রিলেশনশিপ

পুনরায় – তোমার আমার মিলন গল্প

পুনরায় – তোমার আমার মিলন গল্প: মাহমুদের চোখে পানি। ব্যস্ত ভাবে শার্টের কোনা দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করলো সে। মেহরিন তৃপ্ত চোখে চেয়ে রইল তার প্রেমিক পুরুষটির দিকে।


পর্ব ১

শপিং মল ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছিলো মেহরিন। কেনাকাটা প্রায় শেষ। অরেঞ্জ কালারের একটা গাউন তার বিশেষ পছন্দ হয়েছে। ভালোকরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেটা দেখছিলো। একপর্যায়ে থমকে গেলো। ব্যাঙের মত লাফিয়ে উঠলো হৃদপিন্ডটা।

হাত থেকে গাউনটা কখন যে পড়ে গেলো সে নিজেও খেয়াল করলো না। স্থিরভাবে চেয়ে রইলো। সেই মুখ, সেই গাল, সেই হাঁটার ধরণ! অবিকল যেন সেই মানুষটা। মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। এতগুলো বছর পরে সে নিজেকে সামলে উঠেছিলো কিন্তু আবার সেই চিন্তা, সেই ক্ষত বুকের ভেতর তাজা হয়ে উঠছে। তার পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলো সেই স্মৃতির জ্বালাপোড়াটুকু। মেহরিন হাত বাড়িয়ে সামনে দাঁড়ালো।

~ “হেই! লিটল ম্যান? ক্যান আই টক টু ইউ?”
বাচ্চাটা থমকে গেলো। কয়েক মুহূর্তে মেহরিনের দিকে চেয়ে থেকে অবশেষে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। পেছন পেছন ছুটলো মেহরিনও। কিন্তু নাগাল পেলো না। ভালো করে চারপাশ ঘুরে দেখলো সে। নেই! অল্পকিছুক্ষনের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। হতাশ হয়ে হাতের গাউনটা রেখে পেমেন্ট কাউন্টার এর দিকে এগোলো।

বিল পেমেন্ট করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। গাড়ির কাছে আসতেই আবার দেখতে পেলো। বয়স্ক একজনের হাত ধরে গাড়িতে উঠছে বাচ্চাটা। বাচ্চাটাকে দেখতে বাঙ্গালী মনে হলেও লোকটাকে এই দেশী মনে হচ্চে। বাচ্চাটার হাতে আইস্ক্রিম। গালের চারপাশে লেগে আছে। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে বারবার গালের চারপাশে লেগে থাকা আইস্ক্রিম মুছছে সে।

মেহরিন এগিয়ে গেলো। কিন্তু এবারেও হাতছাড়া হয়ে গেলো। সে গাড়ির কাছে পৌঁছানোর আগেই ওদের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিলো।

নিজের ঘরে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছে মাহমুদ। আজকে সারাদিন তার ব্যস্ত কেটেছে। বিছানায় লাফিয়ে উঠে তার পাশে শুয়ে পড়লো সুজান। হাত পা ছড়িয়ে বললো,
~ “আই অ্যাম সো টায়ার্ড বাবা।”

মাহমুদ পাশ ফিরলো। ছেলের ছোট্ট শরীরটাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। বড় বড় সিল্কি চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
~ “আই অ্যাম অলসো!”
~ “তুমি কি এখন ঘুমাবে?”

~ “না। বাবার কাজ শেষ হয় নি। সাড়ে পাঁচটায় আবার বেরোতে হবে।”
~ “আসবে কখন?”
~ “রাত হতে পারে। কেন তুমি বাবাকে মিস করবে?”

–“ইয়েস। আই উইল মিস ইউ!”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মাহমুদ। কাজের চাপে ছেলেটাকে ঠিকমত সময় দিতে পারে না সে। ছেলেটা হয়েছে একেবারে এনার মত। কোন কিছু নিয়ে অভিযোগ নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো মাহমুদ। তাকে জরুরি একটা মিটিং এটেন্ড করতে হবে।

রেডি হয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো সে। সুজান খাটে শুয়ে বাবাকে দেখছে। এইটুকু বয়সে সে বুঝে গেছে তার বাবা খুবই কাজ পাগল মানুষ। কাজ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। ফ্যামিলিও না। খাট থেকে নেমে নিজের ড্রয়িং খাতা খুলে ড্রয়িং করতে বসে গেলো। মন খারাপ হলে সে ড্রয়িং করে।

মাহমুদ ছেলের চুল ঝাঁকি মেরে বললো,
~ “আসি বাবা?”
~ “ওকে। স্টে সেইফ।”
~ “তুমিও। বাবার পারমিশন ছাড়া বাইরে যাবে না কেমন?”
~ “যাবো।”

মাহমুদ হাসলো। সে জানে সুজান বাবার বাধ্য ছেলে। তার পারমিশন ছাড়া একপা-ও বাসার বাইরে যাবে না সুজান। মাঝে মাঝেই বাবাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে সে। মাহমুদ ছেলের গালে চুমু খেয়ে বলল,
~ “বাবার সাথে দুষ্টুমি হচ্ছে?”
সুজান খিলখিলিয়ে হাসলো। মাহমুদ পুনরায় তার চুলের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
~ “আসি।”

মিটিং শেষে তাড়াহুড়ো করে বেরোচ্ছিলো মাহমুদ। লিফটে উঠবে এমন সময় সোহাগ ডাক দিলো। থেমে গেলো সে। সোহাগ কাছে এসে বললো,
~ ” চলে যাচ্ছেন কেন মাহমুদ ভাই। আজকে আমরা সবাই মিলে একটা পার্টিতে যাচ্ছি।”
~ “গ্রেট নিউজ। কখন যাচ্ছো?”
~ “এখুনি। আপনিও যাচ্ছেন।”

~ “আমার সময় হবে না। তোমরা যাও।
~ ” আমি সুজানকে নিয়ে আসার জন্য বাসায় বলে দিয়েছি। আব্বাস তাকে নিয়ে আসছে।”

আব্বাস সুজানের কেয়ারটেকার। মাহমুদের অনুপস্থিতিতে সে-ই সুজানের দেখাশোনা করে। দুবাই তে তিনমাসের একটা ট্রেনিং এ এসেছে মাহমুদ। সুজানকে কিছুতেই রেখে আসা যায় নি। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে আসতে হলো মাহমুদের। এই তিনমাস আব্বাদ সুজানের দেখাশোনা করবে। তারপর আবার দেশে ফিরে যাবে ওরা। মাহমুদ বলল,
~ “ভালো করো নি।”
~ “খুবই ভালো করেছি।”

মহমুদ বিরক্ত হলো। এসব পার্টিতে যেতে তার একদম ভালো লাগে না। কিন্তু এদের বাড়াবাড়িতে মাঝেমাঝেই তাকে এটেন্ড করতে হয়।
~ “খবর যখন দিয়ে দিয়েছো। আর কি করার চলো।…সুজান কি এখানে আসছে? না ডিরেক্ট পার্টিতে?”
~ ” পার্টিতে।”

টেবিলের এক কোনায় বসে আছে মাহমুদ। দলের বাকিরা সুজানকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। সুজান ইতোমধ্যে বেশ জমিয়ে ফেলেছে। বাবার সাথে এসব পার্টিতে এটেন্ড করার সুযোগ তার খুব একটা হয় না। কদাচিৎ যদি সুযোগ পায় খুব খুশি হয় সে।

দুবাই এর ফরেন মিনিস্টার এর মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। অতএব দারূণ জাঁকজমক আয়োজন। মাহমুদ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। ভালো লাগছে না। হাত বাড়িয়ে সুজানকে ডাক দিলো সে,
~ “সুজান। এদিকে আসো বাবা!”

বান্ধবীদের কয়েকজনের সাথে নিচে নামছিলো মেহরিন। এখানকার ফরেন মিনিস্টার এর মেয়ে সোফিয়া তার বান্ধবী। কেক কাটার সময় হয়ে গেছে। সোফিয়াকে নিয়ে নিচে নেমে এলো সবাই।হঠাৎ সেই পরিচিত কন্ঠস্বর কানে আসতেই থমকে গেলো মেহরিন। এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সে। বান্ধবীদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে সামনে অগ্রসর হলো। আবারো সেই বাচ্চাটাকে চোখে পড়লো। তার সামনে হাটুমুড়ে কেউ একজন বসে আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে বাচ্চাটা। পিছন ফিরে থাকায় সেই ব্যক্তির চেহারা দেখা যাচ্ছে না। তবুও চিনে ফেললো মেহরিন।

আচমকা বুকের ভেতর ধাক্কা অনুভব করলো সে যার বেগ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মাথা ঘুরতে শুরু করলো তার। কি করবে সে? মূর্তির মত পলকহীন ভাবে চেয়ে রইলো সামনের দুজনের দিকে। বাচ্চাটাকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মানুষটা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দ্বিধায় পড়ে গেলো মেহরিন। সে কি যাবে? কথা বলবে? একটার অন্তত চোখের দেখা দেখবে? না! থাক। কি দরকার পুরোনো স্মৃতিগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলার। মানুষটা ভালো আছে। সংসারী হয়েছে আর কি চাই মেহরিনের। এইটুকুই তো চেয়েছিলো সে।আড়ালে সরে গেলো মেহরিন।

নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছে মেহরিন। বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে। হঠাৎ পিঠে টোকা পড়তেই চমকে উঠলো সে। সামনের মানুষটার দিকে অসহায় ভাবে চেয়ে রইলো। রায়হান হাসি মুখে বললো,
~ “কি ব্যাপার? তুমি ঠিক আছো?”

শরীরের কাঁপুনিটুকু থামার সময় নিল মেহরিন। ধাতস্থ হয়ে নরম গলায় বললো,
~ “আমি ঠিক আছি।”

~ “সিউর?”
~ “হ্যাঁ।”
~ “ওকে। দেন লেটস এঞ্জয়?”

মেহরিনের অস্থির লাগছে। এখানে আর একমুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে মন চাইছে না। ঝাপিয়ে কান্না আসছে তার। ধরে আসা কন্ঠে বললো,
~ “আই এম সরি রায়হান। আমার বাসায় যেতে হবে!”
রায়হান ওর চেহারা দেখে আন্দাজ করে নিলো কিছু একটা হয়েছে। ঘাটাঘাটি করলো না সে। বলল,
~ “চলো।”

সারারাস্তা গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে কেঁদেছে মেহরিন। রায়হান বাধা দিলো না। এই মুহূর্তে মেহরিনকে কিছু জিজ্ঞেস করা সংগত হবে না নিশ্চই। তাকে স্বাভাবিক হওয়ার সময় দেওয়া উচিৎ। বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো সে। বাসায় ঢুকেই বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়লো মেহরিন। কান্নার বেগ ক্রমাগত বাড়লো। একসময় চিৎকারে পরিনত হলো। নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না সে। দুটো ঘুমের ওষুধ একসাথে খেয়ে মরার মত বিছানায় পড়ে রইল সে।


পর্ব ২

মেহরিন একদৃষ্টিতে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। কাল সারারাত থেকে মরার মত ঘুমিয়েছে সে। কখন সকাল হয়েছে, সকাল গড়িয়ে দুপুর কোন হুঁশ ছিলো না তার। দুপুরের দিকে রায়হান গিয়ে না তুললে হয়ত আজকে সারাদিন হয়ত এমনি কেটে যেত। তাকে নিয়ে বাসার কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে রায়হান। একরকম জোর করেই নিয়ে এসেছে ওকে। আসার পর থেকে একটা কথাও বলে নি মেহরিন। ঠায় বসে আছে। রায়হান খেয়াল করলো কিছুক্ষন পর পর মেহরিনের ঠোঁট দুটো কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে যেন কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে সে।

মেহরিন কোলের ব্যাগটা খামছে ধরলো। অসহ্য লাগছে তার। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মাহমুদের মুখটা। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলো না। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো। রায়হান হতবাক হয়ে চেয়ে আছে। মেহরিনের আকস্মিক কান্নার কারণ কি হতে পারে সে বুঝতে পারছে না। নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে মেহরিনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ “কি হয়েছে মেহরিন? কোন সমস্যা? আমাকে বলো।”
~ “আমার খুব খারাপ লাগছে রায়হান। আমি একা থাকতে চাই।”

~ “ঠিক আছে। লাঞ্চ করে যাই? সকাল থেকেই তো না খেয়ে আছো।”
চোখ মুছে সোজা হয়ে বসলো মেহরিন। খাবার আসার অপেক্ষা করে বসে রইল। রায়হান চুপচাপ তাকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। মেহরিনের আকস্মিক মন খারাপের কারণ কি সেটা ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। খাবার আসতেই মেহরিন দ্রুত শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। ব্যাগ নিয়ে বললো,
~ “আমি একা যেতে পারবো রায়হান। তুমি বাসায় চলে যাও।”

~ “তোমাকে পৌঁছে দিয়ে যাই?”
~ “আমি বাসায় যাবো না।”
~ “কোথায় যাবে?”

~ “কিছুক্ষন একা ঘোরাঘুরি করবো। প্লিজ!”
~ “ঠিক আছে।”
রায়হান উঠে দাঁড়ালো। তার খাওয়া শেষ। ওয়ালেট বের করে বিল পে করলো সে। মেহরিন কে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ “চলো।”

দুজনে একসঙ্গে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো। গাড়ির কাছে এসে রায়হান আলতো করে মেহরিনকে জড়িয়ে ধরে বললো,
~ “ঠিক আছে আমি তাহলে যাচ্ছি। বাট ইউ টেইক কেয়ার…!”

বাসায় কাছের এই পার্কটায় মাঝে মাঝে আসে মেহরিন। কখনো কখনো সঙ্গে রায়হান থাকে কখনো বা একা আসে। পার্কের রাস্তা ধরে একা একা হাঁটছিলো সে। হঠাৎ একটা বলের বাড়ি এসে কপালে লাগলো। প্রচন্ড জোরে লেগেছে। মাথা ঘুরতে শুরু করলো। নিজেকে সামলাতে একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। চারদিকটা মনে হচ্ছে ঘুরপাক খাচ্ছে। মেহরিন কপালে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে আছে। হঠাৎ একটা নরম তুলতুলে হাত তাকে স্পর্শ করতেই চোখ খুললো সে।

~ “আর ইউ ওকে মিস? আই এম সরি!”
মুহূর্তের জন্য বাক্যহারা হয়ে গেলো মেহরিন
ফ্যালফ্যাল করে বাচ্চাটার দিকে চেয়ে রইলো। বাচ্চাটার মুখে স্পষ্ট অনুতাপ। মেহরিন এদিক ওদিক তাকালো। সেদিনের সেই বুড়ো লোকটা ছাড়া আর কেউ নেই। কপালের ব্যথা ভুলে গিয়ে হঠাৎ করেই বাচ্চাটাকে প্রশ্ন করে বসলো সে,
~ “উইল ইউ টেল মি ইউর ফাদার’স নেইম? প্লিজ?”

বাচ্চাটা ভ্রু কুঁচকে ফেললো। চোখেমুখে বিস্ময় ভাব। তবে জবাব দিল সে। নিখুঁত উচ্চারণে বলল,
~ “মাহমুদ সিদ্দিকি!”
~ “ডু ইউ নো বাংলা?”

~ “ইয়েস। আই নো দ্যাট!”
মেহরিন হাটুমুড়ে তার পাশে বসলো। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে আব্বাস। সুজানের তুলতুলে গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ “তোমার নাম কি বাবা?”
~ “সুজান মাহমুদ।”

চোখে পানি, মুখে হাসি ফুটে উঠলো মেহরিনের।সুজানকে বুকে চেপে ধরলো সে। দুগালে অসংখ্য চুমু খেলো। সুজান বিরক্ত হলো। অপরিচিত একজন মহিলা তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে কেন সে কিছুই বুঝতে পারলো না। ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো। আব্বাস মেহরিনকে বাধা দিয়ে বললো,
~ “হোয়াট আর ইউ ডুয়িং? লিভ হিম। আই সেইড লিভ হিম!”

ছেড়ে দিলো মেহরিন। সঙ্গে সঙ্গেই দৌঁড়ে গিয়ে আব্বাসের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো সুজান। তার চোখে রাগ। বাঁ হাত দিয়ে গাল মুছছে। মেহরিন হেসে ফেললো। ছেলেও বাবার মতই রাগী হয়েছে! দুষ্টুমি করে সুজানকে একটা চোখ মারলো সে। সুজান চোখ বড়বড় করে তার দিকে চেয়ে রইলো। চোখে দারূণ ক্ষোভ! আব্বাসকে টানাটানি শুরু করে দিল কেটে পড়ার জন্য। মেহরিন উঠে দাঁড়ালো। হাসিমুখে বললো,
~ “আসি?”

সুজান রাগে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। মেহরিন কিন্তু গেলো না। যাওয়ার ভান করে একপাশে লুকিয়ে পড়লো সে। উদ্দেশ্যে মাহমুদের বাসা চিনে নেওয়া। আব্বাস সুজানকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো। ট্যাক্সি নিয়ে তাদের পিছু করলো মেহরিন।

জুতো খুলে লম্বা হয়ে খাটে শুয়ে পড়লো সুজান। মাহমুদ তার পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,
~ “কি ব্যাপার আজকে মনে হয় তাড়াতাড়ি চলে এলে?”

সুজান জবাব দিলো না। মুখ ভার করে বসে রইলো। মাহমুদ ছেলের মতিগতি পর্যবেক্ষণ করে ল্যাপটপ সরিয়ে তার গা ঘেঁষে বসলো।
ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হাসিখুশি গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ “কি ব্যাপার মি.সুজান মাহমুদ? আপনার চান্দি গরম কেন?”

~ “একটা আন্টি আমাকে চোখ মেরেছে।”

বোবার মত তার দিকে চেয়ে রইলো মাহমুদ। খানিকবাদে হো হো করে হেসে ফেললো। অনেকদিন বাদে এমন করে হেসেছে সে। হাসির চোটে চোখে পানি চলে এলো তার। সুজান চোখমুখ লাল করে তার দিকে চেয়ে আছে। মাহমুদ হাসি থামিয়ে বললো,
~ “আহারে! কি দিনকাল শুরু হলো। আমার বাচ্চা ছেলেটাকে পর্যন্ত আন্টিরা চোখ মারে।”

সুজান কাঁদোকাঁদো গলায় বললো,
~ “ইউ আর জোকিং বাবা!”
মাহমুদ ভালো ছেলেদের মত হাত নাড়িয়ে বললো,
~ “নো, আই এম নট!”
সুজান জোর গলায় বললো,
~ “ইয়েস! ইউ আর..!”

ধরা খেয়ে আবারো হাসলো মাহমুদ। সুজানের প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। মেয়েরা এমন কেন? হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেই কেন তাদের অসভ্যতা শুরু হয়ে যায়? স্কুলে একবার তাদের ক্লাসের একটা মেয়ে জোর করে সুজানের গালে চুমু খেয়েছিলো। সুজান অবশ্য চুপ করে থাকে নি। মেয়েটার গালে কষে চড় মেরেছিলো সে। কিন্তু আজকের আন্টিটাকে তো কিছুই করা হয় নি। আবার যদি সুযোগ হয় অবশ্যই তাকে খামচে দেবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো সুজান। মাহমুদ মুচকি মুচকি হাসছে। বললো,
~ “সুজান? বাবা, এত রাগ করতে নেই! আফটার অল ইউ আর হ্যান্ডসাম এনাফ!”
~ “বাবা?”

মাহমুদ হাসতে হাসতে বললো,
~ “কি বাবা?
~ “আমি কিন্তু রেগে আছি।
~ “ওকে। আমি আর কিছু বলবো না। কিন্তু একটা প্রশ্ন?”

~ “কি?”
~ “আন্টি কি তোমাকে আর কিছু বলেছে?”
~ “না। আমার গাল টিপে আদর দিয়েছে।”

মাহমুদ ছেলের মনের ভুলটুকু দূর করে দিলো। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
~ “এর জন্য মন খারাপ করছো কেন বাবা। আন্টি হয়ত তার ছেলেকে মিস করছিলো তাই তোমাকে আদর করেছে।”
এইবার সুজানকে চিন্তিত দেখালো। বাবা তো ঠিক বলেছে। সুজানতো এইকথা একবারও ভেবে দেখে নি। মন খারাপ হলো তার। মাহমুদ বললো,
~ “কি ভাবছো?”

সুজান বাচ্চাসুলভ কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করলো,
~ “ঐ আন্টির ছেলের কি হয়েছিলো বাবা?”

~ “আমি জানি না। আবার যদি তোমার সাথে দেখা হয় তুমি জিজ্ঞেস করে নিও!”
সুজান কতক্ষণ চুপ করে থেকে, হঠাৎ মৌন কণ্ঠে বলে উঠলো,
~ “আমি মাকে অনেক মিস করি বাবা।”

মাহমুদের দৃষ্টি অসহায়। ছেলেকে কোলে নিয়ে বারান্দা এসে দাঁড়ালো সে। শক্ত করে চেপে ধরলো বুকের মাঝে। মা মরা ছেলে তার। কাজের জন্য ঠিকমত সময় দিতে পারে না। বাবা হিসেবে ছেলের প্রতি দায়িত্বগুলোকে এড়িয়ে-ই চলেছে এতকাল যাবত। এনা মারা যাওয়ার পর থেকেই সুজান একা একা বড় হচ্ছে। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
~ “মা-ও তোমাকে অনেক মিস করে সুজান। তুমি তো মায়ের কলিজার টুকরো ছিলে!”

সেদিনের পর থেকে আর সুজানের সাথে দেখা হয় নি মেহরিনের। আজকে অফ ডে। মেহরিন প্রায় সকাল থেকেই পার্কে এসে বসে আছে, যদি কোনভাবে সুজানের দেখা পায়। এবার দেখা হলে বাসার সবার কথা জিজ্ঞেস করে নিবে সে।

অবশেষে আরো ঘন্টাখানেক বাদে বহুল প্রত্যাশিত কালো রংয়ের গাড়িটা পার্কের গেট দিয়ে ঢুকতে দেখা গেলো। পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে তার ভেতর থেকে সুজানকে কোলে নিয়ে নামলো মাহমুদ। অপ্রত্যাশিত কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটা মুহূর্তেই মেহরিনের বুকের ভেতর বিষন্নতার ঝড়ো হাওয়া হয়ে বইতে শুরু করলো। আশেপাশের সবকিছু উপেক্ষা করে সে পলকহীন ভাবে চেয়ে রইলো মানুষটার দিকে। তার দৃষ্টি ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। পায়ের পাতা টলছে। সরে গেলো সে। আড়ালে চলে গেলো।

পার্কের খোলা ময়দানে বাপ ছেলে ক্রিকেট খেলছে। দুজনের পরনেই কালো প্যান্ট আর নীল শার্ট। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একই ড্রেসআপ। এমনকি চুলের কাটিংটা পর্যন্ত সেইম। মেহরিন জলভরা চোখে মুচকি হাসলো। হঠাৎ করেই সুজানের চোখ পড়লো মেহরিনের দিকে। দৌড়ে গিয়ে বাবার কানে কানে কি যেন বললো সে। মাহমুদ মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। মেহরিনের আর এক সেকেন্ডও দেরী করলো না। তীব্রগতিতে পা চালিতে পার্ক থেকে বের হয়ে গেলো।

ছেলেকে মৌনমুখে ফিরে আসতে দেখে মাহমুদ হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো,
~ “কি ব্যাপার পাও নি?”
~ “না। মনে হয় আমার সাথে রাগ করেছে।”

ছেলেকে কোলে তুলে নিলো মাহমুদ। কাছেই আব্বাস পানির বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাহমুদ পানি বোতল খুলে পানি খাইয়ে দিয়ে নরম গলায় বললো,
~ “ঠিক আছে। কোন ব্যাপার না। আবার দেখা হলে সরি বলে নিবে!”
~ “বাবা, দাদুভাইয়ের ফোনে এই আন্টিটার ছবি আমি দেখেছি।”

মাহমুদ থমকে গেলো। হঠাৎ করেই বুকের ভেতর উথাল পাথাল শুরু হলো। চিনচিন করে সেই পুরোনো ব্যথাটা আবার মেহরিন নামক শব্দটার উপস্থিতি জানান দিয়ে উঠলো। চোখের কোনে পানি জমা হলো। হাহাকার করে উঠলো বুকের ভেতরটা। তবে কি সুজান মেহরিনের কথা বলছে? মেহরিন এখানে?

পুনরায়! আরো একবার নিজেকে সামলে নিলো সে।হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে নিয়ে বললো,
~ “আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে সুজান। চলো বাসায় ফিরে যাই।”


পর্ব ৩

সুজান নিজের মত করে খাচ্ছে। মাহমুদ তার পাশে বসে খাবার নাড়াচাড়া করছে।
~ “সুজান?”
~ “হুম?”
~ “ভালো করে মনে করে দেখো তো সেদিন ঐ আন্টি-টা কি তোমাকে কিছু বলেছিলো?”

~ “কেন?”
~ “এমনি। তুমি বলছো তুমি আন্টির ছবি দাদুর ফোনে দেখেছো, তাই। তিনি কি তোমাকে দাদুর ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করেছে?”

সুজান তার ছোট্ট হাতখানা দিয়ে কাটাচামচ নাড়াচাড়া করতে করতে কিছুক্ষন ভাবলো। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
~ “তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো।”
~ “আমার কথা?”

মাহমুদের চোখেমুখে উত্তেজনা। অধীর হয়ে সুজানের মুখের দিকে চেয়ে আছে সে। সুজান খাওয়া থামিয়ে বললো,
~ “তোমার নাম জিজ্ঞেস করেছিলো।”
~ “তাই? তুমি বলেছো?”

~ “হুম।”
~ “আর কিছু জিজ্ঞেস করেছিলো?”

~ “হ্যাঁ। আমার নাম জিজ্ঞাসা করেছিলো। আর কিছু মনে নেই।”
~ “আচ্ছা ঠিক আছে। খাও!”
পরোক্ষনেই মাহমুদ আবার প্রশ্ন করলো,
~ “আন্টিটা দেখতে কেমন?”

~ “ভালো না!”
মাহমুদ আর কিছু বললো না। ডান হাতটা সস্নেহে ছেলের মাথায় রেখে বললো,
~ “ঠিক আছে তুমি খাও।”

মাহমুদের খাওয়া শেষ। প্লেট নিয়ে সিংকে ভিজিয়ে রাখলো সে। সুজানের খাওয়া তখনো শেষ হয় নি। মাহমুদ কিচেন থেকে বেরিয়ে ডাইনিং এর পাশ দিয়ে হেটে রুমে যাচ্ছিলো। সেই মুহূর্তেই সুজান আবার ডাক দিলো তাকে,
~ “বাবা?”

মাহমুদ ফিরে এলো। ছেলের আদুরে মুখখানার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
~ “কিছু বলবে? কিছু লাগবে?”

~ “আন্টিটা খুব সুন্দর। ফেইরীদের মত!”
মাহমুদ হেসে ফেললো। ছেলের নরম গালটা টেনে দিয়ে বললো,
~ “ঠিক আছে। এবার তুমি তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো।”

রায়হান সরুচোখে মেহরিনের দিকে চেয়ে আছে। মেহরিন নির্বিকার। আজকে তাদের বিয়ের শপিং করার কথা। একসপ্তাহ আগে মেহরিনের নিজেই সব প্ল্যান করে রেখেছিলো। কিন্তু এখন বসে বসে কাঁদছে। রায়হান প্রথমে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলেও মানিয়ে নিলো। হাটুমুড়ে মেহরিনের সামনে বসলো। নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ “তোমার কি হয়েছে মেহরিন? আমাকে বলবে? সেদিন পার্টিতে যাওয়ার পর থেকেই দেখছি তোমার মুড অফ! কোন সমস্যা? তুমি কি বিয়েটা করতে চাইছো না?”

মেহরিন অসহায় ভাবে ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে। রায়হানের মুখটা তার চেয়েও বেশি অসহায়। দুবাই আসার পর রায়হানের সাথেই প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিলো মেহরিনের। রায়হান বাঙালী। সেই জন্যই বন্ধুত্বটা খুব সহজে হয়ে গেছে। রায়হানের পুরো পরিবারসহ দুবাই থাকে। ওদের পরিবারের সবার সাথেই মেহরিনের খুব ভালো সম্পর্ক। রায়হানের মা মেহরিনকে নিজের ছেলের জন্য পছন্দ করে বিয়ে প্রস্তাব দেন। মেহরিন সরাসরি না বলতে পারলেও এতকাল যাবত এড়িয়ে এসেছিলো। কিন্তু আজ যখন সে সবকিছু ভুলে বিয়েতে মত দিলো তখনই পুরোনো স্মৃতি জ্বলজ্বল করে তার সামনে এসে দাড়ালো।কালবৈশাখীর ঝড় তুলে দিলো বুকের ভেতর। কি করবে সে?

অবশেষে মনকে বোঝালো মেহরিন। মাহমুদ বিবাহিত। তার সংসার আছে। ফুটফুটে সুন্দর দেখতে একটা ছেলে আছে। অতএব মেহরিনের কষ্ট পাওয়া অনুচিত। আলমারি থেকে জামা বের করে রেডি হয়ে নিলো সে। তারপর রায়হানের সাথে শপিং করতে বেরোলো।

সুজানকে নিয়ে শপিং করতে বেরিয়েছে মাহমুদ। সঙ্গে আব্বাস আছে। সুজান খুব খুশি। মাহমুদের একেবারে গা ঘেঁষে হাঁটছে সে। হঠাৎ করেই চেঁচিয়ে উঠলো সে,
~ “বাবা ঐ আন্টিটা!”
মাহমুদ ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকালো। মুহূর্তে হৃদপিন্ডটা বরফে পরিনত হলো। আকাশ পাতাল সমেত ঘুরতে শুরু করলো। মেহরিন! এখানে!.. তার ধারণাই ঠিক। সুজানের সাথে মেহরিনের-ই দেখা হয়েছিলো।

~ “সুজান? চলো বাসায় ফিরে যাই।”
~ “কেন বাবা? আন্টিকে সরি বলবো না?”

~ “পরে বলে দিও। বাবার একটা কাজ মনে পড়ে গেছে। আমাদেরকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে।”
~ “ঠিক আছে চলো।”

মেহরিন তাদের দেখতে পায় নি। সেই সুযোগে টেনে সুজানকে নিয়ে আড়ালে চলে গেলো মাহমুদ। দ্রুত পেমেন্ট কাউন্টারের দিকে গেলো সে। পেমেন্ট ক্লিয়ার করে বেরোতে যাবে এমন সময় তারই মত সামনে অগ্রসরমান কারো সাথে ধাক্কা খেলো। সরি বলতে গিয়ে, দীর্ঘ সাত বছর পর আশেপাশে সবকিছু ভুলে পুনরায় দুইজোড়া তৃষিত নয় একত্রিত হলো। ঠিকরে পড়লো অভিমান, আক্ষেপ। তবুও আচমকা মুখে হাসির রেখা টেনে নিলো মাহমুদ। যেন সে জানতোই না মেহরিন এখানে আছে। শান্ত স্বাভাবিক ভাবে বললো,
~ ” তুমি? এখানে? এখানেই সেটেল হয়েছো বুঝি?”

মেহরিন কোন কথা বলতে পারলো না। তার গলার স্বরটাকে কে যেন আটকে রেখেছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু। এর মাঝেই তার পাশে এসে দাঁড়ালো রায়হান। মেহরিনকে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ “তোমার এখনো হয় নি? জুয়েলারি কখন নিবে?”

মাহমুদের চেহারার হাসিটা নিভে গেলো। চেহারায় নেমে এলো আকস্মিক অন্ধকার!নিজেকে স্বাভাবিক রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করলো। মেহরিন তখনো নিশ্চুপ। মাহমুদ রায়হানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
~ “হ্যালো। আমি মাহমুদ। মিস মেহরিনের ফ্রেন্ড!”
রায়হানও হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
~ “আপনি বাঙ্গালী? পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো।”

তারপর মেহরিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
~ “কি ব্যাপার মেহরিন তুমি তো আমাকে বলো নি এখানে তোমার ফ্রেন্ড থাকে।”

~ “আসলে আমি ট্রেনিং এ এসেছি। হঠাৎ করেই উনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।
~ “ও আচ্ছা। কয়দিন আছেন?”
~ “বেশিদিন না।”

সুজানের দিকে চোখ পড়লো রায়হানের। ইশারায় জিজ্ঞেস করল,
~ “কে?”
~ “আমার ছেলে।”

রায়হান সুজানকে কোলে তুলে নিলো। সুজান নামার জন্য ছটফট করলেও বাবার ইশারা পেয়ে শান্ত হয়ে গেলো।রায়হান হেসে উঠে বললো,
~ “একেবারে আপনার বাধ্য দেখছি! যাই হোক আপনারা গল্প করুন আমি ওকে নিয়ে ঘুরে আসছি।”

শপিং মল সংলগ্ন রেস্টুরেন্টে বসে আছে দুজনে। মেহরিনের দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। সে জানে তার মোটেও কাঁদা উচিত নয়। তবুও কেন যে কান্না চেপে রাখতে পারছে না। মাহমুদ তার মুখোমুখি চুপচাপ বসে আছে।
~ “কাঁদছো কেন মেহরিন?”

মেহরিনের কান্না থামলো না। পূর্বের মতই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
~ “এতদিনে তো সব ভুলে যাওয়ার কথা। সাত বছর। এনাফ টাইম। নিজেকে সামলে নেওয়ার

~ “তুমি পেরেছো?”
মাহমুদ হাসলো। বলল,
~ “তুমি নিজের চোখেই তো দেখেছো। পেরেছি কি না? বিয়ে করেছি। ছেলের বাবা হয়েছি।”

~ “ওও!”
~ “তুমি বিয়ে করো নি?”
বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই মেহরিনের ফোঁপানো বেড়ে গেলো। মাহমুদ চিন্তিত মুখে বলল,
~ “পাত্র কি রায়হান সাহেব?”

~ “হুম!”
মাহমুদ আর কিছু বললো না। মেহরিন তার মুখ থেকে কিছু শোনা অপেক্ষায় চেয়ে রইলো। কেন রইলো সে নিজেও জানে না। মাহমুদ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার চেষ্টা করলো। বলল,
~ “তোমার কাছে মি.রায়হানের নাম্বার আছে?”
~ “কেন?”

~ “ভয় পাচ্ছো? সুজানকে নিয়ে আসতে বলবো।”
~ “ভয় পাবো কেন? রায়হান আমার সম্পর্কে সব জেনেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।”

~ “আমি বুঝতে পেরেছি। তোমাকে তো আমার চেনা আছে। একমাত্র আমি ছাড়া আর কারো কাছেই তুমি সত্যি গোপন করো না। যাইহোক, সেসব বাদ দাও! এখন বলো মি.রায়হান কি উদ্দেশ্যে আমাদের দুজনকে একা কথা বলার সুযোগ দিয়ে গেছে? আমাকে এতটা বিশ্বাস করা কি তার ঠিক হচ্ছে? অবশ্য বিশ্বাস যে পুরোপুরি করে নি তা বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন।”

মাহমুদের মুখে স্মিত হাসি। মেহরিন ঠাট্টায় যোগ দিলো না। তার মুখে গম্ভীরভাব। রায়হানের নাম্বার বের করে ফোন এগিয়ে দিলো। পাঁচমিনিটের ভেতরই সুজানকে নিয়ে হাজির হলো রায়হান। তারপর কোন রকম বাক্যবিনিময় ছাড়াই সুজানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মাহমুদ। মেহরিন শুধু নিষ্পলকভাবে চেয়ে রইলো।

রায়হান নির্বাক হয়ে বসে আছে। এইমুহূর্তে তার কি করা উচিৎ সে বুঝতে পারছে না। তারপাশেই বসে আছে মেহরিন। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে। রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
~ “সেদিন পার্টিতে তুমি মি.মাহমুদকে দেখেছিলে তাই না? আমাকে বলো নি কেন?”

মেহরিন চেহারার কোন পরিবর্তন হলো না। আগেরমতই বসে রইলো সে। রায়হান অধৈর্য কন্ঠে বলল,
~ “আমাকে সত্যিটা বলা উচিৎ ছিলো তোমার।”
~ “সরি।”
রায়হান অবাক হলো। মেহরিন সরি বলেছে ঠিকই কিন্তু তার কন্ঠে কোনরূপ অনুশোচনা কিংবা অনুতাপ নেই। যন্ত্রের মতই শব্দটা উচ্চারণ করেছে সে। রায়হান বিক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
~ “সরি?”

~ “হুম সরি। আমার ভুল হয়ে গেছে। এরপর থেকে আর এমন হবে না।”
~ “তুমি এমন যন্ত্রের কত আচরণ করছো কেন মেহরিন? সহজ হও। আমরা আলোচনা করতে পারি!”
মেহরিনের চোখে পানি টলমল করছে। যে কোন মুহূর্তেই অশ্রুবর্ষণ শুরু হয়ে যেতে পারে। রায়হান সেদিকে চেয়ে আবারো নিজেকে সামলে নিলো। শান্ত কন্ঠে বলল,
~ “ঠিক আছে। এই বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।”


পর্ব ৪

আজকে অফ ডে। মাহমুদ বাসায়ই ছিলো। এই সপ্তাহের মেইল গুলো চেক করছিলো সে। এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠলো। পর পর দুবার বাজলো। মাহমুদ তাড়াহুড়ো করে ল্যাপটপ বন্ধ করে দরজা খুলতে গেলো। দরজার ওপাশের মানুষটাকে দেখে যারপরনাই অবাক হলো সে। মেহরিন! হ্যাঁ মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে! মাহমুদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো পাছে তার উত্তেজনাটুকু মেহরিনের কাছে ধরা পড়ে যায়। উত্তপ্ত নিশ্বাস চেপে রেখে বললো,
~ “তুমি!”
~ “হ্যাঁ। তোমার বাসা দেখতে এলাম।”

দরজা থেকে সরে ভেতরে তাকে ঢুকার জায়গা করে দিলো মাহমুদ। মেহরিন নিঃসংকোচে সোফায় গিয়ে বসলো। তার মুখোমুখি বসলো মাহমুদ। তার চোখে হতবম্ভ ভাব! চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো মেহরিন। বেশ বড়সড় ফ্ল্যাট। খোলামেলা, শান্ত! ইতোমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে মাহমুদ। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ “বাসার ঠিকানা পেলে কার কাছ থেকে?”
~ “জেনে লাভ কি?”

~ “কোন লাভ নেই। তবুও তোমাকে দেখে অবাক হয়েছি। একা এসেছো?”
মেহরিন ইঙ্গিতটা বুঝলো। তবে সূক্ষ্মভাবেই পাশ কাটিয়ে গেলো সে। বললো,
~ “সুজান বাসায় নেই?”
~ “সুইমিং এ গেছে।”

~ “এনা?”
সরাসরি মাহমুদের মুখের দিকে তাকালো মেহরিন। মাহমুদের চেহারার অবশ্য কোন পরিবর্তন হলো না। এই প্রশ্নটার জন্য সে প্রস্তুত হয়েই ছিলো। সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো,
~ “না।”

~ “এখানে কতদিন থাকবে?”
~ “আগামী মাসেই ফিরে যাচ্ছি। তুমি চা কফি কিছু নেবে?”

~ “বানাবে কে?”
মাহমুদের স্মিত হাসলো। মেহরিন মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। ঠাট্টার সুরে বললো,
~ “এনা শিখিয়েছে বুঝি?”

মাহমুদ জবাব না দিয়ে উঠে কিচেনে চলে গেলো। মেহরিন পিছু পিছু এলো। মাহমুদের পরনে ছাইরঙা একটা টি-শার্ট আর সাদা ট্রাওজার। মুখভর্তি খোঁচা দাড়িগুলো বেশ বড় হয়েছে। চোখজোড়া আরেকটু গভীর হয়েছে কেবল। তবে এখনো আগেই মতই সুস্বাস্থ্যবান। মেহরিন একটু হাসার চেষ্টা করে বললো,
~ “আগের মতই হ্যান্ডসাম আছো দেখছি!”

মাহমুদ হাসলো। মেহরিনের হাতে কফির মগ তুলে দিয়ে বললো,
~ “থ্যাংকস!”

দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে এলো কিচেন থেকে। বেডরুমে গিয়ে কাকে যেন ফোন করলো মাহমুদ। পুনরায় সোফায় বসে বললো,
~ “কফি কেমন হয়েছে?”
~ “ভালো।”

~ “থ্যাংকস!”
তারপর কিছুক্ষন নিরবতা। মাহমুদ কফিতে চুমুক দিয়ে বললো,
~ “তারপর?…বিয়ে করছো কবে?”
~ “কেন? আসবে তুমি?”
~ “এই মাসে হলে, অবশ্যই চেষ্টা করবো।”

ভাংচুর দুদিক থেকেই হচ্ছে। নিঃশব্দ ভাংচুর! হৃদয় ভাংচুর! তবুও দুপক্ষই শান্ত! যেন কিছুই হয় নি। মেহরিনের নিঃশব্দে কিছুক্ষন চেয়ে রইলো মাহমুদের দিকে। বিয়ের প্রসঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করেই এনার কথা জিজ্ঞেস করলো। এনাকে দেখতে না পেয়ে ভেতরে ভেতরে খানিকটা কৌতূহল অনুভব করছে সে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললো,
~ “এনাকে নিয়ে আসো নি যে?”
~ “সুজানকেও আনার প্ল্যান ছিলো না। বাধ্য হয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে।”

~ “এনা জোর করে নি?”
~ “না।”
~ “তোমাকে একা ছেড়ে দিলো?”
~ “মানে?”

মাহমুদ কফির মগ সেন্টার টেবিলে ওপর রাখলো। তারপর ফিরে তাকালো মেহরিনের দিকে। এমন সরাসরি চাহনি মেহরিনকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলো। অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বেরোনোর জন্য বললো,
~ “সুজানের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। ওকে বলো আমি এসেছি। আজ তাহলে আমি উঠি।”
~ “লাঞ্চ করে যাও? আমি সুজানকে নিয়ে আসার কথা বলেছি।”

~ “অন্যদিন।”
~ “অন্যদিন কি আবার আসবে?”
~ “বারণ করছো?”

~ “বারন করবো কেন? তবে না এলেই বোধহয় ভালো। তোমার জন্যেও, আমার জন্যেও!”
অপমানে মেহরিনের মুখ থমথমে হয়ে গেলো। নিদারুণ ক্ষোভ জমা হলো সুন্দর মুখটাকে। তড়িৎগতিতে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। সদর দরজা খুলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাচ্ছিলো, তবে ত্বরিতে তার ডানহাতটা চেপে ধরলো মাহমুদ। ছাড়ানোর চেষ্টা করে গর্জে উঠলো মেহরিন,
~ “ছাড়ো আমাকে।”

~ “রিলাক্স মেহরিন! এত রেগে যাচ্ছো কেন? রাগার মত কিছু হয় নি।”

মেহরিন কোনরকম ভদ্রতার ধারে কাছে দিয়েও গেলো না। ঝাড়া মেরে হাত সরিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
~ “তুমি আমাকে কি ভাবো? আমি ভিখিরি? আমি তোমার আর এনার মাঝখানে ঢুকতে এসেছি? তবে শুনে রাখো, যে জায়গা আমি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে সেই জায়গা পুনরায় দখল করবার কোন অভিলাষ আমার নেই।”
~ “শুনে খুশি হলাম।”

ক্রোধে জ্বলে উঠলো মেহরিন। মাহমুদ শান্তস্বরে বললো,
~ “যাইহোক সেই সব প্রসঙ্গ থাক!”
~ “কেন থাকবে কেন? বলো আমি শুনতে চাই!”
~ “তুমি শুনতে চাইলেই যে আমি বলবো তেমন তো কোন কথা নেই?”

~ “ভয় পাচ্ছো? সত্যিটা বেরিয়ে আসার ভয়?”
~ “কোন সত্যি?”

~ “তুমি এনাকে ভালোবাসো! স্বীকার করে নিলেই তো হয়!”
আশ্চর্য জনক ভাবে এবারেও হাসলো মাহমুদ। শান্ত স্বরেই বললো,
~ “সেটা তো তোমার জন্য খুশির খবর। তুমি তো তাই চেয়েছিলে?”

আত্মসংবরণ করতে পারলো না মেহরিন। দুপ করে সোফায় বসে পড়লো সে। টলমল করতে থাকা চোখের পানি বৃষ্টির ধারার ন্যায় গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। নিজের বোকামি লজ্জায় নুইয়ে দিলো তাকে। কেন সে নিজেকে সামলাতে পারলো না। কেন এলো এখানে? কেন?

আগের মত হলে হয়ত মাহমুদ বলতো, “শোন মেহরিন! আমার হৃদয়টা কোন দানের বস্তু নয় যে যখন খুশি, যাকে খুশি দান করবে। আমার হৃদয় একান্তই তার। আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাটাও একান্তই আমার। তবে যেই জায়গার কথা তুমি বললে তা বরাবরই তোমার দখলে ছিলো, আছে এবং থাকবে। এনা সেই চরম সত্যিটা জেনেই আমাকে ভালোবেসেছিলো কিন্তু আফসোস তুমিই জানতে পারলে না।”

কিন্তু এখন বললো না। এসব কথা এখন ভিত্তিহীন। এসব কথা বলে মেহরিনকে দ্বিধায় ফেলে দেওয়ার কোন মানে হয় না। মেহরিন যখন স্বেচ্ছায় বিয়েতে রাজী হয়েছে তখন মাহমুদ তাকে কোন রকম অস্বস্তিতে ফেলতে চায় না। চুপচাপ মেহরিনের পাশে বসে রইল সে।মেহরিন চোখ মুছে শান্ত স্বরে বললো,
~ “আমি আসি মাহমুদ!”

তারপর দুটো দিন নিজেকে পুরোপুরি ঘরবন্দি করে রাখলো মেহরিন। নিজেকে সময় দিলো। মাথা ঠান্ডা করে ভাবলো। নাহ! আর কোনভাবেই মাহমুদের সাথে জড়াবে না সে। মাহমুদ এনাকে বিয়ে করে সুখি হয়েছে। মেহরিন শুধুশুধু তাদের মাঝে ঢুকে ঝামেলা সৃষ্টি করতে চায় না। এতকাল যাবত যা করে এসেছে আজও তাই করে করবে।

নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেলবে মাহমুদের কাছ থেকে। মাহমুদকে সামনে এলে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। আর তা হতে দেওয়া যাবে না। নিজেকে আটকাতে হবে। তারজন্য রায়হানের সাথে বিয়েটা হওয়া জরুরী! কারো বিবাহিতা স্ত্রী নিশ্চই চাইলেই অন্য কোন পুরুষের চিন্তা মাথায় আনতে পারবে না। তখন বিবেকবোধ, দায়িত্ব, কর্তব্যের অদৃশ্য দেওয়াল তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হ্যাঁ ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে মেহরিন। যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে ভালোবাসার এই টানাপোড়ন থেকে বের করে আনতে হবে। পুনরায় নিজেকে সামলে নিতে হবে।


পর্ব ৫

এবারেও ভাগ্যদেবতা মেহরিনের প্রতি বিমুখ।সে যখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে মাঠে নেমেছিলো ঠিক সেই মুহূর্তেই সোহাগের সাথে দেখা হয়ে গেলো তার। মুহূর্তের জন্য আবারও সবকিছু থমকে গেলো। সোহাগ প্রথমে তার সাথে কথা বলতে চাইলো না। মাহমুদের কাছ থেকে মেহরিনের এখানে আসার কথা শুনে মনে মনে বিরক্ত হয়েছে সে। বস্তুত মাহমুদকে ছেড়ে আসার পর থেকেই মেহরিনের প্রতি কিছুটা নারাজ সে। মেহরিনই তাকে আটকালো। নিজের করা প্রতিজ্ঞা ভুলে গেলো সে। সোহাগের কাছ থেকে মাহমুদের সব খবরাখবর জেনে নেওয়ার কৌতূহল দমন করতে পারলো না সে।

সোহাগের মুখ থেকে যখন এনার মৃত্যুর খবর শুনে আবার সমস্ত পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেলো। সুজানের বয়স যখন একবছর, হঠাৎ রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় এনা। সেই থেকে বিগত চারবছর মাহমুদ একা! হু হু করে উঠলো বুকের ভেতরটা! মেহরিন অসহায়, হতবম্ভ হয়ে মাহমুদের কাছে ছুটে যেতে উদ্যত হলো। অনেক কিছু জানার আছে তার! কেন মাহমুদ তাকে এনার মৃত্যুর কথা জানায় নি। কেন নিজেকে আড়াল করে রেখেছে? কিন্তু সোহাগ বাধা দিলো। বলল,
~ ” তিনি যখন এনার মৃত্যুর কথা তোমাকে বলে নি এর মানে তিনি তোমাকে জানাতে চায় না।”
~ “কেন?”

~ “হয়ত তোমার ওপর অভিমান থেকে! কম কষ্ট-তো দাও নি তাকে? বিনা অপরাধে চারবছর তাকে ঘুরিয়েছো। তারপর যখন সব ঠিক হলো তখন এনার জন্য তার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে নিলে। লুকিয়ে রইলে। হ্যাঁ সেই মানুষটা নিজের ভুলের দায় এড়াতে এনাকে বিয়ে করেছেন ঠিকই কিন্তু তোমাকে একমুহূর্তের জন্য। ভুলতে পারে নি। বাট সরি টু সে দ্যায় ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ হিম। ইভেন ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ সো মাচ লাভ।”
মেহরিন বিস্মিত গলায় বললো,
~ “সোহাগ? তুমি তো সবই জানতে?”

~ “হ্যাঁ সবই জানতাম। তাই জন্যই এই কঠিন কথাটা বলতে পারছি। তুমি তাকে ফেলে চলে যাওয়ার পর এনা কীভাবে তাকে সামলেছে তার সাক্ষি কেবল আমরা কয়েকজন মানুষ। অধিকাংশ দিন নেশায় বুঁদ হয়ে বাড়ি ফিরতেন। হ্যাঁ তিনি আর দশজনের মত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোন অসংলগ্ন কথাবার্তা তিনি বলতেন না। চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকতেন। কিন্তু তাকে সামনে থেকে দেখা প্রতিটা মানুষ তার কষ্ট অনুভব করতে পেরেছে। তারপর যখন সুজান এলো। নিজেকে খানিকটা সামলে নিলেন। কিন্তু এবার তাকে সামলে রাখার মানুষটাই চলে গেলো।”

সোহাগ না থেমেই বললো,
~ “আমি তোমাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করি মেহরিন, তাই তোমাকে স্বচ্ছ দেখতে চাই। অন্তত ভালোবাসার দিক থেকে। বাকি সবার মত তুমি অন্তত যুক্তি দিয়ে ভালোবাসার বিচার করো না। প্লিজ!”
আবারও শুরু হলো প্রবল অশ্রুবর্ষণ। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন চেষ্টা করলো না মেহরিন। হ্যাঁ! যুক্তি দিয়ে সে বিচার করেছে ঠিকই। তবে ভালোবাসা নয়, তার যুক্তি কেবল ন্যায় অন্যায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ন্যায় অন্যায় বিচার করা প্রতিটা মানুষেরই উচিৎ।

ভালোবাসা-তো কেবল নিজের স্বার্থের জন্য হতে পারে না। ভালোবাসা হতে হবে নিঃস্বার্থ। সে চায় নি তার ভালোবাসার মানুষটা কারো কাছে অপরাধী হয়ে থাকুক।তাকে মেহরিন অনেক দুঃখ দিয়েছে ঠিকই তবে কেবল নিরুপায় হয়ে। তা না হলে এনার সাথে অন্যায় করা হতো।তবে মুখে যাই বলুক না কেন সে জানে মাহমুদ আজও তাকে ভালোবাসে! মানুষটাকে দূরে সরিয়ে সে কেবল নিজেকে শান্ত করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভুলতে পারে নি। কিন্তু এবার আর ঐ মানুষটাকে একা ফেলে কিছুতেই বিয়ে করতে পারবে না সে।

সোহাগ নির্বোদ নয়। সে জানে মেহরিন নিরুপায় হয়ে মাহমুদকে ছেড়ে এসেছিলো। কতটা কষ্টে তার ভালোবাসার মানুষটাকে এনার কাছে তুলে দিয়ে এসেছিলো। হ্যাঁ সম্পর্ক হয়ত ভেঙ্গে গেছে তাদের। কিন্তু ভালোবাসা নয়। এখনো ঠিক আগের মতই দুজন দুজনে ভালোবাসে। তাই বাধ্য হয়ে তাকে আজকের এই কঠোর কথাগুলো বলতে হলো। তা না হলে পরস্পরের পাগলের মত ভালোবাসা এই দুটি মানুষ পুনরায় আলাদা হয়ে যেত। আবার না পাওয়ার তীব্র বেদনা, হাহাকার তাদেরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতো।

ঝরঝর করে কাঁদছে মেহরিন! কি করবে সে? রায়হানকে কি জবাব দেবে? এদিকে মাহমুদ নেক্সট মান্থেই ফিরে যাবে। বাধ্য হয়ে সোহাগের সাহায্য চাইলো মেহরিন। যে করেই হোক মাহমুদের যাওয়া আটকাতে হবে। তারপর থেকেই দিনরাত ভেবে চললো দুজনে। কিভাবে মাহমুদকে আটকানো যায়।

সোহাগের সাথে দেখা হওয়ার পরেরদিন আবারো পার্কে গেলো মেহরিন। উদ্দেশ্য সুজানকে একনজর দেখা। মা-হারা এই ছোট শিশুটিকে সেদিন যখন মেহরিন বুকে টেনে নিয়েছিলো তারপর থেকেই অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করছে সে। মাহমুদের প্রতিচ্ছবি এই ছোট্ট শিশুটি!
পার্কের একমাথায় সুজান আব্বাসের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলছে। মেহরিন ইশারায় কাছে ডাকলো। থমকে গেলো সুজান। ব্যাট হাতে নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এলো সে।

তার পরনে জগিং স্যুট। হলুদ স্পোর্টস জ্যাকেটের সাথে হলুদ ট্রাউজার এবং সাদা কেডস। ঘাড়ের দিকে খানিকটা নিচে নেমে গেছে জ্যাকেট। হাতে বাচ্চাদের দামি ঘড়ি! চুলের কাটিংটা বেশ স্টাইলিশ। বোঝাই যাচ্ছে ছেলের সাজসজ্জার ব্যাপারে মাহমুদ বেশ শৌখিন। মেহরিন হাসলো। এই ছেলের বড় হয়ে বাপের মত কত মেয়েকে নাকের ডগায় রেখে ঘোরাবে তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন। কী ভীষণ আদুরে লাগছে সুজানকে।

হাতের কাছে আসতেই কষে চুমু খেলো তার গালে। সুজান তার স্বভাবসিদ্ধ শুচিবায়ু বজায় রাখতে ডান হাত দিয়ে গাল মুছলো। তা দেখে হাসলো মেহরিন। ইচ্ছে করেই আবার চুমু খেলো। সে যতবার চুমু খায় সুজান ততবার গাল মুছে। একসময় বিরক্ত হলো সুজান। ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করে দিলো। মেহরিনকে সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,
~ “তোমার ছেলের কি হয়েছে?”

আচমকা এমন প্রশ্নে অবাক হলো মেহরিন। তার ছেলে? কোন ছেলে? কিসের ছেলে? সুজান কি বলছে? সে কি মেহরিনকে অন্য কারো সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। আদুরে ধমক দিলো মেহরিন,
~ “কি বলছিস তুই? আমার ছেলে আসবে কোথা থেকে?”

ধমক খেয়ে সুজান বোধহয় একটু ভয় পেলো। মিনমিন করে বললো,
~ “বাবা যে বলল…!”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহরিন বলল,
~ “তোর বাবা বলেছে? কি বলেছে তোর বাবা?”

~ “বাবা বলেছে তুমি তোমার ছেলেকে মিস করছিলে তাই আমাকে আদর করেছো!”
~ “এসব বলেছে তোর বাবা? ঠিক আছে, তাকে আমি পরে দেখে নেবো। তুই এদিকে আয়।”
~ “না! তুমি পঁচা!”
~ “কে বলেছে?.. তোর বাবা?”

~ “না। বাবাকে একদম বকবে না।”
~ “একশোবার বকবো। হাজার বার বকবো। তোর বাবা মিথ্যে বলল কেন?”
~ “বাবা মিথ্যে বলে নি।”

~ “তাহলে? তুই আমাকে পঁচা বললি কেন?”
সুজান মুখ কালো করে বললো,
~ “তুমি আমাকে তুই বললে কেন? আমাকে কেউ তুই করে বলে না।”

মেহরিন হেসে উঠে বললো,
~ “ইসশ রে আমার নবাবপুত্তুর! তো কি বলবো তোমাকে? আপনি করে বলতে হবে? আচ্ছা ঠিক আছে বলবো। এবার দিকে আসুন তো মি.জুনিয়র মাহমুদ!”
সুজান বুঝতে পারলো তাকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে। ফিরে যেতে উদ্যত হলো সে। মেহরিন খপ করে ধরে ফেললো,
~ “চলে যাচ্ছিস কেন? রাগ করেছিস?”

সুজান বেঁকে বসলো। বিরস মুখে বললো,
~ “তোমার সাথে কথা বলবো না। তুমি পঁচা!”
হাল ছাড়লো না মেহরিন। সুজানে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
~ “বোকা ছেলে। শোন আমি হচ্ছি তোর মা। মায়েরা ছেলেদের তুই করে বলে। বুঝলি?”

~ “কে বলেছে তুমি আমার মা?”
~ “কে বলবে? আমি বলেছি।”

~ “তাহলে তুমি বাবার সাথে থাকো না কেন?”
~ “তোর বাবার ওপর রাগ করেছি।”
সুজান বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মায়ের ছবির সাথে এই আন্টির ছবির একটুও মিল নেই। তাহলে এই আন্টি তার মা হলো কি করে?
~ “কি ভাবছিস?”

~ “আমি বাসায় যাবো।”
~ “বাসায় যাবি কেন? খিদে পেয়েছে?”

~ “ইয়েস! আই এম হাংরী!”
~ -“আমার সাথে ইংরেজী বলবি না। খবরদার।

~ “কিন্তু স্কুলের মিস তো ইংরেজী শেখায়।”
~ “শেখাক। তুই বাঙ্গালী। তোর বাপ বাঙ্গালী। তোর মা বাঙ্গালী। এখন থেকে রোজ আমার সাথে বাংলা শিখবি।”

এবার আলতো করে চুমু খেলো মেহরিন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সুজান। গালে থুথু লাগে নি। এতটা সময় আব্বাস কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো। তবে কিছু বললো না। সে কি বুঝেছে কি জানে। এরপর থেকে রোজ মেহরিনের সাথে সুজানের দেখা হয়। মাহমুদ এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনবগত। তবে এরমধ্যে সুজানের সাথে মেহরিনে ভাব হয়ে গেলো। আব্বাসকে সাথে নিয়ে রোজ ঘুরতে যায় তারা।

সপ্তাহ খানেক বাদে একদিন, মাহমুদ ড্রয়িংরুম পেরিয়ে কিচেনে যাচ্ছিলো। ড্রয়িংরুমের বিশাল টিভির পর্দায় সুজান রেসলিং দেখছে। হঠাৎ করেই চেঁচিয়ে উঠলো সে,
~ “ঠেঙা!…আরো জোরে ঠেঙা।”

অবাক হলো মাহমুদ। সুজান এসব কি বলছে? কার কাছ থেকে শিখেছে? সুজানের পাশে গিয়ে বসলো সে। সুজানের মনোযোগ টিভির দিকে। এবার দ্বিগুণ ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠলো সে।
~ “মেরে লুলা করে দে!…আরো জোরে!আরো জোরে!

মাহমুদ হাঁ করে ছেলের কান্ড দেখে যাচ্ছে। বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করলো,
~ “এসব কার কাছ থেকে শিখেছো বাবা?”
~ “কি?”
~ “এই যে মাত্র বললে? ঠেঙাতে?”

~ “আমি ঠেঙাই নি তো বাবা। জন সীনাকে ঠেঙাতে বলছি!”
~ “কিন্তু তোমাকে এসব কে শিখিয়েছে?”
~ “মা!”
~ “মা?…কে?”

সুজান বিরক্ত হলো। এইমুহূর্তে মাহমুদের জেরা তার বিনোদনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাবার হাত সরিয়ে দিয়ে টিভির দিকে মনোযোগ দিলো সে। মাহমুদ তাকে বিরক্ত করলো না। টিভির কাছ থেকে সরে বেডরুমে এসে ঢুকলো সে। কিন্তু চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারলো না। তার মাথায় কেবল একটা নামই ঘুরপাক খাচ্ছে। মেহরিন! তার কেন যেন মনে হচ্ছে সুজানের মেহরিনের কথাই বলছে।

পর্ব ৬

মাহমুদের বুকের কাছ ঘেঁষে শুয়ে আছে সুজান। মাহমুদ চিন্তিত মুখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলের চুলের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ডাক দিলো,
~ “সুজান?”

~ “হুম!”
~ “ঐ আন্টিটার সাথে কি তোমার আর দেখা হয়েছে?”
~ “কে?… মা?”

মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বললো,
~ “হুম!”
~ “হয়েছে। আমি আর মা অনেক জায়গায় ঘুরেছি।”

~ “তাই? তাহলে তো নিশ্চই তোমার খুব মজা হয়েছে?”

~ “অনেক!”
~ “কিন্তু এবার থেকে বাবাকে না বলে আর কখনো তোমার মায়ের সাথে কোথাও যাবে না কেমন?”
~ “কেন বাবা? মায়ের সাথে কি তোমার আবার ঝগড়া হয়েছে?”

মাহমুদ চিন্তায় পড়ে গেলো। ছেলের ছোট মাথায় এসব ঝগড়া ক্যাচাল ঢুকানো একদম ঠিক হবে না। মেহরিন কেন এমন করছে? দুদিন বাদে তার নিজের বিয়ে, স্বেচ্ছায় কেন এসব ঝামেলায় জড়িয়েছে? তারওপর ছেলেটাকে মা ডাকতে শিখিয়েছে। কেন? মেহরিন কি জেনে গেছে এনা মারা গেছে? কিন্তু কার কাছ থেকে জানলো? সুজান বলেছে? তবে সুজানকে এই প্রসঙ্গে কোন প্রশ্ন করলো না সে। টেনে বুকের ভেতর নিয়ে গালে চুমু খেয়ে বললো,
~ “তোমার মায়ের সাথে আমার ঝগড়া হয় নি বাবা। তোমার মা খুব ভালো।”

~ “তাহলে আমি মায়ের কাছে যেতে পারবো?”
~ “আমি তো তোমাকে যেতে নিষেধ করি নি। শুধু বাবাকে না জানিয়ে যেতে নিষেধ করেছি।”
~ “ওকে।”

~ “এবার ঘুমাও। চোখ বন্ধ করো। ওয়ান টু,থ্রি, চোখবন্ধ!”
সুজান চোখ বন্ধ করে ফেললো। অল্পকিছুক্ষনের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়লো। কিন্তু মাহমুদের ঘুম হলো না। শেষরাতে বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় হাঁটাহাটি করলো কিছুক্ষন। নিজেকে অসহায় লাগছে। সুজানের মুখ থেকে মা ডাকটা শোনার পর থেকে অন্যরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে। সারাক্ষণ মাথায় একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছে মেহরিন মেহরিন! মেহরিন! নিজের ওপর অবাক হলো মাহমুদ।

এতকিছুর পরেও কেন মেহরিনের প্রতি তার তীব্র আকর্ষন! সে তো নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে আর কখনো নিজের ভালোবাসার অধিকার নিয়ে মেহরিনের সামনে দাঁড়াবে না। তবে কেন বুকের ভেতরটা আবার হু!হু! করছে। নাহ! এবার আর মাহমুদ কোন আশা রাখবে না। আরো একবার সে নিজেকে সেই তীব্র যন্ত্রনায় মাঝে ফেলতে পারবে না। মেহরিন বিয়ে করছে! মাহমুদ চায় সে সুখি হোক।

আজকে সুজানকে একা ছাড়লো না মাহমুদ। আব্বাসের সাথে সে নিজেও বেরোলো। তাকে দেখে মেহরিন আড়ালে সরে গেছে। মাহমুদ অবশ্য ওকে দেখতে পায় নি। মনে মনে সে যতই প্রতিজ্ঞা করুক,যতই নির্বিকার থাকুক,কোথাও না কোথাও তার চোখ দুটো মেহরিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ঘন্টাখানেক বাদে যখন তারা ফিরে যাচ্ছিলো হুট করে মেহরিন সামনে এসে দাঁড়ায়। সুজান অভ্যাসবশত তার কাছে দৌঁড়ে গেলো। দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরলো মেহরিন। মাহমুদ আড়চোখে দেখেও না দেখার ভান করে রইলো। আহা! কি সুন্দর দৃশ্য! অতঃপর মেহরিন তাকে উপেক্ষা করে সুজানকে কোলে নিয়ে একটু দূরে সরে গেলো। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না মাহমুদ। ফোনে কথা বলতে বলতে দূর থেকে ওদের লক্ষ্য করলো কেবল। সুজানের গালে ইতোমধ্যে কয়েকশো চুমু পড়ে গেছে। বেচারা কাচুমাচু চেহারা নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। না চাইতেও হাসি চলে এলো মাহমুদের। মুখ ফিরিয়ে নিঃশব্দে হাসলো সে। ফোন রেখে সুজানকে ডাক দিলো,
~ “সুজান?”
সুজান একা এলো না। ওকে নিয়ে এগিয়ে এলো মেহরিন। বললো,
~ “সুজান আজকে আমার কাছে থাকবে!”

স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বললো মেহরিন। যেন মাহমুদের মতামত জানা অনাবশ্যক!
~ “সুজান আমাকে ছাড়া কোথাও থাকতে চায় না। কান্নাকাটি করবে।”
~ “তাহলে তুমিও চলো।”

এমন প্রস্তাবে তাজ্জব বনে গেলো মাহমুদ। এই মেয়েটা বদরাগী, মাথামোটা সে আগে থেকেই জানে। এখানে এসে কি মাথাটা খারাপও হয়ে গেছে? নিজেকে সামলে নিয়ে সুজানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ “সুজান? তুমি না আইস্ক্রিম খাবে বলেছিলে? আব্বাসের সাথে যাও। বাবা একটু পরে আসছি।”

সুজান চলে গেলে মাহমুদ খুব শান্ত স্বরে বললো,
~ “সেটা নিশ্চই খুব সমীচীন হবে? আফটার অল আর কিছুদিন পরেই তুমি অন্য একজনের বউ হতে যাচ্ছো!”
~ “ঠিক আছে তাহলে সুজানকে নিয়ে যাই।”

~ “কেন? সুজানকে তোমার কি দরকার?”
~ “অনেক দরকার। ও জানে আমি ওর মা! আমার ছেলে আমার কাছে থাকবে।”

মাহমুদ হাসলো। মেহরিনের চোখেমুখে কোন পাগলামি নেই। মা-মা টাইপ একটা সত্ত্বা ফুটে উঠেছে। ওকে হাসতে দেখে মেহরিন কঠিন গলায় বললো,
~ “হাসছো যে? আমি কি হাসির কিছু বলেছি?”

বলতে বলতেই আচমকা কেঁদে ফেললো মেহরিন। মাহমুদ হতবম্ভ হলো। তার হাসিটা মেহরিনের মাতৃসত্তায় খানিকটা আঘাত দিয়েছে বোধহয়! কিছুটা নরম হল। বললো,
~ “ঠিক আছে নিয়ে যাও। তবে ওর অভ্যস্ত জীবন থেকে বিচ্যুতি ঘটানোর চেষ্টা করো না। ছোট মন পরবর্তীতে ইফেক্ট পড়তে পারে।”

মেহরিন চোখ মুছে শান্ত হলো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে সুজানকে দেখলো। মাহমুদ ঠাট্টার সুরে বললো,
~ “সুজান বললো তুমি নাকি আজকাল ওকে বাংলা ট্রেনিং দিচ্ছো? এটা কিন্তু ঠিক নয়। এইবয়সে যা শিখবে তাই মাথায় ঢোকাবে!”
~ “শিখাবো। বেশ করবো। তুমি বলার কে? তুমি ওকে আমার কাছ থেকে কেন আড়াল করে রেখেছো?”

অবাক হলো মাহমুদ। মেহরিন নিছক ছেলেমানুষির বশে কথাগুলো বলছে না। যেন সুজানের ওপর তার অনির্ধারিত অধিকার আছে, তার বলেই বলছে। মাহমুদ আর কিছু বলার সাহস পেলো। এই সম্পর্ক তো প্রেমিক প্রেমিক সম্পর্ক নয় যে ঠাট্টা মশকরা করা যায়। মা-ছেলের সম্পর্ক! মোলায়েম কন্ঠে বললো,
~ “আমি বলার কেউ নই বুঝি?”

মেহরিন লজ্জা পেলো। বললো,
~ “আমি ওভাবে মিন করে বলি নি।”

~ “ঠিক আছে বাদ দাও। রায়হান সাহেবের কি খবর?”
রায়হানের কথা বলতেই মেহরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো,
~ “ভালো।”

মাহমুদ সরু চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করলো। মেহরিনের অস্বস্তি হচ্ছে। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহমুদ বললো,
~ “ভালো হলেই ভালো। তাকে সত্যি সত্যি বিয়ে করবে তো? নাকি তার জন্যেও আমার মত পাত্রী রেডি করে রেখেছো?”

রাগে, দুঃখে, অপমানে, মেহরিনের কান্না পাচ্ছে। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
~ “আমি ওকে ভালোবাসি না।”

~ “কেন বাসো না। বাসা উচিৎ! সে নিশ্চই আমার মত চরিত্রহীন নয়?”
~ “তাকে ভালোবাসা নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন?”

~ “আমার কোন মাথাব্যথা নেই। তবে ভালোবাসার যন্ত্রনা খুব কষ্টের হয়। তাই আমি চাই না আর কেউ তার শিকার হোক!”
~ “কেন তুমি কি খুব যন্ত্রনা ভোগ করেছিলে? ভালোই তো সুখে আছো। বিয়ে করেছো, সংসারী হয়েছে, ছেলে আছে। আমার কে আছে?”

~ “তুমি করে নাও না। বিয়ে করো, সংসারী হও। তোমাকে তো কেউ বেধে রাখে নি। এর মধ্যে আমাকে টানছো কেন? আমি তো চরিত্রহীন! তাই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।”
~ “রায়হানকে সত্যি বিয়ে করবো বলছো?”
~ “মানে?”

~ “তোমার গলায় ঝুলে পড়বো ভেবে তুমি সরে পড়তে চাইছো তাই না?”
~ “তার সুযোগ কি আর আছে আমার? আমি চরিত্রহীন হলেও বিবাহিত!
~ “বারবার এক কথা বলছো কেন?”
~ “এই কথাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি! তাই।”

দু কদম এগিয়ে এলো মেহরিন। মাহমুদ থমকে গেলো। মেহরিন রাগে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
~ “আমি সব জানি।”
~ “কি জানো?”
~ “এনা মারা গেছে।”

~ “তাতে তো সত্যিটা পাল্টে যায় নি? আমি বিবাহিত! আমার ছেলের আছে।”
~ “তাহলে তুমি কি করতে বলছো আমাকে?”

~ “আমি কিছুই বলছি না। ইটস আপ টু ইউ। তুমি বিয়ে করবে, নাকি চিরকুমারী থাকবে পুরোটাই তোমার ব্যাপার। আই অ্যাম নট বোদারর্ড অ্যাট অল!”
~ “তোমার কিচ্ছু আসে যায় না? সত্যি করে বলো।”
মাহমুদের মিথ্যে বলতে পারলো না। তবে সত্যিটাকে খুব সাবধানে এড়িয়ে গেলো সে।

~ “হুম! যায় আসে কারণ আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি চাই তুমি সুখি হও। অযথা আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি ভালো আছে।”
মেহরিন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। মাহমুদ এতটা নিষ্ঠুর কি করে হতে পারলো। মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো সে। আব্বাস সুজানকে নিয়ে ফিরে এসেছে। মাহমুদ সুজানকে কোলে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
~ “তোমার মাকে বায় বলো সুজান।আমরা ফিরে যাচ্ছি।”

~ “কেন বাবা? আমি মায়ের সাথে যাচ্ছি না?”
~ “না। তোমার মা অসুস্থ।”

সুজান বাবার নির্দেশমত মেহরিনকে বিদায় জানালো। মেহরিন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুজানের কথা তার কানে গেলো না। সে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলো,মাহমুদ সুজানকে নিয়ে গাড়িতে উঠে গেছে। গাড়ি চালু হয়ে গেছে! সব শেষ হয়ে যাচ্ছে!

আবারো থমকে গেলো মাহমুদ! নিজের কঠিন আবরণটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না মাহমুদ। মেহরিন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি তার ভেতরটাকে তছনছ করে দিচ্ছে। ফিরে এসে সুজানকে মেহরিনের কোলে দিয়ে গেলো। পাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পায় সে ভয়েই কিছু না বলেই গেলো। সে চলে যেতেই সুজানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মেহরিন।

কাছেপিঠে কোথাও দাঁড়িয়ে সবই লক্ষ্য করেছে সোহাগ। মাহমুদ চলে যেতেই দ্রুত মেহরিনের কাছে এগিয়ে এলো সে। আশ্বস্ত কন্ঠে বললো,
~ “এখন কাঁদার সময় নয় মেহরিন। আগে বাসায় চলো। অনেক কাজ বাকি আছে।”

বাসায় ফিরেছে অবধি মেহরিন টানা কেঁদে চলেছে। সোহাগ সুজানকে ভিডিও গেমস খেলতে বসিয়ে দিয়ে মেহরিনকে নিয়ে আড়ালে সরে এলো। সুজানের সামনে এসব আলোচনা করা ঠিক হবে না। ওর নিরুদ্বেগ চেহারা দেখে মেহরিন ফুঁপিয়ে উঠে বললো,
~ “আমি ভুল ছিলাম সোহাগ। ও আমাকে আর ভালোবাসে না। ওর লাইফে আমার আর কোন ইম্পর্টেন্স নেই।”

বলতেই না বলতেই আবার ফুঁপিয়ে উঠলো মেহরিন। সোহাগ বিরক্ত কন্ঠে বললো,
~ “বোকার মত কথা বলো না তো মেহরিন। বললেই হলো? ওয়ালেটে এখনো তোমার ছবি নিয়ে ঘুরে! ইম্পর্টেন্স না থাকলে কেন তোমার ছবি নিয়ে ঘুরবে?”
সাথে সাথে মেহরিন কান্না থামিয়ে দিলো। উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
~ “সত্যি বলছো?”

সোহাগ হেসে ফেললো। বললো,
~ “হান্ড্রেড পার্সেন্ট! এবার চোখ মোছো। শোনো, সবার আগে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে রায়হানের সাথে কথা বলা। বিয়েটা ক্যান্সেল করতে হবে।”

~ “রায়হান যদি না মানে?”
~ “মানবে না কেন? জোর করে বিয়ে করবে? এত সোজা নাকি?”

~ “আমার ভয় করছে।”
~ “ও কি তোমাকে ভালোবাসে?”
–“জানি না। তবে যদি রেগে যায়?”

~ “ভয়ের কিছু নেই। ওকে পুরোটা বুঝিয়ে বলতে হবে। বেশি ঝামেলা হলে মাহমুদ ভাই তো আছেই, যতই রাগ থাকুক সে নিশ্চই তোমাকে কোন ঝামেলার মাঝে ফেলে যাবে না!”
ওর কথার প্রতিউত্তরে মেহরিন কেবল মিষ্টি করে একটু হাসলো।

রায়হান স্বভাবগতভাবে কখনোই আক্রোমণাত্বক নয়। সব শুনে সে কেবল হেসে উঠে বললো,
~ “মেহরিনের মুখে আমি আগেও তাঁর নাম শুনেছি। হি ইজ আ ভেরি নাইস গাই! আমার সাথে শপিংমলে দেখা হয়েছিলো। মেহরিনও সাথে ছিলো। আমি ওদের দুজনকে আলাদা করে কথা বলার সুযোগও করে দিয়েছিলাম।”
~ “তাই নাকি?”

~ “ইয়েস! প্রেম ভালোবাসার আনাড়ি হলেও মেহরিনের চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, স্টিল নাউ সি লাভস হিম। তবে আমার রাগ হয়েছিল। মেহরিম আমার কাছ থেকে লুকালো কেন? আম তো ওকে ফোর্স করি নি।”
~ “এনার মারা গেছে সেই খবর ওর জানা ছিলো না।”

রায়হান কিছুক্ষন ভেবে বললো,
~ “আই থিংক মেহরিনের রোমিও সাহেব এখনো তাকে ভালোবাসে?”

~ “আপনাকে তো সবই বললাম! বিগত একযুগ ধরে মেহরিনকে ভালোবেসে এসেছে। কত ঝড়ঝাপটা গেলো তার ওপর দিয়ে তবুও ভালোবাসতে ভুল করেন নি। এখনো মেহরিনকে পাগলের মত ভালোবাসে। এবার তাদের এক হওয়ার সময়।”

দুদিন বাদে মাহমুদ নিজে গিয়ে হাজির হলো মেহরিনের বাসায়। দরজা খুলেই মেহরিন ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেললো। মাহমুদ কি সুজানকে নিয়ে যেতে এসেছে? সুজানের পরনের নতুন জামাকাপড়! এখানে আসার সময় কোন জামাকাপড় নিয়ে আসা হয় নি। তাই মেহরিন সোহাগকে দিয়ে একগাদা জামাকাপড় কিনে আনিয়েছে তার জন্য। সুজান মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে তাদের পুরোনো ছবিগুলো দেখছিলো।

এতদিন যাবত ছবিগুলোই মেহরিনের স্মৃতি হয়ে জমা ছিলো। অনেকবার ডিলিট করতে গিয়েও পারে নি। ছবিগুলোর দিকে মাহমুদের চোখ পড়তেই সচেতনভাবে মেহরিনের দিকে তাকালো। মেহরিন নতমুখে বসে আছে।
~ “ওকে নিয়ে এসো। আগামী পরশু আমার ফ্লাইট।”

বিষন্ন গলা মাহমুদের, মুখটা অসহায়। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো মেহরিনের। বিস্মিত গলায় বলল,
~ “হঠাৎ?”
~ “এখানের কাজ শেষ।”

তারপর পকেট থেকে সুন্দর একটা রিং বের করে নিলো মাহমুদ। মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
~ “সরি কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তোমার বিয়েতে থাকতে পারছি না। তাই গিফট নিয়ে এলাম! অনেক খুঁজে পছন্দ করেছি। তোমার অপছন্দ হবে না আশাকরি!”

রক্ত সরে গেলো মেহরিনের মুখ থেকে। ফ্যাকাসে হয়ে চেহারা। মাহমুদ মুখ ফিরিয়ে নিলো। আর দুর্বল হতে চায় না সে। মেহরিনের ওপর তার কোন অধিকার নেই। আর কয়েকদিন বাদে সে অন্য একজনের বউ হতে যাচ্ছে! সুতরাং মাহমুদকে শক্ত হতে হবে। সুজানকে ডেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সে। ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটলো যে মেহরিনের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোলো না। মানবমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কেবল।

পর্ব ৭

সারারাত ধরে ভাবলো মেহরিন। রাগ, অভিমান, অপমান কোনটাই ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না সে। মাহমুদ তাকে বিয়ের উপহার দিতে এসেছে? কতবড় সাহস! ছেলের সামনে তাকে এমন অস্বস্তিতে ফেলে? এই রিং যদি মাহমুদের নাক বরাবর না মেরেছে তো তার নামও মেহরিন না। পরেরদিন সকালবেলাই চেইঞ্জ করে রেডি হয়ে নিলো সে। মাহমুদের সাথে আজ এসপারওসপার যাই হোক একটা বোঝাপড়ায় আসতে হবে।
আধঘন্টার ভেতরেই মাহমুদের বাসায় পৌঁছে গেলো সে। দরজায় দাঁড়িয়ে পরপর দুবার কলিংবেল বাজালো।

মাহমুদ ওয়াশরুম। আব্বাস এসে দরজা খুলে দিলো। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো দেখলো মেহরিন। আগামীকাল ফ্লাইট। সুতরাং লাগেজপত্র সব গোছানো শেষ। তারমানে মাহমুদের দেশে ফিরে যাওয়া মোটামুটি ফাইনাল। বেডরুমের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো সে। সুজান খাটের ওপর বসে ড্রয়িং করছে। হাত বাড়িয়ে সুজানকে কাছে ডাকলো,
~ “সুজান?”

মেহরিনের ডাক শুনে খাতা থেকে মনোযোগ সরালো সুজান। মুখে হাসি ফুটে উঠলো। খাতা রেখে উঠে এলো। দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরলো মেহরিনের। ওকে জড়িয়ে ধরতেই অর্ধেক রাগ করে গেলো মেহরিনের নরম মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
~ “তোর বাবা কই?”

~ “ওয়াশরুমে!”
সুজানের আদুরে মুখখানার হাত বুলিয়ে দিলো মেহরিন। আবারো তার তুলতুলে নরম গালে খুব সাবধানে চুমু খেলো। নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,
~ “তোকে আমি কোথাও যেতে দেবো না। তুই মায়ের কাছে থাকবি!”

সুজান আগাগোড়া কিছুই বুঝলো না। অতএব চুপ করে রইলো সে। মেহরিন পুনরায় তার গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
~ “শোন। মা এখন তোর বাবার সাথে ঝগড়া করবো। তুই কিন্তু একদম ভয় পাবি না কেমন?”

সুজান অবাক হয়ে চেয়ে রইলো তার দিকে। ধীরে ধীরে মাথা দুলিয়ে বললো,
~ “তুমি বাবাকে বকবে কেন?”

~ “তোর বাবা পঁচা যে! খালি আমাকে কষ্ট দেয়!”
সুজান কথাটা বিশ্বাস করলো না। তার দৃঢ় ধারণা মেহরিনের শুধুশুধুই মাহমুদকে বকবে। এতদিকে সে খানিকটা হলেও বুঝে গেছে তার মায়ের মেজাজ একটু গরম। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললো,
~ “কি করেছে বাবা?”

~ “তোর বাবা তোকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেতে চাইছে।”
ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে মেহরিন আবারো ফিসফিস করে বললো,
~ “আমি যাই। তুই কিন্তু একদম ভয় পাবি না।”

মাহমুদ ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর আগেই বেডরুম থেকে দ্রুত ড্রয়িংরুমে চলে এলো মেহরিন। মাহমুদ তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরলো। ছেলের দিকে চোখ পড়তেই হাসিমুখে বললো,
~ “কি হলো বাবা? তোমার মুড অফ কেন?”

তার বাবাকে মা শুধুশুধু বকবে এটা সুজানের সহ্য হলো না। দৌঁড়ে বাবার কাছে গিয়ে কানের সাথে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে বললো,
~ “বাবা, মা এসেছে। তোমাকে বকবে বলেছে।”

মাহমুদ অবাক হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকালো। সুজানের মুখ থমথমে। তার সিরিয়াস ভাব দেখে হেসে ফেললো মাহমুদ। সুজান অবশ্য হাসলো না। বরং বাবার হাসিতে বিরক্ত হয়েছে সে। মাহমুদ ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে বললো,
~ “চলো তোমার মায়ের কাছে যাই।”

সুজানকে কোলে নিয়েই ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকলো মাহমুদ। মেহরিন সোফায় বসে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে। স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তার দিকে চেয়ে রইলো মাহমুদ। বড় নিশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। গলা খাঁকারি দিলো। তার উপস্থিতি টের পেয়ে সোজা হয়ে বসলো মেহরিন। মুখের হাসির রেখা টেনে জিজ্ঞেস করলো,
~ “কখন এলে?”
মেহরিন ঝগড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেডি হয়ে ছিলো। মাহমুদ কিছু বললেই ঝাপিয়ে পড়বে তার ওপর। কিন্তু অকস্মাৎ বাপ ছেলের হাসি হাসি মুখ থেকে নিমিষেই সব রাগ পানি হয়ে গেলো।

~ “হয়েছে দশমিনিটের মত!”
মাহমুদ সুজানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ “মাকে তোমার ড্রয়িং দেখিয়েছো?”

~ “না। এখনো শেষ হয় নি।”
~ “ঠিক আছে তুমি ড্রয়িং শেষ করে এসো। বাবা তোমার মায়ের সাথে একটু কথা বলি কেমন?”

মেহরিন যেন এই সুযোগেই ছিলো। এবার আচ্ছামত ঝাড়া যাবে মাহমুদকে। সুজান ভেতরে চলে গেলে মেহরিনের মুখটা আবার আগের মত থমথমে হয়ে গেলো। মাহমুদ তার চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করে বললো,
~ “তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোন সমস্যা?”
শক্ত, রিনরিনে গলায় বললো,
~ “হ্যাঁ। অনেক বড় সমস্যা!”

স্পষ্ট রাগ তার চোখেমুখে। প্রতিউত্তরে মাহমুদ বলল,
~ “আমি কি কোনভাবে হেল্প করতে পারি!”
রাগে মেহরিনের গা জ্বলে যাচ্ছে। মাহমুদ এত নরমাল বিহেভ করছে কি করে? ঝগড়ার মুহূর্তে অপরপক্ষের নির্লিপ্ত মনোভাব বড়ই পীড়াদায়ক! কোন ভনিতা না করে সরাসরি কঠিন গলায় বললো,
~ “আমি সুজানকে নিয়ে যেতে দেবো না।”

~ “তার কারণ?”
~ “সুজানের মায়ের প্রয়োজন!”
~ “তবে কি আমাকে আবার বিয়ে করতে বলছো?”

ধক করে জ্বলে উঠলো মেহরিনের চোখজোড়া। রক্তবর্ণ হয়ে গেলো চেহারা। মাহমুদ তার সাথে ঠাট্টা করছে? কাঁটা কাঁটা গলায় বললো,
~ “তা যদি বুঝেই থাকো। তাহলে এতদিন করো নি কেন?”

~ “কি করে করবো বলো। এনার পর কাকে বিয়ে করতে হবে তা তো তুমি বলে যাও নি?”
মাহমুদের কন্ঠে খানিকটা ঠাট্টা, রাগ বিষন্নতা মিশ্রণ। মেহরিন ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
~ “আমি বললে করতে?”

~ “আগের বার তো করেছিলাম।”
মেহরিন অনেক কিছু বলতে পারতো। কিন্তু রাগে অভিমানে সব গুলিয়ে ফেললো। একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। চুপচাপ বসে রইলো।
~ “তোমার কি আর কিছু বলার আছে?”

~ “বললাম তো আমি সুজানকে নিয়ে যেতে দেবো না। সুজান আমার কাছে থাকবে!”
মাহমুদ চুপ করে রইলো। তার জবাবের অপেক্ষা না করেই মেহরিন হুড়মুড়িয়ে বেডরুমে ঢুকে সুজানকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এলো। তারপর সদর দরজা খুলে বেরোতে বেরোতে বললো,
~ “সুজানকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। তোমার যদি ক্ষমতা থাকে তো ঠেকাও।”

সুজান অবাক হয়ে চেয়ে আছে। কি ঘটছে না ঘটছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মায়ের মুখের দিকে তাকালো। বাবার ওপর কি রেগে আছে? তাকে প্রতিবাদ করার কোন সুযোগ না দিয়ে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মেহরিন। মাহমুদ কিছুক্ষন অবাক হয়ে চেয়ে রইলো তাদের যাওয়ার দিকে। পরোক্ষনেই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসে পড়লো সে। মুখে মিটমিটে হাসি। পকেট থেকে ফোন বের করে সোহাগের নাম্বারে ডায়াল করলো।

খবর পেয়ে সোহাগ তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছে। আবার কি ভেজাল লেগেছে কে জানে? হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলো মাহমুদ সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। সোহাগ আতঙ্কিত কন্ঠে বললো,
~ “কি ব্যাপার মাহমুদ ভাই? কোন সমস্যা?”

মাহমুদ খুব স্বাভাবিক ধীরস্থির কন্ঠে জবাব দিলো,
~ “মেহরিন এসেছিলো কিছুক্ষন আগে।”

~ “তাই নাকি?…চলে গেছে?”
~ “হুম। সুজানকে সাথে নিয়ে গেছে।”

সোহাগ পলকহীন ভাবে কিছুক্ষন চেয়ে রইলো মাহমুদের দিকে। তার চোখেমুখে বিস্ময়। তারপর আচমকাই হেসে ফেললো। মাহমুদও হাসছে। হাসিমুখেই বললো,
~ “আজও সেই মাথামোটাই রয়ে গেলো। আমাকে একবার বললেই তো আমি ফ্লাইট ক্যান্সেল করে দিই। তা না করে, পাগল হয়ে সুজানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।”

~ “আপনি চলে যাবেন শুনে দিশেহারা হয়ে গেছিলো বোধহয়!”
মাহমুদের মুখে লেগে থাকা হাসিটা আরেকটু গাঢ় হলো। তার হাসিহাসি মুখটার দিকে চেয়ে সোহাগের ভীষণ ভালো লাগছে। বললো,
~ “আমি কি একটা ফোন করবো?”

~ “আমার মনে হয় না এখন তার সিগন্যাল পাওয়া যাবে। আমার ফ্লাইটের আগে সে আর দেখা দেবে না।”
~ “তারমানে আবার উধাও?”

মাহমুদ একটু শব্দ করে হাসলো। বললো,
~ “ইয়েস, উইথ মাই সান!”
~ “সুজান গেলো?”

~ “মুখ থেকে মনে হলো নার্ভাস! কিছু বুঝতে পারে নি বোধহয়! হতবম্ভ হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। মাকে বোধহয় একটু ভয় পায়!”
সোহাগ কৌতুকমিশ্রিত কন্ঠে মাথা নেড়ে বলল,
~ “সি ইজ রিয়েলি ইম্পসিবল!
~ “বাদ দাও। রায়হান সাহেবের কি খবর? নক আউট?”

~ ” ইয়েস!”
মাহমুদ চিন্তিত মুখে বললো,
~ “কেন যে এমন পাগলামি করে মেহরিন!”
তারপর একসঙ্গেই হেসে ফেললো দুজন।

সোহাগ মেহরিনের সাথে তার দেখা হওয়ার ঘটনা রায়হানের কাছে যাওয়ার ঘটনা একে একে সব খুলে বললো মাহমুদকে। সবশুনে মাহমুদ শুধু হাসলো। আর মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালো রায়হানের প্রতি! হঠাৎ করেই অচেনা নম্বর থেকে সোহাগের নাম্বারে কল এলো। অবাক হয়ে মাহমুদের দিকে তাকাকেই ইশারায় তাকে স্পিকার অন করতে বললো মাহমুদ। তার কথামতই ফোন রিসিভ করে স্পিকার অন করে দিলো সোহাগ। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
~ “হ্যালো সোহাগ। আমি মেহরিন।”

সোহাগ কন্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। বলা যায় না টের পেলে মেহরিন হয়ত সোহাগের কাছে কিছু বলতে চাইবে না। কিংবা অন্য জায়গায় উধাও হয়ে যেতে পারে।
~ “কি ব্যাপার হঠাৎ অচেনা নাম্বার থেকে ফোন করলে যে? কোন সমস্যা?”

~ “তোমাকে পরে সব খুলে বলবো। আপাতত দারূণ একটা গুড নিউজ আছে!
~ “তাই নাকি?”
~ “ইয়েস। সুজান আমার কাছে। ওকে নিয়ে এসেছি। এবার দেখি অসভ্যটা কি করে ওকে নিয়ে দেশে ফিরে যায়?”

সোহাগ এবং মাহমুদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো। মাহমুদ ইশারায় কথা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। সোহাগ বললো,
~ “তুমি কি বাসায়?”
~ “মাথা খারাপ? পরশুর আগে আমি বাসার ফিরছি না।”

~ “ঠিক আছে তোমরা কোথায় আছো? আমাকে বলো, আমি আসছি।”
~ “আমি তোমাকে মেসেজ করে পাঠিয়ে দিচ্ছি!”
~ “রাখছি তাহলে? সাবধানে থেকো।”

~ “ওকে!”
ফোন রেখে আরেকদফা হাসলো সোহাগ আর মাহমুদ। মাহমুদ মাথা নাড়িয়ে হাসিহাসি গলায় বললো,
~ “পাগল! আস্ত পাগল!
~ “আমি ভাবছি আমার সঙ্গে আপনাকে দেখলে ওর রিয়েকশনটা কি হবে?”

~ “তোমার অবস্থা যে খুব ভালো থাকবে তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।”
আবারো হাসির বন্যা বইয়ে দিলো দুজনে।তারপর একসঙ্গে মেহরিনের দেওয়া এড্রেস এর উদ্দেশ্যে বেরোলো।

পর্ব ৮ (অন্তিম)

সোহাগ গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বযে নিউজফিড স্ক্রল করছিলো। হঠাৎ মেহরিনের নাম্বার থেকে ফোন আসতেই মুচকি হেসে রিসিভ করে ধীরেসুস্থে ফোনটা রিসিভ করলো সে। মুখে হাসির রেখেই বললো,
~ “ইয়েস আই অ্যাম অন দ্যা ওয়ে!”
~ “জি আপনি কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠের একজন জিজ্ঞেস করলো প্রশ্নটি। আশাহত সোহাগ অবাক হয়ে নাম্বারটি চেক করলো। ঠিকই আছে, মেহরিনের নাম্বার। কিন্তু ওর ফোন থেকে কে কথা বলছে? উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
~ “আমি সোহাগ। আপনি কে বলছেন? এটা তো মেহরিনের নাম্বার।”

~ “জি এইমাত্র উনার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমরা উনাকে নিয়ে হস্পিটালে যাচ্ছি। আপনি তাড়াতাড়ি….
হাত থেকে ফোন পড়ে গেলো সোহাগের। ধাক্কা সামুলাতে হাতের মুঠো শক্ত করে ফেললো। ওপাশ থেকে ভদ্রলোকের দ্বিধান্বিত কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। বিরতিহীন ভাবে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছেন তিনি।
~ “হ্যালো,….হ্যালো আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা?”

সোহাগ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,
~ “জি পাচ্ছি। সুজান?…সুজান কেমন আছে?”

সুজান ভদ্রলোকের সাথে ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোক আশ্বাস দিয়ে বললেন,
~ “বাচ্চার কোন ক্ষতি হয় নি। আমি আপনাকে হাসপাতালের এড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন।”

ফোন আসার আগে সোহাগ গাড়ি নিয়ে সামনের শপিং মল এর নিচে অপেক্ষা করছিলো। ওদের যাত্রা পথেই হুট করেই মাহমুদ গাড়ি থামাতে বলে পাশের এই বড়সড় শপিং মল টিতে ঢুকে যায়। সোহাগ কিছুই জিজ্ঞেস করে নি। কেবল মুচকি হেসেছিলো। মাহমুদও প্রতিউত্তরে হেসেছিলো কেবল।

মাহমুদ ভেতরে যাওয়ার আধঘন্টার মাঝেই হঠাৎ করে ফোনটা এলো। ভদ্রলোক হাসপাতালের এড্রেস জানালো। মেহরিন তাকে মেসেজ করে যেই এড্রেস দিয়েছিলো তার কাছাকাছি একটা হাসপাতালেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওকে। সোহাগের সাথে কথা বলার পর রেডি হয়ে সুজানকে নিয়ে ঘুরতে বেরচ্ছিলো সে। ঘুরতে যাওয়ার লোকেশনগা মেসেজ করে সোহাগকে পাঠিয়েছিলো। কিন্তু লোকশনের কাছাকাছি এসেই হঠাৎ করে অ্যাক্সিডেন্টটা হলো।

সোহাগ অসাড়ভাবেই কোনরকম মাহমুদের নাম্বারে কল দিলো। রিং হওয়ার আগেই হাসিমুখে শপিংমল থেকে বেরোতে দেখা গেলো মাহমুদকে। গাড়ি কাছে এগিয়ে আসতেই সোহাগের চেহারা দেখে অশনিসংকেত বেজে উঠলো তার বুকের ভেতর। উদ্বিগ্ন, অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো ,
~ “কি ব্যাপার সোহাগ? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোন সমস্যা?”

সোহাগ গাড়ি থেকে বেরিয়ে অপরাধির মত মুখ করে বলল,
~ “মেহরিনের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে মাহমুদ ভাই!”

মুহূর্তেই রক্তশূন্য হয়ে গেলো মাহমুদের মুখ। অজানা আতংকে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। আশেপাশের সমস্ত কিছু কাঁপিয়ে ঝাঁকি দিয়ে উঠলো সমস্ত শরীর। ব্যাপার খেয়াল করতে একসেকেন্ডও দেরী করে নি সোহাগ। লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরলো তাকে। এমন একটা খবর মাহমুদকে দিতে নিজেকে কেমন অপরাধি মনে হচ্ছিলো তার।
~ “শান্ত হোন মাহমুদ ভাই।”

মাহমুদ ঘোরের মাঝে আছে যেন। আকস্মিক এমন আঘাত তার বোধশক্তিকে বিকল করে দিয়েছে। কাঁপাকাঁপা কন্ঠে, অস্পষ্ট ভাবে উচ্চারণ করলো কেবল,
~ “সুজান?”

~ “হি ইজ সেইফ!”
তাকে ধরে গাড়িতে বসিয়ে দিলো সোহাগ। একটু আগে সে নিজেই স্থির হতে পারছিলো না কিন্তু মাহমুদের অবস্থা দেখে সব নিজের অস্থিরতা বেমালুম উধাও হয়ে গেলো। এইমুহূর্তে এই মানুষটা যে আঘাত পেয়েছে তার কাছে ওর নিজের অস্থিরতা কিছুই নয়। গাড়িতে বসে মাহমুদ ফ্যালফ্যাল করে হাতের রিং বক্সটার দিকে রইলো।

সুজান মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোকের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মাহমুদকে দেখে তার হাত ছাড়িয়ে দৌঁড়ে বাবার কাছে এলো সে। ভদ্রলোক জানালেন মেহরিনকে ওটিতে নেওয়া হয়েছে। কি অবস্থা ডাক্তাররা এখনো কিছু জানায় নি। সোহাগ চলে গেলো ঐ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে। সুজানের কাছ হাটুমুড়ে বসলো মাহমুদ। সুজান কাঁদোকাঁদো গলায় বললো,
~ “বাবা,…মা?”

ছেলেকে সান্ত্বনা দেওয়ার পরিস্থিতে ছিলো না মাহমুদ। যন্ত্রের মত কেবল কথা গুলো শুনে যাচ্ছিলো। সুজান বাবার দুহাত ঝাঁকি দিয়ে, জড়িয়ে ধরে বললো,
~ “আমরা মাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। মা খুব ভালো।…খুব ভালো!”
~ “কিচ্ছু হবে না তোমার মায়ের।”
~ “সত্যি বলছো?”

হাউমাউ করে কান্নাটা ঠেকিয়ে রাখতে পারলো না মাহমুদ। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কেঁদে উঠলো সে। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বললো,
~ “আমাকে সহ্য করবার ক্ষমতা দাও খোদা। আমার ছোট ছেলেটার জন্যে হলেও আমাকে সহ্য করবার ক্ষমতা দাও। আমি ছাড়া ওর কেউ নেই।”

দুঘন্টা বাদে ডাক্তার হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন। মাহমুদ নিশ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে আছে উনার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য। বয়স্ক ডাক্তার ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে কোন ভনিতা না করেই বললেন,
~ “থ্যাংক টু দ্যা অলমাইটি। সি ইজ সেইস নাউ।”

গাড় অন্ধকার সরে গিয়ে দিগ্বিজয়ী হাসি ফুটে উঠলো মাহমুদের চেহারায়। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সুজানের গালে চুমু খেয়ে বলল,
~ “কান্না বন্ধ করো বাবা। ডাক্তার কি বলেছে শুনেছো? তোমার মা ভালো হয়ে গেছেন। আর কোন ভয় নেই। ভালো হয়ে গেছেন তোমার মা।”

বাপ ছেলে দুজনের মুখেই ভুবনজয়ী হাসি। সোহাগ তার চোখের কোনে লেগে থাকা পানিটুকু মুছে মুচকি হাসলো। খুশির বাধ ছাড়িয়ে সেই প্রথম বাস্তবে ফিরে এলো। হাসি মুখে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলো,
~ “আমরা কি পেশেন্ট এর সাথে দেখা করতে পারি?”

~ “মাত্র জ্ঞান ফিরেছে। এখন স্ট্রেস না দেওয়াই ভালো। পেশেন্ট ঘুমোচ্ছে।”

মাহমুদ অস্থির কন্ঠে বললো,
~ “আমরা কোন স্ট্রেস দেবো না। শুধু বাইরে থেকে দেখেই চলে আসবো।”
~ “ঠিক আছে। আমি নার্সকে বলে দিচ্ছি। আপনাদের ভেতরে নিয়ে যাবেন।”

অবশেষে দুদিন বাদে আজ মেহরিন সম্পূর্ণ সচেতন। এই দুইদিন দুর্বল শরীরে কেবল ঘুমিয়েছে। চেতনা ফিরতেই প্রথমে সুজানের কথা জিজ্ঞেস করলো। আকুতি ভরা কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো,
~ “আমার ছেলে! আমার ছেলে!…সুজান!”
নার্স ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,

~ “আপনার ছেলে বাইরেই আছে। ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। চিন্তা করার কিছু নেই।”
সুজানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো মাহমুদ। ভেতরে ঢুকেই সুজান দৌঁড়ে মায়ের কাছে চলে গেলো। ওকে বুকে জড়িয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো মেহরিন। তারপর চোখ মুছে ওর দুগালে অজস্র চুমু খেয়ে বললো,
~ “তুই আমার ছেলে। আমার কাছে থাকবি। আমার ছেলে তুই!”

সুজান বাধ্য ছেলের মত তার বুকের সাথে মিশে রইলো। ওকে আরো শক্ত করে বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরলো মেহরিন। মাহমুদ মুগ্ধ নয়নে সেই দৃশ্য অবলোকন করলো। এর চেয়ে পবিত্র কোন ভালোবাসা বুঝি আর হয় না। এমন নিখাদ, নিষ্পাপ, সরল ভালোবাসার কাছে পৃথিবী অন্য সব ভালোবাসা তুচ্ছ। তাকে দেখতে পেয়ে মেহরিন খানিকটা ভয় পেলো। আবারো সেই আতংক মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, মাহমুদ কি সুজানকে নিয়ে চলে যাবে? মাহমুদকে শোনাতেই যেন অস্ফুটসরে উচ্চারণ করলো সে,
~ “আমার ছেলে!”

মাহমুদ হাসলো। সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বিগলিত কন্ঠে বললো,
~ “তোমারই তো ছেলে!”

মাহমুদের এমন আদুরেপনাতে সব ভয় দূর হয়ে গেলো মেহরিনের। অনুতপ্ত কন্ঠে বললো,
~ “আমি বিয়ে ক্যান্সেল করে দিয়েছি মাহমুদ!”
~ “জানি আমি। ওসব এখন না থাক। আমিও ফ্লাইট ক্যান্সেল করে দিয়েছি।”

~ “যাবে না?”
~ “যেতে আর দিলে কই?”

হাসি ফুটে উঠলো মেহরিনের মুখে। খুশিতে সুজানের গালে নিবিড় ভাবে চুমু খেলো সে। মাহমুদ আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
~ “পুত্রমাতা কি শুধু পুত্রকেই আদর সোহাগ করবেন নাকি পুত্রের বাবাকেও কিছু আদর যত্ন করা হবে?”

মেহরিন লজ্জা আরক্তিম হয়ে তার বুকের আলতো চড় মারলো। সাথে সাথেই মাহমুদ ওর হাতখানা টেনে নিয়ে বুকের জড়িয়ে ধরে বললো,
~ “আমি আল্লাহর কাছে শুধু সহ্য শক্তি চেয়েছিলেন মেহরিন। তোমার কিছু হলে মরে যেতাম আমি। একদম মরে যেতাম। তখন আমার ছেলেটার কি হতো?”
মেহরিন অভিমানী গলায় বললো,
~ “দূরে সরিয়ে দিয়ে তো খুব সুখেই ছিলে।”

মাহমুদের চোখে কোন রাগ, অভিমান নেই। আছে শুধু ভয়। মেহরিনকে হারানোর ভয়। ছলছল চোখে চেয়ে অপরাধির মত বললো,
~ “কি করতাম আমি? কোন অধিকারে তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম? আমি ভেবেছিলাম তুমি রাহাতকে বিয়ে করে সুখি হতে চেয়েছিলে। তাই নিজের ভালোবাসাটা লুকিয়ে রেখেছিলান। কিন্তু তুমি তো জানতে, তুমি স্বেচ্ছায় গিয়ে দাঁড়ালে তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, তবুও কেন এত কষ্ট দিলে!”

মাহমুদের চোখে পানি। ব্যস্ত ভাবে শার্টের কোনা দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করলো সে। মেহরিন তৃপ্ত চোখে চেয়ে রইল তার প্রেমিক পুরুষটির দিকে। এই মানুষটাকে আর কষ্ট দেবে না সে। সহ্যের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট ভোগ করে ফেলেছে মানুষটা। এতটা কষ্ট বোধহয় তার পাওনা ছিলো না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের মাথাটা মাহমুদের কাধে এলিয়ে দিলো সে। চোখ বন্ধ রেখেই টের পেলো তার হাতে রিং পরিয়ে দিচ্ছে মাহমুদ। হাসলো মেহরিন। অবশেষে এতগুলো বছর বাদে পুনরায় তার ভালোবাসার মানুষটা তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। দুজনের মাঝখানে সুজানকে টেনে নিলো সে।

লেখা – অরিত্রিকা আহানা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “পুনরায় – তোমার আমার মিলন গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – ব্ল্যাক ম্যাজিক – কালো জাদু শেখার উপায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!