কষ্টের প্রেমের গল্প

মিস্টার জিনিয়াস – Read Bangla premer golpo online

মিস্টার জিনিয়াস – Read Bangla premer golpo online: তিনদিন হলো এক্সিডেন্টে মারা গেছে সবাই। আমার হাতেও বেশি সময় নেই। ছেলেটার তেমন কিছু হয়নি। কালপরশুর মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে। দেখবে ঘুম থেকে উঠেই তোমাকে জরিয়ে ধরে হু হু করে কাঁদবে।


পর্ব ০১

~ ছোঁবেন না আমাকে। আমি আপনাকে স্বামী হিসাবে মানি না। আমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি রোহিতকে ভালোবাসি। (বাসর রাতে বউ এর মুখে এমন কথা শুনেও শিশির অবাক হলো না। বরং আরুকে আলতো করে জরিয়ে ধরলো। আরু এবার চট করে শিশিরকে ধাক্কা দিয়ে খাট থেকে ফেলে দেয়।)

~ আহ। এভাবে কেউ নিজের বরকে ধাক্কা দেয়? কোমরটাই বুঝি ভেঙ্গে গেলো। (আরু ফ্যালফ্যাল করে শিশিরের দিকে তাকিয়ে আছে, ওর মনে হচ্ছে শিশিরের কন্ঠে নেশাজাতীয় কিছু মেশানো আছে, পরক্ষনেই মনকে সামলে নিলো কারন ওকে যে ওর স্বপ্নের কাছে যেতে হবে।)
~ দেখুন সরি। কিন্তু আপনি আমার স্বামী নন।

~ একটু আগে ১০০০ মানুষ সাক্ষী রেখে, কালিমা পড়ে কবুল বলে আমাকে বিয়ে করেছো আর এখন বলছো আমি তোমার স্বামী না। তাহলে কাকে বিয়ে করছো?

~ দেখুন সবাই জোর করে আমার সাথে আপনার বিয়ে দিয়েছে। এই বিয়েতে আমার মত ছিলো না। আপনাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম আমি রোহিতকে ভালোবাসি। আর ওকেই বিয়ে করতে চাই। আপনাকে বারবার বলেছিলাম বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে। কেন দিলেন না? বলুন কেন দিলেন না?

~ ভুল যখন করেছি তখন সংশোধনও করে নিবো। তো তোমার রোহিত থাকে কোথায়? রোহিত দেখতে কেমন?
~ জানি না। ওর বিষয়ে ও তেমন কিছু বলতো না তবে ও বলেছে ও আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমিও ওকে খুব ভালোবাসি। (নিরাশ চোখে উত্তর দিলো)

~ বাহ… ভালোবাসো অথচ প্রেমিকের সম্পর্কে কোনো খবরই জানো না? প্রেমটা কেমন?
~ মানে? কি বলতে চান? (রেগে জিজ্ঞাসা করলো)
~ না মানে কিভাবে প্রেম হলো সেটাই।

~ ওতোকিছু আপনার জানতে হবে না। আপনি শুধু আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিন।
~ ডিভোর্স দিতেই পারি তবে আমি কি পাবো?

~ যা চাইবেন তাই দিবো। বলুন কি চান? কি পেলে আপনি আমাকে ডিভোর্স দিবেন? (আরু ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে উঠে দাড়ালো। শিশির আরুর পা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত স্কান করে নিচ্ছে, উচ্চতা ৫.২” ফর্সা, একটু মোটা, চোখমুখ গোলগাল, বলতে গেলে মিনি সাইজের পুতুল।

লাল বেনারসি, হালকা মেকআপ, হাত ভর্তি চুড়ি, কপালে টিকলি, চোখের কালো কাজলটা ওর সৌন্দর্য আরো ফুটিয়ে তুলছে। শিশিরকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরু ভয় পেয়ে যায়।)

~ দেখুন আপনি যা ভাবছেন তা কখনো হবে না। আমাকে পাবেন না আপনি। আপনি যদি আমাকে জোর করার চেষ্টা করেন তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে দিবো।

~ ওয়াসরুমে একটা নীল শাড়ি রাখা আছে। চেন্জ করে ওটা পড়ে আসো। এতো ভারি শাড়ি + গহনা পড়ে থাকলে তোমার কষ্ট হবে।

~ (ব্যাটাকে এতোক্ষন যা যা বললাম সেগুলোর ওপর পাত্তা দিলো না নাকি? এমন স্থির ভাবে কথা বলছে কেন? তবে একটা কথা ঠিকই বলেছে এতো ভারি শাড়ি পড়ে নাটক করতে সত্যিই অনেক কষ্ট হচ্ছে।) আমার কষ্ট আপনার দেখতে হবে না। আমাকে ডিভোর্স দিবেন কবে সেটা বলুন।

~ আগে চেন্জ করে আসো তারপর বলছি।
আরু চেন্জ করতে ওয়াসরুমে চলে যায়।

[ এই হলো শিশির রিজন। আর তার জীবনের গল্পের একমাত্র নায়িকা আরুশি। যে এখন আরুশি শিশির রিজন। আজ ওদের বিয়ে হয়েছে। শিশির আরুকে ৩বছর ধরে ভালোবাসে। কিন্তু আরুর কাছে তার গানই সব। ওর ইচ্ছা ও একদিন বড় গায়িকা হবে। তার জন্য ওকে ঢাকা থেকে সিলেট যেতে হবে।

ওখানেই রেকর্ডিং শুট হবে। বাড়ি থেকে এসব মেনে নিচ্ছে না বরং জোর করে বিয়েই দিয়ে দিলো। তাই আরু ইচ্ছা করে নাটক করছে। যেন শিশিরের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ওর স্বপ্নের কাছে যেতে পারে। নিজের স্বপ্ন পূরন করতে পারে।

কারন আরু নিজেও শিশিরকে খুব ভালো করে চেনে। ও জানে শিশির এসব জানলে নিজেই আরুকে ওর ভালোবাসার কাছে ফিরিয়ে দেবে নাহলে বন্দি বানিয়ে রেখে দেবে নিজের কাছে। ]

কিছুক্ষন পর আরু চেন্জ করে বাইরে আসলো। চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। শিশির একটা তোয়ালে নিয়ে আরুর চুল মুছতে লাগলো। শিশির আচমকা এমন করায় আরু ঘাবড়ে যায়। আরু শিশিরের হাত থেকে তোয়ালে কেড়ে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে চুল মুছতে থাকে।

~ আমি মুছে নিচ্ছি। আপনার হেল্প লাগবে না। আপনি আমাকে বাড়ি থেকে বের করবেন কবে সেটা বলুন।
~ তার আগে তুমি বলো, তুমি মিথ্যা বলছো কেন?
~ ক.ক.কি ম.ম.মিথ্যা?

~ তোমার যে Bf নাই, তুমি যে কাউকে ভালোবাসো না সেটা আমি ভালো করেই জানি। আর তোমাকে কেউ জোরও করেনি এই বিয়েতে। এই তিনটা কথার সত্যতা তো প্রমাণ হয়েই গেছে
~ (ব্যাটা আসলেই বদ। আমার নাটকটা কাজে দিলো না। ফ্লপ করে গেলাম। কিন্তু চেষ্টা করেই যাবো। আমি সবার থেকে বেশি আমার গানকে ভালোবাসি। কিন্তু আম্মু আব্বুই শুনলো না। ধুরর)

~কি হলো বলছো না কেন? (ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো)
~ আসলে, আব্বু আম্মু কষ্ট পাবে তাই কাউকে বুঝতে দেইনি যে আমার এই বিয়েতে মত নেই। আর আমি কাউকে ভালোবাসি না।

(কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো। আর ও যে শিশিরকে অনেক ভয় পেয়েছে তার প্রমানও দিয়ে দিলো। কারন কথা শেষ হওয়ার ৩সেকেন্ডের মধ্যে আরুর গাল বেয়ে অঝোর ধারায় নোনা পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

শিশির দেখলো আরু ভয়ে কেঁদে ফেলেছে তাই আরুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। শিশিরকে এগিয়ে আসতে দেখে এবার আরু জোরে জোরে কেঁদে দিলো।) মারবেন না প্লিজজ। আমি আর আপনার সামনে নাটক করবো না।
~ আমি তোমাকে মারবো? এই চিন্তা মাথায় আসলো কেন?

~ আমার আম্মু আমাকে ধমক দিলেই মারে। হিয়ান তো মাঝে মাঝে মিথ্যা বলেও আমাকে মার খাওয়ায়। আপনিও রেগে গেছেন। আপনিও তো আমাকে মারবেন.. (কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিলো)
~ উনি তোমার সৎ মা?

আরু মাথা নেড়ে হ্যা সূচক উত্তর দিলো।
~ খাটের ওপর উঠে বসো।

~ কেন? এখানেই ঠিক আছে। দাড়িয়ে কথা বলতেই সুবিধা হচ্ছে।
~ টেবিলের ওপর খাবার রাখা আছে। খেয়ে নাও তারপর কথা হবে। সবকিছু ঠিক করা হবে। তুমি তো ঝাল বেশি খাও তাই আলাদা করে খাবার এনেছি তোমার জন্য।

~ আপনার কথা বার্তায় তো আপনাকে ভদ্রই মনে হয় তাহলে একটু আগে অভদ্রতা করলেন কেন?
~তোমার জামার(ব্লাউজের) চেইন খুলে গেছিলো তাই লাগিয়েছি। তোমার মাথায় এতো চিপ জিনিস ঘোরে কেন? যত্তসব চুপচাপ খেয়ে নাও।

আরু কথা না বাড়িয়েই খেয়ে নিলো। সারাদিন না খেয়ে আছে মেয়েটা। আরু খাচ্ছে আর আড় চোখে শিশিরের দিকে তাকাচ্ছে, শিশির করিডোরে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে। আরু খেয়ে উঠে প্লেটগুলো টেবিলের ওপর রেখে শিশিরের কাছে গেল। শিশিরের হাইট ৬ফিটের কাছাকাছি। আরু পেছন থেকে ডাক দেয়।
~ শুনছেন? আমি খেয়ে নিয়েছি এবার বলুন।

~ চুপচাপ ঘুমাও। যাও।
~ আজব তো আমাকে বাড়ি থেকে বের করবেন কবে? সেটা তো বলেন.. ওই এদিকে ফেরেন। ওতো চাঁদ দেখতে হবে না। চাঁদ কালকেও দেখতে পারবেন।

~ আরু যা বলছি তাই করো। যাও গিয়ে ঘুমাও। বিরক্ত করো না।

~ আমি বিরক্ত করছি? এই আপনার সমস্যা কি বলুন তো? নিজে জোর করে বিয়ে করছেন, আমাদের বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি কি এসব করতে বলেছিলাম? টাকার গরমে এসব করছেন। কি ভেবেছেন যখন ইচ্ছা আমার কেয়ার করবেন যখন ইচ্ছা বেশি কথা বলবেন?

~ সরি। এবার যাও। (বিরক্ত করছো বলেছি দেখে ভালো লাগলো না তাইনা? যখন তুমি সবসময় আমাকে এটা বলো তখন আমারও ভালো লাগে না আরু। ভালোবাসি তোমাকে কারন তোমার সবটা মেনে নিয়েই এই মন তোমাকে ভালোবাসতে সায় দিয়েছে। আর তুমি কি ভাবো? টাকা আছে বলে এসব করি? নাহ আরু তুমি সবটা জানো না। এই টাকা, এই আমি কোনটাই আমার না। এসব তো তোমারই।)

~ শরীর দেখানোর অনেক শখ তোর তাইনা? নে এবার দেখা। শাড়ি খোল। (কথাটা শোনামাত্র দিয়ার চোখ আমড়ার আটির মতো হয়ে গেলো। লোকটা আবার হুংকার দিয়ে উঠলো) কথা কানে যায়নি? কি বলেছি আমি
ভয়ে কলিজার পানি শুকিয়ে আসলো দিয়ার। বড় আপুর বন্ধুর [আরুর] বাড়িতে বিয়ে এটেন্ড করতে এসেছিলো ও।

স্টেইজের কাছে বসে কয়েকটা ছবি তুলতে না তুলতেই উদয় হলো সাক্ষাত যম। দিয়ার দুইমাত্র কাজিন রওশন ইয়ারাভ। প্রফেশনাল সিঙ্গার পাশাপাশি বাবার বিসনেসটাও দেখে সে। দেখতে মাশাআল্লাহ বলিউডের হিরোর চেয়ে কম না।

তবে কাজকাম টোটালি ডেভিলদের মতো। ছয় বছর আগে শনির মতো উদয় হয়েছিলো দিয়ার জীবনে, আর এতো বছরেও অস্ত গেলো না। দিয়া ফ্যালফ্যাল করে রওশনের দিকে তাকিয়ে আছে।

~ কককি বলছেননন ভভাইয়া…
রওশন তেড়ে এসে দিয়ার গাল চেপে ধরলো, তারপর এক হাতে দিয়ার পিঠ থেকে আচলের পিনটা ব্লাউজ থেকে খুলে নিলো। দিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। রওশন দিয়াকে নিয়ে একটা রুমে এসে দরজা লক করে দেয়।

~ আরে আরে দরজা বন্ধ করছেন কেন? প্লিজ দরজা বন্ধ করবেন না। প্লিজ আমার কাছে আসবেন না ভাইয়া। প্লিজ আমাকে মারবেন না। আমি ইচ্ছা করে কিছু করি নি। আমি আমার শরীর ওদের দেখাই নি।

ওরাইইদিয়ার কোনো কথা না শুনেই রওশন দিয়ার শাড়ির কুচিতে হাত দিলো। একটানে কুচি খুলে ফেললো, নাভির কিছুটা উপরে পুড়ে যাওয়ার দাগ, সিগারেটের আগুনে কালো হয়ে গেছে। দিয়ার পেটে হাত রাখতেই ভয়ে সেন্সলেস হয়ে যায় দিয়া।

~ কেন বুঝিস না দিয়া তোকে ভালোবাসি আমি। তুই কষ্ট পেলে তার থেকে হাজারগুন বেশি কষ্ট আমি পাই।
দিয়ার পেটে হাত রাখতেই আৎকে উঠলো রওশন। আজ বিকালেই রাস্তায় কিছু ছেলেরা দিয়াকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যার ফলস্বরূপ দিয়ার পেটের এই হাল।

বিকালে,
রকি: মালটারে দেখ ঝাক্কাস না? রিপু মেয়েটারে এদিকে নিয়ে আয় তো একটু টেস্ট করি। রূপের এতো ঝলক মনে হচ্ছে ছেলেদের পাগল করার জন্যই এমন ফিগার নিয়ে জন্মাইছে।

রিপু: মেয়েটা রওশন ভাইয়ের বোন বস। ওর দিকে তাকালেও রওশন ভাই তার চোখ উপড়ে ফেলে। ওর কথা বাদ দেন বস।

রকি: তুই আনবি নাকি তোরে শেষ করে তোর লাশ কুত্তারে খাওয়াবো? যা মেয়েটারে তুলে আন।
দিয়া তখন স্কুল থেকে বের হচ্ছিলো, কাধে স্কুল ব্যাগ শর্ট ব্লু স্কার্ট আর সাদা শার্ট পড়া, শ্যামলা গোলগাল চেহারা, দুপাশে বেনি করে সামনে ছেড়ে দেওয়া চুল। আর গলায় পানির বোতল ঝুলছে। রিপুসহ আরো একটা ছেলে দিয়াকে স্কুল গেট থেকে টানতে টানতে রকির গাড়ির সামনে নিয়ে যায়।

রকি: গাড়িতে তোল ওকে। রওশনের অনেক গরম তাইনা? আজ ওর বোনকে নিয়েই ফুর্তি করবো আমরা। দেখি কি করে ও।

দিয়া: আমাকে ছেড়ে দিন। কারা আপনারা? আমাকে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? এই চিকনা (রিপু) ছাড়।

রকি: হোল নাইট পার্টি করবো বেবি। তাই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি পার্টির মেইন থিম হিসাবে। তোমাকে আদর করবো, জুস খাওয়াবো।
দিয়ার শার্টের ওপর হাত ছোঁয়াতেই সরে গেলো দিয়া।
দিয়া: যাবো না আমি। & ডোন্ট টাচ মি। বেয়াদব ছেলে,

রকি: আই লাইক ইট। একটু তেজ না থাকলে খেলতেও মজা পাই না আমি। শিকারকে দৌড়ে ধরতে বেশি মজা পায় এই রকি। তো বেবি তোমার এই হটনেস তো আজ পানির মতো হয়ে যাবে।

দিয়া রিপুর হাতটা মুখের কাছে নিয়ে জোরে কামড় দিলো, রিপু ব্যাথায় হাত ছেড়ে দিতেই দিয়া দৌড়াতে লাগলো বাড়ি যাওয়ার শর্টকাট রাস্তাটার দিকে। রকি নিজের হাতে থাকা হকস্টিকটা ছুড়ে দিলো দিয়ার পায়ের কাছে।

দিয়া ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো রাস্তায়। হাটু ছিলে রক্ত বের হচ্ছে, ব্যাথা পেয়েছে খুব। রকি দিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর দিয়া পেছনে পেছচ্ছে। রকি দিয়ার দুহাত চেপে রাস্তার সাথে মিশিয়ে ফেলে। আশেপাশে কেউ নেই।

রকি: এবার কোথায় পালাবে বেবি? তোমার ফিগার নিয়ে একটু প্রশংসা করছিলাম কিন্তু তুমি এতোই লক্ষি যে সেটাও পছন্দ করলে না। তবে তোমাকে হার্ট করে আমি ডাবল মজা পাবো বুঝলে। (দিয়ার মুখে সিগারেটের ধোয়া ছাড়তেই কেশে ওঠে দিয়া।)

দিয়া: প্লিজ ছেড়ে দিন। আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে এমন করছেন কেন?
এরপর আর কিছু মনে নেই দিয়ার। যখন জ্ঞান ফেরে তখন ও নিজের বিছানায় ঘুমাচ্ছিলো। ঘর থেকে বের হয়ে সবাইকে নরমাল বিহেভ করতে দেখে বিকালের ঘটনাগুলোও কাউকে জানায়নি।


পর্ব ০২

রাতে,

রওশন দিয়া আর ছোঁয়াকে বাড়ি পৌছে দিয়ে নিজেও বাড়ি চলে যায়। দিয়া নিজের রুমের করিডোরে এককাপ কফি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ পেছনে ছোঁয়ার কন্ঠ শুনে বলে উঠলো
~ আচ্ছা বুবুন ওই যমরাজটা কোন কাজে বাংলাদেশে ফিরেছে গো? ইন্ডিয়ায় তো বেশ ভালোই ছিলো গান গাইতো, আমরা ওনাকে টিভিতে দেখতাম। বেশ ছিলাম তখন।

ছোঁয়া প্রশ্ন করলো,
~ কেন রে বেবি? ভাইয়া আবার কিছু বলেছে নাকি? কিছু কি করেছিস তুই? আর তোকে বোরকা পড়িয়ে নিয়ে আসলো কেন ভাইয়া।
দিয়া মুখ বাঁকা করে বললো,

~ তোমরা সবকিছুতে আমার দোষ্ খোজো। আমার মতো বাচ্চা মেয়েকে অলঅয়েজ একা ছেড়ে দিয়ে হাওয়া হয়ে যাও এটা ঠিক না। ভালো লাগে না আমার।

ছোঁয়া বুঝতে পারলো দিয়া কোনো কারনে রওশন ভাইয়ার ওপর ক্ষেপে আছে। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছে না।
~ বেবি কাল মামাদের বাড়ি আমাদের দাওয়াত। সকালেই যেতে হবে। এখন ঘুমিয়ে পড়।

~ আমার না আজ বিয়ে বাড়ির খাবার খেয়ে পেটে ব্যাথা হয়েছে। আমি মনে হয় যেতে পারবো না। তোমরা যেও। টাটা। উফ কি ব্যাথা।

নাটক করতে করতে ব্লাংকেট মুরি দিয়ে শুয়ে পড়লো দিয়া। ছোঁয়া বুঝতে পারছে যে দিয়া নাটক করছে তবুও কিছু বললো না। কারন সোজা কথায় দিয়া ওবাড়ি যাবে না। কিন্তু দিয়া কেন রওশনকে ইগনোর করতে চায় সেটা কেউ জানে না ইভেন বুঝতেও পারে না।

[দিয়া এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে। পড়াশুনায় ভালো তবে ভীষন ফাঁকিবাজ স্টুডেন্ট। আর ছোঁয়া ওর একমাত্র বড়আপু যাকে ভালোবেসে ও বুবুন বলে ডাকে। ছোঁয়া অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। রওশন, রওশন ইয়ারাভ দিয়ার একমাত্র মামাতো ভাই, ভীষন জেদি, একরোখা, ঘাড় ত্যারা, এক কথার মানুষ, কখনো হাসে না, বাড়ির মানুষদের সাথে এক হয় না। দিয়ার আরেকটা মামাতো বোনও আছে নাম রুহি।

সে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। রওশনের ছোট। ]
সকালে,
দিয়ার যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন ও খেয়াল করে যে ওর খাটটা কাঁপছে, বলতে গেলে ওঠানামা করছে। আর একটু গরম গরম লাগছে। দিয়া পাশ ফিরে আবার শুয়ে পড়ে।

কিন্তু আরেক জ্বালা শুরু হয়ে গেলো। এবার নাকে সুড়সুড়ি লাগছে, মনে হচ্ছে চুল উড়ে এসে পড়ছে বারবার। দিয়া নিজের মাথার ওপর হাত দিয়ে আরেকটু বালিশের উপর উঠে শুতেই ঘাড়ের ওপর গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়লে যেমন অনুভব হয় তেমন অনুভব করতে লাগলো। তাড়াতাড়ি চোখ মেলে তাকায় ও, কিন্তু অদ্ভুদ ব্যাপার এই যে রাতে ও যখন ঘুমিয়েছিলো তখন ওর ব্লাংকেট গোলাপী ছিলো আর এখন কালো। চট করে উঠে পড়ে দিয়া।

আর উঠে যা দেখতে পেলো তাতে ওর দম আটকে মরে যেতেও বেশি টাইম লাগবে বলে মনে হয় না।
দিয়া রওশনের উদাম বুকের ওপর আরামসে বসে আছে।

আর রওশন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ভয়ে কেঁদে ফেললো দিয়া, এটা দিয়ার অন্যতম খারাপ অভ্যাস ভয় পেলেই কেঁদে ফেলবে। দিয়ার চোখের কয়েকফোটা পানি রওশনের বুকে পড়তেই জেগে যায় রওশন।

দিয়া ওর বুকের ওপন আসন কেটে বসে চোখে হাত দিয়ে বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। ব্যাপারটা অদ্ভুদ তাইনা একটা মেয়ে একজনের বুকের ওপর বসে কাঁদছে অথচ অন্যজনের কষ্ট হচ্ছে না বরং হাসি পাচ্ছে এই ভেবে, , দিয়ার আকার আয়তন এমন যে সে একজনের বুকের ওপর বসলেও আরো একজন বসার মতো জায়গা ফাঁকা থাকে। রওশন খুব একটা মোটা না হলেও ব্যায়ামপুষ্ট বুকটা অনেক চ্যাপ্টা দেখা যায়। ” হাত পাগুলোও যথেষ্ট আকর্ষনীয় “এটা দিয়ার বলা সবচেয়ে খারাপ সংলাপ।

~ এভাবে কাঁদছিস কেন? আর আমার বুকের ওপর কি করছিস? লজ্জা করে না একটা ছেলের বুকের ওপর এভাবে বসতে।

~ আমি বসিনি, আমি তো এটাও জানি না আমি এখানে কিভাবে এসেছি। আমি তো আসতেও চাইনি। প্লিজ মারবেন না আমাকে।

~ তোকে মারি আমি?
~ আপনাকে দেখলেই মনে হয় এই বুঝি, এক্ষুনি মারবেন। দেখুন আমি তো আপনার ছোট বোন। ছোট বোনকে কেউ মারে? গতকাল শাড়িও খুলতে চেয়েছিলেন।

রওশন বুঝলো যে দিয়া তখনকার (রাতের) কথাটা বোঝেনি, তবে ভুলেও যায় নি।
~ (ওর সাথে ওমন করা আসলেই উচিত হয়নি। বাচ্চা মেয়ে বোঝে নি তবে ওর মনে ব্যাপারটা গেঁথে গেছে। আমি ওকে কিভাবে বোঝাবো যে কাল অনুষ্ঠানে ওকে নিয়ে বাজে বাজে কথা বলছিলো বেয়াদব ছেলেগুলো, তারপর রকিরা… ওদের ব্যবস্থা তো করে ফেলেছি এবার দিয়ার মাথা থেকেও এসব বের করতে হবে।) চকলেট খাবি?

দিয়া এবার চৃপচাপ রওশনের বুকের ওপর থেকে নেমে গেলো, রওশন উঠে ওর কাবার্ড থেকে কিছু চকলেট বের করছে, দিয়ার চোখ রওশনের পায়ের দিকে, কালো পশমে ভরা লোকটার পা।

~ (ফেসবুকের গল্পে পড়েছি ভেজা পায়ে ছেলেদের নাকি বেশি সুন্দর লাগে। ওনাকেও কি লাগবে? ধুরর কি ভাবি আমি.. উনি তো আমার ভাইয়া। তাছাড়া ওনার বয়সও তো আমার থেকে ১৩বছর বেশি কখনো মেলে নাকি
আমাদের? আমি বরং বুবুনের বন্ধুদের সাথে প্রেম করবো।

কিন্তু এই যমটা তো সবসময় আমার ওপর নজর রাখে। এর জ্বালায় তো কোনোকিছুই মনের মতো করতে পারি না। কবে যে ইন্ডিয়া ব্যাক করবে আল্লাহই জানে।) মনে মনে।

~ নে চকলেট খা। আর শোন কাল শাড়ি পড়ে যেভাবে ঘুরছিলি পড়ে যেতিস তখন তোর এই ছোট বডি সবাই দেখে ফেলতো। লজ্জা পেতিস না তখন? তাই ওটা খুলে বোরকা পড়িয়ে এনেছিলাম। বুঝেছিস্?

~ (যাক বাবা আমার ভালোর জন্যই বলছিলো। সত্যিই তো খুলে গেলে সবাই কি ভাবতো? ছেলেরাও টিজ করতো। উনি তো ঠিকই করেছেন। একবার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ওনাকে। এতোটা হেল্প করলেন।) ধন্যবাদ ভাইয়া এই প্রথম আমার ভালো ভাবা + করার জন্য।

ভ্রু কুচকে তাকালো রওশন। এমন চাহুনিতে কেঁপে উঠলো দিয়া।
~ কি বললি?

~ কি বলেছি? কিছু বলিনি তো। আমি কিছুই বলিনি।
হাসার চেষ্টা করে বললো, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে দরজা পর্যন্ত এসেই ভোঁ করে দৌড়ে চলে গেলো নিচে। রওশন কিছু একটা ভেবে একজনকে কল করলো।

নিচে এসেই বাড়ি ফেরার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিলো দিয়া, সারাবাড়ি ছোটাছুটি করছে। রিমিকা (দিয়ার মামি) নিজেও দিয়াকে বোঝানোর জন্য ওর পেছনে দৌড়াচ্ছে,

~ মামনি থাম। দৌড়াস্ না হাপিয়ে যাবি তো। বেলা তো অনেক হলো, ১১টা বেজে গেছে এখনো নাস্তা করিস নি।
~ আমি বাড়ি যাবো মামি। তোমার ছেলের কাছে থাকবো না আমি। তোমার ছেলের কাছে কেন, তোমার ছেলে যেখানে থাকবে সেখানেই থাকবো না। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। কোনো স্বাধীনতাই থাকে না।

~ রুহিকে আজ দেখতে আসবে। আর তুই চলে যাবি? তোর আপিপুর বরকে দেখবি না?
দাড়িয়ে গেলো দিয়া।

~ (আপিপুকে দেখতে আসবে? আর আমি চলে যাবো? নো নো নো আমিও থাকবো। কিন্তু ভাইয়া? কোনো ব্যাপার না ওনার থেকে দূরে থাকলেই হলো।) আমি থাকবো মামি। চলো খেয়ে নি। আম্মু কোথায়?
~ বুবু রান্নার দিক টা দেখছে। তুই চল তোকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি।

~ তুমি কষ্ট করবে কেন? বুবুন তো আছেই।
~ ছোঁয়া রুহিকে সাজাচ্ছে। দুপুরেই আসবে ওরা.. তুই খেয়ে নে।

রিমিকা দিয়াকে খাইয়ে দিচ্ছে আর এটা সেটা গল্প করে শোনাচ্ছে, দিয়াও টুপটুপ করে খাবার গিলছে। খাওয়া শেষে দিয়া নিজের রুমে গেলো, এবাড়িতে দিয়া আর ছোঁয়ার জন্যও আলাদা রুম আছে। দিয়া ছোট বেলায় দুইদিন পরপর এবাড়িতে আসতো সেজন্য, কিন্তু রওশন আসার পর ও আর আসে না।

দিয়া হাটতে হাটতে কখন যে রওশনের ঘরের সামনে চলে এসেছে তা ও নিজেও জানে না। দিয়া জামার কলার গালে দিয়ে রওশনের করিডোরে চলে গেলো। রওশন শুধু দেখলো ” মায়াবতী “নামক একটা বাচ্চা মেয়ে, থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর একটা টি~শার্ট গায়ে, মুখে জামার কিছুটা অংশ ঢুকিয়ে একমনে হেটে চলে যাচ্ছে, অথচ এই বাচ্চা মেয়েটাই ২৭বছরের এক ড্যাসিং যুবকের নেশা।

~ তুই কখনো বুঝবি না দিয়া যে তুই আমার কাছে কি? ৬বছর আগে তখন আমার ক্যারিয়ার সবে শুরু হয়েছে। গান ছিলো আব্বুর নেশা, সে সুবাদে আমিও গান গাইতাম। আস্তে আস্তে নাম ডাকও হলো, দেশের বাহিরেও চলে গেলাম। তুই তখন ৮বছরের বাচ্চা, তোর হয়তো আমাকে মনে ছিলো না।

তোর এটাও মনে ছিলো না যে তুই আমার কত আপন ছিলি। ছোঁয়াকে একটু বেশি আদর করলে তোর নাকটা রাগে কতটা ফুলতো। জানিস ৬ বছর আগে ইন্ডিয়া থেকে যখন প্রথম তোদের বাড়ি যাই তখন ভুল করে ছোঁয়ার রুম ভেবে তোর রুমে ঢুকে গেছিলাম। গোলাপী~সাদা রঙএর সোপিসে ঘরে ঢুকে যখন সাদা বিছানায় তোর মতো হুরকে দেখেছিলাম। বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠেছিলো। তোর জন্য বুকের কোণে জেগেছিলো আসক্তি, নিরুপায় ছিলাম আমি, ২১বছরের যুবক কিভাবে ৮বছরের বাচ্চাতে আসক্ত হয়? নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি তবুও অবাধ্য মন বারবার তোকে চায়। আবেগটা যে কখন ভালোবাসায় রূপ নিয়েছি বুঝতেই পারলাম না, এদিকে তুই?

আমাকে কখনো বুঝলি না জানি বুঝবিও না। এজন্যই তোকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসে যাবো, কখনো মুখ ফুটে প্রকাশ করবো না। তোকে সবসময় আগলে রাখবো। তোর ছাঁয়া হয়ে থাকবো আমি। যেদিন তুই বুঝবি, ভালোবাসবি আমায় সেদিনই ধরা দিবো আমি। অপেক্ষা করবো আমার পিচ্চি আসক্তির জন্য।

দিয়া করিডোরে বসে ভাবতে লাগলো কিভাবে রওশনকে ফাঁকি দিয়ে প্রেম করা যায়, আবার প্রেম তো যার তার সাথে করা যায় না, দেখা গেলো সুযোগ পেলো অথচ ছেলে পেলো না, আবার ছেলে পেলো অথচ সুযোগ পেলো না। বিরক্ত হয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলো দিয়া।

~ জীবনে কি এর হাত থেকে ছাড়া পাবো না? রোজদেরও[ রোজ দিয়ার বন্ধু ] তো ভাই আছে কাজিন আছে, কই ওদের তো নজর বন্দি হয়ে থাকতে হয়না। সব নিয়ম খালি আমার জন্য। আল্লাহ এতো প্যারাময় জীবন দিলে কেন?

দিয়া চোখ বুজে বিরবির করছিলো, হঠাৎ ওর মনে হলো যে ও শূণ্যে ভাসছে, চট করে চোখ মেলে তাকালো ও, আর সামনে রওশনের ঘর্মাক্ত মুখ দেখে শিহরিত হতে লাগলো, রওশনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, অনেকটা ছোট্ট ছোট্ট ম্যাজিক বলের মতো, দিয়া আঙ্গুল দিয়ে একফোটা ঘাম নিজের হাতে নিলো।
~ দেখেন ম্যাজিক বলের মতো।

দিয়ার কথায় দাড়িয়ে পড়লো রওশন, তখন দিয়াকে মাথা চাপড়াতে দেখে ভয় পেয়ে যায় ও, তাই দিয়াকে তুলে এনে বাম লাগিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু দিয়ার মুখে এমন মুহূর্তে এই রকম কথা শুনে ভ্রু কুচকে দিয়ার দিকে তাকালো ও। দিয়া এখনো চোখ ছোট করে আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে আছে। আর হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে। রওশন দিয়াকে খাটে বসিয়ে বাম আনতে যায়, কিন্তু যখন ফিরে আসে দিয়া তখন ঘরে নেই।

~ আমি বারবার ওনার ঘরেই যাই কিভাবে? ভাগ্গিস আমার কথাগুলো শোনেনি, যে পরিমানে কান খাড়া লোক একবার শুনলেই আমাকে ডিটার্জেন্ট ছাড়াই ধুয়ে দিতো। তখন আর বিএফ খোজার টাইম দিতো না পরকালের টিকিট কেটে সেখানে পাঠিয়ে দিতো। আমার জামাইটা বিয়ের আগেই বউহারা হয়ে যেত।

খচ্চর ব্যাটা তোর কপালে বউ নেই, আমাকে অনেক জ্বালাস তাইনা দেখবি তোর বউ এসে তোর রাতের ঘুম হারাম করে দিবে। আমার অভিশাপ অলঅয়েজ লেগে যায়। হাহ।

দিয়া নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাড়িয়ে বকবক করছিলো, রওশন ওকে খুজতে এসে দরজার সামনে দাড়িয়ে সবটা শুনে নেয়।

~ এখন যেটাকে বিরক্ত মনে করছিস একদিন সেটার জন্যই পাগল হবি দিয়া। আমার ভালোবাসাকে যদি তোর কাছে টর্চার মনে হয় তবে সেটাই ভালো, তোর জন্য আমি সব করতে পারবো।

নিজেকে যখন রাতের কালো আঁধারে ভরা নির্জন রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছিলাম তখন একমাত্র তুই ছিলি আমার আঁশার প্রদিপ। এখন নাহয় আবার আঁধারে ঢেকে যাবো। তোর জন্য এটুকু করলেও কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে?

দিয়া বিছানায় শুয়ে শুয়ে রোজের কথা ভাবতে লাগলো। অনেক দিন হয়েছে ওদের কোনো যোগাযোগ নেই। সপ্তম শ্রেণীতে থাকতে একবার বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়ে রোজের সাথে আলাপ হয় দিয়ার। তারপর থেকেই বন্ধুত্ব। রোজ নিজের নাম্বার দিয়েছিলো। এটা মনে পড়তেই দিয়া নিজের ফোন খুজতে শুরু করে।

~ তোর ফোন আমার রুমে ছিলো। তোর লাগতে পারে বলে দিতে আসলাম। এই নে।

~ (বেয়াদব যমটা যখন তখন চলে আসে এই রুমে। এরে কেউ কোনো কাজে পাঠায় না কেন রে। বাল সারাদিন আমার পেছন পেছন থাকে।) ধন্যবাদ।
দিয়া ফোন নিয়ে রোজের নাম্বারে কল করে। ওপাশ থেকে রিং হচ্ছে।

রোজ কম্পিউটারের কিছু প্রোগ্রাম ঠিক করছিলো, দিয়ার নাম্বার দেখে কিঞ্চিত ভ্রু কুচকে ফোনের দিকে তাকালো ও। প্রায় তিনমাস পর দিয়া কল করেছে। রোজ ফোন তুলে কেটে দিলো। তারপর প্রোগ্রাম ঠিক করে কলব্যাক করলো।

~ হ্যালো…
~ কি করছিলি রে তুই। ফোন কাটলি কেন? বি এফ টি এফ হইছে নাকি? তাই ব্যস্ত ছিলি।
~ কাজ করছিলাম। তোর মাথায় এগুলো ছাড়া আর কিছু আসে না তাইনা? এতো প্রেম করার শখ কেন?

~ তোরে বলছিলাম না রওশন যমের মানে আমার কাজিনের কথা। সারাদিন জ্বালায় মারে। প্রেম করার শখ কি এমনি এমনি হইছে? একখান বি এফ থাকলে এই যমের হাত থেকে বাঁচতাম। পালিয়ে যেতাম আমার জানের হাত ধরে।
~ বাহ। কি সুন্দর বুদ্ধি। মাথামোটি.. পড়াশোনার কি খবর সেটা বল।

~ আর পড়াশোনা, কাল তো ওই যম আমার শাড়িই খুলে দিচ্ছিলো। ব্যাটার লজ্জা শরম নাই? একটা মেয়ের শাড়ি কেউ এভাবে খুলতে চায়?
রোজ বাঁকা হেসে ফোন নিয়ে করিডোরে চলে গেলো। মৃদু বাতাসে চুলগুলো উড়ছে, রোজের গায়ের ওরনাটাও পতাকার মতো এপাশ ওপাশ উড়ছে। রোজ স্থীর গলায় বললো

~ আমি যা বলছি মন দিয়ে শোন। আমি তোর সাথে যতদিন কথা বলেছি ততদিনই তোর কাজিনের নাম শুনেছি। তোর কাজিন এই করে.. সেই করে.. তুই কি বুঝতে পেরেছিস যে তুইও চাস তোর কাজিন তোর সাথে এটা করুক।

শুধু তোর সাথে করুক। জীবন নামের এই খেলাঘরের সময়সীমা খুবই অল্প দিয়া। আমরা সবসময় নিজেদের মন আর মস্তিষ্কের কথা শুনি। তবে তুই সবসময় নিজের গোবর ভরা মাথার কথাই শুনিস আর আমাকে সেগুলো বলিস। তোরই বলা কথা থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় তোর কাজিনের তোর ওপর একটা আলাদা টান আছে।

হয়তো তোর সেলেব্রিটি কাজিন তোকে ভালোওবাসে। নাহলে কেউ কারোর জন্য নিজের স্বপ্ন নিজের বাস্তবতা, নিজের স্বকীয়তা অস্বীকার করতে পারে না। আর তুই যে অগোছালো তার জন্য রওশন ভাইয়াই ঠিক আছে। বুঝতে পেরেছিস?
~ নাহহ।
~ বলদ মাইয়া। আমি যা বলছি তাই কর আর তারপর কি হয় সেটা আমাকে ইনফর্ম করে দিস। আমি বলে দিবো তোর কি করা উচিত।

~ মানলাম উনি আমাকে ভালোবাসে বাট উনি আমার চেয়ে ১৩বছরের বড়। বুড়ো হয়ে গেছে একেবারে। তুই কি চাস তোর বেস্টুর জামাই বুইড়া ব্যাডা হোক
~ বয়স? যদি বয়স হিসাব করতে চাস তাহলে বলবো আমার আম্মু আমার আব্বুর চেয়ে ১৪বছরের ছোট + আমার আম্মু আব্বুরাও কাজিন ছিলো। তারা যখন সংসার করতে পেরেছে তখন তুই পারবি না কেন?

~ আংকেল আন্টিকে মারতো না কিন্তু ওই যম সময় পেলেই আমাকে ধরে মারে। কান ধরে দাড় করিয়ে রাখে। সাঁতার শেখানোর নাম করে পুকুরে চুবনি খাওয়ায়। তাও কিসের জন্য জানিস?

আমি একটা ছেলের কাছে নাম্বার চেয়েছিলাম তাই। ছেলেটা আমাকে প্রপোজ করছে আমিও হ্যা বলছি তাহলে নাম্বার নিতে কি সমস্যা?
~ আসলেই গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানানো যায় না। তেমনই তোকেও মানুষ করা যাবে না। চুপচাপ আমার বলা কাজগুলো কর। নোট করে নে সবটা ফাস্ট..


পর্ব ০৩

দিয়া উপর থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ছেলেপক্ষদের দেখছে। ছেলের নাম মিরাজ। ইঞ্জিনিয়ার, তাছাড়া একটা প্রাইভেট কম্পানিতে জবও করে। বাবা মায়ের বড় ছেলে।

রুহি আপুকে আনা হয়েছে। অন্যদিনের তুলনায় আজ রুহি আপুকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। নতুন বউ এর মতো শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়েছে ছোঁয়া। আচ্ছা দিয়ার বিয়ের সময়ও দিয়াকে এভাবে সাজানো হবে তাইনা? ভাবতেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে দিয়ার মুখশ্রী। রওশন নিচে ছেলের পাশে বসা। কিন্তু ওর চোখ দিয়ার দিকে স্থির। চোখ বুজে ঠোট চেপে হাসছে দিয়া। রওশন মুচকি হেসে বিয়ের কথা বলতে শুরু করে।

রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে সবাই। রুহির বিয়ে এ মাসের ১৭ তারিখ। বিয়ের জন্য কাল থেকেই শপিং শুরু হবে।

দিয়া ভাত আঙ্গুল দিয়ে নাড়ছে আর রোজের কথা ভাবছে। রোজ যা যা বলেছে সেগুলো করবে ঠিক আছে তবে সত্যি সত্যি যদি রওশন দিয়াকে ভালোবাসে তাহলে কি রওশনকে ওর বিয়ে করতে হবে? এই যমকে বিয়ে করলে তো ও বেঁচেও মরে থাকবে। দিয়ার ভাবনার মাঝে রওশন গম্ভির গলায় বেশ জোরেই বলে উঠলো,

~ ভাত নেড়েচেড়ে দেখার জন্য প্লেটে দেয়নি মামনি। না গিলে কার কথা ভাবছিস? খাচ্ছিস না কেন?
দিয়া কেঁপে উঠলো ভয়ে। তারপর আমতা আমতা করে বললো,

~ খাচ্ছি তো।
চুপচাপ খেয়ে উপরে চলে আসে দিয়া। তবে নিজের রুমে না গিয়ে রওশনের রুমে যায়। রওশনের বিছানার একপাশে বসে আপেল কাটছে দিয়া। রওশন রুমে এসে দিয়াকে দেখে বাইরে চলে যায়।
~ বাইরে গেলো কেন? অন্যসময় তো পিছু ছাড়ে না। আর আজ যখন দরকার তখন চলে গেলো।

দিয়া রাগে রাগে আপেলের ভেতর ছুরি ঢোকাতেই ছুরি গিয়ে দিয়ার হাত স্পর্শ করে। ধারালো ছুরি হাতে লাগতেই হাতের আঙ্গুল আর চামড়ার বেশখানিকটা কেটে যায়। রক্ত দেখে দিয়ার মাথা ঘুরতে শুরু করে।

ব্লাড ফোবিয়ার জন্য মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজও বের হচ্ছে না। ওদিকে রওশন দিয়ার জন্য চকলেট নিয়ে রুমে আসতেই দেখে দিয়া চুপচাপ হাতের দিয়ে তাকিয়ে বসে আছে। হাত বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। দিয়ার কপাল গলা বেয়ে ঘাম ঝরছে। রওশনের হাত থেকে চকলেটগুলো পড়ে গেলো। রওশন ছুটে এসে দিয়ার হাত ধরে ফেললো,

~ এটা কিভাবে করলি? তোকে আপেল কাটতে বলেছে কে? ব্যাথা করছে অনেক তাইনা? দাড়া আমি এখুনি ঠিক করে দিচ্ছি। তুই চোখ বুজে থাক।

অস্থির হয়ে উঠে দাড়ালো রওশন। পুরো ঘরে তন্নতন্ন করে ফাস্টএইড বক্স খুজতে লাগলো। ড্রয়ারের সব জিনিস নিচে ফেলে দিসে, কাবার্ডের সব জিনিস ভেঙে ফেলছে। তবুও ফাস্টএইড বক্স পাচ্ছে না। রওশনের চোখ বেয়ে একনাগাড়ে পানি পড়ছে। রিমিকা শব্দ শুনে উপরে ছুটে আসে আর রওশন দিয়াকে এভাবে দেখে ঘাবড়ে যায়।

রিমিকা নিচ থেকে ফাস্টএইড বক্স এনে রওশনের হাতে দেয়। রওশন বক্স হাতে নিয়েই সেন্সলেস দিয়ার পাশে বসে হাতে ব্যান্ডেজ করতে থাকে। রওশনের এমন অবস্থা দেখে রিমিকা মুচকি হাসে।

~ আম্মু দিয়া চোখ খুলছে না কেন? ডক্টর ডাকো তাড়াতাড়ি? নাকি হসপিটালে নিয়ে যাবো? অনেকটা কেটে গেছে। আম্মু ও তাকাচ্ছে না কেন? আমি তো ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি তবুও তাকাচ্ছে না কেন? ওকে তাকাতে বলো আম্মু। ওকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না আমার।

রিমিকা রওশনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ধীর গলায় বললো
~ ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে বাবা। কিছুক্ষন যাক জ্ঞান ফিরে আসবে। তুই হাতমুখ ধুয়ে আয় আমি রুম পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

~ ওর কিছু হলে আমি বাঁচবো না আম্মু। আমাররর
~ আমি বুবুর সাথে কথা বলছি তোদের বিষয়ে, আজ জানতে পারলাম আমার ছেলের স্বভাব পাল্টানোর কারণ। এতো কষ্ট পাবার কারণ। আমাদের এসব আগে বলিস নি কেন? বুবুরাও তো চায় দিয়াকে তোর হাতে তুলে দিতে।

~ ও অনেক ছোট আম্মু। আমি চাইনা ওর জীবনটা নষ্ট করতে। আমাকে ও মেনে নিতে পারবে না। ও আমাকে শুধু নিজের ভাই এর মতো। আমিও চাই ওর মতের সম্মান করতে। ও যা চায় সেটাই হবে তবে তুমি কখনো বলবে না যে আমি ওকে ভালোবাসি। প্লিজ

~ দিয়াকে বলে দেখ ও কি চায়… প্রয়োজন পড়লে আমি ওর সাথে কথা বলবো। কিন্তু তোকে এভাবে কষ্টে থাকতে দেখতে পারবো না। আমি তোর মা রওশন, নিজের ছেলেকে এভাবে কষ্ট পেতে, কাঁদতে দেখবো কিভাবে?

~ আমার কষ্ট হলে হোক। তবুও ও কষ্ট পায় এমন কোনো কাজ করো না। আমার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবো কিন্তু ও কষ্ট পেলে সেটা সহ্য করতে পারবো না আমি।

রিমিকা কিছু না বলেই চলে গেলো ওখান থেকে। রওশনের এমন মনগড়া কথা শোনার কোনো মানেই হয়না।
🍂🍂🍂🍂

বিয়ের পরের দিনও কেটে গেলো অথচ শিশির আরুকে এখনো বললো না যে ওদের ডিভোর্স কবে হবে। একটা সম্পর্ক তৈরি করে এভাবে ভেঙে ফেলা উচিত কিনা সেটাও বুঝতে পারছে না আরু। আবার এসব না বললে শিশির কি আরুকে যেতে দেবে?

~ আরু তুমি তোমার গান নিয়ে থাকতে চাও তাইনা?
আরু চট করে উত্তর দিলো।

~ হ্যা। আমি গান নিয়ে থাকতে চাই। নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করতে চাই। কিন্তু আপনার জন্য তো সেটা সম্ভব হলো না। উড়ে এসে জুরে বসেছেন আমার জীবনে।
শিশির আরুর হাত ধরে ছাদে আসলো।

~ পূর্ণিমার চাঁদ সারা আকাশে আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তুমিও তোমার গান সারাদেশে ছড়াতে চাও.. জানি আমি। তাই তোমাকে সিলেট নিয়ে যাবো।
~ কিহ? আপনি সত্যি বলছেন? সত্যি নিয়ে যাবেন।

~ হুম। তবে একটা শর্ত আছে, তুমি গাইতে যাবে তবে সেটা আমাদের ডিভোর্সের পর। তোমার কথামতো আমি এপ্লিকেশন জমা দিয়েছি। কোর্ট থেকে আমাদের ছয় মাস একসাথে থাকতে বলেছে তারপরই ডিভোর্স হয়ে যাবে। তখন তুমি তোমার স্বপ্নের কাছে যেতে পারবে।

~(বাহ এটাকেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা। কিন্তু উনি জানলো কিভাবে আমি গান গাইতে চাই। আমি তো বলিনি। যাক আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই জন্য।) আচ্ছা ঠিক আছে। কফি খাবেন?
~ নাহহ।
রাতে বিছানায় শুয়ে ফোন টিপছিলো শিশির। হঠাৎ আরু এসে কাঁদতে শুরু করে। শিশির চোখ তুলে দেখলো আরুর হাত ফুলে আছে আর আরু হাতে একটু ফু দিচ্ছে, একটু কাঁদছে। শিশির আরুর হাত টেনে ফু দিতে দিতে বললো
~ ফুলে গেছে কিভাবে?

~ মৌমাছি কামড় দিসে। আমার হাত কি কেটে ফেলতে হবে? তাহলে মাইক্রোফোন ধরবো কিভাবে? গান গাইবো কিভাবে?
~ এখনই ঠিক হয়ে যাবে। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি তুমি বসো।
শিশির বাইরে গিয়ে চুন নিয়ে আসলো, চুনে একটু থুতু দিয়ে আরুর হাতে লাগিয়ে দিলো। আরু এখনো নাক টেনে কাঁদছে।

~ আরু এবার ঘুমাও। কাল সকালে দেখবে আর ব্যাথা নেই। সব ব্যাথা সেরে যাবে।
আরুকে বুকের ওপর শুইয়ে দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। শিশিরের ফোন বেজেই যাচ্ছে। আরু ঘুমিয়ে গেলে শিশির উঠে ফোন নিয়ে বাইরে যায়। সাইক্রেটিস্ট এর ফোন।
~ হ্যালো স্নিগ্ধ ভাইয়া
~ হ্যালো। কাল চেক আপ এর ডেট ফিক্সড করেছি শিশির। পরশু দেশের বাহিরে যাচ্ছি তাই ভাবলাম যাওয়ার আগে একবার আরুশিকে দেখে যাবো।

~ জি। কখন আসবো?
~ সকাল ১১টায়। তবে আরুশির কন্ডিশন এখন কেমন দেখছো? গান নিয়েই আছে নাকি অন্যকিছুও বলছে? চিনতে পারছে তোমাদের?

~ নাহ। আগের মতোই আছে। আচ্ছা ও কি কখনো সুস্থ হবে না? আগের মতো স্বাভাবিক হবে না?

~ ইনশাহ্ আল্লাহ আর কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার আরুশি তোমার কাছে ফিরে যাবে। আগের মতো হয়ে। নাহলে যে আমার বদনাম হয়ে যাবে। এ পর্যন্ত সব পেসেন্ট আমার কাছ থেকে প্রপার ট্রিটমেন্ট পেয়ে সুস্থ হয়েছে। আরুশিও হবে।
~ ধন্যবাদ ভাইয়া। রাখছি।

~ আল্লাহ হাফেজ।

🍂🍂🍂🍂
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দিয়ার চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়। রওশন একটা টাওয়াল পড়ে সারা ঘর জুরে হাটছে আর কিছু একটা খুজছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে। সারা শরীরে বিন্দু বিন্দু পানি দেখে দিয়া এক অদ্ভুত অনুভুতিতে শিহরিত হতে লাগলো। রওশন কাবার্ড বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকাতেই দেখলো দিয়া ওর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।

~ দেখা শেষ হলে আমার ব্লু রং এর শার্টটা খুজে দে।
রওশনের কথায় লজ্জা পেয়ে যায় দিয়া। চোখ নামিয়ে উঠে শার্ট খোজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে ও। খাটের নিচে শার্ট পড়ে আছে। এই মানুষটার শার্ট খাটের নিচে গেলো কিভাবে? ইনি তো যথেষ্ট গোছানো স্বভাবের বান্দা। ভেবেই কপাল কুচকালো দিয়া। শার্টটা নিয়ে রওশনের হাতে দিতেই রওশন হাত লম্বা করে দাড়িয়ে গেলো।
~ আমার হাত ব্যাথা করছে। পড়িয়ে দে।

দিয়া তৎক্ষনাৎ শার্ট পড়িয়ে দিলো। জামাবিহিন রওশনকে দেখার চেয়ে শার্ট পড়িয়ে দেওয়াই বেশি সহজলভ্য। শার্ট পড়িয়ে পাশে দাড়াতেই রওশন বলে উঠলো
~ শার্টের বোতাম কে লাগাবে?
দিয়া আবার গিয়ে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগলো। রওশন মুচকি মুচকি হাসছে। দিয়া হাতের দিকে লক্ষ করে দেখলো ওর হাতে ব্যাথা নাই।
~ আপিপুর বিয়ে। আমি আমার এক বন্ধুকে ইনভাইট করতে চাই।

~ কে সে? আর একজন কেন? তোর যত ফ্রেন্ড আছে সবাইকে ইনভাইট কর। কার্ড লাগলে বলিস এনে দেবো।
~ না না। একজনকেই ইনভাইট করবো। নাম রোজ। খুলনায় বাড়ি।

~ একজন কেন?
~ বাকিদের সাথে শুধু কথা বলা যায়। আর ওরা আমার বেস্টু না ওরা তো শুধু আমার পেছনে লাগে সবসময়। আমাকে বারবার বিপদে ফেলে পালিয়ে যায়। আপিপুর বিয়েতে আসলে ঝামেলা করতে পারে তাই ওদের ইনভাইট করবো না। আমার বিয়েতে করবো তখন ঝামেলা করলেও সমস্যা নেই।
~ কেন তখন কি ওরা যুধিষ্ঠি সেজে আসবে।

~ আমাকে তো জ্বালাবে না আমার বরকে জ্বালাবে। আমিও তো সেটাই চাই, দেখতে চাই কার বুকের পাটা এতো বড় যে আমাকে মামনিদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে আসবে। আমার বন্ধুদের সামনে পড়লে বাপ বাপ করে পালাবে বর বাবাজি।

দিয়ার কথা শুনে রওশন আড় চোখে দিয়ার দিকে তাকালো। তারপর নিচের ঘরে চলে গেল। দিয়া আবার রোজকে ফোন দিলো। রোজ ফোন রিসিভ করতেই দিয়া বলে উঠলো

~ পরশু আমি আর যমরাজ গিয়ে তোকে ঢাকায় নিয়ে আসবো। না না করবি না প্লিজ। আমার একটা মাত্র বেস্টু তুই। তোকে ছাড়া বিয়েবাড়িতে মজা করবো কিভাবে?

~ বাহ। নিজের কাজ করিয়ে নেওয়ার ধান্দাটা দারুন। কিন্তু আমি তো যেতে পারবো না। প্রচুর কাজ আছে আমার। আর সামনেই পরীক্ষা এখন যাওয়া সম্ভব না।

~ পরীক্ষা তো এখনো ৩~৪মাস পর। ৩~৪দিনের জন্যই তো আসবি, কোনো সমস্যা হবে না। আমি না তোর ছোট বোন, কিউট বেস্টি। তাহলে না করছিস কেন? তুই না আসলে আমি থাকতে পারছি না এ বাড়িতে। বুঝতেই পারছি না কি করবো। ওই যমটা কি চায় সেটাও তো জানতে হবে।

~ আচ্ছা আমি ভেবে পরে জানাচ্ছি। এখন বল তোর কি খবর? বলেছিলাম না হাতের আঙ্গুল সামান্য কেটে ভাইয়ার রিয়াক্শন দেখতে,
~ আর নাটক! কাল সত্যি সত্যি হাত কেটে গেছিলো

~ তারপর?
~ তারপর কি হইছে সেটা জানবো কিভাবে? সেন্সলেস হয়ে গেছিলাম। জানিস না আমার ব্লাড ফোবিয়া আছে।
~ কোনো কাজের না তুই। মাতব্বরি করতে গেছিলি কেন? পাক্না মাইয়া। হাতের কি অবস্থা এখন, মেডিসিন নিছিস বেয়াদব।

~ তুই কি আম্মা হয়ে গেলি। আমার চেয়ে বেশি পাক্না তুই। সবে ক্লাস টেনে পড়িস তাতেই এতো। বড় হলে কি হবি আল্লাহই জানে।

~ জিনিয়াস।
~ লাড্ডু হবি। তোর যা স্বভাব খালি কাজে আর পড়াশোনায় জিনিয়াস হয়ে কি লাভ। মনের জিনিয়াসই আসল জিনিয়াস রে পাগলি। বাকিসবে তো চোখ বুজে তোকে জিনিয়াসের মেডেল দেওয়া যায়।

~ থাক আর পাম দিতে হবে না। তাছাড়া আমি জিনিয়াস হতে চাইনি। আমি তো তোকে জিনিয়াস বলেছি, তোর প্রতিভা বিচার করে।

~ সিরিয়াসলি, আমি তো জানতামই না যে আমারও প্রতিভা আছে। ওই যমরাজ তো আমাকে অকর্মার ঢেকি আর ছোট হাতি মনে করে।
~ তোর প্রতিভার আওতায় কি কি পড়ে সেটা শুনবি না?

১. এক লাইন জেনেই চার লাইন বেশি বুঝে যাস। ২. তিলকে তাল বানাতে ওস্তাদ তুই। ৩. গাধি দের যতগুন সব নিজের আয়ত্বে করে নিয়েছিস। ৪. মাথায় গোবর ছাড়া কিছু রাখতেই দিসনি। ৫. বাচ্চা থেকে নিজেকে বড় করতেই পারিস নি। পারলেও সেটা শরীরে, মনে বা মস্তিষ্কে না।

~ তুই আমার দূর্নাম করতেছিস। এটা কিন্তু ঠিক না। এক বছরের বড় বলে সবটা মেনে নিলাম। যেদিন তুমি এমন ঝামেলায় পড়বা সেদিন আমিও মজা নিবো জানু। আপাতত ব্যাগ গুছিয়ে রাখ।

~ আচ্ছা। আমাকে হোস্টেল থেকে…
~ এখনো হোস্টেলে থাকিস?

~ কি করবো বল? আমার তো বাবা থেকেও নেই। বাদ দে। তোর তো অনেক কাজ এখন যা সেগুলো কর। রাখছি আমি
~ দাড়া ফোন কাটিস না। শোন

~ আবার কি?
~ বলছি কি আমার জন্য নোটস বানাতে বলেছিলাম না সেগুলো বানিয়ে রাখিস। তোর নোটস পড়লে আর বই পড়া লাগে না। সবটাই কমন আসে।
~ বানানোই আছে। এবার রাখছি কিছু এপ্লিকেশন ওপেন করতে হবে।
~ আচ্ছা টাটা। লাভ ইউ জানু।

রোজ “পাগলি” বলে মুচকি হেসে ফোন রেখে দিলো। দিয়াও ফোন রেখে মাত্রই পেছন ঘুরেছে কিন্তু পেছনে যে সাদা যম টা লাল যমে পরিনত হয়েছে সেটা কে জানতো? দিয়া রওশনের রাগি লুক দেখে ফোন মেঝেতে ফেলেই দৌড়ে নিচে চলে গেলো। রওশন ফোন হাতে নিয়ে কললিস্ট চেক করছে।

~ “জানু” তোর জানু বলা বের করছি। কোন ছেলের সাথে প্রেম করছিস একবার জেনে নেই তারপর হাত পা ভেঙে
কললিস্টে বড় বড় LoVe YoU jAnU নাম দেখে রওশনের মাথায় রক্ত উঠে যায়। ও সাথে সাথে নাম্বারটিতে নিজের ফোন দিয়ে কল দেয়। ওপাশ থেকে একটা মেয়ে বলে উঠলো
~ আসসালামু আলাইকুম। কে?

~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি দিয়ার কাজিন। তুমি?

~ রোজ। কিন্তু আপনি আমাকে কল করেছেন কেন ভাইয়া? কোনো সমস্যা?
~ না আসলে
~ নির্বিঘ্নে বলতে পারেন যা বলতে চান। হেজিটেট করলে কেউই ঠিক করে বুঝতে বা বোঝাতে পারবেন না। হয়তো আমাকে ফোন দেওয়ার একটা কারন বুঝতে পেরেছি তাই বলছি.. যদি দিয়ার প্রতি আপনার ইমোশন ব্যক্ত করতে চান তাহলে অন্যের সাহায্য না নিয়ে নিজেই ওকে সরাসরি সবটা বলুন। কারন দিয়া নিজেও, নিজের অজান্তে আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছে।

ও বুঝতে না চাইলেও আমি বুঝতে পেরেছি। বিকজ আমার বেস্টি, ছোট্ট বোনুটা আমার সাথে সব শেয়ার করে। আমি সময় সম্পর্কে খুবই সচেতন ভাইয়া তাই এখনই আপনাকে সব সত্যটা জানালাম, আমার মনে হলো এমন একটা সত্য জানানোর উপযুক্ত সময় এটাই। হয়তো আপনি এটা শুনে খানিকটা অবাক হবেন। কথা বলতেও সমস্যা হতে পারে তাই আল্লাহ হাফেজ & বেস্ট অফ লাক ভাইয়া।

রোজ ফোন কেটে নিজের কাজে মন দেয়। “যেন স্বাভাবিক কিছু কথা বলেছে” এমন একটা ভাব বিরাজ করছে রোজের মাঝে। ওদিকে রওশন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কি শুনলো ও?

রোজ নামক মেয়েটা ১মিনিট ৭সেকেন্ডে ওর লাইফের সব থেকে ইম্পর্টেন্ট জিনিসটা ওকে বুঝিয়ে দিলো? এইরকম একটা সত্য যে কেউ অনায়াসে রওশনকে জানাবে তা রওশনের কল্পনার বাহিরে। আজ অবধি কেউ রওশনের সামনে স্বাভাবিক গলায় কথাও বলেনি ওর রাগের জন্য। অথচ রোজ সবটা জেনেও এভাবে উপদেশ দিলো?

আসলেই দিয়ার বেস্টু হওয়ার যোগ্য এই মেয়েটা। আর এই মেয়েটার বেস্টু হওয়ার মতো ভাগ্যবতী হলো দিয়া। কথাগুলো ভেবে কয়েক ঢোক পানি গিললো রওশন।

বিকালে দিয়া নিজের ফোন নিতে রওশনের রুমে চুপিচুপি আসে। রওশন তখন ঘুমাচ্ছিলো কিন্তু দিয়ার নুপুরের আওয়াজে ঘুমটা অসময়েই ভেঙে যায়। দিয়া ফোন নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই রওশন বলে উঠলো,
~ দাড়া।
দিয়া পেছনে ঘুরে দাড়ালো

~ কি?
~ রোজকে আনবে কে?
~ আমি আর আপনি যাবো। হোস্টেল থেকে সোজা এখানে নিয়ে আসবো। শুনুন ওর সামনে ওর পরিবার নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। অকে।
~ কেন? ওর মা~বাবা নেই?

~ মা নেই, ওর মা নাকি মারা গেছে ছোটবেলায়। আর বাবা আছে কিন্তু ওকে মেয়ে বলে মানে না।


পর্ব ০৪

~ কেন মানে না কেন?

~ রোজের জন্য নাকি ওর মা মারা যায়। তাই ওর বাড়ির সবাই ওকে অপয়া মেয়ে বলে ডাকে। বাড়ির কোনো শুভ কাজে ওকে যেতে বলে না। ও গেলে ওকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আপনি ওর কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?

~ এরপর থেকে আমাদের সব অনুষ্ঠানে ওকে ডাকবি। বলবি ওর ভাইয়া ওকে আসতে বলেছে।
~ আপনি কবে থেকে ওর ভাই হলেন? ও ছেলেদের সাথে মেশে না। ওর দুইটাই ভাই, ওর কাজিন সম্রাট আর আরিশ। আপনাকে ভাই বলবে কেন? আপনাকে তো ও চেনেও না।

~ এসব তোর বুঝতে হবে। আর এসেছিস যখন তখন আমার ঘাড় টা টিপে দে। সকাল থেকে ব্যাথা করছে।
~ বিয়ে করে বউ কে এনে ঘাড় টিপান আমি পারলে গলা টিপে দিতাম। এতো জ্বালা আর ভালো লাগে না। যত্তসব।

~ কি বললি তুই। দাড়া তোর তো আজজ
রওশন দিয়ার দিকে তেড়ে যেতেই দিয়া দৌড়ে নিচে চলে গেলো। ওরনাটা দরজার ফাকে আটকে আছে। রওশন ওরনাটা হাতে নিয়ে, ওরনায় মুখ গুজে ঘ্রাণ নিতে লাগলো। দিয়া নিচ থেকে উঁকি দিয়ে রওশনকে এভাবে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকালো।

~ লুচ্চা ব্যাটা। ওরনাটা নেওয়ার সময়টুকুও দিলো না। অসভ্য।
🍂🍂🍂🍂
শিশির আর আরু তৈরি হচ্ছে স্নিগ্ধর কাছে যাওয়ার জন্য। স্নিগ্ধ কলেজ লাইফে শিশিরদের সিনিওর ছিলো। আর রওশন স্নিগ্ধর বন্ধু। তাছাড়া রুহি ছোঁয়া, আরুর খুব ভালো বন্ধু। ছোঁয়ার ক্লাসমেট আরু।

কেবিনে গিয়ে বসতেই স্নিগ্ধ ভ্রু কুচকে শিশিরকে জিজ্ঞেস করলো,
~ বিয়ের বা প্রথম রাতের কোনো চিহ্ন তো শরীরে দেখা যাচ্ছে না শিশির।
শিশির ঠোট উল্টে বললো

~ আর বিয়ে। বউ তো বিয়ের রাতেই ডিভোর্স চেয়ে বসে আছে। কানের ১২টা বাজিয়ে দিচ্ছে এক কথা বারবার বলে। দ্বিদুনকেও গ্রামের বাড়িতে রেখে এসেছি ওর এই স্বভাবের জন্য। ও সুস্থ না হলে তো সবাইকে আনতেও পারছি না।

~ ওকে বাইরে রেখেছো কেন? ভেতরে আনো।
~ ও জানে আমার মাথা খারাপ তাই আমাকেই ভেতরে পাঠিয়েছে। এখন ডাকতে গেলে রেগে ঢোল হয়ে যাবে।

~ তাহলে আনার দরকার নাই। আমি কয়েকটা মেডিসিন দিচ্ছি সেগুলো দাও। আমি তো পরশুই চলে আসবো। রওশনের বোনের বিয়ে জানোই তো,

~ হ্যা। আমাদেরও ইনভাইট করেছেন ভাইয়া। যেতে পারবো কিনা বুঝতে পারছি না। আরুর এই অবস্থা।
~ আরুকে নিয়ে এসো। সবার মাঝে থাকলে ভালো লাগবে ওর। আচ্ছা এখন তাহলে উঠি যাওয়ার সময় আরুকে দেখে নিচ্ছি। ওকে জানানোর দরকার নাই সমস্যাটা কি।

~ হুম।
আরুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে শিশির। আরু জানালার দিকে তাকিয়ে গান গাচ্ছে। আর শিশিরকে এটা সেটা বলে বিরক্ত করছে।
~ আরু আইসক্রিম খাবে?

~ হুম। তবে আপনি খেলেই খাবো।

~ চলো খাই।

শিশির আইসক্রিম অর্ডার করে আরুকে নিয়ে বসলো। কিন্তু পেছনে তাকাতেই ওর মুখ “হা ” হয়ে যায়। দিয়া আর ওর কিছু বন্ধুরা মিলে একটা ছেলেকে টিজ করছে। ছেলেটা রেস্টুরেন্টের ভেতর হাত নাড়িয়ে নাচছে। কিন্তু বিষয়টা ভালো ভাবে দেখে বুঝতে পারলো ওরা টিজ করছে না, ছেলেটা “গে”।

দিয়ার বন্ধুর পেছনে লেগেছে তাই ওরা ফাজলামি করছে। দিয়াকে অনেকবার আরুর সাথে দেখেছে শিশির তাই চিনতে সমস্যা হয়নি।

~ দিয়া?
শিশিরের ডাকে পেছন ফিরে তাকালো দিয়া। নিমিষে দিয়ার মুখটা কালো হয়ে গেলো। ও গুটি গুটি পায়ে শিশিরের সামনে আসলো। দিয়ার এমন কাজে অবাক হয় শিশির। হঠাৎ দিয়া কেঁদে বলে ওঠে
~ প্লিজ ভাইয়া যমটাকে বলবেন না আমি এখানে এসেছি। তাহলে আমাকে খুব মারবে। আমি এখুনি চলে যাচ্ছি তবুও কাউকে বলবেন না আমি এখানে এসেছি।

শিশির দিয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। কাকে যম বলছে.. কে ওকে মারবে.. দিয়া কেন কাঁদছে কিচ্ছু বুঝতে না ও। আরু দিয়াকে ডেকে ওর পাশে বসায়।

~ যম টা কে দিয়া? (প্রশ্ন করে শিশির।)
~ আপনাদের ভাই। সিনিওর ভাই রওশন।

দিয়া ঠোট মুখ বাঁকিয়ে ভেঙচি দিয়ে বললো কথাটা। দিয়ার এক্সপ্রেশন দেখে শিশির না হেসে পারলো না। শিশিরের হাসির শব্দের সাথে আরো একজনের হাসির শব্দ যোগ হলো। সেটা আর কেউ না আরু, দিয়া ফ্যালফ্যাল করে ওদের দিয়ে চেয়ে আছে।

~ আমি কি কোনো জোক্স বলেছি যে তোমরা হাসছো? আমার কিন্তু কান্না পাচ্ছে আরুপি। শিশির ভাইয়াকে বলো না যেন যমটাকে কিছু না বলে, মিথ্যা বলছি জানলে নির্ঘাত মারবে।

~ আপনি রওশন ভাইয়াকে কিছু বলবেন না। ঠিক আছে? (শিশির মাথা নেড়ে হ্যা বললো) নাও এবার কান্না থামাও দিয়া। উনি কিছু বলবে না।

~ থামছে না তো। আমি কাঁদা শুরু করলে থামাতে পারি না।

~ শিশির আপনি খাবার অর্ডার করুন। একেবারে দুপুরের খাবার খেয়েই যাই। বাড়িতে তো রান্নাও হয়নি আজ। দিয়া আমার পাশে চুপ করে বসো।

শিশির খাবার অর্ডার করে আরুর দিকে তাকালো। মেয়েটা কতো হাসিখুশি আছে এখন। দিয়ার সাথে কথা বলছে মজা করছে। কে বলবে কয়েকদিন আগে মেয়েটা নিজেই নিজের এক্সিডেন্ট করিয়েছিলো,
~ আরুপি
~ কি হয়েছে সোনা?

~ আমি খাবো না। বাড়ি গেলে ওই যমটা আবার গেলাবে খাবার।
~ এমন বলে না। উনি না তোমার ভাইয়া। এক কাজ করো আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে চলো। আমি রওশন ভাইয়াকে বুঝিয়ে বলবো তাহলেই হবে।

~ তুমি ওদের সাথে থাকতে চাও আরু?

~ হুম। আপনিও থাকতে পারেন যদি চান। আসলে রওশন ভাইয়া তো সিঙ্গার। ওনার আশেপাশে থাকলে আমিও অনেক কিছু শিখতে পারবো প্লিজ যেতে দিন।

~ আচ্ছা ঠিক আছে। আমিও থাকবো তোমাদের সাথে। এখন খুশি?
~ হুম অনেক। ধন্যবাদ।

দিয়া বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে ওদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আছে।
~ [ শিশির ভাইয়া আরুপিকে যেভাবে দেখছে ওই যম টাও আমাকে সেভাবে দেখে। আরুপি যা চায় শিশির ভাইয়া তাই দেয়। আমি যা চাই ওই যমটাও আমাকে সেটাই এনে দেয়। আরুপিকে খুশি দেখলে শিশির ভাইয়া খুশি হয়।

আমাকে খুশি দেখলে যমটাও খুশি হয়। কিন্তু শিশির ভাইয়া তো নিজের বউ এর জন্য এসব করে। তাহলে যম আমার জন্য এসব কেন করে? ওই রোজটাও বললো যম আমাকে ভালোবাসে।

ধুর ধুর সব ঘুলিয়ে যাচ্ছে আমার। আমার এই টুকু মাথা এদের এতো বড় বড় কথা ধরে রাখতে পারে? তাছাড়া আমার যখন বাচ্চা হবে তখন যমটা বুড়ো হয়ে যাবে। তার মানে আমার জামাই মইরা যাবে? তাহলে আমাকে খাওয়াবে কে?

এখন তো আমাকেও জব খুজতে হবে। হায় আল্লাহ এসব তো আগে ভাবিনি ] আমি বিয়ে করবো না।
দুকানে দুহাত চেপে ধরে চিল্লিয়ে কথাটা বললো দিয়া। শিশির আর আরু দুজনেই চিৎকার শুনে ভীষম খেলো। শিশির পানি খেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো,

~ বিয়ে? বিয়ে তো রুহির হচ্ছে। তাহলে তুমি?
দিয়া চোখ খুলে হাসার চেষ্টা করলো। তারপর আমতা আমতা করে বললো,
~ নাহ মানে আমি বলেছি “আমি কি বিয়ে করবো না?

আমারও তো বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। তাইনা আরুপি “
দিয়ার কথা শুনে আরু ফিক করে হেসে দেয়। ১৪ বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে এখনই বিয়ের চিন্তা করছে। ব্যাপারটা বেশ মজার তো। শিশির বিষ্ময় ভরা চোখ দিয়ে দিয়াকে দেখছে।

” এইটুকু মেয়ে এসব কি বলে “নিজের জামাকাপড় গোছাচ্ছে রোজ। ল্যাগেজ প্যাক করার সময় আলমারি থেকে ওর ডায়েরিটা নিচে পড়ে যায়। এটা অবশ্য ওর না ওর মায়ের ডায়েরি। ডায়েরির একটা পাতা ছাড়া, সবগুলো পাতাই ফাঁকা। তবুও সযত্নে গুছিয়ে রেখেছে এটা।

ডায়েরিতে একটা কালির বিন্দু অবধি লাগতে দেয়নি রোজ। প্রথম পাতায় রোজের আর ওর মায়ের একটা ছবি। রোজ যখন তিনদিনের শিশু তখন তোলা ছবিটা। পাপড়ি (রোজের মায়ের নাম পাপড়ি) নিজে ছবিটা ডায়েরির পাতায় লাগিয়ে নিচে গোটা করেছে লিখেছে ” আমার মেয়ে, আমার পৃথিবি। “

~ আম্মু তুমি চেয়েছিলে নাহ তোমার মেয়ে সবসময় সবার আগে থাকুক… সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাক… স্কুল কলেজ সবখানে টপার হোক… সবাই ওর নিজের পরিচয়ে ওকে চিনুক… মিস জিনিয়াস হোক… তোমার স্বপ্ন পূরনের প্রথম ধাপ আমি পেরিয়ে এসেছি আম্মু।

তোমার মেয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে নিজের স্থান করে নেওয়ার তাগিদে ব্যস্ত আজ। এখনো প্রতিদিন আমার জন্য, তোমার বানানো সব গুলো রেকর্ডিং আমি শুনি। কিন্তু তুমি তো বলেছিলে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। তাহলে গেলে কেন?

জানো তোমার একটা ক্যাসেট বাবাই আমাকে আনতে দেয়নি, কিন্তু তুমি চিন্তা করো না। আমি ঠিক ওটা নিয়ে আসবো। ৫বছর বয়স থেকে বাবাই আমাকে স্কুলের হোস্টেলে রেখেছে, আমাকে সবাই এতো কষ্ট দিয়েছে তবুও তুমি একবারের জন্যও আসলে না।

ছোটবেলায় সবাই বলতো তুমি আকাশের তারা হয়ে গেছো। আজ বুঝি তারা রা কখনো নিজ থেকে ধরা দেয় না। আমিও তোমাকে ফিরতে বলবো না। তোমার স্বপ্নের মাঝেই তোমাকে খুজে নিবো। তোমার রেড রোজ কে আমি সেইভাবে সাজাবো যেভাবে তুমি চেয়েছিলে।

ডায়েরিটাও ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো রোজ। জীবনে একটা জিনিসই ওর লক্ষ্য, নিজেকে বেস্ট প্রমাণ করা আর সেই হিসাবে গড়ে তোলা। ও নিজেও জানে না নিয়তি ওকে কোথায় দাড় করাবে, পরিস্থিতি ওকে কোথায় নিয়ে যাবে.. বর্তমান ওকে কতটুকু বুঝবে আর ভবিষ্যৎ এ ওকে কিভাবে সাহায্য করবে। ও জানে ওকে সব শিখতে হবে, জানতে হবে। সবার চেয়ে ভালো এবং নতুন কিছু করতে হবে। আচ্ছা এটা কি সত্যিই সম্ভব?

রোজ সম্রাটের হসপিটালে চলে আসে। সম্রাট নিজের চেম্বারে বসে পেসেন্ট দেখছে এমন সময় রোজ কেবিনে ঢুকে যায়। সম্রাটের টেবিলের সামনে থাকা বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে রোজ। এটা ওর প্রতিদিনের স্বভাব তাই সম্রাটও নিজের কাজে মন দিলো। পেসেন্ট চলে যেতেই সম্রাট রোজের কাছে আসলো, রোজের মাথায় হাত রেখে ওর পার্লস চেক করতে লাগলো,

~ আমার পিচ্চিটা তো আলহামদুলিল্লাহ সুস্থই আছে। তাহলে হঠাৎ তার দাভাই এর কথা কিজন্য মনে পড়লো? সে তো অযথা তার দাভাই এর কাছে আসে না। দাভাই এর সময় বাঁচায়।

~ তুমি টিজ করা বন্ধ করবা? নাকি চলে যাবো।

~ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বল কি হয়েছে? মন খারাপ?

~ সাড়ে তিন মাস পর পরীক্ষা। তারপরই আমি ঢাকায় চলে যাবো।
~ আমিও ঢাকায় চলে যাবো। এদিকটা সামলানোর জন্য তো আরিশ আছেই।
~ আমি নিজের একাউন্টে কত টাকা জমিয়েছি?

~ তোর শুটিং + গানে, চ্যানেল আর কম্পিউটারে পার ডে ১লক্ষ ২০হাজার টাকা মানে মাসে ৩৬ লক্ষ টাকা। তার মানে এই ৬মাসে ২কোটি ১৬ লক্ষ টাকা আর আগের ১২লক্ষ। মোট ২কোটি ২৮ লক্ষ টাকা আর ব্যাংকের প্রফিট মিলিয়ে ২কোটি ৪০ লক্ষের মতো টাকা জমেছে। কেন বলতো?

~ ঢাকায় একটা বাড়ি বানাতে চাই। যেখানে আমার পরিচিতো, আমার ভালোবাসা, বিশ্বাস করার যোগ্য প্রতিটা মানুষ থাকবে। ২কোটিতে হবে না জানি, কিন্তু এটা দিয়ে তুমি কাজ শুরু করো আমি আস্তে আস্তে আরো কিছুটা টাকা জোগাড় করে ফেলবো।

~ তোর আয়ের সব টাকা খরচ করে ফেলবি? তাহলে তুই তোর ভবিষ্যৎ এর কি হবে? এক কাজ কর আমার কাছে নগদ ৭০~৮০ লাখ আছে এবছরের বিজনেসের প্রফিটটাও পাবো ওটা দিয়েই তোর বাড়ি বানিয়ে দিচ্ছি। আর তোর সঞ্চায়ের টাকা তোর কাছেই রাখ। ওগুলো তোর কষ্টের টাকা, রাত দিন কাজ করে এতোগুলো টাকা জমিয়েছিস। ওগুলো ওভাবেই রাখ।

~ রোজ কারোর সাহায্য নিয়ে চলতে শেখেনি দাভাই। যেখানে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে সেখানে সেই বংশের টাকা আমি কিভাবে নেই? নিজেকে তো একেবারে শেষ করতে পারবো না। যতদিন বাঁচবো নিজের সম্মান আর পরিচয়ে বাঁচবো। নিজের কাজ আর শক্তির জোরে বাঁচবো। হোক সে তুমি কিংবা আরিশ ভাই, রোজ কেন তোমাদের কাছ থেকে সাহায্য নেবে হ্যা?

~ তোর এই জেদ যেমন তোর ভালো করে তেমনই দেখবি জেদের জন্য নিজের দামি কিছু হারিয়ে ফেলেছিস। ছোট আম্মু শুধু তোকে না সবাইকে নিয়ে বাঁচতে বলেছে। সবাইকে নিয়ে শুধু মঞ্জিলে না প্রতিটা পথ বিচরন করে যেতে বলেছে। আমি কি তোর এতোই পর? নিজের বোনকে সাহায্য করার অধিকার টুকুও আমার নেই? তাহলে দাভাই বলে ডাকিস কেন?

~ অকে সম্রাট চৌধুরি।
~ আজ আর তোর ফাজলামিতে সায় দেবো না। নিজের এই রাগ আর জেদ টাকে কন্ট্রোল কর বোন। দেখবি জীবনটা নতুন করে সাজাতে পারবি, জীবন টাকে ভালোবাসতে পারবি।

~ চেষ্টা তো করি দাভাই। কিন্তু বার বার কুশান চৌধুরির মুখটা সামনে ভেসে ওঠে। উনি বলেছিলো আমি যেন ওনার সামনে না যাই, আমি যাইনি। উনি বলেছিলো আমি অপয়া.. সেটাও মেনেছি। উনি বলেছিলো আমি কখনো আম্মুর স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না, আমি নাকি দুষ্টু গরু। তাই নিজের গোয়াল শূণ্য রেখেছেন।

কিন্তু এটা একটু হলেও ভুল প্রমাণ করবো আমি। আমি প্রমাণ করবো যে আম্মুকে আমি মারিনি। সেদিন আমার জন্য না বরং ওনার জন্য আম্মু গাড়ি নিয়ে বেড়িয়েছিলো, কিন্তু আর ভেরত আসলো না। উনি তো আমার আব্বু হন? ওনার কি আমার প্রতি এতটুকুও দায়িত্ব কর্বত্য নেই?


পর্ব ০৫

ট্রেনের বগিতে বসে আছে রওশন দিয়া। রোজ বাইরে আরেকটা বগির দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাড়ানো। পড়নে জিন্স, আর শার্ট। চুলগুলো উচু করে খোপা করা। হাতে একটা পেন্সিল। রওশন দিয়াকে চিপস দিয়ে বাইরে আসলো,
~ এখানে একা দাড়িয়ে আছো কেন? মন খারাপ?

~ খারাপ হলে কি ভালো করে দিতে পারবেন?
রোজের এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় রওশন। প্রথমে রোজকে একটা স্ট্রিক্ট মেয়ে ভেবেছিলো কিন্তু ও আসলে তা নয়। ওর সোজাসাপ্টা কথার মাঝেও একটা তীব্র তেজ লক্ষ্য করা যায়।

~ নাহ, তা হয়তো পারবো না তবে শুনতে তো সমস্যা নেই। তাছাড়া আমি তো তোমার ভাই এর মতো। বড় ভাইকে তো বলাই যায়। হয়তো তোমার সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি।
~ আগে নিজের লাভ কেস সল্ভড করুন ভাইয়া। ওটা তো এখনো ঝুলেই আছে। ৬বছর ধরে ভালোবাসেন অথচ ৬সেকেন্ডের একটা কথা বলতে হিমশিম খাচ্ছেন?

~ কথা ঘুরাচ্ছো?
~ যদি বলি, হ্যা তাই।
~ তোমার এই স্বভাবটাই সবথেকে বেশি ইউনিক। তুমি ভেবেচিন্তে কথা বলো। স্ট্রিক্ট, ডিরেক্ট মুখের উপর উত্তর দাও তবে মাঝে মাঝে সামনে থাকা মানুষটাকে চিনে কথা বলাটাই শ্রেয়।

~ রোজ কখনো পরিচয় দেখে কিছু বলে না। যখন সামনে যাকে যেমন দেখে তখন তেমন ব্যবহার করে। সবাই আপনাকে ভয় পায় তবে আমি আপনার মাঝে এমন কিছুই দেখিনি যাতে আমি ভয় পাবো। আপনাকে দেখেই বোঝা যায় আপনি কতটা যুক্তিসংগত বিষয়ক কথার ওপর নজর দেন। তাই আমার ওপর রাগ বা চেচানোর কোনো কারনই খুজে পাচ্ছি না।

~ আচ্ছা। ভেতরে গিয়ে বসো আপু।

~ আমি সিক হয়েই ঠিক আছি তবে কাবাবে হাড্ডি হতে চাইনা। আপনারা ভেতরে থাকুন আমি এখানেই ঠিক আছি।
~ কিছু লাগলে ডাক দিও।

~ সেলেব্রেটিদের খাঁটিয়ে মারবো এমন নিষ্ঠুর মেয়ে আমি নই। আমার যা লাগবে তা আমি নিজেই নিতে পারবো। ডোন্ট ওয়ারি।

~ কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
~ জি।

~ তুমি কি গান গাইতে পারো? তোমার গলাটা বেশ চেনা চেনা লাগছে। আগেরদিন জিজ্ঞেস করতে পারিনি।
~ আমার একটা এলবাম রিলিজ হয়েছে। #SR। আরো তিনটা রিলিজ হবে সামনের মাসে, আমি লাস্ট ৬মাস ধরে গানের জগতে আছি তবে কেউ সেভাবে চেনে না আমাকে। আর নেক্সট এলবামটা বোধ হয় আপনার সাথেই ডুয়েট করার এগ্রিমেন্ট হয়েছে।

~ তুমি সাদিয়া চৌধুরি?
~ হুম।
~ হুয়াট এ প্লেজেন্ট সার্প্রাইজ। কিন্তু দিয়া তো আমাকে
~ ও জানে না এসব। ভেবেছিলাম জানাবো কিন্তু সময় পাইনি বলার।

~ তুমি এতো ছোট অথচ পড়ছো, গাইছো, এক্টিং করছো, একটা এনজিও চালাচ্ছো? হাউ ইজ ইট পসিবল?
~ নাথিং ইজ ইমপসিবল ফর রোজ। & আপনি তো জানেনই Impossible এর মধ্যেই থাকে I Am possible
~ ইন্টেলিজেন্ট গার্ল। তো ফিউচার প্লান কি?

~ রোজের ফিউচার প্লান? নেই।
~ মানে…
~ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো একটা জিনিসকে আকড়ে ধরে। কিন্তু রোজ কোনো জিনিস আকড়ে নয় সব জিনিস মিলিয়ে জীবন গড়তে চায়।

আপনি দিয়ার কাছে যান আমি ঠিক আছি এখানে।
রওশন আর কথা না বাড়িয়ে বগিতে চলে যায়।

কাল রুহির গায়ে হলুদ। তাই আজ সবাই শপিং এ গিয়েছিলো, প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো আনতে। আর এসবের দায়িত্ব নিয়েছে ছোঁয়া আর আরু। শিশির ডেকোরেশনের কাজটা দেখছে।

বাড়িতে ফিরে এসে যে যার ঘরে রেস্ট নিচ্ছে। তখনই রওশন দিয়া আর রোজকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। সবাই রোজের দিকে তাকিয়ে আছে, রোজের পরনে কালো জিন্স শার্ট। চুল উচু করে খোপা করা, এক হাতে ল্যাগেজ অন্যহাতে ল্যাপটপ। চোখে গোল কালো ফ্রেমের চশমা। দিয়া চকলেট খাচ্ছে আর রওশন ফোনে কথা বলছে। রুহি এগিয়ে এসে রোজের সামনে দাড়ালো।

~ তুমি রোজ?
~ জি আসসালামু আলাইকুম আপু। আপনি নিশ্চই বিয়ের কনে।
রুহি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ হ্যা। কিন্তু তুমি বুঝলে কিভাবে?

রোজ মুচকি হেসে উত্তর দিলো।

~ আপনার চেহারা দেখে পড়ে নিয়েছি। যাই হোক অভিনন্দন আপু। বিয়ের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা আপনাদের জন্য। (ব্যাগ থেকে একটা গহনার বাক্স বের করলো) এটা আপনার জন্য।

আসলে গহনা টহনা আমার ঠিক পছন্দ না তাই বুঝতে পারছি না আপনার এটা পছন্দ হবে কিনা। তাই আপনাদের জন্য হানিমুন ট্রিপ হিসাবে সাঁজেকএর একটা কটেজ বুক করেছি। বিয়ের পর অবশ্যই যাবেন মেঘের শহরে

রুহি বক্সটা খুলে দেখলো নিউ মডেলের একটি স্বর্ণের হার, কানের দুল আর টিকলি। খুবই সুন্দর একটা ডিজাইন কিন্তু মেয়েটা এতোকিছু করে ফেললো কিভাবে? ও তো এমন বিহেভ করছে যেন এটা দিয়ার না ওরই আপুর বিয়ে আর ও গেস্ট না বাড়ির মেয়ে।

~ এসবের কোনো প্রয়জন ছিলো না।
~ সেটা আমিও জানি। এসব তো শুধু ফর্মালিটি। আমি তো দিয়া আর ভাইয়ার ইনভিটেশনে এসেছি সুতরাং এসব তাদের সাথেই ডিসকার্স করতে পারতাম। কিন্তু যার বিয়েতে এসেছে সে আমার আমার আপন বোন না হলেও বড় আপুর মতোই তো। সেজন্য ছোট বোনের তরফ থেকে এই সামান্য গিফটা।

~ এতোকিছু করে বলছো সামান্য?
~ চিল আপুই। যাস্ট গহনাই তো। আচ্ছা আমার রুমটা কোনদিকে একটু বলবেন? ফ্রেস হয়ে কিছু কাজ করতে হবে।
~ দিয়ার রুমে যাও। দোতলায় ডান দিকে সিড়ির পাশের রুমটা।

~ ধন্যবাদ আপু। আর হ্যা কাল গায়ে হলুদে এগুলোই পড়বা প্লিজ। টাটা
🍂
সন্ধ্যায় সবাই বসে তত্ব সাজাচ্ছে। অলরেডি অর্ধেক মেহমান চলে এসেছে। রোজ কম্পিউটার আর সিগন্যাল হ্যাক করা শিখছে। তখনই দিয়া হাজির। দিয়া এসে বিছানায় চার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো, রোজ ওকে খেয়াল করে প্রশ্ন করলো

~ কি হয়েছে?
~ কতো সুন্দর সুন্দর ছেলেরা আসছে বিয়েতে। যেই কাউকে পটাতে যাচ্ছি ওমনি যম চলে আসছে আর টেনে টেনে একাজ সেকাজে পাঠাচ্ছে। এরকম করলে হয়? আমার কোনো ফ্রিডমই নেই।

~ তত্ব সাজানো হয়ে গেছে?
~ হুম বুবুন আর আরুপি সাজাচ্ছে। দেখবি? এক কাজ কর, চল আমরাও গিয়ে সাজাই।
~ তুই যা। আমি কাজটা সেড়েই আসছি।

~ কি করছিস রে তুই?
~ তেমন কিছু না। কিছু ডকুমেন্টস সেভ করছি।
নিচে আরুর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। ওর চোখ সামনে থাকা একটা জুটির দিকে। যারা হাত ধরে হেসে হেসে কথা বলছে। ছেলেটার একহাত মেয়েটার কোমরে। রোজ নিচে নামতে নামতে তত্বগুলো দেখে নিলো।

~ ওই যে লাল জামা পড়া ওইটা তোর আরুপি দিয়া?

~ হুম। তুই চিনলি কিভাবে?

~ ছোঁয়া আপুর পাশে বসা, তারওপর নাকে নাকফুল হাতে চুড়ি, আর পেছনের হ্যান্ডসাম লোকটার তীক্ষ্ণ নজর ওর ওপর। নিশ্চই ওটা শিশির ভাইয়া কারন রওশন ভাইয়া তাকে একবার শিশির বলে ডেকেছিলো।

~ হাহ। বেশি ভালো, ভালো না। আর বেশি বুদ্ধিও ভালো না। তোরে তো ঘরে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে। মানুষ তোর খোজ জানলে তোকে চুরি করে নিয়ে যাবে বুঝলি…

দিয়ার কথা রোজের কানে পৌছালো না কারন সামনে সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে আরু। সবাই ওকে নিয়েই ব্যস্ত। রোজ দ্রুত নিচে নেমে আরুর কাছে গেলো। আরু বির বির করে কিছু বলছে। রোজ মুচকি হেসে শিশিরের পিছু পিছু আরুদের রুমে গেলো। কিছুক্ষন পর স্নিগ্ধ আসে।
~ রুমটা খালি করে দাও শিশির।

স্নিগ্ধর কথায় সবাই বাইরে চলে যায়। রোজ বাদে। স্নিগ্ধ আড়চোখে রোজের দিকে তাকায়। পিচ্চি ইংরেজ বললেও চলে মেয়েটাকে। হলদে ফর্সা হলেও কালো পোশাকে অনেকটা উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে। রোজ এগিয়ে এসে শিশিরের পাশে বসলো।

~ আপুর কি সাইকোলজিক্যাল কোনো প্রবলেম আছে?

স্নিগ্ধ চুপ করে রোজের দিকে তাকালো। শিশির উত্তর দিলো।
~ হ্যা। কিন্তু তুমি বুঝলে কিভাবে? তুমি তো বিকালেই এসেছো
~ প্রবলেমটা কি ছেলে মেয়ে মানে প্রেম বা ওই টাইপের কিছু?
~ সেটা জানি না।

~ কিছু মনে না করলে আজ আপুর সাথে আমি থাকি? ইনশাহ্ আল্লাহ কাল সকালের মধ্যে আপু ঠিক হয়ে যাবে।
রোজের এমন আত্মবিশ্বাসী কন্ঠ শুনে অবাক হয় স্নিগ্ধ। গত ৬মাস ধরে ও আরুর চিকিৎসা করছে। কিন্তু এখনো আসল ঘটনা জানতে পারেনি। আর তিন আঙ্গুলের একটা মেয়ে বলছে একরাতেই ওকে সুস্থ করে দেবে। স্নিগ্ধ এবার মুখ খুললো

~ ওকে আমি দেখে নিবো। তোমাকে এই নিয়ে ভাবতে হবে না পিচ্চি। তুমি গিয়ে বিয়ে বাড়ি এঞ্জয় করো।
স্নিগ্ধর কথায় রোজের খারাপ না বরং হাসি পেলো। রোজ ঠোট চেপে হেসে স্নিগ্ধকে প্রশ্ন করলো
~ ভালোবেসেছেন কাউকে?
স্নিগ্ধ থতমত খেয়ে উত্তর দিলো

~ নাহ।
~ তাহলে আপনি গিয়ে বিয়ে বাড়ি এঞ্জয় করুন। একটা কথা জানেন? ” বিয়ে বাড়িতে বিয়ে হয় এক জুটির আর তৈরি হয় নতুন বেশ কয়েকটা জুটি ” বেস্ট অফ লাক।

~ তুমি জানো আমি তোমার কতটা বড়? তুমি আমার সাথে মজা করছো?

~ আপনি কি আমার বিয়াই লাগেন যে মজা করবো? আমি সিরিয়াসলি বলছি। কতদিন আর সিঙ্গেল থাকবেন। বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তো। এবার বিয়েশাদীর কথাটাও একটু চিন্তা করেন। পরে তো আপনার ছেলেমেয়ে আপনাকে আব্বু না ডেকে নানু ডাকবে আপনার পাঁকা দাড়িগোফ আর চুল দেখে।

~ শিশির চলো বাইরেই যাই। দেখি ও কি করে.. আরু সুস্থ হলেই হবে সেটা যেই করুক না কেন…
~ কিহ… আরুকে একা রেখে যাবো?

~ আপনার বউকে একটা আঁচড়ও লাগতে দিবো না আমি। বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার ওপর। আর যাওয়ার আগে দরজাটা লাগিয়ে দিবেন।
🍂
স্নিগ্ধ বসে কফি খাচ্ছে। আর ওর সামনে ছোঁয়া তত্ব সাজাচ্ছে। স্নিগ্ধকে ছোঁয়া পছন্দ করে। ছোঁয়া যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে তখনই ও সিনিওর স্নিগ্ধর ওপর ক্রাশ খায়। কিন্তু স্নিগ্ধ পাত্তা দেয় না।
~ ভাইয়া… ও ভাইয়া…

স্নিগ্ধ আড়চোখে ছোঁয়ার দিকে তাকায়। ছোঁয়া যে কি পরিমানে দুষ্টু তা খুব ভালো করে জানে স্নিগ্ধ। তাই ওর সাথে কথাও বলতে চায় না। না জানি কখন কিভাবে ফাঁসিয়ে দেয়।
~ এই আপনাকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছেন না?
~ হুম। বলো

~ বয়স তো কম হলো না বিয়েশাদী করবেন কবে?
~ তা জেনে তুমি কি করবে? নিজের কাজে মন দাও। আর আমাকে বিরক্ত করো না প্লিজ।
~ আরে.. আমি কখন বিরক্ত করলাম? ভালো কথাই তো বলেছি। যদি আমাকে একটু পাত্তা দিতেন তাহলে আজ দুই বাচ্চার বাপ হয়ে যেতেন।

কথাটা শুনতেই স্নিগ্ধর মুখ থেকে কফি পড়ে যায়। বেচারা ভীষম খেয়ে কাঁশতে থাকে। ছোঁয়া পানি এনে স্নিগ্ধর সামনে ধরে। স্নিগ্ধ একবারে সবটা গিলে ফেলে।

~ আরে আস্তে খান। আপনার পানি কেউ নিয়ে যাচ্ছে না। বরং পানি যদি আপনার গলায় আটকে যায় তাহলে আমার ফিউচার বাচ্চাগুলো এতিম হয়ে যাবে।

স্নিগ্ধ অসহায় চোখে ছোঁয়ার দিকে তাকালো। মেয়েটা আগের চেয়েও বেশি দুষ্টু হয়ে গেছে। লজ্জার কোনো বালাই নেই। যা মনে চায় তাই বলে। কেন যে বারবার এর সামনে পড়তে হয়… এসব ভেবেই কপাল চাপড়াতে থাকে স্নিগ্ধ। ছোঁয়া হাসতে হাসতে বললো

~ পাগলের ডাক্তার কি নিজেই পাগল হয়ে গেলো?
~ তোমার সামনে থাকলে পাগল না হয়ে উপায় আছে?

~ ইশ কি দুঃখ। যাই হোক I Love You.. will You marry me Snigdho?
~ কিহ..
~ ইংলিশ বোঝেন নাই? আচ্ছা বাংলায় বলছি। আমি আপনাকে ভালোবাসি। বিয়ে করবেন আমাকে?
~ নাহ।

~ না কে হ্যা কিভাবে করতে হয় তা ছোঁয়া বেশ ভালো করেই জানে। কিন্তু আপনার জন্য খারাপ লাগছে। একটা “হ্যা” বলার জন্য আপনাকে অনেককিছু সহ্য করতে হবে। সো স্যাড।
~ তুমি কি আর ভালো হবে না?

~ খারাপ ছিলাম কবে? আর আমি যে খারাপ সেটা বুঝলেন কিভাবে একটু বলবেন? তাহলে নিজেও জানতে পারতাম কি করে আপনার কাছে ভালো হওয়া যায়।
~ আপাতত সামনে থেকে সড়ো।

~ আমি তো আপনার পাশে বসে আছি সামনে থেকে সড়বো কিভাবে?
~ ধুরর।

স্নিগ্ধ রেগে ওখান থেকে চলে যায়। ছোঁয়া আবার তত্ব সাজানোর কাজে লেগে যায়।
~ তোমাকে আমার কাছে ধরা দিতেই হবে স্নিগ্ধ। যদি এমনটা না হয় তাহলে আগে তোমাকে মারবো পরে আমি মরবো তবুও তোমাকে অন্যকারো হতে দিবো না। মাইন্ড ইট।
🍂

আরু রোজের চোখ বরাবর তাকিয়ে আছে। রোজ আরুর চোখে নিজের চোখ রেখে ওকে হিপনোটাইজ করার চেষ্টা করছে। এই কাজটা রোজ আগে অনেকবার করেছে। অনেকে চেয়েছে রোজের চোখের গভীরতা মাপতে কিন্তু যেচে এসে ফেঁসে গেছে।
~ তোমার নাম কি?

~ আরুশি।
~ তোমার পরিবারে কে কে আছে?
~ দ্বিদুন। বাবা সৎমা আর সৎভাই। তারা অন্য জায়গায় থাকে।

~ একটু আগে কি দেখে ঘামছিলে?

~ ওই ছেলেটা আর মেয়েটা।
~ কাউকে ভালোবাসতে?

~ হুম নীরবকে। কিন্তু
~ কিন্তু কি?
~ নীরব আমাকে ভালোবাসতো না। ও আমার শরীরকে ভালোবাসতো।

এটুকু শুনেই রোজ আরুর চোখ হাত দিয়ে বন্ধ করে দিলো। আরু ঘুমাচ্ছে আর রোজ পানির গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে দেখছে। খালি চোখে পানি কতটা স্বচ্ছ দেখায় তাইনা? পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু যদি পানিটা বিশুদ্ধ না হয় তাহলে এই পানিই আমাদের জীবন কেড়ে নেয়। ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়। ভুল মানুষকে ভালোবাসলে তার ফল তো পেতেই হয়।

আরুর ঘুম ভাঙতেই ও দেখে বিকালের মেয়েটা ওর পাশে বসে একভাবে ওর দিকে চেয়ে আছে। পলকহীন চাহুনিটা কেমন জানি অদ্ভুত,
~ কি দেখছো?

~ একটা কথা বলার ছিলো। বলবো?
~ হ্যা। কিন্তু চোখের পলক ফেলো। কেমন অস্বস্তি লাগছে।
~ হা হা হা। আচ্ছা।
~ হুম।

~ মানুষ যখন কোনোকিছু নিয়ে প্রয়োজনের অধিক ভাবে তখন কি হয় জানো? সে ডিপ্রেস্ড হয়ে যায়। কিন্তু যখন কোনো খারাপ ঘটনা তাকে বারবার ভাবায় তখন সে ডিপ্রেশনের চেয়ে হেল্পলেস বেশি হয়ে যায়। আর এইঘটনাগুলো সে যত নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখতে চায় ততই সেটা সবার সামনে চলে আসে। একজন মানুষ যখন তার নিজের অস্তিত্ব লুকাতে চায়? আর তা সামনে আসে তখন সে কি করে জানো?

নিজেকে শেষ করতে চায়।
~ তাছাড়া কিই বা করার থাকে?

~ গুড কুয়েশ্চন। সবার আগে তার যেটা করা উচিত সেটা হলো কাউকে নিজের মনের কথাগুলো বলা। তারপর কি করতে হবে বা কি করা উচিত সেটা বোঝা, যদি বুঝতে না পারে তাহলে কারোর থেকে হেল্প নেওয়া। আর সেটাও যদি না পারে আর অধিক কষ্ট পায় তাহলে অপরাধি কে শাস্তি দেওয়া,

~ পরিচিতদের বললে যদি বেশি কষ্ট পায় বা পরিচিতরাই যদি তাকে কষ্ট দেয়…
~ আমি তো তোমার অপরিচিত। আমাকে তুমি ঠিক করে চেনো না। যদি চাও আমাকে তোমার অতিত বলতে পারো।

~ তুমি ছোট।
~ তুমি শিশির ভাইয়া ইভেন সবার সাথে যে নাটকটা করছো সেটা ঠিক না। নীরবের করা অন্যায়ের শাস্তি এদের দিচ্ছো কেন? নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো কেন? কেন মিথ্যা বলে ওদের থেকে দূরে যেতে চাচ্ছো?

~ তততুমি এসব কিভাবে জানলে?

~ তোমাকে হিপনোটাইজ করেছিলাম।
কথাটা শুনতেই আরু চোখ ছোটছোট করে রোজের দিকে তাকায়। রোজ উত্তরের আশায় আরুর দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে।


পর্ব ০৬

~ আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। ভালোবাসা কি সেটা জানতাম না, বুঝতাম না। নীরব আমার সৎমায়ের বড় ভাই এর ছেলে ছিলো। আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতো ও। ওর কথাবার্তা, চালচলন, আমার কেয়ার করা সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করেছি। আস্তে আস্তে ওকে ভালোবাসতে শুরু করি আমি। একদিন ও আমাকে প্রপোজ করে। আমিও রাজি হয়ে যাই।
এটুকু বলেই চুপ হয়ে যায় আরু। রোজ জিজ্ঞেস করে..

~ তারপর..
~ তুমি যাও, নিচে গিয়ে মজা করো রোজ। ভালো লাগছে না আমার। অন্য একদিন বলবো সব।
~ আচ্ছা। তবে নিচে গিয়ে আমি একা মজা কেন? তোমার বন্ধবির বড় আপুর বিয়ে তুমি মজা করবা না? চলো একসাথে গিয়ে মজা করি।
~ মাথা ব্যাথা করছে আমার।

~ তাহলে আমি একাই যাই। তুমি রেস্ট নাও। কিছু লাগলে ডাক দিও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো একজনের ভুলের শাস্তি অন্যজনকে দেওয়া অন্যায়। সে যতই পাওয়ারফুল হোক না কেন সত্যের সামনে সে নিতান্তই ক্ষুদ্র। আসছি।

রোজ ওখান থেকে সোজা ছাদে চলে যায়। আকাশ
জ রংবেরং এর ফানুশে ভরপুর। রোজ একটা চেয়ার টেনে গুটিসুটি মেরে বসলো
🍂

রওশনের রুমে দিয়াকে আটকে রেখেছে রওশন। দিয়ার অপরাধ ও ওরনা ছাড়া রুমের বাইরে বেরিয়েছে আর ছেলেদর সাথে হেসে হেসে কথা বলেছে।

~ যমের বাচ্চা যম। তোর জীবনে ভালো হবে না। আমার মতো নিষ্পাপ একটা বাচ্চাকে এভাবে আটকে রেখে নিজেকে বাহুবলি প্রমাণ করছিস? আমি যদি বড় হতাম না মেরে তোর নাকমুখ আলাদা করে দিতাম।
~ তাই নাকি।

দাঁতে দাঁত চেপে বললো রওশন। দিয়া ভয়ে বিছানার ওপর উঠে পড়লো।
~ মজা করছিলাম ভাইয়া। আমি এসব করতে পারি নাকি? আমি তো এমনিই বলছিলাম।
~ চুপচাপ ঘুমিয়ে যা। নাহলে অসুস্থ হয়ে যাবি।

~ [ ঘুমাবো? কাল আপিপুর গায়ে হলুদ আর এখন আমি ঘুমাবো? এই রাক্ষস টা কি আমাকে একটু শান্তি, একটু ভালো থাকতে দেবে না? সারাদিন প্যাপো প্যাপো করে। ভাল্লাগে না বাল ]
~ কি ভাবছিস?

~ যা ভাবছি, ভাবছি তাতে আপনার কি? যান নিজের কাজ করুন। জীবনটাই শেষ করে দিলো অসহ্য।
~ ঘুমা। আমি দরজা লাগিয়ে দিচ্ছি।
~ হুহ।

দিয়া ব্লাংকেট মুরি দিয়ে শুয়ে পড়লো। রাতে বাগানের লাইটিং ঠিক করে সবাই ঘুমিয়ে যায়।
সকালে ছাদ থেকে হলুদ নেওয়ার জন্য উপরে আসে শিশির। আর রোজকে রেলিংএ হেলান দিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে। শিশির রোজের কাছে গিয়ে ওর কাধে হাত রেখে হালকা ঝাকি দিয়ে ডাকে
~ রোজ.. রোজ..

চোখ খুলে আবার চোখ বন্ধ করে নেয় রোজ। রোজের কান্ডে শিশির আবার ডাকে
~ রুমে গিয়ে ঘুমাও।

~ দাভাই ডিস্টার্ব করো না প্লিজ। রাতে লাইটিং ঠিক করে ঘুমাতে দেরি হয়ে গেছে। আরেকটু ঘুমাতে দাও। আমি পরে ব্রেকফাস্ট করে নিবো। আর হ্যা… গুড মর্নিং। গো নাও।
~ রোজ আমি শিশির।

রোজ এবার ভালো করে চোখ মেললো।
~ সরি ভাইয়া। আসলে রাতে।

~ লাইটিং সিস্টেম তুমি চেঞ্জ করেছো?
~ হ্যা। ওল্ড ফ্যাশান মনে হচ্ছিলো তাই নীল, সাদা, আর পিংক দিয়ে পেচিয়ে রেখেছি।

~ ভালো করেছো। সুন্দর লাগছে দেখতে। এবার উঠে ফ্রেস হয়ে নাও। আচ্ছা আরুকে কি কিছু বলেছো?
~ কেন বলুন তো?

~ ও অনেকটা স্বাভাবিক ব্যাবহার করছে। সবার সাথে আগের মতো বিহেভ করছে।
~ তাহলে এক বক্স চকলেট এনে দিন। আপনার বউকে অর্ধেক সুস্থ করে ফেলেছি মজুরি দিবেন না?
~ তুমি না ম্যাচিউর গার্ল?

~ কোন সংবিধানে লেখা আছে যে ম্যাচিউর গার্লসরা চকলেট খায় না? এমনিতেও আমি চকলেট খাওয়ার জন্য আনতে বলি নি। আমি চকলেট আনতে বলেছি আপনারই বউ এর জন্য। আপনার বউ চকলেট খেতে পছন্দ করে। আমি চকলেট খাইনা কারন আমার এলার্জির সমস্যা আছে।

রুহির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। দিয়া হলুদ নিয়ে ছোটাছুটি করছে। আরুও স্বাভাবিকভাবে সবার সাথে মিশছে। রওশন এক কোণায় দাড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছে।
~ নখ না কামড়িয়ে নিজের পিচ্চিটার সাথে হলুদখেলায় মেতে উঠতে পারেন তো। নাকি সেটা করতেও ভয় লাগছে…

~ তোমার বান্ধবি তিলকে তাল বানিয়ে ফেলবে রোজ। বিয়েবাড়িতে কান্নাকাটি শুরু করে দিলে সবার আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।
~ কিচ্ছু হবে না। ছাদে যান আমি ওকে পাঠাচ্ছি। আর হ্যা ওকে বেশি করে হলুদ লাগাবেন। রিভেঞ্জ নিবো
~ কিসের রিভেঞ্জ?

~ আমার হলুদে এলার্জি আর ও আমাকে একটু এগে হলুদের পানিতে চুবাইছে। চুলে শ্যাম্পু করেছি কন্ডিশনার দিয়ে ধুয়েছি তবুও এই হলুদের গন্ধ যাচ্ছে না। এই গন্ধে বমি চলে আসতেছে বারবার। ইয়াককক।
~ কিন্তু তত্ব?

~ তত্ব নিয়ে আমি যাই? বরকেও দেখে আসতে পারবো।
~ আচ্ছা। সাবধানে যেও আমি শিশিরকে বলে দিচ্ছি।
🍂
রওশন সিড়ি দিয়ে উপরে উঠবে এমন সময় ছোঁয়ার রুমে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শোনে। জানালা দিয়ে উকি দিয়ে যা দেখে তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না ও। ছোঁয়া স্নিগ্ধকে চেয়ারের সাথে বেধে ওর গালে হলুদ লাগাচ্ছে। আর খানিকক্ষন পরপর নিজের গাল স্নিগ্ধর গালের সাথে লাগাচ্ছে।

~ বিয়ে হোক বা না হোক রুহি আপুর বিয়েতে যতগুলো রিচুয়ালস হবে। সেগুলো আমাদেরও হবে মিস্টার পাগলের ডাক্তার।
~ আমার হাত খুলে দাও ছোঁয়া।

~ কেন? আমি হলুদ লাগাচ্ছি তাতে হচ্ছে না? তুমিও আমাকে হলুদ লাগাতে চাও?
~ আমার সাথে এমন করছো কেন?

~ কেন করছি বুঝতে পারছেন না? আমি আপনার বাচ্চার মুখ থেকে আম্মু ডাক শুনতে চাই। তার জন্য যা করার আমি করবো।
~ পাগল হয়ে গেছো তুমি।

~ পাগল থেকে সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বানানোর জন্য তুমি তো আছোই জান।
রওশন গলা খাকড়ি দিয়ে বললো..
~ এসব কি হচ্ছে?

ছোঁয়া ইনোসেন্ট মুখ করে রওশনের দিকে তাকালো। তারপর আমতা আমতা করে বললো
~ অতিথি সেবা ভাইয়া। তেমন কিছু না। তুমি যাও তোমার বন্ধুকে আমি দেখে রাখবো।
~ শুধু দেখে রাখ। বিয়ের আগে বেশি কিছু করিস না। আমি ওর মা কে সব জানাচ্ছি।

স্নিগ্ধ উত্তেজিত হয়ে বেশ জোরে চিল্লিয়ে রওশনকে ডাকলো
~ রওশন… এমন করিস না দোস্ত। ওকে আমি
স্নিগ্ধর কথা শেষ হবার আগেই ছোঁয়া ওর মুখে মিষ্টি পুরে দিলো। স্নিগ্ধ মিষ্টি ফেলে দিতে চাইলে ছোঁয়া আঙ্গুল দিয়ে ঠেসে সবটা ঢুকিয়ে দেয়। রওশন হেসে বললো

~ এতোদিন আমার কাহিনি শুনে মজা নিসো মামা। আজ তোমার পালা। সোজা কথায় মানলে ভালো নাহলে বর তুলে আনার অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগটা পাবো।
~ ভাইয়া এসব তো ঠিক আছে কিন্তু তোমার কাহিনি মানে?

~ মানেটা হলো তোর বোন।
কথাটা বলেই চলে গেলো রওশন। ছোঁয়া গালে হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো। এটা কি শুনলো ও? দিয়া আর রওশন?
স্নিগ্ধ মুখ বাঁকিয়ে বললো

~ এমন নাটক করছো যেন এটা আজ জানলে?
~ ভাইয়া নিজে স্বীকার করেছে আজ? রোজ তো আমাদের জন্য লাকি হয়ে গেলো। কিন্তু তোমাকে কে বাঁচাবে জান? বিয়েটা শেষে আমার সাথেই হচ্ছে। ইশ রে এতোদিন আমাকে পাত্তা না দেওয়ার শাস্তি একবারে পাবে। বি রেডি ফর ইট।

ছাদের এক কোণায় রওশন আর ওর সামনে দিয়া দাড়িয়ে আছে। দিয়ার বলা কিছু কথা শুনে রওশন গম্ভির মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।
~ তোকে এসব কে বলেছে?
~ যে বলেছে, সে তো ঠিকই বলেছে। আপনি আমাকে ঠকাচ্ছেন।

~ তো তোর কি? আমি বিয়ে করে নিলেই তো তোর ভালো। তুই তোর মতো থাকতে পারবি, ঘুরতে পারবি, ছেলেদের সাথে মিশতে পারবি।
রওশনের কথায় ঠোট ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকালো দিয়া। চোখে পানি টলমল করছে।

কিছুক্ষন আগে রোজ দিয়াকে বলেছে মিরাজের ছোট বোনের সাথে রওশনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ওর পড়াশোনা শেষ হলেই ওদের বিয়ে। এতেই দিয়ার অবস্থা খারাপ। নাইনে পড়ুয়া বাচ্চা মেয়ের মাথার ওপর দিয়ে এতোবড় একটা ঝড় গেলে কি মেয়েটা ঠিক থাকে? দিয়া ছাদে এসে রওশনকে ইচ্ছামতো ঘুসি দেয় কয়েকটা লাথি দেয়।

তারপর মেঝেতে শুয়ে ছটফট করতে করতে কাঁদে আর রোজ যা বলেছে সেগুলো বলে। রওশন দিয়ার কাজ দেখে শুধু ঠোট চেপে হাসে।

~ কি হলো আবার কাঁদছিস কেন? আমি বিয়ে করলে তুই খুশি হবি না?

~ হবো।
~ তাহলে কাঁদছিস কেন?
~ এমনি।

~ মেয়ে পছন্দ হয়নি?
~ নাহহ।
~ আমার তো হয়েছে। মেয়ে দেখতে শুনতে ভালো ফর্সা, শিক্ষিত, আবদ কায়দা জানে। রান্না করতে পারে।
~ আমিও শিখে নিবো…
রওশন মুখ বাঁকিয়ে বললো

~ কি শিখবি?
~ আপনি ওনাকে বিয়ে করলে…
~ বিয়ে করলে?
~ কিছু না। আপনি ওনাকে বিয়ে করবেন না ব্যাস। আমি আর এ বিষয়ে কিছু শুনতে চাইনা। আমি কালো বলে এমন করছেন তাইনা? গায়ের রংই কি সব? মানুষ কি একবারে সবকিছু পারে? আস্তে আস্তে শেখে। আমিও শিখে নেবো। আসছি।

~ দাড়া।
~ পারবো না। আমি একটু কালো বলে আমাকে আপনি এভাবে কষ্ট দিলেন। যদি সাদা বয়লার মুরগির মতো হতাম তাহলে টুক করে নিয়ে নিতেন। থাকবো না আমি। চলে যাবো।

~ আর এক কদম এগোলে এখুনি পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবো। উল্টো ঘোর।

~ হুহ পারবো না। সবসময় আমাকে নিয়ে মজা? আমি যখন থাকবো না তখন কাকে নিয়ে মজা করবেন?
~ বিয়ে করবি আমাকে?

দিয়া ঘুরে রওশনের দিকে তাকালো। রওশন মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। রওশনের এমন উদ্ভট ভঙ্গিতে দাড়ানো এই প্রথম দেখছে দিয়া। হাসি চেপে রাখতে কষ্ট হচ্ছে ওর। অবশেষে রওশন ওকে প্রপোজ করেছে ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

তখনই পেছন থেকে রোজ সিটি দিয়ে সামনে আসলো। দিয়া রোজকে দেখে রোজের পেছনে গিয়ে দাড়ালো। রোজ হু হা করে হেসে দিয়ার হাত রওশনের হাতের ওপর রাখলো,
~ বলেছিলাম না ভাইয়া Nothing is impossible for Rose। আপনার ৬বছরের ঝুলে থাকা সম্পর্ক আমি ৬দিনে ঠিক করে দিলাম। তবে একটা শর্ত আছে আমি যা চাই আমাকে তাই দিতে হবে।

তার আগে মুখটা ঠিক করুন ভালোবাসার কথা বলেছেন, মেয়েও রাজি তাহলে এই দেবদাস টাইপের মুখ কেন?
~ কি চাও?
~ সময় আসলে চেয়ে নিবো। কিন্তু এখানে কি হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ডাক্তার সাহেব ছোঁয়া আপু? শিশির ভাইয়া আরু আপি, টোটাল লাভ সার্কেল মনে হচ্ছে। শুধু আমি একাই সিঙ্গেল….
~ মিরাজের হ্যান্ডসাম ভাই আছে একটা। দেখো ওটা পছন্দ হয় কিনা। তাহলে আমার এই হেল্পের রিটার্নটা দিয়ে দিবো।

~ সবুর করুন ভাইয়া। এতো সহজে আপনাকে ছাড়ছি না। সুদে আসলে সবটা উসুল করে নিবো। শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিরে বলদ মাইয়া এখনো আমার হাত ধরে থাকবি? আমাকে ছেড়ে যাকে ধরার তাকে ধর
দিয়া রেগে রোজের হাতে খামচি দিলো। নখ ডেবে গেছে রোজের হাতের চামড়ায়।

~ আহহ। কি রে মেরে ফেলবি নাকি। ছাড়। ভাইয়া আপনার পিচ্চি তো রাক্ষসী হয়ে গেছে। সামলে রাখুন নাহলে মানুষ খেয়ে ফেলবে, অলরেডি আমার নরম হাতের ওপর নজর দিয়ে ফেলছে। আপনার দেহের কি হাল হয় সেটা ভেবেই কষ্ট লাগছে।
~ এই দুঃখটা তুমি ছাড়া কেউ বুঝলো না রে বোন।

রওশনের কথায় তেড়ে আসলো দিয়া। কোমরে হাত দিয়ে চোখ মোটা মোটা করে রওশনের দিকে তাকাতেই রোজ ওখান থেকে বেরিয়ে যায়।

তত্ব নিয়ে শিশিরের সাথে রোজ আসে মিরাজদের বাড়ি। মিরাজ রা দুই ভাই বোন। ওর ছোট বোন মিশ্মি ডক্টর হওয়ার জন্য ইনটার্ন কোর্স করছে। রোজ বাড়িতে ঢুকে তত্বগুলো দিয়ে বাগানে এসে দাড়ালো।

অনেক মানুষের ভীরে থাকার অভ্যাস নেই ওর তাই খারাপ লাগছে। হঠাৎ একজন ওয়েটার এসে রোজের সামনে ওরেঞ্জ জুস উচু করে ধরলো। রোজ কপালের ঘাম বা হাতের জামার হাতা দিয়ে মুছে ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করলো
~ কি?

~ স্যার পাঠিয়েছেন। খেয়ে নিন, ভালো লাগবে। আর বেশি খারাপ লাগলে উপরে গিয়ে রেস্ট নিতে পারেন। আধাঘন্টা পর আপনাকে ডেকে দেওয়া হবে।

রোজ ভাবলো” হয়তো শিশির পাঠিয়েছে ” তাই গ্লাসটা নিলো।
~ ওতোকিছু লাগবে না। জুসটা দাও, এতেই হবে।

~ কিছু লাগলে জানাবেন ম্যাডাম। আসছি।
রোজ জুসটা খেয়ে বাগানে থাকা চেয়ারটায় ওপর বসলো। মাথা ঝিমঝিম করছে গরমে। কিন্তু এসব কিছুর উপরেও এমনকিছু আছে যা রোজকে আরো বেশি অস্বস্তিতে ফেলছে। ওর মনে হচ্ছে কেউ ওকে দেখছে। কেউ ওর ওপর নজর রাখছে। রোজ উঠে দাড়িয়ে চারিদিকটা ভালো করে দেখলো। কোথাও সন্দেহজনক কিছু নেই, তাহলে কি সবটা ওর মনের ভুল?

রোজ ওখান থেকে উঠে গাড়িতে এসে বসলো। তীব্র রোদে ফ্রেন্ডসিটটা গরম হয়ে গেছে। তাই ও ব্যাকসিটে গিয়ে পা লম্বা করে বসে পড়ে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। রোজের মাথাটায়ও অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে।

সেন্সলেস হয়ে যায় রোজ। যখন জ্ঞান ফেরে তখন ও কারোর রুমে শুয়ে আছে। একদম অপরিচিত একটা জায়গা।
কিছুক্ষন পর একটা মেয়ে এসে রোজকে বাইরে নিয়ে আসে। এটা মিরাজদেরই বাড়ি। মিরাজ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে…
~ ঠিক আছো তুমি?
~ জি ভাইয়া। সবাই কি চলে গেছে?

~ না শিশির থেকে গেছে। তুমি সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেছিলে তাই ও নিজে থেকে সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
~ আমার জন্য আপনাদের অনেকটা ঝামেলায় পড়তে হলো। তার জন্য আমি দুঃখিত ভাইয়া।

~ তুমি চাইলে আজ এখানে থাকতে পারো। কাল নাহয় আমাদের সাথেই যেও।

~ থাকতেই পারি তবে আমার কাজের অনেকটা ক্ষতি হয়ে যাবে। অন্য একদিন এসে থাকবো। আজ আসি
~ আচ্ছা। আমি শিশিরকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

রোজ আবার সেই অদ্ভুত ফিলিংস টা অনুভব করতে লাগলো, কেউ ওকে দেখছে। তার তীক্ষ্ণ নজর রোজের ওপর। কে সে?

রোজ একনজর বাগানের দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে যায়। শিশির ড্রাইভ করছে। রোজের চোখ সাইড মিররের দিকে মিরাজদের বাড়ির করিডোরে গিটার হাতে কেউ দাড়িয়ে আছে। মুখটা অস্পষ্ট কিন্তু ওর অবয়ব দেখে বোঝা যাচ্ছে ওর ঘাড় ঘোরানো আর চোখ এই গাড়িটার দিকেই। রোজ নিজের ফোনটা বের করে নিজের কাজ করতে শুরু করে যেন ওর ফোকাসটা শুধু কাজের মধ্যেই থাকে।


পর্ব ০৭

আজ সঙ্গীত। আর আজকের সারাদিন রাতের ড্রেস আপ কোড রেড। অথচ রোজ নীল রং এর জামা পড়ে বসে আছে। রোজের কাছে লাল রংটা ঠিক পছন্দ না। লাল গোলাপ পছন্দ না। সবাই বলে ভালোবাসা রং লাল। তাহলে কি রোজ ভালোবাসতে জানে না? সকাল থেকে গান বাজছে নিচে। রোজ নিজের রুমে বসে হ্যাকিং শিখছে। আর দিয়া নিজের জামা আর মেক আপ চুজ করছে।

~ সারাদিন ল্যাপটপ আর ফোনের মধ্যে ঢুকে থাকিস। কি পাস ওদের থেকে? একটু সাজগোজ করবি, নাচবি, গাইবি। মনটা ফুরফুরে থাকবে তা না চোখে ইয়া বড় চশমা গুজে কাজ আর কাজই করে যাস।
~ তো কি করবো আমার কি তোর মতো বুড়ো কাজিন আছে যে প্রেম করার সুযোগ পাবো। তবে বুড়ো বললে ভুল হবে রওশন ভাইয়াকে দেখে ২১+ এর বেশি মনে হয়।
~ বাট বয়সটা তো মেইন।

~ তাহলে রিজেক্ট করে দে। সমস্যা কি উনি তোর থেকে ভালো মেয়ে পেয়ে যাবে। বেটার ডিজার্ভ করে। শুধু শুধু তোর পেছনে বেকার খাটছে।

~ তুই এমনটা বলতে পারলি?
~ ঢং না করে নিচে গিয়ে নাচগান কর। এখানে বসে বসে আমার মাথা খাস না।
~ তোর মেজাজ এতো গরম কেন?

দিয়ার কথা শুনে রোজ একটু শান্ত হয়ে বসলো। দিয়ার মুখ কালো হয়ে গেছে। রোজের এমন মেজাজি কন্ঠ শুনে হয়তো ওর খারাপ লেগেছে। রোজ ল্যাপটপ অফ করে দিয়ার পাশে এসে বসলো।
~ সরি।

দিয়া এবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসলো। রোজ দিয়ার মুখে হাত দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওর চোখে চোখ রাখলো।
~ একদম চোখে চোখ রাখবি না। তোর চোখে চোখ দিলেই সে হিপনোটাইজ হয়ে যায়। চোখে কি নেশার ঔষধ মেখে রাখছিস?
~ চল নিচে গিয়ে মজা করি।

~ পেতনির মুখে রাম নাম? আমারে ঢপ দিচ্ছিস না তো?
~ নাহ। অনেক ভাবলাম। একা একা না থেকে একটু নাচানাচি করলে মন্দ হয় না। কিন্তু সমস্যা একটাই আমার তো জোড় নেই। তোরা সব জুটি আর আমি সিঙ্গেল।

~ মিরাজ জিজুর ভাইকে দেখছিস? যম না থাকলে আমি পাক্কা ওর সাথে লাইন মারতাম। কিতনা সুন্দার হ্যায়। গান গাচ্ছিলো নিচে, দারুন গায়।

~ তাই নাকি। ইশ রে মিস করে গেলি ওকে। যাই হোক ও নেহি তো যমই সাহি। এবার চল।
~ তুই জানিস আজকের ড্রেসকোড রেড। তুই ব্লু থ্রিপিচ পড়ছিস কেন? চল লাল জামা পড়বি।
~ আমি লাল রং পছন্দ করি না। প্লিজ এই নিয়ে কিছু বলিস না।

🍂
নিচে সবাই একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। রওশন খাবারের ডেকোরেশন করছে। আরু আর ছোঁয়া নাচছে। স্নিগ্ধ দূরে দাড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছে আর শিশির, মিরাজ, রুহি, মিশ্মি বসে বসে সবটা এঞ্জয় করছে। রুহি রোজকে দেখেই ইশারায় ডাকে। দিয়া নাচতে চলে গেছে।

~ মিরাজ এই হলো রোজ।
রোজ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে উত্তর দিলো।

~ উনি আমাকে চেনেন। নতুন করে যদি পরিচয় করিয়ে দিতে হয় তাহলে বলুন আমি আপনাদের ” গেস্ট “।
কথাটা শুনে খারাপ লাগে সবার। রোজের কথাবার্তা গুলো অনেকটা এমন কেন? সবসময় নিজেকে সবার থেকে দূরে দূরে রাখে, পর করে রাখে। মিশ্মি রোজকে টেনে নিজের কোলে বসালো। রোজ খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় মিশ্মির কাজে।

~ আসলেই অনেক সুন্দর রোজানু
রোজ ওঠার চেষ্টা করতেই মিশ্মি আরো জোরে চেপে ধরে। একজন ফটোগ্রাফার এসে ফটাফট কিছু ছবি তুলে নিলো। এসব কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না রোজ। দিয়া এসে রোজকে টানতে টানতে স্টেজের ওপর নিয়ে গেলো তারপর এনাউন্স করলো,

~ এবার গান গাইবে আমার রোজানু। ভাইয়া গিটারটা এনে দেন। (শিশিরকে বললো)
রোজ আবার সেই অদ্ভুত ফিলিংস ফিল করতে লাগলো। কেউ ওকে দেখছে বা ওর খুব কাছে আছে। শিশির গিটার এসে রোজের হাতে দিলো। রোজ গিটারের কডগুলো নেড়েচেড়ে দেখলো।
~ গান শুরু করিস না কেন? (চিল্লিয়ে বললো দিয়া)

রওশন, স্নিগ্ধ, শিশির সবাই কাজ শেষ করে চেয়ারে এসে বসেছে। তখনই রোজের ফোন আসলো। রোজ ফোন রিসিভ করে বললো

~ ডোন্ট ওয়ারি স্যার, আই উইল বি দেয়ার টুমোরো। & দি ওয়ার্ক ইজ অলমোস্ট ডান।
~…………

~ সরি আংকেল। হ্যা আমি ঢাকাতেই আছি। আমার কোনো সমস্যা হবে না। একাই যেতে পারবো।
~…………

~ হুম রাখছি। আল্লাহ হাফেজ।
রোজ ফোন রেখে সামনে তাকালো। সবাই ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে যেন রোজ কোনো অপরাধ করেছে। রোজ ফিক করে হেসে দেয়। আর ওকে দেখে বাকি সবাইও হেসে দেয়।

রোজ~
🎶🎶আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউএ চেপে
নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে

বহুদূর বহুদূর হেটে এসেছো 🎶🎶
🎶🎶আমি কখনো যাইনি জলে কখনো ভাসিনি নীলে
কখনো রাখিনি চোখডানা মেলা গাংচিলে
আবার যে দিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে

আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়?
বলো নেবে তো আমায়? 🎶🎶
🎶🎶আমি শুনেছি সেদিন নাকি তুমি তুমি তুমি মিলে
তোমরা সদলবলে সভা করেছিলে
আর সেদিন তোমরা নাকি অনেক জটিল ধাধা

না বলা অনেক কথা, কথা তুলেছিলে🎶🎶
🎶🎶কেন শুধু ছুটে, ছুটে চলা। একি একি কথা বলা
নিজের জন্যে বাঁচা নিজেকে নিয়ে
যদি ভালোবাসা নাই থাকে, শুধু একা একা লাগে

কোথায় শান্তি পাবো? কোথায় গিয়ে?
বলো কোথায় গিয়ে🎶🎶 [ আরুশিশিরদের দিকে তাকিয়ে গাইলো কলিটি ]
🎶🎶আমি শুনেছি তোমরা নাকি এখনো স্বপ্ন দেখো
এখনো গল্প লেখো গান গাও প্রাণ ভরে
মানুষের বাঁচা মরা এখনো ভাবিয়ে তোলে

তোমাদের ভালোবাসা এখনো গোলাপে ফোঁটে🎶🎶 [ রওশন আর দিয়ার দিকে তাকিয়ে গাইলো ]
🎶🎶আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ
তোমাদের কাছে এসে দুহাত পেতেছি
আমি দুচোখের গহ্বরে শূণ্যতা দেখি শুধু
রাত ঘুমে আমি কোনো স্বপ্ন দেখি না।

তাই স্বপ্ন দেখবো বলে আমি দুচোখ পেতেছি। 🎶🎶
গান শেষে রোজ পাশ থেকে একটা ভায়োলিন তুলে নিলো
রোজ~
🎶🎶ম্যায় জান এ ভার দু.. হার জিত ভি হার দু।

কিমাত হো কোয়ি তুঝে.. বেইন্তেহা প্যার দু🎶🎶
🎶🎶ম্যায় জান এ ভার দু.. হার জিত ভি হার দু।

কিমাত হো কোয়ি তুঝে.. বেইন্তেহা প্যার দু🎶🎶
🎶🎶সারি হাদে মেরি.. আব ম্যায় নে তোর দি।

দে কার মুঝে পাতা আওয়ারগি বান গায়ে🎶🎶
🎶🎶ওও হাসি বান গায়ি ওও নামি বান গায়ে
তুম মেরে আসমা, মেরি জামি বান গায়ে। 🎶🎶

🎶🎶ক্যায় খুব রাবনে কিয়া, বিন মাঙে ইতনা দিয়া
বারনা হে মিলতা কাহা, হাম কাফি রুকো খুদা🎶🎶

🎶🎶ক্যায় খুব রাবনে কিয়া, বিন মাঙে ইতনা দিয়া
বারনা হে মিলতা কাহা, হাম কাফি রুকো খুদা🎶🎶
🎶🎶হাসরাতে আব মেরি তুমছে হে যা মিলি

তুম দুয়া আব মেরি আখরি বান গায়ে🎶🎶
🎶🎶ওও হাসি বান গায়ে ওও নামি বান গায়ে
তুম মেরে আসমা, মেরি জামি বান গায়ে। 🎶🎶
গান শেষে রোজ সামনে তাকালো। রওশন বাদে সবাই অবাক হয়ে চেয়ে আছে।

রোজ নিচু স্বরে বললো
~ ভালো লাগেনি গান?
সবাই একসাথে বলে উঠলো

~ এটা হুবহু #SR এর গলার মতো।
সবার কথা শুনে রোজ ঠোট চেপে হেসে নিজের রুমে চলে গেলো।

তখন রওশন উঠে সবাইকে স্লো ভয়েসে বললো।
~ রোজই #Sr তাই এমন করে হা করে তাকানোর দরকার নাই। ভবিষ্যৎ এ ফ্রিতে এমন অনেক গান শুনতে পাবে।

রাতে ছাদে পাইচারি করছে রওশন। দিয়া আর রোজ সামনের দোলনায় বসে রওশনকে দেখছে আর হাসছে।
~ আমি কি এখন রুমে যেতে পারি?

প্রশ্ন করলো রোজ। রওশন উত্তর না দিয়ে ছাদের রেলিং এর উপর উঠে বসলো। দিয়া গালে হাত দিয়ে রোজের দিকে চেয়ে আছে। কিছুদিন আগেও দিয়া রওশনের কাছে বায়না করেছিলো এস আর কে দেখবে। কিন্তু রওশন ওকে ধোকা দিসে।

তাই একটু আগে রওশনকে ছাদে ডেকে রওশনের গলায় আর ঘাড়ে বেশকয়েকটা কামড় দিয়েছে দিয়া। গলার দাগগুলো স্পষ্ট। লজ্জায় রোজকে ডেকে এনেছে ও। এখন এই দাগ মোছার দায়িত্ব ওদের দুজনকেই নিতে হবে।

~ ভাইয়া ঘুম আসছে। যেতে দিন না আমাকে। আপনারা কামড়াকামড়ি করেছেন, নিজেরা ঝামেলা করেছেন, নিজেরাই মিটান।

ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে কথাটা বললো রোজ। কিন্তু কেউ ওর কথার পাত্তাই দিচ্ছে না। রওশন দুপাশে মাথা নাড়াচ্ছে যার অর্থ ” রোজ যেতে পারবে না ” রোজের এবার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করার পালা।

~ ভাইয়া….আমাকে যদি যেতে না দেন তাহলে আমি চিল্লিয়ে সবাইকে ডাকবো আর বলবো আপনারা ছাদে রোম্যান্স করছিলেন। আমি দেখে ফেলছি বলে আমাকে আটকে রেখেছেন। বাই কিন্তু সহজেই এটা বিশ্বাস করবে। কারন আপনার শরীরে চিহ্ন আছে।

রওশন এবার ধপ করে নিচে পড়ে যায়। দিয়াও গাল থেকে হাত সড়িয়ে চোখ মোটা মোটা করে রোজের দিকে তাকায়। রোজ কপাল কুচকে বিরক্তির সুরে বললো।

~ আমি যাচ্ছি। আমাকে আর একবার ডাকলে সত্যি সত্যি চিল্লাবো। হুহ
~ বোন হয়ে ভাইকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিবে?

~ আগেরদিনই রাক্ষসী টার কথা বলেছিলাম। সেধে বাঁশ নিতে এসেছেন এখন বাঁশের খোঁচা খেয়ে বাঁশকে দোষ দিলে চলে?

~ কথা ঠিক তবে ভুল তো করেই ফেলেছি। এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও। কোনো উপায় বলো প্লিজ।
~ আপনারা দুজন আমাকে অপমান করছেন? রোজানু তুই আবার আমাকে রাক্ষসী বললি?

দিয়া গাল ফুলিয়ে রোজকে আবার খামচি দিলো। রোজ এবার ডেভিল স্মাইল দিয়ে বললো
~ উপায় একটা আছে। আমাদের আঙ্গুল বা হাত কেটে গেলে যেমন আমরা রক্ত চুষে সেটা এক্টু হলেও ঠিক করি তেমনই দিয়া যেখানে যেখানে কামড়েছে সেখানে সেখানে ও সফ্টলি কিস করুক তাহলে সবটা ঠিক হয়ে যাবে।

রোজের কথা শুনে দিয়া হা হয়ে যায়। এটা কেমন কথা? রোজ দোলনা থেকে উঠে রওশনের সামনে যায় আর একটা ছোট মলম ছুড়ে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে বলে…

~ এটা লাগালে দাগ মিলিয়ে যাবে। তবে দিয়াকে যেটা বলেছি ওটা ওকে দিয়ে করাতে হবে। এটা আমাকে খামচি দেওয়ার ছোট্টো পানিশমেন্ট। টাটা

রোজ ওখান থেকে চলে আসে। রওশন ভ্রু নাচাতে নাচাতে দিয়ার দিকে এগোতে থাকে। দিয়ার হাতপা সহ ওর চোখ~মুখও কাঁপছে।

~[ রোজের বাচ্চিটা ইচ্ছা করে ফাঁসিয়ে দিলো নাকি? এটা কি কোনো কথার মতো কথা? যমটা আমাদের দিকে ওভাবে তাকিয়ে এদিকেই আসছে কেন। ? এসব করতে হবে জানলে কখনই কামড় দিতাম না। এখন আমার কি হবে? শয়তান্নিটাও চলে গেলো। হারামি মার্কা বেস্টু। তোর জামাই এই যমের চেয়েও খারাপ হবে দিয়ার এই কথাটা মিলিয়ে নিস। নাম্বার ওয়ান লুচু হবে তোর জামাই ] ভাইয়া? আমারও খুব ঘুম পাচ্ছে আমিও যাই?

~ যাবি? আচ্ছা যা।
🍂

সকালে পার্লার থেকে মেয়েরা আসে রুহিকে সাজাতে। সবাই সাজছে আর দিয়া বারবার লিপস্টিক পড়ছে। রোজ রেডি হচ্ছে বাইরে বের হওয়ার জন্য। দরজার কাছে আসতেই ওর হার্টবিট বেড়ে যায়। আলিজা দাড়িয়ে আছে।

আলিজা রোজের ফুপির মেয়ে। ছোটবেলায় রোজ আলিজার কাছেই থাকতো। দীর্ঘ ৭বছর হয়ে গেছে ওদের যোগাযোগ নেই। আলিজা বিয়ে করে শশুড়বাড়ি যাওয়ার পথে অবশ্য একবার দেখা হয়েছিলো কিন্তু তা কিছুক্ষনের জন্য।

~ রোজ তুই?
রোজ আলিজাকে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কারন ও চায়না আহমেদ পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে। আর তার প্রধান কারন আহমেদ পরিবারের ছোট ছেলে মেঘালয় আহমেদ। আলিজা রোজের পিছু পিছু ওকে ডাকতে ডাকতে আসে কিন্তু রোজকে পায় না। আরাভ আলিজাকে খুজতে খুজতে বাগানে এসে দেখে আলিজা কাঁদছে।

~ আলিজা? তুমি এখানে কি করছো? আর কাঁদছো কেন? কি হয়েছে
~ আরাভ রোজ ছিলো এখানে। কিন্তু ও আমার সাথে কথা বলেনি। আমি জানি ও আমাকে চিনতে পেরেছে।

~ তুমি আগে শান্ত হও। রোজ এখানে আসবে কিভাবে? তুমি ভুল দেখেছ। চলো রুহিকে দেখতে হবে। ও বাড়িও তো ফিরতে হবে। সেদিকে খেয়াল আছে?

~ আমি রোজকেই দেখেছি। তুমি বিশ্বাস করো ওটা রোজই ছিলো। আমি কোথাও যাবো না এখানেই থাকবো। রোজ ফিরলে আমি ওর সাথে কথা বলব। ওরা তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
~ আলিজা এটা বিয়ে বাড়ি। সিনক্রিয়েট করো না। রোজ নেই এখানে। বাড়ি চলো।

দূরে দাড়িয়ে রোজ সবটা দেখলো। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ওখান থেকে চলে গেলো।

ছোঁয়া বর্তমানে স্নিগ্ধর বাড়িতে। বাড়িতে স্নিগ্ধ ছাড়া আর কেউ নেই। তথ্যটা রওশন দিয়েছে। স্নিগ্ধ শাওয়ার নিয়ে সবে বাথরুম থেকে বেড়িয়েছে, তখন ছোঁয়া শাড়ি চুজ করছিলো। স্নিগ্ধকে দেখে ছোঁয়া ইচ্ছা করে শাড়ির আঁচল ফেলে দেয়। স্নিগ্ধ নিজের রুমে ছোঁয়াকে এভাবে দেখে ভয়ে আবার বাথরুমে ঢুকে পড়ে।

~ [ এই ছেলেটারে মানুষ বানাতে পারলো না শাশুড়ি মা। আমি কি এতোটাই খারাপ দেখতে যে ভয় পেয়ে বাথরুমে ঢুকতে হবে? শালা আনরোম্যান্টিকের বাক্স। আজ তোর এই ভোলাভালা চেহারার পেছনের আসল রূপ যদি বের করতে না পারি তাহলে আমার নামও ছোঁয়া না। ] জান, জান বাইরে আসো
বাথরুমের দরজায় টোকা দিতেই স্নিগ্ধ বলে উঠলো

~ এই মেয়ে তোমার লজ্জাশরম কিছু নাই? আমার রুমে কি করছো? যাও বেরিয়ে যাও।
~ তোমার সামনে আবার কিসের লজ্জাশরম। বিয়ের টিকিট তো ভাইয়া কেটেই দিছে। এবার তো হানিমুনটা সাড়ার পালা।
~ কিসের হানিমুন। তোমাকে আমি বিয়ে করবো না।

~ তুই করবি না, তোর বাপের ছেলে করবে। তুই বের হবি নাকি দরজা ভাঙবো।
~ এটা ঠিক করছো না তুমি।
~ আমাকে যখন ইগনোর করতিস তখন আমিও বলতাম ” এটা ঠিক করছেন না আপনি “শুনেছিস সেকথা?

~ রওশন, ভাইরে এভাবে শোধ নিলি? এ কোন ডাইনির কবলে পড়লাম। এবার বাঁচবো কিভাবে?
~ এখনো বাঁচার শখ আছে? এই বেরোবি নাকি আমি আসবো।

~ একটা প্যান্ট দাও কাবার্ড থেকে। টাওয়াল পড়ে ইজ্জত হাতে নিয়ে বের হতে পারব না।
~ কোনো প্যান্ট ট্যান্ট হবে না। যেভাবে আছ সেভাবেই বের হও।

~ বিয়ের আগে এসব কি কথা? অন্ততো বিয়েটা হতে দাও। আর তার আগে প্যান্ট দাও।
~ ওয়াও তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে গেছ। বাহ। দাড়াও এখুনি দিচ্ছি তবে প্যান্ট না পায়জামা আর পাঞ্জাবি। আমরা আজই বিয়ে করবো।
~ ইমপসিবল।

~ তাহলে টাওয়াল পড়েই থাকো। আমি দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকি, শোনো বাই এনি চান্স যদি আমি প্রেগনেন্ট হয়ে যাই তাহলে কিন্তু
~ ছি। কি বলছো এসব। প্লিজ ছোঁয়া আমার কথা শোনো। বাড়ি যাও।

~ সবে তো বলা শুরু করেছি। আরো অনেক কিছু শুনতে হবে তোমাকে। এবার ভালোয় ভালোয় বাইরে আসো, বিয়ের সাজে সাজো থুরি পাঞ্জাবি পায়জামা পাগড়ি, ব্রুস। সব পড়ে নাও নাহলে কিন্তু সত্যি সত্যিস্নিগ্ধ টাওয়াল ধরে বাইরে আসলো।

ছোঁয়া দাঁত বের করে হাসছে। স্নিগ্ধ পাঞ্জাবি পড়ে পায়জামা নিয়ে এক দৌড়ে বাইরে চলে গেল। কারন এই ছোঁয়াকে বিশ্বাস করা যায় না। যদি টাওয়াল ধরে টানে? বা অন্যকিছু করে।
কিন্তু কে জানে যে স্নিগ্ধর জন্য এগুলো না। আরো ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে।


পর্ব ০৮

আলিজার কথা শুনে বাড়ির সবাই অবাক হলেও মেঘ অবাক হয় না। কারন মেঘ নিজে রোজের ওপর নজর রেখেছিলো। কিন্তু ওর হাতে যে এখন কিছুই নেই তাই রোজের সাথে ও চায়না কোনো সম্পর্ক রাখতে। বিয়ে শেষ হলে আজই চলে যাবে ও।

মিরাজ আর রুহিকে স্টেইজে বসানো হলো। সামনে নাচগান হচ্ছে। রওশন গেস্টদের হোস্ট করছে। আরু আর দিয়া শিশিরের জন্য অপেক্ষা করছে। কারন শিশির কাজীসাহেব কে আনতে গেছে।

মিরাজ মেঘের ফুপির ছেলে। অর্থাৎ আরাভ ও মেঘ মিরাজের মামাদের ছেলে। বিয়ে উপলক্ষে ঢাকায় এসেছে ওরা। একই জেলায় থাকে সবাই অথচ কারোর সাথে কারোর যোগাযোগ নেই। ব্যাপারটা অদ্ভুত তাইনা?

রোজ একটা প্রাইভেট ডিটেক্টিভ এজেন্সির হয়ে কাজ করে। মূলত কম্পিউটার নিয়ে ওর কাজ। বিভিন্ন সিগন্যাল হ্যাক করা, কম্পিউটার হ্যাক করা, প্রোগ্রাম সেট করা। মাঝে মাঝে কিছু সলুশনও বের করে দেয়।

এই এজেন্সির খোজ সম্রাট রোজকে দেয়। সম্রাটের সাথে এজেন্সির আলাপ হয় একটা এক্সিডেন্ট কেস এ। তারপরই সম্রাট রোজের মেধাকে তাদের কাজে লাগানোর জন্য, সবার ভালো করার জন্য একটা
আবেদন করে যা পাস হয়ে যায়।

আরাভ আলিজার ৫বছরের বিবাহ বার্ষিকী পূরণ হবে আগামী মাসে। আলিজা প্রেগনেন্ট, আর আরাভ নিজেদের বিজনেস সামলায়।
মেঘ, সে যে আসলে কি করে? কি নিয়ে ভাবে? কি ওর স্বপ্ন সেটা ও নিজেই জানে না। বাড়ির মানুষও ওকে নিয়ে কনফিউজ্ড। তাছাড়া ও ওর প্রিয়জনকে নিয়ে যথেষ্ট পসেসিভ।

মেঘকে এক কথায় ফেইলার বয় বললেও চলে। ও ওর প্রিয়জনকে সবার থেকে একটু হলেও বেশি ভালোবাসে হয়তো রোজের চলে আসার কারন এটাই।

বর্তমানে স্নিগ্ধ তার মা বাবার সামনে অপরাধির মতো দাড়িয়ে আছে। ছোঁয়া ওর মায়ের পাশে বসে আছে আর কাঁদছে। একটু আগে।
স্নিগ্ধ পায়জামা নিয়ে বাইরে আসতেই দেখে ওর মা বাবা দাড়িয়ে আছে। ছেলেকে এভাবে দেখে বেশ অবাক হন তারা। ওদিকে স্নিগ্ধকে ধরার জন্য ছোঁয়াও শাড়ি ছাড়াই বাইরে বেড়িয়ে আসে। ছোঁয়াকে এভাবে দেখে স্নিগ্ধর বাবার বুকের ভেতর ব্যাথা শুরু হয়ে যায়।

নিজের ছেলে এতোটা খারাপ হবে আশা করেননি উনি। স্নিগ্ধর মা ছোঁযাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে শাড়ি পড়িয়ে দেয়। তখন ছোঁয়া কান্নাকাটি করে স্নিগ্ধর মায়ের মাথায় এটা ভালো করে ঢুকিয়ে দেয় যে ” স্নিগ্ধ ওকে ঠকাচ্ছে। ও স্নিগ্ধকে ভালোবাসে, স্নিগ্ধকে ছাড়া ও বাঁচবে না। স্নিগ্ধ ওকে বিয়ে করবে বলেছে কিন্তু এখন করছে না। ” ব্যাস আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বের হওয়া শুরু হয়ে গেলো। স্নিগ্ধর বাবা বেল্ট দিয়ে স্নিগ্ধকে কয়েক ঘা দিতেই স্নিগ্ধ আজই বিয়ে করার জন্য রাজি হয়ে যায়।

ছোঁয়া সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। কাজী এখনো আসেনি। রওশন স্নিগ্ধকে এভাবে আধমরা অবস্থায় দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মূলত এসব রওশন ছোঁয়া মিলে, প্লান করে ঘটাচ্ছে। বাড়ির সবাই জানে যে আজ একটা না দুটো বিয়ে হবে।

কাজী এসে দুয়ে দুয়ে চারজনের বিয়ে সম্পন্ন করলো। কিন্তু রোজ এখনো আসেনি। বিয়ে শেষ হতেই মেঘ চলে যায়। আলিজা অপেক্ষা করছে রোজের জন্য।

সন্ধ্যায় ফেরে রোজ। চোখদুটো ফোলা, নাক লাল হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেঁদেছে। কিন্তু কেন?
আলিজা রোজকে দেখে রোজের কাছে আসে। রোজকে জরিয়ে ধরে ওর মাথায় হাত বোলায়। রওশন দিয়াসহ বাকি সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
~ সরি বোন।

~ আপিলা কেমন আছ? সরি গো সকালে কাজের জন্য থাকতে পারিনি।
~ কেমন আছিস তুই?

~ যদি কেউ আমার কাছে প্রশ্ন করে পৃথিবির সবচেয়ে সুখি মানুষটা কে? ” নিঃসন্দেহে আমি ” এটাই হবে আমার উত্তর। যাই হোক তোমার পেট
টা ফোলা ফোলা লাগছে?
~৫মাস।

রোজ পেছন থেকে একটা জুয়েলারি বক্স বের করলো, বক্সটা খুলে আলিজার সামনে ধরতেই সবাই অবাক হয়ে যায়, ডায়মন্ডের রুলি আর একটা লকেটসহ চেইন। রোজের অর্ধেক জমানো টাকা আজ শেষ করে আসলো।
~ আমার একমাত্র আপিলার বেবির জন্য। দাভাই বললো তোমার নাকি টুইন হবে। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। এগুলো মেয়ের জন্য। ছেলেটাকে তো আমি নিয়ে যাব।

আরাভের চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। আরাভ চোখের পানি মুছে বললো
~ শুধু ছেলে? তার আব্বু কি দোষ করলো?

~ আরে তুমিও আছ? আচ্ছা তোমরা এখানে কি করছ? ছেলেদের গেস্ট?
~ মিরাজ আমার ভাই রোজ। তাই এসেছি আমরা। কিন্তু তুমি?

~ আমাকে রওশন ভাইয়া আর দিয়া এনেছে। আমার বন্ধু দিয়া। আচ্ছা তোমরা থাকো আমি ব্যাগ প্যাক করবো।
আলিজা গোমরা মুখে বলল

~ থাকবি না?
~ কাজ আছে আমার। তাছাড়া সামনে পরীক্ষা। ফিরতে হবে।
রোজ কথা শেষ করে রুমে আসে। আরু বসে আছে হয়তো কিছু বলতে চায় ওকে। আরুকে দেখে অবাক হয়না রোজ। হয়তো এমন কিছু ও আগে থেকেই আশা করে রেখেছিলো। রোজ ফ্রেস হয়ে ল্যাগেজ খোলে।
~ চলে যাচ্ছো?

~ কি আর করবো? এখানে তো শিশির ভাই এর মতো হ্যান্ডসাম জামাই নাই তাই যেতে হচ্ছে। এমন জামাই থাকলে কখনো যেতাম না। তোমার মতো ওতো খারাপ না আমি।

~ আমি আসলেই খারাপ?
রোজ আরুর পাশে বসে ওর গালে আলতো করে হাত ছোঁয়ালো। তারপর মৃদুসুরে বলল
~ মানুষ ভুল করবেই আপু। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল হয়। সেই ভুলটাকে মনে রেখে হাজারটা ভুল করাটা কি অন্যায় নয়? আমি তোমাকে হিপনোটাইজ করে সবটাই জেনেছিলাম।

কিভাবে একটা বাচ্চা মেয়েকে ভালোবাসার নাম করে শারিরীক অত্যাচার করেছে ওই নরপশু। কিন্তু তোমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম তোমার মন হাল্কা করার জন্য। ইভেন শিশির ভাইয়াকেও সবটা বলেছি। ভাইয়া সবটা জেনেও যদি তোমাকে ভালোবাসতে পারে তাহলে তোমার এই অভিনয় কিসের জন্য? অন্যায় নীরব করেছে, শাস্তি নীবর পাবে। তুমি শিশির ভাইয়াকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? আমি জানি তুমি নিজেকে তুচ্ছ মনে করছো।

আমাকে সবটা বলেছো কারন আমি তোমার অপরিচিতো। তবে কিছু কথা পরিচিতো, নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেই আগে বলতে হয়। ভবিষ্যৎ এ কি হবে সেটা ভেবে বর্তমানে ভয় পাওয়াটা নিতান্তই একটা বোকামি।

তুমি তো শুধু একটা ঘটনা কাছ থেকে দেখেছো। আমি প্রতিনিয়ত এগুলো অনুভব করি। প্রতিটা ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হয় মেয়ে যেখানে শুরুটা ছেলেরা করে। আমি জানি বাস্তবতা কতটা কঠিন। প্রতিটা মেয়েরই বোঝা উচিত কোনটা ঠিক কোনটা ভুল। একথা গুলো আমি এমনি এমনি বলছি না। আমার বন্ধু এবং আমাকেও দু দুবার এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে।

কথাটা শুনে আৎকে ওঠে আরু। অস্পষ্ট কন্ঠে বলে
~ ছেলেগুলো?

~ একজন মারা গেছে আরেকজনের? ওটার হাল বেশি ভালো না। আমি পাশে থাকা লাঠি দিয়ে ইচ্ছামতো পিটিয়েছি। আসলে ওরা আমার হোস্টেলের আংকেল ছিলো। প্রচন্ড সম্মান করতাম ওদের কিন্তু সেদিন আমার পেটে, গলায় ওদের বিশ্রি স্পর্শ।

~ কাউকে বলনি?
~ আমার দাভাই আর স্কুলের টিচাররা জানে। হয়তো পরিবারের অনেকে জানে। কিন্তু আমি ছোট ছিলাম বলে এই খুনের দায় আমার ওপর এসে পড়েনি। আমি আত্মরক্ষার জন্য মেরেছি, একটা জিনিস খেয়াল করবা যখন চারদিকের রাস্তাটা শূণ্য হয়ে যায় তখন আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিই তোমাকে সাহায্য করবে।

পিচ্চি একটা মেয়ের শরীরেও সেদিন এমন শক্তিই এসেছিলো। আল্লহর অশেষ দয়ায় আমার আর সেহের আপুর কোনো ক্ষতি হয়নি। সেজন্যই বলছি সামনে থেকে মোকাবিলা করতে শেখো। দূর্বলের ন্যায় আর কতদিন লুকিয়ে, সবার আড়ালে থেকে নিজেকে রক্ষা করবা?
~ কখনো খারাপ লাগেনি তোমার?

~ নাহ। খারাপ লাগবে কেন? অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। তার জন্য যদি অন্যায়কারী মারা যায় তাহলে বলতে হবে সে তার শাস্তি পেয়েছে। আমাদের জায়গায় যদি অন্যকেউ হত তাহলে হয়তো তারা এভাবে মরতো না। হয়ত মরতো। কিন্তু যদি না মরতো তাহলে ওরা অন্য বাচ্চাদের ক্ষতি করার কথা ভাবতো। তার চেয়ে মরে গিয়েই ভালো হয়েছে।
~ আমাদের বাড়ি দুদিন থাকো।

~ সময় থাকলে থাকতাম। কিন্তু পরীক্ষা দিতে হবে। নেক্সট ইয়ার থেকে তো ঢাকাতেই থাকবো। তখন যখন ইচ্ছা একসাথে ঘুরতে, থাকতে পারবো। আসছি।
রোজ নিচে নেমে রওশনকে বাসের টিকিট কেটে দিতে বললো। রওশন অনিচ্ছা স্বত্তেও রোজের কথা মেনে নিতে বাধ্য হলো।

দিয়াকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে রওশন। আগামী মাসে ও চলে যাবে ইন্ডিয়া। এমাসে রোজের সাথে গানের এগ্রিমেন্ট না থাকলে এ মাসেই যেত। দিয়ার মন এজন্য খুব খারাপ।
~ মন খারাপ করিস না। আমি তো তিনবছর পরই ফিরে আসবো।

~ তখন তোমার বয়স ত্রিশ হয়ে যাবে। তুমি তো বুড়ো হয়ে যাবা।
~ এখনো সময় আছে বলে দে, কাকে বিয়ে করতে চাস। আমি নাহয় ওদেশে গিয়ে বিয়েশাদী
~ খুন করে ফেলবো। এমন করো কেন? এমনিই শুধু কান্না পাচ্ছে। বাড়ি চলো ঘুরবো না আজ। ভালো লাগছে না।
~ এমন করলে কিভাবে চলে দিয়া? বুঝিস না কেন?

~ আপনাদের তো বিজনেস আছেই। তাহলে যেতে হচ্ছে কেন?
~ মনে হচ্ছে পিচ্চির রাগ টা বেশি হয়ে গেছে। তোর এতো আবেগ আসে কোথা থেকে? দুদিন আগে তো আমাকে সহ্যও করতে পারতিস না। সব হয়েছে রোজের জন্য।

~ রোজটাও চলে গেলো। বুবুনও চলে গেছে, পুরো একা হয়ে গেছি।
~ এক কাজ করি? রোজ আসলে আমি যাবো তাহলে আর তোর একা লাগবে না। রোজও তোর সাথে ভালো থাকবে। হোস্টেলে কষ্ট করবে কেন?

~ ওই ঢংগি এ কথা শুনবে আপনি ভাবলেন কিভাবে? ও ওর দাভাই এর সাথে অবধি থাকে না। আর আমরা তো বাইরের মানুষ। ওর এতো আত্মমর্যাদা কোথা থেকে আসে কে জানে? প্রচন্ড ইগো ওর।

~ ও ওরকম কেন?
~ তা কি বলছে আমাকে? একনম্বরের কিপ্টা। মেপে মেপে কথা বলে। কথা বলাতেই মনে হয় সবচেয়ে বেশি কিপ্টামি করে।

~ মন ভালো হইছে?
~ হ্যা ওর নামে নালিশ করলে, ওরে পচাইলেই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।
~ অদ্ভুত বন্ধু। কি জিনিস তোরা।
~ অপমান করছো?

~ নাহ। আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা যে তোর সামনে সত্যিটা বলব।
🍂
আরু আগের মতো নিজের জিবনে, নিজের ক্যারিয়ারে মন দিয়েছে। বাড়ির সবাইকে আনা হয়েছে। নীরবের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করেছে শিশির।
~ শিশির?
~ কিছু বলবা?

~ আসলে বলতে চাচ্ছি যে
শিশির ভ্রু কুচকে আরুর দিকে তাকায়। আরু নখ কামড়াচ্ছে আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।
~ বল।
~ শিশির আমি গান গাইতে চাইনা।

~ তুমি বলেছিলে গান গাইতে হলে ডিভোর্স দিতে হবে সেজন্য। আমি ডিভোর্স দিবো না। আমরা সবাই একসাথে থাকবো। যদি গান গাওয়া বন্ধ করতে হয় তাহলে সেটাই ভালো।
ছোঁয়ার কথায় হাসলো শিশির। তারপর ছোঁয়ার হাতে একটা পেপার দিলো। ছোঁয়া কাগজটা মেলে শিশিরের দিকে ছলছল চোখে তাকালো। শিশির পানি খেয়ে বলল
~ রোজ পাঠিয়েছে।
~ কিন্তু আমার গান?

~ তোমার গাওয়া কিছু গান আমি পাঠিয়েছিলাম ওকে। ও সেগুলো
শুনেই ডিরেক্টর দের সাথে কথা বলেছেন। তোমার ভয়েস সবার পছন্দ হয়েছে। এখন আর কি চাও?
~ রোজকে একবার জরিয়ে ধরে ওর গাল টেনে চুঁমু দিতে ইচ্ছে করছে।

~ এখন যে আছে তাকে দিয়েই কাজ সাড়ো পরে নাহয় রোজকে দিও।

~ তোমাকে কিস? তোমাকে তো ফ্লাইং কিসও দিব না। যাও যাও তোমার অফিসের পি এ আছে না? ওর সাথে টাংকি দাও।
~ আচ্ছা।

~ এক পা নড়লে পা কেটে রেখে দিব। ওয়েট করো আমি যাবো অফিসে। আর হ্যা তোমাকে আর কোথাও যেতে হবে না। দ্বিদুন বলছিলো দাদুর কবর জিয়ারত করতে যাবে তুমি নিয়ে যাও আর সবাইকে নিয়ে আসো। আমি এদিকটা সামলে নিব।
~ পারবে?

~ আমাকে সন্দেহ করছো?
~ একদমই না। আসছি এবার।

~ ওই তোরে বলছি না আমার বাবু লাগবে। দিবি কিনা বল। নাহলে কিন্তু শাশুড়িআম্মুকে গিয়ে বলব।
~ এই তোমার বয়স কত? এখন বাবু বাবু করতেছ।

~ তাতে তোর কি? বাবু লাগবে মানে লাগবে।
~ দিব না।
~ আম্মু, আম্মু, আম্মু
ছোঁয়ার চিৎকারে স্নিগ্ধর আম্মু চলে আসে। ছোঁয়া স্নিগ্ধকে চোখ মেরে কাঁদা শুরু করলো। স্নিগ্ধর আম্মু ছোঁয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো

~ কি হয়েছো? কাঁদছো কেন? স্নিগ্ধ কিছু বলেছে? এই কি বলেছিস তুই (স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো)
স্নিগ্ধ কিছু বলার আগেই ছোঁয়া বলে উঠলো
~ আম্মু ও বলেছে ও নাকি চাপে পড়ে বিয়ে করেছে। তাই আমি যেন ওর থেকে কিছু আশা না করি। ও নাকি আমাকে ভালোবাসতে পারবে না। আরুর বিয়ের দেড়মাস হয়েছে আর ওর বাবু হবে। অথচ আমার? আমার সাথে এমন কেন হল?

স্নিগ্ধর আম্মু রেগে স্নিগ্ধকে বলল
~ বছর গুনতেই আমি আমার নাতি নাতনি মুখ দেখতে চাই স্নিগ্ধ। আর বউমার সাথে যদি একটুও খারাপ ব্যাবহার করিস তাহলে তোর আব্বুকে বলে দিব। এই বয়সে মার খাবি লজ্জা করবে না?

~ কিন্তু আম্মু।
~ কোনো কিছু শুনতে চাচ্ছি না আমি। যা বলেছি সেটাই করবি।

ছোঁয়া মিনমিনে গলায় বলল
~ থাক আম্মু আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও। ও যখন আমাকে পছন্দ করে না
~ ওমন বলে না মা। আমরা তো আছি। কিছু হলে আমাদের বলবে। ঠিক আছে?

~ আচ্ছা আম্মু।
স্নিগ্ধর আম্মু চলে যেতেই ছোঁয়া খাটের ওপর বসে পড়লো। স্নিগ্ধ রাগে ফুসছে।
~ এসব কি বললে?

~ কি বলেছি?
~ মিথ্যা বললে কেন?
~ তো সরাসরি কিভাবে বলতাম আম্মুকে যে “আমার বাবু লাগবে “
~ সত্যি বলার সৎ সাহস নেই আবার লম্বা লেকচার।

কথাটা শুনেই ছোঁয়া রেগে যায়। স্নিগ্ধর হাত টেনে ও স্নিগ্ধর মায়ের সামনে নিয়ে যায়। তারপর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলে
~ আম্মু উনি বলেছে আমাদের বাবু হবে না। আমি বলেছি আমি বাবু চাই আর উনি বলেছে উনি দেবে না।

ছোঁয়ার কথা শুনে ওরা এক জন আরেকজনের দিকে আড়ে তাকায়। যেটুকু সম্মান ছিল স্নিগ্ধর এই মেয়ের জন্য সেটুকুও থাকলো না। স্নিগ্ধর আম্মু ছেলের এমন অবস্থা দেখে ঠোট চেপে হাসছে। তারপর রাগি গলায় বলল
~ আমার কথার অন্যথা যেন না হয় স্নিগ্ধ

স্নিগ্ধ রেগে বলল
~ বাবু চায় তাইনা? দেখি কয়টা সামলাতে পারে।
কথাটা বলেই হনহন করে বেড়িয়ে যায় স্নিগ্ধ। ছোঁয়া টেনশনে আম্মুর দিকে তাকায়। আম্মু হেসে বলল
~ চিন্তা করো না। এবার বল কেমন অভিনয় করলাম।

~ অভিনয় তো ঠিকই আছে। কিন্তু কয়টা সামলাবো মানে? উনি যে লেডিস টাইপের লোক দিতে পারবে কয়টা? খালি মুখে মুখে ” হ্যান করব, ত্যান করব “
ছোঁয়ার কথা শুনে দুজনেই জোরে জোরে হেসে ওঠে। এমন বিচ্ছু টাইপের বউমা ছিলো কপালে ভেবে হাসি আরও জোড়ালো হলো তার।


পর্ব ০৯

তিন মাস পর। রোজের পরীক্ষা শেষ। এবার দুমাস ছুটি। সম্রাট এসেছে রোজকে নিতে। আজ ওরা ঢাকায় সিফ্ট করবে। সম্রাট ঢাকায় একটা ফ্লাট কিনেছে। রোজ সেহেরকে কল করে সম্রাটের সাথে গাড়িতে উঠলো। মাঝ রাস্তায় মুন্নি রোজকে আটকালো। মুন্নি রোজের ক্লাসমেট। রোজ নেমে গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে দাড়ালো।
~ কিছু বলবে?

~ যদিও লুজার দের সাথে কথা বলে না মু্ন্নি কিন্তু আজ একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি।
~ লুজার? মানলাম আমি লুজার বাট তুমি তো বেগার। তোমাকে তো তোমার ভালোবাসা ভিক্ষা দিয়েছি আমি। কি ভেবেছো রোজ না চাইলে তুমি মেঘকে পাবে? মেঘ আমাকে ভালোবাসে না ঠিক আছে বাট আমি বাসি। আর রোজ নিজের ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারে।

মুন্নি ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিলো রোজকে।

~ তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে ভিখারি বলার। আছে টা কি তোমার? তোমার তো ফ্যামিলিও নেই। মানে তোমাকে মেনে নেয় না।
রোজকে মারার জন্য মুন্নি আবার হাত তুললে রোজ হাতটা ধরে মোচর দিয়ে মুন্নিকে পেছনে ঘুরিয়ে নেয়। তারপর বলে

~ রোজকে মারার সাহস হলো কিভাবে? হাত টা প্রচন্ড লম্বা হয়েছে। এবার মনে হচ্ছে সত্যিই কেটে ফেলতে হবে।
তখনই কেউ এসে রোজকে ধাক্কা দেয়। রোজ কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখলো মেঘ। মুন্নির হাত ডলে দিচ্ছে মেঘ। চোখে মুখে কষ্ট স্পষ্ট, মেঘ রাগি চোখে রোজের দিকে তাকালো
~ তোর সাহস হলো কিভাবে ওকে কষ্ট দেওয়ার? কে দিয়েছে এই সাহস? মুন্নি ঠিক আছো তুমি?

রোজ উঠে গাড়ি থেকে একটা পানির বোতল এনে মেঘের সামনে দিলো।
~ পানি দিন।
~ কোনো দরকার নেই যা তুই।

~ ফুললি ডাফার। বাই দ্যা ওয়ে সি ইউ এগাইন ইন কলেজ। ” দম থাকলে আমাকে হারিয়ে দেখাও ” মুন্নি। যেটা তুমি বলতে এসেছিলে সেটা আমিই বলে দিলাম।

কথাটা বলেই চলে আসলো রোজ। সম্রাট শুধু বলল
~ কি দরকার ছিলো যাওয়ার? মেঘটাকে কিভাবে ফাঁসিয়েছে দেখেছিস?

~ দাভাই চল এখান থেকে। ভালো লাগছে না। [ এতোদিন রোজের ভালোটা দেখেছো তোমরা। এবার রোজের খারাপ দিক দেখবা। আর জানবা রোজ খারাপ হলে ঠিক কতটা খারাপ হতে পারে। তুমিও বুঝতে পারবে মেঘরোদ্দুর তোমার ভালোবাসা কে? কিন্তু সবটা ঠিক করার সময় পাবে না। আফসোস করবে, ]

🍂
সম্রাটের ফ্লাটটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিচ্ছে আরু শিশির, রওশন দিয়া, রুহি মিরাজ, স্নিগ্ধ ছোঁয়া। রোজকে স্বাগতম করার জন্য বিভিন্ন উপায়ও ভেবে রেখেছে। কিন্তু রোজ ফিরে এসেই একটা রুমে গিয়ে দরজা লক করে দিলো। ভেতর থেকে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ আসছে। সবাই অবাক চোখে সম্রাট সেহেরের দিকে তাকিয়ে আছে। সেহের মৃদু গলায় সম্রাটকে বলল

~ আমি কি ডাকবো ওকে?
সম্রাট কিছু বলল না। মিরাজ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো ” কি হয়েছে? ” সম্রাট তাচ্ছিল্যে ভরা এক হাসি দিয়ে বলল

~ তোমার ভাই মেঘ। রোজকে নিত্যনতুন উপহার দেয় তাই খুশিতে কাঁদছে ও। চিন্তা করো না খুব শ্রীগহ ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তোমরা এখানে?

রুহি চিন্তুত মুখ করে বলল
~ তোমাদের ওয়েলকাম করতে এসেছিলাম। কিন্তু

রোজ শাওয়ার নিয়ে বাইরে আসলো। ঠোটে মৃদু হাসি। সবাইকে জরিয়ে ধরে থ্যাংকইউ বলে সেহেরের পরিচয় দিলো ও।
~ এটা আমার বউমনি সেহের ইবনাত সুমি। আমি সুম্পি ডাকি কিন্তু সেহের নামটাই সবজায়গায় ব্যবহার করে। আর দাভাইকে তো সবাই চেনোই। এখন চল খুদা লাগছে অনেক। কি রে রাক্ষসী তোর মুখটা শুকনা কেন? জামাই ভেগে যাচ্ছে নাকি? কি রওশন ভাই?

সম্রাট রোজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
~ এখন খেয়ে নে। পরে কথা বলিস।

সবাই অদ্ভুতভাবে রোজকে দেখছে, রোজের খাওয়ার স্টাইলটা কেমন জানি লাগছে ওদের। একটা একটা করে ভাত মুখে দিচ্ছে, তরকারি নিতেই আছে প্লেট উপচে পড়ে যাচ্ছে সব, পানি ঢালায়ও মন নেই। মিরাজ নিরাশ চোখে সম্রাটের দিকে তাকালো, একদিনে রোজের ব্যাপারে সবটা জেনে গেছে সবাই।

দিয়া রোজের কাধে হাত রেখে বলল
~ ঠিক হয়ে যাবে সব মিস জিনিয়াস।
দিয়ার কথায় হাসলো রোজ। তারপর সেহেরকে বলল
~ সুম্পি আমাকে ড্রইং আর নাচটা ভালো করে শিখিয়ে দিবে? একবার হেরেছি বারবার হার সহ্য করতে পারবো না। আমার খাওয়া শেষ আসছি।

সেহের অসহায় চোখে সম্রাটের দিকে তাকালো। দিয়া রেগে বলল
~ যে ওকে পছন্দই করে না। ও তার জন্য এতো কষ্ট পাবে কেন? বিয়েবাড়ি যখন দেখেছিলিম ভেবেছিলাম ভালো। কিন্তু না খারাপ, ভীষন খারাপ এই মেঘ। আমিও খাবো না। বাই
দিয়ার কথা শুনে রোজ চিল্লিয়ে বলল
~ না খেলে এবাড়ি থাকবি না। এখুনি চলে যাবি।

দিয়া রেগে বাইরে বেড়িয়ে আসলো। সেহের এসে দিয়াকে বুঝিয়েসুঝিয়ে আবার ভেতরে নিয়ে যায়। রোজ নাচ প্রাকটিস করছে। মেঝেতে কাঁচ ছড়িয়ে। পা কেটে সারা মেঝে রক্তে লাল হয়ে গেছে সেদিকে হুশ নেই ওর। স্নিগ্ধ রোজকে ডাকার জন্য ওর রুমের জানালায় উকি দিতেই ওর বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। ও দরজা খুলে রোজকে কাঁচের ওপর থেকে সড়িয়ে আনে।

~ পাগল হয়ে গেছ? কি করছো এসব?
~ আপনি তো ছোঁয়া আপুকে ভালোবাসেন। পারবেন আপুকে অন্য ছেলের সাথে মেনে নিতে।
রোজের কথায় স্নিগ্ধ আরও রেগে যায়। ভালোবাসে ঠিক আছে তবে নিজেকে এভাবে কষ্ট দিয়ে ভালোবাসার প্রকাশ করে কি লাভ?

~ মেঘই তোমার কাছে সব? আমারা যে তোমাকে ভালোবাসি তার দাম নেই? এতোগুলো ভাইবোন পেয়েছো সব কি শুধু লোক দেখানোর জন্য?

~ বাদ দিন। আমি মেঘের জন্য না মুন্নির জন্য নাচছিলাম। প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো সেজন্য। ওই ডাফারের প্রতি কখন আমার ভালোবাসা ছিলো না। যা ছিল সবটা আবেগ। এখন ঠিক হয়ে গেছে সব
সত্যিই কি ডাফারটার জন্য রোজের কোনো ফিলিংস নেই? শুধু মুন্নিকে হারানোর জন্যই মেঘকে চাই ওর?

রুহি মিরাজ আর রওশন দিয়া আজ ইন্ডিয়ায় চলে যাচ্ছে। বিজনেস আর গানের জন্য। পরীক্ষার সময় এসে দিয়া পরীক্ষা দিয়ে যাবে সেভাবেই কথা হয়েছে। রোজও নিজের কাজে মন দিয়েছে। রেজাল্ট দিয়েছে। কয়েকদিন পর থেকেই কলেজ শুরু।

এদিকে বেবিদের বন্যা বয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। দুজন সারাবাড়ি কেঁদে কেঁদে তুঙ্গে তুলছে আর দুজন পেটে। ছোঁয়া আর সেহের দুজনেই প্রেগনেন্ট। ওরা সম্রাটদের সাথেই থাকে। কারন স্নিগ্ধর মা বাবাকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছে ডক্টর দেখাতে।

রোজ এখন অনেকটা স্বাভাবিক তবে আগের থেকে প্রচন্ড রাগি আর মুডি হয়ে গেছে। আগের বাচ্চামি স্বভাবের ১% ও ওর মধ্যে অবশিষ্ট নাই।

দেখতে দেখতে কলেজ খুলে যায়। রোজও কলেজে আসা শুরু করেছে। মুন্নি মেঘ সবাই আছে এখানে তবে রোজ সেদিকে পাত্তা দেয় না। মেঘদের ক্লাসের টপ বয় রায়ান যাকে কলেজে সবাই জিনিয়াস বলে জানে তার সাথে রোজের কিছুটা ভাব হয়েছে। তবে রোজ ওর থেকে কিছুটা ডিসটেন্স মেইনটেইন করেই চলে কারণ ছেলেটা ভালো না। একটা মেয়েবাজ।

কলেজে এসে রোজ জানতে পারে যে মুন্নি মেঘকে ভালোবাসে না। হয়ত বাসে। তবে মেঘের ভালোবাসার কোনো দাম দেয়না। সেজন্যই রায়ানের পেছনে ছুটছে ও। ব্যাপারটা বেশ এঞ্জয় করছে রোজ।

মেঘ 👉মুন্নি👉রায়ান
ঠিক এমন ট্রাইঙ্গেল লাভ। কলেজের ফার্স্ট টার্ন এক্সামে মুন্নি ফার্স্ট হয় আর রোজ সেকেন্ড। কিন্তু তাতেও রোজের কোনো খারাপ লাগা নেই। ব্যাপারটা সবাই নোটিস করে। ওদের ক্লাসটিচার রোজকে ডেকে পাঠান।

~ তুমি তো ফার্স্ট হতে চেয়েছিলে, সারাবছর এতো কষ্ট করে পড়েছো তাহলে সাদা খাতা জমা দিয়েছো কেন?
~ স্যার আমার এক প্রিয়জন খুব অসুস্থ ছিলো। তার জন্য আমাকে যেতে হয়েছিলো।
~ কিন্তু সারাবছরের কষ্ট। যাই হোক আমরা তোমার থেকে এটা আশা করিনি রোজ।

~ সরি স্যার।
~ রায়ানের সাথে দেখা করো। প্রতিবছর আমাদের কলেজে একটা কম্পিটিশন হয়। সেখান থেকে জিনিয়াস বাছাই করা হয়। রায়ান পরপর দুবছর জিতেছে। তোমাকে সাহায্য করতে পারবে।

~ ধন্যবাদ স্যার।

কলেজ ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছে রায়ান। রোজ যেতেই সবাই চলে যায়। রোজ বসতে বসতে বললো
~ সবাই চলে গেল কেন?
~ জানি না। কিছু বলবে?

~ আসলে কম্পিটিশন হবে শুনলাম। আমিও পার্টিসিপেট করতে চাই।
~ আচ্ছা। তা তোমার জুটি কোথায়? খেলায় তো জোড় এ পার্টিসিপেট করতে হবে।
তাছাড়া গান গাইতে পারো? নাচ, ছবি আঁকা। এগুলো পারো?

~ হ্যা টুকটাক সব পারি। কিন্তু জোড় কোথায় পাবো? কলেজে কাউকেই তো ঠিক করে চিনি না।
~ গতকাল কলেজের কিছু ছেলেকে তুমি মেরেছ?

কথাটা এড়ানোর জন্য রোজ ” থাক লাগবে না ” বলে উঠে গেলো। রায়ান গিটারের একটা টিউন বাজিয়ে রোজকে ডাকলো
~ চাইলে আমাকে পার্টনার বানাতে পারো। ভরসা রাখতে পারো হারবে না।

রোজ রায়ানের কথায় ঠোট বাঁকিয়ে হাসলো। অবশেষে ও যা চেয়েছে সেটাই হচ্ছে। রায়ানকে হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছে ও। এটা ভেবেই সামনে তাকালো রোজ। মেঘ আর মুন্নি প্রাকটিজ করছে।
~ তাহলে তো ভালোই হবে। বসতে পারি? \

রায়ান হেসে বলল
~ সিউর।

ওদিকে নাচের স্টেপ করছে মেঘ। “মুন্নিকে হারতে দেওয়া চলবে না” মেঘের পরিশ্রম আর সব ট্যালেন্টের মূলমন্ত্র এটা। কিন্তু মুন্নির চোখ রায়ানের দিকে। রোজ আর রায়ানকে এভাবে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে রাগে শরীর জ্বলছে ওর। প্রচন্ড রেগে মেঘকে কিছু না বলে ওখান থেকে চলে যায় মুন্নি।

রোজও উঠে আসে। রায়ান চোখ উঠিয়ে রোজের দিকে তাকালো। রোজ গ্যারেজে গিয়ে মেঘের বাইকের টায়ার থেকে হাওয়া বের করে দিয়ে, প্রিন্সিপালের স্কুটিতে চুইংগাম লাগিয়ে দিলো। রায়ান ভ্রু কুচকে হাসলো। রায়ানের গ্যাং চলে এসেছে। রায়ান গম্ভির গলায় বলল

~ এবছর রোজ আর রায়ান জিতবে কম্পিটিশনে। সো মেঘ আর মুন্নির ওপর নজর রাখবি। এট এনি কস্ট রোজ উইল বি উইন।
রায়ানের এক বন্ধু বলে উঠলো,
~ কিন্তু রোজের থেকে মুন্নি ভালো ছবি আঁকে, নাচেও প্রফেশনাল ও। আর রোজ তো সবে শিখছে। প্রোপার গাইড লাগবে তো।

রায়ান চোখ রাঙিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো।

~ রোজকে আমি হেল্প করবো। তোরা শুধু মেঘ মুন্নির গানের ট্রাক আর স্টেপগুলো জানিয়ে দিবি আমাকে।
~ আচ্ছা।

রোজ কলেজের বাইরে বেড়িয়ে দেখলো একটা বোরকা পড়া মেয়েকে কিছু ছেলে ঘুরে ঘুরে দেখছে। মেয়েটা ভয় পাচ্ছে আর কাঁপছে। রোজ মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলো।

~ আপু তুমি এখানে কি করছো? চলো তাড়াতাড়ি। আর কতো ওয়েট করবো?
রোজের মুখে আপু ডাক শুনে ছেলেগুলো ভয় পেয়ে যায়। রায়ানের কানে কথাটা গেলে নির্ঘাত মার খাবে সবগুলো।
মেয়েটা রোজকে দেখে একটু ভরসা পেলো। ভয়ে জান বেরিয়ে যাচ্ছিলো ওর। রোজ মেয়েটার হাত ধরে সাইডে নিয়ে আসলো।

~ ভয় পেয়ো না। ওরা আর আসবে না। এবার বলো কে তুমি?
~ আমি সাদিয়া, সাদিয়া স্বপ্নিল রেজওয়ান।

~ স্নপ্নিল রেজওয়ান মানে প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলের বউ? তাহলে ওরা তোমাকে ডিস্টার্ব করছিলো কেন?
~ ওরা জানে না আমি ওনার বউ।

রোজ সাদিয়ার কথা শুনে জোরে জোরে হাসলো। কেন হাসছে ও তা বুঝতে না পেরে সাদিয়া জিজ্ঞেস করলো
~ হাসছো কেন?

~ ফার্স্ট অফ অল আমার নামও সাদিয়া। সেকেন্ডলি তুমি এতো কিউট যে ডিস্টার্ব না করে থাকাই যায় না। থার্ডলি তুমি বিবাহিত সেটা মিস্ট্রিয়াস কেস। ফোর্থ ওরা রায়ানের ভয়ে দৌড়াচ্ছে, স্বপ্নিল ভাই এর নাম শুনলে ওদের কি হাল হবে সেটাই ইমাজিন করছিলাম।

~ তুমি চেনো ওনাকে? কিন্তু তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না।
~ কলেজে নিউ আমি। বাট কলেজের সবাইকে
]]]ই চিনি। আর তোমার শশুড়ের সাথে আমার আলাদা একটা সম্পর্ক আছে।
সাদিয়া অবাক চোখে তাকায়। জিজ্ঞেস করে
~ মানে?

~ মানেটা হলো তোমার শশুড় আমার আম্মুর “তো” ভাই। মাঝে মাঝে শুনি মামাতো মাঝে মাঝে শুনি ফুপাতো। তাই সে হিসাবে উনি আমার মামা। আর তুমি আমার মামার ছেলের বউ অর্থাৎ ভাবি।
~ ওহহ।

~ হ্যা। এবার যাও তুমি ভাইয়া আসছে, ওই যে গাড়ি।

রোজ বাড়ি ফিরবে তাই বাইক নেওয়ার জন্য আবার কলেজে আসে ও। আর দেখে মেঘ কাউকে খুজছে। নিশ্চই মুন্নি। রোজ চিল্লিয়ে বলে,

~ হেই ডাফার তোমার গার্লফ্রেন্ড অডিটোরিয়ামে আছে। ওখানে গেলেই ওকে পাবে। আর রায়ানকে দেখেছো?
রোজের কথা শুনে দাড়িয়ে গেলো মেঘ। রোজ অনেকটা পাল্টে গেছে, এখন আর মেঘকে মেঘরোদ্দুর বলে ডাকে না, মেঘের সাথে ঠিক করে কথা বলে না। সারাদিন রায়ানের সাথে চিপকে থাকে।

~ ক্লাসে আছে।
মেঘের গলা শুনে রোজ ডেভিল স্মাইল দিয়ে বাইক বের করে। মনে মনে হাসছে ও।

~ [ সো স্যাড মেঘরোদ্দুর। তোমার সাথে কি ঘটতে চলেছে তুমি জানো না। আমি কখনো ভালোবাসা পাইনি। তার জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। আর আমি তোমাকে পাওয়ার আশাও রাখি না। তুমি মুন্নিকে নিয়ে ভালো থাকলে আমার কোনো সমম্যা হতো না।

কিন্তু মুন্নি তোমার এই দুবছরের এতো ভালোবাসার যোগ্য না। যার জন্য তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো সে নিজের জন্য তোমাকে কষ্ট দিতে একবারও ভাববে না। আমি চাইনা তুমি কষ্ট পাও। তাই এই খেলাটা খেলতেই হবে। ]

রোজ বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায়। মেঘও অডিটোরিয়ামে আসে। মুন্নি মাথা নিচু করে, মন খারাপ করে এয়ারফোনে গান শুনছে। মেঘেরও খারাপ লাগছে মুন্নিকে এভাবে দেখে।

মেঘ গান চালিয়ে প্রাকটিস করা শুরু করলো।
আজ মেঘকে অন্যরকম লাগছে, নাচের স্পিড ক্রোমশ বাড়ছে। মুন্নি মেঘকে এভাবে দেখে ভয় পেয়ে যায়। মেঘ এমনভাবে নাচছে কেন? কি হয়েছে ওর?


পর্ব ১০

মেঘ মুন্নি, রায়ান রোজ, আজ একসাথে নাচের প্রাকটিজ করছে। একই গানের একই ট্রাক। রোজ বারবার স্টেপ ভুল করছে আর রায়ান ওকে শিখিয়ে দিচ্ছে। ওদিকে মেঘ একবার ভুল করতেই মুন্নি মেঘকে এক ঝুড়ি বকা দেয়।

রায়ান রোজের পেটে হাত রেখে ক্লোজ হয়ে একটা স্টেপ করছে, যা দেখে মেঘের অস্থির লাগছে।
~ [ এতো চিপকে নাচানাচি করার কোনো দরকার আছে বলে তো দেখছি না। দিন দিন নির্লজ্জ আর বেহায়া হয়ে যাচ্ছে এই রোজটা। আর রায়ানের সাথেই বা এতো ঘেসাঘেসি কিসে? \

ও জানে না রায়ান কেমন ছেলে? ]
মেঘকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোজ মেঘকে চোখ মারে। মেঘ দ্রুত চোখ সড়িয়ে নেয়। এবার পার্টনার চেঞ্জ হওয়ার পালা, মেঘরোজের সাথে আর রায়ান মুন্নির সাথে নাচবে।
🍂🍂মেঘরোজ🍂🍂

মেঘ রোজকে ঘুরিয়ে একটা স্টেপ কমপ্লিট করছে, আর রোজ মেঘের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে। মেঘ বিরক্ত হয়ে বললো
~ এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
~ স্টুপিড, ডাফার।
~ কি বললি?

~ তখন তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন? যাই হোক তাকিয়েছো ভালো করেছো। এখন আমি তাকাচ্ছি। শোধবোধ।

~ কলেজে আর কোনো পার্টনার পেলি না? রায়ানকেই বেছে নিতে হলো?
~ তো কি তোমাকে বাছতাম? মুন্নি দিত তোমাকে? আর রায়ান খারাপ কিসে? আমার ভালো খেয়াল রাখে, আমাকে লং ড্রাইভে নিয়ে যায়, ভাবছি ওকে বয়ফ্রেন্ড বানাবো.. কতদিন আর সিঙ্গেল থাকবো বলো?

~ চুপচাপ নাচ। বেশি কথা বলবি না।
~ কেন জ্বলছে?

~ জ্বলবে কেন?
~ এই যে কলেজের জিনিয়াস আমার Bf হবে। আমরা কম্পিটিশনে জিতবো, তুমি আর মুন্নি চেয়ে চেয়ে দেখবা। আমি হলে তো রেগে ঢোল হয়ে যেতাম। তোমার রাগ হচ্ছে না?
~ না হচ্ছে না।

🍂🍂রায়ান মুন্নি🍂🍂
রায়ান ইচ্ছে করে মুন্নিকে আগে বাড়িয়ে স্টেপে হেল্প করছে। মাঝে মাঝে ক্লোজ হয়ে নাচছে। রোজ মুন্নির দিকে তাকালে মুন্নি রোজকে, রায়ানের দিকে ইশারা করে ভেঙচি দেয়। রোজের মন চাচ্ছে মেঘকে ছেড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি করে, কিছুক্ষন জোরে জোরে মন খুলে হাসতে।

~ তুমি খুব সুন্দর নাচো মুন্নি। তোমার স্টেপগুলোও অনেক ক্লিন।
~ থ্যাংকইউ সো মাচ। বাই দ্যা ওয়ে ইউ আর লুকিং ড্যাসিং।
~ একটা কথা বলি?

~ যতগুলো মন চায় বলতে পারেন।
~ I Love You
মুন্নি চট করে রায়ানের চোখের দিকে তাকায়
~ কি বলছেন?

~ যেটা তুমি শুনেছো সেটাই বলেছি। ভালোবাসতে পারবে আমাকে?
~ কি চাইছেন?
~ আমি জানি তুমি ভালো নাচো। কিন্তু আমি মেঘকে হারাতে চাই। তাই আমার তোমার হেল্প লাগবে। আমার জন্য এইটুকু করতে পারবে না? আমাদের ভালোবাসার জন্য এইটুকু করতে পারবে না?

~ আপনি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন?

~ হ্যা। আমার বুকের দিকে তাকাও
মুন্নির চোখ রায়ানের বুকের দিকে যেতেই একটা লোগো চোখে পড়লো “Munni” মুন্নি একবার মেঘরোজের দিকে তাকিয়ে বললো
~ পারবো।

রোজ ব্রেক নেওয়ার ছলে রায়ানের সব কথা শুনে ফেলে।
~ গ্রিডি গার্ল। আল্লাহ তোকে এতো লোভ দিলো কেম্নে রে? এতোদিন মেঘ আর এখন রায়ান। আরে স্টুপিড রায়ান তোকে হারানোর জন্য আমাকে জেতানোর জন্য নাটক করছে, এবার বুঝবি ধরা কেম্নে খায়।
ইশ মেঘ~> ব্রোকেন হার্ট

আর মুন্নি ~> ছ্যাকা প্রাপ্ত আসামী হয়ে কলেজে চক্কর খাবে। ক্যা সিন হ্যায় ব্রো।
রোজ পানি খেয়ে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। আজ একবার এজেন্সিতে যেতে হবে। রোজ চলে যেতেই রায়ানও চলে যায়। মুন্নির মনে লাড্ডু ফুটছে কলেজের জিনিয়াস ওকে ভালোবাসে,

~ এবার রায়ানকেও হারাবি রোজ। আর যদি রায়ানকে না পাই তাহলে সেকেন্ড চয়েজ মেঘ তো আছেই।
🍂🍂
কলেজ ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছে মেঘ আর ওর বন্ধুরা। রোজ সবেমাত্র কলেজে এসেছে। মুন্নি রায়ানের সাথে দূরে দাড়িয়ে কথা বলছে

~ বাহ বাহ। সকাল সকালই শুরু করে দিসে ওরা। বেচারা মেঘ দেবদাসের মতো মাঠের এক কোণে পড়ে আছে। যাই একটু সুখ দুঃখের আলাপ করে আসি।

রোজ মেঘের সামনে এসে ওর বন্ধুদের ইশারা করলো চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ নড়লোই না। রোজ কোমড় থেকে বেল্ট খুলে একটা বারি দিতেই ভয়ে সবাই তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলো। রোজ বেল্ট পড়তে পড়তে বললো
~ মিষ্টি কথা কেউ বোঝেই না। হাতে কলমে না দেখালে বোধ হয় ওদের ব্রেইনে ঢোকে না রোজের ইচ্ছা। সো ডাফার তুমি একা একা বসে আছো কেন? তোমার গার্লফ্রেন্ড কোথায়?

~ মজা নিতে এসেছিস?
~ ছি! ছি! কি বলো এসব? আমি কি কখনো মজা নিতে পারি? আমি তো শোক পালন করতে এসেছি। তোমার গার্লফ্রেন্ড আমার হতে হতে না হওয়া বয়ফ্রেন্ডের সাথে লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেমালাম করছে। এটা কি ঠিক?
~ রোজ মেজাজ খারাপ করিস না।

~ মেজাজ খারাপ? সেটা আবার করে কেম্নে? যাই হোক একটা হেল্প করবা?
~ কি হেল্প?
~ ভাবছি আপিলাদের দেখতে যাবো। নিয়ে যাবা?

~ তোর পা আছে একা একা চলে যা। পারলে রায়ানকে নিয়ে যা।
~ আচ্ছা।
~ তুই অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছিস রোজ। আগে তো এমন ছিলি না। তোর বদলে যাওয়ার কারণ কি কোনো ভাবে আমি? যদি তাই হয় তাহলে আমাকে মাফ করে দিস। আমি সত্যিই মুন্নিকে ভালোবাসি।

~ হেই ডাফার। কি মনে করো নিজেকে? রোজের ভালোবাসা এতো সস্তা? হুহ। তোমার প্রতি আমার শুধু আবেগ ছিলো। এখন বড় হয়ে গেছি আমি। আবেগে ভেসে বেড়াই না আরা। তবুও তুমি মুন্নিকে যতটা ভালোবাসো তার ৫%ও যদি আমাকে কেউ ভালো বাসে। তাহলে আমি তাকে Bf. বানিয়ে নিবো। যাস্ট Bf বিয়ে তো অন্যকাউকে করবো। আর যাই হোক লাভ ম্যারেজ রোজের দ্বারা হবে না। সো চিল

~ কিহ?
~ শুনতে পাওনি? রোজকে যতটা ভালো মনে করেছিলে রোজ ততটা না তাইনা? আসলেই রোজ খানিকটা ত্যাড়া আছে। বুঝলে?
~ সত্যিই তোকে চিনি নি?

~ মুন্নিকে ছেড়ে আমাকে লাইন মারার ট্রাই করছো নাকি? লাভ হবে না। আমি ফেল্টু ছেলে~পেলে পছন্দ করিনা। রায়ানের মতো হলেও একটা কথা ছিলো।
~ রায়ানকে এতোটা পছন্দ করিস?

~ অবশ্যই। ওকে পছন্দ না করার তো কোনো কারণ দেখছি না, ব্রিলিয়ান্ট, হ্যান্ডসাম, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো শুধু ক্যারেক্টারটাই একটু অন্যরকম। কোনো ব্যাপার না ঠিক করে নিব আমি।

~ ভালোবাসার মতো এখনো একপিস হ্যান্ডসাম গুডলুকিং ছেলে পাইনি। পেলেই ভালোবাসবো।

~ তোর কথা শুনে মনে চাচ্ছে এই গাছেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি। কি ছিলি আর কি হয়েছিস

~ আগে কিউট ছিলাম এখন হট হয়েছি। হট বোঝো ডাফার? [ নিচের ঠোট কামড়ে চোখ মেরে কথাটা বললো রোজ। ]

রোজের কথা শুনে মেঘ গোল গোল চোখ করে তাকালো। মেঘকে দেখে রোজ ভ্রু নাচিয়ে ওখান থেকে চলে আসে।

বিকালে কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় কিছু ছেলে রোজের পথ আটকায়। রোজ ওদের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো ” কি হয়েছে” ছেলেগুলো উত্তর না দিয়ে রোজকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। রোজ দুহাত সামনে বেধে হাই তুলে বললো

~ একটা চেয়ার দে, আমি আগে বসে নেই। তারপর তোরা ঘুরে ঘুরে কেন চাইলে দাড়িয়ে, শুয়ে, বসে, আমার ঘাড়ের উপর উঠেও আমাকে দেখতে পারিস। আল্লাহ আমাকে কিউট বানিয়েছে তো তোদের দেখানোর জন্যই। [ স্টুপিডের দল। ভুল জায়গায় চলে এসেছিস। ]
একজন রেগে বললো

~ এখানে রায়ান বা স্বপ্নিল ভাই কেউই নেই। এটাকে তোল। এর জন্য অনেক ভুগেছি আমরা। আজ বুঝবে মামনি আমার সাথে পাঙ্গা নেওয়ার মজা কি?
রোজ ভয়ে ভয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকালো,

~ ছেড়ে দিন আমাকে, আমি তো মজা করছিলাম। এতোগুলো লোক আপনারা আপনাদের সাথে আমি একা পারবো না। প্লিজ মাফ করে দেন। যদি বলেন তাহলে আপনাদের পায়ে ধরে ক্ষমা চাই? তবুও আমার সাথে কিছু কইরেন না।

ছেলেগুলো হাসছে রোজের মিনতি শুনে। রোজ তখনই একহাতে জোরে জোরে তুরি বাজিয়ে বললো
~ কি ভেবেছিস এটা বলবো? আরে ১ হোক বা ১০ রোজের কাছে তোরা সব পিপড়ার সমান। তোরা তো টুকটাক মারামারি করিস। আর আমি প্রফেশনাল গুন্ডি। আয়, আমাকে তুলে নিতে আয়। খুদা কি কাসাম একটার হাত পাও আস্তো রাখবো না।

হঠাৎ ছেলেগুলো উল্টো ঘুরে কলেজ গেটের দিকে হাটা শুরু করলো। রোজ ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। রোজকে এতো ভয় পায় সবাই? অথচ ওর দাভাই বলে ” তুই তো দমকা হাওয়ায় উড়ে যাবি। শাড়ি পড়লে তোকে কেমন লাগে জানিস? লম্বা বাশে পতাকা উড়ছে”

~ দাভাই এর চোখেই সব সমস্যা। নিজের বোনকে, বোনের ট্যালেন্টকে, বোনের পাওয়ারকে এখনো চিনতে পারলো না। বেকুব দাভাই।

রোজ চুইংগাম মুখে দিয়ে পেছনে তাকালো, মেঘ দাড়িয়ে ওর দি
কেই চেয়ে আছে। রোজ চোখমুখ খিচে হাত উচু করে মেঘকে ডাকলো
~ হেই ডাফার শোনো, এখানে আসো। [ ওহ তাহলে ওরা আমাকে না একে দেখে পালিয়েছে। সরি দাভাই তুমিই ঠিক ছিলাম। তোমার বোনই লম্বা বাঁশের পতাকা ]
S

মেঘ পকেটে হাত গুজে বেশ ভাব নিয়ে এগিয়ে আসছে। যেমনটা রোজ প্রথমে মেঘকে দিখেছিলো। মেঘ রোজের সামনে এসে ঠোট কামড়ে হাসলো। রোজ ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় মেঘের কাজে

~ তুমিও গুন্ডা নাকি? ওরা তোমাকে দেখেই চলে গেছে, আ’ম ড্যাম সিউর। কাহিনি কি তাড়াতাড়ি বলো।
~ আমি? ওরা তো তোর মতো ডাইনিকে দেখেই ভ
য়ে পালিয়েছে। আমি তো মাত্রই আসলাম।

~ আমি ডাইনি?
~ সন্দেহ আছে?
~ বুঝেছি মুন্নি তোমাকে ছ্যাকা দিসে সেই শোকে তোমার মাথার সাথে চোখটাও খারাপ হয়ে গেছে।
~ একদম মুন্নির নামে বাজে কথা বলবি না।

~ নাহ মুন্নির নাম নিবো আর নিজের গালে নিজেই চুুমু খাবো তাইনা? ফারদার আমার সাথে কথা বলতে আসবে না।
রোজ নাক ফুলিয়ে ওখান থেকে চলে যায়। মেঘ রোজকে দেখছে আর হাসছে। খবরটা রায়ানের কান অবধি পৌছে যায়।

বর্তামানে ড্রইং রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। আজ কম্পিটিশনের প্রথম দিন। রেজাল্ট দেওয়ার পর জানা যায় এটাতেও মুন্নি ফার্স্ট হয়েছে।

রায়ান এসে রোজের হাত ধরে। নেক্সট ডান্স কম্পিটিশন। রোজ হাই তুলে বলে
~ ধুর এটাতেও হারবো। এসব নাচগান আমার দ্বারা হবে না। যেমন বেসুরে গলা তেমনই নাচে লবডঙ্কা। আমার জন্য আপনার নামও খারাপ হবে সরি।
~ তুমিই জিতবে।

~ কিছু পারি না তাও জিতবো? জার্জ কি আমার শশুড় লাগে যে ফ্রিতে নাম্বার দেবে?
~ তোমাকে কিছু পারতে হবে না। তুমি শুধু আমাকে সাথ দিবে।

রোজ আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ মুন্নির জামা ঠিক করে দিচ্ছে। রোজ ডেভিল স্মাইল দিয়ে রায়ানের হাত ধরে স্টেইজে উঠলো। থার্ড রাউন্ডে মুন্নি স্লিপ করে নিচে পরে যায়। আর রোজরা ফার্স্ট হয়।
~ রায়ান?

~ হুম। কিছু বলবে মুন্নি?
~ না কিছু না। চলো বাড়ি ফিরি।
রোজ জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বললো

~ ইদানিং কে কার সাথে টাংকি দিচ্ছে কিছুই বুঝতেঝি না। রোজরে খালি তুই সারাজীবন সিঙ্গেল থাকবি। মেঘও গেলো রায়ানও গেলো। সো হুয়াট একটা যাবে তো আরেকটা আসবে। ধুর এই ফিতাটাও এতো শয়তান কেন। এখন খালি পায়ে যেতে হবে নাকি
~ আমি বেধে দেই?

~ নো থ্যাংকস। বাই দ্যা ওয়ে মুন্নি এমন করবে সেটা তো আগে থেকেই জানতে তাও লুজার হতে আসলে কেন?
মেঘ নিচু হয়ে রোজের জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বললো
~ মিস জিনিয়াস রোজানু। তোর নাম তাইনা?
~ ইয়াহ। কুল না?

~ তোর মা কোথায় আছে সেটা আমি জানি। রাতে দেখা করতে পারবি আমার সাথে?
~ গাঞ্জা কয় কেজি খাইছো? ভুল বকার সময় নেই আমার।
~ তাহলে কম্পিটিশনের লাস্ট দিন কলেজের বাইরে ওয়েট করিস। আশা করি প্রতিবারের মতো এবারে বিশ্বাস করে ঠকবি না।


পর্ব ১১

দুদিন পর মধ্যরাতে,

ফুটপাত ঘেসে হেটে চলেছে রোজ। রাতের ঘন আধারের মাঝে ল্যাম্পপোস্টের টিমটিম আলোয় চারিদিকটা সুন্দর থেকে সুন্দরতম লাগছে রোজের কাছে। রাত ১১টার পর এভাবে রাস্তায় হাটা ওর অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু আজ বের হওয়ার কারন আলাদা। রায়ান আর মুন্নিকে হাটতে দেখেছে ও। ওদের পেছনে মেঘও ছিলো। কিছুটা সামনে যেতেই দেখা মিললো সবার। মেঘ আর রায়ানের মধ্যে মারপিট চলছে।

মুন্নি কিছুটা দূরে ভয়ে দাড়িয়ে আছে।
রোজ গিয়ে রায়ানের এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে মেঘের দিকে রাগি লুকে তাকালো। মেঘ রায়ানের কলার ছেড়ে দিয়ে দূরে সড়ে দাড়ালো। রায়ানের চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে। রোজ রায়ানের চোখে হাত দিয়ে ওর চোখ বন্ধ করে দেয়।
~ টেক এ ডিপ ব্রেদথ রায়ান।

রায়ান কিছুটা শান্ত হয়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়ায়। মেঘের হাতের কিছুটা অংশ কেটে গেছে। রোজ নিজের জিন্সের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে মেঘের দিকে
এগিয়ে গেলো।

~ লাগবে না আমার।
বলেই পেছনে হাত গুটিয়ে নেয় মেঘ। রোজ মেঘের হাত চেপে ধরে পেছন থেকে টেনে বের করে। রোজ মেঘের হাতে রুমাল পেচিয়ে গাড়ির ওপর উঠে বসলো।

~ নাও তামাশা শুরু করো। ইশ পপকর্ন আনতে ভুলে গেছি। ইউ নো নাহ? শুকনো মুখে এক্শন মুভি, নুন ছাড়া তরকারির মতো লাগে।

রায়ান দেখলো রোজের পায়ে ব্যান্ডেজ। বেশ কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করেছে এটা। তবে আজ যেন রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
~ রোজ তোমার পায়ে কি হয়েছে?

রায়ানের কথা শুনে মেঘও রোজের পায়ের দিকে তাকালো। রোজ হাই তুলে বললো।
~ ফরগেট ইট। এখন বলো তোমাদের মধ্যে কি চলছিলো? মারামারি করছিলে কেন? মুন্নি কি চলছিলো গো ওদের মাঝে? আর এতো রাতে তুমি এখানে কি করছো?

হঠাৎ ওদের মাঝে মাহির টপকে পড়ে। মূলত রোজকে দেখেই এদিকে এসেছে মাহির। মাহির সম্রাটের বন্ধু। কিন্তু বেশ কিছুক্ষন ধরে দাড়িয়ে সবটা নোটিস করেছে ও। মাহির রোজের দিকে হেসে এগিয়ে গেলো।
~ কেমন আছিস জান।

মাহির রোজকে জরিয়ে ধরে ওর কপালে চুঁমু খেলো। রোজও আলতো করে জরিয়ে ধরে বললো,
~ এতোদিন পর জানের কথা মনে পড়লো? আর তুমি এখানে কিভাবে? লাইন টাইন মারার চক্করে নাকি?

মাহিরকে দেখে মেঘ অবাক হয়। কারন মিশ্মির সাথে বহুবার ও মাহিরকে দেখেছে। কিন্তু মাহিরের সাথে রোজের কি সম্পর্ক?

রোজ একবার সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। কোন ঘটনা থেকে শুরু হয়ে কোথায় চলে গেল। রোজ মুখ ভেঙচি দিয়ে সবাইকে বললো

~ আমাদের এভাবে দেখার কিছু হয়নি ভাই হয় ও। বোন হিসাবে, আমাকে ভালোবেসে জান ডাকে।

রোজের কথায় গেজ দাঁত বের করে হাসে মাহির। মুন্নি রিতীমত চমকে গেছে। রোজের এতো ছেলেবন্ধু দেখে। মুন্নি রায়ানের হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। রোজ সিটি মেরে চিল্লিয়ে বললো

~ এই যে কলিযুগের লায়লা। আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। রায়ানকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো যেখানে তোমার বয়ফ্রেন্ড আমার পাশে দাড়িয়ে আছে…

রায়ান মুন্নির হাত ছেড়ে রোজের কাছে আসে। রোজ মুচকি হেসে বলে
~ মাই ডেয়ার বেস্টু মুন্নি, জানের টুকরা ক্লাসমেট। তোমার এই রায়ানের কথা ভুলে যাও। আর রায়ান স্টপ দিস ড্রামা নাও।

মুন্নি আবার এসে রায়ানের হাত ধরে ” রায়ান চলো “। রোজ ভ্রু কুচকে তাকালো।
~ রায়ান তুমি যাবে না।
মুন্নি রেগে বললো

~ তুমি কে ওকে আটকানোর? ও যাবে।
রোজ পা দোলাতে দোলাতে গুন গুন করে গাইলো
~ মুন্নি বাদনাম হুয়ি, রায়ান তেরে লিয়ে…

মেঘ দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাগে ফুসছে। মাহির ব্যাপারটা বেশ এঞ্জয় করছে। রোজের এই ছোট ছোট কাজগুলো ওদের মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট।
~ রায়ান চলো। এখান থে
মুন্নির কথা শেষ হওয়ার আগেই রায়ান বলে উঠলো,

~ একটু ওয়েট করো মুন্নি। রোজের পায়ে বোধ হয় চোট লেগেছে। আমি একটু ব্যান্ডেজ করে দেই।
~ কোনো দরকার নেই। দেখছো না ওর জন্য মেঘ আর ওই লোকটা আছে। ওরাই ওকে দেখে নেবে।
রোজ ভ্রু কুচকে তাকালো সবার দিকে

~ কে দেখবে আমাকে? মুন্নি ইউ নো হুয়াট? রোজের জন্য রোজ একাই যথেষ্ট। আমার কারোর সাহায্য আগেও প্রয়োজন হয়নি আর ভবিষ্যৎ এ ও হবে না।

কারন আমার ফ্যামিলি নেই তাই আমি একা চলতে শিখেছি। হ্যা সেদিন তুমিই ঠিকই ছিলে আমি ভিখারি তবে এখনো পর্যন্ত কারোর কাছে থেকে চেয়ে ভিক্ষা নেইনি যেমনটা তুমি নিয়েছো। আমাকে কেউ কিছু দিলে সেটা আমার উপহার হিসাবে নয় দান হিসাবে দেখি কারন একটাই আমার কেউ নেই, এটা ঠিক সবাই আমাকে দেখে রাখে, ভালোবাসে তবে কি জানো?

একটা ছোট বাচ্চার কাছে তার মা বাবাই সবথেকে আপন। যখন ছোটবেলায় তাদের পাইনি, বড় হয়ে নিজের অনুভুতি প্রকাশ করার সুযোগ পাইনি তখন নিজেকে নিজে বেশি কিছু ভাবার সময়টাও আমার হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। এই মাহিরকে দেখছো.. এ মেঘের বোনের ভালোবাসা,

এই যে মেঘকে দেখছো এ কাল অবধি তোমার ভালোবাসা ছিলো
আর রায়ান সে এখন আজ থেকে তোমার ভালোবাসা।

বাট টপ সিক্রেট এটা যে আমি ওদের তিনজনেরই ভালোবাসা। বুঝতে পেরেছো? নাকি আরো ক্লিয়ার করে বলবো?
মুন্নি মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকালো। রোজ গাড়ি থেকে নেমে মাহিরের হাত ধরে হাটা শুরু করলো। মুন্নিকে ক্রস করার সময় রোজ মুন্নির দিকে তাকিয়ে আবার বললো,

~ ওয়েট এ মিনিট, আমার কলিজার বন্ধু মুন্নি। আচ্ছা তুমি তোমার ফ্যামিলি থেকে কি পেয়েছো? এখনও তো কোনো এক্সামে তুমি সেকেন্ড হলে তোমার বাবা তোমাকে মারে। এতো বড় মেয়েকে মার খেতে দেখতে চায়না বলে রোজ অলঅয়েজ সেকেন্ড হয়ে এসেছে।

যদি চাও এই ড্রইং, ডান্স, সিংগিং সব কম্পিটিশন আবার নিতে বলো, ইনশাহ্ আল্লাহ তুমি জিতবে না। আর রেজাল্ট নিয়ে এতো অহংকার করে কি লাভ যেখানে একজন সঠিক মানুষ হতে পারোনি।

রায়ান মুন্নির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে ওকে গাড়িতে উঠতে বলে। মেঘও বাইক স্টার্ট দিয়েছে।
~ হেই ডাফার, রুমালটা কাল নিয়ে এসো কলেজে। ওটা কিন্তু তোমাকে একেবারে দিয়ে দেইনি।

মেঘ রোজের কথা শুনে রুমালটা খুলে দেখলো। মেঘের দেওয়া প্রথম উপহার ছিলো এটা। যেখানে মেঘরোজ নামের একটা নকশা করা আছে। মেঘ বাইকের গ্লাসে পেছনে থাকা রোজের মুখটা একবার দেখে নিলো। মাহিরের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে আর হাটছে রোজ।

পরদিন কলেজে এসেই মেঘ রোজের কাছে যায়। মেঘকে দেখে রোজ কিঞ্চিত হাসলো।
~ আমার রুমাল কোথায় ডাফার?
মেঘ রুমালটা রোজের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। রোজ মজা করে বললো

~ গার্লফ্রেন্ড কে জেতানোর জন্য আমাকে পটাতে এসেছো? লাভ নেই আজকে সিংগিং কম্পিটিশনে রোজই জিতবে।
~ জানি।
~ জ্যোতিষ বিদ্যা শুরু করেছো নাকি? ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছো।

~ Sr কে হারাবে এমন মেয়ে বোধ হয় এই কলেজে নেই। আরর
রোজ দ্রুত মেঘের মুখে হাত দিয়ে ওর গাল চেপে ধরলো। তারপর ফিসফিসে গলায় বললো
~চুপ করো প্লিজ। কাউকে সত্যিটা বলো না। আমি এখনই নিজের পরিচয় দিতে চাচ্ছি না। আর একটু পর Sr না রোজ গাইবে। বুঝেছো?

মেঘ দুপাশে মাথা নাড়লো। রোজ মেঘকে ছেড়ে দূরে সড়ে চারপাশটা ভালো করে দেখলো যে কেউ ওদের দেখেছে কিনা.. নাহ কেউ দেখেনি।
~ রোজ?

~ ইয়েস ডাফার। কিছু বলবা?
~ নাহ।

~ তোমার কষ্ট হচ্ছে না ছ্যাকা খেয়ে?
~ না তো।

~ ইন্টেরেস্টিং, ভেরি ইন্টেরেস্টিং। শুনো আজ আমি একজনকে প্রপোজ করতে চলেছি। তুমি আমার সাথে যাবে। অকে?
~ কিহ?

~ কিহ না জি। ওই যে ফোর্থ ইয়ারের গানের কিং আছে না হিমু। ওকে প্রপোজ করবো আমি।
রোজের কথায় হাসলো মেঘ। তারপর মাথা নেড়ে সায় দিলো।

স্টেইজে দাড়িয়ে গিটারের কড ঠিক করছে রোজ। এপর্যন্ত যারা গেয়েছে সবাই নার্ভাস ছিলো অথচ রোজ আরামসে কড ঠিক করছে আর কালচারাল টিচারের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।
রোজ~
🎶🎶হাসতে দেখো গাইতে দেখো অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো
দেখো না কেউ হাসির শেষে নিরবতা।

বোঝে না, কেউ তো চিনলো না। খোজে না আমার কি ব্যাথা
চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে। 🎶🎶
🎶🎶আমার সুরের বুকে, কান্না লুকিয়ে থাকে। আমার চোখের কোণে নোনা ছবি আঁকে
আমার গল্প শুনে হয় আলোকিত উৎসব। গল্প শেষে আমি আধারের মতো নিরব।

নিজেকে ঠেলে আমিই কতো সুখ দিলাম।
বোঝে না, কেউ তো চিনলো না। খোজে না আমার কি ব্যাথা
চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে। 🎶🎶

🎶🎶আমার গানে আঁকা নির্ঘুম অনেক প্রহর। আমায় জেনে জোনাকি জেনে নিরব শহর
ডাকার কথা যাদের ডাকেনি কেউ কাছে। নিঃসঙ্গ এই আমি পুড়েছি মোমের আঁচে। আমার মাঝে আমি যেন শুধু লুকাই।

বোঝে না, কেউ তো চিনলো না। খোজে না আমার কি ব্যাথা
চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে। 🎶🎶

🎶🎶হাসতে দেখো গাইতে দেখো অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো
দেখো না কেউ হাসির শেষে নিরবতা।

বোঝে না, কেউ তো চিনলো না। খোজে না আমার কি ব্যাথা
চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে। 🎶🎶

রোজের চোখ ছলছল করছে। সামনে থাকা মানুষটা অপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে ওর দিকে। রোজ গান শেষে নিচে নেমে আসলো। আজ রোজের গলাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়েছে মেঘের কাছে। মেঘ রোজের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো,
~ উফ ডাফার হাত ছাড়ো।
~ কোনো কথা বলবি না। প্লিজ।

~ মুন্নিকে দেখানোর জন্য আমাকে ব্যবহার করছো? অকে করো বাট এটাও দেখো যেন হিমু কিছু মনে না করে। অবশেষে একটা ছেলে পেয়েছি তোমার জন্য ওকে হারাতে পারবো না।
~ হারাতে হবেও না। এখন চুপচাপ আমার সাথে চল।
~ কিন্তু ব্যাডমিন্টন?

~ তোর পার্টনার আছে তো। ও দেখে নেবে। কলেজের জিনিয়াস বয় এইটুকু পারবে না?
~ তুমি আমাকে নিয়ে পালাচ্ছো? বিয়ে টিয়ে করবা নাকি? আমরা কি কাজি অফিসে যাচ্ছি?

~ সেটার কথা এখনো ভাবিনি এখন তোর মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি তোকে। ওরা হয়তো এতোক্ষনে আন্টিকে নিয়ে এসেছে।

মেঘের কথায় দাড়িয়ে গেলো রোজ। মেঘ অন্ততো রোজের মায়ের নামে মিথ্যা বলবে না এই বিশ্বাস রোজের আছে। রোজের গলা আটকে আসছে। জরানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে রোজ।
~ সত্যিই আম্মুকে এনে দিবা?

~ হুম।
বিগত ১ঘন্টা ধরে নদীর তীরে দাড়িয়ে আছে মেঘরোজ। রোজ মেঘের ওপর বিশ্বাস করে স্বপ্ন পূরনের আশায় সময় গুনছে। হঠাৎ মেঘের ফোনে একটা কল আসে। মেঘ ফোন রিসিভ করে কিছু একটা শুনেই ফোনটা নদীতে ছুড়ে মারে। রোজ উৎসুক দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে।

~ রোজ তোর আম্মু।
~ আসবে না তাইনা? এভাবে আমার মন নিয়ে খেলাটা তোমার উচিত হয়নি। আজ অবধি তোমার জন্য যতটুকু ফিলিংস ছিলো আজ সবটা শেষ। তবে ঘৃণা করবো না তোমাকে।

একদিনের জন্য হলেও ভালোবেসেছি যে। আসছি।
কাঁদতে কাঁদতে ওখান থেকে চলে আসে রোজ। ওদিকে মেঘ রেগে বাইক নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। দুদিন মেঘকে খুজে পাওয়া যায়নি। এবার কলেজে রায়ানের বদলে রোজ জিনিয়াসের মেডেল আর ট্রফি পায় কিন্তু সেটা ও নিজের বাড়ি নেয়নি। মুন্নিকে দিয়ে দিয়েছে।

রোজ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। হাসি মজা, আনন্দে দিন কাটছে ওর। রায়ানের সাথে মুন্নির রিলেশনও ঠিকঠাক চলছে তবে এটা সিউর যে রায়ানের গার্লফ্রেন্ড নামক তকমা টা মুন্নির কপালে বেশিদিন সইবে না।

মেঘ কলেজে এসেই রোজকে খুজতে থাকে। আজ ও রোজকে সব সত্যিটা বলবেই। ক্লাসের সামনে দাড়িয়ে রোজ সাদিয়ার সাথে কথা বলছে, মেঘ রোজের সামনে এসে অপরাধির ন্যায় মাথা নিচু করে দাড়ালো।
~ ভাবি তোমার সাথে পরে কথা বলি?

~ বুঝেছি। আচ্ছা আসছি আমি।
সাদিয়া চলে যেতেই রোজ বলে উঠলো।
~ হেই ডাফার তোমার কি মুড অফ? ডোন্ট ওয়ারি সেদিনের জন্য আমি কিছু মনে করিনি।
~ রোজ।
~ হ্যা বলো।

~ ভালোবাসি তোকে।
~ আমি বাসি না। তাছাড়া তোমাকে ভালোবাসার মতো কোনো কারণ তো নেই… কি আছে তোমার? একটা ভাঙা মন আর কিছু ফেইল করা রেজাল্ট। শোনো ডাফার, রোজ শুধু জিনিয়াস হতে চায়।

ওর মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। তোমার সাথে মিশে নিজের ইমেজ খারাপ করতে সে কখনোই চাইবে না। তোমার সাথে মিশে কিছু কি শিখতে পারবো আমি? পারবো না। বরং তোমার সাথে থাকলে আমিও ফেইল করা শুরু করবো। সো যাও এখান থেকে। [ সরি মেঘরোদ্দুর। আ’ম ভেরি সরি। আমি কষ্ট দিতে চাইনি তোমাকে।

কিন্তু এদুদিনে আমার জীবনের অনেককিছু পাল্টে গেছে। আর দু বছর… তারপরই আমাকে চলে যেতে হবে। মুন্নিকে হারিয়ে একবার কষ্ট পেয়েছো তুমি। আমি চাইনা আমার জন্য তুমি আবার কষ্ট পাও। ]

মেঘের চোখ দিয়ে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। কিন্তু ঠোটে এক মৃদু হাসির রেখা। মেঘ রোজের চোখের দিকে তাকালো। রোজের চোখেও পানি টলমল করছে।

~ ভুল করলি রোজ। এতোদিন যে মেঘকে দেখেছিস সে শুধুই বাইরের একটা অবয়ব। আজ থেকে তুই মেঘকে দেখতে পাবি, তোর মেঘরোদ্দুরকে দেখতে পাবি। যে মেঘ তোকে ভালোবাসতো, ভালোবাসে, ভালোবাসবে সেই মেঘকে দেখতে পাবি।

সত্যিটা জানার পর তুই নিজে আসবি আমার কাছে। বলেছিলি না আমি মুন্নিকে যতটা ফেক লাভ করি তার ৫% হলেও তোর চলবে। তুই এবার মেঘের প্রকৃত ভালোবাসা দেখবি। যেটা শুধুমাত্র রোজের জন্য ছিলো।

~ গো ব্যাক ডাফার। আমি কখনো তোমাকে ভালোবাসি নি আর ভালোবাসবোও না। কোনো ফেইলার & সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস রোজ গ্রহণ করে না।

সেকেন্ড হ্যান্ড কথাটা বলার সময় রোজের গলাটা কিঞ্চিত কেঁপে উঠলো। মেঘও রোজের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। রোজ কি সত্যিই মনে করে মেঘ মুন্নিকে ভালোবাসতো?


পর্ব ১২

ক্লাস শেষে রোজ ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে মাঠের গা ঘেসে হেটে যাচ্ছে। সামনে একটা বড়সড় ভীর। কারোর গিটারের টোন শোনা যাচ্ছে। হয়তো কেউ গাইছে।

সে ~ Kyun Khowaabo pe tere saaya hein
Dil kyun hein tanha mera
Kyun Khamoshyn zuuba meri

Ashku se keh payu nh
Kyun dard hein itna tere isqk mein…….
রোজ ~ Kyun najre teri yo aanjan hein
Aakhein hein meri bhidam

Kyun pa kar bhi tumko khoya hein
Hum kyun nh baan paye hum

Kyun dard hein itna tere iskq mein………
[ যেহেতু গানটার ভিডিও বানিয়ে আই ডি তে দিয়েছি। তাই গান লেখার বেশি প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না। নিজ দায়িত্বে গানটা শুনে নিবেন ]

রোজ ভীর ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলো। এক জন পায়ের ওপর পা তুলে মাথা নিচু করে গিটারের দিকে চেয়ে আছে। রোজ হেসে বললো
~ নাইস সং হিমু ভাইয়া। নাও এ ডেইস আই লাভ দিস সং ভেরি মাচ।

মাথা তুলে রোজের দিকে তাকালো হিমু। হিমুর চেহারা দেখে রোজের পা কেঁপে উঠলো। রোজের বন্ধু সাথে সাথে রোজকে ধরে ফেলে। মুখে বলে

~ কি রে মেঘ ভাইয়া কে দেখে এমন বিহেভ করছিস কেন? আর ভাইয়া ইউ আর লুকিং সো হ্যান্ডসাম। অনেকদিন পর আপনার এই লুক দেখে সত্যিই ইমপ্রেস্ড আমরা। নতুন করে ক্রাশ খেলাম বোধ হয়। [ হাত দিয়ে মাথা চুলকে বললো ]

রোজ ভ্রু কুচকে তাকালো চারপাশে। মেঘকে মৌচাকের মতো ঘিরে রেখে মৌমাছি নামক কলেজের মেয়েরা। মেঘ ঠোট প্রসারিত করে হাসে। রোজ মুখ বাঁকিয়ে ওখান থেকে চলে যায়। মেঘও গিটার রেখে রোজের পিছু পিছু হাটতে শুরু করে।
~ পিছু নিয়েছো কেন ডাফার?

~ এটা কি তোর বাপের কলেজ? [ কিছুটা থেমে আবার বললো ]আমার সেখানে খুশি আমি যেতে পারি। তুই বলার কে? আর তোর পেছনে আমি কেন যাবো? যেখানে কলেজের সব মেয়েরা আমার পেছনে ছোটে।
~ রিয়েলি? সো ডাফার তুমি কি এখন রূপ দেখিয়ে সবাই পটাচ্ছো? গুণে তো লবডঙ্কা।

~ তুই যদি এমনটাই ভাবিস তাহলে তাই। দেখি সড় আমার গার্লফ্রেন্ড আসছে।

~ এই কয়টা গার্লফ্রেন্ড তোমার? একটা কি অলঅয়েজ এক্সট্রা থাকে নাকি? গতপরশু মুন্নি ছিলো। এমন কি গতকাল অবধি আমাকে কিসব বলেছো আর আজ মেয়েবাজি শুরু করছো?

~ আমি তো খারাপ, তুই তো জানিসই সব। তাহলে বারবার প্রশ্ন করিস কেন?
~ আমারই ভুল। বাই ডাফার।

রোজ পেছন ফিরে হাটা শুরু করলো। মেঘ পকেটে হাত গুজে ঠোট কামড়ে হাসছে।
~ ওই রোজ.. শোন।

মেঘের ডাকে ঘাড় কাত করে পেছনে তাকায় রোজ। মেঘ মৃদু হেসে বলে।
~ ভালোবাসি তোকে, আমার মিস জিনিয়াস।

রোজের ভ্রুযুগল অটোমেটিক্যালি কিঞ্চিত কুচকে গেলো। মেঘ দ্রুত একটা মেয়েকে টেনে নিয়ে বাইরে চলে যায়। রোজ এখনও সেভাবেই দাড়িয়ে আছে। রায়ান রোজকে এভাবে দেখে রোজের কাছে আসলো।
~ কি মিস জিনিয়াস? এমন ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছো কেন? মেঘকে দেখছো বুঝি?
রোজ তেড়ে আসলো রায়ানের দিকে

~ কেন? ওই ডাফারকে দেখবো কেন? আমার কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নাই? আর তুমি আমার ভাই হয়ে কি বলছো এসব?
রায়ান ভাবলেশহীন হয়ে উত্তর দেয়।

~ হ্যা সেই। আমিই পড়ে গেছি মহা বিপদে। একদিকে তুমি আমার চাচার মেয়ে অন্যদিকে মেঘ আমার ফুপির ছেলে। কাকে সাপোর্ট করবো ভেবেই পাচ্ছি না।

~ কি? কি বললা তুমি? মেঘ তোমার?
~ মেঘ আমার ছোট ফুপির ছেলে। তুমি জানো না হয়তো যে আমার দুইটা ফুপি। জানবেও বা কিভাবে আংকেল বা ওবাড়ির সাথে তো তুমি যোগাযোগ রাখোই না।

~ তার মানে মেঘ আমাকে বোকা বানালো? আমাকে পিঞ্চ করে বললো আমি ” মিস জিনিয়াস। “
~ হতে পারে।

রোজ এবার পায়ের জুতা খুলতে শুরু করে। কলেজে এসে ধরে শুনেছে মেঘ রায়ানের কম্পিটিটর, রায়ানের শত্রু, রায়ান আর মেঘের মাঝে তুমুল ঝগড়া, আর আজ ভাই হয়ে গেলো?

~ আজ জুতো পেটা করে তোমার পিরিত ছোটাবো। দুভাই মিলে আমাকে বোকা বানিয়েছো এবার বুঝবে রোজ কি?
রোজ জুতে ছুড়ে মারলো রায়ানের দিকে। রায়ান ক্যাচ করে মেঘের দিকে তাকালো।

মেঘ মূর্তির মতো দাড়িয়ে অসহায় চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। রোজ পাশ থেকে বেঞ্চের একটা লাঠি হাতে নিলো।
~ রোজ ওটা রাখো, ওটা দিয়ে মারলে নির্ঘাত আমার হাড্ডি মাংস আলাদা হয়ে যাবে। তুমি জুতা দিয়ে মারো।
~ নাহ.. আমি এটা দিয়েই মারবো।

রোজের কথা শুনে রায়ান ডানেবামে না তাকিয়েই দৌড়ানো শুরু করে, রোজ ওর পেছনে লাঠি নিয়ে তাড়া করছে। রায়ান মেঘের কাছে যেতেই মেঘও দৌড়ানো শুরু করে। সারা কলেজের স্টুডেন্টসরা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। রোজ চিল্লাতে চিল্লাতে বলে,
~ আজ একটাকেও হাতে পাই তারপর দেখো কি করি। দাড়াও, দাড়াও বলছি।

রায়ান দৌড়াতে দৌড়াতে মেঘকে জিজ্ঞেস করে,
~ এখন কি করবো? সব তোর জন্য হইছে। তুই থাম, লাঠির বারি খা।

~ আরে কচ্ছপ, জোরে দৌড়া, হাতে পেলে ও তোকে কেন? আমাকেও ছাড়বে না। মাথায় সমস্যা আছে জানিসই তো। আর এখন তো পুরো ক্ষেপে গেছে।

রোজ মেঘের কথা শুনে চিল্লিয়ে বলে

~ ডাফারের বাচ্চা ডাফার, তোমাকে পাই আগে। নাটক করার সাধ মিটিয়ে দিবো। ওই রায়ান থামো নাহলে কিন্তু পরে খুব মারবো। এখন অল্প মারতাম কিন্তু পালিয়ে গেলে ডাবল মার খাবা।
রায়ান চিন্তিত হয়ে মেঘকে প্রশ্ন করলো,

~ থামবো নাকি? দৌড়াবো?
~ মার খাওয়ার ইচ্ছা থাকলে থাম। আমি বাবা থামছি না। রাগ দেখে মনে হচ্ছে আমাদের কেটে কুচি কুচি করে ফেলবে।

ওদের তিনজনকে এভাবে দৌড়াতে দেখে মুন্নি ক্লাস থেকে একছুটে বাইরে আসে। সবাই এখন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা দেখছে। মেঘ রায়ানের পেছনে রোজ, আর রোজের পেছনে মুন্নি। মুন্নিকে দেখে থেমে যায় রোজ। মেঘ রায়ানও দাড়িয়ে যায়।
~ তুমি দৌড়াচ্ছো কেন? মুন্নি?

~ তার আগে বলো তুমি ওদের পেছনে লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছো কেন? ওদের পাওনি সেটা মেনে নাও। কি ভেবেছো লাঠি নিয়ে তাড়া করলে ওরা তোমাকে ভয় পেয়ে তোমার সাথে থাকবে?
~ [ ইডিয়েট গার্ল ] অদ্ভুত। আমি তো এসব কথা এখনো চিন্তাই করিনি। ইশ কতো বড় ভুল করে ফেললাম। থ্যাংকস একটা উপায় বলার জন্য।
~ থ্যাংকস মাই ফুট।

~ তোমাকে ভালো বললেও ক্ষেপে যাও যেন জানের টুকরা ক্লাসমেট। আর সবসময় আমাকে অপমান করতেই বা কেন আসো? তোমার কোন পাঁকা ধানে মই দিয়েছি আমি?

রোজ আর মুন্নির কথা শুনে রায়ান মেঘ এগিয়ে আসে। রায়ান ধরা গলায় মুন্নিকে প্রশ্ন করে,
~ ওকে অপমান করছো কেন মুন্নি?

~ যা করেছি বেশ করেছি। ও তোমাদের ডিস্টার্ব করছিলো তাইনা?
~ ভেবছিলাম তোমার সাথে রিলেশন রাখবো। কিন্তু সেটা দেখছি আর সম্ভব হবে না। শোনো মুন্নি নেক্সট টাইম থেকে রোজকে একটা শব্দও বলার আগে বুঝেশুনে বলবে।

~ তুমি কিন্তু ওর জন্য আমাকে অপমান করছো রায়ান।
মুন্নি রায়ানের মাঝে মেঘ আলতো স্বরে বললো,

~ রায়ান তো শুধু অপমান করেছে মুন্নি। রোজকে নেক্সট টাইম কিছু বললে তোমার এই মুখ তোমার বাবা মাও শেষবারের মতো দেখতে পারবে না। মেঘের এই কথাটা মনে রেখো।
মুন্নি তেড়ে গেলো মেঘের দিকে,

~ ও তুমিও আছো এসবের মধ্যে। যেই আমাকে পেলে না সেই রোজের সাথে গিয়ে মিশছো? কই আমার জন্য তো কখনো এমন পসিসিভনেস দেখিনি। রোজ বুঝি তোমাকে আমার থেকে বেশি কিছু দিসে? বাই দ্যা ওয়ে রোজের কি আছে যা আমার নেই? এন্সার মি ড্যামিট।

মুন্নির কথা শুনে রায়ান আর রোজ শব্দ করে হাসলো। মেঘও হাসছে। রায়ান হাসতে হাসতে বলে,
~ মেঘ তোমার কাছ থেকে কিছু নিয়েছে নাকি মুন্নি? ও তো আজ অবধি তোমাকে কিসও করেনাই। তাহলে কি দিসো? টাকা পয়সা? বাড়ি গাড়ি? নাকি অন্যকিছু?

রোজ লাঠি দিয়ে রায়ানের পায়ে আঘাত করে,
~ মন দিসিলো ভাইয়া, মন। তাইনা ডাফার?

মেঘ রোজের থেকে খানিকটা দূরে সড়ে দাড়ালো কারন ও জানে এবার কিছু বললেই পরের বারিটা ওর ওপর এসেই পড়বে। রায়ান মাটিতে বসে পা ধরে ” উহ, আহ। গেলো পা টা ” শব্দ করে বলতে লাগলো। মেঘ মুন্নির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,

~ রোজ আমাকে ওর মন, ওর ভালোবাসা দিয়েছে। ওর মধ্যে যা আছে তা দেখতে বা যাচাই করতে এসো না, পরে হয়তো ভাববে সারাজীবনে কিছুই অর্জন করতে পারোনি। তাই তুলনা করার আগে সর্বদা অপর পক্ষকে ভালো করে চিনে নিবে। কিরে রায়ান গার্লফ্রেন্ড কি রাখবি নাকি চেঞ্জ করবি?

~ কিতা করুম? তোরা ঠিক কর আমি তোদের অনুসরন করি।

মেঘ চোখ ছোট ছোট করে বললো
~ ব্রেক আপ।
রায়ান মুন্নির দিকে তাকিয়ে বললো।

~ অকে মুন্নি। আজ থেকে তোমার সাথে ব্রেক আপ। নতুন কাউকে খুজে নিও, বেস্ট অফ লাক।
ওদের কথা শুনে রোজ নিজেও হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ে। কি হচ্ছে এসব?

রেস্টুরেন্টে বসে কফি খাচ্ছে মাহির, মিশ্মি। মাহির আর এক সপ্তাহ পর দেশের বাহিরে চলে যাবে তাই দেখা করতে এসেছে মিশ্মির সাথে।

~ যেতেই হবে?
~ হুম সোনা। আর না গেলে তোমার কাছে ফিরবো কিভাবে?

~ আজ এসব বলে আমাকে সামলাতে পারবে না। তুমি যেও না প্লিজ। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না।
~ তোমাকে ছাড়া কি আমি থাকতে পারবো? কাজের চাপে যেতে হচ্ছে মিশ্মি। একটু বোঝার চেষ্টা করো।
~ আমার থেকেও তোমার কাজ বড়?

~ সেটা কখন বললাম? আচ্ছা তাহলে ব্যাগ গুছিয়ে নাও। তুমিও আমার সাথে যাবে।
~ সামনে আমার পরীক্ষা। এখন কিভাবে যাবো?
~ আমার থেকেও তোমার পরীক্ষা বড়?

মিশ্মি বুঝলো মাহির কি বলতে চাচ্ছে তাই নতজানু হয়ে বসে রইলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মিশ্মিকে বাড়ি ফিরতে হবে। ওদিকে মাহিরকেও সম্রাটদের কাছে যেতে হবে ভেবে তাড়া দিলো মাহির
~ নাও এবার মন খারাপ না করে গাড়িতে গিয়ে ওঠো। আমি বিল পে করে আসছি। সম্রাটদের ওখানেও যেতে হবে আমাকে।
~ হুম।

~ আবার মন খারাপ করছো? তোমাকে এভাবে দেখে গেলে কি আমার ভালো লাগবে? কাজে মন বসবে?
~ আমি রোজের মতো নই যে দুঃখ চেপে রেখে হাসি মুখে অপরজনের মন ভুলিয়ে রাখবো।
~ ভালো কথা মনে করালে।

এই তোমার ভাই কি জিনিস হ্যা? আমার বোনটাকে কারনে অকারনে কষ্ট দেয়। সেদিন রাতেও রাস্তায় দেখলাম ওদের। দেখে তো ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হয়েছে।
~ ও কি জিনিস তা ও ছাড়া কেউ জানে না। বেয়াদবটা আগে রোজের সাথে মিশতো, কথা বলতো, যতদূর জানতাম মেঘ ওকে ভালোওবাসতো।

তারপর শুনি মুন্নির সাথে ওর রিলেশন। ভাইয়ার বিয়েতে রোজকে দেখে পুরো অবাক হয়ে গেছি আমরা, ওকে ছেড়ে শয়তানটা ওই স্বার্থপর মুন্নির পেছনে ঘুরেছে ভাবতেই মেজাজ গরম হয়ে যায়।
~ একটা জিনিস খেয়াল করেছো? রোজ কিন্তু নিজে একা থেকেই সবার একাকিত্ব দূর করেছে। সবাইকে নিজের মতো চলতে শিখিয়েছে।

রুহি ভাবির কাছ থেকে দিয়া আর আরুর কথা শুনে তো খানিকটা অবাক আমিও হয়েছি।
~ চলো নাহ, একটু রোজের সাথে দেখা করে আসি। ওখানে ভাবি আর আপুরাও আছে।

~ সবাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদের দেশের হাওয়ায় কি এলার্জি আছে নাকি?
রোজের প্রশ্নে চমকালো রায়ান। হুট করে এমন প্রশ্ন কেন করলো রোজ?
~ মানে?

~ দিয়ারা, রুহি আপুরা, এমনকি মাহির ভাইয়াও দেশ পরিত্যাগ করছে। পরিচিতদের অর্ধেকই চলে গেছে। তাই বললাম

~ মেঘ তো যায়নি।

~ যাবে কেম্নে? যাইতেও তো যোগ্যতা লাগে। ট্যালেন্ট লাগে। তোমার ভাইয়ের তো দুইটার একটাও নাই।
রোজের কথায় কেঁশে উঠলো রায়ান। রোজ এতক্ষন বই এ মুখ গুজে কথা বলছিলো তাই খেয়াল করেনি যে মেঘ অনেক্ষন ধরে ওদের সামনে দাড়িয়ে আছে।

~ রায়ান যা এখান থেকে। আর খেয়াল রাখিস ঘন্টাখানেকের মধ্যে যেন এদিকটায় কেউ না আসে।

রোজ বই সড়িয়ে মেঘের দিকে তাকালো, তারপর রায়ানের সাথেই উঠে যেতে লাগলো। মেঘ রোজের হাত চেপে ধরে আবার বসিয়ে দিলো। তারপর ঘাড় থেকে ব্যাগ নামিয়ে রোজের হাতে দিলো। রোজ তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করলো
~ কি হয়েছে? ব্যাগ আমাকে দিচ্ছো কেন?

~ ভদ্রভাবে কথা বল।
~ মানুষ এর চেয়েও ভদ্রভাবে কথা বলে কিভাবে?

~ চোখ নামিয়ে, নম্রগলায় কথা বলবি আমার সাথে।
~ বলবো না। কি করবে তুমি? ডাফার ডাফারের মতই থাকো আমার গার্ডিয়ান হতে এসো না।
~ ভেবে বলছিস?

~ ইয়েস।
মেঘ রোজের গলা একহাতে টান দিয়ে আরেক হাতে রোজের দুহাত চেপে ধরলো। মেঘ আর রোজের মাঝে তিন সেন্টিমিরের গ্যাপ। মেঘের ভারি নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে রোজের ঠোটের ওপর, মেঘকে এতোটা কাছে দেখে রোজের হাতপা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়।

মেঘ ঠোট বাঁকিয়ে সামান্য হেসেই রোজের ঠোট নিজের দখলে নিয়ে নিলো। প্রায় ১০মিনিট পর মেঘের হাত আলগা হয়ে আসে। সে সুযোগে রোজ দ্রুত মেঘকে ধাক্কা দিয়ে উঠে দাড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে চারিদিকে তাকাচ্ছে ও। রোজের চোখ চিকচিক করছে।

~ কাঁদতে চাইলে কাঁদতে পারিস তবে সেটা আমার বুকে। আমি চাইনা রোজ আমার আড়ালে, বা এমন কোনো কারনে কাঁদুক যা মেঘের অজানা।

~ তোমার সাহস হলো কিভাবে আমার সাথে এটা করার?
~ সাহস? সাহসের দেখেছিস কি?

~ তোমার মতো অসভ্য, বেয়াদব, বেহায়া ছেলে দুটো দেখিনি।
~ ভদ্রভাবে কথা না বলার শাস্তি ছিলো “১০মিনটের কিস” এবার আমাকে অপমান করার শাস্তি পাবি তুই। তার আগে ব্যাগে থাকা পেপার্সগুলো দেখে নে। সামনে আসা টর্চারগুলো সম্পর্কে আগে জানা থাকলে তা মোকাবিলা করতে সুবিধা হবে তোর।

~ দেখবো না।
~ যদিও তোর জামার চেইন আমি খুলতে চাইনি। তবুও তোর যদি ইচ্ছা থাকে তাহলে আমি খুলতেই পারি, কোনো সমস্যা হবে না আমার।

রোজ তাড়াতাড়ি ওরনা পেচিয়ে নিলো গায়ে। তারপর ব্যাগ নিয়ে মেঘের থেকে ১০হাত দূরে গিয়ে বসলো। পেপার্সগুলো দেখে রোজের চোখ কোটর থেকে বেড়িয়ে আসার মতো অবস্থা। ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে মেঘের কলেজের সমস্ত পরীক্ষার রেজাল্ট আর মার্কসীট আছে এখানে। রেজাল্টের ফার্স্টে জ্বলজ্বল করছে ” টপার ” শব্দটা।

গানের রিহার্সেলে মেঘকে সবাই হিমু নামে চেনে কারন একটাই। নামটা রোজের পছন্দের একটা ঔপোনাসিক চরিত্র। আর এতে লাভ হলো রোজ সহজে মেঘকে চিনতে পারবে না।
আরেকটা পেপার পড়েই উত্তেজনায় দাড়িয়ে গেলো রোজ। কিছুদিন আগে এজেন্সিতে দুবছর পর যে মিশনে রোজ যাবে তার এগ্রিমেন্ট পেপার। যেখানে ক্যাপ্টেন মেঘ।

অর্থাৎ রোজকে মেঘের হয়ে কাজ করতে হবে।
পরের পেপারটা মেঘরোজের ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার। যেখানে অন্যতম শর্ত হিসাবে বলা হয়েছে, রোজ যদি মেঘের কোনো কথা না শোনে তাহলে মেঘের সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে নিজের অধিকার আদায় করার। তবে এটা তিনবছরের শর্তমোতাবেক বিবাহ।

একটা ফাইল #Mr_Genius যেখানে গত চারবছরের কালচারাল প্রগ্রামের রেজাল্ট আছে, আর প্রতিবারই মেঘের নামের পাশে জিনিয়াসের তকমা।
আচ্ছা মেঘ যদি জিনিয়াস হয় তাহলে রায়ান কি?


পর্ব ১৩

~ এসবের মানে কি ডাফার?
~ উহু, ডাফার না। আমি এখন তোর হাসবেন্ড রোজ এসব কি নামে ডাকছিস? আগে কি নামে ডাকতিস ভুলে গেছিস?

~ বিয়েটা তিন বছরের জন্য। এটা ভুলে যেও না।
~ ভুলবো কেন? এই তিনবছরেই যা করার করে নিবো আমি। এবছরে কাজ শুরু করলে নেক্সট ইয়ারে আলিজা, খালামনি + চাচি আম্মু ডাকটা, একসাথে শুনতে পারবে। তবুও তোর ওপর দয়া করে এবছর কিছু করবো না। বাচ্চা মানুষ সামলাতে পারবি না।
~ তুমি এতো নোংরা কেন?

~ আমি খারাপ, নোংরা, অসভ্য, বেয়াদব, বেহায়া আর তোর ভাষায় লুচু, সবটা আমি। তবে সেটা শুধুমাত্র তোর জন্য। বাইরের কারোর জানার বা বোঝার ক্ষমতা নেই মেঘ কে।
~ কেন করলে এমন?
~ তোর জন্য।

মেঘ রোজের সামনে এসে দাড়ালো। রোজ চোখ উঠিয়ে একবার মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ পেছন ঘুরে পকেটে হাত রেখে মাঠের দিকে তাকায়।

~ আজ এই মুহূর্তে দাড়িয়ে এটুকু জেনে রাখ রোজ, আমি যা করেছি শুধু তোকে ভালোবেসে করেছি। তোর খুশির জন্য করেছি। তোকে ভালো রাখার জন্য করেছি। আমার মা নেই রোজ। মা চলে যাওয়ার পর আমার জীবনের একমাত্র মেয়ে তুই। যাকে আমি ভালোবেসেছি।
~ কলেজের কেউ আমাকে এসব বলেনি কেন?

~ তোর বরের নিনজা টেকনিক এটা। এমনিতেই কলেজে সবাই মেঘের ওপর ক্রাশিত। তাই স্যার আর রায়ানদের সাথে প্লানিং করে এই নাটকটা সাজিয়েছি। তোর বন্ধু নিভি মানে যে তোকে মাঠে ধরেছিলো সে রায়ানের গার্লফ্রেন্ড বলে সবটা জানতো। তাছাড়া তোদের ব্যাচের কেউই কিছু জানে না। আর বাকিদের তো নিষেধ করা হয়েছে।
~ আমি তোমার বউ না।

~ ঠিক। তুই আমার বউ না। তবে আমার বাচ্চার মা একমাত্র তুই হবি। এটা নিজের মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে নে। আর তোর মনে এখন কি চলছে সেটাও জানি তাই সরাসরি বলেই দিচ্ছি। এজেন্সিতে যে চিফ সে আমার খালু মানে রায়ানের ফুপা। তাই আমার যখন ইচ্ছা তখন তাকে রাজি করিয়ে যা খুশি তাই করতে পারি। তাছাড়া এমন কোনো কাজ নেই যা মেঘ শেখেনি এজন্যই যখন ইচ্ছা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি আমি।
~ বাই।

~ ওয়েট। কোথায় যাচ্ছিস?
~ বাড়ি যাচ্ছি। ভালো লাগছে না আমার। তোমাদের এসব দেখে ক্লান্ত আমি।

~ গুড। গাড়ি পার্ক করা আছে। ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি তোকে এসে নিয়ে যাবে। শোন বাবা বোধ হয় বাড়িতে আছে, তোকে দেখে অবাক হবে না তবে তুই গিয়ে সরাসরিই বিয়ের ব্যাপারটা বলে দিস তাহলে খুশি হবে।
~ আমি নিজের বাড়ি যাচ্ছি। তোমার বাড়ি কেন যাবো আমি?

~ তোর নিজের বাড়ি কোনটা? ওটা দাভাই এর বাড়ি। লজ্জা করে না বর থাকতেও ভাই এর ঘাড়ে বসে খেতে চাস? আজ থেকে তুই আমার সাথে আমার বাড়ি থাকবি। আর আমার কথার যদি নড়চড় হয় তাহলে তোর জন্য আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।

রোজ রাগে ঘাস মুঠো করে বসে রইলো। চোখ দিয়ে একনাগাড়ে পানি পড়ছে। রোজকে কাঁদতে দেখে মেঘের মেজাজ পুরো বিগড়ে যায়।

~ খোদার কসম রোজ আর এক ফোটা পানি পড়ুক চোখ দিয়ে। তারপর দেখ কি করি, [ রোজ মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। ]

এইবার কাঁদলে আমি তোর সাথে সেই সব করবো যা একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে করে। মনে রাখিস কথাটা।
কথাটা শুনে রোজের হিচকি উঠে যায়।

তাড়াতাড়ি চোখ মুছে মেঘের দিকে তাকায় ও। মেঘের চোখ লাল হয়ে আছে যা দেখে ভয়েই রোজের চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে। মেঘ
এটা দেখে রোজের দিকে এগিয়ে আসে তখনই রোজ ভয়ে চিৎকার দিয়ে বলে
~ আমি নিজের ইচ্ছায় কাঁদতেছি না। চোখ দিয়ে পানি পড়লে আমি কি করবো? প্লিজ কিছু করো না আমার সাথে।
মেঘ রোজের পাশে বসে রোজের মাথা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। রোজ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।

মেঘ রোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তারপর রোজের গাল দুহাতে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো
~ সেদিন তোর মা কে নিয়ে আসছিলো আমার লোক। কিন্তু মুন্নির বাবা তোর মা কে মাঝরাস্তা থেকে কিডন্যাপ করে ইন্ডিয়ার বর্ডার পার করে দেয়। মুন্নির সাথে এতোদিন নাটক করেছি ওর বাবার ওপর নজর রাখার জন্য।

মুন্নির বাবা নিজের মেয়ের হাত আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলো আমি সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তোর মায়ের খোজ জেনেছি। কিন্তু এখন মুন্নি নিজে আমাকে ছেড়ে গেছে তাই ওরা চাইলেও কিছু প্রমাণ করতে পারবে না।

আমি যখন জেনেছিলাম তুই ছোট থেকেই তোর মা কে খুজছিস, তারপর খালুজানের সাথে দাভাই যখন তোর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলো তখন আমিই খালুজানকে বলেছিলাম তোকে তাদের সাথে নিতে এতে আমি তোর ওপর নজর রাখতে পারবো। মুন্নি বা অন্য কেউ চাইলেও তোর ক্ষতি করতে পারবে না।

বিশ্বাস কর আমি কখনো মুন্নিকে ভালোবাসিনি। আমার বুকের বা পাশ টা যে শুধুই তোর। সেখানে অন্য কারোর জায়গা না আগে হয়েছে না ভবিষ্যৎ এ হবে। তুই শুধু আমাকে ভুল বুঝিস না।

রোজের কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেলো। মেঘ হেসে বললো
~ আমার বুকে কাঁদতে বলেছি বলে কান্নার বন্যা বহায় দিবি? শার্ট ভিজে যাচ্ছে তো। এখন ছাড় বাকিটা রাতে কাঁদিস। এমনিতেও আজকের রাতটা তোর জন্য স্পেশালই হবে।

রোজ মেঘের কাছ থেকে সড়ে আসতেই মেঘ আরও জোরে চেপে ধরে রোজকে।

~ কাঁদতে মানা করেছি। দূরে যেতে বলিনি। অনেক বছর কষ্ট করে তোর মাথা নিজের বুকে রাখতে পেরেছি। এভাবে অন্ততো একঘন্টা বসে থাকবো। আর কেউ তো আমাদের দেখতে পাবে না তাই ভয় পাওয়ার কারন নেই। রায়ান সবটা সামলে নেবে।

~ আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি।
~ জানি তো যে আমার পিচ্চিটা এই দুবছরে অনেক কষ্ট পেয়েছে। এখন সে যদি চায় তাহলে তার মেঘরোদ্দুর এই দু বছরের আদর তাকে একবারে দিয়ে দিতে পারবে। সে কি চায়? আদর?

মেঘের লাগামহীন কথায় রোজ লজ্জায় নুইয়ে পড়ে। কিন্তু মেঘের মনটা খচখচ করছে। এখনো অনেক কাজ বাকি। আর সেগুলোতে রোজকে প্রয়োজন কিন্তু রোজের নিরাপত্তা? মেঘের অনুপস্থিতে রোজকে দেখে রাখবে কে?

রোজ নিজের খেয়াল রাখতে পারে ঠিক আছে তবে সিরিয়াল কিলারদের পাওয়ার থেকে রোজ নিতান্তই ক্ষুদ্র।
~ রোজ আমাদেরও ইন্ডিয়াতে যেতে হবে। তুই রওশন ভাই আর মিরাজ ভাইদের সাথে থাকবি।
~ কেন?

~ কারন ওখানে তারা আগে থেকেই আছে। তাছাড়া আমার কোনো শশুড়বাড়িও নেই ওখানে যে সেখানে গেস্ট হিসাবে থাকবো। তাই কাজিনের বাড়িতেই থাকতে হবে। তোর বন্ধু না দিয়া? ওর সাথে থাকতে সমস্যা কি?
~ ” কেন ” জিজ্ঞেস করে তার অর্থ কেন যাবো?

~ তোর মা আছে না ওখানে। তুই তো প্লানিং করেই রেখেছিলি একা একা খুজতে যাবি তোর মাকে। এখন না হয় আমিও তোকে সাথ দেবো।

~ কে কে যাবে?
~ আমি আর তুই। বাবার দেখাশোনা রায়ান মিশ্মি আছে, ওরাই করবে। চিন্তা করিস না সবটা দেখে নিবো আমি। আর দেখিস সবটা ভালোই হবে, কারন কথাগুলো তোর #Mr_Genius বলছে।
~ আমার আম্মুকে সত্যিই পাবো তো আমি?

~ তোর মেঘরোদ্দুরের ওপর বিশ্বাস নেই?
~ নাহ।

~ থাকার দরকারও নেই। এমনিও যা যা করেছি তাতে তুই আমাকে আর বিশ্বাস করবি না আমি জানি। এখন বল ক্লাস করবি নাকি বাড়ি যাবি?
~ ঘুম আসেতেছে আমার।

রোজের কথায় অবাক হয় মেঘ।
~ তাহলে বাড়ি চলে যা।
~ হুম।

রোজ উঠে গাড়ি নিয়ে বাড়ি চলে আসলো। সম্রাটদের বাড়ি। ওবাড়ি যাবে না ও। তিনবছরের কন্ট্রাক্ট কিসের? নিজের সাধ মিটিয়ে রোজকে ছেড়ে দিবে এমন কাউকে রোজ বর হিসাবে মানে না। এতোক্ষন অনেক কষ্টে নিজের রাগ সামাল দিয়েছে আর পরছে না রোজ।

~ দাভাই আমি বিয়ে করবো। ছেলে দেখো।
সেহের রান্না করছিলো কিচেনে। রোজের কথা শুনে ও ছুটে আসে বাইরে। সম্রাট খবরের কাগজ মুখের ওপর থেকে সড়িয়ে রোজের দিকে তাকালো।

~ মজা করার সময় নাই বোন। পরে কথা বলবো তোর সাথে এখন কাজ করছি।
~ বিয়ে করবো আমি। সত্যি সত্যি বিয়ে করবো।
~ কাকে?
~ আমি কি জানি? তোমরা ছেলে দেখো।

তখনই কলিং বেলের শব্দ শোনা যায়। সেহের দরজা খুলে মেঘকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে যায়। মেঘ সেহেরকে পাশ কাটিয়ে রোজের সামনে আসে।
~ এখানে কেন এসেছিস?
মেঘকে দেখে রেগে যায় সম্রাট।

~ সেটা তোমাকে কেন বলবে মেঘ? ও আমার বোন আমার বাড়িতে এসেছে তাতে তোমার কি? চলে যাও এখান থেকে।
মেঘ ডাবল রাগ দেখিয়ে বললো।

~ ও তোমার বোন ছিলো দাভাই। কিন্তু এখন ও আমার বউ। ওর ওপর এখন সবার থেকে বেশি অধিকার আমার। [ রোজের দিকে তাকিয়ে ] আর তুই তোর সাহস হলো কিভাবে আমার কথা অমান্য করার?
~ বউ? রোজ এসব কি বলছে মেঘ?

~ আমি কিছু জানি না দাভাই, ও আমাকে চিট করে বিয়ে করেছে। আমি জানতাম না ওটা ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার। ও আমাকে তিন বছরের জন্য বিয়ে করেছে আমি যাবো না ওর কাছে। দাভাই আমি তোমাদের কাছে থাকবো। আমি যাবো না।

মেঘ রোজের হাত ধরে হিরহির করে টেনে নিয়ে আসতে লাগলো। মুখে বললো
~ কেউ আমাকে আটকাতে আসলে তার ইফেক্ট রোজের ওপর পড়বে দাভাই।

এবার ভেবে দেখো বোনকে আমার সাথে যেতে দিবে নাকি নিজের বোনকে কষ্টে দেখবে। আমি তোমার বোন ছাড়া কাউকে ভালোবাসিনি আজ অবধি। তাই অধিকার না পেলে সেটা ছিনিয়ে নিতে হবে।

রইলো বাকি তিনবছরের কথা সেটা রোজ আর আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার সেবিষয়ে অন্যকারোর কথা বলার কোনো অধিকার নেই। আসছি
কেউ কিছু বললো না। বলার মতো কিছু খুজেই পাচ্ছে না। মেঘ রোজকে নিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে আসে। মৃন্ময় মেঘরোজকে এভাবে দেখে খানিকটা ভ্যাবাচেকা খায়।

~ মেঘ? রোজকে এভাবে টানছিস কেন? ছেড়ে দে। ব্যাথা পাচ্ছে তো ও।

~ পাক। তুমি আমাদের মধ্যে এসো না আজ। অনেক বাড় বেড়েছে ও। আজ একটু শাস্তি না পেলে সুধরাবে না।
রোজ কাঁদতে কাঁদতে বললো
~ আংকেল এর হাত থেকে আমাকে বাঁচাও প্লিজ। আংকেল, আংকেল।

মেঘ রোজকে নিজের রুমে নিয়ে এসে খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে। তারপর দরজা লাগিয়ে দেয়। মেঘকে এভাবে দেখে রোজের কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হবার মতো অবস্থা।

~ আমাকে ছেড়ে যাওয়ার অনেক ইচ্ছা তোর তাইনা। আজ দেখাবো আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও তোর কি হাল হবে।

~ আমি ছেড়ে যেতে চেয়েছি? সবসময় তুমিই চলে গেছো। আমি কতবার বলেছি আমি তোমার কাছে থাকতে চাই শুনেছো সেদিন? আজ কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করে অধিকার ফলাতে এসেছো? শরীর চাও আমার? একবারও ভেবে দেখেছো এই কন্ট্রাক্ট টা আমি কিভাবে সহ্য করবো?

ও ভাববে কিভাবে? তুমি তো সবসময় নিজেকে নিয়ে ভাবো আর মুখেই শুধু বড় বড় কথা।
~ বলা শেষ?

রোজ কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ে। হঠাৎ দুম করে উঠে ব্লাংকেট জরিয়ে নিলো। মেঘ বরফের ট্রে এনে রোজের পাশে বসে। ব্লাংকেটের নিচ থেকে রোজের হাত ধরতেই রোজ ছিটকে দূরে সরে যায়।
~ টাচ করবা না আমাকে।
~ হাত টা দে জান। তোর হাতে দাগ বসে গেছে।

~ বসুক। কেটে পড়ে যাক। তোমার কি? ধরার সময় কি আস্তে ধরেছিলে? এখন মোটেও পিরিত দেখাতে আসবা না। তোমার পিরিত দেখার জন্য আসিনি আমি।

~ সরি। মাফ করে দে। রাগের মাথায় তোকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম।
~ দয়া করে এখান থেকে যাও ভালো লাগছে না আমার।

মেঘ রোজের কথা শুনে ব্লাংকেট টেনে ছুড়ে ফেলে দিলো নিচে। রোজের প্লাজু হাটুর উপরে উঠে আছে। মেঘ দ্রুত চোখ সড়িয়ে নেয়। রোজ হুড়মুড় করে উঠে বসে। প্লাজু ঠিক করে মেঘের দিকে রাগি চোখে তাকায়। মেঘ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে, রোজের হাত টেনে বরফ দিয়ে হাত ডলতে শুরু করে। রোজ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মেঘ ভ্রু কুচকে তাকায়

~ কি হয়েছে?
~ আমার কপাল পুড়ছে। [ কথাটা শুনতেই রাগি চোখে তাকালো মেঘ। মেঘের এমন চাহুনি দেখে রোজ আমতা আমতা করে বললো] নাক বন্ধ হয়ে গেছে। বরফের জন্য ঠান্ডা লাগতেছে, বাল।


পর্ব ১৪

এক বিছানায় শুয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে রোজ। মেঘ ব্লাংকেট শক্ত করে ধরে পিঠের নিচে চেপে রেখেছে। ওদিকে শীতে থরথর করে কাঁপছে রোজ, ব্লাংকেট টানতে টানতে হাত ব্যাথা হয়ে গেছে তবুও মেঘ বিন্দু পরিমাণ নড়ছে না।
~ সারাদিন খেয়ে খেয়ে গন্ডারের মতো হইছে, যেমন ভারী তেমন শক্ত। কোন গোডাউনের ডাল চাল খায় আল্লাহই জানে। [ বির বির করে বললো ]

~ টানাটানি না করে আমার দিকে এগিয়ে এসে ঘুমা।
~ ইমপসিবল। তোমার সাথে এক বিছানায় থাকছি এটাই যথেষ্ট। এক ইসের মধ্যের যেতে পারবো না।
~ ইসের মানে? কিসের মধ্যে?

~ বাংলায় বলতে হবে? তাহলে শোনো তোমার গায়ে গায়ে ঘসতে পারবো না। আমাকে আলাদা ব্লাংকেট এনে দাও।
~ ঘসতে পারবি না? এসব কি ভাষা রোজ? ছোটবেলায় একবার মেরেছিলাম মনে আছে? আবার যদি মার খেতে না চাস তাহলে আমার কাছে এসে ঘুমা।

~ তিন বছরের বিয়ে করে লম্বা লেকচার? দরকার পড়লে মার খাবো তাও যাবো না। এ বাড়ি কি রুমের অভাব? অন্য রুমে যাবো আমি।

রোজ উঠে দরজা খুলতে লাগলো। কিন্তু খুলতে পারছে না। ওর হাইট ৫.৫” আর দরজার হাইট ৯ ফুটের কাছাকাছি। এ বাড়ি একমাত্র মেঘের রুমের দরজাটাই এতো বড়। বাকিগুলো স্বাভাবিক মাপের। রোজ লাফাচ্ছে আর মেঘ উঠে পানি খাচ্ছে।

~ ক্যাঙ্গারুর মতো না লাফিয়ে চুপচাপ এসে ঘুমা। দরজা পর্যন্ত তোর হাত জীবনেও পৌছাবে না। বিশেষভাবে তৈরি করা তোর বরের রুম। [ হাই তুলে বললো ] সবটাই তোর গুনের জন্য।
~ আমি ব্যালকোনিতে ঘুমাবো। প্রয়োজনে মেঝেতে ঘুমাবো।

~ আচ্ছা। শোন ব্যালকোনির দরজা লক করা, কাল সকালের আগে ওটা খুলবে না। তুই বরং মেঝেতে ঘুমা তবে বালিশ ব্লাংকেট কিচ্ছু পাবি না।

~ অদ্ভুত। নতুন বউকে মেঝেতে শুতে বলছো? নিজের বউ হলে বলতে পারতে এমন? [ কথাটা বলেই জিভ কামড়ালো রোজ। মেঘ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। ]

~ নিজের বউ? নাহ নিজের বউ হলে তাকে বিছানা হিসাবে আমার শরীর আর বালিশ হিসাবে আমার বুক দিতাম এবং চাদর হিসাবে আমার পুরোটা তো আছেই। তুই তো অন্য লোকের বউ, তাই যা নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নে।
~ আমি বাড়ি যাবো।

~ তো তোরে কি রাস্তায় রাখছি? এটাকে বাড়ি মনে হচ্ছে না?
~ আমি ঘুমাবো। একদম বিরক্ত করবা না আমাকে।

~ ওরে আমার লাট সাহেবের বউ রে, ওরে নাকি আমি বিরক্ত করি। তুই নিজেই বকবক করে আমার ঘুমের ডিস্টার্ব করতেছিস। বুঝেছিস?

রোজ রাগ করে বালিশ ছাড়াই মেঝেতে শুয়ে পড়ে। মেঘ আড়চোখে সবটা দেখছে। রাগে ওর শরীর জ্বলে যাচ্ছে। দিনদিন অতিমাত্রায় ঘাড়ত্যারা হয়ে যাচ্ছে রোজ যা মেঘের একদমই পছন্দ না। মেঘ উঠে লাইট জ্বালালো। রোজ ঘুমের ভান ধরে পড়ে আছে। মেঘ শার্ট খুলে রোজের মাথার কাছে ছুড়ে দিলো। রোজ এবার মাথা উচু করে তাকায়। মেঘ প্যান্টের বেল্ট খুলতেছে।

~ লাস্ট বারের মতো বলছি খাটে গিয়ে আমার দিকটায় উঠে শুয়ে পড়। নাহলে

মেঘের কথা শেষ হবার আগেই রোজ উঠে মেঘের বালিশে শুয়ে পড়ে। ব্লাংকেট মুড়ি দিয়ে আয়তাল কুরসি পড়ছে ও। মেঘ জিন্স খুলে একটা ট্রাউজার পড়ে আসলো। গায়ে কিছু পড়লো না। হাল্কা গরম লাগছে। রোজের জ্বর এসেছে বলে ওর ঠান্ডা লাগছে। মেঘ লাইট অফ করে খাটের কর্ণারে আসলো। রোজের কাঁপাকাঁপিতে রোজকে এক অদ্ভুত প্রজাতির কোলবালিশের আকার হিসাবে দেখা যাচ্ছে।

~ কাঁপাকাঁপি বন্ধ কর। ঘুমাবো আমি।
~ আল্লাহ বাঁচাও, এবারের মতো বাঁচায় দাও। আর দিয়াকে পচাবো না। ওর কাছে মাফ চেয়ে নিবো। আমি জানি ওর বদদোয়া লাগছে আমার। আর ওরে রওশন ভাইয়ার গুহায় পাঠাবো না। শুধু আমারে বাঁচায় দাও।
মেঘ রোজকে কাঁপতে দেখে ভয় পেয়ে যায়।

~ কাঁপছে কেন ও? আবার জ্বর আসেনি তো? এই মেয়েটাও না। কি দরকার ছিলো তেজ দেখিয়ে মেঝেতে শোয়ার।
মেঘ রোজকে ডাকার জন্য রোজের হাতে হাত রাখলো। কিন্তু অন্ধকারে, ভুল করে হাতটা সোজা রোজের পেটের ওপর পড়ে। পেটে মেঘের হাতের স্পর্শ পে
য়ে কেঁদে দেয় রোজ। ব্লাংকেট সড়িয়ে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দূরে সড়ে যায় রোজ।

~ আমি কিছু করিনি। আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ। আমি এখন এসবের জন্য তৈরি না। আমার সাথে জোরাজুরি করো না। আমি বাড়ি যাবো। বউমনির কাছে যাবো। এ্যা এ্যা এ্যা আমি যাবো।

রোজের কান্না দেখে পুরো বেকুব বনে যায় মেঘ। কি করতে গেলো আর কি হচ্ছে। মেঘ দ্রুত লাইট জ্বালায়।
~ রোজ। রোজ শান্ত হ। কেউ চলে আসবে তো। এভাবে কাঁদিস না। দেখ দেখ আমার দিকে.. আমি কিচ্ছু করছি না। আমি দূরে দাড়িয়ে আছি। তাকা আমার দিকে।

~ একরুমে থাকবো না আমি। আমি বাইরে যাবো।

~ সেটা সম্ভব না। বিয়ে করেছি কি সিঙ্গেল ঘুমানোর জন্য? বউছাড়া আমি থাকবো না। ” না ” মানে না। তুই যদি চাস লাইট অন থাকতে পারে। কিন্তু এর বেশি সুযোগ সুবিধা পাবি না।

মেঘের কথা শুনে রোজ গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। মেঘও রোজের পাশে এসে বসে। ঘন্টাখানে পর। মেঘ এখনো বসে বসে রোজকে দেখছে। ওদিকে রোজও চোখ বুজে বোঝার চেষ্টা করছে যে ” মেঘ কি করছে? ” রোজ সাহস নিয়ে, মাথা কাত করে মেঘ যেপাশে আছে সেদিকে তাকালো। রোজকে তাকাতে দেখে মেঘ রাগি চোখে ওর দিকে তাকায়।

~ এতোক্ষন যে নাটক করলি তার মানে কি? সমস্যা কি তোর? ক্লিয়ার করে বল। বিগত কয়েকঘন্টা ধরে তোর নাটক দেখে যাচ্ছি। এবার সবটা বলবি নাকি আমি সত্যিই কিছু করে দিবো।

রোজ উঠে মেঘের সোজাসোজি আসন কেটে বসলো। কয়েক সেকেন্ড মেঘের দিকে চেয়ে থেকে চট করে চর মারলো। এমন হঠাৎ করে গালে থাপ্পড় পড়বে ভাবেনি মেঘ।

~ প্রথম থাপ্পড় কন্ট্রাক্ট বিয়ের জন্য। [ আরেক গালে আরেকটা থাপ্পড় ] এটা আমাকে হিরহির করে টেনে আনার জন্য। [ আরেকটা থাপ্পড় ] এটা আমার হাতে ব্যাথা দেওয়ার জন্য। [ আরেকটা থাপ্পড় ] এটা লাগামহীন কথাবার্তার জন্য। [ আরেকটা থাপ্পড়] এটা আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। [

লাস্ট থাপ্পড় ] নিয়মমাফিক আজ আমাদের বাসর রাত। তাই এটা আমাদের বাসর রাতে আমার তরফ থেকে গিফট। উত্তর দিলে মাফ করবো নাহলে না। গুড নাইট।

রোজ বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ে। মেঘ এখনো বরফের মতো জমে আছে। এতোগুলো চর মনে হয় জীবনেও গালে পড়েনি। মেঘ রোজের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে,
~ এটা তুই ঠিক করলি না। আজ তোকে
রোজ আবার উঠে বসলো।

~ শাট আপ। কি করবা তুমি? কি ভেবেছো রোজ তোমাকে ভয় পেয়ে মিনমিন করবে? নো মিস্টার মেঘালয়। রোজ কাউকে ভয় পায়না।

~ আচ্ছা তাই নাকি? তাহলে চল তোদের ওই ট্রুথ ডেয়ার গেম আছে নাহ? ওইটাই খেলি। দেখি কার দম কতদূর।
~ যাও যাও। ওসব দেখিয়ে আমাকে ভয় পাওয়াতে পারবে না।

মেঘ কিছু চিরকুট আর একটা বোল নিয়ে আসে। প্রথমে রোজ তুলবে। রোজ একটা চিরকুট তুলে মেঘের হাতে দিলো। মেঘ চিরকুটটা খুলে দেখালো ” ডেয়ার “।

~ কাম নেয়ার রোজ & টাইটলি হাগ মি।

রোজ ভ্রু কুচকে মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ হাসছে। কিন্তু ডেয়ার তো পালন করতেই হবে। রোজ রাগে ফুসতে ফুসতে মেঘের কাছে গেলো। মেঘকে শক্ত করে জরিয়ে ধরতেই মেঘ রোজের কানের লতিতে কামড় দেয়।
~ আহ। বেয়াদব রাক্ষস একটা।

মেঘ চিরকুট তুললো। “ট্রুথ” রোজ প্রশ্ন করে।
~ কন্ট্রাক্ট কিসের?

~ ভুয়া কাগজ। তোর রিয়াকশন দেখার জন্য বানিয়েছিলাম। আসল কাগজটা আমাদের কাবার্ডে আছে।
রোজ রেগে চিরকুট তুললো ” ডেয়ার “
~ তোকে শাড়ি পড়াবো আমি। আর যতক্ষন পড়াবো ততক্ষন কোনো কথা বলতে পারবি না। নড়াচড়া করতে পারবি না।
~ অসম্ভব এসব কেমন ডেয়ার? আমি খেলবো না।
~ সাহস ফুরিয়ে গেলো?

বাধ্য হয়ে রোজ পেটিকোট আর ব্লাউজ পড়ে আসে। মেঘ শাড়ি নিয়ে বসে আছে। রোজ এসে মেঘের সামনে দাড়িয়ে বিরক্তির সুরে বললো
~ তাড়াতাড়ি পড়াও। ঠান্ডা লাগতেছে।

~ লজ্জাশরম কি ধুয়ে খেয়ে ফেলেছিস? আমার মতো ইনোসেন্ট একটা ছেলের সামনে এভাবে চলে এসেছিস? এখন যদি আমি কিছু করে ফেলি তার দায় কে নেবে?
~ মানে?

~ এই যে তোকে এভাবে দেখে এখন আমার অনেককিছু করতে ইচ্ছা করতেছে। শত হলেও পুরুষ মানুষ তো, নিজেকে সামলে রাখতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

রোজ একবার নিজের দিকে তাকিয়ে আবার মেঘের গালে চর বসালো।
~ সম্মান দিয়ে কথা বলো। বউ হই তোমার। প্রথমে তুই~ তোকারি তারপর এসব লুচ্চামি। আমি এসব সহ্য করবো না।

মেঘ উঠে শাড়ি পড়াতে লাগলো।
~ শাড়ির কুচি আর আঁচল আমার হাতে দিবা। যদি দেখি না আমাকে টাচ করেছো হাত ভেঙে রেখে দিবো।
মেঘ চিরকুট তুললো ” ট্রুথ “।

~ সবার সামনে স্ট্রং আর আমার সামনে ভেজা বিড়াল হয়ে থাকো কেন?
~ ভালোবাসি বলে।
রোজ চিরকুট তোলে ” ডেয়ার “

~ কিস মি জান।
~ আমার বেলায়ই এসব সব ডেয়ার জোটে। তোমার বেলা শুধু ট্রুথ আসে কেন? নিশ্চই কাগজে কিছু করেছো।
~ ফার্স্ট কিস মি। দেন চেক দ্যা পেপার।

~ নো। দুপুরে কিস করছিলা না? শোধবোধ।
~ কিসের শোধবোধ? তুই না দিতে পারলে বল আমার ডেয়ার আমিই কমপ্লিট করিয়ে নিচ্ছি। তবে এটা তোর জন্য সুখকর হবে বলে মনে হচ্ছে।

~ [ মনে চাচ্ছে লাথি মেরে চলে যাই। এতোদিন কষ্ট দিয়ে এখন ন্যাকামি করতে এসেছে। মুন্নির সাথে তো ভালোই ঢং করছে এখন এসব দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। লুচ্চা ব্যাটা। দিয়ার কথাই ঠিক ছেলেরা প্রচন্ড রকমের শয়তান হয়, যম, রাক্ষস, আর যা যা আছে সব। ]

~ কি বিরবির করছিস?
~ আমরা ইন্ডিয়াতে যাবো কবে? প্লানিং করেছো? আর মুন্নির বাবাই যে সেই লোক সেটা বুঝলে কিভাবে? আমি নিজেই তো ওনাকে অস্পষ্ট দেখেছি।

~ আজকেই জানতে হবে সব?
রোজ মাথা নেড়ে “হ্যা” বললো। মেঘ উঠে একটা ল্যাপটপ নিয়ে আসে। পাস দেখে রোজ অবাক হয়। ” Rose, The Secret Mission ” মেঘ ল্যাপটপ অপেন করে রোজের পাশে গিয়ে বসলো। কিছু এপ্লিকেশন, ডাটা, আর ডকুমেন্ট। দুইটা স্কেচ মুন্নির বাবার হাতের লোগোর, আর রোজের মায়ের সাথে মুন্নির বাবার একটা ছবি যেখানে তারা দুজন হ্যন্ডশেক করছে।

~ ডকুমেন্টগুলো আমি কালেক্ট করেছি। তুই জানিস তোর মা একজন লেডি গ্যাংস্টার ছিলো। তার সাথে তোর মায়ের মেধা এই শহরের সব মেয়েদের থেকে বেশি ছিলো।

তোর মা যে কোন ইলেকট্রনিক যন্ত্র খুব সহজে কন্ট্রোল করতে পারতো, হ্যাকিং এর জন্য অনেক এজেন্সি তোর মায়ের সাহায্য নিতো। আন্টি নিজের গ্যাং বাদ দিয়ে দিয়েছিলো কারন তার ২৫% শেয়ার ছিলো মুন্নির বাবার। এই যে হ্যান্ডশেকের ছবি এটা একটা রিসেপশনের, সম্ভবত আন্টিদের বিয়ের। কারন বিয়ের সাজে আছে আন্টি

। মুন্নির বাবার হাতের দিকে তাকা, ডান হাতে হ্যান্ডশেক করছে। হাতের কিছু অংশ পুড়ে গেছে। আর বাহাতে একটা ছোট্ট লোগো। অস্পষ্ট লোগো।
এবার আসি তোর কথায়। তোর কথা মতো তুই আর আন্টি সেদিন বাড়িতে ছিলি। তখন একটা কল আসে যে তোর বাবাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। সেটা শুনে আন্টি বেরিয়ে যায়। আর তোর বাবার কাছে কল আসে যে তুই কিডন্যাপ হয়েছিস তাই তোকে দেখার জন্য উনি ছুটে আসে।

তারপর ওনার কাছে আবার খবর আসে যে তোর মায়ের বিনিময়ে ওরা তোকে ছেড়ে দিয়েছে। সেদিন বিকালে তোর মায়ের গাড়ির এক্সিডেন্ট হয়। আর তুই তখন আলিজার সাথে ঘুরছিলি ঠিক সেখানে যেখানে এক্সিডেন্ট হয়েছিলো।

তাই আংকেল সব দোষটা তোর আর তোর মায়ের ওপর চাপিয়ে দেয়। কষ্ট বা রাগ যাই হোক না কেন সেদিনের জন্য তোকে কিছুটা দায়ি ভাবে সবাই।
তুই সেদিন মুন্নির বাবাকে দেখে চিনে ফেলেছিলি।

কিন্তু ছোট ছিলি বলে চেহারা ঠিক দেখতে বা মনে রাখতে পারিসনি। তবে লোগোর ছবিটা হুবহু এঁকেছিলি। এজেন্সিতে আমি তোর ওই লোগোটার স্কেচ পাই। তারপর সেটা মুন্নির বাবার হাতের সাথে মেলাই। মিলে যেতেই আমি তার ব্যাপারে খোজ নিতে শুরু করি।
মুন্নিদের বাগানবাড়িতে ছিলো তোর মা।

তোর মা কে দিয়ে ওরা বিভিন্ন প্রোগ্রাম হ্যাক করায় আর সে সুযোগে ওদের কালো টাকার পাহাড় উচু করে। আমি আন্টিকে নিয়ে আসছিলাম সেদিন। কিন্তু ওরা তার আগেই আমার লোকদের মেরে আন্টিকে নিয়ে যায়।

মাস খানেক পর ইন্ডিয়াতে একটা স্যাটেলাইট লঞ্জ হবে। চীন থেকে একটা গ্যাং এসে ডিল করবে সেদিন। মুন্নির বাবার কাছে একশ কোটি টাকার চুরির ডায়মন্ড আছে। সেটা বিক্রি হবে। এজন্য তোর মা কে নিয়ে গেছে যেন কিছু প্রগ্রামে ঝামেলা করে সময় পেছোনো যায়। কাজটা অনেক রিস্কি অনেক গার্ডস থাকবে তাই ওরা স্কিল মেমবারদের দিয়ে কাজ করাতে চায়।

মাহির ভাই এজন্যই ওখানে আগে গেছে। তুই জানিস মাহিরও ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করেছে। ও এসব ভালো বুঝবে তাই আমি নিজে ওকে সেদিন রাতে ডেকেছিলাম। লোকেশনও আমি দিয়েছিলাম। মাহির সবটা জেনে আমাকে হেল্প করছে।

আমি জানি এগুলোর জন্য তুই একাই যথেষ্ট কিন্তু আমি একবার তোকে হারিয়েছি রোজ। আর হারাতে পারবো না। আমার ওপর রাগ কর, মার, বকা দে। যা ইচ্ছা তাই কর তবুও প্লিজ আমার থেকে দূরে যাস না। আমি তোকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। বিশ্বাস কর তোকে যতটা কষ্ট দিয়েছি তার দ্বিগুন কষ্ট আমি পেয়েছি। তোকে ছাড়া এই মেঘ নিজের জীবনও ভাবতে পারে না রোজ। প্লিজ আবার আগের রোজ হয়ে যা।

যে কথায় কথায় আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়তো। আমার কান ধরে টেনে শাষন করতো। আমি রাগ করলে রাগ ভাঙাতো। আমার কাছে নিজের সব আবদার জাহির করতো। আমি কাঁদলে আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে রাগে গাল ফুলিয়ে থাকতো। প্লিজ মেঘরোদ্দুরের রোজকে ফিরিয়ে দে। আমি আর কখনো কষ্ট দেবো না তোকে। তুই যা বলবি তাই করবো।

তুই শুধু আমার কাছে থাক। আমার সাথে থাক। কথা দিচ্ছি পৃথিবির কোনো কষ্ট তোকে ছুঁতেও পারবে না। আমি তোকে অনেক ভালোবাসি রোজ আমাকে আর ভুল বুঝিস না প্লিজ। প্লিজ মাফ করে দে।

মেঘের চোখ দিয়ে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। রোজ ল্যাপটপের গ্লাস দিয়ে মেঘকে দেখছে। মেঘ মাথা নিচু করে আছে। রোজ মেঘের গালে হাত দিয়ে দু আঙ্গুলে মেঘের চোখের পানি মুছে দিলো। মেঘের গাল টেনে নিজের কাছে আনতেই মেঘ মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

~ নাহ রোজ। আমি সরি এসব খেলার জন্য। এরপর আমি সেদিনই তোর কাছে আসবো যেদিন তুই চাইবি। বাদ দে এসব শোন আমরা একসপ্তাহ পরেই যাবো তোর পার্সপোর্ট ভিসা করতে হবে। আমারটা রেডিই আছে।
~ [ তুমি আমার থেকে অনেক কথা লুকিয়েছো মেঘরোদ্দুর।

এখনো লুকাচ্ছো। আমি জানি তুমি পুরো সত্যিটা আমাকে বলোনি, বলছো না। হয়তো আমার ভালোর জন্যই এমন করছো। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি মেঘরোদ্দুর সেজন্য একয়েকবছর শুধু অপেক্ষা করেছি। তুমি যতটুকু বলবে যতটুকু করবে সেটা নিয়েই হ্যাপি আমি। কারন তুমি নিঃস্বার্থ ভাবে আমাকে ভালোবেসেছিলে।

যেখানে আমি নিজেই আমার এলোন লাইফের জন্য তোমার লাইফে এসেছিলাম। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি মেঘরোদ্দুর। আমিও চাইনা তোমাকে ছেড়ে যেতে। হ্যা আমিও থাকতে চাই তোমার কাছে। তোমার, শুধুমাত্র তোমার রোজ হয়ে।

] ক্যান আই কিস ইউ মেঘরোদ্দুর?
রোজের মুখে মেঘরোদ্দুর ডাকটা শুনে চমকে তাকালো মেঘ। প্রায় আড়াইবছর পর রোজ ওকে এই নামে ডেকেছে। তাহলে কি রোজ ওকে মাফ করে দিয়েছে? নাকি মেঘ কষ্ট পাচ্ছে বলে
~ রোজ নিজের

~ হুশসসসস। [ মেঘের ঠোটে আঙ্গুল রেখে ] হুয়াটএভার নিজের বর কেই তো কিস করবো এতে পার্মিশন নেওয়ার কি আছে? তোমার এই চুল থেকে পায়ের নখ অবধি পুরোটাই আমার। আসলে এই লজ্জাটজ্জা ব্যাপারটা রোজের সাথে ঠিক ম্যাচ যায় না। ইউ নো নাহ? রোজ ইজ ডিফরেন্ট এনি আদার গার্ল।

রোজ মেঘের ঠোটে নিজের ঠোট ছোঁয়ালো। মেঘ চুপচাপ বসে আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মেঘের কান্না রোজ ছাড়া আর কেউ দেখেনি তেমনই রোজের কান্নাও মেঘ ছাড়া আর কেউ দেখেনি। মেঘের কান্না দেখে রোজ ওর নিচের ঠোটে জোরে কামড় দেয়। মেঘ দ্রুত সড়ে গিয়ে হাত দিয়ে ঠোট চেপে ধরে। মেঘকে দেখে রোজ শব্দ করে হেসে ওঠে। তারপর ল্যাপটপ রেখে লাইট অফ করে আসে।

~ বসে আছো কেন? ঘুমাবা নাহ?
~ তুই? ওয়েট ব্লাংকেট এনে দিচ্ছি।

~ মেঘরোদ্দুর আমার গায়ের জোর কিন্তু আগের মতোই আছে। আর আমি যাকে মারি যে যতই শক্তিশালী হোক না কেন দুদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না এটা সিউর। এখন যদি তোমাকে পিটাই তো তুমি যে জিনিয়াসই হও না কেন, হাল একই হবে। আর কি যেন বলছিলে?

তোমার বউ এর বিছানা নিয়ে? হ্যা “নিজের বউ হলে তাকে বিছানা হিসাবে আমার শরীর আর বালিশ হিসাবে আমার বুক দিতাম এবং চাদর হিসাবে আমার পুরোটা তো আছেই। ” আমারও ঘুম পাচ্ছে।

~ শুয়ে পড়।

~ তুইতোকারি আমার পছন্দ না। একা থাকলে বলবা বাট সবার সামনে না। মিস্টার জিনিয়াসের বউ আমি। একটা সম্মান আছে না?
~ তুইও তো মিস জিনিয়াস.

~ বিবাহিত মেয়ের নামের আগে “মিস ” বসে আগে জানতাম না। এক কামড়েই মাথার অর্ধেক বুদ্ধি চলে গেছে। ফিউচারে কি হবে ভেবে টেনশন হচ্ছে। আর এতোক্ষন লুচ্চামি করে এখন ভয় পাচ্ছো কেন?
~ ভয় পাবো কেন?

~ তাহলে কি লজ্জা পাচ্ছো? আর আমাকে ভয় পাবা না তো কাকে ভয় পাবা? অন্যকেউ আছে? নাম কি ওরর? মেরে পুঁতে ফেলবো তাকে।


পর্ব ১৫

এয়ারপোর্টে ল্যাগেজ নিয়ে দাড়িয়ে আছে মেঘরোজ। রওশন নিতে আসবে ওদের। রোজ চারদিকটা ভালো করে দেখছে। কয়েকজন ওদের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। একজন দেখতে হুবহু মুন্নির ভাই এর মতো
~ মেঘ রোদ্দুর একটু ওয়েট করো। আমি আসছি।

~ কোথায় যাচ্ছিস?
রোজ বিরক্তির সুরে বললো।
~ টয়লেটে যাচ্ছি। যাবা?

মেঘ থতমত খেয়ে উত্তর দেয়.
~ এখানে টয়লেট? আচ্ছা যা। তাড়াতাড়ি আসিস।

মাহিনের [ মুন্নির ভাই ] সামনে পায়ের ওপর পা তুলে গাড়িতে বসে আছে রোজ। মাহিনের হাত পা বাধা। শুধু মুখটা খোলা কিন্তু কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রাখার জন্য কথা বলছে না মাহিন।
~ কি করছিলে এখানে? ভাইয়া।

~ কে তুমি? আর আমাকে এভাবে এখানে আনলে কিভাবে?

~ ওয়াও গ্রেট কুয়েশ্চন। তাহলে শোনো তুমি যখন মেঘের দিকে গোল গোল চোখ করে তাকাচ্ছিলে তখনই আমি পেছন থেকে তোমার গলায় টুইস করি। আর তুমি সেন্সলেস হয়ে যাও তারপর তোমাকে রাস্তার সাথে মিশিয়ে টানতে টানতে তোমার এই গাড়িতে আনি। এখানে এসে দেখি দড়ি টেপ সব রেডিই আছে। তাই তোমার জিনিস দিয়েই তোমাকে বেধে রেখেছি।

~ তুমি মেঘকে চেনো? কে তুমি?

~ তা জেনে তোমার কোনো লাভ হবে না। তুমি আগে এটা বলো এখানে কি করছো? মেঘের দিকে ওভাবে তাকাচ্ছিলে কেন? [ মাহিন চোখমুখ শক্ত করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। রোজ ধমক দিয়ে বলে ওঠে ] কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি। উত্তর দিচ্ছো না কেন?

~ মেঘকে নিয়ে যেতে এসেছি।
~ কেন?

মাহিন উত্তর দিলো না। রোজ রেগে মাহিনের চুল মুঠো করে টান দিলো। মাহিন ব্যাথায় কুকড়ে ওঠে।
~ বাবা বলেছে। মেঘকে মেরে ফেলতে। ও বাবার কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ওর জন্য সবকিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
~ ওহ আচ্ছা। তুমি সেই মাহিন না যে সেহের আপুকে রেপ করার চেষ্টা করেছিলে?

সেহেরের নাম শুনতেই চমকে তাকায় মাহিন। রোজ বন্দুকের ট্রিগার টানলো। মাহিনের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রোজ রেগে বলে

~ আমার বউমনিকে টাচ করে অনেক বড় ভুল করেছিলি তুই। সেই ভুলের জন্য এখনো তোকে মাফ করেনি রোজ। আর তুই? সেই তুই আবার রোজের ভালোবাসার ক্ষতি করার জন্য এসেছিস? এবার কি করে ছাড়ি তোকে? জীবনে শেষবারের মতো আল্লাহর নাম নিয়ে নে। তোর কাছে পাঁচ সেকেন্ড সময় আছে।

মাহিন কিছু বলার আগেই রোজ গুলি করে দিলো। রক্তে সারা গাড়ি লেপ্টে আছে। রোজ ওখান থেকে বেড়িয়ে আবার এয়ারপোর্টে আসে। মেঘ রোজকে দেখে ইশারায় ডাকে। রোজ কাছে আসেতই মেঘ ফিসফিস করে বলে
~ আগে বলিস নি কেন যে তুই মাহিনের কাছে যাচ্ছিস? ওদিকটায় সিসি টিভি ক্যামেরা আছে ভুলে গেছিস?

চমকে তাকালো রো
~ সমস্যা নেই। আমি প্রোগ্রামের সেট চেঞ্জ করে দিয়েছি পঁনের মিনিট আগে। কেউ ওই ফুটেজ টা পাবে না। সো টেনশন করিস না। রওশন ভাই নাকি ১০মিনিটের মধ্যে চলে আসবে। তাই [ একটা রুমাল এগিয়ে দিয়ে ] চোখে লেগে থাকা রক্ত মুছে ফেল।

~ তুমি জানো সব?
~ তোর আগেই সবটা দেখেছি আমি। শুধু তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তোর প্রতিশোধ তুই নে। ও তোদের অনেক হ্যারাস করেছে এমনকি বউমনিকে। যাক সেসব আমি সবসময় তোর পাশে আছি রোজ তাই তুই শুধু নিজের কাজে ফোকাস কর। বাকিসব আমি সামলে নিবো।
~ জানি তো।

রোজ আলতো করে জরিয়ে ধরলো রোজকে। মেঘ বাহাতে রোজকে জরিয়ে ধরে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে। রওশন আর দিয়া এসেছে ওদের নিতে। রোজকে দেখে দিয়া দৌড়ে এসে ওকে জরিয়ে ধরে।

~ আমার আগে বিয়ে করে নিলি? ইট্স নট ফেয়ার রোজানু। তোর বিয়ে আর আমিই কিনা সেখানে নেই..
মেঘ হেসে বললো,

~ তোমাদের ছাড়া বিয়ে হবে কিভাবে দিয়া?

দিয়া চোখ বড় বড় করে তাকালো।
~ তার মানে তোমরা বিয়ে না করেই একসাথে থেকেছো? ছি ছি।
মেঘ তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলো।

~ সবটাই তো তোমার যমের কাছ থেকে শেখা। এখন ছি ছি করলে কিভাবে চলে শালিকা + বেয়াইন সাহেবা।

মেঘের কথায় লজ্জা পেলো দিয়া। সবার আড়ালে রওশনকে কয়েকটা খামচিও দিলো। গাড়ির ব্যাকসীটে বসে বসে ঝিমাচ্ছে রোজ। সকালে জুস খেয়েছিলো তারপরেই এই হাল। সামনে দিয়া একের পর এক ঘটনা বলে চলেছে। রওশন ড্রাইভ করছে আর মনোযোগ দিয়ে দিয়ার কথা শুনছে। রোজ মেঘের কাধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যায়।

~ [ ভাগ্গিস জুসে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। ও এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাক ] দিয়া একটু পেছনের সীটে আসবে? রোজ হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। রওশন ভাই আমাকে এখানে নামিয়ে দাও। একটা কাজ সেড়েই আসছি আমি। এড্রেস টেক্সট করে দিও।

মেঘকে নামিয়ে দিয়ে সবাই বাড়ি চলে আসে। রাত ১০টা কি ১১ টা। রোজ ঘুম থেকে উঠে ছাদে পাইচারি করছে। মেঘকে বিকাল থেকে কল করে যাচ্ছে ও কিন্তু মেঘের ফোন বন্ধ। রাত ১টার পর বাড়ি ফেরে মেঘ। রোজ তখন ছাদের দোলনায় বসে তারা গুনছে।
~ বউ.. ও বউ।

মেঘের ডাক শুনেও মুখ ঘুরিয়ে বসলো রোজ। মেঘ এসে রোজের পাশে বসে।
~ আমার মিষ্টি বউটা কি আমার ওপর রাগ করেছে?

~ নাহ নাহ রাগ করবো কেন? খুশিতে চুম্মা দিতে ইচ্ছা করছে।

মেঘ গালটা রোজের দিকে এগিয়ে দিলো। ” গিভ মি এ চুম্মা বউ। ” রোজ সজোরে একটা চর বসিয়ে দিলো। মেঘ গালে হাত দিয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। গত ৮দিনে ১০০এর বেশি চর খেয়েছে ও। বলতে গেলে ইদানিং চর থাপ্পড় না খেলে ওর ব্রেইনই খোলে না।

মেঘরোজ টের পেলো কেউ ছাদে আসছে। তাই ওরা চুপচাপ বসে রইলো। দিয়া ছাদে এসে হাত পা ছুড়ছে। পিছু পিছু রওশনও এসেছে।

~ বলেছি না আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার ঘরে আসবেন না। আমাকে টাচ করবেন না তাও কেন করেছেন? আমি যাবো না রুমে। আমি আপনার সাথে থাকবো না। বুঝতে পেরেছেন? যতদিন না বিয়ে হবে ততদিন আমার বাড়ি মানে এ বাড়ি আপনি থাকতে পারবেন না। আর কয়েকদিন পরই তো ওদেশে যাবো।

মেঘ কিছু বলতে যাচ্ছিলো তখনই রোজ হাত দিয়ে মেঘের মুখ চেপে ধরে। রওশন ধীরে ধীরে দিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশের ছাদ থেকে কিছুটা আলো এসে পড়ছে এ ছাদে। হঠাৎ দিয়া রেগে রওশনের দিকে তেড়ে আসলো। দিয়াকে এভাবে তেড়ে আসতে দেখে ঘাবড়ে যায় রওশন। দিয়া চট করে রওশনের ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দেয়। একে একে হাতে, পিঠেও কামড় দিলো।

~ আহহ দিয়া। কি করছিস এসব?
~ শাস্তি দিচ্ছি তুমি তখন আমার ঠোটে [ আঙ্গুল দিয়ে ঠোট দেখালো] কামড় দিসো নাহ? এবার বুঝবা কার দাঁতে কেমন ধার।

~ তাই নাকি? তখন তো শুধু ঠোটে দিয়েছি। এখন
রওশন দিয়ার দুহাতে পেছনে ধরে দিয়ার ওরনা খুলে নিজের গলায় ঝোলালো। রোজ চট করে মেঘের চোখ ঢেকে দেয়।
~ রোজ ওদের প্রাইভেসি লাগবে চল এখান থেকে।

~ ধুর বাল। ওরা যদি টের পায় যে আমরা এখানে আছি বা ছিলাম তাহলেই ওরা বেশি আনইজি ফিল করবে। তার থেকে ওরা রোম্যান্স করে চলে যাক। তুমি চোখ বন্ধ করে থাকো।
~ তুই দেখছিস কেন?

~ সাবধানতা। আমি নজর রাখছি যেন ওরা আমাদের দেখতে না পায়। এবার ফিসফিসানি বাদ দাও। রোবট হয়ে বসে থাকো।
~ মশা কামড়াচ্ছে তো।

~ চুপ না করলে ছাদ থেকে ফেলে দিবো এবার। দেখতেছো আমার বন্ধু একটা সুন্দর নাইট স্পেন্ড করতেছে তবুও ডিস্টার্ব করেই চলেছো।

রোজ মেঘের চোখ আর মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরে নিজের কোলে রাখলো। নিজেও দোলনায় মাথা রেখে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে রইলো যেন বাই এনি চান্স ওদের দিয়ারা দেখলেও কিছু বুঝতে না পারে।

ওদিকে রওশন ধীরে ধীরে দিয়ার ঠোটের দিকে এগোচ্ছে। হাত দিয়ে দিয়ার কোমর চেপে ধরে আছে যার কারনে দিয়া চাইলেই এই যমের থেকে সড়ে যেতে পারছে না। রওশন প্রথমে গভীরভাবে দিয়ার কপালে ঠোট ছোঁয়ালো। তারপর ঠোটে ঠোট রাখতেই দিয়ে ভয়ে দূরে সড়ে গিয়ে কাঁপতে লাগলো।

~ কি হয়েছে?

দিয়া আঙ্গুলের ইশারায় দোলনা দেখালো। রওশন দোলনার দিকে তাকিয়েই একটা লাফ দিলো।

~ ওহ গড। এরা এখানে কি করছে? [ একটু এগিয়ে গিয়ে ওদের ভালো করে দেখলো ]থ্যাঙ্ক গড ওরা ঘুমিয়ে আছে। নাহলে আজ মান সম্মান কিচ্ছু থাকতো না।

কথাটা শুনেই হাসলো দিয়া।
~ যম। ও যম শুনুন না।

~ কি হয়েছে?
~ বলছি আপনি যদি ওদের ঘুম থেকে তুলে এখন যা যা হলো সেটা বলতে পারেন তাহলে আমি নিজে আপনাকে প্রপোজ করবো, কিস্সি দিবো, বিয়ের পর অনেকগুলা বাচ্চাও দিবো।

রওশন দিয়ার শয়তানি দেখে রাগ হলো। তাও ঠোটে চওড়া হাসির রেখা রেখে বললো
~ সিরিয়াসলি?
~ ইয়েস। ক্যান ইউ ডু দ্যাট?

রওশন রোজদের দিকে এগিয়ে গেলো, সেটা দেখে ভয়ে দিয়ার গলা শুকিয়ে আসে। রোজ শুয়ে শুয়ে ঠোট চেপে হাসছে। দিয়া হুট করে এসে রওশনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। রওশনের বেখেয়ালিতে ওর হাতটা দোলনার সাথে ধাক্কা খায়, দোলনাটাও একটু দুলে ওঠে। ওরা যেতেই মেঘ উঠে পড়লো
~ এটা কি হলো?

~ কি আর হবে? ওই যে ওই কথাটা শোনো নি? ” হুট করে এসে লুট করে নিয়ে যাবো। ” দিয়া এটা প্রাকটিক্যালে দেখালো। চলো এবার আমরাও নামি। ঘুম আসছে।
~ খেয়েছিস?

~ এখন খাবো না। ঘুম আসছে অনেক। সন্ধ্যা বেলায় চিকেন স্টু খেয়েছিলাম। তুমি তো গিলে এসেছো। জামা দিয়ে বিরিয়ানির গন্ধ আসছে।

হাত দিয়ে মাথা চুলকালো মেঘ। আসলেই খেয়ে এসেছে ও। রোজ উঠে ঘরে চলে আসে।

সকালে একটা এজেন্সিতে থেকে কল আসে। এটা সেই এজেন্সি যারা স্যাটেলাইট লঞ্জের সময় ডিউটিতে থাকবে।

মেঘ রোজকে নিয়ে ওখানে যায়। মাহির আগে থেকেই ওখানে ছিলো। রোজকে দেখে মাহির মৃদু হাসলো। রোজ প্রশ্ন করলো..
~ হাসছো কেন?
~ বললে লজ্জা পাবি।

রোজ ভ্রু কুচকে তাকালো।
~ না বললে মার খাবা।

~ গলায় ওরনাটা ঠিকভাবে পেচিয়ে রাখ। লাভবাইটের চিহ্ন গুলো জ্বলজ্বল করছে।

রোজ এবার সত্যিই লজ্জা পেলো। কিন্তু তার থেকেও মেঘের প্রতি রাগ জমছে বেশি। মেঘ সবার সাথে কথা বলে রোজকে ডাকলো।

~ নাম্বারগুলো বল আমি সিগন্যাল হ্যাক করছি। মাহির ভাই তুমি ফোন কানেক্ট করে সবাইকে নিউজ পাঠানোর ব্যবস্থা করো।

এজেন্সির চিফ এগিয়ে আসলো।
~ আমরা আমাদের এজেন্টদের পাঠিয়ে দিয়েছি ইনশাহ্ আল্লাহ ওরা লোকেশন ট্রাক করতে পারবে। কিন্তু তোমাদের এতো কষ্ট করার কোনো দরকার ছিলো না।

কথা বলতে বলতে মেঘ সিগন্যাল হ্যাক করে। কোলকাতার একটা রোডে মুন্নির বাবার গাড়িগুলো আটকে আছে। মাহির সাথে সাথে এজেন্টদের লোকেশন বলে দেয়।

~ শুধু এড্রেসটা জেনে রাখতে বলুন। ওদের সাথে এখন ঝামেলা করলে ওরা নতুন প্লান তৈরি করার সুযোগ+ সময় পেয়ে যাবে। [মেঘ]

সারাদিন কাজ করে সবে বাড়ি ফিরেছে মেঘ, রোজ আর মাহির। ঠিক তখনই সামনে রওশন~দিয়াকে দেখতে পায় ওরা। দিয়া সিড়ির ওপর দাড়িয়ে রওশনের ঘাড়ে কামড় দিচ্ছে। সোফায় বসে মিরাজ আর রুহি হাসছে। রোজ ভ্রু কুচকে সবার দিকে তাকালো তারপর গলা খাকড়ি দিলো। রোজ গম্ভির গলায় বললো

~ ঘরে কি জায়গা নেই? আর এমন ভাবে কামড়াস কেন যে দাগই বসে না?
দিয়া দাঁত বের করে হেসে বললো,
~ স্টিল বডি। আমার দাঁতই বেশি কষ্ট পায়। তোদের কাজ হয়েছে?

মেঘ বললো

~ অলমোস্ট। ২০দিন পরই ফিরে যেতে পারবো। দিয়া পড়াশোনা শুরু করে দাও টপ না করলে কিন্তু রওশন ভাই রোম্যান্সের ডোজ কমিয়ে দিবে।

মেঘের কথায় হাসলো সবাই। বিকালে রোজ নিজের ঘরে বসে একটা নকশা আঁকছে। স্যাটেলাইট লঞ্জ করবে যেখানে ঠিক তার পাশের বিল্ডিংটার। মেঘ মনোযোগ দিয়ে রোজের আঁকা দেখছে। আর রোজের ভুল ধরছে। এতোবার ভুল ধরায় রোজ পেন্সিল আর্টপেপার মেঘের মুখে ছুড়ে মারে।

~ নাও তুমিই করো। মিস্টার জিনিয়াস হইছো বলে ভাব মারানো লাগবে না। তোমার এই জিনিয়াসগিরির ওপর রোজ ফিরেও তাকায় না।
~ কি বললি?

~ কি বলেছি শুনতে পাওনি? বলেছি তুমি জিনিয়াস তাই সব কাজ তুমি করো। আমি তো কিছু পারিনা তাহলে বেকার খাটবো কেন? যাই করি না কেন সবটা তুমি আগে থেকে জেনে যাও। ইনফ্যাক্ট সব প্লানিং করে রাখো আর পরে গিয়ে আমি রান্না করা বিরিয়ানি সার্ভ করি। সব বুদ্ধি তোমার, সব ক্রেডিট তোমার।

আমি হুদাই টেনশন করে মাথা ব্যাথা বাড়াচ্ছি। যত্তসব, এতো পারো তা কাজ করার আগে বলতে পারো না? যখন আমি কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে যাই, বিরক্ত হয়ে যাই। তখন পিরিত দেখাতে আসো?
~ তারপর?
~ তারপর তোমার মাথা।

~ আমার মিষ্টি বউটা এতো রেগে গেলো কেন?
~ এজেন্সিতে তুমি মেয়েদের সাথে চিপকা চিপকি করছো কেন? আজ থেকে আমরা সেপারেশনে থাকবো। তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই আমার। বুঝতে পেরেছো মিস্টার জিনিয়াস? লুচ্চা জিনিয়াস।

~ আরে কোই চিপকাচিপকি করছি? ফাইল দিতে আসছিলো একজন। পড়ে যাচ্ছিলো বলেইই
~ পড়লে পড়ুক। তাতে তোর কি? কেউ পড়লেই তাকে ধরতে হবে? দেখছিস ও তোর দিকে কিভাবে তাকাচ্ছিলো? তুই আমার সাথে কথাই বলবি না। যা ওই মাইয়্যা গো লগে ঘেসাঘেসি কর।

~ আর ইউ জেলাস?
রোজ তেড়ে এসে মেঘের শার্টের কলার চেপে ধরলো। মেঘ ভড়কে যায় রোজের কাজে।
~ আমি হিংসুটে না। তবে যেটা আমার সেটা শুধুই আমার। আমার প্রিয় জিনিসের দিকে যদি কেউ নজরও দেয় তো তাকে পৃথিবির মায়া তখনই পরিত্যাগ করতে হবে। কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও।


পর্ব ১৬

পাপড়িকে (রোজের মা) এয়ার পোর্টে পৌছে দিয়ে রওশনদের খবর দিলো রোজ। ঘন্টা দেড়েক পরেই ফ্লাইট। কিন্তু মেঘ আসছে না এখনো। মেঘের চিন্তায় রোজের হাত~পা থরথর করে কাঁপছে। দিয়া, রুহি ও পাপড়ি কে নিয়ে প্লেনের সামনে চলে যায়। রোজ নিজের মা কে নিরাপদ দেখে সেই গোডাউনের দিকে টেক্সি ঘোরালো।

ঘন্টা তিনেক আগে, আজ স্যাটেলাইট লঞ্জ হচ্ছে। ডেটের ঠিক দুদিন আগে লঞ্জ হওয়ায় রোজ এসব জানতো না। হুট করে মেঘ কল করে একটা ঠিকানা ম্যাসেজ করে দেয় রোজকে। সেখানে গিয়েই রোজ নিজের মা কে হাত~পা বাধা অবস্থায় পায়।

মেঘরা এখনও মুন্নির বাবার পুরোনো গোডাউনে আছে যেটা এজেন্সি থেকে সনাক্ত করা হয়েছিলো।
দুহাত পেছনে বাধা মেঘের। কপাল, ঠোট, বেয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছে মুন্নির বাবা। ঠিক ওর পেছনে মাহির আর মিরাজকে চেয়ারের সাথে বেধে রাখা হয়েছে।

~ এমন করলে কেন মেঘ? তোমার সাথে তো আমার কোনো শত্রুটা ছিলো না। এমনকি আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিতেও চেয়েছি। তাহলে আমার ছেলেটাকে মারলে কেন? কেন মেরেছো? [ চিৎকার দিয়ে প্রশ্ন করলো মুবিন ]

মেঘ ঠোট নাড়িয়ে হাসছে। সেটা দেখে মুবিন রড এনে মেঘের মাথায় বারি দেয়। গলগল করে ঘাড় বেয়ে রক্ত পড়ছে মেঘের। মুবিন কাউকে কল করে।

~ পাপড়ি, রোজ ওরা কোথায়? কতক্ষণ লাগবে ওদের আনতে?
~ বস কাউকে পাচ্ছি না। কোথায় চলে গেছে বুঝতেই পারছি না। আজ তো বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো ফ্লাইটও নেই।
মুবিন রাগের চোটে ফোনটা মেঝেতে ছুড়ে মারে। টুকরো টুকরো হয়ে যায় ফোনের প্রতিটা খন্ড। মুবিন চিল্লিয়ে বলে।
~ কিল দেম।

মুবিনের কথায় মাথা তুলে তাকালো মেঘ। চারদিকে তেলের ড্রাম। কোথাও ড্রাগের বক্স কোথাও বা মদ। মেঘ উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পায়ের ব্যাথায় পারলো না। মেঘ পেছনে তাকিয়ে আইকন্টাক্ট করলো মাহির মিরাজের সাথে।
~ ওয়েট মিস্টার মুবিন খাঁন।

মেঘের কথায় পেছন ঘুরে তাকালো মুবিন। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে আছে মুবিনের।
~ যখন মরবোই তখন আপনার প্রশ্ন গুলোর উত্তর দিয়েই যাই। পরপারে তো জবাব দিতে হবে যে ” কেন আপনার উত্তর দেইনি। “

★★ প্রথমত আপনার সাথে আমার শত্রুটা খুবই গভীর। মোহনা কে চেনেন নিশ্চয়ই। আপনার সৎবোন ছিলো। যার ওপর আপনি প্রতিটা দিন রাত অত্যাচার করতেন। [

মোহনার নাম শুনে মুবিনের চোখ মোটা হয়ে যায় ] এমনকি তাকে মলেস্টও করতে চেয়েছিলেন। আমি সেই মোহনার ছেলে। সেই মোহনা যে কয়েকবছর আগে একটা ছোট বাচ্চাকে নিয়ে রাস্তার ধার ঘেসে হাটছিলো, তারপর আপনি তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন.. সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে তাকে খুন করেছিলেন। মনে পড়ছে কিছু? সেদিন তার হাত ধরে যে বাচ্চাটা হাটা শিখছিলো সেটা আমি ছিলাম।

★★ আপনার ছেলে? সে তো আপনার মতোই পশু। জানোয়ার। জানোয়ারদের খুন করতে কখনোই আমার হাত কাঁপেনি। তবুও ওই খুনটা আমি না, রোজ করেছিলো। আপনার ছেলে যে এতোবছর বেঁচে ছিলো তার জন্য শোকর করুন। ওকে তো আমি সেদিনই শেষ করে দিতাম যেদিন ও আমার রোজকে স্পর্শ করেছিলো। কি ভাবছেন? চুপ করে ছিলাম কেন? কারন আমি চেয়েছি আমার রোজ ওর মায়ের মতো হোক। পরিশ্রমী, জিনিয়াস। তাই ওর প্রতিশোধ ওকেই নিতে দিয়েছি।

★★ আপনার মেয়ে? স্মাগলার। কি ভেবেছেন আপনার স্মাগলার মেয়েকে ভালোবাসতাম আমি? নাহ। আমি তো ওর ব্রেইনওয়াস করেছিলাম আপনার খোজ জানার জন্য।

আপনাদের কাছে আসার জন্য। এতক্ষনে বোধ হয় বাংলাদেশের জেলে আপনার মেয়ে শান্তিতে চাকতি পিসছে। আর আমি ফিরে ওকে পার্মানেন্টলি আপনার ছেলের কাছে পাঠিয়ে দিবো। কারন ওর জন্য আমার রোজ কষ্ট পেয়েছে।
মুবিন কিছু বলতে চাচ্ছিলো তখনই মেঘ বলতে শুরু করে।

★★ রোজ আর আন্টিদের এয়ারপোর্টের কোনো প্লেনে পাবেন না। কারন ওদের জন্য প্রাইভেট জেট আছে।
★★ এবার আসি আপনার আর আমার কাজের হিসাবে। আপনি এতো বোকা হলেন কিভাবে মিস্টার খাঁন? যে পাপড়িকে আপনার বাগানবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারে সে তাকে নিরাপদ রাখতে পারবে না। এটা ভাবলেন কিভাবে? সেদিন আমার ইচ্ছাতেই আন্টিকে এদেশে আনতে পেরেছিলেন।

কারন এটা আমার প্লানিং এর একটা অংশ ছিলো। আমি জানতাম তখন আন্টি আমাদের কাছে থাকলে রোজ, আন্টি এবং আমাদের সবারই লাইফ রিস্ক হতো। তাছাড়া আপনার কোটি টাকার চুরির ডিল? সেটাও তো আটকে থাকতো তাইনা? এজন্যই আপনার লোকদের সুযোগ দিয়েছিলাম এখানে আসতে।

★★ আপনার এ পর্যন্ত যতগুলো প্রোগ্রাম ডিলিট হয়েছে সবটা এই মেঘের জন্য। নিজেকে অনেক বড় জিনিয়াস ভাবতেন আপনি। সো স্যাড এই ভাবনা টাই আপনার সবথেকে বড় ভুল। কারন আপনার সমস্ত ল্যাপটপের ডাটা আমি আগেই হ্যাক করে নিয়েছিলাম। আর যতগুলো পেনড্রাইভ ছিলো সেগুলো আপনার মেয়েকে দিয়ে আগেই সড়িয়ে নিয়েছিলাম। জানেনই তো এসব হ্যাকিং এর ব্যাপারে আমি এক্সপার্ট।

[ কথাটা বলে মৃদু হাসলো মেঘ। ]
★★ এবার আসি স্যাটেলাইট লঞ্জের কথায়। এই টাইমটাও আমিই চেঞ্জ করেছি। তার একমাত্র কারন আপনাকে বিভ্রান্ত করবো বলে। আপনি আন্টিকে এনেছিলেন প্রোগ্রাম আর কিছু সুইচ চেঞ্জ করার জন্য। আমি সেগুলো আগেই চেঞ্জ করে রেখেছিলাম। আন্টি এসে সেটা ঠিক করে দিয়েছে। আর আপনার মোটা মাথা কি ভাবলো? আন্টি সবকিছু উল্টোপাল্টা করে দিচ্ছে? ইশ আবারও ব্লান্ডার করে ফেললেন।

★★ আপনার ওই চাংচুংফুং দের কাছে অলরেডি আমার লোক চলে গেছে। এতক্ষনে সব টাকাও হয়তো নিয়ে নিয়েছে। তবে আসল হীরাগুলো দেবে না। চীন জাপানিদের ডিচ্কাউ করে মেরে চলে আসবে। আর দায়টা কার ওপর যাবে? দ্যা মুবিন খাঁনের ওপর।

কারন মিটিং এবং কটেজটা আপনার নামে বুক করা। ইশ আবার একটা ভুল। আচ্ছা নিজের নামে করতে গেলেন কেন? ওদের নামে করলেই তো হতো..
[ মুবিন ভয়ে ফোন খুজতে শুরু করে। কিন্তু ফোন তো পাবে না। এখানে ওর ছাড়া আর কারোর ফোন আনার অনুমতি নেই। ]

★★ সেকি এখন ফোন খুজছেন? পাবেন না তো। ভেঙে ফেললেন যে। যাই হোক। এবার লাস্ট কথাটা শুনুন। আপনি নিজেকে অনেক বড় জিনিয়াস মনে করেন তাইনা? #Mr_Genius ভাবতেন নিজেকে। ভুলে যান কেন এক আকাশে কখনো দুটো চাঁদ বা দুটো সূর্য থাকে না। তেমনই প্রতিটা খেলায় দুটো জিনিয়াস থাকে না।

মেঘের কথা শেষ হতেই মিরাজ আর মাহির নিজেদের হাতের বাধন খুলে, জানালার খোলা জায়গা দিয়ে লাফ দিলো। মেঘ মুবিনের হাত থেকে গানটা কেড়ে নিয়ে তেলের ড্রামে শুট করে। সাথে সাথে আগুন লেগে যায় সেখানে। মাহির বাইরে থেকে গেট বন্ধ করে দিয়েছে। সবাই ছোটাছুটি করছে বাইরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কোনো জায়গাই খালি নেই।

ঠিক তখনই রোজ আসে। বাইরে মাহির আর মিরাজ মেঘের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারপরই বোমব্লাস্টের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে ওরা। রোজ ” মেঘরোদ্দুর ” বলে চিৎকার দিয়ে গোডাউনের দিকে এগিয়ে যায়। মাহির পেছন থেকে রোজকে ধরে ফেলে।

~ ভাইয়া মেঘরোদ্দুর? ভাইয়া ছাড়ো আমাকে, আমার মেঘরোদ্দুর ভেতরে আছে। আমি যাবো ওর কাছে। তোমরা ওকে দেখে রাখতে পারলে না? কেন এমন করলো ও? আমি ওর কাছে যাবো। আমার মেঘঘঘ
রোজের চোখের সামনেটা অন্ধকারে ঢেকে যায়। টানা তিনদিন সেন্সলেস থেকে ও।

তার বড় একটা কারন ওর মাথার চোট। পাপড়িকে বাঁচাতে গিয়ে কয়েকটা গার্ডস এর সাথে মারামারি করার সময় একজন রোজের মাথার পেছনে ইট দিয়ে বারি দেয়। সেখান থেকেই ইনফেক্শন হয়েছে। তারওপর কিছুদিন ধরেই ওর মাথাটা মাঝে মাঝে ঝিম ঝিম করতো তাই এই সমস্যা।

জ্ঞান ফিরতেই রোজ কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। কেউ মেঘের ব্যাপারে ওকে কিছু বলছেই না। ঘন্টাখানেক পর একজন নার্স এসে রোজ কে স্ট্রেচারে করে অন্য একটা কেবিনে নিয়ে যায়। মেঘ বেডে শুয়ে শুয়ে নিশ্চিন্তে আপেল খাচ্ছে। মেঘকে এভাবে দেখে রোজের রাগ আরও বেড়ে যায়। বেডের কাছাকাছি যেতেই রোজ নার্সকে বলে ওকে আগের কেবিনেই দিতে।

~ রোজ ভালো হচ্ছে না কিন্তু। নার্স ওকে আমার পাশে রাখুন। বেড আনুন আরেকটা।
~ আমি থাকবো না এখানে।

~ তোর ঘাড় থাকবে। নার্স আপনাকে বলেছি না.. বেড আনুন। ওকে ফেলে রাখুন ওখানে।

মেঘের কথামতো নার্স আরেকটা বেড এনে মেঘের বেডের সাথে মিশিয়ে রাখে। তারপর রোজকে সেখানে বসিয়ে দেয়। আপাতত রুমে সবার আসা বন্ধ তাই সারাদিন কেউ আসেনি। রোজ বালিশে মুখ গুজে কাঁদছে। আর মেঘ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা ওর সামনে এসে এতো কাঁদে….
~ রোজ… এই মেয়ে।

~ কথা বলবা না আমার সাথে।
~ সেটা নাহয় বললাম না। কিন্তু তুই কি কিছু বুঝিস নি? তোকে সেদিন যে মেডিসিন দিসিলাম সেটা খাস নি?
~ আমি কি খাই না খাই তাতে তোমার কি? একবারও বলেছো তুমি কি করছো? কেন করছো? কোথায় যাচ্ছো? কার সাথে যাচ্ছো? নাহ। আমাকে বলবা কেন? আমি কে?

~ কি জানি? কে তুই?
~ হু। কেউনা।

~ আচ্ছা পায়ে একটু মালিশ করে দে না। ব্যাথা করছে। সেদিন দোতলার কাঁচ ভেঙে লাফ দিতে গিয়ে হাতে আর পায়ে ব্যাথা পেয়েছি অনেক। মুন্নির বাপটা যে মার দিসে আমাকে তাতে তো আধামরাই হয়ে গেছি। একটু সেবা টেবা কর তোরই তো বর আমি।

~ বর? কিসের বর? কি করছো আমার জন্য? কষ্ট ছাড়া আর কিছু দিসো?
~ আচ্ছা পাব্লিকলি বিয়েটা সেড়ে নেই তারপর দিবো। একহালি দিলে হবে?
রোজ ভ্রুকুচকে তাকালো। মেঘের চোখেমুখে দুষ্টুমির রেখা ফুটে উঠেছে। রোজ বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়লো। মেঘ খানিকক্ষন পর পর রোজকে খোচাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে মেঘ বলতে শুরু করে,

~ মুন্নির বাবা আমার আম্মুর সৎভাই। আর আমার মায়ের খুনি। আমি ছোট থেকেই ওনাকে শাস্তি দিতে চেয়েছি। ওনাকে টক্কর দেওয়ার জন্য মিস্টার জিনিয়াস হয়েছি। পরে তোর মায়ের কথা শুনে তোর জন্য আমি করেছি এগুলো। ব্যাস এইটুকুই লুকিয়েছি। এবার তো এদিকে ফের।

রোজ একবার তাকালো মেঘের দিকে তারপর উঠে মেঘের পা টেনে নিজের কোলে রেখে তেল দিয়ে মালিশ করতে লাগলো। মেঘ সরুচোখে তাকালো। রোজ কাঁদছে।
~ আবার কি হলো? কিছু হয়নি তো আমার।

রোজ এবার উঠে এসে মেঘের গলা জরিয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। মেঘ মৃদু হেসে রোজকে একহাতে জরিয়ে ধরলো।
~ যদি কিছু হয়ে যেতো?

~ মিসেস জিনিয়াসের মিস্টার এতো তাড়াতাড়ি মরবে না। বুঝলি? তাছাড়া আমার বুদ্ধি কি তোর মতো নাকি? পড়ে পড়ে কাঁদার অভ্যাস আর হার মেনে নেওয়ার অভ্যাস আমার নেই। বাপ রে মুন্নির সাথে যখন ছিলাম তোর মুখটা দেখার মতো ছিলো।
~ বাল।

~ একদম এসব ভাষা বলবি না। আমি চাইনা আমার বেবি তোর মতো এমন বেয়াদব হোক। দিন দিন কি হচ্ছিস?
~ বাড়ি যাবো আমি। ভালো লাগছে না আমার।

~ তোর জন্য একটা গুড নিউজ আছে। দিয়া আর মিশ্মিরা বিয়ে করে নিয়েছে।
মেঘের কথায় চমকে তাকালো রোজ। ওকে অসুস্থ রেখে সবাই বিয়ে করে নিলো? মেঘ হাই তুলে বললো।
~ দিয়াকে না জানিয়ে আমরা বিয়ে করেছি বলে, ওরাও আমাদের না জানিয়ে, আমাদের বাদ দিয়েই বিয়ে করে নিয়েছে। ১৫দিনের শপিং জলে চলে গেলো।

রোজ কিছু না বলে মেঘকে জরিয়ে ধরে বসে রইলো। ৭দিন পর ডিসচার্জ করে দেয় ওদের। বাড়িতে ফিরেই রোজ লক্ষ্য করছে কিছু খেতে ভালো লাগে না ওর, বমি বমি পায়। মাথাটাও মাঝে মাঝে চক্কর দিয়ে ওঠে।
মাসখানেক পর রোজ টের পায় ওর পিরিওড বেশকিছুদিন ধরেই অফ। ভয়ে অটোমেটিক চোখমুখ শুকিয়ে আসে ওর। সেহেরের মেয়ে, ছোঁয়ার ছেলে আর আলিজার দুই ছেলেমেয়ে সবসময় রোজের সাথেই থাকে। তাই ভয়টা আরও জেকে বসেছে।

রাতে চারবার বমি করে রোজ। ডাক্তার এসে রোজের চেক আপ করে যায়। কি হয়েছে সেটা কেউ বলছেই না। ওদিকে রোজের টেনশন বেড়েই চলেছে। মেঘ বাইরে থেকে এসেই ঘুমিয়ে পড়ে। মেঘের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে ও রেগে আছে। তাই রোজও কিছু বলে না।

সকালে টেবিলে বসে তেতুলের আচার খাচ্ছে দিয়া। রোজের লোভ লাগছে আচার দেখে। ইদানিং তেমন কিছু খেতে পারে না বলেই হয়তো আচারের প্রতি ওর এই লোভ।
~ দিয়া আমাকে একটু দে..
রোজের কথায় দিয়া মুখ ভেঙচি দিলো।
~ নিজে গিয়ে নিয়ে আয়। আমি দেবো কেন? এটা আমার। আমার জামাই এনে দিয়েছে। তুই মেঘ ভাইয়াকে বল এনে দিতে।

রোজ মন খারাপ করে চেয়ার টেনে বসলো। মেঘকে কিভাবে বলবে? মেঘ তো রেগে আছে। কিন্তু কেন রেগে আছে? কার ওপর রেগে আছে?

রওশন আর মাহির রোজের এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ দেখে হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে। মাহির দাঁত বের করে হেসে বললো।

~ দিয়াটা ঠিক জায়গায় ঢিল মেরেছে। মেঘ যে পরিমাণে রেগে আছে। ওকে একমাত্র রোজই সামলাতে পারবে।
রওশন দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে বললো।

~ তোমার বোন নিজেই তো বেসামাল। মেঘকে কিভাবে সামলাবে? আর ও এতোটা কেয়ারলেস হলো কবে?
~ খেয়াল রাখার মানুষ পেলে প্রতিটা ব্যক্তিই বেখেয়ালি হয়ে যায়। তারওপর রোজ তখন বিভিন্ন টেনশন নিয়ে ছিলো। কলেজ, নিজের কাজ, আন্টি, মেঘ এদের নিয়ে চিন্তিত ছিলো। তাই ভুল করে ফেলেছে। তবে মেঘও ভুল করেছে। এটা ওকে মানতেই হবে।

~ মেঘের সার্প্রাইজ ওয়েডিং প্লানিংটা মাথায় রেখো। ভুল করা যাবে না। মেঘরোজের বিয়ের জন্য অনেকে অপেক্ষা করে আছে।


পর্ব ১৭

মেঘের সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে রোজ। মেঘ হাতে লাঠি নিয়ে রোজের দিকে ঝুকে বললো।
~ কলেজে তোকে সিড়ি থেকে ধাক্কা মেরেছিলো মুন্নি। সেটা বলিস নি কেন? তোর জন্য কতটা ভুগতে হয়েছে জানিস? এমনকি সবার সামনে অপরাধির মতো মাথাও নিচু করেছি।

~ আমি কি করে জানবো তোমরা আমাকে প্রেগনেন্ট ভাবছো? আমার তো দুপুরেই পিরিওড হইছে। প্রথমে অবশ্য মাথা ব্যাথা আর বমি দেখে ভয় লাগছিলো পরে ভেবে দেখেছি সেদিন তো মেডিসিনটা খেয়েছিলাম আমি।
~ তো এটা যখন হসপিটালে থাকতে জিজ্ঞেস করেছিলাম তখন বলিস নি কেন?

~ আরে বাবা তখন রেগে ছিলাম। ওতো খেয়াল করছি নাকি? এর জন্য তুমি লাঠি নিয়ে আসছো? আমাকে মারতে?
~ এই লাঠি তোর পিঠে ভাঙবো বেয়াদব মেয়ে। জানিস তোর এই না বলা কথার জন্য তোর ব্রেইনে ইনজুরি হয়েছে। এজন্য বারবার বমি আর মাথা ঘুরছিলো। খাটের ওপর মেডিসিন এনেছি নিয়ম করে খাবি।

রোজ খাটের দিকে তাকালো। একবস্তা সমান মেডিসিন। রোজ মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ চোখ মোটা করে তাকায়।
~ সব খেতে হবে?

~ তো কি সো অফ করার জন্য এনেছি ঔষধ? রেগুলার যেন খেতে দেখি। আর শোন আজ থেকে আমরা আলাদা থাকবো। তুই এই রুমে আর আমি পাশের টায়। তোর বয়স কম আমি এখন কোনো রিস্ক নিতে চাইনা। আর কাল থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবে। আমি তেমন টাইম দিতে পারবো না তোকে। তাই ভালো মুখে বলছি টাইম টু টাইম খাবি, ঘুমাবি। নিয়ম সব গোল্লায় যাক। আগে সুস্থ হবি পরে ওসব। ঠিক আছে?

রোজ মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললো। মেঘ রোজকে শুতে বলে নিচে চলে আসে। সবাই কালো মুখ করে বসে আছে। মেঘ ভ্রু কুচকে তাকায়।
~ কি হয়েছে?

দিয়া নিরাশ কন্ঠে বলে,
~ কি ভাবলাম, কি হলো? এভাবে ছ্যাকা না খেলেও চলতো।
মিরাজ উঠে মেঘের কাধে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বললো

~ বলেছিলাম না আমার ভাই এমন না। ও নিজের জান দিয়ে দেবে তাও রোজের গায়ে ফুলের টোকাও লাগতে দেবে না। কিন্তু একটাই ভুল করেছে, সেটা হলো রোজের খেয়াল ঠিক করে রাখতে পারেনি। তো মিস্টার জিনিয়াস সব ব্যবস্থা কি আমরাই করবো? বিয়ে অবধি নাহয় করলাম। বিয়ের পর?

মেঘ মিরাজের দুষ্টুমি বুঝতে পেরে কেশে ওঠে। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো।
~ ভাবিকে বলতে হবে।

মিরাজ একটু দূরে সড়ে দাড়ালো। ” থাক ভাই বাকিটা তুই~ই করিস। ” মিরাজের এমন আহত কন্ঠ শুনে হেসে উঠলো সবাই। রওশন সবার মাঝে এসে দাড়ালো।

~ এবার আমার কিছু বলার আছে। বিষয়টা আমার বোনকে নিয়ে।

মিরাজ ঠোট চেপে হাসছে। রুহি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। রওশন বলে উঠলো।
~ যারা রোজের জন্য আপসেট ছিলার তাদের জন্য রুহি নতুন মেহমান আনছে। খুব শ্রীগহই চলে আসবে সে।
সবাই অবাক হয়ে তাকালো রুহির দিকে। রুহি ব্লাশিং হচ্ছে।

পরের দিন সকালে রোজ ঘুম থেকে উঠেই চমকে যায়। পুরো ঘরের দেয়ালটা মেঘরোজের ছবি দিয়ে সাজানো। বিছানার একপাশে মিনি সাইজের ফ্রিজ। টিভি, ল্যাপটপ সবকিছু সুন্দর করে গোছানো। রোজ ফ্রেস হয়ে বাইরে আসে। বাড়ির ছাদ থেকে মেঝে অবধি ফুলের আবরনে ঢাকা। রোজ মুচকি হাসলো। মিশ্মি এসে রোজকে হলুদ শাড়ি আর ফুলের গহনা দিয়ে সাজিয়ে দেয়।

~ আপু শুধু আমার বিয়ে হবে? তোমাদের বিয়েটা এভাবে হবে না?

~ কি করবো বলো? আমাদের জামাইরা তো আর মিস্টার জিনিয়াস না। তোমার জন্য মেঘ যেসব রেডি করেছে তা আমাদের জামাই একবছরেও রেডি করতে পারবে না। তাই বিয়েটা তোমাদেরই হবে।

~ কেন? আমাদের সাথে তোমাদেরও নিয়ম মেনে বিয়ে হোক। আমি বলবো মেঘরোদ্দুরকে।
~ ধুর পাগলি। এগুলো তো শুধু তোর জন্য। তোকে ভালো রাখার, খুশি রাখার একটা উপায়ও মিস রাখতে চায়না মেঘ। দুবছরের সব কষ্ট এখন একটু একটু করে কমাতে চাচ্ছে।

~ সেসবের কোনো দরকার ছিলো না।
~ কি দরকার ছিলো বা ছিলো না সেটা আমি বুঝবো। মিশ্মি বাইরে যা তুই।
মেঘের ধমকে বাইরে চলে যায় মিশ্মি। মেঘ এসে রোজের মুখে কিছু ঔষধ ঠেসে ঢুকিয়ে দিলো। রোজ পানি দিয়ে গিলছে।

~ ভালোবাসি বলে শাষন করতে ভুলে যাইনি। বলেছি না আগে নিজের খেয়াল রাখবি পরে বাকি সব। মেডিসিন নিস নি কেন? আচ্ছা শোন আন্টিরা এসেছে। তোর বাবাও এসেছে। মিসবিহেভ করবি না। কাঁদবি না, রাগ হবি না। ঠান্ডা মাথায় কথা বলবি।
~ অকে। আর কিছু?

~ শাড়ির আঁচল ঠিক কর। যদি এদিক ওদিক দেখি না.. তাহলে

~ ইদানিং তুমি অনেক বেশি ধমকাও আমাকে। পাল্টে গেছো অনেক। তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও? বোঝা হয়ে তাইনা?

মেঘ কিছু না বলেই চলে গেলো। রোজের চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। গায়ে হলুদের স্টেইজের সামনে ক্যামেরা হাতে দাড়িয়ে আছে মাহির। মিরাজ খাবারের ডেকোরেশন দেখছে, রওশন প্যান্ডেলের দিকটা। শিশির, সম্রাট, স্নিগ্ধ সবাই চলে এসেছে সকালে।

রোজ পাপড়ির সাথে কথা বলছে এমন সময় মেঘ আসলো। মেঘকে দেখে পাপড়ি মুচকি হেসে উঠে যায়। দরজার বাইরে আড়ি পেতে দাড়িয়ে আছে ছোঁয়া আর দিয়া। মেঘ আজ নিজে রোজকে শাড়ি পড়াবে। বিয়ের সাজে সাজাবে। কিন্তু রোজ সেটা চায় না।

~ বেশি বাড়াবাড়ি করিস না রোজ। সবাই আশেপাশেই আছে। তাই আমি কোনো ঝামেলা চাচ্ছি না।
~ আমি একাই পড়ে নিতে পারবো। তোমার কষ্ট করতে হবে না। আমি নিজের কাজ নিজেই করতে পারি।
ছোঁয়া ওদের কথা শুনে অবাক হয়ে দিয়াকে প্রশ্ন করে।

~ কি হয়েছে রে বেবি? ওরা ঝামেলা করছে কেন? রাগারাগি করছে?

~ আরে না। আমরা ভেবেছিলাম রোজ প্রেগনেন্ট। মেঘ ভাইয়া রাগ হলেও অনেক খুশি হয়েছিলো। পরে জানলাম রোজের মাথাব্যাথার জন্য এমন হয়েছে। একটু কষ্ট পেয়েছে ভাইয়া কিন্তু এমন করবে সেটা তো বলেনি।

~ এদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের আগেই ডিভোর্স হয়ে যাবে। দুইটাই বেশি ইমোশনাল।

~ ঘাড়ত্যারাও। আমাদের মধ্যে এই দুই পিসই বেশি শয়তান। মেঘ ভাইয়া তো গিরগিটি, যমের চেয়ের খারাপ। আর রোজ? ওই আরেক ঢংগি একটু ইগনোরেন্স দেখলেই মনে করে ও সবার কাধে বোঝা। এর জন্যই তো ভাইয়া আরও বেশি রাগে
~ নাহ মনে হচ্ছে রোজকে ট্রেনিং দিতে হবে। একটু লজ্জা টজ্জা না পেলে এমন মোমেন্ট জমে না।

~ রোজ আর লজ্জা? দেখো চেষ্টা করে পারো কিনা।

মেঘ রোজের গায়ের শাড়িটা খুলে নিচে রাখে। তারপর লাল বেনারসির আঁচল ঠিক করতে থাকে। ঠিক তখনই ছোঁয়া রুমে ঢুকে যায়। আর চিৎকার দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলে। মেঘ খানিকটা অবাক হলেও রোজ অবাক হয়না। ছোঁয়া যে এমনই সেটা ও ভালো করেই জানে।
রোজ হাই তুলে ছোঁয়াকে জিজ্ঞেস করলো

~ দেখেই তো এসেছো, আবার কি না দেখার কথা বলছো আপু? দরজার নিচ থেকে দিয়ার পা দেখা যাচ্ছে ওরেও ডাকো।
রোজের কথা শুনে দিয়াও ভেতরে চলে আসে। মেঘ ওদের পাত্তা না দিয়ে শাড়ি পড়াতে লাগলো। এদের লাজ লজ্জা দেখতে না পেয়ে ওদের দুবোনেরই লজ্জা লাগছে।
~ ভাইয়া আমরা দেখছি কিন্তু।
দিয়ার কথায় মেঘ হেসে বললো।

~ দেখার জন্যই তো তোমার বন্ধু ডেকেছে তোমাকে। দরজার আড়াল থেকে স্পষ্ট দেখা যেতো না এখন ভালো করে দেখো। আর দাড়াও
মেঘ স্নিগ্ধ আর রওশনকেও ওর রুমে ডেকে পাঠায়। রওশন শাড়ি নিয়ে এসে ওদের এভাবে দেখে ভিমড়ি খায়। মেঘ গম্ভির গলায় বললো।

~ এটা আমার বউ। ওর দিকে নজর না দিয়ে নিজেদের বউকে শাড়ি পড়াও। বেচারিরা আমাদের দেখে দেখেই সাধ মেটাচ্ছে। কি করছো এতোগুলো মাস?

মেঘের কথায় বার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। পরক্ষনেই হেসে ওঠে সবাই। সবার শাড়ি পড়া শেষ হলে আয়নার সামনে বসে রোজ। মেঘ রোজকে গহনা পড়িয়ে দিচ্ছে। রোজ আয়নায় দেখলো দিয়া মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। রোজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেঘ রওশনকে বললো

~ রওশন ভাই? দিয়াকে সাজাও না ক্যান? ছোঁয়ার বিয়ে হয়ে গেছে ধুমধাম করে, দিয়ার তো হয়নি। ওকে সাজিয়ে দাও নতুন করে কবুল বলে নিও।

রোজ মেঘের কথায় হাসলো। মেঘ চোখ সরু করে বললো
~ হাসছিস কেন?
~ এখন কি হাসতেও পারবো না?

~ দেখছিস না লিপস্টিক পড়াচ্ছি। লেপ্টে গেলে ডায়নি ডায়নি লাগবে। যে চেহারা তারওপর
~ এতই যখন খারাপ দেখতে তখন বিয়ে করছো কেন? যাও না মুন্নির কাছে যাও। আমার থেকে ও বেশি সাদা। বয়লার মুরগি একদম।
~ চুপ করবি? নাকি মার লাগাবো।

ওদিকে রুহি আর মিরাজ বসে বসে খাবার টেস্ট করছে। সেটা দেখে মিশ্মি মুখ ভেঙচি দেয় মিরাজকে।
~ ভাবিরটা নাহয় বুঝলাম কিন্তু তুই মেয়েদের মতো হ্যাংলামি করিস কেন ভাইয়া? আমার প্লেট থেকেও নেওয়া লাগে? জীবনে খাস নাই কিছু?
রুহি হাসতে হাসতে বলে

~ ঠিক বলেছো। আমাদের মাঝে এসে কেমন করছে দেখো। কোনো কাজকাম নেই শুধু আমাদের প্লেট নিয়ে টানাটানি করে।
মিরাজ রেগে বলে,

~ বসে বসে গিলছো তো, টের পাচ্ছো না আমার কষ্ট। যদি আমার মতো খাটতে তখন বুঝতে। ক্যান যে মেঘ আমার ভাই হলো। কাজ করিয়ে করিয়ে আধামরা বানিয়ে ফেলতেছে।

মিরাজের কথায় ক্ষেপে গেলো মিশ্মি আর রুহি। মিরাজের হা থেকে লেগপিসটা কেড়ে নিয়ে বাবুর্চিদের নিষেধ করে দিলো মিরাজকে যেন কিছু খেতে না দেয়। রোজ ছাদ থেকে এসব দেখছে আর হাসছে। হঠাৎ পেছন থেকে আরু ডাক দিলো।
~ রোজ।
রোজ পেছন ঘুরে তাকাতেই আরু এসে রোজকে জরিয়ে ধরলো রোজ হেসে বললো
~ কেমন আছো আরুপি?

~ আজ আমি খুব খুশি। তাই এই খুশির কারনটা সবার আগে তোমাকে বলতে চাই।
~ আমাকে কেন? শিশির ভাই কি দোষ করলো?

~ যখন কাউকে নিজের মনের কথাগুলো কাউকে বলতে পারছিলাম না তখন তুমি আমাকে আমার ওই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করেছিলে। আর আজ আমার আমিটা তো তুমিই গিফট করেছিলে। শিশিরকে বুঝতে সাহায্য করেছিলে।

~ এবার আসল ঘটনা বলো। কি হয়েছে? খুশির খবর কোনটা?
~ প্রথমত আমি কিছু মুভিতে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দ্বিতীয়ত শিশির আমাকে সবার থেকে, সবথেকে বেশি ভালোবাসে। আর

~ তারপর?
~ একটু আগে রিপোর্ট এসেছে। আমি মা হবো। আমার মধ্যে আরও একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে ভাবতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে।

~ কনগ্রাচুলেশন আরুপি। গিফটটা পাওনা রইলো। তোমাদের সবার গিফট একসাথে পাবে। কাউকেই তো কিছু দিতে পারিনি। নিচে দেখো আপু আর ভাইয়ারা প্লেট নিয়ে ঝগড়া করছে।

~ হুম কিন্তু তোমাকেও এবার নিচে যেতে হবে কাজী এসেছে। মেঘকে দেখলাম সিড়িতে দাড়িয়ে আছে, আমাকে দেখেই বোধ হয় উপরে আসেনি।
~ চলো।

কাজীর সামনে চারজনই চুপচাপ বসে আছে। দিয়া লজ্জায় লাল, নীল বেগুনি হতে শুরু করেছে। ওদিকে রোজের বিরক্ত লাগছে একে~তো শরীর খারাপ তারওপর এতোক্ষন শাড়ি পড়িয়ে রেখেছে।
~ আর কতক্ষন লাগবে? বিয়ে দিতে এতো সময় লাগে ক্যান? ছেলেমেয়ে যখন সামনেই বসে আছে তখন তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেড়ে ফেলুন তো কাজী সাহেব।

রোজের কথায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় কাজীসাহেব। বিয়ের কনের মুখে এ কি কথা? লজ্জার কোনো বালাই নাই। কাজী আলতো করে রওশনকে কবুল বলতে বলে। রওশন একদমে তিনবার কবুল ফেললো। সেটা দেখে মেঘ ঠোট চেপে হাসছে। এবার দিয়ার পালা। দিয়ার মুখ থেকে কোনো কথাই বের হচ্ছে না। রোজ গালে হাত দিয়ে আড়চোখে সবটা দেখছে।

~ কি রে কবুল বল.. কবুল বলতেই এতো লজ্জা, বাসর রাতে কি করবি? ফাস্ট বল আমার বিয়েটাও তো হবে। নাকি?
রোজের কথায় কান্না চলে আসে দিয়ার। ভয় লজ্জা আষ্টেপিষ্ঠে ধরেছে ওকে। কান্নাভেজা গলায় দিয়া অস্পষ্ট ভাবে বললো।
~ প্রথমবার তো।

রোজ হেসে উত্তর দেয়।
~ তো বিয়ে মানুষের কয়বার হয়? রওশন ভাইয়ের আগে হয়েছিলো নাকি? যে সে একবার বলাতেই কবুল বলে দিলো। চোখ বুজে একবার জোরে শ্বাস নিয়ে বলে ফেল।

দিয়া রোজের কথামতো একবার জোরে শ্বাস নিয়ে কবুল, কবুল, কবুল বললো। যতবারই ও কবুল বলেছে ততবারই ওর গলা কেঁপে উঠেছে সেটা দেখে রওশনের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ে। কাজী সাহেব রোজের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকায়। রোজ হেসে বলে
~ কি দেখছেন? আরেকটা বিয়ে বাকি আছে তার কাবিননামা বের করুন।

মেঘ বললো

~ দাড়ান। কাবিননামা আমি দিচ্ছি। দেনমোহর হিসাবে আমার সব সম্পত্তি থাকবে। সবটা রোজের নামে।
~ নো ওয়ে। আমার নামে আজ অবধি কোনো সম্পত্তি ছিলো না। সো এরপরেও থাকবে না। সবটা তোমার নামেই থাকবে।

~ ঝামেলা করবি না একদম। চারপাশে এতো মানুষ কি ভাববে ওরা?
~ যা ভাবে ভাবুক। এসব হবে না মানে হবে না।

~ রোজ ভালো হচ্ছে না কিন্তু। আমার যা আছে তা তো তোরই। শুধু নামটা চেঞ্জ হবে।
~ সেটাই তো তোমার যা আছে সবটা আমারই তাই তোমার নামেই থাকবে সব। কাজীসাহেব কি কি বলতে হবে?
কাজী থতমত খেয়ে বলে,

~ কবুল বলুন। তারপর উনি বলবে।
রোজ হাই তুলে বললো

~ আগে ও বলুক। বিকজ ফার্স্টে আপনি বকুল বলেছেন সো আড়চোখে দেখলে ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিবে।
রোজের কথা শুনে কেশে উঠলো মেঘ। বাকিরা জোরে জোরে হাসছে। আরিশ [ সম্রাটের ছোট ভাই] তন্নি [ আরিশের বউ] রিতীমত সিটি দিচ্ছে।

মেঘ রোজের চোখে চোখ রেখে কবুল বললো।
~ কবুল, কবুল, কবুল।
রোজ চোখ না নামিয়েই কবুল বলে দিলো

~ কবুল, কবুল, কবুল।
স্টেজের পাশ থেকে রায়ান চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে।

~ মিস্টার & মিসেস জিনিয়াস এতো বেশরম হলে কিভাবে চলে? বাচ্চা~কাচ্চা গুলাকেও কি এমন বানাবি? আমাদেরও চান্স টান্স দিস। বেকার বসে আছি বুঝিসই তো।
রোজ বাঁকা হেসে বললো

~ বেকার থাকতে বলেছে কে? পাত্রি তো পাশেই আছে। কাজ সেড়ে ফেললে মেঘের আগে তোমার বাচ্চা~কাচ্চায় বাড়ি ভরে যাবে।

রোজের কথা শুনে ভয়ে ভয়ে সামনে তাকায় রায়ান। রিলেটিভরা সন্দেহের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বংশের সবথেকে ভালো বাচ্চা হিসাবে রায়ানকে সবাই চেনে। এতভদ্র একটা ছেলে তলে তলে টেম্পু চালায় এটা ফাঁস করার কি খুব দরকার ছিলো রোজের?


পর্ব ১৮

রাত ২টা। ছাদে দাড়িয়ে একমনে চেয়ে আকাশ দেখছে রোজ। তখনই পাপড়ি এসে রোজের পাশে দাড়ায়।
~ আমার অভ্যাসগুলো দেখছি সবই আয়ত্ত্ব করে নিয়েছিস মামনি। কিন্তু আজ এখানে কেন? মেঘকেও দেখলাম বাগানে হাটছে। সেদিন যা হয়েছে সেটা ভুলে যা তো। মেঘ ভুল বুঝে করে ফেলেছে সবটা।

~ ভুলে যেতেই তো চেয়েছি বারবার। কিন্তু ও নিজেই আমাকে সবটা ভুলতে দিচ্ছে না। ওর সাহস হয় কি করে বাবাই এর মুখের ওপর কথা বলার? তারওপর আমাকে কিছু জানায়নি। রাগ দেখিয়েছি। নিজেকে কি মনে করে ও?

~ ওর রাগ করাটা জায়েজ ছিলো রোজ। তুই সবসময় আমার সব কথা শুনেছিস। মেনে চলেছিস। এমনকি সব অপবাদ নিজের ঘাড়ে নিয়ে ওইটুকু বয়সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলি। সবটা করেছিস তোর বাবার জন্য। আর সেই মানুষটা তোকে কি দিলো?

~ সেটা তার আর আমার ব্যাপার আম্মু। তুমি তো আমাকে কখনো শেখাওনি বাবাই কে অসম্মান করতে। তোমার সব রেকর্ড আমি হাজারবার শুনেছি। তোমার মতো হতে চেয়েছি। জিনিয়াস হয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছি। মেঘ কি মনে করেছে ওর সাথে টক্কর দেওয়ার মতো কেউ নেই? আমি চাইলেই আরও পরিশ্রম করতে পারতাম, ওর থেকে বেটার হতে পারতাম। কিন্তু না আমি সেসব করিনি।

আমি চেয়েছিলাম সবাই যেমন মিস্টার পার্ফেক্ট এর বউ হতে চায়। আমিও মিস্টার জিনিয়াসের বউ হবো। আর ও?

~ তুই শুধু নিজের দিকটা ভাবছিস। একবার ভাব ওকে যদি ওর বাবা এভাবে এতোগুলো বছর কষ্ট দিয়ে মাফ চাইতে আসতো, ওকে ভালোবাসা না দিয়ে সম্পত্তির ভাগ দিতে চাইতো তুই কি রাজি হতিস? কুশান যদি প্রথমেই তোকে মেয়ের জায়গা দিতো তাহলে মেঘ এতোটা রিয়াক্ট করতো না।

কিন্তু ও প্রথমেই তোর প্রাপ্য দিতে চেয়েছে। এটা যে কোনো স্বামীর কাছেই অপমানজনক। আজ কাবিননামায় ওর সব সম্পত্তি তোর নামে দিতে চেয়েছে শুধু এই একটা কারনেই।

~ ও আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না আম্মু। আমার মনে হয় সম্পর্কটা বেশিদিন কন্টিনিউ করা সম্ভব না।
~ রোজ এবার কিন্তু তুই বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। এসব শিখিয়েছি তোকে? রেকর্ডিং এ এসব বলেছি? তুই বুঝিস না? মেঘ হসপিটালে থাকাকালীন ৭টা দিন কেন আমাদের তোর সামনে যেতে দেয়নি? আজ তো সব জেনেছিস তবুও ওর দোষটাই তোর চোখে পড়লো?

~ দাড়াও দাড়াও এটার ব্যাপারে আমি সত্যিই কিছু জানি না। আমি শুধু শুনেছি যেদিন ডক্টর এসে আমাকে দেখেছে সেদিন বিকালে মেঘ বাবাইকে অপমান করেছে। আপিলা বলছিলো এটা।

~ আলিজা সবটা জানে না। তাই এমন বলেছে। সেদিন মেঘ নিজের ডিপ ইনজুরি নিয়েও নিজের ট্রিটমেন্ট করায় নি। আগে তোর সুস্থতার ব্যাপারে জেনেছে তারপর নিজের ট্রিটমেন্ট করিয়েছে। আমাকে ফিরে পাওয়ার পর কুশান নিজের ভুল বুঝতে পারে।

আমরা সেদিন হসপিটালে গিয়েছিলাম। মেঘ ওটির বাইরে বসে কাঁদছিলো। কুশান জানতো না তোদের ব্যাপারে তাই ও তোর ট্রিটমেন্টের টাকাটা দিতে চায়। তোকে সুস্থ করতে চায়। তখন মেঘ অনেক রেগে যায়। ও বলে ” আমার বউ এর ট্রিটমেন্ট আমি নিজে করাতে পারবো তার জন্য কারোর হেল্প লাগবে না।

এতোদিন যে মানুষটা নিজের মেয়েকে এভাবে কষ্ট দিয়েছে তার কাছ থেকে নেওয়া এক পয়সা বা জিনিসও আমার বউ এর ধারে কাছে আসবে না। ” এমন এক দু কথায় কুশানও ওকে নানারকম কথা শোনায়। মেঘকে ওটিতে নেওয়ার আগে মেঘ আমাকে রিকুয়েস্ট করেছিলো তোর খেয়াল রাখার জন্য, সেটা ও থাকুক বা না থাকুক।

তোর আগেই ওর জ্ঞান ফেরে। জানিস না ছেলেটা পাগলের মতো করেছে। অথচ তোর সামনে কিভাবে অনায়াসে হাসিমুখে ছিলো শুধু তোর খুশির কথা চিন্তা করে। তোর ব্রেইনে ইনজুরি ছিলো বলে আমার পা ধরে মিনতি করেছে যেন আমরা না যাই, আমরা গেলে তুই বেশি ইমোশনাল হয়ে যেতি। ওর কথা যুক্তিসংগত ছিলো। আবার কিছুটা ভুলও ছিলো। হয়তো তোর অভিমান হতো আমাদের ওপর।

কিন্তু জানতাম ও সবটা ঠিক করে দিতে পারবে। আর ও সবটা আমার কাছ থেকে শুনেই করেছে তাই ও অপরাধি হলে ওর সমান অপরাধ আমিও করেছি।
তুই যেদিন সেন্সলেস হয়ে যাস সেদিনও কুশান মেঘকে নানা কথা শোনায়। মেঘ শুধু বলেছিলো ” বিয়ের আগ অবধি ও আপনার মেয়ে ছিলো, কিন্তু এখন ও আমার বউ।

ও মরুক বাঁচুক সবটা আমি দেখবো। যদি ওর প্রেগনেন্সির জন্য কোনো সমস্যা হয় তখন সেটা আমি বুঝে নিবো। এটা মনে রাখবেন পৃথিবিতে রোজের আগে মেঘের শেষ নিঃশ্বাস পড়বে। কারন রোজকে কারন ছাড়া ভালোবেসেছি আমি। আপনার মতো স্বার্থপর বাবা ভালোবাসার কি বুঝবে? “

মেয়ের প্রতিটা কথা ঠিক ছিলো। কিন্তু কুশান সেটা বিন্দু বিন্দু করে এক সিন্ধু অপমানে পরিণত করে। মেঘকেও অপমান করে। আসল কথা কি জানিস? তোর বাবা ভালোবাসা কি সেটা বোঝেই না। ওকে তো ছোট থেকে চিনি আমি। ও আমার রূপে মুগ্ধ হয়েছিলো,

কিন্তু হুট করে আমাকে হারিয়ে সব রাগটা তোর ওপর দেখায়। এরপর আমি ফিরে আসি। আমি ওকে বোঝাই সবটা কিন্তু ও আবার টাকার হিসাব করতে বসে। আর মেঘের বলা প্রতিটা কথা ওর ইগো হার্ট করে। আমি যদি পারতাম ওকে ছেড়ে চলে আসতাম।

কিন্তু সবাইকে বোঝাবো কিভাবে ও মানসিকভাবে অসুস্থ? মেঘ এটা জানার পরই তোকে বলেছিলো রাগারাগি না করতে। আর তুই তো অভিমান করে আমাদের সাথে কথাই বললি না। মেঘকেও ভুল বুঝলি।

পাপড়ি কিছুটা থেমে আবার বলে
~ মেঘকে ভুল বুঝিস না মামনি। ওর মায়ের পরে তুই~ই একমাত্র মেয়ে যে ওর পুরো জীবনটা জুরে আছে। ওকে কখনো ছেড়ে যাস না। আম্মুর এই কথাটা শোন। পরে নাহয় বাকি কথাগুলো জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নিস।
~ কোথায় ও?
~ বাগানে আছে।

~ আমি কি সত্যিই ভুল করেছি আম্মু? মুন্নির কথাটাও ওকে জানাইনি শুধু অভিমান করে। আর (কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো রোজ), আজ বাবাই এর কথা শুনে ওকে যা নয় তা বলেছি। ও কি মাফ করবে আমাকে?
~ গিয়ে দেখ। আর হ্যা আমার গাড়িটা নিয়ে যাস। মেঘ বোধ হয় কোথাও যাবে।

~ তোমার সাথে কাল এসে ঝগড়া করবো। ওই একসপ্তাহ তোমার জন্য যতটা কেঁদেছি সব শোধ তুলবো কিন্তু আগে তোমার জামাইবাবাকে দেখে আসি। টাটা মামনি, বাবাই এর খেয়াল রেখো গুড নাইট।
~ পাগলি মেয়ে।

রোজ পাপড়ির কাছ থেকে চাবি নিয়ে বাগানে আসলো। মেঘ চেয়ারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রোজ পেছন থেকে গলা খাকড়ি দেয়। মেঘ ভাবলেশহীন হয়ে বসে থাকে।

~ শুনছো?
~ কিছু বলার থাকলে, বলে চলে যা। বাতাস হচ্ছে অনেক। ঠান্ডা লেগে যাবে।

হঠাৎ পেছনে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনে মেঘ পেছন ফেরে। রোজ কান ধরে কাঁদছে।
~ সরি। আমি আর ভুল বুঝবো না তোমাকে। আম্মু সবটা বলেছে আমাকে। সরি মেঘরোদ্দুর। প্লিজ মাফ করে দাও। আমি
~ একটা বেবি এডপ্ট করেছি আমি। দেখতে যাবি?

মেঘের কথায় রোজের কান্না থেমে যায়। অবাক হয়ে মেঘের দিকে তাকালো ও। তারপরই মুচকি হাসলো।
~ চলো।

~ জিজ্ঞেস করবি না কেন এডপ্ট করেছি? আমার কোনো সমস্যা আছে কিনা? বা আমার কোনো এফেয়ার?
~ নাহ। আম্মু গাড়ির চাবি দিয়েছে। চলো বেবি দেখে আসি। আমাদের ফার্স্ট বেবি বলে কথা। চলো, চলো।
মেঘ রোজকে নিয়ে সিটি হসপিটালে আসে। বছর চারেকের একটা বাচ্চা শুয়ে আছে বেডে।

পাশে স্বপ্নিল। স্বপ্নিলকে দেখেই মনে হচ্ছে প্রচন্ড অসুস্থ ও। মেঘ গিয়ে স্বপ্নিলের কাধে হাত রাখলো।
~ ভাইয়া রোজ এসেছে।
স্বপ্নিল রোজের দিকে একনজর তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো।

~ আমার ছেলেটাকে দেখে রেখো রোজ। ও ওর মাকে ছাড়া কিছু বোঝে না। একটু সামলে রেখো ওকে।
~ কি হয়েছে ভাইয়া? আর সাদিয়া ভাবি কোথায় ভাইয়া?

~ তিনদিন হলো এক্সিডেন্টে মারা গেছে সবাই। আমার হাতেও বেশি সময় নেই। ছেলেটার তেমন কিছু হয়নি। কালপরশুর মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে। দেখবে ঘুম থেকে উঠেই তোমাকে জরিয়ে ধরে হু হু করে কাঁদবে।
~ আমাকে কেন?

স্বপ্নিল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো।

~ তুমি সাদিয়ার মতোই হুবহু একরকম দেখতে। কেউ জানেনা এটা। আজও তোমাদের জানাতাম না যদি আমার হাতে সময় থাকতো। মেঘ এডপ্ট করেছে সাফিনকে। জানি আমার ছেলেটা তোমাদের কাছে ভালো থাকবে। তাছাড়া ওর ক্যারিয়ারের পেছনে কিছুটা কন্ট্রিবিউশন রেখে গেছি। প্রয়োজন পড়লে দিও ওকে। আসছি আমি।

রোজ স্বপ্নিলের কথায় পুরো থ। স্বপ্নিল উঠে দাড়িয়ে খোড়াতে খোড়াতে বাইরে চলে গেলো। রোজ ওকে ধরতে চাইলেও পারেনা। তার আগেই বেড়িয়ে যায় স্বপ্নিল। কিছুক্ষন পর খবর আসে স্বপ্নিল সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। খবরটা পেয়ে রোজ পাগলের মতো কাঁদতে শুরু করে। মেঘ স্থীর হয়ে দাড়িয়ে আছে। কারন ও জানতো এমন কিছুই হবে। স্বপ্নিল আগেই ওকে সবটা জানিয়ে রেখেছিলো।

পৃথিবিতে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা ভবিষ্যৎ দেখতে পারে। সাদিয়া ছিলো তেমনই একজন। মৃত্যুর আগে ও’ই স্বপ্নিলকে এগুলো করতে বলে গিয়েছিলো। কারন ও জানতো রোজ কখনো কোনো বাচ্চার ওপর অবিচার করবে না কারন ও নিজেই ছোট থেকে এতিমের মতো থেকেছে। তাছাড়া সাদিয়া আর রোজের চেহারা প্রায় এক। তাই সাফিনের কোনো সমস্যাই হবে না রোজকে মেনে নিতে।

পরদিন স্বপ্নিলকে সাদিয়ার পাশে কবর দিয়ে বাড়ি ফেরে ওরা। সাফিনের জ্ঞান ফিরেছে তাই সাফিনও রোজের সাথেই এসেছে। সাফিনকে দেখে সবাই অবাক। একদম রোজের ডুবলিকেট কার্বন কপি বাচ্চাটা। রোজ সাফিনকে ঘুম পাড়িয়ে ড্রইংরুমে আসলো। মেঘ আগে থেকেই সবাইকে ডেকে রেখেছিলো।

কিছুটা বলেও রেখেছে। রোজ এসে শুধু এটুকুই বললো যে সাফিন ওদের প্রথম সন্তান তাই ওর ব্যাপারে যেন আলাদা করে কোনো কথা তোলা না হয়।

বিকালে সাফিনের ঘুম ভাঙতেই ও স্বপ্নিলকে খুজতে থাকে। রোজ অনেক কষ্টে বুঝিয়ে বলে যে স্বপ্নিল ওর জন্য একটা চাঁদ আনতে গেছে। আর মেঘও ওর আব্বু। রোজের প্রতিটা কথা সাফিন বাণির সমান মেনে শুনতে থাকে। আর সেটাই মেনে চলে। সারা বাড়িতে এতোগুলো বাচ্চা দেখে সাফিনের খুশির সীমা থাকে না।

সাফিন বড় হতে থাকে নিজের মতো। স্বপ্নিলকে প্রায় ভুলেই গেছে। সারাদিন মেঘের সাথে থাকে। মেঘের কাছে ঘুমায়, খায়। আর্যা আর আদ্রিয়ান [ আলিজার টুইন বেবি ] কে নিয়ে খেলে। রোজও সাদিয়ার মতো করে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। সাফিনের পর্যাপ্ত খেয়াল রাখছে।
~ মেঘরোদ্দুর।
~ কিছু বলবে?

~ ধন্যবাদ। আমাকে এমন একটা সন্তানের মা হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
রোজের কথায় হাসলো মেঘ। তারপর একটা ছোট্ট রোবট ওর সামনে ধরলো।

~ নাও তোমার ছেলের জন্য তার ভাই এনে দিলাম। ওকে কিভাবে বোঝাই ওর মা নিজেই বাচ্চা, ওর ভাই~বোন আরও পরে আসবে।
হঠাৎ সাফিন চিল্লাতে চিল্লাতে আসে।

~ জিনিয়াস বাবাই, জিনিয়াস বাবাই আমার ভাই এসেছে?

মেঘ হেসে সাফিনকে কোলে তুলে নিলো। তারপর রোবটটা ওর হাতে দিলো।
~ এই যে তোমার ভাই। এর নাম শাহিন। যাও ওকে নিয়ে খেলো।

~ থ্যাংকইউ জিনয়াস বাবাই। টাটা। চল শাহিন আমরা খেলি
~ একটা রোবট বানিয়েছে বলে বাবাই জিনিয়াস। আর মাম্মা যে সেদিন ড্রোন বানিয়ে দিলো?

রোজের কথা শুনে সাফিন ফিরে আসলো আবার। রোজের গলা জরিয়ে ধরে দুগালে চুঁমু খেয়ে বললো।
~ মাই মাম্মা ইজ দ্যা বেস্ট মাদার অফ দ্যা ওয়াল্ড। সি ইজ মিসেস জিনিয়াস & মাদার অফ ফিউচার মিস্টার জিনিয়াস।

সাফিনের কথায় হেসে দেয় দুজনেই। সাফিন রোবটটা নিয়ে নিচে চলে যায়। রোজও চলে আসছিলো কিন্তু পেছন থেকে মেঘ ডাক দিলো ওকে।

~ আজকের তারিখটা মনে আছে? আজ থেকে ঠিক একবছর আগে যেদিন রায়ান মুন্নির সাথে ব্রেক আপ করে সেদিন তোকে ও সিড়ি থেকে ফেলে দিয়েছিলো।

মেঘের কথায় ভ্রু কুচকে তাকায় রোজ। এই ব্যাপারটা নিয়ে তো আর কোনো কথা তোলা হয়নি তাহলে মেঘ আজ হঠাৎ একথা কেন বলছে? হ্যা সেদিন বিকালে মুন্নি মেঘের নাম করেই ছাদে ডাকে রোজকে। রোজও যায় কিন্তু ছাদে কাউকে দেখতে না পেয়ে নেমে যাচ্ছিলো ও। তখনই পেছন থেকে কেউ একজন ধাক্কা দেয় রোজকে।

রোজ পড়ে যাওয়ার সময় মুন্নির হাসির শব্দ শুনেছিলো কিন্তু সেটা যে মুন্নিই সেবিষয়ে সিউর ছিলো না ও। পরের দিন জ্ঞান ফিরতেই হাসপাতালে সাদিয়াকে দেখতে পেয়েছিলো, সাদিয়াই বলেছিলো যে “ও মুন্নিকে দেখেছে রোজকে ধাক্কা দিতে। কিন্তু এটা যেন রোজ নিজে কাউকে না বলে”
রোজ প্রশ্ন করে,
~ কেন?
~ আজ মুন্নির ডেডবডি পাওয়া গেছে। ছাদ থেকে নাকি লাফ দিয়েছে। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত লাগলো। মরার হলে এতোদিন মরেনি কেন? আজকের ডেট টাতেই লাফ দিলো?
ভয়ে আৎকে ওঠে রোজ। সাফিন রোবটটা নিয়ে উপরে আসে। রোজকে কাঁদতে দেখে সাফিন রেগে যায়। তেড়ে এসে মেঘের দিকে রাগি চোখে তাকায়।

~ জিনিয়াস বাবাই তুমি মাম্মাকে কাঁদাচ্ছো কেন? মাম্মা কি হয়েছে তোমার? কে কষ্ট দিয়েছে? বাবাই কিছু বলো।
~ তোমার মাম্মা একটা আন্টির কথা মনে পড়ায় কাঁদছে সাফিন।

সাফিন মেঘের গলা জরিয়ে ধরে ফিসফিস করে বললো।

~ তোমাদের যারা যেভাবে কষ্ট দিবে তারাও তেমন ভাবেই কষ্ট পাবে বাবাই। আমি তোমাদের কষ্ট দেখতে পারবো না। তোমার ওপর রাগ করেছিলাম আমি, তুমিও আমার ওপর রাগ করো কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেওনা।
সাফিন তোমাদের ছাড়া একা, খুব একা। ওকে ছেড়ে যেওনা মেঘরোজ।

মেঘের সারাশরীর ঝাড়া দিয়ে উঠলো। কেমন জানি সাদিয়ার কন্ঠ মনে হলো। রাতে সাফিনকে নিয়ে ঘুমায় ওরা। মাঝরাতে মেঘ টের পায় সাফিন খাট থেকে নেমে যাচ্ছে। মেঘ মাথা তুলে তাকায়। করিডোরে সাদা আলোয় কিছু জ্বলছে আর সাফিন হাসছে। মেঘ উঠে ওখানে গেলো সাথে সাথে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যায়। সাফিনও মেঘকে দেখে ভয় পেয়ে যায়।
~ এখানে কি করছো বাবা? একা নেমেছো কেন? আমাকে ডাকতে, বাথরুমে যাবে?

~ জিনিয়াস বাবাই একটা কথা আমি তোমাদের বলিনি। আমার আম্মু পরি হয়ে গেছে। আমি জানি তোমরাও আমার আব্বু আম্মু কিন্তু আজ আমার আম্মু আমার থেকে বিদায় নিয়ে গেছে।

~ সাফিন বাবা তোমার আম্মু ওই তো খাটে ঘুমাচ্ছে। তোমার আম্মু তোমাকে ছেড়ে যাবে কেন? তোমার আম্মু কোথাও যাবে না, তোমার কাছেই থাকবে। কিন্তু তুমি কার সাথে কথা বলছিলে এখানে দাড়িয়ে?

~ ওটা রোজ মাম্মা, বাবাই। আমি সাদিয়া আম্মুর কথা বলছি। আমার আম্মু চলে গেছে। মানুষের মাঝে পরিরা থাকে এটা তোমরা বিশ্বাস করো না বলে আম্মু আমাকে এটা বলতে মানা করেছিলো। আর আজ আম্মু আমাকে তোমাদের কাছে রেখে গেলো। আর আসবে না আম্মু। একেবারে চলে গেছে।

মেঘ.. সাফিনের ধারনা, ভুতের গল্প পড়ার সাইড ইফেক্ট ভেবে এড়িয়ে গেলো। তারপর ওকে কোলে তুলে নিয়ে শুয়ে পড়লো। এরপর আর সাফিনের এমন কোনো অদ্ভুত কাজ চোখে পড়েনি।


পর্ব ১৯

২বছর পর,

আজ সাফিনের জন্মদিন। আহমেদ ভিলা রঙিন ফুলে সজ্জিত হয়েছে। সবাইকে নিজে ইনভাইট করেছে মেঘ।
কারন জন্মদিন শেষে সবার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে। রোজ সাফিনের প্রিয় চকলেট কেক বানিয়ে টেবিল গুছিয়ে রাখে। সাফিন….. ‘ আদ্র ‘, ‘ আর্যা ‘..
স্নিগ্ধ ছোঁয়ার মেয়ে ‘ শাহরিয়ার’

সম্রাট ও সেহেরের ছেলে ‘ ইশানি’
মিরাজ রুহির মেয়ে ‘মিরা’

আরু শিশিরের টুইন ছেলে ‘ আরিয়ান ‘ আয়মান ‘
মাহির মিশ্মির মেয়ে ‘ সুস্মি ‘।

সব বেবিদের নিয়ে খেলছিলো। তখনই দেখলো এক অদ্ভুত শক্তি ওদের ড্রেস আপ চেঞ্জ করে দিচ্ছে। সবাইকে প্রিন্স প্রিন্সেসদের সাজে সাজিয়ে দিচ্ছি। আর্যা ভুত ভুত বলে চিল্লাবে তার আগেই সাফিন হাত ঘুরিয়ে বললো
~ ইট্স ম্যাজিক আর্যা। ডোন্ট ক্রাই। লুক এট মাই হ্যান্ড।

আর্যা ম্যাজিক ভেবে খিলখিল করে হেসে ওঠে। সাফিন আস্তে করে বলে
~ থ্যাংক ইউ আম্মু।

রাতে কেক কেটে খেয়ে নিলো সবাই। মেঘ ল্যাপটপ অফ করে ড্রইংরুমে এসে বসে। সবাই অধির আগ্রহে বসে আছে। রোজ সাফিনকে ঘরে পাঠিয়ে মেঘের পাশে এসে বসে।

~ আজ কার মনে কি প্রশ্ন আছে সব করো। উত্তর পেয়ে যাবে।

মেঘের কথায় সবাই একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে। পাপড়ি হাসছে সবার অবস্থা দেখে। কেউ কিছু না বলায় পাপড়ি নিজেই বলে ওঠে।

~ সবাই প্রশ্ন সাজিয়ে বলতে পারছে না। ওদের হয়ে কি আমি প্রশ্ন করতে পারি? অনুমতি কি পাবো?
~ অবশ্যই আম্মু। লেডি গ্যাংস্টার প্রশ্ন করবে বলে কথা। এমন সুযোগ কি বারবার আসে?

পাপড়ি এসে মেঘের সোজাসুজি বসে। মেঘ হাসছে পাপড়ির কাজে। বাকি সবাই ওদের কাজে খানিকটা ভড়কে গেছে।

~ প্রথম প্রশ্নঃ রোজকে কিভাবে চেনো? কতবছর ধরে ভালোবাসো? এবং কোন সূত্রে ওর খোজ জেনেছো?
~ রোজকে প্রথম দেখেছি তোমার সাথে। সূত্র পাপড়ি থেকে এবং তোমাদের বাড়ি থেকে ওর খোজ জেনেছি। ভালোবাসি তখন থেকে যখন বুঝতে পেরেছি ওকে ছাড়া একমুহূর্ত চলতে পারবো না।

~ ২য় প্রশ্নঃ মুবিনের সাথে, মুন্নিদের সাথে তোমার সম্পর্ক কি?

~ মুবিন খাঁন আমার আম্মুর সৎ ভাই + খুনি। সে হিসাবে সে আমার কাছে অপরাধি ছাড়া কিছুই নয়।
~ ৩য় প্রশ্নঃ মিরাজ রুহি, মাহির মিশ্মি এদের চারজনের প্রেমের মূল ঘটনা কি?

~ আমি আর রোজ এটা অনেক আগে থেকে প্লানিং করে রেখেছিলাম। কারন আমাদের ওদের চারজনকে একসাথে দেখতে ভালো লাগতো। পরে আমরাই এদের মধ্যে মিথ্যা বলে সেটিং করিয়েছি। [ মেঘ, রুহি আর মিশ্মিকে বলেছিলো মাহির আর মিরাজ ওদের ভালোবাসে। আর রোজ মিরাজ আর মাহিরকে বলেছিলো যে রুহি আর মিশ্মি ওদের ভালোবাসে। ]

রোজ অন্যদিকে তাকিয়ে এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন ও কিছু জানেই না। রুহি নড়ে চড়ে বসে। তারপর মেঘকে প্রশ্ন করে।

~ মানে?
~ মানে পাঁচ বছর আগে আমি যখন রোজের সাথে ছিলাম। তখন থেকেই তোমাদের এক করার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। পরে মুন্নির কাছ থেকে খোজ জানার জন্য আমি রোজের কাছ থেকে দূরে সড়ে আসি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় প্লানিং আমার একার না। রোজেরও ছিলো। রোজ তোমাকে অনেক আগে থেকে চিনতো। বিয়ের দিন নাটক করেছে. এক্ট্রেস বলে কথা।

রোজ চোখ মোটা করে তাকাতেই মেঘ পাপড়ির দিকে তাকায়। পাপড়ি হেসে বলে।
~ হুম তারপর। কুশানের ব্যাপারটা বলো।

~ আংকেল যে মানসিক ভাবে অসুস্থ সেটা জানতাম না আমরা। সেদিন বিকালে আংকেল রোজের প্রেগনেন্সি নিয়ে অনেক কথা শোনায় আমাকে। আর তার পরিবর্তে আমিও দুচার কথা শোনাই পরে যখন পাপড়ি আম্মু বলে সবটা তখন বুঝতে পারি যে আমি ভুল করেছি। তখন থেকেই রোজের সাথে নরমাল বিহেভ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু ওই ঘাড়ত্যারা টাই বারবার ঘাউড়ামি করছে।

রোজ এবার অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেঘের দিকে। সব ঠিক আছে কিন্তু সবার সামনে ঘাউড়া বলবে? পাপড়ি বললো।
~ রাগারাগি করা চলবে না। সবাই জানতে চাচ্ছে কাহিনিটা। সেদিন মুবিনের গোডাউন থেকে কিভাবে পালালে?
~ সব পথ যখন বন্ধ হয়ে যায় মেঘ তখন নিজেই রাস্তা তৈরি করে নেয়।

(ভাব নিয়ে বললো কথাটা) যখন সব দরজা জানালা বন্ধ ছিলো তখন গোডাউনের একদম উপরে একটা কাঁচের দরজা ছিলো, সামনে থাকা বস্তার ওপর অনেক কষ্টে উঠে ওটা ভেঙে লাফ দিয়েছিলাম আর আসার সময় ওদের বারুদ ভর্তি বাক্সতে ফায়ার করেছিলাম যার কারনে ব্লাস্ট হয়েছিলো গোডাউনটা।
রোজ আড়চোখে তাকালো।

~ যে আকাইম্মা। সে নাকি নায়কের মতো লাফ দিসে। কপাল ভালো ছিলো বলে বেঁচে গেছো। এতে এতো লাফানোর কিছু হয়নি। ভাব দেখানো বন্ধ করো হাহ।

ঘাউড়ার বলার পরিপ্রেক্ষিতে আকাইম্মা?

রোজের কথা শুনে মেঘ বাদে সবাই শব্দ করে হাসে। রোজ প্রশ্ন করে
~ বাকি সবকিছুর উত্তর সবাই জানে কিন্তু মুন্নির মৃত্যুর ব্যাপারটা ধোয়াশা থেকে গেলো।
মেঘ এবার সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো।
~ উত্তরটা শোনার জন্য সবাই প্রস্তুত না।

~ তার মানে তুমি জানো। আমরা জানতে চাচ্ছি উত্তরটা।
~ সাফিন ধাক্কা দিয়েছিলো মুন্নিকে।

মেঘের উত্তর শুনে চট করে একসাথে সবাই মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ ওদের তাকানো টা উপেক্ষা করে বললো।
~ আমি সিসি টিভি ফুটেজ চেক করে দেখেছি। ওখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সাফিন হাসতে হাসতে মুন্নিকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
রোজ রেগে দাড়িয়ে যায়।

~ আমার ছেলের নামে আর একটাও বাজে কথা বলবা না। ও সেদিন সারাক্ষন আমার সাথে ছিলো। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
~ আমি ভুল বলছি না। ভিডিও আছে আমার কাছে।
মেঘ ফোনের একটা ভিডিওটা সবার সামনে তুলে ধরলো। যেখানে স্পষ্ট সাফিনকে দেখা যাচ্ছে। চার বছরের একটা ছোট বাচ্চা মুন্নিকে টানতে টানতে ছাদের কর্নারে নিয়ে ধাক্কা দিয়েছে। দিয়া ভয়ে রওশনের পেছনে গিয়ে দাড়ালো। রোজ অশ্রুসিক্ত চোখে মেঘের দিকে তাকালো।

~ আমার সাফিন। এটা ডিলিট করে দাও। কাউকে বলো না প্লিজ। আমার সাফিন এটা করেনি। সাফিন বাচ্চা।
~ এটা সাদিয়া ছিলো। আর আমি দেখার পরপরই এই ভিডিও সব কম্পিউটার থেকে মুছে গেছে। তাই আমরা বাদে আর কেউ সাফিনের কথা জানতে পারবে না।

কথা বলার মাঝেই মেঘ পকেট থেকে একটা বন্দুক বের করে কাজের ছেলেটার কপাল বরাবর গুলি করে। এটা দেখে দিয়া আর আরু সেন্সলেস হয়ে যায়। রোজ অবাক হয়ে মেঘের দিকে তাকায়।

~ ও সাফিনকে চুরি করতে এসেছিলো। দুবছর ধরে সাফিনকে পাহাড়া দিচ্ছে। কয়েকদিন আগে ফোনে এসব বলছিলো একজনকে। তখন সিউর ছিলাম না। এখন সিউর হলাম কারন ও সাফিনের দুধে কিছু মিশিয়েছে।
মাহির ভাই লাশটা গুম করে দিও।

মাহির মাথা নেড়ে সায় দিলো। কিছুক্ষন পর সাফিন গুটি গুটি পায়ে নিচে নামে। রোজ সাফিনকে দেখে কিছুটা ভয় পায়। তারপরই ভাবে এই বাচ্চাটার মা তো ও’ই। সাফিন যেমনই হোক না কেন ও রোজের সন্তান। তাই যা হয়ে যাক না কেন ও সাফিনের থেকে কিছুতেই দূরে যাবে না। সাফিন এসে রোজের সামনে মাথা নিচু করে দাড়ায়।
~ কি হয়েছে আমার সাফিনের?

~ আমাকে তুমি গিফট দাওনি মাম্মা। বাবাই’ও কোনো গিফট দেয়নি। তোমরা বাদে সবাই দিয়েছে। তোমরা দিবা না?
মেঘ আর রোজ হাটু গেড়ে সাফিনের সামনে বসে।
~ কি চায় আমাদের সাফিন?

~ আমার একটা চাঁদ চাই।
~ তুমিই তো আমাদের চাঁদ। বলেছিলাম না মাহতাব মানে চাঁদ। আর সাফিন মাহতাব হলো সাফিন চাঁদ। তাহলে আবার কোন চাঁদ লাগবে?

~ মাম্মা তুমি তো বলেছিলে স্বপ্নিল আব্বু চাঁদ আনতে গেছে। কাল রাতে আম্মু আমাকে বলেছে তোমাদের কাছে চাঁদ চাইতে। তোমরা নাকি আমাকে ছোট চাঁদ মানে লিটিল মুন এনে দিবা।
~ লিটিল মুন? কেমন মুন সেটা?

~ আয়মানের মতো ছোট আর আর্যার মতো মিষ্টি মুন। সবার বোনু আছে আমার নেই কেন? আমারও লিটিল মুন চাই। যে সবসময় আমার সাথে থাকবে। আর্যারা তো থাকে না। তখন একা একা লাগে আমার।
দিয়া পানি খেয়ে হাসতে হাসতে বলে।

~ কতদিন আর ধোকা দিবি? সেদিন ছ্যাকা দিয়েছিলি সেই যে বাঁকা হইছি আর সোজাই হইনি। এবার মনে হয় সোজা হওয়ার সময় হয়েছে।

দিয়ার কথায় ঠোট চেপে হাসে সবাই। রোজ অসহায় মুখ করে মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো

~ আমার দিকে তাকাচ্ছো কেন? তোমার ছেলে তোমার কাছে চাঁদ চেয়েছে। এনে দাও। তুমি না মিসেস জিনিয়াস? যা ইচ্ছা তাই করতে পারো এবার আনো লিটিল মুনকে।
পাপড়ি ওখান থেকে চলে যায়। ছোঁয়া গলা খাকড়ি দিয়ে বলে।

~ চাইলে ব্যবস্থাটা আমিই করে দিতে পারি। এসবে এক্সপার্ট ছোঁয়া।
স্নিগ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
~ এটা কারোর অজানা না। সবাই জানে তুমি কি জিনিস।
~ জিনিস? এই তোমার সমস্যা কি? বহু কষ্টে একটা মেয়ে এনেছি। তোমার স্বভাব দেখলে না কোনো মেয়েই টিকতো না। মেয়েলি সব ব্যাপার তোমার মধ্যে বিদ্যমান।

~ হ্যা। মেয়েই তো বলবা। বাচ্চাটা তো উড়ে উড়ে আসছে। আমার তো কোনো ক্রেডিটই নাই। তাইনা?

~ কোন বালের ক্রেডিট আছে? ১৫দিন ধরে শুধু ঘুরতে হইছে এটা বোঝানোর জন্য যে আমি বাচ্চা না। তারওপর যখন রাজি করিয়েছি তার পরেও একসপ্তাহ ঘুরাইছো। কোন পুরুষরে দেখছো বিয়ের পর বউকে এমন ঘোরাতে?
স্নিগ্ধ দ্রুত ছোঁয়ার মুখ চেপে ধরে। সবাই আড়চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

স্নিগ্ধ হাসার চেষ্টা করে বললো।
~ আমি মজা করছিলাম রে বাবা। তোমার মতো বউ পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।
ছোঁয়া স্নিগ্ধর হাতে কামড় দিতেই স্নিগ্ধ হাত সড়িয়ে নেয়।

~ আবার বাবা বলছো? নেক্সট টাইম বললে খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম। যেদিন আমাকে টাচ করছো সেদিন তোমার রিয়াক্শন কেমন ছিলো সেটা জানিয়ে দিবো সবাইকে। মনে রেখো।


শেষ পর্ব

সাফিনের জন্মদিনের পর আরও একটা বছর কেটে যায়। আজ রোজের ডেলিভেরি। ওটি শেষে নার্স দুটো ফুটফুটে মেয়ে বাবু মেঘের কোলে দিয়ে গেলো। ধবধবে সাদা চেহারায় বাদামি রং এর চোখ মোহিত করছে সবাইকে।

সাফিন একটা বাবুকে নিজের কোলে দিতে বললো। সাফিনের কথায় মেঘ নিচে বসে সাফিনকে বাবু দেখায়।
~ তুমি ছোট সাফিন। বোনুদের কোলে নিতে পারবে না। ওরাও তো অনেক ছোট।

~ ওদের তো নিতে চাচ্ছি না। এই হালকা সাদা বাবুটাকে নিতে চাচ্ছি। সুন্দর বাবুটা তুমি রাখো। এই হালকা সাদা বাবুটাই আমার মুন।

~ কি করে বুঝলে এটা তোমার মুন?
~ কারন এর কপালেও আমার আম্মুর মতো ছোট তিল আছে।

মেঘ এবার নড়ে চড়ে বসে। সাফিনকে চেয়ারে বসিয়ে ওর কোলে মুনকে রাখে। সাফিন শক্ত চেপে ধরে মুনকে। যেন একটু আলগা হলেই মুন হারিয়ে যাবে ওর থেকে। রোজকে একটু পর কেবিনে দেওয়া হবে। আরাভ আর রায়ান সেদিকটা দেখছে। মেঘ সাফিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।

~ তোমার সাদিয়া আম্মু এখনও আসে সাফিন?
~ নাহ বাবাই।
~ কেন আসতো সেটা জানো তুমি? তোমার সাথে খেলতো আম্মু?

~ ধুর। আমি কি ছোট যে আমার সাথে খেলবে? আম্মু তো শুধু আমার জন্মদিনে আসতো। কিন্তু লাস্ট বার এসে বলে গেছে সে নাকি আর কখনো আসতে পারবে না। সে নাকি আমাদের চাঁদনি গিফট করে যাচ্ছে। তাই তো তোমাকে আমি লিটিল মুনকে আনতে বলেছিলাম।

~ আচ্ছা।
~ তুমি কি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাও আমাকে?

~ নাহ। তুমি মুনকে নিয়ে বসে থাকো। বিকালে বাড়ি যাবো আমরা।

~ আমি বুঝতে পারি বাবাই যে তুমি কিছু জানতে চাও। আমি এখন জানি সবকিছু। সাত বছর হয়ে গেছে আমার তাই আম্মু আমাকে সব বলে দিয়েছে।

আম্মু পরি ছিলো, স্বপ্নিল আব্বুকে আম্মু ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। বিয়ের একবছরের মাথায় আমি হই। আম্মু নাকি শুধু আব্বুকে দেখার জন্যই কলেজে ভর্তি হয়েছিলো। তখনই রোজ মাম্মাকে দেখে আম্মু। প্রথমে অবাক হলেও কিছু বলেনা।

পরি বলে, আম্মু সব সময় পর্দায় থাকতো। তাই আব্বু আর দাদু ছাড়া কেউ আম্মুর চেহারা দেখতে পারেনি। পাশাপাশি আম্মু জানতো আব্বু আর দাদু বেশিদিন বাঁচবে না। আব্বু সিড়ি থেকে স্লিপ করে পড়ে যাবে আর দাদু এক্সিডেন্ট করবে। তাই আম্মু দাদুর সাথে সেদিন গাড়িতে গিয়েছিলো যার কারনে এক্সিডেন্টে দাদুর পাশাপাশি আম্মুকেও মৃত বলা হয়।

আমি প্রথমে মাম্মাকেই আম্মু ভাবতাম। মাম্মা আমাকে কখনো ফিল করতে দেয়নি যে আমি তার ছেলে নই। সেদিন মুন্নিকেও আমি না, সাদিয়া আম্মু মেরেছিলো। ফায়দা ছিলো যে সাদিয়া আম্মু সবার রূপ ধারন করতে পারতো।

যেহেতু আমি মাম্মাকে ভালোবাসি তাই আম্মু আমার রূপেই মুন্নিকে মেরেছে যেন তোমাদের জীবনে কোনো কষ্ট না আসে। আমি যেন কোনো কষ্ট না পাই। আমাকে তোমরা এডপ্ট করেছো কিন্তু তোমরা কি জানো আমি কেন তোমাদের সাথে আছি?

মুনের জন্য। তোমাদের একটা মেয়েকে আমি বিয়ে করবো। এতে তোমরা বাঁধা দিতে পারবে না কারন আমি না তোমাদের নিজের ছেলে না ওদের ভাই।

আমার কোলে যে বাচ্চাটা আছে একে চাই আমি। সবসময়ের জন্য কাছে চাই একে। ভয় নেই আমি জ্বীন নই। আমিও তোমাদের মতোই মানুষ। আম্মুকে আর পাবো না বলে মুনকে আকড়ে ধরতে চাচ্ছি। গতকাল আম্মু বলে গেছে যে সে আর কখনো আসবে না। ছোট ছিলাম, কষ্ট পেতাম বলে এই তিনবছর এসেছে।

কিন্তু আর আসতে পারবে না। তাই আমাকে মুনকে নিয়েই থাকতে হবে। আমাকে কি তোমাদের মুন দেবে না? আমি কখনো ওকে কষ্ট দেবো না। তোমাদের আরেকটা মেয়ে তো আছে। তোমরা ওকে নিয়ে থাকো, আমি মুনকে নিয়ে থাকি?

সাফিনের কথায় মেঘের চোখ কোটর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলো। এইটুকু ছেলে এসব কি বলছে? মেঘের এখন কি বলা উচিত?

~ আচ্ছা আগে বড় হও তারপর মুনকে তোমার সাথে বিয়ে দিবো। এখন তো ছোট তোমরা।
~ সত্যিই দেবে?

~ হ্যা দিবো। এখন মুনকে আমার কাছে দাও। আর তুমি গিয়ে চাচ্চুদের সাথে ঘুরাঘুরি করো।
~ আমি কি তোমার মতো বাবাই? মাম্মাকে ছেড়ে যাওয়ার পর মাম্মা যেমন তোমার জন্য কষ্ট পেয়েছে, আমি চাইনা মুনও আমার জন্য তেমন কষ্ট পাক। বুঝেছো?

সাফিনের কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেঘ। পিচ্চি দেখি ওর চেয়েও বেশি স্মার্ট। এই বয়সেই এতো পাঁকা পরে কি হবে আল্লাহই জানে।

সাফিন কিছুটা থেমে আবার বলে
~ তুমি মাম্মার জন্য যে বাড়িটা বানাচ্ছো সেটা মাম্মাকে কবে গিফট করবা বাবাই?
সাফিনের কথায় চমকে তাকালো মেঘ। এই কথাটা ও জানলো কিভাবে?

~ তুমি জানলে কিভাবে?

~ সাফিন সব জানে। মাম্মার স্বপ্ন ছিলো ঢাকায় একটা বড় বাড়ি বানাবে যেখানে মাম্মার সকল প্রিয়জন ভালোবাসার মানুষ একসাথে থাকবে। অলরেডি চারতলা বাড়িটা কমপ্লিট করে ফেলেছো তুমি এক একটা ফ্লাটে ৩টা করে রুম। মোট ১০৪টা ফ্লাট হয়েছে। আরো এক তলা বাকি আছে যেখানে ২৬ টা ফ্লাট হবে। তাইনা?

~ তুই কেম্নে জানলি রে বাপ? দয়া করে চুপ থাক। নাহলে সব পরিশ্রম বৃথা যাবে।

~ তোমার মুখে এ ধরনের কথা শুনতে না খুব ভালো লাগে বাবাই। হি হি হি। শুনো আমার আর মুনের জন্য আলাদা ফ্লাট রাখবা।
~ কেন? আলাদা ফ্লাট কেন? তোমরা তো আমাদের সাথে থাকবে।

~ বিয়ের পর তো আলাদাই থাকতে হবে। তখন তো আমাদেরও বাবু হবে। অনেকগুলো বাবু হবে আমাদের। সবাই মিলে কি ঠেসেঠুসে তিনরুমে থাকবো কিভাবে?

মেঘের মন চাচ্ছে মাটি ফাক করে তার মধ্যে ঢুকে যেতে। রেলগাড়ির মতো চললেও হতো সাফিনের মস্তিষ্ক তো প্লেনের গতিতে ছুটছে।

বিকালে রোজকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। নার্সরাও বাড়িতে আসে। সব কাজ বাড়িতে হবে। কিন্তু ঝামেলা এক জায়গাতেই মুনকে সাফিন কারোর কাছে দিচ্ছে না। নার্সদের সাথে বিকাল থেকে অলরেডি চারবার ঝগড়া হয়েছে। বাড়ির সবাই সাফিনের কাজ দেখে মিটিমিটি হাসছে।

মাসখানেক পর রোজকে নিয়ে মেঘ রেড রোজ প্যালেসে আসে। রোজের এনজিও’র ঠিক পাশেই বিল্ডিংটা। এখানে কয়েকটা নেশার দোকান ছিলো, সেগুলো আর নেই। তার পরিবর্তে বিশাল বড় এ বিল্ডিং দেখে চোখ লেগে আসছে রোজের।
~ মাম্মা রেড রোজ প্যালেস। তোমার স্বপ্ন, তোমার সব প্রিয়জন থাকবে এখানে। তাই বাবাই এটা তোমার বার্থডে গিফট হিসাবে দিচ্ছে।

মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। রোজ ভ্রু কুচকে তাকায় মেঘের দিকে।
~ কি হলো?

~ কোথায় কোন গিফট, কেন দিচ্ছি তোমার ছেলে সব আগে থেকেই জানে। ছেলে নাকি জ্যোতিষী বুঝে উঠতে পারছি না।

~ সাদিয়া ভাবি সবকিছু বলে দিয়ে গেছে ওকে। কিন্তু এটা তো অনেকক
~ চুপ থাকো রোজ। এখন হিসাব নয়।
মেঘের কথা শেষ হতেই সাফিন বলে,

~ বাবাই ভুলে যেও না। আমি ফিউচার মিস্টার জিনিয়াস। তোমাদের থেকে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকবো আমি। মুনের একটা প্রেস্টিজ আছে না? মাম্মার মতো ওকেও তো মাথা তুলে বলতে হবে ওর হাসবেন্ড মিস্টার জিনিয়াস।

সাফিনের কথা শুনে সবাই হাসলো। মুনও হা করে হাসছে। সেটা দেখে সাফিন লাফিয়ে উঠলো।

~ দেখো মুনও হাসছে। মুন আমার কথা বুঝতে পেরেছে। তাইনা মাম্মা?

সাফিনের কান্ড দেখে রোজের হাসি থামছেই না। একমাসের একটা বাচ্চা নাকি ওর কথা শুনে হাসছে। আর ও সেই খুশিতে লাফাচ্ছে।
১৯বছর পর….

দিয়ার ছেলে দ্বীপ আর মুন কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলো ঠিক তখন সাফিন এসে পেছন থেকে মুনকে জরিয়ে ধরে। মৌ (মুনের বোন) ওদের দেখছে আর হাসছে।

এটা সাফিনের প্রতিদিনের কাজ অফিসে যাওয়ার আগে একবারের জন্য হলেও মুনকে জরিয়ে ধরতে হবে ওর। দ্বীপ দাঁত কেলিয়ে বলে।
~ আজ সবার ছোট বলে জরিয়ে ধরার মানুষ জুটলো না কপালে।

মুন রেগে বলে

~ একটা থাপ্পড় দিবো শয়তান। বয়স কতো তোর? ১৭ও হয়নি। এখন এসব চিন্তা?
~ বা রে? বুবুরা যদি খোলামেলা জরাজরি করতে পারে তাহলে আমি বলতে পারবো না? কি বলো মৌ বুবু?
মৌ সায় দিলো।

~ হ্যা হ্যা একদম ঠিক। তোরা করলে দোষ নেই আমরা বললেই দোষ?
মুন রেগে সাফিনের দিকে তাকালো।

~ দেখলেন তো। আপনার জন্য সব ভাইবোন গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনি যে পরিমানে অসভ্য তার ডাবল হচ্ছে এরা। কতবার মানা করেছি এসববব

মুনের কথা শেষ হবার আগেই সাফিন বললো
~ ভাবছিলাম মৌ আর দ্বীপকে স্কুটি & বাইক গিফট করবো। কিনেও ফেলেছি। চাবিটা পকেটেই আছে। তবে
এটা শুনে মৌ আর দ্বীপ ঝাপিয়ে পড়লো সাফিনের ওপর।

~ তুসি গ্রেট হো ভাইয়া। থ্যাংকইউ।

দ্বীপ আর মৌ চাবি নিয়ে লিফ্টে উঠে পড়লো। মুন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে সাফিনের দিকে। সাফিন মুনের দিকে এগিয়ে এসে মুনের কপালে গভীরভাবে ঠোট ছোঁয়ালো। মুন রাগি চোখে তাকায়।
~ আমিও তো স্কুটি চেয়েছিলাম। আমাকে কি দিলেন?

~ তোমাকে তো পুরো সাফিনটাই দিলাম। আর কি চাও? বাচ্চাকাচ্চা? ওটা তো বিয়ের পর দিবো। নাকি বিয়ের আগে চাচ্ছো? এইটুকু সবুর করতে পারছো না?
~ উফ। আপনি এতো

সাফিন দুহাতে মুনের কোমর জরিয়ে ধরে।
~ আমি এতো কি?
~ খারাপ ভীষন খারাপ।

সাফিন হেসে মুনকে নিয়ে নিচে নামে। মৌ আর দ্বীপ স্কুটি ঘুরে ঘুরে দেখছে। চাবি ঢোকানোর কোনো জায়গাই খুজে পাচ্ছে না।
~ কি রে তোরা এখনও যাস নি?

মৌ চটে গিয়ে বলে।
~ চাবি দিয়ে স্টার্ট করবো কিন্তু কোথায় কি সেটা তো বুঝতেই পারছি না। স্কুটিটা সুন্দর তবে অদ্ভুত টাইপের। মনে হচ্ছে কেউ এর উপর হাত লাগিয়ে পুরো নকশা বদলে দিয়েছে।
সাফিন হেসে বলে

~ কিছুই করিনি তোদের যে ভুলোমন তাই তোদের জিনিসের সেফটির জন্য আমি চাবির জায়গাটা লক করে রেখেছি। তোদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ওটা অপেন হবে দেন চাবি দিয়ে স্টার্ট দিবি। পুরো একদিন লাগছে এটা করতে। বুঝলি।

মৌ আর দ্বীপ দ্রুত গিয়ে চেক করলো বাইক। সত্যিই তো। দ্বীপ খুশিতে চিল্লিয়ে বললো।
~ জিনিয়াস ভাই। তুমি আসলেই জিনিয়াস। থ্যাংকস & বাই নাউ। মৌ বুবু চলো।

মুন মৌকে চিল্লিয়ে ডাকলো।
~ এই দাড়া। আমিও যাবো। এই মৌ?

মৌ পেছন না ঘুরে উত্তর দিলো।
~ স্কুটিতে জায়গা নাই। তুই তোর মিস্টার জিনিয়াসের সাথে আয়। আমরা গেলাম।
মুন মন খারাপ করে সাফিনের দিকে তাকালো। সাফিন কিছু না বলেই হুট করে কোলে তুলে নেয় মুনকে।
~ একি

~ হুসসস। কোনো কথা বলবে না। প্রতিদিন ওদের সাথে যাও কেন? আজ থেকে আমার সাথে যাবে। ওরা তোমাকে আর সাথে নেবে না।
~ নিবে ওরা। আপনি নামান আমাকে।

~ ওদের স্কুটি আর বাইক কিনে দিয়েছি তোমাকে না নেওয়ার জন্য। তোমাকে নিজের সাথে নিয়ে যাবো বলেই এতোকিছু করলাম আর তুমি ওদের সাথে যেতে চাচ্ছো?

এতো নিষ্ঠুরতা করতে পারবে আমার সাথে?
মুন আর কথা বাড়ালো না। কারন এই মানুষটা রোজ আর মেঘ ছাড়া কারোর কথাই শোনে না। আর মুন যদি নালিশও করে তবুও মেঘরোজ শুধু হাসবে, কিছু বলবে না।

জানালা দিয়ে সাফিনকে দেখছিলো রোজ। ঠোটে বাঁকা হাসি। মেঘও এসে রোজের পাশে দাড়ালো। মেঘরোজ অপলক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে নিজেদের সন্তানদের। তখনই পেছন থেকে নিরা [ নিভি রায়ানের একমাত্র মেয়ে ] চিল্লিয়ে বলে।

~ রোজানু। তোমাদের ছেলে থুরি প্রেজেন্ট মিস্টার জিনিয়াস আমাকে কিছু দিলো না। এর বিচার না করা অবধি তুমি মেঘরোদ্দুরের থেকে আলাদা থাকবে। নো রোম্যান্স নো লাভ অনলি পানিশমেন্ট ফর সাফিন ভাইয়া।
নিরার কথা শুনে মেঘ রোজের দিকে তাকালো।

~ আমার দিকে তাকাও কেন? তুমি না মিস্টার জিনিয়াস? কলেজ লাইফে তো সেই ভাব নিতা। নাও এর বিচার করো। প্রথমেই বলে রাখলাম আমি কিছু করতে পারবো না। তোমার ছেলে তোমার মতই হয়েছে এতে আমার কোনো ফল্ট নেই। অকে?

২২ বছর আগের সেম ডাইলগ মনে পড়ায় হাসলো মেঘ। নিরাও মিটিমিটি হাসছে। রোজ নিরাকে টেনে বুকে জরিয়ে নিলো।

~ আজ বাড়ি আসুক সাফিন। ওর পানিশমেন্ট হিসাবে দুমাসের মধ্যে ওদের বিয়ে দেওয়া হবে। বিয়েতে ওকে যেভাবে খুশি নাচাবি তখন কিছু বলবো না।

কথাটা শোনামাত্র [ আদ্রিয়ান, আর্যা, সুস্মি, আরিয়ান, আয়মান, মিরা, ঈশানি, শাহরিয়ার ] দরজা থেকে হুরমুর করে গড়িয়ে পড়লো ঘরের মেঝেতে।

রোজকে দিয়ে বিয়ের কথাটা পাঁকাপাকি করার জন্য সাফিন ওদের পাঠিয়েছিলো। কিন্তু দরজারও তো কষ্ট হয় এতোগুলো মানুষের ওজন কি সহ্য করতে পারে নরম তুলোর মতো দরজাটা? মেঘরোজ কে ভ্রু কুচকে তাকাতে দেখে সবাই একসাথে ” স্যরি ” বললো। রোজ গম্ভির গলায় বললো।
~ কি হচ্ছিলো?

নিরা আমতা আমতা করে বলে ” সাফিন ভাইয়া পাঠিয়েছে আমাদের। আমরা সত্যিই কিছু জানি না। গাইস রান ফাস্ট। ” নিরা কথাটা বলেই দৌড়ে চলে যায়। বাকিরা উঠে হাসার চেষ্টা করেই দৌড় দিলো। রোজ মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে রোজের চোখের দিকে তাকায়। রোজও মেঘের চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। মেঘ ঠোট বাঁকিয়ে স্লো ভয়েসে গাইলো
~ এই চোখে তাকিও না,

তুমি লুটপাট হয়ে যাবে।
তুমি চৌচির হয়ে যাবে,
তুমি লুটপাট হয়ে যাবে।
সমাপ্ত।
[ গানের মতই মেঘরোজের দিকে কেউ তাকিও না। তোমরা লুটপাট হয়ে যাবে
আশা করি সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। তবে প্রথম থেকে শর্টকাটে বলছি। গল্পটার নাম মিস্টার জিনিয়াস সুতরাং এটা ধরে নিতে হবে সে একজনই। রোজ ছোট থেকে স্ট্রাগেল করেছে নিজের মায়ের মতো হবে বলে।

আর মেঘ ছোট থেকে চেয়েছে নিজের মায়ের খুনিকে শাস্তি দিতে। সেটা নিয়েই ১৬পার্ট অবধি গল্পটা চলমান ছিলো। বাকি ক্যারেক্টারগুলোর স্টোরি কিছু কিছু অংশে ছিলো।

গল্পে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে রোজ মেঘের সম্পর্কের বিচ্ছেদের সময়সীমা ২বছর ছিলো। তার আগে ওদের সম্পর্ক ঠিকঠাক চলছিলো। এটা তো সাধারন জ্ঞান মাহির সম্রাটের বন্ধু তাই রোজ মাহিরকে চেনে+ মিরাজ মেঘের ভাই তাই রোজ মিরাজও কিছুটা চেনে।

তাই সম্পর্ক তৈরিতে রোজের ভূমিকা ঠিক ততটাই যতটা মেঘের রয়েছে। কারন মেঘ রুহি এবং নিজের বোন মিশ্মিকে ভালো ভাবে চেনে বলে বোঝাতে পেরেছে।

এবার আসি মেঘের সাথে রোজের পরিচয়ে। মেঘ মুবিনের ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে পাপড়ির সাথে কিছুটা পরিচয় মেঘের আগে থেকেই ছিলো। তবে ওরা পুরোপুরি দুজন দুজনকে চিনতো না। তাই মেঘ পিচ্চি রোজকেও কিছুটা চিনতো। তবে বাচ্চাকালের প্রেম নয় এটা।

আরাভ আলিজা, রায়ান নিভি এরা মেঘরোজের সবথাকে কাছের মানুষ, বন্ধু। প্রতিটা পর্বে এদের নাম উল্লেখ করা কি খুব জরুরি? একটি পার্টে যদি ১৮~২০টা নাম থাকে তাহলে কি বোঝা যায় কোনটা কে? নাম লিখতে লিখতেই তো গল্প শেষ। এজন্য সবার নাম উল্লেখ করিনি। জুটির একটা কিংবা কোনোটায় দুইটা নাম আছে। তবে উপস্থিত ছিলো সকলেই।
এবার আসি প্রশ্নে।

~ সাদিয়া কি বা কে?
~তথাকথিত পরি। সাদিয়া সাফিনের আশেপাশে থাকতো কারন সাফিন ছোট ছিলো। তাছাড়া ও মানুষের মাঝে চিরকাল থাকতে পারবে না যার মূল কারন ও পরি। স্বপ্নিল বেঁচে থাকলে সাফিনকে নিয়ে চিন্তা করতো না। যেহেতু বেঁচে নেই তাই রোজের দায়িত্বে রেখে গেছে সাফিনকে।

~ সাফিন কিভাবে সব জানে?

~ সাদিয়া সাফিনকে সব গল্প করে শুনিয়েছে।
~ মুন্নিকে কে মেরেছে?
~ সাদিয়া, সাফিনের রূপ নিয়ে মুন্নিকে মেরেছে। সাফিনের কোনো শক্তি নেই।

এভাবেই সমাপ্ত করলাম গল্পটি। ভালো লাগলে পাশে থাকবেন। ধন্যবাদ।

লেখা – সাদিয়া আহমেদ রোজ

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “মিস্টার জিনিয়াস – Bangla premer golpo online” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূনশেষ বিকেলের রোদ – Bangla premer golpo