ভুতের গল্প

রহস্যময় সারপ্রাইজ – ভৌতিক গল্প

রহস্যময় সারপ্রাইজ – ভৌতিক গল্প: নিতিনের কথায় অধরা অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না। লাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। নিতিন তখনো পত্রিকা পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। খানিক পরে নিতিনের ফোন বেজে উঠলো।

পর্ব-১

র‍্যাপিং পেপার খুলে ভালোবাসার মানুষটি লাশ দেখে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলো তুরাগ। প্রিয়তমার লাশ জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাবে এমনটা কল্পনা করেনি তুরাগ। সবাই জন্মদিনে কত সুন্দর চোখ ধাঁধানো উপহার পায়।

সেক্ষেত্রে তুরাগ কি পেয়েছে? র‍্যাপিং পেপার মোড়ানো ট্রলি ব্যাগে স্ত্রীর লাশ! যাকে কিনা সে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে!

এমনটা তো হবার কথা ছিলো না। কাল সন্ধ্যা অব্দি ও তো দুজনে কত হাসি খুশী ছিলো। স্বপ্নের মতো দিন ছিলো। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে একটা ঝড়ো হাওয়া এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেলো। স্ত্রীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে জ্ঞান হারালো তুরাগ। হুইলচেয়ারেই ঢলে পড়লো। ভালোবাসার মানুষটির লাশ দেখার চেয়ে ভয়ংকর মুহুর্ত আর কি হতে পারে? এটা খুবই কষ্টদায়ক বিষয়।

আওয়াজ পেয়ে কাজের মেয়ে শিলা দৌড়ে এলো সদর দরজার কাছে। দরজার কাছে এসে তুরাগের সামনে থাকা ট্রাভেল ব্যাগে প্রতিভার লাশ দেখে সজোরে চিৎকার দিলো। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা মালকিনকে ছুঁতে গিয়ে ও ছুলো না। আবার চিৎকার দিলো। শিলার চিৎকার শুনে পাশের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলেন জাহাঙ্গীর আলম।

তুরাগের ফ্ল্যাটের দরজা খোলা থাকায় ভিতরে এসে প্রতিভার লাশ দেখে আঁতকে উঠলেন।জাহাঙ্গীর আলম ঠান্ডা মাথার মানুষ। হুটহাট উত্তেজিত হন না। তিনি নিজের ভয় আর আতঙ্ক নিজের মাঝে চাপিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে হাতে নিলেন। তারপর বিল্ডিংয়ের মালিক সমিতির সভাপতি, পুলিশ এবং প্রতিভার পরিবারকে খবর দিলেন।

প্রতিভার মা তিহানা জাহান এসে মেয়ের লাশ দেখে জ্ঞান হারালেন। বাবা প্রভাত মির্জা মাথা আর হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে মেয়ের থেকে খানিক দূরে চেয়ারে বসে স্থির দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। একমাত্র আদরের সন্তানের এমন করুণ মৃত্যু তিনি মানতে পারছেন না। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না।

তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কাল রাতেও মেয়ে তাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে, কত শাসন করেছে! কাল অব্দি মেয়েটা কত চাঞ্চল ছিলো কিন্তু আজ তার চঞ্চল মেয়ের বদলে পড়ে আছে মেয়ের নিষ্প্রাণ দেহ। কে জানতো বাবাকে দেখে ফিরতে গিয়ে মেয়েটা আর ফিরবে না। চিরবিদায় নিবে!

এমন হবে জানলে কাল ফিরতেই দিতেন না তিনি। নিজের কাছে রেখে দিতেন।

প্রভাত মির্জার পিছনে দাঁড়িয়ে বিলাপ করে কেঁদে যাচ্ছে এক যুবতী। বয়স প্রতিভার মতোই হবে। এই বাইশ কি তেইশ? শ্যামবর্ণের মায়াবী চেহারার এই মেয়েটির নাম স্বরূপা।

সম্পর্কে প্রতিভার বান্ধবী। আর সবাই তাদের বান্ধবী মনে করলেও তারা কখনো একে অন্যকে বান্ধবী মনে করতো না। বোনের মতো আপন ভাবতো। প্রতিভা তো নিঃশ্বাস একটা ফেললেও স্বরূপার সাথে শেয়ার করতো। একের দুঃখে অন্যে দুঃখী, একের সুখে অন্যে সুখী এমন ভাব দুজনার।

খুবই বিশ্বস্ত আর ভালোবাসার মানুষ। স্বরূপা প্রতিভার পরিবারের একজন। তিহানা আর প্রভাত মির্জা স্বরূপাকে ও তাদের মেয়ে ভাবেন। সেই হিসেবেই ট্রিট করেন। রক্তের সম্পর্ক না হলেও সম্পর্কটা আত্মার। আত্মার সম্পর্কের বিচ্ছেদের কষ্ট অসহ্য। বান্ধবীর লাশ দেখে স্বরূপার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে।

বান্ধবীর মৃত্যুর খবর শুনে কিভাবে যে এসেছে সে-ই জানে। পরনে বাসার পরার পাতলা টি-শার্ট আর প্লাজো। গায়ে ওড়না নেই, চুল সব এলোমেলো, কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেছে। দেখতে বিধ্বস্ত লাগছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে প্রতিভার বাবা মায়ের মতো সেও ট্রামার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

স্বরূপার বিলাপে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠলো সাব ইন্সপেক্টর অধরা আনানের মুখে। তরুনী ইন্সপেক্টর অধরা আনান প্রতিভার লাশের সামনে বসে লাশ খুঁতিয়ে দেখছে। এখনো কোন ক্লু পায়নি। স্বরূপার বিলাপে তার মনোযোগ বিঘ্ন হচ্ছে বারবার। এতেই বিরক্ত সে। প্রতিভার দিকে খানিক তাকিয়ে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো অধরা।

তারপর স্বরূপাকে ডাকলো। স্বরূপা হেঁচকি তুলতে তুলতে ধীর পায়ে অধরার সামনে এসে দাঁড়ালো। অধরা একবার স্বরূপাকে পরখ করে বললো,
“কান্না থামিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”

স্বরূপা ভেজা গলায় বললো,
“ব ব লু ন।”
“তোমার পরিচয়? “

কান্না থামিয়ে মিনমিনে গলায় স্বরূপা উত্তর দিলো,
“আমি স্বরূপা। প্রতিভার বান্ধবী।”

“প্রতিভার সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন ছিলো?”

“আমাদের আত্মার সম্পর্ক ছিলো। অটুট বন্ধন ছিলো।বোনের মতো ছিলাম। কত আনন্দে ছিলাম। এক ঝড়েই সব শেষ হয়ে গেলো!”

আর বলতে পারলো না। স্বরূপা আবার স্বশব্দে কেঁদে দিলো। স্বরূপার কথা আর ভাবভঙ্গি দেখে অধরা বুঝতে পারলো দুজনের বন্ধনের গভীরতা বেশ, প্রতিভার মৃত্যুতেও সে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। স্বরূপার এখন কথা বলার অবস্থায় নেই। অধরা স্বরূপাকে আর জিজ্ঞেস করলো না। উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলালো। তারপর কাজের মেয়ে শিলাকে ডাকলো। শিলা ভয়ে ভয়ে এগুলো। অধরা বললো,
“তোমার পরিচয় ?”

“শশিলা। এই ব্বাসসার ক্কা..মের মমইয়্যা।

ভয়ে তটস্থ হয়ে তোতলিয়ে বললো শিলা। অধরা বললো,
“কবে থেকে এই বাসায় কাজ করো?”

“দ্দুই ব্বচ্ছর ধোরি কাম করি।”
“কাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত তুমি কোথায় ছিলে?”
“এই ব্বাসসাত আচছিললাম।”

“তুরাগ মানে প্রতিভার স্বামী কোথায় ছিলো?”
“ব্বাসসাত আচছিলো।”

“প্রতিভা কোথায় ছিলো?”

“বাপের বাসাত গেছিলো রাইতে।”

অধরা এবার নড়ে চড়ে দাঁড়ালো। তারপর বললো,
“বাবার বাসায় গিয়েছিলো কখন আর এসেছিলো কখন?”

“হাইঞ্জিন্না গেছিলো, রাইচ্ছা আইবের কথা। আর ত আইয়েনো।”

শিলার ভাষার কাঠিন্য বেশ। অধরার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। অধরা বললো,
“গ্রামের বাড়ি কোথায় তোমার?”

“ননোয়াখখাললী।

শিলার তোতলানো দেখে অধরা শান্ত কন্ঠে বললো,
“ভয় না পেয়ে ঘটনা খুলে বলো। আমি কিছুই করবো না। তবে সত্যটা গোপন করলে পরে আস্ত রাখবো না। বলো আজ সকালে কি হয়েছিলো।”

অধরার কথায় ঢোক গিললো শিলা। ভয়ে কলিজাটা কাঁপছে তার। ছোটবেলা থেকেই পুলিশকে ভীষন ভয় পায় সে। অধরা এক কনস্টেবলকে কাছে ডাকলো। তারপর শিলাকে বললো,
“কি হলো বলো?”

শিলা তোতলিয়ে তোতলিয়ে তার গ্রামের ভাষায় কাল রাত থেকে সব ঘটনা বললো। যার সারসংক্ষেপ এই যে, কাল বিকেলে প্রতিভার বাবা প্রভাত মির্জা সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। এতে তার মাথা ফেটে যায় এবং হাত কেটে যায়। চিকিৎসা শেষে সন্ধ্যায় তার ম্যানেজার তাকে নিয়ে বাসায় পৌঁছান। বাবার অসুস্থতার খবর শুনে সাথে সাথেই প্রতিভা বাবাকে দেখতে ধানমন্ডি বাবার বাসায় যায়।

তুরাগকে শিলার দায়িত্বে রেখে যায়। বাবার বাসায় গিয়ে প্রতিভা খানিক পর পর শিলাকে ফোন দিয়ে তুরাগের খোঁজ নেয়। শিলাকে জানায় রাতেই সে বাসায় ফিরবে তবে দেরি হতে পারে। যাতে তুরাগকে ডিনার করিয়ে মেডিসিন খাইয়ে দেয়। প্রতিভার কথায় রাত দশটা নাগাদ শিলা তুরাগকে ডিনার আর মেডিসিন খাইয়ে রুমে নিয়ে দিয়ে আসে। তুরাগকে বিছানায় শুইয়ে দিতে চাইলে তুরাগ নিষেধ করে। তুরাগ জানায় হুইলচেয়ার এ বসেই সে প্রতিভার আসার জন্য অপেক্ষা করবে।

অপেক্ষা করতে করতে তুরাগ হুইল চেয়ারেই ঘুমিয়ে যায়। শিলা প্রতিভার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে বসার রুমে। রাত বারোটা পর ও প্রতিভা না এলে শিলা প্রতিভার কাছে ফোন দেয়। কিন্তু ফোন বন্ধ পায়। রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ শিলার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে প্রতিভার নাম্বার থেকে। ম্যাসেজটা এমন ছিলো যে, বাবার অসুস্থতার জন্য আজ বাসায় আসবে না। কাল সকালে আসবে। সাবধানে থাকতে। তুরাগের খেয়াল রাখতে।

“প্রতিভার ম্যাসেজ পেয়ে শিলা নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সকাল আটটায় শিলা তুরাগকে ঘুম থেকে জাগিয়ে উঠায়। তুরাগ তখনো হুইলচেয়ারেই বসা। চোখ খুলেই স্ত্রীর খোঁজ করে তুরাগ। স্ত্রীকে ফোন করে বন্ধ পেয়ে চিন্তিত হয়। শেষে শিলা প্রতিভার ম্যাসেজের কথা বললে তুরাগ কিছুটা শান্ত হয়। তুরাগ মলিন মুখে স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সকাল সাড়ে আটটায় বাসার কলিংবেল বাজে।

কলিংবেল পেয়ে প্রতিভা এসেছে ভেবে শিলা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে। স্ত্রী এসেছে ভেবে তুরাগ ও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর বসার রুমের এক কোণায় থাকা সদর দরজার কাছে যায়। দরজা খুলে নুর করিমকে দেখে শিলা তুরাগ দুজনেই হতাশ হয়। দুধওয়ালা এসেছে গরুর দুধ দিয়ে যেতে। বায়োবৃদ্ধ দুধওয়ালা নুর করিম প্রতিদিন সকাল আটটা কি নয়টার মাঝে এসে তার পোষা গাভীর দুধ দিয়ে যায় ফ্ল্যাটে ফ্লাটে। আজো তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

শিলা নুর করিম থেকে দুধের প্যাকেট নিয়ে নেয়। নুর করিম চলে যায়। শিলা দরজা বন্ধ করতেই চোখ যায় দরজার পাশে রাখা র‍্যাপিং পেপার মোড়ানো বড় গিফট বক্সটার উপর। শিলা তুরাগকে দেখায়। তুরাগের মনের অবস্থা ভালো না থাকায় গিফটের দিকে ভালো করে নজর দেয় না। বলে হয়তো অন্য কারো।

শিলাকে ভিতরে আসতে বলে। শিলা ভালো করে গিফট পেপারের উপর তাকাতেই তুরাগের নাম দেখতে পায়। টেনেটুনে এইট পাশ করায় এটুকু পড়তে বা বুঝতে সমস্যা হয় না যে গিফটটা তুরাগের জন্যই আসছে। শিলা বক্সটা ঠেলে ঠেলে ভিতরে নিয়ে আসে যেহেতু অনেক ভারি। ভিতরে এনে তুরাগের সামনে রেখে তুরাগকে নেমকার্ডে তুরাগের নাম দেখায় এবং গিফটটা খুলে দেখতে বলে।
র‍্যাপিং পেপারের উপর নেম কার্ডে “শুভ জন্মদিন তুরাগ, তোমার জন্মদিনে ছোট্ট একটা উপহার আমার পক্ষ থেকে”লেখাটা দেখে তুরাগ গিফট খুলতে নেয়। কারণ লেখাটা ছিলো প্রতিভার। স্ত্রীর লেখা চিনতে অসুবিধা হয় না তার। তুরাগ ভাবে প্রতিভা তাকে জন্মদিনের সারপ্রাইজ দিবে বলেই বাবার বাসা থেকে আসেনি। আর প্রতিভাই এই গিফট পাঠিয়েছে। তুরাগ যখন গিফটটা খুলতে ব্যস্ত তখন শিলা রান্না ঘরে চলে যায় সকালের নাস্তা তৈরি করতে।

মিনিট বিশেক পরে বসার ঘর থেকে কোন স্টিলের ঝনঝন আওয়াজ শুনে বসার ঘরে আসে শিলা। দেখে তুরাগ হুইল চেয়ারে ঢলে পড়েছে তার মাথাটা কাত করা। হুইলচেয়ার হেলে গিয়ে দেয়ালের সাথে ঠেকেছে। শিলা তুরাগের কাছে গিয়ে তুরাগকে ঠিক করে বসায়।

তারপর কয়েকবার ডাকে কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পায় না। তারপর পানি আনার জন্য পা বাড়াতেই সামনে বিশাল সাইজের ট্রলি ব্যাগের ভিতরে প্রতিভাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। এবং চিৎকার জুড়ে দেয়। এরপর পাশের ফ্ল্যাটের চাচা আসে এবং সবাইকে খবর দেয়।

শিলার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে অধরা। তারপর ভাবুক কন্ঠে বলে,
“আচ্ছা তুরাগ হুইল চেয়ারে কেনো! কি হয়েছে আর কবে হয়েছে?”

১৫ কি ১৬ বছরে কিশোরী শিলা জবাব দেয়,

“এক্সিডেন অইছে দুইমাস আগে। রাস্তায় গাই চালাইতো যাই। হাসপাতালে আছিলো বিশ দিন। ঠ্যাং ভাঙি গেছে। আইট্টো মাইট্টো হারে না। হিল্লাই ডাক্তরে হুইলচেয়ার এ চইলবেল্লাই কইছে। হেসমে তুন ভাইয়া হুইলচেয়ার এ আছে।”

“ওহ আচ্ছা। তা ওদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিলো? “

“মেলা ভালা আছিলো। ভাইয়া ভাবির তো লাভ মেরিজ। মেলা ভালোবাসে দোনোগায় দোনোগারে।”
“কখনো রাগারাগি বা ঝগড়া হয়নি? বিশেষ করে গত এক সপ্তাহে?”

“না ম্যাডাম কিচ্ছু অয় নো। বিয়ার পর থেইক্কা কোনদিন ওগো রাগারাগি ও করতে দেখি নু। ভাবি তো ভাইয়ার সেবা করে দিন রাত। ভাইয়ার মেলা খেয়াল রাখে।”

“ওহ আচ্ছা।”
বলে অধরা জাহাঙ্গীর আলমের যায় এবং তার সাথে কথা বলে। সেও প্রতিভা আর তুরাগের সম্পর্কে ভালো ধারণাই প্রকাশ করেছে। কোন খারাপ দিক দেখেনি। জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথা বলে অধরা আবার লাশের কাছে গেলো।

তরুনী সাব ইন্সপেক্টরঅধরা আনান আরো একবার প্রতিভাকে সুক্ষ্ম ভাবে পরখ করে।এই কেসটা অধরাই হেন্ডেল করবে। তার কপালে চিন্তার ভাজ। পুলিশে জয়েন করেছে প্রায় বছর তিনেক হবে। এর মাঝে অনেক চ্যালেঞ্জিং কেস হাতে পেয়েছে। অল্প সময়ের মাঝে অনেক জটিল কেস সমাধান করে সুনাম অর্জন করেছে। চারদিকে তার নিষ্ঠা আর সাহসিকতা জয়গান হয়। মেয়ে হয়েও কখনো পিছনে থাকেনি। বরং অনেক পুরুষ পুলিশ যা সাহস করে করতে পারেনি তা অধরা করেছে। বড় বড় রাঘব বোয়ালের মুখোশ টেনে খুলেছে নির্ভয়ে।

কিন্তু তিন বছরের কর্মজীবনে প্রতিভা কেসের মতো এমন চ্যালেঞ্জিং আর রহস্যময় কেস আর পায় নি সে। যখন থানায় ফোন দিয়ে কেউ একজন বলেছিলো র‍্যাপিং পেপার মোড়ানো ট্রলি ব্যাগে একটা লাশ পাওয়া গেছে দ্রুত আসতে। তখনি অধরার মনে হয়েছে বেশ রহস্যময় কেস পেতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে এসে প্রতিভার লাশ দেখে তার মনের ভাবটা বেড়ে গেলো।

এর আগে অনেক লাশ দেখেছে কিন্তু এমন লাশ দেখেনি অধরা। স্ত্রীকে খুন করে লাশকে বারবি গাউন আর পার্টি সাজ দিয়ে স্বামীর জন্মদিনে পাঠানো হয়েছে! লাশের দুধে আলতো ফর্সা চেহারায় ভয়ার্ততার পরিবর্তে রয়েছে বিস্ময়ী ভাব। গোল গোল চোখ দুটো বড় বড় দিগুন গোল করে তাকিয়ে আছে। মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় দেখলে যেমন অবাক হয় তেমনি একটা ভাব। মৃত্যুর আগে হয়তো চমকপ্রদ কিছু দেখেছে যার দরুন সে বিস্মিত হয়েছে।

বিস্মিত ভাবটা অতিমাত্রায় ছিলো বলেই চেহারায় মৃত্যু কষ্ট থেকে চমকপ্রদ বিষয়ের বিস্ময়ী ভাব লেগে আছে। যা মৃত্যু কষ্টকেও তুচ্ছ করেছে। তাইতো গোল গোল দুটো আর চেহারায় বিস্ময় মাখিয়েই মারা গেছে। তা আর স্বাভাবিক হয় নি। এখনো সেভাবেই আছে। পরিধানে একটা অফ হোয়াইট বারবি গাউন।

হাতে অফ হোয়াইট ডায়মন্ড ব্রেসলেট, গলায় ভারী কাজের ডায়মন্ড নেকলেস,
যা পুরো গলাটাকে ডেকে রেখেছে। কানে নেকলেসের সাথে মিলানো ইয়ারিং, বাঁ হাতের অনামিকা আঙুলে ডায়মন্ড রিং। মাথার চুল গুলো পাফ করে খোঁপা করা। চেহারায় মেকাপের কমতি নেই। ভারী মেকাপ করা হয়েছে। পার্টি সাজে সাজানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রতিভার রূপ এখনো নজরকাড়া। না জানি চেহারাটা স্বাভাবিক থাকলে কেমন লাগতো! নিশ্চয়ই অপ্সরীর মতো লাগলো, কিংবা পুতুলের মতো। তবে একটা বিষয় অধরাকে অবাক করেছে তা হলো, প্রতিভার সাজসজ্জার বিঘ্ন না হওয়া। প্রতিভার সাজসজ্জা একটুও এদিক ওদিক হয় নি। না লিপস্টিক ছড়িয়েছে আর না একটা চুল এলোমেলো হয়েছে। সব কিছুতে চকমকে ভাব।

যেন খানিক আগেই কেউ খুব যত্ন করে সাজিয়ে ট্রালি ব্যাগে হাটু গুজিয়ে আলতো করে শুইয়ে দিয়েছে কিংবা নিজে সেজেগুজে ‘দ’ স্টাইল শুয়ে আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, খুনটা কিভাবে করা হয়েছে? এতক্ষণ পরখ করার পর যা বুঝা গেলো, শরীরে আচঁড়ের লেশ মাত্র নেই। না গলায় কোন দাগ আছে, আর না শরীরে। অফ হোয়াইট গাউনটার কোথাও একটাও রক্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারমানে কোথায় কাটাছেঁড়া ও নেই।

তবে খুন করলো কিভাবে! প্রতিভার গেট আপ ও অধরাকে ভাবাচ্ছে। যদি সাজিয়ে খুন করা হয় তবে মৃত্যুর আগে খানিক ধস্তাধস্তি হলেও প্রতিভার সাজ বিঘ্ন হওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হয় নি।

সব সাজে নতুনত্ব বজায় আছে এখনো। তবে কি খুন করার পর লাশকে সাজানো হয়েছে! তারপর ‘দ’স্টাইলে ব্যাগে রেখে দিয়েছে! নাকি সাজানোর পর অন্য কোন উপায়ে প্রতিভাকে খুন করেছে। যা প্রথমে প্রতিভা নিজেই টের পায় নি। পরে যখন টের পেয়েছে
তখন সে ভীষণ রকমের বিস্মিত হয়েছে। তবে দেখে বুঝা যাচ্ছে প্রতিভাকে খুন করা হয়েছে বেশি সময় হয় নি।

সর্বোচ্চ সাত আট ঘন্টা হবে। অধরা তার বাম হাতটা উঁচু করে হাতে পরে থাকা কালো বেল্ডের ডায়াল ঘড়িটায় সময় দেখে নিলো। এখন বাজে সকাল সাড়ে ন’টা। আনুমানিক সাত ঘন্টা আগে খুন করা হলে প্রতিভা খুন হয়েছে রাত দু’টায়। প্রতিভার বাবা বললো, প্রতিভা বাবার বাসা থেকে বের হয়েছে রাত এগারোটায়।

অথচ বারোটায় শিলাকে ম্যাসেজ দিয়ে বলছে সে তখনো বাবার বাসায়। কাল আসবে বাসায়। প্রতিভা মিথ্যা বললো কেনো! এগারোটায় বাবার বাসা থেকে বের হয়ে স্বামীর বাসায় না ফিরে গিয়েছিলো কোথায়! ম্যাসেজই বা করেছে কেনো!
আর প্রতিভার লাশ মোড়ানো র‍্যাপিং পেপার এর উপর নেম কার্ডে প্রতিভার লেখা কিভাবে এলো! খুনি কি প্রতিভার লেখা নকল করেছে নাকি প্রতিভাই লেখেছে। আর চিরকুট কে লিখেছে! নিজের লাশের উপর নিজে চিরকুট রেখেছে প্রতিভা! অধরা তুরাগের হাত থেকে নেয়া চিরকুটটা হাতে নিয়ে আরেকবার চোখ বুলালো।

“সারপ্রাইজ হয়ে আমি তোমার জীবনে এসেছি। সারপ্রাইজ হয়েই তোমাকে রাঙিয়ে, তোমাকে ভাঙিয়ে চলে যাচ্ছি।
তোমার জন্মদিনে কি উপহার দেয়া যায় ভাবতে ভাবতে গত একসপ্তাহ আমার মাথা ধরে গিয়েছিলো। হুট করেই এই প্ল্যান মাথায় এলো তাই কাজে লাগালাম। কেমন লাগলো সারপ্রাইজ? আমাকে এই বেশে কেমন লাগছে? নিশ্চয়ই ভালো। ভালো তো লাগতেই হবে। দেখতে হবে না বউটা কার? যাই হোক শুভ জন্মদিন।

নিজের খেয়াল রেখো, ঠিকমতো মেডিসিন নিয়ো, একদম হেয়ালি করো না। আর হ্যাঁ সবাইকে বলে দিও আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আমি সুইসাইড করেছি।”

অধরা চিরকুটটা পড়ে আবারো ভ্রু কুঁচকালো। এটা সুইসাইড কিভাবে হয়! সুইসাইডের জন্য এত প্ল্যানিং কেনো! আর মেয়ে হয়ে বাবার অসুস্থতার দিকে খেয়াল না দিয়ে স্বামীর জন্মদিনের উপহার নিয়ে পড়েছিলো কিভাবে!

তাছাড়া সুইসাইড হলে লাশের উপর চিরকুট আর লাশ প্যাকিং পাঠানো কে করেছে! চিরকুট আর নেম কার্ডের একি লেখা। তবে মৃত্যুর পর নেম কার্ডে কিভাবে লেখলো! চিরকুট পড়ে বুঝা যায় প্রতিভা মৃত্যুর আগেই সেজেছিলো।

কিন্তু সেজেগুজে সুইসাইড করলে সাজ এলোমেলো হলো না কেনো! আর সুইসাইড সাধারণত সবাই গলায় দড়ি দিয়ে, হাতের রগ কেটে কিংবা বিষ খেয়ে করে। কিন্তু প্রতিভার শরীরে এমন কিছুই নেই তবে কিভাবে সুইসাইড করলো। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে এটা মার্ডার তবে প্রতিভা চিরকুটে সুইসাইড বললো কেনো! যদি মার্ডার হয় তবে প্রতিভা নিজের হাতে চিরকুট আর নেমকার্ডে লিখলো কিভাবে! কেউ কাউকে পোর্স করে লিখালে হাত কেঁপে লেখা বাঁকা হবে কিন্তু লেখা তো একেবারে স্পষ্ট। যেন যত্ন করে লিখেছে।

মার্ডার হলে এটা কিভাবে সম্ভব! অধরার মাথায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আসল রহস্য কি! এটা মার্ডার না সুইসাইড? মার্ডার হলে খুনী কে! আর সুইসাইড হলে হেল্পার কে! এমন সাজিয়ে গুজিয়ে খুন করে স্বামীকে জন্মদিনের উপহার পাঠানোর কারণ কি! কি কারণ!


পর্ব-২

হাতের তর্জনী আর মধ্যমার মাঝে কলম আটকে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কলম ঘুরাচ্ছে অধরা। কপালে চিন্তার ভাজ। কোন কিছু নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করছে সে। তার চিন্তার গভীরতায় আছে প্রতিভার কেসটা। খানিক আগেই প্রতিভার ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেয়েছে সে। যাতে বলা হয়েছে, প্রতিভা প্রেগন্যান্ট ছিলো।

থ্রি মান্থ রানিং। অধরা ধারণা করছে প্রতিভার প্রেগ্ন্যান্সির কথা পরিবারের কেউ জানে না। হয়তো তুরাগ ও জানে না। কারণ প্রেগন্যান্সির বিষয় জানা থাকলে সবার রিয়েক্টশন ভিন্ন হতো। সাধারণত প্রথম সন্তান নিয়ে মা বাবার আশা আকাঙ্খা আনন্দ উল্লাস বেশি থাকে। যেহেতু প্রতিভা তুরাগের লাভ ম্যারেজ এবং দুজনের মাঝে ভালোবাসা বেশ তবে বেবি নিয়ে আনন্দটাও বেশি থাকার কথা। এবং কেয়ার ও বেশি থাকার কথা।

প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা তুরাগ জানলে এত রাতে প্রতিভাকে এক ছাড়ার কথা না। নিজেদের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও অধরাকে লোকাল গাড়িতে করে আসা যাওয়া করতে দিতো না। সবসময় প্রাইভেট কারে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটা হঠাৎ লোকাল গাড়ির আশ্র‍য় নিলো। তাও এত রাতে! কেনো! এই প্রশ্নও রহস্যজনক।

প্রেগন্যান্সি এবং প্রতিভার লোকাল গাড়ি চড়ার রহস্যটা তুরাগের জবানবন্দি থেকে ক্লিয়ার হওয়া যাবে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তুরাগ গত কয়েক ঘন্টায় ছ’বার জ্ঞান হারিয়েছে। হুশ ফিরে প্রতিভা প্রতিভা বলে আবার জ্ঞান হারায়। যার কারণে তার জবানবন্দি নেয়া সম্ভব হয় নি। তুরাগের জবানবন্দি নিলে ব্যাপারগুলো আরো সহজে ক্লিয়ার হতো, এত ধোঁয়াশা থাকতো না।

আচ্ছা, প্রতিভার মৃত্যুর পিছনে প্রেগন্যান্সিই দায়ী নয় তো ? কোথাও এই বাচ্চা অবৈধ নয় তো! প্রতিভা কি পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলো? এবং বাচ্চাটা তার প্রেমিকের। যার কারণে তুরাগ জানার আগে প্রতিভা কারো সাথে প্ল্যান করে নিজের মৃত্যু নিজে ডেকেছে? কিংবা সেই প্রেমিকের সাথে কোন কারণে বিরোধ লেগে প্রেমিকই প্রতিভাকে খুন করেছে! এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। হতে পারে। আজকাল পরকীয়া, খুন এসব অহরহ দেখা যায়।

রীতিমতো ট্রেন্ড হয়ে গেছে। কিন্তু সবার ভাষ্যমতে প্রতিভা-তুরাগের বন্ডিং ভালো ছিলো। সম্পর্কটা ভালোবাসায় ভরপুর ছিলো। তুরাগকে প্রতিভা প্রচন্ড ভালোবাসতো। যদি ভালো না বাসতো কিংবা পরকীয়া করতো তবে তুরাগের এক্সিডেন্টের পর দিনরাত তুরাগের সেবা না বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে যেতো।

সে তো তা না করে অসুস্থ স্বামীর সেবায় দিন রাত এক করে দিয়েছে। তবে স্বামীর প্রতি এত ভালোবাসা থাকলে প্রেগন্যান্সির কথা জানালো না কেনো!

যদি জানায় তবে তারা আমাদের কাছে বিষয়টা লুকালো কেনো!এখানে ও ঘাপলা আছে। পুরো কেসটাই ধোঁয়াশা, রহস্যঘেরা।

আরেক ধোয়াঁশা হলো মৃত্যুর ধরণ। প্রতিভার মৃত্যুটা শ্বাসরোধ এর কারণে হয়েছে। যা গলায় দড়ির মাধ্যমে হয়েছে। রিপোর্ট বলছে গত কাল রাত তিনটা নাগাদ প্রতিভার মৃত্যু হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে অধরা ভাবছে, প্রতিভার মৃত্যু যদি গলায় দড়ির প্যাচে শ্বাসরোধের কারণে হয় তবে গলায় দড়ির চিহ্ন তো থাকবে না? কিন্তু আমি যখন লাশ দেখলাম তখন তো গলায় বিন্দুমাত্র চিহ্ন ও ছিলো না। গলায় ফাঁস লাগালো অথচ গলায় কোন দাগ হলো না! এটা কিভাবে সম্ভব?

আর প্রতিভা বাবার বাসা থেকে বের হয়েছে রাত এগারোটায়, রাত বারোটায় প্রতিভা শিলাকে ম্যাসেজ করেছে।

এর অর্থ দাঁড়ায় রাত বারোটা অব্দি ও প্রতিভা সুস্থ সবল এবং স্বজ্ঞানে ছিলো। প্রতিভার ফোন লোকেশন বলছে সে রাত বারোটায় ধানমন্ডি লেকে ছিলো। ম্যাসেজ দেয়ার পর থেকে এখন অব্দি ফোনটার লোকেশন ধানমন্ডি লেকই শো করছে। তারমানে ফোনটা এখনো ওখানেই আছে।

কিন্তু বাবার বাসা থেকে মিরপুর স্বামীর বাসায় না গিয়ে এতে রাতে লেকের পাড়ে কেনো গেলো! কে ডেকেছে তাকে? তার প্রেমিক? নাকি অন্যকেউ!

প্রতিভা যখন লেকে গেলো তখন তার বাবা মা ধানমন্ডি নিজেদের বাড়িতে ছিলো। স্বরূপা প্রতিভার বাবার বাসায় ছিলো। তুরাগ ও মিরপুর নিজের ফ্ল্যাটে ছিলো। তবে বাসায় যাবার নাম করে প্রতিভা লেকে কেনো গেলো! কে ডাকলো?আর তার মৃত্যু কেনো হলো! এটা ঘাপলা নাম্বার টু।

ঘাপলা নাম্বার থ্রি হচ্ছে, প্রতিভার মৃত্যু হয়েছে রাত তিনটায়। তুরাগদের বিল্ডিংয়ের দারোয়ান গেট খুলে ভোর পাঁচটায়। কারণ বিল্ডিংয়ের অনেকে ফজর নামাজ পড়তে যায়। ভোর থেকেই মানুষের চলাচলা শুরু হয়ে যায়।

ভোর পাঁচটার পর লাশ আনা সম্ভব নয়। তাছাড়া আসার আগে বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেও ভোর পাঁচটার পর বাইরের কাউকে বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করতে কিংবা বের হতে দেখা যায় নি। তার মানে ভোর পাঁচটার আগেই লাশ তুরাগের ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে গেছে! কিন্তু দারোয়ান ভাষ্যমতে কাল রাত বারোটা থেকে ভোর পাঁচটার পর অব্দি না কেউ বিল্ডিং থেকে বেরিয়েছে, আর না কেউ বাইরে থেকে এসেছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও তাই বলছে। ভুঁইয়া ভিলার গ্রাউন্ডে কোণায় কোণায় লাইট জ্বালানো থাকে সারারাত। লাইটের উজ্জ্বল আলোতে প্রতি সেকেন্ড সিসিটিভিতে রেকর্ড হয়। কেউ যদি লাশ নিয়ে আসে তবে সিসিটিভিতে রেকর্ড হওয়ার কথা।

কিন্তু তেমন তো রেকর্ড হয় নি। কেউ যদি না আসে তবে লাশ তুরাগের ফ্ল্যাটের সামনে আসলো কিভাবে?

এইখানেই রহস্য। সবকিছু খুব ভালো করে খুতিয়ে দেখতে হবে। এখনি ভুঁইয়্যা ভিলায় গিয়ে সব কিছু আরেকবার পরখ করে আসবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো অধরা। তার সন্দেহ তার অদেখা কোন ক্লু সে ফেলে এসেছে।

তার সন্ধানেই যাবে। সিসিটিভি ফুটেজ আরেকবার চেক করবে। কিন্তু তার আগে একবার ফরেনসিক রিপোর্ট এর ব্যাপারটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার। মৃত্যুটা কিভাবে হয়েছে জানাটা খুব দরকার৷ এতেই হয়তো কোন জোট থাকতে পারে।

ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার লিপিকা মন্ডলকে ফোন দিলো অধরা। তার সাথে ব্যাক্তিগতভাবে পরিচিত সে। তাই খাতিরটা একটু বেশিই। প্রথমবার রিং হওয়ার পরই রিসিভ হলো। কুশল বিনিময় শেষে অধরা বললো,
“আচ্ছা ডক্টর প্রতিভার মৃত্যুটা কিভাবে হয়েছে?”

“শ্বাসরোধের কারণে মৃত্যু হয়েছে। গলায় দড়ির দাগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গলায় দড়ি দেয়ার ফলে শ্বাসবন্ধ হয়ে মারা গেছে।”

“কিন্তু আজ সকালে আমি যখন লাশ দেখলাম তখন তো গলায় কোন দাগ ছিলো না। তবে এখন কিভাবে দেখা গেলো! “

“তুমি দেখোনি কারণ দড়ির দাগটা ভারি মেকাপের সাহায্যে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তারউপর গলায় থাকা ভারি নেকলেসটা দেয়ার ফলে গলার দাগটা কারো নজরে পড়েনি। যা আমাদের পরীক্ষায় ধরা পড়েছে।”
ডক্টর লিপিকার কথায় অধরা চমকে গেলো। কিন্তু সেটা লিপিকাকে বুঝতে না দিয়ে বললো,
“শরীরে আর কোন আঘাতের চিহ্ন নেই তো?”

“নাহ। শরীরে আর কোথাও একটা পিপড়ার কামড় সমান জখম ও নেই। গলায় দড়ির দেয়ার ফলেই মৃত্যু হয়েছে।”
“মৃত্যুর আগে কোন নেশা করা হয়েছে কি?”

“নাহ। একদম স্বাভাবিক ছিলো।”

“সেক্সুয়াল কিছু?”
“নাহ।”
“লাশের শরীরে কারো আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে? “

“নাহ।”
“আপনার কি মনে হয় এটা কি কোন ভাবে সুইসাইড হতে পারে?”

“মৃত্যুর আলামত দেখে তো স্পষ্ট বলা যায় এটা মার্ডার কেস। সুইসাইড কোনভাবেই হতে পারে না। সুইসাইড হলে তার চোখে মুখে বিস্ময়ভাব থাকতো না। যা লাশের চেহারায় দেখা যাচ্ছে।”

“সুইসাইড হলে মরার পর নিজের গলার দাগ কিভাবে মুছা সম্ভব? আর যদি মার্ডার কেস হয় তবে প্রতিভার মুখে আতঙ্ক থাকতো। যা মৃত্যুর পর প্রতিভার মুখে ছিলো না। এখানেই ঘাফলা।”

“এই ঘাফলাই সমাধান করতে হবে তোমাকে।”
হেসে বললেন লিপিকা। অধরা

কি ভেবে বললো,
“ম্যাম আপনি প্রতিভার ভিতরে বেড়ে উঠা ভ্রুণের ডি এন এ টেস্ট করুন। আর যত দ্রুত পারেম আমাকে রিপোর্ট জানান। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি আপনাকে পরে ফোন দিচ্ছি।”

বলে লিপিকার উত্তরের আশা না করে ফোন কেটে দিলো অধরা। তারপর কনস্টেবল আদাবরকে ডাক দিলো।
অধরার তলবে মিনিটখানের মাঝেই অধরার কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালো চল্লিশোর্ধ্ব এক শ্যামবর্ণের লোক। পরনে পুলিশী পোশাক। দরজায় নক করে বললো,

“আসবো ম্যাডাম?”
“আসুন।”
আদাবর ভিতরে এসে অধরার ডেস্কের সামনে নত ভঙ্গিতে দাঁড়ালো। অধরা বললো,
“আদাবর সাহেব আপনাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা পালন করেছেন?”

“জ্বি ম্যাডাম।”
“রিপোর্ট বলুন।”

” লাশের উপর থাকা চিরকুট, নেম কার্ড, র‍্যাপিং পেপার, ট্রলি সব কিছু পরীক্ষা করেছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিভাগ। তাদের দেয়া রিপোর্ট মুতাবেক চিরকুট এবং নেমকার্ড ব্যাতিত কোথাও কারো আঙুলের ছাপ নেই। চিরকুট এবং নেম কার্ডে আঙুলের চাপ পাওয়া গেছে। যা লাশের আঙুলের ছাপের সাথে ম্যাচ করে।”

“তারমানে চিরকুট আর নেমকার্ড প্রতিভাই লিখেছে।”

আনমনে বললো অধরা। আদবর বললো,
“জ্বি ম্যাডাম। তবে একটা কথা বলতে হয়, এটা পূর্ব পরিকল্পিত মার্ডার। খুনি সবকিছু ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত ভাবে করেছে। কোথাও একটা ক্লু এ রেখে যায় নি।”

“তা যা বলেছেন। তবে সুইসাইড কিংবা মার্ডার কোনটাই সিওরভাবে বলতে পারছিনা। সুইসাইড হোক কিংবা মার্ডার সবটাই পূর্ব পরিকল্পিত। তাই কেসটা এখনো ধোঁয়াশাময়। আমার মনে হয়ে আমাদের আবার ভুঁইয়া ভিলায় যাওয়া দরকার। সবকিছু আরেকবার খুঁতিয়ে দেখা দরকার। কোথাও কোন ক্লু রেখে আসলাম কিনা। “

“জ্বি ম্যাডাম।”
এরিমাঝে দরজায় নক হলো। দরজায় পুলিশ পোশাকে এক যুবক দাঁড়ানো। অধরা ভিতরে আসতে বললো। অনুমতি পেয়ে পুলিশ কনস্টেবল জিহাদ অধরার কেবিনে প্রবেশ করলো। একটা ফাইল অধরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ম্যাডাম সবার কললিস্ট ডিটেইলস এন্ড লোকেশন।”

প্রতিভা জিহদের হাত থেকে ফাইলটা হাতে নিয়ে খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লো। তারপর বললো,
“ফোন লোকেশন অনুযায়ী কাল রাত বারোটা থেকে সকাল দশটা অব্দি প্রভাত মির্জা, তিহানা, এবং স্বরূপা ধানমন্ডি প্রভাত মির্জার নিজে বাড়ি তথা মির্জা হাউজে ছিলো। তুরাগ আর শিলা মিরপুরে তুরাগের ফ্ল্যাটে ছিলো। প্রতিভা ছিলো ধানমন্ডি লেকে। এখনো প্রতিভার ফোন লেকেই এক্টিভ।”

“জ্বি ম্যাম।”
তারমানে এরা সবাই সত্যিই বলেছিলো। মনে মনে বললো অধরা।

এই মুহুর্তে অধরা বসে আছে মিরপুরের পূর্ব কাজীপাড়ার সাত তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং ভুঁইয়া ভিলার কন্ট্রোল রুমে। উদেশ্য আরো একবার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা। গত দুদিনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে হতাশ হলো। কোন সন্দেহজনক কিছুই ফেলো না। দেখতে দেখতে একটা দৃশ্য দেখে বিস্মিত হলো অধরা।

মিনিট দশেকের সিসিটিভি ফুটেজ মিসিং! কাল রাত চারটা থেকে চারটা দশ অব্দির ফুটেজ নেই। কেউ ফুটেজটা কেটে দিয়েছে। রাতে তিনটা উনষাট এর পর চারটা এগারোর ফুটেজ শো করছে। মধ্যখানের দশ মিনিট কেটে আগে পরের সময়টাকে এডিট করে জোড়া দিয়ে দিয়েছে। এমন ভাবে এডিট করেছে সময়ের দিকে নজর না দিলে বুঝাই যাবে না যে মাঝের দশমিনিট নেই। অতি নিখুঁত ভাবে করার কারণ সকালে চেক করার সময় অধরার চোখে পড়েনি। যা সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখায় এখন চোখে পড়ছে।

তারমানে এই দশমিনিটের মাঝেই প্রতিভার লাশ তুরাগের ফ্ল্যাটের সামনে রেখে গেছে কেউ। প্রতিভার মৃত্যু হয়েছে রাত তিনটায়, লাশ পৌঁছেছে চারটায়। এক ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু, সাজানো, প্যাকিং, এবং গন্তব্যে প্রেরণ সব হয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব!

তবে একটা কথা ক্লিয়ার যে এসব মোটেও একজনের ক্রিয়াধারা নয়। এতে কয়েকজন কিংবা একটা দলের সম্পৃক্ততা আছে। নাহলে দশমিনিটের মাঝে লাশ জায়গামতো পৌছানো, সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করা এবং পালায়ন একজনের ধারা সম্ভব নয়। আর এটা পূর্ব পরিকল্পিত হত্যা, সুইসাইড নয়। কোন ভাবেই সুইসাইড হতে পারেনা। মার্ডারের জন্য প্ল্যানের দরকার হয়, সুইসাইডের জন্য না।

সেকেন্ড দশেক ভেবে অধরা ভূঁইয়া ভিলার মালিক সমিতির সভাপতিকে তলব করলো। দশজনের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে কাজী পাড়ার ভুঁইয়া ভিলা। এর একটা মালিক সমিতি আছে। যার সভাপতি দেলোয়ার ভুঁইয়া। বয়স পঞ্চাশের ঘরে গিয়ে আটকেছে। ময়লা গায়ের রঙ, মোটা ঠোঁটের উপর মোটা ঘন কালো গোঁফ।চ্যাপটা চিবুক। দানবের মতো শরীর। চেহারায় হিংস্রতার আভাস।

মূলত তিনি নেতা গোছের লোক, রাজনীতি করেন। বেশ প্রভাবশালী। এলাকায় অনেক দাপট তার। তার এই দাপটের জন্যই দশজনের মালিকানা সত্ত্বেও বিল্ডিংটা তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।

অধরার তলবে পেয়ে খানিক পরেই দেলোয়ার হোসেন মালিক সমিতির সবাইকে নিয়ে বীরবেশে হাজির হলেন কন্ট্রোল রুমে। ভাবটা এমন যেন তিনি কোন মহান কাজে যাচ্ছেন। অধরা সবার দিকে এক নজর দিয়ে বললো,
“মালিক সমিতির সভাপতি কে?”

“আমি।”
কন্ট্রোল রুমের এক কোণায় থাকা একটা চেয়ার টেনে পায়ের উপর পা রেখে বসে বললেন দেলোয়ার ভুঁইয়া। অধরা দেলোয়ার ভুঁইয়ার দিকে সন্দেহের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। অধরার মনে হচ্ছে এই লোকটা খুন করতে পারে।

চেহারায় খুনি খুনি ভাব আছে। তা ছাড়া নেতা মানুষ। তাদের জন্য এসব বাঁ হাতের খেলা। তবে প্রমাণ ছাড়া তো আর যাকে তাকে খুনির পদবী দেয়া যায় না। তাই মনের সন্দেহকে মনে চেপে রেখে অধরা বললো,
“কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বরত কার উপর ন্যাস্ত?”

“ফরিদদের উপদ।”

গম্ভীরমুখে বললেন দেলোয়ার হোসেন। অধরা বললো,

“কোথায় সে? ডাকুন।”
“সে তো এখানে নেই। গ্রামে গেছে অসুস্থ মাকে দেখতে।”

কন্ঠের গম্ভীর্যতা বজায় রেখে বললেন দেলোয়ার ভুঁইয়া। দেলোয়ার সাহেবের উপর সন্দেহের দৃষ্টি ফেলে অধরা বললো,

“কবে গেছে?”
“দু’দিন আগে।”

“এই দুইদিন কন্ট্রোল রুম কে কন্ট্রোল করেছে?”

“কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব একজনের ছিলো সে হচ্ছে ফরিদ। সেই কন্ট্রোল রুম কন্ট্রোল করে। ফরিদের অনুপস্থিতিতে কন্ট্রোল রুম খালিই থাকে। সিসিটিভিতে সব রেকর্ড হয়। ফরিদ আসলে চেক করে কোন সমস্যা দেখলে আমাদের জানায়, আমরা সমাধান করি।”

“সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে তা চেক করার জন্য পার্মানেন্ট লোক রাখেন না কেনো! আর ফরিদের অনুপস্থিতিতে মালিক সমিতি কেউ একজন দিয়ে সেই দায়িত্ব পালন করাতে পারতেন। তাহলে আজ কেউ এভাবে লাশ রেখে পালিয়ে যেতে পারতো না। আপনাদের একটু অসচেতনতার জন্য মানুষের জীবন যায়।”

বিরক্ত কন্ঠে বললো অধরা। অধরার কথায়
দেলোয়ার হোসেনের চোয়ালে কাঠিন্যতা দেখা দিলো। কন্ঠে কঠোরতা মিশিয়ে কালো চেহারাটাকে আরো কালো করে বললেন,

“দেখুন ম্যাডাম আপনি খুনের ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছেন তাই করুন। আমাদের কাজ শিখাতে আসবেন না। কন্ট্রোল রুমে কাকে রাখবো না রাখবো আমরা বুঝবো। আপনাকে বলতে হবে না। এই সিকিউরিটিতেও ভুঁইয়া ভিলায় কখনো চুরি ও হয় নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এখন খুন হয়েছে। এতে আমাদের তো দোষ নেই। খুনী খুন করেছে। আমরাতো করিনি। আর সবসময় তো আর খুন হয় না যে আমরা এলার্ট থাকবো। আজ হয়েছে আর কখনো হবে না। আমাদের সিকিউরিটি এমনই থাকবে। তাই আপনি আমাদের নীতি না শিখিয়ে খুনীকেই ধরুন।”

“আমি আমার কাজই করছি। আপনাদের জবাবদিহি করার রাইট আছে আমার। খুন যেহেতু ভুঁইয়া ভিলায় হয়েছে আর আমাকে এই কেসের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাই আমি কেস সলভ করবো। আর কেস সলভ করার জন্য আপনাদের সাথে জেরা করতে পারি। কেস সলভ করার জন্য আমাকে যা করতে হয় আমি তা করবো। এর পিছনে যত বড় নেতা বা রাঘব বোয়ালই থাকুক না কেনো আমি খুনীকে আইনের আওতায় এনে শান্তি দিবোই।”

দৃঢ় কন্ঠে বললো অধরা। দেলোয়ার সাহেব মুখ ভর্তি পানের রস পিক করে পাশে ফেলে হেসে বললেন,
“আপনার যা করার করুন। আমরাও দেখি কেমন পারেন আপনি। পারলে খুনীকে বের করুন দেখি।

আর হ্যাঁ, আমরা নির্দোষ মানুষ আমাদের এসবে জড়াবেন না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেস সলভ করুন। আমার বিল্ডিংয়ে পুলিশের অবাধ যাতায়াত আমার পছন্দ না। এমনিতেই পুলিশদের আমার ভীষন অপছন্দের। আপনাদের ইনভেস্টিগেশনের চিপায় পড়ে পুরো বিল্ডিংয়ের সব মানুষের ডিস্টার্ব হচ্ছে। খুনীকে বের করতে এসেছেন খুনীকে বের করে দলবল নিয়ে বিদায় হন। আমাদের জ্ঞান দিতে কিংবা জেরা করতে আসবেন না। অন্যথায় ফলাফল ভালো হবে না।”

অধরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দেলোয়ার ভুঁইয়া তার দলবল নিয়ে চলে গেলেন। কনস্টেবল জিহাদ বললো,
“ম্যাডাম দেখলেন, চোরের মায়ের বড় গলা। এই লোকের নামে চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণের মামলা আছে।

ক্ষমতার দাপটে কেউ কিছু করতে পারে না। এই লোকেরে আমার সন্দেহ হয়। দেখতেই খুনী লাগে। এই লোক কোথাও কোনভাবেই এই খুনের সাথে জড়িত নয় তো?”

“অসম্ভব নয়। হতে পারে। ক্ষমতার দাপটে মানুষ সব করতে পারে। এখন আমাদের সুত্র খুঁজে বের করতে হবে। কে কোন এঙ্গেলে চাল চালছে সেটাই আমাদের বের করতে হবে। একবার সুত্র খুঁজে পেলে আমরাও আমাদের পাওয়ার দেখাতে পারবো। আচ্ছা শুনো, মালিক সমিতির সবার উপর নজর রাখো। “

“আচ্ছা ম্যাডাম।”
“আর দারোয়ানকে ডাকো। এই দারোয়ানের মাঝেই আমার ঘাপলা লাগে।”

.
ভুঁইয়া ভিলার মধ্যবয়সী দারোয়ান বোরহান অধরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নত ভঙ্গিতে। ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে ও দরদর করে ঘামছে। বাদামী চামড়ার হাত দুটোর একটা দিয়ে আরেকটার আঙুল কচলাচ্ছে, ত্রিকোণ চোয়াল ভয়ে ঘেরা। কপালে চিন্তার ভাজ।ভয়ে কাচুমাচু করছে।

চোখ এদিক ওদিক করছে, যেন পালানোর পথ খুঁজছে। ভাবটা এমন যে বড় সড় কোন অপরাধ করে ধরা খেয়েছে। অধরা বোরহানের হাত কচলানো দেখে মুচকি হাসলো। বোরহানের ভয়ার্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“এমনটা কেনো করলেন?”
“কক্কি কক্কিরেছে ম্যাডাম?”

তোতলিয়ে বললো বোরহান। অধরা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“প্রতিভার সাথে আপনার কিসের শত্রুতা ছিলো যে এভাবে খুন করলেন? আমি জানি সব, আমার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই। সত্যটা বলুন।”

দারোয়ান অধরার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো…


পর্ব-৩

অধরার কথায় বোরহানের ভয় ক্রমশ বেড়ে গেলো। ভয়ে ভয়ে ঢোক গিললো। উত্তর না দিয়ে কাচুমাচু করতে দেখে অধরা একটা ধমক দিলো,
“কি হলো বলুন? চুপ করে আছেন কেনো? চুপ করে থাকলে কিন্তু নিস্তার পাবেন না। তাই তাড়াতাড়ি সত্যটা স্বীকার করুন।”

“ব্বিশশাসস কক্কোররুন ম্মেম্মেড্ডাম আয়াম্মি কক্কিচচ্ছু ক্কররিননি।”
ভীত কন্ঠে তোতলিয়ে বললো বোরহান। অধরা বললো,
“কিছু না করলে এমন তোতলাচ্ছেন কেনো!”

“ভভয়ে।”
“ভয় পায় দোষীরা। নির্দোষীরা তো ভয় পাওয়ার কথা না। তবে কি আমি ধরে নিবো আপনি দোষী?” ভ্রু কুঁচকে বললো অধরা।

নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য হলেও ভয় কাটাতে হবে। এই ভেবে ভয় খানিকটা কাটিয়ে আকুতি ভরা কন্ঠে বোরহান বলে উঠলো,
“বিশ্বাস করুন ম্যাডাম আমি কিছু করিনি। আমি নির্দোষ।”
তেজী কন্ঠে বললো,
“সত্য কি আপনি বলবেন নাকি আমি থানায় নিয়ে যাবো। ভালোয় ভালোয় সত্যটা স্বীকার করুন। বলুন কাল রাতে কে এসেছিলো লাশ নিয়ে? তখন আপনি কি করছিলেন?”

“কাল রাতে বাইরের কেউ আসেনি ম্যাডাম?”

নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে বললো বোরহান। অধরা প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বললো,
“তাহলে কি ভিতরের কেউ এসেছিলো?”

“না ম্যাডাম। কাল রাত বারোটার পর থেকে ভোর অব্দি কারো আসা যাওয়া ছিলো না।”
“কারো যাওয়া আসা না থাকলে লাশ কি হেটে হেটে তুরাগের ফ্ল্যাটের সামনে এসে গেছে! বলুন?”

বোরহান চুপ মেরে গেলো। অধরা এক ধমক দিয়ে বললো,
“আপনি কি ভালোয় ভালোয় সত্যটা স্বীকার করবেন নাকি আমি অন্য উপায় বেছে নিবো?”

বোরহান এবার ঘাবড়ে গেলো। কাঁদোকাঁদো গলায় বললো,
“বিশ্বাস করুন ম্যাডাম আমি কিছু করিনি। আমি নির্দোষ।”
অধরা বাঁকা হেসে বললো,
“চোর চুরি করে কখনো বলে আমি চুরি করেছি? শাক দিয়ে মাছ না ডেকে বলুন লাশ কে নিয়ে এসেছে?”
“আমি জানি না।”
“কাল সারারাত আপনি কোথায় ছিলেন?”

“গেটের কাছেই ছিলাম।”

“ঘুমিয়ে ছিলেন?”
“না জেগেই ছিলাম।”

“আপনি গেটের কাছে জাগ্রত অবস্থায় সারারাত পাহারা দিয়েছেন অথচ রাতে কেউ বাইরে থেকে লাশ নিয়ে এসে এক ফ্ল্যাটের সামনে রেখে গেলো আপনি টের পাননি!ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর শুনাচ্ছে না? মজা করেন আমাদের সাথে?”

গর্জন করে বললো অধরা। অধরার গর্জনে দারোয়ান কেঁপে উঠলো।

ভয়ে ভয়ে বললো,
“বিশ্বাস করুন ম্যাডাম আমি সারারাত গেটের কাছেই ছিলাম। শুধু মাঝে একবার ছাদে গিয়েছিলাম। এ ছাড়া পুরো রাত আমি গেটের কাছেই ছিলাম। কিন্তু কাউকেই বাইরে থেকে আসতে দেখিনি কিংবা কেউ ভিতর থেকে বের হয় নি।”

অধরা এবার সন্দেহী কন্ঠে বললো,
“কখন গিয়েছিলেন ছাদে আর কেনো গিয়েছিলেন?”

“রাত চারটার দিকে। পাঁচ তলার ভাড়াটে ছেলেটা মানে অভি ফোন দিয়ে বলেছিলো পানির সমস্যা। লাইন চেক করতে। তাই গিয়েছিলাম। আমি লাইন চেক করে দিয়েই চলে এসেছি। বিশ্বাস করুন ম্যাডাম এর বাইরে আমি আর কিছুই করিনি।”

দারোয়ানের করুণ কন্ঠে বলা কথা শুনে জিহাদ আর আদাবর একে অপরের চোখ চাওয়াচাওয়ি করলো। অধরার দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হলো। অধরা জানতো যে দারোয়ান কোন দোষ করেনি।

এসবে অন্য কারো হাত আছে। কারণ এতসব প্ল্যান করে খুন করা দারোয়ানের পক্ষে সম্ভব না। তাও দারোয়ানকে ভয় দেখাচ্ছে যেন দারোয়ান কিছু জানা থাকলে বলে দেয়। অধরা নড়েচড়ে বসলো। তারপর বললো,
” আপনি গিয়ে কি দেখলেন? পানির লাইনে কোন সমস্যা ছিলো?

আর সেখানে কি কলার মানে অভি ছিলো ?”

“আমি গিয়ে দেখলাম পানির লাইন সব বন্ধ করা। তা দেখে আমি সব অন করলাম। আর আমি গিয়ে ছাদে অভি দেখি না। আমি আমার কাজ সেরে চলে এসেছি।”

“আসার সময় আপনি তুরাগদের ফ্ল্যাটের সামনে কোন বক্স দেখেছেন?”
“না।”
“আপনি ছাদ থেকে নেমে সোজা গেটে গিয়েছেন? “
“আমি ছাদ থেকে নেমে আমার রুমে গিয়েছিলাম। তারপর গেটের কাছে গিয়েছি।”

“কেনো!”

অধরার তড়িৎ প্রশ্নে দারোয়ান কাচুমাচু শুরু করলো। অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
” কেনো গিয়েছিলেন?”
“ইয়ে মানে বেশ ছাপ পেয়েছিলো।”

দারোয়ানের কথা আর কাচুমাচু দেখে বুঝতে পেরে জিহাদ বললো,
“ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন?”

লজ্জিত চেহারা নিয়ে মাথা নাড়লো বোরহান। অধরা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো,
“ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে যখন গেটের কাছে গেলেন তখন কি গেট অন ছিলো?”

“নাহ আগের মতোই বন্ধ ছিলো।”

“পাঁচতলার অভি কি করে? মানুষ কেমন?”

“কি করে জানি না তবে প্রতিদিন সকালে সিগারেট খেতে খেতে বের হয় রাতে সিগারেট খেতে খেতে বাসায় ফিরে। আসা যাওয়ার পথে কখনো তেমন কথা বলে না। কেমন গম্ভীর।”

“অভির সাথে প্রতিভা বা তুরাগকে কথা বলতে দেখেছেন কখনো?”

দারোয়ান খানিক ভাবলো তারপর বললো,
“অভির সাথে প্রতিভা ম্যাডামকে তর্কাতর্কি করতে দেখেছি একবার।”

বোরহানের কথা অধরা চমকে গেলো। তারপর বললো,
“কবে!”
“এই মাসখানেক আগে। একদিন দুজনে সকালে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে তর্কাতর্কি করেছে। খানিক পরে দুইদিকে চলে গেছে।”

“কি নিয়ে ঝগড়া করছিলো শুনেছেন কিছু?”

“পুরোপুরি শুনিনি। শুধু এইটুকু শুনেছি প্রতিভা ম্যাডাম বলছিলো”দোহাই লাগে আমার জীবনটা শেষ করবেন না।

আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন।”
শিকারের নাগাল পেলে শিকারীর চোখ যেমন চকচক করে উঠে, দারোয়ানের কথায় অধরার চোখ ও তেমনি করে উঠলো। অধরা বললো,
“নাম কি ছেলেটার? “

“অভিলাষ।”

“হিন্দু?”
“নাহ, মুসলিম।”

“একা থাকে?”
“নাহ, মা বাবার সাথে থাকে।”

“আর কখনো অভিলাষকে প্রতিভার সাথে দেখেছেন?”

“না ম্যাডাম।”
“আচ্ছা যান আপনি। সন্দেহের কিছু দেখলে আমাদের জানাবেন। ঠিকাছে?”

“জ্বি ম্যাডাম।”
দারোয়ান চলে যেতেই অধরা বললো,

“পানির পাইপ বন্ধ থাকা, দারোয়ানকে কল করা এবং ছাদে যাওয়া সবটাই পূর্বপরিকল্পিত। অভিলাষ দারোয়ানকে কল করে বাহানা দিয়ে ছাদে নিলো। দারোয়ান গেট ছেড়ে ছাদে যেতেই গেটের আশেপাশে লাশ নিয়ে প্রস্তুত থাকা কেউ একজন বা দুজন গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করেছে। লাশ ভর্তি ব্যাগ বিল্ডিংয়ের ভিতরে কোন এক জায়গায় লুকিয়ে রেখে পালিয়ে যায়। দারোয়ান যখন ছাদ থেকে নিচে নামে তখন অভিলাষ অগত ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিদ্বয়ের রেখে যাওয়া বক্স তুরাগের ফ্ল্যাটের সামনে রেখে কন্ট্রোল রুমে গিয়ে ফুটেজ ডিলিট করে নিজ বাসায় চলে যায়।

আমি যদি ভুল না হই তবে এমনটাই হয়েছে। তবে এখানে আরো ঘাপলা আছে। এখন কোন এ্যাকশন নিলে মূল রাঘব বোয়ালকে ধরা যাবে না। তাই প্রমাণসহ এগুতে হবে। জিহাদ এই অভিলাষের মানচিত্র বের করো।”

“আচ্ছা ম্যাডাম।”
“এই কেসের মতো এমন জটিল কেস আমি আর দেখিনি। সকালে একে খুনী মনে হয়, বিকেলে ওকে খুনী মনে হয়। রাতে আরেকজনকে খুনী মনে হয়। মূল খুনী কে সেটাই ধোঁয়াশা।”

এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদাবরের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনি আমার সাথে আসুন। তুরাগের ফ্ল্যাটটা আরেকবার তল্লাশি করি। দেখি কিছু পাই কিনা।

“জ্বি ম্যাডাম।”

অধরা আদাবর আবার এলো দোতলায় দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাটের দরজায়। দরজায় নেমপ্লেট টানানো। যাতে লেখা,
‘তুরাগ আহমেদ
&
প্রতিভা মির্জা।’
আদাবর ফ্ল্যাটে দরজা খুলে দিলে অধরা দুই হাত প্যান্টের পকেটে রেখে বেশ স্টাইলের সাথে ভিতরে ডুকলো। তারপর আদাবর থেকে গ্লাবস নিয়ে হাতে পরে নিয়ে ঘরের প্রতিটি কোণায় চোখ বুলাতে শুরু করলো।

ড্রয়িং, ডাইনিং, এক্সট্রা তিনটা বেড, কিচেনের সমন্বয়ে বিশাল ফ্ল্যাট। তুরাগদের বেড রুম বাদে বাকিসব রুম চেক করে তুরাগ প্রতিভার বেডরুমের দিকে পা বাড়ালো অধরা। অন্য কোথাও তেমন কিছু ফেলো না সে। বেড রুমে যেতে যেতে ডাঃ লিপিকাকে কল দিলো।

ভ্রুণের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই লিপিকা জানালো প্রতিভার গর্ভে বেড়ে উঠা ভ্রুণের সাথে তুরাগের ডি এন এ ম্যাচ করেছে। অর্থ্যাৎ বাচ্চাটা তুরাগের। কনফিউশান দূর হওয়ায় খানিক স্বস্তি ফেলে অধরা।

ফোন রেখে অধরা আবার তার কাজে মন দিলো।চারদিক চোখ বুলাতে গিয়ে বেড রুমের দেয়ালে অধরার চোখ আটকালো। রুমের চার দেয়াল জুড়ে আছে চারটা বড় বড় ফটোফ্রেম। তুরাগ- প্রতিভা দম্পতির আনন্দময় কিছু মুহুর্ত ফ্রেমে বাধানো হয়েছে। প্রতিটা ছবিতেই দুজনকে অতিব সুখী লাগছে। প্রাণখুলে হাসছে দুজন। দেখলেই প্রাণ জুড়ে আসে। খুব সুন্দর আর সুখী এক জুটি। পুরো রুমটা যেন ভালোবাসায় বাধানো। রুমের প্রতিটা কোণা অতি যত্নের সাথে কেউ সাজিয়েছে। রুমের এক কোণে উইডোর সাইডে একটা বোর্ড টাঙানো। তাতে হরেক রঙের শ’খানেক ছোট ছোট চিরকুট আটকানো। বোর্ডের মাঝে বর্ডার দেয়া।

একপাশে শিরোনামের মত করে প্রতিভার নাম লেখা, অন্যপাশে তুরাগের নাম লেখা। প্রতিভার নামের নিচে সবকটা চিরকুট তুরাগকে উদ্দেশ্য করে লেখা, যা প্রতিভা লিখেছে। আর তুরাগের নামের নিচে থাকা সবকটা চিরকুট প্রতিভাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, যা তুরাগ লিখেছে।

প্রতিভা তুরাগ একজনের প্রতি অন্যজনের নিত্যকার অনুভুতি প্রকাশ করেছে চিরকুটে। বুঝাই যাচ্ছে এরা চিরকুট আদান প্রধান করতো সবসময়। অধরা মনোযোগ দিয়ে সবগুলো চিরকুট পড়লো। প্রতিটা চিরকুট জুড়েই ভালোবাসা গাঁথা। একের অনুপস্থিতিতে অন্যজনে চিরকুট লিখেছে। চিরকুট আদান-প্রদানের ব্যাপারটা অধরার বেশ লাগলো। একটা কথা ক্লিয়ার যে এদের মাঝে ভাবটা বেশ।

আরো খানিকক্ষণ পুরো রুম তল্লাশী করলো। একটা নীল মলাটের ডায়েরি ছাড়া আর তেমন কিছুই পেলো না। অধরা ডায়েরিটা সাথে নিলো। যদি এর থেকে কিছু জানা যায়!
*
পরদিন তুরাগ, স্বরূপা, প্রভাত মির্জা, তিহানা জাহানকে থানায় ডাকা হয় কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তুরাগের জবানবন্দি অতিব জুরুরি বিধায় খানিক অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাকে থানায় ডাকা হয়েছে। অধরা আলাদা আলাদা ভাবে সবার জবানবন্দি নিলো। যাতে কোন ঘাপলা থাকলে বেরিয়ে আসে।

স্বরূপা, প্রভাত মির্জা আর শিলার জবানবন্দিতে তেমন কোন ক্লু পাওয়া যায় নি। তিনজনই প্রতিভা-তুরাগের ব্যাপারে পজেটিভ বলেছে। নেতিবাচক কোন কিছু তাদের চোখে পড়েনি বিধায় তারা বলেনি। তবে তুরাগ ও তিহানা জাহানের জবানবন্দিতে বেশ কিছু সত্য বেরিয়ে এসেছে। যা সত্যিই বিস্ময়কর।

অধরা যখন প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা তিহানা জাহানকে জিজ্ঞেস করে তখন তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, আমি প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা জানতাম।”

“কবে জানলেন ?”

“দেড়মাস আগে। টেস্ট করানোর পর রিপোর্ট হাতে পেয়ে প্রতিভা আমাকে বলেছিলো।”
“তুরাগ জানতো?”

“না।”
“কেনো!”
“প্রতিভা তুরাগকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো তাই জানায়নি। প্রতিভা চেয়েছিলো তুরাগের জন্মদিনে তাকে এই সারপ্রাইজটা দিবে। সেই সাথে সবাইকে জানাবে। তাই প্রতিভা তার প্রেগন্যান্সির কথা শুধু আমাকেই বলেছে আর কাউকে বলেনি।”

প্রেগন্যান্সির রহস্যটা উদঘাটন হওয়ায় অধরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। তারমানে প্রতিভা তুরাগ না জানানোর কারণ এটাই! যাক একটা ধোঁয়াশা ক্লিয়ার হয়েছে। অধরা এবার বললো,
“তুরাগের জন্মদিনে প্রতিভার কি প্ল্যান ছিলো?”

“প্ল্যান ছিলো, প্রতিভা নিজ হাতে কেক বানিয়ে ঘর সাজিয়ে রাত বারোটা এক মিনিটে তুরাগকে বার্থডে উইশ করবে এবং উপহার হিসেবে নতুন অতিথি আগমনের বার্তা দিবে।”

অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কিন্তু তুরাগের জন্মদিনের আগের দিন তো প্রতিভার বাবার বাসায় থাকার কথা ছিলো। বাবার কাছে সময় দিতে থাকার কথা।”

“এমন কোন কথাই ছিলো না। প্রতিভা আমাদের বাসায় গিয়ে তার বাবাকে দেখে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। প্রতিভার খুব তাড়ায় ছিলো বাসায় ফিরে তুরাগকে সারপ্রাইজ দিবে, সব রেড়ি করতে হবে। আমাদের জোরাজোরিতে ডিনার করলো। ডিনার করে সাথে সাথে বেরিয়ে পড়েছে।”

“যাবার সময় কিছু বলেছিলো? “

“বলেছিলো সোজা বাসায় যাবে তারপর তুরাগকে সারপ্রাইজ দিবে। কেক কাটার সময় যেন আমরা ভিডিও কলে থাকি।”

“আচ্ছা, অধরার সাথে কারো কোন শত্রুতা ছিলো? বা অধরাকে কেউ ডিস্টার্ব করতো? কোন ছেলে?”
“কয়েকটা ছেলে প্রতিভাকে বিয়ের আগে খুব ডিস্টার্ব করতো। বিয়ের প্রস্তাব ও পাঠিয়েছিলো দু’একজন। কিন্তু প্রতিভার আপত্তি জেনে কারো প্রপোজাল গ্রহন করিনি আমরা। প্রতিভার পছন্দ অনুযায়ী তুরাগের সাথেই বিয়ে দিই। বিয়ের পর তারা বিরক্ত করা ছেড়ে দিয়েছে।”

“কারা ডিস্টার্ব করতো? নাম বলুন।”
তিহানা জাহান খানিক ভেবে বললেন,

“সাজিদ, মাহির, কাকন আর অভিলাষ এই চারজন বিরক্ত করতো। তারমধ্যে অভিলাষের বিরক্তির মাত্রা বেশি ছিলো। “

‘অভিলাষ’ নামটা শুনে অধরা চমকে উঠলো। বললো,
“অভিলাষ কে?”

“অভিলাষ আর প্রতিভা একি স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছে। অভিলাষ প্রতিভার কয়েক ব্যাচ সিনিয়র ছিলো। স্কুল লাইফ থেকে প্রতিভাকে পছন্দ করতো অভিলাষ। ছেলেটা অনেকটা উগ্র আর বখাটে টাইপের ছিলো তাই প্রতিভা অভিলাষকে মোটেই পছন্দ করতো না। সবসময় এড়িয়ে যেতো। কয়েকবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

বিয়ের আগ অব্দি অভিলাষ প্রতিভাকে বিরক্ত করতো। নেশা করে বাসায় এসে হাঙামা করতো। বাসায় গিফট পাঠাতো। প্রতিভাকে কিডন্যাপ আর রেপ করার হুমকি দিতো। এসবের জন্য বছরখানেক আগে অভিলাষকে জেলেও দিয়েছি আমরা। চারমাস জেলে ছিলো। জেলে থাকাকালীন সময়েই তুরাগ প্রতিভার বিয়ে হয়ে যায়।”
“জেল থেকে বের হয়ে অভিলাষ যখন শুনলো প্রতিভার বিয়ে হয়ে গেছে তখন ঝামেলা করেনি?”

“না। জেল থেকে বের হয়ে অভিলাষ আর কখনো প্রতিভাকে কোন প্রকার বিরক্ত করেনি।।”

“অভিলাষ যে প্রতিভাদের বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায় থাকে তা আপনি জানেন না?”

সন্দেহী কন্ঠে বললো অধরা। অধরার কথায় তিহানা জাহান স্বভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“জানি।”
“একি বিল্ডিংয়ে থাকার সুবাধে তাদের তো দেখা হওয়ার কথা। চোখের সামনে পেয়েও প্রতিভার কোন ক্ষতি করেনি?”
“আমার জানামতে করেনি। প্রতিভা আমাকে তেমন কিছুই বলেনি। আমি কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রতিবারই বলেছে অভিলাষ সুধরে গেছে। এখন তাকে আর বিরক্ত করে না। নিজের মত থাকে।”
“প্রতিভা নিজের দুঃখ কষ্টের কথা কার সাথে শেয়ার করতো?”

“প্রতিভা নিজের সুখের কথা সবার সাথে শেয়ার করলেও দুঃখ কষ্টের কথা কখনো কারো সাথে শেয়ার করতো না। আমি, তুরাগ কিংবা স্বরূপার সাথেও না। তবে সব কথা ডায়েরিতে লিখতো।”

“প্রতিভার ডায়েরিটা কোথায় এখন?”

“তুরাগের ফ্ল্যাটে আছে।”
“আচ্ছা আপনি এখন আসুন। পরে ডাকলে আবার আসবেন।”
“আচ্ছা।”
বলে তিহানা জাহান উঠে চলে গেলেন বাইরে। অধরা আনমনে বললো, তুরাগকে বার্থডে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে প্রতিভা নিজেই লাশ হয়ে সবাইকে সারপ্রাইজ করলো। সারপ্রাইজের উপর সারপ্রাইজ! তাও এতটা রহস্যময়। সত্যিই এটা রহস্যময় সারপ্রাইজ। এক সারপ্রাইজের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে অনেক রহস্য তৈরি হচ্ছে অনেক রহস্যের জট খুলছে।

তিহানা জাহানের পর ডাকা হলো তুরাগকে।
*
“মি.তুরাগ আপনি কি জানেন আপনার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ছিলো?”

হুইলচেয়ারে বসা শুভ্র বর্ণের সুদর্শন যুবকের উদ্দেশ্যে প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়লো অধরা। অধরার কথায় অধরার বিপরীত পাশে হুইলচেয়ারে বসা সুদর্শন যুবকের চেহারার রঙ পালটে গেলো। বিমর্ষ চেহারায় একরাশ বিস্ময় উঁকি দিলো। যেন সে কোন চমকপ্রদ তথ্য জেনেছে। যা সে ইতিপূর্বে জানতো না।

তুরাগের কানে শুধু ‘আপনার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট’কথাটাই গিয়েছে। তিনটা শব্দই তুরাগের কানে বাজছে বারবার। এই তিনটা শব্দই তুরাগকে মুহুর্তের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখী মুহুর্তে নিয়ে গেলো। এই তিনটা শব্দ তুরাগকে ভুলিয়ে দিলো যে তার স্ত্রী এখন মৃত। সে তার অনাগত সন্তানকে নিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। এই তিনটা শব্দই তুরাগকে সেকেন্ডের জন্য বধির করে দিলো। তাই তো সে অধরার বলা বাক্যের শেষ ‘ছিলো’ শব্দটা শুনতে পায় নি।

তুরাগের চোখে মুখে একমুঠো সুখ উঁকি দিলো। আনন্দে চোখ চিকচিক করছে। চোখের সামনে নানান দৃশ্য ভেসে উঠছে। দৃশ্যের পালাবদলে চোখের সামনে ছোট্ট একটা রাজকন্যার অবয়ব ভেসে উঠতেই ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে দেখে দিলো। নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বললো, “আমার প্রিন্সেস আসছে? আমার প্রিন্সেস! আমি বাবা হবো! “

প্রথম বাবা হওয়ার সংবাদটা অধিকতর সুন্দর আর প্রশান্তিকর হয়। সংবাদটা জুড়ে থাকে একরাশ স্বস্তি, আনন্দ আর সুখ। তুরাগের বিমর্ষ চেহারার মাঝে উঁকি দেয়া আনন্দটা যেন তার বিমর্ষতা দূর করে দিয়েছে। বিমর্ষতার বিনিময়ে একমুঠো সুখ উপহার দিয়েছে যেন।

অধরা তুরাগের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না তুরাগের এত খুশির কারণ। এখন তুরাগের চেহারা দেখলে যে কেউ বলবে এই মুহুর্তে তুরাগ নিজেকে খুব সুখী বোধ করছে। অনাগত সন্তানের কথা শুনে তুরাগের কষ্ট দিগুন হওয়ার কথা। কারণ সে স্ত্রীর সাথে সন্তানকেও হারিয়েছে। তবে কষ্টের সময়টায় তুরাগ খুশি হচ্ছে কেনো! অধরা ভ্রু কুঁচকে উচ্চকন্ঠে বললো, ।

” প্রতিভার মৃত্যুর আগে আপনি প্রতিভার কনসিভ করার কথা জানতেন?”

“মৃত্যু”শব্দটা বজ্রপাতের মতো ভয়ংকর শব্দে তুরাগের কানে বাজলো। তুরাগে বধিরতা কাটার জন্য এই একটা শব্দই যথেষ্ট ছিলো। তুরাগের স্তব্ধতা, উৎফুল্লতা, সুখী অনুভূতির তাঁরটা যেন মুহুর্তেই সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হলো।

খানিক আগে ঘুরে বেড়ানো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখকর মুহুর্ত থেকে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবতার কাটাযুক্ত পথে নামিয়ে দিলো তুরাগকে। মনে করিয়ে দিলো মৃত্যু’নামক কঠিন, নির্মম এবং ভয়ংকর শব্দটা তার কাছে থেকে তার স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। গ্রাস করেছে তার অনাগত সন্তানকেও।

বাবা হওয়ার খবর জানার আগেই তার সন্তান পরপারে চলে গেছে। সন্তান আগমনের খবরটা খানিক আগে তাকে যতটা সুখ উপহার দিয়েছিলো এখন তার চেয়ে দশগুন বেশি কষ্ট উপহার দিচ্ছে। ভিতরটা জ্বলে ফুড়ে যাচ্ছে। স্ত্রী সন্তান হারানোর কষ্টটা ভয়ংকর ভাবে ঘিরে ধরেছে তুরাগকে। কেনো হলো এমনটা!

ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে সে সুখীই তো ছিলো। তার সুখকে দিগুন করতে তার সন্তান আসছিলো কিন্তু তার দিগুন সুখী হওয়া হলো না। দিগুন তো দূরে থাকে ভাগের খানিক সুখটাও চলে গেলো। প্রতি কেনো হলো এমনটা? কে আমার সুখকে কেড়ে নিলো বলো! কার এত বড় ক্ষতি করেছি আমি? অসহনীয় কষ্টের ভীড়ে তুরাগের গলা পাকিয়ে কান্নার ধলা বেরিয়ে এলো। সে শব্দ করে কেঁদে দিলো। কান্নামাখনো গলায় বললো,
“কেনো হলো এমনটা? বাবা হওয়ার কথা জানার আগেই নিঃস্ব হলাম। একেবারে নিঃস্ব হলাম আমি।

প্রতি আমাকে জানালে না কেনো! একটা সন্তানের জন্য দুজনে কত মুখিয়ে ছিলাম তবে আমাকে না জানিয়ে নিজেই সন্তানকে নিয়ে পরপারে চলে গেলে কেনো? আমি কি নিয়ে বাঁচবো বলো? আমার কষ্টটা যে দিগুন হয়ে গেলো।”
বলে কাঁদতে লেগে গেলো তুরাগ। ‘প্রতি’ শব্দটা ‘প্রতিভা’ নামের অংশবিশেষ। যা ভালোবাসা প্রকাশ পূর্বক ব্যবহৃত হয়েছে। তুরাগ নিজ স্ত্রীকে ভালোবেসে প্রতি বলে ডাকতো। এমনটা আন্দাজ করছে অধরা।

সে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তুরাগের হাবভাব লক্ষ্য করছে। এতক্ষণে অধরা তুরাগের হাসি কান্নার অর্থ খুঁজে ফেলো। তারমানে তুরাগ সত্যিই স্ত্রীর প্রেগন্যান্সির কথা জানতো না। তার আন্দাজ এবং তিহানা জাহানের কথা ঠিক হলো।

প্রতিভা কাউকে জানায় নি। তুরাগের কথা শুনে বুঝা যাচ্ছে সন্তানের আগমনের জন্য দুজনেই অপেক্ষায় ছিলো। অধরা তুরাগকে এই খুশির খবরটা এমনি এমনি দিতে চায় নি বলেই তুরাগের জন্মদিন অব্দি অপেক্ষা করেছিলো হয়তো।

তুরাগের জন্য খারাপ লাগলো অধরার।ভালোবাসার মানুষের বিচ্ছিনতার কষ্ট সত্যিই অসহনীয়। অধরা শান্ত কন্ঠে বললো,
“শান্ত হোন। মৃত্যু অবধারিত। সবাইকে একদিন না একদিন এর স্বাদ গ্রহন করতে হবে।

কেউ ঠেকাতে পারবে না। কান্নাকাটিতে কোন কিছুর সমাধান হবে না। কষ্ট থেকেই যাবে। আপনাকে যারা নিঃস্ব করেছে তারা শাস্তি ফেলে আপনার কষ্ট কিছুটা লাঘব পাবে। তাই আমাদের সাহায্য করুন। আমরা খুনীদের পাকড়াও করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিবো। আপনি শান্ত হন। ঠান্ডা মাথায় বলুন, মূলত সেদিন রাতে কি হয়েছিলো?”
মিনিট তিনেক সময় নিয়ে তুরাগ নিজেকে শান্ত করলো। কষ্ট গুলোকে চোখের পানিতে না ঝরিয়ে সবগুলো এক করে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাসে গেলে দিলেন। কষ্ট ঝরানোর নিরব উপায় হয়তো এটাই। নিজেকে শান্ত করে মাথা নিচু করে তুরাগ বলা আরম্ভ করলো।
” সারাদিন নিত্যকার রুটিনেই কেটেছিলো। প্রতি তার দিনের বেশির ভাগ সময় আমার সেবায় ব্যয় করেছিলো। আমার খাওয়া, ঘুম পাড়ানো সব সে তার নিজ হাতে করাতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি সব ঠিকঠাক ছিলো। সন্ধ্যায় প্রতি কিচেনে ছিলো। সিক্রেট কি রেসিপি করবে বললো। আমি জিজ্ঞেস করলে আমাকেও জানায় নি।

শিলাকে ও ড্রয়িংরুমে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। আমি আমাদের বেডরুমে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ কিচেন থেকে তাড়াহুড়ো করে এসে রেডি হতে লাগলো। আমি কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে জানালো, বাবার বাসায় যাচ্ছে, বাবার নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাসায় নিয়ে এসেছে বাবাকে দেখতে যাচ্ছে। এক্সিডেন্টের কথা শুনে আমিও যাবো বললাম। কিন্তু প্রতি আমার অসুস্থতার কথা ভেবে আমাকে সাথে নিতে রাজি হলো না।

একা যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। আমি অনুরোধ করলাম একা না যেতে। আমাকে না নিলে অন্তত শিলাকে নিয়ে যেতে। কিন্তু প্রতি বললো, ‘শিলাকে নিয়ে গেলে তোমার খেয়াল কে রাখবে? তুমি যদি পড়ে টড়ে যাও তবে?

আমি তোমাকে নিয়ে কোন রিস্ক নিতে চাই না। শিলা থাকুক তোমার কাছে। তোমার আবার কখন কি লাগে। আর আমি সুস্থ সবল মানুষ, একা চলে যেতে পারবো। বাবাইকে দেখেই ডিনারের আগে ফিরে আসবো।তুমি চিন্তা করো না।’ তবুও আমি কোনভাবেই ওকে একা ছাড়ছিলাম না। মূলত আমার মনে কু ডাকছিলো।

আমার কথা রাখতে এক পার্যায়ে প্রতি বললো, ‘আমার একা গেলেই সমস্যা তো? তবে আমি একা যাবো না রক্সিকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি।

আর গাড়িতে যাবো গাড়িতে আসবো। খানিক পর পর তোমাকে আর শিলাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিবো। তাও টেনশন করো না। দুই ঘন্টারই তো ব্যাপার। এখন বাজে সাতটা দুই আমি রক্সিকে নিয়ে সাড়ে নটার আগে ফিরবো।

খুশি?’ আমার মন তখনো আনচান করছিলো। কিন্তু প্রতিকে আটকানোর উপায় ও ছিলো না। অনুমতি দিলাম। অগত্যা সে রক্সিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো। গাড়ির স্টার্ট না হওয়ায় লোকাল গাড়িতেই চলে গেলো। যা আমাকে পরে জানিয়েছে।”
“রক্সি কে!”
তুরাগের কথার মাঝে পোঁড়ন কেটে বললো অধরা। তুরাগ বললো,
“রক্সি একটা বিড়াল। প্রতির খুব পছন্দের বিড়াল ছিলো সে। মানুষের মতো কথা না বলতে পারলে ও সব বুঝতো।

রক্সি প্রতিভার কাছে নিজের বাচ্চার মতো ছিলো। খুব আদর করতো। যেখানে যেতো রক্সিকে নিয়ে যেতো। বিয়ের আগে রক্সি প্রতির সাথে তার বাবার বাসায় থাকতো বিয়ের পর প্রতির সাথে আমার ফ্ল্যাটে চলে আসে। তারপর থেকে আমাদের সাথেই থাকতো।”
“রক্সি এখন কোথায়? প্রতিভার লাশের সাথে কি তাকে পেয়েছিলেন? “

“রক্সি নিখোঁজ। প্রতির সাথে বাবার বাসায় গিয়ে ফেরার পথে প্রতির সাথেই নিখোঁজ হয়েছে। তারপর আর সন্ধান পাওয়া যায় নি।”
“আচ্ছা। আপনাদের দাম্পত্যজীবন কেমন ছিলো? কোন ঝগড়া বিবাদ ছিলো?”

“আমার আর প্রতির দুই বছরের রিলেশন ছিলো। দু’বছরের রিলেশনের পর সাত মাস আগে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। এই দুই বছর সাত মাসে আমাদের মাঝে কখনো মান অভিমান ও জায়গা পায়নি।

সেখানে ঝগড়া ত অনেক দূরের কথা। আমরা খুব সুখে ছিলাম। আমাদের সম্পর্কটা পরসু অব্দি তেমনি ভালোবাসার ছিলো যেমনটা রিলেশনের প্রথম দিকে ছিলো। কিন্তু কারো আমাদের সুখ সহ্য হলো না। সব কেড়ে নিলো। আমি হারালাম আমার সুখ, আমার ভালোবাসাকে।”
তুরাগের গলাটা বেশ ধরে এলো। অধরা বললো,

“আচ্ছা আপনার বা প্রতিভার কোন শত্রু ছিলো? কারো সাথে কোন ঝগড়া বিবাদ ছিলো? স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য আপনার কেউ কে সন্দেহ হয়?”

একটা ঢোক গিলে ধরা গলাটাকে স্বাভাবিক করলো তুরাগ। তারপর বললো,
“প্রতি বেশ শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিলো। ঝগড়া ঝাটি পছন্দ করতো না। কাউকে পছন্দ না হলে এড়িয়ে যেতো কিন্তু ঝগড়া করতো না। আমার জানামতে প্রতিভার তেমন কোন শত্রু নেই। আমারো নেই কোন শত্রু।”

অধরা সুযোগ বুঝে চট করে প্রশ্ন করলো,
“আচ্ছা পাঁচতলার অভিলাষকে আপনি চিনেন?”

অভিলাষেরর কথা শুনতেই তুরাগের চেহারায় কাঠিন্যতা দেখা দিলো। অধরা পরখ করলো সেটা। সে বললো,
“চিনেন তাকে?”
“জ্বি।”

গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলো তুরাগ। অধরা বললো,
“কিভাবে?”
“আমার প্রতিবেশি হিসেবে চিনি। আর..
“আর?”

“ইভ-টিজার হিসেবে। অভিলাষ প্রতিভাকে উত্যক্ত করতো বিয়ের আগে।”

“বিয়ের পর করতো?”

“নাহ। জেল থেকে ফিরে আর বিরক্ত করেনি কখনো। ততদিনে আমাদের বিয়ে ও হয়ে গিয়েছিলো। তখন আর কিইবা করার ছিলো।”
“অভিলাষের সাথে আপনার কখনো কথা বা ঝগড়া হয়েছে?”
“নাহ।”
“আপনি এখন আসুন।”

তুরাগ যাওয়ার পর অধরা মনে মনে বললো,
আমি যদি ভুল না হই তবে বিয়ের পর ও অভিলাষ প্রতিভাকে বিরক্ত করতো। এত সহজে প্রতিভাকে ছাড়ার কথা না অভিলাষের। অভিলাষের অত্যাচারের কথা প্রতিভা কাউকেই বলতো না।
অভিলাষের জেলে যাবার জন্য অভিলাষ প্রতিভাকে কোন না কোন ভাবে শাস্তি দিচ্ছিলো। যা প্রতিভা নিজের মাঝে চেপে রেখেছে। হতে পারে প্রতিভার কনসিভ করার কথা কোন ভাবে অভিলাষ জেনে গেছে। এতে ভীষন ক্ষেপে গিয়েছে। তাই প্রতিভাকে খুন করেছে। সব কথা জানা যাবে এই অভলাষকে পাকড়াও করলে।
অধরা জিহাদকে বললো,
“এই অভিলাষকে থানায় নিয়ে আসো। ডান্ডার বাড়ি পড়লে সব স্বীকার করবে।”

“জ্বি ম্যাডাম।”বলে যেতে নিলেই অধরার ফোন বেজে উঠলো। কল রিসিভ করার পর অপাশ থেকে শুনা গেলো,
“ম্যাডাম অভিলাষ পালিয়েছে। কাল রাতের আঁধারে ব্যাক প্যাক গুছিয়ে বাসায় তালা দিয়ে পালিয়েছে।”
অধরা টেবিলে এক ঘুষি মেরে বললো, “শিট! কেসটা সমাধানের দিকে না গিয়ে জটিলতার দিকে যাচ্ছে।”


পর্ব-৪

“আমি প্রতিভা, প্রতিভা মির্জা। শিল্পপতি প্রভাত মির্জা ও তিহানা জাহানের একমাত্র সন্তান। বাবাই আমার আদর্শ, মা আমার শিক্ষক।
আমার জীবনে এরা অপরিমিত স্থান জুড়ে আছে। মা বাবা বাদে আরো দুজন মানুষ আছে যারা আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, আমার ভালোবাসার মানুষ। যাদের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। সে দুজনের একজন হলো আমার বোন নামক বান্ধবী স্বরূপা। আমার সুখ দুঃখ হাসি কান্নায় যাকে সবসময় পাশে পাই। স্বরূপাকে পেয়েছিলাম দ্বাদশ শ্রেণিতে। সিটি কলেজে ভর্তি হওয়ার বছর তখন অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিলো। বন্ধু বান্ধব ও বেশ কয়েকটা জুটিয়েছিলাম।বেশ চলছিলো দিন। হঠাৎ একদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি একটা নতুন মেয়ে এসেছে।

ক্লাসের এক কোণে একটা টেবিলে ঘাপটি মেরে বসে আছে। দেখে আমার কেমন যেন মায়া হলো। কাছে গিয়ে কথা বলে জানতে পারলাম, মেয়েটা চিটাগাং সিটি কলেজ থেকে বদলি হয়ে এসেছে এখানে। নাম স্বরূপা, স্বরূপা হাসান। তার বাবা হাসান আলীও একজন শিল্পপতি। আগে চিটাগাং থাকতো। বাবার ব্যবসার কারণে ঢাকা এসেছে। কাকতালীয় বিষয় হচ্ছে, তারা আমাদের এলাকাই বাসা নিয়েছে।শুনে ভীষণ খুশি লাগলো।

যাক এলাকার একটা সঙ্গী পেলাম তবে। মেয়েটার শ্যামবর্ণের চেহারায় কেমন যেন মায়া আছে। যা যে কাউকে গ্রাস করবে। শ্যমবর্ণের চেহারায় টানা টানা হরিণী চোখ যেন তার মায়াটা দিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।

মেয়েটাকে এক নজর দেখলে মনে হবে অতীতে কবিরা ঠিক কথাই বলেছেন। রূপের রানী শ্যামবতীরাই। আমি জেসে গিয়ে মেয়েটার সাথে কথা বললাম, বন্ধুত্বের হাত বাড়ালাম। এই হাজার মানুষের ভীড়ে একাকীত্ব গ্রাস করে থাকা মেয়েটা যেন আমার বাড়ানো হাত দেখে আকাশের তারা হাতে পেলো। খুশি হয়ে লুফে নিলো।

শুরু হলো আমাদের বন্ধুত্ত্ব। দিন যত অতিবাহিত হতে লাগলো আমাদের বন্ধুত্ব তত গাঢ় হতে লাগলো। আমরা বান্ধবী থেকে বোন হয়ে গেলাম। স্বরূপা একেবারেই শান্ত স্বভাবের, অল্পভাষী, কোন ঝগড়া ঝাটি কিংবা তর্কেও নেই সে। মোটকথা, সমস্ত ঝামেলা থেকে দূরে থাকে। ভীষন শান্তি প্রিয় মানুষ। তার মাঝে একটা জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব থাকে সবসময়। সব কিছুর সমাধান খুব বিজ্ঞের মতো করে দিবে। উদারতায় ভরা তার মন, আমি আজ অব্দি ওকে কখনো কারো খারাপ চাইতে দেখিনি। সব সময় সবার ভালো কামনা করে।

আমার বেলায় সে সবসময় সিকিউর থাকে। আমার যাতে ভালো হবে সে তাই করে। প্রচন্ড কেয়ারিং। একদিন আমরা দুজন ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। কেউ গাড়ি নিয়ে বের হইনি। তো রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম। আমি রাস্তার ধারে ছিলাম ও আমার পাশেই ছিলো। হঠাৎ কোথা থেকে একটা গাড়ি আমার দিকে তেড়ে এলো।

সম্ভবত ড্রাইভার মদ্যপায়ী ছিলো। আমি বিষয়টা খেয়াল করি নি। স্বরূপা বিষয়টা খেয়াল করে আমাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার সাইডে ফেলে দেয়। যার ফলে আমি অক্ষত ছিলাম। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে স্বরূপা চরম আহত হয়।

মাসখানেক হাসপাতালে ছিলো। তাও তার কোন দুঃখ ছিলো না। প্রচন্ড যন্তনায় যখন হাসপাতালের বেডে কাতরাতো তখনও আমাকে দেখে মুচকি হাসতো। ওর এই আত্মত্যাগ আমাদের সম্পর্ককে আরো গাঢ় করেছিলো।

স্বরূপা সারাদিন বইয়ের মাঝে মুখ গুজে পড়ে থাকে। বড় লোক বাবার সন্তান হয়েও একেবারে সাদাসিধা জীবন যাপন করে, কোন হাই বিলাসী জীবন যাপন তার পছন্দ নয়। অন্যদিকে আমি হচ্ছি তার বিপরীত। উচ্চ বিলাসী আমি। দুদিন পর পর শপিং করে টাকা উড়াই। যদি ও শপিং তার জন্য ও করি। কারণ সে এসব উচ্চ বিলাসিতা ভেবে শপিংমলের ধারে কাছে ও যায় না।

কখনো জোর করে স্বরূপাকে নিয়ে গেলেও তাকে দিয়ে কিছু কেনানো যায় না। বরং আরো হাইস্যকর বিষয় হয়। আমি কিছু কিনে যখন ওকে ও কিনতে বলি।

বিশেষ করে প্রসাধনী কিছু। তখন স্বরূপা মুখ বাকিয়ে বলে, “তুই কিনে নে।

আমার ওসব চাই না। আমি মেকাপের ‘ম’ টাও পারি না। আর জানি ও না। তবে যদি জোর করিস তো মেকাপের বদলে আমি একটা একটা বই কিনতে পারি।’ আমি তখন চিন্তায় পড়ে যাই এই মুহুর্তে আমার কান্না করা উচিত নাকি হাসা? চিন্তাভাবনা ছেড়ে একসময় সায় জানাই তাকে। আমার হাতে থাকে মেকাপের প্যাকেট আর তার হাতে নীল ক্ষেতের মোটা মলাটের দেশ বিদেশের বিখ্যাত লেখকের কয়েকটা বই।

বিপরীত মুখী দুই মানুষের বন্ধুত্বটা বেশ জমলো। আমরা সুখে দুঃখে সবসময় একে অপরের পাশে থেকেছি। একে অন্যকে সবসময় ছায়ার মতো পাশে পেয়েছি। বিশাল বড় সার্কেলের মাঝেও এই শ্যামবর্ণ মেয়েটাই আমার আত্মার সাথে মিশে গিয়েছিলো। আজ আমাদের বন্ধুত্বের বয়স বছর চার পার হওয়ার পর ও আজো তেমনি আছে দুজনের বন্ধন। আমি সংসার সামলানোর পাশাপাশি তাকে সময় দিই, সে পড়াশুনার পাশাপাশি আমাকে সময় দেয়।

ব্যস্ততা আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারেনি। আজো আছে অমলিন। বই আর মেকাপের তুলনা এখনো আছে। সব কিছুই আগের মতোই আছে৷ মাঝে মাঝে রক্তের সম্পর্ক হারিয়ে যায় কিন্তু আত্মার সম্পর্ক হারায় না। আমার আর স্বরূপার সম্পর্ক ও কখনো হারাবে না। মৃত্যুর আগ অব্দি অমলিন থাকবে।

স্বরূপার পর আরেকজন, যার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। সে হলো আমার ভালোবাসা, আমার প্রেমময় সঙ্গী তুরাগ। তার সাথে আমার পরিচয়টা বছর আড়াই আগে। শরতের এক পড়ন্ত বিকেলে উত্তরার তুষার শুভ্র কাশফুলের রাজ্যে।

ঋতুতে শরতের আগমনের দিন কয়েক পরে আমি আর স্বরূপা গিয়েছিলাম কাশফুলের রাজ্য ভ্রমনে। সাথে অবশ্য আমাদের আরো এক বান্ধবী নিতু ও ছিলো। নিতু আর আমি গিয়েই লেগে গেলাম সেল্ফি নিতে ৷

স্বরূপা সেখানেও বই নিয়ে গিয়েছিলো। স্বরূপার বাদামী রঙের হাতে চকচক করছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধসূর নীল রঙের মলাটের শেষের কবিতা নামক উপন্যাসটা। আমরা যখন মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরা নিজেদের দিকে তাক করে সেল্ফি নিতে ব্যস্ত স্বরূপা তখন ব্যস্ত নিরিবিলি জায়গা খুঁজতে।

যেখানে বসে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে পারবে। খানিক পরে জায়গা পেয়েও গেলো। সেদিকে হাটা ধরলো।

কিন্তু যেতে আর পারলো না। আমরা দুজন স্বরূপাকে ফটোগ্রাফারের দায়িত্ব নামক ব্যস্ততা উপহার দিলাম। স্বরূপা নিজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শ’খানেক ছবি তুলে দিলো আমাদের।

তাকে টেনে টুনে কয়েকটা সেলফিও নিয়েছিলাম সেদিন। ছবি তোলা শেষে ছবি গুলো দেখতে গিয়েই স্ক্রিনে একটা চমকপ্রদ দৃশ্য চোখে পড়লো। ছবিতে আমার আর নিতু পিছনে কয়েক গজ দূরে একটা ছেলে কতগুলো ছোট ছোট বাচ্চাকে নিয়ে গোল হয়ে বসে আছে। কোন একটা ব্যাপার নিয়ে তারা হাসছিলো।

তখনি ছবিটা ক্লিক হয় যার ফলে সবার হাস্যজ্বল মুখ ক্যাপচার হয়। কৌতুহলবশত আমি ঘুরে তাকালাম৷ পিছন ফিরে দেখলাম একি দৃশ্য তখনো চলমান। বাচ্চা গুলো হয়তো পথশিশু। চেহারায় কেমন রোগারোগা আর অসহায় ভাব! হতে পারে পথশিশুদের নতুন ড্রেস পরিয়ে এখানে ঘুরতে নিয়ে এসেছে ছেলেটা। তবে ছেলেটার চেহারা বেশ আকর্ষণীয়।

ফর্সা গোল গাল চেহারায় খোচাখোচা না কাটা দাঁড়ি, প্রশান্ত চোখ, খাড়া নাক, আর সরু ঠোঁটের সম্মিলনে চেহারাটা নজর কাড়া। পরনে তার মেঘের ভেলা শার্ট, আর কালো ডেনিম প্যান্ট, হাতে কালো বেল্টের ঘড়ি। রেশমি কালো চুল গুলো যখন বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো তখন হাত দিয়ে বারবার তা পিছনের দিকে গোছাচ্ছিলো।

সেই সাথে মুখ ভর্তি হাসি আর সরু ঠোঁট আর জিহ্বার নড়াচড়ায় গলা থেকে বেরিয়ে তৈরি হওয়া বাক্য, যা নিমিষেই আশেপাশের মানুষ গুলোকে হাসির রাজ্যে নিয়ে যায়। সবমিলিয়ে চমৎকার একটা দৃশ্য। ঠিক ফ্রেমে বাধার মতো।

ছেলেটাকে এক নজর দেখেই কেমন যেন ভালো লাগা জন্মে যায় আমার। চারদিকে তার বয়সি ছেলেরা যখন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ছবি তুলতে আর রোম্যান্স করতে ব্যস্ত তখন সে ব্যস্ত অসহায় পথশিশুদের মুখে হাসি ফুঁটাতে।

এমনটা ক’জনা পারে? জানা নেই আমার। তবে সেদিন সবার মাঝে ওই ছেলেটাকেই আমার অনন্য লেগেছে। তার রূপ গুন দুটোই আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম নিয়েছিলো। আমি নিজের অজান্তেই ছেলেটার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলাম। আমার ঘোর কেটেছিলো স্বরূপা আর নিতুর ঝাকানিতে। আমার তাকানো নিয়ে সেদিন মজা নিয়েছিলো দুজন! সেকি হাসাহাসি তাদের! আমার নিরামিষ বান্ধবী ও যেন আমিষ হয়ে গিয়েছিলো।

আর আমি? আমি তো প্রথম বারের মতো কোন ছেলের ব্যাপার নিয়ে লজ্জায় লাল হয়েছিলাম। যা ওদের হাসির মাত্রাটা দিগুন করেছে। আমি তাদের হাসি এড়িয়ে তখন ছেলেটাকেই দেখতে মনোযোগী হলাম।

তারা হাসি থামিয়ে বললো, “কুচ কুচ হোতা হে?” আমি এক লাজুক হাসি দিয়েছিলাম সেদিন। যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণ ছেলেটাকেই দেখে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় মৃদুল ভাই এসেছিলো আমাদের নিতে।

মৃদুল ভাই হলো আমার নিরামিষ বান্ধবী স্বরূপার আমিষ প্রেমিক। তিনি মেডিকেল স্টুডেন্ট। বেচারা দীর্ঘ দুই বছর পিছন ঘুরে স্বরূপাকে পটিয়েছিলো। মেডিকেলের পড়া থেকে স্বরূপার মন পড়া অতীব কঠিনতম কাজ বলে তার মনে হয়। একাদশ শ্রেনী থেকেই রিলেশন শুরু হয়েছে তাদের। আমি মৃদুল ভাইকে যতবারই দেখেছি ততবারই একটা কথাই জিজ্ঞেস করতাম, “ভাই এই নিরামিষ নিয়ে চলেন কিভাবে!”ভাইয়া প্রতিবারই হেসে জবাব দিতো, “ভালোবাসা বড় বেহিসাবী। কোন নীতি, নিয়ম, হিসেব মানে না। বরং নিজ নীতি ভুলিয়ে দেয়।

এই দেখো, তোমার নিরামিষ বান্ধবীর সাথে থেকে থেকে আমিও নিরামিষ হয়ে গেছি। এখন আমার তেমন খারাপ লাগে না। ভালোবাসি তো তাকে। তার ভালো লাগাতেই আমার ভালো লাগা।”

মৃদুল ভাইয়ের চমৎকার উত্তর শুনে আমি হাসতাম। ওদিকে আমার নিরামিষ বান্ধবী লজ্জায় লাল নীল হতো। যা মৃদুল ভাইয়ের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির জোগান দিতো। দিনের অল্প খানিক সময় স্বরূপা মৃদুল ভাইকে দিতো। তাতেই মৃদুল ভাই খুশি ছিলো। কোন অভিযোগ ছিলো না তার। স্বরূপা ও ভীষণ ভালোবাসতো মৃদুল ভাইকে। তারা সবসময় চিঠি আদান প্রদান করতো। দুজনে পাশাপাশি বসে থেকেও চিঠিতেই কথা বলতো।

ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগতো। আমি তো মনে মনে সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম যে বিয়ের পর স্বামীর সাথে চিঠি আদান প্রদান করবো। ভালোবাসাটা কথার স্বরে নয় কলমের কালিতে ফুটিয়ে তুলবো। চমৎকার হবে। আমার সেই আশা পূরণ হয়েছে।
যাক গে, সে অন্য কথা। আমি ফিরে আসি আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে পথ চলার কথায়।

সেদিন মৃদুর ভাই এসে আমার ভালোলাগার কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই ছেলেটার খোঁজ এনে দিবেন বলে আশ্বাস দিলেন। আমি বেশ খুশি হলাম তার কথায়। পরদিন যথারীতি দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই ছেলেটাকে দেখার জন্য চলে গেলাম আবার উত্তরার দিয়া বাড়িতে। সাথে টেনে হিচঁড়ে স্বরূপাকে ও নিয়ে গেলাম। স্বরূপা সেখানে গিয়েই নিরিবিলি জায়গা খুঁজে বইয়ে মুখ গুজলো। আমি আমার ভালোলাগার মানুষটাকে দেখায় মন দিলাম।

আজো ছেলেটা এসেছে একদল ছোট বাচ্চা সাথে করে। সবাইকে নিয়ে কাশফুল রাজ্যের এক ফাঁকা জায়গায় গোল হয়ে বসে আড্ডার আসর জমিয়েছে। ছেলেটা গল্প করছে আর তার কথায় বাচ্চা গুলো হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে আড্ডা জমাতে ভীষণ পটু সে। মৃদুল ভাই থেকে কোন খবর না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই গিয়ে তার সাথে পরিচিত হবো। ভালোলাগা এসেছে জীবনে, তাকে উড়ে যেতে দিবো না।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুঠোবন্দি করবো। এ ভেবেই আমি চুপিচুপি ছেলেটার পিছনে গিয়ে অন্যদিকে ফিরে বসে পড়লাম। এমন একটা ভাব করলাম যেন আমি ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আর এখানে বসে জিরিয়ে নিচ্ছি। আমার নজর অন্যদিকে হলেও কানটাকে ছেলেটার আড্ডার আসরে ভেসে উঠা কথাগুলো শুনার দায়িত্ব দিলাম। ওদের কথা খানিক শুনে বুঝলাম, ওদের আড্ডার মেইন টপিক হলো জীবনের সবচেয়ে মজার ঘটনা।

পিচ্ছি ছেলে মেয়ে গুলো তাদের জীবনে দেখা বা ঘটা সবচেয়ে হাইস্যকর ঘটনা বলছে আর সবাই মিলে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সবার ঘটনা বলার পর ছেলেটার পালা আসলো। ছেলেটা বলা শুরু করলো, ‘আমি একটা মজার ঘটনা বলি। একবার আমি চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে হাপিয়ে যাওয়ায় বানরের খাঁচার খানিক দূরে একটা বেঞ্চেতে বসলাম। আমার দৃষ্টি ছিলো বানরের খাঁচার দিকে। খানিক পরে দেখলাম, একটা মেয়ে কোমর অব্দি খোলা চুল নিয়ে বানরের খাঁচা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেল্ফি নিতে ব্যস্ত।বয়স কত হবে? সতেরো কি আঠারো?

মেয়েটার খানিক দূরে দাঁড়িয়ে তার বোন আর দুলাভাই গল্প করছে। তাদের আচরণে বোন দুলাভাই মনে হলো। যাক গে, তো হঠাৎ করে একটা বানর করলো কি, মেয়েটার চুলের গাছি ধরে দিলো টান। চুলে টান পড়ায় মেয়েটা হাত থেকে ফোন ফেলে চিৎকার জুড়ে দিলো। আর বানরের হাত থেকে চুল ছাড়াতে লেগে গেলো।

মেয়েটা বারবার বলছে, “দুলাভাই আমাকে বাঁচান। আপু আমাকে বাঁচান।”মেয়েটার চিৎকারে শুনে মেয়েটার বোন দুলাভাই এগিয়ে গেলো। তারপর দুলাভাই মেয়েটার এক হাত ধরে দিলো এক টান।

তাতে মেয়েটা খানিক দূরে সরে এলো। পুরোপুরি সরে যাওয়ার আগেই বানরটা খপ করে আবারো মেয়েটার চুল ধরে ফেললো। এবার মেয়েটার দুলাভাই এসে আরো জোরে মেয়েটার হাত টান দিলো। বানর ও তার জোর বাড়ালো। সর্বশক্তি দিয়ে মেয়েটার চুল টেনে ধরছে।

দুলাভাই ও হাল ছাড়ার পাত্র না, শালিকাকে বানরের হাত থেকে বাঁচিয়েই ছাড়বেন। দুলাভাই এবার মেয়েটার বোনকে চোখের ইশারা করলো। স্বামীর ইশারা বুঝে মেয়েটার বোন কোমরে কাপড় বেধে নেমে গেলো যুদ্ধ মাঠে। স্বামীর এক হাত ধরে সেও টানছে। এদের পাল্লা ভারি হয়ে গেলো।

এবার বানর তার জোর আরো বাড়ালো। গ্রীলের ফাঁকে দুহাত বের করে মেয়েটার চুলের গাছি ধরে টান দিলো। এদিকে মেয়েটার দুলাভাই সর্বশক্তি দিয়ে মেয়েটার হাত টানছে।

আর মেয়েটার বোন তার স্বামীর হাত টানছে। টানাটানির মাঝে এমন অবস্থা হলো যে, বানর মেয়েটার চুল টানে একদিক থেকে, দুলাভাই হাত টানে আরেকদিক থেকে। মাঝ থেকে মেয়েটার চুল জোরে টান লেগে মাথাসহ ছেঁড়ার উপক্রম হলো। মেয়েটা কাতরতার সাথে বারবার চিৎকার করে বলছে, “আপু দুলাভাই ছাড়েন আমাকে। বানরের চুল টানা থেকে আপনাদের হাত টানায় ব্যাথা বেশি লাগছে। আমাকে বানরের হাতে ছেড়ে দিন। দুই পক্ষের টানাটানির মাঝে আমি দুই ভাগ হয়ে যাবো।”দুলাভাই নাছোড়বান্দা।

কোনভাবেই ছাড়বে না। শালিকাকে সে বানর থেকে ছাড়িয়েই ছাড়বে। দুই পক্ষ আবারো লেগে গেলো তাদের টানাটানিতে। মাঝে নিরিহ মেয়েটার অবস্থা শোচনীয়।”

ছেলেটা কথা গুলো অনেকটা আবৃত্তি করে বলছে। ছেলেটার জোকস শুনে বাচ্চারা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।আমার ও হাসি পেয়ে গেলো। ধরা খাওয়ার ভয়ে মনখুলে হাসতে পারি নি।
তবে পরনের শুভ্র শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে ঠিকই হেসে নিয়েছি। খুব মজার কথা বলে ছেলেটা। ছেলেটার সাথে কথা বলার ইচ্ছেটা আর দমিয়ে রাখতে পারলাম না। ঘুরে গিয়ে বললাম, “এক্সকিউজ মি!”

আমার কথায় ছেলেটা পিছন ফিরলো। তারপর বললো,
“আমাকে বলছেন?”

“হ্যাঁ।”
“জ্বি বলুন?”

আমি ক্লান্ত চেহারা বানিয়ে বললাম, “
“আসলে আমি ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। পানির পিপাসা পেয়েছে। আমার কাছে পানির বোতল নেই। আপনার কাছে কি মিনারেল ওয়াটার হবে?”

আড্ডার মাঝে ব্যাঘাত ঘটায় ছেলেটার চোখেমুখে বিরক্তির চাপ স্পষ্ট ছিলো। তাও সৌজন্যের খাতিরে না বলতে পারলো না। নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে আমাকে দিলো।

আমি পানি খেয়ে বোতলটা ফেরত দিতে গিয়ে মুচকি হেসে বললাম,
“ধন্যবাদ।”
“স্বাগতম।”
হেসে জবাব দিলো ছেলেটা। আমি বললাম,
“আপনারা কোন পিকনিকে এসেছেন?”
ছেলেটা একবার বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে তারপর বললো,
“পিকনিক না এমনিই বিকেলে ঘুরতে এসেছি।”

“ওহ। আচ্ছা আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?

আমার তড়িৎ প্রশ্নে ছেলেটা হেসে উত্তর দিলো,
“আমি তুরাগ আহমেদ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ি। এ ছাড়া দেয়ার মতো তেমন কোন পরিচয় নেই।”

‘তুরাগ! নাইস নেম’মনে মনে আওড়ালাম। তারপর ফিরতি হাসি দিয়ে বললাম আমি,
“আমি প্রতিভা। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজির ছাত্রী।

তা আপনি এখানে কি করেন? আর এই বাচ্চারা কারা?”
তুরাগ তার মুখের হাসি বজায় রেখে সহজ ভাবে উত্তর দিলো,
“এরা সবাই এতিম। এতিমখানায় থাকে। বাবা মা আত্মীয় স্বজন নেই। ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার ও কেউ নেই। তাই আমিই ওদের প্রতিদিন এখানে নিয়ে আসি। তারপর জমিয়ে আড্ডা দিই। আমিও এতিম, এতিমখানায় বেড়ে উঠেছি। সেখানেই এখন শিক্ষকতা করি। তাদের কষ্ট বুঝি তাই একটু আধটু খুশি রাখার চেষ্টা করি।”
তুরাগ এতিম শুনে খারাপ লাগলো। পরিচয় জানতে চাওয়াটা উচিত হয়নি ভেবে নিজেকে বকলাম তারপর মলিন মুখে বললাম,

“সরি আসলে আমি জানতাম না।”
তুরাগ তার হাসি বজায় রেখেই বললো,
“আরে না, সরি হওয়ার কিছু নেই। আপনি নিজেকে দোষী ভাববেন না। সত্য হজম করতে পারি আমি। হজমশক্তি বেশ আমার।”

আমি চুপ করে রইলাম। তুরাগ আবারো হেসে বললো,
“সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। ফিরতে হবে। আজ তবে আসি?”

আমি মাথা নাড়ালাম। তুরাগ বাচ্চাদের নিয়ে গল্প করতে করতে চলে গেলো। আমি মনে মনে বললাম, কি অমায়িক ব্যবহার তার! আর হাসিটা?হায় মে মার জাভা। বলে লাজুক হাসলাম।

পরদিন থেকে নিয়ম করে প্রতিদিন দিয়া বাড়ি চলে যেতাম। আর তুরাগের আড্ডায় যোগ দিতাম। কদিনের মাঝেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। কথা এবং নাম্বার আদান প্রদান হলো।বন্ধুত্বটা বেশ ভালোই চলছিলো। বন্ধুত্ত্বের বয়স যখন এক দশদিন তখন আমি আর থাকতে না পেরে প্রপোজ করে দিলাম।

তুরাগ ও তখন মনে মনে আমাকে পছন্দ করতো আমি তা বুঝতাম। আমি ভেবেছিলাম তুরাগ আমার প্রপোজাল একসেপ্ট করবে। কিন্তু নাহ, সে আমাদের দুজনের লেভেলের কথা ভেবে সাথে সাথে আমাকে ফিরিয়ে দিলো। আমি ও নাছোড়বান্দা, আমার ভালোবাসা তাকে বুঝিয়েই ছাড়বো। আমি তার পিছনে আঠার মতো লেগে গেলাম। ভালোবাসি ভালোবাসি বলে এক রকম পাগল করে ফেলছিলাম তাকে। সেই সাথে নানা রকম ব্ল্যাকমেইল আর পাগলামী তো আছেই। না পেরে পনেরোদিনের মাথায় তুরাগ আমাকে একসেপ্ট করলো।

মন ও আদান-প্রদান হয়ে গেলো অবশেষে। শুরু হলো আমাদের ভালোবাসার জার্নি। প্রতিদিন দুজনের ভার্সিটি শেষে রিক্সা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে বসে বাদাম খাওয়া, সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখা।

সবমিলিয়ে ভালোই চলছিলো দিনকাল। তুরাগ এতিম খানায় পড়াতো। বিনিময়ে কোন টাকা নিতো না। শুধু সেখানে থাকতো। পাশাপাশি কয়েকটা টিউশনি করাতো। টিউশনির খরচ দিয়ে নিজে আর পড়াশোনার খরচ চালাতো। মাঝে মাঝে আমাকে এটা সেটা কিনে দিতো। আমার ডিমান্ড বেশি ছিলো না। অল্পতেই খুশি হতাম। সম্পর্কে কোন অভিযোগ ছিলো না, দুজনই দুজনকে বুঝতাম। দুজনার ভালোবাসাটা বেশ ছিলো। তুরাগ প্রচন্ড চঞ্চল আর হাস্যরসী মানুষ। সারাক্ষণ সবাইকে হাসাতো।

আমাকেও কখনও মন খারাপ করতে দিতো না। প্রচন্ড রকমের কেয়ারিং আর সাপোর্টিং আর পজেটিভ মানুষ সে। মনটা একবারেই সচ্চ। মনে মুখে এক কথা। কোন ধোঁয়াশা নেই। দিন যত যেতে লাগলো তার প্রতি আমার মুগ্ধতা আর ভালোবাসা বেড়েই চলছিলো। কেটে গেলো দুটো শরৎ। চমৎকার ছিলো সময়টা। তুরাগ মাস্টার্স শেষ কমপ্লিট করে একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে পেলো। কিস্তিতে মিরপুর একটা ফ্ল্যাট এ কিনলো। সম্পর্কের দুই বছর পর আমি বাসায় জানালাম তুরাগের কথা।

আমার বাবাই মা সবসময় আমার খুশিতেই খুশি থাকতো। তাই তারা বিনা বাক্যে মেনে নিল। তাছাড়া তুরাগ পাত্র হিসেবে চমৎকার ছিলো। কোন খারাপ দিক নেই। বিয়েটা ধীরস্থিরভাবে সবকিছু গুছিয়ে তারপর সুন্দরভাবে হওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু এক বখাটের বখাটেপনার কারণে হুটহাট বিয়ে হয়ে গেলো আমাদের। বিয়ের দিনই তুরাগ আর আমি গিয়ে উঠলাম তুরাগের কেনা মিরপুরের ফ্ল্যাটে। সেখান থেকে তুরাগের অফিস খুব কাছেই। সুযোগ সুবিধা বেশ ছিলো। বাবাই বিয়েতে তুরাগকে একটা কার গিফট করলো।

আমাদের ছোট্ট একটা সংসার হলো। সুখের মাঝে ছ’মাস কেটে গেলো। আমাদের বন্ধন ভালোবাসা আজো তেমনি আছে যেমনটা প্রেমের প্রথমে ছিলো। মাঝে তুরাগের এক্সিডেন্টে হলো। সে এখন হুইলচেয়ারের বন্দী। নিজে নিজে চলতে পারে না। তাকে দেখলে আমার কলিজাটা ফেটে যায়। আমি প্রতি মুহুর্তে আপ্রাণ চেষ্টা করি তার খেয়াল রাখার। আমি চাই সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাক। তাকে যে আমার অনেক বড় সারপ্রাইজ দেয়ার আছে! মাস খানেক আগেই জেনেছি, আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন আসতে চলেছে।

এই খবরটা তুরাগকে দিবো। তবে তা বিশেষ ভাবে। আমি ভেবে রেখেছি, আর মাস খানেক পরেই তুরাগের জন্মদিন। সেদিনই তাকে এই সারপ্রাইজটা দিবো। তুরাগ কি রিয়েকশন দিবে ভাবতেই আমার খুশিতে মনটা নেচে উঠছে। নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে তুরাগ? আমার ভালোবাসার খাঁচায় আরেক পাখি যুক্ত হবে। সেও থাকবে আমার পছন্দের তালিকা জুড়ে। তাকে নিয়েও লিখবো কখনো।

অতি পছন্দের মানুষের তালিকা শেষে আসে অতি অপছন্দের মানুষের তালিকা। আমার লাইফের সবচেয়ে অপছন্দ, সোজা কথায় বললে ঘৃণিত মানুষের তালিকা জুড়ে একজনই বিচরন করে। সে হলো অভিলাষ। আমার জীবনের সকল দুঃখ কষ্টের কারণ। সেই স্কুল জীবন থেকে আমাকে টিজ করে যাচ্ছে। আঠার মতো লেগে আছে। আমি সেই স্কুল লাইফ থেকেই তাকে এড়িয়ে চলি। তাও সে আমার পিছু ছাড়ে না।

তার কারণে আমি তাড়াতাড়ি করে তুরাগকে বিয়ে করেছি। তার অসভ্য আচরণের কারণে তাকে জেলে দিয়েছে বাবাই। ভেবেছিলাম বিয়ের পর অভিলাষ নামক ঝামেলাটা পিছু ছাড়বে।

কিন্তু নাহ, জেল থেকে বেরিয়েই সে আবার তার অসভ্যতা শুরু করেছে। এখন তো রীতিমতো মতো তুরাগকে খুন করার হুমকি দেয়। বলে আমি যেন তুরাগকে ডিভোর্স দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলি। না হলে সে তুরাগ, আমাকে, আমার পরিবারের সবাইকে খুন করে ফেলবে। দিনকে দিন তার অসভ্যতা বেড়েই চলেছে। আমার কয়েকটা ছবি বাজে ভাবে এডিট করে আমাকে পাঠিয়েছে। খুবই আপত্তিকর কিছু শরীরে আমার মাথা এড করেছে। দেখে মনে হয় যেন এটা আমিই। অভিলাষ প্রতিদিন একটা একটা ছবি আমাকে পাঠিয়ে থ্রেট দেয়। বলে আমাকে দুই মাস সময় দিয়েছে। এরিমাঝে তুরাগকে ছেড়ে তার কাছে না গেলে তুরাগকে খুন করবে।

আর আমি এসব কাউকে জানালে ছবিগুলো ভাইরাল করে দিবে। লজ্জায় ভয়ে এইসব কথা গুলো আমি কাউকেই বলতে পারি না। বাবাই আর তুরাগ ওর সাথে ঝামেলা করবে। শেষে অভিলাষ তুরাগের ক্ষতি করে ফেলবে। এসব ভেবে আমি চুপ আছি।তবে খুবই অশান্তির মাঝে দিন কাটছে আমার। না সইতে পারছি আর না বলতে পারছি।

আমি তো তুরাগকে ছাড়তে পারবো না। না জানি অভিলাষ আমাদের কি ক্ষতি করে। কি হয় আমাদের শেষ পরিণতি?”

বেশি কিছু সময় নিয়ে অধরা প্রতিভার পুরো ডায়েরিটা পড়ে শেষ করলো। প্রতিভা এই ডায়েরিটা মাস খানেক আগে লিখছে। কারণ ডায়েরির প্রথম পেজে লেখা, উৎসর্গঃআমার আগত সন্তান। ধারণা করা যায়, প্রেগন্যান্সির খবর জানার পর তার আগত সন্তানকে উৎসর্গ করে প্রতিভা ডায়েরিটা লিখেছে। ভবিষ্যতে প্রতিভা তার সন্তানকে ডায়েরি উপহার দিবে বলে হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আগের ডায়েরি গুলো হয়তো হারিয়ে গেছে। তাই এটা নতুন করে লিখেছে। প্রতিভার ডায়েরি পড়ে অধরা খানিক ভাবলো। তারপর ফোন উঠিয়ে আদাবরকে টেক্সট করলো,
“সব ইউনিটকে খবর দিন। চারদিকে পুলিশ মোতায়ন করুন।

যত দ্রুত পারেন অভিলাষকে গ্রেফতার করুন।”
ফোন রেখে ডায়েরিটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো অধরা। তারপর গায়ে জড়ানো সাদা শার্টটা টেনে ঠিক করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। জিহাদকে ইশারায় ফলো মি বললো। ইশারা বুঝে জিহাদ অধরার পিছন পিছন ছুটলো। জিহাদ গাড়িতে উঠে বললো,
“কোথায় যাচ্ছি ম্যাডাম?”

“অভিলাষের বাসা তল্লাসি করতে হবে। এখন আমাদের সন্দেহের তালিকায় শীর্ষে আছে সে।”
“আচ্ছা।”

“আর মালিক সমিতির সবার উপর নজর রাখতে বলেছিলাম। রিপোর্ট কি?”

“ম্যাডাম আমি কয়েকজন পুলিশ তাদের পিছনে লাগিয়েছি। একটু আগে তারা জানিয়েছে, মালিক সমিতির সভাপতিসহ পাঁচজন কাল রাতের আঁধারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বর্ডার হয়ে ভারত চলে গেছে।”

অধরা কড়া গলায় বললো,
“কড়া সিকিউরিটির পর ও কিভাবে পালালো!”

“ম্যাডাম তারা ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলো। কেউ মহিলা আর কেউ বুড়ি সেজে বাসা থেকে বের হয়েছে। আমাদের লোক যখন তাদের ফলো করছিলো।তখন তারা মেলায় গিয়ে হাজার লোকের মাঝে মিশে গিয়েছে। যার ফলে তাদের আর পাওয়া যায় নি।”

মিনমিনে গলায় বললো জিহাদ। অধরা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো,
“যাকে খানিক সন্দেহ করি সেই পালায়! তাও অভিযোগ আনার আগেই। এরা টের পায় কিভাবে! আর মালিক সমিতির সভাপতি নিশ্চয়ই এসবে যুক্ত ছিলো। না হয় পালালো কেনো!”

অভিলাষের বসা তল্লাসি করার পর বেরিয়ে এলো আরো কিছু চমকপ্রদ ক্লু। যা হয়তো কেস সমাধানে সাহায্য করবে। অভিলাষের রুমে ডুকতেই সবার চোখ পড়লো ফ্লোরে পড়ে থাকা র‍্যাপিং পেপারের উপর।

প্রতিভার লাশের উপর মোড়ানো র‍্যাপিং পেপারের মতোই কিছু কাটাছেঁড়া র‍্যাপিং পেপার এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে ফ্লোরে। নীল র‍্যাপিং পেপারের পাশে দুইটা সালমন কালার পেপার এবং একটা হোয়াইট নেমকার্ড ও আছে। একি রকমের কাগজ প্রতিভার লাশের সাথে পাওয়া গিয়েছিলো। র‍্যাপিং পেপার, স্কেচ টেপ, কাচি সব এখনো ফ্লোরে পড়ে আছে। বুঝাই যাচ্ছে এখানে বসে কেউ কোন গিফট প্যাক করেছে। অধরা কাটা ছেঁড়া কালার পেপারের কাছে গেলো। হাটু ভেঙে বসে কালার পেপার হাতে নিয়ে তাতে সুক্ষ্ম দৃষ্টি দিলো।

সাথে সাথে তার দৃষ্টিতে বিস্ময় দেখা দিলো। সালমন কালারের দুটো কালার পেপারের একটা কালার পেপারের এক পাশে চতুর্ভুজাকৃতি করে ফাঁকা। যা কেটে নেয়া হয়েছে। সেটা হয়তো কিছু লিখে কেটে গিফট বক্সে আটকানো হয়েছে! অধরা খেয়াল করে দেখলো প্রথম কালার পেপারের নিচে থাকা কালার পেপারটায় লেখার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। একটা পেপারের উপর আরেকটা পেপার রেখে খুব ছাপ দিয়ে লিখলে নিচের পেপারটায় ও লেখা বসে যায়।

কালি না বসলেও ছাপ খানিক স্পষ্ট পড়া যায়। নিচের পেপারের সেই লিখাটার ছাপাংশ দেখা যাচ্ছে যা অধরার লাশের সাথে পাওয়া গিয়েছিলো। চিরকুটে লেখা সেই কথা গুলো এখানে ও লেখা আছে। তারমানে অভিলাষ এখানে বসেই চিরকুট লিখেছে, প্যাকেট করেছে! তবে কি সেই দশ মিনিট সময়ে লাশের প্যাকেট নয় লাশ নিয়ে আসা হয়েছে? তারপর বাসায় নিজের রুমে এনে আগে থেকে কিনে রাখা জিনিস পত্র দিয়ে লাশ প্যাক করা হয়েছে?

সেটাও কিভাবে হয়? বাসায় তো অভিলাষের মা বাবা ও থাকে। তাদের সামনে কিভাবে লাশ আনবে! আচ্ছা কোথাও তারা ও এসবে যুক্ত না তো! তেমন হতেও পারে কারণ প্রতিভার এমন নিখুঁত সাজ কোন ছেলের দ্বারা সম্ভব নয়।

নিশ্চিত সাজটা কোন মেয়েই দিয়েছিলো। আর খবর নিয়ে জানা গেছে অভিলাষের মা অতীতে একজন বিউটিশিয়ান ছিলেন। পার্লারে কাজ ও করতেন। পরে অবশ্য ছেড়ে দিয়েছেন। তার দ্বারা এসব অসম্ভব নয়।

অভিলাষের রুম তল্লাসি করে পাওয়া গেলো দুটো রিসিট। একটা ড্রেসের কেনার রিসিট। যাতে ড্রেসের মূল্য এবং ক্রেতার নামের স্থানে অভিলাষের নাম নিবদ্ধ। আরেকটা জুয়েলারি শপের দেয়া রিসিট। যাতে ক্রেতা অভিলাষের নাম আর তার কেনা একটা নেকলেস সেট এবং বিশাল অঙ্কের একটা মূল্য লেখা আছে।

দুটো জিনিসই কেনা হয়েছে প্রতিভা খুন হওয়ার দুদিন আগে। রিসিট দুটো, কালার পেপার, র‍্যাপিং পেপার যেন অভিলাষের খুনী হওয়ার সন্দেহকে আরো গাঢ় করে দেয়। তবে অভিলাষ একা নয় তার সহযোগী ও কেউ আছে। কারণ একজনের দ্বারা কখনোই এত কিছু সম্ভব নয়।

অভিলাষের রুমে কেস সমন্ধীয় আরো কয়েকটা জিনিস পাওয়া গেছে। তা হলো অভলাষের ডায়েরি। ডায়েরি জুড়ে প্রতিভার বিচরণ। ডায়েরির প্রথম দিকের প্রতিটা লাইনে প্রতিভার প্রতি অভলাষের ভালোবাসা ব্যক্ত করেছে। এই যেমন, “আচ্ছা প্রতিভা ভালোবাসার কি কোন দাম হয়? যদি হতো তবে আমি নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য তোমার ভালোবাসা কিনে নিতাম।

কি দোষ করেছি আমি? কেনো এত কষ্ট দাও আমায়? একটু ভালোবাসলে কি এমন হয় বলো? খুব ভালোবাসি যে আমি তোমায়। তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো জেনেও ভুলতে পারি না তোমায়। প্লিজ আমাকে একটা বার ভালোবাসার সুযোগ দাও? কথা দিচ্ছি ভালোবাসার উচ্চ সীমায় নিয়ে যাবো।”

এভাবে অর্ধেক জুড়ে শুধু নিজের প্রেম প্রকাশ করেছে অভি

“কি ভেবেছিলে আমাকে জেলে পাঠিয়ে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হবে? এমন চিন্তা মাথাও এনো না। আমি জেল থেকে ফিরে এসেছি। এখন তোমার জীবন নরক করে দিবো। তোমাকে আমি না ফেলে কাউকেই পেতে দিবো না। তোমার সুখ হাসি সব আমার জন্য হতে হবে। অন্য কারো জন্য হলে তাকে শেষ করে দিবো।

তার আগে তোমাকে শেষ করে দিবো। কারণ তুমি আমার ভালোবাসাকে অগ্রহ্য করে তাকে বেছে নিয়েছো। আমি তোমাকে শান্তিতে থাকতে দিবো না প্রতিভা। একি বিল্ডিংয়ে থাকি, খুব দেখা হবে। আমাদের প্রতিটা সাক্ষ্যাত তোমাকে নরক মনে করিয়ে দিবে। তোমাকে এমন শাস্তি দিবো যে কাউকে বলতেও পারবে না আবার সইতেও পারবে না। সো তৈরি হও আমার প্রতিশোধ গ্রহন করার জন্য।

তুমি আমাকে ছেড়ে তুরাগের সাথে খুব সুখী বোধ করছি তাই না? আজ তোমার সেই সুখটা ছিঁড়ে নিলাম। তোমার ভালোবাসার তুরাগকে ভাড়া গুন্ডা দিয়ে এক্সিডেন্টে করিয়েছি।

যে হাল করেছি আশা করি বাঁচবে না। খুব শান্তি লাগছে। হা হা হা এমন ভাবে প্ল্যান করে এক্সিডেন্ট করেছি যে একটা কাক পক্ষি ও জানতে পারবে না যে আমিই তোমার প্রাণপ্রিয় স্বামীর মরার আই মিন এক্সিডেন্টে করিয়েছি। কেউ না। সবাই জানে এটা নেহাৎ আকস্মিক দুর্ঘটনা মাত্র। মূলত এটা পূর্ব পরিকল্পিত। এটা তুরাগের শাস্তি। সে কেনো আমার প্রতিভা, আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিলো!

সেই স্কুল লাইফ থেকে ভালোবাসি আমি। আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নেয়ার শাস্তিতো তাকে পেতেই হবে। তুরাগকে শাস্তি দিয়ে দিয়েছি। ব্যাটা মরুক। একবার তুরাগের বাচ্চা মরুক তারপর আমি আমার প্রতিভাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। আপোষে নাহলে তুলে নিয়ে আসবো। তাও না পারলে শেষ করে দিবো ওকে। ও আমার না হলে ওর বাঁচার অধিকার নেই।

তুরাগের কৈ মাছের প্রাণ। এত বড় এক্সিডেন্টের পর ও বেঁচে গেলো। যদি ও পায়ের হাড় গোড় ভেঙে একাকার হয়ে গেছে। আর হাটতে পারবে না হয়তোবা। কিন্তু তবু রাগ লাগছে ব্যাটা মরলে না কেনো?মরলে ভালো হতো। কারণ তুরাগের এই অবস্থায় প্রতিভা তাকে ছেড়ে এক মুহুর্তের জন্য ও যাচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে আজ বাসায় এনেছে তুরাগকে। প্রতিভাকে দেখে মনে হয় ব্যাথা তুরাগের নয় তার লাগছে। সেকি ব্যাথিত চেহারা আর যত্নাভাব!

দেখলে রাগে গা জ্বলে যায়। এমন যত্ন পাওয়ার যোগ্য কি আমি ছিলাম না? কেনো হলো এমন! ভাগ্য কেনো আমার সহায় হয় না? কেনো! তবে সে যাই হোক। ওদের দুজনকে এক হতে দিবো না। কখনোই না। আলাদা করে ফেলবো একদম আলাদা। খুন করে ফেলবো। আগুন লাগিয়ে দিবো। এমন কিছু করবো কাক পক্ষীও টের পাবে না আসলে হয়েছে কি!”

অধরা আন্দাজ করলো এগুলো অভিলাষের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর। এই ডায়েরি পড়ে আরো ক্লিয়ার হলো যে অভিলাষই খুনী। প্রতিভা আর তুরাগের প্রতি তার অনেক ক্ষোভ। তুরাগকে খুন করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তুরাগ বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু প্রতিভাকে কোন রিক্স না নিয়ে জানে মেরে দিয়েছে। তবে একটা ডাউট থেকেই যায় সেটা হলো, প্রতিভার হ্যান্ডরাইটিং। চিরকুটে প্রতিভার হ্যান্ডরাইটিং আসলো কিভাবে? প্রতিভাকে খুন করে অভিলাষ নিজ বাসায় এনে লাশ প্যাক করেছে। কাটা ছেঁড়া গিফট পেপার দেখে মনে হয় প্রতিভার লাশ এখানেই প্যাক করেছে। র‍্যাপিং পেপারের সাথে সাথে চিরকুট লিখেছে। প্রতিভাকে যদি মৃতই আনা হয় তবে প্রতিভা নিজের হাতে লিখলো কিভাবে! কোথাও প্রতিভাকে জীবিত এনে এখানে মারা হয় নি তো!

কিন্তু সেটাও কিভাবে সম্ভব! ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিভার মৃত্যু হয়েছে রাত তিনটা নাগাদ। লাশ আনা হয়েছে চারটায়। সে হিসেবে মৃতই এনেছে প্রতিভাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির হ্যান্ডরাইটিং আসলো কিভাবে! এখানেই রহস্য। কিভাবে কি হয়েছে ঝট খুলবে অভলাষকে ধরতে পারলে। কিন্তু অভিলাষ তো নাগালের বাইরের। পুলিশ চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না তাকে।


পর্ব-৫

বসুন্ধরার আবাসিক এলাকার রাস্তা ধরে হেটে হেটে যাচ্ছে একটা ছেলে। হলদে ফর্সা গায়ে সাদা টি-শার্টের উপর নীল চেক শার্ট জড়ানো। পরনে তার, ব্লু ডেনিম প্যান্ট। ফর্সা চেহারার ধসূর কালো ঠোঁট দ্বারা বেশ কায়দা করে সিগারেট খাচ্ছে। খানিক পর পর উদাসীন চোয়ালটা আকাশের দিকে তাক করে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে।

দুই কানে ভর দেয়া কালো লাল মিশ্রনের হেডফোনটা মাথায় জড়ানো। ভাবভঙ্গিতে বুঝা যায় গান-টান শুনছে। সিলভার কালার ব্রেসলেট জড়ানো ডান হাতটার তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যখানে একটা সিগারেট আটকানো। রুমাল বাধা বাঁ হাতের তালুতে মোবাইল আবদ্ধ। বাদামী চোখের দৃষ্টি সেই মোবাইলে স্ক্রিনে নিবদ্ধ। খুব মনোযোগ দিয়ে ফোনে কিছু একটা দেখছে। চারদিকের কোন খেয়াল নেই তার।

ভাবখানা এমন যে দুনিয়া ভেসে যাক তাতেও তার আপত্তি নেই। ছেলেটার ঠিক সামনে কয়েকগজ দূরে একটা পুলিশের জিপে বসে পুলিশী পোশাক গায়ে দেয়া মধ্যবয়সী কয়েকটা লোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কিছু একটা মিলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

ব্যর্থতাকে বরণ করে নিয়ে তাদের মধ্য থেকে একলোক পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল লিস্টে থাকা প্রথম নাম্বারটায় ডায়াল করলো। রিসিভ হওয়া অব্দি ফোনটা হাতে নিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

রিসিভ হতেই আট ইঞ্চি লম্বা স্ক্রিনের স্মার্টফোনটা কানে লাগালো। তারপর বললো,
“ইন্সপেক্টর অধরা আপনি সিওর এই ছেলেটাই খুনী? আই মিন একেই খুনের দায়ে এরেস্ট করতে হবে!”
ভাটারা থানার ওসির কথায় অধরা সামনে থাকা কম্পিউটারের স্ক্রিনে জিপিএস লোকেশনে চোখ বুলিয়ে বললো,
“ইয়েস ওসি শাহরিয়ার, এই মুহুর্তে আপনার ঠিক সামনে যেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে সেই ক্রিমিনাল। তাকে এরেস্ট করুন। কুইক।”

“কিন্তু ছেলেটাকে দেখে তো অপরাধী মনে হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা, কোন দ্বিধা নেই। একটা খুনী কি এভাবে চলাফেরা করতে পারে?”

চোখে মুখে বিরক্তির আভা এনে অধরা বললো,
“পারে। যার প্রমাণ আপনার সামনেই আছে। প্রমাণ দেখে শেষ হলে অভিলাষ মানে আপনার সামনে থাকা ছেলেটাকে এরেস্ট করুন। না হয় পালিয়ে যাবে। এমনিই এটা জটিল কেস। অভিলাষকে হাতের নাগালের বাইরে যেতে দিলে আরো জটিল হবে।”

“আসলে খটকা লাগছিলো। আপনি চিন্তা করবে না, আমি এক্ষুনি এরেস্ট করছি এবং আপনারা কাছে হস্তান্তর করছি।”

“কুইক।”
ফোন রেখে হাসান শাহরিয়ার তার সামনে থাকা ছেলেটার দিকে আরেকবার তাকালো। বুঝার চেষ্টা করলো এই ছেলে কি আদৌ খুন করতে পারে! চেহারায় কি স্নিগ্ধতা! সেকি নিষ্পাপতার ছায়া! আচ্ছা একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে খুন করে এতটা সহজ সরল ভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে! খুন করার পর খুনীর চেহারায় ভয়, অপরাধী ভাবটা থাকে।

থাকে সন্দেহজনক আচরণ। যা খুনীকে সন্দেহের তালিকায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

কিন্তু এই ছেলেটার চেহারায় ভয় কিংবা অপরাধের ছায়া অব্দি নেই। ছেলেটাকে উদাস লাগছে, অপরাধী নয়।

হাসানের বারবার মনে হচ্ছে এই ছেলেটা খুনী হতে পারে না। এত নিষ্পাপ চেহারা নিয়ে কেউ খুন করতে পারে!

নিশ্চিত একে কেউ ফাঁসাচ্ছে। হাসানের ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো কনস্টেবলের কথায়,
“স্যার ছেলেটা তো চলে যাচ্ছে। এরেস্ট কি করবো না?”

ভাবনা থেকে বের হয়ে হাসান শাহরিয়ার গায়ে জড়ানো সফেদা রঙের শার্টটা টেনে গাড়ি থেকে নামলো। তারপর বললো,
“চলো এরেস্ট করে ফেলি।”

*
অধরার সামনে বসে আছে অভিলাষ। ভাটারা থানা পুলিশ অধরার কথায় অভিলাষকে তাদের থানার অন্তর্ভুক্ত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আটক করে মিরপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। আটক করার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে থানায় আনা চেয়ারে হয়েছে।

এই মুহুর্তে তারা বসে আছে একটা আঁধার কক্ষে। যার মধ্যখানে একটা টেবিল ও দুটো চেয়ার পাতানো। টেবিলের উপর হাত ভাজ করে বেশ আয়েশ করে বসে আছে অধরা। তার পিছনে গোটা পাঁচেক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। অধরার বিপরীত মুখী চেয়ারটায় অধরার মুখোমুখি বসে আছে অভিলাষ।

অভিলাষের চোখে মুখে ভয়ের লেশ মাত্র নেই। সে ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। যেন এতসব হচ্ছে এসবে তার কিছু যায় আসে না।

তবে অভিলাষের চেহারায় একটা নিষ্পাপার ছোঁয়া লেগে আছে।যেন অভিলাষের চেয়ে ইনোসেন্ট মানুষ আর হতেই পারে না।অধরার চোখে মুখে রাগ স্পষ্ট। অভিলাষকে খানিক পরখ করে অধরা কড়া গলায় বললো,
“তো মি.অভিলাষ এবার বলুন কিভাবে কি করলেন?”
“কি করেছি আমি!”

ভ্রু কুঁচকে বললো অভিলাষ। অধরা ও ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনি সত্যিই বুঝতে পারছেন না আপনি কি করেছেন!”

“নাহ, আমার জানামতে আমি এমন কিছু করিনি যার কারণে আমাকে আটক করা যাবে। আপনারা বিনাদোষে আমাকে আটক করেছেন।”

“রিমান্ডে নিয়ে টর্চার শুরু করলে সব মনে পড়বে। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করেছেন। আবার বলেন কিছু করেন নি!”
অধরার কথায় অভিলাষ বিস্মিত চোখে তাকালো। এমন একটা ভাব যেন সে অধরার মুখ থেকে অপ্রত্যাশিত কোন খবর শুনেছে। যা শুনে সে বিস্ময়ের সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেছে। অভিলাষ বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“আমি খুন করেছি!”

“নয়তো কি আমি করেছি!”
ভ্রু কুঁচকে বললো অধরা। অভিলাষ দ্বিধাগ্রস্ত চেহারায় বললো,
“আমার সাথে খুনের কি সম্পর্ক! আমি আজ অব্দি কাউকে ছুরিঘাত ও করিনি, সেখানে খুন তো অনেক পরের কথা। আমার মনে হয় আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। “

“চোর চুরি করে কখনো বলে? আমি চুরি করেছি? সমস্ত প্রমাণ আপনাকেই খুনী বলে খ্যাত করে। আপনিই প্রতিভাকে খুন করেছেন।”

“খুন করবো আমি তাও প্রতিভাকে! যাকে কিনা আমি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি তাকে খুন করবো আমি! এর থেকে আমি নিজেকে নিজে খুন করেছি বললে কথাটা শুনে আমার কষ্ট কম হতো। আমি প্রতিভাকে খুন করবো কেনো! আমি তো ওকে ভালোবাসি।”

ধরা গলায় বলে উঠলো অভিলাষ। অধরা কড়া গলায় বললো,
“আপনি যদি খুন না করে থাকেন তবে আপনার ঘরে প্রতিভার লাশের সাথে পাওয়া চিরকুট, নেম কার্ড, আর প্রতিভার গায়ে থাকা ড্রেস, নেকলেস কেনার রিসিট পাওয়া গেলো কিভাবে! সব কিছু আপনাকে খুনীই প্রমান করে। তাই ভালোয় স্বীকার করুন। না হয় রিমান্ডে নেয়া হবে। তখন নিশ্চয়ই ভালো হবে না।”

অভিলাষ বিচলিত কন্ঠে বললো,
“বিশ্বাস করুন ম্যাডাম আমি কিছুই করিনি। কিসের ড্রেস? কিসের চিরকুট! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
অধরা জিহাদকে ইশারা করলো। জিহাদ দুটো প্যাকেট টেবিলের উপর রাখলো। পাতলা সাদা পলিথিনের ভিতর রিসিট, নেম কার্ড আর চিরকুট দেখা যাচ্ছে। অধরা পলিথিন প্যাকেট দুটো ইশারা করে বললো,
“দেখুন! দেখে ভাবুন আর কিভাবে অযুহাত দিবেন।”

প্যাকেট দুটোতে চোখ রাখতেই বিস্ময়ে অভিলাষের চেহারার রঙ পাল্টে গেলো। যেন সে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য নিউজিল্যান্ডের লেক রোটোমোহনার সিলিকা নামক গোলাপি-সাদা সিঁড়ির মতো উপত্যকাটির সৌন্দর্য খুব কাছ দেখছে। বিস্ময়ে তার চোখের পাতা অব্দি নড়ছে না। সে অবাক চোখে টেবিলের উপর থাকা প্যাকেট দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলো। খানিক তাকিয়ে তারপর চোখ উঠিয়ে অধরার দিকে তাকালো।

অধরা বললো,
“এখনো বলবেন আপনি কিছু করেন নি?”

“এ..টা ককিভাবে সম্ভব! “

বিচলিত কন্ঠে বললো অভিলাষ। সচেতন চোখে তাকিয়ে অধরা বললো,
“এই অসম্ভবকেই আপনি সম্ভব করেছেন। এখন বলুন খুন কিভাবে করেছেন আর আপনার সাথে এসবে কে মিলিত আছে?”

“আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে ম্যাডাম।”

শান্ত কন্ঠে বললো অভিলাষ। অভিলাষের কথা এড়িয়ে অধরা বাঁকা হেসে বললো,
“আপনি প্রতিভাকে স্কুল লাইফ থেকেই বিরক্ত করতেন। প্রতিভার বিয়ের আগে আপনার অতিরিক্ত বখাটেপনার জন্য আপনি জেলে ও গিয়েছেন। জেল থেকে বেরিয়ে এসেই আবার আপনি আপনার বখাটেপনা শুরু করেছেন।

তুরাগের এক্সিডেন্ট করিয়েছেন, প্রতিভার ছবি অশ্লীলভাবে এডিট করে থ্রেট দিয়েছেন। সেই সাথে খুন করার হুমকি দিয়েছেন। এসব করেছেন প্রতিভাকে পাওয়ার জন্য। আর যখন এসবে ও প্রতিভাকে ভাগে আনতে পারেন নি তখন ওকে খুন করলেন। কি তাই তো! দেখুন শাক দিয়ে মাছ ঢেকে লাভ নেই। বলে ফেলুন।”

অধরার কথায় ও অভিলাষের চেহারায় কোন ভয়ের রেখা উঁকি দিলো না। দেখা দিলো এক রাশ বিমর্ষতা। অভিলাষ করুণ গলায় বললো,
“আমি নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি যে আমি প্রতিভাকে স্কুল জীবন থেকে ভালোবাসতাম, এখনো ভালোবাসি। আপনারা যেটা বিরক্ত করা বলেন আমি সেটাকে ভালোবাসা প্রকাশ বলি।

আমি সবসময় প্রতিভার কাছে বিভিন্নভাবে নিজের ভালোবাসাটা তুলে ধরেছি। আমি শুরু থেকেই চাইতাম প্রতিভা আমাকে বুঝুক, আমাকে ভালোবাসুক। আমি সুন্দরভাবেই ওকে ভালোবাসার কথা বলতাম, কখনো গিফট পাঠাতাম, কখনো বা চিঠি। সেই ক্লাস নাইন থেকে ওকে আমি ভালোবাসি।

সেই থেকে এগারোটা বছর আমি ওর জন্য, ওর ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করে আসছি। আমার ভালোবাসাটা যদিও সবার কাছে উত্যক্ত আর বখাটেপনা। ভালো না বাসলে ইভটিজার, ভালোবাসলে প্রেমিক। ও আমাকে ভালোবাসলে এসব হয়তো ভালোবাসার পাগলামী আখ্যায়িত হতো। প্রতিভা আমাকে পছন্দ করতো না বলেই আমি ইভটিজার, বখাটে।

কিন্তু ম্যাডাম বিশ্বাস করুন, আমি কখনোই ওর গায়ে হাত দিই নি, শ্লীলতাহানির চেষ্টা ও করিনি। আমার ভালোবাসা প্রতিভা বুঝতোনা বলেই ওকে আমার কাছে আ
নার জন্য থ্রেট দিতাম। প্রতিভার বিয়ের আগে জেলে যাওয়ার কারণ ছিলো তুরাগ।”

“তুরাগ!”কথার মাঝে পোড়ন কেটে বললো অধরা।

অভিলাষ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে নির্বিকার কন্ঠে বলে উঠলো,
“হ্যাঁ তুরাগ, তুরাগই ছিলো মেইন কারণ। প্রতিভার আমার প্রত্যাখ্যান আর তুরাগের সাথে অতি মেলামেশা। যা আমার একদমি সহ্য হতো না। আমি কোনভাবেই তুরাগকে প্রতিভার সাথে সহ্য করতে পারতাম।

ভালোবাসায় ভাগ হয় না বলে কথাটা আমার মাথায় ঝেকে বসেছিলো প্রতিভার বিয়ের কিছু সময় আগেই। অনেক দিন চুপ থাকলেও তখন আর চুপ থাকতে পারলাম না। অনিশ্চিত অপেক্ষা জিনিষটা ভয়ংকর।

এই ভয়ংকরী অনিশ্চিত অপেক্ষাই আমাকে ভয়ংকর করে তুলেছে। আমি প্রতিভার ভালোবাসার কাঙাল ছিলাম। যখন ওর জীবনে কেউ ছিলো না তখন প্রতিভার আমাকে ইগনোর করলে আমার অতটা খারাপ লাগতো না।

কিন্তু প্রতিভা যখন নিজের জীবনে তুরাগ নিয়ে আসলো। তখন আমাকে ওর করা প্রত্যাখানটা মেনে নিতে কষ্ট হতে লাগলো। দীর্ঘ দেড় বছর আমি নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যকারো সাথে সহ্য করেছে। হঠাৎ যেন আমার সহ্য ক্ষমতা বিলীন হয়ে গেলো। সব কিছুর মাঝেই আমার একটা কথাই মনে হতো, তা হলো প্রতিভাকে আমার চাই। ও শুধু আমার। আমি নিজেকে গুছিয়ে একটা কাজ জোগাড় করলাম।

তারপর ভালোভাবেই প্রতিভাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। কিন্তু আমি তখনও প্রত্যাখ্যান উপহার পেয়েছি। তারপর ও আমি হাল ছাড়িনি। কয়েকবারই ওদের প্রস্তাব দিয়েছি। প্রতিবারই জবাব ‘না’ এসেছে। সাথে অপমান আর লাঞ্চনা তো আছেই।

প্রতিভার বাবা মা আমাকে জানিয়েছিলো তারা আমাকে নয় তুরাগকেই তাদের মেয়ে জামাই হিসেবে মেনে নিবে।

হাতাশা আমাকে আবারো ঘিরে ধরলো। আমি জাস্ট আর নিতে পারছিলাম না। অসহ্য হয়ে গেছি এসবে। তাই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যা মনে আসছিলো তাই করেছি। ওকে থ্রেট দিয়েছি রেপ করার। ফলাফল আমার জেল হলো আর প্রতিভার বিয়ে। তাও তার ভালোবাসার মানুষের সাথে।”

“জেল থেকে বের হয়ে এসবের প্রতিশোধ নিতে তুরাগকে মারতে চাইলেন। যদিও সে মরেনি। তখনো যখন ওদের আলাদা করতে পারেন নি তখন প্রতিভাকে খুন করলেন। তাই তো?”
আবারো ফোঁড়ন কেটে বললো অধরা।

অভিলাষ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,

“জেল থেকে বের হওয়ার পর আমি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। তবে এই কথাও ঠিক যে, বরাবরের মতো তখনো আমার শত্রুতা শুধু মাত্র তুরাগের সাথেই ছিলো। তুরাগকে সহ্য হতো না। তুরাগকে সরাতে চাইতাম। তাই এক্সিডেন্টে করেছি। কিন্তু সে প্রাণে বেঁচে গেলো।

এতে যখন প্রতিভা আর তুরাগকে আলাদা করতে পারলাম না তখন প্রতিভাকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলাম। এসব করেছি শুধু মাত্র প্রতিভাকে নিজের করার জন্য। তখনো প্রতিভাকে পাওয়ার ক্ষীণ আশা আমার মনের কোণে জমাট বাধা ছিলো।

আমি ভেবেছিলাম প্রতিভাকে ব্ল্যাকমেইল করলে প্রতিভা ভয়ে তুরাগকে ডিভোর্স দিয়ে আমার কাছে আসবে। আমার ক্রিয়াধারা এতটুকুতেই সমাপ্তি হয়েছিলো। ও যখন আমার কাছে আসেনি তখন আমি হাল ছেড়ে দিয়েছে। হতাশাকে বরণ করে তাকে নিজের মতো থাকতে দিয়েছি।”
“এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দিলেন! স্ট্রেইঞ্জ!”
ঠোঁট উল্টিয়ে অবাক হওয়ার ভান করে বললো অধরা।

অভিলাষ টলমল চোখে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“যার জন্য এগারোটা বছর অপেক্ষা করেছি, যাকে এগারোটা বছর ভালোবেসে এসেছি সেই মানুষটা যখন অন্য একজনকে ভালোবেসে তার ভালোবাসার চিহ্ন পেটে ধারন করে। তখন সেই কথা জেনেও আমার হাল ধরে রাখা নিতান্তই বোকামি নয় কি!”

অভিলাষের কথা শুনে বিস্মিত চোখে অধরা বললো,
“প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা আপনি জানতেন!”
“হ্যাঁ। জেনেছি বলেই ছেড়েছি ওকে।”

নির্দ্বিধায় বললো অভিলাষ। অধরা সন্দেহী চোখে তাকিয়ে বললো,
“কিভাবে জানলেন! আর কবে জানলেন?”

“প্রতিভা মারা যাওয়ার পনেরো কি বিশ দিন আগে, একদিন ও বেরিয়েছিলো চেকাপ করতে। ওকে ফলো করতে করতে আমিও হাসপাতালে গেলাম। গিয়েই জানতে পারলাম যে ও প্রেগন্যান্ট। অন্য কারো ভালোবাসা শরীরে বহন করছে শুনে আমার দুনিয়াটাই ঘুরে গিয়েছিলো। ইচ্ছে করছিলো সব শেষ করে দিই। কিন্তু পারি নি।

নিজেকে সামলে নিলাম। প্রতিভা একদিন বলেছিলো, ভালোবাসা মানে কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের কাছে বন্দি রাখা নয়। সত্যিকারের ভালোবাসা হলো ভালোবাসার মানুষটিকে ভালো রাখতে শিখানো, তার সুখ খুঁজে তাকে উপহার দেয়া।

বিপরীত মানুষটিকে আকঁড়ে রাখায় নয়, বিপরীত মানুষটিকে ভালো রাখার মাঝেই ভালোবাসা। আমি সেদিন বারবার প্রতিভার বলা কথাটা আওড়ালাম। তারপর অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম, আকঁড়ে ধরে নয়, ভালোবাসার মানুষটিকে ভালো থাকার সুযোগ করে দিবো। আমি না হয় ওকে নাই বা পেলাম!

নাই বা পেলাম ওর ভালোবাসা। আমি তো হতাশা আর অসুখী জীবনটাকে আপন করে নিয়েছি। আমার এত কষ্ট হবে না। কিন্তু যাকে আমি ভালোবাসি, সে তো এসবে অভ্যস্ত নয়। নিজে সুখী হতে গিয়ে প্রতিভাকে অসুখী জীবন উপহার না দিয়ে বরং নিজে অসুখী জীবনকে বরণ করে নিয়ে প্রতিভাকে সুখী জীবনই উপহার দিলাম নাহয়!

ভালোবাসাটা সুখে থাকুক, আমার সাথে না হয় অন্য কারো সাথে! আমি তাকে ভালোবেসে যাবো না হয় দূর থেকেই! সেদিন থেকেই ওর থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছি। সেদিনের পর আর কখনো ওকে কোন প্রকার বিরক্ত করিনি।”

এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে থামলো অভিলাষ। অধরা গালে হাত দিয়ে খুব মনোযোগের সাথে অভিলাষের কথা গুলো শুনছে। অভিলাষ কথা গুলো মনের গভীর থেকে বেশ আবেগ মিশিয়ে বলছিলো। চমৎকার শুনাচ্ছিলো।
অভিলাষের কথায় অধরা মনে মনে বললো, আচ্ছা মানুষ প্রেমের পড়ার পর কবি হয় নাকি কাব্য রচনার গুন মনে পুষেই প্রেমী হয়! উত্তরটা জানার ইচ্ছে ছিলো। তবে প্রেমে পড়ার পর মানুষের একটা কবি কবি গুন চলে আসে।

ছন্দে আনন্দে গুছিয়ে কথা বলার গুনটাও আপনাআপনি এসে যায়। তবে অভিলাষ প্রেমে পড়ার পর কবি হয়েছে এটা নিশ্চিত। একটা বখাটের মনেও এতটা প্রেম ভালোবাসা থাকে ভাবা যায়! আহ প্রেম, তুমি ছন্দে আনন্দে মানুষ আর মানুষের মন দুটোকেই বদলে দাও। যাক এবার কাজে আসি। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করলো অধরা।
তারপর নড়েচড়ে বসে বললো,
“আপনার কথা অনুযায়ী আপনার মূখ্য কথা হলো আপনি প্রতিভকে খুন করেন নি তাই তো?”
“প্রতিভাকে বিরক্ত করতাম, রেপ করার হুমকি দিতাম ঠিকই কিন্তু আজ অব্দি কখনো ওর গায়ে একটা নখের আঁচড় ও দিই নি। আমি মানষিক ভাবোও প্রতিভাকে কষ্ট দিতে চাই নি কখনো। কিন্তু প্রতিভা আমার ভালোবাসা বুঝতো না, অগ্রাহ্য করতো বলেই রেগে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই অনেক কষ্টে দিয়ে ফেলতাম। কিন্তু কখনোই ওর চোখের পানি অব্দি আমি সহ্য করতে পারতাম না। ওর কষ্টে আমার কষ্ট হতো।
সেখানে ওকে এত কষ্ট দিয়ে মারাটা আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও কষ্টদায়ক। যেখানে আমি কখনো ওকে নখের আচঁড় ও দিতে পারি নি সেখানে ওকে খুন করার কথা ভাবাও কল্পনাতীত। আমি নিজেকে খুন করতে পারি ওকে নয়।”
“আপনি ওকে এত ভালোবেসে থাকলে ওর মৃত্যু আপনার মাঝে কোন পরিবর্তন আনছে না কেনো!আপনি তো দিব্যি আছেন।”
সন্দেহ চোখে তাকিয়ে বললো অধরা। অভিলাষ পিন পিনে নিরবতাময় রুমটায় বেশ শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সেই দীর্ঘশ্বাসটাকে ভেতরকার কষ্টের ঝড় ও বলা যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিলাষ করুন কন্ঠে বললো,
“একটা মেয়ে নিজের কষ্টটা যত সহজে প্রকাশ করতে পারে একটা ছেলে ততটা সহজে কখনোই পারে না।

ছেলেদের তো কাঁদা পাপ। আর ছেলেদে র কান্না আর প্রেমিকের বিরহে উদাস হওয়া ঘোরতর অপরাধ আর গড়াগড়ি খাওয়ার মতো হাইস্যকর। তাছাড়া আমি চাই প্রতিভার খুনীর বিচার হোক। তাইতো নিজের কষ্টটা মনে চাপা রেখে কষ্টটাকে দীর্ঘশ্বাসে প্রকাশ করে স্বাভাবিক ভাবে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।”

” আপনি যদি খুন না করে থাকেন তবে আপনার রুমে চিরকুট নেম কার্ড, রিসিট আসলো কিভাবে! তাও সেগুলো যেগুলো প্রতিভার লাশের সাথে পাওয়া গেছে!”

“আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে ম্যাডাম। আমি এসবের কিছুই জানি না। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পেশায় একজন ক্ষুধে ব্যবসায়ী। বাবা অবসরপ্রাপ্ত গার্মেন্টস কর্মী। আমার সীমিত আয়ে সংসার চলে। আমি লাখ পাঁচের ডায়মন্ড সেট আর দশ হাজার টাকার ড্রেস কিনবো কিভাবে! যেখানে আমাদের নুন আনতে পান্তা পুরায় সেখানে পাঁচ লাখের ডায়মন্ড সেট কেনা, তাও আবার ভালোবাসার মানুষটাকে খুন করে তার লাশকে পরানোর জন্য!

ব্যাপারটা হাইস্যকর নয় কি! বাকি রইলো চিরকুট আর নেম কার্ডের কথা, চিরকুট আর নেম কার্ডের লেখার সাথে আমার লেখার আকাশ পাতাল ডিফারেন্স। এগুলো আমার লেখা না। অন্য কারো লেখা। কেউ ইচ্ছে করে প্রতিভাকে খুন করে প্রমাণ আমার রুমে রেখে গিয়ে আমাকে ফাঁসাচ্ছে। আমি কিছুই করিনি।”

“অন্য কেউ আপনার বাসায় গিয়ে আপনার রুমে এসব রেখে গেলো কিভাবে!”

“আমার রুমে এসব কিছুই ছিলো না।হয়তো আমি আসার পর রেখে আসা হয়েছে।”
“প্রতিভা খুন হওয়ার রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
“বাসায় ছিলাম।”
“রাতে দারোয়ানকে কল দিয়েছেন কেনো!”

“আমি কোন ফোন করিনি।”

“আপনার নাম্বার থেকে কল গিয়েছিলো দারোয়ানের কাছে।”
“আমার ফোন চুরি হয়েছিলো তার দশ দিন আগে। সেখানে আমার নাম্বার থেকে কল যাবে কিভাবে!”

“কিন্তু আপনার সিম তো এখনো আপনার হাতে।”
“ফোন হারানোর পর গত কালই সিম তুলেছি।”
“আচ্ছা, তা আপনি খুন না করলে পরিবার নিয়ে পালালেন কেনো!”

“আমি পালাই নি। আমার খালু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো হুট করে। তাকে দেখতেই রাতের বেলা আমরা তিনজন ছুটে গিয়েছিলাম। যখন আসছিলাম তখন দারোয়ান গেঁটে ছিলো না তাই দেখেনি। আর ধুলোবালির এলার্জি থাকায় আমার মুখে মাস্ক ছিলো। যার কারণে যারা ছিলো তারা কেউ আমাকে চিনেনি।”

আরো কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেও তেমন কোন কিছু স্বীকার না করায় অভিলাষকে দুই দিনের জন্য রিমান্ডে পাঠানো হয়। রিমান্ডে ও তেমন কিছু বের করা যায় নি তার থেকে। সে আগের কথা গুলোই বলছিলো। অধরা ধরেই নিয়েছি অভিলাষ সত্য বলছে। কারণ ঘাপলা থাকলে এতক্ষণে বেরিয়ে আসতো৷ তাছাড়া অভিলাষের মা বাবার ব্যাপারে খবর নিয়ে জানা গেছে তারা অভিলাষের খালার বাসায় আছে। যেটা বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায়।

সেই সাথে এ কথাও সত্য যে অভিলাষের খালু সত্যিই অসুস্থ। আর অভিলাষের রুমে পাওয়া রিসিট পপর্যবেক্ষণ করে ঐ শপ দুটোতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বুঝা গেলো, প্রতিভা হত্যার দুদিন আগে মাস্ক লাগিয়ে একটা ছেলে এসে নেকলেস আর ড্রেস নিয়ে গেছে। সে মোটেও অভিলাষ নয়।

তার মানে অভিলাষকে কেউ ফাঁসিয়েছে! সব কিছুর দোষ অভিলাষের ঘাড়ে ছাপিয়ে নিজেরা সরে গেছে! অভিলাষ আর তার পরিবার বাসা থেকে বসুন্ধরায় যাওয়ার পর কেউ যাবতীয় প্রমাণাদী অভিলাষের রুমে রেখে গেছে। কিন্তু কে করছে এসব!

রিমান্ড শেষে অভিলাষকে আদালতে উঠানো হবে। আদালতে নেয়ার পথে মাঝ রাস্তায় একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আকস্মিক হামলা করে পুলিশ ভ্যানের উপর৷ কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ি থেকে অভিলাষকে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। চারদিকে খবর দেয়া হয়। অধরা ফোর্স নিয়ে পৌঁছে যায় সেখানে।

চারদিকে সার্চ করার পরও অভিলাষকে পাওয়া যায় না। পরদিন সকাল সকাল থানায় কল আসে। বলা হয় ভুঁইয়া ভিলার অদূরে থাকা ঝোপ জঙ্গলে একটা পোড়া লাশ পাওয়া গেছে। অধরা তার টিম নিয়ে সেখানে পৌঁছে যায়।

লাশ দেখে আঁতকে উঠে সবাই। কি মর্মান্তিকভাবে খুন করা হয়েছে! খুন করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। শরীরে হাড্ডি ছাড়া কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। পাশেই লাশের পরিধেয় কাপড় পড়ে আছে। কাপড় দেখে আরেক ধপা চমকে গেলো অধরা।

এটাতো অভিলাষের কাপড়! তারমানে এই লাশ অভিলাষের! অধরা হাতে গ্লাভস পরে লাশের কাছে গেলো। লাশ দেখে অভিলাষের পড়ে থাকা ড্রেস হাতে নিলো। সার্চ করে শার্টের বুক পকেটে থাকা কালো ছোট্ট চিরকুট নজরে এলো তার। চিরকুটে লেখা একটা গানিতিক সংখ্যা। কালো চিরকুটের মাঝে কালো কালি দিয়ে লেখা “২০১”তারপর একটা হাসির ইমুজি আঁকা। অধরা বেশ কিছুক্ষণ চিরকুটের দিকে তাকিয়ে রইলো।

সে আন্দাজ করছে খুনী এই সংখ্যা দিয়ে কিছু একটা বুঝিয়েছে। কিন্তু কি! এই সংখ্যার মিনিং কি হতে পারে! সংখ্যাটা মাথার উপর দিয়ে গেলো অধরার। অধরার এই চিরকুট নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে ক্লু বের করবে বলে চিরকুটটা প্যাকেটে রেখে কনস্টেবলকে দিয়ে দিলো যাতে এটা ফিঙ্গার প্রিন্ট বিভাগে পাঠানো হয়।

অধরা আবার অভিলাষের লাশের দিকে নজর দিলো। ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে লাশ এবং আশেপাশে তল্লাসি এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে কোন ক্লুই পাওয়া গেলো না। শেষে লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে অধরা থানায় ফিরে আসে।

তার মাথায় ঘুরতে থাকে চিরকুটের সংখ্যাটা। ২০১!
এর মানে কি কি বুঝিয়েছে! কি!

চোখ বন্ধ করে মনে মনে অংক কষছে অধরা। মিনিট পনেরো পরে আকস্মিক চোখ খুলে অস্ফুট কন্ঠে বললো,
“তুরাগ!”


পর্ব-৬

অধরা নিজ মনে তুরাগের নাম আওড়িয়ে জিহাদকে ডাক দিলো। জিহাদ অধরার কেবিনে আসার পর দেখলো অধরা খাতা কলম হাতে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে। তা দেখে জিহাদ ভ্রু কুঁচকালো। তারপর বললো,
“আপনাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে ম্যাডাম। কিছু হয়েছে কি!”

অধরা আনমনে বললো,
“চিরকুটের সংখ্যাটার মানে বের করতে পেরেছি।”

“২০১ এর কি মানে ম্যডাম?”

কৌতুহলী কন্ঠে বললো জিহাদ। অধরা চিন্তিত কন্ঠে বললো,
“তুরাগ…
অধরাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বিস্মিত চোখে চেঁচিয়ে বললো জিহাদ,
“ও মাই গড! তুরাগ খুন করেছে ম্যাডাম!

কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? তুরাগের তো পা অচল। সে কিভাবে এসব করতে পারে! আর কারো সাহায্যে করলে কেনোইবা করেছে? নিজের স্ত্রীকে এভাবে মারলো কেনো! কি কারণ! এত নাটকীয়তা কেনো!”

জিহাদের কথায় অধরার চোখে মুখে বিরক্তির আভা দেখা গেলো।
যেন জিহাদ ভয়ংকর বিরক্তিকর কোন কথা বলে ফেলেছে। অধরা চোখ আর ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আমি বলেছি তুরাগ খুন করেছে? আমার কথাটা তো শেষ করতে দিবে নাকি!

অধরার কথায় জিহাদ দমে গেলো। তারপর নিচু কন্ঠে বললো,
“সরি ম্যাডাম। আসলে খুব এক্সাইমেন্ট কাজ করছিলো তাই আর কি নিজের কৌতুহলকে দমাতে পারি নি।”
“ব্যাপার না। তবে নেক্সট টাইম আগে পুরো কথা শুনে তারপর রিয়েক্ট করবে।

বাক্যের এক শব্দ শুনে পুরো বাক্যে নিজ মনে আন্দাজ না করে পুরো বাক্য শুনে তারপর বাক্যের ভাবার্থ বের করা উচিত। গট ইট?”

গম্ভীর গলায় বললো অধরা। জিহাদ মাথা নিচু করে বললো,
“ইয়েস ম্যাডাম।”

“যাক হোক মূল কথায় আসি, তুরাগ এখন কোথায় আছে জানো?”

“আমি যতটুকু জানি তুরাগ এখন প্রভাত মির্জার বাড়িতে আছে। স্ত্রী মারা যাওয়ার শোকে পাথর হয়ে গেছে সে। তা ছাড়া সে এতিম মানুষ কোন আত্মীয় স্বজন নেই। তাই প্রভাত মির্জা তুরাগকে তার বাসায় নিয়ে গেছে।”

জিহাদের দীর্ঘ উত্তর শুনে অধরা এবারো মনে মনে বিরক্ত হলো। যেখানে তিন শব্দে উত্তর দেয়া যেতো সেখানে তিন লাইন ব্যবহারের কি মানে! এই জিহাদটা সবসময় বাড়িয়েই কথা বলে।

মনের বিরক্তিটা মনেই চেপে রাখলো, প্রকাশ করলো না। অধরা গম্ভীর মুখে বললো,
” ধানমন্ডি থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে তুরাগের নিরপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ…
“তুরাগ যদি খুনী হয় তবে তাকে এরেস্ট না করে তার নিরপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে কেনো!”

আবারো ফোঁড়ন কেটে বললো জিহাদ। অধরা এবার যেন বিরক্তির উচ্চ সীমায় পৌঁছে গেলো। সে কড়া চোখে জিহাদের দিকে তাকালো। অধরার দৃষ্টি দেখে জিহাদ বুঝতে পারলো যে সে আবারো ভুল করে ফেলেছে। তাই চুপ মেরে গেলো। মিনমিনে গলায় বললো,
“সরি ম্যাডাম।”

অধরা এবার বেল বাজিয়ে আদাবরকে ডাক দিলো। আদাবরকে দিয়ে প্রতিভা কেস ইনভেস্টিগেট করার সাথে যুক্ত সবাইকে কেবিনে আসতে বললো। সবাই আসার পর অধরা গম্ভীর গলায় বললো,
“আমার কথা শেষ না হওয়া কেউ কথা বলবেন না। মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন।”

“জ্বি ম্যাডাম “বলে সবাই সায় জানালো।

অধরা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার চেহারার গম্ভীর্যতা ধরে রেখে বললো,
“ফরেনসিক ল্যাব থেকে ফোন এসেছে। সকালে পাওয়া পোঁড়া লাশটা অভিলাষেরই। কেসটা জটিল থেকে জটিল হচ্ছে। কেসের শুরুতে মালিক সমিতিকে সন্দেহ করলাম তারা পালালো।

দারোয়ানকে সন্দেহ করলাম সে নির্দোষ বের হলো। এর পর প্রমাণের ভিত্তিতে অভিলাষকে সন্দেহ এবং আটক করলাম।

রিমান্ড শেষে ও তার থেকে তেমন কোন তথ্য পাওয়া গেলো না। উল্টো সে কিডন্যাপ হয়ে খুন হলো। এতে বুঝা গেলো অভিলাষকে ফাঁসানো হয়েছে। কেসের মোহরা বানিয়েছে অভিলাষকে।

সব কিছু অভিলাষের উপর চাপিয়ে খুনি আড়ালে থেকে গেছে অভিলাষের লাশের সাথে একটা চিরকুট পাওয়া গিয়েছে। খুনি আমাদের উদ্দেশ্যে অভিলাষের মাধ্যমে চিরকুট পাঠিয়েছে।

চিরকুট দ্বারা খুনী আমাদের কিছু একটা বলেছে এমনটাই আমার ধারণা ছিলো। চিরকুটে লেখা ছিলো একটা সংখ্যা আর একটা ইমুজি। সংখ্যাটা হলো, ‘২০১’। একটা সংখ্যা দ্বারা কি বুঝিয়েছে এই কথাটা চিরকুট দেখার পর থেকে আমার মাথায় ঘুরছিলো। ভাবলাম, অনেক ভাবলাম। ২০১ সংখ্যাটা বিশ্লেষণ করলাম, ভাঙলাম।

অনেক চিন্তা গবেষণার পর অবশেষে ২০১ দিয়ে তারা কি মিন করেছে তা বুঝছে পারলাম।”

অধরা থামলো। সবার দিকে একবার চোখ বুলালো। উপস্থিত সবার চোখে কৌতুহল, হাজার প্রশ্ন।কিন্তু কেউ অধরার ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না।

সবার কৌতুহল দেখে অধরা মুচকি হাসলো। তারপর বললো,
“সবার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। কৌতুহল দমিয়ে রাখুন। ২০১ সংখ্যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদের পরবর্তী শিকার তুরাগ। অর্থাৎ অভিলাষের পর খুন হবে তুরাগ। খুনি খুবই চালাক আর দূরন্ত।

সবকিছুই নিখুঁত ভাবে করছে। এতটাই সতর্কতার সাথে করছে যে কোন ক্লু থাকছে না।

আর আমাদের ভীষণভাবে ঘুরাচ্ছে সে। আমরা মালিক সমিতিকে সন্দেহ করলাম তারা পালিয়েছে। হতে পারে খুনি তাদের জোর পূর্বক দেশছাড়া করেছে যাতে তারা আমাদের হাতে না লাগে! অভিলাষের ব্যাপারের মতো ভাবতে গেলে তেমনি হয়েছে।

অভিলাষকে আমরা সন্দেহ, আটক এবং রিমান্ডে নিলাম। মূলত আমাদের সন্দেহটা অমূলক ছিল। অভিলাষ খুনের তালিকায় ছিলো না। খুনি নিজেকে বাঁচাতে অভিলাষকে খুনি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সবকিছু এমনভাবে সাজিয়েছে যে অভিলাষকেই খুনি ভাবতে বাধ্য। অভিলাষ নির্দোষ ছিলো।

কারণ অভিলাষ খুনের সাথে যুক্ত থাকলে তাকে মারা হতো না। অভিলাষকে ফাঁসানো হয়েছে। অভিলাষ হয়তো খুনিদের ব্যাপারে টুকটাক জানতো। খুনিদের সম্পর্কে এখন মুখ না খুললেও পরে মুখ খুলতে পারে এই ভেবে অভিলাষকেও খুন করা হয়েছে

এমনটাই ধারণা আমার। এর পর প্রশ্ন উঠবে অভিলাষ আর মালিক সমিতির কেউ খুন না করলে খুন কে করেছে? কোথাও এই খুন তুরাগ করেনি তো। এই সন্দেহটা খানিক উঁকি দিয়েছিলো আমার মনে। আর তা অভিলাষের লাশ দেখার পর পরই। কিন্তু চিরকুট দেখে সেটাও ক্লিয়ার হয়ে গেলো। নাহ, খুন তুরাগ ও করেনি। কারণ তুরাগ খুন করলে নেক্সট টার্গেট নিজে হতো না।

এখন আমাদের কাজ হচ্ছে প্রথমে তুরাগের নিরপত্তার ব্যবস্থা করা এবং যত দ্রুত সম্ভব খুনীকে বের করা। খুনী যে পরিমাণে চালাক, সুযোগ পেলে সুক্ষ ভাবে তুরাগকে খুন করবে।

কেউ টের ও পাবে না। তাই আমাদের সবার চোখ কান খোলা রেখে ভাবতে হবে। শুরু থেকে ভেবে দেখতে হবে কোথাও কোন ক্লু রেখে এসেছি কিনা। সামান্য তম সন্দেহের কিছু চোখে পড়লেও আমাকে জানাবেন সবাই। প্রমাণ সব আবার চেক দিন। ঠিকাছে?”
“জ্বি ম্যাডাম।”

সবাই সায় জানালো। অধরা তার চেয়ারে বসে বললো,
“এবার কারো কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন। আছে কারো প্রশ্ন?”

জিহাদ আমতাআমতা করছে। তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছে। করা ঠিক হবে কি না ভাবছে। অধরা সবার দিকে একবার তাকালো
তারপর জিহাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“জিহাদ তোমার কোন প্রশ্ন আছে? থাকলে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করো।”
অধরা থেকে অনুমতি পেয়ে জিহাদ খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো। যেন সে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। খুশিমনেই জিহাদ বললো,
“ম্যাডাম আপনি ২০১ এর মানে কিভাবে বের করলেন? “
অধরা মুচকি হেসে বললো,
“১৪+৫+২৪+২০+২০+১+১৮+৭+৫+২০+২০+২১+১৮+১+৭ যোগ করে দেখো তো যোগফল কত হয়?”
জিহাদ মিনিট দুয়েক সময় নিয়ে মনে মনে যোগ করে বললো,
“ম্যাডাম যোগফল ২০১ হয়।

কিন্তু এই সংখ্যা গুলো কোথা থেকে আসলো ম্যাডাম? “
অধরা মুচকি হেসে একটা খাতা জিহাদের দিয়ে বাড়িয়ে দিলো। জিহাদ খাতাটা নিয়ে জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে অধরার দিকে তাকালো। অধরা টেবিলের মাঝে থাকা মাটি রঙের কমনদানি থেকে একটা কলম নিয়ে জিহাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“কলম নাও আর আমি যা বলছি তা লিখো। আমার সমাধান করে দেখানো থেকে তুমি নিজে সমাধান করলে মজা পাবে বেশি।”

কৌতুহলী হয়ে জিহাদ কলম নিলো। অধরা বললো,
“খাতায় একটা ইংরেজি বাক্য লিখো সব অক্ষরের মাঝে বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁক রাখবে।”
“ঠিকাছে মেডাম।”

চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো জিহাদ। সে বুঝতে পারছে না অধরা তাকে কি টাস্ক দিচ্ছে। সে পারবে কিনা!
সবাই জিহাদের আশেপাশে এসে দাঁড়ালো।

উপস্থিত সবার দৃষ্টি অধরার দিকে। তারা অসীম কৌতুহল নিয়ে অধরার মুখের বাক্যটি শুনার অপেক্ষায় আছে। অধরা নিজের আলিশান চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়ে বললো,
“লিখো, Next target turag.”
অধরার কথা মতোই জিহাদ একটা সাদা পেজের মধ্যভাগে বড় বড় করে ইংরেজি অক্ষরে লিখলো, ‘ Next target turag.’ লেখা শেষে বললো,
“লিখেছি ম্যাডাম। এবার কি করবো?”
“এবার ইংলিশ লেটার গুলোকে অংকে রূপান্তর করো। এই যেমন, এন অক্ষরটা অংকে নিলে হবে চৌদ্দ। অর্থাৎ এন অক্ষরটা গানিতিক সংখ্যায় চৌদ্দ নাম্বারে পড়ে। বাক্যের এই গানিতিক নাম্বার গুলো বের করে অক্ষরের নিচে বসাও।”

“জ্বি ম্যাডাম।”বলে জিহাদ তার টাস্ক আরম্ভ করলো।

সবার দৃষ্টি এখন জিহাদের হাতের খাতাটায়। সবাই কৌতূহল নিয়ে দেখছে। কেউ কেউ আবার জিহাদকে সাহায্য ও করছে। মিনিট তিনেকের মাঝে জিহাদ সব সংখ্যা বসালো।
“N e x t T a r g e t
১৪ ৫ ২৪ ২০ ২০ ১ ১৮ ৭ ৫ ২০
T u r a g
২০ ২১ ১৮ ১ ৭ “
খাতায় বসানো অংকগুলোয় একবার চোখ বুলালো জিহাদ। তারপর বললো,
“নাম্বার বসিয়েছি ম্যাডাম।”

“এবার যোগ করো।”

আঙুল দিয়ে কলম ঘুরাতে ঘুরাতে বললো অধরা। আদাবর খাতার দিকে সেকেন্ড ত্রিশেক তাকিয়ে থেকে বললো,
“ম্যাডাম যোগফল দুই শত এক হয়।”
অধরা তার গালে টোল পড়া হাসিটাকে উপস্থিত করলো। হেসেই বললো,

“এটাই সমাধান।”

আধরার কথা শুনে জিহাদ বড় বড় চোখ করে একবার অধরার দিকে তাকালো। তারপর খাতার দিকে তাকিয়ে সংখ্যাগুলোকে যোগ করলো। হ্যাঁ যোগফল ২০১ ই হয়।

তারমানে চিরকুটে দেয়া ২০১ নাম্বারটার মানে হচ্ছে Next target Turag! জিহাদের এই মুহুর্তে অধরাকে স্যালুট দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। কি ব্রিলিয়ান্ট ম্যাডাম! এত প্যাচালো অংক কিভাবে বুঝে গেলো! আমি এই সংখ্যাটার দিকে পাঁচদিন তাকিয়ে থাকলে ও এই ব্যাখা বের করতে পারবো না। মনে মনে বললো, ‘এমনি এমনি এত অল্প বয়স সাব ইন্সপেক্টর হন নি, আর স্বর্ণপদক পান নি।ট্যালেন্ট আছে বলেই পেয়েছে।

আই প্রাউড অফ ইউ ম্যাডাম।’
উপস্থিত সবাই অধরার বুদ্ধিমত্তা দেখে বিস্মিত আর মুগ্ধ হলো। আদাবর তো হেসে বলেই দিলো,
“আপনি খুবই ব্রিলিয়ান্ট ম্যাডাম।”

অধরা আদাবরের কথায় এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

“আমি নিজেকে ব্রিলিয়ান্ট তখনই বলতে পারবো যখন প্রতিভার কেসের মতো চ্যালেঞ্জিং কেস গুলো অতি সহজে সলভ করতে পারবো।”

বলে অধরা থামলো।

তারপর বাঁ হাতের কব্জির উপর পরে থাকা তামাটে রঙের চেইনের ঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে বললো,
“যাই হোক, কাজের কথায় আসি। এখন বাজে দুপুর দুটো। বিকেল চারটার মাঝে প্রভাত মির্জার বাড়িতে পুলিশ মোতায়ন করতে হবে। আমার ধারণা খুনি তুরাগের উপর রাতে হামলা করবে। সেই কারনেই আমাদের আগে থেকে হুশিয়ার থাকতে হবে।

বিকেল থেকে প্রভাত মির্জার বাড়িতে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে খুনী খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। আর তুরাগ আছে প্রভাত মির্জার বাড়িতে, প্রভাত মির্জার বাড়ি ধানমন্ডি। যা আমার থানার আওতায় পড়ে না। তাই আমাদের কোন পদক্ষেপ নিতে হলে ধানমন্ডি থানার সাথে যোগাযোগ করে তাদের সহযোগিতায় পদক্ষেপ নিতে হবে। ধানমন্ডি থানা পুলিশের সাথে আমি কন্টাক্ট করে বিকেল চারটার আগে সব সেট করবো।

যেহেতু কেসটা আমি হেন্ডেল করছি। তাই খুনী এবং খুনের প্রক্রিয়ার ধারণা সবার থেকে আমার বেশি। সেইজন্য আমাকেও সেখানে থাকতে হবে। আমি ধানমন্ডি থানার পুলিশ থেকে অনুমতি নিয়ে সেখানে যাবো। আমার সাথে থাকবে আমার টিম মানে আপনারা। আমরা সবাই ছদ্মবেশ ধরে প্রভাত মির্জার বাড়ির আশেপাশে লুকিয়ে থাকবো। যাতে খুনী এলে পাকড়াও করতে পারি। সবাই প্রস্তুত থাকুন।

সব ঠিকঠাক করে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমরা ধানমন্ডির মির্জা হাউজের সামনে থাকবো। এর মাঝে কেউ থানার বাইরে যাবেন না। আমাদের এখন মেইন ফোকাস প্রতিভার খুনীকে হাতে নাতে পাকড়াও করা। ইজ দেট ক্লিয়ার?”
“ইয়েস ম্যাডাম।”বসে সবাই একসাথে সায় জানালো।

সব ঠিকঠাক করে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ অধরা ও তার টিম ছদ্মবেশ ধারণ করে মির্জা হাউজের কাছে পৌঁছায় এবং অধরার নির্দেশ মোতাবেক বাড়ির চারপাশে কোণাকানা বেছে নিয়ে আড়াল হয়ে লুকিয়ে পড়ে। সবার কানে ওয়ারলেস ইয়ারফোন।যা দিয়ে সবাই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কলে কন্টাক্ট করছে।

অধরার নির্দেশ কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহের কিছু দেখলে সাথে সাথে যেন অধরা এবং তার টিম মেম্বারদের জানায়।

অধরা এবং তার টিম বাদে ধানমন্ডি থানার উপর ও মির্জা হাউজের পাশে টহলরত আছে
যারা সেই বিকেল চারটায় এসে হাজির হয়েছে
রাত আটটা নাগাদ অধরার নাম্বারে একটা কল আসে। একটা আননোন নাম্বার থেকে। ভাইব্রেশনের আওয়াজ পেয়ে ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো অধরা। কাজের সময় ডিস্টার্ব করায় বেজায় বিরক্ত সে। তাছাড়া এই সময় কে কল দিবে!

ভাবতে ভাবতে কল কেটে গেলো। সেকেন্ড দশেক পর আবারো বেজে উঠলো ফোন। অধরা খানিক ভেবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কল ডিসকানেক্ট করে ফোনটা রিসিভ করলো।

হ্যালো বলার আগেই অপাশ থেকে কান্নার আওয়াজে ভেসে আসলো। কান্নার আওয়াজে আবারো ভ্রু কুঁচকালো অধরা। আওয়াজটা বুঝার চেষ্টা করছে, আসলে কাঁদছেটা কে! কন্ঠটাতো অচেনা লাগছে। তবে কে হতে পারে আর কাঁদছেই বা কেনো!

না এর উত্তর পেতে হলে কান্নারত এই বয়স্ক কন্ঠের মানুষটির সাথে কথা বলতে হবে। এই ভেবেই গলা ঝেড়ে মৃদু স্বরে বললো,
“হ্যালো কে বলছেন?”

অপাশ থেকে ভেজা গলার আওয়াজ আসলো,
“আআমমি ততিহহানা। প্প্রত্তিবভার মমা…
ভেজা গলার অস্পষ্ট কথাগুলো বুঝতে অসুবিধা হলো না অধরা। প্রতিভার মা কথাটা কানে বাজতেই অধরা চমকে গেলো। তিহানা জাহান তাকে কল দিলো কেনো?

আর কাঁদছেই বা কেনো! তবে কি তারা আসার আগেই অঘটন ঘটে গেলো। ভাবতেই আঁতকে গেলো অধরা। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“কি হয়েছে? এভ্রিথিং ইজ অলরাইট? “

“কিচ্ছু ঠিক নেই ম্যাডাম। আমার সব শেষ হয়ে গেলো!”
কাঁপা গলায় বললেন তিহানা জাহান। অধরা বললো,

“কি হয়েছে বলুন?”
“ওদের নিয়ে গেছে। ওদের ও প্রতিভার মতো মেরে দিবে…তুমি কিছু করো মা?

বলেই আবারো শব্দ করে কান্না জুড়ে দিলেন তিহানা জাহান। অধরা ঘটনার খানিক আঁচ করতে পেরেছে। পুরোপুরি জানতে বললো,
“কাদের নিয়ে গেছে? দেখুন পুরো ঘটনা আমাকে খুলে বলুন। না হলে আমি বুঝবো কিভাবে আর সমাধান করবো কিভাবে? আপনি শান্ত হোন, আর ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলুন।”

তিহানা জাহান নাক টেনে খানিকের মধ্যে নিজের কান্নাকে ভিতরে দমালেন। তারপর বলা শুরু করলেন,
“তুরাগের পায়ের চেকাপ করানোর কথা ছিলো আজ। সেইজন্যই প্রভাত তুরাগকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছে। এখনো ফেরিনি। তাদের ফোনও বন্ধ। আমি বুঝতে পারছিনা কি করবো।”

“গিয়েছিলো কখন?”

“লাঞ্চ করেই বেরিয়েছে। আর ঘন্টা তিনেকের মাঝে ফিরে আসার কথা। আমি কৌশিককে কল দিয়েছি। কিন্তু কৌশিক বললো ওরা নাকি হাসপাতালে যায় নি।”

“আপনি আমাকে আগে জানাননি কেনো!”

“আমি ভেবেছি ওরা হয়তো জ্যাম বা কোন কাজে আটকে গেছে সেইজন্য দেরি হচ্ছে। তাই আমি সন্ধ্যা অব্দি অপেক্ষা করেছি। যখন আসছে না তখন কৌশিককে কল দিলাম সে জানালো তাদের না যাবার কথা। তারপর আমি স্বরূপাদের বাসায় কল দিলাম। তারা জানালো সেখানেও যায় নি।”

“স্বরূপাদের বাসায় যাবার কথা ছিলো?”

“না ছিলো না। আসলে স্বরূপা আমাদের বাসায় ছিলো। প্রভাতরা যাবার সময় স্বরূপাকে তাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার কথা। তাই আমি ভেবেছিলাম হয়তো স্বরূপা বাসায় নেমে জোর করে প্রভাতদের ও নিয়ে গেছে।”
অবাক হয়ে অধরা বললো,
“স্বরূপাও তুরাগদের সাথে ছিলো! ওরা ক’জন বেরিয়েছে? “

“স্বরূপা, তুরাগ প্রভাত, শিলা একসাথে বেরিয়েছে।”

“তিনজনের কথা না হয় বুঝলাম কিন্তু শিলা কেনো ওদের সাথে গেলো!”

ভ্রু কুঁচকে বললো অধরা। তিহানা জাহান বললেন,
“তুরাগ কারো সাহায্য ছাড়া একা একা চলাফেরা করতে পারে না।তাকে ধরে ধরে নিয়ে যেতে হয়। প্রভাত তুরাগকে একা সামাল দিতে পারবে না তাই শিলাকেও নিয়ে গেছে।”

“চারজনই নিখোঁজ! ও মাই গড! “
বিস্ময়ে বললো অধরা। তার গলা বেজে যাচ্ছে। খুনী তুরাগকে একা নয় তুরাগের সাথে থাকা বাকিদের ও খুন করবে! তবে কি সে এদের কাউকেই বাঁচাতে পারবে না! সিট! দুপুরে কেনো বের হলো না৷

চিরকুটের মানে বুঝার সাথে সাথে পদক্ষেপ নিলে এমন হতো না। না জানি এতক্ষণে সবাইকে শেষ করে দিয়েছে কিনা! অধরার শিরদাঁড়া দাঁড়িয়ে গেলো। বিস্ময় আর হারের আভাস তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাও যথাসম্ভব নিজেকে স্বভাবিক করার চেষ্টা করলো। এত তাড়াতাড়ি তাকে হারলে চলবে না।

খুনীকে সে ধরেই ছাড়বে, আর সর্বাত্মক চেষ্টা করবে এদের সবাইকে বাঁচানোর জন্য। নিজেকে স্বাভাবিক করে ঠান্ডা মাথার তিহানা জাহানের বলা সব কথা একবার মনে করলো। তারপর প্রশ্ন করলো,
“তুরাগরা সবাই ঠিক কয়টায় বেরিয়েছে? “

“লাঞ্চের পর। সঠিক সময় মনে নেই। আনুমানিক আড়াইটা কি তিনটা হবে।”
“তাদের সাথে লাস্ট কখন কথা হয়েছে আপনার ?

আর চারজনের কার সাথে কথা হয়েছে? “
“কারো সাথে কথা হয় নি। তারা সেইফলি চলে আসবে এই ভেবে চারটার আগে আর কল করিনি আমি।”
“তাদের নাম্বার বন্ধ পাচ্ছেন কখন থেকে?”

“সাড়ে চারটা থেকে আমি প্রভাতকে ফোন করলে ফোন বন্ধ পাই। তখনই তারা যাওয়ার পর প্রথম কলটা করেছিলাম। ফিরছে কিনা জিজ্ঞেস করতে।”

“বাকি সবার ফোনে ট্রাই করেছিলেন?”
“হ্যাঁ, সবার ফোন বন্ধ আসছিলো।”

“আচ্ছা এই কৌশিক কে?”
“আমার বোনের ছেলে। আর সে হাড়ের ডাক্তার। তুরাগের ট্রিটমেন্ট কৌশিকই করছে। প্রতিভা তো চলে গেছে। আমি প্রভাত তুরাগ আর স্বরূপাকে নিয়ে কোনমতে বেঁচে আছি। ম্যাডাম ওদের বাঁচান। না হলে আমি বাঁচবো না। আমি একেবারেই নিঃস্ব হয়ে যাবো।

আমার মন বলছে ওরা বিপদে আছে। ম্যাডাম ওদের বাঁচান।”আকুতি মিনতি করে কেঁদে কেঁদে বললেন তিহানা। অধরা আশ্বাস দিয়ে বললো,
“শান্ত হোন। আমি দেখছি ব্যাপারটা।”

বলে ফোন রেখে দিলো অধরা। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপ কলে জয়েন হয়ে বললো,
“সবাই বেরিয়ে এসো। মির্জার হাইজের মূল ফটকে আসুন। কুইকলি।”

টিমের সবাই ভেবেছে অধরা খুনীকে ধরে ফেলেছে তাই খুনিকে দেখার কৌতুহল নিয়ে খুব দ্রুত প্রভাত মির্জার বাড়ির দরজায় হাজির হলো। অধরাকে একা দেখে সবাই ভ্রু কুঁচকালো। জিহাদ বললো,
“খুনি কোথায় ম্যাডাম? আপনি তাকে পাকড়াও করেন নি?”

অধরা ফ্যাকাসে মুখে সবাইকে খানিক আগে ঘটা ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে সবার মুখে হতাশা নেমে এলো। আদাবর চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,
“কেসটা দিনকে দিন জটিল হচ্ছে।

যেন কোন গোলকধাঁধায় গিয়ে আটকেছে। খুনি সম্পর্কে কোনভাবেই আঁচ করা যাচ্ছে না।”

অধরা গম্ভীর মুখে বললো,
“খুনি ভয়ংকর চতুর। সবার সব মুভমেন্ট তার মুখস্থ। আজ আমরা এখানে আসবো জানে সে তাই আমরা আসার আগে যখন তুরাগরা বের হলো তখন সুযোগ বুঝে সবাইকে কিডন্যাপ করে ফেললো। তবে সে যেমনই হোক আমরা তাকে বের করবোই।”

জিহাদ ভাবুক কন্ঠে বললো,
“ম্যাডাম একটা কথা মাথায় ঢুকছে না আমার। তুরাগ আর প্রভাত মির্জার আর স্বরূপার নিখোঁজ হওয়ার কথা মানা যায়। কারণ খুনির সাথে শুধু প্রতিভা নয় হয়তো এদের ও শত্রুতা ছিলো। তাই তাদের খুন করার পায়তারা করেছে। কিন্তু শিলা তো নির্দোষ তাকে কেনো খুব করবে?

একটা কাজের মেয়ের সাথে তার কি শত্রুতা থাকতে পারে? খুনী কে? আর কেনোইবা খুব করছে? এই কেসের ব্যাপারে কথা উঠলে আমার নিজেকে পাগল পাগল মনে হয়।

এত রহস্য কেনো! এর শেষ কোথায়?”

“রহস্য আর সমস্যা দুটো তৈরি হয়ই সমাধানের জন্য। সমাধানই এদের পূর্ণতা। আমাদের সেই পূর্ণতাকে উপস্থিত করতে হবে। আমার বিশ্বাস আমি পারবো। পারতেই হবে আমাকে। অধরা আনান নাম আমার। হারতে শিখিনি আমি, জয়কে চিনিয়ে আনতে শিখেছি। এবারো জয় আনবোই আমি। খুনি যেই হোক তার মুখোশ উন্মোচন করবোই। দেটস মাই চ্যালেঞ্জ।”

দৃঢ় কন্ঠে বললো অধরা। উপস্থিত সবাই এই আশা মনে নিয়েই এক চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সবার ভাবনাতে একটা কথাই ঘুরছে, খুনি কে? এই খুনের আসল রহস্য কি? মুখোশের আড়ালে কে আছে?


পর্ব-৭

প্রভাত মির্জা, স্বরূপা, তুরাগ শিলা ধানমন্ডি থেকে নিখোঁজ হওয়ায় মিরপুর থানায় তাদের অপহরণ মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি ফলে অধরা এবং তার টিম আগ বাড়িয়ে কিছু করতে পারেনি।

তাও নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আশানুরূপ সাফল্য লাভ করতে পারেনি। তিহানা জাহান প্রভাত মির্জাদের নিখোঁজ হওয়ার পর ধানমন্ডি থানায় কয়েকজন অজ্ঞাত নামে অপহরণ মামলা করে। ধানমন্ডি থানা পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় প্রভাত মির্জাদের খুঁজে কোন হদিস করতে পারেনি। ৪৮ ঘন্টাও বিখ্যাত শিল্পপতি প্রভাত মির্জার কোন খোঁজ না পাওয়া গেলে দেশজুড়ে বেশ হৈচৈ লেগে যায়।

সবার এক দাবি প্রভাত মির্জাকে উদ্ধার করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

উপর মহল ও থেকে চাপ আসতে থাকে। প্রভাত মির্জা অপহরণ এবং প্রতিভা মির্জা খুনের ব্যাপারটা রীতিমতো ব্রেকিং নিউজ হয়ে গেছে।

সাধারণত ক্লু লেস চ্যালেঞ্জিং কেসগুলো সি আই ডি সমাধান করে থাকে। আর যেহেতু ধানমন্ডি থানা পুলিশ প্রভাত মির্জার অপহরণ কেসের কোন সমাধান করতে পারছে তাই আদালত সি আই ডির উপর প্রভাত মির্জা কেসের ভার তুলে দেয়। যেহেতু প্রভাত মির্জার কেসের সাথে প্রতিভা মির্জার কেসের সম্পৃক্ততা আছে এবং প্রতিভা মির্জা কেস অধরার হ্যান্ডেল করছিলো তাই সি আই ডি টিমকে এসিস্ট করবে অধরার টিম। আদালত থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর সি আই ডির প্রধান কার্যালয় মালিবাগে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন সি আই ডি প্রধান।

এতে সি আই ডি প্রধান সালেহ উদ্দিন জানান তিনি তার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ইন্সপেক্টর নিতিন সরকারকে এই কেস সমাধান করার দায়িত্ব দিয়েছেন। এই কেস নিতিন সমাধান করবে।

পয়ত্রিশ বছর বয়সী অতিব বুদ্ধিমান আর বিচক্ষণ এই অফিসার চ্যালেঞ্জিং কেস লড়তে ভালোবাসে। সালেহ উদ্দিনের বিশ্বাস নিতিন সরকার এই কেস সমাধান করতে পারবে। অতীতে সে এমন চ্যালেঞ্জিং কেস সমাধান করেছে।

নিতিন সরকারকে এসিস্ট করবে মিরপুর থানার সাব ইন্সপেক্টর অধরা আনান। প্রতিভা মির্জা খুন এবং প্রভাত মির্জা ও তার সাথে তিন জনের অপহরণের যোগসূত্র থাকায় দুই টিম একসাথ হয়ে কাজ করবে এবং অতি শীঘ্রই এই চ্যালেঞ্জিং কেসের সমাধান করবে।

এমন আশ্বাস দিয়ে সালেহ উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে শেষ করেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সি আই ডি প্রধান নিতিনকে পার্সোনালি ডেকে বেশ কিছু উপদেশ এবং উৎসাহ দেন। নিতিন ও সি আই ডি প্রধানকে আশ্বাস দেয় যে সে ওই কেসের সমাধান করবে।

দায়িত্ব পেয়ে প্রায় সাথে সাথে কাজে নেমে পড়ে নিতিন। অধরার সাথে যোগাযোগ করে মিরপুর থানায় গিয়ে প্রতিভা কেসের সব কিছু একবার পরখ করে দেখে। অধরার সাথে মামলা বিষয়ক আলাপ আলোচনা করে। প্রভিতা মামলার ফাইল ঘাটার পর নিতিনের চেহারায় বিস্ময়ী ভাবের পরিবর্তে হাসি রেখা ফুটে উঠে।

নিতিনের চোখ মুখ চকচক করে উঠে। যা অধরাকে অবাক করে। কৌতুহলবশত অধরা জিজ্ঞেস করলো,
“মি.নিতিন আপনি ফাইল দেখে এত আনন্দিত হচ্ছেন কেনো!”

নিতিন চোখে মুখে খুশিতের আভা দিগুন করে হেসে বললো,
“অনেক দিন পর এমন রহস্য ঘেরা কেস হাতে পেয়েছি। এই কেসের আসামীরা দুরদান্ত চালাক। এরা রহস্য নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। আর আমি রহস্য সমাধান করতে ভালোবাসি। তাই এই কেস সমাধান করতে আমার বেশ মজা লাগবে।”
নিতিনের কথা শুনে অধরা ঠোঁট উল্টিয়ে ভ্রু নাচালো। তারপর নিতিনের সাথে কেস সংক্রান্ত আলোচনা জুড়ে দিলো।
অধরা এবং নিতিন মিলে কেসের ডিসকাস করছিলো অধরার কেবিনে। এক পর্যায়ে অধরার ডেস্কে থাকা টেলিফোনটায় বেজে উঠে। নিতিনের অনুমতি পূর্বক অধরা তুলে রিসিভার কানে দিলো এবং বলে উঠলো,
“হ্যালো, মিরপুর থানা থেকে ইন্সপেক্টর অধরা আনান বলছি।

আ….
অধরার কথা শেষ করতে না দিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ফোনের ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় একটা পুরুষকন্ঠ বলে উঠলো,
“ম্ম্যাড্ডামম ললাসশ…
অধরা চমকে গিয়ে বললো,
“লাশ! কোথায়? আর আপনি কে!”

“আমমি ববোররহহান, ববুউইয়য়া বভিললার দ্দাররোয়য়ান। ললাশ আয়াগগের যায়ায়ায়গগায়…
বোরহানের ভীত কন্ঠে বলা তোতলানো কথা শেষ করতে দিলো না অধরা। বোরহানকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
“আপনি সেখানেই থাকেন। এক্ষুনি আসছি আমরা। এসেই বাকি কথা শুনবো।”

বলে রিসিভার রেখে দিলো অধরা। তার চোখ মুখ আবারো ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। তা দেখে নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো,
“মিস অধরা এভ্রিথিং ইজ অলরাইট?”

“আজ আবারো ভুঁইয়া ভিলার অদূরে ঝোপের আড়ালে লাশ পাওয়া গেছে। আই থিঙ্ক নিখোঁজদের কারো লাশ পাওয়া গেছে। আমরা বাঁচাতে পারলাম না ওদের। আমাদের যেতে হবে এক্ষুনি।”
এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো অধরা। নিতিন সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর বললো,
“চলুন যাই। আশা করি আজ কোন না কোন ক্লু পাবো।”

অধরা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“আপনার কথা সত্যি হোক।”
*
এই মুহুর্তে নিতিন আর অধরা দাঁড়িয়ে আছে ভুঁইয়া ভিলার অদূরে সেই ঝোপের সামনে। যেখানটায় অভিলাষের পোড়া লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। আজ ও একি জায়গায় লাশ পাওয়া গেছে। দারোয়ান থেকে খবর পেয়ে অধরা এবং নিতিন তাদের টিম নিয়ে হাজির হয়েছে এখানে। ঝোপের কাছাকাছি এসে অধরা ভীষন চমকালো। এখানে আসার আগে সে ভেবেছে এখানে হয়তো তুরাগের লাশ থাকবে।

কিন্তু এখানে এসে দেখলো ঝোপের আড়ালে ঘাসের উপর তো একটা নয় তিন তিনটা লাশ পড়ে আছে ! লাশ তিনটির মাথা ব্যাতিত পুরো শরীর ঝলসানো। অধরা আন্দাজ করছে লাশের পুরো শরীরে এসিড ঢেলে ঝলসে দেয়া হয়েছে। তবে গলা থেকে মাথা অব্দি পুরোটা অক্ষত আছে। চেহারাগুলো ও স্পষ্ট। মুখে কিংবা মাথায় কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। তিন ঝলসানো শরীরের তিন চেহারাই অধরার বিস্ময়ের কারণ।

তিনটা চেহারাই বলে দিচ্ছে লাশ গুলোর একটা তুরাগের, একটা স্বরূপার আর একটা শিলার। অধরা খেয়াল করে দেখলো লাশের আশেপাশে কোথাও কোন পোঁড়া রক্ত বা ছাই নেই। এর মানে অন্য কোথাও থেকে লাশ মেরে পুড়িয়ে এখানে এনে ফেলে রাখা হয়েছে। লাশ দেখে অনুমান করা যায় খুনির এই তিনটা মানুষের সাথে কোন শত্রুতা ছিলো। যা সে অতি কষ্টদায়ক মৃত্যুর মাধ্যমে শোধ নিয়েছে।

কিন্তু কার এত শত্রুতা এদের সাথে! তুরাগ আর স্বরূপার সাথে না হয় শত্রুতা থাকতে পারে। কিন্তু শিলা নামের একটা কিশোরী যে কিনা তুরাগের বাসার কাজের মেয়ে তার সাথে খুনির কি শত্রুতা থাকতে পারে! শিলা মেয়েটা তো সহজ সরল গ্রাম্য মেয়ে তার সাথে আর যাই হোক খুন করার মতো কোন শত্রুতা তো থাকতে পারে না। তবে সে খুন হলো কেনো! সেও কি অভিলাষের মতো মহোরা হয়েই খুন হলো!

প্রথমে প্রতিভা তারপর অভিলাষ তারপর স্বরূপা, তুরাগ, শিলা। সবার মৃত্যুই ভয়ংকর ভাবে হয়েছে। কি কারণ থাকতে পারে এদের মৃতুর পিছনে? প্রভাত মির্জার সম্পত্তির জন্য যদি প্রতিভাকে মারা হয় এবং প্রতিভার সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তুরাগকেও মারা হয়। খুনি সম্পর্কে জানার কারণে স্বরূপা এবং অভিলাষকে ও মেরে দেয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিলাকে কেনো মারা হবে? তার তো কোন সম্পত্তি নেই। না সে কারো উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি ও পাবে না। তবে নিষ্পাপ মেয়েটাকে কেনো খুন করা হবে! তাও এত জঘন্য ভাবে!

কেনো! আর নিখোঁজ হয়েছে চারজন তবে খুন কেনো তিনজন হলো? প্রভাত মির্জা কেনো খুন হলো না? কোথাও এই খুনের সাথে প্রভাত মির্জার হাত নেই তো! এমন না যে প্রভাত মির্জা ইচ্ছে করে হাসপাতালে নেয়ার বাহানায় এদের কিডন্যাপ করেছে এবং খুন করেছে? এমনটা অসম্ভব না। তবে একটা কথা ক্লিয়ার যে প্রতিভাসহ খুন হওয়া চারজনের খুনি একিজন। সে হিসেবে এদের খুন যদি প্রভাত মির্জা করে থাকে তবে প্রতিভাকে ও প্রভাত মির্জাই খুন করেছে। কিন্তু বাবা হয়ে মেয়েকে কেনো খুন করবে?

তাও এত পরিকল্পনার সাথে! তাছাড়া প্রতিভা খুন হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় প্রভাত মির্জা এক্সিডেন্টে করেছে। চোট পেয়ে চিকিৎসা শেষে বাসাতেই ছিলো। পরদিন সকাল অব্দি বেরোয়নি। প্রভাত মির্জা যদি প্রতিভাকে খুন করতো তবে অবশ্যই বাড়ি থেকে বের হতেন। কিন্তু বের হন নি।

তারমানে কি খুন তিনি অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছেন? নাকি এই খুনের সাথে তিনি নয় অন্য কেউ জড়িত! কিন্তু সে কে? কেনো খুন করছে? স্থির দৃষ্টিতে লাশের দিকে তাকিয়ে এমন নানান কথা ভেবে যাচ্ছে অধরা। সে ভাবনায় এতটাই বুদ হয়ে গেছে যে কখন তার পাশে দাঁড়ানো নিতিন সরে গিয়ে লাশ এবং আশেপাশে সবটা খতিয়ে দেখে আবার অধরার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অধরা টেরই পায় নি। অধরার ঘোর ভাঙলো নিতিনের কথায়,
“মিস অধরা লাশ দেখে কি বুঝলেন?”

ভাবনার সুতো কেটে বাস্তবে ফিরে এসে অধরা বললো,
“প্রতিভা অভিলাষ আর এই তিনজনের খুনি একজন। সবার সাথে সাথেই খুনির ঘোরতর শত্রুতা আছে যার কারনে এদের এত কঠিন মৃত্যু দিয়ে খুনি তার বদলা নিয়েছে। কি কঠিন মৃত্যু ছিলো এদের!”

অধরার কথায় নিতিন মুচকি হাসলো। হেসেই বললো,
” এই তিনজনের মৃত্যুটাকে আপনি যতটা কঠিন ভাবে দেয়া হয়েছে ভাবছেন ততটা কঠিনভাবে কিন্তু দেয়া হয়নি।”
অধরা লাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই ভ্রু কুঁচকে বললো,
“একজন মানুষকে এসিড দিয়ে পুরো শরীর ঝলসে দিয়ে হত্যা করা হলে সেই মৃত্যুটাকে কঠিন মৃত্যু বলে না? এর চেয়ে কঠিন মৃত্যু আর কি হতে পারে!

এসিড ঢালার পর কি কষ্টটাই না পেয়েছে এরা! কষ্টের শেষ সীমায় গিয়ে মারা হয়েছে। এর পর ও এটাকে সহজ মৃত্যু বলবেন আপনি! “
নিতিন আবারো হাসলো অধরার কথায়। হাসি থামিয়ে বললো,
“এদের মৃত্যুটা প্রতিভার মতোই শ্বাসরোধ এর কারণে হয়েছে। জীবন্ত মানুষ গুলোর সাথে ভয়ংকর কিছু করা হয় নি। জাস্ট গলায় দঁড়ি পেচিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে। খানিকের মাঝে ঝুলে মরেছে এরা। এরা মারা যাবার পর তাদের লাশের সাথে ভয়ংকর কিছু করা হয়েছে। মেয়ে দুটোর সাথে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হয়েছে কিনা বলতে পারছি না। তবে আন্দাজ করতে পারি, হয় নি। মৃত্যুর পরই লাশের উপর এসিড ঢেলে লাশের শরীর ঝলসে দেয়া হয়েছে৷ চেনার সুবিধার্থে চেহারা বিকৃত করা হয় নি।”
অধরা লাশ থেকে চোখ সরিয়ে নিতিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“মৃত্যুর পর গায়ে এসিড ঢালা হয়েছে তার প্রমাণ কি? মৃত্যুর আগেও তো ঢালা যায় নাকি? আপনি এতটা নিশ্চিত ভাবে কিভাবে বলছেন?”

নিতিন তুরাগের মাথার পাশে হাটু ভেঙে বসলো। তুরাগ এবং তার পাশে শোয়ানো স্বরূপা ও শিলার লাশের মুখমণ্ডল গ্লাভস পরে থাকে বাঁ হাতের আঙুলের সাহায্যে নেড়ে সেড়ে দেখলো। তারপর বললো,
“লাশ গুলোকে একটা মনোযোগ দিয়ে দেখুন, বিশেষ করে লাশের চেহারাগুলো। এসিড ঢেলার কারণে মৃত্যু হলে লাশের চোখে মুখে কষ্টের আভা থাকতো। যা লাশের নেই।

এসিডে দগ্ধ হয়ে যারা মারা যায় তাদের চেহারায় এসিড না পড়লে ও ঝলসে যাওয়া শরীরের যন্ত্রনায় তাদের চেহারাও এর প্রভাব পড়ে। এরা যদি জীবত অবস্থা এসিড দগ্ধ হতো তবে যন্ত্রণা এদের চেহারাটাও ভয়ংকর হয়ে যেতো। তাছাড়া জীবত অবস্থা শরীরে এসিড ঢাললে নড়ে চড়ে মুখে ছিটেফোঁটা হলেও লাগতো। কিন্তু লাশের গলার উপর এসিডের চিহ্ন মাত্র এ নেই।

আমি নিশ্চিত খুনি তিনজনকে প্রথমে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এর পর গলায় দড়ি থাকা অবস্থায়ই গলার নিচ থেকে পুরো শরীরে এসিড ঢেলে দিয়েছে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে মিলিয়ে নিবেন।”

অধরা খানিক ভেবে বললো,
“এমনটা হতে পারে। দেখা যাক ফরেনসিক রিপোর্ট কি বলে! তবে আমার আরেকটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। নিখোঁজ হলো চারজন কিন্তু খুন তিনজন হলো কেনো!

প্রভাত মির্জাকে খুনি খুন করলো না কেনো?”

শুভ্র বর্ণের প্রশস্ত কপালের ঠিক মাঝখানে তর্জনী আঙুল দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে নিতিন উত্তর দিলো,
“সেটা খুনিই বলতে পারে। খুনির প্ল্যান আমি আপাতত আন্দাজ করতে চাচ্ছিনা। আন্দাজ করলেই খেল খতম। এই লাশ তিনটির ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাবার পর খুনির প্ল্যান আন্দাজ করবো।”

“এমন না তো যে প্রতিভা মির্জাই খুনি? তিনিই সবাইকে খুন করেছে।”

“এটাও অসম্ভব নয়।আজকাল এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। তবে এই খুনের পিছনে একটা ঘটনা জটিল আছে। এই খুনের পিছনে একজন দুজন নয় একটা গ্যাং জড়িত। এই খুন গুলো পূর্বপরিকল্পিত। খুনিরা ঠান্ডা মাথায় স্টেপ বাই স্টেপ এগুচ্ছে।”

“হ্যাঁ সেটা আমারো মনে হচ্ছে। আমাদের এখন সেই ঘটনা এবং খুনের সাথে জড়িত পুরো গ্যাং অব্দি পৌঁছাতে হবে। তবে এটাও ক্লিয়ার যে এরা কেউ খুনের সাথে জড়িত নয়।”

“আপাতত মূল রহস্য হচ্ছে প্রভাত মির্জা। খুনি তিনি নয় তো!”

ক্লু খুঁজতে খুঁজতে চিন্তিত ভঙ্গিতে স্বরূপার মাথার কাছে বসলো অধরা।

স্বরূপার মাথার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। স্বরূপার কোমর অব্দি চুল এলোমেলোভাবে খোঁপা করে মাথার উপরিভাগে একটা বড় ক্লিপের সাহায্যে আটকানো। অধরা কি মনে করে স্বরূপার মাথার ক্লিপটা খুলে দিলো। ক্লিপ খুলে দেয়ার পর পরই খোঁপা খুলে চুল সব মাটিতে এলোমেলো হয়ে পড়ে গেলো। রেশমি কালো চুলগুলো রোদের আলোতে চিকচিক করছে যেন।

এলোমেলো চুলগুলোয় চোখ বুলিয়ে হাতে থাকা ক্লিপটার দিকে চোখ রাখতেই অধরার চোখ আটকে গেলো ক্লিপটায়। কালো রঙা একটা মোটা ক্লিপের ভিতরটায় একটা কালো চিরকুট আটকানো।

খুব সুক্ষ্মভাবে না দেখে চোখে না পড়ার মতো করে চিরকুটটা ক্লিপের ভিতরে সেট করেছে খুনি। অভিলাষের চিরকুটের মতো এই চিরকুটেও নিশ্চয়ই কোন বার্তা আছে এই ভেবে অধরা চিরকুটটার ভাজ খুললো। তারপর এক নজর চোখ বুলালো। তারপর ভ্রু কুঁচকালো। এই খুনি কি সংখ্যা পদ্ধতিতে ছাড়া কথা বলতে পারে না? আজ ও চিরকুটে একটা বিশাল সংখ্যা লিখেছে তারপাশেই চিরচেনা সেই লাফিং ইমুজি।
“১৮১৫৩১১১৯২৫ “
চিরকুটে আরো একবার চোখ বুলিয়ে ভাবতে লেগে গেলো অধরা। কি হতে পারে এই সংখ্যার মানে!


পর্ব-৮

নিকষ কালো চিরকুটের মাঝে থাকা লেখাটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে নিতিন। সে বুঝার চেষ্টা করছে এই সংখ্যাটার মাধ্যমে খুনি কি বার্তা পাঠিয়েছে তাদের কাছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধরা রীতিমতো খাতা কলম নিয়ে হিসেবে কষতে লেগে গেছে। আগের নিয়মে অংক কষছে কিন্তু কোন ফলাফল পাচ্ছে না।

বারবার কাটা ছেঁড়া করছে। নিতিন ও একধ্যানে ভেবে যাচ্ছে। এই মুহুর্তে তারা আছে মিরপুর থানার অধরার কেবিনে। লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়ে থানায় ফিরে এসেছে বেশ কিছু সময় আগে। এসেই দুজনে ভাবনায় লেগে গেছে।

প্রভাত মির্জা, তিহানা জাহানের নামকে অংকের ভাষায় লিখেছে তাও অধরার অংক কিছুতেই মিলছে না। এরপর তুরাগ, স্বরূপা, শিলা, অভিলাষ, প্রতিভা সবার নাম দিয়ে চেষ্টা করলো। কিন্তু এবারো উত্তরটা মিললো না।

খুন, গুম, অপহরণ এই তিনটা শব্দ হুট করে মাথায় আসতেই অধরার মাথায় রক্সির নামটা খেলে গেলো। রক্সি ও তো নিখোঁজ হয়েছে। রক্সির ডেডবডি পাওয়া গেলো না কেনো! রক্সি প্রতিভার প্রিয় বিড়াল ছিলো। খুনির সাথে প্রতিভার শত্রুতা আছে সে হিসেবে প্রতিভার প্রিয় জিনিসকে মারতে পারে। কোথাও নেক্সট টার্গেট রক্সি নয় তো!
এমন ভাবনা মনে আসতেই অধরা খাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখলো,
“R O C K S Y”
লেখার পর ইংরেজি বর্ণগুলোকে গণিতে কনভার্ট করতে লাগলো। কনভার্ট করে একবার চোখ বুলালো,
“R O C K S Y
১৮ ১৫ ৩ ১১ ১৯ ২৫ “
অধরার কাছে সংখ্যাটা কেমন চেনা চেনা লাগলো। এমন একটা সংখ্যা সে চিরকুটে দেখেছে বলে মনে হলো তার। পুরোপুরো নিশ্চিত হতে চিরকুটটা নিয়ে একবার মিলিয়ে নেবার প্রয়োজন বোধ করলো। কাঙ্ক্ষিত চিরকুট তখনো নিতিনের হাতে ধরা। তা দেখে অধরা বললো,
“মি.নিতিন সেকেন্ড দশেকের জন্য চিরকুটটা দেয়া যাবে? “

অধরার কথায় নিতিনের ঘোর কাটলো। সে চিরকুটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ইয়াহ, সিওর।”
চিরকুট হাতে নিয়ে তাতে আরেকবার চোখ বুলাতেই অধরার চোখে মুখে খুশির আভা দেখা গেলো। তার কষা অংকের ফলাফল আর চিরকুটের সংখ্যাটা মিলে গেছে হুবহু।

তারমানে চিরকুটের থাকা ‘১৮১৫৩১১১৯২৫’ সংখ্যাটার মানে হচ্ছে রক্সি। তার সন্দেহই ঠিক। নেক্সট রক্সি খুন হবে। অধরা আনমনে বললো,
“নেক্সট টার্গেট রক্সি।”
অধরার কথাটা কানে যেতে নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো,

“কিভাবে বুঝলেন?”
অধরা তার হাতে থাকা খাতা আর চিরকুটটা নিতিনের দিকে বাড়িয়ে দিলো। নিতিন খাতা এবং চিরকুট হাতে নিয়ে তাতে একবার চোখ বুলালো। তারপর স্বভাবিক ভঙ্গিতে খাতা এবং চিরকুট টেবিলের উপর রেখে দিলো। চোখে মুখে হাসির রেখা টেনে বললো,
“আপনার বুদ্ধিমত্তা চমৎকার মিস অধরা। ইমপ্রেসিভ।”

নিতিনের কথা অধরা শুনলো কি শুনলো না বুঝা গেলো না। তবে নিতিনের কথায় তার ভাবভঙ্গীর বিন্দু মাত্র পরিবর্তন হয়নি। সে এখনো কিছু একটা নিয়ে গভীর ভাবনায় আছে। নিতিন অধরার চিন্তিত চেহারা দেখে বেশ শব্দ করেই হাসলো। নিতিনের হাসির শব্দে অধরা ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হলো।

সে নিতিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো হাসির শব্দটা নিতিনের গলা থেকেই আসছে। অধরা সেকেন্ড দশেক সময় নিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো এখানে আদৌ হাসার মতো কিছু হয়েছে কি! সে কি হাস্যকর কিছু করেছে? ভাবনা শেষে নেতিবাচক উত্তর আসলো। অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনি হাসছেন কেনো! এখানে হাসার মতো কিছু হয়েছে কি!”

নিতিন আবারো হাসলো। এবার আর তার হাসির শব্দ হলো না। যাকে বলে মুচকি হাসি কিংবা নিঃশব্দের হাসি।
নিতিন তার মন মতানো হাসি থামিয়ে বললো,
“এখানে হাসার মতো কিছু না হলেও আমি হাসার মতো কাজ পেয়েছি বলেই হাসছি।”
“তা আপনার হাসির কারণ জানতে পারি? কি কাজ পেয়েছেন যে হাসছেন?”

প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি দিয়ে প্রশ্ন করলো অধরা। নিতিন বললো,
“প্রথমত, খুনির কান্ড দেখে হাসছি। খুনি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে লাশের সাথে চিরকুট পাঠিয়েছে। তার উদ্দেশ্য বুঝে যাওয়ায় আমার মজা লাগছে তাই হাসছি। দ্বিতীয়ত, খুনি যে উদ্দেশ্যে চিরকুট পাঠিয়েছে সেই উদ্দেশ্য আপনি পূরণ করতে শুরু করেছেন দেখে আমার আরো মজা লাগছে।

ফলে হাসির মাত্রাটাও দিগুন হয়েছে।”
বলে আবারো হাসলো নিতিন। অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছিনা। বুঝিয়ে বলবেন কি?”

নিতিন হাসি থামিয়ে বললো,
“অভিলাষের লাশের সাথে যে চিরকুট পাওয়া গেছে তা দ্বারা খুনি বুঝাতে চেয়েছে যে নেক্সট তারা তুরাগকে খুন করবে। শুধু তুরাগের কথাই বলায় আপনারা ভেবে নিয়েছেন সত্যিই পরবর্তীতে তুরাগ খুন হবে। তাই তুরাগের নিরপত্তার ব্যবস্থা করতে লেগে গেলেন। যদিও তা সফল হয়নি।

খুনি তার আগেই তুরাগকে কিডন্যাপ করে তুরাগের চ্যাপ্টার ক্লোজড করে ফেলেছে। কিডন্যাপ শুধু তুরাগকে নয় তার সাথে তিনজনকেও করেছে। অথচ খুনি চিরকুট শুধু তুরাগকে টার্গেট করার কথা বলেছে।

এর মানে খুনি যা আমাদের বার্তা দেয় তা তো করেই এবং তার সাথেও বাড়তি কিছু ও করে। তাছাড়া আমি সিওর খুনি আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে নেয়ার জন্যই এই চিরকুট গুলো দেয়। যাতে আমরা এসব নিয়ে পড়ে থাকি খুনি তার কাজ নিশ্চিন্তে করতে পারে। খুনি চিরকুট গুলো ইচ্ছে করেই দেয়। সে জানে চিরকুট পেয়ে ও আমরা তাদের খোঁজ করতে পারবো না। এ অব্দি যতগুলো চিরকুট পেয়েছেন সব গুলোই খুনির হাতের লেখা। আমি আন্দাজ করতে পারি খুনি অন্যের লেখা নকল করতে পারে।

সে যে কারো লেখা হুবুহু তার মতো করে লিখতে পারে। আপনি প্রতিভার লাশের সাথে পাওয়া চিরকুটই দেখুন। চিরকুটের লেখা গুলো হুবহু প্রতিভার হাতের লেখার মতো। তা দেখে আপনারা ধরে নিলেন চিরকুটটা প্রতিভার হাতের লেখা।

তারপর ভাবনায় লেগে গেলেন একটা মৃত মানুষ কিভাবে চিরকুট লিখতে পারে! তা নিয়ে চিন্তা গবেষনায় অনেক সময় ব্যয় করলেন। ঠিক এই এটাই চাচ্ছিলো খুনি। খুনি লাশের সাথে চিরকুট, নেম কার্ডগুলো দিয়ে খুনি আপনাদের মাইন্ড ডাইভার্ট করার চেষ্টা করেছিলো ইভেন সে সফল ও হয়েছে।”
“কিন্তু চিরকুটে তো অধরার ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া গেছে।

তা দেখেই তো আমরা এমনটা আন্দাজ করেছিলাম। প্রতিভা যদি চিরকুট না লিখে তবে চিরকুটে প্রতিভার আঙুলের ছাপ কিভাবে আসলো?”
অবাক হয়ে একরাশ কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো অধরা।

নিতিন উত্তর দিলো,
“প্রতিভাকে কিডন্যাপ করার পর আগে থেকে লিখে রাখা চিরকুটে প্রতিভার হাতের চাপ বসিয়ে দেয়া অসম্ভব কি?”
“তারমানে চিরকুট প্রতিভা নয় খুনি লিখে প্রতিভার হাতের ছাপ নিয়েছে তাই তো?”
“হ্যাঁ আমি আন্দাজ করছি তেমনি হয়েছে।

তো যা বলছিলাম, খুনি চেয়েছিলো অভিলাষকে আপনারা খুনি ভাবুন। তাই সব কিছু এমনভাবেই সাজিয়েছে যেন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অভিলাষকে খুনি ভাবেন। অভিলাষের রুম তল্লাশি করে আপনারা যত ক্লু পেয়েছেন সব খুনি ইচ্ছে করে আপনাদের জন্য রেখে গিয়েছে। আপনাদের পাওয়া ক্লু গুলো সব পরিকল্পিত। সেগুলোর সত্য মিথ্যার ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।

আমি আর কিছু কথা না বলি জাস্ট অভিলাষের রুমে পাওয়া রিসিটের কথা বলি। রিসিটে লেখা দোকানে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে আপনারা দেখলেন, এই ড্রেস নেকলেস এসব অভিলাষ কিনেনি। মাস্ক, আর টুপি পরা কেউ একজন কিনে নিয়েছে। যার চেহারা সিসিটিভি ক্যামেরা এবং দোকানদার কেউই দেখিনি। এটাও খুনি চেয়েছিলো।

সে জানতো পরবর্তীতে আপনারা ওই দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবেন তাই সে মাস্ক এবং টুপি পড়ে দোকানে গিয়েছে। সে চেয়েছিলো প্রথমে অভিলাষ দোষী সাব্যস্ত হোক। আপনারা যখন অভিলাষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন তখন খুনি তাদের পরবর্তী স্টেপের প্রস্তুতি নিবে। এবং তাদের হাতে বেশ কিছু সময় থাকবে। যার ফলে তারা রিল্যাক্স ভাবে তাদের মতো করে এগুতে পারবে। হলো ও তাই। আপনারা খুনির দেখানো পথ অনুযায়ী চললেন।

অভিলাষকে খুনি ভেবে সব মনোযোগ দিলেন অভিলাষের উপর। এই ফাঁকে খুনি তাদের পরবর্তী প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। তারপরই আপনারা বুঝতে পারলেন অভিলাষ নির্দোষ। খুনির প্ল্যান ছিলো অভিলাষকে প্রথমে দোষী ও পরবর্তীতে নিদোর্ষ সাব্যস্ত করা। অভিলাষের যখন খানিকটা নির্দোষ প্রমাণ হবে তখন তাকে মেরে দিবে। খুনি তার পরিকল্পনা অনুয়ায়ী সঠিক সময়ে অভিলাষকে মেরে দিলো।”
“অভিলাষকে মেরে দিলো যাতে আমরা অভিলাষকে নিয়ে পড়ে থাকি এই ফাঁকে খুনি তুরাগদের খুন করতে পারে, তাই তো?”
নিতিনের কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে বললো অধরা। নিতিন হেসে বললো,
“হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। এটাই টার্গেট ছিলো খুনির। খুনি চিরকুটটা ইচ্ছে করেই দিয়েছে। তার বিশ্বাস ছিলো আপনারা খুব সহজে চিরকুটের সংখ্যাটার মিনিং বের করতে পারবেন না। যদিও পারেন তবে ততক্ষণে খুনি তার কাজ সেরে ফেলবে। এখানেও খুনির পরিকল্পনা মাফিক সব হলো।

আপনি যতক্ষণে চিরকুটের সংখ্যার মানে বুঝতে পারলেন এবং পদক্ষেপ নিলেন ততক্ষনে খুনি তুরাগদের কিডন্যাপ করে ফেলেছে। আপনি যখন তুরাগদের নিখোঁজ নিয়ে বিশ্লেষণ করছিলেন তখন খুনি তুরাগদের খুন করে আগের জায়গায় রেখে গেলো।

এরপর সে আবারো সেই কাজ করলো যা ইতিপূর্ব থেকে করে আসছে। তা হলো, আমাদের মাইন্ড ডাইভার্টের চেষ্টা। তাই সে চিরকুট পাঠালো। চিরকুট সংখ্যাপদ্ধিতে খুনি এই জন্যই লেখে যাতে এর মিনিং সহজে বুঝতে না পারা যায়।

এর পিছনে অনেক সময় দেয়া লাগে। পুরো ধ্যান চিরকুটের উপর দেয়া লাগে। এখন চিরকুট পেয়ে আপনি আপনার প্রধান কাজ হিসেবে চিরকুটে লিখত সংখ্যার ব্যাখা বের করাকেই ধরে নিলেন। এবং চিরকুট নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বসে গেলেন। ব্যাখা বের করার পর আপনি বুঝতে পারলেন নেক্সট টার্গেট রক্সি। আপনি এবার রক্সিকে খুঁজতে এবং তার হিস্টোরি বের করতে লেগে যাবেন। এই ফাঁকে খুনিরা তাদের পরিবর্তী শিকারকে শিকার করে ফেলবে।

আপনি তাই বারবার করছেন যা খুনি চাচ্ছে। মূলত, আপনি খুনিকে নয়, খুনি আপনাকে ঘুরাচ্ছে। এই কথা ভেবেই আমার হাসি পেয়েছে। আমার হাসির কারণ এন্ড লজিক এটাই। আই থিঙ্ক এবার আপনি বুঝতে পেরেছেন রাইট?”

নিতিনের কথায় অধরা যেন বোকা বলে গেলো। তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। সে কি করতে চেয়েছে আর কি করেছে! সে চেয়েছিলো খুনি ধরতে অথচ কি করেছে? খুনিকে খুন করার সুযোগ করে দিলো! নিজের প্রতি নিজেরই রাগ হচ্ছে, পুরো বিষয়টা এমনভাবে খুতিয়ে দেখলো না কেন? সে এতদিনে যা খেয়াল করেনি নিতিন এসে ফাইল পড়ে আর ক্লু দেখে খানিকের মাঝে সব বের করে আনলো! অধরা কেনো পারলো না?

পরক্ষনেই অধরার মনে হলো, এই গোলাটে কাহিনীর প্যারায় তার মাথা নষ্ট হবার উপক্রম হয়েছে। এখনো যে পাগল হয়নি এটাই অনেক। রহস্যের গোলকধাঁধায় সে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অধরার ফ্যাকাশে মুখ দেখে নিতিন মুচকি হেসে বললো,
“আমরা খুনিদের জ্বালে পা না দিয়ে জ্বাল বিছিয়ে খুনিদের জন্য ফাঁদ পেতে কিন্তু রহস্যের সমাধান করতে পারি। একটা কথা মাথায় রাখবেন, সব ধ্যান একদিকে না দিয়ে চারদিকে দেয়া উচিত।

তবে চারদিক থেকে আসা সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে। অন্যথায়, একদিক নিয়ে পড়ে থাকলে তিনদিক থেকে ধেয়ে আসা সমস্যার চাপে পড়ে অস্তিত্ব হারাতে হবে। আর হতাশ হবেন না, আমরা ন্যায়ের পথে আছি, অন্যায়ে হার মানবো না। সত্যকে সবার সামনে আনবোই। সো চিল করুন। আর দেখুন আগে আগে কি হয়! “

অধরা চোখে মুখে বিরক্তি মাখিয়ে বললো,
“এমন কেস, এমন চালাক খুনি আমি বাপের জন্মে দেখিনি। আমার মাথা আওলাযাওলা হয়ে যাচ্ছে।”
অধরার কথায় নিতিন হেসে দিলো। যেই সেই হাসি নয় একেবারে অট্টহাসি। যেই হাসির ধ্বনিতে চারদিকটা মুখরিত হয়। নিতিনের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে সে প্রচন্ড হাস্যকর কথা শুনেছে। যা শুনে তার হাসি আওতাহীন হয়ে গেছে। খুবই মজা পেয়েছে সে।

নিতিন মানুষটা খুবই হাইস্যরসী৷ তার প্রফেশনটা গম্ভীর্য স্বভাবের হলেও সে খুব কমই সিরিয়াস থাকে। যত কঠিন কেস, যত কঠিন পরিস্থিতি হোক সে হেসেই মোকাবিলা করবে। হেসে হেসেই অন্যকে ফাঁস করবে এমন মনোভাব তার। এই জন্যই সে তার ডিপার্টমেন্টে খুবই জনপ্রিয় একজন মানুষ। সিনিয়রদের কাছে ও প্রিয় একজন নিতিন।
হাসতে হাসতে নিতিন বললো,
“নাইস জোক। নেক্সট প্লিজ!”
“আপনার কাছে এটা জোক মনে হচ্ছে! আমার অবস্থাটা বুঝার চেষ্টা করুন।”

অসহায় কন্ঠে বললো অধরা। নিতিন হেসেই জবাব দিলো,

“সাব ইন্সপেক্টর অধরা আনান, যে কিনা তার দুরদান্ত আর আর দুঃসাহসিক কাজের জন্য দুই দুই বার স্বর্নপদক পেয়েছে। যে নিশ্চিত হারকেও জয়ে পরিণত কিরে সে কিনা এত তাড়াতাড়ি হার মেনে নিচ্ছে তাও একটা খুনির কাছে! এটা আমার কাছে নিতান্তই হাইস্যকর মনে হচ্ছে।”

“আমার মনে হয় আমাদের কাজের কথায় ফিরে যাওয়া উচিত।”কথা ঘুরাতে বললো গম্ভীর কন্ঠে বললো অধরা। এই মুহুর্তে নিতিনের হাসির খোরাক হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। অধরার কথায় নিতিন এবারো মুচকি হাসি উপহার দিলো। হেসেই বললো,

“আপনি প্রতিভার লাশ দেখেছেন মিস অধরা?”
“হ্যাঁ।”
“প্রতিভাকে গলাটা খেয়াল করেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“প্রতিভাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে ফেলার পর প্রসাধনীর সাহায্যে দড়ির দাগটা ঢেকে ফেলা হয়েছে। যাতে সহজে ধরা না যায় কিন্তু সেই দাগ কিন্তু পরে ঠিকই সামনে এসেছিলো। জাস্ট সাময়িকের জন্য অদৃশ্য ছিলো। এই কেসটাও প্রতিভার গলার ওই দাগের মতো। যার প্রসাধনীর আড়ালে ভয়ংকর একটা দাগ আছে। আমরা এখনো প্রসাধনী দিয়ে ঢেকে রাখা গলাটাকেই দেখছি। ভিতরকার ভয়ংকর দাগটা দেখছিনা।

আমার যা দেখছি সত্যটা কিন্তু তা নয়, সত্যটা প্রসাধনীর মতো আড়ালে লুকিয়ে আছে। সেই সত্যটাকেই প্রসাধনীর মতো আবরণ থেকে সরিয়ে উন্মুক্ত করতে হবে। তবে দাগ দেখাটা আমাদের জন্য কঠিন এবং অসম্ভব কিছুনা। চিন্তা গবেষনার পরই আমরা দাগটা দেখতে পাবো। সো হতাশ হবেন না একবারেই। পরিশ্রম নয় বুদ্ধি দিয়ে কাজ করবেন তবে সহজেই সফল হবেন। ইংরেজিতে একটা কথা বলা হয়, legends always work smartly, not hardly. আমাদের বুঝে শুনে ফেলা একটা স্টেপ তাদের শত পদক্ষেপের উপর ভারি পড়বে।”

অধরা সায় জানিয়ে কিছু বলবে তার আগেই দরজায় করাঘাত করলো কেউ। অধরা নিতিনকে উত্তর দেয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দরজায় আসা মানুষটার দিকে নজর দিলো। স্বাভাবিক গলায় বললো,
“আসুন।”

কাঠের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো জিহাদ। তার হাতে একটা ফাইল। অধরা ফাইল দেখে বললো,
“ফরেনসিক রিপোর্ট এসে গেছে? “

“জ্বি ম্যাডাম।”বিনয়ের সাথে জবাব দিলো জিহাদ। অধরা হাত বাড়িয়ে বললো,

“দাও দেখি।”
জিহাদ অধরার দিকে ফাইলটা বাড়িয়ে দিলো। অধরা ফাইল হাতে নিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর টেবিলের উপর থাকা চিরকুটটা জিহাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“এটা ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোতে পাঠিয়ে দাও।”

“জ্বি ম্যাডাম।”বলে যাবার জন্য পা বাড়ায় জিহাদ।

নিতিন তখনো অধরার ডেস্কের অধরার বিপরীত পাশের চেয়ারটায় বসে কোলের উপর প্রতিভা কেসের ফাইলটা রেখে তাতে চোখ নিবদ্ধ করে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে। ফাইল থেকে চোখ না উঠিয়েই বললো,
“জিহাদ কড়া লিকারের এক কাপ চা পাওয়া যাবে?”

জিহাদ পিছন ফিরে একবার নিতিনের দিকে তাকালো। তাকিয়ে থেকেই বললো,
“জ্বি স্যার যাবে।”

“তবে কাউকে দিয়ে এক কাপ চা পাঠিয়ে দাও।”
“আচ্ছা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ম্যাডাম আপনার জন্য চা পাঠাবো?”
অধরার দিকে তাকিয়ে বললো জিহাদ। অধরা বললো,
“চা পেলে মন্দ হয় না। মাথাটা ধরে আছে।

পাঠিয়ে দাও।”
ফাইল দিতে গিয়ে চায়ের অর্ডার নিয়ে ফিরে এলো জিহাদ। নিতিনের মনোযোগ তখনো ফাইলের মাঝে। অধরা জিহাদের সদ্য আনা ফরেনসিক রিপোর্ট থাকা ফাইলটা দেখায় মনোযোগী হলো।
ফরেনসিক রিপোর্ট এ চোখ বুলিয়ে অধরা অবাক হলো।

কারণ ফরেনসিক রিপোর্ট তেমনটাই বলছে যেমনটা নিতিন বলেছিলো। তিনজনকেই প্রথমে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। তারপর গায়ে এসিড দিয়ে পুরো শরীর ঝলসে দিয়েছে। স্বরূপা এবং শিলার সাথে কোন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হয়নি।

তিনজনের মৃত্যু হয়েছে আনুমানিক দু’দিন আগে।এই দুদিন লাশকে ফ্রিজ এবং মেডিসিনের সাহায্যে সচল রেখেছে। মৃত্যুর দু’দিন হলেও এসিড ঢালার বেশি সময় হয় নি। লাশ ফেলে যাওয়ার আগেই লাশের গায়ে এসিড দিয়ে পুরো শরীর ঝলসে দেয়া হয়েছে।

মৃত্যু যদি দু’দিন আগে হয় তবে তাদের মৃত্যু হয়েছে নিখোঁজ হওয়ার দিনই। খুনি তাদের কিডন্যাপ করে কোথাও নিয়ে গিয়ে খুন করেছে।খুন করে ফ্রিজ এবং মেডিসিন ব্যবহার করেছে লাশ সচল রাখার জন্য। প্রশ্ন হলো, এদের মৃত্যু দু’দিন আগে হলে খুনি দু’দিন আগে এদের রেখে গেলো না কেনো!

দুইদিন অপেক্ষা করার কারণ কি! কোথায় রেখেছে এদের? আর খুনি কে? খুনি কি প্রভাত মির্জার শত্রু! প্রভাত মির্জা এত বড় শিল্পপতি তার হাজারো শত্রু থাকতে পারে। কোথাও তারা এই কাজটা করেনি তো! নাকি খুনিই প্রভাত মির্জা। এমন না যে এই খুন তিনিই করাচ্ছেন অন্য কাউকে দিয়ে! নাকি তিহানা জাহান খুনি।

খুনি যদি প্রভাত মির্জা না হয় তবে তিহানা জাহান হতে পারে। কিন্তু তিনি নিজের স্বামী সন্তান জামাতাকে কেনো খুন করবেন? এমন না যে তিনি প্রতিভার সৎমা, সম্পত্তির জন্য এমন করবেন। তিনি তো প্রতিভাত গর্ভধারিণী মা, আর বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় নিজের নামে অনেক সম্পত্তি আছে তিহানা জাহানের। সে হিসেবে তার এসবে লোভ থাকার কথা নয়। তিনি যদি মেরে থাকেন তবে তিনি কেনো মারলেন?

মূল খুনি কে? কি চায় সে? এই খুন গুলো কি সম্পত্তির জন্য নাকি পূর্বশত্রুতার জের ধরে হচ্ছে? আবারো এক ঝাক প্রশ্ন এসে মাথায় ঝেকে বসলো অধরা। নিতিন ফাইল থেকে চোখ তুলে এক পলক অধরার দিকে তাকালো। তারপর সেকেন্ড দশেক আগে জিহাদের রেখে যাওয়া দুটো চায়ের কাপের একটা হাতে নিলো। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো,

“মিস অধরা আমার কথা কি মিলেছে?”
“হ্যাঁ।”
ভাবনা ছেড়ে ছোট করে উত্তর দিলো অধরা। নিতিন বললো,
“তাহলে তো হলোই। আগে ভেবেছিলাম ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর খুন সম্পর্কে আন্দাজ করবো। এখন তো দেখি আগেই আন্দাজ করতে পারছি। যাক গে, তাড়াতাড়ি চা শেষ করুন আমাদের এক জায়গায় যেতে হবে।”
“কোথায় যাবো?” ফাইল থেকে চোখ তুলে কপাল কুঁচকে বললো অধরা।

“আমি তুরাগের ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখতে চাই। আমার মনে হচ্ছে আমি ওখানে কোন ক্লু পাবো। আপনি কি যাবেন আমার সাথে?”

প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বললো নিতিন। অধরা মুচকি হেসে বললো,
“কেনো নয়? চলুন। এই কেস যত তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারি বাঁচি আমি।”
*
তুরাগের ফ্ল্যাটে পুলিশ সিল মেরে দিয়েছিলো। প্রতিভার মৃত্যুর পর তুরাগ ও শ্বশুর বাড়ি ধানমন্ডিতে চলে গিয়েছিলো যার ফলে তুরাগের ফ্ল্যাটটা এখনো তালা দেয়াই আছে। আর কেউ যায় নি। চাবি পুলিশের কাছে। ভুঁইয়া ভিলার সিকিউরিটি বাড়ানো হয়েছে। সেই ঝোপের আশপাশে পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে যাতে রক্সির ডেডবডি দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ খুনিকে হাতে নাতে পাকড়াও করতে পারে।

ভুঁইয়া ভিলায় পৌঁছে আরো একবার সিকিউরিটি চেক করলো নিতিন। দেখলো সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করছে কিনা! নাহ, সবাই ঠিকঠাক ভাবেই কাজ করছে। সিকিউরিটি চেক করে পকেট থেকে গ্লাভস বের করে হাতে পরতে পরতে সিড়ি ভেঙে তুরাগের ফ্ল্যাটের দিকে এগুলো। ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে চারদিক পরখ করতে লাগলো। দরজায় আটকানো নেমপ্লেটটার দিকে খানিক তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

মনে মনে আওড়ালো, ‘ মানুষ মরে যায় রেখে যায় স্মৃতি। তুরাগ প্রতিভা দুজনেই মারা গেছে কিন্তু তাদের সাজানো সংসার আর হাজারো স্মৃতি দাঁড়িয়ে আছো আজো অমলিন।’ খট করে দরজা খোলার আওয়াজ কান অব্দি পৌঁছাতেই নিতিনের ধ্যান ভাঙলো। বাস্তবে ফিরে দেখলো আদাবর দরজা খুলে তাকে ভিতরে যাবার আহ্বান জানাচ্ছে। নিতিন ধীর পায়ে ফ্ল্যাটে ডুকলো।

তার পিছন পিছন অধরা ও ঢুকলো। অধরা এর আগে বেশ কয়েকবার এলেও নিতিন এই প্রথমই আসছে তুরাগের ফ্ল্যাটে। তাই সে তার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সব কিছু পরখ করার কাজে লেগে গেলো। ড্রয়িং, ডাইনিং রুমের প্রতিটা জিনিস নড়েচড়ে দেখলো। নিতিনের মনে হচ্ছে এই ফ্ল্যাটে কেউ থাকে। সব কিছু কেমন পরিস্কার! একটা ধূলোময়লা ও নেই। প্রতিভার মৃত্যুর আজ প্রায় দশদিন হতে চললো। প্রতিভার মৃত্যুর পর ফ্ল্যাটটা বন্ধ থাকলে ধুলোবালি জমে যাওয়ার কথা।

কিন্তু এটা পরিস্কার কেনো! তাছাড়া কিচেন টাও কেমন অগুছালো, যেন কেউ রান্না করেছে। তবে কি সত্যিই এখানে কেউ থাকে? থাকলেও কিভাবে! বাইরে কড়া নিরপত্তা, ফ্ল্যাট মেম্বার ছাড়া বাইরের কাউকে ভিতরে এলাউ করছে না পুলিশ। আর ফ্ল্যাটের চাবি পুলিশের কাছে কেউ এখানে আসবে কিভাবে?

আর ফ্ল্যাটে ঢুকবে কিভাবে!
মনে খটকা নিয়ে নিতিন প্রতিভার বেডরুমে গেলো। বেডরুমের সব কিছু যখন খুতিয়ে দেখছিলো তখন গেস্ট রুম থেকে অধরার ডাক এলো। অধরা খানিক চেঁচিয়েই বললো,
“মি.নিতিন এদিকে আসুন।”

ক্লু পেয়েছে ভেবে এক প্রকার দৌড়ে ডাইনিং স্পেচের পাশে অবস্থিত গেস্টরুম এ গেলো। বেডরুমের দরজায় গিয়ে ভিতরে চোখ বুলাতেই নিতিন বিস্ময়ের সপ্তম আকাশে পৌঁছে গেলো। তার সামনে রুমের মাঝখানে বেডের উপর সিলিং ফ্যানের সাথে দড়ি বেধে সেই দড়িতে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় ঝুলে আছে প্রভাত মির্জা। তা পা দুটো বেডের আড়াই ফুট উপরে ঝুলানো।

বেডের এক কোণে কাত হয়ে পড়ে আছে দুই ফুট লম্বা বাদামী রঙের একটা বেতের মোড়া। এই মোড়ার উপর উঠেই হয়তো গলায় ফাঁস লাগিয়েছেন প্রভাত মির্জা। ফাঁস লাগানোর পরে মোড়া পা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন তাই কাত হয়ে অন্য দিকে পড়ে আছে।

প্রভাত মির্জার গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা। মাথা ডান দিকে কাত করা। জিহ্বাটা ছয় কি সাত ইঞ্চি বের হয়ে ঠোঁটের ডান কোণে বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে। জিহ্বায় কামড় দেয়া, জোরে কামড় দেয়ার কারণে জিহ্বা কেটে গিয়েছে বেশ কিছুটা। কাটা জায়গাটা থেকে রক্ত জিহ্বা গড়িয়ে বুকের উপর পড়ছে। বুকের ডান পাশে কয়েক ফোঁটা রক্ত দেখা যাচ্ছে সেগুলো শুকিয়ে গেছে। ফর্সা মুখটা কালো বর্ণ ধারণ করেছে।

অতি কষ্টে মরেছে কিনা। নিতিন দরজায় দাঁড়িয়ে মিনিট দুয়েক সময় নিয়ে প্রভাত মির্জাকে পরখ করলো। তারপর বেডের দিকে এগুলো। তার চোখ বেডের সাইড টেবিলে ল্যাম্পের পাশে রাখা খাতাটায়। নিতিন খাটের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খাতাটা হাতে নিলো। খুলে রাখা খাতার উপর পেজে লেখা,
“আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।

আমি সেচ্ছায় স্বজ্ঞানে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিয়েছি।”
সুইসাইড নোটে লেখা পড়ে হাসলো নিতিন। তার থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অধরার তখনো লাশের দিকে তাকিয়ে ভাবনার জগতে বিচরণ করছে।

প্রভাত মির্জার সুইসাইড নোটের লেখাটা আগেই নজরে এসেছে তার। সে ভাবছে, সুইসাইড নোট দেখে বুঝা যায় প্রভাত মির্জা সুইসাইড করেছে। কিন্তু তিনি সুইসাইড করলেন টা কেনো! যদি সুইসাইড করেন তবে এইখানে এসেই কেনো করলেন?

আর এত কড়া নিরপত্তার পর ও প্রভাত মির্জা এখানে এলেন কিভাবে! যদি মার্ডার হয় তবে খুনি প্রভাত মির্জাকে নিয়ে এখানেই কেনো এলো? সে চাইলে অন্যকোথাও ত মারতে পারতো। এখানেই কেনো!


পর্ব-৯

“এটা সুইসাইড নয় এটা বাকি সব গুলোর মতোই মার্ডার।”
প্রভাত মির্জার লাশ নামিয়ে খুতিয়ে দেখতে গিয়ে বললো নিতিন।

নিতিনের কথায় চমকে উঠলো অধরা। ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কিভাবে বুঝলেন! লাশ আর সুইসাইড নোট দেখে তো সুইসাইডই মনে হচ্ছে।”
অধরার কথায় নিতিন হাসলো।

হাসিটা ঠোঁটের কোণে বজায় রেখেই বললো,
“মিস অধরা আপনি কি আবারো খুনির দেখানো পথ ধরেই এগুনোর কথা ভাবছেন?”
সেকেন্ড দশেক লাগলো নিতিনের কথাটা অধরার বুঝে আসতে। নিতিনের কথার ভাবার্থ বুঝতে পেরে এবারো বোকা বনে গেলো অধরা। তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।

আবারো একি ভুল করতে যাচ্ছে সে! সে কিভাবে ভুলতে পারে খুনির চতুরতার কথা, নিতিনের চিরকুট ব্যাখ্যার কথা! কিভাবে! ভাবতেই নিজের উপর কপট রাগ হলো অধরার। খুনি তো তাদের মাইন্ড ডাইভার্ট করার জন্য চিরকুট পাঠায়। এটাও তেমনি চিরকুট হতে পারে। বরাবরের মতো এবারো অধরার ফ্যাকাসে মুখ দেখে হাসলো নিতিন। বললো,
“একি ভুল বারবার করবেন না।

বরাবরের মতোই এবারো খুনি নিজ হাতে চিরকুট লিখেছে। প্রভাত মির্জার হ্যান্ড রাইটিং নকল করেছে।”
শান্ত কন্ঠে অধরা বললো,

“হ্যাঁ বুঝলাম। আশা করছি এটা মাথায় থাকবে। তবে এটা যে আত্মহত্যা নয় তা কিভাবে বুঝলেন?”
“আপনি প্রভাত মির্জার কাটা জিহ্বার উপর নজর দিন ব্যাপারটা আপনার কাছেও ক্লিয়ার হয়ে যাবে।”
প্রভাত মির্জার ঝুলে থাকা জিহ্বার দিকে ইশারা করে বললো নিতিন। নিতিনের ইশারা অনুসরণ করে প্রভাত মির্জার জিহ্বার দিকে সুক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকালো অধরা।

সাথে সাথে তার চোখে মুখে বিস্ময় দেখা গেলো। তার বিস্ময়ের কারণ হলো প্রভাত মির্জার জিহ্বার কাটা দাগ। ঝুলন্ত অবস্থা দূর থেকে দেখতে দাঁতের চাপ পড়ে কেটে গেছে এমনটা মনে হলেও কাছে গিয়ে অতিব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করলে বুঝা যাবে দাঁতের চাপে নয় এটা ধারালো ছুরি দিয়ে আকাঁ সরু রেখা। এটাই মার্ডার প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

কারণ কেউ সুইসাইড করতে গিয়ে গলায় ফাঁস লেগে যখন জিহ্বা বের হবে তখন সে নিজের জিহ্বায় ছুরি চালানোর মতো অবস্থায় থাকে না। ছুরি চালানো তখনি যায় যখন কেউ তাকে খুন করে। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে অধরা বেডের এক কোণে পড়ে থাকা মোড়ার দিকে তাকালো।

সে ভাবছে এটা মার্ডার হলে এই মোড়ার কি কাজ! অধরার চাহনি বুঝতে পেরে নিতিন বললো,
“মোড়াটা খুনি নিজের জন্য ব্যবহার করেছে। প্রভাত মির্জাকে এই রুমে মারেনি। ড্রয়িং কিংবা ডাইনিং রুমে মেরেছে। ড্রয়িং ডাইনিংয়ের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অন্তত তা বলে। তারপর এখানে এনে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঝুলিয়ে দেয়ার পর মোড়ার উপর দাঁড়িয়ে প্রভাত মির্জার জিহ্বা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।

এমনটাই আমার ধারণা। তবে একটা মজার ব্যাপার হলো এতদিন খুনি আমাদের চমকেছে আর আজ আমরা আকস্মিক তুরাগের ফ্ল্যাটে এসে খুনিকে চমকে দিলাম। এবং তাদের প্ল্যানের পানি পেলে দিলাম। ভাবতেই ভালো লাগছে। আহহারে বেচারার এবং বেচারার গ্যাং! “

চোখে মুখে খুশির আভা ফুটিয়ে বললো নিতিন।

অধরা কৌতুহলী হয়ে বললো,
“আপনি বলতে চাচ্ছেন খুনি জানতো না আমরা এখানে আসবো আর লাশ দেখেবো, তাই তো?”

“এক্সাক্টলি। খুনিরা কল্পনা ও করতে পারেনি যে আজ এভাবে প্রভাত মির্জা এক্সপোজ হয়ে যাবে। আমার ধারণা, খুনিরা আজ রাতে প্রভাত মির্জাকে প্রতিভার মতো প্যাকিং করে তিহানা জাহানের কাছে মানে মির্জা হাউজে পাঠাতো। আর কাল সকালে সবাই দেখতো। কিন্তু তার আগেই আমরা এসে প্রভাত মির্জার লাশ দেখে ফেললাম।

বেচারাদের প্রভাত মির্জার লাশ ট্রাভেল ব্যাগে ভরে র‍্যাপিং পেপার মোড়ানো হলো না। এবার কি হবে খুনি গ্যাংয়ের!”

তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো নিতিন। অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“প্রভাত মির্জার লাশ যে প্রতিভার মতো প্যাক করবে আপনি কিভাবে বুঝলেন!”
অধরার প্রশ্নের জবাবে নিতিন মুচকি হেসে রুমের এক কোণে থাকা কাঠের সোফার দিকে ইশারা করলো। বললো,
“সোফার নিচের দিকে তাকান। সেখানে একটা লাল রঙা ট্রাভেল ব্যাগ আছে। আমার ধারণা ট্রাভেল ব্যাগের ভিতর র‍্যাপিং পেপার, কাঁচি আর স্কেচ টেপ সব আছে।

সব কিছু গুছিয়ে রেখেছে রাতে প্যাকিং করবে বলে।”
অধরা সোফার নিচে তাকিয়ে অবাক হলো। সত্যিই সোফার নিচে একটা লাল রঙা ট্রাভেল ব্যাগ রাখা। অধরা অবাক হয়ে সোফার কাছে গেলো। হাটু ভেঙে বসে সোফার নিচ থেকে ট্যাভেল ব্যাগটা বের করলো। বিশাল আকারের ট্রাভেল ব্যাগ। একবারে নতুন চকচকে। অধরা নিতিনের কথা মিলে কিনা দেখার জন্য একরাশ কৌতুহল নিয়ে ব্যাগের চেইন খুললো।

ব্যাগের চেইন খুলে ভিতরটা প্রকাশ করতেই অধরা বিস্ময়ী ভাবটা আরো বেড়ে গেলো। সত্যিই ভিতরে লাল রঙা হাতলের একটা কাচি, লাল রঙের র‍্যাপিং পেপার ভাজ করা, আর সাদা রঙের স্কেচ টেপ। একটা সাদা রঙের ট্যাগ কার্ড ও আছে। তারমানে সত্যিই খুনিরা প্রতিভার লাশের মতো প্রভাত মির্জার লাশ ও প্যাকিং করার পরিকল্পনা করেছিলো কিন্তু নিতিনের হঠাৎ এখানে আসার পরিকল্পনায় তা ভেস্তে গেলো। নিতিনের বিচক্ষণতা মুগ্ধ করলো প্রতিভাকে। অধরা মুচকি হেসে বললো,
“মি.নিতিন আপনার বুদ্ধিমত্তা দারুণ।”

জবাবে নিতিন হাসলো। হেসে বললো,
“হয়তোবা। তবে একটা কথা না বললেই নয়, আমরা এখানে এসে খুনি গ্যাং কে প্রচুর সারপ্রাইজ করেছি। খুনিরা তাদের সারপ্রাইজের মাধ্যমে পুরো দেশ হেলিয়ে দিয়েছে। আমরা এবার সেই খুনিদেরকে সারপ্রাইজ দিতে দিতে তাদের জীবন ফাঁস করবো। ইশ!

আজ যদি তাদের মুখখানা দেখতে পেতাম! নিচে এসে সিকিউরিটি চেক করার নামে সময় নষ্ট না করলে আজ হাতে নাতে ধরতে পারতাম। চান্স মিস করলাম।”
শেষের কথা গুলো বলার সময় একরাশ আফসোস স্পর্শ করলো নিতিনের গলায়।

অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“নিচে কড়া সিকিউরিটি, ফ্ল্যাটের চাবি পুলিশের কাছে। এতসব ডিঙিয়ে খুনিরা এখানে আসলো কিভাবে? আর প্রভাত মির্জাকে ও আনলো কিভাবে?”

অধরার কথার প্রতুত্তরে নিতিন বললো,
“ভুঁইয়া ভিলার পিছন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদ ভিলা। দুই বিল্ডিংয়ের দূরত্ব একবারে নেই বললেই চলে। ফরিদ ভিলার সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠে লাফিয়ে এক ছাদে আসাটা অসম্ভব নয়।

তারা এভাবেই এসেছে বলে আমার ধারণা। আর প্রভাত মির্জাকে ব্ল্যাকমেইল করে আনাটাও খুব কঠিন নয় তাদের কাছে। আর রইলো কড়া সিকিউরিটির কথা, সিকিউরিটির ব্যাপারটা তাদের স্পর্শই করতে পারেনি।

তারা রাতের আধারে এসেছে। তাছাড়া ফরিদ ভিলা ভুঁইয়া ভিলার পিছনে হওয়ায় ভুঁইয়া ভিলার সামনে থাকা পুলিশের নজরে একদমি পড়ার কথা নয়। আর
আমি যতটুকু জানি ফরিদ ভিলায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা নেই।

এই ব্যাপারটা তাদের আরো কাজকে সহজ করে দিয়েছে হয়তো।”
“কিন্তু চাবি? তুরাগের ফ্ল্যাটের চাবি তো পুলিশের কাছে আছে।

আর ভুঁইয়া ভিলার ছাদের দরজাও তালা মারা থাকে। চাবিটা ও নিচে অবস্থানরত পুলিশের কাছে। পুলিশের সাহায্য ছাড়া তাদের এই ফ্ল্যাটে আসা সম্ভব না। তবে কি এসবে পুলিশ ও জড়িত ছিলো?”

ভাবুক কন্ঠে বললো অধরা। নিতিন মুচকি হেসে বললো,
“মিস.অধরা আপনি অতি গভীরে চলে যাচ্ছেন। সহজ ভাবে ভাবুন।

প্রযুক্তির যুগ এখন। এখন সাবানে চাবি বসিয়ে ছাপ নিয়ে সেই ছাপ অনুসরণ করে চাবি বানানো যায়। আর এটা তো সামান্য তালা! এখন তালাগুলোর ছবি তুলে নিয়ে কি মেকানিককে দেখালে সে বলতে পারবে কোন তালা কোন চাবি।

সে অনায়েসে বানিয়ে দিতে পারবে। খুনিরা অতি সচেতন। পুলিশের সাহায্য নিয়ে রিস্ক কাধে নিবে না। তাই এই ট্রিকসই ফলো করেছে যথাসম্ভব।”
“এত ঠান্ডা মাথায় সব কিছু কিভাবে সামলায় তারা! সব কিছু একদম পারফেক্ট! কোন ক্লু রাখে না।”
“আপনার কথার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুনির উপর ইম্প্রেশড?”

মজা করে বললো নিতিন। অধরা ভ্রু কুঁচকে নিতিনের দিকে তাকালো। নিতিন হেসে বললো,
“না মানে আপনার কথার ধরণ দেখে তাই মনে হলো।”

অধরা গম্ভীর সুরে বললো,
“মি.নিতিন আমরা এখানে একটা কাজের জন্য এসেছি। আই থিঙ্ক, আজাইরা সময় না কাটিয়ে কাজে ফোকাস করা উচিত।”

“ইয়াহ, ইউ আর রাইট। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনি লাশের কাছে থাকুন। আমি তুরাগ প্রতিভার বেডরুমটা পর্যবেক্ষন করে আসি। ওই রুমের তল্লাশি করতে গিয়ে মাঝপথে তল্লাশি থামিয়ে এখানে এসে পড়েছিলাম। যাই আমি।”

হেসে বললো নিতিন। অধরা যে তাকে অপমান করেছে তার রেশমাত্র নেই নিতিনের চেহারায়। সে দুই হাত প্যান্টের পকেটে হাত রেখে হেলে দুলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। অধরা ব্যস্ত হয়ে গেলো লাশ দেখতে।

তুরাগ-প্রতিভার বেড রুমের দেয়ালে টাঙানো একটা ফটোফ্রেমের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিতিন। ফটোফ্রেমটায় ভেসে উঠেছে একটা হাস্যজ্বল সুদর্শন মানবের মুখ। যাকে ক’দিন আগেও সবাই তুরাগ বলে চিনতো। এখন তার নামের সাথে আরো একটা শব্দ যুক্ত হয়েছে তা হলো মৃত।

মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে যে সেই তো মৃত। তুরাগ তো কারো প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ভয়ংকররূপে ধেয়ে আসা মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে। নিতে বাধ্য হয়েছে।
চতুর্ভুজাকৃতি রঙিন ছবিটার স্থান দেখে আন্দাজ করা যায় এটা ইন্দোনেশিয়ার বালিতে তোলা। ফটোফ্রেমের সাথে ট্যাগ কার্ড ঝুলানো। তাতে লেখা ‘ তুরাগের প্রথম ফরেন ট্রিপ।’

লেখাটা চিনতে অসুবিধা হলো না নিতিনের। রুমের এক কোণে বোর্ডে আটকানো প্রতিভা শিরোনামের নিচে থাকা চিরকুটগুলোর লেখার সাথে এই লেখাটা মিলে যায় হুবহু। এটা প্রতিভার লেখা।

নিতিন ট্যাগ কার্ডের লেখার দিকে খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর ছবির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলো। ভাবনা শেষে পুরো রুমের প্রতিটা জিনিস খুতিয়ে দেখলো। তেমন কিছুই চোখে পড়লো না আর। তল্লাশি শেষে বেডরুম থেকে বের হলো সে।

ড্রয়িং ডাইনিং তল্লাশি করার ভান করলো কিছুক্ষণ। তারপর আবার গেস্টরুমে ফিরে গেলো। প্রভাত মির্জার লাশ মেঝেতে শোয়ানো। অধরা লাশের দিকে তাকিয়ে লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিতিন গিয়ে অধরার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো।

তারপর লাশের দিকে তাকিয়ে একেবারে নিচু গলায় বললো,
“আপনি যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকুন। আমার কথা শুনার সময় কিংবা আগে পরে আমার দিকে তাকাবেন না। যা বলছি মনোযোগ দিয়ে শুনুন।”

নিতিতের কথায় অধরা অবাক হলেও প্রকাশ করলো না। লাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,
“জ্বি বলুন।”

নিতিন এবার সোফার সামনে থাকা সেন্টার টেবিলের কাছে গেলো। সেন্টার টেবিলের উপর থাকা পত্রিকাটা হাতে নিলো। পত্রিকায় চোখ বুলানোর ভান করে আবারো অধরার পাশে এসে দাঁড়ালো। অধরা নিতিনের গতিবিধি লক্ষ্য করছে আর অবাক হচ্ছে। সে বুঝতে পারছেনা নিতিন কি করতে চাইছে। তবে এইটুকু বুঝতে পারছে যে নিতিন কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়েই এসব করছে। কিন্তু কি করতে চাইছে!

এমন ভাবনা যখন মনে আওড়াচ্ছে তখন পাশ থেকে নিতিন পত্রিকা চোখ রেখে মিনমিনে গলায় বলে উঠলো,
“মিনিট তিনেক পরে আপনার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসবে। ম্যাসেজ আসার পর আপনি ফ্ল্যাট তল্লাশি করার ভান করে ব্যালকনিতে যাবেন। তারপর ফোন বের করবেন। সেখানে গিয়ে এমন ভান করবেন যেন আপনি তল্লাসি করছেন আর মাঝে সময় দেখার প্রয়োজন বোধ করছেন।

তাই ফোন বের করে টাইম দেখছেন। ফোন বের করে অবশ্যই প্রথমে ফোনের ব্রাইটনেস কমিয়ে দিবেন। এবং টাইম দেখার ভান করে ম্যাসেজটা দেখে নিবেন।”

বলে নিতিন হেসে দিলো। নিতিনের ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে পত্রিকা পড়ে হাসছে। নিতিনের কথায় অধরা অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না। লাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। নিতিন তখনো পত্রিকা পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। খানিক পরে নিতিনের ফোন বেজে উঠলো। ফোনের রিংটোন কানে যেতেই নিতিন পত্রিকা বন্ধ করে এক হাতে নিয়ে আরেক হাত দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করে কানে দিলো। কথা বলতে বলতে পত্রিকাটা যথাস্থানে রেখে গেস্টরুম হয়ে তুরাগের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলো। নিতিন সব কিছু এমন ভাবে করলো যে সন্দেহ করার কোন পথই রাখলো না।

মিনিট তিনেক পর অধরার ফোনে টুং করে আওয়াজ হলো। অধরা বুঝলো যে নিতিনের বলা সেই ম্যাসেজ এসে গেছে। অধরা তল্লাশি করার ভান করে ব্যালকনিতে গেলো। ফোনের ব্রাইটনেস কমিয়ে খানিক আগে আসা ম্যাসেজটা ওপেন করলো।

“আমি নিতিন। আমাকে এখান থেকে চলে যেতে যাচ্ছে অন্য একটা কাজে। এদিকে আজ আর ফিরবো না। তাই এদিকটা আপনি সামলে নিন।লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিন।

তারপর পুরো ফ্ল্যাট আরেকবার তল্লাসি করুন। ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোকে দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রতিটা জিনিস চেক করুন। আমার ধারনা আমরা আসার আগ অব্দি খুনিরা এখানেই ছিলো। আমাদের আসার খবর পেয়ে পালিয়েছে। সো, তাদের ফিংঙ্গার প্রিন্ট থাকার কথা। কিচেন আর ডাইনিং স্পেচটা ভালো করে ঝাক করবেন। আর সেটা অবশ্যই আপনার উপস্থিতিতে।

সব কিছু আপনি নিজে পরখ করবেন। আর
আমার মনে হয় ফ্ল্যাটে সিসি ক্যামেরা আছে। এন্ড এই মুহুর্তে খুনিরা ফ্ল্যাটে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা দেখছে। তাই আপনাকে ব্যালকনিতে যেতে বলা। ব্যালকনিতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার সম্ভাবনা নেই। আমি কোনভাবেই চাই না খুনিরা জানুক আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি খুনিদের চমকে দিতে চাই।

তারা আমার গন্তব্য জানলে হুশিয়ার হয়ে যাবে, যা আমি চাচ্ছি না। তাই আপনাকে সরাসরি না বলে ম্যাসেজের মাধ্যমে বলছি। শুনুন, ফ্ল্যাটের প্রতিটা রুমে সি সি ক্যামেরা আছে বলে আমার ধারণা। তারা অতি সুক্ষ্ম জায়গায় রেখেছে সম্ভবত। যা অতি সুক্ষ্মভাবে না দেখলে চোখে পড়বে না। সিসি ক্যামেরা খুঁজে পেলে সাথে সাথে জব্দ করুন।

তবে অফ করবেন না। জাস্ট কালো কাপড় বা টিস্যু দিয়ে মুড়ে নিবেন। লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে তিহানা জাহানকে খবর দিতে ভুলবেন না। তিহানা জাহানকে খবর দেয়ার পর স্বরূপার বয়ফ্রেন্ড মৃদুল এবং প্রতিভার কাজিন ডাঃ কৌশিককে পুলিশ পাঠিয়ে থানায় নিয়ে যান। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করুন।

কোন ক্লু পেলেও পেতে পারেন।আপনার সাথে আমার কাল সকালে দেখা হবে। আমার সাথে থাকবে শকিং নিউজ। ততক্ষণ অব্দি ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। “
একদমে ম্যাসেজ পড়ে শেষ করলো অধরা।

ম্যাসেজ পড়ে বুঝতে পারলো নিতিনের উদ্ভট আচরণের কারণ। বুঝে একটা চাওয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো, “পুলিশ আসামীদের উপর নজর রাখে, আর আমার বেলায় আসামী পুলিশের উপর নজর রাখছে। কি দিনকাল আসলো রে!
অধরা তেমনটাই করলো যেমনটা নিতিন তাকে করতে বলেছিলো। প্রভাত মির্জার লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়ে তুরাগের ফ্ল্যাট তল্লাশি করলো।

ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোকে দিয়ে সবকিছু চেক করালো। তারা সব কিছু চেক করে সন্দেহ জনক কিছু জিনিস পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ল্যাবে নিয়ে গেছে। তুরাগের ফ্ল্যাটের কাজ শেষে অধরা পুলিশ পাঠালো ডাঃকৌশিক এবং মৃদুল থানায় নিতে। এরপর সে নিজে ফোন করলো তিহানা জাহানের কাছে।

উদ্দেশ্য প্রভাত মির্জার মৃত্যুর খবর তাকে দেয়া। কয়েকবার ফোন করেও তিহানা জাহানকে পাওয়া গেলো না। শেষে মির্জা হাউজের ল্যান্ড লাইনের ফোন করলো। দু’বার বাজার পর এক কেয়ারটেকার ফোন রিসিভ করে জানালো যে, প্রভাত মির্জার মৃত্যুর খবরটা লিক হওয়ার পর যখন টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছিলো তখন তিহানা জাহানের চোখে তা পড়ে। স্বামীর করুণ মৃত্যুর কথা শুনে এবং দেখে সইতে না পেরে সাথে সাথে হার্ট অ্যাটাক করেন।

কয়েকজন সার্ভেন্ট তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। বর্তমানে তিনি হাসপালাইড। শুনে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অধরা। ফোন রাখতেই জিহাদ কল করলো।

কল রিসিভ করতেই অপাশ থেকে জিহাদ বললো,
“ম্যাডাম আমরা মৃদুলকে ধরতে তার বাসায় এসে জানতে পেরেছি স্বরূপার এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে না পেরে মানষিক ভারসাম্য হারিয়েছে মৃদুল। সে এখন মানষিক হাসপাতালে ভর্তি আছে। আর ডাঃ কৌশিককে তুরাগরা নিখোঁজ হওয়ার দিন রাতে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে কে বা কারা কুপিয়ে জখম করেছে।

সেও এখন হাসপাতালে আছে। আমরা হাসপাতালে গিয়েছিলাম তারা কেউই এখনো জবানবন্দি দেয়ার অবস্থা আসে নি।”
“আচ্ছা আপনারা ফিরে আসুন।”

গম্ভীর কন্ঠে বললো অধরা। ফোন রেখে বললো,
“ডাঃকৌশিককের উপর হামলাও খুনিদের কাজ। এই খুশি গুলো একবার হাতে।
পাই হাজারটা মামলা দিবো।”
*
পরদিন সকালে থানায় গিয়ে ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে বসলো অধরা। ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে ইটস এ সুইসাইড। বডিতে প্রভাত মির্জা ছাড়া কারো কোন আঙুলের ছাপ নেই। প্রভাত মির্জার মৃত্যুটা গলায় ফাঁস দেয়ার কারণেই হয়েছে। এবং জিহ্বার কাটা দাগও দাঁতের আঘাতে হয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি কোন কিছু চরম হতাশায় ভুগছিলেন।

যা তার ব্রেইনে ইফেক্ট করেছে। তিনি ডিপ্রেশনের ভারী মেডিসিন ও নিচ্ছিলেন। ফরেনসিক রিপোর্ট পড়ে সবটা মেনে নিতে পারলেও জিহ্বার কাটা দাগের কথা মানতে পারলো না অধরা। সে প্রভাত মির্জার জিহ্বা দেখে বেশ বুঝেছে এটা ছুরির রেখা। তবে রিপোর্ট এমন বলছে কেনো! আচ্ছা ফরেনসিক রিপোর্ট ভুল আসলো না তো? এমন নয় তো যে কেউ রিপোর্ট পাল্টিয়ে দিয়েছে!

কিন্তু ফরেনসিক তো সি আই ডি এর আন্ডারে। আর তারা সবাই স্ট্রিক্ট। কেউ এমন কাজ করবে বলে মনে হয়না। আচ্ছা এমন না তো যে খুনি গ্যাংয়ের কেউ একজন ফরেনসিক বিভাগে আছে। সেই রিপোর্ট পাল্টে দিয়েছে! হতেই পারে। খুনিরা যা চতুর এমনটা হওয়া অসম্ভব না।

“আসতে পারি?”

অধরার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে বললো রুমের বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নক করা ব্যক্তিটি। ভাবনার সুতো ছিড়ে বের হয়ে এসে অধরা বললো,
“আসুন।”
প্রায় সাথে সাথে ফাইল হাতে কেবিনের ভিতরে আসলো নিতিন। ডেস্কের অপজিট চেয়ারে বসে বললো,
“মিস অধরা ফরেনসিক রিপোর্ট এসেছে কি?”
“হ্যাঁ এসেছে। তবে আমার মনে হচ্ছে ফরেনসিক রিপোর্টে ঘাপলা আছে।

রিপোর্ট পাল্টানো হয়েছে। আপনি একবার দেখুন তো!”
বলে অধরার হাতে থাকা রিপোর্টটা নিতিনের দিকে বাড়িয়ে দিলো।

নিতিন অধরার বাড়িয়ে দেয়া রিপোর্ট হাতে নিলো। চোখ বুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ হলো মানুষকে বোকা বানানো। খুনিরা এই কথাটাকে বারবার প্রমাণ করেছে। বারবার আমাদের বোকা বানিয়েছে।

এখনো বানাচ্ছে।”
“কিভাবে!”
ভ্রু কুঁচকে বললো অধরা। নিতিন তার হাতের ফাইল অধরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“এই ফাইলের সর্বপ্রথম পেপারট দেখে নিন। বুঝবেন মানুষকে বোকা বানানো কত সহজ আর খুনিরা আমাদের বোকা বানিয়েছে কিভাবে।”

ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেই অধরা নিতিনের বাড়িয়ে দেয়া ফাইল হাতে নিলো এবং তাতে চোখ বুলালো। চোখ বুলিয়ে অধরা বিস্ময়ের সপ্তম আকাশে উঠলো যেন। এই মুহুর্তে তার সামনে একটা ফরেনসিক রিপোর্ট রাখা।

রিপোর্টটা প্রভাত মির্জার। তাতে বলা হয়েছে যে, প্রভাত মির্জাকে মৃত্যুর আগে এলকোহল জাতীয় কোন পানীয় সেবন করানো হয়েছে অতিমাত্রায়। তবে তার মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধের কারণে। মৃত্যুর পূর্বে তার জিহ্বায় ছুরির আঘাত করা হয়েছে। তার শরীরে অসংখ্য আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। তার শরীরে পাওয়া আঙুলের ছাপের সাথে অভিলাষের আঙুলের ছাপ ম্যাচ করেছে।
“এটা ফরেনসিক রিপোর্ট হলে ওটা কি!”
ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে অবাক হয়ে বললো অধরা। নিতিন তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“ওটা বোকা বানানোর ট্রিকস। এ অব্দি যত ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন সব ভুল।

কোনটার ভিত্তি নেই। খুনিরা তাদের মনগড়া রিপোর্ট বানিয়ে আমাদের দিয়েছে। এতে সাহায্য করেছে ফরেনসিক ল্যাবের কয়েকজন সদস্য।”
“আমি সন্দেহ করেছিলাম। তবে আপনি আসলটা পেলেন কোথায়? ওরা তো পালটিয়ে দিয়েছে।”
“কেসের ভার হাতে পাওয়ায় পর পুরো কেসের ফাইল দেখেই আমার মনে হয়েছিলো যা দেখছি এসব সত্য নয়। এসব আমাদের দেখানো হচ্ছে বলেই আমরা দেখছি।

আড়ালে অনেক বড় সত্য লুকিয়ে আছে। তাদের দেখানো সব কিছুতেই আমার সন্দেহ হচ্ছলো। ফরেনসিক রিপোর্ট ও এর বাইরে নয়। সন্দেহের সত্য মিথ্যা যাচাই করার পরিকল্পনা মাথায় এলো প্রভাত মির্জার লাশ দেখার পর পরই।

ফরেনসিক রিপোর্ট যদি কেউ পাল্টিয়ে থাকে তবে আজ নজরদারি করলে ধরা পড়বে। তাই আমি তুরাগের ফ্ল্যাট থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে মালিবাগে গেলাম। সেখানে সি আইডির প্রধান কর্যালয়। সালাহ উদ্দিন স্যারের সহযোগিতায় ফরেনসিক ল্যাবের ভিতরে অতি সুক্ষ্ম জায়গায় কয়েকটা সিসিটিভি ক্যামেরা বসালাম। যা ল্যাবের কেউ জানে না।

ক্যামেরা বসানোর পর আমি কন্ট্রোল রুমে বসে ফুটেজ দেখতে লাগলাম। তারপর লাশ ল্যাবে পাঠানো হলো। দায়িত্বরত ডাক্তার তার কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষে খুনিদের ধরানো লোক, ডাঃলিপিকা, ডাঃ সাজিদ, ডাঃ জাহাঙ্গীর, রিপোর্ট মেকার ফিরোজ, নিজাজ ল্যাবের মাঝে এক হলো৷ খানিক কানাকানি করলো তারপর রিপোর্ট তৈরি কাজে লেগে পড়লো।

ফিরোজের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সেটা দেখে দেখে টাইপ করতে লাগলো। বুঝলাম খুনিরা চিঠি পাঠিয়ে ডিরেকশন দিয়েছে আর ফিরোজ সে অনুযায়ী রিপোর্ট বানাচ্ছে। রিপোর্ট বানিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট থানায় পাঠালো।

সিসিটিভি ফুটেজ, মিথ্যা রিপোর্ট সব এক করে আমি সালাহ উদ্দিন স্যারকে দেখালাম। সাথে সাথে স্যার পদক্ষেপ নিলেন। তাদের গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। চাপের মুখে সব শিকার করলো তারা।”

“কি স্বীকার করলো?”
কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে বললো অধরা। নিতিন বলা শুরু করলো,
“প্রতিভা খুন হওয়ার দিন পাঁচেক আগে এই পাঁচজনের কাছে একটা করে বেনামি চিঠি আসে। যাতে লেখা ছিলো, ফরেনসিক রিপোর্ট পাল্টানো এবং মিথ্যা জবানবন্দি দিলে তাদের মোটা অংকের টাকা দেয়া হবে।

একটা ফরেনসিক রিপোর্ট পালটানো, এবং মিথ্যা জবানবন্দির বিনিময়ে তারা পাবে জনপ্রতি এক লক্ষ টাকা। ছ’টা রিপোর্ট বদলাতে হবে। বিনিময়ে একজন পাবে ৬লাখ টাকা করে। পঞ্চাশ হাজার কাজ করার আগে ও পঞ্চাশ হাজার কাজ শেষে। ফরেনসিক ল্যাবের দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গের মাঝে এরা ছিলো সবচেয়ে লোভী শ্রেনীর।

তাই হয়তো খুনী তাদেরই হাত করেছে। সামান্য কাজের বিনিময়ে ৬ লাখ টাকা কামানোর লোভ সামলাতে পারলো না কেউই। দিক বেদিক বিচার না করে সুযোগ লুফে নিলো। চিঠিতে লেখা ছিলো, রাজি থাকলে পরদিন সকাল বেলা ধানমন্ডি লেকের পাড়ে যেতে। অগ্রিম টাকাটা সেখানেই একটা ছোট বাচ্চাকে দিয়ে দেয়া হবে। পরদিন তারা সেখানে গেলো।

চিঠি মোতাবেক একটা বাচ্চাকে দিয়ে টাকা পাঠানো হয়। টাকা পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে তারা তাদের কাজ শুরু করে। খুনির কথা মতো মিথ্যা রিপোর্ট বানানো, সেই অনুযায়ী জবানবন্দি সব করে তারা। সব ঠিকঠাক ছিলো তারা তাদের প্রাপ্য ও পেয়েছে। কিন্তু শেষ সময় এসে ধরা খেয়ে গেলো। এমনটাই স্বীকার করেছে তারা।”

নিতিনের কথা শুনে অধরা আফসোসের সাথে বললো,
“ডাঃ লিপিকাকে আমি কত ভালো ভেবেছিলাম। কত বিশ্বাস করতাম। আর সেই কিনা এসব করলো!”
“কাউকেই সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কাউকেই না। যা সহজ মনে কাউকে বিশ্বাস করে তারাই ঠকে।

আর আমাদের প্রফেশনে তো বিশ্বাস শব্দের চেয়ে সন্দেহ শব্দের প্রয়োগ বেশি থাকে। এগুলো মাথায় রাখবেন। সারাদিন আসামীদের সন্দেহ করতে করতে আমার তো আমার বউকেই সন্দেহ করতে ইচ্ছে করে।যদিও তা পারি না।”

কেসের কথার মাঝে পরিবারের কথা বলাটা অপ্রাসঙ্গিক। অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা কোন কালেই পছন্দ নয় অধরার। তাই সে এসব বিষয় এড়িয়ে চলে। সে মানে কাজের সময় শুধুই কাজ। পরিবার তখন কেউ না।

আজ অব্দি থানার কেউ শুনেনি অধরার মুখে তার মা কিংবা স্বামীর গল্প। নিতিনের এই খাতছাড়া কথায় অধরা ভ্রু কুঁচকালো। নিতিন জিহ্বা কামড়ে বললো,
“সরি, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেললাম।”

কথা ঘুরিয়ে অধরা বললো,
“ওই পাঁচজনের ভাষ্যমতে তারা খুনিদের দেখেনি তাই তো? “

নিজেকে স্বাভাবিক করে নিতিন জবাব দিলো,
“হ্যাঁ। অবশ্য, তারা না দেখলেও খুনি বের করা এবার আমাদের জন্য অতি সহজ হয়ে গেছে। একজনকে তো পেয়েই গেছি এবার বাকিদের ধরবো। আমি নিশ্চিত প্রভাত মির্জাকে খুন অভিলাষই করেছে।”
“কিন্তু অভিলাষ কিভাবে খুন করবে? সে তো মারাই গেছে।”

“ফাইলের দ্বিতীয় পেপারটা দেখুন। তাতে লেখা আছে, অভিলাষ মনে করা পোড়া লাশের সাথে অভিলাষের ডি এন এ ম্যাচ করে নি। আমার ধারণা মর্গে থেকে বে ওয়ারিশ লাশ পুড়িয়ে অভিলাষের নাম দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর ফরেনসিক রিপোর্ট পালটিয়ে ঘটনা নিখুঁত করা হয়েছে। অভিলাষ বেঁচে আছে আর এসব করেছে অভিলাষ নিজেই।”


পর্ব-১০ (ধামাকা পর্ব)

“এক সেকেন্ড, ফরেনসিক ল্যাবে কর্মরত ডাক্তার সাজিদ কি সেই যে কিনা অধরাকে বিয়ের আগে বিরক্ত করতো?”
ভাবুক কন্ঠে বললো অধরা। নিতিন মুচকি হেসে বললো,
“ডাঃসাজিদের নাম শুনে আমারো প্রথমে তাই মনে হয়েছিলো কিন্তু পরে খবর নিয়ে জানতে পারি দুজনে ভিন্নজন।

ডাঃ সাজিদের পুরো নাম সাজিদ শেহজাদ। যার গ্রামের বাড়ি যশোর আর ঢাকার স্থানীয় বাড়ি হচ্ছে গুলশানে। আর যে প্রতিভাকে বিরক্ত করতো তার নাম হচ্ছে সাজিদ হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট, ঢাকার বাসা ধানমণ্ডি। বর্তমানে সে কাপড় ব্যবসায়ী। গাউছিয়ায় দোকান নিয়ে বসেছে।

দুজনের সব কিছু আকাশ পাতাল ডিফারেন্স।

সো দুজনকে গুলিয়ে ফেলার কোন ওয়ে নেই।”
“ওহ আচ্ছা। ওই লোভী ডাক্তার গুলোর কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার।”
রেগে কটমট করে বললো অধরা।

নিতিন শান্ত কন্ঠে বললো,
“তারা এখন আইনের আওতায় আছে। আশাকরি বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি পাবে তারা।”
“বাই দ্যা ওয়ে, অভিলাষের কাহিনীটা মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আমার।”
“সিম্পল বিষয়, অভিলাষের মৃত্যুতে ও অভিলাষের হাত আছে।

আমি যদি ভুল না হই তবে প্রতিটা খুনেই অভিলাষের সম্পৃক্ততা ছিলো। তবে এখানে সে একা নয় তার সাথে আরো কয়েকজনের একটা গ্রুপ এতে শামিল আছে। আর এই খুন গুলো অনেক আগ থেকেই পরিকল্পনা করা। জাস্ট সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলো সবাই। সঠিক সময়ে ওয়ার্ক আউট করেছে। তারা পরিকল্পনা অনুয়ায়ী এগিয়েছে। তাই তারা প্রথমে অভিলাষকে ফাঁসিয়েছে তারপর তাকে নির্দোষ প্রমাণ করিয়েছে। তারপর তাকে কিডন্যাপ করেছে।

কিডন্যাপের পর অভিলাষ নিজেই মর্গে থেকে একটা লাশ বেছে নিয়ে পুড়িয়ে ভুঁইয়া ভিলার অদূরে থাকা সেই ঝোপের কাছে রেখে গেছে। যখন তার লাশ সবাই দেখলো, ডিএনএ তার সাথে ম্যাচ করিয়ে সে প্রমাণ করালো যে এটা তারই লাশ। সবাই বিশ্বাস করলো। এবার সে স্বাধীন, যেহেতু সে মৃত তাই কেউ তাকে খুঁজবে না, তাকে সন্দেহ করবে না।

সুতারাং সে নিশ্চিন্তু আড়ালে থেকে তাদের প্ল্যান এ সামিল হতে পারবে। জীবিত থাকা অবস্থায় খুনের মতো কোন কাজ করতে সুবিধা পাচ্ছিলো যা মরার পর নির্দ্বিধায় করতে পারবে। সন্দেহের আওতাহীন হতে সবার কাছে নিজেকে মৃত বলে প্রমাণ করাটা জুরুরি ভেবেছে। তারা কখনো ভাবেনি আসল রিপোর্ট আমরা হাতে পাবো। তারা ভেবেছে এভাবে মামলা সন্দেহের কৌটায় গিয়ে কোন সমাধান না পেয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।”

“অভিলাষ যদি প্রতিভা খুনের সাথে জড়িত থাকে তবে আমি নিশ্চিত বলতে পারি অভিলাষ যেই গ্যাংয়ের সাথে জড়িত সেই গ্যাংয়ে মেয়েও আছে। কোন মর্ডান মেয়ে। যে কিনা ভালো মেকাপ জানে। কারণ প্রতিভাকে খুনের আগে বা পরে সাজানো হয়েছিলো।

আর সাজটা একদম কোন বিউটিসিয়ানের সাজানোর মতো পারফেক্ট ছিলো। প্রতিভা নিখোঁজ এবং খুন হওয়া সবটাই ছিলো গভীর রাতে। যখন কিনা কোন পার্লার সাধারণত খোলা থাকেনা, আর খুন করার প্ল্যান মাথায় রেখে পার্লারে ও নিয়ে যাবে না প্রতিভাকে। তাই আমার মনে হয় কোন মেয়েই সাজিয়েছে প্রতিভাকে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে মেয়েটা কে?”

“তুরাগের ফ্ল্যাটে একটা মেয়ে থাকতো যে কি নাম জানি মেয়েটার?

“মাথা চুলকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললো নিতিন। নিতিনের কথায় অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“শিলা। শিলা ও কি প্রতিভা খুনের সাথে জড়িত আছে বলে আপনার মনে হয়?”
“মনে হওয়ার চান্স নেই আমি নিশ্চিত শিলা খুনের সাথে জড়িত আছেই।

তবে শকিং নিউজ কি জানেন? শিলাই প্রতিভাকে সাজিয়েছে। প্রতিভার চোখ মুখের মেকাপের উপর শিলার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে।”
“শিলা? ওই গ্রাম্য কিশোরী মেয়েটা প্রতিভাকে সাজিয়েছে? “অবিশ্বাস্য সুরে বললো অধরা।

নিতিন তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“আপনি যাকে গ্রাম্য কিশোরী বলছেন সে আসলে গ্রাম্য কিশোরী নয়। একটা গ্রাম্য মেয়ে যে কিনা ঠিক করে শুদ্ধ ভাষায় কথাই বলতে পারে না সে কিভাবে এতটা স্মার্টলি একটা মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিবে আর খুন করবে? এটা হাস্যকর আর অবিশ্বাস্য তাই না? আমার মনে হয় সে শহুরের মেয়ে, প্রতিভা খুনের উদ্দেশ্যেই তুরাগের ফ্ল্যাটে কাজ নিয়ে ছদ্মবেশে ছিলো।”
অধরা চোখ বড় বড় করে নিতিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। অবাক হয়ে বললো,

“এরা একেকটা কি চমৎকার অভিনেত্রী! এদের চল-চাতুরী দেখে আমার মাথা ঘুরাচ্ছে! মেয়েটা কি নিষ্পাপ চাহনি দিয়ে থাকতো! দেখে মনে হতো যেন ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে পারে না। আমার ওকে কোন প্রকার সন্দেহই হয় নি। অথচ এই মেয়ে থলের বিড়াল বেরুলো!”

অধরার বিস্ময়ী ভাব দেখে নিতিন হাসলো। হেসে বললো,
“আপনি এই সামান্য খবর শুনেই কাত! আমার কাছে বাকি যেই শকিং নিউজ আছে তা শুনলে তো আপনি হার্ট অ্যাটাক করবেন তবে।”
“আরো শকিং নিউজ!

“অবাক হয়ে বললো অধরা। নিতিন মাথা নাড়িয়ে বললো,
“হ্যাঁ, পুরো কেসের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি বলতে পারেন। খুনি গ্যাংয়ের প্রায় সবার নাম আমার সামনে এসে গেছে।”
“কারা কারা?”

কৌতুহলী হয়ে দ্রুততার সাথে বললো অধরা। নিতিন উঠে দাঁড়িয়ে অধরার সামনে থেকে ফাইলটা তুলে নিয়ে হেসে বললো,

“এত শকিং নিউজ একসাথে বলবো না আপনাকে। শেষে দেখা যাবে এত শক সইতে না পেরে আপনি ছক্কার ঘরে গিয়ে অক্কা পেলেন। তখন সবাই আমাকেই মার্ডার কেসের আসামী বানাবে। তার চেয়ে বরং এখন থাক, আপনি থানায় বসে চিন্তা করুন। আমি ওদের বাকি খেল জেনে আসি। ততক্ষণ আপনি মাইন্ড সেট করুন। আমি এসে সবার সামনে সব পোল খুলবো।”
বলে ফাইল হাতে নিয়ে নিতিন হাটা ধরলো।

অধরা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো,
“সমস্যা নেই, বলুন আপনি। আমি স্ট্রংলি নিতে পারবো।”

“ইন্সপেক্টর অধরা, আপনার অবগতির জন্য জানাপূর্ব বাধ্য হচ্ছি যে আমি একটা কথা দু’বার বলি না। সুতারাং চলি।”
আবারো হাটা ধরলো নিতিন।

“আচ্ছা বাকিদের কথা নাইবা বললেন কিন্তু শিলার ব্যাপার তো কমপ্লিট করে যেতে পারেন।”
পিছন থেকে বললো অধরা। দরজার কাছে অবস্থান করা নিতিন কিছু একটা ভেবে থেমে গেলো। পিছন ঘুরে বললো,
“তা পারি। বলুন কি প্রশ্ন শিলার ব্যাপারে?”

“অভিলাষ যদি প্রভাত মির্জাকে খুন করে তবে হিসেব অনুযায়ী প্রতিভাকেও খুন করেছে। শিলা প্রতিভাকে সাজিয়েছে মানে সেও কি অভিলাষের সাথে খুনের গ্যাংয়ে ছিলো, তাই তো?”

চট করে প্রশ্ন করলো অধরা। নিতিন ও চট করে উত্তর দিলো,
“শিলা যদি জড়িত না থাকতো তবে নিশ্চয়ই অভিলাষ শিলাকে খুনের কাজে নিতো না তাই না? শিলাকে খুনে শামিল করেছে মানে সে জড়িত আছে। সিম্পল।”

“শিলা যদি জড়িত থাকে তবে শিলা খুন হলো কেনো!”
“কে বলেছে শিলা খুন হয়েছে? “

ভ্রু নাড়িয়ে বললো নিতিন। অধরা অবাক হয়ে বললো,
“আপনি বলতে চাচ্ছেন শিলা খুন হয় নি? তবে তার লাশ!”

শান্ত গলায় নিতিন বললো,
“আমাদের চোখে দেখা দৃশ্য সবসময় সঠিক হয় না মিস অধরা। আমাদের চোখের আড়ালে অনেক কিছু রয়ে যায়। বাই দ্যা ওয়ে, শিলার হাতের রান্না হাত পাঁকা। স্বাদ একদম জিবে লেগে থাকার মতো।”
অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আমি বলছি কি আর আপনি বলছেন কি!

কোথাকার কথা কোথায় লাগাচ্ছেন?”
খানিক থেমে প্রশ্ন বিদ্ধ চাহনি দিয়ে বললো,
“এক সেকেন্ড, আপনি শিলার হাতের রান্না পেলেন কোথায়? আপনি আসার আগেই তো শিলার ডেডবডি পাওয়া গেছে।”
“কাল তুরাগের ফ্ল্যাটে গিয়েই তো খেলাম শিলার হাতের রান্না। খুব টেস্ট।

জিহাদ ও খেয়েছে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে জিহাদকে জিজ্ঞেস করুন।আপনাকে ও টেস্ট করানো উচিত ছিলো। ইশ! কেনো যে আপনাকে টেস্ট করালাম না?”
আফসোসের সুরে বললো নিতিন।

অধরা চোখ কুঁচকে বললো, ।
“কি বলছেন আপনি এসব! আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। প্লিজ ক্লিয়ার করে বলুন! “
অধরার কথায় নিতিন হেসে জিহাদকে ডাকলো। জিহাদ আসার পর বললো, ।

“জিহাদ, কাল তুরাগের ফ্ল্যাটে আমি আর তুমি যে পাস্তাটা গেলাম সেটার রিভিউ দাও তো?”

নিতিনের কথা শুনে জিহাদের চোখে মুখে খুশি দেখা দিলো। চট করেই খুশি মনে উত্তর দিলো,
“ম্যাডাম পাস্তাটা খুব মজা ছিলো।”

তারপর আফসোসের সুরে বললো,
“কিন্তু স্যার এক চামচের বেশি খেতে দেয় নি।”

অধরা এবার অবাক হয়ে জিহাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুমিও খেয়েছো? মার্ডার স্পটের জিনিস তো ইউজ করা নিষিদ্ধ তবে তোমরা খেলে কিভাবে?”

“ম্যাডাম পাস্তাটা দেখতে এত মজা ছিলো যে তল্লাশি করার সময় ওভেনের ভিতরে দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।

তাই টেস্ট করে নিয়েছি। যদিও প্রথমে টেস্ট স্যারই করেছে। দুজনেই এক স্পুন করে খেয়েছি জাস্ট।”

অনেকটা গর্বের সাথে বললো জিহাদ। জিহাদের খুশি দেখে নিতিন বললো,
“এত টেস্টি খাবার কে বানিয়েছে জানো? তুরাগের কাজের মেয়ে শিলা। যার ডেডবডি পাওয়া গেছে। মৃত ব্যক্তির রান্না সাধারণত মজা হয়। যদিও আমি এর আগে কখনো খাইনি। তাও আন্দাজ করতে পারি।”

নিতিনের কথায় জিহাদ যেন আকাশ থেকে পড়লো। সে বিস্ময়ের চাপে কথা বলতে পারছে না। মাথার মধ্যে একটা কথা বাজছে, শিলা মারা গেলে তার রান্না তুরাগের ফ্ল্যাটে আসলো কিভাবে! মরার পর কেউ রান্না করতে পারে!

আচ্ছা আমি যা খেলাম তা শিলার আত্মা রান্না করেনি তো! জিহাদ ভয়ে ভয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,
“ভূউ…ত।”

“ভূত কোথায় পেলে?”

বিরক্ত কন্ঠে বললো অধরা। জিহাদ ঢোক গিলে বললো,
“শিলার আত্মা এসে তুরাগের ফ্ল্যাটে রান্না করেছে। আমি ভূতের রান্না খেলাম!”
জিহাদের কথা শুনে নিতিন উচ্চস্বরে হেসে দিলো। অধরা ধমকে বললো,
“ডোন্ট বি পুলিস জিহাদ! একজন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে তুমি ভূত বিশ্বাস করো! তাও এই যুগে এসে! কি সব বলো? তুরাগের ফ্ল্যাটে শিলার কোন আত্মা টাত্মা ছিলো না। ওটা শিলাই ছিলো। শিলা মরেনি, সে জীবিত।”

“তাহলে লাশ? “
কাঁপা গলায় বললো জিহাদ৷ নিতিন হেসে বললো,
“মিস অধরা আর তুমি বসে বসে সমাধান করো, শিলা মারা গেলে ফ্ল্যাটে আসলো কিভাবে? আর না মারা গেলে লাশ আসলো কিভাবে! এই দুইটা প্রশ্নের উত্তর বের করো। আমি যাই।”

বলে জিহাদ আর অধরাকে চিন্তার সাগরে ছেড়ে দিয়ে নিতিন চলে গেলো।

দুপুর দুটো নাগাদ নিতিন মিরপুর থানার পৌঁছালো। ছ’ফুটের ফর্সা শরীরটাকে আজ বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। সকালের পড়া সি আই ডি ইউনিফর্ম চেঞ্জ করেছে। সাদা চামড়ার দেহটায় ধবধবে সাদা শার্ট, ব্রাউন প্যান্ট

জড়িয়েছে। শার্টের হাতা কনুই অব্দি ফোল্ড করা। চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে একটা কাগজপত্রে ভরা ফাইল।
গাড়ি থেকে নেমে তার হাতে থাকা ফাইলটা তার এসিস্ট্যান্টের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
“ফলো মি।”
“ইয়েস স্যার।”
এসিস্ট্যান্ট সায় জানালে নিতিন তার দু’হাত প্যান্টের পকেটে রেখে অধরার কেবিনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ডার্ক রেড ঠোঁটদ্বয়ের কোনে লেগে আছে মনমাতানো হাসি। সমস্ত শরীর জুড়ে লেগে আছে চমৎকার এটিটিউড।

ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে থানায় নয়, কোন শুটিং স্পটে এসেছে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে। নায়ক নায়ক ভাব দেখা যাচ্ছে তার মাঝে। খানিকের জন্য হয়তো নিতিন নিজেকে নায়ক ভাবতে শুরু করেছে! মূলত সে আজ ছদ্মবেশে ক্লু জোগাড় করতে গেছে কয়েকজায়গায়।

তাই এমন লুক নিয়েছে। তবে নিতিনকে কয়েক সেকেন্ড মনোযোগ দিয়ে দেখে চোখ বন্ধ করে বলা যাবে এই মূহুর্তে নিতিন বেশ খোশ মেজাজে আছে। চোখে মুখে জয়ের আনন্দ এসে ভর দিয়েছে।

নিতিন অধরার কেবিনে গিয়ে দেখলো অধরা তার টিম নিয়ে মিটিংয়ে বসেছে। অধরা ডেস্কে বসে কিছু একটা ভাবছে। তার আশেপাশে তার ১০জন টিম মেম্বার দাঁড়িয়ে আছে।

সবার চেহারায় ভাবুকতা ফুটে উঠেছে। যা প্রমাণ করে সবাই কোন একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত, চিন্তামূলক বিষয়টা সবাইকে বেশ ভাবাচ্ছে। নিতিন সবার দিকে একবার চোখ বুলালো তারপর বরাবরের মতোই অধরার অপজিটের চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়লো।

নিতিনের পিছন থেকে তার সহকারী এসে নিতিনের সামনে ডেস্কের উপর ফাইল রেখে গেলো। নিতিন ব্ল্যাক কালার লেদার চেয়ারটায় গা এলিয়ে হেসে বললো,
“লাঞ্চ হয়েছে সবার? নাকি খালি পেটে বসেই চিন্তায় ডুবে আছেন?”

নিতিনের কথায় অধরা ভ্রু কুঁচকালো। যার অর্থ খুনির ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে আমাদের জান বেরুচ্ছে আর উনি এসেছে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করতে!

অধরা ভ্রু কুঁচকানো দেখে বরাবরের মতো আজো হাসতে ভুললো না নিতিন। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামিয়ে টেবিলের উপর রেখে মাথার দু’ইঞ্চি উচ্চতা সম্পন্ন ঘন কালো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বললো,
“খালি পেটে মাথায় বুদ্ধি আসে না। ভরা পেটে মাথায় ভালো বুদ্ধি আসে৷ তাই আগে খেয়ে নিন তারপর ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখবেন কে খুন করলো। যদিও আমি খুনি অব্দি পৌঁছে গেছি। তবু ও গেস করতে গিয়ে আপনাদের মাথা খাটাতে হবে। তা ছাড়া খালি পেটে শক নিতে পারবেন না। তাই খেয়ে নিন।”

কন্ঠে রাগ মাখিয়ে অধরা বললো,
“কেসের যা অবস্থা, সমাধান না করতে পারলে পেটে কিছু যাবে না। সুতরাং আপনি আগে কেসের জট খুলুন। তারপর আমরা লাঞ্চের কথা ভাববো। প্লিজ হেয়ালি করবেন না সোজাসাপটা বলুন!”

নিতিন সোজা হয়ে বসে বললো,
“আচ্ছা হেয়ালি করবো না। আমি আমার ধ্যান ধারণার উড়োজাহাজ কাজের জায়গায় ল্যান্ড করলাম। এখন হেয়ালিপনা সিস্টেমকে ব্লক করে তরল ভাষায় আই মিন সোজাসাপ্টা সব ক্লিয়ার করছি।”

নিতিনের কথায় অধরা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না। সে ডেস্কের উপর দু’হাত ভাজ করে রেখে বললো,
“প্রথমে শিলার ব্যপারটা পুরোপুরি ক্লিয়ার করুন। আমি আন্দাজ করছি শিলা মরেনি। শিলা জীবিত আছে, এবং পরবর্তী সব খুনে তার হাত আছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, শিলা জীবিত থাকলে ওইদিন আমরা কার লাশ দেখলাম? ওটা যদি শিলা লাশ না হয় তবে শিলার চেহারার সাথে মিললো কিভাবে?”

নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নিতিন বললো,
“শিলা জীবিত আছে এবং সব খুনে জড়িত ও আছে। কাল সে তুরাগের ফ্ল্যাটে অভিলাষের সাথে ছিলো।

তার সাথে অবশ্য আরো ক’জন ছিলো যাদের পোল আমি পরে খুলছি। কাল আমরা তুরাগের ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই তুরাগের ফ্ল্যাটে ছিলো।

ওখানে রান্না করেছে। সকালে বললাম না আমি শিলার হাতের রান্না খেয়েছি? প্রভাত মির্জাকে খুন করে সব কিছু সেট করে সবার ক্ষিধে লাগবে। যার কারনে সবার জন্য পাস্তা বানিয়ে আগেই ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলো শিলা। ফ্রিজে এক বক্স পাস্তা আমি গিয়ে দেখেছি। ওভেনে ও রেখেছিলো পাস্তা। সম্ভবত গরম করছিলো।

খুন করে সবার ক্ষিধে পেয়েছিলো কিনা। আমরা যাওয়াতে তাড়াহুড়ো করে পাস্তা ওভেনে রেখেই ওভেন বন্ধ করে কোনমতে পালিয়েছিলো। যেই কড়াইয়ে পাস্তা রান্না করা হয়েছিলো সেই কড়াইটা তাড়াহুড়োয় ধোঁয়া সম্ভব হয় নি যার ফলে কিচেন কেবিনেটের এক কোণায় লুকিয়ে রেখেছিলো। আমার চোখ পড়ার সাথে সাথে আমি তা ফিংঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোকে দিয়েছিলাম।

আপনি খেয়াল করেন নি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী কিচেনের চুলো, পেঁয়াজের জার, মসলার বক্স, কড়াই, ফ্রিজে থাকা পাস্তার প্লেট, ওভেন, এবং ওভেনে রাখা পাস্তার ট্রেতে শিলার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। যাতে আমি সিউর হয়েছিলাম এমন সুস্বাদু খাবার শিলাই বানিয়েছে। আর বাকি রইলো লাশের কথা, আমি আগেও বলেছি আমরা যা দেখি সবটা সত্যি হয় না। আমাদের চোখের সামনে অনেক কিছু ঘটে কিন্তু আমাদের চোখে পড়ে না।”

নিতিন থামলো তারপর তার হাতে থাকা ফাইলটা অধরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ফাইলের তৃতীয় পেপারটা দেখুন। শিলার লাশের ফরেনসিক রিপোর্ট। যা পড়ে আপনার শিলার ব্যাপারটা বুঝে আসবে।”
অধরা নিতিন থেকে ফাইল নিয়ে একরাশ কৌতুহল ভরা দৃষ্টি ফেললো ফাইলের উপর। অধরার সাথে সাথে উপস্থিত সবার চোখ ফাইলের উপরে। সবার কৌতুহল দেখে অধরা জোরেশোরে পড়লো রিপোর্টটা। পড়ে শেষ করতেই সবার মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো।

মানুষ কতটা সাংঘাতিক হয় এই রিপোর্ট না পড়লে বুঝা যাবে না। রিপোর্টের সারমর্ম এই যে, শিলার চেহারা সদৃশ সম্পূর্ণ ঝলসানো যে ডেডবডি পাওয়া গেছে তা শিলার নয়। শিলার সাথে ওই লাশের ডি এন এ ম্যাচ হয় নি।

সেই লাশের মৃত্যু হয়েছে শিলাদের নিখোঁজ হওয়ার আনুমানিক দিন পাঁচেক আগে। মেয়েটার মৃত্যু হয়েছে বিষপানে। মৃত্যু পর তাকে মেডিসিনের সাহায্যে সচল রাখা হয়েছে। লাশ পাওয়ার আগেই লাশের গলায় দড়ি পেচানো হয়েছে এবং শরীর না চেনার সুবিধার্থে এসিড ঢালা হয়েছে। শিলার সাথে লাশের গায়ের গঠন ভিন্ন ছিলো বিধায় হয়তো এডিট ঢেলে ঝলসে দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, লাশের চেহারায় শিলার চেহারার সদৃশ ফেস মাস্ক পাওয়া গেছে।

সেই সাথে প্লাস্টিক সার্জারীর নমুনা পাওয়া গেছে। ধারণা করা যাচ্ছে দুই তিনদিন আগেই মেয়েটার চেহারা প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারার পরিবর্তন আনা হয়েছে। রিপোর্ট পড়ে অধরাও থ বনে গেলো। কাউকে খুন করার জন্য মানুষ এত কিছু করতে পারে?
অবাক কন্ঠে অধরা বললো,
“এই খুনি গ্যাং ভাবনার বাইরে! কেউ কল্পনাতেও আনতে পারবে?

এরা নিজেকে বাঁচাতে একটা লাশ নিয়ে প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজের নাক ঠোঁট বসায়। প্লাস্টিক সার্জারিতে করে লাশের চেহারাকে হুবুহু শিলার চেহারার মতো সম্ভব হয়নি বলে উপরে আবার শিলার চেহারার সাদৃশ ফেস মাস্ক লাগালো।

এমন নিঁখুত ভাবে সেট আপ করলো যে কেউ ধরতেই পারবেনা। তাও যদি ধরতে পারে তবে মাস্ক উঠানোর পরে সার্জারি করা ফেস যাতে কাভার করে তাই প্লাস্টিক সার্জারি করেছে লাশকে। কি সাংঘাতিক পরিকল্পনা! কি মাস্টার মাইন্ড!”
জিহাদ বললো,
“শিলা মেয়েটা নোয়াখালীর ভাষায় ভাংচুরা করে কথা বলতেও কষ্ট হতো।

আর এই মেয়েটা এত কিছু করছে! অবাক লাগে। আচ্ছা স্যার এরা লাশ পেলো কোথায়?”
নিতিন বললো,
“মর্গে থেকে লাশ চুরি হওয়ার ঘটনা আজকাল অহরহ ঘটে থাকে। হতে পারে বেওয়ারিশ কোন লাশ টার্গেট করেছে তারা বা শিলার চেহারার সাথে মিলে এমন চেহারার মেয়েকে বেছে নিয়ে তাকে মেরেই খুনিদের কার্যসিদ্ধি করেছে! আর তুমি যাকে নোয়াখালীর বলছো সে নোয়াখালীর মেয়ে না।

সে ঢাকার মেয়ে। ঢাবিতে গনিত নিয়ে পড়ছে। থার্ড সেমিস্টার। প্রচুর মেধাবী। চিরকুটের অংক গুলো তার গড়া। প্রতিভার কাছে বোকা সাজার জন্য অসহায় কাজের মেয়ে সেজে দু’বছর ছিলো। বাসায় যাবার নাম করে পরীক্ষা দেয়। পার্লারে কাজ শিখেছে আগে। সেগুলাও প্রতিভার উপর প্রয়োগ করেছে।

মেয়েটার আসল নাম হৃদিতা জামান। বাবা আখতারুজ্জামান, পেশায় পান ব্যবসায়ী। মা মাজেদা বেগম শয্যাশায়ী।

তার স্থায়ী বাসা যাত্রাবাড়ী। বস্তির মতো একটা ঘরে থাকে, নিন্মবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তিন ভাই বোনের মাঝে সেই বড়। অভাবের সংসার। টানাটানি সহ্য করতে না পেরে চাকরির নাম করে বাসা থেকে বের হয়ে তুরাগের বাসায় উঠেছে।

গত দু’বছরে একবারো বাসায় যায়নি তবে মাস শেষে কিছু টাকা বাবা মায়ের জন্য পাঠায়। আমি আন্দাজ করছি প্রতিভার সম্পত্তির জন্য অভিলাষ এবং গ্যাংয়ের সাথে এক হয়ে পরিকল্পনা করে তুরাগের বাসায় ছিলো শিলা। তারপর সব কিছু ঠিকঠাক করে প্রতিভাকে খুন করেছে।”
শিলার পরিচয় জেনে আরেক ধপা শক খেলো সবাই। এত মেধাবী ছাত্রী কিনা শেষে তার মেধা এভাবে কাজে লাগাচ্ছে! লোভে পড়ে মানুষ কত কিছু করে!

এত চল-চাতুরী ? চোখে দেখা নিষ্পাপ চেহারাটা হঠাৎ ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে যা বিশ্বাস হচ্ছে না কারোরই।

বিস্ময় কাটিয়ে অধরা বললো,
“শিলার ডেডবডি যদি ফেক হয় তবে স্বরূপা আর তুরাগের ডেডবডি ও ফেক হওয়ার কথা। যেহেতু লাশ তিনটা একসাথে এবং একরকম পাওয়া গেছে।”

“এ অব্দি যত চিরকুট পেয়েছেন সব কে লিখেছে জানেন?”
কথা ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বললো নিতিন। অধরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনি আবারো কথা ঘুরাচ্ছেন?”

নিতিন এবারো হেসে বললো,
“আমার কথার উত্তর দিন। প্রশ্ন উত্তরের মাঝে আপনার কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেয়ে যাবেন।”
অধরা এবার কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলো,
“কে? কোন হ্যান্ডরাইটিং স্পেশালিষ্ট?

যে কিনা সবার লেখা নকল করতে পারে?”
“সে শুধু হ্যান্ডরাইটিং স্পেশালিষ্ট না। সেই সাথে সর্বগুন সম্পূর্ণা, পাক্কা অভিনেত্রী ও। কি চমৎকার অভিনয় তার! দেখলে গা জুড়ে যায়। “

বাঁকা হেসে বললো নিতিন। আদাবর অবাক হয়ে বললো,
“চিরকুট যে লিখেছে সে মেয়ে?”

মাথা নাড়িয়ে বাঁকা হেসে নিতিন বললো,
“হ্যাঁ, সাধারণ কোন মেয়ে নয় একবারে মাল্টি ট্যালেন্টেড মেয়ে।”

“কে সে?” কৌতুহলী হয়ে বললো অধরা। নিতিন তার হাসি বজায় রেখে বললো,
“সেই গোল্ড এওয়ার্ড দাবিদার অভিনেত্রী হচ্ছে স্বরূপা। প্রতিভার জানের বান্ধবী, যার হাতের লেখা কিনা ভীষন খারাপ, যে কিনা সাজগোজ করতে পছন্দ করে না।

যে সারাক্ষণ বইয়ের মাঝে ডুবে থাকে। যে কিনা এতটাই ভদ্র যে যার কোন তুলনা হয়না। প্রচুর রকমের চতুর হয়েও তিন চার বছর ধরে এমন হাভাগোভার অভিনয় কি বাড়ির কাছের কথা! কতটা অভিনেত্রী হলে এমন করা যায় বলুন তো?”
“স্বরূপা! “
অবাক হয়ে হাঁকচেকিয়ে বললো অধরা। নিতিন বললো,
“হ্যাঁ, স্বরূপা-ই। প্রতিভার সবচেয়ে বড় শত্রু তার আপন বান্ধবী। প্রতিভা স্বরূপাকে আপন ভাবলেও স্বরূপা কখনো প্রতিভাকে আপন ভাবেইনি। আমি আন্দাজ করছি, খুন করার জন্যই প্রতিভার আথে বন্ধুত্ব করেছিলো। স্বরূপাই খুনের মূল কলাকাঠি ঘুরিয়েছে। সেই এতদিনের যাবতীয় চিরকুট সব দিয়েছে।

সবার লেখা নকল করতে পারে সে। শকিং নিউজ কি জানেন? প্রতিভার ডায়েরিটাও স্বরূপার লেখা। ওই ডায়েরিতে স্বরূপার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। ডায়েরির কোন কথাই সত্য নয়। সব স্ক্রিপ্ট।

নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য মনগড়া একটা কাহিনী লিখে দিয়েছে স্বরূপা। প্রতিভার জন্য তার মনোভাব ছিলো, ‘মুখে হাসি হাতে লুকানো ছুরি।’টাইপ।”
“মানুষের চেয়ে ভয়ংকর জীব আর দ্বিতীয়টি নেয়।”আনমনে বললো অধরা।
জিহাদ বললো,
“কিন্তু স্যার আপনি এতসব জানলেন কিভাবে?”

“তোমরা মানুষকে যত তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করো আমি তত তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করিনা। সে জীবিত হোক কিংবা মৃত। কেস ফাইল পড়ার পরেই আমার সবার প্রতি সন্দেহ হয়।

তিহানা জাহান বাদে সবাইকে সন্দেহ হয়। প্রতিভার বিস্মিত চেহারার ছবি দেখেই আমি নিশ্চিত ছিলাম প্রতিভার অতি আপনজনরাই প্রতিভাকে খুন করেছে। স্বরূপা তুরাগের লাশ দেখেও আমার বিশ্বাস হয়নি। আমি ক্লু খুঁজতে থাকি। কাল ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর আমার সন্দেহ ঠিক প্রমাণ হয়।আমি সর্বপ্রথম স্বরূপার খোঁজ নেয়া শুরু করি। স্বরূপার বাসায় গিয়ে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলি। স্বরূপার রুম সার্চ করে কিছুই পাই নি। স্বরূপার বাবার সাথে কথা বলার সময় এক ফাঁকে জেনে নিই স্বরূপার বাবার বাড়ি, ফ্ল্যাট সম্পর্কে।

স্বরূপার বাবার সাথে খানিক আলাপ করে সেখান থেকে চলে আসি। আজ সকালে থানা থেকে বের হয়ে একসাথে চারটা ফোর্স রেড়ি করে স্বরূপার বাবার চারটা বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। আমি নিজে যাই মোহাম্মদপুরে স্বরূপার নামে কেনা ফ্ল্যাট।

যেখানে মাঝে মাঝে স্বরূপা যেত। সেই ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি তালা দেয়া। তালা ভেঙে ভিতরে সার্চ করতে গিয়ে লক করা কাভার্ডে চারটা পাসপোর্ট পাই। পাসপোর্ট থেকে সবার আসল ইনফরমেশন পাই। শিলার নাম দেখে সন্দেহ হয় এবং ওর ব্যাপারে আমি খোঁজ খবর নেই তাতেই এতসব বেরিয়ে এলো।”
“তুরাগ? সে ও তো জীবিত তাই না?”

নিতিনের সহকারী বললো। নিতিন বললো,
“ফরেনসিক রিপোর্ট তো তাই বলছে। শিলা, স্বরূপার মতোই তুরাগের মৃত্যুর কাহিনী একি।

তাছাড়া আজ তো আমি তাকে স্বশরীরেই দেখলাম। এক কলসি এটিটিউট নিয়ে দিব্যি হেটে যাচ্ছে।”
“তুরাগকে কোথায় এবং কিভাবে দেখলেন আপনি!”

দ্রুততার সাথেই প্রশ্ন করলো অধরা। নিতিন ধীর কন্ঠে বললো,
স্বরূপার ফ্ল্যাট থেকে থানায় আসার সময় জ্যামে আটকা পড়ি মাঝপথে।

আনমনে বাইরে তাকাতেই চোখ পড়লো রাস্তার পাশে একটা শপিংমলের কাপড় দোকানে। একটা ছেলে উল্টে পাল্টে শাড়ি দেখছে। দোকানের সচ্চ কাঁচের দেয়াল দিয়ে ছেলেটাকে অনেকটাই তুরাগের মতো লেগেছিলো।

যদি ও মুখে মাস্ক থাকায় চেহারা দেখিনি তাও কৌতুহলবসত নেমে গিয়ে সেই দোকানে গেলাম। ততক্ষণে তুরাগ উধাও। পুরো শপিংমল খুঁজে ও পাইনি। পরে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে নিশ্চিত হলাম এটাই তুরাগ। মুখে মাস্ক লাগানো থাকলেও মাথা খোলা ছিলো যার কারনে চোখ আর চুল দেখা যাচ্ছিলো। যা দেখে আমি নিশ্চত হই এটা তুরাগ। তুরাগ একটা বার্থডে কেক আর একটা নীল শাড়ি কিনেছে মল থেকে।”

“তুরাগের না পায়ের হাড় ভাঙা? সে হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারে না তবে সে হাটছে কিভাবে?”
অবাক কন্ঠে বললো জিহাদ। নিতিন বললো,
“আজ তুরাগতো ফ্রিলি হাটছিলো সামান্য খোঁড়াতেও দেখেনি।”

“এর অর্থ দাঁড়ায় তুরাগের পা সম্পূর্ণ সুস্থ। কোনকিছুই হয় নি।

প্রতিভার খুনের দায় তার কাধে না আসার জন্যই মূলত তুরাগ অসুস্থার ভান করেছে। তুরাগ ও এত সবে সামিল ছিলো! তারমানে প্রতিভার সাথে সব ছিলো তার অভিনয়। তার কার্যসাধনের মূল হাতিয়ার ছিলো প্রতিভা।”
অধরা রাগত কন্ঠে বললো। নিতিন বললো,
“এত খুন, এত কিছু সব কিছুর মূলে তুরাগ। আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন? প্রতিভার র‍্যাপিং পেপার, ট্যাভেল ব্যাগে তুরাগের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। প্রতিভার প্যাকিং তুরাগই করেছে। খুনের লিডার আর কেউ নয় স্বয়ং তুরাগ।

তার গ্যাংয়ে এ আছে, শিলা, অভিলাষ, স্বরূপা।

তাই সব কাজ সহজ হয়ে গেছে।”
অধরা যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। সে গালে হাত দিয়ে চোখ বড় বড় করে বললো,
“স্ত্রীকে মেরে প্যাকিং করে নিজের বাসার সামনে রেখে সকালে আবার স্ত্রীর লাশ দেখে জ্ঞান হারায়।

স্ত্রীর শানে সেকি ভাষণ! এর পর এত মানুষকে মেরে শপিং করে! এতটা নিখুঁত অভিনয় কিভাবে পারে মানুষ! কাছের মানুষ কিভাবে ধোঁকা দেয় প্রতিভার কেস না দেখলে বুঝা যেত না। সবাই ধোঁকা দিলো!”
নিতিন বললো,
“কাউকে বিশ্বাস করা উচিত কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত বিশ্বাস যাকে বলে অন্ধবিশ্বাস সেটা করা উচিত নয়।

সবসময় চোখ কান খোলা রেখে চলতে হয়। তবে কথায় আছে না? বন্ধু শত্রু হলে এর থেকে বড় শত্রু আর হয় না। প্রতিভার ও হয়েছে তেমন অবস্থা। ওর আপনজনই ওর পিঠপিছে ছুরি বসালো। গত চারপাঁচ বছরে প্রতিভার সাথে যা হয়েছে সব ফেক।”

আদাবর চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,
“আমার একটা কথা বুঝে আসছে না তা হলো, অভিলাষ আর তুরাগ দুজন দুজনের শত্রু ছিলো।

তবে দুজনের এক হলো কেনো! সেটা কিভাবে সম্ভব?”

নিতিন নিচের ঠোঁট কামড়ে বললো,
“এটাই রহস্য। এমন আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ওদের ধরতে পারলে।”


পর্ব-১১

“আপনি কি নিশ্চিত ওই গ্যাংয়ে তুরাগ, স্বরূপা, শিলা, অভিলাষ ছাড়া আর কেউ নেই?”
প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বললো অধরা। নিতিন বললো,
“এই চারজন ছাড়া কারো অস্তিত্ব এখনো পাইনি আমি।”

অধরা মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে কিছু একটা ভাবলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“চলুন তবে একটা সার্কাস দেখে আসি।”

“কি সার্কাস?”

ভ্রু কুঁচকে বললো নিতিন। অধরা বাঁকা হেসে বললো,
“গেলেই দেখতে পাবেন। আপাতত সেটা সারপ্রাইজ থাক।দু’একটা শক না হয় আমি ও দিলাম৷ মন্দ কি?”

নিতিন মুচকি হেসে বললো,
“মন্দ নয়, ভালোই হবে। চলুন তবে।”

*
পুলিশ জিপে বসে আছে সবাই। আদাবর ড্রাইভ করছে। বাকিরা কেস নিয়েই আলোচনা করছে।

“স্যার এই ডায়েরি আর ট্রাভেল ব্যাগ গুলো কি আগে পরীক্ষা করা হয় নি?”
নিতিনের সহকারীর প্রশ্ন। নিতিন বললো,
“করা হয়েছে। ফিংঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোর দেয়া রিপোর্ট পাল্টে দিয়েছে তারা।

কাল চাপে পড়ে সঠিক রিপোর্ট দিয়েছে।”
“কিন্তু স্যার ওরা এত চতুর। এত নিখুঁত প্ল্যান, এত নিখুঁত সবকিছু তবে ওরা লাশে ফিঙ্গার প্রিন্ট রাখলো কেনো! ব্যাপারটা কেমন খটকা লাগছে।”

ভাবুক কন্ঠে বললো জিহাদ। নিতিন জিহাদের কাধ চাপড়ে বললো,
“চমৎকার প্রশ্ন করেছো জিহাদ। তবে তোমার এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই আমার কাছে। আমি আন্দাজ করতে পারি, তারা আগে থেকেই প্ল্যান করেছিলো ফরেনসিক রিপোর্ট পাল্টানোর, সব আগে থেকেই সেট ছিলো তাই খুন করতে গিয়ে এত কিছু ভাবেনি।”

“ওহ আচ্ছা।”বিজ্ঞের মতো বললো জিহাদ।

“আমি ভাবছি অন্য কথা।”

চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো অধরা। নিতিন কপাল কুঁচকে বললো,
“কি কথা?”

“আমি ভাবছি তুরাগ শাড়িটা নিলো কার জন্য? সে এতিম তার মা বোন নেই, প্রতিভার মৃত্যু হয়েছে। তবে সে কার জন্য নিলো?তার কি কোন গার্লফ্রেন্ড আছে? কিংবা স্ত্রী?”

অধরা প্রশ্নে নিতিন পকেট থেকে তার ফোন বের করলো। তারপর লক খুলে গ্যালারিতে ঢুকে একটা ছবি ওপেন করে ফোনটা অপজিট সিটে বসা অধরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ছবিটা দেখুন তো। এতে হয়তো আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।”

অধরা বরাবরের মতোই ফোনটা হাতে নিয়ে কৌতুহলভরা দৃশ্য ফেললো ফোনের স্ক্রিনে। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটা ফটোফ্রেমের ছবি। এই ফটোফ্রেমটা অধরা আগেও দেখেছে বেশ কয়েকবার। কোথায় দেখেছে? ও হ্যাঁ, তুরাগের ফ্ল্যাটে দেখেছে। তুরাগের বেডরুমের দেয়ালে টাঙানো ছিলো ছবিটা।

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে তোলা তুরাগের ছবি। ছবির নিচে ট্যাগ কার্ডে লেখা ‘তুরাগের প্রথম ফরেন ট্যুর।’ ছবিটায় চোখ বুলিয়ে তুরাগ ছাড়া সন্দেহজনক কাউকেই দেখলো না অধরা। সে চো কপাল কুঁচকে নিতিনের দিকে তাকালো। অধরার হাবভাব বুঝে নিতিন মুচকি হাসলো। হেসে বললো,
“ইন্সপেক্টর অধরা, আপনি অনেক বিচক্ষণ মানুষ। ছবিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন।

আমার বিশ্বাস ক্লু পেতে আপনার বেশিক্ষণ লাগবে না।”

নিতিনের কথা শুনে অধরা আবারো স্ক্রিনে মনোযোগ দিলো।

মিনিট তিনেক দেখার পর হঠাৎ অধরার চোখ পড়লো তুরাগের চোখের উপর থাকা নীল সানগ্লাসে। ব্লু সানগ্লাসটায় একটা ছায়া মানবী চোখে পড়লো অধরার। সেই ছায়া মানবীকে চিনতে অসুবিধা হলো না তার। সে ফোন থেকে চোখ তুলে বিস্মিত দৃষ্টি ফেললো নিতিনের দিকে।

অধরার বিস্মিত ভাব আবারো হাসালো নিতিনকে। নিতিন বললো,
“আমার বিশ্বাস সত্য বনে গেলো দেখলেন! আপনি আবারো আপনার বিচক্ষণতার প্রমাণ দিলেন।

আপনার মনে সন্দেহটাই ঠিক।

এই ছায়া মানবীই তুরাগের সেই স্পেশাল ওয়ান।”

পুরো ব্যাপারটা আর একবার ভাবতেই অধরার চেহারায় রাগ উল্কি এঁকে গেলো। ফর্সা গালটা রক্তিম লাল করে দাঁত কিড়মিড় করে রাগত স্বরে বললো,
“সব গুলো বিশ্বাসঘাতক। এদের ফাঁসির রায় না হওয়া অব্দি আমি দম নিবো না।”

“রিল্যাক্স ইন্সপেক্টর! এত হাইপার হবেন না, খুনের শাস্তি না পেলেও বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি পাবেই এরা। আমার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার কোন ক্ষমা নেই। সব ঠিক থাকলে এদের কঠিন শাস্তি হবেই।”

অধরার রাগত চেহারার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো নিতিন। অধরা দু’হাতের তালু দিয়ে মুখ চেপে মিনিট খানেক সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর হাতে থাকা ডায়াল ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।

চারটা বেজে পাঁচ মিনিট। সময় দেখে ড্রাইভিং সিটে বসা আদাবরকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“দ্রুত ড্রাইভ করুন। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছাতে হবে।”
“জ্বি ম্যাডাম।”

অধরার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে আবারো ড্রাইভিং করায় মনোযোগ দিলো আদাবর। নিতিন কৌতুহলী হয়ে বললো,
“আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“সিটি হাসপাতাল।”স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো অধরা। নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কেনো! ওখানে কি?”

“সার্কাস দেখবো।”বলে হাসলো অধরা। তারপর ফোন বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করলো। রিসিভ হতেই বললো,
“সব রেডি?”

ওপাশ থেকে ইতিবাচক উত্তর এলো। অধরা বললো,
“সব ঠিকঠাক করে জিনিস পত্র নিয়ে সিটি হাসপাতাল চলে যাও। আমি আসছি।

আর হ্যাঁ, রিসিপশনে আমার জন্য ওয়েট করো। কেউ যেনো তোমার পরিচয় জানতে না পারে। রাখছি।”

বলে ফোন রাখলো অধরা। নিতিন তখনো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে অধরার দিকে। এবার নিতিনের কুঁচকানো ভ্রু দেখে অধরা হাসলো।

হেসেই বললো,
“আপনার ফোর্সকে সিটি হাসপাতাল যেতে বলুন। দর্শক ছাড়া সার্কাস জমে না। আমার পুলিশ ফোর্স ও যাচ্ছে পিছনের গাড়িতে।”

বলে একটা পুলিশ জিপের দিকে ইশারা করলো অধরা। নিতিন অধরা মতিগতি বুঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু ফলাফল শূন্যতে গিয়ে ঠেকলো। এই মুহুর্তে অধরার মতিগতি তার ভাবনার বাইরে। তবে অধরা যে কোন বাজিমাত করতে যাচ্ছে তার বেশ বুঝতে পারলো সে। তাই না বুঝেই অধরা বলা মতো তার ফোর্সকে সিটি হাসপাতাল যেতে বললো। এদিকে জিপে বসা বাকিদের মনে কৌতুহল চেপে বসেছে।

তারা মূলত যাচ্ছে কোথায়? তবে কি অধরা তুরাগদের খোঁজ পেয়ে গেছে? নাকি ঘটনা অন্য কিছু! কারোরই সঠিক ব্যাপারটা মাথায় আসছে না। নানান কথা আন্দাজ করছে। সবাই একরাশ কৌতুহল মনে চেপে চুপ করে থাকলেও প্রশ্নের ভান্ডার সম্পন্ন মস্তিষ্কের অধিকারী জিহাদ কোনভাবেই চুপ থাকতে পারলো না।

কাচুমাচু করে বলেই ফেললো,
“ম্যাডাম আপনি কি তুরাগের সন্ধান পেয়ে গেছেন? আমরা কি তুরাগকে এরেস্ট করতে যাচ্ছি।”

“না। তুরাগের সন্ধান জানি না আমি। তুরাগ যে জীবিত আছে তা জেনেছি কিছুক্ষণ আগে। আমি কিভাবে জানবো তুরাগ কোথায়?”

নির্দ্বিধায় বললো অধরা। জিহাদ প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি দিয়ে বললো,
“তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? তুরাগকে না ধরতে গেলে আমরা কাকে ধরতে যাচ্ছি!”

“আমরা যাচ্ছি সার্কাস দেখতে। সার্কাস দেখা শেষ হলে আমরা সার্কাস দেখানো জোকারকে এরেস্ট করবো। তারপর থানায় এনে সার্কাস শো অন করবো। তাকে অভিনেতা ও বলতে পারো।”মুচকি হেসে বললো অধরা।

“জোকার হাসপাতালে কেনো গেলো?” না বুঝেই প্রশ্ন করলো জিহাদ। অধরা বললো,
“অভিনয় করতে। আমি আর কিছু বলতে পারবো না। হাসপাতালে গেলেই বুঝতে পারবে কাহিনী।”

এরপর জিপময় নিরবতায় ভর করলো। সবাই যে যার মতো ভেবে যাচ্ছে। তখনো গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা ভেবে চলেছে নিতিন। পথের শেষে এলো গন্তব্য। থামলো গাড়ি, নামলো সবাই। অধরা নেমে দেখলো তার ফোর্স হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই সিভিল ড্রেসে আছে। কারো গায়ে পুলিশ ইউনিফর্ম নেই। অধরা সবার দিকে তাকালো। কিছু একটা ইশারা করলো। সবার দৃষ্টি অধরার দিকে নিবদ্ধ।

অধরা সবাইকে এলার্ট থাকতে বললো।তারপর নিতিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনার ফোর্সকে হাসপাতাল ঘেরাও করতে বলুন। জোকার পালাতে পারে। পালালে বিশাল সমস্যা, বিনোদন মিস হয়ে যাবে। যা আমি কোনভাবেই চাচ্ছিনা। সো বি এলার্ট।”

খানিক থেমে সবার দিকে তাকিয়ে আবার বললো,
“সার্কাস দেখতে হলে চলে আসুন সবাই।

বলে হাসপাতালের ভিতরের দিকে হাটা ধরলো। একরাশ কৌতুহল নিয়ে নিতিন জিহাদসহ জিপে থাকা বাকিরাও অধরা পিছন ছুটলো। অধরা রিসিপশনে গিয়ে এক মধ্যবয়সী মহিলার সাথে খানিক কথা বললো তারপর তাকে নিয়ে একটা রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। নিতিনরা বাইরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকালো।

এই মুহুর্তে নিতিনের মনে হচ্ছে অধরা সার্কাস শুরু করে দিয়েছে। অধরাই সার্কাসের অভিনেত্রী। নিতিন যখন সাত পাঁচ ভাবতে ব্যস্ত তখন ওই রুমের দরজা খুলে সাদা এপ্রোন পরিহিতা এক নারী বেরিয়ে এলো।

মুখে মাস্ক থাকার কারণে চেহারা বুঝা যাচ্ছে না। হাতে একটা ডাক্তারি ফাইল, এপ্রোনের উপর গলায় ঝুলানো স্টেথোস্কোপ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, মাথার নিকষ কালো চুলগুলো পনিটেইল বাধা।

ভাবভঙ্গি দেখে অনায়েসে বলা যায় এটআ কোন লেডি ডাক্তার। ডাক্তার সদৃশ সেই মহিলা নিতিনদের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
“চলুন।”

জিহাদ ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনি কে? দেখুন আমরা কোন রোগী নই যে আপনি আমাদের চিকিৎসা করবেন।”

উত্তরে লেডি ডক্টর হাসলো। যা চশনার ভিতর থাকা চোখ দেখে বুঝা গেলো। নিতিন এতক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তার সামনে থাকা মহিলার দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার হাসি দেখে নিতিনের কপাল থেকে চিন্তার ভাজ সরে গিয়ে চোখে মুখে বিস্ময়ে ভাব দেখা গেলো।

নিতিন বুঝে গেলো তার সামনে দাঁড়ানো লেডি ডাক্তার আর কেউ না, সে ইন্সপেক্টর অধরা। অধরার গেট আপ দেখে ঘটনা খানিক আন্দাজ করতে সক্ষম হলো সে।

তাতেই তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সে মুচকি হেসে বললো,
“জিহাদ আমরা রোগী নই, আর উনি ডাক্তার ও নয়।

সো চিন্তার কারণ নেই। উনি তোমাকে চিকিৎসা করবে না বরং সার্কাসের দর্শক সারিতে বসিয়ে সার্কাস দেখাবে। এম আই রাইট ইন্সপেক্টর অধরা? “

উত্তরে সামনে থাকা মানুষটার মাস্কের ভিতর থেকে একটা বাক্য আসলো,
“এভস্যুলেটলি ইউ আর রাইট মি.নিতিন। চলুন সার্কাস দেখা যাক।”

বলে অধরা হাসলো। চশমার কাচ বেধ করে চোখ দিয়ে সেই হাসিটা বেরিয়ে এলো। জিহাদ অবাক হয়ে বললো,
“ম্যাডাম আপনি?”

“হ্যাঁ আমিই। চলো।”

অধরা সবাইকে নিয়ে সেকেন্ড ফ্লোরের সর্বশেষ রুমটার সামনে গেলো। দরজায় দাঁড়িয়ে বললো,
“সবাই বাইরে থাকুন। আমি ভিতরে যাচ্ছি। কেউ কেবিনে প্রবেশ করবেন না।

ডোর গ্লাস দিয়ে সার্কাস দেখুন। তবে ডোর লক করবেন না। জাস্ট ভেজিয়ে দিন। ভিতর থেকে জোকার বেরিয়ে আসলো তাকে পাকড়াও করবেন। তবে হ্যাঁ, কেউ খালি হাতে জোকারকে ধরবেন না। গ্লাভস পরে নিবেন আগে। বাকিটা আমি সামলাবো।”

মনে হাজারো প্রশ্নরা উথাল পাথাল ঢেউ খেললেও কেউ তা প্রকাশ করলো না। সবাই আকাশসম কৌতুহল নিয়ে সায় জানালো। যার অর্থ তারা অধরার কথা অনুযায়ী কাজ করবে।

অধরা সবাইকে এলার্ট করে কেবিনের দরজা ঠেলে ভিতরে ডুকলো। কেবিনে প্রবেশ করে ভিতর থেকে দরজা ভেজিয়ে দিলো। কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সবাই তাদের কৌতুহল ভরা দৃষ্টি ডোর গ্লাস দিয়ে ভিতরে ফেললো। কেবিনের মাঝে সেট করা বেডের উপর শুয়ে থাকা রোগীকে দেখে সবাই আরেক ধপা চমকালো।
তুষার শুভ্র বেন্ডেজে মোড়ানো একটা দেহ শুয়ে আছে সাদা ফোমের তুলতুলে বেডের মাঝখানটায়। চোখ আর ডান বাহুর কিছুটা অংশ ছাড়া বাকি শরীরটা ব্যান্ডেজে আবদ্ধ।

চোখ দুটো বন্ধ তার। হয়তো ঘুমাচ্ছে কিংবা বেহুশ। দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ভাবছে, এই রোগীর সাথে অধরার সার্কাসের কি সম্পর্ক? এখানে অধরা কি সার্কাস দেখাবে!

কেউই ভাবনার সমাধান বের করতে পারছে না। সবাই অধির আগ্রহে ডোর গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছে। অধরা তার হাতে থাকা ফাইলটা খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখার ভান করলো। তারপর কেবিনে থাকা নার্সের সাথে রোগীর ব্যাপারে খানিক আলাপ করলো। নার্সের সাথে কথা বলার সময় অধরা এক হাত এপ্রোনের পকেটে ছিলো, আরেক হাতে ফাইল ধরা ছিলো। বেশ দক্ষ ডাক্তারের মতো বেশ আলাপ করছে সে।

এই রোগী হ্যান্ডেল করছিলো ডাঃ রিন্তিকা রাহি। তার আর অধরার দৈহিক গঠন খানিক মিলে যায়। এই মিলে যাওয়ার দিকটাকে কাজে লাগিয়ে রিন্তিকার গেট আপ নিয়ে কেবিনে এসেছে অধরা।

অধরার নিখুঁত অভিনয় নার্স ধরতে পারলো না। নার্স বললো, গত ২৪ঘন্টা রোগী অজ্ঞান অবস্থায় আছে। অধরা তার হাতে থাকা ফাইলটা নার্সকে দিয়ে রোগীর বেড সাইডে বসলো। তারপর স্টেথোস্কোপ এর সাহায্যে রোগীর হার্টবিট চেক করতে লাগলো। তারপর বিচলিত ভাব নিয়ে পকেট থেকে গ্লাভস পরিহিত মুঠো করা হাতটা বের করে এনে রোগীর বাহু চেপে ধরলো।

সেকেন্ড দশেক পর হাত গুটিয়ে আরেকবার স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগীর হার্টবিট শুনে উঠে দাঁড়ালো। বেড থেকে খানিক দূরে গিয়ে নার্স থেকে ফাইল নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“রোগীর অবস্থা ক্রিটিকাল। মেডিসিন নিচ্ছে না বডি। এমন হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। আপনি রোগীর বাড়ির লোককে খবর দিন।”

নার্সের উত্তর দেয়ার আগেই একটা চিৎকার কানে এলো দুজনের। চিৎকার শুনে বিচলিত হওয়ার বদলে অধরা হাসলো। যার অর্থ, কাজ হয়ে গেছে, সার্কাস ও অন হয়ে গেছে। অধরা পিছন ঘুরে বেডের দিকে তাকালো। রোগী বেডে নেই, বেড থেকে নেমে ফ্লোরে লাফাচ্ছে। অধরা বিচলিত হওয়ার ভান করে বললো,
“কি হয়েছে আপনার?”

রোগী উত্তর না দিয়ে বাহু চুলকাচ্ছে আর লাফাচ্ছে। বলার মতো অবস্থায় নেই। কেবিনের বাইরে থেকে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। এই রোগীর না পুরো বডি ব্যান্ডেজ! হাটতে পারে না চলতে পারে না। তবে এখন লাফাচ্ছে কিভাবে! তবে কি এর ও সব অভিনয়?

তাহলে এটাই কি ম্যাডামের দেখানো সেই সার্কাস?এমন ভাবনা ভেবে চলেছে সবাই।
মিনিট দুয়েক হলেও রোগীর লাফালাফি যখন শেষ হলো না তখন অধরা বললো,
“দৌড়ান, চুলকানি কমবে।”

অধরার কথা রোগীর কানে যেতেই রোগী কেবিনের দরজা দিকে ভৌ-দৌড় দিলো। কেবিনের ভেজানো দরজা দিয়ে বাইরে গিয়ে দু ক’দম এগুতেই অধরার কথা মোতাবেক কয়েকজন পুলিশ সেই ব্যান্ডেজ মানবকে আটকালো।
খানিক পর অধরা মুখের মাস্ক খুলতে খুলতে বেরিয়ে আসলো। তারপর রোগীর সামনে গিয়ে বললো,
“রোগী সাজার অভিনয়টা আপনি চমৎকার করেছেন ডাঃ কৌশিক।”

ব্যান্ডেজ মানব তখন কথা বলার অবস্থায় নেই। থাকলে হয়তো অবাক হতো কিংবা পালানোর চেষ্টা করতো। বর্তমানে সে অধরার দেয়া ইচিং পাউডারের কার্যকারিতা ভোগ করছে। অধরার মুখে ডাঃ কৌশিক শুনে নিতিন ছাড়া বাকি সবাই রীতিমতো হা হয়ে গেলো। এতক্ষণে তারা আসল ঘটনা বুঝতে পেরেছে।

একটা বিষয় সবাইকে ভাবাচ্ছে তা হলো ডাঃ কৌশিকের চলনা। ডাঃ কৌশিক তো অসুস্থ ছিলো। সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলো। তবে সেটাও কি বাকি সবার মৃত্যুর মতো অভিনয়? ঘটনা দেখে তো তেমনই মনে হচ্ছে, নাহলে সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে কেউ এভাবে দৌড়াতে পারে?

কৌশিকের এসব যদি অভিনয় হয় তবে বলতে হয় কৌশিক ও প্রতিভা খুনের সাথে জড়িত ছিলো। এমন ভাবনা মনে হতেই সবাই রাগত চোখে কৌশিকের দিকে তাকালো। জিহাদ অবাক হয়ে বললো,
“কৌশিক ও কি খুনে জড়িত ম্যাডাম?”
“এখনো বুঝতে পারছো না?”

নিতিন বললো। জিহান খানিক ভেবে মাথা চুলকে বললো,
“ম্যাডামের প্ল্যান বুঝতে সময় লাগে আমার। তবে এখন বুঝেছি। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারলাম না, তা হলো কৌশিক এমন লাফাচ্ছে কেনো!”

“বাস্তবতা বুঝতে সামান্য ইচিং পাউডার দিয়েছি কৌশিকের বাহুতে। যা ব্যান্ডেজের ভিতর দিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। এতেই কাজ হয়েছে। তোমরা ফ্রিতে সার্কাস দেখতে ফেলে। এবার বলো কেমন লাগলো সার্কাস?” স্মিত হেসে বললো অধরা।

“ভাবনার বাইরে।”অবাক কন্ঠে বললো জিহাদ। আদাবর বললো,
“আপনি আবারো বিচক্ষনতার পরিচয় দিলেন ম্যাডাম।”

অধরা হাসলো। নিতিন মুচকি হেসে বললো,
“ইউ আর টু মাচ ইন্টেলিজেন্ট ইন্সপেক্টর অধরা।”
অধরা আবারো হাসলো। হাসি থামিয়ে বললো,

“মি.নিতিন আপনি আপনার টিম নিয়ে কড়া নিরপত্তার মাধ্যমে ডাঃকৌশিককে এবং কেবিনে থাকা নার্সকে থানায় নিয়ে যান। খেয়াল রাখবেন যেন পালাতে না পারে।আমি আমার টিম নিয়ে আরেকটা সার্কাস দেখে আসি।”
নিতিন ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো তারপর বললো,
“ডাঃকৌশিকের ইচিং প্রবলেম সারাতে হবে। না হলে পেট থেকে কথা বের করাতে দায় হবে। আমি ডাঃ কৌশিককে ট্রিটমেন্ট করে থানায় পাঠিয়ে তারপর আপনার সাথে জয়েন করবো। এই সার্কাস মজা লেগেছে, আরেকটা দেখার লোভ সামলাতে পারছি না।”

অধরাও খানিক ভেবে বললো,
“ওকে। দেন আমি আপনাকে এড্রেস টেক্সট করবো। আপনি কাজ শেষে জয়েন করুন। পারলে ফোর্স নিয়ে আসবেন, নিরপত্তাজনিত কারণ আছে। বুঝতেই পারছেন।”

“হ্যাঁ বুঝতে পারছি। আপনি যান। এদিকটা আমি সামলাচ্ছি।”
“ওকে।আমার দেরি হচ্ছে, আমি বের হচ্ছি।”

বলে হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে বেরিয়ে গেলো অধরা। গ্লাভস জোড়া ডাস্টবিনের ফেলে হাসপাতালের বাইরে টহলরত পুলিশ ফোর্স নিয়ে আবারো অন্য গন্তব্যে রওনা হলো সে।

সারাটা পথ কেস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবলো অধরা। অধরা তার ভাবনায় মজে থাকাকালীন সময়েই গন্তব্যে পৌঁছে গেলো। আদাবর গাড়ি থামালো। ভাবনার সুতো কেটে অধরা ব্যাগ থেকে এক জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস নিয়ে পরলো। তার গায়ে তখনো ডাক্তারি পোশাক, তবে স্টেথোস্কোপ নেই।

সে হাত দিয়ে চোখের চশমা ঠিক করে গাড়ি থেকে নামলো। তারপর এপ্রোনের মাঝামাঝিতে ডান বাম দুইসাইডে থাকা পকেট দুটোতে দু’হাত রেখে দাঁড়ালো। আশে পাশে চোখ বুলিয়ে সামনে তাকালো।

একটা জং ধরা লোহার গেট। লোহার গেটের দুপাশে দাঁড়ানো দুটো পিলারের দুপাশে টাঙানো নেভি ব্লু কালার দুটো সাইনবোর্ড। এক পাশে একটা সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে বাংলায় লেখা’ “জাতীয় মানষিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,

শের-ই বাংলা নগর, ঢাকা।”

অন্যপাশের সাইনবোর্ডে ও একি কথা লেখা তবে ভিন্ন ভাষায়। মানে ইংরেজিতে লেখা, NATIONAL INSTITUTE OF MENTAL HEALTH AND HOSPITAL.
SHER-E-BANGLA NAGAR, DHAKA.

অধরা সাইনবোর্ড দুটোতে চোখ বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

তারপর মনে মনে আওড়ালো, “এখানেই থেমে গেছে হাজারো সুন্দর গল্প, হাজারো সুন্দর জীবন। থেমে গিয়ে রূপ নিয়েছে করুণতা, তাচ্ছিল্যতা আর ভয়াবহতায়।”কথাটা আওড়িয়ে গেটের দিকে পা বাড়ালো সে। আগে থেকে এলার্ট করার কারণে অধরা আগে তার ফোর্স এসে পৌঁছেছে।

অধরা আটজন পুলিশকে হাসপাতালের বাইরে অবস্থান করতে বলে আদাবর আর জিহাদকে নিয়ে হাসপালের ভিতরে ঢুকলো। ভিতরে গিয়ে গ্র‍্যান্ড ফ্লোরে অধরার জন্য অপেক্ষারত সেখানকার ডাক্তার জিসান মালিককের সাথে কুশল বিনিময় করলো।

কিছু ব্যাপার বুঝিয়ে দিয়ে জিসান থেকে কয়েকটা জিনিস নিয়ে পকেটে রেখে সিড়ির দিকে এগুলো। পিছন পিছন আদাবর, জিহাদ আর জিসান মালিক। সিড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠলো। তিনতলার চতুর্থ নাম্বার রুমের সামনে গিয়ে মাস্ক পরে নিলো অধরা।

ইশারায় সবাইকে বাইরে দাঁড় করিয়ে সে কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। কোন প্রকার শব্দ না করেই ভিতরে প্রবেশ করায় কেবিনের ভিতরে বেডের উপর শুয়ে থাকা মায়লা কাপড় গায়ের এলোমেলো চুলের উদ্ভট মানুষটা চোখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো।

মাস্ক পরিহতা এক সুন্দরী ডাক্তার দেখে তার কালিতে মাখা কালো মুখের ভ্রু যুগল আপনাআপনি কুঁচকে গেলো। যা দেখে অধরার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। অধরা পকেট থেকে একটা কাঁচি বের করে বেডে শুয়ে থাকা ব্যক্তির দিকে ছুড়ে মেরে বললো,
“ক্যাচ!”

কিছু না বুঝেই শুয়ে থেকেই নিজের দিকে তেড়ে আসা কাঁচিটা হাতলের দিকে খপ করে ধরে ফেললো। এমনভাবে ধরলো যেন তার হাত না কাটে। কারণ কাঁচিটা ধারালো আর খোলা ছিলো। দক্ষ মানুষের মতো ক্যাচ ধরা দেখে অধরা মুচকি হাসলো।

তারপর আরেক পকেট থেকে একটা ইনজেকশন বের করলো। ক্যাপ খুলে সিরিঞ্জে থাকা সাদা রঙের মেডিসিন চেক করলো। উপর দিকে তাক করে দুই এক ফোটা মেডিসিন ফেলে চিকন সুরে বললো,
“এটা কি জানেন? গোখরা সাপের বিষ।

কেউটে আর গোখরা সাপের বিষ ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপি আর অ্যান্টি ভেনাম তৈরির কাজে ব্যবহার হয়। অ্যান্টি ভেনাম হলো একধরনের মেডিসিন।

বিষধর সাপে কামড়ালে একমাত্র অ্যান্টি ভেনাম প্রয়োগের ফলেই মানুষ প্রাণ ফিরে পায়। বিষে বিষে বিষক্ষয় টাইপ আর কি। এই জন্যই কেউটে আর গোখরা সাপের বিষের ডিমান্ড আকাশচুম্বী।

আমার পরিচিত এক আত্মীয় সাপের বিষের বিজনেস করে, আমি তাকে কনভেন্স করে এটুকু নিয়ে এসেছি। কারণ, আমার মনে হয় এটা মানষিক রোগীদের ও প্রয়োগ করা যায়।

একদম সুস্থ হয়ে যাবে। আগে দু’বার দুটো রোগীকে দিয়েছিলাম। দেয়ার সাথে সাথে তারা মারা গিয়েছিলো। তাই আমাকে ওই হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দিলো। আজই এই হাসপাতাল প্রথম দিন।

তাই আমি ঠিক করেছি আজই কারো উপর আমার আবিস্কার গোখরা সাপের বিষের থেরাপি এপ্লাই করবো। যেই ভেবেই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে এখানে এসেছি। কারণ এখানে এসে বিষ থেরাপির কথা বলার একজন নার্স আমার উপর নজর রাখছিলো। যাক গে, এখন যখন আমি এসেই পড়েছি আপনার আর চিন্তা নেই।

আমি এখন এই ইনজেকশন পুষ করবো। তারপর আপনি একটা ঘুম দিবেন, ঘুম থেকে উঠেই দেখবেন আপনি একবারেই সুস্থ। এবার হাত দিন তো।”

বলে ইনজেকশন হাতে রোগীর দিকে এগিয়ে গেলো অধরা। এদিকে রোগীর মুখটা দেখার মতো হলো। ভয়ে কয়েক ঢোক গিললো। গোখরা সাপের বিষ থেরাপি দেয় কেউ মানুষিক রোগীকে? এই থেরাপি দেয়ার সাথে সাথে আমারো মৃত্যু হবে ভেবেই আরেক ঢোক গিললো।

রোগী যেন তার হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেললো। লাফ দিয়ে উঠে বসে ভয়ার্ত গলায় বললো,
“না না, দিবেন না ম্যাডাম। আমি ইনজেকশন ভয় পাই।”

অধরা রোগীর হাত খপ করে ধরে ইনজেকশনের সুঁই এগিয়ে নিয়ে বললো,
“আরেহ ভয় কিসের? একদম পিওর গোখরা সাপের বিষ, বিন্দুমাত্র কেমিক্যাল এড করিনি। এর কার্যকারিতা বেশি। সুতারাং ভয়ের কিছু নেই, কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। চোখের পলকের কাজ শেষ।”

অধরা সুই যখন রোগীর হাত বিধবে তখনই রোগী অধরাকে এক ঝটকায় সরিয়ে এক দৌড়ে দরজার দিকে গেলো।

দরজা খুলে বেরুতে গিয়েই আদাবর আর জিহাদের হাতের বাধনে আটকা পড়লো। রোগী ব্যতিব্যস্ত হয়ে সামনের মানুষগুলোর দিকে না তাকিয়েই বললো,
“আমাকে বাঁচান, উনি আমাকে সাপের বিষ দিয়ে মেরে ফেলবে।

প্লিজ যেতে দিন! আমি সুস্থ মানুষ। আমার কোন সমস্যা নেই।”

রোগীর কথায় জিহাদ আদাবর দুজনেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। আদাবর মনে মনে বললো, “মানুষ তিন সময়ে নিজের অজান্তে সত্য কথা বা মনের কথা বলে দেয়। অতি রাগ, অতি ভয় আর অতি খুশির সময়। ম্যাডাম এই তিনের একটা বেছে নিয়ে ট্রিকস করে ফাঁসালো। রোগীর সুস্থতা যাচাই করার জন্য তিন কৌশল ব্যবহার করেছে। কি দারুণ আইডিয়া। সত্যি ম্যাডাম লিজেন্ড।চমৎকার বুদ্ধিমত্তা তার!”

অধরা পিছন থেকে বললো,
“আপনি ভয়ের চোটে সত্য কথাটা বললেন মিস্টার মৃদুল। আপনার কিছুই হয়, আপনি সুস্থসবল মানুষ। আমি জাস্ট এই কথাটাই শুনতে চেয়েছি। তারজন্যই এতকিছু।”

অধরার কথা শুনে মৃদুল পিছন তাকালো। ততক্ষণে অধরা তার মুখাবৃত মাস্ক খুলে ফেলেছে। অধরার চেহারা দেখে মৃদুল যেন আকাশ থেকে পড়লো। তার বুঝতে বাকি রইলো না এতসব তার আসল রূপ ধরার জন্যই করা হয়েছে। মৃদুলের এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা মানুষ সে-ই।

নিজের খানিক বোকামির জন্য নিজে ফেঁসে গেলো। ভয়ে সত্যটা বলে আরো ফেঁসে গেলো। ভালোই ফেঁসেছে সে। এবার? এবার পালাতে হবে। সে ভেবেই আদাবর আর জিহাদকে ধাক্কা দিয়ে পালাতে চাইলো। দুক’দম যেতেই নিতিন এসে মৃদুলের এক হাত খুব শক্ত করে ধরে ফেললো।

তারপর মৃদুলের অসহায় চেহারার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
“হ্যালো, আমি নিতিন সরকার। সি আই ডির সিনিয়র ইন্সপেক্টর।

আজকাল পুলিশের সাথে জোট বেধে প্রতিভা কেস ইনভেস্টিগেশান করছি। আর এখানে একটা সার্কাস দেখতে এসেছি ফোর্স নিয়ে।”

নিতিন তার কথার মাধ্যমে বুঝালো, তুমি বড় কারো হাতে পড়েছো। তুমি আর পালানোর চেষ্টা করোনা। তোমার পালানোর সব রাস্তা বন্ধ। নিতিনের কথার ভাব বুঝতে অসুবিধা হলো না মৃদুলের। তার মুখটা ফ্যাকাসে আকার ধারণ করলো। অধরা বললো,
“অভিনয়টা আরেকটু ভালো করলে ও পারতেন। তুরাগরা কত নিখুঁত অভিনয় করে আর আপনি কিনা ফ্লপ এড করে ধরা খেলেন!কি লজ্জাজনক বিষয়! “

মৃদুল কোন জবাব দিলো না। সে তখনো ক্ষীণ আশা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করতে ব্যস্ত। তা দেখে অধরা ফোন করে তার টিম মেম্বারদের আসতে বললো। ফোন রেখে অধরা বললো,
“মি.নিতিন সার্কাস তো শেষ, এবার জোকারকে থানায় নিয়ে যাওয়া হোক?”

“ইয়াহ, সিউর।বাই দ্যা ওয়ে, গুড জব। আপনি কেস সমাধানের কাজ এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন।”

হেসে বললো নিতিন। অধরাও কিছু বললো না। টিম মেম্বাররা এলে কড়া নিরপত্তার মধ্য দিয়ে মৃদুলকে নিচে নামিয়ে গাড়িতে উঠানো হলো। জিসান ও অধরার বুদ্ধিমত্তার বেশ প্রশংসা করে বিদায় নিলো।

মৃদুলের পাশে গোটা দশেক পুলিশ, সি আই ড রেখে নিতিন গাড়ি থেকে নামলো। গাড়ি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অধরা জিহাদ আদাবরের সাথে কথা বলছে।নিতিন ও সেদিকে গেলো। জিহাদ বললো,
“ম্যাডাম আপনি সাপের বিষ পেলেন কোথায়?”

“ওটা সাপের বিষ পাবো কই আমি? তাও আবার গোখরার বিষ! ইনজেকশনে থাকা ওগুলো পিওর ওয়াটার। ডাঃজিসান সম্ভব কোন তার ওয়াটার পট থেকে নিয়েছে।

জাস্ট ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যা বলেছি।”

অধরার কথা শুনে আদাবর বললো,
“আপনার বলা মিথ্যাটাও পিওর ছিলো। যার কারনে ধরতে পারেনি। জিহাদ বললো,
“ম্যাডাম আপনি কিভাবে বুঝলেন যে ওরাও খুনের সাথে জড়িত?”

“প্রতিভা মির্জার মৃত্যুর পর কৌশিক আর মৃদুলকে আমার সন্দেহ হয়েছিলো। কিন্তু ওদের দুজন হাসপিটালাইজড শুনে আমি সন্দেহের তালিকা থেকে তাদের বাদ দিয়ে দিই।

কিন্তু মি.নিতিন সবার পোলা খোলার পর আমার হুট করেই এদের উপর সন্দেহ হলো। বারবার মনে হচ্ছিলো এরাও অসুস্থতার ভান করছে। তাছাড়া তুরাগ, শিলা, স্বরূপা, অভিলাষ জীবিত মানে সবার সামনে উপস্থিত থাকার সময়ে এসব বিষয় কে সামলিয়েছে? তারা পুলিশের কড়া নিরপত্তায় ছিলো তখন নিশ্চয়ই অন্য কেউ ছিলো। এসব ভেবেই অনেকটা সন্দেহবশত এসব করেছি।

আমার বিশ্বাস ছিলো দিন শেষে এদেরও ওদের দলেই পাবো। হলোও তাই। আমি বের হওয়ার আগে ফোর্স রেড়ি করে আমাদের আগে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি। তারপর তাদের মাধ্যমে ডাঃ জিহান এবং রিন্তিকার সাথে কথা বলে সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছি। বাকিটা তো তোমরা জানোই।”

একদমে বলে শেষ করলো অধরা। আদাবর অবাক হয়ে বললো,
“তৎক্ষনাৎ আপনি যে বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”

অধরা হাসলো। হাসিয়ে থামিয়ে বললো,
“একটা কথা বলা হয় নি তুরাগদের কাছ অব্দি পৌঁছানোর ক্লু পেয়েছি।”
“কি ক্লু?”

কৌতুহলী হয়ে বললো নিতিন। অধরা প্লাস্টিক মোড়ানো একটা মোবাইল দেখিয়ে বললো,
“মৃদুলের ফোন।”

নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো।অধরা স্মার্ট ফোনের সাইড বাটন চেপে স্ক্রিন অন করলো। সাথে সাথে স্ক্রিনে একটা ম্যাসেজ নোটিফিকেশন ভেসে উঠলো। মিনিট দশেক আগেই এসেছে ম্যাসেজটা। ম্যাসেজ দেখে জিহাদ বললো,
“আমার মাথা ঘুরাচ্ছে ম্যাডাম।”


পর্ব- ১২

অনেক সাধনার পর অবশেষে তুরাগদের সন্ধান মিললো। পুলিশ, সি আই ডি, বর্ডার গার্ডদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এখন চলছে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব।

তাদের ধরা হয়েছে মূলত মৃদুলের ফোনে আসা ম্যাসেজের সূত্র ধরেই। জিহাদের সেই মাথা ঘুরানো ম্যাসেজটি ছিলো এরকম, “2⃣🌠🕛 bp-gp”

জিহাদের মাথা ঘুরানোর কথা শুনে অধরা তখন হেসেছিলো। আদাবর বললো,
“ম্যাডাম এটা কেমন ক্লু?আমার তো কিছুই বুঝে আসছে না।”

অধরা চিন্তিত ভঙিত বললো, ” ওরা ইমোজি টক করেছে। এখানে কোন একটা ম্যাসেজ আছে। খেয়াল করে দেখতে হবে ইমোজি গুলো দিয়ে কি বুঝিয়েছে। বুঝতে পারলেই উত্তর সহজ হবে। এখন সবাই মনোযোগ দিয়ে ম্যাসেজ দেখো আর সমাধান করো।”

নিতিন ঠোঁট কামড়ে ম্যাসেজের দিকে তাকিয়ে রইলো। চারজন এক ধ্যানে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। অধরার কপালে চিন্তার ভাজ। চেহারায় ভাবুকতার আভাস।

চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মৃদুলের বাদামী ফোনের সাত ইঞ্চি স্ক্রিনে আবদ্ধ। খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে সুক্ষ্ম মস্তিষ্কে কিছু একটা ভাবলো।

তারপর বললো,
“2⃣ মানে টু, 🌠এই ইমোজিতে স্টার আছে।

স্টার দিয়ে নাইট বা রাত বুঝিয়েছে।ইমোজি দুটো মানে টুনাইট যার অর্থ আজ রাত। আর 🕛 এই ঘড়ির ইমোজি দিয়ে সময় বুঝিয়েছে। ইমোজির ঘড়িতে বাজে বারোটা। ওই সময়কেই মিন করেছে। তিনটা ইমোজির মানে দাঁড়ায়, আজ রাত বারোটা। আর bp…

“আর bp-gp দিয়ে কি গ্রামীণফোনের ভিপিকে বুঝানো হয়েছে? মানে আজ রাত বারোটায় গ্রামীনফোনের ভিপির সাথে সবার মিটিং। এমনটা?”

অধরার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললো জিহাদ। জিহাদের এই উদ্ভট স্বভাবে বেশ বিরক্ত অধরা। মাঝে পথে কথা না থামালেই কি হয় না জিহাদের? অধরার বিরক্তিভাবকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিলো জিহাদের অর্থহীন প্রশ্ন। খুনের সাথে সিম কোম্পানিকে টানলো। খুনিদের সাথে মিটিং!

তাও আবার কি গ্রামীণ ফোনের ভিপি! কি অর্থহীন কথাবার্তা! চোখে মুখে বিরক্তির আভা ফুটিয়ে অধরা কিছু বলার জন্য মুখ খুললো। তার ভাবনা ছিলো সে জিহাদকে জিজ্ঞেস করবে যে জিহাদ কিভাবে পুলিশের চাকরি পেলো। কিন্তু জিহাদকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেলো না।

তার মুখ থেকে একটা শব্দ বের হওয়ার আগেই নিতিন বলে উঠলো,
“bp-gp মানে গ্রামীণফোনের ভিপি নয়। bp-gp মানে বেনাপোল-গাতিপাড়া। আমি আন্দাজ করছি এটাকেই মিন করেছে তারা।”

“এটা তো বাংলাদেশ- ভারত সীমান্ত। তারমানে কি ওরা বেনাপোল দিয়ে ভারত চলে যেতে চাচ্ছে?”
প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বললো আদাবর।

নিতিন জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“ঠিক ধরেছো। বাংলাদেশ ও ভারতে অবৈধ পথে যাতায়াতের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হয় বেনাপোল সীমান্তকে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সদস্যদের নিয়মিত টহল এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নজরদারি থাকার পরেও চলে এ কার্যক্রম। কাঁটাতারের বেড়া টপকে জল ও স্থলপথে চলে অবৈধ যাতায়াত। নারী প্রাচার থেকে শুরু করে নানা অবৈধ কার্যক্রম হয় এ সীমান্তে।

অবৈধ ভাবে বেনাপোল দিয়ে ভারত যাবার ক্ষেত্রে বেনাপোল পোর্ট থানার পুটখালী, দৌলতপুর, গাতিপাড়া ও সাদিপুর সীমান্তকে বেছে নেওয়া হয় নিরাপদ রুট হিসাবে।

এই অবৈধ যাতায়াতে মূখ্য ভূমিকা রাখে দালালরা। একজন সীমান্ত দালাল ঢাকা থেকে একজন নারী বা পুরুষকে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছাতে ৭-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ নিয়ে থাকেন।

সীমান্তের ঘাট মালিক তাদেরকে ভারতে পৌচ্ছে দেয়।তারপর ওপারের দালাল তার নিজ দায়িত্বে সীমান্ত পার করা মানুষদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন। আমি নিশ্চিত তুরাগরা আজ রাতে এভাবেই পালানোর ফন্দি আঁটছে।”
খানিক থেমে নিতিন জিহাদের কাধ চাপড়ে বললো,
“তুমি একজন পুলিশ কর্মকর্তা। অন্যের কথার আগামাথা না বুঝে কোন প্রশ্ন বা উত্তর দিবে না।

কথা বললে ভারি মাপের কথা বলবে, না হলে চুপ থাকবে। এতে সম্মানিত না হলেও অন্তত অপমানিত হতে হবে না।

“জ্বি স্যার।”
লজ্জিত ভঙিতে বললো জিহাদ। সে আবারো বুঝতে পেরেছে পুরোনো ভুল আবারো করেছে। অধরা সেদিকে খেয়াল না দিয়ে বললো,
“মৃদুলের ফোনের আসা ম্যাসেজের মানে হচ্ছে, “আজ রাত বারোটা বাজে তারা বেনাপোলের গাতিপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারত চলে যাবে। ম্যাসেজের মিনিং যদি এটা হয় তবে আমাদের এলার্ট থাকা উচিত।”

আদাবর তার হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললো,
“এখন বাজে সন্ধ্যা ছ’টা। তারমানে আমাদের হাতে আছে আর মাত্র ছ’ঘন্টা।”

নিতিন ও একবার নিজের হাতে পরে থাকা ঘড়িটায় সময় দেখে নিলো। তারপর ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো,
“ইন্সপেক্টর অধরা, আপনি আপনার ফোর্স লাগান আমিও আমার ফোর্স লাগিয়ে দিচ্ছি।”

“আচ্ছা।”

এর পর শুরু হলো জুরুরি অভিযান। নিতিন ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মোহাম্মদ বিহারি মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করেছে। আর অধরা বেনাপোল পোর্ট থানার ইন্সপেক্টরের সাথে যোগাযোগ করেছে। বর্ডার গার্ড, সি আই ডি এবং পুলিশের সহায়তায় পালায়নের চেষ্টাকালে তুরাগ, শিলা, অভিলাষ, স্বরূপাকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। হাতে নাতে জব্দ করায় কেউ পালানোর সুযোগ পায় নি। তাদের আটক করে নিতিনের হাতে সর্পদ করা হয়েছে।

জিজ্ঞাসা পর্বে সর্ব প্রথম নাম এসেছে মৃদুলের।

জেল খানার একটা অন্ধকার রুমের মাঝামাঝি একটা টেবিল।

তাতে তিনটা চেয়ার পাতানো। একপাশে দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছে অধরা নিতিন। তাদের ঠিক অপজিটে একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছে মৃদুল। মাথার উপর ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক বাল্বটার হলদেটে আলোয় যেন চিকচিক করছে মৃদুলের চেহারার ভীত ভীত ভাবটা। ভয়ে অস্বস্তিতে কাচুমাচু করছে।

চেয়ারের দুই হাতলের সাথে হাত বাধা থাকায় নড়াচড়ায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। এতে মহাবিরক্ত সে। বারবার হাতের বাধনের দিকে তাকাচ্ছে। যেন পারলে চোখ দিয়েই হাতের কব্জির উপর বাধা সাদা দড়িটা খুলে ফেলতো।

অধরা নিতিন তাকে নানান প্রশ্ন করছে সে কাচুমাচু করতে করতে বরাবরই একটা উত্তর দিচ্ছে তা হলো জানি না। এই জানিনা শব্দের মধ্যে কেটে গেলো মিনিট বিশ। এক পর্যায়ে মৃদুলের দিকে পরখ করে নিতিন শান্ত কন্ঠে বললো,
“পালানোর ধান্দা ছেড়ে দিন। দড়ি খুললেও আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবেন না। সো, এত গড়িমসি না করে কাহিনী বলুন। না হলে রিমান্ড সেল খুলে বসবো।”

নিতিনের শান্ত কন্ঠে বলা কথায় মৃদুলের মনে ভয়ের হিমশীতল বাতাস ভয়ে গেলো। সে নিমেষেই শান্ত হয়ে গেলো। তা দেখে অধরা বাঁকা হাসলো তারপর বললো,
“তো মি. মৃদুল সত্যটাকি বলবেন নাকি আমরা রিমান্ডের আবেদন করবো? রিমান্ডে নিলে কি হয় তা তো জানেনই।”
অধরার কথাতে মৃদুলের ভীত-সন্ত্রস্ত চেহারা আরো চুপসে গেলো। অধরা মনে মনে ধারণা করছে, ওদের টিমের একমাত্র কাঁচা খেলোয়াড় হচ্ছে মৃদুল। যার কাছে পারফেকশন থেকে ভয়টা বেশি কাজ করে। সম্ভব সে সবচেয়ে ভীত মানুষ। একে খানিক চাপ দিলেই কাজ হবে।

এই ভেবে অধরা নিতিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“মি.নিতিন আমার মনে হয় সবার দশদিনের রিমান্ড আবেদন করা উচিত। এরা ভাঙবে তবু মচকাবে না।”

অধরার চাহনি হয়তো নিতিন বুঝতে পেরেছে তাইতো বললো,
“রিমান্ডের আবেদন, মঞ্জুর, এসবে আমি সময় নষ্ট করবো না। আমি চাই যত দ্রুত কেসটা শেষ হোক। তাই আমি নিজেই রিমান্ড সেল বসিয়ে দিবো এখন। একজন সি আই ডি ম্যান তো। এসবের অভিজ্ঞতা আছে।”

এ বলে নিতিন চেয়ারের ডান হাতলের বাইরে মেঝের দিকে ঝুকে একটা প্লাইয়ার্স অন্ধকারে ফ্লোরে পড়ে থাকা অবস্থা থেকে তুলে নিলো। কাঠের টেবিলটার উপর রেখে ইশারা করে বললো,
“এটা বেশ ধারালো। একটা নখ একবারেই ফিনিশ।

সেকেন্ড দশেকের ব্যাপার।

আমার বেশ মজা লাগে নখ টেনে তুলতে দেখাতে।আপনাকে ও দেখাবো?”
অধরা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“আমি বরং হাতের বাধন খুলে দিই। না হলে তো হাতে কিছু করা যাবে না।”

নিতিন-অধরার কথায় মৃদুল রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছে। সে বেমালুম ভুলে গেছে মানষিক হাসপাতালে অধরার কান্ড। ভুলে গেছে তাদের টিমের প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুতি ছিলো জান যাবে তবু সত্য বলবে না। কিন্তু অন্যসবার কথা মৃদুল জানে না তবে সে কিছুতেই সত্য আর প্রাণ এই দুটো অপশনে প্রাণকে বেছে নিয়ে প্রাণকে হারাবে না।

সে সত্য অপশনকে বেছে নিবে। এতে তার প্রাণ বাঁচবে। এই অপশন টিকাতে যা করার করবে সে। প্রয়োজনে সত্যটাও বলবে। এই ভেবে সব ভুলে সে বর্তমান ভেবে নিজেকে বাঁচানোর চিন্তা সবার আগে করছে।

অধরা যখন নিজের চেয়ার থেকে উঠে মৃদুলের হাতের বাধনে হাত দিলো দড়ি খোলার জন্য নিতিন তখন প্লাইয়ার্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। মাঝে মাঝে প্র‍্যাকটিস ও করছে কিভাবে নখ তুলবে। নিতিনের দিকে তাকিয়ে ভীত কন্ঠে মৃদুল বললো,

“আমার নখ তুলবেন না। আমি বলছি সব।”

মৃদুল কথাটা বলার সাথে সাথে নিতিন টেবিলে প্লাইয়ার্সটা রেখে দিলে। হাত দুটো উঁচু করে বললো,
“রেখে দিলাম, এবার বলুন। না হলে আমার হাত আবার যাবে প্লাইওয়ার্সে।”

“বলছি।”কাঁপা কাঁপা গলায় মৃদুলের উত্তর। নিতিন অধরার দিকে তাকিয়ে বললো,
“ইন্সপেক্টর অধরা আপনি সিটে বসে পড়ুন। আপাতত বাধন খোলা লাগবে না। দেখি মৃদুল সাহেব কি বলে। তার কথায় যদি মিথ্যার আভাস পাই তবে আবার শাস্তির দেবার কথা ভাববো।”

নিতিনের কথায় বাঁকা হেসে অধরাও নিজের সিটে বসে পড়লো। তারপর মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তারপর বলুন এই খুনে আপনার কি রোল ছিলো? “

মৃদুল একবার নিতিন আর একবার অধরার দিকে তাকালো। দুজনের কঠিন দৃষ্টি দেখে ভয়ে ভয়ে বললো,
“স্বরূপার বয়ফ্রেন্ড এর রোল।”
“আমার সাথে স্বরূপার আদৌ সম্পর্ক আছে?”

অধরার বললো। মৃদুল বললো,
“না। এটা জাস্ট একটা ড্রামা ছিলো। প্রতিভার কাছে ভালো হওয়ার জন্য, যাতে প্রতিভা স্বরূপাকে সন্দেহ করতে না পারে।”

“ফরেনসিক রিপোর্ট বদলানোর কাজটা কার ছিলো?”
“আমার আর কৌশিকের।”

“ডাঃ কৌশিক তো প্রতিভার কাজিন। তবে সে আপনাদের সাথে যুক্ত হলো কেনো!”
“সম্পত্তির লোভে।”

“প্রতিভা আর প্রভাত মির্জাকে খুন করার মূল কারণ কি ছিলো?”
“সম্পত্তি।”

“আপনাদের টিম এ কয়জন আছে?”
“ছ’জন।”

“লিডার কে? মানে সব কিছুর নেতৃত্ব কে দিতো?”

“তুরাগ আর অভিলাষ “
“তুরাগ প্রতিভাকে এত ভালোবাসতো তাও মারলো কেনো!”
“সম্পত্তির জন্য। প্রতিভাকে মেরে প্রভাত মির্জার সম্পত্তি হাতানোই মেইন উদ্দেশ্য ছিলো।”
“তাহলে প্রভাত মির্জাকে মারলো কেনো!”

“তার উপস্থিতিতে সম্পত্তি ভাগা আনা দুষ্কর। তাই তাকে খুন করা হয়েছে।”
মৃদুলের কথা শুনে অধরা কিছু একটা ভাবলো তারপর বললো,
“প্রভাত মির্জাকে খুন করার আগে তার টাকা পয়সা ভাগে আনা হয়েছে?”

“হ্যাঁ, প্রভাত মির্জার ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রভাত মির্জার নামে থাকা ছ’টা ফ্ল্যাট, বাড়ি ছ’জনের নামে করা হয়েছে।”

নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আপনার আর ডাঃকৌশিকের কথা না হয় বুঝলাম। কিন্তু বাকি চারজন তো মৃত সবার কাছে। তবে আইনি কাজে তাদের সম্পৃক্ততা থাকলো কিভাবে? মৃত ব্যক্তির নামে উইল করা যায়?”

“সমাজের কাছে তুরাগ, শিলা, অভিলাষ, স্বরূপা মৃত। কিন্তু হৃদিতা, বর্ণা, কুঞ্জন আর চঞ্চল জীবিত। সমাজ এদের চিনে না। এই চারজনই ভোগ করবে সব। তাদের নামেই রেজিস্ট্রি হয়েছে।

মৃদুলের কথায় অধরা নিতিন দুজনেই নড়েচড়ে বসলো। অধরা ভ্রু কুচঁকে বললো,
“হৃদিতা মানে তো শিলা। বাকি তিনজন কে?”

মৃদুল স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো,
“শতাব্দী মেহেক বর্ণা হচ্ছে স্বরূপা, কুঞ্জন বিশ্বাস হচ্ছে তুরাগ, চঞ্চল বিশ্বাস হচ্ছে অভিলাষ। এদের ছদ্মনাম এগুলো।”

“আপনাদের পরিকল্পনা কি ছিলো?”

“আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খুন টুন শেষে সব মিটমাট হলে সবাই বর্ডার হয়ে ভারত চলে যাবো। কলকাতায় একটা বাংলো রেন্টে নিয়েছে মাস কয়েক আগে। সেখানে গিয়ে সবাই থাকবো। কয়েকবছর গেলে দেশবাসী যখন প্রতিভাদের ঘটনা ভুলে যাবে তখন ছদ্মবেশ ধারণ করে বাংলাদেশে আসবো।

ততদিনে ডাঃকৌশিক এদিকটা সামলাবে। তাহিনা জাহানকে কনভেন্স করে প্রভাত মির্জার বাকি সব সম্পত্তি দেখাশোনার নাম করে নিজের নামে করবে। তারপর সম্পত্তি হাতে পেলে তিহানাকে খুন করে সবাই রাজত্ব করবে তার সম্পত্তিতে। এমনটাই পরিকল্পনা ছিলো।”

“আহ হারে আমরা সব ভন্ডুল করে দিলাম। কাজটা কি ঠিক হলো?”
বেশ আফসোসের সুরে বললো নিতিন। মৃদুল কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“স্যার আমাদের ছেড়ে দিন। আপনাদের দুজন ও ফিফটি পার্সেন্ট দিবো।”

মৃদুলের কথায় অধরার চোখে মুখে রাগের আভা খেলে গেলো। টকটকে লাল চেহারা, আর অগ্নিচোখে মৃদুলের তাকিয়ে বললো,

“আমাদের কি ঘুষখোর মনে হয়? একে তো অন্যায় করেছেন আবার অফার ও করছেন। সাহস তো কম না? আপনাদের ফাঁসি হওয়াই ঠিক হবে। তার আগে পুলিশকে হাতে করার চেষ্টার জন্য শাস্তি তো পাবেনই।”

বলে টেবিলে থাকা প্লাইয়ার্স হাতে নিলো। প্লাইয়ার্স নিয়ে উঠতে যাবে তখনই নিতিন অধরাকে থামিয়ে বললো,
“রিল্যাক্স ইন্সপেক্টর অধরা, মৃদুলের অফারটা খারাপ না। ফ্রিতে কত কি পাবো! তা মৃদুল সাহেব আপনাদের ছাড়ার বিনিময়ে কি দিবেন আমাদের? বলুন দেখি পছন্দ হয় কিনা। পছন্দ হলে কেস এখানেই দফারফা করে দিবো।”

নিতিনের কথা শুনে অধরা অবাক চোখে নিতিনের দিকে তাকালো। তার দেখা সবচেয়ে অনেস্ট অফিসার ও তবে দূর্নীতিতে জড়িত! বিশ্বাস হচ্ছে না যেন অধরার। একটা কেস নিয়ে এত দৌড়াদৌড়ির পর সমাধান মুহুর্তে এসে অন্যায়ের পক্ষ নিচ্ছে? তাও কিনা কিছু সম্পত্তির লোভে! ছিঃ! ভাবতেই অধরার গা ঘিন ঘিন করে উঠলো।

সে বিকৃত মুখ করে নিতিনের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“শেষ পর্যন্ত আপনি ও? ছিঃ ছিঃ আমি আপনার থেকে এমনটা আশা করিনি।”

নিতিন বাঁকা হেসে বললো,
“ফ্রিতে এত বড় অফার পেয়ে গেলে কেউ হাতছাড়া করে? আমি তো করি না। আমার মনে হয় আপনার ও এই অফারটা লুফে নেয়া উচিত। প্রভাত মির্জার কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি।

তার মাঝে ফিফটি পার্সেন্ট আমি পেলে বউ বাচ্ছা নিয়ে সারাজীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবো। কি ঠিক বলছি তো মি.মৃদুল?”
নিতিনের কথা মৃদুলের মনে ধরলো। সে হাফ ছাড়লো। যাক একজনকে ভাগে আনা গেছে এখন এখান থেকে বের হওয়া আর ব্যাপার না। মৃদুল সহাস্যে বললো,
“একদম ঠিক স্যার। আপনারা যদি আমাদের সাথে থাকেন তবে আমরা এক তুড়িতেই বাজিমাত করতে পারবো।”
উত্তরে নিতিন হাসলো।

অধরা তার বাঘিনী চেহারা নিয়ে নিতিন আর মৃদুলের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে রাগ আর ঘৃণার উত্তাল ঢেউয়ে ভিজে একাকার।

যেন পারলে এখুনি ট্রিগার চেপে দুটো লাশ গ্রাস করতো। নিতিন অধরার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।

মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এখন তো আমরা টিম মেম্বার। সো, আমাকে সব ব্যাপার খুলে বলুন। তবে আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারবো।”

মৃদুলের মুখে হাসি ফুটলো। চেহারা থেকে ভীত ভাব চলে গেলো। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“আমাদের এখান থেকে বের করুন। তারজন্য যা জানার জিজ্ঞেস করুন আমি বলছি।”

“প্রতিভার ডায়েরিটা কে লিখেছে?”
“স্বরূপা।”
“অভিলাষের ডায়েরি?”
“স্বরূপা লিখেছে।”

“দুই ডায়েরির লিপিবদ্ধ সব কথা কি বানোয়াট? “

“হাতে গোনা দু’চারটা ছাড়া বাকি সব স্ক্রিপ্ট। এর কোন সত্যতা নেই।”

“তারমানে আপনারা জানতেন যে ডায়েরি গুলো পুলিশের হাতে যাবে তাই বানিয়ে এমন গল্প লিখেছেন যেন আপনাদের কারো উপর আঙুল না যায় তাই তো?”

“হ্যাঁ। সব স্ক্রিপ্ট। ইভেন, প্রতিভার সামনে আমি আর স্বরূপা কি কথা বলবো সেটাও স্বরূপা আগে থেকে আমাকে শিখিয়ে দিতো। স্ক্রিপ্ট দিতো। প্রতিভা অভিলাষের ডায়েরির সব কথাই বানোয়াট। যার কোন অর্থ নেই।”
“প্রতিভাকে কি তবে তুরাগ অভিলাষ কেউই ভালোবাসতো না?”

“না। দুজনেই বিবাহিত। প্রতিভার সাথে অভিলাষ আর তুরাগের যা ছিলো সব অভিনয়। ওকে খুন করার আগে বিশ্বাস অর্জন করতে চেয়েছে তুরাগ। সে তো প্রতিভাকে ঘৃণা করতো, ইভেন এখনো করে।

প্রতিভার সামনে শুধু মুখোশ পরে ছিলো। ভালোবাসার ঢং করতো। আর অভিলাষ ও প্রতিভাকে সহ্য করতে পারে না। যেখানে সহ্য করতে পারতো না সেখানে ভালোবাসার আশা করা তো নিতান্তই হাস্যকর।”

“কেনো ঘৃণা করে?”
“তা জানিনা।”
“অভিলাষ পুলিশকে যে জবানবন্দি দিয়েছে সেটা কি ছিলো?”

“পূর্ব লিখিত কথা আওড়িয়েছে অভিলাষ। স্ক্রিপটা ও স্বরূপার লেখা।”

“তুরাগ অভিলাষ এই দুজনের কথা না হয় বুঝলাম কিন্তু শিলা স্বরূপা? ওদের কিসের শত্রুতা প্রতিভার সাথে?”
“ওদের শত্রুতা নেই। শুধু সম্পত্তির লোভ ওদের।”

“প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা কেউ জানতেন না? “
“না শুধু মাত্র স্বরূপা জানতো।”

“আপনি কেনো ওদের দলে যোগ দিলেন? আমি যতটুকু জানি আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ সচ্ছল।”
“আমি ইচ্ছে করে যোগ দিই নি। আমাকে অনেকটা জোর করে যোগ করেছে তারা।”

“পরিচয় কবে এবং কিভাবে?”

“তুরাগ আমার ক্লাসমেট ছিলো। সেই সুবাধে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। আট বছরের বন্ধুত্ব আমাদের। প্রায় তিন বছর আগে ও আমাকে স্বরূপার বয়ফ্রেন্ড সাজার প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে আমাকে একটা ফ্ল্যাট এবং দশলাখ টাকা দিবে। আমি প্রথমে রাজি হইনি। প্রথমে ভালোভাবে বলেছে আমি রাজি না হওয়াতে হুমকি দেয়া শুরু করে।

বাধ্য হয়ে আমি এক পর্যায়ে আমি রাজি হয়ে যাই। আর তাদের কথা মতো কাজ করতে থাকি। মিশনে নেমেই বাকিদের সাথেও পরিচিত হই।”

“কি এমন হুমকি দিয়েছে যাতে আপনি রাজি হয়ে গেলেন?”

“আমার বোনের আর তার বয়ফ্রেন্ডের অন্তরঙ্গ কিছু ছবি তুরাগের কাছে ছিলো। কিভাবে সংগ্রহ করেছে জানি না। সেগুলো দিয়ে তুরাগ আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতো আমি রাজি না হলে সে আমার বোনের ছবি ভাইরাল করে দিবে। আমার একটা মাত্র বোন। সে খুব বোকা আর ইমোশনাল। সবে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে।

ছবি ভাইরাল হলে সুইসাইড করতো। ভাই হয়ে আমি তা দেখতে পারতাম না তাই বোনের জন্য বাধ্য হয়ে তুরাগের প্রস্তাবে রাজি হই। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ওদের বারবার নিষেধ করেছি। ওরা তো শুনেনি।

উল্টো আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতো। আমাকে প্রতিভা কেসে ফাঁসিয়ে দিবে বলে ব্ল্যাকমেইল করে পাগল সাজিয়ে মানষিক হাসপাতালে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে ভারত যাবার কথা ছিলো। সেটা ব্ল্যাকমেইল করেই। আমি রাজি ছিলাম না। ওরা প্রতি পদে পদে আমাকে হুমকি দিয়েছে, এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছে।”

“আইনের সহায়তা নেননি কেনো! এটলিস্ট মিস অধরাকে গোপন ভাবে হলেও বলতে পারতেন।”
“আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু থানায় আসার পথেই ওরা টের পেয়ে যায় এবং আমার বোনের একটা অশ্লীল ভিডিও বানিয়ে হুমকি দেয়। ভিডিওটা এডিটেড ছিলো। কিন্ত আজকাল সময়ে কেউ সেসব বিশ্বাস করেনা। ভাইরাল হলে আমার বোনটা ক্ষতি হতোই তাই আর বলিনি।”

“বোনকে বাঁচাতে গিয়ে একটা পরিবারকে বলি দিলেন তাই তো?”
নিতিনের প্রশ্নে মৃদুল লজ্জিত মুখটা নিচু করে মাথা নাড়লো। নিতিন বললো,

“ওরা যদি আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করে সব করায় তবে ওদের প্রতি আপনার ক্ষোভ জমার কথা। আপনি তাদের শাস্তি কামনা করার কথা। কিন্তু আপনি নিজেরসহ সবার মুক্তির জন্য আমার সাথে ডিল করছেন। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগছে না?”

“ওদের প্রতি আমার ক্ষোভ আছে অনেক। ওদের শাস্তি দিতে চাই। কিন্তু এখন ওদের শাস্তি দিতে গেলে আমিও শাস্তি পাবো। তাই জেল থেকে বের হওয়ার জন্য হলেও ওদের মুক্তি চাচ্ছি। প্লিজ স্যার ম্যাডাম কো-অপারেট করুন। আমাদের ছেড়ে দিন। আমি আর কখনো এমন কাজ করবো না।

আপনারা আমাদের ছেড়ে দিন, বিনিময়ে আমি তুরাগকে বলে একটা বাংলো আর দুটো ফ্ল্যাট করে দিবো আপনাদের দুজনকে। প্লিজ স্যার!”

আকুতিভরা কন্ঠে বললো মৃদুল। নিতিন বাঁকা হেসে বললো,
“আমি অলরেডি কো-অপারেট করেছি মি.মৃদুল। আমিও আপনাদের গ্যাংয়ের। বাই দ্যা ওয়ে আপনাদের গ্যাং আর মিশনের নাম কি?”

“গ্যাংয়ের নাম ‘S I V’ আর মিশনের নাম সারপ্রাইজ।”
“S I V মিনিং? “
“six intelligence villain”

“ইন্টারেস্টিং! আমি প্রাউড ফিল করছি এস আই ভির সদস্য হতে পেরে। সহকর্মী আপনি আমার। সেই হিসেবে আমি আপনাকে কিছু দিতে চাই। আপনি নিবেন?”

“কক্কি দিবেন স্যার?”

ভীত কন্ঠে বললো মৃদুল। নিতিন হেসে বললো,
“ভয় পাবেন না। আমি গিফট দিবো, ফাঁসিতে ঝুলাবো না। এমন গিফট দিবো, যার সাথে আপনারা পরিচিত। যেই গিফট আয়োজন করতে আপনারা এক্সপার্ট তেমন কিছুই দিবো। আমাকে বিশ্বাস করলে নিতে পারেন। করেন বিশ্বাস? “

মৃদুল খানিক সময় নিয়ে কিছু ভাবলো। তারপর হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। যার অর্থ সে বিশ্বাস করে। নিতিন বললো,
“ধন্যবাদ আমার সহকর্মী। আমি এত বছরের অর্জিত সততা ভঙ করে আপনার কথায় সায় জানাচ্ছি। জানি না কেনো হুট করেই সম্পত্তির লোভ লেগে গেলো।

দূর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছি। জানি না কেনো! লোভ বড্ড খারাপ জিনিস। এর থেকে সামলানো দায়। আমি ও নিজেকে সামলাতে পারছি না। হার মানলাম। আপনার জয় হয়েছে।আপনার জয় হিসেবে কিছু দিতে চাই। বিশ্বাস যেহেতু করেন তাই নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। গিফট দিয়েই দি। কি বলেন?”
মৃদুল সায় জানালো। সে বুঝার চেষ্টা করছে নিতিন তাকে কি দিবে। তবে তার ধারণা নিতিন সত্যই তাদের দলে নাম লেখিয়েছে। তাই মনে মনে বেশ খুশি সে।

নিতিন চেয়ার ছেড়ে উঠে মৃদুলের কাছে গেলো। মৃদুলের বাঁ হাতের বাধন খুলে বাঁ হাত টেবিলের উপর রাখলো। এরপর টেবিলের উপর থেকে প্লাইয়ার্স নিয়ে মৃদুলের বাঁ হাতের তর্জনী আঙুলের কাঁচা নখের ডগায় তাক করে সর্বশক্তি দিয়ে নখটা টেনে তুলে নিলো। সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে গেলো।

ঘটনা এত তাড়াতাড়ি হলো যে অধরা থ বনে গেছে। একটু আগে তার চেহারায় যে রাগী ভাব ছিলো তা কেটে গিয়ে এবার বিস্ময়ী ভাব ফুটে উঠলো। মৃদুল ও কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সে। খানিক অবাক হয়ে হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো।

তারপর অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব করা মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার জুড়ে দিলো। নিতিন প্লাইয়ার্স টেবিলে রেখে আবার নিজের চেয়ারে এসে বসলো। একবারেই রিল্যাক্স ভাব নিয়ে বসে আছে। যে কিছুই হয় নি।

এদিকে অধরা এক রাশ বিস্ময় নিয়ে ঘটনা বুঝার চেষ্টা করছে। একবার মৃদুলের দিকে তাকাচ্ছে একবার নিতিনের দিকে। একটু আগে না এরা শান্তিচুক্তিতে মৌখিক সাক্ষর করলো!

এখন তবে কি হলো। নিতিন কি তবে অভিনয় করছিলো? অধরার ভাবনার মাঝেই নিতিন টেবিলে দু’হাত ভাজ করে টেলিভিশনের সংবাদপাঠকের কায়দা অবলম্বন করে বসে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মৃদুলের উদ্দেশ্যে বললো,
“মি.মৃদুল আমার উপহার কেমন লাগলো?”

উত্তরে মৃদুল ব্যাথিত চোখে নিতিনের দিকে তাকালো। নিতিন বাঁকা হেসে বললো,
“আমরা দেশ ভক্ষক নয় আমরা দেশ রক্ষক। এই একটা বাক্যে না বুঝার শাস্তি ছিলো এটা। অবশ্য আমি এটাকে গিফট বলি। একজন সৎ মানুষকে কুপ্রস্তাব প্রদানের চেয়ে অতি অপমান জনক আর কিছুই নেই। আমার অপমানের গিফট ছিল এটা। আমি আইন নিজের হাতে তুলে দিই না।

কিন্তু কেউ দফারফার প্রস্তাব দিলে তাকে শাস্তি না দিয়ে পারি না। তখন আইন মানিনা। আপনি একবার নয় দু’দুবার সেম কাজ করেছেন। সহ্য হচ্ছিলো না তাই এই গিফটের আয়োজন।”

“তাহলে এতক্ষণ কি ছিলো এটা? আর শান্তিচুক্তি! “
অবাক কন্ঠে অধরার প্রশ্ন। নিতিন বাঁকা হেসে বললো,
“যারা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলতে পছন্দ করে তাদের বিশ্বাস নিয়ে আমিও একটু খেললাম। আর কিসের শান্তিচুক্তি, কিসের দলবদল? ইনফরমেশন বের করা আমার উদ্দেশ্য ছিলো। আই থিংক এবার বুঝতে পেরেছেন। আমি নিজের থেকেও বেশি নিজের সততাকে ভালোবাসি। যাই হোক, নেক্সট ডাকুন সবাইকে একসাথে। এই খুনের কারণ সম্পত্তি নয় প্রতিশোধ। এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আজি শেষ করবো।”


পর্ব-১৩ (দুর্ধর্ষ পর্ব)

পাশাপাশি ছ’টা চেয়ারে বসে আছে তুরাগ, অভিলাষ, শিলা, স্বরূপা, কৌশিক এবং মৃদুল। সামনে একটা টেবিল। টেবিলের অপজিটে তাদের ঠিক সামনে পুলিশি ভাব নিয়ে পাশাপাশি বসে আছে নিতিন অধরা। নিতিন সচেতন চোখে সবার দিকে তাকিয়ে থাকলেও অধরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ছে তুরাগের উপর।

সে স্থির দৃষ্টিতে তুরাগের দিকে তাকিয়ে আছে। তুরাগ যখন হেটে আসছিলো তখন অধরা অবাক চোখে তুরাগের দিকে তাকিয়ে ছিলো। এই মানুষটাকে দেখেই তার একদিন আফসোস হয়েছিলো। মনে হয়েছিলো এর থেকে অসহায় ব্যাক্তি আর দুটো নেই। অথচ সেই অসহায় ব্যক্তি দু’মুখো সাপ প্রমাণ হলো!

সে অসহায় ছিলো না সে ছলনাময় ছিলো। সেদিনের আফসোসের জন্য আজ আফসোস হচ্ছে অধরার। তুরাগের দিকে তাকাতেই অধরার একটা কথা মাথায় আসছে।’ একটা মানুষ লোভে পড়ে এতটা নিচে নামতে পারে?হাউ?”

অধরার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো নিতিনের কথায়। নিতিন টেবিলের উপর থেকে প্লাইয়ার্স হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
“ইরানের লার ভ্যালি নামক অঞ্চলে পাওয়া নাট্রিক্স নামক এক ধরনের সাপ।

সাপটির বৈশিষ্ট্য কি জানেন? সে কোন শিকারকালে বা আঘাত পাবার সম্ভাবনা দেখলে নিজের নাক বং মুখ থেকে রক্ত বের করে তার মুখের পাশে ছড়িয়ে দেয়, যাতে শিকার তাকে মৃত ভেবে ভুলকরে। তার মৃত হওয়ার ভান এতটাই নিঁখুত যে সহজে কেউ ধরতে পারে না। সবাই দেখলে বলবে সাপটি নিশ্চিত মৃত। মৃত ভেবে একরাশ আফসোস নিয়ে যখনি শিকার সামনে আসবে তখনি সে মরণ ছোবল দেয়।

তাই এই সাপটাকে অনেকেই ছলনাময় সাপ বা রহস্যময় সাপ বলে। আপনাদের মাঝে এই সাপের বৈশিষ্ট্য লক্ষনীয়। যেন বৈশিষ্টগত দিক দিয়ে একে অপরের কার্বন কপি। কি অভিনয়! বাহ! সত্যিই চমৎকার!”

নিতিন থামলো। তারপর সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার প্লাইয়ার্সের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তবে একটা দুঃখের বিষয় কি জানেন? আপনাদের কেস হ্যান্ডেল করতে করতে আপনাদের কিছু বৈশিষ্ট্য আমার আর ইন্সপেক্টর অধরার মাঝে চলে এসেছে। বিশেষ করে অভিনয়ের গুনটা।

ইন্সপেক্টর অধরা তার নিঁখুত অভিনয় দিয়ে ডাঃকৌশিক আর মৃদুলকে পাকড়াও করেছে। আমি আমার অভিনয় গুন দিয়ে মৃদুলের পেট থেকে সত্য বের করেছি। যদিও এরজন্য আমাকেও নাট্রিক্স সাপের মতো অভিনয় করতে হয়েছে। আমি নিজের সততাকে মৃতের ভান করিয়ে শিকারকে বশে এনেছি। বশে আনতেই ছোবল মেরেছি।”
বলে মৃদুলের রক্তমাখা হাতের দিকে ইশারা করলো। তারপর বললো,

“বিশ্বাস না হলে নিজেরাই দেখুন। ছোবল মারার পিছনে অবশ্য আরেকটা দোষ ছিলো। তা হলো, সে আমাদের হাত করে মামলা দফারফা করতে চেয়েছিলো। যা একবারেই আমার পছন্দ নয়। অপছন্দনীয় কাজের শাস্তি অবশ্যক। মৃদুলের শাস্তির কথা বলার মানে হচ্ছে আপনাদের সতর্ক করা। দেখুন, আপনারা আবার ভুল করেও দফারফার কথা মুখে আনবেন না। সেটা সম্ভব নয়।

যদিও আপনাদের শাস্তি দিতে আমার বেশ মজা লাগবে। প্রচুর ক্ষোভ আপনাদের উপর। ক্ষোভের পরিমান এত বেশি যে এই প্লাইয়ার্স দিয়ে আপনাদের পুরো শরীরের চামড়া টেনে তুলে ফেললেও ক্ষোভের পরিমাণ কমবে না। হয়তো আরো বাড়বে। সুতারাং আমাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করবেন না। এ টু জেড সব সত্য বলুন। না হলে এই প্লাইয়ার্স তো আছেই।”

নিতিন বাঁকা হাসলো। নিতিনের কথা, ভাবভঙ্গি দেখে তুরাগ ছাড়া বাকি সবার চেহারায় ভয়ের আভাস দেখা গেলো। তারা বারবার মৃদুলের ব্যাথিত চেহারা আর রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলছে। মৃদুলের ব্যাথিত চেহারার নিরব আর্তনাদ যেন তাদের ভয়কে ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সাথে নিতিনের প্লাইয়ার্স ঘুরানো দেখে তাদের আত্মা কাঁপছে। তবে তুরাগের চেহারায় ভয়ের তেমন আভাস নেই।

সে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা নিয়ে চিন্তা করছে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় সে নিতিনের কথা শুনেই নি। তুরাগের ভয়হীন চেহারা দেখে অধরা ভ্রু কুঁচকালো। এখনো কি এই অপরাধীর ভয় লাগছে না! আরো অভিনয় করা বাকি আছে?অধরা তুরাগকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“মি.তুরাগ এখন কি আপনি আবার কোন স্ক্রিপ্ট মনে করছেন? যা আমাদের শুনাবেন? যদি তাই হয় তবে সে খেয়াল মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেন।”

অধরার কথায় তুরাগের ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হলো না। এখনো আগের মতোই ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। যা নিতিনের পছন্দ হলো না। নিতিন হুট করেই উঠে দাঁড়িয়ে তুরাগের কাছে গেলো। এবং দড়ি দিয়ে চেয়ারের হাতলের সাথে বাধা ডান হাতের অনামিকা আঙুলের ডগা প্লাইয়ার্সের ভিতর ঢুকিয়ে সব শক্তি দিয়ে একটা চাপ দিলো। এতে তুরাগের নখটা ভেঙে গেলো। কাঁচা নখে আঘাত লাগায় রক্ত ঝরা শুরু হলো।

সেই সাথে অসহনীয় ব্যাথা। সেকেন্ড বিশের মাঝে কাজ শেষ করে নিতিন নিজের জায়গায় এসে বসলো। আকস্মিক নিতিনের কাজ কেউই যেন বুঝে উঠতে পারলো না। ব্যাথায় তুরাগের মুখ থেকে আর্তনাদ বের হলো। সে চটপট করতে লাগলো। কিন্তু শক্ত করে বাধা থাকায় হাত নাড়াতে পারছে না। তুরাগের আর্তনাদ কানে যেতেই সবাই চিৎকার দিলো। এবং তুরাগের হাতের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। এবার ভয়টা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। তারা বেশ বুঝতে পেরেছে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর বাঁচার কোন উপায় নেই।

নিতিন সবার ভীত চেহারার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললো,

“এবার একদম পারফেক্ট লুকে আছেন সবাই। বিশেষ করে তুরাগ। এত বড় ক্রাইম করে পুলিশ, সি আই ডি কর্মকর্তার সামনে রিল্যাক্স ভাব নিয়ে থাকা শোভা পায় না।

চেহারায় ভয় থাকা বাধ্যতামূলক। আমার আবার ক্রিমিনালদের ভীত চেহারা দেখতে ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা থেকেই এত আয়োজন। তবে আপনারা চিন্তা করবেন না। সুযোগ বুঝে সবাই পাবেন এই উপহার। আপনারা প্রতিভাকে ধোকা দিয়েছেন আমি না হয় আপনাদের প্লাইয়ার্স দিয়ে একটু কষ্টই দিলাম!

মন্দ কি? অবশ্য প্লাইয়ার্সের আঘাতের চেয়ে ধোঁঁকার আঘাতে কষ্ট বেশি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমি এখন ধোঁকা দিতে পারবো না আপনাদের। তাই প্লাইয়ার্স দিয়েই একটু আধটু আসামীপরায়ান করবো। কি বলেন ইন্সপেক্টর অধরা? বেশ হবে না?”

শেষে কথাটা অধরার দিকে তাকিয়ে বললো নিতিন। অধরা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বললো,
“পাহাড় সম কষ্টের বিনিময়ে মুঠোভরতি কষ্ট নিতান্তই নগন্য। তবে একবারেই খালি হাতে ফেরানোর চেয়ে মুঠোভরতি কষ্ট উত্তম। বেশ হবে।”
নিতিন এবার অভিলাষ আর আর্তনাদরত তুরাগের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এস আই ভির লিডার যেহেতু অভিলাষ আর তুরাগ। তাই ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট তাদের থেকেই শুনি। তো মি. কুঞ্জন এন্ড চঞ্চল বিশ্বাস ওরফে অভিলাষ, তুরাগ আর নাটক না করে বাধ্য ছেলের মতো ঘটনার শুরু থেকে বলুন তো। কে বলবেন? দুজনের একজন বলুন তাড়াতাড়ি। “

নিতিনের কথায় তুরাগ অভিলাষ দুজনে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। কিন্তু চুপ করে রইলো। নিতিন প্লাইয়ার্স হাতে অভিলাষের কাছে গেলো। অভিলাষের আঙুলে প্লাইয়ার্স তাক করলো। তা দেখে নিজ ব্যাথা ভুলে তুরাগ চেঁচিয়ে উঠলো।
“আমি বলছি। ওকে ছেড়ে দিন।”
অভিলাষকে বাঁচাতে দেখে নিতিন অধরা অবাক হলো। বিস্ময় কাটিয়ে নিতিন বললো,
“বাবা মেয়ের খুন মোটেও সম্পত্তির জন্য নয় রাইট? প্রতিশোধমুলক খুন।”

চোখ বন্ধ করে হাতের অসহনীয় ব্যাথা হজম করলো তুরাগ। তারপর ধীর গলায় বলা শুরু করলো,
“হ্যাঁ, এটা প্রতিশোধমূলক খুন। ঘটনা শুরু আজ থেকে প্রায় ষোলো বছর আগে৷ তখন আমার বয়স ছিলো দশবছর, চঞ্চলের ছিলো আট বছর। আমরা দুজনই ছিলাম এতিম।

আমাদের দুজনের বাস রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলার দুর্লভপুর এতিমখানায়। ওই এতিমখানার একজন শিক্ষক ছিলেন নাম সাদাব বিশ্বাস। অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়বান মানুষ ছিলেন তিনি। এতিমখানার সবাইকে ভালোবেসে আগলে রাখতেন।

তবে সবার চেয়ে আমাদের দু’জনের প্রতি তার ভালোবাসা ছিলো একটু বেশিই। আমাদের দুজনকেই ডাস্টবিনের ময়লার থলে থেকে তুলে এতিমখানায় এনে নিজ সন্তানের মতো লালন পালন করেছেন। সন্তান না থাকায়।
আমাদেরই সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তিনি চেয়েছিলেন তার পরিচয়ে যেন আমরা মানুষ হই তাই আমার নাম রাখলেন কুঞ্জন বিশ্বাস। অভিলাষের নাম রাখলেন চঞ্চল বিশ্বাস। তার স্ত্রী শতরূপা মেহেক বীনা ও আমাদের সন্তানের চোখে দেখতেন।

বুঝ হওয়ার পর থেকে আমরা দুজন তাদের বাবা মা হিসেবে জানতাম। আমরা তাদের বাবা মায়ের মতোই ট্রিট করতাম। আমাদের আন্তরিকতায় তিনি মুগ্ধ হতেন বলেই হয়তো আমাদের বেশি আদর করতেন।

অভিলাষকে যখন বাবা কুড়িয়ে আনেন তখন আমার বয়স দুই কি আড়াই বছর।

বাবা ওকে কুড়িয়ে এনে আমার কোলে দিয়ে বলেছিলেন এটা তোমার ভাই। ছোট ছিলাম এত কিছু বুঝতাম না তাই মেনে নিয়েছিলাম। ওকেই আমার সঙ্গী করলাম। সাধ্যমতো চেষ্টা করতাম ওকে প্রটেক্ট করার।

চঞ্চল বড় হতে লাগলো। ওর চোখে আমি হয়ে গেলাম বড় ভাই। দু’ভাই মিলে বেশ ভালোই হেসেখেলে দিন পার করতাম। এর বেশ কয়েক বছর পর একদিন হুট করেই বাবা মা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেদিন ছিলো শুক্রবার। বাবা আগেরদিন রাতে দীঘাপতিয়ায় নিজ বাড়িতে গিয়েছিলেন। সব ঠিকঠাকই ছিলো।

হুট করে বাবা মায়ের মৃত্যু মানতে পারলাম না। কেনো জানি মনে হচ্ছিলো এটা আতহত্যা নয় এটা মার্ডার। বাবা মা এভাবে মরতে পারে না। তাছাড়া তারা খুব সুখে ছিলো। ছোট হলেও আমার ম্যাচুরিটি ছিলো প্রবল।

তাই খটকাটা বেশি লাগছিলো। থানা পুলিশ হলো। সবকিছু মিটমাট করলেন বাবার ভাই মানে চাচা পলাশ বিশ্বাস। আমি পিতৃশোকে কাতর তখন। শোক কাটিয়ে উঠে একদিন চাচার কাছে গেলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম বাবা মা আত্মহত্যা করেন নি। তাদের খুন করা হয়েছে।

এমনভাবে খুন করা হয়েছে যেন মার্ডান হিসেবে বুঝা যায় না। আত্মহত্যা হিসেবে ঢাকা পড়ে। কে খুন করেছে জিজ্ঞেস করলে চাচা জানায়, বাবার সাথে বেশ কিছুদিন যাবত নাকি এক শিল্পপতি ঝগড়া চলছে। বাবা নাকি শিল্পপতির ইয়াবা প্রাচারের কথা পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

বাবা ন্যায়বান মানুষ ছিলেন, অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়াতেন। নিজ জেলায় ওই শিল্পপতির ইয়াবা প্রাচার দেখে প্রথমে নিষেধ করেন, তাও না মানলে বাবা কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশকে দিয়ে দেন। প্রমাণ হাতে পেয়ে পুলিশ তাকে ধরতে গেলে তিনি পুলিশকে টাকার বিনিময়ে নিজের ভাগে নিয়ে নেন। যাতে পুলিশরাও তার কথামতো কাজ করে। থানায় প্রমাণ জমা দেয়ার দিন দুয়েক বাদেই বাবা মায়ের মৃত্যু হয়।

এতেই বুঝা যায় বাবা মাকে খুন করে ওই শিল্পপতি প্রতিশোধ নিয়েছে। কারণ এর আগেই শিল্পপতি বাবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলো।”

“ওই শিল্পপতি কে ছিলো?”

কৌতুহলী কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো নিতিন। তুরাগ চোয়াল শক্ত করে কঠিন কন্ঠে বললো,
“প্রভাত মির্জা, প্রভাত মির্জাই সেই কালপ্রিট যে আমাদের বাবাকে মেরেছে।”

“আর বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই আপনি প্রভাত মির্জাকে খুন করলেন তাই তো?

অধরা গম্ভীরমুখে বললো। তুরাগ সায় জানিয়ে বললো,
“হ্যাঁ, এর জন্যই। আমাদের তিনজনের জীবন তছনছ করে তিনি সুখে থাকবেন! তা হতে দিই কি করে আমরা? তাই প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার বাবা মায়ের খুনিকে শাস্তি দিয়েছি।”

“তিনজন? তিনজন কে কে? আপনি আর অভিলাষ ছাড়াও আরো কেউ ছিলো?”

অধরা প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো। অধরার কথা শুনে তুরাগের চোখে মুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। যেন সে নিজের কথায় নিজেই ফেঁসে গিয়েছে। এমন কথা সে বলতে চায় নি।

তুরাগ একবার তার পাশে তাকালো। দেখলো দুটো অশ্রুভরা চোখ অসহায় দৃষ্টিত তার দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে তুরাগের চেহারায় ভেসে থাকা অসহায়ত্ব এবার অপরাধবোধে পরিনত হলো। তুরাগ চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো। কোন উত্তর দিলো না।

নিতিন তুরাগের দিকে সচেতন চোখে তাকিয়ে বললো,
“আমি যদি ভুল না হই তবে তৃতীয় ব্যক্তি স্বরূপা। তাই না?”

নিতিনের কথায় চমকে গিয়ে মাথা তুলে তাকালো তুরাগ। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললো,
“না বর্ণা এসবে নেই। ওকে জড়াবেন না এসবে?”

“আচ্ছা ওকে জড়াবো না। কিন্তু স্বরূপার সাথে আপনার পরিচয়, পরিণয় এবং প্রণয়ের কাহিনী শুনতে চাই। আমি যতটুকু জানি স্বরূপা আপনার বিবাহিত স্ত্রী। কিভাবে কি হলো জানতে চাই।”

সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো নিতিন। নিতিনের কথায় স্বরূপা এবার তুরাগের ব্যাথিত হাত থেকে দৃষ্টিতে তুলে নিতিনের দিকে তাকালো। এতক্ষণ সে স্থির দৃষ্টিতে তুরাগের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলো।

তার চোখে পানি টলমল করছিলো। চেহারা ভরা ব্যাথার আভাস। যেন ব্যাথা তুরাগ নয় সে পাচ্ছে। ব্যাথিত চোখে খানিকটা বিস্ময় মাখিয়ে নিতিনের দিকে তাকালো সে। যার অর্থ, আপনি জেনে গেছেন! নিতিন থেকে চোখ সরিয়ে তুরাগের দিকে তাকালো একবার। তুরাগের ও তাকালো স্বরূপার দিকে। তুরাগের চেহারায় অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে।

স্বরূপার চোখের পানি তাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। নাহ, সে কোন ভাবেইবেই এই মানুষটার চোখে পানি দেখতে পারবে না। তাই চোখ ফিরিয়ে নিলো। তারপর কি যেন ভাবলো। ভাবনার মাঝেই তুরাগের চেহারায় দৃঢ়তার ঢেউ খেলে গেলো। হয়তো সে প্রতিজ্ঞা করেছে, নিজের যত দোষই হোক মেনে নিবে।

কিন্তু প্রিয়তমাকে শাস্তি পেতে দিবে না।কখনো না। দুজনের এই বদলানো চেহারার ভাষা খুব সহজেই ধরে ফেললো নিতিন। বাঁকা হেসে বললো,

“মি.কুঞ্জন বিশ্বাস আপনি আপনার পরিচয় পরিণয়ের ব্যাপারে মুখ খুলবেন না তাই তো? যদি ও আমি সবটাই জানি। তাও আপনার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি। নাহলে আমাকে অন্য উপায় অবলম্বন করতে হবে।”
চোখে মুখে দৃঢ়তার রেখা টেনে দৃঢ় কন্ঠে তুরাগ বললো,

“প্রতিভা ছাড়া আমার কোন পরিণয় পরিচয়ের ঘটনা নেই। আমি জানি না আপনি কি শুনেছেন তবে যাই শুনেছেন তা মিথ্যা।”
“প্রভাত মির্জার লাশ যেদিন পেলাম সেদিন আমি আপনার ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখেছি। প্রতিটা জিনিস খুটে খুটে দেখেছি। তেমনি তল্লাশি চালাতে চালাতে আপনার বেডরুমে যাই। আপনার বেডরুমের দেয়ালে চোখ বুলাতে গিয়ে একটা ছবিতে আমার চোখ আটকে যায়। ছবিটা ছিলো আপনার, প্লেস ইন্দোনেশিয়ার বালি।

আপনার গায়ে ছিলো রেড টি-শার্ট এন্ড পরনে ব্রাউন ডেনিম প্যান্ট। চোখে নীল সানগ্লাস। ছবির বাকিসব জিনিস থেকে আপনার ব্লু সানগ্লাসটা আমার অধিক নজর কেড়েছে। কারণ আপনার সানগ্লাসেই ছিলো এক নারীর অবয়ব। খানিক দূরেই ছিলো সে নারী। রেড এন্ড হোয়াইট কম্বিনেশনের স্লিভলেস হাটু অব্দি ফ্রকে শ্যামবর্ণের এক অপরূপা নারী। তার গেট আপ তার মেইন চরিত্র ডেকে দিয়েছিলো।

তাই আমার চিনতে সময় লেগেছিলো। খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখার পর সেই নারীকে আমার পরিচয় লাগলো। কোথায় দেখেছি একে? কোথায়? হুট করেই মনে পড়লো আরে এ তো প্রতিভার বান্ধবী স্বরূপা! ওই মেয়ে ওখানে কি করছে! তুরাগের সাথে তো প্রতিভার থাকার কথা।

তারপর আমার চোখে পড়ে ফটো ট্যাগ কার্ডে। যার সারমর্ম ছিলো, প্রতিভাকে ছাড়া আপনার প্রথম ফরেন ট্রিপ ছিলো সেটা। ওই ট্যাগ দেখে আমি আবারো ফটোফ্রেমে চোখ বুলাই। তারপর খেয়াল হয় আপনাদের দুজনের ড্রেস কালার একি। কাপল ড্রেস! তারমানে এরা… হাহ, তারপরই সব ঘটনা বুঝে আসে আমার। সব কাজ নিঁখুত করে বেড রুমে ওই ছবি না রাখলে ও পারতেন।

সবাই তো আর প্রতিভার মতো বোকা না যে চোখে পড়বে না।”
নিতিনের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। নিতিনের কথায় তুরাগ চোখ মুখ খিচে বসে রইলো। তার চোখে মুখে এবার রাগের আভাস ফুটে উঠছে। সেই রাগটা হয়তো নিজের উপর।

কেনো সে এই ভুলটা করতে গেলো! ছবিটা বেডরুমে না রাখলে তো বর্ণা ফেঁসে যেতো না। রাগে নিজের চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে পারছে না। নাহ, এত তাড়াতাড়ি হার মানলে চলবে না। নিজের জন্য না হলেও বর্ণার জন্য হলেও লড়তে হবে। এ ভেবেই দৃঢ়তার সাথে বললো,
“আপনারা ভুল ভাবছেন এমন কিছুই নেই আমাদের মাঝে। বালিতে বর্ণা যায় নি। আমিই গিয়েছিলাম৷ আপনারা যাকে দেখেছেন সে বর্ণা নয়। অন্য মেয়ে।”

“আপনি মুখ খুলবেন না তাই তো?” রাগত কন্ঠে বললো অধরা। তুরাগ এবারো দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই আমার৷ অন্য যেকোনো ব্যপারে প্রশ্ন করুন। আমি বলবো। বর্ণার সাথে আমার কিছু নেই। ওকে জড়াবেন না।”

অধরা টেবিল থেকে প্লাইয়ার্স নিয়ে রাগত কন্ঠে বললো,
“দিনের পর দিন প্রতিভার সাথে বিশ্বাসঘাতক করেছেন। তাকে বিয়ে করে তার অলক্ষ্যে সব পাপ করে গেছেন। এখন বলতে পারছেন না কেনো! আমি ও দেখি আপনি কিভাবে মুখ না খুলেন

। মি.নিতিন আপনার নখ ভেঙেছে আমি আপনার ভাঙা নখ আঙুল সহ ছিড়ে ফেলবো। তারপর দেখি আপনি কতটা শক্ত থাকতে পারেন।”
অধরা উঠে দাঁড়ালো। তারপর এক পা বাড়াতেই নিতিন থামিয়ে দিলো।

“এক মিনিট মিস অধরা।”
অধরা দাঁড়িয়ে কপাক কুঁচকে নিতিনের দিকে তাকালো। যার অর্থ, থামালেন কেনো! নিতিন তা বুঝতে পেরে বললো,
“অপেক্ষা করুন, বলছি।”

বলে নিতিন তার প্যান্টের পকেট থেকে সাদা কাগজে আবৃত একটা স্প্রে বোতল বের করলো। স্প্রেটার উপরে ছাই রঙের ক্যাপ। বাকিটা কাগজে ঢাকা। নিতিন স্প্রেটা দেখিয়ে বললো,
“এটা কি জানেন? এটা একটা মরনব্যাধি স্প্রে।

এই স্প্রে শরীরের কোন অংশে দিলে সাথে সাথে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় এবং খানিক পরেই সেই স্থান অকাজো হয়ে যায়। লাইক, প্যারালাইজড। প্লাইয়ার্স দিকে নখ টেনে তুলতে বেশ শক্তি খরচ হয়। ওতো শক্তি প্রয়োগ না করে তুরাগের আঙুলে এই স্প্রে ছিটালে ঘন্টাখানেক গলা কাটা মুরগির মতো চটপট করছে।

ব্যাথায় অসহ্য হয়ে মরতে চাইবে। কিন্তু পারবে না।তারপর ঘন্টাখানেক পরে হাত নিস্তেজ হয়ে যাবে। এটাতে আমাদের শ্রম কম যাবে, ভালো শাস্তি ও পাবে। আপনি বরং এটা ট্রাই করুন।”

বলে অধরার দিকে স্প্রেটা বাড়িয়ে দিলো। অধরা স্প্রেটা নিতেই নিতিন অধরাকে ইশারায় কিছু একটা বললো। অধরা ইশারা বুঝে ইশারাতেই সায় জানালো।

তারপর স্প্রে হাতে নিয়ে প্লাইয়ার্স নিতিনকে দিয়ে তুরাগের দিকে পা বাড়ালো। যেতে যেতে বললো,
“আপনার উপর আমার ভীষণ রাগ। আজ সব রাগ এই স্প্রে পুষ করে পুষাবো।”
বলে স্প্রে বোতলের ঢাকনা খুলে একবার ঝাকি দিলো।

এদিকে নিতিন হাতে প্লাইয়ার্স ঘুরিয়ে বললো,
“আমি বেকার বসে না থেকে কিছু কাজ করি। কারো নখ তুলি। হাত নিশপিশ করছে। কার তুলবো? “

বলে মাথা চুলকালো নিতিন। তারপর বললো,
“পেয়েছি। স্বরূপার নখ তুলি। সেই বেশি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর মুখ ও খুলছে না। তাই একটা নখ তুলে মুখ খোলার ব্যবস্থা করি।”বলে বাঁকা হেসে স্বরূপার দিকে এগিয়ে গেলো।

নিতিন স্বরূপার ডান হাতের অনামিকা আঙুলের নখের দিকে তাক করলো প্লাইয়ার্সটা। অধরা ও স্প্রে নিয়ে তুরাগের হাতের উপর ধরলো। রেডি ওয়ান টু থ্রি বলে নিতিন অধরা তাদের কাজ শুরু করার আগ মুহুর্তেই সমস্বরে এক জোড়া কন্ঠ বলে উঠলো,
“ওকে কিছু করবেন না। আমি বলছি। যা করার আমাকে করুন।”

সেই কন্ঠে কানে যেতে থেমে গেলো নিতিন আর অধরা। বাঁকা হাসি ফুটলো দুজনের ঠোঁটেই। তারা একবার খানিক আগে সমস্বরে উচ্চারিত বাক্যের কথক তুরাগ আর স্বরূপার দিকে তাকালো।

দুজনেই একে অপরের দিকে মাথা তাক করে মুখ খিচে চোখ বন্ধ করে আছে। দুজনের কারোরই নিজের ব্যাথা পাওয়ার দিকে খেয়াল নেই। দুজনেই অপরের ব্যাথায় ব্যাথিত। দুজনের এক কথা, যা কষ্ট দেয়ার আমাকে দিন, আমি সয়ে যাবো। কিন্তু ওকে কোন কষ্ট দিবেন না আমি সইতে পারবো না।

তুরাগ চোখ মুখ খিচে বললো,
“প্লিজ বর্ণার নখ তুলবেন না। যত কষ্ট দেয়ার আমাকে দিন। আমার হাত পায়ের সব নখ তুলে নিন তাও ওকে কিছু করবেন না। ও ব্যাথা পাবে, আমি সইতে পারবো না।”

তখনি স্বরূপা চিৎকার করে বললো,
“আমি ব্যাথা পাবো না। প্লাইয়ার্স আর স্প্রে আমার হাতে করুন। তাও ওকে কিছু করবেন না। আপনাদের যা জানার বলুন আমি বলছি সব। কুঞ্জনকে ছেড়ে দিন।

এই কেসের মেইন কালপ্রিট আমি। ওকে ছেড়ে দিন। প্লিজ!”
বলে কেঁদে দিলো স্বরূপা। তার কান্নায় ব্যাথিত না হয়ে হেসে দিলো অধরা আর নিতিন।

তাও আবার সমস্বরে। অধরা হেসে বললো,
“যাক কাজ হয়েছে। প্রমাণ হলো এবার যে আপনাদের দুজনের মাঝে সম্পর্ক আছে। তাও গভীর সম্পর্ক! সত্যটা যেহেতু সামনে এসেছে এবার বলেই ফেলুন। বাবার মৃত্যুর পর কি হলো? এবং আপনাদের পরিচয় কিভাবে হলো তা বলুন।নাহলে শাস্তি দুজনেই পাবেন।”

“কে বলবে? তুরাগ না স্বরূপা? এ টু জেড সব শুনতে চাই। কিছু বাদ গেলে দুজনের একটা নখও হাতে থাকবে না। একজন বলা শুরু করুন।”

চেয়ারে আয়েশ করে বসে প্লাইয়ার্স ঘুরাতে ঘুরাতে বললো নিতিন। প্রায় সাথে সাথেই স্বরূপা বললো,
“আমি বলছি, সব বলছি। তাও কুঞ্জনকে কিছু করবেন না। ও এমনিতেই ব্যাথায় কাতরাচ্ছে।”

“তুমি চুপ থাকো। আমি বলছি। তুমি সব জানো না। উল্টাপাল্টা কি না কি বলে আবার শাস্তি পাবে। তারচেয়ে বরং আমি বলি সবটা। আমি ফিট আছি একদম।”

ধমকে বললো তুরাগ। দুজনের ভালোবাসা দেখে নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে ভ্রু নাচালো নিতিন। তারপর সচেতন চোখে তাকিয়ে বললো,
“তুরাগ আপনি বলুন। স্বরূপার ক্লাস পরে নিচ্ছি।”

তুরাগ বলা শুরু করলো।

“মাঝে মাঝে মায়ের সাথে দেখা করতে বাবার বাড়ি যেতাম। বাবার একটা মেয়ে ছিলো। নাম শতাব্দী মেহেক বর্ণা। মায়ের নামের সাথে মিলানো। বর্নার জন্মের পর বাবা আমাদের ডেকে বলেছিলেন তোমাদের একটা খেলার সাথি এসেছে, একটা পুতুল বন্ধু এসেছে। বর্ণার আগমনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলো চঞ্চল।

সে তো বর্ণাকে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছলো। বর্ণা হওয়ার পরে চঞ্চল সপ্তাহের অর্ধেক সময় বাবার বাড়িতে কাটাতো। চঞ্চল তার পুতুলবোনকে নিয়ে খুনসুটিতে ব্যস্ত থাকতো। বর্ণাও ভাই বলতে অজ্ঞান ছিলো। আমি ছোট বেলা থেকেই গম্ভীর ছিলাম। বাবা মা আর চঞ্চল ছাড়া কারো সাথে মিশতাম না কিংবা কথা বলতাম না।

সে হিসেবে বর্ণার সাথেও আমার ভাব জমে নি। বর্ণার জন্মের পর আমি বাবার বাড়িতে যেতাম না খুব একটা। এতিমখানায় পড়ালেখা নিয়ে পড়ে থাকতাম। চঞ্চল আর বাবা এসে আমাকে সময় সঙ্গ দিতো মাঝে মাঝে। এভাবেই চলছিলো দিন। বাবা মা মারা যাওয়ার ক’মাস আগেই চঞ্চল একবারের জন্য এতিমখানায় চলে আসে।

চঞ্চলের পড়ালেখার কথা ভেবে বাবাই নিয়ে আসে। বাবা মা মারা যাওয়ার সময় বর্ণা বাসায় ছিলো না। সে স্কুলে ছিলো। ফিরে এসে দেখেই কান্না জুড়ে দেয়। বাবা মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে আমি আর চঞ্চল যাই বাবার বাড়িতে।
বর্ণা আর চঞ্চলকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছিলো না। ওর কান্নাকাটি দেখে আমি ওদের নিয়ে চাচার সাথে এতিমখানায় চলে আসি। টানা একসপ্তাহ চঞ্চল আর বর্ণাকে কিছু খাওয়ানো যায় নি।

এতে দুজনেই অসুস্থ হয়ে যায়। এবং হাসপাতালে থাকতে হয় দু’দিন। হাসপাতাল থেকে ফেরার দু’দিন পর হঠাৎ একদিন রাতের আধারে এক এক দম্পতি এসে বর্ণাকে নিয়ে যায়। আমরা যখন ঘুমে ছিলাম। পরদিন সকালে উঠে বর্ণাকে না পেয়ে বর্ণার কথা বড়স্যার করিমুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করলে বড়স্যার বলেন, ‘বাবা মা মারা গেছে এখন বর্ণা এতিম। এক চাচা ছাড়া বর্ণার কোন আত্মীয় ও নেই।

চাচা তার বাসায় নিতে পারতেন। কিন্তু চাচী আগে থেকেই বর্ণাকে দেখতে পারতো না। সেখানে গেলে বর্ণার অযত্ম হবে। এখানে থাকলেও মেয়েটা মানুষ হতে পারবে না। এক নিঃসন্তান দম্পতি হন্য হয়ে একটা সন্তান খুঁজছে দত্তক নেয়ার জন্য। তারা বেশ বড়লোক। বর্ণা ওখানে গেলে অনেক সুখে থাকবে।

আরেক বাবা মা পাবে। ওখানে বর্ণার কোন অযত্ন হবে না। বর্ণার সুখের জন্য বর্ণাকে ওই দম্পতির কাছে দত্তক দিয়েছি। তারা কাল রাতে বর্ণাকে নিয়ে গেছে। ‘ বর্ণার সুখের কথা ভেবে আমি এসবে আর দ্বিমত করিনি। আমি খুব করে চেয়েছিলাম বর্ণা সুখে থাকুক। এতিমখানায় তো আর সুখের বালাই নেই। বাবা মায়ের কাছে থাকুক ভালো থাকুক। আমি এসব মানতে পারলেও চঞ্চল মানতে পারেনি। চঞ্চল একবার বাবা মায়ের জন্য কাঁদছে আরেকবার পুতুলবোনের জন্য। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সারাদিন বর্ণার জন্য কাঁদতো।

এতে আবারো অসুস্থ হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করানো লাগে। একদিন পর হাসপাতাল থেকে ফিরেও চঞ্চলের কান্না থামেনা। সে বাবা মা আর পুতুলবোনের কাছে যাবে। চঞ্চলের কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছিলো না। আমি ও ভেঙে পড়লাম। দুজনে সারাদিন কাঁদতাম। আমাদের এহেন অবস্থা দেখে এতিমখানায় মিটিং বসে এবং সিদ্ধান্ত হয় আমাদের দুজনের মাঝে একজনকে দত্তক দিয়ে দিবে। তখন নিসঃন্তান বন্ধুর কথা মনে পড়ে বড়স্যারের। তারপর তিনি তার বন্ধুকে বলেন ব্যাপারটা। পরে সেই এক ঘটনা রিপিট হয়।

রাতের আঁধারে তারা এসে চঞ্চলকে নিয়ে যায়। আমরা তিনজন থেকে হয়ে যাই এক। বর্ণার চলে যাওয়া মানতে পারলেও চঞ্চলের চলে যাওয়া মানতে পারিনি আমি। খুব বেশিই ভালোবাসতাম কিনা।

এবার আমিই কান্নাকাটি জুড়ে দিই। বড়স্যারকে হাতে পায়ে ধরে চঞ্চলের কাছে যাবার বায়না করি। সেদিন বড়স্যার খুব মারে আমাকে। তার উদ্দেশ্য ছিলো আমাকে শান্ত করা। কিন্তু আমি শান্ত না হয়ে অশান্ত হয়ে যাই। রীতিমতো পাগলামী জুড়ে দিই। বিনিময়ে চঞ্চলকে তো পেতাম না উল্টো আঘাতের সম্মুখীন হতাম। একদিন চুরি করে এতিমখানা থেকে পালিয়ে যাই। চাচার কাছে চলে যাই। উদ্দেশ্য চাচা থেকে কোন ইনফরমেশন কালেক্ট করা। চাচার হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে জানতে পারি চঞ্চলকে যারা এডপ্ট করেছে তারা ঢাকা থাকে।

চঞ্চল এখন ঢাকা আছে। আমার ছোট্ট মস্তিষ্কে কি খেলেছিলো জানি না সেদিন। ওকথা শুনে এতিমখানা ফিরে সিলভারে টাংকে হাতখরচের জন্য বাবার দেয়া টাকাগুলো থেকে যে টাকা জমিয়েছিলাম সেই ১২৭২টাকা নিয়ে রাতের আঁধারে চিরতরে এতিমখানা থেকে বেরিয়ে পড়ি।বয়স তখন আমার দশ। ক্লাস ফাইভে পড়ি। ছোট হলেও বুদ্ধিমত্তা আর ম্যাচুরিটি ছিলো বেশ। সেই বুদ্ধিমত্তার জোরেই রাজশাহী থেকে ঢাকায় চলে আসি।

এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকি। কিছুই চিনিনা। যাকে দেখতাম তাকেই জিজ্ঞেস করতাম, আমার চঞ্চলকে দেখেছেন কোথাও? কেউ ইতিবাচক উত্তর দিতে পারতো না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম।

কোন আশ্রয়স্থল ছিলো না। নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে শুধু চঞ্চলকে খুঁজতাম। এভাবেই কেটে গেলো কিছুদিন। আমি হয়ে গেলাম পথশিশু। দিনে একবার ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খেতাম আর সারাদিন চঞ্চলকে খুঁজতাম। রাতে ফুটপাতে কিংবা পিচঢালা রাস্তার একপাশে প্লাস্টিক বিছিয়ে ঘুমাতাম।”
তুরাগ থামলো। এক নজর অভিলাষের তাকালো। দেখলো। অভিলাষ ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হতে পারে এসব ঘটনা অভিলাষ জানতো না। তুরাগ তারজন্য এত কষ্ট সহ্য করেছে তা হয়তো তার অজানা ছিলো।

তুরাগ অভিলাষ থেকে চোখ ফিরে আবারো বলা শুরু করলো,
“এভাবে কতদিন কেটেছে জানি না। কারণ আমার তখন সময়জ্ঞান ছিলো না। আমার জ্ঞানধ্যানে ছিলো শুধুই চঞ্চল, আমার ভাই, তাকে এক নজর দেখা, একবার বুকে জড়িয়ে নেয়া। হয়তো মাস কয়েক কেটেছে।

এরপর একদিন এক সেচ্ছাসেবক আমাদের কয়েকজনকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে আজিমপুরের স্যার সলিমুল্লাহ মুসমিল এতিমখানায় আশ্রয় দিলেন। তারপর থেকে আমরা সেখানকার বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আমি কুঞ্জন থেকে হয়ে গেলাম তুরাগ। সব কিছু আগের মতো হলো। কিন্তু শূন্যতা ছিলো শুধুই বাবা, চঞ্চলের আর একটু হাসিখুশি মুহুর্তের। আস্তে আস্তে আমি বড় হতে থাকি।

হতে থাকি আরো গম্ভীর আর জেদি। আমার মনে আক্রোশ জমতে থাকে। আমি আমার একাকীত্বের জন্য, আমার পরিবার হারানোর জন্য প্রভাত মির্জাকে দায়ী করতে থাকি। আমার সব রাগ গিয়ে পড়ে তার উপর। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যেভাবেই হোক প্রভাত মির্জাকে মেরে আমার বাবা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবো।

এ ভাবনা মাথা থাকতেই আমি বয়সের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকি। সেই সাথে পড়ালেখা আর চঞ্চলকে খুঁজতেও সময় ব্যায় করি।”
” অভিলাষ আর স্বরূপাকে পেলেন কবে?আর কিভাবে পেলেন?”
উদ্ধিগ্ন কন্ঠে বললো অধরা। এতক্ষণে সে তুরাগের অভিলাষকে বাঁচানোর অর্থ বুঝেছে। ভাই এরা!
তুরাগ উত্তর দিলো,

“চঞ্চলকে পেয়েছি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে। সেকেন্ড সেমিস্টারে পড়তাম তখন। চঞ্চল তখন দ্বাদশ শ্রেনীতে পড়ে। হারিয়ে যাওয়ার পর চঞ্চলের সাথে আমার প্রথম দেখা মতিঝিলের এক টং দোকানে।

এক সন্ধ্যায় আমি মৃদুলের সাথে কোন এক কাজে মতিঝিলে গিয়েছিলাম। কাজ শেষে ফেরার পথে টং দোকানে দুজন বসে চা খাই। তখন সেখানে চঞ্চল আর তার এক বন্ধু আসে৷ তারা চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলো। অনেক সময় পর দেখা হওয়ায় আর চেহারা পরিবর্তনে কেউ কাউকে চিনি নি।

আড্ডা শেষে বিল দেয়ার সময় চঞ্চলের হাতের দিকে নজর যায় আমার। ছোট বেলায় একবার চঞ্চল পড়ে গিয়ে বাঁ হাতের কব্জির উপরে লম্বালম্বিভাবে কেটে গিয়েছিলো। যার পরে দাগ হয়ে গিয়েছিলো। হুবহু ওই দাগটাই দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার হাতে। আমার খটকা লাগলো। সিউর হতে মৃদুলকে পাঠিয়ে আমি ছেলেটাকে ফলো করলাম। ছেলেটার বাসা চিনে নিলাম। ছেলেটার ব্যাপারে কিছু ইনফরমেশন ও জোগাড় করলাম।

দু’দিন পর একদিন ছেলেটা কলেজ থেকে ফেরার সময় একা পেয়ে আমি ডাক দিই। আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি কি চঞ্চল? কুঞ্জনের চঞ্চল?”

ছেলেটা খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
“আপনি কে?” আমি বললাম, “আমি কুঞ্জন।”ব্যাস আবারো দুভাই মিলে গেলাম।”
“স্বরূপাকে কিভাবে খুঁজে পেলেন?”

ফোঁড়ন কাটলো অধরা। নিতিন কাঠের তৈরি সোনালী রঙের চেয়ারের হাতলের উপর হাত রেখে হাতের তালুতে থিতুনি রেখে বেশ মনোযোগ দিকে তুরাগের কথা শুনছে। তুরাগ একবার স্বরূপার দিকে তাকালো। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে বললো,

“চঞ্চলকে পাওয়ার পর কথায় কথায় জানতে পারলাম প্রভাত মির্জার প্রতি তার রাগ এখনো আছে। সেও বাবা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চায়। আর তার পুতুলবোনকে ফেরত পেতে চায়। যে তার পুতুলবোনকে আর ভাইকে তার থেকে দূর করেছে তাকে ছাড়বে না সে
। এতবছরেও সে আমাদের ভুলতে পারেনি। চঞ্চল ও আমাদের খুজেছিলো কিন্তু পায় নি।

প্রতিশোধের ব্যাপারে চঞ্চল আমার থেকে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলো। সে তো প্রভাত মির্জার উপর প্রতিশোধ নিতে তার মেয়েকেই টার্গেট করেছে। রীতিমতো টিজ করতো। চঞ্চলের কাছে থেকে প্রভাত মির্জা এবং তার পরিবার সম্পর্কে জানলাম।

আমিতো আগেই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলাম, আমার সাথে এবার চঞ্চল ও যোগ দিলো। দুজনেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম যেভাবেই হোক মির্জা পরিবারকে ধ্বংস করবোই। দুজনে মিলে নানান পরিকল্পনা বানাতে থাকি।

এর মাঝে বর্ণাকে খোঁজার কাজ ও চালিয়ে যেতে থাকি। বর্ণাকে খুঁজে পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে। দূর্লভপুর এতিমখানায় গিয়ে পুরো ফাইল ঘেঁটে সেখান থেকে বর্ণার দত্তকের কাগজ খুঁজে নিয়ে তারপর সেই ঠিকানা পেয়ে গেলাম।

জানতে পারলাম, চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি হাসান আলী বর্ণাকে দত্তক নিয়েছে। দু’ভাই নাটোর থেকে চলে যাই চিটাগাং। চট্টগ্রামের গিয়ে পুরো বারোদিন লাগিয়ে দুজনে মিলে হাসান আলীর ঠিকানা খুঁজে বের করেছি। তিনি থাকতেন চকবাজার। চকবাজার গিয়ে তার পরিবার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারি তার একটাই মেয়ে।

নাম স্বরূপা। কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। পরদিন স্কুলের কাছে আড়ি পেতে হাসান আলীর মেয়েকে দেখে আসি। উদ্দেশ্য বর্ণার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। হাসান আলীর মেয়েকে দেখে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম যে এটাই বর্ণা। কারণ সব কিছু চেঞ্জ হলেও বর্ণার মায়াবী চোখ গুলো পরিবির্তন হয় নি। আগের মতোই মায়াবী রয়ে গেছে। সেদিনই বর্ণাকে ডেকে আমরা ওর এডপশনের ব্যাপারটা খুলে বলি।

এর আগে থেকে না জানার কারণে বর্ণা বিশ্বাস করেনি। পরে আমরা দূর্লভপুর এতিমখানার দত্তক ফাইল থেকে নেয়া বর্ণার দত্তকপত্র ওকে দেখাই। সেই সাথে এতিমখানার এলবামে থাকা আমাদের তিনজনের ছবিও দেখাই ওকে। বর্ণা সেদিন কিছু না বলে চলে গিয়েছিলো। সেদিন বাসায় হয়তো সব জেনেছিলো।

পরদিন ছুটির পর ওর স্কুলের সামনে আমাদের দেখে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো। সেদিন থেকেই আমরা আবার এক হলাম। সেখান থেকেই নতুন করে পরিচয়, প্রণয়। এসএসসি দিয়ে বর্ণা সিটি কলেজে ভর্তি হয়। বর্ণার একাদশের শুরুতে আমরা বিয়ে করি। আমাদের ব্যাপারটা বর্ণার মা বাবা জানতো না।

এখনো জানে না। বিয়ের পরই বর্ণা জানতে পারে বাবা মায়ের খুনের কথা। আগে ভুলে গিয়েছিলো। জানার পরই সেও আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা তিনজন মিলে প্ল্যান বানালাম। সেই অনুযায়ী বর্ণা বাবা মায়ের কাছে জেদ ধরে বদলি নিয়ে পরিবার সহ ঢাকা চলে আসে।”

“তারপর প্রতিভার সাথে বন্ধুত্ব করার নাটক শুরু করে তাই তো?”
নিতিন বললো। তুরাগ উত্তর দিলো,

“হ্যাঁ।
“মি.অভিলাষ ওরফে চঞ্চল বিশ্বাস এবং হৃদিতা জামান ওরফে শিলা এবার আপনাদের প্রেম কাহিনী বলুন।”
তড়িৎ প্রশ্ন ছুড়লো নিতিন।নিতিনের আকস্মিক কথার আক্রমণে অবাক হলো শিলা আর অভিলাষ। পরক্ষনেই নিজেদের সামলে নিলো। তারপর ভ্রু কুঁচকে সমস্বরে বললো,

“আমাদের মাঝে কোন কাহিনী নেই। আমরা জাস্ট নিজ স্বার্থে খুনে অংশ নিয়েছি।”

নিতিন এবার টেবিলের উপর অধরার রাখা স্প্রেটা নিলো। নিয়ে ক্যাপ খুলে ঝাকিয়ে বললো,
“সোজা কথায় কাজ না হলে স্প্রে করতে হয়। আচ্ছা বলুন আপনাদের কোথায় স্প্রে করবো? হাতে পায়ে নাকি মিথ্যা বলার জন্য জিহ্বায়?”

স্প্রে হাতে উঠে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি বসা অভিলাষ আর শিলার সামনে দাঁড়ালো।শিলা আর অভিলাষের চেহারায় এবার ভয়ের আভাস পাওয়া গেলো। দুজনেই ভীত চেহারা নিয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। নিতিন বললো,

“এমন করে লাভ হবে না। সত্য কি বলবেন নাকি স্প্রে করবো।। মি.অভিলাষ আপনি কি মুখ খুলবেন নাকি আপনার প্রানপ্রিয় স্ত্রীর মুখ সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দিবো?”

বলে স্প্রেটা শিলার মুখের দিকে নিলো। প্রায় সাথে সাথে অভিলাষ চেঁচিয়ে বললো,
“বলছি, বলছি। হৃদিকে কিছু করবেন না। প্লিইজ!”

নিতিন বাঁকা হেসে বললো,
“বলুন তবে?”

“হৃদির সাথে আমার পরিচয় ক্লাস নাইন থেকে। হৃদি তখন ধোলাইপাড় স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। ধোলাইপাড় স্কুলের সামনে রাস্তার অপাশে বিল্ডিংয়ে থাকতো আমার বড় খালা। খালাতো বোন পড়তো ওই স্কুলে। কাজিনের সাথে ওই স্কুলে গিয়েই পরিচয় তার দুজনের বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের বছর খানেক পর প্রেম। এবং ভাইয়ার বিয়ে মাস খানেক পর বিয়ে।”

“বিয়ের কথা পরিবারের কেউ জানতো না? “

“না।”
“শুধু মাত্র প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই প্রতিভাকে উত্ত্যক্ত করতেন? কোন লাভ ম্যাটার ছিলো না?”

“না। প্রভাত মির্জার করা পাপের বদলা নিতেই আমি প্রতিভাকে টার্গেট করেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম প্রতিভাকে দিয়ে প্রভাত মির্জাকে কষ্ট দিবো। তাই ক্লাস নাইন থেকেই টিজ করা শুরু করি। প্রতিভার প্রতি ভালোবাসা তো দূরে থাক ঘৃণা ও আসে না আমার।”

“তুরাগ আসার পূর্বে আপনার পরিকল্পনা কি ছিলো?”

“প্রতিভাকে প্রেমের জালে ফাঁসানো। তারপর বিয়ে করে প্রতিভাকে তিলে তিলে মারার মাধ্যমে প্রভাত মির্জাকে কষ্ট দেয়া। কিন্তু ভাইয়াকে পাওয়ার পর প্ল্যান চেঞ্জ হলো।

নতুন পরিকল্পনা করলাম। নিখুঁত পরিকল্পনা।”

“কি পরিকল্পনা?”


পর্ব- ১৪

অভিলাষ বলা শুরু করলো,
“আমি আর ভাইয়া মিলে প্ল্যান বানাই। এই প্ল্যানটা করেছিলাম পুতুলবোন মানে বর্ণাকে পাওয়ার পর। সে হিসেবে সেও যুক্ত ছিলো। প্রতিভার চোখ আমি হবো সবচেয়ে খারাপ লোক।

আর ভাইয়া আর পুতুলবোন হবে সবচেয়ে ভালো লোক। আমরা সবাই এমন অভিনয় করবো যেন প্রতিভাকে খুন করার পর সব দোষ আমার ঘাড়ে আছে।

তাদের কেউ সন্দেহ না করে
। যেহেতু আমি ইভ-টিজার তাই কাজটা সহজ হবে। সবাই আমাকে খুনি ভাববে। আমাকে নিয়ে পড়ে থাকবে। এই ফাঁকে ভাইয়ারা বাকি কাজ করবে। পরিকল্পনা মাফিক আমি প্রতিভাকে টিজ করতে লাগলাম নিয়মিত। আর বর্ণা ট্রান্সপার নিয়ে এসে নাটক করে ফাঁদ পাতলো যেন প্রতিভা যেসে তার সাথে বন্ধু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হলো, প্রতিভা বর্ণার সাথে বন্ধুত্ব করলো।

বর্ণা মুখোশ ধারীর মতো প্রতিভার সাথে ভালো আচরণ করতে লাগলো। যেহেতু আমাদের পরিকল্পনা বড় এবং কাজ নিখুঁত তাই আমাদের তিনজন ছাড়া আরো মানুষের প্রয়োজন ছিলো। আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম। কাকে নিবো কাকে নিবো? তখন ভাইয়াই মৃদুল, হৃদিতা এবং ডাঃকৌশিকের কথা বললেন।

হৃদিতাকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। আর বাকি দুজনকে ভাইয়া রাজি করাবেন। ভাইয়া পরিকল্পনা করলেন বাকি তিনজনের কাছে এটা হবে একটা সম্পত্তির হাতানোর জেরে খুন।

তাদের সম্পত্তির লোভ দেখিতে ভাগে আনতে হবে। তারা কেউ জানবেনা যে এটা প্রতিশোধ মূলক খুন। ভাইয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে তিনজনকে ভাগে আমলাম। এস আই ভি টিম গঠিত হলো। তারপর মৃদুলকে প্রতিভার সামনে পাঠানো হলো বর্ণার বয়ফ্রেন্ড হিসেবে। এমনটা করা হয়েছে যেন বর্ণা আর ভাইয়ার রিলেশনের কথা কেউ জানতে না পারে। মৃদুল প্রতিভার সামনে বর্ণাকে কি কি বলবে তা বর্ণা শিখিয়ে দিতো।

বর্ণার শিখানো কথা মৃদুলের মুখ থেকে শুনে প্রতিভা বিশ্বাস করে নিলো সব। এদিকে দিন যত যাচ্ছে বর্ণা প্রতিভার সম্পর্কে তত বেশি জানতে শুরু করেছে। বেস্টফ্রেন্ড মানতো বলে নিজের এবং পরিবারের কথা সবটাই শেয়ার করতো প্রতিভা। বর্ণা সেসব থেকে কিছু পয়েন্ট নোট করে নিতো। এভাবে চললো বেশ কিছু সময়।

এর পর আড়াই বছর আগে সুযোগ বুঝে তুরাগ প্রতিভার সামনে যায়। দিয়াবাড়িতে গিয়ে এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন প্রতিভা প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়। হলো ও তাই। প্রতিভা ভাইয়ার পাতানো জ্বালে আটকে গেলো। ভাইয়া অভিনয় জগতে পা দিলেন। গম্ভীর রাগী, জেদী মানুষটাও হাসিমজা করার অভিনয় শুরু করলেন। ভাইয়ার অভিনয়ের জোরেই প্রথম দেখায় ভাইয়াকে ভালো লেগে যায় প্রতিভার। বর্ণা প্রতিভার ভালো লাগা মন্দ লাগা সম্পর্কে জানতো এবং সে হিসেবেই ভাইয়াকে চলতে বলতো। যাতে প্রতিভার ভালোলাগাটা বাড়তে থাকে।

তেমনটাই হলো। দিয়াবাড়িতে প্রথম দেখায় পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব, অতঃপর ভালোবাসার নাটক। সবকিছুতে এগিয়ে ছিলো প্রতিভাই। ভাইয়াকে তেমন কিছু করতে হয় নি। জাস্ট বর্ণার লেখা স্ক্রিপের কয়েকটা ডায়ালগ আর স্ক্রিপে লেখা প্রতিভার কয়েকটা পছন্দনীয় কাজ করতে হলো। ভাইয়া মাস্টার্স কমপ্লিট করে চাকরি নেয়।

এবং কিস্তিতে ফ্ল্যাট নেয়। সেখানে ভাইয়ার ফ্ল্যাটে কাজের মেয়ে সেজে উঠে হৃদি। তার উপর তলায় উঠি আমি, আমার পরিবার। সবাই জানতো, হৃদি ভাইয়ার কাজের মেয়ে। অথচ গোপনে সে আমার স্ত্রী ছিলো।

ততদিনে আমরা বিয়েও করে নিয়েছি। লুকোচুরির সংসারটা বেশ যাচ্ছিলো আমাদের। এত কিছুর মাঝেও আমি ইভটিজারের রোল করতে ভুলি নি। আমি প্ল্যান মোতাবেক এগুচ্ছিলাম। বর্ণা আর ভাইয়া ও মুখোশ পরে প্রতিভার সাথে গভীর একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ভাইয়ার চাকরির পর আমি প্রতিভাকে জ্বালানো বাড়িয়ে দিলাম।

একসময় তারা আমাকে জেলে দিলো, এবং তাড়াহুড়ায় ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। আমাদের পরিকল্পনা বিফলে যায় নি। পরিচয়ের পর থেকে মির্জা পরিবারের কাছেও ভাইয়া আর বর্ণা বেশ ভালো সাজলো। সবার ভালোবাসা কুড়ালো। আর আমি জঘন্য। আমি জেলে গেলাম। অনেকটা ইচ্ছে করবেই। আমার জেলে থাকার সময়ে ভাইয়ার বিয়ে হলো। ভাইয়া এবার প্রেমিক থেকে স্বামীর অভিনয় শুরু করলো। আমি থাকতাম উপর তলায়, হৃদি ভাইয়ার বাসায়। আমার কাছে ছাড়া আমার পরিবার, আশেপাশের মানুষ, প্রতিভার কাছে ছিলো কাজের মেয়ে।

সেও তেমন ভাবেই চলতো। আমি জেলে থাকা অবস্থায় হৃদি ভাইয়ার ফ্ল্যাটেই ছিলো। প্রতিভাকে সময় দেয়ার বাহানায় বর্ণাও আসতো। এভাবে সব ঠিকঠাকই চলছিলো। আমি জেল থেকে বের হলাম। প্রতিভাকে আবার টিজ করা শুরু করলাম। লোকলজ্জায় প্রতিভা কাউকে বলতো না।

আমার জেল থেকে বের হওয়ার পর ভাইয়া এক্সিডেন্টের শিকার হলো। এক্সিডেন্টে হয়নি। ওটা বাহানা ছিলো। ভাইয়ার সব ট্রিটমেন্ট করেছে আমাদের আগে থেকেই ঠিক করা ডাঃ কৌশিক। কয়েকদিন মিথ্যা বাহানায় হাসপাতালে রাখলো। তারপর পায়ের হাড় ভেঙে গেছে বলে হুইলচেয়ারে বাড়ি পাঠালো।

খালাতো ভাইয়ের কথা প্রতিভা অবিশ্বাস করলো না। মেনে নিলো। ভাইয়া এবার ল্যাংড়া হওয়ার অভিনয় কিরতে লাগলো। ভাইয়ার নিয়মিত চেকাপ করতো কৌশিক। তাই তেমন সমস্যা হতো না। মিথ্যা রিপোর্ট বানিয়ে দেখাতো।

মিথ্যা মেডিসিন দিতো। ভাইয়া খেতো না। প্রতিভা খাওয়ালেও ভাইয়া গিলতো না। জিহ্বার নিচে চেপে রেখে পরে ফেলে দিতো। ভাইয়ার সব কিছু এমন ভাবে করতো যে প্রতিভা কোন সন্দেহ করার স্কোপ পেতো না।

প্রতিভা জানতো ভাইয়া প্রতিভাকে খুব ভালোবাসে। অভিনয়ে অন্তত তাই বলতো। প্রতিভার মার্ডারের পরের কথা ভেবেই ভাইয়া আর প্রতিভার বেডরুমে ওই বোর্ডটা টাঙানো হয়। এবং অনুভূতি আদান প্রদান হয়। প্রতিভা যখন ভাইয়ার সেবায় মগ্ন তখন আমি ব্যাস্ত প্রতিভাকে ব্ল্যাকমেইল করতে। আমি এডিট করে প্রতিভার অশ্লীল ছবি বানিয়ে ওকে ব্ল্যাকমেইল করতাম। প্রতিভা ভয়ে, লজ্জায় বলতো না কাউকে। এভাবে ক’দিন গেলো।

এসে গেলো আমাদের সেই মুহুর্তে। ভাইয়া জন্মদিনের আগের দিন। যে দিন আমরা প্রতিভাকে খুন করবো। প্ল্যান অনুযায়ী বিকেলে আমি আর মৃদুল সন্ত্রাসী সেজে প্রভাত মির্জার উপর হামলা চালাই। এতে তিনি আহত হন। চিকিৎসা শেষে বাসায় আসেন। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে প্রতিভা ছুটে গেলো সেখানে।

এই ফাঁকে আমি ভাইয়ার ফ্ল্যাটে গেলাম। আগের দিন বর্ণার দেয়া প্রতিভার নাম দিয়ে লেখা ডায়েরিটা ভাইয়ার ফ্ল্যাটে রেখে যাই। বর্ণা হ্যান্ড রাইন্টিং এক্সপার্ট। সবার লেখা নকল করতে পারে। তাই সে অনায়েসে প্রতিভার লেখা নকল করে মন গড়া একটা কাহিনী লিখে দিয়েছিলো ডায়েরিতে। এটা মূলত পুলিশের জন্যই ছিলো। বর্ণা তখন মির্জা হাউজে।

তারপর ভাইয়া, হৃদিতা ভুঁইয়া ভিলার ছাদ টপকে ফরিদ ভিলা হয়ে চলে যায় ধানমন্ডির আমার ফ্ল্যাটে। যেখানে আমি আর হৃদি সময় কাটাতাম। সেখানে আগে থেকে খুনের সব সরঞ্জাম এবং ডাঃকৌশিক, আর মৃদুল উপস্থিত ছিলো। আমরাও গিয়ে যোগ দিলাম।

বাবাকে দেখে ডিনার করে ভাইয়ার ফ্ল্যাটের জন্য বের হলো প্রতিভা।”
অভিলাষ থামলো। অধরা অধৈর্য্য গলায় বললো,
“তারপর? “

অভিলাষ লম্বা নিয়ে বললো,
“প্রতিভাকে মার্ডার করার দুদিন আগে মৃদুল গিয়ে প্রতিভার গায়ের বারবি গাউন আর ডায়মন্ড সেট কিনে নিয়ে আসে। র‍্যাপিং পেপার, ট্রাভেল ব্যাগ, নেম কার্ড সব কিছু আগেই রেডি ছিলো।

নেম কার্ড আর চিরকুট বর্ণা আগেই লিখে রেখেছিলো। হৃদি পার্লারে কাজ করেছে বিধায় সাজানোর ভার পড়েছিলো তার উপর। প্রতিভা বাবার বাসায় থেকে বের হওয়ার পর বর্ণা বারান্দায় দিয়ে দড়ি বেধে অতি সচেতনার সাথে নিচে নেমে প্রতিভার পিছু নেয়।বর্ণার সেদিন মির্জার হাউজে থাকার কথা।

প্রতিভা যাওয়ার পর বর্ণা রুমে ডুকে দরজা লক করে। তাই মির্জা হাউজের কেউ টের পায় নি। গুটগুটে অন্ধকার থাকায় সিসিটিভি ক্যামেরায় ও আসেনি কিছু। সেদিন কায়দা করেই লোকাল গাড়িতে পাঠিয়েছে ভাইয়া প্রতিভাকে। তাই প্রতিভা ভাইয়ার ফ্ল্যাটে ফেরার জন্য গাড়ির অপেক্ষা করে বাড়ির সামনে। তখনি বর্ণা প্রতিভার সামনে আসে আর বলে, তুরাগ আর প্রতিভার জন্য সে সারপ্রাইজ রেড়ি করেছে। সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য তার সাথে যেতে।

সারপ্রাইজের কথা বলে কনভেন্স করার পর মৃদুলকে ম্যাসেজ করে বর্ণা। ম্যাসেজ পেয়ে মৃদুল গিয়ে প্রতিভার আড়ালে প্রতিভার ফোন নিয়ে যায়। ফোন নিয়ে ধানমন্ডি লেকে চলে যায়।

রাত বারোটায় শিলাকে সেই ম্যসেজ করে। আমরা সবার লোকাল ফোন নিজ নিজ গন্তব্য এ ছিলো। আমাদের সাথে ছিলো না। আমাদের সাথে ছিলো আমাদের গোপন ফোন। যার নাম্বার আমরা ছ’জন ছাড়া কেউ জানিনা। বর্ণা প্রতিভাকে আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়।

সেখানে প্রতিভাকে চোখ বেধে সাজিয়ে দেয় বর্ণা আর হৃদি। সাজানো শেষে চোখ বেধেই বর্ণা কথা বলতে বলতে আমাদের গেস্ট রুমে নিয়ে যায়। গেস্ট রুমের সিলিংয়ের সাথে দড়ি বাধা ছিলো। প্রতিভাকে চোখ বাধা অবস্থায় দড়ির সামনে নিয়ে একটা মোড়ার উপর দাঁড় করানো হয়। প্রতিভা সারপ্রাইজ ভেবে চুপ ছিলো। প্রতিভার মাথায় দড়ি ঢুকায় বর্ণা। তারপর প্রতিভার চোখের বাধন খুলে দেয়।

আমরা সবাই প্রতিভার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ততক্ষণে ধানমন্ডি লেকে প্রতিভার ফোন পেলে মৃদুল ও আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলো। প্রতিভা চোখ খুলে দেখে তুরাগ দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে খুব অবাক হয়। তারপর তুরাগের পাশে আমাকে দেখে আরো অবাক হয়। সবচেয়ে বেশি অবাক হয় তার গলায় দড়ি দেখে। প্রতিভা অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকায়। তখন আমরা ছ’জন সমস্বরে হেসে উঠি।
ভাইয়া বলে উঠে,
“ওপারে ভালো থেকো আমার অভিনয়ের স্ক্রিপের স্ত্রী। আজ আমার প্রতিশোধ পূর্ণ হলো।”

প্রতিভা অবাক হয়ে বললো,
“প্রতিশোধ! তুমি!”
“হ্যাঁ আমিই। আমি তোকে খুন করার জন্যই তোর সাথে এতদিন নাটক করেছি। শুধু আমি না, আমরা সবাই নাটক করেছি। এই যে দেখছিস তোর বান্ধবী স্বরূপা, ও আমার স্ত্রী। তোর আগে থেকে।

আর অভিলাষ আমার ভাই। তোর সাথে আমি আর বর্ণা মানে স্বরূপার যা সম্পর্ক ছিলো সবটা ফেক। ওটা আমাদের প্রতিশোধের জন্য ছিলো।”

ভাইয়ার কথা শুনে প্রতিভার চোখে মুখে আকাশচুম্বী বিস্ময় দেখা গেলো। সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। বর্ণা গিয়ে প্রতিভার পায়ের নিচের মোড়া ফেলে দিলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই শ্বাস আটকে মারা গেলো প্রতিভা।”
অভিলাষ থামলো। অধরা ঘৃণার সুরে বললো,

“আপনারা কি মানুষ! ছিঃ আমার ভাবতেই রাগ লাগছে।”
অধরার কথার জবাব এলো না। নিতিন বললো,

“বাকি কাহিনী বলুন তুরাগ।”

তুরাগ ধীর কন্ঠে বলা শুরু করলো,
“প্রতিভাকে মারার পর লাশ নামিয়ে চোখ আর গলার দাগের উপর মেকাপ করে হৃদা। তারপর নেকলেস পরায়। তারপর ট্রাভেল ব্যাগে রেখে চিরকুট রাখি লাশের উপর। তারপর র‍্যাপিং পেপার দিয়ে ট্রাভেল ব্যাগ মুড়িয়ে নিই। দেন নেম কার্ড দিয়ে আমর রওনা হই মিরপুরের উদ্দেশ্যে।

বর্ণা চলে যায় মির্জা হাউজে। মৃদুল আর কৌশিক ও চলে যায়। সবার আগে চঞ্চল ভুঁইয়া ভিলায় যায়। ফরিদ ভিলার ছাদ বেয়ে ভুইয়্যা ভিলায় যায়। দারোয়ানকে কল করে মিথ্যা বাহানা দিয়ে ছাদে ডেকে নেয়।

দারোয়ান উপরে গেলে আমি আর হৃদিতা লাশ মোড়ানো প্যাকেট নিয়ে বাসায় চলে যাই। দারোয়ান ছাদে ট্যাপ ঠিক করে নিচে নেমে নিজের রুমে যায়। এই সুযোগে চঞ্চল গিয়ে কন্ট্রোল রুমে গিয়ে ফুটেজ ডিলিট করে। এবং উপরে চলে আসে। ভোরের আগে আমরা লাশ বের করে ফ্ল্যাটের সামনে রাখি। তারপর ঘুমিয়ে যাই।”

“সকালে উঠে লাশ দেখে অভিনয় শুরু করেন তাই তো? কিন্তু অজ্ঞান হলেন কিভাবে?”

নিতিন বললো। তুরাগ বললো,
“ক্লোরোফর্ম দিয়ে। শার্টের হাতায় হালকা স্প্রে করা ছিলো। আমি যতবার তা নাকে মুছেছি ততবার অজ্ঞান হয়েছি।”

“তা না বুঝলাম, কিন্তু অভিলাষের বাসায় পাওয়া রিসিট, কালার পেপার, নেম কার্ড আসলো কিভাবে?”

“খুনের পর চঞ্চল আসার সময় সব কিছু নিয়ে এসেছিলো। চিরকুট লিখেছিলো বর্ণা। চাপ দিয়ে লেখার কারণে এক্সট্রা পেজে বসে গেছে। সেগুলো নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে অভিলাষকে দোষী সাভ্যস্ত করা হয়। চঞ্চলের ডায়েরিও স্বরূপার লেখা। পুলিশ যা পেয়েছে সব আমাদের সাজানো ছিলো।”

“তারপর অভিলাষকে ভিকটিম বানিয়ে পুলিশের সব ফোকাস ফেললেন অভিলাষের উপর। এরপর আপনারা নেক্সট স্টেপ এগুলেন। তাই তো?”

“হ্যাঁ। অভিলাষ আর আমরা যখন নজর বন্দি ছিলাম তখন ডাঃকৌশিককে দিয়ে মর্গে থেকে লাশ চুরি করে। তারপর অভিলাষ আটক হওয়ার পর তার ফেক জবানবন্দি দিয়ে পুলিশকে গুলিয়ে দেয়।

রিমান্ড শেষে হাজতে যাবার সময় আমরা ছ’জন মিলে ছদ্মবেশ ধরে চঞ্চলকে কিডন্যাপ করি। তারপর মর্গে থেকে চুরি করা লাশ পুড়িয়ে রেখে আসি ভুঁইয়া ভিলায় অদূরে ঝোপের কাছে। ফরেনসিক ল্যাবের পাঁচ লোভী ডাক্তারকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছিলাম আগেই।

তাদের মাধ্যমে ফরেনসিন রিপোর্ট বদলে দিই। লাশের সাথে চঞ্চলের কাপড় দিই। যাতে সবাই বিশ্বাস করে এটা চঞ্চলের লাশ। লাশের সাথে চিরকুটে হৃদিতার তৈরি সংখ্যা দেয়া হয় পুলিশের মাইন্ড ডাইভার্ট করার জন্য।

ইন্সপেক্টর অধরা যখন চিরকুট নিয়ে পড়ে রইলেন তখন আমরা অলরেড়ি শিকার ফাঁদ পেতে নিয়েছি। আমার চেকাপের বাহানায় প্রভাত মির্জাকে নিয়ে আমি আর হৃদা বের হই। ড্রপ করার বাহানায় বর্ণাকেও নিয়ে নিই। কিছুপথ গিয়ে সবাই নিজেদের আসল রূপে ফিরে আসি।

এবং প্রভাত মির্জাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাই বর্ণার ফ্ল্যাটে। মুখে মাস্ক থাকায় কেউ চিনে নি।

এর আগে আমাদের তিনজনের চেহারার সাথে কিছুটা মিলে এমন তিনটি চেহারার তিনটি লাশ বেছে নিয়েছি মর্গে থেকে। লাশ চুরি করে প্লাস্টিক সার্জারি করে আমাদের নাক ঠোঁট এর রূপ দিই।

তারপর ধরা না পড়ার জন্য উপরে আমাদের চেহারার মতো ফেস মাস্ক লাগিয়ে দিই। এসব আগেই রেড়ি করা ছিলো। তারপর ফাঁসি দিয়ে গলায় দাগ করি। তারপর শরীরটা এসিড দিয়ে ঝলসে দিয়ে আগের জায়গায় রেখে আসি। এবার আমরা চারজনই মৃত হয়ে গেলাম।”

“তারপর? “

“আমাদের তিনজনের কাছে খুনটা প্রতিশোধেরর হলেও বাকি তিনজনের কাছে সম্পত্তির জন্য। তাই জোরপূর্বক প্রভাত মির্জার বিপুল সম্পত্তি নিজেদের নামে করি।

আমাদের আসল নামে রেজিস্ট্রি পেপার আগেই বানানো ছিলো। জাস্ট সাইনের দরকার ছিলো যা প্রভাত মির্জা থেকে জোর করে নিয়ে নিলাম। তার একাউন্ট থেকে বিপুল অর্থ ও নিলাম।”

“প্রভাত মির্জা স্বরূপার ফ্ল্যাট থেকে আপনার ফ্ল্যাটে গেলো কিভাবে?আর কেনো!”

“ওখানে কড়া সিকিউরিটি ছিলো। পুলিশের আনাগোনা ছিলো বেশ। সেফ ছিলো না। আর যেহেতু আমার ফ্ল্যাট পুলিশ থেকে সিলগলা করা তাই ওখানে পুলিশ আসবে না তেমন।

আসলেও খবর পাবো। তাই সেখানে চলে গেলাম।
রাতের আধারে ছাদ টপকে ফ্ল্যাটে গেলাম। ব্ল্যাকমেইল করে মির্জাকে ও নিলাম। তারপর সেখানে কিছুসময় থাকার পর শ্বাসরোধক করে হত্যা করে জিহ্বা কাটা হলো। র‍্যাপিং পেপার, ট্রাভেল ব্যাগ, নেম কার্ড কাচি টেপ সব রেড়ি ছিলো। বর্ণা প্রভাত মির্জার লেখা কপি করে চিরকুট ও লিখেছে।

রাতে লাশ নামিয়ে ট্রাভেল ব্যাগে ভরে, বর্ণার লেখা চিরকুট দিয়ে তার উপর র‍্যাপি পেপার মুড়িয়ে নেম কার্ড চাপিয়ে পরদিন মির্জা হাউজে দিয়ে আসার কথা ছিলো। কিন্তু খুন করার পর টায়ার্ড হয়ে সবাই সিদ্ধান্ত নিই, খেয়ে কিছু কাজ গুছিয়ে নিবো।

তাই চিরকুট খাতায় আর লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় ওভাবে ফেলে রেখেছিলাম। হৃদিতা পাস্তা বানিয়েছিলো আগে। তা গরম করছিলো। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ এসে যায়। তাড়াহুড়ো করে হৃদিতা কিচেনে কড়াই লুকিয়ে ওভেনেই পাস্তা লুকিয়ে পালায়। আমরাও সব ওভাবে রেখেই পালিয়ে যাই ফরিদ ভিলা দিয়ে।”
“আপনারা জানতেন না আমরা আসবো যে?”
“না।”
“যাক, সারপ্রাইজ দিতে পারলাম তবে!”
“হ্যাঁ, সেদিন ওভাবে কেস খেয়ে যাবো ভাবিনি। আর সেদিন থেকেই সব উল্টাপাল্টা হচ্ছিলো। সব আমাদের প্ল্যানের বাইরে হচ্ছিলো। তাই মৃদুল আর কৌশিককে মিথ্যা বাহানায় হাসপাতালে পাঠাই। এবং আমরা বিদেশ যাওয়ার পায়তারা করি। কিন্তু আপনারা ও ভেস্তে দিলেন। পাকড়াও করে ফেললেন।”

আফসোসের কন্ঠে বললো তুরাগ।
“মি.তুরাগ আপনি কি জানতেন না প্রতিভার প্রেগন্যান্সির কথা?”
নিতিনের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন। তুরাগ নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো,
“না।”

“কে জানতো? অভিলাষ আপনি জানতেন?”
অভিলাষ বললো,

“হ্যাঁ, জানতাম।”
“আর কে জানতো?”

“আমি জানতাম।”
স্বরূপা নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো। অভিলাষ ছাড়া বাকিরা সবাই অবাক হয়ে স্বরূপার দিকে তাকালো। যার অর্থ তারাও জানতো না যে স্বরূপা জানতো। তুরাগ অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,
“তুমি জানতে? আমাদের বলো নি কেনো!”

?
“প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার পর রেজাল্ট হাতে পেয়েই প্রতিভা আমাকে জানিয়েছিলো। আমি তোমাদের জানাইনি কারণ আমার ভয় ছিলো বাচ্চার কথা শুনে তুমি যদি প্ল্যান চেঞ্জ করে দাও? যেহেতু তুমি বাচ্চাদের অনেক পছন্দ করো।আর ওটা তো তোমার বাচ্চা ছিলো।

তুমি প্ল্যান চেঞ্জ করে যদি প্রতিভাকে হত্যা করা বাদ দিতে তবে আমার বাবা মায়ের খুনিকে শাস্তি দিতে পারতাম না তাই বলি নি। তা ছাড়া শুধু মাত্র বাবা মায়ের জন্য আমি প্রতিভাকে সহ্য করছিলাম। কিন্তু ওর পেটে তোমার সন্তান আসবে শুনে আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি।

ওর কনসিভ করার ব্যাপারটা তোমার কানে যাবার আগেই আমি ওকে শেষ করে দিতে চাচ্ছিলাম। তাই আমি ওকে বুদ্ধি দিই। তোমাকে যেন এখন না জানায়, জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেয়।

প্রতিভা তাই করলো। এই ফাঁকে আমি তোমাদের তাড়া দিতে থাকি প্রতিভাকে খুন করার জন্য। এবং আমার তাড়া কাজ হলো। তোমরা সবাই খুন করলে। চঞ্চল ভাইয়া জানতো। আমি তাকে নিষেধ করি তোমাকে বলতে। তাই বলেনি।”

তুরাগ রাগত দৃষ্টিতে স্বরূপার দিকে তাকালো। তারপর কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তখন অধরা থামিয়ে বললো,
“আপনাদের ঝগড়া করার পর্ব এখন না। কখনো সময় পেলে ঝগড়া সেরে নিবেন। এখন থামুন। তারপর স্বরূপা ওরফে বর্ণা বলুন, ভালোবাসার মানুষকে অন্যের সাথে শেয়ার করতে আপনার বিন্দুমাত্র বাধে নি? প্রতিশোধের নেশায় এতটাই অন্ধ হয়ে গেছেন যে সব ফিলিংস অগ্রাহ্য করলেন?”

স্বরূপা একবার তুরাগের দিকে তাকালো। তারপর অসহায় কন্ঠে বললো,
“ভালোবাসার মানুষকে অন্যের সাথে দেখা আর শেয়ার করার চেয়ে কষ্টকর অনুভূতি পৃথিবীতে দুটি নেই। আড়াই বছর আমি এই কষ্ট সহ্য করেছি। প্রতিটা মুহুর্তে তিলে তিলে শেষ হয়েছি।

হাজারো সময় চিৎকার করে কেঁদেছি। কিন্তু কষ্ট সহ্য করা ছাড়া আমার কিছু করার ছিলো না। আমি ও যে চেয়েছিলাম আমার বাবা মায়ের খুনির শাস্তি হোক।

তাই নিরবে সয়ে গিয়েছি। এই সবের জন্য আমার প্রতিভার উপর ক্ষোভ ছিলো প্রচুর। তাই প্রতিভা খুনের অধিকাংশ কাজ আমি করেছি। এতে আমার এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ হয়েছে। এখনো হচ্ছে। আমার ফাঁসি হোক, সমস্যা নেই। আমি নির্দ্বিধায় মেনে নিবো। কিন্তু বেঁচে থেকে আর কুঞ্জনের সাথে কাউকে দেখতে পারবো না।”

বলে হেসে তার আনন্দ প্রকাশ করলো। নিতিন আন্দাজ করলো এতদিনের জমানো ক্ষোভ প্রকাশ করে আনন্দ হচ্ছে স্বরূপার।অধরা ভাবছে অন্য কথা।

“হৃদিতা জামান ওরফে শিলা আপনি কি জানতেন না যে প্রতিভা এবং প্রভাত মির্জার খুন প্রতিশোধ মূলক ছিলো? সত্যটা বলবেন না হলে স্প্রে প্রয়োগ করবো।”

কঠোর গলায় বললো অধরা। শিলার নির্দ্বিধা মাখানো উত্তর,
“না আমি জানতাম না। আমি জাস্ট জানতাম এটা সম্পত্তির জন্য খুন। আমার অভাবী পরিবারকে হেল্প করার জন্য আমার টাকার প্রয়োজন ছিলো তাই আমি খুনে সামিল হয়েছি। খুনের পিছন যে প্রতিশোধ শব্দটা ছিলো তা আমি এখন জেনেছি। এর আগে জানতাম না।”

“আর ডাঃ কৌশিক? আপনি জানতেন? আপনি কেনো খুনে অংশ নিলেন? তাও আবার নিজের খালাতো বোন আর খালুর খুনে?”

“আমি ও জানতাম না। আমাকে জাস্ট সম্পত্তির কথাই বলা হয়েছে। এন্ড আমার খালুর সম্পত্তির উপর আগে থেকেই নজর ছিলো। তাই আমি প্রতিভাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খালু আমাকে অপমান করে। তাও ক্ষোভ ছিলো কিছুটা। আমি অপমানের শোধ আর সম্পত্তির জন্যই খুনে অংশ নিয়েছিলাম। আমি জানতাম না এরাও যে প্রতিশোধ নিতেই খালু আর প্রতিভাকে খুন করছে।”

“তারমানে সত্যই যে এরা কেউই খুনের মূল কারণ জানতো না তাই তো?”
অভিলাষ বললো

“হ্যাঁ, শুধু আমি, ভাইয়া আর বর্ণা জানতাম।”

“প্রভাত মির্জার জিহ্বার কাটা দাগ দেখে আমার মনে একটাই কথা এসেছে তা হলো এই খুনের পিছনে শত্রুতা কিংবা প্রতিশোধমূলক কারণ ছিলো।

কোন অপমান কিংবা অন্য কোন অপমানের জেরে করেছে এই খুন। ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে প্রভাত মির্জার জিহ্বার কাটা দাগের পাশে অভিলাষের হাতে ছাপ পাওয়া গিয়েছে।

তো মি.অভিলাষ আপনার সাথে প্রভাত মির্জার আলাদা শত্রুতা ছিলো নাকি? তুরাগ স্বরূপা থেকে ও বেশি? কি শত্রুতা ছিলো?”

নিতিন ভাবুক কন্ঠে বললো। অভিলাষ শান্ত কন্ঠে বললো,

“বাবা মায়ের খুন হওয়ার মাস কয়েক আগে একদিন প্রভাত মির্জা বাড়ি এসে বাবাকে হুমকি ধমকি দেয়। খুব অপমান করে যায়। বাবা সেদিন কষ্টে কেঁদেছিলো। আমি তখন বাবার বাসায় ছিলাম।

বাবার চোখে এর আগে কখনো পানি দেখিনি। সেদিনই দেখলাম। বাবার কান্না আমার সহ্য হয়নি। ছোট্ট কন্ঠে তখন বলেছিলাম একদিন ওই লোকের জিব ছিড়ে বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিবো। তাছাড়া প্রতিভাকে টিজ করার কারণে প্রভাত মির্জা আমাকে অনেক অপমান করেছেন। বাবার অপমান এবং আমার অপমান দুটোর শোধ নিলাম জিব কেটে।”

অধরা কিছু একটা ভাবলো তারপর বললো,
“আচ্ছা, প্রতিভার সাথে রক্সিও ছিলো। প্রতিভার লাশ পাওয়া গেলো। রক্সির লাশ পাওয়া গেলো না কেনো!”
“কারণ ওকে খুন করা হয় নি।”

ধীর গলায় বললো তুরাগ। নিতিন ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কেনো!”

“কারণ রক্সি বর্ণার খুব পছন্দের ছিলো। রক্সিকে খুন করার কথা থাকলেও বর্ণার জেদের কারণে খুন করা সম্ভব হয় নি। রক্সিকে মারার কথা আসলেই বর্ণা বাধা দিতো। তার খুব মায়া হতো রক্সির জন্য। বর্ণা ঠিক করেছিলো ইন্ডিয়া যাওয়ার সময় রক্সিকেও নিয়ে যাবে। নিজের কাছে রাখবে।

তাছাড়া একি বাসায় থাকার কারণে রক্সির সাথে আমার ও ভাব ভালো ছিলো। তাই ওকে খুন করতে আমার বিবেক ও সায় দায় নি। মায়া হচ্ছিলো। তাই বাদ দিয়েছি ওকে। কিন্তু সীমান্তে আমাদের পালানোর সময় রক্সিকে হারিয়ে ফেলি আমরা। আর পাইনি।”

ঠোঁট উল্টিয়ে হাত তালি দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে নিতিন বললো,
“বাহ! একটা বিড়ালকে মারতে আপনাদের হাত কাঁপছিলো, বিবেকে বাধছিলো। অথচ দুই দুইটা মানুষকে মারতে একবারো হাত কাঁপে নি? একবারো বিবেক বাধা দেয় নি?

একটা প্রানী ক’দিন থাকতেই তারপ্রতি আপনাদের মায়া বসে গেলো অথচ প্রতিভার সাথে তো তুরাগের আড়াই বছরে সম্পর্ক ছিলো। তুরাগের ভালোবাসা অভিনয় হলেও প্রতিভার ভালোবাসা তো আর অভিনয় ছিলো না তাও কি মায়া জমেনি! আপনারা মানুষ! আমার তো সন্দেহ হয়। মানুষ এত ছলনা কিভাবে করে?”
নিতিনের কথায় সবাই মাথা নিচু করে ফেললো।

অধরা বললো,
“তুরাগ থেকে বেশি সময় প্রতিভা স্বরূপার সাথে কাটিয়েছে। এত ভালোবাসা দেখিয়েছে। রীতিমতো বোন বলেছে। তাও কি মায়া হয়নি? দোষ যা করার প্রভাত মির্জা করেছে প্রতিভা তো করেনি। তবে ওকে কেনো শাস্তি দিলেন? একটা নির্দোষ জীবন কেড়ে নিলেন। একটু ও বিবেক বাধা দেয় নি?”
“না, প্রতিভার সাথে যা হয়েছে বেশ হয়েছে।

ও এসব ডিজার্ব করতো। সতিনকে কেউ সহ্য করতে পারে? ভালো হয়েছে। আরো কষ্ট দিয়ে মারা উচিত ছিলো। ওর বাবার জন্য আমি কত কি সাফার করেছি। ওকে আমি এমনি এমনিতে ছেড়ে দিতাম কিভাবে? “
রাগত গলায় বললো স্বরূপা। স্বরূপার আচরণ অধরার সহ্য হলো না। হুট করেই টেবিল থেকে প্লাইয়ার্স হাতে নিয়ে স্বরূপার বাঁ হাতের অনামিকার নখ এক টানে তুলে ফেললো।

আকস্মিক এমন কিছুর জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলো না। নিতিন ও অবাক। সে ভাবেই নি অধরা এমনটা করবে। স্বরূপার নখ তুলার সাথে সাথে স্বরূপা চিৎকার জুড়ে দিলো। তাতে সায় জানালো তুরাগ ও।

একে অপরের ব্যাথায় ব্যাথিত কিনা! অধরা সেদিকে খেয়াল না দিয়ে বললো,
“আপনার উপর প্রচুর রাগ আমার। কন্ট্রোল করতে পারি নি।”

কি মনে করে নিতিন অধরার হাত থেকে প্লাইয়ার্স নিলো তারপর অভিলাষের একটা নখ তুলে ফেললো। বললো,
“এটা পুলিশকে স্বরূপার লেখা স্ক্রিপ্ট পড়ে শুনিয়ে বোকা বানানোর জন্য।”

অভিলাষ তখন অসহনীয় ব্যাথা নিয়ে চটপট করতে ব্যাস্ত। অভিলাষের কষ্ট দেখে চোখ মুখ খিচে দোয়া পড়ছে হৃদিতা। হার্ট কানেকশন লড়ে উঠছে তার। চটপট করছে স্বরূপাও। রীতিমতো চিৎকার করে কাঁদছে। তার চটপট দেখে তুরাগের চোখেও জল ভর করেছে। প্রিয়তমার কষ্ট সহ্য হচ্ছে না তার।

এদিকে নিজের হাতে যে ভাঙা নখে ব্যাথা করছে আর রক্ত ছুয়ে পড়ছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই তার। মৃদুলের একটা নখ আগেই তোলা হয়েছে। সেও ব্যাথায় নীল হয়ে আছে। সবার মাঝে এখনো স্ট্রং আছে ডাঃকৌশিক। নিতিন প্লাইয়ার্স রেখে পকেট থেকে টিস্যু বের করে ফিনকি মেরে হাতের তালুতে লেগে থাকা রক্ত মুছতে মুচতে বললো,
“আপনার আর কিছু জানার আছে ওদের থেকে?”

“নাহ, আপনার কিছু জানার না থাকলে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব এখানেই সমাপ্ত করা হোক।”
সায় জানিয়ে বললো অধরা। নিতিন সবার দিকে একবার তাকিয়ে বললো,
“জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষ। তবে যারা এখনো খানিক শাস্তি পায় নি তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করে যাবো।

শিলা, আর ডাঃকৌশিক বাদে বাকিরা খানিক শাস্তি পেয়েছে। এরা বাদ যাবে কেনো! এদের নখ তুলবো না। স্প্রে করি?”
“এজ ইউ উইশ মি.নিতিন।”

কাধ নাচিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো অধরা। নিতিন স্প্রে হাতে নিয়ে আবারো ক্যাপ খুললো। তারপর বললো,

“আগে শিলাকে ট্রাই করি।তারপর অর্থোপেডিক্সকে ট্রাই করবো।”

বলে শিলার দিকে এগুলো নিতিন। সাথে সাথেই অভিলাষ কাতরাতে কাতরাতে বললো,
“স্যার আপনার পায়ে পড়ি ওকে কিছু করবেন না। যা করার আমাকে করুন। ও প্রেগন্যান্ট।”

“এমন এক প্রেগন্যান্ট নারীকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়ে মেরেছেন আপনারা। তখন সহ্যক্ষমতা কোথায় ছিলো?”
রাগত দৃষ্টিতে তাকিয়ে অধরা বললো। অভিলাষ চটপট করতে করতে জবাব দিলো,
“মেইন কালপ্রিট আমরা। ওর তেমন দোষ নেই। তাই শাস্তি দিলে আমাকে দিন। প্লিজ ওকে ছেড়ে দিন!”
“কি আর হবে হয়তো মরেই যাবো। সমস্যা নেই। আমাকে শাস্তি দিন। তাও ওকে প্যারালাইজড করবেন না।”
করুন গলায় বললো শিলা।

নিতিন কিছু একটা ভেবে বললো,
“আচ্ছা শিলা বাদ। এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে কষ্ট দেয়ার পক্ষে আমি নেই। তাহলে কৌশিককে শাস্তি প্রয়োগ করি?”
বলে কৌশিকের দিকে তাকালো নিতিন। কৌশিক ভয়ে ঢোক গিললো। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“স্যার প্লিজ! আমাকে ছেড়ে দিন!
“আমি তো মারবোই?”

বলেই ক্যাপ খুলে কৌশিকের ডান হাতের আঙুলের উপর স্প্রে করলো।
ভয়ে কৌশিক চিৎকার করে উঠলো৷ এই বুঝি সব শেষ। সাথে সাথে কৌশিক হাতে জ্বালাপোড়া অনুভব করলো। সে ভাবলো সত্যিই তার হাত অবশ হবে। ভয়ে অনবরত চটপট করতে লাগলো। মিনিট খানেক পরেই জ্বালাপোড়া থেমে গেলো। কৌশিক তখনো চোখ মুখ খিচে আছে। হঠাৎ ব্যাথা অনুভব না করায় ভয়ে ভয়ে চোখ খুললো।

হাত অবশ হয়ে গেছে কিনা চেক করতে হাত নাড়লো। নাহ, সব ঠিকঠাকই আছে। কিন্তু স্প্রে করার পর তো হাত অবশ হওয়ার কথা। এমনটাই বলেছিলো নিতিন। তবে হলো না কেনো! বুঝতে না পেরে মাথা তুলে অবাক চোখে তাকালো কৌশিক। দেখলো তার সামনে দাঁড়িয়ে নিতিন হাসছে। কৌশিক ভ্রু কুঁচকালো৷ তা দেখে নিতিন শব্দ করে হেসে দিলো। হাসতে হাসতে বললো,

“আপনারা খুব বোকা। মানুষ বোকা বানানো মানুষ গুলো এতটা বোকা হয় জানতাম না।”

“মানে?”

প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে বললো কৌশিক। নিতিন স্প্রে বোতলের উপরের সাদা আবরণটা খুলে ফেললো। তারপর স্প্রেটা কৌশিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“অর্থোপিডিক্স কৌশিক, দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা!”

কৌশিক কৌতুহল চোখে স্প্রের দিকে তাকালো। দেখলো সাদা রঙের বোতলটার গায়ে ‘OPSITE’ লেখা। খানিক তাকিয়ে অবাক কন্ঠে বললো,
“এটা তো ড্রেসিং স্প্রে!”

নিতিন হেসে বললো,
“ধরতে পারলেন অবশেষে! opsite স্প্রে হলো এক ধরনের ড্রেসিং স্প্রে। যা বিভিন্ন ধরণের শুকনো ক্ষতের জন্য ব্যবহারের জন্য নির্দেশিত হয়।

যেমন, ছোটখাট কাটা, ঘর্ষণ এবং পোড়া শুকনো ক্ষত ক্ষতের উপরে, নিকাশী নলগুলির সীলমোহর এবং স্টেইনম্যান পিনের মতো বহিরাগত অর্থোপেডিক স্থিরকরণের পরে সিউন অপসারণ, টিকা দেওয়ার সাইটগুলির উপর, অক্ষত ফোস্কা এবং ত্বকের গ্রাফ্ট স্থিরকরণের উপরে।

কাটাপোড়া স্থানে দিলে প্রথমে বেশ জ্বালা করে। আবার অক্ষত জায়গায় দিলেও জ্বলে। আমার ফার্স্টএইড বক্সে এটা থাকে। আজ ফার্স্টএইড বক্সে স্প্রেটা দেখে মনে মনে বললাম, ‘ বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাস নিয়ে খেলা যাক।’সেই ভাবনার উপর অটল থেকে এই ড্রেসিং স্প্রেকে মরণব্যাধি স্প্রে হিসেবে ব্যাবহার করে সবাইকে ভয় লাগালাম। বিশ্বাস করালাম। এবং পেট থেকে কথা বের করলাম।

সিক্স ইন্টেলিজেন্স ভিলেন ধরতে পারলো না সেটা। কি দুঃখের কথা! তো এবার বলুন, কেমন লেগেছে আমার মজা? আসলেই বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাস নিয়ে খেলতে মজা আছে।”

বলে বাঁকা হাসলো। এস আই ভির সব সদস্য ব্যাথা ভুলে হা করে নিতিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। ড্রেসিং স্প্রে দিয়ে তাদের বোকা বানালো! অধরা আনন্দিত কন্ঠে বললো,
“তারা শকড, আর আপনি রক।”
নিতিন ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,

“কেসা লাগা মেরা মাজাক?”
“আউটস্ট্যান্ডিং।”হেসেই বললো অধরা। তখনই রুমে ঢুকলো জিহাদ আর আদাবর। এতক্ষণ তারা বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিলো। ভিতরে এসে জিহাদ বললো,
“সরি স্যার নক না করে আসার জন্য।”

“ইটস ওকে জিহাদ।”হেসে উত্তর দিলো নিতিন।

“স্যার, ম্যাডাম আপনারা দুজনেই লিজেন্ড। আপনাদের বুদ্ধির জবাব হয় না। আমরা আপনাদের নিয়ে গর্ববোধ করি। আপনারা আইন সমাজের গর্ব।

এই মুহুর্তে আপনাদের বুদ্ধিমত্তাকে সম্মান করতে আমরা স্যালুট দিতে চাই।”
আদাবর মুগ্ধ কন্ঠে বললো। তারপর জিহাদের দিকে তাকালো। দুজনেই ইশারায় ভাব বিনিময় করে একসাথে স্যালুট করলো নিতিন অধরাকে। জবাবে দুজনেও মুচকি হাসলো।


পর্ব-১৫ তথা শেষ পর্ব

পুলিশ ভ্যানে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় বসে আছে তুরাগ, স্বরূপা, অভিলাষ, শিলা, মৃদুল ও কৌশিক। সবারই চেহারায় পরাজয়ের হতাশা, অসুস্থতার মলিনতা আর অপরাধবোধ ফুটে উঠেছে।

দশ দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগেই। রিমান্ড টর্চারে সবার জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছে। ভালোই টর্চার হয়েছে তা তাদের চেহারায় লক্ষণীয়। কারো চেহারা আগের মতো গ্লো করছে না। কাউকে আর মায়াবী লাগছে না। সবার চোখের নিচে কালো দাগ, শুকিয়ে চোয়ালে হাড় যেন উকি দিচ্ছে। ঠিকমতো দাঁড়াতেও কষ্ট হয়।

কয়েকজন পুলিশ সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপর টর্চার কম হয়েছে। তাতেও তারা নিজেদের নেতিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি। আজ আদালতের শুনানি শুনে তারা আরো নেতিয়ে গেলো। সমস্ত প্রমাণ SIV এর বিরুদ্ধে থাকায় আদালত সবার সাজা শুনিয়েছে। তুরাগ, অভিলাষ, মৃদুল, কৌশিককে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীদের ফাঁসির আদেশ দেয়া হলেও কখনো ফাঁসি কার্যকর করা হয় নি। নারী আসামীদের সাধারণত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। সে হিসেবে স্বরূপা আর শিলাকে ও সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। স্বরূপার সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। শিলা মাস তিনেকের গর্ভবতী হওয়ায় এবং এতসবে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় তাকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও খুনে ও খুনীদের সহযোগিতা করায় ফরেনসিক ল্যাবের পাঁচজন ডাক্তার, মানষিক হাসপাতালের একজন ডাক্তার ও নার্সকে দু’বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।

আদালতে ফাঁসির রায় শুনানোর পর থেকে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে স্বরূপা আর শিলা। তারা প্রিয়জনের মৃত্যুর আভাস মেনে নিতে পারছে না। শিলা তো কিছুক্ষণ পর পর পেটে হাত দিয়ে অভিলাষের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে। অভিলাষ তখন অন্যদিকে ফিরে চোখের পানি লুকাতে ব্যস্ত। স্বরূপা স্থির দৃষ্টিতে তুরাগের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার।

তুরাগ মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে কান্না দমিয়ে রাখছে। যদিও তা পারছে না। অবাধ্য অশ্রুগুলো গড়িয়ে পড়ার সিদ্ধন্তে অটল। তারা নিজ সিদ্ধান্ত মতোই গড়িয়ে পড়ছে।

কৌশিক থমথমে চেহারা নিয়ে বসে আছে। আদালতে দেখা মা বোনের করুণ চেহারা চোখের উপর ভেসে উঠছে বারবার! বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে।

সত্যিই লোভ আর প্রতিশোধের মন মানুষিকতা নেশার আর সাপ পোষার মতো। মানুষকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে। খানিক সুখ দিলেও পরে সাপুড়ের পালিত সাপের মতো নিজেকেই ছোবল মারে। পালিত সাপের কামড়েই মৃত্যু হয় তার। ভালোই তো ছিলো। ডাক্তারি পরীক্ষায় কত ভালো র‍্যাঙ্ক এসেছিলো।
কত সুনাম, কত সম্মান কুড়িয়েছিলাম। বাবা, মা আর ক্লাস নাইন পড়ুয়া ছোট বোনটাকে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলাম। হঠাৎ লোভ নামক বিষধর সাপ এসে ভাগ্যের খাতায় ধরা দিলো। সেই সাপ পুষতে গিয়েই সব হারালাম।

একবারেই ঘৃন্য কাজ করলাম, ঘৃণা কুড়ালাম, অতঃপর নিজেকে ধ্বংস করলাম। একদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরের খুনির ফাঁসির আদেশ শিরোনাম দেখে মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন চাওয়া আমিই দুদিন পর তেমনি শিরোনাম হবো!

মানুষ ঘৃণ্য চোখ বুলিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে? এটা কি হওয়ার ছিলো! আমি সবসময় চাইতাম আমার আদরের ছোট্ট বোন কৌশানীকে সুখী করতে। দুনিয়ায় সব সুখ এনে দিতে।

কিন্তু সেই চাওয়াকে অগ্রাহ্য করে আমি কি করলাম! তাকে নরকীয় জীবন দিলাম! এখন সবাই নিশ্চিয়ই তাকে দেখলেই বলবে, খুনীর বোন! আমাকে নিয়ে গর্ব করা আমার বোনটা তখন অপমানে মরে যেতে চাইবে। আমার বাবা মা? তারা তো জীবন্ত লাশ হয়ে যাবে! আমার একটা কাজে আমার আশেপাশে সবার জীবন নরক করে দিলো! এইজন্যই বলে, কোন অপরাধ করার আগে হাজার বার ভাবো।

কারণ অপরাধ করলে শাস্তি পাবে তুমি। তোমাকে শাস্তি পেতে দেখে শান্তি নামক শব্দটা উঠে যাবে তোমার পরিবারের। তারাও শাস্তি পাবে। এমন হাজারো ভাবনা নিয়ে জীবন সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত কৌশিক।

অপরদিকে মৃদুল মাথা নিচু করে চোখের জ্বল ফেলছে। আদালত চত্বর থেকে পুলিশ ভ্যানে উঠানোর আগে তার দিকে তাকিয়ে মায়ের আঁচলে মুখ গুজে কান্না করার দৃশ্যটা বারবার চোখে ভাসছে।

বুকটা ফেটে যাচ্ছে।মা বারবার চিৎকার করে বলছিলো, বাবা বলনা ওরা মিথ্যা বলছে, তুই এসব করিস নি? আমার কত ভালো ছেলে ছিলি তুই। এসব করতে পারিস না। মায়ের কথার উত্তর ছিলো না তার কাছে। শুধু মাথাটা বাকিয়ে এক নজর মাকে দেখে মাথা নিচু করে সামনে চলে গেলো।

সেই নজরে মায়ের পাশে ছোট্ট বোন মৃধাকে ও চোখে পড়েছিলো। কেমন করুন চোখে তাকিয়েছিলো! এই বোনের মলিন মুখ না দেখার জন্যইতো সে এত খারাপ কাজ করলো। অথচ কাজের কাজ কিছুই হলো না। উল্টো বোনটাকে নরকিয়ে জীবন উপহার দিলো। এটা কি হওয়ার ছিলো!

সবাই যখন ভাবনার গহীনে বিরাজ করছে তখন পুলিশ ভ্যানের দরজা ঘেঁষে বসা নিতিন বললো,
“একটা শকিং নিউজ শুনবেন সবাই? বিশেষ করে তুরাগ, অভিলাষ আর স্বরূপা।”

নিতিনের কথায় সবাই ভাবনা থেকে বের হয়ে নিতিনের দিকে তাকালো। নিতিনের অপজিট সিটে বসা অধরাও এক রাশ কৌতুহল নিয়ে নিতিনের দিকে তাকালো। নিতিন বললো,

“মি. তুরাগ, অভিলাষ, আর মিসেস স্বরূপা আপনারা বাবা মায়ের খুনি ভেবে যাকে এবং যার মেয়েকে মেরেছেন মূলত তিনি খুন করেন নি।”

নিতিনের কথায় চকিত নজরে সবাই চেয়ে রইলো নিতিনের দিকে।
তা দেখে নিতিন বললো,

“অতীব দুঃখের সাথে বলছি যে, প্রভাত মির্জার সাথে সিহাব বিশ্বাসের ইয়াবা প্রচার নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও মূলত সিহাব বিশ্বাস এবং তার স্ত্রী শতরূপা মেহেক বীণাকে প্রভাত মির্জা খুন করেন নি। তিনি এসবে জড়িত ছিলেন না। প্রভাত মির্জার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে আপনাদের চাচা পলাশ বিশাল সিহাব বিশ্বাস এবং তার স্ত্রীকে খুন করেছেন।

সব কলা কৌশল তিনিই করেছেন। আপনাদের চোখে প্রভাত মির্জাকে ধরিয়ে দিয়েছেন। খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়েছে। কারণ কি ছিলো জানেন? এই আপনার বাবার রাজশাহীর শহরাঞ্চলে একটা জমি। এই জমির লোভ ছিলো প্রচুর তার। তাই আপবার বাবা মাকে মারলেন। তারপর স্বরূপাকে দত্তক দিলেন।

তারপর অভিলাষকেও দত্তক দিলেন। তুরাগকে শহর ছাড়া করতে অভিলাষের ঢাজার থাকার কথা বললেন। তার বিশ্বাস ছিলো, অভিলাষের কথা শুনে তুরাগ ঢাকা চলে যাবেন। তারপর সবকিছুই তার। কোন বাধা নেই। হলোও তাই। আপনারা সবাই চলে গেলেন। পলাশ বিশ্বাস সিহাব বিশ্বাসের সব সহায় সম্পত্তি কব্জা করলেন। যেই জমির জন্য সিহাব বিশ্বাস এবং তার স্ত্রী খুন হলেন সেই জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে পলাশ শপিংমল।

“তারমানে বিনাদোষে প্রভাত মির্জার আর প্রতিভা মির্জা মরা গেলো, তাই তো?” অবাক কন্ঠে বললো অধরা।

“হ্যাঁ। তবে শুধু প্রভাত মির্জা আর প্রতিভা মির্জা মরেনি। তিহানা জাহান ও মারা গেছেন। আদালত চত্ত্বরে থাকতেই আমার কাছে খবর এসেছে তিহানা জাহান তৃতীয়বারের মতো স্ট্রোক করেছেন। এবং ঘন্টাখানেকের মাঝেই মারা গেলেন। প্রথমবার তিনি মাইনর এট্যাক করেছেন প্রভাত মির্জার নিখোঁজ হওয়ার পর। যা ধরা যায় নি।

দ্বিতীয়বার করেছেন স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে। এতদিন তার ঠিকমতো হুশ ছিলো না। কাল রাতে তার অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছিলো। কিন্তু আজ সকালে কোন একভাবে জেনে যান যে তারা স্বামী আর মেয়েকে তুরাগ, স্বরূপা খুন করেছে। যাদের তিনি নিজের সন্তানের মতো ভাবতেন। বেশ শক খেলেন।

তারপর শক সইতে না পেরে তৃতীয়বারের মতো স্ট্রোক করে ঘন্টাখানেকের মাঝে মারা গেলেন। তার মৃত্যুর জন্যও এরাই দায়ী। সঠিক সত্য না জেনে একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রতিভা বড় হওয়ার পর থেকে প্রভাত মির্জা স ছেড়ে দিয়ে সৎ মানুষ হয়ে গেছেন।”

রাগত স্বরে বললো নিতিন। এই প্রথম তাকে রাগতে দেখা গেলো। রাগে চেহারাটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। অধরা নিতিনের দিকে একবার তাকিয়ে বললো,
“এদের নাম বিশ্বাস না রেখে অবিশ্বাস রাখা উচিত ছিলো।

বিশ্বাস নাম নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। প্রথমে পলাশ বিশ্বাস, তারপর এরা সবাই করলো প্রতিভার সাথে। তারপর করলো পুরো দেশবাসীর সাথে৷ মানুষের ধ্বংস মানুষ নিজেরাই ডেকে আনে। সম্পত্তি নামক ভয়ংকর সাপ সদৃশ জিনিসটা তার ভয়ংকর ছোবলে সব ধ্বংস করলো।

আহ! প্রতিভারা শুধু শিকার হলো। কোন দোষ ছিলো না তাদের। ভাবতেই খারাপ লাগছে।”
এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অধরা। নিতিন নিজের রাগ সামলে সবার দিকে একবার তাকালো।

এস এই ভি তখনো হতভম্ব হয়ে আছে। সবাই বাকরূদ্ধ। কারো মুখে কোন কথা নেই। তারা কি করতে চেয়েছে আর কি করেছে তাদের নিজেদেরই খেয়াল নেই। নিতিন সবার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

দেখতে দেখতে ফাঁসির দিন এসে যায়। অনেক আকুতি মিনতির পর ফাঁসির আগে তুরাগ আর অভিলাষকে একি মামলার আসামী শিলা এবং স্বরূপার সাথে দেখা করতে দেয়া হয়। যাকে বলে শেষ দেখা। শেষ দেখার পুরো মুহুর্তটা ছিলো হৃদয়বিদারক। শেষ দেখা করতে এসে তুরাগ আর অভিলাষ তাদের প্রিয়তমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। চোখ বেয়ে অঝোরে জ্বল ঝরছিলো।

আর তাদের প্রিয়তমারা? তারা তো গগনবিদারী বিলাপ জুড়ে দিয়েছিলো।

আহ! এ দেখা শেষ দেখা। আর দেখা হবে না! আজকের পর থেকে এই মানুষ দুটোর মুখখানা আর দৃশ্যমান হবে না! তাদের স্মৃতিতে বন্দি হবে ভাবতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে দুই যুগলের। তুরাগ স্বরূপার হাত ধরে কান্নাভেজা কন্ঠে বললো,
“ভালো থেকো নিজের খেয়াল রেখো! নিজের যত্ন নিও। কান্নাকাটি করো না।

স্বরূপা তো কেঁদেই ব্যাকুল। কি জবাব দিবে সে! আর অভিলাষ শিলার হাত ধরে ভেজা গলায় বললো,
“হৃদি নিজের এবং আমাদের সন্তানের খেয়াল রেখো। আমি তো ওকে দেখতে পারবো না। তুমি দেখে রেখো।

জেলখানায় এই নরকীয় জীবনের মাঝে না রেখে তোমার মায়ের কাছে কিংবা আমার মায়ের কাছে দিয়ে দিও। আর তাকে বলে দিও, তার বাবা তাকে অনেক ভালোবাসতো।”

বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছে। আর শিলা প্রতিত্তোরে বললো,
“তোমাকে ছাড়া আমি নিঃস্ব চঞ্চল। আমি বাঁচবো না। আমি মরে যাবো।”

এমন হৃদস্পর্শিক বাক্যলাপের মাঝে শেষ হলো দুই যুগলের অন্তিম সাক্ষাৎ। বিদায়ের পর শিলা আর স্বরূপা খুব কাঁদলো। যথারীতি রাত আট টা নাগাদ তুরাগ, অভিলাষ, মৃদুল, কৌশিক এই চারজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে পরদিন কারাগার থেকে চারটি নয় মোট ছয়টি লাশ বের করা হয়।

তুরাগ, অভিলাষের মৃত্যুর পর সে রাতেই জেল খানার শিকের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে শিলা আর স্বরূপা। একসাথে পরপারে পাড়ি জমায় চারজনই। ইহজাগতে চারজন সুখে থাকার কথা থাকলেও নিজেদের কৃত কর্ম তা হিতে দিলো না। কৃতকর্মের ফল হিসেবে পরপারে পাড়ি জমালো। যদি তারা অপরাধ না করতো তবে কতোই না সুখী হতো!

শিলা, স্বরূপার মৃত্যুর সাথে সাথে মুছে যায় সব। মামলাও নিষ্পত্তি হয়। একটু লোভ, একটু প্রতিশোধ কতগুলো জীবন কতগুলো পরিবার ধ্বংসের কারণ হলো! মানুষের মাঝে আজ মূল্যবোধের বড়ই অভাব। তাই তো মানুষ কোন বিষয়কে সহজ ভাবে না নিয়ে কঠিন ভাবে নিয়ে নিজের এবং আশেপাশের মানুষদের ধ্বংসের মুখে দাঁড় করায়।

বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে অধরা। অবশেষে প্রতিভাকে ন্যায় দিতে পারলো সে। বিশ্বাসঘাতকরা শাস্তি ফেলো তবে। ভাবতেই খুশি লাগছে তার।

ফুরফুরে মেজাজে নিজ কেবিন থেকে বের হলো। গায়ে জড়ানো সালমন কালার ডেনিম শার্ট, শার্টের হাতা কনুই অব্দি জড়ানো, ফর্সা হাতে সোনালী চেইনের ডায়াল ঘড়ি। পরনে ব্ল্যাক ডেনিম প্যান্ট, বুক অব্দি চুল গুলো পনিটেইল বাধা। একবারেই ফর্মাল লুক। আজ কেসের কাজ ছিলো না বিধায় সিভিল ড্রেসেই এসেছে।

এখন সে যাবে পুলিশের হেড অফিসে। উদ্দেশ্য কয়েকদিনের ছুটি নেয়া। কিছুদিন যাবত প্রতিভা কেস নিয়ে যা দৌড়াদৌড়ি করেছে ক’দিন বিশ্রাম না করলেই নয়। শরীরটাও একটু আরাম চায়।

অধরা ভেবে নিয়েছে কম হলেও দিন চারেকের ছুটি নিয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটাবে। পেশার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনটা উপভোগ করবে। পারলে দু’একটা ডে ট্যুর ও দিবে। আহ!কতদিন ঘুরতে যাওয়া হয়না। এবার আর কোন বাধা নেই। ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবতেই আনন্দে মনটা নেচে উঠলো।
“হেই ইন্সপেক্টর? “

থানা গেট অব্দি আসতেই পিছন ডাক পড়লো অধরার। অধরা থেমে গিয়ে পিছন ঘুরলো। দেখলো তার পিছনে নিতিন দাঁড়িয়ে আছে। অধরা নিতিনকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। নিতিনের এখানে থাকার কথা নয়। কেসে সমাধানের সাথে সাথে এই থানায় তার কাজ শেষ তবে সে কেনো এলো সেটা বুঝতে পারছে না অধরা। অধরাকে দাঁড়াতে দেখে নিতিন অধরা সামনে এসে দাঁড়ালো।

গ্রীন কালার শার্টের সাথে গ্রে কালার প্যান্ট পড়েছে। ফর্সা শরীরে রং দুটো বেশ মানিয়েছে। চোখ মুখে প্রশান্তির আভা লেগে আছে। ঠোঁটের কোনে হাসি। সেই হাসির খানিক আভা চোখে লেগেছে। নিতিনের চেহারাই বলে দিচ্ছে এই মুহুর্তে বেশ খুশি সে।

নিতিন অধরার কুঁচকানো ভ্রু দিকে তাকিয়ে হাসলো। হেসে বললো,
“মিসেস অধরা?”
নিতিনের কথায় অধরা চারপাশে চোখ বুলালো। তারপর নিতিনের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারো ভ্রু কুঁচকালো। তা দেখে নিতিন অনুরোধের সুরে বললো,
“আমরা দুজনেই অফ ডিউটিতে আছি এখন।

সো এখন তো পার্সোনাল লাইফ সিস্টেমটা অন করাই যায়, তাই না মিসেস নিতিন সরকার?”
অধরা সচেতন চোখে তাকিয়ে বললো,
“বুঝলাম না। কিসের অফ ডিউটি?”

নিতিন পকেট থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করে ভাজ খুলে অধরার সামনে মেলে ধরলো। অধরা কৌতুহল চোখে কাগজের মাঝে কালো কালির লেখা গুলোয় চোখ বুলালো। হেড অফিস থেকে আগত বার্তা। যাতে বলা হয়েছে নিতিন আর অধরাকে মাসখানেকের জন্য কর্মবিরতি দেয়া হয়েছে নিজ জীবন উপভোগের জন্য। তাদের ছুটি শুরু হয়েছে আজ সকাল থেকে।

কাগজটায় চোখ বুলিয়ে অধরা অবাক চোখ নিতিনের দিকে তাকালো। নিতিন হাত দিয়ে মাথার চুল নেড়ে বললো,
“আমার ওয়ান এন্ড অনলি স্ত্রী মনে মনে খুব আশা করেছিলো এই চ্যালেঞ্জিং কেসে সমাধান হলে সে ঘুরতে যাবে। তাই স্ত্রীর মনে আশা পূরণ করার ছোট্ট প্রয়াশ।”

জবাবে অধরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুচকি হেসে বললো,
“থ্যাংকস নিতিন। এই ছুটিটার দরকার ছিলো। তারপর বলো, লম্বা ছুটি তো পেয়েছো এবার প্ল্যান কি?”

নিতিন ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,
“বিয়ের বছর গড়ালেও দেশা রক্ষা করতে গিয়ে সংসার করা আর হয়ে উঠলো না। ভাবছি ক’টাদিন সংসার করবো। টিপিক্যাল হাজবেন্ড হবো। এই অধরা? চলো না এই মাস খানেক সময়ে লাভ বার্ডস হয়ে যাই?”

অধরা তার গেজ দাঁত বের করে মায়াবী হাসি দিয়ে নিতিনের হাত ধরে বললো,
“আইডিয়া মন্দ না। চলো যাওয়া যাক? “

“চলো।”

অধরার হাত জড়িয়ে বললো নিতিন। তারপর হেসে পা বাড়ালো দুজন।

নিতিন অধরার যাওয়ার পর তাদের পিছনে ঠাস করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। মূলত, গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জিহাদ সেন্সলেস হয়ে নিচে পড়ে গিয়েছে। অধরার পিছন পিছন এসেছিলো সে অধরার কেবিনে ফেলে যাওয়া ফোন ফেরত দিতে৷ কিন্তু গেটে কাছে যেতেই অধরা নিতিনের কেমিস্ট্রি দেখে সে ভালোই শক খেলো।

কারণ এতদিন কাজ করেও সে জানতো না এরা স্বামী স্ত্রী। ইভেন কেউ জানে না। দুজনেই বিবাহিত তা জানে কিন্তু তাদের স্ত্রী, আর স্বামী কে জানতো না।কি বিহেভ দুজনের! সন্দেহ করার কোন পথ আছে? কেউ ঘূনাক্ষরেও বলবে এরা স্বামী স্ত্রী!

জিহাদ জ্ঞান হারানোর আগে একটাই কথা বলছিলো,
“মির্জা মার্ডার কেস থেকে এরা দুজন বেশি রহস্যময়।

এস আই ভি থেকে ও বেশি অভিনয়ে পরিপক্ক। এই কেসের সবচেয়ে সারপ্রাইজিং নিউজ হলো এদের স্বামী স্ত্রী হওয়া। এটাই মেইন রহস্যময় সারপ্রাইজ। যার আন্দাজ কেউ করতে পারে না।”

লেখা – আফিয়া আপ্পিতা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “রহস্যময় সারপ্রাইজ – ভৌতিক গল্প” টি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – এক্স বয়ফ্রেন্ড (১ম খণ্ড) – জ্বালাময়ী প্রেমের গল্প