রিলেশনশিপ

লাভ উইথ মাই বেটার হাফ – বিবাহিত জীবনের গল্প (সিজন ১)

লাভ উইথ মাই বেটার হাফ – বিবাহিত জীবনের গল্প: প্রেমের সম্পর্কের বিয়েতে যখন ভাঙ্গন ধরে তখন আশেপাশের মানুষ মুখ লুকিয়ে অট্টহাসি হাসে। ভকভক শব্দে বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে ইমরান। পাশেই কাঠ কাঠ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ইমরানের বাবা।


পর্ব ১

“আমি আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছি।”

বাম হাত দিয়ে টেবিলের উপর থাকা পেপার ওয়েট হাতে নিয়ে কথাটা বলল ইমরান।
টাইয়ের নব ঢিলে করে একটু আরাম করে বসতে চাইলো সে। তবে তার চোখে মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠেছে।

ইমরান বসে আছে একজন ডিভোর্স আইনজীবীর সামনে। মধ্যবয়স্ক আইনজীবী তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন?”

“কারণ আমি আর ওকে জাস্ট নিতে পারছি না।”
“পরকীয়ায় আসক্ত আপনার স্ত্রী?”
“না না। অধরা ওমন মেয়েই নয়। ও যথেষ্ট ভালো মেয়ে।”
“তবে? আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?”

আইনজীবীর এমন কথায় কিছুটা নড়েচড়ে বসে ইমরান।
হাতের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
“এমন কিছুই নয়। আমাদের প্রেমের বিয়ে। দীর্ঘ সাত বছর সম্পর্ক থেকে বিয়েতে।”
“তবে?”

“সেদিন অধরার সাথে বাজারে গিয়েছিলাম। ও পাঁচ টাকার হিসেব মিলাতে না পেরে অস্থির হয়ে গিয়েছিল। পুরো রাস্তা হিসেব না মিলাতে পেরে আমার সাথে কথা বলেনি।”

“বাহ্ মশাই। আপনার স্ত্রী তো বেশ কড়া হিসেবি।”
“বিয়ের আগে ওর এই স্বভাবটা ভালো ছিল কিন্তু ইদানীং অসহ্য হয়ে উঠেছে।”

“তাই আপনি তাকে তালাক দিয়ে দিচ্ছেন?”
“সে তো আমার টাকার হিসেব নেয় না। সে নিজের টাকা খরচ করতে সে বার বার ভাবে৷”
“তাহলে আপনার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আপনি নিজের টাকা নিজে খরচ করুন।”

“সমস্যাটা হচ্ছে ও আমার ক্লাসের সাথে যাচ্ছে না। হ্যাঁ আমরা মিডেল ক্লাস ফ্যামিলি থেকে বিলং করতাম। ছাত্র জীবনে আমাদের এই পাঁচ দশ টাকা ছিল মাস শেষের সম্বল তবে এই না এখনো সেভ করেই চলবো।”
“কথাটা শেয়ার করুন তার সাথে। ডিভোর্স সমাধান নয়।”

“চেষ্টা করিনি এমন নয়। তাকে নিয়ে আমি কোনো পার্টিতে যেতে পারি না। তার বাসায় থাকলে তার দুহাতে থাকে মাছ মাংসের আঁশটে গন্ধ। ছুটির দিনে দুপুরবেলা তাকে কাছে পেতে চাইলে তার গা থেকে আসে ঘামের গন্ধ। কারণ সে রান্নায় ব্যস্ত।”
“আপনার স্ত্রী কী করেন?”

“কলেজ শিক্ষিকা।”
“সন্তানাদি আছে আপনাদের?”
“আমাদের বিয়ে হয়েছে সবে ন’মাস।”

“ঠিকাছে। আপনি প্রয়োজনীয় কাজ সেরে রেখে যান। যথা সময় আপনার স্ত্রীর কাছে লিগ্যাল নোটিশ চলে যাবে।”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরায় ইমরান। সিগারেটের ধোয়ায় যেন উড়িয়ে দিতে চায় তার মনের সকল অবসন্নতা।

চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সিগারেটের শেষ টান। তারপর বাইকে উঠে বসে চলে যায় তার গন্তব্যে।
পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসেছে অধরা। কলেজের মিডটার্মের পরীক্ষার খাতা দেখছিল। তখন শাশুড়ী এসে বললেন,
“পায়ের ব্যথা বেড়েছে। কালো জিরা, সরিষার তেল গরম করে এনে দিবে?”

পুরো দিন ক্লান্তি তখন অধরার দু পায়ে। তবুও উঠে গেল তেল গরম করতে। সাথে বসিয়ে দিলো চায়ের পানি। শ্বশুর -শাশুড়ীর জন্য চা নাস্তা আর গরম তেল নিয়ে চলল তাদের রুমের দিকে।

ইমরান যখন ফিরেছে অধরা তখন রাতের রান্নায় ব্যস্ত। কাতল মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট।
ইমরানের পায়ের শব্দ পেয়েই সে ছুটলো চা নিয়ে। হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত কোনো রকমে ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে এসেছে সে। ইমরানের যে আবার মাছের আঁশটে গন্ধ মোটেও পছন্দ নয়।

কিন্তু পাজি মাছের গন্ধ কী একবার সাবান জলে যায়?

যতই রাগ অভিমান থাকুক না কেন অধরার মুখ দেখলে সব রাগ পড়ে যায় ইমরানের। সে ভেবেছিল উকিল কে কল দিয়ে না করে দিবে। মানিয়েই নিবে কিন্তু চা’য়ের কাপ হাতে নেওয়ার সময় আবার সেই আশঁটে গন্ধ।

ইমরান কিছু না বলে চুপচাপ চায়ের কাপ হাত নেয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় আজ রাতেই অধরাকে সব জানাবে।
রাত যখন গভীর হচ্ছে অধরা ব্যস্ত খাতা দেখায়।

অনবরত বেজে চলেছে ইমরানের ফোন। তার বন্ধু রুমন কল দিচ্ছে বার বার।
ওয়াশরুম থেকে ফিরে ইমরান ফোন হাতে নিয়ে বাহিরে চলে যায়।
“বলছিস তালাকের কথা?”

“এখনো বলিনি।”
“কবে বলবি? আর মেলামেশা করিস না ওর সাথে। বাচ্চা পেটে থাকলে….. “
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি জানি।”

“আচ্ছা আমি রাখি তুই ওকে সব বলে দে। তালাক দিবি যে। সম্মতিতে হলে ভালো না হলে নাই।”
“আচ্ছা রাখ।”

বাহির থেকে ফিরে এসে ইমরান দেখতে পেল অধরা বিছানা ঠিক করে রেখেছে। হয়তো ওর খাতা দেখা শেষ। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে ইমরানের পাশ দিয়ে বাহিরে গেল অধরা। বেলি ফুলের হালকা সৌরভ ভাসছে ঘর জুড়ে। ফিরে এসে এক গ্লাস গরম দুধ ইমরানের দিকে এগিয়ে দিয়ে মুচকি হাসে অধরা।

তবে আজ তার হাসিতে ভুলবে না ইমরান। দুধের গ্লাস টেবিলে রেখে ইমরান অধরার হাত ধরে বলল,
“আমাদের এইবার ডিভোর্সটা নিয়ে নেওয়া উচিৎ। কারণ এভাবে আমি আর তোমাকে নিতে পারছি না।”


পর্ব ২

সাত বছরের এক কন্যা সন্তান রেখে প্রবাসী স্বামীর জমানো সকল টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়েছে গৃহবধূ।
ফেসবুকে এমন কিছু একটা শিরোনাম পড়ে মেজাজ গরম হয়ে গেল অধরার৷

পুরো খবর পড়ে জানতে পারলো বিয়ের পর স্বামী বিদেশ চলে যায় মাস খানেকের মধ্যে। এরপর বার দুয়েক ছুটিতে এসেছিল। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে রেখেছিল অনেক টাকা। স্বামী বিদেশ থাকার কারণেই স্ত্রীর হাতে উঠেছিল স্মার্ট ফোন। কথা বলার সুবিধার্থে কখনো কখনো ইমু, কখনো ম্যাসেঞ্জারে কথা হতো দম্পতির।

সেখান থেকেই কোনো ভাবে পরিচয় হয় এক ছেলের সাথে। প্রথমে আলাপচারিতা, বন্ধুত্ব পরবর্তীতে পরকীয়া।
মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে বার বার ছেলের সাথে মিলিত হয়েছে স্ত্রী। একসময় স্বামীর বাড়ির লোক কিছুটা সন্দেহ করলে পরদিন সকালবেলায় নিজ গহনা এবং জমানো টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় স্ত্রী।

খবরটা পড়ে বেশ মেজাজ গরম হয়ে আছে অধরার। ইমরান সেই কখন থেকে চেষ্টা করছে সে বলবে অধরা কে বলবে ডিভোর্স এর কথা৷ দুজনের মিউচুয়ালে হলে ঝামেলা কম হবে কিন্তু সাহস হচ্ছে না।

কিছুক্ষণ আগে তন্দ্রাঘোরে সে দেখছিল অধরাকে সব বলেছে কিন্তু অধরা রাজি নয়। উল্টো তার নামে মামলা দিবে বলেছে। স্বপ্নটা দেখে ঘেমে নেয়ে অস্থির ইমরান।

হাতে সিগারেট নিয়ে অধরার পাশে বসে বলল,
“এত রেগে আছো কেন?”
“মেজাজ গরম হচ্ছে।”
“কেন?”

“পরকীয়া কিংবা ডিভোর্স দাম্পত্য জীবনের কোনো সমস্যার সমাধান নয়।”
“যখন দুজন মানুষ একত্রে থাকতে না পারে তখন তারা কী করবে?”
“কিছুটা আত্নত্যাগ না করলে সংসার করা সম্ভব হয় না।”

অধরার কথায় কিছুটা নড়েচড়ে বসে ইমরান। এখন সময় হয়েছে, সুযোগ আছে কথাটা বলার। বেড সাইড টেবিলের উপর রাখা এশট্রে সিগারেট রেখে অধরার সামনাসামনি বসে। কিছুটা তার দিকে ঝুকে বসতেই অধরা মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল,

“ভুলেও চুমু খাবে না।”
অধরার কথায় নাক ফুলিয়ে হাসে ইমরান। অধরাকে পিছন ফিরিয়ে বসে হালকা হাতে ম্যাসাজ করতে থাকে তার কাধের দিকটায়।

“তো ম্যাম বলুন তো! আপনার কাছে আমাদের সংসার কেমন?”
“পারফেক্ট নয়। তবে চেষ্টা করি। তোমার সাথে আমার অনেক কিছু মিলে না। আমার যা পছন্দ তুমি পছন্দ করো না কিংবা তোমার যা পছন্দ আমি করে অভ্যস্ত নই তবুও তো চেষ্টা করি।”
“যেমন?”

“যেমন আমার বৃষ্টি পছন্দ না অথচ তুমি বৃষ্টি পছন্দ করো। তোমার মন রাখতেই আমি বার বার বৃষ্টিতে ভিজি এবং আমার চা পছন্দ তোমার কফি। তুমি বৃষ্টিতে ভিজে এসে আমার জন্য হলেও এক কাপ চা নিয়ে বসো।”
“আর?”

“এই যে! এখন করতেছো? তুমি জানো আমার কাধে পিঠে হঠাৎ করেই ব্যথা হয়। ঝিম ধরে থাকে আর তুমি ঠিক এই ভাবেই আমাকে স্বস্তি দাও।”

“যদি আমাদের মাঝে কখনো ডিভোর্স শব্দটা আসে?”

ইমরানের কথায় একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে অধরা। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেক্র বলল,
“আমি জানি আমি তোমাকে ঠিক মতো সময় দিতে পারছি না। আমার সময়টা প্রয়োজন। বাবা মা অসুস্থ তার উপর এক্সাম চলে বাচ্চাদের। কাজের মেয়েটাও এত কিছু বুঝে না কিন্তু আমি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। বাকীটা যা থাকে কপালে।”

ইমরান কিছু বলে না, খুব শক্ত করে অধরার মাথাটা চেপে ধরে বুকের বা পাশে।
এইতো ফাকা ফাকা জায়গাটা পূর্ণ লাগছে।
না সে অধরাকে ছাড়তে পারবে না।

হঠাৎ ম্যাসেজের শব্দে ঘুম ছুটে যায় ইমরানের। ম্যাসেঞ্জারে তার বন্ধুদের সাথে থাকা চ্যাটগ্রুপ থেকে অনবরত ম্যাসেজ আসছে।

সবার এক প্রশ্ন
“বলেছিস ডিভোর্স দিয়ে দিবি?”
ইমরান ছোটো করে জবাব দেয়,
“না।”

তখন অনেকেই এংরি রিয়্যাক্টে ভরিয়ে দিলো তার ম্যাসেজ। সোবহান তখন বলল,
“ভাই তোর বউ কি তোর স্ট্যাটাসের সাথে যায়? তুই কেন আমাদের কথা শুনছিস না?”
“ও সবার থেকে আলাদা।”

“আলাদা না ফকিন্নি স্বভাবের। দেখিস না ওর চাল চলন? আমাদের যখন হ্যাং আউট হয় তখন তোর ভাবী কী তোদের সাথে মেশে না?

অথচ তোর বউ আসবে হিজাব পরে, থাকবে দূরে দূরে। একটু রাত হলেই তাগাদা দিবে। এই কী পুরুষ মানুষের জীবন?”

“দেখ ওর চাল চলন নিয়ে কিছু বলবি না। আমার স্ত্রী। ওর সম্বন্ধে কিছু বলার আগে ভেবে চিন্তে বলিস।”
“এটাই সমস্যা ও তোর স্ত্রী। আর তুই আমাদের জিগরি দোস্ত। তাই বলতেছি ছাড় ওরে। হাজার মেয়ের লাইন লাগবে।”

ইমরান কোনো ম্যাসেজের রিপ্লাই করে না। নিজের হাতে ঘুমিয়ে থাকা অধরার মাথা সরিয়ে বালিশে রাখে। তার মনের চলে দু মন দু দশা।

সে কী আদৌও সুখে আছে? না সুখ নামের অভিনয় করছে?

সকাল হতে না হতেই শুরু হয়েছে অধরার। কাজের মেয়েকে দিয়ে সকালে বাবা-মা কে চা নাস্তা বানিয়ে দিয়েছিল। মায়ের বাতের ব্যথাটা বেড়েছে না হলে শাশুড়ি মা নিজেই সকালের নাস্তায় অধরাকে সাহায্য করে। শ্বশুর মশাই চা তো খেয়েছেন কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি ভালো ছিল না। কিন্তু সে সকালের চা-নাস্তা অনেক আনন্দের সাথে খায়।
তার জন্য রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিতেই বুঝতে পারলো যাচ্ছে তাই চা হয়েছে।

বাবা এসবে অভ্যস্ত নয়৷ তবুও অধরার কষ্ট হবে বলে চুপচাপ খেয়ে নিলো?

কান্না দলা পাকিয়ে উঠে এলো গলা অবধি। তাই অধরা কষ্ট হলেও দ্রুত নিজ হাতে সকালের খাবার বানিয়ে ফেলল।
গোসল সেরে যখন অধরা স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিল তখন ইমরান হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে টানতেই অধরা বলল,

“আমার এমনিতেই দেরী হচ্ছে। বাস পাবো না। এখন এসব করো না তো।”
অধরার কথায় বিরক্তি স্পষ্ট ইমরানের অপমানিত দু চোখে জমছে রাগ। গতকাল রাতে বলা বন্ধুদের কথাগুলো মনে হলো।
ওরা বলেছে প্রয়োজনে ওরা ডিভোর্স এর পর কাবিনের টাকা যদিও অধরা মাফ করে দিয়েছে সেই টাকা পরিশোধ করতে সাহায্য করবে।

তবুও ওকে রাখার দরকার নেই। কারণ ও আসলেই যোগ্য নয়।
বিছানা ছেড়ে উঠে ইমরান আইনজীবী কে ম্যাসেজ করে জানিয়ে দিলো কাজ সব করে রাখতে। আজ সে তালাক নামায় সই করে সরাসরি পাঠাবে অধরার কাছে।


পর্ব ৩

সকাল সকাল শাশুড়ি মায়ের চিৎকার, রাগীস্বরে কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অধরা।

আজ নতুন নয়, এ বাসার নিত্যদিনের কাহিনী এসব। শাশুড়ি তার বউয়ের উপর বিরক্তি প্রকাশ করে আর শ্বশুর খবরের কাগজ পড়তে পড়তে মুচকি হাসে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অধরা এগিয়ে গেল খাবার টেবিলের পাশে।

তার শাশুড়ি সাদা ভাতের প্লেট এবং ডিম ভাজি নিয়ে বসে আছেন। বলা বাহুল্য অপেক্ষা করছে অধরার জন্য।
অধরা এগিয়ে যেতেই বলল,

“এই মেয়ে, কোনো বাহানা না। চুপচাপ এসে বসো বলছি।”
হিজাবে ক্লিপ লাগাতে লাগাতে অধরা বলল,

“মা সত্যি আজ সময় নেই। আমার বাস ধরতে হবে৷ আমি রুটি রোল করে নিয়ে যাচ্ছি তাতেই হয়ে যাবে। পরে না হয়…… “

“নাও হা করো। রুটি নিতে নিষেধ করেছে কে? নিয়ে যাও। আগে ভাত খেয়ে নাও।”
“আপনি হাটুর ব্যথা নিয়ে আবার ভাত চড়িয়েছেন?”

“আতুরঘরে তিন দিন থাকার পরেই আমার শাশুড়ি আমাকে ধান বানতে দিয়েছিল। হাটুর ব্যথা নিয়ে ভাত রান্না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়।”
এই পর্যায়ে শ্বশুর বললেন,

“তোমার কপাল দেখো, তোমার শাশুড়ি তোমাকে নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে।”
“কেন দিবো না। ও কী কম করে আমাদের জন্য? এই কাজের মেয়ের রান্না খেতে কষ্ট হয় বলে নিজে রান্না করে। আমি দু মুঠো ভাত খাইয়ে দিলেই কী এমন হয়?”

অধরার চোখে হঠাৎ পানি এলেও প্রকাশ করলো না সে। তাগাদা দিয়ে বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। এতটা সুখ বুঝি তার পরাণে লাগেনি আগে৷

পরীক্ষা শেষ করে টিচার্স রুমে প্রবেশ করতেই অধরার ফোন বেজে উঠলো।
কথা শেষ করে অধরা খেয়াল করলো আড্ডা জমে উঠেছে সবার মাঝে।
গরম চা’য়ের কাপে চুমুক, সমুচার মুড়মুড় শব্দে।

বিষয় বস্তু বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ি। তাদের কথা বলতে বলতে একেকজন নাট ছিটকাচ্ছে।
মিসেস রহমান বললেন,

“মিস বিশ্বাস করবেন না আমার সাহেবের বাবা টয়লেট ফ্ল্যাশ করতে জানে না। কি যে অবঘেন্না।”
অংকের ম্যাম বললেন,

“আমি পিতপিতে স্বভাবের সেই আমার শাশুড়ি যত্রতত্র কফ ফেলে, ভুরভুর করে গ্যাস ছাড়ে। আর পারি না। ভেবেছি বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দিবো। কারণ বাসায় রাখলে আমার সন্তানের লেখাপড়া হচ্ছে না।”

একসময় অধরাকে জিজ্ঞেস করে তার পরিবারের কথা। সে কবে তার শ্বশুর শাশুড়ি কে বৃদ্ধাশ্রমে দিবে। যেহেতু সবাই মোটামুটি এমনটাই করার ভাবছে তাই সবাই মিলে যে কোনো একটা জায়গায় দিলে বিষয়টা মন্দ হয় না।
অধরা তাদের কথায় প্রথমে অবাক হয় তারপর বিরক্ত তবুও কন্ঠে নমনীয়তা রেখে বলল,

“আমার মা-বাবা সাথেই থাকবে। কারণ সংসারটা আমার শাশুড়ির আমিই বা এলাম কদিন হলো। তাছাড়া তারা যাই হোক বর্তমানে আমার অভিভাবক আমার স্বামীর মা-বাবা।”

তার কথায় তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মিসেস রহমান বললেন
“যাক আর বছর দুই। তখন এই নীতি কথা থাকবে না।”

“জানেন মিস, আমার এক ভাই। আমার ভাইয়ের সাথেই বাবা-মা থাকে। যদি তাদের কে ভাই বৌ না রাখে তখন আমি কী জোর করতে পারবো? আমার বাবা মা বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে এটা আমি ভাবতেও পারি না। যদি নিজের বাবা-মা কে না দিতে পারি তবে অন্যের বাবা-মা কে পাঠানোর চিন্তা করা কী উচিৎ?

আপনি বললেন না? সন্তানের পড়াশোনা ক্ষতি হচ্ছে অথচ আপনার স্বামীও কারো সন্তান। সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কতই না আত্মত্যাগ করেছে তারা। অথচ শিক্ষিত হয়ে, চাকরি পেয়ে কী লাভ হলো তাদের? যদি তাদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়?

আজ যে সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আজ তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে চাচ্ছেন, আগামী দিনে আপনার ভবিষ্যৎ কী?

ধরেন, আপনি এলাকার একজন মানুষ যার অনেক জমিজমা আছে, অন্য একজন ব্যবসায়ী। সেই ব্যবসায়ী শুধুই আপনাকে কটাক্ষ করে কারণ সে মনে করে তার মতোন ভালো আর দুটো নেই। কিন্তু দিনে দিনে তার ব্যবসায় মন্দা দেখা দিচ্ছে কারণ বাজারে নতুন একজন এসেছে। সে আর কেউ নয় আপনি। যে নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে নিজেই সব করছেন। আপনার লাভ লোকসান আপনার নিজের কাছেই রইল। অপর দিকে ব্যবসায়ীকে অন্যের থেকে ফসল কিনে, নানা উপায়ে প্রচারণা করে এরপর ব্যবসা করতে হচ্ছে।
কিন্তু এতে সে খুব একটা লাভ হচ্ছে না।

কারণ লাভের পরিমাণ খুব অল্প। ঠিক তেমনি শ্বশুর শাশুড়ি হচ্ছে জমি। যে আমাদের আগলে রাখছে তাদের সব’টা দিয়ে। তাদের অবহেলা করে আমরা কী সুখী হতে পারি?
আজ আমি বৌ কাল তো শাশুড়ি হবো।

হ্যাঁ মানি অনেক শাশুড়ি বৌকে অত্যাচার করে তাই বলে তো আর সবাই সমান নয়। বরফ মিশ্রিত
ঠান্ডা পানিও ধীরেধীরে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরম হয়ে যায়। আর রইল বাকী মানুষের মন!”
ইমরান চিন্তিত মুখে বসে আছে। তার পাশে বসে আছে সোবহান, আসিফ, শ্রাবণ সহ আরো দুই একজন।
সোবহান জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে ইমরানকে বোঝানোর জন্য।

অধরা যায় না ইমরানের লাইফ স্টাইলের সাথে। কর্পোরেট দুনিয়ায় একটা ভালো পদে চাকরি করা ছেলের বউ নিয়মিত যাতায়াত করে সামান্য বাসে। কালেভদ্রে বেড়াতে যায় না। দামী পোশাক পরে খুব কম। সব’চে বড় কথা ড্রিংকস করে না।

ইদানীং কালের কোনো মেয়ে আছে না কী? এই সোসাইটিতে? যে ক্লাবে যায় না। যত্তসব ন্যারো মেন্টালিটির কাজ।
সোবহানকে থামিয়ে দিয়ে শ্রাবণ ইমরানকে জিজ্ঞেস করলো,

“তুই আমাকে বল, তুই কেন ডিভোর্স চাইছিস?”
“কারণ আমি ফেড আপ। ওর মিডেলক্লাস ন্যারো মেন্টালিটির কারণে আমি ফেড আপ হয়ে আছি।”
“কী রকম?”
“সোবহান তো বলল।”

ইমরানের জবাবে নিঃশব্দে হাসে শ্রাবণ। কাধে হাত রেখে সে ধীরে ধীরে বলল,

“আলোতে নিলে চোখ ধাধানো আলো কিন্তু কাঁচেও পাওয়া যায় কিন্তু হীরে সব সময় ঝলমলিয়ে উঠে না। তাই কাঁচ আর হীরের মধ্যে পার্থক্য নিজে নিজে বুঝতে শিখেনে। না হলে হীরে হারিয়ে কাঁচে হাত কেটে বসবি।”

রাত তখন সাড়ে বারোটা। ইমরান ফিরেছে নেশায় বুদ হয়ে। ঘরে ফিরেই নিজের স্বাক্ষর করা ডিভোর্স পেপার ছুড়ে দিলো অধরা সামনে। জঘন্য ভাষায় গালি দিয়ে বলল,

“এই মুহুর্তে স্বাক্ষর করে বেরিয়ে যা ফকিন্নির বাচ্চা।”


পর্ব ৪

প্রেমের সম্পর্কের বিয়েতে যখন ভাঙ্গন ধরে তখন আশেপাশের মানুষ মুখ লুকিয়ে অট্টহাসি হাসে।
ভকভক শব্দে বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে ইমরান। পাশেই কাঠ কাঠ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ইমরানের বাবা।

ছেলের বেগতিক অবস্থা দেখেও এগিয়ে যায়নি তার মা। সে শক্ত হাতে নিজের বুকের সাথে অধরার মাথা চেপে ধরে আছেন।

অধরা তখন থরথর করে কাঁপছে।

ঘাড়ের পিছনে, কাধে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। মাথার ভিতর শ’ টনের বোঝা, শ্বাস নিচ্ছে।
খুব ধীর গতিতে। চোখের সামনে বেহুশ অবস্থায় পড়ে আছে তার স্বামী। আশেপাশে ছড়িয়ে আছে ডিভোর্স পেপার এর তিনটে পাতা। ঠোঁটের বা পাশে জমাট বাধা রক্ত হাত দিয়ে স্পর্শ করলো অধরা। কেমন শুকিয়ে জমে আছে রক্ত।

ইমরানের হাতে থাকা ঘড়িতে লেগে তার ঠোঁটে আঘাত লাগার পর শাশুড়ি মা তাকে যে ধরেছে আর ছাড়ার নাম নেই।

কিন্তু তাকে তো উঠতে হবে। এই পরিবেশে থাকা সম্ভব নয়। শাশুড়ীকে ছাড়িয়ে সে উঠে বসলো, চুলগুলো হাত খোপা করে এগিয়ে গেল ইমরানের দিকে।

এতক্ষণ চুপ করে থাকা তার শ্বশুর এবার বজ্রকন্ঠে তাকে ধমকের সুরে বলল,
“ঘরে যাও। ওকে ধরার প্রয়োজন নেই। সে কোনো স্বর্ণপদক জিতে আসেনি। বন্ধুদের সাথে মাতলামো করে এসেছে।

তোমার জন্য তালাক নামা বানিয়ে এনেছে।

ওর সেবা করার কোনো দরকার নেই। যাও ঘরে যাও। বিশ্রাম নাও, কাটা জায়গা পরিষ্কার করো।
ওকে থাকতে দাও ওখানেই। নেশা কেটে গেলে তখন বুঝতে পারবে ও কোথায়, তুমি ছাড়া ওর স্থান এ বাড়িতে কোথায়।”

শ্বশুর মশাইয়ের কথা শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অধরা। কিছুক্ষণ পর বলল,

“বাবা এখানে থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে। সারা রাত নিজের করা বমির মধ্যেই গড়াগড়ি খাবে। দূর্গন্ধ ছড়াবে।”
“এই ময়লা না হয় পরিষ্কার করলে, দূর্গন্ধ তুমি সরিয়ে দিলে কিন্তু ও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে যে ময়লা ঘাটছে, সেই দূর্গন্ধ কীভাবে দূর করবে?”

“সে যদি আমাকে বাধতে না চায় আমি কীভাবে বাধবো নিজেকে তার সাথে?”

অধরা দাঁড়ায় না, দ্রুত চলে যায় ওয়াশরুমে৷শাশুড়ি সাহায্যে ইমরান কে ঘরে নিয়ে পরিষ্কার করে তাকে। বিছানায় যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইমরান, অধরা তখন ব্যস্ত স্মৃতির চিঠিগুলো পড়তে।
ইমরানের সাথে প্রেমটা হুট করে হয়নি।

হয়েছিল বুঝে, শুনে, মেপে মেপে। কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের আবেগে ভেসে বেড়ালে চলে না। তাদের পদক্ষেপ নিতে হয় অনেক ভেবে চিন্তে।

দশ টাকার বাদাম কিনেও পার্কে আড্ডায় সময় নষ্ট করা যায় না, বিকেলটা থাকে দুটো এক্সট্রা টিউশনির জন্য।
মাস শেষে দুজনের দেখা, প্রিয় মানুষের জন্য রান্না করে নিয়ে আসা খাবার দুজনে ভাগ করে খাওয়ায় এক তৃপ্ততা আছে যা পাওয়া যায় না রেস্টুরেন্টের বার্গার কিংবা অন্য কোনো খাবারে।

একই এলাকায় বাসা ছিল দুজনের। অধরা মায়ের জন্ম দিনে সোনার দুল উপহার দিবে বলে তখন বিকেলে টিউশনি করাতো।

ফিরতে রাত হতো না তবে সন্ধ্যে হতো। সেই সন্ধ্যে বেলা কখনো অধরার বাবা বা ভাই এগিয়ে নিয়ে আসতো তাকে। বিড়ালছানার মতো একটা মেয়ে চুপচাপ হেটে যেত বাবা বা ভাইয়ের পাশে। রাস্তায় কুকুর দেখলে বাবা বা ভাই তাকে আগলে নিয়ে যেত এমন ভাবে যেন সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া বাচ্চা মেয়ে।

একদিন সন্ধ্যেবেলা তুমুল বৃষ্টি। টিউশনি থেকে বেরিয়ে বাবা বা ভাই কাউকে না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অধরা। বৃষ্টির থামার নাম নেই, হয়তো এজন্য কেউ আসতে পারেনি। কিন্তু এমন তো হয় না, কেউ না কেউ তো আসেই। সন্ধ্যে হচ্ছিলো অধরা ধীরে ধীরে এগুতে থাকে বাসার দিকে। কিন্তু রাস্তার মাঝে কয়েকটা কুকুরের ঝগড়া দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে যায়। সদ্য কলেজে পড়া অধরার চোখে মুখে ভয় দেখে টং দোকান থেকে এগিয়ে আসে ইমরান। কোনো কথা না বলেই চলতে থাকে তার আগে। অধরা তাকে চেনে না এমন নয়, এলাকার ভাই হিসেবে চিনে, সে বুঝতে পারে লোকটা তাকে সাহায্য করছে যা এখন তার খুব প্রয়োজন তাই চলতে থাকে তার পিছন পিছন।

বাকী রাস্তা কেউ কোনো কথা বলেনি, বাসার কাছাকাছি আসতেই তাদের সামনে একটা রিক্সা এসে দাঁড়ায়। রিক্সায় ছিল অধরার বড় ভাই। কোনো কথা না বলেই বোনকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমি কতটা ভয় পেয়েছি তোকে না পেয়ে। একা আসতে গেলি কেন? বৃষ্টির সময় যদি বিপদ হতো?”
এরপর ইমরানকে দেখে কৃতজ্ঞতার সুরে তাকে বলল,

“ভাই তুই বড্ড উপকার করলি। দাদী আছাড় পড়ে পা ভেংগে ফেলেছে। আমরা সবাই হাসপাতালে ছিলাম। ওকে আনতে যাবো তখন বৃষ্টি। তবুও যেতে যেতে দেখি এসে পড়েছে।
এগিয়ে দিয়ে গেলি এর জন্য অনেক ধন্যবাদ।”

“উল্টো কেনো ভাবলেন না? আমি তো ক্ষতিও করতে পারতাম?”
“চা মামার কাছে যখন জিজ্ঞেস করতে গেছিলাম তখন সে বলল কুকুরের ঝগড়ার কথা। তাছাড়া তোকে অবিশ্বাস করার কিছুই নেই।”

রাত পেরিয়ে ভোর হচ্ছে। অধরা সালোয়ার কামিজ পাল্টে শাড়ি পরেছে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সে কিছু একটা মনে মনে আওড়াচ্ছে।

ইমরানের যখন ঘুম ভাংলো তখন বেলা প্রায় অনেক। ঘরটা ফাঁকা ঠিক যেমন লাগছে তার মাথার ভিতরটা। এ সময় অধরা কখনো বিছানায় থাকে না কিন্তু বাসায় থাকে। বার কয়েক ডাক দেওয়ার পরও কোনো খোঁজ না পেয়ে ইমরান বেরিয়ে এলো রুম থেকে।

এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে ঘরে ফিরে এসে দেখলো,

ঘরের কোথাও অধরা নেই, না আছে অধরার কোনো স্পর্শ। হুট করে অধরা যেন মিলিয়ে গেছে যেমনটা মিলিয়ে যায় এক রাশ নিস্তব্ধতায় দীর্ঘশ্বাস।”


পর্ব ৫

আমার মা যখন পাশের বাড়ির কাকুর সাথে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে তখন আমার বয়স মাত্র সাত বছর।
সাত বছর হলেও স্পষ্ট মনে আছে সেদিন স্যান্ডো গেঞ্জির সাথে নীল হাফ প্যান্ট পরেছিলাম।
বাবার ইনকাম খুব সীমিত ছিল, মায়ের ইচ্ছে তখন আকাশচুম্বী। গনগনে আগুনের মতোন ছিল আমার মায়ের শরীরের রঙ। রূপের আগুনে যে কাউকে পুড়িয়ে ফেলতো সে।

বাবা সামান্য ব্যবসায়ী। তবে ছিলেন সৎ এবং এক কথার মানুষ। মায়ের সব আবদার মেটাতে হিমশিম খেলেও মুখে হাসি দেখতাম। কিন্তু মা রইলেন না। কারণ দিনের বেলা তার ঘরে পরপুরুষের অগাধ চলাফেরায় একটা ঝামেলা ছিলাম মাত্র।

তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি। চারের ঘরের নামতা ভুল করায় মা আমাকে বিবস্ত্র করে গেটের বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন।

আজ পুরো আঠারো বছর পর, আমার মায়ের কিন্তু সেই রূপ নেই। চামড়া কুঁচকে গেছে। মাথায় চুলে সাদা রং।
আশ্চর্য হলেও সেই মা এখন আমার বাবার জন্য কাঁদে৷ বিগত সতেরো বছর সময় ধরেই কাঁদছে সে।
অথচ আমার বাবা বেচারা কতই না কষ্ট নিয়ে দুনিয়া ছেড়েছেন।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে চুপচাপ বসে রইল অধরা। সামনে বসে থাকা সুদর্শন যুবক সম্পর্কে তার কেউ নয় কিন্তু অনেক কিছু।

একটা সময় তার কাছে টিউশন পড়তো অধরা।
ব্যক্তিটার চোখে মুখে আলাদা এক জ্যোতি উপচে পড়ছে। সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে অধরা বলল,
“রঙ্গান ভাই আমি এসব জানি।”
“তুই কী জানিস আমার নামের মানে কী?”

“তুমি মানেই তো রঙ, রংধনুর সাত রঙ৷ তাই হয়তো তুমি আশেপাশে থাকলে প্রত্যেকটা মানুষ বড্ড সুখী হয়।”
“ইমরান কেন এমন করছে? তুই তো ওকে ভালোবাসিস৷”
“সোনাতেও খাঁদ পড়ে আর রইল ভালোবাসা….. “
“সময় দে।”

“ডিভোর্স পেপার সাইন করে দিয়েছে ও।”
“চাচাজান জানে? আর তোর ভাই?”
“না, কিছু বলিনি।”
“কী করতে চাইছিস?”
“জানি না।”
“আজ কী তোর অফ ডে?”

“টিচারদের অফডে হয় না। আজ সরকারি ছুটি।”
“তোদের ছুটি, আমার কী? আমার তো ভাই ছুটি নেই। রাতে ডিউটি।”
“তোমার কাছে রিভলবার আছে?”
“আছে।”
“সিভিলেও রাখো?”

“নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। কেন? আত্নহত্যা করবি না কী? দেখ ভাই ওসব ন্যাকামো আর না। সেবার কিন্তু বহুত প্যারা দিয়েছিলি।”

“চল তোকে ফুচকা খাওয়াই। তারপর ইমরানের সাথে দেখা করে সব’টা মিটমাট করিয়ে দিয়ে আসবো। তোদের কী যে হয় মাঝেমধ্যে!”

রঙ্গান কথাটা বলে বিল পে করতে উঠে দাঁড়ায়। অধরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল,
“এক তরফা কষ্ট পেতে কেন চলে আসো প্রতিটা ডাকে?”

আমি যদি ঘড়ি চিনতে পারতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইবো
কেমন যাই মিস্ত্রীর কাছে?
মন আমার দেহঘড়ি
সন্ধান করি, কোন মিস্ত্রী বানাইছে……

রঙ্গান যেন নিজের মাঝে নিজেই আস্ত এক দুনিয়া। কারোর কোনো কথা তাকে আঘাত করতে পারে না। কী সুন্দর না জীবনটা? কে বলবে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা রাতভর ডিউটি করে বিশ্রাম না নিয়ে ছুটে এসেছে তার একটা মাত্র কলে!

আপন মনে তখনো গান গেয়েই চলেছে রঙ্গান। গ্রামের বাড়ি একই এলাকার হওয়ায় তাদের পরিবারের সাথে বেশ ভালো সখ্যতা রয়েছে। এমনকি ইমরান- অধরার বিয়েতে দুই পরিবারের কাছে ঘটকের কাজ সে করেছিল। অথচ সচরাচর কেউ কী বুঝে?

সবার জীবনে রঙ লাগানো এই রঙ্গান নামের মানুষটার পুরোটা জীবন রঙহীন।
“দাঁড়িয়েই থাকবি?”
“বাইক এনেছো?”
“না গরুর গাড়ি। চলবে ম্যাম?”
“হুম।”
“মন খারাপ করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“হয়তো।”
“তোর কী দাঁতে পোকা?”
“আমি ঠিক আছি। আমাকে হাসাতে এমন লেইম জোক্স বলিয়ো না।”
“আচ্ছা তবে চল।”

নিজে হেলমেট পড়ে একটা এগিয়ে দিলো অধরার দিকে। অধরা তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে। শুধু মনে মনে ভাবছিল
“এমন একটা মানুষকে স্বপ্ন ফিরিয়ে দিতে পারলো কী করে!”

অধরাকে বাসায় না দেখে তেমন একটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করেনি ইমরান। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে তাদের আড্ডা স্থানে।

আজ সরকারি ছুটির দিন। তাই পূর্ব প্ল্যান অনুযায়ী ছোটো একটা গেট টুগেদার হবে পাশের পিকনিক স্পটে।
বাসা থেকে বেরিয়ে বাইক নিয়ে প্রথমে ইমরান চলে গেল ডিলারের কাছে। কচকচে কয়েকটা হাজার টাকার নোট বিনিময়ে নিলো

ইমরান কোনো জবাব দেয় না। ফোন বের করে বার বার দেখছিল অধরা কল দিয়েছে কী না।
কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও অধরার কোনো কল এলো না। কিছুটা মন খারাপ হলেও সে নিজেই নিজেকে বলল,
সাত বছরের অভ্যেস সময় তো লাগবে। অধরার অভ্যেস ছাড়তে পারলেই সোনালীকে আপন করে নিতে পারবে।
অধরার মতো ব্যাকডেটেড মেয়ের সাথে আর যাই হোক বর্তমানে তাল মিলিয়ে চলা যায় না।

সবার সাথে চলতে হলে সোনালীর মতোন খোলামেলা মনের মেয়ে প্রয়োজন। বুঝতে দেরি হলেও সোবহান তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে।
এসব ভেবেই কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলো ইমরান। কারণ সামনে সোনালী তার ভবিষ্যৎ আর অধরা প্রাক্তন।


পর্ব ৬

রঙ্গান হাতে একটা হাওয়াই মিঠাই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অধরার সামনে।
অধরা নাক সিটকে বলল,

“এসব খেতে তোমার কেমন লাগে ভাই?”
“দারুণ লাগে।”
“ভালো লাগে?”
“হুম। তাইতো বললাম দারুণ লাগে।”
“তুমি কী জানো দারুণ একটা নিনার্থক শব্দ?”
“মানে?”

“মানে হচ্ছে না বোধক শব্দ হচ্ছে দারুণ। ভালো লাগার ক্ষেত্রে তুমি কখনো দারুণ ব্যবহার করতে পারবে না। করতে হবে খারাপ লাগার ক্ষেত্রে।”

অধরার কথা শুনে বুকের কাছটায় আড়াআড়ি ভাবে হাত রেখে কপাল কুঁচকে রঙ্গান বলল,
“তুই প্রফেশনে টিচার। আমি জানি। তাই বলে এমন ছোটো খাটো বিষয়ে ভুল ধরিস না।”
“নিত্য দিনে ব্যবহার করছি। ভুলগুলো না শোধরালে কি হবে?”

“হয়েছে। বুঝেছি, তুমি ভীষণ ভালো কথা বলেছো। হয়েছে এবার থামো।”
“এই তো আবার ভুল বললে। ভীষণ শব্দটাও তো নিনার্থক।”
রঙ্গান হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,

“আমার দাদী। মাফ চাই। হয়েছে। এই আমি মুখ বন্ধ করলাম। আর কিছুই বলবো না। চল তোর বাসায় যাবো। তোর শাশুড়ি মায়ের হাতের কড়া লিকারের দুধ চা খাই না অনেক দিন।”
“চা খাওয়া……..

অধরা কথা শেষ করার পূর্বে রঙ্গান ওর মুখে জোর করে হাওয়াই মিঠাই ঠেলে দিয়ে বলল,
” আর একটা কথা বলবি তো ভালোবাসার গুলি দিয়ে এক্ষুণি ক্রসফায়ার করে দিবো।”
ইমরান নিজের প্রতি নিজের রাগে ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছে।

সে কী করে এমন ভুল করতে পারলো?
ভুলে ভুলে সে সোনালীকে অধরা বলে ডাক দিতে পারলো?

তার মন মস্তিষ্কে অধরা ছেয়ে আছে। অবচেতন মন বার বার কেন অধরাকে খুঁজছে।
রেস্ট রুমে এসে হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ইমরান।
ফোন হাতে নিয়ে দেখতে পেলো বেলা তখন তিনটে বেজে দশ মিনিট।
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ইমরান ভাবতে লাগলো
জীবন এর মানে আদৌও কী?
সংসার মানেই বা কী?

ছোটো বেলা থেকে দেখেছে বাবা সারা দিন অফিস থেকে ফিরে এসে প্রথমে মায়ের মুখ দেখতো।
মায়ের যতই কাজ থাকুক না কেন বাবা আসার সময় হলে সে চিরুনিটা টেনে নিয়ে সামনের চুলগুলো আঁচড়ে নিতো।

হাত মুখ ধুয়ে চোখে পড়তো হালকা কাজল। শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়ে অপেক্ষা করতো স্বামীর জন্য।
ইমরানের বাবাও যেন কম ছিল না। তিনি সন্তানদের জন্য প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। এর কোনো ভুল হয় নি।

চাকরির শেষ দিন অবধি সে তার স্ত্রী সন্তানদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে এসেছেন।
যখন নতুন নতুন কোণ আইসক্রিমগুলো এদেশে এলো তখন তার বাবা তাদের জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসার পর কী না কান্ড ঘটিয়েছিল তার মা।

ভেবেছিল কিছুক্ষণ পর খাবে, এদিকে আইসক্রিম গলে বিচ্ছিরি অবস্থা। দুই ছেলে মেয়ের আইসক্রিম খাওয়া তখন শেষ। স্ত্রী খেতে পারেনি বলে তার বাবা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বের হয়েছিল।

ভিজে চুপচুপে হয়ে যখন আইসক্রিম হাতে ফিরেছে তখন বাড়ির সবাই প্রায় ঘুমে। পরীক্ষা থাকায় ইমরান পড়ায় ব্যস্ত ছিল। পানির জন্য উঠে এসে দেখলো

তার মা তার বাবার মাথার চুল নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিচ্ছে, হালকা স্বরে কঠিন দৃষ্টিতে চলছে শাসন।
আর তার বাবা আইসক্রিম বাড়িয়ে দিয়েছে তার মায়ের মুখের সামনে।
তবে কী ওটাই ভালোবাসা, ভালো থাকার টনিক ছিল?

মায়ের গায়ের ঘামে ভেজা গন্ধ, মাছের আঁশটের গন্ধ তো কখনো বাবার কাছে অসহ্য লাগেনি। কখনো মা যদি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেত বাবা তখন নিজ হাতে খাইয়ে দিতো।
অধরাও তো ঠিক তার মায়ের মতোন। ইমরান যখন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে তখন কোথা থেকে যেন দৌড়ে আসে। হাতে থাকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি।

ইমরান যে অবধি তার মাথায় হাত না রাখে সে অবধি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
ইমরান ভালোবেসে সে কাজটা এতদিন করতো। কিন্তু যখন থেকে সোবহান ওদের সাথে মিশতে শুরু করেছে তখন থেকে সে যেন তার অধরাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
অধরার অধরায় আজ জান পরাণ বেরিয়ে যাচ্ছে ইমরানের।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি।
যখন ঘুম ভাংলো তখন মনে হলো তার সারা শরীর ভিজে আছে। হ্যাঁ সে ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে আছে।
হাত ঘড়িতে সময় দেখতে পেল রাত একটা বেজে বারো মিনিট।
ইচ্ছে হচ্ছিলো এক্ষুণি সে বাসায় চলে যাবে। কিন্তু বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। যাওয়া সম্ভব নয়।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইমরানকে থেকে যেতে হলো।

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আনমনে ইমরান গেয়ে উঠলো।,
“তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও—
আমি তােমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে, আর কিছু নাহি চাই গাে
আমারো পরাণো যাহা চায়।
তুমি তাই, তুমি তাই গো…….

আমারো পরাণো যাহা চায়।”

সকাল হতে না হতেই ইমরান ছুটলো তার বাড়ির দিকে। ফ্ল্যাটে এসে দেখতে পেলো তালা ঝুলছে তাদের দরজায়। পাশের ফ্ল্যাটের লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো সবাই হাসপাতালে।
কারণ ইমরানের জীবন থেকে হয়তো ততক্ষণে ভালোবাসার একটা অংশ মুছে যাচ্ছে।


পর্ব ৭

ইমরান যখন হাসপাতালে পৌঁছেছে তখন তাকে জানানো হয় রোগীর অবস্থা আশংকাজনক।
রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।
যখন সে ধীরে ধীরে কেবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন জানতে পারে গতকাল রাতে আনা বাইক এক্সিডেন্টে ভর্তি রোগী মারা গেছেন।

অন্য জনের অবস্থা আশংকাজনক। ইমরান এই রক্ত জিনিসটা নিতে পারে না। তার প্রচন্ড গা গুলিয়ে উঠে এসবে।

এইতো বছর দুয়েক আগের কথা। অধরাকে সে নিয়ে গিয়েছিল ভ্যাক্সিন দিতে। পালিত বিড়াল কামড়ে দিয়েছিল অধরাকে। খুব একটা রক্ত না পড়লেও কেউ রিস্ক নিতে চায়নি। ভ্যাক্সিন দিতে গিয়ে অধরা নড়ে চড়ে বসতেই হালকা রক্ত বেরিয়ে আসে সুঁচের আঘাতে।

ব্যস সেই রক্ত দেখেই ইমরানের পৃথিবী উল্টো পাল্টা লাগছিল। আজ চোখের সামনে রক্তাক্ত মানুষ দেখেও নিজেকে সামলে নিতে পারলো না।

গতকালকের নেশা এখনো কাটলেও মাথায় একটা ভারী ভাব রয়েই গেছে। এর মাঝে এত মানসিক চাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইমরান যখন তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলো তখন কোথা থেকে অধরা এসে তাকে দু হাতে আগলে নিলো।

অধরাকে দেখে ইমরান কিছুটা স্বস্তি পেয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে পাশের ওয়েটিং সিটে বসে।
“তোমার কী শরীর খারাপ লাগছে।”

অধরার প্রশ্নে ইমরান কিছুক্ষণ চুপ থাকে। এরপর অধরার দিকে তাকিয়ে দেখে তার পরণে বাসার পোশাক।
সালোয়ার কামিজ পরে আছে। অধরার ওড়নায় সে নিজের মুখ মুছে, চশমাটা মুছে নিয়ে বলল,
“উহুম। পানি হবে তোমার কাছে?”
“হুম।”

“এখানে কেন? কার কী হয়েছে?”
“তুমি রাতে কোথায় ছিলে?”
“ওয়েস্টার্ন রিসোর্টে।”
“ওহ্।”
“বললে না তো!”
“কি?”

“আশ্চর্য! কার কী হয়েছে? বাবা- মা কোথায়?”
“মা আছে সামনে। বাবার কার্ডিয়াক এট্যাক হয়েছে।”
“মানে? বাবার এট্যাক হয়েছে আর তুমি আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি?”
“তোমার ফোন বের করে দেখো। জবাব পেয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর বাবাকে একটা পরীক্ষা করাতে নিবে। হার্টে ব্লক আছে কী না দেখার জন্য।”
“বাবার সাথে দেখা করবো।”
“এখন প্রয়োজন নেই।”

ভারী পুরুষালী কন্ঠে কেউ ইমরানকে নিষেধ করে।

সামনে তাকিয়ে দেখে রঙ্গান দাঁড়িয়ে আছে। ইমরানের সাথে কুশলাদি বিনিময়ের দিকেও যায়নি রঙ্গান। অধরা কে বলল,

“তৃষ, আপাতত প্রয়োজন নেই দেখা করার। চাচা হাইপার হলে সমস্যা হবে। তুই চল ও এখানেই অপেক্ষা করুক। চল আমার সাথে।”

ইমরানের জবাবের অপেক্ষা না করে রঙ্গান চলে যায় কেবিনের দিকে।

গতকাল বিকেল থেকে রাত আটটা অবধি রঙ্গান অপেক্ষা করছিল ইমরানদের বাসায়। ইমরান আসবে তার সাথে কথা বলবে এবং কী সমস্যা জানার চেষ্টা করবে। কিন্তু ইমরানের ফিরেনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরেও যখন ইমরান ফিরেনি তখন রঙ্গান ডিউটিতে চলে যায়।

ইমরানের বাবা গতকাল সন্ধ্যে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিল। তবে অধরার অবস্থা দেখে কিছু বলেনি। রঙ্গান, বা ইমরানের বাবা চেষ্টা করেছে গতকালের সন্ধ্যে যেন অনেকটা আনন্দের মাঝে কাটে।
রাত যত গভীর হতে থাকে ব্যথাটা বাড়তে থাকে। ছেলের প্রতি জমা অভিমানের কারণেই সে অসুস্থতার কথা জানায় নি।

তিন পাওয়ারের টেনিল খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু রাত দুটোর দিকে তার বুকে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ঘামতে থাকে সে।

উঠে বসে, দাঁড়িয়ে কোনো ভাবেই যখন শান্তি পাচ্ছিলো না তখন গোসল করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ঠিক সে সময় ইমরানের মা জেগে উঠে। বুঝতে পেরে অধরাকে এক ডাক দিতেই অধরা দ্রুত চলে আসে। দুজন মেয়ে মানুষ মাঝ রাতে অসুস্থ মানুষকে নিয়ে কোথায় যাবে বুঝতে পারছিল না। কারণ তাদের একমাত্র ছেলের ফোন তখন বন্ধ।

বাধ্য হয়েই অধরা তার ভাই এবং রঙ্গান কে কল দেয়। অধরার ভাই আগে পৌঁছে গেলেই তাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসে অধরা।

কিছুক্ষণ পর রঙ্গান ইমরানের মা কে নিয়ে পৌঁছায়৷
গতকাল অবধি যা হয়েছে তা নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিল না অধরার ইমরানের প্রতি তবে আজ চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে।

জন্ম নিচ্ছে তীব্র অভিমানের।

ডক্টর জানালেন হার্টে ৯৮% এর দুটো ব্লক রয়েছে। দ্রুত সার্জারী করাটাই উত্তম। এটি অবশ্যই ব্যয়বহুল হবে।
পেশেন্টের যা অবস্থা তাতে যত দ্রুত হয় তত ভালো।

রঙ্গান তখন ছিল না। জরুরী কাজে বেরিয়েছে। অধরা এবং ইমরান যখন জানতে পারলো তখন দুজন চুপচাপ ছিল।

ইমরান নিজে জানে তার কাছে এত টাকা নেই। বাবা পেনশনের টাকায় নিজ ইচ্ছেয় বাড়ি করেছে। এই মুহূর্তে এত টাকার জোগাড় করা আদৌও কী সম্ভব?
অফিস থেকে এক দিনের ছুটি নিয়েছিল ইমরান৷ আগামীকাল তাকে অফিসে যেতে হবে। চেষ্টা করবে লোন নেওয়ার। তাছাড়া আর উপায় তো নেই। পুরোদিন ইমরান চিন্তা করেছে সে সময়ে অসময়ে কতই না টাকা নষ্ট করেছে৷ এইতো গত পরশু সে হাজার বিশেক টাকা নষ্ট করেছে মাত্র বন্ধুদের কে বিয়ার খরচ দিয়ে। অথচ আজ বিশ হাজার টাকা থাকলেও অনেকটা এগিয়ে যেত।

অফিস শেষে যখন ইমরান বাবার কাছে হাসপাতালে গেল তখন রিসিপশন থেকে তাকে জানানো হলো তার বাবাকে কিছু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে নেওয়া হয়েছে। কারণ কাল দিন পর তার অপারেশন।
এবং তার হাতে একটি রিসিট দিয়ে বলল সই দিতে।

“টাকা কখন পেমেন্ট হলো?”

“উনার ছেলের স্ত্রী মিসেস অধরা ওয়াহেদ কিছুক্ষণ পূর্বে আপাতত দুই লক্ষ টাকা পে করেছে। বাকীটা অপারেশন এর দিন করবে বলেছে।”

ইমরান রিসিট হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। অধরার কী আদৌও কোনো প্রয়োজন ছিল তার বাবার জন্য এসব করার? যেখানে তাদের ডিভোর্স ফাইল হয়েছে।


পর্ব ৮

ওয়েটিং সিটে বসে প্রায় ঘুমিয়ে গিয়েছিল অধরা। শাশুড়ি মায়ের কাঁধে মাথা রেখে। ক্লান্তিতে তার দুচোখ আর সঙ্গ দিচ্ছে। ইমরানের মা কিছুটা চেপে বসে অধরাকে একটু ভালো ভাবে বসে থাকতে দিলো। তার সামনের সিটে বসে থাকা ভদ্র মহিলা জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার মেয়ে?”
“জি।”

“বিয়ে দিয়েছেন? কিছু না মনে করলে একটা কথা বলি?”
“বলুন।”
“আমার কাছে ভালো একটা সম্বন্ধ আছে। ছেলে ভালো, চাকরি করে, বাবা মায়ের এক ছেলে।”
“আচ্ছা।”
“যদি রাজি থাকেন তো….. “
“ছেলে বিয়ে করিয়ে এনেছি এই মেয়ে।”
“ঠিক বুঝলাম না।”

“আমার ছেলের বউ।”
ইমরানের মায়ের জবাবে ভদ্র মহিলা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।
বোকা বোকা হাসি দিয়ে বললেন,
“ছেলের বউকে কেউ মেয়ে বলে পরিচয় দেয় না।”
“দেয় না, তবে আমি এবং আমার স্বামী দেই। কারণ এই মেয়েটা তো আমাদের মা-বাবা বলে ডাকে। তবে কেন সে আমার সন্তান নয়?”

“আপনার মতো সবাই চিন্তা করলে!”
কথোপকথনের মাঝে রঙ্গান এসে ইমরানের মায়ের হাতে কফি দিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ইমরানের বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেতে হবে। আজ তাই রঙ্গান ছুটি নিয়েছে। ইমরান তখন রক্ত দিতে এসেছে তাদের সাথে ব্যস্ত।
প্রথমে চিন্তা করেছিল রক্ত কিনে আনবে। কিন্তু এর বিরোধিতা শুরু করে অধরার বাবা।
কারণ রক্ত কেনা-বিক্রি করা উভয় হারাম।

অধরার ভাই ডোনার নিয়ে এসেছে।
রঙ্গান চলে যাওয়ার পর ভদ্রমহিলা আবার বললেন,
“এটা আপনার ছেলে? মা-শাহ্-আল্লাহ্, ছেলে তো বেশ সুন্দর।”
“জি, এটাও আমার ছেলের মতোন।”

সোনালী এইবার দিয়ে সতেরো বার কল দিয়েছে। ইমরান প্রতিবার কেটে দিচ্ছে। আজ সোবহানের বাসায় তাদের ছোট্ট একটা গেট টুগেদার রয়েছে। সেখানে যাবে কী না এর জন্য। কিন্তু ইমরান আগেই মানা করে দিয়েছিল। সে যতই খারাপ ছেলে বা সন্তান হয়ে থাকুক না কেন? এতটাও না যে তার বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে রেখে সে আড্ডা দিতে পারবে।

পৃথিবীর সব থেকে বাজে সন্তানের পক্ষেও এটা সম্ভব নয়।

বিগত কয়েকদিন যাবত একটা অপরাধবোধ তাকে ঘুমোতে দেয় না। সে জানে না সে রাতে নেশা করে এসে কী কী করেছিল বাসায় তবে এটা নিশ্চিত তার বাবার অসুস্থতা এই কারণেই অনেকটা বেড়েছে।
যদি রাতে রিসোর্টে না থাকতো তবে হয়তো বাবাকে আরো আগে হাসপাতালে নিতে পারতো।
ডোনারকে ভিতরে রেখে এসে বাহিরে দাঁড়িয়ে কল রিসিভ করে ইমরান।

ফোনের অপরপাশে তখন হাই ভলিউমে হিন্দি গাল চলছে।
“কী মশাই আজ আসবেন না?”
“না।”
“কেন?”

“সোবহান বলেনি? আমার বাবার আজ সার্জারী আছে।”
“অহ আচ্ছা, জানতাম না। আংকেল এখন কেমন আছে?”
“অপারেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
“আপনি কী আমার প্রতি রেগে আছেন?”
“জি না।”

“সেদিন দুপুরে কোথায় হাওয়া হয়েছিলেন? দুপুরের পর আপনাকে পেলাম না।”
“রিসোর্টেই ছিলাম। কিছুটা ক্লান্তি ছিল তাই ঘুমিয়েছিলাম।”
“আমি আপনার খোঁজ করেছিলাম কিন্তু আপনি নিরুদ্দেশ ছিলেন।”
“জি। মাঝেমধ্যে নিরুদ্দেশ হতে হয়।”

“একটা কথা বলবো?”
“বলুন।”
“আমাদের মাঝে সম্পর্ক কী?”

“আমরা দুজনেই সোবহানের বন্ধু। সোবহান আমার বন্ধু ঠিক তেমনি আপনি সোবহানের। তাই বলতে পারেন বন্ধু।”
“যদি বলি এর থেকে…… “
“কিছু মনে করবেন না সোনালী আমি ব্যস্ত। রাখছি।”

ইমরান কল কেটে দিয়ে পা বাড়ায় বাহিরের দিকে। ভুল একবার করাই শ্রেয়। বার বার নয়। কারণ এবার সময় এসেছে ভুল শুধরে নেওয়ার।

The fog is now dead.
The last point of which is the deficit in the universe.
The first rays of the sun came to the earth and disappeared.
But why so many evenings around?
Love! Why aren’t you and I together?

“সামিয়ার লেখা এখনো পড়িস?”
রঙ্গানকে পাশে বসতে দিয়ে অধরা বলল,
“পড়া হয় মাঝেমধ্যে। বেশ ভালো লিখে কিন্তু মেয়েটা।”
“হুম।”

“ভাই জানো অনেকেই এখানে মনে করছে শাশুড়ি মায়ের মেয়ে আমি আর তুমি আমার প্রেমিক।”
বলেই মুখে হাত দিয়ে হাসতে থাকে সে। তার হাসির দিকে ভ্রু-কুঁচকে তাকিয়ে রঙ্গান বলল,
“কোন ভাইরাস এই চিন্তা ভাবনা করে?”
“রিসিপশনের মেয়েটা আরো অনেকে।”

অধরার হাসি ততক্ষণে থেমেছে কারণ রঙ্গান তার ডান হাত নিজের দু হাতে আবদ্ধ করে বলছিল,
“তুই আমার বোন নয়। তোকে আমি বোন বলে পরিচয় দেই না কারণ তুই বোনের থেকে অনেক বেশি তবে তুই আমার প্রেয়সীও না। প্রেয়সীর থেকে অনেক নিচে। আমার দিক থেকে যদি প্রেমিকের এক ইঞ্চি এক তরফা ভালোবাসা তোর প্রতি থাকতো

তবে আজ তুই আমার স্ত্রী হতে বাধ্য থাকতি। এবং ইমরান কখনোই আমাদের মাঝে আসতে পারতো না।”
অধরা মুচকি হেসে বলল,
“সত্যি কী তাই?”


পর্ব ৯

রঙ্গান অধরার মাথায় হাত রেখে বলল,

“নিজের খেয়াল রাখিতে শিখ এবার। ঠিক মতোন খাবার খেয়ে নে। তুই অসুস্থ হলে আন্টি আরো ঘাবড়ে যাবে।”
“ভাই খুব ভয় লাগছে। অপারেশন এখনো শেষ হলো না যে।”

“সময় লাগবে কিছুটা। শোন আমি বাহিরে যাচ্ছি। দেখি ইমরান কোথায়।”
“একটা উপকার করবে?”
অধরার হাতে ছোট্ট একটা দই ধরিয়ে দিয়ে রঙ্গান বলল,

“ওকে খাওয়াতেই নিয়ে যাচ্ছিরে। তোর বলতে হবে না। কিছু না খেলে ও নিজেও পড়ে যাবে। যাইহোক তুই খেয়ে নে।”

ততক্ষণে অধরার মা খাবার নিয়ে এসেছে। রঙ্গান চলে যাওয়ার আগে অধরার মাথায় পুনরায় হাত রাখে। পরম স্নেহ অধরা অনুভব করে এই স্পর্শে।

খুব কী ক্ষতি হতো রঙ্গান তার আপন ভাই হলে?
“রঙ্গান এখন কই যাচ্ছো?”
অধরার মায়ের প্রশ্নে রঙ্গান জবাব দিলো,

“এই তো সামনে।”
“একটা মার দিবো। এখন খাওয়ার সময় আর তুমি পালাচ্ছো? এসো খাবে এসো। ইমরান কই?”
“আমি তাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম কাকী।”

“যেতে হবে না। কল দাও। আসো খেয়ে নিবে আসো। আমি ইমরানের মা কে নিয়ে আসছি। অধরা যেতে দিস না কিন্তু ওকে। ও একবার গেলে আর খেতে আসবে না।”

অধরার পরিবার এখনো জানে না ইমরান এবং অধরার ঝামেলা সম্পর্কে।
তারা জানে আট দশটা স্বাভাবিক সম্পর্কের মতোন এখনো ঠিক সম্পর্কটা।

ইমরান ফিরে এলে রঙ্গান ইচ্ছে করেই সরে বসে। অধরার পাশে আজ অনেকদিন পর বসেছে ইমরান৷
এখন তো সময় হয় না, একদিকে বাবার অপারেশন এর জন্য টাকার ব্যবস্থা অন্য দিকে মায়ের খেয়াল রাখা আবার বাবাকে সাহস জুগানো সব যেন অধরা একাই করে চলেছে।

আজ। ইমরান বুঝতে পারছে অপচয় না করে যদি কিছু টাকা জমাতো!
কথায় কথায় বন্ধুদের ট্রিট না দিয়ে যদি একটু সামলে চলতো!
তবে হয়তো আজ অধরার পাশে বসতে এতটা খারাপ লাগতো না।
অধরার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় ইমরান।
এই কদিনেই অধরা কেমন শুকিয়েছে।
হিজাব পরেনি আজ। হয়তো গরমে খুলে ফেলেছে।

বোরখা পরে বসে আছে সে৷। তার সামনে বসে তার মা খাবার বেড়ে দিচ্ছে এবং ইমরানের মা কে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে।

ভাতের প্লেটে ভাত হাতে নিয়ে আনমনে বসে থাকা অধরার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো ইমরান।
দু লোকমা ভাত মুখে দিতে হু হু করে কেঁদে উঠেছে সে।

আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে সবাই।

মুখে সামনে ভাত তুলেছিল অধরা। হাতের ভাত প্লেটে রেখে ইমরানের পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে? কি হলো? খারাপ লাগছে।”

ইমরান কে স্বান্তনা দিতে রঙ্গান উঠে এসে বলল,

“কিছু কিছু সময় পরিস্থিতি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকে না। যেমন এখন তোমার নেই।
বিশ্বাস রাখো, স্থির হও যা তোমার ছিল আজন্ম কাল থাকবেই। শুধু একটু যযত্নশীল হতে হবে।”
অধরা তখনো বেকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করছিল।

রঙ্গান বেশ বুঝতে পারে ইমরান অনুতপ্ত এবং যেহেতু অধরার পরিবার কিছু জানে না তাই সে কথা কাটিয়ে নেয় এই বলে যে,

“আংকেল অপারেশন থিয়েটারে। এখন ওর মনের অবস্থা তো তুই বুঝিস। আমরা জানি যে কোনো সময় যে কোনো কিছুর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”

অধরা হাত সরিয়ে নেয় নিজের ভাতের প্লেট থেকে। ইমরানের ভাতের প্লেট কাছে টেনে নিয়ে লোকমা ভাত তার মুখের সামনে তুলে ধরে বলল,

“উই উইল ম্যানেজ। না?”
ইমরান শক্ত হাতে অধরার হাত ধরে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো।

ইমরানের বাবার অপারেশন ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছে। ইমরান তার মা কে অধরাদের বাসায় পৌঁছে দিতে গেছে।

অধরার ভাই, রঙ্গান, অধরার বাবা এবং অধরা রয়েছে হাসপাতালে।

আজ রাতে ইমরান এবং অধরার ভাই থাকবে। যদিও কিছুর প্রয়োজন হবে না তবুও কারণ নিজেদের মনের শান্তির জন্য৷

ইমরান ফিরে এলে অধরা তার বাবার সাথে চলে যাবে। ওয়েটিং সিটে ভাইয়ের কাধে মাথা দিয়ে কথা বলছিল অধরা।
আগামী দিন সাতেকের জন্য তার ছুটি প্রয়োজন।

কিন্তু দরখাস্ত করতেই হবে তাই আগামীকাল যেতে হবে।

কথা শেষ করে অধরা ভাইকে বলল,
“ঘাড় ব্যথা করছে ভাইয়া। চোখ জ্বালা করছে৷”

“আজ পানি খেয়েছিস? একটু অনিয়ম হলেই কষ্ট হয় তোর। একটু সামলে থাকবি না। বোস এখানে আমি পানি নিয়ে আসি। সাথে কিছু খাবার।”

“না, যেও না। থাকো আমি একটু চোখ বন্ধ করে থাকি। ও ফিরলেই তো বাসায় চলে যাবো।”
কথার মাঝে রঙ্গান এবং অধরার বাবা চলে আসে। রঙ্গানের ডিউটি আটটা থেকে৷ কিছুক্ষণ পর তাকে চলে যেতে হবে। তারা গিয়েছিল পাশের কফি শপে।

অধরার বাবা অধরা কে জিজ্ঞেস করলে তার ভাই সব বলে।

রঙ্গান অনুমতি চায় অধরাকে পাশের কফিশপে নিয়ে যেতে। ভদ্রলোক বলেন তোমরা তিনজন যাও আমি আছি।

ভালবাসার সময় তো নেই ব্যস্ত ভীষন কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাড় ভাজে।
ঘামের জলে ভিজে সাবাড়
করাল রৌদ্দুরে,
কাছএ পাই না, হৃদয়- রোদ দূরে।
কাজের মাঝে দিন কেটে যায়
কাজের কোলাহল
তৃষ্নাকে ছোয় ঘড়ায় তোলা জল।
নদী আমার বয় না পাশে
স্রোতের দেখা নেই,
আটকে রাখে গেরস্থালির লেই।

কফিতে চুমুক দিয়ে অধরা জিজ্ঞেস করলো,
“রুদ্র বাবুর কবিতা, এখনো মনে আছে তোমার?”
রঙ্গান মৃদু হাসে। চোখের ইশারায় দেখায় পাশের এক টেবিলে বসে থাকা দুজন কে।
তাদের দিকে তাকিয়েই সে বলল,

“প্রথম প্রেমের অনুভূতি কিংবা প্রথম প্রেমের বেঈমানী। সব সময় মনেই থাকে।”


পর্ব ১০

“তোরে কতো বার বলেছি আমি তোকে না তোর বড় বোন ইস্মাকে ভালোবাসি তবুও নির্লজ্জের মতো আমার আশেপাশে কেন দেখি সবসময়?”

চোখ ভর্তি টলমল করা পানি নিয়ে ইনতিসারের দিকে তাঁকালো কাজরী। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে লোকটার। উত্তেজনা ও রাগে ঠোঁট কামড়ে কাজরীর দিলে অগ্নিচক্ষু হয়ে তাঁকিয়ে রয়েছে। কাজরীর বড্ড লোভ হলো ঘাম গুলো ছুঁয়ে দিয়ে বেয়াদবি করার। কিন্তু লোকটা যে বড্ড শয়তান।

“নিচে যা কাজরী। আর ইস্মার জন্য এনেছিলাম এ শাড়ীটা। ওকে পড়ে আসতে বল।”
“বাহ ভাইয়া আমি পড়লে কি হবে?”

“এক থাপ্পড়ে তোর গাল ফাটাবো। তুই জানিস ভালো করে আমি ইস্মাকে ভালোবাসি এবং সে ও ভালোবাসে।”
ইনতিসারের কথায় কাজরী মিন মিন করে বলল,

“আমিও তো আপুর মতো আপনার চাচাতো বোন। সমস্যা কোথায়?”
“সমস্যা কোথায়? দেখবি সমস্যা কোথায়?”
“হুহ।”

ইনতিসার এক পা এক পা করে কাজরীর দিকে এগুচ্ছেন। বিশাল বক্ষের সুপুরুষটির এরকম কাছে আসা দেখে ধক করে উঠলো কাজরীর মন। সমান তালে সে ও পিছাতে গিয়ে ধপ করে ছাদের রেলিঙ ধরে বসে পড়লেন।

“উহু।”

“ব্যাথা পেলি? এরকম ব্যাথা তোর জন্য ইস্মা দশটা সহ্য করতে পারে। আর তুই ছোট বোন হয়ে ওর ভালোবাসার দিকে কুনজর দেস। এটা সমস্যা।”

কথাটা বলে ইনতিসার চলে যেতে নিলে কাজরী তার শার্টের এক কোণা টেনে ধরলেন। মাটির দিকে তাঁকিয়ে ইনতিসারের উদ্দেশ্যে বললো,

“সুখের জন্য তো প্রেম সকলে চায়, কিন্তু সুখ পাওয়ার মতো প্রেম কি সকলে পায়?”
~ স্মৃতিগন্ধা(সামিয়া খান প্রিয়া)

মা-বাবা সন্তানের সকল ইচ্ছে, আবদার, চাওয়া পূর্ণ করে। যত কষ্ট হোক না কেন, নিজের প্রয়োজন বাদ রেখেও সন্তানের ইচ্ছে পূর্ণ করে। তাদের কাছে সন্তানের সুখ সব কিছুর উর্ধে থাকে। তবে এই একটি বিষয়, সন্তানের একটি ইচ্ছে তারা কেন মেনে নেয় না? এই ইচ্ছের উপর নির্ভর করে সন্তানের সারা জীবনের সুখ। সন্তান যখন নিজ পছন্দে, ভালোবেসে কাউকে জীবনসঙ্গী করতে চায় তখন কেন তারা মেনে নেয় না?

~ (সুবাসিনী)

আমাদের দুই বোনের একত্রে একটি গল্প সংকলন আসতে চলেছে। যেখানে আমার দুটো এবং সামিয়ার একটি গল্প থাকবে। ইতিমধ্যে তা অনেকেই জানেন।
তো নাম টি একটু বড়।

“এরা সুখের লাগি চাহি প্রেম, প্রেম মেলে না।”

রবীন্দ্র সংগীত থেকে নেওয়া। এই একটি লাইনের উপর আমরা দুইবোন বইটিতে গল্পগুলো সাজিয়েছি।
হ্যাঁ আমাদের একক বই আসবে।

আমার- ত্রিধার
সামিয়ার- আফারীত

এবং আমাদের যৌথ বই – “এরা সুখের লাগি চাহি প্রেম, প্রেম মেলে না।”

চলবে

লেখা – সাদিয়া খান (সুবাসিনী)

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “লাভ উইথ মাই বেটার হাফ – বিবাহিত জীবনের গল্প” টি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ুন – লাভ উইথ মাই বেটার হাফ – বিবাহিত জীবনের প্রেম (সিজন ২)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!