কষ্টের প্রেমের গল্প

নোনাজলের শহর (১ম খণ্ড) – ভালোবাসার কষ্টের কথা

নোনাজলের শহর (১ম খণ্ড) – ভালোবাসার কষ্টের কথা: চোখ মেলে কিছুই মনে করতে পারছে না মুমু, মাথাটা মনে হচ্ছে অকেজো হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থেকে মনে হয় সে তো লিফটে ছিল, কালো হুডি পড়া লোকটা তার মুখ চেপে ধরেছিল তারপর আর কিছু মনে নেই।


পর্ব ১

দেদেদেখুন আআআমাকে এএএকদম ছোয়ার চেএএষ্টা করবেন না, আআআমি কি কিন্তু চিৎকার দি..দিব।
মুমু আর কিছু বলতে পারলো না তার আগেই আদিব তার ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে দিলো। মুমু হাজার চেষ্টা করেও যখন আদিবকে সরাতে পারলোনা, তখন সে কাঁদতে শুরু করে। আদিবের গালে মুমুর চোখের জলের ছোয়া পেয়েতেই সে মুমুর ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দিয়ে চোখের জল মুছে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, কেন বুঝিস না তোকে কতটা ভালোবাসি আমি।

আর কিছু বলার আগেই মুমু দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। আর আদিব চেয়ে থাকে ওর যাওয়ার দিকে। মুমু হলো আদিবের বেস্ট ফ্রেন্ড মিমন এর একমাত্র আদরের বোন, সবারই আদরের সে। বাড়ির একমাত্র মেয়ে বলে কথা। গ্রামের যৌথ পরিবারের মা~ বাবা, কাকু~ কাকি একমাত্র মেয়ে আর দুই ভাইয়ের একমাত্র বোন সে। মামাদেরও চোখের মনি সে। সবে ক্লাস টেনে পা রেখেছে মুমু। বাইরের জগৎ সম্পর্কে খুবই কম জানে। পরিবারই তার জগৎ।

গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করে সে। খুব সুন্দরী সে নয় তবে তার শ্যাম বর্ণে মায়াবী চেহারা আার লম্বা চুল ই যথেষ্ট তার সৌন্দর্যের ব্যাখ্যায়। আর আদিব এই মায়াবী কে চাই তার প্রতি নিশ্বাসে।

আর আদিব হলো বাবা~ মায়ের হলো ছোটো ছেলে। তিন ভাই ও দুই বোন নিয়ে ছিল তাদের সুখের সংসার। হঠাৎ মায়ের মৃত্যুতে বাবার নতুন সংসার সব এলোমেলো করে দিয়েছিল তার পরিবারকে। তারপর থেকেই পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে নিজের মত থাকে। ভার্সিটিতে উঠে মিমন এর সাথে বন্ধুত্ব হয় আদিবের। মিমন আদিবের সবকিছু জানে তাই ছুটিতে আদিবকে সাথে নিয়ে আসে সব সময়।

মিমনের মা~ বাবা আদিবকে খুবই পছন্দ করেন। করারই কথা, আদিব দেখতে হ্যান্ডসাম, লম্বা, ফর্সা, মুখে খোচাখোচা দাড়ি, ঠোঁট দুটো লাল, অনেকে বলে মেয়ে হতে গিয়ে ছেলে হয়ে গেছে। অনার্স ২য় বর্ষের গরমের ছুটিতে মিমন জোর করে নিয়ে আসে আদিবকে, আসতে রাত হওয়ায় কারো সাথেই দেখা হয়নি ওদের।

সকালে দরজায় ঠকঠক শব্দে আর ভাইয়া উঠ বলে দরজা ভাঙ্গার উপক্রম হওয়াকালীন আদিব দরজা খুলে দেয় আর হুরপার করে ফ্লোরে পরে যায় মুমু। ডাকতে ডাকতে মুমু দরজাতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিল তার পরিণতি হিসেবে সে ফ্লোরে। আর আদিব তো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ফ্লোরে পরে থাকা দুই কাঁধে লম্বা বেণি করা, মুখে ব্রাশ পুড়া চোখ দুটো ছলছল করা ছোট্ট মেয়েটার দিকে।

ততক্ষণে মিমন মুমুর পড়ে যাওয়ার শব্দে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি মুমুর কাছে এসে ধরে মনি পড়লি কী করে, ব্যাথা পেয়েছিস, লেগেছে কোথাও দেখি। মিমন মুমুকে বেডে বসিয়ে বলল, কিরে বল ব্যাথা পাইছিস। মুমু মাথা নেড়ে জবাব দেয় লাগেনি। মিমন মুমুর মুখ থেকে ব্রাশটা বের করে বলল, যা আগে মুখ ধুয়ে আই।

মুমু লক্ষি মেয়ের মতো ভাইয়ের ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে আসে আর মিমন ডয়ার থেকে ওয়েন্টমেনট বের করে তার পাশে বসে হাতের কনুই তে ওয়েন্টমেনট লাগিয়ে দিয়ে একটু রেগে বলে, কতবার বলেছি ব্যাথা পেলে লুকাবিনা আমি কি রাগ করি। মুমু কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল এই যে রাগ ই তো করছিস।

আদিব এতখনে কথা বলল, আরে বাচ্চা মেয়ে বুঝতে পারেনি ছেড়ে দে। মুমু এতখনে সামনে তাকালো, মিমন বলল ও বুঝতে পারলেও বলে না মা বকবে সেই ভয়ে, ভীতুর ডিম। মুমু অসহায় লুক নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায় যেন ভাইয়া অপরিচিত ছেলেটাকে তার সম্পর্কে কিছু না বলে। সেটাই ছিল মুমুর সাথে আদিবের প্রথম দেখা।

সেই থেকে মুমু লজ্জায় আর আদিবের সামনে আসতো না, লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতো। ততদিনে মায়ের সঙ্গে আদিবের মা~ ছেলে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। তাই মা মুমুকে আদিবের কাছেই ম্যাথ পড়তে দেন। মুমুও বাধ্য হয়ে পড়তে যায়। মুমু বাড়িতে চঞ্চলতা করলেও বাইরের সকলের সামনে সে ভেজা বিড়াল। চৌদ্দ বছরের সেই মুমুর প্রেমে পড়েছিল আদিব। কখন কীভাবে সে নিজেও জানতে পারেনি। আজ এক বছর পরে তার সেই প্রেম কে সে পেতে চলেছে।

কিন্তু মুমু এখনো অনেক ইমম্যাচুউর, সে তো বিয়েটা করতে চাই না। হ্যা মুমুর পরিবার আদিবকে মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে নিজেদের কাছে রাখতে চাই। মুমু শ্যাম বর্ণের মেয়ে তাই বাবা মা চায় না আদিবের মতো জামাই হাত ছাড়া হোক। তারা আদিবকে নিজেদের কাছে রেখে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তাই এত অল্প বয়সে মুমুকে বিয়ে দিতে চায়।

গ্রামের মানুষ হিসেবে মুমুর পরিবার অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াকে কিছুই মনে করছে না। আদিবও না করেনি নিজের ভালোবাসাকে পাওয়ার লোভে। মিমন এ বিয়েতে কোনো ভাবেই রাজি নয় তাই বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে। মুমুর মামারাও রাজি নই। মুমুকে কেউ রাজি করাতে পারে নি। মা তাকে বকে মেরে আদিবের খাবার হাতে দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে ছিল। মুমু আদিবকে জমের মতো ভয় পায়। সে চুপিচুপি খাবার রেখে আসছিল কিন্তু তার আগেই আদিব চলে আসে আর মুমুকে ধরে নেয়।


পর্ব ২

গতকাল রাত থেকে মুমুর ভীষণ জ্বর, দুপুরে ডাক্তার এসে দেখে গেছেন কিন্তু জ্বর কমেনি। অন্যদিকে আদিবও বেশ অসুস্থ, গতকাল বিকেলে মুমুর ছোট মামা তাকে মুমদের বাড়িতে এসে মেরেছে। ছোট মামার কলিজা মুমু, আর সেই মুমুকে বিয়ে করার জন্য কোথাকার কে এসে বসে আছে! মুমুর কাকু প্রবাসী, বাবা ব্যবসায়ী সারা দিন বাড়ির বাইরে থাকেন, মুমুর মা গেছিলেন পাশের বাড়িতে কোনো কাজে, মুমু বসেছিল কাকির সাথে, আর আদিব বাইরে বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল এমন সময় ছোট মামা তার কিছু বন্ধুদের নিয়ে এসে আদিবকে বেধড়ক মারধর শুরু করে।

মুমুর কাকি বাধা দিলেও আদিবকে মারধর থেকে বাচাতে পারেনি। অন্যদিকে মুমু ভয়ে কাঁদতে শুরু করে। মুমুর মা আসার আগেই ছোট মামা বের হয়ে যায়। মা এসে আদিবের অবস্থা দেখে মুমুকে প্রচুর মারেন। মায়ের ধারণা মুমু তার মামাকে আদিবকে মারার জন্য বলেছে।
ভয়ে ও মায়ের মার খেয়ে রাতে মুমুর জ্বর এসে গেছে। আদিবকে আগেই ডাক্তার দেখে গেছেন সে অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু মুমুর মারার কথা শুনে তার খুবই কষ্ট হচ্ছে। মুমুকে একবার দেখতে গেছিল আদিব চোখের কোণে পানি, লম্বা চুল গুলো এলোমেলো করে বিছানায় কাঁথা জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিল।

মুমুকে দেখার পর আদিব বিয়ের জন্য না করে দেয়। সেদিন ই আদিব হলে ফিরে যাই। কিছুদিনের মধ্যে মুমুও সুস্থ হয়ে ওঠে। মা মুমুর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তার কিছুদিন পরেই মুমুর বাবা মিমনকে বাসায় আসতে বলেন জরুরি ভাবে, মিমন বাসায় আসলে বাবা তাকে মুমু ও আদিবের বিয়ের কথা বলে কিন্তু মিমন রাজি হয়না। বাবা রেগে মিমনকে থাপ্পড় মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেন। আর মুমুকে বলেন বিয়ে না করলে মিমনকে আর বাড়িতে উঠতে দিবে না এবং পড়াশোনাও করতে দেবে না। পনেরো বছরের ছোটো মুমু তখন কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে যায় ভাইয়ার জন্য। সেদিন রাতেই আদিবকে নিয়ে আসে বাবা, সাদাসিধা ভাবেই কাজী ডেকে বিয়ে দিয়ে দেন আদিব আর মুমুর।

বিয়ে শেষে রাতে মুমু যখন কাকির কাছে বসে ছিলো মিমন বাড়িতে এসেই মুমুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছিল আর বলেছিল, আমি তোকে বাচাতে পারলাম না মুমু, তোর জীবন টা শেষ করে দিলো আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না রে। মুমুও কেঁদেছিল ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে।

টুপ করে দু ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো ডায়েরি টার উপর, মুমু চোখ বন্ধ করে জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখে নিলো সময় 2:37am.ডায়েরি টা বন্ধ করে বিছানার দিকে পা বাড়ালো মুমু। বিছানায় গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে প্রয়া। মুমুর বেঁচে থাকার ঔষধ। কাথাটা ভালো ভাবে প্রয়ার গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো মুমু। সকাল নয়টাতে অফিস ঘুম দরকার কিন্তু ঘুম তো আসছে না। ইচ্ছে করছে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

ভোর 5:40 ফোনের রিংটোনে মুমুর ঘুম ভেঙে গেল, হাতড়ে টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে মুমু।
মিমন ব্যস্ত ভাবে বলে উঠলো মুমুমনি তুই ঠিক আসছি তো, তুই কি একবার বাড়িতে আসবি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

সকাল সকাল ভাইয়ের ফোন পেয়ে ভালো লাগলেও কথা শুনে রেগে মিমনকে বলল, ভাইয়া গতকাল সকালে বাড়ি থেকে এসেছি আমি আর তুই ২৪ ঘন্টা হওয়ার আগেই আবার বাড়ি যেতে বলছিস। তুই কী ভুলে গেছিস আমার অফিস আছে।
মিমন নরম কন্ঠে বলল রাতে তোকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছি তাই বলছিলাম…।
কথা শেষ হওয়ার আগেই মুমু বলল ভাইয়া আমি ভালো আছি আর আমি বড় হয়ে গেছি এক বাচ্চার মা এখন প্লিজ আমাকে নিয়ে ভাবনা কমা। আর নিজে আসার কথা চিন্তাও কারবি না।

আচ্ছা নিজের খেয়াল রাখিস আর প্রয়াকে দেখে রাখিস বলে চিন্তিতভাবে মিমন ফোন রেখে দেয়।
মুমুর আর ঘুম হবে না, তাই উঠে নামাজ পড়ে নাস্তা করতে গেল। নাস্তা তৈরি করে মুমু মায়ের ঘরে যায়। মা কোরআন পড়েছে দেখে মুমু নিজের ঘরে যেয়ে প্রয়াকে তুলে ফ্রেশ করিয়ে নাস্তা করাতে আসে, ততক্ষণে মুমুর মা মরিয়ম বেগম এসে গেছেন। প্রয়াকে মায়ের কোলে দিয়ে মুমু রেডি হয়ে আসে।
মুমু এসে দেখে প্রয়া সারা মুখে খাবার লাগিয়ে সামনের দুটো দাঁত বের করে হাসছে। মুমু প্রয়াকে দেখে বলল মাম মাম কি করেছো তুমি সারা মুখে খাবার কেন?

প্রয়া দ্বিগুণ হাসি দিয়ে বলল, মাম মাম দেতো আমি মিম (ডিম) থেয়েচি (খেয়েছি)
মুমুর মা বলল দেখ মুমু তোর মেয়ের কাজ, নিজে নিজে খাবে বলে কি অবস্থা করেছে। এখন পরিষ্কার করতে গেলে আমাকে ভিজিয়ে ছাড়বে।

মুমু মেয়েকে কোলে নিয়ে টিসু দিয়ে মুখ মুছে নাকে একটা চুমু দিয়ে মায়ের কোলে বসিয়ে বলল দুষ্টুমি করবে না মাম মাম নানুমনির কষ্ট হবে, একদম গুডগার্ল হয়ে থাকবে
প্রয়া নানু মনির গলা জড়িয়ে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল আমিতো দুদ দাল তাইনা নানু।
মরিয়ম বেগম হেসে নাতনীর কপালে চুমু দিয়ে বললেন হুম আমার পাকা গুডগার্ল


পর্ব ৩

দের বছরের বেশি হলো ঢাকার একটা নাম করা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে মুমু। স্ট্যাডি শেষে পিএইচডি ~ র জন্য স্কলারশিপ পেলেও ছোট্ট প্রয়াকে নিয়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রয়ার বয়স দুই বছর এগারো মাস চলছে সামনের মাসে তিন এ পা দেবে। বয়সের তুলনায় অনেক আগেই হাটা ও কথা বলা শিখেছে। কিন্তু কিছু কথা স্পষ্ট বলতে পারে না, খুব মিষ্টি হয়েছে দেখতে। আর যখন দাঁত বের করে হাসে গালের একপাশে টোল পড়ে একদম কিউটের ডিব্বা। প্রয়াকে নিয়ে অফিসে যাওয়া সম্ভব হয়না, তাই মা এসে থাকেন। প্রয়াকে মায়ের কাছে রেখে
ভার্সিটির উদ্দেশ্য বের হয়ে যায় মুমু।

হঠাৎ করে বিয়ে হওয়াতে আদিবের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না সত্যি সে মুমুকে পেয়েছে। রাত ১:৫৬ মিনিট এ আদিব মুমুর রুমে গিয়ে দেখে, মিমন মুমুকে জড়িয়ে ধরে নিরবে কাদছে আর মুমু তার ভাইয়ার বুকে মাঝে ঘুমিয়ে আছে। আদিবকে দেখে মিমন দ্রুত চোখের পানি মুছে, মুমুকে বালিশে শুয়ে দিয়ে একটা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আদিবকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যায়। মিমনের কলিজা হলো মুমু, সেই মুমুকে কষ্ট দিয়েছে আদিব। তাকে এত সহজে মাফ করেবে না মিমন তা জানে আদিব। কথাগুলো ভেবে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে গেল বেডের দিকে।

মুমুর লম্বা চুল গুলো অগোছালো ভাবে বালিশের একপাশে পড়ে আছে, অনেক সময় ধরে কাদার ফলে হঠাৎ হঠাৎ তুলা হেচকি ও গাঢ় নিশ্বাস এর সাথে কেপে উঠা ঠোঁট আর ঠোঁটের নিচে বা পাশের কালো তিল আদিবকে আকুলভাবে মোহিত করছে। আদিব কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থেকে মুমুর মুখের ওপর কিছুটা ঝুঁকে, ঠোঁটের নিচে তিলটা আলতো করে ছুয়ে দেয়, তারপর কপালে একটা ডিপ কিস করে লাইটটা নিবিয়ে মুমুর পাশে শুয়ে পড়লো।

সকালে আদিবের ঘুম ভাঙলো বুকের উপর কারো গরম নিশ্বাসে, মাথা তুলে দেখে মুমু গুটিশুটি হয়ে বা হাত দিয়ে আদিবের টি~ শার্ট এর গলা ধরে বুকের মাঝে ঘুমিয়ে আছে। এটা দেখে মুচকি হেসে মুমুকে আরো কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে আদিব। আমার বাচ্চা বউটা বলে টুপ করে মুমুর মাথার বা দিকে একটা চুমু খায়। মুমুও উষ্ণতা পেয়ে আরো লেপ্টে গেল। মুমকে জড়িয়ে ধরে আদিব আবার ঘুমিয়ে যায়।

খানিকক্ষণ পরে মুমুর ঘুম ভেঙে যায় গরমে, চোখ মেলে দেখে সে আদিবকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। এ অবস্থা দেখেই মুমুর জানের পানি শুকিয়ে সাহারা মরুভূমি হয়ে গেল, ভয়ে একটা ফাকা ঢোক গিলল। ক্লাস শেষে প্রতিবেশি পার্থ দার সাইকেল এ করে বাড়ি ফিরে ছিল মুমু। নামার সময় হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় পার্থ দা হাত ধরে নামিয়ে দেয় মুমুকে সেই সময় আবিদ বাইরে বের হচ্ছিল। মুমু রুমে এসে স্কুলব্যাগ রাখতেই দরজা আটকানোর শব্দ পেয়ে পিছনে ঘুরে দেখে আদিব চোখ মুখ লাল করে ভয়ানক রেগে দাঁড়িয়ে আছে। মুমু কিছু বলার আগেই হিস হিসিয়ে দাতে দাঁত চেপে মুমুর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে উঠে ” ছেলেদের হাত ধরতে খুব ভালো লাগে তোর তাইনা

মুমুঃ আআদিব ভাইয়া আ আমি ই ইচ্ছে ক………(কথা শেষ হওয়ার আগেই আদিব মুখ চেপে ধরে)
আদিবঃ তোকে আমি…… ( মুমুর ডান হাতে জোরে কামড় দেয়)
মুমুর মুখ চেপে ধরাই কোনো শব্দ করতে পারেনা, মুমুর চোখে পানি দেখতেই আদিবের হুঁশ ফিরে। এমনিতে ভদ্র~ শান্ত হলেও রেগে গেলে তার কিছু মনে থাকে না। মুমু ততক্ষণে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছিল। সেদিন এর পর থেকেই মুমু আদিবকে জমের মতো ভয় পায়। মুমু ভয়ে দ্রুত উঠতে গেলেই আদিব জেগে যায়, দেখে মুমু তার দিকে ভীতু ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে। আদিব কিছু বলার আগেই মুমু বলল, আদিব ভাইয়া….

আদিবঃ কে তোর ভাইয়া হ্যা? পৃথিবীর সবাই তোর ভাই হতে পারে আমি নই বুঝলি, এক লাখ দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে করে বউয়ের মুখ থেকে কি ভাইয়া ডাক শুনব আমি হ্যা? 😡😡
মুমু ভয়ে দ্রুত দু’দিকে মাথা নেড়ে না জানালো।

পর্ব ৪

পরীক্ষার জন্য আজই ফিরতে হবে আদিবকে, সকালের পর থেকে মুমুর আর দেখা পাচ্ছে না। ৩:৩২ বাজে চারটায় বাস, মুম নিশ্চয় কোথাও লুকিয়েছে। বাধ্য হয়ে শাশুড়ীকে বলেছে মুমুকে ঘরে পাঠানোর জন্য। রাগে গজগজ করে ঘড়ি পড়ে পিছনে ঘুরে দেখে মুমু দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে। পরনে মিষ্টি কালারের টিশার্ট, কালো স্কার্ট, গলায় কালো ওরনা ঝুলে আছে। আর বাচ্চাদের মতো দু’কাধে লম্বা বেণি। মাথামোটা, অসভ্য মেয়েটা কি জানে ওর এই লম্বা বেণি, ভীতু ভীতু মুখ দেখলে আদিবের মাথা ঝিম ঝিম করে, বুক ধড়ফড় করে। মুমু এখনো মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই আদিবের রাগ উধাও হয়ে গেল, কিন্তু মেজাজ খিটে গেল মুমুর পা দিয়ে ফ্লোর কুটানো দেখে।
আদিবঃ ফ্লোর খুড়ে নিচে যাওয়ার প্ল্যান করছিস নাকি, আর তোকে কি ইনভিটেশন কার্ড দিয়ে ঘরে নিয়ে আসতে হবে?

আদিবের কথা শুনে দ্রুত সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাড়ায় মুমু।
আদিবঃ মাথা উঁচু কর তাকা আমার দিকে। ( মুমুর কাঁধ ধরে)
মুমু মাথা উঁচু করলেও নিচে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করেই আদিব মুমুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দেয়, অন্যদিকে ভয়ে মুমু চোখ বন্ধ করে রেখেছে। আদিবের কোনো সাড়া না পেয়ে চোখ মেলে মুমু। আদিব তার উপর আধশোয়া হয়ে ঝুকে তাকিয়ে আছে। মুমু আদিব ভাইয়া বলার আগেই মুমুর ঠোঁটে ছোট্ট কামড় দিয়ে বলল, সকালে ভাইয়া ডেকে উধাও হওয়ার শাস্তি।

আদিবঃ একমাস তুই স্কার্ট~ টিশার্ট গায়ে দিবি না ইভেন বাড়িতে আমি না থাকলে একদম এগুলো পরবি না শুধু থ্রিপিস পরবি। যদি ভুল হয় (মুমুর টিশার্ট এর নিচ দিয়ে কোমড় চেপে ধরে) তাহলে এখানে কামড়ে দেব। এখন ঝটপট চুমু দে।
কোমড় চেপে ধরায় মুম শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল আদিবের চুমু দে শুনে হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে বলে, হা?

আদিবঃ হা না হ্যা, চুমু দে। বিয়ে করে কি উপবাস থাকবো? ঝটপট চুমু দে। না দিলে দমবন্ধ চুমু দিব আমি। (আদিবের কথায় মুমু দ্রুত ঠোঁট মুখের মধ্যে চেপে ধরে)
মুমু ঠোঁট চেপে ধরা দেখে আদিব চট করে মুমুর নাকে কামড়ে দেয়। মুমু আহ করতেই আদিব ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে নেয়। মুমু ধাক্কা দিলে ওর হাত দুটো নিজের হাতে বন্ধ করে নেয়। আদিবের সাথে না পেরে হাত পা ছোড়া বন্ধ করে দেয় মুমু। কিছুক্ষণ পরে ছেড়ে দিলে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়। আদিব মুমুর নাকে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ওর চোখের জল দুই হাতের বৃদ্ধাগুল দিয়ে আলতো করে মুছে দেয়। নরম কন্ঠে বলে, তুই এতো অবুঝ কেন মুমু, একটু বড় হয়ে যা না পাখি।

Flight attendants, please prepare for landing.
কেবিন ক্রুর কন্ঠে চোখ মেলে আদিব, উইন্ডো সিটে বসেছে সে। শূন্য চাহনিতে বাইরে অবলোকন করল। অতীতের স্মৃতিগুলো তার চোখে ভেসে উঠেছিল। পাওয়া না পাওয়ার অনেক হিসাব আছে। সব ছেড়ে বহু বছর আগে পাড়ি দিয়েছিল কানাডা। দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে বাবার অসুস্থতার জন্য ফিরতে হচ্ছে তাকে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (NSI) এর জব সুত্রে পাঁচ বছর আগে পাড়ি দিয়েছিল কানাডা।
Bangladesh Airport
Time:4pm.

আধাঘন্টা আগেই এসেছে তরুণ, কারণ NSI এর মোস্ট ফেমাস অফিসার ও তার বেস্ট ফ্রেন্ড দ্যা রুড আদিব মাহমুদ বহুবছর পরে দেশে ফিরছেন। তরুণ নিজেও এন এস আই ~ এর সিনিয়র অফিসার। আদিবের সাথে সেও কানাডা ছিল দুই বছর। আদিবের দুই বছর কানাডা থাকার কথা থাকলেও কাজের দক্ষতা ভালো হওয়ায় তাকে পারমানেন্টলি রেখে দেয় NSI. প্রচন্ড রাগী, জেদি, একরোখা আদিবকে দেখে অবাক হতো তরুণ, প্রতিটা ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন এ যেচে মৃত্যুর জন্য এগিয়ে যেতে দেখে হতবাক হতো। ‘মৃত্যু না হওয়া টাই পাপ’
এমন বাক্যে বিশ্বাসী যদি কেউ থাকে সেটা হলো আদিব।

রুড এটিটিউট এ ভর্তি হলেও প্রচন্ড রকমের ভালো মনের মানুষ দুই বছর একসাথে থেকে বুঝছিল তরুণ। ফেমেলি বা আপনজন সম্পর্কে কিছু বললে প্রচন্ড রেগে যেত। তিনদন আগে হঠাৎ করে ফোনে জানালো তার বাবা ICU তে দেশে ফিরছে। তার জন্য একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য তরুণকে ফোন করেছিল। আদিবকে দেখেই বোঝা যায় আভিজাত্য পরিবারের ছেলে। কিন্তু দেশে ফিরে বাড়িতে না যেয়ে ফ্ল্যাট যাবে কেন ব্যাপার টা ভাবছে তরুণ। কাঁধে কারো স্পর্শে ভাবনার বিচ্ছেদ হলো, পিছনে ঘুরে দেখলো আদিব দাড়িয়ে আছে এক হাত পকেটে দিয়ে।

তরুণঃ আরে আদিব……….. (জড়িয়ে ধরে)
আদিবঃ কানে কি বুলেট লেগেছে? (বিরক্তি নিয়ে তরুণকে ছাড়িয়ে)
তরুণঃ কিহ! (অবাক হয়ে)
আদিবঃ কখন থেকে ডাকছি বাল, শুনতে পাশ না কেন?
তরুণঃ ( শুরু হলো দ্যা রুড আদিব মাহমুদ, এতদিন পর দেখা হলো কোথায় কেমন আছি জিজ্ঞেস করবে তা না)
আদিবঃ ধুর বাল, কাকে কি বলি। (লাগেজ ধরে হাটা শুরু করে)
তরুণঃ এই শোন শোন, কোথায় যাচ্ছিস?

‘তোমার সবগুলো ফুল নিব আমি কতো নেবে’ জিজ্ঞেস করলে মেয়েটি উজ্জ্বল হেসে উত্তর দিলোচল্লিশ টাকা এতো সুন্দর ফুল শুধু চল্লিশ টাকা কিন্তু আমার কাছে তো খুচরা নাই এই টাকাতে দিবে প্লিজ? একশো টাকার একটি নোট এগিয়ে দিল মুমু। মেয়ে টি কিছু একটা ভেবে বলল আচ্ছা নেন। নেতিয়ে যাওয়া গোলাপ গুলো নিয়ে মেয়ে টা মাথার চুল গুলো ঠিক করে দিলো মুমু।

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে ছিলো আদিব ও তরুণ। অনেক্ক্ষণ হলো জ্যামে বসে আছে, বা সাইডে দুইটা গাড়ি পরের গাড়ি থেকে কোনো মেয়ে পথশিশুর থেকে নেতিয়ে যাওয়া গোলাপ নিয়ে আদর করছে। দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলো আদিব।

পর্ব ৫

তরুণ হা করে তাকিয়ে আছে ICU এর ভিতরের মাুনষটার দিকে। বিখ্যাত শিল্পপতি রওনক হাসান আদিব এর বাবা! এই বেটার NSI এ জব করার দরকার কি ইভেন এই শালার তো কোনো চাকরি করাই উচিত না।
আদিব তার ছোট বোন আনিয়ার সাথে কথা বলছে। ডক্টর ICU এর ভেতর কাউকে এলাউ করছে না, তাই বাইরে থেকে দেখে চলে যেতে হবে। আনিয়ার সাথে কথা বলে আশেপাশে কারো সাথে কথা না বলে বাইরে থেকে বাবাকে একনজর দেখে সোজা হাটা শুরু করে আদিব।

বাধ্য হয়ে তরুণও তার পিছনে ছুট লাগাই।
হসপিটাল থেকে বের হয়ে একটা কথাও বলেনি আদিব, শুধু নিজের নতুন এপার্টমেন্টে যাবে জানাই। আদিবের নীরবতা দেখে তরুণও কিছু না বলে পৌঁছে দেয় তাকে।
রাত ১১: ৫৭ মিনিট
মুমুর বুকের মাঝে গুটিশুটি হয়ে ঘুমচ্ছে প্রয়া। মুমুর চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে বালিশে।
মুমু অস্পষ্ট ভাবে বলল আমি বড় হয়ে গেছি, অনেক বড়।

অতীত…….
বিয়ের সকালে আদিবের আকুতি ভরা কথা শুনে মুমুর হঠাৎ অন্যরকম অনূভুতি হয় কেমন যেন মায়া লাগে। চোখ খুলে দেখে আদিব ওর দিকে টলটলে চোখে তাকিয়ে আছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে, ঠোঁট জোড়া লাল হয়ে আছে, সুর নাক, খোচাখোচা দাড়ি। আদিব ভাইয়া এতো সুন্দর কেন? মাই গড, এই সুন্দর ছেলে টা তার বর!ভাবা যায়?

ভাবতে পারেনি, আদিব ভাইয়া উঠে তার চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করছে। মুমুও চটপট উঠে দাড়ায়, ব্যাগ কাঁধে দরজা পর্যন্ত যেয়ে হঠাৎ ফিরে এসে মুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাথায় টুপ করে একটা চুমু দিয়ে সোজা বের হয়ে যায়। মুমু ঝিম ধরে দাড়িয়ে ছিল, কেমন কেমন লাগছিল, কেমন ভালো লাগা ভালো লাগা।
মিমন যাওয়ার সময় জানাই পরীক্ষার জন্য একমাস আসতে পারবে না। এই প্রথম মুমুর মন খারাপ হয়ে যায় আদিবের জন্য, একমাস আসবে না ভেবেই কেমন পঁচা মন খারাপ লাগছে তার।

আদিব রেগুলার ফোন করে বাড়ির সকলের সঙ্গে কথা বলে, মুমুর সাথেও বলেছে দুবার। কিন্তু দুবার ই স্কার্ট~ টিশার্ট না পড়ার থ্রেট দিয়েছে। মুমু আচ্ছা বলে ফোন রাখলেও কথা রাখে না। তারমতে আদিব ভাইয়া তো আর সি সি ক্যামেরা লাগায় রেখে যায় নি, যে জানবে মুমু কি পড়ছে, হি হি হি।

সকাল বেলা শখের বশে লুচি ভাজতে যেয়ে তেল লেগে ডান হাতের অনেক টা পুড়ে গেছে মুমুর। অসহ্য যন্ত্রণায় জ্বর এসে গেছে তার। মা মাথায় পানি দিয়ে ঔষধ লাগিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে সন্ধ্যায়।
হঠাৎ কপালে উষ্ণ কিছুর পরশে ঘুম হালকা হয়ে যায় মুমুর, ঘুমের ঘোরে বুঝতে পারে টুপটুপ করে পানি পড়ছে তার কপালে। ফট করে চোখ মেলে দেখে আদিব তার হাতে কিছু লাগিয়ে দিচ্ছে।

আদিবঃ তোকে বড় হতে বলেছিলাম, কেকা ফেরদৌসী নই। (গম্ভীরভাবে মুমুর হাতে মলম লাগাতে লাগাতে)
মুমু ভাবছে আদিব ভাইয়া এখানে কি করছে তার তো একমাস পর আসার কথা, সে কি ভুল দেখছে।
আদিবঃ তুই তো পণ করেছিস যেন আমার পরীক্ষা খারাপ হয়। পরশু পরীক্ষা আমার, কালই চলে যাব। তোকে ভয়ানক শাস্তি দিতে এসেছি, একেতো আমার কথা রাখিস নি তার উপর কেকা ফেরদৌসী হয়ে হাত পুড়িয়েছিস।
আদিবের কথা শুনে মুমু পট করে উঠে, দৌড় দেবে ভেবে। কিন্তু তার ভাবনাতে এক বালতি পানি ঢেলে মুমুর কোমর ধরে টেনে কোলে বসিয়ে নেয় আদিব।
মুমু কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আদিব ভাইয়া এবারের মতো ছেড়ে দিন, আর করবো না।
আদিব মুমুর কাঁধে থুতনি রেখে কানের পাশে চুমু খেয়ে বলল, ছেড়ে দিব যদি আমাকে ভাইয়া বলা বন্ধ করে তুমি বলিস
সেই রাতে তুমি বলার পরে ছাড়া পেয়েছিল মুমু, পরের দিন নিয়ম মাফিক দম বন্ধ চুমু ও জড়িয়ে ধরে চলে যায় আদিব।
এভাবেই আদিবের দমবন্ধ ভালোবাসাতে একসময় মুমুও প্রচন্ড ভালোবাসতে শিখে যায়। তার জন্য নুপুর, তার পছন্দের বেলি ফুল, পছন্দের জিলাপি সকল ছোট ছোট চাওয়া গুলো পূর্ণ করতো আদিব। মুমুও আদিবের মনের মতো চলার চেষ্টা করতো।
হঠাৎ একদিন আদিব মুমুর জন্য একটা লাল টুকটুকে শাড়ি নিয়ে এসে বলে পরে আসতে, মুমুও লাফাতে লাফাতে কাকির কাছ থেকে শাড়ি পরে গুটি গুটি পায়ে রুমে এসে দাঁড়ায়। মুমুর ভীষণ লজ্জা লাগাই মাথা তুলে তাকাতে পারছে না।
আদিব তখন মুমুর জন্য কেনা মাজার বিছাটা ব্যাগ থেকে বের করছিল। পিছনে ঘুরে দেখে মুমু শাড়ি পরে লাজুকলতা হয়ে দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে। কিন্তু শাড়ির সাথে বাচ্চাদের মতো দুই বেণি দেখে ফিক করে হেসে দেয় আদিব।

হাসির শব্দে সামনে তাকিয়ে দেখে আদিব ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। মুমুর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়, তবে কি শাড়িতে তাকে পচা লাগছে। মুখ গোমড়া করে আদিবের সামনে যেয়ে দাড়ায় মুমু।
আদিব মুমুকে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে বলল, কি ব্যাপার আমার বাচ্চা বউটার মন খারাপ কেন?
মুমু মুখ গোমড়া করে বলল, আমাকে কি ভীষণ পচা লাগছে
আদিব মুমুর গালে গাল লাগিয়ে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, বর শাড়ি পরতে বলেছ কোথায় পেট বের করে হট হয়ে সামনে আসবি, তা না বাচ্চাদের মতো ঝুটি বেধে এসেছিস। তাই তো বাচ্চাদের মতো আদর দিচ্ছি।
মুমু লাজুকলতা হয়ে বলল, আমি মোটেও বাচ্চা নই
চলবে

মুমু লাজুকলতা হয়ে বলল, আমি মোটেও বাচ্চা নই
আদিব মুমুর বেণি খুলতে খুলতে বলল, বাচ্চা বলিনি বাচ্চা বউ বলেছি।
মুমু বোকা বোকা চাহনিতে বলল, বউ আবার বাচ্চা হয় কি করে? তাছাড়া আমার বয়স তো পনেরো প্লাস কিভাবে কি? (ঠোঁট উলটিয়ে)
আদিব মুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, এই যে বাচ্চা বউ মানে বুঝিস না, বরকে একটুও ভালোবাসিস না। বাচ্চা বউ না হলে তো এসব বুঝতি তাইনা?
মুমু ফট করে বলে, কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। বলেই ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায় মুমু, দৌড় দেবে ভেবে উঠতে গেলেই আদিব খপ করে ধরে মুমুকে বিছানায় ফেলে ওর উপর শুয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, ‘তাই বুঝি ‘মুমু লজ্জায় শক্ত করে চোখ বন্ধ করে বলল, জানিনা।

আদিবের ভালোবাসা মিশ্রিত শাসন, মুমুর অবুঝ ভালোবাসা সব মিলিয়ে খুব ভালো চলছিল আদিব ~ মুমুর চড়ুই প্রেম। মুমুর ইমমেচুরিটি’র কথা ভেবে আদিব ইনটিমেট হওয়ার চেষ্টা করেনি, মুমুর অবুঝ ভালোবাসাই যথেষ্ট তার কাছে। আদিব তার ভালোবাসার চাদরে মুড়ে রেখেছিল মুমুকে। দেখতে দেখতে মুমু খুব ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হয়। আদিবও ব্যাস্ত হয়ে উঠে ফাইনাল ইয়ারের পড়াশুনা নিয়ে। আদিব~ মুমুর স্বাভাবিক সম্পর্ক ও মুমুর আবদারে, ততদিনে মিমন ও আদিবের সম্পর্কও স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
মুমুকে নিজের কাছে রাখার জন্য ভার্সিটির পাশাপাশি একটি কলেজে ভর্তি করেছে। আদিব হল ছেড়ে বাসা নিয়েছে। মুমু চলে আসবে শুনে ছোট ভাই মুগ্ধ ( চাচার ছেলে) কেঁদেকেটে একাকার, সাথে মুমুও যোগ দিয়েছে। অনেক বুঝিয়ে মুমুকে নিয়ে আসে আদিব।

নতুন পরিবেশে, নতুন বন্ধু, দুজনের চড়ুই সংসার সব মিলিয়ে খুব ভালো কাটছে মুমুর জীবন। নিজেকে গিন্নি গিন্নি মনে হয়, যদিও রান্না পারে না তাই সোনা খালাকে ঠিক করেছে আদিব। তারপরও মাঝে মাঝে শখের বশে রান্না করে। নতুন বেস্টু রুপার সাথেই বেশি সময় কাটায়। আদিবের ফাইনাল ইয়ারের পেশারে মুমুকে ঠিক মতো সময় দিতে পারে না। রুপার বার্থডে উপলক্ষে এক সন্ধায় আটকে যায়। মুমুর ফোন না থাকায় আদিবকে জানাতে পারেনা। সেদিন আদিবের টিউশনি না থাকায় মুমুর জন্য গরম গরম জিলাপি নিয়ে বাসায় আসে। এসে মুমুকে না পেয়ে টেনশনে পরে যায়, মুমু খুঁজতে কোচিং~ এ যেয়ে জানতে পারে অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে। মিমনকে জানালে সেও খোঁজা শুরু করে।
রাত ৮:১৯ মিনিট
আদিব বাসায় এসে মুমুর বইপত্র পাগলের মতো ঘাটছে যদি কোনো কিছু জানতে পারে। কিছু না পেয়ে বের হতে যেয়ে দেখে মুমু কারো বাইক থেকে নেমে বাই জানাচ্ছে। আদিব রাগে হাত মুঠো করে ঘরে ফিরে আসে। মুমু রুপার ভাই রূপক এর থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় এসে দরজা খোলা দেখে একটু অবাক হয়ে যায়, আদিব টিউশনি শেষ করে আসতে সাড়ে আটটা বেজে যায় তবে কি আজ চলে এসেছে। ভয়ে ভয়ে দরজা লক করে ডাইনিং পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই কিছু বোঝার আগেই ঠাস করে একটা চড় দেয় আদিব। হঠাৎ এমন হওয়ায় মুমু তাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে পড়ে যায়। সাথে সাথে মুমুর দুই কাধ শক্ত করে চেপে ধরে দাড় করায়। আদিবের লাল চোখ দেখে মুমু ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদিব তার বাম হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে মুমুর ঠোঁট থেকে লাল লিপিস্টিক ঘেটে দেয়। চিৎকার করে বলে ছেলেটা কে।

রুপা জোর করে তাকে সাজিয়ে দিয়েছিল। রাত হওয়ায় রূপক ভাইকে দিয়ে পৌঁছে দিয়েছে, যদিও মুমু বাইকে আসতে চাইনি। কিন্তু আদিবের রাগ দেখে কিছুই বলতে পারছে না ভয়ে থরথর করে কাপছে। মুমু কিছু না বলাতে আরো রেগে যায় আদিব। মুমুকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে রুক্ষভাবে ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরে। মুমু বাধা দিলে আরো রুডলি আঁকড়ে ধরে, মুমু চোখের জলও আদিবকে দমাতে পারেনি।

আজ প্রথম আদিবের অচেনা স্পর্শ গুলোতে মুমুর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বাধা দিয়েও কিছু হচ্ছে না। অন্যদিকে আদিব নিজের সমস্ত রাগ ফলিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায়। ফোনের রিংটোনে আদিবের ঘুম ভেঙে যায়, হাতড়ে ফোনটা রিসিভ করতেই মিমন ব্যাস্তভাবে বলে উঠে, আদিব আমাদের থানায় যাওয়া উচিত তুই তাড়াতাড়ি আয়। মিমনের কথায় পাশ ফিরে মুমুকে দেখেই কলিজা কেপে উঠে আদিবের। মিমনকে কোনোমতে বুঝিয়ে ফোন রেখে দ্রুত মুমুর কাছে আসে। মুমু সেন্সলেস হয়ে গেছে, আদিব দ্রুত পানি নিয়ে এসে চোখে মুখে পানি দেয়। কিন্তু মুমুর কোনো সাড়া না পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার।

দিশেহারা হয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মুমুকে, বার বার ডাকতে থাকে। তারপর আবার চোখে মুখে পানি দিয়ে গালে আলতো করে চাপড় দেয়, কিছুক্ষণ পরে পিটপিট করে চোখ মেলে মুমু। আদিবকে সামনে পেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। মুমুর কান্না দেখে নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে, আদিবও মুমুকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে নিরবে কেঁদে দেয়। মুমুর মাথার পাশে অজস্র চুমু দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আম সরি সোনা, আম রেলি সরি, আই’ল নেভার গনা হার্ট ইউ।

মুমুও কেঁদে হেঁচকি তুলে রুপার বার্থডের কথা জানায়। কান্নার চোটে ভালোভাবে কথা বলতে পারছে না, নিজের থেকে ছাড়িয়ে মুমুর চোখ মুছে দেয় আদিব। গালে চড়ের দাগ বসে গেছে, ঠোঁট দুটো ফুলে আছে। ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিয়ে গালে হাত বুলিয়ে দেয়। হঠাৎ আদিবের কিছুক্ষন আগের করা ভয়ানক আচরণের কথা ভেবে নিজের দিকে তাকিয়ে চাদর টা শক্ত করে চেপে ধরে মুমু। আদিবের হাত সরিয়ে দিয়ে কেঁদে বলে উঠে, আ…মি বাড়ি যাব, আম্মুর কাছে যাব

আদিবের নিজেকে একদম শেষ করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে, তার রাগের জন্য আজ মুমু তাকে ভয় পাচ্ছে শুধু ভয় না ভীষণ ভয় পাচ্ছে। দুই হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো জোরে চেপে ধরে বসে থাকে কিছুক্ষণ পরে আহত চোখে মুমুর তাকিয়ে বলে, মুমুসোনা আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি সত্যি সরিরে পাখিটা।

বলে মুমুর হাত ধরতে গেলে মুমু পিছিয়ে যায়। আদিবের চোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা পানি পড়ে যায়। আই সোয়ার মুমুপাখি, আর কখনো কষ্ট দিব না, তাকা আমার দিকে প্লিজ আমাকে ভয় পাস না। আদিবের চোখে পানি দেখে মুমুর ভয়টা কমে সে আদিবকে উদ্দেশ্য করে বলেআমি পানি খাব আদিব পানি নেওয়ার জন্য যেতে যেয়ে আবার মুমুর দিকে ফিরে বলল, মুমুসোনা কোথায় কষ্ট হচ্ছে বল আমাকে মুমু ফুপিয়ে কেঁদে দেয় আমি ওয়াশরুমে যাব আদিব মুমুকে কোলে করে দিয়ে আসে। দ্রুত বেডশিট চেঞ্জ করে মুমুর জন্য দুধ গরম করে নিয়ে আসে। ততক্ষণে মুমুও ফ্রেশ হয়ে বেডে এসে বসেছে। মুমুকে দুধটুকু খায়িয়ে একটা পেনকিলার দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় আদিব।

পরদিন সকালে মিমন আসে মুমুর সাথে দেখা করতে। মিমনকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে যায় মুমু। সে তো ভাইকে পেয়ে একহাত জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো বসে আছে। ভাইয়ের সাথে থাকলে মুমু একদম বাচ্চা হয়ে যায় আর মুমুর এই বাচ্চামি স্বভাব খুব ভালো লাগে আদিবের। মুমুর ফোলা চোখ মুখ দেখে মিমনের মন খারাপ হয়ে যায়। সে আদিবের রাগ সম্পর্কে খুব ভালো করে জানে। মুমুর সাথে অনেক সময় কাটিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আদিবকে সাথে নিয়ে বের হয়ে যায় মিমন। যদিও মুমুকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না তার, মিমনের জোরাজোরি তে বাধ্য হয়ে যাচ্ছে।

অনেকক্ষন হলো মিমন চুপচাপ বসে আছে, কিছু বলতে চাইছে হয়তো। নিরবতা ভেঙে আদিবই কথা বলে কি বলবি বল এত হেজিটেট করছিস কেন?

এতক্ষণে মিমন মুখ খুলে, দেখ আদিব তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, কিন্তু এখন আমি মুমুর বড় ভাই হয়ে কিছু কথা বলবো প্লিজ কথা গুলো বোঝার চেষ্টা করবি। (আদিব মাথা নেড়ে জবাব দেয়)
মুমু খুব শান্ত স্বভাবের, ও যাকে ভালোবাসে সে হাজার কষ্ট দিলেও একটা কথাও কাউকে বলে না। ওর আট বছর বয়স তখন, আমি রেগে ধাক্কা দিলে পড়ে গিয়ে পা কেটে দুটো সেলাই দিতে হয়। বাড়ির সকলকে বলেছিল দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেছে। মুমু যে সবার কত আদরের তাতো জানিসই, ও একবার বললেই বাবা চাচা আমাকে রাম কেলানি দিতো।

আমি কথাগুলো বলছি তার একটাই কারণ মুমু তোকে খুব ভালোবাসে, ওকে কখনো কষ্ট দিস না। খুব আদরে বড় হয়েছে ও, অল্পতেই মন খারাপ করে তাছাড়া এখনো অনেক ছোট। কিন্তু একটু ভালোবাসা পেলে সব ভুলে যায়। তুই আমাকে কথা দে ওর গায়ে কখনো হাত তুলবি না প্লিজ। (লাস্ট কথাগুলো আদিবের হাত ধরে বলে)
আদিবের নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে মিমন মুমুর গালে দাগ দেখে কষ্টে কথাগুলো বলছে। আদিব সরি বলতে নিলে মিমন তার আগেই আবার বলে, প্লিজ কথা দে

পর্ব ৭

ব্যাস্ত শহরে ব্যাস্ত হয়ে ছুটে চলছে গাড়ি গুলো। সন্ধ্যার পর থেকে বাতাসটা একটু ক্ষেপেছে। এখন তার সাথে বৃষ্টি বৃষ্টি আভাস যুক্ত হয়েছে। অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে, ফুটপাত ধরে নিয়ন আলোর নিচ দিয়ে বাসার পথে এগিয়ে যাচ্ছে আদিব।

আজ একলা হাটতে বেশ ভালো লাগছে। একহাত পকেটে পুরে অন্য হাতে মুমুর পছন্দের পিংক কালারের হাওয়াই মিঠাই ও আইসক্রিমের প্যাকেট নিয়ে হেটে চলছে। আর ভাবছে মিমন ও মুমুর সম্পর্কের কথা। দুজনের প্রতি দুজনের টান দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। মুমুতো ভাইয়া বলতে এমনিতেই পাগল, আর মিমন আজ যা করেছে। মুমু অন্যায় করলে সে যেন মিমনকে যেয়ে ইচ্ছে মতো মেরে আসে তবু মুমুর গায়ে আঘাত না করে, ছোট বাচ্চা ছেলেদের মতো আবদার করেছে। কথাটা ভাবতেই মৃদু হাসলো আদিব।
ফোনটা বের করে আনিয়াকে কল দিলো, কিছুক্ষণ পরে ফোনটা রিসিভ হয়, ফোনের ওপাশ থেকে আনিয়া ভীষণ রেগে চিল্লিয়ে বলে উঠে, আমি মারা গেলে সবাইকে খবর দেওয়া হবে, তোদের খবর নিতে হবে না আর আমার ফোনও রিসিভ করতে হবে না

আনিয়া আদিবের থেকে তিন বছরের ছোটো অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। ভীষণ রাগী কিন্তু মনটা খুব ভালো। আদিব ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, থামবি নাকি ফোন রেখে দিব?
ভাইয়া তুই এমন কেন? ফোনটা তো এট লিস্ট রিসিভ করতে পারিস, গতমাসে বড় ভাইয়াও ব্যাংকক চলে গেল, মেজো ভাইয়া তো কথায় বলে না, বড় আপু তো তার সংসার নিয়ে ব্যাস্ত, আমাকে কেউ ভালোবাসে না। অভিমান করে বলল।

সামনের মাসে আমার ভার্সিটি এসে ফোন দিস আর বাড়িতে বলবি দুই দিন থাকবি আমার কাছে। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে
আনিয়া ভীষণ এক্সসাইটেড হয়ে বলল সত্যি!আদিব হুম বলে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দেয়।

দুপুরে আদিবরা বের হওয়ার পরে ঘুম দিয়েছিল মুমু। কিন্তু ঘুমটা ভালো হয়নি, ঘুমের ভিতরে কোমড়ে ভোতা ব্যাথা হচ্ছিল। অনেক সময় হলো বিছানায় শুয়ে আছে, উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আজানের মধুর ধ্বনি শুনে অনিচ্ছা শর্তেও উঠে নামাজ পড়ে নেয়। দরজা নকের শব্দে উঠে দরজা খুলে দেখে আদিব মুখে লম্বা হাসি ঝুলিয়ে দাড়িয়ে আছে। দেখে বেশ খুশি খুশি মনে হচ্ছে।

মুমুর ফোলা ফোলা চোখ দেখতে বেশ লাগে আদিবের। ভিতরে ঢুকে মুমুর হাতে প্যাকেট টা ধরিয়ে দিয়ে গালে টুপ করে একটা চুমু খায়। মুমু প্যাকেটটা দেখে ভীষণ খুশি হয়ে বলে, আমার জন্য?
না আমার বউয়ের জন্য, বাচ্চা বউতো তাই নিয়ে এলাম। (এক চোখ টিপে শয়তানি হাসি দিয়ে)
মুমু ঝটপট আইসক্রিম বের করে খেতে খেতে বলল আচ্ছা আদিব ভাইয়া (বলেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটে)মানে তুমি কি করে জানলে আমার পিংক কালারের হাওয়াই মিঠাই পছন্দ?
আদিব মুমুর নাকটা টেনে বলল, ম্যাজিক! ম্যাজিক করে জানতে পারলাম বুঝলি আর কেন পছন্দ সেটাও জানি।
মুমু উৎসাহ নিয়ে বলল, কেন, কেন বলো?

আদিব ভাব নিয়ে বলল, এটা খাওয়ার পরে জিভ আর ঠোঁট লাল হয় তাই তোর পছন্দ
মুমু চোখ ছোট ছোট করে বলল, সত্যি বলো, ভাইয়া তোমাকে বলেছে তাইনা?
আদিব মাথা চুলকিয়ে ফিক করে হেসে বলল, হুম
রাতে খাবার শেষে মুমুকে একটা ইমার্জেন্সি পিল খায়িয়ে দেয়। আর নিয়ম মাফিক দমবন্ধ চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে যায়। মাঝরাতে বুকের টিশার্টে টান পরায় ঘুম ভেঙে যায় আদিবের, মুমু চোখ বন্ধ করে কাঁদছে আর টিশার্ট খামচে ধরে আছে। আদিব দ্রুত মুমুকে সোজা করে শুয়ে গালে হাত দিয়ে ডাক দেয়, মুমু, এই পাখি তাকা, কি হয়েছে স্বপ্ন দেখছিস? মুমু চোখ বন্ধ করেই দাত দিয়ে ঠোঁট চেপে মাথা নেড়ে না জানাই। তাহলে কাঁদছিস কেন?

মুমু কোমরে হাত চেপে ভাঙা গলায় বলল, কোমরে ব্যাথা করছে
আদিব কী করবে বুঝতে পারছে না, নিজের উপর রাগ হচ্ছে। মুমু আন্ডার এইজ ওর উচিত ছিল ডক্টরের সাথে কথা বলা। ডক্টরের কথা মনে হতেই বড় আপুর কথা মনে পড়ে আদিবের। তার বড় বোন অনুপ্রিয়া একজন গাইনীকোলোজিস্ট। কিছু না ভেবেই দ্রুত ফোন করে, আপুর নির্দেশনা অনুযায়ী মেডিসিন বক্স ঘেটে পেইন কিলার নিয়ে খায়িয়ে দেয়। তারপর মুমুর জন্য কেনা হট ব্যাগটা খুজে বের করে। ঝটপট পানি গরম করে নিয়ে এসে কোমরের নিচে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পারানোর চেষ্টা করে, আধাঘন্টা পরে মুমু ঘুমিয়ে যায়।

সকালে সোনা খালা রান্না করে গেলে মুমুকে দ্রুত খেয়ে তৈরি হতে বলে আদিব। সকাল থেকে আদিবকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে মুমুর। খাবার জন্য ডাকলে না বলে, ডক্টরের কাছে যাবে তাই মুমুকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বলল।

অন্যদিকে আদিবের টেনশন হচ্ছে বড় আপুকে নিয়ে, রাতে মুমুর কথা সব বলেছে। কিন্তু আপু মুমুকে চেম্বারে না নিয়ে তার বাসায় কেন নিতে বলল বুঝতে পারছে না। বেশি না ভেবে মুমুকে নিয়ে বেরিয়ে যায় আদিব। রিকশাটা একটা সুন্দর দোতলা বাড়ির সামনে থামতেই মুমু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আদিবের দিকে তাকায়, যার অর্থ এখানে কেন? আদিব কিছু না বলে মুমুর হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যায়। কলিং বেল চাপার কিছুক্ষন পরে একটা সাত আট বছরের ছেলে দরজা খুলে দেয়। মনিমামা!

বলেই আদিবের কোমর পেচিয়ে ধরে। আদিব হেসে বলল, এই বাঁদর ভিতরে ঢুকতে দে আগে আদিবকে ছেড়ে চেচিয়ে বলল, আম্মু মনিমামা আমাকে বাঁদর বলছে। মুমু দুই জনের কথাবার্তায় বুঝতে পারে ছেলেটা সম্পর্কে আদিবের ভাগিনা। এসব ভেবে সামনে তাকাতেই একজন শাড়ি পরিহিতা সুন্দরী মহিলাকে দেখতে পায়। মহিলাটি এসেই রেগে আদিবের গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দেয়। ভয়ে আদিবের বা হাত নিজের দুই হাতে জাপটে ধরে মুমু।

পর্ব ৮

অনুপ্রিয়ার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে, তার ভাই কি করে এমন একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটাতে পারে। সে এক বছর এর বেশি বিয়ে করেছে কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। সেটা তাও ঠিক ছিল কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়েকে, উফফ আর কিছু ভাবতে পারছে না। রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ পড়ে মুমুর দিকে,
মিষ্টি চেহারার মেয়েটা আদিবের এক হাত জড়িয়ে ধরে ভীতু ভীতু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অনুপ্রিয়ার তাকানো দেখে দ্রুত নিচের দিকে তাকায় মুমু, আড়~ চোখে আদিবের গাল দেখার চেষ্টা করে, ব্যাথা পেয়েছে মনে হয়।

অনুপ্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে তার ছেলেকে বলল, স্বাক্ষর তোমার মনিমামা কে বলো সে যেন এইমুহূর্তে আমার সামনে থেকে চলে যায়।

আদিব হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে আছে, বড় আপু তার গায়ে হাত তুলেছে? আসলেই কি সত্যি? আবার এখন চলে যেতে বলছে। সবকিছু কেমন অবাস্তব মনে হচ্ছে। সেকি চলে যাবে? অস্ফুট শব্দে বলল, আমি কি সত্যি চলে যাব? অনুপ্রিয়া কটমট করে আদিবের দিকে তাকালো যার অর্থ একপা বাইরে রাখ কুচিকুচি করে কাটবো।
দুই মিনিটের মধ্যে ডাইনিং টেবিলে আই, আমি ব্রেকফাস্ট করবো বলেই গটগট করে হেটে চলে গেল অনুপ্রিয়া। আদিব মৃদু হাসলো সে জানে তার বোন একটুও রাগ করে থাকতে পারে না। মুমু এখনো আদিবের হাত ধরে লেপ্টে দাড়িয়ে আছে, তার মাথায় কিছু ঢুকছে না এদের কারসাজি।

অনুপ্রিয়া প্লেটে খাবার সার্ভ করতে করতে মুমুকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, নাম কি তোমার? মুমু আস্তে করে বলল, মিশিকা রহমান মুমু, (বলে আদিবের দিকে তাকিয়ে আবার বলল) না মানে মিশিকা মাহমুদ মুমু উত্তর শুনে মৃদু হাসলো অনুপ্রিয়া।

মুমুর বেশ ভালো লেগেছে সুন্দরী মহিলা কে, অনেক যত্ন করে খায়িয়ে আবার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছেন। এখন সে স্বাক্ষরের রুমে বসে আছে, স্বাক্ষর মনি মামি বলে তার আর্ট বুক এটা সেটা দেখাচ্ছে। যখন থেকে জানতে পেরেছে এটা তার মনি মামি বার বার ডাকছে। মুমুর কাছে ডাকটা খুব মিষ্টি লাগছে। কিছুক্ষণ পরে অনুপ্রিয়া মুমুকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। মুমুকে পাশে বসিয়ে মুমুর চোখ টেনে দেখে হাতে স্টেথোস্কোপ লাগাতে লাগাতে বলল, তুমি কি জানো আমি তোমার কে হই? মুমু একবার আদিবের দিকে তাকালো, সে ভাবলেশহীন ভাবে বসে ফোন টিপতে ব্যাস্ত। তারপর মাথা নেড়ে না জানালো। অনুপ্রিয়া হেসে বলল, আমি এই গাধাটার বড় বোন, মানে তোমার বড়ো ননদ বুঝলে? মুমুও হেসে মাথা নাড়ালো।
মুমুর ভীষণ মন খারাপ, সে আরো কিছুক্ষণ আপুর কাছে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু গাধাটা, না না রাগী গাধাটার জন্য হয়নি। রাগী গাধাটা জোর করে নিয়ে এসেছে, তাই সে রাগ করে আছে। খাবে না সে মোটেও খাবে না, ডাকলেও যাবে না।

মুমু আমি আর একবার বলছি খেতে আই আদিবের রাগ হচ্ছে, বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করার জ্বালা কথায় কথায় অভিমান। উফফ…. আজ আস্ত রাখবো না। রেগে রুমে এসে দেখে মুমু বিছানার উপর বালিশ কোলে বাবু হয়ে বসে আছে। দুই হাত থুতনিতে ঠেকিয়ে গাল ফুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে আদিবের দিকে তাকিয়ে আছে। উফফ, এই মেয়ে এত্তো কিউট হয়ে বসে আছে কেন? আদিব সোজা গিয়ে বালিশ টা ফেলে টুপ করে মুমুর নাকে একটা কামড় দেয়। ব্যাথায় আহহ করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদিব তাকে কোলে তুলে হেটে খাবার টেবিলে নিয়ে বসিয়ে দেয়। মুমু তখনও তার নাক ডলছে। মুমু খাবো না বলার আগেই আদিব বলে উঠে, ঝটপট খেয়ে ঔষধ খাবি, আর একটা কথা বললে সারারাত দমবন্ধ চুমু দিব। (শয়তানি হাসি দিয়ে)
মুমু থ্রেট শুনে লক্ষি মেয়ের মতো খেয়ে নেয়।

ভালোবাসা, খুনসুটিতে বেশ কাটছে মুমুর দিন। মাঝে মাঝে আদিবের সাথে ঘুরতে যায়। রুপাকে আদিবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকে সে আদিবের ফ্যান হয়ে গেছে। তারা প্রায় প্রায় আদিবের ক্যাম্পাসে যেয়ে মিমন আর আদিবের সাথে দেখা করে আসে। মুমু তো যেয়েই ভাইয়ের হাত ধরে বসে থাকে আর রুপা ও আদিব মুমুকে নিয়ে মজা করে। আদিবের সব বন্ধুরাই মুমুর সম্পর্কে জানে। মিমনের বোন প্লাস আদিবের বাচ্চা বউ হিসেবে তাকে সবাই খুব আদর করে। সবাইকে ভালো লাগলেও সৃজা আপুকে তার ভালো লাগে না। কেমন যেন আদিব ভাইয়ার পাশে পাশে ঘেঁষে থাকে, কাধে হাত রাখে। মুমুর ভীষণ রাগ হয়, আজকে তো খ্যা খ্যা করে হেসে হেসে আদিবের কাঁধে লুটিয়ে পড়ছিল।

আদিবের ক্লাস না থাকায় মুমুর সাথেই ফিরছে। কিন্তু ম্যাডামের কোনো কারণে রাগ হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অন্যসময় বাইকে উঠলে লেপ্টে বসে আজ কাঁধটাও ভালো করে ধরছে না। বড় আপু গিফট করেছে বাইকটা মুমুকে নিয়ে তার বাসায় যখন তখন যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাগ করলো কি নিয়ে, ইদানিং এই মেয়ের নাকের ডগায় রাগ ঝুলে থাকে বোঝা দায় কি নিয়ে রাগ। কিছু দিন আগে হঠাৎ মুখ ফুলিয়ে বলল, তুমি আমাকে তুই কেন বলো? আব্বু তো আম্মুকে তুমি বলে দুলাভাইও তো আপুকে তুমি বলে। আদিব তখন বলেছিল বলতে ভালো লাগে তাই কিন্তু ম্যাডামের ইচ্ছা তাকে যেন তুমি বলা হয়।

এসব ভাবতে ভাবতে বাসায় পৌঁছে যায়। মুমু রাগে গজগজ করে ভিতরে এসেই ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বসে আছে। আদিব ভিতরে এসে দেখে মুমু মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। মেয়েটা দিন দিন আরো সুন্দর হয়ে যাচ্ছে, আগের থেকে উজ্জ্বল হয়ে গেছে। হালকা মোটা হয়ে বেশ কিউট কিউট হয়ে গেছে। সাদা কলেজ ড্রেস পড়ে দুই কাধে বেনি করা রাগে নাকটা ঘেমে উঠেছে। আদিব মৃদু হেসে রুমের ভেতরে এসে বিছানার সাইড টেবিলে বাইকের চাবি রেখে মুমুর সামনে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, আমার মুমুপাখিটা কি রাগ করেছে?

আমি কোনো পাখি ফাঁকি নই পানি না নিয়ে রেগে বলল মুমু। মুমুকে রাগাতে ভীষণ ভালো লাগে আদিবের। তাই বলল, তাহলে কি মুমু ঢেঁড়স বলবো মুমু কটমট করে তাকালো। আদিব আবার বলল, পছন্দ হচ্ছে না, আচ্ছা তাহলে মুমুকাক ডাকবো, ঠিক আছে? মুমু রেগে আদিবের হাতের থেকে গ্লাস নিতে গেল, আদিব চট করে গ্লাস রেখে দিয়ে মুমুকে জড়িয়ে ধরে পিছনে থেকে। কাঁধ থেকে বেণি সড়িয়ে একটা গভীর চুমু দেয়, কাঁধে নাক ঘষতে ঘষতে বলল, কিসের জন্য রাগ হয়েছে বলো? আদিবের এমন করায় মুমু চুপসে যায়। আগে কেমন অস্বস্তি লাগলেও ইদানিং কেমন ভালো লাগা কাজ করে। চেয়েও মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারছে না মুমু। কিছু না বলায় সামনে ঘুড়ায় মুমুকে। মুমু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মৃদু হেসে টুপ করে নাকে একটা চুমু খায়। মুমু চোখ খুলে দেখে আদিব তার দিকে হেসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে বলো কি হয়েছে?

মুমু আদিবের টিশার্টের বোতাম নাড়তে নাড়তে বলল, তুমি সৃজা আপুর সাথে কথা বলবে না, একটু আকটু বলবে কিন্তু একদম পাশে দাঁড়াবে না। এতক্ষণ ভ্রু কুঁচকে মুমুর কথা শুনছিল কথা শেষ হতেই হু হা করে হেসে দিল। আদিবের হাসি দেখে মুমুর আবার রাগ হয়ে গেল সে আদিবের হাতের বাঁধন খুলতে মোড়ামুড়ি শুরু করে। আদিব হাসতে হাসতে মুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা কালই সৃজাকে বলে দিব ও যেন একদম আমার আশেপাশে না আসে।

পরের দিন মুমু কোচিং থেকে বের হয়ে দেখে কোচিং এর সামনের পেয়ারা মামার দোকানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পেয়ারা মাখমাখা খাচ্ছে মিমন, আদিব ও সৃজা। রুপাকে নিয়ে সেও যায় সেখানে। আদিব মুমুকে দেখে বলল, আজ দেরি হলো যে মুমু বলল, এমনিতেই
আদিব খেতে খেতে বলল, মিমন তোর গার্লফ্রেন্ড কে বলিস সে যেন আমার আশেপাশে না আসে, আমার বাচ্চা বউয়ের পছন্দ না কোন মেয়ে আমার আশেপাশে আসুক।

একথা শোনার সাথে সাথে মিমন কাশতে শুরু করে, সৃজা দ্রুত পানি নিয়ে মিমনকে দেয়। মুমু অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আবার আদিবের দিকে তাকায়, সে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পেয়ারা খাচ্ছে। মনে হচ্ছে পেয়ারা না খেলে পেয়ারা গুলো তার নামে থানায় মানহানীর মামলা করবে। বজ্জাত ছেলে সৃজা আপুর সামনে আমাকে লজ্জায় ফেলল, কিন্তু কি বলল ভাইয়া কে? মুমু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। মিমন জোর করে হেসে বলল, মনি আসলে কি হয়েছে, আমি বলবো বলবো করে বলা হয়নি মুমু থাকবে না, আর এক মুহূর্ত থাকবে না সে। রুপার হাত ধরে সোজা হাটা শুরু করে। মিমন কি করবে ভেবে ফট করে মুমুর সামনে কান ধরে দাড়িয়ে যায় মুমুমনি ভুল হয়ে গেছে রে রাগ করিস না আর হবে না।

পর্ব ৯

শালা কেস খায়িয়ে এখন আবার পকেটও ফাঁকা করলি আদিবের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল মিমন।
আদিব সিক কাবাবে একটা কামড় দিয়ে বলল, ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আম নট ইউর শালা। তোর বোন জামায়ের শালাটা কে ভেবে দেখ, মাথামোটা শালা। দুই ভাই~ বোনের ই মাথামোটা। (বলেই চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়)
মিমন মুমুর অভিমানের পালা শেষে আদিব সবাইকে ট্রিট এর কথা বলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসে বলেছে আজকের ট্রিট মিমনের গোপন প্রেম ধরা খাওয়ার জন্য তাই মিমনই বিল দেবে। আর খাবার টেবিলে বসে তারা গল্প করছিল। কিন্তু সে ভুলে গেছিল মুমুও তার সাথে আছে। হাসির শব্দে আস্তে করে চোখ খুলে দেখে সৃজা আর রূপা হাসছে। মিমনও ঠোঁট চেপে হাসছে, আদিবের তাকানো দেখেই নিজের গলার কাছে হাত নিয়ে মাডার সাইন দেখালো। আড়চোখে মুমুর দিকে তাকালো, মুমু তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যার অর্থ আমি মাথামোটা? আদিব মুমুর দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো। মুমু কিছু না বলেই রাগের সাথে নিজের খাবার খেতে শুরু করে।

রাস্তায় একটা কথাও বলেনি মুমু বাসার সামনে বাইক থামতেই পট করে নেমে হাঁটা ধরে, আদিবও তার পিছনে আসে। রুমে ঢুকে ব্যাগ টেবিলের উপর শব্দ করে রাখে, বেণি খুলে আলমারি থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। আদিব চুপচাপ তার কাজকর্ম দেখছিল, কিন্তু মেজাজ খারাপ হয়ে গেল পানির শব্দে। রাত গোসল করলে জ্বর~ সর্দি হয় মুমুর সেটা ও ভালো করেই জানে। দ্রুত ওয়াসরুমের দরজা নক করে আদিব। মুমু দরজা খোল, এখন গোসল করবি না। মুমুর কোনো সাড়া না পেয়ে আরো রাগ হচ্ছে আদিবের। মুমু দরজা খোল নইলে ভেঙে ফেলবো কিন্তু, এখন যদি গোসল করিস আস্ত রাখবো না বলে দিলাম

রাগে আদিবের কান লাল হয়ে গেছে, কপালের রগ ভেসে উঠেছে। রাগে দরজাতে দুইটা লাথি মেরে বিছানায় বসে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে মুমু ভেজা চুলে বের হয়ে আসে। লম্বা চুল গুলোর একটাও ভিজতে বাকি নেই। দেখেই মেজাজ আরো বিগড়ে গেল, দাড়িয়েই মুমুকে থাপ্পড় দিতে গিয়েও থেমে যায়। মুমু ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল, চোখ মেলার সাথে সাথেই আদিব বাম হাতটা পিছনে মুচড়ে ধরে মুমুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। দাতে দাঁত চেপে বলে, জ্বর হোক সেদিনের থেকেও বেহাল অবস্থা করবো আমি, মাইন্ড ইট। বলেই মুমুকে ছেড়ে দেয়। মুমুর তো ভয়ে আত্না আগেই পালিয়েছে। ওয়াসরুমের দরজা নক করে থ্রেট করার সময়ই মুমুর জানের পানি শুকিয়ে সাহারা মরুভূমি হয়ে গেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সে তো পুরো ভিজে গেছিল তাই বের হতে পারেনি। এখন যদি জ্বর আসে, সেদিনের কথা ভেবেই ফাঁকা ঢোক গিলল মুমু।
রান্নাঘর থেকে দুধ গরম করে নিয়ে আসে আদিব। দুধের গ্লাসটা মুমুর এক হাতে ধরিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়, অন্য হাত থেকে তোয়ালে টা নিয়ে সারা চুলে পেচিয়ে দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে মুমু মাথায় তোয়ালে পেচিয়েই শুয়ে পড়েছে। ডান কাত হয়ে শুয়ে থাকায় বা কাঁধের তিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আদিব পিছন থেকে মুমুকে জড়িয়ে ধরে তিলটার উপর চুমু দেয়, কাঁধে নাক ঘষতে ঘষতে বলল, তোয়ালে টা পেচিয়ে শুয়েছো কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো।

মুমু আদিবের এমন স্পর্শে তার হাত খামচে ধরে ছিল, কিন্তু প্রশ্ন শুনে ঘুরে অভিমানী সুরে বলল, আমি তো মাথামোটা তা….. কথা শেষ করার আগেই আদিব মুমুর ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে দেয়, মুমুও আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলে। খানিকক্ষণ পরে ছেড়ে মুমুর কপালে কপাল ঠেকিয়ে আদিব নেশাক্ত কন্ঠে বলল, মুমু, তোর প্রত্যেক টা তিল ছুঁতে ইচ্ছা করছে, ছুঁতে দিবি আমায়? আদিবের নেশাময় কন্ঠ শুনে মুমুর সারা শরীর থরথর করে কাপছে। কাঁপা কাঁপা হাতেই আদিবের গলা জড়িয়ে ধরে মুমু।

আজানের মধুর ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যায় মুমুর, আদিব তাকে দুই হাতে জাপটে ধরে ঘুমচ্ছে। রাতের কথা মনে পরতেই ভীষণ লজ্জা লাগছে তার, রাতে ভালোবাসার এক অন্যরকম রাজ্যে নিয়ে গেছিল তাকে আদিব। আদিবের বুকে টুপ করে একটা চুমু খায় মুমু, সাবধানে আদিবের হাত সরিয়ে উঠে পরে। ফ্লোরে পা ফেলতেই কোমড় থেকে পা পর্যন্ত অসহ্য ব্যাথায় ওখানেই পড়ে যায়। উহ… মা গো বলে আত্নচিৎকার দেয়। মুমুর আওয়াজে ধড়ফড় করে উঠে বসে আদিব। বিছানায় নাই দেখে অন্যপাশে তাকাতেই দেখে ফ্লোরে হাটু ভেঙে কোমড় চেপে বসে আছে মুমু। বুকটা ধুক করে উঠে, তবে কি আবার মুমুকে কষ্ট দিয়ে ফেলল। দ্রুত উঠে মুমুকে কোলে করে বিছানায় বসিয়ে দেয়। মুমু নিচে পড়লি কি করে? কোমড় চেপে ধরে আছিস কেন, কোমড়ে কি ব্যাথা করছে? অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো আদিব।

আদিবের টলটলে চোখ আর অস্থিরতা দেখে নিজেকে সামলে নেয় মুমু। মুখে জোরপূর্বক হাসির রেখা টেনে আমতা আমতা করে বলল, আসলে নামতে গিয়ে পড়ে গেছি। আমাকে একটু ওয়াশরুমে দিয়ে আসো তো, হাটতে ইচ্ছা করছে না। আদিব মুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঝট করে মুমুকে কোলে করে ওয়াশরুমে দিয়ে আসে, তারপর মুমুর জামা কাপড় দিয়ে দরজা টেনে বেরিয়ে আসে। অনেকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয় মুমু, দরজা খুলতেই আদিব আবার ঝট করে কোলে তুলে নেয়। মুমু ভাবছে সে কি এতক্ষণ দাড়িয়েই ছিল।

মুমুকে বিছানায় হেলান দিয়ে বসিয়ে কোমড়ের পিছনে হট ব্যাগটা সেট করে দেয়। সাইড টেবিল থেকে একটা বাটি নিয়ে মুমুর হাতে ধরিয়ে দেয়। বাটিতে সুপ নুডলস দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় আদিবের দিকে। আলমারি থেকে কাপড় নিতে নিতে বলল, বাটি ফাঁকা না হলে আস্ত রাখবো না। বলেই সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায় আদিব। সকাল সকাল এরকম ঝোল ঝোল নুডলস দেখেই গা গুলচ্ছে মুমুর, কিন্তু রাগী গাধাটা এক গাদা ভালোবেসে কষ্ট করে তার জন্য বানিয়েছে মনে করে খেতে শুরু করে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে মুমুর হাত থেকে বাটিটা নিয়ে আপুর সাজেস্ট করা ঔষধ খায়িয়ে দেয় মুমুকে।

আদিব~ মুমুর চড়ুই সংসার অজস্র ভালোবাসা, খুনসুটি আর মিষ্টি ঝগড়াতে চলছে। গতমাস থেকে আদিবের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে, থিওরি শেষ হলেও প্রাকটিকাল রয়েছে। প্রতি মাসে মুমুকে বাড়িতে নিয়ে গেলেও গত দুই মাস যাওয়া হয়নি। মিমন আর আদিবের মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে বাড়িতে যাওয়ার জন্য, না পেরে আদিব নিজে গাড়িতে তুলে দিয়েছে মুমকে। বড় দুলাভাই গতমাসে মুমুকে একটা ফোন গিফট করেছে, গাড়িতে উঠার বিশ মিনিট পর পর ফোন দিচ্ছে আদিব। রেগে বলেছে আর কল দিলে ফোন অফ করে দিবে। তারপর থেকে ফোন না দিয়ে মেসেজ দিচ্ছে। হনুমান টা এত কেন ভালোবাসে তাকে? ভেবেই মুমু ফিক করে হেসে দেয়, পাশে বসা আন্টি টা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই হাসি বন্ধ করে দেয় মুমু।

দুই দিন হলো মুমু বাড়িতে গেছে, কিন্তু আদিবের সবকিছু অসহ্য লাগছে। তাই সে ব্যাগপত্র গুছিয়ে মিমনের হলে চলে এসেছে। ভরদুপুরে আদিবকে তলপিতলপাসহ নিজের রুমে দেখে মিমন অবাক হয়ে বলল, তুই এভাবে এখানে কেন? আদিব ব্যাগপত্র রেখে বিছানায় ফট করে শুয়ে বলল, তোর মাথামোটা, অসভ্য বোনটা তো আমাকে ফেলে চলে গেছে, এখন আমি থাকবো কি করে? আদিবের কথা শুনে মিমন
হুহা করে হেসে দেয়। হাতের কাছ থেকে বালিশ টা নিয়ে মিমনের দিকে ছুড়ে মেরে আদিব বলল, হাসিস না, আমার পরীক্ষা খারাপ হোক তোর বোনকে আস্ত রাখবো না। মিমন বালিশ টা জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে।

আজ এক সপ্তাহ হলো মুমু বাড়িতে এসেছে। প্রচুর ব্যাস্ত, মা~ কাকি এটা সেটা খাওয়াতে খাওয়াতে তাকে মোটা করে ফেলছে। আব্বু তো প্রতিদিন তার পছন্দের এটা সেটা এনে দিচ্ছে। আর মুগ্ধ তো সব সময় লেজের মতো সাথেই থাকে। উমম…এতো ভালোবাসা। অন্যদিকে রাগী গাধাটা সাত দিনে সাতাইশ হাজার থ্রেট দিয়েছে…হি হি হি।
আগামী পরশু স্বাক্ষরের বার্থডে, সে তার ফ্রেন্ডদের তার মনি মামিকে দেখাবে তাই বার ফোন করছে। তাই মুমু কালই চলে যাবে তবে হনুমান টাকে জানাবে না সারপ্রাইজ দেবে ভেবেই মুচকি হাসলো। মিমনকে ফোন করে বলেছে যেন আদিবকে না জানাই তার আসার কথা। আব্বু তাকে আজকে সকালেই বাসে তুলে দিয়েছে। আদিবের আজই শেষ পরীক্ষা, হল থেকে বের হয়েই শ্বশুর বাড়ি যাবে বলে মিমনের রুমে এসে ব্যাগ গোছাচ্ছে। মিমন অনেক বুঝিয়ে থামাতে না পেরে মুমুর আসার খবর বলে দেয়। খবরটা শুনেই মিমনের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, দুই জনের একটা ছোট যুদ্ধের পর মিমনকে ছেড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তোর বোন আসুক, আমাকে ছেড়ে আমার শ্বশুর বাড়ি বেড়ানো ছুটাবো, আর সারপ্রাইজও বের করবো।

তিন ঘন্টা যাবত মুমুর ফোন বন্ধ, মিমনের ভীষণ টেনশন হচ্ছে। তার থেকেও টেনশন হচ্ছে আদিবকে দেখে। রাগে নাক মুখ লাল হয়ে আছে, রুমের মধ্যে পায়চারি করছে আর মুমুর ফোনে বার বার কল দিচ্ছে। হঠাৎ দাড়িয়ে মিমনকে বলল, তোর বোনকে আমি আজ খুন করবো প্রতিউত্তরে মিমন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো।

বাস কাউন্টারে এসে বাবার বলা বাসের সুপারভাইজার, হেলপার সকলকে মুমুর ছবি দেখিয়েও কিছু জানতে পারে নি মিমন ও আদিব। বাবাকে জানিয়েছে তিনিও বার ফোন করছে। হঠাৎ আদিব মিমনের হাত ধরে টলটলে চোখে বলল, তোরা কি আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ায় জন্য মজা করছিস? প্লিজ এমন মজা করিস না আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

পর্ব ৮

অনুপ্রিয়ার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে, তার ভাই কি করে এমন একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটাতে পারে। সে এক বছর এর বেশি বিয়ে করেছে কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। সেটা তাও ঠিক ছিল কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়েকে, উফফ আর কিছু ভাবতে পারছে না। রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ পড়ে মুমুর দিকে,

মিষ্টি চেহারার মেয়েটা আদিবের এক হাত জড়িয়ে ধরে ভীতু ভীতু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অনুপ্রিয়ার তাকানো দেখে দ্রুত নিচের দিকে তাকায় মুমু, আড়~ চোখে আদিবের গাল দেখার চেষ্টা করে, ব্যাথা পেয়েছে মনে হয়।

অনুপ্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে তার ছেলেকে বলল, স্বাক্ষর তোমার মনিমামা কে বলো সে যেন এইমুহূর্তে আমার সামনে থেকে চলে যায়।
আদিব হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে আছে, বড় আপু তার গায়ে হাত তুলেছে? আসলেই কি সত্যি? আবার এখন চলে যেতে বলছে। সবকিছু কেমন অবাস্তব মনে হচ্ছে। সেকি চলে যাবে? অস্ফুট শব্দে বলল, আমি কি সত্যি চলে যাব? অনুপ্রিয়া কটমট করে আদিবের দিকে তাকালো যার অর্থ একপা বাইরে রাখ কুচিকুচি করে কাটবো।
দুই মিনিটের মধ্যে ডাইনিং টেবিলে আই, আমি ব্রেকফাস্ট করবো বলেই গটগট করে হেটে চলে গেল অনুপ্রিয়া। আদিব মৃদু হাসলো সে জানে তার বোন একটুও রাগ করে থাকতে পারে না। মুমু এখনো আদিবের হাত ধরে লেপ্টে দাড়িয়ে আছে, তার মাথায় কিছু ঢুকছে না এদের কারসাজি।

অনুপ্রিয়া প্লেটে খাবার সার্ভ করতে করতে মুমুকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, নাম কি তোমার? মুমু আস্তে করে বলল, মিশিকা রহমান মুমু, (বলে আদিবের দিকে তাকিয়ে আবার বলল) না মানে মিশিকা মাহমুদ মুমু উত্তর শুনে মৃদু হাসলো অনুপ্রিয়া।

মুমুর বেশ ভালো লেগেছে সুন্দরী মহিলা কে, অনেক যত্ন করে খায়িয়ে আবার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছেন। এখন সে স্বাক্ষরের রুমে বসে আছে, স্বাক্ষর মনি মামি বলে তার আর্ট বুক এটা সেটা দেখাচ্ছে। যখন থেকে জানতে পেরেছে এটা তার মনি মামি বার বার ডাকছে। মুমুর কাছে ডাকটা খুব মিষ্টি লাগছে। কিছুক্ষণ পরে অনুপ্রিয়া মুমুকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। মুমুকে পাশে বসিয়ে মুমুর চোখ টেনে দেখে হাতে স্টেথোস্কোপ লাগাতে লাগাতে বলল, তুমি কি জানো আমি তোমার কে হই? মুমু একবার আদিবের দিকে তাকালো, সে ভাবলেশহীন ভাবে বসে ফোন টিপতে ব্যাস্ত। তারপর মাথা নেড়ে না জানালো। অনুপ্রিয়া হেসে বলল, আমি এই গাধাটার বড় বোন, মানে তোমার বড়ো ননদ বুঝলে? মুমুও হেসে মাথা নাড়ালো।

মুমুর ভীষণ মন খারাপ, সে আরো কিছুক্ষণ আপুর কাছে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু গাধাটা, না না রাগী গাধাটার জন্য হয়নি। রাগী গাধাটা জোর করে নিয়ে এসেছে, তাই সে রাগ করে আছে। খাবে না সে মোটেও খাবে না, ডাকলেও যাবে না।

মুমু আমি আর একবার বলছি খেতে আই আদিবের রাগ হচ্ছে, বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করার জ্বালা কথায় কথায় অভিমান। উফফ…. আজ আস্ত রাখবো না। রেগে রুমে এসে দেখে মুমু বিছানার উপর বালিশ কোলে বাবু হয়ে বসে আছে। দুই হাত থুতনিতে ঠেকিয়ে গাল ফুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে আদিবের দিকে তাকিয়ে আছে। উফফ, এই মেয়ে এত্তো কিউট হয়ে বসে আছে কেন? আদিব সোজা গিয়ে বালিশ টা ফেলে টুপ করে মুমুর নাকে একটা কামড় দেয়। ব্যাথায় আহহ করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদিব তাকে কোলে তুলে হেটে খাবার টেবিলে নিয়ে বসিয়ে দেয়। মুমু তখনও তার নাক ডলছে। মুমু খাবো না বলার আগেই আদিব বলে উঠে, ঝটপট খেয়ে ঔষধ খাবি, আর একটা কথা বললে সারারাত দমবন্ধ চুমু দিব। (শয়তানি হাসি দিয়ে)
মুমু থ্রেট শুনে লক্ষি মেয়ের মতো খেয়ে নেয়।

ভালোবাসা, খুনসুটিতে বেশ কাটছে মুমুর দিন। মাঝে মাঝে আদিবের সাথে ঘুরতে যায়। রুপাকে আদিবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকে সে আদিবের ফ্যান হয়ে গেছে। তারা প্রায় প্রায় আদিবের ক্যাম্পাসে যেয়ে মিমন আর আদিবের সাথে দেখা করে আসে। মুমু তো যেয়েই ভাইয়ের হাত ধরে বসে থাকে আর রুপা ও আদিব মুমুকে নিয়ে মজা করে। আদিবের সব বন্ধুরাই মুমুর সম্পর্কে জানে। মিমনের বোন প্লাস আদিবের বাচ্চা বউ হিসেবে তাকে সবাই খুব আদর করে। সবাইকে ভালো লাগলেও সৃজা আপুকে তার ভালো লাগে না। কেমন যেন আদিব ভাইয়ার পাশে পাশে ঘেঁষে থাকে, কাধে হাত রাখে। মুমুর ভীষণ রাগ হয়, আজকে তো খ্যা খ্যা করে হেসে হেসে আদিবের কাঁধে লুটিয়ে পড়ছিল।

আদিবের ক্লাস না থাকায় মুমুর সাথেই ফিরছে। কিন্তু ম্যাডামের কোনো কারণে রাগ হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অন্যসময় বাইকে উঠলে লেপ্টে বসে আজ কাঁধটাও ভালো করে ধরছে না। বড় আপু গিফট করেছে বাইকটা মুমুকে নিয়ে তার বাসায় যখন তখন যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাগ করলো কি নিয়ে, ইদানিং এই মেয়ের নাকের ডগায় রাগ ঝুলে থাকে বোঝা দায় কি নিয়ে রাগ। কিছু দিন আগে হঠাৎ মুখ ফুলিয়ে বলল, তুমি আমাকে তুই কেন বলো? আব্বু তো আম্মুকে তুমি বলে দুলাভাইও তো আপুকে তুমি বলে। আদিব তখন বলেছিল বলতে ভালো লাগে তাই কিন্তু ম্যাডামের ইচ্ছা তাকে যেন তুমি বলা হয়।

এসব ভাবতে ভাবতে বাসায় পৌঁছে যায়। মুমু রাগে গজগজ করে ভিতরে এসেই ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বসে আছে। আদিব ভিতরে এসে দেখে মুমু মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। মেয়েটা দিন দিন আরো সুন্দর হয়ে যাচ্ছে, আগের থেকে উজ্জ্বল হয়ে গেছে। হালকা মোটা হয়ে বেশ কিউট কিউট হয়ে গেছে। সাদা কলেজ ড্রেস পড়ে দুই কাধে বেনি করা রাগে নাকটা ঘেমে উঠেছে। আদিব মৃদু হেসে রুমের ভেতরে এসে বিছানার সাইড টেবিলে বাইকের চাবি রেখে মুমুর সামনে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, আমার মুমুপাখিটা কি রাগ করেছে?

আমি কোনো পাখি ফাঁকি নই পানি না নিয়ে রেগে বলল মুমু। মুমুকে রাগাতে ভীষণ ভালো লাগে আদিবের। তাই বলল, তাহলে কি মুমু ঢেঁড়স বলবো মুমু কটমট করে তাকালো। আদিব আবার বলল, পছন্দ হচ্ছে না, আচ্ছা তাহলে মুমুকাক ডাকবো, ঠিক আছে? মুমু রেগে আদিবের হাতের থেকে গ্লাস নিতে গেল, আদিব চট করে গ্লাস রেখে দিয়ে মুমুকে জড়িয়ে ধরে পিছনে থেকে। কাঁধ থেকে বেণি সড়িয়ে একটা গভীর চুমু দেয়, কাঁধে নাক ঘষতে ঘষতে বলল, কিসের জন্য রাগ হয়েছে বলো? আদিবের এমন করায় মুমু চুপসে যায়। আগে কেমন অস্বস্তি লাগলেও ইদানিং কেমন ভালো লাগা কাজ করে। চেয়েও মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারছে না মুমু। কিছু না বলায় সামনে ঘুড়ায় মুমুকে। মুমু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মৃদু হেসে টুপ করে নাকে একটা চুমু খায়। মুমু চোখ খুলে দেখে আদিব তার দিকে হেসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে বলো কি হয়েছে?

মুমু আদিবের টিশার্টের বোতাম নাড়তে নাড়তে বলল, তুমি সৃজা আপুর সাথে কথা বলবে না, একটু আকটু বলবে কিন্তু একদম পাশে দাঁড়াবে না। এতক্ষণ ভ্রু কুঁচকে মুমুর কথা শুনছিল কথা শেষ হতেই হু হা করে হেসে দিল। আদিবের হাসি দেখে মুমুর আবার রাগ হয়ে গেল সে আদিবের হাতের বাঁধন খুলতে মোড়ামুড়ি শুরু করে। আদিব হাসতে হাসতে মুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা কালই সৃজাকে বলে দিব ও যেন একদম আমার আশেপাশে না আসে।

পরের দিন মুমু কোচিং থেকে বের হয়ে দেখে কোচিং এর সামনের পেয়ারা মামার দোকানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পেয়ারা মাখমাখা খাচ্ছে মিমন, আদিব ও সৃজা। রুপাকে নিয়ে সেও যায় সেখানে। আদিব মুমুকে দেখে বলল, আজ দেরি হলো যে মুমু বলল, এমনিতেই আদিব খেতে খেতে বলল, মিমন তোর গার্লফ্রেন্ড কে বলিস সে যেন আমার আশেপাশে না আসে, আমার বাচ্চা বউয়ের পছন্দ না কোন মেয়ে আমার আশেপাশে আসুক।

একথা শোনার সাথে সাথে মিমন কাশতে শুরু করে, সৃজা দ্রুত পানি নিয়ে মিমনকে দেয়। মুমু অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আবার আদিবের দিকে তাকায়, সে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পেয়ারা খাচ্ছে। মনে হচ্ছে পেয়ারা না খেলে পেয়ারা গুলো তার নামে থানায় মানহানীর মামলা করবে। বজ্জাত ছেলে সৃজা আপুর সামনে আমাকে লজ্জায় ফেলল, কিন্তু কি বলল ভাইয়া কে? মুমু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। মিমন জোর করে হেসে বলল, মনি আসলে কি হয়েছে, আমি বলবো বলবো করে বলা হয়নি মুমু থাকবে না, আর এক মুহূর্ত থাকবে না সে। রুপার হাত ধরে সোজা হাটা শুরু করে। মিমন কি করবে ভেবে ফট করে মুমুর সামনে কান ধরে দাড়িয়ে যায় মুমুমনি ভুল হয়ে গেছে রে রাগ করিস না আর হবে না।

পর্ব ৯

শালা কেস খায়িয়ে এখন আবার পকেটও ফাঁকা করলি আদিবের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল মিমন।
আদিব সিক কাবাবে একটা কামড় দিয়ে বলল, ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আম নট ইউর শালা। তোর বোন জামায়ের শালাটা কে ভেবে দেখ, মাথামোটা শালা। দুই ভাই~ বোনের ই মাথামোটা। (বলেই চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়)

মিমন মুমুর অভিমানের পালা শেষে আদিব সবাইকে ট্রিট এর কথা বলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসে বলেছে আজকের ট্রিট মিমনের গোপন প্রেম ধরা খাওয়ার জন্য তাই মিমনই বিল দেবে। আর খাবার টেবিলে বসে তারা গল্প করছিল। কিন্তু সে ভুলে গেছিল মুমুও তার সাথে আছে। হাসির শব্দে আস্তে করে চোখ খুলে দেখে সৃজা আর রূপা হাসছে। মিমনও ঠোঁট চেপে হাসছে, আদিবের তাকানো দেখেই নিজের গলার কাছে হাত নিয়ে মাডার সাইন দেখালো। আড়চোখে মুমুর দিকে তাকালো, মুমু তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যার অর্থ আমি মাথামোটা? আদিব মুমুর দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো। মুমু কিছু না বলেই রাগের সাথে নিজের খাবার খেতে শুরু করে।

রাস্তায় একটা কথাও বলেনি মুমু বাসার সামনে বাইক থামতেই পট করে নেমে হাঁটা ধরে, আদিবও তার পিছনে আসে। রুমে ঢুকে ব্যাগ টেবিলের উপর শব্দ করে রাখে, বেণি খুলে আলমারি থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। আদিব চুপচাপ তার কাজকর্ম দেখছিল, কিন্তু মেজাজ খারাপ হয়ে গেল পানির শব্দে। রাত গোসল করলে জ্বর~ সর্দি হয় মুমুর সেটা ও ভালো করেই জানে। দ্রুত ওয়াসরুমের দরজা নক করে আদিব। মুমু দরজা খোল, এখন গোসল করবি না। মুমুর কোনো সাড়া না পেয়ে আরো রাগ হচ্ছে আদিবের। মুমু দরজা খোল নইলে ভেঙে ফেলবো কিন্তু, এখন যদি গোসল করিস আস্ত রাখবো না বলে দিলাম

রাগে আদিবের কান লাল হয়ে গেছে, কপালের রগ ভেসে উঠেছে। রাগে দরজাতে দুইটা লাথি মেরে বিছানায় বসে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে মুমু ভেজা চুলে বের হয়ে আসে। লম্বা চুল গুলোর একটাও ভিজতে বাকি নেই। দেখেই মেজাজ আরো বিগড়ে গেল, দাড়িয়েই মুমুকে থাপ্পড় দিতে গিয়েও থেমে যায়। মুমু ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল, চোখ মেলার সাথে সাথেই আদিব বাম হাতটা পিছনে মুচড়ে ধরে মুমুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। দাতে দাঁত চেপে বলে, জ্বর হোক সেদিনের থেকেও বেহাল অবস্থা করবো আমি, মাইন্ড ইট। বলেই মুমুকে ছেড়ে দেয়। মুমুর তো ভয়ে আত্না আগেই পালিয়েছে। ওয়াসরুমের দরজা নক করে থ্রেট করার সময়ই মুমুর জানের পানি শুকিয়ে সাহারা মরুভূমি হয়ে গেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সে তো পুরো ভিজে গেছিল তাই বের হতে পারেনি। এখন যদি জ্বর আসে, সেদিনের কথা ভেবেই ফাঁকা ঢোক গিলল মুমু।

রান্নাঘর থেকে দুধ গরম করে নিয়ে আসে আদিব। দুধের গ্লাসটা মুমুর এক হাতে ধরিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়, অন্য হাত থেকে তোয়ালে টা নিয়ে সারা চুলে পেচিয়ে দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে মুমু মাথায় তোয়ালে পেচিয়েই শুয়ে পড়েছে। ডান কাত হয়ে শুয়ে থাকায় বা কাঁধের তিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আদিব পিছন থেকে মুমুকে জড়িয়ে ধরে তিলটার উপর চুমু দেয়, কাঁধে নাক ঘষতে ঘষতে বলল, তোয়ালে টা পেচিয়ে শুয়েছো কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো। মুমু আদিবের এমন স্পর্শে তার হাত খামচে ধরে ছিল, কিন্তু প্রশ্ন শুনে ঘুরে অভিমানী সুরে বলল, আমি তো মাথামোটা তা….. কথা শেষ করার আগেই আদিব মুমুর ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে দেয়, মুমুও আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলে। খানিকক্ষণ পরে ছেড়ে মুমুর কপালে কপাল ঠেকিয়ে আদিব নেশাক্ত কন্ঠে বলল, মুমু, তোর প্রত্যেক টা তিল ছুঁতে ইচ্ছা করছে, ছুঁতে দিবি আমায়? আদিবের নেশাময় কন্ঠ শুনে মুমুর সারা শরীর থরথর করে কাপছে। কাঁপা কাঁপা হাতেই আদিবের গলা জড়িয়ে ধরে মুমু।

আজানের মধুর ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যায় মুমুর, আদিব তাকে দুই হাতে জাপটে ধরে ঘুমচ্ছে। রাতের কথা মনে পরতেই ভীষণ লজ্জা লাগছে তার, রাতে ভালোবাসার এক অন্যরকম রাজ্যে নিয়ে গেছিল তাকে আদিব। আদিবের বুকে টুপ করে একটা চুমু খায় মুমু, সাবধানে আদিবের হাত সরিয়ে উঠে পরে। ফ্লোরে পা ফেলতেই কোমড় থেকে পা পর্যন্ত অসহ্য ব্যাথায় ওখানেই পড়ে যায়। উহ… মা গো বলে আত্নচিৎকার দেয়। মুমুর আওয়াজে ধড়ফড় করে উঠে বসে আদিব। বিছানায় নাই দেখে অন্যপাশে তাকাতেই দেখে ফ্লোরে হাটু ভেঙে কোমড় চেপে বসে আছে মুমু। বুকটা ধুক করে উঠে, তবে কি আবার মুমুকে কষ্ট দিয়ে ফেলল। দ্রুত উঠে মুমুকে কোলে করে বিছানায় বসিয়ে দেয়। মুমু নিচে পড়লি কি করে? কোমড় চেপে ধরে আছিস কেন, কোমড়ে কি ব্যাথা করছে? অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো আদিব।
আদিবের টলটলে চোখ আর অস্থিরতা দেখে নিজেকে সামলে নেয় মুমু। মুখে জোরপূর্বক হাসির রেখা টেনে আমতা আমতা করে বলল, আসলে নামতে গিয়ে পড়ে গেছি। আমাকে একটু ওয়াশরুমে দিয়ে আসো তো, হাটতে ইচ্ছা করছে না। আদিব মুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঝট করে মুমুকে কোলে করে ওয়াশরুমে দিয়ে আসে, তারপর মুমুর জামা কাপড় দিয়ে দরজা টেনে বেরিয়ে আসে। অনেকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয় মুমু, দরজা খুলতেই আদিব আবার ঝট করে কোলে তুলে নেয়। মুমু ভাবছে সে কি এতক্ষণ দাড়িয়েই ছিল।

মুমুকে বিছানায় হেলান দিয়ে বসিয়ে কোমড়ের পিছনে হট ব্যাগটা সেট করে দেয়। সাইড টেবিল থেকে একটা বাটি নিয়ে মুমুর হাতে ধরিয়ে দেয়। বাটিতে সুপ নুডলস দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় আদিবের দিকে। আলমারি থেকে কাপড় নিতে নিতে বলল, বাটি ফাঁকা না হলে আস্ত রাখবো না। বলেই সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায় আদিব। সকাল সকাল এরকম ঝোল ঝোল নুডলস দেখেই গা গুলচ্ছে মুমুর, কিন্তু রাগী গাধাটা এক গাদা ভালোবেসে কষ্ট করে তার জন্য বানিয়েছে মনে করে খেতে শুরু করে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে মুমুর হাত থেকে বাটিটা নিয়ে আপুর সাজেস্ট করা ঔষধ খায়িয়ে দেয় মুমুকে।
আদিব~ মুমুর চড়ুই সংসার অজস্র ভালোবাসা, খুনসুটি আর মিষ্টি ঝগড়াতে চলছে। গতমাস থেকে আদিবের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে, থিওরি শেষ হলেও প্রাকটিকাল রয়েছে। প্রতি মাসে মুমুকে বাড়িতে নিয়ে গেলেও গত দুই মাস যাওয়া হয়নি। মিমন আর আদিবের মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে বাড়িতে যাওয়ার জন্য, না পেরে আদিব নিজে গাড়িতে তুলে দিয়েছে মুমকে। বড় দুলাভাই গতমাসে মুমুকে একটা ফোন গিফট করেছে, গাড়িতে উঠার বিশ মিনিট পর পর ফোন দিচ্ছে আদিব। রেগে বলেছে আর কল দিলে ফোন অফ করে দিবে। তারপর থেকে ফোন না দিয়ে মেসেজ দিচ্ছে। হনুমান টা এত কেন ভালোবাসে তাকে? ভেবেই মুমু ফিক করে হেসে দেয়, পাশে বসা আন্টি টা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই হাসি বন্ধ করে দেয় মুমু।

দুই দিন হলো মুমু বাড়িতে গেছে, কিন্তু আদিবের সবকিছু অসহ্য লাগছে। তাই সে ব্যাগপত্র গুছিয়ে মিমনের হলে চলে এসেছে। ভরদুপুরে আদিবকে তলপিতলপাসহ নিজের রুমে দেখে মিমন অবাক হয়ে বলল, তুই এভাবে এখানে কেন? আদিব ব্যাগপত্র রেখে বিছানায় ফট করে শুয়ে বলল, তোর মাথামোটা, অসভ্য বোনটা তো আমাকে ফেলে চলে গেছে, এখন আমি থাকবো কি করে? আদিবের কথা শুনে মিমন
হুহা করে হেসে দেয়। হাতের কাছ থেকে বালিশ টা নিয়ে মিমনের দিকে ছুড়ে মেরে আদিব বলল, হাসিস না, আমার পরীক্ষা খারাপ হোক তোর বোনকে আস্ত রাখবো না। মিমন বালিশ টা জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে।
আজ এক সপ্তাহ হলো মুমু বাড়িতে এসেছে। প্রচুর ব্যাস্ত, মা~ কাকি এটা সেটা খাওয়াতে খাওয়াতে তাকে মোটা করে ফেলছে। আব্বু তো প্রতিদিন তার পছন্দের এটা সেটা এনে দিচ্ছে। আর মুগ্ধ তো সব সময় লেজের মতো সাথেই থাকে। উমম…এতো ভালোবাসা। অন্যদিকে রাগী গাধাটা সাত দিনে সাতাইশ হাজার থ্রেট দিয়েছে…হি হি হি।

আগামী পরশু স্বাক্ষরের বার্থডে, সে তার ফ্রেন্ডদের তার মনি মামিকে দেখাবে তাই বার ফোন করছে। তাই মুমু কালই চলে যাবে তবে হনুমান টাকে জানাবে না সারপ্রাইজ দেবে ভেবেই মুচকি হাসলো। মিমনকে ফোন করে বলেছে যেন আদিবকে না জানাই তার আসার কথা। আব্বু তাকে আজকে সকালেই বাসে তুলে দিয়েছে। আদিবের আজই শেষ পরীক্ষা, হল থেকে বের হয়েই শ্বশুর বাড়ি যাবে বলে মিমনের রুমে এসে ব্যাগ গোছাচ্ছে। মিমন অনেক বুঝিয়ে থামাতে না পেরে মুমুর আসার খবর বলে দেয়। খবরটা শুনেই মিমনের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, দুই জনের একটা ছোট যুদ্ধের পর মিমনকে ছেড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তোর বোন আসুক, আমাকে ছেড়ে আমার শ্বশুর বাড়ি বেড়ানো ছুটাবো, আর সারপ্রাইজও বের করবো।

তিন ঘন্টা যাবত মুমুর ফোন বন্ধ, মিমনের ভীষণ টেনশন হচ্ছে। তার থেকেও টেনশন হচ্ছে আদিবকে দেখে। রাগে নাক মুখ লাল হয়ে আছে, রুমের মধ্যে পায়চারি করছে আর মুমুর ফোনে বার বার কল দিচ্ছে। হঠাৎ দাড়িয়ে মিমনকে বলল, তোর বোনকে আমি আজ খুন করবো প্রতিউত্তরে মিমন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো।

বাস কাউন্টারে এসে বাবার বলা বাসের সুপারভাইজার, হেলপার সকলকে মুমুর ছবি দেখিয়েও কিছু জানতে পারে নি মিমন ও আদিব। বাবাকে জানিয়েছে তিনিও বার ফোন করছে। হঠাৎ আদিব মিমনের হাত ধরে টলটলে চোখে বলল, তোরা কি আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ায় জন্য মজা করছিস? প্লিজ এমন মজা করিস না আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

পর্ব ১০

আদিব প্লিজ চোখ বন্ধ করিস না তাকা আমার দিকে, প্লিজ তাকা। স্টেচার ধরে হাসপাতালের হলে দৌড়াতে দৌড়াতে বলছে মিমন।
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা, আদিবের আকুতি দেখে নিজেরই কান্না পাচ্ছে মিমনের। অনেক বুঝিয়ে বললেও আদিব তার কোনো কথা মানতে নারাজ। রাগারাগি করে রুপার বাসার উদ্দেশ্যে মিমনকে ফেলেই বাইক নিয়ে চলে যায়। কিছুদূর যেতেই ট্রাকের সাথে ভয়ানক ভাবে দূর্ঘটনা ঘটে। অফ হোয়াইট কালারের টিশার্ট টা রক্তে চুপেচুপে হয়ে গেছে। মিমনের মরে যেতে ইচ্ছা করছে, একদিকে আদিব অন্যদিকে মুমু।

ও.টি. এর সামনে দেয়াল ঘেষে ফ্লোরে বসে আছে মিমন, সারা শার্টে আদিবের রক্ত লেগে আছে। বাবাকে ফোন করেছিল, সবাই আসছে। সৃজা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে মিমনের সামনে হাটু গেড়ে বসে, সৃজাকে সামনে পেয়েই জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মিমন। সৃজা আদিবের কিছু হলে আমি মুমুকে কি জবাব দিব? আমার মুমু!সৃজা আমার মুমু…মুমুকে পাচ্ছিনা… সৃজা মুমুকে কোথায় পাবো? সৃজা মিমনকে অনেক বোঝালেও মিমনকে থামাতে পারছেনা। আদিবের এই অবস্থায় তুমি পাগলামি করলে মুমুকে কে খুজবে মিমন, প্লিজ শান্ত হও। এই কথায় মিমন কান্না থামিয়ে দ্রুত চোখ মুছে নেয়, আদিবের ফোন বের করে রুপাকে ফোন দেয়। রুপাকে সবকিছু জানাই, সেও সকল ফ্রেন্ডের থেকে খবর নিয়ে কিছুই জানাতে পারেনি।

রাত ১২:০০ মিনিট

আদিবকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে, মাথায় লাগায় এখনো জ্ঞান ফেরেনি তবে ভয়ের কিছু নাই বলে জানিয়েছেন ডক্টর। মুমুর কোনো খবর এখনো পায়নি মিমন। থানায় জি ডি করেছেন বাবা, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার আগে কিছু করবে না তারা। সৃজা আর মিমন বসে আছে আদিবের পাশে।

মুমু ভয়ে কাঁদছে, ভীষণ পানি তেষ্টা পেয়েছে তার। কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারছে না। হাতটা পিছনে বাধা, চোখেও কিছু দেখতে পাচ্ছে না, মুখটাও বাধা কাউকে ডাকতেও পারছে না। সকালে বাসে উঠার আধাঘন্টা পরে হালকা ঘুমিয়ে গেছিল, তারপর তার কিছুই মনে নাই। নানা ধরনের বাজে চিন্তায় ভীষণ ভয় পাচ্ছে, অঝরে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজে মুমুর কান্নার গতি আরো বেড়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে কেউ তার সামনে এসে বসেছে। বসা অবস্থায় ভয়ে কুঁকড়ে পিছনে সরতে গেলেই সেই কেউটা তাকে কাছে নিয়ে আসে, কোনো পুরুষ পারফিউম এর কড়া গন্ধ নাকে আসছে। লোকটা তার গালে স্লাইড করতেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠে মুমু।

একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠে, কাঁদে না জান, তুমি কাঁদলে আরো কিউট লাগে তখন আমার অন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে। (মুমুর হাত ও মুখের বাধন খুলতে খুলতে) হাত ছাড়া পেয়েই মুমু লোকটা কে ধাক্কা দিয়ে চোখের বাধন খুলতে গেলেই লোকটা তার দুই হাত পিছনে ধরে কাছে নিয়ে আসে। লোকটা ভীষণ জোরে মুমুর গলায় কামড়ে দিয়ে বলল, কোনো চালাকি না জান মুমু ব্যাথায় ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। পি..প্লিজ ছে..ছেড়ে দিন আ..মাকে কান্নার দমকে কথা বলতে পারছে না মুমু। কেনো আদিবের কাছে যাবে, আজ এমন হাল করবো কোনো দিন ওর কাছে যাবে না, আর গেলেও আদিবকে শেষ করে দিবো আমি মাথার অসহ্য যন্ত্রণায় চোখ মেলে তাকাতে পারছে না আদিব, অনেক কষ্টে চোখের পাতা দুটো আলাদা করে। সাদা সিলিং দেখে পাশ ফিরে তাকায়, মুগ্ধ তার পাশে চুপ করে বসে আছে। অন্য পাশে আম্মু কাদছেন আর কাকি তাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। দরজার সামনে মিমন তার বাবার সাথে কথা বলছে। আদিবকে চোখ মেলতে দেখেই মুগ্ধ সবাইকে ডাকে। সবাই কাছে আসলেই আদিব মিমনের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, মুমু মিমনের নীরবতা দেখে আদিব নিজেই উঠতে গেলে মিমন দ্রুত বলে উঠে, মুমু ঠিক আছে। আদিব ঠোঁটে কষ্টের হাসি ফুটিয়ে তোলে, সে তো জানে তার এই অবস্থায় মুমু একমুহূর্ত তার থেকে দূরে থাকবে না।

আমার ফোন টা দে মিমন ঝটপট ফোন দেয় আদিবকে। মেজো ভাই আদনান NSI অফিসার সেই এখন ভরসা, কিন্তু মেজো ভাইয়ার ফোন অফ। কোনো ভাবেই ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না, কান্না পাচ্ছে তার, দিশেহারা হয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎই বাবার কথা মনে পড়ে, হ্যা বাবা পারবে। কোনো কিছু না ভেবেই হন্তদন্ত হয়ে বাবার নাম্বার খুঁজে কল দেয় আদিব।
কনফারেন্স রুমে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং করছেন রওনক হাসান, হঠাৎই পি এস ফোনটা সামনে দেয়। স্ক্রিনে ‘বাবাই’ নামটা দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বিগত সাত বছর যাবত যোগাযোগ তো দূরে থাক তার ফোনও কোনো দিন রিসিভ করেনি তার ছোট ছেলে। ‘এক্সকিউজ মি’ বলেই ফট করে বের হয়ে যান কনফারেন্স রুম থেকে। ফোন রিসিভ করতেই আদিব অস্থির ভাবে কেদে বলল, বাবা, আমার মুমু…।

রাত ৯:২৭ মিনিট

নামকরা হসপিটালের সবথেকে এক্সপেন্সিভ কেবিনে রাখা হয়েছে মুমুকে। সারা গায়ে কামড়ের দাগ, ঠোঁটের কোণে কেটে গেছে, গালে থাপ্পড়ের দাগ হয়ে আছে। হাতে স্যালাইন সেট করা, নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে আছে মুমু। একটু আগেই পুলিশ একটা পুরাতন গোডাউন থেকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু অন্য কাউকে পায়নি। রওনক সাহেব মুমুর দিকে তাকিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর এর সাথে কথা বলছিলেন।

মিমন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে কেবিনে টাতে ঢুকে যায়, পিছনে বাবা~ মাও আছেন। সৃজা আর কাকি আদিবের সাথে আসছে। মুমুর বেডের কাছে এসেই ধুপ করে হাটু গেড়ে বসে পড়ে মিমন, ঝরঝর করে পানি পড়ছে চোখ থেকে। মুমুর গালে হাত দিতেও ভয় পাচ্ছে, হঠাৎ বাবার গলা শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখে মা সেন্সলেস হয়ে গেছে। সৃজা আর কাকিও দ্রুত এসে মাকে ধরে।
আদিব একদৃষ্টিতে মুমুর দিকে তাকিয়ে আছে, তার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে কিন্তু কোথায়? মাথায় নাকি বুকে? ঠিক বুঝতে পারছে না, চোখ টা ঝাপসা হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাবাই বলেই রওনক সাহেব দ্রুত ধরে নেয় ছেলেকে। মিমনও দৌড়ে আসে, হুম আদিবও অবচেতন হয়ে গেছে।

মাথায় আঘাত ও অতিরিক্ত প্রেসারে জ্ঞান হারিয়েছে আদিব। ডক্টর ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছে, রেস্ট দরকার। আদিবের বাবা সব সামলাচ্ছেন। মুমুর মায়ের জ্ঞান ফিরেছে, মুমুর বাবা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। জার্নি করে এসে দুইদিন যাবত হসপিটালে থাকায় সবাই ক্লান্ত। সৃজা অনেক বুঝিয়ে মিমনের মা~ বাবা কাকি ও মুগ্ধকে সাথে নিয়ে যায়। আনিয়া এসেছে আদিবের সাথে থাকার জন্য।
আনিয়া এসে থেকে মুমুকে দেখছে, এই ছোট বাচ্চা মেয়ে টাকে তার এই রগচটা ভাইটা বিয়ে করেছে ভাবা যায়। মুমু ও আদিবকে একই কেবিনে রাখা হয়েছে। ক্লান্ত হয়ে মুমুর মাথার কাছেই বসে ঘুমিয়ে গেছে মিমন। মেয়েটা ধুর মেয়ে হবে কেন ভাবির ভাইটা খুব ভালোবাসে মনে হয়, কি সুন্দর বোনের হাত ধরে ঘুমিয়ে আছে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মুমুর চিৎকার শুনে লাফিয়ে উঠে আনিয়া, ততক্ষণে মিমনও উঠে গেছে।

মুমু কুঁকড়ে বসে হাত দিয়ে দুই পা জাপটে ধরে চোখ বন্ধ করে কাদছে আর চিৎকার করছে। মিমন দ্রুত বোনকে জড়িয়ে ধরে মুমুমনি তাকা, ভয় নেই ভাইয়া আছিতো দেখ, কাঁদিস না ভাইয়ার দিকে তাকা। (বলেই কেঁদে ফেলে) মুমু হাত পা ছুড়ে কাছে আসতে দিচ্ছে না জোরে জোরে কাঁদছে, মিমন না পেড়ে শক্ত করে জাপটে ধরে বুকের মাঝে। স্যালাইনের নলে রক্ত দেখে আনিয়া নার্স নিয়ে আসে। ততক্ষণে মুমু শান্ত হয়ে মিমনের বুকে আবার ঘুমিয়ে গেছে। নার্স এসে স্যালাইন ঠিক করে মুমুকে বিছানায় শুয়িয়ে দিতে বললেও মিমন কোনো ভাবেই বোনকে ছাড়বে না। নার্স আর আনিয়া অনেক বুঝিয়ে বলার পরে মুমুকে শুয়িয়ে দিলেও মুমুর হাত ধরে বসে থাকে মিমন।

পর্ব ১১

কপালে উষ্ণ পরশে ঘুম হালকা হয়ে গেছে মুমুর, ঠোঁটের কোণেও উষ্ণ পরশ পেল সে। চোখটা খুলতে ইচ্ছে করছে না, চেনা শরীরের গন্ধ ও স্পর্শে কেঁপে কেঁপে উঠছে মুমু। গালে আলতো করে ছুয়ে দিচ্ছে সে, হঠাৎ কপালে উষ্ণ পানির উপস্থিতি টের পেতেই ভয়ংকর লোকটার কথা মনে পড়ে যায় মুমুর। ঝট করে উঠেই আদিবের গলা জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কান্না শুরু করে। আদিবও শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় মুমুকে।

মুমসোনা, এই মুমু? এই পাখি? তাকা আমি আছিতো, প্লিজ তাকা আমার দিকে বলতে বলতে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে আদিবের চোখ থেকে। মুমু দ্বিগুণ গতিতে কাঁদা শুরু করে, কান্নার তোড়ে হেঁচকি শুরু হয়ে গেছে। ওই লোকটা… বলেই ফুপিয়ে কেঁদে দেয়। মুমুকে একটু আলগা করে ধরে মুমুর গালের সাথে আলতো করে ঠোঁট লাগিয়ে, হুসসস, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু সে আ সিঙ্গেল ওয়ার্ড। বলেই আলতো করে চুমু দিল আদিব।

মুমু ভীষণ ভয় পেয়েছে, কান্না থেমে গেছে কিন্তু হাত~ পা থরথর করে কাপছে। আদিব শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে বসে আছে, বা হাত দিয়ে ফোনটা নিয়ে কল করে মিমনকে ডক্টর সাথে নিয়ে আসতে বলল। ডক্টর এসে মুমুকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

she is deeply traumatized by the incidentবলেই একটু থামলেন ডক্টর মুক্তাদির রহমান। আদিব ও মিমন গম্ভীর হয়ে তার কথা শুনছে। বাবার বন্ধু হওয়ার সুবাদে কিছুক্ষণ আগেই আদিবকে পারসোনালি ডেকে পাঠিয়েছেন তার চেম্বারে। আদিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা যেটা ভেবে ভয় পাচ্ছো তেমন কিছুই হয়নি। বাচ্চা মেয়ে, ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতার জন্য ভয় দেখিয়ে এরকম করেছে হয়তো। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, টেনশনের কিছু নেই ঠিক হয়ে যাবে, বাট সি হ্যাজ ভেরি উইক হার্ট, অল্পতেই ভয় পেয়ে যায় হয়তো, তাই একটু টাইম লাগবে, আর এই মূহুর্তে ওকে কিছু না জিজ্ঞেস করাই বেটার হবে।

আজ পনেরো দিন হলো মুমু আদিবকে তার কাছে ঘেঁষতেও দিচ্ছে না। আদিবকে দেখলই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। হসপিটালে এক সপ্তাহ থাকাকালীন এক রাতে মুমু ভীষণ কান্নাকাটি করে আবার সেন্সলেস হয়ে যায়। তারপর থেকে আদিবকে কাছে আসতে দেয় না, ওকে দেখলেই ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাঁদে। অনেক বুঝিয়েও আদিব কিছু করতে না পেরে রাগে দুঃখে আজ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে।

রাত ১০:৪৫ মিনিট

মিমন অসহ্য টেনশনে ঘুমতে পারছেনা, গুটি গুটি পায়ে মুমুর রুমের সামনে যেয়ে দরজাটা হালকা খুলে দেখে মুমু মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমচ্ছে। বাবার রুমে আলো দেখে মিমন দরজা নক করতে যেয়ে দেখে দরজা খোলা, বাবা ফোন হাতে বসে আছে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। মিমন বাবা বলে ডাকতেই তার দিকে তাকায়, বাবা কাঁদছে? কিন্তু কেন? মিমনকে ফোনের মেসেজ গুলো দেখাতেই সে অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায়, তার ফোনেও একই মেসেজ এসেছে। নিজের বোনকে বাঁচাতে চাইলে আদিবের থেকে যেন দূরে নিয়ে যায়, নইলে এরপর পতিতালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বলে হুমকি বার্তা এসেছে। মুমু হসপিটালে থাকাকালীন মেসেজ টা পেলেও পাত্তা দেয়নি কিন্তু সেদিন রাতে মুমু আবারও ভীষণ অসুস্থ হলে আবার মেসেজ আসে পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না, এবার ছেড়ে দিলেও পরের বার কোনো সুযোগ পাবে না বোনকে ভালো রাখার।

প্লিজ ছেড়ে দিন, কি ক্ষতি করেছি আপনার কেন আমার সাথে এমন করছেন, মুমু ফুপিয়ে কোনরকমে কথাটা বলে। লোকটা মুমুর গলার অন্য পাশে কামড়ে দিয়ে বলল, আমার সব শেষ করে দিয়েছো জান, তোমার কলেজে ড্রেস পড়ে রোজ কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যাওয়া, বোকা বোকা চাহনি, অল্পতেই ভয় পেয়ে আঁতকে উঠা, লম্বা চুল, মিষ্টি করে হাসা, আর এই ঠোঁটের নিচে তিলটা…উফফ (বলেই কামড়ে দেয়) বিশ্বাস করো জান আমি ঘুমতে পারিনা, আর ওই আদিবের সাথে তোমাকে দেখলে আমি নিশ্বাস নিতে পারিনা। মুমু অনেক চেষ্টা করে একটা ধাক্কা দিয়ে পালাতে গেলেই লোকটা মুমকে জোরে থাপ্পড় দেয়। পাগলের মতো মুমুর সারা শরীর কামড় দিয়ে বলতে থাকে, আদিবের আশেপাশে গেলে খুন করে ফেলবো আদিবকে, আজ বেচে গেছে তবে তুমি ওর কাছে ফিরলে একদম শেষ করে দেব। মুমু ব্যাথায় ছটফট করছে হঠাৎই লোকটা মুমুর কাধ থেকে জামা সরাতেই মুমু ভয়ে সেন্সলেস হয়ে যায়।

মায়ের কান্নার আওয়াজে দৌড়ে মুমুর ঘরে যায় মিমন, পিছনে বাবাও আসে। মা মুমুকে উঠানোর চেষ্টা করছে মুমু ঘুমের মধ্যেই কাঁদছে আর হাত~ পা ছুড়ছে। মিমন মুমুর কাঁধ ধরে ঝাকি দিয়ে জাগিয়ে তোলে। মিমনকে দেখেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে মুমু। ভাইয়া ওই লোকটা… ভাইয়া আমাকে লুকিয়ে ফেলো, ভাইয়া ওই লোকটা হসপিটালেও এসেছি..। বলেই মুমু সেন্সলেস হয়ে যায়।

আদিব রাগে গজগজ করে পায়চারি করতে করতে বলল, আপু আজ ওকে কিডন্যাপ করবো আমি, তারপর পুলিশের থার্ড ডিগ্রি দেব। অনুপ্রিয়া মিটি মিটি হাসছে ভাইয়ের পাগলামি দেখে। গতকাল সন্ধ্যায় মুমুর সাথে রাগ করে এসেছে, এ পর্যন্ত একশোর অধিক আইডিয়া বের করেছে মুমুকে ঠিক করার। কতোবড় বেয়াদব, মাথামোটা হলে এরকম করতে পারে ভাবতে পারিস তুই আপু!আমি, আমি মানে ওর বর রাগ করে এসেছি একটা ফোন পর্যন্ত দেয়নি! বাইকের চাবি টা হাতে নিয়ে গটগট করে হেটে যেতে যেতে বলল, আপু আমি যাচ্ছি, অসভ্য মেয়েটাকে আজ আস্ত রাখবো না।
মিমন হাত~ মুখ ধুয়ে কেবলমাত্র বেরিয়েছে নাস্তা করার জন্য, আদিবকে হন্তদন্ত হয়ে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে একটু দাড়ালো। গায়ে রুমে পড়া টাওজার ও গোল গলার টিশার্ট, চুলগুলো এলোমেলো, চোখ গুলো লাল হয়ে আছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘুমোয়নি। তোর অসভ্য বোন টা কই? জিজ্ঞেস করতেই মিমন আঙুল উঁচিয়ে মুমুর রুম দেখালো। গটগট করে হেটে মুমুর রুমে ঢুকে যায় আদিব। এই ছেলে টা এত কেন ভালোবাসে বোন টাকে, একরাতেই বেহাল দশা করেছে চেহারার, এর থেকে কি করে দুরে রাখবে বোনটাকে ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মিমন। তাকেই কিছু করতে হবে ভাবতে ভাবতে নাস্তার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

দরজা লাগানোর শব্দে মুমু পিছনে ঘুরে দেখে আদিব দরজা বন্ধ করে চটপট পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে টেবিলের দিকে মোবাইল আর চাবি ছুড়ে দিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই মুমুকে জাপটে ধরে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়েই ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরে, মুমু ছোটার চেষ্টা করতেই হাত দুটো বিছানার সাথে চেপে ধরে। হঠাৎ গালে উষ্ণ পানির ছোয়া পেতেই ফট করে চোখ খুলে মুমু, আদিব কাঁদছে! মুমুর বুকে ভীষণ ব্যাথা করছে, তার আদিব ভাইয়া কাঁদছে কেন? কেন কাঁদছে? মুমুর ছটফটানি বন্ধ হওয়ায় আদিব মুমুর গলায় মুখ ডুবিয়ে আস্তে করে বলল, আমাকে দূরে সরালে তোকে খুন করবো তারপর নিজেও খুন হবো।

মুমু গোসল করে বের হয়ে দেখলো আদিব এখনো ঘুমচ্ছে। মেজে থেকে আদিবের টিশার্ট টা তুলে রেখে বিছানার উপর বসে। আদিব বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমচ্ছে, এ কয়দিনে অনেক টা শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে হালকা ডার্ক সার্কেল দেখা যাচ্ছে, চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। মুমু আলতো করে চুল গুলোতে হাত বুলিয়ে দেয়, হঠাৎ ফোনের রিংটোন শুনে দেখে আদিবের ফোন বাজছে। স্ক্রিনে রুপার নাম দেখে রিসিভ করে মুমু। রুপার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে নিজের ফোনটা খোঁজা শুরু করে। রুপা ভীষণ অভিমান করেছে তার ফোন রিসিভ না করার জন্য, হসপিটালে থাকাকালীন দেখতে গিয়েছিল নাকি কিন্তু তখন মুমু কথা বলার অবস্থায় ছিল না। তাই পরে অনেকবার ফোন করেছে সে কিন্তু মুমু রিসিভ না করায় আজ বাধ্য হয়ে আদিবকে ফোন দিয়েছে।
জান তুমি কি চায়ছো আমি আদিবকে মেরে ফেলি? দেন ওকে, আই’ল কিল হিম জান…. উম্মাহ।
মেসেজ টা দেখেই মুমু কাঁপতে শুরু করে…..

পর্ব ১২

ICU এর সামনে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে মুমু, একধ্যানে তাকিয়ে আছে ভেতরে থাকা মানুষটার দিকে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, সারা শরীরে একগাদা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিথর হয়ে শুয়ে আছে আদিব। মা~ বাবা, বড় আপু অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে মুমকে, কিন্তু সে ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে আছে আদিবের দিকে।

দৌড়াতে দৌড়াতে এসে মুমুর পাশে দাড়ায় মিমন, একটু দম নিয়ে ভিতরে তাকাতেই ধুক করে উঠে বুকটা। পাশে মুমুর দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় সে, মুমু চুপচাপ শান্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই মুমু হাটা শুরু করে, মিমনের ডাকে কোনো সাড়া না দিয়ে হাটতে থাকে। মিমন হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করলে আস্তে করে বলল, আমি বাড়ি যাব ভাইয়া। মিমন মুমুর দুই কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, পাগল হয়ে গেছিস তুই? মুমু মিমনের হাত কাঁধ থেকে ঝাড়ি দিয়ে চিৎকার করে বলল, বললাম তো বাড়ি যাব উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু মুমু কারো কথা না শুনেই চলে এসেছিল। তারপর বাড়ির সবাইকে বাধ্য করে মিমনের সাথে কলকাতা চলে গেছিল মুমু। বাবা~ মা সকলে চট্টগ্রামে চলে যান, কোন আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি মুমুর শর্তে অনুযায়ী। আর কোনদিন আদিবের ধারে কাছে যায়নি মুমু।

বর্তমানে

নির্ঘুম একটা রাত পার করলো মুমু, আজকের দিনে তার জীবনে এসেছিল আদিব। আজ আদিব~ মুমুর দশম বিবাহ বার্ষিকী। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মুমুর, গত আট বছর যাবত সে এই কষ্টে ছটফট করছে। কি করবে কার কাছে যাবে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। দৌড়ে মায়ের রুমে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে মুমু। মা আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মা, একটু আদিবকে এনে দাওনা মা, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না, ওমা একটু এনে দাওনা মা মরিয়ম বেগম মেয়েকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন, তার চোখেও পানি। বিগত দুই বছর যাবত হাজার বার মেয়ের এরকম কষ্টের আহাজারি শুনে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন, তাই চুপচাপ মেয়েকে বুকের মাঝে নিয়ে বসে থাকেন।

সকাল ১০ টা

আদিব ডেলিভারি বয় থেকে প্যাকেট নিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই পাশের এপার্টমেন্টের দরজা হা করে খোলা দেখে অবাক হয়ে যায়। কিন্তু তার থেকেও অবাক হয় দুই তিন বছর বয়সী একটা বাচ্চাকে দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে, তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে বাচ্চাটা। বাচ্চাটার তাকানো দেখে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, কি করবে ভেবে না পেয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসি দিল। উত্তরে বাচ্চাটা তার সামনের দাঁত দুটো বের করে গালে টোল ফেলে হাসি দিল। বাচ্চাটা বেশ কিউট, মাথায় ঝাকড়া চুল, গালটা গুলুগুলু, হালকা পিংক কালারের শর্ট ফ্রকে একদম ছোট বারবি ডলের মতো দেখাচ্ছে।

বাচ্চাটি গুটি গুটি পায়ে আদিবের সামনে এসে বলল, তুমি তি থালামনি তে দেতেচো? আদিব বাচ্চাটার কথা বুঝতে না পেরে কি বলবে বুঝতে পারছেনা, তখনই লিফট খুলে একজন মাঝ বয়সি মহিলা হাতে বালতি নিয়ে বের হয়ে আসে। আল্লাহ, পয়া আম্মা আপনে এহানে ক্যান? বলেই মহিলা টি বাচ্চাটির কাছে এসে কোলে তুলে নেয়। তোমাতে থুজছি তো, আমি থাদে দাবো তো মহিলা টি এতক্ষণে আদিবের দিকে সরু চোখে তাকায়, আপনে কেডা? মহিলার তাকানো দেখে আদিবের নিজেকে আসামি মনে হচ্ছে তাই শক্ত গলায় বলল, আমি নতুন এসেছি, এটা আমার এপার্টমেন্ট। বলেই ফট করে দরজা বন্ধ করে দেয় আদিব।

‘কেমনে যে ভুইলা গেলাম দরজা লাগাইতে, আপায় জানবার পারলে তো রাইগ্গা যাইবো’ বিড়বিড় করতে করতে ভিতরে ঢুকে যায় টুনি বেগম। মরিয়ম বেগম টুনি কে বিড়বিড় করতে দেখে বলল, কিরে কি বলছিস? টুনি ভ্যাবলার মতো হাসি দিয়ে বলল ‘কিছুনা খালাম্মা। ‘

বাবার সাথে দেখা করে বাসার উদ্দেশ্যে বের হয় আদিব, বহুদিন পরে দেশে আসায় তেমন কিছুই চিনতে পারছে না। চারটা বাজে প্রায়, তরুণ হয়তো অফিসে তাই তাকে ফোন দিলো না। বারো তালা বিশিষ্ট ভবনের সাত তালায় থাকে আদিব। গাড়িটা পার্ক করে বের হতেই, বিল্ডিংয়ের পাশে গার্ডেনে চোখ পড়ে আদিবের। অনেক গুলো বাচ্চা খেলছে, সেদিনের দেখা বাচ্চাটার দিকে চোখ আটকে যায় তার। ফর্সা গায়ে লাল ফেন্সি ফ্রকে একদম ছোট্ট পরী মনে হচ্ছে। সেই একইভাবে টোল একে হাসছে, বাচ্চাটার হাসি দেখে আনমনেই হেসে উঠে আদিব। হঠাৎই বাচ্চাটা পড়ে যেতে নিলেই কেউ এসে কোলে তুলে নেয়, সেও লাল কালারের শাড়ী পড়েছে। হয়তো বাচ্চা টার মা, এখনকার মায়েদের ফ্যাশন বাচ্চার সাথে ম্যাচিং জামা কাপড় পড়া। বাচ্চার মায়ের মুখ দেখেই থমকে যায় আদিব। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, বুক ধড়ফড় করছে তার। অস্পষ্ট সরে বলল, মুমু। হঠাৎই আদিবের চোখ লাল হয়ে গেল, কপালে রগ ভেসে উঠেছে, হাত মুঠো করে দাড়িয়ে আছে। কিছু একটা ভেবে ফট করে পকেট থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নেয় মুমু আর বাচ্চাটার।

তরুণ ফোন রিসিভ করতেই ঝড়ের গতিতে আদিব বল উঠে, একটা ছবি পাঠিয়েছি, একঘন্টার মধ্যে মেয়েটার সব ইনফরমেশন সেন্ড কর আমাকে। তরুণ হেসে বলল ভাই ছুটিতেও গোয়েন্দা গিরি ক… কথা শেষ করার আগেই আদিব রেগে চিৎকার করে বলল, আই নিড দিজ ইনফরমেশন রাইট নাউ ড্যাম ইট।

রাগে আদিবের মাথা ফেটে যাচ্ছে, মুমুকে খুন করতে ইচ্ছে করছে। না না তার আগে ওর বর্তমান হাসবেন্ড কে খুন করবে। কিন্তু বাচ্চাটার কি হবে? যা হয় হবে আই ডোন্ট কেয়ার। আমাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যের সাথে সংসার!শেষ করে ফেলবো একদম শেষ করে ফেলবো।

এসব ভাবতে ভাবতে তরুণকে কল দেয়, ফোন রিসিভ করছে না। রাগে সামনে থাকা টেবিল টাতে লাথি দেয় আদিব।
কলিংবেলের আওয়াজে বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখে তরুণ দাড়িয়ে আছে। তুই এখানে কেন? তোকে যে কাজটা দিলাম সেটা ফেলে এখনে কি করছিস? ভীষণ রেগে বলল। তরুণ হেসে বলল আগে ভিতরে আসি তারপর তোর ইনফরমেশন দিই, এতো ইম্পরট্যান্ট ইনফরমেশন তাই ভাবলাম সামনাসামনি বসে দেয়া উচিত।

আদিব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তরুণের দিকে। তরুণ একটু গলা পরিষ্কার করার ভঙ্গি করে বলতে শুরু করে, মেয়েটির নাম মিশিকা মাহমুদ মুমু, পেশায় একজন শিক্ষিকা। মেয়েটি মা ও তার মেয়েকে নিয়ে ঢাকাতে থাকে। মজার ব্যাপার মেয়েটি তোর সামনের এপার্টমেন্টেই থাকে। মেয়ে টি ইন্ডিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে পড়া শোনা করেছে, দুই বছর হলো দেশে এসেছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে লেকচারার হিসেবে দেড় বছর যাবত চাকরি করছে। ওহ…আজ তার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ছুটিতে আছে। আর…
মেয়েটির হাসবেন্ড সম্পর্কে বল আদিব অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল। তরুণ আদিবের দিকে সরু চোখে তাকালো তারপর মৃদু হেসে বলল এই একটা তথ্যের জন্য আমি তোর বাসায় আসতে বাধ্য হয়েছি।

পর্ব ১৩

সি ইজ আ সিঙ্গেল মাদার, বাট বাচ্চার বার্থ সার্টিফিকেট ঘেটে হাসবেন্ড এর নামটা দেখে আমি না এসে পারলাম না। একটু থেমে হাতের ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে আদিবের দিকে এগিয়ে দেয় তরুণ। কাগজটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে নিজের নামটা দেখছে আদিব। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না।

আদিবের অবাক হওয়া দেখেই তরুণ মুচকি হাসলো। দুই বছর একসাথে থাকাকালীন যে ছেলে কোনো মেয়েকে পাত্তা দেয়নি সে কেন দেশে ফিরেই একটা মেয়ের তথ্যের জন্য এতো হাইপার হলো ভেবেই নিজ দায়িত্বে সব কিছু করেছে। এতো অল্প সময়ে এর থেকে বেশি কিছু জানা সম্ভব না। আর আমার মনে হচ্ছে এর থেকেও বেশি কিছু তুই নিজেই জানিস। বলেই সোফায় গা এলিয়ে বসে তরুণ। তরুণের কথা শুনে ভাবলেশহীন ভাবে তাকায় আদিব। হঠাৎ তরুণ সোজা হয়ে বসে বলল, হ্যারে আদি, তোর বউ বাচ্চা পেলো কোথা থেকে? না মানে শুধু মাকে তো বাচ্চা এডপ্ট দেয়া হয় না আর তুইও তো পাঁচ বছর… আদিবের রাগি ফেস দেখে বাকি কথা না বলে জোরপূর্বক হাসলো তরুণ।

বাচ্চাটার নাম আরিয়া মাহমুদ প্রয়া, বয়স তিন। এদিকে হাসবেন্ড এর নামে নিজের নাম দেখে কিছুই বুঝতে পারছে না আদিব। তরুণের কথাটাও ঠিক, এসব ভাবছে আর পুরো ঘরে পায়চারি করছে। অন্যদিকে তরুণ হাত~ পা ছুড়ে আদিবের বেডে ঘুমচ্ছে।

মুমুদের বাড়ি থেকে বের হয়েছিল বাবার কাছে যাওয়ার জন্য কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ করে একটা গাড়ি ধাক্কা দেয়। তিনমাস কোমায় ছিল। সুস্থ হলে মুমুকে কোথাও পায়নি, বড় আপা যখন ডিভোর্স পেপারটা হাতে দিয়েছিল আদিব অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ছিলো মুমুর সিগনেচারের দিকে।

আর এখন হাসবেন্ড হিসেবে আমার নাম ব্যবহার করে সিঙ্গেল মাদার হয়ে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে। তোর সিঙ্গেল মাদার হওয়া ছুটাবো আমি। এসব ভাবতে ভাবতে তার পরিচিত এজেন্টকে ফোন করে আদিব। ইন্ডিয়ান এজেন্টের ইনফরমেশন দিতে বেশ লেইট হবে। কিন্তু আদিবের ওয়েট করার মতো ধর্য্য নাই, অন্যকিছু ভাবতে হবে।

প্রয়া ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদছে আর বলছে, সমিদদো (সমৃদ্ধ) ভাইয়া, থারাপ ভাইয়া, পতা ভাইয়া। মিমন ও সৃজার একমাত্র ছেলে সমৃদ্ধ, বয়স পাঁচ বছর। প্রয়ার বার্থডে উপলক্ষে আজ সন্ধ্যায় এসেছে তারা। সমৃদ্ধ প্রয়ার চুলের একটা ঝুটি খুলে দিয়েছে তাই প্রয়া কেঁদে ভাসাচ্ছে। মিমন ভাগ্নিকে থামাতে পারছেনা তাই বাধ্য হয়ে কিচেনের দিকে যায় মুমুর খোঁজে। মুমু প্রয়া আর সমৃদ্ধর জন্য আমের জুস বানিয়ে গ্লাসে ঢালছিল, প্রয়ার কান্নার শব্দে দ্রুত ডাইনিং এ আসে। কি হয়েছে আমার মাম মাম টা এতো কাঁদছে কেন? আদুরে গলায় কথাটা বলেই প্রয়াকে কোলে নেয় মুমু। প্রয়া দ্বিগুণ ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে মুমুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, সমিদদো ভাইয়া পতা… আমার তুল(চুল) নত্ত (নষ্ট) তরে দিতে। মুমু প্রয়ার চুল ঠিক করে চোখের জল মুছে বলল, এইতো আমার মাম মাম কে একদম পরীর মতো লাগছে। বলেই টুপ করে একটা চুমু খায়। প্রয়াও চোখে টলটলে জল নিয়ে দাঁত বের করে হেসে মুমুর গলা জড়িয়ে ধরে।

প্রয়ার জন্মদিন উপলক্ষে সারাদিনের দৌড়াদৌড়িতে খুব ক্লান্ত মুমু। বিছানায় যেতেই ঘুমের রাজ্যে ডুবে যায়। গভীর ঘুমের মাঝেই মনে হচ্ছে কারো গরম নিশ্বাস তার মুখে পড়ছে, চোখ বন্ধ করেই প্রয়াকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ চেনা একটা গন্ধ নাকে আসতেই ফট করে চোখ খুলে মুমু। কিন্তু কই কেউ তো নেই। লাইটটা জ্বেলে সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক নিশ্বাসে সব পানি খেয়ে নেয়।

মুমু না খেয়ে এক পা ও আগাবি না বলে দিলাম। পিছন থেকে মিমনের কথা শুনে ঘুরে দাঁড়ায় মুমু। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে, নয়টায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নিতে হবে। ভাইয়া আমি অফিসে নাস্তা করে নিব, আমার একটা ক্লাস আছে এমনিতেই গতকাল ছুটি নিয়েছি। বলতে বলতেই সৃজা একটুকরো ডিম রুটি মুখে পুড়ে দেয়। সৃজা কঠিন কন্ঠে বলল, ফটাফট খেয়ে নাও মুমু বাধ্য হয়ে খেয়ে বের হয়। লিফট খুলতেই উঠে দাড়ায় মুমু। কালো হুডি পড়া লোকটার দিকে ভ্র কুঁচকে একবার তাকায় মুমু। ভাবছে পাগল নাকি গরমের মধ্যে ভুত সেজে আছে, তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে আফসোস করে ইস দেরি হয়ে গেল।

রুপাদের বাসায় এসেছে মিমন, অনেকদিন খবর নেওয়া হয়না রুপার অবশ্য বিয়ে হয়ে গেছে। মুমু হসপিটালে থাকাকালীন রুপার বাবা অনেক সাহায্য করেছিলেন। পুলিশ হওয়ায় আইনের সকল কিছু উনিই সামলে ছিলেন। রূপকও বেশ হেল্প করেছিল, নিজ দায়িত্বে তার বাবাকে ডেকে মুমুর ব্যাপারে সব বলে মিমনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কলকাতা যাওয়ার সময়ও ভিসা পাসপোর্ট করতে অনেক হেল্প করেছিলেন রুপার বাবা। এসব ভাবতে ভাবতে সামনে তাকিয়ে দেখে রুপার বাবা, এসে বসতে বসতে বললেন, আরে মিমন যে, কেমন আছো? মিমনও হেসে উত্তর দেয়, জ্বি আংকেল ভালো, আপনি কেমন আছেন? কথা বলতে বলতে রূপকও আসে, রাতেই ব্যাক করবে মিমন তাই সকলের সাথে দেখা করে চলে আসে।

চোখ মেলে কিছুই মনে করতে পারছে না মুমু, মাথাটা মনে হচ্ছে অকেজো হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থেকে মনে হয় সে তো লিফটে ছিল, কালো হুডি পড়া লোকটা তার মুখ চেপে ধরেছিল তারপর আর কিছু মনে নেই। কথা বলতে যেয়ে বুঝতে পারে তার মুখ বাধা শুধু মুখ নই হাত দুটোও পিঠমোড়া করে বাধা। নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে মুমু কাঁপতে শুরু করে, আট বছর আগের ঘটনা মনে হতেই মুমু নিঃশব্দে কেঁদে উঠে।

একটা ভারী পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো, কষ্ট হচ্ছে?

লেখিকাঃ হৃদিতা আহমেদ

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “নোনাজলের শহর (১ম খণ্ড) – ভালোবাসার কষ্টের কথা” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – নোনাজলের শহর (শেষ খণ্ড) – ভালোবাসার কষ্টের কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button