ভুতের গল্প

রহস্যময়ী মেয়ে – লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প

রহস্যময়ী মেয়ে – লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প: সবাই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিছুক্ষণ পর তাকিয়ে দেখি আমি, দিপু আর ইশান বাদে কেউ নেই। সেই লোক গুলো যেন ভূতের মতো গায়েব হয়ে গেল।


পর্ব ০১

~ “ইউনিভার্সিটি তে আজ প্রথম দিন। সকাল থেকে রেডি হচ্ছি। খুব এক্সাইটেড। ইউনিভার্সিটি লেভেল নাকি জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। নতুন নতুন বন্ধু, আড্ডা, হাসি, মজা, হইহোল্লোর। লাইফ টা নাকি স্বপ্নের মতো হয়ে যায়। আজ আমি সেই জীবনে প্রবেশ করছি। ওয়াও ভেবেই আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে বললে ভুল হবে উত্তেজনায় দুই একবার লাফিয়ে উঠেছি। ইইসস কখন যে যাবো সেটা ভেবে বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি।
ঘড়িতে যখন ঠিক ৮ টা আমি দৌড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতে চাইলাম। আর ঠিক তখনি পেছন থেকে মা ডেকে উঠলো।

~ যারিন, এভাবে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিস।
~ মা ইউনিভার্সিটি তে যাবো।
~ না খেয়ে, ব্যাগ না নিয়ে এমনি দৌড়ে চলে যাবি?
ইসস রে মনেই ছিল না, আনন্দে আমি খেতেই ভুলে গেছি আর ব্যাগ নিতেও ভুলে গেলাম।
~ না মা এখন আর খাওয়ার সময় নেই আমি চলে যাচ্ছি এসে খাবো।
~ আচ্ছা যা পাগলি মেয়ে। সাবধানে যাবি কিন্তু।
~ আচ্ছা মা।

(মা ভালোকরে ই জানে এখন যদি দুনিয়া উল্টে ও যায় আমি খাবো না। আসলে আমি একবার যা বলি তা করেই ছাড়ি। কেউ আমাকে জোর করে কিছু করাতে পারে না। )
ঘর থেকে ব্যাগ টা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। উফফ কি যে করি। অনেক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা রিক্সা আসছে। কিন্তু তাতে তো পেসেঞ্জার রয়েছে আমাকে নেবে কি?

ধুর এতো কিছু ভাবার টাইম নেই। আমাকে যেভাবে হোক আজ ইউনিভার্সিটি তে যেতেই হবে। যা হবার হোক। কুছ পরোয়া নেহি।
দৌড়ে রিক্সার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। রিক্সা টা দুম করে থেমে গেলো। একটুর জন্য আমার উপরেই উঠে আসছিল। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। শুনতে পেলাম রিক্সা চালক গরুর মতো চিল্লাচ্ছে।

~ এই মেয়ে, আমার রিক্সার সামনে চলে এলে কেন?
~ আমি কোথায় এলাম আপনি ই তো রিক্সা একটুর জন্য আমার উপরে তোলে দিচ্ছিলে। (একটু অভিনয় করলাম)
~ কি মিথ্যা কথা বলে রে বাবা, আজ কালকার মেয়ে।
~ এতো কথার কি আছে এখন যদি আমি মরে যেতাম?
~ হয়েছে এবার আমাকে যেতে দিন।
~ না, আগে বলুন কোন দিকে যাচ্ছেন।
~ ইউনিভার্সিটি রোড।
~ চলেন আমি ও যাবো।
~ আমার পেসেঞ্জার আছে আপনাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
~ নেবেন না মানে? এখন না নিলে সোজা থানায় যাবো।

রিক্সাচালক একটু বিব্রত হয়ে গেল। এটাই সুযোগ। আমি গিয়ে রিক্সাতে চড়ে বসলাম। এতক্ষন রিক্সাচালকের সাথে কথা বলে পেছনে কে বসে আছে সেদিকে খেয়াল করি নি। দেখলাম একটা ছেলে। দেখে খুব সাদাসিধে মনে হলো, একটা কালো শার্ট আর প্যান্ট পড়া। সাথে একটা ব্যাগ। একটু আশ্চর্য হলাম। এতো কিছু ঘটে গেল অথচ ছেলেটা এমন ভাবে বসে আছে যেন কিছুই হয়নি। এই ছেলের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতোক্ষনে বিরাট কান্ড করে বসতো। কে যানে আবার এডভান্টেজ নেয়ার মতলব আছে কিনা। এই হলো ছেলেদের স্বভাব। মেয়ে দেখলেই এডভান্টেজ নিতে চায়। যাক বাবা একদিক ভেবে ভালো লাগছে, প্রথম দিন ক্লাস মিস করতে হবে না।

প্রায় ১০ মিনিট পর রিক্সা থামলো। আমি নামার আগেই ছেলেটা নেমে ভাড়া দিয়ে হনহন করে চলে গেল। এ কেমন ছেলে রে বাবা! একবার আমার দিকে তাকালো না পর্যন্ত। ভদ্রতা ও নেই। একবার তো আমাকে বলতে পারতো “ভাড়া দিতে হবে না আমি দিয়ে দিচ্ছি” কিপ্টা কোথাকার। তবে যাই হোক ছেলেটা কেমন যেন অদ্ভুত। আমার লাইফে এমন ছেলে কখনো দেখি নি।
হঠাৎ রিক্সাচালক বলে উঠলো..”আপা, নামুন এসে গেছি।”

আমি নেমে লোকটাকে ভাড়া দিয়ে ইউনিভার্সিটির ভেতর ঢুকলাম। বিশাল বড় মাঠ, সামনে বড় বিল্ডিং অন্যপাশে একটা বাগান, একটু ডান দিকে একটা লাইব্রেরি। আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আমি সোজা যেতে লাগলাম। কিন্তু ক্লাসরুম টা কোনদিকে তা তো জানি না। আশেপাশে অনেকে রয়েছে। একজন কে জিজ্ঞেস করতেই সে আমায় দেখিয়ে দিল। আমি ক্লাসরুম এ চলে এলাম। চারদিকে অনেক স্টুডেন্ট। কিন্তু কেউ আমার চেনা নেই। ক্লাসে ঢুকে মাঝামাঝি একটা বেঞ্চ এ বসলাম।
একটু পরেই স্যার এলো। আমাদের অভিনন্দন জানালেন আর কিছুক্ষন লেকচার দিলেন। বেশ ভালোই লাগলো। ক্লাস শেষ হতেই আস্তে আস্তে সবাই বেরিয়ে যেতে শুরু করলো। আমি যেই বের হবো ঠিক তখন লাস্ট বেঞ্চে আমার চোখ আটকে গেলো। সেই ছেলেটা বসে আছে যার সাথে আমি রিক্সায় এসেছি। কিন্তু এখনো ওকে কেমন অদ্ভুত লাগলো। দেখলাম চুপ করে বসে আছে। ক্লাস তো শেষ এখনে বসে আছে কেন জানার খুব আগ্রহ হলো।
আসলে আমি যে কোন বিষয়ে খুব আগ্রহী। আমি ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় দুই মিনিট দাঁড়িয়ে আছি অথচ ছেলেটার কোন পরিবর্তন নেই। সে এক ভাবেই বসে আছে। দেখে একটু বিরক্ত হলাম।

~ এই যে, এখানে এভাবে বসে আছেন কেন?
ছেলেটা আমাকে পাত্তাই দিল না। যেন আমার কথা তার কান দিয়ে ঢুকছে না। আমি আবার বললাম..
~ হ্যালো, মিস্টার!আমি আপনার সাথে কথা বলছি। শুনতে পারছেন না?
এখনো ছেলেটা আমাকে এড়িয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে হাতে থাকা বই টা ছেলেটার সামনে দুম করে ছেড়ে দিলাম। জোড়ে শব্দ হলো। আমি রাগি দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ছেলেটা আমার দিকে একবার চাইলো। এর পর উঠে চলে গেলো। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এত কিছুর পর ও ছেলেটার কিছু যায় এলো না। তবে ছেলোটা যখন আমার দিকে চাইলো দেখলাম ওর চোখে কেমন যেন একটা মায়া মিশে আছে। যেন অনেক কথা বাকি যা আমাকে বলতে চাইছে। কিন্তু বলতে পারছে না। জানিনা কেন এমন মনে হলো।

সেদিন আর ছেলেটাকে দেখতে পেলাম না এর পর যতগুলো ক্লাস হলো একটা তে ও আমি মন দিতে পারছিলাম না। সেই ছেলেটার কথা বার বার মনে হচ্ছিল। কিছু একটা আছে যা আমাকে বার বার ছেলেটা কে নিয়ে ভাবাচ্ছে। কি হতে পারে? আমি ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় চলে এলাম। আমাকে দেখে মা জিগ্যেস করতে লাগলো..
~ কিরে যারিন, তোকে এমন মনমরা লাগছে কেন, কিছু হয়েছে?
~ না মা, কিছু হয় নি।
~ কি আর হবে, সারা দিন না খেয়ে থাকলে তো এমন হবেই কত বার বলেছি এতো জেদ ভালো না, কে শোনে আমার কথা। হ্যাঁ রে, একবার আমার কথা তোর শুনতে ইচ্ছে হয় না?
~ মা, তুমি তো জানো আমি এমন। শুধু শুধু এসব কথা বলো না। ভালো লাগছে না আমি আমার ঘরে গেলাম।
ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়েছি। পছন্দের একটা গান বাজিয়ে চোখটা বন্ধ করলাম। হঠাৎ সেই ছেলের মুখ টা মনে পড়ে গেল। তখনি দোলার ফোন এলো।
~ কিরে যারিন, কেমন আছিস? কত দিন হলো তোর সাথে কথা হয় না। একটি বার ফোন দিতে তো পারিস। নাকি আমাকে আর মনেই পড়ে না? (একটু অভিমান করে)
~ ধুর কি যে বলিস, তা তোর সংসার কেমন চলছে?

~ এইতো ভালোই। খালিদ আমার খুব খেয়াল রাখে।
~ রাখবেই তো, তোর মতো মিষ্টি মেয়েকে পেয়ে যে কেউ খুশি থাকবে।
~ ধুর কি যে বলিস। আমি ও খুব লাকি রে। এমন একজন কে পেয়েছি।
~ তা আমার মনোবিজ্ঞানী দুলাভাই এখন কোথায়?
~ ও তো কাজে খুব ব্যস্ত। কিন্তু এতো ব্যস্ততার মধ্যে ও আমার খুব খেয়াল রাখে।
~ কত দরদ!
~ হুম হবেই তো। তুই যখন প্রেমে পরবি তখন বুঝবি।
~ দুর ছাই এসব প্রেম আমার দ্বারা হবে না।
~ আচ্ছা আজ রাখি, কাজ আছে।
~ হু, আল্লাহ্‌ হাফেজ।
পরদিন সকালে……
~ মা আমি ইউনিভার্সিটি তে যাচ্ছি।
~ আচ্ছা যা, তারাতারি চলে আসিস।

বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরলাম। রাস্তায় হাটছি, একটার পর একটা গাড়ি যাচ্ছে কিন্তু ইউনিভার্সিটি তে যাওয়ার কোন গাড়ি পাচ্ছি না। হঠাৎ দেখতে পেলাম একটা মেয়ে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। মুখ দেখতে পেলাম না। তখনি চোখ পড়লো মেয়েটির ঠিক সামনে একটা ট্রাকের উপর। দ্রুতবেগে আসছে মেয়েটার দিকে।
কয়েকবার মেয়েটা কে আওয়াজ দিলাম। মনে হয় শুনতে পেলো না। উপায় না দেখে আমি দৌড়ে মেয়েটার কাছে যাই। ধাক্কা দিয়ে মেয়েটা কে সহ আমি রাস্তার ধারে গিয়ে পরি। পাশে থাকা একটা ইটে আমার মাথায় আঘাত লাগে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তবে অজ্ঞান হওয়ার আগে এক পলক মেয়েটার মুখ টা দেখে নিলাম।

চোখ খুলতেই দেখি আমি হাসপাতালে। উঠে বসতে চাইলেই মাথায় ব্যথা পাই। হাত দিয়ে দেখি ব্যান্ডেজ করা। তখনি দেখলাম নার্স আমার পাশে।
আমি নার্স কে জিজ্ঞেস করলাম কে আমাকে এখানে নিয়ে এলো। নার্স বলল কিছু লোক আমাকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে এখানে নিয়ে আসে। আমি আবার নার্স কে জিজ্ঞেস করলাম”এখানে কি কোন মেয়ে এসেছিল?”নার্স বলল কোন মেয়ে আসে নি।

মনে মনে একটু খারাপ লাগলো। মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার এই অবস্থা অথচ মেয়ে টাই আমাকে রেখে এভাবে চলে গেলো?
সেদিন আর ইউনিভার্সিটি তে যাওয়া হলো না। হাসপাতাল থেকে কিছু ঔষধ লিখে নিয়ে বাসায় চলে এলাম। আমার মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে মা চিন্তুিত হয়ে গেলেন। হাজার টা প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি সেগুলোর জবাব দেওয়ার অবস্থায় ছিলাম না। তাই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পরি।

রাতে ঘুম ভাঙলো একটা শীতল হাওয়ায়। চোখে মেলার আগেই টের পেলাম আমার রুম শিউলি ফুলের সুগন্ধে ভরে গেছে। এতো সুবাস কোথা থেকে এলো বুঝতে পারলাম না। উঠে বসতেই হালকা ডিম লাইটের আলোতে আমার হাতে একটা কাগজ দেখতে পেলাম।
আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ঘুমানোর সময় তো আমি কোন কাগজ হাতে নিই নি তাহলে এই কাগজ আসলো কেথাথেকে।
কাগজে কি আছে দেখার জন্য লাইট অন করলাম। ভাজ করা কাগজ টা মেলতেই আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

আরো পড়ুন – প্রতিশোধ – রহস্যময় ভূতের গল্প


পর্ব ২

~ ‘কাগজের মধ্যে রক্ত দিয়ে লিখা ছিল”Help Me”কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। কেউ রক্ত দিয়ে এসব লিখতে যাবে কেন? হঠাৎ দেখতে পেলাম কাগজটা থেকে নিজে নিজেই রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো। লাল টকটকে তাজা রক্ত। আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার হাত কাঁপতে লাগলো। রক্ত গড়িয়ে আমার হাত ভিজে গেল। আমি ভয়ে, চিৎকার করে কাগজ টাকে ছুড়ে ফেলে দিই।
কাগজ টা মেঝেতে পড়ে রইলো। আমি চিৎকার করে মাকে ডাকতে থাকি। মা দৌড়ে আমার ঘরে এলো। মা আসতেই আমি মা কে জিজ্ঞেস করলাম…
~ কে এসেছিলো আমার ঘরে?
~ কেউ তো আসে নি।
~ না, কেউ তো এসেছিলো। আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে গেছে।
~ কিসের কাগজ?
~ এইতো!(মা কে ইশারায় কাগজের দিকে দেখালাম)
~ কোথায়, যারিন?

~ আরে কাগজ টা কোথায়। একটু আগে তো এখানেই ফেলেছিলাম। মা বিশ্বাস করো একটা কাগজ ছিল। কাগজ টাতে রক্তে লিখা ছিল “Help Me”এর পর কাগজ টা থেকে রক্ত পরতে শুরু করে। দেখো আমার হাতে এখনো লেগে আছে। আর চারদিকে শিউলি ফুলের সুবাস ছিল।
~ যারিন, কি সব যা তা বকছিস। তোর হাতে কিচ্ছু নেই। কাগজ ও নেই আর কোথাও শিউলি ফুলের গন্ধ ও নেই।
~ এটা কিভাবে সম্ভব, আমার হাতে রক্ত লেগে ছিল। আমি সত্যি বলছি।
~ শোন, তুই স্বপ্ন দেখেছিস। মাথায় আঘাত লাগায় উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে। তুই শুয়ে পড় মা, আমি তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
আমি শুয়ে পড়লাম, মা আমার মথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আমি ঘুমাই নি এমন কোন দিন নেই। কিন্তু আজ আমার কিছুতেই ঘুম আসছে না। এই সুবাস, কাগজ, রক্ত এসব বিষয় ভেবে আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে। এতটা ভুল দেখলাম?

এটা কি সত্যই স্বপ্ন ছিল? যদি সত্য ই হবে তাহলে আমার হাতের রক্ত সেই চিঠি এসব কোথায় গেলো? আর শিউলি ফুলের গন্ধই বা এতো তারাতারি কিভাবে চলে যাবে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কি ঘটছে আমার সাথে?
সেদিন হঠাৎ কেন যেন মনে হলো আমার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার নিশ্বাস এর শব্দ শুনতে পারছিলাম। তখনি মনে হলো কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু সুসসসসস সুসসসস শব্দ ছাড়া আমি কিছুই শুনতে পারছিলাম না। প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিলাম। আমার সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তখনি মায়ের ডাক শুনতে পেলাম। আমি হুরমুরিয়ে চোখ খুলতেই দেখি মা আমার পাশে। বুঝতে পারলাম হয়তো স্বপ্ন দেখেছি।

উঠে রেডি হয়ে ইউনিভার্সিটি তে গেলাম। ক্লাস শেষে ভাবলাম একবার লাইব্রেরী তে যাই। কিছু বই পড়া হবে আর মন টা ও ভালো হয়ে যাবে। লাইব্রেরী তে গিয়ে আমার পছন্দের কয়েকটা বই নিয়ে একটা টেবিলে বসলাম। দেখলাম আশেপাশে আরো কয়েকজন বই পড়ছে। কিছুক্ষন পড়ার পর মনে পড়লো আগের দিনের সেই কাগজ টার কথা আর সেই স্বপ্নের কথা। একে একে দু বার আমার সাথে এমন হলো। কিন্তু কেন? জানতেই হবে। তাই ভাবলাম লাইব্রেরীতে সব ধরনের বই যেহেতু পাওয়া যায়, খুঁজে দেখলে হয়তো ভৌতিক বা এই ধরনের কোন বই পাবো। যদিও আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।
তাই আবার উঠে গিয়ে এই ধরনের বই খুঁজতে লাগলাম। যখন আমি বই খুঁজছি, কেন জানিনা বার বার মনে হচ্ছিল কেউ আমার উপর নজর রাখছে। চারদিকে তাকিয়ে তেমন কিছুই দেখতে পেলাম না। সব তো নরমাল রয়েছে। আমি আবার খুঁজা শুরু করলাম। কিন্তু তেমন কোন বই পেলাম না। তাই কয়েকটা উপন্যাসের বই নিয়ে নিলাম।

হঠৎ আমি অনুভব করলাম পেছন দিয়ে হাওয়ার বেগে কিছুএকটা চলে গেল। আমি পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। তখনি আবার পেছনে কিছুএকটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি আগের বারের মতো এবারেও কিছু নেই। সবার মধ্যে থেকে ও আমার ভয় করছিল।
কারণ এসব একা আমার সাথেই হচ্ছিলো। আশেপাশের কেউ বিষয় গুলো লক্ষ্য করছে না দেখে ভয় টা আরও বেড়ে গেল। ঠিক যখনি আমি সেখান থেকে বেরিয়ে পরতে চাইলাম তখনি কারো সাথে ধাক্কা লেগে বই গুলো হাত থেকে পড়ে যায়। আরে সেই ছেলেটা। আজ পেয়েছি, জিজ্ঞেস করেই ছাড়বো সমস্যা টা কোথায়!
~ এইযে, নাম কি আপনার?
~ কাব্য(ছোট্ট করে জবাব দিল)

এই প্রথম আমি ছেলেটার মুখে কথা শুনলাম।
~ সেদিন এভাবে আপনার সাথে কথা বলতে চাইলাম। একবারো বললেন না কেন?
(কাব্য মাথা নিচু করে রইলো)
~ মাথা নিচু করে আছেন কেন বলুন।

(কাব্য বই গুলো তুলে আমার হাতে দিয়ে চলে গেল। )
কি অদ্ভুত! কথার জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। ধুর আমার কি। জাহান্নামে যাক এই ছেলে আমার তাতে কিছু না। কেন যে অন্যের ব্যাপারে এতো আগ্রহ আমার নিজেই বুঝতে পারি না। আমাকে একটু দাম দিলো না? এখন নিজের গালে নিজে চড় মারতে ইচ্ছে করছে।
রাগে বই লাইব্রেরী তে রেখেই কেন্টিনে চলে এলাম। এক কাপ কফি নিয়ে বসে বসে ভাবছি। হঠাৎ কোথা থেকে শিউলি ফুলের সুবাস আসা শুরু করলো। ঠিক সেই আগের রাতের মতো। আমি বুঝতে পারছিলাম না কোথাথেকে আসছে। ঠিক তখনি কেউ আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি ঘুরে তাকালাম।
একটা মেয়ে। কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মেয়েটি আমায় জিজ্ঞেস করলো..'”চিনতে পেরেছো আমায়?”

আমি অনেক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। হঠাৎ মনে পড়লো এটা তো সেই মেয়ে যাকে আমি বাঁচিয়েছিলাম। কিন্তু এক পলক দেখেছিলাম সেদিন তাই নিশ্চিৎ ভাবে না বলে জিজ্ঞেস করলাম…
~ তুমি সেই মেয়ে না? যে কাল এক্সিডেন্ট করতে যাচ্ছিল?
~ হ্যাঁ, তুমি ঠিক চিনেছো। আমি সেই মেয়ে।
~ অহ আচ্ছা! দাঁড়িয়ে আছো কেন, বসো।
(মেয়েটা বসলো)সামনে খুশি দেখালে ও মনে মনে খুব রাগ হচ্ছিল।
~ তুমি নিশ্চই খুব রাগ করেছো? সেদিন তোমাকে আমি হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারি নি। একটা জরুরি কাজ ছিল তাই।
~ ঢং করতে এসেছে, হুহ সেদিন তো গাড়ির নিচে পটল তুলতে গেছিলে। আমি না বাঁচালে এখানে আর বসে থাকতে পারতে না। আবার কাজ। মন চাইছে কানের নিচে তবলা বাজাই। (বির বির করে বললাম)
~ কিছু বললে?
~ কই কিছু না তো।
~ অহ আচ্ছা। আমাদের পরিচয় হয়নি। আমি নিশি।
~ আমি যারিন। পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। (মনে মন বললাম, খুশি না ছাই)
~ আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
~ হ্যাঁ অবশ্যই।
~ আচ্ছা আজ আসি, অন্য কোন সময় কথা হবে।

~ হুম, বাই।
মেয়ে টা চলে গেল। ভাবলাম কাল রাতের মতো নিশি আসতেই শিউলিফুলের সুবাস এলো কিভাবে? একটু চিন্তা করে মনে হলো.. “আরে এসব পারফিউম তো অনেক পাওয়া যায়। এক এক ফুলের গন্ধ। হতেই পারে নিশি ও এমন পারফিউম ব্যবহার করে। ধুর মাঝে মাঝে যে কি সব ভাবি নিজেই বুঝতে পারি না। বিল মিটিয়ে আমি বাড়িতে ফিরে এলাম।
রাতে পড়ছিলাম। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে দেখলাম অপরিচিত একটা নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করতেই একটা মেয়ের কন্ঠ পেলাম। চিনতে আমার অসুবিধে হলো না। এটা নিশি। কিছুক্ষন কথা বলে ফোন রেখে দিলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়লো, নিশিকে তো আমি নাম্বার দিই নি। তাহলে ও কিভাবে আমার নাম্বার পেলো? কিছুক্ষন ভাবলাম, নাহ কিচ্ছু মাথায় আসছে না। নিশি কিভাবে নাম্বার পেলো।
আমি নিশি কে আবার ফোন দিলাম। নিশি ফোন ধরতেই জিজ্ঞেস করলাম আমার নাম্বার কোথায় পেলো। তখন সে বলল এক্সিডেন্টের পর যখন আমি জ্ঞান হারাই সে নাকি তখন আমার ফোন থেকে নাম্বার পায়। ওহ আচ্ছা। আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।

কল রেখে দিয়ে একটু বিরক্ত হলাম। এ কেমন মেয়ে! আমি অজ্ঞান ছিলাম সেদিকে খেয়াল নেই অথচ নাম্বার ঠিকি নিলো। আজব!
প্রায় অনেকদিন আমার নিশির সাথে কথা হয়। যদিও বা আর দেখা হয় নি। আস্তে আস্তে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। এর মধ্যে আমি কাব্যের কথা প্রায় ভুলেই গেছি।
প্রতিদিনের মতো আজো ইউনিভার্সিটি তে গেলাম। ক্যাম্পাসে বসে ছিলাম। ঠিক তখনি দেখতে পেলাম কাব্যকে। আমি অনেক্ষন লক্ষ্য করলাম। আমার ওকে দেখে স্বাভাবিক লাগে নি। কেমন যেন একটা রহস্যে ভরা
কি রহস্য তা আমায় জানতেই হবে। সেদিন ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে কাব্য কে ফলো করতে লাগলাম। একটা গাড়িতে করে কাব্য বেরিয়ে গেল। আমি ও পেছনে একটা গাড়ি নিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

কিছুক্ষন পর একটা বিশাল বাড়ির সামনে গাড়ি টা দাঁড়ালো। দেখলাম কাব্য নেমে সেই বাসার ভেতর ঢুকে গেল। বাসা দেখে মনে হলো বেশ ধনী পরিবারের ছেলে। কিন্তু ওর চালচলন দেখে বুঝা যায় না তার পারিবারিক অবস্থা এতো বিশাল।
কাব্য চলে যাওয়ার পর আমি সেই বাসায় ঢুকতে চাইলাম কিন্তু একজন মধ্যবয়সী দারোয়ান কে দেখতে পেলাম। বুঝতে পারলাম যে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে না।
কিন্তু আমার মনে হাজার টা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সেগুলো না জেনে আমি শান্তি পাবো না। তাই উপায় না পেয়ে দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করলাম।
~ আসসালামু ওয়ালাইকুম।
~ ওয়ালাইকুম আসসালামু, কে তুমি মা?
~ আমি আর কাব্য একই ইউনিভার্সিটি তে পড়ি।
~ অহ আচ্ছা বাইরে কেন, ভেতরে যাও। এখানে বাইরের কেউ আসতে পারে না। কিন্তু তুমি যেতে পারো।

~ না থাক আজ আর না। কিছু প্রশ্ন ছিল।
~ কি প্রশ্ন?
~ আপনি এখানে কতদিন ধরে আছেন?
~ এখানে আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে কাজ করি। সেই যুবক থাকতে চাকরি টা নিয়েছি সেই থেকে এখানেই পড়ে আছি।
~ আচ্ছা, এই বাড়ি টা কি কাব্যের বাবার?
~ না, এটা কাব্যের ফুফুর বাসা। কাব্যের বাড়ি শিলাকুন্ত গ্রামে। সেখানে যে রাজবাড়ি আছে সেটা কাব্যের বাবার। কাব্য এখানে পড়তে এসেছে। খুব ভালো ছেলে। কিন্তু খুব মন মরা।
~ কারণ টা কি জানেন?
~ না মা, আমি তো দারোয়ান মাত্র। অত কিছু জানি না। শুধু জানি ও এখানে পড়তে এসেছে।

~ আচ্ছা ধন্যবাদ।
আমি সেখান থেকে চলে এলাম। কিন্তু রহস্য এখনো থেকেই গেলো। কাব্য এমন কেন। এর পেছনের কারন টা আমায় বেরকরতেই হবে। তবে সেখানে গিয়ে একটা জিনিস জানতে পারলাম, কাব্য একটা রাজপরিবারের ছেলে। আচ্ছা, এমন তো নয়? ও রাজপরিবারের বলে সবার সাথে কথা বলে না। হতেও পারে। কিন্তু এমন অদ্ভুত আচরন করার কথা না। সে রাজপরিবারের হোক বা বিলগেটস এর ছেলে। হুহ! তাহলে কারণ নিশ্চই আছে।
আমি বাড়ি চলে এলাম। বাড়িতে আসতেই নিশিকে ফোন দিলাম।
~ হ্যালো, নিশি জানো আজ আমি সেই অদ্ভুত ছেলের বাসার সামনে গিয়েছিলাম।
~ অহ তাই, কি পেলে সেখানে?
~ (নিশি কে সব খুলে বললাম)
~ যারিন তুমি কি কাব্য কে আবার স্বাভাবিক করে তুলতে চাও?
~ হ্যাঁ চাই। কিন্তু কিভাবে করবো তা বুঝতে পারছি না।
~ আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
~ তুমি?

~ হ্যাঁ, কিন্তু তার জন্য আগে তোমাকে কাব্যের বন্ধু হতে হবে। ওর সাথে মানিয়ে নিতে হবে।
~ কিন্তু ও তো কারো সাথে মিশতে ই চায় না।
~ মিশবে, আমি যেভাবে বলি সেভাবে সেভাবে করবে।
~ আচ্ছা বলো। …..
পরদিন সকালে ক্যাম্পাসে গিয়ে আমি কাব্য কে খুঁজতে থাকি। কিছুক্ষন পর দেখতে পাই কাব্য একটা নিরব জায়গায় একা বসে আছে।
আমি ব্যাগ থেকে একটা পেয়ারা বের করলাম। গিয়ে কাব্যর সামনে ধরে বললাম “এইযে, পেয়ারা খাবেন?” দেখতে পেলাম কাব্য আমার দিকে ভূত দেখার মতো কেমন তাকিয়ে আছে।
আমি আবার বললাম ””এইযে উল্লুক এর মতো তাকিয়ে থাকার কি আছে হে?”তখন কাব্য মাথা নিচু করে ফেলল।
আমি বললাম”বসতে পারি?”কাব্য বলল “বসো”

কাব্যের মুখ থেকে তুমি শুনে অনেকটা অবাক হলাম। একেবারে তুমি তে চলে গেছে। ছেলে টা তো বেশ ফাস্ট। যাই হোক থেংস টু নিশি। এই পেয়ারার আইডিয়া টা ওই আমাকে দিয়েছিল। আমি বসলাম…
~ কাব্য তুমি সবসময় এভাবে চুপচাপ থাকো কেন? (আমি ও তুমি করেই বললাম)
~ এমনি।
~ এমনি কেউ চুপ থাকে? আচ্ছা তোমার পরিবার সম্পর্কে আমাকে কিছু বলো।
~ তেমন কিছু নেই।
কাব্য আমার সাথে কথা বলা শুরু করলে ও এখনো মিশে উঠতে পারে নি। কিন্তু আমাকে ওর বন্ধু হয়ে উঠতে হবে। তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম…….
~ কাব্য, তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?
কথাটা শুনে কাব্য আমার দিকে একবার তাকালো, ওর মায়াভরা চোখের কোণে জল ভরে গেছে। এটা দেখে আমি আর কিছু বলতে পারছিলাম না।
কাব্য চুপ করে বসে আছে। কিন্তু এভাবে থাকলে চলবে না। আমাকে জানতেই হবে কাব্যের বিষয়ে।
~ আচ্ছা কাব্য আমরা কি বন্ধু হতে পারি না?

~ আমার সাথে বন্ধুত্ব করে কি হবে।
~ আমি একজন বন্ধু হিসেবে তোমাকে জানতে চাই কাব্য, তোমাকে বুঝতে চাই। তোমাকে সাহায্য করতে চাই।
~ আমার জীবন টা খুব জটিল এই জীবনে আর কাউকে আনতে চাই না।
বলেই কাব্য উঠে চলে গেল। আমার বুঝতে বাকি রইলো না কাব্য কাউকে না কাউকে ভালোবাসতো। কিন্তু কি এমন হয়েছিল যার কারনে কাব্যের জীবন এতো পরিবর্তন হয়ে গেলো। অনেক বড় রহস্য রয়েছে যা হয়তো কাব্যের পরিবারের সাথে ও জড়িত। আমি সেই রহস্য ভেদ করেই ছাড়বো।

আরো পড়ুন – অন্তরালে – Voyonkor vuter golpo in bengali


পর্ব ৩

কাব্য চলে যাওয়ার পর আমি নিশি কে ফোন দিলাম।

~ হ্যালো নিশি?
~ হুম যারিন বলো।
~ নিশি তোমার দেয়া আইডিয়া টা কাজে লাগলেও কাব্য এখনো আমার সাথে ততোটা মিশে উঠতে পারে নি। কিন্তু আজ কথা বলে বুঝতে পারলাম ও নিশ্চই কাউকে ভালোবাসতো। কিন্তু নিজে থেকে আমায় কিছুই বলে নি। আমি বন্ধু হতে চাইলে সে উঠে চলে যায়।
~ কাব্য নিজেকে খুব একা মনে করে, সে ভাবে তার জীবনের সাথে যেই জড়াবে সেই তাকে ধোকা দেবে। তাই এমন করলো। কিন্তু আমি জানি তুমি ওর ভালো বন্ধু হতে পারবে। একটু সময় কাটাও ওর সাথে। দেখবে সে আস্তে আস্তে তোমাকে সব বলবে।

~ তা বুঝলাম, কিন্তু তুমি এতো কিছু কিভাবে জানো? তুমি কি কাব্য কে আগে থেকেই চিনতে?
~ ইয়ে, না মানে তুমার কথা শুনে আমার মনে হলো। হয়তো কাব্য এমন স্বভাবের।
~ অহ, আচ্ছা আমি তাই করবো।
আস্তে আস্তে আমি কাব্যের সাথে মিশতে লাগলাম। কখনো পড়ার ছলে, কখনো বিভিন্ন প্রবলেমের কথা শেয়ার করতাম। এক সময় কাব্য আমার সাথে একদম ফ্রি হয়ে গেল। যদিও খুব কষ্ট করতে হয়েছে। এর পরও আমাকে ওর লাইফ সম্পর্কে কিচ্ছু বলল না।
আজ ঠিক করলাম কাব্য কে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবো। তাই রেডি হয়ে ক্যাম্পাসে চলে গেলাম। বসে আছি, কাব্য এলো।

~ কাব্য চল।
~ কোথায় যাবো?
~ তোমাকে একটা জায়গায় আজ নিয়ে যাবো।
~ আমি কোথাও যাবো না।
~ আজ যেতেই হবে। আমি কোন কথা শুনবো না। বল যাবে…বলো..বলো…প্লিজ। (অনেক্ষন জোর করলাম)
~ আচ্ছা যাবো। চলো!
আমি কাব্য কে নিয়ে আমাদের বাসায় গেলাম। সেখানে আম্মুর আর হাসানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আব্বু চাকরি করে অন্য একটা শহরে, তাই বাড়িতে আমি আর মা আর আমার ছোট ভাই হাসান ই থাকি। দেখলাম বেশ ভালোই মিলেছে হাসান আর কাব্য
। বুঝলাম কাব্য বাচ্চা খুব ভালোবাসে। কিন্তু ভাবিনি এতোটা।
আমি যেন আমার সামনে এক অন্য কাব্য কে দেখতে পেলাম। এই প্রথম আমি কাব্যের মুখে হাসি দেখলাম। যে কখনো হাসতো না সে হাসছে, শুধু তাই নয় হাসানের সাথে খেলা করছে, দেখে মনেহচ্ছে কাব্য তার কৈশর জীবনে ফিরে গেছে। ওদের একা থাকতে দিয়ে আমি আমার রুমের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষন পর কাব্য এলো।

~ যারিন!
~ হুম?
~ আজ আমি তোমার সাথে আমার জীবনের ঘটে যাওয়া কিছু কথা শেয়ার করতে চাই।
~ মনে মনে অবাক হলাম, যা জানার জন্য আমি এতো কিছু করলাম কোন কাজ হলো না তাতে। অথচ আজ কাব্য নিজেই আমাকে বলতে এলো?
~ কি ভাবছো জারিন?
~ কিছু না। কি বলতে চাও বলো।
~ যারিন আমি একজনকে ভালোবাসতাম। কিন্তু একদিন সে আমাকে আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়।
~ কেন?
~ জানি না, হয়তো আমার ভালোবাসাতেই কোন খামতি ছিল।
~ কি হয়েছিল?
~ তাহলে শুনো,
আমি তখন সবে মাত্র এসএসসি পাশ করেছি। কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে একটা মেয়ে কে দেখে খুব ভালো লাগলো। ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি তাকে দেখতাম। কিন্তু কখনো তাকে আমার মনের কথা বলতে পারতাম না। আমার বন্ধু ছিলো রনি ওকে সব বলতাম। অনেক বার ওকে দিয়ে ও বলতে চেয়েছি কিন্তু পারি নি।

একদিন ক্লাসের সামনে দিয়ে সে যাচ্ছিল, আমি সেখানে রনির সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভাবলাম আজ বলবই। সে কাছে আসতেই তাকে বললাম “সিবালোভা কেমাতো মিআ”(উল্টো করে-আমি তোমাকে ভালোবাসি)ভেবেছিলাম কিছু বুঝবে না। কিন্তু জানতাম না মেডাম এতো বুঝে। চরকির মতো ঘুরে এলো। আমি তো ভয়ে ঘেমে প্রায় শেষ। কিন্তু ভাবি নি আমার জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করবে।
সে এসেই আমায় বললো “বুদ্ধু কোথাকার, ইডিয়েট, কিভাবে প্রপোজ করে জানো না? বলেই হাটু গেড়ে আমার সামনে বসে পরলো। ব্যাগ থেকে একটা গোলাপ বের করে বলল”কাব্য আমি তোমাকে ভালোবাসি” তখন যে কি আনন্দ হচ্ছিল। হঠাৎ একটা বাজ পরার মতো আওয়াজ হলো। ভালো করে তাকিয়ে দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তাকালাম, শালার রনি ও নেই। সুযোগ পেয়ে ভেগে গেছে। আমি কিছুক্ষন চেয়ে থেকে অনুভব করতে পারলাম গালে ব্যথা পাচ্ছি। এর মানে নিশ্চই বোঝাতে হবে না?
~ হাহাহাহা, থাপ্পর টা কি খুব জোড়ে মেরেছিল?

~ তা আর বলতে? আমি শুধু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এর পর আমাকে রেখে চলে গেল। আশে পাশে তাকিয়ে দেখি সবাই আমার দিকে ভূত দেখার মতো তাকিয়ে আছে। গালে ধরে আমি বাড়িতে চলে এলাম। সেদিন বিকেলে কেউ আমার জানালা দিয়ে একটা কাগজ ফেলে গেল। আমি কাগজ খুলে দেখি সে আমাকে পুকুরপাড়ে দেখা করতে বলেছে। আমি সেখানে যাই। একটা শিউলি গাছের নিচে সে দাড়িয়ে ছিল। আমি যেতেই জিগ্যেস করলো”ভালোবাসো আমায়? ””আমি শুধু “হু”বলেছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে আমায় জড়িয়ে ধরলো। আমার চোখ দিয়ে তখন জল পরছিল। যাকে চেয়েছিলাম তাকে পাওয়ার আনন্দে মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাবো। তাকে বুকে জড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল সারাটা জীবন এভাবেই কাটাতে পারবো। (কাব্য চোখের জল মুছে আবার বলা শুরু করলো)
এভাবে আমাদের সম্পর্ক চলতে থাকে। প্রায় দেড় বছর পর একদিন আমার চাচা আমাদের দেখে নেয়। বাবার কানে খবর যায়। তিনি আগের যুগের মানুষ। আমি ভিষন ভয় পেয়ে যাই। কি হয় সেটা ভেবে সারা দিন সেদিন বাড়িতে যাই নি। রাতে বাড়ি ফিরতেই বাবা আমাকে ডেকে নিলেন। আমাকে বললেন, “তুমি অনেক ছোট আগে বড় হও সামনে পরিক্ষা। পরিক্ষা শেষ হোক তার পর যা করার করো। ততোদিন তুমি আর অই মেয়ের মধ্যে কোন যোগাযোগ থাকবে না। আমি বাবার মুখে এসব শুনে খুশি হই।

আমি আর ও দুজনেই এই কথা মেনে নিই। সেদিন থেকে আমাদের দুজনের দেখা করা বন্ধ হয়ে যায়। সামনে পরিক্ষা থাকায় কলেজে ও যাওয়া হতো না। অনেক কষ্টে থেকে ও ভাবতাম পরিক্ষার পর তো সব ঠিক হয়ে যাবে তাই আর ওর খোঁজ নেয়া হতো না। এর পর পরিক্ষা শেষ হয়।

সেদিন আমি তাদের বাড়ি যাই কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে খুজে পেলাম না। সারা গ্রামে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু কেউ বলতে পারে না ওরা কোথায় গেছে আর কখন ই বা গেছে। রাতারাতি গায়েব হয়ে যায়। সেদিন রনি এসে আমায় একটা চিঠি দিল। আমি চিঠি খুলে দেখলাম সেখানে লিখা..
“কাব্য, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, অনেক বড় পরিবারের ছেলের সাথে। ওরা আমাকে সহ আমার পরিবার কে ও সাথে নিয়ে যাবে। তাই আমার পক্ষে তোমার সাথে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। আমাকে ভুলে যাও, ভালো থেকো।”
আমি বিশ্বসার করি নি এই চিঠির কথাগুলো। রনি বলল ৫ দিন আগে এটা ওকে দিয়ে নাকি সে চলে যায়।
তার পর থেকে দিন রাত না খেয়ে না পড়ে ওকে খুঁজে গেছি। কিন্তু কোন লাভ হলো না। বাবা ও অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু পান নি। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমাকে ধোকা দিয়েছে। লোভী একটা মেয়ে। তার পরও আমি তাকে না পেয়ে পাগলামি করতে লাগলাম। কি করবো খুব ভালোবাসতাম যে। আমার বাবা এসব সহ্য করতে না পেরে আমাকে এখনে পড়তে পাঠিয়ে দেয়। কি ভুল ছিল আমার? এমন ভাবে আমাকে সে কষ্ট দিতে পারলো। কিভাবে পারলো..কিভাবে? (কাব্য কাঁদতে থাকে)

~ কাব্য শান্ত হও।

~ যারিন জানো? আমি সেখান থেকে আসার পর নাকি গ্রামে একটা লাশ খুজে পাওয়া গেছিল। মুখ থেতলানো কিন্তু অনেকে বলেছিল এটা নাকি ওর ভাই এর লাশ। কিন্তু কেউ নিশ্চিত ছিল না। তাই আমিও আর যাই নি। সেখানে গেলেই অই লোভী মেয়ে টার কথা মনে পড়ে। কত ভূলে যেতে চেষ্টা করি কিন্তু প্রতি টা রাত ওর কথা মনে পড়ে। খুব কষ্ট হয়। খুব…..(কাব্য দৌড়ে আমাদের বাড়ি থেকে চলে যায়)
কাব্যের কথা গুলো শুনে খারাপ লাগলে ও কেন জানি না মনে হলো কোথায় যেন ঠিক মিলছে না। বড় ঘরে বিয়ে হওয়ার কথা আর সেই মেয়েটি চলে গেল অথচ গ্রামের কাউকে বলল না কেন তারা চলে যাচ্ছে, আর সবচেয়ে বড় কথা গ্রামের কেউ তাদের যেতে ও দেখে নি। তারা তো আর চুরি করছিল না। তাহলে কি হতে পারে। আর সেই লাশ টা যদি সেই মেয়ে টার ভাই এর হয় তবে নিশ্চই ওরা বিপদে পড়েছে? কিছু একটা গড়বর আছে। আমাকে জানতেই হবে।

আমি নিশি কে ফোন দিয়ে সব জানালাম। নিশি আমাকে বলল কাব্য দের গ্রামে যেতে। সেখানে গিয়েই সবটা পরিষ্কার হবে। আমারও সেটাই মনে হচ্ছিল। তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম আমি সেই মেয়ে কে খুঁজে বের করবই।
ফোন রেখে ভাবছি কিভাবে জানা যায় সেই মেয়েটা আর তার পরিবারের সাথে কি ঘটেছিল? তখনি আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো। আমি সাথে সাথে আমার কয়েকজন বন্ধু কে ফোন দিয়ে একটা কফিসপ এ ডাকলাম।

অনেক্ষণ ধরে বসে আছি, ওফফ এদের স্বভাবই এমন। সব কাজে লেইট। তখনি পেছন থেকে কেউ এসে আমার চুল ধরে টান দিল।
~ আআআআ….ইশান…..(রেগে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। এটাই ওর স্বভাব। )
~ হয়েছে নাটক করতে হবে না এখানে হঠাৎ ডাকলি কেন সেটা বল।
~ বলবো আগে বাকিরা আসুক।
~ বাকিরা মানে, কে আসবে?
~ আসলেই দেখতে পাবি।
তখনি দিপু আর অনা এলো।
~ এতো লেইট করলি কেন। আচ্ছা শোন একটা রহস্যের সন্ধান পেয়েছি।
সবাই মিলে বলে উঠলো, “কি রহস্যে?”
~ একটা পরিবার কে খুঁজতে হবে।

দিপু~ কার পরিবার?
~ তাহলে শোন….সবাই কে সবটা বললাম।
ইশানঃ হুম এখানে বেশ বড় একটা রহস্য আছে।
কিন্তু মেয়ে টা মেয়ে টা যে করছিস। মেয়ে টার নাম টা কি?
~ ইশশশ ভুলে গেছি। কাব্যের কাছে সেটা তো জানা হয়নি।
ইশানঃ তুই যে কি করিস না! আচ্ছা কবে যাবি?
~ আগে কাব্যের সাথে কথা বলি। কোনো ভাবে ওকে বুঝিয়ে ই আমারা সেখানে যাবো। আর ঘটনা টার রহস্য বের করবই।
অনামি~ আচ্ছা কাব্যকে এখন ফোন করে জিজ্ঞেস করে নে মেয়ে টার নাম কি।
অনামির সাথে সবাই সম্মতি জানালো।
আমি কাব্য কে ফোন দিলাম।
~ কাব্য, তুমি ঠিক আছো তো?

~ হ্যাঁ যারিন আমি ঠিক আছি।
~ কাব্য একটা কথা জিজ্ঞেস করবো যদি কিছু মনে না করো।
~ হ্যাঁ বলো!
~ অই মেয়েটার নাম কি যাকে তুমি ভালোবাসতে?
~ ওর নাম নীলাদ্রি।
~ অহ আচ্ছা।
ফোন কেটে সবাই কে জানালাম মেয়েটার নাম নীলাদ্রি। এখন আমাদের লক্ষ্য এর পেছনের রহস্য বের করা। কাল ই আমি কাব্যের সাথে কথা বলবো আর সেই গ্রামে যাবো যেখানে গেলে সব রহস্যের সমাধান পাবো।

আরো পড়ুন – ছাত্রী ধর্ষণ – অতৃপ্ত আত্মার প্রতিশোধ পর্ব ১


পর্ব ৪

~ “পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি তে আমি কাব্যকে খুঁজছি। আর ভাবছি কাব্য এখন আমার ভালো বন্ধু। বন্ধু হয়ে বন্ধু কে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব। তাই আজ আমি কাব্য কে রাজি করাবই। কাব্যের ভালোর জন্যই। ভাবতে ভাবতে কাব্য আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
~ কাব্য তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।
~ কি কথা যারিন?
~ আগে প্রমিস করো রাখবে।
~ না জেনে কিভাবে?
~ না আগে বলো তার পর বলবো।
~ ওকে রাখবো। এবার বলো।

~ কাব্য, আমাকে তোমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবে?
~ না যারিন, আমি সেখানে আর যেতে চাই না।
~ কাব্য প্লিজ, আমার অনেকদিনের সখ রাজবাড়ি দেখবো। আর আমি একা নই আমার কয়েকজন বন্ধু ও সেখানে যাবে। আর তুমি তো সেখানকার সব চেনো। আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে ই চলে আসবে।
~ আমার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব না, বোঝার চেষ্টা করো।
~ কাব্য, এই প্রথম আমি কিছু চাইলাম আর তুমি দেবে না?
~ কিন্তু!
~ কোন কিন্তু নয়, আগের স্মৃতি নিয়ে বসে থাকলে জীবন চলবে না। তাহলে কালই আমরা যাবো আর তুমিও যাবে। রাজি?
~ আচ্ছা বাবা রাজি।
~ আমরা কখন বেরবো?
~ কাল বিকাল ৪ টায় আমরা ট্রেনে করে যাবো।

~ ওকে তুমি রেডি থেকো আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে আসবো।
যাক কাব্য কে বুঝানো গেছে। আমি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ইশান, দিপু আর অনা কে ফোন দিয়ে রেডি থাকতে বললাম। আমাদের মিশন শুরু। এই প্রথম আমরা কোন রহস্যের সমাধান করবো। আর এর পেছনে কাদের হাত আছে তাও জানবো।
বাড়িতে গিয়ে মা কে রাজী করি। প্রথমে মা মানা করে, কিন্তু আমি সেই নাছোড়বান্দা! রাজী করিয়েই ছাড়লাম।
সকাল সকাল ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। তবে কিছু বাড়তি জিনিস ও নিলাম যেগুলো পরে কাজে লাগতে পারে। তবে যেহেতু আমরা একটা রহস্যের সমাধান করতে যাচ্ছি তাই সেখানে বিপদ আসা টা স্বাভাবিক। এই কথা চিন্তা করে ইশানের রিভলবার টা নিয়ে নিতে বললাম। ইশান এটা নিজের বাড়িতে সবসময় রাখে সেফটির জন্য। যত বার ওর বাসায় গেছি ততো বার ওই রিভলবার টা আমায় আকৃষ্ট করতো। ওফফ কবে যে এমন একটা রিভলবার আমারো হবে…..
যাই হোক সব রেডি, এখন শুধু সকলের আসার অপেক্ষা।

তখনি নিশি ফোন দিল। আমার সাথে দেখা করতে চায়। কিন্তু আমি এখন কিভাবে যাবো সেটাই ভাবছিলাম। নিশি জোর করায় রাজী হলাম।
পাশের একটা পার্কে নিশি আসতে বললো। আমি গেলাম। গিয়ে দেখি নিশি আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। নিশির কাছে যেতেই সেই শিউলিফুলের গন্ধ আমার নাকে ভেসে এলো। আমি নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলাম..
~ নিশি তু্মি কি শিউলিফুলের পারফিউম ব্যবহার করো?
~ (নিশি একটু ইতস্তত হয়ে বললো)কেন?
~ তোমার কাছে আসলেই এই ফুলের গন্ধ আমি পাই। তাই আরকি!
~ হুম করি।
~ আচ্ছা আসল কথায় আসি, হঠাৎ কেন ডাকলে এভাবে?
~ তোমাকে কিছু দেয়ার ছিল।
~ কি?

নিশি আমার হাতে একটা লকেট ধরিয়ে দিল।
~ এটা কেন নিশি?
~ যারিন, এটা আমার। সবসময় তোমার সাথে রেখো। হয়তো কেন প্রয়োজনে আসতে পারে।
আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না এই লকেট আমার কি প্রয়োজনে আসতে পারে। তবু যখন দিয়েছে নিজের কাছে রেখে দিলাম।
~ যারিন, সাবধানে থেকো। তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে অনেক বিপদ। অনেক খারাপ লোক আছে চারপাশে। সবসময় সাবধানে থেকো। আমি সবসময় তোমার সাথে আছি।
~ তুমি সাথে আছো মানে?
~ তেমন কিছু না। এবার আমাকে ফিরতে হবে। বিদায় যারিন।
~ আল্লাহ্‌ হাফেজ!

এই প্রথম আমার নিশিকে দেখে কেমন যেন লাগলো। মনে হলো নিশি আমার কাছে কিছু লোকাচ্ছে। আমি বসে ওর যাওয়া দেখতে লাগলাম। কিছু দূর গিয়ে নিশি একবার আমার দিকে তাকালো। কেমন প্রাণহীন একটা চাহনি। আমার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠলো। কেন এমন হলো বুঝতে পারলাম না।
নিশি চলে গেল। আমিও বাসায় চলে আসলাম।
বিকেল ২:৩০ এ দিপু, অনা, ইশান সবাই আমার বাসায় হাজির হলো। এখন আমরা কাব্য কে নিতে যাবো। একটা গাড়ি নিয়ে যখন কাব্যের ফুফুর বাসায় যাবো ঠিক সেই মুহূর্তে কাব্য ফোন করে জানালো সে রেলস্টেশন এ পৌছে গেছে। আমাদের সোজা সেখানে যেতে বলল।
আমরা ও সেখানে গেলাম। ট্রেন আসতে আরো ৪৫ মিনিট এর মতো বাকি। গাড়ি থেকে নেমে কাব্যের সাথে সকলকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। কাব্য আগে কখনও ওদের দেখে নি। কারণ আমরা আলাদা আলাদা ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হয়েছি।

আজ আমি কাব্যের চোখমুখে সেই আগের মতো গম্ভীরতার ছাপ দেখতে পাচ্ছি। তাই কাব্য কে একটু আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম…
~ কাব্য, কিছু হয়েছে?
~ না, কিছু হয় নি।
~ তাহলে তোমাকে এমন গম্ভীর লাগছে কেন?
~ তুমি তো সব জানোই যারিন, নতুন করে আর কি বলবো?
~ সব ঠিক হয়ে যাবে কাব্য। চলো ট্রেন এর সময় হয়ে গেছে।
~ হুম!

ট্রেন প্লাটফর্ম এসে দাঁড়ালো। কাব্য আগেই আমাদের সকলের জন্য টিকিট কেটে রেখেছে।
গ বগি তে আমাদের সিট পরলো। সকলেই ট্রেনে উঠে যার যার জিনিসপত্র সাবধানে রেখেদিলাম।
শিলাকুন্ত গ্রামে পৌছাতে আমাদের ৪/৫ ঘন্টা সময় লাগবে। এমনিতে এখন দিনে বেশি শীত না থাকলে ও রাতে ঠান্ডা লাগে। তার উপর ট্রেনের প্রবল হাওয়া।
আজ ট্রেনে তেমন ভির নেই, ইশান, দিপু, অনা সবাই গান গাইতে শুরু করলো। কাব্য ও ওদের সাথে বেশ ভালোই মিশে গেছে। আমার একটু পিপাসা পাওয়ায় অনা কে বললাম পানির বোতল টা দিতে। পানি পান করে কাব্যের দিকে তাকালাম। আর মনে মনে ভাবতে লাগলাম, ” ছেলেটা ইচ্ছে করে সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখে, আসলে ও যেমন টা সবাইকে দেখাতে চায় তেমন টা নয়। মনে মনে ও খুব একা।

ভাবতে ভাবতে একটু সামনে চোখ গেলো। দেখতে পেলাম একটা মেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। তখনি আমার হাত থেকে পানির বোতল টা পরে গেলো। আমি সেটা উঠাতে নিচের দিকে চাইলাম। বোতল টা হাতে নিয়ে আবার সেদিকে তাকালাম। আশ্চর্য মাত্র ৩ সেকেন্ডের ব্যবধানে মেয়ে টা উধাও হয়ে গেলো।
মেয়ে টা কোথায় তা দেখার জন্য উঠতেই দিপু আমাকে আটকে দিল।
~ যারিন কোথায় যাচ্ছিস? বস একটা নতুন গল্প বলবো।
বাধ্য হয়ে বসতে হলো। এক সময় দিপুর গল্প গুলো শুনে খুব মজা পেতাম আর আগ্রহের সাথে শুনতাম কিন্তু আজ জানিনা কেন আমার সব অদ্ভুত লাগছে। সবার মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এলো। সকলেই ক্লান্ত। পেছন থেকে হকার এসে চা দিয়ে গেলো। এর মধ্যে দিপু ঘুমিয়ে বেহুঁশ হয়ে গেছে। অনা ঝিমুচ্ছে আর ইশান মোবাইলে কার্টুন দেখছে। আমি, আর ইশান কার্টুনের অনেক বড় ফ্যান, যে পরিমান কার্টুন দেখি সে পরিমান মুভি ও দেখি না। এটা অবশ্য ছেলেমানুষি বলা যায় না। কারণ আমরা যথেষ্ট বড় হয়েছি।
এদিকে কাব্য তার ব্যাগ থেকে বের করে কি যেন একটা পড়ছে।
আমি যাচ্ছি আর ভাবছি কিভাবে সেই মেয়ের খুঁজ পাওয়া যায়।

রাত প্রায় ৯ টা ছুঁই ছুঁই অবস্থা। গাড়ি প্লাটফর্ম এ এসে থামলো। সবাই সবার ব্যাগ নিয়ে নামলাম।
হঠাৎ দেখলাম কিছু লোক আমাদের দিকে আসলো। আর আমাদের হাত থেকে ব্যাগ গুলো নিয়ে চলে যাচ্ছে। সবাই অবাক হয়ে গেল। আমি ডাকাত ভেবে পেছনে দৌড়াতে লাগলাম।
আমার পেছন পেছন অনামি, ইশান, দিপু ও ব্যাগের পেছনে ছুটতে লাগলো। তখন পেছন থেকে কাব্য ডেকে বললো এই লোক গুলোকে তার বাবা পাঠিয়েছেন। সে আগেই তার বাবা কে আমাদের কথা বলে রেখেছিল।

শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। যাক বাবা লোক গুলো ডাকাত নয়।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখলাম একটা গাড়িতে আমাদের জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। একে একে সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম।
প্রায় ২০ মিনিট পর আমরা কাব্যদের রাজবাড়ি তে পৌছালাম। বাড়িটা বাইরে থেকেই বিশাল বড়।
আমাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছিল এখন রাজাদের আমল না থাকলে ও তাদের আগের মতই বাড়িতে সব আগের মতোই আছে।
আমাদের আলাদা আলাদা ঘরে থাকতে বললে ও আমরা ঠিক করলাম আমি আর অনামি এক ঘরে, ইশান আর দিপু আরেক ঘরে থাকবে।
বলা যায় না, অচেনা জায়গা। কি থেকে কি হয়ে যায়।

রাজাবাড়ির এক একটা রুম বিশাল বিশাল। আমরা সকলে ফ্রেশ হতেই একজন লোক এসে আমাদের খেতে ডাকতে এলো। আমরা লোকটির পেছন পেছন গেলাম। বড় একটা টেবিলে অনেক ধরনের খাবার। প্রায় ১০/১২ ধরনের রান্না করা। আমরা গিয়ে বসে আছি। পেছনেই দিপু, ইশান আর কাব্য এলো।
আমি কাব্য কে জিজ্ঞেস করলাম বাড়ির বাকি রা কেথায়। কাব্য বলল সকলেই টাইম ধরে কাজ করে। অরা খেয়ে নিয়েছে, যে যার কাজ করছে। সকালে উঠে সবাইকে দেখতে পাবে। তোমরা এখন খাওয়া শুরু করো।

বাড়ির এমন নিয়ম দেখে খুব অবাক হলাম না। রাজ পরিবারে সাধারনত এসব বিষয়ের প্রচলন ছিল। কিন্তু এখানে থেকেও কাব্য এতোটা আলাদা আর সাধারণ ভাবে কিভাবে থাকে তা বুঝতে পারলাম না।
খাওয়া শেষ করে আমরা সকলে একটা রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ আমার চোখ গেলো দরজার দিকে। একটা ছায়া সরে গেল। আমি কাউকে কিছু না বলে ছায়াটার দিকে যেতে লাগলাম। হঠাৎ ছায়াটা আমার সামনে চলে এলো। দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

আরো পড়ুন – এলিয়েন রহস্য পর্ব ১ – এলিয়েন মানবের গল্প


পর্ব ৫

~ “বিশালদেহী ছায়ামূর্তিটা আমার সামনে চলে এলো। ভয়ে আমি ছিটকে পিছিয়ে গেলাম। সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অনা জিজ্ঞেস করলো।”কি হয়েছে?” আমি ইশারা দিয়ে ছায়া মূর্তিটার দিকে দেখালাম। সবাই একটু ভয় পেয়ে গেল। এতো বিশাল দেহের কে এটা?

তখনি কাব্য হেসে উঠলো। আমি কাব্যের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কাব্য সেই ছায়ামূর্তির কাছে যেতে লাগলো। মদরজার বাইরে কিছুটা অন্ধকার হওয়ায় শুধু দেহের আকৃতি টা দেখা যাচ্ছিল। কাব্য দরজার সামনে গিয়ে ডাক দিল “সামনে আসুন” একটা লোক আবছা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো। কাব্য বলল এই লোক তাদের বাড়ির একজন কর্মচারী। এখানে আমাদের দেখতে এসেছিল।
আল্লাহ্‌! একটুর জন্য আমার প্রাণ টা বেরিয়ে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি আমার গলা চেপে ধরবে। এভাবে কেউ আসে? আজব!
কাব্য ও হাসছে সাথে সেই বিশাল দেহী লোকটা ও। ওদের হাসি দেখে সবাই উচ্চস্বরে হেসে পড়লো। কি বেয়াদব সবগুলো। আর আমার সাথে তো তোরাও ভয় পেয়েছিলি? এখন আবার আমাকে দেখেই হাসছে। ধুর…সবার সামনে এভাবে লজ্জিত হতে হলো।

কাব্য বলল ” অনেক রাত হয়েছে, সবাই যার যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পর। কাল ভোরে উঠতে হবে। এই বাড়ির নিয়ম।”
আমরা সবাই যার যার ঘরে শুয়ে পড়লাম। অনেকটা জার্নি করে আসায় সহজেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। চারপাশে তাকিয়ে সবকিছু কেমন অচেনা লাগছে। আমি রাজবাড়িতে নেই, বরং ছোট একটা অর্ধপাকা ঘরের সামনে দাড়িয়ে আছি। কিন্তু আমি এখানে এলাম কিভাবে? চারদিকে আর কোনো বাড়ি ঘর বা মানুষ কিছুই নেই। শিয়ালের ডাকে চারদিক ভূতুরে হয়ে উঠেছে। অন্ধকার সব গ্রাস করে ফেলেছে। ভেতর থেকে ক্রমশ আত্মচিৎকার বেরিয়ে আসছে। প্রচন্ড ভয় করছে আমার। আমি আস্তে আস্তে সেই ঘরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যতই কাছে যাচ্ছি চিৎকার আরো বেড়ে যাচ্ছে।

এখন স্পষ্ট শুনতে পেলাম একজন নয় ৩/৪ জন একসাথে চিৎকার করছে। নিশ্চই কোন বিপদ হয়েছে। এখন আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। পালিয়ে যাবো, নাকি ওদের বাঁচাবো?
কিছু একটা করতেই হবে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। এখনে আসার পেছনে নিশ্চই কোন কারণ রয়েছে। আমাকে দেখতে হবে।
আমি দরজার কাছে গিয়ে কান পেতে দাঁড়াই। কিছু মানুষের হাসির শব্দ পাচ্ছি তবে কান্নার কারনে সেটা বুঝা বেশ শক্ত। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারলাম এখানে কিছু গন্ডগোল হচ্ছে।
আমি ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। ঘরটা বেশ অন্ধকার। আমার হাতে কোন লাইট নেই। জানিনা বিদ্যাুৎ আছে কি না। তাই আস্তে আস্তে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তখনি কিছু একটায় ধাক্কা খেয়ে পরে যাই। মেঝেতে কিছু একটা পরে ছিল যা উপর আমার হাতটা গিয়ে পরলো আমি জিনিস টা হাতে নিলাম। উঠে বসতে যাবো তখনি দরজা টা আটকে গেল। আমি অন্ধকারে বন্দি হয়ে গেলাম। উঠে দরজার কাছে গিয়ে ধাক্কাতে লাগলাম। চিৎকার করতে লাগলাম।

পেছন থেকে কেউ গম্ভীর গলায় বলল “বিপদ”। বলার সাথে সাথেই কেউ আমার মুখ চেপে ধরে দেয়ালের সঙ্গে আমার মাথা আঘাত করলো।
আমি হকচকিয়ে উঠে বসি। স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ। ইশশ কিছুদিন ধরে যে আমার সাথে কি হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এমন অদ্ভুত স্বপ্ন….
পাশে অনা নেই। উঠতে যাবো..

তখনি বুঝতে পারলাম আমার হাতে কিছু একটা আছে। একটু ভয় পেলাম। হাতটা মেলে যে দেখবো কি আছে সেই সাহস টাও হচ্ছে না। তবু আস্তে আস্তে হাত টা খুলে দেখলাম ছোট্ট একটা চাবি।
এমন চাবি কোন ঘরের বা এমন কিছুর হতে পারে না। তাহলে এটা কিসের চাবি। কিছুটা ভয় পেলাম। স্বপ্নে ও তো আমি কিছু একটা হাতে নিয়েছিলাম। এই চাবি ছিল না তো? কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? সেটা তো কেবল স্বপ্ন ছিলো। আদৌ কি ছিলো? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছি। কিন্তু কোন উত্তর পাচ্ছি না। অনেক ভাবার পরও কিছুই বুঝতে পারলাম না। নিশ্চই এর পেছনে কোন রহস্য আছে।
উঠে ফ্রেস হতে গেলাম। মুখ ধোয়ার জন্য আয়নার দিকে তাকাতেই মনে পড়লো আমার মাথায় আঘাত থাকার কথা। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। ব্যাপার টা কেমন যেন ভৌতিক লাগছে আমার কাছে।

কিন্তু ভূত কি সত্যিই হয়? নাকি সব আমার কল্পনা। নাহ!কল্পনা হতে পারে না চাবি টা তো আমার হাতেই ছিল যেটা সেই বাড়িতে পেয়েছিলাম। আচ্ছা সেই বাড়ি টা কার? । আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।
রেডি হয়ে ঘরের বাইরে বেরোলাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ৭ টা বাজে। বেশি লেইট হয়নি। বিশাল বড় রাজবাড়িটা ভালো করে ঘুরে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি দেয়ালে পুরনো কারুকার্যে ছেয়ে গেছে। দেয়াল গুলো এখনও বেশ মজবুত। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম।

একটা বড় বাগান দেখলাম। সেখানে সবাই সেখানে দাড়িয়ে আছে। আমি কাছে যেতেই কাব্য সবাইকে খাবার জন্য যেতে বলল।
খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি একটা মাঝবয়সী লোক টেবিলে বসে আছে। পাশেই দুজন মহিলা একজন পুরুষ আর ২ টা বাচ্চা।
কাব্য সবার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল।
মাঝবয়সী লোকটি কাব্যের বাবা, পাশের জন মা আর তার সাথে কাব্যের চাচি, পুরুষ টি হলো কাব্যের চাচা। পাশের ২ টা বাচ্চা হলো কাব্যের চাচার ছেলে মেয়ে। মেয়ে ত্রিশা আর ছেলে অনিক।
সবার সাথে পরিচিত হতে বেশ ভালোই লাগলো কিন্তু কাব্যের বাবা একজন গম্ভীর লোক। একবারও ওনার মুখে হাসি দেখতে পেলাম না। বরং মনে হলো আমাদের দেখে বিরক্তই হয়েছেন।
খাওয়া শেষ করে আমি কাব্য কে বললাম পুরো গ্রাম টা আমাদের ঘুরিয়ে দেখাতে। কাব্য রাজি হলো।
আমরা বেরবো ঠিক সেই সময় অনামি জিগ্যেস করলো”
অনা~ আমরা কি হেঁটে যাবো?

কাব্যঃ গ্রাম যদি ভালোভাবে দেখতে হয় তবে হেঁটে ই যেতে হবে। বড় গাড়ি সেখানে যেতে পারবে না।
শুনেই অনার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ও আবার একটু বেশি রুপচর্চা করে। মুখে ময়দা মনেহয় অর্ধেক বস্তা ঢালে। এখন ওনি হাঁটতে চাইছেন না। রোদে ঘেমে যদি ময়দা উঠে যায়। এসব দেখলে আমার গা জ্বলে। আরে বাবা আমিও তো মেয়ে। তাই বলে এভাবে কি ময়দা মাখি?
আমিঃ অনা এই ময়দার জন্য তুই কি আমাদের গ্রাম ঘুরা বন্ধ করতে চাস?
অনা~ তা নয় কিন্তু!

আমিঃ অই চল আমাদের সাথে।
শেষমেশ রাজি হলো। পুরো গ্রাম অনেকটা ঘুরলাম। ঘুরতে ঘুরতে একটা রাস্থা দেখিয়ে কাব্য বললো, “এদিকে নিলাদ্রীর বাড়ি। আমি সেখানে যেতে চাইলাম কিন্তু কাব্য কিছুতেই রাজি হলো না। বরং তাড়াতাড়ি আবার রাজবাড়িতে ফিরে এলো।
কিন্তু আমি সেখানে যাবোই।
বিকেলে সেই আগের মতোই কাব্যের বাবার গম্ভীর মুখ দেখে খেতে হলো। আমাদের দিকে এমন ভাবে চেয়ে থাকে যেন গিলে খাবে। ইচ্ছে করছিল বুড়োর গোপ কেঁটে ফেলি। তার পর দেখি কিভাবে এতো ভাব ধরে থাকতে পারে।
বিকেল বেলা যখন সবাই ঘুমাচ্ছিলো। আমি চুপি চুপি উঠে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে পরলাম। বেরনোর আগে কৌশলে ইশানের রিভলবার টা নিয়ে নিলাম। যদি কোন বিপদে পড়ি কাজে লাগবে। আরো একটা জিনিস আমি সবসময় সাথে রাখি। যে কোন সময় কাজে লাগতে পারে। কি সেটা নাহয় পরে বলবো।
এখন কোন দিক থেকে এসেছিলাম সেটা মনে করার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম এগোতে থাকি আস্তে আস্তে মনে পড়বে। যেতে যেতে পেয়ে গেলাম। এইতো কাব্য এখানে দাঁড়িয়ে ই বলেছিল নিলাদ্রীদের বাড়ি কোন দিকে।

কাব্যর দেখানো রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষন যাবার পর দেখলাম সামনে বাড়িঘর খুব কম। আস্তে আস্তে কমতে লাগলো। এক সময় আর কোন বাড়ি দেখতে পেলাম না। শুধু বাঁশঝাড় আর জঙ্গল। তবু কেন যানি আমি এগিয়ে যেতে লাগলাম।

মনে মনে ভাবছিলাম ফিরে যাবো কিন্তু একটা অদৃশ্য শক্তি অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল কিছুএকটা আমায় টানছে। নিজের দিকে আকৃষ্ট করছে। যেতে যেতে মনে হলো জায়গাটা আমি কোথাও দেখেছি। চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু কোথায় দেখেছি….কোথায় দেখেছি….ওহ হে মনে পড়েছে এই জায়গা তো আমি স্বপ্নে দেখেছি। তার মানে কি বুঝতে আর বাকি রইলো না।
একটু এগিয়ে যেতেই অর্ধ পাকা বাড়ি টি দেখতে পেলাম। এটাই তাহলে নীলাদ্রির বাড়ি। পেয়েছি! স্বপ্নে আমি তাহলে নীলাদ্রির বাড়ি দেখেছিলাম। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আমি এখানে কখনও না এসেই কিভাবে বাড়িটা দেখতে পেলাম? কিছু তো গড়বড় আছে।

আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম ভেতরে কারা যেন চিৎকার করছিল কিন্তু এখানে তো তেমন কিছুই শুনতে পারছি না।
আমার সামনে তখন সেই স্বপ্নের মতো হুবহু বাড়িটা রয়েছে। সেই জায়গা ই। একটু ভয় করলে ও এখন আর পেছনে গেলে চলবে না। সূর্যের আলো কমে আসছে। কিছু একটা করতেই হবে।
বাড়ির চারদিক টা ঘুরে দেখলাম। তেমন কিছুই পেলাম না। জানলা গুলো বন্ধ করা।

আমি বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ালাম। খুব ভয় লাগছে। স্বপ্নের মতো আবার আমি ভেতরে বন্দি হয়ে যাবো না তো? ঠিক যখনি দরজায় ধাক্কা দিতে যাবো তখনি দরজার নিচথেকে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগলো। লাল টকটকে রক্ত। আমি ভয়ে পিছিয়ে আসি।

হঠাৎ দেখতে পেলাম বাড়ির একপাশে কারো দুটি চোখ। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাথার লম্বা চুল রক্তে লাল হয়ে গেছে। আমি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, “কে এখানে, সামনে এসো। সামনে এসো বলছি। নইলে কিন্তু গুলি করবো” বলতে বলতে রিভলবার টা সেদিকে তাক করলাম।
তখনি পেছন থেকে কেউ শক্তকরে আমার হাতটা চেপে ধরলো।

আপনারা পড়ছেন “রহস্যময়ী মেয়ে – লোমহর্ষক ভূতের গল্প।”


পর্ব ৬

~ “হাত থেকে রিভলবার টা নিয়ে নিলো। এরপর হাতটা পেছন দিকে বেঁধে দিলো। পেছনে তাকাতে চাইতেই আমার চোখেও কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলো। মুখে কাপড় বাঁধলো যাতে চিৎকার করতে না পারি। আমি দেখতে ও পারছি না কথা ও বলতে পারছি না। কিন্তু এটা বুঝলাম এখানে ২/৩ জন লোক রয়েছে যারা আমায় বন্দি করেছে। এর পর আমাকে টানতে টানতে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। আমি ছটফট করছি কিন্তু বেরোতে পারছি না।

যখন বুঝতে পারলাম এভাবে হবে না, মাথা খাঁটিয়ে এখান থেকে বেরোতে হবে, তখন থেকেই অনুমান করতে লাগলাম আমি কতোটা হাঁটছি আর কত সময় ধরে হাটছি। আমাকে কোনদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রায় ২০ মিনিট ধরে হাটছি মনে হচ্ছে ক্রমেই কোন জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছি। পায়ের নিচের শুকনো পাতার মচ মচ আওয়াজ হচ্ছে। হঠাৎ সবাই দাঁড়িয়ে গেলো। দরজা খুলার মতো শব্দ হলো। আমাকে টেনে ভেতরে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো। এবার পা টাও বেঁধে দিলো। এতক্ষনের মাঝে কারো মুখ থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম না। মনে হয় আগে থেকেই প্লেন করে রেখেছিলো।
ওরা আমাকে একটা রুমে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। পুরো রুমে একটা অদ্ভুত পঁচা গন্ধ ছড়িয়ে পরেছে। বেশ বমি বমি পাচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে পাতালপুরীতে চলে এসেছি। কোন ভাবে নিজেকে সামলে নিলাম। কিসের গন্ধ সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি কিছুক্ষন একেবারে চুপ করে ছিলাম যাতে বুঝতে পারি ওরা চলে গেছে কিনা। অনেক্ষণ পর মনে হলো সবাই আমাকে রেখে চলে গেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিৎ নই। তাই নিজের শরীর টাকে অনেক কষ্টে টেনে দরজার কাছে নিয়ে গেলাম। বাঁধা দুটো পা একসাথে দরজার দিকে ছুড়ে দিচ্ছিলাম। ফলে দরজায় জোরে শব্দ হতে লাগলো। অনেক্ষণ এমন করার পর ও কেউ এলো না। আমার হাতে এটাই সুযোগ।

আমার পড়নে ছিল জিন্স প্যান্ট আর জামা। প্যান্টের পকেটে সবসময় নিজের সেফটির জন্য একটা জিনিস রাখতাম। আর সেটা হলো ছুরি। হ্যাঁ, ইশানের রিভলবারের সাথে আমি এই ছুরি টাও নিয়েছিলাম। এমন বিপদের আশঙ্কা আমার আগেই ছিল তবে ভাবিনি প্রথম দিনই আমাকে এরা এভাবে বন্দি করে নেবে।
হাতটা পেছন থেকে ক্রসের মতো করে বাঁধা। আমার ছুরিটা ছিল বাম পকেটে। তাই দুটো হাত একসাথে করে বামদিকে পকেটের কাছে নিয়ে যেতে পারলেও ছুরিটা বের করতে পারছিলাম না। অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু হচ্ছে না। বার বার চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই পারছি না। হঠাৎ কোথা থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে এলো। আর পচা গন্ধ টা গায়েব। আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। এখানে শিউলিফুলের গন্ধ টা কিভাবে এলো? ঠিক তখনি মনে হলো আমার পকেটে কিছু নাড়াচাড়া করছে। আমি আবার চেষ্টা করতেই ছুরিটা হাতের নাগালে চলে এলো। আমি আর শিউলিফুলের গন্ধ নিয়ে ভাবলাম না। আগে আমাকে এখান থেকে বেরোতে হবে।

আমি কোনভাবে চাকুটা হাতে নিয়ে হাতের রসি কাটতে লাগলাম। এক সময় কেটে গেল। হাতের বাধন খুলে আমি চোখ মুখ ও পায়ের বাঁধন খুললাম। নিজেকে একটা অন্ধকার বন্ধ ঘরে আবিস্কার করলাম। মোবাইল টা থাকলে ভালো হতো..ধুর সেই যে চার্জে বসিয়েছিলাম আসার সময় নিয়ে আসতেই ভুলে গেছি।

এখন এখানথেকে যেভাবে হোক বেরোতে হবে। আমি দরজায় অনেক্ষণ ধাক্কা দিলাম কিন্তু খুলল না। চারিকে অন্ধকার। তাই রুমের দেয়াল ধরে ধরে রুমের চারপাশ দেখছি। হঠাৎ কিছুএকটা আমার হাতে লাগলো। কি তা বুঝতে পারছি না। পঁচা গন্ধ টা সেখান থেকেই আসছে। আমি একটু দূরে সরে গেলাম তার পর আবার দেয়াল ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। হাতে একটা সুইচবোর্ড লাগলো। আমি সুইচ গুলো অন করে দিলাম। একটার পর একটা সুইচ অন করলাম কিন্তু কোন লাভ হলো না। মনে হয় ইলেক্ট্রিসিটির লাইন টা নষ্ট হয়ে গেছে।
আমি হাল ছেড়ে আবার দরজার দিকে ফিরে যাচ্ছিলাম। তখনি একটা জানালা পেলাম। জানালাটা খুলে দিতেই পুরো ঘর আলোকিত হয়ে গেল। যদিও আর কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। কিন্তু দিনের আলোটা এখনো বেশ খানিকটা আছে।

ঘরটা দেখার জন্য পেছনে তাকাতেই ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এতক্ষণ আমি একটা মৃতদেহের সাথে এক ঘরে ছিলাম। এমনকি একে আমি ছুঁয়েছি পর্যন্ত। ভেবেই শরীরে একটা অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেল। মৃত দেহ টা একটা শিকল দিয়ে দেয়ালের সাথে আটকে রাখা হয়েছে। আর এই পঁচা গন্ধটা সেখান থেকেই আসছে। দেহটা অর্ধেক পঁচে গেছে।
আমি এখন কি করবো ভাবতে লাগলাম। তবে যা বুঝা যাচ্ছে যারা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে তাদের ইচ্ছে ছিল আমাকে মেরে ফেলা। তবে সেই সুযোগ না দিয়ে আমাকে এখন এখান থেকে বেরোতে হবে।

জানলাটা এক দম ফাঁকা, সহজেই বেরিয়ে আসা যাবে। আমি জানালা দিয়ে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চারদিকে গাছপালা। অনেকটা জঙ্গলের মতো। আমি সাবধানে বাড়ির সামনের দিকে গেলাম। দেখলাম কেউ নেই। সেখান থেকে কোন দিকে যাবো মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না। তখনি শুকনো পাতার মাঝে কিছু একটা দেখতে পেলাম। হ্যাঁ ইশানের রিভলবার।
তার মানে এদিকেই আমায় যেতে হবে। যাক বাঁচা গেল, একদিকে রিভলবার টাও পেলাম আর বেরিয়ে যাওয়ার পথও। মনে হয় কোন ভাবে ওদের হাতথেকে রিভলবার টা পরে গেছে।
আমি রিভলবারটা তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলাম। সূর্য প্রায় অস্ত যেতে চলল। এখন এখান থেকে না বেরোতে পারলে পথ খুঁজে পাবো না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাঁটছি। এক সময় নীলাদ্রি দের বাড়ির সামনে চলে এলাম। ঠিক ততোক্ষনে চারদিকে অন্ধকার নেমে গেছে।

পথ ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। আমি সাবধানে নীলাদ্রি দের বাড়ির সামনে আসতেই তাদের ঘর থেকে অদ্ভুত ধরণের আলো বেরোতে শুরু করলো। আমি থেমে গেলাম। আর সেই আলোর দিকে চেয়ে রইলাম। কিছুক্ষন পর হঠাৎ আলো টা নিভে গেলো। বুঝতে পারলাম কিছু গন্ডগোল আছে। আমি একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেলাম।
তখন দেখতে পেলাম তিনজন লোক এদিকে হেঁটে আসছে। তার মধ্য একজন বলে উঠলো”মেয়ে টাকে কি করবি?”অন্যজন বলল “আগের বার যা করেছিলাম এবারেও তাই করবো” বলেই তিনজন হাসতে শুরু করলো।

এর মানে এরা আগেও কারো সাথে এমন করেছে। তবে সেটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে সেই লাশ টা দেখে। কিছুক্ষন পর লোক গুলো একটু দূরে চলে যেতেই আমি সেখান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। এখন তাড়াতাড়ি আমায় রাজবাড়ি তে ফিরতে হবে। সবাই চিন্তা করছে। আর অই লোক গুলো যদি সেখানে গিয়ে আমায় না দেখতে পায় তবে আবার খুঁজতে আসবে।
আমি অন্ধকারে পথ চলতে চলতে রাজবাড়ি পৌছে গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই ইশান, দিপু, অনা, কাব্য, কাব্যের পরিবারের লোকজন সবাই মিলে আমায় ঘিরে ধরলো। একের পর এক হাজার টা প্রশ্ন। কিন্তু এখন যদি সবাইকে আমার সাথে ঘটে যাওয়া কথা গুলো বলি তবে সবাই ভয় পাবে আর হয়তো কালই আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। আর অই বাড়িতে গিয়ে যদি আমাকে দেখতে না পায় তবে সেই লাশ টাও অই লোক গুলো সরিয়ে ফেলতে পারে। তখন কেউ আমার কথা আর বিশ্বাস করবে না। কিন্তু এর পেছনের বিরাট রহস্য টা বের না করে এভাবে আমি চলে যেতে পারবো না।
তাই সবাইকে বললাম আমি গ্রাম দেখতে গিয়েছিলাম।
তখন কাব্য এসে আমায় বলতে লাগলো গ্রামের সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছে তারা। কোথাও আমাকে পায় নি।

আমি তখন কাব্যকে বললাম আমি নীলাদ্রি দের বাড়ির কাছে গিয়েছিলাম। কথাটা শুনে সবাই চুপ করে গেল। তখনি কাব্যের বাবা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একজন কর্মচারী কে বললেন আমাকে পানি দিতে। বিষয় টা আমার কাছে কিছুটা সন্দেহজনক লাগলো। সবার সামনে তা প্রকাশ না করে মনে মনেই চেপে গেলাম।
ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আর ভাবতে লাগলাম সেই লাশ টা কার। ঘরের মধ্য শিউলি ফুলের গন্ধ, ছুরি হঠাৎ হাতের নাগালে চলে আসা আর নীলাদ্রি দের ঘরে ওই আলোর মধ্যে নিশ্চই কোন যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু সেটা কি? আচ্ছা বার বার এই শিউলি ফুলের গন্ধের সাথে কি কোন ভাবে নিশির সম্পর্ক আছে? না না এটা কিভাবে হয়। নিশি থাকে ময়মনসিংহ আর এটা শিলাকুন্ত। নিশি এখানে আসতে পারে না। কিন্তু কি এমন অদৃশ্য শক্তি আমাকে বার বার সাহায্য করছে। কে সে?

তখনই আমার সেই ছেট্ট চাবিটার কথা মনে পড়লো। আমি আমার পকেটে চাবি টা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোথাও খুজে পাচ্ছি না। তাহলে কি চাবি টা আমি হারিয়ে ফেললাম? না! এই চাবি হারালে চলবে না। এই চাবির পেছনেও কোন রহস্য রয়েছে। আমাকে সেটা খুঁজে পেতেই হবে। দরকার হয়ে সেই জায়গায় আমি আবার যাবো কিন্তু যেভাবেই হোক চাবি আমি খুঁজে বের করবই।
আর এই চাবি, শিউলি ফুলের গন্ধ, নীলাদ্রির বাড়ির রহস্য, আর সেই লোকগুলোকে বের করেই ছাড়বো।
রাতে আমি, অনামি, দিপু, ইশান সবাই মিলে ঘরে বসে আছি তখনি কাব্য এলো।

~ যারিন!
~ আরে কাব্য এসো।
~ তোমার থেকে কিছু জানার ছিল।
~ কি?
~ নীলাদ্রিদের বাড়িতে তুমি কেন গিয়েছিলে?
~ এমিন একটু ঘুরতে।
~ না সত্যি করে বলো সেখানে কেন গিয়েছিলে?
~ আমি সত্যি বলছি।
~ প্লিজ যারিন আমায় সত্যি বলো। (সবার সামনেই কাব্য আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল)
~ আচ্ছা আমি বলছি!আগে বল তো নীলাদ্রী দের পরিবারে কে কে আছে?
~ ওর মা, ভাই রিফাত আর ছোট একটা বোন তমা, বাবা অনেক আগেই মারা গেছে।
~ ওর ভাই আর বোনের বয়স কত হবে?

~ ওর বোন নীলাদ্রীর এক বছরের ছোট, আর ভাই ৪/৫ বছরের বড়। কিন্তু কেন?
~ কাব্য, আমার মনে হয় নিলাদ্রী কোন বিপদের মধ্য আছে।
~ কিসের বিপদ?
~ তা আমি জানি না। তবে অর সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে এটুকু বুঝতে পেরেছি।
~ কি ঘটেছে?
~ তা আমি এখনো জানি না। সেটা জানার জন্য তোমার সাহায্যের প্রয়োজন। (কাব্য কে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ব্যাপার টা বললাম না)
~ কি করতে হবে বলো।
~ আপাততো কাল আমাকে নীলাদ্রী দের বাড়িতে যেতে হবে। পারবে নিয়ে যেতে?
~ হ্যাঁ পারবো।
~ তাহলে কাল সকালেই আমরা সেখানে যাবো।
কাব্য চলে গেল। দিপু, ইশান, অনামি সবাই মিলে আমাকে জিজ্ঞেস করলো”তুই কিভাবে এসব জানলি?”আমি ওদের আমার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বললাম। আমার কথা শুনে দিপু বলল
দিপু~ তোকে কোন আত্মা সাহায্য করছে না তো?
আমিঃ জানি না রে, এখন আমি শুধু জানি এই রহস্য আমাকে বের করতেই হবে। ইশান, কাল তোর রিভলবার টা নিয়ে নিস যাওয়ার সময়। খেয়াল রাখিস কেউ যেন না দেখতে পায়।
ইশানঃ ঠিক আছে!

কাল আমাকে যেভাবেই হোক ঐ চাবি টা পেতে হবে। অনেক রহস্য এই চাবির মধ্য লুকিয়ে আছে।
পরদিন সকালে…..
আমি, কাব্য, ইশান, দিপু, অনামি সবাই বেরিয়ে পরলাম নীলাদ্রী দের বাড়ির দিকে। ঠিক তখনি একটা ছেলে এসে কাব্য কে জড়িয়ে ধরলো। কাব্য ও ছেলেটাকে দেখে কেঁদে ফেলল। কিছুক্ষণ নিরব থেকে কাব্য বলতে লাগলো,
কাব্যঃ ও রনি, আমার বন্ধু।
আমি বুঝতে পারলাম এই সেই রনি যার কাছে নীলাদ্রীর দেয়া চিঠি টা ছিল। ভালোই হলো। একে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিলো আমার।
রনিঃ যানিস কাব্য তুই এসেছিস শুনে আমি ঢাকা থেকে চলে এসেছি। খুব খারাপ লাগছিল তোর জন্য।
কাব্যঃ তুই সেই পাগল ই রয়ে গেলি। চল আজ আমরা নীলাদ্রি দের বাড়িতে যাবো।
কথা টা শুনে রনির চোখ মুখ কালো হয়ে গেল।
রনিঃ সেখানে কেন যাবি। অই মেয়ে তো তোকে রেখে চলে গেছে অন্য কারো হাত ধরে।
কাব্যঃ জানি না তবে ওর কোন বিপদ হয়েছে।

রনিঃ কিভাবে বুঝলি?
তখনি আমি কাব্য কে ডেকে বললাম “আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে চলো”
কাব্য রনি কে নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলো। এক সময় আমরা নীলাদ্রি দের বাড়ির সামনে চলে এলাম। আমার প্রথম কাজ এই বাড়িটা ঘুরে দেখা। যেহেতু আমি কাব্য কে সেই তিনজন লোকের কথা টা গোপন করেছি তাই সেখানে কাব্য কে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

আমি নীলাদ্রি দের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সবাই আমার পেছনে। দরজার তালাটায় টান দিতেই খুলে গেল। কাব্য আশ্চর্য হয়ে বলল…
কাব্যঃ আমি যেদিন এখানে নীলাদ্রি কে খঁুজতে আসি তখন দরজা টা তালা দেয়া ছিল। অনেক চেষ্টা করে ও খুলতে পারি নি। আজ হঠাৎ কিভাবে খুলে গেল?
আমি ব্যাপার টা সামলে নিয়ে বললাম..”অনেক দিন হয়ে গেছে তো তাই হয়তো তালা টা কোন ভাবে খুলে গেছে।
কাব্য তা মেনে নিল। কিন্তু এদিকে অনা ভয়ে কাঁপতে লাগলো। ওর আবার ভূতে ভয়। আমি ব্যাপার টা লক্ষ্য করে ইশারায় শান্ত হতে বললাম।
তালা খুলে আমি ভেতরে ঢুকলাম। এক এক করে সবাই ভেতরে ঢুকলো। হঠাৎ পেছন থেকে কারো চিৎকার শুনতে পেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি রনি দরজা থেকে তিন হাত দূরে পড়ে আছে।
সবাই দৌড়ে রনি কে তুলল। বেশ খানিকটা ব্যথা পেয়েছে পায়ে। ওকে দাঁড় করিয়ে কাব্য জিজ্ঞেস করলো “কিভাবে পড়ে গেলি?”রনি বলল সে বুঝতে পারে নি, হঠাৎ তার মনে হয়েছে তাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।

কথা টা শুনে আমার ওর উপর সন্দেহ হলো। ছেলেটা হয়তো বা অভিনয় করছে নয়তো নিশ্চই এই ঘটনার সাথে কোন ভাবে জড়িত রয়েছে।
রনি একা হাঁটতে পারছে না। কাব্য বলে উঠলো এখন রনির বিশ্রাম দরকার তাই এখান থেকে সবাই কে চলে যেতে। কথা টা শুনে আমার মনে হলো এই সুযোগ নষ্ট করা চলবে না। তাই আমি কাব্য কে বললাম কাব্য যেন রনি কে নিয়ে চলে যায়। আমি, দিপু, ইশান আর অনা এখানে থাকি। কিছুক্ষণ পর চলে যাবো।

কাব্য আমাদের রেখে যেতে চাইছিল না। কিন্তু অনেক বুঝানোর পর রাজি হলো। রনিকে নিয়ে কাব্য চলে যাচ্ছিল তখনি পেছন থেকে অনা ডেকে বলল সে ও কাব্যের সাথে যাবে। দিপু অনা কে আবার ফিরে আসতে বলতে চাইতেই আমি আটকে দিলাম। আস্তে আস্তে বললাম অনা না থাকতে চাইলে যাক। কখন আবার ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, যেতে দে।
দিপু আর কিছু বলল না। অনামি ও কাব্যের সাথে চলে গেলো। ইশান আর দিপু আবার ঘরের ভেতরে চলে গেলো। আমিও যাচ্ছিলাম। কিন্তু কি ভেবে একবার রনির দিকে তাকালাম। দেখলাম কাব্য রনিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভেতরে ঢুকবো সেই সময় কিছু একটা দেখে থ হয়ে গেলাম।
রনিরা যেদিক দিয়ে ক্রস করছিস ঠিক সেখানেই পাশের একটি গাছের আড়ালে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভালে ভাবে তাকালাম। স্পষ্ট একটা মেয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ ইশান আমাকে ডেকে উঠলো। আমি এক পলক সেদিকে তাকিয়ে আবার মেয়েটার দিকে তাকাতেই উধাও। আমার সেই ট্রেনের মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেলো। সেই মেয়েটা ও এভাবেই উধাও হয়ে গেছিল। তাহলে কি সত্যি এই মেয়েটি কোন আত্মা?

আমি আবার ঘরের ভেতর চলে গেলাম। ভেতরে যেতেই ইশান বলল
~ এখানে তেমন কিছু পেলাম না রে। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস?
আমিঃ কি?
ইশানঃ ঘর গুলো এতো পরিষ্কার যে দেখে মনে হচ্ছে কালই কেউ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেছে।
আমিও ব্যাপার টা লক্ষ্য করলাম। মনে পড়লো কাল যখন আমি এখানে এসেছিলাম ভেতর থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল কিন্তু আজ কিছুই হলো না। সবাই মিলে চারদিকে অনেক খুঁজেও কিছু পেলাম না। তখনি দিপু আমায় ডাকলো। আমি আর ইশান সেদিকে গিয়ে দেখি দিপু একটা আলমারির সামনে কিছু একটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যেতেই একটা ডায়েরি আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। ডায়েরি টা হাতে নিয়ে দেখলাম এটায় তালা দেয়া। তালা দেয়া ডায়েরি আমি এর আগেও দেখেছি। কিন্তু এটা একটু অন্যরকম। চাইলেই কেউ এই ডায়েরি খুলতে পারবে না। দিপু বলল…
দিপু~ কি করবি এটা। চাবি কেথায় পাবি?

আমিঃ চাবি আছে। চল আমার সাথে।
ইশানঃ কোথায় যাবি?
আমিঃ সেই বাড়িতে যেখানে আমায় আটকে রেখেছিল। সেখানেই এই ডায়েরির চাবি খঁুজে পাবো।
ইশানঃ এই চাবি সেখানে আছে তুই এটাও জানিস? কিভাবে?
আমি আমার স্বপ্নের কথা টা ওদের বললাম।
আমি, ইশান, দিপু তিনজন সেই জঙ্গলের দিকে যেতে লাগলাম। যেতে যেতে ইশান কে বললাম রিভলবার টা রেডি রাখতে। আমার হাতে ছুরি আর দিপু কোথা থেকে একটা মজবুত লাঠি যোগার করে নিলো।

তিনজন এগিয়ে যাচ্ছি। বাড়ির সামনে আসতেই কেমন একটা মচ মচ আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি। দিপু আর ইশান কে দাঁড়াতে বললাম। তখনো মচ মচ আওয়াজ আমাদের চারপাশ থেকে আসতে লাগলো। আমাদের যার হাতে যা আছে তা নিয়ে তৈরি হয়ে গেলাম।
তখনি চারপাশ থেকে ছয় জন লোক আমাদের ঘিরে ধরলো। সবার হাতে রাম দাঁ। আর আমাদের হাতে ছোট অস্ত্র। এখন ইশানের রিভলবার টাই আমাদের ভরসা। ইশান তাদের দিকে বন্দুক তাক করে বলল “‘এক পা সামনে এলে গুলি করবো।”
কিন্তু লোক গুলোর চোখ মুখে কোন ভয় দেখতে পেলাম না। সবাই একসাথে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
তখনি আকাশ থেকে বিদ্যুৎ এর মতো কিছু একটা আমাদের সামনে এসে পড়লো। সবাই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিছুক্ষণ পর তাকিয়ে দেখি আমি, দিপু আর ইশান বাদে কেউ নেই। সেই লোক গুলো যেন ভূতের মতো গায়েব হয়ে গেল।

আমি বুঝতে পারলাম না এই ভর দুপুরবেলা বিদ্যুৎ এলো কোথা থেকে। আর এলো কিন্তু আমাদের কিছু হলো না আর সেই লোক গুলো ও গায়েব। এর মানে….আমি ভাবার আগেই ইশান বলে উঠলো “যারিন আমাদের আশেপাশে নিশ্চই কোন আত্মা আছে”আমিও সায় দিলাম। দিপু কে দেখলাম এখনো চোখ বন্ধ করে আছে।
ওকে ডাকলাম। চারদিকের লোকগুলো কে দেখে দিপু ভয় পেয়ে গেছিল তার ওপর বিদ্যুৎ। বেচারা মুখটা মলিন হয়ে আছে। আমি ওকে স্বাভাবিক হতে বললাম। কিছুক্ষণ পর ও স্বাভাবিক হয়ে উঠলে আমি বললাম” এখন আমাদের বাড়ির ভেতরে যেতে হবে। এখানে থাকলে চলবে না”
আমরা বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। প্রথম ঘরটায় একটা টেবিল রাখা আর চারটা চেয়ার। ইশান বলে উঠলো “যারিন সেদিন তোকে তিনজন বন্দি করেছিল। আর আজ এখানে ছয়জন আমাদের মারতে এলো। এদের মধ্য কি সেই তিনটে লোক ছিল?”
আমি কিছুক্ষন ভাবলাম। নাহ! এই ছয়জনের বডি দেখেই বুঝা যাচ্ছে এরা কোন সাধারন লোক নয়। নিশ্চই কারো ভাড়া করা গুন্ডা। আর আমি যাদের দেখেছিলাম তাদের সরাসরি না দেখলে ও নিশ্চিত করে বলতে পারি এদের মধ্য কেউ ছিল না।

ইশান বলল “তার মানে একটাই। যারা এসব করছে তারা চার জন। কারণ এখানে চারটা চেয়ার রয়েছে। এদের মধ্য তিনজন কে তুই দেখেছিস। কিন্তু চার নাম্বার টা কে?”
দিপু বলল”এসব বাদ দিয়ে ঘর টা ভালো করে দেখা দরকার। পরে নাহয় এসব আলোচনা করা যাবে।”
ঘরটা খুজে দেখলাম কয়েকটা সিগারেট এর অবশিষ্ট অংশ পরে আছে। এর বেশি কিছু পেলাম না। আমি রুমের অন্য একটা দরজা খুলে ভেতরে যেতেই দেখলাম সেই ঘর টা যেখানে আমাকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই লাশ টা কোথাও খুঁজে পেলাম না।

আমার সন্দেহ সত্যি হলো। সেই তিন জন লাশ টা কোথাও সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কোন ক্লু নিশ্চই আছে আর সেই চাবি টা ও এখানেই কোথাও আছে। আমি ভালো করে দেখতে লাগলাম। রুমের জানালা খোলা থাকলেও আমি মোবাইলের ফ্লাস লাইট টা জ্বালিয়ে নিলাম। লাইট টা একটা জায়গায় পড়তেই এক কিছু একটা জ্বল জ্বল করে উঠলো। কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম সেই চাবি।
দিপু আর ইশান কে দেখালাম। এর পর আবার খুঁজতে লাগলাম। অনেক্ষন খুঁজার পর যখন কিছুই পেলাম না আমরা ফিরে আসছিলাম। তখনি সেই রুম টার দরজার কাছে কিছু একটা দেখতে পেলাম।

আরো পড়ুন – পাপের পরিণাম – নতুন ভয়ানক ভুতের গল্প


পর্ব ৭

~ “দরজার সামনে একটা আংটি পড়ে ছিলো। আমি আংটি টা তুললাম। কার হতে পারে ভাবছি। হয়তো এখানে যে লাশ টা ছিল তার নয়তো যারা এসবের মধ্য জড়িত তাদের কারো হবে। আংটি টা সাবধানে রেখে আমি, দিপু, ইশান রাজবাড়ি তে ফিরে আসি।
ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেলাম কাব্য দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে প্রায় দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো।
কাব্যঃ কিছু জানতে পারলে, নীলাদ্রি কি সত্যি কোন বিপদে আছে?
আমিঃ কাব্য আমরা নীলাদ্রির কোন খুঁজ পাই নি। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেক অদ্ভুত কিছু দেখেছি।
কাব্যঃ কি দেখেছো?

ইশানঃ কাব্য, আমার জানা মতে নীলাদ্রি তার পরিবার কে নিয়ে অনেক দিন আগেই এখান থেকে চলে গেছে। যদিও সেটা কতটা সত্যি তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারন আমরা তাদের ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস ভালোভাবে লক্ষ্য করেছি আর যা বুঝা গেল, আমরা যাওয়ার আগে নীলাদ্রি দের বাড়িটা খুব সুন্দর করে পরিষ্কার করা হয়েছে যাতে আমরা কোন ধরনের প্রমাণ
খুঁজে পেতে না পারি।
দিপু~ আমারা নিশ্চিত নীলাদ্রি খুব বড় একটা
চক্রান্তের শিকার হয়েছে।
কাব্য কান্না শুরু করে দিল। আমার খুব খারাপ লাগছিলো। কিন্তু কাব্য কে এখুনি ডায়েরির কথা বলা যাবে না। তাই আমি কাব্য কে আংটি টা দেখিয়ে বললাম….
আমিঃ কাব্য, এই আংটি টা চেনো?
কাব্যঃ না, এই আংটি আমি চিনি না। তবে
কোথায় যেন দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।
আমিঃ কাব্য, কথায় দেখেছো মনে করো। এই
আংটি আমাদের এই রহস্যের সমাধান দিতে পারবে।

কাব্যঃ আমি পারছি না, মনে পড়ছে না আমার।
কাব্য অনেক চেষ্টা করলো কিন্তু মনে করতে পারলো না। আমি কাব্য কে শান্ত হতে বললাম। আর একটু সময় নিয়ে ভাবতে বললাম। পেছনে হঠাৎ চোখ যেতেই দেখলাম রনি দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে কেমন যেন একটু রেগে তাকিয়ে ছিল। আমি ওর দিকে তাকাতেই
যতোটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে চেয়ে কাব্যের কাছে এলো।
রনিঃ কাব্য আমার একটা জরুরি কাজ আছে
আমি যাই।
কাব্যঃ তোর পায়ে তো ব্যথা। কিভাবে যাবি?
রনিঃ আমি যেতে পারবো এখন অনেক টা ঠিক
আছি। তুই চিন্তা করিস না।
কাব্যঃ রনি এই আংটি টা চিনিস?
রনিঃ কই না তো! কার আংটি? (মুখে স্পষ্ট
ভয়ের ছাপ)
কাব্যঃ জানি না ঠিক মনে পড়ছে না। কোথায়
যেন দেখেছি।

রনিঃ কাব্য আমি এবার আসি রে। অন্য সময়
আসবো।
আমি বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা গন্ডগোল আছে। রনি চলে গেল। আমি ডায়েরি টা নিয়ে আমাদের থাকার ঘরে চলে এলাম। ইশান, দিপু ফ্রেশ হতে গেছে। ঘরে গিয়ে দেখি অনা ঘুমোচ্ছে। আমি ডায়েরি টা এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে চাবি টা নিলাম। এবার চাবি টা তালায় ঢুকিয়ে চাপ দিতেই তালা টা খুলে গেলো।
ডায়েরি তে প্রথমেই কয়েকটা শুকনো শিউলি ফুল দেখতে পেলাম। এর পর পাতা উল্টাতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছি না।
সেখানে লিখা ছিল “নীলাদ্রি নিশি” এর মানে নীলাদ্রির নাম নিশি ছিল? এই কি সেই নিশি যে আমার সাথে দেখা করেছিল? ভাবতে ভাবতেই দেখতে পেলাম আমার চারদিক অন্ধাকার হয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সব অস্পষ্ট হয়ে যেতে লাগলো। এক সময় সব অন্ধকার। আমি কিছুই দেখতে পারছি না। হঠাৎ চারদিক শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে গেল। তখনি কেউ আমাকে ডেকে উঠলো।
যারিন………

আমি গলা টা চিনে ফেললাম। হ্যাঁ এটা নিশির গলা। কিন্তু ও কোথায়? শব্দটা শুনে বুঝতে চেষ্টা করলাম কোন দিক থেকে আওয়াজ টা আসছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। আবার আমাকে নিশি ডাকলো।
নিশিঃ যারিন…..
আমিঃ কোথায় তুমি নিশি, আমার সামনে এসো। অনেক কিছু যে জানার আছে তোমার থেকে।
নিশিঃ আমি জানি কি জানতে চাও তুমি।
আমিঃ তাহলে বল আমায় সব।
নিশিঃ তাহলে শুনো। আমাকে হত্যা করা হয়েছে। আর এইযে আমাকে দেখছো আমি মানুষ নই, একটা আত্মা।
আমিঃ কে তোমাকে হত্যা করেছে বলো। আমি তাদের শাস্তি দেবো।

নিশিঃ হাহাহা! না যারিন ওদের তো আমি নিজের হাতে শাস্তি দেবো। আমি চাইলে ওদের অনেক আগেই মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু এভাবে মরলে যে কাব্য আমাকে সারা জীবন ভুল বুঝে যাবে। তাই আমি তোমাকে
এখানে এনেছি।
আমি এমন একজন কে খুঁজছিলাম যে কাব্যের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারবে। ওকে আবার সাধারন জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু এমন কাউকে পাই নি।
যেদিন তুমি প্রথম দিন কাব্যের সাথে ইউনিভার্সিটি তে যাচ্ছিলে সেদিন তোমাকে প্রথম আমি দেখি। সব সময় তোমার চারপাশে থাকতাম। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল একমাত্র তুমি আমাকে আর কাব্য কে সাহায্য করতে পারো।

যারিন আমি তোমাকে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো বলতে চেয়েছিলাম অনেক আগেই। কিন্তু প্রথম দিন তুমি আমার দেয়া চিঠি টা দেখে ভয় পেয়ে যাও। তার পর যখন তোমাকে ঘুমের মধ্য সব বলতে চাইলাম তুমি আবারো ভয় পেয়ে গেছিলে। তাই আর কোন উপায় না পেয়ে আমি তোমার সাথে অভিনয় করি।
তোমাকে কাব্যের সাথে মিশতে সাহায্য করি। আর এই গ্রামে নিয়ে আসি।
আমিঃ কিন্তু তোমাকে কারা মেরেছিল?

নিশিঃ জানতে পারবে, সব জানতে পারবে তবে এক এক করে সবার মুখোশ সামনে আসবে আর আমি তাদের শাস্তি দেবো।
আমিঃ মানে, তুমি কি করতে চাও?
নিশিঃ সব বুঝতে পারবে যারিন সব। বলেই কোথায় উধাও হয়ে গেল। আমি নিশিকে বার বার ডাকছি কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই। শুনতে পেলাম। পেছন থেকে অনা
আমাকে ডাকছে। আস্তে আস্তে আবার সব পরিষ্কার হয়ে গেলো। দেখতে পেলাম আমি আগের জায়গা তেই দাঁড়িয়ে আছি।
অনা আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে কখন এসেছি। তার মানে আমার আর নিশির কথা গুলো অনা শুনেনি। আমি অনামির কথার কোনো উওর না দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। কাব্য দের বাগানের কাছে গিয়ে ডায়েরি টা পড়তে শুরু করলাম।

পৃষ্ঠা ১~ আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। আজ আমি জানতে পারলাম কাব্য আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু বোকা আমাকে প্রপোজ করলো তো করলো তাও উল্টো করে।
পৃষ্ঠা২~ কাব্যের ভালোবাসা পেয়ে আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখী মেয়ে। কিন্তু আমার কপালে এই সুখ সইবে তো? ওরা অনেক বড়লোক আর আমি গরিব। জানি না কি হবে। বিধাতার কাছে আমি কাব্য কে ছাড়া আর কিছু চাই না।

পৃষ্ঠা ৩~ আজ আমি অনেক খুশি। কাব্যের বাবা আমাদের বিষয় টা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু কাব্যের সাথে আমার দেখা করতে নিষেধ করেছেন। বলেছেন কাব্য আর আমার পরীক্ষা শেষ হলে দেখা করতে আর কাব্য প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের বিয়ে দেবেন। কিছু পেতে হলে তো কিছু হারাতে হয়। নাহয় কিছুদিনের জন্য আমাদের দেখা হলো না। তার পর তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর আমাদের মিল কেউ আটকাতে পারবে না।
পৃষ্ঠা৪~ অনেক দিন হলো কাব্যের সাথে আমার দেখা হয় না। ও আমাকে ছাড়া সে কেমন আছে। জানি ভালো নেই। আমিও না, খুব ভালোবাসি যে কাব্য কে।
পৃষ্ঠা৫~ ঘরের বাইরে কিছু লোক বার বার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। আমার অনেক ভয় করছে। মা, ভাই, আমার ছোট বোন টা খুব ভয় পাচ্ছে। মনে হচ্ছে লোক গুলো দরজা ভেঙে একটু পরই ঢুকে পরবে। কি চায় ওরা?

পৃষ্ঠা৬~ মা জোর করে আমাকে আর তমা কে
ঘরের ভেতের পাঠিয়ে দিয়েছে।
পৃষ্ঠা৭~ ওরা আমার মা আর ভাইয়ার উপর খুব অত্যাচার করছে। আমাকে ওরা নিয়ে যেতে চায়। কি করবো আমি? খুব ভয় করছে। ওরা
জোরে জোরে ধমক দিচ্ছে। সবাইকে নাকি মেরে ফেলবে আমি না গেলে। এদের মধ্য একজনের গলা অনেক টা রনির মতো লাগছে কিন্তু তা কিভাবে হতে পারে? রনি তো কাব্যের বন্ধু। সে এসব করবে?
পৃষ্ঠা৮~ ওরা আমার ভাইয়া কে মেরে ফেলেছে। মায়ের চিৎকার আমাকে যেতে বাধ্য করলো। আমি চাই না ভাইয়ার মতো মা আর তমা কে ওরা মেরে ফেলুক। এই বোধহয় আমার শেষ লিখা…..
এর পর আর কোন লিখা নেই। তার মানে রনি এইসবের মধ্য যুক্ত ছিলো? আমাকে এই ডায়েরি কাব্যের কাছে নিয়ে যেতে হবে। পেছনে ঘুরতেই মাথায় কেউ ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করলো। আমি মাটিতে পরে গেলাম। হাত থেকে ডায়েরি টাও পরে গেলো।

আরো পড়ুন – আলপিন – bangla voyonkor bhuter golpo


পর্ব ৮

~ “কেউ মুখে পানি ছুড়তেই আমার জ্ঞান ফিরে এলো। সামনে তাকিয়ে দেখি রনি দাঁড়িয়ে আছে। আমার হাত পা বাঁধা। মাথায় আঘাত লাগায় ব্যথা পাচ্ছি। অনেক টা রক্তও ঝড়েছে। এদিকে রনি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত গুলো বের করে হাসতে লাগলো। সাথে আরো একজন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে অবশ্য আমি কখনও দেখি নি।
রনি জোড়ে জোড়ে বলতে লাগলো..

রনিঃ এখানে এসে মস্ত বড় ভুল করেছো যারিন। এসেছিলে ভালো কথা কিন্তু আমাদের বিষয়ে না ঢুকলে হয়তো এভাবে তোমাকে মরতে হতো না।
আমিঃ রনি, তুমি যা করেছো তার জন্য লজ্জা হওয়া উচিত। তা না করে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?
রনিঃ ভয় না রে পাগলি আমি তোকে মারবো। আর ঠিক সেভাবেই মারবো যেভাবে নিশি কে মেরেছিলাম।
আমিঃ কিভাবে মেরেছো তুমি নিশিকে?
রনিঃ আহা রে, বেচারি নিশি! খুব কষ্ট হয়েছিল ওর মরার সময়। হাহাহা। কিভাবে মেরেছি জানিস? ওকে অনেক বার বলেছিলাম। আমি তোমাকে খুব সুখে রাখবো। রানীর মতো রাখবো। কিন্তু আমার কোন কথাই শুনলো না। নিজের জেদের কারনে নৃশংসভাবে হত্যা করেছি ওকে।
আমিঃ কি করেছো তুমি নিশির সাথে বলো।

রনিঃ ওর হাতের আঙুল কেটেছি, পায়ের আঙুল কেটেছি। জিহ্বা কেটেছি। সারা শরীর টুকরো টুকরো করে। এর পর গলা কেটে কাব্য দের পুকুরপাড় এর শিউলি গাছের নিচে পুঁতে রেখে দিয়েছি।
আমিঃ ছিঃ এতো নৃশংস তুমি? তুমি না কাব্যর বন্ধু ছিলে? তাহলে কিভাবে এসব করলে?
রনিঃ ছিলাম তবে যেদিন থেকে নিশি কাব্যের সাথে সম্পর্কে জড়ায় আমি ঠিক থাকতে পারি নি। ভালোবেসেছিলাম নিশিকে। কিন্তু ও শুনলো না।
আমিঃ আর কে কে ছিল তোমার সাথে?

রনিঃ আমি, আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেখছো সেও ছিল। ও আবির আমরা আর কাব্য এক সাথেই পড়ি।
আমিঃ আরো যে দুজন ছিল তারা কে?
রনিঃ বাহ! আরো দুজন ছিল সেটা ও বুঝে গেলে। কি ব্রেইন তোমার। সত্যি মানতে হবে বুদ্ধিমতি। তবে আমাদের চার জনের পেছনে মাস্টার মাইন্ড একজন আছে।
আমিঃ বলো আরকে ছিলো? আর মাস্টারমাইন্ড কে?
রনি বলতে বলতে আর বললো না।

রনিঃ না না সেটা বলা যাবে না, সিক্রেট। অবশ্য মরার পর তো জানবেই সব শুনেছি আত্মারা নাকি সব দেখে। সব জেনে যায়। তোমার তো জানার সখ। চলো পুরন করে দিই।
বলেই একটা বড় ছুরি নিয়ে আমার সামনে এলো। আমার হাতের কাছে ছুরি টা ধরলো। হঠাৎ চারদিক থেকে প্রবল হাওয়া আসতে শুরু করলো। একটা বন্ধ ঘরে এতো হাওয়া আসাটা অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পেরেছি এখানে নিশি এসেছে। কারণ হাওয়ার সাথে সাথে শিউলি ফুলের গন্ধ স্পষ্ট আমার নাকে আসছে।

আমি রনি কে সাবধান করলাম। ‘”রনি এখনো সময় আছে। সব স্বীকার করে নাও নইলে নিশির আত্মা তোমাকে বাঁচতে দেবে না।” কিন্তু রনি হেসে উঠলো আর কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাস করছিল না।
হঠাৎ চারপাশ থেকে তীব্র ধোয়ার কুন্ডলী আমাদের চারপাশে ঘুরতে শুরু করলো। এটা দেখে রনি আর আবির নামের ছেলেটি ভয় পেয়ে গেল।
আবির ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল কিন্তু রনি যেতে পারলো না। রনির চারপাশে ধোয়া ঘুরছে। এক সময় রনিকে ধোয়া টা হাওয়ায় ভাসিয়ে নিল। রনি ধোয়ার সাথে সাথে শূন্যে ঘুরতে লাগলো। কিছুক্ষন পর রনি ছিটকে গিয়ে ঘরের এক পাশের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে নিচে পরে গেল। সাথে সাথে হাওয়া টাও মিলিয়ে গেলো।

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। আমি আবারো রনিকে বললাম সব স্বীকার করে নাও। কিন্তু রনি কিছুতেই তা করলো না। বরং আবার পালিয়ে যেতে চাইতেই ঘরের দরজা টা বন্ধ হয়ে গেল। রনি দরজায় ক্রমশ ধাক্কাচ্ছে কিন্তু কোন লাভ হলো না।
আমার হাতের বাঁধন টা নিজে নিজেই খুলে গেলো। আমি ছাড়া পেয়ে গেলাম। দেখলাম পাশের একটা টেবিলে ডায়েরিটা রাখা। আমি গিয়ে ডায়েরিটা হাতে নিলাম। কাব্যকে প্রমাণ দেখাতেই হবে। তখনি নিশির কন্ঠ ভেসে এলো।

নিশিঃ যারিন চলে যাও এখান থেকে। একে এবার শাস্তি দেয়ার সময় চলে এসেছে।
আমিঃ না নিশি। ওকে কিছু করো না। এভাবে শাস্তি দিয়ে কি পাবে তুমি?
নিশিঃ শান্তি। আমি যে অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগ করছি তা থেকে শান্তি পাবো। এর রক্তে স্নান করবো আমি। চলে যাও যারিন।
আমিঃ না নিশি ছেড়ে দাও ওকে।

তখনি নিশি আমার দিকে তাকালো। আমি এক নিমিশে কিভাবে সেই বাড়ির বাইরে চলে এলাম নিজেই জানি না। জায়গা টা আমি আগেও দেখেছি। কাব্য আমাদের এই জায়গা টা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। রাজবাড়ীর কাছাকাছিই। ভেতর থেকে রনির আত্মচিৎকার ভেসে আসছে। আমাকে কিছু করতেই হবে। আমি দৌড়ে রাজাবাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। হাতে নিশির ডায়েরি।
যেভাবেই হোক রনি কে বাঁচাতে হবে। প্রায় ১০ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে আমি রাজবাড়ি পৌছালাম। আমি ভেতরে ঢুকেই কাব্যকে খুঁজতে ওর ঘরে গেলাম সেখানে কেউ নেই। দৌড়ে বসার ঘরে যেতেই দেখতে পেলাম কাব্য, ইশান, দিপু, অনা সহ কাব্যের বাড়ির সকলে বসে গল্প করছে।
আমি ভেতরে যেতেই কাব্য আমার দিকে তাকালো। আমার মাথা ফেঁটে রক্ত বেরিয়েছে ফলে জামাকাপড় এ রক্ত লেগে আছে। আমাকে দেখে কাব্য দৌড়ে এলো। আর সকলেই আমাকে জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে।

আমি সবাইকে সবটা খুলে বললাম। আর ডায়েরি টা কাব্যের হাতে দিলাম। কাব্য ডায়েরি পড়ার পর আমি রনির কথা বললাম। কিন্তু কাব্য রনিকে বাঁচাতে চায় না। আমি বুঝালাম রনিকে বাঁচালে বাকি খুনিদের নাম হয়তো জানা যাবে।
কাব্য বুঝতে পারলো। আমি, কাব্য, দিপু, ইশান, অনা রনি কে বাঁচাতে চললাম। কিন্তু আমরা যেতে যেতে খুব দেরি হয়ে গেছে।
ভেতরে গিয়ে দেখি রনির টুকরোটুকরো করা লাশ টা নিচে একপাশে পড়েআছে আর মাথা টা আলাদা হয়ে অন্যপাশে। আর ঠিক সামনেই রনির রক্ত দিয়ে লিখা, “আজ রনি তার পাপের শাস্তি পেয়েছে এবার পাবে আবির”

আমি কাব্যকে জলদি আবিরের কাছে যেতে বললাম
নইলে আবির কেও নিশি মেরে ফেলবে। এভাবে মরলে চলবে না ওদের আইন সাজা দেবে। কাব্য দৌড়াচ্ছে আমি, অনা, দিপু, ইশান সবাই কাব্যের পেছন পেছন যাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর আমরা আবিরের বাড়িতে চলে আসি। দেখি আবির ব্যাগ গোছাচ্ছে। কাব্য গিয়েই আবির কে ঘুষি দিতে শুরু করলো। ইশান আর দিপু কোন ভাবে কাব্য কে শান্ত করলো। আমি আবির কে জিজ্ঞেস করলাম ” কে কে ছিল তোমাদের সাথে বলো” আবির বললো না। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম তাও বলল না। এর পর আমি রনির কথা বললাম…

আমিঃ আবির, রনি কে নিশি মেরে ফেলেছে। এবার তোমার পালা। তুমি কি মরতে চাও, চাও না তো! তাহলে বলো আমাদের তোমাদের সাথে আর কে কে ছিল?
আবির বললো “আমি, রনি, লিমন….”” কাব্য নাম গুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। আবির ৪র্থ জনের নাম বলতে যাবে তখনি কাব্য উঠে ঘরে থাকা একটা গ্লাস হাতে নিয়ে ভঙলো আর। আবিরের দিকে ক্রোধ এ এগিয়ে আসছিল। আমরা সবাই মিলে কাব্য কে আটকে রাখার চেষ্টা করছি। আবির ভয়ে কি করবে বুঝতে পারছে না। কাব্য আমাদের ঠেলে ফেলে দিলো আর আবিরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। আবির দৌড়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কোনো ভাবে কারেন্টের তারের সাথে আটকে যায়। গলায় কারেন্টের তার টা আটকে আবির কে উপরে উঠিয়ে নেয়। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল এটা স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়।

ইশান কেথা থেকে একটা শুকনো কাঠের লাঠি এনে আবির কে মুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন কাজ হয় না। মনে হচ্ছিল আবিরের শরীরে তার টা আঠার মতো লেগে গেছে। কিছুক্ষণ পর আর আবিরের কোন সাড়াশব্দ আসছে না। তার টা থেকে আবিরের দেহ নিচে পরে গেলো। শরীরে কারেন্ট লাগায় সেখানেই ওর মৃত্যু হয় তার।
চারদিকে শিউলি ফুলের গন্ধ বয়ে আসছে। কানের কাছে শুনতে পেলাম। নিশি বলছে…

“পারবে না যারিন, কাউকে বাঁচাতে পারবে না। সবাই তার পাপের সাজা ভোগ করবে। এবার আমি লিমন কে মারতে যাবো। পারলে আটকে দেখাও।”
বলেই চলে গেল। আমি কাব্যকে বললাম এবার লিমনের পালা। কাব্য চলো আমাদের যেতে হবে। তখন কাব্য বলল “কি হবে গিয়ে? আমার কাছের বন্ধু যাদের সাথে আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি। এক সাথে খেলেছি, লেখাপড়া করেছি। সুখেদুঃখে সব সময় আমি যাদের পাশে ছিলাম তারা আমার জীবন টাকে এভাবে নষ্ট করে দিলল। আমার ভালোবাসা কে এভাবে খুন করলো? ছিঃ লজ্জা হচ্ছে আমার, সব আমার দোষ। আজ যদি আমি নীলাদ্রিকে ভালো না বাসতাম তাহলে এতকিছু কখনোই ঘটতো না। সব দোষ আমার।”
আমার কাব্য কে শান্তনা দেবার ভাষা ছিল না। সত্যি এ কেমন বন্ধু নিজের বন্ধু এতো বড় ক্ষতি করলো। রনি নাহয় নিশি কে পাবার জন্য এমন করেছে কিন্তু সেই মাস্টার মাইন্ড টা কে? তার কি স্বার্থ ছিল এর পেছনে?

এটা নিশ্চই বড় একটা চক্রান্ত কিন্তু সে কে আমাকে বের করতেই হবে। আর তা জানতে হলে লিমন কে বাঁচাতেই হবে।
কিন্তু এখন কাব্যের অবস্থা খুব খারাপ ছেলে টা ভেঙে পরেছে। আমি বললাম..
“আজ আর কোথাও যেতে হবে না। এখন কাব্যের একা থাকা প্রয়োজন।”
তাই সবাই মিলে কাব্য কে রাজাবাড়িতে নিয়ে গেলাম। কাব্য কে তার ঘরে দিয়ে আমি আমার ঘরে চলে এলাম। ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই শুনলাম কাব্যকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এটা কিভাবে হয়? নিশি তো কাব্যকে কখনও নিয়ে যাবে না। তাহলে কাব্য কোথায় চলে গেলো? নাকি কেউ কাব্য কে কিডন্যাপ করেছে?
আমি নিশি কে ডাকতে লাগলাম। তখনি বাতাসে শিউলির গন্ধ ভেসে এলো।

কেমন লাগছে আমাদের এই ভয়ানক ভূতের গল্প টি।


পর্ব ৯

~ “আমিঃ নিশি কোথায় তুমি সামনে এসো।
নিশিঃ বলো যারিন।
আমিঃ কাব্য কোথায়, কে নিয়েগেছে কাব্য কে?
নিশিঃ হাহাহা!

আমিঃ হাসছো কেনো। বলো কোথায় কাব্য?
নিশিঃ এই গ্রামের শেষ সীমানায় একটা বাড়িতে কাব্য রয়েছে।
আমিঃ কে নিয়ে গেছে সেখানে ওকে?
নিশিঃ যে একটু পর মরতে চলেছে। হাহাহা!
আমিঃ কে মরতে চায় নিশি? কে, নিশি কোথায় তুমি? বলে যাও কে সে?

মিশি চলে যায়। আমি নিশি কে ডাকছি কিন্তু নিশি আর আসে না। তার পর ভাবতে লাগলাম কে হতে পারে? এর পর মাথায় এলো। আবির তো লিমন নামে একটা ছেলের নাম বলেছিল। তাহলে কি সেই ছেলে কাব্যকে কিডন্যাপ করলো? কিন্তু ও কেন এমন করবে? মাথায় কিচ্ছু আসছে না।
আমাকে কাব্যের কাছে তাড়াতাড়ি পৌছাতে হবে। আমি ইশান, দিপু, অনা আর কাব্যের পরিবার কে সব বললাম। সবাই ঘাবড়ে গেলো। আমরা সেখানে যেতে চাইলে কাব্যের চাচা বললেন তিনি ও আমাদের সাথে যাবেন। তাই যাওয়ার জন্য ওনি একটা গাড়ি নিয়ে আসলেন।

আমরা ঝটপট গাড়িতে উঠে পরলাম। কালাম চাচা(কাব্যের চাচা)গাড়ি স্টার্ট দিলেন। আমি শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছি যাতে কাব্যের কোন ক্ষতি না হয়। আর নিশি যেনো লিমন কে আগেই না মারতে পারে। সেই মাস্টার মাইন্ড এর কথা টা তবে হয়তো আর জানা যাবে না।

রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি খারাপ হয়ে গেল। ভালো ভাবে চেক করে দেখা গেল পেট্রোল শেষ। এখন আমরা কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। তবে কাব্যকে বাঁচাতেই হবে। কালাম চাচা কে বললাম অন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে কিন্তু তিনি জানান অন্য গাড়িতে একটু সমস্যা দেখা দেয়ায় সার্ভিসিং এর জন্য শহরে পাঠানো হয়েছে।
এবার আমাদের হাতে একটাই রাস্তা। হেঁটেই যেতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটে যাবো। কালাম চাচা বলে উঠলেন এখান থেকে অনেকটা দূরের পথ। যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা অপেক্ষা করি।

আমি বললাম রাজবাড়ি গিয়ে আবার পেট্রোল নিয়ে ফিরে আসতে অনেক সময় লাগবে। আর এখানে তেমন নেটওয়ার্ক না থাকায় ফোনে কল ও করা যাবে না।
কিন্তু যাই হোক আমাকে সেখানে পৌছাতেই হবে। এখন তো সবে দুপুর। হয়তো পৌছাতে পারবো। চাচা বললো আমাদের যেতে তিনি গাড়িতে তেল ভরার ব্যবস্থা করবেন। আমরাও তাই করলাম। চাচা তেল আনতে রাজবাড়ি তে চলে গেলেন।

এদিকে আমি, অনা, দিপু, ইশান মিলে হাঁটতে লাগলাম
অনেক্ষন হাঁটার পর গ্রামের ঘর বাড়ি আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো। রাস্তায় একটা লোক কে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম…
আঙ্কেল গ্রামের শেষ সীমানা আর কতো দূর? লোকটি বলল আমরা কাছেই এসে গেছি এখান থেকে এক ঘন্টার রাস্তা।
আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম। প্রায় এক ঘন্টা পর একটা সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। অন্য একটা গ্রামের নাম লিখা। তার মানে এখানেই গ্রামের শেষ সীমানা। কিন্তু কাব্য কোথায়? এদিকে প্রায় সন্ধা হয়ে গেছে। তাই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।
কিছুক্ষণ খুঁজার পর একটা বাড়ি দেখতে পেলাম। দেখে মনেহচ্ছে বেশ পুরনো। সেখানেই কাব্য কে হয়তো রেখেছে। আমি, অনা, ইশান, দিপু আস্তে আস্তে বাড়ির পেছনে গিয়ে কান পেতে রাখলাম কারো আওয়াজ আসে কি না দেখতে।

শুনতে পেলাম কথার আওয়াজ আসছে। জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখতে পেলাম কাব্য অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। ভেতরে আরো কিছু লোকজন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ইশান কে রিভলবার টা হাতে নিতে বললাম।

এবার সময় এসে গেছে। আমি ইশান দিপু অনামি চারজন দুইদিক থেকে বাড়ির সামনের যাচ্ছিলাম
তখনি একজন বেরিয়ে এলো। ইশান সেই সুযোগে ছেলেটার মাথায় রিভলবাল টা তাঁক করলো। ছেলেটা সেই ভয়ে কাঁপছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমার নাম কি? ছেলেটা জবাবে বললো রিফাত। তুমিও নিশি কে হত্যার মধ্য জড়িত ছিলে? ছেলোটা মাথা নিচু করে ফেললো। আমরা সবাই মিলে রিফাতকে ধরে বাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। বাড়ির সামনেও কিছু লোক ছিল। মনেহয় এদের ভাড়া করে আনা হয়েছে।

আমাদের দিকে লোক গুলো এগিয়ে আসছিল। তখনি আমি বললাম কেউ সামনে এলে একে আমরা মেরে ফেলবো। রিফাত নিজের প্রাণের ভয়ে সবাইকে সবাইকে পিছিয়ে যেতে বলল। আমি ইশানকে বললাম প্রথমে কাব্য কে ঘর থেকে বের করতে হবে। তাই আমরা ঘরের দিকে যেতে লাগলাম। আমরা ঘরের ভেতরে ঢোকার সময় ভাড়া করা লোক আমাদের ঘিরে ধরে। ইশানেক হাত থেকে রিভলবার টা কেড়ে নেয়।

রিফাত মুক্ত হয়ে যেন ভিজে বিড়াল থেকে হিংস্র বাঘ হয়ে গেলো। আমাদের সবাইকে বেঁধে ফেলে। তখনি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে আরো একজন। রিফাত বলে উঠলো..
রিফাতঃ দেখ লিমন, আমাদের জন্য মেহেমান এসেছে। এবার আর নিশি আমাদের কিছুই করতে পারবে না।
লিমনঃ ঠিক বলেছিস রিফাত। আমাদের আর ভয় পাবার প্রয়োজন নেই। এবার শুধু নিশির আত্মা কেন নিশির চৌদ্দ গুষ্ঠির আত্মা আসলেও আমাদের কিছু করবে না। যদি কিছু করার চেষ্টা করে তাহলে কাব্য আর এই পিচ্চি গুলো কে….!হাহাহা।
রিফাতঃ এখন কি করবি ভাবছিস?

লিমনঃ ভাবছি একটু মজা করবো। এই দুটো মেয়ের মধ্য একজন কে নাচাবো। কেমন হবে বল?
রিফাতঃ দারুন মজা হবে।
লিমনঃ আরে ধুর বোকা। জীবনে কতো মেয়ের নাচ দেখলাম। আত্মার নাচ কখনো দেখেছিস? আজ আমরা আত্মার নাচ দেখবো। অহ, আমার যে তর সইছে না।
আমিঃ তোমাদের মতো সয়তান দের কি ভেবেছো নিশি ছেড়ে দেবে? ভুল করছো। এখনো সময় আছে। সব স্বীকার করে আইনের কাছে ধরা দাও। নইলে তোমাদের নিস্তার নেই। তোমাদেরও রনি আর আবিরের অবস্থা হবে।

লিমনঃ হাহা! আমরা কি অই দুটো গর্ধপের মতো নাকি? আমাদের বুদ্ধি তেই আমরা বেঁচে যাবো। সেদিন কিভাবে জানি না আমাদের ভাড়া লোক গুলোর হাত থেকে বেঁচে গেছিলে। কিন্তু আজ না। আজ আমি যা চাইবো তাই হবে।
আমিঃ এতো সহজ না লিমন। আমি জানি তোমাদের পেছনে কোন মাস্টার মাইন্ড রয়েছে। কে সে?
লিমনঃ তোমাকে এই কথা কে বলেছে?
আমিঃ আবির আমাদের সব বলে গেছে।

লিমনঃ এই আবির হলো একটা বলদ। সব সময় ভয় পায় আর একটুতেই সব কথা পেট থেকে বের করে দেয়।
আমিঃ এবার বলো সেই মাস্টার মাইন্ড টা কে?
আরে দাঁড়াও দাঁড়াও এতো অধৈর্য হওয়ার কি আছে? সবে তো শুরু।
বলতে বলতে লিমন একটা চেয়ারে বসলো। হঠাৎ চেয়ার টা হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। চারদিকের লোকগুলো ভয় পেয়ে গেলো। কিন্তু আমরা বুঝতে পারলাম এটা নিশি।
লিমন কে আবার চেয়ার সহ নিচে ফেলে দিল। এদিকে রিফাত ইশানের রিভলবার টা নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলো। দিপু ইশান ভাড়া করা লোকগুলোর সাথে লড়াই করছে। আমি রিফাতের পেছন পেছন ঘরে ঢুকতেই দেখি রিফাত কাব্য কে মেরে ফেলার জন্য উদ্ধত হয়েছে।
আমি এক ধাক্কায় রিফাত কে ফেলে দিলাম। কাব্যের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছি কিন্তু কাজ হচ্ছে না। পাশেই একটা ছোট্ট বোতল দেখতে পেলাম। বোতল থেকে পানি বের করে কাব্যের চোখ মুখে ছিটিয়ে দিতেই ওর জ্ঞান ফিরে এলো।

এদিকে রিফাত একটা লাঠি দিয়ে আমায় আঘাত করলো। আমি হাতে প্রচন্ডে ব্যথা পেলাম। কাব্য রিফাতের হাত থেকে লাঠি টা কেড়ে নিয়ে ওকে মারতে লাগলো।
রিফাত কে নিয়ে কাব্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আমিও পেছন পেছন বেরিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি নিশি লিমন কে তখনও হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখেছে। এক সময় লিমনের জিহ্বা বাইরে বের হতে থাকলো। একটা গাছের কাছে গিয়ে জিহ্বা টা পেচিয়ে গেল। লিমন গাছে ঝুলছে। হঠাৎ জিহ্বা লিমনের মুখ থেকে ছিড়ে বেরিয়ে এলো। ক্রমশ রক্ত বের হচ্ছে ওর মুখ থেকে। লিমনকে আবার মাটিতে ছুড়ে মারলে নিশি। তার পর আবার হাওয়ায় তুলে ওর হাত আর পা ভেঙে উল্টো করে দিল। এর পর লিমনের গলা থেকে ঘার টা ছিড়ে নিচে ফেলে দিল। এসব দৃশ্য দেখে রিফাত অজ্ঞান হয়ে গেল।
নিশি রিফাতকে কাব্যের কাছ থেকে হাওয়ায় উঠিয়ে নিয়ে চলে যেতে লাগলো।

কাব্য নিশি কে পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো “কোথায় যাচ্ছো নিশি?”নিশি বলল “রিফাতকে তার পাপের শাস্তি দিতে।”বলে হাওয়ায় ভাসিয়ে রিফাত কে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
আমি নিশি কে মানা করলাম কিন্তু ও আমার কোনো কথা শুনলো না। উপায় না পেয়ে আমরাও পেছন পেছন যেতে লাগলাম। নিশি রিফাতকে নিয়ে অনেকটা দূরে একটা কাঁঠ কাটার মিলের মধ্য চলে গেল।

যেখানে কাঁঠ কাটার জন্য কাঁঠ রাখা হয় সেখানে রিফাত কে রাখলো। রিফাতের শরীর দড়ি দিয়ে পেচিয়ে গেল। রিফাত তখনো অজ্ঞান ছিল। কিছুক্ষন পর জ্ঞান ফিরতেই চারদিকে তাকিয়ে দেখলো সে মেশিন টার সামনে। আমাদের দিকে তাকিয়ে রিফাত বার বার চিৎকার করছে। মকাব্যকে ডাকছে তাকে বাঁচাতে।
হঠাৎ মেশিন না চালু হয়ে গেল। রিফাত আস্তে আস্তে ধারালো বড় ব্লেট টার সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাণপণে চিৎকার করছে কিন্তু নিশি হাওয়ায় ভেসে ভেসে হাসছে।
এক সময় রিফাতের মাথা টা ব্লেডের মধ্যে চলে গেল। একটা বৃহৎ চিৎকার। সাথে সাথে মাথা টা কেঁটে দুভাগ হয়ে গেল। তাতেও নিশি শান্ত হয় নি। নিতে নিতে পুরো শরীর টা কেঁটে দুভাগ করে ফেলল।
আমরা সবাই এই নৃশংস দৃশ্য দেখে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। এর পর নিশি হাসতে হাসতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
নিশি চলে যাওয়ার পর আমি কাব্য কে জিজ্ঞেস করলাম…

আমিঃ কিভাবে তোমাকে ওরা এখানে নিয়ে এসেছে?
কাব্যঃ বাড়িতে গিয়ে আমি আমার জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখনি রিফাত আমার জানালার নিচে দাড়িয়ে বাইরে বেরোতে বলল। আমি বাইরে বেরোতেই কেউ আমার মুখ চেপে ধরে তার পর আমার জ্ঞান হারিয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি এই ঘরে পরে আছি। আমি জেগে উঠতেই ওরা আবার আমার মুখে একটা রোমাল চেপে ধরে তাই আবার আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।
সব তো হলো। কিন্তু আমরা জানতে পারলাম না কে আসলে এই সবকিছুর মাস্টার মাইন্ড। আর এই পুরো ঘটনা কে সাজিয়েছে?
তখনি কাব্য বলে উঠলো আমি জানি কে এসব করেছে। আমরা সবাই মিলে জিজ্ঞেস করলাম কে করেছে এসব? আর তুমি কিভাবে জানো?
কাব্য বলতে লাগলো….

কাব্যঃ আমাকে যখন ওরা এখানে অজ্ঞান করে নিয়ে এসেছিল এর কিছুক্ষণ পর আমার জ্ঞান ফেরে। আমি চোখ না মেললেও রিফাত আর লিমনের কথা গুলো স্পষ্ট শুনতে পারছিলাম। ওরা তখন সেই মাস্টার মাইন্ড এর নাম টা বলল।
আমিঃ কে সে কাব্য?
কাব্যঃ সে……
কাব্য বলতে চাইতেই একটা গাড়ির আওয়াজ হলো। দেখলাম আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম ওটা কালাম চাচা। তিনি গাড়ি থামিয়ে দৌড়ে কাব্যের কাছে যান।
চাচাঃ তোমরা এখানে কেনো? তোমাদের তো গ্রামের শেষ সীমানায় থাকার কথা। আর কাব্য, তুই ঠিক আছিস তো? ওরা তোকে কেন নিয়ে গিয়েছিল?
কাব্যঃ সেটা তো আমার থেকে ভালো আপনার জানার কথা চাচা।
চাচা চমকে উঠলেন। আর আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। এসব কি বলছে কাব্য?
আমিঃ এসব কি বলছো কাব্য? তোমার মাথা ঠিক আছে?

কাব্যঃ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ যারিন। ইনি সব জানেন। বলুন জানেন না?
চাচাঃ কাব্য কি সব উল্টাপাল্টা বকছিস। চল বাড়িতে চল।
কাব্যঃ আর কতো মিঃ মাস্টার মাইন্ড?
আমি, ইশান, দিপু, অনা কেউ যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তার মানে মাস্টার মাইন্ড কালাম চাচা? আমরা এটা ধারনাই করতে পারি নি।
চাচাঃ এসব কি বলছিস কাব্য, কে মাস্টার মাইন্ড? তোর কোথাও ভুল হচ্ছে।
কাব্যঃ কোনো ভুল নেই লিমন নিজের মুখে এই কথা বলেছে।
চাচাঃ মিথ্যে বলেছে সব।
কাব্যঃ সব সত্যি আর আপনিই মাস্টার মাইন্ড। স্বীকার না করলেও এটাই সত্যি।

তখনি চাচা পকেট থেকে একটা রাজার আমলের রিভলবার বের করে কাব্যের মাথায় ধরলো। আর জোড়ে জোড়ে হাসতে লাগলো…
চাচাঃ তাহলে জেনেই গেছো? হ্যাঁ আমি মাস্টার মাইন্ড এই সবকিছুর পেছনে আমার হাত রয়েছে।
কাব্যঃ কেন করলেন এসব? কেন এত গুলো নিরীহ মানুষকে মেরে ফেললেন?
চাচাঃ হ্যাঁ মেরেছি। কারন তুই কাব্য।
কাব্যঃ আমি?

চাচাঃ হ্যাঁ তুই। ভাইয়ার সব সম্পত্তির মালিক তুই আর আমি কেউ না?
কাব্যঃ কিন্তু নিশি কে কেন মারলেন?
চাচাঃ তোকে মেরে ফেললে তো সব দোষ আমার হতো তাই যেদিন জানতে পারি নিশির সাথে তোর সম্পর্ক রয়েছে সেদিনই প্লেন করি।
যেভাবেই হোক নিশিকে তোর জীবন থেকে বের করতে হবে। আমি চেয়েছিলাম তুই নিশির জন্য জীবনের সব মায়া ত্যাগ করে আত্মহত্যা কর। আর এই সম্পত্তি আমি পেয়ে যাই।
তাই তোর বন্ধু রনি কে ডেকে তোর আর নিশির মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে বলি। কিন্তু ও পারে না। শেষে উপায় না দেখে নিশি কে মারতে চাইলে রনি বলে ও নিশি কে ভালোবাসে। নিশিকে নিয়ে এখান থেকে দূরে চলে যাবে। আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম।
ভাইয়া কে বলে তোর আর নিশির দেখা বন্ধ করে দিলাম। এর পর তোর পরিক্ষা শেষ হওয়ার দিন রাতে রনি আর কয়েকজন ভাড়া করা লোক গুলোকে নিশি দের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। সেখানে ওরা প্রথমে নিশির ভাই আর তার পর মা কে খুন করে।

নিশির ভাই আর মাকে একটা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
ওরা নিশি আর তার ছোট বোন তমা কে উঠিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গলের সেই বাড়ি টায়। সেখানে গিয়ে রনি তার তিনজন বন্ধুকে ডাকে। রনি চেয়েছিল নিশি কে বিয়ে করে অনেক দূরে চলে যেতে আর ওর বোন তমা কে মেরে ফেলতে। কিন্তু ওর তিন বন্ধু তমাকে ভোগ করতে চাইলো। আমিও বাঁধা দিলাম না।
অন্যদিকে রনি নিশি কে অনেক বার বোঝায়। মারধর করে কিন্তু সেই মেয়ে শুধু কাব্য কাব্য করতো। এই কারনে রনি ওর জিহ্বা কেঁটে দেয়।
তার পরো নিশি কাব্যের কাছে যেতে চাইতো। এসব দেখতে না পেরে রনি নিশিকে মেরে ওর শরীর কেঁটে টুকরো টুকরো করে আমাদের পুকুরের পেছনে শিউলি গাছের নিচে পুঁতে দেয়। কারণ সেদিকে লোকজন বেশি আসা যাওয়া করতো না। নিশির ছোট বোনকে ওরা চার জন মিলে কিছুদিন ভোগ করে সেই বাড়িতেই ফেলে রাখে।
এই সব কিছুই হয়েছিল আমার কথায়।

রনিকে দিয়ে হুবহু নিশির হাতের লেখার মতো লিখে একটা চিঠি তোকে দিতে বলি। যাতে তুই নিশি চলেযাওয়ায় নিজের ক্ষতি করিস। তার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা আমি করি। তোকে তোর ফুফুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। সেখানে তুই আরো একা হয়ে যাস।
এর কিছুদিন পর নিশির ভাই এর লাশ পানিতে ভেসে উঠে। সবাই সেটা বলাবলি করতে থাকলে কোন ভাবে আমি ব্যাপার টা ধামাচাপা দিই।
কাব্যঃ ছিঃ চাচা! একবার বললেই আমি আপনাকে সব দিয়ে দিতাম। আপনি ভালো করেই জানেন আমার এসবের প্রতি লোভ নেই।
চাচাঃ বললেই হলো? আমি জানি তুই দিতি না। তাই এই প্লেন। কিন্তু ভাবি নি তুই শহরে থেকে এসব বন্ধু জুটিয়ে ফেলবি। আর আমার সাজানো খেলা এভাবে নষ্ট করে দিবি। এই সবকিছুর মূলে রয়েছে এই যারিন মেয়েটি। ওর জন্যই আমার সব গন্ডগোল হয়ে গেছে। সবার আগে ওকে মারবো।
বলেই আমার দিকে গুলি ছুড়ে দিল। কিন্তু কোথায় গুলি? আমার শরীরে কোনো গুলি লাগলো না। চারপাশে শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। নিশি আমায় বাঁচিয়ে দিল। আমার ঠিক পেছন থেকে নিশি সবার সামনে বেরিয়ে এলো।

নিশি আসতেই কালাম চাচা হাসতে লাগলেন। নিশির চোখ মুখে চরম প্রতিশোধ এর আগুন। নিশিকে দেখে চাচা হাসছে।
আমরা এসব দেখে অবাক। যেখানে ভয় পাবার কথা সেখানে কেউ কিভাবে হাসতে পারে?
তখন চাচা বলতে লাগলো~ আরে নিশির আত্মা আমার কিছুই করতে পারবে না। (তিনি একটা তাবিজ আমাদের দিকে দেখিয়ে বললেন) এই দেখ। এই তাবিজ টা আমি বড় একটা হুজুরের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি। এবার আমাকে কেউ কিছুই করতে পারবে না। বলে আবার হাসতে লাগলো।

নিশি ওর হাত টা উপরে তুলতেই রিভলবার টা চাচার হাত থেকে পড়ে গেলো। এবার নিশি হাতের ইশারায় চাচা কে ধাক্কা দিয়ে কিছু দূরে ফেলে দিলো। চাচা ধাক্কা খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন।
তখন নিশি বলে উঠলো…তুই যেমন মুখোশ ধারী তেমনি একটা মুখোশ পড়া হুজুরের তাবিজ তুই এনেছিস। এবার তোর রক্ষা নেই। কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না।
দেখতে পেলাম নিশির হাত ওর শরীর থেকে আলাদা হয়ে চাচার গলায় ধরেছে। চাচার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নিশি বলে উঠলো..
~ এভাবে তোর কথায় আমার বোন কে নির্যাতন করে শেষে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছিল তাই না?
এর পর রিভলবার টা হাওয়ায় ভেসে চাচার দিকে তাঁক করে ওনার ঠিক বুকের মধ্যে গুলি করলো। আর বলল..
~ এভাবে আমার মা কে মেরে ছিল তোর কথায় মনে পড়ে?

চাচা চিৎকার করতে লাগলো। আর ব্যথায় ছটফট করতে লাগলো। বলতে লাগলো মেরো না আমায় মেরো না কিন্তু নিশি কোন কথাই শুনলো না।
এবার নিশি একটা ছুরি কোথা থেকে নিয়ে এলো আর চাচার জ্বিহব্বা টা কেটে দিল। জ্বিহব্বা টা নিচে পড়ে লাফাতে লাগলো। আর হাতের আঙুল গুলো পায়ের আঙুল গুলো কেঁটে দিল। আর বললো.
এই ছুরি দিয়ে আমার জ্বিহব্বা আর হাত পায়ের আঙুল কাটা হয়েছিল মনে পড়ে?
চাচার মুখ হাত পা থেকে ক্রমশ রক্ত বের হচ্ছে চাচা কথাও বলতে পারছে না। শুধু আ আ করছে।
কাঁটা হাত দিয়ে মাফ চাচ্ছে। কিন্তু নিশি ক্রমশ হাসছে। আর বলছে….
আমার পরিবারের সবাইকে যখন মেরেছিলি কোথায় ছিল তোর ভয়, কোথায় ছিল তোর মনোষ্যত্ব। আমার মা ভাই বোন কি দোষ করেছিল? কিসের শাস্তি দিয়েছিলি ওদের?
ওদের রেহায় দিস নি। আর আমি তোকে রেহায় দেব? হাহাহা

বলোই একটা বড় পাথর নিল। চাচা হাতের ইশারায় না না করতে লাগলো। কিন্তু নিশি কোন কথাই শুনলো না।
পাথর টা চাচার উপর ছেড়ে দিল। চাচার দেহ পাথরে স্পৃষ্ট হয়ে গেল। তবও এখনো ওনি বেঁচে আছেন।
এবার নিশি ছুরি টা সোজা ওনার হৃদপিন্ডের কাছে ঢুকিয়ে দিল। ছুরির আঘাতে হৃদপিন্ড বেরিয়ে এলো। নিশি সেটা কে নিজের মুখে দিয়ে চিবিয়ে ফেলে দিল। চাচা মারা গেলেন সেখানেই।
কাব্য এতক্ষণ দাঁড়িয়ে পলকহীন ভাবে নিশি কে দেখে গেলো। নিশি কাব্যের সামনে গেলো।

নিশিঃ যারিন আজ তোমার জন্য আমি কাব্যের চোখে আবার আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পেলাম। ধন্যবাদ যারিন। এই ঋণ আমি কিভাবে শোধ করবো?
আমিঃ ধন্যবাদ দিও না নিশি। এই কাজের বিনিময় হিসেবে আমি কাব্যের মতো একজন ভালো বন্ধু পেয়েছি। এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় গিফ্ট।
নিশি ইশারায় আমাকে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে কাব্য কে বলল….

নিশিঃ কাব্য আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমাকে এভাবে ছেড়ে যেতে চাই নি। কিন্তু এই সয়তান গুলো আমাকে তোমার থেকে অনেক দূরে চলে যেতে বাধ্য করেছে। এবার আমায় যেতে হবে।
কাব্যঃ থেকে যাও নিশি। তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকবো? খুব ভালোবাসি তেমায়।
নিশিঃ আমিও তেমাকে খুব ভালোবাসি কাব্য। কিন্তু আমায় যেতেই হবে।
কাব্যঃ তাহলে আমাকে সাথে নিয়ে যাও।

নিশিঃ না কাব্য! তা হয় না। তোমার এখনও অনেক দিন বাঁচতে হবে। বিয়ে করতে হবে। অনেক গুলো বাচ্চা হবে তোমার। তুমি বৃদ্ধ হবে। তার পর তোমার মৃত্যু। আমি চাই না এভাবে তুমি এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাও। এবার আমাকে যেতে হবে কাব্য।
বিদায়….
কাব্য এক রাশ চোখের জল নিয়ে অপলকে চেয়ে রইলো। নিশি হাওয়ায় ভেসে রইলো। এক অদ্ভুত আলো এসে তার গায়ে পরলো। তার পর হঠাৎ সেই আলো টার সাথে মিলিয়ে গেলো নিশি চির জীবনের মতো।

আমি, কাব্য, দিপু, ইশান, অনা সবাই মিলে নিশিকে বিদায় জানালাম।

কিন্তু এবার এই লাশগুলোর কি হবে? কেউ তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবে না। তখনি দিপু বলে উঠলো বিশ্বাস করবে। আমরা সবাই মিলে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে? দিপু তার মোবাইল টা পকেট থেকে বের করে বলল এটা আমি অনেক আগেই চালু করে রেখেছিলাম। এখানে চাচার সব কথা আর কিভাবে মরেছে সব রেকর্ড করা আছে। শুধু নিশি কে দেখা যাচ্ছে না।
আমি একটু সস্তুি পেলাম। যাক পুলিশ কেইস এ আমাদের সন্দেহ করবে না।

বাড়ি ফিরে আমরা সবাইকে সবটা বললাম। কঠিন হলেও সবাই মেনে নিলো। পুলিশ এসে সব তদন্ত করলো। আমাদের কারো বিরুদ্ধে প্রমাণ না পাওয়ায় আর ভিডিও টা দেখে ছেড়ে দিল।
কাব্যের মনের অবস্থা খুব খারাপ। সেই গ্রামে কিছুদিন থেকে পুলিশের ঝামেলা শেষ করে আমরা কাব্য কে নিয়েই শহরে ফিরে আসি। ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে। ডিপ্রেশন এ চলে গেছে কাব্য। এমন হওয়ার ই কথা প্রথমে নিশি তার পর একজন একজন করে সব আপন জন দের হারিয়ে ছেলেটার অবস্থা খুব খারাপ।
শহরে এসেই আমি আমার বান্ধবী দোলা কে ফোন দিলাম।

আমিঃ হ্যালো দোলা, কাল দুলাভাইকে বলিস আমার পরিচিত একজন রুগী আছে তাকে দেখতে হবে। একটা এপয়েন্টমেন্ট আমাদের জন্য রেখে দিতে।
দোলা~ আরে পাগলি তুই এলে এপয়েন্টমেন্ট লাগবে নাকি? চলে আয় যেকোন সময় আমি বলে রাখবো।
আমিঃ আচ্ছা।

এদিকে বাড়ি যেতেই মার ঝাড়ি শুনতে হলো। গ্রামে একটা দিন ও মাকে ফোন করি নি। করবো কিভাবে? সেখানে যে নেটওয়ার্ক ছিলা না। এই কথা কি মাকে বুঝাতে পারি?
তবে হ্যাঁ এর থেকে আমার রহস্য বের করার প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে গেছে। আমি অপেক্ষায় আছি পরের কোন রহস্য বের করতে। কে বলতে পারে, হয়তো আবার কোন নতুন এডভেঞ্চার এর খুঁজ পেয়ে যাই।

লেখা – কাব্য আহমেদ

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “রহস্যময়ী মেয়ে – লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – সারপ্রাইজ – Valobashar golpo bangla lekha


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!