রিলেশনশিপ

মনের গহীনে – Romantic Love story BD

মনের গহীনে – Romantic Love story bd: মেয়েটা এক হাতে সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে কফিতে চুমুক দিলো। সৌধ অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে, মেয়েটা তো ভীষন সুন্দরী। শীতের সকালের সমস্ত স্নিগ্ধতা যেনো ভরে আছে মুখটাতে।


পর্ব ১

ভার্সিটির সামনে গার্লফ্রেন্ড এবং নিজের বিয়ে করা বউ দাঁড়িয়ে আছে। সৌধ তার বউ পিংকি কে বললো পাঁচ মিনিট ওয়েট করো আমি রুশাকে বাসায় রেখেই আসছি। পিংকি ছোট করে হুম বলেই তার বান্ধবী রিতুর সাথে কথা বলতে লাগলো।

সৌধ তার গার্লফ্রেন্ড রুশাকে ইশারা করতেই রুশা এসে সৌধর বাইকের পিছনে বসলো।

সৌধর কাঁধে হাত রাখতেই রিতু পিংকি কে বললো বেহায়া মেয়ে একটা। বিবাহিত ছেলের বাইকে ওঠতে লজ্জা করে না। তাও আবার বয়ফ্রেন্ডের বউ এর সামনে।

চরিএহীনা নারী একেই বলে। পিংকি রিতুকে থামিয়ে দিয়ে বললো আরে কি সব বলছিস, ওদের মধ্যে একটা রিলেশন আছে গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড ওরা। ওর অধিকার আছে ওর বাইকে ওঠার, ওর সাথে সময় কাটানো সব কিছুরই অধিকার আছে।

রিতু ধমকে বললো চুপ কর তুই ও গার্লফ্রেন্ড থাকলে তুই কি, তুই তো বউ। ওর থেকে তোর অধিকার টা বেশী। কোন সাহসে তোর সামনে তোর হাজব্যান্ডের বাইক চেপে বাড়ি যায়। লজ্জা করে না ওর। পিংকি হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে বললো আরে ইয়ার রাগ করছিস কেনো বাদ দে না।

রিতু ফুঁসতে ফুঁসতে পিংকি কে বললো এই তুই ই বা আজ ওই ফালতুর জন্য ওয়েট করছিস কেনো? যা বাড়ি যা ওর সাথে একদম যাবি না।

পিংকি হেসে বললো আর বলিস না বাবা টু কড়া গলায় বলে দিয়েছে আজ যেনো দুজন একসাথে বাসায় ফিরি। মা টু আসছে নাকি, বোধ হয় এতোক্ষনে এসেও গেছে। একি ভার্সিটিতে পড়ি আলাদা আলাদা ফিরলে নানারকম কথা হবে। তাই বাবা টু বলে দিয়েছে একসাথেই ফিরতে কয়েকটা দিন।

রিতু বললো ওহ তোর শাশুড়ী আসছে নাকি আজ।
পিংকি বললো ধূররর, কি সব বলিস কিসের শাশুড়ী ওই বাল আমি মানি না।
রিতু বললো সরি, সরি, তোর মা টু আসছে তা মা ওয়ানের খবড় কি?

জানিনা, আমি ওদের সাথে কথা বলি নাকি যে খবড় রাখবো।
কথা বলতে বলতেই সৌধ এসে বাইক থামালো।

রিতু মুখটা পাঁচ বাকা করে পিংকিকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো। আর বিরবির করতে লাগলো দেখলেই গাঁ, পিত্তি চলে যায় ফালতু ছেলে একটা।

পিংকি গিয়ে বাইকে ওঠলো। সৌধ বাইক স্টার্ট দিলো। পিংকি বেশ দূরত্ব বজায় রেখেই বসলো।

বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার চা স্টলের সামনে সৌধর কয়েকজন ফ্রেন্ড কে দেখা গেলো। সৌধ বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিলো চা স্টল ক্রস করতেই স্পিড কমিয়ে দিলো হঠাৎ এমন হওয়াতে পিংকির গাল গিয়ে ঠেকলো সৌধর পিঠে। পিংকি রেগে গিয়ে বললো কি হচ্ছে, ভালো ভাবে যেতে পারলে যাও নয়তো এখানেই নামিয়ে দাও আমায়।

সৌধ স্বাভাবিক ভাবেই বললো চা স্টলে আমার কিছু ফ্রেন্ড ছিলো একসাথে দেখলেই অন্যরকম কিছু ভাবতো তাই ওদের তারাতারি ক্রস করাটা জরুরি ছিলো।
পিংকি কিছু বললো না মনে মনে ভাবলো।

একেই বলে জীবন, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরাঘুরি করলে লুকোচুরি খেলতে হয়না, বউ কে নিজের বাইক ওঠালেই যতো লুকোচুরি।

চমকে ওঠলো পিংকি, বউ ছিঃ কি ভাবছি আমি কিসের বউ একটা কাগজের সই কখনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারেনা।

সৌধর দিকে আড় চোখে একবার তাকিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলো পিংকি। প্রচন্ড বাতাস বইছে, চোখ মেলাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

ভাবতে লাগলো সবার চোখে আমরা স্বামী -স্ত্রী, নাহ সবার চোখে নয় সামাজিক এবং আইনগতভাবেও আমরা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু এই সম্পর্ক টা না তুমি মানো আর না আমি মানি। আর না কখনো আমরা কেউ কাউকে মানবো।

জীবন টা দিনের পর দিন খুবই জটিল হয়ে যাচ্ছে।

আর এই জটিলতার মাঝে আমাদের জীবনটা জরিয়ে ফেলেছে আমাদের বাবা, মা।

আমার বাবা, মা একবারো ভাবেনি তাদের মেয়েকে কার হাতে তুলে দিচ্ছে। তোমার বাবা, মা ভাবেনি তোমারও একটা ভালোলাগা, ভালোবাসা থাকতে পারে বা ইচ্ছে থাকতে পারে।

জীবনটা খুবই সহজ।
নাহ,

জীবন টা সত্যি অনেক কঠিন।
জীবনের এই সহজ, কঠিনের হিসেব মিলাতে গিয়েই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়।

ডায়রির প্রথম পাতায় কারো জীবনের সুখের গল্প লিখা থাকলে শেষ পাতায় থাকে দুঃখের গল্প।

ঠিক তেমনি প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের একাংশে থাকে সুখ অপরাংশে থাকে দুঃখ।

সহজ, সুখময় জীবন থেকে মানুষ যতোটা না শিক্ষা লাভ করতে পারে।
কঠিন, এবং দুঃখময় জীবন থেকে মানুষ তার থেকেও হাজারগুন বেশী শিক্ষা লাভ করে।


পর্ব ২

ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে গেলো পিংকির।

বেশ শীত পড়েছে এই শীতের সকালে এক কাফ কফি হলে মন্দ হয় না। রুম ছেড়ে বেড়িয়ে কিচেনে চলে গেলো। নিজের হাতে কফি বানিয়ে মাপলারটা গলায় পেচিয়ে চলে গেলো ছাদে।

রুশার ফোনে ঘুম ভেঙে গেলো সৌধর। রুশার কর্কশ কন্ঠ শুনে দ্রুত ওঠে বোসলো।

সৌধ এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছো, ভুলে গেছো আজ আমার ফ্রেন্ডের ওখানে যেতে হবে। বলেছিলাম তো আটটার মধ্যে আমার বাসার সামনে থাকবে।
সৌধ বিরক্তি নিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। ৭ঃ৩২ বাজে। বিরক্তি কন্ঠেই বললো রেডি হয়ে থাকো টাইমলি পৌঁছে যাবো। রুশা ফোন কাটতেই সৌধ দ্রুত গিয়ে শাওয়ার নিয়ে নিলো।

টাওয়াল টা ছাদে মেলতে দিতে গিয়েই চোখ আটকে গেলো ডানপাশে,
কালো টি-শার্ট, কালো প্লাজোর সাথে গলায় গোলাপী রঙের মাপলার পেচানো, হাতে সাদা কফির মগ, হালকা ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে।

মেয়েটা এক হাতে সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে কফিতে চুমুক দিলো। সৌধ অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে, মেয়েটা তো ভীষন সুন্দরী। শীতের সকালের সমস্ত স্নিগ্ধতা যেনো ভরে আছে মুখটাতে।

পিংকি আরেক চুমুক দিয়ে ফিরতেই চমকে ওঠলো।

সৌধ এতো সকালে ছাদে, কখনো তো এই সময় এখানে দেখিনি, আর এমন ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে চেয়ে আছে কেনো?

হাতের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ভেজা টাওয়াল, চুল গুলোও ভেজা টপটপ করে পানি পড়ছে গাল বেয়ে। পিংকি হালকা কেশে ওঠলো।

সৌধ চমকে গিয়ে হালকা কাশলো, মুখটা গম্ভীর করে তয়ালে টা রশিতে মেলে দিয়ে চলে গেলো।

পিংকি মুখ টা বাঁকা করে মুখ বির বির করতে করতে কয়েক পা পাইচারী করলো।
সৌধ বাইকের চাবি হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো, সামিয়া চৌধুরী বললেন কোথায় যাচ্ছিস সৌধ?

সৌধ বললো ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে।
ফ্রেন্ড না গার্লফ্রেন্ড?

সৌধ মায়ের দিকে ফিরে তাকালো সে যাই হোক এতো জেনে কি করবে?
বাড়িতে যাকে নিয়ে এসেছো তাকে নিয়েই থাকো। অন্যকাউকে নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। বলেই সৌধ চলে গেলো।

কাজের মেয়ে জবা এসে বললো আম্মা, ভাই আর ভাবী দুই জন, দুইজনরে একবারেই সহ্য করতে পারে না।

এক্কেবারে সাপে নেওলে সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রী তাও এক রুমে থাকে না। একসাথে খাবাড়টা অবদি খায় না। এমন তো জীবনেও দেহিনাই আম্মা।

সামিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন একবছর হয়ে এলো এখনো দুজন দুজনের দিকে ফিরেও তাকালো না। এক উপরওয়ালা ছাড়া এই দুটোকে বোধহয় আর কেউ মেলাতে পারবে না রে।

মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা কি সত্যি ওদের সাথে অনেক বড় একটা অন্যায় করে ফেললাম?

জবা বললো দুঃখ পাইয়েন না আম্মা। হেরা তো স্বামী-স্ত্রী, হেগোর সম্পর্ক তো উপর থিকাই ঠিক হইয়া আছিলো তাই হেগোরি বিয়া হইছে।
বিয়া যখন হইছে হেগোর মহব্বত ও হইবো দেইখেন।

সামিয়া চৌধুরী বললেন সেই অপেক্ষাতেই তো আছিরে।
পিংকি রুমে বসে পড়ছিলো এমন সময় ফোনে মেসেজ এলো তামান্নার, Dst Sowdho bhai to Rusha dainik niye sokal sokal e koi jani ghurte gelo.

পিংকি সাথে সাথে রিপলাই দিলো, To Ami ki korbo dance korbo naki? Sowdho, Rusha Jahanname jak, tui sokal sokal goyendagiri suru korli kno. Portesi faltu msg kore matha noshto korish na

তামান্না রিপলাই দিলো, Maf chai boin, tore nobel dewa darkar, jamai onno meyer sate tanki mare r tui segula dekhe kivabe thakish boin allah jane acca por.
পিংকি মেসেজ টা দেখে ফোনটা এক ঢিল দিলো। সোফায় গিয়ে পড়ায় ফোনের কোন ক্ষতি হলোনা।

সাথে সাথে ফোন বেজে ওঠলো।

পিংকি বেশ বুঝতে পারলো কারা ফোন দিতে পারে।
বিরক্তি নিয়ে মাথার চুল খামচে ধরে ফোন রিসিভ করলো।

ওপাশ থেকে নির্জনা বলে ওঠলো এই পিংক, সৌধ ভাই আর রুশা,
বাকিটা বলার আগেই পিংকি চিৎকার করে বললো, সৌধ ভাই আর রুশা সকাল সকাল ঘুরতে যাচ্ছে একসাথে তাই তো, তা তোর সমস্যা কি? অন্যের খবড় এতো নিস নিজের খবড় কয়বার নিস? তোর বয়ফ্রেন্ড যে ফ্রাইডে তে জারা কে পার্কে বসে লিপ কিস করেছে সেই খবড় নিয়েছিস?

নির্জনা বলে ওঠলো কি,
পিংকি বললো দেখ সৌধ, রুশা যা ইচ্ছে করুক তোরা দয়া করে আমাকে এসব নিয়ে কিছু বলবিনা।

লাইফটা আমার, সৌধর লাইফ সৌধর, রুশার লাইফ রুশার। তোদের এসব নিয়ে নাক না গলালেও চলবে।
প্লিজ দয়া করে ফোন রাখ।
নির্জনা ফোন কেটে দিলো। পিংকি বিছানায় গিয়ে বসে বিছানার চাদর খামচে ধরলো। চিৎকার করে ওঠলো।
আর পারছিনা এসব নিতে, আর ভালো লাগছেনা।
সামিয়া চৌধুরী দৌড়ে এলো কি হয়েছে পিংকি?
এনি প্রবলেম,
পিংকি চোখের পানি মুছে নাক টেনে বললো নো প্রবলেম মা টু৷
আমি একটু বাইরে যাবো,
তুই তো বললি আজ ভার্সিটি নেই।
পিংকি ওঠে ওয়াড্রব থেকে ড্রেস বের করতে করতে বললো হুম নেই, ভালো লাগছে না তাই একটু বাইরে ঘুরে আসবো আর কি।
সামিয়া চৌধুরী বললেন আমি কি সৌধ কে ফোন করবো?
পিংকি বাঁকা হেসে সামিয়ার দিকে তাকালো।
তোমার ছেলের আমার জন্য সময় হবেনা। আর সময় হলেও আমি তার সাথে বেরোতাম না।
ওয়াশ রুম চলে গেলো পিংকি।
সামিয়া চৌধুরী এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবলেন আকাশের সাথে আমার কথা বলতেই হবে।
বিজনেসে মন দিয়ে ছেলের দিকে তার কোন খেয়ালই নেই। আমাকে ওর সাথে এ ব্যাপারে এবার কথা বলতেই হবে। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। এক বছর হয়ে এলো এতোদিনে একটু স্বাভাবিক ও হয়নি দুজনের সম্পর্ক। এবার এদের নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে,
কলেজের কতো ছেলে তোর জন্য পাগল। একটা প্রেম কর না পিংক, সৌধ কে তো তুই স্বামী হিসেবে মানিসই না। আর সৌধ যা সব করে বেড়ায় এই সম্পর্ক মেনে নেওয়ার কোন রাস্তাও নেই। তুই অন্য কিছু ভাব পিংক এভাবে তোর জীবন নষ্ট করিস না।
রিতু বললো কি বলছিস লাবনী, ওরা ম্যারিড। একটা বিয়ে ভাঙা কি এতোই সহজ।
পিংকি চোখ গরম করে রিতুর দিকে তাকালো। হ্যাঁ সহজ। এই বিয়ে আমি মানি না, মানি না। আর না সৌধ কে মানি৷ এই বিয়ে তো ভাঙবেই আজ হোক কাল হোক বিয়েটা ভাঙবেই শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।
রিতু বললো পিংকি তোর কি কোন পছন্দ আছে? বা তোর লাইফে কেউ আছে। পিংকি বললো নেই তবে আসবে না তার ও তো কোন গ্যারান্টি নেই।
লাবনী বললো ইয়েস ঠিক বলেছিস। এছাড়া বিয়েটা তো আর তোদের কারো ইচ্ছে তে হয়নি। আর না তোদের মধ্যে কোন সম্পর্ক তৈরী হয়েছে? না শারীরিক না মানসিক। বন্ধুত্ব টাও তো তৈরী হয়নি তোদের তাহলে কিভাবে সম্ভব একসাথে থাকা বলতো।
পিংকি বললো কখনোই সম্ভব না।
সারাদিন রুশার সাথে সময় কাটিয়ে বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরলো সৌধ।
সৌধ কে বাড়ি ঢুকতে দেখেই পিংকি উপরে চলে গেলো। জবা এসে সৌধ কে এক গ্লাস পানি দিলো। সৌধ পানিটা খেয়েই উপরে যেতে নিলো।
সামিয়া চৌধুরী বললো সৌধ,
সৌধ বিরক্তি নিয়ে থেমে গেলো।
সামিয়া চৌধুরী বললো এসব কি সৌধ? সারাদিন কোথায় ছিলে। কেমন জীবন এটা তোমার। বাড়িতে বউ রেখে সারাদিন বাইরে টো টো করে ঘুরে বেড়াও।
রাতে একসাথে এক ঘরে থাকো না। কেমন ছেলে তুমি, যে নিজের বউকে যোগ্য সম্মান দিতে পারো না।
সৌধ চোখ গরম করে মায়ের দিকে তাকালো।
কঠোর গলায় বললো তুমি যেমন মা, তোমরা যেমন অভিভাবক আমিও ঠিক তেমনি তোমাদের ছেলে।
সামিয়া চৌধুরী উত্তেজিতো হয়ে বললো সৌধ,
সৌধ বললো কুল মা, কুল।
কেনো আমাকে ঘাঁটছো থাকি না আমরা যে যার মতো। আমরা কেউ তো ছোট বাচ্চা নই তাইনা।
সৌধ উপরে চলে গেলো সামিয়া চৌধুরী তারাতারি রুমে গিয়ে আকাশ চৌধুরী কে ফোন করলো।
সুইমিং পুলের পাশে বইয়ে মুখ গুজে বসে আছে পিংকি। সৌধ রুশার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে ছাদে আসলো। পিংকি কে দেখেই ফিরে যেতে নিয়েও থেমে গেলো। পাশের বাসার ছাদে এক যুবক দেখতে পেলো পরিচিত। তাদের ভার্সিটির থার্ড ইয়ারেই পড়ছে এক ব্যাস জুনিয়র। সৌধ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ছেলেটা সৌধ কে দেখে ইতস্তত বোধ করে ফোন বের করে চাপতে চাপতে হাঁটতে লাগলো।

সৌধ পিংকির দিকে একবার চেয়ে আবার ছেলেটার দিকে তাকালো। রুশা হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই সৌধর।
পিংকি তো পড়ছে কিন্তু ছেলেটা এসময় এখানে। বা এই বাসায়ই কেনো। এই বাসায় তো কোন রিলেটিভ নেই ওর তাহলে,
পরোক্ষনেই ভাবলো ধূর আমি এতো ভাবছি কেনো।

ফোনে কথা বলতে বলতেই নিচে নেমে গেলো সৌধ।
পাশের বাসার ছাদের রেলিং এ কনুই ভর করে অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে রইলো সামনের ছাদের সুইমিং পুলের পাশে বসা মেয়েটির দিকে।
ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠলো তুষারের। কতো কাঠখড় পোহাতে হয়েছে তাকে এই বাসাটা ভাড়া নেওয়ার জন্য। এক বছরের চেষ্টার ফলে অবশেষে এই সপ্তাহে বাসার দ্বিতীয় তলার এক রুম পেলো।

তার স্বপ্নের রাজকুমারি কে এবার থেকে রোজ সকাল বিকাল দেখতে পারবে।

কিন্তু সৌধ, নাহ কোন সমস্যা নেই সৌধ তো তার ভালোবাসার মানুষ নিয়েই ব্যাস্ত। যতোদূর জানি এরা কেউ কাউকে মানেই না। তাহলে আমি কেনো আমার ভালোবাসাকে বদ্ধ করে রাখবো? বরং আমার ভালোবাসায় আবদ্ধ করে নিবো আমার স্বপ্নের রাজকুমারীকে।
সামনে সপ্তাহে সৌধর বোন সূচি আসবে। আর সূচি এলে পিংকি কে তার রুমটা ছেড়ে দিতে হবে।

একবছর যাবৎ সূচির রুমেই পিংকি থাকছে। বাড়ির বউ গেস্টরুমে থাকবে সেটা সামিয়া চৌধুরীর ভালো লাগেনি। কিন্তু সূচি আসলে সে কারো সাথে রুম শেয়ার করবে না। ভাই বোন বড্ড জেদী, পিংকিও কম নয়। তবে কোথাও একটু দূর্বল সে।

সামিয়া চৌধুরী পিংকি আর সৌধ কে বললো দুজন যেনো একরুমেই থাকে। বাড়ির বউ গেস্ট রুমে একা থাকবে সেটা সে মানবে না। সে মানলেও আকাশ চৌধুরী কখনো মানবে না। আর তাদের পরিবারে আকাশ চৌধুরীর কথাই শেষ কথা। সৌধ রাগে খাবাড় ছেড়ে গট গট করে চলে গেলো।
পিংকিও রাগে খাবাড় মাখাতে মাখাতে ফুঁসতে রইলো।

সূচির আসতে রাত আটটা বাজলো, আকাশ চৌধুরীর বন্ধুর বাসায় থেকে ইন্জিনিয়ারিং পড়ছে সূচি। কিছু দিন ছুটি পাওয়াতে বাড়ি এলো। বাবা বাড়ি নেই অফিসের কাজে বেশীর ভাগ বাইরেই থাকে। সামিয়া চৌধুরী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সেও ছুটিতে এসেছে। তাই মায়ের সাথে দেখা করতে সূচিও এসেছে। সূচি ক্লান্ত থাকায় কারো সাথে তেমন কথা বললো না। রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

পিংকি সৌধর রুমে যাবে না তো যাবেই না। অনেক ভেবে চিন্তে পিংকি ফোন টা নিয়ে ছাদে চলো গেলো।
সৌধ ও পিংকির সাথে এক রুমে কিছুতেই থাকবে না তাই ছাদে গিয়ে রুশার সাথে ফোনে কথা বলতে লাগলো৷ ছাদের একপাশে সৌধ আরেক পাশে পিংকি ফোনে কথা বলছে।

কথার ফাঁকে ফাঁকে দুজন ই হাঁটছে। সৌধ বললো তুমি কি করে ভাবলে আমি ওর সাথে রুম শেয়ার করবো।
পিংকি ও হাঁটতে হাঁটতে বললো তুই ভাবলি কি করে আমি ঐ কেরেক্টারলেসটার সাথে রুম শেয়ার করবো।
দুজন মুখোমুখি, জোৎস্না রাতের আলোতে দুজনের ই বুঝতে অসুবিধা হলো না সামনে কে আছে।
সেই সাথে দুজনের বলা কথাই দুজনে শুনতে পেয়েছে।

সৌধ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো পিংকির দিকে।
পিংকিও রাগি দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।

সৌধ ফোন টা রেখে ধীর পায় এগোতে লাগলো।
পিংকি খানিকটা পিছিয়ে গেলো, সেই সাথে ঢোক গিললো। এগুতে এগুতে ছাদের রেলিং এ ঠেকলো পিংকির কোমড়।
সৌধ দুপাশে রেলিং এ হাত রাখলো।

পিংকি ভয়ে ভয়ে বললো কি হচ্ছে সৌধ,
সৌধ মুখটা একটু এগুলো। পিংকির বুকটা কেঁপে ওঠলো অজানা ভয়ে,


পর্ব ৩

আঙুল তুলে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো সৌধ এই ক্যারেক্টারলেস এর পরিচয়েই এ বাড়িতে রয়েছো। এই ক্যারেক্টারলেসের পরিচয়েই শহরের নাম করা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছো। মি.আকাশ চৌধুরী বা মিসেস সামিয়া চৌধুরীর পরিচয়ে নয়। মি.সৌধ চৌধুরীর পরিচয়ে।

পিংকি ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। চোখের কোনে পানি এসে গেলো। নিজেকে স্ট্রং করে নিয়ে জোর গলায় বললো সেটা আমার দূর্ভাগ্য।
সৌধ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো দূর্ভাগ্য না সৌভাগ্য তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

পিংকির দম বন্ধ লাগতে শুরু করলো। সৌধ তার এতো কাছে থাকায় মনে হলো তার বুকের ভেতর বিশাল পাথর চেপে আছে। সেই সাথে সৌধর বলা কথা গুলোতে তার কান সহ মাথা ঝিম ধরে যাচ্ছে।
কি করবে সে কি বলবে সে। সৌধ তো মিথ্যে বলছে না।

সৌধ আবারো বললো নেক্সট টাইম আমার বিষয়ে কথা বলার আগে হাজার বার ভেবে বলবে। মনে রেখো সৌধ চৌধুরীর পরিচয়ে সৌধ চৌধুরীর দয়ায় এখানে রয়েছো।

সৌধ কথা গুলো বলে চলে গেলো। পিংকি থ মেরে সেখানেই বসে পড়লো। দুহাতে দুকান চেপে চিৎকার করে বললো না, আমার কারো দয়া চাইনা। কারো করুনা চাইনা। আমি তো নিজের ইচ্ছায় এখানে আসিনি, আর না এখানে থাকতে চেয়েছি। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো পিংকি।

যা আমার না তা আমি কখনোই চাইনা, আমি জানি এই বাড়ি, এই সংসার, মি.সৌধ চৌধুরী এরা কেউ আমার নয়, কেউ আমার নয়। রেলিং এ হেলান দিয়ে বসেই পুরো শীতের রাত কাঁদতে, কাঁদতে পার করলো পিংকি।

সকালে সৌধ ভার্সিটি যাবে বলে তারাহুরো করে শাওয়ার নিয়ে তয়ালেটা ছাদে মেলতে আসলো।
বাম পাশে তাকাতেই দেখতে পেলো পিংকি সেখানে গুটিশুটি মেরে বসেই ঘুমাচ্ছে।
পিংকির ঘুমন্ত মুখটার দিকে চোখ আটকে গেলো সৌধর।

মেয়েটা সুন্দরী এটা জানতাম কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থায় এতো টা মায়াবী লাগে জানতাম না তো,
শীতে নাক টা কেমন লালচে হয়ে গেছে। গেস্ট রুমে গিয়ে থাকলেই পারতো। এখানে থাকার মানে কি এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তয়ালে টা মেলে যেই ছাদের দরজায় পা দিবে অমনি চোখে পড়লো পাশের বাসার ছাদে। হ্যাঁ তুষার। এতো সকালে ছেলেটা এখানে, কোনভাবে কি পিংকি কে ফলো করছে।
যা ইচ্ছে হোক আই ডোন্ট কেয়ার। বিরবির করতে করতে চলে গেলো সৌধ।

সৌধ চলে যেতেই তুষার আবার ছাদের এক কোনে এসে দাঁড়ালো পিংকির দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো ইশ মেয়েটার কি কপাল। এতো বড় বাড়িতে মেয়েটার একটা রুম হলোনা। সারারাত এই শীতে ছাদে কাটালো কেউ একবার খোঁজ ও নিলো না।

আর সৌধ সে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলো। এদের কি মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই নাকি।
যেভাবেই হোক পিংকির সাথে আমার কথা বলতেই হবে। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা এসব।

সৌধ আর সূচি একসাথে বসে খাচ্ছে আর গল্প করছে। সামিয়া চৌধুরী এসে বললো কি ব্যাপার পিংকি কোথায়? সৌধ কিছু বললো না খেতে মনোযোগ দিলো। সূচি সৌধর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো কি ব্রো তোর বউ কই। সৌধ রাগি লুক নিয়ে তাকাতেই সূচি চোখ টিপ দিলো। সামিয়া চৌধুরী রেগে বললেন দুজন এসে খেতে বসেছো বাড়িতে যে আরো একজন আছে সে খেয়াল তোমাদের আছে?

সৌধ বললো সেটা নেওয়ার জন্য তুমিতো আছোই।
সূচি হেসে ফেললো। আর বললো ওহ মা, সে বাড়ির বউ। তার উচিত ছিলো সকালে ওঠে তার হাজব্যান্ড আর ননদ কে দায়িত্ব নিয়ে খাওয়ানোর তা না করে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে, তাইনা ব্রো।

সৌধ হালকা কেশে পানি খেলো। সামিয়া চৌধুরী বললেন ওও আচ্ছা তাই পড়ে পড়ে যখন ঘুমাচ্ছেই তো আমি গিয়েই তাকে ওঠাই।
সৌধ চোখ তুলে সূচির দিকে তাকালো। সূচি ইশারা করলো কি, সৌধ আবার খেতে মনোযোগ দিলো।
সাথে সাথে উপর থেকে সামিয়া চৌধুরী বললো সৌধ পিংকি কোথায় ও তো রুমে নেই।

সূচি জ্বিবে কামড় দিয়ে বললো এই যা, কি ব্রো পিংকি কই। ঘরে ঢুকতে দিসনি? ব্রো এটা কিন্তু ঠিক না। সে তোর লিগ্যাল ওয়াইফ, তার অধিকার আছে তোর সাথে এক রুমে থাকার। আর তুই ই বা কি এতো সুন্দরী একটা মেয়ে কে ঘরেই ঢুকতে দিলিনা। কই ঘরে একসাথে থাকবি রোমান্স করবি। তা না ইটস রেইলি ব্যাড ব্রো। সৌধ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। সূচি হাসি চেপে মুখে খাবাড় পুরে ভয়ে ভয়ে অন্যদিকে তাকালো।

সামিয়া চৌধুরী চিল্লিয়ে ওঠলো কি ব্যাপার আমি কিছু বলছি তোমাদের কানে কি কথা যাচ্ছে না। পিংকি কোথায়। সৌধ সূচিকে বললো মা কে বল ছাদে দেখতে পারে।
জবা কথাটা শুনেই চিল্লিয়ে ওঠলো আল্লাহ গো ভাবি নাকি ছাদে।

সামিয়া চৌধুরী বললেন কিহ,
পিংকি ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো শরীর টা তার খুব একটা ভালো না। শরীর, সেই সাথে মনটাও বড্ড খারাপ হয়ে আছে। সামিয়া চৌধুরী সৌধ কে জোর গলায় বললেন পিংকি ছাদে কেনো রুম ছেড়ে এর জবাব তুমি দাও। সৌধ বিরক্তি মুখ করে বললো সেটা আমাকে না জিগ্যাস করে পিংকি কে করো।
সৌধ পিংকির দিকে তাকিয়ে বললো এই মেয়ে বলো।

আমি তোমাকে ছাদে যেতে বলেছি না তুমি নিজ ইচ্ছেতে গিয়েছো।
সামিয়া চৌধুরী পিংকির দিকে তাকালেন।

সূচি সোফায় বসে বসে মজা নিচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে।
পিংকি মাথা নিচু করেই বললো আসলে মা টু আমিই গিয়েছি। আর কখন যে ঘুমিয়ে গেছি ওখানেই নিজেও জানিনা।
সামিয়া চৌধুরী সন্দেহ চোখে পিংকি আর সৌধ কে দেখতে লাগলো। কড়া গলায় বললো কাল থেকে যেনো এমন না হয়। নয়তো তোমাদের বাবাকে বলে কঠিন ব্যাবস্থা নিবো। আর সৌধ তোমার উচিত ছিলো যে পিংকি রুমে এলো না তাহলে কোথায়।

দায়িত্বজ্ঞান কি কোন দিন হবে না তোমার। দায়িত্ব নিতে শেখো।
সৌধ বললো দায়িত্ব নেওয়ার সময় হওয়ার আগেই দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে এমনতো হওয়ার ই কথা।

সামিয়া চৌধুরী কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৌধ চলে গেলো। সূচি জোরে বললো বাহ সকাল সকাল কি অসাধারণ একটা মুভি দেখা হয়ে গেলো।
জামাই, বউ এন্ড শাশুড়ি হোহো করে হেসে ওঠলো সূচি। পিংকি বিরক্তি মুখ নিয়ে একবার তাকালো আবার চোখ ফিরিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বোসলো।
সূচিও গিয়ে পিংকির পাশে বোসলো। হেই ওয়ান এন্ড অনলি ব্রাদার্স ওয়াইফ। তোমার সাথে তো কাল কথাই হলো না। তো বলো কেমন চলছে দিনকাল।
পিংকি বললো হুম ভালো তোমার। আমারো বেশ ভালো।

এতো সুন্দরী একটা ভাবি আমার আর ভাই কিনা পর নারীতে বিভোর, এটা কি মানা যায়।
পিংকি বিব্রত বোধ করলো। মেয়েটাকে তার বেশ বিরক্তই লাগে যে কটা দিন থাকে একদম জ্বালিয়ে মারে। মানি বা না মানি ননদ তো। সব গুলা একি গুয়ালের গরু।

সূচি বললো ইটস ওকে কষ্ট নিও না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আগে নিজে মন থেকে মেনে নাও তারপর ঠিক ব্রোও মেনে নিবে। তুমি তো আমার থেকে জুনিয়র কিন্তু সম্পর্কের খাতিরে তো তোমার সাথে আমার মজারই সম্পর্ক তাইনা।

শুনো একটা ভালো সাজেষ্ট দেই। পুরুষ মানুষের মন যতো কঠিন ই থাকুক একটা মেয়ের কাছে তারা সবসময়ই দূর্বল হয়। আর তুমি তো ওর বিয়ে করা বউ। নিজের অধিকার আদায় করে নাও। তোমার এতো সুন্দর চেহেরা যে কোন ছেলে কে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট আর তুমি কিনা আমার ভাই কে বাঘে আনতে পারছো না।

পিংকি বিরক্তি বোধ করলো। সূচি অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো। কি বিরক্ত লাগছে,
পিংকি জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলো।
সূচি বললো জীবনটা তোমার সিদ্ধান্ত টাও তোমার।

কিন্তু যে পরিস্থিতে পরেই তুমি এ বাড়ি আসো না কেনো তোমার উচিত নিজের টা নিজে বুঝে নেওয়ার।

রাত প্রায় দশটা ছুঁই ছুঁই সৌধ বাড়ি এলো। জবা খেতে দিতে চাইলে বললো বাইরে ডিনার করে এসেছে। রুমে আলো দেখতেই ভাবলো হয়তো মায়ের জোরাজুরিতেই পিংকি তার রুমে শুয়েছে। রুমে এসে দেখে ঠিক তাই সোফায় শুয়ে আছে। ঘুমিয়েছে কিনা ঠিক বোঝা গেলো না।
সৌধ রুমে এসে টি-শার্ট আর প্যান্ট নিয়ে ওয়াশ রুম চলে গেলো।

ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে ফোনটা নিয়ে রুমে লাইট অফ করে বিছানায় শুতে যাবে এমন সময় পিংকি চিৎকার করতে লাগলো।
সৌধ ভয় পেয়ে দ্রুত গিয়ে রুমের লাইট অন করলো।

অবাক সেই সাথে বিরক্ত হয়ে পিংকির দিকে চাইলো। পিংকি ভয়ে ঢোক চিপলো।
সৌধ বললো কি সমস্যা চিল্লাচ্ছো কেনো।

প্লিজ লাইট অফ করোনা। আমি অন্ধকার রুমে ঘুমাতে পারিনা। সৌধ ভ্রু কুঁচকে বললো হোয়াট,
পিংকি বললো প্লিজ সৌধ লাইট অন থাকুক আমি অন্ধকারে প্রচন্ড ভয় পাই। আর আমি সারারাত রুমে লাইট অন রেখেই ঘুমাই।
সৌধ কিছু বলার ভাষা পেলো না। বিরবির করতে লাগলো এতো বড় মেয়ে, যার এতো ত্যাজ, সবসময় এমন ভাব করে যেনো কতো স্ট্রং সে কিনা অন্ধকারে ভয় পায়।

পিংকির দিকে চোখ রেখে ভাবুক মুখে বললো সারারাত ছাদে কিভাবে কাটালে?

পিংকি বললো চাঁদের আলো আর ফোনের আলোতে। ভোরের দিকে ঘুমিয়েছি।
সৌধ পিংকির অমন ত্যাজ, রাগ বিহীন মুখ দেখে মনে মনে হেসে ফেললো। আর বললো আমি আলোতে ঘুমাতে পারিনা। সো রুম অন্ধকারই থাকবে। পিংকি অসহায় চোখে তাকালো সৌধর দিকে। সৌধ মুখ ঘুরিয়ে নিলো আর বললো ইয়েস আমি আলোতে ঘুমাবো না। পিংকি মনটা খারাপ রেখেই শুয়ে পড়লো।
সৌধ লাইট অফ করতে গিয়েও থেমে গেলো। কি জানি ভেবে আর লাইট অফ করলো না।

পিংকির ও ভয় লাগলোনা গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলো। সৌধ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।

রুশা বার বার কল করছে, সৌধ মেসেজ করে বললো কথা বলতে পারবেনা ঘুমাবে। রুশা সেটা শুনে রেগে গিয়ে বার বার ফোন করতে লাগলো।
এক পর্যায় সৌধ, প্রচন্ড রেগে গেলো ফোন রিসিভ করে প্রচন্ড জোরে ধমকে ওঠলো। রাগের মাথায় তার খেয়ালই ছিলোনা রুমে কেউ আছে।

পিংকি ঘুমের মাঝেই ভয়ে লাফিয়ে ওঠলো। আম্মু, আম্মু বলে কেঁদে ফেললো চোখ দুটো বন্ধ করে। মুখটা ছিলো ভয়ার্ত সৌধ চমকে ওঠে তাকালো।
রুশা পিংকির ভয়েস শুনে চিৎকার করে ওঠলো সৌধ তোমার ঘরে পিংকি কি করছে। সৌধর সেদিকে কোন খেয়াল নেই, ফোন বিছানায় রেখেই ছুটে সোফার সামনে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে পিংকির হাতটা চেপে ধরলো।

এই মেয়ে ভয় পাচ্ছো কেনো। এমন করছো কেনো, পিংকি, তাকাও এইদিকে। পিংকি ভয়ে চোখ, মুখ খিঁচে সৌধর গলা জরিয়ে ধরলো।
ফোনের ওপাশে রুশা সবটা শুনতে লাগলো আর চিৎকার করতে লাগলো। সৌধ তুমি আমাকে ঠকাচ্ছো। তোমরা এক রুমে আছো। ছিঃ সৌধ ছিঃ লায়ার, ইউ আর এ লায়ার।

সৌধ হতভম্ব হয়ে গেলো। একটা বছর পার হয়ে গেলো যে মেয়েটা কিনা কখনো তাকে স্পর্শ করেনি, যে মেয়েকে সে কখনো স্পর্শ করে দেখেনি সে আজ তাকে এভাবে জরিয়ে ধরেছে। কেমন একটা অচেনা অনুভূতি হলো তার পুরো শরীর, মন জুরে।
পিংকি সৌধকে আরো শক্ত করে জরিয়ে নিলো।

সৌধ ছাড়াতে চেয়েও পারলো না।
অদ্ভুত তো এইটুকুতে এতো ভয় পেয়ে গেলো কেনো মেয়েটা। আর আম্মু, মানে ওর মা কে ডাকছে। মেয়েটা কি নিজের মা, বাবার কথা ভেবে কষ্ট পায়? মিস করে?
ভয় পেয়ে তাই নিজের মা কেই স্মরণ করছে।

সৌধ সব কৌতুহল দূরে ঠেলে দিয়ে পিংকির মাথায় হাত রাখলো। হালকা হাত বুলিয়ে বললো পিংকি, ছাড়ো এতো ভয় পাওয়ার কিছু হয়নি।
নিজেকে স্বাভাবিক করো।

পিংকি থেমে গেলো বেশ কিছুক্ষন পর সৌধর থেকে ঝট করে সরে গেলো সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরলো।
ওড়নাটা গলায় ভালো ভাবে ঠিক করে বললো একি তুমি এখানে, সৌধ বললো তুমি ভয় পেয়ে গেছিলো তাই এসেছি।
পিংকি ঢোক চিপে বললো প্লিজ, কোন দয়া দেখাতে হবেনা আমাকে। ভয় পেয়েছি একাই ঠিক হয়ে যেতাম। তুমি তোমার কাজ করো।
সৌধ রেগে গেলো হাতটা শক্ত মুঠ করে ফেললো।

এই মেয়ে কি ভাবো কি নিজেকে, ভয় পেয়েছো একজন সাধারন মানুষ হিসেবেই কাছে গিয়েছি তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও যেতাম। ডিজগাস্টিং।
সৌধ গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে কানে দিলো। রুশা যা তা বলতে লাগলো। সৌধ পিংকির দিকে তাকিয়ে আবার ফোনে কথা বলতে লাগলো জানু সরি, সরি।
বেলকুনিতে চলে গেলো সৌধ। রুশার রাগ ভাঙিয়ে একটার দিকে রুমে ফিরে এলো।
সোফায় তাকাতেই দেখতে পেলো পিংকি ঘুমে মগ্ন।

বেশ কিছুক্ষন পিংকি দেখলো। এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।
রিতুর ফোনে ঘুম ভেঙে গেলো পিংকির।

রিতু বললো দোস্ত একটু তারাতারি আসিস আজকে খুব ইম্পরট্যান্ট একটা কথা আছে৷ পিংকি ওকে বলে রেখে দিলো। ঘুমটা ছাড়িয়ে টাইম দেখলো আটটা বাজে। সূচি তো দশটার আগে ওঠবেই না। ভাগ্যিস দুটো জামা নিয়ে এসেছিলাম। এখানেই শাওয়ার নিয়ে নেই। বিছানায় তাকাতেই সৌধ কে দেখতে পেলো।
ঘুমে আছে ওঠার আগেই বেরিয়ে যাবো এখান থেকে।

পিংকি শাওয়ার নিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ভেজা চুলগুলো আওড়াতে লাগলো।
ঝাপসা চোখে এক অপ্সরী কে দেখতে পাচ্ছে সৌধ।

চুলের সুগন্ধে পুরো রুম ভরে ওঠেছে। সবে মাএ শ্যাম্পু করেছে বোধ হয়। শ্যাম্পু করা চুলের তীব্র ঘ্রান নাকে আসতেই সৌধর ঘুম পুরোপুরি উড়ে গেলো।
ধপ করে ওঠে বোসলো চোখ কঁচলে সামনে তাকালো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পিংকি কে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। ভেজা চুল বেয়ে পানি পড়ছে পিঠসহ কোমড় ভিজে কামিজটা পিঠে লেপ্টে গেছে।

পিংকি চুলগুলো ধরে কাধের একপাশে নিয়ে একহাতে পানি ঝাড়তে লাগলো। সৌধ বেহায়ার মতো তাকিয়ে রইলো পিংকির গোলাপী
আভা পিঠের দিকে। মূহুর্তেই সৌধ চোখ সরিয়ে নিলো। নাহ এটা কি করছি আমি, যাকে বউ হিসেবেই মানি না তার দিকে এমন দৃষ্টি রাখাও ভুল।
কই রুশার দিকে তো কখনো এভাবে চোখ পড়েনি।

রুশাও তো কম সুন্দরী নয়, আর রুশাতো সবসময় কতো কাছে থাকে কই এমন আকর্ষণ ফিল তো করিনি। না রুশার সাথে অন্যায় হয়ে যাবে। সৌধ দ্রুত ওঠে ওয়াশ রুম চলে গেলো।
পিংকি চলে গেছে ভার্সিটিতে।

সৌধ ড্রয়িং রুমে আসতেই বেশ কয়েকজন লোক দেখতে পেলো দুজন মহিলা, একজন পুরুষ আর সাথে বাচ্চা ছেলে।
সামিয়া চৌধুরী বললেন আমি ভেবেছিলাম আপনারা সূচির কথা বলেছেন। তাই আসতে বলেছিলাম, কিন্তু পিংকি সেটা জানতাম না।
সৌধ ভ্রূ কুঁচকে তাকালো মায়ের মুখের দিকে।

একজন মহিলা বলে ওঠলো আপনার ছেলের বউ? কই আপনার ছেলের সাথে তো কখনো দেখিনি, আর মেয়েটাও তো সেদিন কিছু বললো না। আগে জানলে আমরা এমন ভুল করতামনা।

সামিয়া চৌধুরী সৌধর দিকে কঠোর চোখে তাকালো। মুখে হাসি একে বললো আসলে আমরা মেয়ের মতোই ভালোবাসি ছেলের বউ কাউকে বুঝতেই দেইনা।
মহিলা গুলো ওঠে পড়লো বললো মাফ করবেন। আমাদের বুঝতে ভুল হয়েছে বলেই চলে গেলো।
সামিয়া চৌধুরী বললো এটা দেখারও বাকি ছিলো।

ছেলের বউয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হয়ে গেলো।
সৌধর কথাটা শুনে খুব একটা ভালো লাগলো না।

কেমন বিছরী শুনালো, এই প্রথম বোধ হয় কোন স্বামী, শুনলো তার বউ এর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাড়িতে লোক এসেছে।
কেমন মাথায় রাগ ওঠে গেলো। মায়ের সামনে থেকে চলে গেলো। সেই সাথে পিংকি কে বকতে শুরু করলো।

মানুষকে নিজের চেহেরা দেখিয়ে বাড়িতে বিয়ের প্রোপজাল আনা হচ্ছে। এতো সাধু, অত সাধু আর এই তার নমুনা। পাখনা গজিয়েছে অনেক, টোটো করে বাইরে ঘুরে বেরিয়ে ছেলেদের মাথা খেলে বিয়ের প্রপোজাল তো আসবেই।

ভার্সিটিতে যেতেই বন্ধু সাকিব বলে ওঠলো সৌধ দেখে যা কি হচ্ছে,
সৌধ সাকিবের সাথে যেতে লাগলো সাকিব কেন্টিনের দিকে ইশারা করতেই দেখতে পেলো পিংকি আর তুষার পাশাপাশি বসে আছে।
মনের অজান্তেই সৌধর রাগে কান দুটো লাল হয়ে গেলো। হাতটা শক্ত মুঠ করে রাখলো।

এই মূহুর্তে সে যে কি করবে জানেনা শুধু এটা জানে পিংকির কপালে দুঃখ আছে। এর ফল খুব খারাপ হবে, আর তুষার কে তো আমি দেখেই ছাড়বো আজ বলেই পা বাড়ালো সৌধ।


পর্ব ৪

সৌধ কয়েক পা এগুতেই পিছন থেকে ডাক পড়লো রুশার। রুশা এসেই সৌধর সামনে দাঁড়ালো।
কোথায় যাচ্ছো তুমি চলো ওদিকটায় যাই। সৌধ পিংকি আর তুষার কে একবার চেয়ে দেখলো।

রুশাও তাকালো সৌধর চোখ বরাবর। মনে মনে বেশ খুশি হলো রুশা, চটপট সৌধর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। সৌধ কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। সাকিব এসব দেখে বললো হায় কপাল, বউ ওদিকে একজনের সাথে বসে আছে, আবার বর তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে চলে গেলো। এটাই তো হওয়ার কথা ছিলো, এতো সুন্দরী মেয়ে ঘরে থাকলে আমি জীবনেও বাইরের মেয়েদের দিকে নজর দিতে পারতাম না। এখন দেখ নিজের ফুলের বাগানে অন্য কেউ প্রবেশ করে নিলো।

তুষারের ক্লাস আছে বলে পিংকির থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। লাবনী, আর রিতু দৌড়ে এসে পিংকিকে জাবটে ধরলো। লাবনী বললো দোস্ত কি কথা হলো, রিতু বললো জানু তুষার ভাই কিন্তু হেব্বি হ্যান্ডসাম, অনেক ভালো স্টুডেন্ট, ভার্সিটির অনেক মেয়ের ক্রাশও সে কিন্তু তার ক্রাশ শুধুই তুই। বললাম না তখন তুষার ভাই সেই আগে থেকেই তোকে পছন্দ করে কিন্তু সৌধর ব্যাপারে জেনে আগায়নি।

কিন্তু যখন রুশা আর সৌধর রিলেশনশিপ দেখলো তোরা কেউ কাউকে মানিস না জানতে পারলো তখন থেকেই আমার ভাইয়া কে বলেছে যে তোকে যেভাবেই হোক তার ভালোবাসার কথা জানাবে। আর আমি তো কাল রাতেই সব জানতে পারলাম। ভাইয়া আর তুষার ভাইয়া তো বেষ্ট ফ্রেন্ড।

লাবনী বললো আরে চুপ কর না। ওকে কিছু বলতে দে। পিংক কি হলো প্রপোজ করেছে,
পিংকি বিরক্ত মুখ নিয়ে ওঠে দাঁড়ালো।

তোরা পারিসও বটে। একদিনেই পরিচয় হয়ে প্রোপোজ করে প্রেম হয়ে যাবে তাই না।

তোরা যা ভাবছিস সেসব কিছুই না। আমরা জাষ্ট ফ্রেন্ডশিপ করলাম আজকে। আর আমার জীবন তোদের মতো নয় যে চাইলেই হুট করে কাউকে জীবনে জায়গা দিয়ে ফেলবো। আমার জীবনটা একটা গোলাকার বৃত্তে আটকে আছে। আর সেটা থেকে বের হওয়া খুব জরুরি।

লাবনী বললো দেখ তুই সৌধ কে ডিভোর্স দিয়ে দিবি। তারপর তুষার ভাই কে বিয়ে করে সৌধর বাড়ি থেকে কেটে পড়বি। পিংকি লাবনীর মুখোমুখি হয়ে হিহি করে হেসে আবার তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠলো।

তুই কি ভাবছিস ডিভোর্স দিতে পারলে এতোদিনে হাতগুটিয়ে বসে থাকতাম। ঐ বাড়িতে দুজন মানুষ আছে যাদের জন্য আমি এটা করতে পারছিনা। আর সব কিছু বাদই দিলাম, আমার একটা পরিচয়ের দরকার এই শহরে থাকার জন্য যেটা আমাকে ঐ বাড়ির সবাই দিয়েছে।

আর আমার জীবনে এমন কোন স্ট্রং সাপোর্ট আসেনি যার জন্য আমি এতোবড় সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। এছাড়া অনার্স কমপ্লিট করে একটা ছোটখাটো জব নিয়ে তারপর আমি এসব ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু তার আগে যদি লাইফে কেউ আসে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার সব অতীত মেনে নিয়ে আমাকে ভালোবাসে, আমাকে যোগ্য সম্মান দেয় তখন আমি এটা নিয়ে ভাববো।

লাবনী বললো দেখ তুষার ভাই কিন্তু অনেক স্ট্রং পার্সোনালিটির একজন মানুষ। ভালো পরিবারের ছেলে সে খুব ভালো গানও গায়। দেখতে তো অস্থির সৌধর থেকে কোন অংশে কম নয়। বরং ক্যারেক্টার সৌধর থেকে হাজারগুন ভালো। আর তুই যেমন টা চাস তুষার ঠিক তেমনটাই দেখিস।
পিংকি এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো দেখা যাক কি হয়।

জীবন তো এখানেই শেষ নয়, দেখি উপরওয়ালা কি কপালে রেখেছে।
একটার দিকে পিংকি, রিতু, লাবনী, তামান্না ভার্সিটির মাঠের একপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো গেইটের দিকে।

গেইটের সামনে আসতেই সৌধর এক ফ্রেন্ড বলে ওঠলো ইশ এতো হট বউ আমার থাকলে আমি কখনোই পর নারীর দিকে নজর দিতাম না।
রিতু আর পিংকি অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো ছেলেগুলোর দিকে ছেলে গুলো পিংকির দিকে অন্যরকম এক দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো। যে দৃষ্টি দেখে পিংকির ঘৃনা সৃষ্টি হলো সেই সাথে প্রচন্ড রেগে গেলো। ছেলেগুলোর থেকে একটু দূরেই রুশা আর সৌধ দাঁড়িয়ে আছে।

পিংকি সৌধর দিকে ঘৃনার চোখে একবার তাকালো।

ছেলেগুলোর সামনে গিয়ে পলাশ নামের ছেলেটার গালে ঠাশশ করে এক থাপ্পড় দিলো।
সাথে সাথে সৌধ চলে এলো পিংকির দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললো এসব কি হচ্ছে?
পলাশ রেগে সৌধ কে বললো সৌধ তোর বউ কে সাবধান কর বলছি নয়তো,

রিতু বললো এই কুলাঙ্গারের বাচ্চা মেয়েদের সম্মান করতে পারিস না যখন তখন তো এমন থাপ্পরই খাবি।
পিংকি পলাশকে বললো নেক্সট টাইম আমাকে নিয়ে কোন বাজে মন্তব্য করলে জুতো খুলে মারবো।
সৌধ বললো পিংকি, ও আমার বন্ধু।

সো হোয়াট, আপনার বন্ধু বলে কি সে অন্যায় করলেও তাকে ফুল দিয়ে পূজো করবো।
পলাশ সৌধর দিকে রেগে বললো সৌধ তোর বউ ভার্সিটিতে অন্য ছেলের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে আর আমি বলতে গেলেই দোষ।
সৌধ তুষারের বিষয় টা মনে করে পিংকি কে আঙুল তুলে বললো তোমার সাহস কি করে হয় ওর গায়ে হাত তোলার,
সরি বলবে ওকে এখুনি।

রিতু বললো মানে এই তুই মিথ্যা বলছিস কেনো শয়তান, কাপুরুষ।
লাবনী বললো সৌধ ভাই আপনি না জেনে পিংকি কে সরি বলতে বলবেন না। পিংকি কোন দোষ করেনি।
পিংকি বললো লাবনী তুই ভাবলি কি করে ও সরি বলতে বলবে আর আমি সরি বলে দিবো। পিংকি সৌধর দিকে আঙুল তুলে বললো মি.সৌধ চৌধুরী। পিংকি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। আর আজো করবে না। চল রিতু, চল লাবনী।

পলাশ সৌধ কে বললো সৌধ আমি ওকে ছাড়বোনা, ছাড়বোনা আমি ওকে।
সৌধ বললো দোস্ত তোর কিছু করতে হবেনা। ওকে আমি দেখে নিবো। সাকিব কিছু বলতে গিয়েও বললো না। পুরো ঘটনাই চেপে গেলো। রুশা পলাশকে বললো পলাশ ভাই রাগ করো না। ওর মতো মেয়ের থেকে আর কি আশা করা যায়। সত্যি বলছো তো তাই গায়ে লাগছে অনেক।
সৌধ বেবী তুমি কিন্তু ওকে আজকে শাস্তি দিবে বলে রাখলাম।

পলাশ বললো তুই ঠিকি করেছিস এমন মেয়েকে বউ হিসেবে না মেনে। ফালতু মেয়ে কোথাকার।
রুশার ধারে কাছেও নেই এই মেয়ে। সুজন সত্যিটা বলতে গেলেই পলাশ থামিয়ে দিলো। সৌধও আর কিছু জিগ্যাস করলো না। রুশাকে বললো রুশা আমি বাড়ি যাচ্ছি তুমি বাসায় চলে যাও।

“স্বপ্ন এমন একটা জিনিস যা ঘুমিয়ে দেখলে শুধু সুখ আর সুখ। কিন্তু যখন একজন মানুষ জেগে স্বপ্ন দেখে তার বিনিময়ে শুধু দুঃখই পাওয়া যায়,
“ঘুমন্ত স্বপ্ন পূরনের তীব্র আশা থাকে না।

কিন্তু জেগে স্বপ্ন দেখলে তা পূরনের জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে। আর যখনি সেই স্বপ্ন পূরন হয় না তখনি মানুষ হতাশায় ভোগে। (জান্নাতুল নাঈমা)
পিংকি ছাদের চিলেকোঠার ঘরের এক কোনে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছে। আর ভেবে যাচ্ছে তার অতীত জীবনের কথা।

ইন্টার পাশ করে ঢাকা শহড়ে আসে পিংকি তার মায়ের সাথে। সাথে ছিলো তার বাবার বন্ধু আবরার খান। পিংকির বাবা মারা যায় পিংকি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। আর আবরার খানের স্ত্রী তার প্রথম সন্তান প্রিয় কে জন্ম দিতে গিয়েই ইন্তেকাল করেন।

পিংকির মা প্রমিলা খাতুন দ্বিতীয় বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আবরার খানের সাথে। সৌধর বাবা আর মা নিজ দায়িত্বে তাদের বিবাহ সম্পন্ন করেন। প্রথম ধাক্কা পিংকি সেদিনই খায় যেদিন তার মা দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন।

পিংকি কখনোই তার বাবার জায়গায় অন্য কাউকে ভাবতে পারেনি সেদিনও পারেনি। কিন্তু তার কথার গুরুত্ব সেদিন তার মা দেয় নি। একজন বিধবা মহিলার শুধু এক মেয়ে নিয়ে সমাজে টিকে থাকা টা যে কতো কঠিন তা প্রমিলা ছয় বছর হারে হারে টের পেয়েছে। অনেক কঠিন সময় দিয়েও গেছে সে। মেয়েকে বুঝানোর ফলেও মেয়ে বুঝেনি তবুও মেয়ের অবাধ্য হয়েই আবরার খানকে বিয়ে করেন৷ প্রমিলা ভাবে প্রিয় মা হারা প্রিয় একজন মা পাবে, আর পিংকি বাবা হারা পিংকি একজন বাবা পাবে।

কিন্তু প্রমিলার ভাবনা ভুল হতে থাকে। পিংকি প্রচুর রাগি জেদী হয়ে যায়। আবরারকে সহ্যই করতে পারেনা। এদিকে আবরার লন্ডনে যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। পিংকি সহ তারা সবাই লন্ডনে চলে যাবে এটাই ভাবনা। কিন্তু পিংকি কোনভাবেই যেতে রাজি নয়। সুইসাইড করতে রাজি তবুও আবরার খান বা তার মায়ের সাথে লন্ডন যাবে না। সামিয়া চৌধুরী আর আকাশ চৌধুরী এমন পরিস্থিতি দেখে ঠিক করলেন পিংকিকে তাদের কাছেই রেখে দিবেন। পিংকি রাজি হয়ে যায়। মায়ের প্রতি ঘৃনা, রাগ থেকেই পিংকি সামিয়া চৌধুরীর কথায় রাজি হয়।

কিন্তু সামিয়া চৌধুরী আর আকাশ চৌধুরী সেদিন প্রমিলা আর আবরারের সাথে কথা বলে ঠিক করেন তাদের একমাএ ছেলে সৌধ আর পিংকির বিয়ে দিবে। ছেলের বউ করেই সারাজীবন নিজেদের কাছে রেখে দেবে পিংকি কে।

পিংকি কথাটা শুনে প্রথমে আপত্তি করলেও পরে ভাবে হ্যাঁ বিয়েই করে নিই। আমার নিজের একটা পরিচয় হবে। তবুও অন্যকাউকে বাবা বানিয়ে তার পরিচয় বহন করতে হবেনা। নিজের বাবার ঘরের পর তো একটা মেয়ের স্বামীর ঘরই আপন হয়। আর সামিয়া আন্টি তো খুব ভালো শাশুড়ী হিসেবে এমন একজন মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সূচি আপুও অনেক ভালো আর সৌধ, ওনাকে তো একবার দেখেছি। খুবই সুদর্শনীয় একজন পুরুষ। একবার তাকালেই চোখ আটকে যায়, লম্বা, ফর্সা, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা ছোট ছোট দাড়ি কথা বলার ভনিতা সবটাই আকর্ষণীয়। যার মা, বাবা, বোন এতো ভালো সেও নিশ্চয়ই খুবই ভালো হবে।

সূচি এসে পিংকি কে বললো এই যে ম্যাডাম আপনার কি আমার ভাই কে পছন্দ হয়েছে? কাল তো বিয়ে,
পিংকি লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে রইলো।

সূচি বললো আরে ইয়ার লজ্জা পাচ্ছো কেনো, বয়সে বড় হলেও সম্পর্কে আমি তোমার ননদ হচ্ছি বুঝলে। প্রচন্ড জ্বালাবো তোমাকে। ব্রো আমার থেকে দের বছরের বড় কিন্তু আমরা দুজন খুবই ফ্রি। আমার ব্রো কিন্তু প্রচুর হ্যান্ডসাম, মেয়েরা একবার দেখলেই প্রেমে একদম হাবুডুবু খায় বুঝলে।
পিংকি সব শুনে মিটি মিটি হাসলো।

সূচি বললো আচ্ছা তোমার কেমন ছেলে পছন্দ সেটাতো বলো। কোন লজ্জা নেই ফ্রি ভাবে বলেই ফেলো এতো কম বয়সে বিয়ে করে নিচ্ছো, আমার ভাই ও পড়াশোনা করছে সবে, দুজনেরই তো বয়স কম। তাই দুজনের ভাবনাটা আগেই জেনে নেওয়া ভালো।
পিংকি হঠাৎ ই বলে ফেললো –

“আমাকে প্রচুর প্রচুর ভালোবাসতে হবে,
আমার বর প্রচুর রোমায়েন্টিক হবে,
আমাকে বুঝবে, আমার চোখের এক ফোটা জল গড়ার আগেই সেই জল মুছে ফেলবে।
আমি যখন প্রচন্ড রেগে যাবো সে আমাকে ভালোবেসে মানিয়ে নেবে।

আমি তাকে খুব ভালোবাসবো, সে আমাকে খুব খুব ভালোবাসবে।
আমি যেমন তার প্রচুর কেয়ার নিবো সেও আমার প্রচুর কেয়ার নিবে।

আমার জীবনে সেই প্রথম পুরুষ, তার প্রতি আমার ভক্তি, শ্রদ্ধা সীমাহীন। আমি চাই সেও আমাকে আমার মতো করেই বুঝবে ভালোবাসা দিবে।
সূচি কিছুক্ষনের জন্য থমকে রইলো। মেয়েটা সত্যি বাচ্চা, অবুঝ মন। কিভাবে নিজের ইচ্ছার কথা বলে যাচ্ছে। কতো আশা, কতো স্বপ্নে দুচোখ ভরা মেয়েটার। ইশ এই বয়সেই কতো বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে। সৌধ ভাইয়া যদি ওকে একসেপ্ট না করে তাহলে তো আরো ভেঙে পড়বে মেয়েটা।
কিন্তু এটা তো তেমন বিয়ে নয় আর সৌধ ভাইয়া তো বিয়েতে এখনো রাজিই হয়নি। আল্লাহ জানে কি হবে।

হোয়াট বিয়ে! অসম্ভব এই বয়সে বিয়ে করবো মানে? তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি সবে পড়াশোনা করছি এখুনি কিসের বিয়ে। এছাড়া কাকে বিয়ে করবো। চিনিনা, জানিনা একজন কে ধরে আনবে আর আমি বিয়ে করে নিবো।

সামিয়া চৌধুরী বললেন দেখ সৌধ পিংকি মেয়েটা যথেষ্ট ভালো। আর তোর বাবার আর আমার ও খুবই পছন্দ তোর ও পছন্দ হবে তুই একবার কথা বল ওর সাথে।

ইম্পসিবল। একদিনের পরিচয়ে কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
সূচি বললো ব্রো মেয়েটা দেখতে খুবই সুন্দরী। আর যা বুঝলাম কখনো কোন ছেলে আসেনি ওর জীবনে৷ এছাড়া মেয়েটা খুবই অসহায়ও এখন। বাবা নেই মা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। মানুসিকভাবে খুবই আহত।

তো আমি কি করবো?
সামিয়া চৌধুরী বললেন তুমি ওকে একটা পরিচয় দিবে। বউ করে বউ এর পরিচয়ে এ বাড়িতে সসম্মানে থাকতে দিবে।
আই এম রেইলি সরি মা। অসহায় মেয়েদের পরিচয় দেওয়ার জন্য আমি দুনিয়াতে আসিনি।

স্টপ ইট, আকাশ চৌধুরী ধমকে ঘরে ঢুকলেন সৌধ কে শাশিয়ে গেলেন যে বিয়েটা তোমাকে করতেই হবে। নয়তো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও।
বাধ্য হয়ে সেদিন সৌধ পিংকি কে বিয়ে করে নেয়।

বাসর ঘরে লম্বা ঘোমটা টেনে একরাশ লজ্জা নিয়ে বসে ছিলো পিংকি। দরজার সিটকিরি লাগানোর শব্দ পেয়ে তার হার্ট বিট বেড়ে গেলো। হাত টা কাঁপতে শুরু করলো। মনে মনে নিজেকে গুছিয়ে নিলো কিভাবে কথা শুরু করবে, আজ রাতে বরকে কি কি গল্প বলবে। নিজেও বলবে এবং তার থেকেও শুনবে। ভাবনার পথে হঠাৎ চমকে ওঠলো কিছু ভাঙার শব্দে।

পিংকি চমকে গিয়ে ঘোমটা তুলে তাকিয়ে দেখে দুধের গ্লাসটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলেছে সৌধ।
পিংকি বিছানা ছেড়ে ভয়ে ভয়ে ওঠে দাঁড়ালো সাথে সাথে সৌধ হাত ঘড়িটা খুলে ঢেল দিলো। ফোন বের করে ছুঁড়ে ফেললো। পিংকি বার বার কেঁপে ওঠলো।
বুকের ভেতরটা তার ওলোটপালট করতে শুরু করলো। মাথায় এক চক্কর মারলো। সৌধ রাগে ফুসতে ফুসতে বাসর ঘরের সমস্ত ফুল ছিঁড়তে লাগলো। পিংকি কাঁপতে শুরু

করলো ভয়ে। এক ঢোক গিলে বললো আআপনি, কি করছেন।
সৌধ থেমে গেলো পিংকির দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকালো। এই প্রথম সে চেয়ে দেখলো পিংকিকে। কিন্তু তার রাগের কোন কমতি ঘটলো না।
বরং আরো দ্বিগুন বেড়ে গেলো।

আমি কি করছি সেই কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে আমার চিৎকার করে ওঠলো সৌধ। পিংকি ভয়ে কান্না করে দিলো।
সৌধ আরো রেগে বললো এই মেয়ে কাঁদছো কেনো? বিয়ের খুব শখ হয়েছিলো তাইনা। কি হতো নিজের মায়ের সাথে লন্ডন চলে গেলে তা না করে আমার ঘাড়ে চেপে বসলে।

লিসেন হাতে তুড়ি বাজিয়ে আঙুল তুলে বললো এই বিয়েটা শুধু বাবা মায়ের জোরের কারনে করেছি। এর বেশী কিছু না। কোন দিন ও স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আমার কাছে আসবে না। আর না আমি স্বামীর অধিকার নিয়ে যাবো তোমার কাছে। এই বিয়েটা আমার কাছে বিয়ে নয়, এই বিয়েটা আমার কাছে জাষ্ট একটা সার্টিফিকেট সই যেটার মাধ্যমে আমি একটা মেয়েকে জাষ্ট একটা পরিচয় দিয়েছি।

আর সেটার বিনিময়ে মেয়েটার এই বাড়িতে থাকার পথ হয়ে গেছে। কখনো কারো কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না নিজের কবর খুঁড়ে অন্যের জান বাঁচানো যাকে বলে। বলেই সৌধ নিজের শার্ট, প্যান্ট টাওয়াল নিয়ে বাথরুম ঢুকে পড়লো।

পিংকি থ মেরে নিচে বসে পড়লো। দুচোখ বেয়ে অঝড়ে পানি ঝড়তে লাগলো। দুকান তার যেনো ঝলসে যাচ্ছে । মূহুর্তেই তার সকল স্বপ্ন চূর্ণ, বিচূর্ণ হয়ে গেলো। পায়ের তলা থেকে তার মাটি সরে গেলো। সব আশা তার নিরাশায় পরিনত হলো।

সারা রাত একই ভাবে বসে কাটালো পিংকি। সৌধ বিছানায় আরামে ঘুমালো। ঘুমানোর আগে ওয়ার্নিং দিয়ে দিলো যাতে বিছানায় ভুলেও স্পর্শ না করে।
যে মেয়েটা বাবা হারিয়ে, মায়ের ছায়ার আশা ছেরে নতুন করে অন্যভাবে জীবন সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলো। সাজাতে শুরু করেছিলো ছোট্ট একটা সংসার। এক নিমিষেই যেনো সব শেষ হয়ে গেলো।

বাসর ঘরেই স্বামী অস্বীকার করলো তার স্ত্রী কে।
ভেঙে চূরে চুরমার হয়ে গেলো একটা হৃদয়। সদ্য ফোটা ফুলের পাপড়ি যেনো অকালেই ঝড়ে পড়লো।

বিয়ের সাতদিনের মাথায় প্রমিলা এবং আবরার খান দুবছরের প্রিয় কে নিয়ে চলে গেলো লন্ডন। পিংকির মায়ের প্রতি যতো অভিমান ছিলো তার থেকেও দ্বিগুন অভিমান নিজের প্রতি হলো।

এতো বড় ভুল সে কি করে করতে পারলো।

পর কি কখনো আপন হতে পারে? না পারেনা তাই তো সৌধ তাকে আপন করে নিতে পারেনি। কিন্তু সে যে এক মিথ্যা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছে। না পারবে ছাড়তে না পারবে ধরতে।
দিনের পর দিন সৌধর অবহেলা, অপমান সয়ে সয়ে নিজেকে ভেঙে চুরমার করে আবার গড়িয়ে নিলো অন্যভাবে।

আকাশ চৌধুরী কাজের জন্য দেশের বাইরে চলে যায়, সামিয়া চৌধুরী জবের জন্য রাজশাহী তেই বেশী থাকে। আর সূচি পড়াশোনার জন্য তার বাবার বন্ধুর বাসায় থাকে। পুরো বাড়িতে সৌধ আর পিংকি। কাজের মেয়ে জবা এসে কাজ করেই চলে যায়।

সৌধ তার মতো জীবন কাটাতে লাগে। প্রথম দিকে পিংকির কষ্ট হলেও এখন আর কষ্ট হয়না নিজেকে অন্যভাবে গড়িয়ে নিয়েছে। মানতে শিখেছে দুনিয়াতে তার আপন বলতে কেউ নেই। বুঝতে শিখেছে বিয়ে মানেই সংসার নয়, বিয়ে মানেই ভালোবাসা নয়।
কিছু বিয়ে মানে জীবনের অভিশাপ।

বিয়ের সাতদিনের দিন থেকেই পিংকি বুঝে ফেলে স্বামী, এই সংসার এসব কিছুই তার নয়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সঠিক সময়ে ঠিক সরে যাবে।
শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।

পুরোনো স্মৃতি ভেবেই ডুঁকরে কেঁদে ওঠলো পিংকি।

বাবা মা জোর করে বিয়ে দিয়েছে বলে নিজের বউ কে বন্ধুরা যা ইচ্ছে তাই বলতে পারবে। কোন প্রতিবাদ হবে না? বউ প্রতিবাদ করতে গেলে সেখানে সরি বলতে হবে?

ওও আমিতো তার বউ ই না। না আমি নিজেও মানি না সৌধ চৌধুরী আমার স্বামী। এতো জঘন্য মনের মানুষ আমার স্বামী হতে পারে না।
সূচি বললো মা তুমি তো কাল চলে যাবে। আমি আরো দুদিন পর যাবো এই দুদিন ওদের একসাথে রাখা যাবে বলো?

ওদের একসাথে রাখবো বলেই তো আমি কড়া গলায় পিংকি কে বলেছি আমি কারো সাথে বেড শেয়ার করি না। মেয়েটার মুখ তখন দেখার মতো ছিলো বলেই হোহো করে হেসে ওঠলো সূচি।
সামিয়া চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো হুম। কিন্তু মন একসাথে হবে কবে?
সূচি বললো কি জানি, সব দোষ তো তোমার ছেলেরই তোমার ছেলে ঠিক থাকলে পিংকি আজ এমন হয়ে যেতো না। ওর অবহেলা পেয়ে পেয়েই মেয়েটা এমন হয়ে গেছে।

মা মেয়ে গল্প করছিলো এদিকে সৌধ রেগে বাড়িতে প্রবেশ করলো। জবাকে বললো পিংকি কোথায়?
জবা বললো কি ভাইজান আমনে ভাবীরে খুঁজতাছেন বলেই ভ্রু কুঁচকালো।

সৌধ ধমকে বললো বলবি নাকি?
জবা ভয়ে ভয়ে বললো ভাবীতো ছাদে গেছে। মনটা খুব খারাপ দেখলাম। সৌধ দেরী না করে দ্রুত ছাদে চলে গেলো।
ছাদে যেতেই পাশের ছাদে তাকালো হ্যাঁ তুষার রেলিং এ বসে আছে পিছন ঘুরে৷ সৌধ আরো রেগে গেলো। আশে পাশে তাকিয়েও পিংকি কে দেখতে পেলো না।

কি ব্যাপার পিংকি কোথায়, তুষার যেহেতু এখানে পিংকি অবশ্যই আছে কিন্তু কোথায়?
সৌধ পুরো ছাদে চোখ বুলিয়ে আবার ফিরে যেতে পা বাড়াতেই পিংকি চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সৌধ কে দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটাতে যেতেই সৌধ সামনে দাঁড়ালো। পিংকির মুখ দেখে সৌধর স্বাভাবিক লাগলো না। তবুও কঠোর চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো আমার বন্ধু কে মারার সাহস কে দিলো তোমায়?

পিংকি চোখ দুটো বন্ধ করে নিজেকে শক্ত করে নিয়ে বললো আমার সাথে যে বা যারা অসভ্যতা করবে তাদের সাথে আমি ঠিক এমনটাই করবো।
সৌধ ধমকে ওঠলো। কি অসভ্যতা করেছে ঐ তুষারের সাথে আড্ডা দিচ্ছো সেটাই বলেছে, যা সত্যি তা মানুষ বলবেই তাই তুমি ওদের গায়ে হাত তুলবে।
পিংকি অবাক হয়ে গেলো। সত্যিটা না জেনেই সৌধ বন্ধুদের সাপোর্ট নিয়ে নিচ্ছে।

তুষার ছাদে তাকাতেই সৌধ পিংকিকে একসাথে দেখতে পেলো। তারা তর্ক করছে তাও চোখে পড়লো।
দুহাত শক্ত মুঠ করে পাইচারী করতে লাগলো তুষার।

পিংকি বললো বেশ করেছি আড্ডা দিয়েছি। আমি যা ইচ্ছে করবো তাতে ওদের সমস্যা কি। আমার লাইফ আমি যেভাবে খুশি চলবো।
সৌধ বললো স্যাট আপ, পিংকির দুকাঁধে শক্ত করে চেপে ধরলো।

যেভাবে খুশি চলতে কোন বাঁধা নেই। কিন্তু ছেলেদের সাথে যা ইচ্ছে তাই করা এ বাড়িতে থেকে চলবে না।

পিংকি এক ঝটকায় সৌধ কে ছাড়িয়ে দিলো। চিৎকার করে বললো চলে যাবো এ বাড়ি থেকে। সময় হোক চলে যাবো আর খোঁটা শুনতে পারবো না। চলে যাবো আমি। তুমি যদি মেয়েদের নিয়ে যা তা করতে পারো আমি কেনো ছেলেদের সাথে জাষ্ট কথা বলতে পারবোনা। ওওও এ বাড়িটা তোমার তাই বাহ ওকে ফাইন চলে যাবো আমি।

সৌধ পিংকির রাগি গলা শুনে আড় চোখে একবার পাশের ছাদে তাকালো।

তুষার কে ছটফট করতে দেখতে পেলো। ওদিক ফিরে যেই তুষার আবার সামনের দিকে পাইচারি করতে ঘুরেছে অমনি সৌধ তুষারকে দেখানোর জন্য পিংকির দুগাল ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। সৌধ রাগের মাথায় হিংসে থেকেই কাজটা করে ফেললো। ঠোঁট ছেড়ে পিংকির চুলের ফাঁকে একহাত গুজে আরেক হাতে কোমড় জরিয়ে ধরে গলায় ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো। ইচ্ছে করেই কাজ গুলো করতে লাগলো সৌধ।

কয়েক সেকেন্ডে নিজের সাথে কি সব ঘটে যাচ্ছে পিংকি বুঝেও বুঝতে পারলো না। শুধু শরীরে স্পর্শ অনুভব করতে পারলো।
দুহাতে খুব চেষ্টা করেও সৌধ কে ছাড়াতে পারলো না। বিয়ের এতোগুলো দিন পার হওয়ার পর আজই প্রথম সৌধ পিংকিকে এভাবে স্পর্শ করলো।
পিংকির পুরো শরীর শিউরে ওঠলো সেইসাথে বুকের ভিতর অজানা এক ব্যাথা কাজ করলো। রুশার সাথে সৌধর মেলামেশার কথা মনে পড়তেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠলো।

পুরো শরীর তার অবশ হয়ে এলো। চোখে এতো অশ্রুকনার ভীড়ে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো তার। সৌধর ভারী শ্বাস অনুভব করতে পারলো পিংকি। সেই সাথে সৌধও অনুভব করলো পিংকির কান্না, সেইসাথে অস্থিরতা।
সৌধ পিংকি কে ছেড়ে দিতেই পিংকি ঢলে পড়লো তার বুকে।


পর্ব ৫

জ্ঞান ফিরতেই হিংস্র বাঘিনীর মতো সৌধকে আক্রমণ করলো পিংকি। দু নখের আঁচ লাগাতে লাগলো পিঠে ক্রমাগত, সৌধ ছারাতে চাইতেই আরো দ্বিগুন ক্ষেপে গেলো কানের নিচে কামড়ে ধরলো। সৌধ সহ্য করতে না পেরে পিংকি কে ছাড়িয়ে ঠাশশ করে গালে এক থাপ্পড় লাগিয়ে দিলো।
কি হয়েছে পাগল হয়ে গেছো, সমস্যা কি?

পিংকি চিৎকার করে কেঁদে ওঠলো সৌধর কলার ধরে চিৎকার করে বললো তোর সাহস কি করে হলো আমাকে টাচ করার?
সৌধ থমকে গেলো পিংকির এই ভয়ংকর রূপ দেখে।

পিংকি প্রচন্ড রাগি, জেদি সেটা জানতো কিন্তু এতোটা হিংস্র রূপ ধারন করতে পারে সেটা সৌধ জানতো না।
সৌধ নিজেও বোকাবনে চলে গেছে।

আমি এটা কি করে ফেললাম, কেনো করলাম এটা। পিংকি যা ইচ্ছে করুক তাতে আমার কি জায় আসে। ওহ গড এখন কিভাবে এসব ফেইস করবো। রুশা সব জানতে পারলে কি হবে।

পিংকি আবারো সৌধর কলার ধরে চিৎকার করে ওঠলো। সৌধ পিংকির হাতে ধরতেই সামিয়া চৌধুরী আর সূচি দৌড়ে এলো।
সামিয়া চৌধুরী বললেন এসব কি হচ্ছে তোরা কি শুরু করেছিস।

সূচি সৌধর কাছে ছুটে এসে বললো ব্রো তোর ঘাড়ে কি হয়েছে ব্লিডিং হচ্ছে তো,
সামিয়া চৌধুরী ও ছুটে এলো সৌধ কি হয়েছে?

দাঁতের দাগ স্পষ্ট দেখতে পেলো সামিয়া চৌধুরী। পিংকি সৌধ কে ছেড়ে বিছানায় বসে রাগে ফুঁসছে, আর কেঁদে যাচ্ছে।
সূচি পিংকির অবস্থা দেখে পিংকির পাশে বসে পিংকিকে ধরে বললো কি হয়েছে?

সামিয়া চৌধুরী সৌধর দিকে ভালো করে চেয়ে বুঝার চেষ্টা করলো আসলে ঘটনাটা কি?

সৌধ আমতা আমতা করে মায়ের সামনে থেকে চলে যেতে নিতেই সামিয়া চৌধুরী সৌধর হাত চেপে ধরলো।

সোফায় নিয়ে বসিয়ে ফার্স্ট এইডস বক্স নিয়ে এসে রক্ত পরিষ্কার করে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ করে দিলো।
সৌধ লজ্জায় মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না।

সামিয়া চৌধুরী ভাবলেন কিছু তো হয়েছেই, সৌধ তো এমন চুপ থাকার ছেলে না, তাহলে অবশ্যই সৌধ কিছু একটা করেছে যার কারনে পিংকি এমন করছে। কিন্তু আসল ঘটনা টা কি?

সূচি পিংকির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো পিংকি শান্ত হও। কি হয়েছে প্লিজ বলো,
সামিয়া চৌধুরী রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

সৌধ ও বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। সূচি পিংকিকে বেশ কিছুক্ষন সান্ত্বনা দিলো এবং কি হয়েছে জানতে চাইলো। পিংকি কিছুতেই কিছু বললো না চুপ রইলো।
সূচি বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

রুম থেকে বেরোতেই সৌধ সূচির হাত চেপে ধরে একটানে নিয়ে গেলো ছাদে।

ব্রো কি হয়েছে এখানে কেনো নিয়ে এলি?

সৌধ সূচিকে নিয়ে দোলনায় বোসলো। হাঁটুতে দুই কনুই ভর করে হাতর উপর মাথা ঠেকালো।
সূচি শান্ত গলায় ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে বললো ব্রো, কি হয়েছে?

সৌধ ভার্সিটির পুরো ঘটনা, তুষারের কথা সহ সৌধ রাগের মাথায় কি করেছে সব খুলে বললো সূচিকে।
সূচি বিস্ময় চোখে বড় বড় করে তাকালো সৌধর দিকে।

ব্রো, তুই জেলাস ফিল করেছিস?

সৌধ মাথা তুলে সূচির দিকে তাকালো।
কি বলছিস আমি কেনো জেলাস হবো? যা করেছি সবটাই রাগের মাথায় দেটস ইট।

সূচি ওঠে দাঁড়ালো সৌধর মুখোমুখি হয়ে বললো ব্রো তুই বুঝতে পারছিস তুই কতোটা জেলাস হয়ে কাজটা করেছিস?
তার মানে তুই চাচ্ছিস না পিংকির লাইফে কোন ছেলে আসুক।

সৌধ অবাক হয়ে গেলো সূচির কথা শুনে।
কেনো চাচ্ছিনা আমি, কেনো?

কারন ও তোর বউ ব্রো।

বউ, চুপ হয়ে গেলো সৌধ।

সূচি সৌধর হাতটা চেপে ধরে বললো ব্রো তুই যতোই বলিস ও তোর বউ না ওকে তুই বউ মানিস না, কিন্তু তোর মন তো ঠিকই তোর অজান্তেই ওকে বউ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। তাই তো তুই ওর পাশে অন্যকাউকে সহ্য করতে পারছিস না।

“তোর মাথা ওকে মানতে নারাজ
কিন্তু
তোর মন ওকে হয়তো গ্রহন করতে চাইছে,
সৌধ দাঁড়িয়ে পড়লো। কি বলছিস তাহলে রুশা, রুশার কি হবে।

সূচি দাঁড়িয়ে পড়লো। ব্রো রুশা তোর গার্লফ্রেন্ড আর পিংকি তোর বউ। আর মনে রাখিস রুশা তোর জীবনে আগে আসেনি বরং পিংকি এসেছে। তোর বউ হয়ে। তুই নিজের বউ কে অস্বীকার করে রুশার সাথে সম্পর্কে জরিয়ে ভুল করেছিস। এটা অন্যায় হয়েছে পিংকির সাথে। শুধু পিংকি নয় এই সমাজের চোখে, আমাদের ধর্মের চোখেও তুই অন্যায় করেছিস ব্রো। সব বাদ দে সব বাদ দিয়ে পিংকি কে স্বীকার করে নে। বউ হয় ও তোর বিয়ে করা বউ।

আজ যদি তুই এসব থেকে না বের হোশ কাল ঠিকি পিংকি তুষারের সাথে নিজেকে জরিয়ে চলে যাবে এ বাড়ি থেকে। নিজের বউ কে অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে সেটা তুই সহ্য করতে পারবি ব্রো?

সত্যিকারের পুরুষ কখনো নিজের বউকে অন্যকারো হতে দেখে চুপ থাকতে পারে না।

এখনো সময় আছে নিজের টা বুঝে নে।
নিজের ঘরের জিনিসে নজর দিয়ে দেখ বাইরের জিনিসের থেকে নিজের টাই বেষ্ট। একবার চোখ খুলে দেখ কি পেয়েছিস তুই।
সৌধর মাথা ঝিম ধরে গেলো একবার রুশা আরেকবার পিংকি কপাল ঘামতে শুরু করলো।
সূচি বললো ব্রো তুষার ঐ বাসায় ওঠেছে?

সৌধ শুধু মাথা নাড়ালো সূচি বিশ্ব জয়করা এক হাসি দিলো। তারপর বললো ব্রো এখনো সময় আছে ভেবে দেখ সবটা বলেই চলে গেলো সূচি।
জবার সাথে কাজের ফাঁকে টুকটাক কথা বলছে সামিয়া চৌধুরী। সূচি দৌঁড়ে এসে বললো মা কাল বাবা আসছে সকালে?

সামিয়া চৌধুরী বললেন ওমা মেয়েকেও ফোন দিয়ে বলা হয়ে গেছে। সূচি গাল ফুলিয়ে বললো তুমি বলোনি তো কি হয়েছে বাবা ঠিকি বলেছে। কাল সকালে এসে তোমাকে নিয়ে আবার রাজশাহী যাবে। সব জানি আমি।

সামিয়া চৌধুরী হাসতে হাসতে বললো হ্যাঁ আমার মেয়ে সব জানে তো, তা আমার মেয়ে কি এটা জেনেছে যে তার গুনোধর ভাই আর বাঘিনী ভাবির মধ্যে কি হয়েছে?

সূচি সাথে সাথে ওঠে রান্নাঘরে চলে গেলো।
মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে কাধে মাথা রেখে বললো সব বিষয় কি আপনাকে জানতেই হবে ম্যাডাম।
এগুলো সিকরেট ব্যাপার, হাজব্যান্ড ওয়াইফের।

সামিয়া চৌধুরী বিস্ময় চোখে ঘুরে তাকালো সূচির দিকে, উৎসুক চোখে বললো সত্যি,
সূচি মাথা নাড়িয়ে বললো হ্যাঁ মা সত্যি।

সামিয়া চৌধুরী বললেন আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে ওদের মধ্যে হাজব্যান্ড, ওয়াইফ ঝামেলা হচ্ছে।
জবা অবাক হয়ে চেয়ে বললো আল্লাগো আপনেরা হেগোর ঝামেলা দেইখা এতো খুশি।
হেগোরে বুঝান এতো ঝামেলা না করতে।

সামিয়া চৌধুরী গ্যাস বন্ধ করে তরকারি নামিয়ে জবার দিকে চেয়ে বললো। এই ঝামেলা সেই ঝামেলা নারে পাগলা, এইটা সিকরেট ঝামেলা।
সূচি ফ্রিজ থেকে আপেল বের করে খেতে খেতে চলে গেলো। জবা সমিয়ার কথা না বুঝে ভাবতে লাগলো ব্যাপারটা কি,

রাত দশটা বাজে পিংকি খায়ও নি ঝিম মেরে বসে আছে। সামিয়া চৌধুরী সূচি খুব জোরাজোরি করেও পিংকি কে খাওয়াতে পারেনি। সৌধ ফোন বন্ধ করে ছাদে বসে আছে। মা বোনের ডাকাডাকিতেও সৌধ নিচে যায় নি।

রুশা ফোন করে করে পাগল হয়ে যাচ্ছে বার বার বন্ধ দেখাচ্ছে। বাধ্য হয়ে সাকিব কে ফোন করলো। সাকিবও জানালো সৌধর ফোন বন্ধ। রুশা রেগে গিয়ে নিজের ফোনটাই ভেঙে ফেললো।

সূচি আবারো পিংকির কাছে এলো। পিংকির পাশে বসে বললো জেদ ধরে বসে না থেকে বরং ব্রো কে দেখিয়ে দাও ও যদি পারে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে তোমার সামনে ঘুরাঘুরি করতে তুমি কেনো পারবে না।

পিংকি চমকে ওঠলো সূচির দিকে তাকালো। সূচি মাথা নেড়ে বললো ইয়েস,

আজকে বসে আড্ডা দিয়েছো তাতে কি কাল থেকে ঘুরবে ফিরবে। সারারাত ফোনে কথা বলবে। ব্রো যদি পারে তুমি কেনো পারবে না। ওর স্বাধীনতা থাকবে তোমার কেনো থাকবে না।

পিংকি অবাক হয়ে সূচির দিকে তাকালো।
এসব কি বলছো মা টু, বাবা টু জানলে সমস্যা হয়ে যাবে। এসব আমি পারবো না।

সূচি বললো আরে ইয়ার, কি বলছো মা, বাবা ব্রো কে কিছু বলছে না তো তোমায় কেনো বলবে?
পিংকি চেয়ে রইলো সূচির দিকে সূচি পিংকি কে বললো নো টেনশন ইয়ার, কেউ কিছু বলবে না।

তুমি বরং ব্রো কে একটা শিক্ষা দাও। ও যদি পারে তুমি কেনো পারবেনা। তুমি যথেষ্ট সুন্দরী, ওর থেকে হাজারগুন ভালো ছেলেরা তোমার জন্য পড়ে আছে।
এভাবে নিজের সাথে, খাবাড়ের সাথে জেদ ধরে বসে না থেকে বরং নিজেকে স্ট্রং করো আর মি.সৌধ চৌধুরী কে দেখিয়ে দাও তুমিও পারো। জীবনটা তোমার যেভাবে খুশি সেভাবে চলবে। বউ হিসেবে স্বীকার করে না তাহলে কেনো অধিকার ফলাতে আসবে, হোয়াই? তুমি জাষ্ট ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে নিজের মতো বিন্দাস থাকো।

পিংকি চট করে ওঠে দাঁড়ালো চোখের পানি মুছে বললো ইয়েস ঠিক বলেছো।
সূচি পিংকির অগোচরে হাতটা মুঠ করে উপর থেকে নিচে নামিয়ে আস্তে করে বললো ইয়েসস।
সূচি দৌড়ে মায়ের রুমে গিয়ে মা কে জরিয়ে ধরলো।

পেরেছি আমি পেরেছি, আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছি।
এখন শুধু জ্বলে ওঠার অপেক্ষা।

সামিয়া চৌধুরী কাপড় গোছাতে গোছাতে বললো এবার ভাই কে একটু দেখে আসেন। সেও তো না খেয়ে পড়ে আছে। সূচি বললো ওয়েট মাদার বাংলাদেশী। আগে তো এক বোম সরুক ড্রয়িং রুম থেকে। তারপর আরেক বোম কে নিয়ে আসছি।

দুটো বম একসাথে থাকলে অতি দ্রুত তা ব্রাস্ট হয়ে যায় জানোনা বুঝি। সামিয়া চৌধুরী হাসতে লাগলো মেয়ের কথা শুনে।
পরেরদিন –

আকাশ চৌধুরী এসে সামিয়া চৌধুরী কে নিয়ে রওনা দিলো। সৌধ, পিংকি, সূচি বাবা, মা কে বিদায় দিয়ে যে যার কাজে চলে গেলো।
সূচি ভাবলো আজকে ওর সাথে আমাকে মিট করতেই হবে যেভাবেই হোক। কাকে যেনো ফোন করে বাড়ির ভিতর চলে গেলো সূচি।
সৌধর মাথায় নানারকম চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

সৌধ নিজেও বুঝতে পারছে না সে কি চায়।
এদিকে রুশা ওয়েট করছে তার জন্য পার্কে। মন না চাইলেও রুশার সাথে দেখা করতে যেতে হলো তাকে। কিন্তু সেখানে যে এখন কি পরিস্থিতি তৈরি হবে তা শুধু সৌধই জানে।

লাবনীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো তার বয়ফ্রেন্ড রিজভীর সাথে। সব বান্ধবীকে ইনভাইট করা কমপ্লিট। রিতু আর পিংকিকে একদম সামনাসামনি ইনভাইট করবে বলে রেষ্টুরেন্টে এসেছে।

লাবনী তো প্রচুর খুশি, ওর এতো খুশি দেখে পিংকির চোখে জল চলে এলো। আর বললো ইশ ভালোবাসার মানুষ কে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার অনুভূতিই আলাদা তাইনা বল?

লাবনী বললো হুম দোস্ত বিশ্বাস কর আমি খুব খুব হ্যাপি। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে সব থেকে সুখী মানুষ আমি। এই শোন রিতু, শোন পিংকি আমি কিন্তু আগেই বলে দিলাম গায়ে হলুদ, মেহেন্দি, আর বিয়ে সবকিছুতেই আমি পুরো ফাটাফাটি ভাবে ইনজয় করতে চাই। আমার বিয়ে বলে আমি কিন্তু চুপচাপ বসে থাকতে পারবো না, নাচবো, গাইবো তোদের সাথে ফাটিয়ে ইনজয় করবো।

রিতু বিস্ময় চোখে চেয়ে বললো এই ছেমরি লাজ, লজ্জা সব ধুয়ে খাইছোস নাকি, পিংকি অট্রস্বরে হেসে ওঠলো।
লাবনী গাল ফুলিয়ে বললো ক্যান, ক্যান তোরা মজা করবি আর আমি চুপ করে ভূতের মতো বসে থাকবো নাকি। ছিঃ তোরা কি সেলফিশরে,
পিংকি বললো ইশ আমার বান্দরনীটার কতো শখ।

আচ্ছা যা ইচ্ছে তাই করিস, কিন্তু আত্মীয় স্বজন সহ তোর বর যেনো আবার না পালিয়ে যায়,
রিতুও হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।

লাবনী হাত নেড়ে থামিয়ে বললো -এই শোন শোন যখনি ডান্স শুরু হবে তোরা আমাকে টানাটানি করবি, আমি প্রথমে না না করবো, লজ্জা পাওয়ার ভান করবো, তোরা তবুও টানবি তারপর আমি বাধ্য হয়েই তোদের সাথে সামিল হবো কেমন,
পিংকি আর রিতু গালে হাত দিয়ে হা করে লাবনীর দিকে চেয়ে রইলো। রিতু বললো দোস্ত একটু পানি দে খেয়ে নেই এই মেয়ে বলে কি।
পিংকি রিতুকে পানি দিয়ে লাবনীর পিঠে এক চাপড় দিলো৷

জিনিয়াস দিদি জিনিয়াস। তুই বলেই এটা সম্ভব।

রেষ্টুরেন্ট থেকে বেরোনের সময় লাবনী বললো এই পিংক বাবা বলেছে সৌধ ভাই কেও ইনভাইট করতে।
তুই কি চাচ্ছিস আমি তোর বিয়েতে না যাই।

দোস্ত কি বলছিস বাবা বলেছে আমি না, বুঝার চেষ্টা কর।
পিংকি কিছু না বলে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

রিতু বললো চিন্তা করিস না সৌধ ভাই আসলেও পিংকি বিয়েতে আসবে না আসলেও আসবে ওসব নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই৷
অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে আছে সূচি,

সামনের লোকটির থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না সে। ফর্সা মুখটায় খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, হাসির ফাঁকে দাঁতের ঝলক দেখে সূচির বুক টা ডিপডিপ করতে শুরু করলো। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে বললো তুমিই সেই,
সেই তুমি?

সামনের লোকটা হালকা কেশে ওঠলো। বললো
হুম আমিই সেই। আর আমিও জানি তুমিই সেই ছোট্র প্রিন্সেস টা।
সূচি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললো-

এতোগুলো বছর পর তোমার সাথে দেখা। একি শহড়ে আছি আর আজি প্রথম দেখা।
চারবছর হলো দেশে এসেছি।

সূচি অভিমানের স্বরে বললো ওও চারবছর হলো দেশে এসেছো। একবারো মনে পড়েনি যে এখানে কেউ একজন রয়েছে। নাকি অন্য কোন মোহে আঁটকে পড়েছো বলে এই সূচিকে আর মনেই পড়ে না।

কি বলছো, তোমাকে আমার মনে পড়ে মাঝে মাঝেই। কিন্তু জীবনে চলার পথে সবাই তো আর পাশে থাকে না। সময়টা যে অনেক এগিয়ে গেছে। আর এই
“সময়ের ব্যবধানে বহু পরিচিত মুখ অপরিচিত হয়ে গেছে।
বহু অপরিচিত মুখ পরিচিত হয়েছে,

আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমায় ভুলেই গেছো। ভাবতে পারিনি এখনো মনে আছে তোমার।
কি বললে আমি ভুলে গেছি,

যে তুমি চলে যাওয়ার পর কেঁদে কেঁদে রাতদিন পার করেছে। সেই যে চলে গেলে তারপর আর আমার কোন খেলার সাথীই হলো না। হলো না বললে ভুল হবে আর কখনো কাউকে খেলার সাথী বানাইনি। পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়ি চলে এলাম। কিন্তু প্রত্যেকটা রাতই পার হতো সেই পুরোনো বাড়ির ছাদে। স্বপ্নে শুধু তুমি আর তুমি। দুজনের কতো স্মৃতি ঐ বাড়িটায়। সব ভেসে আসে ঘুমন্ত স্বপ্নে।

সূচি তুমি বেশ সুন্দরী হয়েছো, ছোট্র বেলায় একরকম কিউট ছিলে এখন আরেক রকম কিউটনেস এসেছে তোমার মধ্যে। ভেরী স্মার্ট।
সূচি লজ্জা পেয়ে কানের পিঠে চুল গুজে বললো –

পিংকির থেকেও কি সুন্দরী?

পর্ব ৬

তুষার মৃদু হাসলো সূচি কে গভীর চোখে পর্যবেক্ষন করতে লাগলো। সূচির চোখের গভীরতা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হলো না তার। হালকা কেশে বললো -“আমাদের হৃদয় এবং চোখকে যেটা পুলকিত করে সেটাই সুন্দর,

আমাদের হৃদয় এবং চোখে একাধিক মানুষ সুন্দর হতেই পারে। একজন কে ভালো লেগেছে, একজন কে সুন্দর লেগেছে তাই বলে অন্য কাউকে ভালো লাগবেনা সুন্দর লাগবেনা এমন তো কথা হতে পারেনা।

সূচি চট করেই বলে ফেললো আমাকে এতো বছর পর দেখে তোমার চোখ পুলকিত হয়েছে না হৃদয়?
সূচির প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ দেখে তুষার সূচির দিকে অপলক ভাবে চেয়ে রইলো। চোখ টা বুজে আবার চোখ খুললো সূচি তুষারের মুখের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো। প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে সে। তুষার মনে মনে ভাবলো যদি বলি চোখ তাহলে কি ভাববে সেই পিচ্চি মেয়েটা,
আর যদি হৃদয় বলি তাহলেই বা কি ভাববে,

ওর ভাবা ভাবি নিয়ে কেনো এতো ভাবছি আমি বরং ভাবি সত্যি আমার হৃদয় উপলব্ধি করেছে কিনা।
সূচি একই ভাবে চেয়ে রইলো।

তুষার সূচির দিকে তাকিয়েই বললো যদি বলি দুটোই পুলকিত হয়েছে।

সূচির চোখ স্বাভাবিক হয়ে এলো দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির রেখে মুচকি হাসলো। তারপর আবার বলতে শুরু করলো দেখো পিংকি কিন্তু আমার ভাবি হয়,
ওর প্রতি যদি তোমার কোন প্রকার দূর্বলতা তৈরী হয়ে থাকে তো সেটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।
অন্যের জিনিস থেকে নজর সরিয়ে, নিজের টা বুঝে নাও।

তুষার অবাক চোখে তাকালো সূচির দিকে। এক ঢোক গিলে বললো মানে, কি বলছো বুঝতে পারছিনা।
সূচি বললো বুঝতে হবে না। শুধু এইটুকু বোঝো আমার ভাই ম্যারিড, পিংকি তার স্ত্রী।
কিন্তু ওরা তো কেউ কাউকে মানে না।
ভুল জানো তুমি।

,
সৌধ রুশার সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথেই হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রজত বললো সৌধ তুই কোথায়?
রুশার সাথে মিট করতে যাচ্ছি। রজত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছু কথা বললো সৌধ কে।

সব শুনে রাগে সৌধর কান দুটো লাল হয়ে গেলো। কপাল দিয়ে ঘামতে শুরু করলো তবুও নিজের গন্তব্য স্থলে পৌঁছালো সৌধ। পার্কের একপাশে রুশা বসে ফোন টিপছে সৌধ সেদিকে এগিয়ে এলো।

রুশা সৌধকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লো সামনাসামনি হতেই জরিয়ে ধরলো। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো এমন কেনো করলে সৌধ জানো কতোটা টেনশনে ছিলাম। ফোনটা অবদি সুইচ অফ করে রেখেছিলে কেনো এমন করলে। সৌধ রুশাকে ছাড়াতে চেয়েও পারলো না। সৌধর বড্ড মায়া হলো মাথায় হাত রেখে বললো সরি, আর এমন হবে না। রুশা মাথা ওঠিয়ে সৌধর দিকে তাকালো ঘাড়ে চোখ পড়তেই আঁতকে ওঠলো রুশা একি কি হয়েছে এখানে,
সৌধ ও চমকে গেলো, আমতা আমতা করে বললো ওই একটু লেগেছে আর কি। রুশা অস্থির হয়ে পড়লো।
হাত দিতে যেতেই সৌধ ধমকে ওঠলো।

বললাম তো একটু লেগেছে,
রুশা কেঁপে ওঠলো।
সৌধ আবার শান্ত হয়ে বললো একটু লেগেছে।
রুশা চুপ হয়ে গেলো সৌধর আচরন স্বাভাবিক লাগছে না তার কাছে তবুও শান্ত হয়ে বোসলো সৌধও বোসলো। রুশা সৌধর হাতের ওপর হাত রাখতেই সৌধ হাত সরিয়ে নিতে নিলো। রুশা সৌধর দিকে তাকাতেই সৌধ হাতটা আর সরাতে পারলো না।
রুশা বললো সৌধ, বাবা আমার বিয়ের কথা বলছে বাসায়, প্লিজ কিছু একটা করো তুমি।

পিংকি কে এবার ডিভোর্স টা দিয়ে দাও প্লিজ। আর কতোদিন এভাবে থাকবো আমরা। আমার পরিবার তো আমাকে নিয়ে অন্যকিছু ভাবছে।
আরো দুটো বোন আছে আমার আমি বড় তাই আমাকে বিয়ে দিয়ে বাবা একটু চিন্তা মুক্ত হতে চায়।
জানোইতো আমার পরিবারের অবস্থা,
রুশার কথা শুনে সৌধ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো, একদিকে রজতের বলা কথায় তার মাথা প্রচন্ড গরম হয়ে আছে আর এদিকে রুশার কথা শুনে তার বুকটা ভাড় হয়ে আছে।
সৌধ ভাবলো রুশার বিয়ের কথা, রুশার পরিবারের সমস্যার কথা শুনে আমার এমন হচ্ছে, নাকি পিংকি কে ডিভোর্স দেওয়ার কথা শুনে খারাপ লাগছে। কিন্তু কেনো আমি তো এটাই চাইছি,
রুশা সৌধর কাঁধে ধাক্কা দিলো,

সৌধ ভাবনা থেকে ফিরে রুশার দিকে তাকালো।
রুশা বললো কি ব্যাপার হয়েছে টা কি, সমস্যা কি তোমার তুমি এখানে আছো নাকি?
সৌধ বললো এখানেই তো আছি কি আজব প্রশ্ন করো?
রুশা খানিকটা রেগেই বললো আজব প্রশ্ন আমি করছিনা, আজব বিহেইভ করছো তুমি। তাই তোমার সব আজব লাগছে,
হঠাৎ সৌধ ওঠে দাঁড়ালো আর বললো রুশা প্লিজ রাগ করোনা আমার খুব জরুরি একটা কাজ পড়ে গেছে। আমি পড়ে তোমাকে ফোন করবো বলেই ঝড়ের গতিতে সৌধ পার্ক থেকে বেরিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো৷ রুশা সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো ভ্রু কুঁচকে।

,
এক ঘুষিতেই পলাশের নাক দিয়ে রক্ত ঝড়তে শুরু করলো। আরো কয়েক ঘুষি দিতেই রজত এসে থামালো। সাকিবকেও কয়েকটা দিতে গেলো কিন্তু কয়েকজন থামিয়ে দিলো সৌধ কে। রাগে তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। রজত সৌধর কাধে হাত রেখে বললো মাথা ঠান্ডা কর।
সাকিব পলাশ কে ধরে ওঠালো। পলাশ কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৌধ চিৎকার করে বললো পিংকি আমার বউ, তোদের সাহস কি করে হয় ওর সাথে খারাপ আচরন করার ওকে টিজ করার।

সাকিব বললো দেখ সৌধ তুই নিজেই বলেছিস তুই ওকে বউ মানিস না। বউ যখন মানিস তাহলে আমাদের সামনে এতোদিন কেনো অভিনয় করলি। শুরুতেই বলতে পারতি। সৌধ আরো দ্বিগুন রেগে গিয়ে সাকিবের কলার টেনে ধরলো। রজত গিয়ে থামিয়ে বললো দেখ সাকিব দেখ পলাশ ও বউ মানুক বা না মানুক তোদের কোন অধিকার নেই একটা মেয়ের সাথে খারাপ আচরন করার। বাজে ইনগিত দিয়ে কথা বলার। মেয়েদের সম্মান করতে শেখ তোদের ঘরেও মা বোন আছে।
সাকিব এর মুখটা চুপসে গেলো। পলাশ কে নিয়ে চলে যেতে নিতেই সৌধ বললো দাঁড়া।
দুজনেই পিছন ঘুরলো সৌধ বললো আজ থেকে আমি ভুলে যাবো তোরা আমার বন্ধু। তোদের মতো বন্ধুর কোন প্রয়োজন নেই আমার।
আমি পিংকি কে মানি বা না মানি তোদের আমি ওকে অসম্মান করার অধিকার দেইনি।

রজত বললো দোস্ত মাথা গরম করিস না। সব ব্যাপারেই তোর মাথা গরম। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পারিস না,
সৌধ রজতের কলার ধরে বললো না পারিনা। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতেও চাইনা আমি। ওর সাহস কি করে হয় পিংকি কে হট বলার, যেখানে আমি কোনদিন পিংকির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখিনি সেখানে ও কোন সাহসে কুনজর দিয়েছে।
রজত বাঁকা হেসে বললো এই সাহসেই,

মানে,
ইয়েস তুই তোর বউয়ের দিকে নজর দিস না বলেই তো বাইরের মানুষ নজর দেওয়ার সাহস পায়।
সৌধর হাত নরম হয়ে এলো কলার ছেড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে চোখ বুজলো। রজত বললো দেখ সৌধ পিংকি যথেষ্ট সুন্দরী একটা মেয়ে। যে কোন ছেলে দেখলেই ওর প্রেমে হাবুডুবু খাবেই সেখানে তুই ওর স্বামী হয়েও ওর দিকে চেয়ে দেখলি না।

তুই সোনার কদর করছিস না বলে অন্যরা করবে না এর তো কোন মানে নেই। পলাশ কুনজরে দেখেছে কিন্তু অনেকে সুনজরেও দেখে। আর জানিসতো মেয়েরা হচ্ছে ভালোবাসার কাঙাল, যেদিন সুনজর আর খাঁটি ভালোবাসা পাবে সেদিন ঠিকি পাখি উড়ে যাবে।
মানে,

মানেটা খুব সহজ দোস্ত, শোন একটা কুকুর যদি তোর বাড়ির ওঠোনে রোজ রোজ গিয়ে বসে থাকে আর তুই যদি ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখিস দেখবি কিছুদিন পর কুকুরটাও আর তোর ওঠোনে যাবে না।

আর যদি কুকুরটা কে খাবাড় দিস, দেখবি খাবাড়ের টানেই প্রতিদিন আসবে তোর দ্বারে।

যেখানে একটা কুকুর অবহেলা আর ভালোবাসার পার্থক্য বুঝতে পারে সেখানে মানুষ কেনো পারবে না বল তো,
পিংকি মানুষ শুধু মানুষ না মেয়ে মানুষ বুঝলি। মেয়েদের মন যেমন নরম হয় তেমন কঠোর ও হয়।
আর মেয়ে মানুষ এর মতো অভিমানী প্রানী পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় টি নেই।

এখনো সময় আছে খাঁটি সোনার কদর দিতে শেখ।
আসল নকল বুঝতে শেখ।
আজ লাবনীর বিয়ে, গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে মেহেন্দি সব কিছুতেই লাবনীর সব বন্ধু -বান্ধব ছিলো। পিংকিও ছিলো কিন্তু সকালেই চলে গেছে একদম রেডি হয়ে আবার আসবে লাবনীদের বাসায়।

এদিকে রিতু, লাবনী প্ল্যান করে তুষার কে ইনভাইট করেছে। রিতুর ভাই রিভু আর তুষার সকাল সকালই এসে পড়েছে। এসেই তুষার লাবনীর সাথে আলাদা কথা বলতে চাইলো। রিতু একটু অবাক হলো আবার ভাবলো হয়তো পিংকি কে নিয়ে কিছু বলবে।

কিন্তু পিংকি কে নিয়ে বললে আমাকে কেনো জানাতে প্রবলেম, ভ্রু কুঁচকে রুম থেকে বেরিয়ে এলো রিতু রিভু বললো কি করে কপালটা এমন ছয় ভাজ করেছিস কেনো।
কিছু মেলানোর চেষ্টা করছি।

রিভু রিতুর হাত টেনে প্যান্ডেলের ভিতরে ঢুকে গেলো। আর সব কিছু খুলে বললো রিতুকে। সব শুনে রিতু কয়েক ঢোক গিলে বললো সব কি সত্যি নাকি,
রিভু বললো সেটা নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। শুধু যা বলছি তাই কর। যা এখন ওকে আমি লাবনীর ভাইয়ের সাথে হাতে হাতে কিছু কাজ করে দেই। তুষার কে বলিস এদিকটায় আছি আমি।

তুষার বেরুতেই রিতু বললো ভাইয়া রিভু ভাইয়া ওদিকটায় যেতে বললো। তুষার হালকা হেসে বললো ঠিকাছে,
রিতু তুষারের যাওয়ার দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবলো ইশ কত কিউট হাসিটা, কি সুন্দর কথা বলার ভনিতা, কি সুন্দর বডি স্ট্রাকচার ইশ,
পিংকির জন্য তো এমন ছেলেই পারফেক্ট ছিলো,
পরোক্ষনেই ভাবলো না থাক ও তো বিবাহিত।

একটা বিয়ের সম্পর্ক ভাঙ্গার চিন্তা না করে
কিভাবে সেটা টিকিয়ে রাখা যায় সেই চিন্তা করা উচিত।

রিতু রুমে যেতেই দেখলো লাবনী কারো সাথে ফোনে কথা বলছে।
ভাইয়া আপনি কিন্তু অবশ্যই আসবেন। আর পিংকি কে সাথে নিয়ে আসবেন।

ওপাশ থেকে কি বললো বুঝা গেলো না।
লাবনী বললো না ভাইয়া অবশ্যই আসবেন। সবাই এসেছে, রিতু, রিতুর ভাই রিভু, তুষাররর ভাইয়া, আমার সব বন্ধু-বান্ধবরা।
লাবনী মুখ চিপে হাসলো, রিতু বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো লাবনীর দিকে।

ওপাশ থেকে কি বললো এবারেও রিতু বুঝলো না।
লাবনী বললো তুষার ভাইয়া তো রিভু ভাইয়ার বন্ধু।

আচ্ছা ভাইয়া রাখছি, আপনি কিন্তু অবশ্যই আসবেন। পিংকি কে বলবেন যেনো তারাতারি এসে পড়ে কেমন রাখছি।
লাবনী ফোন কাটতেই রিতু বললো কিরে কে,

লাবনী অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো। রিতুকে বলতে যেতেই আরো কয়েকজন বান্ধবী রুমে ঢুকলো। একজন বললো কিরে লাবনী, কাল এতো নাচানাচি করেও মন ভরেনি। এখন আবার হেসে হেসে পুরো বাড়ি মাথায় করছিস। ভালোবাসার মানুষ কে পাওয়ার সুখে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেলো না তো।
সবাই মিলে হাসি তামাশায় মেতে ওঠলো লাবনীও কম নয় সেও যোগ দিলো।
,
সেই কবে শাড়ি পড়েছিলাম। তাও মা টু পড়িয়ে দিয়েছিলো। আমি কি এসব পড়তে পারি নাকি, সব বান্দরনী গুলা কে পই পই করে বললাম তোরা পর আমি পড়বো না। না কে শোনে কার কথা ধূর,

আমি তো পড়তেই পারছিনা। বার বার এলো মেলো হয়ে যাচ্ছে। সূচিটাও চলে গেলো ও থাকলে আমার এতো ঝামেলা হতো না ধ্যাত।
জবা কি পারবে,
এক কাজ করি ও না পারলেও কুচিটা তো ধরতে পারবে, ইয়েস ওকেই ডাকি।

পিংকি শাড়িটা খুলে একটা ওড়না গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে তাকিয়ে জবাকে ডাকলো।
জবা বললো দাঁড়ান ভাবী আমি আইতাছি।
দাঁড়াতে পারবোনা তুমি রুমে আসো তাই হবে।

জবা বোকা হেসে বললো আইচ্ছা জান আমনে আইতাছি আমি।
সৌধ রুম ছেড়ে বেরুতেই পিছন থেকে পিংকিকে দেখতে পেলো রুমে যেতে। ভ্রু কুঁচকে পিংকির রুমের সামনে গেলো। পিংকি রুমে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ওড়নাটা খুলে বিছানায় রাখলো। আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।

সৌধ রুমের সামনে গিয়েই থমকে দাঁড়ালো। এক ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নিলো। বুকের ভিতর কেমন একটা করতে লাগলো। আবারো আড় চোখে একবার তাকালো গেল্ড কালার পেটিকোট, ব্লাউজ পড়া, ফর্সা মেদহীন কোমড়ে চোখ আঁটকে গেলো সৌধর। ব্লাউজের ফিতাটাও লাগানো নেই যা দেখে দম বন্ধ হয়ে আসলো তার,

মূহুর্তেই সরে গেলো দরজার সামনে থেকে পিছন ঘুরে দুপা আগাতেই জবা সামনে পড়লো। জবা অবাক চোখে তাকাতেই সৌধ বিরক্তি মুখ নিয়ে সরে গেলো। আর বির বির করতে লাগলো কি বিয়াদব মেয়েরে বাবা, দরজা লাগিয়ে নিলে কি হতো। যদি অন্যকেউ এসে যেতো, পরোক্ষনেই ভাবলো নাহ আমি আর জবা ছাড়া তো কেউ নেই।

এই যা, জবা ওকে এই অবস্থায় দেখে ফেলবে না তো সৌধ পিছন ঘুরে দ্রুত পিংকির রুমের সামনে আসলো। ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে,
জবার সামনে ওভাবে, মেয়েটা তো ভারী অসভ্য।
সৌধ দরজায় হেলান দিয়েই দাঁড়িয়ে রইলো।

হঠাৎ ই তার বুকের ভিতর কেমন করতে শুরু করলো। বুকের বাপাশে হাত দিয়েই চোখ বুজে ফেললো।
বুকের বা পাশে এমন মৃদু যন্ত্রণা হচ্ছে কেনো?
এই যন্ত্রণানুভূতি যে বড্ড অচেনা।

“চেনা অনুভূতির চেয়ে
অচেনা অনুভূতি
বেশীই তীব্র হয়, (জান্নাতুল নাঈমা)
,
শাড়ি পরে এতো ভারী সাজে আজ আর রিকশা করে যেতে ইচ্ছে করলো না পিংকির। ড্রাইভার কে বললো লাবনীর বাসায় পৌঁছে দিতে।
ড্রাইভার বললো আপা মনি সৌধ ভাই ও

যাবো। অপেক্ষা করতে বললো।
পিংকি চমকে গেলো। কি, সৌধ যাবে, কোথায় যাবে। ড্রাইভার বললো বিয়ে বাড়ি যাবে নাকি বললো।
কিহ!

পিংকি তারাহুরো করে রিকশা নিয়েই চলে গেলো।

এদিকে সৌধ এসে শুনতে পেলো পিংকি তার যাওয়ার কথা শুনেই তারাতারি বেরিয়ে পড়েছে।
আমি যাবো বলে এতো সমস্যা সেজে গুজে ঐ তুষার কে দেখাতে যাচ্ছো বিয়েতে। আমার সাথে গেলে তোমার তুষারের বুঝি বড্ড গায়ে লাগবে,
সৌধ রাগি লুক নিয়েই ড্রাইভার কে বললো তোমার যেতে হবে না। আমি নিজেই ড্রাইভ করবো।
সৌধও বেরিয়ে পড়লো লাবনীদের বাসার উদ্দেশ্যে।

বিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই সকলে হা করে চেয়ে রইলো। রিতু দৌড়ে এসে পিংকির সামনে দাঁড়ালো।
ওররে বাবা, কি লাগছেরে আজ তোকে। এক চোখ টিপ দিয়ে দু আঙুলে ইনগিত দিয়ে বললো হেব্বি,
পিংকি হালকা হেসে বললো যাহ কি যে বলিসনা চল লাবনীর কাছে যাই। আর তোকেও খুব সুন্দর লাগছে,
রিতু বললো আচ্ছা চল ওর সাজ কমপ্লিট প্রায়।

হঠাৎ সামনে তুষার চলে এলো।

হাই, পিংকি কেমন আছো?
পিংকি তুষার কে দেখে বেশ অবাক হয়ে বললো আপনি এখানে,
হ্যাঁ ভালো আছি আপনি কেমন আছেন?

তুষার মৃদু হেসে বললো এইতো ভালো।
রিতু বললো আরে ভাইয়ার সাথে এসেছে লাবনী তুষার ভাইকেও তো ইনভাইট করেছে জানিস না।
ওও আচ্ছা চল।

রিতু আর পিংকি চলে গেলো৷ তুষার ওদের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
,
বিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই সৌধর চোখ আটকে গেলো বারন্দায়। পিংকি আর তুষার কথা বলছে একা। আশে পাশে আর কেউ নেই।
সৌধ রাগে হাতটা মুঠ করে এগিয়ে গেলো।

লাবনীর ভাই নীরব সৌধর সাথে হ্যান্ডশেক করে সৌধকে বসতে বললো। কিন্তু সৌধ বোসলো না সৌধ আশে পাশে তাকাতে তাকাতে সোজা পিংকি আর তুষারের দিকে চলে গেলো।

পিংকি সৌধ কে দেখেই বারান্দা থেকে রুমে চলে গেলো। তুষার ও সৌধ কে ইগনোর করে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।
যা সৌধর রাগটা দ্বিগুন বাড়িয়ে দিলো। তবুও চুপচাপ রইলো। রিতু পিছন থেকে ডাকলো সৌধ ভাই,
সৌধ পিছন ঘুরে রিতুকে দেখে বেশ অবাক হলো।

মনে মনে ভাবলোএই মেয়ে তো আমাকে সহ্যই করতে পারেনা। এ আবার কি বলে,
রিতু বললো এখানে একা কি করছেন চলুন ওদিকটায় যাই। ওখানে সব রিলেটিভরা বসেছে বর ও এসে পড়বে খানিক বাদে।
সৌধ বললো আমি বেশী লেট করবো না। লাবনীর সাথে দেখা করেই চলে যাবো।

রিতু লাবনীর কাছে নিয়ে গেলো সৌধ লাবনীকে গিফ্ট পেপার মোড়ানো একটা বক্স হাতে দিয়ে বললো কনগ্র্যাচুয়েলেশনস, আসছি ভালো থেকো কেমন।
লাবনী বললো ভাইয়া এখুনি চলে যাবেন। পিংকির ফিরতে তো রাত হবে ও কার সাথে যাবে এতো রাতে,
সৌধ লাবনীর দিকে তাকিয়ে ওর কথাগুলো ভাবতে লাগলো।

লাবনী বললো রাত করে মেয়েরা বাইরে সেভ না ভাইয়া। আশা করি আপনি বুঝবেন।
সৌধ মৃদু হাসলো শুধু। আশে পাশে তাকিয়েও পিংকিকে দেখতে পেলো না।

রুম থেকে বেরুতেই লাবনী বলে ওঠলো ভাইয়া আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। সৌধ হেসে ফেললো পিছন ঘুরে বললো তোমাকেও খুব সুন্দর সেই সাথে খুব মিষ্টি লাগছে।

রিতু বললো আর পিংকি কে কেমন লাগছে বলেই ভ্রু নাচালো।

সৌধ বাঁকা হেসে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
পিংকি তামান্নার সাথে পিছন ঘুরে কথা বলছিলো। সৌধ পিংকি কে দূর থেকে দেখতে পেলো।
খোঁপা করায় ফর্সা পিঠটা দূর থেকেও খুব স্পষ্ট ওকি দিচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই বিশ্রি লাগলো সৌধর।

নিজের অজান্তেই কি ভেবে যেনো পিংকির দিকে এগিয়ে গেলো। একদম পিছনে দাঁড়াতেই তামান্না চমকে গেলো। তামান্না এই প্রথম সৌধকে পিংকির আাশে পাশে দেখতে পেলো। যা তাকে খুবই অবাক করলো।

সৌধ পিংকির পিছনে দাঁড়াতেই আরেক দফা ভড়কে গেলো। চোখ আটকে গেলো পিংকির কাধের তিলটার উপর। ইশ কি বিশ্রি লাগছে,
এই মেয়েটার সমস্যা কি,

তামান্না চোখ বড় বড় করে ইশারা করতেই পিংকি পেছন ঘুরলো। সাথে সাথেই সৌধর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো।
পিংকি দ্রুত চোখ সরিয়ে চোখে মুখে রাগের ঝলকানি নিয়ে এলো।

সৌধ নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
তামান্না হা হয়ে তাকিয়ে রইলো।

পিংকি অবাক হওয়ার সাথে সাথে রেগে বললো আমার কোন কথা নেই।
সৌধ বললো আমার আছে। তামান্নার দিকে চেয়ে বলল এক্সকিউজ মি. প্লিজ।

তামান্না অবাক স্বরে হুম বলে চলে গেলো।
পিংকি তামান্নার কান্ড দেখে চট করে পা বাড়ালো আর সাথে সাথেই সৌধ পিংকির হাতটা চেপে ধরে সিড়ির পাশে দেয়ালে পিংকির পিঠ ঠেকিয়ে নিজের এক হাত দেয়ালে রাখলো।

পিংকি কয়েক সেকেন্ডে বুঝে ওঠতেই চেঁচিয়ে বললো এসব কি হচ্ছে। সমস্যা কি তোমার?
সৌধ বললো চুপপ,

সৌধ পিংকির এতো কাছে আসাতে পিংকি শান্ত হয়ে ইতোস্তত বোধ করতে লাগলো।
সৌধ পিংকির দিকে অপলক ভাবে চেয়ে বললো চুলটা খোলা রাখলে ভালো হবে।

পিংকি ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
সৌধ এক ঢোক গিলে বললো দেখো আমি তোমার সাথে বিয়ে বাড়িতে কোন প্রকার ঝামেলা করতে চাইছিনা। শুধু চুলটা খোলা রাখো ব্যাস এতটুকুই।
পিংকি অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে বললো সরি পারবোনা।

আমি তোমার কথা শুনতে বাধ্য নই।

সিঁড়ি দিয়ে কেউ আসছে বুঝতে পেরে সৌধ দ্রুত পিংকির কাঁধে ধরে পিছন ঘুরিয়ে খোপাটা খুলে চুলগুলো পুরো পিঠ জুরে ছড়িয়ে দিলো। খোলা পিঠে সৌধর হাতের স্পর্শ পড়তেই পিংকির শরীর শিউরে ওঠলো। সেই সাথে তার হৃদয়ের স্পন্দন দ্রুত বেগে বেড়ে গেলো। রাগটা সে আর করতে পারলো না আর না পারলো কিছু বলতে। কিভাবে বলবে তার গলা দিয়ে যে কোন স্বরই বের হচ্ছে না।

সৌধ তারাহুরোয় কাজটা করেই সরে গেলো।

পিংকি সৌধর কর্মকান্ড দেখে স্তব্ধ হয়ে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে রইলো। শ্বাস-প্রশ্বাস তার যেনো হাজারগুন বেড়ে গিয়েছে। কি হলো এটা, কেনো হলো? সৌধ এমন অদ্ভুত আচরন কেনো করলো?

চোখ দুটো পানিতে চিক চিক করছে তার। বুকের ভিতর কেমন চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। সেই পরিচিত এক ব্যাথা যা সে দুবছর আগে বাসর ঘরে বসে অনুভব করেছিলো।

মূহুর্তেই তার সকল অনুভূতিতে কালো ছায়া এসে ভড় করলো। রাগে তার নাক, কপাল ঘামতে শুরু করলো।
এতো বড় সাহস তুমি কোথায় পাও সৌধ, আমাকে স্পর্শ করার অধিকার তো আমি তোমায় দেইনি। বলেই খোলা চুল হাত দিয়ে পেঁচিয়ে লাবনীর রুমের দিকে ছুটে চললো।

,
রাত আটটা বেজে গেছে বিয়েও কমপ্লিট সৌধ পিংকির আশে পাশেই রয়েছে৷ সেই সাথে রাগে তার মাথা এতোই গরম হয়ে আছে যে অগ্নি দৃষ্টিতে শুধু পিংকি আর তুষারকেই দেখে যাচ্ছে।

এতো বড় সাহস তোমার, নিজের শরীর দেখাতে খুব ভালো লাগছে মানুষকে তাই না। তুষারের সাথে হেসে হেসে কথা বলতেও কোন সমস্যা হচ্ছে না। কাঁধে তিলটা নিশ্চয়ই তুষারের চোখে পড়েছে,

খোলা পিঠটাও নিশ্চয়ই দেখেছে। ওর জন্যই তো আবারো চুল বেঁধেছো, ওকে দেখানোর জন্যই তো।
রাগে সৌধ কি করবে বুঝে ওঠতে পারছে না। আর না পারছে এখান থেকে যেতে। একবার চলে যেতে নিয়েও ফিরে এসেছে আর ভেবেছে চোখের সামনেই এমন আড়ালে চলে গেলে না জানি কি হবে।

রিভু আর তুষার ভীর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে এই সুযোগে সৌধ পিংকির পিছনে গিয়ে পিংকির হাত চেপে ধরে ভীর ছেড়ে বেরিয়ে একটা ফাঁকা রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।

পিংকি চিৎকার করে ওঠলো৷
সৌধ,

তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছো, এখানে কেনো তুমি এখান থেকে দয়া করে চলে যাও। তোমাকে আর জাষ্ট সহ্য করতে পারছিনা। আর আমাকে কেনো নিয়ে এলে এখানে সড়ো, বলেই পিংকি দরজার কাছে যেতেই সৌধ পিংকির কোমড় জরিয়ে একদম নিজের কাছে নিয়ে এলো।
মুখোমুখি মুখ করে বললো জাষ্ট স্যাট আপ,

পিংকি সৌধর চোখের দিকে চেয়ে আঁতকে ওঠলো।
চোখ দুটো একদম রক্ত বর্ন ধারন করেছে।

পিংকি সৌধর শক্ত বাঁধন ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলো। খানিকটা ভয়ও লাগলো তার শুকনো ঢোক গিলে বললো সৌধ প্লিজ ছাড়ো।
সৌধ পিংকির দিকে তার কঠোর দৃষ্টি স্থির রেখে কোমড় থেকে ধীরে ধীরে হাতটা পিঠে ওঠিয়ে নিলো।

পিংকির পুরো শরীর শিউরে ওঠলো। ধরা গলায় ভয়ে ভয়ে বললো সৌধ, কি করছো? প্লিজ এমন করো না।
সৌধ পিঠ ছেড়ে হাতটা চুলে নিয়ে খোপাটা খুলে দিলো।

মুখটা পিংকির আরেকটু কাছে নিয়ে বললো তোর এতো অবাধ্যতা আমাকে এমন করতে বাধ্য করলো।
বলেই পিংকির কাধের দিকে তাকালো। আবার পিংকির মুখের দিকে তাকালো।

তাকানোটায় রাগ স্পষ্ট থাকলেও আরো অনেক কিছুই ছিলো। যা পিংকির বুকের ভিতর ঝড় তুলে দিলো। সৌধ নেশা ভরা চোখে আবারো পিংকির কাঁধের তিলটার দিকে তাকালো এক হাতে পিংকির পিঠ টা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁধের তিলটায় আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো।
সাথে সাথে পিংকি কেঁপে ওঠলো। চোখ গড়িয়ে এক ফোঁটা জল বেরুলো।

পরোক্ষনেই নিজেকে শক্ত করে নিয়ে সৌধ কে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে ঠাশশ করে গালে এক চড় বসিয়ে দিলো।
সৌধ রেগে গিয়ে পিংকির কোমড় আরো শক্ত করে চেপে পিংকির মুখোমুখি হয়ে বললো এই আমি তোকে স্পর্শ করলেই তোর এতো সমস্যা কেনো?
পিংকি রাগে, ক্ষোপে সৌধ কে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু সৌধর শক্তির কাছে সে পেরে ওঠলো না। সৌধও রাগে, জেদে পিংকিকে আরো বেশি করে নিজের সাথে চেপে নিলো।


পর্ব ৭

ছাড়ো আমায় সৌধ। তোমার মতো চরিএহীন ছেলের স্পর্শ পেতেও আমার ঘৃনা হয়। আই হেইট ইউ, আই জাষ্ট হেইট ইউ।
পিংকি আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৌধ নিজের ঠোঁট জোরা দিয়ে পিংকির ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো।

পিংকি ছটফট করতে করতে এক সময় চুপ হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে অঝড়ে পানি পড়ছে। তবুও সৌধর কোন হেলদোল নেই। বেশ কিছু ক্ষন পর সৌধ পিংকি কে ছেড়ে দিলো। সৌধর ঘনশ্বাস পিংকির মুখের ওপর লাগতেই পিংকি সৌধকে বুক বরাবর এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজে চুপ করে গুটিশুটি মেরে ফ্লোরে বসে পড়লো।

সৌধ খানিকটা দূরে সরে গেলো। পিংকির দিকে চেয়ে আবার কাছে এসে দাঁড়ালো। কাঁধে হাত রেখে বললো পিংকি,
সাথে সাথে পিংকি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠলো।

হাঁটুর ওপর হাত রেখে মাথাটা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাদতে লাগলো।

সৌধ নিজের হাতটা মুঠ করে শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক করে নিয়ে পিংকির পাশে বোসলো।
মাথায় হাত রেখে বললো সরি,
আমি জানিনা আমি কেনো নিজেকে তোমার থেকে আটকে রাখতে পারছিনা, কেনো আমি তোমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছিনা আমি সত্যি জানিনা। আমি শুধু জানি তোমার পাশে আমি ছাড়া অন্য কেউ থাকবে না। অন্য কোন পুরুষ তোমার দিকে ভালো লাগার দৃষ্টি নিয়ে তাকাবে না।
তুমি শুধু আমার, আর আমার হয়েই থাকবে।

পিংকি মাথাটা ওঠিয়ে সৌধর দিকে চোখ তুলে তাকালো। চোখ দুটো রক্ত বর্ন ধারন করেছে তার।
একরাশ ঘৃনা ছুঁড়ে সৌধর কলার টেনে ধরে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে বললো – কেনো পারবেনা আমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে।
আমি যদি পারি তুমি কেনো পারবেনা।

সৌধ অবাক চোখে পিংকির দিকে চেয়ে রইলো।

হঠাৎ তাঁর হুঁশ ফিরে এলো।
পিংকি তো সত্যি বলছে আমি কেনো এসব করছি, আর কেনোই বা এসব বলছি। এই বিয়েটা তো আমি কোনদিন মানিনি। আর রুশা, আমার জীবনে যে অন্যকেউ রয়েছে, অন্যকারো সাথে আমি কামিটেড রয়েছি।

পিংকি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলতেই থাকলো।
আমি যদি পারি দিনের পর দিন তোমার পাশে অন্য কাউকে দেখতে তুমি কেনো পারবে না। আর তুমি যদি সত্যি আমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য নাই করতে পারো তাহলে কি পারবে রুশা কে ছাড়তে।

পারবে আমাকে স্ত্রীর অধিকার দিতে?
সৌধর মুখটা শুখিয়ে গেলো, বুকের ভিতর টা ভারী হয়ে এলো। যেনো কেউ তার বুকে পাথর চেপে ধরেছে।
পিংকি ওর মুখটা আরেকটু কাছে এনে শান্ত স্বরে বললো কি হলো পারবে না,

সৌধ এক শুকনো ঢোক গিললো। পিংকির হাত ধরে কলার ছাড়াতে নিতেই পিংকি আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললো তুমি একটা কাপুরুষ,
হ্যাঁ তুমি কাপুরষ, কাপুরষ, কাপুরষ।

তোমার মতো মেরুদণ্ডহীন পুরুষ যেনো আর কোন নারীর ভাগ্যে না জোটে।
সৌধ পিংকির কথায় থমকে রইলো। পিংকি তো ভুল বলছে না, সে তো সত্যি অন্যায় করছে, দুটো মেয়ের সাথে সে অন্যায় করছে।
হঠাৎ পিংকি সৌধকে ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো।

কাঁধের সেপ্টিপিন খুলে আঁচল সরিয়ে সৌধর সামনে বসে পড়লো। সৌধ ধীর গলায় বললো পিংকি,
পিংকি আঙুল ওঠিয়ে বললো চুপ, আজ আমি বলবো তুমি শুনবে,
সৌধ এক ঢোক গিললো। চোখ সরিয়ে ওদিক সেদিক তাকাতে লাগলো।

পিংকি বাঁকা হেসে বললো নিজের বউ এর দিকে তাকাতে এতোটা ইতস্তত বোধ, তাহলে কেনো আমার কাছে আসো, কেনো আমার সাথে জোর জবরদস্তি করো সৌধ?

আমার শরীরে একবার চেয়ে দেখো সৌধ, তাকাও। রুশার থেকে কোন অংশে কম আমি?
সৌধ অবাক হয়ে পিংকির মুখের দিকে তাকালো।

গাল বেয়ে পানি গলা অবদি পৌঁছে যাচ্ছে আবারো চোখ বেয়ে গাল, গলায় পড়ছে। সৌধর বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠলো।
পিংকি বলতেই থাকলো -রাস্তায় যখন বের হই, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে এতো সুন্দরী একটা বউ থাকতে কেনো সৌধ বাইরের মেয়ের দিকে নজর দেয়।

তোমার নিজের বন্ধু-বান্ধবরা যখন রাস্তা ঘাটে আমাকে অসম্মানের চোখে দেখে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, আমার শরীরের দিকে লোভাতুর দৃষ্টি দেয় তখন আমার মনের ভিতর কতোটা যন্ত্রণা হয় সেটা কি তুমি কোনদিন ও জানতে পেরেছো সৌধ,
লোক হাসাহাসি করে আমাকে দেখে, আমি কি সত্যি মানুষের হাসির পাএী সৌধ?

পিংকি সৌধর কলার ধরে আবারো বললো এই কি নেই আমার মধ্যে কি নেই।

সৌধ নীরব রইলো তার কিছু বলার ভাষা নেই। নিজের ওপর আজ তার ভীষণ রাগ হচ্ছে।
পিংকি নিজেকে ঠিক করে নিয়ে ওঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলে দৌঁড়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

সৌধ ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো।

ওঠে দাঁড়িয়ে পিংকির বলা কথা গুলো ভেবে দেয়ালে সাজোরে এক ঘুষি দিলো।

নাহ আমাকে যে কোন একটা সিদ্ধান্তে আসতেই হবে। দুটো মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোন অধিকার নেই আমার। কোন অধিকার নেই।
হঠাৎ সৌধর মনে পড়লো বেশ কিছুদিন যাবৎ রুশা তার সাথে যোগাযোগ করছে না। পলাশ কে মারার পর একবার দেখা করেছিলো।

পিংকিকে সবার সামনে বউ বলার কারনে বেশ ঝামেলা করে গেছে। তাই আর সৌধ রুশাকে ফোন করেনি রুশাও সৌধ কে ফোন করেনি। তাদের মধ্যে যোগাযোগ পুরোই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।

পরোক্ষনেই সৌধ ভাবলো পিংকি কোথায় গেলো।
ওর মনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বিবস্ত্র মুখ নিয়ে কোথায় গেলো ও?

সৌধ অস্থির হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পিংকি কে খুঁজতে লাগলো। লাবনীর বিদায় হয়ে গেছে।
রিতু বললো পিংকি নাকি বাসার উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছে।

রিতু বললো ভাইয়া তুষার ভাইয়া ওকে পৌঁছে দিতে গেছে।
কিহ! সৌধ অবাক সেই সাথে রেগেও গেলো।
দ্রুত বের হয়ে রাস্তায় এদিক সেদিক তাকালো।

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো বাসার উদ্দেশ্যে।
দাড়োয়ান কে ফোন করে জানতে পারলো পিংকি বাসায় পৌঁছায় নি।

পিংকি সমান তালে ড্রিংক করে যাচ্ছে, তুষার পিংকির সামনে বসে পিংকির কান্ড দেখছে। চোখ দিয়ে যেনো আগুন বের হচ্ছে পিংকির, তুষার হালকা হাসলো আরেক গ্লাস এগিয়ে দিতেই তুষারের ফোন বেজে ওঠলো।

হ্যালো,
হুম জানু বলো?

কি খবড় পিংকি কোথায়,
তুষার পিংকির থেকে সরে গিয়ে বললো ও তো চুপ করে বসে আছে, প্রচন্ড রেগে আছে সৌধর ওপর। জানিনা কি হয়েছে?
সেকি এতো রাতে পিংকি তোমার সাথে ওকে বাড়ি পৌঁছে দাও ব্রো তো টেনশন করবে। পিংকি কে দাও আমি ওর সাথে কথা বলবো।
তুষার বললো তুমি চিন্তা করো না। আমি ওকে পৌঁছে দিবো। এখন তো মুড ঠিক নেই তুমি ওর সাথে পরে কথা বললেই ব্যাটার হবে।
ওও আচ্ছা,
তো জান কবে আসছো,

সূচি লজ্জামাখা হাসি এঁকে বললো খুব তারাতারি।
তার আগে আমাদের প্ল্যান টা সাকসেসফুল হোক৷

ব্রো আর পিংকি কে এক করতে সফল হই নাকি,
তুষার বললো সে তো হবেই ম্যাডাম তো আপনি বাড়ি ফিরছেন কবে, ভাই ভাবিকে নিয়েই শুধু ভাববেন।
এখানে যে কেউ আপনার অপেক্ষায় রয়েছে।

সূচি বললো খুব তারাতারি আসছি গো আরেকটু ধৈর্য ধরুন।
এই তারাতারি ওকে বাড়ি পৌঁছে দাও। আর তোমরা কই আছো বলোতো?
রিভুদের বাসায় আছি, রিভু আর রিতু লাবনীদের ওখানেই এখনো আসেনি ওরা।
ওও রিভু ভাইয়ার আম্মু, আব্বু কোথায়।

তুষার আমতা আমতা করে বললো আছে তারাও বাসায়ই আছে।
,
সৌধ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর ভাবছে পিংকি যদি বাড়ি না ফিরে থাকে তাহলে কোথায়?

পাশের বাসায় তাকিয়ে ভাবতে লাগলো তুষারের সাথে বেরিয়েছে তাহলে কি,
নাহ সে কি করে হয়।

সৌধ পিংকির ফোনে ডায়াল করলো। সাথে সাথেই ফোন বেজে ওঠলো।
সৌধ ফোন হাতে রেখেই এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো।

ফোন বাজছে তার মানে পিংকি আশে পাশে কোথাও আছে,
ফোনের শব্দে সৌধ এগুতে এগুতে একদম সিড়ি অবদি পৌঁছে গেলো সিড়ির কয়েক ধাপ উপরেই পিংকির ফোন পড়ে আছে। সৌধ গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়েই উপরের দিকে তাকালো।
তার মানে পিংকি উপরে আছে, তুষারের বাসায়। কিন্তু কেনো এসবের মানে কি। আজ তো এদের দুজনকে আমি,
সৌধ রাগে দুহাত মুঠ করলো পিংকির ফোনটা পকেটে রেখেই উপরে চলে গেলো।
সবকটা রুমেই দরজা লাগানো।
হঠাৎ ই কানে ভেসে এলো – ভাঙা আওয়াজ। আওয়াজ টা পিংকির হতে পারে আবার নাও হতে পারে শংসয় রেখেই এগিয়ে গেলো।
দরজায় কান পাততেই সৌধ সিওর হয়ে গেলো। আর যা বুঝতে পারলো তাতে সৌধর পায়ের রক্ত মাথায় ওঠে গেলো।

দরজায় কাঁধ দিয়ে কয়েক বাড়ি দিতেই দরজা খুলে গেলো। চোখ চলে গেলো বিছানায় পিংকি নিজের মতো আবোল তাবোল বকে যাচ্ছে, আর তুষার ওর অনেকটা কাছে দরজার আওয়াজে ঘাড় ঘুড়িয়ে সৌধকে দেখেই ওঠে দাঁড়ালো।

একি সৌধ,
সৌধ ঝড়ের বেগে এসে তুষারের কলার ধরে এক ঘুষি দিলো। তোর সাহস কি করে হয় ওকে এখানে নিয়ে আসার। তুই কি করছিলি ওর সাথে বলেই আরেক ঘুষি দিলো।
তুষার সৌধ কে ছাড়িয়ে বললো এসব কি বলছিস। তোর কোথাও ভুল হচ্ছে,

সৌধ পিংকির দিকে তাকালো, পিংকি ঢুলোঢুলো চোখে সৌধকে দেখে বিরবির করতে লাগলো।
সৌধ পিংকিকে ওঠিয়ে গালে সাজোরে এক থাপ্পড় দিলো।
সাথে সাথে পিংকি ফ্লোরে ঢলে পড়লো। ওখানে বসেই ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে লাগলো।

আমাকে এই পচা ছেলেটা মারলো বলেই কাঁদতে কাঁদতে ওঠে দাঁড়ালো। তুষারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো এই তুমি কতো ভালো, বলেই সৌধর দিকে চোখ টেনে তুলে চেয়ে বললো ও এমন পচা কেনো আমাকে মাড়লো, বলেই আবারো ভ্যাঁভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো।

সৌধ পিংকি কে সরিয়ে আবারো তুষারকে মারতে নিলো। এই তোর সাহস কি করে হয়, তুই ওকে নেশা করিয়েছিস। তোকে আমি খুন করে ফেলবো। তুষার সৌধকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে বললো -সৌধ তোর ভুল হচ্ছে কোথাও, আমি ওকে নেশা করাইনি ও নিজেই করেছে, আর আমি ওকে জাষ্ট বাসায় পৌঁছে দিচ্ছিলাম। কিন্তু ও বেঁকে বোসলো আমার বাসায় আসবে। তাই নিয়ে এসেছি মেয়েটা নেশার ঘোরে আছে তাই আবলতাবোল করছে। আমি তোকে ফোন করতাম কিছুক্ষনের মধ্যেই। তখন যদি ওকে আমি এখানে না নিয়ে আসতাম রাস্তায় সিনক্রিয়েট হতো।

সৌধ অবিশ্বাসের চোখে তুষারকে দেখতে লাগলো।
তুষার, তুই আমার সাথে গেইম খেলতে আসিস না।

অতীত কি ভুলে গেছিস? তুই ভুললেও আমি ভুলিনি। আর মনে রাখিস পাপ, বাপকেও ছাড়েনা।
ঐটুকু বয়সে যদি আমি তোকে দেশ ছাড়া করতে পারি তাহলে এই বয়সে তোর ভুলের জন্য কি করতে পারবো ভেবে দেখ।
তুষার বাঁকা হেসে বললো নিজের ঘরের লোক কে আগে ঠিক কর তারপর বাইরের লোক ঠিক করতে আসিস।
সৌধ আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিংকি বললো-এই তুমি আমার বর না?

হ্যাঁ তুমি তো আমার বর। তাহলে তুমি কে বলেই তুষারের দিকে এগিয়ে গেলো।
সৌধ পিংকি কে পেছন থেকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

তুষার শার্ট ঠিক করে নিয়ে রাগে ট্টি টেবিলটা ওলটিয়ে ফেললো। ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত সূচির নাম্বারে ডায়াল করলো।
আহ লাগছে, এই পচা বর ছাড়ো আমায়। লাগছে তো আমার ছাড়ো।

সৌধ পিংকি কে নিয়ে সোজা নিজের রুমে গিয়ে ছিটকে ফেলে দরজা লাগিয়ে দিলো।

পিংকি বিছানা থেকে ওঠে বোসলো ঢুলু ঢুলু চোখে সৌধর দিকে তাকালো। সৌধ শার্ট খুলতেই পিংকি ঢুলতে ঢুলতে ওঠে সৌধর দিকে এগিয়ে গেলো।
টিশার্ট হাতে নিতেই পিংকি খপ করে টিশার্ট টা কেড়ে নিলো। সৌধ পিংকির দিকে তাকাতেই পিংকি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠলো।
সৌধর রাগি লুকটা পিংকির হাসি দেখে মিলিয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে বললো মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে,
দাও বলছি।

পিংকি হাত সরিয়ে বললো না দিবো না।
টিশার্ট টা হাতে মোচরাতে লাগলো আর বললো তুমি এটা পড়বে না,
সৌধ বললো পাগলামি বাদ দিয়ে এটা দাও আর নিজে ওয়াশ রুম যাও।

পিংকি আরেকটু কাছে এসে সৌধর বুকে হাত রাখলো। মাথাটা সোজা করে রাখতেও পারছে না সে, প্রচন্ড নেশা হয়ে গেছে। চোখ বাঁকিয়ে বললো কেনো যাবো আমি, আমি গেলেই তো ফুঁস করে ঐ শাঁকচুন্নি টা এসে পড়বে। বলেই পড়ে যেতে নিলো সৌধ হাত ধরে ফেললো ভ্রু কুঁচকে বললো শাঁকচুন্নি কে?

পিংকি আবারও খিলখিল করে হেসে সৌধর বুকে হালকা ঘুষি দিয়ে বললো বোকা ছেলে, শাঁকচুন্নি কে চিনে না, ঐ যে আছে না কোঁকড়া চুলের শাঁকচুন্নি টা। সৌধ ভ্রু কুঁচকে তাকালো আবারো পিংকি সৌধর দিকে চেয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো এদিকে এসো সৌধ মুখটা পিংকির দিকে এগিয়ে দিতেই পিংকি সৌধর এক গাল ধরে কানের কাছে ঠোঁট এগিয়ে বললো নাম জানি কি, ওওও রুশা না টুশা বলেই আবারো হাসতে লাগলো।

সৌধ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিংকি কে ছাড়িয়ে ভাবলো একটু তেঁতুল পানি খাওয়ানো উচিত। মেয়েটা হুঁশে নেই হুঁশে ফিরুক সব বোঝাপড়া করে নেবো। সৌধ রুম ছেড়ে বেরুতে নিতেই পিংকি হাত পা ছড়িয়ে ফ্লোরে বসে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো।

সৌধ থেমে পিছনে তাকালো কি হলো আবার,
তুমি আবার ঐ রুশার কাছে যাচ্ছো, কেনো যাচ্ছো আমি কি এতোই পচা, আমি কি সুন্দরী নই বলেই নিজের গাল দেখিয়ে বললো এই দেখো আমি কত্তো সুন্দর।

সৌধ পিংকির কথা শুনে ভ্রু উপরে ওঠিয়ে বড় বড় করে তাকালো। হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না।
নিজের সৌন্দর্যের প্রশংসা কেউ এভাবে করতে পারে তার জানা ছিলো ন।

হঠাৎ ই পিংকি শাড়ির আঁচল সরিয়ে ফেললো।
ওঠে দাঁড়িয়ে সৌধর সামনে গিয়ে বললো এই দেখো আমি কতো সুন্দরী, একদম ইন্ডিয়ান নায়িকাদের মতোন। বলেই সৌধর বুকে ঢলে পড়লো।
সৌধ পিংকির কথা শুনে হেসে ফেললো। পিংকিকে ধরে ওঠাতে নিবে ওমনি পিংকি সৌধর বুকে হাত দিয়ে আলিঙ্গন করতে করতে অস্পষ্ট স্বরে বললো এতো সাদা বুক তোমার বলেই বুকের লোমে হালকা টান দিলো।

আর বললো পুরুষ না মহিলা কিছুই তো বুঝিনা,
সাথে সাথে সৌধর মেজাজ বিগরে গেলো।

এক ধমক দিয়ে বললো চুপপ, কি শুরু করেছো।
চুপ চাপ এখানে দাঁড়াও আসছি আমি।

পিংকি আবারো ভ্যাঁভ্যাঁ করে কাঁদতে লাগলো।
আর বলতে লাগলো পচা বর একটু কাছে আসেনা খালি বকে, আর শাঁকচুন্নির কাছে যায়।
পচা বর, পচা বর।

সৌধ চোখ গরম করে তাকাতেই পিংকি আবারো বসে বির বির করতে লাগলো। সবদিক দিয়েই পচা। আপন মনে বির বির করতে লাগলো পিংকি।
সৌধ বাঁকা হেসে বেরিয়ে গেলো। আর মনে মনে বললো বউ জাতিটাই বুঝি এমন হয়। পুরুষ না কি সেটা তোমাকে আমি বুঝাচ্ছি ওয়েট,
সৌধ তেঁতুল পানি নিয়ে এসে পিংকি কে জোর করে খাওয়াতে নিতেই বমি করে সব ফেলে দিলো।

সৌধ বিরক্ত হয়ে এক ধমক দিলো আর বললো এসব কে খেতে বলেছিলো তোমায়, লজ্জা করে না মেয়ে হয়ে এসব গিলেছো। বাবা, মা থাকলে কি হতো।
পিংকি আবারো কাঁদতে শুরু করলো আর বললো ওই ভালো লোকই তো খেতে বললো,
কিহ ও খেতে বলেছে।

পিংকি মুখে আঙুল দিয়ে মাথা নাড়ালো। আবার আঙুল সরিয়ে সৌধকে কাছে ডাকলো। সৌধ কাছে যেতেই ফিসফিস করে বললো ওটা খেলে সব কষ্ট হাওয়া, বলেই দুহাত দুদিকে মেললো।

সৌধ পিংকির দিকে গভীর চোখে চেয়ে বললো কিসের কষ্ট তোমার এতো?

মূহুর্তেই পিংকির চোখে মুখে মেঘ জমে এলো। কান্নার স্বরে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো তুমি শুনবা?

সৌধ মাথা ঝাকালো। পিংকি কাঁদতে কাঁদতে সৌধর গালে আঙুল দিয়ে চোখ দুটো ছোট করে বললো এই তোমার মতোন আমার একটা বর আছে। একদম তোমার মতোন সৌধ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।

পিংকি বললো সে না আমাকে ভালোবাসেনা, আমাকে আদর করে না।

সৌধর বুকটা ভারী হয়ে এলো, অপলক দৃষ্টি তে চেয়ে রইলো।

পিংকি বললো দেখো আমি কতো সুন্দরী তবুও আমার দিকে তার নজর নেই সে শুধু শাঁকচুন্নির পিছনে ঘুরে,
সৌধ হেসে ফেললো।

পিংকি অভিমানী চোখে তাকিয়ে বললো তুমি হাসছো, আমার কষ্ট দেখে তুমি হাস
ছো,
সৌধ বললো তাই বুঝি, তোমার খুব কষ্ট,
পিংকি মাথা নাড়িয়ে বললো হুম আমার খুব কষ্ট, বিছানা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো মাথাটা ঘুরে এলো তবুও দাঁড়িয়ে সৌধকে বললো এই দেখো আমি কতো সুন্দরী, কতো ছেলে আমাকে দেখে হট বলে জানো, আমার পচা বরের বন্ধুরাও বলে আর আমার বর আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।

সৌধ হঠাৎ পিংকি কে এক ঝটকায় বিছানায় ফেলে দিলো। পিংকির ওপর মুখোমুখি হয়ে বললো কে কে হট বলেছে তোমায় পলাশ ছাড়া,
পিংকি সৌধর দিকে চেয়ে আবারো খিলখিলিয়ে হেসে ওঠলো।

এবাবা তোমাকে তো একদম পচা বরের মতো দেখতে। সৌধ হেসে ফেললো নেশা ধরে গেলো তার।

পিংকির পাগলামো দেখে সৌধ যেনো হারিয়ে গেলো এক অজানা রাজ্যে, যেই রাজ্যের প্রজারা এক ডাকে বলছে সৌধ পিংকি কে নিজের করে নাও। ও শুধু তোমার নিজের সম্পত্তি। মনের সব দ্বিধা কাটিয়ে নিজের স্ত্রী কে স্বীকার করে নাও।

ঘোর লাগা চোখে পিংকির দিকে চেয়ে রইলো সৌধ। এক হাতে ব্লাউজের ফিতায় দিলো এক টান।

পিংকি নিজের মতো বির বির করে যাচ্ছে ওর কোন কথা সৌধর কান অবদি পৌঁছাচ্ছে না। একহাতে পিঠ আঁকড়ে ধরতেই পিংকি শিউরে ওঠলো। সৌধ পিংকির দিকে তাকাতেই পিংকি ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো।

সৌধ বাঁকা হেসে হালকা করে ঠোঁটে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো। সাথে সাথে পিংকি কেঁপে ওঠলো খামচে ধরলো পিঠ।
শাড়িটা একটানে খুলে ফেলে দিলো। কাঁধে ঠোঁট ছুয়াতেই পিংকি ঘোর লাগা গলায় বলে ওঠলো সৌধ,
সৌধ পিংকির দিকে চেয়ে আরেকটু কাছে যেতেই চমকে ওঠলো,


পর্ব ৮

সৌধ পিংকি কে ছেড়ে পিছন ঘুরে বসলো। চোখ দুটো বন্ধ করে কয়েকদফা শ্বাস নিলো।
আমি এটা কি করতে যাচ্ছিলাম, পিংকি হুঁশে নেই হুঁশে থাকলে নিশ্চয়ই অন্যরকম পরিস্থিতি হতো।

নাহ আমি ওর কাছাকাছি থাকলেই দূর্বল হয়ে পড়বো আর এক মূহুর্তও এখানে থাকা ঠিক হবে না।
ভারী অন্যায় হয়ে যাবে ওর সাথে বির বির করতে করতে সৌধ বিছানা ছেড়ে ওঠতেই পিংকি পিছন থেকে সৌধর হাত টেনে ধরলো।
সৌধ পিছন ফিরে তাকাতেই পিংকি ঘোর লাগা চোখে আবেদনময়ী কন্ঠে বলে ওঠলো কোথায় যাচ্ছো,

সৌধর বুকের ভিতর এক প্রকার ঝর ওঠে গেলো।
মন বলছে সৌধ ও তোর বউ, নিজের করে নে আজি মস্তিষ্ক বলছে না সৌধ তুই কোন প্রকার সুযোগ নিস না। তাহলে কাল সকালে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তাঁর জন্য নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবিনা।

সৌধ পিংকির হাতের ওপর হাত রেখে অসহায় ভঙ্গিতে বললো ঘুমিয়ে পড়ো।
পিংকি ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে লাগলো।

সৌধ বললো কি হলো,
আমাকে আদর করো না কেনো, আমার আদর চাই,
সৌধর দম বন্ধ হয়ে আসলো, পিংকির হাতটা ছেড়ে ওঠে পড়লো। শাড়িটা নিয়ে পিংকির শরীর ঢেকে দিলো।

সাথে সাথে পিংকি শাড়ী সরিয়ে বললো ঢেকে দাও কেনো, আদর করবে না বলেই নিজেও ওঠে পড়লো।
চোখ টেনে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে বললো আদর করলে কেমন শীত লাগে, হাত দিয়ে অভিনয় করে বললো বুকের ভিতর ধুকপুক, ধুকপুক করে।
করোনা একটু আদর,

সৌধ নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।
পিংকির কাছে গিয়ে দুগালে আলতো করে চেপে ধরে কপালে ভালোবাসার পরশ একে দিলো।

পিংকি খিলখিল করে হেসে ওঠলো।
সৌধও হেসে ফেললো। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসার ছোঁয়া টাই তোমায় দিলাম। যা আমি নিজের মা, বোন ছাড়া কাউকে দেইনি।
পরোক্ষনেই সৌধ ভাবলো রুশার সাথে এতোদিনের রিলেশনে হাত ধরা ছাড়া আর জরিয়ে ধরা ছাড়া কিছুই হয়নি, হয়নি বললে ভুল হবে কখনো সেভাবে আকর্ষিতই হয়নি।

তাহলে পিংকি বউ বলেই কি এমন কাছে টানে, অজান্তেই কাছাকাছি হয়ে যাই।
মনের গহীনে কি পিংকির জন্য সত্যি স্পেশাল জায়গা তৈরী হয়ে গেছে,
রুশা কি শুধুই আমার জেদের বসে করা একটা ভুল?

পিংকি সৌধর বুকে মুখ ঘষতেই সৌধর ভাবনা কেটে গেলো।
এই মেয়ে তো আজ আমাকে বড়সড় ভুল করতে বাধ্যই করে ছাড়বে।

সৌধ নিজেকে শক্ত করে নিয়ে বললো তুমি যদি এখন চুপচাপ না ঘুমাও তো আমি এ রুম ছেড়ে বেরিয়ে যাবো।
পিংকি দুহাতে সৌধর পিঠ শক্ত করে জরিয়ে বললো না না তুমি কোথাও যাবে না।

তাহলে চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।
পিংকি চোখ পিটপিট করে সৌধর দিকে তাকালো, দুষ্টুমি মাখা এক হাসি একে বললো আমার খুব গরম লাগছে। আমাকে শীত দাও, শীত দাও।
সৌধ চোখ বড় বড় করে বললো কিহ গরম, এখনো তো শীত যায়ইনি বেশ শীত রয়েছে নেশা করে তোমার অনুভূতি শূন্য হয়ে গেলো নাকি।
পিংকি গাল ফুলিয়ে সৌধকে জরিয়েই বললো না আমার অনেক অনুভূতি আছে দেখবা,

সৌধ কেশে ওঠলো না ভাই দেখতে চাইনা আপনি প্লিজ ওখানে গিয়ে বসুন।

পিংকি সৌধ কে ছেড়ে হাতে ইশারা দিয়ে কাছে ডাকলো। সৌধ মৃদু হেসে মাথাটা একটু ঝুকলো।
পিংকি কানে ফিসফিস করে বললো আমি আইসক্রিম খাবো,

কিহ এতো রাতে এই ঠান্ডায় আইসক্রিম খাবে তুমি।
না খাওয়া যাবে না চুপ চাপ ঘুমাও গিয়ে। আর শাড়িটা গায়ে জরিয়ে নাও লজ্জা করছে না এভাবে আমার সামনে থাকতে,
পিংকি ভাবুক মুখে কপালের এক সাইটে শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে কয়েকটা টোকা দিয়ে সৌধর ওপর ঝুঁকে বললো তুমি তো আমার স্বামী তোমার সামনে আমি সব খুলতে পারি বলেই পিছন ঘুরলো।

চুল গুলো সরিয়ে উন্মুক্ত পিঠ মেলে ধরলো।

সৌধ বেশ ঘাবড়ে গেলো,

পিংকি বললো এই দেখো আরো দেখবা বলেই সামনে ঘুরতেই সৌধ বললো এইই, তুমি না আইসক্রিম খাবে ওয়েট আমি নিয়ে আসছি বলেই দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

পিংকি খিলখিল করে হাসতে হাসতে ঢুলেঢুলে বিছানায় গিয়ে বসলো।

নিচে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো সৌধ। বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে স্বস্থির শ্বাস নিয়ে নিলো। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিমের বক্স বের করে চামচ নিয়ে উপরে চলে গেলো।

পিংকির সামনে আইসক্রিম ধরতেই পিংকি প্রচন্ড খুশি হয়ে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকালো। সৌধর গাল টেনে দিয়ে বললো তুমি তো খুব ভালো বর।
সৌধ অবাক চোখে পিংকির দিকে চেয়ে রইলো।

দুবছরের সব কি একদিনেই উসুল করে নিবে মেয়ে টা,
আজ কি সৌধর মনে বিশাল জায়গা তৈরীর জন্যই এমন পাগলামি করছে, ও সত্যি নেশার ঘোরে আছে তো নাকি সব ইচ্ছে করেই করছে। পরোক্ষনেই ভাবলো নাহ ইচ্ছে করে করলে কি এই ভাবে আমার সামনে থাকতে পারতো আর যাই হোক এভাবে অর্ধনগ্ন অবস্থায় আমার সামনে আসতে পারতো না সে আমি যতোই ওর হাজব্যান্ড হই না কেনো। আমাদের মাঝে বিশাল এক দেয়াল আছে।

পিংকি আইসক্রিম খাচ্ছে মুখ চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সৌধ অপলক দৃষ্টি তে সেই খাওয়া দেখে যাচ্ছে।
আজ যেনো পিংকি সৌধ কে আলাদা এক নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে, পিংকির দিকে চেয়েই এক ঢোক গিললো
পিংকি সৌধর দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো খাবে,
সৌধ বাঁকা হাসলো পিংকি টপ করে কিছুটা আইসক্রিম সৌধর গালে ভরিয়ে দিলো।

আমার সাথে দুষ্টমি করা হচ্ছে, বলেই সৌধ পিংকির কাছে এগিয়ে গেলো পিংকির গালের সাথে গাল ছুঁইয়িয়ে খানিকটা আইসক্রিম তার গালেও ভরিয়ে দিলো। ঠান্ডা অনুভূত হওয়াতে পিংকি খানিকটা শিউরে ওঠলো।

সৌধ পিংকির শরীরের শিহরন অনুভব করতেই তার ঘোর লেগে গেলো পিংকির গালের আইসক্রিম টাতে ঠোঁট ছুইয়িয়ে মুখে পুরে নিলো।
পিংকি আরো দ্বিগুন শিউরে ওঠলো। সৌধ বাঁকা হেসে সরে গেলো।

পিংকি এক চোখ খুলে সৌধকে দেখে নিলো আরেক চামচ আইসক্রিম নিজের ঠোঁটে কড়া করে ভড়িয়ে সৌধর দিকে ঠোঁট এগিয়ে দিলো।
সৌধ দুষ্টু চোখে চেয়ে পিংকির ঘারে একহাত চেপে মুখ আগাতেই পিংকি চট করে জিহ্বা দিয়ে আইসক্রিম মুখে পুরে নিলো। যা দেখে সৌধ ঘাড় ছেরে পিঠে আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে চেপে ধরলো চুলে নাক ডুবিয়ে দিলো ঘোর লাগা কন্ঠে বললো এতো দুষ্টুমি, আমি যদি শুরু করি টিকতে পারবে তো।
চুল ছেড়ে ঘারে নাক দিয়ে আলিঙ্গন করতে লাগলো।

পিংকি কেঁপে কেঁপে ওঠলো। সৌধর ঘনশ্বাস পিংকির ঘারে পড়ছে সমান তালে, সৌধর পিঠ খামচে ধরলো, সৌধ একহাতে চুল আরেকহাতে পিঠ আঁকড়ে ডুবে গেলো পিংকির মাঝে।

দুজনের পেটেই ঠান্ডা ভীষন ঠান্ডা অনুভূত হতেই সৌধ সরে গেলো।
পিংকি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।

আমার আইসক্রিম, আমার আইসক্রিম।
সৌধ অসহায় মুখে পিংকির কান্না দেখতে লাগলো।

মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো।
কিছুক্ষন পর আইসক্রিম গুলো পরিষ্কার করে তয়ালে দিয়ে পিংকির পেটে ভরে থাকা আইসক্রিম মুছে দিলো।
এভাবে পিংকির জ্বালাতন চলতেই থাকলো।

রাত তিনটার দিকে পিংকি ক্লান্ত হয়ে ঘুমে ঢলে পড়লো।
সৌধও স্বস্থির এক নিঃশ্বাস ছেড়ে পিংকি কে শুইয়িয়ে দিয়ে কম্বল টেনে দিলো ওপরে।
নিজে গিয়ে সোফায় বসে পিংকিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।

সারারাত এভাবেই নিদ্রাহীন কাটালো সৌধ,
সকাল হতেই ঝড় ওঠে গেলো পুরো বাড়িতে,
মাথাটা তার বেশ ভারী হয়ে আছে।
সৌধ এতো করে বুঝিয়েও পিংকি কে চুপ করাতে পারলো না।

সে কেঁদেই চলেছে আর সৌধ কে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে যাচ্ছে।
চরিএহীন তুই, চরিএহীন। আমার সাথে তুই এতো বড় অন্যায় কি করে করতে পারলি। হয়েছে তো এবার ভোগ করেছিস আমায়, এবার খুশি তো চলে যা আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা তুই বলেই দুহাতে নিজের চুল খাঁমচে ধরলো।

সৌধ আর সহ্য করতে পারলো না, তাই পিংকির কাছে গিয়ে পিংকি ধরে বললো পিংকি তুমি ভুল বুজছো যা ভাবছো সেরকম কিছুই হয়নি।
পিংকি এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে রক্ত বর্ন চোখে তাকালো।

চিৎকার করে বললো তুই একটা ক্যারেক্টারলেস,
শরীরের প্রতি এতো লোভ তোর, রুশাকে দিয়ে হয়নি। আমার সর্বনাশ করলি, আরে এতোই যদি চাহিদা তো পতিতা লয়ে যা। বলেই বাজে একটা গালি দিলো।
সৌধর রাগটা আর নিয়ন্ত্রণে থাকলো না।

পিংকির গালে ঠাশশ করে চড় দিয়ে দুগাল চেপে বললো আর একটা কথা তুই বলবি না, বলবিনা মানে বলবিনা।
কি বললি তোকে আমি ভোগ করেছি, যদি সেটা করে থাকি তো বেশ করেছি। আর কি বললি পতিতালয়ে যেতে বউ থাকতে পতিতালয়ে কেনো যাবো।
পিংকি কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না৷ শুধু ছটফট করে যাচ্ছে। সৌধর এতোটাই মাথা গরম হয়ে গেছে যে সমস্ত শক্তি দিয়ে গাল চেপে ধরেছে।

তুই কি বললি রুশা, তোর মতো এতো নিচু মন আমার বা রুশার নেই, যদি কিছু করতেই হতো তো বিয়ে করে বউ করে ঘরে নিয়ে আসতাম।
পিংকির দাঁতের সাথে ঠোঁট লেগে কেটে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। সৌধ সমান তালে কাল রাতের ঘটে যাওয়া সব কথা দাঁতে দাঁত চেপে বলে যাচ্ছে।
মুখ ছেড়ে রাগে গলায় চেপে ধরলো।

এই বল তুষারের সাথে কেনো বেরিয়েছিলি কাল উত্তর দে।
লজ্জা করেনা রাত করে পরপুরুষের সাথে তার বাসায় গিয়ে নেশা করিস। কি হতো কাল যদি ঠিক সময় আমি না পৌঁছাতাম।
পিংকি হাত দিয়ে ছটফট করতে করতে কাশতে শুরু করলো।

সৌধ পিংকির গলা ছেড়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। রাগে হনহন করে বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে।
পিংকি কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়লো। টেবিল থেকে পানি নিয়ে পানিটা খেয়ে নিলো। তবুও কাশি থামার নাম নেই।
ঠোঁট কেটে রক্ত বের হচ্ছে বাথরুম গিয়ে মুখে পানি দিলো।

সৌধর কথা তার বিশ্বাস না হলেও তার সাথে যে খারাপ কিছু ঘটে নি এটা বিশ্বাস হলো।
আর যাই হোক সৌধ অমানুষ হতে পারেনা।

নিজেকে এভাবে দেখে আমি মাথাটা ঠিক রাখতে পারিনি। আমি তো সত্যি কাল তুষারের সাথে তুষারের বাসায় গিয়েছিলাম। ড্রিংকস ও করেছি কিন্তু তারপর, মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পিংকি।
ওহ গড কিচ্ছু মনে পড়ছে না কেনো।

আমি ওকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইনা, আমি ওকে মন বাড়িয়ে ছুঁতে চাই,
ওর প্রতি আমার অনুভূতি এমনি এমনি আসেনি,
ওর প্রতি আমার অনুভূতি এসেছে ওকে হারানোর ভয় থেকে,

আমার থেকে কেউ ওকে ছিনিয়ে নিতে পারে সেই ভয় থেকে,
বুকের বা পাশে যে ছোট্ট হৃদয় রয়েছে সেইখান থেকে এসেছে ওর প্রতি আমার অনুভূতি,
ইয়েস ওকে আমি চাই, মন থেকে চাই ওকে আমি।

আমার মনের গহীনে শুধুই ও রয়েছে আর সেটা আমি এখন নির্দিধায় স্বিকার করতে পারি।
সত্যিকারের ভালোবাসা কি সেটা আমি অনুভব করেছি, আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি, ইয়েস আই লাভ হার,
ভালোবাসা বলে কয়ে আসেনা, ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যে কখন কার প্রতি কিভাবে একজন মানুষের ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে যাবে মানুষ টা নিজেও জানতে পারেনা।

দমকা হাওয়ার মতো একজন মানুষ আরেকজন মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে নেয়।
আমি কিছু জানতে চাইনা আমি কিছু বুঝতে চাইনা আমার শুধু ওকে চাই ব্যাস।

রজত এক ঢোক গিলে ভূত দেখার মতো সৌধকে দেখতে লাগলো। চেয়ার টেনে সৌধর মুখোমুখি হয়ে বললো এ ভাই তুই ঠিক আছিস তো জ্বর টর হয়নিতো বলেই কপাল চেক করলো।

সৌধ চোখ গরম করে তাকাতেই রজত মুখ চিপে হেসে বললো আমার তো মনে হয় কাল পিংকি ড্রিংক করেনি তুই করেছিস।
তুই যা বললি আমি যা শুনলাম সব কি সত্যি,

সকাল সকাল সত্যি আমার বাড়ি তুই এসেছিস নাকি তোর ভূত এসেছে।
সৌধ রেগে গিয়ে ওঠে পড়লো, শালা বেশী বুজলে আমার বোন কে পাবি না।

আমার ভালোবাসা নিয়ে ফান করিস, তোর ভালোবাসার ১২টা যদি আমি না বাজিয়েছি দেখে নিস।
বলেই সৌধ ওঠে যেতে নিলো।

রজত হুমকি শুনে বললো এ ভাই ভাই এসব কি বলছিস ভাই, তোর কি লাগবে বল সব দিবো, বুকে হাত দিয়ে বললো এই জানটাও দিয়ে দিবো শুধু তোর বোন কে দিয়ে দে।

সৌধ রহস্যময় হাসি হেসে বললো জান দিতে হবে না।
শুধু বল এই রনচন্ডী কে কিভাবে সামলাবো।

রজত বললো আগে রুশার ব্যবস্থা কর পরে পিংকিকে নিয়ে ভাব। পিংকি এখনো তোর বউ সো নো টেনশন। যে কুকাম করছো সেইটা আগে সামাল দেও।
এই শালা মুখ সামলে কথা বল। জাষ্ট গার্লফ্রেন্ড ছিলো এটুকুই। এছাড়া কিছু করিনি ওর সাথে।
রজত বললো ও বাবা এখন জাষ্ট গার্লফ্রেন্ড,

সৌধ কিছু না বলে শুধু চোখ রাঙালো।

রুশাকে বেশ কয়েকবার ফোন করাতেও ফোন রিসিভ হলো না। সৌধ বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো।
অবশেষে ফোন রিসিভ হতেই সৌধ দেখা করতে বললো। রুশাও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলো।

সৌধ বেশ টেনশন করতে লাগলো কিভাবে রুশাকে ফেইস করবে, তবুও নিজেকে শক্ত করে নিয়ে, পিংকির মুখটা ভেবে ভেবে স্থির করলো একটা সিদ্ধান্তে সে আসবেই।
রুশা আসতেই সৌধ বেশ চমকে গেলো, হঠাৎ শাড়ি পড়ে এলো রুশার মুখটা দেখেও বেশ অবাক হলো।

চেহেরার মধ্যে কি যেনো একটা রয়েছে তবে সে যে কোন প্রকার দুঃখ বা কষ্টে নেই তা বেশ বুঝতে পারলো।

সৌধ আর রুশার একটা পিক ওঠিয়ে মেসেন্জারে সেন্ট করে দিলো তুষার,
সৌধ আর রুশা কে একসাথে দেখে বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হলো পিংকির।

পরোক্ষনেই ভাবলো আমি কেনো কষ্ট পাচ্ছি এ আর নতুন কি, সকালে হয়তো ভুলবশত আমাকে নিজের বউ বলে দাবি করে ফেলেছে, মন থেকে বললে হয়তো এখন এটা দেখতে হতো না আমার। আমি মিছেমিছি একটা আশার আলো খুঁজছিলাম।

সত্যি আবেগটা আজো চাপা দিতে শিখলাম না, বড্ড বোকা আমি।
চোখের কোনে পানি এসে ভড় করলো।

চোখ বুঝতেই দুফোটা পানি গাল বেয়ে পড়লো।
এভাবে আর থাকা যায় না, আমাকে এবার কিছু একটা করতেই হবে আমার এখানে দম বন্ধ লাগছে আর পারছিনা আমি, পারছিনা।

মহান আল্লাহ তায়ালা নারী পুরুষদের মধ্যে সুন্দর ও পুতঃপবিত্র জীবন-যাপনের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। বল্গাহীন, স্বেচ্ছাচারী জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা ও নোংরামির অভিশাপ থেকে সুরক্ষা করতেই ইসলাম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জোর তাগিদ প্রদান করেছে। কেননা নারী পুরুষের পবিত্রতা ও সতিত্ব রক্ষার মোক্ষম ও বাস্তব সম্মত হাতিয়ার হল এ বিবাহ ব্যবস্থা।

বিয়ে হল পুরুষ ও নারীর মাঝে সামাজিক পরিবেশে এবং ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক অনুষ্ঠিত এমন এক সর্ম্পক স্থাপন যার ফলে নারী-পুরুষ দু’জনে একত্রে বসবাস এবং পরস্পরের মধ্যে যাবতীয় সব ধরনের সর্ম্পক স্থাপন সম্পূর্ণ বৈধ হয়ে যায়। বিবাহ একটি শুভ ও ধমীয় অনুষ্ঠান যা পালনের মধ্য দিয়ে নারী পুরুষের ভবিষ্যৎ জীবনের সূচনা হয়।


পর্ব ৯ (Romantic Love story BD)

রুশার মুখে বিয়ের কথা, সেই সাথে বিয়ের এতো নিখুঁত গুরুত্ব শুনে বেশ অবাক হলো সৌধ।
সৌধ এক ঢোক গিলে রুশার দিকে অবাক চোখে চেয়ে বললো কবে এসব হলো, একটা বার জানাতে পারতে আমায়,
রুশা বাঁকা হাসলো তোমাকে জানালে তুমি কি করতে সৌধ,

সৌধ লজ্জায় পড়ে গেলো খুব সত্যি কি সে কিছু করতে পারতো, আর না কিছু করতে চাইতো।
তার মন যে বাঁধা পড়ে গেছে গভীরভাবে,

সৌধ লজ্জিত মুখে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রুশা বললো কোন কথা নয় সৌধ, তুমি হয়তো জানোনা প্রত্যেকটা মেয়ের মাঝেই অলৌকিক কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তাঁরা ঠিক পুরুষের চোখের ভাষা বুঝতে পারে।

“একটা ছেলে একটা মেয়েকে কতোটা ভালোবাসে কতোটা চায় একটা মেয়ে ঠিক মন থেকে সেটা উপলব্ধি করতে পারে,
আমিও পেরেছি তোমার চোখের ভাষা পড়তে পেরেছি, তোমার মনের গহীনের অনুভূতি পড়তে পেরেছি যা আমি দুবছরে পারিনি তা আমি গত কয়েকসপ্তাহে পেরেছি।

তোমার সেই চোখের ভাষা আমি পড়তে পেরেছি সৌধ, যা আমি খুঁজতাম তা আমি খুঁজে পেয়েছি।
কিন্তু সেটা আমার জন্য নয় অন্যকারো জন্য,
সৌধ যা আমি বুঝতে পেরেছি তা কি সে বুঝেছে,
জিগ্যাসু দৃষ্টিতে তাকালো রুশা,

সৌধ লজ্জায় আমতা আমতা করতে লাগলো।
রুশা সৌধর হাতের ওপর হাত রেখে বললো দুবছরে তোমার ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠতে না পারলেও বন্ধু অবশ্যই হয়ে ওঠেছি?
সৌধর ঘাবরানো মুখটা মূহুর্তে হাস্যজ্জ্বল মুখে পরিনত হলো। ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে মাথা ঝাকালো।
সৌধ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে রুশা কে বললো নাহ সে বুঝতে পারেনি,

রুশা বললো নো প্রবলেম না বুঝাটাই স্বাভাবিক। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যাতে খুব তারাতারি বুঝে যায় সেই ব্যবস্থা করো, ও খুব ভালো মেয়ে।
সৌধ রুশার দিকে রহস্যময় চোখে তাকালো।

রুশা খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেলো। এতোদিন যেই মেয়েকে সহ্যই করতে পারেনি আজ তার প্রশংসা করছে,
হ্যাঁ রুশা পালটে গেছে গতো কয়েকদিনেই যেনো তার জীবনটা একদম বদলে গেছে। যে জীবন খুব কম সময়েই তাকে স্বর্গীয় সুখ এনে দিয়েছে।
সৌধ হালকা কেশে বললো তো সে কে, যার জন্য আপনার এতো পরিবর্তন?

রুশা হালকা হেসে বললো আরাফ শেখ,
দেখতে আসতেই ওর আমাকে পছন্দ হয়ে যায়, আমারো বেশ ভালো লাগে আর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই বিয়েটা করে ফেলার। আর ও আমাকে একটা বিয়ের গুরুত্ব, বোঝায়। তখন আমি ফিল করি আমি জেনে হোক না জেনে হোক অন্যায় করেছি। তুমিও এর বাইরে নও অন্যায় টা আমরা দুজনেই করেছি পিংকির সাথে।

আর ভালোবাসা কখনো অন্যায় শেখায় না। ভালোবাসা শেখায় সেক্রিফাইস। প্রিয়জনকে সুখি হতে দেওয়ার জন্য ত্যাগ করতে শেখায়। কিন্তু আমি সেটা করিনি আমি নিজের স্বার্থ বজায় রেখেছি।
সৌধ রুশার দিকে অবাক হয়ে তাকালো।

রুশা বললো হ্যাঁ সৌধ, তুমি আমার বয়ফ্রেন্ড হওয়াতে যতোটা সুবিধা নিয়ে আমি ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছি, রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেরিয়েছি তার এক কানাকড়িও পিংকি পায় নি। অথচ এর থেকেও বেশী কিছু পাওয়ার যোগ্যতা বা অধিকার দুটোই ওর রয়েছে। আরাফ হঠাৎ করেই আমার জীবনে চলে আসাতে আমি আমার জীবনের ভুল গুলো নিখুঁত ভাবে খুজে বের করতে সক্ষম হয়েছি।

সত্যি বলতে অনেক ভাগ্য করে ওর মতো স্বামী পাওয়া যায়। আমার পরিবারের অবস্থা ভালো নয় সে নিয়ে ওর কোন মাথা ব্যাথা নেই ওর শুধু একজন অর্ধাঙ্গিনীর প্রয়োজন। যে সুখে দুঃখে ওর পাশে থাকবে যার সুখে দুঃখে ও পাশে থাকবে।

সত্যি বলতে আমি সেদিন ফিল করেছিলাম সৌধ,
“কারো জন্য কান্নাকাটি করলেই কাউকে পাওয়ার জন্য দিনরাত চোখের জল ফেললেই সেটা ভালোবাসা হয়ে যায় না। কিছু কান্না শুধুই আবেগের বসে চলে আসে।

লাভ আর এট্রাকশন দুটোই মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু বুঝতে হবে কোনটা মানুষের জীবনে আগে এসেছে লাভ না এট্রাকশন।

আর যদি ভালোবাসা হয় তবে নির্দিধায় আগানো যায়। ভালোবাসা হচ্ছে পবিএ।
কয়েকবছর একটা রিলেশনশীপে থাকলেই সেটা ভালোবাসা হয়ে যায় না। ভালোবাসা কয়েকদিনেও হতে পারে,
কারো সাথে কারো সম্পর্ক মানেই সেখানে ভালোবাসা রয়েছে এটা সম্পূর্ণ ভুল।

“সম্পর্ক অনেক রকম হয়
কিছু সম্পর্ক বন্ধুত্বের,
কিছু সম্পর্ক দায়িত্বের,
আর কিছু সম্পর্ক ভালোবাসার,

আর কিছু সম্পর্ক শুধুই পরিচয়ের,
ঠিক যেমন তোমার আর পিংকির সম্পর্কটা শুধুই পরিচয়ের জন্য তৈরী হয়েছিলো।
কিন্তু আমার ধীর বিশ্বাস এবার তোমাদের সম্পর্কটা পূর্ণতা পাবে খুব শিঘ্রই।

আর তোমার আমার সম্পর্ক ভালোবাসার গড়ে তুলতে চাইলেও আমরা কেউ পারিনি। তবে যেটা গড়েছি সেটা হলো বন্ধুত্ব।
রাত ১১ঃ৫৫ বাজে রজত অধীর আগ্রহে বসে আছে।

রজতের ছোট ভাই রাজন এসে বললো ভাইয়া আর পাঁচমিনিট ভাবী কি জেগে আছে না ঘুমিয়ে পড়েছে।
রজত বললো তা তো জানিনা বেশকিছুক্ষন আগে অনলাইনে দেখেছিলাম।

রাজন বললো ধূর তুমি যে কিনা ভাইয়া,
কই ভাবীর সাথে চুটিয়ে প্রেম করবা দুজন দুজনকে চিনবে, জানবে একসাথে ঘুরতে যাবে। তোমাদের ক্যামিস্ট্রি কতোটা রোমায়েন্টিক বলোতো, বেষ্ট ফ্রেন্ডের ছোট বোন তোমার ভালোবাসার মানুষ। শুধু ভালোবাসা না হবু বউ।

রজত, রাজন কে থামিয়ে দিয়ে বললো ব্যাস ব্যাস তোর থেকে আমার কোন টিপস নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পড় নয়তো গার্লফ্রেন্ডদের পাহারা দে যা।

রাজন গোল গোল চোখ করে তাকালো।

রজত বাঁকা হেসে বললো রাত দুটো, তিনটে অবদি ভিডিও কল করে তো গার্লফ্রেন্ডদেরই পাহাড়া দিস।
রজত ব্যালকুনিতে গিয়ে রেলিংএ কনুই ভড় করে আকাশের দিকে তাকালো।

রাজন পিছন পিছন এসে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে বললো এসব কি বলছো ভাই গার্লফ্রেন্ডদের মানে,
এইভাবে আমার চরিএে দাগ লাগাচ্ছো কেনো।

আমার তো একটাই গার্লফ্রেন্ড।
আমার মতো নিষ্পাপ শিশুকে এইভাবে বলতে পারলা তুমি,
রজত বললো বাহ আমার ভাই তো বেশ এগিয়ে গেছে। আন্দাজে ঢিল ছুড়লাম আর মিলে গেলো।
তার মানে গতো দেরবছর যাবৎ সারারাত রুমে লাইট অন করে রাখার রহস্য এটাই।

তাই তো বলি ফোনের আলোতে যে ছেলের ঘুমে ডিস্টার্ব হতো হঠাৎ করে সেই ছেলে পুরো রুমে লাইট অন করে ঘুমায় কেনো।
রজত আকাশ পানে চেয়েই কথাগুলো বললো।
রাজন হা করে ভাইয়ের দিকে চাইলো।

এসেছিলো তাকে ক্ষেপাতে আর সে কিনা তার ই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলো।
রজত বললো এবার যা ভাই আর একমিনিট আছে।

রাজন অবাক চোখে ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে এক ঢোক গিললো। রজত বাঁকা হেসে রুমে গিয়ে ফোনটা হাতে নিলো।
রাজন হা হয়েই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

রজতের সব আশাই নিরাশাতে পরিনত হলো।
গতো সাতবছর যাবৎ সূচি কে ঠিক সময় উইশ করতে পারলেও এবার পারলো না। তিনবছর যাবৎ সূচি দূরে থাকলেও ঠিক রাত বারোটায় ফোনে উইশ করে রজত। কিন্তু এবার এমন টা কেনো হলো সূচির ফোন তো এতোক্ষন যাবৎ ওয়েটিং থাকার কথা নয়।

পুরো বিশ মিনিট কেটে গেছে রজতের পুরো শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে দম বন্ধ লাগছে তার।
এমনটা কেনো লাগছে আমার, রজত আবারো ট্রাই করলো ওয়েটিং রাগে ফোন ছুঁড়ে বিছানায় ফেলে দিলো রজত৷ পরোক্ষনেই মনে পড়লো সৌধ কে ফোন করি।

সৌধ কে ফোন করতেই রিসিভ করলো সৌধ।
ঘুমের রেশ কাটেনি সবে মাএ ঘুমিয়েছে সৌধ।

চোখ বুজেই বললো হ্যালো,
রজত বললো সৌধ সূচিকে আমি সেই কখন থেকে ট্রাই করে যাচ্ছি কিন্তু ওর ফোন ওয়েটিং।
সৌধ বললো তো কি হয়েছে সকালে উইশ করিস।

হয়তো কারো সাথে কথা বলছে।
রজত কঠোর গলায় বললো সৌধধ,

সৌধ ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসলো। এ ভাই রেগে যাস না।
আসলেই ওয়েটিং,
রজত শান্ত স্বরে বললো তো কি আমি তোর সাথে ফান করছি,

সৌধ বললো আচ্ছা আমি দেখছি।

সৌধ বেশ অনেকক্ষন ট্রাই করলো ফোন ওয়েটিং।

হতাশ হয়ে রজতকে ফোন করলো কি বলবে বুঝে ওঠতে পারছেনা।

তুই এক কাজ কর ওকে মেসেজ করে উইশ কর।
তোর কি মনে হয় সেটা আমি করিনি। এই একটা দিন আমি ওকে ফোন করি ওর ভয়েস টা শুনি।
ব্যাস এতটুকুই এর বেশি কিছু না।

সৌধ রজতের মনের অবস্থা বুঝতে পারলো।
কিন্তু কি বলবে ঠিক বুঝে ওঠতে পারলো না।

রজত কিছু না বলেই ফোন কেটে দিলো।
সৌধ বার বার সূচিকে ট্রাই করতে লাগলো।

একসময় ফোন যেতেই সূচি রিসিভ করলো।
সৌধ বললো হ্যাপি বার্থডে সূচি,

থ্যাংকিউ সো মাচ ব্রো, কেমন আছিস।
সৌধ গম্ভীর গলায় বললো কার সাথে ফোনে কথা বলছিলি সূচি হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করতে করতে বললো ঐ এক ফ্রেন্ড,
সৌধ বললো ফ্রেন্ড,

সূচি লজ্জা পেয়ে বললো ব্রো তোকে সব বলবো আমি নেক্সট উইক আসছি।
আচ্ছা খুব ঘুম পেয়েছে এখন রাখছি বলেই কেটে দিলো সূচি।

সৌধ অবাক সেই সাথে রেগেও গেলো।
বেশ চিন্তায় ও পড়ে গেলো, রজত আর ওর বিয়ের ব্যাপারে ওকে না জানিয়ে কি কোন ভুল করে ফেললাম আমরা, সূচি কি রিলেশনশিপে গেছে।
ওহ মাই গড, রজত যদি বুঝতে পারে কি হবে। ছেলেটা পাগলের মতো ভালোবাসে আমার বোনটাকে।

বোনের চিন্তা করতে করতে চোখ লেগে এলো সৌধর। ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো সে।

“গভীর রাতে ধীর পায়ে তুষার পিংকির হাত ধরে ছাদের সিঁড়ি তে ওঠছে। ছাদের এক কিনারে গিয়ে দঁড়ি বেয়ে প্রথমে তুষার নামলো তারপর পিংকি নেমে তুষারের হাত চেপে ধরে দিলো এক দৌড়,
সৌধ আবারো ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসলো।

শরীর ঘেমে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কপাল ঘেমে গাল বেয়ে পানি পড়ছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক ঢোক গিয়ে শুকনো গলাটা খানিকটা ভিজিয়ে নিলো বিছানা ছেড়ে দৌঁড়ে দরজা খুলে ছাদে চলে গেলো।

পুরো ছাদে চোখ বুলালো জোৎস্নার আলোতে সব স্পষ্ট দেখতে পারছে। কোথাও কোন দঁড়ি ঝুলানো নেই। পরোক্ষনেই থমকে দাঁড়ালো সৌধ। চোখ দুটো ডলে নিয়ে এক লম্বা শ্বাস নিলো।

আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম, পরোক্ষনেই আবার ছুটে গেলো সূচির রুমের দিকে।

সেদিন পিংকি তার সাথে খারাপ আচরন করার পর থেকে পিংকি সৌধর সাথে কথা বলেনি, সৌধও বলতে চেয়েও বলতে পারেনি। দুজনই খুব কম দুজনের মুখোমুখি হয়েছে।

পিংকির রুমের সামনে যেতেই দেখলো দরজা হালকা খোলা, সৌধর বুকটা ধক করে ওঠলো।

তারমানে সব সত্যি,
ছুটে রুমের ভিতর ঢুকলো বিছানায় তাকাতেই তার আত্মা টা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
পিংকি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে,

সৌধ নিজের অজান্তেই ছুটে বিছানায় বসে পিংকি কে দুহাতে জাগিয়ে তুলে বুকে আঁকড়ে ধরলো।
বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে মাথায় কিস করলো।

পিংকি হালকা নড়তেই সৌধ পিংকির দুগালে ধরে পাগলের মতো কিস করতে লাগলো।

ঠোঁটের শীতল স্পর্শ গাল, কপাল জুরে মাখামাখি হতে হতেই পিংকির ঘুম ভেঙে গেলো।

ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো তাঁর এতো রাতে কে।

ভালোভাবে চোখ খুলতেই ভয়ার্ত মুখে বলে ওঠলো সৌধ,
সৌধ হুঁশে ফিরে চট করে পিংকি কে ছেড়ে দিলো।

সরি সরি বলেই দাঁড়িয়ে পড়লো।
পিংকি রেগে গিয়ে বিছানা ছেড়ে লাইট অন করে সৌধর মুখোমুখি দাড়ালো।

এবার স্পষ্ট সৌধ কে দেখতে পেলো খালি গায়ে শর্ট প্যান্ট পড়া রয়েছে। মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে ঘুম থেকে ওঠেই তার রুমে এসেছে। পিংকি কঠোর দৃষ্টিতে সৌধ কে আগা থেকে গোড়া অবদি চেয়ে দেখলো।

সৌধ বেশ ঘাবড়ে গেলো তার শ্বাস প্রচন্ড গতিতে ছুটছে। গোলাপি রাঙা ঠোঁট জোরা জিহ্বা দিয়ে খানিকটা ভিজিয়ে ভয়ার্ত চোখে পিংকির দিকে তাকালো।
পিংকির রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো এক হাত তুলে যেই গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসাতে যাবে অমনি খপ করে হাত ধরে ফেললো সৌধ।
পেছন ঘুরিয়ে কানের কাছে মুখ ঠেকালো।

পিংকি হাত ছাড়াতে ছুটাছুটি করতে লাগলো।

তোমার সাহস কি করে হয় মাঝরাতে রুমে এসে লুচ্চামি করার। সৌধর চোখ কপালে ওঠে গেলো।
এক ধমক দিয়ে বললো চুপ এসব কি কথা। শোনো ব্যাপার টা মোটেও সেরকম কিছুনা আসলে হয়েছে কি।

সৌধর কথা কেটে পিংকি কনুই দিয়ে বুকে ধাক্কা দিতে দিতে বললো আসলে হয়েছে কি মাঝরাতে তোমার মেয়ের নেশা পেয়েছে, লুইচ্চা কোথাকার।
সৌধর মেজাজ গরম হয়ে গেলো।

পিংকিকে ঘুরিয়ে কোমড়ে এক হাত চেপে আরেক হাতে কানের পিছের চুলগুলো চেপে পিংকির চোখে চোখ রেখে বললো, মেয়ে নেশা নয় বউ নেশা পেয়েছে। নিজের বউয়ের নেশা ধরে গেলে যদি আমি লুইচ্চা হয়ে যাই তো আমার কোন আপত্তি নেই বলেই বাঁকা হাসলো।
পিংকি আঙুল ওঠিয়ে বললো তোমার এই রূপ কি তোমার রুশা জানে মি.সৌধ চৌধুরী,

সৌধ এক রহস্যময়ী হাসি দিয়ে পিংকির কপালে কপাল ঠেকিয়ে ঘোর লাগা গলায় বলে ওঠলো অবশ্যই,
সৌধর গরম শ্বাস পিংকির মুখে পড়তেই পিংকি দূর্বল হয়ে পড়লো। হৃদয়ে গভীর কম্পন শুরু হয়ে গেলো তাঁর।
ধীর গলায় বললো সৌধ ছাড়ো,

সৌধ নেশা ভরা গলায় বলে ওঠলো ছাড়ার জন্যতো ধরিনি।
পিংকি চমকে ওঠলো সৌধর দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো সৌধ নিজের মধ্যে নেই একটা ঘোরে আছে।
কিন্তু কেনো, কেনো সৌধ এমন করছে।

সৌধ ধীরে ধীরে মুখ এগিয়ে নিতেই পিংকি সৌধর ঠোঁট জোরা এক হাতে চেপে ধরলো।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বললো তুমি যদি এখুনি এই রুম ছেড়ে বেরিয়ে না যাও তো তোমার এই রূপ তোমার গার্লফ্রেন্ড এর সামনে তুলে ধরতে আমার জাষ্ট দুমিনিট ও লাগবে না।

পর্ব ১০

সৌধ পিংকির হাতে শব্দ করে কিস করতেই পিংকি চমকে গিয়ে হাত সরিয়ে ফেললো। সৌধ পিংকি কে ছেড়ে দিয়ে বললো ওয়েট ওয়েট আমি আমার ফোন নিয়ে আসছি রুশার নাম্বারটা নিয়ে ওকে ফোন করে সব জানিয়ে দাও।

পিংকি অবাক হলো সৌধর কথা শুনে বেশ খটকাও লাগলো। বিরবির করে বললো অসভ্য,
সৌধ বাঁকা হেসে যেতে যেতে বললো অসভ্যতামির দেখেছো কি কেবল তো শুরু।

পিংকি চোখ বড় বড় করে বললো কিহ,
চট করে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে সেখানেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
অজান্তেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠলো বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগলো।

পিংকি বুকের বা পাশে হাতটা চেপে ধরে বললো একদম না, কাল সকালেই সব আবার বিপরীত হয়ে যাবে, তাই এতো খুশি হওয়ার কোন মানে হয় না।

ভার্সিটির সামনে রজত আর সৌধ দাঁড়িয়ে আছে। রজতের চোখ মুখ স্বাভাবিক লাগছে না।

সৌধ বললো চিন্তা করিস না সামনে সপ্তাহে সূচি আসবে। মা, বাবারও আসার কথা তারপর তোদের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবো।

রজত বললো ব্যাপারটা কি আদেও আমাদের না শুধুই আমার। সূচিকে কাল উইশ করার পর একটা থ্যাংকস বলেই কেটে দিয়েছে, আর কিছু বলার সুযোগ দেয়নি। বিষয়টা হালকা ভাবে তুই নিলেও আমি নিতে পারছিনা। নিশ্চয়ই সূচি কোন রিলেশনশিপে জরিয়ে গেছে,

সৌধ ধমকে বললো আরে শালা এতো টেনশন করছিস কেনো, অন্য রিলেশনশিপে গেলেই কি সূচি অন্যকারো হয়ে গেলো নাকি। বোন আমার আমি যেটা ভালো মনে করবো সেটাই হবে। আমার বোন কার হাতে পড়লে নিরাপদ থাকবে, সুখে থাকবে সেটা আমি আর মা বাবাই ভালো বুঝবেন।
রজত বাঁকা হেসে বললো সূচি যদি না চায় তো ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছু করতে পারবো না।

আমি ওকে ভালোবাসি আর আমি চাই ও সব সময় সুখে থাকুক তার জন্য যদি আমার ভালোবাসা মাটি চাপা দিতে হয় তাতেও আমি রাজি।
সৌধ রজতের পিঠে এক চাপড় দিয়ে বললো বাহবা জটিল প্রেমিক। এতো প্রেম কই থাকে ভাই,
রজত হালকা হাসলো।

সৌধ বললো দেখ ভাই নিজের জিনিস কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না। যা তোর তা তোর ই যা আমার তা আমারই।
তুই ওকে খুব ভালোবাসিস, তুই ওকে সুখে রাখবি। তুই খুব ভালো ছেলে আমি একটা ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের মনের খবড় অবশ্যই জানবো। আর সে যদি হয় আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড তাহলে তো কথাই নেই। সেই কতোগুলো বছর ধরে তুই ওকে ভালোবাসিস বলতো মুখ ফুটে না ওকে আর না আমাকে বলেছিস। সবটা তো আমিই বুঝেছি।

ফাইনাল এক্সামটা দিয়ে একটা জব নিয়ে নে তারপর সূচিকে তোর হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব টা আমার।
রজত মৃদু হেসে বললো তোর কি খবড়,

সৌধ বললো আমার আর কি খবড় থাকবে ম্যাডাম তো রুশাকে নিয়েই পড়ে আছে।
রজত বললো সেটাই তো স্বাভাবিক।

সৌধ বললো হ্যাঁ এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা মনের কথাটা জানাতেই হবে। কিন্তু সামনে গেলেই সাপের মতো ফুসফুস করতে থাকে ভাই। চোখ মুখে রাগের ঝলকানি। এমন এমন কথা বলে যে মাথা অটোমেটিক গরম হয়ে যায়।

রজত বললো পিংকির কোন দোষ নেই ওর জায়গায় অন্যকেউ থাকলে এর থেকে বেশী কিছু হতে পারতো।
যতো তারাতাড়ি সম্ভব তোদের সম্পর্ক টা স্বাভাবিক করে নে। এতেই মঙ্গল।

কয়েকদিন যাবৎ পিংকির শরীর টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। মা কে খুব মনে পড়ছে,
লন্ডন চলে যাওয়ার পর মায়ের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। বেশ কয়েকবার ফোন করেছে কিন্তু অভিমানে মায়ের সাথে কথা বলেনি। আজ বড্ড মনে পড়ছে তাঁর মা কে।

সৌধ বাড়ি ফেরে সন্ধ্যার দিকে সৌধ ফেরার পর জবা চলে যায়। সৌধ বাড়ি এসে বেশ উশখুশ করতে লাগলো পিংকি কে দেখার জন্য।
মেয়েটা বের হচ্ছে না কেনো রুম থেকে কি এমন করছে।

সৌধ আর চুপচাপ বসে থাকতে পারলো না।

মনের সাথে যুদ্ধ করেই পিংকিকে দেখার জন্য চলে গেলো। দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো।

পুরো রুম অন্ধকার। সৌধর বেশ খটকা লাগলো পিংকি তো অন্ধকারে ভয় পায় তাহলে আজ রুম অন্ধকার কেনো। ও কি বাড়ি নেই চট করে গিয়ে লাইট অন করলো সৌধ। বিছানায় তাকাতেই দেখতে পেলো পিংকি শুয়ে আছে কাঁথামুড়ি দিয়ে।

ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে কয়েকবার ডাকলো কিন্তু কোন রিসপন্স পেলো না।
কাধে হাত রাখতেই চমকে গেলো বেশ গরম,

পিংকি, জ্বর হয়েছে তোমার কখন থেকে?
জ্বরের ঘোরে পিংকি কি যেনো সব বিরবির করতে লাগলো। সৌধ পিংকির গালে এক হাত রেখে ডাকলো পিংকি, অতিরিক্ত জ্বরের কারনে পিংকি নিজের হুঁশে নেই৷ সৌধ আর দেরী না করে সামিয়া চৌধুরী কে ফোন করে সব জানালো।

সামিয়া চৌধুরী বললেন খাবাড় খাওয়িয়ে জ্বরের ওষুধ খাওয়াতে। জলপট্টি দিতে। সকালের মধ্যে না কমলে ডক্টর দেখাতে।
সৌধ মায়ের কথা অনুযায়ী পিংকির গালে আলতো করো হাত রেখে ডাকতে লাগলো।

পিংকি চোখ টেনে হালকা তাকাতেই সৌধ বললো কখন থেকে এমন জ্বর, তারাতারি খাবাড় খেয়ে ওষুধ খেতে হবে। কষ্ট করে নিচে যেতে পারবে?
পিংকি চোখ বন্ধ করে কি যেনো সব বিরবির করতে লাগলো। সৌধ বুঝতে পারলো জ্বরের ঘোরে এমন করছে। কিন্তু এখন একে কি করে খাওয়াবো,
বাধ্য হয়ে নিচে চলে গেলো কিছু খাবাড় নিয়ে উপরে এলো। মনে মনে ভাবলো কখনো কাউকে খাওয়াইনি আজ কি ওকে খাওয়িয়ে দিতে হবে, এসব ব্যাপারে আমি একদমই কাঁচা হায় আল্লাহ রক্ষা করো।

ওকে যেনো খাওয়িয়ে ওষুধ টা খাওয়াতে পারি।

সৌধ রুমে এসে পিংকি কে ওঠিয়ে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসিয়ে দিলো। পিংকি মাথা সোজা করে রাখতে পারছেনা, ঘাড় কাত করতেই সৌধ নিজের কাঁধে মাথাটা নিয়ে নিলো।

পিংকির শরীরের উষ্ণতা সৌধর কাধে বেশ কড়া ভাবেই অনুভূত হলো। মনের ভিতর কেমন আলাদা ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়লো সৌধর।
একহাতে পিংকিকে জরিয়ে আরেক হাতে খাবার মাখিয়ে মুখের সামনে ধরলো। পিংকি চোখ বুজেই রয়েছে। সৌধ শান্ত গলায় আদর মেখে বললো পিংকি হা করো অল্প একটু খেয়ে নাও ওষুধ খেতে হবে।

পিংকির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে সৌধর বুকে গিয়ে ঠেকলো। শীতলতা অনুভব হতেই বুঝতে পারলো পিংকির চোখের পানি,
সৌধ বললো পিংকি কষ্ট হচ্ছে, একটু খেয়ে ওষুধ টা খেয়ে নাও সব ঠিক হয়ে যাবে।

পিংকি জ্বরের ঘোরে সব বুঝতে পারলেও কিছু বলতে পারছেনা শুধু অনুভব করতে পারছে।
সৌধ খাবাড় মুখের কাছে নিতেই পিংকি হা করলো সৌধর মুখে হাসি ফুটে ওঠলো।

পিংকি খাবাড়টা মুখে নিয়ে চুপ করে রইলো।
সৌধ ডান হাতের পিঠ দিয়ে গালে হালকা ধাক্কা দিলো,

পিংকি খুব কষ্টে খাবাড়টা খেলো। এভাবে কয়েক লোকমা দেওয়ার পর বমি বমি ভাব হতেই সৌধ পানি খাওয়িয়ে ওষুধটা খাওয়িয়ে শুইয়িয়ে দিলো।
নিচে গিয়ে পিংকির খাবাড় যে টুকু বেশী হয়েছে সেটুকু নিজে খেয়ে নিলো।

তৃপ্তি তে বুকটা তার ভড়ে ওঠলো। মুচকি হেসে আবার উপরে চলে গেলো। নিজের রুমে গিয়ে শার্ট চেন্জ করে টিশার্ট, সাথে শর্ট প্যান্ট পড়ে চলে গেলো পিংকির কাছে।

পিংকির পাশে বসে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো এখন কেমন লাগছে,
পিংকি একটু নড়ে আবার গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলো। সৌধ কপাল চেক করতে বুজতে পারলো তাপমাএা আগের থেকে কিছু টা কম।
সৌধ ওভাবেই বিছানায় হেলান দিয়ে বসেই ঘুমিয়ে গেলো। শেষরাতের দিকে পিংকির জ্বর ছেড়ে শরীর ঘেমে ওঠে ঘুমটাও ছেড়ে যায়।

ঘুম ভাঙতেই পাশে তাকিয়ে চমকে যায় সৌধ কে দেখে। পরোক্ষনেই মনে পড়ে যায় সবটা ভ্রু কুঁচকে ওঠে বসে ওড়নাটা গায়ে জরিয়ে সৌধর মুখের দিকে চেয়ে ভাবে সৌধ কি চাইছে, হঠাৎ করে কেনো আমার এতো খেয়াল এতো যত্ন করছে, কি চলছে সৌধর মনে?

পিংকি সৌধর গায়ে কাঁথা টেনে দিয়ে নিজে বাথরুম চলে গেলো।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে তয়ালে দিয়ে মুখ মুছে চুলটা বেঁধে নিলো। শরীরটা বেশ দূর্বল লাগছে তাঁর।

মনটাও ভালো নেই ভাবলো মা টু কে ফোন করি আজ। অনেকদিন হলো কথা হয় না, ফোন টা কোথায়, বিছানায় গিয়ে খুঁজতে লাগলো।
সৌধ যে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে আছে তার নিচে ফোনের একটু কোনা বেরিয়ে আছে। পিংকি ফোন বের করতে নিতেই সৌধর ঘুম ভেঙে গেলো।
চোখ খুলেই পিংকি কে দেখে বললো একি তুমি ওঠে পড়েছো, জ্বর কমেছে, কেমন লাগছে এখন বলেই কপালে হাত রাখলো। পিংকি সরতেই সৌধ বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়ালো।

ইয়ে মানে আসলো তোমার খুব জ্বর ছিলো কাল,
তাই আর কি এসেছিলাম, চোখটা লেগে গেছিলো এই আর কি।

পিংকি সৌধর মুখের অবস্থা দেখে মুখ চিপে হেসে ফেললো। সৌধ ভ্রু কুঁচকে বললো হাসছো কেনো?
একদম মিথ্যা বলছি না সত্যি জ্বর ছিলো, এই যে এখন ঠিক ভাবে দাঁড়িয়ে আছো সেটা আমার জন্যই।
পিংকি চোখ ছোট করে তাকিয়ে বললো সেবা করে খোঁটা দিচ্ছো,

সৌধ বললো হ্যাঁ দিচ্ছি আমি কখনো কারো সেবা করিনি, নিজের খাবারটাই নিজে বেড়ে খাইনা সেখানে তোমার জন্য কাল কতোটা খাটতে হলো।
পিংকি সৌধর একদম সামনে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে বললো কেনো করছো এসব, কে হই আমি তোমার?

সৌধ চুপ হয়ে গেলো। মলিন চোখে তাকালো পিংকির দিকে, পিংকির চোখের মায়ায় ডুবে গিয়ে এক ধ্যানে চেয়ে রইলো।
পিংকি বললো কোনো এসব করছো, হঠাৎ করে কেনো এই পরিবর্তন।

সৌধ ঘোর লাগা গলায় বললো যদি বলি যা করছি আমার নিজের জন্যই করছি।
পিংকি বললো নিজের জন্য?
সৌধ বললো হ্যাঁ নিজের ভালোবাসার জন্য।

বলেই সৌধ পিছন ঘুরে রুম ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ালো।
পিংকি দ্রুত সামনে গিয়ে দুহাতে কলার টেনে ধরে বললো অভিনয় করো, হিরো সাজছো।
একটায় মন ভরে না দশটা লাগে,

এই যদি আমি তোর ভালোবাসা হই তাহলে রুশা কে।
সৌধ পিংকির হাতে ধরে হাত ছাড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কঠোর গলায় বললো রুশা আরাফের স্ত্রী।
মানে,

ইয়েস।

ওওও তার মানে রুশা ছ্যাঁকা দিয়েছে বলেই আমার সাথে এতো ভনিতা। হাহাহাহা তুমি কি ভেবেছো মি.সৌধ চৌধুরী তোমার মতলব আমি বুঝিনা।
রুশা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে আর সেই কষ্ট ভুলতে তুমি আমার কাছে এসেছো।

তোমার মতো এতো বাজে ক্যারেক্টার আমি আর দুটো দেখিনি।

সৌধর মাথা গরম হয়ে গেলো। সবটা না জেনে না শুনে যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে। পিংকির কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরে বললো বেশী বলে ফেলেছো তুমি।
আর একটা কথা মনে রেখো সৌধ চৌধুরীর কষ্ট ভুলার জন্য তোমার কাছে আসতে হবে না।

আমি যদি একবার ইশারা করি অহরহ মেয়ে আমার নাগালে চলে আসবে। বলেই পিংকি কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বেরিয়ে গেলো সৌধ।
পিংকির চোখ বেয়ে অঝড়ে পানি ঝড়তে লাগলো।

সূচি বাড়ি ফিরে পিংকির সাথে দেখা করে দুপুরের খাবাড় না খেয়েই আবার বেরিয়ে গেলো।
বিকালের দিকে সৌধ আসতেই জবা বললো সূচি এসেছে। সৌধ সূচির রুমে গিয়ে পিংকিকে দেখতে পেলো। জিগ্যাস করলো সূচি কোথায়?
পিংকি সৌধর দিকে না চেয়েই বললো বেরিয়েছে। সৌধ পিংকির দিকে চেয়ে রাগে গটগট করতে করতে বেরিয়ে গেলো।
তুষারের হাতে হাত রেখে সূচি বললো চিন্তা করোনা।

ভাইয়া আমাকে খুব খুব ভালোবাসে, ভাইয়া কোন প্রবলেম করবে না তুমি মিথ্যা ভয় পাচ্ছো।
সেদিন পিংকি তোমার বাসায় গিয়েছিলো আর ও নেশা করেছিলো তাই ভাইয়া ভুল বুজেছে। আর সেই ভুলটা আমি ভাঙিয়ে দিবো নো প্রবলেম।
তুষার বললো আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা। সৌধ যদি কোন প্রকার বাঁধা দেয় তো আমি তোমাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবো। তুমি যাবেতো আমার সাথে,
তুষারের দিকে অপলকভাবে চেয়ে রইলো সূচি।

চোখে তার পানি এসে গেছে।
এতোটা ভালোবাসো আমায়,
তুষার বললো সেটা জানিনা আমি শুধু জানি তোমাকে আমার চাই। তোমাকে আমার বউ করে ঘরে তুলতে চাই।
সূচি লজ্জা পেয়ে গেলো। সব হবে শুধু তুমি আমার পাশে থেকো।

সূচি বাড়ি ফিরতেই সৌধ কড়া গলায় বললো কি ব্যাপার কোথায় ছিলি তুই। বাড়ি এসেই বাইরে চলে গেছিস, সূচি কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৌধর ফোনে সামিয়া চৌধুরীর ফোন এলো।

সৌধ রিসিভ করতেই সামিয়া চৌধুরী বেশ কিছু কথা বলে কেটে দিলেন।

সূচিকে আর কিছু বললো না সৌধ বরং বললেন কাল রেডি থাকিস, পিংকিকেও রেডি থাকতে বলিস। আমরা এক জায়গায় যাচ্ছি।
সূচি ভ্রু কুঁচকে বললো কোথায়,

মায়ের বান্ধবীর ছেলের বউভাতের অনুষ্ঠানে। বাবা মা যেতে পারছেনা। তাই দাওয়াত রক্ষা করতে আমাদেরই যেতে হবে।
সূচি ভ্রু নাচিয়ে বললো তো আমি আর তুই যাই পিংকি কেনো?

সৌধ সূচির নাকে দু আঙুলে চেপে বললো ভাই বিবাহিত। এতোদিন যা করেছি করেছি এবার তো বউয়ের দিকে নজর দিতে হবে নাকি।
সৌধ সূচি কে কথাগুলো বলেই চলে গেলো।

সূচি হা করে ভাইয়ের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
মা কে দ্রুত ফোন করে এদিকের সব খবড় জানালো।

সূচি রেডি হয়ে বসে আছে কিন্তু পিংকি জেদ ধরেছে যাবেনা। ওখানে গেলে সৌধর বউ এর পরিচয়েই যেতে হবে নানা রকম অপ্রস্তুত জনক কথাও শুনতে হবে। যা শুনতে পিংকি মোটেই ইচ্ছুক নয় তাই সে সোজা বলেছে যাবেনা। সূচি খুব ভালো করেই জানে তার ভাই যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বউ নিয়ে আজ যাবে তো যাবেই।

সৌধ রেডি হয়ে সূচির রুমে এসে বললো কি ব্যাপার তোরা রেডি হোসনি,
সূচি পিংকি কে ইশারা করতেই সৌধ পিংকির দিকে তাকালো। বাসায় পড়ার ড্রেসেই দেখতে
পেলো। পিংকির মুখ দেখে যা বুঝার বুঝে গেলো।

সূচি কে বললো তুই বাইরে যা। সূচি ভাইয়ের আচরণে অবাকের ওপর অবাক সেই সাথে খুশি হয়ে বেরিয়ে গেলো। পিংকি ওঠে দাঁড়িয়ে সৌধকে বললো দেখো আমি যাবনা। ভালো লাগছেনা এতো মানুষের মাঝে যেতে ইচ্ছে করছে না তোমরা যাও। তোমাদের মায়ের বান্ধবীর ছেলের বিয়ে সো তোমরা যাও।
সৌধ পিংকির দিকে এগিয়ে গিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো জাষ্ট পনের মিনিট টাইম দিচ্ছি তোমায়। এর মধ্যে রেডি হয়ে আসবে নয়তো আমি কি করবো তুমি ভাবতেও পারবে না।

পিংকি রেগে গিয়ে আঙুল তুলে বললো একদম আমার সাথে এভাবে কথা বলবে না। আমি কোন মিথ্যা পরিচয় বহন করে কোথায়ও যেতে চাইনা।
সৌধর রাগ চরম পর্যায়ে চলে গেলো।

পিংকির কাঁধে ধরে ধমকে ওঠলো। পিংকি ভয়ে খানিকটা কেঁপে ওঠলো।
কিসের মিথ্যে, তুমি আমার বউ,

সৌধ চৌধুরীর লিগ্যাল ওয়াইফের পরিচয়ে যাবে তুমি দ্যাটস ইট।
পিংকি সৌধর দিকে অবাক চোখে তাকালো।

সৌধর চোখে মুখে রাগ স্পষ্ট সেই সাথে কতোটা সিরিয়াস হয়ে বলছে বেশ বুঝতে পারলো পিংকি।
জাষ্ট পনেরো মিনিট এর মধ্যে রেডি হবে। বলেই সৌধ বেরিয়ে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেলো পিছন ঘুরে আঙুল তুলে বললো আর হ্যাঁ শাড়ি পড়বে।
সৌধ বেরিয়ে যেতেই পিংকির চোখ বেয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।

কি হচ্ছে এসব কেনো হচ্ছে, সত্যি কি এটা সম্ভব। “যা গড়ে ওঠার আগেই ভেঙে পড়েছে তা কি আবার ও গড়ে তোলা সম্ভব,

বিয়ে বাড়িতে কোনে দেখে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো সৌধ, সূচি, আর পিংকি।
রুশার দিকে চেয়ে আবার সৌধর দিকে তাকালো পিংকি।

সৌধ মুখে এক গাল হাসি ফুটিয়ে বললো আরে রুশা তুমি,

রশাও এগিয়ে এসে বললো সৌধ,
আরাফের মা এসে বললো তোমরা একে অপরকে চেনো?
রুশা বললো হ্যাঁ আম্মু আমরা পরিচিত ফ্রেন্ড সৌধও হাসলো। পিংকি ভ্রু কুঁচকে এদের কথোপকথন শুনতে লাগলো। এহ ন্যাকা, ফ্রেন্ড, যত্তসব মিথ্যাবাদীর দল। বলবো বলবো সত্যিটা হাঁটে হাড়ী ভাঙবো,

আরাফ রুশা কথা বলছে, আরাফের মা পিংকির দিকে চেয়ে বললো সৌধ এটাই তোমার বউ তাইতো, সেই কবে দেখেছিলাম ছবিতে। বাস্তবে আরো অনেক বেশী সুন্দরী বাহ। পিংকি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। সৌধ বাঁকা হাসলো। সূচি বললো আরে আন্টি দেখতে হবে না কার ভাবী,

সবাই যে যার মতো ব্যাস্ত। সূচি সেলফি তুলছে সৌধ আরাফের সাথে আড্ডায় মেতেছে পিংকি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে সৌধকে একবার রুশা আরেকবার পর্যবেক্ষণ করছে। আর ভাবছে এদের দেখে কেউ বলবে এরা একসময় গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড ছিলো।

এক্সের বরের সাথে এতো ভাব জমানো এই প্রথম দেখলাম। আজব পাবলিক সব বলেই ওদিকে ঘুরতেই রুশা কাঁধে হাত রেখে বললো কি ভাবছো,
আমরা সবাই এতো স্বাভাবিক কেনো তাই তো।

স্বাভাবিক আমরা হতাম না যদি আমরা কখনো সত্যিকারের ভালোবাসায় আবদ্ধ হতাম।

পিংকি আর সূচি কে বাসায় পৌঁছে দিয়ে সৌধ বেরিয়ে পড়লো রজতের সাথে দেখা করতে।
অথচ পিংকি অপেক্ষা করছিলো কতক্ষনে বাসায় ফিরে সৌধর সাথে একা কথা বলবে।
মনের ভিতর তার ঝঁড় বয়ে চলেছে, আর এই ঝড় থামানোর জন্য সৌধ কে তার খুব প্রয়োজন।
আরে ভাই আমি বুঝিনা মানুষের সমস্যা টা কি।

যে কারনে ওকে আমি শাড়ি পড়িয়ে নিয়ে গেছি। যাতে সবাই বুঝে ও ম্যারিড, আর একজন বিবাহিতা মেয়ের দিকে অমন দৃষ্টিতে তাকানো কি ঠিক বল,
মাথা আমার গরম হয়ে গেছে শুধু মাএ মায়ের বান্ধবীর বাড়ি, আর অনুষ্ঠান বলে চুপচাপ ছিলাম।
নয়তো সব কটার চোখ আমি গেলে দিয়ে আসতাম।

এই বোন আর বউ নিয়ে এখন বাইরে বের হওয়া যাবে না। এসব পাবলিক কে ধরে কটা লাগানো উচিত।
রজত সৌধর পিঠে এক চাপড় দিয়ে বললো আরে দোস্ত শান্ত হ। আরে ওসব লোকের কাজই এটা মেয়ে দেখলেই নিজেদের বাজে দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয়।
এরা ভাবে না এদের ঘরেও মা বোন রয়েছে৷ এরাও কোন এক মায়ের সন্তান।

সৌধ বললো দেখ আমি এসব সহ্য করতে পারছিনা।

পিংকির দিকে কোন ছেলের স্বাভাবিক নজরও আমি সহ্য করতে পারছিনা। আমি ওর পড়াশোনাই বন্ধ করে দিবো বাইরে যাওয়া টোটালি নিষেধ। সূচিকে তোর হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবো। ওকে সামলানোর দায়িত্ব তোর।

রজত বললো এটা তো তুই অনেক বড় ভুল করবি পড়াশোনা কেনো বন্ধ করবি। যেখানে তোর বাবা, মা শিক্ষিত তোর পুরো পরিবারটাই শিক্ষিত। সেখানে তুই এসবের জন্য ওর লেখাপড়া বন্ধ করতে চাচ্ছিস।

বোন কিন্তু আমারও আছে বাইরে কখনো দেখেছিস ওকে তুই?

সৌধ অবাক হয়ে বললো না তো,
সত্যি তো তোর বোন পড়াশোনা করেনা?
কোন ভার্সিটিতে পড়ে?

রজত বাঁকা হাসলো।
সৌধ বললো কিরে,
রজত বললো কোন ভার্সিটি মানে পিংকির সাথেই তো পড়ে আমাদের ভার্সিটিতেই।
সৌধ বললো হেয়ালি করিস আমার সাথে। ফাজলামো বাদ দে।

রজত বললো একদম হেয়ালি করছিনা। আমার বোন কে তুই অনেক দেখিস কিন্তু চিনতে পারিস না।
মানে,
হ্যাঁ। আর এর কারন হচ্ছে আমার বোন নিজেকে সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে রেখে তাঁর পড়াশোনা এগিয়ে নিচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে নিজের স্বপ্ন পূরনের উদ্দেশ্যে।
সৌধ রজতের দিকে অবাক চোখে তাকালো।

রজত বললো সৌধ আমরা মুসলিম,
আমাদের ধর্ম ইসলাম, কিন্তু আমরা ইসলাম ধর্মের কোন কিছুই মানি না আজ তোর যে সমস্যা গুলো হচ্ছে এসবের জন্য তুই নিজেই দায়ী।
মানছি আন্টি -আংকেল দুজনই তাদের কাজের জন্য তোদের সময় দিতে পারেনি কিন্তু তোরা দুভাইবোন তো বড় হয়েছিস, লেখা পড়া শিখেছিস। যা আন্টি -আংকেল শেখাতে পারেনি তা কি তোরা শিখে নিতে পারিস নি।

সূচিকে কি বলবো তুই তো বড় ভাই তোর ও উচিত ছিলো ওকে শিক্ষা দেওয়া।
এখন বোঝ এখন নিজেও শিখে নে আর নিজের বোন আর বউকেও শেখা।
আর সব থেকে বড় ভুল তুই পিংকির স্বামী হয়েও তোর সঠিক কর্তব্য পালন করিস নি।

তোর বোন কে আমি বিয়ে করার পর সর্বপ্রথম কি করবো জানিস,
সর্বপ্রথম ওকে আমি পর্দা শেখাবো যাতে আমার তোর মতো অবস্থা না হয়, যেটা আজ তোর হয়েছে।
সত্যি খুবই দুঃখ জনক একজন স্বামীর চোখের সামনে তার স্ত্রী কে পরপুরুষ রা কু নজর দেয়।

এর জন্য ওরাও দায়ী নয় এর জন্য দায়ী তুই। যদি পিংকি তোর বউ না হতো তবে এর জন্য দায়ী পিংকির বাবা-মা কে করতাম।
“নারীকে হাদীস শরীফে ‘আওরত’ বলা হয়। আওরত শব্দের অর্থ – গুপ্ত বা আবৃত। সুতরাং নারীর নামেই বুঝা যায় – নারীর জন্য পর্দা আবশ্যকীয়। পারিপার্শ্বিকতার বিবেচনায় বিবেকের দাবীও তাই। তেমনি শরীয়তে নারীর জন্য পর্দাকে ফরজ করা হয়েছে,
জ্ঞান তো অনেক দিয়েছি কটা আর নিয়েছিস। যা বাড়ি যা মাথা গরম করিস না, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ কর।

আর হ্যাঁ আন্টি-আংকেল আসলেই মা কে পাঠিয়ে দিবো। বলে দিস আন্টিকে। আর যতো তারাতাড়ি সম্ভব আসতে বল। আমি আর দেরী করতে চাচ্ছি না।

রজতের কথা গুলো শুনে সৌধর চোখ খুলে গেলো।
এতো সহজ একটা হিসেব নিয়ে আমি এতো মাথা গরম করছিলাম, রজতকে জরিয়ে ধরে সৌধ বললো তোর মতো এমন একজন বন্ধু থাকলে আর কিছু লাগে না ভাই।

রজত বললো যা বাড়ি যা, আপন জিনিস আপন করে নে। রাগ, জেদ একটু কমিয়ে মাথা ঠান্ডা কর।
নিজে সুখে থাক আমাকেও সুখে থাকার ব্যবস্থা করে দে।

সৌধ বাড়ি ফিরে রুমে যেতেই হঠাৎ ঝড়ের মতো পিংকি তাকে জাবটে ধরলো।
সৌধ আকস্মিক এমন কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। পিংকি সৌধকে প্রচন্ড শক্ত করে জরিয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠলো।
সৌধর বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠলো।

কাঁদছো কেনো, কি হয়েছে।
পিংকি চট করে মাথা তুলেই ইচ্ছে মতো কিল ঘুষি দিতে লাগলো। সৌধ আহ করতেই আবারো জরিয়ে ধরলো। সৌধ পিংকির মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো। নরমস্বরে জিগ্যােস করলো কি হয়েছে।

পিংকি কিছু বললো না বুকে মাথা ঠকিয়ে সৌধর হৃদস্পন্দন অনুভব করতে লাগলো।

সৌধ কিছুটা আঁচ করতে পেরে পিংকির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো ভালোবাসিতো,
পিংকি কথাটা শুনা মাএই শক্ত করে পিঠ খামচে ধরলো। সৌধ মৃদু হেসে গভীরভাবে জরিয়ে নিলো পিংকি কে,
বেশকিছুক্ষন পর সৌধ পিংকি কে ছেড়ে শার্টটা খুলতে লাগলো। পিংকি অন্যদিক ঘুরে বললো আমি যাচ্ছি।
সৌধ ভ্রু কুঁচকে বললো কোথায়,
ও ঘরে সূচির কাছে।

সৌধ পিংকি কে একটানে নিজের কাছে নিয়ে এলো।
সূচির কাছে না গিয়ে সূচির ভাইয়ের কাছে থাকা যায় না?

পিংকি লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। মুখ লুকোনোর বৃথা চেষ্টা করতেই সৌধ বললো শাড়িটা এখনো খুলোনি যে,
পিংকি কিছু বললো না। সে যে তার অপেক্ষা করতে করতে কোন কিছুই করতে পারেনি তা আর বলতে পারলো না।
পিংকি বললো আচ্ছা আমি চেন্জ করে আসছি।

সৌধ বললো কোন প্রয়োজন নেই।

পিংকি সৌধর দিকে তাকাতেই সৌধ রহস্যময় হাসি হেসে দরজাটা লাগিয়ে দিলো।

পর্ব ১১

বুকের ভিতর কেমন ঝড় শুরু হয়ে গেলো পিংকির। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। সৌধ যতো এক পা এক পা করে এগুচ্ছে পিংকির হৃদস্পন্দন ততো বেড়ে যাচ্ছে। সৌধ পিংকির একদম কাছে আসায় পিংকি নিজের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে ফেললো।

সৌধ বাঁকা হেসে এক পা আগালো। পিংকি ভয়+লজ্জায় আবারো পিছিয়ে গেলো। সৌধ এগুতে লাগলো এভাবে পিছানো আগানোতে পিংকি একদম দেয়ালে ঠেকে গেলো। লজ্জায় সৌধর দিকে তাকাতেও পারছেনা। কেমন অচেনা ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে।

সৌধ পিংকির দুগালে আলতো করে হাত রাখলো।

পিংকির শ্বাস ঘন হয়ে এলো সৌধ ভারী আওয়াজে বললো আর পিছিয়ে লাভ নেই, তুমি যদি এক পা পেছাও তো এই সৌধ দশ পা এগিয়ে আনবে তোমায়।
বউ তুমি আমার, ইউ আর মাই প্রপার্টি।

পিংকির বুক টা ধক করে ওঠলো চোখ তুলে সৌধর দিকে তাকালো।

সৌধ পিংকিকে পিছন ঘুরিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। পিংকির ঘন শ্বাস অনুভব করতে পারছে যা সৌধ কে খুব করে কাছে টানছে পিংকির।
চুলে নাক ডুবিয়ে এক হাত কোমড়ে রাখতেই পিংকি কেঁপে ওঠলো, সৌধর হাতের ওপর শক্ত করে চেপে ধরলো। সৌধ পিংকির মাথায় আলতো করে কিস করে একহাতে শাড়ীর পিন খুলার চেষ্টা করলো।

হঠাৎ ই পিংকি চমকে গেলো ঘুরার জন্য সৌধ বলে কোমড়ে রাখা হাত ছারানোর চেষ্টা করলো।
সৌধ সেদিকে মন না দিয়ে শাড়ীর আঁচল খুলায় মন দিলো,

পিংকির শ্বাস ক্রমাগত ঘন থেকে ঘন হতে শুরু করেছে। সৌধ পিংকির ছটফটানি অনুভব করতে পারছে। পিংকিকে ছেড়ে দিলেই যে সে এখন তাঁর থেকে পালিয়ে যাবে খুব করে বুঝতে পারছে। কিন্তু সে চায় না পিংকি তাঁর থেকে পালিয়ে যাক,

তাঁর এখন পিংকির নেশা ধরে গেছে, নেশাটা অনেক আগে ধরলেও একটা বাঁধা ছিলো কিন্তু সেই বাঁধা পিংকি নিজেই ভেঙে দিয়েছে, দুজনেই দুজনের কাছে আজ স্পষ্ট, দুজনেই দুজনের মনের কথা পড়ে ফেলেছে।

শাড়ির আঁচল সরিয়ে কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিতেই কেঁপে ওঠলো পিংকি, পুরো শরীর তাঁর শিউরে ওঠলো।
সৌধ তাঁর হাতের বাঁধন আলগা করে পিংকির ঘারে মুখ ডুবিয়ে দিলো,

পিংকি সৌধর এতো গভীর ছোয়া সহ্য করতে না পেরে সামনে ঘুরে শক্ত করে জরিয়ে লজ্জায় বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললো,
সৌধর বুকের ভিতর শীতল শিহরন বয়ে গেলো।

দুটো মন আজ যেনো একে অপড়ের কথা গুলো নির্দ্বিধায় পড়ে ফেলছে। ঘোর লেগে গেছে আজ সৌধর শাড়িতে দ্বিতীয় বার পিংকি কে আজ দেখেছে সারাটাদিন খুব কষ্ট করে নিজেকে দূরে রেখেছিলো কিন্তু এখন আর পারছেনা।

বার বার মন বলছে সৌধ অনেক দেরী করে ফেলেছিস। আর দেরী করিস না যা তোর, যা তোর জন্য হালাল তা তুই নিজের করে নে।
পিংকির অধিকার থেকে আর ওকে বঞ্চিত করে রাখিস না। আর না নিজেকে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখবি।
পিংকিকে পাঁজাকোল করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো।

পিংকি আজ সৌধকে বাঁধা দিতে চেয়েও পারছে না।
হাত পা তার অবশ হয়ে আছে, গলার স্বর ও তাঁর সাথে আজ বেইমানি করছে। সৌধ ধীরে ধীরে নিজের সাথে সম্পূর্ণ আবদ্ধ করে ফেললো পিংকি কে। আদরে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিলো, তাদের বৈধ সম্পর্ক অবশেষে পূর্নতা পেলো।
চোখ বেয়ে সুখের জল পরতে লাগলো,

সৌধ সেই সুখানুভূতির প্রত্যেকটা জলকনা ঠোঁট দিয়ে শুষে নিলো।
কানের কাছে ফিসফিস করে বললো তোমার চোখের অশ্রুকনা এভাবেই শুষে নিবো আমি, আজকের পর তোমার প্রত্যেকটা অশ্রুকনাকেও আমার পারমিশন নিয়ে পড়তে হবে। তোমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজকের পর শুধু সৌধর নাম থাকবে।

ফজরের আজান কানে ভেসে আসতেই সৌধর ঘুম ভেঙে গেলো। বেশ অবাক হলো এমন সময়তো কখনো ঘুম ভাঙে না, আজ এমন সময় ঘুম ভেঙে গেলো। কয়েকটা মসজিদের আজান কানে ভেসে এলো। সৌধ ভাবলো আজ থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু, এই পৃথিবীতে যাই ঘটুক সবকিছুর পিছনে কোন না কোন কারন অবশ্যই থাকে।

এতো আগে ঘুম ভাঙার কারনটা হয়তো আমাদের নতুন জীবনের শুরুটা নামাজ দিয়েই হওয়ার জন্য।
পিংকির শরীরের উষ্ণতা অনুভূত হতেই আলাদা এক ভালো লাগা কাজ করলো পুরো হৃদয় জুরে। পিংকির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাতেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠলো। তাঁর মনে হলো বহুদিন পর মেয়েটা এতো শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু তাঁর এই শান্তির ঘুমটা যে এখন নষ্ট করতেই হবে,

পিংকিকে একটু সরিয়ে কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে কয়েকবার ডাকলো সৌধ।

পিংকি নড়ে চড়ে সৌধ কে ছেড়ে গায়ে কম্বল জরিয়ে লজ্জায় মুখ লুকানোর চেষ্টা করতে লাগলো।

সৌধ ওঠে বললো এই যে ম্যাডাম এখন আর লজ্জা পেয়ে কি হবে, সব তো দিয়েই দিয়েছেন। এবার ওঠুন দুজনে একসাথে নামাজ পড়বো, শুরুটা নামাজ দিয়েই হোক।
শুধু দুনিয়াতে না আখিরাতেও একসাথে থাকতে চাই। পিংকির মধ্যে এতো ভালালাগা বোধহয় কখনো কাজ করেনি, সেই সাথে সৌধর মুখে এমন কথা শুনে বেশ অবাক লাগছে এই সৌধ কে যেনো আগের সৌধর সাথে মেলানোই যাচ্ছে না।

তবে কি এই সৌধ শুধুই পিংকির,
সৌধ ওয়াশ রুম চলে গেলো। পাঁচ মিনিট পর বেরিয়েও এলো।

পিংকি মুখ টা মলিন করেই বসে আছে,
সৌধ চুলের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বললো কি হলো এখনো বসে আছো,
পিংকি মুখটা ভাড় করে বললো আমি কি পড়বো শাওয়ার নিয়ে,

সৌধ হকচকিয়ে গেলো তার তো খেয়ালই নেই।

পিংকি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো,
সৌধ বললো আসছি আমি,
পিংকি আঁতকে ওঠলো সে কি কোথায় যাবে তুমি, ছিঃ সূচি কি ভাববে?

সৌধ মুচকি হেসে বললো কিচ্ছু ভাববে না,
আমার বোন কে আমি খুব ভালো করেই চিনি।

ভাই-ভাবী প্রবলেমে পড়েছে সেটা সমাধান করবে ওয়েট এন্ড সি,
,
সৌধ নামাজ পড়ে আবার ঘুমাচ্ছে, পিংকি আয়নার সামনে বসে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর কাল রাতের কথা গুলো ভাবছে, সৌধর প্রতিটা স্পর্শ প্রতিটা কথা তাঁর বুকে একদম গেঁথে আছে,

মনকে প্রশ্ন করছে আমি স্বপ্ন দেখছিনা তো, ঘুম ভেঙে গেলেই সব আবার আগের মতো অভিশপ্ত হয়ে যাবে না তো, হ্যাঁ অভিশপ্ত যে জীবনটায় বাসর ঘরেই একজন স্বামী তাঁর স্ত্রী কে অস্বীকার করে সেই জীবন সত্যি অভিশপ্ত।

যে জীবনে একজন স্ত্রী প্রতিটা দিন তাঁর স্বামীর পাশে অন্য কোন মেয়েকে দেখতে পারে সেই জীবনটা সত্যি অভিশপ্ত, চাইনা ঐ জীবনে ফিরে যেতে।
না এটা স্বপ্ন নয়, সব সত্যি নিজের স্বামীকে নিজের করে পাওয়ার সত্যি, ইয়েস সৌধ শুধুই আমার।

পিংকি তয়ালে টা খুলে হাত দিয়ে চুল গুলো আওড়াচ্ছিলো চুলের পানি ছিটকে সৌধর মুখে, উন্মুক্ত বুকে পড়ছে,
ঘুমটাও তাঁর আলগা হয়ে গেছে, চোখ পিটপিট করে সামনে তাকাতেই বুকের ভিতর ধক করে ওঠলো।

যেনো এক হুরপরীর আগমন ঘটেছে তাঁর ঘরে,
ভেজা চুলে এতোটা স্নিগ্ধ লাগছে পিংকিকে যা দেখে বুকে টান পড়লো তাঁর। আয়নায় পিংকির লাবন্যময়ী চেহেরা স্পষ্ট ফুটে ওঠেছে।
হঠাৎ ই যেনো পিংকির মধ্যে অসম্ভব সৌন্দর্য এসে ভড় করেছে। চোখটা দুহাতে মুছে নিয়ে ভালো ভাবে তাকালো। এই মেয়েটাকে কেনো এতোদিন চোখে পড়েনি,

বড্ড দেরী হয়ে গেলো না, সৌধ আফসোসে আফসোসে গালে হাত রেখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। পিংকি চুলটা ঠিক করে নিয়ে তয়ালে টা মেলতে বেলকুনিতে যেতে নিতেই সৌধকে দেখে লজ্জায় দ্রুত বেলকুনিতে চলে গেলো।

সৌধ পিংকির মুখের অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে বিছানা ছেড়ে বেলকুনিতে যেতেই দেখতে পেলো পিংকি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুঝে আছে, ঘনঘন শ্বাস ফেলছে।

সৌধ মুখ চিপে হেসে এক হাত দেয়ালে রেখে আরেক হাতে পিংকির চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিলো।
পিংকি চমকে তাকালো সৌধর হাসি হাসি মুখটা দেখে চোখ সরিয়ে নিলো সৌধ কানের কাছে নাক ঘষতে ঘষতে বললো এমন নেশা ধরিয়েছো ঘোরই কাটছে না বলেই ভেজা চুলের ঘ্রান নিতে শুরু করলো। পিংকি সৌধর বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রুমে চলে গেলো।

সৌধও পিছন পিছন গেলো। পিংকি বিছানা গুছাচ্ছে সৌধ পিংকির দিকে তাকিয়ে বিছানার একপাশে বসে বললো এতোদিন কি ভুল ধারনার মধ্যেই না ছিলাম।
পিংকি জিগ্যাসু দৃষ্টি তে তাকালো,
সৌধ বললো এই বিয়েটার জন্য বাবা-মায়ের সাথেও দূরত্ব সৃষ্টি করেছি,

পিংকির মুখটা মলিন হয়ে গেলো। বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে পড়লো,
সৌধ বুঝতে পেরে বললো এখানে বসো,
পিংকি চুপচাপ বসলো,
সৌধ বললো একটু কাছে আসো।
পিংকি একটু কাছে যেতেই সৌধ পিংকি কে পিছন দিক ঘুরিয়ে গভীরভাবে জরিয়ে নিলো।
আসলে কি হয়েছে বলতো ছোট বেলা থেকেই আমি আর সূচি ধরতে গেলে একা একাই বড় হয়েছি,

টাকা-পয়সা, খাবাড়, জামাকাপড় কোন কিছুরই কমতি ছিলো না দুইভাই বোনের। কিন্তু আমাদের অনেক বড় একটা অভাব ছিলো,
পিংকি অবাক হয়ে সৌধর দিকে একবার চোখ ওলটিয়ে তাকালো,
সৌধ ভীষণ সিরিয়াস হয়ে বলতেই থাকলো।

পিংকি মন দিয়ে কথা শুনায় ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
জন্মের পর থেকে একটা সন্তান বাবা, মায়ের ছায়াতেই বড় হয়ে ওঠে, অবুঝ বয়সে কতোটা পেয়েছি জানিনা কিন্তু বুঝ বয়সে যা পেয়েছি তা ছিলো শুধুই দায়িত্ব, হ্যাঁ বাবা -মা দুজনই আমার আর সূচির প্রতি তাদের সব দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ঠিক সময় রান্না করে খাওয়ানোর জন্য কয়েকটা কাজের বুয়া রেখেছেন, ছোটবেলায় দাদী, ফুপিরা আমাকে আর সূচিকে দেখে রাখতো।

ফুপিদের বিয়ে হয়ে যায় দাদীও মারা যায়। তাঁর পর থেকে আমি আর সূচি এতো বড় বাড়িতে একা থাকি সব কাজের লোকদের সাথে। জ্বর হলে সূচি মাকে ফোন করতো মা যেভাবে বলতো ও সেভাবেই আমার সেবা করতো। সূচি অসুস্থ হলে আমি ওকে দেখে রাখতাম।

মা মা বলে যখন জ্বরের ঘোরে কাঁদতো খুব কষ্ট হতো আমার। কি নেই আমাদের সব আছে সব থেকেও আমাদের যেনো কিছুই নেই। কখনো মায়ের হাতে রান্না খেয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি যাওয়া হয়েছে কিনা মনে পড়েনা। তাঁরা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে ঠিকি কিন্তু তবুও অনেক বড় একটা ফাঁক রয়ে গেছে। আর এটার জন্যই আমি হয়তো অগোছালো একটা জীবন পার করেছি।

বাবা-মা কে খুব মিস করি সেই ছোট বেলা থেকেই কিন্তু তাঁরা তাদের কাজের জন্য নিজেদের ছেলে মেয়েকে সময়ই দিতে পারেনি কখনো।
হুট করে তোমাকে নিয়ে এলো জীবনে সৌধ এই মেয়ে কে বিয়ে কর,

তখন আমার প্রচন্ড জেদ চাপলো মনে,
এরা কি অনুভূতি বুঝে না, নিজের সন্তান দের থেকে দূরে থাকে টাকার পিছনে ছুটে বেরায়। আর এখন কিনা বিয়ে নিয়েও এমন করবে। মনকে কঠিন করে সিদ্ধান্ত নিলাম জীবনে বাবা-মাকে সেভাবে কাছে পাইনি। যে লাইফ টা আমি কাটাচ্ছি সেই লাইফের মতো করে আর কাটাতে পারবোনা। ভালোবাসাহীন জীবন আর কাটাতে পারবো না।

বিয়ে তাকেই করবো যাকে আমি মন থেকে ভালোবাসবো, যে আমার অগোছালো জীবনটা গুছিয়ে দিবে। ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে জীবনটা।
কিন্তু মা আমাকে ইমোশনালী ব্ল্যাকমেইল করলো, হুমকি দিয়ে দিলো বাধ্য হয়ে বিয়ে করে নিলাম। কিন্তু আমি কখনো কাউকে ঠকাতে চাইনি।
যে বিয়েটাই আমি মন থেকে মানিনি সেখানে কি করে স্বাভাবিক স্বামী -স্ত্রীর অভিনয় করতাম।

কিন্তু এখন আমি বুঝতে শিখেছি সত্যি বলতে এসব বুঝতে উপরওয়ালা যার মাধ্যমে আমাকে সহায়তা করেছে সে হলো আমার প্রানপ্রিয় বন্ধু রজত।
ও না থাকলে আমি আমার নিজের ভুলগুলো থেকে বেরুতে পারতাম না।

আমি এমন খাঁটি রত্ন কে এতোদিন দেখেও দেখিনি।
কিন্তু আর না এবার জীবনটা অন্যভাবে কাটাতে চাই। অন্যভাবে বাঁচতে চাই।
সৌধ বললো পিংকি,

পিংকির চোখ দুটো চিকচিক করছে। সে তো জীবনের এগারোটা বছর বাবা-মার ছায়ায়, আঠারো টা বছর মায়ের ছায়ায় থেকেছে। আর সৌধ, সূচি ছোট থেকেই বাবা-মার ভালোবাসার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাঁরা থেকেও নেই। পিংকির চোখ গড়িয়ে পানি পড়লো। সৌধর হাত ছাড়িয়ে সামনাসামনি বসলো।
সৌধর দুগালে আলতো করে ধরে বললো তোমার অগোছালো জীবন আমি গুছিয়ে দিতে চাই সৌধ,

ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চাই তোমায় আমি।
সৌধ পিংকির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো।

আবেশে চোখ বুজে ফেললো পিংকি।
সৌধ বললো ফাইনাল এক্সাম টা দিয়ে বাবার বিজনেসে বসবো। কাজ করবো, চুটিয়ে সংসার করবো, তোমার সব দায়িত্ব আমার।
তুমি আমার ঘর সামলাবে, আমার বাচ্চা সামলাবে + বাচ্চার বাবাকে সামলাবে।
পিংকি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো গাল দুটো তার লালচে আভায় ভরে গেলো।

সৌধ পিংকি হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো পিংকি আমার একটা কথা শুনবে,
পিংকি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।

সৌধ হাতের পিঠে কিস করে বললো আমি চাইনা তুমি জব করো, পড়াশোনা করছো বেশ ভালো।
নিজে শিক্ষিত হচ্ছো বাচ্চার জন্য একজন শিক্ষিত মা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু আমি তোমাকে জব করতে দিবো না।
আমি চাইনা যে পরিস্থিতির স্বীকার আমি বা সূচি হয়েছি সেগুলোর মুখোমুখি আমার সন্তান হোক।

পিংকির মুখটা মলিন হয়ে গেলো,

সৌধ পিংকির মলিন মুখের দিকে চেয়ে বললো
পিংকি, “একটা শিশুর বেড়ে উঠতে সাধারণত বাবা-মা দুজনের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বাবারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের অর্থনৈতিক চাপটা সামাল দিয়ে থাকেন, ঘর সামলানোর কাজে থাকেন মায়েরা।

এছাড়া শিশুকালই হচ্ছে ভবিষ্যত জীবনের ভিত্তিভূমি। এই ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে ভবিষ্যতের আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে মায়ের ভূমিকাই প্রধান ও মুখ্য। একজন সচেতন, বিজ্ঞ মা-ই পারেন তার সন্তানকে যথার্থ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে। একজন শিশুর সবচেয়ে বড় সাথী হচ্ছে তার মা। মা শুধু একজন জন্মদাত্রী জননীই নন, সুন্দর চরিত্রবান সন্তান তৈরী করার কারিগরও বটে।

সৌধর কথাগুলো তাঁর মন ছুঁয়ে গেলো।
কিন্তু সেও তো ভেবেছিলো নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
বাবার মৃত্যুর পর তো এই একটা স্বপ্ন কেই লালন করেছিলো। কিন্তু সৌধওতো এখন তাঁর জীবনের বিরাট একটা অংশ,
সৌধ বললো কি হলো পিংকি, কি ভাবছো তোমার কি আপত্তি আছে?

সৌধর মুখের দিকে তাকিয়ে পিংকি সৌধকে নিরাশ করতে পারলো না। এছাড়া সৌধ ভুল কিছুও বলেনি।
বাবা-মা দুজনই যখন কর্মজীবী হয়ে যায়, সন্তান রা অবহেলার স্বীকার হয়,

তাঁরা কাজের চাপে, কাজের ভীরে সন্তান দের সময়ই দিতে পারে না। আমার নিজের সন্তান কে এভাবে বঞ্চিত করতে সত্যি পারবো না।
বাইরে টা না হয় সৌধই দেখবে আমি আমার ঘরের দায়িত্ব টাই না হয় নিবো

পিংকি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে সৌধকে জরিয়ে ধরলো। সৌধও পিংকিকে জরিয়ে নিলো।

সামিয়া চৌধুরী, আকাশ চৌধুরী, সূচি খেতে বসেছে সৌধ তারাহুরো করে নিচে নেমে এলো আজ থেকে তাঁর পরীক্ষা শুরু। পিংকি সৌধর খাবাড় বেড়ে এগিয়ে দিলো সৌধ তারাহুরো করে খেতে শুরু করলো।
সামিয়া চৌধুরী বললেন আলহামদুলিল্লাহ।

তোদের দুটিকে এভাবে দেখে বেশ ভালো লাগছে।
আকাশ চৌধুরী বললেন সৌধ এক্সাম শেষে অফিস বসছো তো,
সৌধ বললো হুম ভেবে রেখেছি। পিংকি যত্ন নিয়ে সৌধকে খাওয়াচ্ছে, সৌধ তৃপ্তি সহকারে খেয়ে উপরে চলে গেলো।
সামিয়া চৌধুরীর বেশ ভালো লাগলো, যাক এবার যদি ছেলেটা আমার ঠিক হয়। কাজের জন্য ছেলে মেয়ে দুটোকে সময় দিতে পারিনি। দুটোই বেশ বেপরোয়া হয়ে গেছে সৌধটা এবার ঠিক হবে,

সূচির ব্যবস্থাও এবার করতে হবে।
রজতের মতো হীরের টুকরো ছেলে থাকতে আর কি চিন্তা, আাকাশ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন তুমি তো আরো তিনদিন আছো তাইনা,

বিকাল চারটা ছুঁই ছুঁই সূচি এসে বললো এই যে পিংক ভাবী, পিংকি বই থেকে মুখ ওঠিয়ে বললো ইয়েস ননদীনি বলেন।
আমার সাথে বেরুতে হবে একটু,

পিংকি অবাক হয়ে বললো কোথায়,
চলো তো সারপ্রাইজ আছে, ইউ আর সো লাকি ম্যান। ভাইয়ের আগে আপনাকেই সারপ্রাইজ টা দেবো।
পিংকি ভ্রু কুঁচকে বললো কি,

সূচি বললো আরে চলো না।
পিংকি আলমারী থেকে বোরখাটা বের করলো।
সূচি বোরখা দেখেই বললো সেকি বোরখা পড়ে বেরুবে,
পিংকি বললো সৌধ রাগারাগি করবে এটা ছাড়া বের হলে।

সূচি বললো না, না তুমি বোরখা পড়োনা আজ প্লিজ একদিন কিছু হবে না।
পিংকি বললো সূচি, তোমার ভাই কে তুমি ভালো করেই চেনো শুধু শুধু ঝামেলা হবে।
সূচি বললো ওহ ম্যাডাম ওকে যেভাবে ইচ্ছে চলুন।
মুখোমুখি বসে আছে পিংকি, তুষার সূচি রেষ্টুরেন্টের বাইরে এক বান্ধবী আর তার হাজব্যান্ড দেখেই দৌড়ে বেরিয়ে গেলো সবেমাএ।
পিংকি ভ্রু কুঁচকে বললো আপনি সূচির বয়ফ্রেন্ড,

তুষার বললো বয়ফ্রেন্ড বললে ভুল হবে বরং আমি ওর আর ও আমার মনের মানুষ। বলেই হেসে ফেললো।

রজত, সৌধ আর তানিম নামে এক ফ্রেন্ড রেষ্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে একপাশের টেবিলে বসলো।
সৌধ বললো কি সমস্যা তানিম কি হয়েছে?

তানিম তাঁর একটা পারিবারিক সমস্যা সৌধ আর রজতের সাথে শেয়ার করলো।
রজত হঠাৎ বললো তুষার না,

সৌধ ভ্রু কুঁচকে পিছনের দিকে তাকাতেই চমকে গেলো। এতো পিংকি তুষারের সাথে ও এখানে,
সৌধর রাগে মাথায় রক্ত ওঠে গেলো।

টেবিলে জোরে হাত মুঠ করে বাড়ি দিতেই রজত সহ তানিম চমকে ওঠলো। আশে পাশের কয়েকজন সহ তুষার, পিংকিও তাকালো।
সৌধ সোজা গিয়ে পিংকি কে একটানে তুলে ঠাশ করে গালে এক থাপ্পড় দিলো।

পিংকি গালে হাত দিয়ে সৌধর দিকে অবাক চোখে তাকালো চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো।
সৌধ বলতেই সৌধ থামিয়ে দিলো।
চুপপপ তুই আর একটা কথাও বলবি না।

রজত এসে বললো সৌধ তুই শান্ত হ মাথা গরম করিস না।
সৌধ তুষারের দিকে চেয়ে গলায় চেপে ধরলো।

তুষার সৌধর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো৷ রজত তানিম সৌধ কে ফেরানো চেষ্টা করলো।
রেষ্টুরেন্টে এক প্রকার চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে গেলো।
ম্যানেজার এসে সৌধ কে অপমান করতে লাগলো।

সৌধ তুষারকে ছেড়ে পিংকির দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। এক হাত চেপে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রেষ্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলো।

পর্ব ১২

রজত তুষার এর দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকালো কঠোর গলায় বললো তোর সমস্যা কি বল তো একজন বিবাহিতা মেয়ের পিছনে কেনো পরে আছিস,
আগে থেকেই ওর প্রতি তোর দূর্বলতা ছিলো মানছি কিন্তু তুই হয়তো জানিস না সৌধ আর পিংকির মাঝে এখন সব ঠিক হয়ে গেছে,
আর পিংকির মতো মেয়ে হাজব্যান্ড থাকা সত্ত্বেও পরপুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখবে এটা আমি বিশ্বাস করিনা। সৌধর অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়, তাই কি ভুল কি ঠিক ও সঠিক সময়ে বুঝতে পারেনা।

কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি এটা তোরই কোন চাল।
দেখ তুষার বহুবছরের শত্রুতা পুষে কারো দাম্পত্য জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিস না।

তুষার বাঁকা হাসলো শার্টের কলার ঠিক করে নিয়ে চেয়ারে বসে দাঁত বের করে এক দফা হেসে নিলো।
রজত সহ তানিমেরও প্রচন্ড রাগ হলো সৌধ থাকলে আরেক দফা গায়ে হাত পড়তো এখন।
তুষার টেবিলে রাখা ফোনটা ঘুরাতে ঘুরাতে বললো রজত,
রজত ভ্রু কুঁচকে তুষারকে বুঝার চেষ্টা করলো।

ছোট থেকেই তুষারের মনে কি চলে ঠিক বোঝা যায় না।

সাইল্যান্ট কিলার হয়ে ছোট বেলায় বেশ ক্ষতি করেছে তাদের, একটা প্রান ও হারিয়ে গেছে ওর জন্য। যেহেতু নাবালক ছিলো সেহেতু শাস্তি টা তাঁকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু ঐটুকু বয়সে যার মনে এতো হিংসা, আক্রোশ থাকতে পারে সে বড় হয়ে কি হতে পারে সেটাই ভাবার বিষয়। সঠিক শিক্ষা পেলে হয়তো এতোটা বিকৃত মস্তিষ্কের হতো না।

রজত টেবিলে হাত দিয়ে এক থাবা দিলো,
তুষার বললো বোস ভাই বোস।

রজত মাথা ঠান্ডা রেখে বসলো।
রজত তানিম ও পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো।
তুষার বললো পিংকি বেশ সুন্দরী বল, যে কোন ছেলে এক দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতোই সুন্দরী। কিন্তু যখনি কেউ জানবে মেয়েটা বিবাহিত তখন কি আর আাগানোর সাহস পাবে বল। তবুও এগিয়ে ছিলাম কেনো এগিয়ে ছিলাম বল বল।
রজত তুষারের দিকে ঘৃনার দৃষ্টিতে তাকালো।

তুষার মুচকি হেসে বলতে লাগলো,
সূচি কে মনে আছে তোর, অবশ্যই আছে যেহেতু সৌধ আছে সূচিও অবশ্যই আছে তাইনা।
রজতের হৃদস্পন্দটা থেমে গেলো,
তুষার বলতেই রইলো।

মোহ কি জিনিস ভাই সেই ছয় বছরের মোহ আজো কাটাতে পারলাম না। তুই বলছিলি না বিবাহিত মেয়ের পিছনে কেনো পড়ে আছি ভুল ভাই আমি একদম ওর পিছনে পড়ে নেই, পিছনে পড়ে ছিলাম কিন্তু ইউস করা জিনিসের পিছনে না পড়ে আনইউস জিনিসে বেশী মজা তাই আমি আমার আগানোর রাস্তা টা ঘুরিয়ে নিলাম। এতে কি হলো বলতো সব দিক দিয়ে লাভ হলো।

যে মেয়েটার জন্য, যে মেয়েকে ঐটুকু বয়সে শুধু নিজের করে পাওয়ার জন্য একটা খুন হয়ে গেলো আমার হাতে। যে মেয়ের জন্য দেশ ছাড়তে হলো আজ এতো বছর পর যদি সেই মেয়ে এসেই আমার কাছে ধরা দেয় তো কেনো আমি ধরবো না বল। বিড়ালের সামনে এক প্লেট মাছ রেখে দিলে কি বিড়াল সেই মাছের লোভ টা সামলাতে পারে নাকি,

সৌধ টা না বড্ড বোকা ছোট বোনের হবু বরের সাথে কেউ এমন বাজে বিহেইভ করে বল,
রজতের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। তুষারের বলা কথা গুলো তাঁর এতো বিশ্রি লাগলো যে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলো না।
তুষারের কলার চেপে ধরে বললো তোর সাহস কি করে হয় সূচিকে এমন বাজে ইনগিত দিয়ে কথা বলার। তোর সাহস কি করে হয় ওকে নিয়ে এতো নোংরা ভাবনা ভাবার।

রজত ভাইয়া কি করছো, একি ওকে এভাবে ধরেছো কেনো বলেই হাত ছাড়াতেই রজতের হাতের ওপর হাত রাখলো সূচি, চোখে মুখে আতঙ্ক রজতের ওপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো রজত ভাইয়া প্লিজ ওর কলার ছাড়ো।

সূচির দিকে বিস্মিত হয়ে চেয়ে কলার ছাড়লো রজত। তানিম বেশ বুঝতে পারছে আসল ঘটনা টা কি। রজত বুঝেও নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে,
সূচি তুমি এখানে কি করে,

তুষার সূচির দিকে খুব ইনোসেন্ট মুখ করে চেয়ে রইলো।

সূচি বললো আমি এখানে ওর সাথে মিট করতে এসেছি, তুষার পিংকি কোথায়?

তুষার কিছু বলতে যাবে তার আগেই রজত বললো
তুমি পিংকির সাথে এসেছো,
সূচি বললো না পিংকি কে আমি নিয়ে এসেছি।

আর তুমি ওর সাথে এমন আচরন করছিলে কেনো ভাইয়া?

ব্রো কি কিছু জেনে গেছে, ব্রোই বলেছে তোমায়? যাক ভালোই হয়েছে এবার ব্রোকে আমি ম্যানেজ করে নিবো। রজত ভাইয়া তুষার খুব ভালো ছেলে ওই যে মনে নেই ছোট বেলায় আমাদের পাশের বাসায় থাকতো, আমরা তো একসাথেই খেলাধূলা করতাম বলো।

ভাইয়া প্লিজ ব্রো কে তুমিও বুঝিও একটু প্লিজ, প্লিজ,
রজতের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো তুষারের দিকে তাকাতেই তুষার ইনোসেন্ট একটা হাসি দিলো।

রজতের এই মূহুর্তে তুষারকে খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

সূচিকে এক ধমক দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে লজ্জা করে না হবু বরের কাছে এসে এসব বলতে,
কিন্তু রজত তা বলতে পারলো না, বুকের ভিতর টায় কালো মেঘ এসে জমলো। সূচিকে মুখ ফুটে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই সূচি বললো পিংকি কোথায়?
তুষার কিছু বলার আগেই তানিম বললো সৌধ ভাবীকে ভুল বুঝে ভাবীর ওপর ভিষণ রিয়্যাক্ট করে এখান থেকে চলে গেছে।

সূচি কপালে হাত রেখে বললো ওহ গড এই ভাইটাকে নিয়ে আর পারা যায় না, তুষার এখুনি বাসায় যেতে হবে নয়তো ক্যালেংকারি ঘটে যাবে।
প্লিজ কিছু মনে করো না আজ আসি। বলেই রজতের দিকে চেয়ে বললো ভাইয়া আসি কেমন।

সূচি চলে যেতেই তুষারও ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলে যেতে নিলো।
রজত বললো দাঁড়া, তুষার থেমে গেলো।
রজত সামনে গিয়ে বললো দেখ তুষার তুই সূচির জীবন থেকে সরে যা, তুই ও ভাল করে জানিস আর আমিও জানি যে তুই সূচি কে ভালোবাসিস না, সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা কি সেটাই তুই জানিস না। তুই যদি সূচিকে সত্যি ভালোবাসতি, ওর প্রতি বিন্দু ফিলিংস থাকতো তো আমি নিজ দায়িত্বে সূচিকে তোর হাতে তুলে দিতাম। কিন্তু না তুই ওকে ভালোবাসিস না তুই সৌধর ওপর জেদ করে এসব করছিস।

তুষার বিরক্ত মুখ করে রজতকে থামিয়ে বললো আমি বাসি না তো কি হয়েছে সূচি তো বাসে,
রজতের বুকের ভিতর টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে,

দম বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো তুই ওর দূর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস, ভালোবাসার জালে ফাঁসাচ্ছিস,
তুষার চোখ বন্ধ করে বললো আহা, তোর এতো ফাটছে কেনো বোনটাতো তোর না তুই চুপচাপ থাক।
রজত তুষারের গায়ে হাত দিতে যেতেই তানিম থামিয়ে দিলো।

কি করছিস আশে পাশে মানুষ দেখছে।

তুষার বাঁকা হেসে চলে গেলো,
রজত আর এক মূহুর্ত দেরী না করে বেরিয়ে গেলো তানিম কে নিয়ে।
,
নিজের মনের মানুষ যদি চোখের সামনে অন্য কাউকে দেখিয়ে বলে সে তাঁকে ভালোবাসে,
নিজের মনের মানুষ যদি এসে বলে রজত ভাইয়া আমার ভাইকে তুমি বুঝিও।

এতোগুলো দিন ধরে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে আসছি,

এতোগুলো বছর ধরে যাকে বউ করে ঘরে তোলার আশা নিয়ে বেঁচে আছি, এতো গুলো বছর ধরে যার জন্য মনের গহীনে অসীম ভালোবাসা তৈরী করেছি, তাকে কিনা আজ চোখের সামনে অন্যকারো সাথে দেখতে পেলাম, তাঁর মুখে অন্যকারো নাম শুনতে পেলাম, এতোগুলো বছরের ভালোবাসা, এতোগুলো বছরের পবিএ চাওয়ার এটাই প্রাপ্য ছিলো,

তবুও বুঝতাম যাকে চাচ্ছে সে তাঁকে সত্যিকারের অর্থে ভালোবাসে, কিন্তু না ভুল মানুষ কে বেছে নিয়েছে, কি করে সহ্য করবো আমি এসব সৌধ বলতে পারিস তুই কি করে সহ্য করবো।

রাগে শরীর কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে সৌধর।

রজতের মনের অবস্থা বুঝতে তাঁর অসুবিধা হলো না।
সব থেকে বেশী রাগ হচ্ছে নিজের ওপর, নিজের বোনের ভুলের জন্য নিজের বউ কে এভাবে শাস্তি দিলো। পিংকির মুখোমুখি কি করে হবে সৌধ,
পিংকি এতো করে সৌধ কে সব বলার চেষ্টা করলো, এতো কান্নাকাটি করলো তবুও সৌধ পিংকির কোন কথা শুনলো না। নিজের রুমে ছুঁড়ে ফেলে বেশ কড়া কড়া কথা শুনিয়ে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে তালা মেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো।

সামিয়া চৌধুরীর এতো ডাকাডাকি সত্ত্বেও সৌধ ফিরলো না।
রজত ফোন করতেই রজতের সাথে দেখা করতে এসে এসব শুনতে পারছে, ইচ্ছে করছে তুষার কে খুন করতে।
সৌধ বললো রজত চল আমার সাথে,

কোথায়,
তুষারের কাছে আজ কে ওর এমন অবস্থা করবো যা কল্পনাও করতে পারবে না। আমার বোনের এিসীমানায় আসার সাহস ও করবে না কোনদিন।
রজত বললো ভুল ভাবছিস তুই, মনে রাখিস সূচি জরিয়ে আছে, সূচি তুষারকে ভালোবাসে।
সৌধ বললো ভালোবাসা, কিসের ভালোবাসা।

এতোগুলো বছর যা চেপে ছিলাম সব সূচির সামনে নিয়ে আসবো। সব জানার পর নিশ্চয়ই সূচি বুঝতে পারবে তুষার কতটা ভয়াবহ।
রজত বললো সূচি কি সত্যি বুঝবে তুষার ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে আছে সূচির সামনে। শুধু সূচি না প্রত্যেকটা মানুষের কাছেই তুষার খুব ভালো হয়ে আছে নিজের ব্যাক্তিত্ব এমন ভাবে উপস্থাপন করেছে যে তুষারের বিষয়ে নেগেটিভ কিছু তাঁরা ধারনাই করতে পারবেনা।

তাই তুই সূচিকে সব সত্যি বললেও সূচি বুঝবেনা হয়তো বলবে তখন তুষার ছোট ছিলো। অবুঝ ছিলো তাই এমন করেছে।
সৌধ কড়া গলায়, বললো বুঝতে ওকে হবেই,

সামিয়া চৌধুরী মুখ ভাড় করে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। সূচি অপরাধীর মতো মায়ের পাশে বসে ভাবছে সব সত্যি কি বলবো না বলবো না।
সূচি বললো আমি কিছু বলবো, সামিয়া চৌধুরী ধমকে ওঠলেন, কখন থেকে বলছি কি হয়েছে বল।

তোরা কোথায় গিয়েছিলি, সৌধই বা পিংকি কে এভাবে কেনো নিয়ে এলো, এতো রাগারাগির মানে কি। সবেমাএ ছেলে মেয়ে দুটি এক হয়েছে আবার কিসের ঝামেলা বাঁধালি তোরা।
সূচি ঠিক করলো আগে তুষারের কথাটা বলবে তারপর রেষ্টুরেন্টের ঘটনাটা বলবে। মায়ের সাথে খুবই ফ্রি হওয়াতে তুষারের কথা বলতে খুব একটা ভয় হলোনা কিন্তু আমতা আমতা করতে লাগলে,
আসলে আমি, আসলে মানে আমি একটি,

সূচি বলার আগেই সৌধ ড্রয়িং রুমে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করলো।
আসলে তোর ভুলের জন্যই সব হয়েছে, তোর ভুলের জন্য শুধু পিংকি না তুই নিজেও বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছিস।
সূচি চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো, ভাইয়ের চোখে মুখে প্রচন্ড পরিমানে রাগ দেখতে পেলো সূচি। সামিয়া চৌধুরী ওঠে বললো মানে কি বলছিস, কি হয়েছে।
সৌধ সূচির সামনে এসে সামিয়া চৌধুরীর দিকে চেয়ে বললো কাল রজত আর সূচির এনগেজমেন্ট টা সেড়ে ফেলো মা, বাবা তো আছেই আপাতত এনগেজমেন্ট টা হয়ে যাক।
সৌধর কথা শুনে সূচি চমকে ওঠলো। অবাক হয়ে বললো ব্রো,

সৌধ বললো ইয়েস ডিয়ার সিস্টার, রজত এর সাথে কাল তোর এনগেজমেন্ট।
হোয়াট, এসব কি বলছিস ভাইয়া তোর মাথা ঠিক আছে?
সৌধ কঠোর চোখে তাকিয়ে বললো একদম ঠিকাছে,
সামিয়া চৌধুরী বললেন কোনো মা তোর আপত্তি আছে।
সূচি কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৌধ বললো একদমই না কোন আপত্তি নেই।

সূচি অবস্থা বেগতিক দেখে বলেই ফেললো না এটা সম্ভব নয়, আমি তুষার কে ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করবো ব্যাস।
সৌধর মাথার রক্ত ওঠে গেলো ঠাশ করে সূচির গালে চড় বসিয়ে দিলো, সূচি টাল সামলাতে না পেরে সোফায় পড়ে গেলো।

সামিয়া চৌধুরী বললেন সৌধ এসব কি হচ্ছে। এতো বড় বোনের গায়ে কেউ হাত তুলে? রাগটা কন্ট্রোলে আনার চেষ্টা কর।
সৌধ বললো পারছিনা ওর সাহস কি করে এসব বলার।

সূচি কান্না করে দিলো কাঁদতে কাঁদতে বললো- ব্রো আমি ওকে ভালোবাসি, আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমার ওকে চাই।
সামিয়া চৌধুরী মেয়ের কথা শুনে বললো সৌধ, তুষার কে?
সৌধ মায়ের দিকে কঠিন চোখে তাকালো।

ব্যাস মা তুমি আর একটা কথাও বলবে না। জীবন টা পুতুল খেলা নয় যে যাকে খুশি তাকে বিয়ে করার বায়না ধরবে আর তুমি তাকে এনে দেবে। আর আমি বেঁচে থাকতে তুষার কে ওর জীবনে আসতে দেবো না।

সূচি ওঠে বললো ভাইয়া তুই ভুল ভাবছিস তুষার খুব ভালো ছেলে।
সৌধ সূচির কাঁধে ধরে চিৎকার করে বললো ভালো ছেলে তুই কতোটুকু জানিস ওর সম্পর্কে,

সূচি কাঁধে দেওয়া হাত এক ঝটকায় ছাড়িয়ে চিৎকার করে বললো সবটুকু জানি, কেনো এমন করছিস সবটা না জেনে কেনো ওকে ভুল বুজছিস।
সৌধ সামিয়া চৌধুরীর দিকে চেয়ে বললো মা ওকে বুঝাও,

সামিয়া চৌধুরী ছেলে মেয়ের চিৎকার, চেচামেচি শুনে বাকরুদ্ধ। দু’ভাইবোনের এতো মধুর সম্পর্কের মাঝে এতো বড় ফাটল এতো বড় ঝামেলা কি করে হতে পারে সে বিশ্বাস করতে পারছে না।

সূচি কাঁদতে কাঁদতে বললো- ব্রো তুই বিশ্বাস কর তুষার খুব ভালো ছেলে।
সৌধ বললো তুই তোর নিজের ভাইকে বিশ্বাস কর সূচি। তুই জানিস না তুষার পিংকি কে ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে ড্রিংক করিয়ে ওর সাথে বাজে কিছু করার চেষ্টা করেছিলো।

সামিয়া চৌধুরী আঁতকে ওঠলেন। সূচি দুকান চেপে চিৎকার করে ওঠলো না বিশ্বাস করিনা। তুই ভুল জানিস সেদিন পিংকি নিজে গিয়েছিলো। আর ড্রিংক ও নিজেই করেছিলো তুষার নিষেধ করা সত্ত্বেও পিংকি শুনে নি।

উপর থেকে পিংকি সব কথা শুনছিলো যখন এই কথা শুনলো চমকে ওঠলো। তুষার এই মিথ্যাটা সূচিকে কেনো বললো। সেদিন তো তুষারই আমাকে বলেছিলো ড্রিংক করে নিজের কষ্ট দূর করতে। আর আমিও রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ড্রিংক করেছিলাম। তুষার তো আমায় নিষেধ করে নি।
তার মানে কি সৌধ ঠিক

বলছে তুষার খারাপ ছেলে।
সৌধ রেগে গিয়ে আরো কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই সামিয়া চৌধুরী বললেন সৌধ, তমাল খানের ছেলে তুষার,
সৌধ বললো হ্যাঁ মা হ্যাঁ। এবার বুঝতে পারছো কেনো আমি বলছি। সামিয়া চৌধুরী রেগে গেলেন কড়া গলায় বললেন সৌধ কালকেই রজত এর সাথে সূচির এনগেজমেন্টের ব্যবস্থা করো।

সৌধ কিছুটা শান্ত হলো কিন্তু বিপদ ঘটালো সূচি। পুরো ড্রয়িং রুমের সব কিছু ভাঙচুর করতে শুরু করলো। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো আমি তুষার কে ভালোবাসি আর ওকেই চাই

সৌধ সেখান থেকে চলে গেলো। সামিয়া চৌধুরী সূচিকে শান্ত করার চেষ্টা করলো সব বুঝানোর চেষ্টা করলো সূচি কোন কথাই শুনলো না। ড্রয়িং রুম ছেড়ে দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। সামিয়া চৌধুরী তারাতারি আকাশ চৌধুরী কে ফোন করে বাড়ি আসতে বললো।
এদিকে পিংকি রুমে গিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো।

সৌধ রুমে আসতেই পিংকি চোখ মুখ মুছে ওঠে রুমের বাইরে যেতে নিতেই সৌধ হাত আটকে ধরলো। একটানে নিজের সামনে নিয়ে এলো।
পিংকি অভিমানে চোখ অন্যদিক করে রাখলো।

সৌধ পিংকির গালে স্পষ্ট ফুটে ওঠা পাঁচ আঙুলের দাগের ওপর আলতো করে হাত রাখলো। পিংকি ব্যাথায় গাল সরাতে নিতেই সৌধ চট করে এক হাতে মুখ এগিয়ে গালে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো।

পিংকি সৌধর থেকে সরে গেলো। সৌধ আবারো নিজের কাছে নিয়ে এক হাতে কোমড় জরিয়ে আরেক হাতে নিজের কানের লতি তে ধরে বললো সরি,
পিংকি তবুও মুখ ফিরিয়ে রইলো।

সৌধ আর কিছু না বলে বললো খুব খিদে পেয়েছে কিছু খাবাড় আনোতো, উপরেই খাবো।
পিংকি সৌধকে ছাড়িয়ে নিচে চলে গেলো।

এই বিশ্বাস আমার প্রতি এই ধারনা তোমার ছিঃ।
তোমার প্রতি যা দায়িত্ব যা কর্তব্য সেটাই পালন করবো। দরকার নেই ভালোবাসার। অতগুলো মানুষের সামনে এভাবে আমাকে থাপ্পড় দিলে। সন্দেহ করে আমার গায়ে না সৌধ আমার মনে আঘাত করেছো তুমি। এতো করে বোঝাতে চাইলাম আমাকে কোন সুযোগ ও দিলে না তুমি। এই তোমার ভালোবাসা, এই তোমার প্রতিশ্রুতি।

পিংকি খাবাড় নিয়ে যেতেই সৌধ খেতে শুরু করলো পিংকি ওঠে যেতে নিলেই বললো কোথায় যাচ্ছো এখানেই বসো কড়া গলায় কথাটা বললো সৌধ।
যা পিংকি কে আরো দ্বিগুন রাগিয়ে দিলো।
নিজে ভুল করে আবার নিজে খবর দাঁড়ি করছে,

এক লোকমা খাবাড় পিংকির সামনে ধরতেই পিংকি মুখ ফিরিয়ে নিলো। সৌধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে তাকালো,
আবারো সিনক্রিয়েট হওয়ার ভয়েই পিংকি খাবারটা মুখে পুরে নিলো অন্যদিকে চোখ রেখে।
এভাবে নিজেও খেলো এবং নিজের প্রিয়তমাকেও খাওয়ালো।

সৌধ পিংকির এত্তো অভিমান দেখে বাঁকা হাসলো।

বউ রাগ করেছে বউ এর ভাঙানোটাই বেশী জরুরি।
খাবাড় শেষে পিংকি সব গুছিয়ে নিচে রেখে এলো। ভাবলো আজ সূচির সাথে ঘুমাবে কিন্তু সূচি তো রুমে দরজা লাগিয়ে রেখেছে। যাই গিয়ে নক করি পিংকি যেতে নিতেই দেখতে পেলো আকাশ চৌধুরী সূচির কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েকে বুঝাচ্ছে।
বাবা মেয়ের মাঝখানে সে আর গেলো না।

মুখ ভাড় করে সৌধর রুমের সামনে পাইচারি করতে লাগলো।
হঠাৎ সৌধ পিংকিকে ডাকতে শুরু করলো,
পিংকি শুনেও না শুনার ভান করে রুমের সামনে থেকে আস্তে করে সরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে সৌধ টেনে রুমের ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা লক করে দিলো।

পিংকি সৌধর হাতের শক্ত বাঁধন ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো। সৌধ নিজর দিকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো বললাম তো সরি বউ, ভুল হয়ে গেছে কেনো রেগে আছো এখনো।

পিংকি রেগে বললো আমি কারো বউ না।
সৌধ বললো কি বললে, পিংকি জোর গলায় বললো আমি কারো বউ না।

সৌধ কড়া গলায় বললো কি বললে,
আমি কারো বউ না।

সৌধ আবার জিগ্যাস করায় পিংকি আবার বললো কথাটা। বলেই সৌধর দিকে চোখ পড়তেই এক ঢোক গিললো। সৌধ পিংকির দুগালে চেপে ধরে ঠোঁটে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিলো। পিংকি চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো।

ঘনঘন শ্বাস নিতে থাকলো, পিংকির ঘনশ্বাসের নীরব শব্দে সৌধর বুকে উথাল পাথাল ঢেউ খেলে গেলো।

সৌধ পিংকির ওড়না টা সরিয়ে দিয়ে পিংকি কে পাজাকোল করে নিয়ে বিছানায় যেতে যেতে বললো বউ না, কি সেটা বুঝাচ্ছি ওয়েট।
পিংকি হাত পা ছুটাছুটি করতে লাগলো।
তুমি আমাকে একদম ছুঁবে না সৌধ,

তুমি আমাকে সবার সামনে অপমান করেছো, অসম্মান করেছো।
সৌধ বাঁকা হেসে বললো সব পুষিয়ে দিচ্ছি সোনা, ওয়েট।
কামিজের একপার্ট ওঠিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়িয়ে দিলো সৌধ, পিংকি আর কিছু বলতে পারলো না। তাঁর পুরো শরীর অবশ হয়ে গেলো। শ্বাস ঘন হতে শুরু করলো।

সৌধ ধীরে ধীরে তাঁর পুরো শরীরে আলিঙ্গন করতে লাগলো। পুরো গালে আদরে আদরে ভরিয়ে দিলো। পিংকি ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে লাগলো সৌধর পিঠ খামচে ধরলো, সৌধ পিংকির কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো সরি বউ। এমন ভুল আর কখনো হবে না। পিংকির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
স্বামীর চোখে অবিশ্বাস দেখলে একজন স্ত্রীর কতটা কষ্ট হয় তা শুধু একজন স্ত্রীই বোঝে।

আর স্ত্রী কে কষ্ট দেওয়ার পর সেই কষ্ট কীভাবে দূর করতে হয়, কিভাবে স্ত্রীর অভিমান ভাঙাতে হয় সেটা সৌধ খুব ভালো করেই জানে।
তাই পিংকির কষ্ট টা সৌধ লাঘোব করে তাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো,
কোন রাগ, অভিমান করার সুযোগ না দিয়ে নিজের ভালোবাসার উন্মাদনায় মাতিয়ে রাখলো।

পর্ব ১৩ (Romantic Love story BD)

ফজরের সময় সৌধর ঘুম ভাঙতেই পিংকি কে ওঠিয়ে দুজন একসাথে শাওয়ার নিয়ে এসে একসাথেই নামাজ পড়ে নিলো। সৌধ জায়নামাজ থেকে যখনি ওঠতে নিবে ঠিক তখনি পিংকি সৌধর এক হাত চেপে ধরলো। সৌধ বুঝতে পারলো তাঁর সহধর্মিণী চাইছে না এখন সে ওঠে যাক মৃদু হেসে পিংকির পাশে কিছুটা চেপে বসলো। পিংকি বললো

সৌধ, আমার কিছু কথা বলার আছে, সৌধ পিংকির গলায় সিরিয়াস স্বর শুনে হালকা কেশে বললো প্লিজ, কালকের বিষয় টা ছাড়ো না।
পিংকি বললো কালকের বিষয় না এই কথাগুলো প্রত্যেকটা স্বামী স্ত্রীর ই জানা উচিত।

খুব ছোটবেলায় বাবা-মায়ের মধ্যে ভীষণ ঝামেলা হয়েছিলো, আর বাবা মা কে এই কথাগুলো বলেছিলো। আমি সেদিন বাবার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম। সত্যি বলতে বাবার প্রত্যেকটা কথার মাঝেই কিছু একটা ছিলো। তাঁর সব কথা এতোটাই মন দিয়ে শুনতাম যে এখন সেগুলো আমাকে সঠিক পথ দেখায়, ভালো মন্দ বাছাই করতে সুবিধা হয় তাঁর কথাগুলো তার আদেশ -উপদেশ গুলো মেনেই জীবনে এতটুকু এসেছি।

হয়তো তিনি নেই কিন্তু তাঁর বলা প্রত্যেকটা কথা আজো আমার মাঝে বিরাজ করে আমার কাজের মধ্যে, আমার স্বভাব আচরনে আমিই নিজেই ফিল করি আমি তাঁর কন্যা।

সৌধ, স্বামীস্ত্রীর মাঝে যখন অবিশ্বাস ঢুকে পড়ে তখন সেই সম্পর্কের বাঁধন আলগা হতে শুরু করে।
সৌধ পিংকি হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো।

পিংকি ভারী একটা শ্বাস নিয়ে বললো -আমি খুব খুশি সৌধ যে আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসছে, প্রচন্ড পরিমানে ভালোবাসছে, আমার স্বামী নিজে আমাকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে সে নিজেও পড়ছে। এতোটা পরিবর্তন দেখে সত্যি আমি প্রাউড ফিল করছি। কিন্তু ভালোবাসার চাবিকাঠিই তো বিশ্বাস, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সর্ব প্রথম থাকতে হবে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, তারপর থাকতে হবে বিশ্বাস। বিশ্বাসই তো স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক দৃঢ় করবে।
তোমার এই মাথা গরম, এতো রাগ, একটা কিছু দেখে না বুঝে না শুনে হুট করে মাথা গরম করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এসব চেঞ্জ করতে হবে সৌধ।
“অতিরিক্ত রাগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, অবিশ্বাস, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না ভাবা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ হয়ে থাকে।
মানুষকে দুনিয়ায় দেওয়া আল্লাহর অন্যতম নিয়ামত হলো ঘর-সংসার। যাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলা চলে।

যে নিকেতনের ছায়াতলে মানবগোষ্ঠী ভালোবাসা ও অনুকম্পা, নিরাপত্তা ও পবিত্রতা এবং মহৎ জীবন ও শালীনতা লাভ করে। মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে কখনও কখনও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়- যেখানে কোনো ভালোবাসা ও প্রশান্তি সুদৃঢ় হয় না; ফলে ক্ষেত্রবিশেষ দাম্পত্য সম্পর্ক অটুট রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। এমন বিশৃংখল অবস্থার কারণ কখনও কখনও হয়ে থাকে আভ্যন্তরীণ আবার কখনও বহিরাগত।

সৌধ পিংকির দুহাত আঁকড়ে ধরে বললো স্ত্রী ভুল করলে স্বামীর যেমন দায়িত্ব সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার, তেমন স্বামী ভুল করলেও স্ত্রীর দায়িত্ব তাঁকে তাঁর ভুলটা সুদরে দেওয়ার।

পিংকির চোখে পানি চিকচিক করছে, কাঁপা গলায় বললো আমি বিশ্বাস চাই সৌধ,
আমি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা এসবই চাই এর বেশী কিছু চাইনা।
সৌধ পিংকির দুগালে আলতো করে ধরে কপালে চুমু খেলো।

” সরি বউ, আর এমন হবে না। তোমার বরের একটু মাথা গরম বোঝোই তো। এই একটা রোগই আছে।
এটা একটু মানিয়ে নাও দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

পিংকি মাথা নাড়ালো।
সৌধ জায়নামাজ থেকে ওঠে গিয়ে ঘুমানোর প্রিপারেশন নিচ্ছে এমন সময় পিংকি সৌধর মাথায় তিনটা ফুঁ দিলো। সৌধ তাকাতেই পিংকি মৃদু হেসে বললো আমার বরটার রাগটা যেনো উপরওয়ালা একটু কমিয়ে দেয়, তাই কিছু দূয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলাম। সৌধ তাই নাকি বলেই পিংকিকে একটানে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে পিংকির বুকে মুখ গুজে ধীর গলায় বললো যতোক্ষন ঘুমাবো ততোক্ষন ওঠবে না। দেখবে তোমার বরের রাগ এমনিতেই কমে গেছে।

পিংকি সৌধর কথায় মনে মনে বেশ খুশি হলো আবার লজ্জাও পেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো কিন্তু আমার তো ওঠতে হবে। সকালের খাবাড়টা তো তৈরী করতে হবে নাকি। সৌধ বললো জবা আছে কি করতে, মা ও আছে সো তুমি ওঠবে না। আর কোন কথা নয়।

সৌধ মা টু আছে বাট আমার এটা দায়িত্ব, ছেলের বউ থাকতে ওনি কেনো কষ্ট করবে।
সৌধ কড়া গলায় বললো আমি যা বলেছি তাই হবে।

পিংকি গাল ফুলিয়ে বললো আমার বরটা এমন অবুঝ কেনো কে জানে,
সৌধ পিংকির শরীরের ঘ্রান নিতে নিতে চোখ বন্ধ করেই বললো আমার বউ টা এতো বোঝদার বলেই তো আমি এতো অবুঝ।

সৌধ যখন ঘুমে বিভোর তখনি দরজায় নক করলো জবা, ভাবী ও ভাবী তারাতাড়ি ওঠেন।
পিংকি চমকে গেলো, সৌধ যে গভীর ঘুমে মগ্ন, এখন ঘুম ভাঙালেই ক্ষেপে যাবে। এমন ভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে যে একটু নড়াও সম্ভব নয়।
আস্তে করে বললো তুমি যাও আমি আসছি।

পিংকি সৌধ কে আস্তে করে সরানোর চেষ্টা করতেই সৌধ আরো গভীর ভাবে জরিয়ে নিলো। এবার সৌধর মুখ গিয়ে ঠেকেছে তাঁর ঘাড়ে, সৌধর গরম শ্বাস ক্রমাগত তাঁর ঘাড়ে পড়ছে। যার ফলে শরীর তাঁর শিরশির করছে। সৌধ যখন আরেকটু নড়ে পিংকিকে জরিয়ে নিলো সৌধর ঠোঁট জোরা গিয়ে ঠেকলো পিংকির গলায়।

পিংকির পুরো শরীর শিউরে ওঠলো। মনে মনে বললো এই সৌধ টা তো বড্ড পাজি নিজে ঘুমাচ্ছে আর আমাকে জ্বালাচ্ছে দেখাচ্ছি মজা,
পিংকি নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে দুহাতে এক ধাক্কা দিয়ে সৌধকে সাইটে সরিয়ে ফেললো। সৌধর ঘুম একদম আলগা হয়ে গেলো এভাবে ঘুম ভাঙাতে মেজাজ টা প্রচন্ড বিগরে গেলো।

প্রচন্ড জোরে ধমকে ওঠলো, পিংকি কেঁপে ওঠলো চোখ বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। সৌধ আবার ও বালিশে মুখ গুজে শুয়ে পড়লো।
পিংকি মুখ ফুলিয়ে সৌধর উন্মুক্ত পিঠের দিকে রাগি দৃষ্টি তে তাকিয়ে রইলো।

মনে মনে বিরবির করে সৌধকে কয়েকটা বকা দিলো। হাত দিয়ে ইশারায় মার দিতে চেয়ে আবার ঢোক চিপে একরাশ অভিমান নিয়ে তয়ালে টা মাথা থেকে খুলে মাথায় ওড়না চেপে বেরিয়ে গেলো।
,
সূচি সারারাত কান্নাকাটি করেছে, দুচোখের পাতা এক করে নি সে। তুষার ও তাঁর ফোন তুলছে না। সব যেনো থমকে গেছে তাঁর, নিজের বাবাকেও বুঝাতে পারেনি। কেউ তাঁর কথা তাঁর ভালোবাসা, তাঁর আবেগ বুঝতে চায় নি কেউ না।

পিংকি নিচে যেতেই সামিয়া চৌধুরী বললেন আজকে রজতদের বাড়ির সবাই আসবে, দুপুরের পর শাড়ি পড়বে, আর সূচিকেও পড়াবে মেয়েটার মনের অবস্থা ভালো না, ছেলে মেয়ে দুটোই বড্ড জেদি। কাল রাতে না খেয়েই ছিলো তুমি এটা নিয়ে ওকে একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করো প্লিজ।
পিংকি সামিয়া চৌধুরীর থেকে খাবড় টা নিয়ে বললো তুমি চিন্তা করো না আমি দেখছি,

পিংকি খাবাড় নিয়ে সূচির রুমে যেতেই সূচি চিৎকার করে ওঠলো।

কেনো এসেছো তুমি চলে যাও, চলে যাও আমার সামনে থেকে। তোমার জন্যই আজ এসব হচ্ছে।
পিংকি চমকে ওঠলো অবাক চোখে সূচির দিকে তাকালো। সূচির চোখে মুখে রাগ, অভিযোগ স্পষ্ট।

হ্যাঁ, তুমি যদি সেদিন জেদাজেদি না করে তুষারের বাসায় যেতে আজ এসব হতো না। তোমার বাড়াবাড়ির জন্য সব দোষ তুষারের হলো।

পিংকি সূচির মনের অবস্থা বুঝে রাগ না করে খাবাড় টা টেবিলে রেখে সূচির কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললো সূচি, তুমি ভুল করছো আমি সেদিন ওখানে ইচ্ছে করে যাইনি। তুষারই আমাকে খানিকটা জোর করেছিলো রাগের মাথায় আমিও চলে গেছি, আর ড্রিংক করতে তুষারই আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলো। রাগের মাথায় আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ওর কথা শুনে নিয়েছিলাম।

সূচি যেনো ফুঁসে ওঠলো এক ঝটকায় পিংকির হাত ছাড়িয়ে বললো ছিঃ লজ্জা হওয়া উচিত রাতের বেলা একটা ছেলের বাসায় গিয়ে নিজের ইচ্ছায় ড্রিংক করে এখন মিথ্যা বলছো।

আমি কোন মিথ্যা বলছি না সূচি তুষারই তোমায় মিথ্যা বলছে। কিন্তু কেনো সেটা জানিনা।

ব্যাস, আর একটা কথাও তুমি বলবে না। বেরিয়ে যাও এখান থেকে, বেরিয়ে যাও।
সূচির চিৎকার চেচামেচি শুনে সামিয়া চৌধুরী আর জবা দৌড়ে এলো।

পিংকির দিকে তাকাতেই দেখতো পেলো নিঃশব্দে কাঁদছে,
সামিয়া চৌধুরী সূচি কে ধমকে ওঠলো।

সূচি তুই এবার বাড়াবাড়ি করছিস,

বাড়াবাড়ি আমি করছিনা মা তোমরা সবাই করছো।
একজন মানুষের সম্পর্কে না জেনে তাকে তোমরা ভুল বুঝছো,

নিজের মেয়ের আবেগ, ভালোবাসা কে মাটি চাপা দিয়ে দিচ্ছো।
সামিয়া চৌধুরী বললেন হ্যাঁ ঠিক বলেছিস আবেগ,

ভালোবাসা না। আবেগের বসে তুই নিজের ক্ষতি নিজেই করছিস। আমি বেঁচে থাকতে এটা কোনদিন হতে দিবো না। আমার সন্তানদের কোন ক্ষতি আমি হতে দিবো না।

সূচি সামিয়া চৌধুরীকে জরিয়ে ধরে ডুঁকরে কেঁদে ওঠলো। পিংকি চোখের পানি মুছে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। জবা পিছন পিছন গেলো।
” মা আমি তুষার কে খুব ভালোবাসি,

সেই কোন ছোটবেলা থেকেই আমি ওকে মিস করি মা। কিন্তু বড়বেলা যখন ওর সাথে আমার দেখা হলো তারপর থেকেই ওর প্রতি আমার একটা অনুভূতি কাজ করে। আমার ওকে চাই মা ওকে চাই।

ভালোবাসি ওকে আমি। রজত ভাইয়া কে আমি মেনে নিতে পারবো না কখনোই না। বিশ্বাস করো মা আমি নিজের আবেগ, ভালোবাসা কে মাটি চাপা দিয়ে বাঁচতে পারবো না।

সামিয়া চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, মা রে,
“বাস্তবতার ভীড়ে
সব

আবেগ যাবে উড়ে, (জান্নাতুল নাঈমা)
আমার মেয়েটা যে অনেক সরল তাই কিছু মানুষ সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে আমার মেয়েটা কে কষ্ট দিচ্ছে কিন্তু আমি তো সেটা হতে দিতে পারিনা রে মা।
তোকে আজ আমি অনেক বড় একটা সত্যি জানাবো রে মা। সূচি মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকালো।

সামিয়া চৌধুরী চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে সূচিকে বিছানায় বসিয়ে নিজেও বসলো।

তারপর বলতে শুরু করলো অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া এক সত্যি ঘটনা,
তোর শিহাব কে মনে আছে সূচি,

সূচি চমকে গেলো, সেই সাথে বুক টা ধক করেও ওঠলো। অবাক স্বরে বললো হ্যাঁ মনে আছে, আমরা তো একি বাসায় থাকতাম, ওর ছোট বোন ছিলো শিফা, ছোট বেলার খেলার সাথীদের মধ্যে তো শিহাব ও ছিলো।

কিন্তু ও তো ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়,
তারপরই তো আমাদের ছাদে খেলা নিষেধ করে দাও। আর তুষারও তাঁর কিছুদিন পরেই চলে যায়। ওর পরিবারের সাথে। এই দুটো মানুষ চলে যাওয়ার পর তো আমার আর খেলার সাথী হয়েই ওঠেনি।

সামিয়া চৌধুরী মেয়ের সরল ভনিতা, সরল কথা গুলো শুনে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন -শিহাবের মৃত্যু টা শিহাবের ভুলে হয়নি, হয়েছে তুষারের ভুলে, তুষার এর হিংসা, আক্রোশের কারনে।

ঐটুকু একটা বাচ্চা ছেলের মনে যে এতো হিংসা, আক্রোশ থাকতে পারে সেটা আমাদের সবার ধারনার বাইরে ছিলো।
সূচির বুকের ভিতরটায় অস্থিরতায় ভরে গেলো।

মায়ের মুখোমুখি হয়ে বললো কি বলছো এসব, এসবের মানে কি?
সামিয়া চৌধুরী বললেন হ্যাঁ। এসব কথা তোকে বলতে চাইনি, তোকে কেনো এই সত্যি ঘটনাটা কেউ জানেনা, শুধু তুষারের পরিবার, আমার পরিবার আর রজত ছাড়া।

সূচি অবাক চোখে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
চোখে মুখে জানার তীব্র আকাঙ্খা,
সামিয়া চৌধুরী বললেন সর্বপ্রথম আমি তোকে একটা কথা বলে নিতে চাই –
“বৃক্ষ থেকে বৃক্ষই জন্মায়,

“আম গাছে আম ই ধরে,
আম গাছে কখনোই কাঁঠাল ধরে না।

আর একটা কথা গবরে পদ্যফুল সব সময়ই হয়না।

তুষারের বাবা ছিলো শহড়ের নাম করা গুন্ডা -মস্তানদের মধ্যে একজন। এদেশে ধরা খেয়ে পরিবার ছেড়ে বিদেশ চলে গিয়েছিলো। আর তাঁর ছয় বছরের ছেলে খুনের মতো জঘন্য অপরাধ করার ফলে বাচ্চা ছেলেকে বাঁচানোর জন্য পুরো পরিবার দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তাদের মনে ভয় ছিলো যদি বাচ্চা ছেলেকে কারাদণ্ডে রাখা হয় বা ফাঁসি দেওয়া হয়।

ক্ষতি কারো হয়নি, ক্ষতি হয়েছে শিহাবের মা-বাবার।

শেষ হয়ে গেছে একটা নিষ্পাপ প্রান, আর মানুসিক আঘাত পেয়েছে আমার ছেলে।

চোখের সামনে শিহাবের মৃত্যু দেখেছে, ওর চোখের সামনে তুষার শিহাব কে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।
সূচি আঁতকে ওঠলো। চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো।

সামিয়া চৌধুরী বললো কেনো করেছে এই কাজ জানিস,

সূচি চোখ খুলে তাকালো ভয়ার্ত চোখে,
সামিয়া চৌধুরী বললেন শিহাব আর তুই সবসময় একসাথে থাকতিস বলে, একসাথে খাওয়া, পড়া, একসাথে স্কুল যাওয়া, একসাথে ঘুমানো এই সব তুষার সহ্য করতে পারেনি। ঐটুকু বাচ্চার মনে এতোটা রাগ এতোটা হিংসা ভাবতে পারিস তুই।

তোর জন্মদিনে শিহাব তোর মতো একটা মেয়ে কে আর্ট করেছিলো হাতে একগুচ্ছ গোলাপ দেওয়া ছিলো। সেই আর্ট করা পেইজটাও তুষার ছিঁড়ে ফেলেছে। তুষার চাইতো তুই শুধু ওর সাথে খেলাধূলা করবি। তুই শুধু ওর বেষ্টফ্রেন্ড হয়ে থাকবি।

যখন দেখলো তোর আর শিহাবের মধ্যে এতো ভাব তখন থেকেই শিহাবের সাথে ঝামেলা শুরু হয়,
তোকে কিছু না বলে শিহাবের সাথে ঝগরা করতো,

ওইটুকু বয়সে ও কি বুঝতো বল, কিন্তু ও এমন একটা, পরিবারের সন্তান যে ঐটুকু বয়সে অন্যের সাথে ঝামেলা করা, নিজের স্বার্থ দেখা, হিংসা করা, হিংসার বশীবত হয়ে অপরের ক্ষতি করে দেওয়া, খুব ভালো করেই আয়ত্ত করে ফেলেছিলো।

“মানব চরিত্রে যেসব খারাপ অভ্যাস আছে, তারমধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ খুবই ক্ষতিকারক।

ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষাকাতরতা, দ্বন্দ্ব ও কলহ-বিবাদ মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনকে অত্যন্ত বিষময় ও দুর্বিষহ করে তোলে।

এতে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) বলেন, তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বাঁচো। কেননা, হিংসা মানুষের নেক আমলকে এমনভাবে ধ্বংস করে, যেভাবে আগুন লাকড়িকে জ্বালিয়ে দেয়। ’

দোষটা ওর ছিলো না ছিলো ওর পরিবারের যে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেনি। আর সেই একি শিক্ষায় এখনো আছে, কুকুরের লেজ কখনোই সোজা হয় না। তাইতো তোর সাথে জঘন্য খেলায় মেতে ওঠেছে।

সৌধর উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই তোকে বেছে নিয়েছে।
মানে,

সেদিন তুই দুপুরে ঘুমিয়েছিলি। শিহাব ছাদে ছিলো, তুষার এসে শিহাবের সাথে ঝগরা লাগায়, ঝগরায় এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যেই বেশ মারামারি লাগে। ঠিক সেময়ই সৌধ ছাদে গিয়ে এসব দেখতে পারে।

তুষারকে নিচে ফেলে শিহাব ওর উপরে ওঠে

ঘাড়ে কামড় বসায়, এতে তুষার রেগে গিয়ে ওঠে শিহাবকে টেনে ছাদের কিনারায় নিয়ে ধাক্কা দেয়।

সৌধ বুঝে ওঠতে পারেনি এমন ঘটনা মূহুর্তেই ঘটে যাবে। তখন থেকেই আমার এতো শান্তশিষ্ট ছেলেটা কেমন বদলে যায় ৷

সেদিন সৌধ অমন ঘটনা দেখে ভয়ে নিচে আসতে নিতেই তুষার সৌধ কেও জাবটে ধরে কয়েকটা মার ও দেয়। এমনকি সৌধ কেও টেনে ছাদের কিনারায় নিয়ে যায় ফেলে দেওয়ার জন্য। দুজনের মাঝেই বেশ ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়।

সৌধ কাঁদতে কাঁদতে বলে আমাকে ছেড়ে দে,

তুষার বলে আব্বু বলেছে অপরাধ করলে কোন প্রমান রাখতে নেই। তুই তো সবাইকে বলে দিবি তাই তোকেও ফেলে দিবো। নয়তো সবাই আমাকে বকবে, মারবে। সৌধর জোরে কান্না শুনতে পেয়েই আমি ছাদে যাই ছুঁটে আর গিয়ে দেখি আমার ছেলেটাকে তুষার জাবটে ধরে টানছে ছাদের কিনারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর আমার কলিজাটা ছটফট করছে বাঁচার জন্য। আর অন্যদিকে নিচে চেঁচামেচি আমি তাঁরাতারি গিয়ে সৌধকে ছারাতেই তুষার ছুটে পালালো।

সৌধর ভয়ে হেচকি ওঠে যায় ও আমাকে কিছু বলতে পারেনা। আমি নিচে কোলাহল শুনে কান্নাকাটি শুনে উপর থেকে নিচে চাইতেই দেখি শিহাবকে এম্বুলেন্স করে নিয়ে যাচ্ছে।

পর্ব ১৪

তুষার ভয়ে ওর পরিবারের কাছে সব খুলে বলে।

তুষারের মা এসে হাতজোর করে অনুরোধ করে বাচ্চা মানুষ ভুল করে ফেলেছে। আপনারা দয়া করে এসব কথা বাইরে বলবেন না। কিন্তু সৌধর কান্নাকাটি সেই সাথে তুষারের ওপর রাগ, জেদ থেকেই সবটা তার বাবাকে বলে দেন। শিহাবের মৃত্যুর খবর আসার পর সৌধ কেমন একটা হয়ে যায়, বার বার তুষার কে মারতে যেতে চায়। শিহাবের পুরো পরিবার পাগলের মতো হয়ে যায়। সৌধ তখনি সব সত্যিটা শিহাবের পরিবার কে জানিয়ে দেয়।

কিন্তু তুষারের পরিবার এটাই প্রুভ করার চেষ্টা করে সৌধও বাচ্চা, তুষারও বাচ্চা, শিহাবও বাচ্চা ছিলো।
তাই এখানে কেউ খুনি হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা।

ওরা সবাই একসাথে খেলাধূলা করতো, এক্সিডেন্টলি ঘটে গেছে সব। থানা অবদি রিপোর্ট গেলেও সেটা আর কোর্ট অবদি যায় নি। বয়স বিবেচনায় কেসটা ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু সৌধ ভুলতে পারেনা সব মনের ভিতর তীব্র জেদ চাপে তাঁর। তুষারের ওপর ঘৃনা, রাগ থেকেই বার বার তুষারকে আঘাত করতে যায়।

আমার তখন ছুটি প্রায় শেষের দিকে, তোর সবটা মনে আছে কিনা জানিনা তুই জিগ্যাস করতি মাম, ভাইয়ুর কি হয়েছে,
আমি বলতাম এমনি বন্ধু দের সাথে ঝগরা আর প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর জন্য কষ্ট থেকে এমন করছে।

আমি পড়ে যায় ভীষন টেনশনে এক বাচ্চার থেকেই তো আরেক বাচ্চা শেখে ভালো হোক মন্দ হোক।
আমার ভয় হতে লাগলো সৌধ যদি তুষারকে কোনভাবে এট্যাক করে,

আমার ভয়টাই সত্যি হলো সৌধ সেদিন সত্যি তুষারকে চাকু দিয়ে মারতে গিয়েছিলো। তখনি আমি তুষারের পরিবারকে বলি আপনারা এখান থেকে প্লিজ চলে যান। যতোদিন আপনারা চোখের সামনে থাকবেন আমার ছেলে স্বাভাবিক হতে পারবে না।

সেদিন ওদের কথাগুলো বলে কিছুদিনপর আমি নিজ দায়িত্বে তোর বাবাকে জানিয়ে বাসাটা চেঞ্জ করি। আর নিজেদের বাড়িতে চলে আসি, তারপর থেকেই কাজের জায়গায় আমি একা থাকি তোদের বাড়িতেই রাখাতাম দাদী, ফুপিদের কাছে।

না সৌধ কে না তোকে সময় দিতে পারতাম। কাজের জন্য তোদের থেকে আলাদা থাকতেই হতো। আর এই দিকে সৌধ ও কেমন যেনো হয়ে গেলো। রাগ, জেদ বড্ড বেশী হয়ে গেলো ওর। কারো কথা শুনার প্রয়োজন মনে করতো না নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সব করতো,
সূচি একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলো।

সামিয়া চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকালো।

সূচি মেঝেতে দৃষ্টি স্থির রেখে কাঁপা গলায় বললো মা তুষার আমাকে ভালোবাসে বিশ্বাস করো, কোন অভিনয় না।

সামিয়া চৌধুরী বললেন তুই মিথ্যা আশায়, আছিস তুষার তোকে ভালোবাসেনা, ওর মধ্যে ভালোবাসার মতো কোন মনই নেই। ও মুখোশ, পড়ে আছে।
সূচি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো সামিয়া চৌধুরী কে জরিয়ে ধরে।

সামিয়া চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো মা রে রজত তোকে অসম্ভব ভালোবাসে৷
ছেলেটা আজ অবদিও কিছু প্রকাশ করেনি ঠিকি কিন্তু তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তুই রজতের সাথে অনেক সুখে থাকবি মা। নিজের বাবা-মা কে একটু ভরসা কর।

“কিভাবে করবো মা, আমি যে তুষারকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছি, সেখানে আমি রজত ভাইয়াকে কি করে মেনে নেবো”
“রজত ভাইয়া কে আমি ভাইয়ের নজরে দেখে এসেছি।

ও মা তুষার তো পালটে যেতেও পারে, মা গো তুষার তো এখন বদলে যেতেও পারে, তখন তো তুষার ছোট ছিলো।
সৌধ এসে কড়া গলায় বললো কিন্তু তুষার পালটে যায় নি।

সূচি থেমে গেলো, নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো সে।

সামিয়া চৌধুরী সৌধ বলতেই সৌধ সামিয়া চৌধুরী কে থামিয়ে দিয়ে এগিয়ে সূচির পাশে বসে বললো “আমি যদি তুষারের চোখে তোর জন্য বিন্দু ভালোবাসাও খুঁজে পেতাম তো নিজ দায়িত্বে তোকে ওর হাতে তুলে দিতাম”।

সূচি অশ্রু মিশ্রিত চোখে তাকালো সৌধর দিকে।

সৌধ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো কাল থেকে তো খুব ট্রাই করছিস পেয়েছিস তুষারকে?
সূচি চমকে ওঠলো, অবাক চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালো,

তুই কি করে জানলি, তুষারের ফোন কেনো বন্ধ,
ওর কিছু হয়নিতো, তুই ওকে কিছু করিসনিতো,
সূচির ভয়ার্ত, ব্যাস্ত মাখা গলা শুনে সৌধ বাঁকা হাসলো। সূচির মাথায় হাত রেখে বললো বোনটা আমার বড্ড বোকা।

সূচি এক ঢোক গিললো, চোখ বেয়ে অঝড়ে জল পড়ছে তাঁর।

সামিয়া চৌধুরী বললেন কি হয়েছে সমস্যা কি?
সৌধ বললো বুঝতে পারছো না, জানের ভয়ে ভালোবাসা উড়ে গেছে।

সামিয়া চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সূচি বললো মানে,
মানেটা খুব সহজ আমি কি জিনিস সেটা তুষার ভালো করেই জানে, আর ওর মনেও জানা আছে যে ও ঠিক কি করছে, তো আর কি কাল রাতে রজত সহ আরো কয়েকজন তুষারের সাথে দেখা করে। আর বলে তোর পরিবারের লোক কে আমাদের সামনে ফোন কর, আর জানা যে তুই সূচিকে ভালোবাসিস আর ওকেই বিয়ে করবি।

এই হয়ে গেলো গন্ডগোল তুষার কোনভাবেই ফোন করবে না।

অনেক জোরজবরদস্তি করে তুষারের ফোন নিয়ে ডায়ললিষ্টে যায় রজত সেখানে যেতেই দুটো নম্বর দেখতে পায়, একটা নাম্বার রজতের পরিচিত হলেও আরেকটা অপরিচিত থাকে। কিন্তু নাম্বারটা সেইভ করা ছিলো প্রিয়তমা দিয়ে রজত কোন কিছুই না ভেবে নাম্বারটায় ডায়াল করে।

তুষার এক ঢো গিলে ফোনটা রজতের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইতেই আরো কয়েকজন তুষারকে আটকায়, তুষার জোর গলায় বলে রজত এটা তুই ঠিক করছিস না। অন্যের পার্সোনাল জিনিসে এভাবে জোর জবরদস্তি করে হাত দিতে পারিস না। এটা কোন ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না

রজত ফোন কানে নিয়েই বলে তোর এই সিম্পল একটা ফোন জোর করে নিয়েছি বলে এমন করছিস তাহলে ভাব তুই আমার কতো মূল্যবান জিনিসে বিনা অনুমতিতে হাত দিয়েছিস। তোর এই ফোনের থেকে সে আমার অনেক বেশী ব্যাক্তিগত।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে একটি মেয়ের ভয়েস শোনা যায়,
কি ব্যাপার স্যার এই সময় ফোন দিলেন যে, আমি তো বিজি আছি আপনার শাশুড়ী মা আর শশুড় মশাইয়ের সাথে কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলছি, আমি আপনাকে পরে ব্যাক করছি ওকে, টুট টুট টুট

তুষার এক ঢোক গিললো, রজতের মাথায় যেনো আগুন ধরে গেলো। ফোন টা ছুঁড়ে ফেলে তুষারের কলার চেপে ধরলো। ইচ্ছে রকম ঘুষি দিতে লাগলো নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়তে শুরু করলো।
তুষার চিৎকার করে বললো একবার শুধু আমার হাতটা ছাড় তোরা আমিও দেখি কার কতো ক্ষমতা।

রজত মারতে মারতে তুষারকে মাটিতে চেপে বুকের ওপর পা রেখে বললো তোর ক্ষমতা দেখার আগেই তোর মুখোশটা তোর প্রিয়তমার সামনে তুলে ধরবো।
টিটু নাম্বারটা কালেক্ট কর।
তুষার এবার ভয় পেয়ে গেলো আর বললো রজত দেখ ভাই ঝামেলা আমাদের মাঝে হয়েছে পরিবারে কেনো টেনে নিয়ে যাচ্ছিস এসব।

চুপপ একদম চুপপ লজ্জা হওয়া উচিত তোর তুই একসাথে দুটো মেয়েকে ঠকিয়েছিস তাই তোর আসল রূপটা সবার সামনে বের করে আনবোই।
টিটু নাম্বারটা টা কালেক্ট কর রজতের কাছে দিতেই রজত নাম্বারটায় ফোন করে সব কিছু খুলে বলে।

মেয়েটা আর কেউ নয় তুষারের বিয়ে করা বউ।
তুষারের বাবাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে তুষারকে কিনে নিয়েছে মেয়েটার বাবা।
দেশের বাইরে থাকাকালীন ই বিয়ে হয়েছে ওদের।

মেয়েটা তুষারের থেকে অনেকটাই সিনিয়র।
এদেশে আসার পর তুষার ভার্সিটি ভর্তি হওয়ার পর পিংকির দিকে নজর দেয়। যখন জানতে পারে পিংকি আমার ওয়াইফ তখন থেকেই প্ল্যান সাজাতে থাকে। কিভাবে আমাকে হ্যানোস্তা করতে পারবে। আমার জীবন বিষিয়ে তুলতে পারবে কিন্তু তুষারের সাজানো প্ল্যানের মাঝেই সূচি ঢুকে পড়ে।

আর প্ল্যানটা ঠিক রাখে শুধু মানুষ টা বদলে নেয়।
ও খুব ভালো করেই জানে সূচি আমার কলিজার টুকরা তাই সূচির মাধ্যমেই ও প্ল্যানটা সাকসেস করার চেষ্টা করে।

সূচি সব শুনে দুকান চেপে ধরে, এক চিৎকার করে বলে ওঠে না আমি বিশ্বাস করিনা। তুই মিথ্যে বলছিস মিথ্যা বলছিস তুই বলেই সৌধকে জাবটে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে সূচি। সে বুঝে গেছে তাঁর ভাই মিথ্যা বলছে না

সামিয়া চৌধুরী সূচির মাথায় হাত রেখে সৌধ কে কড়া গলায় বললো ওর সাহস কি করে হয় আমার মেয়ের সাথে এতো বড় গেম খেলার।

সৌধ বললো দেখেছো মা তুষার ঠিক সফল হয়েছে। আমার সূচিকে আঘাত করে ঠিক সফল হয়েছে ও।
ওকে আমি ছাড়বোনা মা ছাড়বো না ওকে আমি।
রজত যাই করুক ওর আরো ভোগান্তি আছে।

পিংকির মনটা ভীষণ খারাপ ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে কানে দুল পড়ছে সে,
সৌধ রুমে এসেই পিংকির দিকে তাকালো মৃদু হেসে পিংকির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।

পিংকি আয়নায় সৌধকে এক নজর দেখেই অবাক হয়ে গেলো, আয়নাতেই ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে রইলো।
সৌধ বাঁকা হেসে আয়নাতে পিংকিকে দেখতে লাগলো। পিংকি তো সৌধর দিকে অপলক ভাবে চেয়ে রইলো। এ আমি কাকে দেখছি ওয়াও সৌধ জাষ্ট অসাধারণ লাগছে তোমায়। পাঞ্জাবি তে এতো টা সুন্দর লাগে তোমায়। মনে মনে কথা গুলো ভাবছে পিংকি, সৌধ হাত মুঠ করে মুখের কাছে নিয়ে হালকা কেশে ওঠলো। পিংকি চমকে গেলো হাত থেকে দুলটা পড়ে গেলো নিচে।

পিংকি দুলটা তুলে নিয়েই পিছন ঘুরে দাঁড়ালো।

সৌধকে এক নজরে দেখলো “এক্সক্লুসিভ ডিজাইন ব্লু কালার মিক্সড ফেব্রিক্স কটন পান্জাবি পড়েছে, চুলগুলো লেয়ার স্পাইক করা, কপালের ওপরের চুল ছোট করে স্পাইক রাখা। মাথার ওপরের দিকের চুল তুলনামূলক বড় হ অর্থাৎ সামনের চুল খুব ছোটও না আবার খুব বড়ও না। তবে পেছনের দিকে লেয়ার স্টাইল করা। গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, আগের থেকে স্বাস্থ্য টা বেশ ভালো হয়েছে তাঁর, জিম করায় বডি স্ট্রাকচার কোন হিরোর থেকে কম মনে হচ্ছে না তাঁর কাছে নিজের অজান্তেই বুকের ভিতরটায় কেমন শিহরন বয়ে গেলো তাঁর। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করতে লাগলো এ আমার বর,

সৌধ হাতে তুরি বাজিয়ে বললো হ্যালো ক্রাশ খেয়েছো নাকি বেবি,

পিংকি হকচকিয়ে গেলো ড্রেসিং টেবিলের দিকে ঘুরে কানে দুল পড়তে পড়তে বললো মোটেই না।
সৌধ পাশে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলে হালকা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পিংকি কে দেখতে লাগলো আর বললো ক্রাশ তো তুমি খেয়েছোই চোখ দুটো তো তাই বলছে।
পিংকি বাঁকা চোখে সৌধর দিকে একবার চেয়ে বললো ক্রাশ না ছাঁই খেয়েছি, নিজেকে কি ভাবো মহাপুরুষ?

সৌধ হালকা ঝুঁকে এক চোখ টিপ মেরে বললো তাঁর থেকেও বেশী।
পিংকি দু হাত দিয়ে সৌধর বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো ও আমার মহাপুরুষ হয়েছে আমাকে রেডি হতে দিন এবার।

সৌধ ওভাবেই পিংকির দিকে চোখ বুলালো এক নজরে রয়েল ব্লু প্লেইনব্লেনডেড কটন শাড়ী সাথে গোল্ড কালার ব্লাউজ পড়া, চুলগুলো সামনের দিকে ফোলানো হলেও ছোট ছোট চুলে কপাল ছেয়ে আছে। কাজল কালো চোখ গুলো আরো বেশী টানা, টানা লাগছে, গোলাপি লিপস্টিকে ঠোঁট দুটো আরো বেশী আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। ফর্সা গাল দুটো যেনো দ্বিগুণ ফর্সা হয়ে গেছে আজ, শ্যাম্পু করা চুলের মৃদু ঘ্রান নাকে পৌঁছে গেছে খুব কড়া ভাবেই।

ইচ্ছে করছে এই সৌন্দর্যটা একটু নষ্ট করে দিতে, ইচ্ছেটা পূরনের লক্ষ্যে এক ঢোক গিললো সৌধ।

পিংকি হালকা কেশে ওঠলো সৌধর মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখা গেলো না বরং সৌধর চোখের ভাষা খুব করেই বুঝে গেলো সে। তাই বড্ড তাড়ার স্বরে বললো সৌধ সরোনা, রেডি হবো তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সৌধ চমকে খানিকটা সরে সোজা হয়ে চোখ বড় বড় করে বললো আরো কি রেডি হবে এটুকুই তো আমার জান যায় যায় অবস্থা, পিংকি লজ্জামাখা হাসি দিয়ে বসে পড়লো জুয়েলারি গুলো বের করে এক এক করে সব পড়তে লাগলো। শশুড় মশাইয়ের দেওয়া ডায়মন্ডের নেকলেস টা বের করে পড়তে নিতেই সৌধর চোখ আটকে গেলো ফর্সা ঘাড়ের দিকে।

সোজা হয়ে দাড়িয়ে একদম পিংকির পেছনে চলে গেলো। পিংকি নেকলেস টা লাগানোর চেষ্টা করছিলো সৌধ পিংকির হাতের ওপর হাত রাখতেই পিংকি হাত সরিয়ে ফেললো। সৌধ ধীরে ধীরে নেকলেসটা লাগিয়ে চুল গুলো ভালো করে এক সাইটে রাখলো। পিংকি আয়নায় সৌধকে স্পষ্ট দেখতে পারছে, তার হৃদস্পন্দন ক্রমাগত বাড়তে শুরু করলো সৌধ পিংকির কাধে আলতো করে ঠোঁট ছুয়াতেই পিংকির পুরো শরীর শিউরে ওঠলো।

দুহাতে কাঁধ ধরে সামনে ঘুরাতে নিতেই পিংকি চট করে ওঠে দাঁড়ালো। সৌধও সোজা হয়ে দাড়িয়ে ভ্রু কুঁচকালো। পিংকি হাতে তুরি বাজিয়ে বললো এই যে মিষ্টার আর কোন কাজ নেই, আমার অনেক কাজ আছে ওকে বলেই চুলগুলো ঠিক করে নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলো সাথে সাথে সৌধ হাত আটকে বললো এই যে মিসেস আপানার খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই। শুধু আমার রোমান্সে বাঁধা সৃষ্টি করা। কতো ভাগ্য করে এমন রোমায়েন্টিক বর পেয়েছো জানো,
কতো মেয়ে এমন রোমায়েন্টিক বর পাওয়ার জন্য দিনরাত আফসোস করে।

পিংকি টিটকারি দিয়ে বলল না কথাটা এমন হবে কতো মেয়ে সৌধ কে পাওয়ার জন্য আফসোস করে। সৌধ মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললো ভুল কিছু বলোনি। বলেই বাঁকা হাসলো।

পিংকি রাগের ঝংকার নিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
সৌধ দাঁত বের করে হেসে ফেললো। পাগলী একটা,

দুবছর পর সৌধদের বাড়িতে পা ফেললো সুবহা,

সাথে তাঁর মা আনিসা বেগম। সামিয়া চৌধুরী তাদের দেখেই বললো এইতো আপা এসে গেছে, এ কে সুবহা যে,
সুবহা মামি বলে এক

চিৎকার দিয়েই জাবটে ধরলো।
কেমন আছো মামি, কতোদিন পর দেখা বলোতো।
সামিয়া চৌধুরী সুবহার কপালে চুমু খেয়ে বললো আসিস না তো, আসলেই তো দেখা হয়।
সুবহা বললো তোমার ছেলের অবহেলা সহ্য করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই তো আসিনা।

আনিসা বেগম বললেন শুরু হয়ে গেলো ওর ফাজলামো বলেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় বসলেন। আর বললেন আকাশ কোথায়,
সামিয়া চৌধুরী সুবহা কে ধরে নিয়ে সোফায় বসাতে বসাতে বললেন ও বাইরে গেছে একটু এসে পড়বে এখনি।
সুবহা বললো মামি সৌধ কোথায়,

সামিয়া চৌধুরী বললেন উপরে আছে।
সুবহা চট করে ওঠেই বললো আমি আসছি মামি।

আনিসা বেগম বললেন এই সুবহা দাঁড়া সুবহা পেছন ঘুরতেই আনিসা বেগম বললেন সৌধ কিন্তু বিবাহিত, ওর বউ আছে এখন এমন কোন পাগলামি করিস না যে কোন সমস্যা হয়,

সুবহা নাক -মুখ কুঁচকে বললো হোয়াট বউ,
কি বলছো মা সব টাই জানি আমি সৌধ নিজেই আমাকে বলেছে ফোনে সো আমার সমানে এসব ড্রামার মানে হয় না। বলেই উপরে চলে গেলো সুবহা।
সামিয়া চৌধুরী মুখটা কালো করে ফেলল কথাটা শুনেই।
আনিসা বেগম বললেন এখনো কি কিছু ঠিক হয়নি,
সামিয়া চৌধুরী বললেন সব ঠিকাছে ওরা দুজনেই দুজনকে গ্রহন করে নিয়েছে।

আনিসা বেগম বললেন আলহামদুলিল্লাহ তা হলে তো ভালোই। কিন্তু আমার মেয়েটা না জানি কি বাজায় আবার।
সামিয়া চৌধুরী বললেন আরে চিন্তা করবেন না। ও তো অমনি পাগলী সমস্যা নেই। কেউ সিরিয়াস নেবে না ওকে পিংকি কে আমি বুঝিয়ে বলবোনি সবটা।

সূচি কান্নাকাটি করে অস্থির কোন ভাবেই সে রেডি হবে না। তুষার তাকে ঠকিয়েছে, তুষার তাঁর সাথে মিথ্যা অভিনয় করেছে তাই বলে সে অন্যকাউকে বিয়ে করে নেবে যার প্রতি তাঁর কোন অনুভূতিই নেই তাকে বিয়ে করবে। বিয়েটা কি আদেও এভাবে হয়।

পরোক্ষনেই ভাবলো ব্রো আর পিংকির তো এমনভাবেই হয়েছিলো যেখানে কারো প্রতি কারো ফিলিং ছিলো না। কিন্তু সবার জীবন তো একই নিয়মে চলে না আর না সবার ক্ষেএে একই ঘটনা ঘটে। কোন ভাবেই কোন কিছু মিলছে না সূচির। এই দিকে মা বাবা ভাইয়ের চাপ ও নিতে পারছেনা।
তাই ভাবলো রজত ভাইয়ার সাথে কথা বলা উচিত ইয়েস,
পিংকি, তুমি একটু বাইরে যাও আমি রজত ভাইয়ার সাথে কথা বলে নিতে চাই।

পিংকি সূচির কথা শুনে রুম ছেড়ে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।

দরজার সামনে গিয়েই থমকে গেলো পিংকি।
পুরো শরীর তাঁর কাঁপুনি দিয়ে ওঠলো, নিজের শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলো না, মাথাটা কেমন ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠলো দরজায় এক হাতে চেপে ধরে এক পা পিছিয়ে গেলো। পরোক্ষনেই ভাবলো না আমি পিছিয়ে যাবো না। আর আমি সৌধর মতো মাথা গরমও করবো না। বলেই রুমের ভিতর ঢুকলো,
সৌধ বিরক্তি মুখ করে,

পর্ব ১৫

সুবহা এসব কি আচরন, গায়ে পড়ার স্বভাবটা এখনো চেঞ্জ হলো না তোর।
সুবহা কে এ ঝটকায় ছাড়িয়ে ধমকে কথা গুলো বললো সৌধ।

পিংকির আর বুঝতে বাকি রইলো না সৌধর অপ্রত্যাশিত ভাবেই মেয়েটা তাকে ওভাবে জরিয়ে ধরেছিলো।

সুবহা নাক বুচো করে বললো এমন করছিস কেনো সৌধ কতো দিন পর দেখা বল তো, এটুকু তো স্বাভাবিক তাইনা বলেই সৌধর দুগালে দুহাতে ধরে বললো ইশ আগের থেকে আরো বেশী কিউট এন্ড স্মার্ট হয়েছিস। সৌধ আবারো হাত ছাড়িয়ে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য এক পা বাড়িয়ে বললো ধূর এই পাগলটা যে কেনো এলো মাথাটা খেয়ে ফেলবে এখন।

পিংকির অশ্রুমিশ্রিত চোখের সাথে সৌধর চোখাচোখি হয়ে গেলো, সৌধর পিছন সুবহা এসে দাঁড়িয়ে হা করে সামনের দিকে চেয়ে রইলো।
সৌধ এক ঢোক চিপে মনে মনে বললো এই সেরেছে,

“ওরে সৌধ এবার বুঝো ঠ্যালা”।
বউ কাকে বলে, বউ কতো প্রকার, বউ কি কি সব এবার তোমার বউ বুঝাবে। পিংকি চোখ সরিয়ে ঘুরে যেতে নিতেই সৌধ পিংকির হাতটা চেপে ধরলো।
সুবহা হা করে সামনের অতি সুদর্শনীয় মেয়েটাকে দেখেই যাচ্ছে। ওয়াও এততো কিউটনেস, এতো সুন্দরী মেয়ে এ বাড়িতে কোথা থেকে এলো। আমি মেয়ে হয়েই এমন ক্রাশ খেয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

মূহুর্তেই আঁতকে ওঠলো সুবহা হায় আল্লাহ সৌধ যদি এই মেয়ের ওপর ক্রাশ খায় আমার কি হবে ভেবেই দ্রুত সৌধর চোখ এক হাতে চেপে ধরলো। আর সামনের দিকে চেয়ে বললো এই তুমি কে, প্লিজ এখান থেকে যাও প্লিজ।

পিংকি রেগে চোখ মুখ শক্ত করে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে সৌধর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
সৌধ বাম হাত দিয়ে সুবহার হাত সরিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ফাজলামো বন্ধ করবি।
ও আমার বউ পিংকি,

সুবহা অবাক হয়ে বললো কি এটা পিংকি এটা তোর বউ।
পিংকি ভ্রু কুঁচকে তাকালো দুজনের দিকে।

পরোক্ষনেই ভাবলো মেয়েটাকে কোথায় যেনো দেখেছি।
সূচির ফোনে ছবি দেখেছিলো, ছবি আর বাস্তব অনেকটাই পার্থক্য থাকায় চিনতে অসুবিধা হচ্ছে পিংকির।

সৌধ পিংকি কে একটানে নিজের অনেকটা কাছে নিয়ে এসে কোমড় জরিয়ে পিংকির দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে বললো ইয়েস মাই ওয়ান এন্ড অনলি ওয়াইফ। মিসেস.পিংকি চৌধুরী।

সুবহার শরীরে যেনো আগুন ধরে গেলো। সৌধর কথা শুনে আর দুজনকে এতোটা কাছে দেখে।
পিংকির রাগ চরম পর্যায়ে ওঠে গেলেও এবার সৌধর আচরনে বেশ লজ্জা লাগছে তাঁর।

খুব ছাড়ানোর চেষ্টা করতেও সৌধর শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়াতে পারলো না নিজেকে। পিংকি সৌধর দিকে চেয়ে চোখ রাঙাতেই সৌধ ভূবন ভুলানো এক হাসি দিলো। এক চোখ টিপ মেরে বললো জান,
এ হলো তোমার বড় ননদ, আমার বড় ফুপুর একমাএ কন্যা সুবহা। আমার সাতদিনের বড় বোন।

সুবহা এক চিৎকার দিয়ে বললো সৌধ,

ফোন রিসিভ হতেই সূচি বললো রজত ভাইয়া আমি সূচি,
রাজন অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো, হাসিটা সূচির কানে বিষের মতো লাগছিলো এমন সময় এমন হাসি। এমন মনের অবস্থায় এরকম ফান করার কোন মানে হয়, রজত ভাইয়ার কি মাথাটা পুরো খারাপ হয়ো গেছে ওহ গড এ আমি কাদের পাল্লায় পড়লাম।

রজত ভাইয়া আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে,
এবারেও রাজন দাঁত কেলিয়ে হেসে দিলো আর বললো ওহ ভাবি জি এতো ব্যাস্ততা কিসের। আরেকটু পর তো আসছিই আমরা,
সূচি এবার বুঝলো রজত নয় রজতের ছোট ভাই ফোন ধরেছে।

সূচি বললো ওহ সরি আমি ভেবেছিলাম রজত ভাইয়া।
রাজন বললো ওহ ভাবি জি সরি বলার কি আছে। হবু বরের ফোন হবু বর ধরাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আমার মতো এতো কিউট হ্যান্ডসাম দেবর থাকলে সেও তো ধরতে পারে তাইনা।

সূচি মনে মনে বললো আহা কিউটের ঢেঁকি, ডিজগাস্টিং।
সূচি জোর পূর্বক হাসি দিয়ে বললো ওহ আচ্ছা, আমি রাখছি কেমন।

রাজন বললো ওকে ভাবি নে টেনশন আমরা তারাতারিই পৌঁছে যাবো।

সূচি ফোন রেখে মুখ বাঁকিয়ে বললো এহ তারাতারি এসে পড়বো আয় তোদের ফুল দিয়ে পুঁজো করবো।
পিংকি সামিয়া চৌধুরীর সাথে হাতে হাতে টুকটাক কাজ করছে। সূচি আর সুবহা বেশ কিছুক্ষন গল্পস্বল্প করলো। সুবহা কথার ফাঁকে ফাঁকে ঠিক জেনে নিলো সৌধ আর পিংকির মধ্যে মিল হওয়ার কথা।

সূচি রুম ছেড়ে বের হতে নিতেই সুবহা বললো এই কোথায় যাচ্ছিস, মামি আমাকে তোকে রেডি করিয়ে দিতে বলেছে দেখ শাড়িটা কি সুন্দর,
সূচি চোখ মুখ শক্ত করে বললো আমার কাছে খুবই বিশ্রি লাগছে বলেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

বউ রেগে আছে তাই সৌধ ড্রয়িং রুমেই ঘুরঘুর করছে। আর পিংকি কে ইশারা করছে, কিন্তু পিংকি তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। মায়ের জন্য আর ফুপুর জন্য বেচারা বউ এর কাছে যেতেও পারছে না। বউ ও তাঁকে পাত্তা দিচ্ছে না।

জবা সরবতের গ্লাস গুলো ফ্রিজে রাখতে যেতে নিতেই সৌধ বললো জবা তোর ভাবীকে বল আমার ওয়ালেট খুঁজে পাচ্ছি না। রুমে গিয়ে খুঁজে বের করতে বল না হয় কিন্তু মাথা আমার গরম হয়ে যাবে।
জবা এক ঢোক গিললো তারাতারি গিয়ে বললো ভাবী ও ভাবী সৌধ ভাই খুব রাইগা আছে, কিসের ওয়ালুট পাইতাছে না। আপনেরে তারাতারি খুঁইজা দিতে বললো।

পিংকি যেই বলতে যাবে যেতে পারবো না অমনি আনিসা বেগম বলে ওঠলেন সেকি ওয়ালেট খুঁজে পাচ্ছে না? হায় হায় কি বলিস কতো টাকা ছিলো।
সামিয়া চৌধুরী বললেন পিংকি যাও তো একটু ছেলেটা ভীষন অগোছালো, তুমি গেলেই খুঁজে পাবে তারাতারি যাও নয়তো আবার ক্ষেপে যাবে।
পিংকি মনে মনে অসংখ্য গালি দিতে দিতে রান্নাঘর থেকে বের হলো। সৌধ উপর থেকে পিংকি কে আসতে দেখেই দ্রুত রুমে ঢুকে পড়লো।

পিংকি রাগের ঝংকার নিয়ে ঝড়ের মতো রুমে ঢুকলো। টেবিলের ওপর ওয়ালেট টা দেখেই রাগ টা আরো দ্বিগুন বেড়ে গেলো। ওয়ালেট টা নিয়ে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ওয়ালেট টা তো এখানেই, তাহলে পাচ্ছো না কেনো?
সৌধ কনুইয়ে ভর করে মাথাটা রেখে পিংকির দিকে ঘুরে এক চোখ টিপ মারলো,

আমিতো বউ খুচ্ছিলাম, ওয়ালেট কখন খুঁজলাম, জবাটা বোধ হয় কানে একটু কম শুনে বলেই দুষ্টু হাসি হাসলো।

পিংকির রাগে গাল, নাক লাল হয়ে গেলো ওয়ালেট টা মুখের কাছে ছুঁড়ে চলে যেতে নিতেই সৌধ আহ করে আর্তনাদ করে ওঠলো।

পিংকির বুকের ভিতর টা ধক করে ওঠলো। পিছন ঘুরতেই সৌধ আরো জোরে আহ করে ওঠলো এক চোখ ধরে। পিংকি ভয়ে এক ঢোক গিলে বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে বললো কোথায় লেগেছে, দেখি সরি সরি বলেই সৌধর গালে হাত দিলো। সৌধ চোখ দেখাতেই পিংকি ধীরে ধীরে মুখ এগিয়ে ফুঁ দিতে লাগলো। সৌধ আরেকটু এগিয়ে দিলো মুখটা পিংকি একই ভাবে ফুঁ দিতে থাকলো। সৌধ ধীরে ধীরে পিংকির অনেকটা কাছে এসে এক হাতে কোমড় জড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজের ওপর ফেললো।

পিংকি বড় বড় চোখ করে তাকাতেই সৌধ পিংকির নাকের সাথে নাক ছুঁয়িয়ে দিলো।

ঘোর লাগা গলায় বললো চোখে লাগে নি বউ, বুকে লেগেছে ভীষন এভাবে কেউ দূরে দূরে থাকে? এভাবে কেউ রেগে থাকে বলো?
পিংকি সৌধর মতলব বুঝতে পেরে সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়াতে চেষ্টা করতে করতে বললো আমার এমন কন্যারাশি বর চাইনা,
সৌধ পিংকির কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।

হা হয়ে বললো মানে,
পিংকি মুখোমুখি মুখ করে বললো ইয়েস,
সিনিয়র রাও পিছু ছাঁড়েনা তোমার। সিনিয়র কাজিন সোজা রুমে এসে গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তুমি কি ভেবেছো এইসব আমি মুখ বুজে সহ্য করবো, কখনোই না ওদের সাথেই থাকো আমাকে ছাড়ো।

সৌধ পিংকির এতো রাগ আর এমন অদ্ভুত কথা শুনে বড় বড় চোখ করে এক ঢোক গিললো।

বর তো আমি হয়েই গেছি মিসেস,
এর থেকে তো আপানর রেহাই নেই।
পিংকি মুখ বাঁকিয়ে বললো কেনো যাওনা তোমার সিনিয়র আপুর কাছে সাত দিনের সিনিয়র যে কিনা তোমার জন্য দিওয়ানা,
সৌধ ছাড়ো ছাড়ো বলছি বলেই হাত ছাড়াতে চাইলো। সৌধ পিংকির কোন কথায় পাত্তা না দিয়ে ধীরে ধীরে শাড়ী ভেদ করে হাতটা পেটের দিকে চেপে ধরলো, সৌধ জানে একে এভাবে ছাড়া এখন থামানো যাবে না।

ঠিক তাই হলো পিংকির গলার স্বর নিচু হয়ে এলো শ্বাসটাও ভারী হয়ে এলো, সৌধ দুহাতে পেট গভীর ভাবে চেপে পিংকি
র গলায় আলতো করে চুমু খেলো।

পিংকি মূহুর্তেই কেঁপে ওঠলো সৌধর পাঞ্জাবি খাঁমচে ধরলো।
সৌধ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো এবার তো তুমিই ধরেছো এই দেখো আমি কিন্তু একদম তোমায় ছুঁইনি। পিংকি কথাটা শুনা মাএই চোখ খুলে চট করে ওঠতে নিবে অমনি সৌধ আবারো নিজের সাথে চেপে ধরলো।

সৌধ এসব কি হচ্ছে,
সুবহার চিৎকারে সৌধ পিংকি দুজনই কেঁপে ওঠলো।

পিংকি দ্রুত ওঠে শাড়িটা ঠিক করতে থাকলো লজ্জায় শেষ সে,
সৌধ বিরক্তি মুখ করে ওঠে বললো এটা কোন ধরনের অভদ্রতা কারো রুমে প্রবেশ করলে নক করতে হয় জানিস না। ছোট ভাই আর ভাইয়ের বউ এর রোমান্সে বেগরা দিস লজ্জা করে না।

সুবহা সৌধর কথায় পাত্তা না দিয়ে পিংকির সামনে গিয়ে পিংকির গালে ঠাশশ করে চড় বসিয়ে দিলো।
সুবহা যে এমন একটা কান্ড করে ফেলবে সৌধ বা পিংকি কেউই কল্পনা করতে পারেনি। সৌধ সুবহার বাহুতে ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললো সুবহা, কি করলি এটা তুই। ওর গায়ে কোন সাহসে হাত তুললি ও আমার স্ত্রী।

পিংকি গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবাক হয়ে,

সম্পর্কে সে বড় সেই সাথে এ বাড়ির আপন জন। নয়তো এই চড়ের বদলে চড় সে ঠিক দিয়ে দিতো।
প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো পিংকির। চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানিও গড়িয়ে পড়লো।

বেশ করেছি হাত তুলেছি ও শুধু মাএ পরিচয়ের জন্য তোর বউ হয়ে আছে তাই বলে ও তোর গায়ের ওপর পড়ে থাকবে এভাবে বলেই পিংকির দিকে ঘুরে বললো এই মেয়ে যাও গিয়ে কাজ করো এখানে কি তোমার, বেহায়া, ছোটলোক মেয়ে কোথাকার। চাল চুলোহীন মেয়ে রূপ দেখিয়ে সৌধকে বস করতে চাইছো,

সৌধ সুবহা কে একটানে ঘুরিয়ে ঠাশ করে গালে একটা চড় বসিয়ে দিলো। সুবহা চিৎকার করে ওঠলো সৌধ, এই মেয়েটার জন্য তুই আমার গায়ে হাত তুললি।
সৌধ বললো ব্যাস অনেক হয়েছে তুই জাষ্ট এই রুম ছেড়ে বেরিয়ে যা। আমার স্ত্রী কে অপমান করার অধিকার এই বাড়িতে কাউকে আমি দেইনি। সেখানে তুই ওর গায়ে হাত তুলেছিস তুই জাষ্ট আমার চোখের সামন থেকে সরে যা নয়তো আমি কি করবো নিজেও জানিনা বেরিয়ে যা। সুবহা সৌধর চোখ-মুখ দেখে ভয় পেয়ে গেলো।

সেই সাথে পিংকির সামনে এভাবে থাপ্পড় দেওয়া টা বেশ ইগোতে লাগলো তাঁর আর এক মূহুর্ত দেরী না করে বেরিয়ে গেলো সুবহা।
সৌধ পিংকির দিকে তাকাতেই দেখলো পিংকি অঝড়ে কেঁদে চলেছে।

পিংকি বলে কাছে যেতেই পিংকি পিছিয়ে গেলো।
না সৌধ প্লিজ তুমি আমার কাছে এসোনা এখন প্লিজ। সৌধ পিংকির কোন কথা কানে দিলো না।
পিংকির কাছে গিয়ে আলতো করে দুগালে স্পর্শ করলো। পিংকি চোখ বুজে কেঁদেই চলেছে।

সুবহার বলা কথাগুলো তাঁর বুকে এসে বিঁধেছে।
আজ যদি তাঁর বাবা বেচে থাকতো, তাঁর মা কাছে থাকতো এভাবে কেউ এসে চালচুলোহীন বলতে পারতো না। সৌধ যদি শুরুতেই তাঁকে গ্রহন করতো আজ কেউ এসে আঙুল তুলে বলতে পারতো না তোদের সম্পর্কটা শুধু পরিচয়ের জন্য।

প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে পিংকির, খুব আঘাত লেগেছে আজ তাঁর। চড়ের আঘাতের চেয়েও কথার আঘাতটা কড়া ভাবেই লেগেছে।
সৌধ পিংকির চোখের জল মুছে ইচ্ছে মতো আদর করলো। পিংকির কান্না থেমে গেছে সৌধ পিংকি কে জরিয়ে নিলো শক্ত করে বুঁকের সাথে চেপে বললো সরি বউ। প্লিজ মন খারাপ করো না। সুবহাকে আমি পড়ে দেখে নিবো অনুষ্ঠান টা শেষ হোক আজ।

পিংকি কান্না থামিয়ে বললো কোন দরকার নেই।

আমি নিচে যাচ্ছি মা টু কে হেল্প করতে হবে।

সৌধ মৃদু হেসে পিংকির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললো আচ্ছা যাও। আমি রজত কে ফোন করি। আর শোনো এভাবে আর কাঁদবে না বুকে লাগে খুব,
পিংকি চোখের পানি মুছে মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। সৌধ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো সুবহার বাচ্চা, তোকে তো আমি দেখেই ছাড়বো ফাজলামো বের করবো তোর ওয়েট এন্ড সি,

সূচি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে অথচ কেউ কিছু জানেনা। সুবহা কিছুটা জানলেও প্রচন্ড রেগে থাকায় কাউকে কিছু বললো না রুমে মুখ গুঁজে বসে রইলো।
এদিকে রজতের ছোট ভাই আর মা, বোন পৌঁছে গেছে।

সামিয়া চৌধুরী, আকাশ চৌধুরী, আনিসা বেগম, রজতের পরিবারের সাথে কথাবার্তা বলছে।
সৌধ রজতকে ফোন করতেই রজত বললো সূচি আমার সাথে আছে চিন্তা করিস না।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সূচি, জিন্স প্যান্ট, সাদা লেডি শার্ট সাথে সাদা প্রিন্টের ওড়না গলায় পেচানো রয়েছে। সূচির দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রজত। রজত বরাবরই ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। রাগ, জেদ সবটাই সে ঠান্ডা মেজাজে নিয়ন্ত্রণ করে।

সূচির ওপর প্রচন্ড মাএায় রাগ হলেও সেই রাগটা সে হজম করে নিলো। সূচির পাশে গিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে গভীর শ্বাস ছাড়লো। ধীর গলায় বললো গাড়ি ছাড়া, বেরিয়েছো কেনো? সূচি গম্ভীর চোখ -মুখে তাকালো রজতের দিকে।

রজত মৃদু হেসে বললো গাড়ি নিয়ে আসোনি বলেই তো অঘটন ঘটতে যাচ্ছিলো, আমি যদি খেয়াল না করতাম তাহলে কি হতো ভাবতে পারছো,
সূচি রাগী

গলায় বললো কি আর হতো মরে যেতাম, বা হসপিটালে থাকতাম। এতেই বেশ হতো নিজের অনুভূতি মেরে ফেলার চেয়ে নিজেকে মেরে ফেলাই শ্রেয়।
রজত হাতটা শক্ত মুঠ করে ফেললো। রাগটা দমিয়ে বললো বাড়ি চলো।

সূচি কঠোর গলায় বললো না যাবো না।
রজত ভাইয়া, প্লিজ এনগেজমেন্ট টা আটকাও,

আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না।
আমি তোমাকে কখনোই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে মানতে পারবো না। এই সম্পর্কটা কখনোই সম্ভব নয়। তোমাকে আমি সেই চোখে কখনোই দেখিনি।
আমি জানি তুমি খুব ভালো একটা ছেলে।

একজন ভালো ছেলে, ভালো মানুষ হওয়ার সব গুনই তোমার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আমি তোমাকে পছন্দ করি, আমার চোখে তুমি ভীষণ ভালো একটা মানুষ তাই বলে আমি তোমাকে স্বামীর আসনে বসাতে পারবো না।

পর্ব ১৬

তাহলে কি চাও, একটা বিবাহিত ছেলের জন্য সারাজীবন এভাবেই থাকতে চাও। এতোটাই আত্মসম্মানহীন তুমি।
সূচি রেগে গেলো রজতের দিকে কঠোর দৃষ্টি স্থাপন করলো। কড়া গলায়, বললো আমি সেটা বলিনি আমি বলেছি আমি তোমাকে স্বামীর আসনে বসাতে পারবো না। বিকজ তোমাকে আমি সেই চোখে দেখিইনি কখনো।

রজত বাঁকা হেসে বললো সৌধ, পিংকিও কিন্তু সেই চোখে দেখেয়নি কখনো অথচ আজ কেউ কাউকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।
সূচি বিরক্তি মুখ করে দূরপানে চেয়ে বললো ওদের জীবনের সাথে আমাদের জীবনটা গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে।

রজত বললো ইয়েস রাইট। বিকজ ওরা একে অপরকে যতোদিন ধরে চেনে জানে তাঁর থেকেও বেশী তুমি আমাকে জানো, চেনো, আমি তোমাকে জানি, চিনি।

সূচি বিস্ময় চোখে রজতের দিকে একবার চেয়ে বললো আমি এসব সম্পর্কে নিজেকে জরাতে চাইছি না। মানছি আমি ঠকেছি তাই বলে আমি আরেকটা সম্পর্কে জরিয়ে পড়তে পারিনা। কারন আমার ভালোবাসা তো মিথ্যে ছিলো না।

সূচি” মিথ্যার মাঝে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠতে পারেনা।
“সত্যির শক্তি দীর্ঘস্থায়ী

আর
মিথ্যার শক্তি ক্ষনস্থায়ী,
একটা মিথ্যা কখনোই কোন সম্পর্ক তৈরী করে দিতে পারে না বরং যেকোন সম্পর্ক ভেঙে দিতে একটা মিথ্যাই যথেষ্ট। হোক সেটা ভালোবাসার সম্পর্ক বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

তুষার তোমাকে মিথ্যার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলো,
ভালোবাসা জিনিসটা সত্যি সূচি, ভালোবাসা জিনিসটা মিথ্যের উপর গড়ে ওঠতে পারে না।

হ্যাঁ তুমি তুষারের মিথ্যা প্রেমের জালে ফেঁসে গিয়েছিলে। জাষ্ট প্রেম সেখানে ভালোবাসা ছিলো না।
ভালোবাসা কখনোই কাউকে ঠকাতে শেখায় না। তুষার তোমাকে ঠকিয়েছে কারন ওর মধ্যে তোমার জন্য বিন্দু পরিমান ভালোবাসাও ছিলো না।
বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে তোমার সাথে।

তুমি যদি বলো তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিলো তাহলে সেটা আমি বিশ্বাস করিনা। তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো, প্রেম ছিলো কিন্তু ভালোবাসা ছিলো না। রজতের কথা গুলো বলার সময় গলাটা একটু কেঁপে ওঠলো তাঁর। যদি ভালোবাসা সূচির মধ্যে থেকেও থাকে তাহলেও সেটা সে বিশ্বাস করতে চায় না। কারন সে সূচিকে অসম্ভব ভালোবাসে।

এক ঢোক গিলে বললো সূচি তুষার তোমায় ঠকিয়েছে, ওর জন্য নিজেকে কষ্ট না দিয়ে, ভেঙে না পড়ে জীবনটাকে নতুন করে শুরু করো। কয়েকমাসের মিথ্যাকে বুকে চেপে কষ্ট পেওনা, ভেঙে পড়োনা।

আমি ঠকে গেছি বলে তুমি আমাকে দয়া দেখিয়ে বিয়ে করতে আসছো, আমি কারো দয়া নিয়ে বাঁচতে চাইনা।
দয়া না ভালোবাসা সেটা তো সময়ই বলে দেবে,
বলেই সূচির দিকে তাকালো রজত, সূচি আমতা আমতা করে বললো আমি পারবো না এই বিয়ে করতে।
রজত বললো আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি,
রজত হঠাৎ করে কথার মাঝে এমন একটা কথা বলে ফেলবে সূচি ভাবতে পারেনি।

ভ্রু কুঁচকে বললো কেনো,
রজত স্বাভাবিক ভাবেই বললো এতোদিন ধরে চেনো আমায় আশা করি এটুকু বুঝতে পারছো যে কোন বাজে মতলব নেই।
সূচি বাঁকা হেসে বললো বাইরে থেকে দেখেই যদি মানুষ চেনা যেতো তাহলে কি আজ এই দিন দেখতে হতো আমার। মানুষ যদি মুখোশ পড়ে নিজেদের উপস্থাপন করে তাহলে সারাজীবন একসাথে থেকেও মানুষের আসল রূপ ধরা যায় না।

রজত বললো একজন মানুষ কে সঠিক ভাবে চেনার ক্ষমতা রাখতে হয় আবেগে গাঁ ভাসিয়ে দিলে চলবে না। যাকে তুমি ভালোবাসবে, যার সাথে সারাজীবন পথ চলার জন্য পা বাড়াবে, যাকে নিয়ে নিজের সকল স্বপ্ন গুলো সাজাবে তাকে যদি নাই চিনতে পারো তাহলে তুমি কিসের ভালোবাসলে, কিসের স্বপ্ন দেখলে। তাই সবার আগে মানুষ টা কে চিনতে হবে জানতে হবে তারপর তাকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

সূচি বললো তুমিও তো মুখোশ পড়ে থাকতে পারো।
কেউ তিনমাস, বা কেউ তিন বছর মুখোশ পড়ে থাকতেই পারে।

রজত বাঁকা হাসলো সূচির পাশ থেকে সরে সূচির সামনা- সামনি দাঁড়ালো, দুজনই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে পিছন দিয়ে একটা দুটো বাস যাচ্ছে, কখনো কখনো বাইক, কার এসব ও যাচ্ছে।
রজত সূচির সামনে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হয়ে বললো

যে মানুষ চিনতে পারে না,
সে কি করে বুঝবে মুখ আর মুখশের পার্থক্য?
(জান্নাতুল নাঈমা)

সূচি চোখ মেলে তাকালো রজত হালকা হেসে বললো আগে মানুষ চিনতে হবে তারপরই বুঝতে পারবে তাঁর ভিতর কি আছে না আছে, সে মুখোশ পড়ে আছে নাকি তাঁর সবটা উজার করেই দিচ্ছে তোমাকে।

সূচি অপলক ভাবে চেয়ে রইলো রজতের দিকে।

এই মানুষ টা ভীষন ভালো একজন মানুষ, সেটা আমরা সবাই জানি, এর মতো এতো ভদ্র, সভ্য, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান মানুষ খুব কমই দেখা যায়। এই বয়সেই অনেকটাই ম্যাচিওর। কিন্তু এই মানুষ টাকে কখনো নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে কল্পনাও করে দেখিনি আর আজ কিনা তাই হচ্ছে,
মানুষের জীবন কি অদ্ভুত তাঁরা ভবে এক আর হয়ে যায় আরেক।

যাকে নিয়ে হাজারো স্বপ্ন সাজানো হয় মনের মাঝে তাকে ছেড়ে ঠিক অন্যকারো সাথে ঘর বাঁধতে হয়।
সারাজীবন তাঁর সাথেই থাকতে হয়,

তাহলে জীবনে ওইসব মানুষ কেনো আসে? কেনোই বা তাদের সাথে পরিচয় হয়, কেনোই বা তাদের সাথে মিথ্যে সম্পর্ক তৈরী হয়। সূচি এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
রজত বললো কি হলো,

সূচি অজান্তেই নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো।
রজত মৃদু হেসে সূচির হাতটা আলতো করে চেপে ধরলো। দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো সূচির চোখ বেয়ে। বুকের ভিতর কেমন চাপা কষ্ট অনুভূত হচ্ছে তাঁর।

রজত সূচির হাতটা চেপে তাঁকে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে বললো বাইকটা রেখেই এসেছি আজ, তোমাদের ওখানে যাবো বলে।
আমার তো বাবাও নেই, গাড়িও নেই।

সূচি রজতের কথা গুলো শুনলো না, কেমন একটা দৃষ্টিতে যেনো রজতের পিছন দিকে চেয়ে এগোতে লাগলো।
একটা রিকশা নিয়ে ওঠে পড়লো দুজনে,
দুজনের মাঝেই বেশ নিরবতা চললো।

কিছু সময় পর নিরবতা ভেঙে সূচি রজতের দিকে তাকালো, রজত সামনের দিকে চেয়ে আছে।
রজতের দিকে চাইতেই তুষারের মুখটা ভেসে ওঠলো সূচির চোখের সামনে।

সুন্দর চেহেরা হলেই কারো মন সুন্দর হয় না।

তুষার আমাকে এতো বড় ধোকা দেবে কখনো ভাবতে পারিনি। রজত ভাইয়া কি তুষারের থেকে অসুন্দর, সূচি গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।
রজত আড় চোখে একবার চেয়েও চোখ সামনে স্থির রাখলো। সূচি তাঁর দিকে চেয়ে আছে বুঝতে পেরে আর তাকালো না।

রজত ভাইয়াও সুন্দর, গায়ের রঙ কখনো সৌন্দর্য তুলে ধরতে পারেনা। রজত ভাইয়ার চেহেরা কতোটা মায়াবী, সব থেকে বড় কথা রজত ভাইয়া খুব ভালো মনের একজন মানুষ। কিন্তু রজত ভাইয়াকে কি লাইফ পার্টনার হিসেবে মেনে নিতে পারবো আমি?

রজতের দিকে আরো গভীর দৃষ্টি ফেললো। চোখ দিয়ে মন কে বুঝানোর চেষ্টা করছে সে,

কিন্তু চোখ দিয়ে না দেখে মন দিয়ে দেখে চোখ কে বুঝালে কেমন হয়?

আচ্ছা রজত ভাইয়া আজ পাঞ্জাবি পড়েছে কেনো?
এনগেজমেন্ট তাই, পাঞ্জাবিটা চেয়ে দেখলো, পারপেল কালার মিক্সড কটন পাঞ্জাবি পড়েছে রজত হাতে ব্ল্যাক ওয়াচ। চুল গুলো ইমো সুইপ কাট দেওয়া।
সূচি ভাবলো চুলগুলো এলো মেলো কেনো, মানুষ টা গোছানো তবে চুল গুলো এমন কেনো।

শ্যামবর্নের ছেলেদের মধ্যেও বেশ আকর্ষণীয় কিছু থাকে। তাঁর ওপর ছেলেটার যদি শারীরিক ফিটনেস ভালো হয় লম্বা, স্মার্ট, হয় তবে তো কথাই নেই।
তবে সব থেকে যেটা ম্যাটার করা উচিত সেটা হলো একটা ছেলে কতোটা প্রানবন্ত, কতোটা সম্মানীয় বা অপরকে কতোটা সম্মান দিতে পারে।

সবগুনই তো আছে রজত ভাইয়ার মাঝে তো আপত্তি কেনো করছি আমি। পরোক্ষনেই মনে পড়ে গেলো তুষারের কথা। নাহ আর আমি হুট করে সিদ্ধান্ত নিবো না।
সূচি বললো রজত ভাইয়া,

রজত চমকে ওঠলো খানিকটা সূচির হাতটা এখনো তাঁর হাতের মাঝে আবদ্ধ রয়েছে, রজত ভাবলো এজন্যই বোধহয় ডাকলো তাই বললো ওহ সরি খেয়াল করিনি। হাত ছারতেই সূচি চমকে গেলো সেই সাথে খেয়াল ও হলো যে তাঁর হাত এতোক্ষন রজতের হাতের মাঝে আবদ্ধ ছিলো। কেমন করে যেন বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠলো। গলাটা ভীষনভাবে শুকিয়ে গেলো। এক ঢোক গিয়ে শুকনো গলাটা ভিজিয়ে নিলো।

রজত বললো বলো কি বলবে, তবে হ্যাঁ এনগেজমেন্ট টা আজ হচ্ছেই বিকজ এখানে আমাদের দুজনের পরিবার জরিয়ে আছে। আমার মা এসে গেছে আমার মায়ের কোন প্রকার অসম্মান বা আমার মা কোন ভাবে নিরাশ হোক সেটা আমি চাইনা।
তাই এনগেজমেন্ট টা তোমাকে করতেই হবে।

সূচি বললো প্লিজ ভাইয়া আমার একটু সময় চাই। আমাকে একটু সময় দাও তোমরা। এভাবে তারাহুরোর মাঝে কিছু করতে চাইনা।
রজত সূচির চোখে চোখ রেখে বললো জাষ্ট এনগেজমেন্ট হচ্ছে। এটা তেমন কোন বিষয় না তারপর যতো খুশি সময় নাও নো প্রবলেম।
সূচি বললো এতো তারাতাড়ি আমি বিয়ে করতে পারবো না।

রজত বাঁকা হেসে বললো এতো তারাতাড়ি আমিও বিয়ে করছিনা। বউ কে খাওয়াবো কি হ্যাঁ আগে একটা জব নিতে হবে তাঁর পর ওসব বিয়ের চিন্তা।
আমার তো সৌধর মতো বাবার হোটেল নেই। এক্সামটা শেষ এবার জব এর ট্রাই করবো তারপর বউ এর চিন্তা।
সূচি বেশ লজ্জায় পড়ে গেলো এতো এগিয়ে বলার জন্য।

রজত সূচি বাসায় পৌঁছাতেই সূচিকে দ্রুত রুমে নিয়ে গিয়ে রেডি করালো। রজতের সাথে ফেরায় কেউ সূচিকে কিছু বললো না।

সূচি নিচে আসতেই রজত অপলক ভাবে চেয়ে রইলো। পুরো বাড়িতে দুটো কাপলের দিক থেকেই যেনো দৃষ্টি সরানোই যাচ্ছে না। সবটাই ছিলো সৌধর প্ল্যান,
জরজেট ডিজাইনার স্টোন ওয়ার্ক পারপেল কালার শাড়ীতে সূচিকে রজতের কাছে হুরপরীর মতো লাগছে। জীবনে প্রথম সূচিকে শাড়ী তে দেখছে তাঁর অনুভূতি সত্যিই আলাদা।

সৌধ কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো আমার বোনের দিকে একদম কুনজর দিবি না, চোখ তুলে নেবো। রজত সৌধর দিকে চাইতেই সৌধ দাঁত বের করে হেসে বললো আরে ভাই সুনজর দে তাই তো হয়।

সকলেই যখন নিচে ব্যাস্ত সুবহা তখন সৌধর রুমে ঢুকে হন্তদন্ত হয়ে সৌধর শার্ট খুঁজতে লাগলো।

কাবার্ড থেকে সাদা কালার দুটো শার্টের মধ্যে একটা শার্ট নিয়ে সব কিছু যেভাবে ছিলো সেভাবেই রেখে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। সূচির রুমে গিয়ে সুবহা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো আজকের জন্য সারাজীবন পস্তাবি সৌধ। তুই সারাজীবন আমাকে ইগনোর করেছিস মুখ বুজে সহ্য করেছি। পিংকি কে বিয়ে রুশার সাথে রিলেশন সবটাই আমি সহ্য করেছি। তাই বলে তুই পিংকির জন্য আমার গায়ে হাত তুলবি এই সুবহার গায়ে।

আমি বুঝে গেছি তুই কখনো আমার হবি না।

বেশ ভালো তুই যদি আমার না হোস তাহলে তুই কারো হবি না। আর যদি কারো হোস তাহলে সেটা আমারই হবি।

রুশার বিয়ে হওয়ার পরই পিংকির সাথে তোর রিলেশন হয়েছে তাইনা। তাঁর মানে তো তুই একাকিত্ব দূর করতে পিংকি কে কাছে টেনে নিয়েছিস।
তাহলে যখন পিংকি চলে যাবে তুই আবারো একা হয়ে যাবি। আর সেই সুযোগ টাই আমি নেবো। পুরুষ মানুষের মন সুযোগ বুঝেই টোপ ফেলবো,
আর যাই হোক পিংকি কে আমি তোর লাইফে মেনে নিতে পারবো না। তোর বউ এতো সুন্দরী হবে আর আমি সেটা মুখ বুঝে সহ্য করবো ইম্পসিবল।

কয়েকদিন পর –
আকাশ চৌধুরী ফোন করে জানালেন সৌধ যেহেতু অফিস জয়েন করবে তার আগে কিছু ট্রেনিং নিয়ে নিতে হবে। আর ট্রেনিং টা যেহেতু খুলনায় হচ্ছে তো তুমি তোমার ফুপুর সাথেই চলে এসো আজ।

বাবার কথা শুনে সৌধ চমকে গেলো আর বললো কদিনের ট্রেনিং?
সবার জন্য অনেক টাইম হলেও তোমার জন্য কম হবে নো টেনশন। চলে এসো শুধু।

ফোন রেখে সৌধ পিংকি কে ডাকতে লাগলো পিংকি রুমে যেতেই সৌধ তাঁর বাবার বলা কথাটা বললো।
পিংকি ভীষন খুশি হলো। কোন স্ত্রী না চায় তাঁর স্বামী নিজের পায়ে দাঁড়াক। নিজে কর্মঠ হোক,

পিংকি বললো অবশ্যই যাবে আমি তোমার সব কিছু গুছিয়ে দিচ্ছি। বলেই কাবার্ডের দিকে এগোতেই সৌধ পিংকিকে হেচকা টান দিয়ে নিজের ওপর এনে ফেললো একহাতে কোমড় জরিয়ে বললো তোমায় ছেড়ে কতোদিন থাকতে হবে ভেবেছো একবারো,
পিংকি চোখ রাঙিয়ে বললো সৌধ,
কাজের জন্য তো যেতেই হবে তাইনা আর কতোদিন শশুরের টাকায় খাবো পড়বো, এবার নিজেও কিছু করো। আমিও মাথা উঁচু করে বলি আমার হাজব্যান্ড এই করে সেই করে।

সৌধ বললো তোমার হাজব্যান্ড কিছু না করলেও তোমার কিছুর অভাব হবেনা।

পিংকি সৌধর নাক চেপে বললো সে তো শশুর মশাইয়ের জন্য বর মশাইয়ের জন্য তো না।
আচ্ছা ছাড়োনা আজি যেতে হবে তো সব গুছিয়ে রাখি তাহলে।

সৌধ পিংকিকে আরেকটু নিজের সাথে চেপে বললো ফুপুর সাথে যেতে হবে ট্রেনিং টা ওখানেই। বাবা ফুপুকে নিয়েই যেতে বলেছে।
পিংকির বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠলো। ইদানীং সুবহাকে বড্ড সন্দেহ হয়। সেদিনের পর বেশ ভালো আচরন করে মেয়েটা তবুও কেনো জানি বড্ড সন্দেহ হয়। কেমন করে তাকিয়ে থাকে মনের মধ্যে না জানি কি চলে।

সৌধর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা আছে তার কিন্তু সুবহার ওপর কেমন যেনো ভরসা আসেনা। একবার ভাবলো না করবে পরোক্ষনেই ভাবলো বাবা টু যেহেতু বলেছে আমি না করলে সেটা ভালো দেখাবে না।

পিংকি সৌধ কে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।

ধীর গলায় বললো সৌধ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি,
তোমায় আমার থেকে কেউ কেড়ে নেবে না তো।

আমি কিন্তু আর সহ্য করতে পারবোনা। বলেই হুহু করে কেঁদে ওঠলো। সৌধ শক্ত করে চেপে বললো এই পাগলী কি বলছো কে কেড়ে নেবে। তুমি যদি নিষেধ করো তো আমি যাবো না। বউ আগে না জব আগে, আমার কাছে বউ আগে বুজেছো।

পিংকি কেঁদেই বললো না যাবে তুমি কিন্তু সুবহা,
সৌধ পিংকি কে বুক থেকে ওঠিয়ে বললো আরে ধূর ওকে নিয়ে ভেবো না। সেই কোন বয়স থেকে পিছে লেগে আছে ফুপুর মেয়ে বলে সহ্য করছি নয়তো বারোটা বাজিয়ে দিতাম।

পাগলামো ছাড়িয়ে ফেলতাম ওকে নিয়ে ভেবো না পাগলের সুখ মনে মনে।
পিংকি বললো আচ্ছা আমি সব গুছিয়ে রাখি তাহলে। সৌধ বললো ওয়েট শুনো যে কটা দিন বাইরে আছি সে কটা দিন ভার্সিটি যেতে হবে না।
মা চলে গেলে সূচি থাকবে আর সূচি যদি আমি আসার আগেই চলে যায় তো একটা ব্যবস্থা হবেই,
ভালোভাবে থাকবে কিন্তু মন খারাপ করবে না।

আর ফোন সবসময় নিজের কাছে রাখবে আমি সময়-অসময় ফোন করবো। পিংকি হালকা হাসলো সৌধ পিংকির দুগালে আলতো করে ধরে কপালে ভালোবাসার পরশ একে দিলো।

পনেরো দিন কেটে গেছে, আয়নার সামনে বসে নিজেকে দেখে, গলার মাঝ বরাবর কামড়ের দাগটা দেখে লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে পিংকি,
মানুষ বলে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। প্রথম দিকে যেভাবে পাওয়া যায় পরে নাকি সেভাবে পাওয়াই যায় না। আর স্বামী দূরে থাকলে নাকি ভালেবাসা-সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের তো এমন কিছু হয়নি।

বরং আরো বেশী কাছে পাওয়ার নেশা হয়ে গেছে। ভালোবাসা, কেয়ার দ্বিগুন বেড়ে গেছে সৌধর শরীর খুলনায় থাকলেও মন যেনো ঢাকায় পিংকির কাছেই রয়েছে, আর পিংকি ঢাকায় থাকলেও তাঁর মন খুলনায় সৌধর কাছে রয়েছে।

আর কাল রাতে যা হলো তারপর তো পিংকি লজ্জায় মরে যাচ্ছে।

দুহাতে চোখ মুখ ঢেকে বললো এতো পাগল কেনো সৌধ, এতো ভালোবাসে কেনো। এতো দুষ্টু কেনো?
ইশ ওর ছেলে -মেয়ে গুলো না জানি কতো দুষ্ট হবে বাবাই যা দুষ্টু বাচ্চারা যে কি হবে,
কাল রাত দশটার পর সৌধ হুট করে বাসায় আসে।

পিংকি কে জরিয়ে ধরে কানে ফিসফিস করে বলে এক নজর না দেখে থাকতে পারছিলাম না বউ, তাই বাবাকে বলে বিকালেই বের হয়েছি। আবার সকালেই চলে যেতে হবে। পিংকি আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্না করে ফেলে সৌধকে ভীষভাবে জরিয়ে নেয়। সারারাত তাদের মাঝে খুনসুটি ভালোবাসা, রোমায়েন্টিক টর্চার চলে অবশেষে সৌধ যেটা করলো তা পিংকির ভাবার বাইরে ছিলো। আরো দশদিন পর ব্যাক করবে বলে এই দশদিনের জন্য একটা স্মৃতি চিন্হ রেখে যেতে গলায় চুমুতে চুমুতে অস্থির করে জোরে এক কামড় বসিয়ে দেয়।

পিংকি ব্যাথায় কেঁদে ফেললেই সৌধ আবারো চুমু দিতে থাকে। যতোক্ষন না পিংকির কান্না থামে ততোক্ষন চুমু দিতেই থাকে। পিংকি কান্না থামিয়ে আবেশে চোখ বুঝে সৌধর স্পর্শ গুলো অনুভব করতে থাকে।

কলিং বেল বাজতেই জবা দরজা খুলে বললো আপা আপনে,

পর্ব ১৭

সারাদিন পাগলের মতো খুঁজেছে সৌধ পিংকি কে।

রজত, সহ সৌধর সব বন্ধু -বান্ধব রা মিলে পিংকি কে খুঁজেছে, রিতু সহ সব বান্ধবীর বাসায় গিয়ে গিয়ে খোঁজ নিয়েছে। তবুও কোন খোঁজ পায়নি। অবশেষে সৌধ পাগলের মতো গাড়ি নিয়ে ছুটে চলল তুষারের বাসার উদ্দেশ্য পাশে রজত রয়েছে।

সূচির বিষয় নিয়ে ঝামেলার পর তুষার ফ্ল্যাট টা ছেড়ে নিজের বাড়ি চলে গিয়েছে। তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যই সৌধ গাড়ি ঘুরিয়েছে। এবার তাঁর বেশ সন্দেহ লাগছে এসবের পিছনে তুষার ই রয়েছে।

রজত বললো সৌধ আমার মন বলছে তুষার এসবে জরিয়ে নেই। ওইদিন তুষার কে যেভাবে শায়েস্তা করেছি এরপর কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও ১০০বার ভাববে।

সৌধর চোখ দুটো রক্ত বর্ন ধারন করে আছে, বুকের ভিতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে অজানা ভয়ে।
কোনভাবেই কোন হিসেব মেলাতে পারছে না সৌধ।
রাতে সন্দেহ হয়েছিলো একবার পিংকির কন্ঠ টা তাঁর স্বাভাবিক লাগে নি প্রশ্ন করায় বলেছিলো তাঁর ঠান্ডা লেগেছে। সৌধর ফেরার কথা শুনেও তাঁর মধ্যে কোন উত্তেজনা অনুভব করেনি।

মনের ভিতর এতো এতো ভালোবাসা জমিয়ে, এতো এতো গিফ্ট নিয়ে সেই সাথে দুদিন পর তাঁর অফিস জয়েন করার সংবাদ নিয়ে বাড়ি এসেছিলো সৌধ।
বাড়ি ফিরতেই জানতে পারে সকালে ঘুম থেকে ওঠে সূচি পিংকি কে দেখেনি জবা এসেছে আটটার দিকে, সেও কিছু জানেনা। সূচি ফোন করতেই দেখতে পেলো ফোনটাও বিছানায় পড়ে আছে। সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেলো তবুও পিংকির দেখা মিললো না।

অবশেষে সৌধ বেরিয়ে পড়লো পিংকির খোঁজে। পিংকির আচরনে প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তাঁর কিন্তু এই মূহুর্তে রাগের থেকে বেশী জরুরী পিংকি কে খুঁজে বের করা হতেও পারে ওর কোন বিপদ হয়েছে। এতোটা দায়িত্ব জ্ঞান হীন মেয়ে তো পিংকি না।

,
তুষারের বাসায় ঢুকলো সৌধ, তুষারের মা বললো কি হয়েছে, তোমরা এভাবে ভিতরে আসছো কেনো? কি চাই?
রজত বললো তুষার কোথায়,

তুষারের মা ভয়ে এ ঢোক গিললো, আমতা আমতা করে বললো আমার ছেলে কি করেছে?
তুষার এর বউ জারা বাইরে আওয়াজ শুনেই তুষার কে বললো বাইরে লোক এসেছে। তুষার স্বাভাবিক ভাবেই বেরিয়ে এলো, সৌধ, রজতকে দেখে ভ্রু কুঁচকে এগোতে লাগলো।

সৌধ তুষার কে দেখে নিজের রাগটা আর কন্ট্রোল করতে পারলো না দ্রুত গিয়ে তুষারের কলার চেপে বললো বল পিংকি কে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?
জারা এসে বললো হোয়াট, তুমি এখনো এসব করে বেরাচ্ছো তুষার আমি তোমাকে ছাড়বো না।

তুষার বউ এর মুখের দিকে একবার সৌধর মুখের দিকে একবার অসহায়ের মতো চাইলো।
সৌধর হাত ধরে বললো এসব কি বলছিস আমি এসব কিছুই জানি না। তোর বউ কে আমি লুকাতে যাবো কেনো।
সৌধ আরো জোরে কলার টেনে বললো সত্যি করে বল পিংকি কোথায়,

তুষার বললো দেখ ভাই আমি এমনিতেই অনেক ঝামেলায় আছি এবার আমি কিচ্ছু করিনি বিলিভ কর।
রজত বললো সৌধ ওকে ছাড় ঠান্ডা মাথায় কাজ কর। উত্তেজিত হোস না এতো।

সৌধ তুষারের কলার ছেড়ে চিৎকার করে বললো পারছিনা আমি ঠান্ডা হতে। বলেই আবারো তেড়ে গেলো তুষারের দিকে তুষার খানিকটা পিছিয়ে বললো কবে থেকে পিংকি নিখোঁজ?

রজত সৌধকে টেনে পিছন দিকে নিয়ে বললো আজ সকাল থেকেই। তুষার জারার দিকে চেয়ে বললো জারা আমরা তো আজি তোমার বাবার বাসা থেকে ফিরেছি বিশ্বাস করো এসবের মধ্যে আমি নেই।
জারা চিন্তিত মুখ করে বললো সত্যি তো তুষার তো সাতদিন যাবৎ আমার সাথেই ছিলো।

জারা বললো আপনাদের ভুল হচ্ছে হয়তো। ঐ ঘটনাগুলো জানার পর তুষারকে আমি একটুও ছাড় দিয়ে চলিনা। সব সময় নজরেই রাখি আমার ধীর বিশ্বাস তুষার এসবে নেই।

সৌধ কঠিন চোখে তুষারের দিকে চাইলো।

তুষার বললো বিশ্বাস কর ভাই আমি এমনিতেই অনেক প্যারায় আছি। আমি এসবের কিছু জানিনা।

জারা তুষারের দিকে তাকাতেই তুষার এ ঢোক গিলে বললো না মানে প্যারা না আমি আমার বউ কে নিয়ে বেশ হ্যাপি আছি বলেই জারার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
সৌধ রাগে সেখানে আর এক মূহুর্তও দাঁড়ালো না।
রজত বললো হ্যাপি হলেই মঙ্গল, আসছি।

তুষারের মা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে চলে গেলেন ড্রয়িং রুম থেকে।
জারা এবার তুষারের দিকে চাইতেই তুষার আমতা আমতা করে বললো জান চলো না রুমে যাই।
জারা বললো স্যাট আপ,

আমি তোকে প্যারা দেই।
তুষার বললো একদমই না বলেই জোর পূর্বক হেসে বললো আমাকে বাবা ফোন করতে বলেছিলো করি গিয়ে হে,
,
সামিয়া চৌধুরী ফোন রিসিভ করতেই সৌধ বললো আজো তোমার কাছে তোমার পরিবার, সন্তানদের থেকে জবটাই বড় হয়ে গেলো মা। টাকার পিছনে ছুটতে ছুটতে তোমরা নিজেদের সন্তানদের অনেক অবহেলা করেছো। না পেয়েছি বাবাকে ঠিকভাবে না পেয়েছি মা কে ঠিকভাবে।

সারাজীবন অগোছালো, ওলোট-পালট জীবন যাপন করে যখন নিজের জীবনটা একটু গুছিয়ে নিলাম ঠিক তখনি আরেকটা ঝড় আসলো।

সামিয়া চৌধুরী বললেন সৌধ বাবা শান্ত হ আমি দেখছি কি করা যায় তোর বাবা রাতেই যাবে চিন্তা করিস না। সৌধ বাঁকা হেসে বললো আমার সাথে কেনো এমন হয় মা, আমাকে কি ভালোবাসার মতো বুঝার মতো কেউ নেই এই পৃথিবীতে।

সামিয়া চৌধুরী বললেন বাবা আমার পরীক্ষার ডিউটি আছে কাল নয়তো আমি ঠিক যেতাম।

সৌধ চিৎকার করে বললো হ্যাঁ ডিউটি, নিজের পরিবারের প্রতি কোন ডিউটি পালন করেছো তুমি?
টাকা-পয়সা, ভালো, ভালো পোশাক দিলেই সন্তানরা হ্যাপি হয়ে যায় না। জীবনের কঠিন সময় গুলো তে যদি বাবা – মাকেই পাশে না পাই তাহলে তোমরা কিসের বাবা -মা। সামিয়া চৌধুরী গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সূচি সৌধর কাঁধ ধরে বললো ব্রো,
সৌধ ফোন কেটে সূচিকে জরিয়ে কাঁদতে লাগলো।

সূচিও নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না।
রজত এই দৃশ্য দেখে মনে মনে বললো এতো ভালোবাসিস সৌধ তুই মেয়ে টা কে, এতোটা ভালোবাসিস, এই প্রথম তোকে কাঁদতে দেখছি সৌধ। সত্যি পিংকি অনেক ভাগ্যবতী যে তোর মতো স্বামী পেয়েছে।
তোকে না দেখলে বুঝতাম না কষ্ট কি?

কি নেই তোর সব আছে, টাকা, পয়সা, গাড়ি, বাড়ি তবুও তুই আর সূচি ছোট থেকে কখনোই সুখ পাসনি। তোদের মনের ভিতর ভীষন চাপা কষ্ট রয়েছে। বাবা-মা থেকেও তোদের বাবা-মা নেই।

“যার বাবা -মা নেই তাকে বলে এতিম আর যার বাবা-মা থেকেও নেই তাকে বলে হতভাগা”।
রজত বললো সূচি জবার বাড়ি কোথায়?
সূচি ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো কেনো?

সৌধ বললো জবার বাড়ি দিয়ে কি করবি?

রজত বললো দরকার আছে, তাঁর আগে বলতো আংকেল পুলিশে ইনফর্ম করতে দিচ্ছে না কেনো?

সৌধ বললো বাবা যতোই না করুক আমি ঠিকই ইনফর্ম করেছি। আমার এক পরিচিত পুলিশ অফিসারকে সব ইনফর্ম করেছি। তাঁরা তাদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা বাবা কেনো এখনো চুপচাপ আছে।

সূচি বললো সত্যি বলেছিস ব্রো বাবার তো চুপ করে থাকার কথা না। বাবার তো এতোক্ষনে পুরো ঢাকা শহড় তোলপাড় করে ফেলার কথা।
রজত সূচিকে থামিয়ে বললো সৌধ এখুনি জবার বাসায় যেতে হবে চল। বের হওয়ার সময় রজতের মনে পড়লো এ কদিন তো সূচিও বাসায় ছিলো। জবা যা জানবে সূচিও নিশ্চয়ই তাই জানবে।

রজত সৌধকে থামিয়ে বললো ওয়েট, সূচির সামনে গিয়ে বললো সত্যি করে বলতো এ কদিন তোমাদের বাসায় পিংকির কোন বন্ধু-বান্ধব এসেছে কিনা?
সূচি বললো মিথ্যা বলবো কেনো তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো।
সৌধ মাথার চুল টেনে ধরে চোখ বন্ধ করে মাথা ওপর দিক করে রইলো।

রজত সিরিয়াস হয়ে রাগি গলায় বললো যা প্রশ্ন করেছি তাই বলো।
সূচি ভ্রু কুঁচকে বললো না কেউ আসেনি।

রজত বললো বাইরের কেউ আসেনি?
সূচি বললো না কেউ তো আসেনি।
রজত সূচির সামনে থেকে সরে সোফায় বসলো। সূচিকে বললো ভালোভাবে ভেবে বলো কেউ আসেনি।

সূচি রেগে গিয়ে যেই বলতে যাবে কেউ আসেনি অমনি হুট করে মনে পড়লো বেশ কিছু দিন আগেতো সুবহা আপু এসেছিলো। এক ঢোক গিলে বললো এসেছিলো তো। সৌধ চোখ খুললো সূচির দিকে চেয়ে বললো কে এসেছিলো।

রজত দাঁড়িয়ে পড়লো।
কে এসেছিলো,

সূচি সৌধর দিকে ভয়ে ভয়ে চেয়ে বললো সুবহা আপু।
সৌধ সূচিকে ধমকে বললো হোয়াট,
তুই এটা আমাকে আগে বলিসনি কেনো?
রজত আমি সিওর সুবহাই কিছু করেছে। আমার পিংকি নিশ্চয়ই অভিমান করে লুকিয়ে আছে আমার থেকে।
রজত সূচিকে ধমকে বললো মন কোথায় থাকে এতো ইম্পরট্যান্ট একটা কথা এখন বলছো,

সূচি কেঁদে বললো সবাই আমাকে ধমকাচ্ছ কেনো আমার মনে থাকলে তো বলতামই।
আর সুবহা আপির জন্য পিংকি উধাও হয়েছে এটা কি আমি জানি নাকি?
রজত বললো ইডিয়ট,

সূচি রেগে বললো কি তুমি আমাকে ইডিয়ট বললে?
রজত সূচির সামনে থেকে সরে বললো সৌধ সুবহাকে ফোন কর,
সৌধ বললো রজত তুই আজ এখানেই থাক আমি আসছি,

কোথায় যাবি তুই?
ব্রো কোথায় যাবি?
এতো কথা বলার সময় নেই, আমাকে এখুনি বের হতে হবে।

রজত বললো আমিও যাবো তোর সাথে?
সৌধ বললো আমার টা আমি বুঝে নিবো রজত তুই সূচির দায়িত্ব টা নে। একা একা ফাঁকা বাড়িতে ও থাকতে পারবে না ভয় পাবে।
রজত আর কিছু বললো না। সৌধ দ্রুত বেরিয়ে পড়লো।

,
সারাদিন পর শান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো পিংকি। চোখ বেয়ে অঝড়ে নোনাজল পড়ছে।

কি ভেবেছিলো আর কি হয়ে গেলো। চরিএহীন মানুষের বউ হওয়া যতোটা না কষ্টের চরিএহীন মানুষের সন্তান হওয়া তাঁর থেকেও দ্বিগুন কষ্টের।
নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে বললো কেনো এলি তুই, তুই না এলে আজ আমি নিজেকে শেষ করে দিতে পারতাম। মুক্তি পেতাম এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে, মুক্তি পেতাম কিছু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে।

কি পরিচয়ে বড় করবো তোকে আমি? কোন চরিএহীন পুরুষের পরিচয় দিতে পারবো না।
তুই কি মানতে পারবি তোর জন্মদাতা একজন চরিএহীন। না কখনো না, আমাকে নিজের পরিচয় তৈরী করতে হবে, হ্যা তোর জন্য আমাকে নতুন করে ভাবতে হবে নতুন করে বাঁচতে হবে।
মা গো, আজ ভীষণ মনে পড়ছে তোমাকে।
মা গো তোমার সেই ছোট্ট প্রিন্সেস টা মা হতে চলেছে। জানো মা যখন আমি এই কথা জানতে পারলাম নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আজ যদি সব ঠিক থাকতো কতো ভালো হতো বল মা। আমার জীবনে কেনো কিছু ঠিক হয় না। কেনো আমি সব পেয়েও হারিয়ে ফেলি।
ডুঁকরে কেঁদে ওঠলো পিংকি।

আজ সকালের দিকে বাড়ি ছেড়ে এক কাপড়ে বেরিয়েছে পিংকি। বাড়ি থেকে বেশ দূরের রাস্তায় চলে গিয়েছিলো হাঁটতে হাঁটতে। সুযোগ খুঁজ ছিলো আর ভাবছিলো কিভাবে নিজেকে শেষ করে দেওয়া যায়। ধীরে ধীরে রোদ টা কড়া হতে শুরু করলো। কড়া রোদে বিষন্ন মনে হেঁটে চলেছে অজানা পথে।
হঠাৎ ই মাথাটা কেমন ঘুরে এলো, দুচোখ ঝাপসা হতে শুরু করলো, দু এক পা এগোনোর পরই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটে পড়লো।

জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো হসপিটাল বেডে। একজন নার্স এসে কিছু প্রশ্ন করলো পিংকি উত্তর দেওয়ার পর নার্স কিছু টেস্ট করাতে বললো হাসি হাসি মুখ করে মা হওয়ার সম্ভাবনার কথা বললো। পিংকি আঁতকে ওঠলো মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করতে শুরু করলো। নার্সের সাহায্যে প্রেগনেন্সি কীটের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখলো সে সত্যি প্র্যাগনেন্ট।

বুকের ভিতর কেমন করে ওঠলো, খুশি হবে না কি একজন ক্যারেক্টার লেসের সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করার জন্য চিৎকার করে কাঁদবে বুঝে ওঠতে পারলো না।

হসপিটাল থেকে বেরিয়ে সোজা চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিতে চলে গেলো। আকাশ চৌধুরী মিটিং শেষ করে লাঞ্চ করবে এমন সময় দাঁড়োয়ান এসে বললো স্যার একটি মেয়ে এসেছে নাম পিংকি। আর বললো আপনাকে নাম বললেই চিনবেন।
আকাশ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললো ভিতরে আসতে বলো।

,
রাত চারটার দিকে কলিং বেলের আওয়াজ শুনে বেশ অবাক হলো আনিসা বেগম।

কাজের মহিলা ভয়ে ভয়ে লাইট অন করে আনিসা বেগমের রুমের সামনে গিয়ে বললো আম্মা এতো রাইতে কেরা আইলো, ভূত না তো।
আনিসা বেগম রুম থেকে বেরিয়ে বললো পাগলামি বাদ দিয়ে গিয়ে দরজা খোল।
মহিলাটি আনিসা বেগম কে জাবটে ধরে বললো আমার ডর লাগে৷

আনিসা বেগম জোর করে ছাড়িয়ে এক ধমক দিলো।
ধমক খেয়ে সুড়সুড় করে নিচে নেমে দরজার কাছে গিয়ে মনে মনে দূয়া পড়ে বুকে তিনটা ফুঁ দিয়ে দরজা খুললো।
সৌধ ঝড়ের মতো ভিতরে ঢুকলো। পাগলের মতো চোখ ঘুরিয়ে আসে পাশে তাকাতে লাগলো।
আনিসা বেগম বললেন একি সৌধ এতো রাতে, তুই বাড়ি যাসনি, চোখ, মুখ এমন লাগছে কেনো?

আম্মা গো ভাইজান তো গেছেগা এইডা হাছাই ভূত না তো বলেই আনিসা বেগমের পিছনে গিয়ে লুকালো।
সৌধ আর এক মূহুর্ত দেরী না করে সোজা উপরে চলে গেলো। আনিসা বেগম এতো ডাকা সত্ত্বেও দাঁড়ালো না। আনিসা বেগম অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে উপরে চলে গেলেন।
,
পরপর ছয়টা থাপ্পড় খেয়ে ফ্লোরে মুখ গুঁজে পড়লো সুবহা। ঘুমের মাঝে আচমকা এভাবে টেনে ছয়টা থাপ্পড় কেউ তাকে দিতে পারে সেটা তাঁর কল্পনার বাইরে ছিলো। ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে শুরু করেছে নিচ থেকে মাথা উপরে ওঠাতেই সৌধর ভয়ংকর রূপ দেখে আঁতকে ওঠলো।
আনিসা বেগম ধমকে বললেন সৌধ। এসবের মানে কি?

কাজের মহিলা বললো আম্মা গো হাছাই ভূত আইছে

এইডা তো ভাইজান না।
সুবহা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ওঠে ভয়ার্ত চোখে সৌধর দিকে চেয়ে বললো সৌধ কি হয়েছে এমন করছিস কেনো।
সৌধ এবার আরো ক্ষেপে গিয়ে আরেকটা থাপ্পড় ওঠাতেই সুবহা ভয়ে আনিসা বেগমের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো।

পর্ব ১৮

সৌধ রেগে আনিসা বেগম কে সরিয়ে সুবহা কে আরো দুটা থাপ্পড় দিয়ে বললো বল পিংকি কে তুই কি বলেছিস কি করেছিস তুই ওর সাথে।
সুবহা কান্না করে দিলো আনিসা বেগম গিয়ে সৌধকে সাজোরে এক থাপ্পড় দিলো। সৌধ আনিসা বেগমের দিকে এমন চোখে তাকালো যা তাঁর দেওয়া থাপ্পড়ের থেকেও দ্বিগুন অসম্মানজনক ছিলো।

সুবহা আনিসা বেগমের কাছে গিয়ে জরিয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো- আম্মু আমি কিছু করিনি আমি কিছু জানিনা।
সৌধ একটানে সুবহা কে ছাড়িয়ে গলা চেপে ধরলো।

আনিসা বেগম সৌধর আচরনে ভয় প্লাস বিরক্ত হয়ে বললো সৌধ বাড়াবাড়ি করিস না। কি হয়েছে খুলে বল না বললে জানবো কি করে। কাজের মহিলা সৌধর হাত ছাড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে লাগলো।

সুবহা কেশে ওঠতেই আনিসা বেগম কান্না করে দিয়ে সৌধর সাথে জোর জবর দস্তি করতে করতে বললো বাবা ছার। আমার মেয়েটা মরে যাবে আমার কসম বাবা তুই সুবহা কে ছাড়।

সৌধ সুবহা কে ছেড়ে চিৎকার করে বললো ফুপু তোমার মেয়েকে সত্যিটা বলতে বলো নয়তো ওকে আমি খুন করে ফেলবো।
আনিসা বেগম সুবহা কে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বললো সত্যি তুই কিছু জানিস। সুবহার ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা। সন্দেহের বশেই এতো গুলো মার খেলো। সত্যি জানলে বোধহয় মেরেই ফেলবে। সুবহা চুপচাপ থাক বাঁচতে চাইলে।

সুবহা বললো না আম্মু আমি কিছু জানি না।

রাগে সারা শরীর ঘেমে একাকার সৌধর, হাত পা রাগে কাঁপছে তাঁর।

সৌধ কড়া গলায় বললো তুই সত্যি টা বলবি নাকি পুরো বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিবো।
আনিসা বেগম সৌধর এই রূপ দেখে মর্মাহত।

যে মেয়ের গায়ে কোনদিন ফুলের টোকাও লাগতে দেয়নি তুই আজ তাকে মেরে রক্তাক্ত করলি সৌধ।
এক মায়ের বুকে এভাবে আঘাত করলি।

সন্তান কে ঠিকঠাক শাসন করতে পারোনি বলেই আজ এইদিন দেখতে হচ্ছে তোমাকে।
তোমার মেয়ে আমার পিছন লেগে থাকতো কিচ্ছু বলিনি। আমার রুমে গিয়ে আমার ওপর হামলে পড়তো লজ্জায় তোমাদের কিছু বলিনি, আমার সামনে আমার বউকে থাপ্পড় দিয়েছে তবুও তোমাদের কিছু জানায়নি। কিন্তু আজ যখন ওর জন্য আমার বউ নিখোঁজ হয়েছে তখনও আমি চুপ করে থাকবো এটা ভাবলে ভুল ভাবছো তোমরা।

সৌধ একটু এগিয়ে এলো সুবহা পিছিয়ে গেলো।
তুই আমার বাড়ি গিয়েছিস কিনা,
সুবহা চমকে ওঠলো, এক ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বললো হ্যাঁ,

সুবহা নিশ্চুপ রইলো।
সৌধ বললো তুই সত্যিটা বলবি নাকি আমি পুলিশ আনতে বাধ্য হবো,
সুবহা এক ঢোক গিললো সৌধ এতটা ভয়ংকর বিহেইভ করবে সে ভাবতে পারেনি। সাজানো প্ল্যানটা যে এভাবে বিপরীত দিকে মোড় নিবে তাঁর কল্পনার বাইরে ছিলো। তাই সুবহা বিষয়টা অন্যভাবে ফেইস করার জন্য মুখ খুললো।

এক চিৎকার দিয়ে নিচে বসে নিজের চুল নিজেই খামচে ধরলো।
আম্মু আমি সৌধ কে ভালোবাসি,
সেই ছোট্ট বয়স থেকেই ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি,
আনিসা বেগম সৌধর দিকে চেয়ে এক ঢোক গিললেন, তাঁর মেয়ে যে সৌধ কে পাগলের মতো ভালোবাসে সেটা আর কেউ না জানলেও সে ঠিক জানে কারন সে যে মা,

সৌধ রাগে রাগে কাঁপছে, সুবহার কথাগুলো তাঁর কানে বিষের মতো লাগছে,
দাঁতে দাঁত চেপে বললো আমি তোর প্রেমের প্রপোজাল শুনার জন্য এখানে আসিনি, কি সর্বনাশ ঘটিয়েছিস সেটা বল?

সুবহা কাঁপা গলায় বলতে লাগলো সেদিন আমি তোর বাড়ি গিয়ে অনেক ভুলভাল বুঝাই পিংকিকে,
কিন্তু কোন ভাবেই সফল হতে পারিনি। তাই ফেরার জন্য পা বাড়িও আবার পিছিয়ে যাই। আর বলি,
পিংকি একটা কথা মনে রেখো সৌধ নিরুপায় হয়ে তোমার কাছে ফিরে এসেছে, তোমাকে ভালোবেসে ফেরে নি। রুশা চলে গেছে বলেই নিজের একাকিত্ব দূর করার জন্য তোমায় বেছে নিয়েছে, আবার কোন নারীর সংস্পর্শে এলে ঠিক তোমায় ভুলে, তোমায় ছেড়ে চলে যাবে। পুরুষ মানুষ কে চেনা অতো সহজ নয়। তুমি যথেষ্ট সুন্দরী তাই তোমাকে নিজের না করেই ছেড়ে দেবে এতোটা বোকা সৌধ নয়।

পিংকির মুখো ভঙ্গিতে বুঝেছিলাম আমার শেষ কথাগুলো একটু হলেও ওকে ভাবাচ্ছে,
তারপরই আমি দিয়ে দিলাম আরেকটা চাল,
কিছু ভয়েস রেকর্ড পাঠাই ফার্স্ট,
আনিসা বেগম, সৌধ বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বললো কিসের?

সুবহা মায়ের দিকে লজ্জার দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললো।
সৌধর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, হুংকার দিয়ে বললো তুই বলবি, ।

সুবহা কেঁপে ওঠলো, এক ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করে এক দমে বলে ফেললো
তোর কয়েকটা ভয়েস গোপনে রেকর্ড করে তাঁর সাথে আমার ভয়েস এড করে একটা অডিও ক্লিপ পাঠিয়ে দিয়েছি, আর দুদিন আগে তোর একটা শার্টে লিপস্টিকের দাগ দিয়ে পার্সেল করে তোর বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। পিংকিকে এটাই বুঝিয়েছি তুই এখানে এসে আমার সাথে অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেযুক্ত
হয়েছিস।

সৌধর চোখ দুটো রক্ত বর্ন ধারন করেছে।

সুবহা আরেক থাপ্পড় দিতে গিয়েও থেমে গেলো।

হাত পা কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছে তাঁর। স্বাভাবিক গলায় বললো আমার শার্ট তোর কাছে,
সুবহা অঝড়ে কাঁদতে শুরু করলো।

আর বললো সূচির এনগেজমেন্টের দিনই তোর কাবার্ড থেকে সাদা রঙের একটা শার্ট নিয়ে নিয়েছিলাম।

তোর বউ তোকে বিশ্বাস করে না সৌধ। ওর সাধারণ জ্ঞান ই নেই নয়তো কেউ এইটুকুতেই অবিশ্বাস করে তোকে ছেড়ে যায়, । তাহলে তো যে কেউ এসে যেভাবে খুশি সেভাবে বুঝিয়ে তোদের সম্পর্ক শেষ করবে।

সৌধর দুগালে ধরে সৌধ আমি তোকে খুব ভালোবাসিরে তুই ওকে ভুলে যা, যে তোকে ছেড়ে গেছে তাকে নিয়ে কষ্ট পাস না আমি আছিতো, এই সৌধ বলেই জরিয়ে ধরতে নিতেই সৌধ প্রচন্ড জোরে এক ঝটকা দিতেই সুবহা গিয়ে ছিটকে পড়লো।
ভালোবাসা, এই তুই কিসের ভালোবাসিস আমাকে।

তোর এটা ভালোবাসা হতে পারেনা, ভালোবাসা হলে তুই এই জঘন্য খেলাটা কোনভাবেই খেলতে পারতিস না। ভালোবাসার মানুষের চরিএে এতো বড় কলঙ্কের দাগ দিতে পারতিস না।

মিথ্যা দিয়ে কখনো কাউকে জয় করা যায় না।

ভালোবাসা তো কখনোই না। আর এই সৌধর চোখে আজ এতোটাই নিচু হয়ে গেলি যে এই সৌধ কখনো তোর ছায়াও মাড়াবে না।
বিষাক্ত নারী তুই,
ইয়েস এক নারী হয়ে আরেক নারীর জীবনে, সংসারে বিষ দিস তুই। তোর মতো মেয়ে দের এই সৌধ কুকুরের মতোও দাম দেয় না রাস্তার কুকুররাও তোর থেকে অনেক উঁচুতে আছে বুঝেসিস।

আনিসা বেগম লজ্জায়, ঘৃনায় মরে যাচ্ছিলো।

সুবহাকে ওঠিয়ে কষিয়ে দিলো দুই থাপ্পড়,
ছিঃ তোকে নিজের মেয়ে ভাবতেও লজ্জা হচ্ছে, তাই বলে এতোটা নিচে নামতে পারলি তুই। ছেলে মেয়ে দুটোর সংসার ভাঙলি বলেই আরেক থাপ্পড় দিতেই দেয়ালে মাথা লেগে কেটে রক্ত পড়তে শুরু করলো।

সুবহা কেঁদেই চলেছে।

আনিসা বেগম সৌধর দু পা আঁকড়ে ধরতেই সৌধ ছিটকে সরে গেলো ফুপুর দিকে বিস্ময় চোখে তাকালো।
আনিসা বেগম বললেন বাবা গো কুসন্তান জন্ম দেওয়ার ফল তো এটাই হওয়া উচিত।

সৌধর চোখ বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
এই পানি ফুপুর জন্য নয়, আর না সুবহার জঘন্য কাজের জন্য, এই পানি তাঁর প্রিয়তমার অবিশ্বাসের ফলে তাঁর ভিতরের যন্ত্রণার মহাসমুদ্রের পানি।
,
অবিশ্বাস অবিশ্বাস অবিশ্বাস
সারা পৃথিবীতে আজ অবিশ্বাস
অবিশ্বাস অবিশ্বাস অবিশ্বাস !!

যে বিশ্বাস করতে শেখালো, যে ভরসা করতে শেখালো। আজ সেই অবিশ্বাসের বশবতী হয়ে গেলো?
একটা বার তুমি আমার কাছে শুনার প্রয়োজন মনে করলে না, একটা বার যাচাই করতে আসলে না। ছিঃ পিংকি ছিঃ। কখনো ক্ষমা করবো না তোমায় আমি।
শুধু জাষ্ট একবার তোমার মুখোমুখি হতে চাই ব্যাস।

তারপর আমি নিজে তোমার থেকে দূরে সরে যাবো।
ইয়েস আই প্রমিস ইউ। সরে যাবো আমি।
,
ভোর হয়ে গেছে সূচির ঘুম ভাঙতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো সোফার এক কোনে গুটিশুটি মেরে বসেই ঘুমিয়ে গেছিলো সে। পাশের এক কোনে রজতও বসেই ঘুমাচ্ছে, তাঁর মানে ব্রো এখনো ফেরে নি, আর বাবা, বাবা তো ফিরেছিলো। বাবার সাথে কথা না বলেই ঘুমিয়ে গেছিলাম ওহ গড।
আর এই ছাগলটাও হা করে ঘুমাচ্ছে কই আমাকে জাগিয়ে দেবে তা না হা করে ঘুমাচ্ছে।

সূচির মেজাজটা বিগরে গেলো।

রজতের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। কিন্তু রাগ টা বেশীক্ষন স্থায়ী হলো না। রজতের ঘুমন্ত মুখটা এতোটাই মায়াবী ছিলো যে সে আর রাগ করে থাকতে পারলো না। অদ্ভুত ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো মন টা।

ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেলো রজতের দিকে, পাশে বসে গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করছে সে রজত কে।
ঘুমন্ত অবস্থায় রজতের বেশ ভারী শ্বাস বের হচ্ছে সূচি এতটা কাছে গিয়েছে যে প্রত্যেকটা শ্বাস সে গুনতে পারছে।

এতটা কাছে যাওয়াতে আবেগটা কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না গভীর চোখে চেয়ে মুখ বরাবর মুখ নিয়ে ধীর গলায় বললো রজত ভাইয়া সত্যি তুমি আমাকে ভালো বাসোতো,

সূচির গরম শ্বাস রজতের মুখের ওপর পড়তেই রজতের ঘুম আলগা হয়ে গেলো, তাঁর ঘুম বেশ পাতলা ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর রুমে কেউ প্রবেশ করলেই তাঁর ঘুম ভেঙে যায়।

রজত চট করে চোখ খুলতেই সূচি চোখ বড় বড় করে সরে গিয়ে আমতা আমতা করতে লাগলো, ইয়ে মানে একটা মশা পড়েছিলো মুখে তাই আর কি, বলেই জোর পূর্বক হাসলো।

রজত সূচির মিথ্যা কথা শুনে ভড়কে গেলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে চেয়ে বললো মিথ্যাবাদী রাখালের বউ,
সূচি হকচকিয়ে গেলো আমতা আমতা করে বললো মানে, রাখালের বউ মানে?
রজত সোফা থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে শার্ট ঠিক করতে করতে বললো সারারাত পাহারা দিয়ে শেষ রাতে একটু ঘুমিয়েছি, সেই সুযোগে তুমি কিনা আমার মতো অবলা পুরুষ কে নির্যাতন করতে এসেছো ছিঃ সূচি ছিঃ ভাইয়ের বন্ধুর সাথে এই জঘন্য কাজটা তুমি কি করে করতে পারো।

সূচি বিস্ময় চোখে ওঠে দাঁড়ালো, কান্না করে দেবে এমন ভাব।
রজত ভাইয়া তুমি আমাকে ভুল বুজছো আমি ওরকম কিছু না,

রজত সূচির দিকে একটু ঝুঁকে বললো কিরকম কিছু,
রজত এতো কাছে আসায় সূচির দম বন্ধ হয়ে এলো।

রজত সেভাবেই বললো তুমি তো ভারী বজ্জাত মেয়ে, তোমাকে আমি বলেছি তোমার বাজে উদ্দেশ্য আছে, তার মানে সত্যি বাজে উদ্দেশ্য ছিলো।
বলেই রজত সোজা হয়ে ফোন বের করলো।
সূচি বললো বিশ্বাস করো আমার নেগেটিভ ভাবনা ছিলো না।

রজত আঙুল তুলে বললো সসসুশ,
কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো -” যদি তুমি জানতে চাও আমি তোমাকে কতোটা ভালোবাসি,
তাহলে আমার এই মনে একটু থেকে যাও”

সূচির কান জুরে শীতল শিহরন বয়ে গেলো, হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো কয়েক গুন। রজত বাঁকা হেসে ড্রয়িং রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
সূচি বুকটা চেপে ধরে সোফায় বসে এক ধ্যানে সামনের দিকে চেয়ে রইলো।
,
সারারাত আকাশ চৌধুরী ঘুমাতে পারেনি।
পিংকির বলা লথাগুলোই সে ভাবছে।

তবে কি সত্যি সৌধ পালটায় নি,
পিংকি যখন আকাশ চৌধুরীর অফিস যায় আকাশ চৌধুরী কে সব খুলে বলে সৌধর ব্যাপারে, আকাশ চৌধুরী প্রথমে বিলিভ না করলেও পিংকি মিথ্যা বলার মেয়ে না তাই ভেবে বিশ্বাস করে নেয়।
আর বলে আমি সৌধর সাথে কথা বলবো।

তুমি বাড়ি যাও,
কিন্তু পিংকি আকাশ চৌধুরীর দু পা আঁকড়ে ধরে অঝড়ে কাঁদতে থাকে আর বলে,
বাবা এই শহড়ে আমার আপন কেউ নেই, আপনি, মা টু ছাড়া আমার আপন বলতে কেউ নেই। বাবা আমি এতোকিছুর পর আর ঐ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবো না। আপনি আমাকে হোস্টেলের ব্যবস্থা করে দিন বাবা।

আকাশ চৌধুরী অবাক হয়ে গেলো। কি বলবে সে বুঝতে পারছে না। এতো স্ট্রং একটা মেয়ে এভাবে ভেঙে পড়েছে সত্যি দুঃখ জনক। সব পেয়েও মেয়েটা সব হারালো। আমার ছেলেটা কে মানুষ করতে পারলাম না, একটু আশার আলো দেখতে না দেখতেই আবার সব অন্ধকার হয়ে এলো।
আকাশ চৌধুরী বললেন হোস্টেল একদিনে তুমি কি করে পাবে, আর আকাশ চৌধুরীর পুএবধু হোস্টেলে থাকবে এটা লোকচক্ষুতে কেমন দেখাবে।
পিংকি বললো বাবা আমি সৌধর মুখোমুখি আর হতে চাই না।

আকাশ চৌধুরী অনেক ভেবে তাঁর ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলো পিংকি কে। পিংকি হাত জোর করে অনুরোধ করলো যাতে সৌধ কে কিছু না জানায়। আর তাদের ডিভোর্স এর ব্যবস্থা করে।

আপনাদের কাছে আমি অনেক ঋনি বাবা, কোন দিন যদি সুযোগ পেলে সব ঋন শোধ করে দেবো।
আকাশ চৌধুরী বললো তাঁর মানে তুমি আমাকে নিজের বাবার চোখে দেখোনি।

পিংকি কান্নায় ভেঙে পড়লো। আকাশ চৌধুরী বললেন তুমি আমার আরেকটা মেয়ে কখনোই সূচিকে আর তোমাকে আলাদা চোখে দেখিনি আমি আর সামিয়া,
পিংকি চুপ রইলো। আকাশ চৌধুরী বললেন এখানে থাকো তোমার কোন অসুবিধা হবে না।
পিংকি বললো বাবা আমি ডিভোর্স চাই আপনি ডিভোর্সের ব্যবস্থা করেন।

বিষয়েই কথা বলবো। এভাবে হয় না, আর কতোদিন এভাবে চলবে অনেক হয়েছে আর না এবার আমি শক্ত হয়ে ওকে আমার সিদ্ধান্ত জানাবো।
এবার আমি বুঝতে পারছি সৌধ কেনো ট্রেনিং করতে আমার এক কথায় রাজি হয়ে গেলো।
যেহেতু সুবহা কে চায় তবে তাই হোক।

পিংকি চোখ দুটি বন্ধ করে ফেললো। মনে হচ্ছে তাঁর বুকের ভিতর কেউ বিশাল পাথর চেপে ধরেছে।
,
সৌধ বাড়ি ফিরতেই সব ভাঙচুর করতে শুরু করলো। আকাশ চৌধুরী নিচে নামতেই ড্রয়িং রুমের এই অবস্থা দেখে হুংকার ছাড়লো।
সূচি একপাশে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাপছে।

অসভ্যতামি বন্ধ করো সৌধ, অনেক হয়েছে তোমার অসভ্যতামি আর সহ্য করবো না আমি।
সৌধ চিৎকার করে ওঠলো,

সূচি দৌড়ে গিয়ে আতঙ্ক ভরা মুখে আকাশ চৌধুরী কে বললো বাবা সুবহা আপুর জন্যই সব হয়েছে,
আকাশ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললো মানে,
সূচি সব খুলে বললো আকাশ চৌধুরী কে।

এবার আকাশ চৌধুরী পড়ে গেলো বিপাকে।
সুবহা এসব করেছে নাকি সৌধ সুবহা দুজনই চায় দুজনকে কোনটা,
সৌধ রক্ত বর্ন চোখে বাবার দিকে তাকালো।

চিৎকার করে বললো আমি সুবহাকে কখনোই চাইনি। আমার সাথে যে জঘন্য খেলা ও খেলেছে তাঁর শাস্তি ওকে আমি দিয়ে এসেছি।
সূচি বললো বাবা ব্রো পিংকিকে খুব ভালোবাসে, ব্রো সত্যি অনেক পালটে গেছে শুধু মাএ পিংকির জন্যই ব্রো নিজেকে নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এতোটা সিরিয়ায় হয়েছে।

সুবহা আপু সব নষ্ট করে দিলো বাবা সব।

সৌধ রাগে, ক্রোধে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে পিংকি, পিংকি বলে ডাকতে লাগলো।
আকাশ চৌধুরী ছেলের এই অবস্থা দেখে আর চুপ থাকতে পারলো না।

সৌধর কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললো সৌধ চিন্তা করিস না, পিংকি ঠিক ফিরে আসবে। আমি নিজে ওকে ফিরিয়ে আনবো।
সূচি বললো তুমি জানো পিংকি কোথায়,

সৌধ চুপ হয়ে গেলো, আকাশ চৌধুরী এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন ও আমার ফ্ল্যাটেই আছে।
সুবহার জন্যই তাহলে পিংকি ভুল বুঝেছে সৌধকে,
আমি বাবা হয়েও তো নিজের ছেলেকে চিনতে পারিনি। আমি ডিভোর্সের কথা ভাবছিলাম একটা ভুলকে বিশ্বাস করে,
সৌধ যা পিংকিকে ফিরিয়ে নিয়ে আয় সব ভুল-বোঝাবুঝি মিটিয়ে নে।

সৌধ রক্ত বর্ন চোখে ওঠে দাঁড়ালো। দু হাত মুঠ করে বললো ফিরিয়ে আনার প্রশ্নই ওঠে না। সব বোঝা পড়া করে সারাজীবনের জন্য আমি ওকে ত্যাগ করতে চাই।
তুমি ডিভোর্সের কথা ভাবছিলে তাইনা হ্যাঁ সেটাই ভাবো।
যে নারী নিজের স্বামী কে অবিশ্বাস করে কোন প্রকার যাচাই ছাড়াই স্বামীকে ছেড়ে চলে যায়, সেই নারীর সাথে আর যাই হোক সংসার হতে পারে না।
এরকম ঘটনা বার বার ঘটলে বার বার ই একি পরিস্থিতি তৈরী হবে। আমার জীবনটা পুতুল খেলা নয়। আর আমি সিদ্ধান্ত বার বার নেই না।
বলেই সৌধ বেরিয়ে গেলো। আকাশ চৌধুরী পিছু ডাকলো বার বার তবুও সৌধ ফিরলো না।

সূচি ভয়ে একদম শেষ।
বাবা এখন কি হবে,
আকাশ চৌধুরী বললেন এখুনি পিংকি কে ফোন করো ওকে সব সত্যিটা জানাও, তাহলে সৌধ যাই বলুক যাই করুক ও চুপ থাকবে, নয়তো দুজনেই মাথা গরম করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে।

সৌধর পৌঁছানোর আগেই রজত পৌঁছে গেছে ফ্ল্যাটে। সৌধ যখন সব সত্যি জানালো, আর আকাশ চৌধুরী যখন বললেন পিংকি তাঁর ফ্ল্যাটে আছে তখনি রজত ছুটে গেছে পিংকির কাছে সব সত্যিটা জানাতে।

সব শুনে পিংকির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো।

সত্যি কি আমি ভুল করলাম। সৌধকে ভুল বুঝলাম আমি? সুবহা এতো বড় জঘন্য খেলা খেলতে পারলো নিজেকে জরিয়ে?
তাহলে আমি যে নিজের চোখে শার্টে সুবহার লিপস্টিকের দাগ, ওইসব ভয়েস,
রজত পিংকি কে থামিয়ে বললো -পিংকি চোখের দেখাতেও অনেক সময় ভুল থাকে।

কানের শুনাতেও অনেক সময় ভুল থাকে। সত্যি বলতে সুবহা তোমাকে যা বুঝাতে চেয়েছে তুমি তাই বুঝেছো। তুমি একবারো পরখ করে দেখোনি।
তুমি সৌধকে অবিশ্বাস করেছো, তুমি অন্যায় করেছো ওর সাথে এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি।
আমি কখনো ভাবিনি তুমি এমন একটা কাজ করবে।

তুমি একটা ম্যাচিওর মেয়ে হয়ে এতো বড় ভুল কি করে করতে পারলে সৌধ আর যাই হোক চরিএহীন নয়, আর সুবহার সাথে রিলেশনশিপ তো ইম্পসিবল।
পিংকি ফুপিয়ে কেঁদে ওঠলো।

এখন কি হবে রজত ভাইয়া, সৌধর সামনে আমি কি করে দাঁড়াবো। এতো বড় ভুল আমি কি করে করে ফেললাম। পরোক্ষনেই পিংকির মুখে হাসি ফুটে ওঠলো। বেবীর কথা শুনে অবশ্যই সৌধ আমাকে ক্ষমা করে দেবে।

কলিং বেলের শব্দ পেতেই চমকে ওঠলো পিংকি।
রজত গিয়ে দরজা খুলতেই সৌধ অবাক হয়ে বললো তুই এখনে,
রজত বললো সৌধ মাথা গরম করিসনা আমি সব সত্যিটা জানিয়েছি পিংকি ওর ভুল বুঝতে পেরেছে।
সৌধ রজত কে এক ধাক্কায় সরিয়ে ঝড়ের বেগে ভিতরে ঢুকলো।

পিংকি ভয়ে ভয়ে সৌধর দিকে এগিয়ে কান্না করে ফেললো। সৌধর বুকের ভিতর যে ঝড়টা বয়ে চলেছিলো সেটা হঠাৎ ই থেমে গেলো।
ইচ্ছে করলো জরিয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে আর বলতে তোর সাহস কি করে হলো আমাকে ছেড়ে চলে আসার,
কিন্তু তাঁর রাগ জেদ সেটা করতে দিলো না।

হুট করেই পিংকি সৌধকে জরিয়ে ধরলো।
কাঁপা গলায় বললো সৌধ, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি সত্যি বুঝতে পারিনি কি থেকে কি হয়ে গেলো সত্যি জানিনা। তোমার খুব কষ্ট হয়েছে তাইনা।
সৌধ এক চিৎকার দিয়ে পিংকি ছাড়িয়ে বললো এই তুই আমাকে কি মনে করিস। আমি রাস্তার কুকুর,
সারারাত সারাদিন কুকুরের মতো রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করে তোকে খুঁজে বেরাবো।

আর তুই নিশ্চিন্তে এখানে বসে মজা দেখবি।
পিংকি সৌধকে আবারো জরিয়ে ধরতে যেতেই সৌধ ঠাশশ করে পিংকির গালে কয়েকটা থাপ্পড় দিলো।
রাগ যেনো তাঁর কমছেই না। রজত সৌধকে থামাতে গিয়েও পারছে না।

সৌধ আবারো পিংকিকে থাপ্পড় দিতেই পিংকি ফ্লোরে ওপুত হয়ে পড়ে সেন্সলেস হয়ে গেলো।

পর্ব ১৯

রজত জোরে চিৎকার করে সৌধর কাঁধে ধরে বললো। পাগল হয়ে গেছিস, এইসব কি পাগলামো, স্বামী -স্ত্রীর মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হতেই পারে সেই ভুলটা শুধরিয়ে দেওয়া টাই একজন স্বামী বা স্ত্রীর কর্তব্য। এই ভাবে অসভ্যের মতো মারামারি কেনো করছিস।

সৌধ চিৎকার করে বললো এটা ভুল বুঝাবুঝি নয়, এটা অবিশ্বাস। ও আমাকে বিশ্বাসের মর্যাদা করতে শিখিয়েছিলো সেই ওই আমাকে অবিশ্বাস কি করে করতে পারলো। আমি ওকে ক্ষমা করবো না করবো না ক্ষমা।

রজত ও হাইপার হয়ে গেলো।
তুই যদি ওকে ভালোবেসে থাকিস তো তুই ওকে ক্ষমা করতে বাধ্য।
ভালোবাসা কিসের ভালোবাসা।

“ভালোবাসা মানে দুইজন মানুষের আত্মার মিল যা টিকে থাকে দুইজনের বিশ্বাসের উপর”
আর ওর মধ্যে কি আদেও বিশ্বাস আছে,

বলেই সৌধ থমকে গেলো বুকের ভিতর টা ধক করে ওঠলো। সে তো রাগের মাথায় এতোক্ষন খেয়ালই করেনি পিংকি জ্ঞান হারিয়েছে৷ রজত ও সৌধর চোখ অনুসরন করে তাকাতেই চমকে গেলো।
একি পিংকি কোন সারা শব্দ করছে না কেনো?

সৌধ ছুটে পিংকির কাছে গিয়ে মুখ ওঠিয়ে কয়েকবার পিংকি বলে ডাকলো।
রজত দৌড়ে এসে বললো ওহ মাই গড, এটা কি হয়ে গেলো। সৌধ ওকে এখুনি হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে।
সৌধর বুকের ভিতর টা মোচড় দিয়ে ওঠলো।

আর কিছু বলার সাহস হয়ে ওঠলো না তাঁর।
রাগের মাথায় না জানি কি করে ফেললাম। অপরাধ বোধ ঘিরে ধরলো তাঁকে। দ্রুত পাঁজাকোল করে নিয়েই বেরিয়ে পড়লো।
এদিকে ল্যান লাইনে ফোন আসতেই রজত গিয়ে ফোন ধরে সূচিকে সবটা জানালো এবং নিজেও বেরিয়ে পড়লো।
,
দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৌধ।
রজত আকাশ চৌধুরীর সাথে কথা বলছে, সূচি গালে হাত দিয়ে বেঞ্চে বসে আছে।
ডক্টর এসে বললো মি.আকাশ চৌধুরী কনগ্রেচুয়েলেশনস, আপনি দাদা হতে চলেছেন।
ডক্টরের কথা শুনে উপস্থিত সকলেই বিস্ময় চোখে তাকালো, খুশিতে সবাই বাকরুদ্ধ।

রজত একবার ডক্টর আবার সৌধ সমানে চোখের পলক ফেলছে আর দেখে যাচ্ছে,
সূচি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে, আতঙ্ক ভরা কন্ঠে বললো আমি যা শুনলাম তোমরাও কি তাই শুনেছো, তাঁর এই আতঙ্কতে খুশির ভাগ যে ১০০% তা উপস্থিত সবাই টের পেলো।

আকাশ চৌধুরী কাকে যেনো ফোন করে বিশ কেজি মিষ্টি নিয়ে আসতে বললো হসপিটালে, সামিয়া চৌধুরীর নাম্বার ডায়াল করে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেলো।
সৌধ চুপচাপ মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো।

সূচি এসে সৌধকে জরিয়ে ধরে বললো ব্রো কনগ্রেস,
ডক্টর অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, তাকে বাকি কথা বলার কেউ সুযোগ ই দিলো না।
এরা যে কেনো এতো হাইপার হয়ে যায়, কখনো খুশিতে কখনো রাগে।
এক্সিউজমি,

রজত তাঁর বিস্ময় ভরা চোখ মুখ স্বাভাবিক করে ডক্টরের দিকে তাকালো।
জ্বি বলুন,

প্যাসেন্ট এই অবস্থায় মাথায় এমন আঘাত কি করে পেলো। এই অবস্থায় প্রচন্ড সাবধানে থাকতে হবে, এছাড়া প্যাসেন্ট ভীষণ উইক। এমন সময় কোন প্রকার মানসিক চাপ নেওয়া যাবে না। স্পেশালি খাওয়া-দাওয়াটা ঠিক ভাবে করতে হবে। সবাইকে মাথায় রাখতে হবে প্যাসেন্ট একা নয় তাঁর সাথে তাঁর বেবীও আছে।
সূচি বললো জ্বি ডক্টর আমরা সব খেয়াল রাখবো।

আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা কি পিংকির কাছে যেতে পারি।
অবশ্যই ওনাকে রিলিজ করতে পারবেন নো প্রবলেম।

সূচি খুশিতে গদগদ হয়ে দৌড়ে কেবিনে চলে গেলো।
কিরে ভায়া, এতো দূর,
এই ছিলো তোর মনে, ছিঃ কি করে পারলি তুই। আমাদের সবাইকে এতো বড় ধোঁকা টা তুই দিতে পারলি,
সৌধ এবার হুঁশে ফিরলো, বাবা হওয়ার সুখ বোধ হয় একেই বলে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখের শিখরে যেনো সে পৌছে গেছে। বুকের ভিতর যে সুখানুভূতি টা হচ্ছিল তা সে চেপে নিলো।

রজতের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো মনে হয় তোরা আমার গার্লফ্রেন্ড যে ধোঁকা দিচ্ছি।
রজতের মুখ চোখ গোল হয়ে গেলো অবাক স্বরে বললো এই কি বলছিস। না ভাই না, আপনি এখন এক সন্তান এর বাপ আপনি কতো এগিয়ে বলুনতো সেটাই বুঝাচ্ছিলাম আর কি।

সৌধ বললো চুপথাক আমার বোঝাপড়া শেষ হয়নি।

ওর সাহস কি করে হলো আমার সন্তান কে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার, যদি কোন ক্ষতি হয়ে যেতো।
ওকে জবাব দিতেই হবে বলেই কেবিনে ঢুকে পড়লো।

রজত বললো পাগলা ঘোরা ক্ষেপেছে এবার আর রক্ষে নেই।

,
পিংকি সমানে কেঁদেই যাচ্ছে, প্রচন্ড ভয় পেয়েছে যদি বাচ্চাটার কিছু একটা হয়ে যেতো।
আমি সত্যি যাবো না, এমন রাগি, জেদী মানুষের কাছে যেতে চাইনা আমি। আমার বাচ্চা কে নিয়ে আমি একাই থাকবো।
সূচি মুচকি হাসলো পিংকির অভিমান মাখা কথা গুলো শুনে।

আমার ভাই তোমাকে যেতে দিলে না যাবে,
কে বললো যেতে দেবো না,
সূচি, পিংকি দুজনেই তাকালো। সৌধকে দেখে পিংকি সূচির হাত টা চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করলো।
সৌধ কড়া গলায় বললো তুই যেখানে খুশি সেখানে চলে যা, কিন্তু আমার বাচ্চা কে সঙ্গে নিতে পারবিনা।

তোর মতো অবিশ্বাসী নারীর কাছে আমি আমার সন্তান কে রাখবো না, নয়তো কোনদিন চরিএহীনের সন্তান বলে গলা টিপে মেরে ফেলবি কে জানে,
সৌধ, ছিঃ এতো নীচ ভাবনা তুমি কিভাবে ভাবতে পারো।
যেভাবে তুই ভেবেছিস।

সূচি বললো ওহ তোরা থামবি।
রজত এসে বললো সৌধ ডক্টর কি বলেছে শুনিসনি। এসময় এইসব ঝামেলা করিস না, বাচ্চাটার ক্ষতি হয়ে যাবেতো।
সৌধ চুপ হয়ে গেলো রাগি চোখে পিংকির দিকে তাকালো। পিংকির চোখ বেয়ে অঝড়ে পানি পড়ছে।

সৌধ দাঁতে দাঁত চেপে বললো সূচি আমার বাচ্চা যে পর্যন্ত অন্যকারো কাছে রয়েছে সে পর্যন্ত তাঁকে আমার কাছেই থাকতে হবে।

বাচ্চা টা আমার হাতে দিয়ে যেখানে খুশি সেখানে চলে যাক। আই ডোন্ট কেয়ার,
সূচি হকচকিয়ে গেলো ভাইয়ের কথা শুনে। কেমন যেনো তাঁর মজা লাগছে এদের কান্ড দেখে।
মুখ চিপে হেসে সূচি গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো পিংকি বাবুকে না দিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে না।
পিংকি নাক, টেনে কাঁদতে লাগলো।

রজত এদের কথাবার্তা শুনে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।
বেশকয়েকদিন হয়ে গেছে। সৌধর রাগ একটুও কমেনি। এক বিছানায় পর্যন্ত থাকে না পিংকির সাথে। তবে যতো প্রকার টর্চার সব করে বেরায় দূর থেকেই। এতো সব রাগ ঝামেলার মাঝে পিংকির কেয়ার নিতে কখনো ভুল হয় না তাঁর।

সূচি চলে গেছে সামিয়া চৌধুরী ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে।
একটা মেয়ের প্রেগ্ন্যাসির সময় তাঁর মা কে ভীষন প্রয়োজন হয়। পিংকির মা দিনে কয়েকবার ফোন করে। পিংকির রাগটাও বেশ কমে গেছে সে ঠিক মায়ের সাথে নিয়ম করে কথা বলে। সামিয়া চৌধুরীও তাঁর বেশ যত্ন নিচ্ছে।

আর বলছে দেখিস বাচ্চার মুখ দেখে সৌধ সব ভুলে যাবে আর রেগে থাকতে পারবে না।
পিংকির খুব মন খারাপ হয় সৌধ তাঁর কাছে আসেনা। দুচোখে সহ্য করতে পারেনা যেনো তাকে।
রাতে নিঃশব্দে কাঁদে খুব।

সৌধ যদি টের পায় তো হুংকার ছাড়তে থাকে তোর এই কান্নার জন্য যদি আমার বেবীর কিছু হয় তো তোর একদিন কি আমার একদিন। সব দিক দিয়ে বিপদে পড়েছে পিংকি, মন খুলে কাঁদতেও পারে না।

জমের মতো এসে ঘাড়ে চেপে ধরে যেনো।
সৌধ অফিস জয়েন করেছে, সারাদিনটা বেশ রিল্যাক্সে কাটাতে পারে পিংকি। সামিয়া চৌধুরী খাওয়ার জন্য জোর করলেও সৌধর মতো থ্রেট বা হুংকার ছাড়ে না। তবে রাতে বেশ বিপদে পড়ে যায়।

তিনমাস ছেড়ে চারমাসে পা দিয়েছে। ইদানীং তাঁদের নবাগত অতিথির উপস্থিতি বেশ টের পায়।
শরীরটাও আগের থেকে বেশ ভারী হয়ে গেছে।

এদিকে থার্ড ইয়ারে এক্সাম শুরু হয়ে গেছে। আরো চারটা এক্সাম বাকি। সারাদিন পড়া আর খাওয়া ছাড়া তাঁর এক্সট্রা কোন কাজ নেই।
,
রাত নয়টা বাজে পিংকি রুমে বসে পড়ছিলো এমন সময় সামিয়া চৌধুরী এক গ্লাস গরম দুধ এনে বললো পিংকি সারাদিন যা খেয়েছো সব বমি হয়ে পড়ে গেছে, রাতে খালি পেটে থাকা যাবে না এটা খেয়ে নাও।

পিংকি ছোট থেকেই দুধ টা খুব একটা পছন্দ করে না। দুধ খেলে তাঁর এমনিতেই গা গোলায়, এই অবস্থায় এটা খেলে তো উপায়ই নেই। যেসব খাবাড় পছন্দ করে সেগুলোও ভালো লাগছে না। এটা যে কতটা বাজে লাগবে ভেবেই নাক মুখ খিঁচে ওঠলো পিংকির। মা টু প্লিজ আমি এটা খাবো না, আমি অন্য কিছু খেয়ে নিবো। সামিয়া চৌধুরী ভয়ে এক ঢোক গিললেন, ভয় টা নিজের জন্য না ভয় টা পিংকির জন্যই। এমনিতেই যা সব ঘটে যাচ্ছে আর সৌধ যা ক্ষেপে আছে এখন যদি এটা না খায় আরেক ক্যালেংকারী হবে।

এটা খেয়ে নাও পিংকি এমন অবস্থায় পেট খালি রাখতে নেই। এমনিতেও অনেক উইক তুমি এটা খেতেই হবে।

পিংকি বুঝলো তাঁর শাশুরি না খেলে ছাড়বেনা তাই বললো আচ্ছা আমি এই চ্যাপ্টার টা পড়েই খাচ্ছি। তুমি যাও শুয়ে পড়ো গিয়ে কেমন। সামিয়া চৌধুরী স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বললেন আচ্ছা এটা খেয়ে তারপরই ঘুমাবে বলেই মাথায় হাত বুলালো সামিয়া চৌধুরী। পিংকিও মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিলো।

সামিয়া চৌধুরী চলে যেতেই পিংকি একটু একটু বির বির করে পড়ার ফাঁকে দুধের গ্লাসটার দিকে তাকালো। দুধ দেখেই তাঁর গা গোলাতে লাগলো। চট জলদি বিছানা ছেড়ে ওঠে দুধের গ্লাসটা নিয়ে বাথরুম গিয়ে ফেলতে নিতেই সৌধ শক্ত করে হাত চেপে ধরে টেনে বাথরুম থেকে বের করে নিয়ে এলো পিংকি কে।
সৌধর মুখের দিকে একবার আবার হাতের দিকে তাকাতেই ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠলো। সেই সাথে ভয় ও পেলো ভীষনভাবে ইদানীং সৌধ যা ক্ষেপে আছে। অবশ্য তাঁর কারন ও আছে এখন না জানি কি করে বসে। ভয়ে ভয়ে বললো সৌধ লাগছে আমার,

সৌধ হাত মুচড়ে ধরে আরেক হাতে দুধের গ্লাসটা হাতে নিলো। হাত ছেড়ে এক হাতে পিংকির গলায় চেপে ধরে একদম দেয়ালে ঠেকিয়ে ফেললো।
তোর সাহস কি করে হয় দুধ টা ফেলে দিতে যাস।

তুই কি ভাবছিস এটা তোর জন্য আনা হয়েছে।
এটা আমার সন্তানের জন্য আনা হয়েছে আর এটা তোকে খেতেই হবে।
পিংকি সৌধর হাত ধরে গলায় রাখা হাত ছাড়াতে চেষ্টা করলো।

সৌধ ছাড়ো প্লিজ লাগছে আমার,
সৌধ কোন কথায় কান না দিয়ে গলা থেকে হাত সরিয়ে হাত টা ঘাড়ের দিকে নিয়ে চেপে আরেক হাতে থাকা দুধের গ্লাসটা মুখের সামনে এনে ঘাড় ঠেসে ধরলো।

ঠোঁটের কাছে গ্লাস নিয়ে জোরে চেপে ধরলো এক হাতে ঘারটা চেপে ধরলো।
তোকে এটা খেতেই হবে, তোর জন্য আমার বাচ্চার কোন ক্ষতি হোক সেটা আমি চাইনা। বাচ্চা টাকে সুস্থ ভাবে আমার কাছে দিয়ে যেখানে খুশি চলে যা তুই। আই ডোন্ট কেয়ার, যতোদিন ও তোর গর্ভে আছে ততোদিন আমার নিয়মেই তোকে চলতে হবে।

কথাগুলো বলতে বলতেই পিংকি দুধ টা চোখ বন্ধ করে খেয়ে নিয়েছে। খাওয়া শেষে সৌধও পিংকি কে ছেড়ে গ্লাসটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেললো কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো কাঁচের টুকরো গুলো।

পিংকি প্রচন্ড হাঁপাচ্ছে সেই সাথে তাঁর প্রচন্ড গা গোলাচ্ছে বমিও পাচ্ছে খুব। সৌধ কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে পিংকির দিকে।
পিংকি ভয়ে কি করবে বুঝতে পারছে না প্রচন্ড গা গোলাতে শুরু করলো, অবশেষে না পেরে সেখানেই গল গল করে বমি করে সব ফেলে দিলো।
সৌধ তারাতাড়ি করে পিংকি কে ধরে নিয়ে বাথরুম চলে গেলো৷ পানি এগিয়ে দিলো পিংকি পানিটা চোখে মুখে দিয়ে সৌধর দিকে চেয়ে ডুঁকরে কেঁদে ওঠলো। সৌধকে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।

সৌধর প্রচন্ড কষ্ট হলো কিন্তু কি করবে সে, সে যে ক্ষমা করতে পারছে না তাকে। যদি সন্তান সম্ভবা না হতো হয়তো ইচ্ছে মতো শাস্তি দিয়ে নিজের রাগটা কমাতে পারতো। সেটাও সে পারছে না। না পারছে শাস্তি দিতে না পারছে ভালোবাসতে আর না পারছে দূরে ঠেলে দিতে।

“কেনো বুঝলি না তুই, কেনো অবিশ্বাস করলি তুই আমায়, এই তোর ভালোবাসা। আজ যা সব ঘটছে এসবের জন্য তুই নিজেই দায়ী, কখনো ক্ষমা করবো না তোকে আমি কখনোই না।

সৌধ পিংকি কে পাঁজাকোল করে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়িয়ে দিলো। কড়া গলায় বললো এখানেই শুয়ে থাকবি একদম ওঠবিনা। বলেই চলে গেলো।
জবাকে দিয়ে আমের আঁচার পাঠিয়ে দিলো সাথে চকলেট বক্স। আর বললো রুমটা পরিষ্কার করে দিতে। জবা সৌধর সব কথা শুনে পিংকিকে খাবাড় গুলো দিয়ে রুমটা পরিষ্কার করলো।

পিংকি কাঁদতে কাঁদতে আচার টা খেয়ে নিলো।

আর অভিমানী স্বরে বললো এসব তো আমার জন্য না তাঁর বাচ্চার জন্য আমার এতো খুশি হয়ে লাভ নেই সবটাই তাঁর বাচ্চার জন্য আমি তো তাঁর কেউ না।
জবা বললো আপা আপনিই তো সব। বাচ্চা কি আর বলছে সে আচার খাবো, চকলেট খাবো। ভাই আপনারে ভালোবাইসাই তো এইসব দিছে। আপনে পছন্দ করেন বইলাই। হুদাই আপনারা এমন মান-অভিমান করতাছেন। দরজার বাইরে থেকে সৌধ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে আবার মান-অভিমান। যেই সহজ বিষয় টা তুই বুঝলি সেই সহজ বিষয়টা এই অবিশ্বাসী নারী বুঝলো না।
জবা চলে যেতেই সৌধ এসে সোফায় সুয়ে পড়লো।

চোখ দুটো বন্ধ করে সোজা হয়ে সুয়ে রইলো সে।
পিংকি সৌধর দিকে তাঁকিয়ে রইলো এতো জেদ, এতো রাগ তোমার পিংকি না হয় একটা ভুল করেই ফেলেছে তাই বলে এভাবে শাস্তি দেবে।
ওপাশ ফিরে পিংকি নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে বিরবির করে বললো বাবু তুই তারাতারি চলে আয় তো, তোর বাবা খুব খারাপ তোর মা কে কতো কষ্ট দিচ্ছে দেখেছিস। একটু কাছে আসেনা যখন আসে এসেই ব্যাথা দেয়, কখনো শারীরিক কখনো মানসিক। দেখ বাবু গলাটা কেমন লাল হয়ে গেছে।
আহ,

সৌধ চমকে ওঠলো,
চোখ খুলে বিছানায় তাকাতেই দেখতে পেলো পিংকি পেটে হাত রেখে কেমন করছে, বুঝলো হয়তো পেইন হচ্ছে।

পর্ব ২০ (Romantic Love story BD)

তারাতাড়ি ওঠে পিংকির কাছে গিয়ে এক হাত চেপে ধরে আরেক হাত মাথায় রেখে বললো কি হয়েছে পেইন হচ্ছে,
পিংকি কেঁদে ফেললো মাথা নাড়ালো।

সৌধ বললো পেটে পেইন হচ্ছে, খুব ব্যাথা করছে, ডক্টর কে ফোন করবো? মা কে ডাকবো?
অস্থির হয়ে পড়লো সৌধ, সৌধর অস্থিরতা দেখে পিংকির চোখ বেয়ে পানি ঝড়তে শুরু করলো।

সৌধ বললো এই কাঁদছো কেনো, কিছু হবে না আমি আছিতো, কিছু হবে না এখুনি মা কে ডাকছি।
পিংকি পেটে হাত রেখে ও মা গো বলে ওঠতেই সৌধ ভয় পেয়ে পেটে হাত রাখলো। আলতো করে বুলিয়ে বললো কিছু হবে না ভয় পেওনা। বলেই মা বলে ডাকতে লাগলো।

পিংকি বললো মা টু কে ডেকোনা একটু হাত দিয়ে মালিশ করো ঠিক হবে। বাবু নড়ছে মনে হয়।
সৌধ চমকে ওঠলো বাবু নড়ছে সত্যি,

পিংকি আবারো ও মা গো বলতেই সৌধ কামিজের পার্ট টা ওঠিয়ে গভীর চোখ রাখলো। হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলো বাবু সত্যি নড়ছে কিনা।
সৌধ কিছু বুঝতে না পেরে মাথা টা ঝুকিয়ে গাল টা পেটে ঠেকালো।

পিংকি মুখ চিপে হাসছে,
বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এই বার ঘুঘু তোমার লহিব পরান,

সৌধ আবারো পেটের দিকে তাকালো। ফিসফিস করে বললো এই বাবু বেশী নড়াচড়া করিস না, মায়ের কষ্ট হয় তো। ওখান থেকে বেরিয়ে যতো পারিস লাফালাফি করবি সব কিছু ভেঙেচুরমার করবি, মাকে ইচ্ছে মতো জ্বালাবি বাবার মতো,
এখন একটু চুপচাপ থাক বাবা।

পিংকি হকচকিয়ে গেলো সৌধর কথা শুনে,
বাহ এখনি ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি বলেই পিংকি জোরে এক চিৎকার দিলো। সৌধ ভয় পেয়ে জোরে মা কে ডাকলো। সৌধর মুখটা তখন দেখার মতো ছিলো সৌধ চোখ অন্যদিক নিতেই পিংকি মুখ চিপে হাসতে শুরু করেছে।

সামিয়া চৌধুরী আসতেই সৌধ বললো মা ওর অনেক পেইন হচ্ছে কি করবো এখন।

সৌধর চোখে মুখে ভয় দেখে সামিয়া চৌধুরী বললেন বাবা ভয়ের কিছু নেই এখন এমন হবেই পেইন মানেই ওর ভিতর কোন অংশ রয়েছে তাঁর উপস্থিতি টের পাইয়িয়ে দিচ্ছে। সামিয়া চৌধুরী ভ্রু নাচিয়ে বললো মনে হয় নাতি আসবে তাই এতো আগে থেকেই তাঁর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

পিংকি অনেক পেইন হচ্ছে, বলেই পিংকির মাথার কাছে গিয়ে বসলো। পিংকি বললো না মা টু ঐ একটু আর কি।
সৌধ বললো মিথ্যা বলবে না ব্যাথায় কেমন করছিলে আমি এখনি ডক্টর কে ফোন করছি।

পিংকি না করা সত্বেও সৌধ শুনলো না সে ডক্টর কে ফোন করলো ডক্টর বললেন এটা স্বাভাবিক ভয়ের কিছু নেই।
,
পিংকি ব্যাথার বাহানা দিয়ে সৌধর মনটা বেশ নরম করে ফেলেছে। সৌধ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পিংকি কে পিছন থেকে জরিয়ে হাতটা পিংকির পেটের ওপর দিয়ে বুলিয়ে দিতে দিতে বললো বাবু মা কে জ্বালাসনা আর এবার মা কে ঘুমাতে দে কেমন,

পিংকি অনেক দিন পর সৌধর মাঝে নিজেকে আবদ্ধ অনুভব করে যেনো স্বর্গ সুখে ভেসে গেলো।
তিনটে প্রান যেনো আজ একই প্রান হয়ে গেলো।

সৌধও অনেক দিন পর পিংকির চুলের ঘ্রান নিতে নিতে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো।
,
আজ সূচি আর রজতের বিয়ে বেশ বড়সড় আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে পিংকিও ছয়মাসে পা দিয়েছে পেটটা একটু উঁচু হয়ে গেছে দেখে যে কেউ বলবে সে সন্তানসম্ভবা।
শুধু পেট না তাঁর হাত, পা শারীরিক গঠন সবদিক দিয়েই পরিবর্তন এসেছে। বেশ ভারীও হয়ে গেছে।

মেদহীন পেট টা আর নেই। যতোদিন যাচ্ছে ততোই যেনো তাঁর চেহেরার সাথে শরীরের ও পরিবর্তন হচ্ছে। আয়নায় নিজেকে দেখে বার বার এটাই ভাবছে আমি দিন দিন এমন গোল হয়ে যাচ্ছি কেনো।
সৌধ পিংকির কথা শুনে মিটমিটি হাসছে।

সত্যি বলতে পিংকির চেহেরা খারাপ হলো না ভালো হলো। সে মোটা হলল না চিকন হলো সেসবে তাঁর কোন জায় আসেনা। পৃথিবীতে পাওয়া সব থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার নিয়ে আসছে সে বাবা হওয়ার মতো সুখ দিতে যাচ্ছে সে এটাই তাঁর কাছে অনেক।

কতোটা ব্যাথা, কতোটা যন্ত্রণা কতোটা কষ্ট, শারীরিক অবক্ষয় ঘটিয়ে সৌধ কে সে বাবা হওয়ার আনন্দ দিচ্ছে, তাঁর অংশকে পৃথিবীতে নিয়ে আসছে, এতোগুলো মাস ধরে সব যন্ত্রণা সহ্য করে তাঁদের সন্তান কে নিজের মধ্যে লালন করছে এই তো অনেক।

সত্যি মানবজীবনে একটা মেয়ের অবদান তুলনাহীন। একটা মেয়ে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দুনিয়াতে জন্মায়। পুরুষকে সর্বোচ্চ সুখের শিখরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা কেবল একজন নারীরই রয়েছে। কখনো সে মা হয়ে, কখনো সে স্ত্রী হয়ে, কখনো সে মেয়ে হয়ে, কখনো সে বোন হয়ে।

তবে এক্ষেএে মা এবং স্ত্রীর ভূমিকাই বেশী মা সন্তান কে তাঁর সমস্ত দুঃখ, কষ্টের বিনিময়ে তীব্র যন্ত্রনা সহ্য করে পৃথিবীর আলো দেখায়, দুনিয়াতে টিকিয়ে রাখার লড়াই করে আবার স্ত্রী সমস্ত দুঃখ -কষ্টের বিনিময়ে তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে বাবা হওয়ার মতো সুখ দেয় তাঁর স্বামী কে।
,
সৌধ পিংকির অজান্তেই পিংকির মায়ের সাথে যোগাযোগ করেছে পিংকি কে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। সৌধ চায় তাঁদের কোল আলো করে একটা ফুটফুটে সন্তান আসার পর যেনো তাদের জীবনের সবটাই পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এই পরিপূর্ণ জীবন পাওয়ার জন্য পিংকির ও ওর মা কে প্রয়োজন।

পিংকির মুখে হাসি দেখলেও সৌধর যেনো কেনো মনে হয় পিংকির ভিতরে কিছু চাপা কষ্ট রয়েইছে তাই সে তাঁর সব কষ্ট দূর করতে চায়।

অনেক কষ্ট দিয়েছে সে এবার শুধু সুখ দেওয়ার পালা। এছাড়া তাঁর সন্তান সবার আদর যেনো পায় সেটাই তাঁর চাওয়া। সারাজীবন নিজে ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে বেঁচেছে। নানা-নানীকে তো পায়ই নি, দাদা-দাদীকে ছোটবেলায় পেয়েছে, বাবা-মাকে তো তেমনভাবে পাওয়াই হলোনা তাঁর। তাঁর না পাওয়া গুলো তাঁর সন্তান কে পাওয়িয়ে দিয়ে পুষিয়ে নিতে চায়। নিজে যে অভাব অনুভব করেছে সেই অভাব নিজের সন্তান কে অনুভব করতে দেবে না।

নিজের সন্তান এর সুখের জন্য নিজের সন্তান এর ভালোর জন্য নিজের জীবনটাকেও বাজি রাখতে পারবে সে।
,
হলুদ রঙের রাউন্ড ড্রেস পরেছে আজ পিংকি।
সূচিকে পার্লারের লোকজন এসে সাজাচ্ছে, এই পেট নিয়ে সে আর এতো ভীড়ের মাঝে যায় নি।

পিংকি কানের দুল পড়ছে এমন সময় সৌধ এসে পিংকির পিছন দাঁড়িয়ে পড়লো।
জামার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বললো জবা একটু পর দুধ নিয়ে আসবে ওটা খেয়ে বেরুবে।

পিংকি নাক বুচো করে বললো আজ না প্লিজ রোজই তো খাই।
সৌধ পিছন থেকে জরিয়ে দুহাতে পেট জরিয়ে ধরলো।
এখানে যে আছে তাঁর জন্য বলছি। নয়তো রোজ রোজ চোখ রাঙিয়ে, গলা ফাটিয়ে তোমায় দুধ খাওয়াতে আসতাম না।
পিংকি অভিমানী স্বরে বললো হ্যাঁ সব তো এর জন্যই।

একে আপনার হাতে তুলে দিয়েই তো আমাকে চলে যেতে হবে।
পিংকির কথাটা বলতে দেরী সৌধর আক্রমন করতে দেরী হলোনা। ঘারে বেশ জোরেই কামড় দিলো।
পিংকি আহ করতেই সৌধ একহাতে পিংকির মুখ চেপে কামড়ের জায়গায় ঠোঁট ছুয়িয়ে বললো একদম খেয়ে ফেলবো। তোকে খেয়ে বুকের ভিতর তোর হাড্ডি, মাংস জরো করে ঘর বানিয়ে রেখে দিবো।

পিংকি হাত সরিয়ে আহত গলায় বললো আমাকে খেলে আমি পেটে যাবো বুকে না। দিন দিন বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে নাকি তোমার, কদিন পর এক বাচ্চার বাবা হবে এখন এমন ছেলেমানুষী মানায় না।

সৌধ পিংকি কে ঘুরিয়ে বললো আর কয়েকটা মাস ই করি এর পর তো পুচকের ছেলে মানুষি দেখতে হবে।
পিংকি সৌধ কে ছাড়িয়ে ঘারে হাত দিয়ে ব্যাথায় কুকড়িয়ে ওঠলো আয়নায় তাকিয়ে দাগটা দেখে বললো এখন আমি কি করে বাইরে যাবো সবাই কি ভাববে?
ধ্যাত ভালো লাগে না। একজন কামড়াচ্ছে আরেকজন পেটে ফুটবল খেলছে আমি আর পারিনা এদের নিয়ে।

সৌধ আবারো পিংকি কে জরিয়ে নিয়ে ঘাড়ে আলতো করে চুমু খেলো। পিংকি কেঁপে ওঠলো,
আর বললো সৌধ ছাড়ো ভালো লাগছে না।

সৌধ বললো ইশ বড্ড লেগেছে জান,
পিংকি ক্ষেপে গিয়ে বললো না লাগেনিতো তুমিতো আমাকে এইভাবে কামড়েছো বলেই সৌধর দিকে ঘুরে সৌধর গলায় কামড়ে দিয়ে দিলো এক দৌড়।
সৌধ পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে বললো পিংকি আস্তে যাও পড়ে যাবে।

পিংকি শুনার নাম নেই সৌধর দিকে চেয়ে সমানে এগুতেই ধপাশ করে পড়ে গেলো।

সৌধ জোরে পিংকি বলে এক চিৎকার দিতেই নিচ থেকে সবাই উপরে গেলো দৌড়ে। সূচি অর্ধেক সেজেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
সৌধ দ্রুত পিংকিকে কোলে তুলে রুমে নিয়ে বিছানায় শুইয়িয়ে দিলো।
বেশ কয়েকটা ধমক দিয়ে রাগে ফুঁসতে শুরু করলো।

আজ শুধু সৌধ না প্রত্যকটা লোকই পিংকিকে বেশ বকা ঝকা করলো।
আকাশ চৌধুরী ডক্টর কে ফোন করতেই ডক্টর এসে চেকআপ করলো। সব ঠিক আছে তবে আজ আর নড়াচড়া না করাই ভালো রেষ্টে থাকো।
একটু পেইন হবে ভয়ের কিছু নেই।

সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে যে যার কাজে চলে গেলো।
পিংকি ভয়ে একদম শেষ না জানি সৌধ আজ তাকে কি করে।

সবাই চলে যেতেই সৌধ রুমের দরজা লাগিয়ে পিংকির পাশে বসলো। পিংকি ভয়ে ভয়ে প্রিপারেশন নিচ্ছিলো সৌধর সব শাসন নির্ভয়ে গ্রহন করার।
কিন্তু সে যা ভাবলো তাঁর ঠিক ওলটো টা ঘটলো।

সৌধ পিংকি কে একটু ওঠিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে কেমন অদ্ভুত ভাবে বাচ্চা দের মতো করে কাঁদতে শুরু করলো।
পিংকি সৌধর মাথায় হাত দিয়ে আদুরে গলায় বললো এই সৌধ, বাবু ঠিক আছে তো, কাঁদছো কেনো বোকার মতো বাবুর আব্বু তো এমন নয়, বাবুর আব্বু তো ভীষন স্ট্রং।

সৌধ কান্না থামিয়ে পিংকির মুখ ওঠিয়ে পাগলের মতো গালে, কপালে, চোখে, থুতনিতে চুমু খেতে লাগলো।
পিংকি সৌধর পাগলামো দেখে নিজেও কেঁদে ফেললো। সৌধ আবারো পিংকিকে জরিয়ে নিলো নিজের মাঝে।
কয়েক সেকেন্ডে যেনো দমটা বেরিয়ে গিয়েছিলো।

কেনো এই কাজটা করলে, এভাবে কেউ দৌড়ায়?
যদি বাবুর কিছু হতো, এক ঢোক গিলে কয়েকদফা শ্বাস নিয়ে বললো যদি তোমার কিছু হতো ভাবতে পারছো আমার কি অবস্থা হতো?
বলেই পিংকিকে আবারো ওঠিয়ে মুখোমুখি হয়ে বললো এই মেয়ে তোকে ভীষন ভালোবাসি রে,

তোর বাবুকে আর তোকে ছাড়া আমি এখন আর একটা মূহুর্তও ভাবতে পারিনা। তুই শুধু আমার বউ না তুই আমার সন্তানের মা বুঝেছিস। তুই কতোটা ইম্পরট্যান্ট আমার কাছে।
আর আমি তোর সন্তান এর বাবা।

পিংকি লজ্জায় লাল হয়ে গেলো, খুশিতে চোখ দুটো টলমল করছে তাঁর।
সৌধ বললো দেখ বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাইনি। জীবনটা এখন তোদের দুজনের নামেই করা।
তোদের দুজনের ভালোবাসাও যদি না পাই তাহলে এই সৌধ দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারবে না রে।

তোকে পাগলের মতো ভালোবাসি রে, হ্যাঁ ভালোবাসা টা পাগলামি রাগ দিয়ে প্রকাশ করি তুই তো বুঝিস কেনো এমন করি বল, বুঝিস না।
পিংকির গাল বেয়ে অশ্রুকনা গলা ভেদ করে ফেললো। মাথা নাড়ালো সে বুঝে, সে অনুভব করে তাঁর স্বামীর ভালোবাসা।
,
বিয়ে টা সম্পন্ন হওয়ার পর সৌধ, আকাশ চৌধুরী, সামিয়া চৌধুরি সব আত্মীয় স্নজন মিলে সূচির বিদায় জানালো।
পিংকি নিচে আসতে পারেনি। সূচি রজত দুজনই পিংকির সাথে দেখা করে গেছে। যাওয়ার আগে বেশ শাসনও করে গেছে, ঘাড়ে কামড়ের দাগ দেখে বেশ লজ্জায় ও ফেলে গেছে ভাই, ভাবিকে।
,

গৃহপ্রবেশ করলো সূচি, আজ থেকে তাঁর নতুন জীবন শুরু। নতুন পরিবেশে পুরানো লোক সাথে কিছু নতুন লোকদের সাথেও তাঁর নতুন জীবন শুরু।
,
বাসর ঘরে বসে আছে সে। বেশ কয়েকটা মাস রজতের সাথে আলাপচারিতা করে বেশ স্বাভাবিক হয়েছে সে। তবে কেউ কাউকে সরাসরি ভালোবাসি কথাটা বলেনি সূচি রজতের থেকে আশাও করেনা।

তাঁর মতে রজত যতোই ভালো হোক না কেনো রোমায়েন্টিকতা বলতে কিচ্ছু নেই থাকলে অবশ্যই এতোদিনে ভালোবাসি কথাটা বলতো।
দরজায় সিটকেরী লাগানোর শব্দ শুনেতে পেয়েই সূচি ঠিকঠাক ভাবে নিজেকে গুছিয়ে বসলো।
তাঁর শাশুড়ী স্বামীর পা ধরে সালাম করতে বলেছে ভেবেই মুখটা বাঁকা করে ভাবলো বয়েই গেছে।
রজত বিছানার কাছে এসে বললো এসব পড়েই ঘুমাবে?

সূচি ভ্রু কুঁচকে ঘোমটা ওঠিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো।
চেঁচিয়ে বললো এটা কোন ব্যবহার। বাসর ঘরে এসেছো নাকি বন্ধুর সাথে মিট করতে এসেছো।

রজত হকচকিয়ে গেলো এ বাবা আমি আবার কি ভুল বললাম ভেবেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।
ভদ্র ভাবে বলেছি এসব পড়ে ঘুমাবে কিনা।
সমস্যা হলে চেন্জ করে আসো এই আর কি।

সূচি বিছানা ছেড়ে রজতের দিকে তেড়ে এলো।
বড় বড় চোখ করে বললো রজত ভাইয়া,

বাসর ঘরে বউ কে গিফ্ট দিতে হয় তুমি জানো না।
রজত একটু ঝুকে বললো সে তো বউ কে তুমি তো আমার বন্ধুর বোন, কেমন ভাইয়া ভাইয়া করছো।
সূচি রাগে ফুঁসতে শুরু করলো।
তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেনো?

রজত ওয়ালেট বের বিছানার পাশের টেবিলে রেখে ঘড়ি খুলতে খুলতে বললো সে তো জাষ্ট ফর্মালিটি ম্যাম। বন্ধুর বোন ছ্যাঁকা খাইছে তাই বিয়ে করে সান্ত্বনা দিলাম আর কি।
সূচি অবাক হয়ে বললো কিহ,
,
রাত প্রায় একটা বাজে সামিয়া চৌধুরী ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। নিজের ক্যারিয়ার গোছাতে গিয়ে ছেলে-মেয়ে গুলোকে অনেক অবহেলা করেছে।
সূচি কে বিদায় দেওয়ার পর বেশ ভেঙে পড়েছে সামিয়া চৌধুরী। বুকের ভিতর তাঁর শূন্যতায় ভরে গেছে। বড্ড মিস করতে শুরু করেছে ছেলে-মেয়ে দুটোকে। সূচিকে বেশীই মিস করছে।

মায়ের মন যে, সন্তান দের অনুভূতি ঠিক বুঝতে পারে।
সামিয়া চৌধুরীও পেরেছে সবটা,
কিন্তু পরিস্থিতির স্বীকার হওয়ার দরুন কিছু করার নেই তাঁর। আজকে বড্ড ইচ্ছে করছে তাঁর না বলা অনেক কথা তাঁর সন্তান দের সাথে শেয়ার করতে,
চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছে তাঁর।

আকাশ চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন আহ এভাবে কাঁদার কি আছে, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে মেয়ের মঙ্গল কামনা করো। কোন দিক দিয়ে আমার সন্তান রা অসুখী বলো তো। দেখো শশুর বাড়িতেও সূচি বেশ সুখী হবে। দরকার পড়লে আমার মেয়ের জন্য সুখ কিনে আনবো আমি।
রজতের ঐসব ছোটখাটো জব না করলেও চলবে।

আমার যা আছে তাই দিয়ে ওদের একজীবন না দুইতিনজীবন বেশ ভালোভাবেই চলে যাবে। নাতি, পুতি সব বলেই হোহো করে হেসে ওঠলো আকাশ চৌধুরী।
সামিয়া চৌধুরী রেগে বললেন হ্যাঁ এই টাকা, টাকা সম্পত্তি করে করে জীবনটা এমন পর্যায়ে নামিয়েছো যে এগুলোর বাইরে যে একটা জীবন আছে তা তুমি ভুলেই গেছো।

টাকা দিয়ে সুখ কেনা গেলে আমার সৌধর জীবনটা অমন হতো না।
পিংকি না থাকলে হয়তো সৌধটা এতোটা ঠিক হতোওনা কখনো।

আকাশ চৌধুরী বললেন তুমি কি বলতে চাচ্ছো?
কি বলতে চাচ্ছি বুঝতে পারছো না,

কখনো ছেলে মেয়ে দুটোর চোখের ভাষা পড়েছো?
কখনো মনের কথা, মনের ব্যাথা বুজেছো?

ঝুড়ি ঝুড়ি টাকা দিতে পেরেছো আর কি পেরেছো।
একটা ঈদ, একটা শক্রবার ছেলেকে পাশে নিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছো?

একটা বার্থডে টে ছেলে-মেয়ে দুটোকে মাথায় হাত বুলিয়ে আস্থা, ভরসা, প্রেরনা জুগিয়েছো?
আকাশ চৌধুরী থমকে গেলেন, বুকের ভিতর টা কেমন ভারী হয়ে গেলো।

ভারী কন্ঠে বললেন সামিয়া, আমি না হয় পারিনি কিন্তু তুমি?
সামিয়া চৌধুরী হাত তালি দিতে শুরু করলেন।
বাহ মি.আকাশ চৌধুরী বাহ,

পর্ব ২১

আমি কেনো পারিনি সেই প্রশ্ন আমাকে না করে নিজেকে করো আকাশ।
মানে, কি বলতে চাইছো তুমি?

আমি কি বলতে চাইছি তুমি আজ বুঝতে পারছো না তাইনা, মাধ্যমিক পাশ করা বউ নিয়ে তো তুমি লোক সমাজে মুখ দেখাতে পারতে না।
অফিসের স্টাফ, নিজের বন্ধু -বান্ধবী যারা বি.সি.এস ক্যাডার, এম বি.বি এস ডাক্টার, বড় বড় ইন্ডাস্ট্রির মালিকের ছেলে মেয়েরা তোমার বন্ধু -বান্ধব। তাদের সামনে তো তুমি মাধ্যমিক পাশ করা মেয়েকে বউ এর পরিচয় ই দিতে পারতে না।

তোমার সন্তান দের মা এতো অল্প শিক্ষিত হলে সেটা তোমার ইগোতে লাগতো।
রোজ রোজ এইসব কথা চলতেই থাকতো। সকলের চোখে আমার প্রতি সম্মান বোধ, ভালোবাসা যতোটা না দেখতে পেয়েছি তাঁর থেকে অনেক বেশী আমাকে নিয়ে তাঁদের চোখে, মুখে চিন্তার ছাপ দেখতে পেয়েছি।

তুমি আমাকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করার সময় এটা মাথায় রাখো নি যে মেয়েকে পছন্দ করেছো সে তোমার যোগ্য কিনা? তাঁকে যেভাবে দেখে ভালোবেসেছো এভাবে সারাজীবন মেনে নিতে পারবে কিনা? তোমার পরিবার বাধ্য হয়ে আমাকে মেনে নিয়েছিলো ঠিকি কিন্তু কেউ মন থেকে খুশি হতে পারেনি। বিয়ের একবছরের মাথায় আমি নিজেও বুঝতে পারি যে আমার স্বামী সবসময় আমাকে নিয়ে আতঙ্কে থাকে। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সকলে জেনে গেলে যে তাঁর সম্মান কমে যাবে।

নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি একসময় বাবাকে ফোন করে বলেও ফেলি আমি পড়াশোনা করতে চাই সে যেনো সেই ব্যবস্থা করে।
আমার মুখে এই কথা শুনে তুমি অবাক হয়েছিলে ঠিকি তবে আশার আলোও দেখেছিলে। স্বস্তি পেয়েছিলে।
স্বামীর মনের মতো, শশুরবাড়ির মনের মতো হওয়ার জন্য নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।
মনের ভিতর জেদ পুষে রেখে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম। সৌধ তখন চার বছরের সূচি কোলে।

আমি বুঝতে পারছিলাম এসবের জন্য আমি পরিবারে সময় দিতে পারছিনা। দুধের শিশুগুলো কে নিজের থেকে আলাদা রাখছি। তবুও আমাকে এসব করে যেতে হচ্ছে কারন সমাজের চোখে আমার স্বামী কে প্রমান করতে হবে তাঁর বউ শিক্ষিত। তাঁর বউ প্রতিষ্ঠিত। সব ঠিকই ছিলো জব ও হয়ে গেলো আমার। জব হওয়ার একবছরের মাথায় বললে সামিয়া জবটা ছেড়ে দাও। মা অসুস্থ, বাবার শরীরও ভালো নেই। সৌধ, সূচি টিউটরের কাছে পড়তে চায় না।

খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন। কষ্টও হয়েছিলো ভীষন। এটাই যদি বলার ছিলো তাহলে সেদিন কেনো আমাকে নিয়ে তোমাদের এতো সমস্যা হচ্ছিল।
সেদিন কেনো এই জিনিসটা তোমরা একবার বুঝলে না।
মনের সাথে আবারো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আসলে দোষটা আমার না দোষটা তোমার, তোমার পরিবারের আর তো

মাদের সমাজের। আমি যাই করি না কেনো সবটাতেই তোমাদের বাঁধা, আপত্তি থাকবে কারন আমি মেয়ে। অল্প শিক্ষিত হলে সমাজের বলা কথা -অমকের বউ বেশী পড়ালেখা জানেনা, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, বোধহয় বাবা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারেনি বড় পরিবারের ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিছে।

আহারে এতো সুন্দর সোনার মতো ছেলেটা এতো টাকা-পয়সাওয়ালা ছেলে অনেক ভালো মেয়ে বিয়ে করতে পারতো। বড়লোকের শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত মেয়ে বিয়ে করার মতো কপাল ওয়ালা ছেলে কিনা শেষে এমন মূর্খ মেয়ে বিয়ে করলো।

শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজের বলা কথা -এতো বড় বাড়ির বউ চাকরি করতে হবে কেন। কিসের অভাব টাকা, পয়সা, খাবাড়, কাপড় কোনটার অভাব হইছে, মেয়ে মানুষ ঘরমুখো থাকবো বাহির মুখো মেয়ে মানুষ ভালো না। পড়াশোনা জানোস এই ভালো চাকরি করা লাগবো কেন, স্বামী কি কম রোজগার করে?
সংসারে মন নাই কেমনে থাকবো, মন তো আপিসে পইরা থাকে ইত্যাদি নানারকম টিটকারী মূলক কথাবার্তা।
শিক্ষিত চাকুরিজীবী বউ হলে পরিবারের আফসোস ইশ কম শিক্ষিত বউ আনলে পরিবারে সময় দিতো, সংসারে মন থাকতো। কোথায় বাড়ির বউ ঘর সামলাবে শশুর-শাশুরির সেবা করবে, স্বামী সেবা করবে তা না পরিবার, সংসার ফেলে স্বাধীন জীবন, ছন্নছাড়া জীবন কাটাচ্ছে।
অল্প পড়াশোনা করে শুধু মাএ সংসার সামলালে শুনতে হবে অমকের বউ এই করে, অমকের বউ সেই করে।

সন্তান রা স্কুলে গেলেও বন্ধুদের কাছে শুনবে তাঁর মা এই জব করে তাঁর বাবা সেই জব করে আর নিজের মা গৃহিণী। সেই নিয়ে আবার মন খারাপ হবে।
অশিক্ষিত হলে পরিবারের চোখে স্বামীর চোখে কতোটা ছোট হতে হয় তাতো আমি নিজেই উপলব্ধি করেছি। শিক্ষিত হয়ে যখন নিজের পায়ে দাড়ালাম তখনও তোমাদের মনের মতো হতে পারলমা না।

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা শুনে ভাবলাম –
আজ চাকরি ছেড়ে দিলাম কাল তোমার বন্ধুর বিসিএস ক্যাডার বউ দেখে আবার নিজেকে ছোট মনে হবে না তো? আমার সন্তান দের কখনো কারো সামনে ছোট হতে হবে না তো?

হতেই পারে কারন কিছু মানুষ তো সিদ্ধান্ত বারে বারে নেয়।
কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত বারে বারে নেই না। আমি একবারই নেই।
এটা আমার বদ অভ্যেস থাকলে তাই ধরে নাও।
অনেক ভেবে চিন্তে আর জবটা ছাড়লাম না।

চলতে থাকলো সময়গুলো ওভাবেই।
সকলের কাছে ভালো হতে গিয়েও আজ আমি কারো চোখো ভালো নই।
আমার সব থেকে বড় ব্যার্থতা আমি একজন ভালো মা নই।

ভুল টা আমি সেদিনই করেছিলাম যেদিন এতো বড় বাড়ির বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি বিশ্বাস করো তেলে জ্বলে কোনদিনে মিশে না।
নিজেকে সবার যোগ্য প্রমান করতে গিয়ে আজ নিজের সন্তান দের কাছেই একজন অযোগ্য মা হয়ে গেছি।
সামিয়া চৌধুরী সমাজের, পরিবারের বাস্তব চিএ তার জীবন দিয়ে উপলব্দি করে সবটা এমন নিখুঁত ভাবে বললেন যে লজ্জায় আকাশ চৌধুরী মাথা নিচু করে ফেললেন।
,
প্রায় দশ বারো দিন পর হঠাৎ দুপুর বেলা সূচি ব্যাগ পএ নিয়ে হাজির হলো।
পিংকি আর জবা ছাড়া কেউ নেই বাসায়।

পিংকির রুমে গিয়ে জোরে জোরে চিৎকার করে করে বাসর ঘর থেকে শুরু করে গত দশদিনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলতে শুরু করলো সূচি।
জবা ভয়ে দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে গালে হাত দিয়ে সব শুনতে লাগলো।

পিংকি মুখ চিপে হাসছে তো আবার পেটে হাত রেখে ভয় মুখে সূচির দিকে তাকিয়ে সব কথা শুনছে।
সূচি যদি বুঝতে পারে সে মজা নিচ্ছে তো তাকে তুলো এক ঢিলই দিবে যদিও তুলতে নাও পারে কারন সে বেশ ভারী হয়ে গেছে এখন।
সূচি কে থামিয়ে পিংকি বসা অবস্থায়ই বললো এটাতো বেশ, বাসর ঘরে সবাই কি সবার বউ কে বোরখা দেয় নাকি, তোমরা বর দিয়েছে তোমার বরের মাঝে আনকমন ব্যাপার আছে বুঝতে হবে, বলেই চোখ মারলো।

সূচি মুখটা ফুলিয়ে চট করে পিংকির কাছে এসে অভিমানী স্বরে বললো সে নিয়ে কি আমার অভিযোগ আছে নাকি,
পিংকি সিরিয়াস মুখ করে সূচির মুখোমুখি হয়ে বললো সেই তো তোমার অভিমান তো অন্য কিছু নিয়ে,
এটা কোন কথা হলো এখন অবদি বিয়ে করা বউ কে ছুঁয়েও দেখলো না ঘোর অপরাধ, আমার ননদ কি কম সুন্দরী নাকি?
সূচি মনটা খারাপ করে বললো এমন মানুষের সাথে সারাজীবন কি করে থাকবো? আমার তো একটা রোমায়েন্টিক বর চাই আর এইটা তো হাদারাম।
পিংকি বললো ইশ দাঁড়াও ব্যাটাকে শায়েস্তা করছি।

সূচি চমকে বললো এই না একদম না। তুমি কিছু বলবে না। আমি আর ঐ বাড়ি যাবোই না। বিয়ে করেও যদি সিঙ্গেল থাকতে হয় তাহলে বিয়ে করার কি মানে?
একসাথে থেকেও যদি দুজনের মাঝে চার হাত দূরত্ব রেখে ঘুমাতে হয় তাহলে একসাথে থাকার মানে কি।
এইসব ফালতু বিয়ে মানিনা। যাবো না আমি আর যাবো না ব্যাস।

পিংকি ফোনটা হাতে নিয়ে সৌধ কে চট করে একটা মেসেজ করলো -তোমার বোন রেগে বোম হয়ে আছে। এই দুর্যোগ থেকে বাঁচতে চাইলে বোন জামাই কে অফিস থেকে সরাসরি এখানে আসতে বলো।
আর বাবু তোমায় খুব মিস করছে তারাতারি ফিরো।

মেসেজ রিপ্লাইয়ে শুধু এটাই আসলো- শুধুই বাবু মিস করছে?
পিংকি লজ্জার ইমোজি দিয়ে দিলো।
,
রাত তখন নয়টা। সূচি তাঁর রুমে বসে কানে হেড ফোন গুঁজে দিয়ে গান শুনছে,
এদিকে রজত এসে বাথরুম গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সূচির পাশে কখন বসেছে তা খেয়ালই করেনি।
হঠাৎ পাশে চোখ পড়তেই ভয়ে এক চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে বিছানা থেকে ওঠলো।
সৌধ দৌড়ে আসলো রুমে কি হয়েছে।

রজত সূচিকে ধমকাচ্ছে, মাথা কি একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। ডায়নির মতো চিৎকার করছো কেনো?
সূচি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে বললো তুমি ভূতের মতো আমার পাশে বসেছো কেনো?
আঙুল ওঠিয়ে বললো তুমি এই বাসায় কেনো এসেছো বেরিয়ে যাও।

সৌধ এক ধমক দিতেই সূচি চুপসে গেলো। রজত বাঁকা হাসলো।
সৌধ বললো নিচে আয় একসাথে খাবো সবাই।
সৌধ, পিংকি পাশাপাশি বসেছে, সৌধ খুব যত্ন নিয়ে পিংকিকে খাওয়াচ্ছে। ভাই, ভাবির ভালোবাসা দেখে সূচি রজতের দিকে চেয়ে বিরবির করে বকে যাচ্ছে।
রজত বুঝেও না বুঝার ভান করছে।
চারজনকে জবা পরিবেশন করছে৷

জবা এখন পার্মানেন্ট এখানেই থাকে। এতদিন সারাদিন সময় দিলেও রাতে চলে যেতো কিন্তু সৌধর অনুরোধে পিংকির ডেলিভারি হওয়া অবদি জবাকে রাত দিন থাকতেই হচ্ছে।
,
খাওয়া শেষে সূচি বললো জবা গেস্ট রুমের চাবি রজত কে দিয়ে দিবি। আজ থেকে আমি কারো সাথে বেড শেয়ার করতে পারবো না বলেই ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলো।

সৌধ রজতের দিকে কড়া চোখে তাকালো, পিংকি মজা নিচ্ছে রজত পড়ে গেছে বেশ লজ্জায়। এদিকে জবার মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি কম হওয়াতে সৌধর সামনেই দুপুরে সূচির বলা সব কথা গড়গড় করে বলতে লাগলো।
রজত কোনরকমে পানি খেয়ে দ্রুত কেটে পড়লো সেখান থেকে।

সৌধ এবার জবাকে এক ধমক দিতেই জবা সুরসুর করে চলো গেলো।
খাওয়া শেষে সৌধ পিংকিকে নিয়ো আস্তে আস্তে উপরে চলে গেলো।
,
রজত রুমে ঢুকতেই সূচি চেচামেচি শুরু করে দিলো।
রজত সিটকেরী লাগিয়ে দিয়ে বিছানার কাছে আসতেই সূচি বিছানা ছেড়ে ওঠে আঙুল ওঠিয়ে বললো কি চাই,
রজত সূচির আঙুল চেপে ভূবন ভুলানো এক হাসি দিয়ে বললো বউ চাই,
সূচি হকচকিয়ে গেলো। রজতকে কেমন একটা লাগছে ভেবেই এক ঢোক চিপে হাত টা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে এক দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে ছিটকেরী খুলেই দিলো এক দৌড়।
,
ছাদে গিয়ে রেলিং এ হাত রেখে দূরপানে চাঁদ দেখছে সূচি।
পাশে কারো উপস্থিতি টের পেতেই বুঝলো রজত।
সূচি এবার রাগ করলো না। চুপটি করেই আকাশপানে চেয়ে রইলো।

রজত বললো বরের আদর চাই, রোমান্স চাই, ভালোবাসা চাই বরকে বললেই হয়। এইভাবে সবার সামনে লজ্জায় ফেলার মানে কি?
সূচি এবার প্রচন্ড রেগে গেলো। রজতের দিকে ফিরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো কেনো তোমার কি কোন সমস্যা আছে? বলে বলে আদর ভালোবাসা নিতে হবে কেনো? নিজের কোন অনুভূতি নেই?
বউ পাশে রেখে কিভাবে দূরে থাকতে পারো।

বউকে স্পর্শ করতে মন চায় না কেনো?
বউ এর প্রতি ফিলিংস, আকর্ষণ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

যেহেতু তোমার এসব কিছু নেই সেহেতু বুঝতে হবে তোমার কোন প্রবলেম আছে।
একদমে কথাগুলো বলে থামলো সূচি। রাগের মাথায় কি যে বলে ফেলেছে তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
যখন বুঝলো তখন তার আত্মা টা ধক করে ওঠলো।
আর যাই হোক এতো বড় কথার পর রজত চুপ করে থাকবে না। ভয়ে ভয়ে এক ঢোক চিপতেই হাতে শক্ত স্পর্শ পেলো। তাঁর বুঝতে বাকি রইলো না রজত কতোটা রেগে গেছে।
সূচি ভয়ে ভয়ে বললো সরি,

পর্ব ২২

রজত ভাইয়া সরি আসলে,
রজত হাত ওঠিয়ে থামিয়ে কড়া গলায় বললো আমার সমস্যা কি তুমি জানতে চাও।

তোমার ব্রেইন এতো উইক সেটা আমার জানা ছিলো না। আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম সূচি রজত জোর করে কোন কিছুই হাসিল করতে চায় না।
আর যেখানে বিয়ের আগেই তোমাকে জানানো হয়েছে যেদিন তুমি স্বীকার করবে তুমি মন থেকে স্বামী হিসেবে আমাকে গ্রহন করবে, তোমার মনের গহীনে রজতের জন্য ভালোবাসা জন্মাবে, মায়া জন্মাবে, তুষারের বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভেবে আর কখনো কষ্ট পাবে না বরং আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করবে। সেদিনই এই রজত স্বামীর অধিকার ফলাবে।

সেসব ভুলে তুমি আমার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছো,
সূচি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো সেদিনের বলা কথা গুলো তাঁর মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলো।

তুষার নামের কেউ যে তাঁর জীবনে এসেছিলো সেটাই তো সে ভুলে গেছিলো তাহলে সেই কথা কি করে মনে থাকবে তাঁর?
রজত এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সূচির হাতটা ছেড়ে বললো আমি বাড়ি যাচ্ছি। তোমার যখন ইচ্ছে হবে আমায় ফোন করো নিয়ে যাবো।
বলেই হাত ছেঁড়ে দিলো সূচি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কি সব বলে ফেললো সে, এমন ভাবে না বললেও পারতো। রজত সবার মতো নয়, আর পাঁচ টা ছেলের মতো রজত নয়, তাঁর ব্যাক্তিত্ব সত্যি অনন্য। চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে সূচির।
,
হঠাৎই ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে গেলো তাঁর পুরো শরীর জুরে। আকাশের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো মেঘ শুধু তাঁর মনেই জমেনি, পুরো আকাশ জুরেই মেঘের আবরন। রোজ রোজ আকাশে তাঁরার মেলা থাকলেও আজ আকাশটা বিদঘুটে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মেঘের গর্জনে ধ্যান ভাঙলো সূচির বিন্দু বিন্দু জলকনা স্পর্শ করে গেলো তাঁর শরীরে। শীতলতা অনুভব হতেই রজতের বলা কথাটা মাথায় নাড়া দিয়ে ওঠলো।
বুকটা ধক করে ওঠলো তাঁর ছুটে নিচে চলে গেলো।

নিজের রুমে গিয়ে রজতকে দেখতে পেলো না।
তাহলে কি সত্যি রেগেই চলে গেলো। আমি কি তাঁকে অনেক বড় আঘাত করে ফেললাম। মানুষ টা তো এতো সহজে রাগার কথা না। তাহলে কি সত্যি আমি অনেক বড়সড় ভুল করেছি।

হ্যাঁ করেছি তো, তাঁর পুরুষত্ব আঘাত করেছি আমি।
যা তাঁর জন্য খুবই লজ্জাজনক, অপমানজনক, অসম্মান জনক।
আর এক মূহুর্তও দেরী করলো না সূচি। নিচে নেমে এলো দরজা ভিতর থেকে লাগানো নেই, তাঁর মানে সত্যি রজত বেরিয়ে গেছে। এতো রাতে গাড়ি পেয়েছে তো, নাকি হেঁটেই চলে গেলো।

কোন কিছু ভাবার সময়টুকু নিলো না নিজেও বেরিয়ে পড়লো।
সে বের হওয়ার পরই টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো।

যেনো তাঁরই অপেক্ষা করছিলো বৃষ্টির প্রত্যেকটা জলকনা। সূচি রজতদের বাসার দিকেই হাটা ধরলো। বৃষ্টি তে গা ভিজে একাকার হয়ে গেলো।
শরীরে কাপড় লেপ্টে রয়েছে একদম। গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। রাস্তার ল্যামপোস্টের আলোতে যতদূর দেখতে পারছে ততোদূর চোখ স্থির রেখেই পা চালিয়ে যাচ্ছে সূচি।
বৃষ্টির বেগ হঠাৎ ই দ্বিগুণ বেড়ে গেলো।

বাতাসের বেগ ও বাড়ছে ধীরে ধীরে, যেনো ঝড়ের পূর্বাভাস। সূচির এবার বেশ ভয় হতে শুরু করলো।
কেনো সে বেরিয়ে এলো এভাবে, রজত ছেলে মানুষ তাই সে বেরিয়েছে হয় বাড়ি ফিরেছে নয় অন্যকোথায় গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। এতো রাতে সে কি হেটে রজতের বাড়ি যেতে পারবে,

ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো তাঁর, শীত লাগছে ভীষন
ওড়নাটা শরীলে পেঁচিয়ে আবারও নিজের বাসায় ফেরা ধরলো।
আশে পাশে চোখ বুলিয়ে বুলিয়ে যেতে লাগলো।

কোথাও দেখতে পেলো না সে রজত কে।
হঠাৎ প্রচন্ড জোরে বজ্রপাত হতেই ভয়ে দুকান চেপে এক চিৎকার দিলো সূচি। সাথে সাথে কেউ একজন ছুটে এসে জাবটে ধরলো।
ধমকের সুরে বললো এখানে আসতে কে বলেছে, এতো রাতে বাসার বাইরে আসার সাহস কোথায়, পাও তুমি। মেরে হাড়গোড় ভেঙ্গে দিবো। বড্ড বাড় বেরেছো সূচি।

রজতের কন্ঠ পেয়ে সূচি এক ঢোক গিলে খুব শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।
বৃষ্টির পানিতে দুজনের শরীরই ভিজে একাকার,

দুজনের শরীরেই বয়ে গেলো শীতল হাওয়ার শীতল শিহরন।
এই শিহরণ কি বৃষ্টির ফোঁটা গুলো গায়ে ছুঁয়ে যাওয়ার, নাকি দুটো শরীর, দুটো হৃদয়, দুটো হৃদয়ের স্পন্দনের এক হয়ে যাওয়ার,
ঝড় শুরু হয়ে গেছে, প্রাকৃতিক আবহাওয়া গুলো শুরুতে বিরক্তি সৃষ্টি করলেও এবার মনে হচ্ছে সময় টা যেনো এভাবেই থেমে যায়।
দুটো হৃদয় যেনো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আজ তাঁরা এক হয়েই ছাড়বে।

কিন্তু রজত তো এমনিতে ছাড়ার পাএ নয়। আগে তার সহধর্মিণীর থেকে গহীন কোণে লুকিয়ে রাখা অনুভূতির কথা শুনবে পরেই না তাঁকে নিজের করে নিবে।
শরীরের তীব্র কাঁপুনি অনুভব হতেই রজতের ঘোর কাটলো।

হ্যাঁ সূচি কাঁপছে শীতে, রাতের মুষলধারে বৃষ্টি তে ভেজা মানেই হার কাঁপুনি শীতে চেপে ধরা।
সূচিকে ছাড়িয়ে হাতটা চেপে সামনে এগুতে লাগলো।

সূচি এক হাতে কপাল থেকে থুতনি অবদি মুছে পানি ঝেড়ে পা ফেলতে ফেলতে বললো রজত ভাইয়া, সেদিনের বলা কথাগুলো সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম আমি। কারন আমি তুষারের চ্যাপ্টারটাই ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে চিনতে পারোনি রজত ভাইয়া, সূচি মন থেকে তোমায় স্বামী হিসেবে গ্রহন না করলে কখনোই তোমায় বিয়ে করতো না। আর যখন মন থেকে মানার পরও আমি তোমার সান্যিধ্য লাভ করতে পারছিলাম না। তখনি আমার প্রচন্ড রাগ হয়ে যায়। রাগের মাথায় এসব কান্ডও ঘটিয়ে ফেলি।

আমার যে ভালোবাসা চাই রজত ভাইয়া, খুব খুব ভালোবাসা চাই, আদর চাই। কারো আগলানো ভালোবাসা চাই। আর সেটা দেওয়া কি স্বামী হিসেবে তোমার কর্তব্য নয়।
,
তুমি আমার ওপর রেগে থেকো না প্লিজ।
সূচির কথায় কোন, সারা দিলো না সে তাঁর মতো এগিয়ে চলেছে। আবছা আলোতে ভেজা সাদা শার্ট ভেদ করে গেন্জিটা স্পষ্ট দেখতে পারছে সূচি।
রজত দ্রুত পা ফেলেই চলেছে, হঠাৎ সূচি হাত ছাড়িয়ে মুখ ঢেকে হাঁচি দিলো।

রজত এক ধমক দিয়ে বললো হলো তো এবার আরো ভিজো ভিজে ভিজে খুঁজতে বের হও আমায়। হিরোগিরি দেখাতে আসো, ,
সূচি রজতের রাগ দেখে মুখ চিপে হেসে বললো হিরো না হিরোইনগিরি দেখাচ্ছি।

রজত ভ্রু কুঁচকে সূচির ভেজা মুখটা, অস্পষ্ট দেখলো এক নজরে। পরোক্ষনেই আবার টেনে বাসার পথে হাঁটা ধরলো।
শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাথরুম গেলো সূচি।
পিছন পিছন রজতও ঢুকে পড়লো,
সূচি বললো এমা তুমি বের হও আগে আমি পরে তুমি।

রজত স্বাভাবিক গলায় বললো আগে পড়ে নেই কোন। শীত লাগছে ঠান্ডা লেগে যাবে সো এখনই চেঞ্জ করবো।
সূচি মুখ ফুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো ডানহাতে বাম হাত চেপে কাঁপতে থাকলো।
রজত শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কঠিন গলায় বললো আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলেছি।
সূচি হকচকিয়ে গেলো আর বললো মানে,

মানেটা খুব সহজ বলেই শার্ট টা রেখে বেরিয়ে সূচিকে পাজাকোল করে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।
ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটে গেলো যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রজত তাকে বন্দিনী করে ফেললো।
ভয়ে ভয়ে তাকালো লজ্জায় মরে যাচ্ছে সে।
উন্মুক্ত বুকের ভেজা লোমগুলোতে চোখ যেতেই শরীর জুরে অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেলো।
বুকের ভিতর কেমন মৃদু যন্ত্রণা অনুভব হলো।

পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে মিনমিনে গলায় বললো রজত ভাইয়া তুমি চেঞ্জ করে তারাতারি বেরোও।

রজত বাঁকা হেসে কয়েক পা এগিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো কি গো, এ টুকুতেই হাওয়া ফুঁস,
সূচির বুকটা ধক করে ওঠলো। নিশ্বাসটা তাঁর প্রচন্ড ভাবে ওঠানামা করছে। এ মূহুর্তে যেনো তাঁর সকল শীতলতা দূর হয়ে পা থেকে মাথা অবদি গরম হাওয়া স্পর্শ করতে লাগলো।

রজত আবারো কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো আমার সত্যি কোন সমস্যা নেই যা ছিলো সব তো আজ দূর করেই দিলে। মনের গহীনের কথাগুলো তো পড়েই ফেলেছি। কিন্তু আমার যে সমস্যা নেই সেটা মুখে বললে তো হবে না প্র্যাকটিকেলি বুঝাতে হবে। যতোই হোক মেয়ে মানুষের মন বলে কথা।
সূচি ভয়ে ঘুরে দাঁড়ালো ছিঃ কি সব বলছো।
আমি সেভাবে কিছু বলিনি তোমায়।

রজত একটু ঝুকে বললো কিভাবে,
রজতের চুলের পানি চুইয়ে সূচির গালে পড়তেই সূচি চোখ দুটো বন্ধ করে একদমে বললো রজত ভাইয়া আমার খুব গরম লাগছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে পানি খাবো।
রজত হকচকিয়ে গেলো কিসের মাঝে কি বলে এই মেয়ে,

কোমড়ে গভীরভাবে চেপে ধরলো রজত। পাঁচ আঙুলের গভীর স্পর্শে যেনো কেপে ওঠলো সূচি চোখ খুলতেই রজত একটানে একদম নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিলো।
সূচি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর ছারাতে চাচ্ছে।
রজত ভাইয়া ভালো হবে না কিন্তু,

খারাপও হবে না সূচি,
তুমি যা চাও তাইতো হচ্ছে। বউ কে আর কতোদিন দূরে রাখবো বলো। এছাড়া বউ যখন পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাকে তো প্রমাণ করতেই হবে যে তাঁর স্বামী একদম ফিট আছে।
সূচি লজ্জায় মরে যাচ্ছে,
ইশ কেনো যে ওসব বলতে গিয়েছিলাম। ধ্যাত, এখন ভাববে আমিই তাঁকে এভাবে চাইছি, এর থেকে লজ্জার কি কিছু হয়।
সূচির ভাবনায় বেঘাত ঘটলো রজতের ঠোঁটের শীতল স্পর্শে,

তাঁর পুরো শরীর অবশ হয়ে গেলো রজতের করা গভীর স্পর্শ গুলো যেনো তাঁর শরীরের শীরা, উপশিরায় পৌঁছে যাচ্ছে।
ঠোঁট ছেড়ে গলায় গভীর ভাবে স্পর্শ করতে লাগলো।
সূচি সহ্য করতে না পেরে খামচে ধরলো তাঁর উন্মুক্ত পিঠ।

রজত সূচির মুখের দিকে একবার চেয়ে আরো প্রবলভাবে সূচিকে দূর্বল করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।
একহাতে কোমড় জরিয়ে আরেক হাতে কামিজের এক পার্ট সরিয়ে নাভীতে গভীর ভাবে ঠোঁট ছুয়ালো।
সূচি এবার রজতের চুলগুলো খামচে ধরলো।
সে যতোই সরিয়ে দিতে চায় রজত ততোই উন্মাদনায় মেতে ওঠে।

পুরো শরীরের সমস্ত শক্তি যেনো শুষে নিচ্ছে রজত।
সূচি নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে কেমন নেতিয়ে পড়লো।

রজত ঘোরে চলে গেছে কোনদিকে তাঁর খেয়াল নেই।
সে এখন সূচির নেশায় আসক্ত হতে চায়। সূচির উন্মাদনায় মত্ত হতে চায়।

সূচির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে জামার চেইন খুলতে শুরু করলো।
সূচির বুকটা কেঁপে ওঠলো চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে রজতের দিকে চাইতেই রজত নেশাভরা গলায় বললো ব্যাস, আর না।
লজ্জ, ভয়ে কাঁপছে সূচি। লজ্জায় যেনো মরে যাচ্ছে সে। না পারছে ছুটতে না পারছে থাকতে। তাঁর সমস্ত শক্তি যেনো শুষে নিয়েছে রজত। রজত যেনো তাঁকে বশ করে নিয়েছে আজ।

সম্পূর্ণ কাপড় ছাড়িয়ে একটা সাদা তয়ালে পড়িয়ে দিলো। বুক থেকে হাটু অবদি ঢাকা,
রজত সূচিকে কোলে তুলে নিলো, সূচি লজ্জায় বুকে মুখ লুকানোর বৃথা চেষ্টা করতে থাকলো।
রজত এগুতে এগুতে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো সো হট,
সূচি যেনো এবার মরেই যাবে চোখ বন্ধ করে মুখ গুজে ফেললো।
,
সৌধর ঘুম ভাঙতেই পিংকি কে তারাতাড়ি ওঠালো।
চুলগুলো বড্ড এলোমেলো, ইদানীং পিংকি নিজের যত্নও ঠিকভাবে নিতে পারে না। চলাফেরাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে দিনদিন তাঁর পক্ষে। সাত মাস পরবে আর তিনদিন পর। ইদানীং সৌধ লক্ষ করছে পিংকির গাল দুটো টমেটোর মতো গোল হয়ে যাচ্ছে, কেমন টসটসে, হাত পা কেমন ফোলা ফোলা লাগে তাঁর কাছে। পেট ফোলার না হয় কারন আছে হাত, পা ফোলার কারন কি?

অসংখ্য যুক্তি মিশিয়ে প্রশ্ন করছে সৌধ আর যত্ন সহকারে পিংকির চুল আঁচড়ে বেনুনি করে দিচ্ছে।

পিংকির বড্ড সুখ লাগে এখন। যে ছেলে কিনা ভাতটা অবদি বেড়ে খেতো না, নিজের ঘরটাই গোছাতে পারেনি কখনো সে কিনা আজ তাঁর বউয়ের চুল বেনুনি থেকে শুরু করে গোসল করানো, কাপড় চেন্জ করা সবটাই করছে।
সত্যি বাবা হওয়ার আনন্দে সৌধটা সত্যি আরো দ্বিগুন পালটে গেছে।

বেনুনি শেষে সৌধ বিছানা ছেড়ে ওঠে পিংকি কে পাজাকোল করে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।
চেয়ারে বসিয়ে ব্রাশ হাতে দিয়ে নিজেও ব্রাশ করা শুরু করলো।

পিংকি হাসতে হাসতে বললো এই যে বাবুর আব্বু শুনুন এখনো আমি অতটা পঙ্গু হয়ে যাইনি ওকে।
মানুষ আট নয়, মাসে এমন করলে মানায়। তুমি তো ছয় মাসে আমাকেই ছয়মাসের বাচ্চা বানিয়ে দিয়েছো।

সৌধ মুখে পানি পুরে খাক খাক করে ফেলে দিয়ে পিংকির মুখে পানি দিতে দিতে বললো সব মানুষ আর সৌধ কি এক হলো নাকি।
আর সব বাচ্চা আর সৌধর বাচ্চা কি এক নাকি।

পিংকি তয়ালে দিয়ে সৌধর মুখ টা মুছতে মুছতে বললো হয়েছে স্যার এবার আমায় রুমে নিয়ে চলুন।
ইয়েস ম্যাম অবশ্যই।
,
সূচি ইচ্ছে রকম রজতের বুকে কিল, ঘুষি দিয়ে যাচ্ছে। রজত সূচির হাতটা চেপে বুকে পুরে নিয়ে হোহো করে হেসে যাচ্ছে।
অবশেষে সূচি ক্লান্ত হয়ে রজতের বুকেই চুপ মেরে রইলো।
বেশকিছুক্ষন পর রজত ফিসফিস করে বললো কি জান কোন প্রবলেম আছে কি? একদম ফিট আছে না?
সূচি এক ঝটকায় রজত কে ছাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে মাথা থেকে তয়ালে খুলতে খুলতে বললো অসভ্য কোথাকার, লুচু কোথাকার। আজি বের হও আমার বাড়ি থেকে।

পর্ব ২৩

আটমাস চলছে, সামিয়া চৌধুরী এবার পার্মানেন্ট বাড়ি রয়েছে। রিটায়ার করেছেন পনেরো দিন হয়েছে। শরীর টা খুব একটা ভালো না তাঁর। সূচিকে দেখা করে যেতে বলেছেন। দু ছেলে মেয়েকে একসাথে দেখতে ইচ্ছে করছে ভীষন।

দুজনের খুনসুটি ঝগরা গুলো খুব মিস করছেন।
রুমে বসে পুরোনো ফোটো এলবাম ঘাটাঘাটি করছেন। সৌধ, সূচির ছোট বেলার ছবিগুলো মন ভরে দেখছেন। চোখের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে সে।
পিংকি তাঁর পেটের দিকে চেয়ে চেয়ে বির বির করতে করতে ছাদে যাচ্ছে।
জবা বললো ভাবী ছাদে যাইয়েন না। ভাইজান বকা দিবো।

পিংকি বললো ও জবা চিন্তা করো না তো। বাবুকে নিয়ে বিকেলে একটু হাটাহাটি করে আসি আমারো ভালো লাগবে, বাবুর মনটাও ভালো লাগবে। তোমার ভাইজান আসার আগেই আমি চলে আসবো।

মনটা ভীষণ ভালো পিংকির তাঁর মা স্বপ্নে দেখেছে তাঁর বাবা নাকি তাঁর হাত ধরে তাঁর মায়ের সামনে গিয়েছে। আবরার খানের সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে তাঁর বাবাকে নাকি আর স্বপ্নে দেখেনি কালই দেখলো। তাও আবার এমন একটা স্বপ্ন।

পিংকিকে ফোন করে জানালো দেখিস তোর ছেলেই হবে। আমি সেইরকম ইনগিতই পাচ্ছি।
মায়ের কথা ভাবছে আর মিটি মিটি হাসছে পিংকি।
ইদানীং সেও তো তাঁর বাবা কে স্বপ্নে দেখে,
তাহলে সত্যি বাবা আসছে,

পেট ধরে ধীরে ধীরে খুব সাবধানে নিচে নামছে পিংকি। প্লাজুতে পারা লেগে পরে যেতে নিতেই সিঁড়ির রেলিং খাঁমচে ধরলো। হৃদস্পন্দন দ্রুত চলছে তাঁর বেশ ভয় পেয়েছে। হঠাৎ সৌধর ধমকে পাশ ফিরে তাকালো। দেখেই চমকে গেলো সৌধ নিচ থেকে পিংকি কে পড়তে যেতে দেখেই দৌড়ে উপরে এসেছে। তাঁর মাঝেই পিংকি নিজেকে সামলে নিয়েছে দেখেই সৌধর যেনো প্রানপাখি ফিরে এলো।
পিংকি কে ধরে নিয়ে প্রচুর বকা দিতে দিতে রুমে নিয়ে গেলো।

হাত পা বেঁধে রুমে ফেলে তারপর অফিস যাওয়া লাগবে? পা কেটে হাতে জমা রেখে অফিস যাবো কাল থেকে দেখি হাটাহাটির শখ কোথায় যায় তখন।
পোশাক পালটাতে পালটাতে ধমকাচ্ছে আর বকে যাচ্ছে।
পিংকি চোরের মতো বিছানায় বসে আছে।

সে টু শব্দ টিও করবে না। সে এখন কিছু বললেই কপালে মাইর জুটবে।
এর থেকে সৌধ মুখ চালাচ্ছে চালাক, হাত না চালালেই হলো ভেবেই চুপটি করে বসে রইলো।
সৌধ বাথরুমে ঢুকতেই পিংকি বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো।
,
সামিয়া চৌধুরী রুমে আসতেই পিংকি বললো এখন কেমন লাগছে তোমার মা টু।
সামিয়া চৌধুরী হেসে এগোতে এগোতে বললো একদম ফিট আছি। তা আমার মেজাজী বাপজান কোথায় গেলো।
বাইরে গেছে রজত ভাইয়া আসছে বোধহয়।

সামিয়া চৌধুরী বিছানায় বসলো। পিংকির দিকে চেয়ে বললো সৌধ অনেক বকাবকি করেছে শুনলাম।
পিংকি মুখ ফুলিয়ে মাথা নাড়ালো।
মন খারাপ করিস না। ছেলেটা অমনই জানিসই তো।

এই আর একটা মাস একটু ওর কথা শুনে চল। বাবু আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ওর রাগটাও কমে যাবে। এখন থেকে মায়ের ভালোবাসা পাবে, বউ এর ভালোবাসা পাবে, বাচ্চা পাবে জীবনটা তো পূর্নতায় ভরে ওঠবে।

সারাজীবনের সকল আফসোস শেষ হওয়ার পালা এবার বল।
পিংকি হেসে বললো ইয়েস মা টু আমাদের সকলের সব আফসোস শেষ হওয়ার পালা এবার।
কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার আমরা সকলেই সুখের মুখ দেখবো বলো।
এবার সূচিকেও কনসিভ করতে বলতে হবে।

সামিয়া চৌধুরী বললেন মেয়েটাকে আসতে বললাম।
কাল আসবে হয়তো।
পিংকি মা তোকে একটা কথা বলি।
হয়তো তুই সবটা এখন বুঝে গেছিস তবুও অনেক দিন হলো কথা গুলো বলতে চাইছি। সেই সুযোগ টা আর হয়ে ওঠছে না।
কি,
আমার সৌধ কিন্তু মনের দিক থেকে অনেক ভালো।

ও হয়তো সেভাবে ওর গুনগুলো বোঝাতে পারে না, প্রকাশ করতে পারে না। সবসময় মাথা গরম করে ফেলে, অল্পতেই ভীষন রেগে যায়। কিন্তু মনের দিক থেকে ছেলেটা অনেক ভালো রে।

ভিতরে বাবা মায়ের ওপর অনেক অভিমান পুষে রেখেছে তো তাই অভিমান, ডিপ্রেশন থেকেই এমনটা করে।
ছেলেটা আমার ভালোবাসার পাগল। দেখিস না তোকে কেমন পাগলের মতো ভালোবাসে।
এই যে ওর কথার অবাধ্য হোশ কতো বকা ঝকা করে কেনো করে বলতো,
পিংকি সামিয়া চৌধুরীর হাতটা চেপে ধরলো।

নরম গলায় বললো আমি জানি মা টু। আমি ওকে এখন বুজতে পারি। ওর মনটা আমি বইয়ের পাতার মতো করে পড়ে ফেলতে পারি এখন।
তুমি চিন্তা করো না, রাগ, অভিমান, ঝগরা শেষে আমি সৌধরই আর সৌধও আমারই।
আমাদের সম্পর্ক এখন অনেক গভীর মা টু।
“আমি ওর সন্তান এর মা হতে চলেছি

আর ও আমার সন্তান এর বাবা”
এই সম্পর্কের গভীরতা যে বিশাল,
হুম সেটাই তোরা সারাজীবন এভাবেই থাকিস এটুকুই চাই।

আমার পাগলটার পাগলামো টা সহ্য করে নিস।
বড্ড ভালোবাসার কাঙ্গাল তো ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, ভালোবাসা হারানোর ভয় থেকে এই পাগলামো গুলো করে। ছেলেটা আমার ম্যাচিওর হয়েও আনম্যাচিওর।
,
মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহন করলো পিংকি।

ফুটফুটো এক ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে সে।
ছেলের মুখ দেখে সৌধ আনন্দে আত্নহারা, তাঁর পুরো শরীর কেমন কাঁপছে। এতো ছোট্ট বাচ্চা কে সে ধরতেই পাচ্ছে না। সামিয়া চৌধুরী ধরে আছে সৌধ অপলক ভাবে চেয়ে আছে।

সূচি বললো ব্রো দেখ দেখ বাবার মতো চুলগুলো কেমন গোল্ড গোল্ড। সৌধর সেদিকে কোন খেয়াল নেই। সূচি তো শুধু বেবীটাকে সকলের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ব্রো দেখ চোখটা আমার মতোন।

রজত বললো আজাইরা কথা বাদ দেও। চোখ দুটো তো বন্ধ এতো ছোট চোখে মিল খুঁজে পাও কি করে।
সূচি নাক বুচো করে ফেললো কান্নার ভঙ্গিতে বললো বাবা বেবীটা আমার আর তোমার মতো হয়েছে বলো,
আকাশ চৌধুরী হোহো করে হেসে ওঠলো।
আমাদের বংশধর তো আমাদের মতোই হবে।

প্রিয় গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো বেবী টার দিকে দেখিয়ে বললো মাম্মা হি ইজ মাই লিটল প্রিন্স?
প্রমিলা বেগম বললেন হ্যাঁ বাবা।

সামিয়া চৌধুরী হেসে বললো প্রমিলা তুমি ওকে কোলে নাও।

প্রমিলা বেগম বললেন সৌধ বাবা ওকে নিয়ে পিংকির কাছে যাক এখন।
আমিতো আছিই,

প্রমিলার বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে,
আজ যদি পিংকির বাবা বেঁচে থাকতো কতো খুশিই না হতো। মেয়েটা আমার কতো বড় হয়ে গেলো।
আল্লাহ আমার মেয়েটা কে সুখ দিও তুমি। এ সুখে যেনো কারো নজর না লাগে।
চোখের পানি মুছে প্রিয় কে নিয়ে সেও পিংকির কাছে গেলো।
দেখতে দেখতে কেটে গেলো কয়েকটা মাস।

পুরো বাড়িটাই যেনো পালটে গেছে। পুরো বাড়িতে কেমন বাচ্চা বাচ্চা ঘ্রানে ভরে থাকে। চারদিকে খেলনার ছড়াছড়ি। এই কান্নার আওয়াজ তো এই হাসির আওয়াজ। পিংকির সব বান্ধবী রাই মাঝে মাঝে এসে বাবুকে দেখে যায়। সকলেই ভীষন খুশি।

সৌধও কেমন পালটে গেছে, সেই রাগ সেই জেদ গুলো একেবারেই নেই।

বউ কে ভালোবাসা, বাচ্চা কে ভালোবাসা। মায়ের আদর খাওয়া। বাবার আর সূচির সাথে ভিডিও কলে আড্ডা দেওয়া বেশ চলছে জীবন।
বাবু আজ ভীষন জ্বালিয়েছে রাত প্রায় একটা বাজে সৌধ এগারোটার দিকেই ঘুমিয়ে গেছে।

বাবুকে নিয়ে বেলকুনিতে হাটাহাটি করতে করতে কখন একটা বেজে গেছে খেয়ালই করেনি পিংকি।
বিছানায় গিয়ে বাবুকে শুয়িয়ে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করতেই কেমন গোঙানির আওয়াজ কানে ভেসে এলো।
চট করে চোখ খুললো পাশে তাকাতেই দেখলো সৌধ কেমন করছে।

ও এমন করছে কেনো বাজে স্বপ্ন দেখছে, বাবুকে মাঝখান থেকে সরিয়ে অন্যপাশে শুয়িয়ে ওপাশে কোলবালিশ দিয়ে সোধর বুকে হাত রেখে ডাকলো সৌধ ভয় পাচ্ছো কি হয়েছে,
সৌধ আরো দ্বিগুন ছটফট করছে, কতোটা ভয় পাচ্ছে সে তাঁর গোঙানিতে নড়াচড়াতেই বোঝা যাচ্ছে।
পিংকি এবার ভয় পেয়ে গেলো।

দুগালে ধরে হালকা থাপ্পড় দিতে দিতে ডাকতে লাগলো।
সৌধ আচমকাই পিংকিকে জরিয়ে ধরে কাঁপতে শুরু করলো। ভীষন হাঁপাচ্ছে সৌধ, পিংকি সৌধকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বললো এই কি হয়েছে তোমার। এতো ভয় পাচ্ছো কেনো, পানি খাবে।

সৌধ কোন জবাব দিলোনা পিংকি কে প্রচন্ড শক্ত করে জরিয়ে হাঁপাতে লাগলো সে। বেশ কিছুক্ষন পর বললো পিংকি একটু পানি দাও তো,
ছাড়ো আমায় ওঠবো কি করে।
ওহ হ্যাঁ।
সৌধ ছাড়তেই পিংকি ওঠে গ্লাসে পানি ভরে সামনে দিলো। সৌধ পানিটা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে গ্লাস এগিয়ে দিলো। পিংকি ভ্রু কুঁচকে গ্লাসটা নিয়ে টেবিলে রেখে সৌধর সামনে বসলো।
পিংকির অমন চাহনী দেখে সৌধ মৃদু হাসলো।

বাবুর কাছে গিয়ে বাবুর গালে আর কপালে একটা কিস করলো। বাবুকে ঘুমালে ভীষন কিউট লাগে তাইনা।
পিংকি সৌধর গালে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো সৌধ প্লিজ কিছু লুকোবে না কি হয়েছে বলতো। হঠাৎ এমনটা কেনো হলো। দুঃস্বপ্ন দেখছিলে?
কি দেখেছো বলো আমায়।

সৌধর মুখটা মলিন হয়ে গেলো। বুকের ভীতরটা ভারী হয়ে এলো তাঁর। নিজের মন কে সান্ত্বনা দিলো স্বপ্ন তো স্বপ্নই স্বপ্ন কখনো বাস্তব হতে পারেনা।
পিংকিকে স্বপ্নের কথাটা বলা যাবে না। তাহলে টেনশন করবে ভীষন। এমনিতেই সংসার, পড়াশোনা, বাবু সামলাতে গিয়ে নিজের চেহেরার কি হাল করেছে। খাওয়ার সময়টুকু পায় না মেয়ে টা এর ওপর এইসব শুনে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়বে।
ধূর ফালতু স্বপ্ন দেখার আর টাইম পাইনা আমি।

পিংকি প্রচন্ড রেগে গেলো সৌধকে ঝাকিয়ে বললো কি ভাবছো, কি হয়েছে বলবে নাকি মা টু কে ডাকতে হবে আমার। তোমার ভাবসাব আমার ভালো ঠেকছে না সৌধ বলেই চোখ গরম করলো।

সৌধ দুষ্টু হাসি দিয়ে এক ঝটকায় পিংকি কে নিজের বুকের উপর ফেললো।
কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো তোমার ভাবসাব তো আমার আরোই ভালো ঠেকছে না। শুধু বাবু আর বাবু বাবুর বাবাকে তো চোখেই পড়ছে না। যার জন্য বাবুকে পেলে তাকেই কিনা ভুলে গেলো। বলেই ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো পেটে আলতো করে চেপে ধরলো।

পিংকি বেশ বুঝতে পারছে সৌধ তাঁকে কিছু বলবে না বলেই এভাবে জব্দ করলো। তাই সৌধকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।
সৌধ পিংকির ছুটাছুটি দেখে ফিসফিস করে বললো একদম চুপ বাবু ওঠে পড়লে কিন্তু খবড় আছে। আমার কাজে একদম বাঁধা দিবে না বাবুর বাবার এখন বাবুর মা কে ভীষন প্রয়োজন বলেই ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।

পিংকি সৌধ কে আর বাঁধা দিলো না। বরং সৌধর কাছে নিজেকে সমর্পণ করলো।
সৌধ যেনো আজ একটু বেশীই ভালোবাসছে তাঁকে। সৌধর প্রত্যেকটা স্পর্শে যেনো কি আছে। মনে হচ্ছে সব আদর ভালোবাসা উজার করে দেবে তাঁকে।
কপালে, গালে, থুতনিতে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে।

একটু পর পর বলছে আমার বাবুর আম্মু তো আদর খাওয়াতে এক্সপার্ট হয়ে গেছে এখন।
পিংকির চোখ দুটো বন্ধ ঘন শ্বাসের ভারী আওয়াজ সৌধর কানে বাড়ি খেলো খুব করে।
সৌধ মৃদু হেসে চোখের পাতায় চুমু খেলো।
পুরো শরীরে ভালোবাসা আঁকতে থাকলো সে।

পিংকিও সৌধকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো।
,
রাত তখন তিনটে সৌধ বললো বাবুকে এবার আমাদের কাছে নেওয়া উচিত নয়তো বাবুর সাথে অন্যায় হবে। পিংকি মুচকি হেসে সৌধর থেকে সরে গেলো সৌধ বাবুকে আলতো করে তুলে নিয়ে মাঝখানে শুইয়ে দিতেই বাবু সৌধর বুকে মুখ ঘষতে লাগলো।
সৌধ বললো এবাবা আমার প্রিন্স টা তো দেখছি ঘুমের ঘোরে বাবার মাঝে মা কে খুঁজছে।

পিংকি লজ্জা পেয়ে গেলো বাবুকে নিজের দিকে নিয়ে ফিসফিস করে বললো দেখ বাবু সবাই সবটা পারেনা। তুই খিদেয় যতোই ছটফট করিস মা ছাড়া এখন কেউ তোকে খাওয়াতে পারবে না।
সৌধ মৃদু হেসে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো।

আজেবাজে চিন্তা রা ঘুরপাক করছে মাথায়।
ঘুম আসছে না কিছুতেই। মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু এখন তো যাওয়া যাবে না।
পিংকি ঘুমিয়ে গেছে, বাবুও ঘুমিয়ে গেছে।

সৌধ চোখ দুটো মেললো, মা ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেক সময় ধরে।
পিংকির কপালে আলতো করে চুমু খেলো। বাবুকেরও আদর করলো।
আমার এমন লাগছে কেনো। এমন ভয় এমন শূন্যতা তো কখনো লাগে নি। এতটা উইক লাগছে কেনো আমার। ওহ গড কিচ্ছু ভালো লাগছেনা।
কদিনের জন্য কি কোথাও ঘুরে আসবো,

পিংকি আর প্রিন্স কে নিয়ে, হ্যাঁ তাই করি এছাড়াও হানিমুন করা হয়নি আমাদের। বাবু নিয়েই না হয় ঘুরে আসবো।
রজত, সূচিরও হানিমুন টা হয়ে যাবে। কালই জানাবো ওদের, পিংকি কেও কাল জানাবো।
,
সকাল হতেই সৌধ মায়ের রুমে চলে গেলো।
সামিয়া চৌধুরী সৌধর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
সকাল সকাল ছেলের আবদার মা একটু তোমার কোলে মাথা রাখি?
কোন মা কি সন্তানের এমন আবদার ফেলতে পারে?

আকাশ চৌধুরী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো সৌধ কে দেখেই বললো কি ব্যাপার সকাল সকাল ছেলের বাবা হাজির?
সৌধ বললো ছেলের বাবারও তো বাবার প্রয়োজন হয় নাকি।
আকাশ চৌধুরী হোহো করে হেসে ওঠলো।

সামিয়া চৌধুরীর পাশে বসতে বসতে বললো বাবাদের যে অনেক দায়িত্ব,
বাবারা চাইলেও ছেলেমেয়েদের সময়, দিতে পারে না মাই সান।

সৌধ চট করে ওঠে বললো চলো দাবা খেলি আজ কোন কাজ নেই ফ্রাইডে।
আকাশ চৌধুরী হোহো করে হেসে ওঠলো আবারো।
তাঁর ছেলেটা আজ সেই চার বছরে ফিরে গেছে যেনো।

সামিয়া চৌধুরীর বাবা ছেলের কাছাকাছি আসা দেখে চোখে পানি এসে গেলো। কে বলবে সৌধ এক ছেলের বাবা।
,
জবা আসেনি তাঁর স্বামীর নাকি প্রচন্ড জ্বর, সামিয়া চৌধুরীর কোমড়ে ব্যাথাটা হঠাৎ ই বেড়ে গেছে নিজের রুমে রেষ্ট নিচ্ছে সে।
এদিকে পিংকি তাঁর ছয় মাসের পুচকো কে নিয়ে রান্নাটা সামাল দিতে পারছে না। কাজ ধরতে যেতেই হামাগুড়ি দিয়ে এদিক সেদিক চলে যাচ্ছে। যদি ব্যাথা পেয়ে যায় কোনভাবে, ওর বাবা জানলে তো একদম খবড় করে ছাড়বে।
বাবা ওদিক যাস না এখানে চুপ করে বস না,

প্রিন্স দুষ্টমি মাখা হাসি দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে চলে গেলো। পিংকি আল্হাদে আটখানা হয়ে প্রিন্সকে কোলে তুলে নিলো। প্রিন্স কি ভেবে যেনো কাঁদতে শুরু করলো বোধ হয় তাঁর দুষ্টুমিতে বেঘাত ঘটানোর জন্যই রেগে গেছে।

পিংকি প্রিন্সের কান্না থামানোর জন্য পুরো রুম জুরে ছুটতে শুরু করলো। তবুও ছেলের কান্না থামাতে পারলো না। বিরক্ত হয়ে ধমক দিলো কয়েকটা এতে কান্নার বেগ যেনো দ্বিগুণ বেড়ে গেলো।

সৌধ আসতেই পিংকি বিরক্তি মুখ নিয়ে বললো ফ্রাইডেতেও কোন মহান কাজে বের হও তুমি,
আজ জবা আসেনি তুমি জানোনা,
সৌধ বললো একি আমার প্রিন্স বাবা কাঁদছে কেনো।

দেখি ওলে বাবা এই তো বাবা এসে গেছে,
পিংকি স্বস্তির এক শ্বাস ছেড়ে বললো এবার ছেলে কে সামলাও আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।

সৌধর কোলে যেতেই প্রিন্স চুপ হয়ে গেলো। সৌধর নাক, মুখে তাঁর ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে ধরতে লাগলো।

সৌধ মাথাটা কাঁত করে বললো রাতে মা কে সামলাতে হয়, দিনে অফিস সামলাতে হয়, ফ্রাইডেতে না হয় ছেলেকেই সামলালাম বলেই চোখ টিপ দিলো।
পিংকি রান্নাঘরে যেতে যেতে ঘার ঘুড়িয়ে বললো অসভ্য,
সৌধ বাঁকা হেসে প্রিন্স কে নিয়ে খেলতে খেলতে বাইরে চলে গেলো।

পর্ব ২8 (অন্তিম পর্ব)

আবারো ঘুরে এলো,
পিংকি কাজে মনোযোগ দিয়েছে সৌধ একহাতে পিংকির চুলগুলো সরিয়ে কাঁধে কিস করলো।
পিংকি চমকে ওঠলো, পিছন ঘুরে সৌধর দুষ্টুমি হাসি সেই সাথে ছেলের মিষ্টি চেহেরা দেখতে পেলো।
পিংকি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে চেয়ে বললো ছেলের সামনে এসব কি?

সৌধ হকচকিয়ে গেলো। প্রিন্সের দিকে চেয়ে মুখোভঙ্গি হাসি হাসি করে বললো বাবা তুমি কিছু দেখেছো, প্রিন্স কি যেনো বুঝে হাসতে শুরু করলো।
গুলুমুলু গাল দুটো হাসিতে টসটসে হয়ে গেলো।

প্রিন্সের হাসি দেখে পিংকি সৌধ দুজনেই দুজনের মুখের দিকে চেয়ে হেসে ফেললো।

আচ্ছা তো আমি আমার ছোট্ট প্রিন্সকে নিয়ে আজকে বাইক জার্নি করবো,
পিংকি কাজ করা বাদ দিয়ে ক্ষেপে গেলো।

মাথা খারাপ ওকে নিয়ে বাইক চালাবে। ওকে সামলাবে নাকি বাইক সৌধ এসব ভাবনা মাথা থেকে বের করো নয়তো আজকের রান্না তুমি কর, আমি ওকে সামলাই।
সৌধ হকচকিয়ে গিয়ে বললো এবাবা মজা করছিলাম। আচ্ছা আমরা বাগান থেকে ঘুরে আসি তুমি নিশ্চিন্তে কাজ করো কেমন।

সৌধ বাগানে হাঁটাহাঁটি করছে। প্রিন্স শুধু গেটের দিকে চেয়ে হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে। সৌধ বুঝলো বাইরে যেতে চাইছে,
ইশ আমার রাজকুমার বাইরে যেতে চাইছে কিন্তু মহারানীর তো নিষেধ রয়েছে বাবা।
আচ্ছা কেমন হয় মহারানী কে ফাঁকি দিয়ে মহারাজা, আর রাজকুমার যদি শহড় ঘুরে আসে। সৌধর ভ্রু যুগল নাচানো, মুখে হাসি দেখে প্রিন্সও হেসে দিলো।

বাড়ি থেকে বেশ অনেকটা দূরে এসে গেছে। একহাতে বাইক আরেক হাতে প্রিন্সকে ধরে আছে।
প্রিন্স খুশিতে বেশ নড়াচড়া করছে। ছেলের আনন্দে সৌধও বেশ আনন্দিত হলো। বাইক থামিয়ে নেমে এক বন্ধুর সাথে কথা বললো। সিপন প্রিন্স কে কোলে তুলে বললো কি বাবা কেমন আছো?

প্রিন্স শব্দ করে হাসতে লাগলো তা দেখে সৌধ, সিপন দুজনেই হেসে ফেললো।
সিপন বললো বাহ বউ, বাচ্চা নিয়ে ভরা সংসার।

আর আমি এখনো বিয়েই করতে পারলাম না।

সৌধ বললো চিন্তা করিস না দোস্ত খুব তারাতারি জীবনসঙ্গিনীর খোঁজ পেয়ে যাবি ইনশাআল্লাহ।

সিপন প্রিন্সের দিকে চেয়ে বললো কবে যে বিয়ে করবো, কবে যে এমন ফুটফুটে একটা সন্তান পাবো আল্লাহ জানে।
পেয়ে যাবি ধৈর্য ধর। আর যখন পেয়ে যাবি দেখবি পৃথিবীর সব সুখ, সব খুশি তোর মন প্রান জুরে বসবাস করবে।
সিপন মৃদু হাসলো, ভাবী কেমন আছে?

ভালো বুঝিসই তো পড়াশোনা, সংসার বাচ্চা তিনটা একসাথে সামলাচ্ছে।

হুম। ভাবীর মতো মেয়ে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। এমন মেয়ে যদি পেতাম।
সৌধ প্রিন্সকে কোলে নিয়ে বললো পাবিনা পিংকি তো এক পিস ই আছে হয় ওর থেকে ব্যাটার পাবি নয়তো একটু কম ব্যাটার পাবি। তবে তোর কাছে সব থেকে বেষ্ট হবে সে। যেমনটা পিংকি আমার কাছে সকলের ঊর্ধ্বে।

বাইক স্টার্ট দিলো সৌধ।
প্রিন্স মুখ দিয়ে কেমন আওয়াজ করছে বোধহয় কিছু বলবে। সৌধ সামনে মনোযোগ রেখে প্রিন্স কে ধরে আছে। হঠাৎই প্রিন্সের বলা অস্পষ্ট কথা টা কানে ভেসে এলো বাব, বাব, বাবা, শার্টে মুখের লালা পড়ছে। সৌধর কানটা স্থির হয়ে গেলো।
ছয়মাসের বাচ্চা বাবা বলছে, ধীর গতিতে বাইক চালিয়ে এগুতে লাগলো।

প্রিন্স বারে বার বাব, বাব, বাবা বলছে সৌধ খুশিতে যেনো আত্মহারা হয়ে গেছে। ছেলের মুখে প্রথম বাবা ডাক শুনছে, না মা বলেছে না দাদা-দাদী কে ডেকেছে প্রথম ডাক টা বাবাই হয়েছে। এক ফোঁটা অশ্রুকনা বেয়ে পড়লো। পুরুষ মানুষের চোখে সহজে পানি আসে না। সৌধর চোখে এসেছে তাঁর স্ত্রী পুএের জন্যই। ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে সামনে তাকালো।

এখন কেমন আছো।
ভালো লাগছে না আমার আমি বাড়ি যাবো।
সূচির পাশে বসে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো শরীর খারাপ নিয়ে কিভাবে যাবে দুদিন পর যাও। চলো আজ হসপিটাল নিয়ে যাই।
সূচি বললো না আমি বাড়ি যাবো আমার ভালো লাগছে না কিছু।

রজত বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। কদিন যাবৎ মেয়েটা অদ্ভুত আচরন করছে মুড টা একদম ঠিক নেই কাজের চাপে সেভাবে সময়ও দিতে পারছে না।
সৌধ বললো কদিন বাইরে ঘুরে আসতে এটাই বোধহয় ভালো হবে কালকেই ছুটি নিতে হবে সৌধ কে জানিয়ে। আগে বউ এর মন ভালো করি তারপর সব কিছু। এইভাবে ওর মন খারাপ থাকলে কোন কাজে মন দিতে পারবো না। অশান্তি তে ভুগতে হবে এর থেকে ছুটি নিয়ে ওকে সময় দেওয়াটাই ব্যাটার হবে। এক দীর্ঘশ্বাস ছেরে রজত সূচির অনেকটা কাছে গিয়ে গালে হাত রেখে বললো বউ এর মুড এমন থাকলে বর কি করে শান্তি পায় বলোতো।
সূচি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠলো।

রজত হতভম্ব হয়ে গেলো। এভাবে কান্নার কোন অর্থই সে খুঁজে পেলো না। সূচি আচমকাই রজত কে জরিয়ে কাঁদতে লাগলো। রজত ঘেমে গেলো।
প্রচন্ড নার্ভাস ফিল করলো সূচির আচরনে।

কেমন যেনো ভয় লাগছে। মুখের দিকে চেয়ে এক হাতে গাল মুছে দিয়ে কপালে চুমু খেলো।
কি হয়েছে আমাকে না বললে কি করে বুঝবো আমি।
এভাবে কেনো কাঁদছো কষ্ট হয় তো আমার।
কি হয়েছে বলো।

রজত সমানে চোখের পানি মুছে যাচ্ছে।
সূচি বললো আমি ইদানীং প্রায়ই স্বপ্ন দেখি সাদাকাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় তোমাকে আমার সামনে শুইয়িয়ে রাখা হয়েছে। আর আমি পাগলের মতো ছটফট করছি।

রজত অট্টস্বরে হেসে ওঠলো। আরেকটু গভীরভাবে জরিয়ে নিয়ে বললো এই জন্য বাপের বাড়ি যেতে চাইছো আমাকে ছেড়ে, যদি সত্যি অমন কিছু ঘটে।
সূচি চিৎকার দিয়ে না বলে ওঠলো।
রজত সূচির ঠোঁট জোরা চেপে বললো চুপপ।

মা শুনলে সমস্যা হবে। আর শুনো স্বপ্নে যাকে মৃত দেখবে তাঁর হায়াত আরো বেড়ে যায় বুঝলে।
সত্যি কিনা জানিনা মুরুব্বিরা তাই বলে আমিও তাই শুনে আসছি সো তুমি ভয় পেওনা।
তোমায় ছেড়ে কোথাও যাবো না।

সূচি শান্ত হলো কিছুটা। রজত সূচির চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো।
সূচি সরে গিয়ে বললো চলো খেতে দেই। রাজন গোসলে গেছে বেরিয়েই ভাবী, ভাবী শুরু করবে।
রজত বললো উহুম, চুপ করো তো খিদে নেই।

আর রাজনকে মা খেতে দিবে, ছুটকি আছে নো টেনশন। বলেই কোমড় পেঁচিয়ে নিজের উপর ফেললো।
একহাতে ঘাড় চেপে মুখোমুখি মুখ নিয়ে দুইজোড়া ঠোঁট এক করে ফেললো।
দুজনেই যখন দুজনাতে মত্ত তখনি ফোন বেজে ওঠলো রজতের।

ঠোঁট জোরা ছারতেই সূচি ঘনঘন শ্বাস ছেরে সরে বসলো। রজত নাম্বার দেখে বললো শশুর বাড়ির লোকেরা আমার রোমান্সের বারোটা বাজিয়ে দিলো।
সূচি চমকে ওঠলো কে ফোন করেছে।
ল্যান্ডফোন থেকে এসেছে।

আশ্চর্য রিসিভ করো।
সূচির বিরক্তি মুখ দেখে রজত মুচকি হেসে রিসিভ করলো।

কি থেকে কি হয়ে গেলো এসব আকাশ।
আকাশ মেঝেতে শরীর ছেড়ে বসে পড়লো।
আবরার খান আকাশের কাঁধে ধরে বসল।

ধীরে ধীরে পুরো বাড়িতে লোকসমাগম বাড়তে লাগলো। সামিয়া চৌধুরীর আর্তচিৎকারে পুরো বাড়িটা থমকে রইলো। সামনের রক্তাক্ত মুখটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে চেয়ে আছে পিংকি। প্রমিলা বেগম মেয়ের কাঁধে ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর কেঁদে যাচ্ছে।
লোকজনের হায় হতাশ এর আওয়াজ কানে ভাসতে লাগলো।

আহারে গো দুধের শিশুটা এতিম হয়ে গেলো।
মাথার ওপর ছায়াটা রইলো না গো। পুরা কপাল নিয়ে জন্মিয়েছে ছেলেটা।

আহারে কি কপাল গো বাপটার যেখানে বাবার খাটিয়া ছেলের কাঁধে থাকবে সেখানে কিনা ছেলের খাটিয়া বহন করতে হবে।

ইশ যুবতী মাইয়াটা, দুধের শিশুটা রাইখা পোলাটা মইরা গেলো। পথে বসাইয়া গেলো গো।

পিংকি দুকান চেপে চিৎকার করে ওঠলো।

হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো,
আকাশ চৌধুরীর দিকে চেয়ে চিৎকার করে বললো বাবা আপনার ছেলেকে হসপিটাল না নিয়ে বাড়ি আনলেন কেনো।
বাবা আপনার এতো টাকা পয়সা, থাকতে আপনার ছেলেকে হসপিটালে জায়গা কেনো দিলো না।
বাবা সারাজীবন সন্তান দের রেখে টাকার পিছনে ছুটলেন অথচ সেই টাকা কেনো কোন কাজে লাগলো না।
বলেই জ্ঞান হারালো পিংকি।

প্রমিলা বেগম মেয়েকে জরিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। তাঁর কান্না দেখে ছোট্ট প্রিয়ও কাঁদতে শুরু করলো।
পাশের বাড়ির কয়েকজন মহিলা সামিয়া চৌধুরীর মাথায় পানি ঢালছেন। আনিসা বেগম সুবহা এবং তাঁর বাবা রাস্তায়। হঠাৎ এমন কিছু ঘটে যাবে সেটা সকলের কল্পনার বাইরে ছিলো।

জবা প্রিন্স কে সামলাচ্ছে পেটের দিকে ছিলে গেছে।

মাথায় খানিকটা আঘাত পেয়েছে ছেলেটা কেঁদেই যাচ্ছে। অথচ জবা ছাড়া তাকে সামলানোর কেউ নেই আজ। গলা ফাটিয়ে কাঁদছে প্রিন্স মাকে খুঁজছে জবার মাঝে। বাচ্চা শিশুটা বুঝতেও পারলো না তাঁর মুখে প্রথম বাবা ডাক শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে তাঁর বাবা প্রান দিয়েছে।

ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে সামনে তাকাতেই মুখোমুখি হয় ট্রাকের এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলো না। সেই মূহুর্তে মাথায় একটা জিনিসই চলছিলো আমার যা হয় হোক প্রিন্স কে বাঁচতে হবে। ওর মায়ের জন্য ওকে বাঁচতে হবে।

একসাথে দুজন চলে যেতে পারিনা। প্রিন্সকে ডান দিকে চোখ বন্ধ করে এক ঢিল দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে সৌধ। মূহুর্তেই থমকে যায় গাড়ি, রাস্তায় চলা মানুষ গুলো সকলেই ছুটে যায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোক গুলো প্রিন্সকে কোলে তুলে নেয়।

সূচি এতো মানুষ দের ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই চিৎকার করে ওঠে।
ওবাবা, আমার ভাইয়ের কি হয়েছে।

ওবাবা, বাবা আমার তো একটাই ভাই, বাবা আমার তো একটাই ভাই।
আকাশ চৌধুরী মেয়েকে জরিয়ে কেঁদে ফেললো।

চিৎকার করে বললো আমার তো একটাই ছেলে মা।
মা গো আমার তো একটাই বাবা ছিলো।

রজত হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।
তাঁর ছোট বেলার বন্ধু তাঁর জীবনের অর্ধেক টা সময় পার করেছে এই মানুষ টার সাথে। সুখে দুঃখে দুজনেই একে অপরের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জরিত ছিলো সেই মানুষ টার নিথর দেহ কিনা আজ তাঁর সামনে।

প্রিন্সের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতেই সূচি পাগলের মতো প্রিন্সের কাছে ছুটে গেলো।

কোলে নিয়ে পাগলের মতো চুমু খেয়ে বুকে জরিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
আমার বাবার কি হবে। আমার সোনামুনির সাথে কেনো এমন হলো। আমার ভাই, বলেই প্রিন্সকে নিয়ে সৌধর পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
রজত সূচিকে সহ প্রিন্সকে জরিয়ে কেঁদে ফেললো।

আমার বাবা, আমার কলিজা, আমার আত্মা বলেই সামিয়া চৌধুরী ছুটে এলো।
সূচি মাগো বলেই এক চিৎকার দিলো।
রজত প্রিন্সকে জরিয়ে নিয়ে থমকে রইলো।

মাকে জরিয়ে পাগলের মতো কেঁদে চলেছে সূচি।

ভার্সিটির সকল বন্ধু -বান্ধব, রুশা, তুষার সকলেই সৌধকে শেষ বার দেখার জন্য হন্য হয়ে ছুটে এসেছে।
ছোট বাচ্চা টাকে দেখে কারো চোখে বাঁধ মানলো না।
প্রিন্স কে কোলে নিয়ে অঝড়ে কাঁদতে লাগলো রুশা।

রজত সৌধর পাশে বসে এক ধ্যানে সৌধর মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
তুই এটা কি করলি সৌধ, এইভাবে তুই চলে গেলি।

তুই না তোর জীবনের সবকিছু আমাকে জানাস। তাহলে তুই চলে যাবার আগে একটা বার কেনো জানালি না আমায়। আমি তো তোকে বোঝাতে পারতাম বল। তোর সকল জেদ, রাগ তো সারাজীবন আমি সামলেছি। তুই তো আমাকে মানতিস দোস্ত নিজের বেষ্ট ফ্রেন্ড এর সাথে এতো বড় বেঈমানী কেনো করলি।
রোজ রাতে তোর অস্থিরতা, ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখা তুই পিংকির সাথে শেয়ার করতি না ও চিন্তা করবে বলে।

আমি তো তোকে বলেছিলাম দোস্ত তুই সাবধানে চলবি ভেবে চিন্তে পা ফেলবি। এখন তুই ছেলের বাবা, তোর দায়িত্ব অনেক তুই তবুও কেনো বুঝলিনা। কেনো শুনলি না পিংকির কথা।

বন্ধুর কথা না শুনলি তোর বাচ্চার মায়ের কথা টা শুনতি। আজ এই বাচ্চা, বাচ্চার মা কার দায়িত্বে রেখে গেলি তুই।
তোর পিংকি কে কার কাছে ছেড়ে গেলি তুই।

চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। বুকটা ফেটে যাচ্ছে রজতের। একসাথে খেলাধুলা, ঘুরাফেরা, পড়াশোনা কতো স্মৃতি দুজনের। রোজ রাতে চা স্টলে বসে আড্ডা, লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া কত-শত স্মৃতি রা এসে ভীড় করলো হিসেবের বাইরে।

সামিয়া চৌধুরী বুকে থাপড়াতে, থাপড়াতে পাগলের মতো ছটফট করছেন আর বলছেন আমার কলিজা, আমার কলিজা। আমার আত্মা গো আমার কলিজাটা ছিড়ে নিলো গো আল্লাহ আমার কলিজাটা ছিড়ে নিলা। আমার কলিজা ফিরিয়ে দাও গো আল্লাহ একটা বার আমার কলিজা ফিরিয়ে দাও।

সৌধর রক্তাক্ত বুকে মাথা রেখে দুহাতে শক্ত করে জরিয়ে আছে পিংকি। চোখ দুটো তাঁর বন্ধ। বিরবির করে বলতে থাকলো সৌধ, তুমি আমার কথা না শুনে কেনো বাইক নিয়ে বেরুলে। কেনো তুমি একটু সচেতন হলে না। তোমার একটা ভুলের কারনে তিনটা জীবন শেষ হয়ে গেলো। আমাদের রাজকুমার পিতৃহীন বড় হবে সৌধ। এই সৌধ শুনতে পারছো আমাদের সন্তান বাবার আদর ছাড়া মানুষ হবে।

সকলেই মুখ চেপে কেঁদে চলেছে।
লাবনী, রিতু দুজন দুজনকে জরিয়ে কেঁদে চলেছে।
সূচি পিংকির কাছে গিয়ে কাঁধে হাত দিতেই পিংকি আঙুল তুলে বললো শশশ চুপ।

আবারো বুকে মাথা রেখে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো পিংকি। চোখের পানিগুলো বুকে পড়ে পড়ে রক্তগুলো ধূয়ে যাচ্ছে।
আধাঘন্টা পার হয়ে গেলো পিংকি ওভাবেই রয়েছে।
প্রমিলা বেগম এসে পিংকির মুখ ওঠাতেই বুঝলো মেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে।

দুহাতে সৌধকে শক্ত করে জরিয়ে আছে বহু কষ্টে ছাড়িয়ে আবরার খান আর প্রমিলা বেগম পিংকিকে রুমে নিয়ে গেলো।

তাঁর দেওয়া সব ব্যাথা সহ্য করে নিয়েছি আমি।

বিশ্বাস করো তোমরা, সূচি ও সূচি, রুশা ও রুশা বলো কি সহ্য করিনি আমি? বিয়ের পর স্বামীর পাশে অন্য কাউকে সহ্য করে নেওয়ার ক্ষমতা কজন রাখে বলো? আমি করেছি জানোতো, বুকে হাত দিয়ে আমি করেছি, দূর থেকে ভালোবেসেছি, দূর থেকে চেয়েছি কখনো বুঝতে দেয়নি আমি ওকে চাই, কখনো জানতে দেইনি আমি শুধু ওকেই ভালোবাসি।

নিজের মনকেও জোর করে বুঝিয়েছি আমি ওকে চাইনা, সবটা ওর জন্যই বিশ্বাস করো তোমরা।
যখন আমি ওকে কাছে পেলাম, যখন আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেলো আমাদের ঘর আলো করে ফুটফুটে এক সন্তান এলো তখনি কেনো ও আবার আমাকে ছেড়ে চলে গেলো বলতে পারো তোমরা। গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করতে লাগলো পিংকি।
সৌধ, ওসৌধ তুমি শুনতে পাচ্ছো বলেই চিৎকার করে ওঠলো।

তোমরা দেওয়া সব কষ্ট, সব ব্যাথা সহ্য করে নিয়েছি আমি। তোমার দেওয়া সব আঘাত আমি সহ্য করে নিবো বিশ্বাস করো।
কিন্তু পৃথিবীতে তোমার কোন অস্তিত্ব থাকবে না।

যে আকাশের নিচে, যে মাটির উপরে আমি থাকবো সেখানে তুমি থাকবে না এই ব্যাথা কি করে সহ্য করবো আমি? কি করে মেনে নেবো আমি।
কিভাবে পারলে তুমি এভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে।

আমার কথা না ভাবলেও নিজের সন্তানের কথা একবারো ভাবলে না। তুমি দুটো প্রান কে এভাবে ধোঁয়াশার মাঝে ঠেলে চলে গেলে।
আমার বাবু কাকে বাবা বলবে সৌধ,
আমার বাবু কার হাত ধরে স্কুলে যাবে,

আমার বাবুকে আমি বকলে কে এসে আমাকে শাসন করবে,
বাবুকে মারলে বাবু কার কাছে তাঁর মায়ের নামে নালিশ জানাবে,
কথাগুলো বলতে বলতেই আবারো সেন্সলেস হয়ে গেলো পিংকি।

কেটে গেছে কয়েকটা বছর। ছেলেকে এবার স্কুলে ভর্তি করানোর পালা। আবরার খান এ নিয়ে তিনবার পিংকি কে জানিয়েছে সে যদি চায় তো ভালো ছেলে দেখবে যে তাকে সহ তাঁর বাচ্চার দায়িত্ব নিবে।

বরাবরই পিংকি এড়িয়ে গেছে পড়াশোনা শেষ তাঁর এবার একটা চাকরি নিবে আকাশ চৌধুরী তাঁর পুরো বিজনেস টাই প্রিন্সের নামে করে দিয়েছেন। ছেলেকে নিয়ে কোন চিন্তা নেই। আর নিজেকে নিয়ে নতুন করে কোন আশা নেই। সে তাঁর গহীন কোণে লুকিয়ে রাখা মানুষ টাকে নিয়েই বেশ আছে। আর কিচ্ছু চাইনা তাঁর।

সূচি এসেছে তাঁর ফুটফুটে মেয়ে টা কে কোলে নিয়ে আদর করছে পিংকি।
সূচি বললো আজ বাদে কাল মা, বাবা চলে যাবেন।
প্রিন্স বড় হচ্ছে আমি জানি ব্রোর জায়গা কাউকে দেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু তুমি প্রিন্সের কথা ভেবে আংকেলের কথাটা মেনে নাও।

পিংকি বাঁকা হাসলো। প্রিন্স কে সামলানোর জন্য ওর মা বাবা আছে। ওর কথা আমরাই ভাববো আর কাউকে প্রয়োজন নেই তো।

পিংকির হাতটা চেপে ধরে বললো কিন্তু কিভাবে পারবে পিংকি কিভাবে সম্ভব একা একা বাঁচা যায় না। যতোই আমরা বলি না কেনো দিনশেষে তুমি তো সত্যি একা।

এসব কি বলছো কিভাবে একা আমি। সৌধর মতো স্বামী থাকতে আমার একা বাঁচতে হবে কেনো?
উপরওয়ালা ওকে নিয়ে গেছেন কেনো সেই কারন উপরওয়ালাই ভালো জানে কিন্তু আমার স্বামী তো আমায় একা রেখে যায় নি পৃথিবীর সব থেকে দামী জিনিস ওর অস্তিত্ব কে রেখে গেছে আমার কাছে।
যাকে সামলাতে সামলাতেই বাকি জীবন কেটে যাবে আমার। নতুন করে কিছু শুরু করার সময় আর নেই।

আর কি মনে হয় হুম তোমার ভাই আমার পাশে অন্য কাউকে দেখে চুপচাপ বসে থাকবে। একদম মেরেই ফেলবে আমায় বুঝলে।

তুমি তোমার ভাইকে যতোটা না চেনো আমি আমার স্বামীকে দ্বিগুন চিনি। আমি তাঁর সম্পত্তি, সারা জীবন, শেষ নিঃশ্বাস অবদি শুধু তাঁর ই থাকতে চাই আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাঁর স্পর্শ রয়েছে। আমার কানে আজো তাঁর মাতাল হওয়া শ্বাস বয়ে বেড়ায়। তাঁর দেওয়া ভালোবাসার আঘাত গুলো আজো আমার মন গহীনে কড়া নাড়ে।
আমার এই গর্ভে তাঁর সন্তান ছিলো, আমার এই ঠোঁটে তাঁর গভীর স্পর্শ, আমার শরীরের প্রত্যেকটা শীড়ায় শীড়ায় শুধু সৌধ আর সৌধ।
আর বললে সম্ভব, অসম্ভবের কথা,

এই পৃথিবীতে সবই সম্ভব।
যিনি উপরে আছেন তিনিই সব সম্ভব করিয়ে দেন।
এই দেখোনা

“তাঁর দেওয়া সব কষ্ট আমি সহ্য করে নিয়েছিলাম।
কিন্তু এই বিশাল পৃথিবী তে তাঁর ছায়া ছাড়া তাঁর অংশ কে নিয়ে একা বাঁচার মতো কঠিন জীবন, নির্মমতম কষ্ট, যন্ত্রণা আমাকে সহ্য করতে হবে কখনো ভাবতে পারিনি আমি”।

কিন্তু তাই ঘটেছে কয়েকটা বছর তাঁকে ছাড়া তাঁর অস্তিত্ব কে আঁকড়ে ধরেই তো বেঁচে আছি আমি। বেচেই তো আছি মরিনি তো,
আমার শুধু একটাই লক্ষ এখন ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করা। আর সকলের মাঝে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা তুলে ধরা। যাতে আর কারো জীবনে এমন ঘটনা না ঘটে।

আর কোন মা তাঁর সন্তান কে না হারায়, আর কোন বাবা তার সন্তানের লাশ বহন করে কবরে না নিয়ে যায়, আর কোন পিংকির জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ না হয়, আর কোন প্রিন্স পিতৃহারা না হয়।

রাস্তা ঘাটে বেরুলে আজো এমন অনেক সৌধ চোখে পড়ে যারা অসচেতন, বর্তমানে কিছু ছেলেরা প্রচন্ড অসচেতন হয়ে রাস্তায় চলাফেরা করে। তাঁদের কাছে আমি একটা মেসেজ পাঠাতে চাই। তোমরা তোমাদের সব কাজ সব ভালো লাগা, সব এটেনশন জমিয়ে রেখো সঠিক সময়ে তা উপভোগ করার জন্য।
দয়া করে রাস্তায় গাড়ি, বাইক নিয়ে বেরুলে ঐ সময়টা খুবই সাবধানতা অবলম্বন করো।

তোমার একটু অসতর্কতার জন্য ঘটে যেতে পারে অনেক বড় কোন দূর্ঘটনা।

তাই সর্বদা সতর্ক থাকো তোমরা। নিজে সুখে শান্তি তে বাঁচো এবং অপরকেও বাঁচতে দাও।

তোমার কাছে তোমার জীবনের মূল্য কতোটা দামী সেটা তুমিই জানো কিন্তু তোমার মা-বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী -সন্তানদের কাছে তোমার জীবনের মূল্য সীমাহীন।
“মানব জীবন এমন এক জীবন যে জীবনে অপ্রত্যাশিত ভাবেই অনেক ঘটনা ঘটে যায়।

আর সেই ঘটনা গুলোর জন্য কিছু প্রাপ্তি কিছু অপ্রাপ্তি তেই জীবন অপূর্ন হয়েও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রজত বললো পিংকিকে বুঝিয়েছিলে? কি বললো –

সূচি বাঁকা হেসে বললো তুমি ঠিকি বলেছিলে। সত্যি ও রাজি হয়নি আর হবেও না কোনদিন।
কিছু মানুষ আমাদের “মনের গহীনে” এমন ভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে যে চাইলেও সেই মানুষ গুলো কে আমরা ভুলে থাকতে পারিনা।
আর পিংকি তো ভুলে থাকতে চায়ও না।
তাহলে ও কি করে সৌধর জায়গায় অন্য কাউকে বসাবে?

লেখা – জান্নাতুল নাঈমা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “মনের গহীনে – Romantic Love story bd” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আয়না সুন্দরী – Bangla choto new golpo