মিষ্টি প্রেমের গল্প

মেঘমুখ – ছোট্ট মেয়ের মোবাইল প্রেম

মেঘমুখ – ছোট্ট মেয়ের মোবাইল প্রেম: মেয়েটির প্রোফাইল আনলক করা ছিলো। প্রোফাইল দেখে রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করলাম। প্রোফাইলে তার নিকনেম দেওয়া, ‘বৃষ্টিমেঘা’। বায়ো’তে লেখা, ‘আকাশ ভালবাসি’।


১ম পর্ব

অপেক্ষা! অপেক্ষার সময়গুলো খুব দীর্ঘ মনে হয়। তবে খুব প্রিয় মানুষটার জন্য অপেক্ষা করার মধ্যে যেমন অস্থিরতা আছে, তেমন অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতিও কিংবা ভালো-লাগা আছে। এখন আমি অপেক্ষা করছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং খুব প্রিয় একটা মানুষের মেসেজের জন্য। মানুষটাকে খুব পছন্দ করি।

খুব বলতে অনেকটা পছন্দ করি। অনেকদিন ধরেই। ফেসবুকে বন্ধুত্ব। তবে বন্ধু বলতে শুধু ফ্রেন্ড লিস্টেই আছে। প্রথম মেসেজটা কেউ কাউকেই দিচ্ছি না। কেমন একটা দ্বিধা, ভয় কাজ করছে। এই জন্য চাইলেও মেসেজ দিতে পারছি না। তবে অনেক ভেবে চিনতে এমন একটা কাজ করেছি যে কারণে সে অবশ্যই মেসেজ দিবে। তার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করছি।

ওহ হ্যাঁ, সরি আমার পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি।

আমি শুভ্র।

কিছুদিন আগে!

একদিন হঠাৎ সন্ধ্যা বেলা ফেসবুকে নোটিফিকেশন আসলো, ‘সেন্ড এ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট।’ একটা মেয়ের রিকোয়েস্ট ছিলো। আগেকার দিনে গৃহিণীরা যেমন করে তাদের অলংকার বড় ট্রাংকে তালাবন্দী করে চাবি কোমড়ে রেখে দিতো, আজকাল মেয়েরা ঠিক সে ভাবেই তালা-চাবি দিয়ে ফেসবুক লক করে রাখে।

তবে, এই মেয়েটির প্রোফাইল আনলক করা ছিলো। প্রোফাইল দেখে রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করলাম। প্রোফাইলে তার নিকনেম দেওয়া, ‘বৃষ্টিমেঘা’
বায়ো’তে লেখা, ‘আকাশ ভালবাসি’।

আমিও আকাশ ভালবাসি। কারণ ছাড়া হুটহাট আকাশ দেখি। মন খারাপ থাকলে মেঘেদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দেই। আকাশের প্রতি আমার খুব দুর্বলতা। তাই-তো যে আকাশ ভালবাসে তাকে অপছন্দ করে থাকা যায় না।

আর যে আকাশ ভালবাসতে পারে না সে কোন কিছুই ভালবাসতে পারে না।
বেশ কিছুদিন কেটে গেলো৷ মেয়েটা কিছুদিন পর পর ছবি আপলোড করে। ছবিগুলো এতো সুন্দর, দেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে লাভ রিয়েক্ট দেওয়া হয়ে যায়।

হয়তো বামন আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলো লাভ রিয়েক্ট দেওয়ার জন্য। স্টোরিতে শেয়ার করা পিকেও সেম লাভ রিয়েক্ট। কালো টিপে মেয়েটাকে ভিষণ সুন্দর লাগে। কাজল ভর্তি চোখে ডুব দিতে ইচ্ছে করে। শাড়িতে সম্পূর্ণ বাঙালি বঁধুর মত লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো সে কোন এক স্বপ্নের রাজ্য থেকে টুপ করে নেমে এসেছে এই ভূখন্ডে। নয়-তো সাদামেঘের রাজ্য থেকে এই শহরে এসেছে। কেনো এসেছে সে?

আমায় কিছু দুঃখ দিতে? আসুক, সে যদি দুঃখ দিতে আসে, তবে সে আসুক। কিছু দুঃখ দিয়ে যাক৷ তবুও চাই সে কাছে আসুক।

মেয়েটা কোন মেসেজ দেয় না। আমার মেসেজ দিতে সাহস হয় না। আকাশ’কে দূর থেকে দেখতে হয়, তাকে দূর থেকে ভালবাসতে হয়।

ছুঁতে চাইলে কষ্ট পেতে হয়। তাই হয়তো, দু’মুঠো স্বপ্নকে ছুঁতে খুব ভয়। ভয় থেকে মেসেজ দেওয়া হয়ে উঠে না। মেয়েটা কি একবার নিজ থেকে নক দিতে পারে না? একবার ছোট একটা মেসেজ শুধু ‘হাই’ দিতে পারে না? মেয়েটা এমন কেনো? নাকি এই ক্ষুদ্র আমিটা তার কাছে ধুলিকনার মত। এই ক্ষুদ্র আমিটা সমুদ্রের মধ্যে এক বিন্দু শিশিরে মত। যার মূল্য সমদ্রের কাছে কিছুই না।

রাতে ঘুম হয় না৷ মেয়েটা আমার ভাবনার জগৎ সম্পূর্ণ দখল করে রেখেছে৷ জীবনে সব কিছু এলোমেলো করে সে তার মত আছে। অনেক ভেবে হঠাৎ একটা বুদ্ধি এলো মাথায়। বুদ্ধি মত কাজ করে ঘুমিয়ে গেলাম।

অপেক্ষা!

সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। কোন মেসেজ আসেনি। সকাল কেটে দুপুর হয়ে গেলো। অপেক্ষার সময় আর শেষ হয়না। ঠিক বিকালে মেসেজ এলো, ‘আপনি আমার ৫টা পিকে হাহা রিয়েক্ট দিয়েছেন কেনো?

আমি দেখতে এতো খারাপ? না কি আমাকে দেখে হাসি পায় আপনার?’
আমি তো মেসেজ পেয়ে খুশিতে সব কিছু ভুলে লাফিয়ে উঠলাম। স্বপ্নের মানুষের মেসেজ এসেছে এই ভেবে। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি।

আমি লিখলাম,
‘আপনার সাথে কথা বলার খুব ইচ্ছা। ভয়ে আপনাকে কখনো মেসেজ দিতে সাহস হয়না। তাই অনেক ভেবে হা হা রিয়েক্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে আপনি রাগ করে হলেও মেসেজ দেন৷।’

মেয়েটা লিখলো,
‘আমি কি ভাল্লুক, নাকি ভয় পাবার মত কনো অদ্ভুত প্রাণী? জানেন, আপনাকে রিকোয়েস্ট দেওয়ার পর থেকে প্রতিদিন আমিও আপনার আইডি খুলে অপেক্ষা করেছি। ভেবেছি এই বুঝি মেসেজ দিলেন। কখনো দেন নি। আর এখন হা হা রিয়েক্ট?’

‘সরি, আসলে কথা শুরু করার জন্য এমনটা করেছি। রাগ করবেন না।’
এভাবেই আমাদের পরিচয়, প্রথম কথা বলা।


পর্ব ২

সকালে ঘুম থেকে উঠে তারাহুরো করে হাতের কাজগুলো শেষ করেছি। তারাহুরো করে চা বানাতে গিয়ে হাত কিছুটা পুড়ে গেছে। তবে, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। গত এক মাস ধরে যাকে খুব পছন্দ করি তার সাথে আজ প্রথম দেখা হবার কথা। গতকাল প্রথম মেসেজে কথা হয়েছে।

একটা মাস কোনো মেসেজ দিতে পারিনি দ্বিধায়। তবে বুদ্ধি করে হা হা রিয়েক্ট দেওয়া, এটা কাজে দিবে কিছুটা অনুমান করেছিলাম। কিন্তু সত্যি, সত্যি কাজ করেছে৷ স্বপ্ননীলা মেসেজ দিয়েছে। প্রথমে কিছুটা রাগ করেছিলো। তবে রাগ বেশিক্ষণ থাকেনি। কথা বলার শেষে নিজ থেকে আজ দুপুরে দেখা করার কথা জানিয়েছে।

মধ্যদুপুর, রোদে পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে গেছে মাটি ও মানুষ। নিজের হাতে বানানো, এক কাপ চা’য়ের সাথে বিস্কুট ভিজিয়ে সকালের খাবার শেষ করেছি। যাত্রাবাড়ী থেকে রিক্সায় সরাসরি মৌঁচাক চলে এসেছি। স্বপ্ননীলার সাথে দেখা করার জন্য তার প্রিয় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। স্বপ্ননীলা মেসেজে এই রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিয়ে বলেছে, ‘এই রেস্টুরেন্টের খাবার খুব ভাল।’

স্বপ্ননীলা মাঝে মাঝে এখানে খেতে আসে। তবে, অবাক করা বিষয়, এটা আমারও খুব প্রিয় রেস্টুরেন্ট। বাইরের গনগনে আগুনের উত্তাপ থেকে একটুকরো পৃথিবীর সৃষ্টি করা স্বর্গে প্রবেশ। কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাসে পুড়ে যাওয়া শরীর ক্রমশ কাদামাটিতে রুপান্তর হতে লাগলো। লোকজন খুব কম। অর্ধেক টেবিল খালি পরে আছে। আকাশ দেখা যায় এরকম একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। বসতেই ওয়েটার খাবার অর্ডার নিতে চলে এলো।

আমি বললাম, ‘এক জনের জন্য অপেক্ষা করছি। সে আসলে আপনাকে ডাকবো।’

আকাশ খুব পছন্দ করি। আকাশের সাথে একটা বিকাল নিমিষেই কাটিয়ে দিতে পারি। তাই-তো আকাশ দেখা যায় এমন একটা টেবিলে বসেছি। টুকরো টুকরো মেঘ জমেছে আকাশে। আজ বিকালে বৃষ্টি হবে মনে হয়। শহরে যদি নিয়ম করে আকাশ দেখার জন্য একটা সময় সকল কাজ বন্ধ করে দেওয়া যেতো ভাল হত। এ-সব ভাবতে ভাবতে স্বপ্ননীলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো।

স্বপ্ননীলা কেনো শাড়ি পড়ে এসেছে? নিজে নিজেকেই প্রশ্নটা করলাম।
মেয়েরা কি কারো সাথে প্রথম দেখায় শাড়ি পড়ে আসে? হয়তো, সব মেয়ে চায়, প্রথম দেখায় সবাই তার প্রেমে পড়ুক। আর বিশেষ কেউ যদি হয়, তাহলে আরো সুন্দর করে সেজে আসে৷ যাতে ছেলেটা প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ুক।

কিন্তু, সে কি জানে? তাকে সামনা সামনি না দেখার আগেই তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। স্বপ্ননীলা আকাশি রঙের শাড়ি পড়েছে। মেচিং করে চুরি, টিপ। চোখে কাজল দিয়েছে। মনে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা এক টুকরো মেঘ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস সৃষ্টি করেছে। আর মেঘের চোখে পরিয়ে দিয়েছে কাজল। এ কাজল ভরা চক্ষে ডুব দিতে ইচ্ছে করে।

এখানে, একবেলা হারিয়ে গিয়ে ভাল থাকা যায়। স্বপ্ননীলা হেটে হেটে আমার দিকে আসছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে স্বপ্ননীলাকে বসার জন্য চেয়ার বের করে দিলাম। স্বপ্ননীলা বসার পর ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসলাম।

স্বপ্ননীলা বলল, ‘এই যে অভ্র, কেমন আছেন?’
আমি বললাম, ‘মেঘ মুখ দেখে কেউ কি খারাপ থাকতে পারে?’
‘মেঘমুখ?’

‘হ্যাঁ, মেঘ মুখ। এই যে আমার সামনে এক টুকরো সাদা মেঘ, আমার সামনে বসে আছে৷ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমায় একটু চিমটিকাটবেন?’
মেয়েটা হেসে দিলো। হাসির শব্দ জলতরঙ্গ শব্দের মত। মেয়েটার সব কিছুতেই আমি মুগ্ধ হচ্ছি কেনো?

মানুষ যাকে ভালবাসে তার সব কিছুই কি প্রিয় মনে হয়। সব কিছুই কি পছন্দ হয়? হয়তো হয়। সেই জন্য আমার সামনে বসা মেয়েটার সব কিছু ভাল লাগছে।

স্বপ্ননীলা বলল, ‘চিমটিকাটা লাগবে না। আমি সত্যি আপনার সামনে বসে আছি।’

  • সমস্যা নেই। একটু চিমটি দিয়েই দিন। যদি স্বপ্ন হয় তবে স্বপ্ন ভাঙার পর আমার থেকে বেশি কষ্ট আর কেউ পাবে না। আমার থেকে দুখি মানুষ কেউ হবে না।’

স্বপ্ননীলা হালকা করে হাসতে হাসতে আমার হাতে চিমটি কাটলো। বলল, ‘এবার খুশি।’

‘আমি বাস্তবে আপনার সামনে বসে আছি। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।’
‘এবার কি আমাকে চিমটি কাটবেন?’

‘না না, তেমন কিছুই করবো না।’
‘আচ্ছা, আপনাকে বৃষ্টিমেঘা বলে ডাকি?’

‘এই নামে তো কেউ ডাকে না। আমার বৃষ্টি খুব পছন্দ। তাই ফেসবুকে নিক নামের জায়গা বৃষ্টিমেঘা দিয়েছি।’

‘আচ্ছা, যখন বৃষ্টি হবে তখন বৃষ্টিমেঘা বলে ডাকবো। আর এখন নীলা বলে ডাকবো।’

‘আচ্ছা, সমস্যা নাই। আপনার যা ইচ্ছা ডাকতে পারেন।”
‘কি খাবেন?’

‘আপনার খুশি, যা অর্ডার দিবেন।’
‘ওকে, তাহলে আমার পছন্দ মত অর্ডার দিচ্ছি।’

ওয়েটার কে ডেকে খাবার অর্ডার দিয়ে দিলাম। নীলা সামনে বসে আছে। হঠাৎ কি ভেবে বললাম,
‘আপনাকে ভয়ংকর সুন্দর লাগছে।’

নীলা অবাক। চোখ দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে কতটা অবাক হয়েছে সামনে বসা মানুষটা। অবাক চোখে জিজ্ঞাসাসুরে বলল, ‘ভয়ংকর সুন্দর মানে?’

আমি বললাম, ‘এতো সুন্দর, দেখলে বুক কেপে উঠে। হঠাৎ কাউকে দেখে যদি বুক কেপে উঠে তবে একেই ভয়ংকর সুন্দর বলে। আপনাকে প্রথম দেখে বুক কেপে উঠেছে। এক মুহূর্ত মনে হয়েছে এই বুঝি হৃদয়টা ফেটে গেলো।’

নীলা আবার হেসে দিলো। ইশ! এতো সুন্দর কেনো হাসিটা? নীলা বলল, ‘আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন।’

কথা বলার মাঝে খাবার চলে এলো। খবার খাওয়া সময় নীলা আমার হাতের দিক লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করলো, ‘এখানে কি হয়েছে?’

আমি বললাম, ‘পুড়ে গেছে।’
‘কী ভাবে?’

‘সকালে তারাহুরো করে চা বানাতে গিয়ে।’
‘এতো তারাহুরো করে কেউ? তা আপনি চা বানাতে পারেন?’
‘কেনো পারবো না। চা থেকে শুরু করে রান্না করা সবই পারি।’

‘শিখলেন কি ভাবে।’
‘ব্যাচেলার মানুষ। রান্না করতে করতে শিখেছি।’
‘আপনি একা থাকেন? আপনার ফ্যামেলি?’

‘ঢাকায় আমি একা থাকি। ফ্যামিলির বাকি সবাই সিলেট থাকে।’
‘সিলেট কেনো?’

‘বাবার চাকরির জন্য। বাবা ব্যাংকে চাকরি করে। চার বছর হয়েছে প্রমোশন পেয়ে সিলেটে শাখায় ট্রান্সফার হয়ে চলে গেছে।’
‘এখানে আপনি একা থাকেন?’

‘না, আমার রুমমেট আর আমি।’
‘এখন থেকে সাবধানে কাজ করবেন। এতো তারাহুরো করার দরকার নেই। হাতে মলম লাগিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ, আসার আগে মলম লাগিয়ে এসেছি। সমস্যা নেই। সেরে যাবে। টেনশনের কিছুই নেই।’
‘তবুও, বাসায় গিয়ে ভাল করে সেভলন দিয়ে পরিষ্কার করে মলম লাগিয়ে নিবেন।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যেটা বলবেন সেটাই।’
দু’জনের খাওয়া শেষ। নীলা বলল,
‘আচ্ছা, চলুন উঠি আজ।’

‘চলুন, আপনাকে পৌঁছে দেই।’
‘না না, আমি একা যেতে পারবো। আপনার কাজ থাকতে পারে। আপনি চলে যান। আমার জন্য উল্টো পথে আসা দরকার নেই। আমি একটা রিক্সা নিয়ে চলে যাবো।’

‘তাহলে রিক্সা ঠিক করে দেই।’
এই ভর দুপুরে রিক্সা পাওয়া মুশকিল। এই সময়ে রিক্সা চালক রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় রিক্সার মধ্যে জম্পেষ্ট একটা ঘুম দেয়। দু’জনে বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা রিক্সা এলো।

‘এই যে মামা, যাবেন?’
‘কোথায় যাবেন?’
নীলার দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোথায় থাকেন? সেটা জানা হলো না। কোথায় যাবেন?’

‘উত্তরা।’
‘মামা ওকে উত্তরা পৌঁছে দিবেন।’
নীলা রিক্সায় উঠে বসলো। বলল, ‘চলি, আপনি সাবধানে যাবেন।’
‘আপনিও সাবধানে যাবেন।’

রিক্সা চলা শুরু করলো। কিছুটা দূরে চলে যাবার পর আমি দৌড়ে রিক্সার কাছে এসে বললাম, ‘আবার মেঘমুখ দেখার অসুখ হলে কি করবো?’

নীলা কিছু বললো না। হেসে দিলো। রিক্সা চলছে। আমি হাপিয়ে দাঁড়িয়ে পরলাম। হঠাৎ নীলা রিক্সা থেকে মুখ বের করে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘কিছু রহস্য থাকা ভাল। আবার দেখা হওয়াটা না হয় রহস্যের মত অজানাই থাকুক।’

রিক্সা অনেক দূর চলে গেলো। আমি উল্টো দিকে হাটা শুরু করলাম। যাত্রাবাড়ী একটা বাসে উঠে জানালার সিটে এসে বসলাম।
মেয়েরা সবসময় তার চারপাশে রহস্যময় করে রাখরে পছন্দ করে। গোলকধাঁধার মধ্যে থাকতে পছন্দ করে।

মেয়েরা এমন কেনো? কেনো রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে রহস্য রেখে চলে যায়। আবার কবে দেখা হবে বৃষ্টিমেঘার সাথে? কবে? এখনি আবার দেখতে ইচ্ছে করছে। খুব ইচ্ছে করছে।


পর্ব ৩

‘অভ্র, এই অভ্র, রাতে কি রান্না হবে? কিরে, এখনো ঘুম? সেই বিকালে ঘুমিয়েছিস। উঠবি না?’

আমি ঘুমঘুম চোখে রাকিবের দিকে তাকালাম।
‘আজ সারাদিন, কিছুই রান্না করিস নি? সকালে, দুপুরে কি খেয়েছিস? আমি অফিস থেকে এসে দেখি কিছুই রান্না করা নাই। তোর কি শরীর খারাপ? জ্বর এসেছে?’

নীলার সাথে দেখা করে বাসায় এসে শুয়ে ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি জানিনা।

ঘুমঘুম কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ক’টা বাজে?’
রাকিব জবার দিলো, ‘রাত ৮.১৮।’

‘এতো সময় ঘুমিয়েছি? সরি রে। কিছুই রান্না করতে পারিনি। সকালে তুই অফিসে যাওয়ার পর আমি চা বিস্কুট খেয়ে বেড়িয়েছিলাম। দুপুরে বাইরে খেয়েছি। সে জন্য আজকে রান্না করিনি। ভেবেছিলাম সন্ধ্যা বিকালে করবো। কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। তুই কখন এসেছিস?’
প্রশ্ন শুনে চমকে গেলো রাকিব।

‘মনে নেই তোর? তুই-তো দরজা খুলে দিলি। দরজা খুলে কোনো কথা না বলে রুমে এসে শুয়ে পড়লি। ভাবলাম হয়তো শরীর ভাল না। তাই আর বিরক্ত করিনি।’

‘আচ্ছা, আমি হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি। এসে একসাথে রান্না করবো।’
‘আচ্ছা৷’

রান্না শেষ করে, খেয়ে রাকিবের সাথে গল্প করার সময় হঠাৎ নীলার মেসেজ এলো।
‘কি করেন?

‘রাকিবের সাথে আড্ডা দেই। রাতে খেয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, খেয়েছি। ব্যস্ত থাকলে পড়ে কথা বলি।’
‘না না, ব্যস্ত না। আপনি কি করেন?’
‘জানালা দিয়ে আকাশ দেখি। অন্ধকারে মধ্যে তারাগুলো মিটিমিটি করে জ্বলছে। সুন্দর লাগছে।’

‘চাঁদ আছে আকাশে?’
‘আছে, খুব সুন্দর। আজকের চাঁদটা খুব সুন্দর।’

‘আচ্ছা, চাঁদ কি আপনার থেকেও বেশি সুন্দর? নাকি একটু কম সুন্দর?’
‘আমি মোটেও সুন্দর না। আর চাঁদ আমার থেকে বেশি সুন্দর। জানালা খুলে নিজেই দেখুন। অনেক সুন্দর আজকের চাঁদ, মুগ্ধ হবেন দেখে।’
‘আমিও দেখছি। তবে আমার মনে হচ্ছে, চাঁদ ঠিক আপনার মত সুন্দর।’
‘আপনাকে বলেছে! চাঁদ বেশি সুন্দর।’

‘এই অভ্র, কার সাথে কথা বলিস। একা একা হাসতাছিস? বিশেষ কেউ?’
রাকিবের কথা শুনে পিছন ফিরে তাকালাম। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘না, তেমন কেউ না। এই এক বন্ধুর সাথে কথা বলছি’
‘ওহ, আচ্ছা ঠিক আছে বল। তাহলে আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। সকালে আমার অফিস আছে।’

‘ঠিক আছে। তুই গিয়ে ঘুমা। কাল কথা হবে।’
‘ব্যস্ত বুঝি? নীলা প্রশ্ন করলো।’
‘না এখন সম্পূর্ণ ফ্রি আছি।’
‘কি করবেন এখন?’
‘নদী দেখবো!’

‘এই ঢাকা শহরে, গিজগিজ করা বিল্ডিং, গাড়ি-রিক্সার মধ্যে নদী পাবেন কোথায়?’

‘নদী কি একমাত্র নদীর কাছে গিয়ে দেখা যায়? এই কোলাহল, ব্যস্ততার মধ্যেও নদী দেখা যায়।’
‘কীভাবে?’
‘জানালা দিয়ে কি দেখতে পাচ্ছেন?’

‘আকাশ, রাস্তা, গাড়ি, রিক্সা ইত্যাদি।’
‘এই যে রাস্তা, একে নদী মনে করুন। রিক্সা গুলোকে নৌকা মনে করুন, বাস গুলোকে লন্স মনে করুন। দেখবেন চোখের সামনে নদী চলে আসবে।’
‘বাহ, দারুণ বুদ্ধি তো।’

‘আমার যখন একা লাগে, যখন মন খুব খারাপ থাকে তখন এই রাস্তা কে নদী মনে করে দেখি। আকাশ দেখি। নিমিষেই মন ভাল হয়ে যায়।’
‘জানেন, আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। তা এই পর্যন্ত কথা বলে কয়টা মেয়ে পটিয়েছেন?’

‘গুনে দেখতে হবে, ঠিক মনে নেই। হবে ১০/১২ টা।’
নীলা মেসেজ দেখেও রিপ্লাই দেয় না। হয়তো মন খারাপ করেছে। অনেকক্ষণ পর আমি আবার মেসেজ দিলাম।
‘কি হলো? কথা বলছেন না কেনো?’

‘একটু ব্যস্ত ছিলাম।’
বাহ, কত সহজে মানুষ অযুহাত দিতে পারে।
‘শুনুন, আমি আগে কাউকে পটায়নি, আর কেউ পটেও নি। জীবনে আগে কেউ ছিলো না!’

‘সত্যি বলছেন? তবে এখন কি কেউ আছে?’
‘ভেবে দেখতে হবে।’
‘কি, কি বললেন? ভেবে দেখা লাগবে?’
‘রাগ করছেন কেনো?’

‘আমি রাগ করার কে, কেউ না৷ আমাদের সম্পর্ক তো এখনো আপনিতেই আছে। আমি তো আপনার তুমিই না৷ এখানে রাগ করার অধিকার নেই।’
‘যদি অধিকার দিতে চাই৷ রাগ করবেন? অভিমান করবেন? মাঝে মাঝে বকে দিবেন? অভিমান করে কথা না বলে থাকবেন? আবার কিছুক্ষণ পর অভিমান ভেঙে বলবেন, ভালবাসি!

‘না, বয়ে গেছে আমার৷ শুধু শুধু রাগ করতে। বলবো না কিছুই?

‘আমি যে চাই। কেউ রাগ করুক, অভিমান করুন, বকে দিক, রাগ করে দেখা হলে মারুক, তবুও কেউ একজন থাকুক। খুব আপন কেউ একজন থাকুক। যাকে অকারণে ভালবাসবো, জালাবো, না বলা কথাগুলো নিমিষেই বলে দিতে পারবো। যার কাছে কষ্টগুলো জমা রাখতে পারবো। সুন্দর মুহুর্ত গুলো, সুন্দর সময়গুলো ভাগ করতে পারবো। আপনি কি আমার তুমি হবে? তুমি কি আমার সেই তুমি হবে?’

নীলা কিছু বলেনা। চুপ, চুপ, চুপ করে থাকে। মেসেজের উত্তর দেয় না।
আমার খুব ইচ্ছে করে নীলার কন্ঠ শুনতে। আমি ফোন দেই। নীলা ফোন ধরে, ফোন ধরে চুপচাপ থাকে। কনো কথা বলে না। তবুও আমি কিছু শুনতে পাই৷ আমি শুনতে পাই এই নৈশব্দ মাঝে কেউ একজন বলছে, ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি৷ আমি শুনতে পাই, কেউ একজন বলছে, আমি তোমার তুমি হতে চাই, আমি আরো শুনতে পাই, আমি তোমার সেই মানুষটি হতে চাই। আমি বার বার এ কথাগুলো শুনতে পাই। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলে না। কেউ কিছুই বলে না। তবুও আমি কেনো শুনতে পাই। কেনো?

অনেকক্ষণ পর নীলা বলে, ‘আজ রাখি। কাল কথা হবে। বাই, শুভ রাত্রি।’
এটা বলে ফোন কেটে দেয়। আমি কানে ফোন চেপে রাখি৷ ওপাশে কেউ নেই। তবুও আমি শুনতে পাই, কেউ একজন বলছে, ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি।
এভাবে কেটে যায় অনেকটা সময়। অবশেষে ফোন নামিয়ে রেখে জালানা দিয়ে তাকাই। একটা নদী দেখতে পাই। খুব ছোট একটা নদী। নদীর মধ্যে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। চাঁদটা আসলে সুন্দর। অনেক সুন্দর। এভাবে আকাশ দেখি, নদী দেখি। আর মনে মনে ভাবি।

“আজকার ‘শুভ রাত্রি’ খুব অপ্রিয় বাক্য মনে হয়
শুভ রাত্রি বললে যে কথোপকথনের ইতি টানতে হয়”


পর্ব ৪

দু’দিন কেটে গেলো, নীলা একবারও কল রিসিভ করেনি। মেসেজের উত্তর দেয়নি৷ বার’কয়েক বার ফোন দিয়েছি, মেসেজ দিয়েছি। নীলার কোনো রেসপন্স পাইনি। প্রতিবার ফোনে কল যায় তবে ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করে না৷ ফোনে রিং যাবার সময় আমি অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পাই। তবে কিছুই বুঝতে পারি না। সব কিছু এলোমেলো। অদ্ভুত। ভুতুড়ে।

বৃষ্টি নেমেছে৷ খুব বৃষ্টি হচ্ছে। দুপুরে ইন্টারভিউ দিয়ে বাসায় ফেরার সময় আকাশে কালো মেঘ জমে ছিলো। এখন বিকাল, সেই মেঘ গুলো বৃষ্টি হয়ে নেমে আসছে নগরীতে। মন খুব খারাপ। এই নিয়ে ১৬’টা ইন্টারভিউ দিয়েছি। সব জায়গায় ব্যর্থ৷ ব্যর্থ!

কিছু মানুষের জীবনে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পরিমাণ বেশি থাকে। তবে, সেই সব মানুষগুলোর জীবনে হঠাৎ করে অলৌকিক ভাবে খুব বড় সফলতা আসে। সেই সফলতা বাকিটা জীবন সুখে থাকার জন্য যথেষ্ট।

আমার জীবনে কি সফলতা আসবে? সফলতা’কে কি ছুঁয়ে দেখতে পারবো? এ সব ভাবতে ভাবতে ছাঁদে চলে এসেছি। আজ বরং ভিজি৷ এই বৃষ্টির পানিতে ভিজে সকল ব্যর্থতা ভুলে যাই৷ সকল কষ্ট, সকল খারাপ লাগার অনুভূতি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যেতে দেই। আজ বৃষ্টি হই। তুমুলঝড় হই। ঝড়ে সব এলোমেলো চিন্তাগুলোকে উড়িয়ে দেই। আজ আমি পাখি হই। আচ্ছা, পাখি’রা কি বৃষ্টি মধ্যে উড়ে?

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খুব মাথা ব্যথা করছে। রুমে এসে কোনো রকম মাথা মুছে, কাপড় চেঞ্জ করে শুয়ে পরলাম। রাকিব বার কয়েকবার রান্না করার জন্য ডাকতে এলো রুমে। আমার মাথা তুলার মত শক্তি নেই। কথা বলার মত শক্তি নেই। আবার ডাকতে এসে গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠে বলল, ‘অভ্র, তোর তো ভিষণ জ্বর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো?’

খুব কষ্টে উত্তর দিলাম, ‘না, দরকার নাই। আমার ড্রয়ারে ঔষধ আছে। তুই আমাকে একটু পানি আর ড্রায়ার থেকে ওষুধ বের করে দে৷ আমি খেয়ে শুয়ে থাকি।’
‘আচ্ছা।’

‘তুই আজকে কিছু একটা রান্না করে খেয়ে নে। আমি রাতে খাবো না কিছু।’
‘আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুই ওষুধ খেয়ে ঘুমা। আমি কি থাকবো আজকে তোর রুমে? যদি কিছু দরকার পরে।’

‘না দরকার নেই। সমস্যা হবে না। ওষুধ খেয়েছি, সুস্থ হয়ে যাবো সকালের মধ্যে।

‘তাহলে আমি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’

মধ্যরাত হবে হয়তো৷ প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। চোখ বন্ধ করে থাকতে পারছি না আবার চোখ খোলা রাখতে পারছি না। মনে হচ্ছে কানের কাছে, খুব কাছে কেউ একজন চিল্লাচিল্লি করছে, সাথে বাইরে থেকে আসা গাড়ি চলার শব্দ, ফ্যান ঘোরার শব্দ সব এক সাথে কানে আসছে। এসব শব্দ গুলো কানের আসার সাথে সাথে সরাসরি মাথার মধ্যে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, মাথাটা ব্যথায় ফেটে যাবে এক্ষনি।

কয়টা বাজে? কত রাত হয়েছে? সকাল হতে কি অনেক দেরি? এসব প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে৷ ঘুম আসছে আবার ঘুম আসছে না। মনে হচ্ছে একটা বন্ধ রুমে আটকে পড়েছি। কিছুতেই বের হতে পারছি না। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে যাবে ভাব। আমি খাটের আশেপাশে হাত দিয়ে মোবাইল খুঁজতে লাগলাম। ক’টা বাজে জানতে না পারলে মাথা ব্যথা আরো দিগুণ হবে।

এদিক ওদিক হাত দিয়ে তালাশ করতেই পেয়ে গেলাম ফোন। ফোনের লক বাটনে চাপ দিয়ে কিছুতেই লক খুলতে পারছি না। ফোন খুলছে না কেনো? মাথা ভো ভো করে ঘুরছে। প্রচন্ড চাপ অনুভব করছি। হঠাৎ পিপাসা পেয়ে গেলো। পানি খেতে হলে খাট থেকে নেমে টেবিলের কাছে যেতে হবে। খুব কষ্ট হচ্ছে নামতে। তবুও নামতে হবে, মনে হচ্ছে এখন পানি না খেলে আর কখনো পানি খেতে পারবো না। নেমে পানি খেয়ে আসার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।

ঘুম ভেঙে দেখি সাদা রঙের বিছানায় শুয়ে আছি। পাশে একটা জানাল। জানালায় সাদা পর্দা টাঙানো। অদ্ভুত, এখানে প্রায় সব কিছুই সাদা। তবে জানালা বন্ধ। জানালাটা খুলে দিতে ইচ্ছা করছে। তবে এখন বিছানা থেকে নামতে ইচ্ছা করছে না। মানুষ খুব অদ্ভুত। কখন কি ইচ্ছা করে সে নিজেও জানে না। উলটো দিকে ঘুরে দেখে কিছুক্ষণ পর বুঝলাম আমি হাসপাতালের ব্রেডে শুয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে কেউ একজনের ঢোকার শব্দ পেয়ে তাকাতেই চমকে গেলাম।

‘মা, তুমি এখানে? কখন এসেছো?’ মাকে এখানে দেখে আমি খুব অবাক হলাম। রীতিমতো চমকে গেলাম।

‘দুপুরে এসেছি। রাকিবের ফোন পেয়ে। কেমন আছিস এখন?
‘ভাল আছি। বাসার সবাই কেমন আছে? আনিকা, বাবা কেমন আছে? এখন কয়টা বাজে? এখন কি বিকাল?’

‘দেখতে পাচ্ছি, আমার ছেলেটা খুব ভাল আছে। এতো ভাল আছে যে এখন হাসপাতালে ব্রেডের পাশে বসে তার সাথে কথা বলতে হচ্ছে। তুই কাল রাতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলি। তোর বন্ধু ভোরে এম্বুল্যান্স ডেকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে আমাকে ফোন দিয়েছে। আমি ফোন পেয়ে সাথে সাথে চলে এসেছে। দুপুরে এসে পৌঁছেছি। এসে দেখি তুই ঘুমিয়ে আছিস। শুনলাম ডাক্তার তোকে কড়া ডোজের ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছে। আর বাসার সবাই ভাল আছে। আমি একা এসেছি। আনিকার পরীক্ষা ছিলো তাই ও আসতে পারেনি।’

‘তোমার আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? আর আমি কি একদিনের মত ঘুমিয়ে আছি। এই সামান্য জ্বরের কারনে।’

‘আমার আসতে কোনো সমস্যা হয়নি। তোর সামান্য জ্বর! তুই জানিস কি পরিমান জ্বর ছিলো। এখন একটু কম। ডাক্তার বলেছে, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ভেজার কারনে জ্বর এসেছে, সাথে দুশ্চিন্তা, টেনশন, ঠিকমতো খাবার না খাওয়া, রাত জাগা সব কিছু মিলে তোর শরীর খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। এই কয়দিনে একদম কাবু হয়ে গেছিস৷ তা এতো দুশ্চিন্তা, টেনশন কিসের জন্য। চাকরি? নাকি অন্য কিছু?

তোর আব্বু কতবার বলেছে ব্যংকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিবে। এবার বললে আমি আর তোর হয়ে না বলতে পারবো না। বাবার ভয়ে বাবাকে সরাসরি কিছু বলিস না। সব আমার বলতে হয়। আর আমার কথা শুনতে হয়। এই বলে দিলাম, আমি আর তোর জন্য কনো কথা শুনতে পারবো না।’

‘মা, মা, মা!’
‘কি হলো, মা, মা, মা করছিস কেনো। আমি তোর কোনো কথায় রাজি হবো না৷’

‘মা, মা, মামনী৷ এতো টেনশন করো না৷ আমি সুস্থ হয়ে যাবো। তুমি কি জানো, তুমি যখন খুব টেনশন করো তখন একটার পর একটা কথা বলতে থাকো। বাচালের মত কথা বলেই যাও।’

‘হ্যাঁ, আমি তো এখন বাচাল। আমি তো ভাল না। তোরা বাপ-বেটাই শুধু ভাল। তোদের কথাই সব সময় ঠিক। মাঝখানে আমি শুধু কষ্ট পাই।’

  • এই দেখো, আবার চোখে পানি। প্লিজ মা কান্না করবে না। তোমার চোখে পানি দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। এখন তুমি বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেও। আমার মাথা ব্যথা করছে। আমি একটু ঘুমাবো।’

‘আচ্ছা, আমি রাতে আসবো খাবার নিয়ে। বল কি খাবি, কি রান্না করবো?’
‘আমার পছন্দের খাবার কোনটা সেটা কি আবার বলে দেওয়া লাগবে?’
‘না, লাগবে না। আমি জানি।’

মা চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর রাকিব রুমে ঢুকলো।
পাশে এসে বসে জিজ্ঞাসা করলো, ‘কিরে এখন কি অবস্থা? কেমন আছিস?’
‘এইতো কিছুটা ভাল লাগছে।’

‘আচ্ছা বিশ্রাম নে। আমি বাইরে আছি।’
‘শোন, আমার ফোন কোথায়?’
‘ফোন মনে হয় বাসায় আছে৷ কেনো, দরকার?’
‘হ্যাঁ, খুব দরকার। মনে হয় চার্জ শেষ। তুই এক কাজ কর। বাসায় গিয়ে ফোনে চার্জ দিয়ে নিয়ে আয়।’

‘তোকে এখানে একা রেখে যাব?’
‘আরে আমি ভাল আছি। আমার সমস্যা হবে না। তুই যা। রাতে মা যখন আসবে সাথে আসিস। আর মনে করে ফোন নিয়ে আসবি।’
‘আচ্ছা, নিয়ে আসবো। তুই বিশ্রাম কর।’

রাকিব চলে গেলো। ঘুম আসছে না। নীলার কথা খুব মনে পড়ছে৷ নীলা কি কোনো মেসেজ বা ফোন দিয়েছিলো? ফোন দিলে তো ফোন বন্ধ পেয়েছে নিশ্চয়। ফোন বন্ধ পেয়ে কি ভেবেছে কে জানে!

সময় মত মা আর রাকিব চলে এলো। রাতে খাবার খেয়ে মা সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে মা চলে গেলে ফোন চালু করলাম। চালু করার পর সাথে সাথে কয়েকটা মেসেজ এলো। সিম কোম্পানির লোকদের খেয়েদেয়ে কাজকর্ম নাই। সারাদিন শুধু মেসেজ দিতেই থাকে। মেজাজটা খারাপ করে দেয়। হাঠাৎ নীলার মেসেজ চোখে পরলো।

মেসেজে লিখেছে,
‘আপনার ফোন বন্ধ কেনো? আপনাকে অনেকবার ফোন দিয়েছি।’
‘রাগ করেছে? আপনার ফোন রিসিভ করিনি বলে কি রাগ করে ফোন বন্ধ করে রেখেছেন?’

এই মেসেজ দু’টি রাত ১ টায় এসেছে।
নীলা সকালেও মেসেজ পাঠিয়েছে।

‘শুভ সকাল! সকালে বারকয়েক ফোন দিয়েছি। রাতের মত বন্ধ। রাতে ভেবেছিলাম হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু এখনো ফোন বন্ধ করে রেখেছেন সেহেতু আমি নিশ্চিত আপনি খুব রাগ করেছেন আমার উপর। আমি সত্যি সরি বলছি।’

দুপুরে মেসেজ পাঠিয়েছে। লেখা,
‘শুনুন৷ আমিও আপনাকে খুব পছন্দ করি। তবে, সব মেয়ে একটু সময় চায় ভাল করে ভাবার জন্য। আপনি তো খুব অদ্ভুত। এমন ভাব করছেন কেনো। আর ফোন বন্ধ করে কি পুরুষত্ব দেখাচ্ছেন?’

এই মেসেজটা পড়ে মন ভালো হয়ে গেলো। ঠোঁটে হাসি চলে এলো।
‘আমাকে আর কখনো ফোন বা মেসেজ দিবেন না। আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই না। বাই।’

সবগুলো মেসেজ পড়ে আমি যতটা অবাক ঠিক ততটা খুশি। অনেকটা খুশি। আমি খুব ছোট একটা মেসেজ টাইপ করে কয়েক মিনিট ভেবে সেন্ড বাটনে ক্লিক করে পাঠিয়ে দিলাম।

অপেক্ষা করছি। এক ঘন্টা হয়ে যাবার পরও ওপাশ থেকে কনো রিপ্লাই আসে নি। এখন সত্যি মেজাজ খুব খারাপ হচ্ছে।

মেয়েরা আসলে অদ্ভুত। যখন কেউ মেসেজের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে তখন মেসেজ দিবে না৷ আর যখন ঘুমিয়ে কিংবা অন্য কাজে বস্ত থাকবো কেমন করে বুঝে ঠিক তখনি গুরুত্বপূর্ণ মেসেজগুলোর রিপ্লাই দিবে।

অবশেষে ঠিক এক ঘন্টা, চল্লিশ মিনিট পর মেসেজ এলো শুধু হা হা রিয়েক্ট। নিচে লেখা, ‘এটা দিয়ে আমাকে মেসেজ দিতে বাধ্য করেছিলেন। তাই এটাই এখন আপনার প্রাপ্য।’


পর্ব – ৫

‘আমার হাতটা ছাড়া যাবে? হাতের তালু ঘেমে গেছে?’ হঠাৎ নীলা অন্য দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে আমার উদ্দেশ্যে কথাটা বলল।

‘আচ্ছা।’ এই বলে আমি নীলার হাত ছেড়ে দিলাম।
নীলা হাতের তালু মুঁছতে মুঁছতে বলল, ‘অনেকক্ষণ হাত ধরে ছিলে, এই জন্য হাতের তালু ঘেমে গেছে। যা গরম পড়েছে!’

মিনিট পাঁচেক পর। আমি আবার হাত বাড়িয়ে দিলাম। নীলা মুছকি হেসে আমার হাতের তালুর উপর হাত রাখলো। আমি নীলার হাত ধরে রিক্সায় বসে রইলাম। নীলা অন্যদিকে ফিরে হাসছে। আমিও অন্য দিকে ফিরে হাসছি। অদ্ভুত মুহূর্ত। দু’জনে রিক্সা করে ঘুরছি।

জ্বর থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ছয়দিন লেগেছে। এই প্রথম জ্বর আমাকে ভালই ভুগিয়েছে। আমি কখনো দু’দিনের বেশি অসুস্থ থাকি না৷ কিন্তু এবার পাঁচটা দিন লাগলো সুস্থ হতে। গতকাল মা’কে সিলেটের ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছি। আব্বুকে ফোন করে সময়মত স্টেশনে থাকতে বলেছিলাম। মা বাসায় গিয়ে জানিয়েছে সুস্থ ভাবে পৌঁছেছে।

নীলার সাথে এটা আমার দ্বিতীয় বারের মত সরাসরি দেখা। ওইদিন রাতে নীলা হা হা রিয়েক্ট পাঠানোর পর আর কথা হয়নি। রাতের দিকে আবার প্রচন্ড জ্বর এসেছিলো। পরের দিন দুপুরে একটু সুস্থ হয়ে নীলাকে ফোন দিয়েছিলাম। নীলা ফোন রিসিভ করেনি। পরে ফোন করে জানিয়েছে, নীলা ক্লাসে ছিলো। ক্লাস শেষ করে কল ব্যাক করেছে। সেদিন নীলার সাথে দীর্ঘ সময় কথা হয়।

বৃষ্টিতে ভেজে, রাতে জ্বর হওয়া, হাসপাতালে ভর্তি, ফোনে চার্জ না থাকা, সব খুলে বলার পর নীলা আর রাগ করে থাকতে পারেনি। নীলা বারবার বলেছিলো দেখতে আসবে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে পরের দিন বাসায় চলে যাই। ডাক্তার বলেছে, ‘বাসায় বিশ্রাম নিন, এবং ঠিকমতো ওষুধ খান, পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান। খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন৷ হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নাই।’

গতকাল মা সিলেটে ফিরে যাবার পর রাতে নীলাকে ফোন করে আজ দেখা করতে বলি। নীলা সাথে সাথে হ্যাঁ বলে। নীলা বলেছিলো, কাল আমার ক্লাস আছে। ক্লাস শেষে দেখা করবো। তুমি একটু আগে এসে বাইরে অপেক্ষা করো। আমি নীলার কথামতো অনেক আগে এসেছি। চারটায় ক্লাস শেষ হবে। ক্লাস শেষ করে বাইরে আসতেই নীলার সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। নীলা একটা হাসি দিয়ে বলল,

”এই যে অভ্র, কথামতো আগেই চলে এসেছো দেখছি। কখন এসেছো?’
‘মিনিট তিরিশ হবে।’

‘আমি কি এতো আগে আস্তে বলেছি। আর একটু দেরি করে আসলে সমস্যা হত না।’

‘এই যে আজ আগে আসলাম। যখন দেরি করে আসবো সেদিন রাগ করবে না। তাহলেই হবে।’

‘বাহ, আগে থেকে দেরি করে আসবে বলে রাখছো।’
‘কি করবো বলো, আজকার দেরি করে এসে যদি সত্যি কথাও বলি তাহলে মানুষ বিশ্বাস করে না। ভাবে এক্সকিউজ দিচ্ছি।’

‘আমি এরকম না। আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাস টুকু রাখলেই হবে। আচ্ছা একটা রিক্সা ঠিক করো। আজ রাত পর্যন্ত রিক্সায় ঘুরবো।’
সেই থেকে দু’জনে রিক্সায় ঘুরছি।
‘তুমি কিন্তু এখনো উত্তর দেও নি?’

নীলা আমার দিকে ফিরে বলল, – কোন প্রশ্নের উত্তর?

‘যে প্রশ্নটা যতবার মেসেজ এ জিজ্ঞাসা করেছি ততবার হা হা রিয়েক্ট পেয়েছি। যতবার ফোনে জিজ্ঞাসা করেছি ঠিক ততবার শুধু নিশ্বাসের শব্দ শুনেছি। তুমি প্রতিবারই নিশ্চুপ ছিলে। সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই। এখন বলো।’
নীলা বাচ্চা শিশুর মত অবুঝ হবার ভঙ্গিতে বলল,
‘কি বলবো?’

‘যেটা আমি শুনতে চাই।’

‘তুমি কি শুনতে চাও? সেটা তুমি জানো। আমি কি করে জানবো।’
আমার অল্প অল্প রাগ হচ্ছে।
‘আমি কি শুনতে চাই তুমি জানো না?’

‘না জানিনা। তুমি আবার বললে হয়তো মনে পড়বে৷’
‘আচ্ছা, থাক। তোমার মনে করার দরকার নাই। আমি আর শুনতে চাই না। কখনো বলতেও চাই না।’

নীলা খুব জোরে হাতে চিমটি কাটলো। রাগি রাগি কন্ঠে বলল, ‘তুমি শুনতে চাও না? সত্যি শুনতে চাও না?’

‘না, আমি শুনতে চাই না। আমি বলতেও চাই না।’ আমিও সামান্য রাগ করার ভাব নিয়ে নীলাকে কথাগুলো বললাম।

নীলা মন খারাপ করে অন্য দিকে ঘুরে তাকালো। কিছুটা সরে গিয়ে বসলো। হাত ধরা ছিলো। ছেড়ে দিলো। এভাবে কেটে গেলো নৈশব্দে কিছুক্ষণ।
নীলা রিক্সা চালক কে বলল, ‘মামা, রিক্সা উত্তরার দিকে ঘুরান। আমি বাসায় যাবো।’

‘এখনি চলে যাবে। মাত্র সন্ধ্যা হলো। কফিশপে গিয়ে কফি খেতে খেতে কিছুসময় গল্প করি।’

‘আমার ভাল লাগছে না অভ্র। আমি বাসায় যেতে চাই৷ এখনি। মামা, রিক্সা ঘুরান।’

আমি আর বাঁধা দিলাম না। রিক্সা উত্তরার দিকে যাচ্ছে। এক ঘন্টার মত সময় লাগলো আসতে। পৌঁছে গেলে নীলা বলল, ‘মামা, এখানে রিক্সা থামান। ভিতরে যাওয়া দরকার নাই। আপনি রিক্সায় থাকা এই ভদ্র লোককে পৌঁছে দিন।’

এই বলে নীলা রিক্সা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলো। মেইন রোড থেকে নীলাদের বাসায় হেটে যেতে মিনিট দশেকের একটু বেশি সময় লাগে। নীলা রিক্সা থেকে নেমে যাওয়ার পর আমি রিক্সা মামাকে বললাম, ‘মামা, এখানে অপেক্ষা করুন৷ আমি আসছি।’

নীলার পিছুপিছু দৌঁড়ে গেলাম। নীলার কাছে আসতেই নীলা ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘কি চাই?’

‘কি চাই মানে?’ নীলা এভাবে কথা বলবে আমি কখনো ভাবিনি। জায়গাটা একদম শান্ত, আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। এতো অল্প রাতে এখানে মানুষগুলো কি ঘুমিয়ে পড়েছে? কে জানে।

নীলা আবার বলল, ‘আমার পিছুপিছু দৌঁড়ে এসেছো কেনো? কিছু বলবে?’
আমি নিলার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললাম,
‘কি বলবো?’

নীলার রাগ আরো বেড়ে গেলো। বলল, ‘তাহলে এভাবে পিছুপিছু এসেছো কেনো? আমি কি আসতে বলেছি?

এই বলে নীলা আবার হাঁটতে শুরু করলো। আমি নীলার হাত ধরে কাছে টেনে আনলাম।

‘এভাবে পালাচ্ছ কেনো? পালানো বন্ধ করো?’

নীলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমি আস্তে করে নিলার কানের কাছ থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে কিছুসময় নিয়ে বললাম, ‘তোমার তুলের ঘ্রাণ খুব সুন্দর। কি স্যাম্পু দিয়েছো?’ এই বলে হেসে দিলাম।

রাগে নীলার চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো। নীলা চলে যাবার জন্য হাত ছুটানোর ট্রাই করছে। ছটফট করছে। নীলা চলেই যাবে। আমি নীলার চোখে হাত দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে বললাম, ‘শান্ত হও, খুব শান্ত। ধিরে ধিরে নিশ্বাস নেও। শান্ত। একদম শান্ত থাকো।’

নীলা শান্ত হলো। খুব শান্ত হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি নীলার খুব কাছে চলে গেলাম। কিছুটা সময় নিয়ে বললাম, ‘আমি যতটা আকাশ পছন্দ করি, আমি যতটা সাদা মেঘ পছন্দ করি তারচে’ বেশি তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছি। তোমাকে অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছি। ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।’

নীলা সাথে সাথে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি ভাবিনি নীলা এটা করবে। এই রাস্তার মধ্যে। আমি অনেকটা অবাক-খুশি। আমিও নীলাকে জড়িয়ে ধরলাম।
হঠাৎ নীলাকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিলাম। নীলা অবাক চোখে বললো, ‘কি হলো?’

দূর থেকে হেটে আসা লোকটাকে দেখিয়ে বললাম,

‘আমরা গলিতে আছি। তুমি এখানে আমাকে জড়িয়ে ধরবে ভাবিনি।’
নীলা অনেকটা লজ্জা পেলো কথাটা শুনে। নীলা কিছুই বললো না। লোকটা পাশ দিয়ে চলে যাবার পর বলল, ‘আমি এখন বাসায় যাবো। তুমি চলে যাও।’
এই বলে নীলা হাটা শুরু করলো।

আমি একটু জোর গলায় বললাম, ‘যেটা শুনতে চাই সেটা বলবে না?’
নীলা যেতে যেতে হেসে উত্তর দিলো, ‘জড়িয়ে ধরার পরেও শুনতে হবে?’
এটা বলে চলে গেলো। কোনো কিছু বলার সুযোগ দিলো না। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাসার দিকে রওনা হলাম।


পর্ব ৬

দুপুর থেকে আকাশে ঘন কালো মেঘ। বৃষ্টি নামবে খুব জোরে। এই বৃষ্টি কয়েক ঘন্টা ধরে হবে। বৃষ্টিতে ভেজার জন্য এরকম বৃষ্টি পার্ফেক্ট। যে বৃষ্টি নেমে অল্প কিছু সময় পর থেমে যায় সে বৃষ্টিতে ভিজে মজা নেই। বৃষ্টি নামতে নামতে বিকাল। বিকালে বৃষ্টি শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত একাধারে বৃষ্টি হবে। নীলাকে সকাল থেকে ফোন দিচ্ছি তবে সে ফোন রিসিভ করছে না।
নীলা ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে বললাম।
‘এই যে, বৃষ্টিমেঘা।’

‘আজ হঠাৎ এই নামে ডাকছো?’
‘ভুলে গেছো। বলেছিলাম, যেদিন আকাশে মেঘ থাকবে, বৃষ্টি হবে সেদিন তোমায় বৃষ্টিমেঘা বলে ডাকবো। কি করো?’
‘চা-আইস্ক্রিম বানালাম!’

‘চা-আইস্ক্রিম? এটা আবার কি? তোমোর মুখে মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব আইটেমের নাম শুনেই অবাক হয়ে যাই।’

‘খাবে? খুব মজা হবে হয়তো। কিছুক্ষণ হলো ফ্রিজে রেখেছি। বরফ হলে খাওয়া যাবে। খাবে?’

‘তোমার অদ্ভুত সব রান্না আমি কি কখনো খেয়েছি?
আচ্ছা, শুনি কি ভাবে চা-আইস্ক্রিম বানালে।’

‘খুব সহজ। প্রথমে এক চুলাই পানি আর অন্যটায় দুধ গরম করতে দিয়েছি, পানি গরম হয়ে গেলে পর্যাপ্ত পরিমানের চিনি, অল্প কিছু এলাচ, দুই তিনটা লবঙ্গ দিয়েছি। ৫ মিনিট পর চা পাতা দিয়ে সাথে সাথে নামিয়ে ফেলেছি। চা টা ভাল করে ছেকে, চা’য়ের মধ্যে দুধ, বাদাম, কিচমিচ দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুটেছি। সবকিছু মিক্স হলে আইস্ক্রিমের কাপে ঢেলে তার উপর কিছুটা চকলেটের গুরো দিয়ে ফ্রিজে রেখেছি।’

‘বাহ! দারুন। তুই চাইলে একটা বই বের করতে পারো। বইয়ের নাম হবে অদ্ভুত সব রেসিপি। অনেক সেল হবে বইটা।’
‘তুমিও না। শুধু আজে বাজে কথা।’

‘সারাদিন কি চা-আইস্ক্রিমের পিছনে লেগে ছিলে? ফোন দিলাম ধরলে না। আচ্ছা শুনো, যে কারনে ফোন দিয়েছি’
‘হ্যাঁ, বলো।’

‘মেঘ হয়েছে আকাশে। বৃষ্টি হবে। খুব বৃষ্টি। কয়েক ঘন্টা ধরে এই বৃষ্টি হবে। চলো বৃষ্টির মধ্যে শহরের রাস্তা দিয়ে হাটি। কিছু বৃষ্টির ফোঁটায় আমাদের দু’জনের স্মৃতি জমা রাখি। জানো, পানিরও স্মৃতি আছে। এই সুন্দর স্মৃতি টুকু আমি তুমি আর বৃষ্টি মনে রাখি। ভিজবে আমার সাথে?’

ফোনের ওপাশ থেকে নীলা কিছুই বললো না। হয়তো ভাবছে। আমাকে অপেক্ষার কষ্টটুকু দিয়ে অবশেষে বলল, ‘তোমার বাসা থেকে আমাদের বাসায় আসতে অনেক সময় লাগবে। যা য্যাম।’

আমি বললাম, ‘তুমি কি ভিজবে আমার সাথে?’
‘ভিজতাম। তবে, তুমি এখন..! এখানে আসবে কি করে?’
‘আমি কিভাবে আসি সেটা বেপার না। তুমি কি ভিজবে আমার সাথে? হ্যাঁ কি না?’

‘হ্যাঁ ভিজবো।’
‘তাহলে শাড়ি পরে নিচে নামো।’
‘তুমি কি আমার বাসার নিচে?’

‘ না, তোমার বাসার নিচে না। তবে মেইন রাস্তায়। গলির মাথায়। সেই দুই ঘন্টা ধরে দাড়িয়ে আছি। আর দাঁড়িয়ে রেখোনা প্লিজ।’

‘কি? কি বললে? জানো, আমি ভাবিনি এখন তুমি আমার বাসার কাছে থাকবে। আমি সত্যি অবাক। তুমি এমন কেনো? আমাকে ১৫ মিনিট সময় দেও। আমি আসছি।’

‘১৫ মিনিট না, তোমাকে ২০ মিনিট দিলাম। তবে শাড়ি পড়ে আসবে। প্রথম দেখা হবার দিন আকাশি রঙের যে শাড়িটা পড়েছিলে সেটা পড়ে আসবে।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি আসছি।’
‘আচ্ছা, শুনো। একটা চাদর নিয়ে আসবে।’
‘আচ্ছা, একটু কষ্ট করে অপেক্ষা করো।’

নীলা অপেক্ষা করতে বলে ফোন কেটে দিলো। নীলার সাথে রিলেশনের প্রায় সাত মাস কেটে গেছে। যতদিন যাচ্ছে তত ভালোবাসা বাড়ছে। আমি সত্যি অবাক। আমি কখনো ভাবিনি একটা মানুষকে এতো ভালোবাসা যায়। আমি একটা মানুষকে এতো ভালোবাসতে পারবো।

মানুষ যেটা ভাবেনা, যা চিন্তা করেনা, মানুষের জীবনে সেটাই ঘটে বেশির ভাগ সময়।

মাঝে নীলার সাথে বার কয়েকবার ঝগড়া হয়েছে। নীলার অনার্স শেষ। নীলার বাসা থেকে বিয়ের জন্য বারবার বিরক্ত করছে। নীলা বার বার বলেছে, আমাদের কথা বাবা-মাকে বলতে। আমি মাকে সব বলেছি। মা রাজি। তবে বাবাকে ভয়ে বলতে পারিনি। কখনো পারবো কি না জানিনা। এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয়ে আছি। টেনশনে আছি।

এখনো বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। চাকরি নিয়েও টেনশনে আছি। আর কত ইন্টারভিউ দিবো কে জানে। শেষমেশ বাবার কথায় এবার রাজি হতে হবে। চাকরিতে জয়েন্ট না করা পর্যন্ত নীলাও বাসায় আমার কথা বলতে পারছে না। তাই মনে মনে ঠিক করেছি বাবার কথায় এবার রাজি হয়ে ব্যাংকেই জয়েন্ট করবো।

বাবা এইমাসে ট্রান্সফার নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছে। অলৌকিক ভাবে উত্তরার ব্রান্সে জয়েন্ট করেছে। ব্রান্সের হেড হিসাবে। আজকে উত্তরায় বাসা খোঁজা জন্য এসেছিলাম। এসে দেখি আকাশে মেঘ করেছে। হঠাৎ নীলার সাথে ভিজতে ইচ্ছা হলো। বাসা খোঁজা আর হলো না।

এটা নিয়ে ভাবনা নাই। আমি আর বন্ধু যে বাসায় ছিলাম বাবা-মা আর বোন সে বাসায় উঠেছে। ফ্যামিলি বাসা তাই কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। রাকিবের সাথে সামনের মাসে এক কলিক উঠবে। এই মাস আমারা এই বাসায় এক সাথে আছি। তাই তারাহুরো নেই। অন্যদিন বাসা খোঁজা যাবে কিন্তু অন্যদিন বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না। নীলাকে এখনো বলিনি যে সামনের মাসে আমরা উত্তরায় চলে আসছি। নীলাকে সারপ্রাইজ দিবো ভেবে রেখেছি।

দূর থেকে নীলা হেটে আসছে। আমি যতবার এই মেঘের মত মুখ ‘মেঘমুখ’ দেখি ততবার নতুন করে প্রেমে পড়ি। মানুষটার মধ্যে এতো মায়া। এই মায়া সারাজীবনেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। আমি চাই এই মায়া থাকুক, সারাজীবন থাকুক। এই মায়ার মধ্যে বাঁচতে চাই। আকাশি রঙের শাড়িটাই পড়ে এসেছে।
নীলা কাছে এসে মুচকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
‘কি? এভাবে কি দেখো?’
‘তোমাকে দেখি।’

‘আমাকে নতুন করে দেখার কি আছে?’
‘জানিনা, যত দেখি তত দেখতে ইচ্ছা হয়। দেখার ইচ্ছা এই একজনম দেখেও মিটবে না হয়তো। আমিও চাই না মিটুক।’

‘হয়েছে, হয়েছে, এবার চলো। কোথায় যাবো?’
‘যে দিকে দু’চোখ যায় চলে যাবো। আর ফিরবো না। যাবে?’
‘ইশ, কত সখ।’

‘তুমি শাড়ি পরেছো। আমি পুরনো একটা শার্ট পরা। পাঞ্জাবি পরলে দারুণ হত।’

‘এখন পাঞ্জাবি পাবে কোথায়।’
‘চলো, আগে একটা শো-রুম থেকে পাঞ্জাবি কিনি। তারপর যাবো।’
‘এখন পাঞ্জাবি কিনবে? দরকার নেই।’

‘না, আমি পাঞ্জাবি পরে তোমার সাথে ভিজবো। এই মুহুর্ত আর কখনো ফিরে আসবে না। একটু আয়োজন করেই বৃষ্টি’তে ভিজি৷’
সেই সময় পাঞ্জাবি কিনে, সেটা পরে নীলা আর আমি হাতিরঝিল চলে এলাম। হাতিরঝিল আসার সাথে সাথে বৃষ্টি নেমে দিলো। সবাই ছুটাছুটি করছে।

বৃষ্টি দেখে সবাই পালাচ্ছে। কেউ কেউ বৃষ্টি পৌঁছাতে পারবে না এমন ছোট জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। কেউ কেউ ছাতা বের করে দ্রুত হাটছে বাসার ফেরার জন্য। কয়েক মিনিট পর দেখা গেলো জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেছে। কিছু মানুষ অদ্ভুত ভাবে দূর থেকে আমাদের দেখছে৷ দেখছে, দু’টি মানব-মানবীর হেটে যাওয়া। দেখছে, যেখানে সবাই বৃষ্টি থেকে পালানোর চেষ্টা করছে সেখানে এই দুই জন আরো বৃষ্টি মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।

ইটের পিচ থেকে একটা ঘ্রাণ বের হয়েছে। পুড়া ঘ্রাণ। অনেক দিন বৃষ্টির অপেক্ষা ছিলো রোদে পুড়া রাস্তা গুলো। বৃষ্টি আসতেই তাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। বৃষ্টির একটা ঘ্রাণ আছে। বৃষ্টি যখন আকাশ থেকে ভূখন্ডে এসে পড়ে সেটার একটা ছন্দ আছে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা ছন্দ মত নেমে আসে। সৃষ্টি কর্তার এক রহস্য সৃষ্টি, এই বৃষ্টি।

নীলা আর আমি বেশ কিছুক্ষণ সময় বৃষ্টি মধ্যে হাটলাম। হঠাৎ নীলা বলল, ‘চলো কোথাও বসি।’

আমি নীলাকে ব্রিজ দেখিয়ে বললাম, ‘চলো, ওই ব্রিজের উপর পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসি। অন্য রকম লাগবে।’

নীলা ভাবেনি এরকম কিছু বলবো। তবে কিছুটা ইতস্ততা করে শেষমেশ বললো, ‘আজকে তুমি যা বলবে তাই হবে।’

নীলার সাথে ব্রিজে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি। নীলা অন্য দিকে ফিরে ছিলো। আমি নীলার হাতটা ধরলাম। সাথে সাথে নীলা আমার দিক ফিরে বলল,
‘এভাবে হাত ধরে আছো কেনো?’
‘অকারণে হাত ধরতে পারি না।’

নীলা শুধু হাসলো। কিছু বলল না। আমি নীলার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ভেজা চুল, মুখে জমা বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির পানি। নতুন বৃষ্টি ফোঁটা এসে পুরনো বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে গাল বেয়ে নামিয়ে দিচ্ছে। জগতের এটাই কি নিয়ম? নতুন কিছু এসে পুরনো জিনিস গুলোকে বিদায় করে দেওয়া। মেঘমুখটা আজ বৃষ্টির পানিতে ভিজে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। হঠাৎ নীলার ঠোঁটে জমা বৃষ্টির ফোঁটা দেখে বৃষ্টি উপর হিংসা হলো।

নীলা জিজ্ঞাসা করলো, ‘কি দেখো? আমাকে না দেখে বৃষ্টি দেখো। বৃষ্টি আরো সুন্দর।’

হঠাৎ করে বললাম, ‘আমি তোমার ঠোঁট ছাড়া কিছুই দেখছি না। অন্য কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সত্যি। চোখের সামনে শুধু তোমার ঠোঁট।’

নীলা খুব লজ্জা পেলো। মেয়েরা লজ্জা পেলে মেয়েদের কান এবং চোখের নিচে লাল হয়ে যায়। ভাল করে লক্ষকরলে বোঝা যায় কতটা লজ্জা পেয়েছে। আমি আবার বললাম, ‘কিস করতে পারি?’

নীলা একটু রেগে অনেকটা লজ্জামাখা কন্ঠে বললো, ‘জিজ্ঞাসা করার কি আছে?’

কেউ কি দেখছে? দু’টি মানব-মানবী বৃষ্টির মধ্যে ডুবে আছে একজন আরেক জনের ভেতরে। কেউ দেখলে দেখুক। কেউ কিছু ভাবলে ভাবুক। কিছু লোক ভাববে, কিছু বলবে, তারা যা বলবে তা বলুক।


পর্ব ৭

‘অভ্র, শোন, তুমি যদি ৩০ মিনিটের মধ্যে আমার বাসায় না আসো তাহলে আমি ছাঁদ থেকে লাফ দিবো। আমার মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী থাকবে।’
এখন রাত ১০টা। আমি ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নীলার মেসেজ দেখে চমকে গেলাম। যতটা চমকেছি তার থেকে বেশি ভয় পেয়েছি। নীলার সাথে চার দিন কোনো যোগাযোগ নেই। ঝগড়া হবার পর এই প্রথম মেসেজ দিয়েছে। আমি কম হলেও একশোবার ফোন দিয়েছি এই চার দিনে। ৫০ টার মত মেসেজ দিয়েছি। না, নীলা একটা মেসেজেরও উত্তর দেয় নি।

একটা বার ফোন রিসিভ করেনি। ফোন ব্যাক করেনি। চারদিন পর মেসেজ দিলো, কিন্তু মেসেজে লিখা, আমি ৩০ মিনিটের মধ্যে না গেলে নীলা ছাঁদ থেকে লাফ দিবে। আমি মেসেজটা কয়েকবার পড়লাম। নীলা কি দুষ্টুমি করে মেসেজটা দিয়েছে? নাকি মজা করার জন্য? জানার জন্য সাথে সাথে নীলাকে ফোন দিলাম। নীলার ফোন বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। বন্ধ। কয়েকবার ট্রাই করলাম। প্রতিবার বন্ধ। আমি মেসেজ আসার টাইম লক্ষ করলাম। পাঁচ মিনিট আগে এসেছে। তার মানে হাতে সময় আছে ২৫ মিনিট। এখন আমি কি করবো?

চারদিন আগে।

বিকালে নীলা ফোন দিয়ে বলল,
‘তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।’

আমি বললাম, ‘বলো? আমি শুনছি।’
‘ফোনে বলা যাবে না। দেখা করো। আমাদের পছন্দের জায়গায় আসছি। তুমি যত দূত পারো চলে এসো।’

‘আমি এখন অফিসে। সন্ধ্যার পর দেখা করি।’

নীলা রেগে বলল, ‘না, এখনি দেখা করতে হবে। তুমি এখনি আসবে।’
নীলার মেজাজ হয়তো খুব খারাপ। এখন কথা বাড়ালে শুধু শুধু ঝগড়া হবে। তাই আমি বললাম,

‘আচ্ছা, আমি আসছি। তুমি অপেক্ষা করো।’
নীলা আচ্ছা বলে ফোন রেখে দিলো।

নীলা আগে কখনো এভাবে দেখা করার কথা বলেনি। কি হয়েছে? নীলার বাসায় কি কোনো সমস্যা হয়েছে? এ সব ভাবতে ভাবতে আফিস থেকে বের হলাম।
বাবার কথা মতো গতমাসে ব্যাংকে জয়েন্ট করেছি। উত্তরা ব্রান্সে। বাবার সাথে এক অফিসে কাজ করতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। মাঝে মাঝে বাবা এসে দেখে যায় কি করি। খুবই বিরক্তিকর একটা বিষয়। বাবা বুঝেও না বোঝার মত কাজটা করে। বাবা কে প্রচন্ড ভয় পাই। সেই ছোট বেলা থেকে। যখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন একদিন বাবা বলল, ‘অংক বইটা নিয়ে আয় তো?’
সবসময় আমি মায়ের কাছে পড়ালেখা করি। বাবা কাছে এর আগে কখনো পড়তে বসিনি। আর অংক, এই নাম শুনলেই ভয় লাগে।

বাবার পরে একমাত্র অংককে এতোটা ভয় পাই। অংক যতটা কম পারি ততটা কম বুঝি। অংক বুঝতে অনেক সময় লাগে। এজন্য ছোটবেলায় মায়ের কাছে, স্যারদের কাছে অনেক বকা খেয়েছি। বাবার মুখে অংক বই নিয়ে আসার কথা শুনে ভয়ে কাপতে লাগলাম। তবে কিছু করার নাই। বাবা যখন বলেছে তখন বাবার কাছে আজ অংক করতে হবে। কাঁপতে কাঁপতে বাবার সামনে অংক বই নিয়ে দাড়ালাম। বাবা বলল, ‘খাতা কই?’

আমি এক দৌড়ে টেবিল থেকে খাতা আর কলম নিয়ে আবার বাবার কাছে ফিরে এলাম। বাবা আমাকে অংক বোঝাতে লাগলো। বাবা, বাবার মত করে অংক বোঝাচ্ছে। তবে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাবা যখন বলে, ‘বুঝেছিস?’ আমি শুধু হ্যাঁ বলি। অংক বোঝানো হলে বাবা বলল, ‘এবার ঠিক এই নিয়মের অন্য একটা অংক দিচ্ছি কর। যদি পারিস তাহলে বুঝবো বুঝেছিস।’

আমি অংক নিয়ে বিশ মিনিট বসে রইলাম। বাবা ফিরে এসে দেখলো আমি কিছুই করতে পারি নি। বাবা মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে বলল, ‘যদি না বুঝতে পারিস বলতি বুঝিনি। আর কখনো না বুঝে, বুঝেছি বলবি না। ঠিক আছে?’ আমি এবার ও মাথা উপর নিচে করে বুঝালাম হ্যাঁ, ঠিক আছে।

সেই অংক বাবা আবার বোঝাতে লাগলো। যতবার বলছে বুঝেছিস? আমি ততবার মাথা ডানে বামে ঘুড়িয়ে বলে দিচ্ছি, বুঝিনি। আরো কয়েক বার বোঝানোর চেষ্টা করলো। আমি ভয়ের মধ্যে ছিলাম। তাই টেনশনে, ভয়ে ভাল করে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। তাই কিছুই বুঝতেও পারছিলাম না।

বাবা শেষমেশ বোঝানো বন্ধ করে, রেগে খুব জোরে পিঠে থাপ্পর দিলো। রেগে বলল, ‘মাথার মধ্যে তো গোবরও নাই। গোবর থাকলে কিছুতো বুঝতে পারতি।’ আমি একাধারে কান্না করতে লাগলাম। মা এসে আমাকে নিয়ে গেলো। পিঠে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেলো। সেই থেকে ভয় আরো বেড়েছে। কখনো কমেনি। বাবাকে আমি সরাসরি কখনো কিছু বলতে পারিনা। যা প্রয়োজন সেটা মাকে বলি, মা পরে বাবাকে বলে।

পৌঁছে দেখি নীলা বসে আছে। নীলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘সবকিছু ঠিক আছে? কোনো সমস্যা হয়নি তো?’

নীলার মুখ দেখে বুঝে গেলাম কিছু একটা হয়েছে। মেজাজ খারাপ। নীলা কথা বলছে না। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কি হলো, কথা বলছো না কেনো?’
নীলা আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে বলল, ‘ভালোবাসো? তুমি আমাকে ভালোবাসো?’

আমি অনেকটা অবাক হলাম। বললাম, হঠাৎ এই প্রশ্ন?’
‘সত্যি করে উত্তর দেও। আমাকে ভালোবাসো?’
আমি বললাম, ‘কোনো সন্ধেহ আছে?’
নীলা বলল, ‘আমাকে বিয়ে করবে?’

আমি কিছুটা রেগে বললাম, ‘তোমার কি মনে হয়? আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবো? তুমি জানো, তোমাকে আমি কতটা ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতে পারিনা।’
নীলার এখনো মেজাজ খারাপ। মন খারাপ। আমি আবার বললাম, ‘বাসায় কিছু হয়েছে? বিয়ে জন্য কি প্রেশার দিচ্ছে?’

নীলা খুব রাগি কন্ঠে বলল, ‘তুমি বাবাকে বলেছো আমার কথা?’
আমি বললাম, ‘মাকে বলেছি। মা আব্বুকে বলবে। আব্বুর কোনো কারনে কয়দিন ধরে মেজাজ খারাপ। তাই আম্মু বলতে সাহস পাচ্ছে না।’
‘তুমি বলতে পারো না? যাকে ভালোবাসো তার কথা সাহস করে নিজের বাবাকে বলতে পারোনা? তাহলে কি রকম ভালোবাসো?’ নীলা খুব জোরে কথাগুলো বলল। আশেপাশের মানুষ নীলার কথা শুনে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।

আমি নীলাকে বুঝিয়ে বললাম, ‘তুমি জানো আমি বাবাকে প্রচন্ড ভয় পাই।’
নীলা বিদ্রুপ ভাবে বলল, ‘এতোই যখন ভয় পাও তাহলে নীজেকে পুরুষ ভাবতে লজ্জা করে না?’

‘নীলা বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। শান্ত হও।’

‘না, আমি শান্ত হবো না। আজকে রাতের মধ্যে তোমার বাবাকে আমাদের কথা বলবে। যদি না বলো তাহলে আমাদের সম্পর্ক এখানে শেষ।’
এই বলে নীলা চলে গেলো। আমি একা একা যেখানে ছিলাম সেখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম।

রাত ১১ টা।

নীলার ফোন এলো। ফোন রিসিভ করার পর নীলার প্রথম কথা ছিলো, ‘বাবাকে আমাদের কথা বলেছো?’

আমি কিছুটা ভয়ে উত্তর দিলাম, ‘বাবার মেজাজ আজকে অনেক খারাপ ছিলো। তাই ভয়ে কিছুই বলিনি। বাবার মেজাজ ঠান্ডা হোক। তখন বলবো।’
নীলা চার পাঁচ মিনিট কিছুই বললো না। আমিও কিছু বললাম না।
‘তুমি আমাকে আর কখনো ফোন দিবে না। কোনো মেসেজ দিবে না।’
নীলা খুব শান্ত ভাবে কথাগুলো বললো।

আমি কিছু বলার আগে নীলা ফোন কেটে দিলো। ফোন কেটে দেওয়ার পর আমি কয়েকবার ফোন দিয়েছি নীলাকে। নীলা ফোন রিসিভ করেনি। ভেবেছি সকালে রাগ কমে যাবে। সকালে আবার ফোন দিবো। কিন্তু গত তিন দিন ধরে আমার দেওয়া মেসেজের একটাও রিপ্লাই দেয়নি। একবারও ফোন রিসিভ করেনি। অবশেষে, প্রচন্ড রাগে নীলাকে মেসেজ বা ফোন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। যখন রাগ কমবে নিজ থেকে ফোন দিবে এই আশায় অপেক্ষা করছি।

একটু আগে নীলার পাঠানো মেসেজটা আবার পড়লাম। আবার। ঘড়ির সাথে টাইম মিলিয়ে দেখলাম ৩০ মিনিট থেকে ১০ মিনিট চলে গেছে। হঠাৎ বুক কেপে উঠলো। নীলা যদি সত্যি সত্যি এমন কিছু করে তাহলে আমার কি হবে। কিছুই ভাবতে পারছি না। বাসায় এই মুহুর্তে কেউ নেই। সবাই সন্ধ্যায় একটা দাওয়াতে গিয়েছে। আমাকে অনেক করে বলেছে যেতে আমি যায়নি। কি করবো এখন? চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় কিছুই ভাবতে পারছি না।

দ্রুত একটা প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট পরে দরজা খুলে বের হলাম। স্যান্ডেল পাচ্ছিলাম না তাই খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় এলাম। রাস্তায় কোনো বাস, রিক্সা কিছু নেই। গুরুত্বপূর্ণ সময় কিছুই ঠিক মত পাওয়া যায় না। হিসাব করে দেখলাম এখান থেকে নীলাদের বাসায় হেটে গেলে ৫০ মিনিট লাগবে। যদি দৌঁড়ে যায় তাহলে ৩০ মিনিট। আমার হাতে সময় আছে ২০ মিনিট। বাস বা রিক্সার জন্য অপেক্ষা না করে দৌঁড়াতে লাগলাম।
খালি পায়ে, রাস্তায় দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম, নীলার যাতে কিছু না হয়। নীলা যাতে কনো পাগলামী না করে। হাঠাৎ কিছু একটাতে পা বেধে পড়ে গেলাম। হাটু কিছুটা কেটে গেলো। সামান্য ব্যথা অনুভব হলো তবে ব্যথাকে এতোটা গুরুত্ব দিলাম না। দৌঁড়াচ্ছি। দৌঁড়াচ্ছি। দৌঁড়াচ্ছি।


পর্ব ৮

ঘড়ির দিকে তাকালাম। সময় শেষ। নীলা মেসেজে বলেছিলো, ৩০ মিনিটের মধ্যে নীলাদের বাসায় না আসলে, নীলা ছাঁদ থেকে লাফ দিবে। মেসেজ পেয়ে অন্য কিছু না ভেবে বাসা থেকে বের হয়ে দৌঁড়াচ্ছি৷ এতো রাতে বাস কিংবা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করা মানে সময় নষ্ট।

নীলা কি ছাঁদ থেকে লাফ দিয়েছে? মনে মনে প্রার্থনা করলাম। নীলা আমাকে আর দশ মিনিট সময় দেও। আমার আসতে মাত্র দশ মিনিট লাগবে। প্লিজ নীলা, পাগলামী করো না। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি একা কি করে বাঁচবো।

পা থেকে রক্ত বের হচ্ছে৷ প্যান্টের সাথে রক্ত জমাট বেঁধে ব্যথা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। হাপিয়ে গিয়েছি, দৌঁড়ানোর শক্তি নেই। তবুও কিছু করার নেই। নীলাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে আমাকে এটুকু কষ্ট করতে হবে।
নীলাদের বাসার নিচে পৌঁছে সাথে সাথে সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে চলে এলাম।

দশ তালা বেয়ে উঠতে উঠতে মনে হয়েছে পায়ের হাড্ডি ভেঙে যাচ্ছে৷ ছাঁদে উঠে এদিক ওদিক নীলাকে খুঁজতে লাগলাম। ছাঁদের এ মাথা থেকে ও মাথা কোথাও নীলা নেই। আমি ছাঁদ থেকে নিচে তাকাতে তাকাতে পুরো জায়গাটা ভাল করে দেখলাম। কোথাও নীলা নেই। মাথা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেলো। বুক আষ্টেপৃষ্টে, গলা শুকিয়ে অবশেষে চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো নিচে৷ আমি ছাঁদে বসে রইলাম।

আমি ব্যর্থ। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যর্থ। আমি কিছু ভাবতে পারছি না। চোখ দিয়ে অনবরত বুলেট-বৃষ্টি হচ্ছে। কি হবে? এখন কি হবে? আমি এই কষ্ট একটা জনম বুকে চেপে কি করে বাঁচবো।

হঠাৎ ছাঁদের গেট দিয়ে কারো প্রবেশ করার শব্দ পেলাম। কেউ একজন ছাঁদে আসছে। আমি কোথায় যাবো? কি করবো?

পরমুহূর্তেই নীলাকে ছাঁদে দেখে দৌড়ে গিয়ে জাপ্টে ধরলাম। জরিয়ে ধরার সাথে খুশিতে কান্না পেয়ে গেলো। কান্না চেপে রাখতে না পেরে কেঁদে দিলাম। নীলাকে জড়িয়ে ধরে কাদলাম। কতক্ষণ জানিনা। তবে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি মানুষ কেউ হলে সেটা আমি। এই আমি। শুধুই আমি। তবে আমি কি জানতাম? জানতান না, পরমুহূর্তেই নীলাকে দেখে সবচেয়ে অখুশি মানুষটা আমি হবো।

নীলা কিছুক্ষণ পর রেগে বলল, ‘প্লিজ অভ্র, এবার শান্ত হও। এভাবে ছাঁদের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে থেকো না। বাসায় অনেক লোকজন। হঠাৎ কেউ ছাঁদে চলে আসলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে।’

আমার বুক থেকে নীলাকে মুক্ত করে একটু দূরে সরে গেলাম। নীলাকে ভাল করে দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। আমি যেনো তলিয়ে যাচ্ছি। মাটির গহবরে।

নীলাকে প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি এই পোশাকে?’
নীলা উত্তর দিলো, ‘আজকে আমার বিয়ে।’

আমি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমার স্বপ্নে গড়া দুনিয়া ধিরে ধিরে ধ্বসে পড়ছে, ভেঙে যাচ্ছে। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নীলার বিয়ে আজকে!

নীলা বলল, ‘প্লিজ কোনো পাগলামি করবে না। প্লিজ।’

নিস্তব্ধতায় কেটে গেলো অনেকটা সময়। আমি নীলাকে কিছুই বললাম না। হাটুর ব্যথার তীব্রতায় দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়লাম।

কোনো রকম উঠে দাঁড়িয়ে খুড়াতে খুড়াতে হাটা শুরু করলাম। নীলা সেখানে ছিলো সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো।

ছাঁদ থেকে নামার মুহুর্তে, নীলা দৌড়ে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। খুব জোরে। আমি ফিরে তাকালাম না। আমি চাইনি নীলাকে আমার চোখের জল দেখাতে। নীলা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।

রেগে বললাম, ‘কি করছো? কেউ দেখে ফেলবে। তোমার বিয়ে ভেঙে যাবে।’
নীলা উত্তর দিলো না। জড়িয়ে ধরে থাকলো। নীলা কি কান্না করছে? অবশেষে ঘুরে তাকালাম। আমার মেঘমুখ ভর্তি বৃষ্টি। নীলার চোখ থেকে পানি মুঁছে দিলাম। নীলা আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।’

আমি হতবাক। নীলা পাগলামী করছে কেনো। যা হবার হয়ে গেছে। এখন কি কিছু করার সুযোগ আছে?

নীলা বলল, ‘তোমার পায়ে কি হয়েছে। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছো। দেখি কি হয়েছে।’

নীলা হাটু গেড়ে বসে পা দেখে চমকে গেলো। বলল,
‘এতো খানিকটা কেটেছে। কি ভাবে? আর তুমি খালি পায়ে কেনো? পেয়ের কি অবস্থা। রক্ত বের হচ্ছে।’

নীলার কাছে অনেক গুলো প্রশ্ন। তবে এখন এই মুহুর্তে এই প্রশ্নগুলো অর্থহীন। তাই বললাম, ‘বাদ দেও। যা হবার হয়ে গেছে। এখন এসব অর্থহীন।’
নীলা রেগে গিয়ে বলল, ‘কোনো কিছুই অর্থহীন না।
বলো কি হয়েছে?’

আমি বললাম, – প্রশ্নগুলোর উত্তর শুনতে গেলে তোমার বিয়ের সময় পার হয়ে যাবে। আর আমি বলতে চাই না৷ তুমি চলে যাও। বাসায় যাও। তোমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।

আমি যাবার জন্য ঘুরে যেতেই নীলা আবার আমাকে জড়িয়ে ধরলো। খুব শক্ত করে। আমার খুব কাছে এসে কানে কানে খুব আস্তেধীরে বলল,
‘তুমি চলে গেলে বিয়ে হবে কার সাথে?’


শেষ পর্ব

আজ আমার বিয়ে?
তুমি চলে গেলে বিয়ে হবে কার সাথে?

নীলার বলা কথাগুলোর অর্থ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ঘন্টাখানেক আগে মেসেজ দিয়ে বলেছে, ৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের ছাঁদে না আসলে, আমি ছাঁদ থেকে লাফ দিবো। আমি ৩০ মিনিটের মত দৌড়ে নীলাদের ছাঁদে এসে কাউকে দেখিনি। কিছুক্ষণ পর নীলা বিয়ের পোশাকে ছাঁদে এসে বললো, আজকে আমার বিয়ে। আবার, আমি চলে যাবো এই মুহুর্তে বলল, তুমি চলে গেলে বিয়ে হবে কার সাথে? নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। নীলা এক সময় এক এক রকম কথা কেনো বলছে? নীলার উপর এই প্রথম এতোটা রাগ হচ্ছে।

রেগে নীলাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘কি হচ্ছে এসব? আমাকে একটু ক্লিয়ার করে বলবে? আমি তোমার কথা কিছুই বুঝছি না। সত্যি নিজেকে এখন পাগল পাগল লাগছে। অসহায় লাগছে।’

নীলার মুখে সেই চেনা পরিচিত হাসি দেখে এখন খুব ভাল লাগছে। এই মানুষটা অদ্ভুত। মেঘমুখের হাসিটা অদ্ভুত। নীলাকে বিয়ের শাড়িতে দারুন লাগছে। বাকরুদ্ধ সুন্দর! সাথে, ভয়ংকর সুন্দর!

নীলা হাসি দিয়ে বলল, ‘আজকে তোমার সাথেই আমার বিয়ে। তুমি চলে গেলে বিয়ে হবে কি ভাবে?’

আমি অবাক-খুশি হয়ে বললাম, ‘আমার সাথে?’

নীলা বলতে লাগলো, ‘তোমার সাথে ওইদিন রাতে ঝগড়া করে ফোন কেটে দেওয়ার পর, কষ্টে আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি৷ অনেক কান্না করেছি। তোমার প্রতিটি মেসেজের উত্তর দিতে ইচ্ছা হয়েছে।

তোমার ফোন কল রাগে ইচ্ছা করে ধরিনি। তবে, না ধরতে পেরে তোমার থেকে আমার বেশি কষ্ট হয়েছে। ভোর রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তুমি যখন বাসায় থাকবে না তখন তোমার বাসায় গিয়ে বাবা মার সাথে আমি নিজে কথা বলবো। পরের দু’দিন অনেক ভেবেছি কি করবো৷ ভেবেছি, বাসায় যাবার পর কি ভবে কি বলবো। তোমার মা সবটা জানতো। তাই তোমার মাকে নিয়ে কোনো ভয় ছিলো না।

ভয় ছিলো বাবাকে নিয়ে, বাবা কিভানে রিয়েক্ট করে এটা নিয়ে অনেক ভয়ে ছিলাম। তবুও আমাকে কাজটা করতে হবে। তোমাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে মরে গেলেও বিয়ে করতে পারবো না। অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবো না।’
‘তৃতীয় দিন বিকালে তোমার বাসায় যাই। তুমি তখন বাসায় ছিলে না। আমি জানতাম তুমি এই মুহুর্তে বাসায় থাকবে না। আর আমি চেয়েছিলাম তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো। তাই আগে থেকে কিছু জানাইনি।’

‘বাসায় গিয়ে মা’র সাথে প্রথম দেখা। মা’কে সবটা খুলে বলি। আনিকা বাসায় ছিলো। আনিকাকে সবটা বলি। বাবাকে ফোন দিয়ে মা বাসায় আসতে বলে। তোমার বাবা বাসায় আসার পর প্রথমে ভয়ে ছিলাম। হঠাৎ তোমার বাবা বলল, ভয় নাই। যা বলতে এসেছো বলো। আমি সবটা বলি। আমাদের রিলেশনের কথা। তুমি ভয়ে বাবাকে আমাদের কথা বলতে না পারার কথা। তোমার বাবা খুবই ভাল মানুষ। তুমি শুধু শুধু ভয় পাও। বাবা সবটা শুনে কোনো দ্বিধা করেনি। সাথে সাথে রাজি হয়ে গেছে।’

‘সেদিনই তোমাকে সবটা জানাতে চেয়েছিলাম। সেদিন তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। তবে, আনিকা সবার সামনে বললো, ভাইয়া কে বড় একটা সারপ্রাইজ দিবো। তারপর এই যে মেসেজ দেওয়া, ৩০ মিনিট মধ্যে বাসায় আসা, আজকে আমার বিয়ে এটা বলা তোমাকে, সব কিছু আনিকার প্লান ছিলো।’

তোমার বাবা-মা গতকাল ফোনে আমার বাবা-মার সাথে কথা বলেছে। আমার বাবা-মাও দ্বিমত করেনি। সবাই রাজি। তাই আজ পারিবারিকভাবে বিয়েটা হবে। পরে অনুষ্টান করা হবে।

হঠাৎ আনিকা ছাঁদে আমাদের ডাকতে আসলো। বলল,
‘ভাইয়া, আর কত সময় থাকবে ছাঁদে। তারাতাড়ি নিচে আসো। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।’

আমি আনিকাকে বললাম, ‘তোর খবর আছে। আজকে বিয়েটা হোক। তারপর দেখছি তোকে।’

‘ইশ, আমি সব কিছু ম্যানেজ করলাম। উল্টো খুশি হয়ে আমাকে উপহার গিফট দিবে৷ এখন বলছো আমার খবর আছে। আচ্ছা, এখন নিচে আসো। সবাই অপেক্ষা করছে।’ এই বলে আনিকা নিচে চলে গেলো।

আমি নীলাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘জানো, আমি আজকে কতটা খুশি?’
নীলা বলল, ‘তোমার থেকে আমি বেশি খুশি।’

‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
নীলা বলল ‘আমার থেকে বেশি না।’

নীলা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার পায়ের অবস্থা ভালো না। কেউ এভাবে পাগলের মত আসে? কি করছো নিজের খেয়াল আছে?’
আমি হেসে বললাম, ‘ভালোবাসি যে।’

‘হয়েছে, এবার চলো। নিচে গিয়ে আগে ড্রেসিং করে ব্যান্ডেস করে দেই। তারপর ফ্রেশ হয়ে পাঞ্জাবি পড়বে।’
‘বাহ, সবকিছু প্রস্তুত?’

‘জি হ্যাঁ, শুধু তোমার এই অবস্থা। আসো, নিচে আসো।’

এই বলে নীলা চলে যাচ্ছিলো। আমি নীলার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে বললাম,
‘আজকে সম্পূর্ণ আমার হয়েই যাচ্ছো।

‘হয়ছে! আর আহ্লাদ দেখাতে হবে না। এখনো হয়নি। আর হবার পর তোমার খবর আছে।’

এই বলে লজ্জায় দৌড়ে নিচে নেমে গেলো নীলা।

অবশেষে মেঘমুখ একান্ত আমার নিজের হচ্ছে। এটা ভাবতেই নিজেকে দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হচ্ছে। ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পাওয়ার মত আনন্দ অন্য কিছুতে কি আছে?

লেখাঃ সবুজ আহম্মদ মুরসালিন

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “মেঘমুখ – ছোট্ট মেয়ের মোবাইল প্রেম” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – প্রতিশোধ – আজ তোমার শেষ দিন । koster premer golpo bangla

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!