কষ্টের প্রেমের গল্প

অসমাপ্ত ভালবাসা – অবশেষে তুমি আমার (সিজন ২)

অসমাপ্ত ভালবাসা – অবশেষে তুমি আমার: আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না। আমিও যে শিমুলকে এখনো ভালবাসি। আর তার চেয়ে বেশি দরকার নুসরাতের জন্যে মা আর ইসমাঈলের জন্যে বাবার। তাই আমি রাজি হলাম বিয়েতে।


মূলগল্প

আমার বিয়ে হয়েছে আজ একমাস পুর্ণ হলো। এই একমাসে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছি আমিও। আমার মুখে আর আগের মতো সেই হাসি নেই। নেই কোনো আনন্দ বা সুখ। জীবনটা যে এমন হবে তা কখনো ভাবিনি আমি। আমার সাথেই কেনো এমন হলো বুঝতে পারি না।
একমাস আগের ঘটনা_

আমি বসে আছি একটি সুন্দর ফুল দিয়ে সাজানো রুমের মধ্যে। মনের মধ্যে বয়ে চলেছে নানা রকম প্রশ্ন যে প্রশ্ন গুলোর কোনো উত্তর আমার জানা নাই। আমি যেনো ঘোরের মাঝে আছি।
হঠাৎ দরজা লাগানোর শব্দে ঘোর কাটলো আমার। তাকিয়ে দেখি আমার স্বামী ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করছেন। আমি বিছানা ছেরে উঠে গিয়ে তাকে সালাম দিলাম তারপর জিগ্যেস করলাম কেমন আছেন।
আমার কথার উত্তরে সে যা বললো তা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। উনি বললেন,

_ খবর দার আমার সাথে এমন নেকামি করতে আসবে না। আমি নেকামি একদম পছন্দ করি না। আর শোনো তোমায় বিয়ে করেছি কারণ আমার বাবা মা জোর করেছে তাই। তাছারা তোমার প্রতি আমার কোনো ভালবাসা নেই আর কখনো হবেও না। (রিফাত)

ওনার নাম রিফাত।

আমি ওনার কথা গুলো শুনে এতটাই শক্ট কলাম যে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। তাই আমি চুপচাপ গিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম। কিন্তু আমার চোখে একটুও ঘুম নাই। শুধু আমার শিমুলের কথা মনে পরছে বারবার। কেমন আছে ও। কি করছে ও। ওকি আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। না আর ভাবতে পারছি না আমি। হঠাৎ রিফাতর ডাক শুনে ঘোর কাটলো আমার
_ এই তোমাকে তো অনেক সুন্দর দেখতে। তাই তো আমার মা বাবা সব সময় বলতো তুমি খুব সুন্দর। তবে আমি তোমার রুপে গলছি না। (রিফাত)

একমাস পর…

কেটে গেছে অনেক গুলো দিন। রিফাত শুধু তার শরীর পিপাশা মিটায় আমায় দিয়ে তাছারা আমার প্রতি ওর কোনো ভালবাসা নেই। তবে আমার শশুড়বাড়ির সকলে আমায় খুব ভালবাসে। আমার শশুড় শাশুড়ি ননদি সবাই খুব ভালবাসে আমায়। আমি পেরেছি সকলের মন জয় করতে। শুধু পারিনি আসল মানুষ টার সাথে। এতো দিনে রিফাতর প্রতিও আমার একটু ভালবাসার সৃষ্টি হয়েছে। যতই হোক ও তো আমার স্বামী। কিন্তু শিমুলের জায়গাটা আমি দিতে পারিনি ওকে। আর হয়তো কোনো দিন পারবোও না।

এই একমাসে শিমুলের সাথে একটুও যোগাযোগ হয়নি আমার। কেমন আছে ও কিছুই জানি না আমি। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা হয় ওকে একটু দেখার। কিন্তু তখনি মনে পরে আমিই সরিয়ে দিয়েছি ওকে। সরিয়ে দিয়েছি আমার জীবন থেকে। হয়ে গেছি অন্য কারো। খুব কষ্ট হয় ওর জন্য কাউকে বোঝাতে পারি না। বলতেও পারি না।
এতক্ষণ এই সব ভাবছিলাম একা একা বসে।

হঠাৎ পিছন থেকে শাশুড়ি মায়ের ডাকে ভাবনার জগত থেকে ফিরলাম আমি।

_ দিবা মা কি হয়েছে তোমার? এভাবে এখানে বসে কি ভাবছো মা। তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে নাকি? (শাশুড়ি)

_ না মা আমার কিচ্ছু হয় নি। আপনার ছেলের আসতে দেরি হচ্ছে তো তাই ভাবছিলাম। কিছু বলবেন মা? (আমি)
_ হ্যা মা বলতেই তো এলাম। আজ রিফাত এলে ওকে নিয়ে একটু আমার রুমে এসোতো মা কিছু কথা আছে তোমাদের সাথে। (মুচকি হেসে শাশুড়ি)
_ কি কথা মা বলুন আমায়? (আমি)

_ এখন না রিফাত আসুক তারপর দুজনকে একসাথে বলবো কেমন। এখন আমি আসি মা তুমি রিফাত আসলে আমার রুমে আসতে ভুলনা কিন্তু। (শাশুড়ি)
শাশুড়ি মা চলে যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই রিফাত এলো। আমি ওনাকে সালাম দিয়ে হাতের ব্যাগ নিয়ে রেখে দিলাম। তারপর ওনার জুতা জামা কাপর সব খুলতে সাহায্য করলাম। তারপর ভয়ে ভয়ে বললাম
_ আপনি ফ্রেশ হয়ে আশুন আমি খাবার দিচ্ছি। তারপর মা আমাদের তার রুমে ডেকেছেন কি যেনো বলবেন মনে হয়। (আমি)

উনি কোনো উত্তর না দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলেন। আমি গিয়ে ওনার খাবার রেডি করলাম। কিছুক্ষন পর উনি এসে খেতে বসলেন। আর আমায় এই এক মারের মধ্যে আজ প্রথম বার জিগ্যেস করলেন আমি খেয়েছি কিনা। আমি ওনার কথায় অনেক অবাক হলাম আর তার চাই তে বেশি আনন্দ অনুভব করলাম। তারপর দুজনে একসাথে খাওয়া শেষ করে শাশুড়ি মায়ের রুমে গেলাম।

রিফাত আর আমি খাওয়া শেষ করে আমার শাশুড়ি মায়ের রুমে গেলাম।
_ মা আসবো(আমি)

_ হ্যা আসো মা। এই রুমে আসতে আবার অনুমতি নিতে হয় নাকি। (শাশুড়ি)
_ মা কেনো ডেকেছো আগে সেটা বলো। আমার খুব টায়ার্ড লাগছে আমি ঘুমাবো। (রিফাত)

_ দারা দারা আমি এখন যে কথা বলতে যাচ্ছি তা শুনে তোর সব ক্লান্তি দুর হয়ে যাবে বাবা।
আমি আর তোর আব্বু মিলে ঠিক করেছি যে তোদের কে হানিমুনের জন্যে কক্সবাজার পাঠাবো। তোদের বিয়ের তো একমাস হয়ে গেলো কিন্তু এখনো কোথাও ঘুরতে যাসনি তোরা। তাই কালকে সকালেই হানিমুনের জন্য কক্সবাজার চলে যাবি বৌমাকে নিয়ে। (শাশুড়ি)

_ কিন্তু আমার অফিসের কি হবে। বস কিছুতেই রাজি হবে না। (রিফাত)

_ অফিসের কথা তোকে ভাবতে হবে না। তোর আব্বু তোর বসের সাথে আগেই কথা বলে তোর জন্য ১১দিনের ছুটি নিয়েছে। আর কক্সবাজারে ১০দিনের জন্য একটা সুন্দর রুম বুকিং দেওয়াও হয়ে গেছে। আর কোনো কথা নয় রুমে গিয়ে সব জিনিস পত্র গুছিয়ে রাখো যাও। সকালেই রওনা হবা। (শাশুড়ি)

আমি কোনো কথা বললাম না। রিফাতও কিছু না বলে সোজা রুমে চলে এলো। তারপর আমাকে বললো সব জিনিস পত্র গুছিয়ে নিতে। আমিও সব গোছাতে শুধু করলাম আর ভাবতে লাগলাম_
কি হবে হানিমুনে গিয়ে আমার তো যতক্ষণ রিফাত বাসায় থাকে ততক্ষণই শুধু ভয়ে ভয়ে থাকি। কারণ ও কারণে অকারণে আমায় নানা রকম কথা শোনায়। আর হানিমুনে গেলেতো শুধু ওর সাথেই থাকতে হবে নাজানি ওখানে কি অবস্থা করবে আমার। এগুলো ভাবতে ভাবতে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে শুয়ে পরলাম ঘুমানোর জন্যে। রিফাত অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি শাশুড়ি মা সব রান্না করে রেডি করছেন। তারপর আমাকে বললেন,

দিবা বৌমা তারাতারি খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে পরো। ৮ টার বাস ধরতে হবে এখন ৬_১৫ বাজে। আমি তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করে দিয়েছি গাড়িতে খাওয়ার জন্য।

তারপর খাওয়া শেষ করে রিফাত আর আমি রেডি হলাম বেরোনোর জন্যে। আমার একটু অবাক লাগছে রিফাতর আচরণ দেখে। ও আমায় কাল থেকে একবারও গালাগালি করেনি। ভাল ব্যাবহার করছে।
শশুর শাশুড়ির কাছে থেকে বিদায় নেওয়ার সময় শাশুড়ি মা রিফাতকে লক্ষ করে বললেন,

_ রিফাত বাবা তোরা ফিরে আসার পর যেনো শু সংবাদ টা শুনতে পাই। (মুচকি হেসে শাশুড়ি)
_ কিসের শু সংবাদ? (রিফাত)

_ কিসের আবার আমাদের বাড়িতে নতুন অতিথি মানে আমার নাতি নাতনি আসার শু সংবাদ টা যেনো পাই। বৌমা তোমাকেও বলে দিলাম কিন্তু মনে যেনো থাকে। (শাশুড়ি)
আমি বা রিফাত কেউ কোনো কথা বললাম না। সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। তারপর সারাদিন পার হয়ে রাত ৪ টার সময় কক্সবাজার গিয়ে পৌছালাম।

দুজনেই খুব টায়ার্ড তাই সোজা রুমে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুমানোর আগে আমার বাড়ি ও শশুড়বাড়িতে কল করে বলে দিলাম পৌছানোর কথা।

সকালে ঘুম ভাংলো রিফাতর মিষ্টি ছোয়ায়। আমার কপালে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ও। এ যেনো আমি নতুন এক রিফাতকে দেখছি। ও আমার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। আর এই প্রথম বার আমি ওর চোখে আমার জন্যে অনেক ভালবাসা দেখতে পাচ্ছি। বিশ্বাস করতে পারছিনা নিজের চোখ কে। মনে হচ্ছে যেনো সপ্নে দেখছি আমি। হঠাৎ রিফাতর ডাকে ধ্যান ভাংলো আমার।
_এই দিবা এভাবে কি ভাবছো আমার দিকে তাকিয়ে?ভুত দেখছো নাকি আমার মধ্যে। (রিফাত)

_ না না মা মানে আ আসুলে আপনি আমায় এভাবে কখনো। পুরো কথা বলার আগেই আমার মুখ চেপে ধরলো রিফাত আর বললো,
_ হয়েছে হয়েছে আর তোতলাতে হবে না আমার মিষ্টি বৌটার। আসলে এতো দিন আমি তোমার ভালবাসাটা বুঝতে পারি নি। আর বুঝতে পারিনি তোমার জন্যে আমার মাঝের বেরে ওঠা ভালবাসার কথা। আমি তোমাকে অনেক ভালবেসে ফেলেছি দিবা। (রিফাত)

আমি হা করে রিফাতর কথা শুনছি আর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এটাই কি সেই রিফাত যে প্রতিটা মুহুর্তে আমার সাথে বাজে ব্যবহার করে এসেছে। তবে যাই হয়ে থাকনা কেনো আমার খুব আনন্দ অনুভব হচ্ছে ওর কথা গুলো শুনে।

এই কথা গুলো বলেই রিফাত আমায় শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরলো। আর বললো,

_ দিবা তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও। আমি তোমাকে বিয়ের রাত থেকে শুধু কষ্টই দিয়েছি কখনো ভালবাসিনি। নানা রকম ভাবে তোমায় কষ্ট দিয়ে এসেছি। কিন্তু তুমি কখনো তার প্রতিবাদ করো নি। এখন আমি বুঝতে পারছি আমিও তোমাকে অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছি। আই লাউ ইউ দিবা। আই রেইলি লাভ ইউ সো মাচ। আমি তোমায় কথা দিচ্ছি আজকের পর থেকে আর কখনো তোমায় কোনো কষ্ট পেতে দেবো না। তোমায় আমি অনেক সুখি করবো কথা দিলাম। (কান্নার শুরে বললো রিফাত)

আমি ওর কথা গুলো শুনে কোনো কথা বলতে পারলাম না শুধু অনেক আনন্দে চোখে পানি চলে এলো আমার। আমিও ওকে শক্ত করে জরিয়ে ধটলাম। এ মনে হয় আমার নতুন জীবন শুরু হলো। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম। তারপর নিজেকে ওর কাছ থেকে ছারিয়ে নিয়ে বললাম।
_আমিও আপনাকে ভালবাসি। আর সারা জীবন আপনার সাথেই থাকতে চাই। (আমি)

_ আর আপনি নয় দিবা এবার থেকে শুধু তুমি। আমায় তুমি করে বলবে। এগুলো বলেই আবার আমায় জোরিয়ে ধরে কপালে আলতো করে একটি চুমু দিলো। (রিফাত)
_ হয়েছে হয়েছে এবার তাহলে চলো দুজনে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যাই। আর কতক্ষণ ঘরের মাঝে বসে থাকবো। (আমি)
_ হুম যো হুকুম আমার ম্যডাম। চলুন তবে যাওয়া যাক। (মুচকি হেসে রিফাত)

তারপর দুজনে ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা করে রওনা হলাম সমুদ্র সৈকতে যেতে। অনেক আনন্দ করে ঘুরছিলাম সেখানে দুজন। হঠাৎ সেই ফুচকা ওয়ালাকে দেখতে পেলাম যার কাছ থেকে আমি লামিয়া আপু আর শিমুল ফুচকা খেয়ে ছিলাম। আর তখনি বুকের মাঝে শিমুলের কথা মনে পরে ব্যথা অনুভব করলাম। চোখ দিয়ে পানি চলে এলো। কিন্তু আমি তারাতারি সেই পানি লুকালাম।
এভাবেই কেটে গেলো ৫ দিন। ৬ষ্ঠ দিন বিকাল বেলা সমুদ্রের পারে বসে আছি আমি আর রিফাত। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ডাকলো আমার নাম ধরে কন্ঠটা আমার খুব পরিচিত। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম শিমুল ভাই আর লামিয়া আপু হাত ধরে দারিয়ে আছে।

লামিয়া আপুকে রিফাত চিনতে পারলো কিন্তু শিমুল কে চিনতে পারলো না। কারণ বিয়ের দিন লামিয়া আপুকে দেখেছিলো রিফাত তবে শিমুল বিয়ে শুরু হওয়ার আগেই চলে যায়।
_ আরে দিবা কেমন আছো তুমি? দুলাভাই কেমন আছেন আপনি? আমরা তো ভাবতেই পারেনি যে এভাবে দেখা হবে তোমাদের সাথে। (লামিয়া আপু)
_ জি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি আমরা। আপনি এখানে আপু? কেমন আছেন? আর আপনার সাথে এটা কে? (রিফাত)

_ ও আপনার সুমুন্দি হয় সম্পর্কে। মানে আপনার দিবার চাচাতো ভাই শিমুল। আর আমারও চাচাতো ভাই ছিলো এখন নেই। (মুচকি হেসে লামিয়া)
_ চাচাতো ভাই নেই মানে? (রিফাত)

_ মানে কিছু দিন পর শিমুল আর আমার বিয়ে। আমরা তো এই সপ্তাহের মধ্যেই যেতাম আপনাদের বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড দিতে। যাক দেখা হয়ে ভালোই হলো। তা এখানে কেনো আপনারা হানিমুন করতে তাই না? (দুষ্টুমি হাসি দিয়ে লামিয়া)

ওদের কথার মধ্যে আমি ও শিমুল কেউ কিছুই বলছি না শুধু দুজন দুজনকে তাকিয়ে দেখছি। হঠাৎ আমাদের ধ্যান ভাংলো রিফাতর ডাকে
_ এই যে মিস্টার সুমুন্দি আপনি আমাদের বিয়েতে আসলেন না কেনো হুম। (রিফাত)

_ না মানে আসলে আমি গিয়েছিলাম আপনাদের বিয়েতে কিন্তু একটা কাজ পরে যাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। তাই আপনার সাথে দেখা হয়নি। আজ পরিচিত হয়ে খুব ভাললাগলো। (শিমুল)
সবাই পরিচিত হওয়ার পর লামিয়া আপু রিফাতকে বললো,

_ দুলাভাই চলুন আপনার সাথে একটু ঘুরে আসি ঐ দিক থেকে। দিবা তুমি শিমুল এখানে থাকো আমি মিস্টার দুলাভাই এর সাথে একটু প্রেম করে আসি। (লামিয়া আপু)
রিফাতও লামিয়া আপুর কথায় সায় দিয়ে চললো লামিয়া আপুর সাথে হাটতে। তখন শিমুল ভাই এসে পাসে বসলো আমার। তারপর বলতে শুরু করলো সব কথা
_ আমি জানি দিবা তুমি আমায় আর লামিয়াকে দেখে খুব অবাক হচ্ছো। অনেক প্রশ্ন উকি দিচ্ছে তোমার মনে তাই না। তাহলে শোনো,

সেদিন আমি যখন তোমার কাছ থেকে ডায়েরি নিয়ে বাড়ি চলে আসি তখন আমি হারিয়ে ফেলি বেচে থাকার সব আশা ভরসা। একে বারে ভেঙ্গে পরি আমি। পাগল হয়ে যাই তোমার জন্য। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে তুমি আমার থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছো। আর কখনো তুমি আমার হবে না। পুরো তিনদিন তিনরাত আমি এভাবেই ভেতরে ভেতরে ধুকে ধুকে মরছিলাম তোমার কথা ভেবে। তারপর লামিয়া এলো আমার সামনে আর আমার হাত ধরে বললো,

_ শিমুল আমি জানি তুমি দিবা কে অনেক ভালবাসো। কিন্তু দিবা এখন অন্য কারর বৌ। ওকে তুমি আর কখনই পাবে না। আমি চাচির কাছে সব শুনেছি,(আমার মায়ের কথা বলল) যে দিবা তোমার কাছে কি চেয়েছে। তোমায় আমি অনেক ছোট বেলা থেকেই ভালবাসতাম শিমুল কিন্তু কখনো তোমায় বলতে পারিনি। আমি জানি তুমি আমায় কখনো ভালবাসতে পারবে না। কিন্তু দিবা শেষ ইচ্ছা পুরোন করতে হলে তোমায় আবার বিয়ে করতে হবে আর আমি তোমার বৌ হতে চাই। বলো না শিমুল তুমি আমায় বিয়ে করবেনা। দেবেনা আমায় তোমার জীবন টা নতুন করে রাঙ্গিয়ে দিতে আমার ভালবাসায়। কথা দিচ্ছি কখনো আমি তোমার কাছে স্ত্রীর অধিকার চাই বো না। শুধু তোমার বন্ধু হয়ে তোমার পাসে থাকতে চাই সারাজীবন। (কান্না করে বলেছিলো লামিয়া)

লামিয়ার কথা গুলো শুনে সেদিন আমি ওকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। তাই ওর মাঝেই খুজতে চেস্টা করেছি তোমায় দিবা। ওকে আমি এই একমাসে ভালবেসে ফেলেছি অনেকটা কিন্তু তবুও বিশ্বাস করো দিবা তোমার জায়গাটা ওকে দিতে পারিনি আমি আর কখনো পারবোও না। (শিমুল)

_ শিমুল তুই জানিশ না তোর আর লামিয়া আপুর বিয়ের কথা শুনে আমার কতটা আনন্দ লেগেছে। আমি সব সময় চাই তাম তুই অনেক সুখি হও। আর আমি আজ খুব ভালো করেই বুজতে পারছি যে তোর সুখ একমাত্র লামিয়া আপুর কাছেই আছে। তোরা বিয়ে করে অনেক সুখি হ দোয়া করি। আমিও আমার রিফাতর সাথে অনেক সুখি আছি। আজ থেকে আরও সুখে থাকবো কারণ আজ আমি জানলাম তুই সুখি। (আমি আনন্দ ভরা দৃষ্টি নিয়ে বললাম)

কথা বলা শেষ হতেই লামিয়া আপু আর রিফাত এসে দারালো আমাদের সামনে। তারপর কিছুক্ষন একটু কথা বলেই যার যার মতো চলে এলাম।
১০ দিন কক্সবাজারে থাকার পর বাড়ি ফিরে এলাম আমি আর রিফাত। আমাদের সাথে এক সাথেই এলো শিমুল আর লামিয়া আপু সবাই কে বিয়ের দাওয়াত দিতে।

দেখতে দেখতে কেটে গেলো অনেক গুলো দিন। আমরা সবাই এসেছি লামিয়া আপু আর শিমুলের বিয়েতে। আমি নিজে হাতে সাজালাম লামিয়া আপুকে আর বললাম,
_আপু শিমুল কে অনেক ভালবেসো আর তোমার ভালবাসায় ভুলিয়ে দিও ওর জীবনের আগের সব সৃতি। অনেক অনেক সুখি হও আপু। আমি প্রান ভরে দোয়া করি তোমাদের জন্য। (আমি)
লামিয়া আপু আমায় জরিয়ে ধরে বললো,

_ হ্যা দিবা আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসবো শিমুলকে। ওকে আমি কখনো কোনো কষ্ট পেতে দেবো না। আমার ভালবাসায় রাঙ্গিয়ে দেবো ওর জীবন। আর আমি তোমার কাছে চিরো ঋনি দিবা। তোমার জন্যই আমি আমার ভালবাসা শিমুলকে আজ স্বামী হিসাবে পাবো। (লামিয়া)

তারপর সবাই এসে রুমের মধ্যে পুরা হয়ে গেলো। আমি চলে গেলাম শিমুলের কাছে। গিয়ে দেখি শিমুল শেরোয়ানী পরে জামাই সেজে বসে আছে। রুমের মধ্যে শিমুল আর রিফাত ছারা কেউ নেই। রিফাতই ওকে বর সাজিয়েছে। আমি রিফাতকে বললাম,

_ এই যে মিস্টার স্বামী মশাই এবার গিয়ে নিজেও একটু রেডি হয়ে আসুন জান আমিও আসছি রেডি হতে। (আমি)
_ হুম চলুন ম্যডাম আমরাও রেডি হয়ে আসি। (রিফাত)

_ তুমি যাও আমি আসছি শিমুল ভাই এর সাথে একটু কথা আছে। (চোখ টিপ দিয়ে বললাম রিফাতকে)
রিফাত চলে গেলো। আমি শিমুল ভাই কে লক্ষ করে বললাম,

_ শিমুল ভাই তুমি আমার কথা রেখেছো। আমি চাই তুমি আমার আরেকটা কথা রাখো। তুমি আমায় কথা দাও যে তুমি লামিয়া আপুকে অনেক অনেক ভালবাসবে। ওকে কখনো কষ্ট দিবে না। তুমি ভাববে ওই তোমার আসল ভালবাসা। আর আমাকে ভুলে যাবে শুধু লামিয়া আপুকেই ভালবাসবে। কথা দাও আমায়। (আমি)

_ আমি তোমায় কথা দিলাম দিবা আমি লামিয়াকে অনেক ভালবাসবো কখনো ওকে কোনো কষ্ট অনুভব করতে দেবো না। তবে আমি তোমাকে কখনোই ভুলতে পারবো না। আমি লামিয়ার মাঝেই তোমাকে খুজে নেওয়ার চেস্টা করবো। (শিমুল)

তারপর আমি চলে এলাম। রিফাত আর আমি রেডি হয়ে বিয়েতে গেলাম। বিয়ে খুব ভালভাবেই মিটে গেলো। আমরা বাড়ি চলে এলাম।

শিমুল আর লামিয়া আপুর বিয়ে শেষ করে বাড়ি ফিরে এলাম আমি আর রিফাত। রিফাত এখন আমায় অনেক বেশি ভালবাসে কখনো আমায় কষ্ট পেতে দেয় না। এভাবেই কেটে গেলো ৬ মাস।
একদিন আমি আর শাশুড়ি মা রান্না করছি হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গেলাম। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন ঙ্গান ফিরলো তাকিয়ে দেখি আমি বেডে শুয়ে আছি আর সবাই আমার পাশে দারিয়ে আছে। আমার মা বাবা শশুর শাশুড়ি ও রিফাত সবাই আছে। সবার চোখে মুখে খুশির ছটা দেখতে পাচ্ছি।

আমার ঙ্গান ফেরা দেখে সবাই অনেক খুশি হলো। তারপর আমার শাশুড়ি মা বললেন,

_ তুমি জানোনা দিবা মা আজ তুমি আমাদের সবাই কে কতোটা খুশি উপহার দিলে। (আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন শাশুড়ি মা)
_চলুন বিয়াইন আমরা এখন এখান থেকে যাই। রিফাত আর দিবা একটু একসাথে থাকুক। (মা)

তারপর সবাই চলে গেলো শুধু রিফাত থাকলো আমার কাছে। আমি এদের কথার আগা মাথা কিছুই বুজতে পারছি না। তাই রিফাতকে জিগ্যেস করলাম,
_ আমার কি হয়েছিলো? আর সবাই এতো খুশি কেনো গো? আমি কি উপহার দিলাম সবাই কে? (আমি)

_(রিফাত আমায় শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরে কপালে আলতো করে চুমা দিয়ে বললো) তুমি আমায় বাবা হওয়ার সৌভাগ্য উপহার দিছো দিবা। আর ওদের নানা নানি দাদা দাদি হওয়ার সৌভাগ্য। (অফুরন্ত খুশি নিয়ে বললো)

আমি একটু লজ্জা পেয়ে রিফাতর বুকের মাঝে গিয়ে লুকালাম। আমারও আজ অনেক আনন্দ লাকছে। মা হতে পারার একটা নতুন অনুভুতি কাজ করছে আমার মাঝে।

এভাবেই কেটে গেলো ৯ টি মাস। এই নয় মাস আমায় কেউ কোনো কাজ করতে দেয়নি। আর রিফাততো আমায় মাথায় তুলে রেখেছে বললেই চলে। আজ আমার ডেলিভারির ডেট দিয়েছে ডাক্তার। তাই সবাই আমায় নিয়ে হাসপাতালে চলে এলো। রিফাতর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না ওর চোখ দুটো টলমল করছে পানি দিয়ে। বড্ড বেশি ভালবাসে আমায়। ডাক্তার আমায় ওটিতে নিয়ে গেলো।
তারপর আমার কোল আলো করে জন্ম নিলো ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান। ছেলেটিকে একদম আমার মতো দেখতে হয়েছে। রিফাত প্রথম কোলে নিলো ওকে।

তারপর একটু সুস্থ হয়ে ২ দিন পর বাড়ি ফিরে এলাম আমরা। সবাই খুব খুশি। ছেলের নাম রাখা হলো ইসমাঈল। নামটা আমার শশুড় মশাই রাখলেন।

অনেক আনন্দে কাটতে লাগলো আমাদের দিন। সবাই অনেক সুখি আমরা। কিন্তু একদিন হঠাৎ ঝড় উঠে এলো আমার জীবনে। সব কিছু উলোট পালোট করে দিলো।

হঠাৎ আমার সুখের সংসারে ঝড় এসে সব কিছু উলট পালট করে দিয়ে গেলো।

একদিন দুপুর বেলা রিফাত কল করলো আমায় আর বললো ও বাসায় আসছে একসাথে লান্চ করবে আমার সাথে তাই। আমি তো অনেক খুশি হলাম। ফোন রেখে দেওয়ার ২০ মিনিট পর আবার কল আসলো আমার ফোনে। তাকিয়ে দেখি রিফাতর ফোন থেকেই কল এসেছে। তাই কল রিসিভ করে বলতে লাগলাম,

_ এই যে মিস্টার স্বামী মশাই সেই কখন বলছেন যে আসতেছেন এখনো এসে পৌঁছাতেই পারলেন না হুম। (মুখে হাসি নিয়ে বললাম আমি)
ওপাস থেকে যে কথা গুলো শুনলাম তা সোনার জন্য আমি একদমি তৈরি ছিলাম না।

_ আচ্ছা এই নাম্বার টা যার আপনি তার কি হন। আসলে এই ফোনের মালিক কিছুক্ষণ আগে রোড এক্সিডেন্ট করেছেন এখন আমরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রাখছি। আপনারা তারাতারি হাসপাতালে চলে আসেন রোগির অবস্থা বেশি ভালো না। (অপরিচিত)

কথা গুলো সোনার পর আমার পায়ের নিচে থেকে যেনো মাটি সরে গেলো। আকাশ ভেঙে পরলো আমার মাথায়। আমি একটা চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে পরে গেলাম। তারপর আর আমার কিছু মনে নাই।
যখন আমার হুশ ফিরলো তখন দেখি আমার শাশুড়ির কোলের মধ্যে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি আর উনি আমার মাথায় পানি ঢেলেছেন। আমি শাশুড়ি মাকে বললাম,

_ মা আমার রিফাত কই। আমি রিফাতর কাছে যাবো। ও কেমন আছে এখন? (আমি)
আমার কথা শুনে শাশুড়িমা একটু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন,

_ কি বলছো বৌমা কি হয়েছে রিফাতর আর তুমি চিৎকার করে বেহুঁশ হলে কেনো মা। আমায় সব খুলে বলো দিবা। (শাশুড়ি মা)
_ মা আমাদের তারাতারি হাসপাতালে যেতে হবে রিফাত রোড এক্সিডেন্ট করেছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে। (কান্না করতে করতে বললাম আমি)

তারপর আমি শাশুড়ি মা আর শশুড় আব্বা সবাই মিলে হাসপাতালে গেলাম। গিয়ে দেখি রিফাত ICU তে মৃত্যুর সাথে লরাই করছে। আমি রিফাতর এমন অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারলাম না। আবার অঙ্গান হয়ে গেলাম। যখন ঙ্গান ফিরলো তখন আসেপাশে তাকিয়ে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। আর আমার পাশে আমার মা বাবা আর মায়ের কোলে আমার ৩ বছরের ছেলে ইসমাঈল। আমি মাকে জিগ্যেস করলাম,

_ মা আমার রিফাত কোথায় কেমন আছে ও। বলো না মা। আমি আমার রিফাতর কাছে যাবো। চিৎকার করে কাদতে কাদতে বললাম আমি।
মা কোনো কথা বলছে না শুধু মুখে কাপর গুজে কান্না করছে। বাবাও চুপ করে বসে আছে চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পরছে।
আমি আবার জিগ্যেস করলাম আমার রিফাত কই। তখন মা বললো,

_ দিবা তুই সান্ত হ মা। এমন পাগলামি করিস না। তোর কিছু হলে তোর ছেলেটার কি হবে একবার ভেবে দেখ মা তুই ছারাতো আর কেউ রইলো না ওর । (কান্না করে বললো মা)
_ আর কেউ রইলো না মানে কি বলছো এসব মা আমার রিফাত আছেতো। আমি একা কেনো হবো। আমি রিফাতর কাছে যাবো কোথায় ও। এগুলো বলেই দৌড়ে চলে গেলাম ICU এর কাছে। গিয়ে দেখি সেখানে রিফাত নেই। আমি পাগলের মতো খুজতে লাগলাম রিফাতকে। হঠাৎ দেখলাম একটা কেবিন থেকে খুব কান্নাকাটির শব্দ আসছে। আমি দৌড়ে গেলাম সেখানে। তারপর যা দেখলাম তা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

দেখি আমার রিফাতকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা কাপর দিয়ে ঢেকে রেখেছে। আর পাসে বসে আমার শশুড় শাশুড়ি কান্নাকাটি করছে।
আমি দৌড়ে গিয়ে রিফাতর মুখের ওপরের কাপর সরিয়ে বলতে লাগলাম,

_ এই রিফাত এই তুমি এভাবে শুয়ে আছো কেনো। ওঠো তারাতারি আমার সাথে একসাথে লান্চ করবে না ওঠোনা রিফাত। এই রিফাত কি হলো আমার কথাকি তুমি শুনতে পাচ্ছো না। দেখো তোমার দিবা তোমায় ডাকছে ওঠো রিফাত এই রিফাত ওঠোনা প্লিজ।

মা ওমা আমার রিফাত কথা বলছেনা কেনো। আর ওকে এভাবে ঢেকে রেখেছিলেন কেনো। ওমা ওকে বলেন না আমার সাথে কথা বলতে। ওকি আমার সাথে রাগ করছে। এই রিফাত ওঠো না এবার কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি ওঠোনা।

_ রিফাত আর কখনো উঠবে না দিবা ও একে বারে চলে গেছে আমাদের ছেরে। তুমি সান্ত হও মা। (ফুপিয়ে কান্না করে বললো শশুড়)
_ কি বলছেন আব্বু কোথায় গেছে ও এই তো আমাদের সামনেই তো আছে রিফাত। ঘুমিয়ে আছে একটু পর উঠেই আমায় বলবে দিবা এসো একসাথে লান্চ করি দেখেন আব্বু। ঐ রিফাত তুমি এতো স্বার্থপর হয়ে গেলে কেনো গো আমি তোমায় কখন থেকে ডাকছি তুমি উঠছো না কেনো।

এভাবেই কেটে গেলো সারাদিন রিফাতকে নিয়ে আমরা বাড়ি চলে এলাম। আমার মুখে কোনো কথা নাই। বোবা হয়ে গেছি আমি। পাগলের মতো হয়ে গেছি। কোনো কিছুই আমার মধ্যে কাজ করছে না। ওদিকে আমার রিফাতকে সবাই কবর দিয়ে এলো। রেখে এলো আমার থেকে অনেক দুরে। বাড়ির মধ্যে নেমে এলো মহা শোকের ছায়া। কিন্তু আমার মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই। চুপ করে বসে শুধু অঝোর ধারায় কান্না করছি আমি বোবার মতো।

আমার রিফাত আমায় রেখে স্বার্থপরের মতো চলে গেছে আজ একমাস হলো। প্রথম দিকে আমি বেচে থাকার সব আসা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমার আর আমার রিফাতর একমাত্র সৃতি আমাদের ছেলে ইসমাঈলের জন্যে আবার আমাকে শক্ত হতে হলো। কিন্তু আমার জীবনের ঝড় আর থামলো না।

একসময় যে শশুড় শাশুড়ি আমায় মেয়ের চেয়েও বেশি ভালবাসতো আজ তারা আমায় অপয়া ভাবে। আমার মুখ দেখতে চায় না। কথায় কথায় আমাকে নানা রকম গালি গালাজ করে। নানান ভাবে অপমান অপদস্ত করে। আমি সব কিছু সহ্য করে বেচে আছি শুধু মাত্র আমার ছেলেটার জন্য। সারারাত চোখের পানিতে ভিজে যায় আমার বালিশ।

আমার মা বাবা আমার কষ্টটা বুজতে পেরে আমায় একেবারে নিয়ে আসলেন বাড়িতে। আমার শশুড় শাশুড়ি যেনো আমি চলে আসায় হাফ ছেরে বাচলেন।
আমার মা বাবা আমাকে আগের চেয়েও বেশি ভালবাসতে শুরু করলেন। আসুলেই মানুষ ঠিক বলে বাবা মায়ের ভালবাসার সাথে কারো ভালবাসার তুলনা হয় না।

দেখতে দেখতে কেটে গেলো ২ টি বছর। আজ আমার আর আমার রিফাতর শেষ সৃতি ইসমাঈলের জন্মদিন। আজ ওর ৫ বছর পুর্ন হলো। এই দুই বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। আমি আর আগের মতো কষ্ট পাই না। নিজেকে অনেক শক্ত করে নিয়েছি। একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা আমি। স্কুলের সব বাচ্চাদের নিয়ে ভালোই সময় কাটে আমার। আমার ছেলেটাও এই স্কুলেই পড়ে।
শিমুল আর লামিয়া আপুর বিয়ে খেয়ে আসার পর আর যোগাযোগ হয়নি ওদের কারও সাথে আমাদের। আমি ইচ্ছা করেই কখনো যোগাযোগ করিনি। আমার যে এখন এই অবস্থা সেটা হয়তো ওরা কেউ জানে না। আর আমি জানাতেও চাই না। ওরা যেমন সুখে আছে তেমনি থাক।

আজ স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেলো। স্কুলে মিটিং ছিলো তাই। বাসায় এসে দরজা ধাক্কা দিলাম। দরোজা খোলার পর আমি অবাক হয়ে গেলাম। কারণ দরোজার ও পাশে শিমুল দারিয়ে ছিলো। ওর কোলে একটা পরির মতো ফুটফুটে মেয়ে। মেয়েটার বয়স ৩ বছর হবে। আমি শিমুল কে দেখে চমকে উঠলাম। তারপর ঘরে ঢুকে ওকে বললাম,

_ আরে শিমুল ভাই তুই এখানে। কখন এসেছিস। আর লামিয়া আপু কই। এটা কে তোদের মেয়ে নাকি। এই বলেই আমি ইসমাঈল কে নামিয়ে দিয়ে শিমুলের মেয়েকে কোলে নিলাম। (আমি)
শিমুল ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নাই। ও শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর চোখ দুটো ছলছল করছে পানিতে। তরপর বললো,

_ দিবা কেমন আছিস তুই? এতোকিছু হয়ে গেছে তোর সাথে একবার আমায় জানাবার প্রয়োজনও মনে করিসনি। আমি কি তোর এতই পর হয়ে গেছি। (কান্না ভরা কন্ঠে বললো শিমুল)
_ আমি ওর কোনো কথার উত্তর না দিয়ে লামিয়া আপুকে ডাকতে শুরু করলাম। এই লামিয়া আপু কই তুমি। লামিয়া আপু। শিমুল ভাই লামিয়া আপুকে নিয়ে আসিস নি। কই ও। কখন থেকে ডাকছি ওর কোনো সারা শব্দ নাই কেনো। (আমি)

_ তোর লামিয়া আপু আর আমাদের মাঝে নেই রে দিবা। স্বার্থপরের মতো চলে গেছে আমায় ছেরে ৩ বছর আগে। (কান্না করে বললো শিমুল)

_ আমাদের মাঝে নেই মানে। ৩বছর আগে কোথায় গেছে ও। তোর মেয়ের বয়সও তো ৩ বছর মনে হচ্ছে। কি হলো বল কোথায় গেছে লামিয়া আপু। (আমি)
শিমুল ভাই কিছু বলার আগেই দরোজায় কেউ ধাক্কা মারলো। আমি গিয়ে দরোজা খুলে দিলাম। দেখি মা বাবা দারিয়ে আছে বাইরে। শিমুল ভাই কে রেখে ওনারা একটু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। আব্বু একটু অসুস্থ তাই।

মা বাবা ভিতরে আসলে আমি তাাদের জিগ্যেস করলাম,

_ মা এসব কি বলছে শিমুল ভাই বলোতো। লামিয়া আপু কই গেছে ওকে ছেরে। তুমি কিছু জানো মা। (আমি)

_ মা শিমুল ভাই এসব কি বলছে বলোতো। লামিয়া আপু ওকে ছেরে কই গেছে। তুমি কিছু যানো মা? (আমি)
মা কিছু বলার আগেই শিমুল ভাই বললো,

_ লামিয়া মারা গেছে ৩ বছর আগে। (চিৎকার করে বলে উঠলো শিমুল)

কিছুক্ষনের জন্যে পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেলো। আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পরলো। নিজের কানকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমি। তারপর আমি প্রশ্ন করলাম
_ লামিয়া আপু মারা গেছে মানে। কি হয়েছিলো ওর। ৩ বছর আগে মারা গেছে অথচ আমাকে একবারো জানানোর প্রয়োজন মনে করলিনা তুই। (কান্না করে বললাম আমি)

_ তাহলে শোন কি হয়েছিলো আমার লামিয়ার। আমার আর লামিয়ার বিয়ের পর আমরা অনেক সুখে ছিলাম। লামিয়া কখনো আমায় কোনো কষ্ট পেতে দেয়নি। আমার জীবনে ও তোর শুন্যতাকে পুরন করেছিলো ওর ভালবাসা দিয়ে। আমিও ওকে অনেক ভালবাসতাম। আমাদের বিয়ের ৩ বছর পর যেদিন লামিয়ার বাচ্চা হবে সেদিন ও কেনো জানিনা আমায় কাছে ডেকে বলেছিলো,

_ শিমুল আমি তোমায় অনেক ভালবাসি। আমি চাই তুমি সারা জীবন অনেক সুখে থাকো। আমার কেনো জানিনা মন খুব কু ডাকছে। যদি আমার কিছু হয়ে যায়। তুমি আমাদের সন্তান কে অনেক ভালবেসো। আর আবার বিয়ে করো।

সে সময় আমি লামিয়ার কথা কিছুই বুজতে পারিনি শুধু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম। তোমার কিচ্ছু হবে না। তারপর ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। দীর্ঘ ৩ ঘন্টা পরে আমরা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। আমি তখন অনেক আনন্দ অনুভব করি। কিন্তু সেই আনন্দ আমার বেশি সময়ের ছিলো না। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে বললো,

_ দুঃখিত মিস্টার শিমুল আমরা আপনার স্ত্রীকে বাচাতে পারিনি। ওনার অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। তবে আপনার একটা কন্যা সন্তান হয়েছে সে সুস্থ আছে। (ডাক্তার)

ডাক্তার এগুলো বলে চলে যায়। আমি সেদিন পাগলের মতো কেদেছিলাম লামিয়ার জন্য। আমার জীবনের সব আলো নিভে গিয়েছিলো। কিন্তু আমার মেয়েটার জন্য আমাকে শক্ত হতে হলো। আর এই হলো আমার সেই লামিয়ার শেষ সৃতি নুসরাত আমার আর লামিয়ার মেয়ে। আর আমি তোদের জানাই নি তার কারণ হলো আমি চাই নি তোর সুখের মাঝে কষ্ট দিতে। আমি তো জানতাম না যে রিফাত ভাই….। (কান্না করে এই কথা গুলো বললো শিমুল)

লামিয়া আপুর কথা গুলো শুনে আমি যেনো পাথর হয়ে গেলাম। শুধু দুচোখ বেয়ে বয়ে চলেছে অঝোর ধারায় পানি। কেনো এমন হলো আমাদের সাথে। কেনো চলে গেলো লামিয়া আর রিফাত এভাবে আমাদের একা ফেলে। কিচ্ছু ভাবতে পারছিনা আমি। তারপর সবাই মিলে অনেক কথাবার্তা কান্নাকাটি হয় বাসার মধ্যে। তারপর সবাই যার যার মতো চলে যাই রুমে। সকালে মা আর বাবা খাবার টেবিলে বলে

_ দিবা মা আর শিমুল বাবা তোমাদের কিছু কথা বলি। দেখো নুসরাতের জন্য একটা আম্মুর খুব প্রয়োজন আর ইসমাঈলের জন্যেও আব্বুর প্রয়োজন। আর আমরা জানি তোমরা দুজন দুজনকে অনেক আগে থেকেই ভালবাসতে। তাই আমরা চাই তোমাদের বিয়ে দিয়ে দিতে। তাহলে নুসরাত আর ইসমাঈলও মা ও বাবা পাবে। আমরা তোমাদের জোর করবো না তোমরা আলাদা ভাবে কথা বলে দেখো। তারপর তোমরা যদি রাজি হও তবেই আমরা তোমাদের বিয়েটা দিবো। শুধু একটা কথাই বলি শোনো আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। (মা বাবা)
আমি কিছু বলার আগেই শিমুল ভাই বলে উঠলো,

_ চাচি আমার মাও এই কথা আমায় বলেছেন কাল রাতে ফোনে। তাই আমি দিবার সাথে আগে আলাদা করে কথা বলতে চাই। (শিমুল)
আমি আর শিমুল একা একা ছাদে দারিয়ে কথা বলছি,

_ দিবা আমি তোমাকে আগে যপমন ভালবাসতাম এখনো তেমনই ভালবাসি। আমি তোমাকে নিয়ে আবার নতুন জীবন শুরু করতে চাই। তোমাকে আমার নুসরাতের না হিসাবে পেতে চাই। আমি ইসমাঈলের বাবার জায়গাটা পেতে চাই। কথা দিলাম কখনো কোনো অভিযোগ করার সুযোগ দেবো না। আমি তোমাদের অনেক সুখে রাখবো ইনশাআল্লাহ। (শিমুল)

আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না। আমিও যে শিমুলকে এখনো ভালবাসি। আর তার চেয়ে বেশি দরকার নুসরাতের জন্যে মা আর ইসমাঈলের জন্যে বাবার। তাই আমি রাজি হলাম বিয়েতে।

এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেলো আমার আর আমার শিমুলের। আমরা হয়ে গেলাম জীবন সংগি। যেমন চেয়ে ছিলাম আমরা আজ থেকে ৬ বছর আগে। ঠিক তেমনি পেলাম সব কিছু নতুন করে। দুঃখ শুধু একটাই মাঝখান থেকে হারিয়ে গেলো আমাদের কে ভালবাসার দুটি মানুষ।

আজ আমার আর শিমুলের ১৮ তম বিবাহ বার্ষিকী। আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। আমি নুসরাতের মা হয়ে দেখিয়েছি কখনো ওকে মায়ের অভাব বুজতে দেইনি। আর ইসমাঈল পেয়েছে তার বাবাকে শিমুল কখনো ইসমাঈলকে বাবার অভাব বুজতে দেয়নি। আমরা এখন খুব সুখি একটি পরিবার। সুখের কোনো কমতি নেই আমার পরিবারে। আমি আর শিমুল আর কোনো বাচ্চা নেইনি। আমাদের দুটি সন্তান।

এভাবেই বেচে থাক শিমুল আর দিবার ভালবাসা। আর বেচে থাক সব ভালবাসার মানুষ গুলো।

লেখিকা: সোনালী

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “অসমাপ্ত ভালোবাসা” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ুন – অসমাপ্ত ভালবাসা – ব্যর্থ প্রেমের গল্প (সিজন ১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!