কষ্টের প্রেমের গল্প

প্রতিশোধ – আজ তোমার শেষ দিন । koster premer golpo bangla

প্রতিশোধ – আজ তোমার শেষ দিন । koster premer golpo bangla: নিশ্চুপ হয়ে গালে হাত দিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে মায়া। যা দেখে মাহিরের চোখেও পানি চলে আসে। মাহির মায়ার গাল থেকে হাতটি নামিয়ে দিয়ে একটা চুমু একেঁ দেয়।


পর্ব ১

তোর বুকের কাপড় ফ্যাল। বলেই একটানে মিরার বুক থেকে শাড়ির আচঁলটি টেনে খুলে ফেলে সোহাগ মির্জা। মিরার গলায় আর বুকে পাগলের মতোন কিস করতে থাকে। তারপর একটা একটা করে ব্লাউজের সবগুলো হুক খুলে ফেলে। মিরাঃ এসব কি করছেন আপনি?

ঠাসসস করে একটা চর বসিয়ে দেই মিরার গালে। আয় আমার সাথে আয়। খুব সক তোর আমার বউ হবি তাই না? আজ তোর সব স্বাদ আমি মিটিয়ে ছাড়ব! শাড়ির আচঁলটা উঠিয়ে মিরার বুকের সাথে চেপে ধরে, সিঁরি থেকে ঘেষতে ঘেষতে টেনে ঘড়ে নিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে বিছানায় ছুড়ে মারে মিরাকে। সার্টের বোতামগুলো একটান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে সার্টটি খুলে মিরার মুখের কাছে ছুড়ে মারে। তারপর মিরার বুকের উপর গিয়ে ঝাপিয়ে পরে।

সোহাগ তার হাত দিয়ে মিরার হাতদুটি শক্ত করে চেপে ধরে আছে বিছানার সাথে। মিরার হাতের কাচের চুরিগুলো ভেঙে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে বিছানার চাদর। মিরাঃদেখুন আমার খুব লাগছে। ছাড়ুন বলছি। আহহহ করে মিরা চিৎকার করেই চলেছে কিন্তু সোহাগের তাতে কিচ্ছু যাই আসে না। মিরার গলাই জোড়ে একটা কামড় বসিয়ে দেই। একদম পৈচাশিক নিয়মে নিজের খেলায় মেতে উঠেছে সোহাগ মির্জা।

কিছুক্ষণ পর, বিছানায় এলোমেলো ভাবে বসে আছে মিরা। পুরো শরীরের ব্যাথায় কুকড়ে আছে। বিছানার চাদরটি শরীরের সাথে পেচিয়ে ওয়াশরুমের দিকে আগাচ্ছে। এক পা এক পা করে ওয়াসরুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে পানি ছেড়ে দিয়ে বসে আছে মিরা। তারপর কাঁদতে কাঁদতে মিরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

জ্ঞান ফিরলে মিরা নিজেকে আবিষ্কার করে সোহাগের ঘড়ের সোফায়। খেয়াল করে তার পড়নে স্যালোয়ার কামিজ। সে ভেবে দেখে তার শরীরে তো চাদর প্যাচানো ছিল তাহলে এই পোশাক কোথা থেকে আসলো! কিছু বুঝতে পারছে না সে। বিছানা থেকে যেই উঠতে যাবে তখনই খেয়াল হলো তার সারা শরীরে এক অসহনীয় ব্যাথা। তখন তার কাল রাতের কথা মনে পড়ে গেল। কতটা হিংস্র এই লোকটা। যে তার নিজের বউয়ের সামনে পর নারীর সাথে রাত্রী যাপন করে। বিয়ের পর থেকে কখনও নিজের বউকে কাছে টানে নি। যদিও কোনও দিন কোনও মেয়েকে রাতে নিজের সাথে না আনতে পেরেছে তখনও তাকে সোফায় সুতে বলে দিব্যি নিজের বিছানায় ঘুমিয়েছে। কিন্তু কাল কি করল সে এটা? কি দোষ ছিল মিরার? সে একবার শুধু নিজের অধিকার দাবি করাই এইভাবে হিংস্র রূপ ধারণ করল সোহাগ মির্জা?

অন্যদিকে হসপিতালের বেডে সুয়ে থাকা মেয়েটির হাত ধরে অঝোরে কেঁদেই চলেছে সোহাগ মির্জা। যেই সোহাগ মির্জার সামান্য চোখ রাঙানোতেও মানুষ ভয়ে গুটিয়ে পড়ে। আজ তার চোখে পানি। -যানিস ছুটকি আজ তোর জন্মদিন! একদিন এই দিনটাই তুই বাইনা ধরেছিলি বাবার কাছে, আমাদের নিয়ে ঘুরতে কক্সবাজার যেতে হবে। আমি, তুই, মা-বাবা আমরা গিয়েছিলামও। তারপর ফিরে আসার পথে একদল লোক ছিনতায়কারীর বেশে আমাদের চলতি গাড়িটি থামিয়ে আটক করে। তোর আর আমার গলার কাছে ধাড়ারো চাকু ধরায় বাবা-মার কাছে যা টাকা, পয়সা আর গহনা ছিল সব দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও তারা খুশি হয়নি। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল শিশু পাচার করা।

যখন কথাটি বাবা-মা যানতে পারে তখন বাবার সাথে লোকগুলোর দস্তাদস্তি হয়। আর সেই সুযোগে মা আমাদের একটা গাড়ির মধ্যে বসিয়ে দেই। অতঃপর বাবার কাছে ফিরে যাই। লোকগুলোর আমাদের দুইজনকে দেখতে না পেরে খুবই তীক্ষ্ণ দৃস্টিতে বাবার দিকে তাকায়। -বস আমাদের বলেই দিয়েছে, দুইটা শিশু কম পরেছে। আজকের রাতের মধ্যেই যেভাবেই হোক দুইটা শিশু বসের কাছে নিয়ে যেতেই হবে। কাল সকালেই বিদেশে পাচার করা হবে। তোদের জন্য আমরা আমাদের শিকার হারিয়েছে।

এখান থেকে তোরা তোদের প্রাণ নিয়ে বেচেঁ ফিরতে পারবি না। এই তোরা ধর তো ওদের। তারপর বাবা-মায়ের বুকে বন্দুকের গুলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় ঝাজড়া করে দিয়ে ওরা চলে যেতে লাগলে তুই গাড়ির ভেতরের কাচের ফাঁক থেকে ঐ দৃশ্যটা দেখে চিৎকার দিতে যাচ্ছিলি। তখন আমি তোর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে জোড়ে টিপে ধরি। লোকগুলো চলে গেলে আমরা বাবা-মায়ের কাছে যায়। বাবা ততোক্ষণে আর বেচেঁ ছিল না। মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে বলেছিল তোকে দেখে রাখতে।

সবসময় তোর খেয়াল রাখতে। আমি মাকে কথাও দিয়েছিলাম। কিন্তু মাকে দেওয়া সেই কথা আমি রাখতে পারি নি রে বোন। তবে আমি চেস্টা করেছিলাম জানিস। খুব চেস্টা করেছিলাম। তখন থেকেই তো আমি তোর বাবা এবং মা দুটোই হয়ে যায়। তোকে খাইয়ে দেওয়া, চুল বেধেঁ দেওয়া, ঘুমানোর সময় ঘুমপারানি গান গাওয়া সবই করেছি আমি। সব কি ভুলে গেলি তুই বোন? তুই আমার কথা একবারের জন্যও ভাবলি না? দুই দিনের ঐ ছেলেটার জন্য নিজের ভাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলি? -কি রে পাগলি তোর চোখে পানি কেন? তুই কিচ্ছু ভাবিস না যে তোর এই অবস্থার জন্য দায়ী তাকে আমি ছাড়বো না। সে সহ তার কাছের প্রত্যেকটা মানুষকে আমি ছারখার করে দেব। তিল তিল করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অতিস্ট করে দেব তাদের জীবন। এটা তোর কাছে আমার ওয়াদা।

সোহাগের পি.এ হাসান। হাসান হঠাৎ কেবিনের দরজার সামনে এসে সোহাগকে কাদঁতে দেখলো।

-এই আমি কি দেখছি, স্যার কাদঁছে?
সোহাগের চোখ দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকা হাসানের দিকে গেল। -এখানে কি করছো? তোমাকে না বলেছিলাম বাইরে দাড়িয়ে থাকতে? দেখছো না আমি আমার বোনের সাথে সময় কাটাচ্ছি? -কিন্তু স্যার ইমপটেন্ট একটা মিটিং ছিল আজ। এক্ষুণী ফোন আসলো, না গেলে যে ২কোটি টাকা লস হয়ে যাবে। সোহাগ রক্ত চুক্ষু দিয়ে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল ২ কোটি কেন ২০০ কোটি টাকারও যদি লস হয়। আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আজ আমার বোনের জন্মদিন। আজ সারাদিন আমি আমার বোনের সাথে কাটাবো।
-কিন্তু স্যার।

-আর একটাও কথা না! এই সোহাগ মির্জা একবার যা বলে দেই সেটাই শেষ কথা। চোখদুটো বড় বড় করে বলল। হাসান সোহাগের দিকে তাকিয়ে দেখে সোহাগের চোখদুটো রাগে গজগজ করছে। ভয়ে আর কোনও কথা না বলেই হাসান চলে যায়।

বাইরে এসে হাসান নিজেই নিজেকে বলছে একজন অসর, কোমা যাওয়া রোগীর জন্য যত্তসব আদিক্ষেতা। এত্তো ইমপরটেন্ট একটা মিটিং এ নাকি যেতে পারবে না।


পর্ব ২

এদিকে ডা.সাহারা এসে মিরার ক্ষত স্থানগুলোতে মেডিসিন লাগিয়ে দিচ্ছে।
ডা.সাহারাঃ এত্তো কেয়ার লেস কেন আপনার হাজবেন্ড। ওনার মতোন একজন এতো বড় বিজনেন্সম্যান এমনটা করবে আমি কখনই ভাবতে পারি নি! নিজের ওয়াইফকে শেষ পর্যন্ত ছিঃ

যেই ঔষুধগুলো দিচ্ছি নিয়মিত ক্ষতস্থানে লাগাবেন। আর এই টেবলেটগুলো খাবেন। আমি এখন আসি।
মিরাঃ ডা. একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আপনার কাছে?
ডা.সাহারাঃ হ্যা, বলুন?
মিরাঃ আপনাকে কে এখানে আসতে বলল!

ডা.সাহারাঃ আপনার হাজবেন্ড আমাকে সকালে ফোন করে ছিল।
মিরা মনে মনে ভাবছে নিজেই অত্যাচার করবে আবার নিজেই ডা. কে ফোন করবে। কি চাই ওই লোকটা! আর কেন এমন করছে? বুঝেছি! আমাকে সারিয়ে তুলে একটু একটু করে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতে চাই। কিন্তু আমি করেছিটা কি? তাকে ভালোবেসে! তার মিথ্যা অভিনয় বিশ্বাস করে তাকে বিয়ে করেছি এটাই কি আমার দোষ? তাহলে কেন সে আমাকে সুখের স্বপ্ন দেখাতো। এখন তো ভেবেছে আমার সামনেই পরকিয়া করে বেড়াবে আর আমি তাকে বাধা দিব না। না তা আমি হতে দেব না। নস্ট করে দিল লোকটা আমার জীবন। এখন আমিও দেখবো কিভাবে পরকিয়া করে।

মিরা আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠার চেস্টা করে রান্নাঘড়ে আসল। বিয়ের পরই সোহাগ মির্জা বাড়ির সবগুলো কাজের লোককে ছুটিটে পাঠিয়ে দিয়েছে। মিরাকেই সব কাজ করতে হয়। এখন যদি দুপুরে রান্না করে না পাঠানো হয় তাহলে তো রাতে এসে আবার বড় কোনও শাস্তি মিরাকে দিয়ে দিবে। এই ভয়ে রান্নাঘড়ে গিয়ে আস্তে আস্তে রান্না করতে থাকে। রান্নার শেষে কেউ একজন আসলে খাবারটা টিফিনে করে পাঠিয়ে দেয়।

ঘড়ির কাটায় রাত ১টা ছুঁই ছুঁই,

কলিংবেলের আওয়াজে মিরার ঘুম ভেঙে যায়। অসুস্থ শরীরটা নিয়ে দরজাটা খুলতে একটু লেট হয়। দরজা খুলেই দেখে সোহাগ মির্জা একটি মেয়েকে বুকের সাথে মিশিয়ে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে আছে। তাকে দেখেও ছাড়ার নাম নেই। মিরাকে এড়িয়ে বাড়ির ভেতর যেই যেতে যাবে। ঠিক তখনই মিরা মেয়েটার হাত টান দিয়ে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দেই।

সোহাগ মির্জাঃ তোর সাহশ তো কম নয়! তোকে তো আমি!
যেই মিরাকে চর দিতে যাবে তখন মিরা নিজের চোখদুটো বন্ধ করে ফেলে। আর সোহাগের চোখের সামনে মিরার শরীরের ক্ষতগুলো ভেসে আসে। কিছু একটা ভেবে মেয়েটাকে উঠিয়ে তার রুমের দিকে যেতে যাবে। মিরা চোখ খুলে পিঁছন থেকে মেয়েটার হাত আবার ধরে।
মিরাঃ দেখুন এই মেয়েটাকে আমি আপনার সাথে কিছুতেই যেতে দেব না!
সোহাগঃ ভালো ভাবে বলছি সরে যা আমাদের রাস্তা থেকে!

মিরাঃ আমি আপনার স্ত্রী! আমি বেচেঁ থাকতে ওই মেয়েকে নিয়ে আপনি আর এক পাও আগাতে পারবেন না। যদি ওই মেয়েটাকে নিয়ে আপনার থাকতেই হয় তাহলে আগে আমাকে মেরে ফেলুন। তাই ওকে নিয়ে আপনার ঘড়ে যান।
সোহাগঃ তোর দেখি আজ আবার স্ত্রী হবার সক যেগেছে! কালকের কথা ভুলে গেলি? ঠিক আছে আজ তাহলে কালকের মতো…

সোহাগ হাতের ইশারাই মেয়েটিকে চলে যেতে বলে। মেয়েটি চলে যায়। তারপর সোহাগ বাকাঁ দৃস্টিতে মিরার দিকে তাকায়। এবার সোহাগ একটু একটু করে মিরার দিকে আগাতে থাকে..সোহাগ যত আগাচ্ছে মিরা ততো পিছাচ্ছে। আস্তে আস্তে মিরা দেয়ালের সাথে গিয়ে বেধেঁ যাই। সোহাগ মিরার দুই হাত শক্ত করে দেয়েলের সাথে চেপে ধরে। সোহাগের নিশ্বাস গিয়ে মিরার মুখে পরছে। মিরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেই।
মিরাঃ দেখুন আমাকে ছেড়ে দিন!
সোহাগঃ কেন আমার বউ হবি না?

মিরা দুকরে কেদেঁ উঠল,
মিরাঃ কালরাতে আপনি যেটা করেছেন তারপর আমার পক্ষে আপনাকে স্বামী হিসেবে মেতে নিতেও ঘৃণা হয়।
সোহাগঃ তাহলে মেয়েটাকে তারালি কেন?

মিরাঃ আমি যানি না কেন আমি এমনটা করলাম আমাকে প্লিজ যেতে দিন! আমার সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা করছে আজ আর আমার সাথে কিছু করবেন না প্লিজ!
সোহাগঃ তুই বললেই কি তোর কথা আমি শুনবো নাকি?

মিরাঃ আজকের দিনটা আমাকে আপনি রেহাই দিন। কাল থেকে আপনি যা বলবেন আমি আপনার সব কথা শুনবো।
সোহাগঃ কি শুনবি তুই?

মিরা আর কিছু ভেবে না পেয়ে মাথা ঘুরে পরে যাওয়ার নাটক করে। যেই পরতে যাবে সোহাগ মিরাকে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নেই। এই মিরা ওঠ! ওঠ বলছি। মিরার কোনও সারা না পেয়ে মিরাকে কোলে করে রুমে নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুইয়ে দেয়।

মিরার মুখের দিকে এক মায়া ভরা দৃস্টিতে তাকিয়ে আছে সোহাগ। আমি যানি না মিরা আমি ঠিক করছি কিনা। কিন্তু তোমাকে যে আমার শাস্তি দেওয়াই লাগবে। প্রতিশোধ নিতে হবে আমাকে! প্রতিশোধ! বলেই সোহাগ মিরা পাশে লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পরে। আর মিরা সোহাগের কথাটি শুনে চমকে যাই। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে সোহাগ উল্টোদিকে মুখ করে শুয়ে আছে। মিরা তখন ভাবতে থাকে কোন প্রতিশোধের কথা বলছে সোহাগ? না আমাকে যানতেই হবে!


পর্ব ৩

বিছানায় উবূ হয়ে শুয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী রাইশার কথা ভাবছে রাইসূল সিকদার। না যানি কতদিন তার এই বুকে মাথা রেখে ঘুমাই নি রাইশা। বুকের ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করছে। এমনটা যেন মাঝ রাত হলেই হয়। আর তো মাত্র কটা দিন। তারপরই তো রাইশা ঠিক আগের মতোন তার এই বুকে ঘুমাবে। আর তাদের সন্তান? সে এতোদিনে হয়তো বাবা ডাক টাও শিঁখে গেছে।

আচ্ছা! রাইশার মধ্যে কি এখনও সেই ছেলে মানুষী গুলোই আছে নাকি মা হওয়ার পর নিজেকে একটু বদলে নিয়েছে? খুব যানতে ইচ্ছা করে! আবার ভয় হয় অনেক। রাইশা যেরকম জেদি মেয়ে আমার উপর রাগ করে উল্টো পাল্টা কিছু করে বসে নিতো সেদিন? কিন্তু আমি কি করতাম তখন..! মাকে যে ওই রকম অসুস্থতার সময়ে কস্ট দিতে পারতাম না। তবে রাইসার দেখাশুনা করার জন্য আমি তো আমার মিরা আপুকে রেখে এসেছি। মিরা আপু থাকতে এতো চিন্তা কিসের? বাবা মারা যাবার পর মিরা আপু নিজ হাতে সংসারের সব দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। একা হাতে সামলিয়েছে সবকিছু। যে আমার ডাক্তারি পড়ার খরচ চালাতে গিয়ে নিজের একটা কিডনি পর্যন্ত বিক্রি করেছে। এমন আপুর কাছে থাকতে কিছুতেই আমার রাইশা খারাপ থাকতে পারে না। কথাগুলো বিচারণ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে রাইসূল।

সকালের এলার্ম বাজতেই এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে মিরা। তাকিয়ে দেখে সোহাগ তার কানের কাছে ঘড়িতে এলার্ম বাজিয়ে ধরে রেখেছে।
মিরাঃ আপনি? আমতা আমতা করে বলে।
সোহাগ মির্জাঃ ঘড়িতে টাইম দেখেছিস কয়টা বাজে? বাড়ির কাগজগুলো কে করবে শুনি? আজ আমি অফিসে যাব না। তাই আজ বাড়িতেই ব্রেকফাস্ট করব ভেবেছি। আর তুই কিনা পরে পরে ঘুমোচ্ছিস?

মিরাঃ আপনি একটু বসুন আমি এক্ষুণী আপনার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করে আনছি। বলে দরজার কাছে গিয়ে কিছু একটা ভেবে মিরা আবার ফিরে আসে।
সোহাগ মির্জাঃ কি হল?

মিরাঃ না মানে আপনি তো রোজ সকালে খুব ভোরে অফিসে চলে যান। বাইরে ব্রেকফাস্টে কি খান তাতো আমি যানি না।
সোহাগ মির্জাঃ স্ত্রী হয়েছিস আর এটুকুর খোঁজও নিস না। এ তুই তো দেখছি স্বামীর কি পছন্দ, অপছন্দ কিছুই যানিস না। আর বলিস কিনা আমার বউ হবি! হাত দিয়ে মিরার গালটা শক্ত করে চেপে ধরে।
মিরাঃ আহ্ ছাড়ুন আমাকে! সোহাগের থেকে মিরা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, আপনি যদি না বলেন তাহলে আমি যানবো কি করে? তারপর আমি কি থেকে কি আপনার জন্য বানিয়ে আনবো যদি আপনার মুখে না রোচে?

সোহাগ মিরাকে বিছানায় ছুড়ে মারে। শক্তকরে মিরার দুই বাহু চেপে ধরে বলে, তোর সাহশ তো দেখছি দিন দিন বেরে যাচ্ছে। মিরার ফোলা ঠোটটাতে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে, আজ দেখছি তোর এই মুখে খুব বলি ফুটেছে। আর যেন কখনও তোকে আমার মুখের উপরে কথা বলতে না দেখি। নইলে এর ঝাঁজ তোকে বোঝাতে আমার বেশী টাইম লাগবে না।
মিরাঃ সোহাগের আঙুলে একটা কামড় বসিয়ে দেই। অনেক হয়েছে আর না।

বিয়ের আগে তো শুধু আপনার মুখে মধু ফুটতো। এখন তো ভাষার ছিড়িতে আপনার কাছেও আসতে ঘৃণা হয় আমার। সোহাগকে একটা ধাক্কা দিয়ে উঠে দাড়িয়ে, কাপুরুষের মতো আমার গায়ে যে ভাবে হাত দেন মাঝে মাঝে তো মনে হয় আপনার মতো লোকের পুরুষত্ব না থাকায় ভালো ছিল। এতো জঘন্য ব্যবহার করেন আমার সাথে। কেন কি অপরাধ করেছি আমি? আর কত? আর কত এইভাবে অত্যাচার করবেন আমার উপর।

এই কি আপনার সেই ভালোবাসা? কি চান আপনি আমাকে একটু বলবেন? আমি আর পারছি না। হয় আমায় মুক্তি দিন নয় আমায় একটু ভালোবাসা দিন। খুব বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে আমি। বলেন না আপনার স্ত্রী হতে গেলে আর কি কি করতে হবে আমাকে? মেয়েরা তো বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর মনের পছন্দ অপন্দের খবরাখবরের খোঁজ নিয়ে আসে না। আপনি যদি আমাকে একটু সময় না দেন তাহলে কিভাবে আমি বুঝবো আপনাকে! কথাগুলো বলতে গিয়ে মিরার চোখে পানি চলে আসে।
সোহাগের মিরার মুখটা দেখে খুব মায়া হতে থাকে। একটা সময় মিরার চোখের পানি সোহাগ সহ্য করতে পারত না। মিরার মন খারাপ থাকলে সারাদিন একটার পর একটা সারপ্রাইজ দিয়ে মিরার মুখে হাসি ফোঁটানোর চেস্টা করত।

সোহাগ মিরার খুব কাছে চলে আসে। দুই হাত দিয়ে মিরার গালটা আকড়ে ধরে মুখটা উঁচু করে তোলে। নিজের ঠোঁট দিয়ে মিরার চোখের পানি মুছিয়ে দেই। তারপর যখনই নিজের ঠোঁটটা মিরার ঠোঁটে বসাতে যাবে ঠিক তখনই মিরা নিজের হাতটা দুইজনের ঠোঁটের মাঝখানে নিয়ে আসে।
মিরাঃ আমি ব্রাশ করি নি! সরুন। বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে কিচেনে চলে যায়। গ্যাসের চুলাটা অন করে দিয়ে বিরবির করে বলে লোকটা আস্ত একটা অসভ্য! যখন তখন শুধু আমাকে হেনস্তা করার বাহানা খুঁজে। নাহ এই লোকটাকে যেভাবেই হোক সোজা পথে আনতে হবে। কি পেয়েছেটা কি? আমি কি মানুষ না? আমারও একটা মন আছে। সেই মনটাতে খুব কস্ট হয় যখন আমার সাথে উনি খারাপ বিহেভ করেন।

কিছুক্ষণ পর, মিরা গরম, গরম পরোটা আর আলুভাজি নিয়ে ঘড়ে এসে দেখে সোহাগ বিছানার উপর গাদাগাদি কাপড় মেলে রেখেছে।
মিরাঃ আমরা কি কোথাও যাচ্ছি?
সোহাগ মির্জাঃ নাহ।
মিরাঃ তাহলে এতো কাপড় কেন বের করে রেখেছেন? মনে তো হচ্ছে আলমারীর সব কাপড়ই এখানে!

সোহাগ মির্জাঃ তোমার কথাগুলো শুনে আমার মনটা বদলে ফেললাম। ভেবে দেখলাম তোমাকে স্ত্রী হবার একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সুযোগটা নিতে রাজি থাকলে তোমাকে কিছু পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলেই তুমি আমার স্ত্রীর হবার সম্পূর্ণ সম্মাণ ও মর্যাদা পাবে। হতে পারবে আমার যোগ্য অধাঙ্গিনী। আর মনে রেখ আমার পরীক্ষায় উত্তির্ন না হলে আজ কিন্তু পুরো বাড়িতে ঝাড়ু-পোছা লাগিয়ে মেঝে পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির একটা কোনাও বাদ দিতে পারবে না। কয়েকটা কাপড় মিরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ওয়াশরুমে যাও। ৩০ মিনিট সময় আছে তোমার কাছে, ওয়াশিন মেশিন ছাড়াই সব পরিষ্কার করবে। তারপর আয়রন করে ঠিক যেভাবে আগে আলমারীতে সাজানো ছিল সেভাবেই গুছিয়ে রাখবে।

সবার আগে আমার গল্প পড়তে চাইলে “নীল ক্যাফের ভালোবাসা” পেজে পাবেন।
মিরাঃ একটু মুচকি হেসে, এমন ফালতু আইডিয়া কোথা থেকে বের করেন বলেন তো? আমাকে কি আপনার বোকাঁ মনে হয়? পুরো কাপড়ের দোকান সামনে রেখে বলছেন ৩০ মিনিটে ধূয়ে আয়রন করে দিতে? আর শুনুন আমি আপনার খেলনা পুতুল নই। কোনো পরীক্ষা টরীক্ষাই আমি দিতে পারব না। আপনার এসব ছেলে মানুষী এবার বন্ধ করুন। আর এটা ভুলে যাবেন না আমাকে বিয়ের প্রস্তাবটা আপনিই দিয়েছিলেন। আমি আপনার যোগ্য নাকি অযোগ্য সেটা তো আপনার বিয়ের আগেই ভাবা উচিত ছিল।
মিরা বিছানা থেকে একটি শাড়ি আর তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। আর সোহাগ থ হয়ে পরে থাকে। বিছানার উপর বসে পড়ে পা ঝুলিয়ে দিয়ে ভাবে আর কি উপায়ে মিরাকে শাস্তি দেবে!

(সরি, আমার ফোনে টাসে প্রবলেম। যার কারণে সাজিয়ে লিখতে পারলাম না। ক টাইপ করলে ঝ টাইপ হচ্ছে আর ন টাইপ করলে ম। অনেক কস্টে এটুকু লিখছি। চাইলেও বড় করতে পারি নি। যদি করতাম পোস্টের আগেই ডিলিট হয়ে যেত। ২য় ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা আমার। পরীক্ষাটা শেষ হলেই নিউ ফোন থেকে বড় করে পার্ট দেওয়ার চেস্টা করব। তখন লেখাগুলোও সাজানো গোছানো হবে। )


পর্ব ৪

(ফ্লাশ ব্যাক)
খাবার টেবিলে বসে আছে রাইশা।
সখিনাঃ খাইয়া লউ মেম সাব!
রাইশাঃ না খালা! যতক্ষণ না ভাইয়া আসছে আমি কিছুই খাবো না।
সখিনাঃ এইডা কোনো কথা হইলো? সাহেব যদি রাতে না আহে তাইলে কি না খাইয়াই থাকবা?

রাইশাঃ হুমম খালা। তুমি আর কথা বলো নাতো। দেখছোই তো সেই কখন থেকে পেটের ভেতরে ইঁদুরে দৌঁড়া দৌঁড়ি করছে।
সখিনাঃ হের লাইগাই তো কইতাছি খাইয়া লউ। সাহেব না যানি কহন আইবো আর তোমারে আমি খাওয়াই নায় দেইখ্যা আমারেই কথা হুনাইবো।
রাইশাঃ প্লিজ খালা আর জোড় করো না। ভাইয়া হয়তো খুব বিজি আছে। দেখি না আরেকটু অপেক্ষা করে!
সোহাগ মির্জাঃ আর অপেক্ষা করা লাগবে না আমি এসে গেছি।

রাইশা উঠে গিয়ে সোহাগের সামনে এসে দাড়াই, এতো রাত করে কেন আসো ভাইয়া? যানো না আমি না খেয়ে বসে থাকি?
সোহাগ কান ধরে বলে, সরি ছুটকি। আসলে সারাদিন খুব বিজি ছিলাম। আজ তো লান্সটাও করার সময় পাই নি।
রাইশাঃ আচ্ছা হয়েছে এখন চলো ডিনার করবে।
সোহাগ মির্জাঃ হুমম চল।

মির্জা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি,
-আই লাভ ইউ জানু।
-আই লাভ ইউ টু।
-উম্মাহ।
-উম্মাহ উমম।

মিরা দরজার কাছে দাড়িঁয়ে কান পেতে হেলান দিয়ে কথাগুলো শুনার চেস্টা করছে আর বার বার নাক মুছছে। বিরবির করে বলছে ব্যাটা বেঈমান, খবিস, লুচ্চা সামুক। তোকে আমি দেখে নেব! এবার আসিস আমার কাছে? ভালোবাসা দাও না সোনা! ভালোবাসা দাও! ফাঁটা বাশ ধরাই দেব হাতে। আমার জীবনডারে ত্যানা ত্যানা কইরা এখন অন্য মেয়ে নিয়ে ফুরতি! তোরে তো আমি….

সোহাগ দরজাটা খুলতেই মিরা পরে যাবে। সোহাগ অমনি মিরার হাতটা ধরে বসে। মিরাকে নিজের খুব কাছে টেনে নেয়। তারপর মিরার কোমড়টি খুব শক্ত করে চেপে রেখে,
সোহাগ মির্জাঃ এই এক্ষুণি তো পড়ে যাচ্ছিলে। একটু সাবধানে থাকতে পারও না? মেয়েটিকে চোখের ইশারার চলে যেতে বলে।
মিরাঃ সরুন তো আপনি! আপনি একটা খারাপ লোক। আপনার সাথে কোনো কথা নেই।
সোহাগ মির্জাঃ কেন আমি আবার কি করলাম?

মিরাঃ সেটা আপনি খুব ভালো করেই যানেন।
সোহাগ মির্জাঃ কি যানি আমি?
মিরাঃ উহফ আপনি আসলেই একটা বজ্জাত।
সোহাগ মির্জাঃ ওই বজ্জাতের কি করেছি আমি?

মিরাঃ কি করেছেন আবার বলছেন ছি! ছি, ছি, ছি, ছি! মিরা ছি ছি করতে করতে মুখটা ঘুরিয়ে নেয় সোহাগের থেকে।
সোহাগ মির্জাঃ তোমার ছিঃ এর লিস্ট এতো লম্বা যে আমি বুঝে উঠতে পারছি না কি করেছি। যদি একটু বুঝিয়ে না বল….
সোহাগ আর কিছু বলার আগেই মিরা সোহাগের গালে একটা কিস বসিয়ে দেই। উম্মাহ!

মিরাঃ এই করছিলেন ওই মেয়েটার সাথে। মুখটা মলিন করে বলে।
সোহাগ একটু মুচকি হেসে, তাই বুঝি? তো আমি যাই করি না কেন তাতে তোমার কি? তুমি তো আর আমাকে ভালোবাসো না। তাছাড়াও আমি তো সালমান খান নই যে যুগ যুগ মেয়েরা আমার অপেক্ষায় বসে থাকবে। একবার মাথার চুল পাঁকতে শুরু করলে সুন্দরী মেয়েরা আমায় আংকেল বলে ডাকবে, তুমি বোঝা না?
মিরা মুখ টিপে হাসতে শুরু করে। সত্যিই আপনার মাথাতে কিছু কিছু চুল পেঁকে গেছে। এখন তো সব মেয়েরাই আপনাকে আংকেল বলবে। এইতো দেখুন না..এখানে একটা, এখানেও আছে। এখানেও আর এখানে…সোহাগের চুলের এখানে-ওখানে আঙুলের ইশারায় দেখায় মিরা।

সোহাগ কিছু না বলেই মিরার কোমড়টা ছেড়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার পাঁকা চুলগুলো খুঁজতে থাকে।
মিরা সোহাগের পিঁছন পিঁছন এসে ওয়াশরুমের দরজাটা একটু আলগা করে ব্যাপারটা দেখে মুখ টিপে হাসে। তখন সোহাগ আয়নার ভেতরে মিরাকে দেখতে পেয়ে,
সোহাগ মির্জাঃ এই মিরা কোথায় পাঁকা চুল? একটা পাঁকা চুলও তো খুঁজে পাচ্ছি না।
মিরা ওয়াশরুমের ভেতরে চলে আসে।

মিরাঃ আরে স্যার! আপনি সত্যিই একটা বোকা। আপনার মাথায় পাকা চুল….
মিরা আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই সোহাগ পানি ছেড়ে দেয়। আস্তে আস্তে মিরার সারা শরীর ভিজে যায়। ভিজে গিয়ে মিরা কুকড়ে থাকে। থর থর করে দাঁতগুলো কাপে। একই তো কলকলে শীতের দিন। তার উপর সকাল সকাল ভেজা শরীরে। প্রচন্ড ঠান্ডা আহ্ গাল থেকেই ধোঁয়া বের হচ্ছে।
কেমন লাগে এই সময়ে?

মিরা রেগে চলে যায়। পরপর তিনদিন অফিসে আসে না। সোহাগ অনেক চেষ্টা করে মিরার মান ভাঙানোর। যার জন্য একটার পর একটা সারপ্রাইজ প্লান করতে থাকে মিরার জন্য। আর মিরারও সারপ্রাইজ পেতে ভালো লাগে তাই সোহাগের উপর রেগে থাকার নাটক করে যায়। তারপর যখন এক ঝড়-বৃস্টির রাতে মিরার বাড়ির সামনে দাড়িয়ে কলকলে শীতে সোহাগ ভিজছিল তখন গিয়ে মিরা বলে রেগে থাকার নাটক করেছে।

সোহাগ মির্জাঃ অতীতের ছোট ছোট সুখের মুহূর্তগুলো কেন খুব দ্রত গতিতে চলে যায়? কেন সেই মুহূর্তগুলোকে আটকে রাখা যাই না?

{বিছানায় পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসে বসে মিরাকে শাস্তি দেওয়ার উপায় খুঁজতে গিয়ে মিরার সাথে কাটানো সুখের মুহূর্তগুলোই মনে পড়ে যায় সোহাগের। বুকের ভেতরটাই এক চিনচিনে ব্যাথা হয় মিরাকে কস্ট দিলে। কিন্তু মিরা যে অপরাধী। ওর ভাই যে অপরাধী। ছোটবেলা নৃশংস ভাবে চোখের সামনে বাবা-মাকে হত্যা হতে দেখেও কিছু করতে পারে নি সোহাগ। তারপর থেকে বোনই তো সোহাগের সবটা জুড়ে। খুব বেশি দিন না হলেও সোহাগের জীবনে মিরার আগমন হওয়াতে ভেতর থেকে মিরার অস্তিত্বের জানান দেয়া অস্বীকার করা যায় না। সোহাগ যেদিন মিরাকে প্রথম দেখেছিল সেদিন থেকেই মিরাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর আজ এতো কাছে পেয়েও পারছে না আপন করে নিতে। এটাই হয়তো বিধির বিধান! }

হঠাৎ সোহাগের সেলফোনটা বেজে ওঠে। তাকিয়ে দেখে হসপিটাল থেকে ডা. শিহাব কল করেছে। কলটা রিসিভ করার পর সোহাগের চোখে মুখে এক উজ্জ্বল রেখা ফুটে ওঠে।
সোহাগ মির্জাঃ কি বললেন ডাক্তার? আমার বোনের জ্ঞান ফিরেছে? কথা বলতে পারছে? আমি এক্ষুনি আসছি!
অনেক আনন্দ আর উল্লাস নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্য রওনা হয় সোহাগ মির্জা।
আর এদিকে মিরা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে সোহাগকে খোঁজে।

মিরাঃ গেল কোথায় মানুষটা? বলে তো ছিল আজ সারাদিন বাড়িতে থাকবে! আসলে এই লোকটা শুধরাবে না কখনও। পরনারীর নেশায় আসক্ত হয়ে গেছে। যার জন্য বাড়িতে মন বসে না। আজ আসুন আপনি কোনো মেয়েকে সাথে নিয়ে যদি ঘার ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের না করেছি তাহলে আমিও আপনার স্ত্রী নই।


পর্ব ৫

হসপিটালে রাইশা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। কেবিনের সব কিছু ভাংচুর করছে। হাতের সামনে যা পাচ্ছে তাই ছুড়ছে। দুই-তিনজনের তো মাথাও ফাটিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার, নার্স কেউ রাইশাকে সামলাতে পারছে না।
ডাঃ শিহাবঃ মিছ রাইশা, এখন একটু শান্ত হোন। আপনার ভাই এক্ষুণী চলে আসবে।
সবাই রাইশার হাত, পা শক্ত করে ধরে রেখেছে। তবু্ও রাইশার ঝাঁপাঝাঁপি বন্ধ হয় নি। একটা সময় পর রাইশা নিজেই ক্লান্ত হয়ে পরে। বিরবির করে বলে,
রাইশাঃ আমাকে ছাড়ুন! যেতে দিন আমার সন্তানের কাছে। নেহা ওকে মেরে ফেলবে। কথাটা বলে বেডে ঢলে পড়ে।
সোহাগ এসে বোনকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

সোহাগ মির্জাঃ ডাক্তার আপনি তো বলেছিলেন আমার বোনের জ্ঞান ফিরেছে, কথা বলতে পারছে। তাহলে?
ডাঃ শিহাবঃ আমি ভুল বলিনি মি.মির্জা! আপনার বোন এখন ঘুমোচ্ছে। আমরা উনাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রেখেছি। ইনজেকশনটা না দিলে আমাদের পক্ষে পেশেন্টকে সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। এই যে, এদেরকে দেখুন! মাথা ফাটিয়ে কি অবস্থা করেছে!
সোহাগ মির্জাঃ সরি, ডাক্তার। কিন্তু আমার বোন এমনটা কেন করছে?

ডাঃ শিহাবঃ যানি না। আমরা তো কথায় বলতে পারছি না। আপনি বরং উনাকে বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িতে গেলে অবস্থার পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক সময়ে পেশেন্টের এমন অবস্থায় চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের আপনজনদের সঙ্গ প্রয়োজন।
সোহাগ আর কোনো কথা না বলে, নিরবে রাইশার পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। রাইশার ঘুমোন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে দু’ফোঁটা চোখের পানি ফেলে। তারপর বোনকে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে যায়।

মির্জা প্যালেস,
সোহাগের কোলে রাইশাকে দেখে মিরা রেগে ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে। শাড়ির আচল কোমরে গুজে,
মিরাঃ আপনি আজও?

সোহাগ কিছু না বলেই, মিরার পাশ কেটে রাইশাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। মিরাও সোহাগের পিছন পিছন যায়।
মিরাঃ আমি আপনাকে কিছু বলছি! আমার কথার উত্তর না দিয়ে চলে যাচ্ছেন কেন?
সোহাগ বোনকে নিয়ে রুমে শুইয়ে দেয়।

মিরা সোহাগে হাত ধরে এক টানে নিজের সামনে নিয়ে আসে। সোহাগের শার্টের কলারটি টেনে ধরে,
মিরাঃ কেন এমন করছেন আপনি? আজ কিছুতেই এসব দুশ্চরিত্রা মেয়ের সাথে আপনাকে আমি থাকতে দেব না।
মিরার মুখে রাইশাকে বলা দুশ্চরিত্রা কথাটা শুনে সোহাগ প্রচন্ড আকারে রেগে যায়। মিরার গালে ঠাসসসস করে একটা চর বসিয়ে দেয়। মিরা গালে হাত দিয়ে সোহাগের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।

সোহাগ মির্জাঃ তোর সাহশ তো কম না। ওকে দুশ্চরিত্রা বলছিস তুই! তোকে তো আমি..
মিরাঃ দুশ্চরিত্রাকে দুশ্চরিত্রা বলব না তাকি সতি সাবিত্রী বলব? যে অন্যের স্বামীর সাথে বেড শেয়ার করতে দিন দুপুরে অন্যের বাড়িতে চলে আসে তাকে আর কি বলা যায়? ওকে এখন আমি কি করি আপনি দেখুন।
মিরা রাইশার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত রাইশাকে ঝাকাতে শুরু করে। এই মেয়ে ওঠ! ওঠ বলছি! বের হ আমার বাড়ি থেকে। তোদের মতোন নস্টা মেয়ের জন্য আমাদের মতো মেয়েদের আজ কপাল পুরছে।

সোহাগ মিরার হাত ধরে রাইশার থেকে দূরে সরিয়ে আনে। তুই কিন্তু এবার সত্যিই অনেক বারাবাড়ি করে ফেলছিস।

মিরাঃ আমি বারাবাড়ি করছি? একটানে মিরা বুক থেকে নিজের শাড়ির আচলটি টেনে খুলে ফেলে। কি আছে এসব মেয়েদের মধ্যে যা আমার মধ্যে নেই? কেন বারবার আপনি যৌবনের চাহিদা মেটাতে এসব মেয়েদের ব্যবহার করেন? বাড়িটাকে তো পতিতালয় বানিয়েই ফেলেছেন! এসব মেয়ের প্রতি যদি এতই আসক্ত থাকবেন তাহলে আমায় কেন বিয়ে করেছিলেন?

সোহাগের রাগ এবার চরম আকার ধারণ করে। এক ধাক্কায় মিরাকে মেঝেতে ফেলে দেই। কি বললি তুই? বেল্ট খুলে মিরার পিঠে মারতে থাকে। তারপর মিরার এক মুষ্টি চুল শক্ত করে ধরে কপালে আঘাত করে। মিরার কপাল ফেটে রক্ত ঝড়তে থাকে। ফর্সা পিটটা কেটে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিরা সোহাগের প্রতিটা আঘাতে আর্তনাদ করে, সেই দিকে সোহাগের কোনো খেয়াল নেই। সোহাগ মিরাকে মারে। এতো মারে যে মিরার নিঃশ্বাস নিতে খুব কস্ট হয়। মারতে মারতে সোহাগ যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পরে তখন মিরার গালটি শক্ত করে চেপে ধরে রাইশার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে,

দেখ ওকে!
জানিস তুই কাকে কি বলেছিস?
ও তোর কাছে দুশ্চরিত্রা?
নস্টা মেয়ে তাই না?
তুই জানিস আামার জীবনে ওর কি স্থান?

কেউ যদি আমায় বলে ওর জন্য আমার কলিজাটা ছিড়ে দিতে তাহলে আমি সেটাও দিয়ে দিতে পারি। আর তুই কিনা….?
মিরা সোহাগের পা ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাড়ায়। নিজের রক্তাক্ত কপালটা সোহাগের বুকের সাথে মিসিয়ে কম্পিত ঠোঁটে বলে, আপনি আমার কাছে সব সময় জানতে চাইতেন না আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা? ভালোবাসি! খুব ভালোবাসি আপনাকে! এজন্যই তো অন্য কারও সাথে আপনাকে আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমার খুব কস্ট হয় যখন চোখের সামনে অন্য মেয়েদের নিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেন। আমি তো আপনাকে ভালোবাসি বলেই আপনার এতো অত্যাচার সহ্য করেও আপনার কাছে পরে আছি। আমি তো আপনার কাছে বেশি কিছু চাই নি? আর পাঁচটা স্বামী-স্ত্রীর মতোন একটু সুখে থাকতে চেয়েছি। আর আপনি আমার সাথে….
মিরা আর কিছু বলার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।


পর্ব ৬

জ্ঞান হারিয়ে মিরা সোহাগের বুক থেকে ঢলে পরছে! এমন সময়ে সোহাগ মিরার হাতদুটো শক্ত করে ধরে বসে। মিরাকে টেনে নিজের বাহুডোরে মিশিয়ে নেয়। মিরাকে ঝাঁপটে ধরে,

সোহাগ মির্জাঃ মিরা?
এই মিরা?
এই, সত্যিই কি তুমি আমাকে এতোটা ভালোবাসো?
কি হলো? কথা বলছো না কেন?

সোহাগ মিরার মুখটা নিজের সামনে নিয়ে আসে। দেখে মিরার কোনো সারা শব্দ নেই। সোহাগের রাগ এখন অনুশোচনায় পরিণত হয়। মিরার সারা শরীরের ক্ষতগুলোতে চোখে বুলাতে থাকে। মিরার ক্ষত-বিক্ষত শরীরটা দেখে সোহাগের চোখ বেয়ে পানি পরছে। যন্ত্রণায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে।

সোহাগ মির্জাঃ কতোটা ব্যাথা আর যন্ত্রণা দিয়েছি তোমাকে আমি! কেন আমি এতো রাগতে গেলাম? তুমি তো যানোই রাগ হলে আমার মাথার ঠিক থাকে না। তাহলে কেন তুমি আমাকে রাগাও?
মিরার শরীরের ক্ষত স্থানগুলোতে সোহাগ হাত বুলিয়ে দেয়, পিঠের ক্ষত গুলোতে আলতো ঠোঁটের পরশ ছুইয়ে দেয় তারপর গলায় দেওয়া সেদিনের কামড়ের দাগটাতে একটা গভীর চুম্বনে ডুবে থাকে। এমন সময়ে,
-উহু উহু, দরজার কাছে দাড়িয়ে হাসান হালকা কাশি দিয়ে ওঠে।

সোহাগ মির্জাঃ হাসান তুমি এখানে?

হাসানঃ স্যার, একটা গুড নিউজ দেওয়ার ছিল!

সোহাগ মির্জাঃ কি এমন গুড নিউজ, যা বলতে বাড়িতে চলে আসতে হলো?

হাসানঃ স্যার এটা এমন নিউজ যে আমি না এসে পারলাম না। ভাবলাম নিজে এসে আপনাকে নিউজটা দিই।

সোহাগ মির্জাঃ কি বলতে এসেছো তাই বল?

হাসানঃ আপনার শ্বাশুড়ি মায়ের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছি আপনার সালা সাহেবের কাছে।

সোহাগ মির্জাঃ মানে?

হাসানঃ আজই আপনার সালা সাহেব দেশে ফিরছে।

সোহাগ হাসানের দিকে জিজ্ঞেসা বোধক চিহ্ন নিয়ে তাকায়…..?
সোহাগ মির্জাঃ তুমি কি বলছো যানো?

হাসানঃ আমি সব জানি স্যার।

সোহাগ মির্জাঃ কি যানো তুমি?

হাসানঃ স্যার। কাল রাতে অফিসে একটা মেয়ে এসেছিল, আপনাকে খুঁজতে। তার কাছ থেকেই সব যানতে পেরেছি আমি।

সোহাগ মির্জাঃ কি যানতে পেরেছো?

হাসানঃ আপনার বোন একজনকে ভালোবাসে আপনার অমতে গিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু তার শ্বাশুড়ি মা অন্য এক মেয়েকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে ঠিক করে রাখে। কাল সেই মেয়েটিই এসেছিল।

সোহাগ মির্জাঃ কি বলতে এসেছিল মেয়েটি?

হাসানঃ আপনার শ্বাশুড়ি মা একজন হার্টের পেশেন্ট। বিয়ের পর যখন আপনার বোনকে নিয়ে আপনার শ্বাশুড়ি মায়ের সামনে দাড়ায়, তখন আপনার শ্বাশুড়ি মা সবটা যেনে হার্ট অ্যাটাক করেন। তারপর……

সোহাগ মির্জাঃ থাক এসব কথা রাখও। শুধু বল, তুমি কি শিওর? ওই প্রতারকটা আজই আসছে?

হাসানঃ জ্বি, স্যার। আমি একদম শিওর।

সোহাগ মির্জাঃ ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।

সোহাগ মিরাকে বিছানায় রাইশার পাশে শুইয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টে চলে যায়। আর এদিকে সোহাগ চলে যাওয়ার পর হাসান আবার মির্জা প্যালেসে আসে। মিরার মুখের উপর ঝুঁকে,
হাসানঃ মিরা তুমি আমার স্বপ্ন ছিলে। কিন্তু তোমাকে আমি পায় নি। সোহাগ মির্জার কাছে তুমি কখনোই ভালো থাকতে পারবে না। চলো আজ তোমায় আমি নিয়ে যাবো। অনেক ভালোবাসা দেব দেখও! এতোটা ভালোবাসা দেব যে এই সোহাগ মির্জাকেই তুমি ভুলে যাবে।

কথাগুলো বলে হাসান মিরাকে সেন্স লেন্স অবস্থায় কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তারপর মিরাকে গাড়িতে শুইয়ে নেহার ফোনে একটা ম্যাসেজ করে, “থ্যাংক ইউ নেহা। তোমার জন্যই আজ আমি মিরাকে পেয়েছি। “

সোহাগ এয়ারপোর্টে গিয়ে অপেক্ষা করে কিন্তু রাইসূল আসে না। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে রাত অবশেষে সোহাগ বাড়ি ফেরে।
সোহাগ বাড়ি ফিরতেই রাইসা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে সোহাগকে জড়িয়ে ধরে,

রাইসাঃ ভাইয়া। কোথায় ছিলে তুমি?

সোহাগ মির্জাঃ কি হয়েছে ছুটকি হাঁপাচ্ছিস কেন?

রাইসা হাত দিয়ে কিচেনের দিকে ইশারা করে। সোহাগ বোনের দিকে তাকিয়ে দেখে খুব ভয় পেয়ে আছে। বোনকে ধরে কিচেনে গিয়ে দেখে সব কিছু এলোমেলো। মনেই হচ্ছে এখানে খুব দস্তাদস্তি হয়েছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে অন্ধকারে কালো জ্যাকেটে, মুখে মুখোশ পরিধানকৃত কেউ জানালার পাশ কেটে পালাচ্ছে। সোহাগ বোনকে রেখে তার পিছন পিছন ছোটে কিন্তু তাকে আর ধরতে পারে না। সোহাগ ফিরে আসে। বোনকে জিজ্ঞাসা করে, ওটা কে ছিল ছুটকি? মুখটা দেখেছিস?
রাইশা মাথাটা কাত করে হ্যাঁ, উত্তর দেয়।

সোহাগ মির্জাঃ কে ছিল?

রাইশাঃ নেহা।

সোহাগ মনে মনে ভাবছে, একি সেই নেহা যে সেদিন আমায় ফোন করেছিল? কিন্তু ও আজ এইভাবে কেন এসেছে?

সোহাগ মির্জাঃ কেন এসেছিল ও?

রাইশাঃ আমাকে মারতে ভাইয়া! এ সেই নেহা যার সাথে আমার শ্বাশুড়ি মা রাইসূলের বিয়ে ঠিক করেছিল। আমি যখন বিয়ের পর রাইসূলের বাড়িতে যায় তখন আমার শ্বাশুড়ি মায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়। নেহার কথাতেই হসপিটালে আমি আর রাইসূল আমার শ্বাশুড়িকে বোঝায়। নাহ আমাদের বিয়ে হয় নি। আমরা শুধুই বন্ধু। নেহা ব্যাপারটাকে মজা করেছি বলে পাল্টে দেয়। রাইসূল আমাকে আলাদা একটা ফ্লাটে রাখে। মাঝে মাঝে ও আমাকে দেখে যেত। যখন আমি আট মাসের গর্বভতী তখন নেহা এসেছিল আমায় দেখতে। কথায় কথায় আমার হাতে একটা বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দেয়। কার্ডটা ছিল ওদের বিয়ের।

নেহা আমাকে রাইসূলের জীবন থেকে সরে যেতে বলে। কিন্তু আমি তাতে রাজি হই না। তাই নেহা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। ভাগ্যক্রমে তখন রাইসূল চলে আসে বলেই আমি বেঁচে যায়। তারপর থেকেই রাইসূল দিন রাত আমার সাথে পরে থাকতো। আমার অনেক যত্ন নিত। কিন্তু কতোদিন? রাইসূলের মা আবার অসুস্থ হয়ে পরে। তখন ওকে আমি জোড় করি ওর মায়ের কাছে যেতে। তবুও ও আমাকে একা ছাড়তে চাই নি। আমাকে ওর আপুর কথা বলে।

ভাবলাম ওর আপু আমাদের অবস্থাটা বুঝবে! তাই ও আপুর সাথে কথা বলে আমাকে খুলনার বসে উঠিয়ে ওর আপুর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাস খুলনাতেই আসছিল কিন্তু মাঝপথে নেহার দলবল আমাকে আটক করে। অনেক চেস্টা করেও আমি পালাতে পারি না। আমাকে নেহা অনেক আঘাত করে। আমার সন্তান ভূমিষ্ট হতেই ও নিয়ে যায় আমার থেকে। আর আমাকে পিছিয়ে দিয়ে যায় ওর গাড়ির সাথে। তারপরের কোনও কথা আমার মনে নেই। শুধু চোখ মেলে নিজেকে হসপিটালে আবিষ্কার করি। ডাক্তার, নার্স সবাইকে দেখতে পাই কিন্তু আমার সন্তানকে পায় না। আমার সন্তান কোথায় ভাইয়া! প্লিজ ওকে আমার কাছে এনে দাও! আমি আর কখনও তোমার কাছে কিচ্ছু চাইবো না প্লিজ। রাইশা কাঁদতে থাকে।

সোহাগ রাইশাকে জড়িয়ে ধরে, শান্ত হ বোন।
কিছুক্ষণ পরে,
সোহাগ মির্জাঃ একটা কথার উত্তর দিবি আমাকে? তুই কি কখনও রাইসূলের আপুকে দেখেছিস?
রাইশাঃ না ভাইয়া তবে শুনেছি ওর আপু খুবই ভালো। সবসময় ওর আপুর প্রশংসা শুনতাম।


পর্ব ৭

সোহাগ মির্জাঃ এ আমি কি করেছি?
সোহাগ নিজের হাতদুটো সামনে নিয়ে আসে, এই হাত দিয়ে আমি আমার ফুলের মতোন নিষ্পাপ মিরাকে মেরেছি। ওর শরীরকে করেছি ক্ষত-বিক্ষত। না যানি কতটা যন্ত্রণা সহ্য করেছে আমার মিরা। এক্ষুনি আমি আমার মিরার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবো।

রাইশাঃ কি বলছো ভাইয়া? কে মিরা?

সোহাগ কোনও উত্তর না দিয়েই ছুটে রুমে চলে যায়। মিরা? কোথায় তুমি? এই মিরা? সোহাগ মিরাকে ওয়াশরুমেও পাই না।
সোহাগ সারা বাড়িতে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে। কোথাও মিরাকে পাচ্ছে না। রাইশা সোহাগের পিছন পিছন ছুটছে। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
রাইশাঃ তোমার কি হয়েছে ভাইয়া? এরকম কেন করছো?
সোহাগ মির্জাঃ মিরা কোথায় তুমি? মিরা কি আমায় ছেড়ে চলে গেল?

বাড়িতে যা ঘটেছে, তাহলে কি নেহা আমার মিরাকে…..
কিছু ভাবতেই, সোহাগ পাগলের মতো হয়ে যায়।
রাইশাঃ শান্ত হও ভাইয়া! আমাকে বল কি হয়েছে?
সোহাগ মির্জাঃ ছুটকি, আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি..

সোহাগ মিরার সাথে করা সব অন্যায়ের কথা বোনকে খুলে বলে।
নেহা আমাকে ভুল বুঝিয়েছিল ছুটকি। এখন আমি কি করব? কোথায় পাব আমার মিরাকে?
সোহাগ নিজের হাত দুটো দেয়ালের সাথে বার বার আঘাত করতে থাকে।
জালেমের মতো এই হাত দিয়ে অত্যাচার করেছি তোমার উপর মিরা। আমি সত্যিই খুব খারাপ।
রাইশাঃ এ কি করছো তুমি ভাইয়া? রক্ত ঝড়ছে তোমার হাত থেকে।

সোহাগ মির্জাঃ ঝড়ুক রক্ত! আমি আমার মিরার শরীর থেকে এর থোকেও বেশি রক্ত ঝড়িয়েছি।
রাইশাঃ প্লিজ শান্ত হও। আমাদের এখন পুলিশ স্টেশন যাওয়া উচিত। তাহলেই ভাবির খোঁজ পাবো।

পুলিশ স্টেশনে,
অফিসার জসীমঃ একি মি. সোহাগ মির্জা! আপনি এখানে? কোন অসুবিধা? আমাকে একটা ফোন করলেই পারতেন। আপনি কেন কস্ট করে আসতে গেলেন।
রাইশাঃ স্যার, একটা বিপদে পরে এসেছি আমরা।
অফিসার জসীমঃ কি বিপদ?

রাইশা আর সোহাগ অফিসার জসীমকে সব খুলে বলে।
অফিসার জসীমঃ আচ্ছা, মি.মির্জা আপনার পি.এ হাসানের ফোন নাম্বার আর গাড়ীর নম্বরটা আমাদেরকে দিয়ে যান। আমরা দেখছি কিছু করতে পারি কিনা। হাসানের সাথে যদি নেহার কোনও যোগাযোগ থেকে থাকে তাহলে নেহাকে ধরা আমাদের পক্ষে সহজ হয়ে দাড়াবে।

ওদিকে….

মিরাঃ নাআআআআ… এই বিয়ে আমি করতে পারবো না। আমার এতো বড় সর্বনাশ করবেন না হাসান ভাই। যেতে দিন আমায়! আমি আপনার ছোট বোনের মতোন। মিরা নিজের হাতটা হাসানের থেকে ছাড়ানোর অহেতুক চেস্টা চালাচ্ছে!
হাসানঃ প্লিজ মিরা! প্লিজ! তুমি আমায় ভাই বলো না! আমার খুব কস্ট লাগে কস্ট! কাজী সাহেব তারাতাড়ি বিয়েটা পড়ান না।
কাজীঃ বল মা কবুল?
মিরাঃ প্লিজ, আপনারা বোঝার চেস্টা করুন আমি বিবাহিতা। এই লোকটা আমাকে তুলে নিয়ে এসেছে। মিরা চিৎকার জুড়ে দেয়। কেউ আছেন? বাঁচান আমায় এই রাক্ষসটার কাছ থেকে।

হাসানঃ আহহা জান এতো চিৎকার চ্যাচামেচি কেন করছো? এখানে কেউ আসবে না। আর তোমার শরীরটা খারাপ না? এতো উত্তেজিত হইও না। শুধু একটাবার বিয়েটা হতে দাও দেখও সব ঠিক হয়ে যাবে।
মিরাঃ আপনাকে খুব ভালো ভেবেছিলাম ভাইয়া। আমি কখনও ভাবতে পারি নি সেই আপনিই এভাবে আমায় নিজের নোংরা রূপটা দেখাবেন।
হাসানঃ তুমি আমাকে যায় বলো, তোমাকে আমি ভালোবাসি মিরা। খুব সুখে রাখবো। ওই সোহাগ মির্জা তোমায় কখনও সুখে রাখতে পারবে না। ও তো কখনও তোমায় ভালোবাসে নি। আমি তোমায় ভালোবাসাতে ভরীয়ে দেব। একটা বার বিয়েটা হতে দাও।

বিয়ের পর তোমায় আমি কখনও ওর মতো অত্যাচার করবো না শুধু আদর দেবো দেখও।
মিরাঃ আমি যানি উনি আমার উপর অনেক অত্যাচার করেছে। অত্যাচারী বীরপুরুষের মতো নিজের পুরুষত্ব খাটিয়েছে। হয়তো উনি আমাকে কখনও ভালোই বাসে নি। তবু্ও উনি তো আমার স্বামী! ভালোবাসি উনাকে আমি। আমি কিছুতেই এই জীবনে আর উনার জায়গায় কাউকে বসাতে পারবো না। আর তোর মতোন সয়তানকে তো নয়ই।
হাসানঃ এই., মিরা! জান আমার। দেখ তুই তুকারি করো না। একটু পরেই তোমার স্বামী হব। এখন এমন ব্যবহার করলে চলে?
মিরাঃস্বামী আর তুই? তুই ভাবলি কিভাবে যে তোকে আমি বিয়ে করবো?

হাসানঃ বিয়ে তো আমাকে তোমায় করতেই হবে। আর সেটা আজই।
মিরা কিছু বুঝে উঠতে পারে না! কি করবে? তারপর অনেক ভেবে বলে, আমি ওয়াশরুমে যাবো।
হাসানঃ আগে বিয়েটা হোক তারপর যেও।
মিরাঃ নাহ এক্ষুনি যাবো।
হাসানঃ ঠিক আছে চলো।

মিরা ওয়াশরুমের ভেতরে গেলে হাসান বাইরে দরজার কাছে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। অনেক্ষন হয়ে যায় মিরা বাইরে আসে না। হাসান ওয়াশরুমের জরজাটা ভাঙে। কিন্তু এখানে মিরা নেই। জানালার কাচগুলোও খোলা।
হাসানঃ নাহহ মিরা এভাবে তুমি পালাতে পারও না। অনেক সাধনা করে তোমাকে আমি পেয়েছি।
এমন সময়ে, পুলিশ এসে হাসানকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশের কেলানি খেয়ে হাসান যা করেছে সব শিকার করে আর হাসানের মাধ্যেমে নেহাকেও পুলিশের কাছে ধরা পরতে হয়।
[আপনারা ভাবছেন মিরা ওয়াশরুমের থেকে পালিয়ে সোহাগের কাছে গিয়েছে? নাহহ, মিরা আর সোহাগের কাছে যায় নি। তবে মিরার শরীর এতোটা দূর্বল ছিল যে মিরা নিজের সর্বচ্চো প্রচেষ্ঠা দিয়ে হাসানের কবল থেকে বেড়িয়ে এসে রাস্তায় ঢলে পড়ে।

হুমাইরা বেগম আর তার স্বামী শাহীন খান মেয়ের শ্বশুড়বাড়ির থেকে ফিরছিল। তাদের গাড়ির সামনে এসেই মিরা ঢলে পরে।
হুমাইরা বেগমঃকি করলে এটা?
শাহীন খানঃ আমি কি ইচ্ছা করে করেছি?
হুমাইরা বেগমঃ এতো কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে চলো মেয়েটির কাছে।
শাহীন খানঃ হ্যাঁ, চলো।

দুজনে মিরার কাছে যায়। মিরাকে টেনে মুখ দেখেই দুজনে হতভম্ব হয়ে পড়ে।
হুমাইরা বেগমঃ ওগো, এতো মিরা। মিরা মা কি হয়েছে তোমার? আমাকে শুনতে পারছো? এতো রাতে এখানে কিভাবে এলে?
শাহীন খানঃ হুমাইরা, দেখছো তো মেয়েটার অবস্থা ভালো না। আগে বাড়িতে নিয়ে চলো পরে মেয়েটা চোখ খুললে সব জিজ্ঞাসা করো।
হুমাইরা বেগমঃ হুমম।
দুজনে মিরাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়।


পর্ব ৮

চোখ খুলেই মিরা চোখের সামনে সোহাগকে দেখতে পাই। সোহাগকে দেখে মিরা নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। দেখে এপাশে হুমাইরা বেগম, শাহীন খান আর সেই মেয়েটা দাড়িয়ে আছে যার জন্য সোহাগ মিরার উপর গতকাল এতোটা অত্যাচার চালিয়েছে। মুহূর্তেই মিরার কানে সোহাগের বলা প্রত্যেকটা কথা বেজে ওঠে। মনে মনে ভাবে, এতোটা ভালোবাসেন এই মেয়েটাকে, যার জন্য আমার গায়ে ওভাবে হাত তুললেন?
সোহাগ মিরার ডান হাতটা ধরে নিজের বুকের বাম পাশটায় রাখে,
সোহাগ মির্জাঃ কস্ট দিয়েছি তোমাকে আমি! আর নিজেও কস্ট পেয়েছি। যানো তোমাকে না পেয়ে কতোটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম?

মিরা নিজের হাতটা সোহাগের থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
সোহাগ আবার মিরার হাতটা শক্ত করে ধরে, নিজের হাতের মুঠোয় আনে। তারপর মাথাটা হাতের সাথে ঠেকায়।
সোহাগ মির্জাঃ প্লিজ এমনটা করো না মিরা! আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি সত্যিই খুব অনুতপ্ত।
এবার মিরা নিজের মুখ খোলে। কান্না জড়িত কন্ঠে বলে,
মিরাঃ আমার কাছে কেন ক্ষমা চাচ্ছেন? আমি আপনার কে? আমার জন্য তো আপনার কস্ট হবার কথা না! আমি চলে যাব আপনার জীবন থেকে আর কখনও আসবো না। এই মেয়েটাকে নিয়ে আপনি সুখে থাকেন। আর যদি পারেন ওকে বিয়ে করে নিয়েন। তাহলে যদি আপনার পরনারীর সাথে রাত্রী যাপনটা কমে। আপনার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দিন কাটান। তাতে আমার কি?

রাইশাঃ ভাবি, এসব তুমি কি বলছো?
মিরাঃ ভাবি?
রাইশাঃ হ্যাঁ, ভাবি। তোমার বুঝতে কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। আসলে ভাইয়া তোমার সাথে যা করেছে এর সবকিছুই নেহার চক্রান্ত।
মিরাঃ…..?

রাইশা মিরাকে সব খুলে বলে। নেহা যা যা করেছে এতোদিন ধরে সব বুঝিয়ে বলে মিরাকে। মিরা সব শুনে সোহাগকে ক্ষমা করে দেয়, কিন্তু তা প্রকাশ করে না। রাইশাকে বলে,
মিরাঃ সব বুঝলাম ননদিনী কিন্তু আমি এটা বুঝতে পারছি না। এখানে আসলাম কিভাবে?
হুমাইরা বেগমঃ আমরা নিয়ে এসেছি।
মিরাঃ তোমরা নিয়ে এসেছো?

হুমাইরা বেগমঃ হুমম। তুমি আমাদের গাড়ির সামনে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে। আমরা কি ওভাবে তোমাকে রেখে আসতে পারতাম? প্রতিবেশী হওয়ার তো একটা কর্তব্য থাকে। সোহাগকে ফোন দিলাম! শুনলাম একটা জরুরি দরকারে বাইরে আছে। এতো রাতে তোমাকে একাও সোহাগের বাড়িতে রেখে আসতে পারতাম না। তাই আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসলাম।
মিরা সোহাগের দিকে তাকায়। দেখে সোহাগ এখনও অস্থির হয়ে আছে। মিরা একটু হালকা কাশী দেয়,
মিরাঃ উহু উহু। শুনছেন?
সোহাগ নিরুপায়ের মতো মিরার দিকে তাকায়।
মিরাঃ চলুন বাড়িতে যাবো!

মিরার মুখে কথাটা শুনে সোহাগের ফ্যাকাসে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাথা কাত করে সম্মতি যানায়।
মিরা উঠতে যায় কিন্তু পারে না। সারা শরীরের ব্যাথায় কুঁকড়ে থাকে। সোহাগ বুঝতে পারে মিরার খুব কস্ট হচ্ছে। তাই মিরাকে কোলে তুলে নেয়। আর মিরা তাকিয়ে দেখে সবাই মুচকি হাসছে। লজ্জায় মিরা সোহাগের বুকে মুখ লুকায়।

মির্জা প্যালেস,
রাত অনেক গভীর। রাইশা তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। আর সোহাগ মিরাকে নিয়ে রুমে গিয়ে শুইয়ে দিয়েছে।
মিরাঃ আজ আমায় সোফায় শুয়াবেন না?
সোহাগ মির্জাঃ মিরা…….?

মিরাঃ আমি কি কিছু ভুল বলেছি? সেই বিয়ের প্রথম দিনটা আপনার মনে আছে? কতটা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে আপনার ঘরে এসেছিলাম আমি। আর আপনি কি করেছিলেন? আমাকে স্টোর রুমে নিয়ে বন্ধ করে রেখেছিলেন।
সোহাগের শার্টের কলার টেনে ধরে, এই আপনি যানেন না আমি অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পাই? তাহলে কেন অমনটা করেছিলেন আমার সাথে বলুন?
সোহাগ দুই হাত দিয়ে মিরার গালটা আকড়ে ধরে, আমি ভুল করেছি স্বীকার করছি মিরা। প্লিজ আমায় তুমি ক্ষমা করে দাও। আর কখনও তোমার সাথে এমনটা করবো না। বিশ্বাস কর আমাকে! আমি সত্যিই খুব অনুতপ্ত।

মিরাঃ বিশ্বাস আর আপনাকে? আপনার মতোন একটা খারাপ, পাষাণ আর নির্দয় মানুষকে কখনও ক্ষমা করা যায় না।
সোহাগ মির্জাঃ প্লিজ মিরা আমায় একটা সুযোগ দাও।
মিরাঃ সুযোগ?
মিরা একটু ভেবে দেখার রিএ্যাক্ট করে,
ঠিক আছে একটা সুযোগ আপনাকে আমি দিতে পারি কিন্তু তার জন্য আপনাকে পরীক্ষা দিতে হবে। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই আমার ক্ষমা পাবেন।
সোহাগ মির্জাঃ কেমন পরীক্ষা?

মিরাঃ সকালে ঘুম থেকে উঠেই রাইশা আর আমার জন্য চা করে দিবেন। তারপর সকালের নাস্তা বানিয়ে আমাদের সাথে ব্রেকফাস্ট করে অফিসে যাবেন। দুপুরে জাস্ট বারোটা বাজলেই বাড়িতে চলে আসতে হবে। নিজের হাতে রান্না করে আমাদের সাথে লান্স করবেন। তারপর এঁটো থালাবাসন পরিষ্কার করে দু’ঘন্টা আমার শরীরের যেখানে যেখানে এতোদিন আঘাত করেছেন, ম্যাসার্চ করবেন। সন্ধ্যায় আবার অফিস যাবেন। রাতে বেশী রাত করে ফিরতে পারবেন না।

আর সাথে করেও কোনো মেয়েকে আনতে পারবেন না। আসার সময়ে আমার জন্য আখঁ কিনে আনবেন। যদি সারাদিনের কাজে যেমনটা বলেছি তার মধ্যে কোন গাফিলতি খুঁজে পাই তাহলে সেই আখঁ দিয়ে আপনাকে সায়েস্তা করব। আর যদি দেখি সবকিছু ঠিক ঠাক করেছেন তাহলে একসাথে বসে রাতে আখঁ খেতে খেতে জোসনা বিলাস করব।
মিরা কথাগুলো বলে একটা জোড়ে নিশ্বাস নেই। সোহাগের দিকে তাকালে দেখে সোহাগ হা করে আছে।
কি পারবেন তো এসব করতে?

সোহাগ মির্জাঃ এটা পরীক্ষা নাকি টর্চার?
মিরাঃ ওহহ তার মানে আপনি দিবেন না পরীক্ষাটা? ঠিক আছে ক্ষমাও পাবেন না।
সোহাগ মির্জাঃ না আমি সেটা বলতে চাই নি?
মিরাঃ তো কি বলতে চেয়েছেন?

সোহাগ মির্জাঃ একটা ঢোক গিলে, আচ্ছা মিরা এসব কতোদিন করতে হবে?
মিরাঃ যতোদিন না আমি বুঝবো আপনি একজন আদর্শ স্বামী হয়ে উঠতে পেরেছেন ততোদিন।
সোহাগ মির্জাঃ আদর্শ স্বামী হতে গেলে এসব করতে হয় বুঝি?
মিরাঃ এই আপনি রাজি কিনা তাই বলুন তো আগে?
সোহাগ মির্জাঃ ঠিক আছে। চেস্টা করব।

মিরাঃ ওকে এখন ঘুমান!
সোহাগ বিছানায় যেই শুতে যাবে,
মিরাঃ এই করছেন কি?
সোহাগ মির্জাঃ কেন ঘুমাচ্ছি!
মিরাঃ এখানে কেন ঘুমাচ্ছেন।

বিছানার থেকে বালিশটা নিয়ে সোহাগের মুখের উপর ছুড়ে মেরে বলে, যান গিয়ে সোফায় ঘুমান।


পর্ব ৯

সোহাগ বালিশটা নিয়ে, সোফাতে গিয়ে শুয়ে পড়ে। মিরার দিকে মুখ করে মিরার মুখপানে চেয়ে থেকে ভাবে, কতোটা নিষ্পাপ আমার এই মিরা? আর আমি কিনা এর সাথেই!
নাহহ আর ভাবতে পারছি না।
ভাবলেই যেন বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে।
রাত তিনটার কাছাকাছি সময়,

সোহাগের চোখে এখনও ঘুম নেই। যদি একটু মিরাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারত হয়তো শান্তিতে ঘুমটা হতো।
সোহাগ একটু টুকটাক শব্দ করে বোঝার চেস্টা করে মিরা সজাগ কিনা? যখন বুঝতে পারলো মিরা ঘুমিয়েছে, সোহাগ আস্তে করে গুটিগুটি পায়ে সোফা ছেড়ে উঠে মিরার পাশে এসে শুয়ে পরে। কিছুক্ষণ কোনোও সারা শব্দ করে না। মিরার পাশে চুপটি করে শুয়ে, মিরার ঘুমন্ত মুখটার পানে চেয়ে থাকে। তারপর মিরাকে টেনে এক ঝাটকায় নিজের বাহুডোরে মিশিয়ে নেয়। মিরার কাটা পিটটায় আলতো করে হাত বুলাতে থাকে। আর পরক্ষণে মিরার ঘারে নাক ডুবিয়ে ঘুমিয়ে যায়।

সকালে সোহাগের বরাবরের জন্যই একটু তারাতাড়ি ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস। সেই ছেলেবেলায় বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সোহাগ একা হাতে বাড়ি এবং বিজনেস সবটা সামলিয়েছে। আর আজও তার ব্যতীক্রম কিছু হয় নি। মিরা হয়তো যানে না সোহাগ কি কি করতে পারে!
মিরার দেওয়া শাস্তি সোহাগ খুব খুশি মনে উপভোগ করছে। ঘুম থেকে উঠেই সকালের নাস্তা তৈরী করা শেষ। এবার চা বানিয়ে প্রথমে রাইশাকে ডেকে দিয়ে এসে এখন মিরাকে ডাকছে। কিন্তু মিরা যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন! সোহাগ মিরাকে ডাকতে ডাকতে মিরার কানের কাছে চলে আসে। তারপর নিজের নাকটা দিয়ে মিরার কান ঘেষে
ফিসফিসিয়ে বলে,

সোহাগ মির্জাঃ মিরা? এই মিরা? এই ওঠো! দেখ চা এনেছি!
মিরা ঘুমের ঘোড়ে এমন শিরশিরানি অনুভব আর আবেগ মাখানো কণ্ঠস্বর শুনে এক লাফে উঠে পরে।
আপনি?
সোহাগ মির্জাঃ একটু মুচকি হেসে, তোমার জন্য চা বানিয়ে এনেছি!

কথাটা শুনে মিরা একটু অবাক হয়ে যায়। এতো সকালে চা বানিয়ে এনেছেন? তাকিয়ে দেখে সোহাগের মুখে অনেক হাসি!
মিরা সোহাগের দিকে তাকাতে তাকাতে চায়ের কাপে এক চুমুক দেয়। একি? সবকিছু তো ঠিকঠাক আছে।
মিরাঃ এই সত্যি কি চা’টা আপনি নিজে বানিয়েছেন?
সোহাগ মির্জাঃ কেন বিশ্বাস হয় না তোমার?

মিরাঃ যানি না! হতেও পারে আপনি রাইশাকে দিয়ে…
সোহাগ মির্জাঃ আমার বোনকে দিয়ে আমি কখনও কাজ করাই না!
মিরা ঠোঁটটা একটু বাকিয়ে মাথা ঝাকিয়ে বলে, দারোয়ান আংকেলকে দিয়ে পাড়ার মোড় থেকে আনিয়েছেন নিশ্চয়!
সোহাগ মির্জাঃ এই তুমি আমাকে কি ভাবো বলো তো? বিশ্বাস যদি না হয় তাহলে চলো! তোমার সামনে দাড়িয়ে আমি আবার বানিয়ে দেখাবো!
মিরাঃ থাক! দরকার নেই! যান গিয়ে সকালের নাস্তা রেডি করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখুন। আমি ফ্রেস হয়ে আসছি।

সোহাগ মির্জাঃ ব্রেকফাস্ট আমি আগেই গুছিয়ে রেখে এসেছি।
মিরা কোন কথা বলে না। সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর মনে মনে ভাবে সত্যিই কি এই লোকটা নিজের হাতে সব করছে?
কিছুক্ষণ পর মিরা বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে, সোহাগ এসে মিরাকে আস্তে করে কোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়।
মিরাঃ কি করছেন কি ছাড়ুন! আমি পারবো যেতে।

সোহাগ মির্জাঃ চুপপপ! আমি আছি কি করতে? ব্রাশে প্রেস্ট লাগিয়ে,
সোহাগ মির্জাঃ ইইইইই দাঁত বের কর!
মিরাঃ আমি পারব আপনি যান।
সোহাগ মির্জাঃ তুমি যে পারবে সেটা আমিও যানি। তবুও আমাকে একটু আমার বউয়ের সেবা করতে দাও।
মিরাঃ উউউ ঢং!

সোহাগ মির্জাঃ এই ঢং কি হ্যাঁ! আমি কি আমার বউয়ের যত্ন নিতে পারি না?
মিরা কোনও কথা বলে না। সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ সোহাগকে যে বড্ড ভালোবাসে মিরা। চুপচাপ সোহাগ যা বলে শুধু তাই শোনে। যতোই চায় সোহাগকে শাস্তি দেবে। সোহাগের করা সব অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবে, ততোই সোহাগ কাছে আসলে মিরা দূর্বল হয়ে পরে।

বেলা ৮টা,
খাবার টেবিলে বসে আছে রাইশা আর মিরা। সোহাগ সার্ভ করে দিচ্ছে। সোহাগের রান্না এতো সুস্বাদু যে মিরা চেটেপুটে খাচ্ছে। ঝাঁলঝাঁল আমের চাটনির সাথে খিঁচুরি আর ডিম শিদ্ধ। আহ কি তৃপ্তি এই খাবারে! মিরা মনে মনে ভাবছে, সোহাগকে দিয়েই সারা জীবন এমন রান্না করিয়ে খাবে।
খেতে খেতে মিরা বলে, মা ফোন করেছিল রাইসূল সামনের সপ্তাহে আসছে! কথাটা শুনে রাইশার বিষুম লেগে যায়। সোহাগ রাইশার মাথায় হাত বুলিয়ে এক গ্লাস পানি রাইশার সামনে ধরে।
রাইশার চোখ ছলছল হয়ে ওঠে। যেন চোখের পানি বাঁধ মানছে না।

সোহাগ মির্জাঃ তুই কাঁদছিস কেন ছুটকি? দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে!
রাইশাঃ কিভাবে ঠিক হবে? তুমি বল ভাইয়া! কোন মুখে দাড়াবো আমি ওর সামনে? নেহা যে বলেছে, আমাদের সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। ওকে আমি কি জবাব দিব? আমি তো যানি না আমার সন্তান বেঁচে আছে নাকি মরে…
মিরা রাইশার মুখটা চেপে ধরে, ওসব কথা কখনও মুখে আনবে না তুমি! ওই সৃস্টিকর্তার উপর একটু ভরসা রাখও! তাছাড়াও তোমাকে নিয়ে আমি অনেক মিথ্যা বলেছি আমার ভাইটাকে।

সোহাগ মির্জাঃ মিথ্যা? কি মিথ্যা বলেছো তুমি মিরা?
রাইশাঃ মিথ্যা বলেছো মানে?

মিরাঃ হ্যাঁ, রাইসূল যানে তুমি তোমার ভাইয়ের বাড়িতে আছো। সেদিন আমি তোমার জন্য বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলাম। সেখানে নেহাকে দেখি! আমি ওর পিছু নিই আর ও কারও সাথে ফোনে কথা বললে, যানতে পারি তোমার সাথে কি করেছে! অনেক চেস্টা করেও আমি তোমার কোনও খোঁজ পাই নি। রাইসূল আমাকে ফোন করলে ওকে বুঝিয়ে ছিলাম তুমি তোমার ভাইয়ের বাড়িতে আছো। যেদিন তুই নিজের পায়ে দাড়াতে পারবি সেদিনই ওর ভাই তোদেরকে মেনে নেবে। তুই প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেই তোর বউকে নিয়ে যাবি। আমি নিজে রাইশাকে তার ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে এসেছি। আর এই সিদ্ধান্তটা রাইশার ভাইয়ের।

সোহাগ মির্জাঃ তুমি মিথ্যা কেন বলতে গেলে?
মিরাঃ এটা না বললে যে আমার ভাইটা খুব ভেঙে পরতো।
রাইশাঃ কিন্তু আমার শাশুড়ি মা? উনি তো কখনও আমাকে মেনে নিবে না।

মিরাঃ কে বলেছে মেনে নিবে না? আমি মাকে সব খুলে বলেছিলাম। আসলে আমার বাবার একসময় বিজনেসে লস হয়। নেহার বাবা আমার বাবার বন্ধু ছিল। নেহার বাবা অতন্ত্য ভালো একজন মানুষ। তিনিই আমাদের সেই দূর দিনে পাশে দাড়িয়ে ছিলেন। আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। যার জন্য বাবা নেহার বাবার দেয়া রাইসূলের সাথে নেহার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। বাবা মাকে তার বন্ধুকে দেওয়া ওয়াদার কথা বলেছিল। আর তাই মা চেয়েছে বাবার সেই ওয়াদা পূরণ করতে। তবে এখন নেহার আসল রূপটা নেহার বাবা-মায়ের কাছেও পরিষ্কার। আমি জানতাম মা যদি নেহার সামনে মুখ খোলে তাহলে নেহা মায়ের ক্ষতি করবে। এইজন্য মাকে বলি, রাইসূল না আসা অবদি নেহার সাথে অভিনয় করতে।

সোহাগ মির্জাঃ তুমি কি যানতে রাইশা আমার বোন?
মিরাঃ যানতাম কিন্তু আপনাকে বলার কোনও সুযোগ পাই নি। কাল আমি রাইশাকে দেখে চিনতে পারি নি কারণ বাড়িতে রাইশার একটাও ছবি ছিল না। আর আপনি তো রাইশাকে মেনে নেন নি। যদি যানতে পারেন আমি রাইসূলের বোন হয়তো আমাকে মেরে ফেলতেন তাই রাইশার ব্যাপারে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহশ হয় নি।
হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ। সোহাগ গিয়ে দরজাটা খুলতেই একটা মেয়ে সোহাগের বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আর ন্যাকা ন্যাকা কন্ঠে বলে,
ওগো, তোমার কি আমার কথা একটুও মনে পড়ে না? এতো বদলে গেছো তুমি!


পর্ব ১০

সোহাগ এক ধাক্কায় মেয়েটিকে নিচে ফেলে দেয়। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখে, মাথার বিনি করা চুলগুলো দুইপাশে কুকুরের লেজের মতো বেকেঁ আছে, পড়নে গ্রাম্য মেয়েদের মতো পরিপাটি ধাজের শাড়ি। মুখের মধ্যেখানে ইইআআআ বড় একটা তিল। গায়ের রং কয়লার মতো কালো। আর চোখদুটো ট্যারা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে সোহাগের দিকে। মেয়েটি তার হাতের টুপলিটা রেখে উঠে সোহাগের মুখোমুখি এসে দাড়ায়। কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে চোখ ডলতে ডলতে বলে, ওগো আমারে তুমি ফেইলা দিলা?
সোহাগ মির্জাঃ এই মেয়ে এই! তুমি কি পাগলা গারদ থেকে এসেছো?

মেয়েটিঃ নাহ না গেরাম থেইকা আইছি!
সোহাগ মির্জাঃ সে তুমি যেখান থেকেই আসো! হুট করে এসে আমার গায়ে পরলে কেন?
মেয়েটিঃ অনেকদিন পর দেখছি তো তাই! বলেই আলহ্লাদে গদগদ হয়।
সোহাগের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
সোহাগ মির্জাঃ তুমি চেনো আমাকে?

মেয়েটি একটি হাসি দিয়ে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে, কিতা কউ? তোমারে আমি চিনবো না?
সোহাগ মির্জাঃ তাই নাকি? কই আমি তো তোমাকে আগে কখনও দেখি নি!
মেয়েটি কান্না জুড়ে দিয়ে, হায় আল্লাহ! এই কস্ট আমি কারে দেহায়! আমার সোয়ামী আমারে কয় চেনে না। চোখের পানি শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে বলে, ওগো তুমি আমারে ভুইলা গেলা?

সোহাগ মেয়েটিকে এক ধমক দেয়। ধমকের সাথে মেয়েটি একটু কেঁপে ওঠে।
সহাগ মির্জাঃ ন্যাকামো হচ্ছে? ঠাসসস করে একটা থাপ্পড় দেব। ভালো ভাবে বল তুই কে?
মেয়েটাঃ ওগো ধমক দাও কেন? আমার ভয় লাগে!
সোহাগ দাঁত কটমট করে, ভয় পাচ্ছিস…? আগে বল কে তুই?

মেয়েটিঃ আমারে চিনতে পারতাছো না? আমি তোমার জড়িনা গো! জড়িনা!
সোহাগ মির্জাঃ জড়িনা? কোন জড়িনা? কিসের জড়িনা?
মাথাটা সোহাগের খারাপ হবার উপক্রম।
জড়িনাঃ তোমার বিয়া করা বউ জড়িনা।
এই মেয়ে বলে কি?
আমি তার স্বামী?

সে আমার বিয়ে করা বউ জড়িনা!
নিশ্চয় কোনও পাগলা গারদ থেকে চলে এসেছে! যত্তসব, আবল তাবল বকছে!
এখন তো মিরা চলে আসলেও সমস্যা। মিরা দেখার আগেই যে করে হোক মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করতে হবে।
সোহাগ মির্জাঃ এই মেয়ে বের হ বলছি। রাস্তায় গিয়ে তোর পাগলামি দেখা। দেখবি অনেক স্বামী পাবি। তাদের সাথে সংসার করিস। আমারে রেহায় দে। অনেক কস্টে আমার সংসারটা জোড়া লাগিয়েছি! তুই আর আগুন লাগাস না!

কথাগুলো বলে মেয়েটির হাত ধরে দরজার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় মিরার আগমন।
যার ভয় ছিল তাই হয়েছে।
মিরাঃ কে এসেছে গো?
সোহাগ মেয়েটিকে নিয়ে দাড়িয়ে পরে। সোহাগ মিরার দিকে ঘুরে দাড়াতেই মেয়েটি সোহাগের ধরে রাখা হাতটায় চুমু খেতে থাকে। মিরা দেখে চোখদুটো বড় বড় করে ফেলে। আর সোহাগ তো মিরার ভয়ে কিছু করতেও পারছে না।

মিরাঃ ছি: আপনি কি কখনো শুধরাবেন না? সারা জীবন এমনই থাকবেন?
সোহাগ মির্জাঃ মিরা আমার কথা শোনো?
মিরাঃ কি শুনবো আপনার কথা? একটা দুশ্চরিত্র, নোংরা! খারাপ! পুরুষ মানুষ আপনি! আমার লাইফটায় শেষ করে দিলেন।
সোহাগ মেয়েটির থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে মিরার কাছে যায়। মেয়েটিও সোহাগের পিছন পিছন ছোটে।
সোহাগ মির্জাঃ প্লিজ মিরা আমার কথাটা তো শোনো!

মিরাঃ আমি কালই আমার মায়ের কাছে চলে যাব। আর থাকবো না আপনার মতো প্রতারকের কাছে।
সোহাগ মির্জাঃ আমাকে একবার সুযোগ দাও আমার কথাটা বলার!
মিরাঃ লজ্জা করে না আপনার? আবার সুযোগ চাচ্ছেন?
সোহাগ মির্জাঃ মিরা! তুমি ভুল বুঝছো আামাকে!

মিরাঃ আমি ভুল বুঝছি আপনাকে? এতোগুলো দিন ধরে চোখের সামনে যেসব করেছেন তার সবই কি ভুল?
সোহাগ মির্জাঃ দেখও, তুমি যেটা দেখেছো সেটা সত্যি না। আসলে…
মিরাঃ থাক! আর কিচ্ছু বলবেন না আপনি!
ভেবেছিলাম আপনার সাথে নতুন ভাবে জীবনটা শুরু করবো। কিন্তু আপনি? ছি:

সোহাগের শার্টের কলারটা টেনে ধরে, চলে যাব আমি। থাকুন আপনি একা আপনার এসব বাজে অভ্যাস নিয়ে।
মেয়েটি মিরাকে টেনে সোহাগের থেকে দূরে সরিয়ে ঠাসসসস করে একটা চর বসিয়ে দেয়।
তারপর মিরার চুলের মুঠি ধরে, আমার সোয়ামীর শার্টের কলার ধরনের অধিকার তোরে কেডা দিছে?
মিরা মেয়েটির থেকে নিজের চুল ছাড়ানোর চেস্টা করছে। কিন্তু পারছে না! সোহাগ এসে একবার বলে, এই মেয়ে ছাড়ো আমার স্ত্রীকে। মেয়েটি তখনই মিরার চুল ছেড়ে পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে, আপা আমারে আপনি ক্ষমা কইরে দিয়েন। আমি যানতাম না, আপনি আমার সতিন।

মিরাঃ এই মেয়ে আমার পা ছাড়ো!
তখন মেয়েটি মিরার পা ছেড়ে দেয়। ঘুরে দরজার কাছে গিয়ে তার টুপলিটা নিয়ে আবার ফিরে আসে। সোহাগ আর মিরার মাঝখান থেকে থরবর করে হেটে সিঁড়ি বেয়ে সোহাগের রুমে চলে যায়।
সোহাগ মেয়েটিকে বের করে দেবে, তাই মেয়েটির পিছনে ছুটছে, মিরা সোহাগের হাত ধরে টেনে থামিয়ে দেয়।
সোহাগ মির্জাঃ ছাড়ো মিরা যেতে দাও!
মিরাঃ হয় আপনাকে আমি ছেড়ে দিয় আর আপনি আমার সতিনের কাছে যান?
সোহাগ মির্জাঃ কিসের সতিন? ওই মেয়েটিকে আমি চিনি না বিশ্বাস কর!

মিরাঃ চেনেন নাহ? তাহলে ও আপনার রুম চিনলো কিভাবে?
সোহাগ মির্জাঃ সেটা আমি বলতে পারব না।
মিরা কেঁদে দেয়, আমি সতিনের ঘড় করতে পারবো না। আপনি থাকেন আপনার ওই বউ নিয়ে আমি কালই আমার মায়ের কাছে চলে যাব।

ওদিকে,

মেয়েটি সোহাগের রুমে গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। কোমড়ে গুজে রাখা সেলফোনটা বের করে কাউকে ফোন করে,
তাকে বলে, হ্যাঁ আপু সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। তুমি চিন্তা করও না তো, ওই সোহাগ মির্জা আমায় চিন্তে পারে নি। তবে দেখও আমরা ঠিকই ওর কর্মের ফল ওকে ফিরিয়ে দিতে পারব। আচ্ছা রাখি, পরে কথা বলবো।
মেয়েটি ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পরে। তোমাকে তোমার কর্মের ফল ভোগ করতেই হবে সোহাগ মির্জা। আর সেটাই হবে তোমার প্রতি আমাদের তিন বোনের নেওয়া প্রতিশোধ। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেব তোমার জীবনটা। তখন তুমি বুঝবে কস্ট কাকে বলে।

koster premer golpo bangla


পর্ব ১১

মিরাঃ আপনার মতো পুরুষের সাথে সংসার করা যায়? আমার জীবনটায় শেষ করে দিলেন। ইচ্ছা তো করছে আপনাকে.. দাঁতেদাঁত চেপে মিরা এদিকে, ওদিকে তাকাতে থাকে..
সোহাগ এক ঝাটকায় টেনে মিরাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
সোহাগ মির্জাঃ বেশি পকপক করছো কিন্তু তুমি।
মিরাঃ আমি পকপক করছি? ছাড়ুন আমাকে! আপনার সাথে আমি আর এক মুহূর্তও থাকবো না।
সোহাগ মির্জাঃ এভাবে থামবে না তুমি! তোমাকে আমি?
মিরাঃ কি করবেন মারবেন? মারুন। শুধু তো ওইটাই করতে পারেন।

সোহাগ মির্জাঃ না তোমাকে আর মারা যাবে না। অন্যরকম শাস্তি দিতে হবে।
মিরাঃ অন্যরকম শাস্তি?
সোহাগ মির্জাঃ হুমম। দিয়ে দেখায়?
মিরাঃ দেখুন আপনি যদি এখন উল্টা পাল্টা কিছু করেন তাহলে ভালো হবে না বলে দিলাম।

মিরা আর কিছু বলার আগেই সোহাগ মিরার মুখটা উঁচু করে মিরার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নেয়। মিরার মাথাটা এমন ভাবে চেপে ধরে রাখে, যে চাইলেও মিরা সোহাগের থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারে না। মিরা অনেক দাপাঁদাপিঁ ঝাপাঁঝাপিঁ করতে থাকে। সোহাগের তাতে কোনো হুশ নেয়। সে এবার মিরার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপালে, গালে, গলায়, মুখে কিস করতে ব্যস্ত।
মিরা হাতদুটো দিয়ে সোহাগের বুকে আর পিঠে ইচ্ছামত নখের আচর দেয়। সোহাগ আহ্ করে ওঠে। মিরাকে ছেড়ে দিয়ে মিরার মুখের দিকে তাকায়। মিরা সোহাগকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরাতে চাই। আর সোহাগ মিরার হাতদুটো শক্ত করে চেপে ধরে।

সোহাগ মির্জাঃ কি হচ্ছে তোমার? আমাকে ভালো লাগছে না?
মিরাঃ ছাড়ুন আমায়! আপনি আমাকে স্পর্শ করবেন না!
সোহাগ মির্জাঃ তাই নাকি? তোমাকে আমি..
সোহাগ আবার মিরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট জোড়া বসিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ এভাবে থাকার পর
সোহাগ মিরাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গিয়ে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিতে থাকে।

মিরা সোহাগকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। রাগী দৃষ্টিতে সোহাগের দিকে তাকায়।
মিরাঃ এটা কি করলেন আপনি?
সোহাগ একটু মুচকি হেসে মিরার গালটা আকড়ে ধরে।
সোহাগ মির্জাঃ কি করলাম দেখতে পাও নি? আমার বউটাকে আদর করেছি।
মিরাঃ কেন করলেন?

সোহাগ মির্জাঃ আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই!
মিরাঃ ইচ্ছা হয়েছে বলেই আমার কাছে আসবেন? আমায় জোড় করে আদর করবেন?
সোহাগের শার্টের কলারটা মিরা টেনে ধরে,
যখন আপনার ইচ্ছা হবে আমার প্রতি অত্যাচার করবেন। ইচ্ছা হলেই চোখের সামনে অন্য মেয়ে নিয়ে বেড রুমে চলে যাবেন। এই, আর কত অপমান করবেন আমাকে বলতে পারেন?

সোহাগ মির্জাঃ আমি তোমাকে অপমান করেছি?
মিরাঃ এটা অপমান ছাড়া আর কি? এখন তো আপনার কোথাকার কোন বউকে বাড়িতে এনে রেখেছেন। আপনার বেড রুমে তো এখন থেকে সেই থাকবে। আমার কোনও মান-সম্মাণ কি আছে আপনার কাছে? বিয়ের পর থেকে চোখের সামনে প্রতিনিয়ত আপনার পরকিয়া দেখতে হয়েছে। এরপরও আপনার সাথে কিভাবে থাকি বলুন তো?
সোহাগ রেগে যায়। মিরার গালটা জোড়ে চেপে ধরে।
সোহাগ মির্জাঃ সমস্যাটা কি তোমার? একটা কথা একবার বললে কি বোঝ না?
মিরার চোখে পানি চলে আসে।

মিরাঃ আজ যদি আপনি আমায় মেরে ফেলেন তবুও বলবো আপনি একজন দুশ্চরিত্র, খারাপ, নোংরা মানুষ!
সোহাগ মির্জাঃ মিরা আমাকে রাগীও না কিন্তু।
মিরাঃ আমি আপনাকে রাগাছি? আমি তো আপনাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। আর আপনি কি করলেন? আসলে আমারই ভুল। আমার বোঝা উচিৎ ছিল আপনি কখনও শুধরাবেন না।
সোহাগ মিরাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যায়। মিরার উল্টো দিকে মুখ করে দাড়িয়ে থাকে।
সোহাগ মির্জাঃ সরি!

মিরাঃ সরি! সরি বললেন আর সব ঠিক হয়ে গেল?
সোহাগ মির্জাঃ কেন এমন করছো তুমি?
মিরাঃ বুঝতে পারছেন না? আমার উপর যেভাবে নিজের অধিকার বোধটা খাটান, এতে আমার অসহ্য লাগে।
সোহাগ মির্জাঃ ঠিক আছে! এরপর থেকে তুমি না চাইলে আমি আর তোমার কাছে আসবো না।
মিরাঃ তা কেন আসবেন এখন তো নতুন শরীর পেয়ে গেছেন।
সোহাগ মির্জাঃ কি চাউ তুমি বল তো? আমি কি এই বাড়ি থেকে চলে যাব? এতো অশান্তি আমি আর নিতে পারছি না!
মিরাঃ অশান্তি কি আমি করি?

সোহাগ মির্জাঃ আমি কি সেটা বলেছি?
মিরাঃ আপনার বলা আর না বলায় কি যায় আসে সতিন তো ঢুকিয়ে ফেলেছেন আমার জীবনে।
সোহাগ ঘুরে মিরার সামনে আসে।
সোহাগ মির্জাঃ তোমাকে আমি কিভাবে বললে বুঝবে বল তো?
মিরাঃ আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। আমি আর আপনার সাথে থাকতে চাই না।
সোহাগ মির্জাঃ কি চাউ তুমি?

মিরাঃ ডিভোর্স!
সোহাগ মির্জাঃ এই মিরা মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে তোমার? কি বলছো ভেবে বলছো? বিশ্বাস কর! ঐ মেয়েটিকে আমি চিনি না।
এমন সময় জড়িনা ড্যাং, ড্যাং করে লাফিয়ে সিঁড়ি থেকে গান গাইতে গাইতে নামে।
ঝুঁঠ বোলে কাউয়া কাটে…
কালি কাউয়ে ছে ডারিও..
মে মাইকে চালি যাউংগি..

তুম দেখতে রাহিও
মে মাইকে চালি যাউংগি..
তুম দেখতে রাহিও
জড়িনা গান গাইতে গাইতে সোহাগ আর মিরার চারপাশে হাততালি বাজিয়ে বাজিয়ে ঘুরছে।
মিরাঃ এই মেয়ে, এইভাবে লাফাচ্ছো কেন?
জড়িনাঃ মনে সুখ জাগছে তো তাই। আচ্ছা, সতীন আফা! আপনে কি আজই চইলা যাইবেন? আমি কি আপনের ব্যাগ পত্র সব গুছাইয়া দিবু? ভালোই হইবে! আমারও ইচ্ছা করে না সতীনের ঘড় করতে।

মিরা সোহাগের দিকে তাকায়,
মিরাঃ শুনেছেন? এরপরও আপনার সাথে থাকা যায়?


পর্ব ১২

সব অশান্তির মূলে তুই। আই আমার সাথে, সোহাগ জড়িনার হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। জড়িনাকে বের করে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে একটা স্বস্থির নিশ্বাস ছাড়ে। তারপর মিরার সামনে এসে দাড়ায়।
সোহাগ মির্জাঃ এবার খুশি হয়েছো তো তুমি?
মিরাঃ।
সোহাগ মির্জাঃ কি হলো কথা বল?

মিরাঃ কি বলব?
সোহাগ মির্জাঃ মেয়েটিকে বের করে দিয়েছি। দেখতে পেয়েছো?
মিরাঃ আমাকে দেখানোর জন্য কি বের করেছেন?
সোহাগ মির্জাঃ নাহ
মিরাঃ তাহলে আমাকে কেন বলছেন?
সোহাগ চুপ করে থাকে। কারণ সে ভালো করেই যানে, এখন কিছু বললেই মিরা আবার ঝগড়া শুরু করে দেবে। মিরা একটু আড় চোখে সোহাগের দিকে তাকিয়ে পাশ কেটে চলে যায়।

সোহাগ বুঝতে পারে মিরা তার উপর ভীষণ রেগে আছে। তাই দুশ্চিন্তায় পরে থাকে। সোহাগ অফিসে না গিয়ে বসে বসে ভাবে কিভাবে মিরার রাগ ভাঙাবে! ওদিকে মিরাও মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। সোহাগ আর মিরার কাছে আসছে না দেখে।
দুপুরে সোহাগ রান্না করছে হঠাৎ দেখে মিরাকে কিচেনের বাইরে থেকে উঁকি ঝুঁকি দিতে। সোহাগ মিরাকে টেনে এনে পাশে দাড় করিয়ে রান্না করতে থাকে। রান্না করতে করতে সোহাগ মিরার সাথে অনেক কথা বলে কিন্তু মিরা সোহাগের সাথে একটাও কথা বলে না। সোহাগ রেগে মিরাকে কিছু বলতে গেলেই মিরা তখনও ঝগড়া শুরু করে দেয়।
রাইশা খাবার টেবিলে বসে তার শাশুড়ী মায়ের সাথে ফোনালাপ করছিল। ভাইয়া, ভাবীর ঝগড়া শুনে ফোনটা রেখে দৌড়ে এসে দেখে ভাইয়ার মাথার উপর ময়দার কৌটা। আস্তে করে ময়দার কৌটা’টা মাথা থেকে তুলতেই ভাইয়ার সারা শরীরে ময়দার গুড়া লেগে ভুতের মতো দেখতে লাগছে। আর ভাবী হাসছে।

সোহাগ মির্জাঃ এটা কি করলে?
মিরাঃ বেশ করেছি! আমার উপর চিল্লাচ্ছিলেন কেন?
সোহাগ মির্জাঃ আমি তোমার উপর চিল্লাচ্ছিলাম?
মিরাঃ হুমম। সব সময় নিজের অধিকার খাটাবেন সেটা হবে না।
সোহাগ মির্জাঃ তাই নাকি?

সোহাগ মিরাকে ময়দা মাখা অবস্থায় জড়িয়ে ধরে। দুজনের খুনসুটি মূলক রোমাঞ্চ দেখে রাইশার মনটা খারাপ হয়ে যায়। রাইশা রাইসূলের কথা ভাবতে ভাবতে সেখান থেকে চলে আসে। আর তো মাত্র কটাদিন! তারপর রাইসূলও এমন ভাবেই রাইশার কাছে থাকবে!
-ঠাসসসস
-আপু
-একটা কাজ দিয়েছিলাম সেটাও করতে পারলি না?

  • আমি আবার যাব আপু!
    -আবার যাবি? কি করতে যাবি?

-সরি আপু!

  • তুই না চলচ্চিত্রের একজন ভালো অভিনেত্রী? কেমন অভিনয় করলি যে একটা ঘন্টাও সোহাগ মির্জার বাড়িতে থাকতে পারলি না?
    -আমাকে আর একটাবার লাস্ট সুযোগ দাও আপু। আমি ঠিকমতই অভিনয়টা করছিলাম কিন্তু এমন ভাবে বের করে দেবে সেটা বুঝতে পারি নি।
    -বের করে দিলেই চলে আসতে হবে?
    -আমি অনেক বার কলিং বেল বাজিয়ে ছিলাম। কিন্তু কেউ দরজাটা খুলছিল না!
    -তাই চলে আসবি? তুই অপেক্ষা করতিস? যানিস না সোহাগ মির্জা আমাদের সাথে কি কি করেছে?
    -সব যানি আপু! তুমি আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও।

-তোকে যেটা বলেছিলাম করেছিস?
-হ্যা আপু, আমি সোহাগ মির্জার বাড়ির নানা জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে এসেছি।
-গুড। একটা কাজ অন্তত করেছিস। চল গিয়ে দেখি কি করছে!

মির্জা প্যালেস।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ। এটোঁ থালা-বাসন পরিষ্কার করে সোহাগ মিরাকে কোলে তুলে রুমে নিয়ে যায়।
মিরাঃ কি হলো? এখানে নিয়ে আসলেন কেন?
সোহাগ মির্জাঃ কাল কি বলেছিলে মনে নেই?
মিরাঃ কি বলেছিলাম?
সোহাগ মির্জাঃ মনে পরছে না?

মিরাঃ নাহ
সোহাগ মির্জাঃ বলেছিলে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই রাইশা আর আমার জন্য চা করে দিবেন। তারপর সকালের নাস্তা বানিয়ে আমাদের সাথে ব্রেকফাস্ট করে অফিসে যাবেন। দুপুরে জাস্ট বারোটা বাজলেই বাড়িতে চলে আসতে হবে। নিজের হাতে রান্না করে আমাদের সাথে লান্স করবেন। তারপর এঁটো থালা-বাসন পরিষ্কার করে দু’ঘন্টা আমার শরীরের যেখানে যেখানে এতোদিন আঘাত করেছেন সেখানে সেখানে ম্যাসার্চ করে দিবেন।
মিরাঃ আপনি কি এখানে আমার শরীরের ম্যাসার্চ করতে এনেছেন?

সোহাগ মির্জাঃ বুঝেছো তাহলে?
মিরাঃ যান করা লাগবে না। আপনার এই শাস্তিটা মওকুফ করে দিলাম।
সোহাগ মির্জাঃ তা বললে তো আমি শুনছি না। সারাদিন ধরে এতো খাটা-খাটনি করে সংসারের সব কাজ করেছি। আর তুমি কি ভাবো এখন এটুকু কাজ করতে পারবো না? সোহাগ মিরাকে নিয়ে বিছানায় উঠিয়ে বসায়। এবার বলো তো তোমার শরীরের কোথায় কোথায় আঘাত করেছি আমি! কি হলো তারাতাড়ি দেখাও। তুমি যদি না দেখাও আমি ম্যাসার্চ করা কখন শুরু করব?
মিরা বিছানার থেকে উঠে যায়।

মিরাঃ আপনার এসব ন্যাকামো দেখতে আমার ভালো লাগছে না।
সোহাগ মির্জাঃ তাই নাকি? বেশি কথা না বলে চুপচাপ বিছানায় আসো।
মিরাঃ নাহ
সোহাগ আবার মিরাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। মিরা আবার উঠে যায়। সোহাগ আবার বসিয়ে দেয়। মিরা আবার উঠে যায়। তারপর সোহাগ নিজেই উঠে দাড়ায়।
সোহাগ মির্জাঃ বসবে না তো? ঠিক আছে!

সোহাগ মিরাকে একটানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। হাত দুটো মিরার কোমড়ে গুজে থুতনিটা মিরার মাথার সিঁতিতে ঠেকায়। আস্তে আস্তে মিরার চুলের কাছে নাকটি নিয়ে আসে। তারপর মিরার চুলে নাক ডুবিয়ে কিছুক্ষণ পর ঠোঁটের পরস দিতে মিরার গলাতে এসে থেমে যায়। মিরার পিঠে সোহাগের হাত পরতেই মিরা আহ্ করে ওঠে। তখন সোহাগ মিরাকে ছেড়ে দিতে চাই কিন্তু মিরা সোহাগকে শক্ত করে ধরে রাখে তাই সোহাগ আবার মিরাকে কাছে টেনে নিয়ে পিঠে আলতো ভাবে হাত বুলায়।
সোহাগ মির্জাঃ মিরা?
মিরাঃ উমম

সোহাগ মির্জাঃ আমি তোমার প্রতি খুব অন্যায় করেছি তাই না?
মিরাঃ হুমম
সোহাগ মির্জাঃ আর করবো না দেখো! এখন থেকে প্রচুর আদর দেব। তোমাকে আমি সবসময় ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখব।
হঠাৎ সোহাগের ফোনটা বেজে ওঠে। সোহাগ তাকিয়ে দেখে আন-নন নাম্বার। ফোনটা কাটতে যাবে মিরা বলে আজ অফিসে যান নি ইমপ্রোটেন্ট ফোনকল হয়তো। রিসিভ করন। সোহাগ রিসিভ করতেই,

ওপাশ থেকেঃকি সোহাগ মির্জা বউকে আদর করা হচ্ছে?
সোহাগ মিরাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। কন্ঠস্বরটা খুবই পরিচিত লাগছে।
সোহাগ মির্জাঃ কে বলছেন?
ওপাশ থেকেঃ আমাকে আপনি খুব ভালো করেই চেনেন। আপনাকে বলেছিলাম না? প্রতিশোধটা তোলা থাকলো। ধরে নিন আজ থেকেই শুরু।
সোহাগ মির্জাঃ মানে?

ওপাশ থেকেঃ মানেটা সময় হলেই বুঝতে পারবেন। আজ এটুকুই যেনে রাখুন “আমি আসছি সোহাগ মির্জা খুব শিগগিরই আসছি। “
সোহাগ মির্জাঃ হ্যালো হ্যাল….
টুট টুট টুট……
কলটা কেটে যায়। সোহাগের আর বুঝতে বাকি থাকে না কলটা কে করেছিল! তাই দেরী না করেই ওয়াশরুমে গিয়ে খুব দ্রুত রেডী হয়ে বেরিয়ে আসে।
মিরাঃ একি? কোথাও যাচ্ছেন?

সোহাগ মির্জাঃ।
মিরাঃ কি হলো কথা বলুন?
সোহাগ মির্জাঃ এখন আমি তোমাকে কিছু বলতে পারছি না। ফিরে এসে সব বুঝিয়ে বলব।
মিরাঃ কখন ফিরবেন?
সোহাগ মির্জাঃ রাতে।
মিরাঃ বেশি রাত করবেন না কিন্তু।

সোহাগ মির্জাঃ ঠিক আছে। রাইশা আর তুমি সাবধানে থেকো। কলিং বেল বাজলেই দরজা খুলে দিও না। আমি আসলে ফোন করব তখন খুলো।
মিরাঃ কেন খুললে কি হবে? এমন ভাবে বলছেন যেন ডাকাত আস….
সোহাগ মির্জাঃ উসসসস!
বড্ড বেশি কথা বল তুমি! যা বলেছি তাই করো। মনে থাকবে?
মিরাঃ হুমম

মিরার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বেরিয়ে যায় সোহাগ।


পর্ব ১৩

মিরা আর রাইশা দুজনে রুমে বসে গল্প গুজব করছে। হঠাৎ রাইশার ঘড়ের জানালায় কেউ একজন ঢিল ছুড়ে দিয়ে চলে যায়। রাইশা এগিয়ে গিয়ে দেখে ঢিলের সাথে একটি কাগজ মোড়ানো। যাতে লেখা আছে, “আমি যানি তোমার সন্তান কোথায় আছে। যদি তোমার সন্তানকে পেতে চাও এক্ষুনি রূপসা ব্রীজের নিচে চলে এসো। ” রাইশা ব্যাপারটা মিরাকে গিয়ে যানায়। মিরা রাইশাকে একা যেতে দিতে চাইনা। তাই দু’জনে মিলেই রইনা হয়।

ওদিকে,
সোহাগ মির্জাঃ মোনাআআআ! কোথায় তুমি মোনাআআ?
চিৎকার করে ডাকতে থাকে সোহাগ মোনাকে।
মোনার মেজো বোন জুলি সোহাগের চিৎকার শুনে বেড়িয়ে আসে।
জুলিঃ একি সোহাগ মির্জা। এখানে কি মনে করে আসলেন?
সোহাগ মির্জাঃ তোমার বোন কোথায় জুলি?

জুলিঃ আমার বোন? হাহাহা! কোন বোনের কথা বলছেন আপনি?
সোহাগ মির্জাঃ প্লিজ জুলি বল তোমার আপু কোথায়?
জুলিঃ আমার আপু? তা হঠাৎ আমার আপুকে আপনার কি দরকার পরল?
সোহাগ মির্জাঃ সেটা তোমাকে আমি পরে বলব! এখন তোমার আপুকে একটু ডেকে দাও। তার সাথে আমার কিছু কথা বলার আছে।
জুলিঃ সরি! আমার আপু এখন বাসায় নেই আর যদিও থাকত আপনার সাথে কখনোই কথা বলতে চাইতো না।
সোহাগ মির্জাঃ কেন?

জুলেঃ কেন সেটা আবার যানতে চাইছেন?
ভুলে যাবেন না সোহাগ মির্জা আপনার জন্য আমরা আমাদের বাবাকে হারিয়েছি। ছোট বোন দিনাকে হারিয়েছি!
সোহাগ মির্জাঃ তোমরা ভুল বুঝছো আমাকে!
জুলিঃ আমরা ভুল বুঝছি? যেটা নিজের চোখে দেখেছি সেটাও কি ভুল?
সোহাগ মির্জাঃ হ্যাঁ হ্যাঁ ভুল। তোমরা ভুল বুঝছো আমাকে। সেদিন আমি দিনাকে অতন্ত্য সুন্দরভাবে বুঝিয়েছিলাম। আমি যখন চলে যায় তখন স্যান্ডি তোমাদের বাড়িতে ঢোকে। আমার পুরো বিশ্বাস সেই রাতের ঘটনার জন্য স্যান্ডিই দায়ী।

জুলিঃ মিথ্যা বলবেন না সোহাগ মির্জা। দিনা নিজে আমাদেরকে ফোন করে বলেছিল আপনি ওকে ভালোবাসেন, বিয়ে করতে চান। সেদিন আপনিই আমাদের বাড়িতে ছিলেন। আর ওর সাথে..
সোহাগ মির্জাঃ আমি এমনটা কিছুই করি নি। আমি তো জানতামই না দিনা আমাকে ভালোবাসে। আমি তো শুধু ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম আমি মিরাকে ভালোবাসি আর মিরাকে বিয়ে করতে চাই।
জুলিঃ আমি বিশ্বাস করি না।

সোহাগ মির্জাঃ তুমি বিশ্বাস না করলেও এটাই সত্যি! ভেবেছিলাম তুমি অন্তত আমাকে বিশ্বাস করবে কিন্তু না তুমিও মোনার মতোই আমাকে ভুল বুঝলে। আরে ওতো আমার ফ্রেন্ড ছিল। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি একসাথে আমরা পার করেছি। ও আমাকে বুঝলো না। তুমি কিভাবে বুঝবে?
দিনাকে আমি শুধুই ছোট বোনের মতো দেখতাম। দিনার সাথে এমন কিছু আমি কল্পনায়ও ভাবতে পারি না। আমি জানতামই না দিনাকে রেপ করে খুন করা হয়েছিল! তোমাদের অসুস্থ বাবাকে খুন করা হয়েছিল। কারণ নিউজটা আমি দেরিতে পায়। আর পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছিলাম কিন্তু তোমাদেকে পায় নি। তোমাদের বাড়িতে আদালত কতৃক সিল পরে গিয়েছিল। ব্যবসায় ডুবে গিয়েছিল তোমার বাবার। সবার ঋণ আমি পরিশোধ করি। তোমাদের বাড়িটা আমি নিলামীর হাত থেকে বাচাঁয়। আর তোমরা কিনা!

জুলিঃ এর সবই আপনার নাটক! আমাদের কাছ থেকে আপন জনদের কেড়ে নিয়ে আবার দয়া দেখাতে কে বলেছিল আপনাকে?
সোহাগ মির্জাঃ সবই কি দয়া? আচ্ছা তোমাদের দয়া দেখিয়ে আমার কি লাভ? আমি যদি এতোই খারাপ হবো তাহলে কেন তোমাদের জন্য ভাববো?
জুলি ভেবে দেখে সত্যিই তো এটা তো ভেবে দেখি নি। সোহাগ মির্জার কি লাভ ছিল আমাদের উপকার করার! তাছাড়াও উনি তো আমার দিকে কখনও খারাপ নজরে তাকায় নি! সোহাগ ঘুরে চলে যাচ্ছে জুলি সোহাগকে ডাক দেই।
জুলিঃ সোহাগ ভাইয়া?

সোহাগ পিছনে জুলির দিকে ঘুরে তাকায়।
জুলিঃ ভাইয়া আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি। এখন খুব দেরি হয়ে গেছে। মোনা আপু প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মিরা আপু আর রাইশাকে কৌশলে রূপসা ব্রীজ নিয়ে গেছে।
সোহাগ মির্জাঃ কি বলছ কি তুমি?
জুলিঃ হ্যাঁ ভাইয়া। আপু ওদেরকে মেরে ফেলবে।
সোহাগ মির্জাঃ তোমার আপুকে আটকাও জুলি!
জুলি মোনাকে ফোন করে কিন্তু ফোনটা বন্ধ পায়।

জুলিঃ মোনা আপুর ফোনটা বন্ধ ভাইয়া। আমাদেরকে ওখানে যেতে হবে।

মিরাঃ কে আপনি? আমাদের এভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন?
মোনা মিরার চুলের মুঠি টেনে ধরে।
মোনাঃ আমি কে সেটা জানতে চাস? তোর জম আমি!
মিরার মাথায় হাতের বন্দুকটা দিয়ে অনবরত আঘাত করতে থাকে মোনা।
রাইশাঃ প্লিজ মোনা আপু আমার ভাবিকে তুমি ছেড়ে দাও। মারতে হয় আমাকে মারো।
মোনাঃ মরবার এত্তো সক তোর? ঠিক আছে আগে তোকেই মারবো।

মিরাঃ নাআআআ আমাকে মারো ওকে ছেড়ে দাও!
রাইশাঃ না আমাকে!
মিরাঃ না আমাকে।

মোনা রেগে যায় বাআআআআচ। অনেক হয়েছে। আজ তোরা দুজনই মরবি। তোদের মৃত্যু এতোটা যন্ত্রণা দায়ক হবে যে দাফন করার জন্য শরীরের একটা হারও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মোনা মিরার দিকে তাকায়, আগে তোকেই মারি। বন্দুকটা নিয়ে মিরার সামনে ধরে। তারপর এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনে ঘ্যাচাং করে মিরার বুকে একটা গুলি বসিয়ে দেয়। তারপর মোনা তার গুন্ডাগুলোকে ডেকে মিরাকে জাহাজে উঠিয়ে দেয়। আর গুন্ডাগুলোকে বলে যাও গিয়ে মাঝ নদীতে ফেলে এসো একে। গুন্ডাগুলো মাঝ নদীতে মিরাকে গিয়ে ফেলে দিয়ে মোনাকে ফিরে এসে জানায়। মোনা তখন একটা বিজয়ীর হাসি দিয়ে চিৎকার করে বলে, সোহাগ মির্জাআআআ আমার বোনের সাথে যা করেছিস আমি তার প্রতিশোধ নিতে পেরেছি। রূপসা নদীর মাছগুলো তোর বউকে ছিড়ে ছিড়ে খাবে।

তারপর রাইশার দিকে বন্দুকটা ধরে……


পর্ব ১৪

জুলি এসে বন্দুকটা ধরে উপরের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
মোনাঃ জুলি তুই এখানে।
জুলিঃ এ তুমি কি করছিলে আপু?
মোনাঃ প্রতিশোধ নিচ্ছিলাম।
জুলিঃ কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃস্টি হচ্ছে আপু।
মোনাঃ কি বলতে চাস তুই?

জুলিঃ আপু আমার মনে হয় সোহাগ ভাইয়া নির্দোষ।
মোনা ঠাসসসস করে জুলির গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
মোনাঃ তুই কি বলছিস যানিস?
জুলিঃ হ্যাঁ, আপু আমি যা বলছি ভেবেই বলছি।

সোহাগ এসে রাইশার বাঁধনটা খুলে দিয়ে রাইশাকে জড়িয়ে ধরে।
সোহাগ মির্জাঃ তুই ঠিক আছিস তো বোন?
রাইশাঃ ভাইয়া…
রাইশা কাঁদতে থাকে।
সোহাগ মির্জাঃ কাঁদছিস কেন পাগলি? আমি চলে এসেছি না? সোহাগ এদিকে ওদিকে তাকিয়ে, মিরা কোথায়?
রাইশাঃ ভাইয়া… ভাবি…
সোহাগ মির্জাঃ কি?

রাইশাঃ ভাবিকে মোনা আপু
সোহাগ মির্জাঃ হুমম। তারপর?
রাইশাঃ মোনা আপু ভাবিকে।
সোহাগ মির্জাঃ আমার এবার খুব ভয় করছে কিন্তু ছুটকি, তারাতাড়ি বল? কি করেছে মোনা আমার মিরার সাথে?
রাইশাঃ তুমি শান্ত হও ভাইয়া আমি বলছি।
সোহাগ মির্জাঃ কি করেছে মোনা ওর সাথে?

রাইশাঃ মেরে ফেলেছে। মোনা আপু ভাবিকে মেরে রূপসা নদীতে ফেলে দিয়েছে।
সোহাগ মির্জাঃ নাআআআআ।
সোহাগ চিৎকার করে বসে পরে। খুব জোড়ে কাদঁতে থাকে সোহাগ। এমন সময়ে হঠাৎ কেউ এসে তার রক্তে ভেজা নরম হাতটি দিয়ে সোহাগের কাঁধ স্পর্শ করে। সোহাগ ঘুরে দাড়িয়ে দেখে মিরা রক্তাক্ত অবস্থায় দুলছে। সোহাগ মিরাকে ধরতেই মিরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
সোহাগ মির্জাঃ এই মিরা কথা বল? কথা বল বলছি? কি হয়েছে তোমার মিরা?

রাইশাঃ ভাইয়া ভাবির গুলি লেগেছে। এক্ষুণি ভাবিকে নিয়ে আমাদের হসপিটালে যেতে হবে আর দেরি করও না।
সোহাগ মিরাকে কোলে তুলে নিয়ে হসপিটালে যাবে মোনা এসে সোহাগকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
মোনাঃ ভেবেছিলাম তোর বউকে মারব! বোনকে মারব! কিন্তু না তোর বউ বেঁচে ফিরে আসলো। তবে এখন যখন তুই এসেই গিয়েছিস। আজ নিজের হাতে তোদের সবাইকে খুন করবো।

সোহাগ মির্জাঃ দেখ মোনা তোর রাগ আমার উপর আমার মিরাকে তুই বাঁচতে দে।
মোনাঃ বাঁচতে দেব? হাহাহা! তুই বাঁচতে দিয়েছিলি আমার বাবা, বোনকে?
সোহাগ মির্জাঃ তুই ভুল করছিস মোনা!
মোনাঃ আমি ভুল করছি? আজ আমি আমার বাবা, বোনের প্রতিশোধ নিচ্ছি। এখন যখন সুযোগ পেয়েই গেছি নিজের হাতে তোকে আর তোর পরিবারকে খুন করে প্রতিশোধ পূর্ণ করব।

মোনা সোহাগের দিকে বন্দুকটা ধরে। যেই গুলি ছুড়তে যাবে তখনই পুলিশ এসে মোনার হাতে ঘ্যাচাং করে একটা গুলি বসিয়ে দেয়। মোনার হাত থেকে বন্দুকটা ছিটকে দূরে গিয়ে পরে। তারপর পুলিশ মোনাকে এ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় মোনা সোহাগকে বলে যায় আমি আবার ফিরে আসবো সোহাগ মির্জা। তোর প্রতি প্রতিশোধ নিতে, তোকে শাস্তি দিতে, কথাটা মনে রাখিস!

সোহাগ মিরাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। মিরার শরীরে গুলি ছুয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার কারণে মিরা এখন বিপদ মুক্ত। মিরাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। রাইশা আর সোহাগ মিরার পাশে বসে রয়েছে।
রাইশাঃ আচ্ছা ভাবি তোমাকে না নদীতে ফেলে দিয়েছিল?
মিরাঃ পালিয়ে ছিলাম।
রাইশাঃ মানে?

মিরাঃ আমাকে জাহাজে উঠিয়ে গুন্ডাগুলো গল্প করছিল। আমি সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালায়। তারপর গুন্ডাগুলোর মধ্যে একজন আমাকে চিনতে পেরে পালাতে সাহায্য করেছে। আর তার সাথীদের বলে আমাকে সে নদীতে ফেলে দিয়েছে।
রাইশাঃ কিভাবে চিনলো ঐ গুন্ডাটা তোমাকে?
মিরাঃ রাইসূলের ডাক্তারি পরার টাকার জন্য একদিন তার স্ত্রীকে আমি কিডনি ডোনেট করেছিলাম।
রাইশাঃ ওহহ।
সোহাগ মির্জাঃ এসব কথা এখন বাদ দাও! আগে সুস্থ হও তারপর বলবে!

২০ বছর পর, >>>>>>>>>>>>>>>>>>

মায়াঃ হাহাহা
রুসাঃ হাসছিস কেন মায়া?
মায়াঃ কি করব বল?
তোর এই গল্পটা শুনে আমার মুভি মুভি লাগছে!
রুসাঃ সেই তো! তোর বিশ্বাস হলো না? এইজন্যই বলতে চাচ্ছিলাম না।
মায়াঃ না না বল তারপর কি হলো?

রুসাঃ আমি আর কিচ্ছু বলব না! তোর বিশ্বাস হলো নাতো যা ভাগ!
মায়াঃ ওই সালি একটা গল্প শেষ না করে বাহানা শুরু করেছিস? আগে বল তারপর কি হলো?
রুসাঃ এটা গল্প না মায়া এটা আমার মামা মামির…
মায়াঃ কি?

রুসাঃ মা আমাকে এই গল্পটা ছোটবেলা থেকেই শোনাতো। আমার মামা মামি এখন আর একসাথে থাকে না।
মায়াঃ মানে?
রুসাঃ বাদ দে ওসব কথা। এখন জলদি চল তো অফ টাইম শেষ! দেরি করলে ডাক্তার মাহির এসে তোর ব্যন্ড বাজাবে।
মায়াঃ ওই এক যন্ত্রণা! লোকটার কাছে পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ ভালো শুধু আমি ছাড়া! যখন তখন শুধু আমাকে জ্ঞান দেয়!
রুসাঃ কারণ তোর কাজগুলো এমন যে তোকে জ্ঞান না দিলে হয় না!

মায়াঃ জ্ঞান কি মা কম দেয়? তবুও কি ভেবে যে মেডিকেলে পড়তে পাঠালো! আমি তো এ্যাডমিশন টেস্টেও ফেল করার কত চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কি করতাম ওই মাহির বজ্জাতটা এসে যেহারে খাতার উপর হুমরি খেয়ে পরেছিল। বজ্জাতটাকে দেখাতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেছি। কপাল আমার সেই ডাক্তারি পড়তে আসা লাগলো।
রুসাঃ ওভাবে বলিস না মায়া! স্যার কত্ত ভালো। আমাদের বকে তো ভালোর জন্য!
মায়াঃ থামবি তুই? ওই বজ্জাতটার হয়ে আর সাফায় গায়তে আসবি না!

মাহিরঃ কে বজ্জাত মায়া?
হঠাৎ মাহিরের কন্ঠস্বর শুনে মায়া তাকিয়ে দেখে মাহির সামনে দাড়ানো। মাহিরের চোখ দুটো রাগে গজগজ করছে। ভয়ে মায়ার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মাহিরঃ রুসা ক্লাসে যাও।
রুসাঃ ওকে স্যার।
মাহিরঃ দাড়াও মায়া! তুমি কোথায় যাচ্ছো?
মায়াঃ আপনি বললেন তো ক্লাসে যেতে।

মাহিরঃ কানে কি সমস্যা আছে তোমার?
মায়াঃ কেন স্যার?
মাহিরঃ আবার বলছো কেন?
মায়াঃ সরি স্যার!
মাহিরঃ সরি? কিসের জন্য?
মায়াঃ আর কখনও আপনাকে কিচ্ছু বলব না!

মাহিরঃ তোমার মধ্যে শিক্ষা দিক্ষার খুব অভাব। শিক্ষকদের কিভাবে সম্মান দিতে হয় সেটাও যানো না।
মায়াঃ স্যার আমি আসলে
মাহিরঃ কি? শোনও মেয়ে এটা লাস্ট। নেক্সট টাইম যেন এভাবে কোনও শিক্ষকদের নিয়ে বলতে না শুনি। মনে থাকবে?
মায়া মাথা কাত করে হ্যাঁ বলে।
মাহির ধমক দিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, মুখে বল মনে থাকবে?
মায়াঃ জ্বী স্যার।
মাহিরঃ হুমম। এবার ক্লাসে যাও।

আজ সোহাগের জন্মদিন। মিরা বাড়িতে অনেক ভালো ভালো রান্না করছে। যা যা খেতে সোহাগ পছন্দ করে তার সব। রান্নার শেষে মিরা খাবারগুলো নিয়ে বাইরে আসে। কিছু সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু বসে আছে খাবারের অপেক্ষায়। তাদেরকে পাত পেরে খেতে দিয়ে শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছছে মিরা। খাওয়ানোর শেষে যখন শিশু গুলো চলে যায় মিরা দৌড়ে গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা সুটকেসটা বের করে। সোহাগের ছবিটা হাতে নিয়ে কাঁদে। অনেক অসম্মান, অবহেলা আর অপমান নিয়ে মিরা সোহাগের বাড়ি থেকে সেদিন রাতে বেরিয়ে এসেছিল। তারপর আর নিজের আপনজন কারও সাথে যোগাযোগ রাখে নি!

মিরা সোহাগের ছবিতে হাত বুলাছে আর কাঁদছে। মিরার চোখের পানি গড়িয়ে সোহাগের ছবির ফ্রেমে পড়ছে।
মিরাঃ আপনি আমাকে ভুল বুঝলেন? এতো বড় অপবাদ দিলেন আমাকে আপনি? মায়া! ওতো আমার আর আপনার সন্তান। কিন্তু আপনি ভাববেন না! আমি কক্ষনো মায়াকে যানতে দেব না ওর পিতৃ পরিচয়। ওর মাও আমি আর বাবাও আমি। ও কক্ষণো আপনার কাছে নিজের পরিচয় নিয়ে যাবে না। আপনি ভালো থাকুন! খুব ভালো থাকুন!


পর্ব ১৫

জীবন থেকে ২০টা বছর চলে গেল। এর মধ্যে এমন একটা রাত নেই আমি আমার মিরাকে নিয়ে ভাবি নি। এমন একটা দিন নেই তোমায় অনুভব করি নি। তুমি আছো, তুমি ছিলে আর জীবনের শেষ নিশ্বায় পর্যন্ত তুমিই থাকবে আমার জীবনে। তুমি বলতে না মিরা? আমি সত্যিই খুব পঁচা, নোংরা, খারাপ একটা মানুষ। সত্যিই আমি তোমার যোগ্য নই। ভুল বুঝেছি আমি। ভুল বুঝে তোমার মতো একটা নিষ্পাপ মেয়েকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছি। আর আজ আমি তার শাস্তি পাচ্ছি। তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি তুমি কি ছিলে আমার জীবনে! আমি যানি না আর কক্ষণো তুমি ফিরে আসবে কিনা। বলবে কিনা ওগো আমাকে একটু ভালোবাসুন! একটু আদর দিন! তবুও আমি তোমার অপেক্ষা থাকি। খুব ভালোবাসি যে তোমায়। মিরার ছবি বুকে নিয়ে কথাগুলো বলে কাঁদতে থাকে সোহাগ।

হঠাৎ সোহাগের কাঁধে কারও হাত পরে। সোহাগ চোখের পানি মুছে তাকিয়ে দেখে বোন রাইশা ছলছল চোখে সোহাগের দিকে তাকিয়ে আছে।
সোহাগ মির্জাঃ তুই কখন এলি ছুটকি?
রাইশাঃ।,
সোহাগ মির্জাঃ কি হলো কথা বলছিস না?
রাইশাঃ আর কত নিজের কষ্টগুলো সবার থেকে লুকাবে ভাইয়া?
সোহাগ মির্জাঃ কিসের কস্ট? মুচকি হাসি দিয়ে বলে।

রাইশাঃ ভাবির ছবি বুকে নিয়ে এতোক্ষণ তুমি যেই কথাগুলো বলছিলে। তার সব আমি শুনেছি। এতো ভালোবাসো তুমি ভাবিকে? তাহলে কেন ভাইয়া? সেদিন ভাবির কথাগুলো যদি একবার শুনে নিতে তাহলে আজ এই ভাবে তোমাকে কস্ট পেতে হতো না। আমার ভাবি যে ফুলের মতোন পবিত্র।
সোহাগ মির্জাঃ খুব ভুল করেছি আমি। নাহ ভুল কেন বলছি আমি যে অপরাধী।
রাইশাঃ ওই মিথ্যাবাদী হাসানের কথায় তুমি সেদিন বিশ্বাস না করলে ভাবি আজ আমাদের সাথেই থাকত।
সোহাগ রাইশাকে জড়িয়ে ধরে খুব জোড়ে কাঁদে।

সোহাগ মির্জাঃ ভুল করেছি রে বোন। অনেক বড় ভুল করেছি। আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না। আর তাই তো মিরাকে কোনও কথা বলার সুযোগ দেয় নি। শুধু আমার সিদ্ধান্তটা ওর উপর চাপিয়ে দিয়েছি। ও এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? কিছুই আমি যানি না।
রাইশাঃ ভাইয়া কেঁদো না প্লিজ! আমি তোমাকে এভাবে কাঁদতে দেখতে পারছি না।
রাইশা সোহাগকে বসিয়ে হাতে এক গ্লাস পানি ধরিয়ে দেয়। সোহাগ ডগডগ করে পানিটুকু খেয়ে নেয়।

সোহাগ মির্জাঃ আচ্ছা রাইশা! তোর ভাবি তো যানে আমার খুব রাগ তাহলে এভাবে কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল? ও কি পারতো না প্রতি বারের মতো তখনও আমাকে একটু সময় দিতে। একটু বোঝাতে? ওতো যানে আমি ওর উপর যতোই রাগ করে থাকি না কেন ওকে ছাড়া থাকতে পারি না!
রাইশাঃ আত্মসম্মানবোধ! হ্যাঁ ভাইয়া। একটি মেয়ে তার স্বামীর সব অন্যায় সহ্য করে বাকীটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে কিন্তু চারিত্রিক অপবাদ! সেটা কখনও একটি মেয়ে সহ্য করতে পারে না। আজ যদি ভাবির জায়গায় আমি হতাম হয়তো আমিও রাইসূলকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতাম।

সোহাগ মির্জাঃ হ্যাঁ, খুব খারাপ আমি। মিরা আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল। আর আমি জন্মদিনের পার্টিতে সকলের সামনে ছিঃ আমার ভাবতেও ঘৃণা করছে আমি আমার নিজের সন্তানকে অস্বীকার করেছি। বলেছি মিরার গর্ভে হাসানের অবৈধ সন্তান।
রাইশাঃ হাসান তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে!
সোহাগ মির্জাঃ কিন্তু মিরা? ওতো কোনও অপরাধ ছাড়াই এতো অসম্মান সহ্য করেছে। ও অনেকবার আমার কাছে নিজের সম্মানটুকু ভিক্ষা চেয়েছে। বলেছে আমার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। আর আমি কিনা গোটা সমাজের চোখে আমার মিরাকে এতোটা নিচে নামিয়ে দিলাম।
রাইশাঃ ভাইয়া শান্ত হও।

সোহাগ মির্জাঃ কিভাবে শান্ত হবো বল? এতোগুলো বছর ধরে ভেতরে ভেতরে আমার যে এই অপরাধবোধ টুকু কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমি যে শেষ হয়ে যাচ্ছি বোন। মিরা আমাকে পায়ে পরে বলেছিল, বিশ্বাস করুন আমি পবিত্র। আমার সবকিছুই শুধু আপনার। আমি আপনার আমানত ওই হাসানকে নষ্ট করতে দেয় নি। আর আমি মিরাকে ঘার ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে তারিয়ে দিয়েছি। ও অনেক বার আমাকে ডেকেছে আমি শুনিনি। আজ যখন ও নেই তখন আমি কস্ট পাচ্ছি। আমার ভেতরটা শূন্য মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে।
আচ্ছা, আমার সন্তান কি পৃথিবীর আলো দেখেছে নাকি আমার অংশ বলে মিরা তাকে…
রাইশাঃ ছিঃ ভাইয়া এমন কথা বলো না। আমার ভাবি কক্ষণো এমন কাজ করতে পারে না।

সোহাগ মির্জাঃ যদি তাই হয় তাহলে তো এতোদিনে আমার সন্তান অনেক বড় হয়ে গেছে।
রাইশাঃ হুমম। একদম আমাদের রুসার সমবয়সী।


পর্ব ১৬

মিরা মেডিকেল
কলেজ & হসপিটাল।

একটানে টেবিলের উপর যা ছিল রাইসূল সব মেঝেতে ফেলে দেয়। বেল বাজাতেই নার্স, ডাক্তার সব ছুটে ছুটে আসে রাইসূলের কেবিনে।
রাইসূল সিকদারঃ সব শেষ। আমার এতোদিনের সব পরিশ্রম ধুলোয় মিশিয়ে গিয়েছে। এই হসপিটালটা শুধু আমার স্বপ্ন না। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমার বোনের নাম। আজ সেই নামে…
সবাইঃ কি হয়েছে স্যার?

রাইসূল রাগান্বিত দৃস্টিতে সকলের দিকে তাকায়।
রাইসূল সিকদারঃ কি হয়েছে সেটা আবার যানতে চাইছেন?
আপনারা এতোটা কেয়ারলেস কিভাবে হতে পারেন?
কি হলো বুঝতে পারছেন না?
রাইসূল টিভিটা অন করে।

সবাই নিউজের নিচের হেড লাইনটা পরে মাথা নিচু করে ফেলে।
কি হলো এখন মাথা নিচু করে আছেন কেন কথা বলুন?
কে করেছে শ্যামলি বসুর অপারেশনটা?
ডা.নাহিদঃ শ্যামলি বসু তো ১০৫ নাম্বার কেবিনে ছিল। স্যার ১০৫ নাম্বার কেবিনের পেশেন্টের সার্জারি ডা.মাহির খান করেছে।
রাইসূল সিকদারঃ হোয়াট?
ডা.মানহাঃ জ্বি, স্যার! এটাই সত্যি।

রাইসূল সিকদারঃ নার্স এক্ষুণি গিয়ে ডা.মাহিরকে ডেকে আনুন।
নার্স গিয়ে ডা.মাহিরকে ডেকে আনে। হুট করে মাহির ক্লাস ছেড়ে চলে যাওয়ায় ক্লাসের সব স্টুডেন্টরা অফ টাইম পালন করছে। কেউ ক্যান্টিনে যায় তো কেউ যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। মায়া গিয়ে হসপিটালের পেশেন্টদের খোঁজ খবর নিতে থাকে। তারপর হাটতে হাটতে রাইসূলের কেবিনের কাছে চলে আসে। সেখানে অনেক চিৎকার চ্যাচামেচির আওয়াজ শুনে ব্যাপারটা বুঝতে কেবিনের বাইরে উঁকি দেয়। আর দেখে মাহির বকা খাচ্ছে।

রাইসূল শ্যামলি বসুর ফাইলটা মাহিরের মুখের উপর ছুড়ে মারে। মাহির ফাইলটা তুলে খুলে দেখে বিস্মিত হয়। কারণ রিপোর্টটা চেন্জ।
রাইসূল সিকদারঃ পেশেন্টের শরীরে কোনও রোগ না থাকা স্বত্বেও কেন আপনি অপারেশন করেছেন?
মাহিরঃ স্যার আমি রিপোর্টটা দেখেই অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
রাইসূল সিকদারঃ তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন সব জেনে শুনে একজন পেশেন্টকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন?
মাহিরঃ আমি সেটা কখন বললাম স্যার? আমি তো বলতে চেয়েছি রিপোর্টটা আমার দেখার সময় কেউ বদলে দিয়েছে। কেউ হয়তো আমাকে ফাঁসাতে চায়।
রাইসূল সিকদারঃ অদ্ভুত তো! কে আপনাকে ফাঁসাতে চাইবে?

মাহিরঃ বিশ্বাস করুন স্যার! আমি যখন রিপোর্টটা দেখেছিলাম তখন পেশেন্টের অপারেশন হওয়াটা খুব প্রয়োজন ছিল।
রাইসূল সিকদারঃ তাই নাকি? তা কিভাবে মানবো আপনি যা বলছেন সত্যি বলছেন? কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে?
মাহিরঃ স্যার এখন আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই তবে একটু সময় দিলে আমি প্রমাণ জোগার করে আনতে পারব।
রাইসূল সিকদারঃ বেশ! আমি আপনাকে ২৪ ঘন্টা সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে যদি আপনি নিজেকে নিঃদোষ প্রমাণ করতে না পারেন তাহলে আপনার থেকে ডাক্তারীর লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হবে। আর আপনাকে পুলিশেও দেওয়া হবে।
মাহিরঃ ওকে স্যার।

মাহির রাইসূলের কেবিন থেকে বেড়িয়ে এসে কেবিনের সামনে মায়াকে দেখতে পাই। মায়ার তো ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে, না যানি মাহির এখন তাকে কিনা কি বলবে! কিন্তু মায়াকে অবাক করে দিয়ে মাহির একটু আড় চোখে তাকিয়ে মায়ার পাশ কেটে চলে যায়।
মায়াঃ অদ্ভূত লাগলো ব্যাপারটা! লোকটা আমায় কিছু না বলেই চলে গেল। এমনটা তো আগে কক্ষণো হয় নি। সত্যিই কি উনি অনেক বড় ঝামেলায় ফেঁসেছে? এখন পুরো হসপিটাল তার বিপক্ষে। কেউ উনার কথা বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি তো যানি উনি কখনও এতো বড় ভুল করবেন না। আমার পুরো বিশ্বাস আছে উনার উপর। মায়া মনে মনে কথাগুলো ভেবে দৌড়ে গিয়ে মাহিরের সামনে এসে দাঁড়ায়।

মাহিরঃ কি হলো?
মায়াঃ স্যার আমি আপনাদের সব কথা শুনেছি। আমি কি আপনার কোনও সাহায্য করতে পারি?
মাহিরঃ কি করবে?
মায়াঃ যা আপনি বলবেন। আমার মনে হয় আপনার পাশে আমার এখন থাকাটা খুব দরকার।
মাহিরঃ সরো সামনে থেকে।
মায়াঃ নাহ!

মাহিরঃ ঠিক আছে এসো আমার সাথে! মাহির মায়াকে টেনে স্টোর রুমে নিয়ে যায়।
মায়াঃ একি! এখানে কেন আনলেন?
মায়া মনে মনে ভয় পায় হয়তো কথাটা বলার জন্য মাহির মায়াকে শাস্তি দেবে!
ভয়ে মায়ার কপালে ঘাম চলে আসে। মাহির মায়ার হাতদুটি শক্ত করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে।
মাহিরঃ কি সাহায্য করবে তুমি আমার?

মাহির মায়ার দিকে মুখটা এগিয়ে নিয়ে আসে।
মায়া লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে, কি করছেন আপনি?
মাহির মায়ার এক হাত ছেড়ে দিয়ে স্টোররুমের লাইটটা অন করে। লাইট অন হলে মায়া চোখটা তুলে মাহিরের দিকে তাকায়। তখন মাহির মায়ার আরেকটা হাত ছেড়ে দিয়ে মায়াকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরে যায়।

মাহিরঃ কি করব ভেবেছিলে? শোনও মেয়ে তোমাকে আমি বিয়ে করেছি শুধুমাত্র আমার বাবা-মাকে খুশী করতে। তাছাড়া তোমার মতোন একটা পিতৃপরিচয়হীন মেয়েকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর কখনও স্ত্রী হওয়ার কথা মনেও করো না। মানুষ জানলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। এটা আমার প্রফেশনাল প্লেস।
মনে থাকবে কথাটা?
ধমক দিয়ে বলে, বল মনে থাকবে।
মায়াঃ হুমম…ম….নে! থা…ক..বে।
ভয়ে ভয়ে বলে মায়া।

মাহিরঃ গুড! এখানে শ্যামলি বসুর সেই নকল ফাইলটা পাওয়া যেতে পারে। সাহায্যে করতে চেয়েছিলে না? এখন খোঁজও!
মায়াঃ এখানে তো অনেক ফাইল। কোথায় খুঁজবো?
মাহিরঃ তা আমি যানি না। এই আমি বসলাম তুমি খুঁজে এনে আমার কাছে দাও।
একটা চেয়ার টেনে এনে মাহির পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ে।


পর্ব ১৭

মায়া দুই ঘন্টা ধরে স্টোর রুমে শ্যামলি বসুর ফাইলটি খুঁজে চলেছে। আর মাহির আড় চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা মুহূর্তও মায়াকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। এদিকটায় খোঁজও ওদিকটায় খোঁজও পায়ের উপর পা তুলে হুকুম করে চলেছে। মায়া চেয়ার নিয়ে উপরের তাকের ফাইল গুলো নামাতে চেস্টা করে। হাতটি উঁচু করে ফাইলগুলো নামাতে গেলেই পুরোনো ফাইলগুলোর ভেতর থেকে কিছু ছোটো ছোটো তেলাপোকা বেরিয়ে এসে মায়ার হাত বেয়ে কামিজের মধ্যে ঢুকে যায়। মায়া চিৎকার করে লাফাতে লাফাতে চেয়ার থেকে নেমে মাহিরের সামনে এসে কামিজ ঝাড়তে থাকে।
মায়াঃ আআআআআ

মাহির খপ করে মায়াকে ঠেলে পাশের দরজাটার সাথে মিশিয়ে মায়ার মুখটা হাতদিয়ে চেপে ধরে রাখে।
মাহিরঃ সমস্যাটা কি তোমার? এইভাবে চিৎকার করছো কেন?
মায়া মাহিরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে,
মায়াঃ তেত.. তত.. তেলাপোকা
মাহিরঃ হোয়াট?

তেলাপোকা মায়ার কামিজের মধ্য পিঠের দিকে চলে যায়। মায়া উল্টো ঘুরে মাহিরকে ইশারায় দেখায় যে সে হাতে পাচ্ছে না।
মাহির দেখে খেয়াল করে হ্যাঁ সত্যিই মায়ার কামিজের মধ্যে কিছু একটা দৌড়া দৌড়ি করছে। তাই আর কিছু না ভেবেই মাহির মায়াকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। মায়ার ঘারের উপর থেকে আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কামিজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেয়। তারপর হাতিয়ে তেলাপোকা ধরে বের করে আনে। আচমকা মাহিরের এমন আচারণে মায়া হতবম্ব হয়ে যায়। গলা থেকে কোনো স্বর বের হয় না। মাহিরও বুঝতে পেরে মায়ার থেকে অনেকটা দূরে সরে দাড়ায়।
পাশের পরে থাকা অনেকগুলো ফাইলের মধ্যে চোখ যেতেই শ্যামলি বসুর নামটা দেখে ফাইলটা টেনে তোলে মাহির।
মাহিরঃ পেয়েছি!

এক্ষুণি ফাইলটার থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট রিপোর্ট বের করতে হবে। তাহলেই জানা যাবে হসপিটালের আর কে কে এই ফাইলটা স্পর্শ করেছে। আর এই হসপিটালের এমন কে আছে যে আমাকে ফাঁসাতে চাই!
মায়াঃ আপনাকে কেউ কেন ফাঁসাতে চাইবে?
মাহিরঃ সেটা যেনে তোমার কি কাজ? যাও এখান থেকে।
মায়া মুখটি ফ্যাকাসে করে চলে যাবে বলে স্টোর রুমের দরজাটা খুলছে যা জ্যামে আটকে আছে।
মাহিরঃ কি হলো যেতে বলেছি না তোমাকে?

মায়াঃ স্যার দরজাটা খুলতে পারছি না!
মাহিরঃ একটা দরজা খুলতে এতো ঢং?
চোখ পাকিয়ে মায়াকে সরতে বলে মাহির দরজাটা টেনে দেখে সত্যিই খোলা যাচ্ছে না।
মাহিরঃ ওহহ সিট! আমি তো ভুলে গিয়েছিলাম।
মায়াঃ কি স্যার?

মাহিরঃ দরজাটা একবার বন্ধ করলে বাইরে থেকে ধাক্কা না দিয়ে খোলা যায় না।
মায়াঃ তাহলে এখন কি হবে?
মাহিরঃ যানি না! আমার ফোনটা কেবিনে রেখে এসেছি! নইলে স্নিগ্ধাকে ফোন করতাম!
মায়াঃ সমস্যা নেই স্যার আমার কাছে ফোন আছে। আমি এক্ষুণি রুসাকে ফোন করে আসতে বলছি।
মায়া রুসাকে ফোন করে,
রুসা ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলে,

আর কিছু বলার আগে মায়ার ফোনটা বন্ধ হয়ে যায়। মায়া হ্যালো হ্যালো করে তাকিয়ে দেখে ফোনটা বন্ধ।
মাহিরঃ কি হলো?
মায়াঃ ফোনে চার্জ নেই বন্ধ হয়ে গেছে।
মাহিরঃ সারাদিন ফোনে কি এমন কর যে চার্জ থাকে না!
প্রচন্ড বকা খায় মাহিরের কাছে মায়া। এমন সময় হঠাৎ বিদুৎ চলে যায়। মায়া অন্ধকারে খুব ভয় পেয়ে চিৎকার করে মাহিরকে জড়িয়ে ধরে।
মাহিরঃ এই মেয়ে কি হচ্ছে কি! ছাড়ো আমাকে!

মায়াঃ নাহ স্যার, প্লিজ ছাড়তে বলবেন না আমাকে। আমি অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পায়।
মাহিরঃ ন্যাকামু হচ্ছে? ছাড়ো বলছি।
মায়াঃ আপনি পরে দরকার হলে আমাকে দু’চারটা চর বসিয়ে দিয়েন আমি তবুও এখন আপনাকে ছাড়তে পারব না।
মাহিরঃ ফাজলামু করছো কিন্তু তুমি! ছাড়ো!
মায়াঃ বললাম তো না।

মাহির মায়াকে দূরে সরিয়ে দেয়। মায়া আবার মাহিরের বুকের সাথে মিশে যায়।
মাহিরঃ আমি কিন্তু এবার রেগে যাচ্ছি।
মায়াঃ আপনি রাগলেও আমার এখন কিচ্ছু করার নেই। তাছাড়াও আমি আপনার স্ত্রী। আমার সাথে আপনি এমনটা করতে পারেন না।
মায়া মাহিরকে আরও জোড়ে ঝাপটে ধরে।
মাহিরঃ তুমি অনেক বেয়াদব হয়ে গেছো। তোমাকে মাইর দেওয়া উচিৎ। না হলে সুধরাবে না।
মায়াঃ মারুন তবুও আপনাকে আমি এখন ছাড়তে পারব না। আমি আমার স্বামীকে ধরেছি। আর বিদ্যুৎ না আসা পর্যন্ত এভাবেই থাকব।
আপনার যা করার বিদ্যুৎ আসলে করবেন।

দুম করে আলো জ্বলে ওঠে। মায়ার চোখদুটি অন্ধকারের ভয়ে এখনও বন্ধ হয়ে আছে। মাহির দেখে বিদ্যুৎ আসার পরও মায়া তাকে ছাড়ছে না। মাহিরের অসহ্য লাগে ব্যাপারটা। মায়াকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মায়ার চোখ বন্ধ পেয়ে ঝাকাতে থাকে। মায়া চোখ খুলে দেখে বিদ্যুৎ এসেছে। আর মাহিরের দিকে তাকিয়ে দেখে মাহিরের চোখ রাগে গজগজ করছে। আজ মায়ার রক্ষা নেই। মাহির তো মায়াকে স্ত্রী হিসেবে মানে না তাহলে মায়া কেন বারবার নিজের অধিকার বোধটা জানান দিতে যাবে! মায়া মুখ ঘুরিয়ে মাহিরের থেকে একটু দূরে সরে দাড়ায়।
মায়াকে টেনে সামনে নিয়ে আসে মাহির।

মাহিরঃ ইচ্ছা করছে কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিই। বেয়াদব মেয়ে কোথাকার। সভ্যতা বলতে কিছু শেখো নি?
মায়াঃ আমি কি সত্যি কোনও ভুল করেছি?
মাহিরঃ আবার জানতে চাও? আজ তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। একই তো এখানে আটকে আছি বেড়োবার উপায় খুঁজবো তা-না যত্তসব।
মাহিরের এমন কথা বলার পর মায়া কেঁদে উঠে জোড়ে চিৎকার জুড়ে দেয়।
মায়াঃ বাঁচাও বাঁচাও। মরে গেলাম বাঁচাও।

মাহিরঃ এই চিৎকার করছো কেন তুমি? কেউ এখানে আমাদের দেখলে কেলেংকারী হয়ে যাবে।
মায়াঃ কেউ কি আছো বাঁচাও।
মাহিরঃ আমি বলছি থামো।
এতোক্ষণে মায়ার চিৎকার শুনে কেউ একজন এসে পড়েছে। সে দরজা খুলতে গেলে মায়ার কানে আওয়াজ আসে। সাথে সাথে মায়া মাহিরকে ঠেলে দরজার পিছনে লুকিয়ে দিয়ে নিচে বসে পরে। ডা.নাহিদ এসে মায়াকে এখানে এমনভাবে বসে থাকতে দেখে অনেক অবাক হয়ে যায়। ডা.নাহিদ মায়ার পাশে বসে।
ডা.নাহিদঃ একি মায়া তুমি এভাবে এখানে বসে আছো কেন?

মায়া চোখের ইশারায় মাহিরকে চলে যেতে বলে। মাহির স্টোর রুম থেকে বেড়িয়ে বাইরে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে কি করতে চাইছে মায়া!
মায়াঃ একটা বেড়ালের পেছনে ছুটতে ছুটতে এখানে এসে পড়ে গেছি। কিছুতে উঠতেই পারছি না স্যার।
ডা. নাহিদ মায়ার পা ভালো ভাবে নাড়িয়ে চারিয়ে দেখে।
ডা.নাহিদঃ নাহ তোমার পা তো ঠিক আছে!
মায়াঃ ঠিক আছে তাই না? কিন্তু আমি তো উঠতেই পারছি না স্যার।
ডা.নাহিদঃ সামান্য মোচ হয়তো। ঠিক হয়ে যাবে।

মায়াঃ ওহহ তাহলে ঠিক আছে।
ডা.নাহিদঃ খুব কি ব্যাথা করছে মায়া?
মায়াঃ হুমমমম
মায়াঃ আমি কি তোমাকে হেল্প করব?
মায়া দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে মাহির এখনও আছে। মায়া চোখের ইশারায় মাহিরকে বার বার চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
মায়াঃ হেল্প করবেন? করুন স্যার।

ডা.নাহিদ মায়াকে কোলে তুলে উঠাতে চায়। মাহির দেখে মনে মনে বলে, এই মেয়ে কখনও সুধরাবার নয়। তারপর চোখ পাকিয়ে মায়ার দিকে একবার তাকিয়ে সেখান থেকে চলে যায় মাহির। মায়া মাহিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে এক লাফে উঠে দাড়ায়।
মায়াঃ থাক স্যার। আমার পা একদম ঠিক হয়ে গেছে। এই দেখুন আমি নারাতে পারছি। এখন হাটতেও পারব।
মায়া স্টোর রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। আনমনা হয়ে হাটতে থাকে। রুসা এসে মায়াকে ডাক দেয়। মায়া খেয়াল করে না। হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে ইজিবাইকে উঠে।
রুসা দৌড়ে মায়ার কাছে আসার আগেই মায়া চলে যায়।

রুসাঃ যাহ বলতেই পারলাম না।


পর্ব ১৮

হাদিচ পার্কে শহীদ মিনারের সিঁড়িতে অসংখ্য কস্ট বুকে নিয়ে বসে আছে আবির। মায়া এসে আবিরকে ডাকে,
মায়াঃ আবির!
মায়ার ডাক শুনে আবির কেঁপে ওঠে। আবার মনে মনে খুশীও হয়। মায়া যেন আবিরের প্রাণ। এতোদিন পর মায়ার মুখে নিজের নামটি শুনে আবিরের হারানো সেই মুহূর্তগুলো আবার চোখের সামনে ভেসে আসে। একটা সময় কতো চেস্টা করত আবির মায়ার মুখে একটাবার ভালোবাসি শব্দটা শুনার। কিন্তু মায়ার সেই এক কথা! বিয়ের আগে নো-প্রেম, নো-ভালোবাসা। মায়া শুধু আবিরকে এড়িয়ে চলতো। যার কারণ আবিরের যানা ছিল না।

তারপর একদিন আবির মায়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাবা মাকে নিয়ে চলে যায় মায়ার বাড়িতে। বিয়ে ঠিক হয়, তবুও মায়া আবিরের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। তবে কেন আবিরের থেকে দূরে থাকত মায়া সেই উত্তরটা আবিরের সামনে বিয়ের দিন আসে। কিন্তু সেদিন বাবা-মাকে খুশী করতে গিয়ে আবির বিয়ের আসর ছেড়ে চলে যায়। আর যখন ফিরে আসে তখন খুব দেরি করে ফেলে। মায়াকে বিয়ে করে নিয়ে যায় মাহির, আবিরের থেকে অনেক দূরে। বিয়েটা কিভাবে হলো! মায়া কেমন আছে! কিছুই আবির জানতো না। তবে যেদিন জানতে পারলো সেদিন থেকে আবিরের মনে এক রাশ আশার কিরণ জেগে উঠলো।

আবির উঠে দাড়িয়ে ধীর পায়ের গতিতে মায়ার সামনে আসে। ছলছল চোখ দিয়ে মায়ার মুখপানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ভাবে এই সেই মায়া যা ভেতর থেকে টানে অনবরত।
মায়াঃ কেন ডেকেছিলেন আমাকে?
আবিরঃ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তাই!
মায়াঃ আমাকে দেখার অধিকার আপনি অনেক আগেই হারিয়েছেন।
আবিরঃ বিশ্বাস করও মায়া আমি তোমাকে এখনও খুব ভালোবাসি!
মায়াঃ আর আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি!

আবিরঃ কিন্তু সে তো তোমাকে ভালোবাসে না!
মায়াঃ একদিন বাসবে।
আবিরঃ কখনো বাসবে না। কারণ সে স্নিগ্ধাকে ভালোবাসে।
মায়াঃ সব খোঁজ-খবর নিয়েই এসেছেন দেখছি।
আবিরঃ না মানে।

মায়াঃ থাক আর বলতে হবে না। আমি যানি আমার স্বামী কাকে কতটা ভালোবাসে। সেটা নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে।
আবিরঃ কিন্তু মায়া!
মায়াঃ আমারটা আমি বুঝে নেব। আশা করছি ২য় বার আমার সাথে আর কোনও যোগাযোগ রাখার চেস্টা করবেন না।
বলে মায়া উল্টো ঘুরে চলে যায়। আর মায়ার যাবার পানে আবির তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। আবিরের যে আজ কোনো অধিকার নেই মায়ার উপরে। তাহলে কিভাবে আটকাবে?

মায়া বাড়ি ফেরার আগেই মাহির এসে বসে আছে। সোফায় বসে বসে পা নাচাচ্ছে আর ভাবছে, মায়াকে কিভাবে শাস্তি দেওয়া যায়। এতো বড় সাহস আমার সামনে ডা.নাহিদের কোলে উঠতে চাওয়া! ওকে তো আমি..
-কিরিং কিরিং (কলিং বেলের আওয়াজ)
-এসেছে নবাব নন্দিনী। ওকে আজ কিছু একটা করতেই হবে।

মাহির দরজাটা খুলেই মায়াকে কোলে তুলে নেয়। আচমকা মাহিরের এমন আচারণে মায়া বিস্মিত হয়ে মাহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মাহিরের বাবা-মাও ব্যাপারটা দেখে মুচকি মুচকি হাসে।
মায়াকে রুমে নিয়ে গিয়ে খাটের উপরে ফেলে দেয় মাহির। তারপর বলে,
মাহিরঃ তোমাকে মেরে মেরে সোজা বানানো উচিৎ। মানুষের কোলে উঠার এতো সক?
মায়াঃ আপনি তো নিজেই উঠালেন।
মাহিরঃ আর একটাও কথা বলবে না। বেয়াদব মেয়ে…

মায়া কিছু বুঝে উঠতে পারে না। শুধু মুখ কালো করে মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মাহিরঃ আমি কখনও কোনও মেয়ের গায়ে হাত তুলি নি কিন্তু আজ ইচ্ছা করছে তোমাকে পিটিয়ে সায়েস্তা করতে।
মায়াঃ দেখুন আপনি সব সময় আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারেন না।
মাহিরঃ আমি কার সাথে কিভাবে কথা বলবো সেটা কি তুমি আমাকে শিখিয়ে দেবে?
মায়াঃ আমি সেটা বলি নি।

মাহিরঃ তা কি বলেছো?
মায়াঃ কিছু না।
মাহিরঃ তোমাকে সত্যিই আমার মারতে ইচ্ছে করছে। লাজ-লজ্জা কিচ্ছু তোমার মাঝে নেয়। আমার সামনে বলো ডাক্তার নাহিদের কোলে ওঠবা!
মায়াঃ ওহহ এইজন্য? আসলে ওটা তো
মাহিরঃ ওটা কি?
তখনই মাহির ফোনটা বেজে ওঠে। মায়া কিছু বলতে যাবে মাহির মায়াকে থামিয়ে দিয়ে ফোন রিসিভ করে।
মাহিরঃ হ্যাঁ স্নিগ্ধা বলো?

ওপাশ থেকেঃ…..
মাহিরঃ আরে বাবাহ তুমি যেই ড্রেসটা পরবে তাতেই তোমাকে সুন্দর লাগবে।
ওপাশ থেকেঃ……..
মাহিরঃ হ্যাঁ, আমি আসছি দশ মিনিটের মতো সময় লাগবে।
ওপাশ থেকেঃ….
মাহিরঃ ওকে রাখছি। বাই।

মাহির ফোনটা রেখে মায়ার দিকে তাকায়।
মাহিরঃ তোমাকে আমি পরে দেখে নেব। বলে মাহির চলে যেতে লাগে। মায়া পিছনের থেকে বলে ওঠে,
মায়াঃ কোথাও যাচ্ছেন?
মাহির পিছনে ফিরলে মায়া মাহিরের রাগি চোখদুটি দেখে ভয়ে ভয়ে বলে, না মানে আপনি তো স্নিগ্ধা ম্যামের সাথে বের হবেন। বাবা-মা যদি জিজ্ঞাসা করে কি বলব?
মায়া মাহিরকে রাগি দৃস্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে।

মায়াঃ ঠিক আছে! আমি বলে দেব ইমারজেন্সি পেশেন্ট দেখতে হসপিটালে গেছেন।
মাহির এগিয়ে এসে মায়ার হাতটা ঘুরিয়ে পেছনের দিকে শক্ত করে চেপে ধরে।
মাহিরঃ তোমার সমস্যাটা কি বল তো? শুধু কি মিথ্যা বলতেই শিখেছো?
মায়াঃ না আমি আসলে..

মাহিরঃ থাক তোমার মুখ থেকে আর কোনও কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমি স্নিগ্ধার সাথে রাইসূল স্যারের বাসায় যাচ্ছি মির্জা প্যালেসে। তার সালার জন্মদিনের পার্টিতে। বাবা-মাকে সেটাই বলো।
মায়া মাথা কাত করে হ্যাঁ বোধক উত্তর দিলে মাহির হাতটি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

koster premer golpo bangla


পর্ব ১৯

মায়া ফোনটা চার্জে লাগিয়ে অন করে ওয়াশরুমে যায়। এর মধ্যে রুসার অনেক গুলো মিসড কল। মায়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে রুসাকে ফোন করলে রুসা মায়াকে পার্টিতে যাওয়ার কথা বলে। মায়া প্রথমে না করে দেয়। কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে যায়। এরপর শ্বাশুড়ি মায়ের অনুমতি নিয়ে চলে যায় মির্জা প্যালেসে।

মির্জা প্যালেস,
রুসাঃ চলো না মামা সবাই তোমার জন্য ওয়েট করছে
সোহাগ মির্জাঃ তুই কি পাগল হয়েগেলি মা, এই বয়সে জন্মদিনের কেক কাটবো?
রুসাঃ তুমি যাবে কিনা তাই বল?

সোহাগ মির্জাঃ তোরা তোরা যা করবি কর আমাকে প্লিজ ডাকিস না।
রুসাঃ দেখো তোমার জন্যই এই পার্টির আয়োজন করেছি এখন তুমি না করলে হবে না
সোহাগ মির্জাঃ রাইসূল বোঝাও তোমার মেয়েকে!

রাইসূল সিকদারঃ কি বুঝাবো ভাইয়া? আপনাদের ব্যাপার আপনারাই বুঝে নিন এর মধ্য আমাকে কেন টানছেন?
রুসাঃ প্লিজ, মামা! তুমি সারাদিন মামির ছবি নিয়ে এভাবে পরে আছো এখন তো একটু বাইরে চলো।
সোহাগ মির্জাঃ আজ আমাকে একটু একা থাকতে দে মা।
রুসাঃ তাহলে তুমি যাবে নাতো?
সোহাগ মির্জাঃ নাহ।

রুসাঃ ঠিক আছে, আমার কথা তুমি শুনলে নাতো! আমি কালই হোস্টেলে চলে যাব। থেকো তুমি একা।
সোহাগ মির্জাঃ তোকে নিয়ে আর পারি না। চল তবে আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারব না।
রুসাঃ আগে চলো তো সেটা পরে দেখা যাবে।

পার্টির এক কোণে বসে আছে মায়া। এদিকে সবাই পার্টিতে মেতে আছে। চারিদিকে হৌ হুল্লোড় কেমন যেন একটা অন্যরকম পরিবেশ। এতোটা গান-বাজনা আর ঝাঁক ঝমক পরিবেশের মধ্য মায়া আগে কখনও আসে নি। কেমন যানি একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। আবার ভালোও লাগছে।
মায়াঃ আচ্ছা এই বাড়িটা তো সোহাগ মির্জার। এই শহরের অনেক বড় বিসনেজম্যান সে। মা তো তার নাম শুনতেই ফ্যান। ইসস রে! আজ যদি মা থাকতো! যাই হোক, যেই জন্য আশা, সোহাগ মির্জার সাথে কয়েকটি ছবি তুলে বড় করে বাঁধিয়ে মাকে পাঠিয়ে দেব। মা যা খুশী হবে নাহ। উফফ আমার তো তরই সইছে না। ইচ্ছা করছে এখনই মায়ের সেই খুশী হওয়া মুখটা দেখি।

হঠাৎ পার্টির সবগুলো লাইট অফ হয়ে যায়। সবাই সামনে তাকায়। একটি আলো এসে সোহাগের উপরে পরেছে। পুরো অনুষ্ঠানের সবার নজর সোহাগের দিকে। সোহাগ সিঁড়ি থেকে নামছে আর সবাই হাত তালি দিচ্ছে। মায়াও সবার দেখাদেখি জোড়ে জোড়ে হাততালি দিতে থাকে। সোহাগ নিচে নেমে আসলে সবাই হাততালি বাজানো বন্ধ করে দেয়। আর মায়ার হাত এখনও তালি বাজিয়ে যাচ্ছে। সোহাগ আস্তে করে হেটে মায়ার কাছে এসে দাড়ায়। আলোটা গিয়ে সোহাগ আর মায়ার উপরে পরে। সবার দৃষ্টি এবার সোহাগ আর মায়ার দিকে। সোহাগের কেমন যানি মায়াকে খুব চেনাচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে খুব কাছের আপন কোনো এক স্বত্ত্বা। মায়ার মুখটাও যেন খুবই পরিচিত। একদম মিরার মতো তাকানোর অঙ্গভঙ্গি। আর চোখটা হুবোহু মিরার।

সোহাগ মির্জাঃ কে তুমি?
সাথে সাথেই পার্টির সবগুলো লাইট জ্বলে ওঠে। রুসা এসে মামার হাত ধরে বলে,
রুসাঃ আরে মামা এ আমার ব্রেস্ট ফ্রেন্ড মায়া। এবার আসো তো কেক কাটবে। সবাই সেই কখন থেকে ওয়েট করছে
রুসা সোহাগকে টেনে নিয়ে যায় কেকের কাছে। মায়াকেও ডাকে।
রুসাঃ কি হলো মায়া ওখানে দাড়িয়ে আছিস কেন এদিকে আয়।

মায়া এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মাহিরকে কোথাও খুঁজে পাই না। তারপর এসে সোহাগের পাশে দাড়ায়। সোহাগ কেক কেটে অচেতন ভাবে মায়ার মুখের কাছে ধরে। মায়া হা করে যেই কেকের টুকরাটা মুখে দিতে যাবে ওপাশ থেকে,
রুসাঃ একি মামা আমি তো এপাশে!

সোহাগ মির্জাঃ ওহহ সরি, ভুল হয়ে গেছে।
সোহাগ রুসার মুখে কেকের টুকরোটা দিলে মায়ার মনটা খারাপ হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, রুসা কত ভাগ্যবতী যে কিনা বাবার সাথে মামার ভালোবাসাটাও পেয়েছে। কত হাসি, খুশি, ভালোবাসা আর কেয়ারিং এ ভরপুর এই পরিবারটা। যেখানে সব আছে। ইসস! এরকম একটা পরিবার যদি আমারও থাকতো! তাহলে হয়তো আজ সমাজের মানুষের এতো অবহেলা সহ্য করতে হতো না।
এমন সময় রুসা এসে মায়ার মুখে মধ্যে কেকের একটা টুকরো ঢুকিয়ে দেয়।
রুসাঃ কি রে মুখপুড়ি! ওভাবে মুখ পুড়িয়ে থেকে কি ভাবছিস?

মায়াঃ কিছু না! ভাবছিলাম তোর মামার সাথে কয়েকটি ছবি তুলবো
রুসাঃ তোল তোকে কে বারন করেছে?
মায়াঃ না কেউ বারন করে নি কিন্তু তোর মামা যদি না বলে দেয়? তুই যা গল্প শুনিয়েছিলি আমার তো দেখেই ভয় লাগছে যদি চর, থাপ্পড় কিছু একটা বসিয়ে দেয়
সোহাগ মির্জাঃ কে কাকে মারবে?
মিরা তাকিয়ে দেখে সোহাগ সামনে দাড়ানো।
মায়াঃ আপনি মারবেন।

সোহাগ মির্জাঃ মানে?
মায়াঃ হ্যাঁ। আমি রুসার কাছে শুনেছি খুব মারতেন আপনি আপনার স্ত্রীকে।
মায়ার এমন কথা শুনে সোহাগের মাথাটা নিচু হয়ে যায়। মায়া আবার বলে,
মায়াঃ কিন্তু খুব ভালোবাসেন। একদম সিনেমার হিরোদের মতো
সোহাগ মায়ার এই কথাটা শুনে হেসে দেয়।

সোহাগ মির্জাঃ তাই বুঝি! তুমি কিভাবে যানলে আমি আমার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসি?
মায়াঃ কেন আঙ্কেল আমি কি মিথ্যা বলেছি? আপনি ভালোবাসেন না আপনার স্ত্রীকে।
সোহাগ মির্জাঃ হুমম। বাসি তো।
এভাবে মায়া আর সোহাগের ভেতর কথা শুরু হয়। অনেক কথা হয় দুজনের মধ্যে কিন্তু কেউ যানে না দুজনের মাঝে থাকা রক্তের সম্পর্কের কথা। কথা বলতে বলতে মায়া কয়েকটা ছবিও তুলে নেয় সোহাগের সাথে, মাকে পাঠাবে বলে। অতঃপর মায়া পুরো পার্টিতে মাহিরকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও না আছে মাহির আর না আছে স্নিগ্ধা।


পর্ব ২০

রাত দুইটা বাজে, মায়ার চোখে এখনও ঘুম নেই। মাহিরটাও বাড়িতে ফেরেনি। বিছানায় শুয়ে মায়ার মনে মাহিরকে নিয়ে চিন্তা আসে, আচ্ছা উনি তো আমার আগেই বের হয়েছিল তাহলে পার্টিতেও গেলো না, বাসায়ও ফিরলো না, মানুষটা গেল কোথায়? তবে কি উনি আজ রাতে ফিরবেন না? স্নিগ্ধা ম্যামের সাথেই রাতটা থাকবে? নাহ এ আমি কি ভাবছি! উনি ঠিক চলে আসবে। মুখে যায় বলুক উনি শুধু আমাকে ভালোবাসে। শুধুই আমাকে। আমি ছাড়া উনি আর কারও না। আমি উনাকে বিশ্বাস করব। যেই বিশ্বাস উনাকে একদিন আমার কাছে ঠিক ফিরিয়ে আনবে। উনি আমার! শুধুই আমার। আমি উনাকে এতোটা ভালোবাসা দেব যতোটা ভালোবাসা কেউ কাউকে কোনোদিনও দিতে পারে না। সেই ভালোবাসার জোরেই উনাকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে।

চিন্তায় ঘুম আসে না মায়ার। তাই বিছানা থেকে উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাড়ায়। এক ঘন্টা মায়া এভাবে দাড়িয়ে আছে। এখন ঘড়ির কাটায় বাজে তিনটা। এমন সময় হঠাৎ দরজায় টোকা পরে। মায়া শব্দ শুনে দরজাটা খুলে দিতেই মাহির এসে মায়ার উপর ঢুলে পরতে যায়। মায়া মাহিরকে শক্ত করে ধরে।
মায়াঃ কি হয়েছে আপনার? এই রকম কেন করছেন?
মাহির বিরবির করে বলতে থাকে,
মাহিরঃ ও নস্টা মেয়ে না। ও নস্টা মেয়ে না।

মায়া কিছু বুঝে উঠতে পারে না। মাহিরকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। মাহিরের পায়ের জুতো খুলে শার্ট খুলতে যায় তখন শার্টের পকেটে অনেকগুলো ছবি দেখতে পায়। ছবি গুলো আবির আর মায়ার আজকে বিকালে হাদিচ পার্কে দেখা করতে গেলেই কেউ হয়তো লুকিয়ে তুলেছে। মায়া মাহিরের গায়ে কোম্বলটা টেনে দিয়ে আবিরকে ফোন দেয়।
আবিরঃ হ্যালো মায়া। কেমন আছো?
মায়াঃ আপনাকে বলেছিলাম না আমার সাথে ২য় বার যোগাযোগ রাখার চেস্টা করবেন না? তারপরও কেন এমন করেছেন?
আবিরঃ কি করেছি আমি?
মায়াঃ কি করেছেন সেটা বুঝতে পারছেন না?

আবিরঃ না
মায়াঃ আজ বিকালে আপনার সাথে আমি যখন দেখা করেছিলাম সেই সময়ে কাউকে দিয়ে আমার আর আপনার কথা বলার কিছু ছবি তুলিয়েছেন। আমার চরিত্র খারাপ প্রমাণ করতে চান?
আবিরঃ কি বলছো এসব!

মায়াঃ ঠিকই বলছি। এতো নিচে নেমে গেছেন আপনি?
আবিরঃ তোমার কোথাও বুঝতে একটু ভুল হচ্ছে মায়া। আমি এমন কিছুই করি নি।
মায়াঃ মিথ্যা বলবেন না। আপনার সব চালাকিই আমার যানা আছে। এসব করলে কখনও আপনার জীবনে আমি ফিরে যাবো না শুনে রাখুন।
বলেই ফোনটা কেটে দেয় মায়া।
টুট টুট টুট

আবিরঃ হ্যালো মায়া মায়…
তুমি আমাকে ভুল বুঝলে মায়া। আমি এমন কিছুই করি নি যাতে তোমার অসম্মাণ হয়। আমি যানিও না কে এটা করেছে! তবে আমার মন বলছে সে ঠিকই করেছে। তোমার মতো একটা মেয়েকে কখনোই ডা.মাহির খান ডিজার্ভ করে না।

আবিরের সাথে কথা বলার পর মায়া পিছনে ঘুরে দেখে মাহির বসে আছে। নেশাগ্রস্ত অবস্থা ঝিমাচ্ছে আর মিটমিট করে চেয়ে মায়াকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকছে। মায়া কাছে গিয়ে দাড়ালে মাহির এক টানে মায়ার হাত ধরে টেনে নিজের কোলের উপর বসায়। তারপর থুতনিটা মায়ার ঘারে রেখে বলে।
মাহিরঃ ওই আবির চৌধুরী…. তোমার প্রেমিক তাই না? ওর সাথেই তোমার.. বিয়ে হওয়ার…কথা.. ছিল! তুমি এখনও ওকেই ভালোবাসো।
মায়াঃ এসব কি বলছেন আপনি?

মাহিরঃ আচ্ছা আবির চৌধুরী তোমার… কোথা…য় কোথায় ছুয়েছে?
মায়া ভালো করে যানে মায়াকে কেউ ছুলে মাহির তা সহ্য করতে পারে না। কেউ যদি মায়ার হাত একবার ধরে তাহলে মাহির নানান বাহানা খুঁজে মায়ার হাত দশবার ধরবে। কাল ডা.নাহিদ কোলে তুলতে চেয়েছিল বলে বাড়ি এসে বসে ছিল মায়াকে কোলে তুলবে বলে। মায়ার মনে এখন দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছে।
মাহিরঃ কি হলো বল..লো.. কো..থায় কোথা..য় ছু..য়েছে আ..বির চৌধুরী তোমা..কে?

মায়া মাহিরের হাতটি নিয়ে নিজের কপালে, গলায়, বুকে আর ঠোঁটে মাহিরের হাতের আঙুল ছোয়ায়।
মায়াঃ এখানে, এখানে, এখানে আর এখানেও ছুয়েছে
মাহিরঃ আমিও ছো…বো
মাহির হাত দিয়ে মায়ার কপালে, গলায়, বুকে আর ঠোঁটে আলতো ভাবে ছুইয়ে দিতে থাকে।
মায়াঃ এভাবে ছুঁই নি।

মাহিরঃ তা.. কিভাবে?
মায়াঃ ঠোঁট দিয়ে
মাহির ঠোঁট দিয়ে মায়ার কপালে, গলায়, বুকে আর ঠোঁটে গভীর পরস এঁকে দেয়।
মাহিরঃ আর কো..থায়?
মায়াঃ আর কোথাও না। আপনি ঘুমান এখন কাল সকালে হসপিটালে যেতে হবে না?
মাহিরঃ হুমম। তাহ..লে ঘু..মাই।

মাহির শুয়ে পরলে মায়া কম্বলটা টেনে দিয়ে মাহিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর যখন মাহির ঘুমিয়ে যায় তখন বালিশটা নিয়ে সোফায় গিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পরে।
সকালে,
মাহিরের ঘুম ভাঙলে খেয়াল করে মাথাটা প্রচন্ড আকারে ব্যাথায় চিরে নিয়ে যাচ্ছে। দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে মাহির আস্তেধীরে উঠে বসে। তাকিয়ে দেখে মায়া লেমন সরবত নিয়ে সামনে দাড়ানো। সরবতটা মাহিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে মায়া মাহিরকে বলে,
মায়াঃ এই সরবতটা খেয়ে নিন ভালো লাগবে!

মাহির মায়ার হাত থেকে সরবতটা নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়।
মাহিরঃ সমস্যাটা কি তোমার? আর কতদিন বলবো? সাত সকালে তোমার ওই মুখটা আমার দেখতে ভালো লাগে না!
মায়াঃ আমি তো
মাহিরঃ তুমি কি? যাও আমার সামনের থেকে।
মাহিরের মা কিচেনে রান্না করছিল। মাহির ওভাবে সরবতের গ্লাস ছুড়ে ফেলে দেওয়ায় মাহিরের মা মুফতি খান কাচ ভাঙার শব্দ শুনে ছুটে আসে।
মুফতি খানঃ কি হলো বৌমা কিছু কি ভাঙলো?

মায়া গিয়ে তার শ্বাশুড়ি মাকে জড়িয়ে ধরে। আর কাঁদতে থাকে।
মায়াঃ আপনার ছেলেটা খুব পঁচা মা। উনাকে বলুন না আমার সাথে যেন এমন না করে। সবসময় উনি শুধু আমাকে অপমান করার বাহানা খোঁজে।
মাহিরঃ মা ও…
মাহিরের মা মাহিরকে হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয়। তারপর মাহিরকে জিজ্ঞাসা করে,

মুফতি খানঃ আমি জানতে চাই বৌমা যা বলছে তাকি সত্যি নাকি মিথ্যা? তুই আমার বৌমাকে কস্ট দিস?
মাহিরের মুখে কোনো কথা নেই। মাহিরের মা আবার বলা শুরু করে।
মুফতি খানঃ তোকে কি আমরা এই শিক্ষা দিয়েছি? যে বউয়ের সাথে একটু নম্রস্বরে কথা বলতে পারিস না? তুই তো আগে এমন ছিলি না মাহির। এখন কি তুই তোর শিক্ষা, দিক্ষা সব কিছু ভুলে যাচ্ছিস?

মায়াকে বলে, পরের বার তোমার সাথে মাহির খারাপ ব্যাবহার করলে এভাবে কাদঁবে না মা। আমাকে এসে নালিস করবে। ঠিক আছে?
মায়া মাথা কাত করে হ্যাঁ বলে।
তারপর মাহিরের মা মাহিরকে ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতে বলে চলে যায়। মাহির অগ্নি দৃস্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে ওয়াশরুমে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে এসে মায়ের সামনে মায়ার সাথে ব্রেকফাস্ট করে মায়াকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারপর মাঝপথে গিয়ে মাহির তার গাড়ীটা থামিয়ে দিলে মায়া গাড়ী থেকে নেমে ইজিবাইকে উঠে হসপিটালে যায়। আর মাহির যায় স্নিগ্ধার বাসায় স্নিগ্ধাকে নিয়ে হসপিটালে যাবে বলে। যা মাহির প্রতিদিন করে।


পর্ব ২১

আজ শুক্রবার। মিরার ছুটির দিন। শীতের সকালে লেপের মধ্যে মুখ গুজে এখনও শুয়ে আছে মিরা। আর ভাবছে, সেই ২০ বছর আগের দিনটার কথা। যেদিনটা সবকিছু ঠিক হয়ে গিয়েছিল। না ছিল কোনও মান-অভিমান। আর না ছিল কোনও ভুল বুঝাবুঝি। ছিল শুধু একে অপরের প্রতি ভালোবাসা। রাইসূল দেশে ফেরার পর মা আর রাইসূলকে সোহাগ বলে দিয়েছিল মির্জা প্যালেসেই থাকতে হবে। এতে সোহাগও তার বোনকে মিস করবে না আর মিরাও তার মা, ভাইকে মিস করবে না। তারপর হাসি, আনন্দ আর যত্নে ভরপুর একটা পরিবারে ভালোই চলছিল তাদের দিন। এতো আনন্দের মাঝে কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল! হয়তো সুখ বেশি দিন থাকে না তাই এমনটা হয়েছে।
অতীত,

সেদিন মিরা প্রেগনেন্সির রিপোর্টটা নিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয়েছিল। হসপিটালের সামনেই হাসানের সাথে দেখা। হাসান মিরাকে একা পেয়ে জোড় করে তুলে নিয়ে যেতে চাই মিরা কোনমতে হাসানের কবল থেকে পালিয়ে আসে। আর পালানোর সময় রিপোর্টটা সেখানেই পরে যায়। মিরা ফিরে এসে সোহাগকে আর হাসানের কথা বলে নি সোহাগ চিন্তা করবে বলে। দু’দিন পর সোহাগের জন্মদিন। তাই মিরা ঠিক করে নেয় সোহাগকে সারপ্রাইজ পার্টি দেবে।

সাথে এটাও বলবে আমি আপনার সন্তানের মা হতে চলেছি সোহাগ মির্জা। কিন্তু পার্টির দিন হাসান এসে সব কিছু লন্ড ভন্ড করে দেয়। হাসান নিজেকে দাবী করে মিরার সন্তানের বাবা হিসেবে। মিরা অনেকবার সোহাগকে বোঝায় কিন্তু সোহাগ বোঝে না। সোহাগের শুধু একটাই কথা তোমার প্রেগনেন্সির কথা আমায় আগে কেন যানাও নি। আর হাসানের কাছেই বা তোমার রিপোর্টটা গেল কিভাবে? নিজের স্ত্রী আর সন্তানকে অস্বীকার করে ওই বাইরের হাসানের কথার গুরুত্ব বেশি দিয়েছিল সেদিন সোহাগ। সকলের সামনে মিরাকে করেছিল অপমান, দিয়েছিল অপবাদ। মিরা অনেক মিনতি করেছে কিন্তু সোহাগ শোনে নি।

রেগে গেলে যে মানুষটার মাথার ঠিক থাকে না। তাই বলে সোজা বাড়ি থেকেই মিরাকে বের করে দেবে? মিরা তো সোহাগের পায়ে পর্যন্ত পরেছিল, বলেছিল আপনি ছাড়া আমি একদম নিস্ব। প্লিজ আমাকে একটু থাকতে দিন। আমি আপনার বাড়িতে কোনো এক কোণে পরে থাকব। দিন শেষে শুধু আপনাকে দেখব তবুও এভাবে তারিয়ে দেবেন না। সোহাগ মিরার কোনো কথাই শুনি নি। মিরাকে তারিয়ে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। দরজার ওপাশ থেকে হাসান এসে মিরার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। মিরা হাসানের থেকে হাতটা ছাড়িয়ে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে মিরা চলে আসে সোনাডাঙ্গার বাস স্যান্ডে।

চারিদিকে হাসানের লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিরা সবার চোখ এড়িয়ে খুলনা টু ঢাকার বাসটিতে উঠে পরে। বাস চলতে শুরু করে আর মিরার মধ্যে এক নির্বাক যন্ত্রণা ও ভয় কাজ করে। এমন সময়ে মিরার পাশের সিটে বসে থাকা যাত্রী নিরু আপা মিরার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা শুনে ঢাকায় পৌঁছে মিরাকে তার আশ্রমে নিয়ে যায়। সেই আশ্রমে মিরা বৃদ্ধ মানুষদের সেবা করে কাটিয়ে দেয় জীবনের ১৯টা বছর।

মিরার মেয়ে মায়া। যার কাছে মিরা তার সন্তানের বাবার পরিচয়টা গোপন রেখেছে। মিরা চাই নি মায়া যানুক তার বাবা কে! টেলিভিশনে যতবারই সোহাগের সাক্ষাৎ দেখাতো মিরা এক ধ্যানে সবকিছু ছেড়ে টেলিভিশনের সামনে পরে থাকত। শুধু সোহাগের মুখটা দেখবে বলে। মায়া কিছু জিজ্ঞাসা করলে মিরা বলতো সে সোহাগের অনেক বড় ফ্যান। মায়াও যখন কোনও পত্রিকায় সোহাগের কোনো ফটো ছাপা হতো সেই ফটো কেটে এনে মিরাকে গিফট করত। মিরার তখন ঠোঁটের কোণে এক চিলতি হাসি ফুটে উঠত। যা দেখে মায়ারও ভালো লাগত। কিন্তু মায়াকে কখনও মিরা বুঝতেই দিত না সোহাগ আসলে তার বাবা!

হঠাৎ একদিন আবির তার বাবা-মাকে সাথে করে মায়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। মায়াও রাজি হয়। বিয়ের দিনখন সব ঠিক ঠাক। মিরাও মেয়ে বিয়ে দেবে বলে খুব ধুমধাম করে আয়োজন করে। জীবনের সব পুঁজি খরচ করে ফেলে মেয়ের বিয়ের জন্য। বিয়ে পরানোর সময় যখন মেয়ের বাবার নাম জিজ্ঞাসা করা হয় তখন মিরা চুপ থাকে। বলতে পারে না মায়ার বাবার নাম। উক্ত পরিস্থিতিতে সকলেই মিরাকে আবার অপবাদ দেয়। মায়াকেও সবাই বলে পিতৃপরিচয়হীন একটি মেয়ে। আবিরকে তার বাবা-মা নিয়ে যায় বিয়ের আসর ছেড়ে। তখন সবাই বলে মায়াকে কেউ বিয়ে করবে না। কেউ জড়াবে না মায়ার মতো মেয়ের সাথে সম্পর্কে।

এমন সময়ে কোথা থেকে যেন সোহেব খান আর তার স্ত্রী মুফতি খান এসে মিরাকে বলে মায়াকে তারা পুত্রবধূ হিসেবে পেতে চাই। তারা নাকি মায়াকে অনেক আগে থেকেই চেনে। মায়া খুব ভালো মেয়ে যার সাথে তাদের ছেলে মাহির খুব ভালো থাকবে। মাহিরকে তারা ফোন করে বিয়ের আসরে আনে। মাহির বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে রাজি হয়ে বিয়ে করে নেয় মায়াকে। মিরা মাহিরকে বলেছিল, আমার মেয়েটাকে তুমি কখনও কস্ট দিও না বাবা। ও ছোটবেলা থেকে বাবাকে পাই নি ঠিকই কিন্তু আমি ওকে বাবা-মা কোনও কিছুর অভাব বুঝতে দিয় নি। ওর দুইটা পরিচয় এক। ওর বাবাও অামি আর মাও আমি দুই। ও তোমার স্ত্রী। ওর মধ্যে ছেলে মানুষিতে ভরপুর। কিন্তু ভেতরটা একদম পরিষ্কার। ওকে তুমি একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিও।

মিরা মাহিরকে আরও বলে বাবা আমার মেয়েটাকে আমি একজন আদর্শ ডাক্তার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দেখও আমার সেই স্বপ্নটা আজ পূরণ হলো না ঠিকই তবে এমন একজনের হাতে ওকে তুলে দিচ্ছে যে খুলনার অনেক বড় একটা হসপিটালের ডাক্তার।
মাহির তখন মিরাকে থামিয়ে বলে আপনার মেয়ে যদি চায় তাহলে সেও একদিন ডাক্তার হবে। আমি নিজে ওকে সেইদিকটাই সাপোর্ট করবে।

মাহিরের কথায় মিরা অনেকটা খুশি হয়। মাহির মায়াকে বিয়ে করে খুলনায় নিয়ে আসে। মায়া চলে যাবার পর মিরা একদম একা হয়ে যায়। মায়ার বিয়ের দিন মিরা মায়ার বাবার নাম না বলায় আশপাশের মানুষও অনেক কথা বলা শুরু করে। মিরা পারে না এতো অপমান সহ্য করতে। তাই সেখান থেকেও চলে আসে বরিশাল। এখানে এক পুরোনো বান্ধবী রুমার সাহায্যে নিয়ে একটা স্কুলে জব পায়। ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুলে থাকলে সারাদিন শাসন করে, আদর করে কাটিয়ে দেয়। আর রাতের সময়টুকু মাঝে মাঝে মায়ার সাথে ফোনে কথা হয় না হলে টেলিভিশন দেখে কেটে যায়।
বর্তমান

মাহির গাড়ি নিয়ে স্নিগ্ধার বাড়ির সামনে এসে জোড়ে জোড়ে হর্ণ বাজাতে থাকে। স্নিগ্ধা এসে গাড়ীতে উঠলেই মাহির গাড়ি স্ট্যাড দেয়।
স্নিগ্ধাঃ গুড মনিং জান
মাহিরঃ।
স্নিগ্ধাঃ গুড মনিং বলেছি তোমাকে আমি?
ন্যাকা ন্যাকা ভাবে বলে।

মাহিরঃ।
মাহিরের কোনও প্রতিউত্তর না পেয়ে স্নিগ্ধা এবার রেগে যায়।
স্নিগ্ধাঃ কথা কানে যাচ্ছে না তোমার?
মাহিরঃ।,

স্নিগ্ধা মাহিরের শার্টের কলার ধরে নিজের সামনে টেনে আনে,
স্নিগ্ধাঃ ওই নষ্টা মেয়েটার জন্য তুমি আমার উপর এখনও রেগে আছো?
মাহির কিছু না বলেই গাড়িটা থামিয়ে দেয়।
মাহিরঃ গাড়ি থেকে নামো!
স্নিগ্ধাঃ মানে?

মাহিরঃ মানে বুঝছো না?
মাহির গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে এসে স্নিগ্ধার পাশ থেকে গাড়ির দরজাটা খুলে,
মাহিরঃ নামো।
স্নিগ্ধাঃ নাহ।

মাহির স্নিগ্ধার হাত ধরে টেনে গাড়ির থেকে নামিয়ে দেয়। তারপর ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়িতে স্ট্যার্ড দিয়ে স্নিগ্ধাকে রেখে চলে যায়।
স্নিগ্ধা হা হয়ে আছে। এতো বড় অপমান?
স্নিগ্ধঃ মাহিরের সাহস হয় কিভাবে আমার সাথে এমনটা করার? ওই মেয়েটার জন্য? এর শোধ আমি নিয়ে ছাড়বো।


পর্ব ২২

হসপিটালে
রাইসূলের দেওয়া ২৪ ঘন্টা পার হতে আর মাত্র ২ ঘন্টা বাকি। এর মধ্যে পুলিশ এসেও বসে আছে। হসপিটালের সব ডাক্তার ধরে নিয়েছে মাহিরের ডাক্তারি আজ এখানেই শেষ। মাহির হসপিটালে এসে দেখে শ্যামলি বসুর বাড়ির লোকজন অনেক চিৎকার চ্যাচামেচি করছে। সাথে চলছে জনগনের আহাযারি। মিরা মেডিকেল হসপিটাল হায়! হায়! মিরা মেডিকেল হসপিটাল হায়! হায়! ইট, পাটকেল যে যা পাচ্ছে সবাই হসপিটালের উপর ছুড়ে মারছে। মাহির এসে ভীর ঠেলে রাইসূলের কেবিনে যায়। রাইসূল খুব ক্ষিপ্ত হয়ে বসে আছে। মাহির রাইসূলের সামনে গিয়ে দাড়ালে রাইসূল পুলিশকে দেখিয়ে দেয়।

এই সেই ব্যক্তি নিয়ে যান একে। পুলিশ এসে মাহিরের সামনে দাড়ালে মাহির রাইসূলের কাছে ২ ঘন্টা সময় চাই। রাইসূলের মাথার ঠিক থাকে না। সে অনেক রেগে পুলিশকে বলে মাহিরকে যতদ্রুত সম্ভব চোখের সামনে থেকে নিয়ে যেতে। মাহির অনেক বোঝানোর চেস্টা করে রাইসূল কিছুতেই শুনতে চাই না। তারপর পুলিশ মাহিরকে এ্যারেষ্ট করে বাইরে আনলে সবাই জোরে জোড়ে ইট, পাটকেল ছুড়তে থাকে। একটা ইটের টুকরো এসে মাহিরের কপালে লেগে কপালটা কেটে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে জনগনকে পিটিয়ে রাস্তা ফাঁকা করে মাহিরকে জীপে উঠিয়ে খালিশপুর থানায় নিয়ে আসে।

মায়া ইজিবাইকে করে হসপিটালে আসায় একটু দেরি হয়ে যায়। মাহিরকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পরে মায়া হসপিটালের মধ্যে ঢোকে। এতো চিৎকার চ্যাচামেচি কিসের সেটা ভাবতে ভাবতে ক্লাসরুমে যায়। আজকের প্রথম ক্লাসটা ছিল ডাক্তার মাহিরের সাথে। মাহিরকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ায় সব স্টুডেন্ট ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মায়া ক্লাসরুম ফাঁকা পেয়ে সবাইকে খুঁজতে খুঁজতে ক্যান্টিনে গিয়ে সকলের আলোচনা শুনে কেঁপে ওঠে।

মাহিরকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে শুনে মায়া কাঁদতে কাঁদতে মাহিরের কেবিনে ছুটে যায়। পুরো কেবিনে তন্ন তন্ন করে খোঁজে গতকালকের স্টোররুমে পাওয়া শ্যামলি বসুর সেই নকল ফাইলটি। তারপর খেয়াল করে টেবিলের উপর গতকালের স্টোররুমে পাওয়া সেই নকল ফাইলটি পরে আছে। মায়া আর কিছু না ভেবেই ফাইলটা নিয়ে হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে যায়। এমন সময় রাস্তায় বেরিয়ে তারাতারি কোনও রিক্সা বা ইজিবাইক না পেয়ে দৌড়াতে থাকে।

পুরো রাস্তা দৌড়াতে দৌড়াতে থানায় আসে।
মায়া থানায় আসার পর খুব ক্লান্ত হয়ে যায়। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। পাশে একটা পুলিশকে যেতে দেখে ডাক দেয়।
মায়াঃ ভাইয়া শোনেন, এখানে ডাক্তার মাহিরকে ধরে এনে কোথায় রেখেছে বলতে পারেন?
পুলিশটা মায়ার মাথার থেকে পা পর্যন্ত তাকিয়ে দেখে মায়ার হাত পা কাপছে।
পুলিশঃ আপনি কে?

মায়াঃ আমি উনার…
মায়া কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না আমতা আমতা করে যায়
পুলিশঃ কি হলো বলুন আপনি উনার কে?
মায়াঃ আমি উনার স্টুড…

পাশ থেকে মাহিরের বাবা সোহেব খান এসে বলে
সোহেব খানঃ স্ত্রী। উনি ডা.মাহির খানের স্ত্রী
পুলিশঃ ওহহ। আর আপনি?
সোহেব খানঃ আমি ডা.মাহির খানের বাবা
পুলিশঃ আচ্ছা, তাহলে ভেতরে আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি।
বলে পুলিশটি সামনে আগাতে থাকে।

মায়া সোহেব খানকে এখানে দেখে অবাক হয়। তাই জিজ্ঞেসা করে,
মায়াঃ বাবা আপনি এখানে? আপনি কিভাবে জানলেন?
সোহেব খানঃ টিভিতে দেখলাম। প্রতিটা চ্যালেনে এই একই নিউজ। ডা.মাহির খান ভুল অপারেশন করে একজন সুস্থ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই হসপিটাল কর্তৃপক্ষ হসপিটালের সুনাম নস্ট হওয়ায় কেস করেছে মাহিরের নামে।
মায়াঃ বাবা! এসব টিভিতেও দেখাচ্ছে?

সোহেব খানঃ হ্যাঁ রে মা। বাবা হয়ে কি এসব দেখে আর চুপচাপ বসে থাকতে পারি? তাই চলে আসলাম!
সোহেব খান কথাটা বলে খুব ভেঙে পরে। মায়া তাকে ধরে মাহিরের সাথে দেখা করতে যায়।
মায়াঃ স্যার
মাহির গারদের ভেতর থেকে তাকিয়ে দেখে মায়া আর বাবা এসেছে।
মাহির এগিয়ে আসলে মায়া মাহিরের কপাল থেকে রক্ত ঝড়তে দেখে। মায়ার খুব কস্ট হচ্ছে মাহিরকে এই অবস্থায় দেখে।
মাহিরঃ মায়া। বাবা বিশ্বাস করো কেউ আমাকে ফাঁসানোর চেস্টা করেছে।
সোহেব খানঃ আমি যানি বাবা তুই এমনটা করতে পারিস না।

মাহির মায়ার দিকে তাকালে, মায়া ওড়নার আঁচলটা উঠিয়ে গারদের গ্রিরিলেল ফাঁক দিয়ে মাহিরের মুখটা ছুয়ে দেখে। তারপর কপালের থেকে রক্ত মুছে দেয়। মাহির মায়ার নাম ধরে ডেকে উঠলে। মায়া মাহিরের সামনে ফাইলটা ধরে।
মায়াঃ স্যার এই সেই ফাইলটা এটা পুলিশকে দিলে তারা কি আপনাকে ছেড়ে দিবে?
মাহিরঃ না মায়া এই ফাইলে কিছু প্রমাণ হবে না। পুলিশ তো ভাববে আমি এই ফাইলটা বানিয়ে রেখেছি নিজেকে বাচাঁনোর জন্য।
মায়াঃ তাহলে?

মাহিরঃ আমি ফিঙ্গার পেন্ট রিপোর্ট বের করেছিলাম। এই ফাইলটাই আমি ছাড়াও হসপিটালের আরও একজন ডাক্তারের হাতের ছাপ আছে। আমার মনে হয় সেই আমাকে ফাঁসাতে চাই। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আমি জোগাড় করতে পারি নি।
মায়াঃ তাহলে কি হবে? কিভাবে প্রমাণ হবে আপনি র্নিদোষ?
মাহিরঃ একটা উপায় আছে।
মায়াঃ কি?

মাহির মায়াকে একটা প্ল্যান দেয়।
মাহিরঃ বুঝতে পেরেছো কি করতে হবে?
মায়াঃ হ্যাঁ। কিন্তু সেই ফিঙ্গার পেন্ট রিপোর্টটা কোথায়?
মাহিরঃ আমার কেবিনে টেবিলের উপর একটা বই রাখা আছে। সেই বইয়ের মধ্যে রেখেছিলাম।


পর্ব ২৩

মায়ার চোখ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরে। মাহির দেখে গারদের গিরিলের উপর রাখা মায়ার হাত দুটি নিয়ে নিজের হাতের আঙুলে মায়ার হাতের আঙুল চেপে ধরে এক অপলক দৃস্টিতে মায়ার মুখপানে তাকিয়ে থাকে। মায়ার হাতের এই স্পর্শ মাহিরকে কাল রাতের কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়।
মাহিরঃ কাল রাতে কি করেছিলে তুমি আমার সাথে?
মায়াঃ আমি?

মাহির চোখদুটো বড় বড় করে মায়ার দিকে তাকায়। যা দেখলে মায়া সত্যিই ভয়ে মরে যাবে। মায়া মাথাটা ডানে, বামে ঝাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে,
মায়াঃ কই কিছু করি নি তো
মাহিরঃ একদম মিথ্যা বলবা না আমার সব মনে পরে গেছে
মায়াঃ কি মনে পরেছে?

মাহিরঃ আমাকে বোকা বানিয়ে আদর খেয়েছো!
মায়া কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না।
মায়াঃ সরি আমি আসলে
মাহিরঃ থাক আর বলতে হবে না। এর শাস্তি তো তোমায় আমি বাইরে এসে দেব। এতো বড় সাহস তুমি পাও কোথায়?
মায়াঃ আমি ভেবেছিলাম আপনি..

মাহিরঃ আমি কি?
মায়াঃ কিছু না। আপনি আগে বাইরে আসুন তো তারপর আমাকে যে শাস্তি দেবেন দিয়েন।
কথাটা বলেই মায়া কেঁদে দেয়।
মাহিরঃ এই মেয়ে কাদঁছো কেন?
মায়া কাঁদতেই থাকে।

মাহিরঃ আচ্ছা থামো। এবারের মতো তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আর কখনও যেন এমনটা করা হয় না। মনে থাকবে?
মায়া তবু্ও কেঁদে চলেছে। মাহির জোড়ে একটা ধমক দেয়।
মাহিরঃ থামো বলছি।

মাহিরের ধমক শুনে মায়া কেঁপে ওঠে। ভয়ে ভয়ে মাহিরের দিকে তাকায়। দেখে মাহির মুচকি মুচকি হাসছে।
মায়াঃ আপনি সত্যিই খুব খারাপ। এমন একটা পরিস্থিতিতেও আমাকে ধমকাচ্ছেন।
মাহিরঃ আচ্ছা আর ধমকাবো না যেটা বলেছি সেটা গিয়ে আগে কর।
মায়াঃ আমি যদি না পারি।

মাহিরঃ পারবে।
মায়াঃ আমার খুব ভয় করছে স্যার।
মাহিরঃ কিসের ভয়?
মায়াঃ হারিয়ে ফেলার ভয়। আমি পারবো না আপনাকে হারাতে।
মাহিরঃ কি বললে?
মায়া জ্বীব কামড়ে ধরে, কি বললাম এটা?

মাহিরঃ তুমি কিন্তু অনেক পেকে গেছো। তোমাকে এবার শাসন না করলে হচ্ছে না।
সোহেব খান উকিলের সাথে কথা বলছিল। সে এসে মায়া আর মাহিরের দিকে অসহায় দৃস্টিতে তাকায়।
মায়া শ্বশুরকে আসতে দেখে মাহিরের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে শ্বশুরের দিকে ঘুরে দাড়ায়। তারপর প্রশ্ন করে।
মায়াঃ কি হয়েছে বাবা?

সোহেব খানঃ উকিল বলেছে জামিন করানো যাবে না। কাল শনিবার কোর্ট বন্ধ। রবিবারে কেসটা কোর্টে উঠবে। আমাদের হাতে মাত্র দু’দিন সময় আছে। এর মধ্যেই যা করার করতে হবে। নইলে..
মাহিরঃ এতো চিন্তা করো না বাবা তোমার বৌমা আছে তো ও সব ঠিক করে দেবে।
মাহিরের মুখে বৌমা কথাটা শুনে মায়ার মনের ভেতরটা খুশিতে ভরে ওঠে। তাহলে কি মাহির মন থেকে মায়াকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিলো?
আবার মনে মনে ভাবতে থাকে, সে কি পারবে মাহিরকে নির্দোষ প্রমাণ করতে?

কিছুক্ষণ পর,
মায়া আর সোহেব খান বাড়িতে আসে। মায়ার শ্বাশুড়ি মা তখন সবজি কাটছে দুপুরে রান্না করার জন্য। সে কিছুই যানে না।
মুফতি খানঃ কি গো দুজন একসাথে কোথা থেকে আসছো?
বৌমা আজ কি হসপিটালে যাও নি?
এই তুমিও অফিসে না গিয়ে বৌমাকে নিয়ে আজ আবার কোথা থেকে আসছো?
তোমাদের এই অভ্যাসটা আর গেল না।

মাহির যদি যানতে পারে কি হবে যানো? ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বৌমাকে নিয়ে তুমি আজও নিশ্চয় ফুসকা খাওয়াতে গিয়েছিলে? এসবের জন্যই ওদের দুজনের মাঝে মনোমালিন্য চলে। তোমার অন্তত এসব বোঝা উচিৎ ছিল।
সোহেব খানঃ আহ মুফতি থামবে। সেই এসেছি ধরেই শুধু বকবক করে যাচ্ছো।
মুফতি খানঃ আমি বকবক করছি?

মায়াঃ প্লিজ থামো না তোমরা।
মায়া তার শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে গিয়ে সব খুলে বলে।

স্নিদ্ধা বসে বসে টিভিতে মাহিরের নিউজ দেখে চোখের পানি ফেলছে। নেহা ঠাসসসস করে ডা. নাহিদের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। মনা এসে নেহাকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।

মনাঃ তোমার সাহস হয় কিভাবে আমার ছেলের গায়ে হাত তোলার?
স্নিদ্ধা উঠে এসে ডা. নাহিদকে টেনে ধরে নেহার থেকেও জোড়ে একটা থাপ্পড় মারে।
মনা ভীষণ রেগে যায়। সিদ্ধার দিকে ঘুরে রাগী দৃস্টিতে তাকায়।
মনাঃ সিদ্ধা তুই তোর ভাইকে মারছিস?

নেহাঃ ঠিকই করেছে মেরে। একটা অকর্মের ঢেকি। একটা কাজও ঠিক ভাবে করতে পারে না।
সবার আগে আমার গল্প পড়তে চাইলে “নীল ক্যাফের ভালোবাসা” পেজে পাবেন।
মনাঃ দেখ নেহা তোমার শত্রুতা রাইসূল সিকদারের সাথে আর আমার শত্রুতা সোহাগ মির্জার সাথে।
নেহাঃ আর সেজন্যই এদের উপর প্রতিশোধ তুলতে আমি তোমার সাথে হাত মিলিয়ে ছিলাম।

তোমার ছেলে কি একটা কাজও ঠিক ভাবে করতে পারে না?
ডা.নাহিদঃ প্লিজ আন্টি বিশ্বাস করুন আমি আমার দিক থেকে যথেষ্ট চেস্টা করেছি রাইসূল সিকদারের স্বপ্নের হসপিটালের দুর্নাম করতে। ভেবেছিলাম আপনাদের সারপ্রাইজ দেব তাই প্লানটার কথা আগে বলা হয় নি।

স্নিগ্ধাঃ তোর প্ল্যানের চক্করে আজ আমার মাহিরটা ফেঁসে গেছে বেয়াদব।
সিদ্ধা ডা.নাহিদকে আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
ডা.নাহিদঃ আপু আমি আসলে…


পর্ব ২৪

মুফতি খানঃ নাআআআআআআ এ আমি বিশ্বাস করি নাআআআআ।
আমার মাহির কিছুতেই এমনটা করতে পারে না।
মায়াঃ মা আপনি শান্ত হোন। আমরা সকলেই যানি উনি কিছু করেন নি
মুফতি খানঃ আমি কিচ্ছু জানি না। আমার মাহিরকে তোমরা যেভাবেই হোক এনে দাও।

স্নিগ্ধাঃ ঠাসস
ডা. নাহিদঃ আপু আমাকে ক্ষমা..
স্নিগ্ধাঃ ঠাসস।
ডা.নাহিদঃ আপু আমি ইচ্ছে করে…
স্নিগ্ধাঃ ঠাসস।
ডা.নাহিদঃ বিশ্বাস করো আপু..
স্নিগ্ধাঃ ঠাসস।

ডা.নাহিদ যতবার কথা বলছে ততোবার চর খাচ্ছে। যতোবার কথা বলছে ততোবার ঠাসস ঠাসস করে চর খেতেই আছে স্নিগ্ধার হাতে। এমন সময়ে মনা এসে স্নিগ্ধাকে ঘুরিয়ে ঠাসস করে একটা চর বসিয়ে দিলে স্নিগ্ধা গালে তারপর গিয়ে থামে।
মনাঃ কোথাকার কোন ছেলে তার জন্য তুই তোর ভাইকে মারছিস?

স্নিগ্ধাঃ ও কোথাকার কোন ছেলে নয় মা। ও মাহির। আমার ভালোবাসা মাহির। যাকে আমি স্কুল লাইফ থেকে ভালোবেসে এসেছি। আজ তোমার গুনোধর ছেলে ওকে এমন ভাবে ফাঁসিয়েছে ইচ্ছে করছে তো ওকে মেরেই ফেলি।
কথাটা বলে স্নিগ্ধা সব জিনিসপত্র ভাঙতে শুরু করে।
নেহা, মনা, ডা.নাহিদ মিলে স্নিগ্ধাকে আটকানোর চেস্টা করে। কিন্তু স্নিগ্ধার যখন রাগ হয় তখন সে কাউকে মানে না।
মনাঃ এমনটা করিস না মা আমি দেখছি কি করা যায়। প্লিজ এখন থাম।

স্নিগ্ধা জিনিসপত্র ছুড়তেই থাকে। কারও কোনো কথা কানে নেয় না।
স্নিগ্ধাঃ আমার মাহিরকে আমি চাই। যেভাবেই হোক ওকে বাইরে বের কর।
বলছে আর ভাংচুর করেই যাচ্ছে।

স্নিগ্ধাকে কিভাবে শান্ত করা যায়? নেহা কিছু একটা ভেবে নাহিদ আর মনাকে পাশে ডাকে। তারপর নেহার কথামতো স্নিগ্ধাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়।
মনা আর নেহা স্নিগ্ধার হাত পা চেপে ধরে রাখে। ডা.নাহিদ এসে একটা ঘুমের ইনজেকশন দিলে স্নিগ্ধা ঘুমিয়ে যায়।
মনাঃ ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঠিক করলাম?
নেহাঃ এছাড়া যে স্নিগ্ধাকে এই মুহূর্তে বোঝানো খুব কঠিন হয়ে পরেছিল।

মাহির লকাপের ভেতরে বসে বসে ভাবছে স্নিগ্ধার কথা।
মাহিরঃ এমন একটা খবর তো স্নিগ্ধার কানে অনেক আগেই চলে গেছে। সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকাল হতে চলল খবরটা শুনেও স্নিগ্ধা আমায় দেখতে আসলো না? তাহলে কি স্নিগ্ধা আমাকে ভালোবাসে নি মন থেকে? আমিই ভুল করেছি ওর নাটকটা বিশ্বাস করে?

সেদিন মায়াকে বিয়ে করে আনার পর বাসর রাতে স্নিগ্ধা আমায় ফোন করেছিল। আমি কখনও ওর ভালোবাসায় সারা দেয় নি। শুধু ওকে একটা ভালো ফ্রেন্ড হিসেবে ভেবে এসেছি। ওকে ফ্রেন্ড ভেবেই বলেছিলাম আমার আর মায়ার বিয়েটার কথা। ও খবরটা শুনে আমাকে হুমকি দেয় আত্মহত্যা করবে। আমি ওর কোনও কথায় বিশ্বাস করি না। আমি বাসর ঘরে গিয়েছিলাম। মায়ার খুব কাছেও চলে এসেছিলাম হঠাৎ নাহিদের ফোন স্নিগ্ধা হসপিটালে।

ও নাকি বিষ খেয়েছে। তাহলে সবটাই ছিল সাজানো নাটক মাত্র। স্নিগ্ধা কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি, শুধুই জেদের বষে চেয়েছে। আর আমি কিনা বোকার মতো একটা বছর কাটিয়ে দিলাম! আমি তো মন থেকে শুধু মায়াকে ভালোবেসেছি। স্নিগ্ধা এমন ছেলেমানুষী যাতে না করে তার জন্য অভিনয় করেছি স্নিগ্ধার সাথে এতোদিন। কিন্তু আর না। এখন স্নিগ্ধা নিজেই যখন দূরে সরে যাচ্ছে আমি আমার মায়ার সাথে ভালোভাবে থাকতে পারবো। যতো ভুল বোঝাবুঝি আমাদের মধ্যে আছে সব ঠিক করে নতুন ভাবে সবকিছু শুরু করব। এখান থেকে বের হয়েই আগে মায়াকে বলব মায়া তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি।

পরের দিন সকালে,

হসপিটালে।
মায়াঃ নিধি, মিতু, রুসা, সজীব সবাই রেডী তো? ডা.নাহিদ এখনই বের হবে।
সজীবঃ কি করতে চাচ্ছিস বল তো তুই?
মায়াঃ কি দ না প!
সবাইঃ কিইইইইইই?

মিতুঃ এটা ঠিক না মায়া। একজন মানুষকে কিদনাপ করা আমার পক্ষে অন্যায় মনে হচ্ছে।
রুসাঃ আরে রাখ তো তোর অন্যায়। একজন নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাবে সেটা কি ন্যায়?
নিধিঃ আমার মনে হয় রুসা ঠিক বলছে। সবাই রাজি হয়ে যা। তাছাড়া মাহির স্যার কতো ভালো আমরা সবাই যানি।
সজীবঃ ঠিক আছে আমি রাজি।

একএক করে সবাই রাজি হয়। একসাথে সবাই হাত মিলিয়ে সামনের দিকে আগায়।
ডা.নাহিদ কেবিন থেকে বের হতেই তার নাকের সামনে সজীব একটা রুমাল চেপে ধরে। ডা.নাহিদ রুমালটা নাকের সামনে ধরার সাথেই সেন্সলেন্স হয়ে পরে যায়। মায়া, রুসা, মিতু নিধি এসে একটা মানকিটুপি ডা.নাহিদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর তাকে চাদরে মুড়িয়ে সবাই মিলে স্টোর রুমের কাছে যায়। সবাই যার যার মুখ থেকে ঢেকে রাখা চাদর সরিয়ে স্টোর রুমের চেয়ারে বসিয়ে ডা.নাহিদকে বাঁধে।


পর্ব ২৫

ডা.নাহিদ কেবিন থেকে বের হতেই তার নাকের সামনে সজীব একটা রুমাল চেপে ধরে। ডা.নাহিদ রুমালটা নাকের সামনে ধরার সাথেই সেন্সলেন্স হয়ে পরে যায়। মায়া, রুসা, মিতু নিধি এসে একটা মানকিটুপি ডা.নাহিদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর তাকে চাদরে মুড়িয়ে সবাই মিলে স্টোর রুমের কাছে যায়। সবাই যার যার মুখ থেকে ঢেকে রাখা চাদর সরিয়ে স্টোর রুমের চেয়ারে বসিয়ে ডা.নাহিদকে বাঁধে।

কিছুক্ষণ পর,
ডা.নাহিদের জ্ঞান ফেরে। সে মিট মিট করে চোখ মেলে চেয়ে দেখে সামনে মায়া, রুসা, মিতু, নিধি আর সজীব দাড়িয়ে আছে। রুসা একগ্লাস পানি ডা.নাহিদের মুখের উপর ছুড়ে মারে। সজীব যেয়ে ডা.নাহিদের চুলের মুষ্টি টেনে ধরে। মায়া ইনজেকশন নিয়ে সামনে আগাচ্ছে। মিতু, নিধি বেধে রাখা ডা.নাহিদের দু’পাশে দাড়িয়ে আছে।
ডা.নাহিদঃ প্লিজ ছেড়ে দাও আমায়।
মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখে বলে, ওটা কিসের ইনজেকশন?
রুসাঃ পাগলের!

ডা.নাহিদ ভয়ে আমতা আমতা করে।
ডা.নাহিদঃ না আমায় ছেড়ে দাও। তোমরা কত্তো ভালো। তাহলে এমনটা কেনও করছো?
মায়া এসে রুসার হাতে ইনজেকশনটা দেয়।
রুসাঃ সব সত্যি কথা বলবেন নইলে এই পাগলের ইনজেকশন আপনাকে দিয়ে দেব।
ডা.নাহিদ ভ্যাবাচেকা খায়।

ডা.নাহিদঃ সত্যি কিসের সত্যি?
সজীব ডা.নাহিদের চুলের মুষ্টি ধরে এক টান দেয়।
সজীবঃ ন্যাকামো হচ্ছে? চুপচাপ আমাদের কথা শোনেন নইলে।
ডা.নাহিদঃ নইলে কি? তোমরা আমার সাথে এমন কেন করছো আমি কিন্তু এবার চিৎকার দেব।
সজীব ডা.নাহিদের মুখটা চেপে ধরে।

সজীবঃ চিৎকার দেবেন? তার আগেই আপনাকে আমরা পাগলা গারদে পাঠাবো। কিরে রুসা দারিয়ে কি দেখছিস? দিয়ে দে ইনজেকশনটা।
রুসাঃ হ্যাঁ, দিচ্ছি।
সজীব ডা.নাহিদের মুখটা ছেড়ে দেয়।
ডা. নাহিদঃ এমনটা করো না তোমরা। বল কি সত্য বলতে হবে?

রুসাঃ এই তো পথে এসেছেন। এখন বলেন দেখি শ্যামলি বসুর নকল ফাইলটা কে বানিয়ে ছিল?
ডা.নাহিদঃ আমি যানি না। যা করেছে ডা.মাহির করেছে। সে তো তার শাস্তি পাচ্ছে তাহলে আমার সাথে কেন তোমরা এমন করছো?
মায়া গিয়ে ডা.নাহিদকে একটা চর বসিয়ে দেয়।
-ঠাসসস।

মায়াঃ ডা.মাহির স্যার কিছু করে নি। যা করেছেন আপনি করেছেন।
ডা.নাহিদঃ কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে যে আমি করেছি?
মায়া ডা.নাহিদের মুখের উপর ফিঙ্গার পেন্ট রিপোর্টটা ছুড়ে মারে।
মায়াঃ এই রিপোর্টটা দেখছেন? সেই নকল ফাইনালের হাতের ছাপ আপনার সাথে ম্যাচ করেছে। ফাইলটা আপনারই তৈরি।
ডা.নাহিদ ভয়ে ভয়ে তাকায়।

ডা.নাহিদঃ না মানে।
রুসাঃ না মানে এইসব কি? যা বলার পরিষ্কার করে বলুন। আপনি এসব কেন করেছেন?
ডা.নাহিদ সব খুলে বলে যে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল হসপিটালের সুনাম নষ্ট করা। ডা.মাহিরকে বিপদে ফেলা বা শ্যামলি বসুকে মেরে ফেলা না।
ডা.নাহিদের বলা কথাগুলো নিধি রেকর্ড করে আর মিতু ভিডিও করে রাখে।

তারপর মায়া ও তার বন্ধুরা ডা.নাহিদকে টানতে টানতে থানায় নিয়ে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয় প্রমাণ সহ। মাহিরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মাহিরকে লকাপ থেকে বের করে ডা.নাহিদকে লকাপের ভেতরে ঢুকানো হয়।
সবাই খুব খুশী হয় মাহিরকে বাইরে দেখে। মাহির মায়ার ফ্রেন্ডের ধন্যবাদ জানিয়ে মায়ার সামনে এসে দাড়ায়।
মাহিরঃ মায়া তোমাকে আমি..

মাহির কিছু বলতে চাচ্ছিল মায়াকে হঠাৎ কোথা থেকে যেন স্নিগ্ধা চলে আসে। মাহিরকে স্নিগ্ধা জড়িয়ে ধরেই হাওমাও করে কেঁদে দেয়।
স্নিগ্ধাঃ জান তোমাকে এখানে থাকতে হবে না। আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।
মায়া এমন দৃশ্য চোখের সামনে দেখে সেই মুহূর্তেই দৌড়ে থানার বাইরে চলে আসে।
মায়া চলে যাওয়ার পর মাহির স্নিগ্ধাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়।
মাহিরঃ চলে যাও স্নিগ্ধা। তোমার নাটক আমি আর দেখতে পারছি না।

স্নিগ্ধাঃ নাটক? আমার কস্টটাকে তোমার নাটক মনে হয়?
মাহিরঃ কিসের কস্ট তোমার? কাল সারাদিনে একবারও দেখতে এসেছো আমাকে? আজ এসে আবার তোমার এই মিথ্যে নাটক দেখাচ্ছো।
স্নিগ্ধাঃ বিশ্বাস কর মাহির কাল আমার কি হয়েছিল আমি নিজেই মনে করতে পারছি না। ঘুমিয়ে ছিলাম উঠে শুনি পুরো একদিন বিছানায় পরে পরে ঘুমিয়েছি।
মাহিরঃ আবার নাটক! দেখও স্নিগ্ধা অনেক হয়েছে আর না। এবার তোমার এই নাটক থেকে আমাকে মুক্তি দাও।

মাহির কথাটি বলে স্নিগ্ধাকে এড়িয়ে চলে যায়। থানার বাইরে গিয়ে দেখে মায়া রাস্তার এক পাশে দাড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে।
মাহির কান ধরে হাটু নুইয়ে মায়ার পিছনে বসে পরে। মায়াকে ডাকে।
মাহিরঃ মায়া
মায়া পিছনে ফিরে অবাক হয়ে যায়। মায়া কি তাহলে স্বপ্ন দেখছে? মায়া চোখদুটো হাতদিয়ে ভালো ভাবে ডলতে ডলতে মাহিরের দিকে তাকায়। না এতো সত্যি!
মাহিরঃ সরি মায়া।


পর্ব ২৬

মাহির কথাটি বলে স্নিগ্ধাকে এড়িয়ে চলে যায়। থানার বাইরে গিয়ে দেখে মায়া রাস্তার এক পাশে দাড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে।
মাহির কান ধরে হাটু নুইয়ে মায়ার পিছনে বসে পরে। মায়াকে ডাকে।
মাহিরঃ মায়া।

মায়া পিছনে ফিরে অবাক হয়ে যায়। মায়া কি তাহলে স্বপ্ন দেখছে? মায়া চোখদুটো হাতদিয়ে ভালো ভাবে ডলতে ডলতে মাহিরের দিকে তাকায়। না এতো সত্যি!
মাহিরঃ সরি মায়া।
মায়া মাহিরের এমন কান্ডে অবাক হয়ে যায়। মায়া সামনে বসে মাহিরের কান ধরে রাখা হাতদুটি নামিয়ে দেয়। তারপর মাহিরকে উঠিয়ে দাড় করায়। মায়া ছলছল চোখ দিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
মায়াঃ এটা আপনি কি করছেন?

তখন মাহির মায়ার গালটা দু’হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে।
মাহিরঃ আমি খুব খারাপ তাই না?
মায়াঃ আপনি এভাবে কেন বলছেন?
মাহিরঃ খুব কস্ট দিয় তোমাকে আমি?
মায়াঃ নাহ।

মাহিরঃ আজ কিছু কথা বলব শুনবে?
মায়াঃ হুমমম।
মাহিরঃ তোমাকে।
মায়াঃ কি?
মাহিরঃ তোমাকে আমি ভালোবাসি মায়া।

কথাটা বলেই মাহির থেমে যায়। মায়ার গালটা ছেড়ে দিয়ে মায়ার থেকে একটু দূরে সরে দাড়িয়ে তারপর আবার এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করে।
মাহিরঃ ভালোবাসি তোমায়! সেই প্রথম দিন থেকেই। যেদিন বিয়ের পর তোমার ওই মুখটা দেখেছিলাম। বিশ্বাস কর মায়া তুমি ছাড়া আর কাউকে নিয়ে কখনও আমি ভাবি নি। আর কাউকে এতোটা ভালোবাসি নি। আমার মন শুধু তোমাকেই চেয়েছে। আমি যানি না কিভাবে আমাদের মাঝে এতো ভুল বুঝাবুঝির সৃস্টি হলো। আমি এটাও যানি না তুমি আমাকে এখন আর বিশ্বাস করবে কিনা। তবে বিশ্বাস করো, সত্যি বলছি, আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।

মায়া চুপ করে মাহিরের কথাগুলো শুনছে। কোনও কথা না বলে। মাহির মায়ার কাছে এসে মায়াকে ঝাকিয়ে জানতে চাই।
মাহিরঃ এভাবে চুপ করে থেকো না। কিছু তো বলো মায়া। তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করছো না?
মায়া এক ঝটকায় মাহিরের বুকে ঝাপিয়ে পরে কান্না জুড়ে দেয়। কান্না জড়িত কন্ঠে মাথাটা হালকা ঝাকিয়ে বলে,
মায়াঃ হুমমম! আমি বিশ্বাস করি।

আপনাকে আমি নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি। আপনি শুধুই আমার। আর আমাকেই ভালোবাসেন। আপনার মতোন এতোটা ভালোবাসা আমাকে কেউ দিতে পারবে না। এতোগুলো দিন অপেক্ষা করেছি, আপনার মুখে এই কথাটা শোনার জন্য। আপনি কি বোঝেন না আমার কস্ট হয়?
মাহির আর মায়ার পেছনে বেশ খানিকটা দূরে মায়ার ফ্রেন্ডরা দাড়িয়ে আছে। সাথে স্নিগ্ধা রেগে অগ্নি দৃস্টিতে তাকিয়ে দেখছে মায়া আর মাহিরকে।
মায়ার ফ্রেন্ডরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। আর বলাবলি করছে।

সজীবঃ এটা কি হলো?
আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
মিতুঃ আমিও না। এ তোরা যানিস ডা.মাহির স্যারের সাথে আমাদের মায়ার সম্পর্ক কতদিনের?
নিধিঃ হেব্বি জিনিস আমাদের মায়া ডুবে ডুবে জল খাই। অথচ আমরা কিছু জানলামই না। শুধু পার্ট নেই। মাহির স্যার ভালো না! মাহির স্যার ভালো না!
রুসাঃ আহহ। থামবি তোরা?

নিধিঃ এই থামবো কি রে? ফ্রেন্ড হিসেবে আমাদের কি জানার অধিকার নেই?

মাহির একটা রিক্সা ডেকে মায়াকে নিয়ে রিক্সায় উঠে চলে যায়। মায়ার ফ্রেন্ডরা হা হয়ে আছে। তাদের পাশ কেটে রিক্সাটা চলে যায় কিন্তু মায়া, মাহির তাদের দেখেই না।
রিক্সায় বসে মায়ার হাতের আঙুলে নিজের হাতের আঙুলগুলো চেপে রেখে মায়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে মাহির। এতো কাছ থেকে মায়ার সিল্কি চুলের গন্ধ মাহিরকে আরও মাতাল করে তুলছে। মাহির মায়ার চুলে নাক ডুবিয়ে মায়াকে পরম আদরমাখা কন্ঠে ডাকে,

মাহিরঃ মায়া।
মায়াঃ বলুন।
মাহিরঃ স্নিগ্ধা ওই ছবিগুলো।
মায়াঃ প্লিজ! আপনি আর কক্ষণও আমার সামনে স্নিগ্ধা ম্যামের কথা বলবেন না। আমার ভালো লাগে না আপনার মুখে ওই নামটা শুনতে।
কথাটা মাহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে মায়া।
মাহিরঃ আমার কথাটা তো শুনবে? আসলে সেদিন…

মায়াঃ কিচ্ছু শুনতে চায় না আমি। আপনি যে আমার হয়েছেন এতেই আমি খুশি।
মাহিরঃ তবুও!
মায়াঃ বললাম তো শুনবো না।
রিক্সা এসে মাহিরের বাড়ির সামনে থামে। মাহিরের বাবা মা মাহিরকে দেখে খুব খুশী হয়।

ওদিকে, রুমা মিরাকে নিয়ে কিছু রিপোর্ট হাতে হসপিটাল থেকে বের হচ্ছে।
রুমাঃ আমার মনে হয় মায়াকে কথাটা যানানো উচিৎ।
মিরাঃ না রুমা। তার আর দরকার নেই। আমার মেয়েটাকে কিছু যানিয়ে টেনশনে ফেলতে চাই না। আমার যা হয় হবে। মেয়েটা ওখানে সুখে থাকুক।
রুমাঃ কিন্তু মিরা তুই মায়াকে কিছু বলবি না? পরে যদি জানতে পারে কতটা কস্ট পাবে জানিস?

মিরাঃ ভাগ্যের সাথে আমি আপস করে নিয়েছি। এই জীবনে উনিই যখন নেই তখন আর বেঁচে থেকে কি লাভ। শুধু মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা ছিল। আজ ওর বিয়ে হয়েছে। স্বামী, সংসার নিয়ে সুখে থাকুক আমার দায়িত্ব শেষ। এখন আমি শান্তিতে মরতেও পারবো। শুধু একটাবার জীবনের এই শেষ সময়টাতে উনাকে দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। যানি না কখনও সেটা সম্ভব কিনা। তবুও চাইবো উনি সব সময় ভালো থাকুক।

রুমাঃ এতোই যখন ভালোবাসিস একটাবার তো ফিরে গিয়ে দেখতে পারতি। হতেও পারে সে তোকে ভালোবাসে!
মিরাঃ বাসে না রুমা। সে কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি। পর নারীতে আশক্ত ছিল সে। তবুও সবকিছু মেনে নিয়ে আমি তার সংসারে পরে ছিলাম দিন শেষে একটাবার তার মুখটা দেখবো বলে। তার মুখে ভালোবাসি কথাটা শুনবো বলে। ভিক্ষা চেয়েছিলাম প্লিজ আমাকে আপনার সাথে থাকতে দিন। কিন্ত দিল না।

তারিয়ে দিল সে আমাকে। তবুও আমি তো তাকেই চেয়েছিলাম। মা, রাইসূল আর রাইশা পার্টির দিন বাড়িতে ছিল না। আমি পরে আর তাদের সাথে যোগাযোগও রাখতে পারি নি। লজ্জায়, ঘৃণায় আমার ভেতরটা খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছিলো। সকলের সামনে উনি আমার জীবনটাকে হাসি, ঠাট্টা, তামাশা বানিয়েছে। তাতেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু তুই বল রুমা সে যদি আমায় ভালোইবাসতো তাহলে কি পারতো ওইভাবে নোংরা অপবাদ দিতে? আমাদের পবিত্র ভালোবাসার সন্তানকে অস্বীকার করতে? পারতো না! পারতো না এমনটা করতে!

কথাগুলো বলতে বলতে মিরা কেঁদে দেয়।
রুমাঃ শান্ত হ মিরা। প্লিজ উত্তেজিত হোস না।
তখনই মিরার ফোনটা বেজে ওঠে। মায়া মিরার জন্য সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়েছে সেটা বলতে ফোন করেছে। মায়ার সাথে কথা বলে মিরা বাড়ি ফিরে মেয়ের পাঠানো সারপ্রাইজ গিফটের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। বিকালের দিকে কুরিয়ারে একটা পার্সেল এসে মিরাকে দিয়ে যায়। পার্সেলটা ছিল মায়ার পাঠানো সারপ্রাইজ গিফট। মায়ার পাঠানো সারপ্রাইজ গিফটটা খুব খুশী মনে খুলতে থাকে মিরা। তারপর গিফটটা দেখেই মিরা শকট।


পর্ব ২৭

আজ ২০ বছর পর মিরা খুলনায় আসছে। সোহাগের কাছে। শেষ আশাটুকু নিয়ে। যদি জীবনের বাকি দিনগুলো সোহাগের সাথে কাটিয়ে দেওয়া যায়! তাহলে ভালোই হবে। আর তা না হলেও মিরার কোনও দুঃখ নেই। মানুষটা যে তারই। সে যতই অপমান করুক। তাকে ঘিরেই যে মিরার বসবাস। মায়ার পাঠানো সারপ্রাইজ গিফটটাতে বাবা, মেয়ের একসাথে তোলা ছবিগুলো দেখে মিরা আর লোভ সামলাতে পারলো না। চলে এলো খুলনায়। কারণ মিরারও ইচ্ছা করে স্বামী, সন্তান নিয়ে জীবনের একটা দিন অন্তত কাটাবে। আর কত দিনই বা মিরার হাতে আছে? তাই আজ এই শেষবারের মতো মিরা একবার হার মানতে চায়। হার মেনে দেখতে চায় মানুষটাকে পাওয়া যায় কিনা আর যদি না পায় তাহলে সেটাই হবে মিরার ভাগ্য।

মিরা এখন মির্জা প্যালেসের সামনে দাড়িয়ে। তার মনের ভেতরে এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। শুধু ভাবছে, এতোদিন পর নিজের বাড়িতে যাবে অথচ এ বাড়ির কিছুই এখন তার নেই। বাড়িটার সামনে দাড়িয়ে চোখটা বন্ধ করলেই ভেসে আসে সেই পার্টির রাতটার কথা। কিভাবে সোহাগ ধাক্কা দিয়ে মিরাকে বাড়ি থেকে বের করে মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল?
দূর থেকে মিরাকে দেখে দারোয়ান রহিম মিয়া এগিয়ে আসে।

রহিম মিয়াঃ একি বৌরানী তুমি? কেমন আছো? আর এতোদিন কোথায় ছিলে?
মিরা প্রতিউত্তরে শুধু একটা কথাই জানতে চায়।
মিরাঃ রহিম চাচা উনি কি বাড়িতে আছেন?
রহিম মিয়াঃ হ্যাঁ, আছে।

মিরাঃ উনাকে একটু ডেকে দেবেন। আমি কথা বলব।
রহিম মিয়া মিরাকে বসতে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে সোহাগকে ডাকতে বাড়ির ভেতরে যায়। আর মিরা সেখানে বসেই সোহাগের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। মিরার অপেক্ষা যেন শেষ হবার নয়। এক একটা মুহূর্ত যেন হাজার বছরের মতো লাগছে। ওদিকে সোহাগ মিরা এসেছে শুনে ছুটে আসে। বাইরে এসে আর মিরাকে পায় না। খুব ভেঙে পরে সোহাগ। এতোগুলো দিন পরে মুহূর্তের মধ্যেই এতো বড় ধক্কা সোহাগ নিতে পারছে না।
সোহাগ মির্জাঃ কোথায়? আমার মিরা কোথায় রহিম চাচা?

রহিম মিয়াঃ বিশ্বাস কর বাবা এখানেই ছিলো। এইমাত্র আমি বৌরানীর সাথে কথা বলে তোমাকে ডাকতে গেলাম।
সোহাগ মির্জাঃ তাহলে দেখছি না কেন?
রহিম মিয়াঃ সেটাতো আমিও বুঝতে পারছি না।
সোহাগ সেখানে বসে পরে। চিৎকার করে বলে, কোথায় তুমি মিরা? আসলেই যখন তখন চলে কেন গেলে?

মায়াঃ এই ছাড়ুন না।
মাহিরঃ নাহ।
মায়াঃ কটা বাজে খেয়াল আছে?
মাহিরঃ বাজুক! আজ আমার অফ ডে!
মায়াঃ আমাকে তো উঠতে হবে।

মাহিরঃ বললাম তো না! যতক্ষণ আমি উঠবো না এই ভাবে আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকো।
মায়াঃ এমন কেন আপনি?
মাহিরঃ উহু ম-ম কথা বলো না। খুব শীত করছে আমার।
মায়াঃ হুমমম।
এমন সময় মায়ার ফোনটা বেজে ওঠে।
মায়াঃ এই ফোন বাজছে তো।

মাহির মায়ার ফোনের স্কীনে তাকিয়ে দেখে মিরার ফোন। ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নিতেই ফোনের ওপাশ থেকে কেউ মাহিরকে কিছু বলে। মাহির কথাটা শুনেই থ হয়ে যায়। মায়াকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসে।
মায়াঃ এখন কি হলো?
মাহিরঃ মায়া।

মায়াঃ কি?
মাহিরঃ মিরা মায়ের এক্সিডেন হয়েছে।
মাহিরের কথা শুনে মায়ার মুখটা এক নিমিষেই মলিন হয়ে যায়। মায়া পারে না নিজেকে সামলাতে। শুধু ভাবে মাহির কি বলছে এটা? যেই মাকে না জিজ্ঞেসা করে মায়া একটা কাজও করতে পারে না সেই মায়ের এক্সিডেন্ট? কথাটা শুনেই যেন মায়ার ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
মাহিরঃ এভাবে চুপ করে আছো কেন?

মায়া সমস্ত নিরাবতা আর চিন্তা কাটিয়ে উঠে মাহিরকে ঝাকিয়ে জানতে চায়,
মায়াঃ আপনি মিথ্যা বলছেন বলুন?
মাহিরঃ নাহ।
মায়া কাঁদতে থাকে।

মায়াঃ আমাকে এক্ষুণি আমার মায়ের কাছে নিয়ে চলুন।
মাহিরঃ মিরা মা আমাদের হসপিটালে আছে।
মায়াঃ মা খুলনাতে?
মাহিরঃ হুমমম। তুমি কি যানতে মিরা মা আসবে?

মায়াঃ না। মা হয়তো আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছিল। কাল আমি মাকে সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়ে ছিলাম বলে।
মাহিরঃ তাই হবে হয়তো
মায়াঃ কিন্তু এক্সিডেন্ট টা কিভাবে হলো?
মাহিরঃ একটা ছোট বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে মিরা মা নিজে ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। এখন ও.টি চলছে। কল লিস্টের লাস্ট কলটা তোমার ছিল বলে তোমাকে ফোন করে জানিয়েছে।

মায়াঃ দেখেছেন? এভাবেই সারাটা জীবন আমার মা সকলের কথা ভেবেছে। সকলের ভালো চেয়েছে। অথচ দেখুন এই সমাজ কখনও তাকে একটু সম্মান দেয় নি। এতো অপমান আর অসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকে আমার মা। আজ আমার মায়ের এই অবস্থা আমি পারছি না মেনে নিতে।
মাহির মায়াকে বুকে টেনে নিয়ে শান্তনা দেয়।

মাহিরঃ ওসব কথা ভেবে নিজেকে আর কস্ট দিও না। আমাদের এখন হসপিটালে যেতে হবে। মিরা মায়ের কাছে। যাবে না?
মায়াঃ হুমম। যাবো।


পর্ব ২৮

মায়া আর মাহির তখনই হসপিটালে চলে আসে। কিছুক্ষণ পর মাহিরের বাবা-মাও আসে। মাহির এখন ও.টির মধ্যে আছে। ও.টির সামনের বেঞ্চটাতে মায়াকে নিয়ে বসে আছে মুফতি খান আর সাহেদ খান।
মায়া তার শ্বাশুড়ি মায়ের কাধেঁ নাথা রেখে কাঁদছে আর বলছে,
মায়াঃ এতো করে বললাম উনাকে আমি ভেতরে যাব, উনি শুনলেনই না।
মুফতি খান মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতে থাকে।

মুফতি খানঃ কাদিঁস নারে মা। বেয়ানের কিচ্ছু হবে না। ওই আল্লাহর রহমতে একদম সুস্থ হয়ে উঠবে। মাহির তো আছে ভেতরে। ওঠিক পারবে দেখিস।

তারপর সকলে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে কখন অপারেশন থিয়েটার থেকে মাহির ভালো সংবাদ নিয়ে বের হবে। এমন সময় মাহির ও.টি থেকে বেরিয়ে আসে। মাহিরকে দেখেই সবাই উঠে দাড়ায়। মায়া তো ছুটে গিয়ে মাহিরের সামনে দাড়িয়ে জানতে চায়, মা কেমন আছে? মাহির কোনও কথা বলে না। মায়া আবার বলে, আমার মা কেমন আছে? মাহিরের কোনো উত্তর না পেয়ে মায়া কলারটি চেপে ধরে মাহিরকে জোড়ে জোড়ে ঝাকাতে থাকে।

মায়াঃ বলুন আমার মা কেমন আছে? বলুন না?
মায়া মাহিরকে জিজ্ঞেসা করতে করতে কেঁদে দেয়। যার জন্য একটা সময় পর মায়ার কান্না আর চিৎকারে গলাটা শুকিয়ে যায়। মায়া বিরবির করে বলে,

মায়াঃ আমি কিছু জানতে চাচ্ছি? চুপ করে থাকবেন প্লিজ। বলুন আমার মা কেমন আছে?
মাহির কলার থেকে মায়ার হাতটি ছাড়িয়ে শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রাখে। তারপর নিচু গলায় মায়াকে শান্ত হতে বলে।

মাহিরঃ শান্ত হও মায়া। আমরা ডাক্তার। আমাদের হাতে যতোটুকু সম্ভব আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেস্টা করি। তবুও কিছু ব্যাপার আমাদের হাতে থাকে না।
মায়াঃ মানে? কি হয়েছে আমার মায়ের?
মাহিরঃ মায়া…. মিরা মা!
মায়াঃ কি?
মাহিরঃ কোমায় চলে গেছে।

মায়া কথাটা শুনে অনেক বড় একটা ধাক্কা খায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মায়া।
মাহির মায়াকে পরে যেতে দেখে ধরে বসে। মায়াকে ডেকে দেখে মায়ার কোনও সারা নেই। তাই মায়াকে নিয়ে নিজের কেবিনে যায়। চোখে মুখে পানির ছিটা দিলে মায়ার জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফিরতেই মায়া খুব উত্তেজিত হয়ে পরে। আর উত্তেজনায় আবল তাবল বকতে থাকে। মাহির মায়াকে শান্ত করার চেস্টা করে। কিন্তু পারে না। তাই বাধ্য হয়ে মায়ার গালে ঠাসসসস করে একটা চর বসিয়ে দেয়। তখন গিয়ে শান্ত হয়।

নিশ্চুপ হয়ে গালে হাত দিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে মায়া। যা দেখে মাহিরের চোখেও পানি চলে আসে। মাহির মায়ার গাল থেকে হাতটি নামিয়ে দিয়ে একটা চুমু একেঁ দেয়।
মাহিরঃ সরি মায়া। বিশ্বাস করো তোমাকে আমি চর মারতে চায় নি?
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
মায়াঃ আপনি পারলেন না আমার মাকে সুস্থ করে দিতে?

মাহির মায়ার হাত দুটো ধরে চেয়ারটা টেনে মায়ার সামনে মুখোমুখি হয়ে বসে। তারপর মায়াকে বোঝায়।
মাহিরঃ ডাক্তার হলেই কি সব পারা যায়? কিছুদিন পর তো তুমিও ডাক্তার হবে। একটাবার আমার জায়গাটায় নিজেকে রেখে দেখো, তাহলে বুঝবে আমার পরিস্থিতি টা কি। আমারও যে খুব কস্ট হচ্ছে তোমাকে এই অবস্থায় দেখে।
মায়া মাহিরকে জড়িয়ে ধরে। জোড়ো জোড়ে কাঁদতে থাকে।

মায়াঃ এমনটা কেন হলো বলুন তো? আমার মা কি দোষ করেছিলো যে আজ একটা জীবিত লাশের মতো তাকে এভাবে পরে থাকতে হবে? আমি যে এখন একা হয়ে গেলাম। আমার আর কেউ থাকলো না।
মাহিরঃ কে বলেছে তুমি একা? আমি তো সবসময় ছায়ার মতোন তোমার পাশে আছি। তাহলে এমন কথা কেন বলছো তুমি?

রাইসূলের কেবিনে,

রাইসূল সিকদারঃ হোয়াট?
ডা. মানহাঃ জ্বী স্যার, আমার কাছে তো প্রমাণও আছে। ওদের অন্তরগ্ন অবস্থার থাকা কিছু ছবি তুলে এনেছি। এই দেখুন স্যার হসপিটালের রুলসের কোনও তোয়াক্কা করে না ডা.মাহির খান। শেষ পর্যন্ত কিনা একটা স্টুডেন্টের সাথেই ছিঃ
কি লজ্জা! কি লজ্জা!

রাইসূল ডা. মানহার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ছবিটা দেখে যেই ছবিতে মায়ার গালে মাহির চুমু এঁকে দিচ্ছে। তাছাড়াও মায়াও মাহিরের জোড়িয়ে ধরে রাখা আরও অনেক ছবি তুলে এনেছে ডা.মানহা।

ডা.মানহাঃ আরও আছে স্যার!
ডা.মানহা ফোনের স্ক্রীন টেনে টেনে রাইসূলকে ছবিগুলো দেখায়।
ডা.মানহাঃ স্যার এদের কিন্তু একটা বড় ধরনের শাস্তি দেওয়া উচিৎ।

koster premer golpo bangla


পর্ব ২৯

রাইসূল খবর পাঠায় ডাক্তার, নার্স এবং হসপিটালের যতো স্ট্রাফ আর স্টুডেন্ট আছে সকলকে নিয়ে মিটিং হবে। রাইসূলের ডাক পরতেই হসপিটালের সকলে এসে হাজির। শুধু মায়ার মনের অবস্থা ভালো না থাকায় মাহির মায়াকে নিয়ে মিটিংয়ে পৌঁছাতে একটু লেট করে ফেলে।
যখন মায়া আর মাহির আসে তখন তাদেরকে সামনে দাড় করিয়ে রাখে রাইসূল।

এক সারিতে সকল ডাক্তার এবং এক সারিতে সকল স্টুডেটরা দাড়িয়ে আছে। মায়ার চোখ মুখ কাঁদতে কাঁদতে অনেকটা শুকিয়ে আছে দেখে মাহির মায়ার খুব কাছে এক হাত পিঠে, আরেক হাত কোমড়ে রেখে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখে। স্নিগ্ধা তো মাহির আর মায়াকে দূর থেকে এই অবস্থায় দেখতেই পারছে না। শুধু ভেতরে ভেতরে জ্বলছে। আর মায়ার ফ্রেন্ডরাও একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে আর ফিসফিসিয়ে বলছে, আজ মায়া শেষ।
ডা. মানহাঃ দেখেছেন স্যার এদের কোনও লজ্জা নেই। সকলের সামনেও।

রাইসূল হাতটা উঁচু করে ডা.মানহাকে থামতে বলে। হাতের ইশারায় বোঝায় এখানে আমিও উপস্থিত আছি। তারপর রাইসূল মায়া আর মাহিরের সামনে গিয়ে দাড়ায়।
রাইসূল সিকদারঃ এটা হসপিটাল ডা.মাহির খান। এখানে কিছু রুলস আছে। আপনি কি রুলসগুলো যানেন?
মাহিরঃ ইয়েস স্যার।

রাইসূল সিকদারঃ তাহলে এসব কি? আপনি সব রুলস ভেঙে একটা স্টুডেন্টের সাথে হসপিটালের মধ্যে বিশৃঙ্খলা কেন করছেন? এতে অন্য স্টুডেটদের মধ্যে কি প্রভাব ফেলবে বুঝতে পারছেন? আপনি কি যানেন এর শাস্তি আপনার জন্য কি হতে পারে?
মাহিরঃ সরি স্যার। আমার সত্যিই ভুল হয়ে গেছে। আর আমি জানি এর শাস্তি আমার জন্য কি হতে পারে।
হঠাৎ স্নিগ্ধা এগিয়ে এসে বলে,

স্নিগ্ধাঃ ডা.মাহিরের কোনও দোষ না স্যার। সব দোষ এই নষ্টা মেয়েটার। একটা পিতৃ পরিচয়হীন মেয়ে। হয়েছেও একদম মায়ের মতোন। এর থেকে বেশি কি আর করতে পারে? আ.এম শিওর ও-ই মাহিরকে ফুসলিয়ে এসব নষ্টামি করছে হসপিটালের মধ্যে।
স্নিগ্ধার কথাটি শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। মায়া তো কেপেঁ ওঠে। হঠাৎ এতো মানুষের ভীরে এভাবে কথাটা উঠার জন্য। মায়া সহ্য করতে না পেরে সাথে সাথেই মাহিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেদে দেয়। সবাই ব্যাপারটা নিয়ে ফিসফিসে বলতে থাকে ডা.স্নিন্ধা কি বলছে এসব? মায়া কি সত্যিই পিতৃ পরিচয়হীন একটি মেয়ে?
মাহির মুখ খোলে,

মাহিরঃ স্নিগ্ধা তুমি কিন্তু এবার সত্যিই অনেক বারাবাড়ি করে ফেলেছো।
স্নিগ্ধা মাহিরের কানের কাছে গিয়ে আস্তে করে বলে,
স্নিগ্ধাঃ আমি তো তোমাকে বাঁচাতে চাচ্ছি জান।

মাহির সেই মুহূর্তেই ঠাসসস করে স্নিগ্ধার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। শব্দটা এতো জোড়ে হয় যে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর মাহির বলতে শুরু করে।
মাহিরঃ হ্যাঁ আমি ভুল করেছি। নিজের স্ত্রীর পরিচয় গোপন রেখে। তাকে স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
সবাই মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাহির রাইসূলকে উদ্দেশ্য করে বলে,

মাহিরঃ ক্ষমা করবেন স্যার। সত্যটা গোপন রাখার জন্য আমি আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু আমার যে কিচ্ছু করার নেই। মায়া আমার স্ত্রী। আজ মিরা মায়ের এক্সিডেন হয়েছে। এই সময়টা যে আমাকে ওর খুব প্রয়োজন। কোনও রুলস পারে না স্বামী কে তার স্ত্রীর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। আমি যে অপরাধ করেছি এতোদিন ধরে আমার স্ত্রীকে কস্ট দিয়ে। তা আমি শুধরে নিতে চায়।

মাহির মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখে মায়া খুব ভেঙে পরেছে। মাহির আবার স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বলে,
মাহিরঃ মায়ার দুটো পরিচয় একটা মায়ার বাবাও মিরা মা আর মাও মিরা মা। অন্য টা হচ্ছে মায়া আমার স্ত্রী। যেখানে আমার স্ত্রীর সম্মান নেই সেখানে আমি থাকবো না। চলো মায়া।

মাহির মায়াকে ধরে চলে যেতে লাগে এমন সময়ে মায়ার গলা থেকে লকেট টা খুলে পরে যায়। যেই লকেটে মিরার ছবি আছে। মায়া লকেট টা সবসময় নিজের কাছে রাখে। কারণ এটা থাকলে মায়া তার মাকে অনুভব করে। মনে হয় সবসময় মা তার আশেপাশেই আছে।
মাহির আর মায়া চলে যাওয়ার পর রাইসূলের চোখ লকেটের উপর পরে। দেখে তাতে মিরার ছবি। নিচু দিয়ে রাইসূল লকেটটা উঠায়। ঝাপসা চোখে খুব কাছে থেকে লকেটটা দেখে রাইসূলের চোখে আনন্দের অশ্রুতে ভরে ওঠে।

রাইসূল সিকদারঃ এই লকেট টা কি মায়ার? তাহলে মায়া কি আমার মিরা আপুর সন্তান?
এ আমি কি করলাম?
ডা.মানহাঃ কিছু ভাবছেন স্যার? ওদের শাস্তির ব্যাপারটা…
রাইসূল ডা.মানহাকে একটা উচ্চ স্বরে ধমক দেয়।
রাইসূল সিকদারঃ সমস্যাটা কি আপনার?
ডা.মানহাঃ মানে?

রাইসূল সিকদারঃ এক্ষুনি এখান থেকে চলে যান।
ডা.মানহাঃ কিন্তু স্যার…
রাইসূল সিকদারঃ আবার কথা বলছেন? আমি এখন একটু একা থাকতে চায়। সবাই প্লিজ এখান থেকে চলে যান।


পর্ব ৩০

সবাই বেরিয়ে গেলে রাইসূলকে কাঁদতে দেখে রুসা থেকে যায়। রুসা এসে পেছনের থেকে রাইসূলের কাঁধে হাত রাখে। রাইসূল উঠেই রুসাকে জড়িয়ে ধরে।
রুসাঃ কি হয়েছে বাবা তুমি এভাবে কেন কাদঁছো?
রাইসূল সিকদারঃ এ আমি কি করেছি রে মা?
রুসাঃ শান্ত হও বাবা। আগে বলো আমাকে কি হয়েছে?

রাইসূল সিকদারঃ আমার মিরা আপুর মেয়ে মায়া। আর ওকেই আমি এইভাবে কস্ট দিলাম!
রুসাঃ কি বলছো বাবা এসব?
রাইসূল রুসাকে লকেট টা দেখায়।
রাইসূল সিকদারঃ এই লকেট টা দেখ। এতে আমার মিরা আপুর ছবি আছে। এই যে এইখানটায় পরে ছিল লকেট টা। যেখানে মায়া দাড়িয়ে ছিল। আর মাহির তো বলল আপুর নাম। আমার আপুর কি তাহলে এক্সিডেন্ট হয়েছে?
রুসাঃ শান্ত হও বাবা। আমাদের মায়ার সাথে কথা বলতে হবে।

রাইসূল সিকদারঃ হুমমম। মেয়েটাকে এই পরিস্থিতিতেও কতোটা অপমানিত হতে হলো।
রুসাঃ দাড়াও বাবা রিং যাচ্ছে এক্ষুণি মায়া রিসিভ করলে যানা যাবে কোথায় আছে।
-হ্যালো মায়া আমি রুসা বলছি কোথায় তুই এখন?
-আমি মায়া নই মাহির।

-ওহহ ডা.মাহির স্যার। মায়ার সাথে খুব দরকারি একটা কথা বলার ছিল। যদি একটু ওর কাছে দিতেন তাহলে ভালো হতো
-সরি ওর মনের অবস্থা এখন ভালো নেই। পরে কথা বলো রাখছি
-প্লিজ স্যার রাখবেন না।
-খুবই কি প্রয়োজন ওর সাথে কথা বলার?

-হ্যাঁ। প্রয়োজন তো ছিলোয়। আচ্ছা স্যার আপনারা এখন কোথায় আছেন বলতে পারেন?
-বাড়িতে।
-ওকে থাঙ্কস স্যার।
রুসা ফোনটা কেটে দিয়ে রাইসূলকে বলে মায়া এখন মাহিরের বাড়িতে আছে। দু’জনে মাহিরের বাড়িতে যাবার সময় রাইশাকে ফোন করে সব বলে মাহিরের বাড়ির ঠিকানাটা দিয়ে দেয়। সেই ঠিকানায় রাইসূল ও রুসা আসার আগেই সোহাগ আর রাইশা চলে আসে।

মায়া তার মায়ের সামনে বসে কেঁদে যাচ্ছে আর মাকে ডাকছে।
মায়াঃ ওঠো না মা! ও মা আমার সাথে একটু কথা বলো। কেন এমন করছো আমার সাথে?

মাহিরঃ শান্ত হও মায়া। এভাবে আর নিজেকে কস্ট দিও না। চলো এখন কিছু খাবে।
মায়াঃ না আমি আমার মায়ের কাছে থাকবো। এখান থেকে কোথাও যাব না।

মাহির মায়ার হাতদুটি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে মায়ার চোখ থেকে পানি মুছে দিয়ে বলে,
মাহিরঃ এমনটা করো না। দেখ তুমি যদি এখন কিছু না খাও তাহলে সুস্থ থাকবে কিভাবে? তখন মিরা মাকে কে দেখবে? চলো খাবে!
মায়া মাথা ঝাকিয়ে না বলে। মাহির তবুও মায়াকে টানতে টানতে খাবার টেবিলে নিয়ে যায়। মায়ার মুখে এক লোকমা ভাত মাখিয়ে ধরতেই কলিং বেলের আওয়াজ।
-কিরিংকিরিং।

মাহিরঃ এখন আবার কে এলো।
মাহির উঠে হাতধূয়ে,
মাহিরঃ তুমি এখানে বসো, আমি একটু পরে এসে তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।

মায়া মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে।
তারপর মাহির গিয়ে দরজাটা খুলতেই সোহাগ আর রাইশা বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। সোহাগ পাগলের মতো হয়ে যায় মিরাকে দেখবে বলে।
সোহাগ মির্জাঃ মিরা কোথায় আমার?

মাহির সোহাগের কথার ধরণের কিচ্ছু বোঝে না।
মাহিরঃ আপনারা এখানে?
এমন সময়ে মায়া এসে মাহিরের পেছনের থেকে সোহাগকে ডাকে।
মায়াঃ একি আঙ্কেল আপনি এখানে।

সোহাগ মাহিরের পাশ কেটে মায়ার সামনে গিয়ে দাড়ায়। মায়ার মুখটা হাত বুলিয়ে দেখতে থাকে।

সোহাগ মির্জাঃ আমার তো প্রথম দিনই তোকে খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। কেমন যেন অনেক আপন, কাছের কেউ একজন তুই আমার। তুই যানিস মা? তোর এই চোখ, কথা বলার ধরণ, একদম তোর মায়ের মতো হয়েছে।
মায়া কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
মায়াঃ কি বলছেন আঙ্কেল?

সোহাগ মির্জাঃ ধূর বোকা। আঙ্কেল কাকে বলছিস। আমি তো তোর বাবা।
মায়ার কথাটা শুনে যেন অদ্ভুত লাগলো।
মায়াঃ বাবা?
সোহাগ মির্জাঃ হ্যা মা আমি তোর সেই হতভাগ্য বাবা। যে এতো বছর তোকে আর তোর মাকে খুঁজেছি কিন্তু পায় নি। তবে আজ যখন পেয়েছি আর হারাতে দেব না।

কথাটা শুনে মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জোড়ে জোড়ে হাসতে শুরু করে। মায়ার এই হাসিতে সকলেই অবাক হয়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মায়া সোহাগের সামনে হাততালি বাজায়। সোহাগ মায়ার মুখে হাত রেখে বলে,

সোহাগ মির্জাঃ কি হয়েছে মা তোর। এমন কেন করছিস?
মায়া সোহাগের হাতটি ছিটকে ফেলে দেয়।
মায়াঃ বাহ সোহাগ মির্জা বাহ। আজ এসেছেন আপনি আমার কাছে? আমার মায়ের কাছে? কেন এসেছেন? আপনাকে তো আজ আমাদের জীবনে আর কোনও প্রয়োজন নেই। আমার মাকে দেখবেন আসুন।
মায়া সোহাগকে টানতে টানতে মিরার রুমে নিয়ে যায়।

মায়াঃ ওই যে দেখুন আমার মা। যার সাথে আপনি এতো অন্যায় করেছেন। এতো অত্যাচার করেছেন। আমাকে বানিয়েছেন সমাজের চোখে..

রাইশা এসে মায়ার মুখটা চেপে ধরে।
রাইশাঃ এসব কি বলছিস বাবাকে? তুই যানিস? তোর বাবা এই ২০ বছরে এমন একটা দিন নেই যে তোদের ভেবে চোখের পানি ফেলে নি।
মায়াঃ তুমি কে?
রাইশাঃ আমি তোর ফুপ্পি।

মায়াঃ ফুপ্পি!
মায়া তার ফুপ্পিকে জোড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
মায়াঃ এই লোকটাকে চলে যেতে বলো ফুপ্পি। আমি একে সহ্য করতে পারছি না। যার জন্য আমার মা সারাটা জীবন সমাজের কাছে এতো কথা শুনেছে। আমাকেও কম কথা শুনতে হয় নি মানুষের কাছে। যানো ফুপ্পি! ছোট্ট বেলা তো আমাকে আমার স্কুল থেকেও বের করে দিয়েছিল। তারপর যখন ভালো ম্যাম সুপারিশ করল তখন গিয়ে আমাকে পড়তে দিল। স্কুলে আমার একটাও বন্ধু-বান্ধব ছিল না। সবাই আমাকে অপমান করার সুযোগ খুঁজতো। আমি সব পরীক্ষায় ফাস্ট হলেও আমাকে ফাস্ট হতে দেওয়া হতো না আমার পিতৃ পরিচয় নেই বলে। অনেক কস্ট দিয়েছে এই লোকটা আমাদের।

রাইশাঃ শান্ত হ মা! তোর বাবাও তোদেরকে ভেবে নিজেকে অনেক কস্ট দিয়েছে।
সোহাগের কানে মায়া আর রাইশার কোনও কথায় আসে না। সে এক ধ্যানে শুধু মিরার দিকে তাকিয়ে আছে। এখন একপা দুপা করে মিরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মায়া সোহাগকে মিরার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে সোহাগের সামনে গিয়ে দাড়ায়।

মায়াঃ আপনি আমার মায়ের কাছে একদম যাবার চেস্টা করবেন না সোহাগ মির্জা।
সোহাগ মির্জাঃ আমাকে একটাবার ওর কাছে যেতে দে মা।
মায়া সোহাগকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
মায়াঃ চলে যান এখান থেকে।
মাহির এসে সোহাগকে উঠিয়ে বলে।

মাহিরঃ কি করছ তুমি? পাগল হয়ে গেছো? আমি তো অবাক হচ্ছি তোমাকে নিজের বাবার সাথে এমন ব্যবহার করতে দেখে?
মায়াঃ বেশ করেছি করে! একটা খারাপ, নোংরা লোক। যার চরিত্রের ঠিক নেই সে আমার মায়ের চরিত্রের উপর আঙুল তোলার সাহশ কিভাবে পায়? মা তো আমাকে সব কিছু বলে দিয়েছিল শুধু এই লোকটার নাম বলে নি। আজ যখন যেনেছি তখন নিজের হাতে একে আমি খুন করব।
মায়া একটা ফুলদানি নিয়ে সোহাগের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে কপালে আঘাত করতে যায়। এমন সময় মিরা অক্সিজেন মাক্স খুলে মায়ার নাম ধরে চিৎকার দিয়ে ওঠে। মায়া থেমে যায়।

মিরাকে রেসপন্স করতে দেখে সবাই অবাক। সোহাগ গিয়ে দৌড়ে মিরার পাশে বসে। মিরার হাতটি ধরে চোখ বেয়ে গড়িয়ে আসা পানি মুছিয়ে দেয়। মিরা আস্তে করে উঠে বসতে যায়। সোহাগ ধরে মিরাকে উঠিয়ে বসায়। তারপর মিরা মায়াকে হাতের ইশারায় নিজের কাছে ডাকে।
মায়া কাছে আসলেই মিরা মায়ার গালে ঠাসসসস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। মায়া গালে হাত দিয়ে কাঁদতে থাকে।
সোহাগ মির্জাঃ এ তুমি কি করলে মিরা?

মিরাঃ ও কি করতে যাচ্ছিল? আপনাকে মারতে যাচ্ছিল ও? ওকি যানে আপনাকে আমি কতটা ভালোবাসি?
মায়ার দিকে তাকিয়ে বলে, নিজের বাবাকে মারবি? এই শিক্ষা কি তোকে দিয়েছি আমি?
মায়াঃ মা!
মিরাঃ একদম আমাকে মা বলে ডাকবি না। চলে যা আমার সামনে থেকে।

মায়াঃ বিশ্বাস কর মা আমি বাবাকে মারতে চায় নি। মাহিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, উনি আমাকে বলেছিল তোমাকে বড় কোন ধাক্কা দিলে তুমি ভালো হয়ে উঠবে। তাই আমি ভাবলাম বাবার সাথে এমনটা করলে তার থেকে বড় ধাক্কা তোমার কাছে আর কিছু হতে পারে না।
মাহিরঃ তাহলে তুমি এতোক্ষণ নাটক করছিলে?
মায়াঃ হুমমম। আমার মাকে সুস্থ করতে আমাকে এমনটা করতে হলো।

মায়া সোহাগের পায়ের কাছে হাটু নুইয়ে বসে। দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চায়।

মায়াঃ আমি সত্যিই তোমাকে ধাক্কা দিয়ে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। তুমি না ক্ষমা করলে যে আমাকে স্বয়ং সৃস্টিকর্তাও ক্ষমা করবে না।
সোহাগ মায়াকে উঠায়।

সোহাগ মির্জাঃ দূর পাগলি। আমার কাছে কেন ক্ষমা চাচ্ছিস। তোর এই পাগলামিটার জন্যই তো মিরা আবার সুস্থ হয়ে উঠলো।
মায়াকে সোহাগ বুকে নিয়ে বলে,

সোহাগ মির্জাঃ আমার মেয়ের জায়গা আমার পায়ে নয়, বুকে।
এমন সময় রাইসূল আর রুসা আসে।
রুসাঃ বাহ মামা এখন তো আমাকে তোমার কোনও প্রয়োজন নেই। নিজের মেয়েকে পেয়ে গেছো তো।
সোহাগ একটা মুচকি হাসি দিয়ে রুসাকে কাছে ডাকে। রুসা কাছে আসলে বুকের আরেক পাশে রুসাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
সোহাগ মির্জাঃ কে বলেছে আমার একটা মেয়ে আমার তো দুইটা মেয়ে।


পর্ব ৩১

সকলের উপস্থিতির এই শুভক্ষণে মিরা পুরো রুমে একবার চোখ বুলিয়ে নেই। কাউকে যেন মিরা খুঁজছে।
মিরাঃ মা কোথায় রাইসূল?
রাইসূল মিরার ডাকে ছুটে এসে মিরার পাশে বসে।
রাইসূল সিকদারঃ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপু যে তুমি ফিরে এসেছো।
মিরাঃ মা আসে নি ভাই?

রাইসূল চুপ করে থাকে।
মিরাঃ কি হলো বল? মাকে কেন আনলি না? আমারতো মাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
রাইসূল এবার মিরার কোলে মাথা ঠেকিয়ে কান্না জুড়ে দেয়। মিরা রাইসূলের মাথায় হাত ছুঁইয়ে বলে।
মিরাঃ এই বোকা কাঁদছিস কেন?

রাইসূলে মাথা তুলে মিরাকে জড়িয়ে ধরে হাও মাও করে কাঁদে।
রাইসূল সিকদারঃ এইভাবে আমাদের ছেড়ে কেন চলে গিয়েছিলে আপু? কতো খুঁজেছি তোমাকে যানো? অনেক মিস করেছি তোমাকে আমি।
মিরাঃ আমিও মিস করেছি তোদের। প্রত্যেকটা মুহূর্ত তোদের সবার কথাই শুধু ভেবেছি।

রাইসূল সিকদারঃ তাহলে এতোদিন কেন আসলে না? তুমি যানো? মা মৃত্যুর আগে বলেছিল তোমাকে একবার দেখবে। কিন্তু
কথাটা বলে রাইসূল থেমে যায়। আর কিছু বলতে পারে না। শুধু কাঁদে।

মিরাঃ কিন্তু কি? মৃত্যুর আগে মানে?
রাইসূল মিরার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে।
রাইসূল সিকদারঃ মা আর আমাদের মাঝে নেই আপু। অনেকদিন আগেই মা মারা গেছে।

কথাটা শুনে মিরা একটা বড় ধাক্কা খায়। অনেকটা কস্ট হয় মিরার। কস্টে মিরা কাঁদে আর ভাবে, সে এতো অভাগী যে মায়ের মৃত্যুর আগে একটাবার মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারলো না। এমন সময় মিরার বুকের ভেতর এক অসহনীয় ব্যাথা শুরু হয়। মিরা খুব জোড়ে কাশতে থাকে। কাশতে কাশতে মুখ থেকে খানিকটা রক্তও বেরিয়ে যায়। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরে রাখে মিরা। যেন নিঃশ্বাসটায় বন্ধ হয়ে আসছে। সোহাগ এসে মিরাকে ধরে। মিরা সোহাগের মুখটার দিকে তাকায়। কিন্তু কিচ্ছু স্পষ্ট দেখতে পায় না। মিরার দু’চোখের সামনে সবকিছু ঝাঁপসা আধার নেমে আসে।

সোহাগ মিরাকে ঝাকাতে শুরু করে।
সোহাগ মির্জাঃ কি হয়েছে তোমার?
মিরা দুলে পরে যেতে লাগে।
সোহাগ মির্জাঃ মিরা কথা বলো। কেউ আছো? রাইসূল, মাহির প্লিজ দেখও না! মিরা কেন এমন করছে?
তখনই মিরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সোহাগ মিরার রক্তাক্ত মুখটা ধরে ডাকে, এই মিরা ওঠো!

ওঠো বলছি! ওঠো না!
রাইসূল আর মাহির এসে কিছু একটা ভেবে মিরাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গাড়িতে,
সোহাগ মির্জাঃ কি হয়েছে মিরার?

রাইসূল আর মাহির চুপ করে আছে। দুজন একে অপরের চোখের দিকে তাকাচ্ছে আর নিরবতা পালন করছে।
সোহাগ মির্জাঃ কি হলো তোমরা তো ডাক্তার। বলো কি হয়েছে আমার মিরার?

মাহিরঃ বাবা হসপিটালে গিয়ে মিরা মায়ের কিছু টেস্ট করতে হবে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
সোহাগ মির্জাঃ মানে?

সোহাগ রাইসূলের দিকে তাকিয়ে দেখে রাইসূল মাথাটা নিচু করে শার্টের হাতায় চোখের পানি মুছছে। মায়া তার মায়ের হাতের তলা ডলতে ডলতে মাকে ডাকছে। অনেক বিড়ম্বনার মধ্যে আছে সোহাগ।
হসপিটালে এসে মিরাকে খাটনিতে শুইয়ে দিয়ে ও.টি তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সোহাগ মিরার হাতটি ধরে আছে। একটা নার্স এসে সোহাগের থেকে মিরার হাতটা ছাড়িয়ে দিয়ে মিরাকে ভেতরে নিয়ে যায়। সবাই বাইরে বসে আছে। সোহাগ কাঁদছে। আর মনে মনে বলছে,

সোহাগ মির্জাঃ আজ তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার ছিল মিরা। শুধু তুমি নও আমিও যে তোমাকে খুব ভালোবেসে এসেছি। তোমার সব ভুল ধারণাগুলো আজ ভেঙে দেব আমি। একবার সুস্থ হও। তোমাকে বলব আমার মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা কথা গুলো। তুমি বলতে না আমায়? আমার এই চোখ, মুখ, ঠোঁট, নাক আর এই বাঁকা স্বভাব। সব কিছুকেই তুমি ভালোবাসো! তাই তো আমি এতোগুলো বছর ধরে এই সবকিছুই তোমার জন্য তুলে রেখেছি। তোমার আমানত হিসেবে।

এগুলো যে অন্য কাউকে কক্ষনও ছুঁতে দেয় নি আমি। একটা সময় তোমার সামনে হিংস্র মানুষ হয়ে দাড়াতে চেয়েছিলাম। তোমায় কস্ট দেব বলে। তোমার প্রতি প্রতিশোধ নেব বলে। কিন্তু তার মানে এই নয় তোমার অধিকারটা আমি অন্য কাউকে দিয়ে দেব। তুমি যা দেখতে সব ভুল। ওগুলো তোমাকে দেখাতাম কস্ট দেব বলে।

সোহাগ বসে থেকে কথাগুলো মনে মনে বলতে থাকে। এমন সময় মায়া এসে নিচে বসে সোহাগের হাঁটুতে মাথা রাখে। সোহাগ তাকিয়ে মায়াকে দেখে মায়ার হাত রেখে বলে,
সোহাগ মির্জাঃ আচ্ছা মায়া! সবকিছুই তো ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। তাহলে এমনটা কেন হলো?

মায়া মুখ তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখে বাবার চোখে পানি টলমল করছে। মায়া উঠে বাবার পাশে বসে চোখ থেকে পানি মুছিয়ে দেয়।
মায়াঃ কেঁদো না বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে। ওই আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। সে নিশ্চয় ভালো মানুষের সাথে খারাপ কিছু করতে পারে না। আমার মা তো ভালো তাই না?
সোহাগ মির্জাঃ হুমমমম
সোহাগ মায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।

মাহির বেড়িয়ে আসে ও.টি থেকে। সবাই মাহিরকে দেখে এগিয়ে যায়। মাহির সোহাগ আর মায়ার সামনে এসে দাঁড়ায়।
সোহাগ মির্জাঃ কি হয়েছে মাহির? মিরাকে দেখেছো? ও এখন ঠিক আছে তো?
মাহির মাথাটা নিচু করে আছে।
মায়াঃ কি হলো বলুন?

মাহিরঃ মায়া, বাবা যে কথাটা এখন আমি আপনাদের বলব, প্লিজ আপনারা ভেঙে পরবেন না।
সোহাগ মির্জাঃ এভাবে কেন বলছো বাবা? মিরার কি কঠিন কোনও অসুখ হয়েছে?

মাহির মাথাটা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলে।
মাহিরঃ মিরা মায়ের শরীরে ক্যান্সার ধরা পরেছে। এখন লাস্ট স্টেজে আছে।


পর্ব ৩২

তখন মাহিরের কথা শুনে সোহাগ স্ট্রোক করে। দুইদিন ধরে আই.সি. ইউ তে ছিল। এখন কেবিনে শিফট করা হয়েছে। সোহাগ চোখ মেলতেই পাগলের মতো হয়ে যায়। না কোনো ওষুধ খেতে চায় আর না নিজের যত্ন নিতে চাই। মুখে শুধু একটায় নাম মিরা। মিরার কাছে যাব, মিরাকে দেখব আরও কত কি। মায়া মাহিরকে অনেক অনুরোধ করে সোহাগকে একটাবার মিরার কাছে নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু মাহির না করে দেয়।

কারণ মাহির যানে এটা করলে সোহাগের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই মায়া কাউকে কিছু না বলে সোহাগকে কথা দেয় রাতে চুপিচুপি মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। সোহাগ মায়ার কথায় অনেক খুশি হয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পরে। রাত তিনটার সময় সোহাগ ঘুম থেকে উঠে দেখে মায়া তার মাথার কাছে ঘুমিয়ে আছে। সোহাগ উঠে বসে ফিসফিসিয়ে মায়াকে ডাকে,

সোহাগ মির্জাঃ মায়া! এই মায়া ওঠ! আমাকে তোর মায়ের কাছে নিয়ে যাবি না?

মায়া চোখ মেলে বাবার দিকে তাকায়। বাবার এমন মায়ের প্রতি ব্যাকুলতা দেখে নিজের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে।

সোহাগ মির্জাঃ কি হলো কাঁদছিস কেন? চল তোর মায়ের কাছে!
মায়া মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বলে। বাবাকে রেডি করে চুপিচুপি কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর বাবাকে নিয়ে মায়ের কাছে যাওয়া ধরে।
সোহাগ মির্জাঃ একি মা ওদিকে কেন যাচ্ছিস?

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
মায়াঃ প্লিজ বাবা গেলে চলো। নইলে কিন্তু আমি যাব না বলে দিলাম।
সোহাগ আর একটাও কথা বলে না। মুখে আঙুল দিয়ে চুপটি করে দাড়িয়ে থাকে। তারপর মায়া সোহাগের চোখে কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে মিরার কাছে নিয়ে যায়।

সোহাগ মির্জাঃ আচ্ছা মায়া মিরাকে কি বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে? এতদূরে কেন আনলি আমাকে?

মায়া আস্তে করে সোহাগের চোখ থেকে কালো কাপড়টা খুলে দেয়। সোহাগ চোখমেলেই সবকিছু অন্ধকার দেখতে থাকে।
সোহাগ মির্জাঃ কিছুই তো দেখতে পারছি না। এখানে এতো অন্ধকার কেন?

মায়া ফোনের ফ্লাশলাইট টি জ্বালিয়ে সোহাগের সামনে ধরে। সোহাগ এবার সামনে তাকাতেই একটা বড় সড় ধাক্কা খায়। যেন সোহাগের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
সোহাগ মির্জাঃ এ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছিস তুই?

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
মায়াঃ মায়ের কাছে। তুমি মাকে দেখতে চাচ্ছিলে না বাবা? ওইতো দেখ মা কতো শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।
সোহাগ কেঁদে দেয়।
সোহাগ মির্জাঃ এসব তুই কি বলছিস মায়া?
মায়াঃ সত্যি বলছি বাবা! মা আর নেই।

সোহাগ সেখানে বসে পরে মিরার কবরের সামনে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। আর মিরাকে বলে, এ তুমি আমায় কি শাস্তি দিলে মিরা? তুমি ছাড়া যে এই পৃথিবীতে আমি একা হয়ে গেলাম। আমার যে আর বেঁচে থাকার মানে নেই। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেলে তুমি।
সোহাগের সাথে মায়াও কেঁদে চলেছে। কিছুক্ষণ পর চোখের পানি মুছে সোহাগকে সামলানোর চেস্টা করে মায়া।
মায়াঃ বাবা ওঠো! চলো! একটু পরে সকাল হয়ে যাবে।

সোহাগ যেতে চায় না। হাওমাও করে কাঁদে। আর আবল তাবল বকে, দেখ না মায়া কত শান্তিতে ঘুমোচ্ছে তোর মা। ও কি দেখতে পাচ্ছে না আমার কস্ট হচ্ছে, আমি কাঁদছি। কেন চলে গেল আমায় ছেড়ে ও? কেন আমি একটাবার কথা বলতে পারলাম না ওর সাথে? পারলাম না ওকে বোঝাতে কতটা ভালোবাসি। আমি জানি আমি কাঁদলে মিরা কস্ট পাবে। কস্ট পেয়ে চলে আসবে আমার কাছে? আমি এখানে ওর জন্য অপেক্ষা করি। ও আসলে ওকে নিয়ে বাড়ি যাব।

৬ বছর পর,

আবিরঃ তারপর কি হলো মায়া?
আবিরের কথায় মায়ার ধ্যান ভাঙে, চোখের পানি মুছে আবিরের দিকে তাকায়।

মায়াঃ বাবাকে আমি সামলিয়ে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। হসপিটালের সামনে পৌঁছাতেই কোথা থেকে যেন মনা আন্টি এসে বাবার বুকে ছুড়ি বসিয়ে দেয়। বাবার বুকটা রক্তাক্ত ছুড়িতে আঘাত করে পৈচাশিক নিয়মে হাসতে থাকে। আর বলে বাবার প্রতি তার প্রতিশোধ পূর্ণ হয়েছে।
অনেক চেস্টা করেও বাবাকে বাঁচানো যায় নি। মায়ের মতো বাবাও চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।
আবিরঃ আর মাহির?

মাহিরের নামটা শুনেই মায়া থমকে যায়। বুকের ভেতরটায় এক চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হতে থাকে মায়ার। এমন সময় মায়ার ছোট্ট মেয়ে মিরা দৌড়ে আসে। মায়ার সামনে হাত পেতে বলে,
মিরাঃ মাম্মাম দাও না দশটা টাকা! আইসক্রিম খাব!
মায়া রাগি দৃস্টিতে মিরার দিকে তাকায়।
মায়াঃ এইমাত্র বাবাই তোমাকে আইসক্রিম খাওয়ালো না?

মিরাঃ হুমমম খাইয়েছে তুমি তো আর খাওয়াও নি।
মায়াঃ কি বললে তুমি?
আবির পকেট থেকে দশ টাকা বের করে মিরার সামনে ধরে। আর মিরা টাকাটা নিয়ে আবিরের গালে একটা পাপ্পি দিয়ে বলে,
মিরাঃ আমার বাবাই কত্ত ভালো। মাম্মাম পঁচা ভ্যাআআ।

মায়ার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙিয়ে দৌড়ে পালায় মিরা।
মায়াঃ আপনি ওকে টাকা কেন দিলেন? এতো আইসক্রিম খেলে অসুস্থ হয়ে পরবে তো আমার মেয়ে!
আবিরঃ তোমার মেয়ে?
আবিরের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

মায়াঃ না মানে। আমি ওইভাবে বলতে চায় নি।
আবিরঃ নাহ ঠিক আছে। সত্যি তো এটাই মিরা তোমার আর মাহিরের সন্তান।

মায়াঃ এভাবে কেন বলছেন? মিরাতো আপনাকে ওর বাবাই বলে জানে।
আবিরঃ জানা আর সত্যিকার বাবা হওয়াটা এক নয়। আমার খুব ভয় করে মায়া মাহির যদি আবার ফিরে আসে তোমার জীবনে?
মায়াঃ আসবে না।

আবিরঃ আমি কখনও তোমার কাছে কিছু জানতে চায় নি আজ চাইছি একটা কথার উত্তর দেবে?

মায়াঃ কি?
আবিরঃ কি এমন ঘটেছিলো যে মাহিরকে ছেড়ে চলে আসলে তুমি? না মানে তুমি যদি বলতে না চাও তাহলে ঠিক আছে।
আবির মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মায়ার প্রতিউত্তর কি হয় তায় শোনার জন্য। মায়া কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবিরকে আবার বলে।
মায়াঃ এতোগুলা বছর আমাকে আর মিরাকে আপনি আশ্রয় দিয়েছেন এটুকু জানার অধিকার আপনার আছে!

আবিরঃ তাহলে বল মায়া?
মায়াঃ আপনার মনে আছে আবির? হাদিচ পার্কে একদিন আমার সাথে আপনি দেখা করতে গিয়েছিলেন! সেদিন আমার আর আপনার কথা বলতে থাকা কিছু ছবি স্নিগ্ধা তুলে নেই। ওইদিন বাবার বাড়িতে পার্টি ছিল। উনি স্নিগ্ধাকে রাতে যখন পার্টিতে যাওয়ার জন্য আনতে যায় তখন স্নিগ্ধা পানির সাথে উনাকে নেশার ওষুধ মিসিয়ে খাইয়ে দেয়। তারপর আপনাকে আর আমাকে নিয়ে উনার মনের মধ্যে ভুল ধারণা ঢুকিয়ে উনার এতাটা কাছে স্নিগ্ধা চলে যায় যে স্নিগ্ধা উনার সন্তানের মা হয়ে যায়।

আমি তো কিছু যানতামই না। স্নিগ্ধা যখন তিন মাসের অন্তঃস্বত্বা তখন আমি উনার আর স্নিগ্ধা বলা কথাগুলো শুনে ফেলি। উনি স্নিগ্ধাকে বলেছিল বাচ্চাটাকে এবোশন করে ফেলতে কিন্তু স্নিগ্ধা চায় নি। সে ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যেতে চেয়েছিল। আর যাই হোক স্নিগ্ধার কাছে বাচ্চাটা নিজের ভালোবাসার চিহ্ন। এমনিতেই স্নিগ্ধার ভাই, ভাবি, মা সবাই জেলে। এই অবস্থায় স্নিগ্ধাকে একা ছাড়া ঠিক হবে না। পরিস্থিতি ভেবে আমি আর চুপ করে থাকতে পারি নি। আমি চাই নি আর কোনও সন্তানের জীবন আমার মতো হোক।

তাই আমি স্নিগ্ধাকে আর উনাকে বিয়ে দিয়েছি। নিজের হাতে আমি উনার আর স্নিগ্ধার বাসর ঘড় সাজিয়েছি। উনাকে স্নিগ্ধার ঘড়ে দিয়ে যখন আমি বাইরে আসি তখন মাথা ঘুরে পরে যায়। পরেরদিন হসপিটাল থেকে রিপোর্টগুলো হাতে নিয়ে খুলে দেখি আমিও মা হতে চলেছি। আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করব তাই রাস্তায় বেরিয়ে অনমনা হয়ে হাটতে থাকি। হাটতে হাটতে একটা গাড়ীর সামনে চলে আসি। গাড়ীটা ধাক্কা দেওয়ার আগেই আপনি এসে আমাকে বাঁচান। ইচ্ছা ছিল ওইদিনই মরে যাব। কিন্তু আপনি পারি নি।

আবিরঃ এতোকিছু ঘটেছে তোমার জীবনে?
আবির মায়ার দিকে তাকায়।

আবিরঃ কেঁদ না মায়া। তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার যে খুব কস্ট হয়।

মায়া চোখ মুখ মুছে আবার বলতে শুরু করে।
মায়াঃ আমি অনেকবার চেস্টা করেছিলাম বাড়িতে ফিরে যাব। কিন্তু পারি নি। কারণ আমার বাড়িতে উনি স্নিগ্ধার সাথে থাকতো।
আবিরঃ কোন বাড়িতে?

মায়াঃ মির্জা প্যালেস আমার বাবার বাড়ি! উনি ছিল রাইসূল মামার আর রাইশা ফুপ্পির হারিয়ে যাওয়া সন্তান। নেহা নামের এক পুরোনো শত্রু উনাকে ভূমিষ্ট হওয়ার সাথেই উনার পালিত বাবা-মা মুফতি খান ও সাহেদ খানের কাছে তুলে দেয়। সাথে অনেকগুলো টাকা দেয় উনাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবার জন্য। তারা খুব ভালো ছিল। তাই নিজের সন্তানের মতো করে উনাকে বড় করে তুলেছে।


পর্ব ৩৩

মাহির এখন মানসিক রোগী। সারাক্ষণ অন্ধকার রুমে এলোমেলো ভাবে বসে থাকে আর আংড়নো অবস্থায় মুখ বাকিয়ে থপথপ করে হাটে ও বিনবিনিয়ে গান গায়। কেন যে এলে বা জড়ালে প্রেমে কেন তুমি আমায়…কেন বুঝিনি কি হারিয়ে আমি পুড়ে পড়ে যে ছাই…জীবনে কি খেলা খেলেছো যে হায়… এর শেষ বল কোথায়…ঢেউয়ে ভাঙে দুকুল ভাঙে স্বপ্ন হায়..আমি আধাঁরে হারায়..

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে মাহির ভয়ে গুটিশুটি হয়ে বিছানার চাদরটি টেনে নিয়ে নিজের মুখের ওপর ধরে রাখে। পড়নের পাজামার দড়িটা মুখের মধ্যে ভরে চিবাতে থাকে। এদিকে মুফতি খান আর রাইশা এসে রুমের লাইটটা অন করে মাহিরকে ডাকে। মাহির সোনা, বাবা আমার, ওষুধ খেতে হবে না? কোথায় তুমি?

লাইটের আলো মাহিরের অসহ্য লাগে। মায়েরা কাছে আসতেই চিৎকার জুড়ে দেয়।

চোর চোর। আমার মায়াকে নিয়ে গেছে, এখন আমাকে নিতে এসেছে। মাহিরের দুই মা এসে মাহিরকে শক্ত করে ধরে ওষুধ খাওয়ানোর চেস্টা করে। মাহির দাঁপাদাপি ঝাঁপাঝাপি শুরু করে দেয়। যার ফলে রুমের জিনিসপত্র সব এলোমেলো হতে থাকে। কাচের তৈরি জিনিসগুলো ভেঙেচুরে একাকার। রাইসূল শব্দ শুনে রুমে এসে মাহিরের হাত, পা, খাটের সাথে বাঁধে। তারপর মাহিরকে একটা ইনজেকশন দিয়ে চলে যায়।

রাইশা আর মুফতি দুজনে মিলে কাঁদছে আর একে অপরকে শান্তণা দিচ্ছে।

রাইশাঃ কোথায় চলে গেলি তুই মায়া?

মুফতি খানঃ ছেলেটা কি কখনও সুস্থ হবে না বোন?
রাইশাঃ রাইসূল তো বলেছে মায়া ফিরে আসলে মাহিরের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

মুফতি খানঃ সব ওই কাননাগিনীর জন্য হয়েছে। মায়ের জেলে যাওয়ার প্রতিশোধ পূরণ করতে মিথ্যা নাটক করে আমার বৌমাকে ছেলের থেকে আলাদা করে দিয়েছে ওই স্নিগ্ধা।

রাইশাঃ বাদ দাও তো বোন স্নিগ্ধা যে মাহিরকে ডিভোর্স দিয়েছে এটাই অনেক। মাহির এখন একটা ধাক্কার মধ্যে আছে। মায়াকে এইভাবে ঠকিয়েছে ভেবে সহ্য করতে পারে নি। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে মাহিরের জন্য।

মুফতি খানঃ হুমমমম। বোন আমার বৌমা ঠিক আছে তো? না জানি এতোদিন কোথায় আছে। কেমন আছে?

রাইশাঃ ওই উপর অলার উপর ভরসা রাখো সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখ আমার বিশ্বাস ছিলো আমার সন্তান বেঁচে আছে। তাই তো আমি এতো বছর পর মাহিরকে ফিরে পেয়েছি।

হসপিটাল থেকে রুসা বের হয়েছে। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। ড্রাইভার ছুটিতে আছে বলে নিজেই ড্রাইভ করছে। হঠাৎ জঙ্গলের রাস্তায় রুসার গাড়ীটা বন্ধ হয়ে যার। স্ট্রাটই হচ্ছে না। তাকিয়ে দেখে প্রেক্টোল শেষ। কি আর করবে লিফটের জন্য দাড়িয়ে আছে। প্রায় আধ ঘন্টা পর একটা গাড়ী আসে। রুসাকে দেখেও পাত্তা না দিয়ে কিছু দূর চলে যেয়ে আবার ফিরে এসে রুসার সামনে দাড়ায়। রুসা খুশি হয়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ীর দরজায় নক করে বলে, একটু লিফট দেওয়া যাবে। সাথে সাথেই কয় একজন ছেলে মাতাল অবস্থায় গাড়ী থেকে নেমে রুসাকে টেনে গাড়ীর ভেতরে ফেলে দেয়।

রুসা ভয়ে চিৎকার করতে থাকে। এরইমধ্যে ছেলেগুলো রুসার জামার হাতা দুপাশ থেকে ছিড়ে ফেলে।

ঠিক ওই রাস্তা দিয়েই অফিসের থেকে বাড়ি ফিরছিলো আবির। রুসার চিৎকার শুনে আবির এগিয়ে এসে এমন অবস্থা দেখে ছেলেগুলোকে গন পিটুনি দেয়। ছেলেগুলোর মাতাল অবস্থায় আবিরকে মারার শক্তি ছিলো না। তাই শুধুই মার খেয়ে যায়। তারপর আবির রুসার জামার হাতা ছিড়া দেখে চোখ সরিয়ে নিজের কোর্ট টা খুলে রুসার পিঠের উপর রাখে।
কোর্ট টা ঠিক করে পড়তে পড়তে রুসা আবিরকে বলে,

রুসাঃ আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেব? আজ যদি আপনি না থাকতেন তাহলে…

আবিরঃ থাক! আমি বুঝি না আপনারা মেয়েরা এতো রাত্রে এই রাস্তায় কি করেন?

রুসাঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমি একজন ডাক্তার। আসলে ইমারজেন্সি রোগী ছিল তাই দেরি হয়ে গেছে।
আবিরঃ ওহহ ছরি। আমি বুঝতে পারি নি।

রুসাঃ নাহ না ঠিক আছে।
আবির চলে যেতে লাগে রুসা আবিরকে ডাক দেয়।
রুসাঃ শুনুন
আবির রুসার দিকে ঘুরে দাড়ায়।
আবিরঃ কিছু বলবেন?

রুসাঃ আসলে আমার গাড়ীর প্রেক্টোল শেষ হয়ে গেছে। যদি একটু লিফট দিতেন।

আবিরঃ ওহহ শিওর আসুন।
আবির গাড়ী চালায় আর রুসা আবিরের দিকে আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকায়। হঠাৎ রুসার মনে একটা ভালো লাগা কাজ করে আবিরকে নিয়ে।

বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রুসা নেমে যায়।
আবিরঃ এখানে আপনার বাসা?

রুসাঃ না একটু সামনে।
আবিরঃ তাহলে এখানে নামলেন কেন?
রুসাঃ মায়ের ভয়ে। মা যদি দেখে আপনার গাড়ী থেকে আমি নেমেছি তাহলে রাতের মধ্যে আমাদের বিয়ে দিয়ে ছাড়বে।
রুসার কথা শুনে আবির হেসে দেয়।
রুসাঃ একি হাসছেন কেন?

আবিরঃ আপনার কথা শুনে।
রুসাঃ ওকে আসি হ্যাঁ। নইলে মা চিন্তা করবে।
বলেই রুসা চলে যায় আর যাওয়ার সময় আবিরের গাড়ির মধ্যে নিজের ফোনটা ইচ্ছে করে ফেলে রেখে যায়। যাতে পরে যোগাযোগ রাখতে পারে।


পর্ব ৩৪

স্নিগ্ধা তার পোষা গুন্ডাদের ফোন করছে। কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না দেখে রাগ করে ফোনটাই আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে দেয়। ফোনটা ছুড়ে মারতেই নেহার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে। নেহা বসা ছেড়ে উঠে দাড়ায়।
নেহাঃ এসব কি করছো?

স্নিগ্ধা রাগি লুক করে চুলগুলো এলোমেলো করে চেচিয়ে ওঠে,

স্নিগ্ধাঃ তো কি করবো? সেই তিন ঘন্টা ধরে ছেলেগুলোকে ফোন করছি কিন্তু তুলছেই না। আমার জাস্ট অসহ্য লাগছে এখন।

নেহাঃ আহা; এতো অসহ্য লাগার কি আছে? আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম ওই সোহাগ মির্জা আর তার স্ত্রীকে একেবারে মেরে ফেলো। হয়ে যেত সব প্রতিশোধ পূর্ণ। শুধু শুধু তোমার এই ছেলে মানুষী।

স্নিগ্ধাঃ না আন্টি! এতো সহজে ওই সোহাগ মির্জা আর তার স্ত্রীকে আমি মৃত্যু দেব না। তিল তিল করে একটু একটু যন্ত্রণা দিয়ে মারবো ওদের। ওই সোহাগ মির্জা আমার ছোট খালামনিকে মেরেছে, নানুকে মেরেছে। ওর জন্য আমার মায়ের জেল হয়েছে। ওর মেয়ের জন্য আমার ভাইয়ের জেল হয়েছে। আর ওই মাহির! যাকে আমি ভালোবেসতে চেয়েছিলাম সেও আমার ভাই, ভাইয়ের বউকে জেল খাটাতে কম কাটখোরি পুড়ায় নি। ওরা আমার কাছ থেকে আমার পুরো পরিবারটাই কেরে নিয়েছে। এখন আমিও ওদের সবার জীবন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেব। যেন মনে হয় বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটা আরও ভালো ছিলো।
তখন নেহার ফোনটা বেজে ওঠে। নেহা ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরে বলে,

নেহাঃ হোয়াট? এখন কোথায় আছে ওরা?
ওপাশ থেকেঃ….
নেহা কথাটা শুনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ফোনটা কাটে।
স্নিগ্ধাঃ কি হয়েছে আন্টি?

নেহাঃ পালানোর চেস্টা করেছিল সোহাগ মির্জা আর তার স্ত্রী মিরা।
স্নিগ্ধা চমকে ওঠে।
স্নিগ্ধাঃ মানে?

নেহাঃ হুমমম। কিন্তু পারে নি। এতোক্ষণ সেইজন্যই ছেলেগুলো ভয়ে তোমার ফোন ধরে নি। এখন ফোন করেছে আর ফোনটা তো তুমি আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেছো। এজন্য আমাকে ফোন করল ওরা।
স্নিগ্ধাঃ কিভাবে পালানোর চেস্টা করে ওই সোহাগ মির্জা আর মিরা? ছেলেগুলোর কিচ্ছু করতে হবে। একটা কাজ যদি ঠিক ভাবে না করতে পারে তাহলে ওদের রেখে কি লাভ!

নেহাঃ এজন্যই বলছিলাম মেরে ফেলো সোহাগ, মিরাকে। একবার যখন চেয়েছে আবার চেস্টা করবে পালাতে।
স্নিগ্ধাঃ না পারবে না আন্টি।

নেহাঃ তুমি কিভাবে বলতে পারো পারবে না?
স্নিগ্ধাঃ কারণ রোজ ওদের শুধু একটা রুটি খেতে দেওয়া হয়। দুজনের সারাদিনে এতটুকু খেয়ে অতটা শক্তি হবে না, যে আমাদের জাল থেকে বেড়িয়ে যাবে।

নেহাঃ তুমি ভুল করছো স্নিগ্ধা আমার মনে হয় এখন ওদের মেরে ফেলাই উত্তম। অনেক শাস্তি দিয়েছো ওদের এখন অন্তত্য মেরে ফেলো।
স্নিগ্ধাঃ না আন্টি ওদের আমি তিল তিল করে মারবো।

নেহাঃ ঠিক আছে তুমি শুনবে নাতো। তাহলে আমিই মেরে ফেলবো। আমি আর পারছি না ধৈর্য ধরতে। ওদের মৃত শরীরটা দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে আছি।

স্নিগ্ধাঃ একদম না। ওরা আমার শিকার। আপনি ওদের শাস্তি দেওয়ার কেউ না।

নেহাঃ আমি কেউ না? তুমি ভুলে যেও না স্নিগ্ধা আমার প্লানে ওরা আজ তোমার কবলে। অতীতটা ভুলে গেলে?
অতীত,

নিশা নামের একটি মেয়ে হুবহু মিরার মতোন দেখতে। চেহারাটায় হুবহু মিরার মুখটা বসানো। একদিন নেহার গাড়ির সামনে মেয়েটি চলে আসে। নেহা খোঁজ নিয়ে যানতে পারে মেয়েটা খুব অসহায়। বাড়িতে অসুস্থ বাবা আর ছোট একটা বোনকে নিয়ে তার সংসার। একা হাতে নিশার সবটা সামলাতে হয়। নেহা ঠিক করে নেয় এই মেয়েটিকে কিছু টাকার লোভ দিয়ে সোহাগের জীবনে একবার এ্যান্টি করাতে পারলেই পুরোনো প্রতিশোধ পূর্ণ করতে পারবে।

নিশাকে নেহা প্রস্তাব দেয় মিরার অভিনয় করার জন্য। কিন্তু নিশা রাজি হয় না। কিছুদিন পর নিশা নিজের থেকেই নেহার কাছে এসে মিরার অভিনয় করার জন্য প্রস্তুত হয়। কারণ ইতিমধ্যে নিশার শরীরে ক্যান্সার ধরা পরে। খুব একটা বেশি দিন নিশার হাতে সময় নেই। সে যদি মারা যায় তাহলে তার বাবা, বোন একেবারে নিস্ব হয়ে যাবে।

নিশার সিদ্ধান্তে খুশী হয়ে নেহা অনেকগুলো টাকা দেয়। টাকাগুলো নেয়ার পর থেকে নিজের চলন, আচারণ মিরার মতো করার চেস্টা করে নিশা। নেহা মিরার ব্যাপারে সব বোঝাতে থাকে নিশাকে। নিশা সব প্রাক্টিস করার পর নিজেকে মিরা ভাবার চেস্টা করে অভিনয়টার জন্য। বাড়ি ফেরার পথে নিশা মাথা ঘুরে রাস্তায় পরে যায়। হসপিটালে কিছু টেস্ট করে করে নিজের নাম মিরা দিয়ে। পরের দিন রিপোর্টগুলো আনতে গেলে দেখে সবকিছু নরমাল আছে। কারণ আসল মিরার সাথে নিশার রিপোর্টগুলো বদলে যায়। যার জন্য আসল মিরা ভেবে নেই তার ক্যান্সার হয়েছে।

মিরা সোহাগের সাথে পরেরদিন সকালে দেখা করতে এসে মির্জা প্যালেসের সামনে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। তখন নেহা আর নিশা দুজনে মিরাকে বাড়ির সামনে বসে থাকতে দেখে চমকে যায়। তাই প্লান করে কৌশলে মিরাকে তুলে নিয়ে চলে যায় নেহা। যাওয়ার সময় দস্তাদস্তিতে মিরার ফোনটা পরে যায় সেখানে।

নোহা আর মিরা চলে যাওয়ার পর নিশা সোহাগের বাড়িতে যাওয়া ধরে হঠাৎ রাস্তায় একটা ছোট্ট বাচ্চাকে এক্সিডেন্ট হতে দেখে দৌড়ে যায় বাঁচাতে। যার ফলে নিজেই এক্সিডেন্টে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। তার পরের ঘটনার যা কিছুই হয় সব নিশার সাথে ঘটে। সবাই নিশাকে মিরা ভাবে। তবে নিশা কোমায় যাওয়ার এক্টিং করেছিল। সোহাগকে দেখে মিরার হাব ভাব বোঝাতে নেহার শিখিয়ে দেওয়া অভিনয় করেছিল। আর যার কবরের কাছে মায়া সোহাগকে নিয়ে গিয়েছিল সে মিরা নয় নিশা।

অন্যদিকে যখন মনার ছুড়ির আঘাতে সোহাগ মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিল তখন বিদেশ থেকে আসা নাম করা ডাক্তার জাকির হোসাইন রাইসূল আর মাহিরের মনের অবস্থা ভালো না দেখে ও.টি থেকে দুজনকে বুঝিয়ে বের করে দিয়ে একা স্নিগ্ধা আর ডা.মানহার সাথে সোহাগের চিকিৎসা করে।

তারপর ডা.জাকির হোসাইন টাকা খেয়ে স্নিগ্ধাও মানহার প্লানে সাই দেয়। সবাইকে বলে সোহাগ মারা গেছে। তারপর সোহাগের দেহটা কফিনে ভরে পোর্ট মডেমের জন্য পাঠিয়ে দেয়। সকলে কান্না করতে থাকে আর ওদিকে সোহাগের দেহটা সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্য একটি কাটা ছেড়া লাশের সাথে। যার চেহারা বির্ভস্ত ছিলো। ডা.মানহা একবার মায়াকে খুন করার চেস্টা করে যার জন্য সেও এখন জেলে।

বর্তমান,

স্নিগ্ধাঃ কোনও অতীত ভুলি নি আমি। তবে আমি চায় না মেজ খালামনির দেওয়া কথার খেলাপ করতে। আমি তাকে কথা দিয়েছি সোহাগ মির্জা আর তার স্ত্রীকে খুন করব না।


পর্ব ৩৫

রুসার সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যাবার কথা আবিরের। রুসা অনেক ক্ষণ আগেই এসে বসে আছে। ফোনটা তখন আবিরের গাড়িতে ফেলে আসার বাহানায় দুজনের আরও একবার দেখা হতে চলেছে। তবে আবির কিন্তু একা আসে নি। সাথে করে মায়া আর ছোট্ট মিরাকেও সাথে করে এনেছে রেস্টুরেন্টে। আবিরের ডাকে রুসা পিছনে ফিরতেই অবাক। সামনে মায়া দাড়ানো আবিরের সাথে। রুসা কি তাহলে ভুল দেখছে নাকি সত্যি এটা মায়া?

রুসার মতো মায়ারও একই অবস্থা। মায়া বুঝতে পারছে না কি করবে এখন! পাস থেকে ছোট্ট একটা মেয়ে মায়াকে ডাকে মাম্মাম বলে। রুসা আরও চমকে যায়। রুসা উঠে আস্তে করে মায়ার সামনে এসে দাড়াতেই মায়া থমকে যায়। আর ভাবে রুসা কি বলবে? মায়া কিছু বলে উঠার আগেই রুসা মায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কোথায় ছিলি এতোদিন তুই? যানিস ভাইয়ের কি হয়েছে? ওই স্নিগ্ধার আসায় তুই আমার ভাইকে ফেলে গিয়েছিলি? তুই যানিস ও কি করেছে?

মায়া রুসাকে সরিয়ে দিয়ে চোখের সামনে নিয়ে জানতে চায় কি হয়েছে উনার?

রুসা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ছোট্ট মিরা বাইনা করে বসে মাম্মাম খুধা লাগছে খাব তো।

আবির তো পুরোই শকড। বুঝে উঠতে পারে না তখন কি বলছে মায়া আর রুসা। তবে শুধু ভয় পাচ্ছে এই হয়তো মায়াকে হারিয়ে ফেলবে।
আবির একটু এগিয়ে এসে মায়ার কাছে যানতে চাই তোমরা কি দুজন দুজনকে চেনো?

রুসা নিজের সাথে মায়ার সম্পর্কটার কথা বলে।

তারপর মায়া রুসাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে তুই আমাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলি! কি হয়েছে উনার?
তখন রুসা সব খুলে বলে মায়াকে। মাহিরের মানসিক অবস্থার কথা।
মায়া আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সব শুনে সেই সময়ই দৌড়ে মির্জা প্যালেসে চলে যায়।

মায়া চলে যাবার পর ছোট্ট মিরা রুসার হাতের আঙুল টেনে ধরে নিচে বসায়।

মিরাঃ কে তুমি?

রুসার ধ্যান এবার মিরার দিকে আসে।
রুসাঃ তুমি কে?
মিরাঃ আগে বল তুমি কে?
আবির মিরাকে নিয়ে টেবিলে বসায়,
আবিরঃ তোমার খুধা লেগেছে না?

মিরাঃ হুমমম বাবাই। পেটের মধ্যে চুচা দৌড়াদৌড়ি করতাছে।
মিরার মুখে আবিরকে বাবাই ডাকটা দিতে শুনে রুসা চমকে যায়। আবিরের দিকে এগিয়ে আসে রুসা।

রুসাঃ আপনি বিবাহিত? আপনার সন্তান আছে?
আবির রুসার দিকে তাকিয়ে রয়। মিরার সামনে কি বলবে বুঝতে পারে না। মিরা আবিরকে টেনে টেবিলে বসায়। রুসাকেও বসতে বলে।
মিরাঃ আরে আন্টি বস না। খেতে হবে তো এখন।

প্রিয় বজ্জাত রিডার্সগন ধইরে বাইন্দে আপনাগে তো গল্প পরানো হইতাছে না। বিহায়ার মতোন পইরা আবার বাজে ভাষায় গালি দিয়া যান। একটা কথা মনে রাইহেন আপনাগে গালি শুনবার লাইগে গল্প লেহি না আমি। ভালো লাগে তাই লেহি। পরলে পরেন না পরলে দূরে যাইয়া মরেন। যত্তসব ফাউল জনগন।

আইছে জ্ঞান দিতে। তামাসা করতে। এতোই যহন পারস তাইলে নিজে গল্প লেখ। আমিও দেহি তোগে কতো রিডার্স হয়। আমার গল্প হিন্দি সিরিয়াল, বাংলা সিনেমা, ইংলিশ এ্যাকশন মুভি, উর্দূ ফিল্ম যাই হোক না কেন তোগে কি রে? তোগে লাইগে আমি আমার গল্পের এক বিন্দুও চেন্জ করবো না। দুই একজন যারা পরে তাদের জন্য লিখি আমি। তোরা আমার গল্প থেকে হয় ভদ্রতা স্বাপক্ষে দূরত্ব বজায় রাখ নয়তো চিংড়ি মাছ, শুটকি ভর্তা আর মাছের ঝোল রান্না শেখ, জীবনে কাজে আসবে।

মায়া মির্জা প্যালেসে গিয়ে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে থাকে, কেউ আছো? মায়ার চিৎকার শুনে সবাই ছুটে আসে। মাহির তো রুমের মধ্যে কাগজ ছিড়ে নৌকা বানাচ্ছিল। হঠাৎ মায়ার আওয়াজে মাহিরের বুকের ভেতরটা নারা দিয়ে ওঠে। মাহির দেখতে চায় কে এসেছে! রুম থেকে বেড়িয়ে মাহির হেলেদুলে হেটে বাইরে আসে।

সিঁড়ির উপর থেকে দেখে নিচে মায়াকে সবাই ধরে কান্নাকাটি করছে। মাহির লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি থেকে নামতে যায়। আর তাই মাঝ সিঁড়ি থেকে পা পিছলে গড়িয়ে নিচে পরে। মাহিরের চিৎকার শুনে সকলে তাকিয়ে এমন অবস্থা দেখে মাহিরের কাছে ছুটে আসে। সবাই মাহিরকে অনেক ডাকে। মায়াও মাহিরকে অনেক বার উঠতে বলে কিন্তু কোনও সাড়া পাই না। এজন্য মাহিরকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওদিকে স্নিগ্ধার লোকেরা সোহাগকে পালিয়ে যাওয়ার চেস্টা করার জন্য অনেক মেরেছে। সোহাগ এখন মিরার কোলে মাথা রেখে কাতরাচ্ছে।
সোহাগ মির্জাঃ পা..পানি। পানি…

মিরা দু’হাত জোড় করে গুন্ডাগুলোর কাছে মিনতি করছে।

মিরাঃ প্লিজ আপনারা এমন করবেন না? যা শাস্তি দেবার আমায় দিন তবুও উনাকে একটু পানি খেতে দিন আপনারা। প্লিজ…

গুন্ডাগুলো মিরার কথা কানেই নিচ্ছে না। বসে বসে তাস খেলছে আর অট্টহাসিতে মেতে আছে।


পর্ব ৩৬ (অন্তিম)

মিরা অনেক মিনতি করে কিন্তু স্নিগ্ধার পোষা ছেলেগুলো শোনে না। মিরা সোহাগের মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে আস্তে করে ছেলেগুলোর কাছে গিয়ে বলে প্লিজ একটু পানি দিন না উনাকে। ছেলেগুলো এক ধাক্কায় মিরাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। মিরা উঠে দাড়িয়ে সোহাগের দিকে তাকিয়ে দেখে সোহাগ গোংরানি টানছে। ছেলেগুলো সোহাগকে এমন ভাবে মেরেছে যে সোহাগের উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পর্যন্ত নেই। মিরার সোহাগকে দেখে কস্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।

সামনে তাকিয়ে দেখে চেয়ারের উপর একটা গান রাখা। মিরা গানটা হাতে নিয়ে ছেলেগুলোর সামনে ধরে রাখে। ছেলেগুলোকে ভয় পাইয়ে সেই সুযোগে সোহাগকে উঠিয়ে গোডাউনের বাইরে নিয়ে এসে সিটকানিটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয় মিরা।

মাহিরকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। জ্ঞান ফিরলে মাহির সবাইকে চিনতে পারে। মায়াকে চোখের সামনে দেখে অনেক খুশী হয় মাহির। মাহির মায়াকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদে। মায়াও কাঁদে আর কথা দেয় কক্ষনো ছেড়ে যাবে না। ভুল বুঝবে না। কস্টও দিবে না।

রেস্টুরেন্টে ছোট্ট মিরা খাওয়ার শেষে মায়াকে খুঁজতে থাকে। আবির আর রুসা মিরাকে নিয়ে মির্জা প্যালেসে যায় সেখানে গিয়ে খবর পায় সবাই হসপিটালে তাই তারা আর দেরি না করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। হঠাৎ তাদের গাড়ির সামনে মিরা আর সোহাগ চলে আসে। আবির গাড়িতে ব্রেক করে থামিয়ে দেয়। নেমে এসে সরি বলেই সামনে তাকিয়ে দেখে সোহাগ, মিরা।

আবিরঃ একি আংকেল আন্টি আপনারা?
মিরাঃ বাবা আমাদের একটু হাসপিটালে নিয়ে যাবে? উনার অবস্থা খুব খারাপ। দ্রুত হসপিটালে নিতে না পারলে উনাকে আর বাঁচানো যাবে না।
আবিরঃ কিন্তু আপনারা বেঁচে আছেন আর আংকেলের এ অবস্থা…
রুসা গাড়ি থেকে মিরা, সোহাগের মুখটা দেখতে পারে না। আবিরের দেরি হচ্ছে দেখে নেমে এসে চোখের সামনে সোহাগ, মিরাকে দেখে চমকে যায়। আরও বেশি আশ্চর্য হয় সোহাগকে রক্তাক্ত শরীরে মিরার কাঁধে ভর করে দাড়িয়ে দুলতে দেখে।

রুসা গিয়ে সোহাগকে ধরে কান্না জুড়ে দেয়।
রুসাঃ একি মামা, মামি তোমারা বেঁচে আছো? আমার মামার এই অবস্থা কে করল?

মিরাঃ স্নিগ্ধার পোষা গুন্ডারা করেছে বলেই মিরা কেঁদে দেয়।
রুসাঃ প্লিজ আবির আমার মামাকে তারাতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।

আবিরঃ হ্যা চলুন আন্টি। আমরা হসপিটালেই যাচ্ছিলাম।

২ দিন পর,

সোহাগ এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। মিরা সবাইকে বলে স্নিগ্ধা আর নেহার সরযন্ত্রের কথা। পুলিশ গোডাউনে গিয়ে স্নিগ্ধার গুন্ডাদের থেকে ঠিকানা নিয়ে স্নিগ্ধাও নেহাকে আটক করে। মাহিরকে প্রথম প্রথম ছোট্ট মিরা বাবা হিসেবে মেনে নিতে চাই নি কিন্তু মায়ের কাছে মাহিরের প্রশংসা আর ভালোবাসার কথাগুলো শুনে এখন মেনে নিয়েছে। ছোট্ট মিরা আবিরকে কথা দিয়েছে আগের মতোই ভালোবাসবে আর বাবাই বলেই ডাকবে যদি আবির রুসাকে বিয়ে করে। তাই আজই হসপিটাল থেকে ফেরার সময় কাজি অফিস থেকে রুসা, আবিরের বিয়ে দিয়ে সবাই বের হলো। আর আমার এই সিরিয়াল এখানেই শেষ হলো।

লেখা – মোছাঃ লিজা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “প্রতিশোধ – আজ তোমার শেষ দিন । koster premer golpo bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – সুখের সন্ধানে – অসাধারণ গল্প ও কাহিনী