রিলেশনশিপ

জাস্ট ম্যারেড – লোভনীয় বিয়ের গল্প ২০২১

জাস্ট ম্যারেড – বিয়ের গল্প ২০২১: বাসর ঘরে ঢুকতেই আমাকে রাফসান বলল “তুমি বিছানায় শুয়ে পড়ো, আমি আমার স্টাডিরুমে শুয়ে পড়ব।” তার দিকে তাকিয়ে একটা জোরে নিঃশ্বাস ফেলে আমি বললাম….


পর্ব ১

আমি বসে আছি আমার রুমের বিছানাতে। চোখ টা খুব ভারি ভারি লাগছে। কখনই এমন ভারি সাজ দেইনি আমি। তাই হয়ত এতটা অস্বস্তি লাগছে। আমি চোখ উপর করে তাকাতেই আমার ভাবি রুমে এসে বলল “রাফিয়া চল। গাড়ি এসে গেছে।” আমি আমার পার্স টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বের হওয়ার আগে আরো একবার দেখে নিলাম আমার রুম টাকে। হয়ত আর এইভাবে থাকবে না আমার এই রুম টা। হয়ত আমার ছোট বোন মনি এই রুম টা দখল করে নিবে।

হয়ত আম্মু আর আব্বু আজকে এইখানে এসেই কাদবে। শেষ কান্না টা হয়ত বড় ভাইয়া এইখানেই কাদবে। কিন্তু আমি তা দেখতে পাবোনা। আমিতো আর এইখানে থাকব না, কিভাবেই বা দেখবো।? এইসব ভাবতে ভাবতে চোখের কোনায় পানি এসে পড়ল। ভাবি আমার হাত টা ধরে বলল “কাদছিস?” আমি বললাম “নাহ কাদবো কেন? আমি তো আসবই আবার। বার বার। তাই না বলো?”

ভাবি হেসে বলল “হ্যা অবস্যই। চল এইবার।” আমিও ভাবির পিছে পিছে চলে আসলাম। গাড়িতে উঠে বসলাম। কেমন যেনো লাগছে। বুক টা বার বার ধরফর করে উঠছে। আমি জানি ভয়ের কিছুই নেই। যার সাথে বিয়ে হচ্ছে তাকেও আমি আগের থেকেই চিনি। আমাদের ২বার দেখা হয়েছে। একবার যখন আমি ক্লাস ৫ এ পড়তাম। সে আসছিল আমাদের বাসায়। অনেক গুলো চকোলেট দিয়ে গিয়েছিল। হুম। আমি শুনেছি আমার জন্মের ২১দিনের দিন ফয়েজ আংকেল আমাকে একটা স্বর্ণের চেইন গিফট দিয়ে বলেছিলেন যে “রাফিয়া ই হবে আমার বাসার বউ।” এরপর উনারা চলে যান ঢাকার বাইরে।

এরপর একদিন রাফসান কে নিয়ে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন অনেক গুলো চকোলেট। এরপর আর দীর্ঘদিন তাদের কোনো খবর ছিল না। আব্বু আর আম্মু তো আমার আর রাফসানের বিয়ের কথা টাই ভুলে গিয়েছিলেন। সত্যি বলতে আমি তো জানতাম ই না এমন কোনো কথা। আমিও জানলাম যেদিন আমাদের আবার দেখা হলো। রাফসান এর গ্রেজুয়েশন পার্টি তে যখন আমাদের দাওয়াত করা হল।

আমি সেদিন একটা পিংক কালারের গাউন পড়েছিলাম। চুল গুলো খোলা রেখে সুধুই চোখে কাজল আর ঠোটে লিপ্সটিক দিয়েছিলাম। আমি হাটতে পারছিলাম না হিল পড়ে। বার বার আমার ড্রেসের সাথে বাজতেছিলো হিল টা। আর আমি সামলাতে সামলাতে অস্থির হচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একজনের সাথে ঢাক্কা খেয়ে পড়তে নিলাম মাটিতে। কিন্তু খুব বেশি সিনেমেটিক ভাবেই সে আমাকে ধরে ফেলল।

যেমন করে প্রতিটা হিন্দি মুভিতে নায়কেরা নায়িকাদের বাচায়। আমি এক মিনিটের জন্যে স্তব্ধ্য হয়ে গেলাম। তার দিকে তাকাতেই কেন জানিনা বুকে অনেক জোরে একটা মোচর দিয়ে উঠল। আমাকে সে ধরেই রাখলো। তার ও চোখ সরেনা আমার থেকে। আমি একটু অস্বস্তি বোধ করলাম। তাকে বললাম “আমাকে ছেরে দিন লোকে কি বলবে?” সে আমার কথা পুরা হওয়ার আগেই আমকে ছেরে দিল। হুম। ঠিকই বুঝলে। সে আমাকে ছেরে দিলো। আমি মাটিতে পরে গেলাম। এত লোকের সামনে মাটিতে পড়ার পর আমার রাগে চোখ টা লাল হয়ে গেলো। আমি দাড়িয়ে উঠে বললাম “ইডিওট।

কোনো সেন্স আছে বলে মনেই হয়না।” সে আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো “আমাকে মেয়েরা যাই বলে আমি তাদের জন্যে তাই করি। বুঝলেই তো একটু আর কি উইকনেস আছে মেয়েদের প্রতি। তুমি বললে ছেরে দিতে ছেরে দিলাম। এইটা ও কি দোষ হয়ে গেলো?”

আমি বললাম “আমি কি এইভাবে ছারতে বলেছি? নন সেন্স! “সে হঠাৎ করে আমার হাত ধরে আমাকে কাছে টেনে নিলো। আর আমার ঠোটে আংগুল দিয়ে বলল “চুপ। একটা সুন্দরি মেয়ের মুখে এতটা বাজে কথা মানায় না। আর এমনিও তোমার পিছনের চেইন টাও খুলে গেছে। এখন যদি আমার কথা মত না চলো তাহলে সবার সামনেই তোমাকে আজ ইন্সাল্ট হতে হবে।”

আমি তার কথা শুনে আতকিয়ে গেলাম। পিছনে হাত দিতেই দেখি সত্যি সত্যি পড়ে যাওয়ার কারণে চেইন টা খুলে গেছে। আমি আশে পাশে তাকালাম। পরিচিত কেও নেই। হয়ত সবাই আমাকে রেখেই পার্টি তে ঢুকে গেছে। আমি তখন না চাইতেও বললাম আচ্ছা বলেন কি করব?

সে আমাকে ঘুরিয়ে আমার পিছনে সে একেবারেই লেগে লেগে দাড়ালো। তারপর আমকে সোজা হেটে যেতে বলল। আমিও তার কথা মত তাই করলাম। তারপর একটা ওয়াশরুমের কাছে নিয়ে গিয়ে সে আমার পিছনের চেইন টা টেনে লাগিয়ে দিলো। আমি তখন এতটাই লজ্জিতবোধ করছিলাম যে ফিরে আর তাকাতে পারলাম না। সে আমার পিছন থেকে চলে গেলো। আর আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ওয়াশরুমে অনেক্ষন দাড়িয়ে রইলাম।

তারপর পার্টি তে ভিতরে ঢুকতেই বুঝতে পারলাম আসলে যার সাথে এতক্ষন আমি ছিলাম সেই রাফসান। যার গ্রেজুয়েশন পার্টি তে আমরা আসছি। আম্মু আমাকে দেখেই বোকা দিতে লাগল। এতক্ষন কই ছিলাম। কি করছি। এই সেই কথা বলে আমাকে আম্মু কিছুক্ষন ঝারল। তারপর অনেক মানুষের ভিরে কথা না শুনতে পারার কারনে সে নিজেই চুপ হয়ে গেলো। বাসায় পৌছিয়েই জানতে পারলাম ফয়েজ আংকেল এর ছেলে রাফসানের সাথে আমার কথা পাকাপাকি করে আসছে আম্মু আর আব্বু।

আমার বলার কিছুই ছিলো না। কি ই বা বলব! সারাজীবন তাদের পছন্দেরই তো সব করতে হয়েছে আমার। এমন কি কোন ব্রাশ দিয়ে দাত মাজবো তাও তো আম্মু ঠিক করে দিতো। আর এমনিও আমার বড় ভাইয়ার কথা মতই যখন তার বিয়ে হয়নি তাহলে আমার বিয়ের সমিয় আর কে আমাকে জিজ্ঞেস করতে আসবে?

গাড়ি থেমে গেলো। আমরা সেন্টারে পৌছে গেলাম। আমার লাহেংগা টা ধরে ভাবি আমাকে নামিয়ে নিলো। আমি মাথা নিচু করে হাটতে লাগলাম। আমাকে নিচে একটা রুমে বসানো হলো। আমাদের নিকাহ পড়ানো হচ্ছে। মা আমার পাশে বসেই কাদছে। আমি কাদছি না। কারণ ছোট থেকেই নিজের স্বপ্ন গুলোকে মরতে দেখতে দেখতে এখন আর কষ্ট লাগে না। হুম। স্বপ্ন। আমার স্বপ্ন ছিলো নিলয়।

নিলয় আমার ফুপাতো ভাই। আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। সেও আমাকে খুব পছন্দ করত। যখন আমি ক্লাস ১০ এ পড়ি তখন তার দেয়া একটা চিঠি আম্মুর হাতে পড়ে যায়। এরপর আমি হয়ে যাই খাচায় বন্দি আর নিলয় কে ফুপ্পা পাঠিয়ে দেয় ইটালি। এরপর আর তার সাথে না আছে আমার দেখা না আছে কোনো কথা। সে অনেকবার বাসার ল্যান্ডলাইনে ফোন দিতো। কিন্তু আমার তো সেই ফোন টা ধরার ও পার্মিশন ছিল না।

আজকে ৩ কবুল বলার সাথে সাথেই আমার নিলয় কে নিয়ে দেখা স্বপ্ন গুলো ও ভেংগে যাবে। সব শেষ হয়ে যাবে।

কাজি আসল। আমাকে কাবিন নামা পড়ে শুনান হল। আমি ৩বার কবুল বললাম। আম্মার স্বপ্ন ভেংগে ফেলো। ভিতরে আমার অনেক বেশ তোলপাড় চলতে লাগল। কিন্তু বাইরে আমি চুপ করেই রইলাম। আমি সই করে দিলাম খাতায়।

মিনিট পাচ এক পর আমার ছোট বোন মনি এসে বলল বিয়ে পড়ানো কমপ্লিট। আপুনি তোর বিয়ে হয়ে গেছে।

আমার চোখ দিয়ে হটাৎ তখন ২-৩ফোটা পানি বেরিয়ে আসল।

আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো স্টেজের কাছে। লাহেংগা টা বেশ ভারি হওয়ার কারনে আমি উঠতে পারছিলাম না। ঠিক সেই সময় রাফসান (যে এখন আমার স্বামী।) আমার দিকে তার হাতটা বারিয়ে দিলো। সে আমাকে আমার হাত ধরে স্টেজে তুলল। আমি তার দিকে একবার তাকালাম। সে ও আমার দিকে তাকালো। তার চোখে ও যেন আমি আমার জন্যে ঘৃণা দেখতে পারলাম। যেমন টা আমার চোখে তার জন্য ছিল। তারপর মাথা টা নিচু করে আমাকে বসালো তার পাশেই। আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।
অনুষ্ঠান শেষে আমাদের নেয়া হলো বাসর ঘরে। বাসর ঘরের দেয়ালে লিখা ছিলো।


পর্ব ২

বাসর ঘরে ঢুকতেই আমাকে রাফসান বলল “তুমি বিছানায় শুয়ে পড়ো, আমি আমার স্টাডিরুমে শুয়ে পড়ব।” তার দিকে তাকিয়ে একটা জোরে নিঃশ্বাস ফেলে আমি বললাম “যেহেতু বিয়ে হয়েই গেছে, সেহেতু এখন সারাজীবন আমাদের একসাথে ই থাকতে হবে। হেসে হোক বা কেদেই হোক না কেনো আপনার আজ না হয় কাল এই রুমেই আমার সাথে একই বিছানায় ঘুমাতে হবে তাই বলছিলাম যে, এত বারাবারি না করে এখানেই শুয়ে পড়ুন আমি আপনার কোনো ক্ষতি করব না।

“সে অনেক্ষন চুপ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “হেই শুনো তুমি আমার ক্ষতি করবে না মানে? আমি একজন পুরুষ। আর কোনো স্ত্রী একজন পুরুষ এর ক্ষতি করতে পারেনা। কখনই না। আর এমনিও আমি মার্শাল আর্টস জানি। তো আমার সাথে তুমি কিন্তু ভুলেও ঘেসতে এশোনা।” তার কথায় আমার এত্ত বেশি হাসি পাচ্ছিলো যে বলার বাইরে। কিন্তু খুব কষ্টে নিজের ফিলিংস টা লুকিয়ে নিলাম। আর তার জন্যে বিছানায় অর্ধেক টা জায়গা ছেরে চলে গেলাম গোসলে। গোসল শেষে ফিরে দেখি সে এখনও বিছানার এক পাশ দিয়ে বসে আছে। কোনো রকমের ঘুম নেই তার চোখে। আমাকে আসতে দেখে সে বলল “আচ্ছা বুঝলাম তুমি আমার কোনো ক্ষতি তো করতেই পারবে না।

কিন্তু যদি আমি কিছু করি?” তার কথায় বিরক্তি ভাব নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম “আপনি মারশাল আর্টস জানলে আমিও বাংলা থাব্রা আর্টস জানি। আর আমার থাব্রানোর স্টাইল এতই কড়া যে কেও একবার খেলে দ্বিতীয় বার আর উঠে দাড়াতে চায় না। বুঝলেন। আর এমনিও আমি এক চিৎকার দিলে না পুরো বাড়ি মাথায় উঠিয়ে নিতে পারবো মনে রাখবেন কিন্তু! তাই আমার সাথে উল্টা পাল্টা কিছু চিন্তাও করবেন না। বলে দিচ্ছি। ঘুমান”আমার কথা শেষ হতেই ফিরে দেখি সে তো ঘুম। না জানি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার কথাগুলো কি সে শুনেছে? নাকি এভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে?

এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি শুয়ে পড়লাম। ঘুম এসে গেলো চোখে। ঘুম ভাংগলো রাফসানের চিৎকারে। আমি লাফ দিয়ে উঠে দেখি সে তার নাকে হাত দিয়ে রেখেছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল “মার্শাল আরটস শিখলাম আমি আর কাজ করতেসো তুমি। অসহ্য।” আমি অবাক হয়ে বললাম “আমি কি আপনাকেও ঘুষি মেরেছি?” সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “না না। ঘুশি মারোনি আদর করেছো। দেখ এখনি ব্লাড বের হয়ে আসছে।” আমি বিছানা থেকে নেমেই তার দিকে এগিয়ে গেলাম। আসলে ছোটবেলার বদ অভ্যাস, যার সাথেই ঘুমাই তাকেই আমি ঘুশি আর লাথি মেরে আধমরা করে দেই। অবশ্য প্রথম প্রথম ই হয় এমন।

এক বিছানায় একবার সেট হয়ে গেলে আর কোনো সমস্যা হয় না। এখন বেচারা আমার বর টার জন্যে খুব খারাপ লাগছে আমার। তার নাক থেকে সত্যি রক্ত বেরিয়ে আসছে। আমি সব সময় নিজের রুমে ফাস্ট এইড বক্স রাখতাম কিন্তু এইখানে তো এখন ও ওইসব ব্যবস্থা নেই। তাই নিজের মেক আপের পাফ দিয়েই তার নাকের রক্ত চেপে ধরলাম।” আপনি কি শেভ করেন?” আমার এই প্রশ্ন শুনে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কি শেভ করব?” আমি বললাম “আরেহ বাবা। আপনি কি আপনার এই দাড়ি গুলো শেভ করেন না?” সে আমাকে বলল “আমার নাক দিয়ে রক্ত পরতেসে আর তোমার শেভিং এর চিন্তা ঘুরতেসে মাথায়? কেমন মেয়ে তুমি?” আমি তাকে এক ধাক্কায় বিছানায় ফেলে দিলাম। আর বললাম “এইভাবেই সোজা হয়ে শুয়ে থাকবেন।

হিলবেন না। নড়াচড়া করলেই খবর আছে কিন্তু।” এই বলে আমি টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। তার আফটার শেভ লোশন টা নিয়ে আসলাম। তারপর তার কেটে যাওয়া নাকের উপর আমার মেকাপের পাফ দিয়ে আফটার শেভ টা লাগিয়ে দিলাম। এরই মাঝে কখন যে আমি তার এতটা কাছে এসে পড়েছি তা আমি খেয়ালই করলাম না। কিছুক্ষন পর রাফসান আমাকে একটু ঠেলে দিয়ে বলল “রাফিয়া একটু দুরে সরবে?

আমারভনা তোমাকে খুব ভয় করছে।” আমি তার কথায় এক লাফ দিয়ে সেখান থেকে উঠে পড়লাম। আমি একটু দুরে সরতেই সে আমাকে বলল “ঘুমিয়ে পরো। কাল সকালে তোমার অনেক ঝামেলা হবে আর পারলে ৭টার আগেই রেডি হয়ে যেয়ো। নাহলে অনেক কথা শুনতে হতে পারে।” এই বুএ সে শুয়ে পড়ল। আমিও তার কথা মত সকাল ৭টার এলার্ম দিয়ে ঘুমালাম। কিন্তু সকাল হওয়ার আগেই ঘুম ভেংগে গেলো আমার।

উঠে আমি ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেলাম। ঠিক ৭টা বাজতেই আমাদের রুমের গেইট টা কেও নোক করল। আমি তাড়াহুরা করে দরজা খুললাম। খুলে দেখি আমার বড় ফুপু শ্বাশুরি দাড়িয়ে আছে বাইরে। আমাকে রেডি দেখে তার চোখ মুখ কেমন যেন অন্ধকার দেখতে লাগল। মনে হলো যেনো তার কথা বলার প্রথম সুযোগ টাই কেউ তার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে একটা নম্র হাসি দিলাম যেন এই নিস্তব্ধ যুদ্ধটা আমিই জয় করেছি। আমাকে সে বলল “বাইরে এসে পড় জলদি। আজ অনেক জরুরী কাজ আছে।” আমি তার কথা মত তার পিছনে পিছনে ছুটে চললাম। সে আমাকে প্রথমেই বাড়ির সব বড়দের সাথে দেখা করালো। সবাই সালাম দুয়া দিতে দিতেই আমি কাহিল হয়ে গেলাম। কিছুক্ষন পর আমাদের নাস্তায় ডাকা হলো।

কিন্তু রাফসান তখন ও ঘুম। আর স্বামী কে ছেড়ে বিয়ের প্রথম দিন কি আর নতুন বউ একা খেতে পারবে? এইসব বলে তারা আমাকে সাইডে বসিয়ে রাখল। আর রাফসানের তো কোনো খবর ই নাই। আমি খিদা নিয়ে বসে রইলাম। সে আসল বেলা ১১টায়। আমি ততক্ষনে খিদায় আধমরা হতে গেছি। সে এসেই কারো কোনো খবর না নিয়ে খেতে বসে গেলো। তখন আমার খালা শ্বাশুরি পিছন থেকে তার কান ধরে বলল “আগে বড়দের সালাম করতে হয়, তারপর মা-বাবার খবর নিতে হয় এরপর বউয়ের খবর নিতে হয় তারপর খেতে বসতে হয়। এই মেনার্স গুলা কি ভুলে গেলে চলবে?” সে তার চোখ গুলো বড় বড় করে উপরের দিকে তাকালো।

এরই মধ্যে আমার শ্বাশুরি আমাকে ডেকে খেতে বসালো। এতক্ষন এ আমার ক্ষিদা ও মরে গেছে। আমি অল্প চা খেয়েই উঠে পড়লাম। কিছুই বললাম না। রাফসান তার নাস্তা শেষ করে মোবাইল হাতে চলে গেলো রুমে। এর কিছুক্ষন পর আমার বাসার থেকে ভাইয়া আর ভাবিরা আসল। তাদের দেখে আমার কি যে শান্তি লাগছিলো বুঝে বলতে পারবনা। তারাও বিকাল হতে হতে চলে গেলো। আমি আবারোও একা হয়ে গেলাম। খুব কষ্ট লাগছিলো। আমি আমাদের রুমে এসে দেখি রাফসান বসে বসে মোবাইলে গেইম খেলছে। তাকে দেখে রাগে আমার চোখ টা আবারো লাল হয়ে গেলো। আমি আমার জানালার পাশে রাখা সোফায় শুতে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে আমার নিজের রুম আর বাসার কথা মনে পরতে থাকল। আমার খাওয়া- দাওয়ার তো আর এমন বাধা ছিলো না। আমাকে আম্মু কখনোই না খেয়ে ঘুমাতে দেইনি।

আর আজকে এই রাফসানের জন্যে সকাল থেকে প্রায় না খাওয়া অবস্থাতেই আছি আমি। আমি এইসব ভাবতে ভাবতে কেদে ফেললাম। আমার কান্নার শব্দে রাফসান উঠে আসল আমার কাছে।” কি হয়েছে? কাদছো কেন? কেও কিছু বলেছে”আমি তার কথা উত্তর না দিয়ে কান্না মুছে চুপ করে রইলাম। তারপর আবারও সে আমার মাথায় হাত রেখে বলল “কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?” আমি এইবার রাগে টগবগ করে উঠলাম। সে আমার উঠা দেখে ভয় পেয়ে গেলো। একটু পিছনে সড়ে আসল। আমি বললাম “কোনো সমস্যা নেই। সারারাত স্বামীর নাক কাটার ভয়ে না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম, সকাল ৭টা থেকে খাওয়ার রুমে পাপেট এর মত বসে রইলাম।

জামাই না আসলে খাওয়া দিবে না! কেন? বউ কি মানুষ না? ক্ষিদা কি বউ এর লাগে না? জামাই উঠবে ১০টায় খাবে ১১টায় এর মাঝে বউ এর ক্ষিদায় বেহাল অবস্থা তার মধ্যে খিদা তো মরেই গেছে। এরপর দুপুর বেলা জামাইএর মন চাইনি তাই সে খায়নি। বউয়ের বাসা থেকে আসা মেহমানদের খাওয়া দেয়া হলো কিন্তু বউ যে খায়নি এই খবর নেয়ার মত টাইম কারোও নেই। ভালো ভালো। জামাই ছাড়া বউ রা নাকি খায়না। এইটা কেমন রুলস? এত্ত বড় হয়ে গেলাম আজ ও পর্যন্ত এমন রুলস কোথাও দেখিনি। অতিরিক্ত বারাবারি। অসহ্য লাগছে আমার খিদার জ্বালায়।” আমি ননস্টোপ এতক্ষন বক বক করে গেলাম। আর রাফসান চুপ করে আমার সব কথা শুনলো। তারপর সে তার রুম থেকে চুপ করে বেরিয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে আমি যা বলেছি তা কি ঠিক ছিলো কি না।

বেশি বারাবারি তো করে ফেলিনি? এইটা ভাবতে ভাবতে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে রইলাম। কিছুক্ষন পর আমার রুমের দরজা কে যেন লোক করে দিলো। আমি এই শব্দে উঠে বসলাম। দেখি রাফসান আসছে। হাতে কিছু পেকেট নিয়ে। সে আমার দিকে সেই পেকেট গুলো বারিয়ে দিয়ে বলল “এই নাও কিছু কিনে নিয়ে আসছি। খেয়ে নাও। রাত ১১টার আগে এই বাসায় খাওয়া পাবে না।” আমি তার কথা পেকেটগুলো খুললাম। দেখি ভিতরে বার্গার, চকলেট কেক আর একটা ড্রিংক্স আছে। আমি তো খুশিতে নাজেহাল। আমি পেট ভরে খাওয়া দাওয়া করলাম। এর কিছুক্ষন পর আমার ননদেরা এসে আমাকে বাইরে নিয়ে গেলো।

এইভাবে রাত ১২:৩০টা বেজে গেলো। কারো ডাকার আগেই রাফসান খাওয়ার টেবিলে এসে বসল। সবাই মিলে রাতের খাওয়া খেলো। সাথে আমিও। রাতে ঘুমানোর আগে রাফসান বলল “কাল সকালে যখন তুমি উঠবে আমাকেও ডেকে নিও। আমাকে কেও না ডাক দিলে আমি উঠতে পারিনা। বদ অভ্যাস। আর আজকের জন্যে সরি।” জানি না কেনো তার এইটুকু কথাতেই আমার বিশ্বাস হয়ে গেলো যে আসলেই সে আমার জন্যে পারফেক্ট মেচ। আর এতটা ঘৃণার মাঝেও তার এইটুকু খেয়াল রাখা আমার মন টা কে প্রথমবারের মত জয় করে নিলো।


পর্ব ৩

পরেরদিন থেকে রাফসানের ব্যবহার আমার সাথে একটু নরম নরম ছিলো। যা আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম। সে আমার জন্যে সকালেই উঠে আসল নাস্তা করতে। দুপুরে মন না চাইতেও সে আমাদের সাথে বসে লাঞ্চ করল। এরপর আমাকে নিয়ে বাসার মেয়েরা পার্লারে চলে গেলো। আমাদের বৌ ভাতের অনুষ্ঠান হলো। যখন আমি পার্লার থেকে সেন্টারে এন্ট্রি করলাম আমার দিকে রাফসান এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো যে আমার ই লজ্জা করছিল।

এক রাতে কি এমন পাল্টে গেলো যে তার চোখে আমার জন্যে সে ঘৃণা এখন আর নেই যা সেদিন রাতে আমার চোখেও ছিলো।

আমি আবার আমার বাসায় আসছি। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “দেখো আমি কিন্তু আজ সোফায় ঘুমাবো। ঘুষি খাওয়ার ইচ্ছা আমার নাই।” আমি তাকে বললাম “আমার এই বিছানায় অভ্যাস আছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।” তবুও সে নিজের থেকে কত গুলো কুশোন নিয়ে আমাদের দুজনের মাঝখানে একটা বর্ডার বানালো। যেমন লাগছে আমি পাকিস্তানি আর্মি আর সে আমার সামনে এক অবলা বাজ্ঞালি নারী। আমি তাকে এভোইড করে ঘুমাতে চলে গেলাম। কিছুক্ষন পর সে বলল “আচ্ছা তুমি বিয়েতে রাজি হয়েছিলে কেন?” আমি তার বীপরিত দিকে মুখ ফিরিয়ে বললাম “তুমি যে কারনে হয়েছিলে সে কারনে আমিও রাজি হয়েছিলাম।”

সে অনেক্ষন চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করলো।” আচ্ছা বল না! রাজি কেন হয়েছিলে?” আমি এইবার চটে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম “আমি রাজি হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাকে তো জিজ্ঞেস ই করা হয়নি। রাজি হওয়া না হওয়া তো পরের কথা। এখন খুশি?” সে মাথা নীচু করে বলল “সত্যি কি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি বিয়ের কথা?” আমি বললাম “নাহ। আমাদের বাসায় মেয়েদের কে জিজ্ঞেস করা হয় না। আর এমনিও আমি তো আর একমাত্র মেয়ে না যার বিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হচ্ছে। সব মেয়েদের সাথেই এমন হয় নতুন কিছু না। বাদ দাও এখন ঘুমাও।”

সে কিছুক্ষন চুপ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। আমি তার হাসি দেখে জিজ্ঞেস করলাম”কি হয়েছে? এমন করে হাসছ কেন?” সে বলল “তুমি আমাকে তুমি করে বলছো।” আমার তার কথা টা শুনে একটু লজ্জা লাগ্লো। আমি শুয়ে পরলাম। পরেরদিন সকালে জানতে পারলাম আমার ছোটবোনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে রাফসানের ভাইয়ের। কথা টা আমার একটু ও ভালো লাগল না। আমার সাথে, বড় ভাইয়ার সাথে যা হয়েছে তা আবার আমাদের বোনের সাথেও হবে? আমি রেগে গেলাম। রেগে চলে গেলাম রুমে। আমাকে দেখে পিছন পিছন রাফসান দৌড়ে আসল। এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে? তুমি কি বিয়েতে রাজি না?

“আমি বললাম “মেয়েদের এইসব বেপারে কথা বলার অধিকার নেই। থাকলে হয়ত আমাদের বিয়েটাও হত না। আর এই নতুন করে আরো একটা মেয়ের স্বপ্নকেও আমি ভাংগতে দিতাম না।” আমার কথা শুনে রাফসান আমার দিকে এগিয়ে আসল “তোমার কি স্বপ্ন ছিলো রাফি?” আমি বললাম “তা তোমার জানার প্রয়োজন নেই। এমনিও আমাদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ও নেই যার দোহাই দিয়ে সব কথা তোমার সাথে শেয়ার করব।

“এই বলে আমি বিছানা থেকে উঠতেই নিলাম সে আমার হাত ধরে ফেলল। ধরে বলল “স্বামি- স্ত্রী না হোক কিন্তু আমরা বন্ধু তো হতেই পারি। বিশ্বাস কর তোমার বন্ধুত্বই আমার জন্যে যথেস্ট।” আমি তার কথাতে অবাক হলাম। তার বারিয়ে দেয়া হাত ধরে তার বন্ধু হয়ে গেলাম।
আমাদের মাঝে আস্তে আস্তে একটা সম্পর্ক তৈরি হতে লাগল। একই বাসায় থাকতাম। একসাথে খেতে বসতাম। মাঝে মধ্যে ঘুরতে বের হতাম আর আমাদের যেই একসাথে দেখত, বলত আমাদের জুটি নাকি খুবই সুন্দর। আমি মনে মনে খুবই খুশি হতাম কিন্তু উপরে উপরে তাকে দেখাতাম যে আমার এইসব কথায় কিছুই আসে যায় না। কিন্তু তার চেহারা দেখে বুঝতে পারতাম সে আমাকে কত টুকু ভালোবাসে।

একদিন রাতে আমরা যখন ঘুমাতে গেলাম আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা আমার সাথে কি জন্যে বিয়ে তে রাজি হয়েছিলে? তোমাকে তো নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো? তাই না?” সে মুচকে হেসে বলল “আমি এমন কিছু বলব যা তোমার বিশ্বাস হবে না। তাই এই রাতের বেলা এইসব কথা না বলে চলো ঘুমিয়ে পরি। সময় হলে ঠিকই সব জানতে পারবে।” আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে হেসে দিয়ে শুয়ে পড়ল।

কি যেন এক জাদু কাজ করছিলো ২জনের মধ্যে। আমরা ২জন আস্তে আস্তে বন্ধু হতে লাগলাম। একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সে আমাকে বলল “শুনো রাফি। তোমার জন্যে একটা গিফট আছে।” আমি খুশিতে দৌড়ে তার সামনে গেলাম। সে তার হাত সামনে এনে বলল “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে রাফি”এই বলে সে একটা মোবাইল ফোন বের করে আমার হাতে দিলো।

আমার তখন চোখ বেয়ে পানি পরে গেলো। সে এই কান্না দেখে আমাকে জোড়িয়ে ধরে বলল “পাগল আমিতো ভেবেছিলাম তুমি খুশিতে একটা হাসি দিবে। আর এইখানে তো তুমি কেদেই ফেললে।” আমি বললাম “কেও কখনই আমাকে এত বড় গিফট দেয়নি তাই আর কি! “সে আমাকে সামনে বসিয়ে বলল “শুনো রাফি তোমার বাসায় তোমার সাথে যাই হয়েছে যেমন ই হয়েছে সবই আমি জানি। আমাকে জানানো হয়েছে। আর বলা ও হয়েছে যে এমন ই তো হয় সব মেয়েদের সাথে।

কিন্তু আমি তোমাকে প্রমিস করছি আমি তোমাকে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখে রাখতে চাই।” তার এই কথায় আমার তার প্রতি বিশ্বাস টা আস্তে আস্তে ভালোবাসায় পরিনিত হচ্ছিলো। আমি তাকে বললাম “তাহলে আমি আজকে তোমাকে কি গিফট দিবো?” সে মাথা নীচু করে বলল “বেশি কিছু না। ভালোবাসা দিলেই হবে।” আমি এইবার সত্যি সত্যি লজ্জা পেয়ে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে পরলাম।
কিন্তু তার এই দুস্টামি ইতরামি ভালোবাসা থেকে নিজেকে বাচাতে পারলাম না সেই রাতে আমি। আমরা দুজন সত্যিকারের ভালোবাসার বন্ধনে নিজেকে বেধে ফেললাম। আমরা ২জন আসলেই কিভাবে এতটা কাছে এসে পরলাম বুঝতেই পারলাম না।

পরেরদিন সকালে আমার আম্মুর ফোন আসল। ফোন রিসিভ করে জানতে পারলাম আমার ছোটবোন যার সাথে রাফসানের ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে সে অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেছে। আমি এই কথা শুনেই ফ্রিজ হয়ে গেলাম। মায়ের কান্নার শব্দে বাকি কথাগুলো বুঝতেই পারছিলাম না। শুধু এই টুকুই বুঝতে পারছিলাম শেষ সব শেষ।


পর্ব ৪

হঠাৎ করে মনির খবর পেয়ে বেরিয়ে গেলাম আমি। হতভম্ব আমি কাউকে না জানিয়েই চলে গেলাম হস্পিটালে। সেখানে গিয়ে দেখি পুলিশ নিয়ে বাবার সাথে হস্পিটালের এক কর্মকর্তার ঝামেলা বেধেছে। আমি দৌড়ে গিয়ে সেখানে জিজ্ঞেস করলাম “কি হয়েছে? সমস্যা কি?” ওই লোক টা আমাকে বলল আগে পুলিশ কেস হবে তারপরই মনি চিকিৎসা শুরু করতে পারবে তারা। আর বেশি দেরি করলে হয়ত মনিকে হারাতেও হতে পারে। আমি তাদের বললাম “আপনারা কাজ শুরু করেন আর পুলিশের কাগজ আমি পুরণ করে দিচ্ছি।” এই বলে আমি পুলিশের ফর্ম পুরণ করতে বসলাম।

সাসপেক্টের নাম লিখার ঘরে এসে আমি অনেক্ষন চুপ করে বসে রইলাম। এরপর মায়ের কাছে যেয়ে প্রশ্ন করলাম “মা কারোর উপর সন্দেহ আছে? কার জন্যে মনি এই কাজ করবে? কিছু বলতে পারো?” আমার প্রশ্নে মা আমার দিকে হা করে অনেক্ষন তাকিয়ে রইলো। তারপর বাবা বলে উঠল “রাতুলের নাম লিখ। ওই হারামিটার কারণেই আজ আমার মেয়ের এই অবস্থা।” আমি বাবার কথায় চমকে গেলাম। রাতুল? রাফসানের ছোট ভাইয়ের নামই রাতুল। যার সাথে আমার বিয়ের পর মনির বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু রাতুল এমন কি করেছে যে বাবা এমন করে বলছে?

আমি বাবাকে বললাম “বাবা বুঝে শুনে কথা বল রাতুল কি করেছে এমন যে তুমি ওকে দোষ দিচ্ছো? কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?” এই কথা শুনে মা জোরে জোরে কাদতে শুরু করল। বলল “আমি সাক্ষি। শেষ রাতে রাতুলের সাথেই নিচের বারান্দায় দেখা করতে গিয়েছিলো মনি। সেখানে তাদের কি নিয়ে ঝগরা বাধে আমি জানি না। কিন্তু মনিকে ঘরে না পেয়ে যখন আমি তাকে খুজতে বের হই তখন দেখি সে আর রাতুল বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। মনি হাত জোর করে মিনতি করছিলো রাতুলের কাছে। কি নিয়ে মিনতি করছিল জানি না। শুধু শুনতে পারলাম রাতুল বলল তোমার মত মেয়েদের মরে যাওয়াই ভালো। এই বলে সে বেরিয়ে গেলো। আমিয়ার মনির সামনে যায়নি তখন। ভাবলাম সকাল হলেই কথা বলব। কিন্তু কথা বলার আগেই তো।” এই বলে মা আরো জোরে জোরে কাদতে লাগল। আমার মনের ভিতরে কেমন যেন একটা ভয় কাজ করতে লাগল। বাবা আমার হাত থেকে কাগজ টা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

এইদিকে মনিকে অপারেশন রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যানি না ভিতরে কি চলছে। অস্ত্রপ্রচার তো হওয়ার কথা না। তাহলে কি হচ্ছে ভিতরে? খুব ভয় করতে লাগলো মনে। হঠাৎ এক নার্স এসে বলল “patient is now out of danger। বাট তার বেবি নষ্ট হয়ে গেছে।”

আমি আর আমার মা যেন আকাশ থেকে পরলাম। বেবি? কার বেবি? কিসের কি।? নার্স বলল “এই ৪মাস চলছিলো উনার। আমরা বেবিকে সেভ করতে পারিনি। সরি”
আমি নিজেকে প্রশ্ন করছি যে এইটা কিভাবে সম্ভব? মনির তো বিয়ে ই হয়নি। তাহলে বাচ্চা?
এমন সময় এই কথা সহ্য করতে না পেরে আমার মা হার্ট স্ট্রোক করে বসলেন। মা কে নিয়ে ইমারজেন্সি তে এডমিট করা হলো। বাবা একেবারেই চুপ করে রইলেন। দুপুর ঘনিয়ে এলো।

বুকের ভয়টা এখন দ্বিগুনের চেয়েও বেশি বেড়ে গেলো। এরই মধ্যে রাফসানের ফোন আসল প্রায় ১০০বার। কিন্তু ধরার মত সাধ্য ছিল না আমার। আমি চুপ করে হস্পিটালের এক কোনায় বসে রইলাম। মনিকে আই, সি, ইউ তে রাখা হয়েছে। ১২ঘন্টা পর তাকে কেবিনে দেয়া হবে। মা ও আন্ডার অবজাভেশনে আছে। ডাক্টার বলেছেন মায়ের মাইনোর এট্যাক হয়েছে। চিন্তার এখন আর কারন নেই। দুপুর গড়াতেই রাফসান আসল হস্পিটালে।

তাকে দেখে জানি নাহ কেন আমার হাত পা কাপতে শুরু করল ভয়ে। আমি তাকে দেখেই সেখান থেকে যেতে নিলাম। কিন্তু সে আমাকে আটকিয়ে দিলো। সে আমার হাত ধরে আমাকে বলল “জানো রাতুলকে হাজতে নেয়া হয়েছে। আর মনির জ্ঞান আসার আগ পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে হবে।” আমি রাফসানের দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। সে আমাকে আবারো সেই ঘৃনাত্বক চোখে দেখছে। সে আমাকে বলল “যদি আমার ভাই দোষ করে থাকে তাহলে সবচেয়ে কড়া শাস্তির জন্যে আপিল আমি করব। কিন্তু যদি ও নির্দোষ থেকেও আজকে হাজতে গিয়ে থাকে তাহলে মনে রেখো সবচেয়ে বড় শাস্তি আমি তোমাকে দিবো।” আমি চোখ নামিয়ে বললাম “আমি আমার বোন কে আর মা কে হারাতে যাচ্ছি হয়ত তোমার ভাইয়ের জন্যে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে?”

রাফসান মুখ ভেংচিয়ে বলল “হয়ত ওই ২জন কে তোমার হারাতে হবে না। পেয়েই যাবে আবার। কিন্তু মনে রেখো আমার সাথে তোমার সম্পর্ক কে তুমি হারিয়ে ফেলবে। তোমার সাথে তোমার ফ্যামিলির সাথে আমার বা আমার ফ্যামিলির কোনো সম্পর্ক আর থাকবে না আজকের পর। কারন আমি জানি আমার ভাই কোনো অন্যায় করেনি। এইটাই আমার বিশ্বাস। আর হ্যা শুনো কেস যেহেতু করা শিখেই গিয়েছো তাহলে ডিভর্সের কাগজ টাও পাঠিয়ে দিও। নাহলে আমি তো আছি ই।”

আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এই সেই রাফসান যে কাল রাতেও আমাকে ভালোবাসার কসম দিচ্ছিলো? আমাদের সম্পর্ক কে পৃথিবীর সব থেকে মুল্যবান সম্পদ বলছিল? সবই মিথ্যে। তার ভাই আমার বোনের সাথে প্রতানণা করেছিলো। আর আজকে সে প্রমান করে দেলো সেও প্রতারক। আমি রাফাসানকে প্রশ্ন করলাম “তাহলে কি আমার বোন দোষি? সে দোষ করেছে? কি করেছে সে? তোমার ভাইকে হয়ত মন দিয়ে অনেকবেশি ভালোবেসে ফেলেছিলো। আর তোমার ভাই তাকে ব্যবহার করে ফেলে দিয়েছে।” “আমার ভাই এমন কিছুই করেনি।” বলে চিৎকার দিয়ে উঠল রাফসান। সে আমাকে বলল “চ্যালেঞ্জ করছি যে আমার চাই এমন কিছুই করেনি। তোমার বোন কার বাচ্চা পেটে নিয়েছিলো জিজ্ঞেস কর তাকে যাও।” এই বলে সে চলে গেলো সেখান থেকে।

আমি রাফসানের ব্যবহার দেখে অবাক হয়ে বসে রইলাম। এই কি সেই রাফসান? সে আমার বোন কে এইভাবে বলতে পারলো?
এমন সময় বাবা এসে বলল “রাফি মনির মোবাইলে দেখ একটা মেসেজ আসছিলো আজ ভোর ৭টায়। এই একটাই মেসেজ আছে ইনবক্সে। আউটবক্স তো পুরাই খালি। কল লিস্ট। ডায়াল লিস্ট সব ফাকা। মনি এইগুলা ঘুমের বড়ি খাওয়ার আগেই মনে হয় ডিলিট করে দিয়েছে। আর এই মেসেজ টা আসছে হয়ত বড়ি খাওয়ার পর। দেখতো।”
আমি মোবাইলটা হাতে নিলাম। মেসেজ ওপেন করে দেখি লিখা।

“আজকের ব্যপারটার জন্যে সরি মনি। আমি হঠাৎ বাচ্চার কথা শুনে নিজের কন্ট্রল হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরে বাসায় এসে মাথা ঠান্ডা করে যখন ভাবলাম তখন বুঝতে পারলাম আসলে তোমার তো এইখানে দোষ নেই। আমি তোমাকে এক্সেপ্ট করতে রাজি আছি। কারন আই লাভ ইউ।”
আমি মেসেজ পরে নাম্বার টা চেক করলাম। দেখি হ্যা। এইটা রাতুলের নাম্বার। এর মানে রাতুলের জন্যেই আমার বোনের আজ এই অবস্থা। আমি আমার ফোন দিয়ে রাফসান কে মেসেজ করলাম।
লিখলাম-

“তুমি আমাকে কি শাস্তি দিবে? আজ তোমাকে আমি দিলাম শাস্তি। ২দিনের মধ্যে তালাকের কাগজ তোমাকে পৌছে দিবো। কিন্তু তোমার ভাইকে আমি হাজত থেকে বের হতেই দিবনা। ভালো থেকো।”


পর্ব ৫

আমার আর রাফসানের মাঝে এক দেয়াল দাড়িয়ে গেলো। সব উল্টে পাল্টে গেলো। মনে হচ্ছিলো যেন আমার সব শেষ। আসলেই একটা বিবাহিত মেয়ের জীবনে তার স্বামীর থেকে মুল্যবান আর কিছুই থাকেনা। কিন্তু আমি হারাতে বসেছি আমার স্বামীকে। আমার সংসার আজ আমার বোনের জন্যে আমি ত্যাগ করতেও রাজি আছি। কারন সে তো আমার ই রক্ত।

১২ঘন্টা পর মনিকে কেবিনে দেয়া হলো। কিন্তু তার জ্ঞান তখন ও ফিরেনি। সে তখন ও বেহুশ ছিলো। আমি মনির কাছে আর ভাবি আমার মায়ের কাছে সারারাত কাটালো। সকালে আমি আর ভাবি বাসায় চলে গেলাম। বাবা আর ভাইয়া আসল বাকি সময় হস্পিটালে কাটাবে বলে। বাসায় গিয়ে আমি আমার রুমে ঢুকলাম। মনি সেইদিন রাতে এই রুমেই ঘুমিয়ে ছিলো। আমি বিছানায় শুয়ে চুপিচুপি কাদতে লাগলাম। এত কষ্ট আমার এর আগে কখনই হয়নি। নিজের রক্তের এক অংশকে হস্পিটালের বেডে মরতে ছেরে আসছি।
এই কথা ভাবতে ভাবতেই আমি শুয়ে পরলাম। ঘুম ভাংগলো আমার সন্ধার আজানের শব্দে। আমি এতখন ঘুমিয়ে ছিলাম বিশ্বাস ই হচ্ছিলো না। পাশে রাখা ফোন টা হাতে নিলাম। লক খুলতেই রাফসান আর আমার বিয়ের একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠল। বুকের ভিতর টা মোচর দিয়ে উঠল। আমি সাথে সাথে ফোন টা আবার লক করে হস্পিটালের জন্যে বেরিয়ে গেলাম।

সেখানে দেখি রাফসানের বাবা আর মা। আমি তাদের দেখে সালাম করলাম। আব্বা তো আমাকে দেখেই মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেলেন। আর আম্মা আমার সালামের উত্তর না নিয়ে প্রশ্ন করলেন “রাফসানের এইখানে কি দোষ ছিলো আমি জানি না। মানলাম রাতুল আর মনির মধ্যে গেঞ্জাম চলে, চলুক। মনি সুস্থ হইলেই বিয়ের কথা চালাইতাম সব ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু প্রথমে রাতুল কে হাজতে দিয়া ভুল করল তোমার বাবা এখন রাফসান কে তালাকের কথা বইলা ভুল করলা তুমি।”
আমি আম্মার কথায় তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম “আপনার মেয়ের এই অবস্থা হলে আপনি একই কথা বলতেন?” আমার শ্বাশুরি হেসে বলল “আমার ছেলের এর চেয়ে খারাপ অবস্থা হয়ে আছে। তোমার বোনের জন্যে কোনো দোষ ছাড়াই বেচারা জেলে। তবুও আরেক ছেলের খুশির দিকে তাকিয়ে তোমার কাছে আসছি। এরপরেও তোমার এমন কথা থাকে?”

আমি বললাম “আম্মা আমি জানি না রাতুল আপনাদের কি বলেছে? কিন্তু আমার কাছে যথেস্ট প্রমান আছে ওর বিরুদ্ধে।” আম্মা আমাকে বলল “যদি অন্য কারোও আত্মহত্যার জন্যে তার আত্মহত্যার জন্যে দায়ী ব্যক্তি শাস্তি ভোগ করবে তাহলে রাফিয়া রাফসানের আত্মহত্যার জন্যেও মনে রেখো আমি তোমাকে ছাড়ব না।”
আমি আম্মার কথায় বিস্মিত হয়ে বললাম “রাফসানের আত্মহত্যা মানে?”

“যখন নিজের জীবন থেকেও বেশি আমরা অন্য কাউকে ভালোবাসি তখন তাকে হারানোর পর এইভাবে ই আমাদের মৃত্যু হয়ে যায়। যাক ওইসব কথা বাদ দাও এখন। শুধু একটা কথা বলি। তুমি কোনদিনও যে রাফসানকে ভালোবাসনি আজ তারই প্রমান দিয়েছো। ভালো থেকো”এই বলে আম্মা বেরিয়ে গেলেন।
আমি কেবিনের ভিতরে। ঢুকলাম। দেখি বাবা বসে আছে জানালার পাশে। আমাকে দেখে বাবার চেহারায় যেন অন্ধকার নেমে এল। বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি পাশে যেতেই বাবা বললেন “আমি আসলেই ভুল করেছি। ছোট মেয়ের জন্যে ন্যায় করতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছি যে বড় মেয়ের জীবন টা আসলে কার সাথে জোড়া দেয়া। মনি তো এমনিও আমাদের নাক ডুবিয়েছে। এরই মধ্যে আমরা তোর সাজানো সংসার টাকে নষ্ট করে দিচ্ছি। না এইটা আর হবে না। যা তুই তোর বাড়ি চলে যা”বাবা একজন হেরে যাওয়া সৈনিকের মত কথা বলছে।

আমি কিছু না বলেই বেরিয়ে এলাম রুম থেকে। আমার মায়ের কেবিনের দিকে আগালাম। তার কষ্ট টাও হয়তো আমি বুঝব না। আমার পরিবারের উপর দিয়ে যা যাচ্ছে তা কেও ই বুঝতে পারবে না। রাফসান ও না। তাহলে কেনোই বা আমি তার কাছে ফিরে যাবো? সে তো আমার কাছে ফিরে আসেনি। একবার চিন্তাও করলো না যে আমার কি হবে?
আমি এইসব ই ভাবছিলাম এমন সময় বাবা দৌড়ে এসে বলল “রাফিয়া মা মনির জ্ঞান ফিরে আসছে।” বাবার কথায় আমি এক দৌড়ে পৌছে গেলাম মনির কেবিনে।

মনি তার চোখ খুলেছে। আমাকে দেখে সে হাউ মাউ করে কাদতে শুরু করল। আমি তাকে জোড়িয়ে ধরলাম। ধরে বললাম “কেন করলি তুই এই কাজ টা? আমাকে বলতে পারতি। তোর ভুলগুলো কি আমাদের কাছে তোর থেকে বড়?” সে বলল “বুবু আমি তো ভুল করিনি। আমি পাপ করেছি। তাই তো নিজেকে শাস্তি দিতে চাচ্ছিলাম। তোমরা আমাকে কেনো বাচাইলা?”
আমি তাকে বললাম “এক চড় দিয়ে দাত ফেলে দিবো যদি আরেকবার এইগুলা বলিস। দোষ কি তোর একার? সে ছেলে কি দুধে ধোয়া তুলসি পাতা? তাকেও তো শাস্তি ভোগ করতে হবে।”

মনি তার চোখ গুলো বন্ধ করে আরোও জোড়ে কাদতে লাগল। তারপর নিজের চোখ খুলে বলল “সে যদি আজ এই পৃথিবী তে বেচে থাকত তাহলে হয়ত আমাকে আজ এইদিন দেখতে হত না।” আমি তার কথায় বসে পরলাম।” মানে কি? এই বাচ্চা কার? তোর পেটে যে সন্তান ছিলো সেইটা রাতুলের না?” আমি তাকে প্রশ্ন করলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল “এইসব তুমি কি বলছো বুবু? রাতুল? ছি ছি ছি। সে তো কখনই আমাকে এমন খারাপ উদ্দেশ্য করে কোনো কথাও বলেনি। ভাগ্য তো আমার খারাপ যার এম্মন সময় দুর্ঘটনা ঘটলো যে না পারি সইতে না পারি কিছু কইতে।”

আমার মনির কথায় সারা শরীর ঠান্ডা পরে গেলো। আমি ঝিম খেয়ে বসে রইলাম। বাবাও মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল মাটিতে।
২ঘন্টা পর পুলিশ আসল। সাথে রাফসান ও। মনি তার পুরো ঘটনা সংক্ষেপে বলল। যার সারমর্ম ছিলো কিছুটা এইরুপ “মনি আমাদের পাশের বাসার মালিকের ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো। যা রাতুল ও জানত। ওই ছেলের নাম নওশাদ।

সে একজন বাইক রেসার ও ছিলো বটে তাদের সম্পর্কের।গভিরতা এত বেরে যায় যে তারা এই ভুল টা করে ফেলে। কিন্তু গত সপ্তাহেই নওশাদ একটা বাইক এক্সিডেন্ট এ মারা যায়। তার মৃত্যুর শোক থেকে বের হওয়ার সময়ই মনি জানতে পারে সে গর্ভবতি। এই ঘটনা সেদিন রাতে সে রাতুলকে জানায়। কিন্তু রাতুল হঠাৎ আচমকা এমন খবর শুনে বন্ধু হিসেবে মনি কে খুব বকাবকি করে। কিন্তু মনি নিজেই এত শোকে বিভর ছিল যে সে এইগুলা সহ্য করতে পারেনা। ফলে সে সুসাইড করে।”

পুলিশ মনির সব বক্তব্য নিয়ে বেরিয়ে পরে রাতুলের বেইল দিতে।

আমি আর বাবা তখন মনির পাশে দাড়িয়ে আছি। রাফসান মনির মাথায় হাত দিয়ে বলল “এই ভুল টা আর কোনদিনও কর না। ভুলে যেয়োনা যে তোমার জীবনের সাথে জোরিয়ে আছে আরোও কয়কটা মানুষের জীবন যারা তোমাকে নিজেদের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসে। বুঝলে পাগলি? ভালো থেকো আমি আসি।” এই বলে সে বেরিয়ে গেলো। একবারের জন্যেও সে আমার দিকে তাকালো না। আমিও তার চোখে তাকায়নি। পারছিলাম না। কারণ নিজের চোখেই নিজে আমি পরে গেছি।

নিজের উপর এত্ত ঘেন্না হচ্ছিলো যে বলে বুঝাতে পারবো না।

মনি আমাদের ঘটনা শুনে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো। বাবা বলল “আমি আজ ই গিয়ে ওই পরিবারের কাছে মাফ চেয়ে আসবো। আর তোর সংসার ও বাচিয়ে দিবো মা।” তাদের কথা শুনে আমার নিজেকেও দোষী মনে হতে লাগল।

সে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষন পর আমার মোবাইলে তার মেসেজ আসল।

*তালাকের কাগজ টা না হয় আর কয়েক সপ্তাহ পরই পাঠাব। কারণ কিছুদিন ধরেই দুই পরিবারের উপর অনেক কিছু গিয়েছে। তাদের অবস্থা স্বাভাবিক হতেই কাগজ পেয়ে যাবে তুমি। কারন তোমাকে এই মিথ্যা সম্পর্কে বেধে রাখার অধিকার আর আমার নেই।

  • সব সময় এমন গোমড়া মুখ করে থাকো কেন?
  • ওর এমন হইছে আমার জন্য আম্মু।
  • আরে পাগলী মেয়ে ও তো ঠিক আছে।
  • হুম।
  • তো এখন ও কান্না করিস কেন? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আর যদি কাদিস তো তোকে তোর বাবার বাসায় পাঠাবো।
  • না ঠিক আছে আর কাদবো না।
  • হুম।
    এখন আমি অনেকটা সুস্থ। এখন অফিসে যেতে পারি। তবে এখন সেই আগের মতো হাসিটা আর দেখতে পারি না। কেন জানিনা অদ্রিতা অনেক শান্ত হয়ে গেছে। এমন আমার একদম ভালো লাগছে না। আজ অফিস শেষে বাসা গিয়ে এর একটা দফারফা করতেই হবে।
    অফিস শেষে বাসায় আসলাম।
  • আম্মু আব্বু অদ্রিতা (চিৎকার করে সবাই কে ডাকলাম)
    (সবাই আসলো)
  • কি হইছে? (আম্মু)
  • তোমার সমস্যা কি? (অদ্রিতা কে বললাম)
  • (হয়তো ভয় পেয়েছে) কই আমার তো কোনল সমস্যা নাই।
  • শোনো এমন করে চলতে থাকলে আমি কিন্তু তোমায় টলারেট করতে পারবো না?
  • মানে?
  • মানে কিছু না এমন করে চলতে থাকলে আমি তোমায় তোমার বাবার বাসায় পাঠাবো।
  • আমি কি করছি (কান্না করে)
  • কি বলছিস এসব (আব্বু অনেক টা অবাক হয়ে)
  • আমার দোষ কি? (কান্না করেই যাচ্ছে)
  • ঠাসসসসসসসসসসসস (খুব জোড়ে অদ্রিতার গালে একটা থাপ্পড় দিলাম)
  • সুমন এটা তুই কি করলি? তুই ওকে মারলি কেন?
  • কি করবো আম্মু? কি করবো আমি? এই মেয়েটা কি এমন ছিলো? তাহলে এখন এমন হলো কেন? ঠিক ভাবে কথা বলে না, হাসে না মিথ্যে বলে আমায় আর ফাসায় না। আমার যে এসব আর একদম ভালো লাগে না। আমি যে অফিসে গিয়ে শান্তিতে কাজ করতে পারি না, কোথায় যেন শূন্যতা লাগে।
    (কেউ কোনো কথা বলছে না। আমি আবার শুরু করলাম)
  • তুমি নিজে হাসবে না ভালো কথা। কিন্তু ও কি জানে ওর হাসির সাথে সাথে বাসার সবাই হাসতে ভুলে যাচ্ছে? বাসাটা একটা মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে।
    (এবার কেন জানি আম্মু ও কান্না করছে)
  • আম্মু তুমি ওকে বলে দাও ও যদি এ বাসায় থাকতে না চায় তবে যেন চলে যায়। তবুও এমন করে এ বাসায় থাকা যাবে না। আমার এমন বউ চাই না। আমার সেই দজ্জাল বউ চাই। আর আমি গিয়ে দরজা লক করে ঘুমাবো কেউ যদি দরজা নক করে তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।
  • তাহলে অদ্রিতা কোথায় থাকবে?
  • আমি জানি না। বললাম না আমার এমন বউ দরকার নেই।
    কথা গুলো বলে এসে দরজা লক করে শুইলাম। কিন্তু ঘুম তো আসে না। মাঝ রাতে উঠে দরজা খুলে দিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ও আসলো না। হয়তো আম্মুর সাথে শুইছে। কখন জানি আমিও ঘুমাই গেছি।

পর্ব ৬

রাফসানের মেসেজের রিপ্লাই অবশ্য সেদিন আমি করিনি। কারণ আমি নিজের চোখেই নিজে এতো পরিমানে নীচু হয়ে গিয়েছিলাম যে বলার বাইরে। সে তার কথা মতই যদি কাজ টা করে ফেলে তখন আমার কি হবে? ভাবতেই আমি শিউরে উঠি। আমার মত পাগল মেয়ের যে কি হবে সেটা আল্লাহ ছাড়া হয়ত আর কেও জানে না।

মনি সুস্থ্য হয়ে আসল। আমার মা কেও ডাক্টার খুব জলদি রিলিজ দিয়ে দিলেন। আমরা বাসায় এসে পড়লাম। ৩দিন পার হয়ে গেলো। কিন্তু আমার অপেক্ষার প্রহর আমি গুনতে থাকলাম। নাহ রাফসানের কাছে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা না। রাফসানের পক্ষ থেকে কাগজ টা আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কি পাগল মেয়ে আমি তাই না? ১সপ্তাহ পার হয়ে গেলো। বাসায় সবার ই আমাকে নিয়ে টেনশন বারতে লাগল। বাবা প্রতিদিন বাসায় ফিরেই জিজ্ঞেস করত “কোনো খবর কি হলো?” আর প্রতিটা কলিং বেলের শব্দে মা আশাবাদি হয়ে তাকিয়ে থাকত। বলত “তুই নিজের থেকে ফিরে যাস না কেন?” আমি ভাবতাম ফিরে যাওয়া টা কি এখন এতটাই সোজা? না এতটা সোজা না।

একদিন বিকেলে মনিকে নিয়ে ছাদে গেলাম। তাকে ডাক্টার বাইরের পরিবেশের সাথে আবার খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে বলেছেন। আমি তাই প্রথমে ছাদ থেকেই শুরু করলাম। আমাদের বাসা টা ছিলো দোতলা। তিন তোলার ছিল ছাদ টা। হঠাৎ করে কলিং বেল বাজার শব্দ আসল। আমি দৌড়ে নিচে নামলাম। নেমে দেখি রাফসানের বাবা আর মা দাড়িয়ে আছে গেইটে।

আমি তাদের দেখে সালাম করলাম। তারা আজকে হাসি মুখেই সালাম নিলো। আমার ভিতর টা যেন কেউ দুমড়ে মুচরে ফেলছিলো। আমি তাদের গেইট খুলে দিয়ে মা কে ডাকলাম। বাবাকে ফোন দিতে বলল আমার শ্বাশুরি। আমি বাবাকে ফোন দিয়ে ডেকে আনলাম। তারা দুজন ই বলল আমাকে তাদের সাথে যেতে। আমি কি না তাদের সাথে গেলেই রাফসানের রাগ ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর এমনিও তারা চায়না যে আমার আর রাফসানের তালাক টা হোক। আমার শ্বশুর আমাকে ডেকে তার পাশে বসালেন। বললেন “দেখো মা সংসারে এক জন না একজন কে মাথা নত করতেই হয় কেনো না শুরু টা তুমিই কর।” তার কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম।

আমি আসার সময় কিছুই সাথে নিয়ে আসেনি। শুধু মোবাইল টা ছাড়া। তাই আমার কিছু তেমন গুছাতেও হলো না। আমি তাদের সাথে ফিরে গেলাম। কিন্তু এই যেন ছিলো আমার নিজের সাথে এক অগ্নিপরিক্ষা। হ্যা। তাদের সাথে আমি বাড়িতে ফিরে তো গেলাম। কিন্তু রাফসানের সাথে আমি চোখ মিলাবো কি করে?

সেদিন রাতে সে বাড়ি ফিরে দেখল আমাকে। কিন্তু কিছু না বলেই চলে গেলো ওয়াশ রুমে। আমি তাকে রাতের খাওয়ার জন্যে ডাকলাম সে আসল না। এরপর আম্মা যেয়ে তাকে ডাকার পর সে উঠে আসল। সেদিন রাতে আমার পেটে আর খাওয়া ঢুকলো না। পরেরদিন সকালে নাস্তা বানানোর সময় কলিং বেল বেজে উঠল। আমি গেইট খুললাম। দেখি রাতুল। তাকে দেখে আমার লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেলো।

আমি তার কাছে হাত জোর করে মাফ চেতে থাকলাম। সে আমার হাত ২ টা জরিয়ে বলল “এইসব কি করছেন ভাবি? আপনি তো আমার জন্যে আমার বোনের মত। এমন ভুল হতেই পারে। আপনিও তো মানুষ। নিজের বোনের দোষিকে শাস্তি দেয়ার অধিকার আপনার আছে। আপনি এইভাবে আমাকে বলে লজ্জা দিবেন না। চলেন রুমে চলেন”এই বলে সে আমাকে ভিতরে নিয়ে আসল। আমার মন থেকে একটু বোঝা নেমে আসল।

কিন্তু রাফসান বরাবরই আমাকে ইগ্নোর করে যাচ্ছে। আমি নাস্তার টেবিলে তাকে কত করে নাস্তা করতে বললাম কিন্তু সে কোনো কথাই বলল না। সে নাস্তা না করেই চলে গেলো। রাতে ফেরার পর আমি ভাবলাম আজ রাতে দরকারে তার পা ধরেই মাফ চাইবো। কিন্তু সেই রাতে সে বাড়িতেই ফিরলো না। আমি অবাক হয়ে গেলাম। সে রাত টা কোথায় কাটালো? পরেরদিন সকালে আম্মা বলল “রাফসান তোমাকে কিছু জানায়নি? সে তো তার অফিসের কাজে কাল বিকালে আফ্রিকা চলে গেছে। ১০দিন পর ফিরবে।” আমি একেবারেই ভেংগে পড়ছিলাম।

আবারো সেই ১০দিনের অপেক্ষা? আমার শ্বশুর আমাকে আমার বাবার বাসায় দিয়ে আসলো। কারণ রাফসান তো নেই। একা বাসায় আমি কি করব? আমিও চুপচাপ চলে এলাম বাসায়। মা-বাবার প্রশ্ন শুরু হলো।” রাফসান কি মানলো? সে কি মাফ করল? সব কি ঠিকঠাক হলো? ‘”আমি প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর এমন ভাবে দিলাম যেমন আমার সাথে কিছুই হয়নি। সব ঠিকঠাক। তাদের মনেও একটু স্বস্তি আসল।

২দিন পর আমাদের বাসায় ফুপি আসল। মনির খবর ফুপিরা জানে না। কিন্তু মায়ের শরীরটা যে খারাপ হয়েছিলো তা সে মহল্লার একজন থেকে জানতে পেরেছে। তাই সে আমাদের সাথে দেখা করতে আসছে। আর সাথে আসছে নিলয়।

আমি দুপুরের কাজ শেষ করে গোসলে ঢুকলাম। গোসল শেষে মাথায় তোয়ালে পেচিয়ে আমি ছাদে রোদ পোহাচ্ছিলাম। এমন সময় নিলয় আমার পিছনে এসে বলল “শুনেছি বিয়ের পর খুব সুখেই আছো। আর দেখো আমার মত পাগলকে যে তোমার অপেক্ষায় আজ অব্দি বেচেলর।” আমি তার কন্ঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই সে বলল “থাক থাক আর দেখতে হবে না আমাকে। তোমার রুপের আগুনে জ্বলেই তো যাব।”

আমি তার এইসব কথাতে খুব বেশী ইতস্ত বোধ করতে লাগলাম। সেখান থেকে চুপ করেই বেরিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু সে আমার হাত টা ধরে বলল “তোমার স্বামী কে কি জানিয়েছিলে আমার কথা? নাকি আমি ই জানিয়ে দিবো?” আমি তার কথায় অনেক বেশি ঘাবরে গেলাম। সেখান থেকে আমার হাত টা ছারিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে এলাম। কেনো সে ফিরে এলো? কেনো এমন সময় আমার অতীত ফিরে এলো যখন আমি আমার বর্তমানকে সামলাতে পারছি না। আর ভবিষ্যতের কথা তো ভাবতেই পারছি না।
কেনো এলো সে? কেনো?


পর্ব ৭

রাফসান কে আমি বিয়ের পর কখনই নিলয়ের কথা বলিনি। আর কি ই বা বলব? আমিতো নিজেই নিলয়ের বেপারে আর কিছুই জানতাম না।
৫বছর আগের কথা যখন নিলয় দেশ ছেড়ে চলে যায়। এই ৫ বছরে না আমি তার কোনো খোজ পেয়েছি না সে আমার কোনো খোজ নিয়েছে। আর এখন কিসের অধিকার দেখাতে সে ফিরে আসছে? খাওয়ার সময় টেবিলে বসেও সে বার বার আমার দিকে তাকাতে লাগল।

বাবা তাকে বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে বলল “জি মামা। এইবার ভেবেছি বিয়ে করে দেশেই সেটেল হয়ে যাবো। কি দরকার বাইরে থেকে। দেশের ই কোনো মেয়েকে বিয়ে করব।” মা তার কথায় প্রশ্ন করল “কেও আছে নাকি”সে বলল “জি মামি আছে। কিন্তু সে এখনো রাজি হচ্ছেনা। রাজি হলেই বিয়ে কনফার্ম।” এই কথা বলেই সে আমার দিকে তাকালো। আমি টেবিল থেকে উঠে পরলাম। বললাম “মা শরীর টা ভালো না।কিছু খেতে ইচ্ছেয় করছে না। আমি একটু ঘুমাবো।

“এই বলে আমি চলে আসলাম আমার রুমে।

তারপর আমার ফোন টা বের করে আমার আর রাফসানের তোলা শেষ সেল্ফি টা দেখতে লাগলাম। ভেলেন্টাইন্স ডের রাত ছিলো। সে আমাকে ফোন টা গিফট দিয়েই এই ছবি টা তুলেছিলো। তার সাথে এতো কাছে সেদিন রাতেই আমি প্রথম আসছিলাম। তার বুকের স্পন্দন আমি শুনতে পারছিলাম। খুব নিকট থেকে। তার নিঃশ্বাস অনুভব করছিলাম খুব কাছ থেকে। আর বার বার তার চোখ গুলো ধরে বন্ধ করে দিচ্ছিলাম। কারন তার চাহনি টা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। লাজে আর শরমে আমি অর্ধেক টাই শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু। শুধুই কি এই ক্ষনিকের ভালোবাসা ছিলো আমাদের? আমাদের ভালোবাশার আয়ু কি এতটাই কম?

এইসব ভাবতে ভাবতে আমার চোখ লেগে গেলো।
ঘুম ভাংলো সন্ধাবেলায়। উঠেই মনে পড়লো রাফসান এখন আমার থেকে কত টা দুরে। আমি কাদতে লাগলাম। কিভাবে তার কাছে আবার ফিরে যাই? কিভাবে আবার এই ভালোবাসা টা তার ভিতরেও জন্মাই।? এমন সময় মা আমার দরজায় নক করলো। আমি চোখের পানি মুছে বেরিয়ে এলাম। মা আমাকে বলল “রাফিয়া নিলয় এই একটা সপ্তাহের জন্যে ঢাকায় আসছে।

এখন নিজের মামার বাড়ি থাকতে সে হোটেলে কিভাবে থাকে বল। তাই ভাবলাম তোর রুম টা যদি খালি করে দিতি তাহলে এইখানে ই সে থেকে যেত।” আমি মায়ের কথা একেবারে ক্ষেপে উঠলাম। বললাম “কেনো এই খানেই থাকতে হবে? মা তুমি কি নতুন হয়ে গেছো? নিলয়ের সাথে আমার আগের সম্পর্কের কথা কি তুমি ভুলে গিয়েছো? তারপরও কিভাবে পারো তুমি এই কথা বলতে?”

মা হেসে বলল “ওইসব তো বাচ্চামি ছিলো। এখন তুই বিবাহিতো। সেও বিয়ে করবে সামনে। আর এমনিও বিক্রাম্পুর থেকে তার কাজে মতিঝিল কাজে আসতে খুব অসুবিধে হবে। তুই ওইসব চিন্তা নামিয়ে দেয় মাথা থেকে। আর রুম খালি কর।” আমি মা কে বললাম “মা তোমরা যেমন টা ভাবো সে তেমন না”মা বলল “তুই খুব বেশি মানুশ চেনা শিখে গেছিস না? জলদি রুম খালি কর আর একটা কথাও মুখ থেকে যেন বের না হয়।”

আমি মায়ের কথা মত রুম খালি করে চলে এলাম মনি রুমে। আমার ভিতরে ভয়ের পরিমান বাড়তে লাগল একবার ভাবলাম তাকে যেয়ে বলি চলে যেতে। কিন্তু এইটা করলে সে আরো বেশি ভয় দেখানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। আরেকবার ভাবলাম আমি মনিকে সব বলে দেই। কিন্তু মনি তো নিজেই শোকে দুখে কাতর এই বেচারিকে আর কি শুনাবো? তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম কাল সকাল হতেই আমি বাড়িতে ফিরে যাবো। হ্যা। এইটাই করব।

কারন এইখানে সারাক্ষন নিলয়ের মুখামুখি হওয়ার চেয়ে বাসায় চলে যাওয়া ই অনেক ভালো। এমনিও রাফসানের ফিরতে আর বেশিদিন নেই। এরই মাঝে আমি ওকে মানানোর ও কোনো প্লান বের করেই ফেলব। এইসব ভাবতে ভাবতেই আমার রাত কেটে গেলো। সকাল হতেই মা কে বললাম “আম্মু রাফসান এর আসতে আর বেশিদিন বাকি নেই। আমি প্লান করছিলাম তার ফেরার আগেই আমাদের রুম টা আবার থেকে ডেকোরেশন করে ফেলব। জানোই তো ওর মন খারাপ ছিলো। নতুন ডেকোরেশন দেখলে তাকে মানানো আরো সহজ হয়ে যাবে। কি বল”?”

আমার কথায় প্রথম প্রথম মা রাজি না হলেও আমি মা কে রাজি করিয়েই ফেলি। নাস্তার টেবিলে বাবা কে মা বললেন “শুনো তোমার মেয়ে কি না বাসায় যাবে। আমাদের বাসায় তার আর মন টিকে না।” বাবা হেসে বলল “কেনো রাফসান এর ফিরতে তো আরো ৫দিন বাকি।” মা বলল “তোমার মেয়ের আর তোর সইছে না। নাস্তা শেষ করে দিয়ে আসো ওকে।” বাবা বলল “আমি তো দোকানে আজকে নতুন স্যাম্পল নামাবো। সমস্যা নাই নিলয় তো ওইখানেই যাচ্ছে রাফিকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাবে আর রাফির বাসাটাও চিনে নিবে।”

বাবার কথায় আমি টেবিল থেকে উঠে গেলাম।” কাল পর্যন্ত তো এই নিলয় ছিলো না। যদি আজকেও না থাকত তাহলে কিভাবে দিয়ে আসতে? আজকে তার সাথেই আমার যেতে হবে কেন? তোমাদের কারোই আমার প্রয়োজন নেই। আমি বাসায় একাই যেতে পারবো। ‘”এই বলে যেই আমি আমার পা আগে বাড়ালাম, আমি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলাম।

চোখ খুলল আমার হস্পিটালের বেডে। চোখ খুলতে পারছিলাম না আমি। হাতে সেলাইন লাগানো বুঝতে পারছিলাম। চোখ খুলে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলাম আমি। দেখি সবাই আমার পাশেই আছে। আমাকে উঠতে দেখে মা এগিয়ে আসলো। বলল “পিচ্চি মেয়েটা আমার যে কবে এত বড় হয়ে গেলো তা তো আমি বুঝতেই পারলাম না।” মায়ের এমন কথায় আমি জিজ্ঞেস করলাম “মা কি হয়েছে আমার? ব্রেইন টিউমার? নাকি ব্লাড কেন্সার?”

আমার কথায় মা আমাকে এক থাপকি দিয়ে বলল “ধুর যা পাগল মেয়ে। তুই মা হতে চলেছিস।” কথা টা শুনে মনে হচ্ছিলো এই পৃথিবী টা যেনো হঠাৎ করেই থেমে গেছে। অকল্পনিয় একটা কথা আমি শুনতে পারছিলাম তখন। আমার শ্বাশুরি আমাকে টাকা ছুয়ায় সদকা দেয়া শুরু করল। আমার ভাবি আমার মাথায় এসে চুমু খেলো। আমার নিজের কাছে লাগতে লাগল এই পৃথিবী টা আমার হাতের মুঠায় এসে পরেছে।

কি যে সুখ। কি যে শান্তি। কিন্তু। রাফসান তো দেশে নেই। আমি সবাইকে বললাম রাফসান যেনো ব্যাপারটা না জানে। কারণ আমি চাই না শুধু বাচ্চার দিকে তাকিয়ে সে আমাকে মেনে নেক। আমি চাই আমাকে মেনে নেয়ার পর ই সে এই খবর টা জানুক।


পর্ব ৮ (শেষ)

আমি রাফসান কে ব্যপার টা জানাতে না করে দিলাম। কিন্তু মনে মনে চাইলাম যেন ও নিজের থেকে এইবার এসে আমাকে মেনে নেয়।
আর ভালো লাগে না তাকে ছাড়া। তাকে ছাড়া জীবন টা যেন আরো বেশি মুল্যহীন হয়ে গিয়েছে।

আমি যে কিভাবে নিলয়কে ভুলে রাফসান কে এতটা ভালবেসে ফেলেছি আমি নিজেও জানি না। আসলে সত্যি বলতে মা-বাবা, ভাই-বোনের পর বিয়ের সম্পর্কের উপর আর কোনো সম্পর্ক হয় না একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মধ্যে।

আমাকে আমার মা নিজের সাথে বাসায় নিয়ে গেলেন। কারণ এমন অবস্থায় আমার মা আমাকে একা ছাড়তে চাইলেন না। এমনিও মনির সাথে দুর্ঘটনার পর থেকে আমাদের বাসায় শুধু কষ্ট আর হতাশার বন্যা ই বয়ে যাচ্ছে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম মায়ের সাথে যেতে। কারণ আমার আর কারোর ভয় নেই। কারণ আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে যে আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব। না হলে কেও কেও বছরের পর বছর সাধনার পর ও এমন ফল পায় না। অথচ আমার এই মুসিবতের সময় উনি আমার সহায়ক হয়েছেন। এরপর উনি চাইলে আমার কেউ আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

আমি আমার মায়ের সাথে রুমে সুয়ে আছি। এমন সময় এইগুলা চিন্তা করতে করতে আমার চোখে পানি এসে পড়ল। আমার মা আমার চোখে পানি দেখে বললেন “আচ্ছা রাফিয়া তোকে আজ আমি একটা গল্প বলি?” আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম “বলো?”
মা আমার হাত ধরে বললেন “অনেকদিন আগের কথা এক গ্রামে এক মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। খুব গরীব তার পরিবার। বিয়েতে আসা মেহমান কে খাওয়ানোর জন্যেও তারা লোকেদের থেকে টাকা কর্জ করেছে। কিন্তু বিয়ে মাঝ পথে থেমে গেলো। কারণ বরের বাবা নগদ টাকা যৌতুক লাগবে।” আমি মায়ের কথায় মুখ তুলে তার দিকে তাকালাম। গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলাম”তারপর?” মা বললেন “তারপর আর কি। বিয়ে ভেংগে গেলো। মাঝ পথ থেকে জামাই বাড়ির লোকেরা ফেরত চলে গেলো। মেয়ের বাবা কাদলো। মা কাদলো। মেয়েটা ওদের কান্না দেখে নিজেও খুব কাদলো।

এইভাবে ২দিন পার হয়ে গেলো। মেয়েদের ঘরে দুদিন চুলাও জ্বললো না। কারন মেয়ের বাবার কাছে এত টাকা ছিলো না যে পরেরদিন রান্না করার জন্যে ২বাটি চাল ও আনবে। মেয়ের কাছে মনে হতে থাকলো তার জীবন টা শেষ। কারন বিয়ে ভাংগা মেয়েদের তো আর বিয়েও হয়না। তাহলে এর মানে তার না কখনো বিয়ে হবে, না কখনো তাদের ঘরে চুলা জ্বলবে। তাই সে ভাবলো তার পুকুরে ডুবে মরে যাওয়া ভালো। তার জন্যে তার পরিবারের এত কষ্ট। তাই তার বেচে থাকার কোনো অধিকার নেই।” আমি বসে পরলাম।” মা তারপর?”

“তারপর আর কি মেয়েটা গেলো পুকুরের পাশে। নিজের পা ২টো বেধে লাফ দিলো পানিতে। তারপর সে ডুবোতে লাগল। তার শ্বাস বন্ধ হতে লাগল। তার চোখ ২টা জ্বলে জাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় অজ্ঞাত এক সুদর্শন পুরুষ তাকে বাচিয়ে তুলল ঘাটে। তারপর তার পা ২টার বাধ খুলে দিলো। আর তাকে নিয়ে পৌছে দিলো তার বাসায়।” আমি মা কে প্রশ্ন করলাম “কে এই লোক টা?” মা বলল “এইটা সেই ছেলে যার সাথে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছিল।

এরপর দিন যায়, রাত যায় ২জনেরই মনের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এইদিকে ছেলের বিয়ে অন্য মেয়ের সাথে ঠিক হয়। যেদিন ছেলেটার বিয়ে থাকে ছেলেটা এসে মেয়েটাকে বলে যদি বিশ্বাস কর আমাকে তাহলে হাত ধর আর চল ২চোখ যেদিকে যায়। মেয়েটি এক মুহুর্ত না ভেবেই ছেলেটার হাত ধরে বেরিয়ে যায়। তারপর অনেকদিন পার হয়ে যায়। আস্তে আস্তে দুজনের পরিবার ই ২জন কে মেনে নেয়। যে মেয়ে সব কিছু হেরে গিয়ে নিজের প্রাণ দিতে যাচ্ছিলো সে মেয়ে এখন ৩বাচ্চার মা। আর সে এখন অনেক সুখি।”

আমি মায়ের দিকে এইবার কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলাম “মেয়েটা কে মা?” মা হেসে বলল “সেই মেয়েটা আমি। আর ছেলেটা তোর বাবা।” আমি হেসে বললাম “এতদিন যা বলনি তা আজকে কেনো বলছ?” মা বলল “এতদিন তোদের চোখে হারিয়ে ফেলার ভয় দেখিনি এখন দেখছি। তাই তোকে বলছি দুঃখ চিরকালের জন্যে না। শুধু মাত্র তোর ভালোদিন আসার আগের কিছু মুহুর্ত হলো এই কষ্ট, এই দুঃখ। তাই জীবনে হারিয়ে ফেলার ভয়ে না কেদে নতুন কিছু পাবার খুশিতে হাসা শিখে নেয় মা।” মায়ের কথাগুলো শুনে যেনো আমি আবার জীবিতো হয়ে উঠলাম। আমি আবার থেকে নিজের বাচ্চাকে নতুন পৃথিবী দেখানোর খুশিতে খুশি হতে লাগলাম।

কয়েকদিন এইভাবেই কেটে গেলো। নিলয় আর আগের মত আমাকে জালায় না। হয়ত প্রেগনেন্সির জন্যে সেও চুপ হয়ে গেছে। আমি বারান্দায় দাড়িয়ে বিকালে বাচ্চাদের রাস্তায় খেলা দেখছি। এমন সময় দেখি আমার শ্বশুর বাড়ির গাড়িটা এসে দরজায় থামলো। সেখান থেকে কে যেন বেরিয়ে এলো। খেয়াল কিরতে পারলাম না। আমি আস্তে আস্তে নিজের রুমে গিয়ে বসলাম। ভাবছিলাম আম্মা ছাড়া আর কে হবে। এমন সময় দরজায় নোক পড়ল। আমি বললাম “ভিতরে আসুন।”

ভিতরে আসল রাফসান। আমি তাকে দেখে খুশিতে এক লাফ দিয়ে দাড়িয়ে গেলাম। সে আমাকে কিছু বলার আগেই আমি তাকে যেয়ে জোরিয়ে ধরলাম। আর বললাম “আর কিছুদিন দেরি করলে হয়ত আমি মরেই যেতাম। সে আমাকে বিছানায় বসিয়ে বলল “এইসব কথা বলছো কেনো?” আমি বললাম “তাহলে কি বলব? এতটা যে ভালোবাসি।” সে আমার কথায় মাথা নিচু করে হেসে বলল “ওহ তাহলে আজ আপনার মনে হচ্ছে যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন?

আমিতো ভেবেছিলাম এমন চিন্তা আপনার আসবেই না। থাক এখন আর এইসব বাড়তি চিন্তার দরকার নেই। আম্মু বলল তুমি নাকি খুবই অসুস্থ। খাওয়া দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছো। তাই আসলাম বলতে যে চিন্তার আর কোনো কারণ নেই তালাক দিচ্ছিনা আপনাকে। কিন্তু আগের মত কোনো কিছুই আর আমাদের মধ্যে সম্ভব না। থাকতেসো থাকো কিছুদিন। এরপর বাসায় এসে পড়। কিন্তু এইটা চিন্তা করনা এই রাফসান আর তোমার সেই পাগল স্বামী যে এক সময় তোমার আগে পিছে ঘুরত। আর হ্যা আরেকটা কথা আমাদের মধ্যেকার সমস্যা যেন পারিবারিক অশান্তি তে রুপ না নেয় এইদিকে খেয়াল রেখে চুপ থেকো।”

তার কথাতে আমার চোখ বেয়ে বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। কিন্তু সে আমার দিকে এক পলক ও তাকালো না। সে একবার আমাকে আপনি আর একবার তুমি করে বলছিলো। আমি তার দিকে অপলক তাকিয়ে কান্না করেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আমাকে দেখার সময় ছিলো না। সে তার কথা শেষ করে যেই উঠতে নিবে ঠিক এমন সময় নিলয় আমাদের রুমে এসে ঢুকলো। রাফসান কে দেখে সে ও চমকে উঠলো। রাফসান তাকে সালাম করলে সে জানতে পারলো যে রাফসান আমার স্বামী।

সে রাফসান কে উপেক্ষা করেই আমাকে বলল “রাফি তোর স্যুপ খাওয়ার টাইম হইসে মামি বলসে। এই নেয় খেয়ে নেয়।” নিলয়ের হাতে স্যুপ দেখে আমি বললাম “আমি খাব না। রেখে যাও।” নিলয়ে আমার পাশে বসে বলল “আমি তোর ঢং দেখতে আসিনি। খাবি বাস এখনি খাবি”এই বলে আমার মুখে সে স্যুপের চামচ টা এগিয়ে দিলো। আমি কোনমতে তা মুখে নিয়ে রাফসানের দিকে লক্ষ করলাম। কেমন যেন সে তার চেহারা বানিয়ে ফেলল। তার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছিলো সে খুব বেশি জেলাস ফিল করছিলো।
আমার কেনো জানি হঠাৎ করে মনে হলো নিলয় যা করছে তাতে আমারই লাভ হবে। তাই আমি ঢং করতে থাকলাম আর নিলয়ের হাতেই স্যুপ খেতে থাকলাম। এর মধ্যে রাফসান আগুন গরম হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আমার স্যুপ ও খাওয়া শেষ হয়ে গেলো।

সেদিন রাতে মনিকে আমি সব খুলে বললাম। আর সাথে এইটাও বললাম কিভাবে এইবার এই নিলয় কে ইউজ করেই রাফসানের মনে পুরাতোন ভালোবাসা জোগানো সম্ভব হবে। মনিও আমার কথায় রাজি হয়ে গেলো। পরেরদিন কোনো প্লান ছাড়াই আবারো রাফসান আমাকে দেখতে এসে পরল। এসেই সে বলল “আম্মু বলেছে তোমার নাকি ফল খাওয়া খুব দরকার। তাই ফল নিয়ে আসছি। এই নাও, খেয়ে নাও।” আমি তার কথায় ঢং দেখিয়ে বললাম “আমার খেতে ইচ্ছে করেনা।

“আমাকে সে ত্যাড়া ভাবে উত্তর দিলো “হুম আপনার তো এখন মুখে উঠিয়ে খাইয়ে দেয়ার মানুষ আছে।” আমিও তার কথায় মুড দেখিয়ে বললাম “হুম আছে বলেই তো এইখানে পরে আছি। নাহলে কবে আপনার সাথে যাওয়ার জন্যে অস্থির হতাম।'”সে আমার কথায় রাগ করে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার বেড়িয়ে যাওয়া দেখে আমার মনে চিন্তা হতে লাগল যে সে কি আবার চলে গেলো নাকি। আর যদি সত্যি সত্যি আমাকে নিতে না আসে? এইসব ভাবছি এমন সময় সে ফল গুলো কেটে প্লেটে নিয়ে এসে আমার মুখে ধরে বলল “খাও। না খেলে শরীর সুস্থ হবে না। আর সুস্থ না হলে বাসার সবাই তোমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে থাকবে।

“তার কথাতেই আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমি আবার আমার আগের রাফসান কে ফিরে পেতে যাচ্ছি। তাই আমি মনে মনে পরিকল্পনা করেই ফেললাম যে এইবার নাটকীয় ভাবে হলেও আমি আমার সম্পর্ক কে আবার জীবিত করে তুলব।
এইভাবে ২দিন পর পর রাফসান আসতে লাগল আমাদের বাসায়। আর প্রতিদিন হয়ত জুস, ফল, স্যুপ নিয়ে সে হাজির হয়ে যেত। আর নিজ হাতে চুপচাপ আমাকে খাইয়ে সে চলে যেত। আমি তার সামনে নিলয়ের নামে অনেক কিছুই বলতে থাকতাম। যেমন ছোট বেলায় নিলয় আমাকে কিভাবে গাছ থেকে আম পেড়ে দিতো।

আমরা আগে কত বার ঘর ঘর খেলেছি। নিলয় সেজেছে জামাই আর আমি বউ।এইসব কথায় রাফসানের চোখ গুলো আগুনের মত জ্বলে উঠত। আমার প্রতি তার ভালোবাসা তার এই জেলেসি থেকেই বুঝতে পারতাম। আরো বারিয়ে বারিয়ে তাকে কথা শুনাতাম। এরই মধ্যে যদি এক দুদিন নিলয়কে সে আমার আসে পাশেও দেখে ফেলত তার অবস্থা খারাপ হয়ে যেতো। আমার খুব মজা লাগত। আর যখন ই সে বাসায় ফেরার কথা বলত আমি বলতাম সুস্থ হয়েই যাবো এখন তো আর আগের মত কিছু নেই। কেনোই বা ফিরবো?
এইভাবে কয়েকদিন আরো পার হয়ে গেলো।

একদিন দুপুরে রাফসান তার বাবা ও মা কে নিয়ে হাজির আমাদের বাসায়। বাবাকে দোকান থেকে ফোন দিয়ে আনানো হলো। বাবা আসলো। মা ও ছিলেন। রাফসান দের দুপুরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। তারপর খুব সংকোচ নিয়ে আব্বা আমার বাবার কাছে বললেন “ভাই আপনার সাথে বন্ধুত্তের পর তো কুটমের সম্পর্ক হয়েছে। আমরা এই সম্পর্ক টা আরেকটু গভির করতে চাই। আমরা আপনার ছোট মেয়ে মনিকে রাতুলের জন্যে চাই। যে বিয়ে এতদিন স্থগিত ছিলো তা আমরা পুর্ন করতে চাই।

এই বিয়েটা হক। ভাই। প্লিজ না করবেন না।” আব্বার কথায় বাবা-মা ২ জনই কেদে ফেললেন। যে মনিকে তার নিজের মা-বাবা মেনে নিতে পারছেনা সেই মনি কে কিভাবে তারা নিজের বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিবে? কিন্তু তারা আসলেই মনিকে মেনে নিলো। তারা মনি আর রাতুলের বিয়ে ডেট ফিক্স করে গেলেন।
আমাদের বাসায় আবারো খুশির ধুম পরে গেলো। কিন্তু আমার জীবনে একটা তুফান আবারো আসার ছিলো।

মনি আর রাতুলের হলুদের রাতে রাফসান আর নিলয় ছাদে বসে ছিলো। ঠিক এমন সময় নিলয় রাফসান কে বলে বসল “আপনি আসলেই অনেক ভাগ্যবান ব্যাক্তি যে রাফির মত বউ পেয়েছে। আর আমার মত অভাগাকে দেখেন যার জন্যে রাফি পাগল ছিলো তবুও সে রাফি কে পেলো না।” রাফসান তার কথায় আবেগি হয়ে উঠল। রাফসান নিলয়কে প্রশ্ন করল “পাগল মানে?” এরপর নিলয় আমাদের আগের সম্পর্ক আর চিঠি গুলার কথা রাফসান কে বলে দিলো। রাফসান তার রাগ সামলাতে পারছিলো না।
সে নিচে নেমে আমার রুমে ঢুকেই রুম টা বন্ধ করে দিলো। আমি তখন আমার বিছানায় বসে গল্পের বই পড়ছিলাম। তাকে দেখে উঠে বসলাম।

সে আমাকে হাত ধরে দাড় করালো। আমি তার চোখের রাগ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম “কি হয়েছে তোমার? এত রেগে আছো কেন?”
সে আমাকে দু হাত দিয়ে জোরিয়ে ধরে বলল “রাগ না এইটা। এইটা হলো অভিমান। যদি আমাকে না নিলয়কেই ভালোবাসতে তাহলে কেনো আমাকে নিজের মায়ার জালে ফাসালে রাফি? কেনো?” তার কথায় আমি স্থির হয়ে গেলাম।

নিলয় সব বলে দিলো? রাফসান আমাকে বিছানায় ঢাক্কা দিয়ে ফেলে নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।” আমি যে রাফি তোমাকে কত টা ভালোবেসেছি তুমি জানো না। আর তুমি নাকি কখনই আমাকে ভালোবাসনি?” রাফসানের এই কথা শুনে আমি কথা বলতে চাইলাম কিন্তু রাফসান আমাকে কথা বলতে দিলো না। সে বলল “চুপ কর মেয়ে। যানো তোমাকে যেদিন থেকে পার্টি তে দেখেছি সেদিন থেকে শুধু তুমি ই আছো আমার এই চোখে-মনে। আর কেও না। তুমি যদি আমাকে তালাক দিয়েও দিতে আমি তোমাকে কখনই ছারতাম না। আর যদি তুমি ছেরেও দিতে আমি নিজে আত্মহত্যা করে ফেলতাম কিন্তু তোমাকে তালাক দিতে পারতাম না।” আমি বললাম “তাহলে এতদিন যা করলে? তা কি ছিলো?”

রাফসান মাথায় হাত দিয়ে বলল “সব নাটক ছিলো। যেন তুমি বুঝতে না পারো তোমাকে আমি কত টা ভালোবাসি। আর আস্তে আস্তে সব ঠিক হক। কিন্তু তুমি তো দেখি তালাকের আগেই নিজের রাস্তা পরিষ্কার করে নিচ্ছো ওই নিলয়ের সাথে মিলে।” এই বলে সে হাউমাউ করে কাদতে লাগল। সে এইবার মাটিতে বসে পড়ল। বসে আমাকে বলল “দরকারে আমাকে মেরে ফেলো কিন্তু আমাকে ছড়ে ওই নিলয়ের কাছে যেয়োনা রাফি প্লিজ”

আমিও এইবার মাটিতে বসে তার হাত দুটো জরিয়ে বললাম “দরকারে আমিও মরে যাবো কিন্তু তোমাকে ছাড়া না কাউকে ভালোবেসেছি না কাউকে ভালোবাসব।” এই বলে আমি তাকে জোরিয়ে ধরলাম। সেও ছোট বাচ্চাদের মত আমাকে ধরে কাদতে লাগল। এমন সময় মনি আর নিলয় আমাদের রুমের দরজা নক করলো।
রাফসান উঠে গিয়ে দরজা খুলল। আমি এতক্ষন এ চোখের পানি মুছে নিলাম। মনি ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কি গো সব কি বলা হলো?” আমি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম “কিছু কিছু বলেছি সব না”নিলয় রাফসানের দিকে এসে দাড়িয়ে বলল “ভাইয়া তো মনে হচ্ছে আজকে টাংকি খালি করে দিবে।”

রাফসান তার কথায় বিব্রত বোধ করল। সে তার মাথা নিচু করে ফেলল। তারপর নিলয় আমাকে বলল “তোর প্লান কিন্তু সাক্সেস হয়ে গেছে পাগলি তোর জামাই কিন্তু স্বিকার করেই ফেলেছে যে সে তোকে কত টা ভালোবাসে?”

রাফসান এই কথা শুনে বলল “প্লান মানে? এইসব কি নাটক ছিলো?” মনি দাড়িয়ে বলল “বুবুর আপনার প্রতি ভালোবাসা ছারা এইখানে সবই সাজানো ছিলো। এমনকি বুবু নিজেও জানে না যে নিলয়ের এইখানে আসা টাও একটা প্লান ছিলো।

ওইটাও বেচারি আজ সন্ধায়ই জানতে পারছে। আমি হস্পিটাল থেকে আসার পর পরই নিলয় ভাইয়ার ফোন আসে যে সে এখন ঢাকায়। এরপর আমি নিলয় ভাইয়াকে আমাদের সব কথা জানাই। এরপর নিলয় ভাইয়া আমাদের বাড়িতে আসে। আর প্রথম দিন বুবুর চেহারা দেখেই সে বুঝে যায় যে আপনাদের মধ্যে ঝামেলা এখনো ফুরায়নি। তাই সে বুবুর ভিতরে আপনার প্রতি ভালোবাসা যাচাই করতে থাকে বিভিন্ন ভাবে তাকে ভয় দেখিয়ে। যখন সে কনফার্ম হয় বুবু ১০০% আপনাকে ভালোবাসে তখন পালা আসে আপনার।
আপনাকে জেলাস করতেই সে বুবুর কাছাকাছি থাকা শুরু করে। আর বুবু। সে নিজেও আপনার অবস্থা বুঝে প্লানিং করে যে আপনার মুখেই সব বলাবে। আর আজকে অন্তিম সময় তাই হলো। আপনি সব নিজেই বলে ফেললেন।”

রাফসান বোকার মত আমাদের সব কথা শুনে তারপর আমার দিকে এসে বলে “আমি কখনই কল্পনা করতে পারিনি আমি তোমাকে এতটা ভালোবাসি। সরি এতদিন দুরে থাকার জন্যে।” আমি তার হাত ২টা ধরে বললাম “আমিও সরি তোমার থেকে একটা কথা লুকানোর জন্যে।” সে বলল “আবার কি কথা?” আমি লজ্জায় চোখ নিচু করে বললাম “আপনি বাবা আর আমি মা হতে চলেছি।”

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ধুর মিথ্যা কিথা। সত্যি করে বল? তাই নাকি? সত্যি? কসম?”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম “হ্যা হ্যা কসম, খোদার কসম।” এইটা শুনে সে তো পাগল হয়ে গেলো। সাথে সাথে আমাকে কোলে তুলে সে নাচতে লাগলো। তার খুশি দেখে আমিও কেদে ফেললাম।

আমি আর রাফসান আবার এক হয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে নিলয় বলল “শুধু আমার একটা অনুরধ রাখিস ছেলে হলে নাম রাখবি নিলয় আর মেয়ে হলে নীলিমা। তাহলেই আমি আমার সব হারানো ভুলে যাবো। আর অনেক অনেক খুশি হয়ে যাবো রাখবি তো?”
আমি বললাম অবস্যই।

এইখানে মনি আর রাতুলের ও বিয়ে হয়ে গেলো। ৫মাস যেতেই রাফসান আমাকে তার বাসায় নিয়ে চলে গেলো। আমি একটা মেয়ে বাবুর মা হলাম।

আর তার নাম রাখলাম “নীলিমা”আসলে মা সত্যি বলেছিলেন যখন ভবিষ্যতে আমাদের জন্যে অনেক ভালো কিছু অপেক্ষা করতে থাকে তখন দুঃখ আসে। কিন্তু এইটা চিরকাল স্থায়ি থাকার জন্যে আসে না। এইটা আসে কারন যেনো আমরা আমাদের খুশি টাকে ভালোভাবে অনুভব করতে পারি। আর তাকে খুব সুন্দর ভাবে আমন্ত্রন জানাতে পারি

লেখা – সাউদা ইকবাল হোসাইন

সমাপ্ত

আরো পড়ূন –

দজ্জাল বউ – বউয়ের অবহেলা অতঃপর ভালোবাসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!