কষ্টের প্রেমের গল্প

যদি জানতে চাও – Valobasar Golpo Kahini

যদি জানতে চাও – Valobasar Golpo Kahini: চোখ মেলে যখন তাকালাম তখন গভীর রাত হয়ে গেছে, ধড়ফড়িয়ে উঠে বিছানায় বসে অনেক চিৎকার করে কান্না করলাম। বারবার মিজানের নাম্বারে কল দিলাম। কিন্তু নাম্বার বন্ধ করে দিছে। রুমের মধ্যেই আত্মহত্যা করতে চাইলাম কিন্তু সাহস করতে পারি নাই।


পর্ব ০১

প্রিন্সিপাল স্যারের মেয়ে যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “আমি তোমাকে ভালবাসি। ” তখন পিছনে ফিরে দেখি প্রিন্সিপাল স্যার দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তখন কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেলাম, স্যারের মেয়ের ওই প্রপোজালের জবাব দেবো? নাকি স্যার কি কি প্রশ্ন করবে তার জবাব দেবো?’ ( মোবাইলের অপরপ্রান্ত হতে এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে বলে গেল শফিক। )

~ আমি বললাম, তারপর কি হলো? প্রিন্সিপাল স্যার কিছু বলে নাই তোকে?
~ না, আমার ভাবনা খানিকটা কমে গেল কারণ স্যার দরজা থেকে সরে গেল আর আমি তড়িঘড়ি করে বের হয়ে দিলাম দৌড়। কিন্তু পরবর্তী মুহূর্তে আমার ভাগ্যে কি হতে পারে সেই কথা আল্লাহ ভালো জানেন।

~ এখন কি করতে হবে? আর তুই আর স্যারের মেয়ে যখন ক্লাস রুমে ছিলি তখন কি কেউ ছিল না?
~ না, চারতলার দক্ষিণের ফাঁকা রুমের মধ্যে গিয়ে কথা বলছিলাম আমরা।
~ তুই কেন গেলি? শালা শয়তান।

শফিক আমতা আমতা করছি, আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
~ ঠিক আছে আমি তো রওনা দিয়েছি, কালকে সকালে পৌঁছে যাবো খুলনায়। তারপর নাহয় গিয়ে দেখবো কি করা যায়?
~ তুই না আসা পর্যন্ত আমি কলেজে যাবো না।

~ আচ্ছা ঠিক আছে এখন ফোন রাখ, আমি মাত্র বাসের মধ্যে উঠে বসলাম।
~ ঠিক আছে বন্ধু।
চট্টগ্রাম আন্টির বাসায় বেড়াতে এসেছিলাম, তাই আজকে চলে যাচ্ছি। এতক্ষণ ধরে আমার বন্ধু + রুমমেট শফিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কিন্তু এই মুহূর্তে বাস না ছাড়ার জন্য আমি বিরক্ত হচ্ছি, কি কারণে দেরি হচ্ছে বুঝতে পারছি না।

একটু পরে সুপারভাইজারকে কথাটা জিজ্ঞেস করার পরে জানলাম একজন যাত্রী নাকি এখনো আসে নাই। বারবার কল করা হচ্ছে কিন্তু তিনি অনেকক্ষণ ধরে পাঁচ মিনিট পাঁচ মিনিট করছেন।

নির্দিষ্ট সময়ের চল্লিশ মিনিট পরে সেই যাত্রী এসে উপস্থিত হলো, বাসের মধ্যে তখন একটা টানটান উত্তেজনা। গেইট দিয়ে ঢুকে যে মেয়ে পিছনের দিকে আসছে তাকে দেখে অবাক হলাম। চেহারার মধ্যে আহামরি কিছু নেই কিন্তু তাকিয়ে থেকে যেন অনেক কিছু দেখার আছে।

আমি বসে আছি জানালার পাশে, আমার পাশে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। তাকে আমার সহ্য হচ্ছে না কারণ অনেকক্ষণ ধরে তিনি ঘাসের মতো পান চিবোচ্ছে।
আমাদের কাছে এসেই মেয়েটা আমার পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো,

~ ভাইজান এটা তো মনে হয় আমার সিট, আপনি কি এই সিটের যাত্রী?
লোকটা তার পান চিবানো দাঁতগুলো বের করে দিয়ে বললো,
~ সেটাই মনে হচ্ছে।

মেয়েটা স্বাভাবিক ভাবেই সুপারভাইজারকে ডাক দিয়ে বিষয়টা বললেন, তখন সেই সুপারভাইজার দুজনের টিকিট চেক করে আমার পাশের লোকটা কে পিছনের সিটে যেতে বললেন। লোকটা নাকি ভুল করে একসিট সামনে বসে পরেছে, আর ওই মেয়ের সিট নাকি আমার পাশে।

আহারে, আমি তো তখন মেলা মেলা খুশি। এমন সুন্দর একটা মেয়ের সঙ্গে পুর রাস্তায় ভ্রমণ করতে পারবো। মুখে গম্ভীর ভাব নিয়ে চুপ করে বসে আছি, যেন পাশের সিটের বিষয় কোন ভ্রুক্ষেপ নেই আমার।
~ মেয়েটা ব্যাগ রেখে আমার পাশে ধপাস করে বসে পরলো। তারপর বললো, আপনার যদি খুব বেশি অসুবিধা নাহয় তাহলে একটু জানালা বন্ধ করে দিবেন?

~ আমি জানালা বন্ধ করে দিলাম, মেয়েটা তখন বললো, ধন্যবাদ।
~ আমি বললাম, আমার নাম সজীব।
~ সে একটা হাসি দিয়ে বললো, মিথিলা।

তারপর দুজনেই চুপচাপ, বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে রেখে বাস আমাদের নিয়ে খুলনা শহরের দিকে রওনা দিল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো দ্রুত পিছনে সরে যাচ্ছে মনে হয়। জানুয়ারি মাসে বেশ ঠান্ডা থাকে সেটাই স্বাভাবিক, আমি শীতের পোশাক পরে বসেছি আগেই।

বাসের ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা লেগেছিল, হঠাৎ করে চোখ মেলে তাকালাম। পাশের সিটের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখি সে আস্তে আস্তে চাপা কান্না করছে। আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, আপনি কান্না করছেন কেন? কি হয়েছে?
মেয়েটা খানিকটা লজ্জা পেয়ে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে নিল, তারপর আস্তে করে বললো, কোই কিছু না তো।

আমি আবারও চুপচাপ কিন্তু চোখের মধ্যে আর ঘুম ধরে না, মেয়েটার কান্নার রহস্য জানতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু কীভাবে কথা বের করা যায় সেটাই ভাবছি, তাছাড়া একটু গল্প করা দরকার।
~ বললাম, আপনি কোথায় যাবেন?

~ গোপালগঞ্জ।
~ ওহ্হ আচ্ছা, সেখানে আপনার বাড়ি? নাকি বেড়াতে যাচ্ছেন?
~ আমার বাড়ি।
~ চট্টগ্রামে কার কাছে গেছিলেন?

~ এতো প্রশ্ন করছেন কেন?
~ না মানে এমনি, সরি।
~ ইট’স ওকে।

কুমিল্লা হোটেলে গিয়ে যাত্রাবিরতি, সবাই আস্তে আস্তে নামছে কিন্তু মেয়েটা নামার কোন লক্ষ্মণ দেখতে পাচ্ছি না। তার জন্য আমিও বের হতে পারছি না, মেয়েটা সারাক্ষণ কি যেন গভীর চিন্তা করে যাচ্ছে। আর তার চোখ থেকে অনবরত পানি বের হচ্ছে, মেয়েটা কিছুক্ষণ পর পর সেই পানি মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়।
~ আমি বললাম, আপনি কি বের হবেন?

মেয়েটা খানিকটা ধাক্কা খেল, আমার দিকে কেন যেন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর বললো, আপনার কাছে বেশি টাকা আছে? আমাকে কিছু খাওয়াতে পারবেন?
~ আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, হ্যাঁ টাকা আছে। কিন্তু…

~ অপরিচিত মেয়ে বলে সঙ্কোচ হচ্ছে? আসলেই আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু আমার কাছে কোন টাকা নেই।
~ ঠিক আছে চলুন সমস্যা নেই।

ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দুজনেই একটা টেবিলে খেতে বসলাম, আমার মনের মধ্যে একটার পর একটা কৌতুহল জমা হচ্ছে। মেয়েটা এতক্ষণ ধরে অনর্গল কান্না করলো, এখন বলে তার সঙ্গে নাকি টাকা নেই। এতক্ষণে মনে পরলো যে আমি তার হাতে এখনো কোন মোবাইল দেখিনি। অদ্ভুত।

খেতে খেতে আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছি তবুও করলাম না। কারণ আবার যদি বাসের মধ্যে বসে বলার মতো কিছু বলে? কিন্তু সে নিজে থেকে এবার বললো,
~ আমি যে বাসায় ছিলাম সেই বাসা থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডে এসেছি তাই দেরি হয়েছে।

আমি হতবাক হয়ে ভাত চিবানো বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। মেয়ে বলে কি? মনে মনে ভাবলাম যে, নিজেকে খুব গরীব প্রমাণ করে সে আমার কাছে টাকাপয়সা চাইবে নাকি? নাহলে এমন কথা বলে কেন? কিন্তু চোখ দেখে সেটা তো মনে হচ্ছে না।

~ মেয়েটা বললো, টিকিট কাটার টাকা আমি ছোট মোবাইল বিক্রি করে যোগাড় করেছি। আমার এক বান্ধবীর কাছে ছিলাম কিন্তু মাস শেষ তাই ওর হাতেও টাকা ছিল না। তবে মনে হচ্ছিল সে ইচ্ছে করে টাকা দিতে চাচ্ছিল না, কারণ আমি বুঝতে পারছি।
~ বললাম, কিন্তু কেন?

~ সেটা নাহয় নাই বা জানলেন।
খাবার খেয়ে চা হাতে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি দুজনেই, আমাদের বাসের অন্য যাত্রীরা আমার আর মেয়েটার দিকে কৌতুহল নিয়ে তাকাচ্ছে। হয়তো ভাবছেন যে এরা এতো ঘনিষ্ঠ হলো এতো তাড়াতাড়ি?

কিন্তু আমার মনের মধ্যে জমানো প্রশ্ন গুলো যে কীভাবে করবো সেটাই বুঝতে পারছি না। আগে থেকে প্রশ্ন গুলো মনে মনে সাজাচ্ছি।
(১) মেয়েটা কোথায় গিয়েছিল?

(২) বান্ধবীর বাসায় থাকতেই যদি টাকার সমস্যা হয় তাহলে বাড়ি থেকে কল দিয়ে বিকাশে টাকা আনলো না কেন?
(৩) মেয়েটা কান্না করে কেন?
(৪) ছোট মোবাইল বিক্রি করেছে তাহলে কি তার বড় মোবাইল আছে? সেটা কোই? সেটা বিক্রি করে তো অনায়াসে যেতে পারতো।

(৫) মেয়েটা ধান্ধাবাজ নয়তো?
মনকে বললাম, “যদি জানতে চাও” তাহলে তুই অপেক্ষা করো, হয়তো জানতে পারবে।
~ সিটে বসে মেয়েটা বললো, আপনার কাছে এই রাতটার জন্য চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। এভাবে সবাই সবার উপকার হয়তো করে না।

~ ঠিক আছে সমস্যা নেই।
~ আপনি প্রথম যখন অনবরত প্রশ্ন করছিলেন তখন বিরক্ত লাগছিল। তবে এখন আর বিরক্ত লাগছে না তাই নিজের কাছে কথা বলতে ভালো লাগছে।
~ আমি শুধু হাসলাম।

~ আমি দুপুরেও কিছু খাইনি, যার কাছে ছিলাম সে গার্মেন্টসে চাকরি করে। সকাল বেলা ভাত রান্না করে সে এবং তার রুমমেট খেয়েছে, আমিও খেয়েছিলাম। কথা ছিল দুপুরের রান্না করে আমি যেন খেয়ে তারপর বাসা থেকে বের হই। কিন্তু তা হলো না।
~ কেন?

~ চট্টগ্রামে গ্যাসের সমস্যা, আমি বাসা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত গ্যাস আসেনি। বের হয়ে আসার সময় রুমের চাবি পাশের রুমে রেখে এসেছি, ওরা সবাই অফিসে তাই রাখতে হয়েছে।
~ আচ্ছা।

বাস আবারও চলতে আরম্ভ করলো, দুজনেই চুপ হয়ে বসে আছি। মেয়েটা একটু পরেই ঘুমিয়ে গেল, মনে আছে দীর্ঘ ক্ষুধার পরে খাবার খেয়ে শরীর এলিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর তার মাথাটা যখন আমার কাঁধের উপর পরলো তখন আমি কেঁপে উঠেছি। কিন্তু হাত দিয়ে সরাতে গিয়ে আবার হাত গুটিয়ে নিলাম, থাক, সে ঘুমাক।
রাত সাড়ে দশটা।

রাতের কুয়াশা ভেদ করে বাস এগিয়ে যাচ্ছে, এই একটু আগে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পেরিয়ে এখন বুড়িগঙ্গা পোস্তগোলার দিকে যাচ্ছি। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ডাটা চালু করলাম, সময় তো কাটাতে হবে।
মেসেঞ্জারে শফিক কতগুলো ছবি পাঠিয়েছে, তবে নেটওয়ার্ক সমস্যা তাই এখনো সো হচ্ছে না। আমি পিকচার সো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম, তবে ছবির নিচে টেক্সট আছে একটা। ছবি আসেনি এখনো কিন্তু টেক্সট পড়া যাচ্ছে।

শফিক লিখেছেঃ~ ” দোস্ত নতুন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সন্ধ্যা বেলা, কিন্তু মেয়েটা নাকি আমার জেলার মানে গোপালগঞ্জের। কিছু লোভনীয় স্ক্রিনশট দিলাম তোকে, আপাতত এগুলো দেখে রাত পার করো। আগামীকাল সকালে আসো তারপর পুরো ভিডিও দেখাবো, অসাধারণ।

টেক্সট পড়তে পড়তে পিকচার সো হয়েছে, একটা মেয়ের স্বাভাবিক ৬/৭ টা পিকচার এবং তিনটা পোশাক বিহীন পিকচার। পোশাক বিহীন পিকচার গুলো কোন ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট করা হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ছবিটি ভালো করে দেখতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে কেঁপে উঠলাম।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে,
মোবাইলের স্ক্রিনে যে মেয়েটা ছবি উলঙ্গ অবস্থায় আছে সেই মেয়েটাই আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। এটা কীভাবে সম্ভব? আচ্ছা সত্যি সত্যি এটা আমার পাশের সিটের মেয়ের ছবি তো?

আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তুললাম, সে ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলো। আমি আবারও ডাক দিয়ে বললাম,
~ ভালো করে দেখুন তো এই ছবিগুলো আপনার নাকি?

মেয়েটা সম্পুর্ণ সজাগ হয়ে গেল, আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। যেহেতু তার শরীর আমার শরীরের সঙ্গে মিশে আছে তাই অনুভব করছি যে সে কাঁপছে।

আর মোবাইল সে তার সামনে ধরার জন্য স্ক্রিনের আলো পরছে তার মুখের ওপর। সেই আলোতে দেখতে পাচ্ছি যে তার চোখ দিয়ে আবারও পানি বের হচ্ছে।
আমার দিকে মোবাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে হাতে ওড়না নিয়ে মুখ চেপে আবার কান্না আরম্ভ করলো। আর আমি ততক্ষণে যা বোঝার সেটা বুঝতে পারছি।

~ আমি বললাম, ছবি গুলো কে ছেড়েছে? আমার বন্ধু বলছিল যে একটা ভিডিও নাকি ভাইরাল করা হয়েছে। সেই ভিডিও অনলাইনে কে ছেড়েছে?
বাসের মধ্যে এই মুহূর্তে বেশিরভাগ যাত্রী ঘুমিয়ে আছে, কেউ জেগে নেই মনে হয়।

~ মেয়েটা কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বললো, এটা আমার বয়ফ্রেন্ডের কাজ। ওই করেছে এগুলো!
~ মানে..?
~ হ্যাঁ ভাই, ঠিকই বলছি। আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে নিঃশ্ব করে দিয়েছে, ভেবেছিলাম ভিডিও মনে হয় রাখবে কিন্তু সেটাও ছেড়ে দিল? এ কথা বলে সে আবারও কান্না করতে লাগলো।

~ আমি বললাম, আমি কি সবটা শুনতে পারি?
~ মেয়েটা মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বললো।
~ তাহলে বলুন।


পর্ব ০২

~ মেয়েটা বললো, ওর নাম মিজান। আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করি। মিজানের বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে, তবে এখন চট্টগ্রামে কোন একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। মিজানের মা~বাবা নেই বলে ওর প্রতি আমার ভালবাসা বেশি ছিল। যখন ও মা~বাবার জন্য মন খারাপ করতো তখন আমি ওকে অনেক শান্তনা দিতাম।

দুই বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের, ওর চাচাতো বোন আর আমি একসাথে পড়াশোনা করি। আর সেখান থেকেই আমাদের পরিচয়, আমার বান্ধবীর কাছে জানতে পারি যে মিজানের মা~বাবা নেই। মিজান সেবার শহর থেকে বেড়াতে এসেছিল আর আমি তখন আমার বান্ধবীর সঙ্গে তাদের বাড়িতে গেছিলাম।

তখনই মিজান আমাকে পছন্দ করে, তারপর সে আমার বান্ধবীর মাধ্যমে প্রপোজ করে। আমি সেই সময় কিছু বলিনি কিন্তু পরে আস্তে আস্তে তার একাকিত্বের কথা শুনে মায়া হলো। তারপর কোন এক পড়ন্ত বিকেলে আমি তার প্রেমের অভিনয়ে সাড়া দিয়ে ফেললাম।

জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল নিয়ে এগিয়ে চলছিল আমার জীবন। কিন্তু কিছুদিন আগে হঠাৎ করে আমার বিয়ে ঠিক করে আমার পরিবার। আমি সে কথা মিজানকে বললাম, মিজান আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে চাইলো। আমি সপ্তাহখানেক ধরে ভাবলাম, তারপর মিজানের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এবং আরেকটা ভুল।

বাড়ি থেকে বেশ কিছু টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম চলে এলাম একা একা। মিজান আমাকে চট্টগ্রামের কোন বাসায় না নিয়ে সরাসরি কক্সবাজার নিয়ে গেল। যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন বললো “বিয়ে আর হানিমুন একসাথে করবো। “
তবুও আমার কাছে ভালো লাগছিল না, কিন্তু ওর পরবর্তী কথা শুনে আর কিছু বলিনি।

মিজান বললো ” যেহেতু ভাঙ্গা মাস তাই এই মুহূর্তে নাকি বাসা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই চলতি মাসের এগারো দিন আমরা যদি কক্সবাজার থেকে আসি তাহলে নাকি এক তারিখ থেকে নতুন বাসায় উঠবো। ওর কথা বেশ পছন্দ হলো, বিয়ে করার সঙ্গে সঙ্গে যে এভাবে কক্সবাজারে যেতে পারবো ভাবিনি।

তাই ভালবাসার মানুষের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে ঘুমাতে কক্সবাজার চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে একটা রুম নিলাম, আমি ওকে বিয়ের কথা বলাতে ও বললো ” কাগজপত্র সব নাকি চট্টগ্রামে রয়ে গেছে, তাই চট্টগ্রামে ফিরে আমরা বিয়ে করবো। “

আমি বিশ্বাস করে নিলাম, তারপর আমরা বিয়ে ছাড়াই একই রুমে থাকতে লাগলাম। দুপুরে খাবার খেয়ে আমি মিজানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরি, যেহেতু একটা রাত ও একটা দুপ পেরিয়ে গেছে তাই ক্লান্ত শরীর জ্বলে যাচ্ছে। মিজানের বুকে মাথা রেখে সে এক পরম শান্তি মনে হচ্ছিল, যেটা কোনদিন ভুলবো না।

সন্ধ্যা বেলা আমরা ফ্রেশ হয়ে সমুদ্র দেখতে বের হলাম, গোধূলির আলোমাখা আকাশপটের সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার সময় যদি প্রিয় মানুষটা সঙ্গে থাকে তাহলে পৃথিবীর সকল সুখ খুঁজে বের করা যায়। ক্লান্ত তবুও আমার অনেকক্ষণ ধরে হাঁটাহাঁটি করলাম, রাতের খাবার খেয়ে রুমে যখন আসলাম তখন রাত সাড়ে দশটা।

রুমে ঢুকে আবারও দুজন একই বিছানায় শুয়ে পরলাম এবং আমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ভুল যেটা ইহকাল পরকালের শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। আমি জানি ওই পাপের প্রায়শ্চিত্ত এ জীবনে কোনদিন শেষ হবে না আর মৃত্যুর পরেও অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।

সেই রাতে আমাদের মধ্যে স্বামী~স্ত্রীর সর্বশেষ কর্ম সম্পন্ন হয়ে গেল। এবং আমিও আমার এতদিনের আগলে রাখা ইজ্জত তুলে দিলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতাম মিজান আমাকে ঠকাবে না। আটদিন আমরা হোটেলে ছিলাম, এরমধ্যে মিজান আমার সঙ্গে কখনো দিনে কখনো রাতে অবৈধ কাজটা করে গেল। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা কিন্তু সত্যি বলছি, প্রথম দিনের পরে প্রতিবারই ওটা করতে খুব খারাপ লাগতো।

কিন্তু মিজানের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারি নাই, তাছাড়া কাকে বলবো? ওর জন্য তো আমি সবকিছু রেখে এসেছি। তাই মনের মধ্যে প্রতিবাদ আসলেও সেটা কখনো মুখে প্রকাশ করিনি। আমি ওকে যখন বলেছিলাম যে চাকরির ক্ষতি হচ্ছে না তোমার? মিজান বললো ” সে নাকি ছুটি নিয়েছে পনের দিনের জন্য, বিয়ের কথা বলে নাকি সে ছুটি নিয়ে এসেছে। “

আটদিন পরে আমি দুপুরের খাবার খেয়ে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। মিজান তখন বাইরে গেল কারণ কি নাকি কাগজপত্র ইমেইল করতে হবে নাকি এমন কিছু একটা।

ঘুম থেকে উঠে দেখি মাগরিব হয়ে গেছে, তখন মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি মিজান দুইবার কল করেছে আমাকে। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে কলব্যাক করলাম, তিনবার কল দেবার পরে রিসিভ করে মিজান যেটা বললো সেটা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

মিজান বললো ” মিথিলা আমি চট্টগ্রামে চলে যাচ্ছি, তোমার সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। তুমি তোমার সবকিছু নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাও, আর তোমার মা~বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে সংসার করো। আমার সঙ্গে কাটানো এই মুহূর্ত গুলোকে স্বপ্ন ভেবে ভুল যেও, তুমি যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারবে ততই লাভ।

আর এসব নিয়ে কারো সঙ্গে অভিযোগ করতে যেও না এমন কি আমার চাচাতো বোন মানে তোমার বান্ধবীর কাছেও নয়। যদি বেশি বাড়াবাড়ি রকমের কিছু করো তাহলে কিন্তু তোমার ওই ফুটফুটে দেহটির সঙ্গে আমার খেলাধুলা ভাইরাল হবে। কারণ আমি তিনটা ভিডিও বানিয়ে নিয়েছি তোমার অজান্তে। “

চোখ মেলে যখন তাকালাম তখন গভীর রাত হয়ে গেছে, ধড়ফড়িয়ে উঠে বিছানায় বসে অনেক চিৎকার করে কান্না করলাম। বারবার মিজানের নাম্বারে কল দিলাম। কিন্তু নাম্বার বন্ধ করে দিছে।
রুমের মধ্যেই আত্মহত্যা করতে চাইলাম কিন্তু সাহস করতে পারি নাই।

সকাল বেলা হোটেলের ম্যানেজারের কাছে বকেয়া বিলের কথা শুনে চক্ষু চড়কগাছ। নিজের ব্যাগে সামান্য টাকা ছিল কারণ এ কদিনে সব শেষ, মিজান বলছিল যে মাস শেষ হয়ে এসেছে তাছাড়া নতুন রুমের জন্য অগ্রীম ভাড়া দিয়েছে।

তারপর কাঠমিস্ত্রীর কাছে নাকি খাট শোকেচ বানাতে দিয়ে ফেলেছে তাই টাকা নেই হাতে। আমি ভেবেছিলাম যে সবকিছু আমার জন্যই তো করেছে, তাই আমার নিয়ে আসা টাকা দিয়ে কদিন চললাম।

কিন্তু এখন আমি হোটেলের টাকা শোধ করবো কি ভাবে? বাধ্য হয়ে হাতের বড় মোবাইল বিক্রি করে লাঞ্ছিত হলাম কারণ ইতিমধ্যে হোটেলের লোক কিছু কিছু বুঝতে পেরেছে। হাতের ছোট মোবাইল আর খুচরা কিছু টাকা দিয়ে চট্টগ্রামে এলাম। এসে আমার ওই বান্ধবীকে কল দিলাম, তারপর ওর বাসায় গেলাম। আর সেখান থেকেই এখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

আপনারা পড়ছেন – ভালোবাসার গল্প কাহিনী।

সজীব সাহেব, পৃথিবীতে কে কাকে বিশ্বাস করবে? ভালবাসার কত নিখুঁত অভিনয় মানুষ করতে পারে তাই না? আমার জন্য নাকি বাসা ভাড়া করে রেখেছে, খাট~শোকেচ বানাতে দিয়েছে। আহারে জীবন, কত মিথ্যা ছলনায় হারিয়ে যায় হাজারো সত্যি সত্যি স্বপ্ন। মিথ্যার কারণে হারিয়ে যায় স্বপ্ন আর হারিয়ে যায় বিশ্বাস, অদ্ভুত জীবন।

আপনি হয়তো খুব ঘৃণা করছেন আমাকে, অথচ দেখুন সজীব সাহেব ” আপনার মতো একটা পুরুষকে বিশ্বাস করে কিন্তু আমি এমন। যদি তাকে বিশ্বাস না করতাম তাহলে কি ধোঁকা দিতে পারতো? এই দেশে আমার মতো শত মিথিলার বিয়ে হয়ে যায় মা~বাবার পছন্দের ছেলের সঙ্গে।

ফেসবুকে শত শত ছেলের হৃদয় ভাঙার স্ট্যাটাস চোখে পরে, যে মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেছে তার জন্য অভিমান পুষে রাখে মনে। মেয়েটা চলে যাবার পরে সবার সঙ্গে সে ভালবাসার গীবত করে, ভালবাসা মিথ্যা ছলনা বলে বেড়ায়। কিন্তু আমার মতো এভাবে যদি কারো জীবন হয়ে যায়? তাহলে?

স্তব্ধ হলাম মেয়েটার ঘটনা শুনে। বাস ততক্ষণে মাওয়া ঘাটে চলে এসেছে, বাসের সকল যাত্রী এক এক করে নেমে যাচ্ছে। ভাগ্য ভাল তাই সঙ্গে সঙ্গে ফেরি পেলাম, বাস থেকে যখন বাইরে নেমে আমি দাঁড়ালাম তখন বাহিরে বাতাস। শীতের রাতে নদীর মধ্যে বাতাস খুব মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।

মিথিলা মেয়েটা ওয়াশরুমের সামনে সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তাই আমি চলে এসেছি। এমন সময় শফিক আবার কল দিলঃ~
~ হ্যাঁ শফিক বল।
~ দোস্ত কতদূর?

~ মাত্র ফেরিতে উঠলাম, মনে আছে ফজরের ঠিক আগেই পৌঁছে যাবো।
~ খেয়েছিস কিছু?
~ হ্যাঁ কুমিল্লা হোটেলে ভাত খেয়েছি, আচ্ছা তুমি যে ভিডিওর স্ক্রিনশট দিলি সেই ভিডিও কোন আইডি দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে জানো?

~ না দোস্ত, কারণ আমাকে দিয়েছে আমার এক বন্ধু। কিন্তু কেন?
~ পরে বলবো।
~ দোস্ত প্রিন্সিপাল স্যার কল দিছিল আমাকে।
~ তারপর?

~ আগামীকাল আমাকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে, তারপর নাকি প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে হবে আমাকে।
~ আচ্ছা আমি আসি তারপর দেখি।
~ ঠিক আছে সাবধানে।

~ তুই কি ঘুমাবি?
~ আরে না, জলিল ভাই তাস খেলতে ডাকছে তাই তাস খেলতে যাবো।
~ ওহ্ আচ্ছা।

~ তুই ছাড়া তাস খেলতে ইচ্ছে করে না, তোর মত করে কারো সঙ্গে পার্টনার করে জিততে পারি না।
~ আচ্ছা আমি আসি তারপর ঠিক হবে।
~ হুম।

মোবাইল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ ঝালমুড়ি খেলাম, বাহিরে প্রচুর শীত তাই বাসের মধ্যে গেলাম। কিন্তু মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছি না, গেল কোথায়? একা একা কোথাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করছে নিশ্চয়ই? আচ্ছা এই মুহূর্তে তাদের গ্রামের মধ্যে যদি এটা ছড়িয়ে পরে তাহলে সে গ্রামে গিয়ে কি মুখ দেখাতে পারবে?

ফেরি কাঠালবাবি ঘাটে পৌঁছে গেল, কিন্তু মিথিলা কোথায়? ড্রাইভার বাস স্টার্ট দিয়ে ইঞ্জিন গরম করে নিচ্ছে। সামনের গাড়িগুলো এক এক করে তীরে উঠে যাচ্ছে কিন্তু সে কোথায়?
বাস ফেরি থেকে উঠে গেল কিন্তু তখনও তাকে দেখতে না পেয়ে আমি সুপারভাইজারকে গিয়ে বললাম,
~ ভাইজান আমার পাশের যাত্রী আসেনি।

~ সে বললো, মেডাম তো নেমে গেছে, আমাকে বলে গেল সে আর যাবে না।
~ কিন্তু কেন?
~ তা তো জানি না।

~ কিন্তু আমি তাকে ফেরির মধ্যে ওয়াশরুমের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।
~ কিন্তু আমাকে তো ফেরি ছাড়ার আগেই বললো যে জরুরী কাজে ঢাকা যেতে হবে। আগে জানলে নাকি ঢাকাতে নামতো, তাই সে নাকি এখর ঢাকা যাবে।

আমি আর বেশি তর্ক না করে সিটে গিয়ে বসলাম,
সত্যি সত্যি কি ঢাকা চলে গেছে? নাকি পদ্মার নদীর মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে নিজেকে? নিজেকে পাপিষ্ঠ ভেবে নিজের অনুশোচনায় পদ্মার পানিতে ধুয়ে নিচ্ছে পাপগুলো?

বাস চলতে আরম্ভ করলো, আমি চুপচাপ সিটের মধ্যে বসে আছি। অন্য সকল যাত্রী আবারও মনে হয় ঘুমের মধ্যে হারাবে, কিন্তু আমি কি ঘুমাতে পারবো? মিথিলার বলা শেষ প্রশ্ন গুলোর জবাব দিতে পারিনি।

সত্যিই তো।

হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে সবাই নাকি বিপরীত মানুষের প্রেমে পরে। যিনি সত্যি সত্যি ভালবাসে তিনি ধোঁকা খায়, আবার যে অভিনয় করে, তাকে অপরজন হয়তো মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসে কষ্ট পাচ্ছে। “

জীবন এক রহস্যময় বস্তু, সেই রহস্য জানতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু পারবো কি?

জীবন এক বিরক্তিকর অধ্যায়, তবুও পরবর্তী পৃষ্ঠার মধ্যে ভালো কিছু থাকবে বলে আমরা তো প্রতিনিয়ত পাতা উল্টাই।

লেখা – মোঃ সাইফুল ইসলাম (সজীব)

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “যদি জানতে চাও – Valobasar Golpo Kahini” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – মিস বাড়িওয়ালী – ঘরের কোণায় চুটিয়ে প্রেম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button