কষ্টের প্রেমের গল্প

আমার সংসার (শেষ খণ্ড) – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প

আমার সংসার – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প: ডিভোর্স দিবো না তো কি করবো? তানহা তোমাকে ভুলতেই পারছিল না। তার উপরে আমার সাথে কোন ফিজিক্যাল রিলেশন করতে আগ্রহী ছিল না।


পর্ব ১৪

হালকা ভাবেই সেজে নিলাম। সাহিলের দেয়া চুড়ি হাতে পড়লাম।
অনুভূতিটা দারুণ কাজ করছিলো।
মনের মাঝে ভালোবাসা দোলা দিয়ে উঠেছে। কল্পনার রাজ্য হারিয়ে গেলাম আজ।

দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে সাহিল। অপলোক ভাবে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আচমকাই কল্পনার ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে সাহিলের চোখে চোখ পড়তেই বললাম, আপনি কখন এলেন?
~ এই তো এলাম।
~ ওভাবে তাকিয়ে আছেন যে? একটু হালকা করে সাজলাম। খারাপ লাগছে খুব! তাহলে সব ধুয়ে আসি।

সাহিল এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়।
কানের পাশে মুখ লুকিয়ে আস্তে করে বললো, বেশ লাগছে তোমায়। হালকা সাজে তোমায় পরীর মত লাগে। তোমার দিকে তাকালে কেমন জানি চোখ ফিরাতে পারিনা। জানিনা তখন কোন রাজ্যে চলে যাই। তোমার চোখে নেশা আছে। পাগল করা নেশা।
আমি তো পুরোই অবাক। সাহিলের এখন আবার কী হলো? নেশা করেছে নাকি! না নেশা করবে কেন?
আচ্ছা যাবেন না। আমি তো রেডি হয়ে গেছি।
~ সোনিয়া তুমি পাঁচ মিনিট সময় দাও। আমি এখুনি রেডি হয়ে আসছি।

~ হুম।
পাঁচ মিনিট পরে সাহিল রেডি হয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে এক রাশ হাসি এনে বললো,
এবার চলো।
~ দুই মিনিট একটু অপেক্ষা করুণ আমি মাকে বলে এখুনি আসছি।
সোনিয়া আমি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে গেইটের সামনে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি তুমি জলদী এসো।

রুম থেকে বেড়িয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে মায়ের রুমে ঢুকলাম।
~ মা আসবো।
~ হুম আয়। আমার রুমে আসতে তোর এত পারমিশন নেয়া লাগবেনা।
তোর যখন খুশি তখন চলে আসবি।

~ ঠিকাছে মা। তবে ছোটবেলা থেকে জেনেছি বড়জনদের রুমে ঢুকলে পারমিশন নিতে হয় এটা নাকি আদব। তাই তো ঢোকার সময় পারমিশন নেই।
~ সোনিয়া তোকে যতই দেখি ততই মুগ্ধ হই জানিস। মাঝে মাঝে মনে হয় তুই আমার সানজিদা। সানজিদা আর তোকে কখনো আলাদা দেখিনা। সব সময় তোর জন্য দোয়া করি। প্রতি ওয়াক্তে তোদের সুখি দাম্পত্য জীবন কামনা করি। জানিস সোনিয়া, তানহাকে আমি আমার মেয়ের মতই ভালোবাসতাম। সব সময় খেয়াল করতাম তানহার যেনো কোন কষ্ট না হয়। সাহিল কখনো তানহার বাড়িতে যায়নি। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো বলে তানহার বাবা ওদের সম্পর্কটা মেনে নেয়নি।

সাহিল অনেকবার তানহার বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলো কিন্তু সে সাহিলকে ক্ষমা করেননি বরং মেয়েকে সব সময় পরামর্শ দিতেন যেনো সাহিলকে ডিভোর্স দেয়। কিন্তু দেখ আল্লাহর কী অসীম রহমত তানহার বাবার মনের আসাটা আল্লাহ ঠিক পূরণ করেছেন। কারণ আল্লাহ ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয়না।
হঠ্যাৎ ফোনটা বেজে উঠলো,
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি সাহিলের নাম্বারটা ভেসে উঠেছে।
প্রথমবার কলটা কেটে দিতেই সাথে সাথে আবার ও কল ঢুকলো ফোনে।

সোনিয়া সাহিল কল দিচ্ছে না। জলদী যা না হলে সাহিল আবার রেগে যাবে। আমি সাহিলকে ফোনে বলে দিয়েছি কী কী নিয়ে যেতে হবে।
~ মা কী দরকার ছিলো এসবের?
আমি বাবার বাসায় যাবো তাই বলে এত কিছু!

শোন তুই এখন চৌধুরী বাড়ির সম্মান। তাই তোকে নিয়ে এই প্রথম আমার ছেলে যাচ্ছে শ্বশুড়বাড়ি। আর সেখানে কী খালি হাতে যাওয়াটা কী শোভা পায় তুই বল?
~ ঠিকাছে মা আপনার যেমনটা ভালো মনে হয়েছে তাই করেছেন।
পায়ের পায়ে সালাম করে রুম থেকে বেড়িয়ে আসলাম।
নিচে নেমে দেখে সাহিল গাড়ির সামনে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

~ ‘কী ব্যাপার এভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?
~ তোমাকে দেখবো বলে।
~ মজা করছেন।
~ না তো! মজা করার কী আছে?

তাছাড়া তুমি কী মজার পাত্রী নাকি!
~ আচ্ছা শোনেন এত কথা প্যাঁচাচ্ছেন কেনো? আপনি আস্ত একটা জিলাপী। সব সময় তার মতই প্যাঁচাতে থাকেন।
~ বাহ্ রে। আমি জিলাপী হলে তুমি কী দোকানি? যে আমাকে বানাইছো।

সাহিলের কথা শুনে না হেসে পাড়লাম না। আচ্ছা শোনেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন নাকি গাড়িতে বসবো।
~ ওহ্ হ্যাঁ। স্যরি ভুলেই গেছিলাম যে তুমি গাড়িতে বসবে।
ভ্রু কুঁচকে সাহিলের দিকে তাকিয়ে রাগে ফোঁসাতে ফোঁসাতে গাড়িতে বসলাম।
গাড়িতে বসে আছি মুখ ভার করে।

জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছি।
সোনিয়া সিট বেল্টটা কোমড়ে বেঁধে নাও।
~ নিচ্ছি। সিট বেল্ট তো আমি বাঁধতে পারিনা। তাহলে এখন কী হবে? সাহিল জানতে পারলে হয়তো হাসাহাসি করবে। বলবো!

না থাক। কিন্তু না বাঁধলে ও নয়!
গাড়ি স্টার্ট দিলে ঝাঁকি খায়। এতে এক্সিডেন্ট ও হতে পারে। তার চেয়ে বরং লজ্জা শরম রেখে বলি,
এই যে শোনেন, সিট বেল্টটা আপনি যদি একটু কষ্ট করে বেঁধে দিতেন তাহলে উপকৃত হতাম।

সাহিল আমার দিকে তাকায়। তারপর সিট বেল্টটা বেঁধে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। খুব জোরে টানছে গাড়ি। ত্রিশ মিনিটের পথ বিশ মিনিটেই পৌঁছে গেলো সাহিল।
গাড়ি থেকে নেমে বাবার বাসায় ঢোকার জন্য দরজায় কড়া নাড়লাম।
মা এসে দরজাটা খুলে দিলো।
আমাকে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরলো।

~ সোনিয়া মা এসেছি। কতদিন পরে তোকে দেখলাম। ভাবছি যাবো, কিন্তু একটা না একটা ঝামেলার কারণে যাওয়া হয়নি। তোর বাবার শরীরটা ও তেমন ভালো না। তাই তো তোকে দেখতে যেতে পারেনি।
~ বাবা কোথায়?
~ বাজারে গেছে একটু আগেই। তুই বিশ্রাম নে কিছুক্ষণ পরে চলে আসবে।

~ আচ্ছা।
মা রানী কী বাসায় আছে?
রানীর কথা শুনতেই মায়ের মুখটা শুকিয়ে গেলো। মনে হলো নামটা শুনেই আৎকে উঠেছে।
~ কী হলো মা? রানীর কথা শুনতেই তুমি এভাবে ভয় পেয়ে গেলে যে?
কী হয়েছে মা? রানী ঠিক আছে তো?

~ সোনিয়া তার মানে তুই রানীর ব্যাপারে কিছু জানিস না?
~ না মা। আমি কী করে জানবো। বিয়ের পরে তো রানীর সাথে আমার দেখাই হয়নি। তাছাড়া তোমার বাসায় ও তো আসতে পারিনি। আমি সেদিন কল দিয়েছিলাম কিন্তু নাম্বারটা রং নাম্বার বলেছে। সিমটা হয়তো অন্য কেউ ইউজ করে।
মা বলোনা রানী কোথায়?

~ তোর বিয়ের পরেরদিন থেকে রানীকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। আজ পর্যন্ত মেয়েটির কোন খোঁজ পায়নি। কেউ বলতে ও পারছেনা জল জ্যান্ত মানুষটা কোথায় গেছে? বা কী হয়েছে রানীর সাথে?
পুরো ১ মাস রানীর নিখোঁজ সংবাদ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় ছিলো পরে আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সাথে সব কিছু নিরব হয়ে গেছে। এদিকে রানীর বাবা মেয়েকে ফিরে পাওয়ার জন্য তন্নতন্ন করে সব জায়গায় খুঁজেছে। রানীকে খুঁজতে গিয়ে চাকরীটা ও হারিয়েছে। অবশেষে রানীর ছোট বোন খিদের জ্বালায় কাঁদছিলো। তাই দিশাবিশা না পেয়ে রানীর মোবাইল টা বিক্রি করে দেয়।

খুব অভাবে দিন কাটাচ্ছেন তারা। রানীর মা বারবার মেয়ের চিন্তায় বেহুশ হয়ে পড়ে। হুশ আসলেই রানী রানী বলে কাঁদতে থাকে।
মায়ের মুখে রানীর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটা কিছুতেই হজম করতে পারছিনা। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো।
সোনিয়া তুই সাহিলকে নিয়ে বস আমি কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করছি।

সাহিলকে সাথে নিয়ে চেয়ারের উপরে বসলাম। দুজনে আজ মুখোমুখি বসে আছি। সাহিল আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। আমি প্রচন্ড রকমে ঘামচ্ছি।
সাহিল তার হাতটা আমার হাতের উপরে রাখলো। চোখ তুলে সাহিলের দিকে তাকালাম। এই মূহুর্তে সাহিলের হাত দুটো খুব বিশ্বস্ত মনে হচ্ছে। কেউ কোন কথা বলছিনা।

আমার মাথায় রানীর ব্যাপারটা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছুতেই মানতে পারছিনা। বসে আছি ঠিকি কিন্তু মনের মাঝে ঘূর্নিঝর বইছে।
মা ট্রেতে করে নাস্তার প্লেট সাজিয়ে নিয়ে এসে আমাদের সামনে রাখলো।
সোনিয়া, সাহিল নাও খাওয়া শুরু করো। গরীবের ঘরের সামান্য কিছু বন্দোবস্ত করেছি মাত্র।
সাহিল আমার দিকে তাকায়।

আমি সাহিলের দিকে তাকিয়ে তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, মা তোমার জামাই নিজেকে কখনো বড় মনে করেনা সব সময়ই সাধারণ ভাবে। কিন্তু আমি এতদিনে তাকে যতটুকু চিনেছি সে সাধারণের ভিতরেই অসাধারণ।
মায়ের চোখ পানিতে ভিজে যাচ্ছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিলো।
মা শুনে ভীষণ খুশি হলাম। তুই সুখে থাকলেই আমরা সুখি।

তোরা খেতে থাক আমি তোর বাবাকে কল করে জিজ্ঞাস করছি কতক্ষণ লাগবে বাড়িতে আসতে।
এদিকে রানার বাবা চেয়ারের উপরে বসে আছে। তার ছেলে গতকালকে বাসায় এসেছে। যেখানে আনন্দে তার মন ভরে ওঠার কথা সেখানে সে খুব কষ্ট পাচ্ছে। তানহাকে তার একদম সহ্য হচ্ছেনা। দেখলেই ঘৃণা লাগছে। রানাকে দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, রানা বিবাহিত জীবনে সুখে নেই। ছেলেটা আগে যা ছিলো তার এক ভাগ ও নেই। কী পেয়েছে ঐ মেয়ের ভিতরে সেটাই বুঝতে পারছিনা। রানা তো সত্যি ভালোবেসে পাগল প্রায় কিন্তু মেয়েটি রানাকে একদম পছন্দ করেনা। একদিনেই তিনি আঁচ করতে পেরেছেন ব্যাপারটা। মাথার চুল তো আর এমনি এমনি পাঁকেনি।

তবুও ছেলের মুখের দিকে চেয়ে কিছু বলছেনা। সব কিছু হজম করে নিয়েছে।
রানা ফ্লোরে বসে আছে। তানহা বিছানার উপরে শুয়ে আছে। দুজনের ভিতরে মনমালিন্য চলছে।
তানহা এখনো ডিভোর্স চায়। গতকাল রাতে ডাক্তারকে কল করেছে বাচ্চাটা এর্বোশন করানোর জন্য। খুব খারাপ লাগছিলো শুনে। নিজেকে সামলাতে না পেরে থাপ্পর মেরে বসে তানহার গালে।

তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কোন কথাই বলেনি কেউ। রানা খুব অস্বস্তি ফিল করছে। ইচ্ছা করছে তানহার গলাটা চেপে ধরি। তানহাকে বিয়ে করে জীবনটা তেজপাতার মত হয়ে গেছে। মনের ভিতরে বিন্দুমাত্র ও সুখ নেই। রানা হাঁটুর উপরে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে রাখলো।


পর্ব ১৫

আমাদের নাস্তা করা শেষ হয়ে গেলে সাহিলের ফোনটা বাজলো। সাহিল ফোনটা হাতে নিয়ে দরজার সামনে যায়। ফোনে কথা বলা শেষ হলে ঘরে ঢুকে বললো, সোনিয়া এখন যে যেতে হয়। গোল্ডের দোকান থেকে কল করেছেন। যা অর্ডার করেছিলাম সেটা বানানো হয়ে গেছে। কারিকর আবার বাসায় যাবে তাই আমাদের জিনিসটা দেখানোর জন্য বসে আছে। আসা করি সব ঠিকঠাক হবে তবুও একবার গিয়ে চেক করা উচিত। হাতে সময় ও নেই। বলেছিলো কালকে দিবে কিন্তু আর্জেন্ট ছিলো দেখে আজই কম্পিলিট করে ফেলেছে।

আমি সাহিলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি কী আগেই বানাতে দিয়েছিলেন।
~ এই তো পাঁচদিন আগে বানাতে দিয়ে এসেছিলাম। বুঝিনি যে এত তাড়াতাড়ি দিবে।
~ বিয়ের ব্যাপারটা জানতেন এর জন্য।

~ হুম। বিয়ে উপলক্ষেই কিনেছি তরিঘড়ি করে নয়তো তোমায় নিয়ে যেতাম। যাই হোক আমার পছন্দেরটা আপাতত পড় তারপর তোমার পছন্দের মত কিনে নিও।
~ আপনার পছন্দের জিনিসটাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে আপনার চয়েজ আর আমার চয়েজ একই হবে।
~ কী করে বুঝলে তুমি?
~ বুঝি বুঝি সবই বুঝি।

~ ওহ্ আচ্ছা। এবার তাহলে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নাও। আবার সময় করে অন্য একদিন এসে রাতের ডিনার করে যেও।
~ হুম।
মা, মা,
~ বল সোনিয়া।

~ বাবা তো এখনো এলোনা। এদিকে সাহিলের আর্জেন্ট কল এসেছে ওর এখুনি যাওয়া লাগবে সেখানে। বাবার সাথে আজ তাহলে দেখা হলোনা। অন্য কোনদিন আসবো।
~ তোর বাবাকে কয়েকবার কল করলাম কিন্তু বন্ধ বলছে। হয়তো ফোনে চার্জ নেই।
~ হতে পারে হয়তো চার্জ নেই নতুবা নেটওয়ার্ক নেই।

মা তুমি আর বাবা বিয়ের পরে তো আমার শ্বশুড়বাড়িতে যাওনি। একদিন এসো। বাবাকে কতদিন হলো দেখিনা।
~ ঠিকাছে। তোর বাবা আসুক তাকে বলবো যে তুই এসেছিলি।
~ আচ্ছা মা।

বাবার বাসা থেকে বেড়িয়ে গোল্ডের দোকানে ঢুকলাম। দোকানদার সাহিলের অর্ডার মত নেকলেসটা বের করলো।
~ দেখুন স্যার পছন্দ হয়েছে কিনা!
~ সোনিয়া দেখো তোমার পছন্দ হয় কিনা! না হলে সমস্যা নেই অন্য ডিজাইনের বানিয়ে দিবে।
নেকলেসটা হাতে নিতে মনের ভিতরে দারুণ এক অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। নেকলেসটা এতটা সুন্দর যা বলার মত না। হাতে নিয়ে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছি নেকলেসের দিকে।

~ সোনিয়া পছন্দ হয়েছে?
~ হুম অনেক পছন্দ হয়েছে। খুবই সুন্দর নেকলেসটা।
~ স্যার বলছিলাম না আপনার চয়েজ আছে। ভাবীর পছন্দ হবে।
~ ধন্যবাদ ভাইয়া। নেকলেসটা প্যাক করে দিন।

নেকলেস টা প্যাক করে সোনিয়ার হাতে দিলাম। সোনিয়া ভীষণ খুশি।
গোল্ডের দোকান থেকে বেড়িয়ে পাশেই চায়না প্যালেসে ঢুকলাম।
ভিতরে ঢুকে দুজনে পাশাপাশি বসে আছি। টেবিলের উপরে মেনু কার্ড।
একটুপরে ওয়েটার আসলো।

~ স্যার অর্ডার প্লিজ।
আমি মেনু কার্ড দেখে তেহেরি আর দুইটা কোল্ড ড্রিংকস অর্ডার করলাম।
মিনিট দশেক পরে খাবার দিয়ে গেলো।
সোনিয়া শুরু করো।
আমি চামচ দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। হঠ্যাৎ আমার চোখ আটকে পড়লো রেস্টুরেন্টের স্পেশাল রুমের দিকে। ভালো করে তাকালাম।
রানী
~ রানী। কোথায় রানী সোনিয়া?

~ ঐ যে সামনের স্পেশাল রুমে বসা।
~ তুমি শিউর ওটা রানী।
~ সাহিল আপনি এসব কী বলছেন আমার ছোটবেলার বান্ধবী আর আমি চিনবোনা। কিন্তু রানী এত সেজে আছে কেনো? দেখে তো মনে হচ্ছে পার্টিতে আসছে। পড়নে আবার জিন্স, শার্ট। হাতে কতগুলো বেসলাইট। রানী তো এমনভাবে চলাফেরা করতোনা আগে।
~ সোনিয়া তাহলে তোমার কোথায় ও ভুল হচ্ছে। কিছুটা এক রকম দেখতে তো মানুষ হয় তাই না! তুমি এখন খাও। বাসায় গিয়ে রানীর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাবে।
হঠ্যাৎ আমার চোখের উপরে রানীর চোখ পড়লো। আমাকে দেখে ও চমকে গেলো। হঠ্যাৎ করেই রানীর হাসি মুখটা কালো হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে আমাকে দেখে নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

আমি তাকিয়ে আছি এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের পলক ফেলছিনা।
তারপর মেয়েটি রুমের পর্দাটা টেনে দিলো।
~ সাহিল আপনি দেখলেন আমাকে দেখে পর্দা টেনে দিলো। এতে কী বুঝা যায় বলেন, রানী আমাকে চিনতে পেরেছে তাই নিজেকে লুকাতে এমন করছে।
~ সোনিয়া, কী করছো? মেয়েটি হয়তো পর্দাটা টেনেছে এই কারণে যে তুমি তাকিয়ে ছিলে। আর তোমার তাকানো দেখে মেয়েটি লজ্জা পাচ্ছে আর তাই খেতে ও আনইজি ফিল করছে। এছাড়া ঐ মেয়েটি যদি তোমার বান্ধবী হয়ে থাকতো তাহলে আমি শিউর সে নিজে থেকেই তোমার কাছে আসতো কথা বলার জন্য।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, জানিনা রানী কেনো আসেনি কিন্তু আমি ও শিউর যে ঐ মেয়েটা রানীই ছিলো।
~ সোনিয়া খাওয়া শেষ করো বাসায় যাবো। অনেক সময় হয়ে গেছে আমরা বাহিরে এসেছি তাছাড়া বাহিরের অবস্থা বেশী ভালো না। মেঘ করে আছে।
বৃষ্টি নামতে পারে।

~ সাহিল আমি গিয়ে দেখে আসবো রানী কিনা!
~ সোনিয়া কী সব বলছো এসব? তোমার কোন অধিকার নেই যে ঐ মেয়েকে গিয়ে জিজ্ঞাস করার।
তাছাড়া তুমি যাওয়ার পরে মেয়েটি যদি অস্বীকার করে তাহলে ভীষণ ঝামেলা হয়ে যাবে। তার থেকে চল আমরা বাসায় যাই।
মেয়েটি উঠে আমাদের পাশ ঘেষে বাহিরে চলে গেলো। যেতে যেতে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো।

আপনি কী খেয়াল করেছেন রানী বেরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে দেখতে ছিলো। ওর চোখ বলছে ও রানী। নিশ্চয়ই রানী কোন বিপদে পড়েছে।
~ সোনিয়া তুমি আপাতত এই রানীর চিন্তাটা বাদ দাও। এভাবে করছো কেনো?
সাহিল আমার হাত ধরে বিল পে করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গেলো।
সাহিল গাড়ির দরজা খুলতে যাবে তখনি পাশে তাকিয়ে দেখলো তানহা।
তানহাকে দেখে সাহিল আমার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

সাহিল তুমি আমাকে দেখে খুশি হওনি? তোমাকে কতদিন দেখিনা বলে মনটা ছটফট করতে ছিলো। ভালোই হলো যে রাস্তায়ই তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলো। না হলে তোমার বাসায় যাবো ভাবছিলাম।
তানহাকে দেখেই মেজাজ পুরো বিগড়ে গেলো। এমনিতেই রানীর জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে তার ভিতরে সামনে এসে পড়েছে উটকো ঝামেলা। মন চাচ্ছে থাপ্পর মারি। তবুও নিজেকে সামলিয়ে বললাম,
~ রানা ভাই আপনি এখনো তানহার মাথাটা ঠিক করতে পারেননি। আপনি এতদিন কী করেছেন?

ভাবতেই অবাক লাগছে একটা মেয়েকে সামলাতে পারেননা। যদি একটা মেয়েকেই সামলাতে না পারেন তাহলে অন্যের বউকে নিয়ে পালিয়েছিলেন কেনো?
আপনি কী পুরুষ? আমার তো আপনাকে কাপুরুষ মনে হচ্ছে। আমার কথায় কষ্ট পাবেননা তবে কথাগুলো সত্যি। তবুও বলবো। আমাকে বলতেই হবে।
একজন পুরুষ হয়ে একটা মেয়ে মানুষকে আপনার প্রতি পাগল করতে পারছেন না। উফ! ভাবতে পারছিনা। আপনি তানহাকে নিয়ে গিয়ে আপনার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে পাগল করে দিন যাতে করে সাহিলের নামটা চিরতরে ভুলে যায়।

এতক্ষণ আপনাকে বুঝিয়ে বললাম,
কিন্তু তবুও যদি আপনার ওয়াইফ আমার হাজবেন্ডের পিছনে লাগতে আসে তাহলে আমার আসল রুম দেখবেন।
আর তানহা তুমি ও কান খুলে শুনে রাখো, নিজের স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা নিয়ে সুখে থাকার চেষ্টা করো। শুধু শুধু অন্যের স্বামীর দিকে নজর দিচ্ছো কেনো?
আমার স্বামীর যা আছে তোমার স্বামীর ও তাই আছে। সো ফার্দার যদি আমার স্বামীর পিছনে আসো তাহলে তোমাকে আর বুঝিয়ে বলবোনা।
আমার এই হাত দুটো দেখেছো অনেকদিন কাউকে মারেনি। তাই বলছিলাম কী এমন কিছু সৃষ্টি করোনা যাতে করে আমার হাত তোমার গাল পর্যন্ত উঠতে বাধ্য হয়।
কথাগুলো বলেই সাহিলের হাত ধরে গাড়িতে বসলাম।

সাহিল গাড়ি স্টার্ট দিলো। ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে।
মাঝ রাস্তায় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমার দিকে তাকায়।
সোনিয়া আই এম স্যরি। রিয়েলি রিয়েলি স্যরি।
~ স্যরি বলছেন কেনো?
~ আজ আমার জন্য তোমাকে এত বড় অপমান সহ্য করতে হয়েছে।

আসলে আমি খুব
~ দেখেন কোন কথা বলবেন না। এখানে স্যরি বলার কিছু হয়নি। তাছাড়া তানহা খুব বাজে নোংরা মনের মেয়ে। তা না হলে ডিভোর্স হওয়ার পরে ও বারবার সেই স্বামীর কাছে আসতে চায়। নিজের স্বামী আছে। যার সাথে পরকিয়া করে পালিয়ে গিয়েছিলো। এতদিনে কী রানার কাছে থেকেও মন ভরেনি? তাহলে প্রেগন্যান্ট হলো কী করে? অনেক প্রশ্ন আসে। সবগুলোর উত্তর নেই আমার কাছে।
তাই নিরব ভাবে দেখতে হয়।

তারপর ও সবচেয়ে বড় কথা সে প্রেগন্যান্ট। রানার সন্তানের মা হতে চলেছে। অথচ আজ সেই সন্তান বলেন স্বামী বলেন কোনটার পরোয়া সে করছেনা। শুধু ডিভোর্স হয়ে যাওয়া স্বামীকে চাচ্ছে। কত বড় নোংরা মেন্টালিটির সে।
আমি থাকতে কখনো ঐ দুষ্ট মহিলাকে আপনার কাছে আসতে দিবোনা। তাতে আমার যা হোক হবে কিন্তু এর শেষ দেখে ছাড়বো।
সাহিল আমার দিকে অপলোক ভাবে তাকিয়ে আছে।

ভাবছে সোনিয়া তোমায় যত দেখছি ততই অনুপ্রেরিত হচ্ছি। খুব ভালো লাগে তোমায়।
আচ্ছা গাড়ি স্টার্ট দিন। সাহিল সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। গেইটের কাছে এসে গাড়ি থামলো।
দরজা খুলে দিলে আমি গেইট খুলে ভিতরে ঢুকলাম। সাহিল গাড়িটা গ্যারেজে রেখে নেকলেসের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাসায় ঢুকলো।
তাহিয়া রুম থেকে বেরিয়ে এসে বললো, সাহিল ভাইয়া মা আপনাকে ডেকেছেন।

~ হুম। তুই যা। আমি যাচ্ছি।
সাহিল মায়ের রুমে ঢুকলো।
মা আমায় ডেকেছো?
~ হুম। এখানে বস। তোর সাথে আমার কথা আছে।
~ কী কথা মা বলো।

~ বলেছিলাম তো আগামী মাসে নিজের বাসায় যাবো কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে কয়েকদিনের ভিতরেই উঠবো। কেয়ারটেকার কল দিয়েছিলেন। তার একা এত বড় বাড়িতে থাকতে ভয় লাগে।
এখন তোর কী মতামত?

~ মা তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই হবে। আমার কোন মতামত নেই। তোমার মতেই আমার মত। সাহিল কথা বলছে তখনি আমি চায়ের মগ নিয়ে রুমে আসলাম।
~ মা পারমিশন কিন্তু নেইনি। (হেসে হেসে)
~ ভালো করেছিস। যদি পারমিশন চাইতি তাহলে তোর সাথে কথাই বলতাম না। আমি মায়ের দিকে চায়ের মগটা এগিয়ে দিলাম।
~ বাহ্ সোনিয়া। তুই তো আমার মন পড়ে নিয়েছিস। খুব চা খেতে ইচ্ছা করছিলো কিন্তু বানিয়ে খেতে ইচ্ছা করছিলোনা। ভালোই হলো তোকে বলার আগেই চা নিয়ে আসলি।

মা আপনি তাহলে চা খান আমি রুমে গিয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করি।
~ হুম যা।
আমি রুমে গিয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করতে নিলাম। শাড়ি খুলে ব্লাউজের সব কটি হুক খুললাম এমন সময় সাহিল এসে রুমে ঢুকলো।
ইশশশশশশ, বলেই সাহিল চোখ বন্ধ করে নিলো।
সাহিল রুমে ঢুকেছে দেখেও কিছু বললাম না।
তারপর ব্লাউজ খুলে গেঞ্জি পড়লাম।

প্লাজু পড়ে সাহিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কী হয়েছে এভাবে চোখ ঢাকার কী দরকার?
~ আমতা আমতা করে, ইয়ে মানে তুমি ড্রেস চেইঞ্জ করবে ভালো কথা দরজাটা আটকে দিয়ে তো করবে নাকি? এভাবে কেউ খোলা রাখে।
~ বাহ্ রে। আমি জানি আমার রুমে বিনা অনুমতিতে কেউ আসবেনা তাই তো দরজা আটকানো প্রয়োজন মনে করিনি।
~ কেউ আসবেনা না।
~ নাহ্।

~ এই যে আমি আসলাম।
~ এটা তো আপনার ও রুম তাই আপনি যখন খুশি তখন আসতে পারেন। আপনার অনুমতির প্রয়োজন নেই।
ভ্রু টা কুঁচকাতে কুঁচকাতে বিছানার উপরে গিয়ে বসলো।
আমি ও নাছোড় বান্দা। সাহিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
~ সোনিয়া তোমার কী ওড়না ও নেই?
~ ওড়না!

~ হুম।
~ ছিলো তো কিন্তু এখন দেখছিনা। তাছাড়া ওড়না দিয়ে কী করবো?
সাহিল মাথা নিচু করে কথা বলছে।
~ আমি বুঝতে পেরে সাহিলকে রাগানোর জন্য বললাম, আচ্ছা এই গেঞ্জিতে আমাকে কেমন লাগছে।
ভাবছি এখন থেকে বাহিরে এসব পড়েই নামবো যেমনটা সব মেয়েরা পড়ে। আমাকে কিছু গেঞ্জি কিনে দিবেন?
আপনার চয়েজ মত দিয়েন তাহলেই হবে।

সাহিলের চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে কী বলবে বুঝতে পারছেনা।
ইচ্ছে করছে নিজের চুলগুলো নিজেই টেনে ছিঁড়ে ফেলি।
~ কী হলো আপনি এভাবে হাঁদারামের মত চুপ করে আছেন কেনো? বলেন না আমাকে কেমন লাগছে।
সাহিল রুম থেকে চলে যেতে নিলে আমি সাহিলের হাত ধরলাম।
~ কোথায় যাচ্ছেন?
~ বাহিরে।

~ কেনো?
~ ভালো লাগছেনা।
~ সিগারেট খাবেন।
~ হ্যাঁ।
~ চলুন আমি ও খাবো।
~ সোনিয়া তোমার কী হয়েছে?
তুমি উল্টা পাল্টা কথা বলছো কেনো?

~ উল্টা পাল্টা না। আমি ও আপনার সাথে সিগারেট খাবো। তারপর নিকোটিনের ধোঁয়া নাক দিয়ে বের করে দেখবো আপনারা সিগারেট খেয়ে মনের কষ্ট কী করে ভুলে থাকেন।
আমি ও খেয়ে আমার মনের কষ্টগুলো ভুলতে চাই।
~ তোমার আবার কীসের কষ্ট?
~ আমার কী কোন কষ্ট নেই?
~ আমার জানা মতে নেই।

~ তাহলে শোনেন, প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন থাকে বিয়ে হবে। বিয়ের পরে স্বামী তাকে পাগলের মত ভালোবাসবে। সব সময় সুখে, দুঃখে পাশে থাকবে। কেয়ারিং, শেয়ারিং করবে কিন্তু দেখেন আমি কী পেলাম?
বিয়ে তো ঠিকি হয়েছে আদৌ স্বামীর ভালোবাসা পেলাম না। পাবোই বা কী করে তার তো মন প্রাণ আরেকজনকে দিয়ে এখন শূন্য হৃদয়। যেখানে কোন ভালোবাসার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই।
বলতে পারেন কবে আমার স্বপ্ন গুলো পূরণ হবে?
~ নিশ্চুপ সাহিল। চুপ করে দাঁড়িয়ে আমার কথাগুলো শুনছে।


পর্ব ১৬

সাহিল আমার দিকে অপলোকভাবে তাকিয়ে থাকে। চোখদুটো পানিতে ছলছল করছে। কোন কথা বলছেনা। কেমন জানি বুকের বা পাশটায় চিনচিন করে ব্যাথা শুরু হয়ে গেলো। অনেকক্ষণ পরে ধীর গলায় বললো,
সোনিয়া সিগারেট শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য মেয়েদের জন্য নয়।

~ বাহ্ রে সিগারেটের গায়ে কী লেখা আছে এটা অনলি ফর বয়েজ।
~ ‘হ্যাঁ লেখা আছে।
~ আচ্ছা আমি তো কোনদিন লেখা দেখিনি। যদি আপনি আমাকে নিজ চোখে দেখাতে পারেন তাহলে আমি মেনে নিবো আপনি যা বলছেন পুরোটাই সত্যি।
সোনিয়া তুমি এত বেশি বুঝো কেন?

সব কিছুতেই সিআই ডির মত এত খোঁচা খুঁচি করো কেন? সাধারণ ভাবে মেনে নিতে পারোনা।
~ না পারিনা। আর সাধারণ ভাবে মেনে নিয়ে কী করবো? যেখানে আপনি মানে সাহিল চৌধুরী আমাকে এত বড় একটা ভুয়া নিউজ দিচ্ছেন আর আমি সেটা গপগপ করে গিলে নিবো। শোনন আমি এত বোঁকা নই যে সত্যতা যাচাই না করে বিশ্বাস করবো। তাছাড়া আমি সহজে কোন কিছু বিশ্বাস করিনা। যতক্ষণ না উপযুক্ত প্রমাণ পাই।

সাহিল মুখটা বাঁকিয়ে বললো, তোমার না
~ হ্যাঁ বলুন আমার না কী?
~ কিচ্ছুনা। আমার মাথা।
~ আপনার মাথা তো আপনার সাথেই আছে তাহলে এমন করে বলছেন কেনো? এভাবে যে মাথাকে অপমান করছেন এরপর দেখবেন আপনার মাথা ভীষণ রেগে যাবে। শেষে আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।
কথাটা বলেই মুখ চেপে ধরে হাসলাম।

সোনিয়া, সোনিয়া বলে হাত দুটো তুলে আবার নামিয়ে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো সাহিল।
এই যে চলে যাচ্ছেন কেনো?
আমি ও সিগারেট খাবো।
সাহিল চলে গেলে আমি ও তাড়াতাড়ি করে রান্না ঘরে গেলাম। চুলায় চায়ের কেটলিটা বসিয়ে গিয়ে পানি গরম হওয়ার অপেক্ষা দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি সাহিল আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এভাবে চলে গেলো।
~ সোনিয়া, তুই এত রাতে কিচেনে কি করিস?

জিহব্বাতে কাঁমড় বসিয়ে দিয়ে মুখটা অল্প করে পিছনে ঘুরিয়ে তারপর স্বাভাবিক গলায় বললাম,
মা মাথায় প্রচন্ড পেইন করছে তাই চা বানাতে এসেছি।
~ কই দেখি দেখি। গলায়, কপালে হাত দিয়ে বললো, না গাঁ তো ঠিক আছে জ্বর টর নেই।

আচ্ছা সোনিয়া এত রাতে যদি চা খাস তাহলে তো রাতে ঘুমাতে পারবিনা। তুই কি আবার ও রাত জাগবি? পরে আবার চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলবি।
~ মা আসলে কি আমার না ছোটবেলা থেকে অভ্যাস এটা। যদি কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করি বা মাথা ব্যাথা করে তাহলে গরম গরম এক কাপ চা খেলেই মাথা ব্যাথা গায়েব হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর থেকেই অল্প অল্প ব্যাথা ছিলো এখন সেটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তাই চা খেতে রান্নাঘরে চলে এলাম।
~ হুম বুঝলাম। তোর সাথে তর্কে যেতে চাইনা তাই তুই যা বলছিস সেটাই মেনে নিলাম। এখন বলছিলাম কি,
~ হ্যাঁ মা বলুন।

~ যদি তোর আরকি, বলছিলাম তোর যদি সমস্যা না হয় তাহলে আমার জন্য এক কাপ না হয় পানি বাড়িয়ে দে। আমি তো আবার চা খোর। তোর চায়ের পানি দেখে আমার জিভে জল এসে গেছে।
~ আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম।
~ আমাকে এভাবে দেখে লাভ নেই ধরে নে আমি তোর লোভা শ্বাশুড়ি।
মাকে জড়িয়ে ধরলাম।
মা আপনি পারেন ও বটে। ভালো লাগে আপনার কথাগুলো শুনতে।
~ আচ্ছা সোনিয়া, সাহিলের সাথে কি তোর কিছু হয়েছে?

~ আমতা আমতা করে চুল ধরতে ধরতে বললাম, না মা তেমন কিছু হয়নি। আমি তার কাছে কিছু জানতে চেয়েছিলাম তাই সে রাগ করেছে হয়তো। কিন্তু জিজ্ঞাস করাটা প্রয়োজন ছিলো।
চা হয়ে এলে নামিয়ে তারপর চা বানিয়ে এক মগ আমি নিলাম আরেক মগ মাকে দিলাম।
চায়ের মগে চুমুক দিতে দিতে মা বললো, সোনিয়া আমি বুঝতে পারছি তুই কি জিজ্ঞাস করেছিস?
মায়ের কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠলো।

মা আমার দিকে তাকায়। তারপর আবারও বলতে শুরু করলো,
সোনিয়া আমি জানি, সাহিল তোকে এখনো স্ত্রীর অধিকার দেয়নি কথাটা সত্যি কিনা বল।
~ নিশ্চুপ আমি।
~ চুপ থেকে লাভ নেই। সেটা আমি প্রথমদিনই বুঝতে পেরেছি। আমি জানি স্ত্রীর অধিকার না পেলে সেই মেয়ের মনের অবস্থা কেমন হয়। কিন্তু মা একটা কথা মনে রাখিস তুই যুদ্ধে করতে নেমেছিস তাই সময় ভাববি তোর এই যুদ্ধে জয় লাভ করতেই হবে। সোনিয়া তোর প্রতি আমার অঘাত বিশ্বাস তুই নিজের মর্যাদা আদায় করে নিবি। আমার বিশ্বাস তোর ভালোবাসা দিয়ে তুই সাহিলের মন জয় করতে পারবি।

কিন্তু একটা কথা মনে রাখবি যত ঝড় আসুক তুই সাহিলকে আগলে রাখবি। বুঝতেই তো পারছিস সাহিল কত বড় একটা আঘাত দিয়ে আস্তে আস্তে তোর হাত ধরে বেড়িয়ে আসতেছে।
~ মা আপনি শুধু দোয়া করবেন আমার জন্য।

~ আমার দোয়া সব সময়ই তোর সাথে আছে। তুই শুধু এটা খেয়াল করিস সাহিল যেনো কোনদিন কষ্ট না পায়।
সাহিল ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। তানহার কথা মনে পড়ছে আজ। তানহার মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তানহার স্মৃতি কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারছেনা। কেনো পারছেনা সেটাই ভেবে অস্থির হয়ে উঠেছে সাহিল।
আজ সোনিয়ার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মত সাহস ছিলোনা তার। বারবার মেয়েটা স্ত্রীর অধিকার পাবে কিনা জানতে চাচ্ছিলো কিন্তু আমি কাপুরুষের মত পালিয়ে এসেছি।

কি বলতাম সোনিয়াকে? আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। সাহস হয়নি আমার। বলতে চেয়েও গলাটা আটকে গিয়েছে। সিগারেটের প্যাকেট খুলে একের পর এক সিগারেট টানছে। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। না এভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখা সম্ভবনা। আমার যেভাবেই হোক সোনিয়াকে বলতেই হবে আমি ওকে ভালোবাসি। হ্যাঁ পাগলের মত ভালোবাসি। সোনিয়াকেই আমার এলোমেলো জীবনে খুব দরকার। একমাত্র সোনিয়াই পারবে আমার জীবনটাকে সাজাতে।
এদিকে বাসায় এসে সমস্ত কিছু ভাঙচুর করছে তানহা। রানা কিছুতেই তানহাকে মানাতে পারছেনা। রানা যতবার তানহাকে আটকাতে যাচ্ছে ততবারই কিল ঘুষি খেয়ে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

তানহা একের পর এক জিনিসপত্র ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে।
একুরিয়ামটা হাতে নিতেই রানা বাঁধ সাধলো।
তানহা প্লিজ, এটা ভেঙো না। এটা বাবার খুব শখের জিনিস। তানহা প্লিজ ওটা জায়গায় রেখে দাও।
তানহা রানার দিকে তাকালো। তারপর একুরিয়ামটা নিচে ফেলে দিলো।
তানহা
রাগ করে এসে তানহাকে ধরে গালে ঠাস্ ঠাস্ করে থাপ্পর লাগিয়ে দিলো।

তানহা ফ্লোরে বসে পড়লো।
তানহা সব কিছুর একটা লিমিট আছে। তুমি এখন সব কিছু পাড় করে ফেলেছো। অনেক সহ্য করেছি তোমার পাগলামি আর পারছিনা সহ্য করতে। তুমি প্রেগন্যান্ট না হলে তোমাকে আজকেই ডিভোর্স দিয়ে দিতাম। কিন্তু তুমি এটা মনে রেখো আজকের পর থেকে তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা এক ছাদের নিচে থাকবো ঠিকি কিন্তু স্ত্রীর অধিকার তুমি আর পাবেনা।
তোমার বাবাকে কালকেই কল করে বলে দিবো তার মেয়েকে যেনো নিয়ে যায়। দরকার নেই এমন নোংরা স্ত্রীর সাথে সংসার করার। সংসার করার শখ পুরোপুরি মিটেছে আমার। তাই এখন আমি মুক্তি চাই।

তানহা রানার দিকে তাকিয়ে থাকে।
এদিকে ভাঙচুরের শব্দে রানার বাবা দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছেড়ে বিছানার বালিশের সাথে হেলান দিয়ে থাকলো। ভাবছে রানা কেমন মেয়েকে বিয়ে করেছে। যে রানাকে একদম পছন্দ করেনা। ইচ্ছা করছে এখুনি গিয়ে ছেলেসহ ঐ মেয়েকে বাসা থেকে বের করে দেই কিন্তু এক জায়গায়ই আটকে আছি সিদ্ধান্ত নিতে। রানার মা এতটাই অসুস্থ যে রানাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার খবর সে শোনে। সাথে সাথেই স্ট্রোক করে মরে যাবে। তাই এত কিছুর পরেও রানার সব কিছু নিরবে মেনে নিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পরে রানা এসে বললো,
বাবা আসবো।

~ শোয়া থেকে উঠে বসলো রানার বাবা। হুম আয়।
রানা গিয়ে বিছানায় বাবার পাশে বসলো। বাবার কোলে মাথা দিয়ে চুপ করে থাকলো রানা। বাবা রানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
রানা চিন্তা করিসনা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
~ বাবা কি ঠিক হবে? আমার সব কিছু তো শেষ হয়ে গেছে। বাবা তোমার কথা শুনিনি বলেই আজকে আমার এই অধঃপতন হলো বাবা।
বাবা আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। আমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। রানার বাবার কাছে ছেলেকে সান্ত্বনা দেয়ার মত কোন ভাষা ছিলোনা। তার ছেলে এত বড় অন্যায় করেছে যার কোন ক্ষমা নেই।

অন্যের স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী বানিয়ে কেউ সংসার জীবনে সুখি হতে পারেনা। আর কখনো হবেও না।
রানা বাবা তুই একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর। দেখবি ভালো লাগবে।
সাহিল রুমে এসে দেখলো সোনিয়া জানালার গ্রিল ধরে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।
গুটিগুটি পায়ে সোনিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সোনিয়া এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী দেখছো?
সাহিলের দিকে তাকালাম। রাতের আকাশটা দেখছি। বেশ ভালোই লাগছে। বাহিরের পরিবেশটা বেশ মনোমুগ্ধকর।
আপনি ছাদ থেকে নামলেন যে? আর কিছুক্ষণ থাকতেন।
~ একা একা ভালো লাগছিলোনা।

~ আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন। রুমের ভিতরে আমার ও ভালো লাগছেনা।
~ ছাদে যাবে?
~ হুম যাবো। যদি আপনি নিয়ে যান।
~ ওকে।
সাহিল আমার দিকে তাকালো আমি ও সাহিলের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর দুজনে ছাদে উঠলাম।
রমজানে প্রতিদিন হয়তো গল্প দিতে পারবোনা।

পর্ব ১৭

দুজনে ছাদে উঠলাম। সাহিলের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছি। কেনো জানি মনে হচ্ছে উনার মন ভীষণ খারাপ।
কিন্তু তার মন খারাপের কারণটা উপলদ্ধি করতে পেরেছি একটু আধটু। রাস্তায় তানহার সাথে দেখা হওয়ার কারণেই তার হয়তো এমনটা লাগছে। লাগাটাই স্বাভাবিক। প্রথম প্রেম এত সহজে ভোলা সম্ভব না।

সময়ের ব্যাপার। তানহা চলে গিয়েছে এক বছর ও হয়নি। মনের ভিতরে আকাশ সমান ক্ষত তৈরি হয়েছে মুখ দেখলেই অনুভব করা যায়।
ছাদে উঠার পরে সাহিল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ও সাহিলের মায়া ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
সাহিলের গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলো। খানিকা বিস্ময়ের ভঙ্গিতে বললো, কিছু বলবে।
মাথা নাড়িয়ে বললাম, না।
তাহলে এমন ভাবে তাকিয়ে আছো যে?

~ তাকিয়ে থেকে কি অন্যায় করেছি?
~ না তা করোনি।
~ ঠিকাছে আপনার যদি তাকানোটা পছন্দ না হয় তাহলে নেক্সট টাইম আর তাকাবোনা।
~ সোনিয়া আমি কথাটা তোমায় কষ্ট দিতে বলিনি। কেনো জানি মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো। হাত জোর করে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে নিলে আমি সাহিলের হাত চেপে ধরে নির্ভীক দৃষ্টিতে সাহিলের দিকে তাকালাম। সাহিল হঠ্যাৎ একটু কেঁপে উঠে আমার চোখে চোখ রাখলো। আমি হাত ধরাতে সাহিলের চোখে কোন শঙ্কা, ভয়~ ভীতি কোন কিছুই নেই।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমি একটু নরম সুরে বললাম, আপনি না আসলেই বোঁকা। নিজের বিবাহিত স্ত্রী আপনাকে ধরলো কিন্তু আপনার ভিতরে কোন অনুভূতি কাজ করলোনা। তাহলে কী আপনার ভিতরে অনুভূতি কমে গেছে?
যেখানে তানহা রানার স্ত্রী হওয়ার পরে ও আপনার কাছে আবার ও ফিরে আসতে চাচ্ছে। তাহলে আপনি এত নিরামিষ হলেন কীভাবে?
সাহিল কোন উত্তর দিলো না। এই কথার এখন কি উত্তর দেয়া উচিত সে ভেবে পাচ্ছেনা।
সোহিল আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে চোখটা সামান্য নিচু করে রাখলো।
আমি জানতাম এ প্রশ্নের উত্তর সাহিল দিতে পারবেনা।

তার মানে সাহিলের সমস্ত ভালোবাসার ঐ তানহার জন্য ছিলো।
তাহলে কী সাহিল আমাকে কখনো আপন করে কাছে টেনে নিবেনা।
স্বামীর ভালোবাসা কী কোনদিন পাবোনা? ভাবতেই দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেলো। চোখ মুছে বললাম,
~ আচ্ছা শোনেন, আকাশের তারাগুলো দেখেন কত সুন্দর দেখতে! আমার কথাগুলো মাথায় নিয়েন না মনে করেন স্বপ্নে দেখেছেন।
সাহিল আমার দিকে তাকায়। মুগ্ধ চোখে তাকায়।

কী হলো এভাবে তাকিয়ে না থেকে তারা দেখেন ভালো লাগবে।
সাহিল নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে নিয়ে তারপর বললো,
বাসায় আসার পর থেকেই আমার উপরে রাগ হয়েছিলে তাইনা?
আমি সাহিলের চোখের গভীর থেকে গভীরতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হালকা দীর্ঘশ্বাসের ভঙ্গিতে বললাম, না, একদম না। কারণ আমি জানতাম এমন প্রশ্নের উত্তর আমি কখনো পাবোনা। শুধু শুধু সময় নষ্ট করেছি মাত্র।

সাহিলের মুখটা যেনো আবার বিষাদে ভরে যায়। কেনো তা সে জানেনা।
আমি ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফুটিয়ে বললাম, কি হলো আবার মন খারাপ করলেন কেনো? সত্যি কথাই তো বললাম তাইনা।
আচ্ছা নিচে যাই ছাদে ভালো লাগছেনা।
সাহিল মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলো।

আমি আগে আগে ছাদ থেকে নামলাম। ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখের পানি ভালো করে মুছে নিলাম।
রুমে গিয়ে ফ্লোরে মাদুর বিছিয়ে বালিশ এনে শুয়ে পড়লাম।
সাহিল রুমে এসে আমাকে নিচে শুতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। বুঝতে পেরেছে আমার রাগের কারণ।
হুম স্বাভাবিক ব্যাপারটা।
সাহিল হালকাভাবে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
রাত প্রায় দুটো বাজে,
হঠ্যাৎ আমার ঘুম ভাঙে।

বাহিরের চাঁদের আলো রুমে এসে পড়েছে। ডিম লাইটের আলোয় বিছানার দিকে চোখ আটকে গেলো।
সাহিল বিছানার উপরে বসে আছে।
কারণটা জানার জন্য রুমের লাইট অন করলাম। সাহিল চমকে উঠলো।
সোনিয়া তুমি ঘুমাওনি।

~ হুম ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কিন্তু ঘুম ভাঙতেই দেখি আপনি বসে আছেন তাই জানার জন্য উঠলাম।
আপনার কি হয়েছে?
~ কিছু হয়নি।
~ দেখেন মিথ্যা বলবেন না। কি হয়েছে সত্যি করে বলেন।
~ ঘুম আসছেনা।
~ চিন্তা করছেন তাই ঘুম আসছেনা। আজে বাজে চিন্তা মাথায় না রেখে ঘুমিয়ে পড়েন।

~ চেষ্টা করেছি কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছেন।
~ ঠিকাছে আপনি শুয়ে পড়েন। যদি আপনার অনুমতি পাই তাহলে মাথাটা টেনে দিলে ঘুম চলে আসবে।
~ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
ঠিকাছে।

সাহিল চিৎ হয়ে বালিশের উপরে শুয়ে পড়লো। আমি সাহিলের বুকের পাশে বসলাম। সাহিল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। আমি সাহিলের মাথায় হাত বুলাতে লাগলাম।
সাহিল চোখ বন্ধ করলো।
আমার হাতের স্পর্শে সাহিলের সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। কি অদ্ভুত শিহরণ। ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। যে অনুভূতি বাচ্চা বয়সে মায়ের কোলে মাথা রেখেও কোনদিন উপলদ্ধি করিনি। মুগ্ধ অনুভূতিতে সাহিল তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে।
সাহিল ঘুমিয়ে পড়ে। আমি বুঝতে পেরে উঠার জন্য হাতটা সাহিলের মাথা থেকে সরাতে নিলাম তখনি সাহিলের ঘুমন্ত একটা হাত এসে আমার হাতটা চেপে ধরলো। দেখলাম সাহিল সত্যি ঘুমিয়ে গেছে।

আমি সাহিলের হাতের দিকে তাকালাম। আমার হাতটাকে কত আপন করে ধরে রেখেছে হাতটা। মনে হয় যুগ যুগান্তরের ভালোবাসার বন্ধন। এমন বন্ধন থেকে হাতটা ছাড়াতে ইচ্ছা করছিলোনা।
সাহিলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালাম। বাতাসে চুলগুলে কপালে এসে পড়তে লাগলো। আমি হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছি। কি সুন্দর নিষ্পাপ সারল্য মিশ্রিত বিজলী চমকানো মুখ। উষার আকাশে স্নিগ্ধ রুপালী চাঁদের মতই স্বচ্ছ। কোন লোভ, হিংসা, ছলনা এই সরল মনে স্থান নিতে পারেনা। তেমনি উনার হাত দুটোও কখনো বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারেনা এট আমার স্বামীর প্রতি বিশ্বাস। হ্যাঁ আমার স্বামী।

কবুল পড়ে যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। বিবাহের অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। আমি ভাবি না বিশ্বাস ও করি। গভীর বিশ্বাস। একদিন না একদিন সে আমাকে আপন করে নিবে। ভাবতে ভাবতেই তন্ময় হয়ে যাই। তারপর তাকিয়ে দেখি কখন যেনো ঘুমের মাঝে সাহিল তার হাত সরিয়ে নিয়েছে।

আমি উঠতে গেলাম। তার আগে সাহিলের মুখখানি একবার ভালো করে দেখে। দুহাতে সাহিলের দুই চোয়াল স্পর্শ করে। কপালের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানের উপরে দুপাশে ঢুকিয়ে দিয়ে। তারপর আলতো ভাবে আঙুলগুলো ঠোঁটের উপরে বুলালাম। তারপর উদাসভাবে বুড়ে আঙুল দিয়ে নিচের ঠোঁটটা ডানদিকে চেপে ধরলাম। আর মনের অজান্তেই বিড়বিড় করে কি যেনো বলতে থাকলাম। যে কথা আমি নিজেও জানিনা, হয়তোবা বলার কথা কোনদিন কল্পনাও করিনি।
বিছানা থেকে নামার সময় সাহিলের কপালে হালকা করে চুমো এঁকে দিলাম।

বিছানা ছেড়ে নিচে নামার জন্য পা বাড়াতেই বুঝতে পারলাম ওড়নাটা কেউ চেপে ধরে রেখেছে। পরোক্ষণেই ভাবলাম কে আবার হয়তো উনি ধরেছে। টের পেয়ে গেছে মনে হয়। ভাবতেই লজ্জায় টমেটোর মত লাল হয়ে গেলো গাল দুখানা।
অনেকটা ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সাহিলের পায়ের নিচে ওড়নার আঁচলটা পড়ে রয়েছে। বুঝলাম এখন আর আঁচলটা বের করা সম্ভবনা।
সাহিলের পাশেই শুয়ে পড়লাম।

ঘুম ভেঙে চোখ মেলে তাকালো সাহিল। আমি তার বুকের উপরে শুয়ে আছি। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসির ঝলক দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকলো আমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষায়।
আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙতেই নিজেকে সাহিলের বুকে আবিষ্কার করলাম। লজ্জায় জান যাবার উপক্রম তৈরি হয়ে যায়। কী লজ্জা?
শেষমেষ তার বুকের উপরে।
ধীরে ধীরে সাহিলের বুকের উপর থেকে আস্তে আস্তে উঠলাম। ওড়নাটা এখনো সাহিলের পায়ের নিচে আটকে আছে। গায়ে ওড়না ছাড়াই সাহিলের দিকে তাকিয়ে আছি।

সাহিল ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক এক সেকেন্ডের জন্যও পড়ছেনা।
~ এই আমার ওড়নাটা ছাড়েন।
সাহিল তরিঘরি করে ওড়নাটা মরিয়া হয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো।
~ এই যে আপনি কী আন্ধা হয়ে গেছেন নাকি? পায়ের নিচে ওড়না রেখে সারা বরিশাল খু্ঁজতাছেন।
চোখ থাকতে অন্ধ কাকে বলে আপনাকে না দেখলে জানতামই না।

সাহিলের মাথায় এবার রাগ তিনশত ষাট্ ডিগ্রিতে টগবগ করে জ্বলতে লাগলো।
~ এ মা, আপনি তো দেখছি রেগে আছে। ওভাবে সাপের ন্যায় ফসফস করছেন কেনো? কাটবেন নাকি?
রাগে দাঁত খিটমিট করতে লাগলো সাহিল। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত রাগ আজ চেহারার ভাঁজে ফুটে উঠেছে এতদিন এগুলো পাথর চাপা দেয়া ছিলো।

আমি এবার হাসতে লাগলাম। আপনাকে না রাগলে ভীষণ অদ্ভুত লাগে। তবে ভ্রু কুঁচকালে ভালো লাগে দেখতে।
সোনিয়া দেখো রেগে আছি কিন্তু মাথা এখনো ঠান্ডা আছে। এরপর যদি উল্টা পাল্টা কিছু বলো তাহলে কিন্তু খবর আছে বলে দিলাম।
হুম, বুঝলাম মহারাজের কথায় দম আছে। তবে হ্যাঁ আমি কিন্তু ভয় টয় পাইনি। তারপর ঠোঁট চেপে ধরে বললাম, আচ্ছা উল্টা পাল্টা কী করবেন একটু বলবেন?
আমার না খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
~ এবার কিন্তু হবে
~ সত্যি হবে! তা কী হবে?

এখনো হয়নি তবে হবে
~ আমি ও তো বলছি যা হবে তা হবে। আমি ও দেখতে চাই কী হবে?
সাহিল আমাকে রেখে বিছানা দিয়ে নামলো। ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে আসলো।
আমি এখনো বিছানার উপরে মোড়াচ্ছি।
এই যে বললেন না, কী হবে?

আমি তো দেখার জন্য অপেক্ষা করছি।
সাহিল কোন কথার উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।
মায়ের রুমে ঢুকে, মা আমার খুব খিদে পেয়েছে জলদি খেতে দাও।
~ হুম। তুই গিয়ে টেবিলে বস আমি আসছি।

সাহিল গিয়ে চেয়ারে বসলো। আমি ও গিয়ে সাহিলের পাশের চেয়ারে বসলাম।
কী হলো এভাবে কিছু না বলে চলে এলেন যে? আমার কথার কী কোন মূল্য নেই আপনার কাছে? যা বলি তার কোনটারই উত্তর পাইনা। তার মা
কথাটা শেষ করার আগেই সাহিলের মা ডাইনিং রুমে চলে আসলো।
সোনিয়া নাস্তা করে আমার রুমে আসিস কথা ছিলো।
~ জ্বি মা। মা সানি কী উঠেছে?

~ না, সানি ঘুমাচ্ছে।
তাহিয়া টেবিলে নাস্তা দিলো।
দুজনে নাস্তা করছি তখনি মা সাহিলকে বললো,
সাহিল বাসায় ফিরে আমার রুমে আছিস। চেকে সাক্ষর করে দিবো।
~ জ্বি মা। মা,
~ হুম বল।

আজকে বিকালে সোনিয়াকে নিয়ে মার্কেটে যাবো। বুধবার এক বন্ধু গায়ে হলুদ সেখানে যাবো আর শুক্রবার বিয়ে। তাই বলছিলাম সানিকে কী সাথে নিয়ে যাবো?
~ সাহিল কী বলিস এসব? সানিকে কোথায় নিয়ে যাবি? সানি তো বাচ্চা এখনো তাছাড়া এসব পার্টিতে তোরা স্বামী স্ত্রী এটেন্ড করে উপভোগ কর। তাছাড়া বিয়ের পরে তো সোনিয়াকে নিয়ে কোথায় ও বেড়াতে যাসনি।
বিয়ের পরে সব মেয়েদের ইচ্ছা থাকে স্বামীর হাত ধরে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। আনন্দ করবে। এখনি তো ঘোরাঘুরির বয়স। পরে যখন নতুন অতিথি আসবে তখন তো আর বের হতে পারবেনা।

মায়ের কথাশুনে সাহিল খুশি হয়নি বরং একটু রাগ করেছে। সাহিল ভাবছে, নতুন অতিথি আসবে মানে? এটা কোন কথা হয়নি। সানি তো আছে তাহলে নতুন মেহমান আসার কোন কারণ নেই। সোনিয়ার সাথে আজ হোক কাল আমরা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবোই তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু তার আগে সোনিয়াকে বলে নিতে হবে আমি আর কোন সন্তান নিতে চাইনা। সন্তান নিলে সোনিয়া নিজের সন্তানকেই আদর করবে সানিকে কোন খেয়াল করবে না।

আমি বেঁচে থাকতে এটা কখনো মেনে নিবোনা। তাই সোনিয়াকে নিঃসন্তান থাকতে হবে। আর এটাই হবে আমার শর্ত। কারণ যত জায়গায় দেখেছি সৎ মা কখনো আপন হয়না। এতদিন আমার মাথায় এসব আসেনি কিন্তু আজ মায়ের কথা শুনে আমার এমনটা মনে হলো।
মায়ের সাথে এ ব্যপারে আমার কথা বলতে হবে।

সাহিল খাচ্ছিস না কেন? সারাক্ষণ এত কী চিন্তা করিস? এইটুকু একটা মানুষ অথচ মাথার ভিতরে বিশাল চিন্তার লিষ্ট। এত চিন্তা নিয়ে ঘুমাও কী করে?
সোনিয়া সাহিল এত কী নিয়ে চিন্তা করে বলতো? চোখের নিচে কালি বসিয়ে ফেলছে। খাওয়া দাওয়াতে ও অনিহা। এভাবে চলতে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন তো হসপিটালের বেডে শুইয়ে রাখা ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকবেনা।
সাহিল খাওয়া শেষ করে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো, আমার চিন্তা একমাত্র সানিকে নিয়ে। এছাড়া আর কোন চিন্তা নেই।

~ সানিকে নিয়ে এত চিন্তাটা কিসের শুনি? সানির তো সবাই আছে তাহলে এত কিসের চিন্তা।
সানিকে আমরা সবাই এত এত ভালোবাসি তুই সেটা খেয়াল করিস না অথচ আলতু ফালতু বিষয় নিয়ে চিন্তা করিস। শোন সানিকে নিয়ে চিন্তা না করে সোনিয়ার কথা চিন্তা কর। কী করে নিজের ওয়াইফকে খুশি করবি।

আমি মুখ চেপে ধরে হাসলাম। সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে থাপ্পর দেখিয়ে বললো, এক চড় দিবো। খালি হাসে।
মুখটা বাঁকা করে আমি ও ভেংচি কাটলাম।

পর্ব ১৮

সাহিলের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে রুমে চলে গেলাম। মনটা আজ অসম্ভব ভালো লাগছে। কেনো ভালো লাগছে নিজেও জানিনা।
বিছানার সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছি। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।
বিকাল হয়ে এলে সাহিল এসে ডাকলো মার্কেটে যাওয়ার জন্য।
শরীলটা বেশী ভালো লাগছেনা। কালকে গেলে কী হয়না?

~ হুম হয়। আচ্ছা কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ নাকি মন।
~ জানিনা হঠ্যাৎ করে শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে। সমস্ত শরীর ব্যাথা করছে।
~ ওহ্ তাহলে রেস্ট করো।
বলেই সাহিল চলে যায়।
রাতে অন্যপাশ করে শুয়ে আছি। সাহিল রুমে এসে আমার অপর পাশে শুয়ে পড়ে।

রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটা দেখেই ঘুম ভাঙলো আমার।
তারপর সারাক্ষণ চোখের সামনে ভাসতে থাকে। যতবার ভাবছি ততবারই ভালো লাগে।
ঘুম থেকে খুব সকালে উঠা আমার অভ্যাস। কিন্তু আজ কিছুতেই বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছেনা।
আড়মোড়া দিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখি সাহিল ও ঘুমিয়ে আছে। উনাকে আর ডাকলাম না। দরকার থাকলে উঠবেই বলে আবার ও চোখ বন্ধ করলাম।
সাহিলের মা শাহিনা বেগম রান্না ঘর থেকে দৌড়ে এলেন। একটু আগেও তিনি সাহিলকে ডেকে গেছেন। ছেলেটার অফিসের সময় হয় গেছে প্রায়। আজ এখনো উঠছেনা কেনো?

সাহিলএই সাহিল। উঠছিস না কেন বাবা? তোর তো অফিসের সময় হয়ে গেছে।
শরীর খারাপ?
সাহিল আড়মোড়া দিয়ে উঠলো।
‘না মা। তুমি যাও আমি আসছি। শাহিনা বেগম বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই সাহিল জিজ্ঞাস করলো মা, দেখতো কয়টা বাজে?
~ ৮৩০ বাজে। তাড়াতাড়ি ওঠ নইলে দেরী হয়ে যাবে।
~ মা শোন।

~ আবার কী বলবি? তাড়াতাড়ি বল।
~ সানি কী ঘুম থেকে উঠেছে?
~ হুম অনেক আগেই। তাহিয়া সাহিকে নিয়ে খেলছে। সানজিদা ইদের পরে আসতেছে সেটা তো নিশ্চয়ই জানিস।
~ হুম মা।
~ পড়াশুনা শেষ হয়ে যাবে এবছরই। পরীক্ষা দিয়েই দেশে আসবে। মেয়েটা আসলেই বিয়ের ব্যবস্থা করবো। কারণ মানুষের তো হায়াৎ মউয়াতের তো কোন ঠিক নেই। কখন জানি মরে যাই।

~ মা প্লিজ এসব কথা বলোনা। আল্লাহর কাছে শুধু একটাই চাওয়া তোমাকে যেনো অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখে।
~ ঠিকাছে শোন, এবার জলাদী ওঠ না হলে আরো দেরি হয়ে যাবে।
~ আচ্ছা মা।
সাহিল ওয়াশরুমে ঢুকলো।
মা আমার গায়ে হাত দিতেই আমি চোখ মেলে তাকালাম।

শোয়া থেকে উঠতে নিলে মা আমাকে উঠতে দেয়নি বরং আমার মাথায় হাত দিলো তারপর আস্তে আস্তে চুল টেনে দিচ্ছে।
আমি অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি।
~ সোনিয়া তুই এখান থেকে একদম উঠবিনা। আমি তোর জন্য নাস্তা এখানে নিয়ে আসবো। তারপর দুজনে আজ গল্প করতে করতে নাস্তা করবো কেমন।
~ আচ্ছা মা। (হেসে হেসে)
সাহিল কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে ডাইনিং রুমে ঢুকলো।

নাস্তা খেয়ে রেডি হয়ে মোবাইল টা হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
আমি বিকালে আসবো তুমি তার আগে রেডি হয়ে থেকো মার্কেটে যাবো। আজকে যেতেই হবে না হলে আর সময় পাবোনা।
~ বিকাল কয়টায়
~ আমি চারটের ভিতরে আসবো। রোদের তাপ কমলে বের হবো।

~ ঠিকাছে।
সাহিল চলে গেলো।
শাহিনা বেগম নাস্তা নিয়ে আমার রুমে আসলো।
আমাকে বসিয়ে নিজের হাতে নাস্তা খাইয়ে দিলো। তারপর এক গ্লাস দুধ আমাকে দিয়ে বললো,
নে দুধটুকু সব খেয়ে নে।

~ মা, আমি দুধ খাইনা।
~ দুধ খাইনা বললেই হবে নাকি? তাড়াতাড়ি খেয়ে নে নাক বন্ধ করে।
মায়ের কথা রাখার জন্য দুধটুকু খেয়ে নিলাম। দুধ খাওয়া হয়ে গেলে মা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে দিলো। সাথে সাথে আমি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলাম।
মা আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
কিছু বলবি?

~ আজ কেনো জানি আমার অনেক ভালো লাগছে। কিন্তু কেনো লাগছে জানিনা!
মায়ের ঠোঁটে আবার ও মিষ্টি হাসি। তাই? তাহলে তো নিশ্চয়ই ভালো খবর আছে। আমি কী শীঘ্রই দাদী হতে পারবো!
আমার মুখের হাসিটা মলিন হয়ে গেলো।
~ মা আমি কী তোকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?
~ নিশ্চুপ আমি।

~ বল মা।
~ কাঁপা কাঁপা স্বরে, না মা। আমি ঠিকাছি।
~ মায়ের কাছে কোন কিছু লুকাতে নেই। যারা লুকায় তারা ঠকে। তোকেও একদিন মা হতে হবে তারপর শ্বাশুড়ি। তাই সত্যি করে বল আমার কথাটাতে কী তোর খুব লেগেছে?
~ একটু মা।

~ হুম আমি বুঝতে পেরেছি। আমাকে আর খুলে বলতে হবেনা। কিন্তু শোন একটু ধৈর্য্য ধর দেখবি ইনশাআল্লাহ তোর মনের আসা পূরণ হবে।
আমি মন থেকে দোয়া করি যেনো তোর মনের আসা খুব শীঘ্রই পূরণ হয়। আর আমাকে তাড়াতাড়ি একটা গুড নিউজ দিতে পারিস।
আমার চোখ ভর্তি আনন্দ মাখা জল।
~ মা।

~ আপনি তো আমার কাছে একটা সন্তান দাবী করেছেন। যদি আল্লাহ চায় ইনশাআল্লাহ আপনার আসা পূরণ করবো। আপনি শুধু আমাকে দেখবেন।
শাহিনা বেগমের দু’চোখ ইষৎ জলে ছল ছল করে ওঠে। আমি গম্ভির গলায় বলে উঠলাম, মা আপনার চোখে পানি? আপনি যদি কান্না করেন তাহলে আমি ও কান্না করবো।
আপনি কী চান আমি কান্না করি?
~ না পাগলি তুই কান্না করবি কেন?

এই দেখ আমি কান্নার জল মুছে নিলাম এবার হয়েছে।
মায়ের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ হয়েছে।
মা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি ও মাকে জড়িয়ে ধরেছি।
বিকাল তিনটে বেজে পঞ্চান্ন মিনিটে সাহিল রুমে আসলো।

সোনিয়া তুমি কখন রেডি হবে?
~ এই তো শুরু করবো। ঘড়ির দিকে তাকালাম। বাহ্ মানুষটা একদম টাইম মতোই আসে। যাক ভালো গুণ এটা।
~ হুম করো আমি সানির কাছে যাচ্ছি। যে গরম পড়ছেনা রাতে বাসায় এসে আবার গোসল করতে হবে।
~ হুম
আমি রেডি হয়ে রুমে বসলাম। সাহিল আসছেনা দেখে মায়ের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম তখনি সাহিল আমার সামনে এসে পড়লো।

সাহিল মাথা নিচু করে আসছিলো এদিকে আমি ও সামনের দিকে যাওয়াতে উনার মাথার সাথে ধাক্কা খেলাম।
পরক্ষণে আমি মাথাটা ডলতে লাগলাম।
~ এই সোনিয়া তোমার চোখ থাকে কোথায়? একটু দেখে শুনে হাঁটতে পারোনা।
আমি দাঁত খিটমিট করে সাহিলের দিকে তাকালাম।
না পারিনা বলেই, উনার মাথায় আরেকটা টোকা দিলাম।

~ এই এই, তুমি এসব কী করছো? প্রথমবার টোকা লেগে মাথাটা ফুলে গেছে এখন দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকরে টোকা দেয়ায় মাথাটা না জানি ফুটো হয়ে গেছে। হায় আল্লাহ এটা কী জল্লাদ বউ নাকি অন্য কিছু।
রাগি লুকে উনার দিকে তাকিয়ে দাঁতের উপরে দাঁত রেখে কথা চাবিয়ে বললাম, ভালো করেছি।
~ ভালো করেছো মানে কী?

~ কোথায় আমাকে ধন্যবাদ দিবেন তা না দিয়ে উল্টো আরো বকা দিচ্ছেন মানেটা কী হ্যাঁ? তাই তো বলি উপকার করলে বাঘে খায়। তাই উপরকার করতে নেই।
~ ভ্রু দুটো কুঁচকাতে কুঁচকাতে বললো, ধন্যবাদ, কিসের ধন্যবাদ। তুমি কী করছো যে ধন্যবাদ দিবো।
~ বাহ্ রে, এই যে একটা টোকা খেলে তো আপনার মাথায় ইয়া বড় বড় দুটো শিং উঠতো তাই যাতে শিং না উঠে এর জন্যই তো আরেকটা টোকা দিলাম। আর শোনেন,
বাণীতে কিন্তু এলাকাবাসীরা। ভুলে আবার আমার বাণী ভাববেন না।

ছোটবেলা থেকেই এসব শুনে আসছি, হিহিহি দাঁত সব বের করে।
~ এভাবে দাঁত না দেখালেও পারতে।
~ আমার দাঁত আমি দেখাইছি তাতেও আপনার সমস্যা? না জানি আরও কতকিছু তে সমস্যা আল্লাহই জানে।
~ ওয়েট ওয়েট তোমার এত প্যানপ্যানানি শুনতে ভাল্লাগছেনা এবার যাওয়া যাক।
~ হুম চলেন মুখটা ভেংচি কেটে।

সাহিল সামনের দিকে হাঁটছে আর মুখ চেপে ধরে হাসছে।
সাহিলের সাথে মার্কেটে যাচ্ছি। দারুণ অনুভূতি অনুভব করছি নিজের ভিতরে। ভালো লাগছে অনেক। গাড়িতে দুজনে বসে আছি। আমি আড়চোখে সাহিলের দিকে তাকালাম। সাহিল গাড়ি চালাচ্ছে আনমনে। প্রায় মিনিট বিশেক বসে আছি কারো মুখেই কোন কথা শোনা যায়নি।
আচ্ছা শোনেন, একটা কথা বলবো।
~ আমার দিকে না তাকিয়ে বললো,
হু।

~ হু কী? বলবো।
~ আরে তুমি কী আমার কথা বোঝনা। যদি আমার কথা না বুঝ তাহলে প্রতিদিন এটার উপরে স্টাডি করবে। এরপর জানি শুনিনা তুমি কথাগুলো জিলাপির মত প্যাঁচাচ্ছো।
~ আচ্ছা স্টাডি করবো এবার খুশি। কিন্তু এখন কিছু একটা বলার ছিলো।

~ হুম বলো।
~ শুধু একটা কথা বলবো।
~ কী কথা?
~ তোমার তো মুখ চলতেই আছে তাহলে তুমি বারবার কেনো বলছো যে, একটা কথা বলবা, একটা কথা বলবা। আজিব তো!
বলে ফেলো আমি তো শুনছি।

~ উফফ! এটা এমন ভাবে বলে মজা নেই। আমার দিকে তাকান। চেহারা না দেখে কী কথা বলা যায় বলেন?
সাহিল রাগের বসে গাড়িটা মাঝ রাস্তায় এক সাইড করে দাঁড় করালো।
সোনিয়া কী মজা শুরু করছো তুমি? তোমার দিকে তাকালে বলবে না হলে মজা পাবে না।

এসব কী শুনি? সব কিছুর একটা লিমিট আছে। তুমি কিন্তু বেশি বুঝতেছো। কালকে গায়ে হলুদে যাওয়া লাগবে দেখে তোমাকে এই শপিং করতে নিয়ে এসেছি না হলে কে নিয়ে আসতো তোমায় নিয়ে।
তাছাড়া তোমার সাথে বের হলে মাথা খারাপ ছাড়া আর কিছু হবেনা। এত প্যানপ্যান ভালো লাগেনা।

একমাত্র পাগলই তোমার সাথে কথা বলে শান্তি পাবে।
পাগলের সুখ যে মনে মনে, বলেই হো হো করে হাসলো সাহিল।
আমি ও মুখটা গম্ভির করে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলাম।

পর্ব ১৯

বাহিরে তাকিয়ে আছি তো তাকিয়ে আছি সাহিলের দিকে আর ফিরলাম না। এভাবে অনেকটা সময়ই কাটলো। সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। কিছু বলতে চেয়েও কেনো জানি আটকে যাচ্ছে কথাগুলো।
তবুও মনে সাহস জুগিয়ে বললো,
~ সোনিয়া, বাহিরে তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখছো? জানালার দিকে না তাকিয়ে এদিকে তাকাও আমি গাড়ি স্টার্ট দিবো।

মুখটা ঘুরালাম সাহিলের দিকে তারপর চোখদুটো বড়বড় করে তাকিয়ে বললাম, বাহিরের পরিবেশটা ভালো লাগছে তাই তাকিয়ে দেখছি। কিন্তু আপনি গাড়ি স্টার্ট দিবেন তো দিন আমাকে বলছেন কেনো? তাছাড়া আমি নাকি বাঁচাল টাইপের আমার কথা নাকি আপনার ভাল্লাগেনা আরো কত কিছুইত্যাদি ইত্যাদি।
তাহলে এখন এই বাঁচালকে ডাকছেন কেন? আপনার তো কানের বারোটা বেজে তেরোটা বাজবে মশাই তখন তো আবার ষাঁড়ের মত চিল্লাবেন।
~ আমাকে ষাঁড় বলছে তবুও কিছু বললাম না বললেই তো আবার বকবকানি শুরু করে দিবে। তাই নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বললাম, আমাকে যে ষাঁড় বললে আমি কী ষাঁড়?

~ এ মা! আপনি স্বীকার করে নিলেন যে আপনি ষাঁড়। তাহলে এখানে কী করছেন জলদি গোয়াল ঘরে যান। আমার আবার পশুপাখি ভয় লাগে। কখন যে শিং দিয়া গুতা দিবেন আল্লাহই মালুম। আচ্ছা এবার গাড়িটা স্টার্ট দিন। না হলে আজ সারারাত ষাঁড়ের সাথে আউচ স্যরি আপনার সাথে এই রাতের শহরে গাড়ির ভিতরে রাতকাটাতে হবে। আপনাকে তো বিশ্বাস নেই ঘুমের ভিতরে যদি একা পেয়ে কিছু একটা করেন। পরে তো বলবেন ভুল হয়ে গেছে। যেহেতু আমাকে তো স্ত্রী বলে স্বীকার করেননা।

~ মেয়েটা তো আগে এত কথা বলতো না। কিন্তু দু’দিন ধরেই বেশি কথা বলছে। সব এই তাহিয়ার দোষ। আর তাহিয়ার দোষ দিলে তো ভুল হবে তাহিয়ার লিডার তো আবার আমার প্রাণের একমাত্র বোন সানজানা। তাহিয়া তো সব কিছু ওর কাছে থেকেই শিখেছে। ভাগ্যিস পড়াশুনা করতে বাহিরে গেছে নতুবা আরো অনেক বড় শুটিং দেখা লাগতো সোনিয়ার।

গাড়ি স্টার্ট দিলাম। গাড়ি ড্রাইভ করছি আর আড়চোখে সোনিয়ার দিকে তাকাচ্ছি। সোনিয়া আজ শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে বারবার মুখের উপরে উড়ে উড়ে পড়ছে। ও হাত দিয়ে মুখের উপরের চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। হঠ্যাৎ আমার চোখ আটকে যায় সোনিয়ার পেটের দিকে। চোখ ধাঁধানো ছিলো পেটের দিকটা। আমার ভালো চোখদুটো এখন এরকম কিছু দেখবে বুঝতে পারছিনা। চোখ কিছুতেই ফিরছেনা। মানা করছি তবুও দেখেছে। ফিরবেই বা কী করে, উজ্জল শ্যামবর্ণের হলেও মন কেড়ে নেয়ার মত দেখতে সে।
সাহিল কী করছিস এসবএত লোভী হইলি কবে থেকে তুই?

নিজেকে বহুত কষ্টে সামলে নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। মনকে সান্ত্বনা দিতে দিতে হিমশিম খাচ্ছি গাড়িতে বসেই। ইচ্ছে করছে সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরি। ঠোঁটের উপরে আলতো করে চুমে খেতে। কিন্তু পারছিনা দেখে মনটা ছটফট করছে।
আমি উনার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি উনি কিছু একটা নিয়ে টেনশন ফিল করছে। কিন্তু কী নিয়ে সেটা বুঝতে পারছিনা। অবাক চোখে আমি ও তার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি ও দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। চোখদুটো খুব সুন্দর। একদম মায়াবী। এত কিছু ভাবতে ভাবতে গাড়িটা এসে ব্রেক নিতেই ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলাম।

সাহিল গাড়ি থেকে নামলো। দরজার পাশে আমার বেড়িয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি দিশাবিশা না পেয়ে বেড়িয়ে আসি।
ইয়া বড় একটা শপিং মল। জীবনে কখনো এত বড় শপিং মল থেকে কেনাকাটা করিনি। তাই হা করে লাইটিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছি।
সোনিয়া তুমি ঠিক আছো।
~ হুম।

তাহলে চলো ভিতরে ঢুকবো। সাহিল ভিতরে যাওয়ার সময় আমার হাতটা চেপে ধরলো। আমি অবাক হই। আমার হাত ধরে উনি ভিতরে ঢুকলো। ভিতরে ঢুকতেই আমি হকচকিয়ে যাই। এত বড় ডেকোরেশন দেখে। প্রতিটা জিনিসপত্র আলাদা আলদা করে সাজানো। ইয়া বড়বড় কয়েকটা পুতুল। আহ্ তাকে আবার সুন্দর দেখে একটা শাড়ি পড়িয়ে রেখেছে।
যাক ভালোই লাগছে দেখতে।
সোনিয়া তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ভিতরে যাবে।

সাহিলের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। সোনিয়া এই সোনিয়া তোমাকে কিছু বলছি তুমি জবাব না দিয়েই চলে গেলে। আমি হাঁটছি তো হাঁটছি কোন কথাই বলছিনা। সাহিল আমার হাতটা ধরে ফেললো। মুখটা পিছনে ফিরিয়ে বললাম, কী হলো হাত ধরলেন যে?
সোনিয়া তুমি এখানে আছো নাকি কল্পনায় হারিয়ে গেছো বুঝছিনা।
ভ্রু টা কুঁচকে তাকালাম তার দিকে। আপনার সমস্যা কী বলেন তো?

আমার আবার কীসের সমস্যা?
~ কিছুক্ষণ আগে এই ধরুন পনেরো কী বিশ মিনিট আগে বললেন আমি এত প্যানপ্যান করি। আমার প্যানপ্যান শুনতে নাকি আপনার ভালো লাগেনা তাহলে এখন আমাকে কথা বলতে বলছেন কেনো।
~ ওহ্ হ্যাঁ ভুলেই তো গেছি যে তোমাকে তো কথা কম বলতে বলছি। ঠিকাছে কিন্তু সেগুলো আলতু ফালতু কথা। এখন তোমাকে কাজের কথা জিজ্ঞাস করছি অথচ তুমি সেটা এড়িয়ে যাচ্ছো।
আচ্ছা শোন কাজের কথা হলে কথা বলবে ওকে।

~ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
সোনিয়া এভাবে আগে আগে হাঁটছো কেন! সবাই তো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পাশে আস্তে আস্তে হাঁটো।
~ ঠিকাছে।
সাহিল আমার হাত ধরে শাড়ির দোকানে ঢুকলো। কয়েকটা শাড়ি কিনলো কিছু আমার চয়েজে আর কিছু উনার চয়েজে। ব্যাগ, জুতা, কসমেটিকস কিনলো।
সোনিয়া আর কিছু লাগবে।

~ না। অনেক কিনে দিয়েছেন আর কিছু লাগবেনা।
~ হুম। চলো তাহলে বাসায় যাই।
শপিং মল থেকে বেড়িয়ে সোজা গাড়িতে বসলাম।
সোনিয়া সিটবেল্ট বেঁধে নাও।
~ আচ্ছা।

সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বললাম, আপনি তো কিছু কিনলেন না।
~ আমার দরকার নেই। আমার অনেক ড্রেস আছে আলমারি ভরা।
মনের ভিতরে কেমন জানি অদ্ভুত লাগছে। জীবনে এই প্রথম কারো জন্য এতটা অনুভূতি কাজ করছে নিজের অজান্তেই। ঠিকাছে চলুন।
সাহিল গাড়ি চালিয়ে বাসার রাস্তায় না ঢুকে অন্যদিকে গাড়িটা ঘুরালো।

এদিকে যাচ্ছেন কোথায়? বাসায় যাবেননা। আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
~ হ্যাঁ যাবো। বাসায় যাওয়ার আগে ব্রিজের উপর থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। তাছাড়া মনির ভাইয়ের লেবু চা দারুণ। না খেলে এর টেস্ট কেউ বুঝতে পারবেনা। আর কাউকে বলেও এর স্বাদ উপলদ্ধি করাতে পারবনা। ওহ্ আচ্ছা বলে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালাম। বাহিরে চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে ফজরের আজানের পরে হালকা হালকা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। গাড়ি গিয়ে থামালো ব্রিজের নিচে। তারপর আমার হাত ধরে ব্রিজে উঠলো। আমি ব্রিজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাসে চুলগুলো মুখের উপরে এসে পড়ছে। অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করে চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিতেই আমি চমকে উঠলাম।
~ কী করছেন?

~ মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিলাম। এলোমেলো চুলে তোমায় সুন্দর লাগছে। লজ্জায় তো একেবারে ‘বোঁকা’ বনে গেলাম।
বিয়ের পরে প্রথম নিজের মুখে স্পষ্টভাবে স্বীকার পেয়েছে আমাকে এলো চুলে সুন্দর লাগে। এত প্রশংসা শুনে হার্টবিট ধুবধুব করতে লাগলো।
চোখদুটো তো শোনামাত্রই বড়বড় হয়ে গেছে। মুখটা ও হা হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস ও ভারী হয়ে যাচ্ছে। কথাটা শুনেই মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটছে।
সেই যে হা হয়ে গেছে বন্ধ ও হচ্ছেনা।

~ সোনিয়া। কী হলো কোথায় হারিয়ে গেলে। কোন সাড়া শব্দ তো পাচ্ছিনা।
~ কই না তো। কোথায় হারাবো। এখানেই আছি। ভালোই বাতাস বইছে। দখিনা হাওয়া মনে হয় এটাকেই বলে। তুমি ঠিকি ধরেছো এটাই দখিনা হাওয়া। জানো সোনিয়া এই ব্রিজটার সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যখন আমার মন খারাপ লাগতো তখনি আমি এখানে চলে আসতাম। নদীর সাথে কথা বলতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা এখানে কাটাতাম। মন ভালো হলে বাসায় যেতাম।
~ ওহ্ তাহলে তো অনেক ভালো একটা জায়গা এটা। যেখানে আসলে মনের কষ্ট অনেকটা হালকা হয়।
~ হুম।

আমি নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছি। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঢেউ বইছে। হঠ্যাৎ সাহিলের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে তাকালাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আচ্ছা শোনেন,
~ হুম কিছু বলবে।

~ না থাক।
~ থাকবে কেনো বলো।
~ বলছিলাম কী না থাক।
~ সোনিয়া তোমার সমস্যাটা কী বলবা?
~ না কিছুনা।

~ ঠিকাছে। নদী দেখো।
~ বাহ্ ভালোই তো বলেছেন। আমি নদী দেখি আর আপনি আমার দিকে তাকিয়ে আমার ফিগার দেখবেন।
~ সাহিল অনেকটা অবাক হয়। সোনিয়া কী করে বুঝলো আমি ওকে দেখছি। যাক বলে বলুক। আমার কী করার? আমার চোখ তো বারবার সোনিয়ার দিকে যায়। বেহায়া চোখ মানা করলে ও শোনেনা। শুনবে কী করে চোখ তো জানে, বোঝে আবার অনুভব ও করে যে সোনিয়া আমার বউ আর তাকে দেখার অধিকার চোখের আছে।

সোনিয়া তোমায় কে বললো যে, আমি তোমাকে দেখছি।
~ সেটা কারো বলতে হবেনা আমার কী চোখ নেই বুঝি! আমি সব কিছু দেখি। আপনার মন পড়তে পারি।
আচ্ছা একটা কথা ছিলো বলবো।
~ না থাক কষ্ট করে তোমাকে আর কোন কথা বলতে হবেনা।

বাতাস উপভোগ করো।
~ তার মানে আপনি শুনবেন না। ঠিকাছে তাহলে আমাকে একটু কম করে দেখবেন। বুঝতেই তো পারছেন আমার খুব লজ্জা লাগে।
কখনো কোন পুরুষ লোক আমার দিকে এভাবে তাকায়নি তো তাই।
রাগে শরীর জ্বলছে আমার। মেয়েটাকে মানা করলেও সে শোনেনা। এত কথা কীভাবে যে বলে মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করছে।

ভুল করেছি ডাক্তারি পড়লে ভালো হত অপারেশন করে দেখতাম এত কথা কোথা থেকে বের হয়। দেখা শেষ করে আবার সবকিছু সেলাই করে আগের মত রাখতাম।
আজ ডাক্তার হইনি বলে বেঁচে গেছো না হলে কেল্লা ফতে হয়ে যেত।
সোনিয়া সামনের দোকানে স্পেশাল গরুর ভুরির দিয়ে হালিম পাওয়া যায় খাবে? আমার খুব পছন্দের একটা খাবার।

~ ওয়াও ভুরির হালিম। কিন্তু আপনি তো বললেন লেবুর চা খাওয়াবেন।
~ হুম বলেছি তো। আগে হালিম খাবো তারপর চা। পাশাপাশি দোকান দুই ভাইয়ের।
~ আচ্ছা চলুন তাহলে।
হাঁটছি আর উনার দিকে তাকাচ্ছি।

পর্ব ২০

কিছুদূর হাঁটার পরে দূর থেকেই দোকানগুলো দেখা যাচ্ছিলো। সোনিয়া ঐ যে দোকান দেখা যাচ্ছে।
~ মাথা নাড়িয়ে বললাম, হুম দেখেছি।
সাহিল আমার দিকে তাকালো আমি ও মুখটা ঘুরিয়ে তাকালাম। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই আমি চোখদুটো নামিয়ে নিলাম। ব্রিজ থেকে দোকান পর্যন্ত হেঁটে আসতে মিনিট দশেকের পথ। আমি ভালো করে হাঁটতে পারছিনা। নতুন জুতা পড়ায় পায়ে ফোঁসকা পড়েছে। খুব জ্বলছে তাতে। তবুও সাহিলকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ধীরস্থিরভাবে হাঁটতে লাগালাম।

দোকানের সামনে বিছিয়ে রাখা চেয়ারের উপরে আমাকে বসিয়ে সাহিল দোকানের সামনে দিয়ে অর্ডার করে আমার কাছে এসে বসলো।
চুপচাপ বসে চোখদুটো এদিক সেদিক ঘুরাতে লাগলাম। বেশ ভালো লাগছে জায়গাটা।
~ সোনিয়া তুমি চুপ করে আছো যে কথা বলছনা কেনো? তুমি কী কোন কারণে আমার সাথে রাগ করেছো?

উনার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলাম তারপর বললাম, কই না তো। তাছাড়া আপনার সাথে কী আমার কিছু হয়েছে যে রাগ করবো? বলুন!
~ কিছু হয়নি কিন্তু তোমায় তো দেখে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছে।
~ আচ্ছা বাবা, বলুন তো সারাক্ষণ তো বলেন আমি বাঁচাল, অমুক তমুক তাহলে এখন চুপ করে আছি সেটা দেখেও আপনার সহ্য হচ্ছেনা। বুঝতে পারছি আমার সাথে ঝগড়া করতে আপনার ভালো লাগে। আচ্ছা আপনি কী চান সত্যি করে বলুন তো?

সাহিল ভাবছে, সোনিয়া তুমি ঠিকি ধরেছো কেনো জানি তুমি চুপ করে থাকলে আমার বুকের বাঁ পাশে চিনচিন করে ব্যাথা অনুভব করি মনে হয়। মনের ভিতরে ভয় লাগে তোমায় হারাবার। মনে হয় তোমাকে এই বুঝি হারিয়ে ফেললাম। আমি সত্যি তোমাকে চাই। মনে প্রাণে তোমাকে চাই। সারাজীবন তোমাকে চাই যতদিন এ দেহে শেষ নিঃশ্বাস চলবে। সোনিয়া যত সময় পাড় হচ্ছে জানিনা আমার ভিতরে চেপে থাকা আগুনটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে তুমি পানি হয়ে বুকের ভিতরে জ্বলে উঠা আগুনটাকে নিভাতে পারবে। কথায় আছে, বুক ফাঁটে কিন্তু মুখ ফাঁটে না।

~ এই যে সাহিল মশাই আপনি কই হারায়ে গেছেন বলুন তো! হালিম যে এসে গেছে আপনি সেটা খেয়াল পর্যন্ত করছেন না। আপনি কী ঠিকাছেন?
~ চোখ মুছে বললাম, হ্যাঁ আমি ঠিকাছি। স্যরি একটু অফিসের কাজ নিয়া চিন্তিত ছিলাম।
~ এবারের মত ক্ষমা করে দিলাম। পরেরবার আর ক্ষমা করবোনা বলে দিলাম। আপনি দিনদিন সব কিছু ভুলে যাচ্ছেন। এমন ভাব করছেন মনে হয় আপনি বাচ্চা।
~ সাহিলের ঠোঁটে কোণে এতক্ষণ পরে স্বস্তির হাসি ফুঁটলো সোনিয়ার কথা শুনে। তারপর বললো, আমি তো বাচ্চাই নাদান বাচ্চা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই।

~ মুখটা বাঁকা করে হালিমের বাটি থেকে চামচ দিয়ে হালিম উঠিয়ে মুখে তুললাম। খাচ্ছি আর ভাবছি উনি নাকি নাদান বাচ্চা। যে প্রেম করে বিয়ে করেছিলো এক বাচ্চার বাপ সে বলে কিনা নাদান বাচ্চা। আরে ভাই আপনি যদি নাদান বাচ্চা হোন তাহলে সানি কী? আজকাল তো থ্রি, ফোরের বাচ্চারা ও জানে বিয়ে করে বাসর রাতে কী করে? তারপর বাচ্চা কীভাবে জন্ম হয়। সেক্স কী?

তাছাড়া এখন তো ইন্টারনেটের জগৎতে সবাই ভালোভাবে এসব আয়ত্ব করছে। আর সে বলে কিনা!
হু। যাক মনে মনে নিজেই নিজেকে এসব বলে সান্ত্বনা দিয়ে নিরিবিলি হালিম খাচ্ছি।
~ সোনিয়া কী হলো কথা বলছনা যে? আমি যে নাদাম বাচ্চা তাতে কী তোমার সন্দেহ আছে?

~ ভ্রু কু্ঁচকাতে কুঁচকাতে হালিমের চামচ মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে তারপর উনার দিকে তাকিয়ে বললাম, আসলে হালিমটা এতটাই টেস্ট হয়েছে যে আমি তো পুরোই হালিমের প্রেমে পড়ে গেছি। এখন আপনি জানতে চেয়েছেন যে, আপনি নাদান বাচ্চা কিনা! আসলেই আপনি নাদান বাচ্চা। কারণ যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে
সে যদি নাদান বাচ্চা হয় তাহলে দুধের যে শিশুরা আছে তারা কী বাচ্চা হবে সেটা ভাবছি।
~ ওহ্ হ্যাঁ তাই তো। দুধের শিশুরা তো ফিডার খাওয়া বাচ্চা আর আমি সাহিল চৌধুরী হলাম নাদান বাচ্চা।
আপনার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে আমি কোন সার্কাসে এসেছি।

আপনি জীবনে অনেক বড় ভুল করেছেন জব না করে অভিনয় করলে বোঁধহয় আরো বেশি টাকা ইনকাম করতে পারতেন।
সোনিয়ার কথা শুনে মস্তকে উঠলো আমার। এই যে আপনি একটু ধীরে খেতে পারেননা। মস্তকে উঠলো তো এবার শান্তি হয়েছে। এত তাড়াহুড়া করে খাওয়ার কী দরকার? আমি কী আমারটা শেষ করে আপনার হালিমে ভাগ বসাবো নাকি! এসব ভাবছেন না তো!কারণ যেহেতু আমার হালিমটা ভালো লাগছে। আমি কিন্তু এতটাও লোভা নই যে আপনার কাছ থেকে আপনার খাওয়াটা চেয়ে খাবো।

আপনি তো চামচটাকে চেটে চেটে খেয়েছেন তাই আপনার চামচ চেটে খাওয়া হালিম আমি খাইনা। না খেয়ে থাকলে ও খাবোনা।
~ এনাফ সোনিয়া এনাফ। তোমাকে আমার বাটি থেকে কে খেতে বলছে আমি! আমাকে কী পাগলা কুকুরে কামড় দিছে যে তোমাকে দিবো। আর বলবো আমার ভাগেরটা তুমি খাও বলেই চোখ রাঙিয়ে আমার দিকে তাকালো।

দ্রুততার সাথে আমার চোখ নামিয়ে গপাগপ করে হালিম খেতে শুরু করলাম।
~ ভালোই হলো ভয় পেয়ে গেছে। মনে মনে হাসি পাচ্ছিলো কিন্তু তবুও মুখ চেপে ধরে রাখলাম।
~ শুনুন,
~ জি। কিছু বলবে?
~ হুম বলার তো ছিলো।

~ হ্যাঁ বলে ফেলো।
~ আমার না পানির পিপাসা পেয়েছে। যদি কষ্ট করে পানি ঢেলে দিতেন তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকতাম। আসলে আপনাকে বলাটা আমি ঠিক মনে করিনি হয়তো আপনি ভাবতে পারেন আপনাকে আমি অর্ডার করেছি আর আপনার এত দায় পড়েনি যে আপনি আমার অর্ডার পালন করতে বাধ্য।
~ সোনিয়া পানি চেয়েছো ভালো কথা আমি তোমাকে অবশ্যই পানি দিবো কিন্তু তাই বলে এত কথা শোনানোর কোন মানে হয়না। আমি তোমার স্বামী হই তাই আমাদের ভিতরে কোন রিলেশন থাকুক বা নাই থাকুক মানুষ হিসাবে তো একটা দ্বায়িত্ব কর্তব্য আছে তাই না! এখন তুমি যদি অন্য কিছু মনে করে থাকো তাহলে আমার কিছু বলার নেই।

~ এখন প্লিজ আমাকে আগে পানি খাওয়ান না হলে সোজা হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। গলার ভিতরে কাশি পাচ্ছে খুব।
সাহিল উঠে গিয়ে গ্লাসে ভর্তি করে পানি এনে আমার সামনে ধরলো।
নাও পানিটা খেয়ে শান্ত হও।
পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলাম। ধন্যবাদ পানি খাওয়ানোর জন্য।

~ হইছে ধন্যবাদ দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই এবার চা খাওয়া যাক।
~ হুম।
ভাই এখানে দুটো চা দিবেন একটা চিনি ছাড়া।
আমি উনার দিকে ভালো করে দেখছি পা থেকে মাথা পর্যন্ত। আমার তাকানো দেখে সাহিল কিছুটা আনইজি ফিল করছিলো। সোনিয়া এ্যানি প্রবলেম।
~ নো। ভাবছি চিনি ছাড়া চা খাবে তাহলে কী উনার ডায়াবেটিকস। পরে জিজ্ঞাস করবো এখন থাকুক।

~ তাহলে ওমন ভাবে তাকাচ্ছো কেনো।
~ বাহ্ রে আপনার দিকে তাকালে তার জন্য এত কৈয়ফত দিতে হবে জানা ছিলোনা। দ্যাটস ফাইন আর তাকাবোনা ওকে।
চা দিয়ে গেলে আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হা হয়ে গেলাম। আসলেই চায়ের ফ্লেবারটাই অন্যরকম। আর কালারটা তো চোখ ধাঁধানো। চা টা একেবারে আন্তরিকতার সাথে খেয়ে নিলাম কারণ আমি রং চা খাইনা। কিন্তু এই প্রথম রং চা খেলাম তাও দোকানে বসে।

সাহিল চা খাচ্ছে আর হাসছে। সোনিয়া জানো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারপর এভাবে চেয়ারে বসে যেকোন কিছু খাওয়ার অনুভূতিটাই অন্যরকম। খুব ভালো লাগে আমার এভাবে খেতে। সাথে যদি থাকে মনের মানুষ তাহলে তো কোন কথাই নেই।
~ তাই!
~ হুম। নিঃসন্দেহে বলতে পারো।
~ ঠিকাছে।
চা খাওয়া শেষ হলে বিলের টাকা কাপের নিচে চাপা দিয়ে ব্রিজের দিকে রওনা দিলাম।

গাড়িতে বসে সিটের সাথে হেলান দিয়ে শুইলাম। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড গরম পড়েছে যার কারণে শরীর দূর্বল লাগছে।
সাহিল গাড়ি স্টার্ট দিলো তখনি আমার চোখ রাস্তার উপরে রানীর দিকে পড়লো।
এই যে শুনুন।
~ জি।
~ এখানে গাড়িটা একটু দাঁড় করাবেন। খুব জরুরি একটা কাজ আছে।

সাহিল জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে উঁকি ঝুঁকি মারলো। রেস্টুরেন্টের সেই মেয়েটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাথে সাথে বুঝতে আর বাকী রইলো না। সোনিয়া আমি জানি তোমার কী কাজ? তুমি রানীর মত দেখতে ওই মেয়েকে দেখতে পেয়ে দেখা করতে চাচ্ছো তাই না। সোনিয়া তোমার মাথাটা পুরোই গেছে ওই মেয়ে রানী না। মানুষের সাথে মানুষের অনেকটা মিল থাকতে পারে তাই বলে সে রানী হতে পারেনা।
কথা বলতে বলতে দেখলাম প্রাইভেট কার আসলো মেয়েটি তাতে উঠলো।

আমি হতাশ হয়ে মাথাটা নিচু করে মন খারাপ করলাম।
সোনিয়া তুমি এভাবে মন খারাপ করলে আমি কোথায় যাবো বলতো? আরেকটা কথা তুমি কী করে শিউর হলে ওই মেয়ে রানী?
~ মেয়েটির হাতে যে ব্যাগটি ছিলো ওটা আমি গিফট করেছিলাম ওর বার্থডেতে। আমি কী এতই বোঁকা নিজের দেয়া জিনিস চিনতে পারবোনা। আপনি বিশ্বাস করুণ আর নাই বা করুণ তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায়না। আমি রানীকে খু্ঁজে বের করবোই। আমার মন বলছে রানী বড় কোন বিপদে পড়েছে।
সোনিয়ার কথা বিশ্বাস করার মতই ছিলো। কারণ ওই মেয়ে প্রথমদিনই সোনিয়াকে দেখে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলো। তাই হয়তো মেয়েটা কোন বিপদে পড়েছে। এখন আমার সোনিয়াকে সার্পোট করা দরকার।

সোনিয়া তুমি কোন চিন্তা করোনা তোমার পাশে আমি আছি এবং থাকবো।
সাহিলের কথা শুনে বুকের উপরে চাপা পড়া বিশাল পাথরটা সরে গেলো।
আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবোনা তবে হ্যাঁ আপনার এই উপকারের ঋণ আমি সুযোগ পেলে শোধ করবো।
সাহিল হাসলো। আমার কোন দাবি নেই আমি নিঃস্বার্থ ভাবে তোমার পাশে থেকে যতটুকু পারবো উপকার করবো।

~ হুম।
বাসায় পৌঁছে আমি বিছানার উপরে শুয়ে পড়লাম আর সাহিল সোফার উপরে। কিছুক্ষণ পরে তাহিয়া লেবুর শরবত করে রুমে নিয়ে আসলো বরফ কুঁচি দিয়ে।
~ ভাবী আসবো।
~ হুম আসো।

~ ভাবী যে গরম পড়েছে নিন শরবরটা খেয়ে নিন ভালো লাগবে।
শরবতটা খেয়ে নিলাম। তারপর বললাম তোমার ভাইকে দিছো।
~ হুম দিয়েছে। মাকে ও দিয়েছি আর আমি ও খেয়েছি।

~ হুম। মা কী করেন?
~ সানিকে ঘুম পড়িয়ে একটু আগে খালাম্মা ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
~ ওহ্।
আচ্ছা ভাবী আমি আসছি আপনি রেস্ট করেন।
~ হুম লাইটটা বন্ধ করে দিও।

~ হুম।
তাহিয়া লাইট বন্ধ করে চলে গেলো।
আমি অন্ধকারের সুবিধে নিতে শাড়ি চেইঞ্জ করতে নিলাম। কাঁধের হুক খুলে শাড়িটা বুকের উপর থেকে সরিয়ে কোমড়ের কুঁচিগুলো খুলে শাড়িটা বিছানার উপরে রাখলাম। ব্লাউজের হুকগুলো খুলতে খুলতে মাত্র একটা হুক খোলা বাকি এমন সময় রুমের লাইট জ্বললো।
আমি তো পুরোই চমকে গেলাম। পিছনে ফিরে তাকালাম দেখি সাহিল হা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
~ ভাবলাম এখনি রাগানোর সময়।

কী হলো ওভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো এদিকে আসেন। দেখেন না ব্লাউজের হুক খুলতে পারছিনা। আপনি এসেছেন ভালোই হয়েছে হুকটা খুলে দিয়ে ভিতরের ব্রা এর হুকগুলোও খুলে দিন। প্লিজ জলদি আসেন খুব গরম লাগছে।
সোনিয়াকে এমন অবস্থায় দেখে আমার মাথা ঘুরে গেলো। ইচ্ছে করছে এখুনি গিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, সোনিয়া তোমাকে কতবার বলছি ড্রেস চেইঞ্জ করার সময় দরজা আটকে নিবে তা না করে অল টাইম দরজাটা খুলে রাখো।

সাহিলের চেহারা দেখার মত ছিলো। ভীষণ হাসি পাচ্ছিলো এমন চেহারা দেখে। তবুও হাসিকে চেপে ধরে বললাম, আসবেন না খুলে দিতে।
~ তোমারটা তুমি খোল বলেই চলে গেলাম।

দরজার পাশে দেয়ালের সাথে মাথা ঠেঁকিয়ে রাখলাম। সমস্ত শরীর কাঁপছে। এমন অবস্থায় কোন মেয়েকে দেখলে কী কোন পুরুষ ঠিক থাকতে পারে। তার উপরে যদি নিজের বউ হয়। পুরোটাই ভার্জিন সে। আজ পর্যন্ত কোন পুরুষের ছোঁয়া পায়নি। ইচ্ছা করছে এখনি গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরি। সমস্ত শরীর চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেই।

এদিকে আমি তো পুরোই অবাক হয়ে গেলাম। সাহিলের কোন প্রশংসা করলে সেটা কম হয়ে যাবে। এমন পুরুষ হাতে বানানো যায়না। এমন শরীর দেখেও যার মাঝে ভোগ করার বিন্দুমাত্র লোভ ছিলোনা। সত্যি তাকে যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। ইচ্ছে করছে ডেকে এনে সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলি তার জীবন।

পর্ব ২১

শাড়ি চেইঞ্জ করে গেঞ্জি পড়লাম সাথে প্লাজু। প্রচন্ড গরম। পুরো শরীর ঘামে ম্যাজম্যাজ করছে। শরবত খেয়ে কিছুটা হলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম। রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। সাহিল এখনো রুমে আসেনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় দশটা। হালিম খেয়ে পেটে ভরে গেছে রাতে আর খাওয়া লাগবেনা। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। ভাবছি সানিকে তো দেখে আসিনি কী করছে ও। ঘুমিয়ে গেছে নাকি সজাগ আছে। শরীরের জোর পাচ্ছিনা। বিছানা ছেড়ে উঠতে ও পারছিনা। হাত পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা করছে তাই টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম।

সাহিল বেলকুনিতে গিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল। হাতে সিগারেট আর মেজবাতি। কিছুক্ষণ এত ধ্যানে তাকিয়ে থাকলো ফ্লোরের দিকে। বুকের ভিতরটা হাহাকার করছে। সিগারেট জ্বালিয়ে টানতে লাগলো। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। কয়েকটা সিগারেট শেষ করে ফিল্টারগুলো ফ্লোরে ফেলে আস্তে করে উঠে রুমের কাছে গেলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি রুমের লাইট বন্ধ করা। হাতের ঘড়ির দিকে তাকালাম।

রাত ১১৫৫ বাজে। কপালে হাত দিয়ে দেখি ঘামে ভিজে গেছে। পিঠে হাত দিতেই দেখলাম পুরো পিঠ ভিজে চুপচুপ করছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে পুরো এক কলস পানি খেয়ে ফেলতে পারবো এমন লাগছে।
সোনিয়া বোঁধ হয় ঘুমিয়ে গেছে। দরজাটা আস্তে করে খুলে রুমে পা দিতেই মা বললো,
সাহিল।

মুখটা ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। জি মা, কিছু বলবে?
~ বলার তো ছিলো কিন্তু তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখন বলার উপযুক্ত সময় না এটা। এই কারণে আমি তোকে কাল সকালে বলবো।
~ ঠিকাছে মা।
~ সোনিয়া তো না খেয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে মনে হয় এখন তুই ও কী না খেয়েই।
~ আসলে মা আসার সময় আমরা হালিম খেয়ে এসেছিলাম তাই পেট ভরা। রাতে না খেলে ও চলবে।
~ হুম।

~ তুমি খেয়েছো?
~ তুই তো জানিস আমার কয়েক রকমের ওষুধ চলে সময় মত না খেলে সমস্যা হয়।
~ হুম বুঝতে পারছি। আচ্ছা মা তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও।

সানি কী করে?
~ সানি মাত্রই ঘুম থেকে উঠলো তাই এত তাড়াতাড়ি ও ঘুমাবেনা। তাহিয়া সানির পাশে বসে আছে। তুই রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। সানি ঘুমালে তারপর আমি ঘুমাবো।
~ মা তোমার তো রাত জাগলে কষ্ট হবে তার চেয়ে বরং সানিকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
~ আমার কষ্ট হবেনা। আমি সানির সাথে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ আগেই উঠে খেয়ে নিয়েছি।
~ আচ্ছা।

রুমে ঢুকলাম নিঃশব্দে। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে বিছানার কাছে গেলাম।
সাহিল রুমে আসলে আমার ঘুম ভাঙলো। চোখ খুলে তাকালাম। আমি অপর পাশ করে তাকানোর কারণে সাহিল আমায় দেখতে পারেনি যে আমি উঠে গেছি।
সাহিল বিছানার উপরে বসলো। তারপর আমার হাত ধরলো। সাহিলের স্পর্শে আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো। আমার হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকলো।
হঠ্যাৎ সাহিল আমার হাতের উপরে কিস করলো। সাথে সাথে সমস্ত গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। ভালোবাসার জোয়ার বইতে লাগলো।

কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে থেকে তারপর কপালে এক হাত তুলে শুয়ে পড়লো। রাত যত গভীর হয় আমার মনের ভিতরটা ছটফট করতে থাকে।
কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছিনা। ইচ্ছে করছে সাহিলকে ঘুম থেকে তুলে চিৎকার করে বলি আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমায় তুমি আপন করে নিজের করে নাও। তোমার ভালোবাসা দিয়ে আমায় ভরিয়ে দাও। রাঙিয়ে দাও আমার হাত।

চোখ বন্ধ করে আছি তবুও চোখের কোণে ঘুম নেই। ডিম লাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে সমস্ত রুম।
ঘড়ির দিকে তাকালাম রাত তখন পৌনে চারটা। সকাল হওয়ার অপেক্ষা করছি। বিছানায় শুয়ে থাকতে ভালো লাগছেনা। অস্থির লাগছে খুব। সাহিলের দিকে ফিরে তাকিয়ে আছি। সাহিলের ঘুমন্ত মুখটা দেখতে ভালো লাগছে। মনে হয় ছোট বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে।

শোয়া ছেড়ে উঠে বসলাম। সাহিলের কপালে চুমো খেয়ে মাথার চুলগুলো হালকা করে টেনে দিলাম। আঙুল দিয়ে কপালের উপর থেকে ঠোঁট অব্দি আস্তে আস্তে করে নামালাম। আবার একই ভাবে নিচ থেকে কপাল পর্যন্ত উঠালাম। মনের ভিতরে অন্য রকম অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। এতই ভালো লাগছে কাউকে বলে বুঝানো যাবেনা।

সাহিল নড়ে উঠলে আমি আস্তে করে ওপাশ করে শুয়ে পড়লাম। বুঝতে পারলাম উনি সজাগ হয়েছেন। একটু পরে গ্লাসে পানি ঢালার শব্দ পেয়ে পুরোটা শিউর হলাম সে উঠে গেছে। বুকে ফুঁ দিলাম। তারপর বললাম, ভ্যাগিস তিনি দেখেনি না হলে তো কাজ সেরেছিলো। চুপটি করে চেপে শুয়ে থাকি।
একটুবাদে সাহিল ওয়াশরুমে ঢুকলো। আমি উঠে তার খেয়ে রাখা গ্লাসের পানিটা খেয়ে নিলাম।

দরজা খোলার শব্দে আমি আবার ও শুয়ে পড়ার ভান ধরলাম।
ভান করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না।

সকালবেলা তাহিয়ার ডাকে ঘুম ভাঙলো। আড়মোড়া দিয়ে তাকালাম। বাহিরে চোখ পড়তেই লাফিয়ে উঠলাম। বাহিরের রোদ ঝলমল করছে। এমন রোদ তো ১১ টার দিকে আসে। তাহলে কী আমি ঘুম থেকে উঠতে দেরী করে ফেলেছি। তাহিয়া,
~ হ্যাঁ ভাবি।

~ মা কোথায়?
~ রান্না ঘরে।
আমি ঘড়ির দিকে তাকাতেই পুরোই হকচকিয়ে গেলাম। ১১২০ বাজে।
তাহিয়া এত বেলা হয়ে গেলো আমাকে ডাকলে না কেনো?
~ ‘মায়ের অর্ডার তিনি আপনাকে ডাকতে মানা করেছেন।

~ মা বলেছেন।
~ হুম।
তাহিয়ার হাত থেকে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে গরম গরম খেতে লাগলাম। তাড়াতাড়ি কোন রকমে খাওয়া শেষ করে রান্না ঘরে ঢুকলাম। মাথায় ওড়নাটা টেনে দিয়ে আস্তে বললাম, মা।
ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বললো,
আয় সোনিয়া। ঘুম পুরো হয়েছে।

আমি তো পুরোই শকড। মা কী বলছেন এসব? ঘুম পুরো হয়েছে মানে?
~ বাহ্ রে সারারাত তো তুই ঘুমাতে পারিসনি। এর জন্য জিজ্ঞাস করলাম ঘুম পুরো হয়েছে কিনা!
~ আরো শকড হলাম। চোখ দুটো আরো বড় হয়ে গেলো মায়ের কথা শুনে। মাথাটা ও চক্কর কাটতে লাগলো। মা আমি রাতে ঘুমাইনি সেটা আপনাকে কে বললো?
~ কে আর বলবে? সাহিল বলেছে।
~ উনি বলেছেন। কী বলেছেন?

~ সকালে নাস্তার টেবিলে বসে কিছুক্ষণ ঝিম দিয়ে বসে ছিলো। আমি জিজ্ঞাস করায় সাহিল বললো, মা সোনিয়া রাতে ঘুমাতে পারেনি তাই যতক্ষণ না ও নিজে থেকে না উঠে তোমরা কেউ ওকে ডাকবেনা।
মায়ের কথা শুনে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খাওয়া শুরু করলাম। হঠ্যাৎ কাশতে লাগলাম।
সোনিয়া আস্তে খা। পানি খেয়েও যদি মস্তকে উঠাস তাহলে তরকারি খেলে কী করবি হুম?
~ স্যরি মা। আচ্ছা মা আমি এখন যাই পরে আসতেছি।

~ সোনিয়া শোন,
~ হ্যাঁ মা বলেন।
~ সাহিলকে কিছুদিন ধরে দেখছি ভীষণ টেনশনে আছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারছিনা। তানহা যাওয়ার পরে যেমন খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করতোনা এখন আবার ঠিক তেমনি ভাবে শুরু করেছে। ছেলেটার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। মনে হয় খুব কষ্টে আছে।
সোনিয়া শোন তোকে যেভাবেই হোক সাহিলকে খুশি রাখতে হবে। বুঝতেই তো পারছিস সাহিলই আমার সব।

ওর কিছু হয়ে গেলে আমি মরে যাবো।
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে স্তব্দ হয়ে চেয়ারের উপরে বসে পড়লাম। আমতা আমতা করে বললাম, আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবো উনাকে খুশি রাখার কিন্তু
~ কিন্তু কী সোনিয়া? বল। কোন সমস্যা?

~ সমস্যা বলতে, আসলে মা স্বামী~ স্ত্রীর সম্পর্ক এটা আল্লাহর তরফ থেকেই আসে। তাই কেউ জোড় করে এই সম্পর্ক গড়তে পারবেনা। তাই বলছিলাম কীমানে শুধু আমার যেটা বলার ইচ্ছা সেটা হলো উনি যদি আমাকে স্ত্রী হিসাবে মেনে নেয় তাহলেই সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নতুবা না।
সোনিয়া তোর কথার সাথে আমি ও একমত কিন্তু একটা মেয়ে পারে তার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে পুরুষের মন জয় করতে। তুই একটু চেষ্টা কর আমার বিশ্বাস তুই পারবি।

মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, মা আমি চেষ্টা করবো কিন্তু পারবো কিনা জানিনা।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো আচ্ছা মা।

মা আমি তাহলে রুমে যাই গোসল করবো।
~ নাস্তা তো খেয়ে যা।
~ এখন খেতে ইচ্ছে করছেনা মাত্রই চা খেলাম। আগে গোসলটা করে নেই তারপর নাস্তা করবো।
~ ঠিকাছে গোসল করে আয়।

রুমে ঢুকে ভীষণ ভয় পেলাম সাথে লজ্জা ও। শ্বাশুড়িরা ও এমন কথা বলে জানা ছিলোনা। আজকে সন্ধ্যার পরে গায়ে হলুদ তাই কয়েক মগ পানি দিয়ে গোসল করতে হবে কারণ গায়ে হলুদে তো হলুদ মাখিয়ে দেয় যতটুকু জানি। শেষে যত রাতই হোক গোসল করতে হয়। এখন এই গায়ে হলুদে কেমন হবে সেটা তো জানিনা। বড়লোকদের ব্যাপার স্যাপার বলে কথা। আলমারি খুলে থ্রি পিচ বের করে টাওয়ালটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। কয়েক মগ পানি গায়ে দিয়ে মাথাটা ভালো করে মুছে তারপর টাওয়াল পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসলাম।

আমি বেরিয়ে এসে বেলকুনিতে কাপড় মেলতে গেলে তাহিয়া পিছন থেকে ডাকালো। ভাবী
মুখটা ঘুরিয়ে বললাম, জি। কিছু বলবে তাহিয়া।
~ মা আপনাকে নাস্তা খেতে ডেকেছেন।
~ হুম তুমি যাও আমি আসতেছি।
চুলগুলো পেঁচিয়ে মায়ের কাছে গেলাম। মা আমায় ডেকেছেন?

~ হুম। নাস্তা কী করতে হবেনা?
খেতে ইচ্ছে করছেনা।
~ খেতে ইচ্ছে করছেনা বললেই হবে কালকে রাতে ও কিছু খাওয়া হয়নি আর এখনও বলছিস খিদে নেই।
জলদি টেবিলে বস আমি ডিমটা পোঁচ করে দিচ্ছি।
~ মা লাগবেনা আমি ভাজি দিয়ে খেতে পারবো।

~ তুই চুপচাপ বস। পাঁচ মিনিট লাগবে।
টেবিলের উপরে বসে আছি চুপচাপ। মা ডিমের পিরিচটা আমার সামনে দিয়ে বললো, নে পরোটা দিয়ে খেয়ে উঠ।
~ আপনি না পারেন ও বটে। আচ্ছা খাচ্ছি।
মায়ের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটলো। আমি ও মায়ের হাসি দেখে হাসলাম।

পর্ব ২২

নাস্তা খেয়ে মা কে বললাম, মা আজ থেকে সানি আমাদের সাথে ঘুমাবে। আস্তে আস্তে অভ্যাস না করলে পরে আর ঘুমাতে চাইবেনা। অন্তত পক্ষে পাঁচ~ ছয় বছর পর্যন্ত ঘুমাবে তারপর তো আলাদা বিছানায় দিতে হবে। মায়ের মুখ হা হয়ে গেলো আমার কথা শুনে। মায়ের হা করা মুখ দেখে আমার মাথাটা কেমন জানি ঝিম দিয়ে উঠল। আবার গায়ে কাঁটা দিয়ে ও উঠল। মা আবার কিছু মনে করলো না তো? মায়ের মনের অবস্থা জানতে নরমাল ভাবেই বললাম, মা আমি কী কিছু ভুল বলেছি। আসলে মা আমি কোন কিছু না ভেবেই আমার মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করলাম। যদি কোথায় ও দোষ হয়ে থাকে তাহলে আপনি প্লিজ শুধরে দিন। বুঝতেই তো পারছেন গরীব ঘরের সন্তান। এমন বড় ঘরে যে আমার বিয়ে হবে কল্পনাও করতে পারিনি।

আমি কথা বলছি আর মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার কথায় সে বিরক্ত বোঁধ করছে।
আমার কথার মাঝে আমায় থামিয়ে দিয়ে বলে, সোনিয়া তুই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস সেটা একদম উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। সন্তান তো মায়ের কোলেই থাকতেই ভালোবাসে তাই না। মায়ের কোলই সন্তানের শ্রেষ্ঠ ঠিকানা। সোনিয়া আমি বলছিলাম কী কয়েকদিন আমার কাছে থাক। তোদের ভিতরে সম্পর্কের একটা ভিত্তী স্থাপিত হোক তারপর না হয়।

আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে আমার কথা বলা মুখ বন্ধ হয়ে গেলো।
~ সোনিয়া আমি কী বুঝাতে চেয়েছি বুঝতে পেরেছিস?
~ গলার ভিতরে ঢোক গিলে বললাম, জি মা বুঝতে পেরেছি। এদিকে লজ্জায় আমার জান আসে আর যায়।

মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেলকুনিতে আসলাম। বেলকুনিতে বিছিয়ে রাখা চেয়ারে বসলাম। বেশ নরম চেয়ারের গদিটা। খুব আরামদায়ক চেয়ারটা। চেয়ারের সাথে হেলাম দিয়ে বসলাম। দুপুরের প্রখর তীব্র রোদ বাহিরে ঝলমল করছে। রোদের সাথে হালকা বাতাস ও বইছে। বাহিরে লোকজন খুব একটা দেখা যাচ্ছেনা। সকালবেলা হাঁটার মত তিল পরিমাণ ফাঁকা
থাকেনা রাস্তায় আর দুপুরবেলা তার উল্টো চিত্র ভাবতেই অবাক লাগছে। সন্ধ্যার পরে গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যাবো। শহরের প্রোগ্রামে আজ পর্যন্ত যাইনি। তাই অনেকটা আনইজি ফিল করছি। তাছাড়া উনার কাছে যতটুকু শুনেছি তারা বেশ ধনী পরিবারের। তাহলে আয়োজনটা ও বড়সড় করে করেছে।

ভাবছি শাড়ি তো পড়ব ঠিকি কিন্তু হাঁটতে পারবো। এত ভারী কাঁচ করা শাড়ি পড়ে কয়েকঘন্টা থাকা ভীষণ টাফ ব্যাপার। আমার তো ভাবতেই কেমন লাগছে। অবশ্য আজকে তো গায়ে হলুদ তাই সুতির ভিতরে হলুদ শাড়ি পড়ে যাবো আর বিয়ের দিন কাঁচ করা শাড়ি পড়বো। যাক এখনো তো মাঝে একদিন থাকবে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য।

চেয়ারের উপরে ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পাড়িনি। সাহিলের ডাকে ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙতেই লাফিয়ে উঠলাম তাকিয়ে দেখি উনাকে। আমার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি উনার ঠোঁট জোড়া। আমার কাঁধের উপরে তার হাত।
সোনিয়া তুমি এই গরমের ভিতরে বেলকুনিতে ঘুমিয়ে আছো কেন?

বিছানায় গিয়ে ঘুমাতে পারলেনা। আমি জানি সারারাত তুমি ঘুমাওনি তাই তো নিজেকে সামলাতে পারনি ঘুমের কারণে তাই না।
তাড়াতাড়ি উঠে বসতেই তার ঠোঁট আমার গাল স্পর্শ করে। সাথে সাথে উনি সরে যায় আমার কাছ থেকে। আমি বুঝতে পেরে কোন কিছু না বলেই রুমে গেলাম। সে ও আমার পিছনে পিছনে গেলো।
সোনিয়া এক মিনিট।

তার এক মিনিট শুনে আমার হার্ট বিট বাড়তে লাগলো। তিনি ধীরে ধীরে আমার একদম কাছাকাছি চলে আসে তারপর আমার চুলগুলো সরিয়ে পিঠের উপর হাত দিয়ে একটা পিঁপড়া নিজের হাতে আনলো। সোনিয়া দেখ, কত বড় লাল পিঁপড়া। যদি তোমার পিঠে কাঁমড় বসিয়ে দিত তাহলে তো খুব জ্বলতো তাই না।
আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনার হাত থেকে পিঁপড়াটা আমার হাতে নিয়ে বললাম, যদি কাঁমড় দিতো তাহলে কিছুক্ষণ পরে জ্বলানো কমে যেত কিন্তু আমি যে যন্ত্রণায় ভুগতেছি তার চেয়ে হাজার গুণ কম জ্বলতো বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।

সানির রুমে ঢুকে দেখি সানি খেলছে। সানিকে কোলে নিয়ে কপালে চুমো এঁকে দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম।
মা রুমে এসে বলে, সোনিয়া সানি তো চুপ করে তোর কোলের ভিতরে ঢুকে আছে। কোন শব্দ ও করছেনা। বাচ্চারা মায়ের কোল ঠিকি চিনে।
সোনিয়া সাহিল গোসলে ঢুকেছে বেরিয়ে আসলে দুজনে খেয়ে নিবি।
~ আচ্ছা মা।

প্রায় ত্রিশ মিনিট সানিকে কোলে নিয়ে বসে আছি। কোলের ভিতরে খেলতে খেলতে কখন জানি ঘুমিয়ে পড়ল সানি। সানিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সানির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
চুলগুলো মুছতে মুছতে সাহিল দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়।
চুল মুছতেছে আর আমাকে আড়চোখে দেখছে।
মা ভীষণ খিদে পেয়েছে।
সোনিয়া দুজনে গিয়ে খেয়ে নে।

উনার দিকে তাকিয়ে দেখি সে মিটমিট করে হাসছে। মুখটা বাঁকা করে বিছানা দিয়ে নামলাম। তারপর সোজা টেবিলের কাছে গেলাম। দুজনের জন্য খাবার বাড়লাম। উনি এসে চেয়ার টেনে বসলো। প্লেটটা নেয়ার জন্য হাত বাড়ায় আমি ও তাকে দেয়ার জন্য হাত বাড়াতেই তার হাতের সাথে আমার হাত লাগে।
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার হাতটা সরিয়ে নিলাম। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। তার ভাবসাব দেখলে মনে হচ্ছে সে ইচ্ছা করেই আমার হাত স্পর্শ করেছে।
~ সোনিয়া প্লেটটা দাও।

আমি প্লেটটা তার সামনে দিলাম। নিন এবার খাওয়া শুরু করেন।
প্লেট থেকে লোকমা করে খাবার মুখে তুললো। খেতে খেতে বলে, খাবারের স্বাদ আগের মত লাগেনা। মায়ের হাতের খাবার অনেক ভালো লাগতো।
~ শোনেন, আপনার মনে হয় ভুল হচ্ছে। খাবার গুলো মা নিজেই রান্না করেছেন। আমি তো শুধুমাত্র আপনাকে বেরে দিলাম।
আমি খাবারটা মুখে দিয়ে বললাম, খাবারের স্বাদ তো ঠিকি আছে তাহলে আপনার এমন কমেন্ট করার কারণটা বুঝলাম না।
আপনি কী বলতে চেয়েছেন বলবেন প্লিজ?

তরিঘরি করে সাহিল একেরপর এক লোকমা মুখে তুললো আর খেতে লাগলো। আমার কথার কোন জবাব দিচ্ছেনা। আমার ও বুঝতে বাকী থাকলোনা যে, তিনি আমাকে অপমান করার জন্যই এমনটা বলেছেন। খাওয়া শেষ করে উনি হাত ধুয়ে চলে গেলেন। আমি আস্তে আস্তে পুরোটা শেষ করে টেবিল পরিস্কার করে প্লেট ধুতে নিলে তাহিয়া এসে বাঁধ সাধলো।
ভাবী আপনি এটা কী করছেন? আমি থাকতে আপনি এসব কেনো করতে গেছেন সেটাই তো বুঝলাম না। আপনি রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিন আমি এগুলো ধুয়ে গুছিয়ে রাখছি।

তাহিয়া আমি ধুয়ে রাখলে তেমন কোন সমস্যা হবেনা। তাছাড়া আমার কাজ করার অভ্যাস আছে। আমার কাছে দাও আমি করে দিচ্ছি।
~ ‘ভাবী প্লিজ আপনি এখান থেকে যান। আমাকে আমার কাজ করতে দিন।
~ হুম। হাত মুছে রুমে গেলাম। সাহিল বিছানার উপরে পায়ের উপরে পা তুলে শুয়ে আছে।
আমি সোজা গিয়ে রুমে ঢুকলাম।

আমাকে দেখেই পা নাড়াতে লাগলো। চুলগুলো এখনো ভিজা। তবে বেশ ভালোই লাগছে দেখতে। ভিজা চুলে ইনোসেন্ট দেখাচ্ছে তাকে। হাঁটছি আর আড়চোখে তাকে দেখছি। তারপর বিছানার অপর পাশে আধা শোয়া অবস্থায় শুয়ে পড়লাম।
~ সোনিয়া আমরা মাগরিরের আজানের পরেই বের হবো। তুমি নামাজ পড়ে জলদি রেডী হয়ে যাবে।
মাথা নাড়িয়ে উপর নিচ করে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম।

সাহিল ম্যাগাজিন পড়ছে। আমি পাশে বসে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলাম। উনি পৃষ্ঠাটা পাল্টে ফেললে কিছুটা বিরক্ত লাগলো।
কারণ ওই পাতায় স্পেশাল একটা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত ছিলো। কিন্তু পড়তে না পাড়ায় মেজাজ পুরো গরম হয়ে গেছে।
ইচ্ছে করছে জুস করে খেয়ে ফেলি।
সাহিল ম্যাগাজিনটা বালিশের উপরে রেখে শুয়ে পড়লো।

আমি ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে সেটা খুঁজতে লাগলাম। অনেকক্ষণ খোঁজার পরেও সেই পৃষ্ঠাটা পেলাম না যেটা আমি দেখছিলাম।
আচমকাই আমার কোলের উপরে পৃষ্ঠাটা এগিয়ে দিয়ে বলে, এটাই তো খু্ঁজছো তাই না! পুরোই শকড হয়ে যাই। আমতা আমতা করতে করতে বললাম, পৃষ্ঠাটা আপনার কাছে গেলো কী করে? কথাটা বলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সে হাসছে। বুঝলাম সে ইচ্ছা করেই কাজটা করেছে। আপনি ইচ্ছা করেই এমনটা করেছেন না। যাতে আমাকে জব্দ করতে পারেন। আপনি বুঝতে পারছেন যে আমি ওটা পড়ছিলাম তাই তো এটা লুকিয়ে রেখেছেন।
~ সোনিয়া এবার থামো অনেক হয়েছে। আমি আর হাসি ধরে রাখতে পারছিনা।

মুখটা বাঁকা করে দাঁতের উপরে দাঁত কেটে বললাম, আপনার সব দাঁত পড়ে যাবে অভিশাপ দিলাম।
আরে সোনিয়া কী বলছো তুমি? আমার যদি সব দাঁত পড়ে যায় তাহলে আমায় নিয়ে সমাজে চলতে পারবে তুমি? মানুষ তোমায় দেখে হাসবেনা। আর বলবেনা যে তুমি দাঁত নেই এই বুড়ো লোকটিকে কেনো বিয়ে করেছিস। তখন তোমার কেমন লাগবে ভেবে দেখেছো।
মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললাম, বেশ করেছি। আমার কোন সমস্যা নেই। আমার স্বামীর দাঁত না থাকলে আমি বুঝবো তাকে নিয়ে হাঁটতে আমার কোন সমস্যা নেই।
সাহিল আমার পিঠে আচমকাই হাত রাখতেই চমকে উঠলাম। ভয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিনা। হঠ্যাৎ এত দ্রুততার সাথে পিঠের চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে চুমো খেলো।

মুখটা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাতেই তার ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁট চেপে ধরলো। আমি তো অবাক। কিছু বলতে পারছিনা। উনি তার উপরের ঠোঁট দিয়ে আমার উপরের ঠোঁট চুষতে লাগলো তারপর একইভাবে নিচের ঠোঁট। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিলো সাহিলের ছোঁয়ায়। অনুভূতিটা কাজ করতে লাগলো প্রচন্ড রকমের।
আমাকে ধরে বিছানার উপরে শুইয়ে দিয়ে পেটে হাত দিতেই তার স্পর্শে বুক কেঁপে উঠলো। হাতটা পেটের উপর থেকে আস্তে আস্তে বুকের উপর পর্যন্ত আনতে নিলে আমি বাঁধ সাধলাম। এখন না!

সে আমার কথা না শুনে গলায়, গালে পেটে কিস করলো। আমি ও মরিয়া হয়ে উঠলাম। শাড়ির আঁচলটা বুকের উপর থেকে সরিয়ে ব্লাউজের হুক খুলতেই এমন সময় মায়ের ডাক পড়লে সাহিল সাথে সাথে আমাকে ছেড়ে দিলো। আমি হাসলাম। বললাম এখন না তবুও শুনলেন না। উনার মেজাজ গরম হয়ে গেলো। কথা না বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

সমস্ত শরীর কাঁপছে। মনের মাঝে ভয় ও কাজ করছে। বুঝতে পারলাম না হঠ্যাৎ করে তার এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসলো। এটা কী সত্যি ভালোবাসা নাকি মোহ?

পর্ব ২৩

সাহিল চলে গেলে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। ভালো করে মুখটা ধুয়ে নিলাম। যে গরম পড়েছে। শরীর তো ঘামছেই সাথে মুখটা আরও বেশি ঘামছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি উনি জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার বেরিয়ে আসার উপস্থিতি টের পেয়ে আমার দিকে তাকালো। সোনিয়া একটু আগে যা ঘটেছে তাতে কী তুমি মাইন্ড করেছো? জানিনা তোমায় দেখে আমার কী জানি হয়ে গেলো নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। মূহুর্তের মধ্যেই সব কিছু স্বপ্নের মত হয়ে গেল। সোনিয়া প্লিজ মাইন্ড করোনা।

আমি তার কথাশুনে পুরোই হতবাক হয়ে যাই। উনার কী মাথায় সমস্যা হয়েছে নাকি?মুখে যা ইচ্ছা আসবে তাই বলে দিবে। সাধারণ জ্ঞান বলতে কিছু নেই। কিছুক্ষণ আগে কী উনি করেছে? ডাটকলা। হ্যাঁ ডাটকলাই। তার জন্য আবার অনুতপ্ত হচ্ছে। আমার মনের ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে এখন আসছে সাধু সাজতে। ইচ্ছা করছে চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে দিতে। কী করে এমনভাবে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে নিভানোর নামই নিচ্ছেনা আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেকচার দিচ্ছে।

সোনিয়া তুমি কী ভাবছো? উনার ডাকে ভাবনার রাজ্য থেকে বাস্তবে বেরিয়ে এসে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, আপনি এসব কী ভাবছেন আমি মাইন্ড করবো কেনো? তাছাড়া আপনি তো আর বাহিরে মানুষ না। আপনি আমার হাজবেন্ট। তাই আমাকে ছোঁয়ার এবং ভালোবাসার সম্পূর্ণ অধিকার আপনার আছে। আমার কথাশুনে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। কথা বলা তো দূরের কথা স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার ভাবসাব দেখে আমার মাথাটা কোমায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি হচ্ছে। তাই তাকে এড়িয়ে আলমারি খুললাম।

হলুদ শাড়ি বের করে বিছানার উপরে রাখলাম। আচ্ছা সোনিয়া তুমি এই ভরদুপুরে শাড়ি বের করছো কেনো বলতো? তুমি কী এখনি যাচ্ছো গায়ে হলুদে। এই রে কাজ হয়েছে উনার কাছ থেকে বাঁচার জন্যই তো এসব করছি নাহলে এখন তো দিব্বি একটা ঘুম দিতাম একবারে সন্ধ্যার আগে উঠতাম। কিন্তু ভয়ের জন্য ঘুমাইনি যদি সে আবার
কাঁধে হাত দিতেই ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম। সাথে সাথে আমায় তার বুকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আমার বুকের উপরে হাত দিলো। সোনিয়া তোমার তো হার্টবিট বেড়ে গেছে।

তুমি কী আমাকে ভয় পাচ্ছো। তাহলে বলো আমি চলে যাচ্ছি। এখন থেকে দুজনে আলাদা থাকবো। তুমি রাতে বিছানায় ঘুমাবে আর আমি সোফায় ঘুমাবো। তোমার যদি কিছুর প্রয়োজন হয় তাহলে আমায় ডাক দিবে আমি কাজটা করে দিবো তখনি। আজ থেকে এটাই ফাইনাল ঠিকাছে সোনিয়া। এখন আর কোন গন্ডগোল হবেনা। না থাকবে বাঁশ আর না থাকবে বাঁশি।

আমি তো উনার মুখের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। যে মানুষটা কখনো এত কথা বলেনা আর শোনাটা ও পছন্দ করে না আর সে কিনা এত এত বকবক করছে।
একটুবাদে উনি চুপ করে আমার দিকে তাকায়। মাথায় হাত দিয়ে কী জানি ভাবতে থাকে। তারপর বিছানার উপরে বসে অনেকক্ষণ কী জানি মিলাতে থাকে হাতের ইশারায়।

সোনিয়া আমি এতক্ষণ বকবক করলাম তুমি কিছু বললে না কেনো? আমায় থামিয়ে দিতে। তোমার তো কান শেষ হয়ে গেছে তাই না। আচ্ছা স্যরি। আসলে জানিনা কীভাবে এত কথা আমার মুখে আসলো আমি নিজেই বুঝতে পারলাম না।
~ না আমার কান ব্যাথা হয়নি বরং আমার কাছে কথাগুলো বেশ মধুর লাগছে। আপনার কন্ঠটা মাসআল্লাহ দারুণ। তাই আপনি যখন কথা শুরু করেন আমি তো অবাক হয়ে যাই। ভাবী মানুষ এত সুন্দর করে কী করে কথা বলতে পারে। আমি তো আপনার মতো এত সুন্দর করে কথা বলতে পারিনা তাই তো নিজেকে পাগল মনে হয়।

উনি হাসলো। সোনিয়া তোমার নিজেকে পাগল মনে হবে কেনো। তুমি তো মেয়ে তাহলে পাগলি মনে হবে বলেই আরো জোরে হাসলো।
মুখটা ঘুরিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে
বসলাম। ওপাশ ফিরে শাড়ির আঁচল টানতে লাগলাম। মনের মধ্যে ছটফটানি তো চলছে।

সাহিল বুঝতে পারলো রাগ করেছি। রাগের বশে আমি শুয়ে পড়েছি। শুয়ে শুয়ে কী করছে দেখতে উঁকি মারতেই বোকা বনে গেলো। আমি ও এদিকে ফিরে ভেংচি কেটে দাঁতের উপরে দাঁত রেখে বললাম, আমাকে এমন করে দেখা লাগবেনা। আমার কোথায় ও রুপ বাড়েনি।
সোনিয়া তুমি না অযথাই দোষারোপ করছো। আমি তোমায় দেখতে উঁকি মারিনি।

~ ওহ্ আচ্ছা। তাই বুঝি!
~ হুম। তাছাড়া তোমায় কী আমি কখনো দেখিনি। এই তো কিছুক্ষণ আগেই তো! থাক আর নাই বা বললাম।
উনার মুখে কথাটা শুনে লজ্জায় গায়ে কাঁটা বিঁধলো। মনে হচ্ছে সমস্ত গরম আমার গা দিয়ে পড়ছে।
একে তো লজ্জায় মরে যাওয়ার উপক্রম তৈরী হয়ে গেছে তার উপরে গরমে ঘামছি।

সোনিয়া তুমি তো ঘামছো? শরীর কী খারাপ? কপালে আর বুকে হাত দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো কিছুক্ষণ সাহিল। না গায়ে তো জ্বর নেই তাহলে এমন লাগছে কেনো তোমায়।
~ আমি কী করে বলবো? হঠ্যাৎ করেই প্রচন্ড ঘামছে। আর কয়েকদিন অপেক্ষা করো আমাদের বাসায় গেলে গরমে আর কষ্ট হবেনা।
আমাদের বাসায় সব আছে জানো। তুমি গেলে তোমার আর বের হয়ে আসতে ইচ্ছা করবেনা।
~ হুম।

~ সোনিয়া তুমি একটু বিশ্রাম নাও আমি তোমার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছি। তারপর ভিজা কাপড় দিয়ে গা মুছে দিলেই দেখবে ভালো লাগবে।
~ কী করবেন? গা মুছে দিবেন। আআআ আপনি কী বলছেন তা শুনে তো আমার মাথা ঘুরছে। আপনি এত সহজে কী করে বললেন যে আমার গা মুছে দিবেন।
~ বাহ্ রে এতে আবার ভাবার কী আছে? তোমার গা মুছে দিলে কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। শোন আমি তোমার স্বামী আর তোমার শরীর মুছে দেয়ার অধিকার আমার আছে। তাই তুমি এখুনি শুয়ে পড় আমি মুছিয়ে দিচ্ছি।
~ উনার কথা শুনে গলাটা আটকে যাচ্ছে। কথা বলতে ম্যা ম্যা করছি।

খুব কষ্টে গলা দিয়ে কথা বের করলাম। আচ্ছা শোনেন, এখন মুছিয়ে দেয়া লাগবেনা। গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম থেকে আসি তারপর না হয় দিয়েন। এখন আমি একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকবো।
~ ঠিকাছে। তাহলে প্রোগ্রাম থেকে এসে গা মুছিয়ে দিবো। আর না হলে একসাথে শাওয়ার নিবো।

আমি তো হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। উনি কী কিছু খেয়ে এসেছেন নাকি? কী সব আবোল তাবোল বলছেন। কিন্তু সত্যি কী সে আমার গা মুছিয়ে দিবে। ইশশশ ভাবতে তো কাতুকুতু হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে নিজে সামলে বললাম, সোনিয়া কাম ডাউন। এত চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।
~ সোনিয়া একটা চকলেট হবে। না মানে বলছিলাম আরকি। খেতে ইচ্ছে করছে।
~ চকলেট? তাও আমার কাছে।

~ হুম। প্লিজ দাও।
~ আশ্চর্য তো! আমি কী দোকানদার নাকি যে চকলেট নিয়ে বসে থাকবো।
সন্ধ্যার পরে বের হয়ে দোকান থেকে কিনে দিবো। তখন খাবেন।
~ উফফ দোকানের চকলেট না। অন্য চকলেট।
~ অন্য চকলেট মানে? কথা না প্যাঁচিয়ে প্লিজ বলুন না কোন চকলেটের কথা বলছেন?

সাহিল তার ঠোঁট জোড়া আমার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে ধরলে আমার বুঝতে বাকী রইলো না সে কোন চকলেটের কথা বলেছে।
সাহিলের ঠোঁট আমার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি।
আমি কিছু বলার আগেই সাহিল আমার ঠোঁটে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ পরে ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে বললো, হুম দারুণ মিষ্টি চকলেটটা। এখন নরমাল চকলেট খেলাম কিন্তু রাতে ড্যারিমিল্ক খাবো। তোমার ঠোঁট কামড়ে খাবো বলে দিলাম।

আজ রাতে তোমাকে আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিবো।
আমি হা হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। লজ্জায় তো লাল হয়ে আছি। সাহিল রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

পর্ব ২৪

গা এলিয়ে দিয়ে চুলগুলো বালিশের উপরে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছি। হাতের উপরে চিমটি কেটে আহ্ বলে জোরে শব্দ করলাম। কী করছি এসব? এটা তো কোন স্বপ্ন না একদম বাস্তব। তার মানে সাহিল এতক্ষণ যা করেছে সমস্ত কিছু সত্যি ছিলো। আমার কাছে কেনো জানি বারবার স্বপ্ন মনে হচ্ছিলো। ঘুমিয়ে মাঝে স্বপ্ন দেখার অভ্যাস আছে আমার তাই তো হাতে চিমটি কেটে শিউর হয়ে নিলাম আরকি। শেষের দিকে তো কতকিছু বলে গেলো রাতে নাকি কী না কী করবে। পাঁচ মিনিটের ভিতরে মাথার এক পাশে ব্যথা শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত চিন্তা করলে যা হয় আরকি। হাত দিয়ে ব্যথা অনুভবকৃত জায়গায় আস্তে আস্তে চাপতে লাগলাম। অনেকক্ষণ ধরেই চাপলাম তবুও কিছুতেই মাথা ব্যথা কমছেনা।

চোখ বন্ধ করে রাখলাম। এদিকে আমার হাত মাথার উপরে রাখা।
ব্যথায় কুকরাতে কুকরাতে চোখের মাঝে কখন জানি তন্দ্রা এসে যায়।

হঠ্যাৎ কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। ভালোই লাগছিলো অনুভূতিটা। আমার সমস্ত কপাল এবং মাথাটা টিপে দিচ্ছে। স্বপ্ন ভেবে আর চোখ খুললাম না। মাগরিবের আজানের একটু আগেই তাহিয়ার ডাকে ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলে তাকাই। তারপর আস্তে আস্তে বিছানার উপরে উঠে বসলাম। বসা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে গেলাম। দাঁত ব্রাশ করছি হঠ্যাৎ আয়নার দিকে চোখ গেলে আমি তো পুরোই থমকে গিয়ে দাঁত মাজা বন্ধ হয়ে যায়। কপালটা কেমন জানি ভিজা ভিজা লাগছে। আর প্রচন্ড রকমে কপালটা ঘামছে। কপালে হাত দিতেই আৎকে উঠি। একি! পুরো কপাল জুরে তো মলমে ভরা। তার মানে ঘুমন্ত অবস্থায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়েছিলাম সেটা বাস্তব। তাহলে কী সাহিল এটা করেছে? কিন্তু তাকে তো রুমে দেখিনি। তাড়াতাড়ি দাঁত ব্রাশ করে ফেসওয়াশ দিয়ে ভালো করে মুখটা ধুয়ে ওজু করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসি।

মুখটা মুছে মাগরিবের নামাজ আদায় করে শাড়ি হাতে নিয়ে দরজার কাছে গেলাম। দরজাটা লক করে রুমের লাইট বন্ধ করে শাড়ি পড়লাম। শাড়ির কুঁচি ঠিক করে ড্রেসিন টেবিলের সামনে রাখা টুলটাতে বসলাম। হালকার উপরে সাজলাম। চুলগুলো শাড়ি পড়ার আগেই আচঁড়ে নিছি লম্বা বড় চুল তো তাই। চুলগুলো খোঁপা করে নিলাম কাঠি দিয়ে। এক হাতে মুঠো ভর্তি চুড়ি আরেক হাতে বেসলাইট পড়লাম। মুখে হালকা করে পেইন কেক লাগিয়ে তার উপরে হোয়াইটোন পাউডার দিলাম যাতে একটু গর্জিয়াছ লাগে।

বিয়ে বাড়ি বলে কথা। তার পরিচিত মোটামুটি সবাই আসবে প্রোগ্রামে।
পেইন কেক শুকালে চোখে আইলেনার দিলাম মোটা করে। এমনিতে চোখ বড় তাই মোটা করে চোখ আঁকলে ভালো লাগে বেশি। এটা আমার কথা না সবাই বলতো। ঠোঁটে গাঢ় করে লিপস্টিক দিলাম। তারপর দরজাটা খুলে দিলাম।
একটু বাদে সাহিল এসে বললো, সোনিয়া তুমি কী রেডী?

~ কানের দুল পড়ছি আর বলছি এই তো রেডী পাঁচ মিনিট লাগবে। একটু বসেন প্লিজ। আমার হয়ে গেছে প্রায়।
~ আচ্ছা তোমাকে কত করে বলেছি একটু তাড়াতাড়ি রেডী হবে তা না করে তুমি এখনো সাজগোছ করছো। তোমরা মেয়েরা যে স্লো সেটা তোমায় না দেখলে বুঝা যেতনা। আচ্ছা পুরো মেকাপ কী চেহারায় দিচ্ছো নাকি!
রাগান্বিত হয়ে সাহিলের দিকে তাকালাম।

~ আচ্ছা আপনি কয়েকদিন ধরে এত বাঁচাল হয়ে গেলেন কেনো? বুঝলাম না তো কিছুই। এত প্যানপ্যান করেন আমার মাথার ভিতরে আগুন জ্বলে। একটু কম কথা বলতে পারেননা। আমি তো জানি ছেলেরা এত কথা বলেনা কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলেরাই বাঁচাল শুধু হাতে গোনা কয়েকটা বাদে। এতদিন আমায় বাঁচাল বাঁচাল বলে চেঁচিয়েছেন আর আজ আপনি! ভাবতে ও পারছিনা। কথা বলতে বলতে উনার মুখে দিকে তাকাতেই আমার মুখটা হা হয়ে গেলো। কী ব্যাপার আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?

সাহিল ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা ও হা হয়ে গেছে। আমি মাথাটা নিচু করে বললাম, আপনি আমার দিকে ওমন করে তাকালে আমার খুব লজ্জা লাগে। চোখটা নামান প্লিজ।
ভাবনার রাজ্য থেকে বেরিয়ে আমতা আমতা করে সাহিল উত্তর দিলো, সোনিয়া তোমাকে তো দারুণ লাগছে। হলুদ শাড়িতে তোমায় একদম ডানা কাটা পরীর মত লাগছে। তোমায় দেখে আমি তো চোখ ফিরাতে পারছিনা। আচ্ছা তুমি কী আমায় জাদু করেছো নাকি?

আমি কী কোন জাদুকর নাকি? জানিনা আপনার কেনো এমন হচ্ছে। হয়তো আমায় বেশি করে ভালোবেসে ফেলেছেন তাই এমন লাগছে। আমার কথাটা শুনে সাহিলের চেহারার মাঝে খুশির ঝলক স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আমি ও নাছোড় বান্দা তার মুখ থেকে বের করেই ছাড়বো। আচ্ছা বলেননা আমি যা বললাম, মানে ধারণা করে যেটা বললাম সেটা কী সত্যি? শুধু জানতে চাচ্ছি।

সাহিলের চোখে মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে সে রাগ হচ্ছে। দাঁতে দাঁতে কেটে বললো, সোনিয়া একটু আগে তোমায় কী বলেছিলাম ভুলে গেছো? আমি তো জানতাম মেয়েরা নাকি পুরুষদের চোখের ভাষা বুঝতে পারে তাহলে তুমি কী কিছু বুঝতে পারোনি?
~ এই মা আসলেই তো বুঝতে পেরেছি। কয়েকদিন আগে একটা ইন্ডিয়ান ছবি দেখেছিলাম আপনার চোখের ভাষার ডায়লগটা শুনে মনে পড়ে গেলো। গানটা গাইবো একটু শুনবেন। আমার পছন্দের একটা গান। উনি গিয়ে চেয়ারের উপরে মুখ ভার করে বসলো।
আমি গাওয়া শুরু করলাম।

চোখের ভাষা যদি বুঝতে পারি
না বলা কথা যদি শুনতে পারি
তবে করিনি তো ভুল আমি একজন
তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার
তুমি আমারতুমি আমার।

সাহিল বসা ছেড়ে উঠে আমার হাতটা ধরে বললো, সোনিয়া।
আমি তার চোখে চোখ রাখতেই সাহিল আমাকে বুকে টেনে নিলো।
সোনিয়া আই লাভ ইউ। সত্যি তোমায় আমি ভালোবেসে ফেলেছি। মা ঠিকি বলে তুমি অনেক দামী জিনিস যেটা মা আমাকে গিফট করেছেন। তাই তো মায়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সাহিলের বুকের সাথে আমি লেপ্টে আছি। অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে। হঠ্যাৎ সাহিলের ফোন বেজে উঠলো।
ফোনটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখি তন্ময়ের কল। হকচকিয়ে উঠলাম। সোনিয়া আমার বাল্যকালের দোস্ত তন্ময় কল দিয়েছে কলটা রিসিভ করে নেই।

তন্ময়ের নামটা শুনেই ভয়ে কেঁপে উঠলাম। নামটা ভীষণ ভয়ংকর। এই নামের সাথে বড় ধরণের একটা কাহিনী লুকিয়ে আছে আমার। ভাবলেও বুকের ভিতরটা শিউরে ওঠে।
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো তন্ময়ের কন্ঠস্বর।
~ হ্যালো দোস্ত সাহিল। কেমন আছিস?
~ আলহামদুলিল্লাহ তুই কেমন আছিস?

~ হারামী তুই কোন কথাই বলবিনা। তোর সাথে জীবনে ও কথা বলবোনা বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। কিন্তু আজ বন্ধুর বিয়ে বলে তোর সাথে কথা বলতে বাধ্য হলাম। দোস্ত শুনলাম তুই নাকি আবার বিয়ে করেছিস। ভালোই পারিস একটা যেতে না যেতেই আরেকটা বিয়ে করে নিলি। আর দেখ আমি এখনো একটা বিয়ে করতে পারলাম না। একটা মেয়ে পছন্দ করেছিলাম কয়েকমাসের প্রেম ছিলো। ভালোই আগাচ্ছিলাম হঠ্যাৎ করে কেন যে মেয়েটিকে বেড শেয়ার করতে বললাম। ওটাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো। কত মেয়েকে নিয়েই তো শুয়েছি কিন্তু ওই মেয়েটির সাথে শুতে না পেরে আফসোস লাগছে। আজ পর্যন্ত এই তন্ময় চৌধুরী কখনো হার মানেনি কিন্তু ওই মেয়েটা আমাকে হার মানিয়ে দিলো।

~ তন্ময় শোন তোর ভাবী পাশে এখন এসব না বলে সামনাসামনি বললে ভালো হয়।
~ আরে দোস্ত এত কথা বলিস কেন? তোর বউ মানে তো আমার ও বউ নাই না। শোন আমি আজকে একটা জরুরী কাজে আটকে গেছি তাই গায়ে হলুদে আসতে পারবোনা কিন্তু হ্যাঁ শুক্রবার বিয়েতে অবশ্যই আসবো। সাহিল একটা কথা শোন।

~ হ্যাঁ বল। শোন তানহার সাথে পরশুদিন দেখা হয়েছিলো। দোস্ত মালটা তো খুব সেক্সি। আমাকে অনেক অনুরোধ করে বলেছে তোর সাথে দেখা করিয়ে দিতে।
ফোনটা নিয়া বেলকুনিতে গেলাম।
~ হ্যাঁ এখন বল।

~ বলছিলাম কী? তুই তো বিয়ে করেছিস তাই না! বউ বউয়ের জায়গায় থাকবে আর তুই তানহার সাথে গ্যাপ করে সময় দিবি। তাতে তোর বউ ও ঠিক থাকবে আর এক্স ওয়াইফের সাথে ইনজয় করতে পারবি। জাস্ট ইনজয় দোস্ত। আমি কী বলছি বুঝতে পেরেছিস। তানহা তোকে এখনো ভালোবাসে তাই সুযোগটা কাজে লাগা। ফ্রিতে ইনজয় করতে পারবি। দরকার হলে দুজনে একসাথেবুঝতে পারছিস আমি কী বলতে চাচ্ছি।
~ আচ্ছা শোন সোনিয়া ডাকছে তোর সাথে পরে কথা হবে।

~ কী বললি তোর বউয়ের নাম সোনিয়া?
~ হুম।
~ ওয়াও তাহলে তো সোনিয়া আমার ও বলেই হাসলো তন্ময়। আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম যে আমার সাথে শুতে চায়নি সেই মেয়ের নামও সোনিয়া। সোনিয়া নামের মেয়েরা ভীষণ কিউট হয়। তা ভাবি কী কিউট?
~ হ্যাঁ অনেক কিউট। শুধু কিউট না কিউটের পুরো ডিব্বা।
~ আচ্ছা সাহিল তাহলে বিয়েতে দেখা হবে।

~ হুম। কথা বলা শেষ করে রুমে ঢুকল সাহিল।
আমি সাহিলের দিকে অন্য চোখে তাকালাম। অনেকটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম কেমন বন্ধু যে উল্টা পাল্টা কথা বলে। মনে হয় বেজায় খারাপ।

সোনিয়া তন্ময় কল করেছে। গায়ে হলুদে আসতে পারবেনা তাই বিয়েতে দেখা হবে আমাদের। জানো বেশ কয়েকবছর পরে আমাদের দেখা হতে যাচ্ছে। তানহাকে নিয়ে দুই বন্ধুর ভিতরে ঝামেলা হয়েছিলো। তন্ময়ের মাধ্যমেই তানহার সাথে আমার পরিচয়। তন্ময় ভেবেছিলো তানহা ওকে ভালোবাসে আসলে এটা ছিলো তন্ময়ের ভুল ধারণা তাই যখন তানহাকে আমি প্রোপজ করি তখন তানহা আমাকে একসেপ্ট করে আর এই নিয়ে আমাদের ভিতরে বিশাল ঝগড়া বিবাদ শুরু হয়ে যায়।

বিয়ে কয়েকমাস পরে তন্ময় আমাকে বলে দোস্ত সব ভুলে গেলাম এবার একটা মেয়ে পেয়েছি আর তার সাথে আমাকে তোর মিলিয়ে দিতে হবে। কীভাবে দিবি সেটা তোর ব্যাপার আমি জানিনা। কিন্তু বিয়ের পরে এত ব্যস্ততা বেড়ে গেলো যে তন্ময়কে সময় দিতে পারিনি। তারপর তানহা প্রেগন্যান্ট হওয়ার পরে আরো ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এর ভিতরে নাকি সেই মেয়েটির সাথে তন্ময়ের ব্রেকআপ হয়। এরপর থেকে তন্ময় আর আমার সাথে যোগাযোগ রাখেনি আর আমি ও রাখার চেষ্টা করিনি।
তাই বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে কল দিলো।
তন্ময় নামটা শুনে কেমন জানি অস্থিরতা কাজ করতে লাগলো।

পর্ব ২৫

সাহিল মাথার পিছনে হাত রেখে ছোট বাচ্চাদের মত বলল, সোনিয়া তুমি কী বাসায় বসে গায়ে হলদু লাগাবে নাকি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে বউকে হলুদ লাগাবে বলেই হাসলো।

মাথাটা নিচু করেই কাঁপা স্বরে বললাম, বাহ্ এখন সব দোষ আমার হয়ে গেলো তাই না! এতক্ষণ যে আপনি ফোনে প্যানপ্যান করেছেন তাতে কোন দোষ হয়নি। তাই তো বলি যত দোষ নন্দ ঘোষ। এখন আপনি এভাবে যদি মূর্তির মত আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে কার সাধ্য আছে এই মূর্তিটাকে ঠেলে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। বলুন উত্তর দিন।

আমার কথা শুনে তো সাহিল রীতিমত হা হয়ে তাকিয়ে আছে। জিহব্বায় কামড় দিতে দিতে ভ্রু কুঁচকে বলল, সোনিয়া তুমি এখন আমায় নতুন টাইটেল দিয়েছো। আমি এখন মূর্তি হয়ে গেলাম। তা বলি কী কথাটা কম বলে নিচে আসো আমি গেইটের কাছে অপেক্ষা করছি। আর হ্যাঁ যদি দেরী করো তাহলে তোমার একদিন কী আমার একদিন। বলেছিলাম রাতে কিছু একটা হবে কিন্তু যদি যেতে না পারি তাহলে কিন্তু এখনি T20 ম্যাচ হবে বলে দিলাম শার্টের কলার উঁচু করতে করতে বলল। সাহিলের এমন কথায় মাথার ভিতরে চক্কর কাটলো আমার। মুখের ভিতরে সমস্ত পানি শুকিয়ে গিয়েছে। গলাটা ও কাঠ হয়ে গেছে।

সাহিল রুম থেকে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে আমি তার দিকে তাকালাম। সাহিল ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে তারপর চোখ টিপ মেরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি রুমের ভিতরে স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। দৌঁড়ে কিচেনে যাই ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানির বোতলটা হাতে নিলাম। গ্লাসে ঢেলে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে নিলাম। তাহিয়া বলে উঠলো, ভাবি আপনি এত ঠান্ডা পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন যে? গলা ব্যথা করবে তো পরে। এত ঠান্ডা কী খাওয়া উচিত? অন্ততপক্ষে নরমাল পানি মিক্স করে খাওয়া উচিত ছিলো। দিনকালের যে অবস্থা পড়েছে।

তাহিয়ার কথার কোন উত্তর না দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মোবাইলটা হাতে করে দরজার কাছে গেলাম। তাহিয়া আমি যাচ্ছি তুমি দরজাটা আটকে দাও। আর হ্যাঁ পানি খাওয়ার কথাটা আবার কারো কাছে বলোনা।
সিঁড়ি বেয়ে নামছি আর ভাবছি মাকে তো তখন বলেছিলাম যে সন্ধ্যার পরে গায়ে হলুদে যাবো। তাই এখন না বললেও চলবে। শাড়ি পড়ে আমি হাঁটতে পারিনা ভালো করে তবে এটা সুতির বলে বেশ ভালোই লাগছে। শাড়ির কুঁচি ধরে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নামলাম। সাহিল মটরসাইকেলের উপরে বসে আছে। আমাকে দেখে ভালো করে বসলো সিটের উপরে। সোনিয়া উঠ অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে।
~ আমি সাহিলের পিছনে উঠলাম।

~ সোনিয়া শক্ত করে ধরে বসো। স্টার্ট দিলে পড়ে যাবে না হলে। আমি বসে একহাত তার পিঠের উপরে দিলাম আরেক হাত দিয়ে কোমড় চেপে ধরলাম। সাহিল গাড়ি স্টার্ট দিলো। খুব স্পিডে চালাচ্ছে। একটু পরপর ব্রেক নিচ্ছে। তার পিঠের সাথে ধাক্কা খাচ্ছি বারবার। সোনিয়া কেমন লাগছে তোমার?
~ ভালো।
ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলল,
~ সোনিয়া তুমি কী ভয় পাচ্ছো?

~ না কীসের ভয়? তাছাড়া ভয় পাবো কেনো?
~ ঐ যে তখন T20 ম্যাচ খেলবো বলেছিলাম তার জন্য মনে হচ্ছে তুমি ভয় পেয়েছো। আসলে খুব এক্সাইটেড হয়ে গেছি। বিয়ের এতদিন পরে তোমার প্রতি অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। তোমার সামনে যখন আসি খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে যাই। আচ্ছা সোনিয়া তুমি কী সত্যি আমায় ভালোবাসো?

~ আপনি এসব কী বলছেন? ভালোবাসা আবার মিথ্যা হয় নাকি? আমি আপনাকে বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই ভালোবেসে ফেলেছি। সত্যি বলতে আপনার ব্যবহার আমায় মুগ্ধ করেছে। আপনাকে যতই দেখি ততবারই মুগ্ধ হয়ে যাই। তাছাড়া স্বামীকে ভালো না বেসে আজ পর্যন্ত কোন স্ত্রী থাকতে পেরেছে হোক সেটা লাভ ম্যারেজ কিংবা এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। তবে কী জানেন? ভালোবাসা হলো আল্লাহর রহমত। তিনি স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা তৈরী করে দিয়েছেন।

তা না হলে এ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে তো কেউ কাউকে চিনেনা বা কখনো তাদের সাথে যোগাযোগ হয়নি। তবুও দেখুন না তারা একসাথে থাকছে খাচ্ছে, সন্তান হচ্ছে। তাহলে বলুন তো যদি আল্লাহর রহমত না হতো তাহলে কী একজন অচেনা অজানা মানুষকে নিজের সর্বস্ব কিছু উজার করে দিয়ে ভালোবাসতে পারতো।
বিয়ে বাড়ির সামনে এসে বাইক দাঁড় করালো সাহিল। সোনিয়া এসে গেছি এবার চলো ভিতরে যাই। এমনিতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। রাতে তোমার গল্প শুনবো কেমন।

আমি বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালাম। বাড়িটা দশ তলা বিশিষ্ট। পুরো বাড়িতে আলোকসজ্জা। আমি উপর থেকে নিচ অব্দি দেখছি। গেইটের সামনে চেয়ারের উপরে দারোয়ান বসা। আমাদের দেখেই বলল, স্যার টিকিট প্লিজ। আমি তো অবাক হয়ে যাই এটা আবার কেমন প্রসেস ভিতরে ঢুকতে আবার টিকিটের প্রয়োজন। দেখালাম সাহিল পকেট থেকে টিকিট বের করে দেখালো সাথে সাথে দারোয়ান সাইড করে দাঁড়িয়ে বলল, এদিক থেকে উপরে যান।

দারোয়ানের কাছ থেকে গেট পাশ নিয়ে সাহিলের পিছনে হাঁটতে লাগলাম। কয়েকটা সিঁড়িতে উঠার পরে উনি আমার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিলে আমি আমার এক হাত তার হাতের উপরে দিলাম। তারপর আমার হাত ধরে সাহিল গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে ঢুকলো।
একটুবাদে কয়েকটা ছেলে এসে সাহিলের সামনে দাঁড়ায়। তারপর আমার দিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকায়। আরে দোস্ত ভাবি বুঝি। সাহিল হেসে বলল, হ্যাঁ তোদের ভাবি। তারপর সাহিল একে একে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। তাদের ভিতর থেকে একজন বলে উঠলো আপনাকে খুব চেনাচেনা লাগছে। কোথায় যেনো দেখেছি কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছিনা। আমি তার দিকে ভালো করে তাকালাম। বারবার মনে করার চেষ্টা করলাম আমি তাকে চিনি কিনা! কিন্তু না তাকে আমি কখনও দেখিনি আজই প্রথম দেখলাম।

সাহিল সবার সাথে পরিচয় পর্বটা সেরে ফেললো।
আরে দোস্ত সাহিল তন্ময় তোর বিয়ের কথা শুনে তো পুরোই অস্থির হয়ে উঠেছে। কেমনডা লাগে বলনা দোস্ত। তাছাড়া আমরা একটা ও বিয়ে করতে পারলাম না আর তুই কিনা ডাবল করে ফেললি। দোস্ত আমাদের সবার একটা হিল্লে করে দে না ভাই। আচ্ছা শোন তোর কোন শালি নাই তাহলে বলনা প্রেম করবো কিন্তু বিয়ে করবো এটা নিশ্চিত গ্যারান্টি। আমরা তন্ময়ের মত না লুইচ্ছা যে কিনা শুতে চায় বিয়ে না।

কী বলছিস অপূর্ব? মুখে একটু লাগাম টান না। তোর ভাবি পাশে তবুও তুই কাঁচা কথা বলে যাচ্ছিস।
হো হো করে হাসলো সবাই। তারপর আরেক বন্ধু অজয় বলে উঠল তোর মত আমরা ধোঁয়া তুলশি পাতা না দোস্ত। বিয়ে করিনি তো তাই একটু আবেগ কাজ করছে। যখন তোর মত সেঞ্চুরিয়ান হবো তখন একটু কম করবো সব কিছু। এখন তুই অপূর্বের কথার উত্তর দে তোর শালি আছে কিনা!

~ স্যরি দোস্ত আমার কোন শালি নেই এর জন্য তোদের এক বালতি পানির শুভেচ্ছা। আচ্ছা তোরা ইনজয় কর আমি আসছি।
আমার হাত ধরে চলে যেতে নিলে অজয় জোরে বলে উঠল, আরে বউয়ের হাত ধরে রাখছিস কেন ভয় পেয়েছিস নাকি? ছেড়ে দে না দোস্ত আমরা একটু কথা বলি ভাবির সাথে।

~ আচ্ছা এরা আপনার বন্ধু? এত বাজে বন্ধুদের সাথে আপনি চলাফেরা করেন। ছিঃ ভাবতেও অবাক লাগছে। তাহলে কী আপনি ওদের মতই।
সোনিয়া ভুল বুঝতেছো কেন? ওরা আমার স্কুল কলেজের ক্লাস ফ্রেন্ডস আমার ক্লোজ ফ্রেন্ডস না। তাছাড়া আমার সাথে ওদের কোন যোগাযোগ নেই শুধুমাত্র এই বিয়ে উপলক্ষে দেখা হলো।
একটু পরে সোহান এসে বলল, আরে দোস্ত এসে গেছিস। চল গায়ে হলুদ দিবি আমাকে।

~ হুম। তোর বউ কোথায়?
~ স্টেজে বসে আছে।
~ ও।

~ আচ্ছা সাহিল তোকে কিন্তু বিয়ে উপলক্ষে একটা গান গাইতে হবে।
~ গান তাও আবার আমাকে। আমি পারবোনা দোস্ত। আমার গলা ভালো না।
~ আরে দোস্ত ভালো হওয়া লাগবেনা। আমার জন্য গা প্লিজ।
~ আচ্ছা শোন গাইতে যখন হবেই তাহলে আমার বদলে সোনিয়া গাইবে।
~ ওয়াও ভাবি গাইবে। দ্যাটস ফাইন।

তাহলে ভাবিকে প্রস্তুত কর একটু পরেই প্রোগ্রাম শুরু হবে।
এটা কী করলেন আপনি?
~ কী করেছি?

~ এই যে বললেন আমি গান গাইবো। আপনার কী কমনসেন্স নেই যে হুট করে বলে দিলেন আমি গান গাইবো। আমি কোন গান টান গাইতে পারবোনা।
~ সোনিয়া তোমার গানের গলা অসম্ভব সুন্দর। তাই তো সুযোগটা কাজে লাগালাম মাত্র। তুমি গান গাইবে এটাই ফাইনাল। আমি কোন অজুহাত শুনতে চাইনা।
কিছুক্ষণ পরে স্টেজে উঠতে বলা হলে ইচ্ছা না থাকা সত্বেও উঠলাম। মাইক হাতে নিতে থরথর করে হাত পা কাঁপতে লাগলো। সাহিল ইশারায় বলল, সোনিয়া গাও আমি তোমার পাশে আছি।

তারপর একজনে এ্যানাউন্সমেন্ট করলো যে আপনাদের মাঝে গান পরিবেশন করবে সাহিলের ওয়াইফ সোনিয়া।
মনের ভিতরে সমস্ত ভয় বাদ দিয়ে গাওয়া শুরু করলাম।
অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন।
পেলাম খুঁজে এভূবনে আমার আপনজন।

তুমি বুকে টেনে নাও না প্রিয় আমাকে,
আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে।
বিধাতা আমাকে তোমার জন্য গড়েছে আপন হাতে।
জীবনে মরণে আঁধারে আলোতে থাকবো তোমার সাথে।

তুমি বুকে টেনে নাও না প্রিয় আমাকে।
আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে।
যাবেনা কখনও ফুরিয়ে যাবেনা আমার ভালোবাসা।
তোমাকে পেয়েছি, পেয়েছি আবারও বাঁচার নতুন আশা তুমি বুকে টেনে নাও না প্রিয় আমাকে।

আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে।
অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন।
পেলাম খুঁজে এভূবনে আমার আপনজন।

গান গাওয়া শেষ হলে লজ্জায় তাকাতে পারছিনা। তখনি সবাই করতালি দিয়ে আমায় অভিনন্দন জানালো। সাহিল স্টেজে এসে আমার হাত ধরে নামালো। সোনিয়া একবারে ফাটিয়ে দিয়েছো। জাস্ট অসাধারণ। সত্যি তোমার গানের গলা প্রশংসা করার মত। আমি তো পুরোই ফিদে হয়ে গেলাম তোমার গানের প্রেমে। হঠ্যাৎ আমার চোখ আটকে গেলো জানালার দিকে। একি রানী এখানে। আমার চোখের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল রানী। দ্রুত ভিতরে গেলো। আমি সাহিলের দিকে তাকিয়ে বললাম, ওই তো রানী।
~ কোথায় রানী?

~ ওই তো জানালার পাশ দিয়ে ওদিকটায় গেলো।
আমার হাত ধরে সাহিল জানালার কাছে গেলো। কোথায় রানী?
~ এখানেই তো ছিলো।
~ সোনিয়া এখানে গেলো তো এখন কোথায় বলো।

~ বিশ্বাস করেন এইমাত্রই তো দেখেছি।
সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে স্টেজের কাছে গেলো। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি বাহিরের ওই ফাঁকা জায়গার দিকে যেখানে রানী ঢুকেছিলো।

পর্ব ২৬

সাহিলের দিকে তাকিয়ে থেকে সামনের দিকে তাকালাম। দেখি রানী আবার ও বেরিয়ে এসেছে। আমাকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আমি রানীর পিছু নিবো মনে মনে স্থির করলাম। যাওয়ার জন্য পা বাড়তেই যাবো তখনি দরজার সামনে অজয় এসে দাঁড়ায়।

ভীষণ বিরক্ত ফিল করছিলাম অজয়ের এভাবে পথ আগলে দাঁড়ানোর জন্য। মনের ভিতরে প্রচন্ড রকমের রাগ উঠল। রাগের বশীভূত হয়ে নিজেকে বহুত কষ্টে সামলে নিয়ে ধীরস্থির গলায় বললাম, এভাবে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? কিছু বলবেন?
~ বলার জন্যই তো দাঁড়ালাম। ভাবি সত্যি করে বলুন তো আপনার কোন বোন নেই?

~ সত্যি করে বলার কী আছে? বোন যদি থাকত তাহলে নিশ্চয়ই বলতাম। লুকানোর তো কোন কিছু ছিল না এখানে। বোন তো আর ছোট জিনিস না যে ইচ্ছা করলেই লুকিয়ে রাখতে পারবো। আচ্ছা আপনি এসব আজগুবি কথা বলে কী প্রমাণ করতে চান আমার বোন আছে?
~ ভাবি আপনি রাগছেন কেনো? আমি তো দোষ নিয়ে কথাটা বলিনি। আপনার চেহারাটা ভীষণ মায়াবী তাই জানতে ইচ্ছা করলো।
~ আচ্ছা ঠিকাছে। এখন তো জানলেন আমার কোন বোন নেই তাহলে এই বোনের বিষয়টা নিয়ে নেক্সটে কিছু জানতে চাইবেন না।

সুজিতকে রেখে আমি রুমের বাহিরের দিকে গেলাম। একটু সামনে এগুতেই রানীকে দেখতে পেলাম। দ্রুততার সাথে হেঁটে গিয়ে রানীর হাত ধরলাম। আমি হাত ধরাতে রানী ভয় পেয়ে গেল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
~ সোনিয়া তুই আমার পিছনে এসেছিস কেন? এতটুকু তো বুঝতে পারছিস যেকোন কারণ বশত আমি তোকে এড়িয়ে যাচ্ছি। তাহলে বারবার কেনো আমার পিছু আছিস। তোর জন্য আমি হয়তোবা নতুন করে বিপদে পড়ব। বুঝতে পারছিস আমি কী বলতে চাচ্ছি?

রানীর মুখে এমন কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। রানীকে টেনে জড়িয়ে ধরি। রানী তোকে আমি কত খুঁজেছি তুই কল্পনাও করতে পারবি না। বিশ্বাস কর যেদিন তোকে রেস্টুরেন্টে দেখলাম সেদিন থেকে আমার চোখের ঘুম চলে গেছে। তোর চিন্তায় খাওয়া দাওয়া করতে ভুলে গেছি। রানী বল, তুই তোর বাসা ছেড়ে পালিয়ে এসেছিস কেন? আমাকে বল। আমি তোকে আমার সাথে বাসায় নিয়ে যাবো। তুই আবার আগের মত হাসবি, খেলবি বুঝতে পারছিস।

আমাকে সরিয়ে দিলে বলল,
~ সোনিয়া তুই বুঝতে পারছিস না আমি তোর সাথে কোথায় ও যেতে পারব না। কারণ আমি অনেক বড় চক্রের সাথে আটকে গেছি। এখান থেকে একমাত্র মৃত্যু আমাকে মুক্তি দিতে পারবে। সোনিয়া আমি এখন যাচ্ছি কেউ দেখে ফেললে আমাকে এখানেই জবাই করে ফেলবে।
রানী তোর সাথে যোগাযোগ করতে চাই প্লিজ নাম্বারটা দিয়ে যা।

আমার দিকে তাকিয়ে,
ব্যাগের ভিতর থেকে একটা চিরকুট ছুড়ে মেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
চিরকুটটা হাতে নিয়ে খুললাম। তাতে লেখা ছিল,
~ সোনিয়া আমি জানতাম তোর সাথে আমার আবারও দেখা হবে তাই আগে থেকেই চিরকুটটা সাথে নিয়ে ঘুরতাম। যদি কখনও সুযোগ হয় চিরকুটটা তোকে দিবো। যখন তুই চিরকুটটা তোর হাতে পাবি তখন এতে যে ঠিকানা লেখা আছে যেখানে আমি থাকি। থাকি বলতে আমাকে এখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যদি পারিস আমায় এই নরক থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাস। আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।

জানিস, প্রতিদিন আমায় রাতভর শারীরিক ও মানুসিক অত্যাচার করে রাহাত চৌধুরী। আমাকে ভালোবাসার নামে প্রতারণা করে নিয়ে এসে তার পার্সোনাল ফ্লাটে বন্দী করে রেখেছে। আমাকে নিয়ে বের হয় তখনি যখন তাকে কাস্টমার কল করে। কল পেয়ে আমাকে নিয়ে আসে। সোনিয়া আমি নষ্ট হয়ে গেছি। শতশত পুরুষদের ভোগের পাত্রী হয়ে গেছি। আমার ভেতরে এখন আর কিচ্ছু নেই আছে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য আর একটা শরীর। যেটা শুধু কাস্টমারদের জন্য বরাদ্দ।

চিরকুটটি পড়ে চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগলো। হঠ্যাৎ কাঁধে হাত দিল সাহিল। সাহিলকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। সাহিল তো কিছুই বুঝতে পারল না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল,
~ সোনিয়া কী হয়েছে? কাঁদছ কেনো? আমাকে বল।
রানীর দেয়া চিরকুটটা সাহিলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,
~ এটা পড়ুন।

সাহিল আমার হাত থেকে চিরকুটটা নিয়ে পড়তে শুরু করে রীতিমত অবাক হয়ে যায়। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। সোনিয়া, তার মানে তুমি যাকে দেখেছ সে আর কেউ না। সে তোমার বান্ধবী রানী ছিল। ও মাই গড। আমি এতদিন তোমার কথা বিশ্বাস করিনি। আসলে আমি কতটা কেয়ারলেস হাজবেন্ড।
সোনিয়া রানী কী চলে গেছে?

~ হ্যাঁ যাওয়ার সময়ই এটা রেখে গেছে। আপনি রানীকে বাঁচাতে হেল্প করবেন প্লিজ।
সোনিয়া তুমি কী মনে করো আমি সব কিছু যেনে শুনে হাত পা গুঁটিয়ে বসে থাকব। একদম না। আমি আমার মতো করে চেষ্টা চালিয়ে রানীকে উদ্ধার করবো ইনশাআল্লাহ।
~ সাহিল তুই এখানে কী করছিস? ভিতরে আয়।

সোনিয়াকে ছেড়ে দিয়ে বললাম,
~ সোহান তুই আসলি কেন? আমরা তো এখুনি যেতাম।
~ তুই যে কী যেতিস সেটা আমার বুঝতে বাকী নেই এবার দয়া করে আয়।

আমার হাত ধরে সাহিল সোহানের পিছনে গেল। অনেকক্ষণ যাবৎ আড্ডা চলল। এদিকে আমার মনের ভেতরে ঝড় বইছে। রানীর মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কখনও কল্পনা করতে পারিনি যে এভাবে রানীর সাথে আমার দেখা হবে। কলিজা পর্যন্ত লেগেছে রানীর এই পরিস্থিতির কথা শুনে। মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি চলে আসলো। সাহিল দেখে নেয়ার আগেই সে পানি মুছে নিলাম। অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সাহিলের মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা। দেখলে মনে হয় উনিও চিন্তায় পড়ে গেছেন ব্যাপারটা নিয়ে। দুজনের মনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা বাসায় ফিরে আসলাম।

বাসার গেইট খুলে ভিতরে ঢুকলাম।
সাহিল রুমে ঢুকে ফ্যান ছেড়ে দিল। আমি বিছানার উপরে বসলাম।
সোনিয়া, তুমি কোন চিন্তা করো না আমি তোমার পাশে আছি এবং থাকবো। সাহিলের মুখের দিকে তাকাতেই চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। ছোটবেলার বান্ধবীর করুণ পরিণতি জানতে পেরে বুকটা হাহাকার করছে। সাহিল আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমো খেয়ে বলল,
~ তোমাকে না বলছি কান্না করবে না।

কেনো, কান্না করছ? কি হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি। মানুষের জীবনে এমন অনেক কিছুই হয়। হাজারও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাই বলে এভাবে ভেঙে পড়তে হয় না। সোনিয়া মনে সাহস রাখো। আমি দেখছি কি করা যায়? সাহিল মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল করলো। রিং বাজছে। কলটা রিসিভ হওয়ার সাথে সাথে সাহিল বলল,
~ হ্যালো আরমান। কেমন আছিস? আমি খুব ঝামেলায় পড়ে গেছি তাই তোর সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন। কালকে সকালে আমি তোর অফিসে আসছি।
~ সাহিল শান্ত হও প্লিজ। তোর যা সাহায্য লাগে কাল সকালে এসে বলিস আমি আমার ১০০% দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করব।

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সাহিল বলল,
~ তোর কাছে এটাই চেয়েছি। আচ্ছা এখন রাখছি কাল সকালে দেখা হবে।
পরেরদিন সকাল হওয়ার আগেই সাহিলের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার সাথে চোখ খুলে তাকিয়ে আমায় দেখে বলল,
~ সোনিয়া তুমি এখনও জেগে আছো? সারারাত ঘুমাওনি?

মাথাটা নিচু করে হেসে বললাম,
~ আমি সবেমাত্রই উঠলাম। রাতে তো আপনার সাথেই ঘুমিয়েছিলাম।
~ হুম। সোনিয়া তুমি নাস্তা রেডী কর। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
~ আচ্ছা।

রান্নাঘরে ঢুকে চুলোয় চায়ের কেটলিটা বসিয়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে পাউরুটি বের করলাম। দু’টো ডিম ফেটে তাতে পরিমাণমত চিনি ও স্বাদমত লবন দিয়ে আবারও ফেটে নিলাম। পাশের চুলোয় ফ্রাইপ্যানে তেল দিলাম। তেল গরম হলে পাউরুটির পিচ ডিমের ভিতরে চুবিয়ে তেলে ছেড়ে দিলাম। হালকা বাদামী কালার আসলে বাটিতে রাখলাম। চা বানিয়ে ফ্লাস্কে করে টেবিলের উপরে রেখে রুটির ডিম টোস্টটা ও সাজালাম।
টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে উনার আসার অপেক্ষা করছি এমন সময় সাহিল এসে পিছন থেকে কোমড় ধরে ঘাড়ে কিস করলো। সাহিলকে মানা করার জন্য মুখটা ঘুরিয়ে কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনি আমার ঠোঁট দখল করে নিল।

তারপর ছেড়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। রুটি খেতে খেতে বলল,
~ এটা তো নরমাল চকলেট খেলাম। ডেইরিমিল্ক তো খাওয়া হলো না।
আমার তো লজ্জায় যায় যায় পরাণ। তবুও বললাম,
~ সময় কি শেষ? এখনও অনেক সময় বাকী আছে। ডেইরিমিল্কটা না হয় পাওনা থাকলো।

মুখের হাসির ঝলক নিয়ে আমার দিকে তাকালো সাহিল তারপর বলল,
~ সোনিয়া এটা কী তুমি জানো যে বাকীর নাম ফাঁকি? তাই তুমি যদি ফাঁকি দাও তখন আমার কী হবে?

সাহিলের কথা শুনে রাগে শরীর জ্বলতে লাগলো তারপর ধীর গলায় বললাম,
~ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে? আমি কিন্তু তানহা না। কাউকে ঠকানোর বিদ্যা আমি আদৌ শিখিনি। তাই আমাকে এসব বলার আগে আমার ব্রাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জেনে শুনে তারপর বলবেন। আমার এমন কোন রেকর্ড নেই যেটা জানতে পারলে আপনার আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা হবে। শুধুমাত্র একটা কথা আপনাকে আজও বলা হয়নি। কিন্তু আমি এটা কখনো জানানো প্রয়োজন মনে করিনি কারণটা কী জানেন?

মাথা নাড়িয়ে না বোধক বুঝালো সাহিল।
~ কারণটা হলো প্রতিটি মানুষের জীবনে কোন না কোন ঘটনা থাকে আর এটা বাস্তব। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে তার জীবনে কোন গোপন কাহিনী নেই। যদি কেউ এই ধরণের মন্তব্য করে তাহলে বুঝে নিতে হবে সে মিথ্যা বলছে। আমরা সবাই মানুষ এটাই বিশ্বাস করতে হবে এবং মানতে হবে। তেমনি আমি ও তার ব্যতিক্রম নই।

সাহিল আমার কথা শুনে হয়তো শক্ত হয়ে বসেছে এটা আমার নিজস্ব মতামত। তার ভাবভঙ্গি দেখে অনুভব করেছি মাত্র হয়তো নাও হতে পারে তবে তার সম্ভবনা ১০%। আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে এটা চিরন্তন সত্য। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে মনে প্রাণে আপনাকে স্বামী হিসাবে কবুল করে নিয়েছি এটা ও চিরন্তন সত্য। কিন্তু আমার জীবনেও একটা কাহিনী আছে। একটা স্মৃতি বলে ও ভাবতে পারেন। কিন্তু আমি এটাকে দুঃস্বপ্ন হিসাবে ভাবী।
সোনিয়া এত ভনিতা না করে সোজাসুজি বল।

~ একটু ধৈর্য তো ধরতেই হবে। কথাটা খুব কষ্টের। আমার বলতে ও খুব কষ্ট হচ্ছে। তবুও বলবো। বলাটা আমার খুব জরুরি আর শোনাটাও আমরা বিশেষ জরুরি। আপনি অনেক কিছু ভাবতে পারেন মনে মনে কিন্তু মনে মনে ভাবার মধ্যে হাজারও ভুল থাকে।
তাই কিছু না ভাবলেই খুশি হবো।

পর্ব ২৭

আপনি কি শুনছেন? আমি কি বলছি! আপনি শুনতে পারছেন নাকি অন্যমনস্ক হয়ে গেছেন।
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
~ তুমি বল, আমি শুনছি।

~ হুম তাহলে বলছি। মানুষের জীবনটা একটা রঙ্গমঞ্চ তাই না! সব সময় নিজের চাওয়া~ পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নাম জীবন। জীবন এত সস্তা নয়। আমার জীবনের পিছনে একটা গোপন তথ্য আছে। বলব কিন্তু কেনো জানি সাহস পাচ্ছি না। যদি আপনি আমাকে ভুল বুঝেন তাহলে আমি মনে করব এটা আমার ভাগ্যে এটা লেখা ছিল। তবুও আমাকে কথাটা বলতে হবে। সত্যি কখনও চাপা থাকে না।

আজ না হয় কাল প্রকাশ পাবে। আমি এখন যদি আপনাকে জানিয়ে রাখি পরে যদি সত্যিটা জানতে পারেন তবুও আমাকে ভুল বুঝবেন না।
সোনিয়া টেনশন হচ্ছে খুব। তাড়াতাড়ি বল প্লিজ।

~ হ্যাঁ বলবো। তন্ময় নামের একটা ছেলের সাথে আমার রিলেশন ছিল কয়েক মাসের। প্রথমে আমি রিলেশন করতে রাজি হয়নি পরে তন্ময় সুইসাইড করার হুমকি দিয়ে আমাকে বাধ্য করে রিলেশনে আবদ্ধ হতে। তবে অনিচ্ছা স্বত্বেও আমি রিলেশন করেছি তন্ময়ের সাথে। রিলেশনের কয়েক মাস পরেই তন্ময়ের ভাবসাব আমার ভালো লাগছিল না। তার শুধু আমার শরীরের প্রতি ঝোঁক ছিল। কয়েকদিনের কথাবার্তায় বুঝতে পারি। তবুও আমি রিলেশন টিকিয়ে রাখার জন্য তন্ময়কে অনেকভাবে বুঝালাম। কিন্তু তন্ময়কে বুঝিয়ে কোন লাভ হয়নি। যতদিন যাচ্ছিল সে আরও বেশি করে আমাকে ইমোশনাল ব্লাক মেইল করতে লাগল। বারবার বলতে থাকে তার সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন করতে না হলে সে কিছু একটা করে বসবে। এক পর্যায়ে আমি ভীষণ বিরক্ত হয়ে যাই কারণ তন্ময় বারবার আমাকে সুইসাইড করবে বলে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর থেকে কথা বলা কমিয়ে দিলাম।

একদিন রাত প্রায় দু’টো বাজে তখন ফোনটা বেজে উঠল। প্রতিদিন রাত বারোটা বাজলেই ফোন বন্ধ করে রাখি আর সকালে ঘুম ভাঙার পরে ওপেন করি। কিন্তু ঐদিন কিভাবে যেন বন্ধ করতে মনে ছিল না তাই কল ঢুকছে দেখে মেজাজটা পুরোই চড়ে গেল। রাগান্বিত হয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনের উপরে তন্ময়ের নামটা ভাসছে। এতরাতে সে কল দেয়াতে মেজাজটা আরও বিগড়ে গেল। কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসল তন্ময়ের কন্ঠস্বর।
তন্ময় হাসছিলো।

আমি বললাম,
~ তুমি এতরাতে কল দিয়েছো কেনো? সমস্যা কি তোমার?
~ কোন সমস্যা নেই। তুমি কি ভেবেছিলে তোমাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে পাবো না? তাহলে ভুল ভাবছিলে? আমি তোমার মতো ভিক্ষারীর মেয়েকে নিয়ে পড়ে থাকব সেটা তুমি বুঝলে কি করে? আমার পাশে তুহিনা বসে আছে কেনো জানো? আমি বলছি তোমার জানার প্রয়োজন নেই তবুও বলছি।
আজ রাতে বেড শেয়ার করব বলেই হাসলো তন্ময়।

কথাটা শোনার পরে আমি তন্ময়কে বললাম,
~ ভালোই হয়েছে তোমার আসল চেহারাটা তুমি নিজেই সামলে নিয়ে আসলে। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তোমার সাথে বেড শেয়ার করব। কিন্তু দেখ আল্লাহর কি অশেষ রহমত আমাকে তোমার মতো লম্পট চরিত্রের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। জীবনে চলার পথে চলতে গিয়ে আমার এই মুখ তোমাকে আর কোনদিন দেখাবো না। আর তুমি যদি তোমার মায়ের বুকের দুধ খেয়ে থাকো আমাকে আর বিরক্ত করবে না বলেই কল কেটে দিলাম। কিছুদিন পরে সিমটা পাল্টে ফেলি। সেদিনের পর থেকে তন্ময়ের সাথে আজ অব্দি আমার দেখা হয়নি।

সাহিলের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। মনে হচ্ছে সোনিয়ার কাহিনীর সাথে সে আগে থেকেই পরিচিত। তাই সে সোনিয়াকে বলল,
~ সোনিয়া তোমাকে তন্ময় রেড রোজ বলে ডাকাত?
সাহিলের কথায় আমার মুখ হা হয়ে গেল। হতভম্ব হয়ে আমতা আমতা করে বললাম,
~ হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?

~ কারণ তন্ময় আমার বন্ধু। সেদিন যে কল করেছিল সে তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ড।
~ সাহিল প্লিজ এক্স বলে দয়া করে আমার ভালোবাসাকে অপমান করবেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। সারাজীবন বাসবো। আর তন্ময় ছিল আমার একটা দুঃস্বপ্ন। তাই আমাদের পবিত্র বন্ধনের মাঝে অশুভ ছায়াকে মনে করবেন না।

সাহিল আমার কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে তারপর বলল,
~ তুমি কোন চিন্তা করো না আমি তোমাকে কখনও ভুল বুঝবো না বা ছেড়ে যাবো না। তুমি এতটুকু বিশ্বাস রাখতে পারো আমার উপরে। আরেকটা কথা সোহানের বিয়েতে আমরা যাচ্ছি না ঠিকাছে।
~ কেনো যাবেন না?

~ তন্ময় আসবে বিয়েতে। তোমার মুখ থেকে পুরো ঘটনা শোনার পরে আমি চাই না যে তন্ময়ের সাথে আবার তোমার দেখা হোক। পুরনো প্রেম দেখা হলে একবার না একবার উতলে উঠবে তন্ময়ের ভিতরে। তোমাকে দেখলে এতদিনের চেপে থাকা আগুনটা আবার দাউ দাউ করে জ্বলবে। তাই আমি কোন কিছুর বিনিময়ে ঝামেলা চাই না। আর সবচেয়ে বড় কথা তোমাকে হারাতে চাই না। কারণ নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসি তোমায়। আচ্ছা সোনিয়া তুমি থাকো আমি আরমানের কাছে যাচ্ছি।

~ এখুনি যাবেন?
~ হুম। না হলে পরে আরও দেরী হয়ে যাবে। রানীকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে।
~ আচ্ছা তাহলে যান জলদী আসবেন।
মাথাটা নাড়িয়ে ঠোঁটের কোণে অস্ফুট হাসি এনে তারপর রুম থেকে বেরিয়ে যায় সাহিল।

বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো সাহিল এখন আসছে না দেখে চিন্তার ছাপ চোখে মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আমার। মনে হচ্ছে হাজার বছর সাহিলের সাথে দেখা হয়নি। বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। চারদিকটা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে এখুনি বৃষ্টি শুরু হবে। সময় যত গড়াচ্ছে বুকের ভেতরটা আরও ছটফট করছে। মোবাইলটা হাতে নিলাম সাহিলকে কল করব কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। কল করব কি করব না এটা নিয়ে দ্বিধা~ দন্দে পড়ে গেলাম। আরেকটু অপেক্ষা করি কারণ সে তো কাজের জন্যই বের হলো। তাই এভাবে তাকে বিরক্ত করাটা ঠিক মনে করিনি বলে মোবাইলটা ওয়াডড্রবের উপরে রাখলাম। ভালো লাগছে না দেখে বিছানার উপরে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে যাই। কারও স্পর্শে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি সাহিল। স্বপ্ন ভেবে ভ্রুক্ষেপ না করে আবার শুয়ে পড়তেই কারও আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম। এবার পুরো ঘুম গায়েব হয়ে গেল। বসা ছেড়ে উঠে বসে তাকিয়ে দেখি রানী।

রানীকে দেখে চমকে উঠলাম। বিছানা দিয়ে নিচে নেমে রানীকে জড়িয়ে ধরলাম অনেকক্ষণ। সাহিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে।
রানী তুই আমার কাছে দাঁড়িয়ে আছিস আমি তো ভাবতেই পারছি না। আমি সাহিলের দিকে তাকালাম।
সাহিল বলল,
~ সোনিয়া তোমাকে বলেছিলাম না যেভাবেই হোক রানীকে উদ্ধার করে আনবো। দেখ আমি সফল হয়েছি। নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে। এতটাই গর্বিত যেটা বলে বুঝানো যাবেনা।
তবে রানীর সাহসিকতার জন্য আমরা রানীকে এ নরক থেকে বের করে আনতে পেরেছি।

সোনিয়া তুমি কল্পনাও করতে পারবে না আমরা সকাল থেকে রাত আব্দি রানীকে বের করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছি। কতবার যে পুলিশ নিয়ে ওই বাড়িতে সার্চ করিয়েছি তুমি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা রানীকে ফ্লাটের গোপন রুমে বন্দি করে রাখে। তিনবার খোঁজ করার পরে রানীকে না পেয়ে আমরা যখন চলে আসতে নিব তখনি ছোট্ট একটা কাগজের টুকরা বিছানার পাশের টেবিলের উপরে গ্লাস চাপা দিয়ে রাখা ছিল।

অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে কাগজের টুকরাটা নিলাম। বাহিরে এসে খুলে দেখি কাগজে লেখা, আপনারা আমাকে পাবেন না আমাকে এখানেই গোপন রুমে আটকে রেখেছে। রাত ৮ টার পরে আমাকে এই জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাবে এমন কিছু শোনা যাচ্ছে। আমি কখনও এই নরক থেকে বের হতে পারবো না। বুঝতে পারলাম এটা রানীর লেখা। ফ্লাট থেকে বেরিয়ে আমরা দূরে ফাঁদ পেতে ছিলাম যে কখন ওরা রানীকে নিয়ে নামবে।

আরমান পুলিশ ফোর্স খবর দিয়ে রেখেছিল। রাত তখন ৮৪৫ বাজে তখনি দুইজন লোক রানীকে নিয়ে নিচের দিকে নামতেই আগে থেকে পুলিশ প্রস্তুত রাখা ছিল তারা এসে সবাইকে এ্যারেস্ট করে নিলো।
সেখান থেকেই রানীকে নিয়ে থানায় গেলাম এফ আই আর লিখে সোজা তোমার কাছে নিয়ে এলাম সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য।
তবে একটা কথা আমার মাথায় আসলো না।

~ কি কথা?
~ আমি যে এত রাত পর্যন্ত বাসায় আসিনি তুমি তো একবারের জন্যও কল দাওনি। আমি কোথায় আছি এটা জানার জন্য।
~ আমি কল দেয়নি কারণ আমার মনে একটু সন্দেহ হচ্ছিলো আপনি তো গুরুত্বপূর্ণ কাজে গেছেন আমারর একটামাত্র কল আপনার ভোগান্তি কারণ হতে পারে।
~ সোনিয়া তুমি খুব জিনিয়াস একটা মেয়ে। তুমি কল না দিয়ে অনেক ভালো করেছো, না হলে অনেক বিপদে পড়তাম। রানীকে উদ্ধার করে রানীর বাবাকে কল করে বলেছি সে তো কেঁদেই দিয়েছে। অসুস্থ থাকার কারণে এখন আসতে পারবে না। কাল সকালে এসে রানীকে নিয়ে যাবে।

রানীর মুখে হাসির ঝলক ফুটে উঠেছে। আমরা তিনজনে হাসতে লাগলাম। ঠিক সেই মূহুর্তে তাহিয়া এসে দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করল,
~ আমি কি ভিতরে আসতে পারি?
সাহিল হাসিমাখা মুখে বলল,
~ হ্যাঁ তাহিয়া আয়। তোর হাতের চা খাওয়ার জন্য আমরা ওয়েট করছি।

~ আমিও জানতাম, সবার মনের ইচ্ছা জেগেছে ঠান্ডা আবহাওয়াতে এক কাপ গরম গরম চা হলে মন্দ হয় না। তাই তো দেরি না করে নিয়ে চলে আসলাম। এবার ফটাফট খেয়ে নিন তারপর টেবিলে খাবার পরিবেশন করব। রাত তো অনেক হয়েছে।
তাহিয়া সবার হাতে চায়ের মগগুলো হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
~ আপনারা চা খেতে খেতে গল্প করুণ আমি তরকারি গরম করে টেবিলে রাখছি। তবে হ্যাঁ গল্প একটু কম করবেন না হলে তরকারি ঠান্ডা হয়ে বরফ জমে যাবে।
তাহিয়ার কথা শুনে না হেসে পারলাম না। আমার হাসি দেখে সবাই হাসতে লাগলো। কোন রকমে হাসি থামিয়ে বললাম,
~ চা খেয়ে নিন। না হলে পানি হয়ে যাবে।

চা পান করা হয়ে গেলে আমি রানীকে বললাম,
~ আমি আলমারি খুলে আমার এক সেট ড্রেস বের করে রানীর হাতে দিলাম। রানী তুই ফ্রেস হয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করে আমার ড্রেস পড়ে নে।
~ হুম।
রানী চা খেয়ে ড্রেস হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। তারপর বেরিয়ে আসলো।

~ রানী, চল এবার খেতে যাবো।
~ হ্যাঁ চল।
ডিনার শেষ করে রানীকে তাহিয়ার রুমে দিয়ে আমরা রুমে গেলাম। রুমে গিয়ে বসে আছি তখন সাহিল এসে দাঁত ব্রাশ করে আমার পাশে বসলো। আমি আড়চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। মুখটা দেখলে খুব বিশ্বস্ত মনে হয়।
সাহিল বুঝতে পারল আমি তাকে দেখছি তবুও কিছু না বলে আমার মুখ থেকে শোনার অপেক্ষা করছে।

দুজনে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পরে তার কথা ভাবলাম সারাদিন তো ঝামেলার ভিতরে ছিল। দুপুরবেলা না খেয়ে কাটিয়ে এখন ক্লান্ত। তাই নিজের বিবেক জাগ্রত হলে প্রথমেই সাহিলকে বললাম,
~ আপনি শুয়ে পড়েন সারাদিন খাটাখাটুনি করে এসেছেন।

সাহিল মাথাটা ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে নিচু করে থাকে। অনেকক্ষণ পরে অনুনয়ের সুরে বলল,
~ শুতে পারি তবে এক শর্তে!
শর্তের কথা শুনে খানিকটা চমকে গিয়ে আস্তে করে বললাম,
~ কি শর্ত? আচ্ছা আপনি এত প্যাঁচান কেনো? আগে তো এমন ছিলেন না। তাহলে এখন এত বাঁচাল হলেন কেনো? সত্যি আপনাকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি কারণ কি জানেন?

মাথাটা তুলে চোখদুটো এতটাই বড়বড় করে তাকালো সাহিল, দেখেই ভয় পেয়ে আমার কথা বলা মুখটা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি মুখটা কালো করে বিছানার উপরে শুয়ে পড়লাম তখনি সাহিল আমার পাশে শুয়ে গায়ের উপরে হাত পা দিয়ে বলল,
~ বাহ্! আমার কোলবালিশটা তো বড্ড নরম হয়ে গেছে। যাক ভালোই হলো জড়িয়ে ধরতে কষ্ট হবে না। আমার সাধের কোলবালিশ। সাহিল পা তুলে দেয়ায় আমি নড়তে পারছিলাম না। তাই চুপচাপ চেপে শুয়ে থাকি। সাহিল ব্যাপারটা বুঝতে পরে আমার চুলগুলো সরিয়ে খোলা পিঠে চুমো খেতেই সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সাহিলের দিকে কোন রকমে ফিরে বললাম,
~ কি করছেন এসব?

~ বাহ্ রে কি আর করছি, আমার একমাত্র বউকে আদর করছি। আমি হাসলাম। সাহিল ও হাসলো। আমি সাহিলের দিকে লজ্জা রাঙা মুখ নিয়ে তাকালে সাহিল চোখ টিপ মারলো।
আমি সাথে সাথে দুহাত দিয়ে চোখ ঢেকে দিলাম। আমার হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে চোখের উপরে কিস করতেই সমস্ত শরীর কাপন দিয়ে উঠলো। মনে হচ্ছে শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে। একটুও শক্তি নেই। একটু বাদে কপাল থেকে ঠোঁট অব্দি একাধারে চুমো খেল। আমার তো লজ্জায় মরে যাওয়ার উপক্রম তৈরী হয়েছে। দিশাবিশা না পেয়ে সাহিলকে জড়িয়ে ধরলাম। সাহিল আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে আমায় আরও বেশি উত্তেজিত করল। উত্তেজিতর এক পর্যায়ে দুজন দুজনের মাঝে ডুব দিলাম। আমি সাহিলের মাঝে আর সাহিল আমার মাঝে। হারিয়ে গেলাম অথৈ সমুদ্রের তলদেশে।

মধ্যরাতে,
দুজনে উঠে লজ্জায় কেউ কারও দিকে তাকাতে পারছিলাম না। একটুবাদে সাহিল বলল,
~ এবার চল, দুজনে একত্রে শাওয়ার নিব।
যেই বলা সেই কাজ। আমাকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। ঝরণার পানি ছেড়ে দিয়ে তারপর সাবান গায়ে মেখে শাওয়ার নিয়ে দুজনে এক টাওয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসলাম। আলমারি খুলে কাপড় বের করে দুজনে পড়ে নিলাম। ফজরের আযান দিলে দুজনে দুপাশে নামায আদায় করে ছাদে উঠলাম।
ছাদে বসে সাহিল আমাকে বলল,
~ সোনিয়া,
~ হুম।

~ তোমার নিজেরও সন্তান হবে এটা সত্যি কিন্তু তোমার কাছে শুধু একটাই অনুরোধ সানিকে কখনও সৎ ছেলে মনে করে অবহেলা করবে না।
আমি করুণ চোখে সাহিলের কাঁধে হাত দিয়ে বললাম,
~ আপনি এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না
আমি কখনও সন্তান নিবো না। সানি আমার সন্তান।

~ না সোনিয়া এমনটা করবে না কখনও। তুমি একজন মেয়ে তাই তোমারও মা হওয়ার অধিকার আছে। তাই নিজের সন্তান হলেও সানিকে নিজের সন্তান মনে করে মায়ের ভালোবাসা দিবে। সানি যেন কখনও বুঝতে না পরে তুমি সানির আপন মা নও। তোমার কাছে শুধুমাত্র এটাই চাওয়া।
~ আমার প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেন। নিজের সর্বস্ব উজার করে দিয়ে আগলে রাখবো আমার সন্তানকে।
আমাকে জড়িয়ে ধরলো সাহিল।

তারপর সাহিল বলল,
~ সোনিয়া নিচে চল। রানীকে নাস্তা করিয়ে আমরা ওর বাসায় দিয়ে আসবো।
~ ঠিকাছে চলুন।
রানীকে ডেকে নাস্তা খাওয়ালাম। সাথে আমরাও খেলাম।

নাস্তা খাওয়া শেষ হলে রানীকে বললাম,
~ রানী রেডী হও তোকে আমরা তোর বাসায় দিয়ে আসবো। আন্টি তোর জন্য পাগল প্রায়। আংকেলকে কষ্ট করে আসতে হবে না এতদূরে। আমরা গিয়ে তোকে দিয়ে আসি।
সাহিল রানীকে বলল,
~ রানী আমার অফিসে তোমার জন্য একটা জবের ব্যবস্থা করেছি। তুমি বাসায় গিয়ে সুস্থ হয়ে কাজে জয়েন্ট করবে কেমন।

~ সত্যি বলছেন ভাইয়া।
~ হ্যাঁ সত্যি। এই নাও আমার ভিজিটিং কার্ডটা রাখো। জয়েন্ট করার আগেরদিন আমাকে কল করবে। সোনিয়া এবার চল।
আমরা রানীকে নিয়ে বাসায় যেতেই রানীকে দেখে রানীর মা সুস্থ হয়ে উঠলো। তারপর আমরা সেখান থেকে আমার বাবার বাড়িতে গেলাম। বাবার সাথে দেখা করে তারপর বাসায় আসতে লাগলাম।

রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণে গাড়িটা দাঁড় করায় তখনি চোখ পড়ল রানা অন্য একটা মেয়ের হাত ধরে হাঁটছে। সাহিল রানাকে ডাকাল। রানা আমাদের দেখে তারপর গাড়ির কাছে আসতেই সাহিল রানাকে গাড়িতে বসতে বলল। রানা গাড়িতে বসলো। সাহিল গাড়ি স্টার্ট দিল।
তারপর রানাকে বলল,
~ রানা তানহা কেমন আছে?

~ জানিনা।
~ কেনো?
~ আমি তানহাকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছি। আর আগামী মাসে নাদিয়াকে বিয়ে করব।
~ তানহাকে ডিভোর্স দিয়েছো কেনো?

~ ডিভোর্স দিবো না তো কি করবো? তানহা তোমাকে ভুলতেই পারছিল না। তার উপরে আমার সাথে কোন ফিজিক্যাল রিলেশন করতে আগ্রহী ছিল না। আমি একটা পুরুষ আমার ও শারীরিক চাহিদা আছে। এতদিন ধৈর্য ধরেছি কিন্তু যখন দেখলাম তানহা শুধরাচ্ছে না তখন ডিভোর্স ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না আমার কাছে। তাই ডিভোর্স দিয়ে দিলাম।

সাহিল এইখানে রাখ। আমরা এখানে নামবো।
রানার কথায় সাহিল গাড়ি একপাশে দাঁড় করালো। রানা তার হবু বউকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো।
সাহিল আর আমি রানার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তাকলাম।

সাহিল দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বলল,
~ কষ্ট লাগছে তানহার করুণ পরিণতির জন্য। সাহিল গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়িতে আসলো। রুমে এসে বিছানার উপরে টানটান হয়ে শুয়ে আছে।

আমি সাহিলে পাশে গিয়ে বসলাম। কপালে হাত দিয়ে চুল টেনে দিয়ে বললাম,
~ চিন্তা করবেন না প্লিজ। অতীতকে মনে করে কষ্ট পাওয়া বোঁকামী ছাড়া আর কিছু না। তাই সবারই বর্তমানে কি হচ্ছে তার দিকে ফোকাস করা উচিত নতুবা জীবনে কেউ সুখি হতে পারবে না। বিশ্বাস এমন একটা জিনিস একবার ভেঙে গেলে যতই জোরা তালি দেয়ার চেষ্টা করেন কিছুতেই কাজ হবে না। জোরা লাগবে ঠিকি আবার দু’দিন পরে ভেঙে যাবে।

সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একরাশ হাসি এনে বলল,
~ সোনিয়া আমার বর্তমানে দুনিয়া তুমি। জান আর পরাণও তুমি। এছাড়া আর কিছু ভাবছি না আর ভাববো না।

এখন শুধু স্বপ্ন একটাই মায়ের সেবা করা। দ্বায়িত্ব হলো, ছোট বোনটা দু’টোর বিয়ে দেয়া, সানিকে মানুষ করা আর, আর….
~ আর আর করছেন কেনো বলুন?
~ আর হলো আমার যেন একটা কণ্য সন্তান হয় তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি আর বউকে সারাক্ষণ আদর~ সোহাগ করা বলেই সাহিল আমার ঠোঁটের উপরে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

আমি কিছু বলার জন্য মুখটা খুলতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম, যাক লুচু একটা স্বামী পেলাম। যে শুধুমাত্র আমাকে ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে। আমারও ভালো লাগে সাহিলের খুনসুটিগুলো। সত্যি এমন স্বামী পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।

গল্পটা দিয়ে শিখলাম যেমন কর্ম তেমন ফল। কারও সাথে বেঈমানি করে কেউ কখনো সুখি হতে পারে না। ধৈর্যের ফল সব সময়ই মিষ্টি হয় সেটা আবারও প্রমাণ পেলো গল্পটায়।

জানিনা কেমন লেগেছে গল্পটা তোমাদের। তবুও চেষ্টা করেছি নিজের সবটা দিয়ে উপস্থাপন করার।

লেখাঃ নুসরাত জাহান

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার সংসার – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আমার সংসার (১ম খণ্ড) – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!