রিলেশনশিপ

তোমার নিসা (শেষ খণ্ড) – পাগল প্রেমের পাগলামি গল্প

তোমার নিসা (শেষ খণ্ড) – পাগল প্রেমের পাগলামি গল্প: রাত ১০ টা। খাওয়া দাওয়া শেষে সবকিছু গুছিয়ে বিছানার একপাশে নিসা কাত হয়ে শুতেই প্রণয় পাশ ফিরে তাকালো। নিসাকে চুপচাপ উল্টো ঘুরে শুয়ে থাকতে দেখে প্রণয় পেছন থেকে নিসাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে চুমু খেয়ে বলল, “রাগ করেছ?”


পর্ব ২০

সন্ধ্যা ৭:১৫ বাজে। প্রণয় ঘরে ঢুকে গলায় ঝুলানো টাইয়ের বাঁধ খুলতেই নিসা একপ্রকার হুমড়ি খেয়ে রান্না ঘর ছেড়ে রুমে এসে প্রণয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইন্টারভিউ কেমন হলো? জব কি হবে? তারা কি বলল তোমাকে?”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আগে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিবে?”

প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে নিসা প্রায় ভ্রু কুচকে ফেলল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল নামিয়ে নরমাল পানির সাথে মিশিয়ে রুমে এসে প্রণয়ের সামনে ধরতেই প্রণয় এক নিমিষে পুরো ভরা গ্লাসটা ফাঁকা করে দিল।
“এখন তো বলো জবের কি হয়েছে।”

প্রণয় নিসার সামনে ফাঁকা গ্লাসটা ধরে বলল,
“ওয়েটিং ওয়েটিংয়ে থাকতে বলেছে। সময় ও প্রয়োজন হলে তারা নিজেরাই ডেকে নিবে। আর প্রয়োজন না হলে”
“ডাকবে না তাই তো? জানতাম, আমি জানতাম এরকমটাই হবে। গত ২৫/২৬ দিন যাবৎ তো এই একই ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সবাই বলছে প্রয়োজন হলে ডাকবে কিন্তু প্রয়োজন কারো হচ্ছে না।”

“সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এতো টেনশন করো না।”
“কি ঠিক হবে? এই পর্যন্ত কি কিছু ঠিক হয়েছে যে আগামীতে ঠিক হওয়ার আশ্বাস দিচ্ছ। এইরকম টানাপোড়েনের সংসার আমার আর ভালো লাগছে না। অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছি আমি।”

প্রতিদিন নিসার এ যাবতীয় কথা শুনে চুপ থাকলেও আজ আর প্রণয় পারল না চুপ থাকতে। বলল,
“অনার্স পাশ করে সার্টিফিকেট হাতে পেলাম কেবল ২৭ দিন হলো। পুরোপুরি ১ মাসও হয়নি। এই ২৭ দিনের মাঝে কেবল ১ দিন ঘরে বসেছিলাম বাকি ২৬ টা দিন ২৬ জায়গায় ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য দৌড়ে গিয়েছি। যে যেখানে বলছে যেরকম কাজ বলছে সেখানেই ছুটে গিয়েছি। মাস্টার্সের ভর্তি হবার খবরটা পর্যন্ত নেইনি। কিন্তু কার জন্য? এই এতো কিছু কার জন্য করেছি?

পড়ালেখা বাদ দিয়ে জবের জন্য এই বয়সে আমার কি সত্যিই এতো দৌড়ঝাপের প্রয়োজন ছিল? তারপরও দৌড়ঝাপ করছি কেন, কার জন্য? শুধু তোমার শুধু তোমার জন্য এই এতকিছু করছি। তারপরও তুমি এইসব কথাগুলো কীভাবে বলতে পারো নিসা?”
“দৌড়ঝাপ করেছ মানলাম কিন্তু তাতে কি বিশেষ কোনো লাভ হয়েছে? একটা জবও কি জুটেছে কপালে? উল্টো দেখবে টিউশনি গুলিও হারাবে।”
“তো কি করব আমি? জব যদি না হয় এতে আমার কি করার আছে?”

“তোমাকে সেই কবে থেকে বলছি চলো, আব্বু আম্মুর কাছে ক্ষমা চেয়ে আমাদের বাড়িতে চলে যাই। অন্তত বাড়িভাড়া থেকে তো মুক্তি পাওয়া যেত তাই না? আর প্রতিদিন এভাবে আলু সেদ্ধ আর ডাল দিয়েও খেতে হত না। আমাদের দু’জনের খাবার আমাদের ঘরে এমনিতেই বার্তি পড়ে থাকে।”

“তোমাকে এই কথাটা আগেও বলেছি আজ আবারও বলছি। তোমাদের বাড়ি যাওয়া নিয়ে যেন আর একটি কথাও এই ঘরে না উঠে। আর তোমার যদি একান্তই এই আলু সেদ্ধ আর ডাল দিয়ে খেতে ইচ্ছে না করে তাহলে তুমি চলে যেতে পারো। কিন্তু এই আলু সেদ্ধ আর ডাল ছাড়া এই মুহূর্তে আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারব না।”
নিসা আর একটি কথাও বলল না। কিছুক্ষণ প্রণয়ের দিকে এক চোখে তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।

রাত ১০ টা। খাওয়া দাওয়া শেষে সবকিছু গুছিয়ে বিছানার একপাশে নিসা কাত হয়ে শুতেই প্রণয় পাশ ফিরে তাকালো। নিসাকে চুপচাপ উল্টো ঘুরে শুয়ে থাকতে দেখে প্রণয় পেছন থেকে নিসাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে চুমু খেয়ে বলল,
“রাগ করেছ?”

চুপ করে শুয়ে আছে নিসা। একটি কথাও বলছে না। তাই প্রণয় নিজেই আবার বলল,
“কি গো! রাগ করে আছ আমার উপর? প্লিজ রাগ করে থেকো না, তুমি ছাড়া আমার কে আছে বলো। তুমি এভাবে রাগ করে থাকলে আমার ভালো লাগে?”
এ পর্যায়ে নিসা প্রণয়ের দিকে ঘুরে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে হুট করে প্রণয়ের বুকে মাথা গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি কি করে বলতে পারলে আমাকে চলে যেতে? তুমি জানো আমার কতটা কষ্ট হয়েছিল। কষ্টের ভারে মনে হচ্ছিল আমার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে।”

নিসাকে বুকে জড়িয়ে প্রণয় বলল,
“এরকম কিন্তু আমারও লেগেছিল নিসা।”
নিসা মাথা তুলে প্রণয়ের দিকে তাকাতেই প্রণয় আবার বলল,
“যেই স্বপ্নের সংসারের জন্য তুমি সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছিল সেই সংসার আজ তোমার কাছে অতিষ্ট লাগে। কথাটা আমার কাছে কতটা কষ্টের ছিল জানো?”

“আমি কি ওই কথাগুলো মন থেকে বলেছি? আমি তো ওই কথাগুলো রাগের মাথায় বলেছি।”
“মানুষ কিন্তু রাগের মাথায় মনের কথাগুলো মুখ ফসকে বলে ফেলে নিসা।”
“কি বলতে চাচ্ছ তুমি?”

প্রণয় মুচকি হেসে বলল,
“কিছু না।”
বলেই নিসাকে বুকে জড়িয়ে চুপটি করে ধুম মেরে শুয়ে রইলো প্রণয়। মিনিট দশেক পর বলল,
“নিসা!”
“প্রণয়ের বুকেই মুখ গুঁজে খুব আস্তে করে নিসা বলল,
“হু।”
“এই আলু সেদ্ধ আর ডাল দিয়ে খেতে বুঝি অনেক কষ্ট হয় তোমার?”

নিসা চুপ করে রইলো। তাই প্রণয় বলল,
“কি গো কথা বলছ না যে? অবশ্য তুমি না বললেও আমি জানি, এসব খাবার খেতে তোমার অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু কি করব বলো এই সামান্য ক’টা টিউশনির টাকা দিয়ে যে এরচেয়ে বেশি কিছু যোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”

“আমি জানি তোমার পক্ষে সম্ভব হলে তুমি কখনোই আমাকে এগুলো খেতে দিতে না। আবার এটাও সত্য যে এগুলো খেতে আমার কখনোই ভালো লাগে না। আর সেজন্যই আমি ওই কথাগুলো বলে ফেলেছিলাম। তুমি রাগ করো না প্লিজ। আমি আর কখনো ওসব কথা বলব না, তুমি যদি লবণ ভাত দাও তারপরও কিছু বলব না। তুমি শুধু রাগ করো না প্লিজ।”
“হুম; তোমাকে একটা কথা বলার ছিল নিসা।”
“হুম বলো।”

কিছুটা সময় থেমে প্রণয় বলল,
“মাস দুয়েক পর তোমাকে নতুন করে দশম শ্রেণিতে ভর্তি করতে হবে আবার আমার মাস্টার্সের ভর্তিও রয়েছে। সাথে সংসার খরচ তো আছেই। জব যেহেতু হচ্ছেই না এই টিউশনির সামান্য টাকা দিয়ে দু’জনের পড়ালেখা ও সংসার চালানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। তাইতাই আমি টিউশনি গুলো ছেড়ে দিয়েছি।”

নিসা এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ল। বলল,
“মানে! কি বলছ কি তুমি? টিউশনি ছেড়ে দিয়েছ মানে কি? তুমি ভাবতে পারছ তুমি ঠিক কি বলছ?”

প্রণয় নিজেও শোয়া থেকে উঠে দু পা ভাজ করে আসন পেতে বসে বলল,
“আমি গার্মেন্টস সেকশনে যোগ দিয়েছি।”
“এক মিনিট এক মিনিট, কি বললে? তুমি গার্মেন্টসে ঢুকেছ? গার্মেন্টসে জব করবে তুমি?”


পর্ব ২১

“এছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই আমার কাছে নিসা। দুজনের পড়ালেখার খরচ, সংসারের খরচ সবমিলিয়ে আমি পারব না ওই টিউশনির টাকা দিয়ে চালাতে। তাই বাধ্য হয়েই গার্মেন্টসে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পদ নিচু হোক অন্তত স্বাচ্ছন্দ্যে তো চলতে পারব। আর তোমাকে আলু সেদ্ধও আর খেতে হবে না। খুব ভালো ভাবেই চলতে পারব আশা করি।”

“তাই বলে গার্মেন্টসে? না না, তুমি গার্মেন্টসে জব করবে না।”
“এভাবে জেদ করো না প্লিজ। আমার সমস্যা গুলো তো তোমাকেই বুঝতে হবে তাই না? বিশ্বাস করো আমার জন্য ভীষণ কষ্ট হয়ে যাচ্ছে সংসার চালানো।”

ক্ষানিকটা সময় চুপ থেকে নিসা বলল,
“তুমি তো গিয়েছিলে ইন্টারভিউ দিতে। তাহলে গার্মেন্টসে জয়েনের কথা পাকা করে এলে কীভাবে? আর টিউশনিই বা কীভাবে না করে দিলে?”
“টিউশনি তো ফোনে না করে দিয়েছি। তারা প্রথমে অমত করলেও বুঝিয়ে বলাতে মেনে নিয়েছে। আর টাকা বলেছে দিন দশেক পরে গিয়ে নিয়ে আসতে।”
“আর জয়েনের ব্যপারটা?”

“আজ ইন্টারভিউ দিয়ে আসার সময়ই এক পরিচিত আঙ্কেলের সাথে দেখা হলো। উনি গার্মেন্টস সেকশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে এই মুহূর্তে আছেন। কথায় কথায় উনাকে আমার সমস্যা গুলোর কথা ভেঙে বলতেই উনি বললেন উনাদের অফিসে জয়েন করতে। প্রথম দিকে নিম্ন পদে ঢুকলেও মাস্টার্সের সার্টিফিকেট অর্জন করলে পরবর্তীতে উনিই সুপারিশ করে উপরের পদে পদন্নোতি করিয়ে দিতে সক্ষম হবেন। আর আমি যেহেতু উনার পরিচিত তাই এখন চাইলেই অফিসে ঢুকতে পারব। কোনো অফিসিয়াল কাগজপত্রের প্রয়োজন হবে না।”

নিসা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“কত হতে পারে বেতন?”
“আঙ্কেল তো বলল উনি আমাকে সুপারভাইজারে ঢুকাবে। আর সুপারভাইজারের বেতন না হলেও তো ১৫০০০ হবে। এর থেকে কম তো হওয়ার কথাই না। আর সাথে যদি ওভার টাইম করি মাস শেষে ২০০০০ তোলা কোনো ব্যাপারই না।”

“হুম, কিন্তু গার্মেন্টস সেকশন আমার একদম ভালো লাগে না। এই সেকশনে মানুষদের মানুষ বলে গণ্য করে না, প্রচুর পরিমাণে খাটায়। তোমার অনেক কষ্ট হয়ে যাবে এই কাজ করতে।”

“কষ্ট করেও যদি সংসারটা স্বচ্ছলভাবে চালাতে পারি, দু’জনের পড়ালেখা চালাতে পারি আর বাবা-মায়ের দিকেও লক্ষ্য রাখতে পারি সেই কষ্ট করা আমার জন্য ব্যাপার না। বাবা-মা কত কষ্ট করে বড় করেছ কিন্তু এখন দেখো নিজের সংসারের টানাপোড়েন তাদের কথা ভুলেও ভাবতে পারি না। তাহলে আমি আমার বড় ভাইয়ের থেকে কতটুকু ভালো হলাম বলো। আমার তো দায়িত্ব তাদের দেখা তাই না?”

“হুম।”
“আরআর আমি যে সবসময় গার্মেন্টসেই জব করব তাও তো না, গার্মেন্টসের পাশাপাশি তো আমি অন্য জবে ট্রাই করবই। ভালো কোথাও চান্স পেলে সেখানে চলে যাবো। আর সামির ভাইয়াকেও জবের ব্যাপারে বলে রেখেছি। তাদের তো অনেক জানা শোনা আছে আশা করি দ্রুতই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
“হুম ইনশাআল্লাহ। আচ্ছা তাহলে অফিস জয়েন করছ কবে থেকে?”

“পরশু, পরশু থেকে জয়েন করব। কারণ কাল তোমাকে নিয়ে বের হতে হবে স্কুলে ভর্তির জন্য। তাই কাল জয়েন করব না, পরশু থেকে একেবারে জয়েন করব ইনশাআল্লাহ।”

“আর তোমার ভর্তির খবর নিবে না? নিলয় আর মুহিত ভাইয়া তো সেদিন বলল ভর্তি ফরম তারা কিছুদিনের মধ্যেই তুলতে যাবে।”
“হুম, ওদেরটা তুললে আমার টাও তুলবে ওটা নিয়ে ভাবো না।
“ওহ্, আচ্ছা তোমার অফিস কি এখানে কাছাকাছি নাকি দূরে কোথাও?”
“না, দূরে না। এখানেই মেইন রাস্তার সাথেই। হেঁটে যেতে কেবল ৬/৭ মিনিট লাগবে।”

“তাহলে তো ভালোই হলো। আমি এক ফোন করতেই তুমি দৌড়ে চলে আসবে।”
“হা হাহ্যাঁ। আচ্ছা এবার ঘুমোও অনেক রাত হয়েছে। সকালে তো আবার দ্রুত উঠে স্কুলের জন্য বের হতে হবে তাই না?”
“হুম, সে তো বের হতেই হবে কিন্তুআমি তো এত দ্রুত ঘুমবো না।”

“কেন, আবার কি সমস্যা?”
“সমস্যা কি হবে! কোনো সমস্যা নেই তো।”
“তাহলে; তাহলে ঘুমোবে না কেন?”

নিসা চোখ পাকিয়ে বলল,
“তুমি যেন কিছুই বুঝো না, কচি খোকা তুমি। ঘুটঘুটে আঁধার হয়েছে কেন ঘুমবো না বুঝো না?”
“উহু মুখে না বললে আমি কিছুই বুঝি না।”

বলেই দুষ্টু হাসি দিল প্রণয়। যা দেখে নিসা রেগে ভ্রু কুচকে বলল,
“মুখে না বললে বুঝো না তাই না? দাঁড়াও তোমাকে মুখে না বলে সোজা প্র‍্যাক্টিকাল করে বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
বলেই প্রণয়ের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে সজোরে প্রণয়ের নিচের ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল নিসা। প্রণয় ব্যাথায় আহ করতেই নিসা ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“এবার বুঝেছ কেন ঘুমবো না?”

প্রণয় নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে ধরে বলল,
“এত জোরে কামড় দেয় কেউ? আমার তো মনে হয়েছিল কেটেই গিয়েছে ঠোঁটটা।”
“কেটে যাওয়ার জন্যই তো দিয়েছিলাম কিন্তু ভাগ্য ভালো তোমার কাটেনি। কেটে গেলে বেশি খুশি হতাম।”
“কি! কেটে যাওয়ার জন্য এভাবে দিয়েছ? আমি তো ভেবেছিলাম বাই চান্স জোরে লেগে গিয়েছে।”

“উহু ইচ্ছে করেই দিয়েছি।”
“তাই!”
“হুম।”
“বেশ, তোমার ইচ্ছে তো কাজে দেয়নি কিন্তু এবার আমার ইচ্ছে দেখবে তুমি। আর আমার ইচ্ছে কিন্তু তোমার ইচ্ছের মত ফ্লপ যাবে না। একেবারেই ব্লকবাস্টার যাবে।”
“মানে!”

“মানে তুমি তো কেবল আমার ঠোঁট কামড়ে কেটে দিতে এসেছিলে। যেটা পারোনি ব্যর্থ হয়েছ। কিন্তু আমি, আমি এখন তোমার সারা শরীরের অপারেশনে নামব। এমন এমন জায়গায় কেটে দাগ বসাবো মানুষ কেন, তুমি নিজেও দেখতে পারবে না। এমনকি ওষুধ লাগিয়ে দিতেও আমাকেই লাগবে।”
“না, তুমি এরকম কিছু করবে না।”

বলেই নিসা পিছিয়ে যেতে নিলেই প্রণয় নিসাকে টেনে বুকে মিশিয়ে আস্তে করে কানের কাছে বলল,
“আমি এরকমটাই করব জানু।”
বলেই দুষ্টু হাসি দিয়ে নিসার ঠোঁটে ঠোঁট ডোবালো প্রণয়।

দেখতে কেটে গেল ৪ বছর। এই ৪ বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। নিসা এখন আর সেই দশম শ্রেণী পড়ুয়া ছোট্ট নিসা নেই। নিসা এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। আর প্রণয় সে-তো এখন পূর্ণ নওজোয়ান। যেকোনো মেয়েই প্রণয়কে এক দেখাতেই ফ্লাট হয়ে যায়। তারউপর মাস্টার্স সার্টিফিকেট শো করে গত ৩ মাস আগে ওই অফিসেই পদোন্নতি পেয়ে হয়েছে সে জিএম। ভাবই এখন তার অন্যরকম। নিসার তো আজকাল নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে লজ্জা করে প্রণয় তার বর ভেবে।

সেই সাথে হিংসেও করে অন্যান্য মেয়েদের সাথে কেন তার বরের দিকে এভাবে চোখ পাকিয়ে তাকায় সেই ভেবে। তবে দিনকে দিন তার হিংসে করার মাত্রাটাও যেন কমে আসছে। শরীর ভালো না থাকলে যে কিছুই ভালো লাগে না। নিসা আজ পূর্ণ ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট। সারা শরীর ফুলে একাকার অবস্থা। গাল দুটো ফুলে যেন চারটি হয়ে গিয়েছে। আর হাত সেটাও ডাবল হয়ে গিয়েছে। সাথে উঁচু পেট তো রয়েছেই। এই ভারী শরীর নিয়ে নিসার আজকাল কিছুই করতে ইচ্ছে করে না।

অবশ্য প্রণয় কিছু করতে দেয়ও না। যতক্ষণ সে ঘরে থাকে টুকটুক করে নিসার সবকাজই সে করে নিজে ফেলে। এমনকি অফিস যাওয়ার আগেও রান্নার কাজ বাদে বাকী সব ভারী কাজ সে করে দিয়ে যায়। বারংবার চাওয়া সত্ত্বেও নিসার অমতের কাছে হার মেনে বুয়া রাখতে পারেনি প্রণয়। তাই নিজেই সবকিছু করে। যেমনটা আজও করছে। শুক্রবারের ছুটির দিন হওয়ায় ঘরের সব আধোয়া কাপড় ভিজিয়েছে ধোঁয়ার জন্যে। দু বালতি কাপড় ভিজিয়ে হাত মুছতে মুছতে রুমে এসে নিসার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,


পর্ব ২২

তো মিসেস প্রণয় নতুন বাসায় কেমন লাগছে শুনি?”
“নতুন ফ্ল্যাটে এসেছি ৫ দিন হলো। এতদিন জিজ্ঞেস না করে ৫ দিন পর এসে জিজ্ঞেস করছ নতুন ফ্ল্যাট কেমন লাগল!”
“বাসায় থাকলে তো জিজ্ঞেস করতাম। অফিসের কাজে তো সারাদিনই ঘরের বাইরে থাকি আর রাতে এসে নাক টেনে ঘুমোই তাহলে জিজ্ঞস করব কখন বলো। নতুন বাসায় আসার পর তো আজই প্রথম ছুটি পেলাম তাই না?”
“হুম তা ঠিক।”

“তো বললে না কেমন লাগল নতুন বাসাটা?”বলেই নিসার পাশে বসল প্রণয়।
“সত্যি বলতে একদম স্বপ্নের মত। বিশ্বাস করো আমি কখনো ভাবতেও পারিনি এত সুন্দর একটি সংসার আমার হবে।”
“কেন? কেন ভাবতে পারোনি?”

“বারেবিয়ের প্রথম দিকে আমাদের কি অবস্থা হয়েছিল ভুলে গিয়েছ? আমিতো পুরো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম।”
“আদৌ আমার সংসার করতে পারবে না-কি সেই বাবার বাড়ি গিয়েই উঠতে হবে এসবকিছু ভেবে তাই তো?”
“কিছুটা সেরকমই।”

“সংসার প্রথমেই কি সুখের হয় নিসা? হাজারো বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে সংসারকে সুখের করে নিতে হয়।”
“আমি কি সেটা অস্বীকার করেছি? জাস্ট এটাই বলেছি যে প্রথম দিকে ভয় পেয়েছিলাম।”

“আচ্ছা এখন পুরনো কথা বাদ দিয়ে দ্রুত রেডি হয়ে নাও। আজকে তো তোমার ডক্টরের কাছে যাওয়ার ডেট ভুলে গিয়েছ?”
নিসা জিহবায় কামড় দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, সত্যি আমি ভুলে গিয়েছিলাম।”

“জিহবায় কামড় দেয়ার কি আছে এটা তো আর নতুন কিছু না। প্রয়োজনীয় জিনিস ভুলে যাওয়া তো তোমার জন্মগত স্বভাব বলে আমি মনে করি।”
“এভাবে বলছ কেন? আমি কি ইচ্ছে করে ভুলে যাই না-কি! মনে থাকে না বলেই তো ভুলে যাই।”
“হুম, সেজন্যই তো বললাম এটা তোমার স্বভাব।”

“কচু।”বলেই নিসা মুখ ভেংচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে ফেলতে নিলেই প্রণয় নিসার মাথা ধরে সোজা করে বলল,
“মুখ ঘুরাঘুরি পরে হবে আগে যাও রেডি হও। এই ফাঁকে আমিও কাপড় গুলো কেচে ফেলি।”
“আচ্ছা।”

বলেই প্রণয় বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল। পেছনে নিসাও মুখ ফুলিয়ে উঠে যেতে নিলেই প্রণয়ের ফোন বেজে উঠল। ফোন হাতে নিয়ে নিলয়ের নাম্বার ভেসে উঠতে দেখে বলল,
“নিলয় ভাইয়া কল করেছে। ফোনটা এসে ধরো আগে।”

প্রণয় ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে ফোন রিসিভ করতেই নিলয় উত্তেজিত কন্ঠে বলল
“হ্যালো প্রণয়!”
“হ্যাঁ নিলয় বল।”
“তুই তুই এক্ষুনি কুর্মিটোলা হসপিটালে চলে আয়।”

“হসপিটালে! হসপিটালে আসব কেন?”
“সোহানার তো আজ ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল। তো”
নিলয়ের কথা শেষ হবার আগেই প্রণয় বলল,
“হুম সেটা তো জানি। গতকাল মুহিত বলেছিল যাতে হসপিটালে সময় করে একবার ঘুরে আসি। কিন্তু নিসাও তো এদিকে অসুস্থ ওকে নিয়ে আবার হসপিটালেও যেতে হবে তাই আর যাওয়া হয়নি। আচ্ছা তুই কি এখন হসপিটালেই?”

“হুম, হসপিটালেই আছি।”
“তো সোহানার কি অবস্থা? ডেলিভারি কি হয়ে গিয়েছে না-কি হবে?”
“ডেলিভারি হয়ে গিয়েছে কিন্তুসোহানা আর নেই।”
“মানে! কি বলছিস তুই এসব?”

“হ্যাঁ, সোহানার গত দুইদিন যাবৎ ব্যাথা চলছিল। তাই গতকাল মুহিত এনে হসপিটালে ভর্তি করে সোহানাকে। আজ সকালে ব্যাথার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হলে সোহানাকে OT তে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বাচ্চা সুস্থভাবে দুনিয়াতে এলেও সোহানা দুনিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়।”

প্রণয়ের মুখ দিয়ে একটি কথাও বের হচ্ছে না। বারবার মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথাগুলো। নিলয় আর প্রণয় মিলে কতই না মুহিতকে খেপিয়েছে সোহানাকে সখিনা বলে ডেকে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে প্রণয়ের।
এদিকে প্রণয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে নিলয় বলল,
“কী রে আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?”

“হুম।”
“তুই কি এখন হসপিটালে আসবি না-কি ডিরেক্ট বাসায় যাবি?”
“আমি নিসাকে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মুহিতের বাড়িতেই আসছি। তোরাও এই ফাঁকে হসপিটালের অফিসিয়াল কার্যক্রম সেরে বাড়ি চলে আয়।”
“আচ্ছা তাহলে রাখছি।”

“নিলয়!”
“হুম বল।”
“বাচ্চা ছেলে না-কি মেয়ে বললি না তো!”
নিলয় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“মেয়েমেয়ে হয়েছে মুহিতের।”

বলেই ফোন কেটে দিল নিলয়। এদিকে প্রণয় ফোন কান থেকে নামাতেই নিসা বলল,
“কি হয়েছে? সোহানার কোনো সমস্যা হয়েছে?”
প্রণয় টেবিলের উপর ফোন রেখে কাপা স্বরে কিছু বলতে গিয়েও পারছে না। বলবেই বা কি করে নিসা যে ওই একই পথের পথিক।
“কী হলো প্রণয় কথা বলছ কেন?”

অস্পষ্ট গলায় প্রণয় বলল,
“সোহানা আর নেই। মেয়েকে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে দুনিয়ার আলো দেখানোর জন্য নরমাল ডেলিভারি করতে গিয়ে নিজেই দুনিয়ার আলো ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
“কী বলছ তুমি এসব? সবে বছরের গন্ডি পার হলো বিয়ের! এর মধ্যে এত বড় সর্বনাশ কি করে হয়ে গেল?”

“মুহিত এখন পাগল হয়ে যাবে নিসা। সোহানাকে যে মুহিত কত ভালোবাসে এ কেবল আমি আর নিলয় জানি। ৮ বছরের সম্পর্কে হাজারো ঝড় ঝাপটা পার করে এতদিনে দুজন এক হয়েছিল। বছর টাও ঘুরতে পারল না সবশেষ হয়ে গেল মুহিতের। কি করে থাকবে মুহিত! ও তো দম ফেটেই মরে যাবে।”

বলেই চোখের জল ছেড়ে দিল প্রণয়। নিসা প্রণয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কেঁদো না, তুমি কাঁদলে মুহিত ভাইয়াকে সামলাবে কে? তোমাকে আর নিলয় ভাইয়া কেই তো মুহিত ভাইয়াকে সামলাতে হবে তাই না?”

প্রণয় চোখের জল মুছে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিলে নিসা প্রণয়ের মাথা নিজের বুকে ঠেকিয়ে বলল,
“রেডি হয়ে নাও আজ আর ডক্টরের কাছে যাবো না, সোজা মুহিত ভাইয়ার বাসায় যাবো।”

রাত ১০ টা। মুহিতের বাসা থেকে মাত্রই বের হলো প্রণয় আর নিসা। মোটামুটি ফাঁকা বাসের জন্য অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও না পেয়ে শেষমেশ একটি সিএনজি ভাড়া করল প্রণয়। দু’জন পাশাপাশি বসে আছে। প্রণয় নিসার হাত শক্ত করে ধরে নিসার দিকে তাকিয়ে থাকলেও নিসার কোনো সায় পাওয়া যাচ্ছে না। নিসাকে টেনে বুকে জড়িয়ে বলল,
“কোনো সমস্যা?”

নিসা কোনো কথা বলছে না। মাথা প্রণয়ের বুকে থাকলেও দৃষ্টি কোনো এক অলিগলির খোঁজে। যেটা প্রণয় বুঝতে পেরে বলল,
“তোমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছি তাই না?”
নিসার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি প্রণয়ের হাতের উপর পড়তেই বলল,
“বাড়ি যাবে?”

এতক্ষণ নীরবে চোখের জল ফেললেও প্রণয়ের কথা শুনে এবার জোরে কেঁদে ফেলল নিসা। হেঁচকি তুলে বলল,
“সোহানাকে দেখে অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছি বিশ্বাস করো। আমিও তো ওই একই অবস্থাতেই পড়ে আছি। যদি আমারও সোহানার মত অবস্থা হয়! তাহলে তো বাবা-মা কেও শেষবারের মত দেখতে পারব না।”

“কী বলছ তুমি এসব? ইনশাআল্লাহ তোমার কিচ্ছু হবে না দেখো। আমার সব হায়াত আল্লাহ তোমাকে দিয়ে দিক। আর আমি তো তোমাকে নরমাল ডেলিভারি করতে দিবও না। এত রিস্ক আমি নিতে পারব না।”
“আমাকে বাবা-মায়ের কাছে নিয়ে যাবে? একটিবার বিশ্বাস করো একটিবারই। শুধু একবার চোখের দেখা দেখে ক্ষমা চেয়ে চলে আসব। আর কখনো তোমাকে নিয়ে যেতে বলব না।”

“তারা ক্ষমা করে দিলেও বলবে না?”
নিসা আর কোনো কথা বলল না। প্রণয় মৃদু হেসে গাড়ি চালককে বলল গাড়ি ঘুরাতে। আর মনে মনে বলল, “এটাই তো চেয়েছিলাম নিসা। তাই তো এতো পথ ফেলে এই পথ ধরে তোমায় নিয়ে এলাম। এর বড় ঘটনা দেখার পরেও কি করে তোমাকে তোমার পরিবার থেকে দূরে রাখি বলো।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিসাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল প্রণয়।


পর্ব ২৩

কলিংবেল চেপে একবুক ঊর্ধ্বশ্বাস নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিসা। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মুহূর্তের মধ্যে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে তার। কপাল বেয়ে ঝড়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা গুলো।
নিসার এরকম বেহাল দশা দেখে প্রণয় নিসার হাতের মুঠি চেপে ধরে স্মিত হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
“ভয় পেয়েও না, যা হবে ভালোই হবে ইনশাআল্লাহ।”

প্রণয়ের ভরসার হাত পেয়ে শুকনো হাসির রেখা ফুটিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই ভেতর থেকে দরজা খোলার খটখট শব্দ হতে লাগল। প্রণয় দ্রুত নিসার হাত ছেড়ে ক্ষানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে নিসার পাশে দাঁড়ালো।

এদিকে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দরজার ওপাশে থাকা মানুষটিকে দেখে রেখার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। পেছন থেকে বুকের ওড়না ঠিক করতে করতে দরজার পেছনে এসে দাঁড়ালো শিল্পী। দরজার ওপাশে কে আছে তা লক্ষ্য না করে রেখাকে বলল,
“ভাবি, কে এসেছে?”

রেখার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে শিল্পী দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিতেই চোখ দুটো বের হওয়ার উপক্রম। চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“মা! বাবা! কোথায় আপনারা? শীঘ্রই এদিকে আসুন, দেখে যান কে এসেছে!”

শিল্পী আওয়াজ দিতেই নাদিরা খাতুন নিজ রুম থেকে বেড়িয়ে এলেন। পেছন পেছন বেড়িয়ে এলেন সুলতান সাহেবও। নাদিরা খাতুন রুমের গলি পেড়িয়ে করিডোরে পা রাখতেই থমকে দাঁড়ালেন। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার, সাথে আনন্দও! সেই পিচ্ছি মেয়েটা আজ কত বড় হয়েছে তার। সেই চিকন চিকন হাত দুটো মা হওয়ার তাড়নায় ফুলে বেলুন হয়ে গিয়েছে।

সেই ছোট্ট পা দুটো মা হবার যন্ত্রনায় পানি নেমে ফুলে একেকটি কেজি হবার পর্যায়ে। চোখের নিচে পড়েছে মোটা কালির ছাপ। আর সেই ছাপ বেয়ে ঝড়ে যাচ্ছে পাষাণ বুক ছিদ্র করার মত ধারালো নোনা জল। সেই ধারালো নোনা জলের স্রোত ধরে নাদিরা খাতুন ধীর পায়ে দাঁড়ালো নিসার সামনে। নিসা আধো গলায় বলল,
“মা!”

এত বছর পর মেয়ের মুখে মা ডাক শুনতেই তিলে তিলে গড়ে তোলা পাথরের ন্যায় মনটা মুহুর্তের মাঝে বরফের ন্যায় গলে জলে পরিণত হয়ে গেল। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কোথায় ছিলি এতদিন? মায়ের কথা মনে পড়েনি? মায়ের বুকে আসতে ইচ্ছে হয়নি? মায়ের রাগটাই দেখেছিস, কষ্টটা দেখিস

“মা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি অনেক বড় ভুল করেছি। তোমাদের সবাইকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি ভীষণ অপরাধ করেছি কিন্তু, বিশ্বাস করো তখন আমার হাতে এটা ছাড়া কিছুই ছিল না। আমি বাধ্য হয়েছিলাম তোমাদের সবার মনে কষ্ট দিয়ে দূরে চলে যেতে।”
বলেই মা নাদিরা খাতুনকে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল নিসা।

নাদিরা খাতুন পরম যত্নে নিসার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“ক্ষমা, সে তো কবেই করে দিয়েছি। মায়েরা যে সর্বদা ক্ষমাশীল।

দুদিন পরে তুই নিজেও মা হবি তখনই বুঝবি মায়েরা ঠিক কি প্রজাতির।”
“তাহলে আমার কোনো খোঁজ খবর কেন নাওনি? কেন দূর করে রেখে আমাকেও বাধ্য করেছ তোমাদের থেকে দূরে থাকতে? তোমরা কি জানো না, তোমাদের ছেড়ে থাকতে আমার ঠিক কতটা কষ্ট হতে পারে?”

“তুই কি করে জানিস যে, তোর খোঁজ খবর আমরা নেইনি কিংবা নিতে চাইনি? তোর ‘জা’ নিতুর কাছে এই ৪ বছরে ঠিক কতবার তোর ভাই রাফি কে পাঠিয়েছি তোর ধারণা আছে?

কিন্তু নিতু আজ অবধি রাফির সাথে কথা বলার প্রয়োজন বোধটুকুও মনে করেনি হয়তো, সেই পুরনো রাগ বশত! তাই বারংবার চেয়েও আমার ব্যর্থ হয়েছি তোর সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু তুইতুই তো পারতি আমাদের সাথে একবার যোগাযোগ করতে। একবার ফোন করতে। আমরা না’হয় তোর বাসা কিংবা ফোন নাম্বার জানতাম না কিন্তু তুই তো জানতি, তুই কেন একবার আমাদের কাছে আসলি না?”

“ভয়, লজ্জা”
বলেই থেমে গেল নিসা। মায়ের বুক ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আবারো বলতে লাগল,
“আমি অনেকবার চেয়েছিলাম তোমাদের সাথে অন্তত একবার যোগাযোগ করি। কিন্তু ভয়, লজ্জা, অপমান এসব কিছু মিলিয়ে আমি পেরে উঠিনি মা।”

বলেই মাথা নিচু করে নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে পেটের দু পাশে হাত রেখে বলল,
“কিন্তু এখন আর সেই বাঁধা গুলো আমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি মা। যদি তোমাদের চোখের দেখা না দেখে এ ভুবন পারি জমিয়ে অন্য ভুবনে চলে যাই সেই ভয়ে।”
মেয়ের মুখে হাত দিয়ে নাদিরা খাতুন বললেন,
“কী বলছিস এসব! আল্লাহ আমার সব হায়াত তোকে দিয়ে দিক। এসব আজেবাজে কথা আর কক্ষনো মুখে আনবি না।”

বলেই নিসাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন নাদিরা খাতুন। এদিকে সুলতান সাহেব প্রণয়ের কাছে গিয়ে প্রণয়কে ঘরে ঢুকিয়ে মেইন দরজা বন্ধ করে বললেন,
“সবাই যে মেয়েকে নিজে মজে গিয়েছে কেউ কি লক্ষ্য করেছে এখানে আরও একজন মানুষ আছে?”

সুলতান সাহেবের কথা শুনে নাদিরা খাতুন চোখ তুলে প্রণয়ের দিকে তাকালেন। এতক্ষণ মেয়েকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে মেয়ের জামাইয়ের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। প্রণয়ের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলেন নাদিরা খাতুন! ৪ বছরের আগের প্রণয়ের সাথে যেন এ প্রণয়ের একেবারেই মিল নেই। এ প্রণয়ের কাছে যেন তার সুন্দরী মেয়েকেও আজ তুচ্ছ মনে হচ্ছে তার কাছে। এরকম সুদর্শন সুপুরুষ মেয়ের জামাই তো সব মেয়ের বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে। আর তাদের ভাগ্যেই সেই স্বপ্ন বাস্তবতার রূপ নিয়েছে ভাবতেই বুকটা ভরে উঠছে।

প্রণয়ের কাঁধে আলতো করে মমতাময় হাত রেখে নাদিরা খাতুন বললেন,
“দাঁড়িয়ে কেন বাবা? ভেতরে চলো আরাম করবে। রাত তো কম হয়নি।”
এতবছর পর শ্বশুর শাশুড়ির স্নেহময় আচরণ পেয়ে প্রণয় যেন পৃথিবীর সব পেয়ে গিয়েছে। মুচকি হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিয়ে পা বাড়ালো বাড়ির ভেতরের দিকে।

সকাল ৭টা। প্রণয় ঘুম থেকে উঠেই দেখে নিসা পাশে নেই। দরজা হালকা ভিড়িয়ে রাখা। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো প্রণয়। হাতমুখ ধুয়ে শার্ট গায়ে দিয়ে রুমের বাহিরে যেতেই দেখে এত সকালে ঘরের প্রতিটি কোণে যেন এক হৈ হৈ উৎসব মুখর পরিস্থিতি। কেউ আছে পিঠা বানানোর ব্যস্ততার মাঝে, কেউ আছে ঘর গোছানোর মাঝে, কেউ আছে সকালের নাস্তা বানানোর তালে, তো কেউ আছে আবার এই বাড়ির আদরের ছোট্ট মেয়েটিকে আদর করার তালে। সুলতান সাহেব ও নাদিরা খাতুনের মাঝে বসে আছে নিসা।

মুখ জুড়ে রয়েছে অনিহার ছাপ। সুলতান সাহেব একবার নিসার মুখের সামনে জুসের গ্লাস ধরে তো একবার নাদিরা খাতুন প্লেট ভর্তি ফল। এ দুয়ের মাঝে নিসা একেবারেই বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। কনসিভ করার পর থেকে যে নিসা ফল খাওয়া তো দূরে থাক ফলের গন্ধও সহ্য করতে পারে না। গন্ধ নাকে এলেই বমি করে ভাসিয়ে দেয়। প্রণয় তড়িঘড়ি করে ফলের প্লেট আর জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল,

পর্ব ২৪

মা বাবা, ওকে এটা খাওয়ার জন্য জোর করবেন প্লিজ। কনসিভের পর থেকে নিসা এসব ফল কিংবা ফলের জুসের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। বেশি জোরাজোরি করলে দেখা যায় হীতে বিপরীত হয়ে যায়। উল্টো বমি করে অনেকটা দুর্বল হয়ে যায়।”

নাদিরা খাতুন বললেন,
“কী বলো প্রণয়! আমরা তো আরও সেই কতক্ষণ যাবৎ ওর সাথে জোরাজোরি করেই যাচ্ছি।”
নিসা মুখ বাকিয়ে বলল,
“এই একটা কথা আমি যে কতভাবে চেষ্টা করলাম তোমাদের বুঝাতে কিন্তু তোমরা বুঝলে না। সেই তো এখন ও বলার পর বুঝলে কিন্তু আমার বারোটা বাজিয়ে দেবার পর বুঝলে। ভেতর পুরো উল্টিয়ে আসছে।”

সুলতান সাহেব বললেন,
“মারে আমরা তো আর এসব জানতাম না, ভেবেছিলাম এগুলো তোর শরীরের জন্য এই মুহূর্তে ভীষণ উপকারী। যদি জোর করেও খাওয়াতে হয় না’হয় খাওয়ালাম। তবুও তো শরীরটা কিছুটা শক্তি পাবে। কিন্তু আমরা যদি এরকম জানতাম তাহলে কখনোই ওভাবে জোর করতাম না।”

“সেটাই তো বললাম বারোটা বাজিয়ে তারপর ছেড়েছ।”
নাদিরা খাতুন মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
“ভুল হয়ে গিয়েছে তো, এখন আর রাগ করিস না। পরবর্তী থেকে আগে তোর পুরো কথা শুনব তারপর সবকিছু করব। তাহলেই তো হলো তাই না?”

নিসা মুচকি হাসতেই নাদিরা খাতুনও স্মিত হাদি দিলেন। তারপর শিল্পীকে ডাক দিয়ে বললেন,
“জামাইয়ের হাত থেকে এই ফলের প্লেট, গ্লাস এগুলো নিয়ে যাও।”
“আচ্ছা মা।”

বলেই শিল্পী একগাল হেসে প্রণয়ের হাত থেকে প্লেট, গ্লাস নিয়ে চলে যেতে নিলেই নাদিরা খাতুন বললেন,
“নাস্তা হতে আর কতক্ষণ? জামাই ঘুম থেকে উঠেছে তো বেশ সময় হয়ে গেল। নাস্তা দিতে হবে তো না-কি?”
“জ্বি মা, নাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু টেবিলে দেয়া বাকি। আপনি সবাইকে নিয়ে চলে আসুন আমি খাবার এক্ষুনি টেবিলে দিয়ে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা যাও তবে।”

শিল্পী যেতেই প্রণয় সোফায় বসে বলল,
“মা, নাস্তা নিয়ে এত তাড়াহুড়োর কিছুই নেই। আমার দেরিতে খেয়ে অভ্যাস আছে।”
নাদিরা খাতুন বললেন,
“শত অভ্যেস থাক কিন্তু, তুমি এ বাড়ির জামাই। একমাত্র মেয়ের জামাই। এ কথা ভুললে তো চলবে না।”

“তা ঠিকাছে তবে ঘুম থেকে উঠেই সকাল সকাল খাওয়ার অভ্যেসটা নেই তো তাই বলছিলাম। একটু দেরি করে হলে ভালো হয়।”
নিসা সামনে থেকে বলে উঠল,
“হ্যাঁ মা, ও এত সকাল সকাল কখনোই করে না, ১০ টা কি ১০:৩০ টায় মধ্যে ও নাস্তা করে।”

“আচ্ছা বেশ, তাহলে টেবিলে নাস্তা সাজাতে বারণ করে দিচ্ছি আমি।”
বলেই শিল্পীকে ডাক দিয়ে বললেন,
“জামাই এত সকালে নাস্তা করবে না। ১০ টা নাগাদ নাস্তা করবে। তাই এখনি টেবিলে নাস্তা দিয়ে দিও না।”

“আচ্ছা মা।”
বলেই শিল্পী চলে যেতে নিলেই রেখা পেছন থেকে ট্রে ভর্তি চায়ের কাপ আর ড্রাই বিস্কিটের প্লেট নিয়ে এসে বলল,
“শিল্পী, এদিকে এসে বসো। আগে সবাই মিলে চা খেয়ে নতুন জামাইয়ের সাথে খানিকটা সময় আড্ডা দিই পরে বাদ বাকি সব কাজ করব। আর কাজ তো প্রায় সবই শেষের দিকে।”

শিল্পী মুচকি হেসে রেখার ট্রে থেকে বিস্কিটের প্লেটটি নিয়ে বলল,
“চলো ভাবি।”
রেখা সবার হাতে চা তুলে দিয়ে বিস্কিটের প্লেট টি টেবিলের মাঝে রাখল। শিল্পীর পাশে বসে বলল,
“তো প্রণয় ভাই, চায়ে চিনি কি কম হয়েছে না-কি বেশি?”

চায়ে চুমুক দিয়ে প্রণয় বলল,
“না ভাবি চিনি একেবারে ঠিকাছে। কম চিনি খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।”
“রাতে তো তেমন কথা হলোই না আপনার সাথে। কেমন আছেন বলুন? ও হো আমার পরিচয় টাই তো দেয়া হলো না। আমি হলাম”
রেখার কথা শেষ হবার আগেই প্রণয় বলল,
“রেখা ভাবি। নিসার বড় ভাবি। আর আপনার পাশের ভাবি হলেন শিল্পী ভাবি।

আপনাদের না দেখলেও, না কথা হলেও আপনাদের সকলের নাম ও সম্পর্ক আমি জানি। আর নাম ও সম্পর্ক জানা থেকেই প্রথম দেখাতেও আমি সকলে চিনতে সক্ষম হচ্ছি। নিসা প্রায়ই আপনাদের দুজনের কথা বলত। আপনারা দু’জন ওর মায়েত সমতুল্য। ভাবি কম বন্ধু বেশি আরও অনেক কিছুই বলত।”

শিল্পী নিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাদের নিসা বুড়ি টাই যে ভালো। তার সাথে ভালো না হয়ে কি পারা যায়!”
শিল্পীর কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণয় মুচকি হাসতেই রেখা বলল,
“তো প্রণয় ভাই, তোমাকে তুমি করেও বলছি। যেহেতু তুমি আমার ছোট নন্দাই এর বর।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনাদের যেভাবে ভালো লাগবে সেভাবেই আমাকে সম্বোধন করবেন। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
“এই না হলে আমাদের একমাত্র নন্দাই এর বর।”বলেই রেখা হেসে দিল।
সুলতান সাহেব বললেন,
“রাতে তো তোমার সাথে তেমন কথাই হলো না বাবা। তো কোথায় আছ এখন তুমি? মানে আমি জবের কথা বলছি আর কি।”

“জ্বি বুঝতে পেরেছি। আমি বর্তমানে একটি চায়না কোম্পানির গার্মেন্টস সেকশনে শীঘ্রই জিএম পদে জয়েন করেছি।”
“মাশাল্লাহ! তাহলে তো খুবই ভালো।”
প্রণয় শুকনো হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বাবা, অনেক কাঠখড় পেড়িয়ে এতদিনে লক্ষ্যে পৌছতে পেরেছি।”

সুলতান সাহেব সহ সকলের মুখই মুহুর্তের মাঝে চুপসে গেল। প্রণয় নিজেই আবার বলল,
“জানেন বাবা আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে। তাই কষ্টকে কখনো হেয় করে দেখিনি। এই ৪ টি বছর আমার জীবনের এমন কিছু অধ্যায় যা আমি চাইলেও ভুলতে পারব না।

জন্মের পর হয়তো এতটা কষ্ট করিনি যতটা এই ৪ বছর করেছি। দেরি করে হলেও ঠিক তদ্রূপ ফলও পেয়েছি যতটা কষ্ট করেছি। এখন শুধু বসে বসে কাজ করে মাস শেষে টাকা গুনছি। এটা কি আমার কষ্টের ফল না বলুন? এখন আল্লাহ আল্লাহ করে নিসা আর আমার সন্তানের সবকিছু ঠিক থাকলেই হলো। আমার আর কোনো টেনশন কিংবা কষ্ট নেই।”

“তোমার উপর অনেক চাপ পড়েছে আমি বুঝি বাবা। কিন্তু”
“থাক বাবা আগের কথা বাদ দিন। এসব কথা মনে করে কষ্ট ছাড়া সুখ পাওয়া যাবে না। তার চেয়ে বরং চলুন নাস্তাটাই করে ফেলি।”
পরিস্থিতি গম্ভীর হতে দেখে প্রণয় কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

নিসা বলল,
“এখনি নাস্তা করবে? সবে তো পৌনে আটটা বাজে।”
“হুম করেই ফেলি। বিয়ের পর থেকে তো আজ অবধি সকালে গরম খাবার খাওয়াও নি। আজ না-হয় শ্বশুর বাড়িতেই এতবছর পর গরম খাবারের মজা নিই।”
শিল্পী অবাক হয়ে বলল,
“এই ৪ বছরে একদিনও নিসা তোমাকে গরম খাবার সকালে দেয়নি?”
“না ভাবি, ওর যে আরামের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।”বলেই মুখ চেপে হাসতে লাগল প্রণয়।

পর্ব ২৫

রেখা বলল,
“কী রে নিসা, তুই সকালে উঠে রান্না করিস না? ছেলে মানুষের স্বস্তি থাকেই তো তার খাবার তৃপ্তির মাঝে। কখনো দেখেছিস তোর ভাইদের কিংবা বাবাকে আমরা না খাইয়ে কখনো বাহিরে পাঠিয়েছি? তুই কি করে না খাইয়ে অফিসে পাঠিয়ে দিস বলতো।”
“ভাবি তুমি ভুল বুঝছ। ও না খেয়ে কখনো যায় না তো। ফ্রিজে যা থাকে সেগুলো খেয়ে যায়।”

“সকাল বেলা ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার খাওয়া কি চারটে খানে কথা! এ খাবার তো গলা দিয়েই নামে না। বেচারা খাবে কেমন করে?”
“ঘুম ভাঙে না ভাবি। আমি কি করব বলো।”
“অফিস সম্ভবত ১০ টার পর প্রণয়ের। ১০টার পরেও ঘুম ভাঙে না?”

মাথা নিচু করে ফেলল নিসা। আর প্রণয় তা দেখে বলল,
“ভাবি আমি দুষ্টামি করে কথাটুকু বলেছিলাম। সত্যি বলতে ঠান্ডা খাবার খেতে আমার কোনো সমস্যা হয় না, উল্টে অভ্যেস হয়ে গিয়েছে আমার। ভেতরটাও ঠান্ডা লাগে, বেশ ভালোই লাগে।”

“সে আমরা বুঝি ভাই। বউয়ের দোষ ঢাকার প্রয়োজন নেই।”
“ঢাকছি না ভাবি, তাড়াহুড়ো করছি। ১১টার আগে ঘর থেকে বের হতে হবে তো তাই। অফিসে আজ আবার জরুরি একটা মিটিং আছে তো।”
“ওআজ না গেলে হয় না? সবেই তো কাল একে শ্বশুর বাড়ি। অফিস থেকে ছুটি নাও। ২/৩ দিন থেকে পরে না’হয় যেয়েও।

নাদিরা খাতুন বললেন,
“হ্যাঁ বাবা, জামাই মানুষ কাল এসে আজই যাবে কেমন যেন দেখায়। আর মনটাও মানে না। তুমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নাও। একসাথে কটা দিন থাকো তারপর না’হয় নিজের ঘরেও ফিরে যেয়েও আর অফিসও শুরু করো।”

“না মা, এখন ছুটি পাওয়া সম্ভব না। এখন তো কাজের মৌসুম চলছে। এই সময় ছুটি চেয়ে আবেদন করলে ছুটি তো দিবেই না, উল্টো চারটে কথা শুনিয়ে দিবে। আর আপনি ভাবছেন কেন? এখন তো প্রায় আমাদের এখানে আসা হবে, আপনারা যাবেন। নতুন জামাই এমনিতেই পুরনো হয়ে যাবে।”
বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসল প্রণয়।

“আচ্ছা বাবা, যা ভালো বুঝো তাই করো।”
বলেই নাদিরা খাতুন রেখা ও শিল্পীকে খাবার টেবিলে দিতে বললেন।

প্রণয় ও নিসার ছোট্ট সংসার বড় করতে তাদের কোল জুড়ে প্রান্ত এসেছে সবে ১২দিন। এই ১২ দিনই যেন খুশির জোয়ার বয়ে গিয়েছে তাদের জীবন জুড়ে। প্রান্ত কে নিয়ে কত খুনসুটিই না তৈরি হয়েছে দুজনের মাঝে। আবার সেই খুনসুটির সমাপ্তি ঘটে মিল হয়েছেও এই প্রান্তকে ঘিরেই। সারাদিন প্রান্তকে ঘিরেই সময় কাটছে তাদের দু’জনের।

“এই নিসা, দেখো প্রান্ত ঘুমের মাঝে চোখ কীভাবে মিটমিট করছে। আবার মুখটাও কেমন যেন করছে তাই না? মনে হচ্ছে কি মজার চকলেট যেন চুষে খাচ্ছে সে।”
নিসা প্রান্তর কপালে হাত রেখে বলল,
“খাচ্ছেই তো। মজার খাবারই খাচ্ছে আমার ছেলে।”

প্রণয় ভ্রু কুচকে ফেলল। বলল,
“মানে!”
“মা বলেছে, বাচ্চারা ঘুমের মধ্যে যখন কিছু চুষে খাওয়ার মত করে তখন না-কি ঘুমের মাঝে ফেরেশতারা তাদের মজার খাবার খাওয়ায়। তাই বাচ্চারা খালি মুখেই ওভাবে চুষে থাকে।”

“তাই না-কি!”
“সেরকমই শুনেছি বাকিটা মা জানে।”
“তবে আমিও কিন্তু কিছু একটা এই মুহুর্তে জানি।”
“কি?”

“কিছুমিছু মন চাচ্ছে।”
নিসা মুখ ভেংচি কেটে বলল,
“পাগল হয়েছ? মাথার সব তার ছিড়ে গিয়েছে না-কি?”
“কেন? মাথার তার ছিড়বে কেন? নিজের বউকেই তো কাছে পেতে মন চাচ্ছে এখানে মাথার তার ছিড়ার কি আছে?”

“আজ ক’দিন মাথায় আছে? সবে ১২ দিন। আর ২৮ দিন আমার থেকে দূরে থাকবে এসব আজেবাজে চিন্তাভাবনা নিয়ে। ৪০ দিন যাক তারপর ভেবে দেখব।”
প্রণয় জিহবায় কামড় দিয়ে বলল,
“সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম। কি করব বলো গত ২ মাস হলো তোমার ধারের কাছেও যেতে পারি না। যাবারা আগেই চেঁচামেচি শুরু করো। আমি তো আর সন্ন্যাসী না, সংসারী পুরুষ। বদ্ধ ঘরে বউয়ের একাকী সান্নিধ্য তো পেতে ইচ্ছে করে।”

নিসা কিছু বলার আগেই প্রণয়ের ফোন বেজে উঠল। প্রণয় মুখ বাকিয়ে বলল,
“রোমান্স করা তো ২ মাস আগেই ভাগ্য থেকে উঠে গিয়েছে এখন যাও রোমান্টিক মুডে এসে বউকে দুটো রোমান্টিক কথা বলব তাও এই ফোনের যন্ত্রণায় সেই রোমান্টিক কথাগুলোও উড়ে গিয়েছে। ভালো লাগে না।”

বলেই ফোন রিসিভ করল প্রণয়। মিনিট পাঁচেক কথা বলার পর ফোন কান থেকে নামিয়ে চোখেমুখে হাসির ঝলক ফুটিয়ে বলল,
“আমার প্রান্ত শোনা ঘরে আসতে না আসতে একের পর এক খুশির খবর আসছে।”

“মানে!”
“তুমি তো জানোই বাইকের আমার বড্ড শখ। প্রায় বন্ধুদের বাইকে ঘুরে বেড়াতাম। এমনকি তোমাকে নিয়ে পালানোর দিনেও বন্ধুর বাইক নিয়ে এসেছিলাম। কেনার ক্ষমতা কখনোই হয়নি। এখন যাও আল্লাহ রহমতে কেনার ক্ষমতা হয়েছে কিন্তু এখন অফিস থেকেই বলছে বাইক দিবে। কত ভালো হবে তাই না?”
“ভালো তো হবেই কিন্তু আমার কেন যেন বাইক ব্যাপারটা পছন্দ না। এক কথায় ভালোই লাগে না।”

“ও তোমার একার না, বেশিরভাগ মেয়েরই বাইক পছন্দ না। নিজেরা চালাতে পারে না তো তাই এর মজাও বুঝে না। যার এই নেশা একবার হয় সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ নেশা ছাড়াতে পারে না।”
“এটা একটা ফালতু কথা বললে। দুনিয়াতে এমন কোনো নেশা নেই যে, মানুষ চাইলে সেটা থেকে দূরে থাকতে পারে না বুঝলে।”
“কচু।”

“কি?”
“হুম, কচু-ই।”
“ভালো, কচু-ই ভালো। এখন বলো বাইক কবে দিবে বলেছে।”
“বলল তো সব কাগজপত্র ভাজ হয়ে গিয়েছে। দু’একদিনের ভেতরই হয়তো আমার হাতে বুঝিয়ে দিবে। তারপর তোমাকে আর প্রান্তকে নিয়ে সোজা বাইক রাইডে বের হবো।”

“ইনশাআল্লাহ বলো। সবকিছুতে হেয়ালীপনা। আল্লাহর নাম নিয়ে কিছুই বলে না।”
“ওকে বাবা সরি! ইনশাআল্লাহ তোমাদের নিয়ে বাইক রাইডে যাবো। এবার হয়েছে?”
“হুম হয়েছে।”

“এই শুনো না!”
“আমি কি কানে তুলো গুঁজে রেখেছি? যা বলার বলো, আমি তো শুনতেই পাচ্ছি।”
“এখানে আমার আর ভালো লাগছে না। চলো না আমাদের ফ্ল্যাটে চলে যাই। জামাই মানুষ হয়ে শ্বশুর বাড়িতে পড়ে আছি আজ ১৬ দিন। ভালো লাগে বলো? লজ্জা করে তো।”

“আহাআমরা কি এমনি এমনি পড়ে আছি না-কি! বাবুর জন্যই তো এসেছি। এত ছোট বাবু কি আমার দ্বারা একা সামলানো সহজ? মা আর দুই ভাবী আছে বলেই তো আমার কষ্ট কম হচ্ছে। আর ক’টা দিন যাক, বাবুটা একটু শক্ত হোক তারপর চলে যাবো ইনশাআল্লাহ।”
প্রণয় হতাশ গলায় বলল,
“বাবু শক্ত হবে বলতে কতদিন বোঝাচ্ছ ২/৩ বছর?”
“আরে না পাগল, ২/৩ বছর বোঝাব কেন? আমি তো ৩/৪ মাসের কথা বলেছি।”

“ও আচ্ছা।”
বছরের বদলে ৩/৪ মাসের কথা শুনে প্রণয় খুশি হতে চেয়েও পারল না। তার কাছে ৩/৪ মাস ও কেন যেন বছরের চেয়ে বেশি লাগছে। নিজের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ির ভেতর যে আকাশ পাতাল ফারাক। জামাই মানুষ কি আর যেন তেন ভাবে চলতে পারে!

প্রতিদিনের মত আজও প্রণয় খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। কিন্তু নিসা সে তো প্রতিদিনকার মত আজও ঘুমে বিভোর। আর তাদের মাঝে রয়েছে প্রান্ত। যে কি-না ঠিক তার মায়ের মতো ঘুমের পোকা। তাই তো সেও ঠিক তার মায়ের মত বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।

পর্ব ২৬

প্রান্তর ছোট্ট মাথার পাতলা চুলগুলোর মাঝে আলতো করে ছুঁয়ে প্রশান্তিময় হাসির রেখা দুই ঠোঁটের মাঝে ফুটিয়ে তুলল প্রণয়। এরই মাঝে তার পেট বেশ মোচড় দিয়ে বুক ব্যাথা করে উঠল। কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হয়। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না এ ব্যাথা কিসের ব্যাথা। প্রান্তর ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয়ে নিসাকে আস্তে করে ডাকল প্রণয়। কিন্তু সেই ডাক হয়তো নিসার কান অবধি পৌঁছেনি। প্রণয় হালকা ধাক্কা দিয়ে নিসাকে ডাক দিতেই নিসা মিটমিট করে তাকালো। প্রণয় বলল,
“এই উঠো না, বড্ড খিদে পেয়েছে। খিদের চোটে বুক ব্যাথা করছে।”

“খিদে পেয়েছে বলে আমার ঘুম ভাঙালে? তুমি তো নিজ হাতে নিয়েই খেতে পারো। যাও ফ্রিজ খুলে দেখো কী কী আছে, যা ইচ্ছে হবে নিজ হাতে নিয়ে খেয়ে নাও। আর নিজ হাতে নিয়ে খেতে ইচ্ছে না করলে ভাবিদের বলো তারাই তোমাকে দিয়ে দিবে।”
“জামাই মানুষ হয়ে ফ্রিজ হাতাবো নয়তো খাবার খুঁজে খাবো! মাথা ঠিকাছে তোমার?”

“উফফ আচ্ছা জ্বালা তো, নিজ হাতে নিয়েও খাবে না আবার খুঁজবেও না যত্তসব!”
“আজ একটু তুমি উঠেই খাবার দাও না, সিরিয়াসলি প্রচন্ড খিদে পেয়েছে।”
“শোনো প্রণয়, তোমার যদি এতই খিদে লেগে থাকে নিজ হাতে নিয়ে খেয়ে নাও। অযথা আমার ঘুম নষ্ট করে কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করো না। আমি ঘুমোলাম।”
বলেই নিসা কাত হয়ে চোখ বুজে ফেলল।

এদিকে প্রণয় খিদের যন্ত্রণায় পেটে হাত দিয়ে বসে আছে। আর মনে মনে ভাবল, “এই ঘুম ঘুম করে আজ অবধি সকালের নাস্তা বউয়ের হাতে করার সৌভাগ্য হলো না।”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেই মনে হলো রাতের কথা। নিসা বলেছি ওর কিছু ওষুধ আর সেনোরা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওষুধ না হলেও সেনোরা তার লাগবেই লাগবে।

প্রণয় দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। লুঙ্গি চেঞ্জ করে প্যান্ট আর একটি টিশার্ট গায়ে দিয়ে রুমের দরজা খুলে বের হতে নিলেই মনে হলো মানিব্যাগ আর নিসার প্রেসক্রিপশনের কথা। দরজা থেকে ফিরে এসে টেবিলের উপর থেকে প্রেসক্রিপশন আর মানিব্যাগ নিয়ে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে প্রণয় বেড়িয়ে গেল। গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে স্টার্ট দিতেই পেছন থেকে ডাক দিল রেখা। প্রণয় মাথা উঁচু করে দ্বিতীয় তলায় তাকাতেই রেখা বলল,
“এত সকাল বেলা কাউকে কিছু না বলে কোথায় যাওয়া হচ্ছে প্রণয় বাবু?”

“কোত্থাও না ভাবি। জাস্ট রাস্তার ওপাড়ে যাচ্ছি আপনার ননদের কিছু ওষুধ নিয়ে আসতে। অফিস চলে গেলে তো পারব না, তাই এখনি নিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম।”
“ও আচ্ছা, তাহলে যাও। তবে দ্রুত চলে এসো। সবাই কিন্তু খাবার টেবিলে তোমার জন্য বসে থাকবে, বুঝেছ?”
“আচ্ছা ভাবী।”
বলেই মুচকি হেসে প্রণয় বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।

সকাল ৯টা। নিসা সবেই ঘুমে থেকে উঠে ঢুলু ঢুলু চোখে প্রান্তর ঘুমন্ত মুখটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে রয়েছে।
এদিকে শিল্পী একপ্রকার দৌড়ে নিসার রুমে এসে বলল,
“নিসা, দ্রুত বোরখাটা পড়ে নেয়। এক্ষুনি মার্কেটের দিকে একবার যেতে হবে।”

“কেন ভাবি কি হয়েছে? এত সকাল বেলা কোথায় যাবে? আর আমি তো এখনো মুখটাও ধুইনি।”
“মুখ পড়ে ধুলেও চলবে। আগে চল আমার সাথে।”
“তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেন? কী হয়েছে আগে সেটা তো বলো।”

শিল্পী ডুব গিলে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“প্রণয়প্রণয়ের বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে। মাত্রই এলাকার এক খালু দেখে এসে বলেছে বাবাকে।”
নিসা এক লাফে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল,
“কি? কি বলছ তুমি? ওর এক্সিডেন্ট হয়েছে মানে কি? ও তো ঘরেই ছিল। ও বাহিরে গেল কখন?”

“ঘন্টা খানেক আগেই বের হয়েছিল তোর ওষুধ আনতে। আর তখনই হয়তো”
নিসা ড্রয়ার থেকে বোরখা বের করে সেকেন্ডের মাঝে পড়ে নিল। বড় একটা ওড়না গায়ে পেঁচিয়ে রুম থেকে বেড়োতে বেড়োতে বলল,
“ওর এরকমই হবে। নিশ্চয়ই হাত পা ভেঙে মাঝ রাস্তায় বসে আছে। তুমি জানো ভাবি, বছর খানেক আগেও একবার এরকম হয়েছিল।

কত বুঝিয়েছি এত বাইক বাইক করো না, এগুলোর দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয় লাভ হয় না। কিন্তু কে শোনে কার কথা, ওর তো এটা নেশা হয়ে গিয়েছে কীভাবে ছাড়বে! যত্তসব”
বলেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিসা। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখে তার মা নাদিরা খাতুন মুখে ওড়না চেপে কাঁদছে। আর বলছে,
“প্রণয়রেএ কি হলো তোর”

মায়ের এরকম অদ্ভুত, বিভৎস কান্না নিসার সহ্য হলো না। বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
“আশ্চর্য! এভাবে মরা কান্না কাঁদছ কেন? তোমার কান্না দেখে তো মনে হচ্ছে প্রণয় একেবারে মরেই গিয়েছে। এসব নাটক বন্ধ করো আর প্রান্তর কাছে যাও। ও ঘরে একা।”
বলেই নিসা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেম যেতে লাগল। পেছন পেছন যেতে লাগল। সুলতান সাহেব সহ রাফি ও শিল্পী।
মেয়ের এরকম কঠোর কথা বলে যাওয়া দেখে নাদিরা খাতুন আরও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন,
“আল্লাহ আমার মেয়েকে তুমি আরও শক্ত হবার শক্তি দাও।”

রাস্তার মোড় পেড়িয়ে মার্কেটের দিকে যেতেই দেখে রাস্তার মাঝে শত মানুষের ভিড় জমে আছে। আশেপাশে কিছু পুলিশেরও দেখা মিলছে। এতক্ষণ নিসা মনে মনে শক্ত থাকলেও এখন কেমন যেন ঘাবড়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছে তার। শিল্পীর হাত শক্ত করে ধরে কাপা গলায় বলল,
“ভাবী, ওখানে কি হয়েছে? ওখানেই কি প্রণয় না-কি অন্য কোথাও? সবাই কি ওমন হা করে প্রণয়কে দেখছে না-কি অন্য কাউকে? আর পুলিশ এসেছে কেন? ওখানে যদি প্রণয় থাকে তাহলে তো পুলিশের আসার কথা না। সামান্য এক্সিডেন্টের ঘটনায় পুলিশ আসে না-কি!”

শিল্পী কিছুই বলল না, কেবল নিসার আড়ালে চোখের জল মুছে নিল। নিসা খানিকটা সামনে যেতেই দেখল তার বাবা সুলতান সাহেব রাস্তার মাঝের ওই ভিড় যুক্ত জায়গাতেই যাচ্ছেন। নিসাও কোনো কথা ছাড়া বাবার পেছনে পায়ে পা মেলাতে শুরু করল। যতই কাছে যাচ্ছে মানুষ তাদের আস্তে করে সাইড দিয়ে দিচ্ছে।

বেশ অবাক লাগছে নিসার! অন্য সময় তো ভীরে ঢুকতে হলে ধাক্কা দিয়ে ঢুকতে হয় আজ কেন সবাই তাদের আপনাআপনি জায়গা করে দিচ্ছে! কেন সবাই তাদের দিকে এভাবে হা হয়ে তাকিয়ে আছে! চুলের ফাঁক দিয়ে চিকন ঘাম বয়ে যাচ্ছে কপাল জুড়ে নিসার। সেই ঘাম ওড়না দিয়ে মুছে ভীড় পার হয়ে মাঝে যেতেই নিসার হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।

পুরো রাস্তা জুড়ে রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আর তার মাঝে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে প্রণয়। তার ঠিক একহাত দূরে মাথার তালু ছিঁড়ে ছিটকে পড়ে আছে প্রণয়ের মগজ। মাথার মাঝ বরাবর ফাঁক হয়ে আছে প্রণয়ের। নতুন বাইকটি চূর্ণবিচূর্ণ অবস্থা পড়ে আছে প্রণয়ের পায়ের উপর। আর তার ঠিক পাশেই পড়ে আছে নিসার প্রেসক্রিপশন সহ ওষুধের প্যাকেট ও সেনোরার প্যাকটি।

পর্ব ২৭

নিসা ধপাস করে প্রণয়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল। বাইকের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে থাকা প্রণয়ের আঙুল গুলো আলতো করে ছুঁয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“এটা তো আমার প্রণয়ের পা। হ্যাঁ আমার প্রণয়ের পা এটা। ও বাবা বাবা, তোমরা দেখছ না এটা প্রণয়ের পা? তাহলে বাইকের অংশগুলো তুলছ না কেন? ও ব্যাথা পাচ্ছে বুঝতে পারছ না?”

বলেই নিসা বসে থাকা অবস্থাতেই প্রণয়ের পায়ের উপর থেকে বাইকের অংশ বিশেষ গুলো ধাক্কা দিয়ে সরাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু নিসা শক্তির সাথে পেরে না উঠায় বাইকের অংশগুলো তার হাত ফসকে প্রণয়ের পায়ের উপর আবার পড়ে যায়। নিসা কোনো প্রকার কান্না ছাড়া একটা পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে চোখ পাকিয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা কি মানুষ? দেখতে পারছ না আমার হাত ফসকে বারবার এই ভারী জিনিসগুলো প্রণয়ের পায়ে পড়ছে। ওর পা টা কি থেতলিয়ে দেয়ার ইচ্ছে আছে না-কি! হাত লাগাতে পারছ না, এগুলো উঠিয়ে ওর পা টা মুক্ত করতে।”

রাফি কি বলবে মাথায় খেলছে না। দুজন মানুষ ডাক দিয়ে প্রণয়ের পায়ের উপর থেকে বাইকের অংশগুলো তুলে দিল।
রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা নিসার ওষুধ, প্রেসক্রিপশন আর সেনোরার প্যাকটি কুড়িয়ে নিয়ে নিসা প্রণয়ের মাথার কাছে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে প্রণয়কে উপুড় থেকে সোজা করে মাথা নিজের কোলে রাখল। সেকেন্ডের মাঝে প্রণয়ের মাথা বেয়ে ঝড়া রক্ত দিয়ে ভেসে যাচ্ছে নিসার বোরকা। মাথার মাঝখানে ফেঁটে দু-ভাগে হয়ে আছে।

আর মগজ টা ঠিক নিসার হাঁটুর পাশেই থেতলে পড়ে আছে। নিসা এতক্ষণ স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও প্রণয়ের এই অবস্থা দেখে আর পারছে না। প্রণয়ের রক্তমাখা মুখটি দেখে বুক ফেঁটে যাচ্ছে তার। প্রণয়ের গালে আলতো করে হাত দিয়ে বলল,
“তোমার ভালোবাসার মূল্য দিতে পারলাম না আমি। পারলাম না তোমার ভালোবাসার মূল্য দিতে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি আমাকে নিয়েই ভেবে গেল আর আমি”
বলেই প্রণয়ের মাথা নিজের বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল নিসা।

হঠাৎই নিসা চোখমুখ মুছে বলল,
“না, প্রণয়ের কিচ্ছু হতে পারে না। ও তো একটু আগেই আমার সাথে কথা বলেছিল, খাবার খুঁজেছিল। ওর তো ভীষণ খিদে পেয়েছে। এই প্রণয় প্রণয়, তুমি খাবে না? কি হলো কথা বলছ না কেন, তুমি খাবে না? তোমার না খিদের যন্ত্রণায় পেট ব্যাথা, বুক ব্যাথা করছিল। চলো বাসায় চলো, আমি তোমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিব।”বলেই প্রণয়কে ঝাঁকাতে লাগল নিসা।

“কি গো উঠছ না কেন? তোমাকে খেতে হবে তো উঠো, উঠো বলছি।”
নিসার এরকম পাগলামো দেখে শিল্পী নিসার পাশে বসে মুখে ওড়না চেপে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“নিসা এরকম করিস না, প্রণয় যে আর উঠবে না। তোর যে সব শেষ হয়ে গিয়েছে। প্রণয় যে তোর সবকিছু সাথে করে নিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছে।”
“না, আমার প্রণয় কোত্থাও যায়নি। আমার প্রণয় আমার কাছেই আছে। দেখতে পারছ না আমার কোলে ঘুমিয়ে আছে। কেন এসব বাজে কথা বলো? আর কখনো এসব বাজে কথা বলবে না।”

শিল্পী নিসার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“এরকম পাগলামো করিস না নিসা। প্রণয় যে সত্যি আর ফিরবে না রে”
নিসা এক ঝটকায় শিল্পীর হাত ছাড়িয়ে বলল,
“তুমি আবার ওসব কথা বলছ! তুমি দেখতে চাও, বলো দেখতে চাও প্রণয় ঘুম থেকে উঠবে। আবার আমাকে নিসা বলে ডাকবে। দাঁড়াও তোমাকে এক্ষুনি দেখাচ্ছি।”

বলেই প্রণয়ের মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে নিসা হাসোজ্জল মুখ করে বলল,
“কি গো উঠো না, এভাবে শুয়ে আছ কেন? শুনতে পারছ না ভাবি কি বলছে? তুমি উঠো না প্লিজউঠে সবাইকে প্রমাণ করে দাও না ওরা মিথ্যা বলছে।”
শিল্পী নিসার হাত দুটো চেপে ধরে বললেন,
“মরা টাকে আর কত মারবি। নিজেকে সামলা নিসা, নিজেকে সামলা।”

“এভাবে বলো না ভাবিআমার যে সহ্য হয় না। বুকটা যে ভেঙে যাচ্ছে।”
বলেই কাঁদতে কাঁদতে শিল্পীর বুকে মাথা ফেলে দিল নিসা।
এরই মাঝে সামির ও নিতু এসে হাজির হলো। ভীড় ঠেলে ভেতরে এসে প্রণয়ের এরকম বিভৎস রূপ দেখে সামির ও নিতুর বুক কেঁপে উঠল। সুলতান সাহেবের দিকে তাকিয়ে সামির বললেন,
“ওকে এখনো এ অবস্থায় রেখে দিয়েছেন কেন? মশা মাছি তো উপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।”

বলেই রাফির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রাফি, একটু ধরোতো। আমার গাড়ি পাশেই আছে ওখানে নিয়ে যাব।”
“জ্বি।”
বলেই প্রণয়কে ধরে সামির ও রাফি গাড়িতে তুলতে নিল।

দূর থেকে প্রণয়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া দেখে পুলিশ দৌড়ে এসে বললেন,
“ডেড বডি এখন কোত্থাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটা এক্সিডেন্ট কেস। তাই ডেড বডি প্রথমে থানায় যাবে তারপর সেখান থেকে মর্গে। ময়নাতদন্ত করার পর যে ফলাফল বের হয়ে আসবে তার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ডেড বডি ঠিক কোথায় যাবে।”

পুলিশের কথা শুনে নিসা বেশ ঘাবড়ে গেল। আর কানের কাছে বাজতে লাগল কিছুদিন আগে বলা প্রণয়ের একটি কথা।”ময়নাতদন্ত আমার ভীষণ ভয় লাগে! কীভাবে কেটে ছিঁড়ে মরা মানুষটাকে আরও ক্ষত বিক্ষত করে ফেলে তাই না নিসা?”

কথাটি বারংবার কানের কাছে বাজতেই নিসা প্রণয়কে বুকে জড়িয়েই বলে উঠল,
“না, প্রণয়কে আমি কোথাও যেতে দিব না। ওর কোনো ময়নাতদন্তের প্রয়োজন নেই। ও যে ময়নাতদন্তকে ভীষণ করে ভয় পেত।”
“মিসেস প্রণয়, আপনার কথায় তো আর আইনি ব্যবস্থা গুটিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করা যাবে না। আমাদের যা দায়িত্ব সেগুলো আমাদের করতেই হবে।”

নিসা দু হাত জোর করে পুলিশকে বলল,
“প্লিজ এরকম করবেন না স্যার। ও ও ভীষণ ভয় পায়।”
বলেই কাঁদতে লাগল নিসা। নিতু নিসার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুমি গিয়ে প্রণয়ের পাশে বসো। আমি তাদের সাথে কথা বলছি।”

“ভাবি, ময়নাতদন্ত করাবো না। প্রণয় ময়নাতদন্তকে অনেক ভয় পায় ভাবি।”
“আমি আছি তো ময়নাতদন্ত হবে না, তুমি ভয় পেয়েও না। তুমি গিয়ে ওর পাশে বসো।”

নিসা গিয়ে প্রণয়ের কাছে বসার মিনিট পাঁচেক পার হতেই নিতু এলো। নিসা ভীত কন্ঠে বলল,
“কী হলো ভাবি? তারা কি প্রণয়কে নিয়ে যাবে? আমি প্রণয়কে নিতে দিব না, ভাবি আমি প্রণয়কে দিব না।”
নিতু গাড়িতে উঠে নিসার মাথায় হাত রেখে বলল,
“আমি থাকতে প্রণয়কে তোমার কাছ থেকে কে নিবে?”
নিসা মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলে প্রণয়ে দিকে তাকিয়ে রইলো।

পর্ব ২৮

বিকেল ৫ টা। নিসার পরিবারসহ প্রণয়ের আত্মীয়স্বজন সকলেই ময়মনসিংহ কাচিজুলি কবরস্থানের গেইটের সামনে প্রণয়ের লাশের খাট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে নিসা চিৎকার করে কাঁদছে তো অন্যদিকে প্রণয়ের মা পারভীন আলম মুখে কাপড় গুঁজে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। এদিকে শাহ আলম সাহেব লাশের খাটের কাছে বসে মৃত ছেলের নিষ্পাপ মুখ দেখে ভাঙা গলায় বললেন,
“তোমরা কি জন্য বসে আছ?

আমি তো বলেছি আমাদের টাকা লাগবে না। আমাদের ছেলেই যখন দুনিয়াতে নেই, ছেলের টাকা দিয়ে কি করব? শুধু শুধু আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে মাটির উপর এতটা সময় রেখে ছেলেটা আযাবের মাত্রা দশগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছ।”
শাহ আলম সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে সামির বললেন,
“ওর অফিসের নির্দেশ আমরা কি করব কাকা। আর প্রণয়ের একটি ছেলে আছে তার ভবিষ্যৎ টাও তো আমাদের বিবেচনা করা উচিৎ তাই না?”
“কিন্তু কতক্ষণ আর কতক্ষণ এভাবে রাস্তার উপর ফেলে রাখব আমার ছেলে কে?”

এর মধ্যেই কবরস্থানের সামনে একটি প্রাইভেট কার এসে থামল। ফাইলপত্র হাতে নিয়ে দু’জন লোক গাড়ি থেকে নামলেন। একজন এসে সামিরকে বললেন,
“আপনারা কি মিঃ প্রণয়ের বাড়ির লোকজন?”
“জ্বি, আপনারা”
“আমরা মিঃ প্রণয়ের অফিস থেকে এসেছি।”

“ও আচ্ছা।”
“আসলে আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত আপনাদের এভাবে বসিয়ে রাখার জন্যে। কিন্তু এখানে আমাদের করাএ কিছুই নেই, এটাই আমাদের ডিউটি। কর্মকর্তার মরদেহ নিজ চোখে না দেখে আমরা কোনোকিছুই করতে সক্ষম নই।”
“হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। অফিসিয়াল নিয়মের উপর তো নিজ সত্ত্বা কার্যকর নয়।”
“জ্বি। এখন মিঃ প্রণয়ের মরদেহটি যদি একবার দেখাতেন!”

“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
বলেই লাশের খাট টির কাছে নিয়ে গেল সামির দু’জনকে। কাফনের কাপড়টি হালকা উঠিয়ে মুখটি দেখাতেই একজন বললেন,
“জ্বি হয়েছে, আর প্রয়োজন নেই। আপনি বরং মুখ ঢেকে দিন।”

বলেই দুজন মিলে কাগজে কী যেন লিখলেন। তারপর একজন বললেন,
“অফিসের নিয়ম অনুযায়ী কোনো উপরস্থ কর্মকর্তার যদি কিছু হয়ে যায়, তখন তার পরিবারকে সামান্য আর্থিক সহায়তা করা হয়ে থাকে। তবে সেটা শুধু সন্তান থাকলেই প্রযোজ্য।”

“হ্যাঁ, প্রণয়ের একটা পুত্র সন্তান আছে।”
“বয়স কত ছেলের?”
“১৭ দিন।”

“অর্থাৎ নাবালক?”
“জ্বি।”
“দেখা যাবে কি?”
“অবশ্যই।”

প্রান্তকে সামির কোলে নিয়ে তাদের দেখাতেই তারা দু’জনেই কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বললেন,
“বাচ্চা যেহেতু নাবালক এই মুহুর্তে টাকা দেয়ার কোনো আইন নেই আমাদের।

১৮+ বয়স হলে তাকে নমিনি করে ইদানীং এর ভেতর টাকা দিয়ে দেয়া হত কিন্তু নাবালকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় নিয়মটি ধার্য্য করা হবে। যে পরিমাণ অর্থই দেয়া হবে না কেন, বাচ্চার নামে ফিক্সড ডিপোজিট করা হবে। বাচ্চার ভবিষ্যতের পড়ালেখার খরচ কিংবা দেখভালের যেন কোন ত্রুটি না-হয় তার জন্যে।”

“ও, আচ্ছা তাহলে আপনাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটাই করুন। আমাদের হাতে তেমন সময় নেই তো, অনেকক্ষন হয়েছে বসে আছি আমরা।”
“জ্বি অবশ্যই।”
এরই মাঝে নিসার ভাই রনি বলল,
“কত টাকা ডিপোজিট করা হবে?”

এরকম একটা পরিস্থিতিতে এরকম প্রশ্ন আসতে পারে অফিসিয়াল লোক দুটো ভাবতে পারেনি। বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,
“লাখ দশেক।”
রনির চোখ দুটো বেশ বড় বড় হয়ে গেল। তবে কিছুই বলল না।

অফিসের দু’জন মিলে বেশ দ্রুত তাদের কিছু কাগজপত্র পূরণ করে নিসা ও প্রণয়ের বাবা শাহ আলম সাহেবের সিগনেচার নিয়ে সামিরের সাথে প্রান্তর বিষয়ে পার্সোনালি কিছু কথা বলে চলে গেলেন। সামির তাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে বললেন,
“লাশ তাহলে কবরস্থানের ভেতরে নেয়া হোক।”

প্রণয়কে মাটি দিয়ে এসে যে যার মত গোসলে চলে গেল। নিসাকে গোসল করিয়ে পড়ানো হলো একটি সাদা কালো মেলানো ছাপা শাড়ি। হাতের চুরি, নাকের ফুল সব খুলে নেয়া হলো। নিসাও নিঃশব্দে সবকিছু খুলে দিয়ে দিল। ভেজা চুল টান টান করে খোঁপা বেঁধে দিল রেখা। খোলা চুল পেলেই যে প্রণয়ের সাথে করা সকালের ব্যবহারের জন্য নিজের চুল নিজে ছিঁড়ে মুঠ ভরে ফেলে নিসা।

এদিকে শিল্পী প্রান্তকে কোলে নিয়ে নিসার সামনে বসে বলল,
“প্রণয়ের জন্য কি এই ১৭ দিনের বাচ্চাটাকেও মেরে ফেলবি নিসা? সকাল থেকে এই দুধের শিশু টা না খেয়ে আছে সেই খেয়াল আছে তোর? এতটুকু বাচ্চা কি মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতে পারে? এই নিয়ে কতবার চেষ্টা করলাম সেরেলাক খাইয়ে পেট টা অন্তত ভরা থাকুক। প্রতিবারই দু তিন চামচ খেয়ে আর মুখে নিচ্ছে না, এভাবে চলতে থাকলে তো বাচ্চা বাঁঁচবে না।”

শিল্পী কথাগুলো বললেও নিসার মাঝে কোনো পরিবর্তন এলো না। সে তার আগের মতই সোজা হয়ে বসে আছে। শিল্পী জোরে ঝাঁকি দিতেই নিসা চমকে উঠল! চোখ বেয়ে নোনা জলরাশী বয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল,
“প্রণয়, আমার প্রণয় কোথায়? তোমরা কেমন করে আমার প্রণয়কে মাটি চাপা দিয়ে দিলে? তোমরা মানুষ না, কষ্ট হয় না তোমাদের? কীভাবে পারলে ওই গর্তে ওকে একা ছেড়ে দিতে?”

বলেই চিৎকার করে কাঁদতে লাগল নিসা। শিল্পী নিসার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“শান্ত হো নিসা, শান্ত হো। এভাবে করলে যে তুইও বাঁচবি না। তোর একটা সন্তান আছে এটা ভুলে গেলে কি চলবে?”
বলেই প্রান্তকে জোড় পূর্বক নিসার কোলে চাপিয়ে দিল শিল্পী। কেননা এটাই একমাত্র অস্ত্র যা দ্বারা নিসা ঘায়েল হতে পারে। শান্ত হতে পারে।
নিসা প্রান্তকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রান্তর মুখটির দিকে তাকাতেই যেন আরও পাগল হয়ে গেল। প্রান্তর চোখেমুখে হাত দিয়ে বলল,
“ওই চোখ, ওই নাক, ওই ঠোঁট! সবকিছুই একদম প্রণয়ের মত। এত মিল হলো কেন? এতটা মিল নিয়েও কি কেউ জন্মায়?”

বলেই প্রান্তকে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“এত মিল কেন তোদের দুজনের চেহারায়? ও থাকবে না বলেই কি আল্লাহ তোকে হুবহু ওর মত করে আমার কোলে পাঠিয়ে দিল? এই মুখটা যে আমাকে জীবিত করেও বারবার মেরে ফেলছে। আমি পারছি না, আল্লাহ আমি পারছি সহ্য করতে।”

রেখা নিসার মাথা হাত বুলিয়ে বলল,
“কাঁদিস না, তোকে যে শক্ত হতে হবে। নিজের জন্য না হলেও প্রান্তর জন্য হলেও তোকে শক্ত হতে হবে।”
বলে নিজেও চোখের জল ছেড়ে দিল রেখা। কিন্তু নিসা কান্নার মাঝেই হঠাৎ করে থেমে গেল রেখার কথা শুনে। প্রান্তর দিকে এক পলক তাকিয়ে মনে পড়ল শিল্পীর কথাটি। প্রান্ত যে না খেয়ে আছে। ভাঙা গলায় বলল,
“ভাবি, আমাকে একটু শোয়ার ব্যবস্থা করে দিবে? মাথাটা ভার হয়ে আছে। ছেলে টাকে নিয়ে আমি শুয়ে পড়ি।”

শিল্পী বলল,
“খাবি না? না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বি?”
“প্লিজ ভাবি খাওয়া শব্দটা এই মুহুর্তে উচ্চারণ করো না।”

“কিন্তু”
শিল্পীর কথা শেষ হবার আগেই রেখা বলল,
“জোর করিস না, সব সময় সব জোর মানায় না। তার থেকে বরং হাত লাগা বিছানাটা করে দিই। এই মুহূর্তে শুয়ে পড়াটাই নিসার জন্য উত্তম।”
প্রান্তকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে কপালে একহাত দিয়ে চোখ বুজে আছে নিসা। চেষ্টা করছে ঘুমোতে কিন্তু ঘুম পাখিরা কি আর সহজে ধরা দেয়! খাঁচা নজরে পরলেই যে উড়াল দেয় অন্য ভুবনে কিংবা খোলা আকাশে।

ঠিক যেমনটা ঘুম উড়ে গিয়েছে নিসার চোখ থেকে। হাজার চেষ্টা করেও যখন ঘুমকে সঙ্গী করতে পারল না, ঠিক তখনই মনে পড়ল প্রণয়ের একটি কথা। যেটা কি-না ৪/৫ দিন আগে সে নিসাকে বলেছিল।”কি করব বলো গত ২ মাস হলো তোমার ধারের কাছেও যেতে পারি না। যাবারা আগেই চেঁচামেচি শুরু করো। আমি তো আর সন্ন্যাসী না, সংসারী পুরুষ। বদ্ধ ঘরে বউয়ের একাকী সান্নিধ্য তো পেতে ইচ্ছে করে।”

কথাটি মনে পড়তেই চোখ দুটো ভরে উঠল নিসার। মনে মনে বলল,
“আর হলোই না মিল আমাদের! আমাকে কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা টাই তোমার সঙ্গী হলো! সঙ্গী হবার সৌভাগ্য আমার হলো না!”কাঁদতে লাগল নিসা। তবে এ কান্না সবার জন্য নয়, এ কান্না খোলা আকাশের মত উন্মুক্ত নয়। এ কান্না বদ্ধ ঘরের এক কোণে লুকিয়ে রাখার জন্য প্রযোজ্য। সব কথা যে সবাইকে বলা যায় না। সে যতই বুক ফাঁটা আর্তনাদ হোক না কেন, আক্ষেপ হোক না কেন! নিজের মাঝে সযত্নে গোপন রাখাই শ্রেয়।

পর্ব ২৯

নিসা ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেই শাহ আলম সাহেব বললেন,
“বৌমা, তুমি কি তোমার বাবা মায়ের সাথে চলে যাবে?”
“সবাই তো তাই চাচ্ছে বাবা।”

“তোমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই? স্বামীর ভিটেবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বুক কাঁপবে না?”
নিসা মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। শাহ আলম সাহেব নিসার নীরবতা দেখে বসার রুমে চলে গেলেন। নিসার বাবা সুলতান সাহেবের কাছে। সোফায় বসতে বসতে বললেন,
“বেয়াই মশাই, আপনারা কি নিসা আর প্রান্ত কেও সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন?”

“এছাড়া আর কি করব বলেন। মেয়েটা এখন মায়ের কাছে থাকলেও শান্ত হবে। একা থাকা এই মুহূর্তে ওর জন্য মোটেও কাম্য নয়।”
“আমরা তো ওকে একা রাখব না, আর প্রান্তও তো আছে। আপনারা দয়া করে ওদের নিয়ে যাবেন না। আমার যে ওরা ছাড়া কেউ নেই। আমার প্রণয়ের শেষ চিহ্ন প্রান্ত। প্রান্তকে আমাদের থেকে কেড়ে নিবেন না প্লিজ।”

বলতে বলতেই কেঁদে ফেললেন শাহ আলম সাহেব। সুলতান সাহেব বললেন,
“কাঁদবেন না প্লিজ! দেখুন, আপনি যেরকম আপনার ছেলেকে ভালোবেসে আপনার ছেলের শেষ চিহ্নের কথা বললেন, তেমনি আমিও তো আমার মেয়ের কথা ভাবব। তবে আপনি কষ্ট পাবেন না, নিসা প্রায়ই এসে প্রান্তকে আপনাদের সাথে দেখা করিয়ে নিয়ে যাবে। আর আপনারাও মাঝেমধ্যে যাবেন, গিয়ে নিজের নাতিকে দেখে আসবেন। বাঁধা কোথায়?”

পাশ থেকে সামির বলে উঠলেন,
“এখানে বাঁধার প্রশ্ন আসছে না কাকা। এখানের মূল কথা হচ্ছে, এই অবস্থায় তাও আবার সদ্য বিধবা হওয়া বউ মানুষ কীভাবে স্বামীর ভিটেবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি গিয়ে থাকে সেটা নিয়ে। স্বামী মারা গিয়েছে তো কি হয়েছে? তার তো একটা ঠিকানা আছে। মাথার উপর ছাতা হওয়ার মত দুজন বাবা মায়ের ন্যায় শ্বশুর শাশুড়ি আছেন। আর কি লাগে?”

“সামির, আপনারা কেবল আপনাদের দিকটাই দেখছেন। আমাদের দিকটা কিন্তু দেখছেন না। আমার মেয়ের এই দুর্দিনে যদি বাবা মা হয়ে আমরা পাশে না থাকি লোকে কি বলবে ভেবে দেখেছেন?”
“ও তারমানে আপনারা লোকজনের ভয়ে মেয়ের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন, নিজেদের জন্যে না!”
“আমি কিন্তু সেটা বুঝাতে চাইনি।”

“কম বেশি বুঝ ক্ষমতা আল্লাহ আমার মাঝেও দান করেছেন কাকা। তাই আমাকে আর আপনার বুঝাতে হবে না। তবে একটা কথা ভুলে যাবেন না, আপনার মেয়ের জীবনে দুর্দিন কিংবা দুর্দশা কিন্তু আজই প্রথম আসেনি। ৫ বছর আগে অর্থাৎ বিয়ের পরের বছর গুলিও কিন্তু কম দুর্দশার দিন ছিল না। আর তখন কিন্তু হারিকেন দিয়েও আপনাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই প্রণয়ের বাবা-ই কিন্তু পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।”

রনি বলে উঠল,
“এখন আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, আমার এই অল্প বয়সী বোনকে এই অজপাড়াগায়ে ছেড়ে চলে যাব?”
“উহুআমি একটাই কথা বলতে চাচ্ছি, আপনাদের বোনকে যেখানে খুশি নিয়ে যান কিন্তুআমার ভাতিজার যেন কোনো অবমূল্যায়ন না হয়।”
বলেই সামির শাহ আলম সাহেবকে বললেন,
“আর না কাকা, নিসাকে নিয়ে যেতে দিন।”

প্রণয় মারা যাবার ৫ম দিনের দিন নিসার বাবা ভাই গিয়ে নিসার ফ্ল্যাটের ভাড়া মিটিয়ে সব জিনিসপত্র নিয়ে এলো। নিসার রুমে সবকিছু সাজাতে নিলে নিসা জিনিসগুলো হাতিয়ে করুণ কন্ঠে বলল,
“এখানে প্রতিটা জিনিস প্রণয়ের কতটা কষ্টের টাকার এটা কেবল আমি জানি। এই ফ্রিজ কেনার জন্য কত কিছুই না করেছিল। এই খাট, এই আলমারি সবকিছুই বিন্দু বিন্দু করে আমার খুশির জন্য আমার সুখের জন্য করেছিল নিজেকে কষ্ট দিয়ে। কিন্তু আজ এই সবই আছে শুধু নেই প্রণয়।”
বলেই মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগল নিসা।

রেখা নিসার দু কাঁধ ধরে মেঝে থেকে উঠিয়ে রুমের বাহিরে নিয়ে গেল। নয়তো যে নিসা আরও কাঁদবে। ভেঙে পড়বে। যেটা তারা কিছুতেই চায় না। রেখা নিজ রুমে নিসাকে নিয়ে চলে গেল। পেছন পেছন এলো শিল্পীও। বিছানায় বসতেই নিসা বলল,
“ভাবী, আমার সাথেই কেন এমন হলো? আমি কি এমন অপরাধ করেছিলাম যার কারণে আমার ভাগ্যে এরকম অসহ্যনীয় পরিস্থিতি এসে দাঁড়ালো! এত কষ্টের পর সবেই তো সুখের মুখ দেখেছিল প্রণয়। ৬ মাসও পেরোয়নি। এখনি কি এই দুর্ঘটনার প্রয়োজন ছিল?”

নিসার করা একটি প্রশ্নের উত্তরও রেখা বা শিল্পীর কাছে নেই। তাই এই মুহুর্তে তাদের কি বলে নিসাকে সান্ত্বনা দেয়া উচিৎ সেটাও তারা বুঝতে পারছে না। কেবল নিসার মাথায় হাত রেখে ভরসা দেবার চেষ্টা করছে।
এদিকে রনি ও রাফি নিসার রুম সাজাতে ব্যস্ত হতেই সুলতান সাহেব রুমে এলেন। বললেন,
“তোদের সাথে কিছু কথা ছিল।”

রনি বলল,
“হুম বলো বাবা।”
“বস আগে।”

ইতিমধ্যে নাদিরা খাতুনও রুমে চলে এলেন। বিছানার চার কোণে চারজন বসতেই সুলতান সাহেব বললেন,
“মেয়েটার জীবন তো তছনছ হয়েই গেল। বাবা হয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তো আমাকেও ভাবতেও হয় তাই না? তোদের দুজনের সংসার আছে। আজ ভালো আছিস, সবাই মিলে একত্রে আছিস ভবিষ্যতে না-ও থাকতে পারিস। নিসাকে উটকো ঝামেলা মনে করতেই পারিস।

তাই আমি আর তোর মা মিলে ঠিক করেছি আমাদের এ বাড়ির সামনে যে ২৫ কাঠার উপর একটা টিন শেড বিল্ডিং করে ভাড়া দিয়ে রেখেছি সেটা ওর একার নামে কাগজে-কলমে করে দেব। যাতে ভবিষ্যতে নিসা এখানে থাকলেও ওই বাড়ির ভাড়ার টাকা দিয়ে যেন ও প্রান্তকে নিয়ে চলতে পারে। হাত খরচের টাকাটা যেন জোগাড় হয়ে যায়। এখন তোরা কি বলিস? এতে কি তোদের কোনো দাবি দাওয়া আছে?”

রনি কিঞ্চিৎ ভ্রু কুচকে ফেললেও রাফি বেশ উৎসুক কন্ঠে বলল,
“কিসের দাবি দাওয়া বাবা? এটা তো খুব ভালো কথা বলেছ। আমার এতে কোনো সমস্যা নেই। তুমি ওই বাড়িটা নিসার নামেই দিয়ে দাও।”
ছোট ছেলে রাফির মুখে কথাটি শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সুলতান সাহেব ও নাদিরা খাতুন। বড় ছেলে রনির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কী রে তুই এ ব্যাপারে কি বলবি?”

রাফির মত বেশি একটা খুশি প্রকাশ করতে না পারায় বাবা মায়ের সামনে বেশ বিপাকে পড়ে গেল রনি। হাঁসফাঁস করতে করতে বলল,
“মন্দ না ভালোই হবে।”
“যাক তাহলে তোদের দুজনের আমাদের সিদ্ধান্তের উপির কোনো অমত নেই। আমরা তো এটা নিয়ে বেশ টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। যাক গে, তাহলে কালকেই আমি উকিলের কাছে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিয়ে আসব।”

রাফি বলল,
“হ্যাঁ বাবা। তুমি কালই গিয়ে একবার ঘুরে আসো। আমার মতে যত দ্রুত সম্ভব এ কাজটা করে ফেলাই ভালো।”বলেই এক পলক রনির দিকে তাকালো রাফি।
সুলতান সাহেব বসা থেকে উঠে বললেন,
“হুম, তাই করব।”

বলেই সুলতান সাহেব চলে গেলেন। পেছন পেছন চলে গেলেন নাদিরা খাতুনও।

প্রণয় মারা গিয়েছে আজ ২ বছর পূর্ণ হলো। কবর জিয়ারত করে শাহ আলম সাহেব চোখের জল মুছে বাড়ি চলে গেলেন। মনমরা হয়ে বাড়ির গেইট পার হয়ে রুমে ঢুকতেই পারভীন আলম ছলছল চোখে কাপা স্বরে বললেন,
“ছেলেটাকে তো হারালাম এবার কি নাতি টাকেও হারাবো?

প্রান্তর সেই ১৭ দিন বয়সে প্রণয়ের শেষ কাজে দেখেছিলাম। আর না নিসা এলো প্রান্তকে নিয়ে, আর না তুমি আমাকে নিয়ে গেলে। নিসার না’হয় প্রয়োজন নেই আমাদের কিন্তু আমাদের তো প্রয়োজন আছে প্রান্তকে। নিসার না আসা নিয়ে রাগ করে আমরা কেন প্রান্তর থেকে দূরে থাকব? প্রণয়ের ছায়া, প্রণয়ের গন্ধ যে পাবো প্রান্তর গায়ে। তোমার পায়ে পড়ি আমাকে নিয়ে যাও। একটিবার দেখিয়ে আনো আমার প্রান্তকে।”

বলেই কাঁদতে লাগল পারভীন আলম। শাহ আলম সাহেব কোনো কিছু না বলে ভেতরে চলে যেতে নিলেন। পারভীন আলম দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হঠাৎই থমকে দাঁড়ালেন শাহ আলম সাহেব। পেছনে না ফিরে ভারী গলায় বললেন,
“৩০ মিনিটের মাঝে রেডি হও। প্রান্তকে দেখতে যাবো।”
বলেই রুমে চলে গেলেন শাহ আলম সাহেব।

মাগরিবের আযান পড়তেই শাহ আলম সাহেব ও পারভীন আলমসহ সামির ও নিতু এসে নিসাদের বাসায় পৌছালেন। তাদের ড্রয়িং রুমে বসতে দিয়ে সুলতান সাহেব বললেন,
“কী ব্যাপার বেয়াই মশাই, আজ হঠাৎ না জানিয়ে এলেন যে! আগে থেকে বলে আসলে তো আমরা এগিয়ে গিয়ে নিয়ে আসতাম।”

“না সমস্যা নেই।”
“তো কেমন আছেন বলুন? আপনাদের তো কোনো খবরই নেই। ছেলেটা মারা যাবার পর তো একটিবারের জন্যেও ছেলে বউ আর নাতিকে দেখতে এলেন না যে, তারা কীভাবে আছে!”

পর্ব ৩০

শাহ আলম সেহেব বেশ দৃঢ় গলায় বললেন,
“এই প্রশ্নটা উল্টো যদি আপনাদের করি কিংবা নিসাকে করি যে, ছেলে আমার মারা গেল ২ বছর হলো আজ। এই ২ বছরে একদিনও কি আপনারা কিংবা নিসা সময় পায়নি যে একবার অন্তত কবরটা জিয়ারত করে আসার? আমাদের দেখতে না যাক, অন্তত যার ঘর করেছে তার জন্য দু-হাত তুলে মোনাজাত তো করার দরকার ছিল তাই না?”

সুলতান সাহেবের মুখ চুপসে গেল। পাশ থেকে রনি বলে উঠলো,
“আপনি কি বাড়ি বয়ে এসে ঝগড়া বাজাতে এসেছেন?”

নিতু পাশ থেকে বলল,
“রনি, সাবধান!”
রনি আর কিছুই বলতে পারল না। ইচ্ছে তো করছে মহিলাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে। কিন্তু সে পারবে না, তার হাত বাঁধা। তাই মুখ ফিরিয়ে চুপ হয়ে গেল রনি।

শাহ আলম সাহেব বললেন,
“বাজানোর হলে আগেই বাজাতাম। দু বছর পর আসতাম না। আর যেখানে আমার ছেলেই নেই, সেখানে আমার ঝগড়া বাজানোর প্রয়োজনই বা কি! আমি তো এসেছি আমার স্ত্রীর চোখের জল ঘোচাতে। ছেলেকে তো বুকে ফিরে পাবে না, তাই ছেলের ছায়াকেই বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।”

পারভীন আলম বললেন,
“আচ্ছা, নিসা প্রান্ত ওরা কোথায়? ওরা কি ভেতরে? আমি একবার ওদের কাছে যেতাম।”
রেখা সবেই চা নাস্তা নিয়ে এসেছিল। পারভীন আলমের সামনে চায়ের কাপ ধরে বলল,
“আগে হালকা পাতলা কিছু মুখে দিয়ে নিন আন্টি, তারপর না-হয় আমিই আপনাকে নিয়ে যাব।”

“না মা এই মুহুর্তে আমি কিছুই খাবো না, বরং তুমি পারলে আমাকে ওদের কাছেই নিয়ে চলো।”
“একটু তো কিছু মুখে দিন আন্টি। অন্তত এক কাপ চা! জার্নি করে এসেছেন তো চা টা খেলে ভালো লাগবে।”
“আমি সত্যি এখন কিছু খেতে পারব না, জোর করো না।”
“আচ্ছা বেশ, তবে চলুন আমার সাথে।”

রেখা কাপটি রেখে পারভীন আলমকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে লাগল। নিসার রুমের কাছে যেতেই দেখে নিসার হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখে নিসা বিছানায় শুয়ে পায়ের উপর পা সোজা করে রেখে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বেশ জোরে জোরে হাসছে। আর মেঝেতে প্রান্ত ভেজা প্রস্রাবের উপর বসে ঠোঁট বাঁকিয়ে কাঁদছে। পারভীন আলমের বুক কেঁপে উঠল দৃশ্যটা দেখার পর। রেখা রুমে ঢুকতে নিলে রেখার হাত শক্ত করে ধরলেন পারভীন আলম। বললেন,
“অন্য রুমে একটু যাবে আমার সাথে?”

“জ্বি অবশ্যই।”
রেখা তার নিজ রুমে পারভীন আলম নিয়ে যেতেই পারভীন আলম বললেন,
“আমি তোমার মায়ের বয়সী। তুমি এ বাড়ির বউ হলেও আমি মনে করি তুমি সবার আগে একজন মানুষ। সেই মনুষ্যত্ব বোধ থেকে আমি যা প্রশ্ন করব তার উত্তর দিবে আশা করছি।”

রেখা বিচলিত হয়ে গেল পারভীন আলমের কথা শুনে। সেই বিচলিত হওয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে পারভীন আলম বললেন,
“নিসা কি সত্যি প্রান্তর যত্ন আদ্দি করে? ওর খেয়াল রাখে? একজন মায়ের ভুমিকা পালন করে?”

এই প্রশ্নের উত্তর রেখা খুঁজে পাচ্ছে না। তাই মাথা নিচু করতেই পারভীন আলম বললেন,
“প্রশ্নটা কিন্তু তুমি এ বাড়ির কেউ মনে করে করিনি। একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রশ্নটা করেছি।”
“সত্যি বলতে প্রান্তর দেখাশোনা আমরা করি। আর এতে প্রান্ত অভ্যেস ও হয়ে গিয়েছে। প্রান্তর কোনো প্রয়োজন হলে বা খিদে পেলে নিসাকে না, আমাদের বলে। তাই নিসার খেয়াল রাখার প্রয়োজন পড়ে না।”

“প্রয়োজন পড়ে না, না-কি প্রয়োজন করাতে চায় না? কোনো মা যদি নিজে থেকে বাচ্চার সাথে দূরত্ব তৈরি না করে কোনো বাচ্চার সেই দূরত্ব তৈরি করা সাধ্যের মধ্যে নেই। নিসা অবশ্যই অবহেলা করেছে সন্তান ও মায়ের মাঝের সম্পর্কের যার ফলেই প্রান্ত মা’কে না, তোমাদের খুঁজে। আর তার প্রমাণ তো স্বচোক্ষেই দেখে এলাম।”
রেখা এ পর্যায়ে মুখ খুলল,
“কী বলব আন্টি, যার যার মন মানসিকতা।

কোনো মা আছে এক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে স্বামীর স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করে দেয়। আবার এক শ্রেণীর মা আছে যারা ভাবে, সন্তান বুকে নিয়ে স্বামীর স্মৃতি ভেবে ভেবে জীবন পার করলে হবে নাকি! জীবন তো একটাই। এভাবে কাটানো অসম্ভব! এখন এ দুটো ভাবনার মধ্যে তো আমরা পরের বাড়ির মেয়ে হয়ে কিছু করতে পারি না তাই না?”
“নিসা দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি?”

“অল্প বয়সের মেয়ে কি একা থাকতে পার __ এটা তাদের পরিবারের ভাষ্য। প্রণয় মারা যাবার ৩ মাস পড়েই সে বাবা মায়ের কথায় দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হয়েছে। যে একবার প্রণয়ের মত সুদর্শন স্বামী পেয়েছিল তার মন কি যেন তেন স্বামী মানে? তাই এখনো ঘরেই আছে। মন মতো মিলে গেলে যেকোন সময় বিয়ে হয়ে যাবে।”
“সেজন্যই বুঝি ছেলে থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। যাতে নিজে অন্যের ঘরে চলে গেলেও বাচ্চাকে তেমন কাঠখড় পোড়াতে না হয়।”
“দুনিয়াটাই এরকম স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে আন্টি। আমরা কি করব বলেন?”

পারভীন আলম চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। বললেন,
“আমার ছেলের শেষ চিহ্নের এত হেলাফেলা? এত অভক্তি নিয়ে রাখতে বলেছে কে? আমাদের দিয়ে দিক না, আমরা তো যক্ষের ধন করে রাখব।”
“কাঁদবেন না আন্টি। মা হলেই হয় না, সব মায়েরা আপনার মত না।”

ড্রয়িং রুমে প্রণয়ের পরিবার ও নিসার পরিবার সবাই গোল করে বসেছে। নিসা মাথায় ঘোমটা ছাড়াই বসে আছে আর প্রান্ত পারভীন আলমের কোলে। শাহ আলম সাহেব বললেন,
“আমার স্ত্রী স্বচোক্ষে যা দেখেছে তার পরে আমরা চাচ্ছি না, আমাদের নাতিকে এখানে রাখতে। প্রস্রাবের মাঝে পড়ে কাঁদলে আপনাদের কিছু না হলেও আমাদের অনেক কিছু হয়। আমাদের ছেলের শেষ চিহ্ন তো, তাই এসব সহ্য হবে না।”

সুলতান সাহেব বললেন,
“আপনি কি করে জানেন যে, আপনার নাতি এখানে অনাদরে আছে? ভুলে যাবেন না, নাতিটা কিন্তু আমারও। প্রান্তকে আমরা যতটা যত্নে বড় করছি ওতটা আমরা নিজ সন্তানকেও হয়তো করিনি।”
“যত্নের নমুনা কিন্তু অলরেডি দেখা হয়ে গিয়েছে আমাদের।”

“হ্যাঁ আজ একটা ভুল হয়েছে তার কারণ আমরা সকলেই আপনাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাই বলে যে, সর্বক্ষণ এভাবে থাকে তা কিন্তু না। প্রান্তকে আমরা মাটিতে রাখি না পিঁপড়ে ধরবে, মাথায় রাখি না উকুনে ধরবে বলে। আর আপনি বলছেন ওকে আমরা অনাদরে রাখি!”
“লাভ কি সেই আদরের যেখানে মা থাকা সত্ত্বেও মায়ের ছায়াও মেলে না।”

“দেখুন আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ। আপনি কি এটা বুঝতে পারছেন না, মেয়েটার অল্প বয়স। এই বয়সে এমন একটা যুবতী মেয়ে কি করে সারাজীবন একা একা পার করবে?”
“কেন সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কি পার করা যায় না?”

নাদিরা খাতুন বললেন,
“আপনারা কি চাচ্ছেন আমার ২৪ বছর বয়সের মেয়ে সারাজীবন একটা স্মৃতি নিয়ে পার করুক? ক’দিন করেছে সে স্বামীর সংসার যে ওই স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবনটা উৎসর্গ করবে?”

পারভীন আলম বললেন,
“তাই বুঝি বাচ্চাকে মেঝেতে প্রস্রাবের মাঝে ফেলে বিছানার উপর পায়ে পা রেখে
মোবাইল দেখে হাসছিল?”

“আমার মেয়ে কি দেখে হাসছিল সেটা দেখার অধিকার অবশ্যই আপনাদের নেই।”
“আমাদের নাতি যতদিন আপনাদের কাছে থাকবে ততদিন পর্যন্ত সবধরনের অধিকার কিন্তু আমাদের আছে। আমাদের নাতিকে আমাদের সাথে দিয়ে দিন, আমরা এসব অধিকার ফলাতে কখনোই আসব না।”

নিসা বলে উঠল,
“একটা সন্তানকে তার মায়ের থেকে আলাদা করা কোন আইনে আছে দেখাতে পারবেন? আর প্রান্ত কি আপনাদের চেনে না-কি যে গিয়ে আপনাদের সাথে থাকবে? এই মিনিট দুয়েক কোলে নিয়ে বসেছেন বলে কী ভাবছেন, প্রান্ত আপনাদের চেনে গিয়েছে। ওটা তো আমরা সামনে আছি বলে কোলে নিয়ে বসতে বলেছেন।”

পারভীন আলম বললেন,
“এ কদিনে এতটা পরিবর্তন হয়ে গেলে নিসা?”
“না মা, আমি পরিবর্তন হইনি। মানুষ চাইলেই তার সত্ত্বাকে পরিবর্তন করতে পারে না। আমি আগে যেমন ছিলাম তেমনই আছি।”

পর্ব ৩১

“দেখো নিসা আমি কথা বাড়াতে চাচ্ছি না। আমার যা দেখার দেখা হয়ে গিয়েছে আর যা বুঝার বুঝা হয়ে গিয়েছে। নতুন করে বুঝার কিছুই নেই। এখন তুমি তো বিয়ে করবে। আর অবশ্যই বাচ্চাসহ বিয়ে করবে না। তাই বলছি কি তুমি বিয়ে করো না যা ইচ্ছে করো কিন্তু আমাদের বংশধরকে দয়া করে আমাদের কাছে দিয়ে দাও।”
“এটা কি কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন মা? আমার বাচ্চার বয়স কত দেখেছেন? আর বিয়ে করব মানে যে আজ করে ফেলছি তা তো না। দয়া করে আপনারা এই কথাটা আর বলবেন না প্লিজ।”

শাহ আলম সাহেব বললেন,
“তুমি বড় বেয়াদব মেয়ে নিসা। যতটা ভালো ভেবেছিলাম তার কানাকড়িও তোমার মাঝে নেই। একজন বিধবা মেয়ে হয়ে কীভাবে নিজের বিয়ের কথা ভরা মজলিশে বলছ লজ্জা করে না? এমনতো না যে প্রণয় তোমাকে কিছুই দিয়ে যায়নি বাঁচার জন্য। প্রান্তর মত ফুটফুটে একটি ছেলে আছে তোমার। আর বিয়ের কী দরকার? প্রান্তকে বুকে নিয়ে কি জীবন পার করা যায় না?”

সুলতান সাহেব বললেন,
“আপনি কিন্তু আমার মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আপনার কোনো অধিকার নেই আমার মেয়েকে অপমান করার।”
সামির পাশ থেকে বললেন,
“আপনার মেয়েকে কেউ অপমান করেনি আঙ্কেল। প্রণয়ের বউকে প্রণয়ের বাবা শাসন করছে এই যা!”
বলেই নিসার দিকে তাকালেন সামির। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
“নিসা, মন থেকে এখনো প্রণয়ের বউ আছো তো না-কি সেটাও মুছে দিয়েছ?”

নিসা বেশ কড়া গলায় বলল,
“সেই কৈফিয়ত অবশ্যই আপনাকে আমি দিব না।”
“আগের কথা ভুলে গিয়েছ তাই না?”

“ভুলিনি আর ভুলবই বা কেন? আপনি এবং আপনারা সবাই মিলে অনেক সাহায্য করেছেন সেটা আমি কখনোই ভুলব না। তাই বলে যে মুখ বুজে সব সহ্য করব সেটাও কিন্তু না।”
সামির চোখে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বললেন,
“আজ বড্ড আফসোস হচ্ছে। তোমার এই রূপটা প্রণয় কেন দেখে গেল না! তারও তো জানার প্রয়োজন ছিল সে কার জন্য এত কষ্ট করেছে।”

নিতু বললেন,
“ঠিক বলেছ। আমি এতক্ষণ যাবৎ চুপ থেকে এই একটা কথাই ভেবেছি। ওকে চেনার ভীষণ রকম দরকার ছিল প্রণয়ের।”
নাদিরা খাতুন বললেন,
“আপনারা কি বাড়ি বয়ে এসেছেন অপমান করার জন্যে? যদি সেরকম চিন্তাভাবনা থাকে তাহলে আগেই বলে দিচ্ছি, দরজা খোলা আছে আপনারা আসতে পারেন।”

নিতু বললেন,
“আপনাদের মত এরকম নোংরা মন মানসিকতার মানুষদের কাছে এর থেকে বেশি কী বা আসা করা যায়? কথায় আছে না, ব্যবহারই বংশের পরিচয়। আপনারাই এরকম নিচু মনের আপনার মেয়ে কোন দিক থেকে ভালো হবে! ঠিকই আছে যেমন মা তার তো তেমন মেয়েই হবে।”
বলেই পারভীন আলমকে নিতু বললেন,
“বাচ্চা ওদের দিয়ে দিন কাকী। ওরা যেরকম বেইমান ওদের পেটে এর থেকে ভালো কিছু হবে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু রক্ত যেহেতু প্রণয়ের যদি মানুষের বাচ্চা হয় একদিন আপনাদের কাছে ফিরে আসবে। আমি এটা বিশ্বাস করি।”

সামির বললেন,
“নিতু ঠিক বলেছে। আমাদের হলে আসবে আর নিসার মত বেইমান, স্বার্থপর হলে নিজের কপাল খাবে।”
পারভীন আলম প্রান্তর চোখেমুখের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছেন। এই মুখটা আর কখনো সে দেখতে পারবে কি-না জানে না। এই মুখটাই যে তার বেঁচে থাকার কারণ হতো কেউ বুঝার চেষ্টা করল না। নিতু পাশ থেকে পারভীন আলমের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“যার সন্তান সে যখন কাঁদে না, আপনি কাঁদলে কী হবে?

যার সন্তান সে যদি ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন পার করতে নারাজ হয় আপনি কেন কষ্ট পাচ্ছেন এই মুখের দিকে তাকিয়ে। আপনার ছেলে তো চলেই গিয়েছে। বুক তো আপনার ভেঙেছে আর কারোই কিছু হয়নি। তাই অন্যের ছেলেকে দেখে কোনো লাভ হবে না। বেইমানের ঘরে বেইমানই জন্ম নেয় এই কথাটা ভুলে যাবেন না। চলুন, অনেক রাত হয়েছে বাড়ি যেতে হবে।”

প্রান্তর চোখমুখে চুমু খেয়ে সোফায় বসিয়ে দিলে পারভীন আলম। সবাই চলে যেতে নিলে নিতু নিসার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“যে যেমন করে সেঠিক তদ্রূপই ফিরে পায়। ফিডব্যাক খুব শীঘ্রই পাবে ইনশাআল্লাহ। সবাই তো আর প্রণয় হবে না।”
নিতুর কথা শেষ হতেই নিসা প্রান্তকে কোলে নিয়ে নিজ ঘরে চলে যায়। কাউকে বিদায় দেয়ার প্রয়োজন বোধটুকুও করল না সে।

কয়েকদিন পর
রাত ৮ টা। প্রান্তকে বাথরুমের ভেতর বাচ্চাদের ছোট কমোডে বসিয়ে নিসা ঘরে মোবাইল টিপছে। এরই মাঝে কারেন্ট চলে যেতেই নিসা এক দৌড় দিয়ে ড্রয়িং রুমে আইপিএস এর কাছে চলে যায়। মিনিট খানেক চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেখা বলল,
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বস।”

“আসলে ভাবি, বাথরুমে প্রান্ত একা। কারেন্ট চলে যাওয়াতে আমি ভয় পেয়ে চলে এসেছি।”
“কী বলছিস এসব? এতটুকু বাচ্চাকে এই অন্ধকারে তাও বাথরুমে ফেলে এসেছিস? তুই কি মানুষ?”

রেখা মোবাইল টর্চ জ্বালিয়ে একপ্রকার দৌড়ে গেল নিসার রুমে। বাথরুমের দিকে লাইট ধরতেই দেখে প্রান্ত চুপচাপ জামা বুক সমান তুলে বাথরুমেই দাঁড়িয়ে আছে। প্রান্তর এই অসহায়ত্ব দেখে রেখার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে গেল। চোখ ছলছল করছে। প্রান্তকে পরিষ্কার করে কোলে চেপে রুমে এনে গা মুছে দিতে দিতে বলল,
“পুরোই বাপ টার মত হয়েছে। শান্তশিষ্ট, কোনো জ্বালাযন্ত্রণা নেই। এই সময় অন্য বাচ্চারা হলে চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলত। সেখানে প্রান্ত নিজের কপাল বুঝে চুপ করে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এদের কপালই কেন খারাপ হয়?”

নিসার ভেতর কেমন যেন লাগল। রেখা বলল,
“এতটাও অবহেলা করিস না নিসা। পরে না তোকেই অবহেলিত হতে হয় সেটাও দেখার বিষয়।”
“আমি কি করব ভাবি? একদিকে বাবা মা বলে প্রান্তকে এত গা ঘেষাস না, আমরা তো আছি। আর অন্যদিকে তোমরা বলো প্রান্তকে আমি অবহেলা করি। তাহলে আমি করবটা কি বলতে পারো?”

“বাবা-মা বললেই হলো তোর কি বিবেক বুদ্ধি নেই? ৭/৮ বছর আগেই তো বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে প্রণয়ের হাত ধরেছিলি তাহলে আজ কেন এত বাধ্য হতে যাচ্ছিস?”

“বাবা মা কিন্তু ভুল বলছে না ভাবি। ছেলে বড় হতে হতে জীবনে অনেক চড়াইউৎড়াই আসবে তখন আমাকে কে দেখবে ভেবে দেখেছ?”
নিসার কথা শুনে রেখার মনে মনে আপনা আপনি ধিক্কার চলে এলো। কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না তার এই মুহূর্তে। এরই মাঝে কারেন্ট চলে এলো। সেই সঙ্গে ঘরে এলো নাদিরা খাতুন ও সুলতান সাহেব। নাদিরা খাতুন বললেন,
“নিসা, তোর সাথে জরুরী একটা কথা ছিল।”

রেখা বলল,
“আচ্ছা মা, তাহলে আপনারা কথা বলুন আমি আসছি।”
“আরে তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমরা এমন কোনো কথা বলব না যে, তুমি থাকতে পারবে না। আর কথাটা তোমার শোনাও দরকার।”
“আচ্ছা মা।”

পর্ব ৩২

নাদিরা খাতুন নিসার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“বিয়ের ঘর এসেছে একটা। ছেলের পৈতৃক বাড়ি যশোর। আর ছেলে নিজেও যশোরে থাকে। নিজের স্কুল আছে বেশ বড় একটা। পরিবার ছোট খাটো। বাবা মা ছাড়া সংসারে আর কেউ নেই। তবে ছোট দু’জন ভাইবোন আছে। দু’জনেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বোন শ্বশুর বাড়ি থাকে আর ভাই তার পরিবার নিয়ে আলাদা থাকে। সবদিক থেকেই ভালো। তবে ছেলে বিবাহিত। ছেলের আগের স্ত্রী মারা গিয়েছে গত ৩ বছর আগে। বাচ্চার কোনো ঝামেলা নেই। এখন তুই কি বলিস?”

নিসা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“আমার ব্যাপারে সব বলেছ?”
“হ্যাঁ, তোর বাবা সবটাই জানিয়েছে। তারা বলেছে তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ তাদের মনেও তো দুর্বলতা আছে। আর হ্যাঁ, তারা কিন্তু প্রান্তকে সহ নিতেও রাজি।”

“তাহলে তো ভালোই। কিন্তু ছেলে কি ঢাকার এদিক আসতে পারবে না? গ্রামে কি করে থাকব? আমার পক্ষে তো গ্রামে থাকা সম্ভব না।”
“ছেলের ওখানে নিজেস্ব স্কুল খোলা। ওই স্কুল ছেড়ে এখানে এসে কি করবে? আর যশোর গ্রামে ছেলেরা থাকে না, শহরেই থাকে। তোর তেমন কোন সমস্যা হবে না।”
“গ্রামের শহর আর এখানের শহরের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক তুমি নিজেও জানো মা। না না, আমি এই বিয়ে করব না। তুমি নিষেধ করে দাও। আমি গ্রামে গিয়ে থাকতে পারব না।”

“তুই গ্রাম টাকে বড় করে দেখছিস কেন? ওদের অবস্থা টার কথা ভেবে দেখ। যশোর শহরে বেশ প্রতাপশালী ছেলেরা। ঐশ্বর্যের কোনো কমতি নেই তাদের। আর সবচেয়ে বড় কথা প্রান্তকে ওরা মেনে নিয়েছে। এটাই তো সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট আমাদের।”
“মা প্লিজ, এতদূর জঙ্গলের কোন অজপাড়াগায়ে আমি যেতে পারব না। অকারণে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।”

“আশ্চর্য! তুই জঙ্গল, অজপাড়াগা কোথায় পেলি? বললাম না যশোর শহরে বাড়ি।”
“যতই শহরে বাড়ি হোক না কেন, আমাদের এখানের তুলনায় কিন্তু জঙ্গলই।”
সুলতান সাহেব নিসার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“এত জেদ করতে নেই মা। তোকে তো প্রান্তর কথাও ভাবতে হবে তাই না? তারা যেহেতু প্রান্তসহ তোকে মেনে নেবে এর থেকে বড় চাওয়া তো আমাদের হতে পারে না।”
“প্লিজ বাবা, আমার ব্যাপারটা তুমি বুঝার চেষ্টা করো। জন্ম থেকে শহরে বড় হয়েছি। এখন তুমি বললেই হুট করে গিয়ে আম গ্রামে ম্যাচ করতে পারব না। আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।

“কিন্তু”
“বাবা প্লিজআমার সিদ্ধান্ত আমার উপরই ছেড়ে দাও।”
নাদিরা খাতুন রেখার উদ্দেশ্যে বললেন,
“রেখা, তুমি কিছু বলছ না যে? তুমি তো পারো ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ব্যাপারটা সামলাতে। ও তো শোনে তোমার কথা।”

রেখা কিছু বলার আগেই নিসা বলল,
“জীবনটা আমার মা। এটা অন্তত ভুলে যেয়েও না।”
বলেই নিসা উল্টো দিক ঘুরে ওয়াড্রবের উপর হাত রেখে কাজ করছে ভান করে দাঁড়িয়ে রইলো।

নিসার এরকম ভাবসাব দেখে সুলতান সাহেব ও নাদিরা খাতুন চলে গেলেন। আর তাদের পাশ দিয়েই ঘরে ঢুকল শিল্পী। রেখার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কী হয়েছে ভাবি? তোমরা সবাই এখানে গোল হয়ে কী কথা বলছ?”

“ওই তো নিসার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে। বাবা মা সেই কথাই বলতে এসেছিল।”
শিল্পীর মুখটা চুপসে গেল সম্বন্ধের কথা শুনে। মুখ বাকিয়ে বলল,
“তো কী হলো?”

“নিসা মানা করে দিয়েছে।”
“কেন? এখানে আবার কী সমস্যা?”
“ছেলে যশোরের নিজেস্ব স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এখন চাইলেই তো ঢাকাতে ট্রান্সফার হতে পারবে না। কিন্তু নিসা গ্রামে থাকতে পারবে না। তাই আর কি”
“ও বুজেছি।”

নিসা ঘুরে শিল্পীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা ভাবি তুমি বলো, আমি কি গ্রামে থেকে বড় হয়েছি। তাহলে এখন গিয়ে কীভাবে গ্রামের কুলো বধু হবো বলো।”

রেখা বলল,
“এতক্ষণ আমি কিছুই বলিনি তবে এখন বাধ্য হচ্ছি বলতে। আচ্ছা নিসা, তোর কাছে গ্রামে থাকাটা বড় ইসু হলো? প্রান্তকে যে নিজের কাছে রাখতে পারবি এটা কিছু না?”

“দেখো ভাবি, প্রান্ত আমার কাছে বড় না-কি গ্রামে থাকাটা বড় সেটা একমাত্র আমিই জানি। এ নিয়ে কৈফিয়ত আমি কাউকে দিব না। তবে হ্যাঁ, যার যার জ্বালা সে সে বুঝে। অন্যকারো বুঝার ক্ষমতা কখনোই হবে না। তোমরা তো গ্রাম থেকে এসে শহুরে বউ হয়েছ তাই তোমরা আমার যন্ত্রণা বুঝবে না।”
“নিসা!”
“রাগ করো না ভাবি। যা সত্য তাই বলেছি।”

বলেই নিসা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।
রেখা রাগে কটমট করে শিল্পীর দিকে একপলক তাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শিল্পীও চলে যেতে নিলে হঠাৎ প্রান্তর কথা মনে পড়ল। দু পা এগিয়ে প্রান্তকে কোলে চাপিয়ে শিল্পীও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে সোজা রেখার ঘরে চলে গেল।

রেখার রুমের দরজ ভেতর থেকে বন্ধ করে শিল্পী বলল,
“ভাবী!”
রেখা চোখের জল মুছে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী ব্যাপার শিল্পী! এখানে এলে যে? আমি হাসছি না কাঁদছি সেটা দেখতে এসেছ?”

“এসব কী বলছ ভাবী? আমরা কি আর দশ পাঁচটা জা’য়ের মত নাকি যে, একজনের কান্না দেখে খুশি হতে ছুটে আসব?”
বলেই শিল্পী এসে বিছানায় বসল। রেখাও বসে এবার কেঁদেই দিল। বলল

পর্ব ৩৩

“যেই নিসাকে নিজের সন্তান সতূল্য ছাড়া ননদের চোখে দেখিনি সেই নিসা আমার সাথে এভাবে কথা বলল! নিসা কি আমাদের থেকে খুব ছোট? চাইলেই তো আমরা ননদ ভাবীর মত বাজে সম্পর্ক তৈরি করতে পারতাম। কোথায় আমরা তো সেই বয়সের হিসেব করে ওরকম বাজে সম্পর্কের সৃষ্টি করিনি, উল্টো সবসময় মায়ের মত ছায়া হয়ে থেকেছি ওর পাশে। কিন্তু নিসাও কী করে পারল আমার সাথে এরকম স্বার্থপরের মতো আচরণ করতে?”

প্রান্তকে কোল থেকে নামিয়ে শিল্পী বলল,
“তুমি না বড্ড বোকা ভাবি। নিসার মতো মেয়ের কথায় তুমি চোখের জল ফেলছ? তোমার চোখের জল কি এতটাই সস্তা?”

“তারপরও গায়ে লাগে শিল্পী। আমরা তো আর দশটা ভাবির মত ওর সামনে আসিনি তাই।”
শিল্পী হেসে বলল,
“প্রণয়ের মত স্বামীও কিন্তু আর একটা আমাদের জানা সত্ত্বে এ ভুবনে নেই ভাবি। সেই প্রণয়ের মত স্বামীকে ভুলতে যদি ওর সময়ের প্রয়োজন না হয় আমরা কী বলো। সবার থেকে সবকিছু আশা করতে নেই, এটাই হচ্ছে বড় কথা।”

রেখা চোখের জল মুছে বলল,
“কথাটি মন্দ বলোনি। সবার কাছে সবকিছু আশা করতে নেই। আবার সবার কথা চলার পথে ধরতেও নেই।”

“জানো ভাবি, নিসাকে আমার এখন দুচোখে দেখতে ইচ্ছে করে না। স্বামীর সংসার করার ইচ্ছা আছে বলেই ওকে সহ্য করছি। নাহলে কবে ওকে সোজা করে ফেলতাম। মাঝে মাঝে তো ইচ্ছে করে প্রান্তকে কাগজে কলমে নিজের করে ওকে মুক্ত করে দেই। ওর জন্য এরকম একটা ফুটফুটে বাচ্চা টার কত অবহেলা হচ্ছে। লাভ কি ওরকম মায়ের সন্তান হিসেবে নাম ধরে থাকার বলো।”

“না শিল্পী, ভুলেও এ কথা মুখে আনবে না। এখন আদর না থাকলেও যখন তুমি এ প্রস্তাব করবে তখন লোক দেখানোর আদরের অভাব হবে না। তাই যেমন আছে তেমনই থাক। আমরা মামী হিসেবেই নাহয় প্রান্তর যত্ন আদ্দি করব।”

“হুম সেই ভালো। কিন্তু নিসা একটি মেয়ে হয়ে এতটা স্বার্থপর কীভাবে হতে পারে সত্যি আমি বুঝি না। আগে যদি বিন্দুমাত্র টের পেতাম যে ও এতটা স্বার্থপর, তাহলে কখনোই এতটা আপন করে নিতাম না।”
“হুম, এসব মেয়েদের জন্যই তো মেয়ের জাতি ও মায়ের জাতি নিয়ে মানুষ কথা বলার সুযোগ পায়।”

হঠাৎ প্রান্ত রেখার হাত ধরে বলল,
“তু তুমা”
রেখা প্রান্তর মাথায় হাত রেখে বলল,
“ওকে নিসার কাছে দিয়ে এসো। না খেয়ে তো আর বাঁচতে পারবে না, বেহায়ার মত খেয়েই না-হয় বাঁচুক।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিল্পী বসা থেকে উঠে প্রান্তকে কোলে চেপে এগিয়ে গেল নিসার ঘরের দিকে।

ভোরের আলো ফুটতেই নিসার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ঘুম চোখে মাথার পাশ থেকে মোবাইল হাতে নিয়ে ডাটা অন করতেই মেসেজ টোনে কান ধরে আসল নিসার। এত মেসেজ কার থেকে এসেছে চেক করতেই দেখে তার ক্লাসমেট অভির আইডি থেকে এসেছে। একে একে সব মেসেজ পড়ে নিসা রিপ্লাই দিল
“কী রে এত মেসেজ দিলি যে!”
নিসা মেসেজ দিতেই অভি সাথে সাথে রিপ্লাই দিল
“পড়ে দেখিস নি?”

“দেখেছি।”
“তাহলে জিজ্ঞেস করছিস যে?”
“আজ সকাল ১০ টায় কলেজে আসবি?”
“কেন?”

“কেন আবার, এমনিতেই। আর মাস্টার্সে যে ভর্তি হলি একটা ক্লাসও তো ঠিকমতো করিস না। মিট করার ফাঁকে না-হয় ক্লাস টাও করে গেলি। এতটা খামখেয়ালি করলে তো মাস্টার্স পাশ করতে পারবি না। শুধু ডিগ্রির সার্টিফিকেট নিয়ে ঘরে বসা থাকতে পারবি।”
“তা ঠিক কিন্তু সত্যি বলতে ক্লাস করতে আমার মোটেও ভালো লাগে না। তাই আর কি আসি না।”
“সে যাই হোক, আজ তুই আসবি এটা ফাইনাল ওকে?”

“আচ্ছা, ওকে।”
নিসা মোবাইল রেখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল ৭:২১ বাজে। বিছানা ছেড়ে উঠে মায়ের রুমের দিক যেতেই দেখে তার মা নাদিরা খাতুন প্রান্তকে কোলে নিয়ে তার রুমের দিকেই আসছেন। তাই নিসা ফের বিছানায় বসে পড়ল। নাদিরা খাতুনও বিছানায় বসতে বসতে বললেন,
“কী রে আজ এতো সকাল বেলা ঘুম ভেঙে গেল যে, ব্যাপার কী?”

“ব্যাপার আবার কী হবে, এমনি এমনি ঘুম কি ভাঙতে পারে না?”

“না মানে তুই তো ৯/১০ টার আগে ঘুম থেকে উঠিস না তাই আর কি!”
বলেই প্রান্তকে কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলেন। সামনে কিছু খেলনা দিয়ে নিসার উদ্দেশ্যে বললেন,
“রাতের বলা কথাগুলো নিয়ে কিছু ভেবেছিলি?”
“কোন কথা?”

“তোর বিয়ের। ছেলেটা কিন্তু সত্যিই খুব ভালো নিসা। আর সবচেয়ে বড় কথা বাপ মরা ছেলেকে তার মায়ের কাছ থেকে তারা আলাদা করতে চায়নি, উল্টো ছেলেকে মেনে নিয়েছে।”

“মা, আমার যা বলার আমি কিন্তু গতকাল রাতেই ক্লিয়ার করে বলে দিয়েছি। তাই দয়া করে বারবার আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে মাথা খারাপ করে দিও না।”
“তুই গ্রাম টাকে কেন এত ভয় পাচ্ছিস বলতো? আর এমনটাও তো না যে, তারা একেবারে অজপাড়াগাঁয়ে থাকে। তারা তো সিটি তেই থাকে। তাহলে কেন এত তো ভয়?”

“এ কথাগুলো কাল রাতে শোনার পরই কিন্তু আমি রিফিউজ করেছি। তাহলে আজ আবার কেন সেই কথাগুলো রিপিট হচ্ছে?”
“নিজের সৌন্দর্যের বড়াই করতে গিয়ে এটা ভুলে যাস না, তুই এক সন্তানের জননী। তোকে যে তারা বউ করে নিতে চেয়েছে সেটাই সাত কপালের ভাগ্য বুঝলি?”
“তুমি এখানে অামাকে সৌন্দর্যের বড়াই করতে কোথায় দেখলে? আর সাত কপালের ভাগ্যর কথাই বা কেন বললে?”

“তুই সুন্দরী বলেই তো এত ভালো ভালো সম্বন্ধ তে নাকোচ করতে পারছিস। তুই ভাবছিস তোর সৌন্দর্যের জন্য তুই এনি টাইম নিজের মন মতো ছেলে পাবি। তাই এতটা সহজ ভাবে প্রতিটা বিয়ে দেখছিস। কিন্তু তুই এটা ভুলে যাচ্ছিস তুই যতই সুন্দরী হোস না কেন, তোর গায়ে একটা মা নামক সিল পড়ে গিয়েছে। আর এই সিলের সামনে সৌন্দর্যের কোনো মূল্যই নেই মানুষের কাছে।”

“আচ্ছা, তোমরা কী চাচ্ছো একটু ক্লিয়ার করে বলবে? তোমাদের যন্ত্রণায় তো দিনদিন বাড়িতে থাকাও আমার দায় হয়ে পড়েছে। আমরা মা ছেলে তোমাদের ঘাড়ে বসে খাচ্ছি এটাই তো তোমাদের জ্বালা হয়েছে তাই না? বেশ, এবার নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা নিজেই করব। কারো হাতের দিকে আর তাকিয়ে থাকব না।”
“তুই কিন্তু আবারও ভুল বুঝছিস নিসা।”

“আমি যা বুঝেছি একেবারে ঠিক বুঝেছি। এই খাওয়ার জন্যই তোমাদের এত তাড়া। তোমাদের ধনদৌলত যে আমরা খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছি।”
বলেই নিসা আলমারি থেকে নতুন একসেট জামা কাপড় বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। নাদিরা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রান্তকে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেলেন নিজের ঘরের দিকে।

৯ টা বাজার আগেই নিসা বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। এই মুহুর্তে বাড়িতে থাকলে তার মাথা আরও খারাপ হয়ে যাবে। তাই সে সময়ের আগে বেড়িয়ে গেল। রিক্সায় উঠেই অভিকে ফোন দিল
“হ্যালো অভি!”
“হ্যাঁ বল।”

“তোর তো ১০ টায় কলেজ আসার কথা ছিল তাই না?”
“হ্যাঁ, কিন্তু কেন?”

“না মানে আমি এখনই কলেজের দিকে যাচ্ছি। তাই আর কি তোকে কল দিলাম যে, তুইও এখন আসতে পারবি কি-না!”
“পারব না কেন? আলবাত পারব। তুই জাস্ট ১০ মিনিট অপেক্ষা কর আমি এক্ষুনি আসছি।”

“আচ্ছা আয় তাহলে।”
বলেই নিসা ফোন কেটে তাকিয়ে রইলো রাস্তার ধারে।

পর্ব ৩৪

নিসার রিক্সা কলেজের সামনে থামতেই দেখে অভি কলেজের গেইটে দাঁড়িয়ে আছে। নিসাকে দেখে রিক্সার কাছে এসে বলল,
“কী রে তোর আসতে এতো দেরি হলো যে?

আমি তো ভেবেছিলাম তুই কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। কী দৌড়ঝাঁপ করেই না এলাম। কিন্তু এসে দেখি তুই নেই।”
নিসা রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে রিক্সা থেকে নেমে বলল,
“আমি তো তোকে বাসা থেকে বেড়িয়ে কল দিয়েছিলাম। তাই আসতে একটু সময় লেগে গেল।”
“সমস্যা নেই। এখন বল কোথায় গিয়ে বসবি?”

“কলেজে বসি।”
“আরে কলেজের গেইটে তো ১০ টার আগে খুলবে না, তাই অন্য কোথাও বসার ব্যবস্থা করতে হবে।”
“ও হ্যাঁআর এত সকালে রেস্টুরেন্টও হয়তো খুলবে না, তাই না?”
“এখনো খুলেনি তবে মিনিট দশেক পর খুলে দিবে। সেই অবধি না-হয় এদিক ওদিক হাঁটা হাঁটি করি, কি বলিস?”
“হুম কর।”

নিসা আর অভি পাশাপাশি হেঁটে চলছে। অভি বলল,
“এত সকাল বেলা বের হলি যে? বাসায় কি কোনো সমস্যা হয়েছে? আর তোর বাচ্চাটা কেমন আছে?”
“হ্যাঁ, ভালোই আছে।”
“বাবা কথা কি জিজ্ঞেস করে?”

“ওর সেরকম বোধবুদ্ধি এখনো হয়নি অভি। আরেকটু বড় হোক তারপর হয়তো এসব প্রশ্ন মাথায় চাপবে।”
“আচ্ছা বাসায় কোনো সমস্যা হয়েছে কি-না বললি না তো?”

“সমস্যার কথা কী বলব, এটা যেন দৈনন্দিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেকদিন একেক পাত্রের কথা বলছে আর আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। গতকালের ঘটনাতেই আয়, ছেলের বাড়ি যশোর। ছেলের যশোরে একটা নিজেস্ব স্কুল রয়েছে। তাই সে ওখানেই থাকবে আর বিয়ে হলে আমাকে ওখানেই থাকতে হবে। আচ্ছা তুই বল, এটা কি আমার দ্বারা মানা সম্ভব?”

“বাসার সবাই কি রাজি?”
“রাজি মানে? সবাই তো এই সম্বন্ধটা নিয়ে এক ডুগ জল বেশি খাচ্ছে।”
“কেন?”

“ছেলে পক্ষ যে আমার সাথে আমার ছেলে প্রান্তকে এক্সেপ্ট করে নিবে। আর এটাই আমার পরিবারের কাছে বড় অস্ত্র। কারণ আজ অবধি অন্য কোনো পক্ষ তো ছেলে সহ আমাকে নিতে রাজি হয়নি।”

“এখন তুই কী করতে চাস? ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে গ্রামে সেটেল হবি না-কি নিজের সুবিধার কথা ভাববি?”
“আমার দ্বারা গ্রামে থাকা টোটালি অসম্ভব। সবার দ্বারা সবকিছু হয় না অভি।”
অভি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। নিসা বলল,
“আচ্ছা, তুই আমাকে কেন ডেকেছিলি সেটা বল।”

অভি প্রায় কড়া গলায় বলল,
“যে মা তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, সে কখনো কারো জীবন সম্পর্কিত বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না। তাই তোকে আমার আর প্রয়োজন নেই নিসা।”
“মানে? কী বলছিস তুই এসব?”

“হ্যাঁ, আমি যা বলছি একদম ঠিক বলছি। তুই একটা স্বার্থপর মেয়ে। তুই কিভাবে পারছিস বাপ মরা ছেলের কথা না ভেবে নিজের কথা ভাবতে? তুই কি আসলেও মা? বাংলার বুকে এখনো এমন অনেক মা আছে যারা নিজের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বামী ছাড়া সারা জীবন, যৌবন পার করে দেয়।

আর তোর যেখানে মাশাল্লাহ এত ফুটফুটে একটি ছেলে আছে তোর তো বিয়েরই প্রয়োজন নেই। আবার তুই গ্রাম শহর নিয়ে ভেদাভেদ করছিস! ছিআমার তো এখন তোকে ফ্রেন্ড ভাবতেও বিরক্ত লাগছে। আর তোর ফ্রেন্ডের সাথে প্রেম করার সাধও মিটে গিয়েছে। যে যেরকম তার সাথে তো সেরকমই মিশে তাই না?”

“অভি!”
“তোর সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না আমার। ভালো থাকিস। আল্লাহ হাফেজ।”
বলেই অভি রিক্সা ডেকে চলে গেল।
এদিকে নিসার মাথা এমনিতেই গরম ছিল অভির কথায় আরও গরম হয়ে গেল। এমন সময় দূর থেকে প্রণয়ের বন্ধু মুহিত এসে বলল,
“কেমন আছেন?”

নিসার মেজাজ গরম থাকলে মুহিতের সামনে তা প্রকাশ করল না। স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“আছিতো এত সকালে এখানে কী করছেন?”

নিসা কি বলবে বুঝতে পারছে না। মুহিত নিজেই আবার বলল,
“কলেজে এসেছিলেন বুঝি?”
“ও হ্যাঁ কলেজেই এসেছিলাম। কিন্তু কলেজ এখনো খুলেনি তাই অপেক্ষা করছি।”

“ও আচ্ছা। বাসার সবাই কেমন আছেন? আর প্রান্ত, ওর কি খবর?”
“আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালো আছে। আচ্ছা ভাইয়া, আজ তাহলে আসি। আমার একটু তাড়া আছে তো তাই আর কি!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই। ভালো থাকবেন।”
নিসা মুচকি হেসে রিক্সায় উঠে পড়ল। আর মুহিত তাকিয়ে রইলো সেই ঘূর্ণায়মান রিক্সার চাকার দিকে। মনে মনে ভাবল, “মানুষের জীবন কতটা ঘূর্ণায়মান।”

রাতের খাবার গুছিয়ে বিছানায় বসতেই কলিংবেল বেজে উঠল। মুহিত দ্রুত উঠে দরজা খুলে নিলয়কে দেখে বলল,
“এত সময় লাগল আসতে? কটা বাজে দেখেছিস? আরেকটু হলে তো আমি ঘুমিয়েই পড়তাম।”

নিলয় ভেতরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে লক করে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“আরে বলিস না, রাস্তায় যে কি জ্যাম! আমি তো ভেবেছিলাম আজ রাস্তাতেই রাত কাটাতে হবে। তোর সাথে আর দেখা হবে না।”
“তাই তো বলি রাত ১১ টা বেজে গেল নীলয় ব্যাটা আসে না কেন? যাই হোক, হাত মুখ ধুয়ে খেতে বস। রাত তো কম হলো না।”
“হ্যাঁ, খাবো তো অবশ্যই। তবে ভাবছিলাম রাত টাও আজ থেকে যাবো। শরীরটা আর চলছে না।”

“তাহলে তো ভালোই হয়। অন্তত এক রাতের জন্য হলেও একাকীত্ব ঘুঁচিয়ে ঘুমোতে যাবো। তা ভাবীকে কল করে বলে দিয়েছিস যে, আজ আর ফিরছিস না?”
“না বলিনি তবে বলে দিব। আগে হাতমুখ ধুয়ে কিছু মুখে দেই। বড্ড খিদে পেয়েছে।”
“আচ্ছা যা হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমি প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
“ওকে বন্ধু।”

বলেই নীলয় ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষে অফিসের কাপড় চেঞ্জ করে মুহিতের একটা ব্যবহৃত লুঙ্গি আর গেঞ্জি গায়ে দিয়ে বিছানায় ধপাস করে বসতেই মুহিতের আড়াই বছরের মেয়ে মিশু ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে কাঁদতে শুরু করল। মিশুকে কোলে নিয়ের রুমের ভেতর পায়চারি করতে করতে মুহিত আস্তে আস্তে বলল,
“কী রে তুই? এমন করে কেউ বসে? ঘুমন্ত মেয়েটা আমার কতটা ভয় পেয়েছে দেখেছিস?”

“দোস্ত আমি ভুলে গিয়েছিলামরে মিশু যে ঘুমোচ্ছে। দেয় আমার কোলে দেয়, দেখি কান্না থামা না-কি!”
“এই কান্নারত অবস্থায় তোর কোলে দিলে মেয়ে আমার আরও কাঁদবে। তারচেয়ে বরং তুই একটু বস আমি ওকে বারান্দায় নিয়ে পায়চারী করে ঘুম পারিয়ে নিয়ে আসি। অন্ধকার পেলে ও দ্রুত ঘুমিয়ে পড়বে।”
“আচ্ছা যা।”

পর্ব ৩৫

মিশুকে ঘুম পাড়িয়ে মুহিত বিছানায় বসতেই নিলয় বলল,
“ভাই, এখন আর উপরে বসিস না। দেখা যাবে আমি আবার ধাম করে কিছু করে বসব মেয়েটা আবার ঘুম থেকে উঠে যাবে। তারচেয়ে ভালো চল ফ্লোরে বসে কথা বলি।”

“খারাপ বলিস নি। মিশুর একবার ঘুম ভাঙলে ঘুম পাড়াতে যে কাঠখড় পোড়াতে হয়রে বাবা!”
বলেই আস্তে করে বিছানা ছেড়ে ফ্লোরে বসে পড়ল দুজন। নিলয় বলল,
“এখন বল, কী এমন জরুরি কথা বলতে ডেকে আনলি।”

মুহিত একবার মিশুর দিক উঁকি মেরে বেশ নিচু কন্ঠে বলল,
“আজ সকালে নিসাকে দেখলাম।”

“তোওকে তো প্রায় এখানে সেখানে ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়। এখানে জরুরি কথার কী আছে?”
“আগে শোন তো আমি কি বলতে চাইছি।”
“আচ্ছা বল।”

“আজ সকাল বেলা অফিস যাওয়ার পথে নিসাকে একটি ছেলের সাথে বেশ ক্লোজলি হাঁটতে দেখা যায়। মনে একপ্রকার সন্দেহ ঢুকায় দুজনের সামান্য পিছনে গিয়ে দাঁড়াই। আড়াল থেকে দুজনের কথোপকথন শোনার উদ্দেশ্যে।”

নিলয় উৎকন্ঠা স্বরে বলল,
“তারপর!”
মুহিত একে একে অভি ও নিসার অভ্যন্তরীণ বলা প্রতিটি কথা নিলয়কে খুলে বলতে লাগল। নিলয় পুরো কথা শুনে মোটেও বিচলিত হলো না। আর না কথাগুলো বলার সময় মুহিত বিচলিত হলো। এরকম একটা পরিস্থিতি যে আসবে তারা যেন আগে থেকেই জানত। খুব শান্ত গলায় নিলয় বলল,
“এখন আমাকে ডেকে এনে এসব কথা বলার মানে কী? ও কিরকম সেটা তো প্রণয় মারা যাবার পরের দিনই বুঝতে পেরেছিলাম আমরা। নতুন করে ও কী করল না করল সেসব নিয়ে তো মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই, তাই না?”

“ও কী করল সেটা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই নিলয়। তারপরও আমার মাথা ঘামাতে হচ্ছে প্রান্তর জন্য। প্রণয়ের একমাত্র যক্ষের ধনের জন্য। প্রণয়ের রেখে যাওয়া শেষ চিহ্নের জন্য।”
“তুই ঠিক কী বলতে চাইছিস আমাকে একটু ক্লিয়ার করে বলতো মুহিত।”

“তুই তো জানিসই বাবা-মা বিয়ের জন্য আজকাল প্রচুর চাপ দিচ্ছে। মিশুর জন্য হলেও না-কি একটা বিয়ে করা প্রয়োজন। তবে আমিও বলে দিয়েছি আমার পক্ষে বিয়ে করা অসম্ভব।”
“হ্যাঁ, সে-তো জানি। কিন্তু এর সাথে নিসার বা প্রান্তর কী সম্পর্ক?”

“সম্পর্ক আছে নিলয়। আজ নিসা ও অভির মুখের সকল কথা শুনে আমার মনে হলো প্রান্ত ভালো নেই। আর ও বড় হবার সাথে সাথে ওর ভালো না লাগাটা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে। বাবা তো নেই-ই, মা থেকেও না থাকলে যা হয় আর-কি!”
“সবই বুঝলাম, কিন্তু এর সাথে তোর কী সম্পর্ক সেটাই বুঝলাম না।”

“আসলে আমি ভাবছিলাম, প্রান্তকে নিয়ে। আমি মনে করি প্রান্তকে আমি যতটা বাবার আদর দিয়ে পরিপূর্ণ করতে পারব আর কেউ সেটা পারবে না। কেউ হয়তো প্রান্তকে এক্সেপ্ট করতে রাজিও হবে না। এতে তো ছেলেটার জীবন পুরোই ধ্বংস হয়ে যাবে। না পেল বাবা, না পেল মা, আর না পেল একটি পরিপূর্ণ ঘর।”
নিলয় অবাক হয়ে বলল,
“তুই কি নিসাকে বিয়ে করার বিষয়ে কিছু ভাবছিস!”

“নিজের জন্য না, এমনকি নিজের মেয়ের জন্যেও না। কারণ আমি জানি আমার মেয়ের জন্য আমি একাই যথেষ্ট। তবে এই ভরসা টুকুই প্রান্তর নেই। মা থেকেও না থাকার মতই আছে প্রান্ত। ওর একটা ভরসার স্থান প্রয়োজন। আর প্রণয়ের খুব কাছের একজন বন্ধু হওয়ার সুবাদে এটা আমার দায়িত্ব।”
“যদি নিসা এই প্রস্তাবে নাকোচ করে দেয়?”

“সেটা ওর ব্যাপার। কিন্তু পরকালে আমি প্রণয়ের কাছে নির্দোষ থাকব। আর এমনিতেও আমার বিয়ে করার প্রয়োজন নেই তুই ভালো করেই জানিস। আমি জাস্ট প্রান্তর জন্য বলেছিলাম। আদার ওয়াইজ আমি আমার মিশুকে নিয়ে দিব্যি আছি আর দিব্যি থাকব ইনশাআল্লাহ। কারো প্রয়োজন নেই আমার।”

বলেই মুচকি হাসলো মুহিত। নিলয় বলল,
“কী সুন্দর ছিল আমাদের জীবন তাই না রে? হাসি-খুশি, মজ-মাস্তিতে পরিপূর্ণ ছিলাম আমরা। সারাদিন আড্ডা, খাওয়া দাওয়া, ঘোরাফেরায় ভরপুর ছিল দিনগুলি। কিন্তু হঠাৎ করে দুটো ঝড় এসে আমাদের পুরো জীবনটাকে বিভৎস একটা রূপ দিয়ে গেল। যে রূপ কখনো বিবর্তন কিংবা পরিবর্তন হবার নয়।”
বলেই মুহিতের দিকে তাকিয়ে দেখে মুহিতের চোখ দুটো নোনা জলে চিকচিক করছে। শুধু পাহাড়ের বাঁধ সমতুল্য চোখ বেয়ে উপচে পড়ার অপেক্ষা।

নিলয় মুহিতের কাঁধে হাত রাখতেই মুহিত চোখের জল ছেড়ে দিল। কন্ঠস্বর সামান্য উঁচু করে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“সোহানার জায়গা কেউ নিতে পারবে না নিলয়। দ্বিতীয় সোহানা হবার নয়। সোহানার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলে যে আমার পাগল পাগল লাগে।”
বলেই ছোট বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল মুহিত। নিলয় বলল,
“যেভাবে আছিস ভালো আছিস। নিসাকে জীবনের সাথে জড়িয়ে ভেতরের জ্বালা যন্ত্রণাকে প্রশ্রয় দিস না।”

চোখের জল মুছে মুহিত বলল,
“কিন্তু প্রান্ত, ও যে ভালো নেই। আর ও ভালো না থাকলে যে প্রণয়ের আত্মার ভালো থাকবে না। আমি বিয়ের কথা বলেছি শুধুমাত্র প্রণয় আর প্রান্তর জন্য।”
“হুম, ছেলেটার পোড়া কপাল। এর থেকে যদি প্রণয় বেঁচে থাকত আর নিসার কিছু হয়ে যেত, তাতেও আমি মনে করি প্রান্ত ভালো থাকত। আনন্দে থাকত। কারণ প্রণয় নিসার মত অন্তত স্বার্থপর হতো না।”
“হুম।”

“যাক গে সেসব কথা। এখন বল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে নিসাদের বাসায় কবে যেতে চাইছিস?”
“তুই বল। তোকে ছাড়া তো কাউকে নিয়ে যাবো না। কারণ বাবা-মা বিয়ের কথা টের পেলে নিসা রাজি না হলে অন্য জায়গায় জোর করে হলেও বিয়ে করাবে।

যেটা এখন পারছে না। কিন্তু আমি তো বিয়ে করব না। নিসাকে তো একপ্রকার বাধ্য হয়ে বিয়ে করার কথা ভাবছি। বুঝতে পারছিস তো আমার কথা!”
“হুম বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, আসছে শুক্রবার কি নিসাদের বাড়ি যাবি?”
“আসছে শুক্রবার মানে দুদিন পর। খুব তাড়া হয়ে যাচ্ছে না, আরও কয়েকদিন পরে যাই।

“তাড়া হচ্ছে সেটা আমিও জানি। তবে এই শুক্রবার ছাড়া আমার হাতে কোনো সময় নেই রে। এখন তো অফিসে কাজের চাপ বেশি। ছুটি পাওয়া অসম্ভব।”
“একদিনও কি ম্যানেজ করা সম্ভব না?”
“মনে হয় না।”

“তাহলে আর কী করার শুক্রবারেই যাব।”
“আচ্ছা বেশ, তাহলে এখন ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। সকাল সকাল উঠে তো আবার অফিসেও যেতে হবে।”
“হুম।”

“তাহলে কোথায় ঘুমাবো বল।”
“কোথায় আবারআমার পাশ দিয়েই শুয়ে পর। আগে কত ঘুমিয়েছি। আজও না’হয় পুরনো স্মৃতি মনে করে পুরনো দিনে ফিরে যাবো।”
নিলয় হেসে মুহিতের কাঁধে হাত রেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলল,
“চল। পুরনো দিনেই ফিরে যাই।”

পর্ব ৩৬

রাত ৯ টা। দরজার খিল দিয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে প্রতিটি কোণা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে বিছানার উপর ঘাপটি মেরে বসে আছে নিসা। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার মা ও দুই ভাবি মিলে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে গেলেও টু শব্দাটি করেনি নিসা।

নিজের মত করে এক ধ্যানেই বসে রইলো। আর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে নানান কথা!
“আমি সত্যিই এতটা স্বার্থপর কী করে হলাম! আমি কি সত্যিই মানুষ! না-কি মানুষ রূপী কোনো স্বার্থপর জানোয়ার! নিজে ভালো থাকার জন্য দিনের পর দিন আমার নিজের সন্তানকেও পর করে দিলাম! আমি কেমন মা! সবার চোখে আমার সন্তানের কষ্ট গুলো ধরা পড়ল, কেবল আমার চোখেই ধরা পড়ল না!”
ভেবেই জড় জড় দিয়ে চোখের জল ফেলছে নিসা।

বসা থেকে উঠে ঘরের আলো জ্বালিয়ে আলমারি খুলে কাপড়ের ভাজ থেকে বড় মোটা একটি নীল রঙের এলবাম বের করে বিছানায় গিয়ে বসল। এলবামের কভার খুলে এলবাম মেলতেই প্রণয়ের কাঁধ জড়িয়ে থাকা নিজের ছবিটি দেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চোখ বেয়ে অনবরত নোনা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে নিসার। এলবামের আরেকটি পাতা উলটাতে বৃষ্টি ভেজা প্রণয়ের বুকে নিজের মাথা লেপ্টে খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি দেখে নিসার দম বন্ধ হয়ে আসছে। দিনটির কথা ভাবতেই বুক ব্যাথা করছে তার।

চোখের সামনে ভেসে উঠছে প্রণয়ের বলা প্রতিটি কথা। এক মরন যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার ভেতর। তারপরও চোখ বুজে ডুব দিল সেই বৃষ্টি বিলাস দিনটির মাঝে
“বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাইক এক্সিডেন্ট করলে। আল্লাহ না করুক যদি তোমার কিছু হয়ে যেত, আমার কী হতো বলতো। তুমি জানো আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম?”

“বৃষ্টিতে ভিজতে এসেও এই কথা! তোমার মাথাতে কি এই একটা বিষয় ছাড়া অন্য কিছু নেই? এক্সিডেন্ট করেছি আরও দিন দশেক আগে আর তুমি প্রতিদিন প্রতিটি পদক্ষেপে সেই কথাই বলে যাচ্ছ। বৃষ্টি পেয়েছ কোথায় একটু রোমান্স করবে তা না, পুরনো কথা জুড়ে বসেছে!”
“আমার জায়গায় তুমি থাকলে বুঝতে পারতে কেন কথাগুলো বলছি।”
“হয়েছে তো বাদ দাও না।”

“সবকিছু শুধু বাদই দিব তাই না? এখন তুমি বাইক চালানো কবে বন্ধ করছ সেটা বলো।”
“আমার কি বাইক আছে না-কি যে চালানো বন্ধ কবে করব জিজ্ঞেস করছ?

“নিজের না থাকলে কী হয়েছে বন্ধুদের তো আছে। তাতেই কি এক্সিডেন্টের মত কুকাজ গুলি করছ না? আবার বলছ বাইক নেই।”
“আচ্ছা, এই রোমাঞ্চকর বৃষ্টির মাঝে খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে তোমার কি এই কথাগুলো না বললেই হচ্ছে না?”
“না হচ্ছে না। তুমি আগে আমার কথার উত্তর দাও।”

“তোমার কথার উত্তর চাই?”
“হ্যাঁ চাই।”

“যেদিন তোমার জন্য একটি নামি-দামি প্রাইভেট কার কিনতে পারব ঠিক সেদিন এই বাইক নামক ভুত আমার মাথা থেকে নামবে তার আগে না, বুঝলে?”
“প্রণয়! তুমি কেন বুঝেও অবুঝের মত করো বলোতো। আমার আর ভালো লাগছে না তোমার এই অবুঝ আচরণ। এই বাইক নিয়ে আমার মনের ভেতর কী চলে কেন বুঝতে পারো না তুমি? আমার ভয় লাগে। বিশ্বাস করো এই বাইক নামক শব্দটা আমার ভয় লাগে।”

বলেই নিসা চোখের জল ছেড়ে দিল। আকাশ থেকে ঝড়া মিঠা পানির সাথে নিসার চোখ থেকে ঝড়া নোনা পানিগুলো মিশে একাকার হয়ে গেলেও প্রণয়ের টের পেতে সময় লাগেনি। নিসাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নোনা জলে ভেজা দুচোখের পাতায় আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,
“প্রয়োজন ছাড়া আজকের পর থেকে আর কখনো বাইক ছুঁয়েও দেখব না বউ। তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই চলব। তবুও তুমি কেঁদো না প্লিজ।”

অস্পষ্ট স্বরে নিসা বলল,
“সত্যি বলছ?”
“তিন সত্যি বলছি। তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে।”

“প্রয়োজন ছাড়া অকারণে আর কক্ষনো বাইক ধরবে না তো?”
“ধরব না বউ। প্রয়োজন ছাড়া কক্ষনো বাইক ধরব না।”

আর কোনো কথা না বলে নিসা ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রণয়ের বুকে। চোখ বুজে প্রণয়ের ভেজা ঠান্ডা বুকে মাথা লেপ্টে রাখতেই সিঁড়ি ঘরের ভেতর থেকে মুহিত আর নিলয় জোরে জোরে হেসে ফেলল। মোবাইল হাতে নিয়ে নিলয় বলল,
“দোস্ত, তোর মোবাইলের ওয়াল পেপারের জন্য কিন্তু কিছু বেস্ট মোমেন্ট কালেক্ট করেছি।”

বলেই দুজন হাসতে হাসতে নিচে নেমে পড়ল। আর নিসা প্রণয় বাকরুদ্ধ অবস্থায় একে অপরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
একপশলা নোনা পানি গড়িয়ে হাতে পড়তেই নিসা চোখের পাতি ফালিয়ে নিচে তাকালো। হাতে ছবির এলবাম, চারিপাশে বদ্ধ ঘরের উঁচু উঁচু দেয়াল দেখে নিসা হতভম্ব হয়ে গেল। দৃষ্টিপথ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে প্রণয় আর সেই বৃষ্টি ভেজা ছাদ দেখতে না পেয়ে নিসার হুশ এলো সে ঘরে আছে। আর এতক্ষণ সে কল্পনার জগতে ডুবে ছিল।

এলবামের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ছবিটা আলতো করে ছুঁয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল,
“তোমার মত স্বামীকে ভুলে দিব্যি তো ছিলাম আমি। কতটা শক্ত আর পাষান মনের হলে দিব্যি ছিলাম প্রণয়!”
পরক্ষনেই মনে পড়ল প্রান্তর কথা। প্রণয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছে বলল,
“তোমাকে অবহেলা করে যেই ভুল করেছি, দ্বিতীয় বার সেই একই ভুল করে তোমার দেয়া শেষ চিহ্ন প্রান্তকে হারাতে আমি পারব না।”

বলেই ছবির এলবাম মেলেই নিসা দরজা খুলে দ্রুত পায়ে গেল মায়ের রুমে। বিছানা থেকে প্রান্তকে কোলে নিয়ে মা’কে বলল,
“আজ থেকে প্রান্ত আমার কাছে ঘুমাবে। প্রান্তর সবকিছু আমাকে বলবে। আমি প্রান্তর মা। জন্মদাত্রী মা।”

বলেই প্রান্তর চোখেমুখে চুমু দিতে দিতে নিজ ঘরে চলে গেল নিসা। এদিকে নিসার যাওয়ার পথে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নাদিরা খাতুনসহ রেখা ও শিল্পী।
নিসা রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে প্রান্তকে বিছানায় বসিয়ে মোবাইল সুইচ অফ করে আলমারিতে রেখে দিল। সে আগামী দু মাস কোনোমতেই মোবাইল হাতে নিবে না।

হাজার প্রয়োজন হলেও সে মোবাইল ছুঁয়ে দেখবে না। এ দু মাস শুধু তার ছেলের জন্য। তার প্রান্তর জন্য। এ দু মাসে নিসা প্রান্তর সাথে দিনরাত ২৪ ঘন্টা সময় কাটিয়ে অন্যান্য মায়েদের মত সন্তানের সাথে বেস্ট বন্ড তৈরি করবে। সে প্রান্তর বেস্ট মা হবে।
আলমারি লক করে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বিছানায় শুয়ে প্রান্তকে কোলে নিয়ে প্রান্তর সাথে নানান কথা বলতে লাগল নিসা।

পর্ব ৩৭

সকাল হতে দেরি হলেও আজ নিসা উঠতে দেরি হয়নি। ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে খোলা চুল টান টান করে খোপা করে নিল। প্রান্তর কাছে গিয়ে মাথার কাছ থেকে সারা রাতে জমানো প্রস্রাবের সব কাঁথা আর প্যান্ট নিয়ে এগুলো ওয়াশরুমের দিকে। ধুয়ে ফকফকা করে বারান্দায় মেলে দিতেই প্রান্ত ঘুম থেকে উঠে পড়ল। নিজে নিজে বিছানা থেকে নেমে নানু নাদিরা খাতুনের কাছে যাবার জন্য বন্ধ দরজা ধাক্কা দিতেই নিসা বারান্দা থেকে দ্রুত চলে এলো। প্রান্তকে কোলে নিয়ে বলল,
“বাবা, কী হয়েছে?”

“নানু!”
“নানু যাবে?”
প্রান্ত মাথা নাড়তেই নিসা বলল,
“তুমি যদি নানুর কাছে যাও মুখ ধুবে দিবে কে?”

“নানু মুখ”
ছেলের অধো আধো কথা শুনে নিসা বুঝতে পারল ছেলে তার হলেও ছেলের সব চাওয়া পাওয়া তাকে ঘিরে নয়। বরং তার পরিবার, তার মা’কে ঘিরে। আর এর জন্য দায়ী একমাত্র সে নিজেই। তার ভুলের জন্যই আজ তার ছেলে মা’কে কাছে পেয়েও দূরে থাকতে চায়। মায়ের ছায়া নানুর কাছে পায়। কিন্তু সে যে এই ভুলে আর করবে না। তার ছেলেকে তার ভুবন চেনাবে। মায়ের ছায়া না, মা’কেই খুঁজতেই শেখাবে। বলেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রান্তর গালে চুমু খেয়ে বলল,
“নানু না, মা মুখ ধুয়ে দিবে।”

বলেই প্রান্তকে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।

প্রান্তর মুখ ধুয়ে বিছানায় দাঁড় করিয়ে হাত মুখ তোয়ালে দিয়ে মুছে বাসি জামা কাপড় ছেড়ে অন্য জামা পড়িয়ে কোলে চাপিয়ে দরজার লক খুলে রুম থেকে বের হলো নিসা। ড্রয়িং রুমের কাছে আসতেই রেখাকে দেখতে পেয়ে বলল,
“ভাবি প্রান্তকে একটু কোলে নাও না। আমি ওর জন্য একটু নুডুলস রান্না করব।”

নিসার কথা শুনে নিসা হা হয়ে গেল। প্রান্তকে কোলে না নিয়ে রোবটের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। যে মেয়ে কি-না ছেলের ধারের কাছ দিয়েও ঘেষতো না, সেই মেয়ে আজ রান্না করবে? তাও আবার ছেলের জন্য। আশ্চর্যের শেষ সীমানায় পৌছে গিয়েছে রেখা। নিসা বলল,
“কী হলো ভাবি? এভাবে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছো যে? প্রান্তকে কোলে নাও না।”

বলেই রেখার কোলে প্রান্তকে চাপিয়ে দিল। রান্নাঘরে যেতেই শিল্পীকে তার রুমে ঢুকতে দেখে নিসা বলল,
“ভাবি, জাস্ট বিছানা টাই ঝাড় দেয়া রয়ে গিয়েছে। প্রান্ত কোলে ছিল তো তাই ঝাড় দিতে পারিনি। বাদ বাকি সব কাজ প্রান্ত ঘুমে থাকাকালীনই শেষ করে ফেলেছি।”
শিল্পী অবাক হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
“প্রান্তর সারা রাতের কাপড়চোপড়?”

“সব ধুয়ে বারান্দায় মেলেও দিয়েছি। বুয়া খালার জন্য রাখিনি। আর হ্যাঁ, আজ থেকে এসব কিছু আমিই করব।”
বলেই রান্নাঘরে ঢুকে গেল নিসা। এদিকে শিল্পী আর রেখা ভুত দেখার মত তাকিয়ে রইলো একে অপরের দিকে।
রান্নাঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে নিসা বুয়া খালাকে বলল,
“খালা, প্রান্তর নুডুলস কোথায় রাখো গো?”

বুয়া হা হয়ে গেল নিসার কথা শুনে। ডুগ গিলে বলল,
“কেন খালা?”

“কেন আবার কী, রান্না করব। কোথায় রেখেছ দাও তো।”
“খালা তুমি রান্না করবা কে? আমি আছি তো, তুমি যাও আমি রান্না কইরা আনতাসি।”
“না, আমি রান্না করব। তুমি কোথায় রেখেছ শুধু বের করে দাও।”

বুয়া একটি বৈয়ম থেকে প্রান্তর নুডুলসের প্যাকেট বের করে দিতেই নিসা বলল,
“তুমি এবার গিয়ে ঘরের অন্য কাজ করো। আমি রান্না করে যাই তারপর তুমি এসে তোমার কাজ করো।”
“আমি পাশ দাঁড়ায়া কাম করি। আমার সমস্যা হইব না তো।”

“তোমার সমস্যার কথা আমি বলিনি। আমার সমস্যা হবে তাই বলেছি।”
“ও আইচ্ছা। তাইকে তুমি রান্দ পরে আমি আইতাসি।”
“আচ্ছা যাও।”

বুয়া যেতেই গায়ের ওড়না কোমড়ে বেঁধে কাজ করতে লাগল নিসা। এক চুলায় সবার জন্য চা আর অন্য চুলায় কাচা মরিচ ছাড়া অল্প তেল দিয়ে সাদা সাদা করে নুডুলস রান্না করতে লাগল সে। অল্প সময়ের মধ্যে নুডুলস রান্না হয়ে যেতেই একটা মধ্যম সাইজের বাটিতে নুডুলস বেড়ে সাথে কাটা চামচ নিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে বুয়াকে ডেকে বলল চা সবার জন্য নিয়ে আসতে।

বলেই প্রান্তর খোঁজে মায়ের ঘরের দিক যেতেই দেখে রেখা প্রান্তকে নিয়ে নিজ ঘরে বসে খেলা করছে। তাই মায়ের ঘরে না গিয়ে রেখার ঘর থেকে প্রান্তকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ফিরে এলো।

প্রান্তকে কোলে নিয়ে সোফায় বসে টিভি তে ডোরেমন কার্টুন চালু করে প্রান্তকে নুডুলস খাওয়াতে নিলে রেখা ও শিল্পী দু’জনই এসে নিসার সাথে নিসার পাশের সোফায় বসল। নিসা প্রান্তকে খাওয়াচ্ছে আর রেখা শিল্পী ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। একরাতে নিসার মাঝে এ আমূল পরিবর্তন একদিক থেকে দু’জনকে প্রচন্ড অবাক করছে! অন্যদিক থেকে প্রান্তর মুখে প্রাণোচ্ছল হাসি দেখে শান্তিও লাগছে।

ব্যাপারটি নিসা লক্ষ্য করে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আর লজ্জা দিও না ভাবি। নিজের কৃতকর্মের জন্য তো নিজেই অনুতপ্ত। তোমরা আর ওভাবে তাকিয়ে আরও লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিও না।”

রেখা বলল,
“সত্যি বলছি, প্রান্তকে ঘিরে তোর উপর এতদিনের জমে থাকা সব ক্ষোভ আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেল। মা সন্তানের সম্পর্ক তো এমনই হওয়ার কথা তাই না?”
শিল্পী বলল,
“নিসা তুই নিজেই দেখ আজ প্রান্তকে যতটা প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে অন্যসময় কি তা দেখায়? একটা সন্তান তার মায়ের কোলে যতটা মানায় আর কোথাও ততটা মানায় না।”

নিসা চোখের জল ফেলে প্রান্তকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে বলল,
“ভুল করেছিলাম ভাবি। বড্ড বড় ভুল করে ফেলেছিলাম। প্রান্তকে কাঁধ ছাড়া করে নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
নিসা মাথায় হাত বুলিয়ে রেখা বলল,
“কাঁদিস না। দেরি করে হলেও ভুল বুঝতে পেরেছিস এটাই অনেক। ক’জনই বা এই ভুলটা বুঝতে পারে বল।”

এরই মাঝে প্রান্ত নিসার থুতনি ধরে টিভির দিক আঙুল দিয়ে ইশারা করে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
“মানোবেতা।”

নিসা চোখের জল মুছে হেসে প্রান্তর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“হ্যাঁ সোনা, নোবেতা।”

শুক্রবার বিকেল ৫ টা। প্রান্তকে কোলে নিয়ে নিসা ড্রয়িং রুমের এদিক থেকে ওদিক হাঁটছে আর দুষ্টুমি করছে। এরই মাঝে কলিংবেল বেজে উঠতে নিসা বুয়াকে ডেকে বলল দরজা খুলে দিতে। বুয়া দরজা খুলতেই নিসা দরজার দিকে তাকায়। মুহিত আর নিলয় এসেছে। তবে দুজনের দু’হাত রয়েছে মিষ্টি আর ফলের প্যাকেট ভর্তি। নিসা প্রান্তকে বুকে জড়িয়েই এগিয়ে গিয়ে বলল,

পর্ব ৩৮

আরে নিলয় ভাইয়া মুহিত ভাইয়া আপনারা! বাহিরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে আসুন।”
নিলয় ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“দরজায় যেহেতু এসেছি ভেতরে তো আসবই।”

নিলয় আর মুহিত বুয়ার কাছে আনা খাবারের প্যাকেট গুলো দিয়ে সোফায় বসতেই নিসা বলল,
“এতদিন পর কী মনে করে আসলেন? বন্ধু নেই বলে তো আমাদের মা ছেলেকে ভুলেই গিয়েছেন।

নিলয় বলল,
“ভুলব কেন, ভুলিনি। তবে একটা গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছিল এই আর কি! তো কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। ভালোই আছি।”

বলেই মুহিতের দিকে তাকিয়ে নিসা বলল,
“কী ব্যাপার ভাইয়া? আজ আপনি এতো চুপচাপ যে?”
মুহিতের আজ নিসার সাথে কথা বলতে বেশ ইতস্তত বোধ হচ্ছে। চোখে চোখে না রেখেই অস্পষ্ট গলায় বলল,
“কোথায়, বলছি তো কথা।”

মুহিতের ইতস্তত বোধের কারণ বুঝতে পেরে নিলয় বলল,
“ভাবি, বাসায় বড় কেউ আছেন? মানে আংকেল আন্টি কেউ আছেন?”

“হ্যাঁ আছে তো।”বলেই নিসা তার বাবা ও মা’কে ডাকতে লাগল। নাদিরা খাতুন আর সুলতান সাহেব ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় বসলেন। নাদিরা খাতুন বললেন,
“কী রে ডাকছিলি?”
“হ্যাঁ মা। ভাইরা এসে তোমাদের খুঁজছিল তো তাই আর কি!”
“ও আচ্ছা।”

“মা তোমরা কথা বলো আমি চা নাস্তার ব্যবস্থা করছি।”
“আচ্ছা যা আর প্রান্তকে আমার কাছে দিয়ে যা। নাহলে কাজ করতে তোর সমস্যা হবে।”
“ঠিক বলেছ মা। আজকাল ছেলেটা যে কি দুষ্টু হয়েছে না।”

বলেই নাদিরা খাতুনের কোলে দিয়ে নিসা রান্নাঘরের পথ ধরল। এদিকে নাদিরা খাতুন প্রান্তকে কোলে বসিয়ে মুহিত আর নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তো কী খবর তোমাদের? বাসার সবাই ভালো আছে তো?”

নিলয় বলল,
“হ্যাঁ আন্টি, আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি। আপনাদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
“বয়স তো হয়েছে। বয়স আন্তাজে দিনকাল যেমন যাওয়ার তেমনই যাচ্ছে। আর মোট কথা নাতি নাতনিদের নিয়েই দিন কেটে যায়।”
“তাহলে তো দিন ভালোই যায়।”

“হ্যাঁ যায় আর কি!”
সুলতান সাহেবের দিকে তাকিয়ে নিলয় বলল,
“কেমন আছেন আঙ্কেল?”

“আলহামদুলিল্লাহ বাবা, ভালো আছি। তোমাদের কী খবর?”
“আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ পাক ভালোই রেখেছেন।”
“আলহামদুলিল্লাহ।”

“তো আঙ্কেল, কিছু জরুরি কথা বলতে আপনাদের কাছে আসা। আপনারা যদি ব্যাপারটা সহজ ভাবে দেখেন তাহলে আমি বলতে পারি।”
“হ্যাঁ বাবা বলো।”

“আসলে আঙ্কেল আমি এসেছিলাম প্রান্তর ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিসা ভাবির জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।”
সুলতান সাহেব আর নাদিরা খাতুন একে অপরের দিকে বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকালো। সুলতান সাহেব বললেন,
“বিয়ে!”

“হ্যাঁ আঙ্কেল। আপনারা তো মুহিতের সম্পর্কে জানেনই। সোহানা মারা যাবার পর থেকে ও একাই মেয়ের দেখভাল করে। প্রান্তর থেকে কয়েক মাসের বড় ওর মেয়ে। দুধের শিশুকে মা ছাড়া বড় করা অবশ্যই মুখের কথা নয়। তবে সেটাও করে দেখিয়েছে মুহিত।”
“হ্যাঁ জানি তো। নিসা আমাদের বলেছে মুহিতের ব্যাপারে।”

“হ্যাঁ আঙ্কেল। তো সবদিক বিবেচনা করে দেখলাম প্রান্ত টাও ওর মেয়ের মতো অভাগা। তবে মিশু অর্থাৎ মুহিতের মেয়ের তো মুহিতের মত একজন ভরসা যোগ্য বাবা আছে কিন্তু প্রান্তওর তো সেই ভরসার স্থান টুকুও নেই। আজ যদি নিসা ভাবির অন্যকোথাও বিয়ে হয়ে যায় তারা হয়তো প্রান্তকে মেনে নাও নিতে পারে। তখন দেখা যাবে বাবার সাথে সাথে মা হারাও হতে হবে প্রান্তকে। সেদিক থেকে মুহিত প্রান্তর জন্য ওর বাবার সমতুল্য। আমি মনে করি বাবার ছায়া, বাবার শরীরের গন্ধ মুহিতের থেকে নিঃসন্দেহে প্রান্ত পাবে।

তাই বলছিলাম যে”
নিলয়ের কথা শেষ হবার আগেই নিসা চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে এসে সবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বলল,
“নিলয় ভাইয়া যা বলে ফেলেছেন সেটা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যাবে না, তাই নতুন করে আর কিছু বলবেন না।”
বলেই মায়ের কোল থেকে প্রান্তকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো নিসা। নিলয় বলল,
“ভাবি আপনি আমাদের ভুল বুঝবেন না।

আমরা কথাটা কেন বলছি সেটা একবার বুঝার চেষ্টা করুন”
“প্লিজ ভাইয়া। আমি যা বুঝেছি তাতেই আমাকে অটুট থাকতে দিন। এর থেকে বেশি আমি আর বুঝতে চাইছি না। আর আমি আপনাদের বড় ভাই ছাড়া কখনো কোনোদিন অন্য চোখে দেখিনি। আর না ভবিষ্যতে দেখতে পারব। এবার যদি আসেন প্রান্তর ভবিষ্যতের কথায়, তাহলে বলব আমি বিয়ে করছি না।

হ্যাঁ, প্রান্তর কথা ভেবে আমি বিয়ে করছি না। আমার সন্তানের ভবিষ্যত আমার কাছে প্রথমে তারপর বাকিসব। তাই ভাইয়া দয়া করে আর বিয়ে নামক শব্দটা উচ্চারণ করবেন না। আপনারা এতদিন পর এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি। তাই বাদবাকি সব কথা ভুলে চা নাস্তা করুন প্রান্তর সাথে খেলা করুন এটা বেটার।”
নিসার কথা শুনে সকলেই অবাক হয়ে গেল! তবে নিলয় ভাবছিল মুহিতের কথা।

যদি মুহিত অপমানিত বোধ করে থাকে। তাই নিলয় মুহিতের হাতের উপর হাত রেখে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলে নিলয়কে অবাক করে দিয়ে মুহিত হেসে বসা থেকে উঠে প্রান্তকে কোলে নিয়ে বলল,
“হাফ ছেড়ে বাঁচালেন নিসা। নিলয় সহ আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি নিসার কথায় অপমানিত বোধ করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন অপমান তো দূরের কথা আমি বড্ড খুশি হয়েছি। সত্যি বলতে বিয়ে করার ইচ্ছা আমারও ছিল না, আর না আছে। আমি কেবল প্রণয়ের শেষ চিহ্ন প্রান্তর কথা ভেবেই এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম।

তবে এখন আর ভাবনার কিছু নেই। প্রণয় না থাকলেও নিসাই যথেষ্ট প্রান্তর জন্য। এটাই যে মা আর সন্তানের মাঝে সম্পর্ক কিংবা দায়বদ্ধতা। দোয়া করি এভাবেই যেন প্রান্তকে বুকে নিয়ে সারাটা জীবন পার করে দিতে পারেন।”

বলেই প্রান্তর কপালে চুমু খেয়ে মুহিত নিলয়কে বলল,
“কী রে যাবি না? মেয়েটা কে তো বুয়ার উপর রেখে এসেছি। বেশিক্ষণ আমায় না পেলে কাঁদবে।”
নিলয় স্বস্তির হাসির রেখা ফুটিয়ে মুহিতের কাঁধে একহাত হাত রেখে অন্যহাত দিয়ে প্রান্তর গাল ছুঁয়ে বলল,
“চল।”

নিসার কোলে প্রান্তকে দিয়ে মুহিত বলল,
“তাহলে আসছি। ভালো থাকবেন।”

“জ্বি আপনিও ভালো থাকবেন। আর মিশুকে নিয়ে ঘুরে যাবেন।”
“ইনশাআল্লাহ।”
একে একে নাদিরা খাতুন ও সুলতান সাহেবের থেকে বিদায় নিয়ে মুহিত আর নিলয় বেড়িয়ে গেল। এদিকে নিসাও প্রান্তকে কোলে নিয়ে দুষ্টুমি করতে করতে নিজ রুমে চলে গেল।

পর্ব ৩৯

দেখতে দেখতে কেটে গেল ৩ বছর। এ ৩ বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুই। ২ বছর বয়সী প্রান্তর এখন ৫ বছর চলে। এ বছরই সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। আর নিসা, সে দেখতে আগের মতই চিকন চাকন হলেও ব্যবহারে এসেছে ব্যাপক ফারাক। তাকে দেখতে ৫ বছরের বাচ্চার মা মনে না হলেও তার ব্যবহারে পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশ পায় তার সন্তানের কথা।

“প্রান্ত! বাবা তুই কোথায় গেলি? মা সেই কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?”
এভাবেই ঘন্টা ধরে ডেকে যাচ্ছে নিসা কিন্তু প্রান্তর ছোঁয়া পাওয়ার নাম গন্ধও মিলছে না। অবশ্য এটি নতুন না, খাবারের সময় হলেই প্রান্ত ছুটোছুটি শুরু করে।
মায়ের ডাক শুনে প্রান্ত খাটের নিচে থেকে ফিক কতে হাসলেও পরক্ষনেই দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে চুপ হয়ে যায়।

তবে নিসা সেই ক্ষুদ্র হাসির শব্দ টের পেয়ে খাটের নিচে ঝুকতেই প্রান্ত খুশিতে চিৎকার দিয়ে বসে। দু’হাত দিয়ে আলতো করে টেনে প্রান্তকে নিচ থেকে বের করে জামা কাপড় থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
“তোকে না কতবার নিষেধ করেছি খাটের নিচে ঢুকবি না, তারপরও কেন ঢুকিস রে বাবা? জামা কাপড়ে যে ধুলো লেপ্টে যায় দেখিস না?”

“তুমি তাহলে আমাকে বার বার খাওয়াতে কেন আসো? তুমি খাওয়াতে না আসলেই তো আমি ঢুকি না।”

“না খেলে কি শক্তি হবে বাবা? তোর না স্পাইডারম্যান, আইরনম্যানের মত শক্তি চাই। তার জন্য হলেও তো খেতে হবে।”
“বেশি বেশি খেলে আমি স্পাইডারম্যানের মত ছু করে শক্তি দেখতে পারব মা?”

“হ্যাঁ বাবা পারবি তো। স্পাইডারম্যানের থেকেও বেশি শক্তি দেখাতে পারবি।”

“তাহলে আমি খাবো। অনেক গুলো খাবো। পুরো পৃথিবীর সব খাবার ঘাপুস ঘুপুস করে খাবো।”
“এইতো আমার সোনা বাবা বুঝতে পেরেছে। দেখি হা কর তো।”

“হা”
খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ প্রান্ত বলল,
“আচ্ছা মা, আমার বাবা কোথায়? সবার তো বাবা আছে। সবাই বাবাকে ডাকতে পারে আমি বাবাকে ডাকতে পারি না কেন? রুশা আপুর রনি মামা বাবা আছে। সুমন ভাইয়ার রাফি মামা বাবা আছে। তাহলে আমার বাবা কোথায় মা?”

প্রান্তর প্রশ্ন শুনে নিসা চুপ করেই রইলো। এ যে তার দৈনন্দিন প্রশ্নের তালিকায় চলে এসেছে। কত মিথ্যে বলবে সে? এদিকে প্রান্তও যেন আজ চুপ হবার নয়। নিসার গালে আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
“ও মা, বলো না আমার বাবা কোথায়?”

নিসা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আছে সোনা; তোমার বাবা আছে।”

“ওই ছবিগুলো? ওই ছবিগুলো তো আমাকে আদর করতে পারে না সব বাবাদের মত। আমার গালে চুমু খেতে পারে না সব বাবাদের মত। আমাকে রিমোট কন্ট্রোল কার এনে দিতে পারে না সব বাবাদের মত। তাহলে ওই ছবি আমার বাবা হয় কি করে?”

“বাবারা কি শুধু কাছে এলেই বাবা হয়? বাবারা তো দূরে থেকেও বাবা হয়। আর যারা দূরে থেকে বাবা হয় তারা কিন্তু বেস্ট বাবা বুঝলি?”
“আমার বেস্ট বাবাদ দরকার নেই। আমার পঁচা বাবাই চাই। তুমি বাবাকে এনে দাও না মা। প্লিজ প্লিজ প্লিজ তোমাকে তিনবার প্লিজ বলেছি আমার বাবাকে এনে দাও না মা।”

অবুঝ ছেলেকে কী বলে বুঝ দিবে নিসার জানা নেই। তারপরও মিথ্যে হাসির রেখা টেনে বলল,
“আচ্ছা বাবা এনে দেব।”
“ইয়ে তুমি আমার লক্ষী মা। আজ আমি সব খাবার খেয়ে নেব।”

“হা”
নিসা মুচকি হেসে প্রান্তর মুখে খাবার তুলে দিতেই রেখা রুমে এলো। নিসা স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“ভাবি কিছু বলবে?”

প্রান্তর মাথায় হাত বুলিয়ে রেখা বলল,
“নারে এমনিতেই এলাম। আমাদের প্রান্ত সোনা কি করছে তাই দেখতে এলাম।”

“কী আর করবে। আমাকে জ্বালাতন করাই তো ওর একমাত্র কাজ।”
“হা হা ঠিক বলেছিস। ছোট থাকতে কিন্তু বুঝা যায়নি ছেলেটা এত দুষ্টু হবে।”
“হ্যাঁ ভাবি।”
“আচ্ছা নিসা একটা কথা বলি?”

“হ্যাঁ ভাবি বলো।”
রেখা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ইয়ে মানে শিমুলের কী খবর? কথাবার্তা হয়? বিয়ে টিয়ে নিয়ে কিছু কি ভেবেছিস?”

প্রান্তর মুখে খাবার তুলে দিতে নিয়েও থমকে গেল নিসা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রান্তর মুখে খাবার দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“কিছু কথাবার্তা হলেই বিয়ের কথা পাকা করতে হবে নাকি ভাবি? আর শিমুলের সাথে তো আমি ইচ্ছে করে কথা বলতে চাইনি। তোমাদের জোরেই কথা বলেছি।

তাহলে তখন বলোনি কেন, কথা বললেই বিয়ে নিয়ে ভাবতে হবে?”
“তুই ভুল বুঝছিস নিসা। আমি কিন্তু সেরকম কিছুই বলিনি।”

“বয়স তো কম হয়নি ভাবি। কে কখন কি নিয়ে কথা বলে এতটুকু বুঝার ক্ষমতা হয়েছে। আর তুমি এখানে মায়ের কথায় এসেছ সেটাও আমি ভালো করে জানি।”
“ছেলেটা খারাপ না, ভেবে দেখতে পারিস কিন্তু।”
“প্রণয়ের থেকে অবশ্যই বেশি ভালো না?”

“সবসময় তুলনা করতে নেই রে। তবে বিশ্বাস রাখতে হয়। ছেলে যদি ভালো না হতো প্রতিবারের মত আমি নিজেই তোকে বারন করতাম। কিন্তু এবার পারছি না কারণ ছেলেটাকে আমার ভালোই মনে হচ্ছে।”

“উপরে সবাই ভালো থাকে তবে ভেতরটা কেমন সেটাই বড় কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা প্রান্তকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাবো না। সবার আগে আমার ছেলে। ওর আগে কিচ্ছু না।”

“জীবন কিন্তু ছোট না নিসা। অনেক বড়। এই বিশাল জীবনে একা চলা অসম্ভব ছাড়া কিছুই না। প্রান্তকে নিয়ে কি একা মুখ বুজে সব সখ আহ্লাদ ভুলে বাঁচতে পারবি?”
“মানুষের পক্ষে অসম্ভব বলতে কিন্তু কিছুই নেই ভাবি। আর তোমরাই তো একসময় বলতে এক ছেলেকে নিয়ে জীবন পার করা অসম্ভব কিছু নয়। তাহলে আজ তার উল্টো কথা বলছ যে?”

“সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই চেঞ্জ হয় নিসা। তখন প্রান্ত খুব ছোট ছিল। ওর পক্ষে মা ছাড়া থাকা অসম্ভব ছিল।”
‘কিন্তু এখন যে আমার পক্ষে প্রান্তকে ছাড়া থাকা অসম্ভব। সেটা বেলায় কিছু না?”
“তারপরও একবার ভেবে দেখলে হয় না?”

“না ভাবি প্লিজ। এসব বিষয়ে আর কথা বলো না।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রেখা বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা, তুই যা ভালো মনে করিস।”

বলেই রেখা প্রান্তকে আদর করে রুম ছেড়ে চলে গেল। তবে নিসা সেদিকে খেয়াল না করে দ্রুত প্রান্তকে খাইয়ে প্রান্তকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। বেশি রাত না হওয়ায় প্রান্ত ঘুমাতে না চাইলেও নিসা বিভিন্ন গল্প, গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল।

প্রান্ত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলেই নিসা আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা লাগিয়ে আলমারি থেকে প্রণয়ের এলবামটি বের করল। বিছানার এক কোণে বসে এলবাম মেলে ছবিগুলোর উপর হাত বুলিয়ে চোখের জল ফেলে বলল,
“এ নিসা কারো হবার নয় প্রণয়। এ নিসা, তোমার নিসা। এ নিসা প্রণয়ের নিসা।”

বলেই ছবিগুলো বুকের সাথে মিশিয়ে কাঁদতে লাগল নিসা। আর স্মৃতিচারণ করতে লাগলে প্রণয়ের সাথে তার সুখময় মুহুর্ত গুলোকে।

লেখা – জান্নাতুল ফেরদৌস মাটি

সমাপ্তি

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “তোমার নিসা – পাগল প্রেমের পাগলামি গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ। )

আরো পড়ূন – তোমার নিসা (১ম খণ্ড) – পাগল প্রেমের পাগলামি গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button