ছোট গল্প

স্তব্ধ অনুভুতি – valobashar romantic premer golpo bangla

স্তব্ধ অনুভুতি – valobashar romantic premer golpo bangla: একটু পর পর গায়ে হাত ও তুলছে। মাষ্টারি করতে গিয়ে মেয়েকে নটি বানিয়েছে, শিক্ষা দিয়ে বড় করতে পারে নাই, শাসন না করে করে মাথায় তুলেছে। এখন সম্মান ডুবাতে বসছিলো। মায়ের মতোই বারানি হয়ছে। আরো অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে লতার বাবা লতার মা বোন কে।


পর্ব ১

মেসেঞ্জারের টুং শব্দে চোখ মেলে আকিব। হাতের দু আঙুলে চোখ ডলে ফোন হাতে নিয়ে মেসেঞ্জার ওপেন করতেই নওরীনের মেসেজ চোখে পড়ে। লিখেছে,

~ কেমন আছেন আকিব ভাই? দিনকাল কেমন চলছে? আপনি কি বিজি?

আকিব অপ্রস্তুত হাতে রিপ্লাই দেয়
~ ঠিক আছি। বলো কি বলবে?
~ এ কেমন কথা আকিব ভাই? আপনি কি আমার সাথে কথা বলতে বোরিং ফিল করেন?
~ আরে তা না।

~ মাগরীবের নামায পড়েছেন?
~ না পড়ি নি।
~ চাকরি করছেন না কেনো? এভাবে বসে বসে খেলে কি চলবে? ব্যবসাও তো করতে পারেন।
~ কার জন্য করবো? আমার কোন পিছুটান নেই।

~ কোথায় আছেন?
~ আছি নিজের ঘরেই। যতক্ষন ঘরে থাকি নিজের সাথেই থাকি। বাইরের জগত টা অসহ্যকর লাগে। কেউ কারো কথা ভাবে না। কেউ আপন না। সবাই শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। স্বার্থপর দুনিয়া।

~ এভাবে বলবেন না। কে বললো স্বার্থপর? এখনো ভালোবাসা আছে। ভালোবাসার জন্য নিস্বার্থভাবে এখনো কেউ কেউ তাদের একজনের জন্য দোয়া চেয়ে যায় আল্লাহর দরবারে।
~ হয়তো। তবে আমার মতো নেশাখুর একটা বাজে পথভ্রষ্ট ছেলেকে কে ভালোবাসবে? কে ভাববে আমার কথা?

~ কেউ না কেউ তো ভাবতেই পারে। আপনিতো সব জান্তা নন। গল্প শুনবেন? আপনার পজিশনের সাথে মিলে যায় একটা ছেলের আর একটা মেয়ের কাহিনী। যেখানে প্রতিটা মূহুর্তে কাজ করে স্তব্দ অনুভুতি।
~ বলো।
~ প্রনয় কাহিনী কিন্তু!

~ হুম।
~ এভাবে বলতে পারবোনা। কল দিচ্ছি। কথা বলতে সমস্যা আছে?
~ দাও।
ফোন দিতেই রিসিভ করে হ্যালো বলে, আকিব। ওপাশ থেকে নিশ্বাসের আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না। আবার বলে,

~ নওরীন শুনছো?
~ হুম।
~ বলো তোমার কাহিনী বলো।
~ আপনি এই সন্ধ্যা বেলা নামায না পড়ে মদ খাচ্ছেন! যাই হোক কাহিনী বলি। বড় কাহিনী। মনোযোগ দিয়ে শুনবেন আর ড্রিংস করবেন না।

~ ওকে। বলো। আজ তোমার গল্পেই সময় কাটানো যাক।
~ ছেলেটার নাম দিলাম পত্র আর মেয়েটার নাম দিলাম লতা।
~ বাহ ভালো তো। পত্রলতা।

~ কয়েকবছর আগে গ্রামে এসেছে পত্র। মিয়া বাড়ির বড় মিয়ার ছেলে পত্র। গ্রামে প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার দিক থেকে সবচেয়ে বড় মিয়ারা। গ্রামের রাস্তায় ঢুকতেই বন্ধু রনির সাথে দেখা। রনি এগিয়ে হাগ দিয়ে বলে, কিরে বন্ধু? রিহাব থেকে কবে ফিরলি?

ফিরেছি। মাস খানেক হলো।
এবারের ঈদ কিন্তু সেই মজায় কাটবো মামা।
হ মামা। বাসায় আয়।

নাহ। পরে যামুনি। ঢাকা থেকে আসছোস বাসায় যা।
বাসায় আসতেই উঠোনে বিরাট সমাগম দেখতে পায়। আকিব যেতেই পত্রকে দেখে চাচা জব্বার মিয়া উঠে এসে পিঠে দুটো চাপর দিয়ে বলে, আসছো আব্বাজান। যাও ভেতর ঘরে যাও। রোজা রাখছো নি?
না চাচা। চাচা কি নিয়ে বিচার বসছে?

গ্রামের মান সম্মান আর রাখলো না। একি গ্রামের হয়ে কিভাবে এই কাম করে এরা মাবুদই জানে। রহিমের মাইয়ার সাথে সিরাজের পোলার প্রণয় ঘটছে। কত্তো বড় সাহস গ্রামের পোলা হয়ে গ্রামের মাইয়ার দিকে নজর দে। তুমি ভিতরে যাও আব্বাজান। তোমার বাপে বিচার করতেছে। পত্র বাসায় না গিয়ে সেখানেই দাড়িয়ে রইলো।

বিচারে রহিমের পরিবারকে একঘরে করে দেওয়া হয়। দুই দিনের মধ্যে মাইয়ার অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার কথা হয়। সিরাজ পোলারে মারতে মারতে বাড়ির দিক রওনা দেয়। পত্র বাড়ির ভেতর চলে যায়। দুপুরে খেয়ে বের হয় গ্রামে। বন্ধুদের সাথে হাই স্কুল ফিল্ডে গিয়ে আড্ডা দেয়।

হাই স্কুলে পরিক্ষা চলতেছে ছয়মাসিক। ঈদের তিন দিন আগে শেষ হবে। এখন ঈদের দশদিন বাকি। পাচঁটার সময় পরিক্ষা শেষে হল থেকে বের হয় সবাই। কিন্তু অষ্টম শ্রেনীর পরিক্ষা শেষ হয় আরো আধা ঘন্টা পরে। লতা বের হয়ে ফিল্ড ক্রস করার সময় পত্রের দিকে চোখ যায়।

লতার কেমন জানি বুক কেপে উঠে। বার বার পত্রের দিকে চোখ চলে যায়। এক সময় পত্রের চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে জোরে হাটা দেয়। পত্র একবার তাকিয়েই আবার গল্পে মাতে। পর পর দুদিন এভাবে লতা পত্রের দেখা হয়

লতার হার্টবিট বেড়ে যায় পত্র কাছাকাছি থাকলেই। পরদিন আর দেখা পায় না লতা পত্রের। কেমন জানি কষ্ট কষ্ট লাগে তার।
লতার বাবা আরমিতে ছিলো। রিটেয়ার হবার পর কোম্পানিতে জব করছে। লতার মা স্কুল টিচার। পালিয়ে বিয়ে করেছিলো তারা তবে সুখী হতে পারে নি।

বদমেজাজী খারাপ স্বভাবের লতার বাবা লতার মার উপর অসম্ভব অত্যাচার করতো। প্রায় প্রতিদিন ই লতার মা কে মারতো একটুতেই লতার বাবা। লতাদের দু বোনের দিকে চেয়ে লতার মা মুখ বুঝে সবটা সহ্য করে যান। লতার মার পরিবার লতার মাকে বার বার নিয়ে যেতে চাইলেও লতার মা মেয়ে দুটোর মুখের দিক তাকিয়ে সংসারে থাকছে। তার এক কথা সে চলে গেলে সংসারে নতুন গিন্নি আসবে আর তার মেয়ে দুটো জলে ভেসে যাবে।

লতার বাবা লতার মাকে মেরে চলে যায়। আর লতা মাকে ধরে বসে কাদে। কিছুক্ষন পর লতার কাজিন আসে। মাকে ছেড়ে কাজিনকে নিয়ে একরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। লতার অস্থিরতা দেখে অবাক হয়ে যায় লতার কাজিন। লতারা দুই বোন। লতা ছোট। খুব শান্ত শিষ্ট, ভিতু আর চাপা স্বভাবের মেয়েটার মধ্যে এতো উত্তেজনা আজ প্রথম দেখছে। লতা জিজ্ঞাসা করে
~ খবর কি? কি কি জানছো?

~ আমাদের গ্রামের বড় মিয়ার ছেলে। ঢাকা থাকে। ঈদে বেড়াতে আসছে। লম্বা অনেক ছয় ফুট, শ্যামলা রং, কিন্তু চরিত্র ভালো না। নেশা টেশা করে। বড় লোকের ছেলে নেশা টেশা করতেই পারে টাকা পয়সা আছে যেহেতু কিন্তু বাবা আমার পছন্দ না।

~ পছন্দ আমারো না। পছন্দ করলেই কি আর না করলেই কি? আমি প্রেম করবো না কখনো। নেশাখুর একদম। কিন্তু আমার কেমন জানি লাগে। আলাদা অনুভুতি হয়। অনেক মায়া লাগে। ও কাছে থাকলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায়।

~ খালামনি বলছে না কোন প্রেম করা যাবে না? বড় আপু তো এত্তোগুলা প্রেম করতেছে সেইটা দেখে খালামনি কতো কষ্ট পায় আর তুই সেই কাজটাই করতে চাস? তুই যখন ক্লাস ফাইভে ছিলি তখন যে প্রপোজ পেলি তখন খালামনি জেনে কতো সাবধান করেছে তোকে। আপুর জন্য কতো আফসোস করেছে।

~ না না আমি কোন প্রেম করবো না। আমার ভয় লাগে। আমি কিছু করবোনা। আম্মু আর আব্বু তো পালিয়ে বিয়ে করছে। তারা কি সুখী? একটুও না।

সেবার পত্র চলে যায় ঢাকা। কিন্তু লতা পারে না পত্রকে ভুলতে। মাসখানিক না যেতেই লতাদের স্কুলে সাংস্কেতিক অনুষ্টান হয়। লতা নতুন ড্রেস পড়ে সেজেগুজে এসেছে অনুষ্ঠান দেখতে। লতা পাচ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা, গাড় ফর্সা, লম্বা চুল, সুন্দর মুখয়ব হলুদ রঙ্গা জামায় আরো সুন্দর লাগছে। চেয়ারে বসে সবার পারফরমেন্স দেখতে থাকে লতা।

হটাৎ তার হার্টবিট বেড়ে যায়। কেনো জানি মনে হতে থাকে পত্র আশেপাশেই আছে। লতা উঠে চুপি চুপি সব জায়গায় খুজতে থাকে পত্র কে। কিন্তু কোথাও পায় না। শেষমেষ আবার গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে। অনুষ্টান শেষে বের হবার সময় ছোট ছোট বাচ্চারা পপকন খেতে খেতে বের হচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন বলে

পত্র ভাইয়া খুব ভালো। আমাদের সবাইকে পপকন খেতে দিয়েছে। মূহূর্তেই দাড়িয়ে পড়ে লতা। দৌড়ে বাচ্চাদের কাছে গিয়ে বলে
এই তোদের পত্র ভাই এসেছিলো রে?
হা আসছিলো চলে গেছে।

কোথায় ছিলো রে?
ঐতো ঐ ক্লাসের দরজার সামনে দাড়িয়ে ছিলো।
লতা দরজার দিকে তাকায়। সব জায়গায় খুজেছে শুধু এই জায়গায় টায় চোখ পড়লো না। দু চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে লতার। বাড়ি ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

পত্রকে যে ভালোবেসে ফেলেছে বুঝতে পারে লতা। পরের দিন চাচীর সাথে বোরখা পড়ে মুখ বের করে বাজারে যায় লতা। ফেরার পথে দেখে তার এক চাচার সাথে বসে আছে পত্র। হাত পা কাপতে থাকে পত্রকে দেখে। মাথা নিচু করে হাটলেও বার বার উপুর করে চোখ তুলে তাকায়।

চোখ বড়ই বেয়ারা। ক্রসিং করার সময় একদম কাছাকাছি দিয়ে যায়। লতার যেনো দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। যাওয়ার সময় শুনতে পায় পত্র বলছে মেয়েটা কোন বাড়ির?
আমার ভাতিজি।

এটুকু শুনেই জোরে পা চালিয়ে হেটে আসে। বাড়িতে এসেই শুনে চেচামেচি। লতার বড় বোনকে নিয়ে বাবা মার মাঝে ঝামেলা শুরু হয়েছে। লতার বড় বোন কোন ছেলের সাথে পালাতে গিয়ে নাকি ধরা পড়েছে। ভয়ে হাত পা কুচিয়ে দাড়িয়ে আছে। লতার মাকে ইচ্ছা মতো বকাবকি করছে লতার বাবা।

একটু পর পর গায়ে হাত ও তুলছে। মাষ্টারি করতে গিয়ে মেয়েকে নটি বানিয়েছে, শিক্ষা দিয়ে বড় করতে পারে নাই, শাসন না করে করে মাথায় তুলেছে। এখন সম্মান ডুবাতে বসছিলো। মায়ের মতোই বারানি হয়ছে। আরো অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে লতার বাবা লতার মা বোন কে।

লতার মা মুখ ফুটে বলে, তুমিই তো নিয়ে আসছো আমায়। আমি কি আসতে চাইছিলাম? কপাল খাইছি তোমার সাথে পালিয়ে নয়তো আমি সুন্দরী বিএ পাস। আমার ছেলের অভাব হয়তো না। আর বলতে না দিয়েই উড়া ধুড়া মাইর দেয়া শুরু করে। লতা ফেরাতে গেলে লতাও মার খায়। লতার বাবা চলে যাওয়ার পর তিন মা মেয়ে কান্নাকাটি করে।
একটু পানি খেয়ে আসি?

~ যাও।

আকিব অপেক্ষা করে। ইতোমধ্যে তার নেশা কেটে গেছে। বড় অস্থির লাগছে। তার গ্রামের কড়া নিয়ম। গ্রামের ছেলে মেয়ে ভাই বোন। এদের মধ্যে ভাব হওয়া নিষিদ্ধ। ভাব হবে অন্য গ্রামের ছেলে মেয়ের সাথে। তাই হৃদয় চাইলেও গ্রামের কাউকে নিজের করা যায় না। আবার ফোন আসে। ফোন রিসিভ করে বলে,
~খাওয়া শেষ? এতোক্ষন লাগলো? ।

~ ঐ তো ক্ষিধা লেগেছিলো তাই টোস্ট ও খেয়ে আসলাম।
~ তোমার বলা কাহিনীতে ইন্টারেস্ট ই পাচ্ছি না। বুঝলাম গ্রাম সংক্রান্ত আর পরিবার সংক্রান্ত কারনে হয়তো লতা পত্র এক হতে সমস্যা হবে। কিন্তু লতা তো ওয়ান সাইট লাভ দেখছি। পত্রের টা তো দেখছিই না। এখানে প্রনয় কাহিনী ঠিক ঠাক পাচ্ছি না। কোন রোমান্স নেই। পুরোটা জুড়ে স্তব্ধ অনুভুতির খেলা। ভালোবাসার জন্য আকুলতার ছিটে ফোটাও নেই।

~ প্রনয় কাহিনী যে একতরফা হতে পারবে না সেটা তো কে বললো? আর প্রনয় কাহিনীতে রোমান্স থাকতেই হবে সেটার তো কোন মানে নেই, তাইনা?
পুরোটা শুনুন তার পর না হয় আপনার অভিমত জানাবেন।
~ শুরু করো।


পর্ব ২ (অন্তিম পাতা)

পরের বছর ঈদে লতা ভাবে পত্র এসেছে। কিন্তু পত্রের কোন দেখাই মেলে নি। মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু ঈদের দিন সকালে জানতে পারে পত্র নাকি গ্রাম এসেছে। মুহুর্তেই মন ভালো হয়ে যায় লতার। সবাই নামাযে চলে গেলে গোছল করে নতুন জামা পড়ে সেজে গুজে কাজিনকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।

সারাদিন ঘুরা ঘুরি করে বাসায় ফিরে না। পত্র যেখানে যেখানে থাকতে পারে সেই সেই জায়গাতেও যায়। কিন্তু কোথাও দেখা পায় না। সন্ধ্যা সময় বাসায় ফিরে দরজা লাগিয়ে প্রচুর কান্না কাটি করে। পরদিন সকালে স্বপরিবারে তৈরী হয়ে নানুবাড়ির উদ্দ্যেশে রওনা হয়।

রাস্তা দিয়ে হাটার সময় বার বার পেছন থেকে হর্ণ বাজছে। রাস্তা পাশে অনেকটা ফাকা তবুও হর্ণ বাজছে। বিরক্তি ধরে যায় লতার। অবশেষে উল্টো ঘুরতেই দেখে বাইকে পত্র আর রনি বসা। পত্র লতার দিকেই তাকিয়ে আছে নাকি অন্যদিকে সানগ্লাসের জন্য বুঝা যাচ্ছে না।

তবে লতার মনে হচ্ছে পত্র তার দিকেই তাকিয়ে আছে। লতার হাত পা কাপতে শুরু করে। হাটেও থত বত হয়ে। বোনকে ধরে হাটে লতা। বাইক নিয়ে পত্র সামনের দিকে চলে যায়। যাবার সময় পেছন দিকে তাকিয়েছিল দুবার। চলে যাওয়ার পর ও লতার জোরে জোরে শ্বাস পড়তে থাকে। লতার বার বার মনে হয় পত্র তাকেই দেখতে এসেছিলো। নয়তো এতবার হর্ণ দিবে কেনো? আবারো প্রহর গুনা শুরু হয় লতার পত্র কবে আসবে?

কয়েকমাস পর লতাদের পাশের বাড়ি বিয়ের অনুষ্টান হয়। বিয়ের দিন সকাল থেকেই লতার হার্টবিট বাড়তে থাকে। কোন জায়গায় শান্তি পাচ্ছে না লতা। ছটফট করছে শুধু। সেজেগুজে বিয়েতে গিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তার চোখ শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।

বিয়ে বাড়িতে কবুল বলার সময় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছে লতা। কিন্তু তার মন নেই এই অনুষ্টানে। হার্টবিট প্রচুর বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে আশেপাশের সবাই এই শব্দ শুনে ফেলবে। অনেকক্ষন থেকে মনে হচ্ছে পেছনে কেউ আছে। এবার তাকানো উচিত।

পেছনে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে পত্র লতার। তাদের মাঝে দুই আঙুলের ব্যবধান। তাড়াতাড়ি সরে যায় পত্র। যাওয়ার সময় রনিকে ডাকতে গিয়ে বলতে বলতে যায় রনিরে এই গরম কালেও মানুষ শীতে কাপে। লতা দৌড় দিয়ে ঘরে চলে আসে। সত্যি কাপছে সে।

খুব করে কাপছে। বিছানায় শুয়ে নিজেকে শান্ত করে। পরে ভেঙে পড়ে কান্নায়। আজকাল ভীষন কান্না পায় লতার।
কয়েকমাস পর লতার বড় বোনের ও বিয়ে হয়ে যায় তার এক প্রেমিকের সাথে। লতার মা যেন কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায়। বড় মেয়ের কর্মকান্ডে বেচারা খুব ভেঙে পড়েছিলো।

লতাকে ডেকে লতার মা অনেক উপদেশ দেয়। কোন ভুল কাজে জড়াতে নিষেধ করে। সাবধানে থাকতে বলে। এভাবেই দিন কাটছিলো লতার। একদিন কাজিনকে নিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে গল্প জুড়ে দেয়। পুকুর ঘাটের উল্টো দিকে মিয়া বাড়ির পেছন দিক। দুতালা বাড়ির পেছন দিকের বারান্দা একেবারে সামনাসামনি।

বারান্দাটা সুন্দর। লতার একটু পর পর সেই বারান্দাটা দেখছে। হটাৎ চোখ পড়ে যায় বারান্দায় দাড়ানো মানুষটার উপর। পত্র এসেছে নিমেষেই মন পুলকিত হয়ে যায় লতার। আড় চোখে বার বার পত্রের দিকে তাকায়। কিন্তু হায় পত্র যে এক ধ্যানে তার দিকে তাকিয়ে। ভীষন লজ্জা পায় লতা। মুচকি মুচকি হাসে। লতা ঘন্টা দুয়েক সেখানে বসে থাকে। সেদিন থেকে লতা ১০০% সিওর হয় পত্র ওকে দেখে। কিন্তু কবে বলবে মনের কথা?

গ্রামে আবার ঝামেলা লেগেছে ছেলে মেয়ে নিয়ে। এই গ্রামের ছেলে মেয়ের মধ্যে ভাব হলে বিচারক গন নিজ হাতে এদের বিচ্ছেদ ঘটায়। বিচার কার্য দেখতে লতাও আসে। এবারের বিচারে মেয়েকে ন্যাডা মাথা করে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে আনা হয়। ছেলেকে বেধে বেধম মার দেওয়া হয়।

এ দৃশ্য দেখে লতা কাদতে থাকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে। চলে আসার সময় ভেতর ঘরের দিকে তাকাতেই দেখে পত্র দাড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে। অন্যদিকে ফিরে যায় পত্র। লতা কাদতে কাদতে বাসায় আসে। লতার মা ভাবে ঐ ঘটনা দেখে মেয়ে ভয় পেয়ে কাদছে। কিন্তু একমাত্র লতা জানে লতা কেনো কাদছে।

লতার মা লতাকে ডেকে বলে, মা কখনো রিলেশনে জড়াবি না। এইটা পাপ। বাপ মা কে কষ্ট দিস না মা। এইযে দেখ আমি দিয়েছি আমার অবস্থা দেখ। আমি আমার পাপের শাস্তি পাচ্ছি। বাপ মা এর হা নিশ্বাস লেগেছে আমার শরীরে। তোর বাপের আঘাতে আঘাতে বার বার মৃত্যু হয় আমার।

আগে কি বুঝেছিলাম তোর বাপ এমন অমানুষ হবে? বাবা মার ঠিক করা ছেলেকে বিয়ে করলে আজ এমন অবস্থা হতো না আমার। ঐ ছেলে যদি খারাপ ও থাকতো তাহলে বাপের বাড়ি গিয়ে মুখ গুজতে পারতাম। এখন তোর নানু মামারা ডাকলেও আত্মসম্মানের জন্য যেতে পারি না।

তোরা দু বোন তো ছিলি। তোদের মুখের দিকে তাকিয়েও যেতে পারি নি। বড় হয়েছিস মা। লোকজন ফুসলাবেই কিন্তু তুই পা বাড়াবিনা। তোর বোনের মতো করিস না মা। তুই কিছু করলে তোর বাবা আমাকে মেরেই ফেলবে এবার। এখন তোর টুকটাক বিয়ের সম্বন্ধ আসে। রাস্তাঘাটে ভাল ভাবে মাথায় কাপড় দিয়ে চলাফেরা করবি। মায়ের কথা শুনিস মা। মা কখনো খারাপ চায় না।

লতা চুপ চাপ মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।
ঈদের আর পাচঁদিন বাকি। হয়তো এসেছে পত্র ভাবে লতা। লাইব্রেরী থেকে বই কিনে বাড়ির উদ্দ্যেশে খালি সি এন জি তে উঠে বসে লতা।

অন্য যাত্রীর উদ্দ্যেশে ডাক পাড়ে ড্রাইভার। ড্রাইভার কে ডেকে মামা রিজাব নিলাম চলেন নয়া পাড়া মোর বলে, উঠে বসে পত্র। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। লতা পত্র পাশাপাশি বসে পুরো সি এন জি তে। শুধু সামনে ড্রাইভার। লতার হাত পা কাপা শুরু করে।

মনে হাজারো প্রশ্ন। এমন কি তারাহুরা যে পত্র পুরো গাড়ি রিজাব করে নিলো? যাত্রীর জন্য একটু বসতে পারলো না। আর এখান থেকে ওদের বাড়ি আধ ঘন্টার রাস্তা তাহলে তো রিকশা করেই যেতে পারতো। আর ওর তো বাইক আছে। প্রশ্ন গুলো মনে মনে আওড়াতে থাকে লতা। পুরো রাস্তা পত্র সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে একবারের জন্যেও তাকায় না লতার দিকে।

লতা আড় চোখে বার বার পত্রকে দেখে। পচিঁশ মিনিট গাড়িতে থাকে দুজনে পাশাপাশি। মোরে পৌছালে পত্র গাড়ি থেকে নেমে লতার ভাড়া সহ ভাড়া দেয়। লতা দিতে নিলে ড্রাইভার নেয় না। মোর থেকে লতার বাসা দশ মিনিটের হাটার রাস্তা।

লতা হাটতে থাকে বাসার উদ্দ্যেশে। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে পত্রও তার পিছু পিছু আসছে। কিছুক্ষন হাটার পর বট গাছটার নিচে আসতেই লতা ইচ্ছা করে বইগুলো হাত থেকে ফেলে দেয়। বসে পড়ে বই গুলো তোলার জন্য। সামনে এসে দাড়ায় পত্র।

হাতে বই তুলে দেয়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। সাহস করে লতা জিজ্ঞাসা করে আপনি আমাকে চিনেন? আমার ভাড়া যে দিয়ে দিলেন আর আমাকে এগিয়েও দিতে আসলেন।
হুম চিনি। তুমি চেনো না আমাকে?
না। আমি চিনিনা।

আমি মিয়া বাড়ির ছেলে। পত্র।
ওও। কিছু বলবেন?
নাহ। যাও।

লতা ভাঙা মন নিয়ে চলে আসে। লতা ভেবেছিলো পত্র কিছু বলবে কিন্তু বলেনি। এভাবে হয় নাকি? কিছু তো বলতে পারতো। কোন রেসপন্স করেনি পত্র। কাদতে কাদতে বাসায় আসে লতা। তিনমাস পর লতার বিয়ে ঠিক হয়। আংটি পড়িয়ে যায় ছেলে। লতার অস্থিরতা বেড়ে যায়।

পত্র তো কিছুই বললোনা ওকে। কি করবে ও? তবে কি পত্রের মনে কিছু নেই তার জন্য? কিছু থাকলেও কি এই সমাজ কি মেনে নিবে এই সম্পর্ক? তার মার কাছে বললে কি মেনে নিবে এই কথা? সব কিছু ভেবে কাদতে থাকে লতা।

যে ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই ছেলের নাম কাওসার। কাওসার এদিকেই চাকরি করতো। লতাকে দেখে পাগল হয়ে গেছে বিয়ে করার জন্য। মাঝে মাঝেই লতার সাথে কথা বলতে চায় কাওসার। লতার মা লতাকে ফোন দেয়। লতা একটু একটু কথা বলে, তো বিস্তর কথাই শুনে। কথা শেষে মাকে ফোন দিতে গেলে মা পাশে বসিয়ে বলে,
কি বললো কাওসার?

মায়ের সাথে লতা অনেক ফ্রি তাই তেমন দ্বিধা কাজ করে নি।
আমাকে বিয়ে করার জন্য নাকি প্রতিদিন দোয়া পাঠ করে, ইয়াসিন পড়ে।
হালকা হাসে লতার মা।

শোন মা। আমরা যাকে ভালোবাসি তার দিক থেকে যদি কোন রেসপন্স না পাওয়া যায় তাহলে তাকে পেতে চাওয়া বোকামো। আর যে তোকে ভালবাসবে তোকে পেতে চাইবে সুখে থাকতে চাইবে তোকে নিয়ে তাকে মেনে নেওয়া বুদ্ধিমতির কাজ। বুজলি? যা গিয়ে ঘুমা এবার।

লতা চলে আসে রুমে। ওর কাজিনের সাথে কথা বলে। দিকে দিকে বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ে। খবরটা পত্রের কানেও পৌছে দেয় লতার কাজিন। বিয়ের দিন অনেক কান্নাকাটি করে লতা। বিদায় নিবে বলে, কাদছে সবাই জানলেও লতা আর লতার কাজিন শুধু জানে আকিবের জন্যেই এই কান্না।

লতা চোখের ইশারায় ওর কাজিনকে জিজ্ঞাসা করে পত্রের কথা। মাথা নাড়িয়ে লতার কাজিন বলে, নাহ। কোন রেসপন্স নেই। আরো নাকি বাজে নেশা শুরু করেছে।

লতার হাজবেন্ড অনেক ভালোবাসে লতাকে। এখন লতার একটি ছেলেও আছে তিন বছরের। এখনো লতা পারেনি পত্রকে ভুলতে। প্রত্যেকদিন তাহাজ্জুতের নামায পড়ে দোয়া করে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে পত্রের জন্য। পত্র যেনো ভালো হয়ে যায়, পত্র যেনো ভালো চাকরি করে, পত্রের যেনো মিস্টি একটা বউ হয়, পত্র যেন ভালো থাকে।
কিছুক্ষন চুপ থাকার পর আবার বলে,

~ আপনি কি শুনছেন? আপনি কিছু বলবেন না?
ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ আসে না। আকিব চুপ হয়ে গেছে। তার চোখ বেয়ে পড়ছে লুকানো জলধারা। বুক ফেটে যাচ্ছে কান্নায়। নাক টানা শুনে বুঝতে পারে আকিব কাদছে।

~ লতার কাজিনের নাম নওরিন। পত্রলতার আসল নাম হলো আ…
কেটে যায় ফোন। তৎক্ষানাত দেখে ব্লক করে দিয়েছে।
পাশ থেকে নওরীন বল,
~ কলি …..কি পেলি আকিবকে সবটা বলে?

কলি চোখ মুছে হাসি হাসি মুখ করে নওরীনের দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে,
~ অনেক কিছু। এতোদিন যে কথাগুলো বুকের ভেতর জমা রেখেছিলাম সেই কথাগুলো বলে, অনেকটা হাল্কা লাগছে।
~ ভাগ্যিস আকিব ভাইয়ার সাথে কখনো কলে কথা বলিনি তাই কথা বললো। অন্যকারো কন্ঠ বুঝলে কথাই বলতো না।
~ ও বুঝেই কথা বলেছে।

~ কে বললো?
~ আমি বলছি। তার নিজের ঘটনা আর সে বুঝবেনা? আর তোকে তো চিনেই তুই আমার কাজিন। তোর থেকে ফোন তো আমি নিতেই পারি। প্রথমেই বুঝেছিলো। সবটা জানবে বলেই চুপ করে শুনছিলো।

পাশের মসজিদ থেকে ফজরের আজানের আওয়াজ আসছে। সকাল হবে একটু পর। আজান শেষ হতেই নওরীন বলে,
~ কিন্তু লাভটা কি হলো?

~ অনেক কিছু। এইযে একটা পুরো রাত কথা বললাম। এটা কি কম বড় পাওনা? কিন্তু ও যে আমাকে আজো কিছু বললো না।

~ তোর ভালোর জন্য ই বলে, নি। আসলে বলতে নেই কিছু। তুই তোর জীবনে থাক আর আকিব ভাই তার জীবনে থাক। রুমে গেলাম আমি।

নওরীন চলে যেতেই কলি কান্নায় ভেঙে পড়ে। পাশে তাকিয়ে দেখে তার ছেলেটা কতো সুন্দর করে ঘুমুচ্ছে। কাওসার গ্রামের বাড়ি গিয়েছে। নওরীন বেড়াতে এসেছে।

অস্থির লাগছে কলির। এই অস্থিরতা একমাত্র আল্লাহ তা’আলাকে ডাকলেই কমবে। ওযু করে নামাযে বসে পড়ে কলি। নামায শেষে দু হাত তুলে দেয় আল্লাহর দরবার। চাইতে থাকে কাছের মানুষদের জন্য ভালো থাকা যার মাঝে আকিব নামটা শীর্ষ স্হান অধিকার করে আছে। এই চাওয়া চেয়েই যাবে যতদিন সে দুনিয়াতে বেচেঁ আছে।

{গল্পটি কাল্পনিক নয়}

লেখাঃ মায়াবী রোমা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “স্তব্ধ অনুভুতি – valobashar romantic premer golpo bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ)

আরো পড়ূনঃ যদি জানতে চাও – Valobasar Golpo Kahini

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button