মিষ্টি প্রেমের গল্প

তুমি আমার মোনালিসা – Bengali valobasar golpo

তুমি আমার মোনালিসা – Bengali valobasar golpo: রমিজ নিজের ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।কোনো বাবার সামনে নিজের সন্তানের লাশ মানেই পাহাড় সমান কষ্ট, আর সেটা যদি আবার আত্মহত্যা হয়, তাহলে?


পার্ট ১

চারদিকে ঘন কুয়াশা পরেছে। ঠাণ্ডাও খুব, জেনিফা বেগম গাঁয়ে চাদর জড়িয়ে, হাতে গরম পানির কেতলি নিয়ে ছোট মেয়ে মুগ্ধার রুমের দিকে যাচ্ছেন।

জেনিফাঃ গ্রামের মাইয়ারা এতো বেলা কইরা ঘুম থাইকা উঠে? মাইয়া দুইটা নিয়া আর পারিনা বাবা।

জেনিফা বেগম দাঁত মাজতে মাজতে একা একাই বিড়বিড় করছেন।
জেনিফাঃ মুগ্ধা মা, ও মুগ্ধা উঠ মা, সকাল হয়েছে তো?
জেনিফা বেগম কথাটা বলতে বলতে মেয়ের রুমে ঢুকলেন।
জেনিফা বেগম নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে আনমনেই হেসে উঠেন।

মুগ্ধা গাঁয়ে কম্বল পেঁচিয়ে শুয়ে আছে বিভোর হয়ে।
জেনিফা বেগম এর কাছে উনার দুটু মেয়ে কোনো মেয়ে না, ওরা যেনো আসমান থেকে দেওয়া কোনো পরী।

উনি গিয়ে মেয়ের কপালে হাত রাখলেন।
মুগ্ধা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া পেয়ে একটু নড়েচড়ে উঠলো।
জেনিফাঃ মুগ্ধা উঠ মা? সকাল হলো তো?
মুগ্ধাঃ আম্মা যাও তো, ঠাণ্ডা লাগছে আমার।

জেনিফা বেগম হেসে বললেন।
জেনিফাঃ আমি পানি গরম করে এনেছি, তুই উঠতো?
মুগ্ধা ওর মায়ের দিকে তাকালো কিছুক্ষণ।
মুগ্ধাঃ আম্মা বুবু উঠছে ঘুম থেকে?
জেনিফাঃ না এখনো উঠেনি, তুই গিয়ে তুলে দে?

মুগ্ধা আর কিছু না বলে, গরম পানির কেতলি নিয়ে বারান্দায় গেলো।
হাতমুখ ধুয়ে নিলো।
( মণিকা মুগ্ধা, জেনিফা বেগম এর ছোট মেয়ে, বড় মেয়ে নিশিকা নিশি।

বাবা রমিজ মিয়া। পাহাড়ি এলাকায় থাকেন, নিজের ফ্যমিলিকে নিয়ে, উনার বড় ভাইও উনাদের সাথে ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন,তবে যৌথভাবে না।)
মুগ্ধাঃ বুবু তো এতো বেলা করে ঘুম থেকে উঠে না।

তাহলে আজ এতো ঘুম কিসের?
মুগ্ধা কথা গুলো ভাবছে আর টিনের বেড়ায় মাথার চুল গুলো গেতে রাখলো,
গ্রামের মেয়েরা মাথার চুল আছড়িয়ে সেগুলো না ফেলে, টিনের ফাঁকে রেখে দেয়।
মুগ্ধা এবার তার বুবুর রুমের দিকে যাচ্ছে।
ছোট্ট টিনের ঘর রমিজ মিয়ার।

এই টিনের ঘরেই নিজের সুখ এর জায়গা করে নিয়েছেন।
তিনি সকাল হলেই চলে যান কাজের উদ্দেশ্যে।
মুগ্ধাঃ বুবু ও বুবু ঘুম থেকে উঠছো কি?
এভাবে তিন,চারবার ডাকলো। কিন্তু নিশির কোনো সাড়াশব্দ নাই।
টিনের দরজাটা ভিতর থেকে আটকানো।

মুগ্ধা হতাশ হয়ে জেনিফার কাছে যায়।
মুগ্ধাঃ আম্মা বুবু তো দরজা খুলছেই না, আর আমার ডাকের কোনো সাড়াও দিচ্ছেনা।
জেনিফা বেগম কিছুটা বিষন্নতা বোধ হন।
জেনিফাঃ কি বলছিস?

মুগ্ধাঃ হ্যাঁ আম্মা, আমি অনেকবার ডাকলাম বুবুরে কিন্তু বুবু দরজা খুলছে না।
(মুগ্ধা একপ্রকার কেঁদেই দেয়)
জেনিফা জানেন মুগ্ধা আর নিশি ওরা দু’বোনের ভালোবাসা অসীম, যে ভালোবাসায় নেই কোনো প্রতারণা, আছে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা।
জেনিফাঃ পাগলী মেয়ে কান্না করছিস কেন?

হয়তো ঠাণ্ডার জন্য শুয়ে আছে।
মুগ্ধাঃ আম্মা তুমি আসোতো, আমার বুবু কখনো এতো বেলা করে উঠেনা।
জেনিফা বেগম আর কোনো কথা বললেন না।
এখন যদি মেয়ের কথা না শুনেন, তাহলে মেয়ে কান্না করে ঘর বাসিয়ে দিবে চোখের পানিতে।
মুগ্ধাঃ ওই বুবু, দরজা খুলো বুবু? তুমি তো এতো বেলা করে কখনো উঠো না?
(মুগ্ধার দো’চোখে ঝর্ণাধারা নেমেছে।)

জেনিফাঃ কান্না করছিস কেন মা?
উঠে যাবে তোর বুবু, ঠাণ্ডার জন্য ঘুমাচ্ছে হয়তো। আর আজকে দেখছিস কেমন ঠাণ্ডা পরেছে? মাঘমাস শুরু হতেই এতো ঠাণ্ডা?
মুগ্ধার কানে ওর মায়ের বলা কথা গুলো যাচ্ছে না।

সে টিনের দরজায় ঠকঠক করে ডেকেই যাচ্ছে।
এভাবে পাঁচ মিনিট হবে দরজা ধাক্কালো মুগ্ধা,
কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসেনি।
মুগ্ধা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।

মুগ্ধার এমন অবস্থা আর নিশির কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়াতে জেনিফা বেগম এর মনে ভয় ঢুকে যায়।
জেনিফা বেগম আর কোনো কিছু না ভেবেই পাশের ঘর নিশির বড় চাচা আজিজুল মিয়ার ঘর। সেখানে দৌড়ে যান।

সকাল সকাল জেনিফা বেগমকে দেখে অসন্তুষ্ট আয়েশা চৌধুরী।
জেনিফা বেগমকে কখনো মানুষ হিসেবে ভাবেননি আয়েশা চৌধুরি।
জেনিফা বেগম দৌড়ে
আসায়, ক্লান্ত হয়ে গেছেন। ৫০ ছুঁই ছুঁই বয়স।

জেনিফাঃ ভাবি নিতিন এর আব্বা কোথায়?
(কান্নায় গলা ভেঙে আসছে জেনিফার)
আয়েশা চৌধুরি কঠোর গলায় বললেন,
আয়েশাঃ ঘাটে মুখ ধুচ্ছে। (কথাটা বলে নিজের কাজে মন দেয় আয়েশা চৌধুরি )
জেনিফা বেগম কষ্ট পান, এই ভেবে, উনার চোখের পানির কারণটা জিজ্ঞেস করেনি আয়েশা।

জেনিফাঃ ভাইজান ভাইজান,
জেনিফার কণ্ঠ শুনে পানির দিক থেকে মাথাটা তুলেন।
আজিজুল মিয়া খুব ভালোবাসেন জেনিফাকে, তিনিই পছন্দ করেছিলেন রমিজ মিয়ার জন্য।
আজিজুল নিজের ছোট বোন এর মতোই ভালবাসেন।
জেনিফা আবার বললো,

জেনিফাঃ ভাইজান তাড়াতাড়ি আমদের ঘরে আসেন?
জেনিফার উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে আজিজুল প্রশ্ন ছুড়লেন।
আজিজুলঃ কি হইছে জেনি?

(আদর করে ডাকতেন জেনি, এই বুড়ো বয়সেও জেনিই ডাকেন। যেটা আয়েশা চৌধুরি এর একবারে পছন্দের না)
জেনিফাঃ ভাইজান আগে আসেন, নিশি রুমের দরজা খুলছে না, সকাল থেকে ডাকতেছি আমি আর মুগ্ধা।

আজিজুল আর কোনো কথা না বলেই ঘরের দিকে হাটা শুরু করেন।
পিছন পিছন জেনিফা আর আয়েশা ও আসছে, পিছন থেকে সব শুনছিলো আয়েশা।
মুগ্ধাঃ ও বুবু, ও বুবু কি হয়েছে তোমার?

ও বুবু!
মুগ্ধা কান্না করতে করতে মাটিতে বসে পরে,
আজিজুল মিয়া নিশির রুমের পাশে এসে মুগ্ধাকে মাটিতে বসে কান্না করতে দেখে, খুব অবাক হন।

আজিজুলঃ মুগ্ধা মা কান্না করছিস কেন?
(আজিজুল আর আয়েশার মাত্র এক ছেলে, আর কোনো সন্তান নেই।
নিশি আর মুগ্ধাকে খুব ভালোবাসেন আজিজুল।
কিন্তু আয়েশা কাউকেই ভালোবাসে না।)

মুগ্ধা হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো,
মুগ্ধাঃ বড় চাচা আমার বুবু আমার বুবু সকাল থেকে দরজা খুলছে না।
(মুগ্ধার কান্নার জন্য সব কথা বুঝতে পারেন নি আজিজুল)
আজিজুলঃ মুগ্ধা মা দরজার কাছ থেকে দূরে যা?

জেনিফা বেগম মুগ্ধাকে মাটি থেকে তুলতে তুলতে বললেন।
জেনিফাঃ মা এভাবে কান্না করিস না, তোর বুবু হয়তো ঘুমাচ্ছে,
মুগ্ধা কথা বলছে না, শুধু কান্না করেই যাচ্ছে।

আজিজুলঃ জেনি আমি দরজা ভেঙে দেই? নিশি মা তো কোনো সাড়া দিচ্ছে না।
জেনিফাঃ ভেঙে দাও ভাইজান, কাপড় দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে বললেন।
টিনের দরজা থাকায়, বেশি কষ্ট হয়নি ভাঙতে।

আজিজুল দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে
আজিজুলঃ নিশি মায়ায়ায়া,
(চিৎকার দেন)
আজিজুলের চিৎকার শুনে মুগ্ধা আর জেনিফা দৌড়ে রুমে ঢুকেন। পিছনে আয়েশাও ঢুকলো।

মুগ্ধাঃ বুবু বুবু ও বুবু, বলে মাটিতে বসে পরলো,
জেনিফা দৌড়ে এসে মুগ্ধাকে ধরলেন।
কিন্তু মুগ্ধা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
জেনিফা বেগম দু’চোখে সব অন্ধকার দেখছেন,

জেনিফা বেগমের কোলে মুগ্ধা শুয়ে আছে। আর নিশির দেহ উপরে বাঁশে ঝুলে আছে।
জেনিফা চিৎকার করেও চিৎকার করতে পারছেন না।
কি দেখছেন জেনিফা এসব?
আজিজুলঃ ও নিতিনের

মা যাও পানি নিয়া আসো?
(আজিজুল এর চোখ দিয়ে পানি পরছে, কখনো ভাবেন নি এই দৃশ্য দেখবেন?)
আয়েশা চৌধুরি আর কোনো কথা না বলে জেনিফার রান্না ঘরে যান, আর জগে থাকা পানি নিয়া আসেন।

মুগ্ধার মুখে পানির ছিটা পড়তেই মুগ্ধা নড়েচড়ে উঠে।
মুগ্ধা চোখ খুলেই আবার তার সামনে নিশির ঝুলন্ত দেহ।
মুগ্ধা নিশির পা’য়ে ধরে কান্না করছে।
মুগ্ধা চিৎকার করে কান্না করছে।

মুগ্ধাঃ বুবু কি করলে তুমি? ও বুবু আমায় রেখে তুমি কোথায় গেলে?
আমি কাকে বুবু বলে ডাকবো।
বুবু কেন এমন করলে?
কি হয়েছিলো তোমার সাথে?
ও বুবু ও বুবু,

মুগ্ধা আবার মাটিতে বসে পড়লো।
জেনিফার চোখে ঝর্ণা ধারা এর মতো বন্যা নেমেছে।
নিশির আত্মহত্যার কোনো কারণ পাচ্ছেন না খুঁজে।
আয়েশাঃ তুমি লাশে হাত দিবে না নিতিনের বাবা?

আজিজুল কথাটা শুনে জেনিফা আর মুগ্ধার পাশে এসে বসেন।
আয়েশাঃ বোন আমি জানি আমি খুব খারাপ, আমার মধ্যে সব সময় অহংকার বিদ্দমান থাকতো।

কিন্তু আমি ঠিক তোকে, তোর দুইও মেয়েকে ভালোবাসতাম।
কান্না করিস না বোন?
তুই কান্না করলে মুগ্ধাকে কে সামলাবে,
আয়েশার কথা শুনে, জেনিফা বেগম আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না করে দেন।

কোনো মা’য়ের সামনে নিজের সন্তানের লাশ, কখনো আনন্দের না, জেনিফা বেগম কোনো ভাবেই নিজেকে সামলাতে পারছেন না।
কান্নার চিৎকার শুনে পাশের বাড়ির অনেক মানুষ ঘরের বাহিরে ভিড় জমিয়েছে।

অনেকে কান্না করার উৎস খুঁজতে ঘরে ঢুকে, নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
মুগ্ধার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকের চোখে পানি এসেছে।
মুগ্ধাকে কেউ থামাতে পারছে না।
বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।

জেনিফাকে অন্য একটা রুমে নেওয়া হলো।
রমিজ মিয়া সরকারি বাগান দেখা শুনা করেন, তিনি মন দিয়ে কাজ করছেন।
রাস্তায় হঠাৎ রমিজের চোখ পরে।
দুটু মানুষ দৌড়ে যাচ্ছে।

রমিজ একটু চিৎকার করে ডেকে বললেন।
রমিজ: ও ভাই কোথায় যাও এভাবে দৌড়ে?
— পূর্ব দিকের রমিজ মিয়ার মেয়ে না-কি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করছে।
আমরা দেখতে যাচ্ছি।

রমিজ মিয়ার মেয়ে কথাটা শুনে, একটা চিৎকার দেন রমিজ।
চিৎকার শুনে পিছন ফিরে তাকালো দুজন।
এতক্ষণ ওরা দেখেনি কে প্রশ্নটা করেছিলো।
— আরে এ তো রমিজ মিয়া! ওই ধর ওরে, মনে হয় অজ্ঞান হইয়া গেছে?
অন্যজন,

— তোর এটা বলা উচিত হয় নি।
ধর, নিয়ে যাই বাড়িতে।
গ্রামের মেম্বার এসে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে নিশির ঝুলন্ত দেহটা মাটিতে নামান।
বাড়ির উঠুনে নিশির লাশটা রাখা হয়।

নিতিনঃ আজকে আম্মারে ফোন দেওয়া হয় নি এখনো?
রেহানঃ এখনো আন্টির সাথে কথা বলিস নি?
নিতিনঃ ঘুম থেকে উঠেই তো কাপড় ধুতে শুরু করলাম।

রেহানঃ ব্যাচেলার আমরা, এটাই তো কষ্ট, (রেহান হু হু করে হেসে দিলো)
নিতিনের ফোন ভেজে উঠলো।
আয়েশা বেগম ফোন দিয়েছে।
নিতিনঃ আম্মা অপেক্ষা করতে করতেই ফোন দিয়েছেন।

রেহানঃ কথা বল, আমি রুটি বানাচ্ছি।
নিতিনঃ আম্মা কেমন আছো?
আয়েশা বেগম কথা বলছেন না, কান্না করছেন, বাড়িতে সবার চিৎকার।
নিতিনঃ আম্মা কি হইছে, কান্না করছো কেন?
আর এতো চিৎকার কেন?

আয়েশাঃ বাবা নিশি,
কান্নার জন্য কথা বলতে পারছেন না।
নিতিনঃ কি হইছে আম্মা নিশির?
আয়েশাঃ নিশি গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করছে,

কথাটা শুনে নিতিনের হাত থেকে ফোনটা পরে যায়।
মাটিতে বসে পরে নিতিন।
কি বললো এসব আম্মা?
কিছু পড়ার শব্দ শুনে রেহান দৌড়ে আসে কিচেন থেকে।

নিতিন কে মাটিতে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলো।
রেহানঃ কি হয়েছে নিতিন?
নিতিনঃ নিশি!
(নিতিনের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে)

রেহানঃ তোর চাচাতো বোন?
আর কান্না করছিস কেন?
নিতিনঃ নিশি আত্মহত্যা করেছে। (হাউমাউ করে কেঁদে উঠে নিতিন।)
রেহান কথাটা শুনে অবাক না, সে বিশ্বাস করতে পারছে না।

নিতিনের মুখে ওর বোনদের অনেক গল্প শুনেছে। কিভাবে সম্ভব?
রেহান নিতিনের কাঁধে হাত রাখলো।

রেহানঃ নিতিন
নিতিন কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি কাপড় চেঞ্জ করে নেয়।
রেহানঃ নিতিন এভাবে তাড়াহুড়ো করিস না?
আমিও যাবো তোর সাথে।

একটু অপেক্ষা কর।
নিতিনঃ রেহান আমরা যাওয়ার আগেই যদি নিশিকে ওরা মাটি দিয়ে দেয়?
রেহানঃ পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর।
রেহান তার বাবার কাছে ফোন দিয়ে বললো, তাদের গাড়িটা পাঠিয়ে দিতে।
রেহানের বাবাও আর কোনো কথা না বলে গাড়ি পাঠিয়ে দেন।

১০ মিনিটের মধ্যে গাড়ি চলে আসে।
(নিতিন সিলেটের এমসি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে অনার্স দিয়ে এবার মাস্টার্সে পড়তেছে।
আর রেহান এমসিতেই নিতিনের সাথেই পড়ে।

রেহান এর বাবা জাফরুল্লাহ তালুকদার একজন বড় ব্যাবসায়ী।
নিতিন আর রেহান একটা ম্যাচে থাকে।)
রেহান গাড়ি ড্রাইভ করছে।

নিতিন পাশেই বসে আছে। দু চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তেছে।
৪ ঘন্টার রাস্তা।
কিভাবে এতো তাড়াতাড়ি যাবে?
রমিজ মিয়া নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।

লাশের চারপাশে অনেক মানুষ বসে আছে।
রমিজ মিয়া নিজের মেয়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছেন।
বুঝতে চাচ্ছেন, কি হয়েছিলো নিশির সাথে?
আজিজুল এসে রমিজের কাঁধে হাত রাখলো।

রমিজ নিজের ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
কোনো বাবার সামনে নিজের সন্তানের লাশ মানেই পাহাড় সমান কষ্ট, আর সেটা যদি আবার আত্মহত্যা হয়, তাহলে?
গ্রামের চেয়ারম্যান আসলেন।

খুব খারাপ একটা লোক হলো গ্রামের চেয়ারম্যান খলিল মোল্লা।
খলিল: কি রমিজ মিয়া? তোমার মাইয়া না-কি গলায় দড়ি দিয়া মরছে?

নিশির বাবা এমনিতেই খুব কষ্ট পাচ্ছেন নিজের আদরের বড় মেয়েটা এভাবে মৃত্যুতে।
রমিজ মিয়াকে কিছু বলতে না দেখে, খলিল মোল্লা আবার বললো,

খলিল: এই সোহাগ (চামচা) যা কেরোসিন আর কিছু কাঠ নিয়ে আয়?
চেয়ারম্যান এর কথা শুনে সবাই চমকে উঠে।
তখন মেম্বার বললেন।

মেম্বার: ভাইসাব মরা বাড়িতে এমন কথা?
চেয়ারম্যান হেসে বললো,
খলিল: রমিজের মাইয়া গলায় দড়ি দিয়া বড় পাপ কাজ করছে।
জান্নাতেও যাবে না এই পাপী মাইয়া।

জাহান্নামে জ্বলবে, তাহলে দুনিয়াতে জ্বালিয়ে দেওয়াই ভাল।
খলিল মোল্লার কথা শুনে সবাই খুব বড় ধাক্কা খেলো।
কিন্তু কারো কোনো কথা বলার সাহস নেই।
এমন কি মেম্বারেরও!

রমিজ মিয়া চেয়ারম্যান এর পা’য়ের কাছে বসে পড়লেন।
রমিজ: এমন বলবেন না! আমি কখনো সইতে পারবো না।
(রমিজ মিয়া চিৎকার করে কান্না করছেন। একদিকে মেয়েকে হারানোর ব্যথা, আর এইদিকে চেয়ারম্যান এর কঠো কথা।)

খলিল: এই সোনার গ্রামে কখনো এমন পাপ কাজ হয় নি।
তারপরেও তুই বলছিস, আমি সইতে পারবো না।
লোকে দেখুক পাপ কাজের শাস্তি।
আর কেউ যেনো এমন পাপ কাজ কখনো করার সাহস পায় না।

চেয়ারম্যান কিছু সময় থেমে আবার বললেন।
খলিল: সবাই কি আমার কথায় রাজি? তোমরা কি চাও রমিজের মাইয়ার মতো তোমাদের মেয়েও গলায় দড়ি দিয়া মরুক?

চেয়ারম্যান এর কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই চিৎকার করে “না” সম্মতি দিলো।
মুগ্ধা নিশির রুমের দরজায় বসে কান্না করছিলো। পাশের বাড়ির চাচীরা আর শান্তনা দিচ্ছিলো মুগ্ধাকে।

আয়েশা চৌধুরি উনি জেনিফাকে নানা ভাবে নানান ধরণের কথা শুনিয়ে শান্তনা দিচ্ছেন।
হঠাৎ বাহিরে চিৎকার শুনে মুগ্ধা সহ সবাই বাড়ির উঠুনে যায়।
ওরা গিয়ে দেখলো।

আজিজুল আর রমিজ মিয়া চেয়ারম্যান এর সামনে হাটু গেড়ে কান্না করে করে আকুতি করছে।
জেনিফা বেগম এই দৃশ্যটা দেখে বারান্দায় থাকা বাঁশে হেলান দিয়ে বসে পড়েন।
কোনো মাবাবা চাইবে না এমন নির্মম কাজ করতে।
মুগ্ধা আস্তে আস্তে নিশির লাশের সামনে যাচ্ছে।

নিতিন গাড়ি থেকে নেমে, কোনো দিকে না তাকিয়ে, এক দৌড়ে নিশির লাশের কাছে আসে।
নিশির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কান্না করছে।
রেহান গাড়িটা উঠুনের একপাশে রেখে, নিতিনের পাশে এসে দাঁড়ালো।

এই কান্নার সাগরেও চেয়ারম্যান তার খারাপ কাজ করতে মগ্ন।
আবার বলে উঠলো চিৎকার করে।
খলিল: কি’রে সোহাগ তোকে কি বললাম? তোর কানে যায় না না-কি?

সোহাগ একটু ভয়ে নড়েচড়ে উঠে।
চেয়ারম্যান এর চামচা হলেও তার শরীর কাঁপছে, এমন খারাপ কাজ করতে।
এবার মুগ্ধা মুখ খুললো।

মুগ্ধাঃ আর একবার আমার বুবুর নামে খারাপ কথা বলবি তাহলে জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলবো।
(খুব চিৎকার করে কথাগুলো বললো)
মুগ্ধার কথা শুনে, মুগ্ধার মা বাবা সহ সবাই অবাক হলো, চেয়ারম্যান রেগে বললো,
খলিল: আমার কথার উপর কোনো কথা হবে না।

যে গ্রামে পশুরাও আমায় ভয় পায়।
সেখানে কি না এক পুচকে মেয়ে আমায় ধমক দেয়।
কথা গুলো বিশ্রী হাসিতে মেতে উঠে চেয়ারম্যান।

সবাই চুপ হয়ে যায়।
কিন্তু চুপ হয় নি মুগ্ধা।
মুগ্ধাঃ আমার বুবুর জানাজা হবে, এখানের সবাই আমার বুবুর জানাজা পড়বে। আর তুইও পড়বি?

(চেয়ারম্যান এর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো)
খলিল: রমিজ মিয়া মেয়েরে তো ভালোই বানিয়েছো।
খুব পস্তাবে রমিজ মিয়া।

রমিজ কথাটা শুনে ভয়ে কেঁপে উঠলেন। উনি চাননা উনার এই মেয়েটাকেও হারাতে।
রমিজ মিয়া কিছু বলতে গেলে।
খলিল আবার বলে উঠলো।
খলিল: এই পাপী মেয়েকে আগুন দিয়ে জ্বালানো হবে।

আমার গ্রামে প্রথম কোনো মেয়ে এমন খারাপ কাজ করেছে।
তাই এর ফল হবে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে শেষ করা।

মুগ্ধা চেয়ারম্যান এর কথাটা শুনে, রেগে আগুন হয়ে যায়।
মুগ্ধা সবার দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ কথা বলছে না। সবাই চেয়ারম্যান এর সাথে তাল মিলাচ্ছে। নিতিনও

রমিজ আর আজিজুল এর পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
মুগ্ধা চোখের পানি বাম হাতের উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে মুছে, উল্টো হয়ে দৌড় দিলো বারান্দার দিকে।
মুগ্ধার দৌর দেখে সবাই ওর দিকে তাকাচ্ছে।
মুগ্ধা বারান্দায় গিয়ে, মাটিতে পরে থাকা ঠেঙি দা’টা হাতে নিয়ে, আবার দৌড়ে আসলো চেয়ারম্যান এর সামনে।

মুগ্ধাঃ আর একবার বলবি আমার বুবুকে জ্বালানোর কথা।
তাহলে শরীর থেকে মাথা আলাদা করে দিবো।
(এ যেনো কোনো মেয়ে না।

বর্তমান সমাজের কোনো মানুষ রুপী বাঘ। যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।)
চেয়ারম্যান ভয়ে দুই পা পিছালো।
তারপর বললো,
খলিল: দেখছোনি তোমরা, রমিজের দুধের মাইয়া আমায় মারার হুমকি দিচ্ছে।
রমিজের বড় মাইয়া আত্মহত্যা করেছে, তারপরেও দেখো কি ভালোবাসা ছোট মাইয়ার?
আ,

মুগ্ধাঃ আমার বুবু আত্মহত্যা করে নি।
আমার বুবুকে খুন করা হয়েছে।
আর একবার যদি আত্মহত্যা আত্মহত্যা বলে চিল্লিয়েছিস তো তাহলে এখানে আমার বোনের জানাজা একা হবে না।

তোর জানাজা হবে এখানে।
আমার বোন আত্মহত্যা করেনি, আমার বোন আত্মহত্যা করেনি।
মুগ্ধা চিৎকার করে কথা গুলো বলতে বলতে মাটিতে বসে পরলো।


পার্ট: ২

আমার বুবু আত্মহত্যা করেনি শব্দটা শুনে সবাই খুব বড় ধাক্কা খেলো।
নিতিনঃ মানে?
মুগ্ধাঃ আমার বুবু আত্মহত্যা করেনি। আমার বুবুকে খুন করা হয়েছে। (মুগ্ধা নিশির লাশের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো)

চেয়ারম্যান অট্টহাসিতে মেতে উঠে।
খলিল: কোনো বন্ধ ঘরে কে খুন করবে?
তোমাদের ভুল গল্প শোনাচ্ছে রমিজের মেয়ে?
আমার কথাই শেষ কথা।

এই মেয়েকে জ্বা,
মুগ্ধা চেয়ারম্যানকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
মুগ্ধাঃ বলছি না এই কথা আর মুখে উচ্চারণ করবি না?
আমার বুবুকে কেউ খুন করেছে।

খলিল: প্রমাণ করতে পারবি?
মুগ্ধাঃ একদিন প্রমাণ করবো, আমার বুবু আত্মহত্যা করেনি।
আমার বুবুকে খুন করা হয়েছে।

খলিল: এই মেয়ে তোমাদের ভুল গান শোনাচ্ছে।
আর ওর জানাজা কে পড়াবে?
(আবার অট্টহাসিতে মগ্ন হলো।)
মুগ্ধাঃ মসজিদের ইমাম।

খলিল: কখনো না, যে মেয়ে আত্মহত্যা করে তার কখনো জানাজা হয় না।
আর আমাদেত গ্রামের ইমাম কখনো ওই পাপী মেয়ের জানাজা পড়াবেনা।
এখন কে পড়বে তোর বোনের জানাজা?

ও রমিজ মিয়া তুমি পড়াবা তোমার মেয়ের জানাজা?
(হুহুহু করে বিশ্রী ভাবে হাসতে লাগলো খলিল মোল্লা)
রমিজ মিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।

কখনো এমন পরিস্থিতি আসবে তার জীবনে, কখনো ভাবেননি।
নিশির লাশ সামনে নিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
সবার একটা কথা, কেউ এই মেয়ের জানাজা পড়বে না।
সবাই চেয়ারম্যান এর কথায় নাচতেছে।

জেনিফা বেগম বারান্দায় বাঁশে হেলান দিয়ে, সব ঘাতক মানুষেত ধরণ দেখছেন, যে ধরণে আছে শুধু নিজের পরিবারকে হেয় করা।
জেনিফার ইচ্ছা করছে, মাটিতে ঢুকে যেতে। কেন নিশি এমন করলো?
আর মুগ্ধাই বা কি বলছে এসব? তাহলে কি মুগ্ধা কিছু জানে?

ঘড়ি ৪টা বেজেছে, এখনো নিশির লাশটা উঠুনে রয়েছে।
তাহলে কি নিশির জানাজা হবে না?
মুগ্ধাঃ তোমাদের মনে কি একটুও ভালোবাসা নাই?
তোমরা এই চেয়ারম্যান এর কথায় নাচতেছো?

সবাই চুপ, চেয়ারম্যান এর মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।
খলিল: সবাই সবার বাড়িতে যাও, আর রমিজ মিয়া তোমায় ৫ দিনের টাইম দিলাম।
এই পাঁচদিনের মধ্যে তোমার মরা মেয়েকে নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে চলে যাবে।
এই পাপী মেয়েকে আমার সোনার গ্রামের মাটিতে জায়গা দিবো না।

চেয়ারম্যান এর কথাটা শুনে রমিজ মিয়া হাউমাউ করে কান্না করে দেন।
মেয়ে হারানোর কষ্টের চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে চেয়ারম্যান এর করা অপমানের।
মুগ্ধা চিৎকার করে বলে উঠলো।

মুগ্ধাঃ এখানের সবাই আমার বুবুর জানাজা পড়ে যাবে?
নাহলে,
খলিল: জানাজা কে পড়াবে?
মুগ্ধা কিছু না বলে নিতিনের কাছে যায়।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া ও ভাইয়া আমার বুবুর জানাজা পড়াও না তুমি?
আমার বুবু আত্মহত্যা করেনি।
আমি প্রমাণ করবো, আমার বুবুরে আর কষ্ট দিয়ো না তোমরা এভাবে।
আমার বুবু এতো কষ্ট সহ্য করতে পারবে না।
(মুগ্ধা কথা গুলো বলতে বলতে মাটিতে বসে পড়লো)

মুগ্ধার কান্না দেখে সবার চোখেই পানি এসেছে।
এক বোনের জন্য অন্য বোনের ভালোবাসা দেখে সবাই মুগ্ধ।
কিন্তু চেয়ারম্যান এর কথার বিরুদ্ধে কারো যাওয়ার সাধ্য নাই?
নিতিন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

কখনো কারো জানাজা পড়ায় নি নিতিন।
কি করবে এখন নিতিন?
তাই চুপ হয়ে নীরবে নিজের চোখের পানি ফেলছে।
নিতিনঃ মুগ্ধা বোন আমার, আমরা সবাই হেরে গেলাম নিশির কাছে৷ জানিনা নিশি আমাদের কখনো ক্ষমা করবে কি-না?

মুগ্ধা তার কথার উত্তর পেয়ে গেছে।
তাহলে কি চেয়ারম্যান জিতে যাবে?
হেরে যাবে কি নিশির নিষ্পাপ লাশটি।
নিশি হারলে কি শুধু নিশিই হারবে না-কি গ্রামের সবাই হারবে?
মুগ্ধা পাগলের মতো একটা মুখকে খুঁজতে লাগলো।

কিন্তু সেই চেনা মুখটা
এই ভিড়ের মধ্যে নাই।
মুগ্ধার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে।
মুগ্ধা ওর পরিবারের সবার দিকে তাকালো।
সবাই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে,

মুগ্ধাঃ এখানে এমন কেউ নাই কি?
যে আমার বুবুর জানাজা পড়াবে।
যে আমার বুবুর জানাজা পড়াবে আমি তার দাসী হয়ে থাকবো সারাজীবন,
মুগ্ধা কথা বলতে পারছে না।

চেয়ারম্যান আবার কিছু বলতে গেলে।
কেউ একজন বলে উঠলো।
–আমি পড়াবো নিশির জানাজা।

এমন কথা শুনে মুগ্ধা মাথা উপরের দিকে তুলে তাকালো।
চারদিকে তাকাতে লাগলো পাগলের মতো।
কে কথাটা বললো, সেটা দেখার জন্য।

— আমি পড়াবো নিশির জানাজা, জানি না এটা আত্মহত্যা না-কি খুন?
কিন্তু আমি যতটুকু জানি নিশি কখনো আত্মহত্যা করবে না।
এটা খুন।

কোনো অপরিচিত ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মুগ্ধার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
কিন্তু কে এই মানুষ? মুগ্ধা এর আগে কখনো দেখেনি এই মানুষটিকে?
চেয়ারম্যান রেগে গর্জে বললো,
খলিল: কে তুই?

তোকে তো এই গ্রামে আগে কখনো দেখিনি?
ছেলেটি কিছু বলার আগে, নিতিন বলল।
নিতিনঃ ওর নাম রেহান।
আমার ক্লাসমেট।

শহরে থাকে।
নিতিনের কথাটা শুনে চেয়ারম্যান হাহাহা করে হেসে উঠে।
খলিল: হুনছুনি তোমরা?

শহরের ছেলে না-কি জানাজা পড়াবে?
হাহাহাহা করে আবার হাসতে লাগলো।
রেহান বলতে শুরু করলো।

রেহানঃ কেন? শহরের ছেলেরা কি মানুষ না?
চেয়ারম্যান চুপ হয়ে যায়।
রেহান আবার বলতে শুরু করলো।

রেহানঃ অনেক সময় ধরে দেখে আসছি আপনার নষ্টামি।
চেয়ারম্যান মানে বুঝেন?
কয়েকটা গ্রামের রক্ষক বলা হয় একজন চেয়ারম্যানকে।

কিন্তু আপনি তো রক্ষক না, আপনি তো মানুষ নামক এক নিকৃষ্ট পশু।
চেয়ারম্যান রেগে গর্জে বললো,
খলিল: তোর এতো সাহস। আ,

রেহান চেয়ারম্যান কে থামিয়ে দিয়ে কিছু বলতে গেলে। নিতিন বললো,
নিতিনঃ রেহান!
রেহানঃ নিতিন তুই চুপ থাক।

কেমন ভাই তুই?
কেমন সন্তান তুই?
তোর সামনে তোর পরিবারকে অপমান করছে শতশত মানুষ, কিন্তু তুই চুপ হয়ে আছিস?
রেহানের কথা শুনে নিতিন নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে শুরু করে।
রেহানঃ এই পশুর গ্রামে একটা মাত্রই মানুষ বাস করে, আর সেই মানুষটি হলো এই মেয়ে (মুগ্ধা), কতো হবে বয়স ১৮&১৯।

যেই মেয়ে নিজের বোনের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা ছিলো।
কিন্তু সেই মেয়েই তার মৃত বোনকে নিয়ে লড়াই করছে শতশত মানুষের সাথে।
এই ১৮&১৯ বছরের মেয়েটি তোমাদের চেয়েও এতোটা জ্ঞানী না।

এই মেয়েটা কাল পর্যন্ত হয়তো ওর মাবাবার কাছে পিচ্চি মেয়ে ছিলো?
কিন্তু আজ উনারাই নিজের মেয়েকে চিনতে পারছেন না।
মুগ্ধা নীরবে চোখের পানি ফেলছে।

চেয়ারম্যান আবারো রেহানকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।
রেহানঃ সবাই জানাজা পড়ার জন্য তৈরি হোন?
নিতিন তোমরাও তৈরি হ?

নিতিন মুগ্ধা সহ জেনিফা বেগম আর ওর মা কে ঘরে নিয়ে গেলো।
চেয়ারম্যান সহ আরো কয়েকজন অনেক কটুকথা বলে চলে যায়।
রেহান এর ইছামতীতে প্রায় ২&৩শ মানুষ নিয়ে নিশির জানাজা পড়া হয়।
নিশিকে তাদের বাড়ির সামনে উঠুনের পাশেই মাটি দেওয়া হয়।

বাড়ির পিছনটা খুব জঙ্গল, ওরা কেউই বাড়ির পিছনে যায় না।
তাই বাড়ির সামনেই নিশির কবর দেওয়া হয়।
মুগ্ধা আর জেনিফা শেষ দেখাটাও দেখতে পারেনি নিশিকে।
সবাই চলে যায়।

সন্ধ্যা হয়ে আসলো।
ঠাণ্ডাও পরছে খুব, কুয়াশায় সব কিছু অন্ধকার করে রেখেছে।
মুগ্ধা তার আপুর রুমে বসে আছে মাটিতে।
চোখ থেকে ঝর্ণাধারা নামতেই আছে।
খুব ভালবাসতো যে নিশিকে।

আর কেউ কখনো তাকে পিচ্চি বলে ডাকবে না।
কেউ বলবে না, মুগ্ধা কবে বড় হবি?
এসব ভাবছে আর কান্না করছে।

রমিজ মিয়া আসলেন মুগ্ধার কাছে।
মুগ্ধা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আরো বেশি কান্না করতে লাগলো।
মুগ্ধাঃ আব্বা কি হলো এসব আমাদের সাথে?

রমিজ মিয়া মুগ্ধার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন।
রমিজ: জানি না রে মা, আমাদের সুখের সংসারে কি হলো এসব।
কিছু সময় নীরবতা।

রমিজ: মুগ্ধা মা, তখন যে বললি আমার নিশি মা আত্মহত্যা করেনি।
তাহলে কি তুই কিছু জানিস?
মুগ্ধা চোখ তুলে তার বাবার দিকে তাকালো।
মুগ্ধা মাথা দিয়ে এপাশ ওপাশ করে “না” বললো,

রমিজ: তাহলে?
মুগ্ধাঃ আব্বা কোনো কারণ আছে তাই বলেছি।
একদিন তুমিও জানতে পারবে সব সত্য কথা, যেদিন আমি কোনো প্রমাণ পাবো।
রমিজ মিয়া আর কোনো কথা না বলে চলে যান।
জেনিফাকে আয়েশা অনেক বুঝাচ্ছে

কিন্তু জেনিফা কান্না থামছেই না।
উনি শুধু একটা কথা বলছেন।

আমার মেয়ের কি এতো কষ্ট ছিলো? যে আত্মহত্যা এর ময়ো পাপ কাজ করলো।
কারো কাছে যে এই উত্তরটা নেই?
রাত ৮টা, রমিজ মিয়ার ঘর প্রতিদিনের মতো আজকেও হয়তো হাসি খুশিতে মেতে থাকতো।
কিন্তু নিয়তি?

মুগ্ধাকে কিছু খাওয়াতে পারছেন না আয়েশা চৌধুরী।
জেনিফাকে খুব কষ্ট করে খাবার খাওয়াতে সক্ষম হন আয়েশা।
কিন্তু মুগ্ধাকে এক লুকমা খাবার খাওয়াতে পাড়েন নি আয়েশা।
আয়েশাঃ মুগ্ধা মা সকাল থেকে হয়তো কিছু খাসনি।

এভাবে না খাইলে তুই অসুস্থ হয়ে পরবি।
মুগ্ধাঃ যেখানে আমার বুবুই নাই, সেখানে আমি বেঁচে থেকে কি করবো?
আয়েশাঃ এমন কথা বলতে নাই মা।
তোর আম্মা আব্বা এসব শুনলে আরো কষ্ট পাবেন।

এমনিতেই আজ যা হলো, মা তুই শক্ত হ, আর তোর আম্মা আব্বারে শান্তনা দে?
নে মা খাবারটা খেয়ে নে?
মুগ্ধা কোনো কথাই বলছে না।
শুধু নীরবে চোখের পানি ফেলছে।

আয়েশা হতাশ হয়ে চলে যান।
গিয়ে নিতিনকে পাঠান।
নিতিন খাবার এর প্লেট হাতে নিয়ে নানান ভাবে কথা বলে মুগ্ধাকে খাবার খাওয়াতে ট্রাই করছে।

কিন্তু মুগ্ধার একটা কথাই, সে খাবার খাবে না।
রেহান এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলো।
আস্তে আস্তে মুগ্ধার রুমে ঢুকলো।

মুগ্ধা রেহান কে দেখে নিজের চোখের পানি মুছে নিলো।
রেহান এসে মুগ্ধার রুমে থাকা একটা চেয়ারে বসলো।
নিতিনঃ তুই না খেলে কি নিশি ফিরে আসবে? এমঅন জেদ করিস না বোন? খেয়ে নে খাবার।

তুই এমন করলে, চাচা-চাচী আরো বেশি কষ্ট পাবেরে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া আপু কেন এমন করলো। কি এমন কষ্ট ছিলো আপুর?
কাল রাতে ঘুমাবার আগেও আপু ভাল ছিলো।
আপু কখনো কাপড় চেঞ্জ করে ঘুমায় না।

নিতিনঃ মানে?
মুগ্ধাঃ আপুর পড়নে যা থাকতো, তাই পড়েই ঘুমাতো।
কিন্তু আজ কি হলো?
(মুগ্ধা কেঁদে দেয়)
রেহান মুগ্ধার দিকে অপলক ভাবে চেয়ে আছে, একটু আগেই এই মুগ্ধার ভিতরে ছিলো এক সাহসী মুগ্ধা। যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলো।

এখন সেই মুগ্ধাই কান্না করছে।
নিতিন মুগ্ধার কান্না দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি।
নিতিন কোনো ভাবেই মুগ্ধাকে খাবার খাওয়াতে পারছে না।
রেহান এতক্ষণ ওদের পাশে বসে সব শুনছিলো।

রেহানঃ তুমি নিতিনের ছোট বোন মানে আমারো ছোট বোন তাই তুমি করেই বললাম।
মুগ্ধা রেহানের দিকে তাকালো।
রেহান আবার বললো,
রেহানঃ এখন তোমায় কোনো প্রশ্ন করা মানেই বোকামী।

তারপরেও দু একটা বোকামী করবো আমি।
নিতিনঃ মানে? কি বোকামী করবি তুই?
রেহান মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললো,
রেহানঃ নিশি মানে তোমার বুবু কি কাউকে ভালোবাসতো?
রেহানের প্রশ্নটা শুনে মুগ্ধা নিতিনের দিকে তাকালো।

নিতিনঃ বল বোন? নিশি কি কাউকে ভালোবাসতো?
আর কেনোই বা আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেলো? (নিতিনের চোখে পানির রেখা দেখা যাচ্ছে।
নিতিনের বেশি ছোট না নিশি। খুব ভালোবাসতো নিশি আর মুগ্ধাকে। নিজে মা’য়ের পেটের বোনের মতোন ভালোবাসতো মুগ্ধা আর নিশিকে।)

মুগ্ধা চুপ করে আছে।
আবার রেহান বললো,
রেহানঃ হয়তো তুমি খাবার খাবে? নয়তো তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিবে?
রেহানের কথাটা শুনে মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ ভাইয়া খাবার দাও, আমি খাবার খাবো।

রেহান হাসলো, মুগ্ধা ওদের থেকে কিছু লোকাচ্ছে।
নিতিন একের পর এক লুকমা খাবার মুগ্ধার মুখে তুলে দিচ্ছে।
নিতিনঃ রেহান গাড়ির কি করবি?
রেহানঃ কি করবো, উঠুনেই থাক, কাল ড্রাইভারকে ঠিকানা বলে দিবো। এসে নিয়ে যাবে।
নিতিন আর কিছু বললো না।

মুগ্ধাকে খাবার খাইয়ে নিতিন আর রেহান চলে যাবার জন্য উঠলো।
তখন মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আমার বুবুর সম্পর্কে একদিন সব জানবে, আপুকে কেউ খুন করেছে, আমার আপুর কোনো কষ্ট ছিলো না, যে আত্মহত্যা করবে।

নিতিন আর রেহান আবার ওর কাছে এসে বসলো।
নিতিনঃ মুগ্ধা তুই কি কাউকে সন্দেহ করিস?
মুগ্ধাঃ সময় হলেই বলবো ভাইয়া।
নিতিনঃ হুম।

মুগ্ধাঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার বুবুর জানাজা পড়ার জন্যে।
(রেহানের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো)
রেহান মুচকি হাসলো।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া চেয়ারম্যান যদি আমাদের কোনো ক্ষতি করে?
নিতিনঃ আমিও ভাবছি সেটা।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া তখন তো আমি আমার বুবুর অপমানের প্রতিউত্তর দিয়েছি।
কিন্তু আমি যে মেয়ে।

আমি পাড়বো না আমার পরিবারকে ওই চেয়ারম্যান এর হাত থেকে বাঁচাতে।
নিতিন মুগ্ধার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার চলে যেতে শুরু করে।
রেহান মুগ্ধাকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।
মুগ্ধা বিছানায় শুয়ে আছে, ঠাণ্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছে।

কাল রাতেও কতো মজা করেছে মুগ্ধা তার বুবুর সাথে।
কিন্তু আজ তার বুবু আর এই পৃথিবীতে নেই।
ভাবতে মুগ্ধার দু’চোখ ভিজে গেলো।

মুগ্ধার একটা কথা মনে হয়েই, শুয়া থেকে উঠে আবার নিশির রুমে গেলো।
জেনিফা বেগম নিশির কাপড় বুকে নিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। মুগ্ধাকে দেখে তাড়াতাড়ি করে নিজের চোখের পানি মুছে নেন।

মুগ্ধাঃ আম্মা কান্না করছো?
জেনিফাঃ কি থেকে কি হয়ে গেলোরে মা?
মুগ্ধার কাছে এই কথার উত্তর নাই।
মুগ্ধাঃ আম্মা রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাতে যাও, আব্বাকে শান্তনা দাও আম্মা।
আমাদের কান্না করলে হবে না।

জেনিফা নিজের মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন।
যে মেয়েকে এতোদিন সবাই পিচ্চি বলে আসছে।
সেই মেয়ে আজ পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজেকে শক্ত করে নিয়েছে।
জেনিফা মুগ্ধার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন।

জেনিফাঃ তুইও তো কান্না করছিস?
মুগ্ধা কিছু না বলে জেনিফাকে জড়িয়ে ধরলো।
জেনিফাঃ তুইও আয় ঘুমাবি?

মুগ্ধাঃ আমি কিছুক্ষণ বুবুর রুমে থাকি।
জেনিফা বেগম কিছু না বলে চলে যান।
মুগ্ধা চারদিক ঘুরে দেখছে নিশির রুম।

নিশি তার রুম অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতো।
আর বলতো, পিচ্চি বুড়ি আমার কোনো জিনিসে হাত দিবি না।
মুগ্ধা রাগানোর জন্য সবকিছু এলোমেলো করে দিতো।
এখন আর কেউ বলবে না?

মুগ্ধা আবার আসছিস আমায় রাগাতে।
এই মাত্র সব গুছিয়েছি। পিচ্চি বোন আমার নষ্ট করবিনা কিছু।
মুগ্ধা এসব ভাবছে আর সব কিছু গুটিয়ে গুটিয়ে দেখছে।
মুগ্ধা নিশির রুমের টিনের বেড়া ভালোভাবে দেখে, কোনো কিছুই পায় নি।

মুগ্ধা আরো একটা জিনিস খুঁজলো। কিন্তু সেটাও পেলো না।
মুগ্ধা হতাশ হলো। তার বুবুর মৃত্যুতে যার বেশি কাঁদার কথা ছিলো, সেই আসলো না।
না-কি বুবুর আত্মহত্যা এর পিছনে তার হাত আছে? কিন্তু এটা কি কখনো সম্ভব।

তাহলে বুবুকে দেখতে আসলো না কেন?
মুগ্ধা আরো কিছুক্ষণ নিশির রুমে থেকে তার নিজের রুমে চলে আসে।
মুগ্ধা বিছানায় শুয়ে পরলো।
ঘুমানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু মুগ্ধার চোখে ঘুম আসছে না।
তারপরেও চোখ দুটো বন্ধ করলো মুগ্ধা।
গ্রামের লোক একটু তাড়াতাড়ি ঘুমায়।
রাত ১০টা,

— তোমার ছেলে যদি আর কখনো আমার কথার উপর কোনো কথা বলে? তাহলে আমার চেয়ে আর খারাপ হবে না কেউ?
(শান্ত ভাবে কথাটা বললেন আশরাফ চৌধুরী।)
আশরাফ এর কথা শুনে আমিনা মন খারাপ করে বললেন।
আমিনা: কেন এমন করো?

ছেলেটাও তো চায় নিজের মতো নিজেকে সাজাতে।
নিজেকে স্বাধীন ভাবে বাঁচাতে নিজেকে।
(ভয়ে ভয়ে কথাটা বললেন আমিনা)
আমিনার কথা শুনে আশরাফ এর কাছে থাকা পানির গ্লাসটি ছুঁড়ে মারে ফ্লোরে। গ্লাসটি ভেঙে যায়।

আমিনা ভয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে।
এখন আবার নিজের ফ্যামিলিকে কথা শুনাবে এই গম্ভীর মানুষটি।
আশরাফ: ছেলে আমার, তাই আমি যা চাইবো তাই হবে।
আর আমি চাইনা আমার ছেলে ছোট লোকদের সাথে চলাফেরা করে নিজেকে সেভাবে করে তুলুক।

এই আশরাফ চৌধুরীর ছেলেমেয়েরা আশরাফ চৌধুরীর মতো হবে।
আমিনা আর কিছু বললেন না।
এই মানুষটির সাথে তর্কে যাওয়া মানে কোনো রেডিও চালু করা।
বন্ধ ঘরে নিজেকে বন্ধি করে রাখছে রাহিন।
কয়েকদিন আগেও রাহিন ছিলো মুক্ত পাখি।

ঘুরিয়ে বেড়িয়ে চলেছে নিজের মতো করে।
কিন্তু আজ ৬টা দিন ধরে নিজেকে বন্ধি করে রাখছে এই ইট পাথরের শহরে।
রাহিন কখনো তার আব্বু আশরাফ এর কথার উপরে কোনো কথাই বলেনি।
শুধু সে না রাহিনে বড় ভাই আর ছোট বোন কেউই আশরাফের কথার উপরে কোনো কথা বলে না।

রাহিন এর প্রতিটা রাত কাটছে শুধু চোখের পানিতে।
আশরাফ কি কখনো বুঝবে না তার ফ্যামিলিকে।
না-কি সব সময় অহংকারী হয়েই থাকবে।
রাহিনেত ফোন বেজে উঠে।

রাহুল ফোন দিয়েছে, রাহিনেত বড় ভাই রাহুল স্পেন থাকে। দেশে আসবে কিছুদিন পর।
রাহিনের মনের সব দুঃখের কথা রাহুলের সাথে শেয়ার করবে এখন।
রাহিন ফোনে কথা বলতে শুরু করলো।

তিশা: ভাইয়া খাবার খাবি আয়? (রাহিনের ছোট বোন)
রাহিন রাহুলকে বায় বলে,
রাহিন: যা আমি আসছি।
রাহিন এখন জানে, খাবার খাওয়া তার হবে না, আশরাফ নানান ভাবে তাকে অনেক কথা শুনাবেন


পার্ট: ৩

রাহিন প্লেটের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খাবার খাচ্ছে।
আশরাফ চৌধুরী রাহিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

আশরাফ: কাল থেকে কাপড়ের দোকান গিয়ে বসবি?
(রাহিনের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন।)
রাহিন খাবারটা মুখে নিতে গেলেই কথাটা বললো রাহিনের বাবা।
রাহিন খাবার এর লুকমা প্লেটে রেখে বললো,

রাহিন: আব্বু দোকানে তো ১০জন কর্মচারী আছে। তাহলে আমি গিয়ে কি করবো?
আশরাফ: আমি ঢাকা যাবো তোর ছোট চাচ্চুর বাসায়। আর কিছুদিন থাকবো সেখানে। তাই আমার অনুপস্থিতিতে তুই কাপড়ের দোকান সহ সব কয়টা ব্যবসা দেখবি?
(শান্ত ভাবে কথা গুলো বললেন আশরাফ)

রাহিন: আমি আমার বিয়ের পর আপনার সব ব্যবসা দেখবো। এর আগে আমি কোনো কাজ করবো না।
(রাহিন কথাটা বলে খাবার ছেড়ে উঠতে গেলে)
আশরাফ: বেশি বড় হয়ে গেছো?
রাহিন: ভাইয়া দেশে আসবে ৪ দিন পর।

ভাইয়াই সব দেখবে।
আশরাফ কথাটা শুনে খাবার টেবিলে হাত দিয়ে বাড়ি দিলো।
এতে আমিনা আর তিশা ভয়ে নড়েচড়ে উঠলো।

আশরাফ চিৎকার করে উঠলো।
আশরাফ: আমার কথার উপরে কথা বলার সাহস হয় কিভাবে?
রাহিন: ভাইয়া আর আমার দুজনের বিয়ের বয়স হয়েছে।
ভাইয়ার বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই।

কিন্তু তুমি তাকেও বিয়ে না দিয়ে স্পেন পাঠালে।
কেন?
তোমার কি ইচ্ছা হয় না, আমরা বিয়ে করি?

(রাহিন চিৎকার করে কথাটা বললো)
আশরাফ আমিনার দিকে তাকিয়ে বললো,
আশরাফ: দেখেছো রাহুলের মা? আরো পাঠাও তোমার বাবার বাড়ি ছেলেকে? ছোটলোকদের সাথে থেকে ছোটলোক এর সব কিছু শিখে নিয়েছে।

আমিনা কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। কোনো ভাবে না কোনো ভাবে এই মানুষটা তার বাবার বাড়ির সবাইকে কথা শুনাবেই।
এই মানুষটা তো আগে এমন ছিলো না।
তাহলে এখন এমন হলো কেন?
উত্তরটা আমিনার অজানা।

আমিনা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান।
চাননা উনি আর নিজের মা বাবাকে বকা শুনাতে।
রাহিন: তাহলে ছোট লোকের মেয়েকে বিয়ে করেছিলে কেন?
আম্মুও তো ছোট লোকের মেয়ে ছিলো?

আশরাফ চুপ হয়ে যায়।
কি উত্তর দিবে এই কথার?
রাহিন আবার বললো,
রাহিন: আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ্ উপর থেকে ঠিক করে দিয়েছেন, কে বড় লোক আর কে ছোট লোক।
তাই মানুষের এখানে কিছু করার নাই।

আশরাফ: আমায় কথা শোনাচ্ছ তুমি?
রাহিন: কথা শোনাচ্ছি না! বাস্তবটা দেখাচ্ছি।
আর একটা কথা আমি বিয়ের আগে কোনো কাজ করবো না।

আশরাফ রেগে বললেন।
আশরাফ: তোমার লজ্জা করে না, আমাদের সামনে বিয়ের কথা বলতে?
রাহিন: বিয়ের বয়স হয়েছে, তাই আমি আমার বিয়ের কথা বলতে পারি। এখানে লজ্জার কিছু নেই।

আশরাফ আর কোনো কথা না বলে খাবার টেবিল থেকে চলে যান।
আমিনা পিছন ডাকার সাহস পাননি।
তিশা: ভাইয়া দিলি তো আব্বুকে রাগিয়ে?

রাহিন: আম্মু এই মানুষটা এমন কেন?
কিভাবে এতোটা বছর এই অহংকারী মানুষটার সাথে কাটিয়েছো?
আমিনা বেগম মুচকি হাসলেন।
আমিনা: তোর আব্বু হঠাৎ পরিবর্তন হয়েছেরে।
রাহিন আর কিছু বললো না।

যে যার যার রুমে চলে যায়।
আশরাফ বিছানায় শুয়ে আছে।
চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।

সে কি স্বাদেই এসব করছে।
কেউ যে তার কানে বিষ
ঢেলে দিয়েছে সেদিন আমিনার পরিবারের নামে।

কিন্তু কথার সত্যটা না জেনেই আজ এতোটা বছর ধরে আমিনার বাড়িতে যান না আশরাফ।
রাহিনকেও ৬ দিন আগে বাসায় নিয়ে আসেন।
রাহিন তার নানাবাড়ি আজ ৭টা বছর ধরে থাকছে।

সিলেটে পড়ালেখাও করলেও, সে বাসায় থাকতো না।
আশরাফ নিজেই এসব ভাবছেন।
অবিচার করছেন কি দুই ফ্যামিলির উপর?
উত্তরটা অজানা।

আমিনা খাবার প্লেট হাতে নিয়ে রুমে ঢুকলেন।
আশরাফ আমিনার হাতে খাবার প্লেট দেখে, চোখ দুটো বন্ধ করে নিলেন।
কিন্তু চোখের কোণে থাকা পানি গুলো গালের পাশ বেয়ে কানের দিকে পড়লো।
আমিনার চোখে পানিটা পরলো।
আমিনা প্লেটটা হাত থেকে রেখে।

আমিনা: কষ্ট পেয়েছো রাহিনের কথায়?
আশরাফ কিছু না বলে মাথা দিয়ে “না” ইশারা করলো।
আমিনা: তাহলে?
আশরাফ চুপ থাকলেন।
কি বলবেন আমিনাকে?

তিনি যে আজো এতো বছর ধরে সত্যটা জানতে পারেন নি।
তাই চুপ রইলেন।
আমিনা আশরাফ কে চুপ থাকতে দেখে, খাবার প্লেটটা হাতে নিলেন।
আমিনা: ”হা করো”?

আশরাফ: আমার খিদে নাই!
আমিনা: আমি জানি তুমি রাতে না খেয়ে থাকতে পারো না।
তাই মিথ্যা না বলে খাবারটা খেয়ে নাও?

আশরাফ আর কিছু না বলে “হা” করলো।
আমিনাও আর কিছু না বলে একের পর এক লুকমা খাবার দিতে লাগলেন আশরাফের মুখে।
আশরাফও আনন্দে খাচ্ছে।

তিশা যাচ্ছিলো এই দিকে, হঠাৎ এই দৃশ্যটা দেখে অবাক হলো তিশা।
তিশা এতোটা পিচ্চি না।
এবার অনার্সে উঠেছে।
তিশা আর এক মিনিট দাঁড়িয়ে না থেকে রাহিনের রুমে দৌড়ে যায়।
রাহিন কারো একটা ফটোর দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের পানি ফেলছে।
আজ ৬টা দিন ধরে কথা হয় না তার।

দরজাড় দিকে কাউকে আসতে দেখে ফটোটা বালিশের নিচে রেখে দিলো।
তিশা দৌড়ে এসে হাঁপাতে লাগলো।
রাহিন: কি হয়েছে তিশা? (তিশার এমন ভাবে দৌড়ে আসাটা দেখে রাহিন বিছানা থেকে উঠতে উঠতে কথাটা বললো)

তিশা: ভাইয়া তাড়াতাড়ি আয়, লেইট হলে তুই মিস করে ফেলবি।
রাহিন কিছু বলতে গেলে, তিশা রাহিনকে ধরে নিয়ে যায়।
রাহিন আর তিশা চোখ এর তৃষ্ণা মিটিয়ে দেখছে তাদের মা বাবার এই ভালোবাসাটা।
রাহিন হাতে থাকা ফোনটার ক্যামেরা অন করলো।

এই দৃশ্যটা থাক না ক্যামেরা বন্ধি হয়ে।
সকাল হয়েছে,
মুগ্ধা গায়ে সুয়েটার পড়ে তার বুবুর কবরের সামনে যায়।
নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নিশির কবরের সামনে মুগ্ধা।
এখনো সূর্য উঠে নি।

মুগ্ধা ফযরের নামাজ পড়েই তার বুবুকে দেখতে আসে।
মুগ্ধাঃ বুবু একবার তো তোমার পিচ্চি বোনটাকে সব বলতে পারতে।
বুবু কেন এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলে?
তোমার কি একটু কষ্ট হয় নি?

আমাদের ছেড়ে যেতে।ও বুবু
আমি এখন কার সাথে ঝগড়া করবো?
ও বুবু কি হয়েছিলো তোমার সাথে।
আমার বিশ্বাস! আমার বুবু কখনো আত্মহত্যা এর মতো খারাপ পাপ কাজ করবে না।

ও বুবু,
মুগ্ধা মাটিতে বসে পড়লো।
চোখ দুটো থেকে অনবরত পানি পড়ছে।
মুগ্ধা নিশির কবরের মাটিতে হাত বোলাতে বোলাতে বললো,
মুগ্ধাঃ ও বুবু একবার যদি জানতে পারি, তুমি আত্মহত্যা করো নি।

তোমাকে কেউ খুন করেছে।
তাহলে আল্লাহ্ এর কসম আমি তাকে ছাড়বো না বুবু।
বুবু সেও আসেনি তোমায় দেখতে।

ও বুবু এসব কথার উত্তর আমায় কে দিবে?
রমিজ মিয়া ফজরের নামাজ পড়ে, নিশির রুমে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে গেলেই মনে হলো নিশিতো আর এই পৃথিবীতে নাই।
রমিজের চোখ দুটো ভিজে যায়।

চোখের পানি মুছে নেন গায়ের চাদর দিয়ে।
মুগ্ধার রুমে গিয়ে দেখেন মুগ্ধা বিছানায় নাই।
তাই আর কিছু না ভেবেই নিশির কবরের দিকে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরে তাকালেন।
পিছনে জেনিফাকে দেখলেন।

জেনিফাঃ মুগ্ধা উঠেছে?
রমিজ: হুম।
জেনিফাঃ আমি না নিশির রুমে নিশিকে ডাকতে যাই।
গিয়ে মনে হলো আমার নিশিতো এই পৃথিবীতে নাই।
(জেনিফা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।)

রমিজ নিজের স্ত্রীকে কি শান্তনা দিবেন।
নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সন্তান হারানোর ব্যথা যদি কেউ বুঝতো?

কেন করলো নিশি এমন?
জেনিফাঃ আমাদের কান্না করলে হবে না।
আমাদের এখনো একটা মেয়ে আছে।
ওরে নিয়া আমরা বাঁচবো সারাজীবন।

ওর সামনে আমাদের শক্ত থাকতে হবে।
রমিজ কোনো কথা না বলে জেনিফাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেন।
জেনিফাঃ আমি নিশির কবরের পাশে যাবো?

রমিজ: আসো?
রমিজ মিয়া আর জেনিফা বেগম কুয়াশায় ঘেরা অন্ধকারে কাউকে দেখতে পেলেন নিশির কবরের সামনে কেউ বসে আছে।

তাদের আর বুঝতে বাকি নেই এটা তাদের মুগ্ধা।
আস্তে আস্তে দু’জন গিয়ে মুগ্ধার পাশে বসেন।

মুগ্ধার কান্না শুনে দু’জনের কলিজা ফেটে যাচ্ছে।
কিন্তু মেয়ের সামনে যে কান্না করলে হবে না।
শজত থাকতে হবে তাদের।
আস্তে আস্তে অন্ধকার ফেটে আলোর ছিটা আসলো ভবে।
কুয়াশা ঝুব পরেছে।

খুব ঠাণ্ডা।
মুগ্ধা নিজের রুমে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে।
ঠাণ্ডার জন্য কিছুই কিরতে ইচ্ছা করছে না।
পাশের বাড়ির চাচীরা আর আরো অনেকেই আসছে তাদের দেখতে।
রেহানঃ নিতিন কবে যাবি সিলেট?

নিতিনঃ ওদের এভাবে রেখে তো এখন আর যাওয়া যাবে না।
কয়েকটা দিন থাকবো।
আর তুইও আমার সাথে থাকবি?
রেহানঃ আমি আজ চলে যাইরে?

নিতিনঃ না, আমার সাথে যাবি তুই।
রেহান আর কিছু বললো না।
সকালে এসে রেহান এর গাড়িটি নিয়ে যায় ওদের ড্রাইভার।
নিতিনঃ ছোট মা
আম্মা খাবার দিয়েছেন।

জেনিফা টেবিলে রাখতে বললেন।
পেছন পেছন আয়েশা আসলো ভাত নিয়ে।
জেনিফার ভালো লাগছে আয়েশার পরিবর্তন দেখে।
নিশি যদি দেখতে পারতো?

নিতিন আর রেহান খাবার প্লেট নিয়ে মুগ্ধার রুমে আসে।
নিতিন মুগ্ধাকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে।
মুগ্ধাও নিতিনের হাতে খুব ভালবেসে খাবার খাচ্ছে।
রেহান এর চোখের কোণে পানি এসে জমলো।

যেটা মুগ্ধার চোখে পরলো।
কিন্তু মুগ্ধা কিছু বললো না।
মুগ্ধা খাবার খাচ্ছে আর বলছে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া মনে আছে

বুবুকেও এভাবে খাবার খাইয়ে দিতে, আর তুমি বলতে, আমার নিশি বোনটার বর এভাবে খাইয়ে দিবে ভালোবেসে।
(মুগ্ধা কেঁদে দেয়)
নিতিনঃ বোন আমার, এসব এখন মনে না করলে হয় না?
মুগ্ধা চুপ হয়ে যায়।

নিতিন এর ভালোবাসার কাছে মুগ্ধা আর নিশি বারবার হেরে গিয়েছে।
নিশি সব সময় বলতো, ভাইয়া তোমার বউ আসবে যখন, তখন কি এভাবে খাইয়ে দিবে আমায়।
মুগ্ধার চোখে আবার পানি আসে।
নিতিন আবার দমক দিলো।

নিতিনঃ বলছি না তোকে, এভাবে কান্না করবি না।
তুই কি চাস তোর চোখের পানি দেখে আমাদের কষ্টটাও আরো বেশি হোক?
মুগ্ধা মাথা নাড়িয়ে “না” বুঝালো।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া তোমরা খেয়েছো?
নিতিনঃ হুম আমরা খেয়েছি।
মুগ্ধাঃ ওই ভাইয়াটার নাম কি?

ভুলে গেছি।
নিতিনঃ রেহান তালুকদার।
তুই তো সব ভুলে যাস।
রেহান মুচকি হাসলো।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া আমাদের গ্রামটা খুব সুন্দর, নিতিন ভাইয়া তুমি সব দেখাবা কিন্তু।
মুগ্ধাকে স্বাভাবিক রাখার জন্য নিতিন আর রেহান নানান ভাবে মুগ্ধাকে হাসাতে লাগলো।
নিতিন আর রেহান ঘুরতে বের হলো।
রেহান এর আগে কখনো গ্রামে আসেনি।
তাই তার খুব ভালো লাগছে।
আর গ্রামটা খুব সুন্দর।

নিতিন আর রেহান কথা বলছে আর রাস্তায় হাটছে।
মুগ্ধা তখনকার কথা ভাবছে।
নিতিন ভাইয়া খাবার খাওয়ানোর সময় রেহান ভাইয়া কাঁদলো কেন?
আর আমরা দেখার আগেই বা কেন লুকিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো।
কেন কাঁদলো ভাইয়াটা?

রেহান এম মনমাতানো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে।
পাহাড়ের মতো উঁচু উঁচু টিলা। যা দেখতে ছোট ছোট পাহাড় এর মতো।
আবার সেই টিলা গুলোতে নানান রঙের গাছ।

আবার টিলার পিছনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দানব আকারে বড়বড় পাহাড়।
রেহান ভাবছে যদি ওই পাহাড় গুলোতে যেতে পারতো।
কিন্তু ভিসা ছাড়া তো আর ইন্ডিয়া যাওয়া যাবে না।
রেহান এর খুব রাগ হলো।

সিলেটেও এমন পাহাড় আছে যেগুলো ইন্ডিয়ায়।
বাংলাদেশে যে জায়গা গুলোতে পাহাড় রয়েছে, সেই জায়গা গুলো তে যাওয়া হয় নি তার।
রেহান আর নিতিন হাটছে আর টুকটাক কথা বলছে।
রাস্তায় চেয়ারম্যান এর সাথে দেখা হয়েছিল।
রেহান আগেই চেয়ারম্যান কে সালাম দেয়।

কিন্তু চেয়ারম্যান সালামের উত্তর না দিয়ে
কথা শুনালো নিতিন কে।
বললো যে, মুগ্ধার করা অপমানের ফল খুব ভয়াবহ হবে।
এটা শুনে নিতিন খুব ভয় পেয়ে যায়।

— নিতিন ভাইয়া না তুমি?
এলোপাথারি রাস্তা থেকে উঠে আসা এক মেয়ে কথাটা বললো নিতিনকে।
নিতিন ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখলো।
নিতিনঃ সুমা না তুই?

সুমা: হুম, তোমাকে তো এখন আর দেখাই যায় না?
(জমশেদ মিয়ার বড় ছেলে রফিকের মেয়ে সুমা)
নিতিনঃ সময় পাই না রে।
সুমা: নিশি আর মুগ্ধা কেমন আছে?
নিতিন রেগে বলল।

নিতিনঃ মজা করছিস তুই?
এভাবে কথা বলাতে সুমা একটু ভয় পেলো।
সুমা: মজা করবো কেন?
নিতিনঃ তুই কিছু জানিস না?
সুমাঃ কি জানবো?

নিতিনঃ জানিস আমি বাড়িতে কেন আসছি?
সুমা: না,
নিতিনের কষ্ট হচ্ছে তারপরেও বললো,
নিতিনঃ নিশির মরার খবর শুনে।
সুমা কথাটা শুনে খুব বড় ধাক্কা খেলো।

সুমা আর নিশি এক সাথেই পড়ালেখা করেছে। আরো একটা সম্পর্ক আছে সুমা আর নিশির।
সুমা: নিতিন ভাইয়া কি বলছো তুমি এসব? ( সুমার চোখে পানির ঝলক দেখা যাচ্ছে।)
নিতিনঃ তুই কিছুই জানিস না?
সুমা: না,
নিতিনঃ সারা গ্রাম জানে, আর তুই জানিস না?
সুমা মাথা দিয়ে “না” বলল।

নিতিনঃ নিশি আত্মহত্যা করেছে।
কথাটা শুনে সুমা দুই পা পিছিয়ে যায়।
সুমা: মামানেএএ? (চিৎকার করে উঠলো)

নিতিনঃ জানি না রে আমার বোনটা কেন এমন করলো।
সুমা আর কিছু না বলে পিছন ফিরে ওর নিজের বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করলো।
পিছন থেকে নিতিন বারবার ডাকলেও।
ফিরে তাকায় নি সুমা।

রেহানঃ মেয়েটা এমন করলো কেন?
নিতিনঃ জানি না আমি।
কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
রেহান আর কিছু বললো না।

ওরাও পিছন ফিরে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
কিন্তু রেহান আর নিতিন দু’জনি ভাবছে সুমার এমন করার মানে কি?
কি আছে এর পিছনে রহস্যটা?

বাড়িতে এসে নিতিন মুগ্ধাকে দুপুর এর খাবার খাইয়ে দিলো।
জেনিফা ওদের ভাইবোনের ভালোবাসা দেখে সত্যিই খুব আনন্দ পাচ্ছেন।
রেহানের সাথে কথা হয়নি এখনো জেনিফার।

তাই জেনিফা আজিজুল মিয়ার ঘরে যান।
আয়েশা জেনিফাকে দেখে বললেন।
যে কিছু লাগবে কি-না?
জেনিফা না করলেন।

রেহান মুগ্ধা আর নিতিন এর ভাইবোনের ভালোবাসাটা দেখে খুব আনন্দ পাচ্ছে।
আর এটা ভেবে খারাপ লাগছে, মুগ্ধার সামনে খুব বিপদ।
একটা জিনিস ভাবলো রেহান।
হঠাৎ দরজায় জেনিফাকে দেখে বিছানায় উঠে বসলো রেহান।
রেহানঃ আসসালামু আলাইকুম আন্টি।

জেনিফা সালামের উত্তর দিয়ে বললেন।
জেনিফাঃ বাবা তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো?
আমাদের গ্রামের লোকগুলো খুব খারাপ গো বাবা।

রেহান জেনিফার কথা শুনে বললো,
রেহানঃ আন্টি ধন্যবাদ কেন দিবা।
আমি তো আপনার ছেলের মতো।

আর এই কাজটা আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও করতো।
জেনিফা কথাগুলো শুনে অনেক খুশি হন।
আরো অনেক কথা বলেন রেহানের সাথে।

রেহান জেনিফাকে বললো, যে নিশির মরার পেছনে কোনো রহস্য আছে।
জেনিফাও এই কথাতে সম্মতি দেন।
রেহান ভাবছে একটা কথা বলবে কি-না?
তাই ভয়কে জয় করে বলেই ফেললো।

রেহানঃ আন্টি একটা কথা বলবো?
জেনিফাঃ বলো বাবা।
তারপর জেনিফাকে রেহান কিছু কথা বললো,
রেহানের কথাতে প্রথম রাজি না হলেও, কিন্তু রেহান বুঝানোর পর জেনিফা রাজি হয়ে জান।
রেহানের কাছ থেকে হাসি মুখে ফিরলেন জেনিফা।

— ছোট ভাই আর কতক্ষণ ঘুমাবে তুমি?
দরজায় ধাক্কাচ্ছে মণিমা। আর কথাগুলো বলছে।
–বাংলাদেশের মানুষ এতো খারাপ কেন? শান্তিতে ঘুমাতেও দেয় না।
(কথা গুলো বলতে বলতে দরজা খুললো রাইয়ান।)

মণিমাঃ বাংলাদেশের মানুষ খারাপ তাই না।
দুই বছর লন্ডন থেকেই লন্ডনের মানুষকে ভালোবেসে ফেললে?
(রাইয়ান এর কান টেনে কথা গুলো বললো মণিমা)
রাইয়ানঃ ভাবি ভাবি সরি সরি।

তুমি আমার মিষ্টি ভাবি।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক ভালো।
আদুরী গলায় বললো,
মণিমা হেসে বললো,

মণিমাঃ সবাই নিচে অপেক্ষা করছে।
তাড়াতাড়ি আসো দুপুরের খাবার খাবে।
রাইয়ানঃ হুম, তুমি যাও, আমি আসছি।
সকালের নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলো রাইয়ান।
এক সপ্তাহ হলো দেশে আসছে সে।

পড়ার জন্যে গিয়েছিলো লন্ডন।
(রাইয়ান রহমান, বাবা মেরহাব রহমান এর ছোট ছেলে, খুব রাগী,
বড় ভাই মাহবুব রহমান৷ আর মণিকা হলো মাহবুব এর স্ত্রী।

মা মরেছেন রাইয়ানকে ৬ বছরের রেখে।)
রাইয়ান ফ্রেশ হয়ে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে যায়।


পার্ট: ৪

রাইয়ান ফ্রেশ হয়ে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে যায়।
মণিমা ওদের তিনজনকে খাবার দিচ্ছে।
মেরহাব: রাইয়ান দেশে কি করবি এখন?
মণিমাঃ বাবা তোমায় বলছিনা খাবার সময় কোনো কথা বলবে না?
(রাগী গলায় বললো মণিমা।)

মেরহাব: মনেই ছিলো না’রে মা।
(অপরাধীর মতো কথাটা বলে, খাবার এর দিকে মন দিলেন মেরহাব)
রাইয়ান আর মাহবুব হেসে উঠে শব্দ করে।

মাহবুব কে ২০ বছর বয়সের সময় বিয়ে করান মেরহাব।
ফ্যামিলি চলছিলো না মেরহাব এর, অফিস আর ফ্যামিলি আর রাইয়ান, এই তিনটা জিনিস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মেরহাব।

তাই মাহবুবকে ছোট থাকতেই বিয়ে করান নিজের বন্ধুর মেয়ে মণিমার সাথে।
বিয়ের দিন সবার সামনে মণিমাকে সবার গার্জিয়ান বানিয়ে দিয়েছেন মেরহাব।
মণিমাও সেদিন থেকে এই ফ্যামিলিটাকে খুব ভালোবাসে।
রাস্তায় হাটছে তোহফা,
নাম তাহসিন তোহফা।

আজকেই আশ্রম থেকে পালিয়ে আসলো।
পড়নের কাপড় আর একটা কাপড়ের ব্যাগ আর কিছু টাকা নিয়ে আসলো আশ্রম থেকে। টাকা গুলো তানিয়া দিয়েছে। বলছে যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকেও এখান থেকে ছাড়িয়ে নিবি। (তানিয়া এই কথা গুলো বলেছে তোহফাকে।)

পাগলের মতো হাটছে তোহফা।
অচেনা রাস্তা, তাও ঠাণ্ডা। দুপুর হয়েছে কিন্তু এখনো সূর্যের দেখা নাই।
তোহফা রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুই চিনে না সে।

কোথায় যাবে এই এতো বড় শহরে।
রাতগুলোই বা কোথায় কাটাবে তোহফা।
মাথা ধরে আসছে তোহফার। একদিকে তো ঠাণ্ডা।
আর অন্য দিকে একটু আশ্রয়।

রাইয়ান দুপুরের খাবার খেয়ে বেড়িয়ে পরে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে।
বাসা থেকে বের হতেই, ওর চোখ পরে তোহফার দিকে।
গাড়িটা থামিয়ে, সে তোহফার কাছে যায়।
তোহফা তখনো শীতে কাঁপছিলো।

তোহফা কোনো ছেলেকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে যায়।
এই নিরিবিলি জায়গায় অচেনা ছেলে তার সামনে, ভয়ে ভিতর ঠাণ্ডা হয়ে যায় তোহফার।
রাইয়ান কিছু বলতে গেলেই, তোহফা বলে উঠে।
তোহফাঃ ভাইয়া আমার কোনো ক্ষতি করবেন না।

আমি চলে যাচ্চি এখান
থেকে।
(কথা বলার সময়ও কাঁপছিলো তোহফা। ঠাণ্ডার জন্য সবাই কতো কি না পড়ে।
আর তোহফা তো শুধু একটা কামিজ পড়ে আছে।)

রাইয়ান হাসলো তোহফার কথায়।
রাইয়ানঃ কে আপনি?
আর এই ঠাণ্ডার মধ্যে এভাবে ঠাণ্ডার কাপড় ছাড়াই বসে আছেন।
তোহফা কি বলবে?

লোকটাকে দেখে তোহফার খারাপ লাগেনি।
তাই সব বলে দিলো।
তোহফাঃ আমি আজ সকালেই আশ্রম থেকে পালিয়ে আসছি।
এই পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নাই।
কেঁদে দেয় তোহফা।

রাইয়ান কি বলবে ভেবে পেলো না।
কিছু সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলো
রাইয়ান।
উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মেয়ে তোহফা।

হয়তো কিছু মুখে দেয় না, তাই আসল রূপটা ফুটছে না।
রাইয়ান ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,
রাইয়ানঃ নাম কি আপনার?
তোহফাঃ তোহফা তাহসিন তোহফা।

রাইয়ানঃ কোথায় যাবেন এখন?
কোথায় যাবে এই উত্তরটা যে তোহফার অজানা।
তারপরেও বললো,
তোহফাঃ গন্তব্য আমার অজানা।

রাইয়ান তার পড়নের সুয়েটার এগিয়ে দিয়ে বললো,
রাইয়ানঃ এটা পড়ে নেন?
তোহফা কোনো কথা না বলেই রাইয়ান এর সুয়েটারটা পড়ে নেয়।
রাইয়ানঃ আসেন আমার সাথে?
তোহফাঃ কোথায় যাবো আমি?

আমি আপনাকে চিনিও না, আমি আপনার সাথে যাবো না।
কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
রাইয়ানঃ আস্তে আস্তে চিনে জাবেন আমায়।
আমি রাইয়ান রহমান।

কথাটা বলেই তোহফার কাপড়ের ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়।
তোহফা শুধু অবাক হয়ে দেখছে।
রাইয়ানঃ আসেন আমার সাথে?
গাড়িতে বসেন।

তোহফা আর কোনো কথা বললো না।
বাস্তব যে তার সাথে না।
সে জানে না তার মা বাবা কে?
সে জানে না তার ধর্ম কি?

তারপরেও সে ছোট থেকে মুসলিম।
আশ্রম এর মহিলা ছোট থাকতে তাকে একদিন বলেছিলো সে মুসলিম ঘরের মেয়ে।
আশ্রম এর মহিলাটা ছিলো খুব খারাপ আর রহস্যে ঘেরা এক মহিলা।
আশ্রমের করা অত্যাচারের কথাগুলোই মনে হতে চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করে তোহফার।

রাইয়ান তোহফার চোখে পানি দেখে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলো না।
রাইয়ান হাতে ব্যাগ নিয়ে বাসার কলিংবেলে বাজালো।
মণিমা মাহবুবের সাথে কথা বলছিলো।
মেরহাব আর মাহবুব অফিসে চলে যান।

তাই মণিমা মাহবুব এর সাথে কথা বলছিলো।
মণিমা ফোনটা রেখে দিয়ে আসলো দরজা খুলে দিতে।
মণিমা দিরজা খুলে রাইয়ান কে দেখে বললো,
মণিমাঃ তুমি না এই মাত্র
গে,
রাইয়ানের পিছনে অচেনা মেয়েকে দেখে থেমে যায় মণিমা।
মণিমা আবার কোনো প্রশ্ন করতে গেলে।
রাইয়ান বলল।
রাইয়ানঃ ভাবি সব প্রশ্ন পরে করবে, আগে আমাদেত বাসায় ঢুকতে দাও তো।
মণিমাও দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়।
তোহফাকে নিয়ে বাসায় ঢুকলো রাইয়ান।
ড্রয়িং রুমে গিয়ে সোফায় বসলো রাইয়ান।
মণিমাঃ কে মেয়েটা?
রাইয়ান তোহফার দিকে একবার তাকালো।
রাইয়ানঃ কে সেটা আমিও জানি না।
তবে যেটুকু জানি সেটুকু বলছি।
নাম তাহসিন তোহফা।
আশ্রম থেকে পালিয়ে আসছে।
মণিমা তোহফার দিকে ভালো ভাবে তাকালো।

তাকিয়ে বুঝতে চাইলো। রাইয়ানের কথাগুলো কি সত্য?
রাইয়ানঃ ভাবি তুমি উনাকে আমাদের একটা রুমে নিয়ে যাও?
আর খাবার দিয়ো?
মনে তো হয় না, সকাল থেকে কিছু খেয়েছে বলে।

তোহফা নিচের দিকে তাকালো।
সত্যিই তার খুব খিদে লেগেছে।
মণিমাঃ হুম, আসো বোন? (তোহফার হাতটা ধরে নিয়ে গেলো)
রাইয়ান তার রুমে চলে যায়।

জেনিফা আজ আবার রান্না করবেন।
একদিন তো আয়েশা খাওয়ালেন।
চাননা আয়েশাকে কষ্ট দিতে।
তাই আজ নিজেই রান্না করবেন।

আয়েশাকেও বলে দিয়েছেন, তিনি আজ রান্না করবেন।
জেনিফা হাজারো কষ্টকে মাটি চাপা দিয়ে, রান্নাতে মন দিলেন।
জেনিফা সারা রান্নাঘর খুঁজেও শুটকি পেলেন না।
ছুটে যান আয়েশার কাছে।

জেনিফাঃ ভাবি শুটকি আছে?
আয়েশাঃ নিতিনের বাপ তো এই কয়দিন ধরে শুটকি আনেই না।
জেনিফা হতাশ হয়ে চলে আসেন।
মুগ্ধার রুমে যান জেনিফা।

মুগ্ধা বিছানায় শুয়ে আছে।
জেনিফার আর বুঝতে বাকি নেই এখনো কান্না করছে মুগ্ধা।
তাই নিশির কথা আর মন করিয়ে দিতে চান না

জেনিফা।
জেনিফাঃ মুগ্ধা মা একটা কাজ করে দিবি?
মুগ্ধা বসতে বসতে বললো,
মুগ্ধাঃ বলো আম্মা।

জেনিফাঃ পাশের বাড়ি যা, গিয়ে বলবি আমি বলছি শুটকি দেওয়ার জন্য।
মুগ্ধাঃ কার কাছে বলবো?

আর শুটকি কেন?
জেনিফাঃ নয়নের মা’রে বলিস? তাহলেই দিবে।
তরকারি রান্না করবো। তাই।

মুগ্ধা কিছু না বলে উঠে যেতে নিলে আবার জেনিফার কাছে এসে বসে মুগ্ধা।
জেনিফাঃ চলে আসলি যে?
মুগ্ধাঃ আমি যাবো না আম্মা।

মন খারাপ করে বললো মুগ্ধা কথাটা।
জেনিফা অবাক হয়ে বললেন।
জেনিফাঃ কেন?
মুগ্ধা কিছু বলছে না।

জেনিফা আবার মুগ্ধাকে প্রশ্ন করলেন।
জেনিফাঃ কেন যাবি না?
মুগ্ধা এবার বললো,

মুগ্ধাঃ আম্মা ওই বাড়ির রাসেল ভাইয়া আমার দিকে কিভাবে যেন তাকায়।
আমার ভালো লাগে না। উনার তাকানোটা।
খুব খারাপ ওই রাসেল ভাইয়া।
কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো মুগ্ধা কথাগুলো।

জেনিফা মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে খুব অবাক হন।
উনিও এর আগে একবার শুনেছেন রাসেলের নামে খারাপ কথা।
তখন এতো প্রাধান্য দেননি কথাগুলো।

জেনিফা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
আর রান্না ঘরের দিকে চলে যান।
হাতে একটা ঠেঙি দা নিয়ে আসেন।

দা টা মুগ্ধার হাতে দিলেন আর বললেন।
জেনিফাঃ মুগ্ধা মা আমরা হয়তো গরীব। কিন্তু আমরা মানুষ।

মনে রাখবি তোর মতো সুন্দরী এই গ্রামে আর দুটো নেই।
তোর আর নিশির সুন্দর্যের জন্যই আমি তোদের পড়ালেখা বন্ধ করে দেই।
কারণ একটাই এই পাহাড়ি এলাকায় মেয়েরাই বেশি নির্যাতিত।

আর শুন মা। এই দা তোর অস্ত্র। কেউ তোর শরীরের দিকে খারাপ নজরে তাকালেই শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে দিবি।
আমি আমার মুগ্ধাকে দুইদিন আগের মুগ্ধার মতো দেখতে চাই।

সাহসী আর প্রতিবাদী মুগ্ধা।
তুই মেয়ে বলে যে প্রতিবাদ করবি না।
এটা কোথাও লেখা নাইরে মা।

নিজেকে নিজেই বাঁচাতে হবে।
আমি জানি আমার মুগ্ধা নিজেকে রক্ষা করার জন্য সব করতে পারে।
(কথা গুলো বলে, মুগ্ধাকে জড়িয়ে নেন নিজের বুকের সাথে।)
মুগ্ধা তার মায়ের কথা গুলো শুনে খুব ভালো লাগলো।

মুগ্ধাঃ হ্যাঁ আম্মা, আমি নিজেকে নিজেই রক্ষা করবো।
ছেলেদের মতো আমারো দুটো হাত আছে।
আমিও আমার হাতকে প্রতিবাদী বানাবো।

মনে রেখো আম্মা, তোমার এই মুগ্ধা কখনো হারবে না।
কথা গুলো বলে মুগ্ধা খালি হাতেই চলে যায়।
জেনিফা পিছন থেকে শুধু মুগ্ধার চলে যাওয়াটাই দেখলেন।
সত্যিই জেনিফা খুশি।

সময় ই চাঞ্চল্য মুগ্ধা নিজেকে নিয়ে ভাবে।
সেই চাঞ্চল্য মুগ্ধা কয়দিন আগে তার লাল পুতুল কে বিয়ে দিবে না বলে নিশির সাথে ঝগড়া করছিলো।

বলছিলো।
আমার লাল পুতুলটা আমার থাকবে।
তোমার পুতুলের সাথে আমার অন্য পুতুলের বিয়ে দিবো।

সেই কয়েকদিন আগের পিচ্চি অবুঝ মুগ্ধা আজ এক নতুন মুগ্ধা।
যার মধ্যে আছে অন্য এক মুগ্ধা।
জেনিফা হাসি মুখে নিজের চোখের পানি মুছে। আবার রান্না ঘরে কাজ করতে যান।
মুগ্ধার পথ আটকায় রাসেল।

রাসেল: আরে মুগ্ধা যে।
তোর বোন কেন রে গলায় দড়ি দিলো?
মুগ্ধা রাগান্বিত শুরে বললো,

মুগ্ধাঃ আমার পথ ছাড়ো?
রাসেল: এতো রাগ ভাল
না।
মুগ্ধাঃ পথ ছাড়ো?
রাসেল: এতো তাড়া কিসের?

মুগ্ধা ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় রাসেলের গালে।
রাসেল মুগ্ধার শরীরে হাত দিতে চেয়েছিলো।
মুগ্ধাঃ আমি অন্য মেয়েদের মতো না।
অন্যায় কে আশ্রয় দিবো।

আর কখনো আমার সামনে তোকে দেখছি?
তাহলে খুব খারাপ হবে।
মুগ্ধা কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে চলে যায় বাড়ির ভিতরে।
রাসেল গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

— পাকনা ভাঙতে হবে।
বিশ্রী ধরণের হাসি দিয়ে রাসেলও বাড়ির ভিতর ঢুকে যায়।
মুগ্ধা নয়নের মাথায় হাত দিয়ে থাবা দিয়ে।

মুগ্ধাঃ ওই নান্নু পিচ্চি
চাচী কোথায়?
নান্নু শব্দটা শুনে আর থাবা কেয়ে রেগে তাকালো নয়ন মুগ্ধার দিকে।
নয়ন: মুজ্ঞা আপা (মুগ্ধা বলতে পারে না, তাই মুজ্ঞা আপা বলে)
কইছি না আমারে নান্নু ডাকবা না?

মুগ্ধা মিষ্টি হেসে বললো,
মুগ্ধাঃ আর ডাকবো না, এবার বল চাচী কোথায়?
নয়ন মুখে কলা ঢুকিয়ে বললো,

নয়ন: আম্মা রান্না ঘরে রান্না করইন। (ভালো ভাবে কথা বলতে পারে নি। মুখে কলা ঢুকানোর জন্য)
মুগ্ধাঃ আচ্ছা আচ্ছা নান্নু পিচ্চি।(হেসে দেয় মুগ্ধা)
পিচ্চি নয়ন আবার রাগ দেখায় মুগ্ধার উপর।
মুগ্ধা ভেংচি কেটে ঘরের ভিতরে ঢুকে যায়।

(নয়ন এবার ক্লাস ওয়ানে পড়ে)
মুগ্ধা দুটো শুটকি নিয়ে বাড়িতে চলে আসে।
রাস্তায় আর রাসেল কে পায় নি।

মুগ্ধা ভাবছে থাপ্পড় খেয়ে হয়তো রাসেল ভয় পেয়েছে।
কিন্তু রাসেল কতোটা খারাপ সেটাতো আর মুগ্ধা জানে না।
জেনিফাঃ এতক্ষণ লাগলো যে মা?

মুগ্ধা রান্না ঘরে ঢুকতেই প্রশ্নটা করলেন।
মুগ্ধা ভয় না পেয়ে সব বলে দেয় তার মা’য়ের কাছে।
এটাও বলে।
সে রাসেলকে থাপ্পড় দিয়েছে।
রাত হয়েছে।

মুগ্ধাকে সাথে নিয়ে গল্প করছে নিতিন আর রেহান।
নিতিনের পাশাপাশি রেহানও চাচ্ছে মুগ্ধাকে হাসিখুশি রাখতে।
জেনিফা আর রমিজ বাহির থেকে শক্ত হলেও ভিতরে কান্না করে দুটি দেহ।
কিন্তু মুগ্ধা বাহিরেও নরম। এবং ভিতরেও।

নিতিন আর রেহান এর পাশ থেকে উঠে আসে মুগ্ধা।
এখন একটু সময় নিশির রুমে বসবে সে।
ওরাও আর কিছু বলেনি।
মুগ্ধাও নিশির রুমে এসে চুপ করে বসে আছে।

আর ভাবছে সেদিন রাতে কি হয়েছিলো তার বুবুর সাথে।
কিন্তু কোনো কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না মুগ্ধা।
মুগ্ধা তার বুবুর দুইটা জিনিস আজ দু’দিন ধরে খুঁজছে নীরবে।
কিন্তু পায়নি।

মুগ্ধা সেই মানুষটাকেও দেখতে পেলো না তার বুবুর মৃত্যুর দিন থেকেই।
মুগ্ধার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন?
বুবুর মৃত্যুতেও কেন আসলো না সে?

তাহলে কি বুবুর সাথে ঝগড়া? আর এই কারণে বুবু আত্মহত্যা করেছে?
কিন্তু বুবু তো কিছু বলেনি আমায় সেদিন রাতে?
মুগ্ধা আর কিছু ভাবতে পারছে না।
মাথাটা ধরে আসছে।

তাই সে নিশির রুম থেকে চলে যায় তার মা’য়ের কাছে।
জেনিফা কি রান্না করছে তা দেখার জন্য।
ছাঁদে বসে আছে রাহিন।
রাতের আকাশ দেখতে তার অনেক ভালো লাগে।

রাহিন মুক্ত ভাবে তাকিয়ে আছে অর্ধ খণ্ডিত চাঁদের দিকে।
পিছন থেকে তিশা ডাকলো।
তিশা: এই ভাইয়া তোর ফোন রুমে রেখে আসছিস।

আর ফোন রুমে কান্না করতে করতে গরম হয়ে গেলো।
তিশা হাসতে লাগলো।
রাহিন: কে ফোন দিয়েছে?
তিশা: দেখ তুই নিজেই।

রাহিন ফোনটা হাতে নিয়ে মুচকি হাসলো।
তিশা ভাবছে ফোনে থাকা নাম আর আমার মধ্যে কিছু চলছে।
এই নিয়ে দুটোর মধ্যে খুব ঝগড়া হয়।

তিশা রাহিনকে জিহ্বা দেখিয়ে চলে যায়।
রাহিন: কেমন আছো?
ওপাশ থেকে শান্ত ভাবেই রিপ্লাই আসলো।

রাহিন ভাবছে প্রশ্ন করবে কি-না?
কিন্তু প্রশ্ন করেনি।
ওপাশের জন রাহিনকে কিছু একটা বললো,
রাহিন: আব্বুর অবস্থা জানো তো তুমি?

ওপাশের জন আবার কিছু বললো,
রাহিন: আব্বু খুব রেগে আছেন নানা আর তোমার আব্বুদের উপর।
ওপাশে আবারো কিছু বলল।

এখন ওপাশে থাকা লোকটি অনেক কিছু বললো,
রাহিন: আমি কালকেই আসবো।
কি সারপ্রাইজ বলো না।

ওপাশের জন মনমরা হয়ে আবারো কিছু বলে ফোন রেখে দেয়।
রাহিন যা ভাবছে, হয়তো সব ঠিক হয়ে গেছে। হাসি মুখে তাকালো আকাশে থাকা চাঁদটার দিকে।
নানাবাড়ি সেই ফোনটাও রেখে আসছে।

কালকেই গিয়ে দেখবে সব।
কি হতে পারে সারপ্রাইজ।
কিন্তু রাহিনের হয়তো জানা নেই সারপ্রাইজ শব্দের মানেটা?

— রেহান কোথায়? আজ সকালে গিয়ে আমার মেয়ে রেহানকে ওর ম্যাচে পায় নি।
(মানিক তালুকদার কথাটা বলতে বলতে রেহানদের ঘরে ঢুকলেন।)
রামিছাঃ রেহান তার বন্ধুর সাথে গ্রামে গিয়েছে। (রেহানের মা)
মানিক: ভাইয়া কোথায়?

(রেহান এর ছোট চাচ্চু হলো মানিক তালুকদার।)
রামিছাঃ রুমেই আছেন। তুমি বসো আমি চা করে নিয়ে আসছি।
মানিক: না আমি বসবো না এখন।

রেহানকে তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলো।
আমি আমার মেয়ের সাথে রেহানের বিয়ে ঠিক করবো।
রামিছার একবারে সহ্য হয় না এই মানিককে।

তারপরেও ভালোভাবে কথা বলেন।
জাফরুল্লাহ কেন যে তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন।
রামিছাঃ সেটা রেহান আর রেহানের বাবাই ভালো জানে।

আর তোমার মেয়ের সাথে আমি থাকতে কখনো আমার রেহানেত বিয়ে দেবো না।
মানিক শয়তানি হাসি দিলো।
মানিকের ফোনটা বেজে উঠে।
রামিছার সামনেই ফোন ধরে মানিক।

ওপাশে কি কথা হলো তা রামিছা শুনতে পাননি।
কিন্তু মানিকের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন। মানিক খুব রেগে গেছে।
মানিক আর কোনো কথা না বলে চলে যায়।

ফোনে কথা বলতে বলতে।
রামিছা খুশি হন যখন মানিককে চিন্তিত দেখেন।
খারাপ যে সে কখনো হাসিখুশি থাকে না।

রামিছা আর কোনো কিছু না ভেবে দরজা আটকিয়ে নিজের রুমে চলে যান। জাফরুল্লাহ কে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে।
মেহরাব আর মাহবুব একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে রাইয়ানকে।
এটা দেখে মণিমা হাসছে।

কারণ মণিমা তোহফার থেকে সব জেনে নিয়েছে।
রাইয়ানঃ ভাইয়া আর আব্বু এতো প্রশ্ন করো কেন তোমরা?
মেয়েটা আমায় ভাইয়া ডেকেছে।

তাই আমার বোন নাই।
আমিও একটা বোন পেলাম। ভাবিকে একটা নন্দিনী এনে দিলাম।
রাইয়ান এর কথা শুনে মণিমার হাসি মুখ মলিন হিয়ে যায়।

সে ভাবছিলো তোহফাকে রাইয়ান এর বউ বানাবে।
রাইয়ান এর মুখে বোন শব্দটা শুনে তোহফার চোখ দুটো ভিজে যায়।
সত্যিই কি তোহফা কোনো পরিবার পেলো।

তোহফাকে নিয়ে অনেক আড্ডা দিলো রাইয়ান সহ সবাই।
সবাই যার যার রুমে ঘুমাতে চলে যায়।


পার্ট: ৫

রাহিন খুব সকালেই উঠে যায়।

ঠাণ্ডায় কাঁপছে রাহিন।
এতো সকাল গোসল করেছে তাই হয়তো ঠাণ্ডায় কাঁপছে।
সকাল ৮টা বাজে।

আমিনা রান্না ঘরে নাশতা তৈরি করছেন।
রাহিন রান্না ঘরে যায়।
রাহিন: আম্মু নাশতা কিছু তৈরি করেছো?

রাহিনের গলা শুনে পিছন ফিরে তাকান আমিনা।
অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন আমিনা।
আমিনা: শার্ট-প্যান্ট পড়ে কোথায় যাবি?
আর এতো সকাল গোসল করেছিস কেন?

রাহিন: মামার বাড়ি যাবো।
কিছু খাওয়ার থাকলে দাও। নইলে আমি মামার বাড়ি গিয়েই খাবো।
মামার বাড়ি শব্দটা শুনে কেঁপে উঠেন আমিনা।
আমিনা: তোর আব্বু রাগ করবে, তুই সেখানে গেলে।

আমি চাইনা বাবা এখন তোর আব্বু রেগে থাকুক।
দুই দিন পর রাহুল আসছে দেশে।
রাহিন: আম্মু চিন্তা করো না। আমি আব্বুকে বলেই যাবো।
আমিনা: তুই চাস তোর আব্বু সকাল সকাল আমার বাবার বাড়িকে কথা শুনাক।

আমার কষ্ট হয়রে, কেউ
আমার বাবা ভাইদের কটুকথা শুনালে।
রাহিন গিয়ে তার মা’কে জড়িয়ে ধরলো।
রাহিন: আম্মু তুমি শুধু আমার সাথে আসো।

আমি আব্বুকে রাজি করাচ্ছি।
আমিনা ছেলের দিকে তাকালেন।
ছেলে আজ কয়টা দিন ধরেই ঘরবন্ধি।
তাই গ্যাস অফ করে ছেলের পিছন পিছন চললেন।

রাহিন দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলো, তার বাবা ঠাণ্ডার কাপড় পড়ছেন।
বাসার ভিতর তেমন ঠাণ্ডা লাগে না।
তাই সামান্য কিছু পড়লেই হয়।
রাহিন আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকলো, সাথে আমিনাও।

আশরাফ: কিছু বলবি? (রাহিনকে ভিতরে ঢুকতে দেখে প্রশ্নটা করলেন)
রাহিন: আব্বু আমি মামার বাড়ি যাবো। বেশি না দুই দিন থেকেই চলে আসবো।
(নিচের দিকে তাকিয়ে এক সাথে কথা গুলো বলে থামলো)

রাহিনের মুখে মামার বাড়ি শব্দটা শুনে চোখ তুলে তাকান আমিনার দিকে।
আমিনা অপরাধীর মতো নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আর প্রস্তুত হচ্ছেন কথা শুনতে।
কিন্তু আশরাফ অবাক করে বললেন।

আশরাফ: ঠাণ্ডার কাপড় পড়ে যা, সেখানে তো খুব ঠাণ্ডা।
আর গাড়ি নিয়ে যাবি তো?
রাহিন আর আমিনা খুব অবাক হন আশরাফের কথা শুনে।
তাদের কল্পনার বাহিরে ছিলো।

রাহিন দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে।
রাহিন: থ্যাংকস আব্বু, তোমাকে এত্তগুলা থ্যাংকস।
আশরাফ মুচকি হাসলেন। ছেলের পাগলামী দেখে।

আস্তে আস্তে আশরাফ এর হাত দুটো রাহিনেত পিটে চলে যায়।
আশরাফও রাহিনের পিটে হাত বোলাতে শুরু করেন।
আশরাফ: কিছু খেয়েছিস?

রাহিন: না আব্বু, মামার বাড়ি গিয়ে খাবো।
আশরাফ: রাহুলের মা, যা নাশতা তৈরি করেছো, তা রাহিন কে দাও। এতোটা পথ তো আর না খেয়ে থাকতে পারবে না ছেলেটা।
আমিনা হাসি মুখে রান্না ঘরে যান।

আশরাফ কাল রাতেই ডিসিশন নিয়েছেন।
শুধু কারো কথার উপর ভিত্তি করে এমন করা ঠিক না। আর তিনি কোনো প্রমাণ পাননি।
তাই আর এমন ভুল করবেন না।

ঠিক আগের আশরাফ হবেন। যে আশরাফে ছিলো না কোনো অহংকার।
রাহিন অল্প কিছু নাশতা খেয়ে, তার গন্তব্য এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

রাইয়ান হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছাঁদে।
নাশতা করেই ছাঁদে চলে আসে। সিগারেট টানছে, আর আকাশ এর দিকে তাকিয়ে আছে।
চারদিকে কুয়াশা পড়েছে খুব।

কিন্তু বড় বড় বিল্ডিং এর জন্য কুয়াশা পড়া উপভোগ করতে পারছে না রাইয়ান।
তাই আকাশ এর দিকেই তাকিয়ে আছে।
পিছন থেকে কেউ বললো,

তোহফাঃ ভাইয়া আপনি সিগারেট এর মতো খারাপ নেশা করেন?
রাইয়ান কারো কণ্ঠ শুনে তাড়াতাড়ি করে সিগারেটটা ফেলে দেয়।
পিছনে তাকালো।
রাইয়ানঃ ও আপনি?

তোহফাঃ ভাইয়া সিগারেট কি ভালো জিনিস?
তোহফার প্রশ্নটা শুনে রাইয়ান তোহফার দিকে তাকালো।
রাইয়ানঃ অভ্যাস হয়ে গেছে।
তোহফাঃ ওও, (তোহফা আর কিছু বললো না। কারো ব্যক্তিগত কিছু নিয়ে কথা বলা তোহফার অপছন্দ নীয়।

রাইয়ানঃ ঘুম কেমন হলো আপনার?
আর কিছু প্রয়োজন হলেই ভাবি বা আমাদের বলবেন।
নিজের ফ্যামিলি ভাববেন আমাদের।
তোহফাঃ হুম।

ভাইয়া আমায় তুমি করেই বলেন।
আমি আপনার ছোট হবো।
রাইয়ানঃ তুমি আমায় ভাইয়া ডাকছো আবার আপনিও ডাকছো, তাই আমিও আপনি ডাকছিলাম।

তোহফা হাসলো।
রাইয়ান আবার বললো,
রাইয়ানঃ আমায় তুমি করে ডাকবে?
তোহফাঃ হুম।

দু’জন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
তোহফা ভাবছে এখানে কয়দিন থাকবে এভাবে।
তাই রাইয়ানকে প্রশ্ন করলো।
তোহফাঃ ভাইয়া একটা প্রশ্ন করি?

রাইয়ানঃ হুম।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
তোহফাঃ আমার জন্য একটা চাকরী দেখবেন।
আমি সব কাজ পাড়ি।

কম্পিউটার বা কাপড় শিলাই।
এসব আমি পাড়ি।
যেকুনো একটা কাজ হলেই আমার হবে।

তারপর আমি নিজেই বাসা খুঁজে নিবো।
(তোহফা এক শ্বাসে কথাগুলো বলে রাইয়ান এর দিকে তাকালো।)
রাইয়ান তোহফার দিকে
রাগি চোখে তাকিয়ে আছে।

এটা দেখে তোহফা ভয় পেয়ে যায়।
রাইয়ানঃ একটা থাপ্পড় দিয়ে সব কয়টা দাঁত ফেলে দিবো তোমার।
আর একবার যদি বলো চাকরী করার কথা।
আর নতুন বাসার কথা।

রাইয়ান এর কথায় ভয় পায় তোহফা, সত্যি সত্যি যদি থাপ্পড় দেয়।
তাই গালে হাত দিয়ে রাখলো তোহফা। আর বললো,
তোহফাঃ ভাইয়া কেউ যদি বলে আমি কে? আমার পরিচয় কি?
তখন কি বলবে।

তাই ব,
রাইয়ান হেসে দেয় তোহফার গালে হাত রাখা দেখে।
হাসিটা থামিয়ে রাগী গলায় বললো,
রাইয়ানঃ বলছি না, এটা তোমার ফ্যামিলি।
তোমারও কেউ নাই।

আর আমাদেরও কোনো বোন নাই। আব্বুর নাই কোনো মেয়ে। ভাবির নাই কোনো নন্দিনী।
দেখো তুমি একটা মানুষ হয়ে, তিনটা অভাব পূরণ করতে পারতেছো। বোন, মেয়ে,
নন্দিনী।
তোহফা রাইয়ানের কথা শুনে কেঁদে দেয়।

রাইয়ানঃ আরে পাগলী কান্না করছো কেন?
আরে আমি রাগ করে বলছিলাম থাপ্পড় দেওয়ার কথা।
তোহফা চোখে পানি রেখেই বললো,
তোহফাঃ আমি খুশিতে কান্না করছি ভাইয়া।

তুমি জানো একটা অনাথের সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত কি?
সেটা হলো, কোনো পরিবার পাওয়া।
জানো ভাইয়া?
আমি সেই ছোট থেকেই একটা আশ্রমে থাকতাম।

আশ্রমে প্রতিটা দিন প্রতিটা রাত ভাবতাম জানালার পাশে বসে।
কখন আমি মুক্তি পাবো এই নরক থেকে।
আশ্রমের মহিলা গুলো ছিলো খুব খারাফ।
ওদের মধ্যে একটা মহিলা খুব খারাপ ছিলো।

আমায় খুব অত্যাচার করতো।
বলতো আমায় অত্যাচার করার জন্য নাকি উপর থেকে টাকা আসে তাদের কাছে।
কোনো দোষ ছাড়াই আমায় মারতো।
এই দেখেন।

পায়ের কাপড় একটু উপর করে দেখালো প্রতিটা অত্যাচারের দাগ।
তোহফা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
রাইয়ান এসব দেখে আশ্রয় কথা শুনে হতবাক হয়।
রাইয়ান প্রশ্ন করলো।

রাইয়ানঃ উপর থেকে টাকা আসতো মানে?
ঠিক বুঝলাম না।
তোহফাঃ সেটা আমিও জানি না।

শুধু আশ্রম এর মহিলা এই কথা গুলোই বলতো।
রাইয়ান কিছুটা বুঝতে পারে, তোহফার রহস্য আছে।
কেন কেউ তোহফাকে অত্যাচার করার জন্য টাকা দিবে?
রাইয়ানঃ কান্না করবেনা প্লিজ।

আর কখনো কষ্ট পাবেনা তুমি।
এখন তো তোমার ফ্যামিলি আছে।
দুইটা ভাইয়া আছে, বাবা আছে, ভাবি আছে।
আর মন খারাপ করোনা প্লিজ?

তোহফা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বললো,
রাইয়ানঃ তুমি ছাঁদে থাকবে কি?
তোহফাঃ হুম, কিছুক্ষণ থাকি।

রাইয়ানঃ আচ্ছা আমি নিচে যাই।
তাড়াতাড়ি চলে আসবে কিন্তু।
ভাবির সাথে জমিয়ে আড্ডা দিবে তুমি।
তোহফাঃ হুম।

রাইয়ান চলে যেতে নিলে, আবার পিছন ফিরে বললো,
রাইয়ানঃ আমার সিগারেট খাওয়ার কথাটা কাউকে বলবে না প্লিজ।
অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই ছাড়তে পারছিনা।

তোহফাঃ হুম।
রাইয়ান নিচে চলে যায়।
তোহফা ওই দূর আকাশে চেয়ে আছে।
আকাশটা দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।

এর আগে কখনো এভাবে মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখার ভাগ্য হয় নি তোহফার।
সত্যিই কি সে পরিবার পেলো?
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছে।
রাহিন প্রায় কয়েক ঘন্টা পর তার গন্তব্যে পৌঁছায়।

হালকা রোধ উঠেছে।
রাহিন গাড়িটা বাড়ির ভিতর ঢুকিয়েই গাড়ির হরণ বাজায়।
গাড়ির শব্দ শুনে রাহিনের নানা আর বড় মামা ঘর থেকে বের হন।
রাহিনের ছোট মামা বিদেশে থাকেন।

রাহিনের নানা রাহিনকে দেখে কেঁদে দেন। আর প্রশ্ন করেন।
আশরাফ কিভাবে তাজে আসতে দিলো।
রাহিন বললো, আব্বু ভালো হয়ে গেছেন।
হয়তো তোমাদের উপর আর রেগে নাই।

রাহিনের মামা বললেন।
আশরাফের রাগের কারণটাও আজ পর্যন্ত জানিতে পারলাম না।
রাহিন ভিতরে যায়।
কিছুক্ষণ রেস্ট নেয়।

— কেমন আছো?
(রাগী গলায় প্রশ্নটা করলো রাহিনের বড় মামার মেয়ে)
রাহিন রাগের কারণটা বুঝতে পারেনি।
রাহিন: তুমি রাগছো কেন?
— সেটা তুমিও জানতে পারবে।

কথাটা বলার সময় কান্নায় গলা ভেঙে আসে মেয়েটির।
রাহিন কিছুই বুঝতে পারছেনা।
রাহিন তো অন্য কাউকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পরছে।
মেয়েটা সেটা বুঝতে পেরে৷
— সারপ্রাইজ নিবে না?

রাহিন: হুম বলো কি সারপ্রাইজ? যা ফোনে বলা যায় না।
আর এভাবে দেখাচ্ছে কেন তোমায়?
— আমার সাথে চলো?
কোনো প্রশ্ন করবে না।

রাহিন: হুম।
বাড়ি থেকে বের হবার সময় রাহিনের নানা কিছু জিজ্ঞেস করলে মেয়েটি বললো,
— দাদা আমি আর ভাইয়া কিছু সময় ঘুরে আসি।
তাই আর উনিও কিছু বললেন না।

রাহিনের মামা কি একটা খবর এর কথা বলতে গেলে। কিন্তু মেয়েটা তাড়া দিয়ে নিয়ে আসলো বাড়ি থেকে রাহিনকে।
রাহিন কিছুই বুঝতেছে না।
রাহিন আর মেয়েটা রাস্তায় হাটছে।

মুগ্ধা সকালের নাশতা করে শুয়ে পড়ছিলো।
বেশিই ঠাণ্ডা, তাই আর ঘর থেকে বের হয়নি মুগ্ধা।
রমিজ মিয়া আজ থেকে আবার কাজে যাচ্ছেন।
নিতিন আর রেহান আসলো মুগ্ধার রুমে।

জেনিফা গিয়ে বললো ওদেত আসতে।
মেয়েটাকে এভাবে মনমরা হয়ে থাকতে দেখতে পারছেন না জেনিফা।
কোনো মা’ই চাননা নিজের সন্তানকে মন খারাপ করে থাকতে দেখতে।
তাই ওদের বললেন, মুগ্ধাকে যেন ওরা হাসানোর চেষ্টা করে।

নিতিন আর রেহান কে দেখে শুয়া থেকে উঠে বসলো মুগ্ধা।
নিতিনঃ পিচ্চি বোন আমার, আজ ঘর থেকেই বের হলিনা যে?
মুগ্ধাঃ খুব ঠাণ্ডা তাই।
(পিচ্চি শব্দটা শুনে আবারো তার বুবুর কথা মনে পরে যায়।)
নিতিন বুঝতে পারে কি বলে ফেললো সে।

নানা ভাবে কথা বলে রেবান আর নিতিন মুগ্ধাকে হাসাচ্ছে।
একটু পর কারো গলার শব্দ শুনে মুগ্ধা সহ ওরাও ঘরের বাহিরে আসে।
— মুগ্ধা মুগ্ধা কোথায় তুই?
ডাক শুনে জেনিফাও রান্না ঘর থেকে আসেন।

মুগ্ধা বাহিরে এসে খুব বড় ধাক্কা খায়।
কারণ সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে।
তাকেই মুগ্ধা খুঁজছিলো তার বুবুর মৃত্যুর দিন থেকে।

মুগ্ধার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না।
নিতিন আর রেহান মুগ্ধার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
জেনিফা ভিতরে আসতো বললো ওদের।
ভিতরে আসার পর, মুগ্ধা কথা বললো,

মুগ্ধাঃ সুমা বুবু উনাকে কেন এখানে এনেছো?
(রেগে আর কান্না কণ্ঠে প্রশ্ন করলো।)
সুমা: সারপ্রাইজ দিতে এনেছি উনাকে।

রাহিন এবার কথা বললো,
রাহিন: কিসের সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ করছো এতক্ষণ ধরে।
সারা রাস্তায় কোনো কথাই বলো নি।

সুমা তাকালো রাহিনের দিকে। (সুমা হলো রাহিনের মামাতো বোন, জমশেদ হলো রাহিনের নানা। আর রফিক হলো সুমার বাবা, আর রাহিনের বড় মামা।)
মুগ্ধা কোনো কথা বলছে না।
মুগ্ধার ভিতর ফেটে যাচ্ছে।

জেনিফা এসে মুগ্ধার পাশে বসে।
রেহান আর নিতিন কিছুই বুঝতেছে না।
এবং কি জেনিফাও।
রাহিন লজ্জা ভেঙে বলেই ফেললো।

রাহিন: মুগ্ধা তোমার বুবু আমার উপর এখনো রেগে আছে?
আমি এখানে আসছি তারপরেও আমার সামনে আসলো না তোমার বুবু।
রাহিনের এমন কথায় সবাই অনেক বড় ধাক্কা খায়।

মুগ্ধা কোনো কথা বললো না।
জেনিফাঃ সুমা ছেলেটা কে? আর নিশির কথা জিজ্ঞেস করছে কেন?
সুমা জেনিফার কথার উত্তর না দিয়ে।

সুমা: সারপ্রাইজ নিবে না তুমি?
রাহিনকে বললো,
রাহিন মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বুঝালো।

সুমা: নিশি আর এই পৃথিবীতে নাই।
কথাটা বলতে গিয়ে সুমার গলা ধরে আসছিলো কান্নায়।
রাহিন কথাটা শুনে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়।

আর চিৎকার করে বলে।
রাহিন: কি বলছো তুমি এসব?
নিশির নামে এমন কথা বলতে তোমার কষ্ট হলো না?
(চিৎকার করে বলে।)

রাহিনের কথাটা শুনে মুগ্ধা কিছু বলতে গেলে জেনিফা বলে উঠেন।
জেনিফাঃ নিশি আত্মহত্যা করেছে দুই দিন আগে।
খুব সহজেই জেনিফা কথাটা বললেন।

জেনিফাকে চিনতে সমস্যা হয় নি রাহিনের।
নিশি জেনিফার ফটো দেখিয়েছিলো তাকে।
রাহিন চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে পরে।

রাহিন: এটা হতে পারে না।
আমার নিশি আমায় ছেড়ে যেতে পারে না।
তোমরা সবাই মিথ্যা বলছো।
নিশি রুমেই আছে।

নিশির রুম কোনটা আমায় বলো। আমি নিশির কাছে যাবো।
(রাহিনের চিৎকার করে কান্নায় সবার চোখে পানি চলে আসে।)
জেনিফার বুঝতে বাকি নেই এই ছেলেটা আর নিশির মধ্যে কিছু ছিলো।
নিতিন আর রেহানেরও বুঝতে বাকি নেই রাহিন নিশির কি ছিলো।

কিন্তু ছেলেটা কে?
জেনিফাঃ সুমা কি হয় তোর?
সুমা: আমার আমিনা ফুফুর ছেলে রাহিন।
মুগ্ধা বসা থেকে উঠে গিয়ে রাহিনের হাত ধরল।

মুগ্ধাঃ আমার বুবুর কাছে যাবে তাইনা? তাহলে আসো।
মুগ্ধা রাহিনের হাত ধরে টানতে টানতে উঠুনের পাশে নিশির কবরের সামনে নিয়ে আসে।
মুগ্ধাঃ এই নাও, দেখো আমার বুবু শুয়ে আছে এখানে।
(মুগ্ধা কান্না করছে)

রাহিন মাটিতে বসে পরে।
চিৎকার করে কান্না করছে।
রাহিনের চিৎকার শুনে আয়েশাও ঘর থেকে আসেন।
আর কয়েকজন মানুষ ভীড় জমায়।

রাহিন নিশির কবরের মাটি নিয়ে চিৎকার করে কান্না করছে।
মুগ্ধা গিয়ে রাহিনের হাত তার বুবুর কবর থেকে সরায়।
আর বললো,

মুগ্ধাঃ তুমি আমার বুবুর কবরে হাত দিবে না।
তোমার জন্য আমার বুবু আত্মহত্যা করেছে।
কি করেছো আমার বুবুর সাথে।
কেন আসোনি আমার বুবুর মরার দিন।

আজ কেন এসেছো?
এই অভিনয় করার জন্য?
রাহিন মুগ্ধার মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে যায়।

একদিকে তার ভালোবাসার মানুষ নেই এই পৃথিবীতে।
আর অন্যদিকে সেই মানুষটির মৃত্যুর জন্য থাকে দায়ী করা হচ্ছে।
রাহিন: মুগ্ধা কি বলছো তুমি?
তুমি কি জানোনা

আমি তোমার বুবুকে কথটা ভালোবাসতাম?
মুগ্ধাঃ এতোটাই ভালোবাসতে যে, তাহলে আসোনি কেন আমার বুবুর মরার দিন।
যখন সবাই আমার বুবুকে নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলছিলো।
তখন পাগলের মতো তোমায় খুঁজছিলাম।

কিন্তু পাইনি।
বলো কি করেছো আমার বুবুর সাথে, কেন আমার বুবু আত্মহত্যা করেছে।
(মুগ্ধাও চিৎকার করে কান্না করছে)
জেনিফা সহ সবাই দর্শক হয়ে সব দেখছেন।

জেনিফা কখনো ভাবতেই পারেন নি।নিশি কারো সাথে সম্পর্কে জড়াবে।
রাহিন: মুগ্ধা বিশ্বাস করো, নিশির সাথে আমার কিছু হয় নি।
আমরা তো একে ওপরকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম।

আর আমার নিশি কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না।
নিশি নিজেই বলতো ওর মতো সুখী মানুষ না-কি আর কেউ না।
নিশি মন খারাপ করেছিলো। আমার চলে যাবার কথা শুনে।

আর আমি ভুলে আমার ফোনটা এখানেই (মামার বাড়ি) রেখে যা,
কথাটা বলে থেমে যায় রাহিন।
আবার বলে।
রাহিন: আমি যে রুমে থাকি।
ওই রুমের বিছানার নিচে আমার ফোনটা পাবে। (সুমাকে বললো)
যাও ফোনটা গিয়ে নিয়ে আসো?

সুমাও চলে যায়। ফোন নিয়ে আসার জন্য।
রাহিন: সব উত্তর পেয়ে যাবে।
আমার বিশ্বাস আমার নিশি কখনো আত্মহত্যা এর মতো খারাপ কাজ করবে না।
মুগ্ধা তাকিয়ে আছে রাহিনের দিকে।

মুগ্ধারো বিশ্বাস। তার বুবু আত্মহত্যা করবে না।
কিন্তু চোখের দেখা তো আর অবিশ্বাস করা যায় না।
জেনিফা রাহিনের সাথে আরো অনেক কথা বলেন।

জেনিফা বুঝতে পারেন, ওদের ভালোবাসার সম্পর্কটা সুমা আর মুগ্ধা ছাড়া আর কেউ জানতো না।
সুমার বন্ধু ছিলো নিশি, একসাথে পড়তো ওরা।
সুমার মাধ্যমেই ওদের প্রেমের সম্পর্কটা হয়।
আর ওদের সম্পর্ক ৩ বছরের।

রাহিন নিশির সম্পর্কে আরো অনেক কিছু বলে ওদের।
রাহিনের একটা কথাই।
তার নিশি কখনো আত্মহত্যা করবে না।
সবাই অপেক্ষা করছে সুমার জন্য।

হয়তো তাদের অজানা কিছু থাকতে পারে রাহিনের ফোনে।
রাহিন বারান্ধার এক পাশে বসে কান্না করছে।
নিজের ভালোবাসার মৃত্যু।

আর কখনো তার প্রিয় মানুষটির সাথে কথা হবে না।
মুগ্ধা এসে রাহিনের পাশে বসে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া আমার বুবুর ফোন খুঁজে পাই নি বুবুর মৃত্যুর দিন থেকেই।

আর আমার বুবু কখনো কাপড় চেঞ্জ করে ঘুমায় না।
কিন্তু বুবুর লাশ যখন দেখি বুবুর রুমে, তখন বুবুর পড়নে অন্য কাপড় ছিলো।
যখন রাতে বুবুর সাথে গল্প করছিলাম তখন বুবুর পড়নে অন্য কাপড় ছিলো।
রাহিন: জানি না আমি কিছু।

আমার নিশিকে যদি কেউ খুন করে থাকে তাহলে আমি তাকে এই মাটিতেই পুথে দিবো।
মুগ্ধাঃ আমার বুবুকে খুন করাই হয়েছে।
বন্ধ ঘর থেকে ফোন কিভাবে উধাও হবে।

রাহিন তাকালো মুগ্ধার দিকে।
এই অবুঝ মেয়েটা খুব তাড়াতাড়ি সব পাল্টে নিয়েছে।
পিচ্চি মুগ্ধা আর নয় সে।
শুধু কি নিশির মৃত্যুতেই নিজেকে বদলে নিলো।

জেনিফা একটু দূরেই বসেছিলেন। উনার খারাপ লাগলো।
নিশি আর মুগ্ধা উনার কাছ থেকে আর রমিজের কাছ থেকে অনেক কথাই লুকিয়েছে।
নিশির ফোনও ছিলো।
অথচ জেনিফার অজানা।

কে খুন করবে নিশিকে?
উত্তরটা জেনিফার কাছে অজানা।
রাহিন আর মুগ্ধা কি পারবে প্রমাণ করতে নিশি আত্মহত্যা করেনি। ওরে খুন করা হয়েছে।
এসব ভাবনায় মগ্ন ছিলেন জেনিফা।

রেহান আর নিতিন শুধু দেখেই যাচ্ছে।
নিতিন জানতোই না, নিশির সম্পর্ক ছিলো কারো সাথে।
সুমা ফোনটা নিয়ে আসে।
এর মধ্যেই অনেক মানুষ জমা হয়ে গেছে মুগ্ধাদের বাড়িতে।

রাহিনের ফোনটা অফ থাকায়। মুগ্ধার কাছে দেয় ফোনটা চার্জ করিয়ে আনতে।
মুগ্ধা ফোনটা নিতিনের কাছে দেয় চার্জ করানোর জন্য।
রমিজ আর আজিজুল মিয়া এসব শুনে অবাক হন।
রমিজ মিয়া জানতেন উনার দুই মেয়ে এখনো পিচ্চি।

কিন্তু আজকে সব শুনে জেনিফার কাছ থেকে,
সব ভুল ধারণা ভেঙে যায়।
এখন শুধু অপেক্ষায় আছেন।
সত্যটা জানার জন্য।

কিছুক্ষণ পর নিতিন ফোনটা নিয়ে আসে।
ফোনটা অন করতেই অনেক মেসেজ আর মিসকল যা শুধু নিশির।
রাহিন তার বাসায় যাবার পর দিন থেকেই নিশি মেসেজ কল দিয়ে যাচ্ছিলো।
নিশি জানতো না।

রাহিন তার ফোনটা সাথে করে নিয়ে যেতে ভুলে যায়।
রাহিন এক এক করে সব মেসেজ পড়তে শুরু করে।
সব মেসেজ ছিলো শুধু অভিমানের, কেন রাহিন কথা বলে না।

মেসেজ গুলো পড়তে পড়তে শেষের মেসেজ গুলোতে চোখ আটকে যায় রাহিনের।
রাহিনের কান্নাভেজা মুখে হাসি ফুটে উঠে।
আর চিৎকার করে বলে।
রাহিন: মুগ্ধা বলছিলাম না আমার নিশি কখনো আত্মহত্যা করবে না।
আমার নিশিকে খুন করা হয়েছে।

রাহিনের মুখে এমন কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়।
মুগ্ধা তাড়াতাড়ি এসে রাহিনের হাত থেকে ফোনটা নেয়।


পার্ট: ৬

মুগ্ধা রাহিনের কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে মেসেজ গুলো পড়তে শুরু করে।
মেসেজগুলো যা ছিলো।
— রাহিন আমার খুব ভয় হচ্ছে। তুমি মেসেজের উত্তর দিচ্ছোনা কেন?

রাহিন একবার কথা বলো।
— রাহিন তোমার অনুপস্থিতিতে আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করছে রাসেল।
রাসেল নামটা দেখে মুগ্ধার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো, তাহলে কি ওই রাসেল কিছু করেছে?

এই মানুষের ভীড়ে রাসেলও এসেছে এখানে কি হচ্ছে দেখার জন্য।
কিন্তু রাসেলের অজানা তার সাথে কিছুক্ষণ পর কি হবে?
মুগ্ধা পরের মেসেজ গুলো আবার পড়তে লাগলো।

— রাহিন তুমি আজ দুইদিন ধরে আমার সাথে কথা বলো না।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
তারপরেও আমি হাসিমুখে আছি।
কারণ আমি নিজেই জানিনা।

— আজ বাড়ির রাস্তায় হাটছিলাম, তখন রাসেল আমার শরীর থেকে উর্ণা সরিয়ে দেয়। আমি সাথে সাথেই ওরে থাপ্পড় মেরে দেই।
বাড়ির কেউ দেখেনি।
রাহিন তুমি কি আমার মেসেজ গুলো দেখছো না।

মুগ্ধার মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে, মেসেজ গুলো পড়ে।
নিতিন আসলো মুগ্ধার পাশে।
এখন মুগ্ধা আর নিতিন একসাথে মেসেজ গুলো পড়তে লাগলো।
রাহিন মাটিতে বসে আছে, তার মাথা ফেটে যাচ্ছে রাগে।

— রাহিন আসো তুমি বাসা থেকে এখানে। দেখবা আমিও তোমার সাথে কথা বলবো না।
একশবার কানে ধরবা তারপর কথা বলবো তোমার সাথে। খুব কষ্ট দিচ্ছো আমায়।
— আজ আবার রাসেল আমার বাড়ির আশেপাশে ঘুরাচ্ছে।

রাহিন ভয় করছে আমার। যদি আমার সাথে খারাপ কিছু করে?
আমি আম্মা আর আব্বাকেও ওর কথা বলতে পারছিনা।
এবংকি মুগ্ধাকেও বলতে পারছিনা রাসেলের কথা।
নিশির মরার দিনের মেসেজ।

যেটা পড়ে মুগ্ধা আর নিতিন এর বুঝতে বাকি নেই নিশিকে খুন করা হয়েছে।
— রাহিন আজ আমি সুমাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হই।
কিন্তু মাঝরাস্তায় রাসেল আমার পথ আটকায়।
আর আমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে।

আজো আমি থাপ্পড় মারতে গেলে, রাসেল আমার হাত ধরে নেয়।
আর আমার সাথে খারাপ কিছু করতে চায়।
কিন্তু আমি রাসেলকে ধাক্কা মেরে চলে আসি দৌড়ে।
কিন্তু রাসেল পিছন থেকে বললো,

থাপ্পড় গুলোর দাম নিতে হবে তোর।
আর তোর রাহিনের করা অপমানের প্রতিশোধ তোকেই ভুগতে হবে।
— আমি আর পিছন ফিরে তাকাই নি।
বাড়িতে স্বাভাবিক ভাবেই আসি।

রাহিন একটা বার কথা বলো, আমার খুব ভয় করছে।
যদি রাসেল আমার সাথে কিছু, তাহলে আমি বাঁচবো না রাহিন।
নিশি মরার আগের মেসেজ গুলো।

এই মেসেজ গুলো হয়তো মুগ্ধার পাশ থেকে যাবার পরেই।
— মুগ্ধাকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার পাশে আজকে থাকুক।
কিন্তু, আম্মা আব্বা আর মুগ্ধা যদি প্রশ্ন করে? কেন?

আমার কাছে কেন কথাটার উত্তর নাই রাহিন।
— রাহিন আমার খুব ভয় হচ্ছে, বাহিরে কিছু শব্দ শুনতেছি।
খুব ভয় হচ্ছে।

আমার শুধু মনে হচ্ছে, বাহিরে রাসেল আছে। রাহিন অনেক রাত হয়েছে।
রাহিন আমি ভালো ভাবে ঘুমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিলাম।
আজ কয়টা দিন ধরে তোমায় মেসেজ দিয়েই যাচ্ছি। তুমি কথা বলছো না। খুব পঁচা তুমি। শুধু আমায় কষ্ট দিচ্ছো।
তারপর আর মেসেজ নাই।

থাকবেই বা কি করে।
সকালে যে নিশির ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় তার রুমে।
মুগ্ধা মেসেজ গুলো পড়ে মাটিতে বসে পরে।
তার বুবু এতোটা কষ্টে ছিলো।

নিতিন এর চোখ সামনেই পড়তে৷
দৌড়ে যায় সামনের দিকে।
সামনে গিয়েই মারতে শুরু করে রাসেল কে।

রাসেলকে কোনো কথা বলতে না দিয়েই।
নিতিনের এমন কাণ্ড দেখে জেনিফা অবাক হয়ে গেছেন।
শুধু জেনিফা না, সবাই অবাক হয়েছেন।

নিতিন রাসেলকে মারছে। আর বলছে।
নিতিনঃ বল আমার বোনের সাথে কি করেছিস?
কেন মেরেছিস আমার বোনকে?

এই কথাগুলো শুনে উপস্তিত সবাই হৈচৈ শুরু করে দেয়।
রাহিন বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
বারান্দায় থাকা একটা লাঠি হাতে নেয় সে।
লাঠিটা হাতে নিয়ে, সেও রাসেলকে মারতে শুরু করে।

রাহিন আর নিতিন সমান তালে রাসেলকে মারতে শুরু করে।
রাহিন: বল, কেন আমার নিশিকে মেরেছিস।
সেদিন যখন তোকে মেরেছিলাম।

তোর হয়নি।
তারপরেও আমার নিশির দিকে তাকাস।আর আমার নিশিকে মেরেই ফেললি।
আজকে তোকে মেরেই ফেলবো।
এসব বলছে আর মারছে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে।

এদিকে নিতিন একের পর এক লাথ ঘুসি মারছে।
আজিজুল মিয়ার বাড়িতে হৈচৈ পরে যায়।
চিৎকার শুনে রাসেলের বাড়ির মানুষও আসে।

রাসেলের বড় এক ভাই আর ছোট ভাই আর বাবা, এখানে এসে যখন দেখে ওরা দু’জন মিলে রাসেলকে মারছে।

তখন ওরা তিনজন মিলে রাহিন আর নিতিনকে নিষেধ করলেন রাসেলকে মারতে।
কিন্তু ওদের কানে কথা গুলো যায় নি।

একপর্যায়ে রাসেলের ভাইরা আর বাবা নিতিন আর রাহিনকে ধরে ফেলেন।
কিন্তু ওরা নিতিন বা রাহিনকে মারেন নি।
কারণ ওদের অজানা না রাসেলের সম্পর্কে।

ভীড়ে থাকা একজন ফোন দেয় মেম্বারের কাছে।
আর পরে চেয়ারম্যান এর কাছেও ফোন দেয়।
ওরা নিতিন আর রাহিনকে ধরে বসে আছে।

রাসেল চারদিকে তাকিয়ে একটা ইট পায়।
সেই ইট হাতে নিয়ে দৌড়ে যায় নিতিনের দিকে নিতিনকে মারার জন্য, এটা দেখে আজিজুল আর রমিজ পাশ থেকে দৌড়ে আসে।

কিন্তু তার আগেই রেহান পিছন থেকে রাসেলের হাত ধরে ফেলে।
আর ইট কেড়ে নিয়ে। রেহান রাসেলকে মারতে শুরু করে।
রেহানঃ এতো মাইর খেয়েও তোর হয়নি।
তারপরেও আমার বন্ধুকে মারতে যাস।

রাসেল একপর্যায়ে রেহানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
আর বলে।
রাসেল: তোমাদের সামনে আমায় ওরা মারছে, তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো? (তার বাবা আর ভাইদের বললো)

রাসেল গিয়ে রাহিনের কলারে ধরে দু তিনটা ঘুসি মারে।
আবারো রেহান পিছন থেকে এসে রাসেলকে মারতে শুরু করে।
রাসেলের এমন কাণ্ড দেখে তার বাবা আর ভাইরা রাহিন আর নিতিনকে ছেড়ে দেয়।
এখন সমান তালে রাসেলকে মারতে শুরু করে।

নিতিনঃ বল কেন আমার বোনকে মেরেছিস?
রাসেল: আমি মারিনি তোর বোনকে।
রাসেলের কথা শুনে আরো বেশি মারতে শুরু করে।
এক পর্যায়ে, রাহিন রাসেলের মাথা ফাটিয়ে দেয়।

মাথা থেকে রক্ত পড়তে শুরু করে তার।
কিন্তু তারপরেও ওরা মারছে।
চেয়ারম্যান আর মেম্বার এসে ওদেরকে থামায়।

রাসেল মাটিতে বসে আছে।
দাঁড়ানোর শক্তি টুকু নাই তার।
রাসেলের মাথা থেকে রক্ত পরছে।
চেয়ারম্যান শুরু করে দেয় ভাষণ।

খলিল: তোমাদের সামনে তোমাদের ছেলেকে মারছে।
আর তোমরা এসব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো(রাসেলের বাবা আর ভাইদের বলছে)
রাসেলের বাবার আর ভাইরা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
রাসেলের জন্যে তো ওদের কম সম্মান যায় নি।

তাদের অজানা রাসেল কি করেছে নিশির সাথে।
খলিল: তুই জমশেদের নাতি না?
(রাহিন এর দিকে তাকিয়ে বললো)
রাহিন মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বললো,

খলিল: এখনি ফোন দিচ্ছি জমশেদরে, সে কি তার নাতিরে গুন্ডামী শিখাচ্ছে।
(জমশেদ আর চেয়ারম্যান একি বয়সি)
রাহিন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
কোনো কথা বলছে না।
রমিজ মিয়া বললেন।

রমিজ: চেয়ারম্যান সাব, আমার মেয়েরে এই রাসেল মেরেছে।
ওরা (মুগ্ধা রাহিন নিতিন) ফোনে যেন কি পেয়েছে।
রমিজ মিয়ার কথা শুনে চেয়ারম্যান চিৎকার করে বলে উঠলো।
খলিল: রমিজ তোর মাথা গেছে না-কি?
দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিলো।

রাসেল কিভাবে মারবে তোর মেয়েকে?
রেহানের শরীর জ্বলে যাচ্ছে চেয়ারম্যান এর নষ্টামি দেখে।
এই রাসেলের সাথে চেয়ারম্যান কেও পিটানো প্রয়োজন।

রেহানঃ এইযে চাচা আপনিও কি এই ছেলেটার (রাসেল) সাথে এক আছেন।
কথার মানেটা চেয়ারম্যান এর বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
আবারো চিৎকার করে উঠে খলিল।

খলিল: সেদিনও তুই আমায় অপমান করেছিস।
রমিজের পুচকে মাইয়াও আমায় কথা শুনালো।
কি পেয়েছিস তোরা।

নিতিনঃ ওরা যা করছে, তা ঠিক করেছে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে।
নিতিনের কথা শুনে চেয়ারম্যান রাগী চোখে তাকায়।
রাসেল উঠে চলে যেতে লাগলে। নিতিন দৌড়ে গিয়ে ওরে আটকায়।
আর বলে।

নিতিনঃ যদি বাঁচতে চাস?
তাহলে সব সত্য কথা বলে দে।
রাসেল: আমি কিছু করিনি।
চিৎকার করে বলে রাসেল।

রাসেলের চিৎকার শুনে নিতিনের রাগ সপ্তম আকাশে উঠে যায়।
সে আবারো রাসেলের কলারে ধরে।
নিতিনঃ যদি সত্য কথা গুলো না বলিস তাহলে আজকেই তোকে এখানে মেরে ফেলবো।
নিতিনের কাণ্ড দেখে চেয়ারম্যান এসে নিতিনকে আটকায়। আর বলে।

খলিল: ছেলেটাকে কি মেরে ফেলবি?
নিতিনঃ হ্যাঁ মেরে ফেলবো।
এভাবে মিথ্যা কথা বললে। আজকে ওরে মেরেই ফেলবো।
চেয়ারম্যান রাসেলের দিকে তাকায়।
রাসেলের বিরুদ্ধে যাবেনা সে।

ভোটের সময় রাসেল চেয়ারম্যান এর হয়ে কাজ করে।
তাই যেভাবেই হোক রাসেলকে বাঁচাতে হবে।
তাই চেয়ারম্যান বললো,
খলিল: রাসেলরে নিয়া বাড়িতে যাও।
এসব পরে দেখা যাবে।

রাহিন: এখানেই আজ সব প্রমাণ হবে।
আজ কারো কথাই শুনা হবে না।
মেম্বার মামা আপনি পুলিশকে ফোন দিন।

এই চেয়ারম্যান শুধু নামেই, কোনো কাজের না।
চেয়ারম্যান রেগে করে কিছু বলতে গেলে, মেম্বার বলে উঠলো।
মেম্বার: আমি ফোন দিয়েছি।

পুলিশ আসছে।
পুলিশ আসছে কথা শুনে রাসেলের মনে ভয় ঢুকে যায়।
রাসেল পালাতে চাইলে নিতিন আবারো ধরে ফেলে।

এবং পাশে থাকা গাছের সামনে বেঁধে রাখে।
মুগ্ধার মুখে হাসি ফুটতেছে, তার বুবুর উপর থেকে আত্মহত্যা এর অপবাদ জেড়ে ফেলতে পারবে।

একটু পর পুলিশ আসে।
৪ জন পুলিশ আসে, এসেই রমিজ মিয়াকে সালাম দেয়।
কারণ রমিজ মিয়া যে সরকারি রাবার গাছের বাগানে কাজ করেন।
সে জায়গার পুলিশ এরা, রমিজ মিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক।
অফিসার: কি হইছে রমিজ ভাই?

রমিজ: আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি।
ওরে খুন করা হয়েছে। আর এই ছেলে খুন করেছে।
অফিসার: সেদিন বলছিলাম।

আমাদের কেন ডাকো নি তোমার মেয়ের মৃত্যুতে?
রমিজ মিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মুগ্ধা অফিসারের কাছে আসলো আর রাহিনের ফোনটা দেয়।
অফিসার মেসেজ গুলো পড়েন।

অফিসার: ছেলেটার মাথায় কিছু বেঁধে দাও।
নইলে খারাপ কিছু হবে।
(রাসেলের রক্ত পরছে দেখে কথাটা বললেন)
কিছুক্ষণ পর।

অফিসার: রমিজ ভাই তোমার মেয়ের লাশ যখন পাও, তখন ঘরের অবস্থা কেমন ছিলো।
এইটুকু প্রমাণে কাউকে খুনি বলতে পারিনা আমরা।
রমিজ মিয়া সব বললেন অফিসারকে।

অফিসার সব শুনে একটু অবাক হয়েই বললেন।
অফিসার: বন্ধ ঘরে কিভাবে খুন করা যায়?
রাহিন: স্যার আপনি শেষের মেসেজ গুলো পড়েছেন?
অফিসার: হুম পড়েছি।
তুমি কে?

রাহিন: আমি রাহিন।
অফিসার: ওও,
রাহিন: আপনি ওরে টর্চার করেন।
তাহলেই সব সত্য কথা জানবেন।

অফিসার অনেক সময় ধরে রাসেলকে জিজ্ঞেস করছেন।
কিন্তু রাসেল একটা কথাই বলছে।
বন্ধ ঘরে সে কিভাবে নিশিকে মারবে।
রাসেলের সাথে চেয়ারম্যান তাল মিলাচ্ছে।

অফিসার রাসেলের মুখ থেকে সত্যটা বলানোর জন্য এবার অন্য পথ অবলম্বন করেন।
দুজন পুলিশ মিলে রাসেলের পায়ে আর হাতে মারছে।
আর সত্যটা বলতে বলছে।

রাসেলের বাবা এসব দেখছেন, আর চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
রাসেল খুন করতে পারে এতে অবিশ্বাসের কিছু নেই।
কারণ এই ছেলেটা নষ্ট হহে গেছে।

তারপরেও নিজের সন্তান।
রাসেল এতো মাইর সহ্য না করে বলেই দিলো।
রাসেল: হ্যাঁ আমি খুন করেছি নিশিকে।

রাসেলের চিৎকার করে কথাটা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়।
চেয়ারম্যান বলে
খলিল: বন্ধ ঘরে কিভাবে?
রাহিন দৌড়ে আসে রাসেলকে মারতে।
কিন্তু পুলিশ ওরে বাঁধা দেয়।

আর বলে বিষয়টা এখন তারা দেখবে।
অফিসার: কিভাবে মেরেছিস তুই?
রাসেল চুপ থাকে।

সে কখনো ভাবেনি, যে সে ধরা পড়ে যাবে।
রাসেল: আমার হাতের বাঁধন খুলে দিন।
আমি বলছি সব।
(কান্না করে দেয় রাসেল)

কিন্তু তার কান্নাটা কেউ দেখছেই না।
অফিসার ওর বাঁধন খুলে দিয়ে নিজের হাতে রাখেন দড়ি।
অফিসার: এবার বল?
রাসেল: আমার সাথে আসেন।

রাসেল সামনে হাটছে আর ওর পিছনে সবাই হাটছে।
সবার মনে প্রশ্নটা রয়েই যাচ্ছে কিভাবে খুন করলো সে নিশিকে।
রাসেল নিশিদের বাড়ির পিছনের দিকে নিয়ে যায়।
অফিসার: পিছনে কি?
রাসেল কোনো কথা না বলে।

নিশির রুমের পাশে আসে।
রমিজ মিয়ার বাড়ির পিছনটা জঙ্গল। পিছনে আর কারো বাড়ি নেই।
আর তাদের পিছনে কেউ যায়ও না।
আর সেই সুযোগ নেয় রাসেল।

রাসেল নিশির রুমের পাশে গিয়ে, কিছু লতাপাতা সরালো।
একটা গর্ত পরলো সবার চোখে।
রাসেল এবার গর্তে ঢুকলো।
আর নিশির রুমে আসলো।
রাসেলকে আসতে না দেখে।

অফিসার ভাবলেন হয়তো রাসেল এইদিকে গিয়ে কোথাও পালিয়েছে।
তাই অফিসার সহ সবাই দৌড়ে বাড়ির উঠুনে আসে।
অফিসার কোনো একটা জিনিস মনে করে রমিজকে জিজ্ঞেস করলেন।
অফিসার: নিশির রুম কোনটা?

রমিজ মিয়া অফিসারকে সাথে নিয়ে নিশির রুমে যাচ্ছেন।
পিছন পিছন চেয়ারম্যান সহ আরো কয়েকজন ঢুকলো।
নিশির রুমে গিয়ে দেখেন রাসেল দাঁড়িয়ে আছে।
এটা দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়।

রাসেল নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
সবার বুঝতে বাকি নেই।
রাসেল কিভাবে এসেছে।
অফিসারের কথায় নিশির পালঙ সরালে।

অনেক বড় গর্ত চোখে পরে।
যেটা নিশির কাপড়ের বড় ব্যাগ দিয়ে ঢাকা ছিলো।
অফিসার অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন রাসেলের দিকে।
কতো নিখুঁত ভাবে সে খুন করেছে নিশিকে।

হাজার বছর কেটে গেলেও কেউ জানতো না নিশির মরার রহস্য।
অফিসার রাসেলকে সব বলতে বললে রাসেলও সব বলে দেয়।
রাসেল: আমি নিশিকে অনেক আগ থেকেই ভালোবাসতাম।
আর একদিন প্রপোজ করি।

তখন নিশি বলে সে রাহিনকে ভালবাসে।
আর আমায় অনেক ভাবে অপমান করে এই বলে।
আমি নেশা করতাম।
যা গ্রামের সবাই জানতো।

তারপর থেকেই আমি নিশির পিছনে লেগে থাকি।
কিন্তু নিশি রাহিনকে সব বলে দেয়।
তারপর রাহিন একদিন আমায় অপমান করে আর থাপ্পড় মারে।
যেটা আমার সহ্য হয় নি।

সেদিন থেকেই ভাবী আমি নিশিকে আমার করে ফেলবো। সেটা একদিনের জন্যেও।
সেদিন থেকেই আমি মাটি কুড়তে শুরু করি।

ভাবছিলাম নিশিকে আমার করে পাবো।
তাই কিছুদিন আগে আমি নিশিকে খারাপ কাজের অফার দেই।
সেদিনও আমায় অপমান করে নিশি।

তারপরেই আমি ভাবলাম নিশির সাথে আমি তাই করবো। যা আমি ভাবছি।
আমি মাটি কুড়তে সফল হই।

আর আমি রাতে নিশির রুমে ঢুকি তারপর নিশিকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাই।
দু তিন বার ডাকার পরেও নিশির ঘুম ভাঙেনি।

আমার লোভ জাগে নিশির শরীরের প্রতি।
তাই আমি,
কিন্তু এক পর্যায় নিশি জেগে যায়।

আর আমি তখন ভয় পেয়ে যাই, আর নিশির গলা চেপে ধরি।
আর নিশি সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নেয়।
নিশি মরে গেছে।
এটা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই।

তারপর মাথায় একটা খারাপ আইডিয়া আসে।
তারপর আবার আমি নিশির মরা লাশের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করি।
আর নিশির কাপড় পাল্টিয়ে ওরে অন্য কাপড় পড়িয়ে আমি বাশের সাথে ওর মরা লাশটা ঝুলিয়ে দেই।

আর সব প্রমাণ মুছে দেই।
আর কাপড় আর ফোনটা নিয়ে আমি আবার এই গর্ত দিয়ে চলে যাই।
ভাবছিলাম সবাই ভাববে নিশি আত্মহত্যা করেছে।
এই ভেবেই সবাই বসে থাকবে।

কিন্তু নিশির বোন মুগ্ধা সেদিন সবার সামনে বললো, তার বোন আত্মহত্যা করেনি।
খুন করেছে কেউ।
কিন্তু প্রমাণ নাই।
(রাসেল কথাটা বলে কেঁদে দেয়।)

নিশিকে এমন নির্মম ভাবে মেরেছে রাসেল।
এই সব শুনে সবার চোখে পানি আসে।
আর কেউ ভাবতে পারেনি নিশির সাথে এমন হয়েছে।

মুগ্ধা রাসেল কে থাপ্পড় দিয়ে আবারো মারতে গেলে। জেনিফা ধরে নেয়।
জেনিফাঃ মা তুই প্রমাণ করে দিয়েছিস। আমার নিশি আত্মহত্যা করেনি।
আর নিশির খুনির শাস্তি আইন দিবে।
রাসেলের বাবাঃ অফিসার নিয়ে যাও এই পশুকে।
আমার ছেলে ভাবতেও লজ্জা লাগছে।

অফিসার রাসেলকে নিয়ে যায়।
হয়তো রাসেলের ফাঁসি হবেনা, সে নিজেই সব স্বীকার করে নিয়েছে।
এইজন্য যাবজ্জীবন হতে পারে।
অফিসাররা নিয়ে যান রাসেলকে।

মুগ্ধার মুখে হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে।
কারণ সে পেরেছে তার বুবুর উপর থেকে আত্মহত্যা এর অপবাদ নামাতে।
রাহিন সহ সবাই নিশির কবরে দাঁড়িয়ে আছে।

সবার চোখে পানি থাকলেও। হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে।
কারণ একটাই।
নিশির খুনি ধরা পরেছে।
সত্য কখনো চাপা থাকে না।
একদিন ঠিক প্রকাশ পায়।

হয়তো সাথে সাথে, নয়তো অপেক্ষা করতে হয়, মাটি ফেটে বিচ থেকে গাছ গজানোর মতো।
এইদিকে সবাই চলে যায়।

চেয়ারম্যান যাবার আগে মনে করিয়ে দিলো মুগ্ধা আর রেহানের করা অপমানের কথা।
এটার মানে, মুগ্ধাকে শাস্তি দিবেন চেয়ারম্যান।
যে খারাপ সে খারাপ থেকে যায়।
চুল কালো থাকতেও খারাপ আর চুল পাকলেও খারাপ।

রাহিন তার মামার বাড়িতে যাবে।
মুগ্ধা, জেনিফা, রমিজ, নিতিন,রেহান, সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া নিজের কোনো ক্ষতি করবে না।

কথা দাও আমাদের।
আমি আমার বুবুকে দেখতে পাই তোমার মধ্যে।
কথা দাও নিজের কোনো ক্ষতি করবে না।
রাহিন কেঁদে দেয়।

নিশিকে ছাড়া কিভাবে সে বাঁচবে?
রাহিন: বোন আমার, আমি কথা দিতে পারবো না।
যেখানে আমার ভালোবাসা বেঁচে নেই। সেখানে আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো।
মুগ্ধাঃ এমন কথা বলো না ভাইয়া।

আমাদের জন্য তোমায় বাঁচতে হবে।
তোমার আম্মু আব্বুর জন্য বাঁচতে হবে।
আমার বুবুর স্মৃতির জন্যেও তোমায় বাঁচতে হবে।

রাহিন: হুম।
মুগ্ধাঃ কথা দাও নিজের ক্ষতি করবে না।
আমার বুবুকে ভালবেসে থাকলে। তুমি কখনো নিজের ক্ষতি করবেনা।
রাহিন: হুম।

এখন যাই, কাল আসবো।
মুগ্ধাঃ হুম,
রাহিন: আন্টি আপনি হয়তো নিশির প্রতি রাগ হচ্ছে।
আন্টি নিশি খুব ভালো মেয়ে ছিলো।

কখনো মন খারাপ করে থাকতে দেখিনি।
আর আমরা খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু কি থেকে কি হলো?
(রাহিন আবার কান্না করে দেয়)
জেনিফাঃ বাবা আমি নিশির উপর রেগে নেই।

তোমাদের ভালোবাসা জিতেছে,
–সব ভালোবাসা মিলনের
মাধ্যমে পূর্ণতা পায় না।

কিছু ভালোবাসা অপূর্ণতার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
যেটা কাম্য, আমাদের বা তোমার।
রাহিন আর সুমা চলে যায়।

রাহিন নিজের রুমে গিয়ে বিছানাতে শুয়ে পরে।
আসলেই কি তার ভালোবাসা অপূর্ণতায় পূর্ণ পেয়েছে?
কান্না হাজারো কষ্টে থামাতে পারছে না।

দুইদিন কেটে যায়।
সবাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।
কেউ পারছে আবার কেউ পারছে না।

এই দুইদিনে রাহিন প্রতিদিন এসেছে নিশির কবরের কাছে।
কিছুক্ষণ নীরবে থেকে আবার চলে গেছে।
একা একা বিড়বিড় করেছে সে।

জেনিফা এমন ভালবাসা দেখে সত্যিই কষ্টে কষ্টিত।
নিশি ঠিক মানুষকেই খুঁজে নিয়েছিলো।
কিন্তু পূর্ণতার পাড়ে যাবার আগেই ঢেউ এসে সব ভেঙে দেয়।
রাহিন আজ চলে যাবে।

এখানে থাকলে তার বেশি কষ্ট হবে।
রাহিনের ফ্যামিলি এখনো এসবের কিছুই জানেনা।
রাহিন বিদায় নিতে আসে মুগ্ধাদের বাড়িতে।

সুমাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েই এসেছে।
রাহিন প্রথমেই নিশির কবরের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়।
আর কেউ তাকে বলবে না।

রাহিন আমায় কষ্ট দিচ্ছো।
একশবার কান ধরার পর আমি খুশি হবো।
এরকম হাজারো কথা শুনা হবেনা রাহিনের।

রাহিন পারবে কি নিশি বিহীন বাঁচতে।
চোখের পানি মুছে মুগ্ধার ঘরে যায়।
সবার কাছ থেকে বিদায় নেয় সে।
রেহানঃ সিলেট যাবে তুমি?
(নিতিন আর রেহানের সাথে ভালো সম্পর্ক হয় রাহিনের)

রাহিন: হুম।
রেহানঃ তাহলে আমি আর আব্বুকে গাড়ির কথা নাই বলি।
তোমার গাড়ি দিয়েই আমরা চলে যাবো একসাথে।
রাহিন: তাহলে তো ভালোই হবে।

রেহান এবার জেনিফার দিকে তাকালো।
জেনিফা ইশারা দেন।
রেহানঃ মুগ্ধা তৈরি হয়ে নাও, আমাদের সাথে যাবে তুমি?

রেহানের মুখে এমন কথা শুনে মুগ্ধা যেন আকাশ থেকে পরলো।
মুগ্ধাঃ তোমাদের সাথে যাবো মানে?
রেহানঃ তুমি এখানে সেইফ না।
যেকোনো সময় ওই চেয়ারম্যান তোমার খারাপ কিছু করবে।

তাই আমি আর নিতিন চাই তুমি আমাদের সাথে আসো।
আর আমার আব্বু আম্মুর সাথে থাকবে।
মুগ্ধাঃ আমি কোথাও যাবো না।
আমার আম্মা আব্বাকে ছেড়ে কোথাও যাবোনা।

রেহানঃ আন্টি আপনি বুঝান ওরে।
রাহিন তুমি একটু অপেক্ষা করো আমরা তৈরি হয়ে আসি।
মুগ্ধাঃ আমি কোথাও যাবো ন।
রেহানঃ আন্টি?

জেনিফাঃ মুগ্ধা মা যা না তুই।
সত্যিই আমার ভয় হয়রে, যদি চেয়ারম্যান কিছু করে তোর সাথে।
মুগ্ধা ভাবছিলো তার মা তাকে যেতে দিবেনা।
এখন তো দেখে তার মা’ও বলছে।

তাই মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আব্বা!
রমিজ: যা না’রে মা, তোর সুরক্ষিত এর জন্যেই।
কিছুদিন থেকে, সব ঠিক হলে তুই চলে আসবি।
মুগ্ধাঃ সব তোমাদের ভাবনা।
সবাই আমায় যেতে বলছো।

জেনিফা আর রমিজ মিয়া হেসে দেন।
নিতিনঃ মুগ্ধা যা তৈরি হয়ে নে।
আর কাপড়চোপড় গুছিয়ে নে।

মুগ্ধা একপ্রকার রেগেই তার রুমে যায়।
সবাই হেসে দেয়।
জেনিফা আর রমিজ মিয়া রাহিনের সাথে অনেক কথা বললেন।
রাহিনকে বুঝালেন ওরা।

ভাগ্যকে মেনে নিতে।
মুগ্ধা সহ সবাই বিদায় নেয় রমিজ, আজিজুল, জেনিফা আর আয়েশার কাছ থেকে।
মুগ্ধা অনেক কান্না করে।
জেনিফার বুক ফেটে যাচ্ছিলো।

কিভাবে থাকবেন মেয়েকে ছাড়া।
তারপরেও মেয়ের সুরক্ষিত এর জন্য উনি রেহানের কথায় রাজি হন।
তারা চাননা এই মেয়েকেও হারাতে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওরা সবাই শহরে পৌঁছে যায়।
মুগ্ধা গাড়িতে অনেক কান্না করছে।
নিজের গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে তাই।
মুগ্ধা এতো বড় বড় বিল্ডিং দেখে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।
গ্রামের মেয়ে মুগ্ধা এসব দেখার ভাগ্য হয়নি তার।

রাহিনকে বললো রেহান
তাদের বাসার ঠিকানা।
রাহিন বাসায় যায়।
ভিতরে যেতে চায়নি রাহিন।

কিন্তু ওদের জোড়াজুড়ি তে সেও যায়।
জাফরুল্লাহ আর রামিছা মুগ্ধা আর রাহিনকে দেখে প্রশ্ন করলেন কে ওরা?
সবার পরিচয় দেয়।

রাহিন কিছুক্ষণ তাদের সাথে থেকে চলে যায় তার বাসার উদ্দেশ্যে।
রেহান মুগ্ধাকে নিয়ে তার মাবাবার কাছে কিছু কথা বললো,
ওরাও খুশি হন।

রামিছা সব চেয়ে বেশি খুশি হয়ছেন।
রেহান এটাও বলে তার মাবাবাকে, যে রেহান নিজে সব বলবে মুগ্ধাকে।
কারণ সে জানে মুগ্ধা অনেক খুশি হবে।
রাতটা কেটে যায়।

নিতিন আর রেহান সকালে উঠে তাদের ম্যাচে চলে যায়।
মুগ্ধা এর আগে কখনো এতো বড় বাড়িতে থাকেনি।
মুগ্ধা একা একা ভাল লাগছিলো না তাই সে রামিছার রুমে যায়।

জাফরুল্লাহও অফিসে।
মুগ্ধা ভাবলো কিছু সময় রামিছার সাথে গল্প করে কাটিয়ে দিবে।


পার্ট: ৭

মুগ্ধার একা একা ভালো লাগছিলো না।
তাই চাইলো রামিছার সাথে কিছু সময় আড্ডা দেওয়া যাক।
মুগ্ধা রামিছার রুমে যায়।

রামিছা মন খারাপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে বাহিরের আকাশ দেখছিলেন।
আর চোখ থেকে টপটপ করে পানিও পরছিলো।
মুগ্ধাকে দেখে তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে নেন।

তাই আর মুগ্ধা দেখেনি।
রামিছাঃ আয় মা, আমার পাশে বস।
মুগ্ধা কিছু না বলে রামিছার পাশে বসলো।

রামিছাঃ ভালো লাগছেনা বুঝি তোর?
(রাতে খাবার সময় রামিছা সবার সামনে বললেন।
তিনি মুগ্ধাকে তুই করে ডাকবেন।

তখন জাফরুল্লাহ সাথে সাথে বললেন।
আমিও তুই করে ডাকবো।
নিতিন আর রেহান তখন হেসে দেয়।)

মুগ্ধা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বুঝালো।
রামিছা মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন।
রামিছাঃ জানিস? আমারো না এই একলা এতো বড় বাসায় ভালো লাগেনা।
সারাক্ষণ একা একা বসে থাকি।

রেহানের বাবা সেই সকালে বের হন আর সন্ধ্যার পর আসেন।
রেহানকে কতো করে বললাম, বিয়ে কর। কিন্তু তার নাকি বিয়ের বয়স হয়নি।
মুগ্ধা রামিছার কথা শুনে হেসে দেয়।
রামিছা মুগ্ধ চোখে মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে আছেন।
আর মুগ্ধার মিষ্টি হাসিটা দেখছেন।

গ্রামের মেয়েও এতোটা সুন্দর হয়? রামিছা নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন।
রামিছার তাকানো দেখে মুগ্ধা হাসি থামিয়ে দিলো।
মুগ্ধাঃ আন্টি আমি রেহান ভাইয়ারে বলবোনে, যেন ভাইয়া তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেন।
আবারো মুচকি হাসলো মুগ্ধা।

রামিছাঃ হুম।
তুই আরো আগে আসতি তাহলে, আমার এতোটা খারাপ লাগতো না’রে মা এই বন্ধ ঘরে।
মুগ্ধাঃ আমি তো আবার কয়কে দিন পর চলে যাবো আন্টি।
রামিছাঃ উঁম আন্টি না! আম্মু ডাকবি আমায়।

মুগ্ধা নড়েচড়ে উঠে।
আম্মু ডাকবি শব্দটা শুনে।
মুগ্ধাঃ আমার তো আম্মা আছেন।

(পিচ্চিদের মতোই বললো)
রামিছাঃ কেন তারপরেও কি আমায় মা ডাকা যায় না?
মুগ্ধা নীরবে বসে থাকলো।

তার যে লজ্জা লাগছে।
রামিছাঃ কি’রে মা ডাকবিনা আমায় আম্মু?
মুগ্ধা তাকালো রামিছার দিকে, তিনি চাতক ন্যায় অধীর আগ্রহে বসে আছেন মুগ্ধার উত্তরের আশায়।

তার কি বলা উচিত?
মুগ্ধাঃ আন্টিই ডাকি না?
অপরাধীর মতো বললো,
রামিছার হাসি মুখ মলিন হয়ে যায়।

মন খারাপ করে আবারো জানালার পাশে যায় রামিছা।
মুগ্ধা পিছন থেকে গিয়ে রামিছার কাঁধে হাত রাখে।
মুগ্ধাঃ আম্মা ডাকলে হবে কি?

রামিছা কথাটা শুনে পিছন ফিরে তাকান।
আর মুগ্ধাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন।
রামিছাঃ হবে রে মা হবে। আমায় তুই আম্মা
বলেই ডাকিস।

মুগ্ধা অবাক হয়, কেউ আম্মা ডাক শুনার জন্য এতো উৎফুল্ল?
রামিছাঃ তুই রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমা?
আমি রান্নাটা করে ফেলি।

মুগ্ধাও কিছু বলেনি।
সে তার রুমে চলে যায়।
রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পরে মুগ্ধা।

কাল রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারেনি সে।
মা বাবাকে রেখে সে কখনো একা কোথাও যায় নি।
আর কাল ঘুমুতে পারেনি। চোখ বন্ধ করলেই শুধু নিশির চেহারা তার সামনে ভেসে উঠে।
আর কানে শুধু রাসেলের বলা নির্মম কথা গুলোই বাজছিলো।

একটা মানুষ হয়ে কিভাবে পারলো অন্য একটা মানুষকে এতোটা নির্মম ভাবে মারতে।
কেড়ে নিলো তার কাছ থেকে তার আদরের বুবুকে।
মুগ্ধা আস্তে আস্তে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।

রাহিন কাল বাসায় এসে,
কারো সাথে কথা বলেনি।
রাতে কিছু খায়নি পর্যন্ত।

মুগ্ধাদের সামনে ভালো থাকার অভিনয় করেছিলো রাহিন।
রাহিনের এমন কান্ড দেখে আশরাফ, আমিনা, তিশা, এবংকি রাহুলও অবাক।
কি হলো আবার রাহিনের?

(রাহুল দেশে এসেছে স্পেন থেকে একদিন হলো)
রাত থেকে ডেকে আসছে সবাই রাহিনকে। কিন্তু সে আর দরজা খুলেনি।
রাহুল সকাল থেকে ডাকছে রাহিনের দরজায়।

কিন্তু রাহিনের কোনো সাড়াশব্দ নাই।
আশরাফ চিন্তিত হয়ে সোফায় বসে আছেন।
হাসি মুখে গেলো মামার বাড়ি, কিন্তু এখন মন খারাপ ছেলের।
কি হলো ছেলেটার।
আমিনাকে আশরাফ বললেন।

আশরাফ: ফোন দাও তো সুমার কাছে।
জিজ্ঞেস করো কি হয়েছে রাহিনের, এমন করছে কেন?
আমিনা কথাটা শুনেই সুমার কাছে ফোন দেন।

আমিনা: সুমা!
সুমা: কেমন আছো ফুফু?
আমিনা: রাহিনের কি হইছেরে মা? তোদের এখান থেকে এসে, সেই যে তার রুমে ঢুকলো।
আর বের হয় নি।

রাত থেকে আমরা সবাই ডাকছি।
সুমা আমিনার মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে যায়।
সুমা: কি বলছো ফুফু?

সুমার অবাক হওয়া দেখে আমিনা আরো ভয় পেয়ে যান।
আর আবার জিজ্ঞাস করেন।
আমিনা: এমন করছে কেন ছেলেটা?
তোদের এখানে কি কিছু হয়েছে রাহিনের সাথে?
সুমাঃ ফুফু সব পরে বলবো।

তার আগে তোমরা রাহিনের রুমের দরজা ভাঙো।
সুমার কথা শুনে আমিনা ভয় পেয়ে যান।
আমিনা ফোনটা রেখে আস্তে আস্তে রাহিনের রুমের দিকে যান।
পিছন পিছন আশরাফও আসলেন।

রাহিনের দরজায় এখনো রাহুল আর তিশা ডাকছে।
রাহুল: রাহিন ভাই আমার কি হয়েছে তোর?
ভাইয়ের সাথে কথা বলবিনা।
রাহিন ভাই আমার দরজা খুল।

(রাহুল রাহিনের দু’বছরের বড় হলেও। দুই ভাইয়ের ভালোবাসা অসীম।
রাহিন রাহুলের সাথে সব কিছুই বলে। নিশির কথাও রাহুলের অজানা না। রাহিনের পরিবারের একমাত্র রাহুল জানে রাহিন আর নিশির সম্পর্কের কথা।)
রাহুল আবার দরজা ধাক্কা দিয়ে কিছু বলতে গেলে।
পিছন থেকে আমিনা বললেন।

আমিনা: রাহুল দরজা ভেঙে দে?
আমিনার কথা শুনে অবাক হয় রাহুল।
এইদিকে দুপুর হয়ে আসছে।
কি করবে রাহুল?

সবাই প্রথম ভাবছিলো, রাহিন ক্লান্ত থাকার কারণে হয়তো ঘুমাচ্ছে, আর ঠাণ্ডার জন্য বের হচ্ছেনা।
কিন্তু এখন তো ভয় করছে সবার।

আশরাফ: রাহুল দরজা ভেঙে দে?
রাহুল আর কোনো কথা না বলে, দরজা ধাক্কাতে লাগলো।
কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর দরজার লক ভেঙে যায়।

তাড়াতাড়ি করে ওরা রাহিনের রুমে ঢুকে রাহিনকে মাটিতে পরে থাকতে দেখে।
রাহিনের নাক আর মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে সে গুলো জমাট ধরে গেছে।
রাহুল রাহিনকে কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুয়ায়।
আমিনা আর তিশা চিৎকার করে কেঁদে দেয়।

রাহুল: আব্বু তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স ডাকো।
আশরাফ এম্বুলেন্স এর জন্য ফোন করতে নিচে যান।
রাহুল তাকিয়ে আছে রাহিনের চোখ বন্ধ চেহারার দিকে।

রাহুল হাজারো চেষ্টা করে নিজেকে আটকিয়ে রাখে।
তাকে কান্না করলে হবে, তার যে আম্মু আব্বু আর তিশাকে শান্তনা দিতে হবে।
রাহিন এর শ্বাস নেওয়া বা আসা কোনোটাই হচ্ছেনা।

রাহুল: তাহলে কি? রাহুক তাড়াতাড়ি রাহিনকে কোলে নেয়।
খুব কষ্ট করে নিচে নিয়ে আসে রাহিনকে।
রাহুলের চোখ থেকে বৃষ্টি নেমেছে, আশরাফ চুপ হয়ে সব দেখছেন।
এম্বুলেন্স আসলে, রাহিনকে এম্বুলেন্স করে

হসপিটালে নেওয়ার জন্য রওনা দেয়।
আমিনা: কি থেকে কি হয়ে গেলো? (আমিনা নিজের কান্না থামাতেই পারছেন না)
এইদিকে এম্বুলেন্সে রাহিন সামনে আর মা বোনের কান্না দুটু মিলে রাহুল আর আশরাফ পাগল হয়ে যাচ্ছেন।

৩০ মিনিট পর হসপিটাল পৌঁছায় তারা।
তাড়াতাড়ি করে রাহিনকে একটা কেবিনে নেওয়া হয়।
রাহুল কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেনা।
নিশির সাথে কি কিছু হয়েছে তার?

রাহিন আত্মহত্যা কেন করতে চাইলো?
রাহুলের ফোন বেজে উঠে।
সুমা ফোন দিয়েছে।

সুমা: কি হয়েছে রাহিন ভাইয়ার? ফুফুও ফোন ধরছেন না।
রাহুল: রাহিন!
রাহুকের কান্না শুনে সুমা ভয় পেয়ে যায়।

সুমা: বলবেতো কি হয়েছে রাহিন ভাইয়ার? কান্না করছো কেন তুমি?
রাহুল: রাহিন আত্মহত্যা করতে চেয়েছে।
(কথাটা বলে কান্নায় ভেঙে পরে রাহুল। নিজের থেকে বেশি ভালোবাসে তার ভাইকে,)
সুমা কথাটা শুনে পাথর হয়ে গেছে।

সে চিন্তা করতেই পারছেনা রাহিন এমন করবে?
সুমা: কান্না করো না প্লিজ।
তুমি কান্না করলে বাকিদের সামলাবে কে?
প্লিজ কান্না করো না।

আমরা এখনি পথ দিচ্ছি।
কথাটা বলে ফোন রেখে দেয়।
সুমা তার দাদা আর বাবাকে বলে রাহুল তাদের দেখতে চায়।

কিন্তু তারা প্রথমে না করলেও পরে সুমার কথায় সবাই তৈরি হয়।
সুমা সহ তার মাবাবা সবাই সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
সুমা লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের চোখের পানি ফেলছে।
রাহিন এমন পাগলামো করতে পারলো কি করে?
রাহুল দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে।

ডক্টর বের হবার জন্য অপেক্ষা করছে।
আশরাফ শান্তনা দিচ্ছেন আমিনা আর তিশাকে।
রাহিনের কেবিন থেকে ডক্টর বের হয়।

রাহুল আর আশরাফ দৌড়ে ডক্টরের কাছে যায়।
রাহুল: কি অবস্থা আমার ভাইয়ের?
ডক্টর নিচের দিকে তাকিতে বললেন।

ডক্টর: আপনাদের রোগী ভোর রাতেই মারা গিয়েছেন। আমরা ভালোভাবে কনফার্ম হতে পারছিলাম না।
আর আপনারা যদি রোগীর হার্ট অ্যাটাক এর সাথে সাথে আমাদের কাছে নিয়ে আসতেন তাহলে হয়তো বাঁচানো যেতো।
রাহুল এমন কথার জন্য একবারেই প্রস্তুত ছিলো না।
আশরাফ মাটিতে বসে পরেন মাথায় হাত রেখে ডক্টর আশরাফকে ধরেন।
রাহুল: রাহিন আত্মহত্যা করেনি?

(কান্না করছে হাউমাউ করে)
ডক্টর: আপনাদের রোগী আত্মহত্যা কেন করবে।
উনি কোনো একটা জিনিস নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে চিন্তিত চিলেন। আর কাল রাতে হার্ট অ্যাটাক করেন।
যদি আপনারা সময় মতো নিয়ে আসতেন তাহলে হয়তো বাঁচানো যেতো।

আপনাদের রোগীর মৃত্যুটা খুব ভয়ানক ভাবে হয়েছে।
ডক্টর চলে যান।
রাহুল আর আশরাফ আস্তে আস্তে রাহিনের কেবিনে ঢুকেন।

আমিনা আর তিশা এতক্ষণ দূর থেকে দেখছিলেন ওদের কথা বলা।
তাই ওরা কিছুই শুনে নি।
রাহুল আর আশরাফকে কেবিনে ঢুকতে দেখে আমিনা আর তিশা দৌড়ে আসেন।
ভিতের এসে দেখেন।

রাহুল রাহিনকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।
আমিনা: কি হয়েছে আমার রাহিনের? তোমরা এভাবে কান্না করছো কেন?
আমিনাকে কিভাবে বলবেন? রাহিন আর এই পৃথিবীতে নাই।

আশরাফ রাহিনের পাশ থেকে উঠে গিয়ে আমিনার দিকে তাকিয়ে বললেন।
আশরাফ: রাহিন আর এই পৃথিবীতে নাই।
কথাটা শুনে চিৎকার করে উঠেন আমিনা।
পাশ থেকে তিশা দৌড়ে গিয়ে রাহিনকে জড়িয়ে ধরে।

রাহুল এখনো রাহিনকে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখেছে।
আমিনা শব্দ করে কান্না করতে পারছেন না।
শুধু একবার চিৎকার দিয়েছিলেন।
রাহিনের পা’য়ের দিকে তাকিয়ে আছেন আমিনা।
আশরাফ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রাহুল আর তিশা চিৎকার করে কান্না করছে।
রাহিন এর মৃত দেহটা এম্বুলেন্স করে বাসায় নিয়ে আসা হয়।
এরি মধ্যে চারদিকে জানাজানি হয়ে গেছে আশরফ চৌধুরীর ছোট ছেলে মারা গেছে।
বাসায় অনেক মানুষ ভীড় জমিয়েছে।

আশরাফের বাসায় আজ ভীষণ মেঘ জমেছে।
সুমাদের গাড়ি এসে আশরাফের বাসায় থামে।
আশরাফের বাসায় এতো মানুষের ভীড় দেখে।
জমশেদ মিয়া বললেন।
জমশেদ: সুমা বাসায় কোনো অনুষ্ঠান না-কি রে?
এতো মানুষ।

সুমা তার দাদার কথার উত্তর না দিয়ে দৌড়ে বাসায় ঢুকে যায়।
পিছন পিছন ওরাও ঢুকে।
সুমা গিয়ে রাহিনের লাশ দেখতে পায়।যেটার জন্য কখনো কোনোভাবে সে অপেক্ষা করেনি।
বাসায় শুধুকান্নার আওয়াজ। আর কিছুই শুনা যাচ্ছে না।

রাহুল তার নানা জমশেদকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না করছে।
রাহুল: আর কেউ আমায় ভাইয়া বলে ডাকবে না।
আর কখনো রাহিন আমার সাথে কথা বলবেনা।

আমিও আর কখনো রাহিনের সাথে কথা বলতে পারবোনা।
চিৎকার করে কান্না করছে সবাই।
রাহুল এর কান্না কোনোভাবেই থামাতে পারছেনা কেউ।

এইদিকে আমিনা নীরব হয়ে বসে আছেন।
উনি কোনোভাবেই চোখে পানি আনতে পারছেন না।
সুমা নিতিনের কাছে ফোন দেয়।
সেদিন সুমা নিতিনের নাম্বার রেখেছিলো।
নিতিন ফোনে সুমার নাম দেখেই হাসি মুখে ফোন রিসিভ করে।
কিন্তু হাসি মুখটা মলিন হয়ে যায়। ওপাশে কান্নার শব্দতে।

নিতিনঃ কি হয়েছে সুমা?
সুমা: রাহিন ভাইয়া আর এই পৃথিবীতে নাই।
সুমার কথা শুনে নিতিন এর দেহ শীতল হয়ে যায়।
ওয়াশ রুম থেকে রেহান আসে।
এইদিকে সুমা ফোনে হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছে।

রেহানঃ নিতিন কি হয়েছে?
নিতিনকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলো।
নিতিনঃ রেহান নিশির ভালোবাসাও এই পৃথিবীতে নাই আর।
কেঁদে দেয় নিতিন।

রেহান সাথে সাতগে নিতিনের কাছ থেকে ফোনটা নেয়।
রেহানঃ হ্যালো!
সুমা: নিতিন ভাইয়া তোমরা মুগ্ধাকে নিয়ে আসো।
আর বেশিক্ষণ রাখা হবেনা রাহিন ভাইয়ার লাশকে।

রেহানও যেন পাথর হয়ে যায়।
রেহান নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে, সুমার কাছ থেকে রাহিনের বাসার এড্রেস নেয়।
আবার মুগ্ধার মন খারাপ হবে।
ওরা কোনো কিছু না ভেবে বাসায় যায়।
মুগ্ধাকে রাহিনের ব্যপারে কিছু না বলে। ঘুরতে যাবে বলে বাসা থেকে নিয়ে আসে।

মুগ্ধা ঘুম থেকে উঠেছিলো মাত্র। তার মধ্যেই রেহান আর নিতিন বাসায় যায়। আর এসব।
মুগ্ধা বারবার জিজ্ঞেস করছিলো। তাদের মন খারাপ কেন।
কিন্তু দুজন নীরব থাকে।
সুমার দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে যায়। মুগ্ধা একটা বাসায় এতো মানুষকে দেখে কিছুই বুঝতে পারেনি।
রেহান আর নিতিন এর পিছন পিছন মুগ্ধাও ঢুকলো।

ভিতরে ঢুকে সুমাকে দেখতে পায় ওরা।
সুমা দৌড়ে এসে মুগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে।
সুমার কান্না দেখে ভয় পায় মুগ্ধা।
সামনে তাকাতেই রাহিনের লাশটা মুগ্ধার চোখে পরে।

আর চিৎকার দিয়ে দৌড়ে যায় রাহিনের লাশের পাশে।
আশরাফ আর রাহুল অবাক হন এই মুগ্ধাকে দেখে। এর আগে কখনো এই মেয়েকে দেখেন নি।
মুগ্ধা চিৎকার করে কান্না করছে আর বলছে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া তুমিও চলে গেলে। এখন কার মধ্যে আমার আপুকে খুঁজবো।

ভাইয়া তুমি না আমায় কথা দিয়েছিলে। ভাইয়া
আমার আপুর মতো তুমিও আমায় কাঁদালে।
মুগ্ধার এমন কথা আর ভাইয়া ডাক শুনে অবাক হন আশরাফ। কান্না জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন রাহুলকে।
আশরাফ: চিনিস এই মেয়েকে?
রাহুল মাথা নাড়িয়ে “না” বললো,

পাশ থেকে জমশেদ মিয়া বললো,
জমশেদ: আমাদের গ্রামের রমিজ মিয়ার মেয়ে। ওর নাম মুগ্ধা। আমার রাহিন দাদা ভাই মুগ্ধার বড় বোন নিশিকে ভালোবাসতো।
আশরাফ কথাটা শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলেন।
আশরাফ: ভালোবাসতো মানে কি আব্বা?
আব্বা ডাকটা শুনে জমশেদ মনে মনে অনেক খুশি হন।

তারপর বললেন।
জমশেদ: রাহিন দাদা ভাই যখন আমাদের বাড়িতে থাকতো, তখন রমিজের মাইয়া নিশির লগে প্রেম হয়। আমিও জানতাম না এই কথা। কিন্তু কালকের আগে রাহিন আমাদের বাড়ি থেকে আসার সময় বলে।

আশরাফ রেগে গিয়ে বলেন।
আশরাফ: তাহলে ওই নিশি মেয়েটা কোথায়?
জমশেদ: নিশিতো কয়েক দিন আগেই মারা গেছে।
কথাটা শুনে রাহুল বললো,

রাহুল: নিশি মারা গেছে মানে?
জমশেদ: একদিন সকালে ওর ঝুলন্ত লাশ ওর রুমে পান। সবাই ভাবে নিশি আত্মহত্যা করেছে।
কিন্তু রাহিন দাদা ভাই আমাদের বাড়িতে আসে। তারপর সে নিশির মরার খবর শুনে পাগল হয়ে যায়।
পরে দেখা যায় নিশিকে খুন করা হয়েছে।

তারপর জমশেদ সেদিনের সব কথা বলেন।
জমশেদের মুখে এমন মর্মান্তিক ঘটনা শুনে আশরাফ এর দেহ শীতল হয়ে যায়।
এতোটা ভালোবাসা। যে একজনের মৃত্যুতে অন্যজন?
আশরাফ নিজের ছেলের দিকে তাকান।

এই ছেলে আর কখনো বলবেনা তাকে আব্বু আমায় বিয়ে করাও।
আর বলবেনা আমি বিয়ে করার পর কাজ করবো।
চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
রাহুল তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, সেও তার প্রিয় মানুষটার সাথে চলে যায়।

যেখানে থেকে আর ফিরে আসবেনা মন চাইলেও।
মুগ্ধাকে সুমা ভিতরে নিয়ে যায়।
নিতিন আর রেহান সব শুনে হতবাক হয়ে যায়। এটাই কি সত্যিকারের ভালোবাসা।
যার মিল হয় দুজনের মৃত্যুতে।

রাহিনকে সন্ধ্যার আগে কবর দেওয়া হয়।
তার জানাযা তার ভাই রাহুল পড়িয়েছে। বারবার গলা ভেঙে আসছিলো তার।
দুইবছর পর দেশে এসেও নিজের ভাইকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারেনি সে।

পারেনি তার ভাইয়ের মুখে ভাইয়া ডাক শুনতে। রাহিন বলতো ভাইয়া তুমি দেশে এসেই আমার আর নিশির বিয়েটা দিয়ে দিবে।
এমন কথা আর কখনো শুনবেনা সে।
নিশি আর রাহিনকে সবাই মনে রাখবে শুধু দু’জনের সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য।

মুগ্ধাকে রেহান আর নিতিন নিয়ে আসে বাসায়।
গাড়িতেও কান্না করেছে। তার বুবুর ভালোবাসাও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো।

চাইলেই সে আর তার বুবুর ভালোবাসাকে দেখতে পারবেনা। তার বুবুর ভালোবাসা সত্য ছিলো, তেমন রাহিনের ভালবাসাও।
কিছু ভালোবাসা কেড়ে নেয় প্রকৃতি। যার মিল কখনো হয় না।
মুগ্ধা তার মা বাবাকে রাহিনের মৃত্যুর খবর জানিয়ে দেন।
জেনিফা শুনে কান্না করে দেন। আর বলেন।

রাসেল শুধু নিশির খুনি না সে রাহিনেরও খুনি।
সে নিশিকে একা খুন করেনি, খুন করেছে রাহিনকেও।
খুন করেছে একটা সত্যিকারের ভালোবাসাকে।

কেটে যায় বেশ কিছুদিন।
সবাই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আমিনা নিজের ছেলের জন্য নীরবে কান্না করেন। কিন্তু চোখে পানি আসেনা আমিনার।
রাহুল আর তিশা মাঝেমধ্যেই রাহিন এর কথা মনে করে কান্না করে।

রাহিনের মৃত্যু যেনো দুই ফ্যামিলিকে এক করে দিলো। আমিনার বাবা আর ভাইদের সাথে সেই আগের সম্পর্কটা জমে উঠলো শুধু রাহিনের মৃত্যুতে।
সুমা রাহিনের মৃত্যুর পর থেকেই রাহিনদের বাসায় থেকে যায়।


পার্ট: ৮

কুয়াশা ভেজা সকালে,
বাগানে বসে আছে মুগ্ধা।
তার প্রতিটা সকাল শুরু হয় এই বাগানে বসে থাকার মাধ্যমে।
পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ, আর শিশির বিন্দু জল, ভালোই লাগে মুগ্ধার।
রেহানের বাবামার ভালোবাসা পেয়ে মুগ্ধা সত্যিই মুগ্ধ।

কিছু সময় বাগানে বসে, তারপর রান্নাঘরে যায় মুগ্ধা, রেহানের মাবাবার জন্য চা বানাতে।
তোহফা আর মণিমা রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছে।
তোহফার মরুভূমিতে ফসল ফলালো রাইয়ানের পরিবার।

তোহফা কখনো কল্পনা করেনি। সেও একদিন পরিবার পাবে, বাবা পাবে, ভাই পাবে, পাবে একটা বড় আপুর মতো ভাবি।
তোহফাকে কিছু ভাবতে দেখে মণিমা প্রশ্ন করেন।
মণিমাঃ নন্দিনী কিছু ভাবছো না-কি?

( তোহফার খুব ভালো লাগে মণিমার মুখে নন্দিনী ডাক শুনতে)।
তোহফা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বুঝালো।
মণিমা রুটি তৈরি করছে আর বলছে।

মণিমাঃ শুনি কি ভাবা হচ্ছে আমার নন্দিনীর?
তোহফাঃ আমি কখনো কল্পনা করিনি, কখনো তোমাদের মতো একটা পরিবার পাবো আমি।
তোহফার চোখের কোণে পানির রেখা ভালোভাবেই দেখতে পারছে মণিমা।
মণিমা তোহফার মন ভালো করার জন্য বললো,
মণিমাঃ তা নন্দিনী আমার, কাউকে কি কখনো ভালোবেসেছো?

কিন্তু মণিমা জানেই না, সে তোহফার মনটা আরো খারাপ করে দেয়।
তোহফা মণিমার দিকে তাকায় আর বলে।
তোহফাঃ ভাবি আমি কখনো কোনো ছেলেকে দেখিনি।

আমার আশ্রমটা ছিলো, মহিলা আশ্রম।
যেখানে ছেলেরা ঢুকার আইন ছিলো না।
তারপরেও মাঝেমধ্যে আশ্রমে থাকা মেয়েদের বিয়ের জন্য অনেকসময় অনেক পুরুষ আসতো। তাদের ছেলের বউ নির্ধারণ করার জন্য।
মন খারাপ করে বললো,

মণিমা নিজেকে নিজেই কিলাতে মন চাচ্ছে, ভাবলো কি আর হলো তার উল্টো।
মণিমাঃ আমি তোমার ভাইদের ঘুম থেকে জাগিয়ে আসি।
তুমি রুটি গুলো তৈরি করো।
তোহফা মাথা নাড়ালো।
মণিমা চলে যায় রান্না ঘর থেকে।

তোহফা তার আশ্রনে থাকার সময় অত্যাচারের কথা গুলো ভাবতে লাগলো। তখনি তার শরীর কেঁপে উঠে।
তাই আর না ভেবেই কাজ করতে শুরু করে।
মুগ্ধা চা তৈরি করে নিয়ে যায় রেহানের বাবামার জন্য।

জাফরুল্লাহ চেয়ারে বসে বসে কি যেন ভাবছিলেন।
মুগ্ধাকে দেখে ভাবনা থেকে বের হয়ে আসেন।
মুগ্ধাঃ আব্বা তোমার চা?

জাফরুল্লাহ: দে মা,
জাফরুল্লাহ চায়ে চুমুক দেন আর মুগ্ধার দিকে তাকান।
আর ভাবেন গ্রামের মেয়েরা কি রান্নাতে বেশিই পারদর্শী?
মুগ্ধার রান্না করা খাবার রামিছার রান্নার চেয়েও ভালো।

মুগ্ধা যেমন সুন্দর তেমন রান্নায়ও পারদর্শী।
কিন্তু মুগ্ধা একটা জিনিস রান্না করতে পারেনা, সেটা হলো ভাত।
মুগ্ধা ভাত রান্না করকে হয়তো শক্ত হবে নয়তো নরম হবে।

তার ১৯ বছর বয়সে কখনো ভালোভাবে ভাত রান্না করতে পারেনি।
রামিছা আর জাফরুল্লাহ চা খাচ্ছেন।
আর মুগ্ধা পাশে বসে আছে।
মুগ্ধা কিছু একটা কথা বলবে। কিন্তু কোনোভাবেই বলতে পারছেনা।
একপর্যায়ে মুগ্ধা বললো,

মুগ্ধাঃ আম্মা একটা কথা বলার ছিলো?
রামিছা চা’য়ের কাপ পাশে রাখতে রাখতে বললেন।
রামিছাঃ বল কি বলবি।
মুগ্ধাঃ আমি বাড়িতে যাবো।

নিচের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো,
বাড়িতে যাবো কথাটা শুনে রামিছা আর জাফরুল্লাহ এর মন খারাপ হয়ে যায়।
রামিছাঃ কেন’রে মা এখানে বুঝি ভালো লাগছেনা তোর?
মুগ্ধাঃ আসলে তা না আম্মা,

আমি আম্মা আব্বাকে দেখিনা অনেক দিন ধরে।
রামিছাঃ ফোনে তো কথা হয়। তাহলে আর গিয়ে কি করবি।
মুগ্ধা মন খারাপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

রামিছাঃ আচ্ছা তোর মাবাবাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসলে কেমন হয়?
মুগ্ধাঃ মানে?
জাফরুল্লাহ: আমাদের এতো বড় বাসায় মাত্র তিনজন থাকি, তাই যদি তোর মাবাবাও আমাদের সাথে থাকেন। তাহলে একটা সুখী ফ্যামিলি হবে।
মুগ্ধা কিছু বলছে না।

মুগ্ধার এখানে তেমন ভালো লাগছে না।
তার সেই টিনের ঘরেই যে সুখ আবদ্ধ। কিন্তু কিভাবে বলবে সে?
রামিছাঃ মুগ্ধা মা তোকে তো রেহান একবারের জন্য নিয়ে এসেছে।
মুগ্ধা অবাক হয়ে

মুগ্ধাঃ মানে?
রামিছাঃ সেটা রেহানের মুখ থেকেই শুনে নিবি।
মুগ্ধা চলে আসে তার রুমে।
রেহান ভাই একবারের জন্য নিয়ে এসেছে মানে?
তাহলে কি?

মুগ্ধাঃ এটা কখনো হবে না। তাহলে আমি আজকেই চলে যাবো।
মুগ্ধা নিজেই নিজের সাথে কথা বলছে।
রেহান আর নিতিন ক্লাস শেষে তাদের রুমে আসে।
নিতিন তার ক্লান্ত দেহটা বিছানায় তলিয়ে দেয়।

আর রেহান গোসল করে নেয়।
রেহান কিছু টাকা ব্যাংক থেকে নিয়ে আসার জন্য রওনা দিবে।
রেহানঃ আমি ব্যাংকে যাই, তুই রান্নাটা করে নিবি?

নিতিনঃ আমিও তোর সাথে যাবো।
রেহানঃ না আমি একাই যাই।
তুই রান্না কর, তোর কি কিছু লাগবে?
(রেহান আর নিতিন শুধু দুই বন্ধু না। দুই ভাইয়ের মতো ওরা।

নিতিন আর রেহান দু’জনি সমান তালে টাকা খরচ করে।
কখনো নিতিন রেহানের জন্য এটা আনবে ওটা আনবে সারপ্রাইজ করার জন্য, আবার রেহানও একি কাজ করে।)
নিতিনঃ না, কতো টাকা তুলবি?
রেহানঃ ১০ হাজার।

নিতিনঃ তাহলে আমি আসি তোর সাথে?
রেহানঃ আমি পিচ্ছি না-কি?
তুই রান্না কর। আমি এসেই খাবার খাবো।

নিতিনঃ হুম।
তোকে একটা কথা বলবো?
রেহানঃ কি কথা?
নিতিনঃ মুগ্ধাকে তুই সত্যিটা বলে দিচ্ছিস না কেন?
পরে দেখবি তোকে ভুল বুঝবে?
রেহানঃ বাসায় গেলেই বলবো।

নিতিনঃ হুম।
রেহান চলে যায় টাকা তুলতে।
আর নিতিন রান্না করতে মন দেয়।
রাইয়ান দুপুরের খাবার খেয়েই ঘুরতে বের হয়।

দুপুরের পর ঘুরানো এটা তার প্রতিদিনের রুটিনের মধ্যে একটা।
রাইয়ান গাড়ি নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাবে বলে বেরিয়েছে।
৩০ মিনিটের রাস্তা পার হওয়ার পর, সামনে অনেক মানুষের ভীড় দেখলে।
রাইয়ান কোনো ভাবেই সেই ভীড়টা অতিক্রম করতে পারেনি।

তাই ভীড়ের কাছে গিয়ে সে তার গাড়ি থামায়। গাড়ি থেকে নামে, ভীড়ের মধ্যে কি হচ্ছে তা আবিষ্কার করার জন্য।
ভীড় ঠেলে দেখতে পারলো, একটি ছেলেকে মারতেছে ৪ থেকে ৫ জন ছেলে মিলে।
ছেলেটির হাতে চুড়ি দিয়ে টান দিয়ে রক্ত বের করে দেয়।
কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছেনা।

যাকে মারছে সেই ছেলেটাও খুব সাহসী, নিজেই লড়ে যাচ্ছে একা।
ঘৃণা লাগলো ভীড়ে থাকা মানুষের প্রতি রাইয়ানের, সবাই দেখছে, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছে না।
রাইয়ান গাড়ি থেকে একটা লোহার রড বের করে। যেটা তার নিজের সুরক্ষার জন্য রাখে।
এই অভিজ্ঞতা তার লন্ডনে হয়েছিলো।
তার ফ্রেন্ড লিজা (যে এক ইংলিশ মেয়ে)

বলেছিলো, গাড়ি চালানোর সময় সাথে নিজের সুরক্ষার জন্য কিছু রাখবি।
রাইয়ানও লিজার কথা মতো সেই কাজটা করে।
রাইয়ান ভীড় ঠেলে যাওয়ার আগেই, ওই চার-পাঁচজন এর মধ্যে একজন ওই ছেলেটির পেটে চুড়ি ঢুকাতে গেলেই রাইয়ান দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে বাড়ি মারে গাঁঢ়ের ডান পাশে। সাথে সাথে লুটিয়ে পড়ে ছেলেটা, তারপর রাইয়ান হাতে থাকা রড দিয়ে অন্যদের মারতে থাকে।

ওই চার-পাঁচজন এর মধ্যে লিডার যে সে বলে।
সিয়াম: ওই তুই কে?
রাইয়ানঃ সেটা জেনে লাভ কি।
বলেই সিয়ামের হাটুতে আঘাত করে রাইয়ান।

রাইয়ানকে পেয়ে অন্য পাশের জন সাহস পায়।
সে তার রক্তাক্ত হাত নিয়েই মারতে থাকে।
এক পর্যায়ে। সিয়াম তার সঙ্গীদের নিয়ে পালিয়ে যায়।

রাইয়ানঃ কেন মারছিলো ওরা, আর কে তুমি?
রাইয়ান প্রশ্নটা করে ছেলেটির হাতের ক্ষত জায়গাটা কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়।
রেহানঃ আমি রেহান, জানিনা হঠাৎ কেন এভাবে আমার পথ আটকায়। আর মারতে থাকে।
রাইয়ানঃ নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।

রেহান পকেটে হাত দিয়ে দেখে তার টাকা ঠিক আছে। এবংকি ফোনটাও, ফোনটার গ্লাস ফেটেছে।
রাইয়ানঃ আসো আমি তোমায় বাসায় দিয়ে আসি, তার আগে ডক্টর এর কাছে চলো।
(রাইয়ান এর থেকে বয়স কম হওয়ার কারণে তুমি করেই ডাকে)
রেহানঃ তার আর প্রয়োজন হবেনা।

আমি একাই যেতে পারবো।
আর আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
রাইয়ানঃ ওরা যে তোমায় আবার আক্রমণ করবেনা সেটা কি তুমি নিশ্চিত?
রেহান চুপ থাকলো।

রেহানকে গাড়িতে করে প্রথমে হসপিটাল যায়।
— কাজ কি শেষ?
সিয়াম: পারিনি কাজটা করতে মামা।
ওপাশের লোকটি রেগে গর্জে উঠে। আর বলে।

— তুই কোন কাজটা ভালোভাবে করতে পারিস বলতো?
সিয়াম: রাগছো কেন মামা?
আজকেই তো রেহানকে শেষ করে দিতাম। কিন্তু কোথা থেকে এক ছেলে এসে আমাদের মার‍তে শুরু করে।
— তোরা এতোজন থাকার পরেও, একটা ছেলে তোদের কিভাবে পিটায়?

সিয়াম: রেহানও তো কম না।
— যেভাবেই হোক আমি রেহানের মৃত্যুর খবর শুনতে চাই, আর সেটা খুব তাড়াতাড়ি।
সিয়াম: অবশ্যই।
ওপাশের জন ফোন কেটে দেয়।
সিয়াম রেগে পাশে থাকা চেয়ারে লাত্তি মারে।

একটুর জন্য আজ রেহান বেঁছে যায়। তার হাত থেকে ৫ লক্ষ টাকা আবারো ফসকে যায়।
রাইয়ান রেহানকে ডক্টর দেখিয়ে তার বাসায় নিয়ে যায়।
বাসায় শুধু তখন রামিছা আর মুগ্ধা ছিলো। মুগ্ধা ঘুমাচ্ছিলো।

রেহানের হাতে ব্যান্ডেজ দেখে রামিছা কান্না করে দেন।
রামিছাঃ কি হয়েছে তোর,
এরকম হাজার প্রশ্ন কর‍তে শুরু করেন রামিছা।
রেহান তার মা’য়ের এমন অবস্থা দেখে মুচকি হেসে বললো,

রেহানঃ আরে কিছুই হয়নি আম্মু।
পিছন থেকে একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিলো।
(চিন্তা করবেন তাই মিথ্যা বললো,)
রেহানের মা’য়ের এমন অবস্থা দেখে, রাইয়ান এর ভিতর কেঁদে উঠে।

তার মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে ঠিক এভাবেই তার জন্য হয়তো কান্না করতেন।
রামিছাঃ সত্যি বলছিস তো।
রেহানঃ বিশ্বাস না হলে ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেন? ( রাইয়ান এর দিকে ইশারা করে বললো,)
গাড়িতেই রাইয়ানকে বলে দিয়েছে, এসবের কিছু না বলতে বাসায়।

রামিছা রাইয়ান এর দিকে তাকালে,
রাইয়ান মাথা নেড়ে হুম বললো,
রামিছা এখনো কান্না করছেন।
আর রাইয়ানকে ধন্যবাদ জানান।
মুগ্ধার ঘুম ভেঙে যায়।

ঘুম ভাঙার পর নিচে কান্নার শব্দ আবিষ্কার করে সে, রামিছার কান্না শুনে মুগ্ধা ভয় পেয়ে যায়। কেন কান্না করছেন সেটা দেখার জন্য দৌড়ে আসে শরীরে উর্ণা পেচিয়ে।
মুগ্ধা নিচে এসে রেহানকে দেখতে পায়।
রেহানের হাতে ব্যান্ডেজ দেখে প্রশ্ন করে মুগ্ধা।
মুগ্ধাঃ রেহান ভাইয়া তোমার হাতে কি হয়েছে, আর কখন আসলা তুমি?

(কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করে)
রামিছা আর রেহান খুশি হন, মুগ্ধার এমন চটপট দেখে। এটাই তো চান তারা।
মুগ্ধাঃ কিছু বলছো না কেন?
রেহান মুচকি হেসে বললো,
রেহানঃ আরে পাগলী কান্না করছিস কেন।

সামান্য এক্সিডেন্ট করেছি।
মুগ্ধা কোনো কথা না বলে রেহানের হাতটা ধরে, এই প্রথম সে রেহানের হাতটা ধরে।
আর বলে।
মুগ্ধাঃ এটা সামান্য বলছো তুমি?
(রেগেই)

রেহানঃ হুম, বড় কিছু হতো, যদি এই ভাইয়াটা না থাকতেন।
মুগ্ধা রেহানের দেখানো হাতের ইশারর দিকে তাকায়।
মুগ্ধা কোনো ছেলেকে আবিষ্কার করে তার পিছনে থাকা সোফায়, সে এতক্ষণ দেখেনি।
রাইয়ান এতক্ষণ মুগ্ধার কথা শুনছিলো।
কিন্তু মুখটা দেখতে পারেনি।

যখন রেহানের কথায় মুগ্ধা পিছন ফিরে তাকায়। তখন মুগ্ধার মুখটা দেখে রাইয়ান।
রাইয়ান মুগ্ধার মুখটা দেখেই খুব বড় একটা ধাক্কা খাই ভিতরে।
একটা মেয়ে এতো সুন্দর হয় কিভাবে?
এক পলকে চেয়ে আছে
মুগ্ধার দিকে।

মুগ্ধা ঘুম থেকে উঠেই নিচে চলে আসে।
তার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে।
রাইয়ান শুধু মনে মনে এটাই বললো,

রাইয়ানঃ এতো আমার কল্পনার মোনালিসা।
এতোদিন ধরে আমি যার জন্য অপেক্ষা করে আসছি৷ সে-তো ঠিক আমার কল্পনায় আঁকা মোনালিসার মতো।
মুচকি হেসে দেয় রাইয়ান।

রাইয়ান এর এমন তাকানোর জন্য লজ্জা পায় মুগ্ধা।
সেও কেমন করে রাইয়ান এর দিকে তাকিয়েছিলো।
কোনো কিছু না ভেবেই বললো,
মুগ্ধাঃ ধন্যবাদ ভাইয়া আপনাকে।
ভাইয়া ডাকটা শুনে রাইয়ান এর রাগ হয়।

যে রাইয়ান সারাক্ষণ একটাবার ভাইয়া ডাক শুনার জন্য দিশেহারা থাকতো।
তার আজকে ভাইয়া ডাকটার উপর রাগ হচ্ছে।

তারপরেও রাইয়ান মাথা নাড়ালো।
মুগ্ধাঃ রেহান ভাইয়া তোমরা বসো আমি তোমাদের জন্য চা করে নিয়ে আসি।
এই বলে মুগ্ধা রান্না ঘরে চলে যায়।

রেহান রাইয়ান এর দিকে তাকায়৷ তার আর বুঝতে বাকি নেই।
রাইয়ান এর মনে কি চলছে।
রামিছাঃ তোমার নাম কি বাবা?
রাইয়ানঃ রাইয়ান রহমান।

ভাই আমি এখন আসি৷
বাসায় যেতে হবে।
রেহানঃ চা খেয়ে যান?

রাইয়ানঃ অন্যদিন খাবো।
আজ আসি।

রেহানঃ আচ্ছা আপনার নাম্বারটা দেন।
রেহান এর নাম্বার নেওয়ার মানে বুঝলো না রাইয়ান।
রাইয়ান জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায় রেহানের দিকে।

রেহানঃ যে আমার জীবন বাঁচালো তার নাম্বার না রাখলে কি হয়।
রামিছা রান্না ঘরে চলে যান। তাই কথাটা বললো রেহান।
রাইয়ান হাসলো।
আর নাম্বারটা দিয়ে দিলো।

আর রেহানের নাম্বারটা নিলো।
রেহানঃ চা মনে হয় হয়ে গেছে। খেয়েও যেতে পারতেন।
রাইয়ানঃ অন্যদিন খাবো।
(এখানে থাকলে মেয়েটাকে নিয়ে কল্পনাতে চলে যাবে সে।)

রাইয়ান রেহানকে বায় বলে চলে যায়।
মুগ্ধা চা নিয়ে এসে দেখলো, ছেলেটি চলে গেছে।
রেহান বললো তাড়া আছে তাই গেছে।

মুগ্ধা রেহানের দিকে রাগী চোখে তাকায়।
আর তার রুমে চলে যায়।
রেহান নিতিনের কাছে ফোন দেয়।
বকা দিবে জানে রেহান।

কিন্তু সেই সব শুনে মন খারাপ করবে।
নিতিন ফোন ধরে আর বলে।
নিতিনঃ ওই শালা ভদ্র শালা

আমি তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে খাবার খাইনি। আছর এর আজান পড়ে গেলো।
তুই কোথায়?
রেহানঃ এতো প্রশ্ন করছিস, মনে হচ্ছে আমি তোর প্রেমিকা।
হেসে দেয় রেহান।
নিতিনঃ তার থেকেও আপন তুই শালা।

রেহানঃ শালা ডাকিস না তো।
আমার বোন নাই।
নিতিনঃ জানি আমি।

রেহান তারপর সব বলে নিতিন কে।
নিতিন সব শুনে আর বলে।
নিতিনঃ বলছিলাম না আমায় সাথে নে।

বেশি আঘাত পেয়েছিস কি?
(কান্না করে দেয় নিতিন। এতো বছর ধরে থাকছে রেহানের সাথে। সিলেট যখন আসছিলো নিতিন, তখন থেকেই রেহাব তার পাশেই আছে।)
রেহানঃ বাসায় আছি।
তেমন কিছু হয় নি।
নিতিনঃ তাহলে তুই দুইদিন রেস্ট নিয়ে আয়।
রেহানঃ হুম।

নিতিনঃ আমার বোন কেমন আছে?
রেহানঃ কাল সকালে তুইও চলে আয়।
তোর আর ম্যাচে থাকতে হবে না একা।
আর তুই নিজেই এসে দেখে যা তোর বোনকে।
নিতিনঃ আচ্ছা তাহলে কাল সকালেই আসবো।
রেহানঃ হুম।

রেহান ঘুমানোর চেষ্টা করে।
মুগ্ধাকে এখনো কোনো ফোন দেওয়া হয়নি।
বাসার ফোন দিয়েই কথা বলে তার মাবাবার সাথে।
আসলে মুগ্ধা নিতে চায় নি ফোন।
রাইয়ান গাড়ি ড্রাইভ করছে আর ভাবছে,

সে রেহানকে কোথায় যেনো দেখেছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছেনা।
কিন্তু রাইয়ান এর বিশ্বাস সে রেহানকে কোথাও দেখেছে, নইলে কেন এতো চেনা চেনা লাগবে একজন অচেনা লোককে।
অন্য একদিন দেখা হলে ভালো ভাবে কথা বলবে রেহানের সাথে, তাদের আগেও কোথাও দেখা হয়েছে কি-না সেটা জিজ্ঞাস করবে।
রাইয়ান একটা ফোনের দোকানে ডুকে। তোহফার জন্য ফোন কিনবে।

রাইয়ান বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়।
তোহফার রুমে যায় রাইয়ান।
তোহফা শুয়ে ছিলো।
রাইয়ানকে দরজায় দেখে উঠে বসলো তোহফা।
রাইয়ানঃ এই নাও।
তোহফাঃ কি আছে বক্সে?

রাইয়ানঃ তুমিই খুলে দেখো?
তোহফা গিফট বক্সটা খুলে দেখলো একটা ফোন।
তোহফাঃ ভাইয়া এর কি কোনো প্রয়োজন ছিলো?

রাইয়ানঃ আমার বোনকে আমি কি দেবো না দেবো এটা আমার ইচ্ছা।
হেসে হেসে বললো রাইয়ান কথা গুলো।
তোহফা এই কথার উপর কি বলবে ভেবে পেলো না।
তোহফাঃ আমার তো সিম নাই।

রাইয়ান কথাটা শুনে, তার ফোন থেকে একটা সিম বের করে দিলো তোহফাকে।
রাইয়ানঃ এই সিমে শুধু আমাদের নাম্বার আছে। হবে তো?
তোহফাঃ হুম।

রাইয়ান এর হাত থেকে সিমটা নেওয়ার সময় তোহফার দৃষ্টি পরে রাইয়ান এর হাত লাল হয়ে আছে।
তোহফাঃ ভাইয়া তোমার হাত লাল কেনো?
রাইয়ান চায়না আজকের বিষয় তার বাসার কেউ জানুক।
তাই রাইয়ান বললো,
রাইয়ানঃ ও কিছু না,

তোহফা বুঝলো রাইয়ান কিছু লোকাচ্ছে। তাই আর কিছু বললো না।
কারণ কেউ কিছু লোকাতে চাইলে তাকে লোকাতে দেওয়া উচিত, এটা তোহফার মতে।
রাইয়ানঃ আচ্ছা যাই তাইলে?
তোহফাঃ হুম।

রাইয়ান নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পরলো।
রুমে আসার আগে অবশ্য মণিমার রুমে উঁকি দিছে।
মণিমা বই পড়ছে, তাই আর ডিস্টার্ব করলোনা।

মণিমা দেখতে পেলে আসতে দিতোনা। গল্প শুরু করে দিতো।
রাইয়ান চোখ দুটো বন্ধ করলো।
চোখ বন্ধ করতেই মুগ্ধার চেহারাটা তার সামনে ধরা দিলো।
রাইয়ান চোখ বন্ধ রেখেই শুয়া থেকে উঠে বসলো।

বালিশ জড়িয়ে পাশেই দেয়াকে হেলান দেয় রাইয়ান।
আজ কাকে দেখলো সে, যে দেখতে, একবারে তার কল্পনায় আঁকা মোনালিসা।
শুধু একটু নজর দেখেই সে মেয়েটাকে নিজের চোখে এঁকে নিলো।
রাইয়ান হাসলো, মেয়েটার নাম জানা হলোনা তার।

তাই সে নিজে নাম দিলো মুগ্ধার নাম মোনালিসা। তার স্বপ্নের মোনালিসা।
মেয়েটা মোনালিসার চেয়ে দেখতে কম না।
আবারো মনে মনে হেসে উঠলো রাইয়ান।
পেয়েছে সে, পেয়েছে তার কল্পনায় আঁকা মোনালিসাকে।

সন্ধ্যা হয়েছে। মুগ্ধা রামিছাকে চা দিলো। জাফরুল্লাহও চলে আসবে একটু পর। আজকে আবার ঠাণ্ডাও খুব। মুগ্ধা দু’হাতে দুই কাপ চা নিয়ে রেহানের রুমে যায়। রেহান শুয়ে শুয়ে

ফোন টিপছিলো। মুগ্ধা রেহানের রুমে গিয়ে রেহানের রুমের দরজাটা আটকে দেয়। এটা দেখে রেহান অবাক চোখে তাকালো মুগ্ধার দিকে। আর মুগ্ধার রাগী চাহনি দেখে কিছুটা ভয়ও পায় রেহান। কি চলছে মুগ্ধার মনে। আর কেনোই বা দরজা আটকালো?


পার্ট: ৯

রেহানঃ দরজা আটকালে কেনো?
মুগ্ধাকে প্রশ্নটা করলো।

মুগ্ধাঃ এই নাও চা?
রেহান চা নিয়ে নিজের পাশে রাখলো। আর আবারো প্রশ্ন করলো।
রেহানঃ দরজা বন্ধ করলে কেন?

মুগ্ধাঃ কিছু প্রশ্ন করবো। যদি নেগেটিভ উত্তর আসে তোমার কাছ থেকে। তাহলে প্রথমে তোমার হাত ভাঙবো, পরে পা ভাঙবো। তারপর গাঁঢ় ভাঙবো।
মুগ্ধা খুব রাগে কথাটা বললো, রেহান ভয়ে ভয়ে বললো,
রেহানঃ প্রশ্ন করতে হলে কি দরজা বন্ধ করতে হয়?

মুগ্ধাঃ আমাকে কোনো প্রশ্ন করবে না। তাহলে খুব খারাপ হবে।
রেহানঃ আল্লাহ জানেন কি হলো মেয়েটার? (মনে মনে বললো)
মুগ্ধাঃ আমাকে কেন তোমাদের বাসায় এনে রেখেছো?

রেহানঃ চেয়ারম্যান এর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।
মুগ্ধাঃ আর কোনো কারণ নেই?

রেহান মুগ্ধার দিকে কিছুক্ষণ তাকালো। মুগ্ধা এতোটা রেগে আছে যে মনে হচ্ছে রেহানকে খেয়ে ফেলবে। রেহান ভয়ে ভয়ে বললো,
রেহানঃ তোমাকে একবারে নিয়ে এসেছি। কারণ আমা,

রেহানকে কিছু বলতে না দিয়ে, মুগ্ধা চিৎকার করে বললো,
মুগ্ধাঃ তোমার মনে যেটা আসছে, সেটাকে মাটি দিয়ে দাও। আমি কখনো তোমায় ওভাবে দেখিনি। আর যদি জোর করো, তাহলে খুন করে ফেলবো তোমায়। ছেলেদের মারতে এখন আর আমার হাত কাঁপে না। তোমাকে আমি কি ভেবে আসছিলাম। আর তোমার মনে এসব ছিলো?

মুগ্ধা কথাগুলো বলে কেঁদে দেয়। রেহানের রাগ হলো। রেহানের সব কথা না শুনেই মুগ্ধা ভাঙা রেডিও এর মতো বাজতে শুরু করলো। রেহান বিছানা থেকে উঠে। মুগ্ধার সামনে

দাঁড়ায়। আর টাটিয়ে থাপ্পড় দেয় মুগ্ধার গালে। মুগ্ধা থাপ্পড় খেয়ে প্রথমে কিছুক্ষণ নীরব থাকে। রেহান বুঝতেই পারেনি সে মুগ্ধাকে থাপ্পড় দিয়েছে। মুগ্ধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বম ফাটার মতো আচরণ করলো।

মুগ্ধাঃ কি ভাবছো? আমি থাপ্পড় খেয়ে তোমাকে ভয় পাবো? তাহলে ভুল ভাবছো। আমি কালকেই চলে যাবো।
রেহানঃ বেশি বুঝো তুমি তাই না?
মুগ্ধাঃ মানে?

রেহানঃ আমি কখনো বলেছি তোমায় ভালোবাসি? বা বলছি এখানে আমার বউ করে রাখবো তোমায়? বলো কখনো কি বলেছি?
রেগে বললো রেহান। মুগ্ধা ভয়ে চুপসে যায়।
মুগ্ধাঃ না
রেহানঃ তাহলে?

মুগ্ধাঃ আম্মা বললেন আমায় এখানে একবারে নিয়ে এসেছো?
রেহানঃ হুম একবারেই নিয়ে এসেছি। তো?
মুগ্ধাঃ একবারে নিয়ে আসার মানেটা কি?
রেহান হাসলো আর বললো,

রেহানঃ আসলেই তুমি পিচ্চি।
রেহান কথাটা বলে বিছানায় ঘরাঘরি খাচ্ছে আর হাসছে। মুগ্ধা বোকা বনে যায় রেহানের হাসি দেখে।
মুগ্ধাঃ হাসছো কেন? আর আমি পিচ্চি না। কিছুদিন পর আমার বয়স ২০ হবে।
রেহানঃ তাহলে পিচ্চিদের মতো না বুঝে কথা বলো কেন।

মুগ্ধাঃ বুঝিয়ে বললেই তো হয়?
রেহানঃ কথার মধ্যেই তো তুমি আজাইরা কথা বলতে শুরু করে দিলে।
মুগ্ধাঃ এই চুপ করলাম। এবার বলো?
রেহানঃ চোখ বন্ধ করো?

মুগ্ধাঃ চোখ কেন বন্ধ করবো?
রেহানঃ এই তুমি চুপ থাকছো?
মুগ্ধা কোনো কথা না বলে নিজের চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়।

রেহান মুগ্ধার হাতজোড়া ধরে। এতে মুগ্ধা কেঁপে উঠে। মুগ্ধাকে রেহানের রুমে থাকা আলমারির সামনে নিয়ে যায়। আলমারি খুলে, আর মুগ্ধাকে চোখ খুলতে বলে। মুগ্ধা চোখ খুলে, তার সামনে অনেক টেডি আর নানান ধরণের পুতুল, সাজুগুজু করার জিনিস, আর

অনেক শাড়ি রাখা আলমারিতে। মুগ্ধা রেহানের দিকে তাকাতেই রেহানকে হাটু ঘেরে বসা অবস্থায় পায়। মুগ্ধা ভেবে নেয়, এবার রেহান তাকে প্রপোজ করবে। কিন্তু মুগ্ধা যে তাকে ভাই ভাবে। ডিসিশন নিলো মুগ্ধা। রেহান যদি প্রপোজ করে, তাহলে সে রেহানের মাথা ফাটাবে। মুগ্ধাকে রেহান অবাক করে বললো,

রেহানঃ নিতিনের মুখে তোমার আর নিশির অনেক গল্প শুনতাম। তখন ভাবতাম, আমার যদি এমন আপন বোন বা চাচাতো বোন থাকতো। তাহলে আমিও এভাবে মানুষের সাথে গল্প করতাম। জানো আমারও চাচাতো দুই বোন আছে, কিন্তু?

রেহান কথাগুলো বলে থেমে গেলো। আর হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে নিলো। তারপর আবার বলতে শুরু করলো।

সেদিন যখন শুনি নিশি আত্মহত্যা করেছে। কথাটা শুনে সত্যিই খুব বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। কারণ নিতিনের বলা বোন গুলো খুব ভালো। তাহলে আত্মহত্যা কেন করলো। তারপর নিতিনের সাথে তোমাদের বাড়িতে যাই।

গিয়ে দেখতে পাই তুমি একাই লড়ছো ওই খারাপ মানুষের সাথে। তখন ভাবী নিতিনের বলা বোনরা শুধু পিচ্চি আর দুষ্টু না, সংগ্রামীও। তখন থেকেই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা

জন্ম নেয়। সেটা কোনো প্রেমিকার না। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটা বড় ভাই এর মতো। তোমাকে আমার ছোট বোন ভাবী। আর এই জন্যই আমাদের বাসায় তোমায় এনেছি।

কথা গুলো বলে রেহান থামে। তার চোখের কোণে পানি জমেছে, মুগ্ধা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে রেহানের দিকে। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেনা। রেহান আবার বললো,
নিতিন জানে, আমি একটা আপু বা বোনের জন্য কতোই না পাগলামো করেছি। আমি নিতিন কে বলতাম, তোরও তো বোন নাই। তাহলে তুই আমার মতো বোনের জন্য পাগলামো করিস না কেন? নিতিন বলতো।

আমার তো দুইটা বোন আছে, নিশি আর মুগ্ধা। জানো আমি ভার্সিটিতে যে মেয়েকেই পেতাম তাকেই বোন বা আপু বলে কথা বলতাম। কিন্তু কেউ আমায় ভালোবাসেনি। তখন নিজে

নিজেকে বলতাম। হয়তো আমার কপালে বোন বা আপু নাই। মুগ্ধা আমি জানি আমার প্রতি তোমার ভুল ধারণা জন্ম নিয়েছিলো। কিন্তু এটা সত্য আমি তোমাকে ছোট বোন ভাবী।

অন্য কিছু না। আমার ভুল হয়েছিলো, আমি তোমায় এতোদিন বলিনি তাই। আমি জানি তুমি আমায় কখনো ফিরিয়ে দিবেনা। কারণ আমি তোমার কাছে খারাপ কিছু আবদার করিনি। হবে না কি আমার পিচ্চি বোন? খুব ভালোবাসবো মুগ্ধা। শুধু নিজের বড় ভাই ভেবে নিতিনের মতো আমায়ও একটু ভালোবেসো।

রেহান কথা গুলো বলে দাঁড়ায়, আর মুগ্ধার দিকে তাকায়। অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে মুগ্ধার কান্না জড়িত চেহারার দিকে। মুগ্ধা কি বলে সেটার অপেক্ষায়।
মুগ্ধাঃ সেটা আরো আগে বললে কি হতো?
রেহানঃ বলার মতো সিচুয়েশনে পাইনি।

মুগ্ধাঃ আমার সাথে কথা বলার সময় কোনো ইংলিশ শব্দ ব্যবহার করবে না।
রেহানঃ আচ্ছা আচ্ছা মহা রাণী। বলো হবে কি আমার পিচ্চি বোন?

মুগ্ধাঃ আমি তো তোমার আর নিতিন ভাইয়ার পিচ্চি বোন’ই। এতে আর চাওয়ার কি আছে।
মুগ্ধার কথায় রেহানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
মুগ্ধাঃ একটা প্রশ্ন করি ভাইয়া?

রেহানঃ করো।
মুগ্ধাঃ তোমার কি আপন চাচা আছে?
রেহানঃ হুম, কয়েক দিন ধরে আসেনি। নইলে দেখতা।
মুগ্ধাঃ ওও তোমার চাচাতো বোনরা তোমায় ভালোবাসেনা?

রেহান মন খারাপ করে বললো,
রেহানঃ কিভাবে ভালোবাসবে। চাচাতো বোন বড়টার সাথে না-কি আমার বিয়ে দিবেন চাচা। কিন্তু আমার সহ্য হয়না চাচার দুটো মেয়েকেই।
কেমন জানি ব্যবহার করে। চাচার মতো অহংকারী।
মুগ্ধাঃ ওও

রেহানঃ মুগ্ধা একটা কথা বলি। আমার চাচা বা চাচাতো বোন গুলো আমার বাসায় আসলে। তোমায় নানান ভাবে অপমান করবে। তখন মন খারাপ করবে না।
মুগ্ধাঃ হুম।
এখন আমি যাই।
রেহানঃ আচ্ছা।
মুগ্ধা নিজের রুমে চলে যায়। নিজেকে নিজেই বকা দিচ্ছে। রেহানের সম্পর্কে খারাপ চিন্তা করায়। রেহানকে আজ অনেক খুশি লাগছে। সেও একটা বোন পেলো। সকালের নাশতা করেই তোহফা ছাঁদে চলে যায়।

কিছুক্ষণ ছাঁদে বসলো, আর বাহিরের ঠাণ্ডা প্রকৃতিও দেখলো। রাইয়ান নাশতা করার পর সিগারেট না খেলে হয় না। তাই সেও ছাঁদে যায়। ছাঁদে গিয়ে তোহফাকে পায়। তোহফা জানে, তাই আর ভয় পেলোনা রাইয়ান।

রাইয়ান সিগারেট ধরালো। সিগারেট এর গন্ধ পেয়ে পিছন ফিরে তাকায় তোহফা।
তোহফাঃ অভ্যাস বদলানো যায় না বুঝি ভাইয়া?
রাইয়ানঃ কিছু অভ্যাস হয়ে গেলে সেটা ছাড়তে খুব কষ্ট হয়।

তোহফাঃ তাই বলে বাজে জিনিসের প্রতি অভ্যাস করবে?
রাইয়ান চুপ থাকলো।
রাইয়ানঃ আমার সাথে ঘুরতে যাবে?
তোহফাঃ ভাইয়া বাসায় ঠিক আছি, বাহিরে গিয়ে কি করবো?

রাইয়ানঃ এতো কিছু জানিনা আমি। আমি বলছি, তাই তোমায় ঘুরতে যেতে হবেই।
তোহফা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালো। তোহফারও মন চায় ঘুরতে, কখনো মুক্ত ভাবে ঘুরতে পারেনি। কখনো কি? কোনোদিনও সে বাহিরের জগতে বের হয়নি। তাকে আলাদা ভাবে রাখা হতো কঠিন নিরাপত্তা এর মাধ্যমে।
দীর্ঘশ্বাস নিলো তোহফা।

তোহফাঃ ভাইয়া কখন যেতে হবে?
রাইয়ানঃ তুমি গিয়ে তৈরি হও। কুয়াশা কেটে গেলেই বের হবো।
তোহফাঃ আচ্ছা। আমি তাহলে নিচে যাই।
রাইয়ানঃ হুম।

তোহফা নিচে চলে যায়। রাইয়ান আকাশ এর দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশ টা ঢেকে রেখেছে কুয়াশা। সূর্যটাকে ভালোভাবে ফুটে উঠতে দিচ্ছেনা কুয়াশা। রাইয়ান কুয়াশার মধ্যে তার মোনালিসার আভাস দেখলো। আনমনেই হেসে দেয় রাইয়ান। সে কখনো ভাবেনি, তার কল্পনায় আঁকা ঠিক মোনালিসার মতোই মেয়েটা। রাইয়ান ডুব দেয় সেইদিনের ঘটে যাওয়া কিছু মজার মুহূর্তে।
,
রাইয়ান যখন লন্ডন ছিলো তখনকার মুহূর্তে ডুব দেয়। রাইয়ান সে সময়ের কথা গুলো ভাবছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। রাইয়ান যে ভার্সিটিতে পড়তো, হঠাৎ তার ভার্সিটির কয়েকটা ফ্রেন্ড বললো ওরা ট্যুরে যেতে যায়। রাইয়ান এর ফ্রেন্ডক্ল্যাব ছিলো সবাই ইংলিশ, সেখানে

বাংলাদেশি কেউ ছিলোনা। রাইয়ান, লিজা, রকি, লেসি, রাইয়ানের এই তিনজনের সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। ওদের কাছ থেকেই সে সিগারেট খাওয়া শিখে। লিজা আর লেসিও সিগারেট খাইতো। সবাই ঠিক করছিলো কোথায় যাওয়া যায়। তখন লেসি বলে,
প্যারিস গেলে কেমন হয়।

(রাইয়ান এর লন্ডন থাকার মুহূর্ত বলা হচ্ছে এখন।
আপনারাও বুঝতে পারবেন, যে রাইয়ান তার লন্ডনের কিছু সিন ভাবছে।

আর গল্পে রাইয়ান বা তার ইংলিশ ফ্রেন্ডদের কথোপকথন আমি বাংলায় তুলে ধরবো।)
লেসি: প্যারিস গেলে কেমন হয়?
সবার কথার মধ্যে লেসি কথাটা বললো,
রকি: ভালো হয়। কিন্তু?

রাইয়ানঃ কিন্তু কি?
রকি: আমরা ১০জন যাবো।

আর প্যারিস গেলে নির্দিষ্ট কিছু জিনিস বা জায়গা, এসব দেখতে হবে আমাদের।
লেসি: হুম, তাহলে আমরা কি দেখতে যাবো।
লিজা বললো তখন।

লিজা: আমরা ল্যুভর মিউজিয়ামে যেতে পারি।
ল্যুভর মিউজিয়াম কথাটা শুনে আমরা ১০ জন থাকা সবাই হুম বলে উঠি।

লিজা: সেখানে যাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য আমার। সেটা হলো মোনালিসা পেন্ডিং দেখা।
রাইয়ান মোনালিসা শব্দটা শুনেই কেমন একটা অনুভূতি ফিল করলো নিজের মধ্যে।
তার আগ্রহ জাগলো মোনালিসার প্রতি।

তারপর থেকে সে নানাভাবে মোনালিসা পেন্ডিং নিয়ে স্টাডি করতে শুরু করে। এটা দেখে লিজা লেসি রকি সহ বাকিরাও হাসতো।
কয়েকদিন পর তারা প্যারিস যায়।
সেখানে যাওয়ার পর তারা ল্যুভর মিউজিয়ামে যায়। আর অনেক অজানা জিনিস দেখে।

তারপর তারা যায় মোনালিসা পেন্ডিং যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে।
খুব সুরক্ষিত ভাবে, রাখা হয়েছে।
রাইয়ান সহ সবাই ঢুকলো।
লিজা বললো,

লিজা: আমার আশা পূরণ হলো। এতোদিনের ইচ্ছা আশা আকাঙ্খা আজ আমার চোখের সামনে।
রাইয়ান মোনালিসার পেন্ডিং এর দিকে গভীর ভাবে তাকাচ্ছে। ওদের মধ্যে একজন বললো,
জ্যাক: রাইয়ান গিলে খাবি না-কি?

রাইয়ান হেসে হেসে বললো,
রাইয়ানঃ খাবো না। আমি মোনালিসাকে বিয়ে করবো।

মোনালিসাকে বিয়ে করবো শুনে সবাই হেসে দেয়।
লেসি: ভাই এই মোনালিসা পেন্ডিংএ কি এমন আছে। যে সব ছেলেদের মুগ্ধ করে?
রাইয়ানঃ জানিনা। লিজা তুই আমায় কি দেখালি। এখন তুই মোনালিসাকে

এনে দে?
রাইয়ানের পাগলামো দেখে ওরা সহ আরো অনেক মানুষ অট্টহাসিতে মেতে উঠে। তখন একজন জার্মানিয়ান মহিলা বলেছিলো। আজকের মোনালিসার চেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এই ছেলেটার আবেগি কথা গুলো। রাইয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে। তখন সবাই আরো বেশি হাসে।
রাইয়ানঃ আমি ততোদিন বিয়ে করবো না। যতোদিন আমি মোনালিসার মতো কাউকে খুঁজে না পাই।
গাড়িতে বসে বসে কথা বলছে। আর সবাই রাইয়ানকে উপভোগ করছে।

লিজা: ১৮০০ সালের পর এক আর্টিস্ট এবং বিজ্ঞানী ছিলো সেই ব্যক্তি, যে মোনালিসার প্রতি বেশি আবেগ দেখাতে গিয়ে, ছাঁদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করে। যেটা তার সুইসাইড নোট থেকে জানা যায়। রাইয়ান ইয়ার আমার, তুই এতো আবেগ দেখাইস না।

রাইয়ানঃ সত্যি আমি মোনালিসার মতো কাউকে খুঁজে নিবো। কিন্তু আমি ওই লোকের মতো পাগলামো করবোনা। কিন্তু কে জানতো রাইয়ান সত্যি সত্যি মোনালিসার মতো কাউকে খুঁজতে থাকবে।

প্যারিসে তারা অনেক ইনজয় করে। ৮দিন ছিলো প্যারিসে। এই ৮দিন রাইয়ান একবার হলেও প্রতিদিন গিয়ে মোনালিসাকে দেখতো মোনালিসার হাসি, ঠোঁট, চোখ, সব তাকে মুগ্ধ করে।
,
বর্তমানে।

রাইয়ান এসব ভাবছিলো আর ছাঁদে বসে আনমনেই হাসছিলো। মণিমা আসে। রাইয়ানকে হাসতে দেখে,
মণিমাঃ তোহফা তৈরি হয়ে বসে আছে নিচে। আর এই দিকে জমিদার একা একাই হাসছেন। তা জমিদারের হাসার কারণটা কি?
রাইয়ান এখনো তার ভাবনায় আছে। তাই বললো,
রাইয়ানঃ আমার মোনালিসাকে পেয়েছি।

মণিমা এসে রাইয়ানের কান ধরে আর বলে।
মণিমাঃ একা একা মেয়ে খুঁজা হচ্ছে, আমাকে না জানিয়েই।

রাইয়ান এতক্ষণে বুঝে সে তার ভাবির সাথে কথা বলছে।
রাইয়ানঃ ভাবি আমার কান ধরলা কেন?
মণিমাঃ কার প্রেমে পরলে শুনি একটু?

রাইয়ানঃ কোথায় কার প্রেমে পরলাম। তুমি ছাঁদে কিসের জন্য আসলা?
মণিমাঃ লোকাচ্ছো আমার কাছ থেকে। প্রেম করলেও কিন্তু মেয়ে দেখতে আমিই যাবো।
রাইয়ান হেসে দেয়।

রাইয়ানঃ আচ্ছা আচ্ছা ভাবি। আগে মেয়েটাকে আবার পাই। তখন না হয় তোমায় সব বলবো।
মণিমাঃ তাহলে আমার পিচ্চি ভাই এবার কারো না কারো প্রেমে পরলো।
রাইয়ান কথা ঘুরানোর জন্য।
রাইয়ানঃ রোধ উঠেছে। তোহফা কি তৈরি হয়েছে?

মণিমা রেগে বললো,
মণিমাঃ সেই কবে তৈরি হয়েছে তোহফা। আর তুমি ছাঁদে বসে আছো।
রাইয়ানঃ চলো ভাবি নিচে যাই।

সে এতোটা ভাবনায় ছিলো যে। তার মনেই নাই কিছু। তারপর রাইয়ান আর তোহফা বের হয় ঘুরানোর জন্য। তোহফা বোরকা পরেছে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। রাইয়ান তোহফাকে নিয়ে নানান জায়গায় যাচ্ছে। তোহফা সব দেখছে আর এনজয় করছে। রেহান নিতিনের জন্য অপেক্ষা করতে কর‍তে সকালেত নাশতাটা করে নেয়। নাশতা করে গোসল করে, তারপর ফোন দেয় নিতিনকে। নিতিন ফোন ধরেই বললো,
নিতিনঃ আমি এইতো বের হলাম। ঘুম থেকে উঠতে দেড়ি হয়ে গেছে। তাই নাশতা করেই বের হবো, যেই ভাবা সেই কাজ।
রেহান হেসে দেয়।

রেহানঃ দুপুরের খাবার এর আগে তোকে বাসায় দেখতে চাই।
নিতিনঃ হুম।
রেহানঃ মুগ্ধাকে তোর কথা বলিনি। তোকে দেখলে অনেক খুশি হবে।

নিতিনঃ সেটা আর বলতে। আমি এখন রাখি। বের হবো।
রেহানঃ হুম।
রাইয়ানঃ চলো কিছু খাই?
তোহফাঃ না বাসায় গিয়ে খাবো।

রাইয়ানঃ আরে বাহিরের খাবার আলাদা মজাই। চলো?
তোহফাঃ আমি কখনো খাইনি যে।
মন খারাপ করলো তোহফা।
রাইয়ানঃ তাইতো বললাম। আজ ভাইবোন মিলে খাবো।

রাইয়ান আর তোহফা প্রথমে ফুচকা খায়। রাইয়ান তোহফাকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়। তোহফার না করার সাহস হয়নি। কারণ রাইয়ান তো তাকে ছোট বোন হিসাবেই ভালোবাসে। তাহলে কেন সে ভালোবাসবেনা রাইয়ানকে। তোহফাও খাইয়ে দেয় রাইয়ানকে। তোহফা এর আগে কখনো ফুচকা খায়নি। আজ প্রথম। রাইয়ান তেমন ফুচকা খায় না। সে ভাবছিলো তোহফা মনে হয় ফুচকা পছন্দ করে। কিন্তু রাইয়ান ভুলে গেছিলো। তোহফার ছোট থেকে বড় হওয়া আশ্রম থেকে।
রাইয়ানঃ আইসক্রিম খাবে?

তোহফাঃ ঠাণ্ডার মাঝে?
রাইয়ানঃ তো কি হয়েছে? একদিন’ই তো খাবো।
তোহফাঃ হুম।

রাইয়ান আর তোহফা একটা আইসক্রিম এর দোকানে ঢুকে। সে দোকানে নিতিনও ছিলো। মুগ্ধার জন্য কিছু চকলেট আর কিছু আইসক্রিম কিনার জন্য। রাইয়ান আর তোহফা গিয়ে নিতিনের পাশে দাঁড়ায়। নিতিন সামনে থাকা আয়নায় তোহফার চেহারা দেখতে পায়। সে তোহফার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে, কারণ যদি আয়নার দিকে তোহফাও তাকায় তাহলে সে বাঁশ খাবে। নিতিন তোহফাকে দেখার উদ্দেশ্যে আরো কিছুক্ষণ থাকতে চায়।

তাই সে আরো কিছু আইসক্রিম আর চকলেট কিনে। কিন্তু সে তোহফার কাছে ধরা খায়। তোহফা দেখে নিতিন তার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। তাই তোহফা পিছন ফিরে থাকলো। নিতিন মন খারাপ করলো। তোহফার কাছে ধরা খেয়েই নিলো। রাইয়ান এতক্ষণ নিতিনের পাগলামো দেখছিলো। রাইয়ান মনে মনে ভাবছিলো।
এতো চকলেট আর আইসক্রিম দিয়ে তো আরো একটা দোকান খুলা যাবে।
নিতিনঃ কতো হলো?

— ৩হাজার ২শ টাকা।
নিতিন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এতো টাকার জিনিস কিনলো সে।
রাইয়ান মনে মনে হাসছে। নিতিন ৩টা এক হাজার টাকার নোট, আর একটা পাঁচশত টাকার নোট দেয়। তারপর সে বাকি টাকা আর তার জিনিস গুলো নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে যায়।

তোহফাও মনে মনে হাসছিলো, নিতিনের এতো টাকার জিনিস কিনা দেখে, আর রাইয়ান তো নিতিন যাবার পর শব্দ করেই হেসে দেয়।
নিতিন দোকান থেকে বের হয়ে। একটা রিকশাতে উঠে। আর নিজে নিজেই বকবক করছে।

নিতিনঃ একটা মেয়েকে একটু মুহূর্ত দেখার জন্য তিন হাজার টাকা খরচ করে নিলাম। কি মানুষ রে আমি?
আনমনেই হেসে দেয়। এই ভেবে। মেয়েটার রূপে এক অজানা মুগ্ধতা আছে।

পার্ট: ১০

নিতিন গিয়ে রেহানদের বাসার কলিং বাজায়।
রেহান আর মুগ্ধা টিভি দেখছিলো আর গল্প করছিলো।

মুগ্ধা গিয়ে দরজা খুলে নিতিনকে দেখে,সাথে সাথে নিতিনকে জড়িয়ে ধরে।
নিতিনঃ আরে পাগলী কান্না করছিস কেন?
মুগ্ধা কোনো কথা বলছেনা।

নিতিন মুগ্ধাকে ছাড়িয়ে,
নিতিনঃ এভাবে কান্না করিস না বোন। রেহান ভাববে তুই এখানে কষ্টে আছিস তাই কান্না করছিস।
মুগ্ধা কিছু না বলে সামনের দিকে হাটতে লাগলো।
রেহানঃ বাহ বাহ! আজ এত্তো কিছু নিয়ে আসলি?

এর আগে তো কিছু নিয়ে আসতি না।
নিতিনঃ সব বলবো আগে আইসক্রিম গুলো নিয়ে ফ্রিজে রাখ?

সব আমার বোন মুগ্ধার জন্য এনেছি।
রেহান মুচকি হেসে নিতিনের কাছ থেকে সব নেয়, আর ফ্রিজে রাখতে যায়।
রামিছা শুয়ে আছেন। তাই নিতিন আসছে তিনি জানেন না।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া তুমি পাগল না-কি?

নিতিনঃ কেন?
মুগ্ধাঃ এতো কিছু আনতে গেলে কেন? আর আমি এতো আইসক্রিম কবে শেষ করবো?
নিতিন হাসলো।
রেহানঃ নিতিন এতো কিছু নিয়ে আসার মানে কি?

নিতিন মন খারাপ করে বলে।
নিতিনঃ আর বলিস না। প্রথমে সামান্য কিছুই কিনছিলাম।
তারপর,
রেহানঃ তারপর কি?

নিতিনঃ হঠাৎ একটা মেয়ে আসে দোকানে। আর আমিও মেয়েটার রূপে মুগ্ধ হয়ে যাই। লোভ হয় মেয়েটাকে আরো কিছুক্ষণ দেখার। তাই ভাবলাম আরো কিছু জিনিস কিনি। তাহলে আমার চোখের তৃষ্ণা মিটবে। তারপর যখন জিজ্ঞাস করি কতো টাকা হলো। তখন বললো ৩২০০ টাকা।

বল ভাই মেয়েটা প্রথম দেখায় কি বাঁশটাই না দিলো।
রেহান নিতিনের মুখে এমন পাগলামো কথা শুনে শব্দ করে হাসতে থাকে। আর সাথে মুগ্ধাও।
নিতিন নিজেকে এলিয়েন ভাবছে।

রেহানঃ শুধু একটা মেয়েকে দেখার জন্য এতো কিছু। কে’রে ভাই মেয়েটা?
দেখতে হয়তো মেয়েটাকে, যে’কিনা আমার বন্ধুর মনে জায়গা করে নিলো, প্রথম দেখায়?
বুঝলে মুগ্ধা?
রেহানের শেষের কথা মুগ্ধা বুঝলো না।
তাই বললো,

মুগ্ধাঃ কি বুঝবো?
রেহানঃ তোমার ভাইয়ার মনে প্রেমের হাওয়া বইছে৷ যে হাওয়ায় তিন হাজার টাকা গায়েব করে দিয়েছে?।
কথাটা বলে রেহান আর মুগ্ধা “হাহা” করে হেসে দেয়।

নিতিন গভীর ভাবনায় বললো,
নিতিনঃ জানিস তোরা, মেয়েটাকে দেখার পর মনে হয়েছিলো, এর আগে মেয়েটাকে কোথাও দেখিছি।
মুগ্ধাঃ দেখতেও তো পারো।

নিতিনঃ না’রে এর আগে দেখিনি কখনো মেয়েটাকে। তারপরেও মনে হচ্ছিলো সে আমার খুব চেনা।
রেহানঃ বুঝেছি তুই পাগল হয়েছিস।
এখন হাত মুখ ধুয়ে আয়। তোর জন্য অপেক্ষা করে এখনো খাইনি আমরা।
নিতিনঃ হুম।

নিতিন ফ্রেশ হতে যায়।
আর মুগ্ধা সবার জন্য খাবার সাজাতে যায়। আর রেহান রামিছাকে ডাকতে যায়।
রাইয়ান গাড়ি ড্রাইভ করছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। অনেক্ষণ ধরেই সেটা খেয়াল করছে তোহফা।
হাসির রহস্য জানার জন্য আগ্রহী হয় তোহফা।
তাই প্রশ্ন করলো।

তোহফাঃ ভাইয়া হাসছো কেন?
রাইয়ান এবার তোহফার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দেয়।
তোহফাঃ আবার হাসছো?
রাইয়ানঃ ছেলেটার কথা মনে হলেই হাসি পায়।
তোহফাঃ তাহলে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছো কেন?

রাইয়ান গাড়িটা থামালো।
আর তোহফার দিকে তাকালো।
রাইয়ানঃ জানো ছেলেটা এতোকিছু কেন কিনেছে?
তোহফাঃ আমি তো ছেলেটাকে জিজ্ঞাস করিনি ভাইয়া।

তোহফা ভেংচি কেটে আর রেগে বললো কথাটা।
রাইয়ান তোহফাকে এভাবেই দেখতে চায়৷ কিন্তু তোহফা যে তার মধ্যে সারাক্ষণ মেঘ জমিয়ে রাখে।
তোহফাঃ কি দেখছো এভাবে?
রাইয়ানঃ তোমাকে।

তোহফাঃ মানে?
খুব অবাক হয়ে বললো,
রাইয়ানঃ এভাবে রাগী, হাসিখুশি, থাকতে পারোনা তুমি?
তোহফা নীরব হয়ে যায়।
তার মনে একটা কথাই। যার পৃথিবীতে কেউ নাই৷ তার আবার হাসিখুশি শুধুই বিলাসিতা।

তোহফা কথা বলছেনা দেখে রাইয়ান বললো,
রাইয়ানঃ আবার মন খারাপ করেছো?
এভাবে থাকো কেন সারাক্ষণ।
তোহফা এবারো নীরব থাকলো।
রাইয়ানঃ তোহফা প্লিজ এভাবে থেকো না।

হয়তো তুমিই আমার পাওয়া সেরা গিফট। যার নাম বোন।
আর কোনো ভাই চাইবেনা তার বোন এভাবে মন খারাপ করে থাকুক।
ভাবিকে দেখো, সেও তোমার মতো মেয়ে, সে তো হাসিখুশি থাকে।
তোহফাঃ ভাবির সব আছে, কিন্তু আমি যে অনাথ।

তোহফা খুব স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বললো,
রাইয়ানঃ কে বললো তুমি অনাথ। তোমার মা ছাড়া সবাই আছে। কেন আমরা কি তোমার আপন না।
তোহফা আবারো নীরব থাকলো।
রাইয়ান বুঝেনা তোহফা
এমন করে কেন?
উত্তরটা কি এটাই, সে অনাথ?

রাইয়ানঃ কখনো যদি তোমার পরিবার পাও?
তোহফাঃ মানে?
রাইয়ানঃ হঠাৎ যদি কখনো তুমি তোমার পরিবার পাও? তখন কি পাবে তোমার মতো মন খারাপের দিনগুলো।
তাই হাসিখুশি থাকো তোহফা।
তোহফা হাসলো।

তোহফাঃ ভাইয়া এই ২৭ বছর বয়সেও কেউ একবার খুঁজ নেয় নি। আজো জানিনা আমার মাবাবা কে।
আর তুমি বলছো যে, যদি কখনো আমার পরিবার পাই।
তোমার কথাগুলো
পাথরে ফুল ফুটানোর মতো হয়ে গেলো না।
রাইয়ান চুপ থাকলো।

রাইয়ান এর কাছে তোহফাকে রহস্যের মনে হয় তাই কথাটা বললো,
তোহফাঃ ভাইয়া বাসায় যাবো।
রাইয়ানঃ যাবোই তো।
তারপরেও বলি, তোহফা ভেবে দেইখো। আল্লাহ চাইলে সব পারেন।
তাই হাসিখুশি থাকো।

একদিন হয়তো তুমি পস্তাবে তোমার হারানো দিনগুলোর কথা মনে করে।
তোহফা কোনো কথা না বলে গাড়ির গ্লাসের দিকে তাকালো।
রাইয়ান কোনোভাবে সহ্য করতে পারছেনা তোহফার মন খারাপটা।
তাই আবার বললো রাইয়ান।
রাইয়ানঃ যেটা বলছিলাম।

জানো ওই ছেলেটা জেন এতো জিনিস কিনেছিলো?
তোহফা গাড়ির গ্লাসে থাকা দৃষ্টিটা রাইয়ান এর দিকে দেয়।
রাইয়ান আবার বললো,
রাইয়ানঃ তোমায় দেখার জন্য।

মুচকি হাসে রাইয়ান।
তোহফাঃ পাগল তুমি। আমায় দেখার জন্য মানে কি?
রাইয়ান অট্টহাসি দিয়ে বলে।
রাইয়ানঃ মানে হলো।

সে তোমার প্রেমে পড়েছে। আর তোমায় কিছুক্ষণ দেখার তৃষ্ণায় এতো কিছু কিনে সে।
তোহফা কথাটা শুনে, সেও জানে ছেলেটা তাকে দেখার জন্য এমন করেছে।
তারপর রাইয়ান কে বললো,
তোহফাঃ তোমাকে বলছে?
আর ছেলেটা আমার থেকে ছোট হবে।

রাইয়ানঃ বুঝি সব। আমিও ছেলে, ছেলেদের অনুভূতি সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই।
তোহফাঃ আর অর্জন করতেও চাইনা।
রাইয়ানঃ তুমিও তো শেষে আরচোখে তাকাচ্ছিলে,
তোহফাঃ বাজে বকো না তো?
আমি বাসায় যাবো।

রেগে বললো,
রাইয়ান কোনো কথা না বলে গাড়ি চালাতে শুরু করে। অনেক রাগিয়েছে মেয়েটাকে।
তাই আর চায় না রাগাতে।
তোহফা গাড়ির জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। আর দোকানের সেই ছেলেটার কথা ভাবছো।
ছেলেটা কে কি আর কখনো দেখতে পাবে সে?

তোহফা আর রাইয়ান বাসায় এসে যার যার রুমে চলে যায়।
বাহিরে খাবার খেয়ে এসেছে তারা।
সন্ধ্যার আগে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছিলো।

তাদের আড্ডায় জাফরুল্লাহ যোগ হন
সন্ধ্যার আরো কিছুক্ষণ বাকী, কিন্তু জাফরুল্লাহ
আজ খুব তাড়াতাড়ি চলে আসেন।

মুগ্ধাকে সবাই অনেক ধরণের কথা বলে হাসাচ্ছে।
মুগ্ধাঃ আম্মা তুমিও ওদের সাথে?
মন খারাপ করে বললো,

রামিছাঃ না না আমি তো আমার মুগ্ধা মা’র সাথে
মুগ্ধাঃ তাহলে ওদের বকা দাও
রামিছাঃ হুম দিচ্ছি,
রামিছার কথার মাঝখানে হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠে।

মুগ্ধাঃ দাঁড়াও, আমি দেখে আসছি।
জাফরুল্লাহ: এই আড্ডার সময় আবার কে আসলো?
রামিছাঃ দরজা খুললেই
তো দেখতে পাবে।
মুগ্ধা হাসি মুখে গিয়ে দরজা খুলে।

মুগ্ধা দরজা খুলে, দরজার ওপাশে ৪জনকে আবিষ্কার করে।
মুগ্ধা বুঝে এরাই রেহানের চাচা,আর চাচার ফ্যামিলি।
মুগ্ধা সাথে সাথে সালাম দেয়।
মুগ্ধাঃ আসসালামু আলাইকুম।

ভিতরে আসেন।
মুগ্ধা হাসি মুখেই বললো,
কিন্তু দরজার ওপাশের জন সালামের উত্তর না দিয়েই ভিতরে ঢুকে, সাথে উনার ফ্যামিলিও।
মানিক: ভাইয়া কেমন আছো।
জাফরুল্লাহ: ভালো, আমায় না বলে চলে এলি যে?
তাও আমার দুই মা’রে নিয়ে আসলি।

আগে বললে তো আলাদা খাবার তৈরি করতাম।
মানিক হাসে, জাফরুল্লাহ এর সামনে মানিক বেজা বিড়াল।
কিন্তু জাফরুল্লাহ জানেন না, তার ছোটভাই আর দুই মেয়ে কতোটা খারাপ।
জাফরুল্লাহ: মুগ্ধা মা তুমি রাহি আর লাবণ্যকে তোমার পাশের রুমে নিয়ে যাও।

মুগ্ধাও মাথা নাড়ালো।
রেহান আর নিতিনের মুখটা অমাবস্যার চাঁদের মতো কালো হয়ে যায়।
নিতিনের অজানা নয়, এই মানিক এর ফ্যামিলি সম্পর্কে।
মুগ্ধা ওদের কিছু বলতে গেলে মানিক বললো,

মানিক: ভাইয়া কাজের মেয়ে আবার কবে রাখলে?
মুগ্ধার দিকে কেমন করে তাকিয়ে কথাটা বললো মানিক।
মুগ্ধা কথাটা শুনে তেমন অবাক হলো না। কারণ রেহান তো সেদিন বললোই তার চাচার সম্পর্কে।
জাফরুল্লাহ কিছু বলতে গেলে।

রেহান বলে উঠে।
রেহানঃ চাচ্চু ও কাজের মেয়ে না৷ ও নিতিনের বোন৷
আর আমারো বোন।
কারো সম্পর্কে না জেনে কিছু বলা ঠিক না।

মানিক রেহানের দিকে তাকান।
লাবণ্যঃ রেহান তুমি তোমার বন্ধুর বোনের জন্য আব্বুকে কথা শুনাচ্ছো।
(মানিকের বড় মেয়ে)
নিতিনঃ এখন হিন্দি সিরিয়াল শুরু হবে।
(মনে মনে বললো নিতিন)

পাশ থেকে রাহি নিতিনের দিকে তাকাচ্ছে। যা অসহ্য লাগছে নিতিনের।
রেহানের বাসায় এসে আবার ফাসলো সে। নিতিন মনে মনে বিড়বিড় করছে।
রেহানঃ মুগ্ধা বন্ধুর বোন না-কি অন্য কিছু, সেটা তোমাকে বলতে হবেনা।

বাসায় এসেছো রেস্ট নাও।
মুগ্ধা তুমি তোমার রুমে যাও
লাবণ্য রাগী চোখে তাকাচ্ছে রেহানের দিকে।
মুগ্ধাঃ না ভাইয়া আমি ওদের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি।

রেহান অবাক হয়।
নিজেই কেন নিজ থেকে অপমান হতে চায়। বুঝে উঠতে পারছেনা রেহান।
মুগ্ধা ওদের ব্যাগ হাতে নেয়। আর বলে মুগ্ধার সাথে আসতে।

লাবণ্য আর রাহি মুগ্ধার পিছন পিছন যায়। লাবণ্য আর রাহি খুব রেগে আছে, ওরা ভাবলো। রুমে গিয়ে কথা শুনাবে মুগ্ধাকে।
লাবণ্য আর রাহি বাসায় আসলেই মন খারাপ হয় রামিছার। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হয়। মানিকের মতো বজ্জাত তার মেয়ে দুটো।
মানিকের স্ত্রি সোহেলা বেগম।
সোহেলা: কেমন আছো ভাবি।

রামিছাঃ ভালো ছিলাম, কিন্তু এখন তো আর ভালো থাকবো না’রে বোন।
(রামিছা আর সোহেলার ভালো মিল।
কারণ সোহেলাও মানিককে দেখতে পারেন না। মানিক তার মেয়েগুলোকেও তার মতো বজ্জাত আর লোভী, এবং অহংকারী করে তুলেছে।)
সোহেলা: ভাবি, একটু সহ্য করো।

এখন বুঝো আমি এই তিনটা শয়তান কে নিয়ে
কিভাবে থাকি।
রামিছাঃ হুম।
ওরা কি কখনো ভালো হবে না?
সোহেলা: জানিনা আমি।
মানিক আর জাফরুল্লাহ রুমে বসে গল্প করছেন।

জাফরুল্লাহ তার ভাইকে অনেক ভালোবাসেন।
মানিক: ভাইয়া ওই সামান্য মেয়ের জন্য রেহান আমায় কথা শুনালো।
জাফরুল্লাহ: সামান্য না’রে। মুগ্ধাকে আমিও ভালোবাসি। জানিস তো আমার মেয়ে নাই। তাই এই মেয়েটাই আমাদের মেয়ে।
মানিক: (ডং, আর যে কতো ডং দেখবো,)

ভাইয়া বেশি লাই দিয়ো না। দেখবা শেষে সব নিয়ে পালাবে।
জাফরুল্লাহ: মানুষের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।
আচ্ছা এসব বাদ দে।
তারপর দুজন ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে।

রেহানঃ আমি গিয়ে দেখে আসি ওরা মুগ্ধার সাথে কি করতেছে?
নিতিনঃ আমার বোন ওদের বুঝিয়ে দিবে সব। তোর চিন্তা করতে হবেনা।
রেহানঃ ওই দুটো খুব খারাপ রে।
নানান ভাবে মুগ্ধাকে কথা শুনাবে।

নিতিনঃ মুগ্ধার কথা আমাদের ভাবতে হবেনা। আমাদের ভাবতে হবে আমাদেরকে নিয়ে।
তোর চাচাতো দুই বোন তো আমায় আর তোকে জ্বালাবে বেশি।
রেহানঃ মুগ্ধাকে একা রেখেও তো আমি আর তুই ম্যাচে যেতে পারবোনা।
নিতিনঃ আমি আর তুই না, শুধু তুই পারবিনা।

আমি তো বাবা কাল সকালেই চলে যাবো।
শুধু রাতটাই।
রেহানঃ হুম রে।
লাবণ্য আর রাহি দাঁড়িয়ে আছে।
এর মাঝে লাবণ্য গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুগ্ধা লাবণ্যকে থাপ্পড় মেরেছে।

মুগ্ধা যখন ওদের রুমে নিয়ে আসে।
তখন লাবণ্য বলে।
লাবণ্যঃ তুই নিতিন বিতিন যার বোন’ই থাকিস না কেন।
আমরা এখানে যে কয়দিন থাকবো, সে কয়দিন আমাদের কাজের মেয়ে হয়ে থাকবি তুই।
মুগ্ধার মন খারাপ হয় কথাটা শুনে।

মুগ্ধাঃ আপু আমি আপনার ছোট বোনের মতো। (রাহি দিকে উদ্দেশ্য করে বলে)
আমার সাথে এমন ব্যবহার করবেন না দয়া করে।
কিন্তু লাবণ্য আবার বলে।
লাবণ্যঃ ওই ছোটলোক এর বাচ্চা, তুই আবার আমার মুখের উপর কথা বলিস।

মুগ্ধা হাসলো, আর ঠাস
করে লাবণ্যের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
মুগ্ধার হাতে থাপ্পড় খেয়ে লাবণ্য আবার চিৎকার করতে গেলে।আরেকটা থাপ্পড় দেয় মুগ্ধা লাবণ্যকে।
রাহি তখন বলে।
রাহি: তুই আমার আপ্পিকে থাপ্পড় মেরেছিস।

মুগ্ধা তখন বলে।
মুগ্ধাঃ নিজের গাল লাল না করতে চাইলে চুপ থাক।
তাই দুটো পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

মুগ্ধা চলে আসতে গেলে, আবার পিছন ফিরে তাকায়।
আর বলে।
মুগ্ধাঃ আমি গ্রামের মেয়ে।
আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানি।

খারাপকে ভালোবেসেও ঠিক করা যায়। আবার লাঠি দিয়ে।
কিন্তু আমি ভালবাসার চেয়ে লাঠিটাই বেশি ব্যবহার করি।
কি ভেবেছো, আমি প্রতিবাদ করবো না।
হাহাহা।

আর শুনো, যে কয়দিন থাকবে৷ সে কয়দিন আলিফ এর মতো সোজা হয়ে থাকবে। যদি একটু ত্যাড়া হও, তাহলে আমার হাত আর তোমাদের গাল।
কথাটা মাথায় রেখো।
কথা গুলো বলে মুগ্ধা চলে আসে নিজের রুমে।

এসে বিশ্ব জয়ের হাসি দেয়। সে আবারো পেরেছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। এখন শুধু রেহানের চাচাকে বুঝাতে হবে মুগ্ধা কি জিনিস।
আবারো হাসলো মুগ্ধা।
লাবণ্য রাগে জ্বলছে। সাথে রাহিও।
যেভাভেই হোক এই অপমানের মাশুল দিতে হবে ওই মেয়েকে।

মাগরিব এর নামাজ পড়ে রেহান আর নিতিন বসে বসে গল্প করছিলো।
হঠাৎ রেহানের ফোন বেজে উঠে।
ফোনের স্কিনে রাইয়ান নামটা দেখে অবাক হলো।
তার মনেই ছিলো না। রাইয়ান এর কথা।

নিজেকে অপরাধী ভাবলো রেহান।

পার্ট: ১১

ফোনের স্কিনে রাইয়ান এর নাম দেখে অবাক হয় রেহান।

রেহানের মনেই ছিলো না রাইয়ান এর কথা।
এসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা কেটে যায়।
তারপর আবার ফোন আসে।
এবার সাথে সাথে রেহান রিসিভ করলো।

রেহানঃ আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া কেমন আছেন?
রাইয়ানঃ আলহামদুলিল্লাহ, তোমার অবস্থা কি?
(রাইয়ান সন্ধ্যা থেকেই ভাবছে রেহানকে ফোন দিবে। কিন্তু ফোন দিয়ে কি কথা বলবে খুঁজে পাচ্ছিলো না। কিন্তু তার মনে হলো, রেহান এর তো আঘাত ছিলো। আঘাত এর অবস্থা জানতে তো ফোন দেওয়া যায়।)

রেহানঃ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাইয়া।
রাইয়ানঃ হাতের অবস্থা কেমন এখন?
এই দিকে মুগ্ধা অনেক্ষণ ধরে রেহান আর নিতিনকে ডাকছে। কিন্তু ওরা কোনো সাড়াশব্দ দিচ্ছে না।
তাই মুগ্ধা আগুনের মতো রেগেমেগে উপরে আসলো।

মুগ্ধার এভাবে চিৎকার করে ডাকা দেখে লাবণ্য আর রাহি হাসছিলো। মুগ্ধা তো আর সবার সামনে কিছু করতে পারবেনা ওদের।
মুগ্ধা উপরে গিয়ে দেখে। রেহান ফোনে কথা বলছে, আর নিতিন পাশেই বসে আছে।
মুগ্ধার খুব রাগ হয়।
সে আর কিছু না ভেবেই।
মুগ্ধাঃ এই যে দুই বান্দর মিস্টার?

নিচ থেকে চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে আমার গলা ভেঙে গেলো। আর তোমরা এখানে প্রেম করছো।
দেখি কোন পেত্নীর সাথে কথা বলো।
রেহান কিছু বলতে গেলে, তার আগেই মুগ্ধা রেহানের হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়।
আর ফোনের ওপাশে কে আছে, তা না দেখেই মুগ্ধা বলতে শুরু করে।

মুগ্ধাঃ এইযে ভাবি! এখন নাশতা করার সময়। সারারাত আছে প্রেম করার জন্য। তাই এখন বায়।
মুগ্ধা কথা গুলো বলে থামলো।
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ আর একটা শব্দই আসলো।
রাইয়ানঃ কে কার ভাবি? ( রাইয়ান হাসছে। আর ভেবে নিয়েছে, এটাই তার মোনালিসা। কারণ সেদিন বাসায় রেহানের বাবা ছাড়া সবাইকে দেখেছে সে। রাইয়ান তো খুশিতে দিশেহারা।)

মুগ্ধা অবাক হয়ে বললো,
মুগ্ধাঃ ভাইয়া ভাবির কণ্ঠ ছেলেদের কণ্ঠের মতো লাগছে।
ও ভাইয়া তুমি কোন মেয়ের সাথে প্রেম করলা গো?

যার মিষ্টি কণ্ঠ এর বদলে ছেলেদের কণ্ঠে কথা বলে।
মুগ্ধা তাকাচ্ছে তার ভাইদের দিকে।
নিতিন আর রেহান বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে হাসতে হাসতে।

আর এই দিকে রাইয়ান চুপ করে বসে আছে।
কখনো ভাবেনি, তার মোনালিসার কণ্ঠ সে শুনবে।
তাই মন উজাড় করে সে তার মোনালিসার মধুর কণ্ঠ শুনতে মগ্ন।
মুগ্ধাঃ ভাইয়ায়ায়ায়ায়ায়া
চিৎকার দেয় মুগ্ধা।

চিৎকার শুনে রেহান বললো,
রেহানঃ ওইটা তোমার ভাবি না মুগ্ধা! ওইটা সেই দিনের ভাইয়াটা, ওই যে আমায় সেদিন নিয়ে আসলো না।
মুগ্ধা কথাটা শুনে তড়িঘড়ি করে ফোনটা রেহানের হাতে দিয়ে দেয়।

আর বলে।
মুগ্ধাঃ নাশতা নিয়ে বসে আছে।
তোমরা তাড়াতাড়ি আসো।
(নিজের জিহ্বায় নিজেই কামড় দিয়ে দৌড় দেয় মুগ্ধা।)

রেহান আর নিতিন এখনো হাসছে।
রেহানঃ সরি ভাইয়া, আসলে অনেক্ষণ ধরে ডাকছিলো। আর আমরা শুনিনি ওর ডাক।

তাই রেগে আসে, আর এসে দেখে আমি ফোনে কথা বলছি। তাই এসব করলো।
প্লিজ ভাইয়া কিছু মনে করবেন না।
রাইয়ানঃ না না কিছু মনে করার কি আছে। তুমি যাও গিয়ে নাশতা করো।

অন্য সময় ফোন দিবো নে।
রেহানঃ হুম।
রাইয়ান ফোন রেখে দেয়।
রেহান আর নিতিন নিচে নাশতা করতে যায়।

রাইয়ান তার ফোনটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
প্রথম দিন এভাবে তার মোনালিসার সাথে কথা হয়ে যাবে, কখনো ভাবেনি সে।
রাইয়ান মুচকি হাসলো।
যেভাবেই হোক। সে মুগ্ধাকে তার করবেই।

মোনালিসা আর মুগ্ধা, নামের প্রথম অক্ষর “ম”
যেমন নাম এর মিল। তেমন মেয়েটার সাথে মোনালিসার মিল।
রাইয়ান চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়, কারণ এখন তার অনুভূতি অসীম।

আর যখন কাউকে নিয়ে বেশি ভাবা হয়। তখন চোখ বন্ধ করলে তার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠে।
তাই রাইয়ানও ঠিক সেই কাজটা করলো।
আর মুখে এখনো মুচকি হাসি বিদ্দমান।
সকালের নাশতা করে নিতিন রেহানের বাগানে বসে আছে। নিতিনের কল্পনাতেও সেই মেয়েটা প্রতিটা সময় আসে।
নিতিন মনে মনে একটা কথাই বললো,

— জীবনে প্রথম অনুভূতির এক ধাপ কেটে যায়, শুধু সেই মানুষটিকে কল্পনায় হারাতে হারাতে।

নিতিন শিশির ভেজা পাতায় হাত বোলাচ্ছে। আর তার দেখা প্রিয় চেহারাটাকে কল্পনায় হারাচ্ছে।
পিছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত রাখে।
নিতিন পিছনে থাকলে রাহিকে দেখতে পায়।
নিতিনের চাঁদ মুখটা ঢেকে যায় এক রাশ কালো মেঘের আবরণে।
রাহি বললো,

রাহি: বাসায় খুঁজলাম, বাসার ছাঁদে খুজলাম। কোথাও পেলাম না, আর তুমি এখানে বসে আছো। বাসায় কি ভালো লাগেনা তোমার?
যে এই ঠাণ্ডার মধ্যেও বাগানে বসে আছো।
নিতিন এর সহ্য হয় না, এই মেয়েটাকে, বড়টা যেমন রেহানকে জ্বালায়। ঠিক ছোট আপদটা তাকে জ্বালায়।
মুখে বিরক্তের রেখা রেখে বললো,

নিতিনঃ বাসার ভিতরে কালসাপ ঢুকেছে, তাই বাসায় থাকতে ভয় করে। কখন কি করে বসে বুঝা যায় না তো।
রাহি কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বললো,
রাহি: কিহ! বাসায় সাপ আছে? তাও সেটা দেখতে কালো।
নিতিন রাগী গলায় বললো,
নিতিনঃ সেই সাপ হলো তুমি।

নিতিনের কথাটা শুনে রাহির ভয়ে মাখা মুখটা মন খারাপের রূপ নিলো।
রাহি: আমি সত্যি তোমায় ভালোবাসি।
নিতিনঃ রাগতে বাধ্য করোনা আমায়।
নইলে খুব খারাপ হবে।

মুগ্ধা নিতিনের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। তাই নিতিনকে খুঁজতে যায় রেহানের রুমে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া, নিতিন ভাইয়া কোথায়?
রেহানঃ বাগানে দেখো গিয়ে।
মুগ্ধাঃ হুম।
বলে চলে যেতে নিলে।
রেহান পিছন থেকে বললো,

রেহানঃ মুগ্ধা!
ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকায়।
মুগ্ধাঃ কিছু বলবে ভাইয়া?
রেহানঃ হুম, মুগ্ধা ওরা তোমায় এই কয়দিন জ্বালাবে, যে কয়দিন থাকবে ওরা। প্লিজ মুগ্ধা মন খারাপ করবেনা৷ কি করবো বলো, আব্বুর জন্য চুপ থাকতে হয়।
মুগ্ধা হাসলো।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া ওরা হয়তো কালকেই চলে যাবে৷ আর আমায় নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।
মুগ্ধা কথাটা বলে একটা রহস্যের হাসি দেয়।
আর চলে যায় বাগানের উদ্দেশ্যে।

রেহান মুগ্ধার হাসির মানেটা বোঝেনি।
মুগ্ধা বাগানে এসে দেখে। নিতিনের সাথে রাহি মেয়েটা কথা বলছে। আর নিতিন রাগী ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুগ্ধার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। নিশ্চয়ই ওই মেয়ে ভাইয়াকে কোনো কিছু নিয়ে রাগিয়ে দিয়েছে।
মুগ্ধা আস্তে আস্তে সামনের দিকে পা ফেলতে থাকে।

রাহি: কেন আমায় ভালোবাসা যাবেনা?
নিতিনঃ কারণ তুমি একটা খারাপ মেয়ে, শুধু তুমি না। তোমার আপু আর বাবাও খারাপ। বিশ্ব খারাপ লোক।
রাহি রেগে গেলেও, নিজের রাগকে মাটি চাপা দেয়। রাগলে সব হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
তাই সে বললো,
রাহি: তোমার সব ভা,

পিছন থেকে মুগ্ধা ডাক দিলো
মুগ্ধাঃ ভাইয়া!
পিছনে কারো কথার শব্দে দু’জন ফিরে তাকায়।
মুগ্ধাকে দেখে রাহি এক মুহুর্ত দাঁড়ায় নি।
তাড়াতাড়ি করে দৌড়ে বাসায় ঢুকে যায় রাহি।

নিতিন বুঝলোই না রাহির ভয় পাওয়ার কারণ।
মুগ্ধাঃ তোমায় সারা বাসা খুঁজে আমি ক্লান্ত।
আর তুমি এখানে।
রাগী গলায় বললো মুগ্ধা।

নিতিনঃ ওই মেয়েটা তোকে দেখে পালালো কেন?
মুগ্ধা হেসে হেসে বললো,
মুগ্ধাঃ তোমার বোনকে সবাই ভয় পায়।
নিতিনঃ মানে?

মুগ্ধা কাল রাতের কাহিনী নিতিনকে বলে।
নিতিন সব শুনে হাসতে থাকে।
আর বলে।
নিতিনঃ আমার আর রেহানের রাগকে ওরা ধোঁয়া এর মতো উড়িয়ে দেয়। আর তুই কিনা ওদেরকেই
আবার হাসে নিতিন।

মুগ্ধাঃ আমি না ভাইয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ হাত দিয়ে করি।
মুখ দিয়ে না।
তুমি যতোদিন অন্যায়ের
প্রতিবাদ মুখ দিয়ে করবে৷ ততোদিন তুনি নির্যাতিত।

যেদিন অত্যাচার এর প্রতিবাদে হাত ব্যবহার করবে। সেদিন তুমি সফল।
বুঝলে ভাইয়া।
নিতিন অবাক হলো।
পিচ্চি মুগ্ধা অনেক কিছু শিখে নিয়েছে। শুধুই কি নিশির মৃত্যু মুগ্ধাকে বদলে দিলো।
নিতিনঃ হুম।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া তোমায় যা বলতে খুঁজছিলাম।
নিতিনঃ হুম বল।
মুগ্ধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
মুগ্ধাঃ ভাইয়া আমি বাড়িতে যাবো।

নিতিনঃ এখানে ভালো লাগছে না তোর?
মুগ্ধাঃ কতোদিন আম্মা আব্বাকে দেখিনা। শুধু কি ফোনে কথা বলে মন ভরে?
নিতিনঃ আরো কয়টা দিন মনকে বুঝ দিয়ে থাক বোন আমার।

তার পর আমি আম্মা আব্বা আর চাচা চাচি কে সিলেট নিয়ে আসবো।
মুগ্ধাঃ সত্যি তো?
নিতিনঃ একবারে পাক্কা সত্যি।
মুগ্ধা মন খারাপ করে বললো,

মুগ্ধাঃ আম্মা আব্বা আর তোমার আম্মা আব্বাকে এনে কোথায় রাখবে?
নিতিনঃ কাল আব্বা বললেন! ওই চেয়ারম্যান না-কি তাদের উপর অযথাই অত্যাচার করতেছে। এবার বল তুই যদি গ্রামে যাস, তাহলে তোর সাথে কি করবে ওই চেয়ারম্যান?
মুগ্ধাঃ হুম।

নিতিনঃ ভাবছি আব্বা আর চাচাকে বলবো, দুজন মিলে একটা বাসার জায়গা কিনতে।
তাহলে তোর আর চিন্তা করতে হবে না। তাদের এনে কোথায় রাখবো।
মুগ্ধাঃ তোমার আম্মা কি মানবেন এসব?
মুগ্ধার এখনো মনে হয় আয়েশা চৌধুরী আগের মতোই আছেন।

মুগ্ধার কথা শুনে, নিতিন বললো,
নিতিনঃ আম্মা অনেক পরিবর্তন হয়েছেন রে।
বুঝতে পেরেছেন সব।
মুগ্ধাঃ হুম।

নিতিনঃ ওরা দুই ভাই মিলে যদি কয়েক লক্ষ টাকা যোগাড় করতে পারে। তাহলে সিলেটে ভালো একটা বাসা মিলবে, তখন আর জায়গা কিনে বাসা তৈরি করতে হবেনা।
মুগ্ধাঃ ওরা দুই ভাই মানে?
অবাক হয়ে বললো,
নিতিনঃ আরে পিচ্চি। ওরা দুই ভাই মানে, তোর আব্বা আর আমার আব্বার কথা বলছি।
মুগ্ধাঃ ওওও, বুঝিনি গো।

নিতিনঃ তাহলে আর কখনো বাড়িতে যাবার কথা বলবিনা?
মুগ্ধাঃ হুম বলবো না।
তুমি আব্বার সাথে কথা বলো। আর বাসা দেখতে থাকো।
পিছন থেকে রেহান বলে উঠলো।

রেহানঃ ভাইবোন মিলে কিসের বাসা দেখার কথা হচ্ছে?
মুগ্ধা আর নিতিন পিছনে তাকিয়ে দেখলো রেহান।

নিতিনঃ ভাবছি আম্মা আব্বা আর মুগ্ধার মাবাবাকেও সিলেট আনবো।
তাই ভাবছি কোনো বাসা পাই কি-না।
রেহানঃ এটা চিনিস? (তার হাত দেখিয়ে বললো)

মুগ্ধাঃ ওমা ভাইয়া তুমি তোমার হাতকে চিনো না?
রেহানঃ এই হাত দিয়ে দুটোকে খুব মারবো। এতো মারবো যে কোমায় চলে যাবি তোরা।
নিতিনঃ রাগিস কেন?
রেহানঃ তাহলে বাসার কথা বলিস কেন।

নিতিনঃ ওদের আনলে তো, নতুন বাসা কিনতে হবে তাই না?
রেহানঃ কচু কিন টাকা দিয়ে, তারপর তরকারি করে গিলিস।

নিতিনঃ মুগ্ধা বোন আমার, চল ভিতরে যাই। নইলে এ এখন বকবক করবে।
মুগ্ধা হাসছে।
রেহানঃ বাসা কিনবি? তাহলে আমাদের বাসা কিন।
আর আমাদের তোদের বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে রেখে দিবি।

তারপরেও আমি মুগ্ধাকে আমাদের বাসা থেকে কোথাও যেতে দিবো না।
নিতিন আর মুগ্ধা অবাক হচ্ছে, শুধু অবাক না, রেহানের কথায় ওরা মুগ্ধ হচ্ছে।

একটা বোন পাবার জন্য কেউ এতো কিছু করে।
নিতিনঃ আমি ভাবছি। আমার আর মুগ্ধার মাবাবাকে সিলেট আনবো। কোথায় রাখবো তখন?

আর মুগ্ধার বুঝি বিয়ে দেওয়া লাগবেনা। না-কি ওরে বিয়েই দিবোনা। আমাদের বোন করে বাসায় রেখে দিবো আজীবন?
নিতিনের কথা শুনে মুগ্ধা রাগী চোখে তাকায়।
মুগ্ধাঃ আমি বিয়া করবো না। এমনিতেই ভাল আছি।
রেহানঃ আমাদের বাসা কি ছোট?

এখনো দেখ বাসায় অনেক মানুষ, তার পরেও আরো তিনটা রুম ফাঁকা। ওরা আমাদের সাথেই থাকবে।
নিতিনঃ তোর সাথে আমি পারবোনা ভাই।
রেহানঃ তোকে পারতেও হবে না।
আর মুগ্ধার বিয়ে খুব তাড়াতাড়ি হবে।

কিন্তু
নিতিনঃ কিন্তু কি?
রেহানঃ সপ্তাহে চারদিন থাকবে ওর বরের বাসায়। আর তিনদিন আমাদের বাসায়। যে রাজি হবে এই সর্তে, তার কাছেই আমার বোনকে বিয়ে দিবো।
রেহানের কথা শুনে মুগ্ধা আর নিতিন হেসে দেয়।
রেহান যে আর কতো পাগলামো করবে কে জানে?

এভাবে কেটে যায় দুই দিন।
এই দুইদিন মুগ্ধা ভালোভাবে রাহি আর লাবণ্যকে নাকে ধরি দিয়ে ঘুরিয়েছে। মানিক আবার এসবের কিছুই জানে না।
রাহি আর লাবণ্য হয়তো এবার বুঝেছে, তাদের বাহাদুরি শেষ।

আজ সকালেই মানিক তার পরিবারকে নিয়ে যায়। মানিক ভালোভাবেই বুঝেছে, যেভাবেই হোক ওই মুগ্ধা মেয়েকে এই বাসা থেকে তাড়াতে হবে।
দুপুরের খাবার খেয়ে রেহান আর নিতিনও চলে যায়।
রেহান আর নিতিন দু’জন মিলে একটা ফোন কিনে দিয়েছে মুগ্ধাকে। মুগ্ধা ভালোভাবে এসব ফোন ইউজ করতে পারতো না। কিন্তু ওরা সব শিখিয়ে দিয়েছে।
মুগ্ধা আবারো একা হয়ে যায়।

এতোদিন বেশ ভালোই কেটেছিলো তার।
রেহান আর নিতিন রিকশা থেকে নেমে ম্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কারণ তাদের ম্যাচ(বাসার) গেইট ভিতর থেকে লাগানো।
হয়তো দারোয়ান বাতরুমে গিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।

রেহান রাস্তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে, আর নিতিন একটু দূরে।
হঠাৎ নিতিনের চোখে একটা জিনিস পরে।
কিন্তু রেহান অন্য মনস্ক হয়ে আছে।

নিতিন দৌড়ে গিয়ে রেহানকে রাস্তা থেকে টেনে আনে। গাড়িটি সামান্যের জন্য রেহানকে ধাক্কা দিতে পারেনি। চোখের পলকেই গাড়ি উধাও হয়ে যায়।
নিতিনঃ এখনি তো তোকে ধাক্কা দিয়ে দিতো।

রেহান ভয়ে পেয়েছে। তাই তরতর করে কাঁপছে।
নিতিনঃ মনে হলো ইচ্ছে করেই তোকে ধাক্কা দিচ্ছিলো।
রেহান সত্য করে একটা কথা বলবি আমায়?
রেহানঃ কি?

নিতিনঃ তুই কি আমার থেকে কিছু লোকাচ্ছিস বা লুকিয়েছিস?
রেহানঃ মানে?

নিতিনঃ সেদিন তোর উপর হামলা? কিন্তু তোর টাকা পয়সা বা মোবাইল কিছুই নিলো না।
এখন আবার তোকে কোনো গাড়ি এসে ধাক্কা দিতে চাইলো।

কি রয়েছে এর পিছনে? কি রহস্য? যা আমার থেকে লোকাচ্ছিস?
রেহানঃ সত্যি রে আমি কিছুই জানি না।
কে আমার শত্রু, কখনো তো আমি কারো সাথে জগড়া করিনি।

ওই শুধু তোদের গ্রামের চেয়ারম্যান এর সাথে কিছু ঝগড়া। সেটা তো তুই জানিস।
কিন্তু আমার জানা মতে আর কেউ নেই। যে আমার ক্ষতি করবে।

নিতিনঃ এখন থেকে আমায় ছাড়া আর কোথাও বের হবিনা।
তোর অজান্তেই তোর অনেক বড় শত্রু তৈরি হয়েছে। যে তোর ক্ষতি করতে চায়।
রেহানঃ হুম।
এর মধ্যে দারোয়ান এসে গেইট খুলে দেয়।

ওরাও দারোয়ান কে কিছু কথা শুনিয়ে ভিতরে চলে যায়।
প্রতিটা দিন শুরু হয় মুগ্ধার কারো সাথে ফোনে কথা বলে।
কিন্তু কার সাথে কথা বলে তা মুগ্ধার অজানা।

আজ কয়েক দিন ধরে মুগ্ধাকে জ্বালাচ্ছে।
মুগ্ধা প্রতিটা সকাল শুরু হয় ওই লোকটিকে বকা দিয়ে, কিন্তু ওপাশের লোকটি সব শুনে আর হাসে।
ওপাশের লোকটি আর কেউ না, সে হলো রাইয়ান।

মুগ্ধা আজ সকাল থেকেই তৈরি, সে ওই লোকটিকে আজ অনেক বকবে। আজ লোকটিকে বুঝিয়ে দিবে
মুগ্ধা কি।

মুগ্ধা বসে বসে ভাবছে, কিভাবে ছেলেটাকে অপমান করবে, বকবে, আরো ইত্যাদি ইত্যাদি।
তখন’ই ফোনটা বেজে উঠে। আর ফোনের স্কিনে “অভদ্র বিলাই” নামটা ভেসে উঠে।

মুগ্ধা নিজেই এই নাম দিয়েছে। ছেলেটা ফোন করে শুধু হুম, হ্যাঁ,না, বা এরকম ছোট ছোট শব্দেই আবদ্ধ থাকে। যেটা মুগ্ধার কাছে ভদ্রতা মনে হয় না।
মুগ্ধা ফোন ধরতেই, ওপাশ থেকে হাসির শব্দ আসলো।
এটা প্রতিদিনের রুটিন।
মুগ্ধাও ভালোয় ভালোয় ভাষণ শুরু করে।

পার্ট: ১২

ফোনের ওপাশ থেকে হাসির শব্দ আসে।

যেটা মুগ্ধা একাবারে সহ্য করতে পারেনা।
আজ যেভাবেই হোক এর একটা শেষ দেখেই ছাড়বে।
মুগ্ধা কথা বলতে শুরু করে।
কথা বললে ভুল হবে।

একরকম ছোটখাটো ভাষণ। যদিও শ্রোতা নেই তার, ফোনের ওপাশের জন ছাড়া।
মুগ্ধাঃ এই কে বলেন তো আপনি? আর এভাবে প্রতিদিন কেন আমায় জ্বালাচ্ছেন?
রাইয়ানঃ হুম।
এবারো রাইয়ান শুধু হুম বললো,

মুগ্ধাঃ তোর হুমের নাক কাটা পরুক।
তুই কি ভেবেছিস? আমি প্রতিদিন কথা বলে যাবো। আজ তোর সাথে শেষ কথা। এতোদিন খুব জ্বালিয়েছিস।
রাইয়ান তুই শব্দটা শুনে ভয় পায়।
আর মনে মনে বলে।

রাইয়ানঃ বাবা এতো লাল মরিচ। আমার তো মরিচে এলার্জি আছে।
কিভাবে সামলাবো এই মেয়েরে? (নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো)
মুগ্ধার রাগ এবার আরো বেশি হয়। ছেলেটা চুপ করে আছে
তাই।

মুগ্ধাঃ আমি আপনার নামে পুলিশ মামলা করবো।
কি পেয়েছেন?
রাইয়ান আবারো হাসলো। তুই থেকে আবার আপনি।

রাইয়ান এর হাসি শুনে মুগ্ধা রাগে লাল সবুজ কালো সব হয়ে যায়।
মুগ্ধা কিছু বলতে গেলে রাইয়ান বলে উঠলো।
রাইয়ানঃ আমি রাইয়ান বলছি।

এই প্রথম রাইয়ান তার পরিচয় দেয়।
রাইয়ান জানে, এখন যদি নিজের পরিচয় না দেয়। তাহলে বাংলাদেশ- পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে যাবে।
মুগ্ধা রাইয়ান নাম শুনে বললো,
মুগ্ধাঃ আমি কোনো রাইয়ান টাইয়ানকে চিনি না।

এতোদিন আপনি পরিচয় দেননি কেন? সেটা বলুন। নয়তো নাক ফাটিয়ে দিবো।
রাইয়ানঃ তোমার কণ্ঠ শোনার জন্য। আমার প্রতিটা সকালে শুরু হয় তোমার ধমক, আর বাঙালি ঝগড়ার মাধ্যমে। (রাইয়ান হুহুহু করে হেসে উঠে।)
মুগ্ধাঃ আর কখনো আমায় ফোন দিবেনা। আপনি কি চান? আমি আপনার জন্য ফোনটা অফ করে রাখি?

রাইয়ানঃ এই না না এটা কখনো চাই না।
আচ্ছা আর কখনো ফোন দিবো না।
মুগ্ধা কথাটা শুনে কিছুটা খুশি হয়।
কিন্তু রাইয়ান বললো,

রাইয়ানঃ আমায় সত্যি তুমি চিনো নি?
মুগ্ধাঃ আপনি কোন দেশের মন্ত্রী? যে আপনাকে আমার চিনতে হবে?
(রাইয়ান এর এতোদিনের জ্বালানির জন্য মুগ্ধা রেগে ফায়ার।)
রাইয়ানঃ আমি রাইয়ান রহমান।

ওইযে সেদিন তোমার ভাইয়ার এক্সিডেন্ট! আর আমি তোমাদের বাসায় যাই। এবার চিনেছো?
মুগ্ধা চুপ হয়ে যায়।
মুগ্ধার হাত কাঁপছে।
মুগ্ধা ফোন কানে নিয়েই চুপ হয়ে আছে।

সেদিন রাইয়ান বাসা থেকে চলে যাবার পর।
মুগ্ধা শুধু এটাই ভাবছিলো।
ছেলেটা কেন এভাবে তাকিয়েছিলো আমার দিকে। এরকম হাজারো প্রশ্ন তার মনে আসছিলো।
তারপর সেদিন না জেনেই রাইয়ান এর সাথে কথা বলছিলো। ভাবি ডেকেছিলো। সেদিনও সে সারারাত ঘুমায় নি।
কি ভাবভে ছেলেটা?

আর কখনো কথা বলবে না সে।
রাইয়ান নাম শুনে মুগ্ধা অনেক্ষণ ধরে চুপ রইলো।
লজ্জায় কথা বলছেনা সে।
এবার যদি বকা দেয়।

মুগ্ধার চুপ থাকা দেখে রাইয়ান বললো,
রাইয়ানঃ চুপ হয়ে গেলে কেন?
মুগ্ধা কি কথা বলবে খুঁজে পাচ্ছেনা।

তাই আবারো চুপ থাকলো।
রাইয়ানঃ এতক্ষণ তো ভাষণ দিলে। তাহলে এখন?
মুগ্ধাঃ আসসসলেএএ (কথা বলার সময় কাঁপছে মুগ্ধা)
এটা দেখে রাইয়ান বলল।

রাইয়ানঃ ওমা ওমা, রাগী রমণীর কণ্ঠস্বর এভাবে শোনাচ্ছে কেন?
মুগ্ধা নিজের রাগকে মাটি চাপা দিয়ে বললো,
মুগ্ধাঃ আম্মা আমায় ডাকছেন, যাই আমি।
এ কথা বলে ফোন কাটতে গেলেই রাইয়ান বললো,
রাইয়ানঃ এই এই, ৫ মিনিট প্লিজ?

মুগ্ধার তো ভয়ে কোনো কথা বলতে পারছেনা। আর এই ছেলে আবার ৫ মিনিট চাচ্ছে। মুগ্ধা শুধু বললো,
মুগ্ধাঃ হুম।
রাইয়ানঃ কাল একবার আমার সাথে দেখা করবে?
রাইয়ান এর কথা শুনে, মুগ্ধা যেন আকাশ থেকে পরলো।
কি বলে এসব।

মুগ্ধাঃ আমি কেন আপনার সাথে দেখা করবো?
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
রাইয়ান মনে মনে হাসছে, মুগ্ধার কণ্ঠস্বর শুনে।
রাইয়ানঃ কিছু সময় কথা বলবো।

প্লিজ দেখা করো না?
মুগ্ধাঃ আমি পারবোনা।
আপনাকে এতোদিন বকা দিয়েছি বলে, দেখা করতে বলছেন, তাইতো?
আর আমায় শেষে মেরে ফেলবেন।
আমি পারবোনা।

মুগ্ধার বাচ্চামো কথা শুনে, রাইয়ান শব্দ করেই হেসে দেয়।
রাইয়ানঃ দোষ তো আমার ছিলো, তাই তুমি বকা দিয়েছো।
এতে তোমার কোনো দোষ নাই।
মুগ্ধার ভয় কাটলো।

মুগ্ধাঃ তারপরেও আমি আপনার সাথে দেখা করতে পারবোনা।
রাইয়ানঃ একদিন’ই তো।
মুগ্ধাঃ আমি কখনো বাসা থেকে বের হইনি।
আর শহরের কিছুই আমি চিনিনা।

তাই আপনার সাথে দেখা করা কখনো সম্ভব
না।
রাইয়ানঃ শহরের মেয়ে হয়ে বলছো কিছু চিনোনা?
মুগ্ধা হাসলো।
মুগ্ধাঃ শহরের মেয়ে হলে কি শহরকে চিনতে হবে?

আপনিও তো বাংলাদেশের ছেলে। তাই বলে কি বাংলাদেশ চিনেন?
রাইয়ান মুগ্ধার প্রশ্ন শুনে চুপ থাকলো।
রাইয়ানঃ যেভাবেই হোক, শুধু একবার দেখা করলেই হবে।

মুগ্ধাঃ আমি আপনায় চিনি না।
রাইয়ানঃ আমি চিনিয়ে দিবো।
মুগ্ধাঃ কাল সকালে আমাদের বাসায় আসবেন। তখন দেখা হয়ে যাবে।
মুগ্ধা খুব সহজে কথাটা বললো,

রাইয়ান অবাক হয়। মেয়ে এমন কেন।
রাইয়ানঃ আমি কিন্তু সত্যি সত্যি আসবো?
মুগ্ধাঃ হুম আসেন।

তার আগে বলেন কেন আসবেন?
রাইয়ানঃ সেটা কাল সকালেই জানবে?
মুগ্ধাঃ হুম।

মুগ্ধা ফোন রেখে দেয়।
রাইয়ান আরো কিছু বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু মুগ্ধা ফোন কেটে দেয়। রাইয়ান আর ফোন দেয় নি।
মুগ্ধাঃ আমি ভুল কিছু করলাম না তো?

এভাবে কোনো ছেলেকে বাসায় আসার কথা বলা কি ঠিক হলো?
আর ছেলেটা আমার নাম্বার কিভাবে পাইলো?
কাল আম্মাকে কি বলবো?

মুগ্ধা নিজেকে নিজেই এসব প্রশ্ন করছে।
কেনোই বা আমার সাথে দেখা করতে চায়?
কি চলছে ওই ছেলের মনে?
আল্লাহ জানেন কাল সকালে কি হবে?

আমিও প্রশ্ন করবো। নাম্বার কিভাবে পেলো সে?
মুগ্ধা আর কিছু না ভেবে তার রামিছার রুমে যায়।
রামিছা বেগম এর চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে। মুগ্ধা আস্তে আস্তে রামিছার সামনে যায়।
রামিছা মুগ্ধাকে খেয়াল করেন নি।

আজ মুগ্ধার কাছে ধরা খেয়ে নিলেন রামিছা বেগম।
জানালার এক পাশে রামিছা আর অন্য পাশে মুগ্ধা।
রামিছার চোখ বাহিরের প্রকৃতি দেখা বাদ দিয়ে সামনে তাকাতেই মুগ্ধাকে আবিষ্কার করেন রামিছা।
সাথে সাথে রামিছা নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে নেন।

কিন্তু মুগ্ধা তো দেখেই ফেলছে।
রামিছা বেগম কিছু বলতে গেলে। মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আম্মা কান্না করছো কেন?
রামিছা চুপ থাকলেন মুগ্ধার প্রশ্নতে।
কি উত্তর দিবেন উনি।

চাননা এসব কাউকে বলতে।
মুগ্ধা আবারো বলল।
মুগ্ধাঃ আম্মা কি হয়েছে, কান্না করছো কেন?
রামিছাঃ এমনিই
মুগ্ধাঃ এমনি কেউ কান্না করে?
রামিছা নিশ্চুপ।

মুগ্ধাঃ বলো না আম্মা কেন কান্না করছো?
মুগ্ধা এভাবে অনেক্ষণ রামিছাকে জোর করলো।
মুগ্ধার জোরের কাছে রামিছা হেরে জান।
রামিছাঃ শুনে কি করবি?

মুগ্ধাঃ ওমা! আমার আম্মাটা কেন কান্না করবে সেটা আমার জানা উচিৎ না বুঝি?
রামিছা হাসলেন।
রামিছাঃ রেহানকে কখনো বলবি না তো?

মুগ্ধাঃ কি এমন কথা? যেটার জন্য তুমি কান্না করছো। আবার রেহান ভাইয়ারো অজানা।
মুগ্ধার কথায় রামিছা নিজের চোখের পানি মুছেন। আর বলতে শুরু করেন।
রামিছা আর জাফরুল্লাহ দু’জনের ভিতরের কষ্টের কথা একে একে সব বলতে লাগলেন।
মুগ্ধাও মন দিয়ে সব শুনতে থাকে।

মুগ্ধা রামিছার মুখে সব শুনে নির্বাক হয়ে যায়।
এমন কষ্ট ভিতরে রেখেও মানুষ দুটো কিভাবে সবার সামনে হাসিখুশি থাকে?
রামিছাঃ রেহানকে কখনো এসব বলবিনা?
তাহলে রেহান অনেক কষ্ট পাবে।
মুগ্ধাঃ হুম।

রামিছার চোখের পানি আর কান্না দেখে মুগ্ধাও কেঁদে দেয়।
মুগ্ধাঃ আম্মা এসব মনে না করাই ভাল।
অযথাই কষ্ট পাবে বা পাচ্ছো এসব মনে করে।
রামিছাঃ আমাদের ভাগ্যরে মা।
মুগ্ধা যদি আরো কথা বলে, তাহলে উনিও কান্না করবেন।

তাই রামিছাকে ঘুমানোর কথা বলে, আর বলে সে দুপুরের রান্না করবে।
এটা বলে সে চলে আসে,
বাস্তব খুব কঠিন।
মুগ্ধা আর ভাবনায় মগ্ন না হয়ে, রান্নায় মগ্ন হলো।
রাইয়ান খুশিতে আত্মহারা।

সে মুগ্ধাকে কাল প্রপোজ করবে।
রাইয়ানের ভয় হচ্ছে।
এই রাগী মেয়ে কি তাকে ভালোবাসবে?
রাইয়ান তার ভাবির রুমে যায়। গিয়ে দেখে মণিমা আর তোহফা গল্প করছে।
রাইয়ান দরজা থেকেই বলল।

রাইয়ানঃ আমি কি আসতে পারি পেত্নীদের রুমে?
তোহফা রাগী চোখে তাকালেও, কিছু বলে নি।
সে ঝগড়া করে না, সব সময় গম্ভীর হয়ে থাকে।

কিন্তু মণিমা উত্তর দিলো।
মণিমাঃ পেত্নীদের রাজ্যে কোনো এলিয়েন আসা নিষেধ।
মণিমা হাহাহা করে হেসে উঠলো।
রাইয়ান আর কিছু না বলে গিয়ে তাদের সাথে বিছানায় বসলো।
রাইয়ান বললো,

রাইয়ানঃ ভাবি কাল আমার সাথে এক জায়গায় যাবে?
মণিমাঃ না গো ভাই।
রাইয়ানঃ ভাবি তোমার কি ঘুরতে ইচ্ছা হয় না?
মণিমাঃ তুমি আগে বিয়ে করে নাও, তখন তোমাকে আর তোমার বউকে বাসায় রেখে, আমরা ঘুরতে যাবো।
হেসে হেসে বললো,

রাইয়ান লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকালো।
মণিমাঃ ওমা ছোট ভাইটার লজ্জাও আছে?
রাইয়ান জানে কথা না ঘুরালে, তোহফার সামনে নিজের ইজ্জত এর কাপড় খুলে বেইজ্জত করে দিবেন।
তাই রাইয়ান বললো,

রাইয়ানঃ তোহফা কাল সকালে আমার সাথে ঘুরতে যাবে?
তোহফা ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেই, সেদিনের ছেলের কথা মনে পরে যায়।

তোহফা চুপ থাকলো। আর ভাবে আবারো ঘুরতে গিয়ে যদি ওই ছেলেটির সাথে দেখা হয়।
রাইয়ানঃ কথা বলছো না কেন?
তোহফা যখন এসব ভাবনায় ব্যস্থ। তখন কথাটা বললো রাইয়ান।
তোহফাঃ আর ঘুরতে যাবোনা।
রাইয়ানঃ কেন?

তোহফাঃ এমনি।
রাইয়ানঃ কাল সকাল সকাল তৈরি থেকো, আমি আর তুমি এক জায়গায় যাবো।
তোহফাঃ ভাইয়া?
রাইয়ানঃ কোনো প্রশ্ন শুনতে চাইনা।

তোহফাঃ ভাবি আমার ঘুরতে যেতে ভালো লাগেনা। তুমি বলোনা ভাইয়াকে?
মণিমাঃ আরে নন্দিনী ঘুরতে যাও, ঘুরতে গেলে মন ফ্রেশ থাকে।
তোহফা হতাশ হয়ে বললো,
তোহফাঃ হুম।

তিনজন মিলে খুব গল্প করছে।
এক সময় তোহফা বলে উঠলো।
তোহফাঃ ভাবি! আমি আর ভাইয়া ফুফু চাচ্চু কবে হবো?
মণিমার মন খারাপ হয়ে যায়।

তারপরেও রাইয়ান এর দিকে তাকিয়ে বললো,
মণিমাঃ নন্দিনী সময় হলেই তুমি ফুফু হবে?
তোহফাঃ বিয়ে হলো অনেক বছর, আর এখনো?

মণিমাঃ আমি কারো কাছে কথা বদ্ধ।
তোহফাঃ মানে?
মণিমাঃ রাইয়ানকেই জিজ্ঞাস করো?

রাইয়ান নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
তোহফা বুঝতে অক্ষম।
ভাবির বাচ্চা হওয়ার সাথে ভাইয়ার কি সম্পর্ক?

তারপরেও বলল।
তোহফাঃ ভাইয়া?
রাইয়ান নিচের দিক থেকে মাথা তুললো।
আর মণিমার দিকে তাকালো।

মণিমাঃ বলো তোমার বোনকে সব?
রাইয়ান এর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো,
তোহফাঃ ভাইয়া কি কথা?
রাইয়ানঃ ভাইয়া আর ভাবির যখন বিয়ে হয় তখন আমি ছোট।
আম্মু মারা যান আমায় ৬ বছরের রেখে।

আব্বু আর বিয়ে করেন নি।
আর আমায় দেখাশোনা করার জন্যেও কারো প্রয়োজন ছিলো।
তাই আব্বু ভাইয়ার সাথে ভাবির বিয়ে হয়।
ছোট ছিলাম তাই বিয়ে টিয়ে এসব বুঝতাম না।

আমি ভাবিকে প্রথম’ই আম্মু ডাকি।
তখন ভাইয়া বলছিলেন।
ভাবি ডাকতে, তারপর থেকে ভাবি ডাকতাম।
বিয়ের দিন রাতে, অনেক মেহমান ছিলো। আর ভাবিকেও চিনতাম, আব্বুর বন্ধুর মেয়ে। তাই আমি বলছিলাম।
ভাবি ভাইয়া থেকে আমায় বেশি ভালোবাসবে।

ভাবিও হুম বলেছিলো।
বিয়ের দুই দিন পর, ভাবি আমায় খাবার খাওয়াচ্ছিলো। ভাইয়া আর আব্বু বাসায় ছিলেন না।
তখন আমি খাবার খাচ্ছিলাম না।

ভাবি বলল। আমার জন্য বেবি আনবে, যদি আমি ভালোভাবে খাবার খাই।
তখন খুশি হই।
কিন্তু তখন আবার মন খারাপ হয়।
আর বলি।

ভাবি, তোমার বেবি হলে তখন কি আমায় ভালোবাসবে না।
ভাবি চুপ থাকেন, তার কিছুক্ষণ পর ভাবি বলেন।
তুমি কি চাও?
আমি তখন পিচ্ছি ছিলাম। তাই না বুঝেই বলে দিয়েছিলাম।

আমার বিয়ের পর তুমি বেবি নিয়ো।
ভাবিও তখন হাসি মুখে হুম বলে, আর আমায় কথাও দেয়। আর বলে, প্রতিদিন ভালো ভাবে খাবার খাই।
ভাইয়াকে ভাবি সব বলে।

আমায় খুশি রাখার জন্য এসব করবে তারা।
জানো যখন আমি বুঝতে শিখলাম।
একটু বড় হলাম।
আমি তখন চাচ্চু হবো বলে ভাবিকে আর ভাইয়াকে বলতাম, আমায় একটা বেবি দাও।
কিন্তু তখন ভাবি বলতে সেই পিচ্চিকালের কথা।

ভাবি নাকি আমায় কথা দিয়েছে, আমার বিয়ের পর ভাবি বাচ্চা নিবে।
রাইয়ান কথা গুলো বলে থামলো।
মণিমা স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছেন।
কিন্তু তোহফা খুব অবাক হয়।

শুধু সামান্য কথা দেওয়ার কারণে, ভাবি এতোদিন ধরে মাতৃত্বের স্বাদ নেননি।
এমন মানুষকে চোখ বন্ধ করে ভালোবাসা যায়। তার পরেও তোহফা বলে।
তোহফাঃ ভাবি তুমি এমন কেন গো?

ভাইয়াকে কথা দিয়েছো বলে কথা রাখতেই হবে, এটা তো নিয়ম না।
মণিমা হেসে বললো,
মণিমাঃ ছোট থেকেই অভ্যাস৷ কাউকে কোনো কথা দিলে সেটা পূরণ করা।
তোহফা অবাক হয়।

মণিমাকে সে কি বলবে খুঁজেই পাচ্ছেনা।
রাইয়ান মুচকি হেসে বললো,

রাইয়ানঃ তোহফা তুমি খুব তাড়াতাড়ি ফুফু হবে, আর আমিও চাচ্চু হবো।
মণিমাঃ তোমার বিয়ের পর।
রাইয়ানঃ হুম, ভাবি খুব তাড়াতাড়ি আমিও বিয়ে করবো।

মণিমা আর তোহফা হাসে,
মণিমাঃ জানি তো আমার পিচ্চি ভাইয়াটা কোনো এক মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
রাইয়ানঃ হুম, আর খুব তাড়াতাড়ি বিয়েও করবো।
লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে রাইয়ান।

মণিমা আর তোহফা নানান ভাবে রাইয়ান এর সাথে মজা করছে।
রাইয়ান এসবের হাত থেকে বাঁচার জন্য বললো,

রাইয়ানঃ তোহফা! সকালের নাশতা করে রেডি থেকো? তোমায় নিয়ে এক জায়গায় যাবো।
তোহফাঃ কোথায়?
রাইয়ানঃ সেটা সারপ্রাইজ থাকুক।

তোহফাঃ সারপ্রাইজ সব সময় খারাপ হয় ভাইয়া।
রাইয়ানঃ কি জানি বাবা।
তবে এই সারপ্রাইজ ভালোই হবে,

তোহফাঃ হুম।
রাইয়ান তার রুমে আসে, আজ অনেক আড্ডা দেয় সে।
কাল সে তার ভালোবাসাকে দেখবে।

মুগ্ধা তাকে কিভাবে নিবে, তার অজানা।
খারাপ কিছু না হলেই হলো।
রাইয়ান এসব ভাবনায় মগ্ন থাকে।

পার্ট: ১৩

মুগ্ধা সকালের নাশতা করে বসে আছে বাগানে। আজ সকালেই সূর্যের দেখা পায় সে। তাই ঠাণ্ডাও খুব কম।
বাগানে বসে আছে অন্য একটা কারণে।

কারণ রাইয়ান তাকে ফোন করে বলেছে সে আসবে, এখন গাড়িতে আছে।
বাগানে দোলনায় বসে বসে ঝুলছে মুগ্ধা।
রামিছা নিজের রুমে বসে বসে বই পড়ছেন।

মুগ্ধা রামিছাকে বলেছে একজন আজ বাসায় আসবে। সেই একজন কে? সেটা রামিছা জানতে কোনো ইচ্ছা করেন নি। মুগ্ধাও আর বলেনি কে আসবে।
মুগ্ধা দোলনায় ঝুলছে আর ভাবছে।
মুগ্ধাঃ কেন আসবে লোকটা?
কি বলবে আমায়?
কি চলছে লোকটার ভিতরে?

মুগ্ধা কোনো ভাবেই রাইয়ান কেন তার সাথে দেখা করবে? এই দেখা করার সমীকরণ মিলাতে পারেনি।
মুগ্ধা বাগানে থাকা ফুল গুলোর দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে আছে।
বাগানের ফুলগুলো আজ মুগ্ধাকে ভীষণ ভাবে মুগ্ধ করছে।

তোহফাঃ ভাইয়া কোথায় যাবে? এবার অন্তত বলো?
রাইয়ান গাড়ি ড্রাইভ করছে, আর তোহফা বারবার প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। রাইয়ান শুধু মুচকি হাসছে।
আর তোহফা ঝরা বেলীফুলের মতো নিজের মুখটা করে রাখছে।

রাইয়ান আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে।
সেজেছে বলতে সব ম্যাচিং করে পড়েছে। যদিও মুখে বা চুলে সে কিছুই দেয় নি।
সে প্রকৃতির সুন্দরে সৌন্দর্য।

রাইয়ান এর চোখে বারবার মুগ্ধার মুখটাই ভেসে উঠেছে।
— মনে মনে খুশির আভাস,
ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসে প্রিয়তমার সুভাস।

রাইয়ান মুগ্ধাকে নিয়ে একটু বেশিই ভেবে যাচ্ছে।
মুগ্ধা তার কল্পনায় এতোই বিদ্দমান হয়েছে।
সামনে একটা বড় গাড়ি আসছে ধেয়ে। যেটা রাইয়ান দেখতেই পারছেনা।
তোহফার চোখ সামনে পরতেই।

তোহফাঃ ভাইয়ায়ায়ায়া,
তোহফা ভাইয়া বলে চিৎকার করে উঠে।
তোহফার চিৎকার শুনে রাইয়ান বাস্তবে ফিরে।

আর সামনে গাড়ি দেখে সাথে সাথেই রাইট সাইটে যায়।
গাড়িটা অনেকটা দূরেই ছিলো।
রাইয়ান আর তোহফার জীবন নামক প্রদীপ হয়তো সময়ের ব্যবধানে নিমে যেতো।
তোহফা রাগী চোখে তাকাচ্ছে রাইয়ানের দিকে।

তোহফার তাকানো দেখে, রাইয়ান গাড়ি থামিয়ে দেয়।
রাইয়ানঃ সরি সরি বোন আমার। আমি অন্য মনষ্ক হয়ে পরেছিলাম।
তাই,

তোহফা শুধু রাগী চোখে তাকালো। আর বললো,
তোহফাঃ ভাইয়া! গাড়ি ড্রাইভ করার সময় এভাবে অন্য মনষ্ক হলে, যেকোনো সময় কোনো খারাপ কিছু হতে পারে?
রাইয়ান চুপ থাকে। সত্যিই তো।
রাইয়ান বেশি ডুবে গেছিলো মুগ্ধার মধ্যে।

রাইয়ান আবার গাড়ি চালাতে শুরু করে। এবার খুব দেখে শুনে গাড়ি চালাচ্ছে।
মুগ্ধা বাগানে বসে আছে অনেক্ষণ ধরে।
রাইয়ান বলছিলো!

৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগবে।
কিন্তু তার চেয়ে বেশি সময় ধরে মুগ্ধা বসে আছে।
মুগ্ধার রাগ হয়। কথার মধ্যে মিল না থাকলে, তার রাগ সপ্তম আকাশে উঠে যায়।
মুগ্ধা কিছুক্ষণ পর পর নিজের ফোনের টাইম দেখছে।
মুগ্ধা বাগানে পায়চারী করছিলো।

তখনি বাসার গেইটের বাহিরে গাড়ির হরণ বেজে উঠে।
রেহানদের বাসায় কোনো দারোয়ান নেই। নেই মানে জাফরুল্লাহ রাখেন নি।
উনি চাননা বাসায় অপরিচিত কেউ থাকুক।

উনি গাড়ি নিয়ে যাবার সময় নিজেই বাসার গেইট লাগিয়ে যান।
আবার আসার সময় একি কাজ করেন।
কিন্তু এখন মুগ্ধা সকালে বাসার গেইট ভিতর থেকেই লাগায়। জাফরুল্লাহ গাড়ির ড্রাইভার কেও কাজ থেকে বিদায় করে দিয়েছেন।
মুগ্ধা গিয়ে বাসার গেইট খুলে।
কালো একটা গাড়ি ভিতরে এসে ঢুকে।

মুগ্ধা গেইট লাগায়। কিন্তু গেইটের ছোট পাটের দরজাটা লাগায়নি সে। কারণ এটা সব সময় খুলাই থাকে। তারপর মুগ্ধা এসে গাড়ির সামনে দাঁড়ায়।
রাইয়ান এতক্ষণ দেখেনি। কে গেইট খুললো।
রাইয়ান আর তোহফা গাড়ি থেকে নামে। আর রাইয়ান গাড়ি থেকে নেমেই মুগ্ধাকে সামনে আবিষ্কার করে।
মুগ্ধাঃ আসসালামু আলাইকুম।

রাইয়ান মুগ্ধার সালাম এর উত্তর দিয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে মুগ্ধার দিকে।
মুগ্ধার ভালো লাগেনা, তার দিকে এভাবে কারো তাকানো টা।

তোহফা এসে রাইয়ান এর পাশে দাঁড়ায়। তোহফা একবার রাইয়ান এর দিকে তাকাচ্ছে। আর একবার মুগ্ধার দিকে।
মুগ্ধা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু রাইয়ান এখনো সেই একি ভাবে তাকাচ্ছে মুগ্ধার দিকে।
তোহফা রাইয়ান কে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়।

রাইয়ান কারো ধাক্কা খেয়ে বাস্তবে প্রত্যাবর্তন করে।
নিজে নিজেই লজ্জা পায়।
মুগ্ধা কি ভাববে তার প্রতি।
রাইয়ান কিছু বলতে গেলে। মুগ্ধাই বললো,
মুগ্ধাঃ আপনারা ভিতরে আসেন।

রাইয়ানঃ হুম,
মুগ্ধা তোহফার দিকে তাকালো।
মুগ্ধা ভাবছে, তোহফা হয়তো রাইয়ান এর স্ত্রী।
কিন্তু তার ভাবনাটা নিজের মধ্যে রাখলো।

আর একটু কষ্টও পায়। ভিতরটা কেমন জানি করছে তার।
কিন্তু মুগ্ধার অজানা কেন করছে এমন?
মুগ্ধার পিছন পিছন আসতে গেলে রাইয়ান।

তখন তোহফা বলে।
তোহফাঃ ভাইয়া গাড়িতে কিছু ফেলে আসছো?
রাইয়ান এর মনে হতেই।
রাইয়ানঃ ও হুম, ভুলেই গেছিলাম।

এই বলে রাইয়ান আবার গাড়ির দিকে যায়।
তোহফার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে, মুগ্ধার এক অজানা ভালো লাগা কাজ করে।
রাইয়ান মুগ্ধার জন্য চকলেট আইসক্রি এসব আর কিছু মিষ্টি এনেছে।

মুগ্ধা এনে দুজনকে ভিতরে বসতে দেয়।
আর চকলেট আর আইসক্রিম ফ্রিজে রাখে। তার রাগ হয় খুব। নিতিন এর আনা আইসক্রিম গুলোও এখনো রয়ে গেছে এর মধ্যে আরো। উফফ অসহ্য।
মুগ্ধা উপরে যায়। রামিছাকে ডাকতে।
রামিছা বই পড়ছিলেন।

তোহফাঃ ভাইয়া এখানে কেন আসলাম আমরা?
তুমি না ঘুরতে যাবা বললা?
রাইয়ানঃ মেয়েটাকে দেখেছো?
তোহফাঃ হুম, কিন্তু কেন?
রাইয়ানঃ সব বুঝতে পারবে।

তোহফা চুপ থাকলো। সে সেসময় রাইয়ানের তাকানো দেখেই বুঝেছে, রাইয়ান এর মনে কি চলছে।
এখন শুধু দেখার পালা।
তোহফা মনে মনে বললো,
ইশ! মেয়েটা কতোই না সুন্দর!
তোহফা আবার বললো,

তোহফাঃ ভাইয়া মেয়েটা কে?
রাইয়ানঃ ওর নাম মুগ্ধা, এইটুকুই জানি।
তোহফাঃ মানে?
রাইয়ানঃ সব বলবো। আর এই মেয়ে তোমার ভাবি হবে।
রাইয়ান কথাটা বলে হেসে দেয়।

রাইয়ান এর কথা শুনে তোহফা উৎফুল্ল হয়ে উঠে।
আর খুশিতে বলে।
তোহফাঃ সত্যিই ভাইয়া?
রাইয়ানঃ হুম, আর এটাই তোমার সারপ্রাইজ।

তোহফাঃ হুম খুব সুন্দর সারপ্রাইজ। আমি এমন মিষ্টি মেয়েকে ভাবি ডাকবো।
হাসি মুখে বললো তোহফা।
রাইয়ানঃ হুম।
তোহফাঃ তুমি খুব পঁচা ভাইয়া।
রাইয়ান অবাক হয়।

রাইয়ানঃ কেন? আমি আবার কি করলাম?
তোহফাঃ তুমি এতো সুন্দর একটা মেয়ের সাথে প্রেম করো।
কিন্তু আমায় একবারো বলোনি।
মন খারাপ করে বলে।

রাইয়ান হাসে আর বলে।
রাইয়ানঃ প্রেম করলাম আর কোথায়।
তোহফাঃ তাহলে?
রাইয়ানঃ নিজের চোখেই দেখো সব?

তোহফাঃ হুম।
ওদের কথার মধ্যেই,
মুগ্ধা আর রামিছা আসেন।
রাইয়ানঃ আসসালামু আলাইকুম, আন্টি! কেমন আছেন?

রামিছাঃ আলহামদুলিল্লাহ, বাবা তুমি কেমন আছো?
রামিছার চিনতে অসুবিধা হয়নি। কারণ এই ছেলেই যে তার কলিজাকে বাঁচিয়েছে।
রাইয়ান কিছু বলার আগেই মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আম্মা তুমি কথা বলো, আমি নাশতা নিয়ে আসি।

রাইয়ান কথাটা শুনে মন খারাপ হয়।
সে চায়, সারাক্ষণ মুগ্ধা তার সামনে বসে থাকুক।
মুগ্ধা নাশতা বানাতে যায়।
রামিছাঃ নাম কি মা তোমার? খুব মিষ্টি তো দেখতে।

তোহফার দিকে তাকিয়ে বলেন রামিছা।
রামিছার দিকে তাকিয়ে আছে তোহফা, তোহফার মনে হয় কতোই না চেনা এই মহিলাটা।
কিন্তু কখনো তো সে দেখেনি।
তোহফাঃ তাহসিন তোহফা।

চুপ হলো তোহফা।
রামিছা আবার বললেন।
রামিছাঃ বাহ! খুব মিষ্টি তো নামটা।
আমার পাশে এসে বসো মা।
তোহফাও গিয়ে রামিছার পাশে বসে। তোহফার খুব ভালো লাগছে রামিছার পাশে বসতে।
রাইয়ান শুধু দেখছে।

সামান্য সময়ে দুজন কতোটা মিলে গেছে।
মনে হচ্ছে হাজার বছরেত চেনা।
রামিছাঃ তোমাদের বাসায় আর কে কে আছে বাবা?
রাইয়ান এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন।

রাইয়ানঃ আমি, আমার ভাইয়া ভাবি আর আব্বু, আর আমার বোন তোহফা।
আম্মু আমাকে ছোট রেখেই মারা গেছেন।
রামিছাঃ ওও,
তোহফার কেন জানি মনে হচ্ছে একবার জড়িয়ে ধরতে রামিছাকে।
কিন্তু নিজেকে সংযত রাখলো।

কিন্তু রামিছা তোহফাকে অবাক করিয়ে দিয়ে নিজের হাত দিয়ে তোহফাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেন।
তোহফা অবাক হয়।
উনিকি আমার মনের কথা জানতে পারলেন।
এর মধ্যে মুগ্ধা ওদের জন্য নাশতা নিয়ে আসে।

ফলমূল, আর সামান্য নাশতা তৈরি করে রাখছিলো সেগুলো, আর চা বিস্কুট আর আইসক্রিম।
রাইয়ান নাশতার সাথে আইসক্রিম দেখে মুচকি হাসে। আর ভাবে এই মেয়েটা এমন কেন?
সবাই নাশতা করছে, এর মধ্যে মুগ্ধা তোহফার সাথে পরিচিত হয়।
রাইয়ান বারবার মুগ্ধার দিকে তাকাচ্ছে। যেটা মুগ্ধার চোখেও পরে।
কিন্তু কিছু বলেনা।

সবাই মিলে অনেক্ষণ আড্ডা দেয়।
এরি মধ্যে জোহরের আজান হয়।
রামিছা নামাজ পড়ার জন্য উপরে চলে যান।
নিচে যতক্ষণ ছিলেন, ততক্ষণ তোহফাকে নিজের বাহুদ্বয়ে আবদ্ধ করে রেখেছেন।
এটা দেখে মুগ্ধা আর রাইয়ান খুব অবাক হয়।

একটা অচেনা মেয়েকে কিভাবে এতো আপন করে নিলেন রামিছা।
তোহফার মনে হয়েছিলো। সে তার মা’য়ের শরীরে মিশে আছে। যদিও সে জানে না মা শব্দটার অর্থ।
মা শব্দে ভালোবাসা আছে কিনা, সেটা সে কখনো জানেনি।

রাইয়ান এর বাবার ভালোবাসা পেয়ে বুঝেছিলো বাবা শব্দটা কেমন।
মাঝেমধ্যেই তোহফা ভাবে, তারও যদি বাবা মা থাকতো। তাহলে হয়তো আরো বেশি ভালোবাসা পেতো।
মুগ্ধাঃ আপু আম্মা তো আপনাকে খুব ভালবেসে ফেলছেন অল্প সময়েই।

মুগ্ধার কথা শুনে মুচকি হাসে, আর চোখে অল্প অল্প পানির ঝলক দেখা যায়।
রাইয়ান শুধু মুগ্ধাকেই দেখছে।
আর ভাবছে, কিভাবে প্রপোজ করবে সে মুগ্ধাকে।
কিভাবে তার মনের কথা জানাবে।
এক পর্যায়ে রাইয়ান বলেই ফেলে।

রাইয়ানঃ তোমাদের বাগানটা খুব সুন্দর, চলো আমাদের তোমাদের বাগান দেখাবে।
তোহফাঃ আমিও যাবো।
তোহফাকে আজ খুব খুশি আর স্বাভাবিক দেখা যাচ্ছে।
রাইয়ান মনে মনে খুশি হয়, তোহফাকে এমন দেখে।

মুগ্ধাঃ আগে আমরা সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে নেই?
রাইয়ানঃ না না, আমরা খাবার খাবো না।এই নাশতাতেই আমরা শেষ।
চলো বাগানে যাই।

মুগ্ধা আর কোনো কথা না বলে মাথা দিয়ে ইশারা করলো তার সাথে আসতে।
তোহফা আর রাইয়ান তার পিছন পিছন বাগানে যায়।
তোহফা কিছুটা বুঝতে পারছে রাইয়ান এর মনে কি চলছে।
তাই তোহফা মনে মনে হাসছে।

তিনজন বাগানে দাঁড়িয়ে আছে।
তোহফা বাগানে থাকা ফুল গুলো নিজের হাত দিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার।
তার ভালো লাগে ফুল।

কারণ আশ্রমে ছোট্ট একটা বাগান ছিলো।
যেটা আশ্রমের সব মেয়েদের ভালোবাসা।
মুগ্ধা আড়চোখে তাকাচ্ছে রাইয়ান এর দিকে। কিভাবে প্রশ্ন করবে। তারপরেও বললো,
মুগ্ধাঃ আপনি আমায় এতোদিন এভাবে জ্বালিয়েছেন?

কিছুটা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো মুগ্ধা।
মুগ্ধার প্রশ্ন শুনে রাইয়ান আর তোহফা তাকায় মুগ্ধার দিকে।
রাইয়ান লজ্জা পায় মুগ্ধার এমন কথায়।
তোহফাও অবাক হয়।

রাইয়ান কিছুক্ষুণ সামনে থাকা ফুলের দিকে তাকালো।
আর বললো,
রাইয়ানঃ তোমার কণ্ঠ শোনার জন্য।
রাইয়ানের কথায় মুগ্ধা লজ্জা পায়
রাইয়ানঃ ফোনে তো খুব করে আমায় কথা শুনাতে পারলে। তাহলে

এতক্ষণ ধরে বাসায় আসলাম। কিন্তু আমার সাথে ভালোভাবে কথাই বলতে পারছো না।
রাইয়ান হেসে হেসেই কথা বললো,
রাইয়ান এর কথা শুনে মুগ্ধা আরো বেশি লজ্জা পায়।
আর রাগ হয় খুব।
মুগ্ধার মন চাচ্ছে রাইয়ানের মাথা ফাটিয়ে দিতে।
কিন্তু অতিথি যে?

রাইয়ান এমন ভাবে মুগ্ধার দিকে তাকাচ্ছে।
মনে হচ্ছে চোখেই সব প্রেম আদানপ্রদান করবে।
তোহফা রাইয়ানের পাগলামো দেখছে।
বাগানে অনেক ধরণের ফুল ফুটেছে।

তার মধ্য থেকে রাইয়ান নাম না জানা একটা ফুল ছিঁড়ে নেয়।
তোহফা আর মুগ্ধা অন্য দিকে তাকিয়ে গল্প করছিলো।
রাইয়ান ফোনটা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে মুগ্ধার দিকে আগাতে লাগে।
মুগ্ধার পিছনে গিয়ে রাইয়ান ডাক দেয়।
রাইয়ানঃ মুগ্ধা!

পিছন থেকে রাইয়ান এর কণ্ঠ শুনে, পিছনে তাকাতেই রাইয়ান কে ফুল হাতে বসতে দেখে।
মুগ্ধা রাইনকে ফুল হাতে হাটু গেড়ে বসে দেখতে খুব অবাক হয়।
রাইয়ান মুগ্ধার দিকে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে আছে।
তোহফা এসে রাইয়ানের পাশে দাঁড়ায়।
মুগ্ধা এখনো তাকিয়ে আছে রাইয়ানের দিকে।

মুগ্ধার আর বুঝতে বাকি নেই।
তার মনে এই কথাটা কখনো আসেই নি।
সে ভুলেই গেছিলো, একটা ছেলে কেন একটা মেয়ের সাথে কথা বলে।
মুগ্ধার খুব রাগ হয়।
তারপরও নিজের রাগকে মাটি চাপা দেয়।

মুগ্ধার চোখে রাগী ভাব দেখে। তার এখন ভয় পেলে চলবেনা।
রাইয়ান আর অপেক্ষা না করেই বললো,
রাইয়ানঃ আমার মোনালিসা হবে?
(হাতে ফুল, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। আর মায়া ভরা কণ্ঠে নিয়ে তাকিয়ে আছে মুগ্ধার দিকে।)
রাইয়ান এর মুখে কথাটা শুনে অবাক চোখে তাকায় মুগ্ধা।

তার ভিতর কেঁদে উঠে। ঠিক এভাবেই তার বুবুকে না-কি রাহিন ভাইয়া প্রপোজ করেছিলেন।
কিন্তু রাহিন ভাইয়া, মোনালিসা না বলে বলেছিলেন, আমার মমতাজ হবে? এভাবে আরো অনেক কিছু।
মুগ্ধাকে কোনো কথা না বলতে দেখে, রাইয়ান ভয় পেয়ে যায়। তাহলে কি সে পাবেনা মুগ্ধাকে।

আবারো বললো,
রাইয়ানঃ মুগ্ধা! হবে আমার মোনালিসা?
মুগ্ধা কখনো প্রেম নিয়ে ভাবেনি।
মুগ্ধাঃ আপনি এসব বলার জন্য এখানে আসছেন?
খুব রেগেই বললো,

রাইয়ান ভয় পায়। তোহফাও ভাবে, তাহলে কি তার ভাইয়া খালি হাতে চলে যাবে।
রাইয়ান বললো,
রাইয়ানঃ মুগ্ধা! তোমায় যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন, সেই সময় আমার ভিতর নেড়ে উঠে।
কারণ আমি তোমায় খুঁজছিলাম।

প্রেম ভালোবাসা এসবে আমি বিশ্বাসী কখনোই না।
কিন্তু তোমাকে দেখে, আমি আমার আঁকা মোনালিসাকে দেখতে পেয়েছি।
মুগ্ধা সেদিন প্রথম দেখায় আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলছি।
কারণ তুমি আমার দেখা বাস্তব মোনালিসা।
প্লিজ মুগ্ধা।

হয়ে যাও না আমার মোনালিসা।
খুব ভালোবাসবো।
কখনো কষ্ট তোমায় স্পর্শ করতে দিবোনা।
মুগ্ধা এই কয়দিনে তোমায় অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।

মুগ্ধা অনেক ভালোবাসি তোমায়। অনেক অনেক ভালোবাসি।
কথাটা বলতে বলতে রাইয়ান বসা থে কে উঠে দাঁড়ায়।
রাইয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
মুগ্ধার উত্তরের আসায় সে দাঁড়িয়ে আছে।

শুধু সে না, আরো তিনজন মুগ্ধার উত্তরের আসায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু মুগ্ধার চোখ দুটো রাইয়ান এর দিকেই।
রাইয়ানঃ কিছু বলো?
কাঁদো কাঁদো কন্ঠে।

মুগ্ধা চুপ থাকে, তার কি বলা উচিৎ?
হ্যাঁ না-কি না?
তারপরেও মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ প্রথম দেখায় কি ভালোবাসা হয়?

মুগ্ধার প্রশ্নের উত্তর কি দিবে রাইয়ান, তারপরেও বললো,
রাইয়ানঃ হ্যাঁ হয় ভালোবাসা।
প্রথম দেখায় ভালোবাসা হয়।
কারণ জানো?
মুগ্ধা বললো,

মুগ্ধাঃ প্রথম দেখায় কখনো ভালোবাসা হয় না।সেটা আপনার আবেগ আর ভালোলাগা।
কারণ না জানলেও হবে।
প্রথম দেখায় ভালোলাগা ছাড়া আর কিছুই না।
রাইয়ানঃ হ্যাঁ প্রথম দেখায় ভালোলাগা।

কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
ভালোলাগা ছাড়া কি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়?
মুগ্ধা চুপ থাকলো।
রাইয়ান বললো,

রাইয়ানঃ প্রথম দেখায় ভালোলাগা কাজ করে।
আর ভালোলাগা ছাড়া কখনো ভালোবাসা সৃষ্টি হয় না।

ভালোবাসার কয়েকটা ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপ হলো ভালোলাগা।
কাউকে ভালোলাগার পরেই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
ভালোবাসা এমনি এমনি সৃষ্টি হয় না।
প্রেম এবং প্রেম
একটা সম্পর্কে প্রথমেই ভালোবাসা আসেনা।

প্রথমে আসে ভালোলাগা, এটা হল প্রথম প্রেম।
যেই প্রেম এর নাম ভালোলাগা।
একটা সম্পর্কের কয়েকটা বছর কেটে যায় ভালোলাগা দিয়েই।

তারপর আসে ভালোবাসা।
প্রথম প্রেম ভালোলাগা, আর দ্বিতীয় প্রেম হলো ভালোবাসা।
ভালোলাগা ছাড়া কখনো ভালোবাসা হয় না মুগ্ধা।
আর প্রথম দেখায় ভালোলাগাই হয়।

ভালোবাসা না।
আমার ভালো লেগেছে তোমায়।
আর ভালোবাসা শব্দটা শ্রেষ্ঠত্ব পাবে তোমার ভালোলাগাকে কেন্দ্র করে।
কারণ দুজনের ভালোলাগায় ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।
রাইয়ান কথাগুলো বলে থামলো।

তোহফা রাইয়ানের দিকে তাকায়। রাইয়ানের কথায় কি আসলেই যুক্তি আছে।
পিছনের দুজনও অবাক হয়ে শুনছিলো রাইয়ানের কথায়।
মুগ্ধার কি বলা উচিত?

মুগ্ধা রাইয়ানের বলা কথাগুলোতে ডুব দেয়।
রাইয়ানঃ মুগ্ধা কিছু বলো?

আমি প্রমাণ করে দিবো।
ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
কারণ ফ্যামিলির মতে দুই ছেলেমেয়ের বিয়েতে কিন্তু ভালোবাসা কাজ করেনা।

সেখানে প্রথম ভালোলাগাই কাজ করে।
তারপর সময়, স্থান, অবস্থা, এসব মিলেই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
প্লিজ মুগ্ধা আমায় একটা সুযোগ দাও।

বেশি ভালোবাসতে হবে না আমায়।
শুধু আমার জীবন সঙ্গী হয়ে থাকো।
মুগ্ধা!
মুগ্ধা কি বলবে?
তারপরেও বললো,
মুগ্ধাঃ আমায় চিনেন আপনি?

মুগ্ধার অন্য ধরণের প্রশ্ন
শুনে রাইয়ান এর রাগ হলো।
তারপরেও বলে।
রাইয়ানঃ আমি তোমায় ভালোবাসি।

ভালোবাসার মাধ্যমেই চিনে যাবো বাকিটুকু।
আর কাউকে ভালোবাসতে হলে তাকে চিনার প্রয়োজন হয় না।
মুগ্ধা তো আর এসব মানবে না।
সে আগে তার বিষয়ে বলবে তারপর সে তার মতামত দিবে।

তাই মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আমি এই বাসার মেয়ে না?
কথাটা শুনে রাইয়ান আর তোহফা অবাক হয়।
আর বলে।
রাইয়ানঃ মানে?
তোহফা ভাবে তাহলে এই মুগ্ধাও কি তার মতো।

মুগ্ধা হালকা হেসে বললো,
মুগ্ধাঃ আমি গ্রামের মেয়ে।
রাইয়ানঃ কিহ?
রাইয়ান ভাবেনি কখনো, মুগ্ধা গ্রামের মেয়ে।
তারপর মুগ্ধা বলতে শুরু করে।

পার্ট: ১৪

মুগ্ধাঃ আমি গ্রামের মেয়ে।
কথাটা শুনে রাইয়ান আর তোহফা অবাক হয়।
রাইয়ানঃ কিহ?

রাইয়ান হয়তো ভাবেনি কখনো মুগ্ধা গ্রামের মেয়ে।
রাইয়ান এর মতে গ্রামের মেয়েরা খুব সুন্দরী হয়। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের ঠোঁট কালো হয়। এটা রাইয়ান এর একটা ভুল ধারণা। যেটা ৩ বছর আগে তাদের বাসার কাজের মেয়েকে দেখে সৃষ্টি হয়েছিলো।
কিন্তু মুগ্ধা তো একবারে ভিন্ন।

মুগ্ধাঃ অবাক হলেন?
আমি ছোট্ট একটা গ্রামের মেয়ে, আমার বড় হওয়া সব গ্রামেই। আর শহরে এসেছি মাত্র কিছুদিন হলো।
রাইয়ানঃ তাহলে এই বাসা?

মুগ্ধাঃ রেহান ভাইয়ার কোনো বোন নাই, তাই আমায় নিয়ে এসেছেন। আর আমাদের গ্রামে কিছু সমস্যা তাই।
রাইয়ানঃ তুমি গ্রামের হও আর শহরেরি হও। সেটা আমার দেখার কথা না।
আমি তোমায় ভালোবাসি।
এটাই সব।

মুগ্ধার রাগ হয়।
কি বলবে সে?
রাইয়ানঃ একটা সুযোগ দাও আমায় মুগ্ধা।

খুব ভালোবাসবো তোমায়।
করুণ চোখে তাকিয়ে আছে রাইয়ান।
মুগ্ধাও চুপ হয়ে আছে। মুগ্ধার চোখজোড়া রাইয়ান এর ভয়ে ভরা চেহারার দিকে।
মুগ্ধা কি বলবে খুঁজে পাচ্ছেনা।

সে কি নিশিকেই অবলম্বন করবে?
নিশির কথা মনে হতেই, মুগ্ধার মন খারাপ হয়।
রাহিনের প্রপোজ পেয়ে এভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলো নিশি।
পাশেই ছিলো মুগ্ধা আর সুমা।

সুমা অনেক বুঝিয়ে নিশিকে রাজি করিয়েছিলো।
ঠিক রাইয়ান এর মতো রাহিন ছিলো, কেউ কাউকে চিনতো না।
কিন্তু তাদের প্রেম তো অমর হয়ে আছে।

তাহলে আমি কি সুযোগ দিতে পারি?

মুগ্ধা নিজে নিজেই ভাবছে, আর নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো।
মুগ্ধা আর কোনো কথা না ভেবেই।
রাইয়ান এর দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয়।

রাইয়ান খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।
পিছন থেকে দুজন আর তোহফা হাত তালি দিয়ে
উঠে।

রাইয়ান তার হাতে থাকা ফুলটা মুগ্ধার হাতে দেয়। আর মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধার মায়াবী চেহারায়।
পিছন থেকে ওরা হাত তালি দিয়েই যাচ্ছে।
হাত তালির শব্দে রাইয়ান আর মুগ্ধা বাস্তবে আসে।

মুগ্ধা পিছনে তাকায় এবার।
আর পিছনে দু’জনকে দেখে মুগ্ধা ভয়ে কেঁপে উঠে।
পিছনে আর কেউ না।

পিছনে ছিলো নিতিন আর রেহান।
মুগ্ধা শুধু ভয়ে ভয়ে বললো,

মুগ্ধাঃ ভাইয়া তোমরা?
রেহান আর নিতিন কিছু বলতে গেলে রাইয়ান পিছনে তাকায় আর, রেহানকে দেখে বলে,
রাইয়ানঃ আমিই বলেছি

রেহান ভাইকে এখানে আসতে।
(রাইয়ান অবাক হয়ে নিতিনের দিকে তাকায়।
এটা তো দোকানের সেই ছেলেটা।)

তোহফা আর নিতিনের চোখাচোখি হতেই দু’জন অবাক হয়।
নিতিন ভাবেনি কখনো সে আবার দেখতে পারবে মেয়েটিকে।
“রাইয়ান এর কথা শুনে মুগ্ধা বললো”
মুগ্ধাঃ আপনি বলেছেন মানে?

মুগ্ধার প্রশ্ন শুনে রাইয়ান আর রেহান হাসে,
হাসির মানেটা মুগ্ধা বুঝতে পারেনি।
সাথে নিতিনও হাসছে।
রাইয়ান বললো,

রাইয়ানঃ তোমাকে আমার করে দিতে রেহান সাহায্য করেছে।
রাইয়ান এর কথা শুনে মুগ্ধা অবাক হয়ে বললো,

মুগ্ধাঃ কিহহ?
রাইয়ানঃ তোমার নাম্বার দেওয়া, তোমার সাথে ফোনে কথা বলার পারমিশন রেহান দিয়েছে আমায়।

এবং রেহান বলেছে তোমায় খুব তাড়াতাড়ি আমার মনের কথা বলে
দেওয়ার জন্য।
মুগ্ধা সব শুনে আর বলে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া তুমি খুব পঁচা।
শুধু তুমিও না।

ভাইয়া তুমিও খুব পঁচা।
(নিতিনের দিকে তাকায় আর বলে।)
তুমিও তো আমায় বলতে পারতে?

নিতিনঃ রেহান আমার হুমকি দিছে’রে, যে তোকে কিছু বললে, আমার চুল কেটে দিবে ঘুমের মধ্যে।
মন খারাপ করে বললো

নিতিন।
(নিতিনের চুল খুব সুন্দর। যেটা যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে।)
মুগ্ধাঃ হুহ!

রেহানঃ তোমার ভালোর জন্যই এসব করেছি।
মুগ্ধা রাগী চোখে তাকায় রেহানের দিকে।
কিন্তু কিছু বলল না।

রেহানঃ আচ্ছা সবাই ভিতরে চলো।
দুপুরের খাবার আজ একসাথেই খাবো।

রাইয়ানঃ হুম একসাথেই খাবো। আমারো খুব খিদে লেগেছে।
কথাটা বলে মুগ্ধার দিকে তাকায়।
আর মুগ্ধা ভেংচি দেয়।

রেহান আগে আগে চলতে থাকলো।
তার পিছনে মুগ্ধা আর রাইয়ান।
মুগ্ধা রাগী গলায় বললো,

মুগ্ধাঃ আপনি না খাবেন না বললেন? তাহলে এখন?
মুগ্ধার কথা শুনে রাইয়ান মুচকি হেসে বলে।
রাইয়ানঃ তখন তো ভিতরে ভয় ছিলো।

তুমি আমায় যদি ফিরিয়ে দাও।
তাই না করেছিলাম।
কিন্তু তুমি তো হ্যাঁ বললা।

তাই এখন ভয় কেটে গেছে। তাই খাবারো খাবো।
মুগ্ধা আস্তে আস্তে কথাটা বললো,
মুগ্ধাঃ তাহলে আমার না করা উচিত ছিলো।

তারপর ফোনে হ্যাঁ বলতাম।
অন্তত আমার বাসার কিছু খাবার বেঁচে যেতো।
মুগ্ধা রেগে বললো,

মুগ্ধার কথা শুনে রাইয়ান বেয়াক্কেল হয়ে যায়।
মাইয়া বলে কি?
রাইয়ান কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়।

মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ হ্যাঁ বলেছি, তাই বলে ভেবে নিবেন না যে, আমি আপনাকে ভালোবাসি।
আমি অন্য একজনকে অনুসরণ করবো আপনাকে ভালোবাসতে, যদি আপনার ভাগ্য ভালো হয়, তাহলে ভালোবাসা পেয়ে যেতে পারেন।

রাইয়ান অবাক হয়ে বলে।
রাইয়ানঃ অন্য একজন মানে?

মুগ্ধাঃ আস্তে আস্তে বলবো সব।
কথাটা বলে মুগ্ধা বাসার ভিতরে ঢুকে যায়।
রাইয়ান কিছুই বুঝেনি মুগ্ধার কথা।
তার ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দিলো। এই সামান্য কথায়।

রাইয়ানও বাসার ভিতর ঢুকে।
মুগ্ধা রান্না ঘরে যায় খাবার এনে সাজাতে।
আর রাইয়ান গিয়ে সোফায় বসে।
রেহান যায় তার মায়ের সাথে দেখা করতে।

এইদিকে
তোহফা যখন আসতে যাচ্ছিলো।
তখন নিতিন পিছন থেকে ডাক দেয়।
আর তোহফাকে দাঁড়াতে বলে।

তোহফাঃ জ্বি বলেন?
নিতিন কি বলার জন্য ডাক দেয় তোহফাকে, সে নিজেও জানেনা।
তারপরেও বললো,
নিতিনঃ আপনার নামটা কি জানতে পারি?

প্রশ্নটা শুনে নিতিনের দিকে তাকায় তোহফা।
আর সাথে সাথে হেসে দেয় তোহফা।
অনেক কষ্টে তোহফা নিজের হাসি থামায়।
নিতিনের দিকে তাকাতেই, সেদিনের আইসক্রিম আর চকলেট কিনার কথা মনে হয় তোহফার।

তোহফা বললো,
তোহফাঃ আমার নাম তাহসিন তোহফা।
আপনার নাম কি?
নিতিন তোহফার হাসির কারণটা বুঝলো না।
নিতিনঃ নিতিন আহমেদ।
দু’জন আবার চুপ।

তোহফা চলে আসতে নিলে।
নিতিন পিছন থেকে আবার বলে।
নিতিনঃ আপনি হাসছেন কেন?
তোহফা প্রশ্নটা শুনে পিছনে তাকিয়ে।
তোহফাঃ এমনিই।

নিতিনঃ রাইয়ান ভাইয়ার কি হন?
তোহফাঃ বোন হই।
নিতিনঃ ওও,
নিতিনের মন চাচ্ছে, এখনি তার মনের কথা বলে দিতে।
কিন্তু ভয় হয়।
যদি থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দেয়।

আবার মেয়েটাকে দেখতে বড় মনে হচ্ছে।
কার প্রেমে পড়লাম।
শেষ পর্যন্ত কি-না সিনিয়র মেয়ের প্রেমে পড়লাম।
নিতিন নিজে নিজেই ভাবছে।

তোহফাঃ আর কিছু বলবেন আমায়?
তোহফা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নিতিন কিছু বলছে না।
শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছে।
নিতিন প্রশ্নটা শুনে বললো,

নিতিনঃ বলতে চাইলে তো আর শেষ হবেনা কথা।
একটু আস্তে আস্তে বলল।
তোহফা সব কথার মানে বুঝেনি।
তাই বললো,

তোহফাঃ কি বললেন?
নিতিন আর কিছু না বলে।
নিতিনঃ মুগ্ধা মনে হয় আমাদের ডাকছে। চলেন যাই।
তোহফা ভালোই বুঝলো নিতিন কিছু লোকাচ্ছে।

তোহফা আর কিছু না বলে বাসার ভিতরে আসলো নিতিনের পিছন পিছন।
রাইয়ান সোফায় বসে বসে মুগ্ধার খাবার সাজানো দেখছিলো।
আর মুগ্ধা লজ্জায় মাথা নিচু করে খাবার গুলো। রান্না ঘর থেকে এনে টেবিলে সাজাচ্ছিলো।
রাইয়ান তোহফাকে দেখতে না পেয়ে, মনে মনে খুঁজছিলো।

তোহফা যখন নিতিনের পিছন পিছন আসে৷
তখন রাইয়ান মুচকি হাসে।
তোহফা এসে রাইয়ানের পাশে বসে।

আর নিতিন চলে যায় উপরে।
রাইয়ানঃ কি গো, কিছু হলো না-কি?
রাইয়ান এর প্রশ্ন শুনে তোহফা রাগী চোখে তাকায় রাইয়ান এর দিকে।
আর বলে।
তোহফাঃ কি বলতে চাচ্ছো ভাইয়া?
রাগ নিয়েই বললো,

রাইয়ানঃ মানে এই আরকি, দু’জনের দোকানে দেখা হলো।
এখন আবার এই বাসায়। আবার এতক্ষণ বাগানে কথা বলা।
মুচকি হাসলো রাইয়ান।
তোহফাঃ ভাইয়ায়ায়ায়া!
রাইয়ান চুপ হয়ে যায়।

মুগ্ধাঃ আপনারা হাত মুখ ধুয়ে আসেন।
আমি ভাইয়াদের নিয়ে আসি।
কথাটা বলে মুগ্ধা উপরে চলে যায়।

তোহফাঃ ভাইয়া তোমাকে আপনি করে ডাকলো ভাবি?
রাইয়ানঃ পাগলী বোন আমার, প্রথম বার কি তুমি ডাকবে?
তোহফাঃ তোমাদের সম্পর্ক তো হলো। তাহলে ডাকতেই পারে।
রাইয়ান তোহফার বাচ্চামো কথা বলা দেখে হাসে।

রাইয়ানঃ আসো হাতমুখ
ধুয়ে আসি।
আর তুমি এখনো বোরখা খুলোনি কেন?

তোহফাঃ এমনিই।
তারপর দুজন মিলে হাতমুখ ধুয়ে এসে আবার সোফায় বসে।
মুগ্ধা গিয়ে রেহান আর নিতিনকে নিয়ে আসে।

রামিছা বেগম এখন খাবেন না।
তিনি ওদের যখন বাগানে দেখেন,তাই নিজের রুমে এসে বই পড়তে বসেন।
এখন এই বই শেষ করে
খাবার খাবেন।

মুগ্ধা আর রেহান অনেক বললো,
কিন্তু আসেন নি।
রামিছা একটু পর আসবেন।

রামিছা বেগম একাকীত্ব এর সাথে গল্পের বইকে সঙ্গী করে নিয়েছেন।
উনার মতে একাকীত্ব এর আসল বন্ধু হলো বই।
সবাই খাবার এর টেবিলে বসলো।
মুগ্ধা, তোহফা, আর রেহান এক পাশে। আর রাইয়ান আর নিতিন একপাশে।
মুগ্ধা প্রথম সবাইকে খাবার প্লেটে দিয়ে দেয়।

খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে রেহান বললো,
রেহানঃ ভাইয়া উনাকে তেমন চিনলাম না?
তোহফার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন্যা করলো।

রাইয়ানঃ আমার বোন তাহসিন তোহফা।
তোমাকে বলতে ভুলেই গেছিলাম।
তোহফা রেহান এর দিকে তাকায়।
রেহানঃ কেমন আছো আপু?

রেহানের মুখে আপু ডাক শুনেই তোহফার ভিতর কেঁপে উঠে।
এই প্রথম কেউ তাকে আপু ডাকে।
মুহূর্তেই তোহফার চোখ ভিজে জায়।
রাইয়ানঃ তোহফা আরে পাগলী ঝাল লেগেছে না-কি?

তোহফা কিছু বললো না।
শুধু রেহান এর দিকে তাকিয়ে আছে।
এই প্রথম কেউ তাকে আপু ডেকেছে।

চোখ থেকে পানি আসবেই তো এটাই স্বাভাবিক।
মুগ্ধাঃ আপু ঝাল লেগেছে না-কি?
তোহফা মুগ্ধার দিকে তাকায়।

মুগ্ধার আপু ডাকায় এতো ভালোবাসা খুঁজে পায় না। রেহানের ডাকে যেটা পেয়েছে।
নিতিন এনে পানি দেয় তোহফাকে। এটা দেখে রাইয়ান মুচকি হাসে।
তোহফা কোনো কিছু না ভেবে পানি খেয়ে নেয়।

মুগ্ধা বলে।
মুগ্ধাঃ আপু পানি খাওয়ার হলে আমাকেই বলতেন?
রাইয়ান একটু শব্দ করেই হেসে দেয়।
তোহফা নিচের দিকে তাকায়।

রেহানঃ ভাইয়া হাসো কেন?
রাইয়ানঃ খাবার খেয়ে নেই, তারপর সব বলবো।
নিতিন ভয় পায়। কি বলবে আবার?

খাবার শেষ করে সবাই সোফায় বসলো।
রাইয়ানঃ আন্টির হাতের রান্না খুব মজার তো?
মুগ্ধা সব কিছু রান্নাঘরে রেখে এসে তাদের সাথে বসে, আর রাইয়ান তখন কথাটা বলে।
রাইয়ান এর কথা শুনে।
রেহান বললো,

রেহানঃ আম্মু তরকারি রান্না করেন নি।
ওইগুলো মুগ্ধা রান্না করেছে।
রেহানের কথা শুনে।
রাইয়ান মুগ্ধার দিকে তাকায়।

মুগ্ধা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে লজ্জায়।
এই মেয়েটা কি সব দিক দিয়েই পরিপূর্ণ? যেমন রূপ তেমন রান্নার হাত।
রাইয়ান তুই বেষ্ট কিছুই পছন্দ করেছিস।

রাইয়ান নিজেকেই বললো,
রাইয়ান কিছু বলতে যাবে। তখন মুগ্ধা বলে।
মুগ্ধাঃ ভাত ছাড়া সব আমিই রান্না করেছি।

রেহান আর নিতিন হেসে দেয়।
তোহফাঃ ভাত রান্না করোনি তুমি?
মুগ্ধাঃ আমি ভাত রান্না করতে পারিনা।

তোহফাঃ ভাইয়া আজকে বাসায় গিয়ে ভাত রান্না শিখে নিবা।
তোহফা হেসে হেসে বললো,
তোহফার হাসিটা অন্য একজন লোকিয়ে লোকিয়ে দেখছে।
তাই সে হাসি থামিয়ে দেয়।

তোহফার কথা শুনে সবাই হেসে দেয়।
আর মুগ্ধা লজ্জা পায়।
রেহান তোহফার দিকে বারবার তাকাচ্ছে।

কেমন জানি লাগছে তোহফাকে তার কাছে।
ঠিক তার মায়ের মতো।
রাইয়ানঃ রেহান এটা কি তোমার বন্ধু?
নিতিনকে উদ্দেশ্য করে।

রেহান মুচকি হেসে বললো,
রেহানঃ আমার বন্ধু হলেও তোমার সব চেয়ে বেশি কাছের।
রাইয়ানঃ মানে?
রেহানঃ মুগ্ধার আপন চাচাতো বড় ভাই। আর তোমার সমন্দিক।
মানে বুঝলে তো কতোটা আপন?

রাইয়ান এতক্ষণ ধরে বসা, আর সে নিতিনের সাথে পরিচয় হলো না।
মুগ্ধা জানে লজ্জা পাবে। তাই রামিছার কাছে চলে যাবে এটা ভেবে উঠতে গেলেই রাইয়ান বলে।
রাইয়ানঃ আমি তো আগেই চিনি নিতিন ভাইয়াকে?
নিতিন এবার লজ্জায় মাথা নিচু করলো।

মুগ্ধাঃ কিভাবে?
রাইয়ানঃ সেদিন দোকানে আমার বোনকে দেখার জন্য, ভাইয়াটা আমার ৩হাজার টাকার আইসক্রিম আর চকলেট কিনে নেয়।
হুহুহু করে হেসে দেয়।

তোহফাঃ ভাইয়ায়ায়া
রাগী গলায় বলল।
মুগ্ধাঃ তার মানে আপনিই সেই জন, যেই জনকে কিছুটা মূহুর্ত দেখার জন্য আমার ভাইয়াটা এতো কিছু কিনে?
তোহফা লজ্জায় মাথা নিচু করে।

এভাবে আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দেয় ওরা।
তারপর মুগ্ধা আর রামিছার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, ওরা চারজন বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়।
তোহফাকে জড়িয়ে ধরে রাখেন রামিছা অনেক্ষণ।

তোহফাকে বিদায় দেওয়ার সময় চোখে পানি ছিলো রামিছার।
এইদিকে তোহফার মনে হচ্ছিলো। সে এই বাসায় অনেক মূল্যবান কিছু রেখে যাচ্ছে।
রেহান আর নিতিনকে ম্যাচে নামিয়ে যায় রাইয়ান আর তোহফা।
রেহান যতক্ষণ গাড়িতে বসা ছিলো।

ততক্ষণ তোহফার সাথে কথা বলেছে।
মনে হচ্ছিলো তোহফা তার আপন কেউ।
দুজনেরি অজানা কেন এতো মায়া দুজনের মধ্যে।
রাইয়ান আর নিতিন সব ফলো করে।

কিন্তু নিতিন কিছু বলেনি।
নিতিন জানে রেহান, যেকোনো মেয়েকেই আপু ডাকে। আর আপন ভাবে।
মুগ্ধা নিজের রুমে বসে আছে।
বাহিরে খুব অন্ধকার।

আর অনেক ঠাণ্ডা।
রাতের খাবার খেয়ে নিজের রুমে যায় মুগ্ধা, আর রুমের জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়, বাহিরের অন্ধকার দেখার জন্য।

জানালার গ্লাস খোলার সাহস হয় নি ঠাণ্ডার জন্য।
মুগ্ধা বাহিরের ব্যস্থ ধুলো ভরা শহরের দিকে তাকিয়ে আছে আপন নয়নে।
আর আজকের দিনের মূহুর্তের কথা ভাবছে।
সে কি নিজের সঙ্গী খুঁজতে কোনো ভুল করেনি?

মুগ্ধার একটা কথা মনে হয়। যে কথা তার আম্মা বলেছিলেন।
জেনিফা প্রায় অনেক সময় বলতেন।
জীবনের প্রথম প্রেমটা হয় ভুল মানুষের সাথে।

মুগ্ধা কথাটা মনে হতেই, তার ভিতর কেঁপে উঠে।
কারণ তার আম্মা জেনিফাও যে তার বয়সে ভুল মানুষকে খুঁজে নিয়েছিলেন।
যে কিনা জেনিফার ভালোবাসা নিয়ে মিথ্যে অভিনয় করেছিলো।
আর সেই মানুষটি না-কি শহরের।

মুগ্ধার বুকটা কেঁপে উঠে।
যদি তার মায়ের মতো তার সাথেও রাইয়ান মিথ্যে অভিনয় করে।
আম্মা তো আমার আব্বার মতো ভালো একজনকে পেয়েছেন।
কিন্তু আমি?

মুগ্ধা এসব ভাবতেই ঘেমে যায়।
এই ঠাণ্ডার মধ্যেও মুগ্ধার শরীর ঘেমেছে।
মুগ্ধা আর কিছু না ভেবে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়।
মনেমনে রাগ হয় তার।

রাইয়ান একটা ফোনও দিলো না।
এই কি তার ভালোবাসা?
রামিছা আজকের সব বলেন জাফরুল্লাহকে।
জাফরুল্লাহ সব শুনে বলেন।

জাফরুল্লাহ: মেয়েটাকে আমি দেখতে পারলাম না।
মন খারাপ করেন জাফরুল্লাহ।
রামিছা জাফরুল্লাহ এর কাঁধে হাত রেখে বলেন।

রামিছাঃ আসবে আমাদের বাসায় মেয়েটা। খুব মিষ্টি দেখতে। মনে হয়েছিলো
আমার হারিয়ে যাওয়া নূপুর।
কথাটা বলে কেঁদে দেন রামিছা।
জাফরুল্লাহ রামিছাকে জড়িয়ে ধরেন আর বলেন।

জাফরুল্লাহ: অতীত মনে রেখে কি লাভ? শুধুই কষ্ট হবে।
আর এসব যদি রেহান শুনে কখনো। তাহলে রেহানের অবস্থা কি হবে জানো?
রামিছা নিজের চোখ এর পানি মুছে নেন।

আর হেসে বলেন।
রামিছাঃ মুগ্ধা আর ওই রাইয়ান ছেলেটার সব হয়ে গেছে।
জাফরুল্লাহ: সত্যি!

রামিছাঃ হুম, রেহান পেরেছে।
এখন শুধু ওদের বিয়ে দেওয়া বাকি।
দুজন হাসলেন।

মুগ্ধা ছাড়া সবাই রেহানের সাথে জড়িত।
মুগ্ধাকে তো বিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
তাহলে সঠিক মানুষকে খুঁজা তো রেহান বা নিতিনের কর্তব্য।
তারা সেটাই করে।

এভাবেই কেটে যায় কয়েকটা দিন।
মুগ্ধা আর রাইয়ান এর ভালোবাসার সম্পর্কটা বেশ ভালোই চলতেছে।
আর অন্য দিকে নিতিন তোহফাকে আর দেখতে না পেয়ে খুব মন খারাপ করে আছে এই কয়টা দিন ধরে।

রেহান আজ এক জায়গায় যাচ্ছে।
নিতিন বা মুগ্ধাকে কিছুই বলেনি।
রেহান সারপ্রাইজ দিবে নিতিন আর মুগ্ধাকে।

মুগ্ধা আজ থেকেই শুরু করবে ভালোবাসার প্রথম ধাপ।
কারণ সে এই কয়দিনে কিছুটা ভালোবেসে ফেলছে রাইয়ান কে।
রাইয়ান এর ভালোবাসার কাছে নিজেকে হার মানিয়েছে মুগ্ধা।

তাই সে আজ তার নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ভাবনা গুলো রাইয়ানকে বলবে।
এই পর্যন্ত রাইয়ানকে কখনো মুগ্ধা আগে ফোন দেয়নি।
রাইয়ান দেয় সব সময়।
রাইয়ানের সাথে সম্পর্ক হওয়ায় সে তোহফা আর মণিমার মতো দুজনকে পায়।
রাইয়ান এর চেয়ে বেশি ওদের সাথে কথা বলে মুগ্ধা।

তোহফার সম্পর্কে কিছুই জানেনা মুগ্ধা। রাইয়ান বলেছে তোহফাকে তার আসল পরিচয় কাউকে না দিতে।
মুগ্ধা সকাল থেকে অপেক্ষা করছে রাইয়ানের ফোনের জন্য।
আজ সে তার মনের কথা বলবে রাইয়ানকে।

কিন্তু রাইয়ান ফোন দিচ্ছেনা আজ।
মুগ্ধা অপেক্ষা করতে করতে নিজেই ফোন দিলো।
প্রথম বার ফোন রিং হয়ে কেটে যায়।

তারপর আবার দেয়। এবারো ফোন কেটে যায়।
মুগ্ধার রাগ হয়, সকাল ১১টা বাজে। না ফোন দিচ্ছে, আর না ফোন ধরছে।
মনে মনে বকা দেয় মুগ্ধা।
কিছুক্ষণ পর মুগ্ধার ফোন বেজে উঠে।

রাইয়ান ফোন দিয়েছে।
মুগ্ধা ভেবে নেয়। ফোন ধরেই রাইয়ানকে কিছু বকা দিবে। তারপর সে তার মনের কথা বলবে।

পার্ট: ১৫

মুগ্ধা ফোনের স্কিনে তাকিয়ে দেখলো,
রাইয়ান ফোন দিয়েছে।
মুগ্ধা ভেবে নিলো।

প্রথমে বকা দিবে, তারপর মনের কথা গুলো বলবে।
এইদিকে রাইয়ান ভয়ে ভয়ে আছে। এই প্রথম মুগ্ধা থাকে ফোন দিলো, কিন্তু সে ফোন ধরতে পারেনি। নিশ্চিত বকা খাবে।

মুগ্ধা ফোন ধরে,
মুগ্ধাঃ কোথায় ছিলে? কয়টা ফোন দিয়েছি?
খুব রেগে আছে মুগ্ধা।
রাইয়ানকে মুগ্ধা আপনি করেই ডাকতো।

কিন্তু সেদিন রাইয়ানের ধমক খেয়েই তুমি ডাক শুরু করে। রাইয়ানের রাগ সম্পর্কে মুগ্ধার কোনো জ্ঞান ছিলোনা।
রাইয়ান ভয়ে ভয়ে বললো,
রাইয়ানঃ গোসল করছিলাম।
তাই ফোন ধরতে পারিনি।

নরম গলায় বললো কথাটা।
রাইয়ানের গোসলের কথা শুনে মুগ্ধার আরো রাগ হয়।
মুগ্ধাঃ ওই! তোমাকে কে বলছে এতো সকাল গোসল করার জন্য? তাও এতো ঠাণ্ডার মধ্যে?
মুগ্ধার রাগ দেখে কি সত্যটা বলবে রাইয়ান।

কিন্তু যে রাইয়ানের লজ্জা করছে।
তারপর রাইয়ান বলে।
রাইয়ানঃ সমস্যা ছিলো, তাই গোসল করতে হয়েছে।
এতো রাগছো কেন?

মুগ্ধাঃ কি সমস্যা? শুনি আমি? যে এতো সকাল গোসল করতে হয়।
রাইয়ানঃ আম বলতে পারবো না।
নাশতা করেছো?

মুগ্ধা কোনো কথা লোকানো ভালো পায় না।
তাই চিল্লিয়ে বলে।
মুগ্ধাঃ বলবেনা তো? আমি ফোন রেখে দিচ্ছি! ভাবছিলাম কিছু ভাল কথা বলবো তোমার সাথে।

কিন্তু তুমি প্রথমে আমার ফোন ধরো নি।
এখন আবার কথা লোকাচ্ছ?
রাইয়ান হুহু করে হেসে দেয়।

রাইয়ান এর হাসি শুনে মুগ্ধার আরো রাগ হয়।
আর বলে।
মুগ্ধাঃ হাসছো তুমি?
আর কথাই বলবো না।

রাইয়ান তাড়াতাড়ি করে বললো,
রাইয়ানঃ এই না না রাগ করে না সোনা।
মুগ্ধাঃ তাহলে বলো, কেন এই শীতে এতো সকাল গোসল করেছো?
দুপুরে করলে কি হতো?

মন খারাপ করে বলে মুগ্ধা।
রাইয়ান আবারো মুচকি হাসে, শব্দ করে হাসেনি, মুগ্ধা রেগে যাবে তাই।
তারপরেও মুগ্ধাকে বললো,
রাইয়ানঃ শুনে লজ্জা পাবে না তো?

মুগ্ধাঃ তুমি যেহেতু আমায় ভালোবাসো। তাই তোমার সব কথা জানা আমার কর্তব্য। আর সেটা লজ্জার কথা হলেও আমি শুনবো।
যাকে জীবন সঙ্গী বানাবো, তার কথা শুনতে যদি আমি ললজ্জাবোধ করি? তাহলে সেই ভালবাসায় পূর্ণতা কখনো আসবে না।

একটা সম্পর্কে লজ্জা থাকতে নেই। একে ওপরের সাথে সব ভাগাভাগি করে নেওয়ার নাম’ই ভালোবাসা।
মুগ্ধা খুব সাধারণ ভাবেই কথাটা বললো,
রাইয়ান আজ অবাক হয়।

আজ মুগ্ধাকে অন্য ধরণের মনে হচ্ছে। তাহলে কি মুগ্ধাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করলো?
রাইয়ানের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
রাইয়ানঃ হুম, লজ্জা থাকতে নেই একটা সম্পর্কে। কারণ লজ্জা থাকলে ভালোবাসা প্রকাশ পায় না।

কারণ দু’ জনের মধ্যে একজনের যদি লজ্জা থাকে, তাহলে ভালোবাসাটা অপূর্ণ থাকবে।
মুগ্ধাঃ এটা যদি জেনে থাকো? তাহলে আমায় বলছো না কেন? এই ঠাণ্ডার সকালে গোসল করেছো?
রাইয়ান এর মনে মনে রাগ হয়। এই মেয়ে হার মানার না।
যেটা বলে সেটাই করে।

এইজন্য এতো ছোট মেয়ের সাথে প্রেম ভালোবাসা করতে নেই।
কিন্তু নির্লজ্জ মন সুন্দর
রমণী দেখলেই প্রেমে পড়ে যায়।
রাইয়ানঃ ইয়ে মানে রাতে আমার হয়েছিলো?
মুগ্ধা অবাক হয়ে বলে।

মুগ্ধাঃ কি হয়েছিলো?
রাইয়ান নিজের রাগকে সংযত রাখে।
আর বলে,
রাইয়ানঃ আমার রাতে স্বপ্নদোষ হয়েছিলো।

আর গোসল না করে তো নামাজ পড়তে পারবোনা। তাই এই ঠাণ্ডার সকালেই গোসল করলাম
এই স্বপ্নদোষ ছেলেদের জন্য খুব খারাপ সমস্যা, এই কঠিণ ঠাণ্ডার মধ্যেও সপ্তাহে নিজের অনিচ্ছাকৃতভাবেও ৩-৪ দিন গোসল করিয়ে দেয়।

(রাইয়ান লজ্জাকে মাটি চাপা দিয়ে, সব বলেই দিলো।
কারণ, মুগ্ধাকে না বললেও, মুগ্ধা রাগ করে বসে থাকবে।)
মুগ্ধা কথাটা শুনে কিছুটা লজ্জা পায়। সে ভাবছিলো অন্য কিছু। তাই এতো জোর করেছিলো।
কিন্তু তার মনেই ছিলোনা। ছেলেদের একটা কঠিন দোষ আছে, যার নাম স্বপ্নদোষ।
মুগ্ধা নীরব থাকে। মুগ্ধা কি বলবে?
সে যে লজ্জায় মরে যাচ্ছে।

রাইয়ান মুগ্ধাকে চুপ থাকতে দেখে বললো,
রাইয়ানঃ বলছিলাম লজ্জা পাবে। তারপরেও জোর করলে আমায় এসব বলার জন্য।
রাইয়ানের এই কথায়ও আরো লজ্জা পায় মুগ্ধা।
আমি এতো লজ্জা পাচ্ছি কেন?
আমাকে লজ্জা পেলে চলবেনা।

আমি মেয়ে বলেই কি লজ্জা পেতে হবে?
কার কাছে লজ্জা পাচ্ছি? যে আমার ভালোবাসা?
(মুগ্ধা নিজেকেই প্রশ্ন করলো।

এই কথা গুলো ভাবতেই মুগ্ধার লজ্জা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়।)
মুগ্ধাঃ কে বললো আমি লজ্জা পেয়েছি?
রাইয়ানঃ তাহলে এসব শুনে চুপ থাকলে কেন?
মুগ্ধাঃ একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।
আর আমি লজ্জা পাইনি।

রাইয়ানঃ মেয়েটা এমন কেন? ( মনে মনে বলল)
লজ্জা না পেলেই হলো। আমি নিজেই লজ্জা পেলাম।
মুগ্ধা হাসলো। আর বললো,
মুগ্ধাঃ আমি একটা পরামর্শ দেই?

যদি কাজে আসে তাহলে হয়তো তোমার আর ওই দোষ হবেনা।
আবারো হুহু করে হেসে উঠে মুগ্ধা।
রাইয়ান এবার লজ্জা পেলো।
সে চায় এটা এড়িয়ে চলতে। কিন্তু মুগ্ধা বারবার এটাই করছে।

আমার বউটা কি কিছুটা লুচু? (রাইয়ান রাগছে আর ভাবছে)
রাইয়ানকে চুপ থাকতে দেখে মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ কি গো বলবো কি?
রাইয়ান ধমক দিতে গিয়েও ধমক দেয় নি।

রাইয়ানঃ বলো কি বলবা?
মুগ্ধা লজ্জাকে ভয় না পেয়ে বললো,
মুগ্ধাঃ আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম।

তখন আমাদের সমাজ বিজ্ঞান এর স্যার আমাদের কিছু শিক্ষামূলক কথা বলেছিলেন।
তোমরা তো এখন যৌবনে পা দিয়েছো।
তোমাদের কিছু জিনিস মেনে চলতে হবে।

তার মধ্যে প্রথম হলো,
নিজের আবেগকে প্রাধান্য দিবে না।
এই বয়সে তোমাদের সব চেয়ে বড় শত্রু হলো আবেগ। এই বয়সে তোমরা যতোটা ভালো কাজ করবে, তার চেয়ে বেশি খারাপ কাজ করবে শুধু আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে।

আর আমি চাইনা আমার কোনো ছাত্র বা ছাত্রী এমন কোনো খারাপ কাজ করুক।
স্যার এর কথা আমরা খুব মন দিয়ে শুনছিলাম।
তারপর স্যার এমন একটা কথা বলেন। যেটা শুনে ক্লাসে থাকা আমর ৪৭ বা ৫০ জন ছেলেমেয়ে ছিলাম।

সবাই লজ্জা পেয়ে যাই।
স্যার যা বলেছিলেন।
তোমাদের এখন এমন একটা কথা বলবো। যেটা শুনে তোমরা লজ্জা পাবে। কিন্তু এটা তোমাদের জানা কর্তব্য।

তারপর বলেন।
আমি স্বপ্নদোষ আর মাসিক নিয়ে কথা বলবো।
কথাটা শুনে সবাই লজ্জা পাই।
তখন স্যার বলেন।

লজ্জাকে প্রাধান্য দিয়ো না, কারণ এসব সম্পর্কে তোমাদের জানতে হবে।
স্বপ্নদোষ ছেলেদের বেশি হয়। আর তোমাদের এখন থেকে সেটা হচ্ছে বা হবে, মেয়েদেরো মাঝেমধ্যে স্বপ্নদোষ হয়। তবে ছেলেদের তুলনায় খুব কম।
আমি যেটা বলতে চাই।

ছেলেরা তোমরা স্বপ্নদোষকে ভয় পেয়ো না।
এটা তেমন কিছুই না।
এই বয়সে হবেই।

তোমরা এটা থেকে বাঁচতে পারো। এটার মাধ্যমে।
–ঘুমানোর আগে ভালো ভাবে প*** করে আসবে।

কারণ প*** এটার জোর না থাকলে সাধারণ ভাবে স্বপ্নদোষ হয়না।
— তারপর ঘুমানোর সময় খারাপ কিছু ভাববে না। এই ধরো যৌন কিছু নিয়ে ভাবা।
তাহলে স্বপ্নদোষ হবেই।

এরকম কয়েকটা কারণ স্যার আমাদের বলেন।
আর বলেন এই কাজ গুলো করলে, স্বপ্নদোষ খুব কম হয়।
আর মাসিক নিয়েও অনেক কথা বলেন।

স্যারের কথাগুলো সত্য ছিলো।
কারণ পরের দিন থেকেই ক্লাসে এসব নিয়ে ছেলেরা কথা বলতো।
যা মেয়েদের কানেও আসতো।
কথা গুলো বলে থামে মুগ্ধা।

রাইয়ান অবাক হয়ে শুধু শুনছিলো।
মেয়েটা পারেও বটে।
কোনো লজ্জা ছাড়াই সব বলে দিলো।

রাইয়ান লজ্জায় মরছিলো এসব শোনার সময়।
রাইয়ানঃ আচ্ছা আমি এখন থেকে এসব মেনে চলবো।

মুগ্ধাঃ হুম, আর কখনো এতো সকাল গোসল করবে না।
রাইয়ানঃ হুম।
(গোসল করলেও তোমায় বলবোনা।)

মুগ্ধাঃ ভাবছিলাম তোমায় কিছুক্ষণ বকবো।
কিন্তু সব সময় ব্যয় হলো।
রাইয়ান মুচকি হাসে।

মুগ্ধাঃ তোমায় কিছু কথা বলবো।
শুনবে তো?
রাইয়ানঃ হুম শুনবো।
বলো?

মুগ্ধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে শুরু করে।
মুগ্ধাঃ জানিনা কিভাবে আমিও তোমায় ভালোবাসতে শুরু করেছি।
জানিনা আমি ভালো কিছু পছন্দ করেছি কি-না?

আমি তোমার ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়ে তোমাকেই ভালবাসতে বাধ্য হয়েছি।
তাই আমার মনের মধ্যে
লুকিয়ে রাখা সব কথা গুলো বলবো।
রাইয়ানঃ হুম বলো। জানো তো? ভালোবাসা কখন সৃষ্টি হয় বুঝা যায় না।

তুমি যাকে ঘৃণা করবে, এক সময় তার প্রতি তোমার অজান্তেই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে যাবে। মানুষ আর গাছ দুটো একে অন্যের পরিপূরক।
মুগ্ধাঃ মানে?
রাইয়ানঃ মানে হলো।

এই দেখো, গাছ আর মানুষ এর মধ্যে অনেক মিল।
গাছ ভালোবেসে তার মধ্যে থাকা পাতাগুলোকে যত্ন করে রাখে।
মানুষ যেভাবে ভালবাসাকে যত্ন করে, ঠিক সেই ভাবে।

গাছে থাকা পাতা গুলো যেমন বাতাস দিলে একসাথে বাতাসের সাথে ভালোবাসা বিনিময় করে।
গাছ তখন চাইলেও চুপ থাকতে পারেনা।
কারণ গাছ যে বাতাসকে ভালোবাসে।

তাই তো বাতাস আসলে গাছও সব উজাড় করে দেয় এক নিয়মে।
ঠিক সেভাবেই একটা মানুষকে যখন অন্য একটা মানুষ ভালোবাসবে৷ এতোই ভালোবাসবে। সে বাধ্য হবে ওই মানুষকে ভালোবাসতে। ঠিক যেভাবে বাতাসের ছোঁয়ায় পাতা গুলো ভালোবাসা বিনিময় করে।

মুগ্ধাঃ আমি গাছ আর বাতাসের ভালোবাসা বুঝিনা।
বাতাস গাছকে ভালোবাসলেও, বাতাস হয় খুব নিষ্ঠুর। এক সময় সে গাছের পাতাকে না, গাছটাকেই ভেঙে দেয়।
এমন ভালোবাসা কখনো আমি চাইনা।

আমি চাই আকাশে থাকা চাঁদ, তারার মতো ভালোবাসা হোক।
যেখানে আকাশ ভালোবেসে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে চাঁদ তারাকে। আমি সেই ভালবাসা চাই।

যে ভালোবাসায় নেই কোনো প্রতারণার গন্ধ। আছে শুধু মায়া, অনুভূতি, হাজারো মিশ্রণ নামক কথার মেলা। যে মিশ্রিত কথায় দু’জন দু’জনকে জানবো।
রাইয়ানঃ হুম, আমার ভালোবাসায় কোনো প্রতারণা এর গন্ধ নেই মুগ্ধা। আমি তোমায় সত্যিই ভালোবাসি।

তুমি যে আমার মোনালিসা।
মুগ্ধাঃ সময় বলেই দিবে, কি আছে তোমার ভালোবাসায়। মোহ না-কি সত্যিকারের ভালবাসা।
রাইয়ানঃ হুম।

কি বলবে বলো?
মুগ্ধাঃ এটা ভেবে আবার রাগ করোনা যে, আমি তোমায় এখনো বিশ্বাস করিনা। আমি তোমায় বিশ্বাস করি, যতটুকু প্রয়োজন।

রাইয়ানঃ আমি জানি, আমার ভালোবাসার বিশ্বাস আছে।
এবার বলো?
মুগ্ধাঃ আমি তোমায় ভালোবাসি, এটা মিথ্যে না। আর এটাও সত্য না, আমি তোমায় পরিপূর্ণ ভাবে ভালোবাসি।

আমি চাই আমি তোমায় আমার মতো করে ভালবাসতে, কিন্তু সেটা অন্য একজনের মতো।
রাইয়ানঃ অন্য একজন মানে?
মুগ্ধাঃ আমি তোমায় ভালোবাসবো আমার বুবুর মতো। আমার বুবু যেভাবে তার ভালোবাসাকে ভালোবাসতো।
রাইয়ানঃ তোমার বুবু মানে?

মুগ্ধাঃ বলছিলাম না, আমি গ্রামের মেয়ে।
গ্রামে আমার মাবাব আছে। নেই শুধু আমার বুবু। যাকে কিছুদিন আগে খুন করেছে এক নরপশু।
রাইয়ানঃ কিহ?

এতোদিন তুমি আমায় এসব বলোনি কেন?
মুগ্ধাঃ আমি চেয়েছিলাম তোমায় আগে ভালোবাসতে শুরু করি। তখন সব বলবো।
রাইয়ান মন খারাপ করে বললো,
রাইয়ানঃ ওও

মুগ্ধাঃ জানো আমার বুবুকে যে খুন করেছে সে শুধু আমার বুবুকেই খুন করেনি।
সে আমার বুবুর ভালোবাসাকেও খুন করেছে।
রাইয়ানঃ কিছুই বুঝতেছিনা আমি?

মুগ্ধাঃ আমার বুবুর মৃত্যুর খবর জানতে পেরে রাহিন ভাইয়াটা খুব কষ্ট পায়।
রাহিন ভাইয়াই বুবুর খুনিকে ধরেছে।
জানো আমি রাহিন ভাইয়ার সাথেই শহরে আসি।
ভাইয়াকে বলেছিলাম।

ভাইয়াটা যেনো নিজের কোনো ক্ষতি না করে।
কিন্তু
মুগ্ধা কান্না করে দেয়।
রাইয়ানঃ কিন্তু কি, তোমার বুবুর জন্য কি সেও আত্মহত্যা করেছিলো।
মুগ্ধাঃ না।
বুবুর মৃত্যুটা ভাইয়া সহ্য করতে পারেনি।

তাই ভাইয়াটা আমায় শহরে নিয়ে আসার দিন রাতেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়।
বলো কি ভালবাসা ছিলো তাদের মধ্যে, একটা সত্যকারের ভালোবাসা ছিলো। যে ভালোবসা এখনো অনেক মানুষকে কাঁদায়।
(মুগ্ধা শব্দ করেই কেঁদে দেয়।

অনেক দিন পর কারো সাথে আবার সে তার বুবু আর রাহিনের কথা বলছে।)
রাইয়ান সব শুনে চুপ হয়ে যায়।
কি বলবে সে। একটা মানুষ এতোটা ভালোবাসতে পারে।

যে ভালোবাসার মানুষের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে নিজেই এই পৃথিবী ত্যাগ করে।
রাইয়ানের চোখজোড়া ভিজে যায় পানিতে।
সে কি পারবে মুগ্ধাকে এভাবে এতোটা ভালবাসতে?
রাইয়ানঃ কান্না করোনা মুগ্ধা।

সত্যিই তোমার বুবু আর ভাইয়াটার ভালোবাসা ছিলো সত্য।
জানিনা আমি পারবো কি-না তোমায় এতোটা ভালোবাসতে। কিন্তু আমি আমার মতো করে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসবো তোমায়।
দেখে নিয়ো মুগ্ধা, আমাদের ভালোবাসাও শক্ত পাথরের মতো হবে।

আমারদের ভালোবাসা হবে আকাশের মতো বিশাল।
ভালোবাসাটা হবে অসীম।
শুধু বিশ্বাস রেখো আমার উপর।
মুগ্ধাঃ হুম।

এখনো কান্না করছে মুগ্ধা।
রাইয়ানঃ মুগ্ধা কান্না করবেনা প্লিজ?
আমি তোমার কান্নাটা সহ্য করতে পারবোনা।

মুগ্ধাঃ হুম।
রাইয়ানঃ এইতো আমার লক্ষী সোনা।
মুগ্ধাঃ কাল থেকে ঠিক দুপুরে আমাদের বাসার সামনে আসবে?

রাইয়ানঃ কেন?
মুগ্ধাঃ বললাম না আমি আমার বুবুর ভালোবাসার পথ অবলম্বন করবো।
আসবে তো?
রাইয়ানঃ হুম।
মুগ্ধাঃ প্রতিদিন দুপুরে আসবে।

কোনো কথা হবেনা আমাদের মধ্যে।
কিছুক্ষণ একে ওপরকে দেখবো।
আর তারপর আবার চলে যাবে।

পারবে তো আমার জন্য এই কষ্টটা করতে?
আদুরে গলায় বললো মুগ্ধা।
রাইয়ান মুচকি হেসে বলে।
রাইয়ানঃ এটাতো আমার সৌভাগ্য।

নিজের ভালবাসাকে প্রতিদিন দেখতে পারবো।
হ্যাঁ আমি পারবো।
এতে আমার কোনো কষ্ট হবে না।
মুগ্ধাঃ হুম, এখন রাখি।

আজ অনেক্ষণ কথা বললাম। জীবনেও এতক্ষণ কথা বলিনি।
রাইয়ানঃ হিহি, ভালোবাসা এমনি যে।
মুগ্ধাঃ হুম, আর কখনো সকালে গোসল করবেনা। আমিও প্রতিদিন গোসল করি।
তবে সেটা দুপুরে।

রাইয়ানঃ হুম তোমার সব কথা আমি মেনে চলবো।
মুগ্ধাঃ রাখি, আল্লাহ হাফিয।
রাইয়ানঃ হুম।
রাইয়ান ফোন কেটে দেয়।

রাইয়ান ফোনটা তার বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়।
সে পেরেছে মুগ্ধাকে তার ভালবাসায় ডুবাতে।
খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিবে মুগ্ধাকে।
মুচকি হাসে রাইয়ান।

দুপুর হয়ে যায়, এখনো রেহান ম্যাচে আসেনি।
নিতিন সেই কবে থেকে অপেক্ষা করছে।

সকালের নাশতা করে বের হয়েছিলো রেহান।কোথায় গিয়েছে সেটাও জানেনা নিতিন।
নিতিন মুগ্ধাকে ফোন দেয়।
মুগ্ধা আর রামিছা দুপুরের খাবার খেয়ে যে যার যার রুমে বসে আছে।
মুগ্ধা ভাবছে রামিছার খাবার সময়ের কথা গুলো।

কি এমন সারপ্রাইজ আছে, যেটা তে সে অনেক খুশি হবে।
এসব ভাবনায় মগ্ন থাকা অবস্থায় মুগ্ধার ফোন বেজে উঠে।
ফোনের স্কিনে নিতিনের নাম দেখে।

একটু পর সে নিজেই ফোন দিতো, নিতিন আর রেহানকে। এই দুজনের সাথে কথা না বললে মুগ্ধার ভালোই লাগেনা।

নিজের ভাই না থাকলে কি হবে, সে তো দুটো ভাই পেয়েছে।
মুগ্ধাঃ কেমন আছো ভাইয়া?
নিতিনঃ ভালো না’রে
মুগ্ধা অস্থির হয়ে পরে।

মুগ্ধাঃ কি হয়েছে ভাইয়া শরীর খারাপ না-কি?
আমায় বলো কি হয়েছে তোমার?
নিতিনঃ রেহান কি বাসায়?

মুগ্ধাঃ না তো ভাইয়া।
কেন রেহান ভাইয়া তোমার সাথে না?
নিতিনঃ না’রে।

সেই যে সকালের নাশতা করে বের হয়েছিলো।
এখনো আসে নি।
খুব ভয় হচ্ছে কোথায় গেলো?

মুগ্ধাও চিন্তিত হয়ে পরে।
মুগ্ধাঃ দুপুরের খাবার খেয়েছো তুমি?

নিতিনঃ রেহানের সাথে খাবার খাবো বলে বসে আছি।
আমি আর ও তো একসাথেই খাই।
বল এখন ওরে ছাড়া কিভাবে খাবার খাই আমি?
মুগ্ধাঃ ভাইয়া খাবার খেয়ে নাও।

নইলে শরীর খারাপ করবে।
আর ভাইয়া হয়তো কোনো কাজে বাহিরে গিয়েছেন। তাই আসছে না।
তুমি খেয়ে নাও।

নিতিনঃ হুম।
নিতিন ফোন রেখে দেয়।
মুগ্ধা ভাবছে কোথায় যেতে পারে। ভাইয়া কোনো বিপদে পরলো না তো।
এসব ভাবছে সে।

নিতিন খাবার খেয়ে ফোন দেয় আবার রেহানকে।
এবার রেহানের ফোনে কল যায়।
নিতিনের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
রেহান ফোন ধরেই বলে।

রেহানঃ তোর চিন্তা কর‍তে হবেনা। আমি একবারে ঠিক আছি।
তুই এখন আমাদের বাসায় যা।
প্রশ্ন করবিনা।
নিতিনঃ কেন যাবো?

আর তুই কোথায়? সেই সকালে গেলি?
রেহানঃ বললাম তো আমি ভালো আছি।
তুই আমাদের বাসায় এখনি যা।
রাখি এখন।

নিতিনঃ হ্যালো!
রেহান ফোন কেটে দেয়।
নিতিন বুঝতে পারছে না কি চলছে রেহানের মনে।

নিতিন আর কোনো কিছু না ভেবে, তৈরি হয়ে নেয় বাসায় যাবার জন্য।
কয়েকদিন হলো মুগ্ধাকেও দেখেনা।
শহরে গাড়িটা ঢুকতেই জেনিফার চোখজোড়া ভিজে যায়।

রমিজ মিয়া জেনিফার হাতটা নিজের হাতে নেন। আর চোখ দিয়ে ইশারা করেন নিজেকে শক্ত থাকতে।
রমিজ মিয়ার তো অজানা নয় জেনিফার অতীত।
বিয়ের সময় জেনিফা সব বলে দিয়েছিলো।

এই সাদা লাল নীল কালো শহরে যে জেনিফার কঠিন অতীত রয়েছে।
আয়েশা চৌধুরীও দেখেন জেনিফা আর রমিজের কাণ্ড।

তিনি আর সেই দিকে না তাকিয়ে গাড়ির গ্লাসের দিকে তাকান।
আজিজুল বসে আছে গাড়ির সামনের ছিঁটে।আর রেহান গাড়ি ড্রাইভ করছে।
রেহান সকালেই পৌঁছে যায় মুগ্ধাদের গ্রামে।

তার স্বপ্ন সে তার বাসায় সুন্দর একটা সুখী পরিবার গড়ে তুলবে।
তাইতো এই কয়দিনে নিতিন আর মুগ্ধার মাবাবাকে বুঝায় রেহান।
অনেক বুঝাবার পর রাজি হয় ওরা চারজন।

আর রাজি না হয়ে কি করবে।
চেয়ারম্যান খলিল মোল্লার অত্যাচার আর সহ্য করতে পারেনা তারা।
রেহানের মুখে মুচকি হাসি।

সে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
জাফরুল্লাহ আর রামিছাও খুব খুশি।
নিজের ছেলের জন্য সব করতে পারে।

জাফরুল্লাহ এর এতো সম্পদ কি হবে।
তাই সব কথাই শুনেন রেহানের।
নিতিন আর মুগ্ধা বাসার ড্রয়িং রুমে বসে আছে।
রামিছাও তাদের সাথে বসে গল্প করছে।

রামিছার মুখে আজ মুচকি হাসি।
কিন্তু কেনো এই হাসিটা। সেটা জানেনা দু’জন।

একটু পরেই বাসার কলিংবেল বেজে উঠে।
মুগ্ধা বলে।

মুগ্ধাঃ আমি দরজা খুলে আসি।
নিতিনঃ না আমি খুলে আসি।
দুজন এভাবে বলতে থাকে কে খুলবে দরজা।
রামিছা দুজনের এই অবস্থা দেখে বলেন।

রামিছাঃ তোরা দুজন গিয়েই দরজা খুল। তাহলেই তো হয়।
মুগ্ধা আর নিতিন রামিছার কথা শুনে একসাথে উঠে দৌড় দেয়।
মুগ্ধা দরজা খুলে অবাক হয়ে যায়।

সাথে সাথে জড়িয়ে ধরে
জেনিফাকে।
সে ভাবেনি দরজার পিছনে কে থাকবে।
মুগ্ধা জেনিফাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়।

এতোদিন পর সে তার আম্মা আব্বাকে দেখতে পারছে।
মনে হচ্ছে তার কলিজাদের ফিরে পেয়েছে।
নিতিনঃ এভাবে দরজায় জড়িয়ে থাকবি নাকি?

মুগ্ধা ছেড়ে দেয়।
তারপর রেহান সহ নিতিনের মাবাবা আর মুগ্ধার মাবাবা ভিতরে নিয়ে আসে।
সবাই এসে ড্রয়িং রুমে বসেন।
রামিছার সাথেও পরিচয় হয়ে যায়।

মুগ্ধা ভাবেনি আজ তার মা বাবাকে দেখবে।
সে চা তৈরি করার জন্য রান্নাঘরে যায়, আর যাবার আগে রেহানের দিকে রাগী চোখে তাকালো।

পার্ট: ১৬

রেহান মুগ্ধার রাগী চাহনি এর কোনো কারণ খুঁজে পেলো না।

ড্রয়িং রুমে বসে সবাই গল্প করছে। আর মুগ্ধা রান্না ঘরে চা তৈরি করছে সবার জন্য।
মুগ্ধা চা তৈরি করে নিয়ে আসলো ড্রয়িংরুমে।
এক এক করে সবাইকে
চা দিলো মুগ্ধা।

জেনিফা চা’য়ের কাপ হাতে নিয়ে মুগ্ধার দিকে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগের চেয়ে আরো দ্বিগুণ সুন্দর হয়েছে।
জেনিফার এভাবে তাকানোটা মুগ্ধার চোখেও পরে।

তাই মুগ্ধা বললো,
মুগ্ধাঃ আম্মা আসার আগে একবারো তো বলতে পারতে?
জেনিফা মেয়ের কথায় মুচকি হাসলেন।
আর বললেন।

জেনিফাঃ অনেক পরিবর্তন হয়েছিস’রে মা।
মুগ্ধা কিছু বললো না।
শুধু তার মাবাবার দিকে তাকালো অবাক নয়নে।
সবাই কিছুক্ষণ গল্প করে।

মুগ্ধা তার মাবাবাকে একটা রুমে নিয়ে যায়। রুমটা ভালোভাবে গুছিয়ে দিয়ে তাদের বিশ্রাম নিতে বলে, তারপর নিতিনের বাবামাকেও একটা রুমে নিয়ে যায়। তাদেরকেও বিশ্রাম নিতে বলে চলে আসে, নিজের রুমে।

মুগ্ধার আজ ঈদ মনে হচ্ছে।
অনেক দিন পর তার মাবাবাকে সে আবার কাছে পেয়েছে।

এর চেয়ে আর কোনো আনন্দ আছে বলে মনে হয় না মুগ্ধার কাছে।
মুগ্ধা রাতের খাবার খেয়ে নিজে নিজেই ভাবছে এসব।
সুন্দর একটা পরিবার হয়েছে।

তিনটা পরিবার একসাথে থাকছে। রাতে খাবার সময় অনেক মজা করে সবাই।
জাফরুল্লাহও খুশি। তিনি নিজের ছেলের সব চাহিদা মিটাতে পারছেন।

শুধু একটা বোন এনে দিতে পারেন নি আল্লাহ এর কাছ থেকে। এই একটা চাহিদা অপূর্ণ রেখেছেন রেহানের জীবনে।
মুগ্ধার ঘুম পাচ্ছে, কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে।
ঘুমানোর আগে রাইয়ান এর সাথে একটু কথা বলবে সে।

রাইয়ান খাবার খেয়ে এসে মুগ্ধাকে ফোন দেয়।
মুগ্ধাঃ আসসালামু আলাইকুম।
রাইয়ানঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম।
কি করছো আমার সোনা পাখিটা?

মুগ্ধাঃ তোমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম।
জানো আজ আমি খুব খুশি।
রাইয়ানঃ খুশির কারণটা কি আমি জানতে পারি?
মুগ্ধাঃ হুম অবশ্যই! আজ আমার আম্মা আব্বা এসেছেন।

অনেক দিন পর আমি আমার পৃথিবীকে নিজের চোখে দেখলাম।
একটু সময় নিজের বাহুদ্বয়ে আবদ্ধ করে রাখলাম।
পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মনে হয়েছিলো আমায়।

রাইয়ানঃ হুম, নিজের প্রিয় মানুষদের কিছুদিনের ব্যবধানে দেখলে, সবার ভালোলাগে, আর সে ভালবাসার মানুষ গুলোও যদি আবার মাবাবা হয়, তাহলে তো আর কথাই নাই।

মুগ্ধাঃ হুম,
রাইয়ানঃ আমার সোনাপাখির ঘুম পাচ্ছে না-কি?
মুগ্ধাঃ হুম অনেক, খুব ঠাণ্ডাও, তাই আজ একটু বেশিই ঘুম পাচ্ছে।
রাইয়ানঃ তাহলে ঘুমাও।

মুগ্ধাঃ হুম।
রাইয়ান ফোন কেটে দেয়।
মুগ্ধা ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।
রাইয়ান ছাঁদে যায়, সত্যিই খুব ঠাণ্ডা।

রাইয়ান সুয়েটারের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে, অন্য হাত দিয়ে সিগারেট টানছে।
দিন রাত মিলে খুব অল্পই খায়।
সিগারেট মুখে দিয়ে টান দিয়ে, মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে, কালো অন্ধকার আকাশের দিকে তাকায়।

কাল দুপুরে সে তার মোনালিসাকে দেখতে পারবে। এর চেয়ে ভালো খবর আর কি হতে পারে।
রাইয়ান অন্ধকার আকাশে তারা গুলো দেখছে, আর ভাবছে মুগ্ধার কথা। কবে সে আপন করে পাবে মুগ্ধাকে।
তার অন্ধকার রাতে আকাশ দেখার সঙ্গী হবে,
রাইয়ান যেন আর অপেক্ষাই করতে পারছেনা।

সিগারেটটা শেষ করে। নিজের রুমে চলে আসে, আর সেও ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।
খুব সকালেই সুমার ঘুম ভেঙে যায়।
রাতে তেমন ঘুম হয়নি তার।

রাত ৩টার পর সে রুমে আসে, সারারাত ছাঁদেই ছিলো।
সুমা একা ছিলো না। পাশে ছিলো রাহুল।
রাহিনের মৃত্যুর পর আজ প্রথম রাহুলকে হাসতে দেখে সুমা।
আজ রাহুলের জন্মদিন ছিলো।

নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্মদিন, সুমা যতটুকু পেরেছে ততটুকু করেছে।
রাত ঠিক ১১:৫৫ তে সুমা জোর করে রাহুলকে ছাঁদে নিয়ে যায়।
রাহুলের মনেই ছিলো না, আজ তার জন্ম দিন।

নিজের ভাইয়ের মৃত্যুতে রাহুল সব ভুলে গেছে, শুধু রাহুল না, রাহুলের পরিবারের সবাই কেমন জানি হয়ে গেছে, এখন আর আশরাফ রাগ দেখান না। আমেনাও আর আগের মতো নেই।
রাহুলকে ছাঁদে নিয়ে যায় সুমা, কোনো কেক না, বা কোনো খাবার না।
কিছুক্ষণ দু’জনকে কাছে পাবার জন্যই সুমার এই আয়োজন।

রাহুল: এই ঠাণ্ডার মধ্যে ছাঁদে কেন আসলে?
সুমা কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রাহুলের দিকে।
তারপর বলে।

–শুভ জন্মদিন রাহুল, শুভ শুভ জন্ম জন্মদিন রাহুল,
সুমার কথা শুনে সাথে সাথেই রাহুলের চোখ দুটো ভিজে যায়।
কখনো রাহিনের আগে কেউ তাকে উইশ করতে পারেনি।

কিন্তু আজ সেই রাহিনটাই পৃথিবীতে নাই।
সুমা: প্লিজ রাহুল আজকে একটু হাসো।

আমি পারছিনা আর দেখতে এসব।
কে চাইবে নিজের ভালোবাসাকে এভাবে দেখতে।
দুইবছর তো আমার থেকে দূরে থাকলে।
কিন্তু আসার পর থেকেও?

রাহুল: কিভাবে ভালো থাকবো?
আমার কলিজাটাই যে এই পৃথিবীতে নাই।

সুমা: তুমি যদি এভাবে মন খারাপ করে থাকো। তাহলে বাকি তিনজনকে কে সামলাবে?
সুমার প্রশ্নে রাহুল চুপ থাকে।
সুমা আর কোনো কথা না বলে, নিজের ঠোঁট দিয়ে রাহুলের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়।
আর বলে।

সুমা: একটু হাসো? আমি আর পারছিনা তোমাদের কষ্ট দেখতে।
কথাটা বলে সুমা নিজেকে রাহুলের বাহুদ্বয়ে আবদ্ধ করে নেয়।

রাহুলকে অনেক কষ্টে হাসাতে সক্ষম হয় সুমা।
সুমা রাতের ভালোলাগার মূহুর্ত গুলো ভাবতে ভাবতেই দাঁত ব্রাশ করে নেয়।
নিজের রুমকে সুন্দর করে গুছিয়ে, রান্না ঘরে যায় সুমা৷ আজ রাহুলের জন্মদিনে ভালো কিছু খাবার রান্না করবে সে।

হয়তো সে নিজেই পারবে চারটা মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।
ভালোবাসা দিয়ে সব জয় করা যায়। সুমা যে এই কথায় অটল বিশ্বাস রাখে।

আর কিছু না ভেবেই কাজ শুরু করে। সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই
সুমাকে সব করতে হবে।
গ্রামের মেয়ে সুমা৷ কাজ খুব তাড়াতাড়ি পারে।

সকাল থেকেই জাফরুল্লাহ এর বাসায় হৈচৈ৷ মৃত বাসা প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
মুগ্ধা আজ কোনো রান্নাই করছেনা।
জেনিফা সকালে উঠেই রান্নার কাজ শুরু করেন।

মুগ্ধা নিজের রুমে বসেই রাইয়ানের সাথে ফোনে কথা বলছে।
আর এইদিকে নিতিন আর রেহান বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে।
জেনিফা কয়েক ধরণের নাশতা তৈরি করেন।
জেনিফা চা তৈরি করছেন।

রামিছা বেগম রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সব দেখছেন।
রামিছার ছোটো হবেন জেনিফা, রামিছা আর আয়েশার বয়স সমান হবে।
রামিছাঃ যেমন মেয়ে ঠিক তেমন মা, গাছ ভালো হলে তো ফল এমনিই ভাল হবে।
(কথা গুলো ভাবতেই রামিছার মুখে হাসি ফুটে উঠে।)

জেনিফা পিছন ফিরে তাকাতেই রামিছাকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে।
জেনিফাঃ আপা কিছু লাগবে আপনার?
রামিছাঃ হ্যাঁ লাগবে,

জেনফিয়া: কি লাগবে?
রামিছাঃ তুমি করে বলা, এই জিনিসটাই লাগবে।
কথাটা বলে হেসে দেন রামিছা।

আর নাশতার প্লেট গুলো পরিষ্কার করতে শুরু করেন।
জেনিফা মুচকি হেসে হুম বলেন।
এর মধ্যে আয়েশাও আসেন রান্না ঘরে।

তিনজন মিলে নাশতা গুলো টেবিলে নিয়ে সাজান।
মুগ্ধা রাইয়ানের সাথে ফোনে কথা বলে নিচে চলে আসে।
সোফায় বসে বসে তিনজনের নাশতা সাজানো দেখছিলো।

রামিছাঃ মুগ্ধা মা যা তো,
গিয়ে ওদের সবাইকে ডেকে আয়, নাশতা করার জন্য।
মুগ্ধা মাথা নাড়িয়ে হুম বুঝায়।

মুগ্ধা প্রথম তার চাচার রুমে যায়। তাদের রুমটা নিচেই।
আজিজুল মিয়া বিছানায় শুয়ে আছেন।
মুগ্ধাঃ চাচা নাশতা করবে আসো?

আজিজুল মিয়া মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে শুয়া থেকে উঠে বসলেন।
আজিজুলঃ তুই যা মা, আমি আসছি।
মুগ্ধা এক এক করে সবাইকে ডেকে আনে।
সবাই নাশতার টেবিলে বসে নাশতা করছেন।

আর গল্পও করছেন।
নানান ধরণের নাশতা দেখে জাফরুল্লাহ বলেন।
জাফরুল্লাহ: এতো নাশতা দেখে তো আমি কনফিউজড।

কোনটা রেখে কোনটা খাই।
বলেই বাপা পিঠা মুখে দেন জাফরুল্লাহ।
সবাই হেসে দেয়।

এভাবে হাসিঠাট্টা করে সবাই নাশতা শেষ করে।
রেহান আর নিতিন বসে আছে ছাঁদে।
দুপুর হয়েছে।

নিতিন আর রেহান গোসল করেছে। তাই ছাঁদে বসে বসে দু’জন রোধ পোহাচ্ছে।
নিতিনঃ ভাই রেহান আমরা কি সিঙ্গেল থাকবো আজীবন?
নিতিনের প্রশ্ন শুনে হাসে রেহান।

রেহানঃ তোর তো ওই আপুটা আছে।
কিন্তু আমি তো আজো কোনো মেয়ের দেখাই পেলাম না।
নিতিন তোহফার কথা মনে করে হালকা মন খারাপ হলো।
মেয়েটা তার বড় আবার

আর দেখাও হয়নি।
কিন্তু সে যে ওই সিনিয়র মিষ্টি মেয়েটাকেই ভালোবেসে ফেলছে।
নিতিনকে কিছু ভাবতে দেখে রেহান বলে।
রেহানঃ শুরু হয়ে গেলো?

রেহানের কথার মানে বুঝতে না পেরে নিতিন জিজ্ঞাস করল।
নিতিনঃ কি শুরু হলো?
রেহানঃ ওই আপুকে নিয়ে ভাবা।

হিহিহিহি করে হেসে উঠে রেহান।
নিতিন মুখে হাসি রেখে,
নিতিনঃ আর কি দেখা হবেনা রে?

পারবোনা কি মেয়েটাকে আমার মনের কথা বলতে?
রেহানঃ অন্যবার দেখা হলেই বলে দিবি।

তোরতো ভাবার মতোও একটা মেয়ে আছে। কিন্তু আমার তো তাও নেই।
নিতিন অট্ট হাসি দিয়ে বলে।

নিতিনঃ কিভাবে হবে, কোনো মেয়ে দেখলেই তো আপু আপু ডাক শুরু করিস।
নিতিনের কথায় যুক্তি আছে। সত্যিই তো আমিসব মেয়েদের আপু আপু ডাকি।
রেহান ভাবে এসব।

রেহান বাসার সামনে থাকা পথে তাকাতেই কাউকে দেখে, যে
তাদের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে।

রেহান মুচকি হেসে বলে।
রেহানঃ নিতিন বাসার সামনে রাস্তায় তাকা তো?
রেহানের কথায় নিতিন তাকায়।

দু’জন জিনিসটা বুঝতে পেরে মুচকি হাসছে।
আর রাস্তায় থাকা ছেলেটার দিকে তাকাচ্ছে।
মুগ্ধা তার রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।
দু’জনের মধ্যে খুব দেখাদেখি হচ্ছে।

রাইয়ান রাস্তায় গাড়িতে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে তার মোনালিসার দিকে।
আর এই দিকে মুগ্ধা।
ওরা নিজেদের চোখে চোখেই ভালোবাসা আদান-প্রদান করছে।
রাইয়ানঃ মেয়েটা এতো সুন্দর কেন?

কালো ড্রেসে মেয়েটাকে আরো সুন্দর লাগছে।
কোনো সাজুগুজু নেই। তারপরেও এতো মায়া।
মুগ্ধা মনে মনেই এসব ভাবছে।
তার চোখের পলক ফেলতে ইচ্ছে করছে না।

একটা চোখের পলক পড়া মানেই একবার মুগ্ধাকে দেখা মিস করা।
মুগ্ধা কালো ড্রেস না কালো কামিজ পড়ে আছে। কিন্তু রাইয়ান ভাবছে কালো ড্রেস।
মুগ্ধার মনে আজ নতুন কোনো অজানা ফিলিংস কাজ করছে।

সে আজ বুঝতে পারছে, তার বুবু কেন এভাবে নীরবে রাহিনের সাথে দেখা করতো।
মুগ্ধা যখন তার বুবুরে এসব জিজ্ঞাস করতো, কেন এভাবে বাড়ির রাস্তা আর বারান্দায় দু’জন বসে নীরবে তাকিয়ে তাকে একে ওপরের দিকে।

তখন তার বুবু বলতো।
কখনো কারো সাথে প্রেম করলে, তুইও এমন করিস। তখন বুঝবি, আমি কেন এমন করতাম।
আজ তার বুবুর উত্তর পেয়ে যাচ্ছে।

সত্যিই এভাবে দেখা করা, নিজের মধ্যে ভালো লাগা কাজ করে।
জেনিফা মুগ্ধার সাথে কথা বলার জন্য তার রুমে আসেন, মুগ্ধাকে রুমে না পেয়ে, বেলকনিতে আসেন।

এসে মুগ্ধার পিছনে দাঁড়ান।
মুগ্ধাকে কিছু বলতে যাবেন। তখনি দেখেন রাস্তায় একটা ছেলে এই বেলকনির দিকে তাকিয়ে আছে।

জেনিফা ভালোই বুঝতে পারেন, মেয়ে তার ঠিক আগের মতো নাই। অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে।
জেনিফা গিয়ে মুগ্ধার পাশে দাঁড়ান।

রাইয়ান মুগ্ধার পাশে কোনো মহিলাকে দেখে, সাথে সাথে গাড়িতে উঠে যায়। আর সে চলে যায়।
মুগ্ধা কিছুই বুঝে নি। রাইয়ান এভাবে হুট করে চলে গেলো কেন?

মুগ্ধা তার পাশে তাকাতেই। ভয়ে চমকে উঠে।
এখন ঠিক বুঝতে পারে কেন রাইয়ান পালিয়েছে এভাবে।
মুগ্ধা কিছু বলতে যাবে তার আগেই জেনিফা বলে উঠেন।

জেনিফাঃ ছেলেটা কে?
মুগ্ধা কিছু বলছে না। নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
জেনিফা আবার বলেন।

জেনিফাঃ ভালোবাসিস ছেলেটিকে?
মুগ্ধা তার মা’য়ের দিকে তাকায়।

সে এটা বুঝতে চাচ্ছে, তার মা কিভাবে বুঝলেন।
মুগ্ধা এবারো চুপ থাকে।

জেনিফা হেসেই বললেন।
জেনিফাঃ সত্য কথা বল, কিছুই বলবোনা আমি।
জেনিফার মুখে হাসি দেখে মুগ্ধা কিছুটা সাহস পায়।
আর বললো,

মুগ্ধাঃ রেহান ভাইয়া আর নিতিন ভাইয়া জানেন।
জেনিফাঃ কি?

মুগ্ধাঃ উনার কথা (রাইয়ান)
জেনিফাঃ তুই ভালোবাসিস কি ছেলেটিকে?
মুগ্ধাঃ হুম।
নিচের দিকে তাকিয়ে বললো,

জেনিফাঃ বিয়ে করবে তোকে?
মুগ্ধা নীরব থাকে। রাইয়ান তো তাকে কখনো বলেনি বিয়ের কথা।
মুগ্ধাকে চুপ থাকতে দেখে আবার বলেন জেনিফা।

জেনিফাঃ কিছু তো বল। ভয় পাচ্ছি কেন আমায়?
মুগ্ধাঃ হ্যাঁ আম্ম আমায় উনি বিয়ে করবে।
মুগ্ধার কথা শুনে হাসেন
জেনিফা। আর বলেন।

জেনিফাঃ আমি তোকে বকবোনা। আমি চাই তুই তোর সঙ্গীকে বুঝ, দেখ, ভালোভাবে চিন।
কিন্তু ভুল কাউকে পছন্দ করবিনা।
মুগ্ধাঃ আম্মা উনি ভালো।
জেনিফাঃ মা’রে মানুষের সব রূপ কি দেখা যায়?

মুগ্ধাঃ না।
জেনিফাঃ আমি না করবো না যে তুই ছেলেটিকে ভালোবাসিস না।
ছেলেটিকে তুই ভালোবাস। কিন্তু অতিরিক্ত কিছুই ঠিক না।

মুগ্ধাঃ আমি জানি আম্মা।
জেনিফাঃ ছেলেটিকে একদিন আসতে বলবি?
মুগ্ধাঃ হুম।

এভাবে কেটে যায় প্রায় দুই মাস।
মুগ্ধা রাইয়ান এর সম্পর্ক আরো গভীর হয়।

এখন জাফরুল্লাহ একা ব্যবসা সামলান না। সাথে রমিজ মিয়াও সামাল দিচ্ছেন।
আর আজিজুল বাসায় থাকেন। কারণ উনি তেমন পড়ালেখা জানেন না।

আজ আবার রেহান আর নিতিন বাসায় আসবে। এই দুই মাসে ওরা একবারো বাসায় আসেনি।
আজ সকাল থেকেই জাফরুল্লাহ এর বাসা উৎসবে মেতে আছে।
মুগ্ধাকে আজ রাইয়ানের পরিবার দেখতে আসবে।

জেনিফার সেদিনের কথা বলার পর, মুগ্ধা রাইয়ানকে সব বলে। তার পরের দিন রাইয়ান, মুগ্ধাদের বাসায় আসে। আর জেনিফার সাথে আলাদা ভাবে কথা বলে। তারপর থেকে দুই ফ্যামিলি জানতো মুগ্ধা আর রাইয়ানের সম্পর্কের কথা।
মুগ্ধাকে শাড়ি পড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে।

রেহান ফোন দিয়ে জেনে নেয় রাইয়ানরা তাদের বাসার কাছেই এসে গেছে।
মুগ্ধাকে উপরের রুমে রেখে, সবাই বসে আছেন ড্রয়িং রুমে। ওদের আসার ওপেক্ষায়।

পার্ট: ১৭

ড্রয়িং রুমে বসে আছে রাইয়ানের ফ্যামিলি।

রাইয়ানের ফ্যামিলি বলতে তার বাবা ভাই ভাবি আর তোহফা আর সে নিজেই।
এই তার ফ্যামিলি।
সবাই নাশতা করে নেয়।

এখন বিয়ের দিন ঠিক করার সময়।
তার আগে মেরহাব রহমান বলেন।
মেরহাব: আগে বউমাকে দেখে নেই।

মেরহাবের সাথে মণিমাও বললো মুগ্ধাকে দেখার জন্য।
মণিমার মনটা কেমন জানি আনচান আনচান করছে মুগ্ধাকে দেখার জন্য।
রাইয়ানের মুখে মুগ্ধার রূপের বর্ণনা, আর মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধাকে দেখার ইচ্ছা তার কবেই হয়েছে।

মেরহাবের কথা শুনে জেনিফা উঠে যান মুগ্ধাকে নিয়ে আসার জন্য।
মুগ্ধাকে হালকা সাজিয়েছেন জেনিফা। চোখে কাজল আর সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দেওয়াই, এইটুকু সাজ।

জেনিফা মুগ্ধাকে নয়ে আসেন।
মুগ্ধাকে বলেন সবাইকে সালাম দিতে।

মুগ্ধা সবাইকে সালাম দেয়।
মুগ্ধাকে দেখে মেরহাব মাশা’আল্লাহ বলে উঠেন।
ছেলের পছন্দ আছে।

মেরহাব যখন শুনেন রাইয়ান গ্রামের মেয়েকে পছন্দ করেছে। তখনই ভাবেন, মেয়ে দেখতে মাশা’আল্লাহ হবে।
কারণ রাইয়ানের মা’ও যে গ্রামের ছিলেন।

মণিমা অবাক নয়নে তাকিয়ে দেখছে মুগ্ধাকে।
রাইয়ান যা বলেছে মুগ্ধ সম্পর্কে, তার চেয়ে আরো বেশি সুন্দর মুগ্ধা।
মণিমা মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলে।

রাইয়ান যে আল্লাহ এর দেওয়া সব চেয়ে ভালো নেয়ামত পছন্দ করেছে।
মেরহাব: নিয়ে যাও আমার মা’টাকে।
মেরহাবের কথা শুনে, রেহান নিয়ে যায় মুগ্ধাকে।

এইদিকে রাইয়ান মুগ্ধাকে দেখে আবারো নতুন করে প্রেমে পড়ে যায়।
যদি সামান্য কাজলে একটা মেয়েকে সুন্দর দেখায়। তাহলে লিপস্টিক দিলে তো আমায় পাগল করে দিবে তার সুন্দর্যে।

— নারীর আসল সুন্দর্য, তার চোখের কালো কাজল।
প্রতিটা পুরুষকে পাগল করার জন্য নারীর চোখের কাজল যথেষ্ট।
রাইয়ান মুচকি হেসে উঠে, কথাটা ভাবতেই।
পাশ থেকে মাহবুব বলে।

মাহবুব: রাইয়ান তোর পছন্দ মাশা’আল্লাহ।
মাহবুবের কথায় লজ্জা পায়।
জাফরুল্লাহ: মেয়ে কি আপনাদের পছন্দ হয়েছে?

( উনি জানেন এই মেয়েকে পৃথিবীর সব মানুষের পছন্দ হবে। তারপরেও প্রশ্ন করেন।)
মেরহাব: পছন্দ হয়েছে মানে, মন চাচ্ছে আজকেই আমার ছেলের বউ করে নেই।
সবাই হেসে দেয় মেরহাবের কথায়।
রমিজ মিয়া বলেন।

রমিজ: ভাইজান আমার মেয়েটা গ্রামের মেয়ে, শহরে আসছে, বেশিদিন হয়নি।
আ,
রমিজকে কিছু বলতে না দিয়ে।
মেরহাব: এটাই তো বলবেন? মেয়েটা আমাদের ফ্যামিলিতে খাপ খাইয়ে চলতে পারবে কিনা?

শুনেন ভাই, রাইয়ানের মা’ও গ্রামের মেয়ে ছিলেন।
মেরহাবের কথা শুনে রমিজের আর কিছু বলার নেই।
মনে মনে খুশি হন।

মেয়েকে খুব ভালো একটা পরিবারে বিয়ে দিতে পারবেন।
যেখানে মেয়েটা সুখেই থাকবে।

মেরহাব: আমি চাচ্ছি মঙ্গলবারে বিয়েটা হয়ে যাক।
রমিজ: এতো তাড়াতাড়ি। আজ তো শনিবার।
মেরহাব: শুভ কাজ তাড়াতাড়ি হওয়াই ভালো।
জাফরুল্লাহ: তাহলে সামনের শনিবারেই হোক।

এতে দুই ফ্যামিলিই অনেক সময় পাবে। হাতে ৬ দিন পাবেন। আর মেয়ের বিয়েটা তো আর সাধারণ ভাবে দিবোনা। শত-শত মানুষ থাকবে বিয়েতে। তাই শনিবারেই ভাল হবে আমার মনে হয়।

মাহবুব: আঙ্কেল আপনি ঠিক বলছেন।
আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে, আর মেরহাব রহমানের ছেলের বিয়ে, আর ছোট ভাবে তো হবেনা। তাহলে শনিবারেই, আব্বু কি বলো?
মেরহাব: তাহলে এই কথাই থাক।
শনিবারেই হবে বিয়ে।

সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠেন।
মণিমাঃ মুগ্ধাকে আবার নিয়ে আসেন, আংটি পড়াতে হবে তো।
মণিমা কথাটা বলার সময় তোহফাকে পাশে পেলো না। সে ভাবে তোহফা মনে হয় মুগ্ধার কাছে গেছে।

রমিজ: যাও মুগ্ধাকে নিয়ে আসো।
জেনিফা উঠে যান মুগ্ধাকে নিয়ে আসতে।

মুগ্ধার রুমে এসে দেখেন। মুগ্ধা কাপড় খুলে ফেলছে।
জেনিফা রেগে বলেন।
জেনিফাঃ মুগ্ধা মা এটা কি করলি?

জেনিফার রাগী সুরে কথা শুনে মুগ্ধা ভয়ে কেঁপে উঠে।
মুগ্ধাঃ কি করলাম আম্মা।
জেনিফাঃ সত্যিই তুই এখন বড় হইলি না। সে ছোট মুগ্ধাই রয়ে গেলি।
মুগ্ধাঃ কি করলাম বলবে তো?

জেনিফাঃ শাড়ি খুললি কেন?
মুগ্ধাঃ আমার শাড়ি পড়তে ভালো লাগেনা। আর ওরা তো আমায় আর দেখবে না, তাই শাড়ি খুলে নিলাম।

কথাটা বলে মুগ্ধা হেসে দেয়।
জেনিফাঃ তোকে বলছে তারা তোকে আর দেখবে না?
মুগ্ধা মাথা এপাশ ওপাশ করে “না” বললো,

জেনিফাঃ তাহলে?
মুগ্ধাঃ এর আগে তো কেউ এভাবে দেখতে আসেনি। তাই আমি এসব বুঝিনা আম্মা।
আর তুমিওতো আমায় বলোনি।

মুগ্ধার কথা শুনে জেনিফা আর হাসি আটকাতে পারেন নি।
জেনিফাঃ এখন এই কামিজ পড়েই চল আবার সবার সামনে।

হেসেই বলেন।
মুগ্ধাঃ আবার কেন?
জেনিফাঃ তোকে ওরা আংটি পড়াব।

মুগ্ধা জেনিফার কথা শুনে তার হাতটা সামনে আনে।
আর তার হাতে আঙুল গুলো এক এক করে গুণতে থাকে।
মুগ্ধার এমন কাণ্ড দেখে জেনিফা বলেন।
জেনিফাঃ আঙুল গুনছিস কেন?

মুগ্ধাঃ আম্মা ওরা পাঁচজন আমার পাঁচটা আঙুলে পাঁচটা আংটি পড়াবে।
আঙুল গুলো গুনছে আর বলছে।
মেয়ের বাচ্চামো কথা শুনে জেনিফার রাগ আবার হাসি দুটোই হয়।
তারপরেও বলেন।

জেনিফাঃ পাগলী মেয়ে আমার।
গেলেই সব বুঝবি।
আয় তো আগে।

এই বলে উর্ণা দিয়ে মেয়েটাকে আবার সবার সামনে নিয়ে আসেন।
আর বলেন

জেনিফাঃ কেউ কিছু মনে করবেন না। আমার মেয়েটা তো এখনো ছোট। আর এর আগে কখনো শাড়ি পড়ে নি। তাই শাড়ি খুলে ফেলছে। ভাবছিলো আপনাদের সামনে আর আসতে হবেনা।

জেনিফার কথা শুনে রাইয়ান আবার মুগ্ধার দিকে তাকায়।
হলুদ কামিজে মুগ্ধাকে সূর্যমুখী ফুল লাগছে।

রাইয়ান আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে মুগ্ধার দিকে।
মেরহাব: কিছু মনে করার কি আছে, মেয়েকে এই কাপড়েই বেশ লাগছে।
মণিমা আন্টি পড়িয়ে দাও তো।
মণিমা মুগ্ধার হাতে আংটি পড়িয়ে দেয়।

মুগ্ধার হাতটা নরম।
মণিমা মনে মনে হাসে, যেমন সুন্দর, তেমন তুলতুলে।
রাইয়ান মন খারাপ করে মাহবুবকে বলে।

রাইয়ানঃ ভাইয়া আংটি পড়ানোর কথা তো আমার ছিলো।
বিড়বিড় করে বলে।
মাহবুব: আব্বু জানেন সব।
রাইয়ানঃ হু।
জেনিফা মুগ্ধাকে আবার নিয়ে যাচ্ছেন।

মুগ্ধা যাবার আগে একবার রাইয়ানের দিকে তাকায়।
রাইয়ান মায় ভরা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মুগ্ধার পিছন ফিরে তাকানো দেখে মণিমা হেসে দেয়। দু’জন দু’জনকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে।

মেরহাব: এখন তাহলে আমরা উঠি।
জাফিরুল্লাহ: দুপুরের খাবার তো খেয়ে যাবেন আপনারা সবাই।
মেরহাব: এতো নাশতার পর আবার খাবার।
পসিবল না।

জেনিফাঃ অল্প হলেও তো কিছু খেয়ে যান আপনারা।
শুধু নাশতা করে চলে যাওয়াটা কেমন দেখায় তাই না।
মেরহাব আর কিছু বললেন না।
খাবার পূর্বেই টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছিলো।

রেহান তাড়াতাড়ি করে ছাঁদে যায়।
ছাঁদে তোহফা আর নিতিন দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ তাদের খুঁজবার আগেই ডেকে আনে, দু’জনকে।

সবাই খাবার খাচ্ছেন।
খাবারের টেবিলে, জাফরুল্লাহ আর রামিছার চোখ জোড়া দুটো শুধু তোহফাকেই দেখছিলো।
কেন এই মেয়েটাকে তাদের এতো আপন মনে হচ্ছে।
উত্তরটা কে দিবে তাদের?

সেই আসার পর থেকেই রামিছা তোহফাকেই দেখছিলেন।
মাঝে কিছুটা সময় তোহফা ছিলো না।

তোহফাকে দেখলে রামিছার ভিতরে এক অজানা শান্তনা আসে।
রেহান তোহফাকে দেখছিলো। তোহফার সাথে কথা বলেছে।
তোহফাকে আপু ডাকলে তার ভিতর ভরে যায়।
কিন্তু কেন এমন হয় তার।

মনে হচ্ছে তোহফা তার অনেক চেনা জানা কেউ।
রাইয়ানের ফ্যামিলি একটু আগেই বিদায় নিয়েছে।
মুগ্ধা আর নিতিন রেহান তিনজন মিলে খাবার খাচ্ছে।
নিতিন আর রেহান সবাইকে খাবার খাওয়াচ্ছিলো।
তাই তখন খায়নি।

নিতিনকে খুশি খুশি দেখাচ্ছে।
রেহান জানে কেন নিতিনকে খুশি দেখাচ্ছে।
মুগ্ধা নীরবে খাবার খেয়েই তার রুমে চলে যায়।
তোহফা কিভাবে “হ্যাঁ” বলে দিলো সে নিজেই জানেনা।

এতক্ষণ নিতিনের সাথে ফোনে কথা বলছিলো।
তোহফা ফোনটা তার বুকের সাথে মিশিয়ে রেখে হাসছে। তবে শব্দ করে না। মুচকি হাসছে তোহফা।

আর সেই মুহূর্তের কথা ভাবছে।
রেহানদের বাসায় সেও যাবে, কথাটা শুনার পর থেকেই তোহফার অজানা ভালো লাগা কাজ করছিলো।

রেহানদের বাসায় যাওয়ার পর থেকেই হালকা চোখাচোখি হচ্ছিলো নিতিনের সাথে।
এক পর্যায়ে নিতিন কয়েকবার ইশারা করে।

নিতিনের ইশারার মানে বুঝতে পারে, তারপরেও চুপ থাকে সে।
এক পর্যায়ে যখন সবাই কথা বলছিলো।
তখন রেহান এসে কানে কানে বলে।
রেহানঃ আপু একটু ছাঁদে আসবে।

তোহফার ভালো লাগছিলো রেহানের কথাটা শুনে।
তারপরেও চুপ থাকে।
রেহান আবার বলে।

রেহানঃ আপু প্লিজ প্লিজ আসোনা ছাঁদে।
রেহানের আদুরে গলা শুনে। তোহফা উঠে রেহানের পিছন পিছন আসে।
নিতিন আগেই ছাঁদে চলে যায়।

ছাঁদে গিয়ে নিতিনকে দেখতে পায় তোহফা।
তখন রাগী চোখে তাকায় রেহানের দিকে।
রেহান কান ধরে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে তোহফার দিকে।

তোহফা রেহানের তাকানোতেই ডুবে গেছিলো।
তারপর রেহান চলে আসে।
নিতিনঃ আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই।

তোহফা কিছু বলতে গেলেই নিতিন কথাটা বলে।
তোহফাঃ হুম বলেন।
নিতিন তোহফার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে।

নিতিনঃ আই লাভ ইউ
শুধু এইটুকু বলেই থেমে যায় নিতিন।
তোহফা অবাক নয়নে তাকাচ্ছে নিতিনের দিকে।

কিছুক্ষণ দু’জনের মধ্যে নীরবতা।
তারপর তোহফা বলে।
তোহফাঃ আমি আপনার বড় হবো বয়সে?

প্রশ্নটা শুনে নিতিন তোহফার দিকে তাকায়।
নিতিনঃ ভালোবাসা কি আর বয়স দেখে হয়?
তোহফাঃ বয়স কতো আপনার?
নিতিনঃ ২৬

তোহফাঃ আমার ২৮ বছর।
আমি আপনার চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র।
নিতিনঃ মুগ্ধা আর রাইয়ান ভাইয়ার যদি প্রেম হতে পারে।
তাহলে আমার আর আপনার হবে না কেন?

রাইয়ান ভাইয়ার বয়স তো ৩০ ছুঁই ছুঁই।
আর আমার বোন তো ১৯ বছরের।
তোহফা কিছুক্ষণ নীরব হয়ে থাকে আর বলে।
তোহফাঃ সমাজ মানবেনা আমাদের সম্পর্ক।

নিতিনঃ আমি সমাজ ধুয়ে পানি খাইনা। আর খাবোও না।
তাই প্লিজ সত্যিই আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।

এই কয়দিন আপনাকে না দেখতে পেয়ে পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায়।
তোহফাঃ শুধু না দেখতে পেরে পাগল হয়ে গেছেন। তাই ভাবছেন আপনি আমাকে ভালোবাসেন?

নিতিনঃ ভালোবাসতে কোনো কারণ লাগে না।
আর শুধু না দেখতে পেয়ে আরো দ্বিগুণ ভালোবেসে ফেলছি।
প্লিজ একটু ভালোবাসেন?
কথাটা বলে নিতিন কেঁদে দেয়।

তোহফার কেন জানি মনে হলো, চোখের পানি তো আর মিথ্যে না।
কোনো ছেলে যদি। একটা মেয়েকে প্রপোজের সময় রচনা না বলে। নিজের চোখের পানি দেখাতে পারে। সেই ভালোবাসা তো কখনো মিছে হবে না।
তোহফা কথাটা ভাবতেই হাসি ফুটে উঠে তার মুখে।

তার ভালোবাসায় কারো চোখে পানি। সত্যিই মুগ্ধকর সময়।
তোহফা নিজের হাত দিয়ে নিতিনের দু’চোখে আসা পানি গুলো মুছে দেয় আর বলে।
তোহফাঃ ঠকাবে না তো কখনো?

নিতিনঃ যেদিন মনে হবে আমি আপনাকে ভালোবেসে ঠকাচ্ছি। সেদিন যেন আমার মৃত্যু হয়।
তোহফাঃ তাহলে একটা সুযোগ দেওয়া যায়।
নিতিনের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
তোহফা বলে।

তোহফাঃ আমায় তুমি করেই বলো।
ভালোবাসো অথচ আপনি করে বলছো।
নিতিন মুচকি হাসে।

তোহফাঃ আমার কিন্তু কঠিন অতীত আছে।
নিতিনঃ আমি বর্তমান আর ভবিষ্যৎ কে ভালোবাসি।
তোহফাঃ তারপরেও?

নিতিনঃ তুমি যেদিন তোমার অতীত আমায় বলবে সেদিন আমি শুনবো।
এখনো নিতিনের চোখে পানির ঝলক দেখা যাচ্ছে।
এই পানি দুঃখের না।

এই পানি ভালোবাসার, সুখের।
তোহফা কথা গুলো ভাবছে আর মুচকি হাসছে।
তারো ভালোবাসার মানুষ আছে।

বাহিরের পৃথিবী সত্যিই অনেক সুন্দর।
আশ্রমের মতো এতো ভয়াবহ না।
আশ্রমে ভালোবাসা কি, এই শব্দটা সে জানতোই না।

পরেক্ষণেই মনে হয়।
আশ্রমেও তো তাকে কেউ ভালোবাসতো।
তার ক্ষত জায়গায় যত্ন করে ওষুধ লাগিয়ে দিতো।

সেই ভালোবাসাটাই যে তাকে আশ্রমে বাঁচিয়ে রেখেছিলো।
সেই ভালোবাসার মানুষটার নাম যে তানিয়া।
সে কি তানিয়ার ভালোবাসার দাম দিতে পারবেনা।

পারবেনা কি তানিয়াকে আশ্রম থেকে বাহিরের পৃথিবীতে নিয়ে আসতে।
নিজের চোখের পানি মুছে নেয়।
একদিন সেও তানিয়াকে মুক্ত করবে।
আস্তে আস্তে বিয়ের দিন এগুচ্ছে।

আজ রবিবার।
পাঁচদিন পর বিয়ের সানাই বাজবে,
মুগ্ধা আর রাইয়ান এখন ফোনে আরো বেশি কথা বলে।

এইদিকে নিতিন আর তোহফাও।
যদিও নিতিন আর তোহফার কথা রেহান ছাড়া আর কেউ জানেনা।
তোহফা শুধু মণিমাকে বলেছে।

মণিমা খুশি হয়, তোহফা এখন আর আগের মতো মনমরা হয়ে থাকেনা।
কারণ,
ভালোবাসার কাছে কষ্ট কিছুই না।
কষ্টকে ভুলতে ভালোবাসাই যথেষ্ট।

রেহান যাচ্ছে মুগ্ধার বিয়ের কার্ড বানাতে।
মুগ্ধার বিয়ে খুব বড় করেই হবে।
জাফরুল্লাহ তার ভাই মানিককে বলেন মুগ্ধার বিয়ের কথা।
মানিক এর হিংসা হচ্ছে।

অচেনা মেয়ের জন্য এতো ভালোবাসা কেন।
মানিক বললো সে বিয়েত আগের দিন তার ফ্যামিলিকে নিয়ে আসবে।
রেহান বিয়ের কার্ড বানানোর জন্য ওর্ডার দিয়ে আসে।
গাড়িতে উঠে ড্রাইভ করছে রেহান।

মুগ্ধার বিয়ের জন্য ডেকোরেশন এর লোকদের সাথে কথা বলবে।
কাল থেকেই বাসা সাজানোর কাজ শুরু করতে হবে।
রেহান এসব ভাবছিলো।

আর গাড়ি ড্রাইভ করছিলো।
হঠাৎ করেই তিনটা বাইক এসে তার গাড়ির সামনে দাঁড়ায়।
রেহান তাড়াতাড়ি করেই গাড়ি থামায়।
জায়গাটা শহরের মধ্যেই।

কিন্তু এইদিকে গাড়ি খুব কম চলে। সামনে রাস্তার নতুন কাজ হচ্ছে।
তাই ডান পাশের রাস্তা দিয়ে সব গাড়ি চলে।
কিন্তু রেহান এর অজানা ছিলো।

আর অনেক্ষণ ধরেই দেখছিলো এই বাইক গুলো তাকে ফলো করছে।
রেহান গাড়ি থেকে নেমে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বাইক থেকে একজন নেমে তাকে মারতে শুরু করে।

রাস্তার মানুষ গুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।
ওরা ৬জন মিলে রেহানকে অনেক মারে। আর ধারালো ছুরি দিয়ে অনেক জায়গায় আঘাত করে।

রেহান মাটিতে লুটে পরে।
ওরা ভাবছে হয়তো রেহান মরে গেছে।
তাই ওরা বাইকে উঠে পালিয়ে যায়।
ওরা পালিয়ে যাবার পর মানুষ এসে ভিড় জমায়। কিন্তু কেউ রেহানকে হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছে না।

এই রাস্তা দিয়েই আজ সুমা আর রাহুল ঘুরতে বের হয়। সাথে তিশাও ছিলো।
তারাও জানেনা, সামনের রাস্তায় কাজ হচ্ছে, তাই তারা এই রাস্তা দিয়েই আসছিলো।
সামনে অনেক মানুষের ভিড় দেখে, রাহুল, সুমা আর তিশা গাড়ি থেকে নেমে আসে। ওরা ভাবছে হয়তো সামনে কোনো এক্সিডেন্ট হয়েছে।

তাই ওরা ভিড় ঠেলে এগুতে থাকে।
সিয়াম একটা নিরাপদ জায়গায় যায়। তাদের পিছু নেয় নি কেউ।
ফোন দেয় সে তার মামাকে।
ওপাশ থেকে ফোন ধরে।

সিয়াম কিছু বলার আগে তার মামা বলে।
মামা: কিসের জন্য ফোন দিয়েছিস?
সিয়াম: মামা তোমার কাজ হয়ে গেছে।

কথাটা শুনে ফোনের ওপাশের লোকটি তৃপ্তির হাসি দেয়।
সিয়াম আবার বলে।
সিয়াম: মামা কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেছে।
ভয়ে ভয়ে বললো,

মামা: কি সমস্যা।
সিয়াম: আমরা রেহানকে মনেহয় জানে মেরে ফেলছি।
সিয়ামের কথাটা শুনে, লোকটি গর্জে উঠে। আর বলে।

মামা: তোদের কি বলছিলাম? হাত পা ভেঙে জীবনের জন্য বসিয়ে রাখবি। আর তোরা?
সিয়াম: কি করবো আজকে যেগুলো সাথে ছিলো। ওই গুলো ধারালো ছুরি ব্যবহার করেছে৷ মাথায় ভারি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে।
লোকটি আবার গর্জে উঠে।

মামা: দিলিতো আমায় ফাঁসিয়ে। এখন,
সিয়াম: আমার টাকা?
মামা: রাখ তোর টাকা। ফাঁসিয়ে দিয়ে আবার টাকা খুঁজছিস।
লোকটির হাত কাঁপছে।

এখন কি হবে? সত্যিই কি রেহানকে ওরা মেরে দিয়েছে।
ফোন কেটে দেয়।
সিয়াম আবারো ভুল কাজ করলো।

এখন৷ বাঁচার একটা রাস্তাই।
আর সেটা হলো শহর থেকে পালাতে হবে।
এইদিকে ওরা ভিড় ঠেলে গিয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় একটা ছেলেকে দেখতে পায়।
সবাই দেখছে, কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য এগুচ্ছে না।

রাহুল আর সুমা দৌড়ে যায়।
সুমা রক্তাক্ত মুখটা ভালোভাবে দেখে চিৎকার করে বলে উঠে।
সুমা: এতো রেহান।

রাহুল তাড়াতাড়ি গাড়িতে তুলো।
কেঁদে দেয় সুমা, আর সাথে অনেক ভয়ও পায়।

পার্ট: ১৮

সুমার চিৎকার শুনে রাহুল সুমার মুখের দিকে তাকায়।
রাহুল কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলো।
তার আগেই সুমা বলে।

সুমা: রাহুল আগে গাড়িতে তুলো।
অজ্ঞান হয়ে আছে রেহান।
তাড়াতাড়ি হসপিটালে না নিলে বাঁচবে না।

রাহুল আর সুমা এবং তিশা মিলে রেহানকে গাড়িতে তুলে।
রেহানকে গাড়িতে তোলার সময় রাহুল লোকদের অনেক কথা শুনায়।
একটা রক্তাক্ত মানুষকে তারা রাস্তায় দেখেও কিভাবে সাহায্য করলো না।
কোন দেশে বাস করছি আমরা।

রাহুল আরো অনেক কিছু বলে।
রাহুল গাড়ি ড্রাইভ করছে।
আর সুমার কাঁধে রেহান।
তিশার উর্ণা দিয়ে রেহানের মাথা হালকা ভাবে ধরে রাখে।
রক্ত বন্ধ হচ্ছিলো না।

২০ মিনিট এর ভিতরেই রাহুল হসপিটাল পৌঁছে যায়।
কাছেই ছিলো হসপিটাল।
ডক্টররা রেহানকে ইমারজেন্সি রুমে নিয়ে যায়।
বাহিরে বসে আছে ওরা তিনজন।

সুমার চোখে এখনো পানি।
তিশা রক্ত দেখে ভয় পেয়ে আছে।
রাহুল: আরে কান্না করছো কেন?
দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।
সুমা: বাঁচবে তো?

রাহুল: কিভাবে হলো এসব? এতো লোকরা সব দেখছিলো। কিন্তু কেউ সাহায্য করলো না।
রাহুল রেগে আছে।
সুমা কথা বলছে না।

রাহুল: ছেলেটা কে?
সুমা: মুগ্ধার চাচাতো ভাইয়ের ক্লাসমেট।
আর মুগ্ধা এখন রেহানের বাসায় থাকে।
রাহুল: ওও, ওদের কারো নাম্বার আছে?

সুমা ভুলেই গেছিলো।
তার কাছে তো নিতিনের ফোন নাম্বার ছিলো।
সুমা: হুম আছে, নিতিনের নাম্বার আছে।
আমি এক্ষুণি ফোন দিচ্ছি।

রাহুল: হুম।
সুমা ফোনটা বের করে। আর নিতিনের কাছে ফোন দেয়।
নিতিন মাত্র তোহফার সাথে কথা বলে ফোনটা রেখেছে।

এর মধ্যে আবার ফোন বেজে উঠে।
নিতিন ফোনের স্কিনে সুমার নাম দেখে।
নিতিন মনে মনে ভাবে। এতোদিন পর মনে হলো আমার কথা।

নিতিন ফোন রিসিভ করে।
সুমা: হ্যালো নিতিন?
খুব তাড়াহুড়ো করে কথাটা বললো সুমা।

সুমার এমন কণ্ঠ শুনে নিতিন ভয় পেয়ে যায়।
নিতিনঃ কি হয়েছে’রে?
সুমা: রেহান!
নিতিনঃ কি হয়েছে রেহানের?

সুমা: রেহান হয়তো এক্সিডেন্ট করেছে। আমরা রেহানে রক্তাক্ত দেহ রাস্তায় পাই।
আর এখন এই *** হসপিটালে আছি।
সুমার কণ্ঠ নরম হতে আসছিলো কথাটা বলার সময়।
নিতিন কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়।

কি শুনছে এসব।
নিতিনঃ আমি এখনি আসছি।
সুমা: তাড়াতাড়ি আসো।
নিতিন ফোনটা কেটে দেয়।

আর শার্ট আর প্যান্ট পড়ে তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।
ড্রয়িং রুমে রামিছা, আয়েশা, জেনিফা তিনজন মিলে মুগ্ধার বিয়েতে কি করতে হবে না হবে, এসব নিয়ে কথা বলছিলো।

নিতিনকে এভাবে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে যেতে, আয়েশা প্রশ্ন করেন।
আয়েশাঃ কি হয়েছে নিতিন?

নিতিনঃ আম্মা পরে বলবো এখন টাইম নাই।
আন্টি গাড়ি কি নিচে আছে?
রামিছাঃ গাড়ি তো রেহান নিয়ে গেছে।

কি হয়েছে বাবা?
নিতিনঃ পরে বলবো। আমি আসছি এখন।
কথাটা বলেই নিতিন দৌড়ে বের হয়ে যায়।

ওরা নিতিনের এভাবে যাওয়ার মানেটা বুঝতে পারেন নি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নিতিন সুমার দেওয়া ঠিকানায় চলে যায়।

তিন তলায় রয়েছে ওরা।
নিতিন তিন তলায় গিয়ে দেখতে পায়, সুমা দরজার পাশে বসে আছে।
দৌড়ে যায় নিতিন তাদের পাশে।

নিতিনকে দেখে সুমা উঠে দাঁড়ায়।
নিতিনঃ কিভাবে হলো এসব।
রেহান এখন কেমন আছে?

নিতিনের চোখ বেয়ে পানি পরছে।
সুমা: আমরা জানিনা।
,
সুমা নিতিনকে সব বলে।
নিতিন সব শুনে পাথর হয়ে যায়।
সে সাথে থাকলে হয়তো এসব কিছুই হতো না।

নিতিনঃ রেহানের গাড়ি কোথায়?
সুমা: আমরা তো রেহানকে রাস্তায় পেয়েছি।
নিতিনঃ কিহ?

তাহলে এটা এক্সিডেন্ট না।
আবারো ওরে কেউ মারতে চেয়েছে।
নিতিন কথাটা বলে দেয়ালে ঘুসি মারে।

সুমা: কিছুই বুঝতেছি না।
নিতিনঃ সুমা প্লিজ এখানে থাক।

ভাইয়া আমায় ওই জায়গাটায় নিয়ে যেতে পারবে?
(রাহুলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো।)
রাহুল: হ্যাঁ অবশ্যই।

রাহুল আর নিতিন সেই জাহগায় যায়।
রাস্তার ঠিক মাঝখানে এখনো রেহানের গাড়িটা রয়েছে।
এই রাস্তা দিয়ে তো গাড়ি চলছে না।

তাই আর সমস্যা হয় নি।
নিতিন গাড়ি থেকে নামে, আর রাস্তার পাশের দোকানে জিজ্ঞেস করে, সেই সময়ে আসলে ঠিক কি হয়েছিলো।

দোকানের লোকটি ওদের সব বলে। সেই সময়ে আসলে ঠিক কি হয়েছিলো।
সব শুনে নিতিন আর রাহুল নির্বাক হয়ে যায়।
কেন বারবার রেহানের সাথে এমন হয়।
কে শত্রু রেহানের?

রেহান কেন লুকিয়ে রাখলো তার কাছ থেকে।
নিতিনঃ ভাইয়া আপনি আগে যান।

আমি গাড়ি নিয়ে আপনার পিছন পিছন আসছি।
রাহুল: হুম।

নিতিন গাড়ির দরজা খুলে দেখে, এখনো চাবি লাগানো রয়েছে।
নিতিন আর রেহান দুটো গাড়ি পার্ক করে আবার হসপিটালে যায়।
নিতিনঃ সুমা ডক্টর কিছু বলেছে?

সুমা: ডক্টর এখনো ভিতর থেকে বের হয় নি।
মন খারাপ করে বলে।

নিতিন দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রেহানের কি বড় কিছু হলো।

ওদের সামনে পেলে কখনো ছাড়বো না আমি।
নিতিন কথাগুলো ভাবছে। আর চোখ থেকে অনবরত পানি পরছে।
সুমা বা ওদের কারো সাধ্য নেই নিতিনকে বুঝানোর।

তাই ওরা নীরব হয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
একটু পর ডক্টর বের হয়।

নিতিন দৌড়ে যায় ডক্টরের কাছে।
নিতিনঃ কি অবস্থা রেহানের?
ডক্টর: এখনো কিছুই বলা যাচ্ছে না।

পেশেন্ট এর এখনো জ্ঞান আসেনি।
আমরা অক্সিজেন দিয়ে রাখছি।
বাকিটা আল্লাহ এর হাতে।

মাথায় অনেক বড় আঘাত পেয়েছে।
উনার পরিবারের যারা আছেন, তাদেরকে আসতে বলেন।
রোগী হয়তো আর বেশিক্ষণ,
কথাটা বলতে দেয়নি নিতিন।

নিতিনঃ ডক্টর যেভাবেই হোক রেহানকে বাঁচান।
যা লাগে সব দিবো।
প্লিজ ডক্টর।

হাত জোর করে কথাটা বলতে বলতে নিতিন ডক্টরের পা’য়ের কাছে বসে পরে।
ডক্টর নিতিনকে তোলেন। আর বলেন।
ডক্টর: আমরা চেষ্টা করবো।
বাকিটা আল্লাহ্ এর হাতে।

কথাটা বলে ডক্টর চলে যান।
নিতিন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাবেনি কখনো এই দিন দেখতে হবে তাকে।

পিছন থেকে এসে সুমা তার কাঁধে হাত রাখে।
নিতিনের চোখ থেকে ঝর্ণার গতিতে পানি পরছে।

চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছা করছে তার।
সুমা: নিতিন এভাবে কান্না করলে, কিছুই ঠিক হবে না।

শক্ত থাকো।
নিতিন সুমার দিকে তাকায়।

নিতিন পকেট থেকে ফোন বের করে।
আর মুগ্ধার কাছে ফোন দেয়।
মুগ্ধা ফোন ধরে।

নিতিনঃ হ্যালো মুগ্ধা!
নিতিন কান্না করছে। কোনো ভাবেই নিজের কান্নাকে আটকিয়ে রাখতে পারছেনা।
নিতিনের কান্না শুনে মুগ্ধা অস্থির হয়ে যায়।

মুগ্ধাঃ ভাইয়া কি হয়েছে? কান্না করছো কেন? ও ভাইয়া! কথা বলছোনা কেন।
(মুগ্ধা সবার সাথে বসেছিলো। আর তাদের কথা শুনছিলো। তখনি নিতিন ফোন দেয়।)
নিতিন হাজার কষ্টেও কথা বলতে পারলো না।
শুধু কান্নাই কথা রে যাচ্ছে।

নিতিনের কান্নার আওয়াজ শুনছে মুগ্ধা। মুগ্ধা বারবার প্রশ্ন করছে। কিন্তু নিতিন কোনো কথাই বলছে না।
নিতিনের হাত থেকে ফোন নেয় সুমা।
আর বলে।

সুমা: হ্যালো! আমি সুমা বলছি।
ফোনের ওপাশ থেকে কারো কণ্ঠ শুনে মুগ্ধা তাড়াতাড়ি বললো,
মুগ্ধাঃ হ্যাঁ আপু বলো। ভাইয়া এভাবে কান্না করছে কেন?
কি হয়েছে?
সুমা: এই *** হসপিটালে আসো। তাহলেই সব বুঝবে।

মুগ্ধাঃ কি হয়েছে আপু?
সুমা: ফোনে সব বলার সময় নেই।
তাড়াতাড়ি আসো তোমরা।

সুমা ফোন কেটে দেয়।
সুমা: নিতিন এভাবে কান্না করলে কিন্তু তুমিও অসুস্থ হয়ে পরবে। তোমায় ভেঙে পরলে চলবেনা।

সবাইকে তুমিই সামলাতে হবে।
নিতিন সুমার কথা শুনছেই না। সে মেয়েদের মতো কান্না করেই যাচ্ছে।
নিতিনের কান্না দেখে রাহুলের সেদিনের কথা মনে পরে, ঠিক এভাবেই সে তার ভাইয়ের জন্য কান্না করছিলো।

প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় ব্যথিত রাহুলও হয়েছিলো।
মুগ্ধা হ্যালো হ্যালো করে, কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো রেসপন্স আসেনি।
জেনিফাঃ কি হয়েছে মা? কে কান্না করছিলো?

মুগ্ধাঃ জানিনা আম্মা নিতিন ভাইয়া ফোন করে কান্না করছিলো।
আর সুমা আপু বললো হসপিটাল যাওয়ার জন্য।
আয়েশাঃ কি হয়েছে আমার নিতিনের?

মুগ্ধাঃ জানিনা আমি।
রামিছার মনটা কেমন জানি করছে। শরীর কাঁপছে।

তাহলে কি রেহানের কিছু হলো?
কথাটা ভাবতেই, পাগলের মতো আচরণ শুরু করেন রামিছা।
রামিছাঃ এখানে বসে কথা বলার সময় না। মুগ্ধা এখনি আমাদের হসপিটালা যাওয়া উচিত।
ভাইজান আপনি তাড়াতাড়ি গাড়ির ব্যবস্থা করেন?

(খুব অস্থির ভাবেই কথাটা বলেন রামিছা। আর আজিজুলকে কথাটা বলেন।)
আজিজুল তাড়াতাড়ি করেই বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
খুব কষ্টে আজিজুল একটা গাড়ি পান।

এই গাড়িতে করে সবাই পথ দেন হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
বাসায় তালা ঝুলছে।
কি হয়েছে? হসপিটাল আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে?
ভাইয়া কান্না করলো কেন?

সুমা আপু হসপিটাল কি করছে?
আর রেহান ভাইয়াই বা কোথায়?
মুগ্ধা রেহানের কথা ভাবতেই রেহানের ফোনে কল দেয়।

কিন্তু রেহানের ফোন অফ বলছে।
তাহলে কি রেহান ভাইয়ার কিছু হলো।
কথাটা ভাবতেই মুগ্ধার ভিতর কেঁপে উঠে।

আর রামিছার দিকে তাকায় মুগ্ধা।
রামিছা গভীর ভাবে কি যেন ভাবছেন।
চোখে পানির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।

মুগ্ধা আর কিছুই ভাবতে পারছে না।
গাড়িতে থাকা সবাই গভীর ভাবনায় ভাবান্তর।
কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য হসপিটালে?
মুগ্ধাঃ ড্রাইভার আরো স্পিডে গাড়ি চালান?

মুগ্ধার কথায় ড্রাইভার পিছনে তাকায়।
আর গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দেয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা হসপিটাল পৌঁছে যায়।
ড্রাইভারকে টাকা দিয়েই সবাই তাড়াতাড়ি করে হসপিটাল ঢুকে।

মুগ্ধা আবার ফোন দেয় নিতিনের কাছে।
নিতিনের ফোন সুমার কাছে।
সুমা ফোন ধরে।
মুগ্ধাঃ আমরা হসপিটাল এসে গেছি।

তোমরা কোথায় ভাইয়া?
সুমাঃ তিন তলায় চলে আসো।
তাহলেই আমাদের দেখতে পাবে।

আবারো সুমার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধা ভয় পায়।
কি অপেক্ষা করছে তিন তলায়।
লিফটে করে ওরা সবাই তিনতলায় যায়।
তিনতলায় উঠেই।

ডান দিকেই চোখ যেতে দেখলো সুমাকে বসে আছে।
মুগ্ধা দৌড়ে যায় সে দিকে। তার পিছন পিছন সবাই আসে।
মুগ্ধা সুমার কাছে এসে কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখে নিতিন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

আর নিতিনের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে।
সুমা আর রাহুলের কাপড়ে এখনো রক্ত লেগে আছে।
রক্ত দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়।
মুগ্ধাঃ আপু কি হয়েছে?

মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে নিতিন বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আর মুগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে দেয়।
নিতিনের কান্না শুনে। মুগ্ধা সহ সবাই জিজ্ঞেস করছে। কি হয়েছে? কিন্তু নিতিন কিছুই বলছে না।

রামিছাঃ নিতিন কি হয়েছে? আর এভাবে কান্না না করে বল কি হয়েছে?
রামিছার কণ্ঠ শুনে রামিছার দিকে তাকায় নিতিন। আর বলে।

নিতিনঃ আন্টি রেহান এক্সিডেন্ট করেছে। আর কিছুই বলতে পারেনি নিতিন এর আগেই রামিছা চিৎকার করে উঠেন।
রামিছা কে জেনিফা ধরে নিয়ে চেয়ারে বসান।

জেনিফা আর আয়েশা বোঝাচ্ছেন কান্না না করতে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু রামিছা থামছেন না।
মুগ্ধার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে।

তার সাথেই কেন বারবার এমন হয়। সে কি অপয়া? প্রথমে বুবু, পরে রাহিন, এখন রেহান। কি হচ্ছে এসব, এই নিয়ে রেহান ভাইয়া দুইবার এক্সিডেন্ট করলো।
মুগ্ধা নিতিনের বুকে মাথা রেখে এসব ভাবছে আর কান্না করছে।

সুমা, রাহুল আর আজিজুল মিলে সবাই বোঝাচ্ছে। কিন্তু রামিছা কে থামানো যাচ্ছে না।
আর নিতিন আর মুগ্ধাকেও।
রামিছা কান্না করছেন আর বলছেন।

রামিছাঃ এক সন্তানকে হারিয়ে কবেই ভিতর থেকে মরে গেছি।
বেঁচে আছি শুধু আমার রেহানের জন্য।
এখন যদি আল্লাহ আমার রেহানকে নিয়ে যান। তাহলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো।
রেহান যে আমার সব।

রামিছা কথা গুলো বলছেন আর কান্না করছেন।
এক সন্তানকে হারানো কথাটা শুনে সবাই অবাক হয়। মুগ্ধাকে
তো আগেই বলেছেন রামিছা সব।

এখন প্রশ্ন করার সময় না।
নিতিন এর চোখের পানি শুখিয়ে গেছে।
জাফরুল্লাহ আর রমিজও আসেন খবর পেয়ে।

জাফরুল্লাহ নিজের চোখের পানি লুকিয়ে রামিছাকে মিথ্যে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছেন।
ডক্টর অনেক্ষণ ধরে ভিতরে আছে।
সবাই ডক্টর বের হওয়ার আশায় আছেন।

রাহুল বলতে চাচ্ছে সুমাকে, বাসায় যাওয়ার জন্য, এখন তো ওরা সবাই আছেন।
কিন্তু এটা কি ভালো মনুষ্যত্ব এর পরিচয় হবে।

তাই রাহুল চুপ করে থাকে। তার শুধু আজ রাহিনের কথাই মনে পরছে।
তিশা এখনো বসে আছে ঠিক আগের মতো। রেহানের এই অবস্থা আজ তার ভাইয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

সেদিন এভাবেই সেও চিৎকার করে কান্না করেছিলো।
নিতিন সহ সবাই অপেক্ষায় আছে ডক্টর বের হবার।

ঘড়ির টাইম ক্রমশ বাড়ছেই। ঘড়ি ৪টা বেজে যায়।
দুপুরে নিয়ে আসা হয়েছিলো রেহান এর রক্তাক্ত দেহ।

ডক্টর বের হয়। ডক্টর এর বের হয়ে দেখা।
সবাই দৌড়ে যায় ডক্টরের কাছে।
রামিছা বলেন।

রামিছাঃ আমার রেহান কেমন আছে?
ডক্টর: এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।
রোগীর জ্ঞান ফিরেনি।

আর আপনারা তাড়াতাড়ি ৪ ব্যাগ এ নেগেটিভ রক্ত যোগাড় করেন।
রোগীর জ্ঞান আসার আগেই রোগীকে রক্ত দিতে হবে।
ডক্টর এর কথায় আবারো সবাই ভেঙে পরে।

নেগেটিভ রক্ত যোগাড় করা তো খুব কঠিন কাজ। নেগেটিভ রক্ত শততে একজনের হয়। তাহলে কি রেহানকে বাঁচানো যাবে না।
রামিছার কান্না আবারো বেড়ে যায়।

ডক্টর: তাড়াতাড়ি রক্ত যোগাড় করেন। নইলে রোগীকে,
নিতিনঃ আমার এ নেগেটিভ রক্ত৷ আমার রক্ত নেন।
ডক্টরকে কিছু বলতে না দিয়ে।
নিতিন কথাটা বললো,

ডক্টর:আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভয়ে ছিলাম। এই রক্তের গ্রুপ এতো সহজে মিলানো যায় না।
এই ধরণের রোগীর মৃত্যু অনিবার্য।
আপনি আসেন।

নিতিন এর থেকে দুই ব্যাগ রক্ত নেওয়া হয়। তারপর রেহানকে দেওয়া হয়।
এখনো ডক্টর এর মুখ কালো হয়ে আছে।
নিতিনঃ ঠিক হয়ে যাবে তো রেহান।

ডক্টর: এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। আরো দুই ব্যাগ লাগবে। এতেও যদি না হয়। তাহলে আবার রক্ত দিতে হবে।

নিতিনঃ তাহলে আমার কাছ থেকে আরো দুই ব্যাগ রক্ত নেন। যেভাবেই হোক রেহানকে সুস্থ করে তোলেন।
ডক্টর: আপনার কাছ থেকে দুই ব্যাগ রক্ত নেওয়া হয়েছে।
আর আমরা নিতে পারবো না।

এটা নিয়ম না।
নিতিনঃ কেন সম্ভব না?

আমি আমার বন্ধুকে প্রয়োজন হলে দেহের সব রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ।
নিতিনের চোখ থেকে পানি পরছে।
ডক্টর: আপনাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আমি সম্মান করি। কিন্তু আপনার থেকে আমরা আর এক ফোটাও রক্ত নিতে পারবো না।

আপনি ১ঘন্টার ভিতর আরো দুই ব্যাগ রক্ত যোগাড় করেন। নইলে আর আমাদের কিছু করার থাকবে না।
নিতিন রুম থেকে বের হয়ে আসে। চোখে পানি। আর মনে রেহান কে হারানোর ভয়।
এখনো রেহানকে একটা নজর দেখতে পারেনি সে।

কালো মুখ করে বেরিয়ে আসে সবার মধ্যে।
রামিছাঃ নিতিন আমার রেহান তো ঠিক হয়ে যাবে?
নিতিন কি বলবে রামিছা কে।

এখন যা বলবে, তা সব হবে মিথ্যে শান্তনা দেওয়া। এর চেয়ে বেশি কিছু না।
তারপরেও নিতিন বললো,
নিতিনঃ ডক্টর বলেছে আরো দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে, নইলে ডক্টর কিছু করতে পারবে না।
আমি দুই ব্যাগ রক্ত দিয়েছি।

তারা আর আমার কাছে থেকে রক্ত নিবে না।
নিতিনের মাথা ঘোরাচ্ছে।
হয়তো শরীর থেকে রক্ত নেওয়ার কারণে।

কিন্তু তাকে যে বসে থাকলে হবে না। যেভাবেই হোক বন্ধু কে বাঁচাতে হবে।
নিতিনের কথা শুনে রামিছার ভিতর ফেটে যাচ্ছে।

রামিছা জাফরুল্লাহ এর কাছে যান।
রামিছাঃ ওগো যেভাবেই হোক আমার ছেলের জন্য রক্ত নিয়ে আসো।
আমি পারবোনা সইতে।

রেহানকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।
রামিছার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলেন জাফরুল্লাহ।
জাফরুল্লাহ: আমি এখনি যাচ্ছি।

নিতিন আর জাফরুল্লাহ দুজন হসপিটাল থেকে যাবার জন্য রওনা দিলে। মুগ্ধা বলে উঠে।
মুগ্ধাঃ আমি ভাইয়াকে রক্ত দিবো।
মুগ্ধার কথা শুনে থমকে দাঁড়ান দু’জন।
মুগ্ধার গাল বেয়ে পানি পরছে।

নিতিন আর কোনো কথা না বলেই মুগ্ধার হাত ধরে দৌড়ে যায়।
মুগ্ধার রক্ত পরিক্ষা করা হয় কিন্তু রেহানের রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে নি।
ডক্টর: আপনাদের হাতে সময় খুব কম।
আমাদের কাছেও এ নেগেটিভ রক্ত নেই।

কয়েকটা হসপিটাল আর ব্যাংকেও যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের কাছে রক্ত নেই।
(ডক্টর জাফরুল্লাহ কে চিনেন। যখন জাফরুল্লাহ বলেন। রেহান উনার ছেলে।
তখন থেকেই ডক্টর মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করছে।

এমনিতেও করতো। কিন্তু জাফরুল্লাহ কে খুব ভাল করে চিনেন।)
নিতিন আর মুগ্ধা আবারো ভেঙে পরে।
অমাবস্যার চাঁদের মতো
তাদের মুখ অন্ধকার হয়ে যায়।

ডক্টর: আপনারা তাড়াতাড়ি করেন।
রোগীর জ্ঞান আসতে হলে নিশ্চয়ই রোগীকে রক্ত দিতে হবে।
নিতিনঃ প্লিজ আমার থেকে আরো রক্ত নিয়ে নেন। তারপরেও রেহানকে বাঁচিয়ে তুলেন।
ডক্টর: এটা সম্ভব না।

পরে আপনার শরীরে রক্ত শূন্যতা দেখা দিবে। আর এমনিতেই এখন আপনি ক্লান্ত৷ আপনার থেকে রক্ত নিলে। খুব ভয়াবহ কিছু হবে আপনার সাথে।
মুগ্ধা আর নিতিন চলে আসে।

রামিছাঃ এখন তো আর রক্ত লাগবে না। মুগ্ধা মা তো আমার ছেলেকে রক্ত দিয়েছে।
এখন তো আমার ছেলে ভালো হয়ে যাবে?

নিতিন আর মুগ্ধার ভিতর কেঁদে উঠে।
মুগ্ধা রেহানের জন্য কিছু করতে পারলো না।
নিতিনঃ আন্টি মুগ্ধার রক্তের গ্রুপ মিলে নি রেহানের রক্তের সাথে।
সবাই চুপ হয়ে বসে আছে।

রক্তের খুঁজ করছেনা কেউ।
রেহানের বাবা সবাইকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে কিন্তু এ নেগেটিভ রক্ত নেই।
মুগ্ধা রাইয়ান কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু রাইয়ান বা তার ঘরের কারো রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ না।

তোহফার রক্ত এর গ্রুপ বি পজিটিভ
রাইয়ান আর তোহফা আসতেছে রেহানের এমন খবর শুনে।
সবাই যখন চুপ হয়ে আল্লাহকে ডাকছে। তখন একজন অন্য কিছু ভাবনায় মগ্ন।
সে হলো তিশা।

তিশার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ।
কিন্তু সে রক্ত দিতে ভয় পাচ্ছে।
অনেক্ষণ ধরেই ভাবছে কি করবে।

নিজের চোখের সামনে এতগুলো মানুষ এর চোখের পানি সহ্য হচ্ছে না তিশার।
তিশা: আপু!
সুমা: কিছু বলবি?
তিশা: আমার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ।

আমি দিবো উনাকে রক্ত।
সুমার মুখে হাসি ফুটে উঠে।
তিশা: এর আগে কাউকে রক্ত দেই নি।
তাই এতক্ষণ বলিনি।
আমার ভয় করছিলো।

সুমা: ভয়ের কিছু নেই।
তুই রক্ত দিবি।
তোর জন্য সবার মুখে হাসি ফুটে উঠবে রে।

তিশা কথাটা শুনে, আর শব্দ করেই বলে।
তিশা: আমি রক্ত দিবো উনাকে।
আমার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ।
কথাটা শুনে সবার মুখে ভয়ের রেখা সরে গিয়ে হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে।
রাহুল কিছু বলতে গিয়েও বললো না।

ভালো কাজে নিষেধ করতে নাই।
নিতিন তিশাকে নিয়ে যায়।
তিশা দেখতে তেমন বড় না।

হালকা শরীরের মেয়ে তিশা।
নিতিনঃ ডক্টর আমরা রক্ত পেয়ে গেছি।
উনি রক্ত দিবেন।
নিতিনের কথা শুনে ডক্টর তিশার দিকে তাকান।
মেয়েটা একদম হালকা।

এই মেয়ের কাছ থেকে
এক ব্যাগ রক্ত নেওয়াও মুশকিল।
তিশা: আমায় হালকা দেখে ভয় পাবেন না। ইনশাআল্লাহ আমি দুই ব্যাগ রক্ত দিতে প্রস্তুত।
ডক্টর মেয়েটার সাহস দেখে মুগ্ধ হন।

তিশার কাছ থেকে এক ব্যাগ রক্ত নেন।
ডক্টর বললেন প্রয়োজন হলে আবার বলবেন।
তিশাকে জড়িয়ে ধরে অনেকটা চুমু দেন রামিছা৷

সন্ধ্যা হয়ে যায়। এখনো সবাই অপেক্ষায় আছেন। রেহানের জ্ঞান ফিরার জন্য।
রেহানের খবর শুনে আর তার বাবামার চোখের পানি দেখে তোহফার ভিতর কেমন জানি ফেটে যাচ্ছে।

মনে হচ্ছে তার কত জন্মের চেনা এরা সবাই।
নার্স এসে বলে গেলো, রেহানের জ্ঞান ফিরেছে।
ঠিক ৭টা ১৩ মিনিটে রেহানের জ্ঞান আসে।

কিন্তু কেউ তার সাথে দেখা করতে পারবেন না।
এখনো অক্সিজেন দেওয়া আর ডক্টর ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছেন।
রেহানের একটা পা ভেঙে গেছে। আর শরীরের অনেক ক্ষত জায়গা। এমন অবস্থায় কারো বেঁচে থাকা মানেই মৃত্যুর রাস্তা থেকে ফিরে আসা।
সবাইকে এখন চিন্তা মুক্ত দেখা যাচ্ছে।

কারণ ডক্টর বলে গেছে। কাল সকালে রেহানের সাথে সবাই দেখা করতে পারবে।
আর এখন চিন্তামুক্ত। রেহানের শরীর এখন পজিটিভে আছে।
আর রক্তও লাগবে না।

নিতিন জোর করেই সবাইকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
নিতিনের সাথে শুধু জাফরুল্লাহ রয়েছেন।

রামিছা যেতে চাননি, তারপরেও জোর করে রামিছাকে বাসায় নিয়ে যায়।
মুগ্ধা থাকতে চেয়েছিলো। কিন্তু নিতিন থাকেও থাকতে দেয় নি।

সুমাকে বলেছে কাল যেন ওরা আসে। আজ আর থাকার প্রয়োজন নেই।
আর তিশাকে বেশি ফলমূল খাওয়াতে বলে।
নিতিন একা একা বসে আছে। আর ভাবছে কে এমন শত্রু রেহানের? যে এমন নির্মম ভাবে মেরেছে রেহানকে।

রেহানের পরিবার বা অন্য কেউ জানেনা রেহান এর এমন অবস্থা কিভাবে হলো?
সবাই জানে এটা এক্সিডেন্ট।
শুধু নিতিন আর রাহুল জানে সত্যটা।

জাফরুল্লাহ নিতিনের জন্য অনেক ফলমূল নিয়ে আসেন।
নিতিন খেতে না চাইলেও। জাফরুল্লাহ জোর করে খাওয়ান নিতিনকে।
এখন শুধু সকালের অপেক্ষায়।

নিতিন হালকা ঘুমানোর চেষ্টা করে।
ক্লান্ত লাগছে খুব।

পার্ট: ১৯

খুব সকালেই রামিছাকে হসপিটালে নিয়ে আসে মুগ্ধা আর রমিজ।
রামিছার ঘরে মন বসছিলো না।

হসপিটালে যে তার কলিজা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে।
রেহানের সামনে বসে আছে সবাই।

সবাই বলতে নিতিন,জাফরুল্লাহ, মুগ্ধা,রামিছা, আর রমিজ।
রেহানের এখনো অক্সিজেন মাস্ক লাগানো।
রামিছা নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে শুধু নীরবে চোখের পানি ফেলছেন।

ছেলের এমন অবস্থা দেখে কোনো মাবাবা’ই নিজেদের ঠিক রাখতে পারবে না। বারবার কান্নায় ভেঙে পরবে।
আর রামিছা আর জাফরুল্লাহ এর একটাই কলিজা, আর সে হলো রেহান। তারা কিভাবে নিজেদের ঠিক রাখবেন।

এক এক করে সবাই হসপিটালে আসে।
তোহফা এসে নিতিনের ওই ক্ষতবিক্ষত মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তার অজান্তেই গাল বেয়ে পানি পরছে। তোহফার মন চাচ্ছে একটাবার রেহানের মাথায় হাত বোলাতে। কিন্তু কিভাবে একটা ছেলের মাথায় হাত দিবে।

রামিছা রেহানের মাথার পাশে বসে আছেন। বারবার রেহানের মাথার ব্যান্ডেজ এর উপর চুমু এঁকে দিচ্ছেন।

তিশা আর সুমাও আসে রেহানকে দেখতে।
রাহুল কাল রাত ঘুমাতে পারেনি। সারাক্ষণ তার চোখের সামনে রাহিনের সেই ঘুমন্ত মুখটাই ভেসে উঠছিলো।

কথায় আছে না। যে একবার একটা জিনিসে ধাক্কা খায়। তার সামনে যদি সেই জিনিসটা আবার ঘটে, আর তাকে সেই ধাক্কা খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তাহলে সেই মানুষটার কষ্ট কয়েকগুণ বেশি হয়।

রাহুলও তাই সারারাত ঘুমাতে পারেনি।
তাই তিশা আর সুমা এসেছে।
ডক্টর এসে রেহানকে দেখে যায়।

আর আশ্বাস দিয়ে যায়,
রেহান আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাবে।
রামিছাকে বাসায় নিয়ে আসেন।
রেহানের পাশে শুধু নিতিন রয়েছে।

রেহান সত্যিই বন্ধু নামক অনেক বড় ছায়া পেয়েছে।
নিতিন শুধু রেহানের সুখে পাশে থাকেনি। প্রতিটা দুঃখের সময়ও নিতিন পাশে ছিলো। আর আছেও।

জাফরুল্লাহ এসে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। রাতে দু’চোখে এক করতে পারেন নি।
জেনিফা আর আয়েশা অনেক সময় দিচ্ছেন রামিছাকে, কোনো ভাবেই টেনশন নামক শব্দটা রামিছা আশেপাশে আসতে দিচ্ছেন না।

মুগ্ধা রুমে বসে আছে, রেহানের এমন অবস্থা তার একবারে ভালো লাগছেনা।
মুগ্ধা নিজেকে অপয়া ভাবা শুরু করে।
সে ভাবে তারজন্যই এসব হচ্ছে।

দুইটা মানুষ তো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো।
কিন্তু মুগ্ধা একবারো ভাবলো না। এসব তাদের নিয়তি। সব পূর্বেই ঠিক করা।
মুগ্ধার ফোন বেজে উঠে।

রাইয়ান ফোন দিয়েছে। রাইয়ানও বাসায় গিয়ে ফোন দেয় মুগ্ধাকে।
মুগ্ধা ফোনের দিকে তাকিয়ে রাইয়ানের নাম দেখে। ফোনটা কেটে দেয়। ভালো লাগছে না এখন ফোনে কথা বলতে।

আর একটু আগেও তো হসপিটালে দু’জনের দেখা হলো।
রাইয়ান পরপর তিনবার কল দিলো মুগ্ধাকে। কিন্তু মুগ্ধা বারবার কেটে দিলো।

রমিজ মিয়া আসলেন মুগ্ধার রুমে।
মুগ্ধাকে শুয়ে থাকতে দেখে চলে যাচ্ছিলেন।
মুগ্ধা তার বাবাকে দেখে উঠে বসল। আর বললো,

মুগ্ধাঃ আব্বা কিছু বলবে?
মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে পিছন ফিরে তাকান রমিজ মিয়া।
রমিজ গিয়ে নিজের মেয়ের পাশে বসেন। আর বলেন।

রমিজ: মুগ্ধা মা রাইয়ান বাবার কাছে একটা ফোন দে তো?
কথাটা শুনে মুগ্ধা মনে মনে বললো, এই মাত্র নিজেই উনার ফোন কেটে দিলাম বারবার।
এখন নিজেই আবার ফোন দিবো।
মুগ্ধাঃ কেনো আব্বা?

রমিজ: রাইয়ান এর বাবার সাথে কথা বলবো।
মুগ্ধা আর কোনো কথা বললো না।
ফোন হাতে নিয়ে রাইয়ানকে ফোন দিলো।

রাইয়ান মুগ্ধার ফোন পেয়ে খুশি হয়।
সে বুঝতে পারছিলো। রেহানের এমন অবস্থা তাই মন খারাপ। তাই হয়তো কথা বলতে ভালো লাগছে না তার।
রাইয়ান ফোন রিসিভ করে।

মুগ্ধাঃ আব্বা তোমার সাথে কথা বলবেন।
কথাটা বলে মুগ্ধা তার আব্বার কাছে ফোনটা দেয়।
রাইয়ানঃ আসসালামু আলাইকুম।

কেমন আছেন আংকেল?
রমিজ মিয়া সালামের উত্তর দিয়ে বলেন।
রমিজঃ বাবা তোমার আব্বার কাছে ফোনটা নিয়ে যাও তো?

রাইয়ান আর কোনো প্রশ্ন না করে, সরাসরি ফোনটা নিয়ে যায় তার বাবার কাছে।
রাইয়ানঃ আব্বু কথা বলেন?
মেরহাব রুমে বসে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
রাইয়ানের কথা শুনে ফোন নিয়ে কানে লাগান।

মেরহাব: হ্যালো!
রমিজ: আমি মুগ্ধার বাবা রমিজ বলছি।
মেরহাব: ওওও, বলেন বেয়াই।

রমিজ: কিভাবে যে বলি কথাটা।
রমিজ মিয়া কথাটা বলতে কেমন জানি করছেন।
মেরহাব: আরে বেয়াই বলে ফেলেন কি বলবে?

রমিজ: রেহানের কথা তো আমার রাইয়ান বাবা আপনার কাছে বলেছে?
মেরহাব: হুম, শুনে খুব খারাপ লাগছে।
রমিজ: তাই বলছিলাম ভাইজান!
মেরহাব: কি?

রমিজ: রেহান বাবা ভালো হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করি।
রেহান ভালো হওয়ার ৪ দিন পর না হয় বিয়ে হবে ছেলে মেয়ে দুটোর।
মেরহাব: হ্যাঁ, একটা ছেলেকে এভাবে এই অবস্থায় রেখে তো আর আমরা বিয়ে নিয়ে ভাবতে পারিনা।

আমিও ভাবছিলাম, এই কথা। অপেক্ষায় ছিলাম আপনাদের বাসার কারো ফোনের অপেক্ষায়।
রমিজ মিয়া একটা ভয়মুক্ত হন। উনি ভাবছিলেন রাইয়ানের বাবা মানবেন কি-না?
রমিজ: অনেক অনেক শুকরিয়া ভাইজান।

তাহলে আমরা রেহান ভালো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি।
মেরহাব: হুম, দোয়া করি ছেলেটা যেন তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়।
রমিজ মিয়া ফোন রেখে দেন।

মুগ্ধা তার বাবার কথা শুনে খুব খুশি হয়।
সে ভাবছিলো এই বিষয় নিয়ে কথা বলবে সবার সাথে। কিন্তু তার বাবা তো সেই কাজটা পূর্ণ করে দিলেন।

মুগ্ধার মুখে হাসি দেখে রমিজ মিয়া মুগ্ধার মাথায় হাত বোলিয়ে চলে যান।
সিয়াম আবার শহরে চলে আসে। রাতেই পালাতে চাইছিলো। কিন্তু তার কাছে খবর যায়। রেহান মরে নি।

ডক্টররা তাকে বাঁচিয়ে তুলেছেন।
সিয়ামের মুখে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু সিয়ামের অজানা তার সাথে সামনে কি হবে।
হয়তো খুব ভয়াবহ কিছুই অপেক্ষা করছে।
আজ ৭ দিন হলো রেহানের এই অবস্থা।

একটা মুহূর্তের জন্যেও নিতিন রেহানের পাশ থেকে যায় নি।
প্রতিদিন রামিছা, মুগ্ধা, জাফরুল্লাহ এসে রেহানকে দেখে যেতেন।
৪দিনের মাথায় হালকা কথা বলতে শুরু করে রেহান। কিন্তু ডক্টর এর নিষেধ, রেহান যেন কথা না বলে।

তাইতো সবার দিকে তাকিয়ে থাকতো। কথা বলার ইচ্ছা হলেও বলতে পারতো না।
নিতিনের দিকে প্রতিটা সময় জলভরা চোখে তাকিয়ে থাকতো রেহান। নিতিন এই কয়দিন ধরে একবারো রেহানকে রেখে কোথাও যায়নি।

এইতো দুইদিন আগে নিতিন রেহানের জন্য ফলমূল কিনতে যায়।
তখন ডক্টর রেহানের শরীরের ক্ষত জায়গা গুলোর সেলাই কাটছিলো৷ আর পরিষ্কার করছিলো। আর রেহানের সাথে টুকটাক কথা বলছিলো।

ডক্টর: তোমার কপাল অনেক ভালো।
ডক্টরের কথা শুনে অবাক হয়নি রেহান। সে ভাবে ডক্টর হয়তো এটা বোঝাতে চাচ্ছে। সে যে মৃত্যুর রাস্তা থেকে ফিরে এসেছে।

কিন্তু ডক্টর অবাক করে বললো,
ডক্টর: এমন একটা বন্ধু পেয়েছো। সত্যিই কপাল লাগে এমন বন্ধু পেতে হলে।

এমন ফ্যামিলি পেয়েছো
যে, তোমার দুঃখে সবাই
দুঃখী।
তোমার বন্ধু তোমায় তার সব রক্ত দিতেও প্রস্তুত ছিলো।

এই কয়দিন ধরে তোমার কাছ থেকে একবারো যায় নি।
ডক্টরের কথা শুনে, রেহানের চোখ বেয়ে পানি পরছে।
সত্যিই সে খুব ভাগ্যবান। এমন বন্ধু আর এমন একটা ফ্যামিলি পাওয়ার জন্য। কয়জন পায় এমন পরিবার। আর এমন বন্ধু।

নিতিন বসে বসে তোহফার সাথে কথা বলছে। আর রেহান শুয়ে আছে। আর দেখছে নিতিনের প্রেমালাপ।

মুচকি হাসছে রেহান।
তোহফা নিতিনের কাছ থেকে সব সময় রেহানের খবর নিচ্ছিলো। আবার ভিডিও কলেও রেহানকে দেখিয়েছে নিতিন।

রেহানের প্রতি তোহফার আলাদা একটা টান দেখছে নিতিন।
ডক্টর কেবিনে আসে, সাথে নার্সও। একজন নার্স এর কাছে হুইলচেয়ার।
কারণ রেহান এর একটা পা ভাঙা। দুইদিন তাকে থাকতে হবে হুইলচেয়ারে। তারপর আস্তে আস্তে হাটতে পারবে। তবে তার বেশি না হাটাই ভালো।

ডক্টর: আজকে উনাকে বাসায় নিতে যেতে পারেন।
রেহানের মুখে হাসি ফুটে উঠে। অনেক দিন পর সে বাসায় যাবে।
মনে হচ্ছে হাজার বছর পর সে তার বাসায় যাবে।
রেহানঃ আমি এখনি যাবো।
ডক্টর: হুম।

নিতিন ধরে ধরে রেহানকে হুইলচেয়ারে বসায়।
নিতিনঃ আপনাদের কতো টাকা,
ডক্টর: এসব ভাবতে হবেনা।
উনার বাবা আজ সকালেই সব টাকা দিয়ে গেছেন।

নিতিনঃ ওওও।
নিতিন গাড়ি ড্রাইভ করছে,
সকালে যখন জাফরুল্লাহরা এসেছিলেন। তখন উনি গাড়ির চাবি দিয়ে যান নিতিনের কাছে। আর বলেন দুপুরে রেহানকে ওরা ছেড়ে দিবে।

রেহানের পাশে একজন নার্স বসে আছে, জাফরুল্লাহ সব ঠিক করেছেন।
কারণ বাসায় তো আর নিতিন একা নিয়ে যেতে পারবে না রেহানকে।
নিতিন বাসায় এসে দেখে, বাসার গেইট খুলাই আছে।

সবাই দাঁড়িয়ে আছে বাগানে। রেহানকে দেখার জন্য।
নিতিন গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে নামে, আর হুইলচেয়ার বের করে। নার্স আর নিতিন মিলে রেহানকে হুইল চেয়ারে বসায়। তারপর সবার সামনে নিয়ে যায়।

রামিছা রেহানের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন আর কান্না করছেন।
রেহানঃ আম্মু কান্না করো না তো।
এই দেখো আমি ঠিক হয়ে গেছি।

কিন্তু কে শুনে কার কথা।
নার্স রেহানকে রুমে রেখে, আর নিতিনকে সব বুঝিয়ে চলে যায়।
রেহানকে নিচের একটা রুমে রাখা হয়।
এই অবস্থায় তাকে উপরে নেওয়া সম্ভব না।

রেহানকে বাসায় নিয়ে আসার পর থেকেই মুগ্ধা রেহানের সেবাযত্ন করা শুরু করে।
রামিছা ছেলের জন্য নানান ধরণের খাবার রান্না করেন।
কিন্তু রেহান তেমন কিছু খেতে পারে নি।

বাসায় আসার ৪দিনের মাথায় রেহান বলতে গেলে অনেকটাই সুস্থ।
এতোগুলা মানুষের সেবা পাওয়ার পরেও কোনো মানুষ অসুস্থ থাকতে পারে না।
এই চার দিন নিতিন সোফায় ঘুমিয়েছে।

রেহানের যদি কোনো কিছু প্রয়োজন হয়। এইসব ভেবে অন্যরুমে যায় নি।
রেহান এখন হাটতেও পারছে।
বাসায় আসছে ৪দিন শেষ হলো।

আজ সকালে সবাইকে অবাক করে সে নিজে নিজেই নাশতার টেবিলে হেটে যায়।
যদিও ভালোভাবে হাটতে পারেনি।
শরীরের প্রতিটা জায়গায় ক্ষত ক্ষত স্থান।
বলতে গেলে রেহান অনেকটাই সুস্থ।

এইদিকে আবার দুই ফ্যামিলি মিলে বিয়ের তারিখ ঠিক করে।
চার দিন পর মুগ্ধা আর রাইয়ানের বিয়ে।
সোমবারে ওদের বিয়ে।
রেহানকে কেউ বাসায় বসিয়ে রাখতে পারছে না।
সে আবার পা পা শুরু করে দেয়।

মুগ্ধার বিয়েতে যেন কোনো কমতি না হয়। তাই সবাই সব দিক দিয়ে চেষ্টা করছে।
রেহান বাসায় পা পা করছে আর কে কিভাবে কাজ করছে না করছে, এসব দেখছে।
বাসায় সুন্দর করে লাইটিং করা হয়।

আস্তে আস্তে রেহানদের বাসায় মেহমান আসাও শুরু হয়।
জাফরুল্লাহ অনেকবার বলেন মানিক কে বাসায় আসার জন্য। কিন্তু সে বিয়ের আগের দিন আসবে।

এখনো বাসায় অনেক মেহমান।
একদিন কেটে যায়। আজ শনিবার।

রেহান এখনো খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটে। মুখে তিনটা দাগ। এই দাগ গুলো কবে মিটবে তার,
রেহান এই চিন্তা করছে। যদিও দাগ গুলো দেখা যায় না।
নিতিন এক জায়গায় যেতে চাইলে রেহানও তার সাথে যাবে বলে আবদার করে। কিন্তু নিতিন তাকে নিবে না।

রেহানের বকা খেয়ে নিতিন ঠাণ্ডা হয়।
রেহান আর নিতিন এখন রাহুলদের বাসায় যাবে। তাদের সবাইকে মুগ্ধার বিয়েতে ইনভাইট করতে।

ওরা তাদের বাসা কোথায় ভুলে যায়। তাই সুমার কাছ থেকে আবার বাসার এড্রেস নেয়।
তারপর দুজন রওনা দেয় রাহুলদের বাসার উদ্দেশ্যে।
রাহুলের বাসায় বসে আছে রেহান আর নিতিন।

হালকা নাশতা করে নেয় তারা।
আমিনা: তোমার শরীর এখন কেমন আছে?
রেহানকে প্রশ্ন করেন।

রেহানঃ আলহামদুলিল্লাহ আন্টি এখন ভালো আছি। যদি ওরা আমায়
ঠিক মতো হসপিটাল নিয়ে না যেতো তাহলে হয়তো আর বেঁচেই থাকতাম না।
রাহুল আর সুমার দিকে তাকিয়ে বললো কথা গুলো।
এরি মধ্যে তিশা আসে, সে গোসল করে ছাঁদে চুল শোকাচ্ছিল।
তিশা এসে সালাম দেয়।
রেহান চিনেনি।

নিতিনঃ বলছিলাম না তোকে অন্য আরেকজন রক্ত দিয়েছিলো, এই হলো সেই জন।
রেহানঃ ধন্যবাদ আপনাকে।
সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প করে।

নিতিন সুমার হাতে মুগ্ধার বিয়ের কার্ড দেয়।
সুমা কার্ডটা হাতে নেয়, আর বলে।
সুমা: কি এটা?

নিতিনঃ তুই খুলেই দেখ?
সুমা: হুম,
সুমা কার্ডটা খুলে দেখে, এটা মুগ্ধার বিয়ের কার্ড।
সুমা: মুগ্ধার বিয়ে?

ছেলেটা কে?
খুব অবাক হয়েই বলে।

নিতিনঃ হসপিটালে দেখছিলি একটা ছেলে আসছিলো রাতে?
সুমা: হুম।
নিতিনঃ ওইটাই মুগ্ধার বর।

সুমা: পিচ্চি মুগ্ধা আর পিচ্চি থাকলো না। তারো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।
ইশ আজ যদি নিশি থাকতো! তাহলে,

নিশির কথাটা বলতেই সবার মন খারাপ হয়ে যায়।
আমিনা: নিশি থাকলে আগে নিশির বিয়ে হতো।
কিন্তু সে দুইটা মানুষ’ই তো পৃথিবীতে নাই।
আমিনার চোখে পানি টলমল করছে।

রেহানঃ আপনারা সবাই কিন্তু কালকেই আমাদের বাসায় চলে যাবেন।
রাহুল: বিয়ে তো সোমবারে। আমি আর সুমা যাবো নে বিয়ের দিন সকালে।
রেহানঃ না না কালকে গায়ে হলুদ।

আর হলুদের অনুষ্ঠানে আপনারা সবাই থাকবেন।
রাহুল: সবাই

খুব অবাক হয়ে।
নিতিনঃ হুম, কাল সকালে আমি গাড়ি নিয়ে আসবো।
আশরাফ: আমি আর রাহুলের মা বিয়ের দিন যাবো। ওরা না হয় কালকেই যাবে।
রেহানঃ আচ্ছা, আর আপনারা কিন্তু বিয়ের দিন থাকতেই হবে।

আশরাফ: হুম অবশ্যই বিয়ের দিন থাকবো। আমার ছেলের সম্পর্ক যে এখানে।
কথাটা নরম গলায় বলেন।
নিতিনঃ কাল সকালেই কিন্তু তুই ওদের নিয়ে যাবি?
সুমা: হুম,

রেহানঃ তাহলে এখন আমরা উঠি।
আরো অনেক জায়গায় যেতে হবে আমাদের।
আশরাফ: আমরা চাইলেও তো তোমাদের রাখতে পারবো না।
রেহান আর নিতিন হুহু করে হেসে উঠে।

রেহান আর নিতিন রাহুলদের বাসা থেকে বেরিয়ে সোজা কেক এর দোকানে যায়।
কালকে হলুদের জন্য কেক এর অর্ডার দিয়ে আসে।

ওরা বলছে সন্ধ্যার আগেই কেক পৌঁছে যাবে।
নিতিন আর রেহান আরো কয়েক জায়গায় যায়। তাদের চেনা জানা সব বন্ধুকেই ইনভাইট করে।

বাসায় এসে দেখে জাফরুল্লাহ আর আজিজুল মিলে দুইটা অনেক বড় গরু এনেছেন।
আজিজুল মিয়া গরু কিনার দিক দিয়ে অনেক পারদর্শী।
তাই রমিজ তার বড় ভাইকেই পাঠায় গরু কিনতে।

রমিজ মুগ্ধার বিয়েতে অনেক টাকা খরচ করবেন। যদিও রেহান মনে করছে সব খরচ জাফরুল্লাহ দিচ্ছে। কিন্তু জেনিফা আর রমিজ তেমনটা চাননা।
তাই জাফরুল্লাহ কে বলে, বিয়ের অর্ধেক টাকা দিচ্ছে রমিজ মিয়া।
আর বলছেন।

এসব যেন রেহান না জানে।
সকাল থেকেই বাসায় হৈচৈ। বাসায় অনেক মেহমান এর আনাগোনা।

এইদিকে জাফরুল্লাহ ফোন দিয়ে জেনে নেন, তার ভাই মানিক রাস্তায় আছে, তাই তিনি বাগানে বসে আছেন। ভাইকে ভাইকে আর ভাইয়ের ফ্যামিলির অপেক্ষায়।
জাফরুল্লাহ বাগানে বসে আছেন আর বাসায় আসা পিচ্চিদের খেলা দেখছেন।

পার্ট: ২০

জাফরুল্লাহ বাগানে বসে বসে পিচ্চিদের খেলা দেখছিলেন। আর ভাবছিলেন।
তার বাসায় কবে পিচ্চি আসবে। কবে কেউ তাকে দাদা বলে ডাকবে।
গাড়ির হরণ বেজে উঠে।

জাফরুল্লাহ যখন এসব ভাবনায় মগ্ন, তখন বাসার গেইট দিয়ে গাড়ি ঢুকে।
গাড়ি দেখে জাফরুল্লাহ গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ান।

গাড়ি থেকে রাহুল, সুমা আর তিশা নামে।
জাফরুল্লাহ এর চিনতে ভুল হয় নি।
হসপিটালেই তো এদের সাথে পরিচয়, আর এদের জন্যেই তো তার কলিজা আজ পৃথিবীতে বেঁচে আছে।

রাহুল: আসসালামু আলাইকুম, আংকেল কেমন আছেন?
জাফরুল্লাহ সালামের উত্তর দিয়ে বলেন।
জাফরুল্লাহ: আসতে কোনো সমস্যা হয় নি তো বাবা তোমাদের?

রাহুল: কোনো সমস্যা হয় নি আংকেল।
নিতিন ভাইয়ার সাথে ফোনে কথা বলে বলেই আমরা আসছি।
জাফরুল্লাহ হেসে দেন।

জাফরুল্লাহ: ভিতরে যাও তোমরা।
ওরাও ভিতরে চলে যায়।
জাফরুল্লাহ এখনো গেইটের দিকে তাকিয়ে আছেন।
বছরে কয়েকবার আসে তার ভাই।

ভাইকে খুব ভালোবাসেন। মানিকের মেয়ে গুলোকে নিজের মেয়েই ভাবেন।
জাফরুল্লাহ এর অপেক্ষার অবসান হলো।
মানিকের গাড়ি এসে বাসায় ঢুকে।

জাফরুল্লাহ তাড়াতাড়ি বসা থেকে উঠেন, আর মানিকের গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
মানিক গাড়ি থেকে নেমে তার ভাইকে জড়িয়ে ধরে৷

জাফরুল্লাহ মানিকের মাথায় হাত বোলিয়ে, ভিতরে যেতে বলেন।
মানিকের মেয়ে দুটোকেও জাফরুল্লাহ জড়িয়ে ধরে আদর করেন।
নিজের মেয়েকে পাননি তো, তাই নিজের ভাইয়ের মেয়েদের খুব ভালোবাসেন জাফরুল্লাহ।
দুপুর থেকেই বাসায় হৈচৈ।

জেনিফা রান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন।
একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নিজের রুমে আসেন।
পালঙ্কে বসে পা’দুটো

ঝোলাচ্ছেন।
চোখ বেয়ে হালকা পানি পরছে জেনিফার।
উনি সেদিনের পর শহরের মানুষের প্রতি ঘৃণা জন্মেছিল।
ভাবছিলেন আর কখনো শহরে আসবেন না।

চোখে এসে জমা পানিগুলো গাল বেয়ে পরতে শুরু করে।
রমিজ মিয়া রুমে আসেন লুঙ্গি পাল্টানোর জন্য, বাগানে থাকা গরু দুটোকে সামলাতে গিয়ে কাপড় নষ্ট করে ফেলছেন। তাই পাল্টাতে আসেন।

রুমে এসে দেখেন জেনিফা মন খারাপ করে বসে আছেন।
জেনিফার গাল বেয়ে পানি পরছে, রমিজকে দেখে চোখের পানি মুছে নেন জেনিফা।
রমিজ মিয়া লুঙ্গি পাল্টিয়ে এসে জেনিফার পাশে বসেন।

রমিজ: মন খারাপ?
জেনিফা রমিজের দিকে তাকান, আর রমিজকে জড়িয়ে ধরেই কান্না করে দেন।
রমিজ জেনিফাকে ছাড়িয়ে, উঠে দাঁড়ালেন।

রুমের দরজা বন্ধ করে আসেন।
আবার জেনিফার পাশে গিয়ে বসেন। জেনিফার ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলেন।
রমিজ: কি হয়েছে আমায় বলো?

রমিজের প্রশ্নটা শুনে জেনিফা জলভরা চোখে তাকালেন।
রমিজ আবার বলেন।
রমিজ: মেয়ের বিয়ে তাই কষ্ট হচ্ছে তাই না?

আমারো তো কষ্ট হচ্ছে। তুমি এভাবে ভেঙে পরলে, মুগ্ধা কিভাবে ঠিক থাকবে বলো।
কথাটা বলে জেনিফাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেন।

জেনিফা চুপ করে পৃষ্ঠ হয়ে আছে রমিজের সাথে।
জেনিফাঃ মেয়ের জন্য যে কষ্টটা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে চোখের সামনে অতীতটা ভেসে উঠাতে।

রমিজ জেনিফার পিঠে হাত বোলিয়ে দিয়ে বলেন।
রমিজ: সবার অতীত থাকে, কারো ভাল, আবার কারো খারাপ।
যেমন তোমার অতীতটা।

আচ্ছা আমার ভালোবাসা কি এখনো তোমার কাছে কম মনে হচ্ছে?
রমিজের প্রশ্নটা শুনে, রমিজকে ছেড়ে দিয়ে বলেন।
জেনিফাঃ তোমার ভালোবাসা আমার কাছে বিশাল সমুদ্র। বা তার চেয়ে বেশি।
কিন্তু ওইযে বললে অতীত খারাপ, আর ভাল।

আমার যে খারাপ অতীত।
মনে হলেই যে কষ্ট হয়।
রমিজ: মনে করো কেন?

জেনিফাঃ খুব তাড়াতাড়ি বলবো, কেন মনে করি।
রমিজ জেনিফার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে বলেন।

রমিজ: আমি এটা বলবো না, তুমি তোমার অতীতকে ভুলে যাও।
কিন্তু আমি এটা বলবো, তুমি তোমার অতীতকে মনে করে কষ্ট পেয়ো না।
আমি তোমায় কখনো কষ্টে রাখিনি।

তোমার সব জেনেই তোমায় আমি ভালোবেসেছি।
তাই আমাদের ভালবাসার জন্যেও হলে অতীতকে মনে রেখো না।
জেনিফাঃ হুম।
রমিজ আবার জেনিফার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে, গোসল করার কথা বলে যান।

জেনিফা শুধু ভাবছেন।
তার অতীতেও একটা পুরুষ ছিলো।
আর এখনো একটা পুরুষ আছে।

কিন্তু দু’জনের মধ্যে রাত দিন তফাত।
রাইয়ান এর বাসায়ও অনেক মেহমান এসেছে।
রাতে হলুদ এর অনুষ্ঠান।

রাইয়ান শুয়ে শুয়ে সব দেখছে।
বাসার সবাই কাজ করছে। শুধু রাইয়ান কাজ করছে না। মণিমা বলেছিলো। হলুদের কেক এর অর্ডার দেওয়ার জন্য।

কিন্তু রাইয়ান এর একটা কথাই।
সে বিয়ের বর। সে কেন কাজ করবে।
এর জন্য অবশ্য মণিমার হাতে বকা শুনেছে।

রাইয়ান রুমে বসে বসে ভাবছে কাউকে ফোন দিবে। কিন্তু সে অফলাইনে আছে। দুইবছর এক সাথে থেকেছে, বিয়ের দাওয়াত তো দেওয়া প্রয়োজন।
রাইয়ান এর অপেক্ষার প্রহর কাটলো।
লিজা কে নেটে দেখলো।
সাথে সাথে ফোন দেয়।

লিজা: কিভাবে হঠাৎ মনে পরলো আমার কথা?
রাইয়ানঃ সময় পাইনা, তাই আর কথাও হয় না।
লিজা: কেমন আছো?
রাইয়ানঃ ভালো, বাংলাদেশে আসতে হবে তোমাদের?

লিজা: কেন?
রাইয়ানঃ কাল আমার বিয়ে। বাট তোমাদের সাথে কথা হয়না তাই ইনভাইট করতে পারিনি।
লিজা: কিহহ?
বিয়ে, আর তোমার। তাও কাল।

মোনালিসাকে না তুমি বিয়ে করবা?
রাইয়ানঃ মোনালিসাকেই বিয়ে করবো।

তোমরা আমার মোনালিসাকে দেখলে অবাক হয়ে যাবে।
লিজা: তাই বুঝি?
রাইয়ানঃ হুম
আসবে কি আমাদের দেশে?

লিজা মন খারাপ করে বলে।
লিজা: তোমার মোনালিসাকে আমাদের দেখিয়ে দিয়ো ভিডিও কলে।
বাংলাদেশে আসা পসিবল আমাদের জন্য।
রাইয়ানঃ ওওও,

মন খারাপ করে বললো,
লিজা: মন খারাপ করো না।

আমরা তিনজন মিলে বিজনেস শুরু করেছি। নতুন বিজনেস, বুঝোই তো?
রাইয়ানঃ আচ্ছা তাহলে আমিই হানিমুনে আসবোনে।

রাইয়ান হেসে দেয় কথাটা বলে।
সাথে লিজাও হাসে।

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে, রেখে দেয় ফোন।
রাইয়ান ফোন রেখে মুচকি মুচকি হাসছিলো।
তখন মণিমা আসে।

মণিমাঃ গোসল করেছো?
রাইয়ানঃ না,

মণিমাঃ কখন গোসল করবে?
রেগেই বললো,
রাইয়ানঃ আজ গোসল করবো না।

মণিমাঃ কিহ?
রাইয়ানঃ হুম, আজ খুব ঠাণ্ডা। যদি আমার ঠাণ্ডা লেগে যায়। তাহলে?
তাই গোসল করবো না।

চাইনা বিয়েতে বিলেন হয়ে আমার কোনো অসুখ হোক।
মণিমা রাইয়ানের কথায় অট্ট হাসিতে মেতে উঠে।

বাচ্চামো কথা শুনলে কার না হাসি আসে।
মণিমাঃ আমি কি এই কথা গিয়ে আব্বুকে বলবো?
রাইয়ানঃ এই না না, তুমি না আমার লক্ষী ভাবি।

এইতো গোসল করতে যাবো আমি।
মণিমা হেসে চলে যাচ্ছিলো। রাইয়ান আবার পিছন থেকে ডাকে।
রাইয়ানঃ ভাবি?

মণিমাঃ কি?
রাইয়ানঃ বাসর সাজানোর জন্য ফুল কে আনবে?
মণিমাঃ ওইটা তোমার ভাইয়া বলে দিয়েছে ডেকোরেশন এর লোকদের।
রাইয়ানঃ ভাইয়াকে বলো গিয়ে, সব ফুল যেন ডাবল ডাবল আনে।

মণিমাঃ কেন?
রাইয়ানঃ সেটা পরে জানবে। তুমি শুধু ভাইয়াকে এই কথাটা বলবা।
মণিমাঃ হুম।

মণিমা চলে যায়।
রাইয়ান কিছু একটা কথা মনে করে হাসলো।
গোসল করে এসে মুগ্ধার কাছে ফোন দিবে
রাইয়ান।

সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।
মুগ্ধাকে সাজাচ্ছে সবাই মিলে।
লাবণ্য আর রাহি মুগ্ধার সামনে যাচ্ছে না।

সেদিনের থাপ্পড় এখনো মনে আছে লাবণ্যের।
লাবণ্য আর রাহি মুগ্ধার খারাপ কিছু করবে, এই ভেবেই রেখেছে দুই বোন।
মুগ্ধাকে সন্ধ্যার আগেই মেহেদি পড়াতে হবে।
সন্ধ্যার পর হলুদের অনুষ্ঠান হবে।

বেশি রাত করে করলে, সমস্যা আছে। এই কয়দিন ধরে অনেক ঠাণ্ডা।
আর ছাঁদে তো আরো বেশি ঠাণ্ডা লাগবে সবার।
রেহানঃ কেক তো এখনো আসলো না?

নিতিনঃ ওরা বলছে সন্ধ্যার আগে পাঠিয়ে দিবে।
রেহানঃ সেটা তো আমিও জানি।

কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে তো।
নিতিনঃ আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। তারপর ফোন দিয়ে দেখবো নে।
রেহানঃ হুম।

নিতিনঃ রেহান এবার একটা চান্স নিতে পারিস।
রেহানঃ কিসের চান্স?
নিতিনঃ মেয়ে পছন্দ করার।

দেখ আজ বাসায় অনেক মেহমান।
আর অনেক মেয়েও।
তাই বলছিলাম, যদি তোর কোনো মেয়েকে পছন্দ হয়ে যায়।
নিতিনের কথায় রেহান মুচকি হাসে। আর বলে।

রেহানঃ ভাই’রে কপালে যে আছে। তাকে এমনিতেই পাবো।
নিতিনঃ কচু পাবি।
যারে দেখিস তারেই আপু আপু ডাকিস।
রেহানঃ তো কি করবো?

নিতিনঃ বিয়ের দিন তোর বউকেও আপু ডাকিস?
রেগেই বলল নিতিন।

রেহানঃ এভাবে বলছিস কেন?
আমার আপু থাকলে কি আর কোনো মেয়েকে আপু ডাকতাম?
নিতিনঃ তোর তো বউও নাই। তাহলে মেয়েদের বউ বউ ডাকিস না কেন?
রেহান নিতিনের চুলে ধরে বলে।

রেহানঃ এই সুন্দর চুল যদি তোর মাথায় রাখতে চাস। তাহলে চুপ থাক।
নইলে তোর মাথার চু,
নিতিনঃ এই না ভাই, তুই জীবনেও বিয়ে করিস না।

আর আমিও আর বিয়ের কথা বলবো না।

তারপরেও আমার চুলের দিকে নজর দিস না।
রেহানঃ মনে থাকে যেন।

নিতিনঃ হু,
ওদের কথা বলার সময়।
হঠাৎ কেউ ভিতরে ঢুকে, আর দরজা বন্ধ করে দেয়।
রেহান আর নিতিন তাকিয়ে দেখে।

যারা দরজা বন্ধ করেছে, তারা আর কেউ না।
ওরা হলো লাবণ্য আর রাহি।
মেজাজ খারাপ হয়ে যায় দুজনের।

রেহানঃ দরজা বন্ধ করলে কেন?
লাবণ্যঃ আমাদের ইচ্ছা হয়েছে তাই বন্ধ করেছি।

রেহানঃ তাহলে আমরা বেরিয়ে যাই। তোমরা দরজা বন্ধ করে থাকো।
কথাটা বলে রেহান নিতিনের হাত ধরে চলে যাচ্ছিলো।
তখন লাবণ্য রেহানের হাত ধরে নেয়।
আর বলে।

লাবণ্যঃ আজ হলুদের অনুষ্ঠানে আমি তোমাকে প্রপজ করবো।
আশাকরি উত্তর টা হ্যাঁ দিবা?
রেহান রেগে যায়, তারপরেও কিছু বলে না।
চুপ থাকে।

এখন কিছু করলেই, আরো সমস্যা হবে।
এইদিকে কথাটা শুনে নিতিন মহা চিন্তায় পরে যায়।
সে তো তোহফাকে ভালোবাসে।

যদি রাহিও প্রপোজ করে, আর,
রাহি: আর আমি প্রপোজ করবো তোমাকে।
বুঝেছো?

রেহান আর নিতিন ভাবলো।
এই দুই বোন সব ঠিক করেই এসেছে।
এখন কি করবে তারা।

লাবণ্যঃ যদি উত্তর “না” আসে, তাহলে মুগ্ধার বিয়ে বুঝে নিয়ো হবে না।
নিতিনঃ বেশি হয়ে যাচ্ছেনা এখন।
লাবণ্যঃ এতোকিছু আমরা জানিনা।
রেহানঃ আমি আব্বুকে এখনি সব বলে দিবো।

লাবণ্যঃ আমরাও বলবো।
তোমরা দুজন আমাদের রুমে ডেকে নিয়ে খারাপ কি,
লাবণ্য কথাটা শেষ করতে পারেনি।
তার আগেই দরজায় ধাক্কা দিলো কেউ।
রেহান আর নিতিন ভয় পেয়ে যায়।

এই দুই মেয়ে যদি তাদের উপর কোনো অপবাদ দিয়ে দেয়।
রেহান লাবণ্য আর রাহির দিকে তাকায়।

ওরা শয়তানি হাসি দিচ্ছে।
নিতিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
নিতিনঃ কে?
মুগ্ধাঃ আমি ভাইয়া।

তোমরা দরজা বন্ধ করে কি করছো?
দরজা খুলো।

কিছু প্রয়োজনী কথা আছে।
মুগ্ধার কণ্ঠ শুনে লাবণ্য আর রাহি হালকা ভয় পায়।
নিতিনঃ আসছি দাঁড়া।
মুগ্ধাঃ হুম।
নিতিন গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

মুগ্ধা রুমে ঢুকতেই, নিতিন আবার দরজা বন্ধ করে দেয়।
মুগ্ধা নিতিনের দিকে তাকায় আর বলে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া দরজা বন্ধ করলে কেন?

নিতিনঃ ওই দিকে তাকা?
নিতিনের কথায় মুগ্ধা তাকাতেই দেখে, রেহানের দুই পাশে লাবণ্য আর রাহি দাঁড়িয়ে আছে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া তোমাদের রুমে এই দুটো মেয়ে কি করছে?

রেহান তাড়াতাড়ি করে মুগ্ধাকে সব বলে দেয়।
মুগ্ধা সব শুনে আর বলে।
মুগ্ধাঃ সেদিনের থাপ্পড় এর কথা কি ভুলে গেছো তোমরা?
লাবণ্যঃ কি ভাবছিস তোকে এখন ভয় পাবো?

সেদিন কিছু বলিনি। কিন্তু আজ আর তোকে ভয় পাবো না।
মুগ্ধাঃ ওহ! তাই?
তাহলে তো আবারো কয়েকটা থাপ্পড় দেওয়া প্রয়োজন।

কথাটা বলে সামনের দিকে এগুতে থাকে মুগ্ধা।
মুগ্ধার এগুনো দেখেই লাবণ্য তাড়াতাড়ি নিজের গালে হাত দিয়ে দেয়।
মুগ্ধা তখন মুচকি হাসে আর বলে।

মুগ্ধাঃ বিড়াল যখন, তাহলে বাঘ হবার চেষ্টা করো কেন?
রেহান আর নিতিন মুগ্ধার দিকে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। আর ওই দুটো মেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

মুগ্ধা আবার বলে।
মুগ্ধাঃ সেদিন বলেছিলাম।
আমি প্রতিবাদ করতে জানি।

আর আমার প্রতিবাদ আমি হাত দিয়েই করি।
আর তোমরা কি-না আমার বিয়ে ভেঙে দিবে।

মনে রেখো।
এই মুগ্ধার বয়স কম হতে পারে।
কিন্তু হাত দুটো অনেক শক্ত।

আর একটা কথা। আমার হলুদের অনুষ্ঠানে প্রথম তোমরা দুই বোন আমায় কেক কেটে খাওয়াবে।

এখন তোমরা আসতে পারো।
কথাগুলো বলে, মুগ্ধা দু’জনের হাত ধরে টেনে নিয়ে দরজা খুলে বের করে দেয়।
মুগ্ধার কাণ্ড দেখে রেহান আর নিতিন অবাক হয়ে রয়েছে।

রেহানঃ মুগ্ধা আমরা এই দুটো মেয়েকে ভয় পাই আর তুমি কি-না?
মুগ্ধা মুচকি হাসে, আর বলে।
মুগ্ধাঃ ভাইয়া খারাপের সাথে খারাপ হতে হয়।

তবে সবার সামনে না। যে খারাপ। তার সামনেই খারাপ হবে। লোকেও জানবে না। আর সুখেও থাকবে।
নিতিনঃ আমরা এসব জানতাম না রে।
মুগ্ধা হুহু করে হেসে দেয়।

মুগ্ধাঃ যা বলতে আসছিলাম।
সুমা আপু আমায় মেহেদি পড়াবে। তোমরা
পড়বে কি?

ওরা: না
মুগ্ধাঃ ওও, ভাইয়া একটা কথা বলবো তোমাদের?
নিতিনঃ বল?

মুগ্ধাঃ উনি বলেছেন, আমার হলুদের অনুষ্ঠান
ভিডিও কলে উনাকে দেখাতে। আমি বারবার না করলাম।
তারপরেও শুনেন নি।
রেহানঃ উনি কে?

মুগ্ধা রাগী গলায় বললো,
মুগ্ধাঃ ভাইয়ায়ায়ায়া!
রেহান আর নিতিন হুহুহু করে হেসে দেয়।
রেহানঃ তুমি তোমার উনাকে বলে দাও।

উনার আশা পূরণ হবে।
আবারো দুজন হুহু করে হেসে উঠে।
মুগ্ধা ভেংচি কেটে চলে যায়।
রেহান আর নিতিন এখনো হাসছে।
মুগ্ধার রাগ দেখে।

পার্ট: ২১

সন্ধ্যার আগেই মুগ্ধাকে অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করে নেওয়া হয়।
হাতে মেহেদি।

পড়নে হলুদ শাড়ি।
এক হলুদ রাজকন্যা।
মুগ্ধার মা তার মেয়ের কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দেন।
সত্যিই মুগ্ধাকে খুব সুন্দর লাগছে আজ।

বাসার সবাই মুগ্ধাকেই দেখছে।
রেহান তার রুম থেকে আরো অনেক গুলো শাড়ি এনে দেয় জেনিফার কাছে।
রেহানঃ আন্টি এই শাড়ি গুলো আপনারা সবাই পড়বেন।

বয়স্ক মহিলাদের জন্য আলাদা করে কাপড় এনেছে রেহান।
আর মেয়েদের জন্য এনেছে বেগুনি রঙের শাড়ি।

এটা শুধু হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য।
রেহান তার এক বন্ধুর বোনের বিয়ের হলুদের অনুষ্ঠানে দেখেছিলো।
একটু পরেই হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে। ছাঁদের সব কাজ শেষ।

মুগ্ধা তার রুমে বসে আছে।
পাশে কেউ নাই তার। সবাই সাজুগুজু করতে ব্যস্ত।
মুগ্ধা তার বুবুর কথা ভেবে মন খারাপ করে বসে আছে।

তার স্বপ্ন ছিলো, তার বুবুর বিয়েতে অনেক মজা করবে।
হাসি খুশীতে মেতে উঠবে সে তার বুবুর বিয়েতে।
কিন্তু কখনো সম্ভব হলো না। ঘাতক যে তার বুবুটাকেই কেড়ে নিলো।
মুগ্ধা চোখের পানি মুছে নেয়।

এখন কান্না করতে চায় না সে।
যদি তার মা বা বাবা তাকে কান্না করতে দেখেন। তাহলে ওরাও মন খারাপ করবেন।
তাই সে নিজের চোখের পানি মুছে নিলো।

কষ্ট গুলো ভিতরেই রেখে দিলো।
কিন্তু তারপরেও আজ তার বুবুর কথা বেশিই মনে পরছে।
কি করবে সে, সুখের সময় ভালোবাসার মানুষের কথাই মনে পরে।
মুগ্ধার রুমে কেউ আসে।

তাড়াতাড়ি করে মুগ্ধা নিজের চোখের পানি মুছে নেয়।
পিছন তাকিয়ে দেখে সুমা এসেছে।

সুমা: মুগ্ধা তোকে তো লিপস্টিক দেওয়া হয় নি। আর কাজল।
আমি আর তিশা শুধু তোকে শাড়ি পড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম।

মুগ্ধাঃ আপু আমি এসব দিবো না। এমনিতেই তো ঠিক আছি।
সুমা: তোর ভাইয়ারা আমায় বকবে।
আমি নিতিনকে বলেছি, তোকে সাজানোর কাজ আমার।
মুগ্ধা মুচকি হাসে।

মুগ্ধার মুচকি হাসিতেই যেন মুক্তা ঝরে।
মুগ্ধাঃ আপু! আমি বিয়ের দিনও সাজবো না।
প্লিজ জোর করো না।
সুমা: কি বলছিস এসব?

মুগ্ধার এই কথা শুনলে পৃথিবীর যে কেউ অবাক হয়ে যাবে।
কারণ একটা মেয়ের হাজারো স্বপ্নের মধ্যে একটা স্বপ্ন হলো।
“বউ সাজা”
আর মুগ্ধা না-কি বউ সাজবে না।
মুগ্ধাঃ আপু আমার বউ সাজার কোনো স্বপ্ন নাই।

হ্যাঁ আমি লাল বেনারসি শাড়িতে নিজেকে আবদ্ধ করবো ঠিক।
কিন্তু সাজবো না। ওই লাল বেনারসিতে যতটুকু সুন্দর দেখাবে, ততটুকুই আলহামদুলিল্লাহ।
সুমা: পাগলী!

মুচকি হাসে সুমা।
মুগ্ধা সুমার দিকে অবাক নয়নে তাকায়। আর সেভাবেই তাকিয়ে থাকে।
সুমা কিছু বুঝতে না পেরে, মুগ্ধাকে প্রশ্ন করে।

সুমা: কি?
মুগ্ধা উত্তর না দিয়ে ঠিক একভাবেই সুমার দিকে তাকিয়ে আছে।
সুমা: এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?

আমি কি বেশি সেজেছি?
সুমা নিজের শাড়ি ঠিক করে কথাটা বলে।
মুগ্ধাঃ তোমার মধ্যে আমার বুবুকে দেখতে পাচ্ছি আজ।
কথাটা বলে কেঁদে দেয় মুগ্ধা।

মুগ্ধার কথাটা শুনে সুমার মন খারাপ হয়।
মুগ্ধার বুবুর বয়স বইছে যে তার মধ্যে।
সুমা মুগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে বলে।

সুমা: পাগলী কান্না করছিস কেন?
সবাইকেই তো একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।
কাউকে আগে আবার কাউকে পরে।

কেউ যৌবনে পৃথিবী ত্যাগ করে। আবার কেউ নব্বই বছরে।
মন খারাপ করিস না। তুই যদি এভাবে আজকে কান্না করিস। তাহলে সবাই মন খারাপ করবে।

আর তোর কান্না যদি রাহুল আর তিশা দেখে। তাহলে ওদের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।
ওরা আজো রাহিনের জন্য কান্না করে।

হাজারো চেষ্টা করে পারছি না আমি ওদের স্বাভাবিক দুনিয়ায় নিয়ে আসতে।
সুমা কথা গুলো বলে থামে।
মুগ্ধাঃ আচ্ছা বলো আপু?
কেন হলো এমন?

সব কেন এভাবেই শেষ হয়ে যায়।
এটা প্রকৃতির কাজ না-কি নিয়তির?

সুমা: মুগ্ধা এসব এখন থাক।
আর মনে করিস না এসব। সবাইকে আনন্দ করতে দে?
তোর চোখের দু ফোটা পানিই সবার আনন্দ মাটি করে দিবে।
মুগ্ধাঃ হুম।

সুমা: বস তুই, আমি দেখে আসি তিশার হলো না-কি?
মুগ্ধাঃ হুম।
সুমা চলে যায়।
মুগ্ধা গিয়ে নিজের রুমের আয়নার সামনে দাঁড়ায়।

আর ভাবে।
হলুদের অনুষ্ঠান কেন করা হয়?
এটা কি বিয়ের দিনের অনুষ্ঠানের প্রতি ভয় জিনিসটা কাটানোর জন্য?
আর লজ্জাটা চলে যাবার জন্যে?

ঠিক আজকের মতোই তো কাল সবার সামনে বসে থাকতে হবে।
মুগ্ধা এসব ভাবছে আর নিজেকে আয়নায় দেখছে।
হলুদ শাড়িতে তাকে সত্যিই খুব সুন্দর লাগছে।
কোনো সাজ নেই চেহারায়।

মুগ্ধা নিজের গালে হাত দেয়, আর বলে।
আজকে রাতটাই এই বাসায় শেষ রাত।
কাল দিন পর্যন্ত।
পিছন থেকে নিতিন আসে।
নিতিনঃ ওই বিয়ের কন্যা!

আয়নায় কি দেখা হচ্ছে?
মুগ্ধাঃ দেখছি শাড়িতে বিয়ের কন্যাকে কেমন পেত্নী লাগে।
ভেংচি কাটে মুগ্ধা।
নিতিন এসে মুগ্ধার মাথায় টুকা মারে।

আর বলে।
নিতিনঃ আমার বোন পেত্নী না।
সব চেয়ে সুন্দরী।
মুগ্ধাঃ হইছে!

নিতিনঃ উপরে সবাই অপেক্ষা করছে।
মুগ্ধাঃ হুম চলো।
মুগ্ধা আর নিতিন উপরে যায়।
৭টা বেজে গেছে। মুগ্ধাকে নিয়ে বসানো গ
হয়।

মুগ্ধার সামনে নানান ধরণের খাবার। আর অনেক বড় কেক।
মুগ্ধাকে একা বসিয়ে, সবাই অনেক ছবি তুলছে।
কিন্তু মুগ্ধা এই মেয়েদের মধ্যে কাউকেই চিনেনা।
কারো সাথেই কথা বলেনি।

দুটো মেয়ে এসে মুগ্ধার পাশে বসে আর ফটো তুলছে।
একটি মেয়ে বলে
— আপুটা কত্ত কিউট।
ইশ আমি যদি আপুর মতো হতাম।
মুগ্ধা কথাটা শুনে লজ্জা পায়।

অন্য মেয়ে বলে।
— আপু একটু হাসো। তাহলে ছবিগুলো ভাল আসবে।
মুগ্ধা হালকা হাসলো।
ওরা অনেক পিক তুলে, তারপর উঠে আবার মুগ্ধার পিক তুলছে।
মুগ্ধার সামনে অনেক মানুষ সবাই তার দিকেই

তাকিয়ে আছে। কেউ ফটো তুলছে।
আবার কেউ কেউ এসে মুগ্ধার সাথে পরিচিত হচ্ছে।
রমিজ মিয়া তৈরি হয়েছেন।
কালো পাঞ্জাবি।

এসব রেহানের কাজ।
বয়স্কদের জন্য একটু নরমাল পাঞ্জাবি এনেছে।
কিন্তু তাদের জন্য খুব সুন্দর কাপড় এনেছে।
রমিজের বয়স ৫৫।

মুখে তেমন দাড়ি নেই।
এখনো দেখতে স্মার্ট লাগে।
রমিজ পাঞ্জাবি পড়ছেন, আর আয়নার দিকে তাকিয়ে জেনিফাকে দেখছেন।
মন খারাপ কর বসে আছে।

কালকের আগেও তো সে ভালো ছিলো।
আজ মন খারাপ কেন।
কাল থেকে মন খারাপ।

রমিজ গিয়ে জেনিফার পাশে বসেন।
রমিজ: তৈরি হবে না?

আর কাল থেকে এভাবে চুপ হয়ে আছো কেন?
কি হয়েছে আমায় বলো?
জেনিফাঃ ভয় হচ্ছে আমার।

রমিজ জেনিফার কথার কিছুই বুঝলেন না।
রমিজ: কিসের ভয়?

জেনিফাঃ মুগ্ধার বিয়েটা ভালোয় ভালোয় হয়ে যাক।
তারপর বলবো।

রমিজ আর জানতে ইচ্ছা করলেন না।
রমিজ: তৈরি হয়ে নাও।

সবাই হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আর মুগ্ধার সামনে মন খারাপ করে থেকো না।
ও কষ্ট পাবে।

জেনিফা খুব ভয় পাচ্ছেন।
তারপরেও তৈরি হন।
আর উপরে যান।

বাসার ছাঁদে সবাই আছে।
রেহানঃ এখন তাহলে অনুষ্ঠান শুরু হোক।

রেহান তার বাবার বন্ধুর মেয়ে রনিকে তার ফোনটা দেয়।
রেহানঃ রনি তুই এখন অনুষ্ঠানটা এই ভাইয়াকে (রাইয়ানকে)
দেখা।

রনি: আচ্ছা ভাইয়া।
(রনির বয়স ১৪ হবে)
রেহানঃ সুন্দর করে ফোন ধরে রাখবি।

আর ভাইয়ার সাথে কথা বলবি।এটা তোর দুলাভাই।
রনি: আচ্ছা, আমায় আর বলতে হবে না।
আমি এখন দুলাভাইর সাথে লাইন করবো।

কথাটা বলে হেসে দেয়।
রনির কথা শুনে রেহান আর রাইয়ান হেসে দেয়।
অনুষ্ঠান শুরু হয়।

মুগ্ধা চোখ দিয়ে ইশারা করে লাবণ্য আর রাহিকে, ওদের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হোক।
লাবণ্য আর রাহি কোনো কথা না বলে গিয়ে মুগ্ধাকে কেক খাওয়ায়।
মুগ্ধা কানে কানে বলে।

মুগ্ধাঃ কোনো খারাপ কাজ করার ইচ্ছা থাকলে, এখনি মাথা থেকে ফেলে দাও।
মুগ্ধা কি জিনিস সেটা তো জানোই।

কথাটা বলে মুগ্ধা মুচকি হাসে।
আর লাবণ্য আর রাহি দুটোই মিথ্যে হাসি দেয়।
কারণ সামনে যে সবাই তাদের ফটো তুলতে ব্যস্ত।
জাফরুল্লাহ খুশি হন।

মুগ্ধা প্রথমে উনার ভাইয়ের মেয়েদের নিয়ে কেক কাটলো।
রাইয়ানঃ ওই পিচ্চি এদিক ওদিক ফোন রাখছো কেন।
মুগ্ধার দিকে ফোন ধরো।

রনি রাইয়ানের কথা শুনছে না।
রনি মুগ্ধাকে রেখে সবাইকে দেখাচ্ছে।
রাইয়ানঃ এই মেয়ে এতো পাকনা কেন।

কথাটা মনে মনে বলে।
রনি হাসছে রাইয়ানের অবস্থা দেখে।

তারপর গিয়ে রনি মুগ্ধার সামনে ফোনটা ধরে।
তখন মুগ্ধার পাশে তার বাবা মা ছিলো।
রাইয়ান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
রাইয়ান মুগ্ধাকে চোখ ভরে দেখছে।

রাইয়ানের রাগ হয়। মুগ্ধা একটুও সাজেনি।
কিন্তু তারপরেও মুগ্ধাকে অনেক সুন্দর লাগছে৷
মুগ্ধাকে এক এক করে সবাই কেক খাওয়াচ্ছে।

আর অনেক মজা করছে সবাই।
মুগ্ধার মা বাবা এর পর নিতিনের মাবাবা, তারপর রেহানের মাবাবা মুগ্ধাকে কেক খাওয়ায়।
মানিক আর সোহেলা বেগম দু’জন এসে মুগ্ধাকে কেক খাওয়ায়। মানিক কি যেন গুনগুন করছিলো। মুগ্ধা যদিও সব বুঝতে পারে নি।

হয়তো মুগ্ধাকে বকছিলো।
বয়স্কদের পর এবার সব ইয়াং জেনারেশন এখন।
ওরা সবাই নিচে চলে গেছে। এতো ঠাণ্ডা ওরা সহ্য করতে পারছিলো না।

রেহানের বাবার কয়েকজন বন্ধুর স্ত্রী এখনো ছাঁদে রয়েছেন।
এরা হলেন এমন অনুষ্ঠান প্রেমী।
রেহান আর নিতিন এসে মুগ্ধার দুই পাশে বসে।

মুগ্ধাকে ওরা দু’জন কেক খাওয়ায়। আরো সামনে অনেক ধরণের ফল ছিলো। সেগুলোও খাওয়ায়।
মুগ্ধা হাসছিলো। কারণ সুমা তাকে বলছে। সব সময় মুখে হাসি লাগিয়ে রাখতে।
মুগ্ধাও তাই করছে।

মুগ্ধার হাসি দেখে নিতিন বলে।
নিতিনঃ মুগ্ধা তোর উনি কিন্তু তোকে দেখছে।
মুগ্ধাকে রাগানোর জন্য কথাটা বলে।

মুগ্ধা তখন রেহানকে কেক খাইয়ে দিয়ে নিতিনের জন্য কেক নিচ্ছিলো।
তাই মুগ্ধা রেগে গিয়ে কেক গুলো নিতিনের মুখে লেপটে দেয়।
সবাই চিৎকার করে হেসে দেয়।
এই সিন টা রাইয়ানও দেখছে।

রাইয়ানও হাসছে মুগ্ধার কাজ দেখে।
নিতিনঃ সত্যিই তোর বর সব দেখতেছে।
মুগ্ধাঃ দেখুক, আমার কি?
কথাটা কানে কানে বলে।

এভাবে হাসিখুশির মধ্যে মুগ্ধার হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়।
সবাই অনেক মজা করেছে মুগ্ধার হলুদের অনুষ্ঠানে।
রাত ১০টা সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে।
এই দিকে মানিক তার মেয়েদের শাসাচ্ছেন।

মানিক: বাসায় তোদের বললাম কি? আর এখানে এসে তোরা কিছুই করছিস না?
মানিক কথাটা রেগেই বলেন।
মেয়ে দুটো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
সোহেলা বললেন।

সোহেলা: এখন অন্তত নিজের খারাপ কাজে মগ্ন থেকো না।
তোমার ভাইয়া তোমায় অনেক ভালোবাসেন।
আর তোমার মেয়েগুলোকে।

উনার চোখে যখন ভালো আছো। তাহলে ভালোই থাকো।
আর কোনো খারাপ কাজ করো না।
মানিক নিজের বউয়ের কথা শুনে রেগে গর্জে উঠেন।
মানিক: তুমি সব কিছুতে কথা বলবে না।

আমার যা মনে হয়। আমি তাই করবো।
সোহেলা: পস্তাবে তুমি।
মানিকের রাগী চাহনি দেখে আর কিছু বলার সাহস হয়নি সোহেলার।
মানিক: কালকেই সব করতে হবে।

কোথায় থেকে কোথাকার মেয়ে এসে এখানে ভালোবাসা সম্মান সব পাচ্ছে। কালকে যেভাবেই হোক বিয়েটা আটকাতে হবে।
মানিক মুচকি হাসেন। আর কাকে যেন ফোন দেন।
রাইয়ান এর হলুদের অনুষ্ঠানও শেষ হয়।

এখন ঘুমানোর পালা।
রাইয়ান এর নাজেহাল করে দিয়েছে তার ভাবি। আর তার ভাইয়ের বন্ধুদের বউরা।
ভালভাবে গরম পানি দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়।

মুগ্ধার নাম্বার বের করেও আবার ভাবে মুগ্ধা হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। তাই আর ফোন দেয় নি।
রাইয়ান মুচকি হাসছে৷ তার স্বপ্নের মোনালিসা কালকে রাত তার সাথে থাকবে।
শুধু কালকে না। মৃত্যু পর্যন্ত সঙ্গী পাবে৷ মৃত্যুর পরেও পেতে চায় সে মুগ্ধা নামক মোনালিসাকে।

আস্তে আস্তে সে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।

পার্ট: ২২

সকাল থেকেই দুই বাড়িতে হৈচৈ।

কিছু সময়ের ব্যবধানে দুটো মনের মিলন হবে।
মুগ্ধা ঘুম থেকে উঠে নিজে নিজেই গোসল করে নেয়।

সকাল ৯টা থেকে মুগ্ধাকে সাজাচ্ছে সুমা, তিশা আর রেহানের বাবার দুই বন্ধুর দুই মেয়ে।
মুগ্ধার অসহ্য লাগছে। আর ভয়।
কাল পর্যন্ত সে ভালো ছিলো।
কিন্তু আজ তার ভিতরে অজানা ভয় কাজ করছে।

যদিও রাইয়ান তাকে কখনো কষ্ট দিবেনা। তারপরেও মুগ্ধার ভয় হচ্ছে।
তার মন বলছে, আজ বিয়ের অনুষ্টানে কিছু একটা হবে।
রাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছে মুগ্ধা।
তার বিয়েতে হঠাৎ আগুন লেগে যায় বাসায়।

এই স্বপ্ন যে কেউ দেখলেই ভয়ে ভয়ে থাকবে।
আর মুগ্ধার ভয়টাতো সেখানে অস্বাভাবিক না।
তারপরেও যতোটা সম্ভব নিজেকে সংযত রাখছে।

সুমা মুগ্ধার সাথে মজা করতেছে।
সুমা: মুগ্ধা আমি তোর বড় হয়েও আজ অবিবাহিত। আর তুই কিনা আমার এতো ছোট হয়েও,

হুহু করে সুমা হেসে দেয়।
মুগ্ধা লজ্জা পাচ্ছে।
তিশা বললো,

তিশা: লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম না করে, মুখ ফুটে বলতেই তো পারো আব্বুকে ভাইয়ার কথা।
মুগ্ধার ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে দিতে বললো,
যদিও মুগ্ধা চায় নি সাজতে।
তারপরেও সবার কথায় হালকা সাজবে সে।
তিশার কথায় সুমা চোখ বড়বড় করে তাকায়।

মুগ্ধা অবাক হয় তিশার কথায়।
মুগ্ধাঃ আপু বলেন তো কি কথা?
সব শুনবো।
সুমা অবাক হয়ে তাকাচ্ছে এখনো।

তিশা আবার কি বলবে।
তিশা সুমাকে অবাক করে দিয়ে বলে।
তিশা: সুমা আপু তো আমার ভাইয়ার সাথে প্রেম করে।
তাও আবার লুকিয়ে।

আর লুকিয়ে প্রেম করলে তো এমন হবেই।
মুগ্ধাঃ কেমন?
তিশা: বুড়ি হবে, কিন্তু বিয়ে হবে না।
কথাটা বলে তিশা হেসে দেয়।

সাথে সবাই হাসছে, শুধু সুমা ছাড়া।
সে ভাবছে। তিশা কিভাবে জানলো এসব।
সুমা: তুই মুগ্ধাকে সাজাবি নাকি বাজে বকে যাবি।
তিশাকে কথাটা বলে।

তিশা: আমি আব্বুকে বলবো নে তোমদের কথা।
হিহি করে আবার হেসে দেয়।
মুগ্ধাকে লাল টুকটুকে শাড়ি দিয়ে বউ সাজিয়ে রেখেছে।

মুগ্ধাকে আজ এমন সুন্দর লাগছে।
যা বর্ণনা করার বাহিরে।
রাইয়ান মুগ্ধাকে দেখে কেমন হবে, এটা রাওয়াম নিজেই হয়তো জানে না।
রাহুলের বাবা মা আসছেন।

রাহুল সকালে গিয়ে নিয়ে এসেছে।
ওরা বাসায় এসে সবার সাথে পরিচিত হন।

জেনিফা আর রমিজের পাশাপাশি বসে আছেন রাহুলের বাবা মা।
জেনিফাঃ ভাইজান আসতে তো কোনো সমস্যা হয়নি?

আশরাফ: না, রাহুল সাথে ছিলো তো, তাই কোনো সমস্যা হয় নি।
চারজন চুপ হয়ে বসে আছেন জেনিফার রুমে।

আজকে হয়তো তাদের সম্পর্কটা হতো বেয়াই বেয়াইন এর।
কিন্তু সেটা তো আর হলো না।

দুটো ফ্যামিলিই যে হারিয়েছে তাদের কলিজা নামক দুটো শব্দ, দুটো মানুষ।
আমিনা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন।

আমিনা: বোন আপনার মেয়ের কোনো ছবি আছে?
খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আমার পাগল ছেলের ভালবাসাটাকে
কথাটা বলে আমিনা কেঁদে দেন।

আশরাফ আমিনার কাঁধে হাত রাখেন। চোখ দিয়ে ইশারা করেন, কান্না না করতে।
জেনিফাঃ হ্যাঁ আছে। আমি নিয়ে আসছি।

জেনিফা কথাটা বলে উঠে দাঁড়ান।
আর আলমারির সামনে গিয়ে আলমারিতে খুব যত্ন করে রাখা, নিজের মেয়ে নিশির কয়েকটা ছবি নিয়ে আসেন।

রমিজ মিয়া যেখানে কাজ করতেন, সেখানের জায়গাটা ছিলো খুব সুন্দর।
চার দিকে পাহাড়ের মতো উঁচু উঁচু টিলা।
আর সেই টিলা গুলোতে চা’পাতার গাছ।
সত্যিই অসাধারণ জায়গা।

রমিজ নিজের মেয়ে গুলোকে নিয়ে যেতেন ছবি তোলানোর জন্য।
জেনিফা নিজের মেয়ের পিকগুলো আমিনার কাছে দেন।
আমিনা নিশির পিক দেখছেন৷ আর চোখ থেকে টপটপ করে পানি ফেলছেন।
সত্যিই নিজের ছেলের পছন্দ ছিলো।

দুটো ছবি আশরাফের কাছে দেন, আশরাফও নিশির পিক দেখছে, আর চোখে হালকা পানি জমেছে।
ওদের ভালোবাসা ছিলো অসীম।

তাই তো একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজনও পৃথিবীতে থাকতে পারেনি।
আমিনা: বোন! আমি কয়েকটা পিক নেই। প্রতিটা সকাল না হয়। এই ভালোবাসার মুখ গুলো দেখে শুরু করবো।
আমিনার কথায় জেনিফা আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারেন নি।

আমিনা আর জেনিফার কান্না দেখে, রমিজ আর আশরাফ শান্তনা দিচ্ছেন।
ছেলেমেয়েদের সামনে কান্না করলে ওরাও তো ভেঙে পড়বে।
এই কথাগুলো বলছেন দু’জন।
ঘড়ির টাইম ঠিক ১২টা বাজে।

জাফরুল্লাহ এর বাসা আজ উৎসবে মেতে উঠেছে।
বাগানে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।
বরের বসার জায়গাও বাগানে করা হয়েছে।

সব সামলাচ্ছে রেহান, নিতিন, রমিজ, জাফরুল্লাহ আর আজিজুল।
সবার মুখেই হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে।
১২:৩০এ রাইয়ানকে বর সাজিয়ে নিয়ে আসা হয়, রাইয়ান এর পিছনে আরো ৭টা গাড়ি ছিলো।

ওরা সব মিলিয়ে ৪০ জন এসেছে।
মেরহাব সবাইকে ইনভাইট করেছে। আর সবাই এসেছে, মেরহাব তার ছেলের বিয়েতে ৪০জন মানুষ নিয়ে এসেছে।

কারণ সে বউভাতে সবাইকে রাখবে, তাই এখানে ৪০জন নিয়ে এসেছে।
মেরহাব এর সব মেহমান তার বাসায় রয়েছে।
রাইয়ানকে বিয়ের প্যান্ডেলে বসানো হয়।

তার মুখে মুচকি হাসির রেখা বইছে।
কিন্তু একটুপর কি হবে সেটা রাইয়ান নিজেই জানে না।
মুগ্ধাকে রেহান বলে গেছে, বর এসেছে।
মুগ্ধার ভয়টা ক্রমশ বাড়ছেই।

কিন্তু এই অজানা ভয়টা কেন করছে, সেটা মুগ্ধার অজানা।
শুধু ভাবছে, দুঃস্বপ্ন কেন দেখলো সে।

মণিমা, তোহফা আর রাইয়ান এর ভাইয়ের বন্ধুরা আর তাদের বউরা একে একে সবাই এসে মুগ্ধাকে দেখছে। কেউ কেউ পিক তুলছে।

মণিমাঃ মুগ্ধা তোমায় আজ অনেক অনেক সুন্দর লাগছে।
জানিনা রাইয়ান এর অবস্থা কি হবে।
মুগ্ধা মণিমার কথা শুনে লজ্জা পায়।

তোহফাঃ আমি কি ভাবি ডাকবো পিচ্চিটাকে।
মণিমাঃ নন্দিনী পিচ্চি ডাকবা না। এখন তোমার বড় ভাইয়ের বউ।
তোহফা হেসে দেয়।

তোহফা হাসছিলো। তখন দরজার দিকে তাকায় সে৷ সেখানে নিতিনকে দেখে, তোহফা ইশারায় বুঝালো
একটু পর সে তার সাথে দেখা করবে।
মণিমাঃ দেখি দেখি বিয়ের কনে আমাদের দিকে তাকাও তো। সুন্দর করে টাসটাস করে কয়েকটা পিক তুলে নেই।

মণিমার কথা শুনে, রুমে থাকা সবাই হেসে দেয়।
বিকেল ৩টা বাজে।
সবার খাবার শেষ।
আর বিয়ের সব কাজো শেষ।

এখন শুধু রাইয়ান আর মুগ্ধাকে মিলানোর সময়, আর মালা পড়ানোর সময়।
মুগ্ধা প্রায় পাঁচ মিনিট লাগিয়েছে কবুল শব্দটা বলতে।
ভালোবাসার মানুষের সাথেই তার বিয়ে হচ্ছে। তারপরেও এই তিন অক্ষরের শব্দটা বলতে এতক্ষণ সময় লাগায়।

এবার দু’জনকে মিলানো সময়।
মুগ্ধাকে সুমা আর নিতিন বাগানে নিয়ে আসে।
সবাই এখন বাগানে বসে আছে।

মুগ্ধা আর রাইয়ানকে এক সাথে দাঁড় করানো হয়েছে।
সবাই ওদের পিক তুলতাছে।
সোহেলা বেগম চারদিকে অনেক্ষণ ধরেই তাকাচ্ছেন।
মানিককে কোথাও দেখতে পাননি।

সোহেলা মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে, এই খারাপ লোকটা কোথায় গেলো।
খারাপ কোনো মতলব হাসিলের জন্য কোথায় যায় নি তো?
সোহেলা রাতের কথা গুলো রামিছাকে বলে দিয়েছেন সকালে।
রামিছা সব শুনে বলেন।

মানিক যদি আজ কিছু করে, তাহলে রেহানের বাবার সব সম্মান মাটির সাথে মিশে যাবে।
সোহেলার সাথে রামিছাও চারদিকে তাকাচ্ছেন। মানিককে সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছেন।
রাইয়ানের এক পাশে তোহফা আর মণিমা দাঁড়িয়ে আছে। আর মুগ্ধার পাশে জেনিফা আর আয়েশা।

ওরা সবাই মুগ্ধা আর রাইয়ানকে মিলিয়ে দেয়।
রাইয়ান যখন মুগ্ধার দিকে তাকায়। তখন সে অনেক বড় ধাক্কা খায়।

মুগ্ধাকে এতো সুন্দর লাগছে। রাইয়ান যখন মুগ্ধাকে মালা পড়াবে। তখন দুই মিনিটের মতো মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
যেটা সবাই এনজয় করছিলো।
আর তখন তোহফা বলছিলো।

ভাইয়া বাসায় গিয়েও দেখতে পারবে। তোহফার কথায় রাইয়ান খুব লজ্জা পায়।
এবার রাইয়ান আর মুগ্ধাকে বিদায় দেবার পালা।
কিন্তু তখনি পরপর তিনটে গাড়ি এসে বাসায় ঢুকে।
প্রথম গাড়ি থেকে মানিক বের হয়।

আর তার পরের দুই গাড়ি থেকে সিয়াম সহ আরো ১০জন মানুষ বের হয়।
মানিকের সাথে এতো মানুষ দেখে অবাক হন সবাই।
তার পিছনে সবার হাতে ছিলো হকিস্টিক।
যেটা সবার দৃষ্টি কাড়ছিলো।

এসব দেখে সোহেলা আর রামিছার ভিতর কেঁপে উঠে।
সোহেলা যখন নিজের বড় বোনের ছেলে সিয়ামকে দেখলেন।
তখনি বুঝে নেন খারাপ কিছু হবে।
জাফরুল্লাহ সামনের দিকে এগিয়ে আসেন।

যদিও মানিকের চোখ একজনকে দেখতে পায় নি।
নয়তো তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তো।
জাফরুল্লাহ: মানিক এসব কি?

মানিক মুচকি হাসে, আর বলে৷
মানিক: ভাইয়া বিয়ে তো আর এমনি এমনি হবে না।

আমার উদ্দেশ্য পূরণ হবার পর ওরা বউ নিয়ে এখান থেকে যাবে। নয়তো,
কথাটা বলে মানিক অট্টহাসি দেয়।

মানিকের কথা শুনে, রমিজ আর জেনিফা অবাক হন। যদিও জেনিফা প্রথম থেকেই ভয় পাচ্ছিলেন। তাইতো কাল রাতেই,
জাফরুল্লাহ চিৎকার দিয়ে উঠেন।

জাফরুল্লাহ: কি বলছিস তুই?
তোর মাথা ঠিক আছে?
মানিক: চিৎকার করো না ভাইয়া।

নয়তো আজ এখানে খুব খারাপ কিছুই হবে।
মানিকের এই পশুর রূপ দেখে জাফরুল্লাহ খুব অবাক হন।
রেহান আর নিতিন সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।

সিয়াম: মামা এতো কথা বলছো কেন?
কাজের কথা বলো।
মানিক: অপেক্ষা কর।

ভাইয়া এই প্রশ্নের উত্তর দাও।
ছোট লোকদের কেন বাসায় ঠাঁই দিয়েছো।

মানিকের কথাটা শুনে বুঝতে বাকি নেই কারো।
কারণ কথা গুলো যে মুগ্ধা আর নিতিনের বাবামাকে বলেছে।
মুগ্ধার প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করছে।
কিন্তু সে যে আজ বিয়ের কনে।

মানিক আবারো কিছু বলতে যাবে৷ ঠিক তখন তার চোখ আটকে যায় রাইয়ানের পাশে বসা মেয়েটির দিকে।
মানিক অবাক হয়।
মনে হলো সে আকাশ থেকে পড়েছে।

মানিক হাত দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে বলছে।
মানিক: এই মেয়ে এখানে কে করছে? ইশারাটা তোহফার দিকে করে।
রাইয়ানঃ এই মেয়ে না ও, এ হলো তোহফা আমার বোন।

রাইয়ান অনেক্ষণ ধরেই এসব দেখছে।
কিছু বলছিলো না।
কিন্তু এখন আঙুল তার বোনের দিকে তোলা হয়েছে।

তোহফা কোনো কিছুই বুঝেনি।
রাইয়ানের কথা শুনে মানিক অট্টহাসি দেয়।
আর বলে।

মানিক: এই মেয়ে কার বোন, সেটা জানতে চাইনি।
সিয়াম যা মেয়েটাকে ধরে নিয়ে আয়।
আর শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে দে।

কথাটা বলেই অট্টহাসিতে মেতে উঠে মানিক।
তোহফাকে নিয়ে এমন কথা বলায় রাইয়ানের রাগ চরম পর্যায়ে উঠে যায়।

সিয়াম এক পা এক পা করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তোহফা ভয় পেয়ে যায়। আর রাইয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে।

সব মানুষ দর্শক এর ন্যায় দেখছে।
নিতিন এবার মুখ খুলে। আর বলে।
নিতিনঃ কেউ তোহফার শরীরে হাত দিবে, তাহলে আমি তার হাত শরীর থেকেই আলাদা করে দিবো।

আর এক পা’ও সামনে আসবিনা।
যেখানে আছিস, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক।
নিতিনের কথা শুনে তার বাবামা সহ সবাই অবাক হয়।
নিতিন কেন নিজেকে এসবে জড়াচ্ছে।

মানিক: ওই ছোট লোকের বাচ্ছা, তুই এর মধ্যে জড়াচ্ছিস কেন?
নিতিন মানিকের কথা শুনে খুব রেগে যায় তারপরেও নিজের রাগকে সামলিয়ে রাখে, আর অট্টহাসি দিয়ে বলে।

নিতিনঃ আমার সামনে আমার ভালোবাসাকে মারার হুমকি দিচ্ছিস, আর আমি চুপ করে থাকবো।
মানিক আবার কিছু বলতে গেলেই৷ জাফরুল্লাহ বলেন।
জাফরুল্লাহ: মানিক কি শুরু করছিস তুই?
কি চাস তুই?

মানিক: কিছুই চাইনা।
আমি শুধু চাই তোমার এই অঢেল সম্পত্তি। আর কিছুই না।
মানিকের কথা শুনে জাফরুল্লাহ আকাশ থেকে পরেন।
তার ভাই তাকে এসব বলছে।
যে ভাইকে এতোদিন ভালোবেসে এসেছে।

সেই ভাই আজ সম্পত্তির লোভে, তার সব মানসম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিলো।
মানিক: সিয়াম তোকে কি বলছি? তোর কানে যায় না। যা এই মেয়েটিকে নিয়ে আয়।
জাফরুল্লাহ: তোর সম্পত্তি চাই। নিয়ে নে সব সম্পত্তি। এই মেয়ের সাথে তোর কিসের শত্রুতা।

মানিক: আজ সব সত্য কথা বলবো।
আগে কাগজ গুলোতে সাইন করে দাও।
এখন না করলেও সমস্যা না। সব আজ জোর করেই নিবো।
রেহানঃ আব্বু কি বলছে এসব এই লোকটা। তুমি সব চুপ হয়ে শুনে যাচ্ছো।
মানিক: চুপ থাক তুই(মানিক)

দুইবার তো মরে মরেও বেঁচে গেছিস।
একদিন তো তোকে একটা ছেলে বাঁচিয়ে ছিলো।
আর সেদিন তো মরার রাস্তা থেকেও বেঁচে এসেছিস।

আমি চেয়েছিলাম তোকে শুধু হাত পা ভেঙে বসিয়ে রাখতে। কিন্তু,
রেহান তার চাচার মুখে এসব কথা শুনে খুব অবাক হয়। তার চাচা তাকে মারতে চেয়েছে।
জাফরুল্লাহ তার ভাইয়ের মুখে এসব শুনে হতবাক হয়ে যান।

শুধু সম্পত্তির জন্য নিজের ভাতিজা কে মারতে চায়।
জাফরুল্লাহ: যা কর‍তে পারিস কর। তোকে আমি এক আনা সম্পত্তিও দিবো না।
খুব ভালোবাসতাম তোকে।

আর তুই কিনা আমার ফ্যামিলির সাথে এসব।
জাফরুল্লাহ কথাটা বলে কেঁদে দেন।
মানিক হাসছে, আর বলছে।
মানিক: মারতে চাইনি তো, শুধু হাত পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম।

আরো একটা কথা জানো।
এই তোহফা মেয়েটা কে জানো?
জাফরুল্লাহ মানিকের দিকে তাকান।
মানিক: এই তোহফা মেয়েটাই তোমার হারিয়ে যাওয়া সেই নূপুর।

যাকে আমি চুরি করিয়েছিলাম আর আশ্রমে রেখেছিলাম।
কতো কিছুই না করেছি এই সম্পত্তির জন্য। তোহফাকে তো আমি নিজে টাকা দিয়ে আশ্রমে অত্যাচার করাতাম।
কি না কি করলাম এই সম্পত্তির জন্য।
আর স,

কথাটা বলতে না দিয়েই থাপ্পড় দেয় মানিকের গালে। সে আর কেউ না রেহান।
এসব শুনে কে ভালো থাকবে। পরপর দুটো থাপ্পড় দেয় রেহান মানিককে।
সিয়াম এসে রেহানকে ধরে রাখে।
রামিছার কানে মানিকের কথা গুলোই বাসছে।

এই মেয়ে আর কেউ না। এই মেয়েই হলো নূপুর। হারিয়ে যাওয়া নূপুর।
রামিছা দৌড়ে গিয়ে তোহফাকে জড়িয়ে ধরেন।
তোহফা ভাবেনি কখনো। এরাই তার মাবাবা রেহান তার ভাই।

রামিছা কান্না করছেন তোহফাকে জড়িয়ে ধরে।
শতশত মানুষ আজ তাজ্জুব। এই সব দেখে।
জাফরুল্লাহ কে আরো দুইজন মিলে ধরে রাখছে।
রেহানঃ আমি তোকে ছাড়বো না।

তুই আমার থেকে আমার আপুকে দূরে রেখেছিস।
রেহান এসব বলছে আর চিৎকার করছে।
মানিক হাসছে।
মানিক: এই বিয়ে তো কখনো হবে না।

কিভাবে বিয়েটা হবে। নিজের শত্রুর মেয়েকে কিভাবে এই বাসা থেকে বিয়ে দেই।
কথাটা বলে আবার অট্টহাসি হাসে।
মানিকের কথাটা কেউ বুঝেনি।
শুধু একজন ছাড়া, আর সে হলো জেনিফা।

জেনিফার বিশ্বাসঘাতকটা আর কেউ ছিলো না।
সে হলো এই মানিক।
যে জেনিফার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছিলো।

জেনিফা গরিব ছিলো বলে, তাকে অনেক অপমান করেছে মানিক।
জেনিফা এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
যখন মানিককে বাসায় দেখেছেন। তখন থেকেই ভয়ে ছিলেন।
অতীত৷ বারবার মনে হচ্ছিলো।

ভয় করছিলেন।
মানিক মেয়ের বিয়েতে তো কোনো খারাপ কিছু করবে না।
কিন্তু সেটাই হলো। আর
খুব ভয়াবহ।
রমিজ: কে আপনার শত্রু?

মানিককে প্রশ্ন করেন।
মানিক: কে আর হবে।
আপনার স্ত্রী আর আমার আগের প্রেমিকা।

মানিকের কথা শুনে মুগ্ধার রাগ চরম পর্যায়ে উঠে যায়।
এই দিকে মেরহাব আর এসব সহ্য করতে পারেন নি।
একটু দূরে গিয়েই মেরহাব পুলিশকে ফোন
দেন।

আর বলেন সব। পুলিশ খবর শুনে, তাড়াতাড়ি আসার আশ্বাস দেয়।
মেরহাব ভাবেন নি নিজের ছেলের বিয়েতে এসব হবে।
একটা লোক এতোটা খারাপ হয়।

মানিক জেনিফাকে নিয়ে অনেক খারাপ খারাপ কথা বলছে।
মানিক এটাও বলছে রাইয়ানের সাথে মুগ্ধার বিয়ে না। হলে উনার মেয়ে লাবণ্যর বিয়ে হবে।
জেনিফা নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।

কিছু বলার শক্তি পাচ্ছেন না।
মানিক নিজেকে বাঘ মনে করছে।
কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না।
মানিকের লোক গুলো নিতিনকেও ধরে রাখে।
রাইয়ান কিছু বলছে না।

তার বাবা বলেছে। উনি পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছেন।
মানিক জেনিফাকে নিয়ে অনেক বিশ্রী কথা বলতে শুরু করে।
রমিজ মিয়া প্রতিবাদ করতেই। মানিকের লোক রমিজকেও ধরে।
জেনিফার বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।

কোনো কুকুর তাকে নিয়ে বিশ্রী কথা বলছে।
এই দিকে মুগ্ধার এসব সহ্য হচ্ছে না।
মুগ্ধা একবার তার মায়ের দিকে তাকায় আর একবার তার বাবার দিকে।

দু’জনি নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
মুগ্ধা আর দাঁড়িয়ে থাকেনি।
পা থেকে নিজের জুতা জোড়া খুলে, আর দৌড়ে গিয়ে, মানিকের গালে আর শরীরে মারতে শুরু করে।

এক সাথে কয়েকটা মারে মুগ্ধা।
সে সহ্য করতে পারেনি তার বাবা মায়ের অসম্মান। তাই তো জ্বলে উঠেছে।
বিয়ে বাড়িতে বিয়ের কনের এমন কাজ দেখে সবাই অবাক হয়।

রাইয়ান সহ তার বাবা ভাইও।
মুগ্ধার সাহস দেখে মেরহাব মুচকি হাসেন।
মুগ্ধা আবারো জুতু দিয়ে মারে মানিককে।

আবার মারতে গেলে থাপ্পড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় মুগ্ধাকে।
রাইয়ান উঠে দৌড়ে এসে মুগ্ধাকে তুলে।
মুগ্ধা মানিকের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে।
এখনো সবাই অবাক।

রমিজ আর জেনিফা দু’জনি মুগ্ধ মুগ্ধার এমন সাহস দেখে। একটু ভয়ও পাচ্ছে।
এই খারাপ লোক তাদের মেয়ের সাথে কি করবে।

পার্ট: ২৩ (অন্তিম)

মুগ্ধা বলতে শুরু করে।
মুগ্ধাঃ যে খারাপ, সে সব দিক দিয়েই খারাপ হয়।

ইচ্ছা করলেও ভালো হয় না।
আর তুই হলি সেই খারাপ লোক।
একজনের সাথে খারাপ কাজ করিস নি তুই।

তুই আমার আম্মাকে অপমান করেছিস, শুধু আমার আম্মা গরীব ছিলো বলে।
আমার আম্মার সাথে তুই প্রেমের অভিনয় করে তিলেতিলে সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিলি।

তুই তোহফা আপুকে তার মাবাবা আর ভাইয়ের কাছ থেকে আলাদা রেখেছিস এতোটা বছর।
আলাদা রেখেছিস মা বাবার ভালোবাসা থেকে।
তুই বারবার মারতে চেয়েছিস রেহান ভাইয়াকে।
তুই এতোটাই খারাপ। যা ভালো নামক ডিকশিনারির বাহিরে।

আর তোর মতো তোর দুই মেয়েকে খারাপ লম্পট বানিয়েছিস।
মুগ্ধা কথা গুলো বলে থামে।
প্রতিটা কথা গিয়ে মানিকের গায়ে লাগে।

সোহেলা বেগম চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।
নিজের স্বামীর এমন খারাপ খারাপ কাজের কথা শুনে লজ্জা আর মন খারাপ দুটোই হচ্ছে।
মানিক মুগ্ধার কথা হজম করতে পারেনি।

তাই তো পশুর মতো আচরণ করতে শুরু করে।
মানিক মুগ্ধাকে মারতে হাত উপরে তুললে।

রাইয়ান মানিকের হাত ধরে আর বলে।
রাইয়ানঃ মুগ্ধার শরীরে কারো হাত উঠলে সেই হাত হবে আমার।
অন্য কারো না।

রাইয়ান কথাটা বলে মানিকের হাতটা নামিয়ে দেয়।
আর তখনি বাসার গেইট দিয়ে দুটো পুলিশের গাড়ি ঢুকে।
রাইয়ানের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
গাড়ি থেকে পুলিশ নেমে আসে।

তখন রাইয়ান বলে।
রাইয়ানঃ অফিসার নিয়ে যান এই কয়টা কুকুরকে।

রাইয়ান এর কথা শুনে সিয়াম পালাতে নিলে, পুলিশ ওরে ধরে নেয়।
সব কয়টাকে পুলিশ ধরেছে।
তখন জাফরুল্লাহ চোখের পানি মুছলেন। আর বললেন।

জাফরুল্লাহ: ছোট থাকতেই বাবা মারা গিয়েছিলেন।
মা তখন খুব অসহায় হয়ে পরছিলেন।
দুইটা ছেলেকে কিভাবে বড় করবেন।

তখন আমি পড়ার পাশাপাশি ঠেলাগাড়ি চালিয়েছি। এখানে ওখানে কাজ করেছি।
শুধু মা আর তোর যেন কোন কষ্ট না হয়।
ছোট থাকতে থেকেই তোর সব আবদার আমি রেখেছি।
কখনো মানা করেনি।

এই জাফরুল্লাহ তালুকদার এর বাড়ি-গাড়ি এমনি এমনি হয় নি।
তিলতিল করে গড়ে তুলেছি সব।
জানিস তোকে খুব ভালোবাসতাম।
যদি আমার সম্পত্তি চাইতি।

তাহলে আমি হাসিমুখে দিয়ে দিতাম।
কিন্তু তুই আমার সম্পত্তির জন্য আমার মেয়েকে আমার থেকে এতোটা বছর আলাদা রেখেছিস।

আমার মেয়েকে মাবাবার ভালোবাসা পেতে দিলি না তুই।
শুধু আমার সম্পত্তির জন্য আমার ছেলেকে দুইবার মারতে চেয়েছিস।
কিন্তু তুই ভুলে গেছিস।
পাপের শেষ আছে, সেটা খুব ভয়াবহ।

নিয়ে যান অফিসার। আর কঠিন শাস্তি চাই আমি।
জাফরুল্লাহ এর কথা গুলো সবার চোখে পানি এনেছে, নীরবে কান্না করছেন রামিছা আর তোহফা।

তোহফা এখনো তার মায়ের সাথে মিশে আছে।
অফিসার মানিক আর ওই সিয়াম আর তার সঙ্গভঙ্গ দের নিয়ে যায়।

সোহেলা আর মানিকের দুই মেয়ে এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
হয়তো মানিকের মেয়েগুলোর চোখ আলোর খুঁজ পাবে। তার বাবার শাস্তি দেখে তারাও পাল্টে যাবে।

জাফরুল্লাহ গিয়ে তোহফাকে জড়িয়ে ধরেন।
রেহান তার আপুকে জড়িয়ে ধরে একের পর এক চুমু খাচ্ছে তার আপুর কপালে।
আর চিৎকার করে কান্না করছে, আর বলছে।

রেহানঃ আম্মু আব্বু কেন এতোটা দিন লুকিয়ে রেখেছো আমার থেকে এই সত্য কথাটা?
কেন বলো নি আমারো আপু আছে?
জাফরুল্লাহ: কষ্ট পাবি তাই লুকিয়ে রেখেছি।
রেহানঃ আমি কি সুখে ছিলাম?

যখন কোনো ভাইবোনের ভালোবাসা দেখতাম।
তখন লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করতাম।
আল্লাহ এর কাছে শুধু এটাই বলতাম।

কেন আল্লাহ আমায় একটা আপু দেন নি।
যখন কোনো আপু তার ভাইকে ভালোবাসত, আদর করতো।
তখন সেই দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

আব্বু আমার সব আছে, বাড়ি গাড়ি, টাকা পয়সা, সব আছে, নেই শুধু একটা আপু। সব ভালোবাসা পেয়েছি। পাইনি শুধু আপুর ভালোবাসা।

তাইতো সব সময় সব মেয়েদের আপু আপু ডাকতাম।
আমারো আপু আছে, কিন্তু এতোটা বছর আমি পাইনি আপুর ভালোবাসা।
পারবে কেউ প্রতিটা রাতের চোখের পানি ফিরিয়ে দিতে।

যখন একটা আপুর জন্য শব্দ করে কান্না করতাম। তখন নিতিন বুঝাতো। তারো বোন বা আপু নাই।
এটা বলতো আমায়।

কিন্তু তার চাচাতো বোনরা তাকে খুব ভালবাসতো।

আমারো তো চাচাতো দুই বোন ছিলো। কিন্তু একটু ভালোবাসা পাইনি।
সারাক্ষণ আমার কিভাবে ক্ষতি করবে, সেই চিন্তায় থাকতো।

কথা গুলো বলে থামে রেহান। রেহানের কথা শুনে সবার চোখে পানি এসেছে।
একটা ছেলে শুধু আপুর জন্য এতো কিছু করবে।
যার টাকা পয়সা এর অভাব নেই। সেও কান্না করতো শুধু একটা আপুর জন্য।
তোহফা রেহানকে জড়িয়ে ধরে আর বলে।

তোহফাঃ কারো মুখে আপু ডাক শুনে যেদিন আমার ভিতর কেঁদেছিলো, সেটা তুমি।
তোমার আপু ডাক শুনেই আমার ভিতর কেঁদে উঠেছিলো।
তোমার এক্সিডেন্ট এর খবর শুনে শব্দ করেই কেঁদেছি।
কারো বুকে মাথা রাখিনি কখনো। আমার জীবনটা কেটেছে আশ্রমে।
যেখানে প্রতিনিয়ত আমায় অত্যাচার করা হতো।

যেদিন প্রথম আমায় জড়িয়ে ধরেণ আম্মু (রামিছা) সেদিন ভিতরে এক অজানা শান্তি পেয়েছি। এটাই হয়তো রক্তের টান।
মা মেয়ের টান। ভাই বোনের টান। বাবা আর মেয়ের টান।

কথাগুলো বলে তোহফা তার ঠোঁটজোড়া রেহানের কপালে ছুঁয়ে দিলো।
রেহান চোখ বন্ধ করে নেয় তার আপুর ভালবাসার পরশ পেয়ে।
এটাই তো চেয়েছিলো সে। এই ভালবাসাইতো চায় সে।
ঘড়ির টাইম ৫টার কাছাকাছি।
সবাই এতক্ষণ এসব দেখছিলেন।
মেরহাব এবার বলেন।

মেরহাব: আমাদের তো বিদায় দিতে হবে।
কুয়াশা পড়েছে খুব।
মুগ্ধার বাবা বলেন।

রমিজ: হুম,হ্যাঁ!
ভাইজান! মুগ্ধাকে তো বিদায় দিতে হবে।
জাফরুল্লাহ কে কথাটা বললেন।

জাফরুল্লাহ: হ্যাঁ! তাই তো, মেয়েকে পেয়ে সব ভুলে গিয়েছি।
আপনাদের অনেক্ষণ বসিয়ে রাখলাম।

এর জন্য আমরা সবাই খুব লজ্জিত। আর ক্ষমাপ্রার্থী।
মেরহাব এর দিকে তাকিয়ে বললেন।

মেরহাব: এটাই হওয়ার ছিলো। এসব পূর্বেই আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন।
তাই এখানে আপনার ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

আল্লাহ যা করেন সব ভালোর জন্য করেন।
জাফরুল্লাহ: হুম।
মেরহাব: তাহলে আর আমরা এখন আমাদের বউমাকে নিয়ে যাই।
রমিজ: হুম।

মুগ্ধা তার মা জেনিফাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়৷ জেনিফাও কান্না করছেন।
আজ থেকে যে নিজের গর্ভের মেয়ে উনার মেহমান হয়ে যাবে। চাইলেই যে পারবেনা বছরের পর বছর থাকতে।
সেই ছোট মুগ্ধা আর ছোট নেই।

সেও আজ বড় হয়েছে। কারো বউ হয়েছে। আর হয়েছে প্রতিবাদী।
রমিজ নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিলেন। রামিছাও মুগ্ধাকে কিছুক্ষণ নিজের সাথে মিশিয়ে রাখেন জড়িয়ে ধরে।

মেরহাব: তোহফা মা তুই এখানেই থাক। শুধু আমাদের ভুলে যাস না।
মনে রাখিস তোর অন্য বাসায়ও তোর একটা বাবা আছে, আছে দুইটা ভাই, আর একটা ভাবি।
মেরহাবের কথা শুনে তোহফা মেরহাবকে জড়িয়ে ধরে।

তোহফাঃ আব্বু আমি কখনো ভুলবো না।
আশ্রম থেকে আসার পর, ভালোবাসা কি, সেটা আমি আপনাদের কাছ থেকেই পেয়েছি।
মেরহাব তোহফার পিটে হাত বোলিয়ে দেন।

রাইয়ান আর মাহবুব জলভরা চোখে তাকিয়ে আছে তোহফার দিকে।
রাইয়ান একটু বেশিই ভালোবেসেছিলো তোহফাকে নিজের ছোট বোন ভেবেই।

মুগ্ধাকে নিয়ে আসা হয় রাইয়ানের বাসায়।
গাড়িতে কান্না করছিলো মুগ্ধা। মণিমা আর রাইয়ান অনেক বুঝিয়ে মুগ্ধার কান্না থামাতে সক্ষম হয়।
মুগ্ধা নীরবে কান্না করেই যাচ্ছিলো।

সব চেনা মুখ ছেড়ে অচেনা মুখকে ভালোবাসার জন্য এতো ত্যাগ।
এই ত্যাগেও আছে সুখ, ভালোবাসা, আবার কষ্ট।
এটাই মেয়েদের জীবন।
কারো জীবনে সুখ। আবার কারো কষ্ট।

মেয়েদের জীবন চোখ বন্ধ করে পৃথিবীতে থাকা হাজারো গাছের সাথে তুলনা করা যায়।
একটা গাছ যেভাবে ঝড়বৃষ্টি, তুফান, সব জয় করে বেঁচে থাকে।
তেমনি একটা মেয়েও, কষ্ট, ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকে।
মুগ্ধাকে রাইয়ানের রুমে এনে রাখা হয়। রাইয়ানের রুমটা অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।

এখানে কোনো নিয়ম নেই।
সাধারণ ভাবেই মুগ্ধাকে বরণ করা হয়।
রাত হয়ে যায়।

জাফরুল্লাহ এর বাসায় এখনো কিছু মেহমান রয়েছেন।
সোহেলা নিজের মেয়েদের নিয়ে চলে যেতে চাইলে। রামিছা বললেন।
আজ রাতটা থেকে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু সোহেলা কিভাবে থাকবেন।
নিজের পশু নামক স্বামীর পাপ কাজ যে নিজের সব সম্মান ধুয়ে নিয়েছে।

জাফরুল্লাহ বলেছেন, যখন ইচ্ছা তখন যেন এই বাসায় আসে সোহেলা আর তার মেয়েগুলো।
রেহান মুগ্ধার জন্য মন খারাপ, কিন্তু তার আপুকে পেয়ে কিছুটা কষ্ট কমেছে তার।
রেহান, তোহফা, আর নিতিন বসে আছে রেহানের রুমে।
নিতিনঃ রেহান আজ কিন্তু একটা কথা সত্য হলো।
রেহানঃ কি?

নিতিনঃ শালা ডাকটা
কথাটা বলে নিতিন হুহু করে হেসে দেয়।
এই দিকে তোহফা লজ্জা পাচ্ছে।

রেহান তার আপুকে জড়িয়ে ধরে আর বলে।
রেহানঃ আপু দেখছো তোমার বর আমায় শালা বলে লজ্জা দিচ্ছে।
তোহফা নিতিনের দিকে রাগী চোখে তাকায়।

নিতিন চুপ হয়ে যায়। আর বলে,
নিতিনঃ তোমরা ভাইবোন মিলে প্রেম করো, আমি একটু আসি।
রেহানঃ যা।
নিতিন চলে যায়।

রেহান তাড়াতাড়ি করে তোহফার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।
তোহফা মুচকি হেসে তার হাত দিয়ে রেহানের মাথায় হাত বোলাচ্ছে।
কতোটাই না দূরে ছিলো সে।

তার এতো ভালো একটা ফ্যামিলি আছে। কখনো জানেই নি সে।
জেনিফা আর রমিজ মন খারাপ করে রুমে বসে আছেন।
রাহুলের পরিবার তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় সন্ধ্যার আগেই। তাদের বাসায় যাবার জন্য আমন্ত্রণ করেছে।

জেনিফা মুগ্ধাকে বিদায় দিয়ে, এসে যে রুমে ঢুকছিলেন। আর বের হন নি।
রমিজ গিয়ে নিজের বউয়ের পাশে বসেন।

রমিজ: মন খারাপ?
জেনিফাঃ এখন আর মন খারাপ না। যে জিনিসটার জন্য মন খারাপ থাকতো, সেই জিনিসটা আজ অনেক বড় শাস্তি পেয়েছে।
আজ তো আমি খুব খুশি।

কিন্তু কষ্ট হচ্ছে।
রমিজ: কেন?
জেনিফাঃ আমার মেয়ে আজ আমাদের একা করে চলে গেলো।

অনেক কষ্ট হচ্ছে।
রমিজ জেনিফাকে নিজের বাহুদ্বয়ে আবদ্ধ করে এবং বলে।
রমিজ: তুমিও তো একদিন তোমার পরিবার ছেড়ে আমার কাছে এসেছিলে।
সেভাবেই আজ তোমার মেয়ে এই পরিবার ছেড়ে অন্য পরিবারে গেলো।

এটাই তো নিয়ম।
জেনিফাঃ হুম,
রমিজের বুকের সাথে মিশে আছে সে। এটাই যে তার শান্তির জায়গা।
রাত ১১টা,

মণিমা বাসায় আসার পর থেকেই, তাদের রুমে তালা ঝুলছে।
কেউ কিছু বলছেও না। আর চাবিও পাচ্ছে না। কে করছে এটাও জানেনা মণিমা আর মাহবুব।
ওরা সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আছে।
মেরহাব ঘুমিয়ে গিয়েছেন।

আর ড্রয়িংরুমে রাইয়ান
সহ মাহবুব এর সব ফ্রেন্ডসরাও আছে।
মুগ্ধার সাথে বাসার অন্যরা আড্ডা দিচ্ছে।
মণিমা বললো,

মণিমাঃ কে আমাদের রুমে তালা মেরে রাখছে, আমরা কি ঘুমাবোনা আজ।
মণিমার কথা শুনে সবাই হাসছে।
মাহবুব: ওই তোরা হাসছিস কেন?
রাইয়ানঃ আমি বলছি তালা মেরে রাখার জন্য।
মণিমাঃ কেন?

রাইয়ানঃ তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে, আমার বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তুমি মা হবে না।
তুমি সেই কথা রেখেছো।

শুধু আমায় ভালোবেসে তোমরা দু’জন মাবাবার স্বাদটা নাওনি।
কিন্তু আজ আমি বিয়ে করেছি।
আর আজকেই আমায় দেওয়া তোমার কথাটার সমাপ্ত হলো।
আজ আমার বিয়ে হয়েছে, আর আজকেই আমার বাসর রাত।

কিন্ত তোমরা দু’জন তোমাদের রুমে ঢুকার পর। আমি আমার বাসর রুমে ঢুকবো।
মণিমাঃ পাগল!
রাইয়ানঃ পাগল তো বটেই। তাইতো এমন এমন আবদার করতাম।
এবার আসো৷ দু’জন।

রাইয়ানের সাথে মাহবুব আর মণিমাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাইয়ান রুমেত তালা খুলে, ওদের নিয়ে ভিতরে ঢুকায়।
মণিমা আর মাহবুব বিশ্বাস করতে পারছে না।

এতো সুন্দর করে ওদের
রুম সাজানো হয়েছে।
চার দিকে শুধু ফুল আর ফুল।

রাইয়ানঃ খুব তাড়াতাড়ি চাচ্চু ডাক শুনতে চাই।
রাইয়ান মুচকি হেসে কথাটা বলে চলে যায়।
ওরা দু’জন মুচকি হেসে এক সাথে বললো,
পাগল!

রাত ১১:৩৫,
রাইয়ান তার বাসর ঘরে ঢুকে। বাসর রুমে ঢুকার আগে তার ভাইয়ের বন্ধুরা আর ভাবিরা অনেক মজা করেছে।
মুগ্ধা পালঙ্কে বসে বসে পা ঝোলাচ্ছে।

রাইয়ান দরজা বন্ধ করে এসে মুগ্ধার সামনে দাঁড়ায়।
মুগ্ধা রাইয়ানকে সালাম করে পা ধরে।
শেষে ইচ্ছে করেই সে পা’য়ে চিমটি দেয়।

রাইয়ানঃ আউইচচ্!
চিৎকার করে উঠলো।
মুগ্ধাঃ এতক্ষণ লাগে৷ আমার ঘুম পাচ্ছে।
রাইয়ান মুগ্ধাকে সব বলে।

মুগ্ধা সব শুনে, আর বলে।
মুগ্ধাঃ তোমার ভাইয়া ভাবি তোমায় এতো ভালোবাসেন।
রাইয়ানঃ হুম।
মুগ্ধাঃ ভালো।
ঘুম পাচ্ছে আমার।

রাইয়ানঃ আজ আমাদের বাসর।
মুগ্ধাঃ তো? আমি কি এখন নাচবো।
রাইয়ানঃ পাকা পাকা কথা বলো না তো।
মুগ্ধাঃ রাগ দেখাও কেন?
রাইয়ানঃ খুশিতে।

কথাটা বলে রাইয়ান ওয়াশরুমে ঢুকে।
মুগ্ধাকে সবাই অনেক আগেই শাড়ি চেঞ্জ করিয়ে নিয়েছে। রাইয়ানের রুমে তেমন ঠাণ্ডা লাগছে না।

তাই কাপড় পড়েই আছে।
মুগ্ধা ভাবছে আজ রাইয়ানকে কিছু প্রশ্ন করবে।
তাই রাইয়ান আসার অপেক্ষায় আছে।
রাইয়ান হাতমুখ মুছে৷

আর মুগ্ধার পাশে বসে।
মুগ্ধা তার পা দুটো কম্বলের নিচে ঢুকায়। রাইয়ানো তার সামনে বসে পা দুটো কম্বলের নিচে ঢুকায়।

রাইয়ান আজ খুব খুশি। সে তার সঙ্গী পেয়েছে নিজের পছন্দে।
দুজন কিছু সময় নীরব ছিলো। রাইয়ান এসে মুগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে। আর তার সাথে মিশিয়ে নেয়।

রাইয়ানের ঠাণ্ডা ঠোঁটজোড়া মুগ্ধার কপালে ছুঁয়ে দেয়।
রাইয়ানের ঠোঁটের ছোঁয়া পেয়ে মুগ্ধা চোখে দুটো বন্ধ করে নেয়। আর রাইয়ানকে জড়িয়ে ধরে।
রাইয়ানঃ ঘুম পাচ্ছে তোমার?

মুগ্ধাঃ তোমার ছোঁয়া পেয়ে ঘুম উড়ে গেছে। কথাটা বলে রাইয়ানকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

রাইয়ান আবারো মুগ্ধার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়।
মুগ্ধাঃ আমার না কিছু কথা জানার ছিলো।
রাইয়ানের বুকে মাথা রেখেই বলে।
রাইয়ানঃ হুম বলো।

মুগ্ধা রাইয়ানের বুক থেকে মাথা তুলে রাইয়ানের মুখের দিকে তাকায়। লাইটের আলোয় রাইয়ানকে খুব সুন্দর লাগছে।
মুগ্ধা বলতে শুরু করে।

মুগ্ধাঃ আমায় তুমি মোনালিসা বলে ডাকো কেন?
আমাদের সম্পর্কের পর মনে হয় তুমি আমায় লক্ষ কোটি বার মোনালিসা ডেকেছো।
মুগ্ধার প্রশ্ন শুনে রাইয়ান হাসলো।
রাইয়ান বলল।

রাইয়ানঃ কারণ একটাই।
আর সেটা হলো।

তুমিআমারমোনালিসা।

তুমি আমার সেই মোনালিসা, যার জন্য আমি এতোদিন অপেক্ষা করেছি।
আমি কখনো কোনো মেয়ের মধ্যেই মোনালিসার রূপ দেখিনি।
কিন্তু তোমার মধ্যে আমি মোনালিসাকে দেখতে পেয়েছি।
ঠিক যেন তুমি বাস্তব মোনালিসা।

প্যারিসে ল্যুভর মিউজিয়ামে আমি গিয়েছিলাম লন্ডন যখন ছিলাম তখন।
সব খুব মন দিয়েই দেখছিলাম।
তখন আমরা দেখি।
লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা পেন্ডিং।

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম।
কিভাবে এতো সুন্দর করে এই পেন্ডিং আঁকেন ভিঞ্চির।
এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম মোনালিসার

প্রতি। আমি প্রেমেই পরে যাই।
কিন্তু মোনালিসাকে বাস্তবে কিভাবে পাবো?

তার পরেই আমি মোনালিসার মতো মানুষকে খুঁজতে থাকি।
সেদিন তোমায় দেখে, প্রথমেই আমার মনে এসেছে। এইতো আমার মোনালিসা।
মুগ্ধা সব শুনলো। আর বললো,

মুগ্ধাঃ আমার মধ্যে কি এমন পেলে?
রাইয়ানঃ অনেক কিছু।
মুগ্ধাঃ শুনি একটু।

রাইয়ানঃ তোমার ঠোঁট জোড়া, ঠিক যেন মোনালিসার ঠোঁট। তোমার চোখ।
আর সব থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে তোমার ভ্রু।

কারণ মোনালসার যেভাবে ভ্রু নেই। ঠিক তোমারো।
তোমার এই হালকা ভ্রু, দূর থেকে দেখাই যায় না।

যেটা তোমায় আরো বেশি সুন্দর করেছে।
আজ যদি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির বেঁচে থাকতেন।

তাহলে উনি তোমায় দেখলে বলতেন। এই তো আমার আঁকা সেই মোনালিসা।
তখন আমি বলতাম।
এই যে ভিঞ্চির মহাসয়। আপনার আঁকা মোনালিসা থেকে আমার এই মোনালিসা আরো বেশি সুন্দর।

তখন হয়তো উনি তোমায় তার আঁকা পেন্ডিং এর সাথে দাঁড় করিয়ে হাজারো মানুষকে বলতো। আসল মোনালিস কে?
তখন সবাই বলতো তোমার কথা।

এইতো এই মেয়ে মোনালিসা।
তখন আমি মুচকি হেসে চিৎকার করে বলতাম।

তুমিআমারমোনালিসা।

মুগ্ধা রাইয়ানের কথা শুনছিলো।
তাকে নিয়ে রাইয়ানের এতো অনুভূতি।

মুগ্ধা মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বললো,
ভালো সঙ্গী পেয়েছে সে।
মুগ্ধাঃ আরেকটা প্রশ্ন করি?
রাইয়ানঃ হুম।

মুগ্ধাঃ এখন কি আমায় ভালো লাগে নাকি ভালোবাসো?
রাইয়ানঃ আমার প্রতি তোমার যে অনুভূতি কাজ করছে। ঠিক তার চেয়ে অধিক অনুভূতি আমার কাজ করছে।

আমায় যদি তোমার ভালোলাগে।
তাহলে আমি তোমায় ভালবাসি।

আর তুমি যদি আমায় ভালোবাসো। তাহলে আমি তোমার ভালোবাসার পরিমাণ অনুযায়ী দিগুণ ভালবাসি।

রাইয়ানের কথা শুনে মুগ্ধা রাইয়ানকে জড়িয়ে ধরে।
মুগ্ধা নিজের অজান্তেই রাইয়ানের কপালে নিজের নরম মাংস নামক ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে দেয়।
এটাই মনে হয় ভালবাসা।

মুগ্ধা রাইয়ানের বুকে মুখ লুকায়।
কিছু সময়ের ব্যবধানে মুগ্ধার ভ্রমর হয়ে যায় রাইয়ান।
দু’জনি এক অজানা সুখে পাড়ি দেয়।

যে ভালবাসা পবিত্র।
মুগ্ধা রাইয়ানের বিয়ে হয়েছে আজ দুই মাস।
খুব ভালোই কাটছে দু’জনের জীবন।

এইদিকে মুগ্ধার বিয়ের পর রাহুল আর সুমার বিয়েও হয়ে যায়।
ওদের সম্পর্কের কথা শুনে কেও না করে নি।
সবাই হ্যা বলেছে। তাইতো রাহুল আর সুমাও আজ সুখী আছে।

নিতিন আর তোহফার প্রেমের সম্পর্ক তো সবাই মুগ্ধার বিয়ের দিন জেনে নিয়েছিলো।
ওরা দুজনো ভালোই ভালোবাসা ভালোবাসা খেলছে।

আজ রেহান আর তোহফা দুজন এক জায়গায় যাচ্ছে।
রেহান গাড়ি ড্রাইভ করছে। আর তোহফা বলে দিচ্ছে কোথায় যেতে হবে।
তোহফা রেহানকে বলে গাড়ি থামানোর জন্য।

রেহান ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখলো এটা একটা আশ্রম।
রেহানের বুঝতে বাকি নেই। এই আশ্রমেই তার আপুর জীবন কেটেছে।
তোহফার চোখে পানি দেখে রেহান বলে।

রেহানঃ আপু কান্না করছো কেন?
তোহফাঃ সব মনে পরছে তাই।
তোহফা চোখের পানি মুছে, আর বলে।

তোহফাঃ ভাই তোর কাছে একটা আবদার করবো। রাখবি?
রেহানঃ আপু আমি তোমার সব আবদার রাখবো।

বলো একবার,
তোহফাঃ ভিতরে আয়।

রেহান আর তোহফা ভিতরে যায়।
তোহফাকে দেখে, আশ্রমের অনেক মেয়েরাই অবাক হচ্ছে। আশ্রমের সেই তোহফা আজ অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।

সবাই তোহফাকে ভাল আছে কি সেটা জিজ্ঞেস করছে।
আশ্রমের ওই মহিলাটি তোহফাকে দেখে খুব অবাক হয়।
সাথে রেহানকে দেখে ভয়ে কিছুই বলতে পারেনি।

তোহফাও চায়নি। এই মহিলা সম্পর্কে রেহান জানুক।
নইলে রেহান এই মহিলাকে কি করবে সে নিজেই জানবে না।

মহিলা তোহফাকে জিজ্ঞেস করে তোহফা কেমন আছে।
তোহফা শুধু মুচকি হাসে, আর বলে।
তোহফাঃ তানিয়া কোথায়?

মহিলার পাশে একটা মেয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে তোহফা যে রুমে থাকতো, সেই রোমের দিকে।
তোহফা আর রেহান রুমে ঢুকে। সাথে ওই মহিলাও।

তোহফা বিশ্বাস করতে পারেনি। তানিয়ার সাথে এই মহিলা এসব করবে।
তানিয়াকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।
তানিয়া আগ থেকেও শুকিয়ে গিয়েছে।

তোহফা গিয়ে তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। কারো হাতের পরশ পেয়ে তানিয়া চোখ খুলে।

তোহফাকে দেখে তানিয়া কান্না করে দেয়।
তানিয়া: আমার বিশ্বাস ছিলো, তুই একদিন আসবি। আমায় এই জাহান্নাম থেকে নিয়ে যাবি।
তোহফা তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেই যাচ্ছে।

তানিয়া: তুই যাবার পর থেকেই আমি এভাবে। এই মহিলা আমায় এভাবেই রেখেছে।
তোহফা তানিয়ার কথা শুনে উঠে দাঁড়ায়।
তারপর ওই মহিলার কাছে যায়।

তোহফাঃ আজ চাইলেই আমি তোমায় পুলিশের কাছে দিতে পারি।
কিন্তু আমি কিছুই করবো না।
ভালো হওয়ার সুযোগ দিলাম।

প্রতিমাসে আমি এসে এই আশ্রমের প্রতিটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করবো। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করছো নাকি?
মহিলাটি নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তানিয়ার শিকল খুলে দেয়।

আশ্রমের সব কিছু মিটিয়ে তানিয়াকে নিয়ে গাড়িতে বসে তোহফা।
রাইয়ান সব দেখছিলো। তানিয়া ভালোভাবে হাটতে পারছিলো না।

তোহফাঃ বাসায় চল।
রেহানঃ হুম।
তানিয়া: আমার বিশ্বাস ছিলো তুই একদিন আসবি।

তোহফাঃ তোর জন্য আমি এই আশ্রম থেকে পালাতে পেরেছি।
আর তোর জন্যই আজ আমি আমার ফ্যামিলির কাছে আছি।
তানিয়া: ফ্যামিলি?

তোহফাঃ এইতো আমার ছোট ভাই রেহান তালুকদার।
রেহান গাড়ি নিয়ে বাসায় ঢুকে।
মুগ্ধার মাবাবা, নিতিনের বাবামা, আর তোহফার বাবামা, আর নিতিন। সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আছে।

তোহফা তাদের জন্য সারপ্রাইজ নিয়ে আসবে। সেটার অপেক্ষায় আছে।
তোহফা আর রেহান ভিতরে ঢুকে।

সাথে তানিয়াও।
তানিয়াকে দেখেই বুঝলো। এটাই মনে হয় সারপ্রাইজ।

তোহফাঃ আম্মু ওর জন্যই আজ আমি তোমাদের পেয়েছি।
নয়তো কখনো পারতাম না।
রামিছা তানিয়ার দিকে তাকান।

মেয়েটা এতো শুকনা কেন।
তোহফা সব বলে সবাইকে।

তোহফাঃ তানিয়া যা তোর শশুড় শাশুড়ি কে সালাম কর।
তোহফার কথা শুনে তানিয়া অবাক হয়। সাথে সবাই, তানিয়া তোহফার দিকে তাকায়।
তোহফাঃ হ্যাঁ রে এভাবে তাকাচ্ছিস কেন। যেটা বলছি সেটা কর।

তানিয়া একটু এগিয়ে রামিছা আর জাফরুল্লাহ কে পা’য়ে ধরে সালাম করে।
রামিছা তানিয়াকে জড়িয়ে ধরেন আর বলেন।

রামিছাঃ সত্যিই আমার ছেলের বউ হিসেবে মেয়েটা অনেক ভাল।
রামিছার কথা শুনে। রেহান এবার ভালো ভাবে তানিয়ার দিকে তাকায়।
শেমলা রং তানিয়ার।
দেখতে মাশা’আল্লাহ।

রেহান অমত করার কোনো কারণ খুঁজেই পাচ্ছেনা।
তোহফাঃ ভাই রাজি তো তুই?
রেহানঃ হুম।
কথাটা বলে লজ্জা পায় সে।

তোহফাঃ তানিয়া তুই?
তানিয়া: আমি একটা ফ্যামিলি পাবো।

একজন মানুষ পাবো।
মা বাবা পাবো। তোর মতো বন্ধু বোন পাবো।
আমি না করবো কোন সাহসে।

তানিয়ার কথা শুনে দবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে।
আজ মুগ্ধা আর রাইয়ান তাদের গ্রামের বাড়িতে এসেছে৷
দুপুর হয়েছে আসতে আসতে।

নিতিন সেদিন জানিয়েছে, রেহান আর তানিয়ার কথা।
মুগ্ধাও খুব খুশি হয়। রেহানও কাউকে পেলো।

মুগ্ধা আর রাইয়ান দাঁড়িয়ে আছে তার বুবুর কবরের সামনে।
অনেক কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।

কিন্তু তার কলিজা তার বুবু যে সেই কথাগুলোর উত্তর দিতে পারবে না।
তার বুবু হয়তো জানেই না, তার ভালোবাসা রাহিন নামক মানুষটাও আজ তার মতো কবরে শুয়ে আছে।
মুগ্ধা আর রাইয়ান তার বুবুর কবর জেয়ারত করে। তাদের ঘরে আসে। মুগ্ধার কাল তার মায়ের কাছ থেকে চাবি এনেছে।

উনারাও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুগ্ধা জানে তার মাবাবা গ্রামে আসলে আর শহরে যাবেন না।
মুগ্ধা তার বুবুর রুমে বসে আছে। পাশে রাইয়ান।
মুগ্ধাকে কান্না না করতে মানা করে।

মুগ্ধাদের ঘরের দরজা খুলা দেখে একজন তাদের ঘরে আসে।
এসে মুগ্ধাকে দেখতে পায় সাথে রাইয়ানকে।
সেই লোকটি আর কেউ না।

সে হলো রাসেলের বাবা।
রাসেলের বাবাঃ কেমন আছিস মা?
মুগ্ধাঃ আলহামদুলিল্লাহ, আপনি কেমন আছেন চাচা।
আর এই হলো আমার স্বামী।

রাইয়ানও সালাম দেয়।
রাসেলের বাবা কিছু সময় কথা বলেন।
মুগ্ধা না চাইতেও জিজ্ঞেস করে।

মুগ্ধাঃ চাচা রাসেল কেমন আছে?
মুগ্ধার কেন জানি ইচ্ছে করছে তার বুবুর খুনির খবর জানতে।
রাসেলের বাবা চোখের পানি মুছে বলেন।

রাসেলের বাবাঃ ভালোই আছে।
মুগ্ধাঃ ওও।
রাসেলের বাবাঃ রাসেল বেঁচে নেই রে মা।

মুগ্ধাঃ কিহ?
রাসেলের বাবাঃ যেদিন আমি গিয়ে ওরে বলি। রাহিন বাবা মারা গিয়েছে, তোর মা আমায় রাহিনের কথা বলছিলো৷। রাহিন মারা গিয়েছে।

আমিও রাসেলকে সেদিন খুব বকি।
সে শুধু নিশিকেই খুন করে নি। রাহিনকেও খুন করেছে।

আমি ওরে অনেক অপমান করে চলে আসি বাড়িতে। তারপরের দিন সকালে খবর আসে।
আমি আর আমার বড় ছেলে যাই।
গিয়ে দেখি রাসেল ঝুলে আছে।
রাসেল আত্মহত্যা করেছে।

শুধু একটা কাগজ আমাদের জন্য রেখে গেছিলো।
সেটাই লিখা ছিলো।
আমি জানি, কখনো আমি ক্ষমার যোগ্য না।

ভুল করেছি। মানুষ খুন করেছি।
ভালোবাসলে কখনো আমি মানুষ খুন করতে পারতাম না। সত্যিই আমার মধ্যে ভালোবাসা শব্দটাই নেই।

তাইতো দুটো মানুষকে খুন করে ফেললাম। ভালোবাসা শব্দটাকেও খুন করে ফেললাম।
আমি ক্ষমা চাইবো না।
ক্ষমা আমার প্রাপ্য না।

আমিও আজ ভালোবেসেছি নিজের গায়ের কাপড় নামক দড়ি আর উপরের সিলিং ফ্যান।
আমার মতো পশুর ভালোবাসা এই সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দিলাম।
আমি খুনি। আমি খুন করেছি ওদের, আজ খুন করলাম নিজেকে।
মুগ্ধা সব শুনে কিছুটা কষ্ট পায়।

কারো মৃত্যুতে কষ্টিত না হলে সে মানুষ না।
মুগ্ধা চোখে আসা জল মুছে নেয়।

আবার তার বুবুর কবরের সামনে দাঁড়ায়।
রাইয়ান আর মুগ্ধা গাড়িতে বসে আছে।

গাড়ি তার গন্তব্যের পথে চলছে।
মুগ্ধা বারবার রাইয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। আর রাইয়ানও।
মুগ্ধা শুধু এটাই ভাবলো।

কিছু ভালোবাসা অপূর্ণ হলেও। মনে রাখে সবাই। কাঁদে সবাই।
রাইয়ান এর হাতটা জড়িয়ে ধরলো। বাকিটা পথ ঘুমিয়েই যাবে সে।
রাইয়ান গাড়ির গ্লাস বন্ধ করে দিলো।

এক হাত দিয়ে মুগ্ধার মাথায় হাত বোলাতে লাগলো।
রাইয়ানের হাতের পরশ পেয়ে মুগ্ধা চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়।

লেখক: হানিফ আহমেদ

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “তুমি আমার মোনালিসা – Bengali valobasar golpo” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – তোমায় আমার প্রয়োজন (১ম খণ্ড) – Bangla Romantic Bhalobashar Golpo