কষ্টের প্রেমের গল্প

কী দোষ ছিল আমার – Bertho premer golpo

কী দোষ ছিল আমার – Bertho premer golpo: এসিডের কারনে মেয়েটির চেহারা পুরো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যার ফলে তিনি তার আগের চেহারা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি আর কখনো তার নিজের আগের চেহারা ফিরে পাবেন না।


পর্ব ১

রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল আশফিয়া। এমন সময় একটা বাইক এসে ওর সামনে দাড়ায়। আশফিয়া ভ্রু কুঁচকিয়ে সেই দিকে তাকায় কিন্তু কিছু বুঝে উঠার আগেই বাইকে বসা ছেলেটি তার মুখে এসিড ছুড়ে মারে। আশফিয়া মুখে হাত চিৎকার করে উঠে।

~ আল্লায়ায়ায়ায়ায়াহহহহহহহহ
এসিড মারার সাথে সাথে বাইকটি ফুল স্প্রীডে চলে যায় আর আশফিয়া সেখানে মুখ হাত দিয়ে বসে পরে আর ছটফট করতে থাকে। আর বার বার পাগলের মত চিৎকার করছে,
~ আয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া
আশফিয়ার এমন মনে হচ্ছে যেন ওকে কেউ আগুনে ফেলে দিয়েছে আর তাকে সেই আগুনে পুড়ানো হচ্ছে। ওর মুখ থেকে যেন আস্তে আস্তে সকল মাংস গলে গলে পড়ছে। প্রচন্ড জ্বালা করছে যা সহ্য করার মত না।

আশে পাশে সকলেই দূর থেকে ওকে দেখছে কিন্ত্য কেউ সামনে আশার সাহস পাচ্ছে না। আশফিয়া অনাবরত পাগলের মত চিৎকার করেই চলেছে। ওর এই আর্তনাদ ভরা চিৎকার যথেষ্ট যে কাউরো বুক কাঁপিয়ে তোলার জন্য।

আশফিয়ার এমন চিৎকার ওর সামনে থাকা বান্ধবীগুলো ও শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু কেউ ওর কাছে যাচ্ছে না। সকলেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু শেষে না ওর এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আশফিয়ার এক বান্ধবী নাজিফা সামনে যায়। সকলে মানা করার পরও সে আশফিয়ার কাছে যায় আর নিজের বেগ থেকে পানির বোতাল বের করে তা ওর মুখে পানি ঢালতে থাকে।

তখন আশফিয়া আরও জোরে চিৎকার করে উঠে,
আয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া
নাজিফা ওর অন্য বান্ধবীদের বলে এম্বুলেন্স ডাকতে। ওর কথা মত ওরা এম্বুলেন্স ডাকা হয়।
এম্বুলেন্স এসেই আশফিয়াকে গাড়িতে উঠা আর ওর সাথে নাজিফাও যায়। কেন না এখন আশফিয়াকে যে ওর বড্ড প্রয়োজন। আশফিয়া এখনও কষ্টে ছটফট করেই চলেছে। ওর যেন এই কষ্টের শেষ নেই। আস্তে আস্তে ওর চেহেরার বিকৃতি ঘটছে, থেতলিয়ে যাচ্ছে পুরো মুখ। চেহেরার চামড়া ঝুলে পড়ছে।

প্রায় ৩০ মিনিট পর তারা হসপিটালে পৌঁছায়। আশফিয়ার চিৎকার এ সকল ডাক্তার আর নার্স ওর সামনে হাজির হয় আর ওর এই অবস্থা দেখে দ্রুত একটা রুমে নেওয়া হলো। সেখানে গিয়ে আগে ওর জামা, হিজাব খুলে চেঞ্জ করানো হয়। তারপর প্রায় ১০-১২ জন ওয়ার্ডবয় আর নার্সরা বালতি বালতি পানি রুমে প্রবেশ করে। আর একে একে সকল বালতির পানি ওর উপর ঢালা হয়। আশফিয়া চিৎকার করেই চলেছে। ওর চিৎকারে ওর চাপা কষ্টগুলো বেড়িয়ে আসছে। তার আর্তনাদে পুরো হসপিটালটি কেঁপে কেঁপে উঠছে।

এইদিকে নাজিফা আশফিয়ার ফ্যামিলিকে আশফিয়ার এই অবস্থার কথায় জানায় আর তাদের দ্রুত আসতে বলে। হসপিটাল থেকে পুলিশকেও ইনফর্ম করা হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আশফিয়ার বাবা মা আর ভাই এসে হাজির হয়। তারা এসে নাজিফার সামনে যায় কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তাদের কানে আশফিয়ার আর্তনাত ভরা চিৎকার ভেসে আসে। নাজিফা তাদের সেই রুমের সামনে নিয়ে যায়। আশফিয়ার বাবা মা বাইরের গ্লাস দিয়ে ওকে দেখতে থাকে। আশফিয়া পাগলের মত চিৎকার করেই চলেছে আর ডাক্তার রা ওর উপর পানি ঢালছে।

নাজিফা তাদের বলে যে,
~ আশফিয়ার উপর কেউ এসিড ছুড়ে মেরেছে, যার ফল স্বরুপ সে এমন করছে

নিজের মেয়ের এমন অবস্থা দেখে আশফিয়ার মা নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলেন না জ্ঞান হারালেন সেখানেই। তখন আশফিয়ার ভাই তাকে ধরে আর তাকে ধরে নিয়ে চেয়ারে বসায়।
আশফিয়ার বাবা নির্বাকভাবে তার মেয়েকে দেখতে থাকেন আর চোখের জল ফেলতে থাকেন। আশফিয়ার ভাই আরাফ কি করবে বুঝতে পারছে না। বোনের এমন আর্তনাদ ভরা চিৎকার যে ও নিজেও সহ্য করতে পারছে না।

আশফিয়া খানিকটা স্থাপিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আর তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোট বেলায় থেকেই সকলের আদরের। বাবা মায়ের চোখের মনি আর বড় ভাইয়ের কাছে দুষ্টু মনি।
আশফিয়া ছোট থেকেই দেখতে খুব মায়াবী। গায়ের রং হলুদ ফর্সা। নাকটা চিকন সরু লম্বা। ঠোঁট দুটো একদম গোলাপী। ডান গালে একটি তিল যা ওর সৌন্দর্য আরও ফুটিয়ে তুলেছে। সব চেয়ে বেশি সুন্দর ওর চোখ দুটো। যেন দুনিয়ার সকল মায়া বিরাজ করেছে সেই চোখে। একবার ওর চোখের দিকে তাকালে যে কেউ সেই চোখের মায়ায় পরে যেত।

ছোট থেকে একদম রাজকন্যার মত বড় হয়েছে সে। আজ পর্যন্ত ওকে কেউ একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেয় নি। কষ্ট কি তাকে বুঝতেই দেওয়া হয় নি কিন্তু আজ ভাগ্যের এমন নির্মম দোষা যে আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্টটাই পাচ্ছে। আর কেউ চাইলেও সেই কষ্ট কমাতে পারছে না।
ছোট থেকেই আশফিয়া শান্ত শিষ্ট। কোন রকম ঝামেলা তার পছন্দ না। কিন্তু চোখের সামনে কোন অন্যায় হলে তা মেনে নেওয়ার মেয়ে আশফিয়া না। দরকারের সময় সে প্রতিবাদ করতে জানে। কিন্তু আজ এই প্রতিবাদের ফল স্বরুপ তাকে এইভাবে ভুগতে হচ্ছে।

২০ বালতি পানি ঢালা হয় আশফিয়ার ওপর কিন্তু এর পর সকলেই যা দেখলো তাতে সকলের আত্মা কেপে উঠলো। চেহারা পুরোটা জলসে গেছে। চোখ দুটো নিজের জায়গায় ঠিক নেই। ফুলে একদম উপরে গিয়েছে। যার ফল স্বরুপ তার চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যায়। নাক পুড়া থেতলিয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের ভাজ খুজে পাওয়া মুশকিল। চামড়া পুরো জুলে পরেছে যেন একটু হলেই খুলে পরবে আর পুরো মুখ একদম পুড়ে গিয়েছে। কি নাই বাজে অবস্থা ওর।

আশফিয়াকে দ্রুত ওটিতে নেওয়া হলো। ওর এখন যথা দ্রুত অপারেশন করা প্রয়োজন। তা না হলে তার চেহারা যে বাচানো যাবে না,তাকে নতুন করে চেহারা দিতে হবে, তার চেহারার আকৃতি যে বদলাতে হবে।


পর্ব ২

চারদিকে ডাক্তাররা ছুটাছুটি করছে। সকলের এখন শুধু একজনকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা আর সে হচ্ছে আশফিয়া।
কিছুক্ষন আগেই আশফিয়াকে ওটিতে নেওয়া হয়েছে। ওর এখন যথা দ্রুত অপারেশন করা প্রয়োজন। তা না হলে তার চেহারা যে বাচানো যাবে না। তাকে নতুন করে চেহারা দিতে হবে। এর জন্য যে তার চেহারার আকৃতি বদলাতে হবে।

ডাক্তাররা অপারেশনের সকল ব্যবস্থা করে ফেলে কিন্তু এর আগে তাদের যে আশফিয়ার বাবা মার সাথে কথা বলতে হবে। তাদেরকে যে আশফিয়ার করুন অবস্থার কথা জানাতে হবে। একজন ডাক্তার এসে আশফিয়া বাবা মার সামনে দাড়ায় আর বলে
~ আপনাদের সাথে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল।

ডাক্তার কণ্ঠে কানে আসতেই আশফিয়ার বাবা রাহুল সাহেব চট জলদি দাড়িয়ে যায় আর চিন্তিত কন্ঠে বলেন,
~ আমার মেয়ে ঠিক আছে তহ? কি হয়েছে ওর? ওর কিছু হবে না তহ?

তখন পাশ থেকে আশফিয়ার ভাই আরাফ বলে উঠে,
~ আমার বোনের কিছু হয়নি তহ? ঠিক আছে তহ ও? ডাক্তার বলুন না!

ডাক্তার এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলেন,
~ তিনি ঠিক আছে কিনা বলতে পারছি না। কেন না তিনি যে পরিস্থিতিতে আছেন সেই পরিস্থিতিতে কাউরো ভালো থাকার কথা না। তার উপর এসিড ছুড়ে মারা হয়েছে। যার ফলে আর পুরো চেহারার বিকৃতি ঘটেছে এবং অনেক অংশ একদম বাজে ভাবে জ্বলসেও গিয়েছে। তার উপর তার চোখ দুটো পুরোপুরি ডেমেজ হয়ে গিয়েছে। এখন তার অপরেশন ছাড়া কোন পদ খুলা নেই।

রাহুল সাহেব এইবার ভ্রুকটি একত্রিত করে উত্তেজিত হয়ে বলে,
~ তাহলে দেরি করছেন কেনো? দ্রুত ওর অপরেশনের ব্যবস্থা করুন। যত টাকার প্রয়োজন হয় তা আমি দিব।
ডাক্তার এইবার এনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকে,
~ এইখানে ব্যপারটা টাকার না। আসলে..
আরাফ তখন চিন্তিত কন্ঠে বলে,
~ কি হয়েছে ডাক্তার বলুন? প্লিজ!

ডাক্তার এইবার সাহস জুগিয়ে বলে,
~ আপনাদের অবস্থা আমরা বুঝতে পারছি। এই মূহুর্তে এইসব বলা ঠিক না কিন্তু তাও বলতে হচ্ছে। কেন না এইসব আপনাদের জানা প্রয়োজন।

এসিডের কারনে মেয়েটির চেহারা পুরো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যার ফলে তিনি তার আগের চেহারা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি আর কখনো তার নিজের আগের চেহারা ফিরে পাবেন না। আর আমরা যে অপারেশন করতে চাচ্ছি তাতে আমরা শুধু তার চেহারার আকৃতি ঠিক রাখার জন্য আর তাকে নতুন ভাবে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য। কেন না তার চোখ পুরো পুরি ডেমেজ হয়ে গিয়েছে তাই।
পরবর্তীতে এইরকম আরও অনেক অপারেশন করতে হবে তখন তার একেক পার্ট এইভাবে আস্তে আস্তে ঠিক করা হবে। এতে হয়তো তাকে এক নতুন চেহারা দেওয়া যাবে কিন্তু তাও সে আর আগের মত হতে পারবে না বা আগের চেহারা ফিরে পাবেন না। তাকে নতুন চেহারা নিয়ে এক নতুন পরিচয় নিয়ে বাঁচতে হবে।

এই শুনে রাহুল সাহেব আর আরাফ ধপ করে বসে পরে। কিছুক্ষন আগেই আশফিয়ার মা মানে রাহেলা বেগমের জ্ঞান ফিরেছিল। তাই তিনি ডাক্তার এর কথাগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সে তার মেয়ের এমন করুন অবস্থার কথা যেনে একদম ভেঙ্গে পড়েন। হুট করেই চিৎকার করে কাদা শুরু করে। তার বুক যে তার মেয়ের জন্য ফেটে যাচ্ছে। তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছেন। একটা মার কাছে তার সন্তান যে ঠিক কি তা একজন মা বাদে কেউ বুঝবে না। সন্তানের গায়ে পড়া হাল্কা আচড়ও যেখানে একজন মা সহ্য করতে পারে না সেখানে তার মেয়ে এত কষ্ট সইছে তাতে তিনি কিভাবে শান্ত থাকতে পারে?

রাহেলা বেগমে ও বাকিদের অবস্থা দেখে ডাক্তার শান্ত গলায় বলেন,
~ আমি জানি আপনারা এখন কোন পরিস্থিতি দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু আপনাদের এখন এমন সময় ভেঙে পরলে চলবে না। আপনারাদের স্ট্রোং হতে হবে নিজের জন্য না হলে নিজের মেয়ের জন্য। এখন ওর সব থেকে বেশি সাপোর্টের প্রয়োজন। জানি এই সময় এই কথা বলা ঠিক না। কিন্তু তাও বলছি, আপনাদের এই পেপারে সাইন করতে হবে।
আরাফ এইবার মুখ তুলে ডাক্তারের দিকে তাকায়। আর কৌতূহলী কন্ঠে বলে,
~ এইটা কিসের পেপার?

ডাক্তার এইবার শান্ত গলায় বলেন,
~ দেখুন পেশেন্টের অবস্থা অনেক বাজে। কোন সময় কিছু হতে পারে। আমরা আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা করবো কিন্তু তাও অপারেশন চলাকালীন কখন পরিস্থিতি আবার বিপক্ষে চলে যায় বলা যায় না। এইটা অনেক বড় একটা অপারেশন। এইখানে পেশেন্টের বাঁচার চান্স যেমন আছে আবার মারা যাওয়ার চান্সও ততো টুকুই আছে। ইউ ক্যান সে 50-50। তাই আপনাদের এই পেপারে সাইন করতে হবে যে অপারেশন চলাকালীন কিছু হয়ে যায় তাহলে তার জন্য হসপিটালের কর্তিপক্ষ দায়ী হবে না।

এই কথা শুনার পর তারা আরও ভেঙে পরে। আশফিয়ার বাবা-মা কোন দিনও ভাবেন নি যে নিজের মেয়ের এমন করুন অবস্থা তাদের নিজের চোখের সামনে দেখতে হবে বা এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।

ডাক্তার এইবার তাড়া দিয়ে বলে,
~ প্লিজ আপনারা জলদি করুন আমাদের হাতে টাইম নেই। যা করার খুব দ্রুত করতে হবে।

আরাফ নিজেকে শক্ত করে নেয়। কেন না এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। সে পেপারটি নিয়ে সাইন করে দেয় এবং যথা দ্রুত সম্ভব অপারেশনটি করার অনুরোধ করে।
ডাক্তাররাও আশ্বস্ত করে যে তারা তাদের আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। বাকি আল্লাহ ভরসা। ডাক্তার চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই একজন নার্স এসে বাকি সব ফরমালিটিস পূরণ করিয়ে নেয়।
শুরু হয়ে যায় আশফিয়ার অপারেশন। এইদিকে পুলিশও এসে পরেছে। তারা সর্বপ্রথম আশফিয়ার অবস্থার কথা জেনে নেয়। তারপর আশফিয়ার পরিবারকে জিজ্ঞেস করে দেয়। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করেই চলেছে।
যেমন-
কাউরো উপর সন্দেহ আছে কিনা? আশফিয়ার এমন অবস্থার কারন কি? ওর কি কাউরো সাথে সম্পর্ক ছিল কিনা? বা তার কোন প্রাক্তন ছিল কি না? নাকি ওর কোন শত্রুতা ছিল কাউরো সাথে।
কিন্তু আশফিয়ার পরিবার কোন কথাই বলতে পারলো না। একে তহ তারা ভেঙে পরেছেন। তার উপর পুলিশের এমন উৎঘোট প্রশ্ন যেন তাদের ক্ষত বিক্ষত করছে। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে যে নাজিফা নামের মেয়ে আশফিয়াকে এইখানে এনেছে। তাই তারা নাজিফাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য খুঁজে কিন্তু তাকে পায় না। কেন না একে তহ রাত নেমে এসেছিল আর তার উপর বাসায় যেতে লেট হচ্ছিল। তাই নাজিফা
আশফিয়ার বাবা মাকে বলে আগেই চলে যায়।

যার জন্য পুলিশ ওকে না পেয়ে ক্রাইম স্পোটে চলে যায় যদি কোন ক্লু পায়। আর যাওয়ার আগে কিছু দারোগাকে ক্রাইম হওয়ার টাইম আশফিয়ার কাছে থাকা সকল জিনিস এবং পোশাক কালেক্ট করতে বলে যায়। বিশেষ করে ওর মোবাইল ফোন কালেক্ট করতে বলে। হয়তো সেখান থেকেও কোন ক্লু পাওয়া যেতে পারে। শুরু হয় পুলিশদের তদন্ত।

এইদিকে ওটি রুমে আশফিয়া জীবন আর মরনের মাঝে লড়াই করেই চলেছে। ডাক্তাররাও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আশফিয়াকে বাচিয়ে রাখার। আশফিয়ার বাবা মা সকলের কান্নায় ভেঙে পরেছেন। রায়েলা বেগম বার বার আল্লাহর নিকট আশফিয়ার জন্য সুস্থতা কামনা করছেন।
আশফিয়া কি বেচে আসতে পারবে প্রতিবাদ করতে পারবে কি তার সাথে এই অন্যায়ের জন্য? লড়তে পারবে কি তার হোকের জন্য? নাকি এর আগেই সে তার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে?


পর্ব ৩

আজ প্রায় ২ মাস হতে চললো। আশফিয়া এখন আগের থেকে বেশ সুস্থ। সেইদিনের মরণ যাত্রায় সে বেঁচে গিয়েছিল। হয়তো সে তার প্রতি অন্যায় এর প্রতি বিচার চেতে ফিরে এসেছিল। আজ আশফিয়ার চেহারাটাও একটা আকৃতি পেয়েছে। কিন্তু তাও সেই আগের মত না। পোড়া জায়গা এখনো বুঝা যায়। চামড়াটাও কেমন কালচে আর টান টান হয়ে গিয়েছে। দেখতেও কেমন বিদঘুটে লাগে। সার্জারী চেহারার আকৃতি দিতে পারে কিন্তু আল্লাহর দেওয়া সৌন্দর্য নয়।

এই দুইমাসে আশফিয়ার প্রায় ৭ টা সার্জারি হয়েছে। একেকবার একেক অঙ্গ ঠিক করা হয়েছে। তাতে নতুন করে আকৃতি দেওয়া হয়েছে। আশফিয়া এখন একটু আদটু কথা বলতে পারে। সে এখনো জানে না যে তার চেহারা পুরো জলসে গেছে। নষ্ট হয়ে গিয়েছে তার চেহেরা। আশফিয়ার বাবা মা প্রতিনিয়ত আল্লাহ এর কাছের তাদের মেয়ের সুস্থতা কামনা করেই চলেছে।
এইদিকে পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে যে প্রতিক নামের এক ছেলে আশফিয়ার উপর এসিড আক্রমণ করেছিল।

আশফিয়া যে এলাকায় থাকে সেখানে এক বখাটে ছেলের দল প্রতিনিয়ত আশফিয়াকে বিরক্ত করতো। পর্দা করা সত্ত্বেও তাকে এইসব নিম্ন প্রাণীর কুনজরের শিকার হতে হয়েছিল। তার মধ্যে একজন ছিল সেই এলাকার প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছেলে। যে নাকি আশফিয়াকে পছন্দ করতো। সে রাস্তা ঘাটে অনেকবার আশফিয়াকে থামিয়ে প্রোপস করেছে। কিন্তু প্রতিবারই আশফিয়া মানা করে দিয়েছিল। একদিন ও মাঝ রাস্তায় ওর সাথে জোরাজোরি শুরু করে আশফিয়া ওকে সকলের সামনে চড় মারে। আর সেইদিন নাকি ও সকলের সামনেই আশফিয়াকে হুমকি দিয়েছিল যে,
~ নিজের রুপের উপর তোর অনেক অহংকার তাই না? তোর রুপকে যদি আমি মাটিতে না মিশিয়েছি আমার নামও প্রতিক না। তোর এমন অবস্থা করবো যে তুই ভাবতেও পারবি না।
তখন গলির কুকুরও তোর দিকে তাকাতে ভয় পাবে।

তখন নাজিফাও ছিল ওর সাথে। সেইদিন দুইজনই প্রচন্ড রকমের ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাও বাইরে দিয়ে নিজেকে শক্তই দেখিয়েছিল।
দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন চলেও যায়। সেইদিন আশফিয়া টিউশন শেষ করে বান্ধুবিদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই প্রতিক আর তার আরেকটা ফ্রেন্ড এসে আশফিয়ার সামনে আসে আর ওর উপর এসিড ছুড়ে মারে।

হিজাব পড়া সত্ত্বেও এই এসিডের প্রকোপ থেকে সে বেঁচে উঠতে পারে নি। সেইদিনের পর প্রতিক আর আর তার বাকি বন্ধুরা ঢাকা ছেড়ে সিলেট চলে যায় কিন্তু পুলিশ তাদের খোঁজ পেয়ে যায় আর সেখানে তাদের খোঁজে চলে যায়। এসিড আক্রমণ কেস প্রচন্ড রকমের সেন্সিটিভ হয় বলে এর প্রতি পুলিশদের বিশেষ নজর দিতে হয়। এমন কেস আসার সাথে সাথে তাদের একশন নিতে হয় তা না হলে তাদের চাকরি হারাবার আশংকা থাকে। যার ফলে পুলিশের এক্টিভিটি ছিল বেশ।

পুলিশ প্রতিক আর ওর বন্ধুকে আটক করে ফেলে আর তাদের জেলে বন্ধি করে ফেলে।
পুলিশ প্রতিক এর বাইক ফোরেন্সিক এর জন্য পাঠায়। এবং তাতে তারা সেই বাইকটিতে এসিড এর সন্ধান পায়। এর পর পুলিশ তাদের ইচ্ছা মত টর্চার করে এবং তাদের মুখ দিয়ে সত্যিটা বের কর। তারাও তাদের দোষ শিকার করে যে তারা এই কাজ করেছে। কেন না আশফিয়া প্রতিক কে সকলের সামনে অপমান করে যা ওর সহ্য হয় নি আর তাই সে এমন করেছে। তাদের কাজ থেকে এইটাও জানা যায় যে তারা অনেক হাই রেট দিয়ে ইললিগাল ভাবে এসিড কিনে। যেহেতু চিকিৎসা বাদে এসিড ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ আর দূর্লভ। তাই তাদের ইললিগাল ভাবে চড়া দামে এইটি কিনতে হয়।

পুলিশ সব ইনফরমেশন নিয়ে তাদেরও জেলে বন্ধি করে। এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে।
এইদিকে প্রতিকের বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তার ছেলেকে বের করে আনার জন্য৷। কিন্তু তার সকল চেষ্টাই বৃথা যাচ্ছে। কেন না এইটা অতি সেন্সেটিভ কেস। সকল কেসের উপরে এসিড এটাকের কেসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আর এর প্রতি পদক্ষেপ খুব দ্রুত নেয়া হয়। তার উপর আশফিয়া নিজেই প্রতিকের নাম উল্লেখ করে যে এইসবের পিছনেই সেই ছিল। কেন না আশফিয়া ওকে দেখেছিল। এতে ওদের প্রতি প্রুভ আরও পাক্কা হয়ে যায়। যার ফলে কেউ চাইলেও কিছু করতে পারে না।

সকল টিভি এন্ড নিউসে এই খবরটি ছড়িয়ে পরে। সরকার থেকে কড়া আদেশ আসে যে যত দ্রুত সম্ভব এই কেসকে পেশ করার আর আপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার,। আশফিয়ার ঠিক হওয়ার সাথে সাথে এই কেস এর রায় দেওয়া হবে আর ভিক্টিমকে সরকারের পক্ষ হতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আস্থা দেওয়া হয়।

দেখতে দেখতে আরও ১ মাস কেটে যায়। আশফিয়াকে বাসায় আনা হয়। সে এখন হাটতে পারে, কথা বলতে পারে। কিন্তু সে এখনো তার চেহেরা দেখেনি। কেউ তাকে দেখতে দেয় নি। আশফিয়া শুধু জানে ওর চেহারায় আঘাত পেয়েছিল যা ঠিক হয়ে গিয়েছে।
এইদিকে সত্যিটা যাতে ওর সামনে না আসে তাই বাসার সকল আয়না লুকিয়ে রাখা হয়। বাথরুমের আয়নায় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

কিন্তু তাও শেষ রক্ষা হয় নি। সেইদিন আশফিয়া আয়নার কাপড় সরিয়ে নিজেকে দেখে ফেলে। নিজেকে দেখে সে ভয়ে চিৎকার করে উঠে। সকলেই ওর চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে। আশফিয়া পাগলের মত চিৎকার করতে থাকে। সকলে মিলে ওকে সামলানোর চেষ্টা করে। আশফিয়ার মা আশফিয়ার এই অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেন। আশফিয়া পাগলের মত বলতে থাকে,
~ মা আমার চেহারা! মা আমার চেহারা! মা আমি কিভাবে বাঁচবো এই চেহারা নিয়ে মা বলো না? মা ওরা আমার চেহারা কেড়ে নিল মা। কেড়ে নিল! আমি এই চেহারাই কিভাবে বের হবো কিভাবে সকলের সামনে দাড়াবো বলো না মা। আমার এই চেহারা নিয়ে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই।

কোন অধিকার নেইম হ্যাঁ আমি মরে যাব। আমি মরে যাব!
এই বলে আশফিয়া পাগলের মত কি জানি খুঁজতে লাগলে। আশফিয়ার বাবা মা অনেক চেষ্টা করেও ওকে থামাতে পারে নি।
শেষে ড্রোয়ার থেকে একটা ব্লেড বের করে নিজের হাতে চালাতে নেয়। তখন ওর ভাই আরাফ এসে ওর হাত থেকে ব্লেডটা নিয়ে নেয় আর কষে এক থাপ্পড় দেয়। আশফিয়া তখন নিজে বসে কেঁদে দেয়। তখন আশফিয়ার মা এসে ওকে ধরে।

আরাফ তখন চিল্লিয়ে বলতে থাকে,
~ পাগল হয়ে গিয়েছিস? কি করছিস এইসব? মরতে চাচ্ছিলি? মরলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? বল তুই আমায়?
আশফিয়া কাদতে কাদতে নিচে বসে পড়ে,
~ কী দোষ ছিল আমার ভাই? কি দোষ ছিল বল না ভাই? কেন হলো আমার সাথে এমন বল না? আমিও তহ আট দশটা মেয়ের মত থাকতে চেয়েছিলা। তাহলে কেন আমার সাথে এমন হলো?
কী দোষ ছিল আমার? তারা আমাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিল রে ভাই? আজ আমি বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই? আমার ভিতরকে তারা জ্বালিয়ে শেষ করে দিল।

শেষ করে দিল! আমার চেহারা আমার থেকে কেড়ে নিল। আমায় সকলের সামনে হাসির পাত্র বানিয়ে দিল। কিভাবে যাব বাইরে এই চেহেরা নিয়ে? কিভাবে বাঁচবো আমি এই মুখ নিয়ে? বল না আমায়! বল! এর চেয়ে তহ নিজেকে শেষ করে দেওয়া ভালো।
আরাফ এইবার রাগে চেঁচিয়ে বলে,
~ আজ তোর কাছে এই চেহারাই বড় হয়ে গেল যে তুই এর জন্য আত্মহত্যা করতে চলেছিলি। তোর একবারও কি নিজের বাবা মার কথা মনে পড়লো না? যে বাবা মা তুই হওয়ার আগে থেকেই তোকে ভালবেসে এসেছে
তোর অস্তিত্ব বুঝে তোকে না দেখেই নিজের সবটা দিয়ে ভালবেসে এসেছে। তাদের কথা একবারও ভাবলি? আর তুই এই চেহারা কথা বলছিস।

জানিস তোর এর চেয়ে খারাপ অবস্থা দেখেও বাবা মা তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। নিজেদেরকে শক্ত রেখেছে। কেন জানিস যাতে তুই ভেঙে না পরিস। তোর সেই সকল কষ্টে বাবা মা দিন রাত লুকিয়ে নিজের চোখের পানি ফেলেছে যাতে তুই না দেখতে পারিস। এমন একটা দিন নেই যে তারা আল্লাহর দরবারে তোর সুস্থতা কামনা করেনি। দিন রাত তোর পাশে ছাঁয়ার মত ছিল। কতটা কষ্ট সহ্য করেছে জানিস? আর তুই কিনা আজ আবার তাদের কষ্ট বাড়াতে চাচ্ছিলি।

আচ্ছা তোর কি মনে হয় বাবা মা তোকে ঠিক করেছে এই জন্য যাতে তুই আবার তাদের কষ্ট দিতে পারিস? তাদের চোখের সামনেই নিজের প্রাণ নিতে পারিস? না তারা এমন চায় নি। তারা চেয়েছে তুই সুস্থ হয়ে তোর প্রতি অন্যায়ের জন্য প্রতিবাদ করোস। কিন্তু তুই কি করতে চাচ্ছিলিস? ছিঃ!
আশফিয়া এতক্ষন কেঁদেই চলেছিল কিন্তু ভাইয়ের কথা শুনে সে বুঝতে পারে সে কত বড় ভুল করতে চলেছিল। সে যে স্বার্থপরের মত নিজের চিন্তা করে তার নিজের বাবা মাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলতে চলেছিল।

কিভাবে পারলো সে এমন করতে? কিভাবে! আশফিয়া নিজের ভুল বুঝে ভাইকে জরিয়ে ধরে বলে,
~ মাফ করে দে ভাই। আমি বুঝতে পারি নি যে নিজের অজানতে তোমাদের সকলকে এত কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। মাফ করে দে। আমি আর কখনো এমন করবো না। তোরা যা বলবি তাই হবে। আমি বাঁচবো তোমাদের জন্য বাঁচবো আর আমার সাথে যারা এত বড় অন্যায় করেছে তাদের কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি দিব।
আরাফ নিজের বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
~ এই না হলো আমার বোন। তোকে পারতেই হবেই। ফাইট করতে হবে সকলের সাথে। নিজেকে প্রুভ করতে হবে যে তুই ঠিক ছিলি। তুই কোন দোষ করস নি। করেছে ওই জা***গুলো। আর এর জন্য তোকে শক্ত হতে হবে।

আশফিয়া তখন ছোট করে বলে,
~ হুম।
কিন্তু আসলেই কি আশফিয়া পারবে তার অপরাধীদের শাস্তি দিতে? পারবে কি প্রতিকের মত নরপশুর মুখোশ খুলতে?
পারবে কি প্রতিবাদ করতে? পারবে কি নিজেকে প্রুভ করতে? নাকি সমাজের চোখে সেই কলঙ্কিত হবে? দোষী তাকেই হতে হবে?


অন্তিম পর্ব

টক শোয়ের সকল দর্শকের দৃষ্টি এখন আশফিয়ার দিকে। সকলেই উৎসুক দৃষ্টি আশফিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। দর্শকের এমন আগ্রহ দেখে মিস রিহানা বলে,
~ পরে কি হলো মিস আশফিয়া? আপনি কি কেসটা জিততে পেরেছিলেন নাকি না? আপনার অপরাধীদের শাস্তি দিতে পেড়েছিলেন কি?
আশফিয়া এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে আবার বলা শুরু করে।

এর কিছু দিনের মধ্যেই প্রতিক কে আদালতে পেশ করা হয়। তখন আমিও নিজেকে শক্ত করে ফেলেছিলাম সমাজের সামনে যাওয়ার জন্য। তাদের মুখোমুখি হয়ে তাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। কেন না যদি আমি চুপ হয়ে বসে থাকি আর কোন প্রতবাদ না করি তাহলে এমন হাজারো প্রতিক জন্ম নিবে আর আমার মত হাজারও মেয়ে এমন হিংস্র পশুর শিকার হবে।
সেইদিন আদালাতে আমরা সবাই উপস্থিত ছিলাম। আমি এক ওরনা দিয়ে নিজের ফুল ফেস কাভার করে রাখি। প্রতিককে কাটঘোরাতে দাড় করানো হয়। আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখি ও আমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে। তা দেখে আমার বুকের ভিতর রক্ত ক্ষনন শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু চেয়েও আমি কিছু করতে পারছিলাম না। পারছিলাম না তাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে,
~ কি দোষ ছিল আমার যে তুই আমার সাথে এমন করলি? বল!
কিন্তু পরক্ষণে নিজের এই ইচ্ছাটা দমিয়ে রাখতে হলো।
দেখতে দেখতে কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।

প্রথমে আমাকে ডাকা হয় আর বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়। আমি সব কিছুর ঠিক মত উত্তর দেই আর আইডেন্টিফাই করি যে প্রতিকই সেই ব্যক্তি যে আমার উপর এসিড ছুঁড়ে মারে।
এরপর পুলিশ তাদের স্টেইটম্যান্ট প্রদান করে। ফোরান্সিক রিপোর্টও দেখানো হয় যে তাদের বাইক থেকে যে এসিড জাতীয় পদার্থ পাওয়া গিয়েছে এবং তাদের হাতেও এসিডের কেমিক্যালের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে।
সকল প্রমান ছিল প্রতিকের বিরুদ্ধে। কোন উপায় ছিল না ওর বাঁচার কিন্তু তাও ভাগ্যে কি ছিল জানি না।

সব কিছু দেখার পর জার্জ জানালেন যে এই কেস এর রায় পরের হিয়ারিং এ দেওয়া হবে।
আদালত থেকে বের হতেই বিভিন্ন সাংবাদিকরা আমাকে ঝেঁকে ধরে। তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। যা আমার মাঝে এক ঝড় তুলে দিচ্ছিল।
১ম প্রশ্নঃ
~ আপনার কি প্রতিকের সাথে আগে কোন সম্বন্ধ ছিল?
২য় প্রশ্নঃ
~ আপনিকে কি প্রোতিক কোন আপত্তিকর কিছু করতে চেয়েছিল বা আপত্তিকর প্রস্তাব দিয়েছিল?

৩য় প্রশ্নঃ
~ আপনার চেহারাটা একটু দেখান না। যাতে অন্যরা এই অপরাধের হিংস্রতা বুঝতে পারে।
৪র্থ প্রশ্নঃ
~ আদালাত তো এখনো নিজের রায় দেই নি
আপনার কি মনে হয় প্রোতিক শাস্তি পাবে নাকি না?
সকলকে উপেক্ষা করে যেতে চাইছিলাম। নিজেকে যথেষ্ট শক্ত রাখতে চাচ্ছিলাম কিন্তু শেষে রক্ষা হলো না। একজনে হুট করে প্রশ্ন করেই উঠে,
~ আপনি বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবছেন? আদো কি বিয়ে করবেন আপনি?
তখন পাশ থেকে কেউ একজন বলে,
~ কি যা তা বলছেন? এমন মেয়েকে বিয়ে কে করতেই চাইবে?
তখন যেন আমি আবার ভেঙে চুড়ে চুড়মার হয়ে যাচ্ছিলাম। নিজেকে ঠিক রাখাটা বড় দায় হয়ে যাচ্ছিল। কোন মতে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।

বাসায় এসে চিৎকার করে কাদতে থাকি কিন্তু সেই কান্নাটা বন্দী ছিল শুধু সেই চার দেয়ালের মাঝে। কাউকে বুঝতে দেই নি আমি ভেঙে যাচ্ছি। পরক্ষনেই ভাইয়ার কথা গুলো মনে পরে। যা আমাকে আবার শক্ত হতে সাহায্য করে।
নিজেকে বুঝাতে শুরু করি,

  • এই সমাজ আমাকে কখনো উঁচু হয়ে বাঁচতে দিবে না। আমাকে প্রত্যেকটা পদে পদে অপমানিত হতে হবে, লাঞ্চিত হবে। আমাকে বাঁচতে হলে সকলের সামনে চোখে চোখ রেখে চলতে হবে। সকলকে দেখাতে হবে আমি অবলা নই আর না আমি দূর্বল। আমি এই চেহারা নিয়ে সকলকে বেঁচে দেখাব।

সেই থেকে আমি কান্না করা ছেড়ে দেই। নিজের জন্য না নিজের বাবা মার জন্য বাঁচতে শুরু করি।
কিন্তু এই সমাজ কি আমাদের ভালো দেখতে পারে? না পারে না। মহল্লায় থাকায় সকল পারা প্রতিবেশি আমায় দেখতে আসতে শুরু করে।
আমাকে সাহস দিতে নয় বরং আমার পরিস্থিতির উপর করুনা দেখাতে। অনেকে তহ আমার বাবা মাকে বলেই ফেলেছিল।
~ আগে যদি মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতেন তখন আর এই জামেলাই হতো না। কি হলো এত পড়ালেখা করিয়ে? আজ এর জন্যই তহ ওর এমন করুন দোষা।

~ এই মেয়েকে এইভাবে না রেখে মেরে ফেলুন। কেউ কি আর এমন কুৎসিত মেয়েকে নিজের ঘরের বউ করতে চাইবে? সংসার করতে চাইবে? সারাজীবন কি মেয়ের বোঝা বেয়ে বেড়াবেন নাকি? আর যদি মেরে ফেলতে না পারেন তাহলে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে ফেলেন। এতে মেয়েকে এক সুন্দর চেহারা দিয়ে ভালো ঘরে বিয়ে করাতে পারবেন। তা না হলে সমাজে মুখ লুকানো ছাড়া কোন উপায় নেই।
আমি পাশের রুমে ছিলাম বলে সব শুনতে পাই। আমি কিছু বলার আগেই আমার বাবা চিৎকার করে বলে,
~ আপনার সাহস তহ কম না আমার বাসায় এসে আমার মেয়েকেই মেরে ফেলার জন্য বলছে। আপনি কি আদো মানুষ। আমার মেয়েকে আমি কি করবো না করবো তা নিয়ে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন? আমার মেয়েকে আমি পারলে মাথায় তুলে আজীবন খাওয়াবো। শুনেছেন! আর হ্যাঁ পরবর্তীতে যেন আপনাকে আমার বাসার ত্রীসীমানায় না দেখি।
সেইদিন বুঝেছিলাম এই দুনিয়াতে কেউ কাউরো ভালো চায় না। সবাই নিজ স্বার্থের জন্যই জীবন যাপন করে। একমাত্র বাবা-মাই নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের মঙ্গল কামনা করতে পারেন। বাবা-মা আর ভাই বোন ব্যতীত কেউ আপন নয় কেউ না।

আজ জোর্জ সাহেব তার সিদ্ধান্ত জানাবেন। সকলের মনের মধ্যেই এক অজানা ভয় করছিল। কি হয় না হয়। সকলেই প্রার্থনা করছিলাম যেন আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় হয় আর প্রতিকের কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি হোক।
আল্লাহ হয়তো আমাদের কথা শুনেছিলেন। প্রতিককে মৃত্যু দন্ড দেওয়া হয় আর সাথে ১ লাখ টাকা জরিমানা।
সকলের মধ্যেই খুশির বন্যা বয়ে যায়। আমি আমার অপরাধীকে শাস্তি দিতে সক্ষম হই।
যখন প্রতিককে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন আমি ওর সামনে যাই আর জিজ্ঞেস করি,
~ একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল আমার। #কীদোষছিল_আমার? যে আমার সাথে এমন করলে?

হঠাৎ প্রতিক আমার ওরনা টান দিয়ে খুলে ফেলে আর আমাকে দেখে এক পৈচাশিক হাসি দিয়ে বলে।
~ আমার যা করার ছিল তা আমি করে ফেলেছি। তোর এই রুপের অহংকার আমি ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছি। এখন তুই চাইলেও কেউ আর তোর মত কুৎসিতের প্রেমে পরবে না। তুই আর কখনো ভালো ভাবে জীবন যাপন করতে পারবি না। এর চেয়ে বেশি শান্তির আর কি আছে। আর এমনেও তোর এই চেহারা নিয়ে তুই বেশিদিন বাঁচতে পারবিও না। কেন না আমাদের সমাজ তাদের বাঁচতে দিবে না। আমার যা চাওয়া ছিল তা আমি পেয়ে গিয়েছি এখন মৃত্যু পেয়েও আমি শান্তি পাবো।

এই বলে সে চলে গেল আর আমি স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকি। তখন ভাইয়া আর কাধে হাত রেখে বলে,
~ সকলের কাছে তোর এই চেহারা কুৎসিত হলেও তোর জন্য এই চেহারা সুন্দর। তোর গর্ব! যে চেহারার জন্য আজ তুই সবার করুনার পাত্রী সেই একই চেহারার জন্য তোকে এক সময় সকলের কাছে অনুপ্রেরনীত হতে হবে। দেখে নিস একদিন তুই এই চেহারা নিয়ে গর্ব করবি। সকলের সামনে মাথা উঁচু করে চলবি আর সকলের দিকে আঙুল দেখিয়ে চলবি।

হ্যাঁ ঠিকই আজ আমি আমার চেহারা নিয়ে গর্ব করি। সকলের সামনে মাথা উঁচু করে চলি। আজ সকলেই আমায় শ্রদ্ধা করে। আজ সকলের কাছে আমি ফাইটার ওমেন মানে পরিচিত।

মিস রিহানা তখন উৎফুল্ল সুরে বলে উঠেন,
~ Yes, It is true. You are really a fighter woman. তাই তো আজ আপনি সকল নারীদের জন্য এক উদাহরণ। আজ আপনি সকল অবহেলিত নারীদের জন্য এনজিও চালাচ্ছেন। সকলকের পাশে দাড়াচ্ছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। তার সাথে আজ আপনি পেশাগত ভাবে আইনজীবীও।
আশফিয়া মুচকি হেসে বলে,
~ হ্যাঁ।

মিস রিহানা অবশেষে তার উক্তিটি রাখেন,
~ তা এই টোক শো এর শেষে আপনি আপনাদের দর্শকের জন্য কোন মেসেজ দিতে চান? তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?

আশফিয়া হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে বলে,
~ হ্যাঁ চাই। প্রথমত আমি সকলেই ধন্যবাদ দিতে চাই আমার জীবনের গল্প এত আগ্রহ দিয়ে শুনার জন্য।

আমি সকলকেই শুধু এইটাই বলবো। কখনো কাউরো সমস্যাতে হেসো না। তাকে লাঞ্চিত করো না। তাকে অপমানিত বা করুনার পাত্রী বানিও না। সকলের জীবনেই এমন কোন না কোন কলঙ্কিত অধ্যায় আছে যার থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু এই সমাজের জন্য পারে না।
তাই বেছে নেয় আত্মহত্যার মত পথ। আমার সকলের কাছে অনুরোধ তাদের ওই অন্ধকারে না ফেলে তাকে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করো। কেন না সকলেরই অধিকার আছে সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করার।

আর নারীরা দূর্বল এইটা কখনো ভেব না। কেন না নারীরা চাইলে যে সব করতে পারে তার উদাহরণের কমতি নেই আমাদের পাশে। তার সব চেয়ে বড় উদাহরণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী। কেন না তিনিও একজন নারী আর তার অধীনেই আপনারা চলছি। তাই বলছি নারীদের দূর্বলতা না খুঁজে তাদের পাশে দাড়াও। তাদের প্রত্যেকটা কাজে সাপোর্ট করো।
আর এই টোক শো শেষে সকলের কাছে আমার একটি ছোট প্রশ্ন। আমার সাথে যা হয়েছিল তার জন্য কি আমি আসলে দ্বায়ী ছিলাম? আদো কি দোষ ছিল আমার? সমাজ আর ধর্মের সকল বিধি বিধান মেনে চলেছিলাম আমি। আপনাদের কথা অনুসারে পর্দা করলে মেয়েদের সাথে অন্যায় হয় না। তাই পর্দাও করতাম। ছেলেদের সাথে মিশতাম না। চলাফেরা তো দূরে থাক। নিজেকে বাঁচাতে যা যা প্রয়োজন হতো সব করতাম। তাহলে দোষটা আমার কিভাবে হয়?

যদি আমার দোষ থাকে তাহলে সকলকেই জিজ্ঞাসা করতে চাই, কী দোষ ছিল আমার?
কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না। যেমন আশফিয়াও পায় নি তার প্রশ্নের উত্তরটি।
এমন হাজারো আশফিয়া যাদের আমরা চিনি না জানি। কিন্তু তারা আছে আর আমাদের এই সমাজে ভালো ভাবে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও না পেরে কেউ নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে অথবা বন্ধী হয়ে পার করছে তার জীবন। কেউ বা প্রতিবন্ধী হতে কাটাচ্ছে তার জীবন। এইভাবেই চলছে তাদের জীবন আর আজীবন এমনই চলবে। কারণ আমাদের সমাজ কোন দিন পরিবর্তন হবে না। যদি সমাজকে আমরা পরিবর্তন করতে চাই তাহলে প্রথম কদম আমাদেরই নিতে হবে। প্রথম প্রচেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্রথম কদম নেওয়ার সময়টা আসবে কবে? আদো কি আসবে?

লেখা – আছিফা ইসলাম জান্নাত

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “কী দোষ ছিল আমার – Bertho premer golpo” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – কালো অধ্যায় ছিলে তুমি (১ম খণ্ড) – Bangla golpo love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!