কষ্টের প্রেমের গল্প

প্রতিউত্তর – Valobashar koster golpo Bangla

প্রতিউত্তর – Valobashar koster golpo bangla: আদ্র নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। আজ কিছুই করার নেই তার। পরিস্থিতির কাছে হেরে গেছে সে। ডাক্তার বলেছে আনিশার বাঁচার সম্ভাবনা মাএ ১০%।


পর্ব – ১

ভার্সিটির গেইটের সামনে দাঁরিয়ে আছে আনিশা। সাথে ওর বান্ধবী চারু। আজকে ভার্সিটির প্রথম দিন।

কিন্তু মিশু এখনো আসেনি। ওর জন্যই অপেক্ষা করছে ওরা।
চারুঃ আসেনা কেন?

আনিশাঃ ওর বাসা তো এমনেই দূরে। তার উপর আজকে অনেক জ্যাম রাস্তায়। চলে আসবে।
আনিশা অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। এবার ২০ বছরে পা রাখবে। চারু ওর পাশের বাসায় থাকে তাই ওদের সম্পর্ক টা বোনের মতোই। একই কলেজে পরেছে তারা। আর এখন ভার্সিটি ও একই।

চারুঃ ওই যে এসে পরেছে।
আনিশাঃ কিরে এত দেরি হলো কেন?
মিশুঃ আরে আর বলিস না …এত জ্যাম।

আনিশাঃ আচ্ছা বাদ দে। চল নয়তো আবার দেরি হয়ে যাবে।
চারুঃ আরও আধা ঘন্টার মত বাকি আছে ক্লাস শুরু হতে।
ভার্সিটির ভিতরে ঢুকার পর কারও সাথে ধাক্কা খেল আনিশা। পরে যেতে নিলেই দুহাতে কেউ ওর কোমর ধরে ফেলল।

আদ্রঃ দেখে হাঁটতে পারো না? বলেই আনিশাকে সোজা করে দাঁড়া করিয়ে দিল আদ্র।
আনিশাঃ সরি ভাইয়া। আর ধন্যবাদ।
আদ্রঃ নতুন নাকি তোমরা?

আনিশার আগে চারুই বলল,
চারুঃ জি আমরা নতুন।
আদ্রঃ ওহ। বলেই বাঁকা হেসে চলে গেল আদ্র।
চারুঃ ভাইয়াটা কি সুন্দর ছিল নারে, গালে হাত দিয়ে বলতে থাকে চারু।
মিশুঃ আসতেই শুরু হয়ে গেল তোর।

চারুঃ সত্যিই তো বললাম।
মিশুঃ তোর তো সবাইকেই সুন্দর লাগে।
আনিশাঃ ধুরর..থামতো তোরা। তারাতারি ক্লাসে চল।
ফোর্থ পিরিয়ডের পর ব্রেক,
আনিশাঃ ক্যান্টনে যাই চল। ক্ষুদা লাগছে অনেক।

মিশুঃ হুম, চল।
চারুঃ আমারতো ভাইয়াদের দেখেই পেট ভোরে গেসে।
মিশুঃ তো ওদেরকেই খেয়ে ফেলনা।
মিশুর কথা শুনে ওরা দুইজনই হেসে দিলো।

ক্যান্টিনে ওরা খাবার অর্ডার করে বসে আছে। এমন সময় কিছু সিনিয়র আপু ভাইয়ারা ক্যান্টিনে আসল। তাদের মধ্যে সকালের ভাইয়াটাও আছে। ওদের দেখেই সবাই কেমন চুপ হয়ে গেল।

আনিশা তাকিয়ে ছিল আদ্রের দিকে, চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল আনিশা। তারা
ঠিক আনিশাদের পাশের টেবিলে বসল। মোট ছয় জন। চারজন ছেলে দুইজন মেয়ে।
এর মধ্যেই একটা ভাইয়া বলল, আদ্র কি খাবি? বলতেই সকালের ভাইয়াটা তার দিকে তাকাল।
আদ্রঃ তোরা দে তোদের যা ইচ্ছা।

আনিশাঃ ওহ উনার নাম তাহলে আদ্র(মনে মনে)
আনিশাদের খাবার চলে আসল। খেতে খেতে উনাদের কথায় বুঝলো যে তারা ফোর্থ ইয়ারের। মানে সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচ।

মিশুঃ ইসস..কি ভাব দেখ সিনিয়র দেখে কেউ কোন কথা বলেনা।
চারুঃ আরে সিনিয়র উনারা ভাব আছেনা একটা….
আনিশা চুপচাপ খাচ্ছে কোন কথা বলছেনা, ওর বেশ অস্বস্তি লাগছে কারন কিছুক্ষন ধরে
ও লক্ষ্য করছে আদ্র ভাইয়া এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

আর খাওয়ার সময় কেউ তাকিয়ে থাকলে আনিশা একদমই খেতে পারে না। তাই তারাতারি খেয়ে মিশু আর চারুকে নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে আসল।
চারুঃ কি হলো তোর এমনে বের হয়ে আসলি কেন?

আনিশাঃ না কিছু হয়নাই খাওয়া তো শেষই তাই চলে আসলাম।
চারুকে দেখে মনে হলো কথাটা সে বিশ্বাস করেনি। এর মধ্যেই পরের ক্লাস এর সময় হয়ে যাওয়ায় ওরা ক্লাসে চলে গেল।

ক্লাস শেষে ওরা একসাথেই বের হলো।
আনিশাঃ আমি একটু ওয়াশরুমে যাব। তোরা গিয়ে গেইটে দারা আমি আসছি।
ওরা আচ্ছা বলে চলে গেল।

আনিশা ওয়াশরুমে যাওয়ায় জন্য পা বারাতেই দেখল সামনে আদ্র ভাইয়া….


পর্ব ২

আনিশা ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য পা বারাতেই দেখল সামনে আদ্র ভাইয়া রেলিং এ হেলান দিয়ে আছে সাথে আরও একটা ছেলে, দেখে জুনিয়র মনে হচ্ছে। কি নিয়ে যেন কথা বলছে তারা। আনিশা সেদিকে ধ্যান না দিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আদ্র গম্ভীর কন্ঠে বলল,
আদ্রঃ দাঁড়াও।

আনিশা থেমে গেল। আদ্রর দিকে একবার তাকিয়ে সেখানেই দাড়িয়ে গেল।
আদ্রঃ আরিফ যাও তুমি। এ বিষয়ে কালকে কথা হবে। এখন যাও।

আরিফ~ আচ্ছা ভাইয়া। বলেই চলে গেল আরিফ। আরিফ চলে যেতেই আনিশার দিকে তাকাল আদ্র। আনিশা অসস্তিতে পড়ে গেল আদ্রর এমন চাহনি দেখে। আদ্র স্পষ্ট কন্ঠে বলে,
আদ্রঃ কি নাম তোমার?

আনিশাঃ আনিশা।
আদ্রঃ শুধু আনিশা?
আনিশাঃ অরিত্রি আহমেদ আনিশা।

আদ্রঃ ভার্সিটি তে তো নতুন?
আনিশাঃ জি।
আদ্রঃ আজকেই তো প্রথম দিন?
আনিশাঃ জি।

আদ্রঃ তো, আদব~ কায়দা কিছু নেই?
আনিশা অবাক হয়ে বলল~ মানে?

আদ্র কিছুক্ষন আনিশার দিকে তাকিয়ে থাকল, ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে এখনই বকে দেই, ভার্সিটির সিনিয়রদের দেখেও কেমন Damn care ভাব নিয়ে চলে যাচ্ছে। যেখানে আদ্রর মেজাজ সম্পর্কে সবাই জানে। সবাই আদ্রর ভয়ে শাসিয়ে থাকে। কিন্ত কেন যেন এই মেয়েকে কিছু বলতে পারছে না।

আদ্রঃ মানে কালকে বোঝাব। নাউ গো।
আনিশা আর কিছু না বলে ওয়াশরুমে চলে যায়।
তারপর গেটে গিয়ে দেখে শুধু চারু দাড়িয়ে আছে।
আনিশাঃ মিশু কোথায়?

চারুঃ বাসায় চলে গিয়েছে। তোর এত দেরি হল কেনো? আমি কতক্ষন ধরে দাড়িয়ে আছি।
আনিশা চারুর প্রশ্ন টা এড়িয়ে গেল, এখন ওকে ওই কাহিনী বললে হাজারটা প্রশ্ন করবে যেগুলোর উওর দিতে এখন একটুও ইচ্ছা করছে না।

আনিশাঃ চল এখন তারাতারি বাসায় যাই।
এরপর ওরা একটা রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে আসল।

বাসায় এসে একবার কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল আনিশার মা রেহানা আহমেদ।
রেহানা~ তোর এত দেরি হলো কেন অরু? কোন সমস্যা হয়নি তো ভার্সিটিতে?
আনিশার এমনেই বিরক্ত লাগছে তার উপর মায়ের এতসব প্রশ্ন….

আনিশাঃ রাস্তায় জ্যাম ছিল তাই দেরি হয়েছে। আমার ক্লান্ত লাগছে আমি ফ্রেশ হয়ে আসি এই বলেই রুমে চলে আসল আনিশা। তারপর শাওয়ার নিয়ে নিচে চলে যায় দুপুরের খাওয়া খেতে। নিচে যেয়ে দেখে ডাইনিং
টেবিলে ভাইয়া আর বাবা বসে আছে। আনিশা বেশ অবাক হয় কারণ ভাইয়া তো এইসময় অফিসে থাকে।

~ তুমি অফিসে যাওনাই? (আনিশা)
~ না আজকে যাইনাই, তোর ভার্সিটি কেমন গেল?
আনিশাঃ ভালো।

বাবা~ বোস, একসাথে খাই।
আনিশাঃ হুমম, বলেই ভাইয়ার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল আনিশা।
আনিশারা দুই ভাইবোন। আনিশা ছোট। বড় ভাইয়ার নাম আবির। ওর থেকে পাঁচ বছরের বড়। ওদের নিজেদের বিজনেস আছে। মা রেহানা আহমেদ একজন গৃহিনী। আর্থিক দিক দিয়ে মোটামোটি সচ্ছল।
সন্ধ্যার সময় আনিশা বই নিয়ে বসে আছে কিন্তু পড়ায় ওর মনোযোগ নেই, ও ভাবছে আদ্রর কথা…
আদ্রর হাইট ৬ ফুট তো হবেই। গায়ের রং ফর্সা। মাথায় একঝাঁক চুল। গালে হালকা দাড়ি। আর সাথে ব্রাউন কালারের চোখ। ছেলেদের চোখও যে এমন হয় তা আনিশার জানা ছিল না।

আনিশা ভাবছে ও কি এমন করলো যে আদ্র ওকে আদব~ কায়দার কথা বললো। ও তো কিছুই করেনাই। না জানি কালকে কি এমন বোঝাবে ভার্সিটিতে।
আর এদিকে আদ্র বিছানার আধসোয়া হয়ে আনিশার কথা ভাবছে।

আনিশা মেয়েটা কেমন জানি অন্যরকম। গায়ের রং লালচে ফর্সা। হাইট ৫.৫ এর মতো হবে। কোমড় সমান লম্বা চুল। গোলাপি ঠোঁট। আর নীলাভ চোখ। এক কথায় অসাধারণ।
কালকে ওর সাথে কি করা যায় এটাই ভাবছে আদ্র।
সকালে….

ভার্সিটির জন্য রেডি হচ্ছে আনিশা। সাদা রং এর একটা থ্রিপিস পরেছে সে। চুলগুলো খোলা। রেডি হয়ে নাস্তা করে বের হয়ে গেল। নিচে যেয়ে দেখে চারু দাড়িয়ে আছে। তারপর দুইজন একসাথে রিক্সায় চলে গেল।

ভার্সিটিতে ঢুকেই দেখল আদ্র তার বন্ধুদের নিয়ে গাছের নিচে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ওদেরকে দেখেই
মিশু বলল~ এরা কি এখানে পড়তে আসে নাকি খালি আড্ডাই দেয়?
চারুঃ চুপ থাকতো তুই, সবাই কি তোর মতো নাকি। সারাদিন বইয়ের ভিতর মুখ গুঁজে থাকে।
আনিশাঃ উফফ..থামতো তোরা। উনারা যা ইচ্ছা করুক তাতে আমাদের কি? চল তারাতারি ক্লাসে।

আনিশা কোনমতে ওদেরকে এড়িয়ে ক্লাসে চলে গেল। ও চাচ্ছেনা আদ্রর সামনে পড়তে।
ক্লাসে ওরা তিনজন আরও কয়েকজনের সাথে গল্প করছে। তো কথার মাঝখানেই
একটা মেয়ে বলল~ ফিজিক্স ডিপার্টমেনটের আদ্র ভাইয়াকে দেখেছ?

আরেকটা মেয়ে ওর নাম দিপা ও উওর দিল~ হুম দেখেছি। উনি তো এখানকার সবচেয়ে ব্রিলিয়ানট ছাএ। ওর কথার মাঝেই চারু আনিশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল~ “আদ্র”তোর ওই ভাইয়াটা না?

আনিশাঃ আমার মানে?
চারুঃ আরে..মানে কালকের সকালের ভাইয়াটার কথা বলছি।
আনিশাঃ হ্যাঁ, উনিই।

চারু এবার দিপাকে উদ্দেশ্য করে বলল~ ব্রিলিয়ানট এর সাথে দেখতেও অনেক সুন্দর। একদম হিরোদের মতো।

দিপা~ উনি তো ভার্সিটির সব মেয়েদের ক্রাশ। কিন্ত মেয়েরা কখনো উনার ধারেকাছে যায় না। কারন উনি প্রচন্ড রাগি একজন মানুষ। এখানের সব বিষয়ে উনাকে দেখা গেলেও, মেয়েবিষয়ক কোন ঝামেলার উনাকে দেখা যায় না।

উনি খুব কমই কথা হলেন মেয়েদের সাথে। উনি এমনে অনেক ভালো কিন্তু যে মেজাজ কখন কার উপর রেগে যায় তা বলা যায় না। তাই এখানকার সবাই অনেক ভয় পায় উনাকে।
চারুঃ ওহ।

ওদের কথার মাঝেই ক্লাসের সময় হয়ে যায়। ওরাও কথা থামিয়ে যে যার জায়গায় বসে যায়।

এদিকে আদ্র আনিশাকে খুঁজছে। মেয়েটাকি আসেনাই আজকে। একবারও দেখল না ওকে। প্রচন্ড রাগ লাগছে আদ্রর। গতকাল বলার পরেও আজকে আসল না। আদ্র এসব ভাবছে এর মাঝেই ফায়াজের ডাকে পিছনে ফিরে তাকাল।

ফায়াজ~ এখানে কি করছিস? ভিপি স্যার ডাকছে তোকে। তারাতারি চল।
আদ্রঃ আচ্ছা, চল।
ফায়াজ আদ্রকে ভিপি স্যার এর কাছে দিয়ে নিচে নামছিল আর চারু আনিশাকে ডাকতে লাইব্রেরিতে যাওয়ার জন্য উপরে যাচ্ছিল। চারু এমনেই চন্চল তার উপর দৌড়ে দৌড়ে উঠছিল। ফলস্বরূপ সে ধুম করে ধাক্কা খায় ফায়াজের সাথে।

চারু উপরে তাকিয়ে “সরি ভাইয়া, আমি দেখি নাই”বলে। ফায়াজ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে “ইটস্ ওকে”বলতেই চারু একটু হেসে তারাতারি উপরে চলে যায়।

আর ফায়াজ ওখানেই দাড়িয়ে চারুর কথা ভাবছে
ফায়াজ~ এটা কি পুতুল ছিল নাকি। একদম ছোট খাটো গোলগাল। ভেবেই আনমনে হেসে উঠে নিজে।

চারু লাইব্রেরিতে যেয়ে দেখল আনিশা শেলফ থেকে বই নিচ্ছে। চারু ডাক দিতেই পেছনে ফিরে তাকাল।
চারুঃ হয়েছে তোর?

আনিশাঃ হ্যাঁ, হয়ে গেছে নেয়া। চল।
ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চারু বলে~ কি হইসে জানিস?
আনিশাঃ হ্যাঁ, জানিতো।

চারু অবাক হয়ে বলল~ কিভাবে জানিস?
আনিশাঃ উফফ চারু, তুই না বললে কিভাবে জানব?
চারুঃ হেহে তাইতো। আসলে তখন উঠার সময় একটা ভাইয়ার সাথে ধাক্কা লেগেছে।
আনিশাঃ তো লাগতেই পারে। এটা আর এমন কি?

চারুঃ ছেলেটা অনেক সুন্দর ছিল রে।
আনিশাঃ তোর সবসময় একই প্যাঁচাল। মিশু কোথায়?
চারুঃ মিশু ওয়াশরুমে।

কথা বলতে বলতে ওরা নিচে নেমে আসে। এসে দেখে মিশু দাড়িয়ে আছে।
তারপর তিনজন খেতে চলে যায় ক্যান্টিনে।

ক্লাস শেষে তিনজন একসাথেই বের হয়। এর মাঝে আদ্রর সাথে একবারও দেখা হয়নি আনিশার। গেটের কাছে আসতেই আদ্র আনিশাকে দেখে ডাক দেয়। আনিশা পাশে তাকাতেই দেখে আদ্র ডাকছে। আনিশাকে তাকাতে দেখেই হাতের ইশারায় কাছে আসতে বলে। আনিশা ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে আদ্রের দিকে…..


পর্ব ৩

আনিশা ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে আদ্রের দিকে। আদ্রর কাছাকাছি আসতেই আদ্র বলল~ আনিশা, রাইট?
আনিশাঃ জি।

আদ্রঃ কালকে একবার বলার পর আবার আজকেও।
আনিশা এবার বিরক্ত হলো কালকে থেকে একই কথা বলে যাচ্ছে কিন্তু মুল বিষয়টাই বলছে না। করেছে টা কি ও?

আনিশা বেশ জোরেই বলল~ দেখুন ভাইয়া আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছিনা। দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবেন।
আদ্রঃ বাহ্, তোমারতো অনেক সাহস। আমার সামনে দাঁরিয়ে এভাবে কথা বলছ।
আনিশাঃ আমি আপনাকে খারাপ কিছুই বলি নাই। আর আপনি এমন কি যে আপনার সামনে কথা বলতে পারব না?

আদ্রর পাশে ওর বন্ধুরা অবাক হয়ে গেল আনিশার এমন কথা শুনে। কেউ কখনোই আদ্রর সাথে এভাবে কথা বলেনা। আদ্র এমনে খুব শান্ত সভাবের হলেও রাগলে খবর আছে।
আদ্র শীতল চোখে আনিশার দিকে তাকিয়ে বলল~ আমি কে তাই না?

আনিশাঃ কেন আপনি জানেন না আপনি কে, আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন?
এর মধ্যেই চারু এসে আনিশাকে থামায় আর বলে~ তুই কি পাগল হয়ে গেলি? কি বলছিস এসব? চল এখান থেকে। বলেই আদ্রর দিকে তাকিয়ে বলে~ সরি ভাইয়া।

ও আসলে ভয়ে এসব বলেছে ওর তরফ থেকে আমি ক্ষমা..ওর কথার মাঝেই আনিশা বলে উঠল~ কি বলিস এইসব, আমি কেন উনাকে ভয় পাব? আর তুই ক্ষমা কেন চাচ্ছিস? আমিতো ভুল কিছু বলিনি। আদ্র এতক্ষণ জাস্ট আনিশার কথা শুনছিলো। এবার বেশ জোরেই ধমকিয়ে বলে উঠল~ জাস্ট সাঁট আপ, ইডিয়ট। আমি এখানের সিনিয়র। কোন সাহসে তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলো? সম্মান করতে জানোনা? নিজের লিমিটে থাকো।

আনিশাঃ আমি লিমিটেই আছি। আর আমি আপনাকে যথেষ্ট সন্মান দিয়েই কথা বলছি। সিনিয়র হয়ে জুনিয়র দের ধমকাবেন এমন তো কোন রুলস্ নাই।
এই বলেই আদ্রকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চারু আর মিশুকে নিয়ে বের হয়ে যায় আনিশা।

বের হতেই চারু বলল~ তুই এটা কি করলি? কেন ঝগড়া করতে গেলি?
আনিশাঃ আমি ঝগড়া করেছি নাকি উনি? এই তুই আমার ফ্রেন্ড নাকি উনার রে?
চারু আর কিছু বললোনা ও জানেএখন কিছু বলে লাভ নাই।

বাসায় এসেই আনিশা সোজা ওর রুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়লো।
রাত~ ৮:০০ টা
আনিশা ঘুম ঘুম চোখে চোখ মেলল। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া।
আনিশাঃ “আটটা বেজে গেছে। আমি এতক্ষন ধরে ঘুমাচ্ছি। সেই তিনটার দিকে শুয়েছিলাম। “
বাইরে যেয়ে নিচে নামতেই দেখলাম সোফায় ভাইয়া বসে আছে।

মা আমাকে দেখেই বলল~ তোর কি শরীর খারাপ?
আমি বললাম~ না। কেন?
মা~ না মানে, বিকালে তোকে এত বার ডাকলাম কিন্তু উঠলিনা তাই বললাম।
না, আমি ঠিক আছি। ঘুমিয়ে ছিলাম তাই শুনতে পাইনি।

মা আর কিছু বললো না।
আমি টিভি দেখছি আর ভাইয়া আমার পাশে বসে ফোনে কি যেন করছে। হঠাৎই উঠে যেতে নিলে আমি বললাম~ কই যাচ্ছো?
আবির~ একটা জরুরি ফোন এসেছে। বলেই চলে গেল।

আনিশাঃ আমার সামনে কথা বললে কি হতো? আজব।
আমাকে একা রেখে চলে গেল ধুর..
টিভি বন্ধ করে আনিশা ওর রুমে চলে গেল।

এদিকে আবির ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে ফোনটা ধরল। আদিরা ফোন দিয়েছে।
আবির~ হ্যালো, হ্যা বলো।
আদিরা~ কি করছো?
আবির~ কিছুনা। …

কথা বলতে থাকে ওরা। আদিরার সাথে আবির এর সম্পর্ক তিন বছরের। কিছুদিন পরেই বিয়ের জন্য কথা বলবে।
রাত ১২টা
আনিশা সুয়ে আছে বিছানায় আর ভাবছে “আদ্র ভাইয়ার সাথে এমন করা উচিত হয়নি, ও ঠান্ডা মাথায় বললেই পারত। কিন্তু তখন একটু বেশিই রেগে গিয়েছিলো ও। থাক কালকে যেয়ে “সরি” বলে দিবে আদ্রকে।
এই ভেবেই ঘুমিয়ে গেল ও।

আর ওদিকে আদ্র বিছানায় সুয়ে এপাশ~ ওপাশ করছে। ঘুমাতে পারছেনা। চোখ বন্ধ করলেই আনিশার রাগি মুখটা ভেসে উঠছে।
আদ্রঃ এতটুকু মেয়ে, আর সাহসটা কত। আমাকে অপমান করে। আমার সাথে রাগ দেখায়।
সকালে….

আনিশা চারুর বাসার নিচে দাড়িয়ে আছে। চারু এখনো আসেনি। এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আনিশা আর কিছু না ভেবে চারুর বাসায় চলে গেল। কলিংবেল বাজাতেই চারুর মা এসে দরজা খুলে দিলেন।

আনিশা সালাম দিয়েই জিজ্ঞেস করল~ আন্টি চারু আসছেনা কেন?
চারুর মা~ ও তো একটু অসুস্থ মা। আজকে যাবেনা।
আনিশাঃ কি হয়েছে? বেশি অসুস্থ?

চারুর মা~ না, একটু জর এসেছে। তুমি চিন্তা করেনা। ঘুমাচ্ছে এখন।
চারু ঘুমাচ্ছে তাই আনিশা আর কিছু বললোনা। আচ্ছা বলে নিচে চলে আসল।
আনিশাঃ উফফ। আজকে তো মিশুও আসবেনা। কোথায় জানি যাবে। তারমানে আজকে একাই যেতে হবে। ভাবতেই অসহ্য লাগছে ওর।

আনিশা ভার্সিটিতে আসতে আসতেই অনেক অনেক লেট হয়ে গেছে। তাই ও তারাতারি ক্লাসে চলে গেল।


~ “অনুষ্ঠান এর সব রিসপনসিবিলিটি কিন্তু তোমার। আমি জানি তুমি পারফেক্টলিই সব করবে। “
~ জি, স্যার। অবশ্যই।

বলেই পারমিশন নিয়ে বের হয়ে আসল আদ্র। এক সপ্তাহ পরেই নবীন বরণ এর অনুষ্ঠান। বরাবরের মতো সব দায়িত্ব আদ্রর।

দুইটা ক্লাস করেই আদ্রকে সরি বলার জন্য বের হয়ে গেল আনিশা। এখন আর ক্লাস নেই।
আনিশা আদ্রকে পাচ্ছেই না। খুজতে খুজতে তৃতীয় তলায় চলে এসেছে। এখানে তেমন মানুষ নেই। ও হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই কেও ওর হাত ধরে টান দিয়ে একটা খালি রুমে নিয়ে গেল। আনিশা দেখে মানুষটা আর কেউ নয় আদ্র নিজেই।
আদ্রর এমন আচরনে আনিশা অবাকও হলো আবার ভয়ও পেলো। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

আনিশাঃ ভাইয়া, আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম। আসলে কালকের জন্য সরি। আমি….আর কিছু বলতে পারল না আনিশা তার আগেই…

আদ্র আনিশাকে একটানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। আদ্রর একহাত আনিশার কোমড়ে আর আরেকহাত দেয়ালে। আনিশা বার বার নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু একটুও নড়তে পারছে না। ও যতটা সম্ভব হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করছে। কিন্তু আদ্র ওর এতটাই কাছে যে কোন লাভ হচ্ছে না। উল্টা ওর হাত গিয়ে আদ্রর বুকে লাগছে বারবার। আনিশার বেশ অস্বস্তি হচ্ছে।
আনিশাঃ ভাইয়া কি করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে।
আদ্র মুখটা আনিশার একদম কাছে নিয়ে আসতেই আনিশা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কোনমতে বললো~ প্লিজ, ছাড়ুন।

আদ্র কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুখটা আনিশার একদম কানের কাছে নিয়ে গেল।
আদ্রর নিশ্বাস আনিশার ঘাড়ে লাগছে।
প্রচন্ড অসস্তি নিয়ে চোখমুখ খিঁচে দারিয়ে আছে আনিশা।

আদ্র ফিসফিসিয়ে বলল~ আমাকে অপমান করা তাইনা?
আনিশা মুখ ঘুরাতেও পারছেনা কারন ওপাশে আদ্র। ও মুখ না ঘুরিয়েই বলল~ আমি আপনাকে অপমান করিনি যা সত্যি তাই বলেছি।

আদ্র যেন এতে আরও রেগে গেল মুখটা আরো কাছে নিয়ে গেল। ধীর কন্ঠে বলল~ কি বললে?
আনিশার প্রচন্ড লজ্জা আর অস্বস্তি হচ্ছে। কারন কথা বলার সময় আদ্রর ঠোঁট হাল্কা করে আনিশার ঘাড় স্পর্শ করছে। আনিশা ছাড়া পাওয়ার জন্য একটু নড়তেই আদ্র দুহাত দিয়ে শক্ত করে ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে।

আনিশাঃ আহ্। কি করছেন? দয়া করে একটু দুরে যান।
আনিশার কথায় আদ্রর কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। আদ্র কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। কিছুক্ষণ পর কোনমতে নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল,
আদ্রঃ আর কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলবে না। এই বলেই আনিশাকে ছেড়ে দুরে সরে দাড়াল।

আনিশা কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে আদ্রর দিকে তাকিয়ে থাকল। এরকম পরিস্থিতির জন্য ও একদমই তৈরি ছিলনা।
আদ্রঃ যাও এখন।

আনিশা আর কিছু না বলে তারাতারি বের হয়ে গেল।
আর আদ্র সেখানে দাড়িয়ে ভাবছে ও কেন এই মেয়েকে কিছু বলতে পারে না। কেন ওর উপর রাগ দেখাতে পারে না।


পর্ব ৪

আনিশা বের হয়েই তারাতারি নিচে নেমে আসল। রাগে প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। কিন্তু এভাবে সবার সামনে তো আর কাঁদা যায় না। তাই আর কোন ক্লাস না করেই ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গেল। একটা রিকশা নিয়ে চলে আসল বাসায়।

বাসায় আসতেই মা বলল~ তুই এত তারাতারি চলে আসলি যে? কিছু হয়েছে নাকি?
আনিশাঃ ভাল লাগছিল না তাই চলে এসেছি। বলেই রুমে চলে আসল। রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।

“ওনার সাহস কিভাবে হলো আমার সাথে এমন কিছু করার? সিনিয়র দেখেকি যা ইচ্ছা তাই করবে? আমিতো সরিই বলতে গিয়েছিলাম। হাহ্”আর কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলবে না”কেন বলবোনা? এটিটিউডে মাটিতে পা পরে না। “

আনিশা ভেবে ফেলেছে ওই আদ্রর সাথে ও আর কোন কথাই বলবে না। সামনেই যাবেনা।


আবির আজকে আদিরার সাথে দেখা করতে এসেছে। একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে ওরা।
আদিরা~ বিয়ের কথা কবে বলবা আবির?

আবির~ কিছুদিনের মধ্যেই বলবো। কেন তোমার বাসা থেকে কিছু বলেছে?
আদিরা~ না, আসলে বাবা মনে হয় ছেলে দেখছে আমার জন্য। আমাকে কিছু বলেনি তবুও আমার মনে হচ্ছে।

আবির আদিরার হাতটা ধরে বলল~ তুমি কোন চিন্তা করোনা আদিরা। আমি কিছুদিনের মধ্যেই বাবা মাকে জানাবো। আর পরের সপ্তাহেই তোমার বাসায় যাব। তোমার সাথে আমারই বিয়ে হবে।

আদিরা~ ইনশাআল্লাহ, তাই যেনো হয় আবির। আমাদের সম্পর্ক টা যেন মেনে নেয় বাসায়।
আদ্র বাসায় ঢুকতেই দেখল আদিরাও গাড়ি থেকে নামছে। আদ্র অবাক হলো কারন আদিরা তো আরও আগে চলে আসে।

আদ্রঃ কোথাও গিয়েছিলা আপু?
আদিরা~ একটু মার্কেটে গিয়েছিলাম রে।

আদ্রঃ ওহ আচ্ছা। ওরা একসাথেই বাসায় ঢুকে।
ঢুকে দেখে ওদের মা সোফায় বসে টিভি দেখছে। আদিরাকে দেখে বলল~ তোর এত দেরি হলো কেন?

আদিরা~ জ্যাম ছিল মা।
মা~ ওহ। কিনেছিস জামা?

আদিরা~ হুম। বলেই শপিং ব্যাগ গুলো দেখাল মাকে। আসার সময় ভাগ্যিস মনে ছিল জামার কথা। নয়তো মাকে কি বলতো। যদিও ওর মা একদমই ওরকম না। উনি নিতান্তই সরল মনের ভালো একজন মানুষ।

আদ্র রুমে এসেই শাওয়ার নিতে চলে গেছে। শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে ফোন হাতে নিয়েই দেখে ফায়াজের পাঁচটা মিসকল। কল বেক করতেই ফায়াজ রিসিভ করে।
ফায়াজ~ তুই বেঁচে আছিস?

ফায়াজের এমন কথা শুনে বিরক্তি নিয়ে বলে আদ্রঃ কেন কি হয়েছে?
ফায়াজ~ ফোন ধরছিলি না কেন? কতবার কল দিলাম।
আদ্রঃ শাওয়ার নিচ্ছিলাম। এখন কি ওয়াশরুমেও ফোন নিয়ে যাব?
ফায়াজ~ নিতে পারিস।

আদ্রঃ উফফ। কাজের কথা বলতো। কি জন্য ফোন দিয়েছিলি?
ফায়াজ~ আরে ঝামেলা হয়ে গেছে রে। নবীনবরণ এর অনুষ্ঠান আগামী বৃহস্পতিবার এর জায়গায় সোমবার হবে। ডেট বদলানো হয়েছে।

আদ্রঃ কি বলিস? আমরা তো সব কনফার্ম করে ফেলছি বৃহস্পতিবার এর জন্য। আর এমনেও কাল পরশু তো বন্ধ। একদিনে কেমনে মেনেজ করবো?
ফায়াজ~ আমি কি জানি? তাইতো তোকে ফোন দিলাম।
আদ্রঃ আচ্ছা রাখ। আমি দেখি কি করা যায়।

ফায়াজ~ আচ্ছা বলেই ফোন রেখে দিল। ও জানে আদ্র সব সামলে নিবে। ফায়াজ ফোন কাটতেই মোবাইলের স্ক্রীনে চারুর একটা ছবি ভেসে উঠল, যেখানে দেখা যাচ্ছে চারু অন্যদিকে তাকিয়ে হাসছে। যদিও পুরা চেহারা দেখা যাচ্ছেনা, অর্ধেক দেখা যাচ্ছে। তবুও সেটা দেখে ফায়াজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

ছবিটা ও তুলেছিল গত পরশুদিন। চারু হাসতে হাসতে হেটে যাচ্ছিল আর তখনই চারুর অজান্তেই ছবিটা তুলেছিল ফায়াজ। যদিও এটা অন্যায়। তাও কখনো কখনো একটু অন্যায় করলে ক্ষতি কি।

চারুর জর এখন একটু কম। আনিশা পাশে বসে আছে। বিকালের পরই চলে এসেছে চারুর বাসায়।
আনিশাঃ এখন কেমন লাগছে?

চারুঃ জানিনা। জর আসার আর সময় পেলোনা। আমি যদি না যেতে পারি নবীনবরণে? বলেই কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে আনিশার দিকে তাকাল চারু।
আনিশাঃ আরে, পারবিনা কেন? আরও তিনদিন বাকি আছে তো অনুষ্ঠানের। তিনদিনে তুই সুস্থ হয়ে যাবি।

চারুঃ কিন্তু আম্মু যে বললো আমাকে যেতে দিবেনা?
আনিশাঃ ওইটা তো আন্টি এমনেই বলছে। রেগে ছিল তো। তুই ই বা কেন রাতের বেলা বৃষ্টিতে ভিজতে গেলি?

চারুঃ হ্যাঁ, এখন তুই ও আমাকে বক।
আনিশাঃ আচ্ছা যা বকলাম না। আর অনুষ্ঠানের জন্য আমি বলবো আন্টিকে। তুই চিন্তা করিসনা।

বলতেই চারুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
চারুঃ সত্যি?
আনিশাঃ না থাক মিথ্যা। তুই যেতে না চাইলে আর কি করার। আমি আর মিশুই যাবো।
চারুঃ তোকে তো আমি…বলেই আনিশাকে মারতে লাগলো।

আনিশাঃ থাম থাম। মনে তো হচ্ছে এখনই সুস্থ হয়ে গেছিস। …
চারু আর আনিশা দুজনেই হেসে দিল।
চারু মেয়েটা প্রচন্ড বাচ্চা সভাবের। কিছু হলেই বাচ্চাদের মতো করে। চারু না থাকলে যে কি হতো আনিশার।
_
এই দুইদিন অনেক ব্যস্ত ছিল আদ্র। বন্ধের দিনেও সব ম্যানেজ করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে ওকে।

যদিও এখনো বেশ ব্যস্ত ও। আজকে ভার্সিটির ডেকোরেশন, অনুষ্ঠানের নাচ গান, স্টেজ সব
ঠিক করতে হবে। ফায়াজও ওর সাথেই আছে। ওরা এখন জুনিয়রদের গানের লিস্ট দেখছে।
ফায়াজ~ আদ্র, একটু দেখেনে লিষ্টটা।

আদ্রঃ দে।
ফায়াজ লিষ্ট টা হাতে দিতেই আদ্রর চোখে পরল নামটা”অরিত্রি আহমেদ আনিশা”
আদ্রঃ ওহহো, গানও গেতে পারে। দেখে তো মনে হয় না। ইমপ্রেসিভ। (মনে মনে বলে আদ্র)
ফায়াজ~ কি ভাবিস?

আদ্রঃ না কিছুনা। নে, বলেই লিস্টটা ফায়াজের হাতে দিয়ে দেয় আদ্র। আমার একটু কাজ আছে বলে ওখান থেকে চলে আসে।
আনিশা মিশু আর চারু বসে আছে।

চারুঃ কালকে তো তোর গানেই সবাই পাগল হয়ে যাবে।
আনিশাঃ দেখ চারু আমি কিন্তু শুধু তোর জোরাজোরিতে নাম দিয়েছি।
চারুঃ ভালো করেছিস তো। কালকে যখন তোর গানে সব ভাইয়ারা পাগল হয়ে যাবে, তখন…
কথার মাঝখানেই মিশু বলল~ কেনরে? এখানে কি মেয়েরা পড়েনা?

চারুঃ তোর কি আমাদের ছেলে মনে হয়?
মিশুঃ তো শুধু ভাইয়া ভাইয়া করছিস কেন?
চারু কিছু বলতে যাবে তার আগেই আনিশা কথা ঘুড়িয়ে বলল~ শাড়ি পরতে হবে কালকে। বড় আপুরা বলে দিয়েছে শাড়ি ছাড়া আসা যাবেনা।

চারুঃ হ্যাঁ, কিন্তু আমিতো শাড়ি পরতে পারিনা।
আনিশাঃ আমিতো খুব পারি তাইনা? মিশু তুই পারিস?
মিশুঃ পারি মোটামোটি।

চারুঃ তুইতো সবই পারিস।
ওরা কথা বলছে এমন সময় হঠাৎ বাইরে চোখ পরতেই আনিশা দেখল আদ্র কার সাথে যেন কথা বলছে। মুহূর্তেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ওর। সামনের বেঞের কয়েকটা মেয়ে তো চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছে আদ্রকে। কেন যেন প্রচন্ড রাগ হচ্ছে মেয়েগুলার উপর। “উনার দিকে যেই তাকাক আমার কি? “এই ভেবে মাথাকে শান্ত

করতে পারলেও মনকে বোঝাতে পারলোনা ও…….
আবির নিজের রুমে বসে আছে। একটু আগেই মা~ বাবার রুমের থেকে এল সে। আদিরার কথা বলতেই গিয়েছিলো। বলেছেও। আদিরার মা বাবার সাথে কথা বলে আগামী পরশুদিনই যাবে ওদের বাসায়।


পর্ব ৫

আনিশা রেডি হচ্ছে। কালকে রাতেই ও শাড়ি পরার ব্যপক প্র্যাকটিস করেছে। যদিও ওর শাড়ি ওর মা ই পরিয়ে দিতে পারত। কিন্তু আনিশা নিজেই পরবে, মা নাহয় শাড়ি পরিয়ে দিল কিন্তু সেটা যদি অনুষ্ঠানে যেয়ে খুলে যায় তখন কি করবে? তাই ও নিজে নিজেই পরে নিল।

বেশি সাজেনি আনিশা। গাঢ় সবুজ রংয়ের একটা শাড়ি পরেছে। সাথে কাঁচের চুড়ি। চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি করে ছেড়ে দেওয়া। চোখে হালকা সাজ সাথে কালো কাজল। আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। এতেই যেন অপরূপ লাগছে ওকে।

চারুর বাসায় যেতেই দেখে চারু সাজগোজ করে শাড়ি হাতে নিয়ে বসে আছে। আনিশাকে দেখেই কাঁদো কাঁদো ভাবে বলল~ এই তুই দেরি করলি কেন? তোকে কতো সুন্দর লাগছে। আর আমিতো শাড়িই পরতে পারছিনা। এখন আমার কি হবে?

আনিশাঃ তো তুই আন্টিকে বললেই তো পারতি। দে আমি পরিয়ে দেই।
আনিশা, চারু আর মিশু তিনজনই সবুজ কালার পরেছে।
মিশুঃ তোকে যা লাগছেনা আনিশা।

চারুঃ আমিতো আগেই বলসি ওর উপরেই সবাই ক্রাশ খাবে।
আনিশাঃ তোরা তো এমন ভাব করছিস যেন তোদেরকে পেত্নীর মতো লাগছে। হাহ্ তোদেরকে আমার থেকেও সুন্দর লাগছে।

ওরা কথা বলতে বলতে ভিতরে ঢুকতেই দেখে বিশাল আয়োজন। পুরা ক্যাম্পাস সাজানো হয়েছে। স্টেজ টা দেখার মতো করে সাজানো।
চারুঃ আরে এটাকি নবীনবরণ নাকি?
আনিশাঃ না তোর বিয়ে।

মিশুঃ এতো সুন্দর করে নবীনবরণ হয়?
আনিশাঃ হুম, আসলেই।
আনিশা শুনতে পাচ্ছে পাশ থেকে কয়েকজন মেয়ে বলছে~ আদ্র ভাইয়ার সবকিছুই অন্যরকম। এইযে এই অনুষ্ঠান এর সব দায়িত ওনার উপর, ওনি ছাড়া কেউ কি এত সুন্দর করে সব করতে পারত?

“বাহ্”(মনে মনে বলল আনিশা)
আনিশারা দোতলায় উঠতেই আনিশা আদ্রকে দেখতে পেল। ফোনে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছেন ওনি।

আদ্রকেও আজকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। লাল রংয়ের পানজাবি সাথে সাদা পায়জামা। মাথার একঝাঁক চুলগুলো একটু পর পর কপালে এসে পরছে। আর ওনি বারবার ডান হাত দিয়ে পিছনে দিয়ে দিচ্ছে। হাতে একটা কালো ঘড়ি আর পানজাবির পকেটে একটা সানগ্লাস।

আনিশা একদৃষ্টিতে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। একটা ছেলে হয়েও ওনি এত সুন্দর কিভাবে? সুন্দর তো মেয়েরা হয়। আনিশা চোখ সরিয়ে ফেলল। যদিও আদ্র আনিশাকে তাকিয়ে থাকতে দেখেনি।

কিন্তু কাছাকাছি আসতেই আনিশার দিকে চোখ পড়ল ওর। একবার তাকিয়েই দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল ও। কারন আনিশাকে দেখলেই ওর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়।
আনিশারা একপাশে দাড়িয়ে ছবি তুলছে। আর আদ্র দুর থেকে ওদের দেখছে।
আদ্রঃ শাড়িতেও কাওকে এতটা সুন্দর লাগে। (মনে মনে)আদ্র ওর উপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না।

এদিকে ফায়াজও চারুর দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্র ব্যাপারটা খেয়াল করে বলল~ কি দেখস?
ফায়াজ~ না, কিছুনা। হেহে।
আনিশার পারফরমেন্স শুরু হবে এখন।
চারুঃ যা যা দোস্ত।

আনিশাঃ যাচ্ছি তো।
আনিশা ধীরে ধীরে স্টেজে উঠে গেল। গান শুরু করতেই এতক্ষনের কোলাহলপূর্ণ জায়গাটা মুহুর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই স্টেজের দিকে তাকিয়ে আছে।
আদ্রও অবাক হয়ে আনিশার দিকে তাকিয়ে আছে। ও ভাবেনি আনিশা এত সুন্দর করে গান গাবে।

গান শেষ হতেই সবাই জোরে জোরে হাততালি দেয়া শুরু করল। আদ্র এতক্ষন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল হাততালির শব্দ শুনে ও নিজেও হাততালি দিতে লাগল। ফায়াজ অবাক চোখে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে।

ফায়াজ~ তুই হাততালিও দিতে পারিস?
আদ্রঃ পারবোনা কেন?

ফায়াজ~ না মানে কখনো দেসনিতো তাই।
আদ্রঃ আগে দাওয়ার প্রয়োজনবোধ করিনি।

আনিশা চোখ বন্ধ করে গান গাচ্ছে। গান শেষ হতেই যখন চোখ খুলল দেখল সবাই কেমন হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর হাততালি দিচ্ছে। ওর অনেক লজ্জা লাগল। তারাতারি স্টেজ থেকে নেমে গেল ও।

নামতেই চারু আর মিশু ওর কাছে আসল।
মিশুঃ অনেক সুন্দর গেয়েছিস রে।
চারুঃ ফাটায় দিসিস দোস্ত। ফাটায় দিসিস।
আনিশাঃ হইসে হইসে।
_
আদিরা ওর নিজের রুমে বসে আছে। কালকে আবিরের বাবা মা ওদের বাসায় আসবে। ওর ভীষন চিন্তা হচ্ছে।

যদিও না মেনে নেয়ার কোনো কারন নেই তবুও চিন্তা হচ্ছে। আবিরের সাথে ফোনে কথা হয়েছে একটু আগেই।
আবির বলে দিয়েছে কোন টেনশন করতে না। কিন্তু তাও ওর টেনশন হচ্ছে। আবির ছেলেটাকে ও একটু বেশিই ভালোবাসে।

আনিশারা বসে আছে। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। এরমধ্যে ও দুই তিনবার আদ্রকে দেখেছে। কিন্তু কিছুই বলেনি। চারু মিশু আর আনিশা ভার্সিটির ভিতরে চলে গেল।
চারুঃ চল আমরা উপরের তলায় যাই। এখানে অনেক মানুষ, একটু শান্তিমতো ছবিও তোলা যায় না।

চারুর কথা শুনে আনিশার সেদিনের কথা মনে পরে গেল। ও তারাতারি বলল~ আরে, আমরা এখানেই তুলি উপরে যাওয়ার কি দরকার। এইযে, এই সাইডে আয়। এমনেও এখন সবাই চলে যাবে এখন।
চারুঃ আচ্ছা।

ওরা ছবি তুলতে তুলতেই সবাই চলে যেতে লাগল। আর কয়েকজন আছে। নিচের অনুষ্ঠানও শেষ।
মিশুঃ আমরাও চলে যাই। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বেশি দেরি হয়ে যাবে নয়তো।
আনিশাঃ হুম।

ওরা নিচে নামছে। হঠাৎ আনিশা শাড়িতে বেজে হোঁচট খেল। পরে না গেলেও, ওর শাড়ির কুচি অনেকটাই খুলে গেল।
চারুঃ আরে, এখন কি হবে? (ব্যস্ত হয়ে গেল চারু)
আনিশাঃ আমি পারবো, তোরা যা আমি
ঠিক করে আসতেছি।

চারুঃ না তুই একা পারবিনা আমিও আসতেছি।
আনিশা জানে চারু আসলে কথা বলে বলে মাথা খারাপ করে দিবে। তাই কোনমতে বুঝিয়ে মিশুর সাথে পাঠিয়ে দিল।

আনিশা শাড়ি ধরে আসতে আসতে উপরে উঠছে। ওয়াশরুমের কাছে যেতেই দেখল আদ্র দাড়িয়ে আছে। সাথে সাথে ঘুরে গেল ও। উফফ, এখন যদি আদ্র ওকে এই অবস্থায় দেখে ফেলে তাহলে কি একটা লজ্জাকর পরিস্থিতিতে পরবে ও।
আদ্র দেখল আনিশা পিছনে ঘুরে আছে।

আদ্রঃ আনিশা, কি হয়েছে? কোন সমস্যা?
আনিশাঃ না না কোন সমস্যা না।
আদ্রঃ তো এমন পিছে ঘুরে আছো কেন?

আনিশাঃ কই আমিতো সামনেই ঘুরে আছি। আপনি আমার পিছে তো তাই। হেহে। আপনি যান আপনার কাজে যান।
আদ্রঃ কি বলছো এইগুলা? দেখি ঘুরো তো। বলেই আদ্র আনিশাকে ঘুরিয়ে দিল।
ঘুরিয়ে দেখে আনিশা দুহাতে কোনরকম কুচি ধরে দাড়িয়ে আছে। আদ্র এই অবস্থা দেখে সাথে সাথে আনিশাকে ছেড়ে অন্য দিকে তাকাল।

আদ্রঃ শাড়ি পরতে যখন পারোনা তখন পরছো কেনো?
আনিশার মেজাজ গরম হয়ে গেল এমন কথা শুনে। ভাবটা এমন যেন আমি শখে শাড়ি খুলে আসছি।

আনিশাঃ আপনাকে কে বলেছে আমি শাড়ি পরতে পারিনা? হোচট খেয়ে খুলে গেছে। তাতে আপনার কি? আমি কি বলেছি আপনাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে?
আনিশার কথায় আদ্র বাঁকা হেসে বলল~ দিব নাকি পরিয়ে?

আনিশা থতমত খেয়ে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে।
আদ্রঃ দাড়িয়ে আছো কেন? পরিয়ে দিতে বলছো নাকি? কিছুক্ষন চুপ থেকে আদ্র বলল, যাও শাড়ি
ঠিক করে আসো। বলেই নিচে নেমে গেল।

আনিশা শাড়ি ঠিক করে নিচে নেমে দেখে চারু আর মিশু দাড়িয়ে আছে। ও যেতেই চারু বলে~ পেরেছিস?
আনিশাঃ হুম।

তারপর চারুর সাথে বাসায় চলে আসে।
পরেরদিন সকালে……….


পর্ব ৬

পরেরদিন সকালে আনিশা ঘুম থেকে উঠতে উঠতে ১০ টা বেজে যায়। ভার্সিটি বন্ধ আজকে। উঠেই ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে মা বসে আছে ওর রুমে।
আনিশাঃ তুমি এখানে? কিছু বলবে?

মা~ হ্যাঁ, বস এখানে।
আনিশা বসে বলল~ বলো।
মা~ শোন, আজকে সন্ধ্যায় আমরা মেয়ে দেখতে যাব আবিরের জন্য। আর..কথার মাঝখানেই আনিশা বলে উঠল,

আনিশাঃ মা, তুমি তো জানো ভাইয়া বিয়ে করবেনা এখন। আগেও তো গিয়েছিলা কতজনের বাসায় কি লাভ হলো?
মা~ আরে পুরা কথাটাতো শুনবি, আবির নিজে আমাদের এই মেয়ের কথা বলেছে। ওর এই মেয়েকে পছন্দ।

আমাদের পছন্দ হলেই বিয়ে করবে। গত পরশুদিনই আমাদের বলেছে এই ব্যাপারে। তোকে জানাতে পারিনি। তো তুই রেডি হয়ে থাকিস। আমরা ৭:০০টার দিকে যাব।
আনিশা অবাক হয়ে গেছে মার কথা শুনে। আবির ভাইয়া নিজে বলেছে বিয়ের কথা আবার মেয়েও
ঠিক করে ফেলেছে।
আনিশাঃ আচ্ছা, আমি রেডি হয়ে যাব।
ওর মা চলে গেল।

আদ্রদের বাসায় আজকে রমরমা অবস্থা। মিসেস.রেশমা খুবই ব্যস্ত, রান্না নিয়ে। প্রথমবার মেয়েকে দেখতে আসবে।
আদ্র নিচে নামতেই দেখে মায়ের এমন ব্যস্ততা।

আদ্রঃ কি হয়েছে? তুমি এতকিছু রান্না করছো কেন? কেউ আসবে?
~ ওহ তুই তো জানিস না। আদিরাকে দেখতে আসবে আজকে সন্ধ্যার দিকে। তাদের জন্যেই রান্না করছি।
~ কারা আসবে?

~ আরে, বিয়ের জন্য দেখতে আসবে।
~ ওহ
~ হ্যাঁ, এখন যা তুই, বিরক্ত করিসনা।
আদ্র নিজের রুমে চলে গেল।

সন্ধ্যার সময় আনিশা রেডি হচ্ছে। কালো কালারের একটা থ্রিপিস পরেছে ও। সাজগোজ করেনি। শুধু ঠোঁটে হাল্কা লিপস্টিক। সবাই প্রায় রেডি। ওর জন্যই অপেক্ষা করছে নিচে। ও জলদি করে চুলটা আঁচরিয়ে নিচে নেমে গেল। ও নামতেই রওনা দিয়ে দিল।

আদিরাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ও নিজের রুমে বসে আছে।
আদ্র ওর নিজের রুমেই বসে আছে এমন সময় ওর মা ওর রুমে আসল।
~ তুই এটা কি পরে আছিস?

একটু পানজাবি পর। তোর বোনকে দেখতে আসবে।
~ মা, আপুকে দেখতে আসবে। আমাকেতো না। আমি কেনো পানজাবি পরে বসে থাকবো?
~ উফ, আদ্র তুইতো যাবি নাকি উনাদের সামনে। পানজাবিটা পরেনে বাবা।

আদ্র ওর মায়ের জোরাজোরিতে পানজাবি পরছে। নীল রংয়ের পানজাবি।
আনিশারা চলে এসেছে। বেল বাজাতেই তারাতারি দরজা খুলে দিল আদ্রর মা।
ওরা যেয়ে বসল। আনিশা চুপ করে বসে আছে। এর মধ্যেই ওর মা আদ্রর মাকে বলছে~ এইযে, এটা আমার ছোট মেয়ে। আনিশা।

আনিশা সালাম দিলো।
আদ্রর মা~ বেশ মিষ্টি দেখতে তুমি।
আনিশা জবাবে মুচকি হাসল।

আদিরাকে নিচে নিয়ে আসা হলো। বড়রা সবাই কথা বলছে, আনিশা চুপ করে বসে আছে এমন সময় আদ্র নিচে আসল। আদ্র নিচে আসতেই আদ্রর মা বললো~ এটা আমার ছোট ছেলে।
আনিশা সিঁড়ির উল্টা সাইডে বসে ছিল তাই ও দেখতে পায়নি। দেখার জন্য মুখ ঘুরাতেই প্রচন্ডরকম অবাক হলো।

আনিশাঃ উনি এখানে কি করছেন? উনিই ভাবির ছোট ভাই তাহলে।
আদ্রও আনিশাকে এখানে দেখে বেশ অবাক হলো। কিন্তু প্রকাশ করলোনা।
আদ্র সবাইকে সালাম দিয়ে বসে পরল একদম আনিশার সামনেই। আনিশা মাথা নিচু করে বসে আছে। আদ্রর দিকে একবারও তাকায়নি। আদ্র যে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে ব্যাপারটা ও ঠিকই বুঝতে পারছে।

সবাই খাওয়ার জন্য উঠতেই আনিশা আদ্রর মাকে বলল~ আন্টি আমি একটু ওয়াশরুমে যাব। ওয়াশরুমটা কোনদিকে?
আদ্র পাশেই দাড়িয়ে ছিল।

আদ্রর মা~ এই আদ্র ওকে একটু ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দে তো। তুমি ওর সাথে যাও মা।
আনিশার বিরক্ত লাগছে। সবছেড়ে উনাকেই বলতে হলো।
আদ্র আনিশার দিকে তাকিয়ে হাল্কা হেসে বলল~ আসো।
আনিশা আদ্রর পিছে পিছে গেল।

আদ্র ইচ্ছা করেই আনিশাকে নিজের রুমের ওয়াশরুমে নিয়ে আসল।
আনিশা রুমে ঢুকেই দেখে রুমটা বেশ সুন্দর করে সাজানো। একদম গোছানো একটা রুম। খাটের উপরে আদ্রর একটা বড় ছবি দেখে বুঝলো এটা আদ্রর রুম। আদ্র ওর পাশেই দাঁরিয়ে আছে। বেশ অসস্তি লাগছে ওর।

আদ্রঃ দাড়িয়ে আছো কেন? যাও।
আনিশা তারাতরি ঢুকে গেল।
বের হয়ে দেখে আদ্র এখনো বাইরে দাড়িয়ে আছে।
আদ্রঃ চলো, নিচে চলো।

আনিশাঃ আমি একাই যেতে পারতাম। আপনি কষ্ট করে দাড়িয়ে আছেন কেন?
আদ্র কিছু বললোনা।

ওরা নিচে নামছে হঠাৎ আনিশার পা পিছলে যায় আর পরে যেতে নেয় কিন্তু তার আগেই আদ্র ওকে ধরে ফেলে। আনিশা ওর পানজাবি আকড়ে ধরে দুহাতে।
আনিশা আদ্রর দিকে তাকাতেই আদ্র দ্রুত ওকে সোজা করে দাড় করিয়ে ওর কোমড় ছেড়ে দেয়।

আদ্রঃ ঠিক আছ?
আনিশাঃ জি ধন্যবাদ।
আদিরা আর আবিরের বিয়ের ডেট ফিক্স করা হবে আগামী সপ্তাহে। আদিরাকে অনেক পছন্দ করেছে আবিরের মা। আর আদিরাদের দিক থেকেও কোন সমস্যা নেই। তাই তারাতারিই ওদের বিয়েটা হয়ে যাবে।

সব কথাবার্তা হয়ে গেলে আনিশারা বাসায় চলে আসল।
রাতের বেলা….


পর্ব ৭

রাতের বেলা আদ্র জানালার পাশে দাঁরিয়ে আছে। ভাবছে আনিশার কথা।
এই মেয়েটা কাছাকাছি থাকলে ওর কেমন একটা শান্তি লাগে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়।
ওর সবকিছুই ওকে পাগল করে দেয়।

পরেরদিন ভার্সিটিতে…
চারুঃ তারপর ভাইয়ার বিয়ের কি হলো?
আনিশাঃ পরশুদিন ডেট ঠিক করা হবে। তারপর বিয়ে।
চারুঃ উফফ কি মজা না। ভাবিকে কেমন লাগল তোর?

আনিশাঃ আমি তেমন কথা বলার সুযোগ পাই নাই। তাও দেখে অনেক ভালোই মনে হলো।
চারুঃ আরে ভাইয়ার পছন্দ ভালোই হবে।
আনিশাঃ সেটাই।

চারুঃ তোর ভাবির কোন ভাই টাই নাই?
আনিশার মেজাজ গরম হয়ে গেল।
আনিশাঃ সেটা দিয়ে তুই কি করবি?
চারুঃ না মানে এমনেই বলছিলাম।

ব্রেকের সময় আনিশারা ক্যান্টিনে যাচ্ছে। তখন দেখল আদ্র ওর ফ্রেন্ড দের সাথে বসে আছে।
আনিশা সেদিকে ধ্যান না দিয়ে চলে গেল।
ক্লাস শেষ করে চারু আর মিশু নিচে নামছে। আনিশা লাইব্রেরিতে গিয়েছে।

এদিকে আনিশা লাইব্রেরিতে দাঁরিয়ে আছে। বই নামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই পারছে না
ও পাশে একটা চেয়ার এর মতো দেখতে পেল। ওটা নিয়ে সেটার ওপর দাড়িয়ে যখনই হাতটা উঁচু করল সাথে সাথে কিছু একটা ছেড়ার শব্দ হলো।

আনিশাঃ কি হলো? তারাতারি নিজের দিকে তাকাল ও কিন্তু না সব তো
ঠিক আছে।

ও বইটা নিয়ে নিচে নেমে গেল। লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে নিচে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। হঠাৎই সামনে থেকে আদ্র এসে ওকে জড়িয়ে ধরে সিড়ির একপাশে নিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় আনিশা অবাক হয়ে গেছে।

আর আদ্র এইভাবে ধরে রাখায় কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে।
আদ্র অনেকটা রেগে বলল~ নিজের একটু খেয়াল রাখতে পারোনা?
আনিশা মুখ উঠিয়ে আদ্রর দিকে তাকাল। চোখগুলো লাল হয়ে আছে আদ্রর।
দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ রেগে আচ্ছে আদ্র।

আনিশাঃ জি মানে?
আদ্রঃ মানে তুমি দেখবা না তোমার জামা ছিড়ে গেছে পুরা। সব দেখা যাচ্ছে আনিশা।
বলেই আরও ভালোকরে আগলে ধরল ওকে। আশেপাশে কয়েকজন ছেলে মেয়ে ছিল। আদ্র তাদের ইশারা করতেই সবাই চলে গেল।

আনিশাঃ আমি…আমি আসলে বুঝিনি।
আদ্র আনিশার দিকে তাকিয়েই বুঝল ওর অসস্তি হচ্ছে। দ্রুত ওকে ছেড়ে দাড়াল। পকেট থেকে দুইটা সেফটিপিন ওর হাতে দিয়ে বলল~ এটা লাগিয়ে নাও। কেউ আসবেনা এখানে, আমি আছি। বলে অন্য দিকে ঘুরে গেল।

আনিশা সেফটিপিনগুলো লাগানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। কিছুতেই হাত যাচ্ছে না।
বেশ কিছুক্ষন পর আদ্র বলল~ হয়েছে?
আনিশাঃ আ…একমিনিট দাড়ান। আসলে..
আদ্র হাল্কা ঘুরতেই দেখল আনিশা লাগাতে পারছেনা। আদ্র একদৃিষ্টতে তাকিয়ে আছে ছেড়া জায়গাটায়।

পিঠের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। আদ্র নিজেকে সংযত করে বলল~ আমি লাগিয়ে দেই।
আনিশাঃ আমি পার…..
আদ্র এসে ওর হাত থেকে সেফটিপিনগুলো নিয়ে নিল।

আদ্রর হাত যতবার আনিশার পিঠে লাগছে ততবারই আনিশা কেপে উঠছে।
আদ্রঃ হয়ে গেছে। তারপর আনিশার ওড়নাটা দিয়ে ভালভাবে ঢেকে দিল জায়গাটা।
আনিশাঃ থ্যাংক ইউ ভাইয়া আপনাকে।
আদ্রঃ যাও এখন সাবধানে।

আনিশাঃ জি।
নিচে নামতে নামতেই দেখে চারু উপরে উঠছে।
চারুঃ কি হইসে তোর? এত দেরি করলি যে?
আনিশাঃ নিচে চল পরে বলব। ওরা রিকশায় ওঠতেই চারু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। আনিশা ওকে শুধু আজকের কথাটা বলল।

চারুঃ এতকিছু হয়ে গেল?
আনিশাঃ কি হয়ে গেল?

চারুঃ এই আদ্র ভাইয়া মনে হয় তোকে পছন্দ করে।
আনিশা ভ্রু কুচকে চারুর দিকে তাকাল।
তারপর বেশ শান্ত গলায় বলল~ কেন এমন মনে হলো?
চারুঃ আরে পছন্দ না করলে কি সাহায্য করত।

আনিশাঃ এমন কিছুই না। ওনার জায়গায় যে কেও থাকলে এমনই করত।
চারুঃ কে করত এমন? তখন তো তোর আশেপাশে অনেকেই ছিল কেও করেছে কিছু?
আনিশাঃ উফ..তুই বড্ড বেশি কথা বলিস। চুপ করতো। বাদ দে এসব।
চারুঃ হুহ।

বাসায়….
আনিশার মা~ আনিশা শোন
আনিশাঃ বলো
~ আজকে বিকালে আমাদের একটু মার্কেটে যেতে হবে। আদিরার জন্যে কিছু কেনাকাটা করব।

~ আচ্ছা।
~ আমরা দুইজনই যাবো?
~ নারে। এখন তো আর আগের যুগ নাই। মেয়েটার জন্যে কিছু কিনবো কিন্তু ওর যদি পছন্দই না হয় তখন। তাই আদিরাও আসবে। আমিই বলেছি।
~ ওহ, ভালো।

বিকালে..
আনিশা আয়নার সামনে দাঁরিয়ে রেডি হচ্ছে। রেডি হয়ে বের হতেই দেখল আবির আর মা অপেক্ষা করছে ওর জন্য। ওরা বের হয়ে গেল।

মার্কেটের সামনে দাঁরিয়ে অপেক্ষা করছে আনিশারা। আদিরারা এখনও আসেনি।
~ আবির, একটা ফোন দিয়ে দেখনা। কোন সমস্যা হলো নাকি।
আবির ফোনটা বের করতেই গাড়ির হর্ন শুনতে পেল ওরা। চলে এসেছে আদিরারা।
~ ওইতো, এসে পড়েছে।

আবিরের কথা শুনে ওইদিকে তাকাতেই আনিশা দেখল গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে আদ্র নামছে।
~
আনিশাঃ উফ, উনাকেই আসতে হলো ভাবিকে দিতে। (মনে মনে)
মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল আনিশার। আদ্র আশেপাশে থাকলেই ওর কেমন জানি অসস্তি লাগে। আদ্রর সাথে ওর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো হতে পারে অস্বস্তির কারন অথবা অন্যকিছু।
আদ্র একটা জিন্স পরে আছে। আর উপরে একটা ব্রাউন টি শার্ট। হাতে একটা ঘড়ি। আর সেই এলোমেলো চুল।

আদিরা আর আদ্র এসেই আনিশার মাকে সালাম দিল।
আদ্রঃ কেমন আছেন ভাইয়া?
আবির~ ভালো। তুমি কেমন আছো?

আদ্রঃ আমিতো অনেক ভালো আছি। (আনিশার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা)
আনিশা একটু বিব্রত বোধ করল। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলল।

ওরা মার্কেটে ঢুকে গেল। আদ্র কেমন জানি আনিশার পাশ ঘেঁষেই দাঁরিয়ে আছে। আনিশার অসস্তি লাগলেও কিছু বলতে পারছে না। কেনাকাটা শেষ করে ওরা বের হয়ে আসল। এরমধ্য একবারও আদ্রর সাথে কথা হয়নি আনিশার।
দুইদিন পর….


পর্ব ৮

দুইদিন পর….
আজকে আবিরের বিয়ের ডেট ফিক্স করা হবে।
বিকাল বেলা আদ্ররা আনিশাদের বাসায় আসবে।
এদিকে ফায়াজ বসে আছে আদ্রর রুমে। সকালেই চলে আসছে ও।
আদ্রঃ বুঝলি ব্যাপারটা?

ফায়াজ মুখটা বেশ গম্ভীর করার ছেলে বলল~ হুমম, বুঝলাম।
আদ্রঃ এখন তোর কি মনে হয়? আমার কি ওকে বলে দেয়া উচিত?
ফায়াজ~ কয়েকদিন পর বল। আয়ান খান আদ্র প্রেমে পরেছে। একটু ভাব খাওয়াই যায়।
আদ্রঃ হুমম। আপুর বিয়ের দিন বলব।

আনিশা নিজের রুমে বসে আছে।
আনমনে আদ্রর কথা ভাবছে ও।
পাশ থেকে হঠাৎ চারু বলে উঠল~ কি করবি এখন?
আনিশা চিন্তিত ভঙ্গিতে চারুর দিকে তাকাল।
~ জানিনাতো। আমার ভয় লাগে উনাকে।

চারু বিরক্তি নিয়ে তাকাল। কিছুক্ষন পর বলল~ এভাবেই কাটিয়ে দে সারাজীবন। দেবদাসিনী হয়ে। তোর যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে কিছুদিনের মধ্যই পাগল হয়ে যাবি।
চারুর কথায় আনিশার কোন পরিবর্তন দেখা গেল না।

~ তুই কি বুঝতে পারছিস আমার কথা? আনিশা?
~ উনি যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে?
~ দেখ, এতটা শিওর মনে হয় আমি আমার ভবিষ্যত নিয়েও না যতটা এটা নিয়ে যে আদ্র ভাইয়া তোকে পছন্দ করে।

আনিশা আরচোখে চারুর দিকে তাকাল। তারপর আবার উদাসীনভাবে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল।
চারু হাল ছেড়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিল।

তোরা কি ঘরেই বসে থাকবি? বলতে বলতে রুমে ঢুকল আনিশার মা।
দুইজনেই মুখ উঠিয়ে তাকাল তার দিকে।
~ এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?

আনিশা উওর দিচ্ছে না দেখে চারুর বলল~ আমরা আসতেছি আন্টি আপনি যান।
আনিশার মা অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে চলে গেল।
~ এই উঠতো তুই। তারাতারি উঠ।
বলেই জোর করে হাত টেনে দাঁড়া করাল আনিশাকে।
~ চল নিচে চল।

দরজা খুলে বের হতেই গাড়ির হর্ন কানে আসল।
আবির ভাইয়া দ্রুতগতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
ওরা নিচে নামতেই শুনতে পেল “আসুন আসুন”
~ চলে এসেছে। বলে হাসিমুখে আনিশার দিকে তাকাল চারু।
~ তুই কিন্তু আমার সাথে সাথেই থাকবি।

~ তো আমি কি আমার শশুর বাড়ি যাব তোকে ছেড়ে?
আনিশা চোখমুখ কুচকে চারুর দিকে তাকাল।

হলরুমে যেতেই ওরা দেখল আদ্র হাসিমুখে আনিশার বাবার সাথে কথা বলছে। বাবার সাথে উনার এত কি কথা এটাই ভেবে পাচ্ছে না আনিশা। আদ্রর পাশেই বসে আছে ফায়াজ। ফায়াজকে দেখেই চারু বলল~ আরে, এ আবার এখানে কি করে?
~ কে?

~ আদ্র ভাইয়ার পাশের জন।
~ হবে উনার ভাই টাই। তুই চিনিস?
~ এ আমাদের ভার্সিটিতেই পড়ে।
~ বাহ্, ভালোই।

~ এখানে ভালোর কি দেখলি?
আনিশা চারুর কাঁধে একটা বাড়ি মেরে বলল~ কিছুনা রে দোস্ত।
~ তোর আবার কি হলো? পাগল হয়ে গেলি নাকি?
আনিশা জবাব দিল না।

চারুর হাত ধরে রান্নাঘরে গেল।
~ মা।
~ কি হয়েছে?
~ রান্না শেষ?
~ হ্যাঁ, কেন?

~ না, এমনেই। আচ্ছা ভাবীদের সাথে আরেকজন কে আসছে?
~ ওটা ওর ভাই আদ্রর বন্ধু। ওর ভাইয়ের মতোই। তাই সাথে আসছে।
~ ওহ।

হলরুমে যেয়ে সবাইকে সালাম দিল ওরা। ফায়াজতো অবাকচোখে চারুর দিকে তাকিয়ে আছে।
~ চারু এখানে?

~ ও আনিশার ফ্রেন্ড। (পাশ থেকে আদ্র বলল)
~ আদ্ররে।
~ কি হইছে?
~ কিছুনা যা।

আদিরার পাশে যেয়ে বসল ওরা।
~ কেমন আছো তোমরা? (হাসিমুখে আনিশা আর চারুকে জিজ্ঞেস করলো আদিরা। )
~ ভালো আছি ভাবী। (একসাথেই বললো দুজন)
ওদের কথায় হেসে দিল আদিরা।

~ বিয়ে এখনো হয়নাই।
~ হয়ে তো যাবে।
আনিশার বাবা~ আদ্র তো তোদের ভার্সিটিরই। তোরা চিনিস না?
আনিশাঃ চিনি। বলে আদ্রর দিকে তাকাল। আদ্র একহাতে ফোন নিয়ে আনিশার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

উফফ পাগল হয়ে যাব আমি উনার এই হাসি দেখে। (মনে মনে)
আনিশার বাবা~ ভালোই হলো, তোমাদের আগে থেকেই চেনাজানা আছে। ভার্সিটিতে কোন সমস্যা হলে আদ্রকে বলো।
আদ্রঃ হ্যাঁ, অবশ্যই বলবা। (আনিশার চোখে চোখ রেখে)
__
আনিশা ছাদে একা দাঁরিয়ে আছে। চারু নিচে গিয়েছে একটু আগে। আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আনিশা। খোলাচুল গুলো বাতাসে উড়ছে। হঠাৎ ছাদের দরজা খোলার আওয়াজ পেলো। চারু এসেছে ভেবে আর পিছে তাকাল না।
“কি ভাবছো? “

পাশ থেকে আদ্রর কন্ঠ শুনে চমকে পাশে তাকাল আনিশা।
~ আপনি?
~ হ্যাঁ, আমিই। কোনো ভুত না যে এত চমকাচ্ছো।
আনিশা চুপ করে রইল।

~ তোমাদের বাসাটা ঘুরে দেখছিলাম।
~ ওহ্।
তারপর দুজনেই চুপ। কিছুক্ষন পর আনিশা চলে যেতে নিলে আদ্র ওর হাত ধরে থামিয়ে দিল। আনিশা অবাকচোখে আদ্রর দিকে তাকাল।

আদ্র ওর হাত ধরে নিজের পাশে দাড়ঁ করিয়ে বলল~ একটু পর যাও। আর কিছুক্ষন থাকো। বলে আনিশার দিকে তাকাল। আনিশাও আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রকেও এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অন্যদিকে তাকাল আনিশা। অসস্তির মাত্রাটা একটু একটু করে বেড়েই চলেছে। আদ্র এখনও ওর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। হয়তো ধরে রাখার ইচ্ছাটা আজীবনের।

রান্নাঘরে আনিশার মার সাথে দাঁরিয়ে আছে চারু। ফায়াজ সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
~ চারু মা। তুই একটু পানির জগটা এনে দিবি টেবিল থেকে।
~ অবশ্যই আন্টি।

চারু বের হতেই দেখল ফায়াজ ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
দ্রুত জগটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল ও।
ভাইয়ার বিয়ে আগামী সপ্তাহে। আজ থেকে ঠিক সাতদিন পর “শুক্রবারে”।


পর্ব ৯

“বিয়ে” শব্দটার সাথেই একটা আনন্দময় ভাব জড়িয়ে আছে।
আদ্রদের বাসায় তোরজোর আয়োজন চলছে। একমাএ মেয়ের বিয়ে বলে কথা। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। আদ্র নিজেও অনেক ব্যস্ত। বোনের বিয়েতে সব কাজ নিজে দাঁরিয়ে থেকে করাচ্ছে। কোন কিছুতে যেন কোন কমতি না থাকে।

অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে পুরো বাড়ি।
আদিরার বিয়ের সাথে আরও একটা কারণে আজকের দিনটা আদ্রর জন্য বিশেষ একটা দিন। আর সেটা হচ্ছে আজকে ও আনিশাকে নিজের মনের কথা বলবে। নিজের প্রেয়সীকে সে কতটা ভালোবাসে সেটা জানাবে। সব ঠি ক থাকলে আজকে থেকেই ওদের দুজনার ভালবাসাপূর্ন দিনগুলো শুরু হবে। আরতো মাএ কয়েকঘন্টার অপেক্ষা।

এদিকে আনিশাও ভীষন ব্যস্ত। সব আত্মীয়রা ওদের বাসায় এসেছে। বাসায় হুলুসতুল কান্ড। সব কাজিনরা একসাথে হওয়ায় আনন্দের মাত্রাটা আরও একধাপ বেরে গিয়েছে। চারু আর মিশুও সকালেই চলে এসেছে।

সকলেই গল্প~ গুজবে মেতে উঠেছে। কাজিনরা একসাথে হতেই সবাই জেঁকে বসল আনিশাকে।
ইতি~ এরপর কিন্তু তোর পালা অনু। আচ্ছা তোর কি কাওকেই পছন্দ হয়না রে?
উওরে মৃদু হাসল আনিশা। ইতি আনিশার বড় খালার মেয়ে। ইতির কথায় আদ্রকে মনে পরতেই অন্যমনস্ক হয়ে গেল আনিশা।

আচ্ছা, ওর ভালবাসাটাকি আদৌ পূর্ণতা পাবে? আদ্র কি আদৌ ওকে ভালবাসে? নাকি সবটাই ওর নিছক কল্পনা মাএ। হয়তো আদ্র ওকে ভালোইবাসেনা। হঠাৎই আনিশার মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল, ও যদি মারা যায় আদ্র কি ওকে মিস করবে?

ধুরর, এসব কেন চিন্তা করছি আমি? এই ভেবে আনমনেই নিজের উপর বেশ বিরক্ত হলো আনিশা। কিন্তু পরক্ষনেই আদ্রর থেকে ভালবাসি কথাটা শোনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল ওর মন।

চারুর ধাক্কায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো ও। ভ্রু কুঁচকে চারুর দিকে তাকিয়ে বলল,
~ কি হইছে? ধাক্কাসকে?
দাঁতে দাঁত চেপে চারু বলল,

~ তুই কি সবার সামনে এমন পেঁচার মতো গম্ভীর মুখ করে থাকবি?
~ আমি পেঁচা? (চোখ বড় বড় করে বলল)
~ না না আমারই ভুল হইসে। তুইতো পেঁচা না তুইতো একটা কিউট পেঁচী। বলে মুখ বেকিয়ে হাসল চারু।

~ হ্যাঁ, আর তোর ফায়াজ ভাইয়ায়া(ব্যঙ্গ করে)কি রে? তাকেও একটা সুন্দর নাম দে।
আনিশার কথায় যেন বিষম খেল চারু। চারুর চেহারার এমন একটা অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসল আনিশা।

~ হয়েছে, আর লজ্জা পেতে হবেনা। আমি জানি সবটাই।
চারু হতাশা নিয়ে বলল,
~ কিভাবে?
~ এইভাবেই।

চারু আর কথা বারালোনা। সবার সামনে অপদস্ত হওয়ার ইচ্ছাটা ওর একবারেই নেই।
বিকালের দিকে সব মেয়েরা পার্লারে চলে গেল রেডি হওয়ার জন্য।
আদিরাকেও সাজিয়ে দেয়ার জন্যে মেয়েরা চলে এসেছে। পার্লারে যাওয়ার উটকো ঝামেলা এড়াতেই এই ব্যবস্থা।

আবির শেরওয়ানি পরে রেডি হয়ে আছে। ওর থেকে সুখী মানুষ হয়তো এই পৃথিবীতে আর নেই। দীর্ঘ তিন বছরের সম্পর্কটা একটা পবিএ রুপ পেতে চলেছে। একটা নাম পেতে চলেছে। তিন বছরে কম কষ্ট করেনি তারা।

সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দুজনের প্রচেষ্টাই ছিলো সমান। আর অবশেষে আজকে তারা পূর্ণতা পেতে চলেছে। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছেনা আজকে।
আদ্র সাদা রংয়ের একটা পানজাবি পরেছে সাথে কালো পায়জামা। পকেটে সানগ্লাস।

এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠি ক করে ফোনটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল ও। কখন যে আনিশারা আসবে। বিয়েটা ঠি ক ঠাক মতো হয়ে যাক তারপর সময় সুযোগ বুঝে আনিশার কাছে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করবে। কিন্তু সময় যেন আজকে ধীর গতিতে চলছে।
আনিশা একটা একটা সাদা রংয়ের লেহেঙগা পরেছে।

তার মধ্য সাদা সুতার কাজ করা। আর সাদা পাথর বসানো। চুলগুলো খোলা। মুখে তেমন সাজ নেই। তবুও অনেক সুন্দর লাগছে ওকে। আচ্ছা, “আদ্র কি পরেছে আজকে? “কেমন লাগছে উনাকে? “চিন্তাগুলো মাথায় আসতেই আদ্রকে দেখার ইচ্ছাটা তীব্র থেক তীব্রতর হতে লাগল।
আদিরা বউ সেজে বসে আছে। লাল রংয়ের জামদানী পরিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। মুখে ভারী সাজ।

আজকের দিনটা ওর জন্য অনেক বেশি গুরুতপূর্ণ। এখন শুধু আবিরের আসার পালা।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে আনিশারা সবাই পার্লার থেকে বাসায় চলে এসেছে। এখান থেকে সবাই একসাথে যাবে।

প্রথম গাড়িতে উঠল আবির, ওর বাবা, মা, আর বড় খালা, বড় খালু।
পিছনের গাড়িতে উঠল আনিশা, চারু, ইতি মিশু। আনিশা বসেছে ফ্রন্ট সিটে। বাকিরা পিছনের সিটে।

সবাই হাসিমুখে কথাবার্তা বলতে বলতে যাচ্ছে।
হঠাৎই একটা বড় ট্রাক ব্রেক ফেল করে আবিরদের গাড়ির সাইড দিয়ে মাঝারি রকমের একটা ধাক্কা দিয়ে
ওভারটেক করে আনিশাদের গাড়ির সাথে প্রচন্ড গতিতে সংঘর্ষ করলো।
একমুহূর্তেই সব নিস্তব্ধ।

আশে পাশের মানুষরা এসে ভীড় জমাতে লাগল।
আবিরদের গাড়ির সামনের কাঁচ পুরোটাই ভেঙে গেছে। আর আনিশাদের গাড়ি দুমড়েমুচরে পরে আছে রাস্তার এক কোঁণে।


আদিরা বার বার ফোন দিয়ে যাচ্ছে আবিরকে। এখনও আসছেনা কেন? মনটা কেমন যেন কু~ ডাঁক ডাকছে।
বার বার মাথায় খারাপ চিন্তা আসছে। ওর ভাবনার মাঝেই রুমে প্রবেশ করলো ওর মা,
~ কিরে ফোন ধরেছে?

~ না মা। ফোনতো ধরছে না। কিছু হলো নাতো?
মিসেস পারভীন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
~ আরে না কিছু হয় নি। কিছুক্ষন পরেই চলে আসবে। হয়তো জ্যাম বেশি।
মুখে একথা বললেও তার নিজেরও কেমন জেনো লাগছে।

আবির আহত অবস্থায় দ্রুত গাড়ি থেকে নামল। কোনমতে দৌড়ে আনিশাদের গাড়ির সামনে গেল।

আনিশাকে এমন রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে আত্মা কেঁপে উঠল ওর। হারিয়ে ফেললো নাতো আদরের ছোটবোনটাকে? নাহ্, এখন এসব ভাবলে চলবেনা। আশেপাশের মানুষের সাহায্য নিয়ে আনিশাকে বের করল আবির। ততক্ষনে বাকিরাও গাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে।

সবাই কোন ভাবে আহত। বিশেষ করে চারুরা। কিন্তু পিছনে বসার কারণে সরাসরি লাগেনি ওদের। চারুর মাথা ফেটে গড়গড় করে রক্ত পরছে। কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই। ও আনিশার এমন অবস্থা দেখে স্তব্দ হয়ে গেছে। মিশু আর ইতির হাতে কাঁচ ঢুকে গেছে তারা জানালার কাছে বসেছিল। আনিশার মা চিৎকার করে কান্না করছে। ওর বাবা সামলে রাখতে পারছেনা।

আবির আনিশার মাথাটা নিজের কোলের উপর রাখল। হ্যাঁ, এখনও নি:শ্বাস নিচ্ছে আনিশা।
আবির আর সেকেন্ডও দেরি করলোনা। আনিশাকে কোলে নিয়েই ছুটল সামনের হাসপাতালের দিকে।

আদ্রদের বাসায় সবার মুখে চিন্তার ছাপ। আদিরাতো রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আদ্র ভ্রু কুচকে আদিরার ফোন হাতে নিয়ে আবিরকে একটার পর একটা ফোন দিয়েই চলেছে। আবিরের বাবা~ মা কেউ ফোন করা হচ্ছে কিন্তু কেউই রিসিভ করছেনা।

আদ্র বিরক্ত হয়ে ফোনটা যখনই রাখতে যাবে তখনই রিং বেজে উঠল। আদ্র দ্রুতহাতে ফোনটা রিসিভ করে বলল,
~ হ্যালো, আপনা….

আদ্র আর কিছু বলবে তার আগেই অপর পাশ থেকে চারুর কান্নামাখা কন্ঠ ভেসে আসল।
~ আমরা হসপিটালে। আনিশা আই সি ইউ তে।
আদ্র যেন থমকে গেল। হাত থেকে ফোনটা ধপ করে পরে গেল। অপর পাশ থেকে চারু হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। সবাই বার বার জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে?

কোন কথাই যেন ও শুনতে পারছে না। ওর কানে বার বার একটা কথাই বাঝছে”আনিশা আই সি ইউ তে”
পাশ থেকে ফায়াজ ফোনটা তুলে কানে দিল,
~ হ্যালো।

~ আসার পথে একসিডেন্ট করেছে। আনিশা আই সি ইউ তে আছে এখন।
ফায়াজ আদ্রর কাঁধে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলল,
~ কোন হসপিটাল?

চারু ওপাশ থেকে নাম বলতেই খট করে ফোনটা কেটে গেল।
হসপিটাল শুনতেই আদিরা হুহু করে কেঁদে উঠল।
আদ্র নিজেকে সামলে নিয়ে বলল~ কোন হসপিটাল?
~ শান্ত হ আদ্র।

চিৎকার করে বলল আদ্রঃ তারাতারি বল ফায়াজ।
ফায়াজ নাম বলতেই গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল আদ্র।
মাথা নিচু করে হসপিটালের করিডোরে বসে আছে আবির। একটু আগেই অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানো হয়েছে আনিশাকে। আজকের দিনটাতো অন্যরকম হলেও পারতো। এমনই কেন হতে হলো?

নাহ্, আর ভাবতে পারছেনা আবির আশেপাশের কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।
কোনরকম গাড়ি পার্ক করে হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালে ঢুকল আদ্র। রিসিপসনিসট এর কাছ থেকে জেনে আই সি ইউর দিকে ছুটল।

আদ্র আসার কয়েকমিনিট পরেই আদিরা, ফায়াজ আর ওদের বাবা, মা চলে আসল।
আই সি ইউর দরজার কাঁচ দিয়ে ভিতরের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে আদ্র। আনিশার মুখে অক্সিজেন মাসক। মাথায় ব্যান্ডেজ। পাশে রক্তমাখা তুলো ভর্তি ট্রে। চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি গড়িয়ে পরছে আদ্রর।

বেশ খানিকটা সময় পর ডাক্তার বের হয়ে আসল। আবির, আদ্র দ্রুত যেয়ে জিজ্ঞেস করল আনিশার অবস্থা।
ডাক্তার বলল,

~ পেশেনটের অবস্থা এখনও ক্রিটিকাল। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তবে এখন কিছু বলতে পারছি না। একটা পর্যায়ে আমাদের কিছু করার থাকেনা। যদি কিছু হয় তাহলে সেটা মিরাক্কল। কিন্তু আমরা বলব আপনারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।

আদ্র হুঁশ হারিয়ে ফেলল এমন কথা শুনে। চিৎকার করে বলল,
~ কিসের প্রস্তুত থাকব? কেমন হসপিটাল এটা? এখানে রাখবইনা আনিশাকে। কিছু হবেনা আনিশার।

ডাক্তার ইশারায় আদ্রকে শান্ত করতে বলে চলে গেল। এতক্ষনে সবাই আদ্র আর আনিশার ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছে।

মাথায় হাত দিয়ে বসে পরল আদ্র। প্রচন্ড অসহায় লাগছে নিজেকে। কিছু করতে পারছেনা ও।
আনিশাকে বলা হলোনা, হয়তো আর কখনো বলতে পারবে না “ভালবাসি, অনেক বেশি ভালবাসি, নিজের থেকেও বেশি ভালবাসি”।


পর্ব ১০ (শেষপর্ব)

প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা পর…
চারুর, মিশু, ইতি ওদের ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়েছে।
আনিশার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। আদিরা যথাসম্ভব আবিরকে সামলাচ্ছে।

আদ্র নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। আজ কিছুই করার নেই তার। পরিস্থিতির কাছে হেরে গেছে সে। ডাক্তার বলেছে আনিশার বাঁচার সম্ভাবনা মাএ ১০%। মাথায় প্রচন্ড আঘাতের ফলে অনেক রক্তক্ষরন হয়েছে।

যে কোন সময় কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।
কথায় আছে মানুষ অতি শোকে পাথর হয়ে যায়। আদ্রর সাথেও এমনি হচ্ছে। ও কি করবে নিজেই বুঝতে পারছে না।

দুহাত দিয়ে মাথা চেপে নিচু হয়ে বসে আছে আদ্র। আনিশার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত মনে করতেই বুকের বাম পাশটায় চিনচিন ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে। আনিশা তার থেকে দুরে চলে যাচ্ছে ভাবতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। নাহ্, আর ভাবতে পারছেনা সে। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে।

ইশশ, “আজ বড্ড লোভ হচ্ছে”আনিশাকে যদি একটিবার বলতে পারত “ভালবাসি”। আনিশাকে নিজের করে পাওয়ার লোভটা সে সামলাতে পারছেনা। নাহ্, একদমই পারছেনা।

আদ্রকে মাথা চেপে ধরতে দেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল আদ্রর মা। পাশে বসে কাঁধে হাত রাখতেই আর নিজেকে
ধরে রাখতে পারল না আদ্র। মাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে দিল। ছেলেদের নাকি কাঁদতে হয়না। কিন্তু ভালবাসার কাছে এসব যুক্তি নিতান্তই ভীত্তিহীন।

প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রনা যেন মৃত্যু যন্ত্রনাকেও হার মানায়।
ভালবাসা এক ভয়ংকর অনুভূতি। পাথরের মতো শক্ত মনের মানুষকেও নিমিষেই ভেঙে গুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আছে এর।

আদ্রর মা ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বারবার সান্তনা দিচ্ছেন যে আনিশার কিছু হবেনা। যদিও উনি নিজেও জানেন এটা কেবল সান্তনাই।

হঠাৎই একজন নার্স এসে বলল আনিশার জ্ঞান ফিরেছে। আদ্রর মনটা যেন ধুক করে উঠল। অতি আকাঙ্খিত কিছু পেলে মানুষ যেমন দিশেহারা হয়ে যায় আদ্রর অবস্থাও একইরকম।

কোনমতে নিজেকে সামলে চোখ মুছে উঠে দাড়াল ও।
সবাইকে একসাথে যেতে দেয়া হবেনা।
আনিশার মা বাবা, আবির ওরাই প্রথমে গেল।

রুমে ঢুকতেই মিসেস রেহানা কেঁদে উঠলেন। আনিশার কপালে ব্যান্ডেজ। হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ। মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরা। কোনরকম চোখদুটো খুলে রেখেছে।
আবিরের চোখে পানি, কিন্তু আনিশার সামনে কাদা যাবেনা।

আনিশার মা পাশে যেয়ে বসল~ মা..রে। কিছু হবেনা তোর। খুব কষ্ট হচ্ছে মা?
আনিশা কথা বলতে চায় কিন্তু পারেনা। চোখ দিয়ে দুইফোটা জল গড়িয়ে পরে। মায়ের হাতটার উপর আলতো করে হাত রাখে। আর ধরতে পারবে কিনা জানেনা।
বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

কোনরকম হাত নাড়িয়ে আবিরকে ডাকে। আবির পাশে দাড়িয়ে ছিল। দ্রুতপায়ে গিয়ে হাতটা ধরে ও।

ভাইয়ের ছলছল চোখ দেখে দুইদিকে মাথা নাড়ায় ও। যার মানে”কেঁদোনা”।
আবির একহাত দিয়ে চোখ মুছে আনিশার গালে হাত দিয়ে বলে, কাঁদবোনা।
আদ্রর মা~ বাবা আদিরাও ভেতরে গেল।

ওদেরকে দেখে অক্সিজেন মাস্কের ভিতরেই মুখে হাসি ফুটে উঠল আনিশার। ওরা এসেছে মানে আদ্রও এসেছে হয়তোবা। কিন্তু কোথায় উনি? আমার যে বড্ড দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে উনাকে।

সবাই একে একে বেড়িয়ে গেল কিন্তু আদ্র এলোনা।
“ভাইয়ার বিয়েটা হলোনা ওর জন্য”। আচ্ছা, “আদ্র কি আসেনি ওর একসিডেন্ট এর খবর পেয়ে? “, হয়তোবা না। আদ্রকে শেষবার দেখার আশাটা যখন প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল ঠি ক সেই মুহুর্তেই দরজা খুলে প্রবেশ করল আদ্র। তার পিছে চারু, মিশু, ইতি, ফায়াজ ওরাও এল।

আদ্রর লাল লাল চোখ দেখে আনিশা ভাবল “উনি কি কেঁদেছেন? “।
আনিশার ভাবনার মাঝেই চারু এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। আনিশাও কাঁপা হাতে ধরল।
~ এই তোর কিছু হবেনা। তুই সুস্থ হয়ে যাবি।

আনিশা কিছুই বলতে পারল না। শ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে ওর।
মিশু আর ইতিও সান্তনা দিয়ে গেল।

ওদের কথা শেষ হতেই ফায়াজ ওদের নিয়ে বের হয়ে গেল।
পুরো কেবিন জুড়ে নিস্তব্ধতা। আদ্র আনিশার পাশে যেয়ে বসল।
দুজনের চোখেই হাজারো প্রশ্ন তবে একজন প্রশ্ন করার অবস্থায় নেই আর একজন উওর দেয়ার অবস্থায় নেই।

আনিশা কাঁপা হাতে আদ্রর গালে হাত রাখল। আজ কোন সংকোচ কাজ করছেনা ওর মধ্যে। শেষ একটা সুযোগ পেয়েছে এটাই তো ঢের বেশি।
আদ্র একহাত দিয়ে আনিশার হাতের উপর হাত রাখল। আরেকহাত দিয়ে আনিশার হাতটা ধরল।

~ আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা তুমি। তোমাকে যে আমার বড় প্রয়োজন।
আনিশার ভেঁজা চোখদুটো আবারও ভিজে উঠল।
শ্বাসকষ্টটা এতক্ষন কম থাকলেও এখন আবারও বেড়ে যাচ্ছে।
আনিশা চোখদুটো বন্ধ করল। ধক করে উঠল আদ্রর ভেতর।
বিচলিতভাবে বলল~ আনিশা?

আদ্রর কন্ঠে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে প্রিয়জনকে হারানোর ভয়।
ধীরে ধীরে আবারও চোখজোড়া খুলল আনিশা।
হাতের ইশারায় আদ্রকে বোঝাল ওকে উঠিয়ে বসাতে।
আদ্র উঠিয়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল।

~ খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তার কে ডাকব?
আনিশা দুইদিকে মাথা নাড়াল। যার অর্থ “না”।
আদ্র নিজের হাতদুটো দিয়ে আনিশার হাতদুটো ধরল।
ধরে আসা গলায় বলল,

~ “ভালবাসি”, “অনেক বেশি ভালোবাসি তোমাকে আনিশা”।
কিন্ত প্রতিউওরে আজ কিছুই বলতে পারছেনা সে। প্রতিউওরে খুব করে বলতে ইচ্ছা করছে,
~ আমিও অনেক অনেক বেশি ভালবাসি আপনাকে।

আনিশার মনে হলো সে জেনো অন্য জগতে চলে গেছে। যেখানে শুধু ও আর আদ্র আছে। অবশেষে শোনা হলো আদ্রর মুখ থেকে “ভালবাসি”কথাটা। এখন যেন মরেও শান্তি।
আনিশার চোখ থেকে অনবরত পানি পরছে। বার বার মুখ উঠিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। আদ্র ভয় পেয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
~ এই একদম কাঁদবেনা।

আনিশা মুখের মাস্কটা টা খুলে ফেলতে নিলে আদ্র বাঁধা দিয়ে বলল,
~ এটা খুললে শ্বাস নিতে সমস্যা হবে। খুলোনা।
আনিশা আদ্রর কথা না শুনে একটানে মাস্কটা খুলে ফেললো।
আদ্র দ্রুত পরিয়ে দিতে গেলে শক্ত করে ওর হাতটা ধরল।

আদ্রর দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিলে আদ্রও উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ওকে। আনিশা শক্ত করে ওর হাতের বাহু চেপে ধরল। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।

শেষবারের মতো আদ্রকে অনুভব করছে সে। ইশশ, হাতে যদি আর একটু সময় থাকত।
হঠাৎই শ্বাসটান উঠল আনিশার। জোরে জোরে মুখ খুলেও নি:শ্বাস নিতে পারছেনা। আদ্র ভড়কে গেল।

অস্থির হয়ে চিৎকার করে ডাক্তারদের ডাকতে লাগল। আদ্রর চিৎকারে সবাই দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
আনিশা আরও শক্ত করে আদ্রর হাতটা ধরল। মুখ নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। কিন্তু একটা শব্দও বের হচ্ছেনা।

আদ্রকে প্রতিউওরে “ভালবাসি” বলতে না পারার আক্ষেপটা যেনো রয়েই গেল।
~ আনিশা? কিছু হবেনা তোমার। চেষ্টা করো শ্বাস নিতে। এই যে এটা নাও। বলে মাস্কটা মুখে চেপে ধরার আগেই ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলল ও।
হাতটা আলগা হয়ে এল।

~ আনিশা? আনিশা? কথা বলো। ডাক্তার কিছু করেন।
~ উনি আর নেই।

আদ্র অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে। আশপাশ থেকে চিৎকার করে কান্নার শব্দ আসছে।
পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠছে। প্রচন্ড ভারী।

ওদের ভালবাসার গল্পটা যেন শুরুতেই শেষ হয়ে গেল। সমাপ্ত হয়েও অসমাপ্ত রয়ে গেল।

লেখা – মালিহা খান

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “প্রতিউত্তর – Valobashar koster golpo bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – মিস্টার জিনিয়াস – Read Bangla premer golpo online

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!