ভালোবাসার গল্প

এ কেমন ভালোবাসা (২য় খণ্ড) – Bangla Love Story Status

এ কেমন ভালোবাসা – Bangla Love Story Status: বনশ্রাবনের চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে আমার কাঁধ। পাগলের মতো কাঁদছে শ্রাবন। আমি ওকে থামাতে পারছি না চেষ্টাও করছি না শুধু পাথরের মতো দারিয়ে আছি। আমার মুখে নেই কোনো কথা নেই চোখে পানি। শুধু শুনছি শ্রাবনের বলা কথা গুলো।


পর্ব ২৭

শ্রাবন আমায় ভুলে গেলে আমার তো এতে খুশি হওয়ার কথা কিন্তু কেনো জানি না আমি ওর বদলে যাওয়াটাকে মেনে নিতে পারছি না। খুব কষ্ট লাগছে আমার।

পরক্ষনেই আবার ভাবতে লাগলাম হয়তো রাজু আছে বলেই শ্রাবন আমার সাথে এমন আচরণ করছে রাজুকে দেখানোর জন্য। তাছারা শ্রাবন হয়তো আগের মতই আছে আর আমায় আগের মতই ভালবাসে। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই বাসায় পৌঁছে গেলাম বিকেলের দিকে।

বাসায় পৌঁছে আব্বু আম্মুর সাথে একটু কথা বলে রুমে চলে এলাম। তারপর বোরখা খুলে ফ্রেশ হয়ে আম্মু খাবার দিলো খেতে বসলাম আমি আর রাজু। কিন্তু কেনো জানি না আমার গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইছে না। বুকের বাম পাসটায় কেনো জানি চিনচিন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।

কেমন যেনো শূন্যতা কাজ করছে আমার মাঝে।
তারপর কোনো রকমে খাওয়া শেষ করে আমি আর রাজু রুমে গেলাম। দুজনেই খুব টায়ার্ড। রুমে গিয়ে শুয়ে পরলাম। একটু পরেই দেখি রাজু ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই। তাই উঠে ছাদে চলে গেলাম।

তারপর ফোন হাতে নিয়ে নানা রকম কথা চিন্তা করে শ্রাবনের নাম্বারে কল দিলাম। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেলো। এই ভাবে দুই বার কল কেটে গেলো কিন্তু রিসিভ হলো না। তারপর আবারও কল দিলাম এবার কলটা রিসিভ হলো

~ আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। কে বলছেন?
~ কে বলছি মানে আমায় চিনতে পারলে না? আমার নাম্বার কি সেভ নেই?

~ কে বৃষ্টি নাকি। ওহ সরি সরি আসলে আমি ফোনটা ফরমেট দিয়েছি তো তাই সব নাম্বার ডিলিট হয়ে গেছে। তাই চিনতে পারিনি।
~ নাম্বার না হয় ডিলিট হয়ে গেছে আমার কন্ঠটাও কি তোর অচেনা হয়ে গেলো?

~ আরে রাখতো তোর এই ফালতু কথা। আমার এতো সময় নেই তোর ফালতু বকবকানি শোনার। কি জন্যে ফোন করেছিস সেটা বল। আমার আবার আমার জানের কাছে যেতে হবে একটু পর।
~ আমার সাথে কথা বলা তোর ফালটু সময় নষ্ট করা মনে হয়? তাহলে এতদিন কি সব কথা তোর খেলা ছিলো আমার সাথে?

~ কোন কথা?
~ তুই আমায় ভালবাসিস সেই কথা?

~ হাহাহাহা হোহোহোহোহো তোর মাথায় কি কোনো বুদ্ধি নেই। তুই কি করে ভাবলি যে আমি তোর মতো একটা বিবাহিত মেয়েকে ভালবাসবো? আরে এই শ্রাবনের জন্যে হাজার হাজার মেয়ে পাগল। একবার চুটকি বাজালেই সব সুন্দর সুন্দর মেয়েরা লাইন দিয়ে দারাবে আমায় বিয়ে করার জন্যে। আর আমায় কি পাগলা কুত্তায় কামড়াইছে যে আমি তোকে ভালবাসতে যাবো হুহহ।

~ তাহলে এতো দিন কেনো বলতি আমায় ভালবাসিস। কেনো কেঁদে ছিলি আমার জন্যে? সেদিন গান শেষেই বা কেনো কাদলি আমার জন্যে? উত্তর দে?

~ আরে তুই যে এত্ত বোকা তা তো আমি আগে বুঝিনি? আমি কখনোই তোকে ভালবাসিনি। আর কান্না করা তো দুরের কথা।

আসলে আমি আমার কয়েক জন বন্ধুর সাথে বাজি ধরে ছিলাম যে আমি বিবাহিত মেয়ে কেও আমার প্রেমের জালে ফাসাতে পারি। তাই তোকে সেই গেইমের টোপ হিসাবে ব্যাবহার করি। তুই যখন আমায় ভালবাসি ভালবাসি বলতি তখন আমি আমার বন্ধুদেরকে সেগুলো রেকর্ড করে শোনাতাম।

আমি ওদের সাথে বাজিতে জিতেছি। এখন তোর সাথে আমার খেলাও শেষ তাই সত্যি কথাটি বলে দিলাম।
~ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তোর কথা। তোর অভিনয় টা তখন ছিলো না অভিনয় তুই এখন করছিস আমার সাথে। কেনো করছিস এমন? অনেক কষ্ট হচ্ছে আমার তুই কি বুঝতে পারছিস না?

~ এই শোন তোর এই ফালতু বক বকানি বন্ধ করতো। আমার এতো সময় নেই তোর সাথে ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করার। অবস্য একটা কাজ যদি তুই করতে পারিস তাহলে কথা বলতেই পারি। বল একটা কাজ করবি আমার জন্যে?

~ কি কাজ?
~ জানিস আমার না তোকে খুব ছুয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তুই তো লাজুক লতা টাইপের একটা বিরক্তিকর মেয়ে তাই বাজিতে হেরে যাবো ভেবে কখনো বলিনি। তাই বলছিলাম যে আমায় কি একটু সময় দেওয়া যায় না বল?

~ ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমার ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে যে আমি তোর মতো একটা খারাপ দুশ্চরিত্র ছেলেকে কখনো ভালো বেসে ছিলাম। আজ তোর আসল রুপটা জানতে পারলাম ছিঃ আমি তোকো ঘৃণা করি।
~ ঐ যা যাহ আমায় আর কল দিয়ে বিরক্ত করবি না। যদি যেটা চাইলাম সেটা দিতে পারিস তবেই কল দিস। নইলে আর কখনোই আমায় কল দিয়ে বিরক্ত করবি না। যা ভাগ।
ভালো থাকিস। বাই

এই কথা গুলো বলেই শ্রাবন ফোন কেটে দিলো। এদিকে ওর বলা কথা গুলো শুনে আমার দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পরছে। বিশ্বাস করতে পারছি না আমি নিজের কানকে। সত্যিই কি আমার শ্রাবন ছিলো এটা নাকি অন্য কেউ? একটা মানুষ এতোটা খারাপও হতে পারে? বন্ধুদের সাথে বাজিতে জেতার জন্যে একটা মেয়ের মন নিয়েও খেলা করতে পারে?

কিচ্ছু ভাবতে পারছি না আমি। মাথা কেমন ঘুরছে আমার। হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পরে গেলাম।
কতক্ষণ জ্ঞান ছিলনা আমার আমি জানি না। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন তাকিয়ে দেখি আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। হাতে স্যালাইন লাগানো। পাসে আম্মু হাসি মুখে বসে আছে। আমার জ্ঞান ফেরা দেখে আম্মু রাজুকে ডাক দিলো
~ রাজু রাজুবাবা বৃষ্টির জ্ঞান ফিরেছে।

আম্মুর ডাকে রাজু দৌড়ে রুমে এলো। রাজু আসলে আম্মু চলে গেলেন। তারপর রাজু আমার কাছে বসে বললো
~ এখন কেমন লাগছে বৃষ্টি? আর তুমি হঠাৎ জ্ঞানই বা হারিয়ে ছিলে কেনো? আমি তোমায় খুজতে খুজতে ছাদে গিয়ে দেখি তুমি জ্ঞান হারিয়ে পরে আছো। কি হয়েছিল তোমার?

রাজুর কথায় আমার তখনকার সব কথা মনে পরে গেলো আর বুকটা ফেটে যেতে চাইলো কষ্টে। তবুও নিজেকে শান্ত করে রাজুকে বললাম
~ আসলে কি হয়েছিল আমি জানি না হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে গেলো তারপর আর কিছু মনে নেই।
রাজু আমার কথা শুনে বললো

~ এখন থেকে আর কোনো কিছু বাহানা চলবে না সব সময় সাবধানে থাকতে হবে বুঝলে।
এরই মাঝে আম্মু অনেক গুলো মিষ্টি নিয়ে এলেন তারপর রাজুকে একটা খাইয়ে দিয়ে আমার দিকে একটা বারিয়ে দিয়ে বললেন

~ এই নে বৃষ্টি হা কর মিষ্টি মুখ কর তো।
আম্মুর কথা শুনে আমি অশ্চর্য হলাম আমি অসুস্থ দেখেও আম্মু আমায় হাসি মুখে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে কেনো?


পর্ব ২৮

আমি আম্মুর এমন আচরণে অবাক হচ্ছি। আমাকে অসুস্থ দেখেও আম্মু কি করে হাসি মুখে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে? আমি আম্মুকে জিগ্যেস করলাম
~ আম্মু তোমার মাথা ঠিক আছে তো? আমি অসুস্থ দেখেও তুমি এতো খুশি আবার মিষ্টি খাওয়াচ্ছো কিসের শুনি?

আমার কথা শুনে রাজু আর আম্মু এক সাথে হাহা করে হেসে দিলো। তারপর আম্মু বললো
~ এই মিষ্টি তোর জন্যে নয় এই মিষ্টি আমাদের নতুন অতিথির জন্যে। আমার নানুভাইয়ের জন্যে।
~ তোমার নানুভাই মানে?

~ আরে গাধি তোকে এতো বুঝতে হবে না তুই মিষ্টি খা। আমার কাজ আছে আমি গেলাম।
এটা বলেই আম্মু আমার সামনে মিষ্টি রেখে চলে গেলেন। আর আমি হা করে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম কি হলো এটা?

তারপর রাজু আমার পাসে এসে বসে বলল
~ এই যে আমার রাজপুত্রের আম্মু। মিষ্টি খান। আপনি খেলেই তো আমার রাজপুত্রও পাবে নাকি?
~ মানে কি বলছেন আপনি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না?

~ আরে গাধী বৌ আমার তুমি মা হতে চলেছো আর আমি বাবা।
রাজুর মুখে এই কথাটা শুনে আমি যেনো বিষ্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। আর আমার হাতটা আপনা আপনিই নিজের পেটের ওপর চলে গেলো।

অজানা এক মিষ্টি অনুভুতি কাজ করতে লাগলো আমার মাঝে।
তারপর অনেক কথা হলো। বাচ্চা হওয়ার আনন্দে আমি ভুলেই গেলাম শ্রাবনের সব কথা।
তারপর বাবার বাড়ি দুদিন থেকে চলে আসলাম শশুড়বাড়িতে।
এর ভেতর রাজুর আচরণ আমায় অনেক ভাবায়

কখনো হয়তো রাজু আমার অনেক কেয়ার করে আবার কখনো মারধরও করে। কখনো মনে হয় রাজু আমায় অনেক ভালবাসে আবার কখনো মনে হয় সবটাই মিথ্যে নাটক মাত্র।

এখনো মাঝে মাঝেই রাজু আমায় মারধর করে। বাজে ভাষায় গালাগালি করে। আবার কখনো ভালও বাসে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা ওর ভালবাসাটা।
এভাবেই কেটে গেলো ৭ টা মাস। এই ৭ মাসে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে।

এক দিকে রাজুর খারাপ আচরণ অন্য দিকে শাশুড়ি ননদের অত্যাচার। তবুও আমি এগুলোর মাঝে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। ধৈর্যশীল হয়ে সকলের মন জয় করে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এই গত ৭ মাসের মধ্যে একবারো শ্রাবনের সাথে দেখা বা কথা হয়নি আমার। কিন্তু আমি ওর কথা এক মূহুর্তের জন্যেও ভুলতে পারিনি।

প্রতিটা সেকেন্ডে ওকে মিস করেছি আমি। ওর মুখে এতো বাজে বাজে কথা শোনার পরেও জানি না কেনো ওকে এক মুহুর্তের জন্যেও ঘৃণা করতে পারিনি আমি। যত কিছুই হোক আমার জীবনের প্রথম ভালবাসা শ্রাবন। তাকে কি এতো সহজে ভোলা যায়?
রাজু কে যে আমি ভালবাসি না তা নয়। কিন্তু আমার মনে শ্রাবনের জায়গাটা এখনো আমি রাজুকে দিতে পারিনি। হয়তো কখনো পারবোও না।

হঠাৎ আম্মু ফোন করে বললো আব্বুর শরীর নাকি খুব খারাপ। বিছানায় পরে গেছেন একদম। আমি অনেক দিন হলো বাড়ি যাই না তাই আমায় একেবারে বাচ্চা হওয়ার জন্যে নিতে আসবে আম্মু। আব্বু আমার তার পাশে দেখতে চেয়েছেন।

বিকেলে সকলের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি চলে এলাম বাবার বাড়ি। রাজুর খারাপ আচরণের কথা আমি ছারা আর কেউ জানে না। আমি বাড়িতে সবাইকে বললাম। রাজু অনেক ভালো হয়ে গেছে এখন আমায় অনেক ভালবাসে।

আব্বু সত্যিই অনেক অসুস্থ। সকল আত্নীয় সজনকে খবর দেওয়া হলো আব্বুকে দেখে যাওয়ার জন্য। বলাতো যায়না কখন কি হয়।
একে একে আমাদের সকল আত্নীয় সজন এসে আব্বুকে দেখে গেলো। কালকে নাকি খালামনি শ্রাবন ভাই আর শম্মিও আসবে আব্বুকে দেখতে।

শ্রাবনের আসার কথা শুনে আমার বুকের মাঝে যেনো অজানা এক অনুভুতি হচ্ছে। যে অনুভূতিটা একদম অন্যরকম। কিছুটা রাগ কিছুটা অভিমান কিছুটা ভালবাসা সব মিলিয়ে একটা অনুভুতির সৃষ্টি হচ্ছে আমার মাঝে।

আজ বিকেলে খালামনিরা আসবেন তাই আম্মু সব রান্নাকরে রেডি করে রাখলেন। ঘর গুছিয়ে রাখলেন।
বিকেল বেলা খালামনি আর শম্মি এলো৷ আমাদের বাড়ি। শম্মি এসেই আমায় জরিয়ে ধরলো। তারপর অনেক কথা বললাম আমরা। কিন্তু শ্রাবনকে কোথাও দেখতে পারছি না। তাই শম্মিকে জিগ্যেস করলাম
~ শম্মি শ্রাবন ভাই আসেনি?

~ আসছে আপু শ্রাবন ভাইয়াকে আম্মু খালুর জন্যে ফল কিনতে পাঠিয়েছেন। একটু পরেই চলে আসবে।
তারপর আমরা অন্য সব কথায় মজে গেলাম। কিন্তু আমার চোখ দুটো যেনো কারো অপেক্ষায়।

প্রায় ২ ঘন্টা পর গেইটের নক করার শব্দ শুনে হঠাৎ বুকটা কেপে উঠলো। আমি বুঝতে পারলাম এটাই শ্রাবন। তাই তারাতারি নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। কেনো জানি না ওর সামনে যেতে আমার কেমন যেনো লাগছে।

এভাবে অনেক্ষন পরে শম্মি এসে আমার ডাকতে শুরু করলো। বললো আম্মু আমায় ডাকছে
আমি দরজা খুলে বের হয়ে শম্মি কে নিয়ে সামনে এগুতে থাকলাম। আর আমার হার্টবিটও বারতে লাগলো দিগুন গতিতে।

তারপর এক সময় পৌছে গেলাম সবার সামনে। শ্রাবন আব্বুর বিছানায় বসে আছে আমি সেটা আর চোখে দেখলাম। কিন্তু কিছু বললাম না। তারপর…..


পর্ব ২৯

শ্রাবন ভাইয়া বসে আছে আব্বুর বিছানায়। আমি সেটা আর চোখে দেখলাম কিন্তু কিছু বললাম না। তারপর আম্মুকে বললাম
~ আম্মু আমায় ডাকছো কেনো কি হয়েছে?
আম্মু আমার কথার উত্তরে বললো

~ তোর কি হয়েছে বলতো। তোর খালামনি এসেছে শ্রাবন এসেছে শম্মি এসেছে। আর তুই কিনা ওদের সাথে কথা না বলে। ঘরে দরজা দিয়ে বসে কি করছিলি হুমম।
আম্মুর কথার উত্তরে আমি কি বলবো ভেবে না পেয়ে চট করে বলে ফেললাম
~ আসলে শরীরটা ভালো লাগছে না তাই ঘরে শুয়ে ছিলাম।

আমার কথা শুনে কেউ কিছু বলার আগেই আমি সেখান থেকে শম্মিকে নিয়ে বাইরে চলে এলাম।
তারপর শম্মিকে নিয়ে ছাদে গেলাম। শম্মি আমায় বললো
~ আপু তোমার শরীর না ভালো লাগছে না তাহলে ছাদে কেনো এলে। রুমে গিয়ে ঘুমোতে পারতে?
আমি শম্মিকে বললাম
~ না আসলে এখন শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না আর ঘুমও আসবে না তাই একটু ছাদে বসে থাকলে ভালো লাগবে।

তারপর আমি আর শম্মি নানা রকম গল্প করছি। হঠাৎ আমার পিছনে থেকে কেও বলে উঠলো
~ কেমন আছিস বৃষ্টি?

কন্ঠটা আর কারো নয়। আমার চিরচেনা শ্রাবনের কন্ঠ এটা। বুকের ভিতরটা যেনো কেপে উঠলো।
আমায় চুপ করে থাকতে দেখে শ্রাবন ভাই আমার সামনে এসে দারিয়ে আবারও বললো
~ কেমন আছিস রে কালো পেত্নী?
আমি মুচকি হেসে বললাম

~ আলহামদুলিল্লাহ অনেক অনেক ভালো আছি আর সুখেও আছি। তোর কি খবর? কেমন আছিস তুই?
~ হুমম আছি ভালোই। তা তোর রাজু কোথায় রে?
~ ও তো আমার শশুড়বাড়িতেই আছে। আসবে হয়তো কাল পরশু।

~ তোর শশুড়বাড়ির লোক সবাই তোকে ভালবাসে তো? আর রাজু এখন কেমন আচরণ করে তোর সাথে?
~ হুমম আলহামদুলিল্লাহ সবাই আমায় অনেক ভালবাসে। আর রাজু তো আমি বলতেই পাগল। অনেক ভালবাসে আমায়। (ইচ্ছা করেই মিথ্যা কথা বললাম। কারন আমি চাই না আমার কষ্টের ব্যাপারে শ্রাবন বা আমার বাড়ির কেউ জানুক)

~ আলহামদুলিল্লাহ শুনে ভালো লাগলো। এখন বল কি হয়েছে তোর শরীর খারাপ লাগছে বলছিলি যে?
~ না কিছু না এমনিই। ভালো লাগছিলো না তাই ছাদে আসলাম।
~ ওহ ভালো। আচ্ছা তোরা কথা বল আমি তাহলে যাই কেমন?
~ কোথায় যাবি এখন শ্রাবন ভাই?

~ নিচে যাই এখানে থেকে কি করবো শুধু শুধু তোর আর শম্মির মাঝে তাই নিচে যাই।
~ নিচে যাওয়ার চেয়ে এখানে বসে একটা গান শোনা আমাদের। ভালো লাগছে না গান শুনলে ভালো লাগতো।
~ এখন গান গাইতে পারবো না রে সরি। পরে এক সময় শোনাবো।

এই কথা গুলো বলেই শ্রাবন ভাই হনহনিয়ে নিচে নেমে গেলো। যেনো আমাদের থেকে কিছু লুকোনোর জন্যে এভাবে চলে গেলো।
তারপর আমি আর শম্মি কিছুক্ষন গল্প করে নিচে নেমে এলাম।

সন্ধ্যার পর রাজু এলো আমাদের বাসায়।
রাজু এসে সকলের সাথে গল্প গুজব করে কাটিয়ে দিলো রাত ১১.০০ পর্যন্ত। তারপর আমরা যে যার মতো রুমে গিয়ে শুয়ে পরলাম৷

পরের দিন সকালে উঠে নামাজ পড়ে বাইরে বের হলাম। আম্মু আর খালামনির সাথে কাজে হেল্প করতে গেলাম কিন্তু তারা আমায় কোনো কাজ করতে দিলো না। তাই শম্মিকে নিয়ে আবার ছাদে চলে গেলাম। আমরা ছাদে আসার একটু পরেই রাজু শ্রাবন ভাইকে নিয়ে ছাদে এলো।

তারপর আমরা চারজন গোল হয়ে বসে গল্প করতে লাগলাম। রাজু এমন ভাবে কথা বলছে যে মনে হচ্ছে আমার অনেক ভালবাসে রাজু। কখনো গায়ে হাত তোলে। আমিও রাজুর সাথে তালে তাল মেলাচ্ছি। কারন আমি চাই শ্রাবন দেখুক আমি অনেক সুখে আছি।

এভাবে অনেক সময় পার হওয়ার পর আমরা সবাই নিচে নেমে এলাম। তারপর সকালের খাবার শেষ করে। শম্মি আর আমি একসাথে থাকলাম। আর রাজু শ্রাবন একসাথে থাকলো সারাদিন।
সন্ধ্যার পর নামাজ শেষ করে রাজু আমাদের সবাইকে নিয়ে ছাদে গেলো। তারপর শ্রাবন ভাইকে জোর করতে লাগলো গান গাওয়ার জন্যে।

জোর করার এক পর্যায়ে শ্রাবন ভাই রাজি হলো। আমাদের থেকে কিছুটা দুরে গিয়ে বসে গান গাইতে লাগলো
তোমার আমার দেখা হবে ঐ পারে বন্ধু ঐ পারে
তোমার আমার দেখা হবে ঐ পারে।

তোমার আমার দেখা হবে ঐ পারে বন্ধু ঐ পারে তোমার আমার দেখা হবে ঐ পারে।
হৃদয়ের লেনা দেনা এপারেতে আর হবে না।
দেখা হবে দেখা হবে ঐ পারে

তোমার আমার দেখা হবে ঐ পারে। । ঐ
আমি জনম জনম ঘুরিয়া তোমায় কাছে না পাইয়া ভালবাসা রাখিলাম যতনো করে বন্ধু যতনো করে
ওওও তোমার প্রেমে মজিয়ে চোখের জলে ভাসিয়া কেউ জানে না কিসের আগুন আমার অন্তরে বন্ধ আমার অন্তরে

হৃদয়ের লেনা দেনা এপারেতে আর হবে না।
দেখা হবে দেখা হবে ঐ পারে। ঐ

চিনিও চিনিও তুমি ঐ পারেতে গিয়া। থাকিবো থাকিবো আমি প্রেমের তরী নিয়া বন্ধু প্রেমের তরী নিয়া।
ওওও তোমার আমার এই প্রনয়ে ভুল যদি না থাকে ঐ পারেতে আইসো তুমি প্রেমো মালা হাতে বন্ধু প্রেমো মালা হাতে।

হৃদয়ের লেনা দেনা এপারেতে আর হবে না
হৃদয়ের লেনা দেনা এপারেতে আর হবে না
দেখা হবে দেখা হবে ঐ পারে। ঐ ঐ

গানটা শেষ করলে রাজু বলে উঠলো
~ আরে শালা বাবু তোমার কন্ঠটা কিন্তু যটিল। কিন্তু কি হয়েছে বলোতো? তোমার ঐ প্রেমিকার খবর কি হুমম। বিয়ের দাওয়াত পাচ্ছি কবে?

~ চিন্তা করিয়েন না দুলাভাই খুব তারাতারি দাওয়াত পাবেন কথা দিলাম। তারপর এশার আজান হলে আমরা সবাই নিচে নেমে এলাম।
সবাই নামাজ শেষ করে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পরলাম।


পর্ব ৩০

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নামাজ শেষ করে আম্মুর কাছে গেলাম। আম্মু আমার কাছে চা বানিয়ে দিলো সবাইকে দিয়ে আসতে। আমি চা নিয়ে একে একে সবাইকে দিয়ে আসলাম। এখন শুধু রাজু আর শ্রাবনকে দেওয়া বাকি। প্রথমে রাজুর জন্যে চা নিয়ে গেলাম। রাজু চায়ের কাপটা নিয়ে আমায় বললো তারাতারি নাস্তা রেডি করতে ওর অফিসে যেতে হবে।

আমি এসে আম্মুকে বললাম
~ আম্মু তোমাদের জামাই চলে যাবে অফিসে। তাই তারাতারি খাবার দিতে বললো।

~ আচ্ছা আমি খাবার বারছি তুই গিয়ে এই চা টা একটু শ্রাবনকে দিয়ে আয় তো।
আমি আমতা আমতা করে চা টা নিলাম তারপর শ্রাবন ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম
~ শ্রাবন ভাইয়া এই নে তোর চা।

আমার কথার উত্তরে শ্রাবন ভাই চা নিতে নিতে বললো
~ বৃষ্টি একটা কথা সত্যি করে বলবি?
~ কি কি কথা?

~ তুই সত্যিই ভালো আছিস তো? রাজু তোকে আর কষ্ট দেয় না তো? তুই রাজুর সাথে সুখি আছিস তো?
শ্রাবন ভাই এর কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলাম

~ এটা কেমন প্রশ্ন শ্রাবন ভাই?
আমি আল্লাহর রহমতে অনেক ভাল আছি। আর আমার স্বামীও আমায় অনেক ভালবাসে। আমি অনেক সুখি আলহামদুলিল্লাহ।

~ আলহামদুলিল্লাহ তাহলে আমার আর কোনো টেনশন নাই। এই কথাটা জানার জন্যেই আমার এখানে আসা। তুই সুখে থাক সারাজীবন এমনই ভাবে। কোনো দুঃখ কষ্ট যেনো তোকে কখনো ছুতেও না পারে এই দোয়াই করি সব সময়।

~ হুমম শুকরিয়া ভাইয়া। এখন তাহলে আমি আসি উনি আবার চলে যাবেন খাবার দিতে হবে।
তারপর আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।

বুকের ভিতরটা একটা চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে। শ্রাবনকে আমি ইচ্ছা করেই মিথ্যা কথাগুলো বললাম। কারন আমি জানি শ্রাবন এখনো আমার সেই আগের মতই ভালো বাসে। আর তাছারা আমি চাইনা কেউ জানুক আমার আর রাজুর সম্পর্কের ব্যাপারে। সবাই যেনো আমাদের সুখি দেখে এই কামনাই করি সব সময়।

তারপর রাজু এসে খেতে বসলো। আমি রাজুর পাসে দারিয়ে আছি যা লাগে এগিয়ে দিচ্ছি। তখন শ্রাবন ভাই এসে রাজুর পাসে বসলো। তারপর মোবাইলে একটা পিক বের করে বললো

~ দুলাভাই দেখুন তো আপনার শালাবাবুর জন্যে এই বৌটা পছন্দ হয় কিনা?
রাজু তখন ফোনটা নিয়ে দেখলো। আমিও দেখতে লাগলাম

অনেক সুন্দরী একটা মেয়ের ছবি। চোখ দুটো ভাসা ভাসা গায়ের রং ফর্সা, চুল গুলো কোকরানো, মুখে মিষ্টি হাসি। এক কথায় বলতে গেলে শ্রাবন ভাইয়ার সাথে অনেক সুন্দর মানাবে।
রাজু ছবিটা দেখে বললো
~ ওয়াও শালাবাবু তোমার তো দেখি পছন্দ আছে। তোমার সাথে দারুন মানাবে। তা নাম কি আমাদের হবু ভাবি জানের?

~ ওর নাম #জোনাকি। কলেজে পড়ে। ওরা দুই বোন কোনো ভাই নেই। জোনাকিই বড়। এখান থেকে গিয়ে আংটি বদল করে ফেলবো ভাবছি। তারপরেই বিয়ে। ওদের বাড়ির সবাই রাজি। আর আমার বাসারও সবাই জানে। আব্বুকেও বলবো এখান থেকে গিয়ে।

~ শালা বাবু তো কাজের কাজ করে ফেললো গো। তারাতারি দাওয়াতটা দিও। কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে আসবো।
~ হুমম তা তো অবশ্যই। কিরে বৃষ্টি ভাবিকে পছন্দ হয়েছে তোর?
~ হ্যা রে জোনাকি ভাবি আসলেই দেখতে অনেক কিউট। তোর সাথে মনে হবে বাদরের গলায় মুক্তর মালা। হিহিহি। তারাতারি বিয়েটা করে ফেল কত্ত দিন হলো বিয়ে খাইনা।

~ আরে যা যাহ তোকে বিয়ের দাওয়াত দিবে কে হুমম। আমার বিয়েতে তোর কোনো দাওয়াত নাই। শুধু দুলাভাইকে দিবো দাওয়াত। কি বলেন রাজু ভাই?

~ হ্যাঁ গো শালাবাবু যথা আগ্গা।
তারপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাজু চলে গেলো। রাজু চলে যাওয়ার পরেও শ্রাবন ভাইয়েরা ২ দিন থাকলো আমাদের বাসায়।

এই দুইদিনে আমাদের খুব দরকার ছারা কোনো কথা হয়নি। আর সব সময় দুজন দুজনের থেকে অনেক দুরে দুরে থেকেছি। কাল সকালে শ্রাবন ভাইয়েরা চলে যাবে। সন্ধা হয়ে গেলো। আমি আর শম্মি দারিয়ে আছি ছাদের ওপর নীল আকাশ দেখছি।

হঠাৎ শ্রাবন ভাই এসে শম্মিকে বললো
~ কিরে শম্মি তোকে সেই কখন থেকে আম্মু ডাকছে শুনতে পাস না? যা তারাতারি শুনে আয় কেনো ডাকছে।
শ্রাবনের কথা শুনে শম্মি চলে গেলো। আমিও নিচে নামার জন্যে পা বারিয়েছি ওমনি শ্রাবন আমায় ডাক দিয়ে বললো

~ বৃষ্টি তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।
শ্রাবনের কথা শুনে আমি ওর দিকে ঘুরে দারালাম। তারপর বললাম
~ কি কথা ভাইয়া বল?

~ বৃষ্টি আমি হয়তো এখান থেকে বাসায় গিয়েই জোনাকি কে বিয়ে করবো। কিন্তু তোর কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে রাখবি বল আমার অনুরোধটা?

~ কি অনুরোধ বল চেষ্টা করবো রাখার?
~ তুই আমার বিয়েতে যাবি না। আম্মু হয়তো তোদের সকলকেই দাওয়াত দিবে। কিন্তু সবাই গেলেও তুই আমার বিয়েতে যাবি না কথা দে?

~ কেনো রে হার কিপ্টা ছোট বোন কে ছারাই বিয়ে করবি। আমার কত্ত দিনের শখ তোর বিয়ে খাবো। আর তুই কিনা বলছিস আমি তোর বিয়েতে যাবো না?

~ হ্যা তুই আমার বিয়েতে যাবি না। দেখ আমি কিন্তু মজা করছি না সিরিয়াস ভাবে বলছি তুই আমার বিয়েতে যাবি না। এই টুকু দয়া অন্তত কর আমায়?
এবার আমি আর মজা করলাম না। আমি বুঝতে পারছি শ্রাবন কেনো এমন বলছে আমায়। তাই আমি ওকে বললাম

~ চিন্তা করিস না তুই যেমনটা চাস তেমনি হবে আমি যাবো না তোর বিয়েতে। ভালো থাকিস এই দোয়াই করি। আর জোনাকি কে অনেক ভালো বাসিস। কখনো কষ্ট দিস না ওকে।

এই কথা গুলো বলেই আমি নিচে নেমে এলাম। আর শ্রাবন ভাই সেখানেই দারিয়ে রইলো।
তারপর রাতে খাওয়া দাওয়া করে সবাই ঘুমোতে গেলো। শম্মি এলো আমার কাছে ঘুমোতে। শম্মি আর আমি অনেক গল্প করছি। গল্প করার এক পর্যায়ে শম্মি বললো

~ জানো বৃষ্টি আপু আজকে তুমি আমি যে ছাদে দারিয়ে ছিলাম না। আর তখন ভাইয়া যে আমায় বললো আম্মু ডাকছে আর আমি নিচে নেমে এলাম?

~ হুমম তো কি হয়েছে শম্মি?
~ হ্যা তারপর যখন আমি আম্মুর কাছে থেকে আবার ছাদে গেলাম তখন দেখি শ্রাবন ভাইয়া না ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আমায় দেখে চোখের পানি মুছলো তারাতারি। আর আমি যখন প্রশ্ন করলাম কেনো কাঁদছে তখন বললো চোখে নাকি পোকা ঢুকে ছিলো।

জানো আপু আমি কখনো ভাইয়াকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি।
~ বাদ দাও তো শম্মি সত্যিই হয়তো শ্রাবন ভাইয়ের চোখে পোকা ঢুকে ছিলো তাই চোখ দিয়ে পানি পরেছে। নইলে ও কাঁদবে কোন দুঃখে। অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাও আপু।

~ হুমম তাই হবে হয়তো। ঠিকি তো ভাইয়া কাঁদবে কেনো সত্যিই মনে হয় পোকা পরেছিলো চোখে। আচ্ছা গুড নাইট আপু।
~হুমম গুড নাইট।
তারপর আমি শম্মির থেকে অন্য দিকে ঘুরে শুলাম।

কেনো জানি না আমার বুকের ভিতরটা অসম্ভব কষ্ট অনুভব হচ্ছে। বুকটা ফেটে কান্না আসছে। আমি জানি কেনো কেদেছে ঐ পাগল টা। কিন্তু আমি যে নিরুপায় কিচ্ছু করার নাই আমার। আজকের একটু কষ্টের ফলে যদি ও সারাজীবন সুখে থাকে এতেই আলহামদুলিল্লাহ।

সারারাত ঘুম হলো না আমার। ছটফট করেই কেটে গেলো সারাটা রাত। সকালে ফজরের আজান হলে উঠে নামাজ পরে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে অনেক দোয়া করলাম। আমার মন থেকে ওকে মুছে দেওয়ার জন্যে আর ওর মন থেকে আমাকে মুছে দেওয়ার জন্যে।

তারপর সকালে সবাই খাওয়া দাওয়া করে আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। শ্রাবন সবার কাছে থেকে বিদায় নিলেও আমায় কিছুই বললো না। শুধু যাওয়ার আগে আমার দিকে মায়া ভরা কষ্ট জরানো চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর হনহন করে চলে গেলো।

আমার পেটে বাবু এসেছে আজ ১০ মাস ৩ দিন হলো। যখন তখন বাবু হতে পারে। আমি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম আর হঠাৎ করে আমার প্রচন্ড পেইন শুরু হলো….


পর্ব ৩১

আমি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম আর হঠাৎ করে আমার প্রচন্ড পেইন শুরু হলো। আমার এমন অবস্থা দেখে আম্মু দৌড়ে এসে আমায় বিছানায় শুইয়ে দিলো।

তারপর রাজুকে ফোন করলো। রাজু ১ ঘন্টা পর আসলো ততোক্ষণে আমার বেবি হয়েছে। আমার অনেক সুন্দর একটা ফুটফুটে রাজপুত্র হয়েছে। আম্মু ওকে কোলে নিয়ে আদর করছে। আব্বুও অনেক খুশি।

রাজু এসে আমায় দেখলো তারপর বেবিকে কোলে নিয়ে আদর করলো। রাজুও অনেক খুশি।
আমার মনটাও অনেক খুশি আল্লাহ আমায় একটা ফুটফুটে রাজপুত্র দান করেছেন বলে।

আমার বেবি হয়েছে আজ ৭ দিন হলো। অথচ এখন পর্যন্ত আমার শশুড়বাড়ির কেউ আমার ছেলেটাকে দেখতে আসে নি। বড্ড কষ্ট হচ্ছে আমার এটা ভেবে। পরিবারের প্রথম সন্তান অথচ কারো কোনো আনন্দ নেই। কেউ একবার দেখতে আসার প্রয়োজনও মনে করলো না।

আমার ছেলের নাম রাখা হলো #ইসমাঈল। মসজিদের এক হুজুরকে দিয়ে নাম করন করা হলো।
৭ দিন পর আজকে নাকি আমার শশুড় শাশুড়ি আসবেন ইসমাঈলকে দেখতে। আমিও তাতেও খুশি। ওদের সময় হয়েছে আমার ছেলেকে দেখতে আসার এটাই কম কিসের।

দুপুরবেলা আমার শশুড় আর শাশুড়ি মা এলেন। ২ কেজি মিষ্টি আর দুটি জামার সেট নিয়ে।
তারপর আমার ছেলেকে কোলে নিলেন কিন্তু তার মুখে নেই কোনো আনন্দের ছাপ। আমার শশুড় মশাই অনেক খুশি কিন্তু আমার শাশুড়ি মায়ের ভয়ে তিনিও ইসমাঈলকে আদর করার সাহস পাচ্ছেন না।
আমি আমার শাশুড়ি মা কে জিগ্যেস করলাম

~ মা, মিম আপু এলেন না ইসমাঈলকে দেখতে?
আমার কথার উত্তরে শাশুড়ি মা বললেন

~ না মিমের সময় নেই। আজকে ওর বান্ধবী জন্মদিনের পার্টি দিচ্ছে সেখানে যাবে।
আমার শাশুড়ি মার কথাগুলো কেমন যেনো তাচ্ছিল্যের শুরে বললেন। ওনার কথা শুনে আমি আর কোনো উত্তর দিলাম না।

ইসমাঈলকে দেখে ওনারা সন্ধ্যায় চলে গেলেন। অনেক থাকতে বলা হলো কিন্তু থাকলেন না। রাতে আমি ইসমাঈলকে নিয়ে শুয়ে আছি। রাত তখন আনুমানিক ১০.০০ টা বাজে হয়তো। হঠাৎ আমার ফোনে অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে কল আসলো। অপরিচিত তাই প্রথমে দুবার বেজে বেজে কেটে গেলো আমি রিসিভ করলাম না। কিন্তু ৩ বারের সময় রিসিভ করলাম

~ আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। কেমন আছিস বৃষ্টি।
কন্ঠটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। আমার সেই চিরচেনা বড় আপুর কন্ঠ। কতদিন পর শুনলাম। আমি বলে উঠলাম

~ আপু তুমি? এতদিন পর কোথায় ছিলে এতদিন? একবারো কি মনে পরেনি এই ছোট বোনটার কথা?
~ তোর কথা আমার সব সময় মনে পরেছে বৃষ্টি। তোকে কি আমি ভুলতে পারি। তুই যে আমার জান রে পাগলি। এখন বল আমার বোনপো কেমন আছে কি নাম দিয়েছিস ওর?

~ আপু তুমি জানো আমার বিয়ের কথা? বেবি হয়েছে এটাও জানো?
~ হ্যা রে পাগলি। তোদের ছেরে দুরে এসেছি বলে কি তোদের খবর রাখিনা বল? আমি সব জানি। এখন বল তোর বেবি কেমন আছে? আর আব্বু আম্মু কেমন আছেন?

~ আলহামদুলিল্লাহ সবাই অনেক ভালো আছেন আপু। তুমি কেমন আছো? তুমি এখন কোথায় বলোতো?
~ আমিও আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আছি। আর আমি এখন শশুড়বাড়িতে আছি।
~ তোমার শশুড়বাড়ির লোকজন কেমন আপু? আর দুলাভাই সে কেমন?

~ ওরা সবাই অনেক ভালো রে বৃষ্টি আমি অনেক সুখে আছি আলহামদুলিল্লাহ। আমার শশুড়বাড়ির সবাই আমায় নিজের মেয়ের মতই ভালো বাসে। আর আমার পেটে বেবি আসার পর থেকে তো আমার শাশুড়ি ননদ আমায় বেশি কাজই করতে দেয় না।

~ আপু তোমার বেবি হবে? কয় মাস চলছে গো। ইসস কতদিন হলো তোমায় দেখিনা। ফিরে আসো আপু প্লিজ। আব্বু আম্মু অবশ্যই তোমায় ক্ষমা করে দিবে আর সব কিছু মেনেও নিবে।

~ এইতো ৬ মাস চলছে। আর আমি খুব তারাতারি আসবো তোর দুলাভাইকে নিয়ে। আমার বিশ্বাস আব্বু আম্মু আমায় ক্ষমা করবেনই।

~ হ্যা আপু। তুমি কিন্তু সাবধানে চলাফেরা করবা আর নিজের যত্ন নিবা কেমন?
~ আমার সেই ছোট্ট আদরের বোন বৃষ্টি আজ এতো বড় হয়ে গেছে যে আমাকে উপদেশ দিচ্ছে। কত দিন হলো তোকে মন ভরে দেখিনা রে বৃষ্টি। কবে যে দেখা হবে আবার?
~ তুমি চিন্তা করোনা আপু আমি কালকেই আব্বু আম্মুকে সব বলবো তোমার কথা তারপরেই তমি আসবা কেমন?

~ হুমম। আচ্ছা বৃষ্টি ভালো থাকিস এখন রাখি অনেক রাত হয়েছে।
~ আচ্ছা আপু আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম।

তারপর ফোনটা কেটে দিলো। অনেক দিন পর আপুর সাথে কথা বলে মনটা অনেক ভালো লাগছে। সকালে আমি আব্বু আর আম্মুকে আপুর সব কথা খুলে বললাম।
আমার কথা শুনে আম্মু কান্নাকাটি শুরু করলো।

হাজার হলেও বাড়ির বড় মেয়ে অনেক আদরের ছিলো। তারপর আব্বু আম্মুকে অনেক বোঝানোর পর ওনারা আপুকে মেনে নিলো। আর আমায় বললো আপুর নাম্বারটা দিতে।
আমি নাম্বারটা দিলাম আম্মু আব্বু দুজেই আপুর সাথে কথা বললেন। সব কিছু মিটমাট হয়ে গেলো।

এভাবেই কেটে গেলো ৩ মাস। আজকে আমায় নিতে আসবে শশুড়বাড়ি থেকে। তাই নানা রকম আয়োজন হচ্ছে। আপুও আছে সেই আয়োজনে। আপুকে আম্মু আব্বু বেবি হওয়ার জন্যে নিয়ে এসেছে। সবার সাথে মিটমাট হয়ে গেছে।

দুপুরে আমার শশুড়বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ জন মানুষ এলো। তারপর খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা রওনা হলাম শশুড়বাড়ির উদ্যেশে।

শশুড়বাড়িতে আসার পর শাশুড়ি ননদের আচরন যেনো আগের থেকেও খারাপ হয়ে গেছে। আমার ছেলেটাকেও একটু ভালবাসে না তারা। জানি না কি দোষ করেছি আমি আর আমার ছেলে।

রাজুও একবার যদি ভালো ব্যাবহার করে তো ৫ বারই খারাপ ব্যাবহার করে। ছেলেটাকে ভালবাসে ঠিকি কিন্তু কষ্টও দেয় কিছু কিছু সময়। আমার ছেলেটা এখন হাটতে শিখেছে। ওর এখন ১ বছর ৫ মাস চলছে।

এই ১ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছুই। রাজুর আচরন দিন দিন শুধু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। আমি সব সময় চেষ্টা করি সকলের মন জুগিয়ে চলার। কিন্তু কিছুতেই পারি না। আমার শাশুড়ি ননদও সব সময় কথা শোনায় কষ্ট দেয়। শশুড় মশাই কিছু চাইলেও করতে পারেন না আমাদের জন্যে শাশুড়ি মায়ের ভয়ে।

শ্রাবন ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে জোনাকি ভাবির সাথে আজ থেকে প্রায় ৬ মাস আগে। সবাই গিয়েছিল ওর বিয়েতে শুধু আমি যাইনি। শ্রাবন ভাইয়ের কথা রাখার জন্যে।
শ্রাবণ ভাইয়ের বিয়ের পর আর কথা হয়নি ওর সাথে কখনো। ও জানে আমি অনেক সুখে আছি। ভালো আছি।


পর্ব ৩২

৫ বছর পর…..
গত ৫ বছরে আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। আর পাওয়ার মাঝে পেয়েছি শুধু আমার একমাত্র চোখের মনি ইসমাঈলকে।

দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়ে গেছে আমার ছেলেটা। ও এখন অনেক কিছুই বোঝে। আমি ওর প্রান আর ও আমার প্রান। আমি ইসমাঈলের জন্যে পৃথিবীর সব করতে পারি।
রাজুও সময়ের সাথে সাথে অনেক বদলে গেছে। আগের থেকে হাজার গুন বেশি কষ্ট দেয় আমায়। আমার জন্যে রাজুর কাছে কোনো সময় নেই।

আর ভালবাসা তো কখনো ছিলোই না। বছরের পর বছর যায় আমায় দেয়না কোনো কাপড় চোপড় কিনে। মদ্ধবিত্ত বাড়ির বৌ হয়েও আমার পোশাক আশাক সব গরিবদের মতো। কাপড় চোপড় ছিরে যায় সেগুলো সেলাই করে পরি।

মাইর খাওয়ার ভয়ে ওর কাছে চাইতেও পারি না।
আমার বড় বোন আমায় অনেক কাপড় চোপড় কিনে দিয়েছে আমি সেগুলোই পরি সব সময়। খাওয়া দাওয়াতেও অনেক কষ্ট করেছি এই ৫ টা বছর।

আমার শাশুড়ি ননদ তাদের তো আমি যেনো চোখের কাটা।
আমার ননদের বিয়ে হয়ে গেছে। একটি ছেলের সাথে প্রেম করে পালিয়ে গিয়ে। প্রথম দিকে আমার শশুড় শাশুড়ি কেউ মেনে নেয়নি ওদের।

তারপর আমি অনেক কষ্টের পর ওদের মিল করিয়ে দিয়েছি। সেই সময়টায় আমায় অনেক ভালো বাসতো আমার শাশুড়ি মা আর ননদীনি। কিন্তু যখনই ওদের সব কিছু মিটমাট হয়ে গেলো তখনি ওদের ভালবাসাও পরিবর্তন হয়ে গেলো বাজে আচরণে।

আমার ছেলেটা বড় হয়েছে ও এখন অনেক কিছুই বোঝে। যখন রাজু আমার গায়ে হাত তোলে তখন ছেলেটা আমায় জরিয়ে ধরে কাঁদে। রাজু যখন আমার মাইর দিয়ে চলে যায় আর আমি বসে বসে কাঁদি তখন ছেলেটা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমার সাথে কান্না করে। তখন আমার মনে হয় কলিজাটা যেনো ছিরে যাচ্ছে।

ছেলেটাকে মাদ্রাসায় দেওয়ার সময়ও হয়ে গেছে। আমার অনেক আগে থেকেই শখ ছিলো ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াবো। কিন্তু আমার শশুড়বাড়ির কেউ চায় না মাদ্রাসায় পড়ুক। তারা শুধু স্কুল চেনে।

তাই বাদ্ধ হয়ে স্কুলেই ভর্তি করে দিয়েছি।
কিন্তু আমার সব থেকে কষ্টের বিষয় হলো। ছেলেটাকেও কখনো মন ভরে কিছু কিনে দিতে পারি না। অনেক কষ্ট হয় তখন।

এই ৫ বছরে বদলে গেছে আমার আম্মু আব্বুও। তারাও আর আগের মতোন ভালবাসে না আমায়। তাদের কাছেও যেনো বোঝা হয়ে গেছি এখন।

একবার রাজুর মাইর খেয়ে আর শাশুড়ি ননদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমি ইসমাঈল কে নিয়ে আব্বু আম্মুর কাছে চলে যাই। কিন্তু সেই যাওয়াটাই ছিলো আমার সব চাইতে বড় ভুল।

আমি যখন আব্বু আম্মুর বাসায় গিয়ে বলি রাজু আমায় মারধর করেছে। আমি সেখানে থাকতে চাই কিছুদিন। তখন আমার আব্বু আম্মু আমায় বলে

~ এখন তোর বিয়ে হয়েছে বাচ্চা হয়েছে এখন ঐ বাড়িই তোর সব। আমরা এখন তোর পর। আর স্বামী একটু আকটু মারতেই পারে তার সেই অধিকার আছে। তাই বলে তুই এখানে থাকতে চলে আসবি।

সেদিন আব্বু আম্মু আমার কোনো কথাই শোনেনি। আমার সাথে এমন আচরণ করেছিলো যে মনে হয়েছিল আমি যেনো তাদের কাছে অনেক বড় বোঝা। তাই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আবার ফিরে আসি রাজুর কাছে। আর তখনই শুনতে হয় আরো বাজে বাজে খোটা দেওয়া কথা।

রাজু বলে
~ কি হলো মহারানী বাপের বাড়ি থেকে চলে এলো কেনো। থাকতে পারলো না দুদিনও। যা চলে যা কেনো ফিরে এলি।
শাশুড়ি বললো

~ উউউউ তেজ দেখে বাচিনা। আমার ছেলে একটু কি বলেছে না বলেছে ওমনি চলে গেলো বাপের বাড়ি। কেনো জায়গা হোলো না বাপের বাড়িতে যে আজকেই ফিরে আসতে হলো। ঢং দেখে বাচিনা বাপু
আমি ওনাদের কথার উত্তরে সেদিন কিছুই বলতে পারিনি শুধু চোখের পানি ফেলে ছেলেকে বুকে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম নিজের রুমে।

তারপর থেকে আমি আর আব্বু আম্মুর কাছে যাই না। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। আমি তাদের সাথে এমন ভাবে কথা বলি যে তারা জানে আমি অনেক সুখে আছি।

তারা যেমন আছে থাকনা তেমনই সুখে শুধু শুধু আমার কষ্টের কথা বলে তাদের কেনই বা কষ্ট দিবো।
আজকে হঠাৎ করে রাজু যেনো কোথায় থেকে অনেক রাগি লুক নিয়ে বাসায় আসলো। আমি ওনার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম

~ কি হয়েছে আপনার। কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? মুখ এমন দেখাচ্ছে কেনো?
আমার কথার উত্তরে উনি অনেক রেগে গিয়ে আমায় সজোরে একটা থাপ্পড় মারলেন তারপর বললেন

~ তোর জন্য হ্যা তোর জন্য আজকে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তোকে যদি বিয়ে না করতাম তাহলে আজ আমায় এই দিন দেখতে হতো না।
আমি অবাক হয়ে ওনাকে জিগ্যেস করলাম

~ কি করেছি আমি আপনি কেনো এমন বলছেন?
~ তোকে বিয়ে করেছি বলেই আমি আমার মার্জিয়াকে হারিয়েছি। তোকে বিয়ে না করলে আজ ঠিকি আমি মার্জিয়াকে পেতাম।

এই বলেই আমায় আরও কয়েকটা মাইর দিয়ে উনি হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর আমি পরে রইলাম সেখানেই। চোখের জল যেনো আর বাধ মানছে না।

অনেক কাদলাম আমি। জানিনা উনি কেনো আমার সাথে এখন এমন করলেন। কি ভুল করেছি আমি। এদিকে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যাওয়ারও সময় হয়ে গেলো। তাই উঠে হাত মুখে পানি দিয়ে বোরখা পরে বের হলাম ইসমাঈলকে আনতে।

দুপুরে নামাজ পরে খাওয়া দাওয়ার পর ইসমাঈলকে ঘুম পারিয়ে বসে আছি ওর পাশে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছে নানা রকম কষ্টে। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এসেছে। তাই দুই বার বাজার পরেও কলটা রিসিভ করলাম না। কিন্তু ৩ বারের বেলায় রিসিভ করলাম

~ আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। কেমন আছো?


পর্ব ৩৩

~ আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
~ ওয়ালাইকুুমুসসালাম। কেমন আছো?

~ কে? আফসিয়া তুমি? এতো দিন পর বুঝি এই বৃষ্টি আপুর কথা মনে পরেছে তোমার?
~এই বৃষ্টি আপু কি বলো তুমি হ্যা তোমাকে কি আমি ভুলতে পারি নাকি গো। সব সময়ই তোমার কথা মনে পরেছে আমার। কিন্তু পড়াশোনার চাপে কথা বলতে পারিনি। এখন থেকে কথা বলে বলে তোমায় জ্বালিয়ে খাবো হুমম। এটা আমার নাম্বার সেভ করে রাখো।

~ হ্যা বুঝলাম। এবার বলো কেমন আছো তুমি আমার দুষ্টু মিষ্টি বোনটা?
~ এই তো ভালো আছি আপু। তুমি কেমন আছো? আর আমার ভাগিনাটা কেমন আছে?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে ও। তুমি এখন কোথায়?

~ বৃষ্টি আপু আমি তো এখন হস্টেলে শম্মিদের বাসার কাছেই।
~ শম্মি মানে কোন শম্মির কথা বলছো?

~ আরে আপু আমাদের শম্মি শ্রাবন ভাইয়ের বোন। পারুল আন্টির মেয়ে।
শ্রাবনের নামটা শুনতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। তারপর আমি আফসিয়াকে জিগ্যেস করলাম
~ তুমি পারুল খালামনিদের ওখানে কি করো? আর হস্টেলে কেনো?

~ আরে আপু তুমি জানোনা আমি এখানকার কলেজে ভর্তি হয়েছি। আর শ্রাবন ভাইয়ার বৌ জোনাকি ভাবিও আমার সাথে একি কলেজেই পড়ে। আমরা একসাথে কলেজে যাওয়া আসা করি বস সময়।

~ আফসিয়া তুমি জোনাকি ভাবিকে দেখেছো? কেমন দেখতে গো ওকে? আর খালামনিদের বাসার সবাই কেমন আছেন?

~ হ্যা আপু আমি তো সব সময়ই জোনাকি ভাবির সাথেই থাকি বেশি। জোনাকি ভাবিকে দেখতে মোটামুটি ভালই। আর শ্রাবন ভাই দের বাসার সবাইও অনেক ভালো আছে। এখন বলো তোমার কি খবর তুমি কেমন আছো? আর দুলাভাই কেমন আছে? দুলাভাই তোমায় অনেক ভালবাসে তাই না আপু? তুমি যা সুন্দরী ভালবাসতে বাদ্ধ।

আফসিয়ার কথা শুনে আমার দুচোখ বেয়ে পানি পরতে লাগলো। ভালবাসা হুহহ সেটা আবার কি? আমার জীবনে তো ভালবাসা বলে কিছু নেই। তবুও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে আফসিয়া কে বললাম
~ হুমম আছি আল্লাহর রহমতে তিনি যেমন রাখছেন তেমন। আর বাসার সবাইও ভালো আছে।

~ এই আপু তোমার গলা এমন শোনা যাচ্ছে কেনো বলোতো? তুমি কাঁদছো কেনো? কি হয়েছে তোমার? সব ঠিক আছে তো?
~ ক কোই কাঁদছি নাতো। আরে পাগলি কাঁদবো কেনো এই দেখ আমি তো হাসছি। আর ঠান্ডা লেগেছিল তাই হয়তো গলাটা ধরা ধরা শোনা যাচ্ছে। ও কিছু না।

~ আপু তুমি আমার কাছে থেকে কথা লুকাচ্ছো? আমি বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা। আমি কি তোমার এতই পর হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকেও সত্যি টা বলছো না?
আফসিয়ার কথা শুনে আমি আর কান্নাটাকে ধরে রাখতে পারলাম না। আফসিয়া আমায় অনেক ভালবাসে আর ও আমার সব থেকে কাছের বন্ধুও ছিলো।

আমার জীবনের সব কথা সপ্ন আশা সব কিছু শেয়ার করতাম ওর সাথে। তাই আর সহ্য করতে পারলাম না। হো হো করে কাঁদতে লাগলাম। আমায় এভাবে কাঁদতে শুনে আফসিয়াও আমার সাথে কাদতে লাগলো। তারপর আমায় সব কিছু বলতে বললো।

আমি আর কিছু লুকালাম না ওর কাছে প্রথম থেকে শুরু করে শেষে পর্যন্ত সব কিছু খুলে বললাম ওকে।
আমার সব কথা শুনে আফসিয়া তো রাজুর ওপর রাগে ফোসতে লাগলো। আর সাথে আব্বু আম্মুকে গালাগাল দিতে লাগলো। তারপর আমায় বললো

~ আপু তুমি এতটা কষ্ট করেছো এই ৫~৬ টা বছর অথচ একটা বারও আমায় জানাও নি? আর মামা মামিও কি করে এসব জেনেও চুপ করে থাকে। আর তুমি দুলাভাইকে কিছু বলো না কেনো? এভাবে কি কষ্ট নিয়ে মরতে চাও নাকি। ( কথাগুলো আফসিয়া কান্না জরিত কন্ঠে রাগে বললো)

আমি আফসিয়ার শুনে কান্না থামিয়ে ওকে বললাম
~ আফসিয়া বোন আমার আমি জানি তুমি আমায় অনেক ভালবাসো তাই আমার কষ্টের কথা গুলো শুনে এভাবে কাদছো আর কষ্ট পাচ্ছো।

কিন্তু আমি ধৈর্য্য ধরতে জানি আর ধৈর্য্যের ফল আমি একদিন না একদিন পাবোই ইনশাআল্লাহ। তাই তুমি কষ্ট পেওনা আর আমার কথা কাওকে বলো না প্লিজ। আমি চাইনা আমার সংসারের ব্যাপারে কেউ জানুক। প্লিজ বোন আমার কথা দাও কাওকে আমার ব্যাপারে কিছু বলবে না?
~ ঠিক আছে বলবো না। কিন্তু তুমি আগে বলো আর এমন অত্যাচার সহ্য করবে না। আর আমায় সব কিছু বলবা কিন্তু?

~ আচ্ছা তাই হবে আমার দাদি। এখন রাখি আমার একটু কাজ আছে পরে কথা হবে আল্লাহ হাফেজ।
~ ওকে আল্লাহ হাফেজ ভালো থেকো আপু।
~ হুমম তুমিও ভালো থেকো। আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম।

তারপর ফোনটা রেখে আমি কান্নায় ভেঙে পরলাম। অনেক দিন পর আফসিয়ার সাথে মনের কথা শেয়ার করে কষ্টটা একটু হালকা লাগছে ঠিকি। কিন্তু কেমন যেনো একটা বেদনার অনুভুতি হচ্ছে বুকের মাঝে। 😣😣
তারপর আসরের আজান হলে নামাজ পড়ে নিলাম।

তারপর রাতের রান্না করতে রান্না ঘরে গেলাম। শাশুড়ি মায়ের খোটা দেওয়া কথা তো সব সময় আছেই। রাতের রান্না শেষ করে বসে রইলাম রাজুর অপেক্ষায়।
রাত ১২.০০ বাজতে চললো কিন্তু রাজুর আসার নাম নেই বার বার কল দিলাম তবুও ফোনে পাচ্ছি না। খুব চিন্তা হতে লাগলো আমার। রাজুর জন্যে বসে থেকে থেকে রাত ১.০০ বেজে গেলো তখন আমি বসে বসে প্রাই ঘুমিয়ে গেছি। হঠাৎ ডোরবেল এর শব্দে আমার ঘুম ভাঙলো।

তারাতারি উঠতে গিয়ে পরে গিয়ে হাতে অনেক ব্যাথা পেলাম। কিছুটা কেটেও গেলো। তবুও তারাতারি উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম।


পর্ব ৩৪

তারাতারি উঠতে গিয়ে পরে গিয়ে হাতে অনেক ব্যাথা পেলাম। কিছুটা কেটেও গেলো। তবুও তারাতারি উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম।

তারপর দেখি উনি দারিয়ে আছেন আর আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। রাগে ওনার চোখ দিয়ে যেনো আগুন বের হচ্ছে।
আমি ওনার এমন চাহনি দেখে ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেলাম। আর ওমনি উনি ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে আমায় অনেক জোরে একটা থাপ্পড় মারলো।

ওনার আচমকা এমন থাপ্পড় খেয়ে আমি তাল সামলাতে না পেরে চিৎকার দিয়ে নিচে পরে গেলাম। আমার চিৎকার শুনে আমার শশুড় মশাই উঠে এলেন। এসে দেখেন রাজু আমায় আরো মারার জন্যে এগিয়ে আসছে। ওমনি আমার শশুড় মশাই এসে রাজুকে একটা চর মারলো তারপর বললো

~ রাজু আর একবার যদি তুই বৃষ্টি মায়ের গায়ে হাত তুলবি তাহলে তোর হাত আমি কেটে ফেলবো বলে দিলাম। কি পেয়েছিস কি তোরা বৃষ্টিও তো একটা মানুষ নাকি? সব সময় মেয়েটার ওপর এমন অত্যাচার করেই চলেছিস তোরা মা ছেলে মিলে। বৃষ্টির মতো ভালো মেয়ে দেখেই এখনো তোর সংসার করছে। অন্য কেউ হলে কবেই সংসারের কপালে লাথি দিয়ে চলে যেতো।

ছিঃ আমার ভাবতেও ঘৃণা হয় আমি তোর মতো একটা কুলাঙ্গার ছেলেকে জন্ম দিয়েছি। এতো দিন কিছু বলিনি বলে কি ভেবেছিস যা নয় তাই করবি? তা আর হবে না এখন থেকে বৃষ্টি মায়ের সাথে আর কখনো খারাপ আচরণ করে দেখিস আমি কি করি।
আমার শশুড় মশাই এর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আমার শাশুড়ি মা এসে বললো

~ কি হয়েছে কি এতো রাতে হুমম। এটাতো একটা ভদ্র লোকের পারা নাকি। আর এইযে তুমি কি শুরু করেছো হুমম ওরা স্বামী স্ত্রী যা খুশি করুক গে তুমি কেনো ওদের মাঝখানে কথা বলছো?

~ আমি কথা বলবো না মানে তোমার এই কুলাঙ্গার ছেলে এতোরাত করে বাড়ি ফিরে বৌ কে মারবে আর আমি বাবা হয়ে তা চেয়ে চেয়ে দেখবো?

~ রাজু বৃষ্টির স্বামী ও বৃষ্টি কে মারুক কাটুক তাতে ওর অধিকার আছে তুমি কেনো শুধু শুধু ওদের মাঝে কথা বলছো? চলো ঘরে চলো বলছি?

এই কথা গুলো বলেই শাশুড়ি মা আমার শশুড় মশাইকে হাত ধরে টানতে লাগলেন। আর ওমনি আমার শশুড় মশাই সজোরে একটা থাপ্পড় মারলেন আমার শাশুড়ি কে। আর ওমনি রাজু গিয়ে শাশুড়ি মাকে ধরে আমার শশুড় মশাই কে বললো

~ বাবা তুমি আম্মুকে কেনো মারছো? কি করেছে আম্মু? সব কিছু এই শয়তান মেয়েটার জন্যে ওকে আজ আমি মেরেই ফেলবো।
~ খবরদার আর একপা যদি সামনে এগুবি রাজু তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।

এতোদিন আমি কিছু বলিনি দেখে তোরা মেয়েটার সাথে যা নয় তা আচরণ করবি তা আর আমি হতে দিবো না। এখন থেকে বৃষ্টি মায়ের সাথে আমি আছি তোরা যদি বেশি বুঝবি তাহলে ঘার ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিবো তোদের। মনে রাখিস এই বাড়িটা কিন্তু আমার।

~ তুমি ঐ শয়তান মেয়েটার জন্যে আমার গায়ে হাত তুললে। আবার আমাদের বাড়ি ছেড়ে বের করে দিবে বলছো? আমাদের চেয়ে ঐ মেয়েটাই তোমাদের কাছে বেশি হয়ে গেলো? (শাশুড়ি মা)

~ হ্যাঁ এখন থেকে আমি ওর বাবা। আর ওর সাথে যদি তোমরা কেউ একটুও বাজে আচরণ করো তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম।

বৃষ্টি মা তুই এভাবে শুয়ে আছিস কেনো? ওঠ মা তোর আর কোনো ভয় নেই আমি আছি তোর সাথে দেখি কার সাহস হয় এখন থেকে তোর গায়ে হাত তোলার? কি হলো ওঠ মা বৃষ্টি।

অনেকবার ডাকার পরেও যখন আমি উঠছিনা দেখলেন তখন আমার কাছে গিয়ে বসে দেখেন আমার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে আর আমার জ্ঞান নেই। ওমনি শশুড় মশাই রাজুকে ডেকে তারাতারি আমার তুলে খাটে শোয়াতে বলেন।
তারপর আমার কপালে ব্যান্ডেজ করে মুখে পানি ছেটালে আমার জ্ঞান আসে। এতক্ষণ কি হয়েছে আমি কিছুই জানি না। তারপর কেউ কোনো কিছু না বলে যার যার মতো রুমে গিয়ে শুয়ে পরে। আমিও ঘুমিয়ে পরি। 😴😴
সকালকে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ি তারপর ওনাকে ডেকে মসজিদে যেতে বলি উনিও বাদ্ধ ছেলের মতো কিছু না বলে মসজিদে চলে যায়।

এটা দেখে আমার অনেক ভালো লাগে। তারপর আমি শাশুড়ি মায়ের সাথে কাজে যোগ দেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আজকে শাশুড়ি মা আমার সাথে অনেক সুন্দর আচরণ করছে। যেনো আমি ওনার মেয়ে। আমার এতটা ভালো লাগছে যে বলে বোঝাতে পারবো না।

তারপর আমি সকালের নাস্তা রেডি করে রাজুকে খেতে দিলাম। ও খাওয়া দাওয়া শেষ করে অফিসে যাওয়ার সময় আমার বলে গেলো। এই প্রথম এমনটা হলো। আমার বড্ড বেশি খুসি লাগছে। সাথে আশ্চর্যও হচ্ছি। আমার শশুড় মশাই দেখি মুচকি মুচকি হাসছে শুধু। আমার কাছে এসে আমার মাথায় হাত রেখে বললো

~ মা রে তুই দেখিস তুই অনেক সুখি হবি। তোর আর কোনো চিন্তা নাই আমি আছি তোর পাসে।
আমি কিছুই বুঝলাম না তবে মনটা অনেক ভালো লাগছে। তারপর ইসমাঈলের স্কুলের সময় হলে ওকে খাইয়ে রেডি করে স্কুলে নিয়ে রেখে স্কুলের বাইরে বসে রইলাম। আর তখনই ফোনটা বেজে উঠলো।

নাম্বারটা আমার চিরচেনা শ্রাবন ভাই এর নাম্বার। সেভ করা নেই কিন্তু আমার মনে তো সেভ আছেই। নাম্বারটা দেখেই আমার বুকের বাম পাসটায় চিনচিন ব্যাথা অনুভব হতে লাগলো। তবুও আমি নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে কল রিসিভ করে না চেনার ভান করে বললাম
~ আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

~ ওয়ালাইকুুমুসসালাম। আমি শ্রাবন বলছি। কেমন আছিস বৃষ্টি?
কন্ঠটা শুনে যেনো আমার হৃদস্পন্দন এক মুহুর্তের জন্যে থেমে গেলো। তারপর আমি কাপা কাপা কন্ঠে বললাম।

~ আ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই কেমন আছিস ভাইয়া? আর জোনাকি ভাবি কেমন আছে? শম্মি খালামনি ওরা কেমন আছে?

~ সবাই ভালো আছে। আগে তুই বল বৃষ্টি তুই কেমন আছিস? সত্যিই করে বলবি আমায় কোনো মিথ্যা বলবি না।
~ আরে বললাম তো ভালো আছি। মিথ্যে কেনো বলবো? আর তোর কেনো মনে হচ্ছে আমি মিথ্যে বলছি?
~ আমি জানি তুই ভালো নেই। ঐ রাজু তোকে এখনো মারে তাই না? খারাপ ব্যাবহার করে তোর সাথে? বল বৃষ্টি প্লিজ সত্যিটা বল আমায়? তোকে আমার কসম দিলাম তুই আমায় সব সত্যিই কথা বলবি নইলে আমার মরা মুখ দেখবি।

শ্রাবনের মুখে এমন কথা শুনে আমি একদম স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। কি বলবো এখন আমি? এখনতো মিথ্যে বলাও সম্ভব না। আমি যে ওকে বড্ড বেশি ভালবাসি। আমি কি করে ওর কসম দেওয়া সত্যেও মিথ্যা কথা বলবো ওকে?

আমায় চুপ করে থাকতে দেখে শ্রাবন ভাই আবার বললো
~ কি হলো বৃষ্টি বল আমায় সব সত্যি কথা বল বলছি?
~ তারপর আমি আর কোনো উপায় না দেখে সব কিছু বললাম শ্রাবন ভাইকে। ও আমার মুখে সব শোনার পর। প্রচন্ড রাগ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো

~ আমি খুন করে ফেলবো ঐ রাজুকে। ওর সাহস কি করে হয় আমার বৃষ্টিকে কষ্ট দেওয়ার। যে হাত দিয়ে ও আমার ভালবাসাকে মেরেছে সেই হাত আমি কেটে ফেলবো।
~ ঐ কি বলছিস তুই এমন আবল তাবল। রাজু আমার স্বামী ও আমায় মারতেই পারে। তাতে তোর কি তুই কেনো এমন কথা বলছিস?

~ না ও তোকে মারতে পারে না। তুই আমার জান। আমার জানের গায়ে যে হাত দিবে তার হাত আমি কেটে নিবো। এতদিন শুধুমাত্র তোর আর খালামনির কথায় আমি তোর থেকে দুরে সরে থেকেছি। কিন্তু একটা মুহূর্তের জন্যেও তোকে ভুলে থাকতে পারিনি।

তুই আমার নিশ্বাসের সাথে মিশে ছিলি সব সময়। আমি জানতাম তুই অনেক সুখে আছিস স্বামী সন্তান নিয়ে। তাই কখনো তোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি। খালামনি আমায় বলেছিলো। যেনো এমন কিছু করি যে তুই আমায় ভুলে যাস। তাই না চাওয়া সত্যেও বাদ্ধ হয়ে জোনাকিকে বিয়ে করেছি।

তোর থেকে দুরে সরে থেকেছি। কিন্তু তাতে লাভ টা হলো কি। তুই এতো কষ্টে আছিস জানলে আমি কবেই তোকে আমার কাছে নিয়ে আসতাম। আমি তোকে বিয়ে করবো বৃষ্টি। হ্যা আমি তোকে বিয়ে করবো। পৃথিবীর সব সুখ এনে দেবো তোর পায়ের কাছে। আমার বুকের সব ভালবাসা দিয়ে ভরে দিবো তোর জীবন।

~ ছি ছি থাম বলছি থাম। এসব শোনাও পাপ। আমার বিয়ে হয়ে গেছে আর মেয়েদের জীবনে বিয়ে একবারই হয়। আমার একটা সুন্দর সংসার আছে একটা ফুটফুটে রাজপুত্রের মতো ছেলে আছে। আমি আগেই যখন তোর প্রস্তাবে রাজি হইনি। তুই কি করে ভাবলি আমি এখন তোকে বিয়ে করতে রাজি হবো?

আমার মনে তোর জন্যে কোনো ভালবাসা নাই। আমি শুধু আমার স্বামী রাজুকেই ভালবাসি। ও যেমনই হোক ও আমার স্বামী। আর তাছারা ও হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। ও ভাল হয়ে গেছে। আমায় আর কখনো কল দিবি না তুই।

কোনোদিন আমার সামনে আসবি না। জোনাকিকে ভালবাসিস ওকে কখনো কষ্ট দিস না। আর আমায় যদি সত্যিই কখনো ভালো বেসে থাকিস তাহলে জোনাকির মাঝে আমায় খুজে নিস। ওকে সুখে রাখিস। আল্লাহ হাফেজ। ভালো থাকিস।

এই কথা গুলো বলেই ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে দিয়ে বন্ধ করে দিলাম।
বুকটা যেনো ফেটে যাচ্ছে। অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে আমার। ভালবাসায় কেনো এতো কষ্ট?


পর্ব ৩৫

বুকটা ফেটে যাচ্ছে আমার। দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পরছে। ভালবাসায় কেনো এতো কষ্ট?
তারপর ইসমাঈলের ছুটির সময় হয়েছে দেখে নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত করার চেষ্টা করলাম। তারপর ইসমাঈলকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম।

আমার কেনো জানি না মনে হচ্ছে আফসিয়া শ্রাবন কে আমার কথা বলেছে। নইলে এতদিন কিছুই না হঠাৎ আজ কেনো ফোন করে এসব বললো শ্রাবন? তাই সব কাজ শেষ করে ইসমাঈলকে ঘুম পারিয়ে আফসিয়াকে কল দিলাম
~ আসসালামু আলাইকুম।

~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। হ্যা বৃষ্টি আপু বলো। কেমন আছো তুমি?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
~ আফসিয়া তুমি এখন কোথায়?

~ বৃষ্টি আপু আমি তো এখন জোনাকি ভাবির সাথে আছি ঐ একটা নোটস নিতে এসেছি। কেনো কিছু বলবে?
~ না কিছু না। জোনাকি ভাবি কি তোমার পাশেই আছে?
~ হ্যা আপু ভাবি আমার পাশেই বসে আছে। কথা বলবে ভাবির সাথে?
~ হ্যা দাও তো কথা বলি।

~ আচ্ছা ধরো আমি দিচ্ছি। জোনাকি ভাবি বৃষ্টি আপু তোমার সাথে কথা বলবে এই নাও।
~ আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন বৃষ্টি আপু?
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো ভাবি?
~ এই তো ভালই আছি।

~ বাসার সবাই কেমন আছেন। শম্মি খালামনি?
~ হ্যা ওরাও ভালই আছে। তোমার বাসার সবাই কেমন আছেন?
~ হ্যা আলহামদুলিল্লাহ সবাই আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

জানো ভাবি তোমাকে দেখার আমার খুব শখ। চলে আসো আমাদের বাড়িতে। তোমার বিয়েতে তো যাওয়া হয়নি তাই দেখাও হয়নি।
~ হুমম যাবো যখন সময় হয়। এখন তো পড়াশোনা নিয়ে অনেক বিজি থাকি তাই কোথাও যাওয়ার সময় নাই। তুমি আসো আমাদের এখানে।

~ আমি কি করে যাই বলোতো ইসমাঈলের স্কুল শুরু হয়ে আর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই আমার।
~ হ্যা বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা বৃষ্টি আপু পরে কথা হবে। আমি তোমায় কল দিবনি। এখন বাই। আফসিয়ার সাথে কথা বলো।

~ আচ্ছা ভাবি। আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম।
~ হ্যালো আপু। হ্যা বলো কি বলবে?

~ আফসিয়া জোনাকি ভাবি কি চলে গেছে?
~ একমিনিট আপু ওয়েট।
~ আচ্ছা।
~ হ্যা আপু এবার বলো ভাবি চলে গেছে। আপু তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না। জোনাকি ভাবি একটু অহংকারি। আর একটু দেমাগিও বটে।

~ হ্যা আমি বুঝতে পেরেছি সমস্যা নাই।
~ আচ্ছা ঠিক আছে এবার বলো কেনো ফোন দিয়েছো কি দরকার?

~ আচ্ছা আফাসিয়া একটা কথা বলো তো। কাল যখন তুমি আমার সাথে কথা বলছিলে তার পর কি আমার ব্যাপারে কাওকে কিছু বলেছো? সত্যি করে বলবে?
~ আপু তুমি আমায় নিষেধ করেছো তোমার ব্যাপারে কাওকে কিছু বলতে তাই আমি বলিনি তবে….
~ তবে কি বলো?

~ তবে তোমার সাথে কথা বলার পর ফোন কেটে দিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি শ্রাবন ভাই দারিয়ে আছে। তারপর শ্রাবন ভাই আমায় জিগ্যেস করলো কার সাথে কথা বলছি লাম। আমি বললাম তোমার কথা। তখন জিগ্যেস করলো কেমন আছো তুমি। তুমি বলতে নিষেধ করেছো দেখে আমি বললাম বৃষ্টি আপু ভালো আছে। তখন শ্রাবন ভাই আর কিছু না বলে চলে যায়।

তাছারা তো কারো সাথে আমার হয়নি। কেনো কি হয়েছে আপু?
~ না কিছু না এমনিই জিগ্যেস করলাম। আচ্ছা আফসিয়া আপুমনি তুমি এখন পড় তোমার পড়ায় ডিস্টার্ব করলাম। পরে কথা হবে কেমন। আল্লাহ হাফেজ।

~ সমস্যা নাই আপু তোমার জন্য আমার সব সময় সময় আছে। আল্লাহ হাফেজ। ভালো থেকো।
~ হুমম তুমিও ভালো থেকো। আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুমুসসালাম।

তারপর আমি ফোন কেটে দিলাম। আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি শ্রাবন হয়তো আফসিয়ার সাথে কথা বলার সময় কিছু শুনেছিল তাই আমায় ফোন দিয়ে ওসব বললো তখন। শ্রাবনের ভালবাসাটা একদম খাটি ওর ভালবাসায় কোনো খাদ নেই।
কিন্তু আমি যে চাইলেও ওর ভালবাসা গ্রহন করতে পারবো না।

তারপর আসরের আজান হলে আমি ওজু করে নামাজ পড়ে নিলাম। তারপর রাতের রান্না করতে রান্না ঘরে গেলাম। আমার শাশুড়ি মা আজ খুব ভালো আচরণ করছেন আমার সাথে।

এভাবেই কেটে গেলো আরো দুটি বছর। এই দুই বছরে আমার শাশুড়ি মা আর রাজু দুজনেই আমার সাথে খুব একটা খারাপ ব্যাবহার করে নি। জানি না কেনো সেই রাতের মারের পর থেকে রাজু আর আমার শাশুড়ি মায়ের আচরণ ভালো হয়ে গেছে।

এই দুই বছরে শ্রাবন অনেক চেষ্টা করেছে আমার সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু আমি কখনো ওকে প্রশ্রয় দেইনি। সব সময় হাজার কষ্ট হওয়া সত্যেও ওকে অবহেলা করেছি। যাতে শ্রাবন আমায় ভুলে যায়।
এই দুই বছরে আমি রাজুকেও ভালবেসে ফেলেছি একটু হলেও।

আমার ইসমাঈলও এই দুই বছরে অনেক বড় হয়ে গেছে। ও এখন ক্লাস টু এ পড়ে। অনেক বুদ্ধি হয়েছে ওর। আমায় অসম্ভব ভালো বাসে আমার ছেলেটা। আমার সারা পৃথিবীর সুখ আমি আমার ছেলের মাঝে খুজে পাই। ইসমাঈলের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব করতে পারি।

আজ আমার ইসমাঈলের ৭ বছর পুর্ন হলো। ওর জন্যে আমি পায়েস রান্না করেছি। আমার ছেলেটা পায়েস খেতে ভালো বাসে।
আমার শশুড় মশাই অনেক খুশি। নাতি যেনো তার প্রান।

ইসমাঈল আর আমার শশুড় মশাইকে একসাথে খেতে দিলাম। ওনারা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ কোথা থেকে যেনো একটা ফোন এলো আমার শশুড় মশাই এর। উনি ফোনটা রিসিভ করে একটু কথা বলেই হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে নিচে পরে গেলেন।

আমি দৌড়ে গিয়ে শশুড় মশাই কে ধরলাম তারপর চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগলাম।
আমার শাশুড়ি রাজু দুজনে এসে শশুড় মশাইকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন তারপর ডাক্তারকে ফোন করে সব বললেন। ডাক্তার মশাই সব শুনে ওনাকে তারাতারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন।

রাজু একটা ওটো ডেকে তারাতারি শশুড় মশাই কে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
ডাক্তার ওনাকে দেখে বললেন ওনার হার্ট এটাক হয়েছে। তারাতারি একটা অপারেশন করতে হবে। নইলে ওনাকে বাচানো যাবে না।

তারপর আমরা সবাই অপারেশনের জন্যে রাজি হলাম। রাজু কিছু কাগজে শই করে দিলো।
বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো।
দীর্ঘ ২ ঘন্টা পর ডাক্তার বের হলো অপারেশন থিয়েটার থেকে। রাজু দৌড়ে গিয়ে জিগ্যেস করলো বাবার কি অবস্থা?


পর্ব ৩৬

দীর্ঘ ২ ঘন্টা পর ডাক্তার বের হলো অপারেশন থিয়েটার থেকে। রাজু দৌড়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলো বাবার কি অবস্থা?
ডাক্তার মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো

~ I am so sorry মিস্টার রাজু আমরা অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু আপনার বাবার অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল ছিলো তাই আমাদের কিছু করার ছিলো না। হি ইজ ডেড।
ডাক্তারের এমন কথা শুনে পুরো হাসপাতাল জুরে যেনো কান্নার রোল পরে গেলো।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো বাবাকে। আমার যেনো সব কিছু কেমন সপ্নের মতো লাগছে। আমি এখনো বিশ্বাসই করতে পারছি না আমার শশুড় বাবা মারা গেছেন। উনি আমার কাছে নিজের বাবার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না।

আমাকে উনি নিজের মেয়ের মতই ভালবাসতেন। এই বাড়িতে আমার দুঃখের সময়ের সাথী যদি কেউ থেকে থাকেন তাহলে সে ছিলেন আমার শশুড় মশাই। উনি সব সময় আমায় সাহস জোগাতেন। আমার কাছে উনি ছিলেন মাথার ওপর স্নেহের ছায়ার মতন। ওনার মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।

আমি যেনো পাথর হয়ে গেছি। মুখে কোনো কথা নেই একদম চুপ করে বসে আছি মাটির ওপর। চোখের পানিটাও যেনো বেইমানি করছে।

একটুও বেরুচ্ছে না। আমার ইসমাঈলও কান্না করছে ওর দাদুর মাথার কাছে বসে। দাদুভাই ছিলো ওর একমাত্র খেলার সাথী। বড্ড কষ্ট পাচ্ছে ছেলোটা আমার। শাশুড়ি মা মিম আপু রাজু সবাই কাদছে শুধু আমার চোখে পানি নেই। পাথরের মুর্তির মতো বসে রয়েছি।

আমাদের এক প্রতিবেশী জানতেন আমার কথা। আমার শশুড় মশাইকে আমি কতোটা ভালবাসতাম। তিনি আমার এমন চুপ করে থাকা দেখে আমার পাসে এসে বসলেন তারপর বললেন

~ মারে এভাবে বসে থাকিস না। একটু কান্না কর দম বন্ধ হয়ে মরে যাবি তো। একটু কান্না কররে মা।
ওনার কোনো কথাই যেনো আমার কানে যাচ্ছে না। আমি সেই আগের মতই চুপ করে বসে আছি।

তারপর ঐ মহিলাটা আমায় জোরে ধাক্কা দিয়ে বললেন
~ এই বৃষ্টি মা আমার কথা শুনতে পারছিস না। তোর শশুড় মারা গেছেন রে মা। একটু কান্না কর। ঐ দেখ উনি মারা গেছেন।

ওনার ধাক্কায় আমার হুশ হলো। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বাস্তবে ফিরে এলাম। কান্নায় ভেঙে পরলাম। চোখের পানিতে বুক ভেসে যাচ্ছে। আমার মাথার ওপরের ছায়াটা যেনো হারিয়ে গেলো চিরদিনের মতো।
তারপর আসরের সময় বাবাকে নিয়ে যাওয়া হলো গোরস্থানে কবর দিতে। যাওয়ার সময় আমি শাশুড়ি মা আর ননদিনি আমরা পাগলের মতো হাওমাও করে কান্না করছিলাম।

কিন্তু যেটা নিয়ম সেটা তো মানতেই হবে।
শশুড় মশাই মারা গেছেন আজ ১৫ দিন হলো। এখনো মন থেকে একটুও মেনে নিতে পারিনি আমি। আমার এখনো মনে হয় উনি বেচে আছেন। হয়তো অফিসে গেছেন।

রাজু খোজ নিয়ে জানতে পারে সেদিন শশুড় মশাই এর যে ফোনটা এসেছিল সেটা ছিলো কম্পানির একটা বড় লস হওয়ার খবরের ফোন। যে লসটা হয়েছে রাজুর জন্যে। বাবা সেটা সহ্য করতে না পেরে হার্ট এটাক করে মারা গেলেন।

এই ১৫ দিনে আমরা কেউ কারো সাথে তেমন কথা বলিনি খুব প্রয়োজন ছারা।
রাজু এখন অফিসের প্রতি বেশ মনযোগী হয়েছে। মন দিয়ে কাজ করে সব সময়। আমার ননদীনি চলে গেছে শশুড়বাড়ি। শাশুড়ি মা সব সময় মুখ গোমরা করে থাকেন। কারো সাথে কোনো কথা বলেন না।

পুরো সংসারটা সামাল দিতে হচ্ছে আমায়। আমার ছেলেটাও কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। দাদুভাইকে হারানোর ধাক্কাটা এখনো সামালে উঠতে পারেনি।
এভাবেই কেটে গেলো আরো ১ টি মাস। এখান সব কিছুই প্রায় সাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু এখন রাজু আর আমার শাশুড়ি মায়ের আচরণও অনেক পরিবর্তন এসেছে।

রাজু কথায় কথায় আমার গায়ে হাত তোলে। আর শাশুড়ি মায়ের যেনো চোখের কাটা আমি। ছেলেটাকেও খুব একটা ভালবাসেনা এরা।
বড্ডো কষ্ট হয় এদের আচরণ দেখে। মানুষ কি করে এতো পরিবর্তন হতে পারে।

সন্ধ্যায় নামাজ পড়ে ইসমাঈলকে পড়াচ্ছিলাম। বাসায় শুধু আমি আর শাশুড়ি মা ইসমাঈল ছিলাম। হঠাৎ গেইটের শব্দ। আমি দৌড়ে গিয়ে গেইট খুলে দিলাম। খুলতে একটু দেরি হয়েছে। রাজু দরজা খোলার সাথে সাথে। আমায় অনেক বাজে ভাষায় গালি দিয়ে বললো

~ ঐ হারা……… এতক্ষণ সময় লাগে দরজা খুলতে। ঘরের মধ্যে কি করছিলি এতক্ষণ। যে দরজা খুলতে এতো লেট?
ওনার এমন আচরণ দেখে আমি অবাক হয়ে বললাম

~ কি বলেন এসব। আমিতো ইসমাঈলকে পড়াচ্ছিলাম। তাই আসতে একটু দেরি হয়েছে। ছেলেটা বড় হচ্ছে তার সামনে এগুলা কেমন ভাষা আপনার? এখন তো অন্তত নিজের ভাষাগুলোতে লাগাম দেন।
~ কি বলবি তুই? তোর এত্ত বড় সাহস তুই আমার মুখের ওপর কথা বলিস। হারা……, …. আজ তোকে মেরেই ফেলবো।

এই বলেই রাজু আমায় ইচ্ছা মতো মারতে থাকলো। আমি শুধু চিৎকার করে কাদতে লাগলাম। আমার চিৎকার শুনে ইসমাঈল দৌড়ে এসে ওর বাবার সামনে দারিয়ে বললো

~ আব্বু আব্বু আম্মুকে মেরনা। ছারো আব্বু আমার আম্মুকে মেরোনা।
ইসমাঈল আমার জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। তখন রাজু আমায় ছেরে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো।

তখন সব কিছু নিরব হয়ে গেলে আমার শাশুড়ি পাসের রুম থেকে এসে বললো
~ এখানে এত চেচাঁমেচি কিসের শুনি। এই মেয়ে তোমার কি লাজ লজ্জা বলে কিছু নেই। এই ভাবে চেচিয়ে কি মানুষকে জানাতে চাও আমরা তোমায় কষ্ট দেই? কি হয়েছে কি শুনি?

এই রাজু কি হয়েছে হ্যা বলতো আমায়?
~ আর বোলনা আম্মু আমি সেই কখন থেকে গেইটে এসে দারিয়ে আছি। আর মহারানি এতক্ষনে এসে দরজা খুলে দিয়েছেন। আবার আমি বলছি দেখে আমার মুখে মুখে তর্ক করে ওর সাহস কতো। ভেবেছে এতদিন কিছু বলিনি তাই যা নয় তাই করবে আর আমি ওকে কিছু বলবো না।

এতদিন তো শুধু বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। কারন যদি ওকে মারতাম বা কিছু করতাম তাহলে বাবা আমায় এই বাড়ি থেকে বের করে দিতো সেই ভয়ে কিন্তু এখন তোকে কে বাচাবে হুমম এখনতো তোর শশুড়ও নেই।

রাজুর কথার সাথে আমার শাশুড়িও তালে তাল মেলাচ্ছেন। আমি কিছু বলছিনা ইসমাঈলকে বুকে জরিয়ে ধরে কান্না করছি আর ওদের কথা শুনছি। আজকে আমি বুঝতে পারলাম। সেই রাতের পর থেকে রাজু আর আমার শাশুড়ি কেনো এতো ভালো হয়েগিয়েছিল।

আমি তো ভেবেছিলাম ওনারা সত্যিই নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমায় ভসলবাসতে শুরু করেছিলো। কিন্তু আমি পুরোপুরিই ভুল ছিলাম।
আমার শশুড়ের কথা মনে পরে যেনো আরো বেশি কষ্ট হতে লাগলো আমার।

জীবনে হয়তো আর কখনো কোনোদিন সুখের মুখ দেখবো না আমি। কথায় আছে না সবার কপালে সুখ সয়না। আমিও তাদের মধ্যে একজন।
এভাবেই পার হয়ে গেলো আরও ৫ টি বছর…….


পর্ব ৩৭

এভাবেই কেটে গেলো আরও ৫ টি বছর…..
আমার ইসমাঈল টা অনেক বড় হয়ে গেছে সব কিছু বুঝতে শিখেছে। ইসমাঈল এখন ক্লাশ ৮ম পড়ে। আল্লাহর রহমতে ও পড়াশোনায় অনেক ভালো। ছেলেটা আমার, আমার চেয়েও অনেক লম্বা হয়েছে। দেখতেও মাশাআল্লাহ। আমার ছেলেটা যেমন সুন্দর তেমনি ভালো আলহামদুলিল্লাহ। সবাই ওর অনেক সুনাম করে।

এই ৫ বছরে বদলে গেছে সবাই। রাজু এখন আর আগের মতো আমার ওপর অত্যাচার করে না। একটু হলেও আমায় ভালবাসতে শুরু করেছে। আমার শাশুড়ি মাও এখন অনেকটাই বদলে গেছে। এখন আর আগের মতো আমায় সব সময় কথা শোনায় না।

এখন বাবার বাড়িতে গেলে তারাও আর আমায় বোঝা মনে করে না। কারন আমি তো এখন সেখানে যাওয়ার সময়ই পাইনা। সব সময় সংসার নিয়েই ব্যাস থাকি।
আমার ননদীনিও এখন আগের মতো খোচা মেরে কথা বলে না আমায়। যখন আছে ভাবি ভাবি করে মাতিয়ে রাখে। হয়তো নিজের ভুল গুলো বুঝতে পেরেছে।

আমার বড় বোনটাও অনেক সুখে আছে। ওর একটি ছেলে আর একটি মেয়ে হয়েছে তাদের নিয়ে ওর একটা সুন্দর সাজানো সংসার হয়েছে।

আমার ফুফাতো বোন আফসিয়ারও অনেক ভালো একটা ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে। আল্লাহর রহমতে অনেক সুখে আছে ও। আফসিয়ার নাকি বেবি হবে কিছু দিন পর। ওর শশুড়বাড়ির লোক ওকে অনেক ভালবাসে। এখনো কথা হয় মাঝে মাঝে ওর সাথে। মেয়েটা বড্ড ভালবাসে আমায়। আমিও ওকে নিজের বোনের চেয়েও বেশি ভালবাসি।

আর আমার শ্রাবন,
শ্রাবনের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৪ বছর আগে। সেদিনের পর ওর সাথে আমার আর কখনো দেখা বা কথা হয়নি।

সেদিন ছিলো শুক্র বার। আমার বাবার শরীর অনেক খারাপ ছিলো তাই আমি কিছু দিনের জন্যে ইসমাঈল কে নিয়ে বাড়িতে যাই। আমি যাওয়ার পরের দিনই শ্রাবন আসে আমাদের বাড়ি বাবাকে দেখতে। ও একাই এসেছিল। আর কেউ আসতে পারেনি।

আমি ওর চাহনিতে বুঝতাম ও আমায় কতটা পাগলের মতো ভালবাসে। কিন্তু সেই ভালবাসা আমি গ্রহন করতে পারবো না তাই সিদ্ধান্ত নেই শ্রাবনের সাথে আলাদা ভাবে কথা বলবো।

দুপুরে সবাই যার যার রুমে শুয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। আমিও ইসমাঈল কে ঘুম পারাচ্ছিলাম। ইসমাঈল ঘুমালে আমি শ্রাবনকে কল দিয়ে ছাদে ডাকি। ডাকার ৫ মিনিটের মধ্যে শ্রাবন অত্যন্ত আনন্দের সাথে এসে হাজির হয় আমার সামনে। ও হয়তো ভেবেছিল আমি ওকে বিয়ে করতে রাজি হবো।

কিন্তু ওর সব আশা নিরাশা করে দিয়ে আমি ওকে বলতে শুরু করি।
~ শ্রাবন ভাই তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। যে কথাগুলো বলার জন্যেই তোমাকে এখানে ডাকা। আশা করি তুমি আমার কথা গুলো শুনবে আর মানবেও।

~ বলো জান কি কথা বলতে চাও বলো। তোমার কথা শোনার জন্যে আমি সারা দুনিয়ার কথা ভুলে যেতে পারি। তোমাকে যে আমি কতোটা ভালবাসি তা যদি বোঝাতে পারতাম তাহলে হয়তো বুঝতে আমি কেমন আছি তোমায় ছারা। জোনাকিকে আমি বিয়ে করেছি ঠিকি কিন্তু ওকে কখনোই মন থেকে স্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে পারিনি।

আমার জীবনে ভালবাসার নাম বৃষ্টি। যে নাম সরিয়ে কখনো অন্য কোনো নাম আসবে না। বড্ড বেশি ভালবাসি তোমায় জান।

~ প্লিজ শ্রাবন ভাই থামো প্লিজ। এসব কথা শোনার জন্যে আমি তোমায় ডাকিনি। এখন আমি তোমায় যে কথা গুলো বলবো তুমি তা মন দিয়ে শুনবে। আর দয়া করে আমার কথা শেষ হওয়ার আগে কোনো কথা বলবে না প্লিজ।

~ ঠিক আছে জান বলো কি বলতে চাও?
~ শ্রাবন ভাই তুমি প্রথমে আমায় এই জান জান ডাকা বন্ধ করো। আমার এসব শুনতে অসহ্য লাগছে।
~ ঠিকাছে আর বলবো না বলো কি বলবে?

তারপর আমি শ্রাবন ভাইয়ের থেকে অন্য দিকে ঘুরে বলতে শুরু করলাম…
~ একটি মেয়ের যখন একটি ছেলের সাথে বিয়ে হয়। তখন সেই মেয়েদির দুচোখ জুরে হাজারো স্বপ্নের ভির জমে থাকে।

তাদের একটা নতুন জীবন শুরু হয়। মেয়েদের চাওয়াটা কিন্তু বেশি নয়। তারা শুধু চায় স্বামীর একটু আদর ভালবাসা পেতে। চায় নিজের সব ভালবাসা দিয়ে স্বামীর সংসার কে আগলে রাখতে।

সে চায় শশুড় বাড়িতে সকলকে আপন করে নিয়ে সুখের সংসার করতে। কিন্তু যখন সেই মেয়েটা দেখে তার প্রতিটি স্বপ্ন এক এক করে ভেঙে যাচ্ছে তখন সেই মেয়েটি বাচার জন্যে নতুন কোনো স্বপ্নের সন্ধান করে।
ঠিক এমনটাই আমার সাথেও হয়েছিল। বিয়ের সময় হাজারো স্বপ্ন নিয়ে আমি রাজুর ঘরে বৌ হয়ে গিয়েছিলাম বধু বেশে।

কিন্তু সেখানে আমার জন্যে কোনো সপ্ন পুরন তো দুর দুঃস্বপ্নের জাল বোনা ছিলো। যে জালে আমি এতটাই জরিয়ে গিয়েছিলাম যে তার থেকে বেরুনোর জন্যে আমি তোমায় ভালবেসে ফেলি।
আমার ভাঙা স্বপ্ন গুলো তোমায় নিয়ে দেখতে থাকি নতুন করে।

~ হ্যা বৃষ্টি আমি তোমার সব সপ্ন পুরন করবো। পৃথিবীর সব সুখ এনে দিবো তোমার জীবনে। আমার ভালবাসায় ভরিয়ে দিবো তোমায়।
~ প্লিজ থামো শ্রাবন ভাই। আমি তোমায় বলেছি না আমার কথা শেষ হওয়ার আগে কোনো কথা বলবানা!
~ ওহ সরি, ঠিক আছে বলো বৃষ্টি।

~ যখন আমি তোমায় ভালবেসে ছিলাম তখন আমার জীবনে একজন সঙ্গীর অনেক প্রয়োজন ছিলো। তাই সেই সঙ্গী হিসাবে আমি তোমায় বেছে নেই। এখন আমার আর সেই প্রয়োজন টা নেই। তাই তোমার কাছে আমি ক্ষমা চাই। আমায় ভুলে যাও চিরদিনের মতন।

আর জোনাকিও আমার মতো একটা মেয়ে। জোনাকিও আমারই মতো হাজার সপ্ন নিয়ে তোমার ঘরে বৌ হয়ে এসেছে। দয়া করে ওকে কখনো কোনো কষ্ট দিও না।

আমি তোমার বৌ হলে আমায় যেমন ভালবাসতে সুখে রাখতে ঠিক সেই ভাবেই জোনাকিকে ভসলবেসো প্লিজ। ওকে কখনো কষ্ট দিও না। আমি চাই না আমার জন্যে জোনাকি কখনো একটুও কষ্ট পাক।

ওকে অনেক ভালবেসো। কখনো ওর চোখ দিয়ে একফোটা পানিও আসতে দিও না। এখন থেকে মনে কোরো তোমার জীবনে বৃষ্টি নামের কেউ কখনো ছিলো না। আর কোনো দিনো আমার সামনে এসো না প্লিজ। তোমাকে আমার কসম দিলাম তুমি জোনাকিকে নিয়ে অনেক সুখে থাকো।

এই কথা গুলো বলেই আমি পিছনে ঘুরলাম। পিছনে শ্রাবন ভাই এর দিকে তাকিয়ে দেখি ও অঝোর ধারায় কাদছে। খুব ইচ্ছা হলো ওর চোখের পানি মুছে দিতে। ওর চোখে পানি দেখে আমার বুকের ভিতরটা দুমরে মুচরে যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে দুর্বল হলে চলবে না। শ্রাবনের ভালর জন্যে হলেও ওকে আমার কষ্ট দিতেই হবে। তাই আমি একটু কঠোর শুরে বললাম

~ ঐ কি ভেবেছিস কি তুই যে তোর এই ন্যাকা কান্না দেখে আমি গলে যাবো? কখনোই না। তুই যদি আমায় সত্যিই কখনো ভালবেসে থাকিস তাহলে চিরদিনের মতো চলে যা আমার জীবন থেকে আর কখনো ফিরে আসিস না।

আমার কথা গুলো শুনে শ্রাবন আমায় আচমকা অনেক শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরলো। তারপর চোখের পানি ছেরে বলতে লাগলো

~ আমি তোমার সব কথা মেনে নিলাম জান। আজকের পর তুমি না চাইলে আমার এ মুখ কখনোই আর দেখবে না। জোনাকিকেও আমি অনেক সুখে রাখবো কথা দিলাম কিন্তু কখনো কেউ তোমার জায়গাটা নিতে পারবে না।

আজকের পর থেকে তুমি দেখবেনা আর এই শ্রাবনের মুখ। শুনবে না আর এই মুখে তোমার নাম। তবে যদি কখনো কোনো দিন আমার প্রয়োজন পরে তোমার তাহলে আমায় একটিবার খবর দিও আমি ছুটে আসবো তোমার কাছে সারা পৃথিবীকে পিছনে ফেলে।

ভালবাসায় যে এতো কষ্ট আমি আগে বুঝিনি। আর সহ্য করতে পারছিনা আমি। আমি এই মুহুর্তে চলে যাবো তোমার জীবন থেকে চিরদিনের মতো। কিন্তু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তোমায় ভুলতে পারবো না।

শ্রাবনের চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে আমার কাঁধ। পাগলের মতো কাঁদছে শ্রাবন। আমি ওকে থামাতে পারছি না চেষ্টাও করছি না শুধু পাথরের মতো দারিয়ে আছি। আমার মুখে নেই কোনো কথা নেই চোখে পানি। শুধু শুনছি শ্রাবনের বলা কথা গুলো।
তারপর শ্রাবন আমায় ছেরে দিয়ে বললো

~ আমার ক্ষমা করবেন ভুল করে আপনাকে জরিয়ে ধরার জন্যে। ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।
এই কথা গুলো বলেই শ্রাবন চোখের পানি মুছতে মুছতে দৌড়ে চলে যায়।

আর আমি সেখানেই বসে পরি চুপ করে। আজকে যেনো কান্না করার শক্তি টুকুও নেই আমার মাঝে। বুকটা যেনো পুরে পুরে ছাই হয়ে যাচ্ছে কাওকে বোঝাতে পারছি না। সারা পৃথিবী ঘুরপাক খাচ্ছে চোখে অন্ধকার দেখছি সব। তারপর আর আমার কিছু মনে ছিলো না।

যখন জ্ঞান ফেরে তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১০.০০ বাজে। আম্মু আমার পাশে বসে আছে ইসমাঈল আমার অন্য পাশে বসে আছে। আমার শরীরে প্রচন্ড জ্বর এসেছে। শারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।
আমার জ্ঞান ফেরা দেখে আম্মু আমায় জিগ্যেস করলো কি হয়েছিল আমি কি ভাবে জ্ঞান হারালাম।

আমি কিছুই বলতে পারিনি সেদিন। পরে শুনে ছিলাম আমি নাকি ছাদে জ্ঞান হারিয়ে পরে ছিলাম। তখন শ্রাবন আম্মু কে ডেকে আমায় রুমে নিয়ে আসে। ডাক্তার দেখে যাওয়ার পর শ্রাবন ভাই নাকি জরুরি কোনো কাজের কথা বলে চলে গেছে বাড়িতে ফিরে।

যাওয়ার আগে নাকি আম্মু কে বলে গেছে আমার দিকে লক্ষ রাখতে।

আমি খুব ভালো করেই সেদিন বুঝেছিলাম যে শ্রাবন আমার দেওয়া কসম রেখেছে।
সেদিনের পর থেকে আজ প্রায় ৪ বছর হলো শ্রাবণের সাথে আমার কোনো প্রকার যোগাযোগ নেই। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যেও ওকে আমি ভুলতে পারিনি কখনো।

শুনেছি আমার শ্রাবন আর জোনাকির নাকি একটা ফুটফুটে মেয়ে বেবি হয়েছে। অনেক সুখে আছে ওরা। শ্রাবন আমার প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।

গত ১ মাস হলো আমার শরীরটা তেমন ভালো নয়। সব সময় কেমন বমি বমি লাগে কিছু খেতে ভালো লাগে না। মাথা ঘুরায়। এসব বিষয় আমার শাশুড়ি মা খেয়াল করেছেন। উনি আজ সকালে রাজুকে বললেন
~ বাবা রাজু বাড়িতে নতুন অতিথি আসতে চলেছে মনে হয়। আমাদের ইসমাঈলের ভাই বা বোন। মিষ্টি নিয়ে আয় জলদি।

সবাই অনেক খুশি আমার আবার বেবি হবে জেনে। রাজুও অনেক খুশি। আমার সংসার টা এখন সুখে পরিপূর্ণ আর কোনো কষ্ট নেই আমার। লুকানো কষ্ট শুধু একটাই আর সেটা হলো আমার শ্রাবন………


শেষ পর্ব

আজ আমার সংসার টা সুখে পরিপূর্ণ হয়েছে। সবাই অনেক খুশি আমার আবার বেবি হবে জেনে। সকলের খুশি দেখে আমিও অনেক খুশি। কিন্তু আমার লুকানো কষ্ট শুধু একটাই আর সেটা হলো আমার না পাওয়া ভালবাসা শ্রাবন…

যতদিন যাচ্ছে আমার শরীর যেনো আরো বেশি খারাপ হচ্ছে। কিচ্ছু খেতে পারিনা আমি, খেলেই বমি আসে। সব সময় হালকা হালকা মাথা ঘোরে। কখনো কখনো সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে। কিছু ভালো লাগে না আমার। আর কেনো জানি না আমার মনে হয় আমার বেবি হবে না এটা অন্য কিছুর লক্ষন।

তাই আমি সবাই কে লুকিয়ে একাই একটা ভাল বড় ডাক্তারের কাছে যাই তারপর তাকে সব খুলে বলি। সে আমার সব কথা শুনে কিছু পরীক্ষা করাতে দেয় আর সেগুলোর রিপোর্ট তারাতারি নিয়ে আসতে বলে।

ডাক্তার যেনো কেমন ভিতুর মতো করছিলো যেনো অনেক বড় কিছুর আশংকা করছেন উনি।
আমি সব টেস্ট গুলো করিয়ে নিয়ে এসে ডাক্তার কে দেই। উনি আমার রিপোর্ট গুলো ভালো ভাবে উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে। তারপর গম্ভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে
~ আপনার বয়স কতো?

আমি ওনার এমন প্রশ্নে একটু বিরক্ত হই তবুও বলি
~ জি ২৮ বছর।
উনি আমার উত্তর শুনে আবার বলেন

~ আপনার কয়টা বাচ্চা আর তাদের বয়স কেমন?
~ জি আমার একটা ছেলে তার বয়স ১৩ বছর। এসব কেনো জিগ্যেস করছেন বলুন তো?
~ আপনার স্বামী অথবা অন্য কাওকে আসতে বলেন। আমার কথা আছে তাদের সাথে।

ডাক্তারের এমন কথা শুনে আমি বুঝতে পারি নিশ্চয়ই ঐ রিপোর্ট এ এমন কিছু আছে যা ডাক্তার আমায় বলতে চাইছেন না। তাই আমি ওনাকে বলি
~ দেখুন স্যার যদি ওনাদের কাওকে জানতে দিতাম আমি এখানে এসেছি তাহলে কি আমি একা আপনার কাছে আসতাম?

আমি জানি আমায় হয়তো এমন কিছু হয়েছে যা আপনি আমায় বুলতে চাচ্ছেন না। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি অন্য কাওকে জানতে দিতে চাই না আমার বিষয়ে তাই আপনি আমাকেই সব খুলে বলেন প্লিজ।

ভয় নেই আমি কোনো কিছু কে ভয় পাই না আল্লাহ ছারা। তাই দয়া করে আমায় সব কিছু বলেন প্লিজ ডাক্তার
ডাক্তার আমার কথা শুনে কিছুক্ষন গম্ভীর হয়ে বসে রইলো কিছু বলবো না। তারপর কিছু সময় পর আমার বলতে শুরু করলো

~ দেখুন মিস বৃষ্টি আমাদের একটা নিয়ম আছে যে রুগিকে রোগের ব্যাপারে বলা যায় না। কারন সে অনেক ভেঙে পরে। কিন্তু আমার কেনো জানি না মনে হচ্ছে আপনি অনেক স্ট্রং তাই আপনাকে বলা যায়। আর যেহুতু আপনি অন্য কাওকে জানাতে চাচ্ছেন না তাই আপনাকেই বলি।

এই কথা গুলো বলে ডাক্তার আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তারপর বলতে লাগলেন

~ মিস বৃষ্টি আপনার দেহে মরন ব্যাধি ক্যান্সার বাসা বেধেছে। আপনি খুব জোর আর একমাস বাচবেন। আপনার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। আই এ্যাম সরি। আপনার আর কোনো চিকিৎসা নাই।
ডাক্তারের কথা শুনে আমার যেনো কিছুই মনে হলো না। এটা যেনো হওয়ারি ছিলো। আমি একদম সাভাবিক ভাবেই ডাক্তার কে জিগ্যেস করলাম

~ Thank You ডাক্তার সাহেব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমায় এই কথা গুলো বলার জন্য। আমার আপনার কাছে একটা অনুরোধ আছে দয়া করে আমার অনুরোধ টা রাখবেন প্লিজ?
~ জি বলুন মিস বৃষ্টি সম্ভব হলে অবশ্যই রাখবো।

~ দয়া করে এই কথা গুলো আপনি আর কাওকে বলবেন না। আমি চলে যাওয়ার আগে সবার সাথে হাসি খুশি ভাবে কাটাতে চাই। প্লিজ আমার এই অনুরোধ টুকু রাখেন ডাক্তার সাহেব।

~ ঠিক আছে আমি কাওকে কিছু বলবো না। আমি আপনার অবস্থা টা বুঝতে পারছি। আর একটা কথা যেদিন দেখবেন আপনার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা হচ্ছে। আর সাথে বমি হচ্ছে তখন আর দেরি করবেন না যত তারাতারি সম্ভব হাসপাতালে চলে আসবেন।

~ জি ডাক্তার সাহেব আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনার কথা গুলো মানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। এখন তাহলে আসি ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম

ডাক্তার সাহেব আমার সালামের উত্তর নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছারলেন। আর আমি হাসি মুখে বাড়ি ফিরে এলাম। এই একটি মাস আমি সবার সাথে অনেক সুখ ও আনন্দে কাটাতে চাই ভুলে যেতে চাই অতিতের সকল দুঃখ কষ্ট। আমার কষ্ট শুধু একটাই আমি আমার ইসমাঈলের পড়াশোনা শেষ করা। ওর কোনো ব্যাবস্থা হওয়া দেখে যেতে পারবো না।

তবে চিন্তাও করি না কারন আমি জানি রাজু ওকে দেখবে অবশ্যই।
আমি একে একে সকলের সাথে দেখা করতে গেলাম। একদিন গেলাম আমার বড় আপাদের বাড়িতে। সারাদিন ওদের সাথে অনেক আনন্দে কাটালাম।

তারপর গেলাম আফসিয়াদের বাড়িতে ওর সাথেও অনেক মজা করে কাটালাম। কাওকে বুঝতে দিলাম না আমার রোগের কথা।

আমার রাজু আর শাশুড়ি মায়ের সাথেও অনেক ভালো ভাবে পার করলাম ২০ টা দিন। আর এই ২০ দিনে আমার ইসমাঈল কে না না রকম ভাবে বোঝালাম মৃত্যু সবার আছে একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে পৃথিবী ছেরে। ইসমাঈল আমার বার বার জিগ্যেস করতো আমি এসব কেনো বলি। কিন্তু আমি সব হেসে উরিয়ে দিতাম। আল্লাহর ইবাদতে মসগুল থাকতাম। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে তওবা করতাম।

তারপর আমি সবাই কে বলে আমার বাবার বাসায় চলে আসলাম ইসমাঈল কে নিয়ে কিছু দিন থাকবো বলে। আমি চাই বাবার বাসা থেকেই মৃত্যু কে আহবান করতে।

আব্বু আম্মুর সাথে অনেক আনন্দে কাটালাম আরো দুটো দিন। তারপর আমার ক্যান্সার ধরা পরার ২৫ দিনের দিন শ্রাবনকে ফোন করলাম
~ আসসালামু আলাইকুম।

~ ওয়ালাইকুমুসসালাম। বৃষ্টি কেমন আছো তুমি?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো শ্রাবন ভাই? জোনাকি ভাবি তোমার মেয়ে ওরা কেমন আছে?

~ সবাই ভালো আছে বৃষ্টি। তোমার শরীর ভালো তো? কি হয়েছে তোমার কন্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেনো?
~ কই কিছু হয়নি তো। আমি ঠিক আছি। তোমায় একটা অনুরোধ করার জন্যে ফোন করে ছিলাম। আমার একটা অনুরোধ আছে রাখবে বলো?
~ বলো বৃষ্টি কি করতে হবে আমায়। একবার বলেই দেখো?

~ শ্রাবন ভাই তুমি কি কালকে একটু আসতে পারবে আমাদের বাসায়? মানে তোমার খালামনির বাসায়? তোমায় একটু দেখতাম। না মানে আসলে অনেক গুলো বছর হলো দেখিনা তো তাই আরকি।

আমার কথা শুনে শ্রাবন ভাই একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেরে বললো
~ আমি কালকে সকালেই আসছি বৃষ্টি। এই দিনটার জন্যে আমি গত ৪ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি। আমি কালকেই আসছি।

~ ঠিক আছে শ্রাবন ভাই তাহলে কাল দেখা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ। এখন রাখি আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম
তারপর শ্রাবন ভাই কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোব কেটে দিলাম।
তারপর তিনটা চিঠি লিখলাম।

একটা শ্রাবনের জন্যে একটা রাজুর জন্যে আর একটা আমার ইসমাঈলের জন্যে। সব গুলো চিঠির ওপর যার যার নাম লিখে দিলাম। তারপর চিঠি গুলো একটা খামে ভরে ইসমাঈল কে দিয়ে বললাম

~ ইসমাঈল আব্বু এই খামটায় তিনটা চিরকুট আছে তিনটার ওপর তিনজনের নাম লেখা। এটা তোমার কাছে আমি গুচ্ছিত রাখলাম। আমি যখন থাকবো না মানে বলতে চাইছি আমি যদি কোথাও যাই আর তুমি তখন যদি আমায় খুজে না পাও আর তাহলে এই চিরকুট গুলো বের করে নামে নামে দিয়ে দিও। আর আমার আদেস রইলো এগুলো প্রয়োজনের আগে খুলে দেখবে না বাবা কথা দাও?

~ আম্মু কি হয়েছে তোমার বলোতো এমন পাগলের মতো কি সব বলছো তুমি? আর কোথায় যাবে তুমি হুমম।
~ ধুর পাগল আমি কোথায় যাবো যেখানেই যাই না কেনো সব সময় তোমার সাথেই রবো বাবা আমার। এখন এটা রাখো আর কোনো প্রশ্ন করো না। আর এটা খুলেও দেখবে না আশা করি।

~ আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে দেখবো না আমি।
তারপর আমি আমার রুমে চলে আসি আর দরজা লাগিয়ে মন খুলে কান্না করি।

পরের দিন অনেক সকাল বেলাই শ্রাবন চলে আসে আমাদের বাসায়। আমি ওকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখলাম। এই ৪ বছরে কতটা বদলে গেছে শ্রাবন। একটু মোটা হয়েছে ছোট ছোট দাড়ি হয়েছে।

তবে সেই আগের মতই সুন্দর দেখতে আমার শ্রাবন কে।
শ্রাবনকে দেখে আমি সালাম দিলাম তারপর ও সালামের উত্তর নিলো আর আমাকেও একি ভাবে দেখলো একবার মায়া ভরা চোখে।

তারপর ও ফ্রেস হয়ে আসলে আমি নিজে হাতে সব বেরে ওকে খাওয়ালাম। ওর বাসার সবার কথা জিগ্যেস করলাম। সকলের ছবি দেখলাম। জোনাকি ওর মেয়ে শম্মি খালামনি সবার ছবি মন ভরে দেখে নিলাম।
তারপর শ্রাবনকে বললাম

~ শ্রাবন ভাই তুমি এখানে ২ থেকে ৫ দিন থাকবে প্লিজ তারপর আমি চলে যাওয়ার পর একেবারে চলে যেও। আর দয়া করে এই দুই দিন আমার সাথে আগের মতো ঝগড়া করবে দুষ্টুমি করবে কেমন। আর হ্যা আমার সেই আগের মতো কালো পেত্নী লাল পরী বলে ডাকবে হুমম?

~ বৃষ্টি কি হয়েছে তোমার বলোতো তুমি এমন আচরণ কেনো করছো? আমার কেমন জানি লাগছে?
~ তুমি রাখবেনা আমার এই আবদার গুলো? বিশ্বাস করো তোমার কাছে আর জীবনেও কিছু চাই বো না আমি। এটাই হবে আমার শেষ চাওয়া ও পাওয়া।

আর কোনো প্রশ্ন নয় এখন যাও একটু বিশ্রাম নাও অনেক দুর থেকে এসেছো।
তারপর দুটি দিন অনেক আনন্দে ঝগড়া মজা করে কাটালাম শ্রাবনের সাথে যেনো সেই ১৩ বছর আগে ফিরে গিয়েছিলাম আমি।

আজ আমার ক্যান্সার ধরা পরার ২৯ দিন সকাল থেকেই প্রচন্ড মাথা ব্যাথা। আমি বুঝতে পারছি আমার সময় শেষ। তাই ইসমাঈল কে ডাক দিলাম আমার রুমে। ইসমাঈল এলে ওকে অনেক শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরলাম তারপর বললাম
~ বাবা আমাকে একটা তোমার নানা নানির কাছে নিয়ে যাও তো। মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে।

~ ইসমাঈল কেমন চুপ করে আছে কোনো কথা বলছে না। তারপর আমায় মা বাবার কাছে নিয়ে গেলো। আমি মা বাবাকে সালাম করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইলাম। কিন্তু কিছু বুঝতে দিলাম না।

তারপর ইসমাঈল কে স্কুলে যেতে বললাম। তারপর শ্রাবনের কাছে গেলাম গিয়ে ওকে বললাম
~ শ্রাবন ভাই একটা কথা ছিলো রাখবে?
~ কি বলো অবশ্যই রাখবো।
~ ইয়ে মানে আমাকে অনেক শক্ত করে একটু জরিয়ে ধরবে প্লিজ আমার শেষ ইচ্ছা।

~ আমার কথা শুনে শ্রাবন ভাই ভুত দেখার মতো আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর দৌড়ে এসে আমার অনেক শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরলো।
তারপর আমি ওকে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো

~ আমি তোমায় অনেক ভালবেসে ছিলাম জান। কিন্তু কখনো তা প্রকাশ করিনি। আজ না বললে হয়তো আর কখনো বলতে পারবো না। আমার জীবনের সব থেকে বড় সপ্ন ছিলো তোমার কোলে মাথা রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। আমার আশা পুরন হলো। ভালো থেকো জান শ্রাবন। আলবিদা।

এই কথা গুলো বলেই আমি শ্রাবনের কোলে মাথা রেখে রক্ত বমি করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলাম।
শ্রাবন যেনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে। ও কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। ওর সারা শরীর জুরে আমার বমির রক্তে মেখে গেছে ওর কোলের মাঝে পরে রয়েছে আমার প্রান হিন দেহ।

হঠাৎ শ্রাবনের হুশ হলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে ও। ওর চিৎকার শুনে বাসার সবাই দৌড়ে আসে। ইসমাঈল স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল ওর মন টানছিলো না আজ স্কুলে যেতে। দৌড়ে এসে দেখে আমার এমন অবস্থা আর শ্রাবনের পাগলের মতো কান্না করা।

শ্রাবন আর ইসমাঈল মিলে আমায় তারাতারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার আমায় মৃত ঘোষনা করে। আর সেদিনের ডাক্তারের সাথে হওয়া সব কথা খুলে বলে। তারপর আমায় বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়।
রাজু আমার শাশুড়ি ননদ, আফসিয়া বড় আপু জোনাকি খালামনি শম্মি সবাই দেখতে আসে আমায়।

হঠাৎ ইসমাঈলের মনে পরে আমার দেওয়া সেই চিরকুটের কথা। ও কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে গিয়ে চিরকুট গুলো নিয়ে আসে তারপর রাজুকে আর শ্রাবনকে দিয়ে নিজের টা পড়তে থাকে।
ইসমাঈলের চিরকুটটায় লেখা,

ইসমাঈল আব্বু আমার তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে তখন হয়তো আমি তোমাদের থেকে অনেক দুরে চলে যাবো যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না।

তুমি কিন্তু একদম কাদবে না বাবা। আমি সব সময় তোমার পাশে আছি। হয়তো দুর থেকে। আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে আমার জন্য দোয়া করবে। অনেক ভালো থেকো বাবা একদম কাঁদবে না। আলবিদা।
রাজুর চিঠিতে লেখা,
প্রিয়,

আপনি যখন এই চিঠিটা পড়বেন তখন হয়তো আমি আর থাকবো না এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে আপনার ঘরে বৌ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।

কিন্তু কখনো সেই স্বপ্ন গুলো পুরন হতে দেখিনি আমি। আপনার সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমি ভুলে গেছিলাম সুখ কি। আপনার অবহেলা অত্যাচারের কারনে আমি শ্রাবনকে ভালবেসে ফেলি। কিন্তু কখনো ওকে আপনার অধিকার দেইনি। তবে দেহটা আপনার কাছে থাকলেও আমার মনটা ছিলো শ্রাবনের কাছে।

এতোগুলো বছর পর যখন আপনার সংসারে আমি একটু সুখের মুখ দেখতে শুরু করলাম তখনই আমার শরীরে বাসা বাধলো মরন ব্যাধি ক্যান্সার। কথায় আছে না কিছু মানুষের কপালে সুখ সয় না। আমিও হয়তো তাদের মাঝে একজন। আমার এই চিঠিটা পড়ে হয়তো আপনি কাঁদবেন।

কিন্তু তখন কান্না করে আর কোনো লাভ হবে না। আপনার ওপর আমার কোনো রাগ বা অভিযোগ নেই। সুখে থাকুন সব সময় এই দোয়া করি। আমার ইসমাঈলকে কখনো কষ্ট দিয়েন না। ওযে আমার কলিজার টুকরো।

ওকে কখনো কষ্ট পেতে দেখলে আমি সহ্য করতে পারবো না। আর একটা কথা আমি চলে যাওয়ার পর যদি আপনি আবার বিয়ে করেন দয়া করে সেই বৌ এর সাথে কখনো অবহেলা অত্যাচার করবেন না।

সবাই হয়তো সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। ভালো থাকবেন প্রিয় স্বামী। আলবিদা।
শ্রাবনের চিঠিতে লেখা,
জান,

হ্যা তুমি আমার জান। যানো তুমি আমার জীবনে এসে ছিলে অন্ধকারের আলোর মতো হয়ে কিন্তু সেই আলোটা ছিলো অবৈধ। যার কারনে আমি তোমায় প্রচন্ড ভালবাসা সত্যেও গ্রহন করতে পারিনি। তবে এমন একটা মুহুর্ত ছিলো না যে মুহুর্তে তোমায় আমি ভুলে থাকতে পেরেছি।

তোমার মতো আমিও চাইতাম তোমায় জীবন সাথী হিসেবে। কিন্তু আমার হাত পা বাধা ছিলো রাজুর সাথে। আজ হয়তো আমি আর তোমাদের মাঝে নেই কিন্তু আমার ভালবাসা সারাজীবন তোমার হয়েই থাকবে।

আমার সব কথা তুমি রেখেছো আসা করি আমার শেষ আশাটাও তুমি রাখবে। জোনাকিকে কখনো কষ্ট দিওনা জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ওর সুখ দুঃখের সাথী হয়ে থেকো। আমার ভালবাসা ওকে দিও। আর পারলে আমায় ক্ষমা করো। I love u jaan, আলবিদা ভালো থেকো।

চিঠি গুলো পড়ে সবাই কান্নায় ভেঙে পরলো। রাজু অনেক আফসোস করতে থাকলো। শাশুড়ি ননদ তাদের ভুলগুলো বুঝতে পারলো। কিন্তু এখন আর কোনো লাভ নেই। সময়ের কাজ সময়ে না করলে তার কোনো দাম নেই।

এভাবেই নিভে গেলো বৃষ্টির জীবন প্রদীপ।

লেখা – সোনালী

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “এ কেমন ভালোবাসা – Bangla Love Story Status” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূনএ কেমন ভালোবাসা (১ম খণ্ড) – New bangla love story

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!