পুতুলের বিয়ে – Baba Meye Valobasha

অফিসে আজকে অনেক খাটাখাটুনি গেল, দুইটা ফরেন ক্লায়েন্ট নিয়ে মিটিং অ্যারেঞ্জ করা, মিটিং শেষ করা, আবার তাদেরকে হোটেলে ড্রপ করে একদম শেষ বেলায় অফিস ব্যাক করা।
সবমিলিয়ে এতোটাই ক্লান্তি ভর করেছিল যেন অফিসের মেঝেতেই শুয়ে পড়ছিলাম। আর না পেরে কোনোরকম ডেস্ক থেকে ব্যাগটা কাধে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বাসায় ফিরে দেখি আমার মেয়েটা সোফার একপাশে হাতল ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, একদম চোখ ফুলে লাল হয়ে আছে আমার ছোট্ট কলিজাটার! অন্যদিন হলে দৌড়ে উড়ে এসে কোলে উঠে, যেন বাবার জন্য দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে সে। আজকে আমার পরীটার কী হয়েছে! তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে কোলে তোলে নুশাকে একরকম রেগেই বললাম;

  • কী ব্যাপার নুশা আমার মেয়েটা এভাবে কান্না করছে আর তুমি কিচেনে কী করছো! সমস্যা কী তোমার?
    নুশা’ও প্রায় চিল্লায়া বললো;
  • তোমার মেয়েকে জিগ্যেস কর তার কী হয়েছে আর কেন সে কান্না করছে!
    সে সকাল থেকে আবদার করে বসে আছে বউ সাজবে, তাকে নাকি নতুন বউ সাজাতে হবে। টিভিতে ছোট একটা বাচ্চাকে বউ সাজতে দেখে এখন তারও বউ সাজা লাগবে। তুমি এক পাগল আর তোমার মেয়েও হইছে একটা, দুই পাগল তো আমি একা সামলাতে পারব না ভাই, আমিও মানুষ!
  • সিম্পল একটা বিষয় নুশা! মেয়েটাকে চাইলেই সাজাতে পারতা। এটা নিয়ে পাহাড়সম এক্সকিউজ দেখায় দিলা?
  • তাই নাকি! সহজ বিষয়? তো তুমি সাজাও দেখি। আমি আমার ওয়ারড্রব থেকে লাল ওড়না বের করেছিলাম পেচিয়ে শাড়ি বানিয়ে পরিয়ে দিব। না! তার সেটাতে হবে না, তার শাড়িই লাগবে, তার ব্লাউজ লাগবে, তার লাল চুরি লাগবে, তার গয়না লাগবে, তার আলতা লাগবে এবং সাথে লাল টিপ। বউ মানে অরিজিনাল বউ। তোমার ঘাড়ের রগ তো ওর ঘাড়েও আছে, বুঝো নাই? এসব আমি কোথায় পাব এখন? সিম্পল বিষয় মারাতে আসছেন উনি!

নুশার কথাবার্তা শুনে আমি পুরাই ত! আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম;

  • সব’ই লাগবে আম্মু?
    ঠোঁট ভেঙে মাথা ঝাকিয়ে উনি হ্যা সূচক উত্তর দিলেন।
    .
    সন্ধ্যা নেমে যাচ্ছে, কোনরকম ফ্রেশ হয়ে আর কিছু খাই নাই, মেয়েকে কোলে নিয়ে একটা রিকশা ধরে বেড়িয়ে পড়লাম। আমার মেয়েটা আমার জান প্রাণ সব, আমাকে ছাড়া কিছুই সে বুঝবে না ইভেন আমিও আমার মেয়েকে ছাড়া কিছুই বুঝি না। আল্লাহর দরবারে অনেক আবদার করে আমি আমার মেয়েটাকে পেয়েছি। সারাটাদিন বাবার জন্যই তার চিন্তা ভাবনা, বাবা না খাওয়ালে সে খাবেই না। নুশা তো মাঝে মাঝে বলে; আমি হলাম এই ঘরের কাজের বুয়া। এই মেয়ে আমাকে মা বলে মানে কি’না সন্দেহ আছে।

যাহোক, আজকে আমার মেয়ে একটু বউ সাজতে চেয়েছে মাত্র, এই আবদার পূরণ না করলে তো হবেই না।
ধানমন্ডির এদিকে বাচ্চাদের এমন কিছু পাওয়া যায় বলে কেউই কোনো ধারণা দিতে পারল না। শেষ অব্দি একজন মহিলা কাছে এসে বললেন, ভাইজান এদিকে ঘুরে লাভ নেই একটু এগিয়ে নিউমার্কেট চলে যান, সব পাবেন।
তা-ই করলাম, নিউমার্কেট গিয়ে বাপ মেয়ে মিলে কণের বাজার করতে লাগলাম, সব’ই পেয়েছি। যদিও ব্লাউজটা জুতসই হয়নাই তাও দোকানদার বলল পেছনে পিন গুজে টেনে দিলে কোনো রকম হয়ে যাবেনে।
এই মেয়ে তার মায়ের মতোই ধৈর্য পেয়েছে, সব বাজার করে যখন বের হব তখন তার সেটাও খেয়াল আছে যে পায়ে লাগানোর জন্য লাল আলতা নেয়া হয়নি!

যাক সব কিছু নিয়ে বাসায় ফিরলাম, সাথে করে দুই প্যাকেট বিরিয়ানিও নিয়ে নিলাম আর কিছু ডেজার্ট। বাসার রান্না আজ ফ্রিজে থাকবে। বিয়ের দিন ভালো-মন্দ খাওয়া দরকার।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। ক্লান্তি ভুলে আবার কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে আমি আর নুশা মিলে আমাদের মেয়েকে বউ সাজাতে লেগে গেলাম। ভালোই লাগছে মুহূর্তটা, একটা উৎসব মুখর পরিবেশ। নুশা গুনগুন করে লিলাবালি গাইছে। যেনো ছোট বেলার পুতুল খেলায় মেতেছি আমরা। আজকে পুতুলের বিয়ে।

আমি জাস্ট আমার মেয়ের দিকে তাকাচ্ছি বারবার আর ভাবছি যে, তার মধ্যে কোনো ক্লান্তি নাই, ঘুম নাই, জাস্ট মাকে দেখিয়ে দিচ্ছে এটা এভাবে দাও ওটা ওভাবে দাও। মানে এটা কি সত্যিই যে মেয়েরা আগে আগে বড় হয়ে যায়? আমার এইটুকুন বাচ্চা এই রিয়েক্ট কীভাবে দিচ্ছে!
শাড়ি পরানো শেষ, এখন নুশা মেয়ের হাতে মেহেদি লাগায় দিচ্ছে আর আমি পায়ে আলতা মাখিয়ে দিচ্ছি।
আমার জীবনে এটা দ্বিতীয়বার কাউকে আলতা পরিয়ে দেয়া। একবার ছোট বেলায় ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাইছিলাম। খুশিতে আমার আম্মার জন্য বাজার থেকে পাঁচ টাকার আলতা রঙ কিনে নিয়েছিলাম। আলতা আমার মায়ের পছন্দ ছিল, আমি নিজেই মোরগের পাখা দিয়ে মাখিয়ে দিয়েছিলাম আম্মার পায়ে। আমার মা’ও ঠিক আমার মেয়ের মতোই সেদিন চুপ করে বসে ছিল বিছানায়।
.
আলতা মেহেদি পরানো শেষ। তিনজন মিলে অনেক ফটোসেশান হলো, সেলফি নেয়াও শেষ। আর শরীর মানাচ্ছিল না। খাওয়া দাওয়া করে ফেললাম কণেকে তার মা দুই একবার খাবার তুলে দিয়েছে, সে মুখে খাবার নিয়ে গিলে ফেলছিল চোখ বুজে। কারণ চিবুলে লিপস্টিক মেখে যাবে নাকি! মানে আশ্চর্য হওয়ার সব রেকর্ড ভেঙে দিল আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়েটা।
বিছানায় আসলাম, পিচ্চি কিউট পরীটাকে কাছে টেনে নিয়ে বললাম;

  • এবার খুশি তো আম্মু? বউ সেজে ভাল্লাগছে?
    মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল;
  • হ্যা বাবাই।
  • তাহলে এখন এসব চেঞ্জ করে আসো শুয়ে পড়ি আম্মু। অনেক রাত হয়েছে।
    নাহ, সে কোনোভাবেই শাড়ি চেঞ্জ করবে না। সে এসব পরেই ঘুমাবে আজ। ভাগ্য ভাল বলে নাই যে আমাকে বর একটা সাজিয়ে এনে দাও।
    আমাকে না জড়িয়ে আমার মেয়ে ঘুমায় না। বুকের উপর উঠে টুপ করে ঘুমায় পড়লো। নুশাও সারাদিনের ক্লান্ত, সেও অন্যপাশ ফিরে ঘুমায় পড়ল।
    .
    আমার কেন জানি আর ঘুম পাচ্ছে না, আমার বুকটা কাঁপছে। মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে একটু পরেই শেড়ওয়ানি পরা একটা গুন্ডা বর এসে আমার মেয়েটাকে নিয়ে যাবে। সারা বাড়ি ভরা মেহমান থাকবে। খানিকক্ষণ পরেই আমার বুক খালি হয়ে যাবে। আমার মেয়ে তার শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে, শেড়ওয়ানি পরা বরটাকে খুব করে বুঝিয়ে বলতে হবে যেন আমার মেয়েটাকে কষ্ট না দেয়। কষ্ট দিলে যে আমি মরে যাব একদম এটা যেন আর বুঝাতেই পারছিলাম না। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল!

আমি এই দৃশ্য কোনো ভাবেই সহ্য করতে পারছি না। আমাকে আজকে এতো বেশি বাবা বাবা মনে হচ্ছে কেন তাও আমি বুঝতে পারছি না। কেনোই বা আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে এখনই ভয়ে মচকে যাচ্ছি তাও জানিনা। শুধু মনে হচ্ছে, নাহ! পৃথিবীর কোনো শক্তি আমার মেয়েকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
.
সারাটা রাত আমার মেয়েটাকে বুকে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটালাম। আমি যেনো কোন এক শক্তির কাছে অসহায় আর ভীতু একটা বাবা হয়ে গেলাম। এমন যন্ত্রণা আমি নিতে পারিনি।
ভোর হল, মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে। কোনোরকম মেয়েটাকে বিছানায় রেখে আস্তে করে উঠে পড়লাম, নুশা ঘুম ঘুম চোখেই বলতেছে;

  • এই কোথায় যাচ্ছো তুমি, সারারাত ঘুমাও নাই কেন?
    বুঝলাম না নুশা কীভাবে জানে আমি ঘুমাই নাই সারারাত!
    যাগগে, উঠে রেডি হয়ে নামাজ পড়তে বের হলাম।

নামাজ পড়ে খুব করে আল্লাহর কাছে আমার মেয়ের মঙ্গল কামনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম সকাল দশটা বাজার আগেই শ্বশুরের কবর জিয়ারত করে আসব। খুব অপরাধ বোধ করছি এই মুহুর্তে। আমিও একদিন না জানিয়ে কোনো এক রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে চলে আসছিলাম। নুশা ছিল তার বাবার কলিজা। আমি তার কলিজা টেনে নিয়ে আসছিলাম। একটুও আমার মনে লাগে নাই কিংবা আজ অব্দি ভাবি’ই নাই উনার কেমনটা লেগেছিল।

কিন্তু আমি এই মুহুর্তে বুঝতে পারছি খুব করে যে একটা বাবার কাছ থেকে তার মেয়ে ছিনিয়ে নেয়ার কষ্টটা কেমন! কিংবা একটা মেয়ে তার বাবার কাছে কতোটা আদরের আর মায়ার! যদিও এটা চিরন্তন সত্য যে প্রত্যেক মেয়েকেই তার বাবার কাছ থেকে একদিন বিদায় নিতে হয় কিন্তু আমি যেটা করেছি তা ছিল অন্যায় এবং অবিচার। আজ আমি অনুতপ্ত।
.
আমার শ্বশুর অনেক ক্ষমতাবান লোক হওয়া সত্ত্বেও কেমন যেন হার মেনে থমকে গিয়েছিলেন। মাঝ রাতে আমাকে সেদিন কল করেছিলেন আমার শ্বশুর। খুব ভারী কন্ঠটা কান্না জড়ানো মাখায় বলেছিলেন;

  • আমার মেয়েটাকে রাতে আমি ভাত তোলে না খাওয়ালে সে খায়নি কখনো! আমার মেয়েটাকে না খাইয়ে রাইখ না। আর আমার মেয়ের কিছু হলে এর খেসারত খুব খারাপ ভাবে দিতে হবে তোমায়।
    এই বলেই টুপ করে কল কেটে দিয়েছিলেন।

সম্পর্ক যদিও অনেক পরে ঠিকঠাক হয়েছিল কিন্তু সেই যে মানুষটা দমে গিয়েছিলেন, আর তাকে আগের মতো দেখিনি। নুশা শত চেষ্টা করেও আমার উপর থেকে উনার অভিমানটা আর ঠিক করে দিতে পারেনি। এর কিছুদিন পরেই কথা নেই বার্তা নেই চুপিসারে ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক করে আমার শ্বশুর মারা যান। তারপর থেকে নুশা আমাকেই সবসময় তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে আসছিল। আমিই নাকি ভুলিয়ে ভালিয়ে ওকে নিয়ে আসায় ওর বাবা কষ্ট পেয়ে মারা গিয়েছেন।

আলো ফুটে সকাল হয়ে যাচ্ছে, একটা গাড়ি কল করে রিসার্ভ নিয়ে উঠে পড়লাম। পদ্মা সেতু পাড় হয়ে ওপাড় যাচ্ছি শ্বশুরের কাছে ক্ষমা চাইতে। মনে মনে ভাবছি;
এই একটা সুযোগ সৃষ্টিকর্তা রেখেছেন আমাদের জন্য, একটা মানুষ দুনিয়াতে না থাকলেও তার কাছাকাছি গিয়ে বসে থাকা যায়, কবরের উপর হাত বুলানো যায়, কিছুক্ষণ কান্না করা যায়, কিছু কথা বলা যায় মন খুলে।
এই মুহুর্তে কেউ একজন হয়তো উপর থেকে দেখতে পাচ্ছে এই দৃশ্যটা, একটা মেয়ের বাবা আরেকটা মেয়ের বাবার নিকট যাচ্ছে তার ভুলটা বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইতে। পৃথিবীর নিয়ম কতো অদ্ভুত সত্য আর সুন্দর, তাই না?

পুতুলের বিয়ে
লিখা: Bablu Ahmed Robin

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *