রিলেশনশিপ

ডেস্পারেট লাভ (শেষ খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক

ডেস্পারেট লাভ (শেষ খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক: আরাধ্যা অর্নীল চৌধুরী বলেই অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে। মিম বসে বসে দেখছে আর হাসছে। এত বড় মেয়ে এখনো বাবাকে জড়িয়ে ধরে! শিশির আর আরুশ ও হাসছে। এর মধ্যে অগ্নিভ আর অদিতি ও অর্নীলের সামনে আসে।


পর্ব ১৫

অর্নীল ঘুম থেকে উঠার আগেই মিম অর্নীলকে সরিয়ে নিচে চলে আসে। মিমকে দেখে শিশির বলে,
~ রাতারাতি এত পরিবর্তন?
~ কিচ্ছু করার নেই দিভাই। সব তোমার দেবরের দোষ। (রান্নাঘরে ঢুকে মিম)
~ দেবরটা আসলেই পাজি। খুব সুন্দর লাগছে তোমায়।
~ থ্যাংক ইউ। কিন্তু সামলানো ই তো মুশকিল।

~ অভ্যাস হয়ে যাবে। আমিও প্রথম প্রথম পারতাম না। এখন শিখে গেছি।

~ আমিও শিখে যাব নে। আর দিভাই কি করব বলো? একটু হেল্প করি তোমায়।
~ এই না না। মা বকবে আমায় পরে। আমি যখন এই বাড়িতে এসেছি তখন দশদিন মা আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতেই দেয়নি।
~ আহ দিভাই দাও না। আমি করছি। কিচ্ছু হবেনা।
~ তাহলে ময়দাগুলো মাখো। আর শিউলি মিমকে হেল্প কর তো। (শিশির)
~ না দিভাই আমি পারব। (শাড়ির আচল কাঁধে ঝুলিয়ে মিম) চৌধুরী যে কেন আমায় গয়না পরতে বলল! অসহ্য লাগছে একদম ই।
~ হাহাহা মেয়েরা গয়নার পাগল আর তুমি এ কথা বলছো?
~ তো আর কি বলব বলো?

শিশির আর মিম কথা বলতে বলতে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নিলো। অর্নীল আর আরুশ রেডি হয়ে একসাথেই নিচে নামে। অর্নীলের বাবা মা কিছুক্ষণ পর এসে টেবিলে বসে। অর্নীল আরুশের সাথে কথা বলছে আর হাতের ব্যান্ডেজটা ঠিক করছে। অর্নীলের মা অর্নীলকে হাসিখুশি দেখে খুশি হয়। মিম রান্নাঘর থেকে খাবারগুলো এনে টেবিলে রাখছে। মিমকে খাবার রাখতে দেখে অর্নীলের মা রেগে যায়।

~ এ কি! বড় বৌমা? ছোট বৌমা রান্নাঘরে কি করছে? (অর্নীলের মা)
~ না মা। দিভাই কিছু করেনি। আমিই করেছি। দিভাই তো সবসময় ই করে। আমি আজকে একটু হেল্প করেছি শুধু। (খাবার সার্ভ করতে করতে মিম)

~ তুমি এ বাড়িতে নতুন। এখনি কে রান্নাঘরে যেতে বলেছে শুনি? কই এখন ভাববা হানিমুনের কথা আর রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করছো নাকি? (শ্বাশুড়ি মা)

~ মা আপনি ঠিক বলেছেন! পাঠিয়ে দিন দুটোকে কোথাও! (শিশির)
~ ব্যবস্থা করব তারাতারি। (মিমের শ্বশুর)
অর্নীল খাচ্ছে আর ওদের কথা শুনছে। মিম তো লজ্জায় শেষ। সবাইকে খাবার বেরে দিয়ে মিম ফ্রেশ হয়ে শাড়িটা পালটে খেতে আসে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে অর্নীল বলে,
~ মিম অফিসে যাবে তো?
~ হ্যা।
~ চলো আমি নামিয়ে দিবনে।

~ দাঁড়াও ব্যাগটা নিয়ে আসি।
মিম ফুল হাতা দিয়ে সিল্কের একটা শাড়ি পরে আর পাথরের পার্টস ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে বেরিয়ে যায়। অর্নীল ড্রাইভ করছেনা। মিম আর অর্নীল পেছনে বসে আছে আর ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। অর্নীল আর মিম টুকিটাকি কথা বলছে আর হাসছে। মিমকে মিমের অফিসে নামিয়ে দিয়ে অর্নীল নিজের অফিসে চলে আসে। মিমকে শাড়িতে দেখে শৈলি বলে,

~ বিয়ের পর এত চেঞ্জ?
~ হওয়ার ছিল তাইনা?
~ এত প্রিটি লাগছে কেনো ম্যাম আপনাকে?

~ কতদিন পর অফিসে এসেছি সেই খেয়াল আছে?
~ সব ঠিকঠাক আছে অফিসের। কিন্তু বড় ব্যাপার হচ্ছে এইবার চৌধুরী ক্রিয়েশনের প্রফিট বেশি। এই যে ফাইল। আমাদের থেকে ২০% প্রফিট ওদের বেশি। (শৈলি)

~ দেখতে হবে স্বামীটা কার? (ফাইল উল্টিয়ে মিম)
~ জ্বি না। আপনার মতো বউ পেয়েই অর্নীল স্যারের কপাল খুলে গেছে। (শৈলি)
~ বাঁদড়ামি ছাড়ো। এক কাজ কর, আজকে লাঞ্চে অফিসের সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াও।
~ কি উপলক্ষ্যে ম্যাম?

~ আমার নতুন জীবন শুরুর উপলক্ষ্যে৷ আর হ্যা মিষ্টি ও এনো।
~ সে তো আরো দেড় মাস আগে শুরু হইছে ম্যাম!
~ সে তুমি বুঝবেনা। আর হ্যা BFF এর মিটিং কবে?
~ এখনো ডেট দেয়নি। আপনি অসুস্থ ছিলেন বলে ডেট পোসপন্ড করা হয়েছিলো।
~ আচ্ছা। কোনো নতুন অর্ডার আছে?

~ হ্যা পঞ্চান্ন টা বিয়ের শাড়ির। কিন্তু বড় ব্যাপার হচ্ছে ওরা আপনার হাতের ডিজাইনই চাচ্ছে।
~ আচ্ছা আমি দেখছি। শৈলি এক কাজ কর তো।
~ কি ম্যাম?
~ ১৭ বছর বয়সী শ্যামা মেয়ের জন্য দশ বারোটা ড্রেস বানাও। মেয়েটি রোগা আর হাইট ৫ ফুট তিন ইঞ্চির মতো। ড্রেসের ডিজাইন যাতে ইউনিক হয় আর আল্ট্রা মডার্ণ যাতে না হয়।
~ কার জন্য ম্যাম?

~ ওই যে তোমায় বলেছিলাম না চাঁদপুরের সেই মেয়েটির জন্য। কথা দিয়েছিলাম ওকে ড্রেস বানিয়ে দিব রায়হান ক্রিয়েশন থেকে।

~ আচ্ছা ম্যাম আমি করতে বলছি। কবে নাগাদ দিবেন?
~ এক মাসের মধ্যেই। আর বিরিয়ানি আর মিষ্টি অর্ডার করে ফেলো। ফাইলগুলো রেখে যাও।
~ ওকে ম্যাম আসছি।

শৈলি যাওয়ার পরে মিম ডিজাইন নিয়ে ভাবছে। বিয়ের শাড়িতে কি ডিজাইন দিবে ও? ভাবতেই ভাবতেই মিম অনেকগুলো ডিজাইন তৈরি করে ফেলে। এরপর মিমের কোম্পানির ডিজাইনারদের দিয়ে চেক করিয়ে এই ডিজাইনগুলোই ফাইনাল করে। সেদিন অফিসে এসে অর্নীলের সাথে অনেকবারই ফোনে কথা হয়েছে মিমের।
বিয়ের পর আটমাস দুজন আনলিমিটেড ঘুরাঘুরি আর রোমান্স করেই কাটিয়ে দিলো। এরই মধ্যে অর্নীল মিমকে নিয়ে দুবাই হানিমুন করে এসেছে। মিম প্রতিদিন নিজের বাসায় যায় অফিস থেকে ফেরার আগে বাপিকে দেখার জন্য। ওইখান থেকেই অর্নীল মিমকে নিয়ে বাড়ি ফেরে প্রতিদিন রাতে। দুজনার মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং আর ভালবাসার কোনো কমতি ছিল না।
আটমাস পর একদিন বিকেলে,

~ চৌধুরী?
~ হ্যা বলো। (গাছের পাতা কাটতে কাটতে অর্নীল)
~ আজকে রাতে আমায় এক ফ্রেন্ড এর বাসায় থাকতে হবে। (আঙুল মোচড়াতে মোচড়াতে মিম)
~ মানে? (মিমের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ রাগ করনা প্লিজ। আসলে ওর তো বার্থডে আগামীকাল তাই আমরা ফ্রেন্ডরা ওরে সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। (আমতা আমতা করে মিম)

~ তুমি রাতে বাইরে থাকার চিন্তা কিভাবে আনলা মিম? চৌধুরী পরিবারের বউ তুমি। হাজবেন্ড ছাড়া এ পরিবারের বউ বাইরে রাত কাটাতে পারেনা। তুমি এক ঘণ্টাও বাইরে কাটাতে পারবেনা আমায় ছাড়া, এক রাত তো দূর।
~ চৌধুরী প্লিজ। যেতে দাও আমায় প্লিজ। আর কোনোদিন এইরকম আবদার করবনা।
~ মিম তুমি খুব ভাল করে জানো আমি রাজি হবনা এরপরেও এইসব আবদার করা মানায় না। আর যদি আর্জেন্ট ই হয় তো আমাকে নিয়ে যাও।

~ না। আমি একাই যাব। তুমি আমাকে যেতে দিবা কি না বলো? (মিম সিরিয়াস ভাবেই কথাটা বলল)
~ কখনোই না। আমি ছাড়া তুমি বাইরে রাত কাটাতে পারবানা। ইটস ফাইনাল। (হাতের কাচি ফেলে দিয়ে অর্নীল)
~ আমি তো যাবই, তুমি অনুমতি দাও আর না দাও। জেদ তুমি একা করতে পারো না! বিয়ে হয়েছে বলে আমি আমার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছি তা তো নয়। আমারো মতামত আছে। (মিম)
~ বিয়ের পর কি এমন হয়েছে যে আমি তোমার কোনো মতামত অগ্রাহ্য করেছি? (মিমের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ তো আজ কেনো করছো?

~ তুমি আমায় নিয়ে যাও তাহলেই হয়। আমাকে তো নিচ্ছো না আর আমিও তোমায় একা যেতে দিবনা। বাসায় আসো।
মিমকে গার্ডেনে রেখে অর্নীল চলে আসে। মিম বাসায় এসে সোজা বেডরুমে যায়। অর্নীল হাতমুখ ধুচ্ছে। মিম বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। অর্নীল টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেডরুমে আসে। মিমকে কাঁদতে দেখে মিমের সামনে যায় অর্নীল।

~ মিম? কাঁদছো কেনো তুমি? (মিমের ঘাড় ধরে অর্নীল)
~ তুমি আমায় ধরবানা, ছাড়ো।

~ আরে আজিব! তোমার কোন বন্ধুর বাসায় যাবা? নাম কি ওর?
~ সেসব শুনে তুমি কি করবা? তুমি তো আমায় যেতে দিবানা।
~ একা যেতে দিবনা সেইটা বলেছি। যেতে যে একদমই দিবনা তা তো বলিনি! বউ উঠো। (মিমকে উঠিয়ে বসায় অর্নীল) তোমার বন্ধুর বাসা কোথায়?

~ তুমি জেনে কি করবা? (চোখের পানি মুছে অর্নীল)
~ আচ্ছা আমি রাতে দিয়ে আসবনে। দিয়ে চলে আসব আবার কালকে সকালে গিয়ে নিয়ে আসব। হবে তাহলে? (মিমের চোখের পানি মুছে দিয়ে অর্নীল)
~ না হবেনা। আমি একা যাব।

~ আচ্ছা ঠিক আছে। এখন তো কান্না থামাও। (মিমকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অর্নীল)
~ থ্যাংক ইউ। (অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে মিম)

অর্নীলের মনে বিশাল সন্দেহ হয় মিমকে নিয়ে। অর্নীলের জানামতে মিমের এত ক্লোজ বন্ধু কেউই নেই যাকে প্রেজেন্ট থেকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। আর মিমকে এতদিনে অর্নীল যা চিনেছে তাতে এমন আচরণ করার মেয়ে মিম নয়। গত কয়েকদিন ধরেই মিম সন্দেহজনক আচরণ করছে। কিন্তু আজ ও বাইরে রাত কাটাতে চাইছে তাও একা! এইটা খুব ভালভাবে অর্নীলের সন্দেহকে জোরদার করে দিলো। অর্নীল সিদ্ধান্ত নেয় ও মিমকে ফলো করবে যদিও ব্যাপারটা বেমানান। কিন্তু অর্নীলের মনে হচ্ছে গন্ডগোল কোথাও আছে আর সেইটাই অর্নীল বের করবে।
রাত দশটায়,

মিম রেডি হচ্ছে বের হবে বলে। অর্নীল ম্যাগাজিন পড়ছে।
~ আসবা কখন? (অর্নীল)

~ কালকে সকালে। (কানের দুল পরতে পরতে মিম)
~ সাবধানে যেয়ো আর গাড়ি নিয়ে যেয়ো।

~ বাড়ির গাড়ি নিবনা। একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে চলে যাব। (পার্ফিউম দিত দিতে মিম)
~ কিহ? মিম তোমার সব কথাই কিন্তু আমি মেনেছি। বাড়িতে এতগুলো গাড়ি থাকতে তুমি ভাড়া করা প্রাইভেট কারে যাবে? (ম্যাগাজিন রেখে অর্নীল)
~ হ্যা।

~ এইটা কিন্তু বারাবারি হচ্ছে মিম। তোমার সেফটি আগে। (রেগে গিয়ে অর্নীল)
~ কিছুই হবেনা। আমি আসছি। তুমি রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পর। এলার্ম দিয়ে ঘুমাইয়ো। বারান্দার দরজা লাগিয়ে দিয়ে গেলাম আর খুলোনা। সাবধানে থেকো। (অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে মিম)
~ হুম।

অর্নীল একটাও বেশি কথা বলল না মিমের সাথে। বাড়ির কেউ জানেনা মিম রাতে বাড়িতে থাকবেনা। মিম বেরিয়ে যাওয়ার পর অর্নীল গাড়ির চাবি নিয়ে নিচে নামলো। মিম কি আদৌ ওর বন্ধুর বাসায় যাচ্ছে সেইটাই দেখতে হবে অর্নীলকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মিম কাকে যেন ফোন করলো আর ঠিক কয়েক মিনিট পর একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো মিমের সামনে। মিমকে প্রচন্ড চিন্তিত লাগছিলো।

মিম সেই গাড়িতে উঠেই চলে গেলো। অর্নীল দ্রুত ওর গাড়ি নিয়ে মিমকে ফলো করছে। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে অর্নীলের। শেষে কিনা মিমকে অবিশ্বাস করছে ও? কিন্তু কিছু করার নেই! সত্যিটা অর্নীলকে জানতেই হবে। প্রায় দেড় ঘন্টা পর মিম কোনো একটা ফাইভ স্টার হোটেলে নামলো। অর্নীল কিছুটা দূরে গাড়ি পার্ক করে দ্রুত হোটেলে ঢুকলো। রিসিপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ এইমাত্র যেই মেয়েটি ঢুকলো সে কেনো এসেছিলো এখানে? (অর্নীল)
~ উনি তো এখানে প্রায়ই আসেন।

~ কেনো? (অনেক বেশি অবাক হয়ে যায় অর্নীল)
~ ওনার হাজবেন্ড এর সাথে দেখা করতে।

~ হোয়াট? উনি কে জানেন? (অর্নীলের রাগ এইবার কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেছে)
~ হ্যা জানি। উনি মিসেস শিকদার। ওনার নাম নেহা। কিন্তু আপনি এত প্রশ্ন কেন করছেন?
~ আমি অর্নীল চৌধুরী, চৌধুরী ক্রিয়েশনের মালিক।

~ ও স্যার আপনি! আর কি জানতে চান বলুন?
~ উনি কতদিন এখানে এসেছে?
~ তা তো প্রায় পনেরোদিন। উনি মুখ ঢেকে ঢুকে আবার মুখ ঢেকেই বেরিয়ে যায়।
~ ওনার রুম নাম্বার কত?
~ ৪০৩।
~ থ্যাংক ইউ।

অর্নীলের এখন লিফট দিয়ে উঠার ধৈর্য্য নেই। অর্নীল দৌড়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠে গেলো। ৪০৩ নাম্বার রুমে গিয়ে খুব জোরে জোরে নক করলো অর্নীল। আয়মান শিকদার এসে দরজা খুলল। অর্নীলকে দেখে ভয় পেয়ে যায় আয়মান শিকদার। মিম সোফার উপর বসে আছে। আয়মানকে ধাক্কা দিয়ে অর্নীল মিমের হাত ধরে মিমকে বসা থেকে উঠায়। অর্নীলের চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে রাগে আর ঘৃণায়। মিম কিছু বুঝে উঠার আগেই মিমের বাম গালে অনেক জোরে একটা চড় মারে অর্নীল। মিম পরে যায়। অর্নীল মিমকে তুলে আরো দুইটা চড় মারে গালে।
~ চরিত্রহীনা! এইটা তোর বন্ধুর বাসা? এইটাই তোর দেওয়া সারপ্রাইজ? তুই মিসেস শিকদার? তোর লজ্জা করলো না আমাকে মিথ্যে বলে বাড়ি থেকে বের হতে? এতটা মাথায় তুলে ফেলছিলাম তোকে যে তুই শেষে আমাকেই ছোবল মারলি? এইটাই তোর স্বাধীনতা ছিল তাইনা?

~ চৌধুরী আমি চরিত্রহীনা নই! ভুল বুঝছো তুমি আমায়! (ফ্লোরে পরে কাঁদতে কাঁদতে মিম)
~ জাস্ট শাট আপ। তুই আমাকে চৌধুরী বলবিনা। ছিহ! এই তোর সাথে আমি এতদিন সংসার করে এসেছি? তোকে ভালবেসেছি? ঘৃণা হচ্ছে আমার। আর কোনোদিন তুই চৌধুরী বাড়িতে পা রাখবিনা। পনেরোদিনের সংসার সাজিয়ে মিম থেকে নেহা হয়েছিস, মিসেস অর্নীল চৌধুরী থেকে মিসেস আয়মান শিকদার হয়েছিস! এরপরেও কি তোর কিছু বলার আছে বা থাকতে পারে? তার উপর এতগুলো নাটক করেছিস আমার সাথে সন্ধ্যা থেকে শুধুমাত্র বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য। বের হয়েছিস না এখন? আর কোনোদিন চৌধুরী বাড়িতে যাবি না আর আমার জীবনে তো না ই। আজ থেকে তুই আমার বউ না আর আমিও তোর হাজবেন্ড না। আর যাইহোক কোনো চরিত্রহীনার সাথে আমি সংসার করতে পারবনা। গুড বাই!

মিমের কোনো কথা না শুনেই অর্নীল হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। আর শুনবেই কেন? যা যা প্রমাণ অর্নীল পেয়েছে তা তো মিথ্যে নয়! এতকিছুর পরেও বা মিমের কি বলার থাকে? আয়মান শিকদার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মিম চিৎকার করে কাঁদে। আজ সব শেষ মিমের। নিজের সম্মান, সংসার, নিজের স্বামী সব হারিয়ে গেছে এক নিমিষে। সারারাত মিম হোটেলে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়। সকালে মিম নিজের বাড়িতে যায়। মিমকে এভাবে দেখে বাপি ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। মিম সোফায় বসে অর্নীলকে ফোন দেয়। প্রথমবার ফোন রিং হলেও পরেরবার ফোন বন্ধ আসছে। হয়ত ফোন ভেঙে ফেলেছে মিমের ফোন পেয়ে। মিম আবারো চিৎকার করে কাঁদছে। বাপিকেও কিছু বলছেনা।

অর্নীলের বাবা, মা আর আরুশ আসলো মিমের বাসায়। অর্নীলের বাবা মিমকে বলেই ফেললেন বাজারী মেয়ে। এই কথা শুনে মিমের ইচ্ছে করছিলো এখনি গলায় দড়ি দিতে। মিস্টার রায়হান চুপচাপ শুনলেন।
~ কতটা ভালবেসেছিলাম এই মেয়েটাকে আমি জানেন? আমার মেয়ে যতটা না আদর পেতো তার থেকে বেশি আদর করি আমি ওকে। অনন্যা তো এখানে থাকেনা। ওর মাঝেই আমি অনন্যাকে পেতাম। কিন্তু এইটা ও কি করলো? আমার বা আমার ছেলের মান সম্মান কিচ্ছু রাখলো না। (মিমের শ্বশুর)

~ তুমি আর ওই বাড়িতে যেয়ো না। দয়া করে এই মুখ আমাদের আর দেখিয়ো না। আমার ছেলের জীবনটা আরো একবার নষ্ট করে দিলে। ভেবেছিলাম আমার ছেলের জন্য তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলে! আমরা ভুল ছিলাম। (মিমের শ্বাশুড়ি)
~ ঠিক আছে মা, আমি আর কোনো সম্পর্ক রাখবনা আপনাদের সাথে। মাফ করবেন আমায়। (হাত জোর করে মিম)

মিমের শ্বশুর, শ্বাশুড়ি চলে আসে ওই বাড়ি থেকে। অর্নীল তো দরজা বন্ধ করে ঘরের এক কোণায় পরে আছে। মিম সেইদিন ই সিদ্ধান্ত নেয় বাপিকে নিয়ে ও দেশের বাইরে চলে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ! অফিসের পাওয়ার অফ এটর্নি শৈলির নামে করে দিয়ে মিম শৈলিকে ওদের বাসায় থাকতে বলে ওর বৃদ্ধা মা কে নিয়ে। BFF এর চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেয় মিম। শৈলি খুশি হওয়ার বদলে হাউমাউ করে কাঁদছে। দুইদিন পর মিম সিঙ্গাপুর এর টিকেট কাটে যা মিম আর বাপি ছাড়া আর কেউ জানেনা। অর্নীল সেইদিনের পর থেকে ঘর থেকেও বের হয়নি আর মিমকে ফোন করার চেষ্টাও করেনি।


পর্ব ১৬

মিম সিঙ্গাপুর যাওয়ার টিকেট কাটার পর শৈলিকে বলল,
~ শৈলি এইদিকের সবকিছু হ্যান্ডেল করার দায়িত্ব তোমার। আমি কোথায় যাচ্ছি সেইটা আমি কাউকেই জানাবো না এমনকি তোমাকে ও না। কিন্তু তোমার সাথে যোগাযোগ করব ভাইবারে। অফিসের যেকোনো সমস্যা সব আমায় অনলাইনেই জানাবা। আর ভালো থেকো। বিকেলে আমাদের ফ্লাইট! (চোখের পানি মুছতে মুছতে মিম)
~ ম্যাম আপনি আমাকেও জানাবেন না কোথায় যাচ্ছেন? (কেঁদে কেঁদে শৈলি)

~ না শৈলি। আন্টিকে নিয়ে এসো আমাদের বাড়িতে। আর তোমার উপর অফিসের দায়িত্ব দিয়ে গেলাম কারণ আমি জানি তুমি আমার বিশ্বাস নষ্ট করবেনা। এই নাও পাওয়ার অফ এটর্নি। (শৈলির হাতে পেপার দিয়ে মিম)
~ ম্যাম? (মিমকে জড়িয়ে ধরে শৈলি কাঁদছে)

শৈলিকে সামলিয়ে মিম শাড়ি পরে তৈরি হয়। সুটকেস আগেই গুছিয়ে রেখেছিলো মিম। বাপির বাড়িটা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে কারণ এই বাড়িটা মিমের টাকায় তৈরি। বিকেলে মিম যাওয়ার আগে শৈলিকে বলে যায়,
~ আমার গাড়িটা ইউজ কর। আর বাপির গাড়িটা গ্যারেজেই রেখে দিও। আসছি। ভাল থেকো।

এ কথা বলে মিম এক সেকেন্ড ও দাঁড়ায়নি। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এয়ারপোর্টে বসে মিম অঝোরে কাঁদছে৷ অর্নীলকে দেখে যেতে ইচ্ছে করছে অনেক। এখানে থাকলেই মিমকে অর্নীলের মুখোমুখি হতে হবে বারবার যা মিম চায়না। এইজন্যই সবাইকে না জানিয়ে দেশ ছেড়েই চলে যাচ্ছে। মিস্টার রায়হান মিমের হাত ধরে বসে আছেন।

~ আমি চাইলেই পারতাম ওদের ভুল ভেঙে দিতে কিন্তু আমি দিবনা। আমার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার শ্বশুর তোমাকে বাজারী মেয়ে কিভাবে বলল? অর্নীল তোমায় চরিত্রহীনা বলল কোন অধিকারে? আগে~ পিছে কিছু না জেনে এত বড় কথা মুখ দিয়ে বের করতে পারলো ওরা? তোমায় বিয়ে দেওয়াই আমার ভুল হয়েছে। সরি মামনি। (মিমের মাথা নিজের কাঁধে রেখে মিস্টার রায়হান)

~ বাদ দাও বাপি। চলো ভেতরে যাই। (চোখের পানি মুছে মিম)
এয়ারপোর্টের সমস্ত ফর্মালিটি ছেড়ে মিম আর বাপি গিয়ে প্লেনে বসলো। মিম চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্লাইট ছেড়ে দিবে। বাপি ভাবছে বদনাম নিয়ে মেয়েটা চলে যাচ্ছে, আর কত সহ্য করবে আমার মেয়েটা? কম তো করেনি। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ফ্লাইট ছেড়ে দিলো। মিম নিজের সিমকার্ড, ফেসবুক একাউন্ট সব নষ্ট করে ফেলল। কারো সাথে যোগাযোগের কোনো পথ রাখলো না মিম।

অর্নীলকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছে ও। ওইদিকে অর্নীল না খেয়ে চুপচাপ ঘরে বসে গিটার বাজাচ্ছে। না যায় অফিসে আর না বের হয় ঘর থেকে। এভাবেই কেটে গেলো অর্নীলের এক মাস। অর্নীল জানেও না মিম দেশে নেই। এক মাস পর‍ যখন অর্নীল অফিসে গেলো তখন আকাশ জানালো মিম সব দায়িত্ব শৈলিকে দিয়ে বাইরে চলে গেছে কিন্তু কোথায় গেছে কেউ জানেনা। এইটা শুনে অর্নীলের ভীষণ কষ্ট লাগলো কিন্তু অর্নীল মিমকে খোঁজার ও চেষ্টা করলো না।

মিম যা পাপ করেছে তার শাস্তি তো মিম পাবেই। সবকিছু উপেক্ষা করে অর্নীলের দিন কাটতে লাগলো। শুধু অফিসেই সারাক্ষণ পরে থাকে অর্নীল। আর মিম শুধুমাত্র ভাইবারে শৈলির সাথে যোগাযোগ করে। ফোন নাম্বারে কল দেয়না কারণ তাহলে শৈলি বুঝে যাবে মিম কোন দেশে আছে। শৈলি নিজের বেতনের থেকে এক টাকাও বেশি নেয়না। বাকি সব টাকা মিমের একাউন্টে ট্রান্সফার করে দেয়। দুইদেশে দুজনের এইভাবেই চলতে থাকলো দিন।
চার বছর পর……..

~ আরাধ্যা উঠো স্কুলে যাবেনা? (আরাধ্যার স্কুল ড্রেস হাতে নিয়ে মিম)
~ মামনি সকাল হয়ে গেছে? (চোখ ডলতে ডলতে আরাধ্যা)
~ হ্যা তো সোনা। উঠো। (আরাধ্যার কপালে চুমু দিয়ে মিম)
~ নানাভাই? উঠেছো তুমি? (ঘরে ঢুকে মিমের বাপি)

~ হ্যা নানাভাই উঠেছি। জানো তো নানাভাই কালকে মিসেস লুসি (ইংলিশ টিচার) আমায় কি বলেছে?
~ কি বলেছে? (আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে নানাভাই)
~ বলেছে তোমার নানাভাই আর তোমার মাম্মাম অনেক ভালো। তুমি আমায় প্রতিদিন দিয়ে আসো না? তখন উনি তোমায় দেখেছে।

~ ওহ রিয়েলি? (নানাভাই)

~ ইয়েস নানাভাই।
~ মামনি আরাধ্যাকে রেডি করাও আমি গাড়ি বের করতে বলছি। (মিমকে বলল মিস্টার রায়হান)
~ আচ্ছা বাপি।

মিম আরাধ্যাকে দাঁত মাজিয়ে দিলো এরপর আরাধ্যাকে গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে রেডি করে দিচ্ছে। আরাধ্যার বড় বড় চুলগুলো মিম ঝুটি করে দিলো। মিম যখন আরাধ্যাকে টাই পরাচ্ছিলো তখন আরাধ্যা বলল,
~ মামনি তুমি স্কুলে যাবেনা? মিস্টার সান (প্রিন্সিপাল) তো তোমায় মিট করতে বলেছে তার সাথে।
~ কেনো?

~ আমি জানিনা।
~ আজকেই যেতে হবে মা?
~ হ্যা মামনি।
~ তুমি নানাভাইয়ের সাথে চলে যাও আমি রেডি হয়ে আসছি।
~ আচ্ছা মামনি। বাই।

~ বাই সোনা। (আরাধ্যাকে চুমু দিয়ে মিম)
মিম রেডি হয়ে আরাধ্যার স্কুলে গেলো। মিম সোজা প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করতে তার রুমে গেলো। অন্যান্য টিচার রাও সেখানে ছিল। মিমকে দেখে প্রিন্সিপাল বলল,
~ হ্যালো মিসেস চৌধুরী! হাউ আর ইউ?

প্লিজ টেইক ইউর সিট।
~ আই এম ফাইন স্যার। ডিড ইউ কল মি?
~ ইয়েস মিসেস চৌধুরী। আই ওয়ান্ট টু টক উইথ ইউ এবাউট আরাধ্যা চৌধুরী।
~ জ্বি বলুন। (ইংলিশেই বলছিলো মিম)

~ আমাদের স্কুলের সবচেয়ে বাচ্চা মেয়ে আরাধ্যা। ও অসাধারণ। এইবার ইয়ার ফাইনালে আপনার মেয়ের প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমি এইটা শুনে অবাক হলাম যে আপনি নাকি ওকে কোনো প্রাইভেট টিচার দেননি। (ইংলিশেই বলল প্রিন্সিপাল)

~ না মিস্টার সান। আরাধ্যাকে আমি আর ওর নানাভাই ই পড়ায়। আমি ওকে বাংলাও শিখাচ্ছি। এখানকার ভাষা ও খুব একটা পারেনা। আপনি কাইন্ডলি সব টিচারকে বলবেন ওর সাথে যেন ইংলিশে কথা বলে।
~ অবশ্যই মিস্টার চৌধুরী। আর এই নিন আমাদের এনুয়াল ফাংশনের ইনভাইটেশন কার্ড। প্রতিবছরই স্কুলের সেরা অভিভাবককে আমরা বিশেষ অতিথি করি সেইদিন। এইবার আপনি সেরা মা মনোনীত হয়েছেন। সো প্লিজ আসবেন।

~ এইটা তো আনন্দের মিস্টার সান। ধন্যবাদ আপনাকে। আসছি। গুড বাই।
মিম ইনভাইটেশন কার্ড নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। মিস জুলি মিমকে আটকায়। মিস জুলি আরাধ্যার ম্যাথ টিচার।

~ মিসেস চৌধুরী কেমন আছেন? (ইংলিশে বলল মিস জুলি)
~ ভাল আছি। আপনি? (হেসে জবাব দেয় মিম)
~ হ্যা আমিও। আপনি অনেক লাকি আরাধ্যার মতো মেয়ের মা হয়ে। ওর মতো এডরেবল স্টুডেন্ট হয়না। এত ছোটবেলা থেকেই এতটা শিক্ষা দিয়েছেন মেয়েকে তার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
~ দোয়া করবেন ওর জন্য।

~ কখনো ওর বাবাকে দেখিনি স্কুলে। সে কি সিঙ্গাপুর থাকেনা?
~ না মিস জুলি। ওর বাবা বাংলাদেশে থাকে।
~ ওহ। একদিন দেখা করাবেন অবশ্যই।
~ অবশ্যই।

স্কুল থেকে বেরিয়ে মিম গাড়িতে উঠে। ড্রাইভ মিম নিজেই করছে। এতগুলা বছর হয়ে গেলো। আরাধ্যা কখনো বুঝেনি বাবা কি! বাবা বলতে যে কোনো এক মানুষ আছে সেইটাই আরাধ্যা বুঝেনা। শুধু জানে বাবার ইংলিশ প্রতিশব্দ ফাদার। মাঝে মাঝে আরাধ্যা জিজ্ঞেস করে ফাদার কি মামনি? মিম তখন আরাধ্যাকে কিছু একটা বুঝিয়ে দেয়। এরপর আরাধ্যা আর কোনো প্রশ্ন করেনা।

আর হ্যা আরাধ্যা চৌধুরী অর্নীল আর মিমের একমাত্র মেয়ে। চার বছর আগে মিম যখন সিঙ্গাপুর এসেছিলো তার পনেরোদিন পর মিম বুঝে ও মা হতে যাচ্ছে। এইটা অর্নীল ও জানেনা ও এক মেয়ের বাবা। এই চার বছরে দুজনের কোনো রকম কোনো যোগাযোগ হয়নি। অর্নীলকে যদি মিম জানায় আরাধ্যার কথা তাহলে হয়ত অর্নীল বলবে এইটা অবৈধ সন্তান। তার চেয়ে থাকুক ও ওর মায়ের পরিচয়ে। বাবার পরিচয় ওর দরকার নেই। এতদিন পর অর্নীলের জন্য কাঁদলো মিম। মিস জুলি না বললে হয়ত মাথাতেই আসতো না যে আরাধ্যার বাবা আছে! অর্নীল কি আবার বিয়ে করেছে? নাকি ওইভাবেই আছে? এসব ভাবতে ভাবতে মিম বাসায় চলে আসে।

বাংলাদেশে…….
মিমের কেবিন লক হয়ে পরে আছে চার বছর ধরেই। শৈলি কখনো মিমের চেয়ারে বসেনি অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও। মিমের সম্মান ও আজও বজায় রেখেছে রায়হান ইন্ডাস্ট্রিতে। শুধুমাত্র শৈলি জানে আরাধ্যা সম্পর্কে। চার বছর পর অর্নীল হন্তদন্ত হয়ে মিমের অফিসে যায়। অর্নীলকে অফিসে দেখে শৈলি চমকে যায়। অর্নীল রীতিমতো ঘামছে।
~ শৈলি মিম কোথায়? (অর্নীল)
~ আমি জানিনা মিস্টার চৌধুরী।

~ শৈলি আমি আমার জীবনের চারটা বছর অলরেডি নষ্ট করে ফেলেছি মিমকে দূরে সরিয়ে রেখে। আর চার সেকেন্ড সময় আমি নষ্ট করতে চাইনা। প্লিজ আমায় বলো মিম কোথায়? বাপি কোথায়? (অর্নীল কাঁদছে)
~ স্যার আপনি কাঁদছেন কেনো? সত্যি বলছি আমি জানিনা ম্যাম কোথায়! ম্যাম আর আরাধ্যার সাথে আমার প্রতিদিন কথা হয় কিন্তু ওরা আমায় কোনোদিন বলেনি কোন দেশে আছে ওরা!
~ আরাধ্যা? আরাধ্যা কে?

~ আপনার আর ম্যাডামের মেয়ে স্যার। তিন বছর বয়স আরাধ্যার।
এই কথা শুনে অর্নীল চেয়ারে বসে পরে ধপাস করে। এখন ওর কি বলার আছে? ওর মেয়ে আছে আর ও নিজেই জানেনা? এর চেয়ে দুঃখের আর কি হতে পারে? অর্নীল নিঃশব্দে সেখানে বসেই চোখের পানি ফেলে। শৈলিও কাঁদছে।

~ সরি স্যার কিছু মনে করবেন না। ওইদিন মিথ্যে অপবাদ পেয়ে ম্যামের ও একই অবস্থা হয়েছিলো। এখন ম্যাম মেয়ে আর বাবাকে নিয়ে ওখানে ভালই আছে। অন্তত একবার পেছনের কাহিনী জানতেন এরপর সন্দেহ করতেন ম্যামকে। গত কয়েকদিন আগে ম্যাম আমায় সব বলেছে অনেক জোরাজোরির পর। এতটুকু আমি বলতে পারি হয়ত ম্যামকে আপনি হারিয়ে ফেলেছেন সাথে আপনার ওই ফুটফুটে মেয়েটাকেও। আজ কি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন আপনি? (চোখের পানি মুছে শৈলি)

~ পেরেছি বলেই দৌড়ে এখানে এসেছি। আয়মান শিকদার আমায় আজ সব বলেছে। আমি ওইখানেই ওকে শুট করে চলে এসেছি। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তাও জানিনা।

~ আপনার এই এগ্রেসিভ স্বভাবের জন্যই ম্যাম আপনাকে কিছু জানায়নি। সৈকত খানকে মেরে ফেলার পর থেকে ম্যাম চায়নি আপনার হাতে আর কোনো খুন হোক। কেনো স্যার? ওইদিন ম্যামকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন না সবকিছু? উলটো চরিত্রহীনা বলেছেন। ভালো হয়েছে ম্যাম চলে গেছে। অনেক ভালবাসত ম্যাম আপনাকে। এখন তো আপনার নাম ও নেয়না।

~ এর শাস্তি কি আমি পাইনি শৈলি? চারটা বছর অন্ধকারে ছিলাম আমি। আজ শুনছি আমার মেয়েও আছে অথচ দেখো আমি এতদিন জানতাম না। এগুলা কি শাস্তি না?
অর্নীল টেবিলে মাথা ফেলে কাঁদছে। কাঁদলেও এখন আর কিছুই করার নেই। শৈলিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। ঠিক ওই সময় মিম শৈলিকে ভাইবারে কল করে। শৈলি ফোন পিক করার আগে অর্নীলকে বলে,
~ ম্যাম কল করেছে।

~ ও কোথায় ওকে জিজ্ঞেস কর প্লিজ। (অর্নীল)
~ ম্যাম আসসালামু আলাইকুম। (চোখের পানি মুছে শৈলি)
~ লাঞ্চ টাইম না ওখানে? (মিম)
~ হ্যা ম্যাম। ভাল আছেন আপনি?

~ তুমি কি কাঁদছো নাকি? ভয়েস এমন কেন?
~ না ম্যাম কাঁদছিনা আমি। কিন্তু একজন তো এখানে কেঁদে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
~ কে?
~ অর্নীল স্যার।
মিম সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে বসে পরলো। মিম কিছুই বলছেনা। শুধু ফোনটা কানে ধরে আছে। অনেকক্ষণ পর মিম বলছে,
~ কেনো কাঁদছে?

~ স্যার আপনার এড্রেস চাইছে।
~ চার বছর পাঁচ মাসে কি মনে হয়নি আমার এড্রেস জানার দরকার? আজ হঠাৎ মনে হলো! (হেসে মিম)
~ কথা বলেন স্যারের সাথে।

~ একদম না। রাতে কল করছি তোমায়।
মিম ফোন কেটে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। অর্নীল এখন যেখান থেকেই হোক মিমকে খুঁজে বের করবে। কিছুক্ষণ পর অর্নীল বলে,
~ ও এখন আমায় দূরে দূরে রাখবে তো, রাখুক। মিম তোমাকে ভাইভারে কল করেছে তো? মিমের নাম্বারটা দাও আমায়।
~ ম্যামের নাম্বার দেখা যায়না স্যার।
~ তোমার ফোনটা দাও তো।

অর্নীল ভাইবার চেক করে দেখলো আসলেই মিমের নাম্বার দেখা যায়না। অর্নীল শৈলিকে জিজ্ঞেস করলো,
~ কত তারিখে মিম বাংলাদেশ থেকে গেছে সেইটা মনে আছে?
~ ১১ ডিসেম্বর, ২০১৫ আর বিকাল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইট ছিল।
~ আচ্ছা আর কিছু লাগবেনা।

অর্নীল চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা এয়ারপোর্টে গেলো। এয়ারপোর্টের হোস্টকে বলল,
~ ১১ ডিসেম্বর, ২০১৫ তে যতগুলো ফ্লাইট গেছে সেগুলোর ডিটেইলস চেক করে বলুন তো মিম চৌধুরী নামে কেউ সেইদিন বাইরে গিয়েছে কি না! প্লিজ তারাতারি করুন।
~ দেখছি স্যার। সময়টা বললে খুঁজতে সুবিধা হত।
~ বিকেল সাড়ে পাঁচটা।
~ ওয়েট স্যার।

কাঁদতে কাঁদতে অর্নীলের চোখ লাল হয়ে গেছে। এই চার বছরে অর্নীল অনেক পালটে গেছে। চাপ দাড়ি রেখেছে অল্প, চুলগুলো বড় বড়। দেখতেও সুন্দর লাগে এখন।
~ হ্যা মিম চৌধুরী সেইদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সিঙ্গাপুর গিয়েছিলো। সাথে ওনার বাবা ছিলেন। (হোস্ট)
~ থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ।

অর্নীল দ্রুত বাড়িতে এলো। অর্নীলকে এই সময় বাসায় দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়।
~ অর্নীল তুই এই সময় বাড়িতে? (অর্নীলের ঘরে এসে অর্নীলের মা)
অর্নীল অনলাইনে সিঙ্গাপুরের টিকিট কাটার ব্যবস্থা করছে। মায়ের কথার জবাব দিচ্ছেনা অর্নীল।
~ কি হয়েছে তোর?
~ আমি সিঙ্গাপুর যাচ্ছি আগামীকাল। টিকিট কনফার্ম করলাম। (ল্যাপটপ রেখে জামাকাপড় ট্রলিতে ঢুকাচ্ছে অর্নীল)
~ হঠাৎ সিঙ্গাপুর কেনো?

~ তোমার বৌমাকে আনতে।
~ মিম সিঙ্গাপুর আছে? আর এত বছর পর ওকে আনতে যাবি কেন?
~ কারণ ও নির্দোষ ছিল আম্মু। আমি ওকে ভুল বুঝে ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম সাথে আমার মেয়েটাকেও! (জামাকাপড় ছুড়ে মেরে অর্নীল)

~ তোর মেয়ে মানে?
~ হ্যা মা আমার তিন বছর বয়সী মেয়ে আছে। আরাধ্যা চৌধুরী। তোমার একমাত্র নাতনি।
এই কথা শুনে অর্নীলের আম্মু মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
~ মিম যখন এখান থেকে চলে যায় তখন হয়ত আরাধ্যা ওর পেটে ছিলো। ও বুঝেনাই। আমার নিজেই নিজেকে এখন মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে আম্মু। ওই সময়ে আমি ওকে এত বড় কষ্ট দিয়েছিলাম! (আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে অর্নীল)

পর্ব ১৭

অর্নীল আম্মুকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলো। অর্নীলের কান্না দেখে আম্মু ও কেঁদে ফেললেন। অর্নীলের আম্মু অর্নীলকে জিজ্ঞেস করলো,
~ মিমকে কিভাবে ভুল বুঝলি তুই? আর মিমই বা নির্দোষ কেনো?

~ ওইদিন ওর কোনো বন্ধুর বার্থডে পার্টি ছিল না মা। আমি তোমাকে বলেছিলাম না সেইদিনের কয়েকদিন আগে থেকেই মিম যেন কেমন হয়ে গেছে? মিমের অফিসের প্রত্যেকটা ইনফরমেশন হ্যাক করেছে আয়মান শিকদার। এইসব নিয়ে মিমকে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছে।

শেষে মিমের কাছে চাইলো মিমের সমস্ত প্রপার্টি। মিম আমাকে ঠকাবেনা বলে নিজে বিক্রি হয়ে যায়নি ওই আয়মান শিকদারের কাছে। ওর সমস্ত প্রপার্টি সেইদিন ও লিখে দিতে গেছিলো ওই হোটেলে। আর ওই হোটেলে কাপল ছাড়া রুম বুক করার পার্মিশন নেই। তাই মিম মিসেস নেহা শিকদার ছদ্মনামে আর মুখ ঢেকে হোটেলে ঢুকতো যাতে কেউ ওকে না চিনে।
~ এতকিছু হয়ে গিয়েছিলো মিম তোকে জানালো না?

~ এইজন্যই তো আজ আমরা আলাদা আম্মু। ও একবার আমাকে জানাতে পারতো। ও জানায়নি আমার এগ্রেসিভ স্বভাবের জন্য। আমি রেগে যেতাম না ওইদিন যদি না ও আমায় মিথ্যে বলে বাড়ি থেকে বের হতো! আমি এতবড় ভুল করব ভাবিনি আম্মু! কি না কি বলেছি ওকে আমি।

~ আমরা কি কম বলেছি নাকি? আমরাও তো মেয়েটাকে কত কথা শুনিয়েছি।
~ আমি জানিনা আমি এর প্রায়োশ্চিত্ত কিভাবে করব? সবচেয়ে বেশি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো মিসেস আয়মান শিকদার কথাটা শুনে। আমি আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি আম্মু। নিজের শরীরের শক্তি দিয়ে ওকে মেরেছিলাম। হায়! আমি যদি তখন এসব জানতাম তাহলে কি আজ এইদিন দেখতে হতো আমার? (মাথা নিচু করে অর্নীল)

~ তুই যা! মিমকে নিয়ে আয়। আমি জানিনা মিম আমাদের মাফ করবে নাকি। প্রয়োজন হলে ওর পা ধরে মাফ চেয়ে নিব। আমার ছোট্ট দিদি ভাই কে যে দেখতে ইচ্ছে করছে এখন।
~ আজকের টিকিট পেলে আজই যেতাম।

অর্নীল বসে বসে সেইদিনের কথাই ভাবছে যেইদিন ও মিমকে তিনটে চড় মেরেছিলো মিমের কোনো দোষ ছাড়াই। কেন সেইদিন ও মিমকে জিজ্ঞেস করলো না সবকিছু? কেন এতটা রেগে গিয়েছিলো সেইদিন? ওর রাগের জন্যই আজ দুজন আলাদা। সেইদিন আর অর্নীল ঘুমাতে পারেনি। সকাল এগারোটায় অর্নীলের ফ্লাইট। না খেয়েই অর্নীল সুটকেস নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আরুশকে বলে গেলো অফিসে বসতে। ফ্লাইটের এক ঘণ্টা আগেই অর্নীল এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছায়। অর্নীল একটা কথাই ভাবছে সিঙ্গাপুর তো আর ছোট শহর না! কোথায় খুঁজে পাবে ও মিমকে? এসব ভাবতে ভাবতে অর্নীলের কান্না করা অবস্থা। অর্নীল তখন শৈলিকে ফোন দেয়।
~ শৈলি আরাধ্যা কি স্কুলে পড়ে? (অর্নীল)
~ হ্যা।

~ ও কোন স্কুলে পড়ে সেইটা কি জানো?
~ না স্যার।

~ কোনোভাবে কি জানতে পারবেনা মিমের থেকে?
~ জানিনা ম্যাম বলবে কি না! তবে চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু কেনো স্যার?
~ আমি এখন এয়ারপোর্টে। সিঙ্গাপুর যাচ্ছি।
~ সিঙ্গাপুর কেনো?
~ মিম সেখানেই আছে।

~ আপনি কি করে জানলেন স্যার? (অবাক হয়ে শৈলি)
~ জেনেছি কোনো এক ভাবে। তুমি মিমকে বলো না আমি যাচ্ছি। তুমি শুধু আরাধ্যার স্কুলের নামটা জেনে আমায় জানাও সেইটা যেকোনো ভাবেই হোক।
~ চেষ্টা করছি স্যার।

অর্নীলের ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে। অর্নীল বাবা মাকে বিদায় জানিয়ে প্লেনে গিয়ে বসলো। অর্নীলের বাবা ভীষণভাবে লজ্জিত কারণ উনি কিছু না জেনেই মিমকে বাজারী মেয়ে বলেছিলো। অর্নীলকে এখন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলেও আটকানো সম্ভব না তাই আর কেউ আটকায় নি অর্নীলকে। আর কেনই বা আটকাবে? নিজের ভুল শুধরে বউকে আনতে যাওয়া অপরাধ নাকি?

অর্নীল সিঙ্গাপুর ল্যান্ড করার পর পরই সিম পাল্টে সবার আগে শৈলিকে ফোন করলো।
~ জানতে পেরেছো কিছু? (গাড়িতে উঠে অর্নীল)
~ হ্যা স্যার তবে ম্যাম বলেনি। আরাধ্যা মামনি বলে দিয়েছে কথায় কথায়।
~ নাম কি স্কুলের?
~ অলিভিয়া হোমস (কাল্পনিক)

~ আচ্ছা আর কিছু লাগবেনা৷ ধন্যবাদ তোমায়। মিমকে কিছু বলনি তো?
~ না।
~ রাখছি বাই।
~ অল দা বেস্ট স্যার।
~ থ্যাংক ইউ।

অর্নীল জানে অলিভিয়া হোমস লিটল ইন্ডিয়ার ওইদিকেই। বেশ বড় স্কুল ওইটা। সচরাচর গরিব বাচ্চাদের সেখানে পড়তে দেখা যায় না। স্কুলটা অনেক বেশি এক্সপেন্সিভ। অর্নীল আর কিছু চিন্তা না করে লিটল ইন্ডিয়াতে গেলো। সিঙ্গাপুরে ইন্ডিয়ার স্বাদ পাওয়ার জন্য এই হোটেলটাই যথেষ্ট। মিম কি তাহলে এখানেই থাকে? অর্নীল হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে মিমকে সোশ্যাল সাইটে খুঁজতে শুরু করলো। কিন্তু ফেইসবুকে মিম নেই। থাকলে অন্তত জায়গার নামটা দেখা যেতো। অর্নীল অল্প একটু জুস খেয়ে সেখানকার কপ (পুলিশ) কে ফোন করলো।
~ আমি কি পুলিশের সাথে কথা বলছি? (অর্নীল ইংলিশে)
~ হ্যা বলুন। কি হেল্প চাই?

~ আমার একটা ইনফরমেশন চাই শুধু। আমি একজন বিজনেসম্যান। বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
~ দেখুন স্যার আমরা দেশের মানুষ ছাড়া বাইরের কাউকে তথ্য দিতে বাধ্য নই।
~ এই তথ্যটা না দিলে যে আমি আমার স্ত্রী কে খুঁজে পাবনা।
~ আপনার স্ত্রী কি হারিয়ে গেছে?

~ ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ তে আমার স্ত্রী সিঙ্গাপুর ল্যান্ড করেছে। ও বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আমি এখন জানিনা ও কোন জায়গায় আছে। আপনি যদি সেইদিনের ডিটেইলস চেক করে বাংলাদেশীদের থাকার ঠিকানা দিতেন!
~ এক্ষেত্রে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি৷ নাম কি আপনার স্ত্রীর?
~ মিম চৌধুরী।
~ খুব দ্রুত জানাবো আপনাকে।
~ ধন্যবাদ।

অর্নীল কাল সকালে আরাধ্যার স্কুলে যাবে। দেখা যাক কি হয়? এত সহজে কিভাবে খুঁজে পাব আমি মিমকে?
চিন্তায় চিন্তায় অর্নীলের সেইদিন কেটে গেল। পুলিশ জানালো সেইদিনকার ঠিকানা অনুযায়ী মিম লিটল ইন্ডিয়ায় উঠেছে। বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন ও হতে পারে কারণ চার বছর তো কেউ আর হোটেলে থাকবেনা!
পরেরদিন সকাল এগারোটায় অর্নীল আরাধ্যার স্কুলে গেল। মেয়েকে তো কখনো দেখেও নি অর্নীল, চিনবে কি করে? অর্নীল স্কুলে ঢুকতে যাবে তখন দেখে বাচ্চারা বেরিয়ে গেছে। স্কুল ছুটি। একটা বাচ্চা মেয়ে গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াটার বোতল হাতে নিয়ে। অর্নীল সিকিউরিটি গার্ডকে প্রশ্ন করলো,
~ ইজ স্কুল ওভার?
~ ইয়েস স্যার।

~ ক্যান আই মিট উইথ দা প্রিন্সিপাল?
~ নো স্যার। মিস্টার সান ইজ বিজি। প্লিজ কাম টুমোরো।
অর্নীল ট্যাক্সিতে উঠতে যাবে তখনো দেখে বাচ্চা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। কি মায়াবী বাচ্চাটা! অর্নীল ট্যাক্সি থেকে নেমে মেয়েটার কাছে গেলো।

~ আর ইউ ওয়েটিং ফর সামওয়ান বেবি? (অর্নীল বাচ্চা মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো)
~ ইয়েস আঙ্কেল। একচুয়েলি টুডে স্কুল ইজ ওভার সো ফাস্ট। মাই গ্র‍্যান্ড পা ডোন্ট নো এবাউট দিজ। মে বি দ্যাটস হোয়াই হি ইজ গেটিং লেইট।
~ তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারো। (কিভাবে যেন অর্নীলের মুখ দিয়ে বাংলা বেরিয়ে গেলো)
~ আপনি বাংলা বলতে পারেন? (হেসে মেয়েটি)
~ তুমি ও তো বাংলা জানো।

~ হ্যা মামনি শিখিয়েছে।
~ তুমি চাইলে আমি তোমাকে তোমার বাসায় দিয়ে আসতে পারি। এখানে একা একা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বলো তো!
~ নানাভাই না আসা পর্যন্ত তো দাঁড়াতেই হবে। ধন্যবাদ আঙ্কেল। এক্ষুণি এসে পরবে নানাভাই কারণ এইমাত্র স্কুলের সময় শেষ হলো।
~ কি কিউটলি কথা বলো তুমি! (মেয়েটির গালে চুমু দিয়ে অর্নীল) নাম কি তোমার?
~ আরাধ্যা চৌধুরী।

মেয়েটির নাম শুনে অর্নীল যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো। অর্নীল তাঁকিয়ে আছে আরাধ্যার দিকে। অর্নীল আরাধ্যার সামনে নিচু হয়ে বসলো।
~ তোমার মামনির নাম কি?

~ মিম চৌধুরী।
এইবার অর্নীলের হাত পা কাঁপছে। এইটা ওর নিজের মেয়ে! এত সুন্দর কোনো বাচ্চা মেয়ে দেখতে হয় নাকি? এত সহজে পেয়ে গেলাম আমি আমার মেয়েকে? অর্নীল কোনো কথা না বলে আরাধ্যাকে কোলে তুলে নেয়। আরাধ্যার গালে অনেকগুলো চুমু দেয় অর্নীল।

~ কি করছেন আপনি আঙ্কেল? নামিয়ে দিন আমায়। মামনি আমায় অচেনা কারো কোলে উঠতে নিষেধ করেছে।
~ আরাধ্যা তোমার বাবার নাম জানো না তুমি? (ছলছল চোখে আরাধ্যার দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ বাবা কি আমি তো সেইটাই জানিনা। নাম কিভাবে জানব? নামিয়ে দিন আমাকে। আমার মামনি চলে এসেছে।
~ কোথায় তোমার মামনি? (সাথে সাথে পেছনে ঘুরে অর্নীল)

অর্নীল পেছনে তাঁকিয়ে দেখে মিম কাঁদছে। আরাধ্যাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয় অর্নীল। অর্নীল যেন বোবা হয়ে গেছে মিমকে দেখে। মিম চোখের পানি মুছে আরাধ্যাকে বলে,
~ সরি মা। তোমার নানাভাই একটু অসুস্থ তো তাই আমার আসতে দেরি হলো। চল বাসায় যাই।
~ বাই আংকেল। (অর্নীলকে বাই বলে আরাধ্যা)

অর্নীলকে আঙ্কেল বলাতে মিমের খুব লাগলো। মিম গাড়িতে উঠতে যাবে তখনি অর্নীল মিমের হাত ধরে।
~ এত অভিমান তোমার? সামনে দেখেও কিছু না বলে চলে যাচ্ছো? (অর্নীল)
মিম কোনো কথা না বলে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। আরাধ্যা গাড়িতে বসে আছে।
~ হাতটা ছাড়ো! (অন্যদিকে তাঁকিয়ে মিম)

~ কেনো ছাড়ব? তাঁকাও আমার দিকে। (মিমের মুখে হাত দিয়ে অর্নীল)
~ দিজ ইজ ঠু মাচ চৌধুরী! (অর্নীলের হাত ছাড়িয়ে মিম) কেনো এসেছো এখানে?
~ আমার ভুলের প্রায়োশ্চিত্ত করতে।
~ কোনো ভুল নেই তোমার।

~ আমার মেয়েকে এতগুলা বছর আমার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছো, জানাও নি একবার। এর চেয়েও কোনো কঠিন শাস্তি দেওয়া বাকি আমায় মিম?

~ আরাধ্যা শুধু আমার মেয়ে। ওর কোনো বাবা নেই। আর তোমারো কোনো ভুল নেই। চলে যাও বাংলাদেশে।
~ মিম আমি তোমাদের নিয়েই যাব। আমি একা চলে যেতে আসিনি এখানে। আমার সমস্ত ভুলের জন্য আমি তোমার কাছে মাফ চাইছি। (হাত জড় করে অর্নীল)
~ ভুল আমার ছিল, চরিত্রহীনা আমি ছিলাম, বাজারী মেয়েও আমি ছিলাম। এর মধ্যে তোমার কোনো ভুল নেই চৌধুরী! মাফ চেয়ো না।

অর্নীলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মিম গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। অর্নীল ও ট্যাক্সি নিয়ে মিমকে ফলো করছে। অর্নীল জানে খুব ভাল করেই এই অভিমান এত সহজে ভাঙবেনা। মিম গাড়ি চালাচ্ছে আর কাঁদছে। আরাধ্যা মিমকে জিজ্ঞেস করে,
~ মামনি কাঁদছো কেনো?
~ কিছু না মা।

~ তুমি আঙ্কেল টার সাথে এত কথা কেন বললে?
মিম চুপ করে থাকলো। আরাধ্যা ট্যাব নিয়ে গেমস খেলছে। মিম ভাবছে,
~ এতকিছুর পরে চার বছর পর মনে পরলো তোমার চৌধুরী? এই চার বছরে কি একবারো মনে হয়নি তোমার বউ আছে? এত পালটে গেছো? আমি আর কখনো যাব না বাংলাদেশে চৌধুরী, তোমার জীবনেও আমি আর ফিরে যাবনা।

বিশ মিনিট পর মিম বাড়িতে আসলো। মিম আরাধ্যাকে নামিয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাবে তখন অর্নীল মিমকে পেছন থেকে ডাকে।
~ মিম?

~ আপনি কে? ম্যামকে কেনো ডাকছেন? (সিকিউরিটি)
~ আমি তোমার ম্যামের হাজবেন্ড! (অর্নীল)
অর্নীলের কথা শুনে আরাধ্যা অর্নীলের দিকে তাঁকায়। আরাধ্যা জানে হাজবেন্ড মানে স্বামী। আরাধ্যা অর্নীলের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

~ আপনি আমার মামনির স্বামী হন? (আরাধ্যা)
~ হ্যা সোনা। আর তোমার বাবা হই। (আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে অর্নীল)
~ আপনিই তাহলে আমার ফাদার?
~ হ্যা।

~ আজকে ছাড়া আর কখনো তো আমি আপনাকে দেখিনি!
~ আমি বাংলাদেশে ছিলাম বাবু। তোমার মামনি তোমার বাবাইয়ের উপর রাগ করে তোমায় নিয়ে এখানে চলে এসেছে।

পর্ব ১৮

অর্নীল আরাধ্যাকে বোঝাচ্ছে কিন্তু আরাধ্যার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব। এইবার মিম বলে,
~ সমস্যা কি তোমার? ছাড়ো আমার মেয়েকে। আরাধ্যা একদিন না বলেছি অচেনা কারো সাথে কোনো কথা বলতে না? (চোখ রাঙিয়ে মিম)

~ মামনি উনি নাকি আমার বাবা হয়? (মিমের কাছে এসে আরাধ্যা)
~ না। তোমার কোনো বাবা নেই। আমি তোমার মামনি। মামনি আর নানাভাই ছাড়া তোমার আর কেউ নেই। ইজ ইট ক্লিয়ার টু ইউ? (আরাধ্যাকে ধমক দিয়ে মিম)
~ ইয়েস মামনি। আমি বাসায় যাই।

আরাধ্যার স্কুল ব্যাগ মিমের হাতে। আরাধ্যা বাসায় চলে যায়। মিম বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। অর্নীল মিমের সামনে আসে। মিম বলে,
~ আর এক মুহুর্ত দেরি না করে এখান থেকে চলে যাও।

~ আমি তোমাদের নিয়ে যেতে এসেছি মিম। আমি একা যাওয়ার জন্য আসিনি।

~ না। আমরা কেউই বাংলাদেশে যাবনা। আর প্রায় সাড়ে চার বছর পর নিতে আসার কথা মনে হলো কেন?
~ আমার ভুল ভাঙতে ভাঙতে এত দেরি হয়ে গেছে মিম। আমার সাথে দুইদিন আগে আয়মান শিকদারের দেখা হয়েছে। ও সেইদিন আমায় সব বলেছে। আমি এখন জানিও না ও বেঁচে আছে না মরে গেছে। মিম প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দাও শেষ বারের মতো। প্লিজ আমার সাথে বাংলাদেশে চল। যথেষ্ট শাস্তি তো পেয়েছি আমি।

~ মিস্টার অর্নীল চৌধুরী ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট। এখন না আমি আপনার বউ আর না আপনি আমার স্বামী। আমায় অনুরোধ করার সুযোগ ও আপনার আর নেই। বেরিয়ে যান এখান থেকে৷ সিকিউরিটি কিছু করলে পরে এর দায় কিন্তু আমি নিবনা। সো সম্মানের সহিত বেরিয়ে যান।

মিম এ কথা বলে ভিতরে ঢুকতে যাবে তখন অর্নীল মিমের হাত ধরে মিমকে দেয়ালের সাথে দাঁড় করায়। মিমের হাত থেকে আরাধ্যার স্কুল ব্যাগ পরে যায়। মিমের ঘড়ি পরা হাতে অর্নীল এত জোরে চেপে ধরে যে ঘড়ির চেইনের ছাপগুলো মিমের হাতে পরে গেছে। মিম ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। ওদের এইভাবে দেখে সিকিউরিটি ঘুরে দাঁড়ায়।

~ অনেক হয়েছে! মাফ চাইছি এত করে সেইটা কি তোমার কানে যাচ্ছেনা? ভুল কি মানুষ করেনা? কোনো গরু ছাগল তো ভুল করেনা। মানছি আমার ভুল হয়েছে। এজন্য কি আমি মাফ পাওয়ার যোগ্য না? দোষ কি তুমি করনি? এত কিছু হয়ে গিয়েছিলো জানিয়েছিলে আমায় একবারো? মিথ্যে বলে কেনো সেইদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছো? দোষ কি আমার একার? (অর্নীল রেগে গেছে)

~ এজন্যই আমি আলাদা হয়ে গেছি। চরিত্রাহীনা তো আমি ছিলাম তাই আমি আলাদা হয়ে গেছি। দোষী ও আমি ছিলাম তাই আমিই আলাদা হয়ে গেছি।

~ উফফো! মিম জাস্ট ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড! আমি সত্যিই সরি। মানুষ রাগের মাথায় যা বলে মন থেকে নিশ্চই সেইটা মিন করতে চায়না? তবে আমার বেলায় কেনো তার উলটা হবে?
~ ছাড়ো আমায়।

~ না ছাড়তে পারবনা। (মিমের আরো কাছে এসে অর্নীল)
~ চৌধুরী অসভ্যতামো করনা। এইটা তোমার বাড়ির বেডরুম না যে আমার সাথে যা খুশি করবা! (ঝাড়ি দিয়ে মিম)
~ তো চলো আমার বেডরুমে! দেখা যাক কি করতে পারি আর কি না পারি!
মিম এইবার রেগেই গেলো। মিম অর্নীলের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছেনা। যতই হাত মোচড়াচ্ছে মিম ততই ব্যাথা পাচ্ছে। অর্নীল ও নাছোরবান্দা! ছাড়বেনা মিমকে।

~ মিম আমি মাত্র সাতদিনের ভিসা নিয়ে সিঙ্গাপুর এসেছি। প্লিজ আমায় হতাশ করনা তুমি। এই সাড়ে চার বছর কি শুধু তুমিই একা কষ্ট করেছো? আমি করিনি? আমার জায়গায় যদি সেইদিন তুমি থাকতে তাহলে কি করতে তুমি? পাগলের মতো ভালবাসি তোমায়। সেই আমি কিভাবে মানতাম যে তুমি শিকদারের বউ? এই কথাটা শুনলে তুমি পারতে ঠিক থাকতে? রাগ উঠতো না?

~ চৌধুরী ছাড়ো আমায়। আমার হাত কেটে যাচ্ছে!

অর্নীল মিমের হাত ছেড়ে দিলো। ঘড়ির চেইনের জন্য আসলেই হাত কেটে গেছে। অর্নীল ওর পকেট থেকে রুমাল বের করে মিমের হাত চেপে ধরলো। মিমের হাত থেকে ঘড়ি খুলে দিলো।
~ ছাড়ো। দরকার নাই তোমার সিম্পেথির! (রুমাল ফেলে দিয়ে মিম)
মিম কাটা হাত নিয়ে বাসায় চলে এলো। ড্রইংরুমে বাপি বসে আছে।

বাইরে থেকে অর্নীল আর মিমের কথার আওয়াজ আসছিলো বলে উনি আর বাইরে যায়নি। আরাধ্যাকে মেইড জামাকাপড় পালটে দিয়েছে। মিমকে দেখে বাপি উঠে দাঁড়ালেন। মিম বাপিকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। মিম কাঁদতে কাঁদতে বলল,
~ বাপি চৌধুরীকে চলে যেতে বলো! কেন এসেছে ও? আমি তো ভালই ছিলাম। (হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মিম)
অর্নীল পেছনে দাঁড়িয়ে মিমের কান্না দেখছে।

~ তুমি ঘরে যাও। আমি কথা বলছি অর্নীলের সাথে। আরাধ্যা অনেকক্ষণ আগে তোমায় ডেকেছে। যাও। (মিমের বাপি)

অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে মিম চলে গেলো। অর্নীল মিমের বাপিকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো।
~ আপনার মেয়ে যা বলল আপনিও কি সেইটাই বলবেন বাবা? (অর্নীল)

~ সবসময় নিজের মেয়েকে হাসিখুশি দেখতে চেয়েছি আমি। আমার মেয়ে অনেক অভিমানী। হয়ত কখনো দেখায়নি। ও অভিমান করলে তা ভাঙানো এত সহজ না অর্নীল। আমি এতদিন মন থেকে চেয়েছি তুমি এসে আমার মেয়েকে নিয়ে যাও। মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে এই সাড়ে চার বছর। অনেক লম্বা সময় এইটা অর্নীল। ভুল বুঝাবুঝি স্বামী স্ত্রীর মধ্যে হবেই। এজন্য আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তকে সাপোর্ট করিনা আমি। তুমি দেখো কোনোভাবে নিয়ে যেতে পারো কি না মিমকে। আমি আর কয়দিন বাঁচব? আমার মেয়েকে ওর স্বামীর হাতে তুলে তো দিতে হবে আমায়! ওর অনিশ্চিত ভবিষ্যত দেখে আমি কিভাবে শান্তি পাই?

~ বাবা আমি মানছি ভুল আমার হয়েছে। আমার সবকিছু জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিল। অনেকটা সময় ও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমার কি করা উচিৎ বলেন? আমি সত্যিটা জানা মাত্রই চলে এসেছি।
~ আমার থেকে তোমরা ভাল বুঝবা। কোন হোটেলে উঠেছো?
~ লিটল ইন্ডিয়া।

~ সবকিছু নিয়ে এখানে চলে এসো। আমি তোমায় একটাই সাজেশন দিতে পারি সেইটা হচ্ছে আরাধ্যাকে বাবার আদর দিয়ে কনভিন্স করা৷ আরাধ্যা কনভিন্স হলে মিম ও কনভিন্স হয়ে যাবে৷ অর্নীল আমি বিশ্বাস করে একমাত্র মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এইদিন দেখার জন্য না কিন্তু৷
~ এইজন্য আমি লজ্জিত বাবা। (মাথা নিচু করে অর্নীল)
~ সবকিছু নিয়ে এই বাসায় আসো। মেয়েকে আমি বোঝাচ্ছি।

অর্নীল বেরিয়ে যায় হোটেলের উদ্দেশ্যে৷ বাবার দেওয়া সাজেশন ভুল নয়! আমার মেয়েটা বুঝেই না বাবা কি! আর মিমের রাগ ভাঙানোর জন্য মিমের কাছে থাকা জরুরি। অর্নীল বিকেলের মধ্যে সুটকেস নিয়ে মিমের বাসায় আসে। মিম তখন আরাধ্যাকে খাওয়াচ্ছিলো। অর্নীলকে দেখে আরাধ্যা দৌড়ে আসে।
~ আংকেল তুমি এখানে থাকবে? আমাদের সাথে?
~ হ্যা মামনি। আর আংকেল না আমি। বাবাই বলবা। (আরাধ্যার গালে চুমু দিয়ে অর্নীল)
~ বাপি? বাপি? (চিৎকার করে মিম)
~ কি হয়েছে? (বাপি)

~ ও এখানে কি করছে? ও কি এখানে থাকবে নাকি? (মিম)
~ হ্যা। তাছাড়া কোথায় থাকবে? নিজের পরিবার ছেড়ে ও হোটেলে থাকবে? (বাপি)
~ বাপি ওর কোনো পরিবার নেই। বেরিয়ে যেতে বল ওকে।

~ আমি আগামী ছয়দিনের ভাড়া না হয় দিয়ে দিব। খাবার খরচ ও দিয়ে দিব। বাবা আমি থাকতে পারি তো? (অর্নীল)
~ হ্যা পারো। আরাধ্যা, নানুভাই এইটা তোমার বাবা। অর্নীল চৌধুরী। (বাপি)
~ আচ্ছা নানুভাই। বাবাই তুমি আমার আর মামনির ঘরে থাকবে? (আরাধ্যা)
আরাধ্যার কথা শুনে মিমের চোখ লাল হয়ে যায়। আরাধ্যাকে যে বাটিতে খাওয়াচ্ছিলো সেই বাটি ভেঙে ফেলে মিম চলে যায়।

~ হ্যা সোনা থাকব। এখন তুমি রেডি হও। আমরা বাইরে যাব ঘুরতে। (অর্নীল)
~ কিহ? সত্যিই? (হেসে আরাধ্যা)

~ হ্যা।
মিম নিজের ঘরে গিয়ে বসে আছে। আরাধ্যা ঘরে গিয়ে একটা শর্ট আর একটা টি শার্ট আনলো। আরাধ্যাকে অর্নীল জামা পরিয়ে দিলো। আরাধ্যার চুল ও বেঁধে দিলো অর্নীল। আরাধ্যা একা একা জুতা পরতে পারেনা। আরাধ্যাকে শু ও পরিয়ে দিলো অর্নীল। অর্নীল অন্য ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পালটে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে আসে। মিম জানেও না আরাধ্যাকে নিয়ে অর্নীল বেরোচ্ছে।

নানাভাইকে বাই বলে আরাধ্যা বেরিয়ে যায়। আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে ঘুরে অর্নীল। এক মুহুর্তের জন্যেও আরাধ্যাকে কোল থেকে নামায়না। অর্নীল মুস্তাফায় গিয়ে আরাধ্যার জন্য অনেক খেলনা কিনলো। খেলনা গুলো গাড়িতে রেখে অর্নীল আরাধ্যাকে আইসক্রিম আর চকলেটস ও কিনে দিলো। বাবা হওয়ার স্বার্থকতা হয়ত এখানেই! পার্কে গিয়ে আরাধ্যাকে রাইডে ও উঠালো অর্নীল আর নিজেও উঠলো। এত মজা আরাধ্যা কখনো করেনি। মিম এইভাবে আরাধ্যাকে ঘুরায় নি কখনো! অর্নীল রাত করে আরাধ্যাকে নিয়ে বাড়িতে ফেরে। বাড়িতে ফেরার সময় আরাধ্যা অর্নীলকে জিজ্ঞেস করে,
~ তুমি আমার বাবাই হলে আমি তোমার কি হই?
~ মেয়ে হও। (হেসে অর্নীল)

~ তুমি আমাকে এতকিছু কিনে দিলে বাবাই?
~ কেনো মা কি হয়েছে? তুমি খুশি হওনি?
~ ভীষণ খুশি হয়েছি। তুমি আমায় মামনির মতো ভালবাসো তাইনা?
~ হ্যা তো। তোমার মামনি মনে হয় আজকে তোমায় অনেক বকবে।
~ কেনো?
~ এই যে তুমি আমার সাথে ঘুরতে এসেছো তাই।
~ আচ্ছা বাবাই মামনি কেনো তোমার সাথে এমন করে?
~ রাগ করেছে যে তোমার মামনি তাই।
~ ও!
বাসায় আসার পর মিম এক দৃষ্টিতে আরাধ্যার দিকে তাঁকিয়ে থাকে। আরাধ্যা ভয়ে অর্নীলের প্যান্ট খামচে ধরে। আরাধ্যাকে কোলে নেয় অর্নীল।
~ তুই কার পার্মিশন নিয়ে বাইরে গেছিস? (আরাধ্যাকে প্রশ্ন করলো মিম)
~ মামনি তুমি আমায় তুই বলছো?

~ চুপ একদম। তুই কি আমায় বলে বাইরে গিয়েছিলি? (মিম রেগে)
~ মিম ওকে কেনো বকছো? আমিই নিয়ে গেছি ওকে। বাবা হয়ে আমি মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারিনা? (অর্নীল)

~ ইউ জাস্ট শাট আপ! (অর্নীলকে ধমক দিয়ে মিম) তুই নেমে আয়। (আরাধ্যাকে বলল মিম)
~ মামনি আই এম সরি। প্লিজ বকো না আমায়। (কেঁদে দিয়ে আরাধ্যা)
~ একদম কাঁদবিনা। এই মেয়ে বাবাকে কয়দিন ধরে চিনিস যে বাবার সাথে ঘুরতে চলে গেলি? (আরাধ্যার হাত ঝাকিয়ে মিম)
~ মামনি ছেড়ে দাও আরাধ্যাকে। ও ছোট৷ ওর বাবা মা দুজনেরই দরকার আছে। তুমি অর্নীলের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নাও। (বাপি)
~ ইম্পসিবল বাপি। এসো আমার সাথে।

আরাধ্যার হাত ধরে মিম ঘরে চলে গেল। অর্নীল শার্ট এর একটা বোতাম খুলে সোফার উপর বসে পরলো। কতটা দূরে চলে গেছে মিম অর্নীলের থেকে! মেইড এসে অর্নীলকে পানি দিলো। কিন্তু অর্নীল পানি না খেয়েই বাইরে চলে গেলো। বাইরে গিয়ে বাড়ির সিঁড়িতে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে অর্নীল। অর্নীল ভাবছে,
~ আজকে আমার মেয়ের সাথে আমি টাইম স্পেন্ড করেছি। এতটা আনন্দ কখনো হয়নি আমার। আমি সত্যিই বাবা হতে পেরেছি!

রাত বাড়ছে কিন্তু অর্নীল বাইরেই বসে আছে। বাংলাদেশ থেকে মা বাবা ফোন দিচ্ছে কিন্তু অর্নীল রিসিভ করছেনা। ভাল লাগছে না ওর। ইচ্ছে করছে মিমকে জড়িয়ে ধরতে। অর্নীল ডিনার ও করেনি। মিম ও রাতে খায়নি। আরাধ্যা ঘুমিয়ে গেছে। মিমের ভাল লাগছেনা। মিম বাইরে আসে হাঁটবে বলে। এসে দেখে অর্নীল সিঁড়িতে এখনো বসে আছে। মিম পাশ কাটিয়ে নিচে নামে।
~ মিম? (মিমের হাত ধরে অর্নীল)
~ হাতটা ছাড়ো!
~ ঐ হাতে ব্যান্ডেজ করেছো?

~ তা জেনে তোমার কি লাভ?
~ ঘুমাও নি কেন এখনো?
~ সেই কৈফিয়ত কি তোমায় দিতে হবে?
~ কেন এত কষ্ট দিচ্ছো? মাফ করে দাওনা প্লিজ।
~ কোনোদিন ও না।

হাত ছাড়িয়ে মিম ঘরে চলে আসে। অর্নীল ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। মিম ইংলিশে মেইডকে বলে,
~ ওনাকে বলো গেস্টরুমে এসে ঘুমাতে। আর ওইখানে ওনার খাবার দিয়ে এসো।
~ ওকে ম্যাম।

মেইড বলার কিছুক্ষণ পর অর্নীল গেস্টরুমে ঘুমাতে যায়। শুগারের ওষুধ ও খায়নি অর্নীল। শুগার বাড়লে সমস্যা। মিম শোয়া থেকে উঠে গেস্টরুমে যায়। গিয়ে দেখে অর্নীল শার্ট~ প্যান্ট না চেঞ্জ করেই শুয়ে আছে। মিম অর্নীলের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ শুগারের ওষুধ খেয়েছো?

অর্নীল কোনো কথা বলছেনা। মিম একটু পর চেক করে দেখে অর্নীল ঘুমিয়ে গেছে। অর্নীলের শার্টের বোতাম সবগুলো খুলে দিয়ে চলে যায় মিম। এসি ছাড়া তো তার কষ্ট হয়। কিন্তু এই ঘরে তো এসি নেই! তাই মিম জানালা খুলে দেয় আর সিলিং ফ্যান অন করে দিয়ে বেরিয়ে আসে। খাবার খায়নি অর্নীল। সেই খাবারের ট্রে টাও হাতে করে নিয়ে আসে ও।
সকালে,

মিম আরাধ্যাকে রেডি করাচ্ছে স্কুলে যাওয়ার জন্য। অর্নীল কফি খেতে খেতে আরাধ্যাকে বলে,
~ মা আমার সাথে যাবা স্কুলে?

~ ইয়েস বাবাই।
~ কোনো দরকার নাই। নানাভাইয়ের সাথে যাবে। (মিম)
~ মামনি বাবাইয়ের সাথে যাই না!

~ তোমার মামনির কিছু বলার দরকার নাই। আমি চেঞ্জ করে আসছি। (অর্নীল)
অর্নীল রেডি হয়ে আরাধ্যাকে নিয়ে বেরিয়ে যায় মিমের সাথে ছোটখাটো একটা ফাইট করে। মিমের গাড়ি নিয়েই যায় অর্নীল। অর্নীলকে আরাধ্যার সাথে দেখে টিচাররা আরাধ্যাকে জিজ্ঞেস করে,
~ কে সে?
~ আমার বাবা।
~ তোমার বাবা অনেক হ্যান্ডসাম তো আরাধ্যা!
~ হ্যা।

এইভাবেই চলে গেলো আরো তিনদিন। অর্নীলের হাতে আছে কেবল মাত্র দুইটাদিন। কিন্তু মিম অনড়। কিছুতেই মিমকে বোঝানো যাচ্ছেনা। পাঁচদিনের দিন রাতে অর্নীল মিমের ঘরে যায়। আরাধ্যা ঘুমিয়ে আছে। মিমের পাশে গিয়ে মিমকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরে অর্নীল।
~ এ কি! তুমি এখানে কেন? (লাফ দিয়ে উঠে মিম)
~ ওই ঘরে এসি নেই।
~ তো এতদিন ছিলা কিভাবে?

~ আর থাকতে পারবনা। আমি আমার বউয়ের সাথে ঘুমাবো। (মিমের কোলে মাথা রেখে অর্নীল)
~ কোনো বউ নেই।
~ আজকে হয়ত তুমি আমার সাথে সব মিটমাট করে নিবা নয়ত আরাধ্যাকে আমার কাছে দিয়ে দিবা। শূন্যতা নিয়ে আমি আর থাকতে পারবনা।

~ বেরিয়ে যাও এ ঘর থেকে। আরাধ্যা বা আমি কেউ হইনা তোমার!
~ তোমার পা ধরব? যাও তোমার পা ধরেই মাফ চাচ্ছি আমি! (মিমের পায়ে হাত দিয়ে অর্নীল)
~ কি করছো তুমি? আমি তো বলিনি আমার পা ধরে তুমি মাফ চাও! শুধু বলেছি আমার জীবন থেকে চলে যাও।
~ এইটাই শেষ কথা তোমার? (খাট থেকে উঠে অর্নীল)
~ ইয়েস।

অর্নীল আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ায়নি সেখানে। ড্রইংরুম থেকে চাকু নিয়ে নিজের ঘরে গেল অর্নীল। টানা এগারোটা পোচ দিলো অর্নীল বাম হাতে। হাত থেকে রক্ত ঝরছে আর অর্নীল হাত মুঠো করে বসে আছে। মেইড অর্নীলকে কফি দিতে এসে দেখে ফ্লোরে রক্ত গড়াচ্ছে আর অর্নীল খাটে শুয়ে আছে হাত মুঠো করে। মেইড দৌড়ে মিমকে গিয়ে সব বলে। মিম দৌড়ে গেস্টরুমে আসে। রক্ত দিয়ে ঘর ভরে গেছে। রক্ত গড়াতে গড়াতে দরজার সামনে চলে এসেছে। অর্নীল খাটের উপর শুয়ে আছে হয়ত সেন্স নেই।

~ চৌধুরী? এই চৌধুরী? টিউলিপ প্লিজ কল দা ডক্টর! (মেইডকে বলল মিম)
অর্নীলের সেন্স নেই। কাটা জায়গাগুলো থেকে কিভাবে রক্ত ঝরছে! মিম টেবিল ক্লথ টান দিয়ে অর্নীলের হাত বাঁধে। মিমের কান্নার আওয়াজ শুনে বাপি আর আরাধ্যার ঘুম ভেঙে যায়।

পর্ব ১৯

অর্নীল বিছানার উপর সেন্সলেস হয়ে পরে আছে। হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে প্রচুর। মিমের কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে বাপি, আরাধ্যা গেস্টরুমে আসে। এত রক্ত দেখে আরাধ্যা ভয় পেয়ে যায়। মিমের কোলে অর্নীলের মাথা। বিশ মিনিট পর ডক্টর বাসায় আসে। অর্নীলের হাত দেখে ডক্টর বলে,
~ মাই গুডনেস! এত বাজে ভাবে হাত কেটেছেন উনি। সুইসাইড করতে চেয়েছেন নিশ্চই! অলরেডি অনেক ব্লাড লস হয়ে গেছে ওনার শরীর থেকে। (কোনোরকম ব্যান্ডেজ করতে করতে ডক্টর)
~ এক্সট্রা ব্লাড দিতে হবে?

~ ওনাকে হসপিটালে এডমিট করুন৷ হাতে তিন/চারটা সেলাই করতে হবে যা আমার দ্বারা সম্ভব না। এক্সট্রা ব্লাড তো লাগবেই। আমি এম্বুলেন্স কল করছি। (ডক্টর)

এতক্ষণে মিমের কলিজা শুকিয়ে গেছে। মেইড আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে রেখেছে। অর্নীলের হাত থেকে রক্ত পরা থামানো গেছে। কোনো সেন্স নেই অর্নীলের। অর্নীলের ভারী দেহ টার ভর সম্পুর্ন মিমের কোলে।
এম্বুলেন্স আসার পর অর্নীলকে হসপিটালে নিয়ে গেলো মিম। টিউলিপ আরাধ্যাকে নিয়ে বাসায় ছিল। বাপি আর মিম হাসপাতালে। মিম নাইটি টাও চেঞ্জ করার সময় পায়নি। চুল কোনোরকম কাটা দিয়ে আটকানো। অর্নীলের কিছু হয়ে গেলে মিম পারবেনা নিজেকে ক্ষমা করতে। মনে প্রাণে ও আল্লাহকে ডাকছে। অর্নীলের হাতে চারটা সেলাই করার পর ডিউটি ডক্টর বলে,

~ দুই ব্যাগ ব্লাড দেওয়া লাগবে। ওনার রক্তের গ্রুপ জানেন? জানলে আমরা পরীক্ষা করবনা।
~ ও নেগেটিভ। (মিম)

~ হ্যা ব্লাড ব্যাংকে আছে এই রক্ত। চিন্তা করবেন না। উনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু এক জায়গায় ভয় আছে। (ডক্টর)
~ কি? (মিম)
~ উনি ডায়বেটিসের রোগী তাইনা?
~ হ্যা। ওর হাই শুগার। ওষুধ ছাড়া চলতে পারেনা। (মিম)

~ ইঞ্জুরিটা কিন্তু মারাত্মক হতে পারে ওনার জন্য। এভাবে হাত কাটা মোটেও ওনার জন্য ভাল কিছুনা। শুকাতে দেরি তো হবেই উল্টো ইনফেকশন হয়ে গেলে খুব রিস্কি হবে ব্যাপারটা। খেয়াল রাখবেন সেইটা।
~ একবার ওর হাত কেটে গিয়েছিলো কাঁচের টুকরায়। দুই মাস লেগেছে সেই হাত ঠিক হতে।
~ এখন আরো বেশি সময় লাগবে। শুগারের ওষুধ কন্টিনিউ করতে বলবেন আর পাশাপাশি হাতে হাল্কা পাতলা ড্রেসিং করিয়ে নিবেন। (ডক্টর)

~ ঠিক আছে ডক্টর। এছাড়া আর কোনো খারাপ খবর নেই তো?
~ না। আট ঘণ্টা পর বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। হাই শুগার থাকলেও উনার ইমিউনিটি সিস্টেম অনেক বেশি তাই এই যাত্রায় বেঁচে গেলেন প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়া সত্ত্বেও।
~ ধন্যবাদ ডক্টর।

মিমের প্রচন্ড রাগ হচ্ছে অর্নীলের উপর। কেনো করলো ও এমনটা? আমি কি মন থেকে বলেছিলাম আমার জীবন থেকে সরে যেতে? ও কি বুঝলো না আমায়? ডক্টর অর্নীলকে ব্লাড দিয়ে দেয়। ডক্টর ভেবেছিলো ব্লাড মিক্সিং হওয়ার সময় হয়ত কোনো সমস্যা হতে পারে। অনেকের হাই ফেভার উঠে যায় এই সময়ে। কিন্তু অর্নীলের কিছুই হয়নি। দুই ঘণ্টা পর মিম অর্নীলের সাথে দেখা করার জন্য কেবিনে যায়। অর্নীলের হাতের কব্জি পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করা। আঙুলগুলো শুধু খোলা। বাম হাত রক্ত চলছে। অর্নীল চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু জেগেই আছে।
~ নিজেকে এইভাবে কষ্ট দিতে তোমার ভাল লাগে চৌধুরী? (মিম)
~ এখানে না আনলেও হতো আমায়। আমি তো চলেই যাচ্ছিলাম তোমার জীবন থেকে। এখানে কেনো আনলা? (অর্নীল)

~ এই বয়সে এসে তোমার এই পাগলামি মানায় চৌধুরী? এখানে আনতে একটু দেরি করলে কি হতো আজকে জানো?
~ মরে যেতাম। এর বেশি তো কিছু হতো না। কারো কাছে বারবার ভুল প্রমাণিত হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।
~ আর ছয়ঘণ্টা পর বাসায় নিয়ে যাব। শরীর এখন কেমন লাগছে?
~ ভালো।

মিম সারারাত হসপিটালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর অর্নীল ঘুমিয়ে যায়। ভোরে অর্নীলের রক্ত নেওয়া শেষ হয়। অনেক বেশি ক্লান্ত লাগছে। হাতটাও নিজের ইচ্ছেমতো নাড়ানো যাচ্ছেনা। মিম হসপিটালের বিল পেমেন্ট করে সকালে অর্নীলকে নিয়ে বের হয়। অর্নীলের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। মিম ধরে ধরে অর্নীলকে নিয়ে যাচ্ছে। মিম অর্নীলকে ওর গাড়িতে বসালো আর বাপি গিয়ে পেছনে বসলো। মিম গাড়ি চালাচ্ছে। রাতে বাড়িতে গিয়ে বাপি গাড়িটা নিয়ে আসে। হাতে প্রচন্ড ব্যাথা করছে অর্নীলের। মনে হচ্ছে হাতুড়ি দিয়ে হাতটা কেউ পেটাচ্ছে। অর্নীলকে বাসায় নিয়ে মিম ওর ঘরে শুইয়ে দেয়।

অর্নীলের জন্য খাবার বানায় মিম। আরাধ্যা অর্নীলের মাথার কাছে বসে আছে আর হাতটা বারবার দেখছে।
~ ও বাবাই তোমার কি হয়েছে? এত বড় ব্যান্ডেজ কেনো হাতে? (আরাধ্যা)
~ কিছু হয়নি মা। (আরাধ্যাকে নিজের বুকে শুইয়ে অর্নীল ওর কপালে চুমু দিল)
~ জানো বাবাই কালকে এত রক্ত দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। তোমার হাত কি কেটে গিয়েছিলো? (মুখ তুলে আরাধ্যা)

~ হুম।
এরপর আরাধ্যা বাবাইয়ের বুকে পরম শান্তিতে শুয়ে থাকে। স্কুলেও যায়নি আজ আরাধ্যা। মিম খাবার নিয়ে এসে দেখে অর্নীলের বুকের উপর আরাধ্যা শুয়ে আছে।
~ আরাধ্যা উঠো। টিউলিপ কে বলো ও তোমায় খাইয়ে দিবে। তোমার বাবা খাবে এখন। যাও।
~ মামনি বাবাই আমাকে নিয়ে আজ ঘুরতে যাবেনা? (আরাধ্যা)
~ না। যাও তুমি।

~ আচ্ছা।
আরাধ্যা যাওয়ার পর অর্নীল উঠে বসলো। ডান হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করলো অর্নীল। এক পায়ের উপর আরেক পা রেখে টান হয়ে বসলো।

~ আমাকে দাও। আমি একাই খেয়ে নিচ্ছি। (অর্নীল)
~ পারবেনা। আমি খাইয়ে দিলে সমস্যা কি?
~ আগামীকাল আমি বাংলাদেশে চলে যাব। এখন থেকে একা থাকতে হবে তো তাই কারো কেয়ার নিয়ে মায়া বাড়াতে চাইনা।

~ ওহ। তো খাও।
মিম বাটিটা খাটের পাশের টি টেবিলের উপর রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অর্নীল ও কষ্ট করে সেখান থেকে নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে। অল্প একটু খেয়ে আর খেলো না অর্নীল। টেবিলের পাশে ওষুধগুলো দেখে কোনোরকম খুলে ওষুধগুলো খেলো। এরপর আবার শুয়ে পরলো। আরাধ্যাকে ডাকলো অর্নীল। অর্নীলের এক ডাকে আরাধ্যা ঘরে এলো।
~ বাবাই বলো।

~ মা তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবনা যে! খুব কষ্ট হবে যে আমার এই মিষ্টি মা কে ছাড়া থাকতে।
~ বাবাই তুমি আমাকে ছাড়া থাকবে কেনো? আমরা বাংলাদেশে যাবনা?
~ তোমার মা যাবেনা সোনা। আমি তোমাকে প্রতিদিন ফোন করব। তুমি কথা বলবেনা আমার সাথে?
~ হ্যা বাবাই বলব তো! তোমায় ছাড়া আমিও তো থাকতে পারবনা বাবাই।
~ প্রতিমাসে একবার আমি তোমায় এসে দেখে যাব। অনেক গিফটস নিয়ে আসব তোমার জন্য। তুমি মামনির কাছে ভাল থেকো। মামনিকে একদম বিরক্ত করনা, ঠিক আছে?
~ ঠিক আছে বাবাই।

অর্নীল উঠে বসে আরাধ্যাকে আদর করছে। এই মেয়েকে ছেড়ে ও কিভাবে থাকবে বাংলাদেশে? মিম এতটা নির্দয় কবে থেকে হয়ে গেলো? খাওয়াতে না করেছি বলে না খাইয়েই চলে গেলো? এসে দেখেও গেলো না খেয়েছি কি না! এতটাই মুছে গেছি আমি ওর জীবন থেকে? অর্নীল আর মিমকে ডাকেও নি। সেইদিন রাতে আরাধ্যা মাঝে শুয়েছিলো আর মিম~ অর্নীল খাটের দুই সাইডে। মিম ঘুমিয়ে গেছে। অর্নীলের ঘুম আসছেনা কারণ এত সুন্দর একটা পরিবার ছেড়ে ওকে একা থাকতে হবে। মিম চাইছেনা আর অর্নীলের সাথে থাকতে। হয়ত কোনো একদিন বলে দিবে ডিভোর্স চাই। অর্নীল পাশ ফিরে কাঁদছে। একটা ভুল সিদ্ধান্ত এইভাবে মানুষের জীবনকে পাল্টে ফেলতে পারে? অর্নীলের হয়ত এইরকম কিছু জানাই ছিল না। আরাধ্যার জন্য খুব বেশি কষ্ট হবে অর্নীলের। কিভাবে থাকবে এই মেয়েকে ছাড়া?

পরদিন দুপুর একটায় অর্নীলের ফ্লাইট। রিটার্ন টিকিট কাটা হয়ে গেছে আসার সময়েই। অর্নীল শার্ট পরতে অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। পরে মিম শাড়ি পরে এসে অর্নীলকে শার্ট পরিয়ে বোতাম লাগিয়ে দিলো। ইন করতেও সমস্যা হচ্ছে অর্নীলের। মিম নিজেই অর্নীলকে ইন করিয়ে দিলো। মিমকে দেখে বোঝা যাচ্ছে কোথাও একটা যাবে। হাল্কা সেজেছে ও। একটু পর আরাধ্যা ও ঘরে এলো। আরাধ্যা টি শার্ট আর শর্ট পরে ছিলো। জুতা নিয়ে এলো মিমের কাছে।
~ মামনি পরিয়ে দাও।

~ আমার মেয়েটা এখনো জুতা পরা শিখেনি। (আরাধ্যাকে জুতা পরিয়ে দিয়ে মিম)
~ ফিতে বাঁধতে পারিনা মামনি।
~ তোমরা কি কোথাও বের হচ্ছো? (অর্নীল)
~ হ্যা। তোমাকে সি অফ করতে।

~ কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছো! (অর্থপূর্ণ হাসি হেসে অর্নীল)
মিম আর কিছু বলল না। মিমের বাপি ও রেডি। অর্নীল সুটকেস নিয়ে বের হতে যাবে তখন সিকিউরিটি অর্নীলের হাত থেকে সুটকেস নিয়ে গাড়িতে রেখে দিলো। অর্নীল গিয়ে গাড়িতে বসলো। মিম সিকিউরিটি কে ইংলিশে বলল,
~ বাড়ির খেয়াল রেখো। আসছি।
~ জ্বি ম্যাম।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আজ মিম গাড়ি চালাচ্ছেনা। ড্রাইভার আছে আজকে। অর্নীল, মিম আরাধ্যা গাড়ির পেছনে বসা আর মিমের বাপি সামনে। অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো,
~ শান্তিতে থাকবা তো এখন?

~ অফকোর্স ইয়েস। এই ছয়টাদিন আমার জীবন নড়কে ছিল। আজ মুক্তি। (মিম)
অর্নীল আর কিছু বলল না। এয়ারপোর্টে গিয়ে মিম তিনটা পাসপোর্ট শো করে ভেতরে গেলো। সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্ট পৃথীবি খ্যাত কারণ এইখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়টার ফল রয়েছে। আরাধ্যা সেইটা দেখে কি খুশি! মিম যখন এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন চেক আউট করলো তখন অর্নীল বড়সড় শক খেলো। অর্নীল মিমের হাত থেকে পাসপোর্ট নিয়ে দ্রুত পাসপোর্ট খুলে পাসপোর্ট এর ভেতর টিকিট দেখলো। বাংলাদেশে যাওয়ার টিকিট! মিম তখন হাসছে। বাপি ও হাসছে।

~ এত বড় সারপ্রাইজ! (অর্নীল যেনো ৪২০ ভোল্টেজে শক খেলো)
~ সারপ্রাইজ তুমি দিতে পারো, আমি পারিনা? যাও সুটকেস তিনটা নিয়ে এসো।
~ তুমি সুটকেস নিয়ে আসলা কখন? আমি কেনো দেখলাম না?
~ দেখাইনি বলেই দেখোনি।

অর্নীল আর পারলো না নিজেকে কন্ট্রোল করতে! ডানহাত দিয়ে মিমকে জড়িয়ে ধরলো অর্নীল এয়ারপোর্টেই।
~ নানাভাই বাবাই আর মামনির ভাব হয়ে গেছে দেখো!

~ ওইদিকে তাঁকিয়ো না নানাভাই৷ চলো আমরা ওয়াটার ফল দেখি। (মিমের বাপি)
এয়ারপোর্টের সব যাত্রী ওদের দিকে তাঁকিয়ে আছে। সবাই গিয়ে প্লেনে বসলো। কিন্তু একসাথে সিট না পাওয়ায় অর্নীলের কষ্ট হচ্ছে। অর্নীল দ্বিতীয় সারিতে আর মিম, আরাধ্যা, বাবা নবম সারিতে। আরাধ্যা এই প্রথম প্লেনে উঠছে। আরাধ্যার আনন্দই যেন উপচে পরা! অর্নীল তখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা মিম ওর সাথে এসেছে! এই পাঁচ ঘণ্টার জার্নিতে মিমের থেকে আলাদা থাকতে হবে! যথাসময়ে ফ্লাইট ছেড়ে দিলো। পাঁচঘণ্টার জার্নি শেষে ওরা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো। বাংলাদেশে তখন সন্ধ্যারাত।

অর্নীলের বাবা মা জানতো না মিম আসছে! ওরা জানতো অর্নীল একাই আসছে। অর্নীলের বাবা এসেছে অর্নীলকে রিসিভ করতে। অর্নীলের সাথে মিমকে দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। মিমের হাত ধরে আছে কি সুন্দর একটা মেয়ে। ও ই কি তাহলে আরাধ্যা? অর্নীলের বাবা কত কিছু ভাবছেন। অর্নীল বাবাকে এসে জড়িয়ে ধরে। মিম শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে।
~ আসসালামু আলাইকুম বাবা। ভাল আছেন? (মিম)
~ ছোট বৌমা তুমি এসেছো? (অর্নীলের বাবা)

~ হ্যা বাবা। আরাধ্যা উনি তোমার দাদু হয়, উনি তোমার আরেকটা গ্র‍্যান্ডপা। সালাম দাও৷ (মিম)
~ লাগবেনা দাদুভাই। নাতনিকে দেখেই আমার মন ভরে গেছে। তোমার শ্বাশুড়ি, বড় বৌমা ওরা জানলে কত খুশি হবে জানো? আমি একটা ফোন করছি। (অর্নীলের আব্বু আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে)
~ না বাবা ফোন করার দরকার নেই। গেলেই তো দেখবে।

~ বেয়াই সাহেব মাফ করে দিয়েছেন তো আমাদের? (অর্নীলের আব্বু মিকের বাপিকে জিজ্ঞেস করলো)
~ এসব থাকুক বেয়াই। ভুলে গেছি সব। চলুন বাড়ি যাই।
মিম, অর্নীল আর আরাধ্যা এক গাড়িতে গেলো আর দুই বেয়াই আরেক ভাড়া করা গাড়িতে গেলো কারণ অর্নীলের আব্বু একটা গাড়িই নিয়ে এসেছিলেন। সারারাস্তা অর্নীলের কাঁধে মাথা দিয়েছিলো মিম আর আরাধ্যা বাইরে তাঁকিয়ে সব দেখছে।

~ কালকে পর্যন্ত ভেবেছিলাম আমার মতো ব্যর্থ মানুষ আর নেই কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দুনিয়ায় একমাত্র আমিই অনেক সুখি। (এক হাত দিয়ে মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ ওসব কথা থাক। আরাধ্যা বাইরে হাত দিও না মা। (মিম)

~ মামনি এইটাই কি বাংলাদেশ? এতবেশি ডাস্ট কেন এখানে? সিঙ্গাপুরে তো একটা পাতা ও দেখিনি রাস্তায়। (আরাধ্যা)

~ হাহাহা। এখন থেকে অনেক কিছুই দেখতে হবে মা। (হেসে অর্নীল)
রাত সাড়ে নয়টায় অর্নীল আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে বাসায় ঢুকে। বাসায় ঢুকেই অর্নীল চিল্লানো শুরু করে।
~ আম্মু? বউমনি? (অর্নীল)
~ তুই চলে এসেছিস? ছোট বৌমা? (অবাক হয়ে অর্নীলের আম্মু)
~ ভাল আছেন মা? (সালাম করে মিম)

~ ছোট বৌমা না পায়ে হাত না! (মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীলের আম্মু)
~ ও ই কি আমাদের আরাধ্যা? (শিশির)
~ হ্যা। আম্মু এইটা তোমার চাচি। (অর্নীল)
~ চাচি কি বাবাই? (আরাধ্যা)
~ আসো আমার কাছে। আমি বলি চাচি কি। (আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে শিশির)

পর্ব ২০

বাংলাদেশে দাদুর বাড়িতে এসে আরাধ্যা এইদিক ওইদিক তাঁকাচ্ছে। আরাধ্যা মিমকে জিজ্ঞেস করছে,
~ মামনি এত বড় বাড়িতে থাকব আমরা?
~ হ্যা মা। একা একা কোথাও যেয়ো না। এসো চেঞ্জ করে নিবে।
~ দিদিভাই এইদিকে এসো? (অর্নীলের আম্মু)
~ আপনি আমার গ্র‍্যান্ডমা হন না?

~ হ্যা দিদিভাই। (আরাধ্যাকে জড়িয়ে নিয়ে অর্নীলের আম্মু)
~ মিম ধন্যবাদ আবার ফিরে আসার জন্য। আর কত কন্টিনিউ হতো এই ভুল বুঝাবুঝি? (শিশির)
~ এইজন্যই ফিরে এসেছি দিভাই। আমি একটু চেঞ্জ করে আসি হ্যা? রাতে আমি সবাইকে ডিনার সার্ভ করব। আসছি।

মিম, অর্নীল আর আরাধ্যা গেলো ফ্রেশ হতে। আরাধ্যা ফ্রেশ হওয়ার পর অর্নীল আরাধ্যাকে টিশার্ট আর শর্ট
জিন্স পরিয়ে দিলো। আরাধ্যার চুল ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে দিচ্ছে অর্নীল। অর্নীলের যে এক হাত কাটা সেইটাই ও ভুলে গেছে খুশির আমেজে। অর্নীল ব্যান্ডেজ করা হাতে আরাধ্যার চুল ধরে আছে কোনোমতে আরেকহাতে ড্রায়ার।
~ বাবাই তোমার তো কষ্ট হচ্ছে। রেখে দাও মামনি এসে শুকিয়ে দিবে। (আরাধ্যা)
~ একটুও কষ্ট হচ্ছেনা মা। তুমি চুপচাপ বসে থাকো। এত সুন্দর ব্রাউনি চুলগুলো যত্ন না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। (অর্নীল)

~ বাবাই এই ঘরে আমরা থাকব?
~ হ্যা তো।
~ ঘরটা অনেক সুন্দর। আমি এখন নিচে যাই একটু।

আরাধ্যা দৌড়ে নিচে চলে গেলো। অর্নীল ড্রায়ারটা ড্রেসিংটেবিল এর উপর রেখে দিলো। মিম ততক্ষণে গোসল সেড়ে চুল মুছতে মুছিতে বেরিয়ে এসেছে। কটন সিল্কের শাড়ি পরা মিম, চুরিদার ব্লাউজ।
~ আমার সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছেনা তুমি আমার সাথে এসেছো! (অর্নীল)
~ আরেকটা বয়ফ্রেন্ড আছে ওর সাথেই এসেছি। (নাকফুল পরতে পরতে মিম)
~ এতগুলা বছর নাকফুল ছাড়াই ছিলে?
~ হ্যা। ওইখানে এসবের কোনো ট্রেন্ড নেই। তাই খুলতে হয়েছিলো। (কানে দুল পরতে পরতে মিম)
~ এতক্ষণে আগাগোড়া সম্পূর্ণ লাগছে।

মিমকে জড়িয়ে ধরতে যাবে অর্নীল তখনি মিম অর্নীলকে থামিয়ে দেয়।

~ চলে এসেছি মানে এই নয় যে আমাকে ছোঁয়ার পার্মিশন দিয়েছি। খেতে আসো।

এই কথা বলে মিম চলে যায়। অর্নীল মূলত ভাবছে মিম এই কথা কেন বলল? অর্নীল নিচে এলো খাওয়ার জন্য। আরুশ নিজের মেয়ের মতো আরাধ্যাকে আদর করছে। আরুশ আর শিশিরের কোনো সন্তান নেই। এইজন্য শিশির আর আরুশের আরাধ্যার প্রতি এত টান! আরাধ্যাকে শিশির খাওয়াচ্ছে আর আরুশের সাথে খেলছে আরাধ্যা। মিম নিচে আসার পর সবাই সোফা থেকে উঠে এসে ডায়নিং এ বসলো। মিম সবার প্লেট উলটে ভাত বেড়ে দিচ্ছে। অর্নীলের মন খারাপ দেখে শিশির জিজ্ঞেস করলো,
~ কি হয়েছে অর্নীল?

~ কিছুনা তো বউমনি। আরাধ্যা খেয়েছে? (অর্নীল)
~ আমি জানি কি হয়েছে? (খাবার বাড়তে বাড়তে মিম)
~ কি? (শিশির)

~ হয়ত বা এখন বুঝতেছে কেন আমাকে ফিরিয়ে আনলো! (মিম)
~ এইটা কেমন কথা মামনি? (মিমের বাপি)
~ আচ্ছা বাদ দাও। খাওয়া শেষ কর আগে।

অর্নীল কিছুতেই মাংস ছিঁড়ে খেতে পারছেনা। সবসময় কাটা চামচ আর ফর্ক দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস। এখন তো আর ওইসব দিয়ে খাওয়া যাবেনা। এইসব দেখে মিম শাড়ির আচল কাঁধে উঠিয়ে অর্নীলের সামনে এসে অর্নীলকে বলল,
~ হাত সরাও!
~ কেনো? (অর্নীল)
~ সরাও আগে।

অর্নীল হাত সরানোর পর মিম অর্নীলের হাত ধুইয়ে দিলো৷ এরপর ভাত মেখে নিজে অর্নীলকে খাইয়ে দিলো। আরাধ্যা তখন ড্রইংরুমের একুরিয়ামের মাছের সাথে খেলছে। অর্নীলকে খাওয়াতে দেখে উপস্থিত সবাই ই লজ্জা পেলো শুধু অর্নীল ছাড়া। সবার খাওয়া হয়ে গেলে মিম খেতে বসলো। শিশির এক ফাঁকে মিমের জন্য একটু স্যালাড বানিয়েছে। মিম তো রাতে স্যালাড খেতো সেই হিসেবে। মিম অল্প কিছু খেয়েই সবার জন্য লাচ্ছি বানাতে রান্নাঘরে গেলো। সবাই তখন ড্রইংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মিম লাচ্ছি বানিয়ে সবাইকে দিলো। অর্নীলকে লাচ্ছির বদলে ব্ল্যাক কফি দিলো আর আরাধ্যাকে জুস।

~ কতদিন পর এই বাড়িতে সবকিছু আগের মতো হচ্ছে। (খুশি হয়ে অর্নীলের আম্মু)
~ হতেই হবে মা। অনন্যা তো বছরে একবারো আসতে পারেনা। কি দরকার ছিল বিদেশী স্বামীর কাছে অনন্যাকে বিয়ে দেওয়ার? সারাবছর ই বিদেশে পরে থাকে! (শিশির)
~ সেইটাই তো। দেশে কি ছেলের অভাব ছিল? (মিম)

~ মেয়ে ভালবেসে বিয়ে করলে আমরা আর কিই বা করতে পারতাম? (অর্নীলের আব্বু)
~ সেইটাই। কিছুই করার থাকেনা। যেমনটা আমি পারিনাই। (মিমের বাপি)
মিমের বাপির কথা শুনে সবাই হেসে দিলো। কিন্তু মিম হাসলো না। অতীত নিয়ে কেউ কোনো কথা তুললো না।
অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দেওয়ায় আরাধ্যা মিমের কোলেই ঘুমিয়ে গেলো। সবাই যখন ঘুমাতে চলে যাবে তখন মিম ঘুমন্ত আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে উপরে আসে। অর্নীল ও মিমের পিছু পিছু আসে। আরাধ্যাকে খাটের মাঝে শোয়ায় মিম।

~ আরাধ্যাকে ওই পাশে শোয়াও। (অর্নীল)
~ না। কেন? তোমার ওইটুকু জায়গায় হবেনা? (ভ্রু কুঁচকে মিম)
~ হবে তো। আচ্ছা তুমি শুয়ে পরো।
~ হাতের ওষুধ খেয়েছো? (মিম)
~ হ্যা খেয়েছি।

~ কালকে থেকে হাতে ড্রেসিং করিয়ে দিব। গুড নাইট।
~ তুমি শাড়ি পরেই ঘুমাবে? (অবাক হয়ে অর্নীল)
~ হ্যা। শাড়ি পরে ঘুমানো শিখে গেছি। এখন আর প্রবলেম হয়না।
~ ওহ আচ্ছা। ঘুমাও তাহলে। গুড নাইট।

অর্নীল শোয়ার পর মিম আরাধ্যাকে আস্তে করে কোলে নিয়ে সাইডে শোয়ায়। আর মিম মাঝে এসে শোয়। অর্নীল পাশ ফিরে শুয়ে আছে। মিম ওর এক হাত অর্নীলের উপর দেয় আর ওর মুখ অর্নীলের পিঠের সাথে ঠেকায়। অর্নীল পেছনে ঘুরে। নিজের ডান হাত দিয়ে মিমের হাত ধরে।
~ তুমি এখানে কেন? সাইডে না শুইলা? (অর্নীল)

~ সাইড তো আমার জন্য না। এখানেই তো ঘুমানোর কথা আমার। তাই নয় কি? আচ্ছা এই সাড়ে চার বছরে আমি ছাড়া এই বিছানায় কেউ ঘুমায় নি তো? (মিম)
~ কি মনে হয়? (সোজা হয়ে শুয়ে অর্নীল)

~ মনে তো হয় ছোট খাটো একটা সংসার করেছো। (পিঞ্চ করে মিম)
~ হ্যা করেছি তো। বিন ব্যাগের উপর বসে ওই গিটারের সাথে। এই বিছানায় আমিও ঘুমাইনি। ওখানে বসেই ঘুমিয়ে গেছি।

~ নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারলে কে আর কি করবে বলো? (অর্নীলের বুকে হাত রেখে মিম)
~ এ জীবনেও সরি বলে শেষ করতে পারবনা আমি এই সাড়ে চার বছরের জন্য। তোমায় ও কষ্ট দিয়েছি আর নিজেও পেয়েছি। এই ভুল বুঝাবুঝির জন্য উল্টো এতগুলো রঙীন বছর নষ্ট হলো।

~ তুমি যখন আমায় মেরেছিলে তখন আরাধ্যা আমার পেটে ছিল। আমিও জানতাম না। সিঙ্গাপুর গিয়ে জেনেছি। তখন ভেবেছি আর কষ্ট পেয়েছি।
~ সেই দিনের কথা আর তুলো না। লেট ইট বি।
~ হুম। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। ঘুমাচ্ছো না কেনো?
~ আসছেনা তো!

~ আচ্ছা আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই তুমি ঘুমাও।
অর্নীল আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে যাচ্ছে আর মিম ও ঘুমিয়ে যায় এক সময়। অতীত নিয়ে যতই ঘাটা হবে ততই কষ্ট বাড়বে। তাই দুজনেই প্রসঙ্গ পালটে ঘুমিয়ে গেছে।
চারদিন পর সকালে,

মিম অর্নীলকে শার্ট পরিয়ে দিচ্ছে। আরাধ্যা বল নিয়ে খেলছে। দুই গ্র‍্যান্ডপা, চাচি, চাচ্চু সবার থেকে অনেক খেলনা পেয়েছে আরাধ্যা। ওর খেলার ঘরই আছে একটা। সারাক্ষণই লেটেস্ট মডেলের খেলনা আর ডিভাইস নিয়ে থাকে আরাধ্যা। সবার একমাত্র আদরের ও। অর্নীলকে রেডি করিয়ে দেওয়ার পর অর্নীল আরাধ্যাকে বলে,
~ মামনি চেঞ্জ করবানা তুমি?
~ কেন বাবাই?
~ অফিসে যাবা না?

~ এই কিসের অফিস? (মিম)
~ আজকে আমি আরাধ্যাকে আমার অফিসে নিয়ে যাব।
~ আমি তো কাল আমার অফিস থেকে ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসলাম।
~ তো সমস্যা কি? আমার অফিসে যাবে ও এখন।

~ স্কুলে যে ওকে ভর্তি করতে হবে সেই খেয়াল আছে?
~ আছে তো। কোন স্কুলে ভর্তি করাবা?

~ সেইটা তুমিই ভাবো, তোমার মেয়ে।
~ আমার পছন্দ ক্যান্টমমেন্ট। কিন্তু আমার মেয়েকে এত প্রেসারে রাখব না আমি। * এডমিট করাই।
~ ইচ্ছা। তো কি আরাধ্যাকে রেডি করাবো?

~ হ্যা অফকোর্স। (বডি স্প্রে দিতে দিতে অর্নীল)
আরাধ্যা কখনো টিশার্ট আর শর্টস ছাড়া কিছু পরা শিখেনি। ও ছোট মানুষ। ওর ড্রেসাপে আর কিই বা আসে যায়। মিম আরাধ্যাকে টিশার্ট আর শর্টস ই পরালো। চুলগুলো বেঁধে দিতে দিতে মিম বলে,
~ আরাধ্যা অফিসে গিয়ে একদম দুষ্টামি করবানা। চৌধুরী রেগে গেলে তোমাকে এগারোতলা থেকে ছুঁড়ে মারবে পরে।

~ বাবাই টা অনেক রাগী। কিন্তু আমায় ছুঁড়ে মারবেনা। আমায় তো বাবাই অনেক আদর করে।
~ এহ কি কনফিডেন্স বাবার প্রতি! যদি ভাল না লাগে তো বাবাইকে নিয়ে বাসায় চলে এসো হ্যা?
~ লং ড্রাইভে যাব মামনি।

~ চুপ। কয়েকদিন পর তোমার পড়াশোনা শুরু হবে। এখন এইসব একদম চলবেনা।
~ ওকে ডিয়ার। (মিমকে চুমু দিয়ে আরাধ্যা) ক্যান আই গো নাও?
~ ইয়েস সোনা। সাবধানে যেয়ো। এই চৌধুরী মেয়েকে দেখে রাইখো। (মিম)
~ এইটা কি বলতে হবে? আজব তো! (অর্নীল)

সবাইকে বাই বলে আরাধ্যা অর্নীলের সাথে বেরিয়ে যায়। মিম তখন ঘরের জিনিসপত্র পাল্টাতে ব্যস্ত। আরাধ্যা অর্নীলের হাত ধরে অফিসে ঢুকলো। প্রায় দশদিন পর অর্নীল অফিসে এসেছে। কেউ জানেনা এইটা অর্নীলের মেয়ে। অর্নীলের হাত ধরে এই পিচ্চিটাকে ঢুকতে দেখে সবার মনে একটাই প্রশ্ন হু ইজ শি? আকাশ এসে অর্নীলকে জিজ্ঞেস করলো,
~ এই কিউটের ডিব্বাটা কে স্যার?

~ এই কোম্পানির আরেকজন বস। আমার মেয়ে আরাধ্যা চৌধুরী! (অর্নীল)
~ কিহ? আপনার আর ম্যামের মতই কিউট! মাশাআল্লাহ! বেবি তুমি কি একটু আমার কোলে আসবে? (আকাশ আরাধ্যার সামনে নিচু হয়ে বসে)

~ নো। হু আর ইউ? (অর্নীলের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আরাধ্যা)
~ ও মাই গড! এত কিউটলি ইংলিশ ও পারেনাকি ও? (অবাক হয়ে আকাশ)
~ হুম পারে। আরাধ্যা হি ইজ ইউর আংকেল, নেইম আকাশ।
~ অপরিচিত কেউ নয় তো? (আরাধ্যা)

~ হাহা না বাবু। স্যার ওর জন্য কি আনবো বলেন? (আকাশ)
~ কি খাবা আম্মু? (অর্নীল আরাধ্যাকে জিজ্ঞেস করলো)
~ চকলেট পেস্ট্রি। (আরাধ্যা)

~ ভালো ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট থেকে আনবা। (অর্নীল)
~ তা আর বলতে!
~ তার আগে আমায় পেপারস দিয়ে যাও।
~ জ্বি স্যার।

আরাধ্যার জন্য বড় একটা টেডি আর চকলেট পেস্ট্রি কিনে আনলো আকাশ। গিফট পেয়ে আরাধ্যা খুব খুশি। আকাশ অফিসের সবাইকে জানালো এইটা অর্নীল স্যারের মেয়ে। সবাই আরাধ্যাকে কোলে নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে কিন্তু আরাধ্যা যাবেনা। আরাধ্যা এক কথায় সবাইকে বলে দিয়েছে,
~ ইউ গাইস আর আননোন টু মি। আই কান্ট এম্ব্রাসড ইউ।

আরাধ্যার কথা শুনে অর্নীল আর আকাশ হেসে দিলো। আকাশ বলল,
~ আপনার মতই স্ট্রিক্ট আমাদের আরাধ্যা। কিভাবে কড়া গলায় কথা বলে এই বয়সেই!
~ মায়ের মেয়ে না? (মনে মনে অর্নীল)

কয়েকদিন পর আরাধ্যাকে স্কুলে ভর্তি করালো অর্নীল। প্রথমদিন স্কুল থেকে ফিরে আরাধ্যা কেঁদে দেয়। ড্রইংরুমে আরাধ্যাকে কাঁদতে দেখে আরাধ্যার দিদিমা আর চাচি দৌড়ে আসে। মিম তখন উপরে কাজ করছিলো।
~ কি হয়েছে আরাধ্যা মা? তুমি কাঁদছো কেনো? (আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে শিশির)
~ মামনি কোথায়? (কেঁদে কেঁদে আরাধ্যা)
~ মিম? মিম কোথায় তুমি? (চিল্লিয়ে শিশির)

~ হ্যা বলো। আরাধ্যা কি হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেনো? (মিম)
~ মামনি মিস আমায় মেরেছে আজকে।
~ কিন্তু কেনো?

~ ওনাকে মিস নাহার বলেছি বলে! উনি আমাকে বেয়াদব তো বলেছেই সাথে মেরেছে ও। খুব ব্যাথা পেয়েছি আমি মামনি। (মিমকে জড়িয়ে ধরে আরাধ্যা)

আরাধ্যার কথা শুনে মিম চমকায়নি। আরাধ্যা তো এই কালচারেই অভ্যস্ত ছিল। মিম কেন আগে আরাধ্যাকে বলে দিল না যে এইটা বাংলাদেশ। এখানে টিচারদের নাম ধরে ডাকা যায়না। কিন্তু ওরা কি জানতো না আরাধ্যা সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে? ভর্তির সময় তো বলা হয়েছিলো ওদের। অর্নীল এইটা জানলে প্রিন্সিপালের খবর আছে। তাই মিম বাসার কাউকে অর্নীলকে জানাতে নিষেধ করলো। আগামীকাল ও গিয়ে কথা বলবে প্রিন্সিপালের সাথে।

পর্ব ২১

আরাধ্যাকে স্কুলের মিস মেরেছে। সেজন্য মিম নিজেকে দোষী মনে করছে কারণ ও আরাধ্যাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই জানায় নি। ওইদিন আরাধ্যাকে কোনোমতে সামলালো মিম। মেয়েকে এত আদর দিয়ে মানুষ করছে মিম, কারো হাতে মার খাওয়ার জন্য নাকি? রাতে অর্নীল বাড়ি ফেরার পর মিম অর্নীলের হাতে ড্রেসিং করতে বসে। আরাধ্যা তখন শিশিরের ঘরে। অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করে,
~ অফিসে কি রেগুলার যাবানা?

~ সময় কোথায়? সংসার দেখে, মেয়েকে দেখে অফিসে কিভাবে রেগুলার যাই? (অর্নীলের হাতে ওষুধ লাগাতে লাগাতে মিম)

~ শৈলিকেই বলো একটু নজর রাখতে। তুমি ডিরেকশন দিয়ে দিলেই হবে।
~ এতগুলো বছর তো ও~ ই দেখে এসেছে। হাতের ব্যাথা কি কমেছে?
~ এই ব্যাথা কি আর কমে! অসহ্য লাগছে এখন।

~ কাটার সময় মনে ছিলো না যে আপনার শুগার আছে? তখন কেনো ভুলে গিয়েছিলেন?
~ মন খারাপের সময় আর দুঃখের সময় কোনো কিছু খেয়াল থাকেনা।
~ হুম সে~ ই। কালকে সকালে আমাকে আর আরাধ্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে এরপর অফিস যেয়ো।
~ তুমি স্কুলে গিয়ে কি করবে?

~ যাব একটু। আরাধ্যা কাদের সাথে মিশছে দেখতে হবেনা?
~ তারাতারি রেডি হয়ে থেকো।

রাতে সবাই যে যার মতো ঘুমাতে যায়। আরাধ্যা শিশির আর আরুশের সাথে ঘুমিয়ে গেছে। শিশির কিছুতেই আরাধ্যাকে ঘরে আনতে দেয়নি। তাই মিম একাই ঘরে আসে। মিম ঘরে এসে দেখে অর্নীল একহাত দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে গভীর মনোযোগে যেন কি করছে।
~ না ঘুমিয়ে কি করছো এসব? (মিম)
~ তুমি শুয়ে পরো। আমি ঘুমাচ্ছি কিছুক্ষণ পর।
~ আমিও বসি?

~ একদম না। যাও শুয়ে পরো। সকালে না বের হবা?
~ তুমি ঘুমাবা কখন?
~ তারাতারিই।

~ আচ্ছা আমি গেলাম ঘুমাতে।
মিম কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে পরে। মিম বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলো।
রাত আড়াইটায়……
পুরো ঘর অন্ধকার। মিমের কানের সামনে একটার পর একটা বেলুন ফাঁটানোর আওয়াজ হচ্ছে। মিম বুঝতেছেনা স্বপ্ন নাকি সত্যিই সত্যিই আওয়াজ হচ্ছে। মিম চোখ মেলে দেখে বেলুন ফাটানোর আওয়াজ সত্যিই আসছে। আর অর্নীল মিমের কানের সামনে এসে বেলুন ফাটাচ্ছে!

~ কি হচ্ছে কি চৌধুরী? এই রাতে এসে বেলুন ফাটাচ্ছো কেন? পিচ্চি হয়ে গেলে নাকি? (উঠে বসে মিম)
মিম উঠে বসার পর পুরো ঘরের আলো জ্বালালো অর্নীল। অর্নীলসহ ঘরের মাঝখানে বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে বলছে,
~ হ্যাপি বার্থডে মিম। মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে!
মিম কম্বল রেখে উঠে দাঁড়ায়। আরাধ্যা মিমকে বলে,
~ হ্যাপি বার্থডে মামনি! ইউ দা ওয়ার্ল্ড বেস্ট মা।

(মিমকে চুমু দিয়ে আরাধ্যা)
মিম যে থ্যাংক ইউ বলবে সবাইকে সেইটাই মুখ দিয়ে বের হচ্ছেনা। ঘরের চারপাশে ক্যান্ডেল জ্বালানো। আর ট্রলিতে বিশাল একটা কেক। কেকে মিমের একার ছবি।
~ ২৭ বছরে তো পা দিলা? ট্রিট কি পাব নাকি না? (অর্নীল)
~ এইসব তুমি করেছো তাইনা?

~ আর কে করবে? এইসব কুল আইডিয়া তো ওর মাথা থেকেই আসে। (আরুশ)
~ দাদাভাই আমি জীবনে এত বড় শক পাইনি। এখনো গায়ের লোম দাঁড়িয়ে আছে! ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে।
~ আসেন, কেক কেটে আমাদের রেহাই দিন। আর সরি বারোটায় উইশ করতে পারিনি বলে। তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে এইসব এরেঞ্জমেন্টস করতে সময় লেগে গেছে। (অর্নীল)

~ ধ্যাৎ!
বাড়ির সবাই একটু দূরে সরে দাঁড়ালো৷ আরাধ্যাকে মাঝে রেখে অর্নীল আর মিম ছুরি ধরে কেক কাটলো। মিম সবার আগে অর্নীলকে কেক খাওয়ালো এরপর সবাইকে।

~ রাত আড়াইটার সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে এসবের কোনো মানে হয়? (মিম)
~ হবেনা কেনো? তোমাকে ঘিরে কারো কোনো স্বপ্ন থাকতে নেই নাকি? (বাপি)
~ কালকে রাতে সবার ডিনার ট্রিট আমার। চৌধুরী খুশি? (মিম)
~ হ্যা অবশ্যই। (অর্নীল)

কেক কাটার পর আস্তে আস্তে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আরাধ্যাকে নিয়ে গেলো শিশির। মিমের শাড়িতে কেক লেগে গেছে। মিম শাড়ি পরিষ্কার করতে ওয়াশরুমে যায়। অর্নীল বসে বসে বেলুন ফাটাচ্ছে। পুরো ঘর বেলুনে ভর্তি। মিম শাড়ি ধুয়ে আসার পর অর্নীল বলে,
~ এখন একদমই ঘুমানো যাবেনা।

~ তো কি করব?
~ আমার হাত কাটা কিন্তু মন না। ডান্স করব তোমার সাথে, তাও পেপার ডান্স।
~ এত রাতে তুমি আমায় নাচাবা চৌধুরী?

~ তাহলে কি? আমার বার্থডে তে তোমায় পেয়েছিলাম আর তোমার বার্থডে তে পাওনা উশুল করবনা? এখন কথা কম বলে পেপার বিছাও। পেপারের সাইজটা যাতে দেড় ফিটের বেশি না হয়!
~ দেখব সেই দেড় ফিটে আমায় নিয়ে নাচো কিভাবে! বিছাচ্ছি পেপার।

মিম একটা কার্টিজ পেপার ফ্লোরে বিছালো। এত রাতে তো মিউজিক ছাড়া যাবেনা। মিম শাড়ির আচল কাঁধে উঠিয়ে দিয়ে পেপারের উপর দাঁড়ালো। অর্নীল স্যান্ডেল খুলে পেপারের উপর দাঁড়ালো। দুজনের দাঁড়ানোর জন্য পেপারটা খুব বেশি ছোট।

~ আমার পায়ের উপর দাঁড়াও। (মিমের হাত ধরে অর্নীল)
~ ব্যাথা পাবা।
~ পেয়েছিলাম এর আগে?
~ তখন ছিল ২৭ বছর আর এখন ৩২ প্রায়।

~ তবুও সমস্যা নেই। দাঁড়াও।
অর্নীলের কথামতো মিম অর্নীলের গলা জড়িয়ে ধরে অর্নীলের পায়ের উপর দাঁড়ালো। অর্নীল মিমের কোমড় জড়িয়ে ধরে মুভ করছে।
~ আগের মতই চিকন আর সুন্দর আছো।
~ জানি।
~ একটা আবদার আছে আজকে রাখবে?

~ হ্যা অবশ্যই। বলো কি আবদার?
~ আমাকে আরো দুইটা বেবির বাবা ডাক শুনাতে হবে।

অর্নীলের কথা শুনে মিম হেসে দেয়। মিম নাচছে আর বলছে,
~ দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলেই ভালো হয়। বাংলাদেশের মূলমন্ত্র এইটা।

~ সো হোয়াট? আমরাও তো তিন ভাই বোন।
~ আমি এতগুলা বাচ্চার মা হতে পারবনা।
~ তাহলে আরেকটা বিয়ে করি আনি?
~ চৌধুরীইইইই? (অর্নীলকে চোখ রাঙিয়ে মিম)

~ এট প্রেজেন্ট তুমি ছাড়া তো আমার আর কোনো বউ নেই সো বাকি দুই বাচ্চা তুমি ছাড়া তো আর কেউ দিতে পারবেনা। যেহেতু তুমি না করলা তাই আরেকটা বিয়ে করতেই হবে বাকি দুই বাচ্চার বাবা হওয়ার জন্য।
অর্নীলের কথা শুনে মিম অর্নীলকে ধাক্কা দিয়ে খাটে ফেলে দেয়। অর্নীলের কাটা হাত গিয়ে বালিশের উপর পরে। মিম গিয়ে সোজা অর্নীলের উপর শুয়ে অর্নীলের টি শার্টের নেক ধরে।
~ এইটা আবার কি রুপ? (অর্নীল)

~ ডাইনী দেখেছিস ডাইনী? এইটা সেই ডাইনীর রুপ।
~ এইই তুমি আমাকে তুই তোকারি করছো? (অবাক হয়ে অর্নীল)

~ হ্যা করছি। তুই আবার বিয়ে না করবি! (অর্নীলের মাথা বিছানায় ঢুসিয়ে মিম)
~ ওই আস্তে! আমার এত সুন্দর চুল, নষ্ট করনা বউ। আমি তো মজা করেছি। আর বিয়ে করবনা আমি!
তারপরেও মিম অর্নীলের মাথা বিছানার সাথে ঢুসিয়েই যাচ্ছে। অর্নীল ডান হাত দিয়ে মিমের হাত ধরে মিমকে বিছানায় ফেলে দেয়। মিমের হাত চেপে ধরে মিমের উপর গিয়ে পায়ে ভর দিয়ে বসে অর্নীল।
~ মাথাটা ব্যাথা করে ফেললো আমার! উহ কি দজ্জাল বউ। (অর্নীল)

~ আরো মারবো। ছাড় তুই আমায়। (চিল্লিয়ে মিম)
~ তোমার রাগ কমেনি এখনো তাইনা?
~ না কমেনি। (ঝাড়ি দিয়ে মিম)

অর্নীল হাত বাড়িয়ে ল্যাম্পশেডের তার খুলে ফেলল। পুরো ঘরের কৃত্রিম আলো নিভে গেলো। মোমবাতি গুলো এখনো জ্বলছে। অর্নীল মিমের হাতের উপর শুয়ে পরে। মিম অর্নীলের দিকে তাঁকায়।
~ লাস্ট কবে এত সুন্দর টাইম স্পেন্ড করেছি আমরা? (মিমকে প্রশ্ন করলো অর্নীল)
~ আরাধ্যা আসার আগে। (মিম)
~ হ্যা প্রায় সাড়ে চার বছর আগে।

~ হ্যা৷ হঠাৎ এই প্রশ্ন?
~ তোমায় নিয়ে রাঙামাটি যাব বলে এখনো ওয়েট করে আছি। বিয়ের আগে বলেছিলে না রাঙামাটি লাইক আ লাভ সিটি?
~ হ্যা বলেছিলাম। এই সাড়ে চার বছরে এখনো যাইনি।

~ কবে যাওয়ার সময় হবে বলো?
~ এই মাসেই যাব। একটু ফ্রি হয়ে নেই।
মিম পরেরদিন সকালে আরাধ্যার স্কুলে গেলো। অর্নীল ওদের দুজনকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে আসে। মিম প্রিন্সিপালের রুমে যায়। প্রিন্সিপাল মিমকে দেখে দাঁড়িয়ে যায়।
~ মিম ম্যাডাম আপনি? প্লিজ বসুন।

~ আমার মেয়ে আরাধ্যা চৌধুরী এই স্কুলের স্টুডেন্ট সেইটা আপনি জানেন না?
~ হ্যা ম্যাডাম।

~ ও যে সিঙ্গাপুরের কালচারে বড় হয়েছে সেইটা বলিনি?
~ জ্বি ম্যাডাম কিন্তু সমস্যা কি হয়েছে?
~ আপনার স্কুলের টিচার নাহার উনি আরাধ্যাকে মেরেছে।

~ কেনো ম্যাডাম?
~ আরাধ্যা ওনাকে মিস নাহার বলেছিলো তাই। আরাধ্যা টিচারদের নাম ধরেই ডাকতে শিখেছে কারণ ওইটা ওর কালচার ছিল। মিস নাহার আরাধ্যাকে বোঝাতে পারতেন। উনি মারবেন কেনো এজন্য? (মিম)
~ সরি ম্যাডাম। আমি এক্ষুণি আরাধ্যার ক্লাসের সব টিচারকে ডাকছি।

প্রিন্সিপাল সব টিচারকে ডেকে বিষয়টা ক্লিয়ার করলেন। মিস নাহার মিমের কাছে মাফ চাইলো। মিম বলল,
~ ইউ আর আ টিচার। আমার থেকেও বেশি সম্মান ডিজার্ভ করেন আপনি। মাফ চাইতে হবেনা। আপনি আমার মেয়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। এই ধরনের ফালতু কারণে আমার মেয়েকে মারবেন না।
~ ওকে মিসেস চৌধুরী। (মিস নাহার)

মিম আরাধ্যার সাথে দেখা করে স্কুল থেকে ফিরে এলো। অফিসে যাওয়ার পর মিম জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনেক গিফট পেলো সাথে উইশ ও। গিফটগুলো একটা গাড়িতে করে বাসায় পাঠিয়ে দেয় মিম। দুপুরে অর্নীল মিমকে ফোন করে।
~ এই বার্থডে তোমার না আমার? (অর্নীল)

~ কেন কি হয়েছে? (হেসে মিম)
~ সবাই গিফট আমাকে দিয়ে বলছে ম্যামকে দিয়ে দিবেন স্যার।
~ হাহাহা। আমি এই মাত্র গাড়ি ভর্তি গিফট বাসায় পাঠিয়ে দিলাম।
~ আমার কেবিন ভরে গেছে। কি করব এগুলো?

~ গাড়িতে করে বাসায় পাঠাও। খুলে দেখবনে এক সময়।
~ আচ্ছা। আর স্কুল থেকে কখন আসছো?
~ এক ঘণ্টা আগে।
~ বাসায় যাবা কখন?

~ এইত লাঞ্চের আগেই বের হব।
~ সাবধানে যেয়ো আর বাকি দুই বাচ্চার কথা মনে আছে তো? (হেসে অর্নীল)
~ বাসায় আসি এরপর বোঝাবো মনে আছে কি না!

এরপর মিম ফোন কেটে দেয়। মিম ফোন কেটে নিজে নিজেই কথা বলছে।
~ কি হয়েছে ম্যাম? কিছু কি হয়েছে? (শৈলি)
~ আর বলো না চৌধুরীর মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।
~ কেন? কি হয়েছে ম্যাম?

~ ওনার নাকি আরো দুইটা বাচ্চা চাই। না দিলে আবার বিয়ে করবে।
মিমের কথা শুনে শৈলি হেসে দেয়।
~ তুমি হাসছো? (মিম)
~ তো কি করব? দুটো বাচ্চাই তো চেয়েছে স্যার। (আবারো হাসছে শৈলি)
~ হ্যা সে~ ই তো! আচ্ছা শোনো এই মাসে কি কাজের কোনো প্যারা আছে?
~ না। তবে আপনার জন্য গুড নিউজ আছে।
~ কি?
~ আপনি আবারো BFF এর চেয়ারম্যান হচ্ছেন। বর্তমান চেয়ারম্যান ১০০ কোটি টাকার চাপে আছেন। চ্যান্সেলরকে হিসাব দিতে পারছেন না।

~ না। আমি আর বিজনেসে খুব বেশি ইনভলভ হবনা। সংসারই ভাল লাগে এখন। ঐ পরিবারের লোকগুলোকে সময় দিতে না পারলে নিজের কাছেই খারাপ লাগে। তাছাড়া আরাধ্যা তো আছেই।
~ কিন্তু ম্যাম এত বড় সুযোগ মিস করবেন?
~ চৌধুরীর সাথে কথা বলতে হবে। দেখি ও কি বলে! আচ্ছা আমি এখন বের হব। আসছি।
~ আসসালামু আলাইকুম ম্যাম।
~ ওয়ালাইকুম সালাম।

পর্ব ২২

মিম অর্নীলের উপর বিরক্ত কারণ অর্নীল মিমের কাছে আরো দুইটা বাচ্চা চেয়েছে। এই চৌধুরী দিন দিন নিজের হায়া, লজ্জা সব হারাচ্ছে। ৩২ বছর বয়সে এসে কিভাবে বাচ্চা চায়? লজ্জা করলো না একটুও? মিম লাঞ্চ টাইমে বাসায় এসে দেখে শিশির সবাইকে খেতে দিচ্ছে আর আরাধ্যা স্কুল থেকে এসে খেতে বসে গেছে।
~ মিম খেতে বসে পরো। (শিশির)
~ একটু ফ্রেশ হয়ে আসি দিভাই। (মিম)
~ যাও।

অর্নীলের আব্বু, আম্মু, মিমের বাপি আর আরাধ্যা খাচ্ছে। আরাধ্যাকে ওর দাদু খাইয়ে দিচ্ছে। মিম ফ্রেশ হয়ে এসে চেয়ার টান দিয়ে খেতে বসতে যাচ্ছিলো কিন্তু না বসে আবার উঠে গেলো।
~ কি হলো উঠে গেলে কেনো? বসো। (শিশির)
~ না, তোমার সাথে খাব। সবার খাওয়া শেষ হোক। (মিম)

দুপুরে সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেলে মিম প্ল্যান করছে কোন ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে যাওয়া যায় রাতে। মিম আর অর্নীল যেই জামাকাপড় গুলো পরবে সেগুলো আয়রন করে মিম।
সন্ধ্যায়,
~ এই চৌধুরী বাসায় আসছো না কেনো? রাতে বের হব খেয়াল নেই? (অর্নীলকে ধমক দিয়ে মিম)
~ আস্তে। ভয় পাই তো। বিশ মিনিটে আসছি।

~ আসো। বিশ মিনিট এক সেকেন্ড যাতে না লাগে। রাখছি।
মিম সবাইকে রেডি হতে বলে। শিশির রেডি হয়ে আরাধ্যাকে রেডি করিয়ে দিচ্ছে। মিম গলায় লকেট পরতে পরতে বলছে,

~ অলরেডি পঁচিশ মিনিট হয়ে গেছে। এখনো আসছেনা। রেডি হবে কখন ও? আজব!
~ আসছি তো! (মিমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ অলরেডি পাঁচ মিনিট লেট করে ফেলেছো। চৌধুরী তাড়াতাড়ি যাও, ফ্রেশ হয়ে ওই শার্ট প্যান্ট পর। (অর্নীলকে তাড়া দিয়ে মিম)
~ তোমায় অনেক সুন্দর লাগছে কিন্তু। (মিমকে লকেট টা পরিয়ে দিতে দিতে অর্নীল)
~ এখন কি তুমি ওয়াশরুমে যাবা? (রেগে গিয়ে মিম)

~ আরে যাচ্ছি তো। (টাওয়েল নিয়ে অর্নীল ওয়াশরুমে চলে গেলো)
সবাই রেডি হয়ে ড্রইংরুমে ওয়েট করছে। অর্নীল ব্ল্যাক প্যান্ট আর হোয়াইট শার্ট পরে নিচে আসলো।
~ ওই যে বিদেশী কুত্তা চলে আসছে। সবসময় লেইট! চলো বের হই। (মিম)
~ কতদিন পর শুনলাম বিদেশী কুত্তা! আর হ্যা অর্নীল চৌধুরী সর্বদা পাংচুয়াল। তুমি নয়টার টেবিল বুক করেছো। মাত্র বাজে আটটা দশ।

~ যাওয়ার সময় তো ফ্রি তাইনা? (রেগে গিয়ে মিম)
~ মামনি বাবাইকে বকো না, আমার কষ্ট হয়। (আরাধ্যা)
~ তোমার মামনি বুঝেনা মা। চলো বের হও।

সবাই বেরিয়ে গেলে কাজের মেয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। অর্নীল, আরুশ, শিশির, মিম আর আরাধ্যা এক গাড়িতে এবং অর্নীলের আব্বু, অর্নীলের আম্মু আর মিমের বাপি আরেক গাড়িতে। অর্নীলের গাড়ি আরুশ চালাচ্ছে আর অর্নীল সামনে বসা। মিম, শিশির আর আরাধ্যা পেছনে। সারারাস্তা হৈচৈ করে গেলো সবাই। আরাধ্যা বাংলাদেশে আসার পর প্রথমবার সবাই একসাথে বের হচ্ছে। রেস্টুরেন্টে ঢুকে বুক করা টেবিলে বসলো সবাই।
~ সো নাইস মামনি। (আরাধ্যা)

~ ধন্যবাদ মা। আগে তুমিই বলো তুমি কি খাবা? (মিম)
~ চিকেন খাব।
~ আর? (অর্নীল)
~ পাস্তা খাব। (আরাধ্যা)
~ আচ্ছা।

সবাই মেন্যু কার্ড দেখে পছন্দমতো খাবার অর্ডার করে দিল। মিম ভীষণ খুশি এতদিন পর একসাথে পরিবারের সবাই বাইরে এসেছে। খাওয়া দাওয়া শেষে দশটার পর সবাই রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে আর মিম বাড়ির সার্ভেন্ট দের জন্য ও খাবার নিলো। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর দুইটা ছেলে মিমের শাড়ির আচল টেনে ধরে। অর্নীল তখন আরাধ্যাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে।
~ হাউ ডেয়ার ইউ? (মিম একটা ছেলেকে চড় মেরে দেয়)
~ কি হয়েছে মিম? (আরুশ)

~ দেখুন না দাভাই এই ছেলেগুলো আমার শাড়ির আচল ধরে ছিলো।
চেঁচামেচি শুনে অর্নীল পেছনে ব্যাক করে।
~ কি হয়েছে মিম? (ছেলে দুটোর দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ কিছু হয়নি, চলো। (অর্নীলের হাত ধরে মিম)
~ ওরা কি তোমায় কিছু করেছে? (অর্নীল)

~ হ্যা মিমের শাড়ির আচল ধরেছিলো। আমি দেখছি, তুই যা। (আরুশ)
~ ওয়েট ভাইয়া। সাহস থাকলে আবার ধর। (মিমের আচল এগিয়ে দিয়ে অর্নীল)
~ কি হলো? ছেড়ে দাও চৌধুরী! দেখ তোরা বাঁচতে চাইলে এক্ষুণি মাফ চা আর পালা। (ছেলে দুটোকে বলল মিম)
~ আমি তো বললাম ওর আচল আবার ধর। (ঝারি দিয়ে অর্নীল)
~ ম্যাডাম মাফ করবেন, আসি।

মিমের কাছে মাফ চেয়ে ছেলে দুটো দৌড়ে পালালো। অর্নীল মিমের আচল ছেড়ে দিলো।
~ ধুম করেই রেগে যাও কেনো তুমি? (মিম)

~ একটা মশা তোমাকে কামড় দিতে গেলে আমি ওইটার কি অবস্থা করি দেখো না? এরা তোমার শাড়িতে হাত দেওয়ার সাহস পায় কিভাবে? (অর্নীলের চোখ লাল হয়ে গেছে)
~ চৌধুরী রিলাক্স! কিচ্ছু হয়নি।
~ বাসায় চলো। (অর্নীল)

অর্নীল সারা রাস্তা একটাও কথা বলল না। বাড়িতে এসে আরাধ্যাকে নিচে রেখে মিমকে নিয়ে উপরে গেলো অর্নীল। ঘরের দরজা বন্ধ করে এক টানে মিমের শাড়িটা খুলে ফেলল অর্নীল। বারান্দায় শাড়িটা রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেয় অর্নীল।
~ কালকে থেকে তুমি একা বাইরে যাবেনা। আমি নিয়ে যাব যেখানে যেতে চাও আবার আমিই নিয়ে আসব। (অর্নীল)
~ এইভাবে কেনো রেগে যাও তুমি চৌধুরী? এত ডেস্পারেট কেন হয়ে যাও? (একটা টাওয়েল শরীরে দিয়ে মিম অর্নীলের সামনে বসে)

~ আমি জানিনা কেনো হয়ে যাই। তোমার সামনে কাউকে আমি সহ্য করতে পারিনা। (মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ আচ্ছা বাদ দাও। ওরা মাফ চেয়েছে তো। হাতে ড্রেসিং করাবো না? উঠো।
পাঁচ মাস পর…..

মিম সকালে সবাইকে ব্রেকফাস্ট সার্ভ করছে। কেমন যেন মন খারাপ মিমের! অর্নীলের হাত ভাল হয়ে গেছে অনেক আগেই। অর্নীল নিজ হাতে খাচ্ছে আর মিমের দিকে তাঁকিয়ে আছে।
~ মিম? শরীর কি আজকে বেশি খারাপ লাগছে? (উঠে অর্নীল মিমকে ধরে)
~ জানিনা। অনেক দুর্বল লাগছে। (চেয়ারে বসে মিম)
~ কি হলো? (অর্নীলের আম্মু সামনে এগিয়ে এসে)
~ অর্নীল তুমি ডাক্তারের কাছে যাও নি আর? (শিশির)

~ গিয়েছিলাম তো এক সপ্তাহ আগে। মেডিসিন তো চলছে ওর। এক কাজ কর তো বউমনি তুমি ভালো একটা গাইনোকোলজিস্ট এর কাছে সিরিয়াল দাও। আমি আজকে বিকেলে যাব ওরে নিয়ে। (অর্নীল)
~ আচ্ছা। মিমকে নিয়ে ঘরে যাও। আমি খাবার দিচ্ছি সবাইকে। মিমের খাবার ঘরে পাঠাচ্ছি। (শিশির)
~ আচ্ছা।

মিমকে ধরে ধরে উপরে উঠালো অর্নীল। আরাধ্যাও ছুটলো পিছু পিছু।
~ ও মামনি তোমার কি হয়েছে? বাবাই মামনি এমন করছে কেনো? (আরাধ্যা)
~ কিছুনা মা। তুমি নিচে যাও। (অর্নীল)

~ আমি বসি মামনির পাশে?
~ কিন্তু দুষ্টামি করবেনা, হ্যা?
~ আচ্ছা বাবাই।
আরাধ্যা মিমের মাথার কাছে বসে আছে। অর্নীল ভাবছে শুধু ঠান্ডা জ্বরে তো মিমের অবস্থা এত খারাপ হয়না। কি হয়েছে ওর? আর আমি ধুম করেই কেনো গাইনোকোলজিস্ট এর কথা বললাম?
~ চৌধুরী? (অর্নীলের হাত ধরে মিম)

~ কি? খারাপ লাগছে অনেক? (মিমের কাছে বসে অর্নীল)

~ আমি আর বাঁচবনা। মনে হয় মরেই যাব। (অর্নীলের পায়ে মাথা রেখে কেঁদে দেয় মিম)
~ পাগল হয়ে গেছো? কি বলছো উলটাপালটা? (মিমের গালে হাত দিয়ে অর্নীল)
~ মামনি তুমি ভালো হয়ে যাবে দেখো। (মিমকে জড়িয়ে ধরে আরাধ্যা)
~ চুপ একদম। এই কথা তো বলবা ই না আর। (মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ আমি মরে গেলে আমার আরাধ্যাকে দেখবে তো?

~ এইইই তুমি মরে গেলে আমি বেঁচে থাকব কেনো? আমিও মরে যাব। চুপ একদম। (অর্নীল)
বিকেলে মিমকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলো অর্নীল। আরাধ্যা কাঁদছে মিম অসুস্থ বলে। শিশির আরাধ্যার কান্না থামাতে পারছেনা। ডক্টর মিমকে দেখে বলে,
~ মিসেস চৌধুরী আপনি জ্বর ঠান্ডায় কাবু হন নি তো!
~ তো কি হয়েছে ডক্টর? (মিম)

~ মা হচ্ছেন তো। একটু অসুস্থ তো হবেনই।
~ কিহ? (অবাক হয়ে মিম)

~ হ্যা রিপোর্ট তো তাই বলছে। মিস্টার চৌধুরীকে ডাকুন।
অর্নীল কেবিনের বাইরে ওয়েট করছিলো। ডক্টর নার্সকে দিয়ে অর্নীলকে ডেকে পাঠালেন। অর্নীল এসে দেখলো মিম টেবিলে মাথা ফেলে শুয়ে আছে।

~ ঠিক আছো তুমি? (মিমকে উঠিয়ে অর্নীল)
~ হ্যা আমি ঠিক আছি। (মিম অর্নীলের হাত জড়িয়ে ধরলো)
~ আপনার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট মিস্টার চৌধুরী। সেকেন্ড চাইল্ড না আপনাদের?
এইটা শুনে অর্নীল হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছেনা। অর্নীল ডক্টরকে জিজ্ঞেস করে,
~ ও ঠিক আছে তো?
~ একদম।

~ তাহলে ও মরে যাওয়ার কথা কেন বলল সকালে?
~ এইটা ওনার মনের ধারণা ছিল। শি ইজ এবসুলিউটলি ওকে। মিস্টার এন্ড মিসেস চৌধুরী অভিনন্দন দুইজনকেই। (ডক্টর)
~ থ্যাংকস ডক্টর। ওর মেডিসিন? (অর্নীল)
~ হ্যা এই নিন প্রেসক্রিপশন।
~ আসছি। মিম উঠো। (অর্নীল)

মিম দাঁড়াতে গিয়ে মাথা ঘুরে বসে পরে। অর্নীল মিমকে কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। মিমকে গাড়িতে বসিয়ে অর্নীল গাড়ি স্টার্ট করে।
~ মিম?
~ হু?

~ অনেক কষ্ট হচ্ছে?
~ সো সো। তুমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলো।
~ আমার ঘাড়ে মাথা রাখো। সিট বেল্ট খুলো না।
অর্নীল যেতে যেতে ভাবছে বাড়ির সবাই কতই না খুশি হবে এইটা শুনে!

পর্ব ২৩

অর্নীল ড্রাইভ করছে আর ভাবছে মিম আবার মা হবে এই কথাটা শুনলে বাড়ির সবাই কত্ত খুশি হবে। মিম সারারাস্তা অর্নীলের হাত ধরে ছিল। বাড়িতে এসে মিমকে নিয়ে ড্রইংরুমে বসে অর্নীল। বাড়ির সবাই দ্রুত মিমকে দেখতে আসে।

~ অর্নীল ডক্টর কি বলল? (অর্নীলের আম্মু)
~ বেশি সিরিয়াস কিছু না তো? (শিশির)

~ বউমনি তুমি আবার চাচী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। (অর্নীল)
~ সত্যি? (খুশি হয়ে অর্নীলের আম্মু)

~ হ্যা আম্মু।
অর্নীলের আম্মু হাতের থেকে একটা চুরি খুলে মিমের হাতে পরিয়ে দিলেন।
~ আম্মু এইটা তো আপনার প্রিয় চুরি। আমায় দিলেন যে? (মিম)

~ শুধু তোমায় না। একটা বড় বৌকে দিব আরেকটা তোমায় দিলাম। বড় বৌমা হাতটা দাও।
শিশিরকেও একটা চুরি পরিয়ে দেয় অর্নীলের আম্মু। অর্নীলের আম্মু এক বউয়ের আনন্দে আরেক বউকে কষ্ট দিতে পারেন না। তাই দুই বউকেই খুশি রাখলেন। শিশির কখনো মা হতে পারবেনা জেনেও কোনোদিন শিশিরকে এই নিয়ে একটা কথা বলেনি বাড়ির লোকেরা। এইজন্য শিশির মাঝে মাঝে কষ্ট পেলেও আরুশ শিশিরকে সামলে নেয়। বাড়িতে সবচেয়ে বেশি খুশি অর্নীল।

আরাধ্যার ভাইবোন আসবে শুনে আরাধ্যা ও আনন্দে লাফাচ্ছে।
~ মামনি একটা ভাই হবে আমার তাইনা? ওকে আমি অনেক আদর করব না? (মিমের কোলে বসে আরাধ্যা)
~ মা আমার এখন থেকে তো মামনির কোলে বসা যাবেনা। বাবাইয়ের কোলে বসবা আজ থেকে। বউমনি ভাইয়াকে বলো মিষ্টি নিয়ে বাসায় ঢুকতে। (অর্নীল)

~ অলরেডি বলে দিয়েছি দেবর জি। আমি আজকে রাতে সব মিমের পছন্দের রান্না করব নিজের হাতে। (শিশির)
~ গ্রেট! (অর্নীল)

~ কি বলে এসব? আমি হেল্প করব কিন্তু তোমায়। (মিম)
~ একদম না। চুপচাপ রেস্ট করবা আর খাবা। এছাড়া আর কোনো কাজ নাই তোমার। অর্নীল তোমার বউয়ের অফিসে যাওয়াও কিন্তু বন্ধ আজ থেকে। (শিশির)

~ সেইটা আর তোমায় বলতে হবেনা। শৈলিকে ফোন করে আমি বলে দিব। (অর্নীল)
~ ছোট বৌমা তোমায় এখন থেকে এই শাড়ি পরার দরকার নেই। তোমার আরামদায়ক পোষাক যেইটা হবে সেইটাই পরো। তবে ঢিলেঢালা পোষাক ভালো হবে। (অর্নীলের আম্মু)
~ আচ্ছা মা।

~ অর্নীল যা মিমকে নিয়ে ঘরে যা। দিদিভাই তুমি আমার সাথে এসো। গার্ডেন থেকে ঘুরে আসি। (অর্নীলের আম্মু আরাধ্যাকে ডেকে)

~ চলো দিদুন। (আরাধ্যা)
অর্নীল মিমকে নিয়ে ঘরে গেলো। পায়ের মোজা খোলেনি এখনো অর্নীল।
~ চেঞ্জ করতে পারবা? (অর্নীল)
~ হ্যা পারব। খুশি তো তুমি?

~ কিভাবে বোঝাই? (মিমের কাঁধে হাত রেখে অর্নীল) আরাধ্যার সময় তোমায় কাছে পাইনি, কোনো যত্ন করতে পারিনি কিন্তু এইবার আর মিস হবেনা। (মিমের গলার লকেট খুলতে খুলতে অর্নীল)
~ হইছে!
~ তুমি কি খাবা এখন? কফি খাওয়া একদম নিষেধ।
~ বউমনিকে বলো একটু জুস করে দিতে আমায়। মাথাটা ঘুরছে।
~ আমি করে আনছি। বউমনি ব্যস্ত।

~ কিহ? তুমি জুস বানাবা আমার জন্য? (চোখ বড় বড় করে তাঁকিয়ে মিম)
~ হ্যা তো?

~ কখনো তো রান্নাঘরের আশেপাশে দেখিনি তোমায়। দাভাই মাঝে মাঝে আমাদের রান্না করে খাওয়ায়।
~ আজকে আমি খাওয়াবো। সমস্যা?

~ মুখে দিতে পারলেই হয়।
~ আন্ডারেস্টিমেট করনা। আমি আসছি।
~ এই চেঞ্জ না করে কই যাস? চেঞ্জ করে যা। (অর্নীলের শার্টের কলার ধরে মিম)
~ আবার তুই?
~ তোমার দাড়িগুলো আঁচড়াবো একটু পর। তারাতারি জুস নিয়ে আসো যাও।

~ এই আমার দাড়ি কি আঁচড়ানোর বয়স হইছে? এত বড় নাকি আমার দাড়ি? কত সুন্দর লাগে দেখতে। (নিজের মুখে হাত দিয়ে অর্নীল)

~ চুপ। এইগুলো নিয়ে যখন আমায় কিস করতে আসো তখন আমার মুখটা ছিলে যায় এগুলোর ধারে। তাই আজকে এগুলোতে হাল্কা মেকাপ করে মসৃণ করব।

~ এই আস্তে! এইগুলো আমার কত যত্নের ফসল জানো?

~ এইজন্যই তো এখনো বিদেশী গার্লফ্রেন্ড রা বলে উইল ইউ মেরি মি তাইনা?
~ ওরা বললে আমার দোষ কি? এইজন্য তুমি আমার দাড়িগুলো নষ্ট করবা? ছিহ মিম এইটা আশা করিনা আমি।
~ তুই চেঞ্জ করে জুস নিয়া আয় যা। এরপর দেখ কি পারি আর কি না পারি।

অর্নীল চেঞ্জ করে মিমের জন্য জুস নিয়ে আসলো। মিম ততক্ষণে চেঞ্জ করে ঢোলা একটা শার্ট পরেছিলো আর ধুতি। মিম শুয়ে শুয়ে ম্যাগাজিন পড়ছিলো আর অর্নীল মিমকে বলল,
~ জুসটা খাও।

~ থ্যাংক ইউ মাই সুইটহার্ট (গ্লাস হাতে নিয়ে মিম)
~ ওয়েলকাম। (ল্যাপটপ হাতে নিয়ে অর্নীল)

~ এই ল্যাপটপ ধরেছো কেনো? এইদিকে আসো।
~ প্লিজ বউ আমার দাড়ি গুলো নষ্ট করনা। (দূরে দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ তোমার চুলগুলোও কেটে ছোট করব। এই বয়সে স্টাইল বাহির করব দাঁড়াও না।

~ আল্লাহ গো! এই মিম তুমি হঠাৎ আমার চুল দাড়ির পেছনে পরলা কেনো? (সোফায় বসে অর্নীল)
~ তুই কালকে যে তোর প্রোফাইল পিক আপডেট দিয়েছিস আমায় জানিয়েছিলি? তুই এত সুন্দর পিক দিবি কেনো প্রোফাইলে? ওইখানে তোর বিদেশী বন্ধুরা এত্ত লম্বা লম্বা কমেন্ট কেনো করলো? ক্রাশ কেনো লিখলো? ওরা বলল কেন তোর চুল দাড়ি সুন্দর? হারামী এইদিকে আয় তুই। (জুসের গ্লাস রেখে মিম)
~ ও আচ্ছা এইজন্যই তো বলি সবার কমেন্টে এংরি মারলো কে! এই কাজ তোমার তাইনা? আর ওরা এসব বলবে বলে আমি প্রোফাইল চেঞ্জ করবনা? আজব তো?

~ এত সুন্দর পিক কেনো দিবি তুই? (রিমোট হাতে নিয়ে মিম)
~ তাহলে কি লুঙ্গি পরা পিক আপলোড করব নাকি?
~ হারামী তুই লুঙ্গি পরস? (রেগে গিয়ে মিম)
~ তোমার জন্য না হয় পরলাম, সমস্যা কি?

~ তুই কি আমার সামনে আসবি নাকি রিমোট ছুড়ে মারবো?
~ আগে বলো আমার চুল দাড়ির কিছু করবানা?
~ তুই আগে আয়
~ না আগে তুমি বলো কিছু করবানা?
~ দাঁড়া আমিই আসছি।

মিম খাট থেকে নেমে অর্নীলের উপর বসে। একটা কেচি হাতে নেয় মিম।
~ প্লিজ এই কাজ কর না। আমার এত শখের চুল কাইটো না প্লিজ। (মিমের হাত ধরে অর্নীল)
~ আগে বল আমায় না বলে প্রোফাইল আপডেট দিয়েছিস কেন? সপ্তাহে সপ্তাহে প্রোফাইল পালটানো লাগে তাইনা? তোর ফেসবুক, ইন্সটা সব চালানো আমি বন্ধ করে দিব কিন্তু চৌধুরী! (কেচিটা অর্নীলের নাকের গোড়ায় ধরে মিম)
~ শুধু আমার বাচ্চাটা তোমার পেটে খেলতেছে দেখে কিছু বলতেছি না। সব অত্যাচার সহ্য করতেছি।
~ নাহলে কি করতি?

~ কি করতাম আমার থেকে তুমি ভালো জানো। (হেসে অর্নীল)
~ বেশরম!

~ বেশরম আর যা খুশি বলো আমাদের রাঙামাটি ট্রিপের ফসল আমার এই বাচ্চা। সব মিলিয়ে আমার লাইফের বেস্ট ট্রিপ ছিল রাঙামাটি ট্রিপ। (মিমকে ঘুরিয়ে নিজের কোলে বসায় অর্নীল)
~ ওই রাঙামাটি ট্রিপের নাম আমার সামনে নিবানা। মেয়েটার সামনে আমাকে পুরো বেইজ্জতি করে দিছো।
~ তো কি করব? কথা শুনছিলা না কেন আমার?
~ এইজন্য মেয়ের সামনে কিস করবা? ছিহ!

~ ছি ছি কম কর তো। এই বেবিটা যদি ছেলে হয় তাহলে আরেকটা বেবি মেয়ে হবে।
~ কত্ত এডভান্স চিন্তা ভাবনা। চুপ কর চৌধুরী। আমি আর মা হবই না।
~ তা বললে তো হবেনা জান। আমার যে তিনটা বাচ্চাই লাগবে। (মিমের ঘাড়ে কিস করে অর্নীল)
~ এই দাড়িগুলো আমার শরীরে ছোঁয়াবানা তুমি। রাগ লাগে এগুলো দেখলে।
~ কেনো? এমিলি এই দাড়ির জন্য বিয়ে করতে চেয়েছিলো বলে? (হেসে অর্নীল)
~ তুই করিস বিয়ে। ছাড় আমায়।

~ আমি কি বলেছি নাকি আবার বিয়ে করব? (মিমকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ হইছে থাক!

মিম প্রেগন্যান্ট এইটা জানার পর অর্নীল অফিসে খুব কম সময় কাটায়। মিমের পাশে থাকে সবসময়। মা মেয়েকে সামলিয়ে এরপর ঘরেই অফিসের কাজ শেষ করে অর্নীল। একদিন বিকেলে গার্ডেনে সবাই বল দিয়ে খেলছিলো। আরাধ্যা, অর্নীল, শিশির আর আরুশ ফুটবল নিয়ে দৌড়াচ্ছে। মিম, অর্নীলের আব্বু আম্মু আর মিমের বাপি বসে বসে ওদের খেলা দেখছে আর জুস খাচ্ছে।

~ চৌধুরী দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে ফুটবল খেলছে দেখেছেন মা? (হেসে মিম)
~ ওর এই পরিবর্তন শুধুই তোমার জন্য। ওর মেজাজ আগে থেকে অনেক কন্ট্রোলে এসেছে, হাসে, কথা বলে, মজা করে। আরুশেরই ভাই মনে হয় ওরে এখন। (অর্নীলের আম্মু)

~ মেজাজ যে কি পরিমাণ তা তো জানেন না মা! দুই দুইটা খুন করেছে ও আমার জন্য (মনে মনে মিম)
~ আরাধ্যা বল পাস কর। (আরুশ)

~ না চাচ্চু। আমি আর বাবাই জিতব। তোমাকে আর চাচীমাকে বল দিবই না। (বল হাতে তুলে আরাধ্যা)
~ হাহাহাহা। দিবেনা বলে হাতেই তুলে নিয়েছে বল দেখছো। (হাসতে হাসতে শিশির)
~ হাহাহাহা। আরাধ্যা বল হাতে নিছো কেনো? (অর্নীল)

~ আমরা জিতব বাবাই। তাই আমি বল হাতে নিয়ে গোলপোস্টে ছুড়ে মেরেছি। (আরাধ্যা)
আরাধ্যার কথা শুনে সবাই হাসতে শুরু করলো। মিম এগিয়ে গেলো ওদের দিকে।
~ আমিও একটু খেলি তোমাদের সাথে? (মিম)
~ ইশ! তুমি উঠে এসেছো কেন? (অর্নীল)

~ তোমরা কত মজা করছো আর আমি একা বসে মিস করছি।
~ ভাইয়া আমাদের ক্যারম আছে না? (অর্নীল আরুশকে জিজ্ঞেস করলো)
~ আছে তো।

~ তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। তুমি, বউমনি আর আমি মিম খেলব। (অর্নীল)
~ দাঁড়া। সিকিউরিটি? (আরুশ)
~ জ্বি স্যার। (সিকিউরিটি)
~ এসো তো আমার সাথে।

আরুশ গার্ডেনের চিলেকোঠা থেকে ক্যারম নিয়ে এলো সিকিউরিটির সাহায্য নিয়ে। গার্ডেনের মাঝখানে ক্যারম বসিয়ে খেলা শুরু করলো চারজন। আরাধ্যা দিদুন, দাদু আর নানাভাইয়ের সাথে খেলছে। মিম বারবার ঘুটি মিস করছে বলে অর্নীল মিমকে বলে,
~ তোমার জন্য যদি হারি তাহলে খবর আছে কিন্তু।

~ এহ! নিজে মনে হয় উল্টিয়ে দিচ্ছে। (মুখ ভেঙিয়ে মিম)
~ এত বড় বড় নখ থাকলে খেলবা কিভাবে? আজকে ঘরে গিয়ে নখ কাটবা। (অর্নীল)
~ দিদিভাই তোমার দেবরকে কিছু বল। (মিম)
~ থামবি তোরা? সারাক্ষণ লেগে থাকিস কিভাবে রে? (হেসে আরুশ)
~ এই মিম এখন তোমার স্ট্রাইক। রেড যদি এই পকেটে না পরে তাহলে সবগুলো চালের গুড়া তোমার মুখে ছুঁড়ে মারব কিন্তু (অর্নীল)
আর যদি পারি রেড ফেলতে তাহলে এই চালের গুড়া দিয়ে তোমায় গোসল করাবো। রাজি? (স্ট্রাইক হাতে নিয়ে মিম) হ্যা রাজি। আগে তো ফেলো। (অর্নীল)

মিম রেড পকেটে ফেলার পর অর্নীল চোখ বড় বড় করে তাঁকায় পকেটের দিকে। মিম উঠে সমস্ত চালের গুড়া অর্নীলের শরীরে ও মাথায় মাখানো শুরু করলো। আরাধ্যা এইটা দেখে ছুটে এসে অর্নীলের শরীরে চালের গুড়ো মাখাচ্ছে। আরুশ দৌড়ে গিয়ে ক্যামেরা এনে এইসব ভিডিও করছে আর সবাই হো হো করে হাসছে।
সন্ধ্যায় সবাই ড্রইংরুমে আড্ডা দিচ্ছে আর দারোয়ান নক করে ঘরে ঢুকে।
~ ছোট স্যার? (দারোয়ান)
~ হ্যা বলো। (অর্নীল)

~ আপনার এক ক্লায়েন্ট এই টা দিয়ে গেলেন। আপনাকে দিতে বললেন। (একটা চিঠি এগিয়ে দিয়ে দারোয়ান)
~ আচ্ছা তুমি যাও।
অর্নীল চিঠিটা খুলে দেখলো কাপল ইনভাইটেশনের কার্ড। অর্নীল বুঝতে পারে কে চিঠিটা আর কার্ডটা পাঠিয়েছে। অর্নীল সাথে সাথে তাকে ফোন দিলো।

~ মিস্টার সেন ইনভাইটেশন কার্ড কিসের? (অর্নীল)
~ মিস্টার চৌধুরী পার্টিটা আমি থ্রু করেছি। সব বিজনেস ম্যান রা ওয়াইফ সহ নিমন্ত্রিত। আপনি আর ম্যাডাম তো অবশ্যই আসবেন। (মিস্টার সেন)
~ আপনি হয়ত জানেন না মিম অসুস্থ। চার মাসের অন্তসত্ত্বা ও। সরি মিস্টার সেন ইনভাইটেশনটা ক্যান্সেল করতে হচ্ছে।
~ সরি মিস্টার চৌধুরী আমি জানতাম না। তবে আপনি একাই আসুন। আমি অনেক আশা করেছি আপনাদের নিয়ে।
~ আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট মিস্টার সেন।

পর্ব ২৪

মিস্টার সেনের সাথে কথা বলে অর্নীল ফোন কাটলো। মিম জিজ্ঞেস করলো,
~ কি বলল উনি? ইনভাইটেশন ক্যান্সেল করেছো না?
~ কিভাবে করি? উনি আমার পুরোনো ক্লায়েন্ট। আমাকে একা জয়েন করতে বলল। (মিমের পাশে বসে অর্নীল)
~ পার্টি কবে? (মিম)
~ কাল সন্ধ্যায়।

~ তাহলে একাই যেয়ো। শিউলি ব্ল্যাক কফি বানাও তো। (কাজের মেয়েকে বলে মিম)
~ ব্ল্যাক কফি কার জন্য? (অর্নীল)

~ এই বাড়িতে তুমি ছাড়া কেউ ব্ল্যাক কফি খায়? (মিম)
~ না কফি খাব না। আপাতত কিছুই খাবনা। (আরাধ্যার সাথে খেলতে খেলতে অর্নীল)
~ আচ্ছা খেলো তাহলে। (ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে মিম)

পরেরদিন সন্ধ্যায় অর্নীল রেডি হচ্ছে পার্টিতে জয়েন করবে বলে। মিম অর্নীলের টাই বেঁধে দিচ্ছে।
~ তাড়াতাড়ি চলে এসো। বেশি রাত করনা।
~ তুমিও সাবধানে থেকো। আরাধ্যা মামনিকে একদম জ্বালিয়ো না। (অর্নীল)
~ ওকে বাবাই।

~ তোমার জন্য কিছু আনতে হবে?
~ না বাবাই। আমার সব আছে।
~ ওকে মা। আসছি। দুষ্টুমি করনা। (আরাধ্যাকে চুমু দিয়ে অর্নীল)
~ আচ্ছা। (অর্নীলকে চুমু দিয়ে আরাধ্যা)
~ মিম গেলাম আমি।

~ ফি আমানিল্লাহ্। (মিম)
অর্নীল বেরিয়ে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পর মিম খেয়াল করে অর্নীল নিজের ফোনটাই নিতে ভুলে গেছে। মিম ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে দিলো। আরাধ্যা নিচে যায় খেলতে। মিম ঘরে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছে।
দুই ঘণ্টা পর,

~ মিম আরাধ্যা কি এই ঘরে এসেছে? (হন্তদন্ত হয়ে শিশির)
~ না তো বউমনি। ও তো চৌধুরীর সাথেই বেরিয়ে নিচে গেলো খেলতে। (উঠে মিম)
~ ও তো খেলছিলো আমার সাথে ড্রইংরুমে। আমি রান্নাঘরে গেলাম এরপর আর ওকে পেলাম না। মা বাবার ঘরেও তো নেই।

~ বলো কি? পুরো বাড়ি দেখেছো? গার্ডেনে দেখেছো? (তাড়াতাড়ি উঠে মিম)
~ আস্তে উঠো। আমি পুরো বাড়ি দেখেছি মিম। আরাধ্যা কোথাও নেই।
~ দিভাই ছাদে দেখেছো? (চিন্তিত হয়ে মিম)
~ না। দাঁড়াও আমি আসছি।

শিশির দৌড়ে বাড়ির ছাদে গেলো। মিম নিচে নেমে এলো। ড্রইংরুমে আরাধ্যার খেলনা ছড়ানো। সদর দরজাও তো চাপানো। শিশির নিচে নেমে এসে মিমকে বলে আরাধ্যা ছাদেও নেই। মিম কেঁদে দেয়।
~ দিভাই আমার আরাধ্যা কই?

~ মিম কেঁদো না। আমি আরুশকে ফোন করছি। (ফোন হাতে নিয়ে শিশির)
কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে মিমের শ্বাশুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মিমের শ্বাশুড়ি সব শোনার পর বাইরে যায় সিকিউরিটির সাথে কথা বলতে।

~ গেইটে কে ছিলো? আরাধ্যাকে দেখো নি তোমরা? (অর্নীলের আম্মু)
~ না ম্যাডাম। বাবু তো গার্ডেনে আসেনাই। আর আমরা বাবুকে দেখিনি। আমরা আধা ঘন্টা গেইটে কেউই ছিলাম না। (মাথা নিচু করে সিকিউরিটি)

~ কিহ? গেইটে ছিলাম না মানে? কি করছিলে তোমরা? সব কয়টা হোয়াটলেস। আমার দিদিভাইকে যদি খুঁজে না পাই একটাকেও আমি রাখবনা। (চিল্লিয়ে মিসেস চৌধুরী)

বেশ চেঁচামেচি করে মিসেস চৌধুরী ঘরে এসে পুলিশকে ফোন করলেন। আরুশ ততক্ষণে বাসায় চলে এসেছে। আরুশ বাড়ির আশেপাশের রাস্তায় খুঁজলো আরাধ্যাকে কিন্তু পেলো না। অর্নীলের আব্বু, মিমের বাপি অফিসের কাজে বাইরে ছিলেন। বাসায় এসে এসব শোনার পর কারো অবস্থাই ঠিক নেই। মিম কেঁদে অস্থির হয়ে গেছে। শিশির ও কাঁদছে।
~ আরুশ পুলিশ এখনো আসছেনা কেনো? (শিশির)
~ অর্নীলকে ফোন করেছো? (আরুশ)

~ দাদাভাই চৌধুরী ফোন নিয়ে যায়নি। আজকেই ও ফোনটা রেখে গেলো। (মিম)
পুলিশ বাসায় এসে আরাধ্যার ডিটেইলস নিয়ে আরাধ্যাকে খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। অর্নীল রাত বারোটায় পার্টি থেকে ফিরে দেখে বাড়ির এই অবস্থা। মিম কেঁদে কেঁদে আধমরা হয়ে গেছে।

~ মিম? শান্ত হও তুমি। আমি খুঁজে নিয়ে আসব আমাদের মেয়েকে। কাঁদবানা একদম। বউমনি ওকে দেখো। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। (অর্নীল)

অর্নীল মিমকে স্বান্তনা দিলো ঠিকই কিন্তু নিজেই যে অশান্ত হয়ে গেছে সেইটাই কাউকে বুঝতে দিলো না। অর্নীল ব্লেজার ফেলে রেখে সিকিউরিটির সাথে কথা বলতে গেলো। ওরা আধা ঘণ্টা গেইটে ছিল না শুনে অর্নীল আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। অর্নীলের সব রাগ আর দুশ্চিন্তার বলি হলো সিকিউরিটি। চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে আরাধ্যা মিসিং। ও তো একা একা কোথাও যায়না এমনকি গার্ডেনেও একা আসেনা। কোথায় গেলো ও? আরুশ পুলিশের সাথে আছে।

সারারাত ধরে সবাই ড্রইংরুমে বসে কেঁদেছে। অর্নীল মিমের সাথে বসেছিলো। সকাল হয়ে গেছে অথচ আরাধ্যার কোনো খবর নাই। অর্নীল চেঞ্জ করতে উপরেও যায়নি। একই শার্ট পরে সারারাত ড্রইংরুমে বসে ছিলো। সকাল আটটায় আরুশ বাসায় এলো সাথে পুলিশ অফিসার।
~ ভাইয়া? (অর্নীল উঠে দাঁড়ায়)

~ মিস্টার চৌধুরী আপনার মেয়ে কিডন্যাপড এতে তো কোনো সন্দেহ নেই। কে করতে পারে এইরকম কিছু কোনো ধারণা?

~ আরে অফিসার আমার বাড়ি বয়ে এসে আমার মেয়েকে কে নিয়ে যাবে? ও কিডন্যাপড কি করে হয়? আমার কোনো শত্রু নেই যে আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করবে। (অর্নীল)
~ ও যদি একা একা বেরিয়েও যায় তো কতদূর যাবে? খুঁজলাম তো আমরা। পেলাম কই? (অফিসার)
~ এতকিছু তো আমি শুনতে চাইনি। আমি আমার মেয়েকে ……….

এতটুকু বলেই অর্নীল থেমে গেলো। অর্নীল ওইখান থেকে দ্রুত দৌড়ে নিজের বেডরুমে আসে। ওর ফোন খুঁজে বের করে আকাশকে ফোন করে। অর্নীলের হঠাৎ এইভাবে চলে যাওয়া সবাইকে ভাবাচ্ছে। ও এমনভাবে চলে গেলো কেনো?
~ আকাশ আয়মান শিকদার বেঁচে আছে? (অর্নীল)
~ বেঁচে না থাকার কি আছে স্যার? কেনো?

~ আমায় প্রশ্ন না করে দশমিনিটের মধ্যে জানাও আয়মান শিকদার বেঁচে আছে না নাই? ইজ ইট ক্লিয়ার?
~ এক্ষুণি জানাচ্ছি স্যার।

অর্নীল শার্টের বোতাম খুলে বসে আছে। অর্নীল আর মিম ধরেই নিয়েছিলো আয়মান শিকদার সেইদিন মরে গেছে কিন্তু সত্যিটা কেউই জানেনা। একটু পর আকাশ ফোন করে জানালো আয়মান শিকদার বেঁচে আছে। এইটা শোনার পর অর্নীল এক সেকেন্ড ও দেরি না করে নিচে গিয়ে পুলিশকে বলে,
~ আয়মান শিকদারকে ট্র‍্যাক করুন। আমার মেয়ে ওর কাছেই আছে।

অফিসার ফাস্ট।
অফিসার বাড়ি থেকে বেরিয়ে থানায় গেলো ফোনে কতা বলতে বলতে। আয়মান শিকদারের নাম শুনে মিম অর্নীলের দিকে তাঁকিয়ে আছে৷ মিম তো জানে আয়মান শিকদারকে নিজ হাতে মেরেছে অর্নীল। এরপরে ও আসে কোত্থেকে? আয়মান শিকদারকে পুলিশ খুঁজছে এইদিকে অর্নীল ও বসেনেই। অর্নীল ও চেষ্টা করছে। মিনিমাম একটা ফোন তো করবে আয়মান শিকদার! তা না করে কাওয়ার্ডের মতো গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। বাড়ির সবাই খাওয়া দাওয়া ভুলে গিয়ে বসে আছে। অর্নীল ধমকিয়ে মিমকে খাওয়ালো। বিকেলে অর্নীলকে ফোন করে আয়মান শিকদার।

~ এত দেরি করলি কেনো ফোন দিতে? আরাধ্যা কোথায়? (অর্নীল)
~ এত বুদ্ধি কোথায় রাখেন আপনি চৌধুরী? আরাধ্যা আমার কাছে বুঝলেন কি করে?
~ আয়মান তোর সাথে ফালতু কথা বলবনা আমি। আরাধ্যা কোথায়? কি চাই তোর? কেনো আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করেছিস?

~ তোমার রক্ত চাই চৌধুরী। দিতে পারবা? ওই গুলির ক্ষত কিন্তু এখনো শরীরে আছে আমার।
~ কোথায় তুই সেইটা বল। আসছি আমি।

~ এত সহজ? আর কয়েকদিন যাক। তোমার মেয়েকে আদর করেই রাখব সমস্যা নেই। ভীষণ মিষ্টি কিন্তু তোমার মেয়ে। ভাল লেগে গেছে ওকে। তাই ওকে দুটো চড় মারা ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি।
~ হোয়াট? তুই আমার মেয়েকে মেরেছিস? (রাগে অর্নীলের চোখ লাল হয়ে গেছে)
~ কি করব? এত কাঁদছিলো ও।
~ তুই কোথায় আছিস সেইটা বল!

আয়মান শিকদার ফোন কেটে দিলো। অর্নীল আরুশকে দিয়ে এতক্ষণ নাম্বার ট্র‍্যাক করাচ্ছিলো। আয়মান শিকদার মেঘনা নদীতে কোনো এক চলন্ত লঞ্চে আছে। অর্নীল তখনি বেরিয়ে গেলো। আরুশ অর্নীলকে একা যেতে নিষেধ করলো কিন্তু কে শুনে কার কথা? অর্নীল গাড়ি নিয়ে মেঘনা নদীতে আসলো। কোন লঞ্চ সেইটাই তো জানেনা ও। অর্নীল এইটা ভাবতে ভাবতে পেছনে দেখে আরুশ আর পুলিশ অফিসার এসেছে।
~ কিভাবে তুই একা আসলি? না করেছিলাম না? (আরুশ)

~
পুলিশ সবগুলো লঞ্চেই তল্লাশি করলো। একটা লঞ্চে গিয়ে দেখে আয়মান শিকদার দাঁড়িয়ে আছে আর আরাধ্যা সিটে বসে কাঁদছে। আরাধ্যার গালে চার আঙুলের দাগ। বাবা আর চাচ্চুকে দেখে আরাধ্যা দৌড়ে ওদের কাছে যায়। অর্নীল এক দৃষ্টিতে আয়মান শিকদারের দিকে তাঁকিয়ে আছে। আরুশ আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে আদর করে। অর্নীল পুলিশ অফিসারের গান নিয়ে আয়মান শিকদারের বুকে গুলি চালিয়ে দেয় কিছু না ভেবেই।

~ ওইদিন বেঁচে গিয়েছিলি। তুই আমার মেয়েকে চড় মেরেছিস তাইনা? আমাকে মারার এত ইচ্ছে ছিল আমাকেই মারতিস। কোনো কথা ছাড়া মার খেতাম। আমার মেয়েকে কেনো?

এই কথা বলেই আয়মানকে পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় অর্নীল। আরুশ স্তব্ধ হয়ে যায় অর্নীলকে এভাবে দেখে। পুলিশকে অর্নীল বলে,

~ এইটা আরেকটা এনকাউন্টার। আমার মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য ওকে মারতেই হতো। ঠিক আছে? (আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে অর্নীল)

পুলিশ কিছু বলল না। পাঁচ বছর আগে মিস্টার খানকে মেরেছিলো অর্নীল আর এই অফিসারই সেইটা এনকাউন্টার বলে চালিয়েছে। আজও সেইটাই করলো অর্নীল। আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে আদর করে অর্নীল।
~ কেনো তুমি বাইরে এসেছিলে মা? (অর্নীল)
~ এই আংকেল টা আমায় ডেকেছে বাবাই। এরপর আমার মুখ চেপে এখানে নিয়ে এসেছে আমায়। আমি ভয় পেয়ে গেছি বাবাই।

~ কিচ্ছু হয়নি মা। একদম কেঁদো না। চলো বাসায় যাই।
আরাধ্যাকে দেখে সবাই ওকে জড়িয়ে ধরে। মিমের কান্না থামে মেয়েকে দেখে।
~ থ্যাংক ইউ চৌধুরী। থ্যাংক ইউ। (আরাধ্যাকে জড়িয়ে ধরে মিম)

~ দেখেছো আম্মু ও আমায় থ্যাংকস দিচ্ছে? আরাধ্যাকে ও শুধু নিজের মেয়েই ভাবে।
এই কথা বলে অর্নীল ফ্রেশ হতে চলে গেলো। ভীষণ ভয় পেয়েছিলো অর্নীল মেয়ের জন্য। এখন একটু শান্ত লাগছে। এরপর থেকে আর কোনো দুঃখ, কষ্ট নিজের পরিবারকে ছুঁতে দেয়নি অর্নীল। সবসময় আগলে রেখেছে সবাইকে। অর্নীলের একটা ছেলে হলো। নাম রেখেছে অগ্নিভ চৌধুরী। সব ভুলে আরাধ্যা শুধু ভাইকে নিয়েই পরে থাকে।
১৪ বছর পর……

আরাধ্যার আঠারো বছর পূর্ন হলো। আজকে আরাধ্যার কলেজে ওরিয়েন্টেশন ক্লাস। অগ্নিভ আর অদিতি প্রস্তুত আরাধ্যার সাথে কলেজে যাবে বলে। অদিতি অর্নীল মিমের তৃতীয় সন্তান। বয়স ১২ বছর। অগ্নিভর দুই বছরের ছোট অদিতি।
~ মামনি? চাচী? (চুল বাঁধতে বাঁধতে আরাধ্যা)
~ হ্যা আরাধ্যা বলো। (আরাধ্যার ঘরে এসে মিম)

~ মামনি কি এসব? তুমি এখনো রেডি না? দশটায় আমার ক্লাস শুরু মামনি।
~ তোমার বাবাই এখনো আসেনি। রাস্তায় আছে। আসুক এরপর বের হই?
~ অগ্নিভ আর অদিতি কোথায়? (আরাধ্যা)

~ ড্রইংরুমে রেডি হয়ে বসে আছে। আচ্ছা আরাধ্যা তোমার ওরিয়েন্টেশনে আমরা সবাই গিয়ে কি করব?
~ আমার যা কিছু ভালো সব তোমার আর বাবাইয়ের জন্য মামনি। তোমাদের ছাড়া কি করে প্রথম দিন কলেজে যাই? (মিমকে জড়িয়ে ধরে আরাধ্যা)
~ তোর বাবাই কিন্তু রেগে যাবে এই শর্ট স্কার্ট পরে বাইরে গেলে। আমাকে পরে বলবে মেয়েকে মানুষ করতে পারিনি।
~ জানি তো। চেঞ্জ করব এখন।

পর্ব ২৫ (অন্তিম)

আরাধ্যা শর্ট স্কার্ট পালটে লং ড্রেস পরেছে। মিমের ডিজাইন করা ড্রেসই আরাধ্যা পরে। অগ্নিভ পাঞ্জাবি পরেছে আর অদিতি শর্ট ড্রেস। মিম নিচে নেমে আসে।

~ মামনি বড় আপু কোথায়? আমাদের নিয়ে যাবেনা কলেজে? (অগ্নিভ)
~ আচ্ছা অগ্নিভ তোমাকে আমি কতবার বলেছি পাঞ্জাবির উপরের বোতাম না লাগাতে। শুনো আমার কথা তুমি? (অগ্নিভর পাঞ্জাবির বোতাম খুলে দিতে দিতে মিম) তোমরা ওয়েট কর, আরধ্যা আসছে।
~ মিম এই পাজিগুলো সেই সকালে উঠেছে আজকে। অন্যান্যদিন টেনে তুলতে পারিনা আর আজ আগেই উঠে গেছে। (শিশির)

মিমের বাপি, মিমের শ্বশুর শ্বাশুড়ি সবাই বেঁচে আছে কিন্তু বয়সের ভারে আগের মতো আর এঞ্জয় করতে পারেনা। শিশির আর মিমের কথার মাঝে অর্নীল বাসায় ঢুকলো। সেই সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। মিম আজও পর্যন্ত পারলো না অর্নীলকে অন্য রঙের শার্ট পরাতে।

~ লেট করে ফেলেছি না? (মিমের দিকে তাঁকিয়ে অর্নীল)
~ জ্বি চৌধুরী। আপনার জন্য আমি রেডি হতে পারিনি এখনো। আপনি চেঞ্জ করবেন নিশ্চই?
~ হ্যা চলো। অগ্নিভ অদিতি তোমরাও যাবে? (অর্নীল)
~ ইয়েস বাবাই।
~ আরাধ্যা কই? (অর্নীল)

~ ওর ঘরে আছে। তুমি যাও তারাতারি রেডি হও। (অর্নীলকে ঠেলে রুমে পাঠালো মিম)
অর্নীল শার্ট পরছে এই সময় মিম ঘরে ঢুকলো। সেই আগের মতই অর্নীল মিমের শাড়ির কুচি ধরে দিচ্ছে, মিমের গলায় লকেট পরিয়ে দিচ্ছে। রেডি হওয়ার পর সবাই বের হলো। আরাধ্যা ভাই বোনদের নিয়ে পেছনে বসে আর মিম অর্নীলের সাথে সামনে বসে আর অর্নীল ড্রাইভ করছে।

গাড়ির আয়নায় অর্নীল কিছু একটা দেখে চুপ করে রইলো। এই কথা মিমকে পরে বলবে। আরাধ্যার কলেজে ঢুকে গার্ডিয়ান সাইডে অর্নীল, মিম আর অদিতি অগ্নিভ বসলো আর স্টুডেন্ট সাইডে আরাধ্যা বসলো। আড়াই ঘন্টা পর আরাধ্যার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শেষ হলো। অর্নীল তখন অগ্নিভকে বলছিলো,
~ অগ্নি তোমাকেও বেস্ট একটা কলেজে চান্স পেতে হবে আপুর মত।
~ জানি বাবাই।

~ তুমি ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা ছাড়া ছেলেমেয়ের মাথায় আর কিছু ঢোকাতে দিয়েছো? (মিম)
~ তো কি করব? আমার মত বিজনেসম্যান বানাবো নাকি আমার ছেলে মেয়েদের? ওরা এর চেয়েও বেশি সাক্সেসফুল হবে। (অর্নীল)
আরাধ্যার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শেষে সবাই বাড়িতে ফিরে এলো। সন্ধ্যায় সবাই একসাথে গল্প করতে বসলো। আরাধ্যা কফি খেতে খেতে অর্নীলকে বলে,
~ বাবাই একটা কথা কিন্তু আমি এখনো জানিনা।

~ কি? (অর্নীল)
~ তোমার আর মামনির লাভ মেরেজ নাকি এরেঞ্জ? (আরাধ্যা)
আরাধ্যার কথা শুনে সবাই হেসে দেয়। মিমের বাপি বলে,
~ হাফ লাভ আর হাফ এরেঞ্জ।
~ কিভাবে নানাভাই? (অবাক হয়ে আরাধ্যা)

~ বাবা এইসব কি বলেন? (অর্নীল)
~ অর্নীল বলতে দাও। তোমার মামনি তোমার বাবাইকে ভালবেসেছে কিন্তু তোমার বাবাই তোমার মামনিকে নিজের অযোগ্য মনে করেছে। এক প্রকার জোর করেই তোমার বাবাই তোমার মামনিকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। এরপর আর কি বিয়ের পর সব ঠিকঠাক! (হাসতে হাসতে মিমের বাপি)

~ মানে কি বাবাই? আমার মামনি তোমার অযোগ্য ছিল? ইটস আনফেয়ার বাবাই। আমার মামনির মতো সুন্দরী, স্মার্ট, মডার্ণ আর কেউ আছে? সব পারে আমার মামনি। তুমি কি করে আমার মামনিকে অযোগ্য বললে? (আরাধ্যা)
~ আরাধ্যা তুই আমায় একটা কথা বল তো। (অর্নীল)
~ কি বলো?

~ তুই এইসব কেন জিজ্ঞেস করছিস? এইযে আরাধ্যা চৌধুরী, তুমি কিন্তু অর্নীল চৌধুরীর মেয়ে। তোমার পাশে যদি একটা ছেলেকে আমি ঘুরঘুর করতে দেখি সেইদিন ঠ্যাঙ খোড়া করে বাসায় বসিয়ে রাখব। বাবা সব করতে পারবে কিন্তু মেয়ে পারবেনা। আর অগ্নিভ বি কেয়ারফুল। মেয়ে ফ্রেন্ডস দের সাথে কথাও বলা যাবেনা কিন্তু। (দুই ভাই বোনকে ধমকে অর্নীল)
~ জ্বি বাবাই। (চশমা উপরে তুলে অগ্নিভ)
~ এইটা কি হলো অর্নীল? তোর জন্য সব ফেয়ার আর ছেলেমেয়েদের কেয়ারফুল থাকতে বলছিস? (অর্নীলের আম্মু)

~ হ্যা আম্মু। ওরা যথেষ্ট বড় হয়েছে। বোঝা উচিৎ ওদের। এখন না বুঝালে বুঝবে কবে? (অর্নীল)
~ কিন্তু বাবাই আমি যে অলরেডি এক ছেলের প্রেমে পরে গেছি। (ঢোক গিলে আরাধ্যা)
~ হোয়াট? (অর্নীলসহ সবাই আরাধ্যার দিকে চোখ বড় বড় করে তাঁকিয়ে আছে) কে সে?
~ অর্নীল চৌধুরী। আমার বাবাই।

আরাধ্যা অর্নীল চৌধুরী বলেই অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে। মিম বসে বসে দেখছে আর হাসছে। এত বড় মেয়ে এখনো বাবাকে জড়িয়ে ধরে! শিশির আর আরুশ ও হাসছে। এর মধ্যে অগ্নিভ আর অদিতি ও অর্নীলের সামনে আসে।

~ আমি জানি বাবাই তুমি বরাবরই আপুর প্রতি দুর্বল। তবুও আমরা আপুর মতই তোমাকে ভালবাসি বাবাই। আমরাও তো তোমার প্রেমে পরে গেছি। (অগ্নিভ)
অর্নীল অদিতি আর অগ্নিভকেও জড়িয়ে ধরে। মিম তখনো বসে মুচকি মুচকি হাসছে।
~ ভাই আমি জানি একজনের প্রচন্ড হিংসে হচ্ছে আমাদের এইভাবে দেখে। (মিমের দিকে তাঁকিয়ে আরাধ্যা)
~ কে আপু? (অগ্নিভ)

~ ওইযে যিনি বসে বসে হাসছেন। আমাদের মামনি। এইযে মামনি আমরা শুধু বাবাইকে না, তোমাকেও ভীষণ ভালবাসি। ইউ দা ওয়ার্ল্ড বেস্ট মাদার।

সবার ভালবাসার পর্ব শেষ হয়ে গেলে ডিনার করে ঘুমাতে যায় সবাই। আরাধ্যা আর অদিতি এক ঘরে থাকে আর অগ্নিভ আলাদা ঘরে থাকে। অর্নীল রাত বারোটায় ছেলে মেয়েদের ঘরে যায় নিজের ঘরে ঢোকার আগে। এইটা অর্নীলের দশ বছরের অভ্যাস যবে থেকে আরাধ্যা আলাদা ঘুমায়। আরাধ্যা চুল বাধছিলো তখন অর্নীল ঘরে ঢুকে।
~ এখনো ঘুমাওনি তুমি?

~ এইত শুবো বাবাই। তুমি যাও নি এখনো ঘরে?
~ এইত যাব। অদিতি ঘুমিয়ে গেছে?

~ হ্যা মামনি ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
~ তুমিও এখনি ঘুমাও। একদম ল্যাপটপ ধরবানা এখন। বারোটা বাজে। তুমি দুইদিন রাত জেগেছো স্কিনের অবস্থা কি হয়েছে দেখেছো? ঘুমাও।

~ এখনি ঘুমাবো৷ চিন্তা করনা তুমি। গুড নাইট বাবাই। (অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে আরাধ্যা)
~ গুড নাইট মা। (আরাধ্যার মাথায় চুমু দিয়ে অর্নীল)
এরপর অর্নীল পাশের ঘরে গেলো যেই ঘরে অগ্নিভ ঘুমায়। অর্নীল ঘরে ঢুকে দেখে অগ্নিভ ম্যাথ করছে কিন্তু চিন্তিত।

~ অগ্নি তুমি এখনো না ঘুমিয়ে পড়ছো? মাথা ব্যাথা কি শুধু শুধু হয়? (অর্নীল)
~ না বাবাই ঘুমাবো। কিন্তু দেখো এই ম্যাথ তো মিলছেই না। (টি শার্ট টান দিয়ে চেয়ার থেকে দাঁড়ায় অগ্নিভ)
~ ওয়েট, পেন দাও।

অর্নীল অগ্নিভর ম্যাথ করে অগ্নিভকে বুঝিয়ে দেয়। এরপর অগ্নিভ অর্নীলকে গুড নাইট বলে ঘুমাতে যায়। অর্নীল দরজা চাপিয়ে নিজের ঘরে যায়।

~ মিম আমার শুগারের ওষুধটা দাও তো। (দরজা লাগাতে লাগাতে অর্নীল)
~ এতক্ষণে মিম? এত সময় নিশ্চই ছেলেমেয়ের সাথে আড্ডা দিয়েছো।
~ আরেনা। অগ্নিভ ম্যাথ পারছিলো না। সেইটাই বোঝাচ্ছিলাম।
~ এই নাও ওষুধ।

~ থ্যাংক ইউ। আজকে একটা জিনিস খেয়াল করলাম আমি আরাধ্যার কলেজে যাওয়ার সময়। (মিমের চুলের খোপা খুলে অর্নীল)
~ কি?

~ তোমার চুল পেঁকে গেছে দুই একটা। (এই বলে অর্নীল হাসা শুরু করলো)
~ সে তো আমি জানিই। বয়স হচ্ছে চুল পাকবেনা? (মুখ বাঁকিয়ে অর্নীল)
~ কিন্তু আমার চুল তো পাকেনি। আমি তো আগের মতই আছি। (আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অর্নীল)
~ তোমার মতো এত রুপচর্চা করিনা আমি। সুন্দরী ক্লায়েন্টদের সাথেও চলিনা যে রুপচর্চা করা লাগবে। (নাইটির ফিতা বাঁধতে বাঁধতে মিম)

~ ধ্যাৎ আমি তো আগে থেকেই সুন্দর। রুপচর্চা কেন করতে যাব। (মিমের হাত ধরে টান দিয়ে অর্নীল)
~ এহ সুন্দরের বস্তা! সপ্তাহে দুইবার চুলে কিসব লাগায় আসো। দেখিনা আমি? (ঝাড়ি দিয়ে মিম)
~ ও তুমি বুঝে যাও তাইনা? আচ্ছা মিম শুনো আমি আর তুমি যখন একদম বুড়ো~ বুড়ি হয়ে যাব তখন কিন্তু রাস্তায় হাঁটতে যাব। সেই আগের মতো ট্যুরে যাব।

~ কি বলে এসব? বুড়ি হওয়ার পর ট্যুরে যাবা? (মিম হাসছে)
~ হ্যা। তখন তুমি আমার হাত ধরে হাটবা, তোমার চুল সব সাদা হয়ে যাবে আর আমি তখন তোমায় বলব ইউ লুক সো বিউটিফুল ইন হোয়াইট। (মিমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অর্নীল)
~ তোমায় একটা দায়িত্ব দিতে চাই চৌধুরী। প্লিজ কথাটা সিরিয়াসলি নিও।
~ বলো৷

~ আমার কোম্পানি তুমি দেখো। আমি আর পারছিনা। এখন তো সারাদিন অফিসে থাকতে হয়। বাচ্চাদের সময় দিতে পারিনা একদমই।

~ এইটা সম্ভব না মিম। যদিও আমরা স্বামী স্ত্রী কিন্তু কোম্পানির বিষয়টা আলাদা। তুমি তিন ছেলে মেয়ের নামে কোম্পানি করে দাও। আমি সর্বোচ্চ এডভাইসর হতে পারি এর বেশি কিছু নয়।
~ আজব। কেনো পারবানা তুমি?

~ ঠিক কতটা প্রেসার পরবে আমার উপর সেই ধারণা আছে? এখন তো রাতে বাসায় ফিরি বলে তোমার আর বাচ্চাদের কত অভিযোগ! তখন তো ফিরতেই পারবনা। দুইটা কোম্পানিই র‍্যাংকিং এ। কেম্নে দেখব আমি একসাথে দুইটা কোম্পানি?

~ ঠিক আছে যাও। কথা বল না আমার সাথে। আমার সমস্যা তো তোমার কাছে সমস্যাই নয়। (মিম খাটের উপর মন খারাপ করে বসে রইল)

অর্নীল কিছুক্ষণ ভেবে মিমের পাশে গিয়ে বসে। মিমের হাত ধরে বলে,
~ যাও আমি দায়িত্ব নিলাম তোমার কোম্পানির। তুমি চেয়ারম্যান দুই কোম্পানিরই। ৬০% শেয়ার হোলডার তুমি আর ৪০% আমি। তুমি যেভাবে চালাবা কোম্পানি সেভাবেই চলবে। ঘরে বসে লিড করতে পারবা তো? (অর্নীল)
~ হ্যা। থ্যাংক ইউ। (অর্নীলকে জড়িয়ে ধরে মিম)
~ অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুমাবানা?
~ চৌধুরী?

~ বলো
~ অনেকদিন হলো ছাদে যাইনা আর তুমিও গিটার হাতে নাও না। চলো না আজকে ছাদে যাই। ওই দোলনাটায় বসে দুজন কথা বলি।

~ তুমি যখন বলছো তখন তো অবশ্যই যাব। চলো।
~ না থাক। তোমার ইচ্ছে না থাকলে দরকার নাই। (অর্নীলের হাত ধরে মিম)
~ ওরে রে! আমি তো তোমার বলার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। লেটস গো৷ (মিমকে কোলে নিয়ে অর্নীল)
ছাদে গিয়ে মিমকে দোলনায় বসায় অর্নীল। এরপর নিজে মিমের কোলের উপর শুয়ে পরে। বিশাল চাঁদ অর্নীলের মুখে আলো দিচ্ছে।

~ মিম এই চাঁদটা এত বড় কেন? (অর্নীল)
~ চাঁদকেই জিজ্ঞেস কর।
~ ওইদিনের কথা মনে আছে যেইদিন তুমি আমার জন্য গাইছিলে অলিরো কথা শুনে বকুল হাসে, কই তাহার মতো তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো!

~ হ্যা। আরো উনিশ বছর আগে সেইটা।
~ আজকে একবার গাইবা? তুমি অনেক ভাল গাও।
~ গাইলে আমি কি পাব শুনি?
~ যা প্রতিদিন রাতে পাও।

অর্নীলের কথা শুনে মিম অর্নীলকে মারতে শুরু করে। অর্নীল পরে মিমের হাত ধরে বলে,
~ মারছো কেনো?

~ তুমি অসভ্য কেনো আগে সেইটা বলো?
~ বউয়ের সাথে অসভ্য হবনা তো কার সাথে হব? এখন অসভ্য হওয়ার জন্যেও আরেকটা বিয়ে করা লাগবে তাইনা?

~ তুই আবার বিয়ে করবি তাইনা? তুই আবার বিয়ের কথা বললি? তোকে আজ আমি মেরেই ফেলব চৌধুরী।
মিমের থ্রেটে অর্নীল সর্বনাশ বলে উঠে যায়। মিম পুরো ছাদ দৌড়ায় একটা লাঠি হাতে নিয়ে। অর্নীল ও মিমকে বারবার পাজেল করার চেষ্টা করছে। ছাদে দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ পেয়ে শিশির, আরুশ, আরাধ্যা আর অগ্নিভ দৌড়ে আসে। এসে দেখে এই অবস্থা! সবাই উচ্চস্বরে হাসছে আর মিম অর্নীলকে ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত…

অর্নীলকে মিম ধরে পেটাক। এই ফাঁকে আমি কিছু বলি। সম্পর্কে দুজনই আনাড়ি হলে সেই সম্পর্ক টেকসই হয়না। একজনকে অবশ্যই ডেস্পারেট আর বুঝদার হতে হয় তবেই সম্পর্ক টিকতে বাধ্য। বোঝাপড়া আর ভালবাসার প্রতি সম্মান না থাকলে সেই ভালবাসার মূল্য নেই। স্যাক্রিফাইস দুজনেই করবে তবে একজন একটু বেশি। তবেই স্মুথলি রান করবে সম্পর্ক। শেষ করছি। কেমন লাগলো তা গঠনমূলক মন্তব্যে জানাবেন। ধন্যবাদ

লেখা – নীলিমা জেবিন তনয়া

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালো লাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “ডেস্পারেট লাভ – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – ডেস্পারেট লাভ (১ম খণ্ড) – রোমান্টিক বাংলা প্রেমিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!