শিক্ষণীয় গল্প

বউ শাশুড়ীর ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত

বউ শাশুড়ীর ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত: মা’রে তুই আমার একমাত্র ছেলের বউ। তোর আসার পর ছেলেকে হারানোর ভয় চেপে বসেছিল। আমিও চাই শিক্ষিত মেয়ে আমার বউ হউক কিন্তু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম শিক্ষিত মেয়েটা আমার …


মূলগল্প

বিয়ের পর যখন শেফার পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমেই পরিবার থেকে বলে উঠল, বিয়ের পর কিসের পড়ালেখা? পড়ালেখা করিয়ে বউকে দিয়ে চাকরি করাবি না কি?
আবার বেশি শিক্ষিত করাতে গিয়ে অন্যকে নিয়ে পালিয়ে না যায়!

অতি শিক্ষিত মেয়েকে দমিয়ে রাখতে পারবি তো? আর চুপ থাকতে পারিনি, বললাম- ওকে কি দমিয়ে রাখার জন্য বিয়ে করেছি?
পড়ালেখা কী চাকরি করার জন্য? কম শিক্ষিত মেয়েরা অন্যকে নিয়ে পালিয়ে যায় না?
সাথেসাথেই মা বোন বলে উঠলো, দেখব কী করে? এত লাই দিয়ে মাথায় তুলিস না।

  • কিন্তু মা শেফা পড়ালেখা শেষ করতে চায়।
  • যেটা ওর বাবা মা করেনি সেটা তোকে করতে হবে কেন?
  • ওর বাবা মা করেনি বলেই তো আমাকে করতে হবে।
  • তো ঘরের কাজ কে করবে শুনি?
  • বিশ্বাস কর মা, শেফাকে শুধু কাজ করার জন্য বিয়ে করিনি, আমি চাই না তুমিও এত কাজ কর। তাই বারবার বলেছি এই বুয়া বাদ দিয়ে পার্মানেন্ট বুয়া রাখ। কিন্তু তুমিই তো শুনলে না। মা, সবাই মিলেমিশে কাজ করলে কাজ বেশি মনে হয় না।
  • ঘরের কাজ কীভাবে করতে হবে সেটাও তোর থেকে শিখতে হবে?
    তোর টাকা আছে বলে তুই বুয়া দিয়ে কাজ করিয়ে বউকে মাস্টারনি বানাতে চাস, টাকা না থাকলে কি করতি?
  • সবকিছুর একটা ব্যবস্থা হয়ে যেতো। তখন আমিও হেল্প করতাম।
  • বাহ! বাহ! চমৎকার! যেই ছেলেকে আমি কোনদিন এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে দিইনি সেই ছেলেই নাকি বউকে মাস্টারনি বানানোর জন্য ঘরের কাজ করব।
    আমি মায়ের সাথে আর তর্ক করতে চাইলাম না। শুধুশুধু মাকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানে হয় না। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। শেফার পড়ালেখায় যেন কোন ডিস্টার্ব না হয় বাসায় পার্মানেন্ট বুয়ার ব্যবস্থা করলাম।

শেফাকে বললাম,

  • তোমার সব কিছুতে আমি তোমার সাথে আছি ইনশাআল্লাহ থাকব। তুমি শুধু প্লীজ একটু ধৈর্য ধরবে। মা তোমাকে বকা দিলে প্লীজ চুপ করে থেকো।
  • ইয়াসির চিন্তা করোনা তুমি কী বলতে চাচ্ছ বুঝতে পেরেছি। ইন শা আল্লাহ নিরাশ করব না। আর এতদনে অন্তত এতটুকু বুঝতে পেরেছি মা বকা দিলেও মায়ের মনটা খুব ভাল।
    তুমি শুধু দোয়া কর আল্লাহ যেন ধৈর্য দেন।

মা যেহেতু মাথা গরম মানুষ আর যেহেতু একটু অবুঝ টাইপের তাই চিন্তিত ছিলাম, শেফা যেহেতু এই বাড়িতে নতুন, মায়ের সবকিছু হ্যান্ডেল করতে পারবে তো। আমরা ভাই বোন মাকে বুঝতে পারি তাই মায়ের অবুঝপনায় মনে কষ্ট আসে না।

শেফাকে বললাম, কিছুটা সময় বের করে মাঝেমাঝে আম্মারকে (আমার বোনের ছেলে, থ্রীতে পড়ে। বোন আমাদের বাড়িতেই আছে) একটু পড়ানোর চেষ্টা করিও। যেহেতু আপা অসুস্থ তাই আম্মারকে পড়াতে একটু কষ্ট হচ্ছে। এই সুযোগে হয়তো মা বোনের মন জয় করা যাবে। আমি বলছি না, তাদের মন জয় করতেই হবে বা তুমি চাইলেই মন জয় করতে পারবে। এক ঘরে যখন আছি, থাকব সবাই মিলেমিশে থাকতে পারলেই জীবন সহজ হয় অনেকটা। তাছাড়া বুড়ো মানুষ কয়দিনই বা বাঁচবেন। বাবা তো চলেই গেলেন।

শেফা সানন্দে রাজি হয়ে বলল,

  • কেন নয়? আমি বাচ্চাদের পড়াতে ভালোবাসি।

এর পর থেকেই শেফা নিয়ম করে আম্মারকে পড়তে বসাত। লক্ষ্য করলাম, আম্মারকে পড়ানোর টাইমে মা শেফাকে কোন কাজে ডাকে না। আপাও শেফার সাথে এসে মাঝেমাঝে গল্প করে, যা আগে কখনো হত না।

আম্মার যখন পরীক্ষায় আগের চেয়ে ভালো করল। আমি মাকে আরেকটু বুঝানোর সুযোগ পেয়ে গেলাম, বললাম,

  • দেখো না মা, আম্মারের রেজাল্টের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, শেফা যদি পড়াতে না পারত হয়তো মাস্টার দিতাম কিন্তু শেফার মত এত ভালোবাসা দিয়ে মাস্টার পড়াতে পারত? তেমনি আমার বাচ্চাদেরও শেফা পড়াবে ইন শা আল্লাহ। শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক হলো তার মা। তাছাড়া আপা যদি, শিক্ষিত না হতো আম্মারকে এত ভাল আচার আচরণ শিখাতে পারত?

মা কিছু না বললেও মায়ের চোখে প্রশান্তি দেখতে পেলাম। লক্ষ্য করলাম, আগে বুয়া সকালের নাস্তা রেডি করলেও মা শেফাকে ডাকত বা শেফাও ভয়ে কিচেনের দিকে চলে যেতো, সেদিন মা শেফাকে ডাকলই না আবার শেফা কিচেনে যাওয়ার পর মা ধমক দিয়ে বলল, এখানে আসার কি দরকার? রোমে থাকা যায় না? কাল থেকে এখানে আসার দরকার নেই। কাজ থাকলে আমি ডাকব।
বেচারি শেফা কিছু না বুঝে মন খারাপ করে রুমে চলে আসল। বললাম,
মন খারাপ করো না, আমার মা’টা এমনি, আদরও করে বকা দিয়ে।
শেফার প্রতি মা বোনের ভালোবাসা দেখলে আমার মন ভরে উঠে।

শেফার ইন্টার ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমি অন্য এক মা’কে দেখেছিলাম। শেফার পড়ার যেন ডিস্টার্ব না হয়, এক মুহুর্ত সময়ও যেন নষ্ট না হয় মা শেফার খাবারটাও রোমে পাঠিয়ে দিত। ঠিক যেভাবে আমার আর আপুর পরীক্ষার সময় করত। আসলে মা এমনই হয়। মা সহজে ভালোবাসা দেখাতে জানে না, কিন্তু জানি মায়ের মন পরে থাকে আমাদের কাছে। শহরের বাইরে যেতে হলে, কয়েকদিন থাকতে হলে, মা কোনদিন ফোন দিয়ে জিজ্ঞাস করতেও জানে না, কেমন আছিস বাবা?

কিন্তু আমি জানি জানি মা পথ চেয়ে আছে আমি কখন ফিরব। আশা করে থাকে কখন কল দিব। বউ শাশুড়ীর ভালোবাসা চলবে।

যাক, যেদিন শেফার রেজাল্ট বের হল, মা জনে জনে আত্মীয় স্বজনদের কল দিয়ে বলে যাচ্ছে দেখ আমার বউমা এ প্লাস পেয়েছে। যেমন আমার রেজাল্টের সময় করেছিল

এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হল, শেফা মাকে সালাম করেই হাউ মাউ করে কেঁদে দিল বলল,
মাকে হারিয়েছি সেই ছোট বেলায়, মায়ের আদর কী জিনিস পাইনি। আপনার মধ্যেই মাকে খোঁজার চেষ্টা করতাম। যখনই আপনার মধ্যে মা’কে পেতাম খুশিতে কেঁদে দিতাম। ভাবতাম মা বুঝি এমনই হয়। তাহলে শাশুড়ী কী রকম?

মাও শেফাকে জড়িয়ে ধরল, বলল,

  • মা’রে তুই আমার একমাত্র ছেলের বউ। তোর আসার পর ছেলেকে হারানোর ভয় চেপে বসেছিল। আমিও চাই শিক্ষিত মেয়ে আমার বউ হউক কিন্তু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম শিক্ষিত মেয়েটা আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিবে না তো? মা’রে মনে কষ্ট নিস না, তোকে অযথা অনেক বকেছি। তুইও আমারই মেয়ে, আর আজ থেকে মা নেই এই কথাটা বলবি না। আমিই তোর মা। এই ইয়াসির আজ থেকে আমার বউমাকে আমি ছাড়া অন্য কেউ যেন না বকে! আর ওর ভার্সিটির ভর্তির ব্যবস্থা কর।

কী অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য! হয়ত আগে কখনো কেউ দেখেনি।

লেখা- নিলুফা নিলো

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “বউ শাশুড়ীর ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – উপহার – বিয়ের প্রথম রাত এ স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!