শিক্ষণীয় গল্প

জননী কেঁদে যায় রাতভর – অসাধারন শিক্ষনীয় গল্প

জননী কেঁদে যায় রাতভর – অসাধারন শিক্ষনীয় গল্প: আমার বংশের বাতি জ্বালাবার জন্য ছেলে সন্তানের প্রয়োজন। তুমি কোনদিন ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারবা না। ছেলে সন্তানের জন্য আমার ছেলেরে আরেক বিয়া করাইতে হইবো। বুঝছো?


১ম পর্ব

পর পর দুটো মেয়ে হয়ে গেল আমার। এবার আবার কনসিভ করেছি আমি। কনসিভ করেছি শুনেই আমার শাশুড়ি মা সকাল বেলা তার কাছে ডেক নিলেন আমায়। তারপর মুখ কুঁচকে বললেন, বউমা, শুনছি আবার নাকি পেট বাঁধাইছো?

শাশুড়ি তো মায়ের মতই।

খ থেকে এমন ধরনের কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগে না। তিনি ইচ্ছে করলেই তো কথাটা সুন্দর করে বলতে পারতেন! তবুও আমি কোমল গলায় বললাম, জ্বি মা কনসিভ করেছি।

এবার শাশুড়ি মা উদাস গলায় বললেন, এইবারও কী মেয়ে সন্তান জন্ম দিবা?

আমি চোখ নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, মা, সন্তান দানের মালিক তো আল্লাহ। আমি তো জানি না আমার কী সন্তান হবে!

মা রেগে গেলেন। আর রাগত স্বরে বললেন, শুনো বউমা, আমি হইলাম এক কথার মানুষ। এইবার যদি তোমার মেয়ে সন্তান হয় তাইলে কিন্তু তোমার লাইগা এই বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ। আমার ছেলে সন্তান চাই। বংশের উত্তারাধিকার চাই। উত্তারাধিকারী না পাইলে সোজা তালাক। এক দুই তালাক না। তিন তালাক!

মার মুখ থেকে এমন কথা শুনে আমার সারা শরীর জমে উঠলো ভয়ে। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম ওখান থেকে কোন ভাবেই আর নড়তে পারছি না। যেন মাটির সাথে চিরতরে আমার পা আটকে গেছে!

মা তখন ধমক দিয়ে বললেন, কী হইলো এইখানে খাম্বার মতন দাঁড়াইয়া আছো কেনো?
আমি চোখ ভরা জল নিয়ে মার সামনে থেকে দ্রুত পায়ে চলে গেলাম।

আর রাতে আমার স্বামী মিতুলকে বললাম, মিতুল, মা বলেছেন এবার যদি আমার মেয়ে সন্তান হয় তবে তিনি নাকি আর আমায় তোমার বউ করে রাখবেন না। ডিভোর্স দিয়ে দিবেন।

মিতুল আমার কথার ধারে কাছেও গেল না। সে বললো, রাত কত হয়েছে দেখ তো ঘড়িতে?
আমি সময় না দেখে বললাম, মিতুল, আমি তোমায় কিছু বলেছি!

মিতুল এবার রেগে গেল। রেগে গিয়ে বললো, আমার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই বলতে পারবে কিন্তু আমার মায়ের নেয়া ডিসিশনের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই বলতে পারবে না। বুঝেছো?

মিতুলের মতো উচ্চ শিক্ষিত এক ছেলের কাছ থেকে এমন মেরুদন্ডহীন মানুষের মতো কথাটা শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। ভাবতেও পারছি না মিতুল এই কথাটা এমন ভাবে নিবে!

আমার বিপদ ঘনিয়ে এলো আরো পরে। যখন চেকআপ করানোর পর জানতে পারলাম আমি এবারও মেয়ে সন্তানের মা হতে যাচ্ছি। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছিলাম মার সাথে। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে হাসি মুখে বললেন, খুশির সংবাদ আছে। বলুন আলহামদুলিল্লাহ।

আমি আলহামদুলিল্লাহ বললেও মা আলহামদুলিল্লাহ বললেন না। মা শুধু জানতে চাইলেন কী সন্তান হবে।
ডাক্তার মিষ্টি করে হেসে বললেন, মেয়ে সন্তান।

মেয়ে সন্তান হবে এই কথা শুনে আমার শাশুড়ি ঝটপট ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে আমায় বললেন, মাগো, সন্তান দানের মালিক আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করছেন এইবার তোমার মেয়ে সন্তান হইবো।

এবং এই খবর শুইনা তোমার শাশুড়ি তোমারে তালাক দিবে! তালাক দেয়াটাও মালিকের ইচ্ছা। তার ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়াচড়া করার বল পায় না।

মার কথা শুনে আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপছি। কী করবো না করবো বুঝতে পারছি না। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

মা বললেন, সব আল্লাহর ইচ্ছা। কান্নাকাটি কইরো না মা। তোমার দুঃখ দেখে তোমার প্রতি আমি সামান্য দয়া করতে পারি। আমি তোমারে আমার ছেলের জন্যই রাখতে পারি কিন্তু শর্ত আছে একটা। শর্ত হইলো আমার ছেলের অন্য বিয়েতে তোমার অনুমতি দিতে হইবো। অনুমতি না দিলে তোমায় আমি রাখবো না।

আমার বংশের বাতি জ্বালাবার জন্য ছেলে সন্তানের প্রয়োজন। তুমি কোনদিন ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারবা না। ছেলে সন্তানের জন্য আমার ছেলেরে আরেক বিয়া করাইতে হইবো। বুঝছো?

আমি ভয়ে অনবরত কাঁপছি আর হাত দিয়ে চোখের জল মুছেই যাচ্ছি। মার কথার কী জবাব দেয়া উচিৎ তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

আমার স্বামী মিতুল মা ভক্ত ছেলে। মা যদি বলে, এখন তোর বউরে তালাক দে, সঙ্গে সঙ্গে সে তালাক দিয়ে দিবে। তার মা যদি বলে তুই আরেকটা বিয়ে কর, সঙ্গে সঙ্গে সে আরেক বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে।

আমি কী করবো এখন বুঝতে পারছি না। এই প্রচন্ড শীতের সন্ধ্যায়ও আমার সমস্ত শরীর ঘামছে। আমি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই। এক হলো আমার স্বামী থেকে সেফারেট হয়ে যাওয়া আর দুই হলো ওর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়া। কোনটা করবো আমি?আসলে কোনটা করা উচিৎ আমার?


২য় পর্ব

আমি কাঁদতে লাগলাম। আর কাঁদতে কাঁদতেই বললাম, মা, আপনি কী আমায় তিনটা দিন সময় দিতে পারবেন দয়া করে?

মা খানিক সময় চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, দিতে পারি। কিন্তু এরপর আর কোন আবদার করা যাবে না আমার কাছে।

আমি বললাম, আর কোন আবদার করবো না আমি।
মা বললেন, ঠিক আছে। আসো এখন বাসায় যাই।

আমি বললাম, না মা আপনি বাসায় যান। এই তিনটা দিন আমি আমার ভাগ্য খুঁজবো। আমাকে এখন বেরুতে হবে।
মা বললেন, যদি কোন আপদ বিপদ হয় তাইলে কিন্তু এর মধ্যে আমার ছেলে আর আমি নাই! তুমি নিজের ইচ্ছায় যাইতেছো কিন্তু!

শাশুড়ির কথাটা শুনে বুঝলাম তিনি মনে মনে চাইছেন আমি বিপদেই পড়ি। যেন আমার কিছু একটা হয়ে গেলেই তার মঙ্গল!

তিনি রিক্সা করে বাড়ির পথ ধরলেন। আর আমি ধরলাম বাবার বাড়ির পথ। এই আঁধারের রাতে ভারী শরীর নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফুটপাত ধরে হাঁটছি আমি। প্রচন্ড শীত। সেই শীতে ঠকঠক করে কাঁপছি।

আমার মেয়েরা জানে না হয়তো তাদের জননী কতো বড় বিপদে পড়েছে। তারা জানে না তাদের জননী রাতভর রোদন করে কাঁদবে আজ।

বাড়িতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই মা দরজা খুলে দিলেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, এতো রাতে এই শরীর নিয়ে একা একা তুই?

আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম, মা, মিতুলের মা আমায় ডিভোর্স দিতে চায়। আর মিতুলও এতে রাজি। তবে তার দ্বিতীয় বিয়ে যদি আমি মেনে নেই তবে তারা আমায় রাখবে!

মা শুনে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, এটা কী মগের মুল্লুক নাকি!

ভাইয়া শুয়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এলেন। সাথে ভাবীও। ভাইয়া এসে বললেন, মিতুলটা মার সব কথাই শুনে। ওই হারামজাদাটা মেরুদন্ডহীন। কাপুরুষ একটা।

ভাবী আমার হাত ধরলেন। বললেন, ভয় পেয়ো না তুমি। আমরা আছি। তুমি মেয়ে দুটি নিয়ে এখানে এসে পড়ো। ওরা ডিভোর্স দিয়ে দিক। এতো কিছুর পরেও ওখানে থাকার কোন প্রশ্নই আসে না।

ভাইয়াও বললেন, তুই কাল তোর মেয়েদের নিয়ে এখানে এসে পড়। ওখানে থাকার কোন মানে হয়না!
আমি বললাম, আচ্ছা।

পরদিন সকাল বেলা আবার গেলাম মিতুলদের বাড়ি। গিয়ে দেখি মা বাসায় নেই। আমার দুই মেয়েও বাসায় নেই। আমি অবাক হয়ে মিতুলকে জিজ্ঞেস করলাম, জুঁই, কনকা ওরা কোথায় গেছে?

মিতুল বললো, ওর দাদির সাথে নতুন মা দেখতে গেছে।
মানে?

আমার জন্য বউ দেখতে গেছে।
আমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, কোন সাহসে তোমার মা আমার মেয়েদের নিয়ে ওসব নষ্টামি করতে গেল?
মিতুল চেত করে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। আর বললো, মেয়েগুলো কী তোর নাকি রে?

আমি বললাম, হ্যা আমার। এই মেয়েদের জন্যই তুমি আমায় ডিভোর্স দিচ্ছো।

মিতুল বললো, এই মেয়েদের জন্য তোকে ডিভোর্স দিচ্ছি না। তোকে ডিভোর্স দিচ্ছি তোর শুধু মেয়ে সন্তান হয় এই দোষের কারণে।

দোষটা আমার নয়, দোষটা তোমার!

মিতুল খ্যাক করে হেসে উঠলো। হেসে বললো, নতুন বউটা আসুক শুধু। দেখবি বছর বছর ছেলে সন্তান দিবে। তখন বুঝবি দোষটা কার ছিল!

আমি মিতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, এই ছেলে নাকি আবার উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে!

জুঁই আর কনকাকে নিয়ে ওর দাদি ফিরে এসেছে। ওরা এসেই আমার কাছে বললো, মা, বাবা আরেকটা বিয়ে করবে। খুব মজা হবে তাই না?

আমি ওদের কাছে টেনে নিলাম। আর ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, আহারে আমার অবুঝ সন্তানেরা। ছোট মানুষ। বাস্তবতা বিষয়টা ওরা বুঝে না!

আমাকে ওদের আদর করতে দেখে মিতুলের মা এসে বললো, মেয়েদের কাছে ফিসফিস করে কী কথা লাগাচ্ছো?দাদি আর বাপের কাছ থেকে ওদের কেড়ে নিতে চাও?

আমি বললাম, আমার সন্তান আমি তো সাথেই নিয়ে যাবো। এতে ফিসফাসের কী আছে এখানে?
মিতুলের মা মুখ ভেঙচিয়ে বললেন, বাপের বেটি হলে নিয়ে যাস দেখি। তোর টেং যদি তখন না ভাঙি আমি এক বাপের পয়দা না!

মিতুলের মা কিছুতেই মেয়েদের আটকে রাখতে পারলেন না। তিনি জোর জবরদস্তি করলেন। মেয়েদের ঝাপটে ধরে রাখতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। মেয়েরা তার হাতে চিমটি কেটে, কামড়ে ধরে ছুটে এলো। আর চিৎকার করে বলতে লাগলো, আমরা মায়ের সাথে যাবো। এখানে থাকবো না। কিছুতেই থাকবো না।

তুমি একটা পঁচা দাদু। সারাদিন শুধু মায়ের নামে পঁচা পঁচা কথা বলো। তোমায় আমরা ঘেন্না করি!

মেয়েরা আমার সাথে তার মামার বাড়িতে চলে এলো। ওর দাদি শেষ বেলায় বলে দিলো শুধু, দেইখা নিবো আমি তোরে। আর তুই যে মেয়েদের নিয়ে কীভাবে চলবি তা ভালো করেই জানি। নটিগিড়ি ছাড়া ভাত জুটবো না কপালে।

আমার আদরের নাতনী গুলারেও তোর মতন নটি বানাবি রে হারামজাদি!

এই নষ্ট মহিলার নষ্ট কথা শুনার ইচ্ছে আমার নাই। তাই ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আমি চুপচাপ একটা রিক্সা করে মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে এলাম।


৩য় পর্ব (অন্তিম)

আমি মনে মনে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম ভাবী হয়তোবা অতসব ঝামেলা সহ্য করবে না। আমাদের প্রতি বিরক্ত হবে। রাগ দেখাবে। খারাপ আচরণ করবে। আর ভাইয়াও তার সাথে সাথে তাল মিলাবে!

কিন্তু এমন কিছুই হলো না। জুঁই আর কনকা হয়ে গেল ভাবীর পরম বন্ধু, খেলার সাথী। ভাবী ঘরের কাজ গুছিয়ে ওদের নিয়ে উঠোনের পেয়ারা গাছের তলে বসে পুতুল বিয়ে খেলে, চড়ুইভাতি খেলে। ঠাকুরমার ঝুলির গল্প বলে।

কখনো কখনো এমন সব জোকস্ বলে যে জুঁই কনকা দুই বোন হাসতে হাসতে কুটি কুটি হয়।

আর আমি ভয় পেতে থাকি মনে মনে। না জানি কখন আমাদের দুর্দিন আবার এসে যায়! আর উবে যায় আমাদের এইসব সুখের দিন!

মিতুলের মা হঠাৎ একদিন আসে আমাদের বাড়িতে। ডিভোর্স পেপার নিয়ে এসেছে। আর এসেছে নাতনিদের নিতে। আমার মা এবার হুংকার দিলেন। বললেন, ভালোই ভালোই চলে যান বলছি এখান থেকে।

যথেষ্ট করেছেন। আর না!
মিতুলের মা বুঝতে পারলো অবস্থা ভালো না। তার ভালোই ভালোই কেটে পড়া ভালো। তাই সে খুব সাবধানে চলে যায়।

আবার মেয়ে সন্তান হয়েছে আমার। এই মেয়ে হতে অনেক ঝড় ঝামেলা গিয়েছে। হাসপাতাল বাড়ি অনেক দৌড়া দৌড়ি করতে হয়েছে। মার শরীর খারাপ থাকে সব সময়। তাই সব কিছু ভাবীই করেছে।

তিন চার রাত নিদ্রাহীন থেকেছে। তাছাড়া জুঁই কনকার দায়িত্ব তো আছেই। এই দুই মেয়ে এমন বাঁদর হয়েছে যে তার মামীর হাতে খাইয়ে না দিলে খাবেই না। মামী যদি গোসল না করিয়ে দেয় তবে গোসলও করবে না। আর মামী যত ব্যস্তই থাকুক তাদের দু বোনকে নিয়ে খেলতেই হবে। রাতে গল্প বলে বলে ঘুম পাড়াতে হবে।

মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবে। হাসপাতালে দৌড়া দৌড়ি করার সময়ও জুঁই কনকাকে ভাবী ঠিক ঠিক সময় দিয়েছে।

আমার ছোট মেয়ের নাম রেখেছে ভাবী সুখ।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ভাবী, এটা কোন ধরনের নাম? মানুষ কখনো এমন নাম রাখে?

রাখে। এই তো আমি রেখেছি। তোর মেয়ে তোর জন্য সুখ নিয়ে এসেছে। আমাদের প্রফেট সাঃ বলেন, যার তিন মেয়ে আছে তার জন্য তিনটা হেভেন ফিক্সড করে রাখা হয়েছে।

আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ।
ভাবী বললেন, আরেকটা সুখবর আছে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কী সুখবর?
ভাবী মুচকি হেসে বললেন, এখন বলা যাবে না। সময় হলেই জানতে পারবে।

সুখের বয়স যখন তিন মাস তখন হঠাৎ করে সুখবরটা শুনলাম আমি। ভাবীর এক চাচাতো ভাই যিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য জয়েন করা লেকচারার। তিনি এখনও বিয়ে করেননি।

বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছিলেন। ঠিক তখন ভাবীর কাছ থেকে আমার এমন দুর্দশার কথা শুনেন। শুনে তিনি বলেন আমি এই তিন সন্তানের পিতা হতে চাই!

সেই যুবকের নাম ফরহাদ। ফরহাদ সাহেব আজ আমাদের বাসায় এসেছেন। তিনি এসে ভাবীর কাছে বলেছেন, আমার যদি কোন অমত না থাকে তবে তিনি আমায় বিয়ে করতে চান। এবং তা আগামী শুক্রবারেই!
আমি ভাবীকে বললাম, উনার সাথে আমি একটু কথা বলতে চাই!
ভাবী বললেন, অবশ্যই।

আমি আর ফরহাদ সাহেব ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছি। মাথার উপর স্বচ্চ নীল আকাশ। সেই আকাশে একফালি রোদ চকচক করছে। দূরে একটা শাদা বক উড়ে যাচ্ছে। আর ছাদের কার্নিশে বসে আছে একটা নীল রঙা ফড়িং।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে এবার আমি তাকালাম ফরহাদ সাহেবের দিকে। তাকিয়ে ভীষণ অবাক হলাম।

দেশের নামকরা একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যার গায়ে থাকার কথা দামি স্যুট-প্যান্ট-টাই, যার গা থেকে বেরুনোর কথা ভুর ভুর করে দামি পারফিউম এর গন্ধ। যার গাল থাকার কথা টেনে টেনে সেভ করা। এসবের কিছুই পেলাম না তার চেহারাই। সে এক সাদামাটা মানুষ। গায়ে তার শাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা। মাথায় শাদা টুপি। গাল ভর্তি কালো কুচকুচে দাড়ি। চোখে সুরমা দেয়া। কী যে সুন্দর লাগে দেখতে। আমি ভীষণ ভীষণ অবাক হলাম।

এর আগে কখনো ভাবিনি পাঞ্জাবি পাজামা পড়া দাড়িওয়ালা একটা মানুষকেও এতো সুন্দর লাগে দেখতে!
ফরহাদ সাহেব আমায় এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে গলা খাঁকারি দিলেন।

আমি তখন লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে নীচ দিকে চোখ নামিয়ে বললাম, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই!
তিনি বললেন, শিউ্যর। জিজ্ঞেস করুন।

আমি বললাম, আপনি কেন আমায় বিয়ে করতে চান? আপনি তো আনমেরিড। আনমেরিড হয়েও কেন তিন সন্তানের জননীকে বিয়ে করতে চান? তাছাড়া আমার তিন সন্তানই মেয়ে। ওরা মেয়ে বলেই আমার ডিভোর্স হয়েছে। মেয়ে সন্তান নাকি অভিশাপ।

তো আপনি কেন জেনে বুঝে নিজের কাঁধে অভিশাপ তুলে নিতে চাচ্ছেন?
ফরহাদ সাহেব মৃদু হেসে বললেন, সমাজের মানুষকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিতে যে কন্যা সন্তান কোন অভিশাপ নয় বরং রহমত। আমাদের নবী সাঃ বলেন, যার তিনটি মেয়ে আছে তার তিনটি জান্নাত হয়ে গেল।

আমি তিন জান্নাতের পিতা হতে চাই!
ফরহাদ সাহেবের কথা শুনে আমার চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি।

ফরহাদ সাহেবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু সমস্যা হলো জুঁই কনকা দু বোনকে নিয়ে। ভাবী তো কিছুতেই দুই মেয়েকে ছাড়বে না। কিছুতেই না। ফরহাদ বললো, আমি মেয়েদের নিয়েই যাবো।

কিন্তু মেয়েরা যাবে না। তারা থাকবে তার মামীর সাথে। অবশেষে একটা বন্দুবস্ত হলো। মেয়েরা তার মামীর কাছেই থাকবে কিন্তু ওদের ভরণ পোষণের সব খরচা দেবে ফরহাদ। ভাবীর আর উপায় নাই। তাকে অগত্যা রাজি হতেই হলো!

দুটো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:-

সংবাদ – ১

বিয়ের তিন বছর পর আমার এক সন্তান হলো। সেই সন্তান ছেলে। ছেলের নাম তার বাবা রেখেছে আবদুল্লাহ। ছেলের চেহারা তার বাবার মতই। সুখ তার নতুন ভাই পেয়ে মহাখুশি। সে তার ভাইকে সারাদিন কোলে নিয়ে বসে থাকে।

সংবাদ – ২

মিতুল যে নতুন বিয়ে করেছিল সেই স্ত্রীর ঘর থেকেও এক সন্তান হয়েছে।

মেয়ে সন্তান। মিতুলের মা নাকি সেই স্ত্রীকেও তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লেখা – অনন্য শফিক

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “সমাপ্ত অসাধারন শিক্ষনীয় গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – চাঁদে বাসর – মজাদার প্রেমের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!