ভালোবাসার গল্প

আমার তুমি আছো (সিজন ১: শেষ খণ্ড) – Abegi moner kichu kotha

আমার তুমি আছো – Abegi moner kichu kotha: আমি প্রথম প্রথম ওনাকে একটু ভয় পেতাম, জানোই তো উনি একটু গম্ভীর টাইপের কিন্তু ওনার মনটা বেশ ভালো। কথায় কথায় জানতে পারলাম উনি ডিটেকটিভ টিম এর আন্ডার কফার অফিসার।


পর্ব ৮

পিয়াস ভাইয়া আমার শরীরে এমন বাজে ভাবে হাত দিচ্ছে যে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আমি বার বার পিয়াস ভাইয়ার হাত সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছি। কিন্তু উনি কোন কিছুই বলছেনা। এক সময় পিয়াস ভাইয়া আমার শাড়ীর আঁচল সরিয়ে দেয়। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ভাইয়াকে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। পিয়াস ভাইয়া হাসছে।

~ কি হল আলো! আরে কাছে আয় না। আমি জানি তো তোর শরীরের জালাটা বেশি! আর স্বাভাবিক ভাবে ঊনিশ বছরের মেয়েদের যৌনক্ষুধাটা বেশিই হয়। তুই কি বলতো আলো, আমার সাথে সব কিছু শেয়ার করতিস আর এটা বলতে পারলি না? আমি ছিলাম তো।
পিয়াস ভাইয়ার কথাগুলো শুনে দু হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলাম। চিৎকার করে কেঁদে ফেললাম।
~ দোহাই লাগে ভাইয়া আমি তোমার পায়ে পরি। তুমি এই সমস্ত নোংরা কথা আমাকে বোলো না। না আমি এইসব কিছু করেছি না আমার সাথে কিছু হয়েছে। আমি চক্রান্তের স্বীকার হয়েছি, ফাঁদে পড়েছি।

পিয়াস ভাইয়া উঠে এসে আমার চুলের মুঠি চেপে ধরে।
~নাটক করছিস! কাহিনী শোনাচ্ছিস আমায়!
~ না আমি তোমাকে কাহিনী শোনাচ্ছি না। আমার সাথে যা ঘটতে যাচ্ছিল তাই বলতে চাইছি।

~ তুই কি বলবি। কি শুনবো সব কিছুই তো আমি জানি। আর কি চক্রান্তের কথা বলছিস? তোকে কাল রাতে যখন জিজ্ঞাসা করলাম তুই কোথায় যাচ্ছিস? তুই বলে গেলি কাজে যাচ্ছি। এই তো তোর কাজ, শরীর বেচার কাজ। তোকে বিশ্বাস করেছিলাম কিন্তু তুই সেই বিশ্বাস এর মর্যাদা রাখলি না। এই টা দেখ এই ভিডিও টা,
পিয়াস ভাইয়া আমার সামনে মোবাইল তুলে ধরলো। একটা ভিডিও যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আমি ওই গলিতে ঢুকছি। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এখন আর কিছু বললেও পিয়াস ভাইয়া আমার কথা শুনবে না।

~ আর কি বলবি তুই? জানি না কতদিন ধরে তুই এইসব করছিস। এইরকম নোংরা কাজ করার আগে তোর কারুর কথা মনে হলো না আমার কথা! তোকে সেই সাত বছর বয়স থেকে দেখছি কতো নিষ্পাপ ছিলি তুই! তোর মুখ দেখলে আমি পৃথিবীর সব সুখ মনে হতো হাতে পেয়েছি। তোর বাবা মা মারা যেতে তুই যখন অতো কাঁদছিলি তখন আমি তোর সারা জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার শপথ করেছি। আর সেই ছোট্ট আলোটা এতো বড়ো হয়ে গেল। ছোট্ট আলোটা আমাকে ঠকালো। আমার কথা না হয় ছাড় দে তোর মা বাবার কথাও মনে এলো না!
পিয়াস ভাইয়া কাঁদছে। আমি সত্যি অনেক বড়ো ভুল করেছি, পিয়াস ভাইয়াকে নিজের অজান্তেই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমি পিয়াস ভাইয়ার কাছে গিয়ে হাত দুটো ধরি।

~ আমি ভুল করেছি ভাইয়া ক্ষমা করে দাও।
পিয়াস ভাইয়া আমার হাতটা সরিয়ে দেয়। একটানে খুলে দেয় আমার শাড়ী। ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয়। হাত দুটো বিছানায় চেপে ধরে।
~ ভাইয়া কি করছো! ছেড়ে দাও আমায়।

~ কেনো ছেড়ে দেব? বাইরের লোককে যদি শরীর দিতে পারিস তাহলে আমাকে কেন নয়? আমি তোর নিজের লোক।
~ এইসব কিছুই হয়নি ভাইয়া। তুমি ভুল করছো। তোমার পায়ে পরি ভাইয়া আমার সর্বনাশ করো না গো। ভাইয়া প্লিজ,
~ কিসের সর্বনাশ যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তোর শরীরের কামড় বেশি, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি। আমি তোর এমন অবস্থা করবো আজকের পর থেকে কোন পুরুষের সংস্পর্শে যেতে ভয় পাবি।

আমি ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ি। ফ্লোরে পড়ে থাকা কাপড়টা তুলে নিয়ে শরীরে জড়িয়ে নি।
~ আমার কিছু হয় নি ভাইয়া। আমার শরীর কেউ স্পর্শ করেনি। আমার ক্ষতি করো না তুমি। পায়ে পড়ি তোমার।
পিয়াস ভাইয়ার পা ধরে কাঁদতে থাকি। পিয়াস ভাইয়া পুনরায় আমাকে টেনে বিছানায় ফেলে দেয়।

~ আলো তোকে আমি দশ লক্ষ টাকার বিনিময়ে কিনেছি। আমার আলোকে অন্য কারুর কাছ থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। আমাকে তো দামটা তুলতে হবে তাই না। তোর ফিডব্যাক আছে অনেক তৃপ্তি পাওয়া যাবে।

আমি আর পারলাম না পিয়াস ভাইয়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে। ভাইয়া আমার কোন কথাই কানে নিল না। আমার গলা ফাটানো চিৎকার কান্নার আওয়াজ কোন কিছুই ভাইয়া কানে নিলো না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই সময় মনে হচ্ছে কেউ ছুরি দিয়ে আমার শরীর টাকে কেটে ফালাফালা করে দিচ্ছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়।

আমার শরীরে কেউ ধাক্কা দেয়। চোখ খুলে দেখি পিয়াস ভাইয়া পা দিয়ে আমাকে জাগানোর চেস্টা করছে। আমি উঠে বসে পিয়াস ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে ভয় পাই।
~ কি হয়েছে?
~ কিছু হয়নি তো। মহারাণী আপনি যে এখনো ঘুমাচ্ছেন তা বাড়ির কাজ কাম গুলো কে করবে? আমাকে নাস্তা দেবে কে?
~ আ.. মি.. আমি কেন.. ভা. বি.. ভাবী, খালাম্মা আছে তো।

~ আচ্ছা তুই এখন বলতে চাইছিস মা ভাবী রাজশাহী থেকে এসে আমাকে নাস্তা দিবে তাই তো!
পিয়াস ভাইয়ার জোর গলায় কথা বলায় আমি আরো বেশী ভয় পেয়ে যাই। আমি তো ভুলেই গেছিলাম আমি ঢাকায় আছি। তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়াই।
~ আমায় একটু সময় দাও তোমার নাস্তা দিচ্ছি।

পিয়াস ভাইয়াকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আমি ওয়াশরুমে চলে এলাম। চটপট বেরিয়ে এসে কিচেন রুমে এলাম। পিয়াস ভাইয়াকে স্যন্ডউইচ আর জুসের গ্লাস টা এগিয়ে দিলাম। পিয়াস ভাইয়া নাস্তার প্লেট আর জুসের গ্লাস টা ছুঁড়ে ফেলে দিলো।
~ আমি এগুলো খাবো না তো। আমার জন্য পরোটা, ডিম ভাজি করে আন।

আমি আধঘন্টার মধ্যেই পিয়াস ভাইয়াকে নাস্তা দিয়ে দিলাম। পিয়াস ভাইয়া বসে পরোটা কে দু আঙুল দিয়ে তুলে দেখতে লাগলো।
~ আলো এটা কি! এরকম তেল চপচপে? তুই জানিস না আমি বেশি তেল খাওয়া পচ্ছন্দ করি না?
~ জ্বী ভাইয়া, আসলে আমি এর আগে কখনো পরোটা বানায়নি আজ প্রথম তো তাই বেশি তেল দিয়ে ফেলেছি। এরপর থেকে আর এই ভুল হবে না। আজকের মতো খেয়ে নাও না।

আমি ভয়ে ভয়ে কথাগুলো বলে পিয়াস ভাইয়ার দিকে তাকালাম। পিয়াস ভাইয়া কিচেন রুম থেকে তেলের বোতলটা নিয়ে আসলো।
~ আলো ঠিক আছে আমি এই পরোটা খাবো। কিন্তু তোকেও খেতে হবে তো! এই বোতলটা শেষ কর।
আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো। পিয়াস ভাইয়া কি বলছে আমি তেল খাবো।
~ ভাইয়া তেল খেলে শরীর খারাপ করবে তো।

~ তো! খেতে বলছি খাবি, আর তোকে কি আমি রোজ খেতে বলছি। আজকের মতো খেয়ে নে না।
বুঝতেই পারছি আমার কথা আমাকেই ব্যাক করছে। পিয়াস ভাইয়া বোতলের ছিপি খুলে আমার মুখের সামনে ধরলো। আমি না চাইতেও বেশ কিছু টা তেল আমার গলায় গেল। আমি পিয়াস ভাইয়াকে ঠেলে দিয়ে বেসিনের কাছে গিয়ে বমি করে ফেললাম।
~ তুমি কি পাগল হয়ে গেছ নাকি? কি করতে চাইছিলে?

চিৎকার করে কথাগুলো বললে পিয়াস ভাইয়া আমাকে থাপ্পড় মারে।
~ তোকে বলেছিনা আমার সাথে উঁচু আওয়াজে কথা বলবি না। খুব সাহস বেড়েছে তোর।
~ সাহসের কি আছে তুমি কি করতে যাচ্ছিলে? আমি থাকবো না তোমার কাছে‌। আমাকে রাজশাহী নিয়ে চলো। আমি খালাম্মা ভাবীর কাছে থাকবো। তুমি নাটক করছিলে ভালো মানুষ এর মুখোশ পরে ওদের সাথে মিথ্যা নাটক করে তুমি আমাকে নিয়ে আসছো। থাকবো না আমি তোমার সাথে থাকবো না বুঝেছো।
~ কোথায় যাবি রাজশাহী! খালাম্মা ভাবীর কাছে যাবি! না কি ওই পতিতালয়ে যাবি! কোনটা?

আমি পিয়াস ভাইয়ার গালে থাপ্পড় মেরে দিয়ে কেঁদে ফেললাম।
~ আমার তো সেদিন কোন দোষ ছিল না কেন এমন করছো ভাইয়া। আমি আর সহ্য করতে পারছি না যে। আমাকে মেরে ফেলো তুমি।
~ তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি! আমাকে!
আমি পিয়াস ভাইয়ার গালে হাত তুলে অপরাধ করে ফেলেছি। কি করবো যে কথাগুলো বলছিলো তা আমি যে সহ্য করতে পারছি না। পিয়াস ভাইয়া রাগে বেরিয়ে যায়। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। তবে পিয়াস ভাইয়ার সাথে থাকতে পারবো না।

আমার ফোনটা খুঁজে নিয়ে খালাম্মাকে কল দিলাম। হ্যালো বলার সাথে সাথে আমি কেঁদে ফেললাম।
— কেন কাঁদছিস আলো!
— আমার তোমার জন্য মন খারাপ করছে। আমি তোমার কাছে যাবো খালাম্মা।

— খবরদার তুই আমাকে খালাম্মা বলে ডাকবি না। তোর মায়ের মতো তোর খালাম্মা আজ থেকে তোর কাছে মৃত।
— কি বলছো তুমি খালাম্মা! কেন বলছো?
— তোর আমি মুখ দেখতে চাই না। তুই নষ্টা মেয়ে! ছিহ্ ছিহ্ আমাদের মান সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস। আমি সব জানি সব। তোর ব্যবস্থা আমার ওই ছেলেই করবে। মরে যা তুই মরে যাহ।

— খালাম্মা তুমি এগুলো কি বলছো। সব ভুল, সবার ভুল হচ্ছে।
— তোর মতো একটা নষ্টা মেয়ের কাছে আমি ঠিক ভুল জানতে চাইবো না।
— আমার কথাটা শুনো, আমি নষ্টা মেয়ে নই খালাম্মা, আমি নষ্টা মেয়ে নই।

চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। খালাম্মা আমার কথা শোনে না। লাইনটা কেটে দেয়। আমাকে সবাই ভুল বুঝলো। আমি এবার কি করবো! আমি এক ছুটে ছাদে চলে এলাম। খালাম্মা আমাকে ভুল বুঝলো। ছাদে এসে অনেক কাঁদলাম। আমি সেদিনের পর মরে গেলাম না কেন! আমি এখনো কেন বেঁচে আছি। কখন সন্ধ্যা নেমেছে তার টেরই পেলাম না। পিয়াস ভাইয়া আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমি কোন পাত্তাই দিলাম না।
~ তুই ছাদে কি করছিস? আমি অফিস থেকে ফিরেছি সে খেয়াল আছে তোর? তাড়াতাড়ি আমার জন্য কফি নিয়ে আয়।

আমি কিছু বলি না, শুনেও না শোনার ভান করে বসে থাকি। পিয়াস ভাইয়া অনেকক্ষণ ধরে আমাকে দেখলো। এবার রেগে গিয়ে হাত ধরে টেনে তুললো। আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নীচে চলে আসি। পিয়াস ভাইয়া আমার পিছু পিছু আসে। চিৎকার শুরু করে থাপ্পড় মারে। আমি চোখ মুখ শক্ত করে রাখি।
~ তুমি খালাম্মাকে কি বলেছো? আমি নষ্টা মেয়েছেলে তাই তো! বলোনি তুমি আমাকে রেপ করেছো?

এটা শুনে পিয়াস ভাইয়ার মাথায় যেনো রক্ত উঠে গেলো। এলোপাথাড়ি থাপ্পড় মারতে লাগলো। আমি পরে গেলে আমাকে তুলে নিয়ে আবার মারলো।
~ তোকে রেপ করেছি তাই না! আমি রেপ করেছি! তুই বাইরের লোককে শরীর দিতে পারিস আমাকে কেন নয়? আসলে কি বলতো তোর মতো মেয়ের সাথে এইরকমই করা উচিত।

পর্ব ৯

~ তুমি একটা নীচ নোংরা মন মানসিকতার অমানুষ। তুমি ভুল করেছো এবং করছো অনেক বড়ো ভুল। আমায় যদি তুমি বেশ্যা মনে করো তাহলে বিয়েটা করেছো কেন? খালাম্মার কথায়! বলতে পারতে তো তুমি বেশ্যা মেয়েছেলেকে বিয়ে করতে পারবে না।
পিয়াস ভাইয়া আমাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে।

~ বেশ ভালো কথা বলতে পারিস তো তুই হুম। তুই পাপ কাজ গুলো করে বেড়াবি আর আমি কিছু বলবো না আমাকে কি তুই বাচ্চা ছেলে ভাবিস!
~ আমি কিছু করিনি যা করার তুমি করেছো। আমাকে নষ্ট করে দিয়েছো তুমি।
পিয়াস ভাইয়া আমাকে বাড়ির বাইরে বের করে দিল।
~ ঠিকি বলেছিস তুই তো নষ্ট হয়েই গেছিস এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।

~ ভাইয়া প্লিজ এমন করো না আমি এই শহরে কিছু চিনি না আমার খুব ভয় করছে। তুমি আমাকে সকাল হলে রাজশাহী পাঠিয়ে দিও আমি তোমাকে আমার মুখ দেখাবো না। আমাকে আমার বাড়ির লোকেদের কাছে রেখে দিয়ে আসো।
~ কোন কথা বলবি না আজকে তুই সারারাত বাড়ির বাইরে পরে থাকবি।
~ ভাই, ভাইয়া,।

পিয়াস ভাইয়া আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায়। আমি দরজা ধাক্কা দিতে দিতে বসে পড়ি। চিৎকার করে কাঁদি। কিছু সময় পর মেঘ কালো করে ঝোড়ো হাওয়া উঠে তার সাথে বজ্র বিদুৎ। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। দরজা ধাক্কা দিয়ে পিয়াস ভাইয়াকে ডাকতে থাকি কিন্তু না পিয়াস ভাইয়া দরজা খুললো না। হয়তো আরামে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। বৃষ্টি নামলো, যতো বৃষ্টির জোর বাড়ছে ততোই আকাশ ভেঙ্গে বজ্রপাত পড়ছে। খুব ভয় লাগছে নিজেকে অনেক অসহায় মনে হয়। ছোট থেকে সামান্য মেঘ ডাকার আওয়াজ হলেই আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। দু হাত দিয়ে কান চেপে ধরি।

সকালবেলা নিজেকে আবিস্কার করি রুমের মধ্যে। বিছানায় শুয়ে আছি। তাহলে কি পিয়াস ভাইয়া আমাকে নিয়ে এসছে! সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমে চলে আসি। শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে গেলে গালে থাপ্পড় মারার দাগটা দেখতে পাই। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে আসে।
~ সাজের বাহার হয়ে গেলে নিচে আয়।

আমি কিছুটা চমকে যাই পিয়াস ভাইয়ার কথায়। আমি নীচে এসে খালাম্মাকে দেখে চমকে যাই। খালাম্মা আবার কখন আসলো! পিয়াস ভাইয়া কে খেতে দিয়ে নিজেও বসলো। আর একটা প্লেটে নাস্তা দিয়ে কিচেন রুমে রেখে আসলো। বুঝতেই পারলাম ওটা আমার জন্য রাখলো। খালাম্মা আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছে। আমি কোন কথা না বলে কিচেন রুমে চলে যাই। কাল সারাদিন রাতটা আমার না খেয়েই কেটেছে। তাই খাবার দেখে নিজেকে আটকাতে পারলাম না খেয়ে নিলাম।
খালাম্মা আমার সাথে কোন কথাই বলছে না। অনেক চেষ্টা করেও খালাম্মাকে আমার সাথে কথা বলাতে পারলাম না। রুমে এসে হাঁটুতে মুখ গুজে কাঁদতে থাকলাম। কেন এমন হচ্ছে, কেন আমাকে পিয়াস ভাইয়া মেনে নিতে পারছে না। ভেবেছিলাম আমি খালাম্মা কে সবকিছু বলবো কিন্তু খালাম্মাও আমাকে ভুল বুঝছে।
~ আলো নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে আমার সাথে চল।

এমন কথা শুনে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি খালাম্মা। আমি কিছু বলার আগেই উনি বেরিয়ে গেলেন। কিছু বুঝলাম না তাহলে কি খালাম্মা আমাকে কোন শাস্তি দেবে? রুম থেকে বেরোলে পিয়াস ভাইয়া আর খালাম্মার কথা কানে এলো।
~ আমি তোর কোন কথাই শুনবো না। আমি আলোকে নিয়ে চলে যাবো। আমি চাই না ওই মেয়েটা তোর জীবন নষ্ট করুক।

আমি আর কোন কথা কানে নিতে পারলাম না। ছুটে এসে বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে লাগলাম।
আমি পিয়াস ভাইয়ার জীবন নষ্ট করছি আমি! খালাম্মা আমাকে শেষ মেষ ভুল বুঝলো। একবার জানার চেষ্টা করলো না। ঠিকি বলেছে আমার পিয়াস ভাইয়ার থেকে দূরে সরে যাওয়াই ভালো। চাই না আমি কাউকে চাইনা।

ঢাকা থেকে চলে আসলাম রাজশাহী। এতোটা পথ একসাথে আসলেও খালাম্মা আমার সাথে একটা কথাও বললেন না। আমাকে আমার ছোট আম্মু ছোট আব্বুর কাছে রেখে গেলেন। ছোট আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। ছোট আব্বু আমাকে দেখে আমার সাথে কথা না বলেই চলে গেলেন। আমি হাত বাড়িয়ে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলাম।

~ তুই যা কাজ করেছিস তাতে আমাদের সকলের মান সম্মান মাটিতে মিশে গেছে রে। তুই এমন কাজ কি করে করতে পারলি?
ছোট আম্মুও আমাকে ভুল বুঝলো। ছোট আম্মু, ছোট আব্বুও আমাকে পিয়াস ভাইয়া আর খালাম্মার মতো ভুল বুঝছে!
দৌড়ে ছাদে চলে এলাম। ছাদে রেলিং ধরে অঝোর ধারায় কাঁদছি। এতো কষ্ট কেন পেতে হবে আমাকে কেন? কেউ আমার কথা শুনবে না এর থেকে মরে যাওয়াই ভালো। চোখের পানি মুছে ছাদের রেলিং ধরে নীচের দিকে স্থির দৃষ্টি রাখি।

পর্ব ১০

হঠাৎ আমার কাঁধে কারুর হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ছোট আম্মু। আমি কিছু না বলেই রুমে চলে আসলাম। কেনো সবাই কেনো আমাকে ভুল বুঝছে! আজ যদি আম্মু থাকতো তাহলে আমাকে এতো কষ্ট পেতে হতো না। তুমি আমাকে কেন ছেড়ে চলে গেলে আম্মু কেনো!
~ আলো,
আমি চোখের পানি মুছে নিই। ছোট আম্মু আমার মুখোমুখি বসে আমার হাত দুটো ধরে।

~ তোমার মা বাবা মারা যাওয়ার পর আমিই তোমাকে আগলে রাখি। নিজের মেয়ে হবার পরেও তোমার কোন অযত্ন করিনি। কখনো তোমাকে মা এর অভাব বুঝতে দিই নি। দুই মেয়ের মধ্যে কখনো ফারাক দেখিনি। আমার দুটো মেয়েই যে আমার কাছে চাঁদের টুকরো। আমি তোমাকে ঠিক ভুলের শিক্ষা দিয়েছি। তোমাকে মানুষের মতো মানুষ করে বড়ো করেছি। তোমার মনের কথাও আমি বুঝতে পারি। তুমি কষ্ট পাচ্ছ না কি আনন্দে আছো আমি তোমার মুখ দেখলেই ধরতে পারি। আমার কেনো জানি না মনে হচ্ছে এই সব কিছুর পিছনে কোন একটা রহস্য আছে! জুঁই এর এভাবে সুইসাইড করা কিছু তো একটা ভুল হচ্ছে!
ছোট আম্মু আমার চিবুক দু আঙুল দিয়ে তুলে ধরে।

~ আমাকে সত্যি বলো আমি জানতে চাই আসল কথাটা। আলো গোপন রেখো না আমাকে সমস্ত কিছু খুলে বলো?
আমি ছোট আম্মু কে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কেঁদে যাই। তারপর সব কিছু বলা শুরু করি।
~ জুঁই…….
………… ………..।
আমার থেকে সব কথা শুনে ছোট আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে।
~ আমার আলোর সাথে এতো কিছু হয়েছে! আমার আলোটা এতো কষ্ট সহ্য করেছে। নিজের বোনকে শুধু মাত্র বাঁচানোর জন্যে এতো বড়ো বলিদান দিতে হয়েছে।
ছোট আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন আমিও কাঁদছি।

~ এতোটুকু মেয়েটা আমার এতোকষ্ট সহ্য করেছে। তুই একবারও আমার কথা তোর ছোট আব্বুর কথা ভাবলি না। জুঁই আমাদের ছেড়ে চলে গেলো তুই তো এখন আমাদের সম্বল। তোর যদি কিছু হয়ে যেত তাহলে আমরা কি করে বাঁচতাম বলতো!
আমার চোখ দিয়ে বাঁধ ভাঙা পানি গড়িয়ে পড়ছে ঠিকি কিন্তু এতো কষ্টের মাঝেও আমার আনন্দ হচ্ছে। কেউ না হোক আমার ছোট আম্মু আমার পাশে আছে। ছোট আম্মু আমার হাত দুটো ধরে।

~ আমি জানি তুই অনেক সাহসী মেয়ে তা না হলে কি তুই এইরকম একটা পদক্ষেপ নিতিস। আর দেখ নিয়েও কি লাভ হলো তোকে পিয়াস ভুল বুঝছে সানিয়া আপুও ভুল বুঝছে। সব সব কিছু হয়েছে আমার ওই মেয়েটার জন্য নিজে তো মুক্তি পেয়ে গেলো আর তোর জীবনটা নরক করে দিয়ে গেলো।
~ ছোট আম্মু প্লিজ, তুমি জুঁই কে আর কিছু বলো না। আমার এখনো বিশ্বাস হয় না আমার বোনটা বেচেঁ নেই। ও তো সহজ সরল একটা মেয়ে ছিলো ও কি আদেও জানতো এতো কিছু হয়ে যাবে বলে। যদি আমি পারতাম, আমি যদি পারতাম ওই ছেলেটাকে শাস্তি দিতে তাহলে আমার কলিজাটা ঠান্ডা হতো। আমার বোনের আত্মা শান্তি পেতো।

আমার কথা শুনে ছোট আম্মু চোখের পানি মুছে নেয়। আমার চোখের পানি মুছিয়ে আমার হাত দুটো ধরে।
~ হুম আলো আমি চাই তুই ওই ছেলেটাকে শাস্তি দে। তোর সাথে হওয়া অন্যায় গুলোর জবাব দে। আজ তোকে যারা ভুল বুঝছে তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দে তুই ঠিক। আমি এবার ছোট আম্মুর হাতটা শক্ত করে ধরে চোখের দিকে তাকাই।
~ তুমি কি বলতে চাইছো ছোট আম্মু?
~ আচ্ছা আলো তোর কথা মতে ওই ছেলেটা তোকে দেখেনি তাই তো!
~ হুম।

~ তোকে ছেলেটা চিনতে পারবে না কিন্তু তুই পারবি তো?
~ হ্যা ছোট আম্মু ওই অমানুষ ছেলেটাকে আমি চিনতে পারবো।
~ ঠিক আছে আলো তুই ওই ছেলেটাকে শাস্তি দিবি। সাথে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবি।
~ কিন্তু কিভাবে?

~ শোন আলো আমি তোকে জুঁই এর ভার্সিটিতে ভর্তি করাবো। আমি জানি তোর ভার্সিটি থেকে অন্য ভার্সিটিতে যেতে গেলে অনেক ফরমালিটিস আছে। কিন্তু সেসবের দরকার নাই। আমার এক আপুর ছেলে আছে ওই ভার্সিটির প্রফেসর অবশ্য সে হকি খেলার কোচ। আমি তার সাথে কথা বলে বিষয়টা জানাব সে আমাদের হেল্প করবে।
~ আমাদের পরিকল্পনা কি ছোট আম্মু?
~ মন দিয়ে শোন………… …… বুঝেছিস।

~ ঠিক আছে ছোট আম্মু ডান।
কাল থেকে এক নতুন সূর্য উঠবে, এক নতুন সকাল শুরু হবে। এবারে আমিই জিতবো, শেষ হাসিটা আমিই হাসবো। প্রাণ খুলে মুখে লম্বা হাসির রেখা টানলাম।
গোলাপী রঙের ফুল হাতা থ্রী পিছ পরলাম। এক হাতে একটা ব্রেসলেট আর এক হাতে একটা ঘড়ি পরে নিলাম। চোখে কাজল ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক দিয়ে নিলাম। চুলটা উঁচু করে বেঁধে কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ পরলাম। সাইড ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছোট আম্মুকে সালাম করে আমার নতুন ভার্সিটি মানে জুঁই এর ভার্সিটিতে চলে আসলাম। ভার্সিটিতে ঢোকার জন্য পা বাড়িয়ে নিজের লক্ষ স্থির রাখলাম।

চলে এলাম মাঠের কাছে হকি খেলছে সবাই। আমার চোখ খুঁজছে আমায় সাহায্য করা ব্যক্তিটিকে। আমি দেখতে পাচ্ছি ব্লু টি শার্ট পরা হাতে হকির স্টিক ধরে থাকা একজন পুরুষকে। বুঝতে অসুবিধা হলো না এই সেই ব্যক্তি যার কথা ছোট আম্মু বলেছে। আমি মনে অদম্য সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
~ এক্সকিউজমি, আপনি কি রাজীভ আহমেদ! রাজীভ স্যার?

~ জ্বী আলো ম্যাম, আমি রাজীভ আহমেদ। রাজীভ স্যার।
আরে আমাকে তো কিছু বলতেই হলো না তার আগেই বুঝে গেলো আশ্চর্য তো!
~ হুম আমি বুঝে গেছি আর সবটা জানিও আশ্চর্য হয়ার কিছু নেই।
~ আশ্চর্য আমি তো নিজের মনেই কথাগুলো বললাম আপনি জানলেন কি করে?
~ তোমার চেহারায় তা ফুটে উঠছে তো তাই।

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। স্যার কথা বলে দারুণ।
~ আলো আর কিছু ভেবো না। ক্লাসে গিয়ে লেকচার অ্যাটেন্ড করো। তুমি ফাইনাল ইয়ার কমপ্লিট তোমার ভার্সিটি থেকেই করতে পারবে। এখানে যে কাজে এসেছো সেই কাজ করো। আমার প্রিন্সিপাল স্যার এর সাথে কথা হয়েছে। তবে তোমাকে হকিতে জয়েন্ট করতে হবে।
~ আমি জানি ছোট আম্মু আমাকে সব বলেছে। কিন্তু স্যার হকি খেলার সম্বন্ধে আমার কোন আইডিয়া নেই।

~ ইটস ওকে আলো তুমি দুটো কাজেই সাকসেস ফুল হবে আই উইস। এবার যাও। আর হ্যাঁ বেস্ট অফ লাক।
~ থ্যাংক ইউ স্যার, আপনার এই লাকটাই আমার প্রয়োজন।
স্যার মুচকি হাসলো আমিও হেসে ক্লাস রুমের দিকে পা বাড়ালাম। আর কিছু ভাববো না আমার এখন একটাই লক্ষ। লক্ষ স্থির রাখবো এই ছমাসের মধ্যেই আমি জুঁই এর অপরাধীকে শাস্তি দেবো।

প্রফেসর এর লেকচার শেষ করে আমি মাঠের দিকে এগিয়ে এলাম। রাজীভ স্যার আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন রেডী হয়ে এসে প্যাকটিস শুরু করতে। আমার কাছে একটা মেয়ে এলো।
~ হায় আমি ছায়া। তুমি আমাদের টিমে নতুন তাই না?
~ হ্যা আমি আলো।

হকি প্যাকটিস করছি আর চারদিকে নজর রাখছি। রাজীভ স্যার আবার মনে করিয়ে দেয় আমি যেনো লক্ষ স্থির রাখি। ছোট আম্মুর সাথে পরিকল্পনা করেছি মাত্র ছয় মাস ছয় মাসের মধ্যেই ওই ছেলেটাকে শাস্তি দেবো। হকিতে জয়েন্ট করলাম যাতে ওই ছেলেটার কাছে কাছে থাকতে পারি কারণ ওই ছেলেটাও হকি খেলে। রাজীভ স্যার অনেক হেল্প করছেন। জানি না উনি আজ যা করছেন তার ঋণ কিভাবে শোধ করবো। ছায়া মেয়েটা খুব ভালো। আমার বেশ ভালোই লাগছে আমার নতুন বন্ধু আমাকে হেল্প করছে বেশ।

আমি বুঝতে পারছি কেউ আমাকে দেখছে আমার সমস্ত মুভমেন্ট ফলো করছে।
~ ছায়া চলো তো মাঠটায় দু রাইন্ড ছুটে আসি।
~ আচ্ছা চলো।

দু রাউন্ড ছুটে এসে থামলাম। অনেক ফ্রি আর বেশ ভালো লাগছে। সমস্ত ক্লান্তি যেনো ধুয়ে গেলো। হুম আমি ছুটলাম ওই আশিক কে দেখতে ও এতোক্ষণ আমাকেই ফলো করছিলো। তাই ও যাতে আমার প্রতি আরো ইমপ্রেস হয় তাই ওকে দেখিয়ে ছুটে এলাম। ছায়া আমার দু মিনিট পর এসে থামলো।
~ ওহ ওয়াও আলো। তুমি তো দারুণ ছোট। আমি তো হাঁপিয়ে গেলাম।
আমি ছায়ার কথা শুনে হেসে ফেললাম হাসিটা জোরেই ছিলো।

~ কিলার স্মাইল, আই লাইক ইট,
এমন কথা শুনে পেছনে তাকালাম। হ্যা আমার সামনে আশিক দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললো। তার মানে আমি ঠিক লাইনেই চলছি।
~ হায় সুইট হার্ট আই অ্যাম আশিক, আশিক রহমান।
~ ওহ আচ্ছা।
~ অ্যটিটিউট, আই লাইক ইট। তুমি যে ঝড়ের গতিতে ছুটছিলে তাতে আমি ইমপ্রেস।

~ ওহ রিয়েলি, আই ডোন্ট নো।
~ এতোদিন ভেবে এসেছি আমি একাই রানার কিন্তু এখন তো দেখছি,
~ ওহ ইয়েস, এখন তোমার প্রতিদন্ধি এসে গেছে।
~ হুমম ফ্রেন্ড, আই মিন আমরা কি ফ্রেন্ড হতে পারি?
~ ওহ সিওর হোয়াই নট।

আশিক বাঁকা হাসি দিয়ে চলে যায়। ছায়া আমার হাত টেনে ধরে।
~ এই তুমি কি বলতো! না জেনে না শুনে তুমি ওর মতো একটা ছেলের ফ্রেন্ডশিপ করে নিলে! তুমি জানো ছেলেটা কেমন?
~ ছায়া তুমি রাগ করছো কেনো। ওই ছেলেটার সম্পর্কে তুমি আমাকে জানিয়ে দিও আমি এলার্ট হয়ে যাবো। আর হ্যা আমি ওর সাথে থোরি না প্রেম করছি।
~হ্যা তাহলে ঠিক আছে।

আমি আর ছায়া দুজনেই কথাটা বলে হেসে ফেললাম।
আমি বাড়ি চলে আসলাম। সোজা ছোট আম্মুর রুমে চলে এলাম। ছোট আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম।
~ ছোট আম্মু কাজ হয়ে গেছে। আমরা ঠিক যেমন চেয়েছিলাম তেমনি হচ্ছে। ওই আশিক ছেলেটা নিজে থেকে এসে ফ্রেন্ড হয়েছে আমার।
কিন্তু ছোট আম্মু কিছুই বলছে না তো। শাড়ি গুলো গুছিয়ে রাখছে। হাসছেও না কিছু বলছেও না।

পর্ব ১১

আমি ছোট আম্মু কে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলাম। ছোট আম্মুর হাত দুটো ধরলাম।
~ তুমি খুশি হলে না ছোট আম্মু! আমরা যেমন যেমন পরিকল্পনা করেছি ঠিক তেমনি হচ্ছে।
ছোট আম্মু আমার থেকে হাত সরিয়ে নিল। আমার কাপড় গোছানার কাজে মন দিলো।
~ আমি তোমার ওপর রেগে আছি আলো।

~ ছোট আম্মু এমন বলছো কেনো?
~ আলো তুমি যে অতো বড়ো একটা বিপদ মাথায় তুলে নিয়েছিলে আমাকে একবারো জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না। তোমার যদি কিছু হয়ে যেতো! তোমাকে আমি শিক্ষা দিয়েছি যাতে বিপদে কেউ পড়লে তাকে অবশ্যই তুমি সাহায্য করবে। আমার বড়ো মেয়ে ভীষণ সাহসী আমি তা জানি। কিন্তু আলো সেদিন যদি তোমার ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে যেত আমাদের কি হতো বলোতো! ওই দিনের কথা গুলো ভাবলেই তো আমার শরীর শিউরে ওঠে।
ছোট আম্মুর চোখ ছলছল করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি কেঁদে দিবে। আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরে।

~ আলো তুমি আমাকে ছুঁয়ে কসম করো এবার থেকে বড়ো কোন বিপদে পড়লে তুমি আমাকে জানাবে। একা কিছু করবে না।
~ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি ছোট আম্মু আমি এবার থেকে সব কিছু তোমায় শেয়ার করবো।
ছোট আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ থাকলেন। ছোট আম্মুকে জড়িয়ে ধরে থাকতে মনে হচ্ছে আমি যেনো পরম শান্তি পেলাম। ছোট আম্মু আমাকে খাইয়ে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। হ্যা আজ আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারবো, বুকের ভেতরে জমে থাকা পাহাড়টা আজ সরে গেছে।

ঘুম ভেঙে গেলে উঠে বসি। দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ভোর 4 টা বাজে। সামান্য পানি খেয়ে আবার শুয়ে পরলাম। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে এলো।
আচ্ছা পিয়াস ভাইয়া পারতো না আমার পাশে থাকতে! পিয়াস ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে, শুনেছি ভালোবাসলে তার প্রিয় মানুষটির জন্য নাকি সবকিছু করা যায়! তাহলে পিয়াস ভাইয়া কেনো আমার পাশে নেই?

~গুড মর্নিং আলো,
ভার্সিটি তে এসে প্যাকটিসের জন্য মাঠে আসতেই কথাটা কেউ বলে উঠলো। আমি পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম আশিক।
~ মর্নিং,
~ আরে শুধু মর্নিং কেন? আচ্ছা চলো আমরা দৌড় লাগাই দেখি তুমি আমাকে হারাতে পারো কি না!
~ ওহ রিয়েলি! বাট আই অ্যাম নট ইন্টারেস্ট, ওকে,
~ আলো তুমি এখানে আমি তোমাকে ভার্সিটির সব জায়গায় খুঁজলাম পেলাম না, আরে প্যাকটিসে চলো।

ছায়া এসে কথাগুলো বললো। আমি ছায়ার সাথে যেতে যেতে পেছনে তাকালাম আশিক একটা চোখ টিপ মারলো আমি সামনে তাকিয়ে চলে এলাম।
~ আলো তুমি এই আশিকের থেকে দূরেই থাকো বুঝলে। ছেলেটা সুবিধাজনক নয়। সো বি কেয়ারফুল ওকে।
~ হুম ছায়া ওই ছেলেটার মুখোশ খুলবো বলেই তো আমার এখানে আসা। তুমি কোন চিন্তা করো না। ওই ছেলেটা যা কাজ করেছে তার শাস্তি পাবে।
~ আমি কিছু বুঝলাম না কি বলো তুমি?
~ কিছু না প্যাকটিসে মন দাও।

~ ওকে।
আমি হকির স্টিক দিয়ে বলটা নাড়াচাড়া করছি। আর ভাবছি আমার জীবন টা কোথায় এসে থেমেছে। কখনো ভাবিনি আমাকে সবাই এভাবে ভুল বুঝছে। খালাম্মা, পিয়াস ভাইয়া, ছোট আব্বু।
হঠাৎ আমার হাত দুটো কেউ স্পর্শ করে। হকির স্টিকটা ঠিক ভাবে ধরিয়ে দেয়।
~ আলো তুমি তো স্টিক টাই ভালো ভাবে ধরতে পারছো না। প্রথমে হকির স্টিককে ভালোভাবে ধরতে শেখো। আর হ্যা ফোকাস করো দুদিকেই।
~ রাইট স্যার।

~ শোনো এক সপ্তাহ পরে একটা কম্পিটিশন আছে। আমি তোমাকে তৈরী করবো। তুমি হকি চ্যম্পিয়ন হবে এমনকি রেস এর চ্যম্পিয়ন হবে। এইবার স্পোর্টস জিতবে কোন ছেলে না মেয়ে আর সে আলো। আর হ্যা তোমার ট্রান্সফার করে নেওয়া হয়েছে তুমি এখান থেকেই তোমার পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।
~ ও থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাঙ্ক ইং সো মাচ।

আজকে চারদিন হয়ে গেল খালাম্মা পিয়াস ভাইয়া আমার কোন খোঁজ নেয় নি। মাঝরাতে চোখের পানি ফেলি পিয়াস ভাইয়ার কথা ভেবে। এখন ছায়ার সাথে আমার বন্ধুত্বটা অনেক বেশি গাঢ় হয়েছে। ছায়া এখন আমার বাড়িতে আসা যাওয়া করে, বলা ভালো ও আমাদের বাড়িতে একটা সদস্য হয়ে উঠেছে। ও কে সমস্ত ঘটনাটা জানাতে ও ভীষণ ভাবে হেল্প করছে আমায়। ছোট আব্বু বুঝতে পেরেছে উনিও আমাকে সাপোর্ট করছেন। আর রাজীভ স্যার হুম স্যার আমাকে হকি খেলা শিখিয়ে দিয়েছে।

আজকে আমার কম্পিটিশন। এই কম্পিটিশন এ আশিক এতোদিন চ্যাম্পিয়ন এর ট্রফি পেয়ে এসেছে আজ আমি পাবো। ও কে এতে হারাতে পারলেই আমি আমার লক্ষ্যে খুব দ্রুত পৌঁছেতে পারবো।
খালাম্মা কে সালাম করলাম। খালাম্মা আমার কপালে চুমু দিয়ে বললেন। জয়ী হয়ে এসো।

ছায়া আসলে আমরা ভার্সিটি চলে আসি। চারদিকে শুধু পোস্টার লাগানো আশিকের কারণ ওদের বিশ্বাস আশিক জিতবে।
ইয়েস আমি পেরেছি হুম আমি জিতেছি। ভার্সিটির সবাই যেমন অবাক হয়েছে তেমন আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
~ ছোট আম্মু আমি পেরেছি আম্মু, আমি পেরেছি এনাও তোমার ট্রফি। এরপরের জিতটাও আমার হবে।

~ আমি জানি আমার আলো সবার সেরা। সকালে ভার্সিটি আসতেই আশিক আমার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে গোলাপ এগিয়ে দেয়।
~ আই ইমপ্রেসড ইউ, আই লাভ ইউ,
হ্যা আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। ছিপে মাছ টোপ গিলেছে।

~ হোয়াট, লাভ ইউ, আর ইউ ম্যাড, তুমি আমার ব্যাপারে কতোটুকু জানো যে দু দিন হতে না হতেই আমাকে প্রপোজ করছো?
~ আমি যতোটুকু জানি সেটা শুধু আমার মধ্যেই রাখতে দাওনা। আমি শুধু জানি আমি তোমাকে ভালবাসি।
~ আমি ভেবে দেখবো।

পাশ কাটিয়ে চলে আসলাম। ছুটে এসেই রাজীভ স্যার কে জড়িয়ে ধরলাম।
~ স্যার আমি পেরেছি স্যার, আর এটা আপনার জন্যই সম্ভব হয়েছে আপনি যদি সাপোর্ট না করতেন তাহলে আমি কিছুই করতে পারতাম না। স্যার আমি আশিকের মুখোশ খুব তাড়াতাড়ি খুলে দেবো।

কথাটা বলেই স্যার কে ছেড়ে দিয়ে আমি একটু অপ্রস্তুতে পরে গেলাম। আমি না একটা যাতা স্যার কি ভাববেন ধূররর,
~ আমি জানতাম আলো তুমি পারবেই। আর তোমার লক্ষ তুমি খুব তাড়াতাড়ি পূরণ করতে পারবে।
~ থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ স্যার, এই সব কিছুই আপনার জন্য হয়েছে। আপনার অবদান আমি কখনো ভুলতে পারবো না।

~ উহু আলো এখন আমাকে থ্যাংকস বলো না যেদিন তুমি তোমার আসল কাজ শেষ করতে পারবে সেদিন বলো।
দেখতে দেখতে দু মাস কেটে গেল। এই কদিনে আশিকের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। ওর বাবা মা ওর সাথে যোগাযোগ রাখে না। কোন বাবা মা চায় ছেলে জেলে পচে মরুক তাই হয়তো শুধু ওর কাছ থেকেই যোগাযোগ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি ওকে জেলে পচিয়ে মারবো।
ইদানীং আমার কি হয়েছে জানি না। এখন আর পিয়াস ভাইয়ার কথা মনে হয় না। আমার ভাবনায় রাজীভ স্যার আসে। মানুষ টা ভীষণ ভালো।

পর্ব ১২

~ আলো একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো তোমায়?
~ হুম বলো।
~ তুমি কি রাজীভ স্যারকে লাভ করো?

খুব জোরে একটা বিষম খেলাম। সবেমাত্র কফির কাপটাতে মুখ দিয়েছি আর ছায়া এমন একটা কথা বলাতে অপ্রস্তুতে পড়ে গেলাম।
~ ছায়া কি সমস্ত কথা বলছো তুমি? আমি আর রাজীভ স্যার, নো ওয়ে, হ্যা আমি মানছি রাজীভ স্যার বেস্ট তার মানে এই নয় যে আমি স্যারকে! আমি শুধু লাইক করি এই জাস্ট। আর স্যার এর তো গার্ল ফ্রেন্ড থাকতেই পারে।
~ হা হা হা আলো হাসালে, ওই রকম একটা রাগী স্যার এর প্রেমে কেউ পড়তে পারে না কি! আমার তো স্যারকে দেখলেই ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
একমাত্র তুমিই প্রেমে পরতে পারো স্যার এর।

~ না ছায়া রাজীভ স্যার আমার জন্য যা করছে তাতে আমি ওনার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। আর তাছাড়া ওনাকে আমি অনেক সম্মান করি।
~ আমি জানো আলো।
~ আচ্ছা ছায়া তুমি তো ডুবে ডুবে বেশ পানি খাচ্ছো বলো। তোমার ওই সাগরের কি খবর। আই লাভ ইউ টিউ কিছু বললো!
~ আলো এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। সবসময় পেছনে লাগো আমার।

দুজনেই হেসে উঠলাম। আশিক আমাকে হাত ধরে টেনে আনলো। দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে দিয়ে আমার ঠোঁটে এক আঙ্গুল স্লাইড করতে লাগলো। এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে নিজের হাতে ওর গলাটা টিপে ধরি। আশিকের হাতটা আমি ধরে সরিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে উঠি।
~ এই কি করতে চাইছো! এইসব ঠিক না।
~ কেন বেবী? দু মাস হয়ে গেল আমরা রিলেশনে আছি। সামান্য তোমার হাত ধরতে পারা ছাড়া একটা কিস করতে দিলে না তুমি! এটা কেমন বিচার তোমার সুইট হার্ট।

আমি আশিকের শার্টের কলার টেনে আমার সাথে মিশিয়ে নি।
~ পাবে জান তুমি সব পাবে।
আশিক আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার মনে হচ্ছে এই মূহুর্তে ওর সারা শরীরে আরশোলা ছেড়ে দিই। না ওর মুখটা ভীমরুলের চাকের ভিতর ঢুকিয়ে দিই।
~ তাহলে জান কাল রুমডেটে চলো।

~ কাল! না মানে কাল তো হবে না। কাল আমি আমার পরিবারের সাথে রেজিস্ট্রি অফিসে যাবো। আমার এক আপুর বিয়ে ব্যবস্থা ওখানেই করা হয়েছে।
~ ও আচ্ছা তাহলে আমিও কালকে রেজিস্ট্রি অফিসে যাবো। তোমার কাছে থাকবো।
~ কিন্তু আশিক আমার পুরো পরিবার ওখানে থাকবে আর তুমি গিয়ে কি করবে!
এই নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হলো অবশেষে আমি রাজি হলাম আশিককে রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার জন্য। আমিও তো তাই চাই। যাক ফাইনালি আমি আমার লক্ষ পূরণ করতে পারবো।

ছোট আম্মু আমাদের অপেক্ষার দিন শেষ কাল ওই ছেলেটার মুখোশ খুলে যাবে। ছোট আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ঘুরাতে লাগলাম।
~ আরে কি করিস পড়ে যাবো যে। এই ভার্সিটি থেকে আসলি ফ্রেশ হয়ে আয়।
~ হুম আমি যাবো তো। আচ্ছা তার আগে বলো খালাম্মা পিয়াস ভাইয়া আসবে না কি? ওরা যদি না আসে তাহলে আমাদের পরিকল্পনা সব মাটি হয়ে যাবে।
~ আরে না রে ওরা আসবে ওদের সময় হয়ে গেছে।
~ ও আচ্ছা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

কলিং বেলের আওয়াজে আমি নীচে চলে আসলাম। দরজা খুলতেই খালাম্মাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে খালাম্মা মুখ ঘুরিয়ে আমাকে কিছু না বলেই ভেতরে চলে যান। পিয়াস ভাইয়া আমাকে দেখে সরে যা বলে। আমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু শুধু তো আজকের দিনটাই কাল সব ঠিক হয়ে যাবে আমাকে আবার সবাই ভালোবাসবে। নিজের অজান্তেই হাসছি।

ঘুমাতে যাওয়ায় আগে ছায়াকে কল দিলাম। কিভাবে কি করবো সব কিছু একবার সাজিয়ে নিলাম। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করলাম।
~ আজকাল দেখি রাস্তায় বাইকের পেছনে কারো সাথে যাস! কোথায় যাস রে? আর ওই ছেলেটা কে? তোর নতুন কাস্টমার বুঝি? হোম সার্ভিস দিচ্ছি না কি রে!
চোখ খুলে বিছানায় উঠে বসলাম। পিয়াস ভাইয়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে বাঁকা হাসি দিল। আমি কিছু বলবো না কালকেই তো সব প্রমাণ হয়ে যাবে। তোমার যা ইচ্ছা বলার তুমি বলো পিয়াস ভাইয়া।
~ কি হল কিছু বলবি না! বল পিয়াস ভাইয়া তুমি ভুল করছো, আমাকে ভুল বুঝছো তুমি। ন্যাকামি করবিনা আলো! অবশ্য এইসব গুলো তো সত্যিই কি আর বলবি বল!

~ তোমার যা ভাবার তুমি ভাবতে পারো।
বলেই শুয়ে পড়তে গেলে পিয়াস ভাইয়া আমার গাল দুটো চেপে ধরে।
~ আমার লাগছে ছাড়ো। যেদিন সত্যিটা জানাবে সেদিন তুমি পস্তাবে, সেদিন পস্তাবে।
পিয়াস ভাইয়াকে ঠেলে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাই।

সকালে রুমে গিয়ে উঁকি মারলাম দেখলাম পিয়াস ভাইয়া তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছে। এটাই সুযোগ এবার কাজে লেগে পড়ি।
~ তুমি রেজিস্ট্রি অফিসে চলে আসো। আমি সময়ে পৌঁছে যাবো।

এই কথাটা বলেই দ্রুত বাড়ির বাইরে চলে এলাম। এই কথা বললাম যাতে পিয়াস ভাইয়া আমার পিছু পিছু আসে। যতোই হোক এই কথা শুনে যে কেউ সন্দেহ করবে, আর পিয়াস ভাইয়া আমার স্বামী সন্দেহ তো করবেই। রিক্সায় উঠে ছায়াকে কল দিলাম।
—- ছায়া শোন তুই এখন আমার বাড়িতে গিয়ে সবার সামনে বল আমি রেজিস্ট্রি অফিসে গেছি। বাকিটা ছোট আম্মু সামলে নিবে। সবাইকে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আয়।

রেজিস্ট্রি অফিসে যেতেই দেখলাম তার আগেই আশিক চলে এসেছে। কিন্তু আমি তো এখন ওর সামনে যেতে পারবো না। আশিক কয়েকবার কল দিলো কিন্তু আমি পিক করলাম না। ও ভেতরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসলো। আধঘন্টা হতে যাচ্ছে অথচ আমি কাউকে এখনো দেখতে পাচ্ছি না। না ছায়া, না ছোট আম্মু, আর না পিয়াস ভাইয়া! এইভাবে হঠাৎ আশিকের চোখে চোখ পড়ে গেল। আশিক উঠে দাঁড়ালো আর আমি বাধ্য হয়েই কাপা কাপা পায়ে হেঁটে গেলাম আশিকের সামনে।
~ কি ব্যাপার এক ঘন্টা হয়ে গেল আমি আসছি আর তোমার তো কোন পাত্তাই নেই। আর তোমার আপুর বিয়ে হবার কথা না কই সে! আর তোমার পরিবারের লোকজন কোথায়?

~ আসলে এখানে আমার আপুর বিয়ে হবে না। আমার পরিবারের লোক আসবে না। আমার আর তোমার বিয়ে হবে।
~ মা, নে, মানে কি বলতে চাইছো তুমি! মজা করছো আমার সাথে নাকি।
আমি আশিকের হাতটা ধরে করুণ স্বরে বললাম।

~ প্লিজ আশিক প্লিজ, তুমি আমাকে বিয়ে টা করে নাও। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। আমার এই একাকিত্বটা আর ভালো লাগছে না। আমার যে তোমাকে চাই শুধু তোমাকে। ভালোই হয়েছে ওই জুঁই মরে গেছে। ও থাকলে আমি তোমার হতে পারতাম না।
আমার মুখ থেকে জুঁই এর কথা শুনে আশিকের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়।
~ তুমি জুঁই কে চিনো?

~ হ্যা চিনি তো ও আমার বোন হয়। আর ও মরে গেছে ভালোই হয়েছে। আমি তোমাকে বিয়ে করবো। আমি তোমাকে ছাড়া আর থাকতে পারছি না।
আশিককে জড়িয়ে ধরলে আশিক আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।

~ হোয়াট দ্যা হেল। আমি বিয়ে করবো তোমায়! শোন এই আশিক রহমান কোন ফালতু মেয়েকে বিয়ে করবে না। কি যোগ্যতা আছে তোমার! আরে তোমার সাথে রিলেশন করেছি শুধু তোমার শরীর টা পাবো বলে! আশিক রহমান এর বৌ হবার কি যোগ্যতা আছে তোমার!
~ কি বলছো তুমি! আমার সাথে এমন করতে পারলে বলো? ভালোবেসেছি তোমায় নিজের থেকেও বেশী। আমি নিজেকে শেষ করে ফেলবো তোমাকে যদি না পাই।
~ যা ইচ্ছা করো, আই ডোন্ট কেয়ার। তুমি আমার সাথে আর যোগাযোগ রাখবে না ব্রেকাপ করলাম। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে পতিতালয়ে দিয়ে আসবো, ঠিক যেভাবে জুঁই কে দিয়ে এসেছিলাম বুঝেছো।

~ যদি, আমি যদি পারতাম তোমার ওই মুখোশটা খুলে দিতে সবার সামনে! তোমাকে যদি জেলে পচিয়ে মারতে পারতাম! তুমি এভাবে কতো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছো। আমার বোনের জীবন নষ্ট করেছো। কিন্তু আর কিছুই করার নেই তোমার মতো পাপীরা এখনো সমাজে ঘুরে বেড়াবে।
আমি কি সত্যি হেরে গেলাম! আমি কি পারলাম সবার সামনে ওর মুখোশটা খুলে দিতে!

পর্ব ১৩

হঠাৎ দেখলাম আশিক নীচে পড়ে গেলো। মুখ তুলে দেখি পিয়াস ভাইয়া হাত মুঠো করে আছে। আমি সোজা তাকাতেই আমার মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। খালাম্মা, বাবাই, ছোট আম্মু, ছোট আব্বু, বড়ো ভাইয়া আশিকের দিকে তীক্ষ্ণ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আশিককে এতোক্ষণে পিয়াস ভাইয়া দু চারটে লাথি আর ঘুষি মারতে শুরু করে দিয়েছে। ছায়া আমার কাঁধে হাত রাখলো, আমি আর ছায়া জোরে জোরে হাসতে থাকলাম, তারপর চোখের ইশারা করে আমরা আমাদের কাজ শুরু করলাম। ছায়া পিয়াস ভাইয়ার হাতটা ধরে নিল।

~ এক মিনিট ভাইয়া, আশিককে আপনি না আমরা পেটাবো। ও কে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।
পিয়াস ভাইয়া ছায়ার কথা শুনে একটু অবাক হলো। সরে এসে আমার দিকে তাকালো। ছায়া আশিকের কলার ধরে টেনে তুলে একটা চেয়ারে বসালো। অফিসের ভেতর থেকে একটা দড়ি নিয়ে এসে হাত দুটো বেঁধে দিল।
~ আলো শুরু কর তাহলে।

আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আশিকের মুখোমুখি বসলাম। আশিকের গাল দুটো চেপে ধরলাম।
~ উপস, খুব লেগেছে তাই না জান! হা হা হা
~ এই কাজটা একদম ভালো করো নি। আমি তো তোমাদের কোন ক্ষতি করি নি।

~ করেছো তোমার জন্য আমার বোন সুইসাইড করেছে। আশিক আমার কথা শুনে চোখ বড়ো করে তাকালো।
~ ও ভাবে দেখোনা জান বুকে বড্ড লাগে।
ছায়া আশিকের কাঁধে হাত রেখে বললো।
~ আশিক রহমান, ভার্সিটির সব মেয়েদের ক্রাশ, হ্যান্ডসাম, স্মার্ট, না শুধু স্মার্ট না ওভার স্মার্ট। এতোদিন তুমি মেয়েদের জন্য ফাঁদ পাততে, আর আজ আমরা ফাঁদ পেতেছি।

~ ফাঁদ পেতেছি মানে?
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। জিন্সের পকেটে হাত দিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালাম।
~ ইয়েস মাই সুইট হার্ট, ফাঁদ পেতেছি। তোমার এই ইনোসেন্ট চেহারার পেছনে যে নোংরা জানোয়ারটা আছে তাকে সবার সামনে আনার জন্যই তো এতো কাঠ খড় পোড়ানো। তোমাকে যাতে আমার বোনের মৃত্যুর শাস্তি দিতে পারি তাই এতো ড্রামা।

~ কিন্তু জুঁইকে তো আমি পতিতালয়ে রেখে এসেছিলাম!
~ না ওইদিন জুঁই ছিলো না আমি ছিলাম। আর তুমি সেটা টের পাওনি।
আশিক আমার কথা শুনে করুণস্বরে বলে।
~ আমাকে ছেড়ে দাও আমি এমন কাজ করবো না আর। আমাকে যেতে দাও। আমি আশিকের সামনে আসি, ওর মাথার চুল গুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করতে থাকি।

~ যেতে দেবো জান, নিশ্চিত তোমাকে ছেড়ে দেব। এবার লক্ষীছেলের মতো বলোতো বাবু জুঁইকে ছাড়াও আর কটা মেয়ের জীবন নষ্ট করেছো?
~ আমি কিছু করি না বিশ্বাস করো আমাকে ছেড়ে দাও।
~ ছেড়ে দেবো তো তার আগে আমাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও।
~ আমি কিছু জানি না।
ছায়া ও কে থাপ্পড় মারে, ও এবার কেঁদেই ফেলে।
আমি ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিই।

~ আহ ছায়া এভাবে মারিস না। বাবুটা কষ্ট পাচ্ছে তো! বাবু তোমাকে কেউ মারবে না আর। আমি যে প্রশ্ন করবো তার ঠিক উত্তর দাও।
~ আমি সত্যি বলছি আমি কিছু করি না, কিছু জানি না। আমি এই সমস্ত কাজ আর কখনো করবো না ভালো ছেলে হয়ে যাবো।
এই বার আমার মাথা গেল গরম হয়ে। এক থাপ্পড় মারলাম, চুলের মুঠি ধরে গাল দুটো চেপে ধরলাম।
~ এই শোন মাথা গরম করাবিনা। এতোক্ষণ ধরে ভালোভাবে বলছিলাম। সত্যিটা বল তা না হলে তোকে মেরেই ফেলবো স্কাউনড্রেল।
~ বলছি বলছি একটু পানি দিবে?

ছায়া পানি এনে দিলো, আমি আশিকের সামনে পানির গ্লাস ধরে রাখলাম।
~ পানি খাবি দিবো তো পানি। তার আগে বল তুই কি কাজ করিস?
আমি আশিকের মুখে পানি ছুঁড়ে মারলাম। আশিকের চুলের মুঠি ধরে ফেললাম। ইচ্ছা মতো অনেক থাপ্পড় মারলাম। শেষ অব্দি আশিক মুখ খুললো।
~ আমা, আমার কাজ নারী পাচার করা। আমি শুধু একা না আমার মামাও এই কাজ করে। আমি মামার কাছেই থাকি আজ পর্যন্ত ছাব্বিশ জন মেয়েকে আমি দেশে বিদেশে বিক্রি করেছি।

এই কথা শুনে আমি আর ছায়া দুজনেই দুজনের দিকে তাকালাম। তারপর একসাথে আমরা পা তুলে যেই ধাক্কা মারতে যাবো।
~ ঝাঁসির রাণীরা আর না। সব যদি তোমরাই করবে পুলিশ গুলো কি করবে! অফিসার অ্যারেস্ট করুন।
তাকিয়ে দেখি রাজীভ স্যার পুলিশ নিয়ে চলে এসেছে। পুলিশ এসে আশিককে গাড়িতে তুলে। পুলিশের কাছে আগে থেকেই আশিকের বিরুদ্ধে এফ আই আর করাছিল। ছায়া অফিসারের হাতে চিপ তুলে দেয়। যেটার মধ্যে আশিকের সত্য স্বীকার করার বয়ান আছে।

~ থ্যাঙ্ক ইউ মাই লিটিল গার্লস। তোমরা আমাদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছো। মিস্টার রাজীভ আপনার স্টুডেন্টরা তো খুব সাহসী আর বুদ্ধিমতীও।
~ ইয়েস অফিসার আমার স্টুডেন্টরা অল রাউন্ডার। হকি, স্পোর্টসেও যেমন পারদর্শী তেমনি অন্যায়ের প্রতি সুবিচার এরা করতে পারে।
অফিসার রাজীভ স্যার এর কাঁধ চাপড়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি আর ছায়া দুজনে জড়িয়ে ধরে লাফাতে থাকলাম।
~ ইয়েস ছায়া, আমরা পেরেছি আমরা শাস্তি দিতে পেরেছি। রাজীভ স্যার থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ স্যার আপনি ছিলেন বলেই আমরা পেরেছি।
ছোট আব্বু এগিয়ে এসে রাজীভ স্যার এর হাত ধরে।

~ রাজীভ তোমাকে যে আমি কি বলে ধন্যবাদ দিবো আমি জানি না। জানো এই সব কিছুর জন্য আমার বড়ো মেয়েটাকে সবার কতো অপমান অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে দিনের পর দিন। অথচ ও আমার মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য ও এতোকিছু করেছে। আজ যদি ও সবার চোখের সামনে আঙুল দিয়ে সত্যিটা না দেখিয়ে দিতো তাহলে হয়তো এখনো আমার মেয়েটাকে কতো কি সহ্য করতে হতো।
~ না না আঙ্কেল এভাবে বলবেন না। আলো অনেক সাহসী একটা মেয়ে ও সাহস দেখিয়েছে বলেই তো সম্ভব হয়েছে আমি তো শুধু পথ করে দিয়েছি।
ছোট আম্মু আমার কপালে চুমু দিলো।

~ আজ আমি বুঝতে পারছি আমার শিক্ষায় কোন ভুল ছিল না। আমি আলোকে ভুল শিক্ষা দিইনি। আমার আলো সত্যের পথে চলে।
আমাকে জড়িয়ে ধরলো আর ছায়া হাসছিলো ওকেও জড়িয়ে নিলো।
~ আচ্ছা আন্টি আঙ্কেল এবার আমি আসি।

রাজীভ স্যার চলে যান। খালাম্মা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। আমার সারা মুখে চুমু দিতে থাকেন।
~ আমাকে ক্ষমা করে দে আলো। আমি অনেক অন্যায় করে ফেলেছি রে মাফ কর মা তুই আমায় মাফ কর।
বাবাই এসে আমার মাথায় হাত রাখেন।
~ বাবাই তুমি কবে আসছো?

~ আমি তো আজকেই ফিরলাম আর এসেই এইসব দেখছি। আমাকে তো অবাক করে দিয়েছিস আলো।
~ আমি কিছু করি নি এই সব কিছু হয়েছে ছোট আম্মুর বুদ্ধিতে।

~ ঠিক আছে এবার তো বাড়িতে চলো সবাই। আলোর জিতের সেলিব্রেট হবে আর তার সাথে এখনো একটা কাজ বাকি সেটাও তো মেটাতে হবে না কি।
বড়ো ভাইয়ার কথায় আমরা সবাই হেসে উঠলাম। বাড়িতে চলে আসলাম পিয়াস ভাইয়ার বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতেই দেখলাম বাড়িটাকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে ভাবী আমাকে পেয়ে অনেক খুশি। সবাই আজ ভীষণ খুশি। অনেক দিন পর আবার সবাই হাসছে।

Ik baat kahun tujhse
Tu paas hai jo mere
Seene se tere sar ko lage ke
Sunti main rahun naam apna
Seene se tere sar ko lage ke
Sunti main rahun naam apna

Oh likh di tere naa’Zindagi jaaniya
Bas rehna tere naal ve hajuriye
Rehna tu pal pal dilka paas
Judi rahe tujhse har ek saans…
মনের আনন্দে গান গাইছি আর চুলে চিরুনি বুলাচ্ছি। আয়নার সামনে থেকে সরে বিছানার কাছে যেতেই আমি চুপ হয়ে গেলাম।

পর্ব ১৪

পিয়াস ভাইয়া বিছানায় বসে সিগারেট টানছে আমার দিকে চেয়ে। একবার রুমের বাইরে এলাম আবার রুমের ভিতরে গেলাম।
~ কি ব্যাপার আপনি এখানে কি করছেন? আমি তো আপনার রুমে যাই নি! আমার রুমে আছি।
~ আমরা তো স্বামী স্ত্রী এক রুমে থাকবো তাই না!
~ স্বামী! স্ত্রী! কিন্তু আপনি তো আমায় স্ত্রী হিসাবে মানেন না।

পিয়াস ভাইয়া আমার কথা শুনে সিগারেট ফেলে দিয়ে আমার সামনে হাত জোড় করে।
~ আমাকে ক্ষমা করে দে আলো। জানিস যখন জানতে পেরেছিলাম তুই ওইরকম একটা জায়গায় গিয়েছিস আমার খুব ভয় হয়েছিল। ভেবেছিলাম আমি তোকে হয়তো বাঁচাতে পারবো না! আমার এক বন্ধু তোর ওখানে যাওয়ার ভিডিও টা দিয়েছিল। সে তো পারেনি বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছিলো। তুই যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ওখানে গিয়েছিলাম কিন্তু তোকে ওভাবে বাঁচাতে পারতাম না।

পরিকল্পনা করে সকালে গিয়ে তোকে বাঁচিয়েছি। কখনো ভাবতে পারি নি তোকে অপরের কাছে কিনতে হবে আমায়। খুব কষ্ট হয়েছিলো যখন তোর নামে ওই মহিলা নোংরা কথাগুলো বলছিলো। আমার মাথার ঠিক ছিল না, আমি কি করে ফেলেছি নিজেও জানি না। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি সবসময় তোকে তুলোয় মুড়ে রাখার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারি নি রে। সেদিন তোর অনেক কষ্ট হয়েছিল তাই না রে! খুব ব্যথা পেয়েছিলি।
আমাকে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বললো। পিয়াস ভাইয়া কাঁদছে, আজকের কান্না আর সেদিনের কান্নার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পিয়াস ভাইয়া আমার মুখটা দু হাত দিয়ে তুলে ধরলো।

~ আমি জানি আলো আমাকে ক্ষমা করা যায় না। আমি যা কাজ করেছি তারপর আর মুখ দেখানো উচিৎ নয় তোর কাছে। আমাকে শাস্তি পেতে হবে! আমি তোকে অনেক আঘাত করেছি তাই না রে!
পিয়াস ভাইয়া আমাকে ছেড়ে দিয়ে কোমরের বেল্ট খুলে এলোপাথাড়ি নিজেকেই আঘাত করতে লাগলো। পিয়াস ভাইয়ার এমন পাগলামো দেখে আমি এবার কেঁদে ফেললাম। পিয়াস ভাইয়ার হাত থেকে বেল্টটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।

~ প্লিজ পিয়াস ভাইয়া তুমি এমন করো না।
~ আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে আলো নিজের থেকেও বেশি।

পিয়াস ভাইয়া আর কিছু বললো না আমার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলো। আমি পিয়াস ভাইয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠে আসতে গেলাম কিন্তু পিয়াস ভাইয়া আমাকে ছাড়লো না আমাকে বাচ্ছাদের মতো জড়িয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।
সকাল থেকে বাড়িতে মেহেমানদের আনাগোনা। সারা বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। চারদিকে আলোর রোশনাই তো আছেই। আমি নীচে আসতেই ভাবী আমার মাথায় ঘোমটা টেনে বসিয়ে দিলো।

~ আলোরে আজ থেকে তোর সুখের দিন শুরু। এইদেখ কতো আয়োজন সব তোর জন্য। এবার সব কিছু ভুলে গিয়ে পিয়াসের সাথে নূতন জীবন শুরু কর।
আমি ভাবীর কথায় মুচকি হাসলাম।
দে তোরা আমায় নূতন ক’রে দে নূতন আভরণে॥
হেমন্তের অভিসম্পাতে রিক্ত অকিঞ্চন কাননভূমি,
বসন্তে হোক দৈন্যবিমোচন নব লাবণ্যধনে।

শূন্য শাখা লজ্জা ভুলে যাক পল্লব- আবরণে॥
বাজুক প্রেমের মায়ামন্ত্রে
পুলকিত প্রাণের বীণাযন্ত্রে
চিরসুন্দরের অভিবন্দনা।

আনন্দচঞ্চল নৃত্য অঙ্গে অঙ্গে বহে যাক হিল্লোলে হিল্লোলে,
যৌবন পাক সম্মান বাঞ্ছিতসম্মিলনে॥
আমাকে আরো একবার বিয়ের কণের সাজ সাজানো হল। পিয়াস ভাইয়া চায় আবার নতুন করে আমারা জীবন শুরু করবো। সবাইকে সাক্ষী রেখে আমরা আমাদের জীবন শুরু করবো। কিন্তু চাইলেই কি তা সম্ভব! ভাঙ্গা কাঁচ আর ভাঙ্গা মন দুটোই তো এক। ভাঙ্গা কাঁচ জোড়া লাগালেও তার ক্ষত মুছে দেওয়া যায় না। মনটাও ঠিক তেমন জোড়া লাগালেও তার দাগটা রয়েই যায়।

ছোট আম্মু এসে দু আঙুল দিয়ে আমার চিবুক তুলে ধরে।
~ বাহ্ আজ তো আমার আলোকে অনেক স্নিগ্ধ লাগছে! চেহারার দিকে তাকালেই যে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। কি অপরূপ ভুবন ভুলানো রূপ আমার আলোর! নামের সাথে সাথে আমার আলোও যে আজ আলোকিত হচ্ছে।
ছোট আম্মু আমার কপালে ছোট্ট একটা চুমু দিলেন। আমাকে দু চোখ ভরে বেশ কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর সাজাতে আসা বিউটিশিয়ানদের বাইরে যেতে বললেন। আমার পাশে বসে গালে হাত দিলেন।

~ কি হয়েছে আলো? চেহারার উজ্জ্বলতার সাথে সাথে মুখের মধ্যে মনমরার ছাপ স্পষ্ট কেন?
আমি ছোট আম্মুর হাত দুটো শক্ত করে ধরলাম। জড়িয়ে নিলাম ছোট আম্মুকে। কেন জানি মনে হচ্ছে আজকের পর আর ছোট আম্মুকে এভাবে জড়িয়ে ধরতে আর কখনো পারবো না।

~ আমি কিছু বুঝতে পারছি না ছোট আম্মু! আমার কি করা উচিৎ আমি বুঝে উঠতে পারছি না! নারী জীবনটা কি খুব তুচ্ছ আর মূল্যহীন?
~ আলো এতো কিছু দেখে আমি তোর উপর বিশ্বাস রাখি তুই চাইলেই অনেক কিছু করতে পারবি। তোকে জোর করবো না বা আমার নিজের ইচ্ছা তোর ওপর চাপিয়ে দিব না। তুই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারিস। তুই যেটা চাইবি তাই হবে।

ছোট আম্মু উঠে চলে গেলেন। আমি নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর উঠে বিয়ের আসরে গেলাম। আমাকে দেখে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। খালাম্মা আমাকে ধরে বিয়ের আসরের কাছে নিয়ে আসতে গেলেন। কিন্তু আমি খালাম্মাকে ছাড়িয়ে ছোট আব্বুর কাছে গেলাম। ছোট আব্বুর হাত দুটো ধরলাম।

~ ছোট আব্বু, আমার আব্বু মারা যাওয়ার পর তুমি আমার সমস্ত আবদার শখ পূরণ করেছো। একদিনের জন্যও মনে করাও নি আমি তোমার ভাইয়ার মেয়ে। আদরের কমতি রাখোনি। জুঁই কে আর আমাকে সমান ভালোবাসা দিয়েছো।
ছোট আব্বুর হাত ছেড়ে বাবাই এর হাত দুটো ধরলাম।

~ আর তুমি! বাবাই তুমিও তো আমাকে কম ভালোবাসা দাওনি। খালাম্মাও আমাকে অনেক ভালোবেসেছে। নিজের খালাম্মা থাকলেও বোধহয় এতোটা ভালোবাসা পেতাম না যা তোমাদের কাছে পেয়েছি।
খালাম্মা আমার মাথায় হাত রাখলেন।

~ তুই তো আমার মেয়েরে। কেন তোকে অনাদর করবো বল। আচ্ছা এখন ওসব বাদ দে। দেখ কাজী সাহেব চলে আসছেন বিয়েটা আগে হয়ে যাক চল।
আমি খালাম্মার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম।
~ তার আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও তো তোমরা। নারী বলে কি তার কোন মূল্য নেই? নারী কি শুধুই একটা হাতের পুতুল? নারীর সম্মান নেই!
পিয়াস ভাইয়া এবার উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বাহু চেপে ধরে।

~ আলো এখানে এতোলোক সবাই বিয়েতে এসেছে, আর তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি সমস্ত আজেবাজে কথা বলছিস?
আমি পিয়াস ভাইয়ার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিই।
~ নাহ পিয়াস ভাইয়া আমি আজেবাজে কথা বলছিনা। আর প্রশ্নটা আমি সবার উদ্দেশেই বলছি। এখানে আগত সবাইকেই বলছি তোমাকেও বলছি।
তুমি বলোনা পিয়াস ভাইয়া। আমি তো নারী আমার আত্মসম্মান আছে কি? তোমার কাছে নেই আমি সেটা জানি। বিয়ে করেছিলে দিনের পর দিন অত্যাচার করেছো নোংরা ভাষায় গালি দিয়েছো। বিয়ের আগে রেপ করেছো।

সবার সামনে এইকথা বলায় পিয়াস ভাইয়া আমার গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারলো। আমি কিন্তু চুপ থাকলাম না। পাল্টা থাপ্পড় আমিও পিয়াস ভাইয়ার গালে বসিয়ে দিলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল, পিয়াস ভাইয়া গালে হাত দিয়ে মাথা নীচু করে নিলো। কেউ ভাবতে পারেনি আমি এমন একটা কাজ করে বসবো। আমি এতোদিনে বুঝে গেছি এই দুনিয়ায় বাঁচতে গেলে প্রতিবাদ করতে হবে। থাপ্পড় মারলে পাল্টা থাপ্পড় আমাকেও মারতে হবে।

~ শুনুন আপনাদের সবাইকে একটা কাহিনী বলি। একটা মেয়ে ছিল। মেয়েটাকে বাড়ির সবাই ভালোবাসতো। মেয়েটার বাবা মা ছিল না কিন্তু কেউ তাকে বুঝতে দেয়নি। সবাই আদর দিয়ে রাখতে তাকে। একদিন সে বড়ো হলো বাইরের জগৎ এ পা রাখলো। লেখাপড়া শিখলো ভার্সিটি গেলো। দিনকাল বেশ চলছিল। একদিন হঠাৎ ঝড় উঠলো। মেয়েটার একটা পরীর মতো বোন ছিলো। সেই বোনকে বাঁচাতে সে অন্ধকার গলিতে গিয়েছিল। কিন্তু সে তার বোনকে বাঁচাতে পারে নি। আর
একজন জানোয়ার ছিলো অবশ্য সেই মেয়েটা তাকে ভালোবাসতো। আর সেই জানোয়ার টাও তাকে অনেক ভালোবাসতো। সে চাইলেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতো তার পরীর মতো বোনটার মৃত্যুর বদলা নিতে পারতো। কিন্তু সে সেটা করেনি তার বদলে ওই মেয়েটাকে অন্ধকার গলি থেকে তুলে এনে তার সাথে পাশবিক অত্যাচার করেছিলো তার কথা কানেই নেই নি। মেয়েটার কিন্তু কোন দোষী ছিল না। তারপরও ওই জানোয়ারটার কাছ থেকে মেয়েটাকে শুনতে হতো সে একটা বেশ্যা। সবাই তাকে ভুল বুঝতে শুরু করলো।

একদিন মেয়েটা একটা আলোর রেখা দেখতে পেলো। পৃথিবীর সবাই ভুল বুঝলেও মা কখনো সন্তানকে ভুল বুঝবে না। সেই মায়ের সাহায্য নিয়েই আসল শয়তানকে শাস্তি দিতে পেরেছে অবশ্য মা ছাড়াও আর দুজন দূতকে পাশে পেয়েছে। আজ সে জয়ী হয়েছে সে জিতেছে।
এবার আমাকে কেউ উত্তর দিন। মেয়েটাকে যে জানোয়ারটা রেপ করলো তার সাথে ওই মেয়েটা সারাটা জীবন কিভাবে কাটাবে? তার মনের মধ্যে
যে ঝড় বইছে তা থামাবে কি করে?

পর্ব ১৫

এতোক্ষণ পর বিয়েতে আসা মানুষ জন গুলো নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করছে। আমি হাসছি, আমার চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। পিয়াস ভাইয়া এবার আমাকে দেখছে। তার দেখার দৃষ্টিতে আমি স্পষ্ট অনুশোচনা বোধ ও অনুতাপের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার কিছু করা নেই। আমি ছোট আব্বুর হাত দুটো পুনরায় ধরলাম।

~ ছোট আব্বু আমি চাই না আমার আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে। আজ যদি আমি এই বিয়েটা করি তাহলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবো। তুমি আমাকে বড়ো করেছো আমার ওপর তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। ছোট আম্মু ছোট আব্বু তোমরা যদি আমাকে এই বিয়েটা করতে বলো, তাহলে আমি এই বিয়েটা করবো।
~ না আলো তোকে বড়ো করেছি আমরা। ঠিক ভুলের বিচার করতেও শিখিয়েছি। আজকে তুই যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস তাতে আমাদের কিছুর বলার নেই। তোকেই সাপোর্ট করবো আমরা।

খালাম্মা, বাবাই, পিয়াস ভাইয়া নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। বড়ো ভাইয়া মাথা নীচু করে আছে। আমি ভাবীর কাছে যাই।
~ ভাবী তুমিও তো একটা মেয়ে আমি জানি তুমি নিশ্চিত আমার সিদ্ধান্তে একমত। আর যাই হোক এক জন রেপিস্টের সাথে সারাজীবন ব্যায় করা যায় না।
খালাম্মা বাবাই এর হাত ধরলাম।

~ তোমরা পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ছোট আম্মু ছোট আব্বুর সাথে বাড়ি চলে আসলাম। কিছুক্ষন ছোট আম্মুকে জড়িয়ে ধরে নিজের মনকে আরো বেশি শক্ত করে নিলাম। ছোট আব্বু আমার মাথায় হাত রাখলেন।
~ আজ আমি বুঝলাম মা রে তোকে ভুল শিক্ষা দিইনি। আমার মেয়েকে হারিয়েছি কিন্তু আমার কোন কষ্ট নেই কারণ তুই আজকে আমার মাথা উঁচু করে দিয়েছিস। তোর জন্য আমি গর্বিত।

আমি ছোট আম্মুর বুক থেকে মাথা তুললাম। ছোট আম্মু বললো।
~ শোনো আমাদের জুঁইকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এখন একমাত্র আলোই আছে। এখানে তেমন আর কিছু নেই মা বাবাও নেই। তার থেকে চলো আমরা জুঁই কে নিয়ে আমার বোনের কাছে ইন্ডিয়ায় চলে যাই। আর তাছাড়া এখানে থাকলে ও কিছু ভুলতে পারবে না। পিয়াস পিয়াসের মা বাবা আসা যাওয়া করবেই এই বাড়িতে। আমরা তো আর তাদেরকে আসতে মানা করতে পারবো না। তার থেকে চলো আমরা ইন্ডিয়ায় চলে যাই। ইন্ডিয়ায় গিয়ে আমাদের আলো নিজের একটা নতুন পরিচয় বানাবে।

আমি ছোট আম্মুর দিকে তাকিয়ে আছি। এনারা আমায় এতো ভালোবাসেন। আমার মা বাবা বেঁচে থাকলে কি করতো জানিনা আমি। কিন্তু এনারা আমার জন্য নিজেদের জন্মভূমি ছাড়তে রাজি আছে।

~ তুমি ঠিক বলেছো আমি ব্যবস্থা করছি সব কিছু গুছিয়ে নাও। আর আমি খান ভাইয়াকে এই বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে যাবো। কাউকে কোন ঠিকানা দিয়ে যাবো না, আমাদের আলো নতুন করে বাঁচবে, নতুন ভাবে জীবন শুরু করবে আমাদের আলো।
~ কিন্তু তার আগে পিয়াসের সাথে আলোর ডিভোর্সটা হয়া দরকার।

~ থাক না ছোট আম্মু। আমিই যখন থাকছি না তখন আর ডিভোর্স এর কি প্রয়োজন? পিয়াস ভাইয়া যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে তা করুক না, আমি তো আর অধিকার চাইতে আসবো না। এই জীবনে পিয়াস ভাইয়ার কিছু ভালো স্মৃতি নিয়েই না হয় কাটিয় দিলাম।

কষ্ট না হলেও কেন জানিনা দু ফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে এলো। ছোট আম্মুর হাত ধরে চোখের ইশারায় আশ্বাস দিলাম আমি ঠিক আছি, আর যা হবে ভালোই হবে।
হ্যা আমিও পরিচয় বানাবো। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবো। নিজেকে এমন ভাবে তৈরী করবো যেনো কেউ না আমাকে ভাঙ্গতে পারে।

Kabhi toofan hai
Kabhi khamosh hai
Kyun tu itni paresaan hai, aye zindagi
apni hi chaal pe
Apne sawal pe

Kyun tu itni hairaan hai
Aye Zindagi
Uljhan jo hai teri

Mujko tu batla de
Waqt beimaan hai, aye zindagi
Aye Zindagi
Aye Zindagi….. ..
এতোটুকু বলেই আমি চশমাটা খুলে চোখের কোণের পানি টা মুছে নিলাম। চশমাটা ফোল্ড করে সামনের টেবিলে রেখে চেয়ারটা টেনে বসলাম।
~ তারপর কি হল ম্যাম?

~ তারপর আর কি, চলে আসলাম ইন্ডিয়ায় মুম্বাই শহরে। কলেজ লাইফ শুরু হল। অনেক কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছিলাম, বিশেষ করে কলেজের ওই ছয় সাতটা মাস। নতুন ছেলে মেয়ে আমি তাদের কাছে উড়ে এসে বসেছিলাম। আমার সাজ পোষাক চাল চলন আলাদা মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। তারপর একদিন নেত্রা ম্যাম এর সাথে হঠাৎ দেখা হলো। ছোট আম্মুর সাথে ওনার বেশ ভাব।

আমি প্রথম প্রথম ওনাকে একটু ভয় পেতাম, জানোই তো উনি একটু গম্ভীর টাইপের কিন্তু ওনার মনটা বেশ ভালো। কথায় কথায় জানতে পারলাম উনি ডিটেকটিভ টিম এর আন্ডার কফার অফিসার। কেন জানি মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে বসলো আমিও ওনার মতো হবো। ম্যাম বুঝতেও পেরেছিলেন, একদিন উনিই সুযোগ করে দিলেন, ওনার মতোই তৈরী করলেন। প্রথম প্রথম অনেক অসুবিধা হতো মৃত মানুষ দেখা তারপর বড়ো বড়ো ক্রিমিনাল দের ধরা, সময়ের সাথে সাথে সব শিখে গেলাম। তিন বছর পর নিজের পরিচয় হল সি আই ডি অফিসার।

~ ম্যাম আপনার জীবনের কাহিনীতে তো একটা মোটা বই লেখা হয়ে যাবে।
~ তুমি চুপ করবে।
আভা অনুরাগের দিকে বড়ো করে চোখ পাকিয়ে কথাটা বলে। ওদের দুজনের আচরণ দেখে আমি হেসে উঠি। ওরা আমার টিমের অফিসার।
~ আচ্ছা ম্যাম এরপর আর আপনি বাংলাদেশে একবারো জান নি?
~ না।

~ পিয়াস ভাইয়ার খোঁজ রাখেন নি?
~ না, অবশ্য না বললে ভুল হবে খোঁজ পেতাম। খান চাচা সমস্ত আপডেট দিতেন। ওনাকে না কি খালাম্মা বিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলেন .. পাঁচ বছর হয়ে গেছে আর খবর নেওয়ার সময় হয় না গো। আমার কাঁধে যে এখন এই শহরের এই দেশের মানুষ গুলোদের বাঁচানোর দায়িত্ব।
~ ম্যাম আপনাকে দেখে আরো একবার স্যালুট করতে ইচ্ছা হয় শুধু একজন অফিসার হিসেবে না একজন প্রতিবাদী নারী হিসেবে। তবে ম্যাম একটা ছোট মুখে বড়ো কথা বলি!
অনুরাগের কথায় মুচকি হাসলাম।

~ বলো না, তোমাদের আমাকে নিয়ে যা জানার ছিল সব যখন বলছি আর কিছু লুকাবো না। বলে ফেলো।
~ বলছিলাম কি ম্যাম ওই পিয়াস স্যারকে আপনি একটা সুযোগ দিতে পারতেন তো?
আমি এবার বেশ সজোরেই হেসে উঠলাম। আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই আমার জুনিয়র অফিসার আভা বলে ফেললো।

~ সুযোগ! নো ওয়ে, এতোকিছু যখন করেছে তারপর আর কোন সুযোগের প্রশ্ন আসে না। ম্যাম তো সুযোগ দিয়েছেন পিয়াস স্যারকে! হ্যা ম্যাম সুযোগ দিয়েছেন। কারণ পিয়াস স্যার যা করেছেন তাতে পিয়াস স্যার এর এখন জেলে থাকা উচিৎ। কোন মেয়ের অনুমতি ছাড়া তার সাথে কোন পুরুষ জোর জবরদস্তি করতে পারবে না, আইনে আছে স্বামীকেও ছাড় দেওয়া যাবে না। শুধু বাইরের পুরুষরাই জোর করলে তাকে রেপ বলেনা, নিজের স্বামীও যদি জোর করে তখনো তাকে রেপ করাই বলে।

কিন্তু ম্যাম কোন আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। পিয়াস স্যার ওনার সাথে যা করেছেন তাতে ওনারো তো ওই আশিকের মতোই জেলে পচে মরার কথা। শুধু রেপ করেই উনি ম্যামের ইজ্জত রাখে নি, তার সাথে মাথার সুন্দর চুল কেটেও ইজ্জত কেড়ে নিয়েছেন।
~ ইউ আর রাইট আভা। ম্যাম সত্যি আপনি একজন সফল নারী। যেই বয়সে আপনার বয়সী মেয়েরা বাচ্ছাদের আচরণ করেছে, লাইফ টাকে ইনজয় করেছে বন্ধুদের সাথে, আর সেখানে আপনি আপনার অস্তিত্ব গড়েছেন। আজ বুঝলাম আপনি এতো কঠোর কেন হয়েছেন! কেন খামোখা আমাদের মতো সবসময় হাসেন না। সত্যি আপনাকে স্যালুট।

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না শুধু ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো।
~ আচ্ছা অনেক হয়েছে এবার ক্রিমিনাল দের জীবনি নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা হোক তা না হলে যে কতো গুলো নিষ্পাপ মানুষের জীবন চলে যাবে।
~ ইয়েস ম্যাম।

আভা আর অনুরাগ বেরিয়ে গেল। আমি চোখের পানি টা দুহাতে মুছে নিলাম ভালো করে।
ওদের একটু মিথ্যা বললাম যে আমি পিয়াস ভাইয়ার কোন খোঁজ নেওয়ার সময় পাই না।

কিন্তু যে মানুষটা আমার সারা শরীর আর মন জুড়ে আছে তার জন্য সময় হবে না। হ্যা তার খবর আমি কারুর কাছ থেকে নিই না ঠিকি। কিন্তু দিনের শেষে বা শুরুতে রোজ একবার হলেও আমি যে কাঁদি। মানুষটাকে আমি এখনো পাগলের মতো ভালোবাসি। আমি যে এখনো পিয়াস ভাইয়ার স্ত্রী। আমার মনে এখনো পিয়াস ভাইয়া রয়েই গেছে। তাইতো চিৎকার করে মাঝে মাঝে বলি,,
“আমার তুমি আছো”

কিন্তু ওদের বুঝতে দিলে চলবে না যে আমি এখনো আমার পুরোনো দিনের কথা ভেবে কাঁদি। আমি একজন সি আই ডি অফিসার আমার মন অনেক শক্ত এইসব সাধারণ তুচ্ছ বিষয়ে কি মন খারাপ করা মানায় বলুন তো?

দিন শেষে আমি ভালো খারাপের মাঝে ভালোই আছি। পিয়াস ভাইয়া আমার কাছে আসে, হ্যা পিয়াস ভাইয়া আমার কাছে আসে! কল্পনায় আসে আমার সাথে অনেক সুখ দুঃখের কথা বলে জানেন! আপনারা আবার কাউকে বলবেন না যেনো…।

লেখা – সুশমিতা জানা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার তুমি আছো – Abegi moner kichu kotha” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আমার তুমি আছো (১ম খণ্ড) – Abegi moner kichu kotha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!