? ভয়ে ভয়ে সে গেলো আফরোজার কাছে। সাথে নিয়ে গেলো বীনাকেও। এদিকে মায়া বিবেকের সাথে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার খেলা শুরু করে দিলো। বিবেককে বলল,
~ বিবু…চল আমরা সিনামা সিনামা খেলি। হ্যা?

~ সিনামা সিনামা খেলে কেমনে?
~ আরে, সিনামায় দেহোস না কত সুন্দর কইরা কথা কয়? অমনে কথা কমু আমরা। আমি হইলাম তোর মা। আর তুই আমার পোলা। আয় খেলা শুরু করি।
বিবেক বেশ মজা পেলো। এরকম খেলা সে আগে কখনো খেলে নি। সে উৎসাহের সাথে খেলতে আসলো। খেলার শুরুতে মায়া বলল,
~ বিবেক….এসো এখন পড়তে বসবে।

বিবেক ওর সিলেট আর একটা চক নিয়ে পড়তে বসে গেলো মায়ার কাছে।
মায়া বলল,
~ আজ কোনো লেখালেখি হবে না। মুখে মুখে পড়াবো তোমারে…তোমাকে।
~ আইচ্ছা…
~ আইচ্ছা না…বল আচ্ছা।

~ হিহিহি…আচ্ছা।
~ তোমার হাত কয়টা?
~ ২ ডা
~ ২ ডা না…বল ২ টা
~ ২ টা
~ হ্যা, তোমার পা কয়টা?

~ ২ টা
~ চোখ কয়টা?
~ ২টা
~ নাক কয়টা?

~ ২ টা
~ হুশ…তোমার নাক দুইটা?
বিবেক এবার দাত কেলিয়ে উত্তর দিলো,
~ না না…একটা।
~ আচ্ছা, এবার বলো তোমার চুলের রঙ কি?

~ কালা…
~ কালা বলবে না। সুন্দর করে বল, কালো।

~ কালো..
~ হ্যা, এবার বলো তো দুধের রঙ কি?
~ সাদো…
~ সাদো আবার কি?
~ কালা মানে কালো, সাদা মানে সাদো।

মায়া বিবেকের যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো। বিবেককে কাছে টেনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে গালে চুমু খেলো। মুহুর্তের মধ্যেই খেলাটা জমিয়ে ফেললো ওরা। ওদিকে আফরোজার সাথে রেহানা আর বীনা দেখা করতে গেলে আফরোজা বিশেষ কোনো কথা বলল না। এমনি টুকটাক আলাপ করলো।
রাতে খাবারের পর আফরোজার শ্বশুরবাড়ির সবাই ওর ননদের বাসা থেকে ফিরলো। রাতে ঘুমানোর সময় আফরোজা হুমায়ুনকে ডাকলো,
~ শুনছ?

~ বল…
~ সেজো ভাইয়ের জন্য আমাদের ভাড়াটিয়া বীনা আপার বোন মায়াবতী কেমন হবে গো?
~ অই যে, অইদিন যে মেয়েটা আসলো অই মেয়েটা?
~ হ্যা হ্যা….দেখছ না?

~ হুম…একবার দেখছিলাম। সুন্দরই তো আছে। কিন্তু কোথায় তোমরা আর কোথায় অই মেয়ে…! পাগল হইছ তুমি?
~ পাগল হব কেন? যেকোনো বিয়েতে পাত্রপক্ষকে আর্থিক অবস্থার দিক দিয়ে পাত্রীপক্ষের চেয়ে উপরে থাকতে হয়।

~ তারপরও মানানসই বলতে একটা ব্যাপার আছে। তোমাদের সাথে ওদের পার্থক্য আকাশ পাতাল।
~ সে হোক, মেয়ে হিসেবে ভালোই মনে হচ্ছে। ভাবতেছি আব্বা, আম্মার সাথে কথা বলব কিনা।
~ তোমার যেইটা ভালো মনে হয়।
~ গ্রামের হাবাগোবা টাইপ মেয়ে মায়াবতী। বউ হিসেবে এসব মেয়েরা পারফেক্ট হয়। একদম কাদামাটির মত। যেভাবে গড়া হবে সেভাবেই গড়ে উঠবে।

~ আমার কিছু বলার নাই। তোমার ইচ্ছা….
আফরোজাও আর কোনো কথা বলল না এই ব্যাপারে। কিন্তু তারপরের দিনই ওর বাবাকে খবর পাঠালো তার সাথে দেখা করার জন্য। বিকেলের দিকে আফরোজার বাবা আসলে বাবাকে ব্যাপার টা খুলে বলে আফরোজা। সবটা শুনে আফরোজার বাবা মায়াকে দেখতে চান। আসিফকে কোলে নিয়ে আফরোজা নিজেই যায় মায়াকে ডাকতে।
~ মায়াবতী? এই মায়াবতী? কই তুমি?

~ আরে ভাবি…আপনি…! ভিত্রে আসেন।
~ না, ভিতরে যাব না। তুমিই বরং আমাদের বাসায় আসো তো একটু।
~ আইতাছি ভাবি।
~ দিবো একটা মাইর।
~ ইশ…ভুল হইয়া গেছে। আসতাছি ভাবি।

আফরোজা আর মায়া দুজনেই একসাথে হেসে দিলো। মায়া আফরোজার পেছন পেছনই আসতেছিল। হঠাৎ আফরোজা পেছনের দিকে তাকিয়ে বলল,
~ তোমার মাকেও আসতে বল তো…
মায়া এবার একটু অবাক হল। আফরোজাকে জিজ্ঞেস করল,
~ ক্যান ভাবি? কি হইছে?
~ আহা….যা বলছি তাই করো আগে। কি হইছে একাই বুঝবা।

মায়া আর কথা বাড়ালো না। গিয়ে ওর মাকে ডেকে আফরোজার রুমে গেলো। আফরোজার বাবা বাথরুমে ছিলেন অই সময়টাতে। মায়া, রেহানা বিছানার উপরই বসেছিল। আফরোজার কোল থেকে আসিফকে নিজের কোলে নিয়ে মায়া এইটা সেইটা বলে দুষ্টুমি করছিল। হঠাৎ আফরোজার বাবা রুমে ঢুকেই সালাম দিলেন। হুট করে কোট~ প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোককে এই রুমে ঢুকতে দেখে রেহানা একটু নড়েচড়ে বসলেন। মায়াও ঘোমটা ঠিকঠাক করে আফরোজার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আফরোজা কিছু না বলে মিষ্টি করে একটা হাসি দিলো।

আফরোজার বাবা সালাম দিয়ে সোফায় বসতে বসতে বিনয়ের সহকারে বললেন রেহানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
~ আমি আকরাম সিদ্দিক। আফরোজার বাবা।

রেহানা অপ্রস্তুতবোধ করছিলেন। একটু হাসির চেষ্টা করে বললেন,
~ জ্বে সাহেব।

আকরাম অট্টহাসি দিয়ে বললেন,
~ সাহেব সাহেব করার কিছু নেই। ভাই ডাকবেন।
~ জ্বে ভাই।

~ ভালো আছেন আপনি?
~ আল্লায় বালাই রাখছে। আপনি কিবা আছুইন?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। এইটা কি আপনার মেয়ে?

~ হ ভাই…আমার ছুড মাইয়া।
আকরাম এবার মায়ার দিকে তাকিয়ে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
~ তোমার নাম কি মা?

মায়াও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। একবার ঢোক গিলে উত্তর দিলো,
~ মায়াবতী।

~ তুমি দেখতেও মা~ শা~ আল্লাহ মায়াবতীই। হাহাহা….
মায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। আসিফ এখনো ওর কোলেই আছে। ওকে হালকা ঝাকুনি দিতে লাগলো। আকরাম সিদ্দিকী এবার নিজের সম্পর্কে, নিজের পরিবারবে সম্পর্কে অনেক কথাই আলাপ করলো রেহানার সাথে। আর রেহানার অবস্থা সম্পর্কেও অনেক কিছু জেনে নিলো। এমনভাবে আলাপ জমালো মনে হল যে, হাজার বছরের পরিচিত কোনো আত্নীয়..!

কথাবার্তার মাঝখানে আফরোজা চা, মিষ্টি, ফলমূল এনে দিলো। সব শেষে আকরাম মায়াকে তার কাছে আসতে বললেন। মায়া একবার ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে ইশারায় অনুমতি কামনা করলো। রেহানা অনুমতি দিলো। মায়া টিপটিপ করে বিছানার কাছ থেকে সোফার কাছে আকরামের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আকরাম বললেন,
~ তোমার ডান হাতের তালুটা দেখি মা?

মায়া হাতের তালু দেখাতে গেলেই ওর হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট গুজে দিলো আকরাম। মায়া হা হয়ে তাকিয়ে রইলো আকরামের দিকে। তাহলে এতক্ষণ যে সন্দেহ টা ওর মনে মনে ঘুরঘুর করছিল সেইটা কি সত্যি?

পর্ব ১০

কিছুক্ষণ সেই ৫০০ টাকার নোটের দিকে তাকিয়ে থেকে মায়া আকরামকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ এইটা কিসের টাকা চাচা?
~ তোমাকে দিলাম। রেখে দাও।
~ কিন্তু আমারে এত টাকা দিবেন ক্যান হুদাহুদি?

~ হুদাহুদি না…তোমাকে আমার ভালো লেগেছে মা।
মায়া এবার মায়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। আর রেহানা তাকালো আকরামের দিকে। আকরাম মৃদু একটা হাসি দিয়ে ইশারায় তাকে শান্ত থাকতে বললেন। আর মায়াকে বললেন,
~ তুমি এবার যাও এখান থেকে মা। তোমার মায়ের সাথে কিছু পারসোনাল কথা আছে।

মায়া নার্ভাস ভঙ্গিতে চলে গেলো। মায়া চলে যাওয়ার পর রেহানা বললেন,
~ ভাইসাব….আমার বড় মাইয়ার মাসিক বেতনই অইলো ৪০০ ট্যাহা। একটা মাস হাড় ভাঙ্গা খাটুনির পরে মাস শেষে ৪০০ ডা ট্যাহা পায়। হেই জাগায় আপনে আমার ছুড মাইয়ারে কোনো কারণ ছাড়াই ৫০০ ট্যাহা দিলেন?

~ কোনো কারণ ছাড়া না বোন। আমি আমার সেজো ছেলের বউ বানাতে চাই ওকে।
~ কি কন আপনে…! আপনের মাথা ঠিক আছে তো?
~ খুব ঠিক আছে। মায়াবতীর মতই কাউকে চেয়েছিলাম আমি।
~ কিন্তু ভাইসাব…ওরে আমি এহন বিয়া দিমু না।

~ ভালো সম্বন্ধ আসলে বিয়ে দিবেন না কেন? আমার ছেলের নামে শহরেই একটা বাড়ি আছে। ছেলে সরকারি চাকরী করে। দেখতে শুনতে ভালো আর ধার্মিক। আপনার মেয়ে যদি বলে সারাদিন আমি একটা কাজও করব না তাও সই। কোনো সমস্যা নেই। এরকম ভালো প্রস্তাব আপনি আর কোথায় পাবেন?
~ যত বালাই হউক…আমার মাইয়ারে আমি লেহাপড়া করামু। তারপর যা হইবার হইবো।
~ লেখাপড়া তো বিয়ের পরও করতে পারবে। এরকম তো না যে আমার বাড়ি হাজার হাজার কাজ;সেগুলো করতে গিয়ে ও আর পড়াশোনার সময় পাবে না।
~ আমারে ভাবতে দেন ভাইসাব। আমি এহনই কিছু কইতে পারমু না।

~ আচ্ছা আচ্ছা…আপনি ভাবেন। সময় নিয়ে ভাবেন। হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে বলছি না। ভালো করে ভেবেই সিদ্ধান্ত নেন। তবে আমি চাই আপনি রাজি হয়ে যান। মায়াবতীকে আমার একটু বেশিই ভালো লেগেছে।
~ আইচ্ছা…এহন আমি আহি?

~ আচ্ছা যান।
~ সালামালেকুম ভাইসাব।
~ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।
রেহানা হন্তদন্ত হয়ে নিজেদেত রুমে আসলো। বীনা তখনও অফিসে। রেহানাকে দেখেই মায়া বলল,
~ মা…? অই ব্যাটা কি বিয়ার কথা কয়?

~ হ…তোরে খুব পছন্দ করছে।
~ আর তুমিও কি রাজি হইয়া গেছ?
~ হুরু নাহ…এত তারাতারি রাজি হমু? আস্তে ধীরেই রাজি হই।

~ কিহহ…আস্তেধীরে রাজি হবা মানে? দেহো মা…তোমারে খোলাখুলি কইয়া রাখতাছি, বিয়া আমি এহন করমু না।
~ বিয়া তো আমিও তোরে দিতে চাই নাই। কিন্তু প্রস্তাব ডা কত বালা দেখছস? আমাগো নাগাল গরীবের মাইয়ার জন্য এত বালা প্রস্তাব আহে? তুই’ই ক?
~ যত ভালোই হোক গা….তাগো তেল মারা কথায় তুমি গললেও আমি গলমু না। এহন এইডা নিয়া আর একটা কথাও কবা না। আর এই নাও তুমার ৫০০ টাকা।

এইটা বলে মায়া ওর হাতের সেই ৫০০ টাকার নোটটা রেহানার হাতে গুজে দিয়ে ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পরল। রাতে বীনা অফিস থেকে ফিরলে বীনাকে সব খুলে বলে রেহানা। সব শুনে বীনা বলে,
~ মা গো…তুমি ভুলেও এইসবে গইলো না। এই ধরনের বড়লোক গো খুব চিনা আছে আমার। কোন মতলবে এত বড়লোক হইয়াও তোমার মত গরীবের মাইয়ারে বিয়া করতে চায় বুঝো না? এহন যতই তেল মারুক…দেখা যাইবো যে বিয়ার পর আসল রূপ বাইর হইবো।
~ কিয়ের আসল রূপ আবার?

~ শুনো মা…থাকো গেরামে। শহরের ভাবসাব তুমি এত সহজে বুঝবা না। শহরের মানুষ গুলা খুব খারাপ। এরা কেমনে কেমনে প্যাচ খাটাইবো বুঝবাই না। আর তারা ভালো ভালো কথা শুনাইতাছে দেইখাই ভাইবো না তারা ভালো মানুষ। অতি ভক্তি কিন্তু চোরের লক্ষণ। ভুইলো না এইটা। আর এত বড়লোক দেইখা বিয়া দেওনের দরকারও নাই। এত বড়লোক ঘরে বিয়া দিলে উঠতে বইতে ট্যাকার গরম দেখাইবো, অপমান করব। আর চেয়ে ভালো পড়াশোনা করতাছে করতে থাইক।
বীনার কথা শুনে রেহানা অসহায় ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বললেন,
~ এত ভালো সম্বন্ধ..!

~ আহা মা….অতি লোভ কিন্তু ভালো না। দেহা গেলো যে, এত বড়লোক ঘরে বিয়া দিলা কিন্তু সংসার টিকলো না হেইডা কি ভালো হইবো?
~ বড়লোকের কাছে বিয়া দিলেই যে সংসার টিকবো না। আর গরীবের কাছে বিয়া দিলেই যে সংসার টিকবো এইডা কেমন কথা? এইডাই যদি হইতো তাইলে তোর সংসার টিকলো না ক্যা?
~ মা..!

বীনা মৃদু চিৎকার করে উঠলো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
~ যা মন চায় করো। আমার কিছু কওয়ার নাই আর।

এটা বলেই বীনা পেছন দিকে মুখ ফিরে শুয়ে পড়লো গুটিসুটি মেরে। কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে ওর। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। রেহানা কি বুঝলো মেয়ের মনের অবস্থা? হয়তো বুঝেছে কিংবা বুঝে নি। সে ডাকলো মেয়েকে খাওয়ার জন্য। বীনা জানিয়ে দিলো যে খাবে না সে। ওদিকে মায়া এশার নামাজ পরে না খেয়েই শুয়ে পরেছে। ঘুমিয়েছে কিনা কে জানে। রেহানা ডাকাডাকি করলো কিন্তু কোনো সাড়া দিলো না মায়া। বিবেক সন্ধ্যায় সময়ই খেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। বাকি রইলো রেহানা নিজে। তার আর খেতে ইচ্ছে করলো না। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পরলো। মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে তার। এমন লোভনীয় প্রস্তাব টা বাদ দিতেও ইচ্ছে করছে না আবার বীনার কথাগুলোকেও অযৌক্তিক মনে হচ্ছে না। কি করবে এবার সে?

হাজার হাজার চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর করতে লাগলো। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় হঠাৎ চাঁন~ মাহমুদের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। চাঁন~ মাহমুদ যেন ওকে বলছে,
~ মায়াবতীরে বিয়া দিয়ো না বীনার মাও। আমার মায়াবতী গাঁয়ের একখান মাইয়াই হইবো। শিক্ষিত মাইয়া;সবার চাইয়া আলাদা।
মাথাটা ঝিম ধরে আসছে রেহানার। সে বীনাকে ডাকলো,
~ বীনা… অই বীনা?

বীনা নিশ্চুপ। রেহানা আবার ডাকলো। বীনা এবারো নিশ্চুপ। রেহানা এবার বীনার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল,
~ কি কই হুন…কাইলকাই সিলাই মেশিন কিনা আনবি। পশুদিন যামু গা বাইত্তে।
বীনা এবার কথা বলল,
~ পশুদিনই যাবা গা?

~ হ। এইখানে থাকলে না পারমু অগো না করবার আর না পারমু হ করবার। তার চেয়ে যাই গা। পরে তুই যেমনে পারোস কাটাইয়া নিস।
~ না করতে সমস্যা কি তুমার? হুদাহুদি তাগো আশায় রাইখা লাভ আছে?
~ আশায় রাখমু ক্যা? আমরা যাওয়ার পর পরই না কইরা দিবি তুই।

~ আইচ্ছা। যা ভালো মনে করো।
তারপরের দিনই জহিরকে সাথে নিয়ে বীনা মার্কেটে গেলো সেলাই মেশিন কেনার জন্য। মায়ারা চলে যাবে শুনে মনটা খারাপ হলো জহিরের। ও ভেবে পায় না যে মায়া কেন ওর সামনে আসে না? কেন জহির অই বাসায় গেলেই এমন বড় ঘোমটা দেয় যে মুখটা একবারের জন্যও দেখা যায় না? এরকম করার মানে কি?

বীনা আপা তো বলছে যে, এমনি মানুষের সামনে দেখা দেয়। অন্যান্য মানুষকে মুখ দেখাইতে পারলে ওকে মুখ দেখাইতে সমস্যা কি? মায়ারা আসার পর তিনদিন অই বাসায় গিয়েছে। এরমধ্যে একটাবারের জন্যও মায়ার মুখ দেখতে পারে নি জহির। এজন্য আরো বেশি আগ্রহ লাগছে অই মুখটা দেখার জন্য। আজ ফ্যাক্টরি ছুটি হওয়ার পর সেলাই মেশিন কিনে জহির বীনাকে বাসায় পাঠিয়ে দিলো। রিকশায় চড়িয়ে দিয়ে বলল,
~ কাল সকালে আমি আইসা খালাম্মা আর মায়ারে গাড়িতে চড়াইয়া দিব নি আপা।

~ তোর আসা লাগব না। আমিই দিমু নি।
~ আমি থাকতে আপনের এত কষ্ট করা লাগব না আপা। আপনে যান এখন।
~ হাহাহা…আইচ্ছা আইচ্ছা।

বীনা চলে গেলো রিকসায় চড়ে। বীনার রিকসা কিছুদূর যেতেই হঠাৎ কি মনে করে জহির আরেকটা রিকসায় চেপে বসলো বীনার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
বীনা বাসায় পৌঁছে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে মায়ার সুর তোলা কন্ঠ শুনা গেলো,
~ কেএএএ?
মায়ার মুখে ‘কে’ শুনে বীনা ফ্যাক করে হেসে দিলো। বলল,
~ কে কে মারাস ক্যা? দরজা খুল।

মায়া সকাল থেকেই উত্তেজিত হয়ে আছে ওর সেলাই মেশিনের জন্য। কখন বীনা আপা বাসায় ফিরবে আর কখন ওর সেলাই মেশিন পাবে? বীনার কণ্ঠ শুনার সাথে সাথেই লাফ দিয়ে এসে দরজা খুলে দিলো। সাথে দাঁত কেলানো একটা হাসি। চকচকে দৃষ্টিটা বীনার হাতে রাখা সেলাই মেশিরের উপর। ওর যেন খুশিতে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে সেলাই মেশিনের দিকে মনে হচ্ছে আজীবনেও এত সুন্দর জিনিস কখনো দেখে নি।

~ এভাবে দরজার সামনে দাঁড়াইয়া পথ আটকাইয়া রাখবেন নাকি ভেতরে যাওয়ার সুযোগ দিবেন?
পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনে মায়া আর বীনা দুজনেই চমকে উঠলো। বীনা এত্ত বড় একটা হা করে জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
~ জহির তুই..!
~ হ্যা আপা। ভাবলাম খালাম্মার সাথে একটু দেখা কইরা যাই।

মায়া এতক্ষণে ঘোমটা ঘামটি দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে ওর। বীনা এসেছে দেখে উড়না কোনোরকমে গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতে গিয়েছিল। দরজা যখন খুললো তখনও তো বীনা একাই ছিল। এই আপদটা কখন আসলো? একদমই চোখে পড়েনি!
ইশ…এতদিন এত আড়ালে আড়ালে থেকে লাভ হলো কি? শেষ অবদি মুখটা দেখেই ফেললো সে। উফ উফ উফ..! মায়ার ইচ্ছে করছে একটা ইট দিয়ে জহিরের মাথায় আঘাত করে মাথাটা ফাটিয়ে ফেলতে।

ওদিকে জহির রুমে ঢুকে মিটিমিটি করে হাসছে। অবশেষে চাঁদমুখখানা দেখার সৌভাগ্য হলো। ভেতরে খুশির জোয়ার বইছে। জহিরের এমন হাসি দেখে মায়ার আরো পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। প্রচন্ড রাগ সামলাতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে জহিরের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলল,
~ শালা মিচকা শয়তান।

পর্ব ১১

জহির রাতের খাবার বীনার বাসায়ই খেলো। খাওয়ার সময় কথায় কথায় আগামীকাল সকালে জহির যে মায়াদের গাড়িতে উঠিয়ে দিতে চায় সেই প্রসঙ্গ উঠলো। মায়া খেতে খেতে বাধা দিয়ে বলল,
~ বড়পা, তুমি যদি গাড়িতে উঠাইয়া দিতে পারো তো দিয়ো। নইলে আমরা একাই উঠতে পারমু।
বীনা বলল,
~ জহির উঠাইয়া দিলে সমস্যা কি?

~ তুমি উঠাইয়া দিলে সমস্যা কি বড়পা?
রেহানা এবার মায়াকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
~ আহ মায়া..! পোলাডা হাউশ করছে আমাগো গাড়িতে তুইলা দেওনের লিগা তো দিক। তোর এত আপত্তি আহে ক্যা?
মায়া এবার আড়চোখে জহিরের দিকে তাকালো। জহির খেতে খেতে মুচকি মুচকি হাসছে। মায়ার মেজাজ টা আবারো খারাপ হয়ে গেলো। তবুও চুপচাপ খেতে লাগলো। আরেকটা দিনই তো। এইটুকু না হয় সহ্য করতে হবে। তারপর তো চলেই যাবে ওরা।

পরের দিন ভোরে নামাজ পড়েই জহির বীনার বাসায় এসে হাজির। এত সকালে জহিরকে দেখে সবাই অবাক হলো। রেহানা বলল,
~ এত সকাল সকাল আইয়্যা পরছ তুমি বাবা?
~ আসলাম খালাম্মা। আবার কবে না কবে আপনাদের সাথে দেখা হইবো কে জানে? তাই ভাবলাম একটু সকাল সকালই যাই। কি নাস্তা করবেন আপনেরা বলেন? আমি বাইরে থিকা কিনা আনি।

~ না না বাবা। বাইরে থিকা কিনা লাগব ক্যা? ভাত রানতে যাইতাছি।
~ আচ্ছা…আপনি তাইলে রান্না করতে থাকেন। আমি বাইরে থিকা ঘুইরা আসি একটু।
জহির বাইরে গেলো। তিন রকমের বিস্কুটের বড় প্যাকেট, এক কেজি চানাচুর, নিমকি, অনেকগুলা পিঁয়াজু, ২টা চিপ্স, অনেকগুলা ক্যান্ডি, অনেকগুলা ললিপপ, জুস নিয়ে বীনাদের বাসায় ফিরলো। ওর হাতে এতকিছু দেখে রেহানা আর মায়া দুজনেই অবাক। বীনা তখন রান্না করতে ব্যস্ত। জহির খাবারগুলো রেহানার হাতে দিয়ে বলল,
~ এগুলা বিবেক আর আপনাদের জন্য। রাস্তায় খাইয়েন।

~ আমাগো কি তোমার রাক্ষস মনে অয়?
জহির একটা অট্টহাসি দিয়ে বলল,
~ কি যে বলেন খালাম্মা! এত কথা বাদ দিয়া রাইখা দেন।
রেহানা খাবার গুলো হাতে নিলো। মায়া জহিরকে রুমে ঢুকতে দেখে রান্নাঘরে বীনার কাছে চলে গেলো। জহির বিবেককে কোলে নিয়ে এটা সেটা বলে দুষ্টুমি করতে লাগলো। যথাসময়ে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বাথরুম থেকে জামাটা চেঞ্জ করে মায়া গেলো আফরোজার কাছে। রুমের বাইরে থেকেই ডাকতে লাগলো,
~ ভাবিইইই….ও ভাবিইই?

আফরোজা আসিফকে কোলে নিয়ে বের হলো। বের হয়েই দেখে গায়ে ভালো পোশাক পরা। আফরোজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল যে,
~ কোথাও যাওয়া হচ্ছে নাকি?
~ হ্যা ভাবি। চইলা যাইয়াছি বাড়িতে।
~ কিহহ, চলে যাচ্ছো?
~ হ্যা ভাবি।

~ তোমাকে আমি বললাম আরো পনেরদিন থাকতে। আর তুমি সেইটা বলার পর পাঁচ দিন হতে না হতেই চলে যাচ্ছো?
মায়া হাসতে হাসতে আসিফকে কোলে নিলো। তারপর বলল যে,
~ আসলে ভাবি স্কুল তো খুলা। তাই আর পারলাম না। মন খারাপ কইরেন না। আল্লাহ বাচাইয়া রাখলে আসমুই তো আবার।

~ ঠিক আছে, কিন্তু এরপরের বার আসার পরও যদি এরকম গ্রাম্য ভাষায় কথা বলতে দেখি তোমার মুখ কিন্তু সুই সুতা দিয়ে সেলাই করে দেবো। মনে যেন থাকে।
কথাটা বলেই আফরোজা হেসে দিলো। মায়াও একটু হেসে বলল,
~ গাঁয়ে গিয়া শহরের মানুষের মত কথা বলতে চাইলে বেমানান লাগব ভাবি।

~ কিন্তু আজ বাদে কাল শহরের বউ যখন হবা তখন তো শহরের মানুষদের মতই কথা বলা লাগবে। সেজন্যই বলছি আগে থেকেই প্রেকটিস করো।
মায়া একটু লজ্জায় মাথা নিচু করলো। কয়েক সেকেন্ড পর আসিফের গালে একটা চুমু দিয়ে আসিফকে আফরোজার কোলে দিতে দিতে বলল,
~ আজ তাইলে আসি ভাবি। বের হমু এখনই।
~ আচ্ছা যাও। খালাম্মাকে বলো আমার সাথে দেখা করে যেতে।
~ আচ্ছা ভাবি।

মায়া রুমে গিয়ে শেষ বারের মতো সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিলো। তারপর সবার সব কাজ শেষ করে এক এক করে রুম থেকে বের হল। রুম থেকে বের হয়ে রেহানা বিবেককে নিয়ে আফরোজাদের সাথে দেখা করতে গেলো। আর বীনা রুমে তালা দিবে বলে তালা খুঁজতে লাগলো। তালা টা হঠাৎ করে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। জহির আর মায়া রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে বীনার জন্য। জহির ভেবেছিল মায়া বোরকা পরে। কিন্তু মায়াকে বোরকা ছাড়া দেখে জহির একটু অবাকই হলো। তাই বীনা যখন তালা খুঁজতে ব্যস্ত তখন এই ফাঁকে চুপ করে মায়াকে জিজ্ঞেস করলো,
~ তুমি বোরকা পর না মায়া?

মায়া একবার জহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই দৃষ্টি অন্যদিকে নিলো। তারপর উদাস ভঙ্গিতে বলল,
~ নাহ, পরি না।
~ কেন পর না?
মায়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
~ সেইটা কি আপনেরে কওয়া লাগব?

জহির অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মায়ার দিকে। তারপর অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
~ তুমি সবসময় আমার সাথে এমন কর কেন? এমন ভাবে কথা বল আমার সাথে মনে হয় আমি তোমার শত্রু।
~ আপনেরে যে আমার সহ্য হয় না সেইটা আপনে বুঝেন না?

~ সহ্য হয় না কেন? কি করছি আমি?
~ গায়ে পরা লোক আমার পছন্দ না। আমারে খুচানো বাদ দেন।
এটা বলে মায়া কাপড়ের একটা ব্যাগ নিয়ে গেটের দিকে এগুতে লাগলো। জহিরের মনটা খারাও হয়ে গেলো। মায়া ওকে গায়ে পরা লোক বলল? অথচ ওদের গ্রামের কত মেয়েরা, ফ্যাক্টরির কত মেয়েরা জহিরের জন্য পাগল;কিন্তু জহির ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। সেই জহিরকে মায়া গায়ে পরা লোক বলল?

সত্যিই কি জহির মায়াকে একটু বেশিই বিরক্ত করছে? মায়াকে তার ভালো লেগেছে। তাই বলে সে মায়ার বিরক্তির কারণ তো হতে চায় না। এসব ভাবতে ভাবতে জহির মায়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো পলকহীন দৃষ্টিতে। এর মধ্যে বীনা তালা খুঁজে বের করে তালা লাগিয়েও ফেলেছে। তালা লাগানো শেষে জহিরকে এভাবে মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বীনা জহিরকে ডাকলো,
~ অই জহির…অইভাবে কি দেখোস?

জহির কিছুটা চমকে উঠলো। তারপর দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
~ কিছুনা আপা….চলেন তারাতারি বের হই। নইলে লেট হইয়া যাবে।
~ হ চল।

মায়ারা ২ টার দিকে বাড়িতে পৌঁছালো। বাড়িতে এসে দেখে রঞ্জু উঠোনে বসে কান্না করছে। কান্নাকাটিতে হেচকি উঠে গেছে। মায়া, রেহানা দুজনেই অবাক হলো। রেহানা দৌড়ে এসে ভাইয়ের পাশে বসলো,
~ অই রঞ্জু? কি অইছে তোর? কান্দস ক্যা?

রঞ্জু কান্না করেই চলেছে। কথা বলে না। রেহানা আবারো জিজ্ঞেস করলো কান্না করছে কেন? কিছুক্ষণ পর কান্না কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনে রঞ্জু অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
~ তোরা আইছস ক্যা? ঢাকা শহরেই থাইকা যাইতি সারাজীবন।

~ হুর পাগল। এমন করতাছস ক্যা তুই? তোর কি একলা থাকতে অসুবিদা অইছে?
~ কেউ আমারে পেট বইরা বাত দেয় নাই।

এটা বলে মাথা নিচু করে রঞ্জু আবার বাচ্চাদের মতো কান্না করতে শুরু করলো। রেহানা আর মায়া দুজনেই রঞ্জুর এরকম কথা শুনে অবাক হয়ে গেলো। জায়েদার কাছে সাত দিন খাওয়া যায় এমন পরিমাণ চাল দিয়ে গিয়েছিল রেহানা রঞ্জুকে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য। এরপরেও এভাবে খাওয়ায় কষ্ট দেয়ার মানে কি?

ঠিক কতটুক ক্ষুধা লাগলে এভাবে ক্ষুধায় কান্না করে মানুষ? এমনিতেই একটু পাগলা ধরনের মানুষ রঞ্জু। তার উপর এভাবে অবুঝের মত কান্না করতে দেখে রেহানার চোখে পানি এসে গেলো। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
~ ঘরে তো মুড়ি আছিল…খাস নাই ওগুলা?
~ একদিন খাইছিলাম। খাইয়া মাচার উপর মুড়ির টিন রাইখা দিছিলাম। পরের দিন মুড়ি খাওয়ার লিগা টিনের মুখ খুইলা দেহি মুড়ি নাই। মনে অয় চোরে মুড়ি নিয়া গেছে গা।

~ কিহহ…চোর? কি কস? চোর আইবো ক্যা? ঘরের দরজা আটকাইয়া রাহোস নাই?
~ রাকছিলাম তো। ঘরের দরজা বালো কইরা নাগাইয়াই ঘুমাইছিলাম। অইদিন মধ্যে রাইতে ক্যারা জানি ডাক দিলো আমারে। আমি দরজা খুললাম। অমনেই ও আমার মুখ চাইপা ধইরা মুখ কাপড় দিয়া বাইন্দা রাখলো। তারপর হাত~ পাও বাইন্দা রাইখা পুরা ঘর লুট কইরা নিয়া গেলো।

~ কিহহ..!
রঞ্জু এবার কান্নার রেশ আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
~ আমার কুনো দোষ নাই আফা।

রেহানা, মায়া দুজনেই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো রঞ্জুর দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর রেহানা দৌড়ে ঘরে ঢুকে মাচায় উঠলো। মাচায় ধানের গোলায় রাখা ধানের নিচে একটা হাড়ির ভিতরে জমানো এক হাজার টাকা লুকিয়ে রেখেছিল রেহানা। গিয়ে দেখে গোলায় একটা ধানও নেই, সেই হাড়িও নেই আর টাকাও নেই। সে মাথায় হাত দিয়ে মাচার উপরই ঠাস করে বসে পরলো। দীর্ঘ ৪ বছর ভরে এক টাকা, দুই টাকা করে জমিয়ে জমিয়ে অই হাজার খানেক টাকা হয়েছিল। সেইটাও গেলো। আর সারাবছর খাওয়ার জন্য যে ধান রেখেছিল সে ধানগুলোও গেলো। কি হবে এবার?

পর্ব ১২

জহির বীনা আর মায়ার জন্য দুইটা বোরকা কিনেছে। অবশ্য এখানে মায়াকে বোরকা দেয়াটাই মূল উদ্দেশ্য। শুধু মায়াকে দিলে সন্দেহ জাগতে পারে তাই বীনার জন্যও কিনেছে। লাঞ্চ টাইমে খাবার খেয়ে বীনা বিশ্রাম নিতে নিতে ওর এক কলিগের সাথে আলাপ জুড়ে দিয়েছিল। এই সময় জহির শপিং এর ব্যাগ টা বীনাকে দিয়ে বলল,
~ আপা এইটা রাখেন তো।
~ এইডাতে কি?

~ কি সেইটা পরে বলমু নি। এখন খুইলেন না। রেখে দেন অমনেই।
বীনা আর কিছু বলল না। টিফিন কেরিয়ারের পাশেই রেখে দিলো। ফ্যাক্টরি ছুটির পর জহির এসে বীনাকে নিয়ে একসাথে ফ্যাক্টরির বাইরে বের হলো।
রাস্তায় দুজনে একসাথে হাটতে হাটতে বলল,
~ বীনা আপা? অই শপিং ব্যাগের ভিতরে আপনার আর মায়ার জন্য দুইটা বোরকা আছে।

জহিরের কথা শুনে বীনা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো রাস্তাতেই। বীনাকে দাঁড়িয়ে পরতে দেখে জহিরও দাঁড়ালো। বীনা বলল,
~ আমার আর মায়ার জন্য বোরকা আনছস মানে কি?
~ আপনি বোরকা পরেন না। মায়া এত পর্দা করে অথচ বোরকা নাই ওর। তাই ভাবলাম দুইজনরে দুইটা বোরকা উপহার দেই। আমারো সওয়াব হইবো আর আপনেরাও খুশি হইবেন।
বীনা এবার হাটতে হাটতে বলল,
~ তোর কি মনে হয় আমি খুশি হইছি?
~ ছোট ভাই বড় বোনরে কিছু দিলে বড় বোন খুশি হইবো না?

বীনা এবার আড়চোখে জহিরের দিকে তাকালো। জহিরের হাসিমুখটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। নূর ঝরছে সেই চেহারা থেকে। বীনার মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেলো। জহির আবার বলল,
~ আপা? মায়ারে কিন্তু বলবেন না এই বোরকা আমার তরফ থেকে। এইটা বললে ও অন্যভাবে নিতে পারে। যেইটা আমি চাই না। তাই বলি যে, আপনে আমার কথা কিছু বললেন না। বুঝাবেন যে, আপনেই কিনা দিছেন ওরে।

বীনা এবার জবাবে জহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উপর~ নিচ মাথা নাড়িয়ে ইশারায় বুঝালো যে, সে মায়াকে এসব কিছুই বলবে না।
তারপর প্রায় একবছর চলে যায়। জহির এক শুক্রবারে বীনার বাসায় এসে বীনার হাতে রান্না খাবে বলে আবদার করে। এটা নতুন কোনো আবদার না। প্রায়ই এমন করে। কিন্তু অইদিন জহির নিজেই সব বাজার করে আনে। ২ কেজি গরুর মাংস, এক কেজি পোলাও এর চাল সহ যেভাবে যা লাগে সব নিয়ে এসে তারপর আবদার জানায় রান্না খাওয়ার। বীনা কিছুটা অবাক হয়ে বলে,
~ রান্না খাইতে চাইছস ভালো কথা। কিন্তু বাজার করছস ক্যান? কি খাইতে চাস আমারে কইলে কি আমি খাওয়াইতাম না?

~ আপনি আর আমি একই তো হইলাম আপা। যান রান্না করেন। ভালো কইরা রান্না করবেন।
বীনা একটু অভিমানী সুরে বললেন,
~ ক্যান…এমনি কি খারাপ রান্দি আমি?

~ হাহাহা…আমি কি সেইটা বলছি? তবে আজকের পরে হুটহাট কইরা এমন আবদার করার আর সুযোগ হইব না আপা।
বীনা অবাক হয়ে গেলো জহিরের কথায়। অবাক চোখে জহিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কাহিনি কি? খুইলা বল।
~ আপা, বিদেশ চইলা যাবো ভাবতাছি।
~ কিহহ….বিদেশ যাবি?

~ হ আপা…যাওয়ার বন্দোবস্ত সব হইয়া গেছে।
~ কবে কি করলি? আমারে আগে জানালিও না?
~ ভাবছিলাম একবারে জানাই। তাই জানাইলাম একবারেই।
~ কবে যাবি গা?
~ ঢাকায় এই মাসটাই আছি আপা। মার্চের ৯ তারিখে ফ্লাইট।

বীনা ম্লান হেসে বলল,
~ মাসের শেষের দিক এহন। ২৮ দিনের মাস। তার মানে আছস আর ২~ ৪ দিন?
~ হুম আপা।
~ বাহ.. ভালোই। তুই বয়। আমি রান্দার বন্দোবস্তো করি।
বীনার একটু মন খারাপ হলো। মন খারাপ করে রান্নার আয়োজন করতে গেলো। জহির বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় একটা বই পড়তে লাগলো।

২ মাস পর,
জহিরের চিঠি এসেছে বীনার কাছে। জহির সৌদি আরব যাওয়ার পর এই প্রথম প্রথম চিঠি দিলো বীনাকে। খুব উৎসাহ নিয়ে বীনা চিঠি খুললো। আজ পর্যন্ত দেশের বাইরে থেকে কখনো কেউ চিঠি দেয় নি বীনাকে। দেবেই বা কিভাবে? দেশের বাইরে তো কেউ থাকে না ওর। খুব উত্তেজনা অনুভব করছে বীনা।

চিঠির শুরুতে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে জহির মূল প্রসঙ্গে চলে এসেছে। মূল প্রসঙ্গ টা ছিল এরকম,
“আপা…আমি জানি না আপনি আমার কথাবার্তা, ব্যবহারে কিছু বুঝিয়াছেন কিনা। আপনার সামনে দাঁড়াইয়া সরাসরি কিছু বলার সাহস হয় নি আমার। তাই ভেবে রেখেছিলাম যে চিঠিতেই লিখে জানাইবো। আসলে আপা, আপনি কিভাবে নেবেন জানি না।

তবুও বলতেছি, আপনার ছোট বোন মায়াবতীকে আমার ভালো লাগে। আর আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। শুনেছি ওকে আপনারা এখন বিয়ে দেবেন না;লেখাপড়া করাবনে তাই অতটা চিন্তাও হয় নি ওকে নিয়ে। তাই সেভাবে কিছু বলার প্রয়োজনও মনে হয় নি। কিন্তু এখন যেহেতু দেশের বাইরে চলে আসছি;তাই বলেই দিলাম। মায়াবতীকে আমি বিয়ে করতে চাই আপা। আমি দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত আপনি ওকে বিয়ে দেবেন না। আমার মায়াবতীকে আপনি আমানত স্বরুপ রেখে দিবেন। আজ আর নয়।”

চিঠিতে এরকম কিছু পড়ে বীনা মোটেও অবাক হয় নি। জহিরের চালচলন, কথাবার্তায় অনেক আগে থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে, মায়াকে জহিরের পছন্দ। কিন্তু যত যাই হোক, জহিরের সাথে মায়ার বিয়ের কথা ভাবতেও পারে না বীনা। মায়ার জন্য জহিরের চেয়েও অনেক ভালো ভালো জায়গা থেকে সম্বন্ধ আসে। সেগুলো রেখে জহিরের সাথে বিয়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনি জহির দেখতে শুনতে যত ভালোই হোক না কেন;মায়ার যোগ্য না সে। আর তাছাড়া জহিরদের দেশের বাড়িও মায়াদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে।

গাড়িতে গেলেও ৪ ঘন্টা খুব ভালো করেই লাগবে। মায়াদের বাড়ি ঘাটাইলের একটা গ্রামে। আর জহিরদের বাড়ি নাগরপুরের একটা গ্রামে। টাংগাইলের মতো এত বড় জেলার দুইপ্রান্তে দুজন। সম্ভবই না এইটা। বীনা চিঠির উত্তর দিলো,
“তোর চিঠির উত্তর কি দেব বুঝিতেছি না। আমাকে ভাবিতে হবে। তবে, সব চিন্তাভাবনা করার পর ইতিবাচক কোনো উত্তর তোকে আমি দিতে পারব বলে মনে হয় না।

তুই যেমন আমার ছোট ভাই, মায়াও আমার ছোট বোন। তোদের বিয়ের কথা আমি ভাবিতেও পারি না। তাই অনুরোধ করব যে, মায়ার কথা অতো মাথায় রেখে মাথা নষ্ট করিস না। ভালো থাকিস।”

এরপরে আর কোনোদিন জহির কোনো চিঠিতে মায়াকে নিয়ে কোনো কথা বলে নি। এদিকে মায়া মায়ার মতো নিজ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জহিরের দেয়া বোরকা টা বীনা এনে দিয়েছিল ওকে। অইটা পরেই স্কুলে যেতো মায়া। কিন্তু অইদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য বোরকা পরতে গিয়ে দেখে যে বোরকা টা যেখানে রেখেছিল সেখানে নেই। খুঁজতে খুঁজতে দেখে যে, মাচার নিচে পরে আছে বোরকাটা। হঠাৎ মায়ার বুকটা ধক করে উঠলো। তারপর মনে মনে যে কু ডাকছিল সেটাই দেখতে পেলো। এক রাতের ভেতর বোরকাটার এখানে সেখানে ইঁদূরে কেটে রেখেছে। মায়া চিল্লিয়ে মাকে ডাকে,
~ মা…? ও মা?
রেহানা মায়ার কাছে আসতেই কান্না করে ফেললো মায়া।

~ ও মা…? এইটা কেমনে হইলো? অই তারের উপর ঝুলাইয়া রাখছিলাম বুরকা। নিচে কেমনে পরলো? এখন আমি স্কুলে যামু কি পইরা?
রেহানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। মেয়ের এমন কান্না দেখে কি করবেন সেইটা যেন বুঝে উঠতে পারলেন না। কিছুক্ষণ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর রেহানা মেয়েকে সান্ত্বনার স্বরে বললেন,
~ কান্দিস না মা। দর্জি কাম কইরা ট্যাহা তো জমাসই। এহন ট্যাহা জমাইয়া আরেকটা কিনতে পারবি।

~ সেইটা না হয় পারমু। কিন্তু এখন কি পইরা যামু? এতদিন বুরকা পইরা গেছি। এখন যদি বুরকা পইরা না যাই সবাই টিটকারি করবো।
~ অই, তোর কি বুরকা পরার বয়স অইছে? স্কুকের কয়ডা মাইয়া বুরকা পইরা যায় যে তোরে বুরকা ছাড়া না দেখলে মাইনষে টিটকারি করব?
~ হুরু… তুমি বুঝবা না।

মায়া ঠাস করে চকির উপর শুয়ে ফুপাতে ফুপাতে কাদতে লাগলো। যখন প্রথম প্রথম স্কুলে মায়া বোরকা পরে যেতো তখন ওর সহপাঠী, বড় বোনেরা এমনভাবে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো যেন ভূত দেখছে..! প্রায় সবাই’ই ওকে জিজ্ঞেস করতো,
~ স্কুলের বড় বড় মাইয়ারা বুরকা পরে না। তুমি এত ছোট হইয়া বুরকা পরো ক্যা?
মায়া শুধু মুচকি হাসতো। কোনো জবাব দিতো না। অনেকে আবার বলতো,
~ বুরকা পইরা এত হুজুরনি হওয়ার দরকার কি? মনের পর্দাই বড় পর্দা।

মায়া এসব কথার পাত্তা দিতো না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওকে সবার চেয়ে আলাদা চোখে দেখতেন, আদর একটু বেশি করতেন;এটাও অন্যান্যদের সহ্য হতো না। মায়ার সাথে কেউ এত সহজে মিশতে চাইতো না। হিংসা করতো ওকে।
মায়া যদি এখন বোরকা ছাড়া স্কুলে যায় তাহলে সবাই এখন আবার উলটা কথা শুনাবে। সেইটাকেই ভয় করছে মায়া।

কিছুক্ষণ শুয়ে অভাবে কান্না করে মায়া উঠে স্কুলে ড্রেস পড়ে বড় একটা উড়না দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে উপর দিয়ে বোরকার সাথে থাকা এক্সট্রা যে নিকাব টা ছিলো সেইটা পরে স্কুলে গেলো। স্কুল ড্রেসের সাথে এরকম নিকাব পরায় অদ্ভুত দেখাতে লাগলো মায়াকে। রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় থেকে স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত অনেক পিন মারা কথাই শুনতে হলো ওকে। কিন্তু মায়া দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলতে লাগলো,
~ আল্লাহ…আমারে সহ্য করার ক্ষমতা দেও। সহ্য করার ক্ষমতা দেও।

হঠাৎ সামনে থেকে একটা মেয়ে হাসতে হাসতে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
~ পর্দাশালী আইজকা নেংটা হইয়া আইছে ক্যা রে?

এরকম কথা শুনে মায়ার মেজাজ প্রচন্ড রকমের চড়া হয়ে গেলো। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে বুলবুলি। ওদের পাশের পাড়াতেই থাকে। মায়া রেগে গিয়ে বুলবুলির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরতো। অমন মিনমিনে স্বভাবের মেয়ের এরকম ব্যবহার হজম করতে বুলবুলি ও বুলবুলির সাথে থাকা ওর বান্ধবী পারুলের হজম হলো না।

বুলবুলি চোখমুখ শক্ত করে হাত ঝটকা দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারলো না। না পেরে ধমক দিয়ে বলল,
~ তোর সাহস তো কম না। আমার হাত ধরছস..!
মায়া দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলল,
~ সাহসের দেখছেন কি বুলবুলি আপা?

এখন যে কথা কইলেন অইটা হেড সারের কাছে গিয়া বলবেন। চলেন।
মায়া বুলবুলিকে টেনে প্রধান শিক্ষকের রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। বুলবুলি, পারুল দুজনের এত বাধাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। মায়া মায়ার মতো প্রধান শিক্ষকের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বুলবুলির হাতটা ধরে।

পর্ব ১৩

~ অই মায়া? এহনো ঘুমাস নাই তুই? বাজে কয়ডা?
~ ঘড়ি নাই। বুঝমু কেমনে?
~ রাইত কি পোহাইছে না?
~ রাত পোহাইলে কি অন্ধকার থাকে?

~ না থাউক…এক ঘুম পাইড়া উঠলাম। রাইত এহনো না পোহাইলেও দেরি নাই রাইত পোহানোর। তুই এহনো হারকেন জ্বালাইয়া বই নিয়া বইয়্যা রইছস ক্যা এই শীতের মদ্দে?
~ পড়া শেষ হয় নাই মা। কাল শুক্রবার আছে। দিনে ঘুমামু নি আমি। তুমি ঘুমাও।
~ এমনে কইরা রাইত জাইগা পড়লে অসুখে পড়বি। তহন চিকিৎসা করব ক্যারা? ঘুমা এহন…দিনে পড়িস নি আবার।
~ আইচ্ছা….তুমি ঘুমাও। আমি এই পেজ পইরা আসি।

রেহানা বেগম আর কথা না বাড়িয়ে আবার কাথার নিচে ঢুকলেন। মিনিট দুয়েক পরেই তার মৃদু নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলো মায়া। শব্দটা শুনে ফ্যাক করে হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না এই ভেবে যে মায়ের ঘুমটা আবার ভেংগে যাবে। রেহানার ঘুমগুলো বড্ড অদ্ভুত মনে হয় মায়ার কাছে। এত দ্রুত যে কেউ এত গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারে সেইটা রেহানাকে না দেখলে মায়া হয়তো বা জীবনে বিশ্বাসই করত না। আবার ঘুম ভাংগেও তাড়াতাড়ি। হালকা একটু মশা মারার শব্দেও চমকে উঠেন উনি। উনার এই অবস্থা দেখে বই পড়তে পড়তে মাঝদুপুরে কতবার যে মায়া উচ্চশব্দে হেসে উঠেছে তার হিসেব নেই। মায়া কিছুক্ষণ মশারির ভেতরে শুয়ে থাকা মায়ের আবছা দৃশ্যমান মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বইয়ে ডুব দিলো।

মেট্রিক পরীক্ষার আর মাত্র ২ মাস বাকি। কনকনে শীতের রাত্রি। চৌকির পাশেই টেবিল আকারে বাশের মাচাল পাতানো হয়েছে। মাচাল টা পড়ার টেবিল হিসেবে ব্যবহার করে মায়া। পুরোনো একটা আধছেড়া কাথার ভেতর ঢুকে পড়ছিল মায়া। নিস্তব্ধ রাত….বাইরে থেকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কয়েকটা শেয়াল ডাকার আওয়াজও আসছে। একটা ইংরেজি প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করার চেষ্টা করছে। ইংরেজি তে সে খুব একটা ভালো না। অংকতেও বেশ কাচা। কোনো প্রাইভেট টিচারও রাখার সামর্থ নেই ওর যে ওকে এসব জটিল সাবজেক্ট গুলো সহজ করে বুঝিয়ে দিতে পারে। ওদিকে ওদের স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষক;যিনি মায়াকে মেয়ে বানিয়েছিলেন তিনিও মাস ছয়েক আগে হঠাৎ করে মারা গেলেন। যার ফলে তাঁর কাছ থেকে লেখাপড়ার ব্যাপারে যে সহায়তা গুলো মায়া পেতো সেগুলো থেকেও বঞ্চিত হয়ে অনেকটা কোণঠাসায় পরে গিয়েছে মায়া।

হারিকেনের আলো টা প্রায় নিভু নিভু করছে। ঘরে এক ফোটা কেরোসিনও অবশিষ্ট নেই। বীনা গত দুইমাস যাবত একটা টাকাও পাঠাচ্ছে না। ওর কি এক সমস্যা হয়েছে যার জন্য তিন মাস টাকা পাঠাবে না বলেছে। যার ফলে টাকার অভাবে কেরোসিনটাও ঠিকমতো কেনা হচ্ছে না। হারিকেনের আলো প্রায় নিভে আসছে অথচ প্যারাগ্রাফটার অর্ধেকটাও এখনো মুখস্থ করতে পারল না সে…! শীতে কনকন করে কাপছে অথচ একটা পুরোনো পাতলা শাল আর একটা সোয়েটার ছাড়া কোনো গরম কাপড় নেই ওর। এই মুহুর্তে এই শীতের রাতে আর বসে থাকার কোনো মানে হয় না। ও মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রেহানা ৩~ ৪ টা পুরোনো কাথা একসাথে গায়ের উপর দিয়ে শীত নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। ওদের কোনো লেপও নেই।

একটা লেপ গতবছরও ছিলো। কিন্তু সেইটাও সেজো মেয়ে মিনার শ্বশুর বাড়ির জোড়াজুড়িতে মিনা নিয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ এদিকে শীতের কষ্ট করতে হচ্ছে সবাইকে। বিবেক এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে। সে তার রঞ্জু নানার সাথেই ঘুমায়।
যাই হোক, মায়া হারিকেনটা নিভিয়েই ঘুমিয়ে পরলো। ভোরে আজানের শব্দেই আবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মায়া যত রাত করেই ঘুমাক না কেন;ফজরের আজানের শব্দে ওর ঘুম ভাঙবেই। ফজরের নামাজ পরে মাকে জাগিয়ে দিয়ে মায়া আবার ঘুমালো। ঘুম ভাঙলো বীনার ডাকাডাকিতে,
~ মায়া, অই মায়া…এত বেলা কইরা ঘুমাস ক্যান?

বীনার কণ্ঠস্বর শুনে মায়া শোয়া অবস্থায়ই আবার অন্যপাশ ফিরল। ভাবলো, হয়তো বীনাকে স্বপ্ন দেখছে। কারণ এই সময়ে বীনার বাড়িতে আসার কথা না। কিন্তু বীনার ডাক আর ধাক্কাধাক্কি তীব্র থেকে তীব্রতর হতেই মায়া চোখ মেলে তাকিয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তারপর এক লাফে উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে বলল,
~ বড়পা…তুমি? এত সকালে?
~ হ আইলাম। আবার যামু গা দুপুরেই। তোগো নিয়া।
~ আমগো নিয়া যাবা মানে?
~ আগে হাতমুখ ধুইয়া আয়। খাইতে খাইতে কমু নি।

রেহানা, বীনা, মায়া, বিবেক, রঞ্জু সবাই একসাথে চূলার পাড়ে খেতে বসেছে। আলু আর সিম ভর্তা দিয়ে গরম ভাত। খেতে খেতে বীনা বলল,
~ মা…জহির সপ্তাহখানেক আগে দেশে আইছে ছয় মাসের ছুটিতে। ওর বড় ভাইয়ের বিয়া। আমাগো সবটিরে দাওয়াত দিছে। বিয়া রবিবারে। আজকাই যাওয়া লাগবো। খাওয়া শেষ কইরা যার যা গুছানোর গুছাইয়া নাও।

বীনার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেলো। সবচেয়ে বেশি অবাক হলো মায়া। বীনার কথা শুনে রীতিমতো ওর গলায় ভাত আটকে গেলো। কতক্ষণ খকখক করে কেশে, পানি খেয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে মায়া বীনার উদ্দেশ্যে বলল,
~ তোমার কি মনে হয় যে আমি যামু?
~ যাবি না ক্যা?

~ দেখো আপা…তোমার ভাই তুমি যাও গা। আমার অতোদূর বিয়া খাইতে যাওয়ার ইচ্ছা নাই। তাও আবার এমন মানুষের বিয়া যারে আমি জীবনে দেখিও নাই! আর আমার সামনে পরীক্ষা। অনেক পড়া বাকি। তোমার মন চায় তুমি যাও গা।
বীনা এইবার রেহানার দিকে তাকিয়ে বলল,
~ দেখছ মা দেখছ? কত ঢংগের কথা শিখচে তুমার শিক্ষিত মাইয়া? জানো মা? জহির এয়ারপোর্ট থিকা সরাসরি আমার বাসায় আইছে। বার বার আমারে অনুরোধ করছে বাড়ির সবাইরে নিয়া যাইতে। আর তোমার কথা যে কতবার কইছে তার তো হিসাবও নাই। এত বার কওয়ার পরেও না গেলে খারাপ দেখায় না কও?

রেহানা গম্ভীর হয়ে বললেন,
~ খারাপ তো দেহায়ই। কিন্তু ভীনদেশী এলাকা। জহির ছাড়া তো আর কাউরে চিনিও না। অইহানে যাওয়া কি ঠিক হইবো?
~ ১০০ বার ঠিক হইবো মা। জহিররে আমি মেলা বছর ধইরা চিনি। ওর মতো পোলাই হয় না। আমাকে একবারে নিজের বুইনের মতো দেখে। এই দেখো স্বর্নের চেন।
বীনা ওর গলায় ঝুলানো চেইন টা বের করে দেখালো। তারপর আবার বলতে শুরু করলো,
~ জহির বিদেশ থেইকা আমার লিগা নিয়া আইছে এইটা। তুমিই কও, আপন যদি না ভাবতো এত দামী জিনিস দিতো আমারে?

মায়া এবার ভেংচি কেটে বলল,
~ এতক্ষণে বুজছি…
বীনা কপাল কুচকে বলল,
~ কি বুঝছস?

~ আমি কি বুঝছি সেইটা তুমি ভালো কইরাই জানো। এইটা আবার মুখে কওয়া লাগবো ক্যান? শুনো, তোমার ভাই..তোমারে চেন দিছে;তুমি নাচতে নাচতে যাও তার ভাইয়ের বিয়া খাইতে। আমি যামু না। এইটাই আমার শেষ কথা।

~ যাবি কি না যাবি সেইটা বুঝা যাবো। খা এহন….
খাওয়াদাওয়া শেষ করে বীনা রেহানাকে অনেক করে বুঝালো যাতে বিয়েতে যায় সে। রেহানাকে বুঝাতে বেশি বেগ পেতে হলো না। অল্পতেই বুঝে গেলো। এবার বুঝানোর পালা মায়াকে। মায়াকে বুঝানোর দায়িত্ব রেহানাকে দেয়া হলো। অবশেষে অনেক কষ্টে রেহানা মায়াকে বিয়েতে যেতে রাজি করালো। মায়া নিছক অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে রাজি হয়ে গেলো।

দুপুরের নামাজ পড়েই ওরা রওনা হলো নাগরপুরের উদ্দেশ্যে। সবাই গেলো শুধু রঞ্জু বাদে। আসরের আজানের আধা ঘন্টা পর ওরা জহিরদের বাড়িতে পৌঁছালো। রাস্তার সাথেই মাঝারি সাইজের একটা বাড়ি। বাড়ির পশ্চিম আর উত্তর পাশে দুইটা ছোট ছোট টিনের দোচালা ঘর, আর বাকি দুই দিনে চারটা ছনের ঘর। বাড়ির এক কোণে রান্নাঘর, টিউবওয়েলখানা, টয়লেট পাশাপাশি। জহির বীনাদের সবাইকে পশ্চিম পাশের দোচালা ঘরটাতে নিয়ে যেতে যেতে অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বলল,
~ গরীবের বাড়িতে যে আসছেন আপনারা খুব খুশি হইছি আপা। মাত্রই বিদেশ থিকা আসলাম। ঘর বাড়ি ঠিক করার সুযোগই পাই নাই। যার জন্য এখনো এই অবস্থা। আল্লাহ দিলে আস্তে আস্তে ঠিক হইয়া যাবো ইন~ শা~ আল্লাহ।

বীনা জহিরের কথায় বিস্তৃত একটা হাসি দিলো। তারপর বলল,
~ মহিলা কাউরে আইতে বল। মা আর মায়া নামাজ পরবো আসরের।

~ আচ্ছা আচ্ছা আপা। পাঠাইতাছি…
জহির রুম থেকে বের হতেই মায়া মুখের নিকাবটা খুলে বোরকাটাও খুললো। তারপর স্বভাবমতো বড় উড়না দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে নিলো। ঠিক সেই সময় এক মহিলা অই ঘরে প্রবেশ করে বলল,
~ আমি জহিরের বড় ভাবি। একবারে সবার বড় টা। ভালো আছেন আপনারা?

বীনা আর রেহানা হেসে উত্তর দিলো। কুশলাদি বিনিময় শেষে বড় ভাবি মায়া আর রেহানাকে সাথে নিয়ে গিয়ে টয়লেট, টিউবওয়েলখানা দেখিয়ে অজু করিয়ে নিয়ে আসলো। জহির বিদেশ থেকে অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর জায়নামাজ এসেছে;সেগুলো থেকে দুইটা বের করে মাদুরের উপর নিজের হাতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে দিলো জহিরের বড় ভাবি।

মায়া সেই যে এসে রুমে ঢুকেছে। আর একটাবারের জন্যও অজু করার সময় ছাড়া আর বাইরে বের হয় নি। বাড়ি ভর্তি লোকজন গিজগিজ করছে। সব অপরিচিত মুখ। ভীষণ অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো মায়ার। পরের দিন আসরের পর গায়ে হলুদের সময় বীনা আর রেহানা ধমক টমক দিয়ে জোর করে বাইরে বের করলো মায়াকে। সবাই যখন বরের গায়ে হলুদ মাখাতে ব্যস্ত তখন মায়া টিউবওয়েলখানার অইদিকে বড় আমগাছটার নিচে নিজেকে একটু আড়াল করে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলো।

হঠাৎ একটা পুরুষালি হাতের স্পর্শ মায়া ওর গালে অনুভব করতে পারলো। মায়া প্রথমে ভাবলো জহির এরকম করছে। কারণ জহির ছাড়া আর কেউ এরকম করতে পারবে ওর সাথে সেইটা ওর ধারণার বাইরে। প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে মায়া পেছন ফিরতেই যখন দেখলো ২৮~ ৩০ বছরবের অচেনা একটা পুরুষের মুখ তার সামনে সে যতটা না অবাক হলো তার চেয়ে বেশি হলো বিরক্ত। দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
~ কে আপনি? এমন অসভ্যের মতো আচরণ করতাছেন ক্যান?

মায়ার কথার পাত্তা না দিয়ে হাসতে হাসতে সে আবারো মায়ার গালে হলুদ মাখাতে লাগলো। মায়া অনেক জোরাজুরি করেও ওর গাল থেকে সেই হাত জোড়া ছাড়াতে পারছিল না। যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল ততই যেন হাতজোড়া দ্বিগুণ উৎসাহ পেয়ে আরো চেপে ধরছিল মায়ার গালকে। মায়া এক পর্যায়ে না পেরে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে ওর সর্বশক্তি দিয়ে জোড়ে একটা থাপ্পড় বসালো সেই লোকটার গালে। সেই লোকটা হয়তো এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। হাসিমুখটায় হঠাৎ করে কালো মেঘ নেমে এলো।

মায়া আর এক মুহুর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে এক প্রকার দৌড়ে ঘরে চলে গেলো। চকির উপরে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝিম মেরে বসে বসে ভাবতে লাগলো যে, এভাবে থাপ্পড় মারাটা কি আদৌ ঠিক হয়েছে? ভাগ্যিস কেউ দেখে নি। দেখলে ব্যাপারটা আরো বিশ্রী হতো। কিন্তু যতটুকুও বা করেছে মায়া ততটুকুই বা কতটুক ঠিক হয়েছে সেইটাই মায়া বুঝে উঠতে পারছে না। এর পরিনাম কি হতে পারে সেইটা ভাবতেই মায়ার বুকটা কেঁপে উঠলো।
মায়া নিজেকেই নিজে মনে মনে ইচ্ছেমতো বকতে বকতে বলতে লাগলো, এত বেশি বাড়াবাড়ি না করলে কি হইতো না? এত বেশি বুঝোস ক্যান সবসময়?

পর্ব ১৪ (অন্তিম)

মায়াকে এভাবে অস্বাভাবিকভাবে দৌড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকা টা রেহানার নজরে পরলো। তাই মায়ার পেছনে পেছনে রেহানাও ঘরে ঢুকলো। মায়াকে অমন ঝিম মেরে নিচের দিকে মুখ দিয়ে বসে থাকতে দেখে মায়ার মাথায় হাত দিলো রেহানা। মায়া এক প্রকার চমকে উঠে উপরের দিকে তাকাতেই দেখে ওর মা দাঁড়িয়ে। তারপর বুকে হাত দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো মায়া। রেহানা জিজ্ঞেস করলো,
~ কিছু কি অইছে মায়া? এমনে কইরা দৌড় দিলি ক্যা?

মায়া যা হয়েছে সবটা খুলে বলল। সবটা বলা শেষ করে মায়ের হাত দুটো চেপে ধরে মায়া বলল,
~ মা, কালকাই চলো চইলা যাই। আমার এইখানে আর ভাল্লাগতাছে না। ভয়ও লাগতাছে।

রেহানা গম্ভীর হয়ে বসে রইলো। কোনো কথা বললো না। কিন্তু পরের দিন দুপুরে বিয়ের দাওয়াত খেয়েই ওরা বাড়ির পথে রওনা হলো। জহির কিছুতেই যেতে দিতে চাচ্ছিল না। এইটা সেইটা অজুহাত দেখিয়ে এক প্রকার জোর করেই চলে আসলো।

মায়ার মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে আজ। কিন্তু ও গিয়ে বসে আছে ঢাকা বোনের বাসায়। এদিকে রেহানা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন। সারাদিন অপেক্ষা করলেন রেজাল্ট শুনার জন্য। কেউ মায়ার রেজাল্ট নিয়ে আসলো না তাঁর কাছে। রাতে ঘরের ভেতর বসে গুনগুনিয়ে কান্না করলেন কিছুক্ষন। রেজাল্ট ভালো হলে অবশ্যই কেউ না কেউ রেজাল্টের খবর দিতে আসতো। রেজাল্ট ভালো হয় নি বলেই কেউ মায়ার রেজাল্ট নিয়ে তার কাছে আসে নি।

মেয়েটা সারাবছর খেয়ে না খেয়ে এত কষ্ট করে লেখাপড়া করলো অথচ আল্লাহ ওর দিকে মুখ ফিরে তাকালো না? আল্লাহ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারলো? এসব ভাবতেই তার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
তারপর আরো একদিন চলে গেলো, তারপর আরো একটা দিন, আরো একটা দিন। কিন্তু নাহ…রেজাল্টের আর কোনো খবর আসে নি। রেহানা এইবার নিশ্চিত যে মায়ার কোনো একটা সাবজেক্টে ফেইল এসেছেই।

পাশের বাড়ি গিয়ে বসে সেই বাড়ির ছেলের বউ এর সাথে এই ব্যাপারে আলাপ করছিল রেহানা। এই সময়ে সে শুনতে পেলো কেউ একজন মায়ার নাম ধরে ডাকছে। রেহানা হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে এসে দেখলো সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো রঙের মোটা ফ্রেমের চশমা পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। রেহানা বাড়ির উঠানে পা রাখলেই সেই লোকটা সালাম দিয়ে বলল,
~ আপনিই মায়ার আম্মা?
~ হ…তয় আপনেরে চিনলাম না।

~ আমি মায়ার স্কুলের দুলাল স্যার।
‘স্যার’ শব্দটা রেহানার কানে পৌঁছুতেই রেহানার চোখে পানি টলমল করে উঠলো। অসহায় কণ্ঠে স্যারকে জিজ্ঞেস করলো,
~ আমার মাইয়ার রেজাল আমি এহনো জানি না। ফেল করছে নাকি পাশ করছে কুনো খবরই পাই নাই।
~ কি কন..! খবর পান নাই?
~ না মাস্টার সাব।

~ মায়া রেজাল্টের দিন স্কুলে যায় নাই। তাই ভাবলাম বাড়িতে আইসা দেখা করি আর মিষ্টিও খাইয়া আসি।
~ মানে মাস্টারসাব? পাশ করছে আমার মায়া?
রেহানা অনেকটা অবাকের সুরে দুলাল স্যারকে কথাটা জিজ্ঞেস করলো। রেহানার চোখ মুখে খুশির ঝিলিক স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। দুলাল স্যারও মিষ্টি করে হেসে বললেন,
~ শুধু পাস না…ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করছে। ও কই? ওরে ডাকেন।

~ ও তো ঢাকায় গেছে। ওর বইনের বাসার। আপনে একটু খাড়ান মাস্টার সাব। আমি টুল নিয়া আহি।
রেহানা স্যারকে বসতে দেয়ার জন মোড়া আনার উদ্দেশ্যে ঘরের দিকে যেতে নিতেই স্যার বাধা দিলেন,
~ আরে না না আপা…আমি চইলা যাবো এখনই। এদিক দিয়াই যাইতেছিলাম। ভাবলাম মায়ার সাথে দেখা কইরা যান।
~ গরিবের বাড়ি আইছেন….কিছু মুখে দিয়া যান।

~ থাক আপা…আজকে না। আরেকদিন। আসি আমি। আসসালামু আলাইকুম…
~ ওলাইকুম সালাম।
স্যার চলে যাওয়ার পর রেহানা খুশিতে কাঁদতে লাগলেন। অবশেষে যেন জানটা ফিরে পেলেন তিনি। যাক, মেয়ের এত কষ্ট আল্লাহ বিফলে যেতে দেন নি। আল্লাহর দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া জানালেন তিনি।

ওদিকে তিনি ঘরের ভেতরে যেতেই ঘরের বাইরে থেকে মায়ার গলা ফাটানো ডাক শুনতে পেলেন। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে মা মা করে ডাকছে। রেহানা বাইরে বের হয়ে দেখলেন সত্যিই মায়া। রেহানা খুশিতে মায়াকে জড়িয়ে ধরলেন। খুশির চোটে কিছুক্ষণ যেন কথাই বলতে পারলেন না। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে মায়ার দুই গালে নিজের দুইহাত রেখে বললেন,
~ রেজাল হুনছস তোর?

~ হ মা…শুনছি।
রেহানা অবাক হয়ে বললেন,
~ ক্যারা জানাইলো তোরে?
~ স্কুলের পরিচিত একজনরে রেজাল্ট বাইর হওয়ার সাথে সাথে জানাইতে বইলা গেছিলাম। সেই ফ্যাক্স কইরা রেজাল্টের দিন রেজাল্ট জানাইছে।

~ হায় আল্লাহ। তুই ঢাকা বইয়া থাইকা রেজাল হুনছস…আর আমি এইহানে বইয়া থাইকাও রেজাল হুনি নাই। কেউ কয় নাই। পথমে ভাবলাম ফেল করছস। পরে আইজকা একটু আগে তোর দুলাল স্যার আইছিল তোর লগে দেহা করবার। হেই কইলো যে পাশ করছস।
মায়া মায়ের কথায় বিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে ঘরের দিকে ঢুকলো।

আজ শুক্রবার…
প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার বিটিভিতে বাংলা সিনেমা হয়। আজও সিনেমা হবে। মায়া এই সিনেমাগুলো একদম মিস করে না। শুক্রবারে যত কাজকর্ম আছে সব আগেভাগেই সেরে রেখে পাশের টিভিওয়ালা বাড়িতে গিয়ে বসে থাকে টিভি দেখার জন্য।

গতকাল হঠাৎ করে বীনা এসেছে বাড়িতে। মঙ্গলবারেই তো মায়াকে পাঠালো একা একা। বৃহস্পতিবারেই হাঠাৎ বীনা নিজে কেন এলো বুঝে উঠতে পারছে না মায়া। মায়া সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য বাড়ির বাইরে পা দিতেই বীনা পেছন থেকে ডাকলো,
~ অই….কই যাস?

~ সিনেমা দেখমু বড়পা। দেখবা?
~ নাহ… দেখ তুই। ভালো কইরা দেখ। আর কোনোদিন দেখার সুযোগ হইবো কিনা…!
বীনার কথায় অবাক হলো মায়া। অবাক হয়ে বলল,
~ মানে?

~ কিছু না। যা তুই। আর শুন, ঘাটাইল যাওয়া লাগবো বুঝছস? ওমর মামার বাসায়।
~ ক্যান? অইখানে কি?
~ গেলেই বুঝবি…সিনেমা দেইখা আয়। তারপর রওনা দিমু।

মায়া আর কথা বাড়ালো না। সিনেমা দেখতে গেলো।
তারপরের ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটে গেলো।

সন্ধ্যার দিকে মায়া বীনার সাথে ওর চাচাতো মামা ওমরের বাসায় গেলো। ঘাটাইল মেইন টাউনেই থাকেন উনি। অভিজাত পরিবার। ওমর মামার বৃদ্ধ মা অর্থাৎ মায়ার নানী মায়াকে দেখেই খুশিতে জড়িয়ে ধরে বললেন,
~ যাইক…পাত্রী আইলো শেষমেশ..!
মায়া ঠোঁটে লম্বা একটা হাসি টেনে ঠাট্টার ছলে বলল,
~ হ পাত্রী আইছে। তোমার জামাইর ভাগ বহাইতে।

~ ক্যান…জুয়ান জামাই থাকতে আমার বুইড়ার উপর তোমার এত নজর দেয়া লাগব ক্যান?
একটা হাসির রোল পরলো সেখানে। মায়া একটা রুমে কাপড় চেঞ্জ করার জন্য ঢুকতেই মায়ার সেই নানী হলুদ পেটিকোট আর ব্লাউজ এনে মায়ার হাতে দিয়ে বলল,
~ পায়জামা~ কামিজ খুইলা এইগুলা পইরা নে।

মায়া প্রচন্ড রকমের অবাক হয়ে বলল,
~ হলুদ পেটিকোট ব্লাউজ…!
নানী হেসে চোখ নাচাতে নাচাতে বললেন,
~ বিয়ার কনেরে হলুদ লাগানো লাগবো না? ধর এইগুলা, পর। আমি কাপড় আনতাছি।

নানী পেটিকোট~ ব্লাউজ মায়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রুম ত্যাগ করলেন। মায়ার এবার কান্না পাচ্ছে প্রচন্ড। অজানা এক ভয়ে ভেতরটা ছেয়ে গেলো। যা বুঝার বুঝে গেলো। রাগ হচ্ছে প্রচন্ড। রাগে গজগজ করছে ভেতরে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে।

ও মেঝেতে বসে পরলো। শরীরে হঠাৎ করে কোনো বোধশক্তি যেন পাচ্ছে না। আনমনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। গাল বেয়ে চোখের পানি টপটপ করে নিচে পরছে। হঠাৎ কারো হাতের স্পর্শ ওর কাধে পরলো। চোখ মুছে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে বীনা। মায়ার রাগ আরো বেড়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেলে কিড়মিড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ ছেলে কে আপা?

বীনা মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
~ জহির….ভালো পোলা মায়া।

জহির নামটা শুনেই মায়া বীনাকে ছাড়িয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো। তারপর আলনার উপরে ছড়িয়ে রাখা বোরকা টা নিয়ে পরতে লাগলো। বীনা ওত হাত থেকে বোরকা নেয়ার জন্য বোরকা টানতে টানতে বলল,
~ বোরকা পরস ক্যা? কই যাবি?

~ মরবার যামু। ছাড়ো কইতাছি। মাথা গরম কইরো না আর। খারাপ হইবো বইলা দিলাম।
~ দেখ বইন, শান্ত হ…
~ চুপ…একদম চুপ। বড় বোন তোমরা। সম্মান করি তুমগো। তার মানে এই না যে, একটা পোলা ধইরা আইনা বলবা বিয়া কর আর অমনি আমি বিয়া করমু। তুমগো হাতের পুতুল না আমি। ছাড়ো কইতাছি।

মায়ার চিল্লাচিল্লিতে এতক্ষণে ওমর মামা, মামি, নানা, নানী সবাই এসে অই রুমে হাজির। মায়া এবার জোরে জোরে কান্না করছে। সে কি বাধ ভাঙ্গা কান্না…!
মামি এসে মায়ার কাধে হাত রাখতেই মায়া মামিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
~ মামি, অই জহিররে আমি বিয়া করমু না। ওরে আমার ভাল্লাগে না। ওর কাছে আমি জীবনেও সুখী হইতে পারমু না। আমারে যাইতে দেন আপনেরা।

মায়ার এমন কান্না দেখে ওমর বীনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ বীনা…সত্যিই তুই কাজটা ঠিক করতাছস বইলা মনে হয় না। ছেলে কোথায় থাকে না থাকে..! ভীনদেশী ছেলে। আমরা কেউ দেখলাম না, শুনলাম না। আর তুই কারো মতামত না নিয়েই বিয়ের ব্যাপারে কথা দিয়ে ফেললি?

~ পোলা ১০০% ভালো মামা। আমি ওরে অনেক দিন যাবত চিনি। হাজারে একটা এই পোলা। আর ওর ছুটি আর একমাসও নাই। ২৮ দিন আছে মাত্র। তাই হুট কইরা কাউরে না জানাইয়া বিয়া ঠিক করছি। আপনেরা দয়া কইরা ভুল বেয়াদবি মাফ কইরেন।

~ যত যাই হোক বীনা… এত দূরের চড় এলাকায় বোন বিয়া দিতাছস। ওরা তোর বোনরে মাইরা বালুচাপা দিয়া রাইখা নয়তো মাইরা ধলেশ্বরী নদীতে ভাসাইয়া দিয়া তারপর উলটা তোদের বাড়িতে আইসা তোর বোনের খোঁজ করবো। অতো দূরে অই চড় এলাকায় কি দেইখা এই বোনের বিয়া দিতাছস বুঝতাছি না আসলে। এর চেয়ে কত ভালো ভালো প্রস্তাব আনলাম। তখন দিলি না। আর এখন……

ওমর কথা থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বীনা হঠাৎ করে মায়ার পায়ে ধরে বসলো। পায়ে ধরে অমনিই কান্নাকাটি শুরু করলো। এটার জন্য উপস্থিত কেউই প্রস্তুত ছিল না। মায়া বীনাকে এভাবে পায়ের কাছে পরতে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরে অস্বস্তিবোধ শুরু হলো। বার বার পায়ের কাছ থেকে বীনাকে উঠানোর চেষ্টা করছে মায়া। কিন্তু বীনা উঠছে না। কান্নাকাটি করছে আর বলছে যে,
~ তুই আমার সম্মান টা রক্ষা কর বইন…আমি অগো কথা দিয়া ফালাইছি। আমার মুখের দিকে তাকাইয়া বিয়াডা কর। তুই অসুখী হবি না বইন। দয়া কইরা এমন করিস না তুই।

মায়া কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মায়া বীনাকে পা ছাড়তে বলায় বীনা আরো শক্ত করে পা চেপে ধরে বলল,
~ তুই বিয়াতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত পা ছাড়মু না তোর। তুই আগে রাজি হ বইন।

মায়ার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ওকে কখনো পরতে হবে এটা কল্পনাও করে নি কখনো। নিজেকে এখন কুরবানির পশু বলে মনে হচ্ছে ওর। ও বার বার মনে করতে চেষ্টা করলো জীবনে কি এমন ভুল করেছে যার জন্য আজ এই শাস্তি পেতে হচ্ছে ওকে?
নাহ….ওর মাথা কাজ করছে না। ওদিকে বীনার কান্নার গতি বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে। ঠিক এই পর্যায়ে এসে মায়া নিজের সব স্বপ্নগুলোকে এক সাইডে রেখে দিয়ে বীনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ তুমি উঠো বড়পা। আমি কোনো আপত্তি করমু না।

হঠাৎ বীনার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মায়ার পা ছেড়ে উঠে মায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্না করতে লাগলো। মায়ার এখন আর কান্না পাচ্ছে না। ও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন অনূভুতিহীন এক প্রাণী!
পরের দিন সকালে রেহানা, রিনা, মিনা সাথে ওদের বাচ্চা কাচ্চা সবাই বিয়ের উদ্দেশ্যে আসলো ওমরের বাসায়। মায়া তখনও নিশ্চুপ। রেহানা যখন এসে মায়ার পাশে বসলো মায়া তখন একবার মায়ের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
~ মা…তুমিও কি আমারে আগে একবার জানাইতে পারতা না বিয়ার কথা?

রেহানা অপরাধীর সুরে বললেন,
~ আমি নিজেই কি জানতাম নাকি? আমারে তো বিয়ার কথা বীনা কাইলকাই কইলো।
~ তো কাল যখন জানাইলো তোমারে তখন তুমি আমারে জানাইলা না ক্যান?

রেহানা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না। মাথা নিচের দিকে দিয়ে রইলো। মায়া কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। এরপর মায়া কবুল বলা ছাড়া আর একটা বাড়তি কথাও কারো সঙ্গে বলে নি। বিয়ে পড়ানো শেষে মা~ বোনেরা যখন এর উপর ঝাপিয়ে পরে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে তখনও মায়া নির্বাক। একদম কান্না করে নি। অনূভুতিহীন মুর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শুধু।

রাত ১:২৫

জহির মাত্রই বাসর ঘরে ঢুকলো। মায়া প্রথম বার জহিরদের বাড়ি বিয়ে খেতে আসলে ওদের যে ঘরটায় থাকতে দেয়া হয়েছিল সেই ঘরটাতেই আজ বাসর ঘর সাজানো হয়েছে।

প্রথম বার যে ঘরটায় অতিথি হয়ে ঢুকেছিলো আজ সেই ঘরটাতেই বাড়ির বউ হয়ে বসে আছে মায়া। ভিতরে ঠিক কিরকম অনুভূতি হচ্ছে বুঝতে পারছে না সে। অনেক অনেক স্বপ্ন ছিলো এই রাতটাকে নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ কিভাবে কি হয়ে গেলো সেটা বুঝেও উঠতে পারলো না মায়া। ভেতর থেকে কান্না ঠেলে আসছে।
প্রবাসী ছেলেদের স্বামী হিসেবে ওর বরাবরই অপছন্দের ছিল। ওর মতে, রিকশাওয়ালাকে বিয়ে করা ভালো প্রবাসীদের বিয়ে করার চেয়ে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের স্বীকার হয়ে আজ নিজেই সে প্রবাসীর বউ।
প্রবাসীর বউ..!

শব্দ দুইটা মাথায় আসতেই শরীর কেঁপে উঠলো মায়ার। ওর এখনো মনে হচ্ছে ও দুঃস্বপ্ন দেখছে। একটু পরই ওর ঘুম ভেংগে যাবে। আর ও মুক্তি পাবে।
হঠাৎ জহিরের সালাম দেয়ার আওয়াজ শুনে ঘোর ভাঙলো মায়ার। একটু ঠিকঠাক হয়ে বসতে বসতে মৃদু স্বরে সালামের জবাব দিলো। জহির বিছানায় এসে মায়ার পাশে বসলো। মায়া এত্ত বড় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। জহির বলল,
~ আজও এত্ত বড় ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে বইসা থাকবা?

মায়া নিশ্চুপ। ওর যেমন রাগ লাগছে, তেমনই কান্না পাচ্ছে। ভালো কথাগুলোও কাটার মতো বিধছে শরীরে। জহির মায়ার হাতের উপর হাত রেখে ফিসফিস করে ডাকলো,
~ মায়াবতী…?

মায়া হালকা কেঁপে উঠলো। জহির হাতটা এবার হালকা চেপে ধরে বলল,
~ তুমি কি জানো আজ প্রথম তোমারে আমি মায়াবতী বইলা ডাকলাম?

মায়া এবারো নিশ্চুপ। জহির এবার মায়ার ঘোমটা টা মাথা থেকে সরিয়ে মায়ার থুতনিতে ধরে মুখটা উচু করলো। মুখটা এভাবে উচু করার সাথে সাথে মায়া চোখ বন্ধ করলো। আর চোখ বন্ধ করতেই দুই চোখ দিয়ে দুই ফোটা পানি গাল গড়িয়ে পরলো। জহির এতে একটুও বিচলিত হলো না। আরেকটু কাছে এগিয়ে গিয়ে মায়ার মাথাটা ওর বুকের সাথে চেপে ধরলো। তারপর বলল,

~ আমার খুব ইচ্ছা করতো তোমারে মায়াবতী ডাকতে। কিন্তু আমি ঠিক কইরা রাখছিলাম যে, যেদিন তোমারে একদম নিজের কইরা পাবো শুধুমাত্র সেদিনই তোমারে মায়াবতী বইলা ডাকবো। জানো মায়াবতী? আজকে নিজেরে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হইতাছে। আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া যে আল্লাহ আমার চাওয়া পূরণ করছেন। নামাজ পড়বো চল। বাসর রাতের কিছু বিশেষ আমল আছে। সেইগুলাও করতে হইবো। কান্না কইরো না লক্ষিটা।

জহির মায়ার কপাকে একটা চুমু খেয়ে আবারো বুকে চেপে ধরলো। মায়া আবারো কেঁপে উঠলো।

চারিদিকে সুনসান নীরবতা। নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ এমনকি মায়ার কান্নার শব্দটাও শুনা যাচ্ছে না। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে ওর। মায়ার চোখের পানিতে জহিরের বুক ভিজে যাচ্ছে।

হঠাৎ চোখ বন্ধ অবস্থায় মায়া আবছা আবছা অথচ ভয়ংকর একটা প্রতিচ্ছবি ওর সামনে দেখতে পেলো। সেই প্রতিচ্ছবিটার নাম যেন কান্না! প্রতিচ্ছবি টা মায়াকে উদ্দেশ্যে করে তাচ্ছিল্যের সুরে বলছে,
~ একদিনেই সব কান্না একবারে করে শেষ করলে পরে কাদবি কিভাবে? একটু রয়ে সয়ে কাদ..! সারাজীবনই তো কাদতে হবে…! আমি সারাজীবনই তোর সঙ্গে থাকবো।

হঠাৎ মায়া চমকে উঠলো। নিজের অজান্তেই জহিরকে এবার নিজে থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে আরো গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে রইলো। যেন জহিরের বুক থেকে লুকায়িত মুখটা বের করলেই সেই ‘কান্না’ নামক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি টা ওকে থুবড়ে থুবড়ে খাবে…!
আর সেই কান্নার হাত থেকে বাঁচার জন্য জহিরের বুকের চেয়ে নিরাপদ স্থান যেন আর হতেই পারে না।

কিন্তু….কিন্তু, আজকের মতো করে সবসময়ই এই নিরাপদ স্থানটায় মুখ লুকানোর সৌভাগ্য আদৌ হবে কি?
মায়া কি পারবে জহিরের সাথে সারাজীবন সুখে থাকতে?

মায়ার সেই বড় হওয়ার স্বপ্ন….সেই স্বপ্নগুলো কি আদৌ পূরণ হবে কখনো?
এরকম হাজার হাজার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে মায়ার মনে। অথচ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না মায়া। কিন্তু উত্তরগুলো যে বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে মায়ার। হঠাৎ মায়ার বড্ড অভিমান হতে লাগলো।

ইশ, উত্তরগুলো এমন লুকোচুরি খেলছে কেন ওর সাথে?

লেখাঃ সুমাইয়া বিনতে আঃ আজিজ

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “নিবেদিতা – Valobasar Romantic Premer Golpo Bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – মিস্টার সাইকো – Bengali Psycho Storie

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!