কষ্টের প্রেমের গল্প

শুষ্ক পাতার ভাজে (১ম খণ্ড) – valobasar golpo 2019

শুষ্ক পাতার ভাজে (১ম খণ্ড) – valobasar golpo 2019: তৃনা হাতটা মুঠো করে গুটিয়ে জানালার দিকে উদাস তাকালো। তবে কি সেও বড়লোক আর হ্যান্ডসাম দেখে প্রেমে পড়েছিল? ভালোবাসা কি এসব কারনে হয়? না এটা মানা যায় না। ভালোবাসা হলো মনের ব্যপার।


পর্ব ১

সাত বছর থেকে যাকে ভালোবাসলাম আজ সে আমার বোনের সাথে হোটেলের বিছানায় শুয়ে। এ দৃশ্যও যে আমাকে কখনো দেখতে হবে তা আমার কল্পনারো অতীত। কলেজের ছুটি পেয়ে কক্সবাজার দুই বোনে বেড়াতে এসেছি।

বিচ থেকে ঘুরে এসে হোটেলে নিজের রুমে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে তৃষার রুমের সামনে আসতেই দরজার এপাশ থেকে রুমের ভিতরের কোন ছেলের ভয়েজ শুনি।

দরজা নক না করেই ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যা দেখি তাতে আমার চোখ পুরো ছানাবডা। তৃষা শব্দ পেয়ে চমকে উঠে আমার দিকে তাকিয়েই। তারাহুরো করে শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। আমার পক্ষে এই দৃশ্য আর এক সেকেন্ড দাড়িয়ে দেখা সম্ভব না। এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে আসি আমি।

হটাৎ দরজার শব্দ পেয়ে তাকায় তৃষা। তৃনাকে দেখে রায়ান কে ধাক্কা দিয়ে উঠে বসে খুলে রাখা শার্টটা না পড়েই গায়ে জড়িয়ে নেয়। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। রায়ান রেগে উঠে বলে
শিট, ওমেন। ডোর লক করবে না? ওকে আমি লক করে আসছি।

তৃষার মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। রায়ানের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে রায়ান আপুতো সব দেখে ফেললো। এখন আপুর সামনে দাড়াব কোন মুখে? আপু যদি এখন সবাইকে বলে দেয়? উফফ এত্তোবড় ভুল কি করে করলাম আমি?

চিন্তায় দেহের ঘাম গুলো বরফের কনায় জমা হয়ে গেছে। রায়ান একরাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে দরজা লক করে এসে বলে
~ কাম অন বেবি। যে ইচ্ছে সে দেখুক আমার কোন যায় আসে না।

~ আপু ..আপু এসেছিলো। দেখে ফেলেছে আমাদের। বুঝতে পারছো তুমি!
~ আমি দেখি নি তোমার আপুকে ওকে? যা দেখার তা দেখেছেই। এবার চিল মুডে আমার কাছে আসোতো সোনা।

তৃষা রায়ানের ডাকে সাড়া না দেওয়াতে রায়ান রেগে উঠে যায়। শার্ট ফোন ওয়ালেট হাতে নিয়ে একবার তৃষার দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। তৃষা কি করবে এবার? ভাবতে ভাবতে কেদেই ফেলে। কি জবাব দিবে এবার জানাজানি হয়ে গেলে? টেনশনে নিজের মাথার চুল নিজেই ছিড়তে থাকে। এতো ঘৃন্য একটা কাজ করতে যাচ্ছিলো দেখে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেয়।

রায়ান কক্সবাজার ছিলো তাই তৃনাকে রাজি করিয়ে এখানে এসেছে সে। বিচে ঘুরতে যাওয়ার পর আনমনা তৃনা যখন তৃষার একহাত ধরে ঘুরছিলো তখন তৃষা আরেক হাতে ফোনে চ্যাটিং করছিলো রায়ানের সাথে।

তৃষা রায়ানকে বলে সেও এসেছে কক্সবাজার স্পেশালি তাকেই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যে। রায়ান এতোবড় সারপ্রাইজে অভিভুত হয়। প্রেয়সিকে দেখার জন্য মন ছটফট করছে জানায়। হোটেলের নাম শুনে তাড়াতাড়ি ব্যাক করতে বলে কারন পাশের হোটেলেই রায়ান আছে।

কিন্তু তৃনাকে নিয়ে গেলে তো রায়ানের সাথে দেখা করতে পারবে না। তাই তৃষা অনেক ভেবে তৃনাকে বলে
~ উফফ আপু এতো রোদ…আমার স্কিন পুড়ে যাচ্ছে। আর এখানকার খাবারে আমার পেটে প্রবলেম ও হচ্ছে। আমি আর হাটতে পারবো না। আমি হোটেলে ব্যাক করছি। তুমি বিচে থাকো। তারপর বিকালে সানসেটের সময় বিচে আসবো।

তৃনা তৃষাকে ভালোভাবে আপাদমস্তক দেখে অস্হির হয়ে বলে
~ বেশি প্রবলেম হচ্ছে তোর? আচ্ছা চল হোটেলে চলে যাই।
~ না না আপু তুমি থাকো। আমিই বরং যাই। তুমিতো ঘুরাফেরা খুবই কম করো। কখনো নিজেকে প্রকৃতিতে বিলিয়ে দিয়েছো একা?

আজ নিজেকে একবার বিলিয়ে দিয়ে দেখোইনা আপু। দেখবে সব কষ্ট ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। তৃনা সন্ধিহান চোখে তাকিয়ে তৃষার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
~ আচ্ছা ঠিক আছে। ট্যাবলেট খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নে। এমনিতেই কাল রাতে জার্নি করে এসেছিস রেস্ট নেওয়াই হয়নি তেমন। তোর কাছে না থাকলে আমার ব্যাগের সাইট পকেটে দেখবি স্যালাইন আছে গুলে খেয়ে নিবি‌।
~ আচ্ছা আপু।

রায়ানকে জানিয়ে দেয় সে আসছে।
সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের দিকে পা বাড়ায় তৃনা। তৃষা হোটেলে এসে রুমের সামনে এসে দাড়াতেই দেখে দুহাত ভাজ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে রায়ান। মুখে প্রসস্ত হাসি ফুটিয়ে এক দৌড়ে এসে গলা জড়িয়ে ধরে রায়ানের। রায়ান মাথাটা তুলে মুখটা সামনে নিয়ে ঠোটে চুমু দিতেই লজ্জা পেয়ে যায় তৃষা। নিচের দিকে চোখ গলিয়ে বলে
~ আমি এই রুমে আছি জানলে কি করে?

~ রিসিপশনে নেইম আস্ক করতেই বলে দিলো। দেন এখানে এসে মহারানীর জন্য ওয়েট করছি। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে তো পা তো ব্যথা হয়ে গেলো। এবার অন্দরে যাওয়া যাক।

রুমে এসেই রায়ান বিছানায় আধশোয়া হয়ে শোয়ে পড়ে। তৃষা দরজা লাগাতে গেলে বাধা দেয় রায়ান। কেন জিজ্জাসা করতেই বলে সারপ্রাইজ জানু। তৃষা সারপ্রাইজ কথাটা শুনে বেশি এক্সাইটেড হয়ে পড়ে। পা এগিয়ে রায়ানের পাশে গিয়ে বসে পড়ে।

কিছুক্ষনের মধ্যে হোটেল বয় একটা ট্রে নিয়ে আসে। রায়ান রিসিভ করে হোটেল বয়কে বকশিশ মিটিয়ে দেয়। তৃষা ট্রের দিক তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। ট্রেতে দুটো রেড ওয়াইন বোতল, দুটো গ্লাস, কয়েকটি লাল গোলাপ রয়েছে।

তৃষা তার ফ্রেন্ডদের থেকে শুনেছে তারা তাদের বিএফ এর সাথে মাঝে মাঝেই তারা ড্রিংকস করে। এতে নাকি ভালোবাসার সমস্ত ফিলিংস জড়িয়ে থাকে। আর এই ড্রিংস গুলো নাকি অনেক দামি আর অনেক টেস্টি। আজ কি সে এগুলো খাবে? মনে মনে আনন্দিতো হতে থাকে আবার ভয় ও হয়।

রায়ান গ্লাস এগিয়ে দিলে তৃষা হাতে তুলে নিয়ে বলে
~ এটা খেলে মাতাল হবো না? কোনো সাইড ইফেক্ট নেইতো? রায়ান তৃষার মুখের সামনে ঝুকে মুখে হালকা ফু দিয়ে বলে
~ মাতাল তো আমি হয়েই আছি সুন্দরী তোমার প্রেমে আরো হলে ক্ষতি কি? আর রইলো সাইড ইফেক্ট..সব দিক থেকেইতো তুমি ইফেক্ট করে আছো আর কি ইফেক্ট হবে বলো? কোন নেশা হবে না আমাকে বিলিভ করতে পারো।

তৃষা আরো লজ্জা পেয়ে যায়। নিচের দিকে মুখ করে নেয়। দুজনেই চিয়ারস বলে ড্রিংকস করতে থাকে। প্রথম দিকে খারাপ লাগলেও তারপর ভালোই খেতে লাগে তৃষার। গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে দুজনেই দুজনাতে ডুব দেওয়ার জন্য আকুল হয়ে যায়। অনেককিছু হয়ে যাবার আগেই তৃনা এসে তাদের এই নিষিদ্ধ অনুভুতির নিঃশেষ ঘটায়।
নিজের রুমে এসে ডোর লক করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তৃনা।

ধরনী আর কতো আমার সাথে প্রতারনা করবে। ভালোবাসায় এতো কষ্ট কেন আল্লাহ? যদি এতো কষ্টই থাকে তাহলে কেন দিয়েছিলে এ বুকে ভালোবাসা? নাকি একতরফা ভালোবাসায় এতো কষ্ট। এ দৃশ্য দেখার আগে আমার মরন হলো না কেন?
বিছানার চাদর জড়িয়ে কাদতে লাগলো। মনে মনে তৃষাকে ছি ছি করলো। এতো বড় হারাম কাজ কিভাবে করলো সে? তৃষা তৃনার ফুপির মেয়ে। ফুপা মারা যাওয়ার পর থেকে ফুপি আর তৃষা আমাদের বাসায় থাকে। সে হিসাবে তৃষা আর তৃনা অনেক বছর থেকে একসাথে আছে।

যদিও তৃষা তৃনার থেকে চার বছরের ছোট তবুও বন্ধুর মতোই দুজনে। দুজন মায়ের পেটের বোনের থেকেও বেশি। ছোট বোনের মতোই ভালবাসি তৃষাকে। দুজনের অনেককিছুই দুজনে শেয়ার করে। কিন্তু আজ যা দেখলো তাতে তৃনা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা। এতোদিন যাকে এতোটা যত্ম নিয়ে শিক্ষা দিয়ে ছায়াতলে বড় করলো আজ তার নোংরা চেহারাটা তাকে অবাকের থেকেও বেশি কিছু করে দিয়েছে। তৃষা সুন্দরী স্টাইলিশ আধুনিক মানা যায়।

রিলেশনে থাকবে সেটাও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ও এমন নোংরা কিছু করবে তা ধারনার অতীত। ফুপিকে কি জবাব দিবে সে? রায়ান চৌধুরীর মতো একজন প্লে বয় কি আদৌ বিয়ে করবে তৃষাকে? কখনোই না। এ তুই কি করলি তৃষা।

নিজেকে এতো সস্তা করে দিলি। আমি কি ভাবে সহ্য করবো এতো কিছু? আর কতো সহ্য করবো আমি? চোখের সামনে নিজের বোনের সাথে ভালোবাসার মানুষটিকে কিভাবে দেখবো আমি? যদিও এটি নতুন নয়। রায়ান …তুমি দুরে ছিলে দুরেই থাকতে.. কাছে এসে কেনো এতো পোড়াও আমায়? আমার বোনের সাথে রিলেশনে কেনো জড়াতে হলো তোমাকে? কেন?

চোখ মুছে উঠে দাড়ালাম। এ আমি হতে দিবো না। ওদেরকে আটকাতে হবে। নিজের রুম লক করে তৃষার রুমে এসে দেখি দরজা খুলা। ভেতরে গিয়ে দেখি ওভাবেই বসে কাদছে। আমাকে দেখেই লাফ দিয়ে নিচে নেমে আমার পা জড়িয়ে ধরে বলে
~ আপু আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আমি বুঝিনি এমনটা হবে। আমি আমার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি এতোটাও খারাপ নয় আপু তুমিতো জানো সেটা। আমি তোমার বোন আমাকে ক্ষমা করে দাও আপু।

মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। বোন আমার ঠিক আছে। ভাগ্যিস ভয়ংকর কিছু হয়ে যাওয়ার আগেই চলে এসেছিলাম। কিন্তু ঘৃনা লাগছে আমার সব কিছু। চোখ মুখ শক্ত করে বললাম
~ ছেলেটা কে?

তৃনা উঠে দাড়িয়ে বললো
~ হি ইজ রায়ান চৌধুরী। মাই বয়ফ্রেন্ড। আমি এবার সিরিয়াস আপু। আই লাভ হিম সো মাচ।
কথাটা শুনেই হাসি পেলো। আজকাল অনেককিছু শুনেই হাসি পায়। কিন্তু হাসলাম না। কারন হাসি পেলেও হাসতে ভুলে গেছি আমি।

~ -রায়ান চৌধুরী। কতো বছর থেকে চলছে রিলেশন? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি একটা ধরবে তো একটা ছাড়বে। এর জন্য তোমার সাথে না পেরে ফিজিক্যাল রিলেশন করা যাবে না এই শর্ত দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম তোমাকে। এভাবে সিরিয়াস হবে কারো প্রতি জানতাম না। কতোটুকু চিনো তুমি রায়ান চৌধুরীকে? যে তার প্রতি এতোটা সিরিয়াস হয়ে গেলে?

~ -আপু ও একজন বিজন্যাসম্যান। পাশাপাশি যখন যা ভালো লাগে সেই কাজেই ইনভল্ভ হয়। আমাদের দুই বছর থেকে রিলেশন। কিন্তু অনেক আগে থেকেই ভালোবাসি আমি তাকে। এখন আমি আর ও দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসি। আপু আমি সত্যিই ভালোবাসি। আমি তোমার মতোই পাগলের মতো ভালোবাসি।

~ আমার মতো তুমি হতে পারোনা তৃষা। চেষ্টা করো আমাকে ফলো করার বাট হতে পারোনি। তোমার আর আমার মাঝে অনেক পার্থক্য তার মধ্যে একটা পার্থক্য দেখাচ্ছি। এই মুহুর্তে আমিও যেখানে তুমিও সেখানে। আমার হাত পা মুখ ছাড়া পুরো শরীর ঢাকা আর তোমার গায়ে ..থাক আর না বললাম। একটা পরপুরুষের সামনে শার্ট পর্যন্ত যে খুলে দিতে পারো আজ তা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতামনা কখনো। ভেবেছিলাম তুমি বড় হয়ে গেছো মানুষ চিনতে শিখেছো।

কিন্তু না তুমি এখনো মানুষ চিনতে শিখোনি। যে ছেলে জিএফকে নিয়ে বিছানায় যেতে পারে সে অন্তত ভালো হতে পারে না। আল্লাহর অশেষ কৃপা যে আমি চলেএসেছিলাম নয়তো একটা ভুল সারাজীবন তুমাকে কাদাতো। তুমি ঐ ছেলের সাথে ব্রেকাপ করবে আজি।
~ ভুলতো আমারো ছিলো আপু শুধু ওর না। তুমি কি আমার ভালোবাসা মেনে নিতে পারছো না? আমাকে কি তুমার মতো সারাজীবন কাদতে বলতে চাও?
~ এটা তোমার মোহ তৃষা। ভালোবাসা নয়। আমার সাথে তুমার তুলনা হয় না কখোনোই।

~ এটা আমার ভালোবাসা আপু। আমি শুধু রায়ান চৌধুরীকে চাই। আমি তোমার মতো কাদতে পারবো না আপু। তুমি আমার বোন হয়ে আমাকে কাদাতে চাইছো আমার কষ্ট চাইছো এটা আজকের দিনটা না আসলে আমি জানতেই পারতাম না।
পুরো রাত দু বোনের মধ্যে কথা হয়নি। কথা ছিলো আজ রাতে দুজনেই সমু্দ্রের পাড়ে বসে কাটাবে। তারা ভরা আকাশের নিচে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে পা ভিজাবে আর চকলেট খাবে। কিন্তু দুজন দুজনের রুমে শুয়ে বালিশ ভেজাচ্ছে। দুজনের মনে দুজন মানুষের ব্যবহার ই ব্যথা দিচ্ছে।

তৃনার মনে তৃষার ব্যবহার দাগ কেটেছে আর অনেক বছর পর চেনা মানুষটাকে দেখে পুরোনো ব্যথা ফিরে ফিরে আসছে। তৃষা মেনে নিতে পারছেনা তার আপু তাকে ব্রেকাপ করতে বলছে তাকে কষ্টে দেখতে চায়। আর যাওয়ার পর থেকে রায়ান একটা বারের জন্যেও ফোন ধরেনি। রায়ান কি রাগ করে আছে? ও কি আর ফিরবে না তার কাছে? ব্রেকাপ হয়ে যাবে তাদের? এসব ভেবেই বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে বার বার।


পর্ব ২

ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে নেয় তৃনা। বেরিয়ে এসে তৃষার রুমের দরজায় কড়া ঘাত করতেই দেখে দরজা খুলা। এই মেয়েটা যে দরজা লক না করেই পুরো রাত কাটিয়ে দিয়েছে বুঝতে পারে। দরজা লক না করা তার একটা বদঅভ্যাস। তাই বলে বাসার মতো তো হোটেলে চলাচল করলে হয় না। ভিতরে ঢুকে দেখে বিভোরে ঘুমুচ্ছে বালিশে মুখ গুজে। তৃনা বুঝতে পারে তৃষা কেদেছে রাতে। কিছু হলেই ও বালিশে মুখ গুজে কাদে।

বাইরে থাকা কালীন ব্যাগে মুখ গুজে কাদে। শিয়রে এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে কয়েকবার ডাকতেই সাড়া দেয় তৃষা। ধুরমুর করে উঠে বসে তৃনার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বুকে হামলে পড়ে কাদতে কাদতে বলে
~ আপু বিলিভ কর ওর ব্যপারে আমি সিরিয়াস। আমি ওকে ছাড়া বাচবোনা। কাল থেকে আমার ফোন রিসিভ করে নি। রেগে আছে খুব। আমাকে ভুল বুঝে দুরে চলে গেলে এই জীবন আর রাখবো না আমি কিছুতেই না।
তৃনা শান্ত চোখে বোনকে দেখলো কিছুক্ষন। তৃষা যে সিরিয়াস সেটা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে। এই মুহুর্তে ওকে কিছু বুঝালেও বুঝবে না। কিন্তু এই অনিশ্চিত জীবনে বোনকে ঠেলে দিতে পারে না।

অপারগ মাথায় হাত রেখে বললো
~ তৃষা…তুমি রায়ান চৌধুরীকে ভালোবাসো এটা মেনে নিলাম। কিন্তু আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে রায়ান চৌধুরীকে তুমি পুরোপুরি চেনো না বা তার সবকিছু সম্পর্কে খুব কমই জ্ঞান আছে তোমার। এমন যদি হয় তার জীবনে অন্যকেউ থাকা সত্যেও তিনি তোমার রুপে মুগ্ধ হয়ে তোমাকে নিয়ে খেলছে কিন্তু তুমি বুঝতেও পারলে না তখন কি হবে? বোকামোর দন্ড সারাজীবন দিতে হবে তোমাকে।

~ আপু তুমি সব কিছুতেই একটু বেশি ভাবো। এমন কিছুই নয়। আর রায়ান চৌধুরী বড়লোক হ্যান্ডসাম তার পিছু তো মেয়েরা লেগেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এরকম ছেলে থাকলে সব মেয়েরাই পিছু লাগে।

তৃনা হাতটা মুঠো করে গুটিয়ে জানালার দিকে উদাস তাকালো। তবে কি সেও বড়লোক আর হ্যান্ডসাম দেখে প্রেমে পড়েছিল? ভালোবাসা কি এসব কারনে হয়? না এটা মানা যায় না। ভালোবাসা হলো মনের ব্যপার। চোখে সৌন্দর্য বা ভোগ বিলাসিতার ব্যপার নয়। তবে তৃষা ভুল করছে বিরাট ভুল করছে। উঠে দাড়িয়ে বললো
~ তৃষা আমার যতদূর মনে হয় তোমার ভবিষৎ তোমাকে কাদিয়েই ছাড়বে।

~ ভালোবাসায় কান্না ছাড়া সুখ আসবে না আপু তুমিই তো বলো।
~ আমি চাই তুমি ভালো ভাবে খুজ খবর নিয়েই তারপর সামনের দিকে এগোও। এ ব্যপারে আমার থেকে পূর্ন সাপোর্ট পাবে। সাথে সাথে দূর্ধর্ষ এক হৃদ যন্ত্রনা সহ্য করার জন্য তৈরী হও। আমি আবারো বলছি পরে আবার আমাকে বলোনা যে আমি তোমাকে সাবধান হতে বলিনি।

~ আপু আমি কাদবোনা তুমি দেখো। ওকে আমি প্রায় চার পাচ বছর থেকে চিনি। অনেক ভালো সে।
~ নামাযটা পড়ে নাও বলে আর দাড়ায় না তৃনা। নিজের রুমে চলে আসে।

বিচের সামনে ছাতার নিচে বসে ডাব খাচ্ছে তৃনা আর তৃষা। তৃষা লম্বা পাইপে একটা করে চুমুক দিচ্ছে আর ফোনে উকি দিচ্ছে। তৃনা আড়চোখে খেয়াল করেও না খেয়ালের মতো করে বসে আছে। তৃষা উশখুস করতে করতে শব্দ করে কোলের উপর ফোনটা রেখে তৃনার দিকে তাকালো। তৃনা ভ্রু কুচকে কি জিজ্জাসা করতেই তৃষা একরাশ হতাশ মুখে বলে
~ আপু এখনো কল দিলো না আমাকে। কি করবো বলোতো? পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।
~ তুমিতো কল দিতে পারো।

~ তুমিতো একটু আগে বলতে পারো। খুশি মনে কল দিতেই ওয়েটিং এ পায়। কিছুক্ষন পর আবার কল দিলেও ওয়েটিং এ পায়। এখন কান্না আসছে। কিন্তু ব্যাগ পাবে কোথায়? সাথে তো পার্স এনেছে। আপাদতো কান্না অফ থাক। তৃনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ~ তৃষা যদি কখনো জানতে পারো রায়ান চৌধুরী মেরিড পারসন তখন কি করবে তুমি? বা এর থেকে আরো বড় কিছু জানতে পারলে তখন?

~ এগুলো কিছুই নয়। আর যদি ভুলেও হয়ে থাকে তাহলে আমার মৃত্যু ঘটবে।
~ কথায় কথায় মরার কথা বলবেনা তৃষা। মনে হচ্ছে তোমার হেবিট হয়ে গেছে এটা। মরা এতো সহজ নাকি? কই আমিতো মরিনি।

চুপ হয়ে যায় তৃনা। মনে মনে পুষে রায়ান চৌধুরীর ব্যপারে পুরোটা জানলে তুমি একা একাই ঐ পথ থেকে চলে আসবে। এইটাই বিশ্বাস আমার। তবে ভয় হচ্ছে ঐ সময়ের কথা ভেবে যখন তুমার জীবন নরকের মতো লাগবে। কোন উল্টাপাল্টা কিছু না করে ঠিক থাকলেই হয়। হয়তো আমি আছি তোমাকে সামলে নেওয়ার জন্য।

পরদিন রওনা হয় ঢাকার উদ্দ্যেশে। বাসে উঠার পর তৃষা আবার ফোন দেয় রায়ানের নাম্বারে। দু দিন কন্টিনিউয়াসলি ফোন দেওয়ার পর আজ এইবার অবশেষে ফোনটা রিসিভ করে রায়ান। হ্যালো বলতেই তৃষার প্রশ্নের ঝুড়ি তে খই ফুটে
~ তুমি কেমন আছো? ফোন কেনো তুলছোনা? ফোন ওয়েটিং কেন? আমার উপর কি এখোনো রেগে আছো? আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? তুমিকি দেখা করতে পারবে এক্ষুনি?
~ স্টপ প্লিজ। আমি ঢাকার কাছাকাছি। চলে এসছি।

~ চলে গেলে একবারো বলে গেলে না ..। আচ্ছা রাখি বলে মন খারাপ করে ফোন কেটে দেয় তৃষা। চলে যাবে বললেই তো হতো। একসাথে গাড়ি করে যেতে পারতো প্রেম করতে করতে। আপুতো বন্ধুর মতো আমাদের দেখে কিছুই ভাবতো না। এখন আপুর মতোই বলতে ইচ্ছা করছে কেউ ভালুপাসে না। আনরোমান্টিক লোক একটা বলেই জিহ্বায় কামড় দেয়।

আনরোমান্টিক বললে দাহা মিথ্যা কথা বলা হয়ে যাবে। লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কি কান্ডটাই না করলো সেদিন হোটেলে। তৃষার এই লজ্জা মাখা মুখটা দেখে তৃনার বুকে চিন চিন করে ক্রমশ ব্যথা বেড়ে যায়। বোন যে তার মতোই একটা মস্ত বড় ভুল করছে সেটা ভেবেই চোখের কোনে জল চিক চিক করে উঠে। কিন্তু না সেই জল চোখ অব্দিই রয়ে যায়। চোখের জল তো শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই এখন কি আবার ভিজে উঠতে যাচ্ছে? না এই চোখ কে আর ভিজতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই না।

বাসায় পৌছতেই শিল্পি বেগম দরজা খুলে দেয়। উপরে বারান্দায় দাড়িয়ে রাস্তা পানে তাকিয়ে এতোক্ষন তাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলো। তিনটা দিন পর চাদমুখ দুটো দেখে মনটা ভরে যায়। ফ্রেশ হয়ে আসতে বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। রাস্তায় তৃষা কিছু খেলেও তৃনাযে খায় নি সেটা জানা তার।

বাইরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের হোটেলের খাবার একদমি পেটে সহ্য হয়না তার। বমি করে সব ফেলে দেয় তাই একগাদা চকলেট সবসময় ব্যাগে রাখে। তৃনা তৃষা উপরে গিয়ে পারুলের সাথে দেখা করে। পারুল মেয়ে আর ভাতিজিকে দেখেই বলে
~ লাস্ট পাচ ঘন্টা থেকে ফোন তুলছিস না। টেনশন আর কতো দিবি আমাকে। তৃষা পারুলকে জড়িয়ে ধরে বলে
~ আম্মু রাস্তায় ফোন বের করা নিশেধ আপুর কথা।

ফোন হাতে দেখলেই ছেসরা গুলো আশে পাশে চুক চুক করবে হাতানোর জন্য। দু বছর আগে যে আপুর ফোনটা নিলো মনে নেই তোমার? আহারে কতো ভালো ফোনটা ছিলো আর আমার কতো গুলো ওয়াও ওয়াও সেলফি কুলফি সব জলে গেলো। তৃনা চলে যেতে যেতে বলে আমি রুমে গেলাম। তৃষা ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে বের হতে নিলে পারুল বলে উঠে
~ সব সময় এতো আপু আপু করিস আবার এইটা বলে নিস না যে আপুর মতো আয়বুড়ো হয়ে মামার ঘাড়ে পড়ে থাকবো।

লামিয়া ঘুরে দাড়িয়ে বলে ~ আম্মু..আপু মামার ঘাড়ে পড়ে থাকেনা। আপু একজন প্রফেসর। নিজের টাকায় নিজে চলে আর এই বাড়িতে আপুর অধিকারেই থাকে। মামার ঘাড়ে তুমি আর আমি পড়ে আছি যদিও স্টাডি শেষ হলেই একটা কিছু করবো আর বিয়েও করবো।

~ আমিও আমার অধিকারেই এই বাড়িতে থাকি ভুলে যাসনা।
~ হা তবে চলো মামার টাকায়। মাসে মাসে মামা তোমার জন্য আলাদা ভাবে টাকা রাখে। তোমার স্বামীর তো একআনাও পাও নি।
~ তৃষা..আর একটা কথাও বলবিনা তুই।

তৃষা আর কথা বাড়াতে চায়না তাই ঘর ছেড়ে চলে আসে। নিচে এসে দেখে মনোয়ার হোসেন টেবিলে বসে আছে। তৃষা মনোয়ারের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে। মনোয়ার হাসি মুখে বলে
~ আমার মামুনির কেমন হলো সমুদ্র দেখা? ~ অসাধারন মামা। টুর টা দারুন ছিলো। আবারো যেতে চাই।
~ অবশ্যই যাবে। তবে আমার জামাই বাবার সাথে যাবে। পারুলকে নামতে দেখে বলে পারুল মামুনি ও আমার দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেলো। এবার তো বিয়ে দিতে হবে। ছেলে দেখা শুরু করি কি বলিস?

তৃষা লজ্জায় খেতেই পারছে না। পারুল চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, সেই ভালো হবে ভাইজান। আমিতো অনেক আগে থেকেই বলছি। বড় জনের বিয়ে না দিয়ে তো ছোট জনের বিয়ে দিতেই চাইলে না। পারলে নাতো …এতোদিন শুধু শুধু আমার মেয়েটাকে বসিয়ে রাখলে। বাপ ছাড়া মেয়ে যতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবে ততো তাড়াতাড়ি রেহাই পাবে।

~ এ কথা ভুলেও বলবিনা পারুল। তৃষা আমারো মেয়ে। আমি ওর বাবার দায়িত্ব কর্তব্য ভালোবাসা সবটা দিয়ে বড় করেছি। ওর বিয়েও আমিই দিবো। কারো জন্য তৃষার বিয়ে আটকে থাকবে না। কথাটা শিল্পির দিকে তাকিয়ে বলে হাত ধুয়ে চলে গেলো।

তৃষা খেয়ে তৃনার রুমে এসে বিছানায় বসে। ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের আওয়াজ আসছে। আওয়াজ বন্ধ হলে বলে
~ আপু আর কতোক্ষন লাগবে তোমার? আমি ডাইনিং এ তোমাকে তো পেলাম না। তাই খেয়ে নিয়েছি বড্ড ক্ষিধে লেগেছিলো। তৃনার কোন উত্তর না পেয়ে সেখানেই বসে থাকে। মিনিট দশেক পর তৃনা বের হয়ে বলে
~ সবাই খেয়ে নিয়েছে?
~ হুম।

~ আমিও খেতে যাবো। কাপড় গুলো ছাদে মেলে দিয়ে আসি।
~ তুমি গিয়ে খেয়ে আসো। আমাকে দাও। আমি নেড়ে দিয়ে আসি। ফুল গুলোও দেখে আসি কতগুলো গাছে কতোগুলো ফুটলো। আমাকে গগনার দায়িত্ব দিয়ে তো বেচেই গেছো। এতো গুলো গাছের এতো গুলো ফুল কিভাবে গুনতে তুমি বলোতো? আমি তো হাপিয়েই যাই। ধৈর্য্য আছে তোমার বলতে হবে। আচ্ছা আমি আসছি।

তৃষা বেড়িয়ে যেতেই তৃনা নিচে নেমে আসে। টেবিলে শিল্পীকে বসে থাকতে দেখে নিজেও বসে পড়ে। শিল্পি মেয়ের পাতে ভাত বেড়ে দিয়ে নিজের পাতেও বেড়ে নেয়। তরকারি নিয়ে খাওয়া শুরু করে। তৃনা শিল্পির দিকে তাকিয়ে বলে
~ আম্মু আব্বু খেয়েছে?
~ হ্যা।
~ ভাইয়া খেয়েছে?

~ বাইরে থেকে খেয়ে আসছে। ও আর বাসায় থাকে কতোক্ষন আর খায় কখন ..সব বাইরেই চলে তার।
~ আম্মু তোমাদের জন্য শাল কিনে এনেছি। উপজাতিদের হাতে বুনা। অনেক সুন্দর দেখতে। খেয়ে উঠো তারপর দেখাচ্ছি।
তৃনা ছাদে কাপড় মেলতে মেলতে ক্ষনে ক্ষনে হাসির আওয়াজ পায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। ফুল গুলো ছুয়ে ছুয়ে গুনতে গেলে আবারো আওয়াজ পায়। অনুসরন করে গুটি গুটি পায়ে পানির ট্যাংকের আড়ালে এসে উকি দিতেই দেখে রবিন ফোন কানে নিয়ে হাসছে আর বলছে ~ আমি কিন্তু কামড়ে দিবো।

তৃষার চোখ উপড়ে উঠে যায়। ধুপ করে সামনে এসে দাড়াতেই চমকে উঠে রবিন। ফোনটা হাত থেকে পড়তে গেলে ধরে ফেলে। কপাল কুচকে সন্ধিহান চাহনি দিয়ে বলে
~ ভাইয়া তুমি ট্যাংকের পিছনে লুকিয়ে ফোনে কাকে কামড়ানোর হুমকি দিচ্ছো? কামড় তো কুকুরে দেয়। তুমি তো মানুষ। ব্যপারকি ভাইয়া? তুমি কি বাই এনি চান্স জংঙি দলে নাম লিখিয়েছো?

রবিন পরে কথা বলছি বলে ফোন কেটে দিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাড়ায়। তৃনার মাথায় গাট্টা মেরে বলে ~ বুদ্ধু কথাকার। এতো এতো ছেলের সাথে প্রেমালাপ করতে পারো অথচ নির্বোধের মতো কথা বার্তা বলো। তুমার ব্যবস্থা করছি দাড়াও। ধরে বেধে এক ঘাটের জল খাওয়াবো এবার।
~ কেসটা কি? জুথিকা ভাবি? ওরে বাবা আমি এটাই বুঝলাম না। কিন্তু মানুষ জি এফ কে কিস দিতে চায় বাট তুমি কামড় দিতে চাইলে কেনো?

~ বিয়ের পরে যদি তোর জুথিকা ভাবি ননদ দুইটার সাথে কখনো মিসবিহেভ করে তাহলে তোরা কামড়ে দিবি সেটাই বলছিলাম। তোরা না পাড়লে আমিই কামড়ে দিবো।
~ ওমা তাই নাকি? এই সুযোগ টা কবে আসবে বলোতো ভাইয়া? জুথিকা ভাবী মিসবিহেব না করলেও জোর করে করাবো। দাতটা সার্প করতে হবে। একটা সার্প করা পেস্ট এনে দিয়তো ভাইয়া।

~ তোদের ব্যাপারটা কি বলতো? সেদিন তৃনা পেস্ট চাইলো আর আজ তুই..আমিতো এমনি এমনি বললাম জুথিকাকে কামড়ানোর কথা। সত্যি কামড়াবি নাকি?
~ বক বক না করে আমাকে ফুল গুনাতে হেল্প করো আসো। আপুকে আবার হিসাব দিতে হবে। তুমি এদিকটা গুনো। আমি ঐ দিকটা গুনি।

রবিন তৃষা বাগানের ফুল গুনতে থাকে। গুনতে গুনতে রবিনের চোখ পড়ে তৃষার দিকে। গোলাপ গুলোর মতো গোলাপিই মেয়েটার গায়ের রং। হাস্যজ্জল মুখটা দেখে বুঝার উটায় নেই ফুটন্ত গোলাপ কোনটা আর হাসন্ত মুখ কোনটা? সব যেনো মিলে মিশে একাকার।


পর্ব ৩

মাসুদ ফাইল হাতে খুলে দেখতে দেখতে কেবিনে ঢুকে পড়ে। রায়ানের সামনে ঘুরিয়ে এগিয়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। রায়ান ফাইল হাতে নিয়ে বলে
~ প্লিজ এখন বলিস না যে এইটা আমাকে চেক করতে হবে। বোরিং লাগে যাস্ট।
~ হুম কাজে তোর বোরিং ই লাগবে। ভালো তো লাগে শুধু মেয়েদের। একগাদা মেয়ের সাথে মন আদান প্রদান করে বসে আসিছ। আজকাল হোটেলে হোটেলে শরীর আদান প্রদান ও করছিস দেখছি।

রায়ান ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সাইন করে দেয়। মাসুদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে
~ রায়ান চৌধুরী কি করে না করে এইটা এতো তাচ্ছিল্য ভাবে বলতে হবে না তোকে দোস্ত। রায়ান চৌধুরী সব দিক ই সামলায়।
~ হা দেখলাম তো গত বছর সামির সাথে যে সমস্যাটা হলো লাভ করেছিলো তোকে সত্যি সত্যি।

~ হা সেজন্যই টেন লাখ হাতে পেয়েই আমার রাস্তা থেকে সরে গেছে। এরা শুধু রায়ান চৌধুরীর টাকাকেই ভালোবাসে রায়ান চৌধুরীকে নয়। রঙ্গমঞ্চে গিয়ে নিজেকে ওপেন করে টাকা লুটতে পারে। নিজেকে সব সময় সস্তা ভাবে আর একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে উপরে উঠতে চায়।

~ রায়ান কুল ইয়ারর… আমি বুঝতে পারছি তৃষাকে নিয়ে হাইপার হয়ে যাচ্ছিস।
~ ওকে আলাদা ভেবেছিলাম। কিন্তু না সেও নিজেকে সস্তাই ভাবে।
~ সবাই তো আর তৃনলতা হবে না তাইনা?

~ তৃনলতার সাথে কারো তুলনা করবিনা তুই।
~ ওকে করছিনা। আংকেল ফোন দিয়েছিলো। বাসায় ডেকেছে তোকে।
~ বাসায় যাচ্ছি না। ধানমন্ডি যাচ্ছি। ইমপর্টেন্ট মিটিং আছে।

~ হোটেলে নিশ্চয়! নাম কি এর?
~ ওহ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমার জি এফ দের নাম লিস্টের দায়িত্ব নিয়েছিস। ছোয়া নাম।
মাসুদ মিন মিনিয়ে টেনে টেনে বলে ছো…য়া…। প্রেমে ছোয়া। ওহ সরি। এটা হবে …. বলার প্রয়োজন নেই। মুখটা একটা পাপ থেকে হেফাজতে থাকুক।

দীর্ঘ পাচ দিন পর বাসায় ফিরেছে রায়ান। যদিও আরো লেইট করার কথা ছিলো প্রতিবারের মতো তবে এবার আগেই ফেরা হয়ে গেছে। বাসায় ঢুকেই ড্রয়িংরুমে রোহান চৌধুরীকে দেখে গিয়ে পাশে বসল। রোহান ভুত দেখার মতো চমকে উঠে স্ত্রী রোহানাকে জোর গলায় ডাকতে ডাকতে বলে ~ কই গো রোহানা কোথায় গেলে ..বাড়িতে আমাবস্যার চাদ এসেছে। দেখে যাও। তা জনাব আপনি হটাৎ কোথা থেকে উদিত হইয়া আমার বাসায় পড়িলেন।

রায়ান আড়চোখে একবার তাকিয়ে মোজা খুলতে খুলতে বলে ~ পাপা হেয়ালি করো না। তুমি ডেকেছিলে তাই এসেছি। নাহয় আসতাম না। এ বাসায় দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।

রোহান চৌধুরী ছেলের কাধে দু বার চাপড় দিয়ে বলে ~ আই নো পাপা। ভাগ্যিস এই বাড়িটায় তোর দাদুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে নয়তো আমিই তোকে বলতাম অন্য বাসায় শিফট করতে। আমার কাছে তোমার ভালো থাকাটাই মূখ্য।
~ আমার সাথে ফ্লাটে গিয়ে থাকতে কি হয় তোমাদের?
~ ঐ যে বললাম তোমার দাদুর স্মৃতি আমাকে বেধে রেখেছে।

~ তুমি দাদুর স্মৃতির টানে এ বাসায় আছো আমি কিন্তু তোমার স্মৃতির টানে এ বাসায় থাকবোনা বলে দিলাম।
রেহানা এক গ্লাস জুস এনে রায়ানের হাতে দেয়। রায়ান এক চুমুকে পুরোটা শেষ করে বলে ~ মম পাপা আই এম সো টায়ার্ড। একটু ঘুমোতে চাই। উঠছি।

রায়ান উঠে গেস্ট রুমে গিয়ে শরীর এলিয়ে দেয়। রাজ্য জুড়ে নেমে আসা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
রোহান রেহানা কিছুক্ষন থম ধরে বসে থাকে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে। রেহানাই মুখ ফুটে বলে ~ পাপা হয়ে ছেলের এমন অবনতি তুমি দেখতে পারো কিন্তু আমি আর মেনে নিতে পারছি না। ছেলের সাথে কথা বলো। এবার একটা বিয়ে দিয়ে ঘরমূখী করো ছেলেকে।

~ ছেলে আমার সব ঘাটে জল খায় তাকে আর কোন ঘাটের জল দিয়ে আটকাবো বলো? প্রনয় টান ছাড়া তাকে সুপথে আনা সম্ভব নয়।
রোহানা হা নিশ্বাস ফেলে উঠে যায়।

সন্ধ্যার আধার নামছে দু ধারে। শপিংমল থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে রিকশায় চেপে বাসার উদ্দ্যেশে ফিরছে তৃনা। জ্যামে আটকে যায় ক্ষনে ক্ষনে। ঢাকার জ্যাম হচ্ছে সুখের মতো। থেমে থেমে নেমে আসে আবার উচ্ছেদ হয়ে যায়। বসে বসে ট্রাফিক পুলিশের এদিক ওদিক মুভ দেখতে দেখতে চোখ পড়ে হাত দশেক দূর একটি কাল রংয়ের কারে স্বয়ং রায়ান চৌধুরীকে। কালো সানগ্লাস চোখে খোচাদাড়িতে সুকুমার অবয়ব। সামনের চুলগুলো খয়ারী রঙ্গা। কালো ব্লেজার গায়ে চড়ানো। এক মুহুর্ত তাকিয়ে চোখ ফেরায় তৃনা। বার বার চোখ দুটো তার দিকে অবাধ্যতা প্রমান করতে চাচ্ছে।

শক্ত করে চোখ কুচকে বন্ধ করে ফেলে তৃনা। রিকশাওয়ালা মামা এক ঝলক পেছনে তাকিয়ে তৃনাকে দেখে কৌতুক স্বরে বলে ~ কি গো আফা! বালু কনা বালাই ও তো নাই। এমনিতেই চোখে চশমা লাগাইছেন তার উপর আবার ঐভাবে বন্ধ কইরা আছেন ..আরো কানা হবার চান নাকি?
তৃনা চোখ খুলে বলে ~ মামা আপনি বেশি কথা বলেন। জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে যান।
চলে আসার সময় আশে পাশে আরেকবার তাকায় তৃনা কিন্তু সেই কালো কুচকুচে কার টার আর উদ্দিশ পায় না।
বাসায় আসতেই পারুল বেগম বলে ~ আমার জন্য কি আনছো আম্মাজান?

তৃনা এগিয়ে এসে একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বলে ~ তোমার রেডিমেট ব্লাউজ ফুপি। নাও।
তৃষা রিমোট রেখে মায়ের দিকে হা করে থাকে বরাবরের মতো। আঢ়ালে ধান মাড়াই করে সবসময় আর সামনে ক্ষেতে সেচ দেয়। দেখায় সে কতো কাজের। তৃনা হাত দিয়ে তৃষার মুখ লাগিয়ে দিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়।

রেস্টুরেন্টে বসে আছে তৃষা রায়ান। অনেক মেসেজ কল দিয়ে দিয়ে এখানে মিট করাতে এনেছে রায়ান কে। এসেও একবার তাকাচ্ছে না তৃষার দিকে। মোবাইলে মুখ গুজে আছে। তাকানোর কি আছে! সব জিএফ একি! মুখ ভর্তি রংগের বালতি, স্লিম ফিগার, ফরেনারের মতো শরীরের রং যাকে বলে সাদা বিড়াল, এইতো… এদের মধ্যে না পায় কোন আকর্ষন না পায় একটু ভালবাসা আর না পায় সুখ।

শুধু দৈহিক চাহিদার সমাচার। মরিচিকার পেছনে ছুটা বৈকি। তৃষা রায়ানের হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে নেয়। রায়ান তৃষার দিকে তাকায়। তৃষা চোখে চোখ রেখে বলে ~ সেদিনের পর থেকে ভালভাবে কথা বলছো না আমার সাথে। এতো রাগ তোমার আমার প্রতি? আমি কতো কষ্ট পাচ্ছি জানো তুমি? কেনো দাও এতো কষ্ট আমাকে? তুমি জানো সেদিন কতবড় ভুল করতে যাচ্ছিলাম আমরা?

~ হে এক সেকেন্ড। তুমি কি আমাকে জ্ঞান দিতে ডেকেছো? যদি তাই বলো তো আমি উটছি অনেক কাজ আছে আমার।
~ এই না না উঠো না প্লিজ। বাবু আই লাভ ইউ। বিয়ের পর তো আমি তোমারি তাই না? ধৈর্য ধরো একটু।
আড়িচোখে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলে ~ বিয়ে? ও হা বিয়ে। বিয়ে মানে রায়ান চৌধুরী বিবাহিতো। তার সীমাবন্ধতা শুধু তার স্ত্রীর মাঝেই। তাইনা রুপসী?
~ হুম।

মনে মনে হাসে রায়ান ..বিয়ে ..বিয়ে দ্বারা কাউকে কখনো সীমাবন্ধ করা যায় না। সীমাবন্ধ করা যায় শিক্ষা, সম্মান, ভালোবাসা আর ধর্মভীরুতা দিয়ে।
ওয়েটার এসে কফি দিয়ে যায়। রায়ান চুমুক দিয়ে বলে ~ তো বিয়ে করতে চাও আমায় রুপসী?

তৃষা হাত চেপে ধরে বলে ~ বল কবে করবে বিয়ে? তুমি চাইলে এখনি আর না চাইলে_
~ কখনোই না। তাইতো রুপসী?
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে রায়ান। হাসি হাসি চোখ দুটো নিমেষেই বেদনা মুখর হয়ে উঠে তৃষার। রায়ান রিলাক্স বলে গালে হাত দেয় তৃষার।

~ বিয়ে তো করবো রূপসী। সময় হোক। হারিয়ে তো আর যাচ্ছনা।
হাসি ফুটে তৃষার মুখে। তৃষাকে বিদায় দিয়ে আবার রেস্টুরেন্টে ফিরে আসে রায়ান। মাসুদ পুরো টেবিল খাবারে সাজিয়ে খেতে বসে গেছে কজ্বি ডুবিয়ে। রায়ানের সাথেই এসেছিলো এখানে। রায়ান ও বসে প্লেটে ফ্রাইড রাইস আর ভেজিটেবলস নিয়ে খেতে থাকে। মাসুদ প্রশ্ন করে
~ সত্যি সত্যি বিয়ে করবি নাকি?

~ পাগল নাকি? এভাবে হাতে রাখতে হয় বুঝলি? তোর দারা সম্ভব নয়।
~ চাই ও না। আমি বিবাহিতো। আমার সব ভালোবাসা আমার বউয়ের জন্য। অন্য কোন মেয়ে চাই না আমার।
খাওয়া থেমে যায় রায়ানের। মাসুদের দিকে তাকাতেই মাসুদ অস্থির হয়ে পড়ে। হাত ধরে বলে ~ দোস্ত সরি দোস্ত। প্লিজ খাওয়া রেখে উঠবি না। শেষ কর খাওয়াটা।

রায়ান কিছু না বলে ফোন হাতে নিয়ে পেছন দিক ফিরে যায়। মাসুদ কে বলে ~ তুই খাওয়া শেষ কর। আমি ওয়েট করছি। মাসুদ নিজেও আর খেতে পারে না। চুপ চাপ উঠে বিল পে করে আসে। আসার সময় রায়ান মুখে শুধু একটা কথাই বলে ~ আমার অতীতের কথা কখনো আমাকে শুনাবিনা। আই হেট মাই পাস্ট লাইফ।
~ তৃনলতাকে ও?

~ ওর নাম নিবি না।
~ কেনো বল তুই তৃনলতাকে ও হেট করিস।
মাথা নাড়ায় রায়ান। মাসুদের দিকে তাকিয়ে বলে ~ এই জীবনে আমি দুজন প্রেয়সীর চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি। একজনের টা ছিলো মিথ্যা আরেকজনের টা ছিলো সত্য। চিনতে পারিনি তাই মিথ্যাকে বরন করে সত্যকে বর্জন করেছি আমি। তাই হয়তো ভুলতে পারি না কভু। মিথ্যাটা ছিলো আমার চোখে প্রবল দৃশ্যমান আর সত্যটা ছিলো ধোয়াশার মতো যা শুধু আমার অনুধাবনের ভিত্তিতে গড়া।

~ হয়তো। অনুধাবন সব সময় সঠিক হয় না। তাই হয়তোই বলবো আমি এটাকে।
~ বাদ দে। আসলে যে আমাকে ভালোবাসে তাকে আমি ভালো না বাসতে পারলেও সম্মান করি। তার জায়গাও আমার হৃদয়ে হয়। তৃনলতাকেও হয়তো জায়গা দিয়েছি আমি।

বাসায় এসে রাগ নিয়ে পার্স ছুড়ে ফেলে তৃষা। চোখ মুখ জ্বল জ্বল করছে রাগে। এমন রাগ দেখে মনোয়ার ও চমকে যায়। শিল্পি এসে জিজ্জাসা করতেই রাগে গজ গজ করে বলে ~ মামুনি তোমার ছেলের জন্য কি নাক কাটা যাবে আমার? বাসা থেকে বের হতে পারি না। যা ইচ্ছা তাই শুনতে হয় লোকের মুখে।

শিল্পি অধৈর্য্য হয়ে বলে ~ আরে কি শুনেছিস বলবিতো নাকি? ~ আর বলো না মামুনি। গলির মাথায় নাকি প্রেমিকা__ চুপ হয়ে মনোয়ারের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে। মনোয়ার প্রস্থান করতেই আবার বলে ~ গলির মাথায় নাকি প্রেমিকার হাত ধরে, জড়িয়ে ধরে প্রেমালাপ করে। এগুলো কোন কথা বলো? মান সম্মান আছে তো আমাদের। তাড়াতাড়ি বিয়ে দাও তো ওকে নয়তো পাবলিক প্লেসে আর না জানি কি করবে আল্লাহ জানে।

রাতে রবিন তৃষার রুমে ডুকে বলে
~ আম্মুকে কি বলেছিস তুই?
~ যা সত্য তাই বলেছি। রাস্তার মাঝে প্রেম করতে পারবে জড়িয়ে ধরে আর আমি বললেই দোষ!
~ দেখেছিস নিজের চোখে?

~ দেখিনি বাট বান্ধুবীর মুখে শুনেছি। ঐখানেই এক বিল্ডিং এ থাকে।
~ লোকের মুখে তো আমিও শুনি তৃষা। তুই হাজার টা করতে পারিস মেয়ে হয়ে আর আমি করলে দোষ? আমি তো জড়িয়ে ধরেছিলাম আর তুই তো বিছানাতেও চলে গেছিলি।
তৃষার কলিজা ছেত করে উঠে। কাপা গলায় বলে ~ ভা ভা ভাইয়া..আমি কিছু করিনি। বিশ্বাস করো। আমি …
~ জানি আমি। সব জানি। কিছু হয়ে গেলে এই বাড়িতে আর তোর জায়গা হতো না।
~ তোমাকে কি আপু বলে দিয়েছে?

~ তোর আপু তো নিজের কথাই কখনো বললো না আর তোর কথা বলবে এটা তুই ভাবিস নাকি? পিঠাপিঠি ভাই বোন ছিলাম। তখন ততোটাও কিছু ভাবিনি। সব সময় বইয়ে মুখ গুজে পড়ে থাকতাম। যখন বোনটার অস্বাভাবিকতা নজরে আসলো তখন আমার ভাবনার বেগতিক পেল যে আমি বড় ভাই। আমি আমার বোন দের দেখে রাখিনি। তার পর থেকে তোদের দুজনের উপর আমার পূর্ণ নজর থাকে বিশেষ করে তোর উপর। তোর উৎশৃঙ্খলতার উপর।

মাথা নিচু করে ফেলে তৃষা। মুখ থেকে আর টু শব্দ বের করে না। চিবুকে হাত দিকে মুখ উচিয়ে তুলে রবিন। ছল ছল নয়না তৃষার চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে ছোট চুল গুলো কানের পাশে গুজে দেয়।

পর্ব ৪

তৃনলতা মাথায় যেনো ঝেকে বসে একেবারে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করেও ঘুমোতে পারছে না। এতো বছরেও কেনো ভুলতে পারেনি মেয়ে টাকে? না মনে আছে মেয়েটার ঠিক ঠাক চেহারা না মনে আছে কন্ঠ। দেখেও চিনবে কি না কে জানে? এতো দিনে হয়তো মা হয়ে গেছে সে। দীর্ঘ এক বছর তার পেছনে পড়ে ছিলো মেয়েটা। এক বারের জায়গায় দুবার দেখেও দেখেনি। কিন্তু ফিল করেছিলো যে সত্যিই মেয়েটা ভালোবাসে তাকে। ডুব দিতে ইচ্ছে করে পুরোনো সেই দিনে।

বসন্তের ছোয়া লাগলো প্রানে। চারিদিকে ফাগুন হাওয়ার মাতামাতি। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কংক্রিটের বাধানো বৈঠক খানা। সেখানে আড্ডায় মেতে ছিলো রায়ান গ্রুপ। ভার্সিটির হার্ড থ্রোক ড্যাসিং চার্মিং রিচ এক্যাউন্টিং ডিপান্টমেন্টের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট প্লাস ভি পি হচ্ছে রায়ান চৌধূরী। তার বিহেভিয়ার, লুক, বসগিরির জন্য ভার্সিটির অনেক মেয়ের ড্রিম বয় ছিলো সে। প্রত্যেকবার ফাস্ট ইয়ারের হাতে গুনা দু একজন মেয়ে ছাড়া সবাই তাকে প্রপোজ করতো।

সেও সুযোগে ফ্লাট করতো। যাকে বলে রোমিও গিরি। সেরকমি একদিন হলুদ এর মাঝে কমলা রং এর ফুল ফুল একটা থ্রি পিচ পরিহিতা ফাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট হাতে একটি গাদা ফুল নিয়ে হাজির হয় রায়ানের সামনে। একঝলক তাকায় রায়ান। সুশ্রী মুখয়ব মোটামুটি ফর্সা গড়নের বাচ্চা চেহারার একটি মেয়ে। একপাশে উড়না টানা মাথায় গাদার মালা ক্রাউন আকারে দেওয়া, লম্বা নিতম্ব পর্যন্ত চুল গুলো একপাশে দিয়ে সামনে আনা। মোটামুটি সুন্দরী বলা চলে যাকে। শুশীল মার্জিত স্মার্ট মেয়েই বলা যায় তাকে।

তবুও ভার্সিটির হাই সোসাইটির জিন্স, টপস, মিনি স্কার্ট পরিহিতা স্টুডেন্টদের মাঝে বেমানান। ফ্রেন্ডদের থেকে দু পা এগিয়ে এসে বলে
~ ফাস্ট ইয়ার?
মেয়েটা মুচকি হেসে মাথা ঝাকায়।
~ কি চাই?

হাটু মুড়ে বসে গাদা ফুলটা এগিয়ে দিয়ে কোন ভনিতা ছাড়াই এক নিশ্বাসে বলতে শুরু করে
~ আপনাকে আমার অনেক ভালোলাগে। নবীন বরন অনুষ্টানে প্রথম দেখেছিলাম আপনাকে বক্তৃতা দিতে। আপনার কথা চালচলন ব্যবহার আস্তে আস্তে আমাকে মুগ্ধ করতে থাকে। একসময় সেটা মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে আমি বুঝতে পারি আমি আপনাকে ভালবাসি। একেবারে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে। আপনি হয়তো আমাকে দেখেন নি আগে। কিন্তু আমি আপনার আশে পাশেই ছিলাম। আপনার প্রেমে অনেক মেয়েই পাগল। আশে পাশে তারাই থাকে। তাই হয়তো আপনার চোখ তাদের ভেদ করে আমার দিকে পড়েনি। কিন্তু আমার চোখ সব সময় আপনাতেই আটকে রয়েছে। আমি জানি আপনি এই এতো মেয়েদের মধ্যে কাউকেই ভালোবাসেন না। শুধু টাইম পাস ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু ভালোবাসবেন আমায়?

পেছনে থাকা ফ্রেন্ড ছোট ভাই সবাই অবাক হয়ে এতোক্ষনে রায়ানের পাশে এসে দাড়িয়েছে। রায়ান অবাক ও হয়। এ যাবত এরকম স্ট্যাট ফরোয়ার্ড কেউ এভাবে প্রপোজ তো থাক কথাও বলে নি। সবাই ন্যাকামি করতে করতে গায়ে ডলাডলি করতে করতে কথা বলে। রায়ান প্যান্টের দু পকেটে হাত দিয়ে বলে
~ মুখস্ত করে এসেছিলে নাকি?

~ হ্যা। তা বলতে পারেন। একবার কাগজে লিখে দু বার দেখে নিয়েছি তাতেই মুখস্ত হয়ে গেছে।
পেছন থেকে সবাই হেসে ফেলে। প্রপোজ করতে এসে মুখস্ত পড়া দিচ্ছে। আর এই ভার্সিটিতে থ্রি পিচ পরিহিতা রমনী দেখাও খুব রেয়ার ব্যপার।

রায়ান হাত দিয়ে থামিয়ে বলে ~ উঠে দাড়াও। এবার বলো নাম কি তুমার?
~ আবিশা রহমান তৃনা।
~ নিক নেইম?
~ তৃনা।

পেছন থেকে আবারো হাসির রোল উঠে। বলে উঠে ও হো তৃনলতা….। একজন ফ্রেন্ড এগিয়ে এসে বলে ~ তা তৃনলতা তুমি জানো তুমি কাকে প্রপোজ করছো? তুমার থেকে হাজার গুন বেশী সুন্দরীরা রায়ান চৌধুরীর পিছু লেগে থাকে। ওদের রেখে তোমার কাছে কেনো যাবে রায়ান?
~ কারন ভাইয়া সেই সুন্দরীরা রায়ান চৌধুরীকে ভালোবাসে কিনা জানিনা তবে আমি ভালোবাসি।

রায়ান চুইংগাম চিবুতে চিবুতে বলে
~ শোন। আই থিংক তুমি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। লেখাপড়ায় মন দাও নিজের ক্যারিয়ার গড়ো। এইসব ক্রাস খাওয়া বাদ দিয়ে ক্যারিয়ারে ফোকাস করো। আর আমি তোমাকে ভালোটালো বাসিনা ওকে? আমার অলরেড়ি গার্লফ্রেন্ড আছে। থার্ড ইয়ারের লিনা চিনো? দ্যা মোস্ট বিউটিফুল গার্ল মেইড ফর অনলি মি। ভাবী বলে ডাকবে ওকে? যাও।
~ আমি জানি ঐটাও আপনার টাইম পাস বরাবরের মতো। ফুলটা নিন। অন্তত ফুলটা নিলে খুশি হবো।
~ তোমার ফুল তোমার কাছেই রাখো।
~ প্লিজ নিন। চলে যাচ্ছি তো।

অগত্যা ফুল টা নেয়। ফুল তো মেয়েদের হাতে থাকার জন্য। যার ফুল তাকে ফিরিয়ে দেওয়া যাক। ভেবেই পেছন থেকে ডাক দেয় ~ ওয়ান মিনিট তৃনলতা।
তৃনা এগিয়ে আসলে গাদা টা চুলে গুজে দিয়ে বলে যাও। তৃনা ফুলটা হাত দিয়ে ছুয়ে মুচকি হাসি দিয়ে চলে যায়। সেখানেই থেমে থাকেনি সে। প্রতিদিন কিছু না কিছু বাহানা নিয়ে সামনে আসতো। রায়ানের কাছে ছেসরাই মনে হয় তৃনাকে। কিন্তু আবার তাও মনে করতে পারে না। কারন তৃনা খুব কম ই কথা বলতে আসতো। রায়ান এড়িয়ে যেতো। এইটা খুব ভালোই জানে রায়ান।

শিখে গেছে বলতে গেলে। রায়ানের পা বাড়ানো দেখেই তৃনা একবার বলতো একটু ভালবাসবেন আমায়? একবার তো লিনা শুনে ফেলেছিলো। তার পর একজনকে দিয়ে হল রুমে ডাকিয়ে আনে তৃনাকে। তৃনা ভয়ে চুপ চাপ হয়ে ছিলো। সে জানতো এরা কিছুটা হলেও বিকৃত মস্তিষ্কের গায়ে হাত তুলতে পারে তাই চুপ করে ছিলো। লিনা একের পর এক গালাগালী করার পরও কথা বলেনি তৃনা। তৃনাকে চুপ করা দেখে রাগ বেড়ে যায় লিনার। জোরে দেয় কয়েকটা থাপ্পর। তৃনা একটা কথাও বলেনি।

তৃনা জানে এরা জিদের ভাত কুকুরকে খাওয়াও। না জানি পরে কোন ক্ষতি করে দেয় তার। রায়ান ঘটনা শুনে তাড়াতাড়ি হল রুমে এসে লিনাকে আটকায়। তৃনা রায়ানকে দেখে ছল ছল নয়নে একবার তাকিয়ে ছিলো। সেই চোখে তাকিয়ে সেদিন রায়ানের কলিজা কেপে উঠেছিলো। তৃনাকে নিয়ে চলে যেতে বললে তৃনা সেভাবেই দাড়িয়ে বলেছিলো ~ আপনি কিছু বলবেন না? দেখুন আমার গাল লাল হয়ে গেছে। আমার ঠোট কেটে রক্ত বের হচ্ছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। রায়ান দেখুন না আপনি। আমি তো শুধু আমার মনের কথা ব্যাক্ত করেছি। আমার কোন অপরাধ ছিলো না আপনি বলুন না
প্লিজ

একটা টু শব্দ করেনি রায়ান। তখন রায়ান তৃনার বিভৎস মুখ আর অসহায় আকুলতা ভরা চাহনি তে নিজের অস্তিস্ত ভুলে গিয়েছিলো কিছুক্ষনের জন্য। তৃনা উত্তর না পেয়ে সেভাবেই চলে আসছিলো। লিনার উগ্ৰ মেজাজি কথায় যখন রায়ানের হুস ফিরে তখন লিনাকে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল না করতে পেরে তৃনাকে যে ভাবে প্রহার করা হয়েছিলো ঠিক সেভাবেই লিনার চেহারা বিভৎস করে তৎক্ষনাত ব্রেকাপ করে দেয়।

ক্লাস শেষে বাসায় ফিরছিলো তৃষা। রাস্তায় ফুচকা দোকান দেখে রিকশা থেকে নেমে পড়ে। ফুচকা অর্ডার দিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। তৃনাকে টেক্সটে জানিয়ে দেয়”আপু আমি তোমার ভার্সিটির এপারে রাস্তায় বসে ফুচকা খাচ্ছি। তাড়াতাড়ি এসো।”
কিছুক্ষন পর তৃনাও চলে আসে। তৃষা ফুচকা এগিয়ে দেয় তৃনার দিকে। তৃনা আশে পাশে তাকিয়ে বলে ~ কোথায় গিয়েছিলে? আজ তোমার ভার্সিটিতে পিকনিকের জন্য বন্ধ ছিলো কিছুক্ষন আগেই জানলাম।

~ আপু রায়ানের সাথে মিট করতে গিয়েছিলাম।
মুখ থেকে ফুচকা টা পড়ে যায়। তৃষা তাকিয়ে থাকে। তৃনা কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে বলে
~ খোজ নিয়েছিলে তুমি রায়ান চৌধুরীর ব্যপারে?

~ খোজ নেওয়ার কি আছে আপু? যত টুকু জানার ততো টুকু তো জানিই আমি। আপু জানো হি ইজ এ নাইস গাই। আমাকে অনেক লাভ করে। আজো একটা গিফ্ট দিয়েছে দেখো। বলেই নাকে হাত দিয়ে নোজ পিন দেখায়। ডায়মন্ডের ছোট্ট একটা নোজ পিন। চোখের কোনা ভিজে উঠে তৃনার। রায়ান নোজ পিন পছন্দ করতো। এরকম ছোট্ট একটা নোজ পিন ছিলো তৃনার নাকে। ডায়মন্ড ওয়াল্ড থেকে শখ করে কিনেছিলো সে। সব সময় নাকে জ্বল জ্বল করতো। একদিন ক্যাম্পাসে পড়ার বাহানায় সামনে গিয়ে বই নিয়ে বসেছিলো সে। রায়ানের চোখ পড়েছিলো তার দিকে বিশেষ করে সেই নোজ পিনের দিকে। মুখ এগিয়ে নিয়ে একবার ভালো করে খেয়াল করে বলেছিলো
~ সুন্দর মানিয়েছে।

নিচু হয়ে বই পড়ছিলো তৃনা। রায়ানের কথায় মুখ তুলে তাকিয়ে না বুঝা মুখে তাকিয়ে ছিলো। রায়ান বুঝতে পেরে আবার বলেছিলো ~ নোজ পিনে দারুন মানিয়েছে তোমাকে। তখন সে কি লজ্জা তৃনার। বসে না থেকে উঠে চলেই আসতে হয়েছিলো।
এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে তৃনা। দুধে আলতা রংয়ের মুখে দারুন মানিয়েছে তাকে। অনেক সুন্দর লাগছে তৃষাকে। তৃনা আর দ্বিতীয় বার মুখে কুলুপ টি কাটে না। নিজেকে সরিয়ে নিতে চায় এমন অস্থিরতা থেকে। আরো কিছু জিজ্জাসা করলে হয়তো তৃষা অনেক কিছুই বলবে যা তৃনা বিন্দু মাত্র শুনতে ইচ্ছুক নয়। তবুও যেনো রেহাই হলো না। তৃষা বলতেই থাকলো। ~ জানো আপু আমি প্রথমে এই রায়ানকে চিনতাম ই না। কিন্তু যখন চিনলাম তখন ভালোলাগলেও অন্য কারো সাথে রিলেশনে ছিলাম। একদিন ওয়াটার পার্কে নজরে পড়ে যাই তার। তার পর আমার ব্রেকাপ হয়ে গেলে সে আসে আমার জীবনে। অনেক কিছু মেইনটেইন করতে হয় তাকে তবুও আমাকে সময় দেয়।

জানো আপু রায়ান খুব ই রোমান্টিক একজন পারসন আর কেয়ারিং ও। আমি যা বলবো তার সাধ্য মতো তাই শুনতে রাজি সে। আমাকে কখনো কষ্ট দেয় না বকা ঝকা দেয় না। তবে অস্থিরতা বাড়ায়। আসলে দোষ টা আমারি। আমিই তাকে স্পেস দেই না। আসলে সে অনেক বিজি থাকে অলটাইম আর আমাকে সময় খুবি কম দিতে পারে। এতো বড় বিজনেসম্যান বিজি তো থাকবেই। বেচারা আমিই সেটি বুঝি না। সেদিন কি বলেছে জানো? আমাকে বিয়ে করবে। খুব শীঘ্রই।

অবাক হয় তৃনা। মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় ~ কিহ বিয়ে করবে বলেছে? এটা কিভাবে সম্ভব? আর বিয়ে করবে শুনে এতো খুশি হওয়ার ই বা কি আছে? তুই কি এটাও টাইম পাস করছিস?

~ আরে না আপু কি বলো এসব! আমি আর এসব খেলা খেলতে চাই না। এবার সেটেল হবো নিজের ভালোবাসার সাথে।
অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে তৃষা। এসব কথা তৃনার একদম ভালো লাগছে না। ব্যাগ হাতে নিয়ে উঠে বলে ~ বাসায় যাবো চল। আমার ক্লাস নেওয়া শেষ। বেশি কথা বলবিনা। মাথা ব্যথা করছে।

সারা রাস্তা মুখে আর কুলু কাটে নি তৃষা। বাসায় এসে সরাসরি রুমে এসে বোরখা খুলে শুয়ে পড়ে। মাথাটা সত্যিই ধরেছে। তৃষা কিচেনে শিল্পির থেকে মুভ নিয়ে গান গাইতে গাইতে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে। পারুল হাতে মুভ দেখে বলে ~ কিরে মাথা ব্যথা নাকি তোর?

~ আমার না আম্মু। আপুর মাথা ব্যথা। তাই একটু মুভ লাগাতে যাচ্ছি।
~ এ বাড়িতে থাকছি খাচ্ছি বলে কি খাটিয়ে নিতে চাচ্ছে নাকি?
~ কই আমিতো কখনো তোমাকে খাটতে দেখি না। দিব্যি তো পায়ের উপর পা তুলে খাও। আর বোনের সেবা করলে পূন্য হয় বুঝলে? চেঞ্জ ইউর মাইন্ড।

পর্ব ৫

~ রাত বারোটার সময় বাসায় ফেরা হয় আমার অকর্মা ছেলের।
বাবার কথা শুনে দাড়িয়ে পড়ে রবিন। এগিয়ে এসে বাবার পাশে বসে নিচু স্বরে বলে
~ আমি জব করি বাবা। ঘুমোও নি যে এখনো?
~ তোমার জন্যেই অপেক্ষায় ছিলাম। আজকাল তো দেহটা বিছানায় দেওয়ার জন্য বাসায় আসো তুমি।
~ আহ বাবা। বকা ঝকা না করে আসল কথা টা বলো।

~ আসল কথা হলো যে তৃনাটার জন্য আমার তৃষাটা তো ঘরে বসে থাকতে পারে না। দুটো মেয়ে বিয়ে দিতে পারছি না। তৃনাকে বুঝানোর দায়িত্বটা তোমাকে দিয়েছিলাম কিছুই করে উঠতে পারো নি। ওর বিয়েতে কি সমস্যা খোলসা করে বলেও না কখনো। শুধু এককথাই আমার জীবন এভাবেই কাটবে। তৃষাটাকে এবার বিয়ে দিতে চাই। হাতে অনেক ছেলে আছে। সুন্দরী মেয়ে বড় ঘরেই বিয়ে দিতে পারবো। এবার তোমার দায়িত্ব হলো শেষ বারের জন্য আবার বোনকে বোঝাও। মেয়ের বাবার যে কি চিন্তা তা তুমি কি করে বুঝবে? আমার বড় ছেলে তুমি। বাওয়ারী হয়ে ঘুরা ফেরা করছো ঘরে মন নেই। বিয়ে শাদীর ধারে কাছে নেই। এভাবে আর কতো দিন? সন্যাস ব্রতী পালন করতে চাও নাকি?

~ বাবা ঐ টা ফকির হবে। মুসলিমদের সন্যাসী বলে না।
~ চুপ করো। সিরিয়াস কথার মধ্যে মসকরা করো আমার সাথে।
~ আচ্ছা বাবা আমি কথা বলবো তৃনার সাথে। তুমি ঘুমোতে যাও। আসছি।

এতো রাতে তৃষার ঘরে আলো জলা দেখে দরজায় টোকা দেয় রবিন। তৃষা দরজা খুলে হাসি দিয়ে বলে ~ মহারাজের তাহলে আসার সময় হলো তাইতো? ভেতরে আসো।
রবির রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে ~ আজকাল তুই বেশি বেয়াড়া হয়ে গেছিস তৃষা। এখনো ঘুমোস নি। এক বোন তো চিরকুমারী হওয়ার ব্রত পালন করছে আর এদিকে তুই টেস্ট করে করে ঘুরছিস।

~ টেস্ট কি গো ভাইয়া? আমি আবার টেস্ট কোথায় করলাম? আমার একটা বয়ফ্রেন্ড ও টিকে না। এখানে আমার কি করার আছে? এখন বিয়েই করে নিবো। রায়ান চৌধুরীকে। পাগলা দিওয়ানা আমি তার প্রেমে।
~ সে তো প্রত্যেক বার ই হস। এ আর নতুন কি?

~ তোমার কথা বলো। কেমন চলছে জুথিকা ভাবীর সাথে?
~ ভালোই। তবে মেয়েটা অবুঝ। কোথায় কি করে আল্লাহ ই জানে। প্রস্তাব পাঠাতে হবে ওর গার্ডিয়ানের কাছে।
~ আজ দেখা হয়েছে?

~ হা। হলো। টেবিলে ঐটা কি? ডায়েরি লিখছিলি তুই? কয়টা জমিয়েছিস দেখি?
~ ভাইয়া হাত দিবে না। আমি নিজেই দ্বিতীয় বার আমার ডায়েরী ছুই নি একটাও।
~ ওরে বাবা। অনেক গুলো দেখছি। প্রত্যেকটাতে একেকটা এক্স কে নিয়ে লেখা তাই না?

~ তোমাকে বলবো কেনো?
~ বলতে হবে না জানি আমি।
~ হুহহ। আসছে সব জান্তা।

~ শোন আমি কাল অফিস থেকে বাইরে যাচ্ছি। দু দিন পর আসবো। তৃনার সাথে এবার একটা বোঝাপড়া করতে হবে। আমার সাথে থাকবি তুই। যা বোঝানোর দুজনকে এক সাথে বোঝাতে হবে। এবার একটা হিতের বিপরীত করতেই হবে আমাদের। হয় জয় নয়তো ক্ষয়। আসছি। দরজা লাগিয়ে ঘুমোবি এখন।
~ আচ্ছা।

হসপিটালের ইর্মাঞ্জেন্সিতে একটা বাচ্চা মেয়েকে ভর্তি করে তৃনা। মেয়েটা মারাত্বক আঘাত পেয়েছে। তৃনা কাপা হাতে মোনজাত ধরে শুধু বলছে আল্লাহ তুমি মেয়েটাকে বাচিয়ে দাও। ঐ টুকু নিষ্পাপ মেয়ে কতটা কষ্ট পাচ্ছে। না জানি ওর বাবা মার কি অবস্থা মেয়েটাকে না পেয়ে। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ছিলো তৃনা রিকশার অপেক্ষায়। রিকশা না পেয়ে সামনের দিকে হাটতে থাকে। কোথা থেকে জানি একটা বাচ্চা রাস্তার মাঝে এসে পড়ে। এক বেয়াড়া বাইক রাস্তা দিয়ে চলে যেতেই চিৎকার করে উঠে বাচ্চা মেয়েটা। তৃনা চিৎকার শুনে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে। ছুটে যায় মেয়েটার কাছে।

লোকজন ধাওয়া করেও বাইক টাকে আটকাতে পারে নি। চারিদিকে ভিড় জমে যায়। কার মেয়ে কার মেয়ে বলে হৈ হুল্লাড় বেধে যায়। অথচ রক্তাক্ত বাচ্চাটাকে কেউ ধরছেও না বাচানোর ট্রাই ও করছে না। তৃনা এসব সহ্য না করতে পেরে সি এন জি ডেকে এনে বাচ্চাটাকে তুলে হসপিটালের উদ্দ্যেশে রওনা দেয়। ভিড়ের লোকগুলো যদিও বার বার বাধা দিচ্ছিলো এক্সিডেন্ট হয়েছে পুলিশ কেস হবে বলে কিন্তু তোয়াক্কা না করে তৃনা জোর করেই চলে এসেছে। এদের কথা শুনে বসে থাকলে একটা জীবন শেষ হয়ে যাবে।

বাচ্চা টিকে ডক্টর দেখতে এসেই ডাক পাঠায় তৃনাকে। তৃনা যেতেই ডক্টর বলে ~ এই বাচ্চাকে কোথায় পেয়েছেন আপনি? এতো আমার ফ্রেন্ডের মেয়ে।
~ রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। আমি হসপিটালে নিয়ে এসছি। এমনিতে আমি চিনি না এই বাচ্চাকে।
~ ওকে আপনি থাকুন। আমি আমার ফ্রেন্ডের বাসায় খবর দিয়ে দিচ্ছি।

এতোক্ষনে অপারেশন থিয়েটারে পাঠানো হয়ে গেছে বাচ্চাটিকে। তৃনা হসপিটালেই থেকে গেছে। কিছুক্ষন পর দুজন বয়স্ক লোক আসে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতোটা অস্থির তারা কান্না কান্না মুখ। নার্স কে দেখে বলে
~ আমি রোহান চৌধুরী রুমু দাদু ভাই। আমার দুলি কোথায়?

~ ওহ আপনিই তাহলে বাচ্চাটির গার্ডিয়ান! বাচ্চাটি অপারেশন থিয়েটারে আছেন। আপনারা ওখানে বসুন। আর উনিই বাচ্চাটিকে হসপিটালে নিয়ে এসেছেন। (তৃনাকে দেখিয়ে )।

রোহান রোহানা তৃনার কাছে গিয়ে অসংখ্য বার ধন্য বাদ দিতে থাকে। তাদের কলিজার টুকরা নাতনী কে বাচানোর জন্য। এতো এতো বার বলছে যে তৃনার অসস্তি হচ্ছে। কথা ঘুরানোর জন্য জিজ্ঞাসা করে ~ আচ্ছা রুমু রাস্তায় এলো কিভাবে? আপনারা কেউ দেখেন নি?

রোহানা বলে ~ আর বলো না মা …নাতনী আমার শান্ত খুব কিন্তু দুষ্টুও ভারী। ওর সাথে কয়েক দিন না থাকলে বুঝতে পারবে না। আমাদের কাউকে না বলে দারোয়ানকে গিয়ে টাকা দিয়েছে রাস্তার ওপাশ থেকে বেলুন এনে দেওয়ার জন্য। দারোয়ান তো ওকে বসিয়ে দিয়ে বেলুন আনতে গেছে। দারোয়ানকে দেখে ওও রাস্তা খালি পেয়েছে তাই দৌড় দিয়েছে। এক্সিডেন্ট হলে দোরোয়ান ওর কাছে না গিয়ে সরাসরি বাসায় এসে আমাদের জানিয়েছে। আমরা গিয়ে শুনি কে নাকি হসপিটালে নিয়ে চলে গেছে। কোন হসপিটাল কিছুই বলেনি। তারপর ডক্টর শুভ ফোন করে জানালো তো আসলাম।

ঘন্টা দুয়েক পর ডক্টর বলে রুমুর অপারেশন সাক্সেস ফুল। বেডে দেওয়া হয়েছে। অল্পের জন্য মেয়েটা বেচে গেছে। রোহান রোহানা কেবিনের দিকে যেতে থাকে। পিছু পিছু তৃনাও যায়। গ্লাসের দরজা দিয়েই দেখে হাত পা মাথায় বেন্ডেজ করা ছোট একটা পুতুল শুয়ে আছে। কতই আর বয়স হবে? তিন চার বছর হবে। এই ছোট্ট বয়সে কতোইনা কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে মেয়ে টাকে।

বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হয় তৃনার। দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। রোহান -রোহানা চৌধুরীও মুখ চেপে কাদছে। তৃনা উনাদের দিয়ে চেয়ারে বসায়। নানা রকম শান্তনা দিতে থাকে। কিন্তু তাদের একমাত্র নাতির জন্য বুকের ব্যথা কমাতে পারেনি। রোহানা বলতে থাকে”জানো মা আমার নাতনী টা হতভাগী ভিষন। জন্মের নয় মাস পর ওর মা ওকে আর আমার ছেলেটাকে ছেড়ে চলে যায়। ছেলেও আমার মেয়ের দিকে কয়েকদিন পর নজর দেওয়া বন্ধ করে দেয় ওর মার উপর রাগে দুঃখে বেয়াড়া হয়ে যায়। মেয়ের সাথে হটাৎ হটাৎ কথা বলে। রুমুটা পাপা মাম্মা করে শুধু।

পাপা তো আসেই না ওর কাছে। এখন ওর চার বছর। আমি এই বুকে করে বড় করছি ওকে মায়ের মতো করে। কিন্তু মায়ের অভাব কি অন্য কেউ মেটাতে পারে? পারে না। মার অভাব মা ই মেটাতে পারে। তার জন্য ছেলেটাকে বার বার বললাম বিয়ে করে ওর একটা মা এনে দিতে কিন্তু আনলো না। আজ এই ভাবে আমার কলিজার টুকরাকে দেখতে পারছি না আর আমি।
রোহান বলে ~ আহহহ রোহানা চুপ করো। এটা হসপিটাল। আমার রুমুর কিচ্ছু হবে না। তাড়াতাড়ি ঠিক হবে আ্ল্লাহ কে ডাকো।

তৃনাও শান্তনা দিতে থাকে রোহানাকে জড়িয়ে ধরে ~ আন্টি আপনি আর কাদবেন না। আল্লাহ সহায় আছেন। রুমু বেচে আছে এতেই বা কম কি! ঠিক মতো ট্রিটমেন্ট হলে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।

~ ও আগের মতো চলাফেরা করতে পারবে তো? হাটতে পারবে? বসতে পারবে?
~ পারবে আন্টি পারবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি কাদবেন না। পরে আবার আপনি অসুস্থ হয়ে গেলে রুমুর খেয়াল রাখবে কে! আপনিই তো ওর মা দাদুমনি দুটোই।

তখনি হসপিটালে দেখা মিলে রায়ান আর মাসুদের। এলোমেলো চুল, আতঙ্কে গভীর চাহনি, ডুলু ডুলু শরীর, লাল গেঞ্জি আর তথা কথিত হাটুতে ছেড়া ফুল প্যান্টে দৌড়েই এগোচ্ছে সে। রায়ানকে বার বার ফোন দিয়েও ফোনে পায়না রোহান। তার পর মাসুদ কে ফোন দিয়ে জানায়। মাসুদ সরাসরি রোহানের ফ্ল্যাটে গিয়ে তার হাতে থাকা এক্সটা চাবি দিয়ে ডোর খুলে ভিতরে ডুকে। বেডরুমে এসে দেখে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে ভুস ভুস করে ঘুমুচ্ছে। মাসুদ গিয়ে লাথি দেয় জোরে একটা। রায়ান লাফ দিয়ে উঠে মাসুদকে দেখে বিরক্তি নিয়ে বলে ~ ডিস্টাব করবিনা। একটু আগে ঘুমিয়েছি। সারা রাত মনির সাথে ছিলাম। শান্তিতে ঘুমোতে দে এবার। ডাকবিনা আমাকে।

রায়ান শুয়ে পড়তেই মাসুদ চিৎকার করে উঠে ~ আজ মনি তো কাল সাহা তো পরশু ছোয়া এইভাবেই দিন কাটা তুই। আর তো কিছু নেই তোর জীবনে। কোন থার্ড ক্লাস লেডি তোকে ছেকা ছিলো সেইটাই তোর কাছে মুখ্য আর এদিকে যে নিজের একটা সন্তান আছে তার কথা ভেবেছিস কখনো তুই? নাকি তোর মনেই নেই যে তুইও একজন বাবা। সত্যি বলতে তুই কুলাঙ্গার বাবা।
~ মাসুদ… মুখ সামলে কথা বল।
~ আর কি মুখ সামলে কথা বলবো বলতে পারিস? আজকে রুমুর একটা কিছু হয়ে যাক আমি তোর মুখ অব্দি দেখবো না কখনো।

মাসুদ রাগে গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে যেতে পা বাড়ায়। রায়ান জ্ঞানে আসে।
~ কি কি রুমুর কি হয়েছে?
~ মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়েছে। হসপিটালে এখন। আংকেল ফোন দিয়েছিলো আমাকে।
কিছুক্ষনের জন্য রায়ান থ খেয়ে যায়। মাসুদ ধাক্কা দিয়ে বলে
~ শালা তুই উঠবি নাকি? চলে গেলাম আমি।

হাতের কাছে গেঞ্জি পেয়ে পরতে পরতে বেরিয়ে আসে ফ্ল্যাট থেকে। এক দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে। মাসুদ ফ্ল্যাট লক করে তাড়াতাড়ি গাড়িতে এসে ড্রাইভিং সিট থেকে রায়ানকে উঠিয়ে দিয়ে বলে ~ তুই ড্রাইভ করতে পারবি না। আমি করছি।

সারা রাস্তা এই এসি গাড়িতেও কপাল গাল ঘেমে উঠেছিল রায়ানের। চোখ বন্ধ করে দাতে দাত লাগিয়ে ছিলো। কানে শুধু রুমুর পাপা ডাকটা বার বার ফিরে ফিরে আসছিলো। চোখের সামনে মেয়ের মুখটা ভেসে উঠছিলো বার বার। একমাসের বেশি হবে মেয়েটাকে দেখেছিলো সে। সে কি আর মেয়েকে দেখতে পারবে না এটা ভেবেই মাথা ভারী হয়ে আসছিল।

রায়ান এসেই চিল্লাতে থাকে শুভ শুভ বলে। শুভ গলা শুনেই দৌড়ে আসে। শুভ কে দেখে বলে ~ শুভ আমার মেয়ে আমার মেয়ে কোথায়? মম পাপা রুমু কোথায়?
শুভ রায়ান কে নিয়ে রুমুর কেবিনের সামনে যায়। রায়ান কেবিনে ঢুকতে গেলে শুভ বলে ~ দোস্ত এখানেই থাক। তোর ভিতরে না যাওয়াই বেটার।

~ রাখ তুই তোর বেটার।
ভিতরে গিয়ে রুমুকে ব্যান্ডেজে আবৃত দেখে রায়ান গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে। শুভ কাধে হাত রেখে শান্তনা দিচ্ছে রায়ান কে। মাসুদ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাতে দাত চেপে এই দৃশ্য সহ্য করে যাচ্ছে। যে রায়ানের চোখে কোনদিন জল দেখেনি আজ তার গলা ফাটানো কান্না শুনছে। পুরুষ মানুষ কখনো কাদে না। কিন্তু একজন বাবা ঠিক ই কাদে তার সন্তানের জন্য।

পর্ব ৬

এতোক্ষন সবটা চুপচাপ দেখছিলো তৃনা। ভেতর থেকে একজন বাবার আর্তনাদ ভেসে আসছে কানে। কি নাম দেবে এই বাবাকে? অসহায় বাবা। যে বাবার কোন দিন মেয়েকে ঠিক ভাবে ভালোবাসাই দিতে পারে নি অথচ তার বুকে অজস্র ভালোবাসা বিদ্যমান। তার জীবনেই তো ভালোবাসা নেই। কে বললো নেই! আছে তো। রুমু। তবু কেনো ভালোবাসে না?

বাচ্চাটার মুখটা রক্তে লেগে ছিলো। তাই ভালোভাবে দেখতেই পেলো না। রায়ানের মেয়ে নিশ্চয় অনেক কিউট হবে। তৃনার ঠোটের কোনে মৃদু হাসি দেখা মেলে। রায়ান চৌধুরীর মেয়েকে বাচিয়েছে সে। নয়তো আজ সেখানেই মরে যেতো সে। এভাবে তো একদিন রায়ান চৌধুরীকেও বাচিয়ে ছিলো সে।

সময় টা ছিলো শীত কাল। ঘন চাদরে মোড়ানো চারিদিক। তৃনারা তখন ফরিদপুর দাদুর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলো। দাদুর বাসার সাইডেই হসপিটাল। হটাৎ চিৎকার চেচামেচি শুনা যায়। এইটা হসপিটালে হতেই থাকে তাই কেউ কানে নেয় না। মনোয়ার কিছুক্ষন পর এসে বলে ~ শিল্পী বড় সড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। বড় রাস্তার মাথায় একটা বাইক উড়িয়ে দিয়েছে বাসে। বাইকে একটা ছেলে মরন দশা। ছেলেটার ব্যাগ কাগজ পাতি এই যে রেখে দাও। কারো কাছে দেওয়ার ভরসা পাচ্ছিলাম না। আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি। ডক্টর কে বলা আছে ছেলেটার পরিবারের এলে এই গুলো নিয়ে যাবে। রাখো এগুলো।

শিল্পি রান্নাঘরে আটা গুলছিলো পিঠা বানানোর জন্য। তাই তৃনাকে ব্যাগ পত্র নিয়ে রাখতে বলে। তৃনা বাবার কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে আমানত যত্ম করে রাখতে রুমে নিয়ে আসে। আলমারি খুলে রাখতে গেলে দেখে ব্যাগের পকেটে আই ফোন। তখন আই ফোন তৃনার ড্রীম ছিলো কিন্তু একটা স্যামসাং ফোন থাকা সত্বে আবার ফোন কিনে দিচ্ছিলো না মনোয়ার।

খুশিতে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতে থাকে। লক বাটনে ক্লিক দিতেই লক স্কিনে রায়ানের ছবিটা ভেসে ওঠে। হাসি মুখ থেকে উড়ে যায়। মনের ভিতর চিন্তা আর অস্থিরতা ভর করে। ফোন রেখে ওয়ালেট বের করে দেখে রায়ানের ছবি। ব্যাগ খুলে জিনিস পত্র দেখেই বুঝে যায় এগুলো রায়ানের। দু হাতে মাথার চুল খামচে ধরে। রায়ান রায়ান বলে দরজা খুলে দৌড় দেয় হসপিটালের দিকে।

রিসিপসনে বলতেই ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখে রায়ান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চোখ নিভু নিভু মানে এখনো জ্ঞান আছে। এই অবস্থায় রায়ানকে দেখে তৃনা জোরে জোরে কাদতে থাকে। নার্সরা বলে আপনি কি উনার কিছু হন? উনাকে ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। আপনি রিসিপশনে যোগাযোগ করে টাকা জমা করে দেন।

তৃনা নার্সকে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে বলে দৌড়ে বাসায় চলে আসে। কিন্তু টাকা পাবে কোথায়? মনোয়ার থাকলে চেয়ে নেওয়া যেতো কিন্তু এখন কার কাছে চাইবে? চিন্তায় মাথা ঘুরতে থাকে। রায়ানের ওয়ালেটে হাত দিয়ে কয়েকটা পাচশ টাকার নোট পায়। কিন্তু এতে তো হবে না। তার পর কার্ড চোখে পড়ে। তৃনা কার্ড নিয়ে আবার দৌড় দেয়। দরজায় শব্দ হতেই রান্নাঘর থেকে শিল্পি বলে উঠে
~ কোথায় যাচ্ছিস?
~ আম্মু এখানেই। টেনশন করো না পিঠা বানাও।

শিল্পি কাজে মন দেয়। এমনিতেই কাজিনদের কাছে আড্ডা দিতে গেছে মনে করে।
তৃনা হসপিটালে এসে বিল পে করে। ডক্টর এসে জানায় রক্তের প্রয়োজন নয়তো অপারেশন করা সম্ভব না। তৃনা এবার রক্ত কোথায় পাবে? কাকে বলবে? বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করে এ নিগেটিভ ব্লাড কার আছে। দুই একজন পাওয়া গেলেও ওরা এক দু মাস আগে ডোনেট করেছে। চিন্তায় মাথা চেপে ফ্লোরে বসেই কাদতে থাকে। নার্স রা এসে বলতে থাকে ~ দেখুন কারো না কারো কাছে তো পাওয়া যাবে। আপনার পরিবারের, বন্ধুর কারো তো আছে।

তৃনা তখন বলে ~ আমি তো নিজেই নিজের টা জানি না অন্যদের টা কিভাবে জানবো? একথা শুনে নার্স তৃনা ব্লাড পরিক্ষা করে দেখে সেইম ব্লাড গ্রুপ। তারপর আর সময় নষ্ট না করে একে একে দুই ব্যাগ ব্লাড দিয়েছিলো তৃনা। তার পর অবশ্য বাসায় অনেক জবাবদিহি করতে হয়েছে। অনেক অসুস্থ ও হয়ে পড়েছিলো। পরের দিন ই রায়ানের গার্ডিয়ান রায়ানকে নিয়ে ঢাকায় ব্যাক করেছিলো। দারোয়ানকে দিয়ে সব কিছু পাঠিয়ে দিয়েছিলো রায়ানের গার্ডিয়ানের কাছে।

বুকের মধ্যে এক অন্যরকম শান্তির হাওয়া বয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে বলে”শুকরিয়া। আল্লাহ আমি তোমার কাছে এতোই প্রিয় যে আমার হাতে দু দুটো প্রান বাচানোর সুযোগ দিলে। তোমার দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া।”ব্যাগ হাতে উঠতে যেতে নিয়ে আবার বসে পড়ে। কেনো জানি যেতে ইচ্ছে করছে না। এই মানুষ গুলোর পাশে থাকতে ইচ্ছা করছে। পরক্ষনেই তৃষার কথা মনে পড়ে যায়। তৃষা যে পাগল প্রায় রায়ানের প্রেমে। তাকে কি করে এই ঘোর থেকে বের করবে?

রায়ানের মেয়ে আছে এটি জানলে কি হতে পারে ভেবেই বুক কেপে উঠে। কিন্তু তৃষার জানা উচিত। সে যে অনেক সিরিয়াস হয়ে পড়েছে রায়ান কে নিয়ে। যদি আমি বলি তাহলে তো কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। অনেক প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হবে যা আমি কখনোই পারবোনা। এসব ভাবতে ভাবতেই কান্নার আওয়াজে বলতে শুনে
~ আমার রুমু কোথায় আমার রুমু? আমার রুমু ঠিক আছে তো? রুমুর কাছে যাবো আমি।

রোহান রোহানাকে এড়িয়ে দৌড়ে ভিতরে যেতে নিলে রোহানা আটকে দেয়। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে ~ এই মেয়ে কেনো এসেছো তুমি? বের হও এখান থেকে।
~ আমাকে আমার মেয়ের কাছে যেতে দিন। ওর কিভাবে কি হলো? কেমন আছে ও?

~ কিসের মেয়ে? কার মেয়ে? তুমার কোনো মেয়ে নেই এখানে। রুমু শুধু আমার রায়ানের মেয়ে। বের হয়ে যাও তুমি এখান থেকে।
~ আপনি বললেই আমি শুনবো কেনো? রুমু আমার আর রায়ানের মেয়ে ভুলে যাবেন না। নয় মাস এই গর্ভে রেখেছি আমি রুমুকে।

~ আর নয় মাস বয়সেই ত্যাগ করে অন্য সংসার গড়েছি তাই তো? নয় মাস গর্ভে রেখে আর নয়মাস লালন পালন করে ঐ আঠার মাস সময় ই তুমি রুমুর মা ছিলে। আর সেই সময় অনেক আগেই চলে গেছে। অধিকার ফলাতে আসবেনা। কোথা থেকে এসে আমার নাতনীকে নিয়ে বাড়াবাড়ি আমি সহ্য করবোনা কিছুতেই।
~ আমার মেয়ে আমি একশবার বাড়াবাড়ি করবো।
~ ও তুমার মেয়ে নয়। তোমাকে আমরা চিনি না।

শুভ লিনার কথা শুনে ঘটনাস্থলে এসে হসপিটালে কর্মরত কয়েকজন কে বলে ~ এই মেয়েকে এখনি এখান থেকে বের করো।
লিনার দিকে তাকিয়ে বলে
~ খবর পেলে কিভাবে?

~ বাতাসে খবর ভাসে। আর আমি মা তাই আমি বুঝি।
~ ওহ চুপ করো। তুমি কখনো মা হতে পারো না। তোমার কথা রায়ানের কানে পৌছানোর আগে বের হয়ে যাও। নয়তো খুন হতে সময় লাগবেনা তুমার।

~ কে খুন করবে? তুমি? রায়ান? কেউ পারবে না। একটা মায়ের থেকে সন্তানকে দূরে রেখে কি পাও তোমরা? কেনো আমার মেয়েটাকে মায়ের অভাব দিচ্ছো?
~ রুমুর মা আছে ওকে? ওর মা ওকে খুব ভালোবাসে। ওহ সিট, তোমাকে কেনো বলছি আমি! এই তোমরা এই মহিলা টাকে বের করো এখান থেকে।

~ মা আছে মানে? রায়ান বিয়ে করেছে নাকি?
~ হ্যা করেছে। তোর কোন সমস্যা? এখন যা এখান থেকে নয়তো রায়ান কিছু করুক না করুক আমি তোকে কি করি যাস্ট দেখবি।

লিনাকে ধরে বেধে বের করে দেওয়া হয়। এদিকে তৃনা দাড়িয়ে সবটা দেখছিলো। আস্তে আস্তে শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসে। চোখ দুটো নিভু নিভু হয়ে আসে।

চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখতে পায়। জ্ঞান ফিরতে দেখে পাশে দাড়ানো নার্স বলে উঠে ~ এখন কেমন লাগছে? আপনাকে তো সিটিং এ ভালোই বসে থাকতে দেখলাম। হটাৎ কি হলো যে মাথা ঘুড়িয়ে পড়ে গেলেন?
~ আমি ঠিক আছি। ঐটা কোন ব্যপার না। বাসায় যেতে পারি?

~ হ্যা অবশ্যই।
তৃনা উঠে দাড়ায়। ব্যাগ হাতে নিয়ে হসপিটাল থেকে প্রস্থান করে। তার কিছুক্ষনপর রোহানা এসে বলে ~ আরে আরে মেয়েটা গেলো কোথায়?

~ উনি তো চলে গেছেন।
~ একি কথা! যাওয়ার সময় বলে যেতে পারতো তো। আমার নাতনীর জীবন বাচালো রায়ান তো ওর সাথে কথা বলতে চাইলো। কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইলো। ঠিকানা নাম্বার কিছুই তো নেওয়া হলো না।

বাড়ি ফিরে আসতেই শিল্পি দৌড়ে আসে। মনোয়ার চিন্তা মুক্ত হয়ে বলে ~ ফোন দিলে যে ফোনটা তুলতে হয় সেই জ্ঞান বোধ করে হবে তোমার? এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার মানে কি? কোথায় ছিলে সারারাত? তুমাকে কিছু বলি না দেখে যে তুমি উড়বে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ির বাইরে থাকবে সেটা আমি মেনে নিবো না। আমার বাড়িতে থাকতে হলে এতো উড়া উড়ি চলবে না।

তৃনা বাবার দিক তাকিয়ে বলে ~ আমি তাহলে চলে যাচ্ছি এ বাড়ি ছেড়ে।
মনোয়ার রাগ দেখানোর আগেই পারুল বলে উঠে ~ হায় হায় শুনেছো মেয়ের কথা? তৃনা বাবার সাথে বেয়াদবিও করছিস দেখছি। সারা রাত বাইরে কাটিয়ে এসে মুখের উপর কথা বলছিস। কিরে লজ্জা করে না তোর এই মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরতে।
শিল্পি ধমকের সুরে বলে ~ পারুল চুপ করো তুমি। ঠিক করে কথা বলো। তৃনার মুখে হাত দিয়ে বলে ~ কোথায় ছিলি মা? চিন্তা হচ্ছিল তো আমার।

তৃনা ছল ছল চোখে মায়ের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে ~ সাবলেট বাসা ভাড়া তো পাবো না .. হোস্টেলে উঠার চেষ্টা করবো।

কথাটা শুনে মনোয়ার আরো রেগে যায়। পারুল মুখ খুলতেই শিল্পি কঠিন চাহনি দেয়। তৃনা সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলে ~ আমি হসপিটালে ছিলাম আম্মু। শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল হটাৎ। রুমুর কথা না বলাই থাকে।
একথায় বাবা মা দুজনের হৃদয় কেপে উঠে। শিল্পি পিছু গিয়েও তৃনাকে আওড়াতে পারে না তার আগেই তৃনা দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। পিছু পিছু মনোয়ার পারুল ও চলে আসে। মনোয়ার শিল্পিকে বলে ~ ভিতরে যাও তুমি। কি হয়েছে ওর কেনো হসপিটালে ছিলো জেনে আসো। আমাকে তো বলবে না।

~ কোন দিন যেন না বলে।
~ শিল্পি!
~ যার যার জীবন তার তার। মেয়ের জীবন মেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ে করবে না। এটা তার অধিকার। বিয়ে করবে না বলেই যে বাবা ভাবতে পারে তার মেয়ে সারারাত বেলাল্লা পনা করে বাড়ি ফিরে_
~ চুপ করো তুমি। আমার মেয়ে কখনো তেমন হতে পারে না। আমার মেয়ের মতো ভালো পরহেযগার মেয়ে লাখে একটা পাওয়া যায়।

~ কিন্তু একটু আগে তো তাই বলেছিলে।
চুপ করে যায় মনোয়ার। মেয়ের প্রতি রাগ থেকে যে মেয়েকে ঐ সব উল্টা পাল্টা কথা অব্দি বলে ফেলে বুঝতে পারে। মনে মনে অস্থিরতা থেকেই যায় মেয়ের অসুস্থতার ব্যাপারে।

তৃনা বাথরুমে এসে সাওয়ার ছেড়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে। কেনো করে সে জানে না। এই চিৎকার অনেক বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে আজ হটাৎ আবার কেনো ব্যাক করলো তার জীবনে? এতো নতুন কিছু নয়। এতো হয়েই ছিলো। বহুদিন পর আবার এই মুখ গুলো দেখে হৃদয়ে জমা থাকা শুকতো চিৎকার গুলো কি আবার বেরিয়ে আসছে? এতো হতে দেওয়া যাবে না। কিছুতেই না।

পর্ব ৭

রবিন তৃষা অনেকক্ষন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তৃনা দরজা খুলে দেয়। রবিন সিরিয়াস মুড নিয়ে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে। তৃষা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে রবিনের পাশে এসে বসে। তৃনা তাদের দেখে বলে ~ তোমাদের মুখ গম্ভির কেনো? কিছু বলতে চাও?

রবিন মুখ খুলে
~ তৃষার বিয়েটা শীঘ্রই দিয়ে দিবে বাবা। তার আগে তোর বিয়েটা দিতে হবে।
~ আমি বিয়ে করবো না ভাইয়া।
~ তুই শুধু তোর দিকটা দেখিস কেনো? আমরা কি নাই? আমরা তোর একটা সুন্দর জীবন কামনা করতে পারি তুই কেনো পারিস না?

~ আমি তোদের জীবনে কোন প্রভাব ফেলি নি কখনো। প্রয়োজনে আমাকে ভুলে যেতে পারো।
~ আমরা ভুলি আর না ভুলি তোকে সব ভুলে যেতে হবে। কোথাকার কোন ছেলের জন্য তুমি নিজের লাইফ টাই নষ্ট করে দিবে সেটা তো মেনে নিবো না আমরা।
তৃনা ভাইয়ের দিক তাকিয়ে হাসে। ইশারায় বলে তৃষা তোমাকে বলেছে তাই না? রবিন আরো রাগী মুড করে তাকায়।

তৃনা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে
~ বাবা তোমাকে বার বার আমাকে বোঝানোর জন্য পাঠায় তাই না? কিন্তু আফসোস এত কষ্ট করেও তুমি আমাকে রাজি করাতে পারো না। ভাইয়া একজনকে ভালোবেসে অন্য জনকে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কোনদিন সম্ভব হবে না। বুকে অন্যজনের জন্য প্রেম রেখে স্বামীকে মিথ্যা প্রেম দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতো মেয়ে আমি নই। আমি একাই ভালো আছি। আমাকে তোমরা শুধু শুধু ফোর্স করো না।

~ দেখ তৃনা তুই শুধু তোর দিকটাই ভাবছিস আমাদের দিকটা ভাবছিস না। তোর জন্য বাবা কতো টেনশনে আছে জানিস? মেয়েকে বিয়ে না দিতে পারলে কোন বাবাই শান্তি পায় না। তোর এই একগুয়েমির জন্য চিন্তা করে করে বাবার চেহেরা দিন দিন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। আম্মু তুই কষ্ট পাবি ভেবে তোকে সামনে সামনে সাপোর্ট করে কিন্তু আড়ালে ঠিক ই কষ্ট পায়।

তোর জন্য তৃষার বিয়ে আটকে আছে। লোকজন এসে বলে বড় মেয়ে এখনো বিয়ে করেনি কেনো আবার বলে বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে নিশ্চয় কিছু ভেজাল আছে। আবার দেখ আমার বউ যখন আসবে তখন তার সংসারে অবিবাহিত ননদ কতো দিন ভালো চোখে দেখবে বলতো? এই নিয়ে সংসারে আরো বেশি ঝামেলা হবে। সবাই তো আর আমার আম্মুর মতো হবে না বল! সমাজের কথা নয় বাদ ই দিলাম।

তৃষা বলে ~ আপু সেদিন রায়ান শুনে অবাক হয়েছিলো তোমার কথা শুনে। এর প্রভাব যে আমার উপর পড়বে তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। একটা বিয়ের জন্য এতো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তুমি বিয়েটা করে নিলে এইসব সমস্যাও সৃষ্টি হবে না আর তোমার জীবনেও একটা গতি আসবে। তোমার বিয়ের পর পর ই আমি রায়ানকে বিয়ের কথা বলতে পারবো। আমি চাই না বাইরের লোকজন এসব বিষয় জেনে যাক। আমার মাথা নত হয়ে যাক।

রায়ানের কথা শুনে হসপিটালের কথা মনে পড়ে যায় তৃনার। সমস্ত কিছু ভেবে রাগ উঠে যায় মাথায়। দাতে দাত চেপে নিজেকে কন্ট্রোল করে। তৃষাকে বলে ~ রায়ান ছেলেটা ভালো নয়। তুই ওকে ভুলে যায়।
~ আপু তুমি আবার রায়ান আর আমাকে আলাদা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো?

~ হা লেগেছি আর সারাজীবন লেগে যাবো। রায়ানের মতো একটা ছেলের হাতে আমি কখনোই আমার বোনকে তুলে দিতে পারিনা। রায়ান আমার পূর্ব পরিচিত। আমরা একি ভার্সিটিতে পড়েছি। ঐ ছেলের সম্পর্কে যথেষ্ট জানা আছে আমার।
~ আর আমারো জানা আছে। চার বছর থেকে চিনি আমি ওকে। আজ পর্যন্ত তার সম্পর্কে কোন বাজে রিপোর্ট পায় নি। আর তুমি আলতুফালতু কথা বললেই আমি ভুলে যাবো রায়ানকে বললেই হলো?

~ হা বললেই হলো। আমি চাই না রায়ানকে বিয়ে করে তুই তোর জীবনটা শেষ করে দিশ। তোর জিবনে কোন সমস্যা হোক সেটা চাই না আমি।
~ আমার জীবনে সমস্যা টা কি জানিস আপু? আমার জীবনের সমস্যা হলি তুই। তুই যদি বিয়ে টা করে নিতি তাহলে আমার জীবন আমার মতো করে আমি গুছিয়ে নিতে পারতাম।

~ তৃষা!
রবিন বলে, “তৃষা তো ঠিকি বলছে। অনেক হয়েছে আর না। কাল ছেলে বাড়ি থেকে লোক আসছে। পছন্দ হলে কাল ই আংটি পড়িয়ে যাবে। বুঝেছিস তুই?”

তৃনা লাফ দিয়ে উঠে আলমারি খুলে। লাগেজে কাপড় পুরতে থাকে। রবিন তৃষা গিয়ে তৃনাকে ধরে আটকাতে চেষ্টা করতেই তৃনা ঝাড়ি দিয়ে দুজনকে সরিয়ে দিয়ে বলে ~ আমার জন্য যদি কারো এতো প্রবলেম হয় তাহলে আমি আর থাকবো না তোদের লাইফে। চলে যাচ্ছি আমি। শোন তৃষা ঐ ছেলে ভালো না জন্যেই আমি তোকে না করছি। আমি কোন দিন তোর ক্ষতি চাইতে পারি না তাই। বুঝবি তুই বুঝবি। আজ না হয় কাল ঠিক ই বুঝবি। আর ভাইয়া তোমার বউয়ের সংসারে আমি থাকবো না। আমি নিজেরটা নিজে রোজগার করে খাই। এ বাড়িতে থাকবো এটা যদি কারো সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে আমি থাকবো না। আর বাবা কে বলে দিবে আমার জন্য তার টেনশন করতে হবে না। না সহ্য করতে পারলে ত্যাগ করুক আমায়।

ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে আসে। রবিন তৃষা আটকাতে গেলেও আটকাতে পারে না। শিল্পি কান্না কাটি শুরু করে। পারুল বলে ~ থামো তো ভাবী। রাগ পড়ে গেলে ঠিকি বাড়িতে ফিরে আসবে। কই আর যাবে তোমার বোনের বাসা ছাড়া। চলে আসবে কান্না কাটি করো না।

তিন দিন হয়ে গেছে তৃনার কোন খোজ নেই। খালার বাসাতে যায় নি সেদিন। আত্মীয় স্বজন সবার বাসায় খোজ নেওয়া হয়ে গেছে। কোথাও নেই তৃনা। আজকের রাত টা পেরিয়ে গেলে চার দিন। মনোয়ার শহরের সমস্ত হসপিটালে খবর নেওয়ার চেষ্টায় আছেন। তিনি এখন পাগল প্রায়। সেদিন বলেছিলো হসপিটালে ছিলো কিন্তু কেনো ছিলো সেটা বলে নি। মনোয়ার এটা ভেবেই ভয় পাচ্ছে যে তার মেয়ের বড় কোন অসুখ করেনিতো যার জন্য বিয়ে করছে না আর সবার থেকে কথাটা লুকাচ্ছে।

পারুল তৃষা শিল্পি থেমে থেমে কেদেই চলেছে। ঘরের মেয়ে ঘরে না ফিরলে যা হয় তা ঘরের অন্য মেম্বারসরাই বুঝে শুধু। রবিন বার বার আল্লাহ আল্লাহ করছে যেনো তার বোনটার কিছু হয়। আর কখনো বিয়ে করতে বলবোনা তোকে আর কখনো কোন কিছুতে জোর করবোনা তুই শুধু বাড়ি ফিরে আয় বলেই নিঃশ্বব্দে কাদছে।

টেবিলের উপরের জিনিস গুলো তছনছ করে ফেলছে রায়ান। টেবিলে চেয়ারে পা দিয়ে লাথি দিচ্ছে। রোহান বারবার আটকাতে যাচ্ছে রায়ান কে। সামনে দাড়িয়ে থাকা এডভোকেড থরথরিয়ে কাপছে। অবশেষে ক্ষান্ত হয়ে হুংকার ছাড়ে রায়ান।

“ঐ ডার্টি লেডিকে আমি কিছুতেই এক্সেপ্ট করবোনা। কোন দিন না। আমার মেয়ে শুধু আমার ই মেয়ে। ওকে বলে দিবেন ভালোয় ভালোয় যেন টাকা গুলো নিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেয় আমাকে। ঐ লেডিকে তো আমি অনেক আগেই ছেড়েছি এখন অফিসিয়ালি ছাড়ব। এতোদিন ছাড়ার কোন তাগিদ পাই নি কিন্তু এখন আমাকে সবার আগে এটাই করতে হবে আমার বাচ্চার ফিউচারের কথা ভেবে এই লেডিকে ছাড়াব আমি।”

এডভোকেড~ স্যার উনি তো ডিভোর্স করতে চাইছেন না। আপনার লাইফে আবার ব্যাক করতে চাইছেন। আপনাকে আর বেবিকে নিয়ে হেপি লাইফ লিড করতে চাচ্ছেন।”
“আমার আর আমার মেয়ৈর লাইফে তার কোন জায়গা নেই। উই জাস্ট হেট হিম। ঐ লেডিকে বলে দিন ওর সাথে আমার কোর্টে দেখা হচ্ছে।”

এডভোকেট চলে গেলে রোহান ছেলেকে শান্ত করে চেপে ধরে। রায়ান শান্ত হলে রোহান বলে
~ আজ যদি একটা বিয়ে করতি তাহলে এই দিনটা দেখতে হতো না।
~ বিয়ে করলে আমার রুমুটার কষ্ট হবে পাপা। পরের মেয়েকে কেইবা নিজের মেয়ে করে নিবে!
~ তুই তো থাকিস ই না দাদুমনির কাছে।

~ আমি থাকি বা না থাকি দিন শেষে আমি রুমুর পাপাই থাকবো। আমি অনেক দেখেছি পাপা বিয়ে করে বউ আনলে প্রায় সবাই চেঞ্জ হয়ে যায়। আর আমি তো আমি।
~ ভাগ্য ভালো থাকলে এমন মেয়েও পেতে পারিস যে তোর মেয়েকে নিজের মেয়ে করে তোর সাথে সুখে পুরো লাইফ কাটিয়ে দিবে।

~ আমার এই জীবনে আমি কাউকে জড়াতে চাই না পাপা। আমরা পাপা মেয়েই বেশ আছি।
~ রুমুর মার প্রয়োজন। মেয়েটা সব সময় মায়ের খোজ করে। সে তো জানেও না তার মা কে! এতে ব্যপারটা সহজ হবে। তোর নতুন বউকে মা বলে পরিচয় দিলেই সে জানবে ইনিই তার মা। হাল না ছেড়ে একটু খোজে দেখতে তো পারিস। একজন মেয়ের জীবনে মায়ের প্রয়োজন যে কতটুকু তা তুই নিশ্চয় জানিস।
~ ভেবে দেখবো পাপা।
রোহান রায়ানের পিঠে দুটো চাপর দিয়ে উঠে যায়।

কোর্টে মুখোমুখি দাড়িয়ে রায়ান লিনা। একটু আগে ব্যরিস্টারের রুম থেকে বেরিয়ে আসছে তারা। লিনা আলাদা কথা বলবে বলে এদিকটায় এসেছে। লিনা বলে ~ রায়ান আমি তোমার লাইফে আবার ব্যাক করতে চেয়েছিলাম কিন্তু শুনলাম তুমি নাকি বিবাহিত। ডিভোর্স না দিয়ে তুমি বিয়ে করেছো এইটা আনবিলেভল। তবুও আবার বলবো আমার মেয়ের জন্য বলবো আমাকে এক্সেপ্ট করো। আমার মেয়ের আমাকে প্রয়োজন। অন্য কেউ আমার মেয়েকে নিজের মেনে নিবে না কখনো। আমি তোমার বড় বউ হয়েই থাকব। তুমি যা বলবে তাই করবো।
রায়ান মিটি মিটি হাসছে লিনার দিকে তাকিয়ে।

লিনা এই হাসির অর্থ বুঝে লজ্জা পায়। আজ লিনা কাচা সবুজ শাড়ি, হাতে কাচা সবুজ চুড়ি, কপালে কাল টিপ, চোখে কাজল, খোলা চুলে এসেছে যেমনটি রায়ান পছন্দ করে। আগের থেকে আরো সুন্দরী হয়েছে সে। অনেক স্মিগ্ধ লাগছে। শেষ পয়েন্টে এসে রুপ দিয়ে রায়ানের মন ভুলানো ভেবেই হাসে রায়ান। এই রুপ দেখেই তো সম্পর্কে জড়িয়েছিলো সে। ভার্সিটিতে ক্যাম্পাসে দেখেই ক্রাস খেয়েছিলো রায়ান যা আজ বাশ হয়ে রিটার্ন আসছে।

হুর পরীর মতো মেয়েটিকে দুদিন ফলো করে বুঝতে পারে এই মেয়ে একদিন এই ভার্সিটিতে রাজ করবে রায়ানের মতো। একে হাত করলে দোষের কি! তাছাড়া সুন্দরীও বেশ পারফেক্ট মেচিং। কয়েকদিন একটু একটু কথা বলে ক্লোজ হয়ে ইজি হয়ে নিচ্ছিল। কয়েকদিন পর প্রপোজ টা করবে ভেবেছিলো। কিন্তু হলো তার উল্টোটা। হুটহাট লিনাই রায়ানকে প্রপোজ করে দেয়। রায়ানের মতে তখন ফাগুন হাওয়া লাগে।

ইয়েস বলতেই লিনা রায়ানের বুকে ঝাপিয়ে পড়েছিলো। সেই থেকে রায়ানের এক্স গুলো একটাও তার ধারে কাছে ঘেসতে পারে নি। নতুন কেউ এলেই ওকে সাইজ করে দিয়েছে। ভিপি রায়ান চৌধুরীর তখন আকাশ ছোয়া অবস্থা। আর আজ সে লিনার উপস্থিতিতে ধুলোর সাথে মিশে যেতে চাইছে।
রায়ান হাসি বন্ধ করে বলে~ মিস লিনা ..কাম উইথ মি।

পর্ব ৮

পাচ দিন পর তৃনা ফোন খুলে। তৃনাকে ফোনে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠে সবাই। কল ধরা মাত্র ই ওপাশ থেকে তৃনা মনোয়ারের কান্নার শব্দ পায়। বুক সহ সমস্ত শরীর যেন এই কান্না শুনে কেদে উঠে। ফোনের দু পাশে বাবা মেয়ের কান্না চলে কিছুক্ষন।

রবিন ফোন নিতে নিলে মনোয়ার ফোন দেয় না। কিছুক্ষন পর মনোয়ার বলে ~ ঠিক আছিস মা?
একথা শুনে তৃনা আরো জোরে কেদে উঠে। আজ কত বছর পর বাবা তার সাথে মা বলে কথা বলছে। কান্না কমিয়ে বলে
~ কাদছো কেনো বাবা? আমিতো ঠিক আছি।

~ বাবারা যে কাদে মা।
~ আমি ঠিক আছি তো।
~ বাসায় ফিরে আয়। আর ফোর্স করবোনা।

~ তুমি ঠিক ভাবে কথা বলতে পারছো না বাবা। আম্মুকে ফোনটা দেও।
শিল্পিকে ফোনটা দিলে শিল্পি চিৎকার করে বলে
~ ফোন অন করতে গেলি কেনো? বন্ধ করে রাখতি। জাহান্নামে চলে যা তুই। আমার কথা ভাবতে হবে না তোকে। আমি তোর তোর মা নই। আমি তো তোকে ভালোবাসি না। তোর বাপ ভাইয়ের মতো তোর উপর ফোর্স করি তাই না?

~ আমি আসছি আম্মু।
~ কতক্ষন আর অপেক্ষা করবো আমি? আমার কলিজা ছানারে দেখতে আর কতো দেরি হবে।
~ কাল ই ফিরছি আম্মু।

~ কোথায় তুই?
~ আছি কোথাও।
~ বল।
~ পুরান ঢাকাতেই আছি। রাখছি।
~ ভাইয়ার সাথে কথা বলবিনা?
~ ফিরে এসেই বলবো। আল্লাহ হাফেজ।

ভার্সিটি থেকে ছুটি নিয়ে নিয়েছিলো তৃনা। আরো দুদিন ছুটি আছে। এই পাচ দিন হোটেলেই বন্ধ ঘরে দিন কেটেছে তার। এবার সে একটু বেরোতে চায়। বোরখা পড়ে ব্যাগ নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। পুরান ঢাকার গিজগিজ করা মানুষের ভির ঠেলে একটা রিকশা ভাড়া করে। প্রায় প্রতিদিন ই রিকশা দিয়ে যাতায়াত করা হয় কিন্তু ঐ বড় জোড় এক ঘন্টা।
রিকশা করে পুরো শহর ঘুরবে আজ। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঢাকা শহরের ধুলোমাখা হাওয়ায় দিন কাটালো। বিকালে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যার দিকে আবার বেড়োলো। এবার হাটছে ফুটপাত ধরে। কোথায় যাবে কোন গন্তব্য নেই।

হোটেলে থাকতেও ভালো লাগছিলো না কিছুতেই। হটাৎ মনে পড়লো কয়েকদিন আগে যে রুমুকে হসপিটালে রেখে আসলো আর তো খবর নেওয়া হয়নি। মেয়েটার একটু খোজ নেওয়া উচিত। কিন্তু যদি রায়ান থাকে। থাকলে থাকবে। মেয়ের কাছে বাবা তো থাকবেই। বাচ্চা মেয়েটার কথা মনে পড়ে কষ্ট হচ্ছিলো খুব। ঐটুকুনি একটা বাচ্চা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরে আসছে।

সারা শরীরে ব্যান্ডেজ না জানি কতো কষ্ট হচ্ছে। এতো দিনে হয়তো রিলিজ দিয়ে দিয়েছে। নাও দিতে পারে যে পরিমাণ ব্যান্ডেজ দেখেছে সারতে সময় লাগবে। ভেবে ভেবেই সিএনজিতে উঠে পড়ে তৃনা। হসপিটালে এসে রিসিপসনে খবর নিয়ে জানে রুমুর রিলিজ হয়নি এখনো। দেখিয়ে দেওয়া কেবিনে যেতে থাকে। পথে লিনাকে দেখে থেমে যায়। নার্সকে ডেকে জিজ্জাসা করে ~ আচ্ছা ইনি এভাবে অদ্ভুদ আচরন করছেন কেনো? একবার বসছেন তো একবার উঠছেন আবার পায়চারি করছেন।

নার্স লিনাকে দেখে নাক ছিটকে জবাব দিলেন
~ ইনি তো কয়েকদিন থেকেই আসছেন। রায়ান স্যারের এক্স ওয়াইফ নাকি! উনি রায়ান স্যারের মেয়ের জন্য এখানে এভাবে এসে বসে থাকে কাদে কিন্তু কেবিন অব্দি পৌছতে পারেন না। উনাকে কেউ রায়ান স্যার অব্দি পৌছতে দেন না। বাজে মহিলা নাকি একটা। যত্তসব।

তৃনা এগিয়ে গেলো। লিনার সামনে দিয়েই কেবিনে ঢুকে গেলো। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখলো লিনা হা করে তাকিয়ে আছে। দরজা হালকা খুলে সামনে রোহানাকে দেখে সালাম দিয়ে ভিতরে ঢুকলো। রোহানা কন্ঠ শুনেই বুঝে গিয়ে বললো ~ আসো আসো না বলে চলে গিয়েছিলে কেনো বলোতো আর আজ এতোদিন পর। এইটা কিন্তু ঠিক করোনি মা।
~ আসলে আন্টি আর্জেন্ট ছিলো তাই তাড়াহুড়া করে চলে যেতে হয়েছে। আর আজ সময় পেলাম।

রোহানা বসতে বললো। তৃনা বেডের দিকে তাকিয়ে দেখলো বেডে বালিশে হেলান দিয়ে রায়ান বসে। তার বুকের উপর দু বাহুর মধ্যে ব্যান্ডেজ করা রুমু ঘুমিয়ে আছে। এ দৃশ্য মুগ্ধ নয়নে গিলে নিলো তৃনা। যে বাবা মেয়ের কাছে আসে না সে আজ কতো নিবিড় ভাবে আগলে ধরে আছে। আসলে যে ভালোবাসা গুলো প্রকাশ্য নয় তা একটু ধাক্কা খেলেই প্রকাশিত হয়। রায়ান চোখ বন্ধ করে আছে। মনে হয় ঘুমুচ্ছে। রোহানা কাধে হাত দিতেই রায়ান চোখ মেলে তাকায়। রোহানা বলে
~ এই যে এই মেয়েটাই রুমুকে বাচিয়েছে। কাজ ছিলো বলে চলেগিয়েছিলো। আজ এসেছে।

ইতোমধ্যে রুমুর ঘুম ও ছুটে গেছে। রায়ান সোজা হয়ে বসে বলে ~ ও হো। আপনি। বসুন। আপনি আমার মেয়ের জীবন বাচিয়েই তো ভেবেছেন দায়িত্ব শেষ আর চো দেখতেও আসলেন না।
তৃনা বসতে বসতে বলল ~ একচুয়েলি বিজি ছিলাম।

~ দেখুন আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবোনা। আমার মেয়ে আমার কাছে কি আমি নিজেও জানি না। শুধু জানি আমার বেচে থাকার একজন প্রয়াস। ওর কিছু হয়ে গেলে আমার পাপা মম এবংকি আমি কেউ বাচতাম না। তবুও আপনাকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে।

রোহানা বলে উঠে ~ ধন্যবাদ দেওয়ার থেকে তোমাকে দাওয়াত দিলে ভালো হয়। আমাদের বাসায় তোমার স্বপরিবারে দাওয়াত রইল মা স্পেশালী তোমার। একদিন সময় করে এসো কিন্তু।

তৃনা মাথা নাড়ালো। তার চোখ এখোনো রায়ান আর রুমুর দিকে। রুমু আর রায়ানের চেহারার মিল ঠিক কতটুকু সেটাই খেয়াল করছে তৃনা। রুমুর চোখ নাক রায়ানের মতো। খোচা দাড়ি ওয়ালা সুকুমার মুখটি দেখে আজো বুক কেপে উঠে তৃনার। চোখ ফেরাতে পারে না। একবার রুমুর দিকে আরেকবার রায়ানের দিকে তাকাচ্ছে। রোহানা টুক টাক কথা বলছে।
বাইরে বসে লিনা ফুসছিলো। কে এই বোরখাওয়ালী? এরি মধ্যে দুজন নার্স আলাপ করতে করতে যায়।
~ এই কেবিনে একটা মহিলা ঢুকলো।

~ হুম দেখলাম তো। হবে হয়তো বাচ্চাটির মা।
~ রায়ান স্যারের বউ নাকি! বাহ দারুন তো। রায়ান স্যার পর্দাশীল বউ পেয়েছে। মাশাআল্লাহ।
এটুকু শুনেই লিনার মাথা গরম হয়ে যায়। সিকিউরিটিকে ধাক্কা দিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়ে। তৃনার কোলে রুমুকে দেখতে পায়। রায়ান রেগে লিনার সামনে এসে দাড়িয়ে বলে ~ হাউ ডেয়ার ইউ? কিভাবে ডুকলে তুমি? বের হও এখান থেকে। এক্ষুনি বের হও।

~ ঐ মেয়েটা কে? তোমার বউ নাকি ঐ মেয়েটা?
~ হ্যা আমার বউ, আমার মেয়ের মম।
~ কিসের মা? আমি জন্ম দিয়েছি ও কিভাবে মা হয়?

~ আমি তোমাকে চিনি না। বের হও তুমি আমার সামনে থেকে। এক্ষুনী বের হবে।
লিনাকে এমন করা দেখে রুমু ভয়ে তৃনাকে জড়িয়ে ধরেছে। সিকিউরিটি এসে টানতে টানতে লিনাকে নিয়ে চলে যায়। রায়ান তৃনার দিকে ফিরে বলে
~ সরি, আই এম সরি ফর দিজ। একচুয়েলি ইটস ফেমেলি প্রবলেম।

রোহানা বলে ~ বুঝলে মা ..এই সে রাক্ষসী টা যার কথা তুমাকে বলেছিলাম। আমার ছেলের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে।
~ আহ মম। চুপ করো।

কোন কথাই তৃনার কানে যাচ্ছে না। আমার বউ, আমার মেযের মা কথাটা বার বার তার কানে উচ্চারিত হচ্ছে। শরীরের শিরা উপশিরায় যেন রক্ত চলাচল থেমে গেছে। ধপ করে বসে পড়ে। রুমু কোলে ছিলো তৃনাকে আরো জোড়ে জড়িয়ে ধরে।
কোর্টে দুই পক্ষের উকিলের বয়ান শেষ হলো। একটা মেমরি কার্ড গিয়ে পড়লো জজের হাতে। জজ ভিডিও টা অপেন করতেই ভেসে উঠে লিনার সাথে এক লোকের নিষিদ্ধ ভিডিও। সেদিন লিনাকে রায়ান একটা হোটেলে নিয়ে যায়। লিনা মনে মনে অনেক খুশি হয়েছিলো। রায়ান তার দিকে ফিরে তাকিয়েছে। রায়ানকে সে আবার ফিরে পাবে।

হোটেলে ডুকে রায়ান একটা রুম বুক করে। লিনার মুখ থেকে যেন কথা বের হচ্ছে না আনন্দে। লিনার ভিতরে গিয়ে কেমন জানি লাগে। এই হোটেলটা কেমন জানি এবনরমাল লাগছে পরিবেশ দেখে। কিন্তু রায়ানকে কিছু জিজ্জাসা করে না এগিয়ে যায়। রুমে ডুকতেই লিনা রায়ানকে জড়িয়ে ধরে। মুখ ধরে ঠোটে চুমু খেয়ে বলে”আমি জানতাম তুমি এখনো আমাকে ভালোবাসো। তুমি আমাকে চাও। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আমরা আবার নতুন করে সব শুরু করবো।”রায়ানের শরীরটা জ্বলে যাচ্ছিলো। ঠোট টা ইচ্ছা করছিলো কেটে ফেলতে। কিন্তু সহ্য করে গেলো। লিনাকে বসিয়ে নিজেও সামনে বসে।

কচি কলাপাতা রংয়ের শাড়ি, কালো টিপ, দু হাতে চুড়ি, চোখে কাজলে মোহনীয় রুপে রায়ানের চোখ জ্বলে যাচ্ছিলো। ভয়ংকর চাহনীতে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছিলো। লিনার হাত দুটো ধরে মুখের দিক তাকিয়ে ছিলো। এই রুপেই অন্ধের মতো দুইটা বছর কেটেছে রায়ানের। অন্য কোন দিকেখেয়াল ছিলো না। কিন্তু রুপধারী কালো মনের মানুষ টি যে কতটা নিকৃষ্ট তা সে হারে হারে জানে। লিনাকে বললো ~ আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য সেই আগের সাজ তাইনা?
~ হুম। আমি আবার তোমার জন্য সেজেছি।
~ আমার সাথে থাকতে চাও তাইনা?

লিনা খুশিতে মাথা নাড়ায়। রায়ান লিনাকে জড়িয়ে ধরে। নিজের মাঝে নিয়ে নেয়। এতো দিনের প্রত্যেকটা যন্ত্রনার শোধ তুলে। লিনা যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে। শরীরে কোন ঠোটের ছোয়া পায়নি লিনা। পেয়েছে হাতে ছোয়া। পুরো শরীরে খামচির দাগ থেকে রক্তও পড়ছিলো। ঐভাবেই রেখে আসছিলো রায়ান। তারপর আরেকজন লিনাকে সেভাবেই ভোগ করে যেভাবে রায়ান করেছে। সেই ভিডিও ক্লিপ ই এখন জজের হাতে। লিনা চিৎকার করে উঠে রায়ানে ঝাকাতে থাকে আর বলে ~ রায়ান এই ভিডিও কেন করলে তুমি? কেনো দিলে এখানে? আমাকে এভাবে নোংরা প্রমান না করলে কি তোমার চলতো না।

রায়ান হাত ঝাড়া দিয়ে সরে যায়। লিনা সেখানে বসেই কাদতে থাকে। সেদিনের পর থেকে অসুস্থ ই সে। তবুও হসপিটালে গিয়ে থেকেছে। তাই আর রায়ানের সাথে পেরে উঠে না। রায়ান মুচকি হেসে বলে ~ বারে! আপনি প্রস্টিটিউট হয়ে হোটেলে পরপুরুষের সাথে থাকতে পারেন আর আমি সেই ভিডিও কি ভাইরাল করে দিতে পারিনা?
~ রায়ান আমি তোমার সাথে গিয়েছিলাম।

~ তো? আমার সাথে গিয়ে আপনি অন্য একজনের সাথে থেকেছেন। এইটা আর নতুন কি? এইটা আপনার মতো প্রস্টিটিউটের কাছে ওয়ান টু ব্যপার। আপনার তো একজন কে দিয়ে হয়না অনেক গুলো লাগে। তাই লেগেছে। আর আমিও তো আপনার পর পুরুষ ই।
~ আমাদের ডিবোর্স হয়নি রায়ান।

~ তুমি যেটা অফিসিয়ালি বলছো সেটা তো মাত্র একটা কাগজ কলমের খেলা। ছিড়ে ফেললেই শেষ। তেমনি সম্পর্ক টাকেও তুমি ছিড়ে ফেলেছো অনেক আগেই। ডিবোর্স না হওয়ার পরেও আরেক জনের সংসার করেছো। আর তালাক তো আমি তোমাকে অনেক আগেই দিয়েছি। শুধু বাকি ছিলো সাইন টা করার।
লিনা কাদছে।
~ আমাকে ক্ষমা করো রায়ান।

~ লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তোমার। তুমি মরে গেছো আমার কাছে লিনা। তোমার লোভ তোমাকে মেরে ফেলেছে। তোমাকে এক্সেপ্ট করা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। সব প্রমান লুটিয়ে নিয়েছিলে তুমি। তাই এই প্রমানটা দিয়ে ডিবোর্স টা করিয়ে নিচ্ছি আমি।
একটা চেকে সাইন করে লিনার মুখের উপর ছুড়ে দিয়ে বলে ~ গো আউট অফ মাই লাইফ।

পর্ব ৯

ঠান্ডা হাওয়ায় রাতের অন্ধকারে ছাদে বসে আছে তৃনা। ফুলের গন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করছে। হটাৎ তৃষা এসে পাশে বসে পড়ে। কিন্তু কোন কথা না বলে চুপ চাপ বসে আছে। তৃষার মনে খচ খচ করছে তৃনা এতোদিন কোথায় ছিলো কিভাবে ছিলো জানার জন্য। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। কিছুক্ষন পর তৃনাই বললো
“বাবা পাঠিয়েছে না তোকে?

“হুম”
“বাবাকে বলিস আমি পুরান ঢাকায় একটা হোটেলে ছিলাম।”
“আচ্ছা।”

“তোর লাভ স্টোরি টা বলতো। সংক্ষেপে বলিস।”
তৃষা পেছন দিক একবার তাকিয়ে রবিনকে দেখে নিলো। আর কেউ নেই দেখে স্বস্তি পেয়ে বলতে শুরু করলো
“চার বছর আগে আমি তখন লিখনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। একটা মেলায় স্টলে বসে কফি খাচ্ছিলাম। সেখানেই প্রথম রায়ান আমাকে দেখে। রায়ান অন্য ছেলেকে দিয়ে লিমনকে ডেকে নিয়ে আমার পাশে এসে বসে। টুকটাক কথা বলে। পরিচয় জেনে নেয়।

তারপর একদিন ভার্সিটিতে দেখতে পাই। তখন তাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই ক্রাস খাই। কি যে হ্যান্ডসাম ছিলো! তারপর গিয়ে কথা বলি। প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে চিনিয়ে দেই। তারপর যখন লিমনের সাথে ব্রেকাপ হলো তখন ফেসবুকে একটা গ্রুপে রায়ানকে দেখি। তারপর আইডিতে রিকুয়েষ্ট দেই। আমার ডিপি দেখেই চিনে ফেলে। তারপর টুকটাক কথা হতে হতে প্রেমটা হয়ে যায়।”

তৃনা পেছন ফিরে রবিনকে বলে”ভাইয়া বাবাকে বলে আসো আমি কোথায় ছিলাম।”পরিস্থিতি বুঝে রবিন চলে যায়। তৃনা এবার জিজ্জাসা করে”তৃষা রায়ান চৌধুরী তোর সাথে কেমন বিহেভ করে? যেমন ধর রোমান্সের ক্ষেত্রে। তোরা ঐসব কিছু করিস নি তো এখনো?
“না আপু। তবে রায়ান অনেক রোমান্টিক। এমনিতেই অনেক আদর করে আমাকে। অনেক ভালোবাসে। অনেক গিফট দেয়।”

“কখনো তার ফেমেলির কারো সাথে যোগাযোগ করিয়েছে?”
“না। এই দিকে এগোয় নি।”
“তুই যদি কখনো জানতে পারিস যে তুই ছাড়া আরো অনেকেই আছে তার জীবনে তখন কী করবি?”

তৃষা উঠে পড়ে। বিরক্তি দেখিয়ে বলে”উফ আপু আবার শুরু করলে তুমি। আমার আর রায়ানকে আলাদা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো তুমি। কতটুকু চিনো তুমি রায়ান কে? কিছুই জানো না তার সম্পর্কে। তোমার থেকে শতগুন বেশি জানি চিনি ওকে। ও অনেক ভালো ভদ্র একটিভ রিচ একজন মানুষ। আমার মামা হাজার চেষ্টা করলেও ওমন ঘরে বিয়ে দিতে পারবেনা আমায়। নিজের কপাল নিজে ঠিক করছি আমি।”
রাগে হন হন করে চলে আসে। তৃনা বলে”নিজের কপাল নিজে খাচ্ছিস তুই।”

রায়ানের অফিসে বসে আছে তৃষা। রায়ান ঢুকতেই সিকিউরিটি জানায় তৃষা নামের একটা মেয়ে দেখা করতে এসেছে। রায়ান পাঠিয়ে দিতে বলে। তৃষা দরজায় নক করে। রায়ান ভিতরে আসতে বললেই ভিতরে আসে। রুমটা একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেয়। খুব সুন্দর করে সাজানো। রায়ান বলে
“বসো”
তৃষা বসে।

“কেমন আছো।”
“ভালো আছি। তুমার কি খবর বলো তো। আমাকে কল দিলে না কয়েকদিন।”
“কল তো আমি খুব কমই দেই। তুমি দিলে না যে?”

“একটা সমস্যায় ছিলাম তাই। মামা আমার জন্য ছেলে দেখছে। আমি চাই তুমি মামার সাথে গিয়ে দেখা করো। আজি।”
“ছেলে দেখছে দেখতে দাও। আমার তো এখন বিয়ে করা সম্ভব নয়।”
“তুমি মামার সাথে কথা বলো এই ব্যাপারটা নিয়ে। দেখো উনি কি বলে।”
“তৃষা আমি এখন বিয়ে করবো না। আমার আরো অনেক দুর আগানোর আছে।”
“এদিকে মামা আমার বিয়ে দিয়ে দিক। তখন চাইলেও আমাকে পাবে না তুমি।”

এরি মধ্যে রোহান আসে। রায়ান রোহানকে দেখে বলে
“পাপা তুমি? অফিসে আসলে যে। ফোন দিলেই তো আমিই চলে যেতাম।”
তৃষার দিকে তাকিয়ে বলে”তৃষা তুই ওয়েটিং রুমে গিয়ে একটু ওয়েট কর প্লিজ।”
“আমার কথার উত্তর টা দাও। তুমি মামার সাথে দেখা করবে আজি। নয়তো মামা আমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবে। মামাকে বলে এসেছি আমি তোমাকে নিয়ে যাবো বলে।

রোহান বলে”বিয়ে দিয়ে দিবে মানে? রায়ান তোর গার্লফ্রেন্ড? মাশাআল্লাহ সুন্দরী অনেক। তো বিয়ে করতে সমস্যা কি?”
তৃষা ঝপাঝপ বলে”আসসালামু আলাইকুম পাপা। পাপা আপনার কি আমাকে ছেলে বউ হিসাবে মেনে নিতে প্রবলেম আছে? আমাদের দু বছরের রিলেশন কিন্তু রায়ান কিছুতেই আমাকে এখন বিয়ে করতে চাইছে না। এদিকে আমার ফেমেলি পেলে এখনি বিয়ে দিয়ে দেয়।”
“স্টপ তৃষা। বাইরে যাও। আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি।”

তৃষা বাইরে যেতেই রোহান চেয়ার টেনে বসে। টেবিলে হাত রেখে বলে”তৃষা নাম। মেয়েটা সুন্দরী আর চটপটে। ভালোই লেগেছে। বিয়ে করে নে।”
“এই বিয়ে নামক ব্যাপারটা আমার কাছে তুচ্ছ পাপা। প্রথমে প্রেম দেখিয়ে বিয়ে করবে তারপর কিছুদিন সংসার করার পর কাবিনের টাকা নেওয়ার জন্য ডিভোর্স দিবে।”

“সবাই এক হয়না।”
“৯৯% এরকম হয় পাপা। চার পাচ টা মেয়ের মতো এই মেয়েও সুন্দরী, চটপটে, লোভী। নিজেকে খুব সস্তা ভাবে।”
“আমার যত দূর মনে পড়ে তুমিও অতি সস্তা।”
চুপ হয়ে যায় রায়ান।

“শোন রায়ান। সবার আগে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখবে যে তুমি কি। তুমাকে বিয়ে করতে চায়। পরিবারকে জানিয়েছে। নিশ্চয় পরিবারের বাধ্য মেয়ে সে। তাই আগের বারের মতো হওয়ার সম্ভাবনাও কম। এতোদিন সমস্যা ছিলো তোমার ডিভোর্স হয়নি বলে কিন্তু এখন তো কোন সমস্যা নেই। আমি যত দূর জানি এখন অন্য কোন মেয়ের সাথে রিলেশনশিপও নেই তোমার। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। কথা বলে আসো তার মামার সাথে।”

“পাপা একটা প্রবলেম আছে। আমার পাস্ট সম্পর্কে কেউ জানে না। আর আমার মেয়েকে কত টুকু কেয়ার করবে সেটাও দেখার বিষয়। আচ্ছা বাদ দাও। কি বলতে এসছিলে বলো।”
“রুমু মম মম বলে কান্নাকাটি করছে। সেদিন ঐ মেয়েটাকে তুমি ওর মম বলেছিলে নাকি? এখন ঐ মেয়ের কাছে রেখে আসো। আমরা আর সামলাতে পারছি না।”

“এটা কিভাবে সম্ভব পাপা?”
“তার জন্য ই বলছি বিয়ে করো। আর আজ দেখা করো। পরে না হয় ধীরে সয়ে রুমুর কথা বলো। যদি মানে তো মানলই নয়তো অন্য কাউকে দেখতে হবে।”

রায়ান এসে মনোয়ারকে বাসাতেই পেলো। মনোয়ার রায়ানে দেখেই খুশি হয়ে গেছে। ভাগনী রাজপুত্র ধরে এনেছে। পারুল তো খুশিতে মুখ দিয়ে কথাই বের করতে পারছে না। রবিন, তৃনা কেউই বাসায় নেই। মনোয়ার এটা ওটা জিজ্জাসা করছে। পারুল বসে বসে শুনছে। শিল্পি নাস্তার ব্যবস্থা করছে। মনোয়ারের রায়ানের কথা আচরন দেখে খুব ই ভালো লাগে। তৃষা কে বলা হয় রায়ানকে নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তৃষা রায়ানকে নিয়ে নিজের ঘরে আসে। রায়ান রুমে এসে খুটিয়ে খুটিয়ে রুম টাকে দেখছে। তৃষা এসেই দরজা বন্ধ করে এক দৌড়ে রায়ানকে জড়িয়ে ধরে।

রায়ানের দুই গালে চুমু দিয়ে দেয়। চোখে চোখ রেখে বিশ্ব জয়ের হাসি হাসে। রায়ান দু হাতে তৃষাকে তুলে ধরে। তৃষা গলা জড়িয়ে ধরে বলে”মামা পছন্দ করে ফেলেছে। এবার তোমার পাপা মমকে ডেকে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে নিতে বলে।”রায়ান এবার দুষ্টুমি শুরু করে দেয়। তৃষাকে জড়িয়ে ধরে। তৃষা রায়ানের কাধ থেকে ব্যাগটা ছুড়ে মারে বিছানায়।

তৃষাকে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে ঠোটে ঠোট মিশিয়ে দেয়। তৃষাও রেসপন্স করে। খানিক পর তারা হাপিয়ে গেলে সরে আসে। দুজনের মুখেই হাসি। রায়ান তৃষাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে দাড়ায়। তৃষা আয়নাতে রায়ানকে দেখতে থাকে। রায়ান তৃষার ঘাড়ে থুতনি রেখে বলে
“মিসেস চৌধুরী হচ্ছো তাহলে তুমি!”
“রায়ান। লুক, উই আর মেড ফর ইচ আদার। পারফেক্ট কিউট কাপল।”

“হুম।”
“কফি খাবে? আমি কিন্তু খুব ভালো কফি করতে পারি।”
“মিস করতে চাইছি না প্লিজ।”

তৃষা হেসে নিচে চলে যায়। রায়ান খাটে বসে এদিক ওদিক তাকায়। পুরো দেয়াল জুড়ে তৃষার ছবি। হাস্যজ্জল মুখটা দেখেই ভালো লাগে তার। চোখ যায় টেবিল কর্নারে। অনেক গুলো বই ডায়রিতে ভরা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেক যত্ম করে রাখা। এর মধ্যে সব থেকে সুন্দর গোলাপী রংয়ের ডায়রিটা চোখে পড়ে রায়ানের। হাতে তুলে নিয়ে দেখে অনেক সুন্দর ডায়রীটা। কিছু না ভেবেই পাতা উল্টায়। প্রথম পাতাতেই চোখ আটকে যায়। পুরো পাতা জুড়ে লাভ চিহ্ন। তার মাঝে {T লাভ R} লেখা। পাশে কলমের অনেক সুন্দর ডিজাইনে ফুল আকা। কি সুন্দর! মনটা ভরে যায় একদম।

এই ডায়রি তৃষা রায়ানকে নিয়ে লিখেছে ভেবেই ঠোটে হাসি ফুটে উঠে। কি লিখেছে দেখতে হবে ভেবেই ব্যাগে নিয়ে নেয়। তৃষা কফি নিয়ে রুমে আসে। রায়ান কফিতে চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষন গল্প করে। একটা ফোন আসে। কথা শেষ করে তৃষাকে বলে
“তৃষা আমার যেতে হবে।”
“একি খেয়ে যাবে না তুমি?”

“আর্জেন্ট যেতে হবে আমাকে।”
ব্যাগ নিয়ে চলে আসে ড্রয়িংরুমে। শিল্পি টেবিলে খাবার দিচ্ছিলো। রায়ান মনোয়ার কে বলে”আংকেল আমাকে এক্ষুনী যেতে হবে। আমি আসি। অন্য দিন আবার আসবো।”
পারুল বলে”কিছু তো মুখেই দিলে না বাবা। একটু খেয়ে যাও প্লিজ।”
“আন্টি অন্যদিন এসে খাবো। আজ আসি আমি।”

রায়ান বেরিয়ে এসে সোজা হসপিটালে আসে। কেবিনে ঢুকে দেখে লিনা রুমুকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করছে রোহানা লিনাকে বার বার সরিয়ে দিচ্ছে। রোহান এক টানে রুমুকে কোলে নিয়ে লিনার গালে কষে চড় দেয়। লিনা চড় খেয়ে চিল্লিয়ে উঠে। রোহান আরো একটা চড় দিয়ে বলে”আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কি করে হয় তোর? আমার অবর্তমানে তুই এখানে এসে আমার মেয়েকে নেওয়ার চেষ্টা করছিস? রাক্ষসী বের হ এখান থেকে তুই।”
“রুমু আমার মেয়ে। আমি ওকে জন্ম দিয়েছি। আমি ওর মম। আমার রাইট আছে ওকে নেওয়ার।”

রায়ান রুমুকে রোহানার কোলে দিয়ে লিনার হাত ধরে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসে। পাশের একটা রেস্টুরেন্টে বসিয়ে দিয়ে সামনে বসে পড়ে। কলারটা উপরের দিকে টেনে দিয়ে বলে
“তুমি কি চাও লিনা?”
“আমি আমার হারানো সংসার ফিরে পেতে চাই।”

“হারানো সংসার! তুমি তো কিছু হারাও নি লিনা। তুমি ছেড়ে চলে গেছো। তোমার অপেক্ষাতে কেউ কখনো বসে থাকবে ভাবলে কি করে?”
“রায়ান এমন করো না প্লিজ। মানলাম তোমার না হয় বউ আছে কিন্তু রুমুর? রুমুর মমের প্রয়োজন রায়ান। আমার মেয়েটা ছোট। ও মম মম বলে কাদছে আর আমি মম হয়ে ওর কাছে যেতে পারি না। এটা কেমন বিচার?”

“লিনা তুমি যখন চলে গিয়েছিলে তখন আমার মেয়েটা দুধের বাচ্চা। ওর প্রত্যেকটা সেকেন্ডে ওর মায়ের প্রয়োজন ছিলো। ঐ সময় তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেলো। কিসের জন্য? টাকার জন্য। সেই সময় আমার কোম্পানি পথে বসে গিয়েছিলো।

তোমার অতিরিক্ত বিলাসিতায় বাধা পড়েছিলো বলে এই রুপ দেখিয়ে অন্য একজনের গলায় ঝুলে পড়লে। ছোট বাচ্চাটিকে মেনে নিবে না বলে আমার কাছে রেখে চলে গেলে। সন্তানের উপর কোন টান ছিলো না তোমার। ছিলো শুধু টাকা পয়সা বিলাসিতার লোভ।

ঐ টুকুন বাচ্চাটিকে আমার মম এতোদিন বড় করেছে। নিজের ঐ সংসার ভেঙে গেছে বলে মেয়ের দোহায় দিয়ে 2বার আমার লাইফে আসার চেষ্টা করছো যা আমি কোনদিন হতে দিবো না। ওর এখন মমের কোন প্রয়োজন নেই।
~ মমের প্রয়োজন সারাজীবন ই থাকে। আর আমার মেয়েটা মাত্র চার বছর। ওকে আমার চাই চাই।
~ রুমুর মম আছে। তোমার মতো কুলাংগার ল
নোংরা মমকে লাগবেনা ওর।

~ পরের মেয়েকে কেউ নিজের মেয়ে ভাবে না।
~ এই চিন্তা তোমার মাথাতেই আসবে। কারন তুমি তো নিজের মেয়েকেই নিজের মেয়ে ভাবতে পারোনি। ভাবলে কখনো মেয়েকে ছেড়ে যেতে পারতে না।
আমার মেয়ের জীবনে আসার চেষ্টাও করবে না।

রায়ান হসপিটালে ব্যাক করতেই রুমু কোলে আসে। মেয়েকে কোলে নিয়ে কপালে চুমু দেয়। রুমু রায়ানের গাল ধরে বলে”পাপা ঐ আনতি টা কে? আমাকে মম বলতে বলে বালে বালে। আমার মম তো ঐদিন আসছিলো। আমাকে আদর দিচে। বলো পাপা বলো”
“হুম মা। ইনি তোমার মম নয়। তোমার তো মম আছে তাই না? সেদিন তোমাকে কোলে নিয়েছিলো না?”

“হুম। কিন্ত মুখ ডাকি রাখছে কেনো? আমি তো মম কে দেখতেই পেলাম না। চোখ দেখেছি। আমার মতো বলো বলো চোখ। চুন্দর। হি হি।”
“ওষুধ খেয়ে নাও পাপা।

পর্ব ১০

টেবিল কর্নার রেকে গিজ গিজা ডায়েরির মধ্যে একটা ডায়রির জায়গা ফাকা দেখে চমকে উঠে তৃষা। ডায়েরী গেলো কই? খেয়াল করে দেখে যে গোলাপী ডায়েরিটাই নেই। অস্থির হয়ে উঠে তৃষা। পুরো রেক তন্ন তন্ন করে খুজে। না পেয়ে পুরো রুম আনাচে কানাচে খুজে। মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার পালা। কার হাতে পড়লো ডায়েরী? কি হবে এবার? ঘর থেকে বেড়িয়ে রবিনের রুমে এলো। সেদিন ডায়েরী নিয়ে রবিন কথা বলছিলো। তাহলে রবিন ই নেয় নি তো? পুরো রুম খুজে না পেয়ে রবিনকে ফোন দেয়। রবিন ফোন ধরে বলে
~ হ্যা তৃষা বল।

~ ভাইয়া কোথায় তুমি?
~ আছি এক জায়গায় বল কি বলবি।
পাশ থেকে আওয়াজ আসে ~ কে ফোন দিয়েছে বাবু?
~ ভাইয়া কোথায় তুমি? পাশে মেয়ের আওয়াজ পেলাম। কে মেয়েটা?
রবিন মেয়েটাকে বলে ~ তৃষা ফোন দিয়েছে। মেয়েটা বলে ~ ওকে কথা বলো।

এদিকে তৃষার রাগ সপ্তম আকাশে। চেচিয়ে বলে উঠে
~ রাত দশটা বাজে এখন আর তুমি জি এফ নিয়ে ঘুরাঘুরি করছো। কোন মেয়ে এতো রাতে বফ এর সাথে থাকে বলোতো? তোমার জুথিকা তাই না? ছেড়ে যদি থাকতেই না পারো তাহলে আছো কেনো? বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসলেই তো পারো।
~ বেশি বলিস না তো।

~ আমি বেশি বলি তাই না? বাড়িতে তো আমাবশ্যার চাদ হয়ে গেছো। এখন আমি বেশি বলি? রাত বারো টার পর বাড়ি ফিরো আবার কথা বলো! মামাকে সব বলে দিবো আমি।
~ ঐঐঐ তুই আমার বোন নাকি ঘরের বউ? এতো জেরা করস কেনো? ভাই প্রেম করছে সাপোর্ট দিবি তা না আবার জিগায়! ফোন রাখ।

তৃষা মন খারাপ করে সেখানেই কিছুক্ষন বসে থাকে। তারপর আবার উঠে তৃনার রুমে আসে। তৃনা পরিক্ষার খাতা দেখায় ব্যস্ত। তৃষা পুরো রেক চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিলো। আশে পাশেও খুজলো কিন্তু পেলো না। অগত্যা রবিনের রুমে এসে বসে রইল।
রবিন একটার দিকে বাড়ি ফিরলো। রবিন তৃষাকে দেখে বলে ~ ঘুমোস নি? এখানে কি?
~ জুথিকা ছেড়ে দিলো বুঝি?

~ ঝগড়া করবি নাকি? এমন ভাব দেখাস কেনো?
~ ঝগড়াই তো করবো। জায়গায় জায়গায় লোক দেখিয়ে প্রেম করে আসবে আর ঝগড়া করবো না?
~ তুই করতে পারলে আমি পারবোনা কেনো? আঙুল চুসতে বলিস? আমি তো হাত পর্যন্ত ধরেছি তুইতো অনেক কিছুই ধরেছিস।

তৃষা নিভল।
~ একটা ডায়েরি পাচ্ছি না ভাইয়া।
~ আমি নেইনি।

~ আচ্ছা। সুর সুর করে রুমে চলে যায় তৃষা। রবিন নিলে ঠিক ই দিয়ে দিতো।
সকাল দিকে ফোন আসে তৃষার ফোনে। আননোন নাম্বার থেকে ফোন। কানে নিয়ে সালাম দিতেই সুরেলা কন্ঠ ভেসে আসে
~ তুমি কি তৃষা বলছো? রায়ানের ওয়াইফ।
~ ইয়েস।

~ দেখা করতে চাইছি তোমার সাথে।
~ কে আপনি?
~ সামনা সামনি বলি? রায়ানকে নিয়ে কিছু কথা ছিলো। আমি রায়ানের এক্স বলতে পারো।
~ ঠিকাছে।

ফোনে একটা মেসেজ আসে। একটা রেস্টুরেন্টের এড্রেস। সেই এড্রেস মতো চলে আসে তৃষা। দশ মিনিট ধরে বসে আছে খোজ নেই উল্লেখ্য মানুষটির। অবশেষে মেইন ডোরে একটি মেয়ের দেখা পায় এদিকেই আসছে। সামনে এসে বসতেই তৃষা খেয়াল করে মেয়েটিকে। আটাশ -উনত্রিশ বয়সের মতো হবে চোখ ধাধানো সুন্দরী যাকে বলে। কালো ড্রেসে আরো সুন্দর লাগছে। এর সামনে নিজেকেই কেমন জানি লাগছে। দেয়ালে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আড়চোখে দেখছে দুজনকে তুলনা করে।

ভালো ভাবে তুলনা করার পর বুঝলো যে সেই এক ধাচের সুন্দরী আর ঐ মেয়েই এক ধাচের সুন্দরী। তৃষার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে ~ হাই আমি লিনা।
তৃষাও হাত এগিয়ে দিয়ে বলে ~ আমি তৃষা।

~ আমি তোমাকে কেনো ঢেকেছি এখানে জানো কি?
~ না বললে জানবো কি করে আপু?
~ রায়ানের সাথে কতো দিনের রিলেশনশিপ তোমার?
~ দুই বছর।

~ আর আমার আট বছর।
~ ঠিক বুঝলাম না।
~ রায়ানকে আমি ভালোবাসি এমনকি বিয়েও করেছি।
আমাদের চার বছরের একটা মেয়েও আছে। হ্যা রুমু আমার মেয়ে। এর মধ্যে তুমি ভুল করে এন্ট্রি নিয়েছো। সেটা তো হতে দেওয়া যায় না তাই না?

~ আপনি কি ভেবেছেন আপনি রায়ানের সম্পর্কে উল্টা পাল্টা কথা বলবেন আর আমি সব বিশ্বাস করে নেবো? কখনোই না। নিশ্চয় বদ মেয়েদের মতো আপনিও রায়ানের প্রেমে দিওয়ানা হয়ে আছেন তাই আমার কাছে এসে উল্টাপাল্টা কথা বলছেন। শুনুন মিস লিনা আপনার মতো অনেকেই রায়ান চৌধুরীকে সপ্ন দেখে বাট ডু ইউ নো রায়ান ইজ অনলি মাইন। এসব প্রেম বিয়ে বাচ্চা নিয়ে কাহিনী করতে আসবেন না একদম আমার সাথে।
~ অন্ধ বিশ্বাস কর বলে কি সব সত্যি মিথ্যা হয়ে যাবে?
~ কি চাই আপনার?
~ লিভ হিম।

~ কখনোই পসিবল না। আপনি কে যে আপনার কথায় রায়ানকে ছেড়ে দিবো? দাড়ান আমি রায়ানকে ফোন দিচ্ছি।
তৃষা রায়ানের নাম্বারে ডায়াল করে রিং হয় কিন্তু রিসিভ করে না। দু বার ফোন দেওয়ার পর ও যখন ধরে না তখন তৃষা রাগ দেখিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। লিনা কিছুক্ষন বসে রাগ কন্ট্রোল করে বের হয়ে আসে। হাটতে হাটতে সামনের পার্কে চোখ পড়তেই দাড়িয়ে যায়। রায়ান রুমুকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে আসছিলো। সেই সময় তৃনা একা একা পার্কে বসেছিলো। রুমু তৃনাকে দেখেই মম মম বলতে শুরু করে। রুমু জোর করেই রায়ানকে তৃনার কাছে নিয়ে আসছিলো। রায়ান বলে ~ তোমার মম নেই তো এখানে। ঐটা একটা আন্টি বসে আছে পাপা।

~ না ঐটাই আমার মম। দেখো এইটা মমের বোলখা। আসো আসো।
~ এক বোরখা অনেক জনের হতে পারে পাপা।
~ এটা মম। তুমি এসো দেখো এটা আমাল মম।

রায়ান রুমুকে নিয়ে যেতেই রুমু মম বলে ডাক দেয়। তৃনা পিছু ঘুরে দেখে রুমুকে কোলে নিয়ে রায়ান দাড়ানো। বুক কেপে উঠে তৃনার। ঘুরে দাড়িয়ে বলে ~ রুমু…
রুমু হাত বাড়িয়ে তৃনার কোলে যায়। রুমু বলে ~ পাপা দেখো আমাল মাম্মা। আমি চিনি তো। কি চুন্দল চোখ আমাল মাম্মাল।
রায়ান বলে ~ সরি। একচুয়েলি আপনার বোরখা দেখেই রুমু চিনতে পেরে গেছে আপনিই হসপিটালে ছিলেন।
তৃনা বলে ~ আপনি দেখলেও তো চিনতে পারতেন।

~ সরি। আমি আপনার মতো লেডিদের দিক থেকে চোখ গুটিয়েই রাখি। আপনারা ধর্ম পালন ও নিজেদের হেফাজতে রাখার জন্য পর্দা করেন। আমি আপনাদের রেসপেক্ট করি।
~ খুশি হলাম। রুমু মা তুমি কেমন আছো এখন?
~ ভালো মাম্মা।

~ গুড। ঘুরতে এসেছো নিশ্চয়! যাও পাপার সাথে ইনজয় করো।
~ তুমি আসো না মম। সবাই সবাল মম পাপার সাথে থাকে তুমি কেনো দূলে থাকো? আমাদেল বাসায় থাকো না কেনো?
রায়ান রুমুর কথা শুনে বলে ~ আই এম সরি মেম। সেদিন এই কথাটা না বললে রুমু এমন করতো না। রুমু চলে আসো আমার কাছে।

তৃনার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। রায়ানকে না ছুতে পাক রায়ানের সত্বাকে তো নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। রায়ানকে বলে~ সমস্যা নেই। থাকুক আমার কোলে। এখনি চলে যাবেন নাকি?
~ না আছি কতোক্ষন।

লিনা পুরো কনফিউজড হয়ে যায়। কাহিনী কি? ঐকটু আগে ও তৃষার সাথে দেখা করেছে তখন তৃষা মর্ডান ড্রেসে ছিলো আর এখনি বোরখা! সেদিন ও তো বোরখাতেই ছিলো। তাহলে তৃষা কি রায়ানের সাথে থাকাকালীন বোরখা পড়ে? স্ট্রেঞ্জ।
লিনা তৃনাকে ফলো করে। ব্যপারটা তৃনা খেয়াল না করলেও তৃনাদের বাসার প্রথম গলির বাড়িটির একজন মধ্য বয়স্ক লোক ঠিক ই খেয়াল করে। লোকটি লিনার পথ রোধ করে। লিনাকে ধমক দিয়ে বলে ~ এই মেয়ে! কাহিনী কি? তুমি তৃনার পিছু পিছু যাচ্ছ কেনো এইভাবে?

~ তৃনা! না না ভুল করছেন। ঐ মেয়েটির নাম তো তৃষা।
~ তৃষা ওর ছোট বোন। কিন্তু আপনার মতলব টা কি বলেন তো?
~ মেয়ে দেখতে এসেছিলাম।
~ ওহ তাই বলেন।
~ আচ্ছা আসি হ্যা?

লিনা তাড়াতাড়ি করে সরে যায়। বুকে হাত দিয়ে বলে
“বাপরে বাপ। কি জেরা করে লোকটা। বড় শালী তাহলে এটা। কিন্তু মেয়ে দেখতে আসছি শুনে কিছু বললোনা কেনো?
রাতে ঘুম আসছিলো না রায়ানের। তৃষার সাথে কথা বলার পর কিছুই ভালো লাগছে না। লিনা বড্ড বার বেরেছে। তৃষা জিজ্জাসা করার পর অনেক কষ্টে ব্যপারটা কাটিয়ে দিয়েছে। রুমে পায়চারি করতে করতে মনে পড়ে তৃষার ডায়রীটার কথা। ডায়রীটা বের করে টেবিল ল্যাম্প জালিয়ে দেয় রায়ান। পৃষ্টা খুলতেই চোখে পড়ে লাভ শেপের মাঝে T❤R লেখাটা।

কিছুক্ষন তাকিয়ে হসে ফেলে রায়ান। পরের পৃষ্টা উল্টিয়ে দেখে একটা কবিতা। কবিতার হেডলাইন”আমার তুমি”
“তপ্ত রোদের আবছা ছায়ায় দেখেছিনু একখানা সুকুমার অবয়ব,
কন্ঠ তাহার কোকিল সুরা সহিত মুগ্ধকর চমৎকার প্রকাশ,
দীর্ঘদেহি রাজপুত্তুর দেখিয়া চমকে উঠিছিলাম আমি
তাহার সাথে কেপে উঠেছিলো ভীতু এই বুকখানি।

বাধন হারা চক্ষু আমার বার বার উপরে পড়ে তাহার বদনখানি,
সেই চক্ষু জোড়ার নজর দিতে দিতে দিয়ে দিলাম এই হৃদয় খানি।
ফাগুনের আগুনে জালিয়ে দিলো অবচেতন এই মন শরীর খানি,
ধীরে ধীরে হয়ে গেলে প্রিয় আমার তুমি।”

কবিতা টি শেষ করে কিছুক্ষন বসে বসে মিটি মিটি হাসে রায়ান। তারপর অপর পৃষ্টা উল্টাতেই আরো একটি কবিতা পায়। যার হেডলাইন”একটু ছোয়া”
“দূরের মানুষ দূরেই রইবে নাহি পাইব ধরিতে
অনিশ্চিত এই সম্পর্কে তবুও কেনো দাও একটু ছোয়া এই তৃষ্ণার্ত বাহুতে?
নিচে লেখা ~ আজ তোমার প্রথম স্পর্শ পেলাম আমি। তোমার এই একটু স্পর্শ আমার হৃদয় ছুয়ে দিয়েছে।

পরের পৃষ্টায় লেখা
“আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমার একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি কাঙাল হয়ে আছি। যদি তোমার আর আমার মাঝে হাজার রকম বাধাও থাকে ..তুমি যদি বিয়েও করো সন্তানের নাতির অভিবাবক ও হও তবুও আমি তোমার জন্য অপেক্ষাই করে যাবো।”
ফোনটা বের করে তৃষাকে ফোন দেয় রায়ান। তৃষা ফোন ধরে বলে
~ একি ঘুমাও নি তুমি?

~ কি করছিলে বাংলার স্টুডেন্ট?
~ এতোক্ষন আপুর সাথে গল্প করছিলাম। এখন পড়ছি।
~ সত্যি?

~ না। বই নিয়ে বসে আছি। লিনা নামের মেয়েটির কথা মনে পড়ছে বার বার।
~ ধরো আমি সত্যি বিবাহিতা হলাম আর আমার বাচ্চাও থাকলো তখন তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে তৃষা?
~ আমাকে পরিক্ষা করতে চাইছো? আমি শুধু জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ঐ সব বিয়ে মেয়ে যে সব মিথ্যা তা আমি ভালো করেই জানি। তোমার সাথে আমি চার বছর থেকে আছি আমি জানি তুমি কেমন।
~ বোকা মেয়ে।

~ তোমার ব্যপারে আমি সত্যিই বোকা।
~ আমি ভালো না তৃষা।
~ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবেনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছো?
~ না।
~ তাহলে?
~ রাখছি।

ফোন রেখে দেয় রায়ান। বারান্দায় গিয়ে গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে তৃষার কথা ভাবতে থাকে রায়ান।
তৃষা কি তাকে সত্যিই ভালোবাসে? তাহলে তৃষার চোখে কেনো তার জন্য ভালোবাসা দেখতে পায়না। নাকি তার ভালোবাসা প্রকাশের ধরন অন্যরকম? হতেও পারে। সব সময় চোখের ভাষা যে রায়ান ঠিক ঠাক বুঝে তাও তো না। ডায়রীতে হয়তো তার প্রেম মিলেছে। কিন্তু তৃষা কি মেনে নিবে যে তার একটা মেয়ে আছে? বড্ড বোকা মেয়েটা নাকি অন্ধবিশ্বাসী? তাকে অন্ধবিশ্বাসীই বলা চলে। শুধু তো তৃষা নয় আরো অনেকের সাথে একসাথে রিলেশন চালিয়ে গেছে রায়ান।

ইদানিং সবার সাথে ব্রেকাপ হওয়ার পর এখন তৃষার সাথেই দৃশ্যমান রিলেশনশিপ টাই আছে। এক্সদের সাথে তো কিছুদিন পর পর নাইট মিট করা হয় শুধু। কিন্তু সেটা তো অপ্রকাশ্য। হটাৎ ই রায়ানের চোখে জল চলে আসে। একটা মেয়ের জন্য রায়ানের সব শেষ হয়ে গেলো। সেদিন তৃনলতাকে আঘাত করাতে লিনার সাথে ঝামেলাটা না করলে হয়তো আজ তার জীবনটা এরকম হয়ে যেতো না। সেদিন লিনার সাথে ব্রেকাপ করার পর লিনা কয়েকদিন আর যোগাযোগ করেনি। তারপর হটাৎ ই একদিন লিনার বাবা ফোন দিয়ে বলে লিনা সুইসাইড করতে গিয়েছিলো আর সুইসাইড নোডে তোমার নাম লেখা।

আমার মেয়ের যদি কিছু হয়ে যায় আমি তোমাকে ছাড়বো না। নিচে চেচামেচি শুনে এসে দেখে পুলিশ দাড়িয়ে আছে। পুলিশ রায়ান রোহান আর রোহানাকে নিয়ে হসপিটালে যায়। হসপিটালে অসুস্থ বেড়ে শুয়ে থাকা লিনাকে দেখে সবার ই মায়া হয়। রোহান রোহানার বেশ পছন্দ হয় লিনাকে। রোহানের উপর নানা রকম চাপ দিতে থাকে লিনার পরিবার যেহেতু তার ছেলের জন্য এতোকিছু। তারপর কাজী ডেকে হসপিটালেই বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। বিয়ের সময় রোহানের হিতাহিত জ্ঞান চলেগিয়েছিলো এতো লোকজনের চাপে। সাথে লিনার চোখের জল তো আছেই। সেদিনের থেকে শুরু হয়েছিলো সুন্দরী লিনাকে নিয়ে রায়ানের সংসার।

এই বাড়ির প্রত্যেকটা কোনায় কোনায় ছিলো যার পদাচরন। ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম ও দিয়েছিলো তারা। মেয়ে হবার পর হটাৎ রায়ানের ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে সব শেষ হয়ে যায়। দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা। যে টুকু আয় হতো তা দিয়ে দিন চলতো। শুরু হয় লিনার পরকিয়া। একসময় দুধের শিশুটাকে কুসংস্কারের ভিত্তিতে অপয়া বলে আর রায়ানকে অক্ষম বলে চলে যায়। সাথে নিয়ে যায় রায়ানের জীবনের সমস্ত সুখ বিন্দু।

পর্ব ১১

তৃষা বাসায় আসতেই পারুল তৃষার হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে বলে”তর নামে পার্সেল এসেছে।”
তৃষা অবাক হয়ে বলে”কিন্তু আম্মু আমার তো কোন পার্সেল আসার কথা ছিলো না।”
“দেখ কিসের পার্সেল।”

রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে তৃষা খামটা খুলে। একটা চিঠি আর আরেকটা খাম বের হয়। চিঠিতে লিনার নামটা দেখে খাম খুলে তৃষা। সামনে বেড়িয়ে পড়ে বেশ কয়েকটা ছবি। তৃষা প্রত্যেকটা ছবি দেখতে থাকে। রায়ান আর লিনার কাপল পিক সব গুলো। মাঝে মাঝে রোমান্স রত ছবিও আছে। লাস্টের ছবি গুলো দেখে তৃষা কান্নায় ভেঙে পড়ে। রায়ান লিনা আর ছোট একটা বাচ্চার ছবি। চিঠির দিকে নজর পড়তেই চিঠি পড়তে থাকে।

“তৃষা ছবি গুলো দেখে নিশ্চয় তোমার মনে আর কোন সন্দেহ নেই। রায়ান শুধু আমার হাজবেন্ড নয় আমার মেয়ের পাপাও। আমি ভেবেছিলাম তোমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু যখন জানতে পারলাম বিয়ের কথা চলছে তখন আর বসে থাকতে পারলাম না। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের জীবন বাচাতে আমাকে এগিয়ে আসতেই হলো।

রায়ানের সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে কিন্তু আমার মেয়েকে আমার থেকে দূরে রেখেছে। ভাবতে পারো তুমি একটা বাচ্চাকে তার মা থেকে আলাদা রাখলে তার মার কতটা কষ্ট হয়! রায়ান অনেক গুলো মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে তার জন্য আমার সাথে ডিভোর্স হয়েছে। তুমাকেও ইউজ করছে শুধু। নিচে কয়েকটা নাম্বার দিলাম যোগাযোগ করে দেখতে পারো। ওরা সবাই রায়ানের বেড পার্টনার।”

চিঠিটা দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে ফেলে তৃষা। আবার বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। রায়ানের অফিসে পৌছায় সরাসরি। রায়ানকে না পেয়ে মাসুদের কেবিনে যায়। মাসুদ তৃষাকে দেখে অবাক হয়। সচারাচর তৃষার সাথে তেমন কথা হয় না মাসুদের। তৃষা মাসুদের কাছে গিয়ে বলে”রায়ান কোথায়?”

“রায়ান সিঙ্গাপুর গিয়েছে। তিন দিন থাকবে সেখানে।”
“কিহ! আমাকে বলে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না একটুও?”
“নেই তো। থাকলে তো করবে।”

“আর চার পাচ জন মেয়ের মতো কি আমাকেও ভাবে?”
“আর চার পাচ জন কেনো বলছো? আমি যতদূর জানি তোমার আর রায়ানের মধ্যে রিলেশন শিপ আছে এখনো।”
“এখনো! না থাকার কথা বুঝি?”
“তেমনটা বলিনি।”

“আসছি”
সেদিন আর তৃষা খাবার খায়নি। রাতে যখন কান্না গুলো জোড়ে জোড়ে দলা পাকিয়ে আসছিলো তখন তৃনার রুমের সামনে এসে দাড়ায়। দু বার নক করতেই দরজা খুলে তৃনা। তৃষা খাটের উপর গিয়ে বসে চুপচাপ। তৃনা তৃষাকে লক্ষ্য করে এসে পাশে বসে জিজ্জাসা করে”কি হয়েছে তোর? চোখ মুখ ফোলা ফোলা কেনো?”

তৃষা ফুপিয়ে ফুপিয়ে হামলে পড়ে তৃনার বুকে। তৃনা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। জড়িয়ে ধরে বার বার তৃষাকে চুপ করানোর চেষ্টা করে। তৃষা মুখ তুলে কাদতে কাদতে বলে”আপু রায়ান আমার সাথে চিট করেছে। ওর অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক। আমাকে মিথ্যা বলেছে আপু। ওর বউ বাচ্চা সব ই আছে। আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম আপু। তোর কথা শুনিনি। আমাকে ক্ষমা করে দে প্লিজ। আপু আমিতো সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। তবু কেনো ধোকা খেলাম?”
তৃনা চোখ মুছে বলে”ধরে নে না এতোদিন এতোজনকে ঠকানোর পুরস্কার এটি।”

তৃষা লিনার দেওয়া নাম্বার গুলোতে ফোন দিয়ে সবার সাথে কথা বলে। সবার একটিই জবাব রায়ানের সাথে অনেকদিন আগেই ব্রেকাপ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মিট করতে ইচ্ছা হলে মিট করে দেটস ইট। লিনার সাথে ডিভোর্স ও হয়ে গেছে। ঘরে বউ থাকলে যাবেই বা কেনো এসব মেয়ের কাছে? আজ বাচ্চা সেটি তো রায়ানের বাবা মার কাছেই মানুষ। মাথা গুলিয়ে যায় তৃষার।
রায়ান ফেরার পর রোহান রায়ানকে নিয়ে তৃষাকে দেখতে আসে। তৃষা যেমনটি ছিলো সেমনটিই তাদের সামনে যায়। ‌পারুল কিছু বলতে গেলে রোহানা আটকিয়ে দিয়ে বলে”থাকনা। যেমনি থাকে তেমনটিই তো চাই। এতো রুপ সাজগোজের আড়ালে ডাকা পড়লে তো দেখতেই পারতাম না। মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর।”তৃষার মুখ থেকে টু শব্দটি বের হয় না। তৃনা থাকলে ঠিক ই ধরে ফেলতো ব্যপারটা ‌কিন্তু সে বাড়িতে নেই। রায়ান এসেছে শুনে বাড়ি ছেড়েছে। রবিন নিচের দিক তাকিয়ে আছে। মনোয়ারের সাথে কথা বলে সবাই চলে গেলে রবিন তৃষার রুমে আসে। দরজায় দাড়িয়েই বলে
“এতো ভালো দিনে এতো চুপ চাপ কেনো তুই?”

“এমনি ভাইয়া”
“ছেলেটা সুন্দর। কিউট আছে।”
“হুম।”

চলে আসতে নিয়ে আবার থেমে গিয়ে বলে”আচ্ছা ছেলেটার চেহারাটায় কেমন ওয়াইন খোর ওয়াইন খোর ভাব আছে না?”
“হুম। কিন্তু ও ওয়াইন খায় না এখন। আগে খেতো। আমিই কমিয়ে এনেছি। এমনিতেই ভালো।”
“ভালো হলেই ভালো। হয়তো সুখিই হবি।”
“সত্যি?”

অবাক চোখে তাকায় তৃষা। রবিন দুবার মাথা নাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায়।
রায়ানের বাসায় এসেছে তৃষা রায়ানকে না বলে। নিচে বসে রোহানার সাথে গল্প জমিয়েছে। রায়ানকে কাজের লোক দিয়ে খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজের লোক রায়ানকে ডেকে আসলে রায়ান রুম থেকে বের হওয়ার সময় রুমু সামনে এসে দাড়ায়। চকলেট খেয়ে মুখে লাগিয়ে রেখেছে একদম। দেখেই রায়ান হেসে ফেলে। রুমু দু হাত বাড়িয়ে দেয় কোলে উঠার জন্য। রায়ান কোলে না নিয়ে পারে না। রুমু কোলে উঠে বলে ~ পাপা তোমাল হাসি চুন্দল।

~ আচ্ছা। চল নিচে যাই। দাদু মনি ডাকছে।
রুমুকে কোলে নিয়ে নিচে এসে তৃষা কে দেখে অবাক হয়। তৃষাও অবাক চোখে রায়ানের কোলে রুমুকে দেখতে থাকে। রায়ান নিচু স্বরে বলে ~ আগে বলবেনা যে তৃষা এসেছে! এখন রুমুকে কোলে দেখে কি না রিয়েক্ট করে। তৃষাকে তো কিছুই বলি নি এসবের।

~ আমি কি করে জানবো যে তুই না জানিয়েই এগিয়েছিস!
রুমুকে রায়ানের কোল থেকে নেয় তৃষা। রায়ান অবাক হয় তৃষাকে দেখে। তৃষা রুমুকে কোলে নিয়ে বলে ~ তোমার বেবি?
~ হুম।
~ সো কিউট। বেবির মম কোথায়?
~ ডিভোর্স হয়ে গেছে।

~ এই টুকুন বাচ্চা মম ছাড়া থাকে!
রায়ান আর কিছু বলে না। রোহানা কিচেনে চলে যায়। তৃষা রুমুর সাথে কথা বলতে থাকে। ঘন্টা খানিক থেকে যাওয়ার সময় বলে”তোমার মেয়ে টাকে দেখতে আসছিলাম। ভয় পেও না। আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো না যদিও জানি তোমার জন্য মেয়ের অভাব হবে না। আমি শুধু তোমার মেয়েকে মম পাইয়ে দিবো।”
রায়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে যায় তৃষা।

রায়ান যেনো হাফ ছেড়ে বাচে। তৃষা তাহলে সত্যি মেনে নিয়েছে রুমুকে। রাতের ডিনারের সময় মনোয়ার বলে”মেয়েরা শপিং শুরু করে দাও। দুই তারিখ আমি বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করেছি। আমার তৃষা মা যখন তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায় তখন দুই তারিখ শুক্রবারের দিন টিই বিবেচনা করে বের করলাম। বড় মেয়েকে তো আর বিয়ে দিতে পারলাম না। ছোট মেয়ের বিয়েতে পুরো এলাকার লোকজন খাওয়াবো আমি। সবাই খুশি হয়ে যায়।

দুপুরে কড়া রোদে রবিন আর তৃনাকে বসে থাকতে দেখে তৃষা ছাদে ওদের পাশে বসে পড়ে। তৃনার দিকে তাকিয়ে বলে”আপু আমি জানি তুমি খুশি হও নি। এরকম ছেলের কিছে কেউ ই বোনকে বিয়ে দিতে চায় না। কিন্তু অতীত অতীত ই রয়ে যায়। বর্তমানে যেনো না আসে সেই দিকেই নজর রাখবো আমি। আমি আমার জায়গা থেকে পিছপা হবো না। তুমি দেখো আমি সুখী হবো রায়ানকে নিয়ে।”

“এই বিয়েতে সকলের ই মত আছে। তাই আমার বলার কিছু নেই। রায়ানকে হয়তো অনেকেই ভালোবাসবে এটা নিয়ে দুজনের মাঝে কখনো অশান্তি বাধিয়ে বসিস না।”
“থ্যাংকিউ আপু।”

রবিন বলে, “তৃনা মেনে নিলেও আমি মানতে পারবো না কোনদিন।”
“তোকে মানতেও হবে না ভাইয়া। আমি মনে করিনা তুই ফেমেলিতে আছিস। বছরে থাতে গুনা দুই তিনদিন তোকে চোখে দেখতে পাই। কি করেছিস আমার জন্য যে তোর মেনে নেওয়ায় আমার কিছু যায় আসবে। তুই আমার ভালো কখনোই চাস না। ভালো চাইলে রায়ানকে বলতিনা আমাকে বিয়ে না করার জন্য?”

“ঐ রায়ানের থেকে ভালো ছেলে আমি তোর জন্য আনতে পারবো। আর আমি না থাকলে আজ তুই থাকতি না। মুখ সামলে কথা বল। বড় তোর সম্মান দিয়ে কথা বল।”
তৃনা বলে, “ঝগড়া করিস না ভাইয়া।”

“ইস….আসছে আমার সম্মান ওয়ালা। কিসের ঝগড়া! সব সময় তো ওই ঝগড়া করিস আমার সাথে। কিসের সমস্যা তোর আমাকে নিয়ে? যুথিকার সাথে অসভ্যতামি করে আমার মাথা হেড করে দাও ঐগুলো বিচার দেই মামার কাছে তার জন্য আমার পিছু লেগেছো? নোংরা মন মাইন্ডের লোক কথাকার। মান ইজ্জতের ভয়ে আমি মুখ খুলতে পারি না জন্য এমন করিস তাই না?”

চটে যায় রবিন। এক লাফে দাড়িয়ে বলে
“তোর মান ইজ্জত আছে নাকি? না আছে তোর মান সম্মান না আছে তোর মায়ের মান সম্মান। থাকলে আমার সাথে এইভাবে কথা বলতে পারতি না। তোর মা এক লোকের সাথে ভেগে গিয়ে তোকে হাতে করে পোড়া মুখ নিয়ে এই বাড়িতে এসে দাড়িয়েছে। এসেই মিথ্যা বলেছে যে তোর বাবা মারা গেছে আমার বাবার থেকে সিমপ্যাথি আদায় করার জন্য।

এতো বছর থেকে এই বাড়িতে থাকছে খাচ্ছে আর সুযোগ পেলে আমাদের নিয়েই কোট কাচালি শুধু করছে। ছোট বেলা থেকে এই আমার জন্যেই তুই টিকে আছিস। রুপ দেখিয়ে স্কুল লাইফ থেকে ছেলেদের মাথা পাগল করে আসছিস। মনে নেই ক্লাস সেভেনে যখন ধর্ষন হতে যাচ্ছিলি এই আমি মাথা ফাটিয়ে বাচিয়েছি তোকে। এরপর একটা জাল কেসে যখন লকাবে গেলি কাউকে না জানতে দিয়ে আমার সেমিস্টারের টাকা দিয়ে বাচিয়েছিলাম তোকে।

সেদিন যখন রায়ানের সাথে হোটেলে ছিলি তখন খবরটাও আমি দিয়েছি তৃনাকে তোকে বাচানোর জন্য। নয়তো এতোদিনে রায়ান চৌধুরীর অনান্য সুন্দরী গার্লফ্রেন্ডের মতো বেডপার্টনার ই হয়ে থাকতি ঘরের বউ হওয়ার আশাও করতে পারতি না। এই আমি যদি যুথিকার সাথে বেড শেয়ার ও করি তাতে তোর কি? তোর কেনো এতো জলে? হুহ? তোর কেনো জলবে এতো?

চেচামেচি শুনে নিচ থেকে সবাই ছাদে চলে এসেছে। মনোয়ার ধমক দিয়ে বলে”রবিন হচ্ছেটাকি এখানে? আমার মা কাদছে কেনো? তৃনা কি হয়েছে রবিন চেচাচ্ছে কেনো?”তৃনা একবার তৃষার দিক তাকায়। তৃষা মুখ চেপে কাদছে। রবিনের দিকে তাকাতেই রবিন মাথা নাড়িয়ে না করে। তৃনা বলে, “এটা আমাদের ভাইবোনের মধ্যে ঝগড়া বাবা। আমরা ঠিক করে নিতে পারবো। নিচে চলো।”

পারুলের কাছে বসতেই পারুল জিজ্জাসা করে
“রবিন তোকে কি বলেছে তখন যার জন্য তুই কাদলি”
তৃষা বলে, “আমার বাবা কোথায় আম্মু?”

“সাত আসমানে।”
“আমার বাবা কোথায় আম্মু?”
“জানিস ই তো মরে গেছে।”

“মিথ্যা কেনো বললে? বাবা থাকতেও আমাকে বাবার থেকে আলাদা কেনো করে রাখলে?”
“তৃষা। বাজে কথা বলিস না। তোর বাবা নেই।”
“আমার বাবা আছে আর বেচেও আছে। আমি আজ দেখে এসেছি আমার বাবাকে।”

“চুপ চুপ। একদম চিল্লিয়ে কথা বলবি না। কে নিয়েগিয়েছিলো তোকে? ঐ রবিন তাইনা? ছেলেটা বড্ড বার বেরেছে।”
“আম্মু…এতো স্বার্থপর কেনো তুমি? আমার বাবার পা ভেঙেগিয়েছিলো বলে তাকে সরাসরি মৃত বানিয়ে দিলে! আমাকে নিয়ে এসে ভাইয়ের সংসারে ভাগ বসিয়ে রাজার হালে খাচ্ছো যেখানে তুমি স্ত্রী ধর্ম পালন করবে আমার বাবাকে সেবা করবে সেখানে ফেলে রেখে আসলে? অথচ দেখো আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী কিন্তু রোজগার করেই আমার বাবাকে খাইয়ে বাচিয়ে রেখেছে।

“খবরদার আর যেনো না শুনি আমি যে তুই ঐ বস্তিতে আর গিয়েছিস। আমার কসম খা রবিনের সাথে আর যাবিনা ঐ লোকের কাছে। আমি যা করেছি বেশ করেছি। আজ যদি তোর বাপের পিছু ধরে থাকতাম তাহলে আজ তুই ঐ বস্তিতে ছেড়া কাপড় পড়ে ইট ভেঙে পানতা ভাত খেতি। এতো ভালো পরিবেশে লেখাপড়া শিখে এতোবড়ো হতে পারতি না। তোর মুখ চেয়েই আমি তোর বাবাকে ছেড়েছি। এর জন্য আমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই।”

লেখা – লাবিবা তানহা লিজা

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “শুষ্ক পাতার ভাজে (১ম খণ্ড) valobasar golpo 2019” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – শুষ্ক পাতার ভাজে (শেষ খণ্ড) – valobasar golpo 2019

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button