রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

রাকা (শেষ খণ্ড) – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প

রাকা – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প: আমি অবাক হয়ে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে আর বাকি রইলো না, আব্বু আবার অনু চৌধুরীকে মিস করছে। চোখ বাঁকিয়ে দেখলাম, পর্দার নিচে দুটো পা এসে দাঁড়িয়েছে।


পর্ব ১৪

অনু চৌধুরীর ফোন আসার পর থেকেই আব্বুর আর্তনাদে সারা বাড়ি মুখরিত হয়ে গেলো।
বিষয়টা আর এক জায়গায় থেমে নেই।
অনেক দূর ছড়িয়ে গেছে।

কায়সার ফুফা বাসায় এসে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। দাদিকে ফোন করে সবটা জানানো হলো। দাদি মুখ উল্টে শুধু বলেছে,
~ জানতাম! জানতাম আমি এমন কিছুই হইবো! যার মা অমন সেই মেয়ে আর ভালো হইবো কেম্নে? এইবার আমিও দেখি আমার এই পোলা আর কতদিন এই অনুর চিহ্ন নিয়া পইড়্যা থাকতে পারে।

ফুফা কোনোভাবেই রাজি করাতে পারলো না তাকে, আমাদের বাসায় আসতে।
আব্বু আগে থেকেই জানে,
এই ঝড় তাকে একাই সামলাতে হবে।
পাশে পাবে একজনকে।

নিজের অবুঝ, ছোট্ট মেয়ে, রাকাকে।
যে কিছুই করতে বা বুঝে উঠতে পারছেনা, কি কি ঘটে যাচ্ছে তার চারপাশে। আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরেই ঘন্টার পর ঘন্টা কেঁদে পার করে দিলো।
আমিও কাঁদলাম। আমার মনে ও প্রগাঢ় কষ্ট এসে ভীড় করেছিলো এই ভেবে, এক এক করে সবাই

আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে!
আচ্ছা, এরপর কার পালা?
অনু চৌধুরীকে ফোনে আর পাওয়া যায়নি।
সে আর ফোন রিসিভই করেনি ভয়ে।
আব্বু তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো, সাথেও ফুফাও করতো~
কিন্তু সে আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।

আর অনু চৌধুরী তো বলেই দিয়েছে, মেয়ে অবাধ্য, তার কোনো কথাই কানে তোলেনা।
উপরন্তু তাকেই জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে লাফাতে লাফাতে বিয়ে করে নিয়েছে ঐ ছেলেটাকে।

আব্বু কিছুতেই মানতে পারছেনা,
এমন বখাটে ছেলের সাথে তার নিজের বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে।
সে তানিশার ফোনে এখনো ফোন দিয়েই যায়। ফোন বন্ধ।

অবশেষে, সেই রেশ কাটাতে কাটাতে ও এক সপ্তাহ শেষ হয়ে গেলো।
রফিকের বস্তি বাড়িতে হানা দেওয়া হয়েছে কয়েকবারই। কিন্তু ওখানে তারা নেই।
রফিকের আব্বা~আম্মা, ভাই~বোন আছে শুধু।
তাদের সাথে কথা বলাও দুষ্কর।

এমন ভাব আর বাজে স্বভাব যেন গায়ে পড়ে ঝগড়া করে ফেলবে।
কিংবা ১৯/২০ হলেই গায়ে হাত তুলবে।

তাদের তেমন কিছুই বলা যায়নি। এরা একেবারেই নিচু বংশ থেকে উঠে এসেছে, এদের ব্যবহার ও তাই অতিব নিম্নমানের। কথাই ছোঁয়ানো যায়না। তাই ছোট ফুফা আর আব্বু ব্যর্থ হয়েই ফিরে এসেছে বার বার।
আব্বু ইতোমধ্যেই একবার অনু চৌধুরীকে ফোন করেছে। অনু চৌধুরী ও ফোন রিসিভ করেছে।

তাদের মধ্যের কথোপকথন,
~ অনু, তুমি কি সত্যিই জানো না, আমার তানিশা এখন কোথায় আছে?
~ না। তানিশার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নাই। ওর ফোন সবসময় খোলা থাকেনা। অন্য সিম নিছে বোধ হয়।

~ ওর এখনকার নাম্বারটা আমাকে দাও।
~ ওর নাম্বার দিয়েও লাভ নাই। সে আমাকেও দেয়নাই। ঐ ছেলে খুব চালাক। তানিশাকে তানিশার আগের সিম দিয়েই আমার সাথে কথা বলায়, তারপর কথা বলা শেষ হলে আবার খুলে রেখে দেয়।
~ ও। তারমানে তোমাকে তানিশা প্রায়ই ফোন করে?
~ একদিন একটু হইছিলো। এই ৫মিনিট! কিন্তু কেন যেন কথার মাঝখান দিয়েই কেটে দিছিলো। আর এখন পর্যন্ত কোনো ফোন আসেনাই।

~ আচ্ছা, ওকে বলবা, ওর কোনোপ্রকার সমস্যা হচ্ছে কিনা ওখানে, আমাদের এটা অন্তত যেন জানায়। এটাও বলে দিবা, ও চাইলে এখনো আমার কাছে ফিরে আসতে পারে। আমি ওকে আবার বিয়ে দিবো। খুব ভালো জায়গায় ওর বিয়ে দিবো। ওর সব ইচ্ছা পূরণ করবো আমি। দয়া করে মেয়েটাকে বুঝাইয়ো, এই ছেলের সাথে ও টিকতে পারবে না। শুনছি এই ছেলে মাতাল। কে জানে কেমন আছে আমার তানিশা।

এসব শুনে অনু চৌধুরীর চোখ ভিজে গেলো। আসলেই লোকটা ভালো।
কিন্তু রফিক যে মাতাল ও, এটা তার জানা ছিলো না। তানিশার কি অবস্থা, কে জানে.. ফোন ও করেনি মেয়েটা।
অনু চৌধুরী এসব ভাবছে আর নিজের স্বাদের টক~ঝাল~মিষ্টি আমের আচার গোগ্রাসে খাচ্ছে।

আজমল উদ্দীনের টাকার অভাব হলেও ভালোবাসার কোনো অভাব নেই।
তা এই ক’দিনে খুব ভালো করেই অনু চৌধুরী বুঝে গেছে। কিন্তু আজমল উদ্দীনের এই বড়লোক ভাবের রহস্যটা সে কিছুতেই ভেদ করতে পারছেনা।
আজমল উদ্দীন এটার জন্য মাফ ও চেয়েছে বার বার করে। ঢাকার বড়ো, সুন্দর বাসাটা ছেড়ে এখন দুই রুমের ছোট্ট বাসায় উঠতে হয়েছে।

কিন্তু আজমল এখনো তার শখ পূরণ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই এটা~ওটা নিয়ে আসছে সে, অনু চৌধুরীর মন পাওয়ার জন্য। অনু চৌধুরী ও আর রাগ চেপে রাখতে পারলো না। আজমলের বাচ্চা তার পেটে। রাগ চেপেও আর লাভ নেই। আজমলের সাথেই সে থাকবে বলে স্থির করেছে। আর পিছু ফিরে দেখা যাবেনা।
ফিরলেও লাভ নেই কোনো।

রেজা চৌধুরীর দেওয়ার মত সবকিছুই মোটামুটি সে সাথে করে নিয়ে এসেছে।
আর ফিরে গেলেও বা নতুন করে কি দিবে?
এখন যা পাওয়ার সব আজমলের থেকেই পাবে। তার সব শখ আহ্লাদ পূরণ করার দায়িত্ব এখন শুধু একজনেরই। আজমল উদ্দীন।

এভাবে এভাবে চলে গেলো অনেকগুলো দিন। আমি কিছুদিন হলো আবার স্কুলে যাওয়া আরম্ভ করেছি। আপন স্যার আমাকে খুব ভালো সাপোর্ট দিচ্ছে। ক্লাস শেষে একদম একান্তে আমাকে পড়াচ্ছে। আমার পড়াশোনার গ্যাপটা সে পূরণ করে দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আমিও খুব আগ্রহ নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। আব্বু আমার লেখাপড়ার মনোযোগ দেখে খুশি হলেও সে খুশি প্রকাশ করেনি।
সে সারাদিনই মুখ অন্ধকার করে রাখে।
আমার সাথে ঠিক করে কথা বলেনা।
সব জায়গাতেই এমন। তার জবান বন্ধ হয়ে গেছে। না পারতেই কথা বলে। এরকমটাই সবাই বলে।
কিন্তু আমি বলিনা। কারণ আমার পৃথিবী এখন শুধু একজন মানুষ নিয়েই পরিপূর্ণ।
সে হলো আমার আব্বু।

এই মধ্যে তানিশা আপু না আমাদেরকে ফোন করেছে না করেছে অনু চৌধুরীকে। আমি তো রোজ বাসার ফোন দিয়ে আপুকে কল দেই। যদি খোলা পাই, এই আশায়। হয়তো আব্বুও লুকিয়ে লুকিয়ে তাই করে।

হঠাৎ একদিন অনু চৌধুরীর কাছে তানিশা ফোন দিলো।
অনু চৌধুরী প্রথমে রিসিভ করতে পারেনি।
তার এখন অবস্থা খারাপের দিকে।
পেট ফুলেছে একটু একটু। সারা শরীর ব্যথা ব্যথা। কাজের মেয়ে রেখেছে কিন্তু বেতন পায়না ঠিকমত তাই সেও ভেগেছে। তাই তার নিজ হাতেই সব সামলাতে হচ্ছিলো সেদিন।
সব কাজ শেষ শুতে গিয়ে যখন দেখলো অচেনা নাম্বার থেকে কল, তখনই সে কলব্যাক করলো।

কল রিসিভ হলো।
ওপাশ থেকে ক্যাঁচক্যাঁচ করে কে যেন বললো,
~ হ্যালো কে আফনে?

~ আমি অনু। আমাকে ফোন করছিলেন এই নাম্বার থেকে ঘন্টাখানেক আগে।
~ ও আচ্ছা। তাইলে তানিশা ভাবিই হবে।
তানিশার নাম শুনেই তার চোখ~মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
~ হ্যাঁ হ্যাঁ। তানিশা কই?

~ আপনি লাইনে থাকেন, আমি গিয়া দেহি ভাবি ফ্রি আছে কিনা।
অনু চৌধুরী লাইনেই থাকলেন।
মেয়ের অবস্থা জানা যাবে এই আশায়।
কতদিন হয়ে গেলো ফোন পায়না।
অত:পর তানিশার গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো।
~ হ্যালো আম্মু।

~ হ্যাঁ। বল। কেমন আছিস? কী অবস্থা?
তানিশা কাঁদো কাঁদো গলায় উত্তর দিলো,
~ ভালো না আম্মু… তুমি কেমন আছো?
~ আমি আছি ভালোই। কিন্তু তুই ভালো নাই ক্যান? কী হইছে?
~ আম্মু রফিক আমাকে মারছে।
~ মারছে মানে?

~ ও অনেক রাত করে বাড়িতে ফিরে। কি জানি খেয়ে আসে প্রতিদিন। মুখের গন্ধে টেকা যায়না। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই রেগে যায়। মারে।
~ বলিস কি!
~ ও আমাকে খুব ভালোবাসে আম্মু.. কিন্তু..
~ কিন্তু কী? আর ভালোই যখন বাসে তহন মারে ক্যান?

~ সবাই ই তো শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক নেয়। যৌতুক না হলেও অনেকে শখ করে এটা ওটা জামাইকে দেয়। রফিককে তো তোমরা কিছুই দিলানা.. অবশ্য তুমি তো দেওয়ার কথা না। আব্বু দিবে। কিন্তু আব্বুর সাথে তো কথা বলারই সাহস হয়না।
~ তোকে এইসব দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারে কেউ খোঁটা দিছে নাকি?

~ হ্যাঁ। প্রতিদিনই তো উঠতে বসতে শুনয়ে হয় এসব। সয়ে যাচ্ছে আমার। তবুও… আর ভাল্লাগেনা.. অশান্তি লাগে সব…
~ কে খোঁটা দেয়? তোর জামাই?
~ শাশুড়ি আর জামাই। দুজনেই।
~ কী বলে? তারে কিছু দেয়না এটা?

তারে দিবো ক্যাম্নে? সে তো আমগো মেয়েরে ভাগাইয়া নিয়া বিয়ে করছে আমগো অমতে। খুব বড় বড় গলায় বলছিলো না, ভালোবা_সে? কই এখন কই তার ভালোবাসা? বই পেটায় ক্যান? যৌতুক চায় ক্যান? দেখছোস তানিশা? তোরে আমি বলছিলাম না, এই ছেলে ভালো হইব্যো না? দেখলি তো?

~ আম্মু সবাইকেই তো যৌতুক দেয়। রফিককে তো তোমরা কেউই কিছুই দাওনাই। ওর তো এত টাকাও নাই জানো তো.. আর..
~ আর কী?
~ কিছুনা।

~ শুন, তোকে কি বেশিই মারে নাকি রে?
~ না। আমি ভালোই আছি।
~ শুন তানিশা, তোর আব্বু বলছে তুই এখনো যদি তোর বাপের কাছে ফিরে যাস, সে তোকে ঘরে রাখবে। তোর আবার নতুন করে ভালো জায়গায় বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে। বুঝলি? তুই শুধু আমাকে একবার বল। আমি তাকে জানাই। তোর বাপ এখনি তোকে বাড়িতে নিয়ে যাবে।

তানিশা কাঁদো কাঁদো গলাতেই শক্ত হয়ে বললো,
~ না আম্মু। এখন রাখি। আবার পরে কথা বলবো। তোমার সাথে কথা বললে খুব ভালো লাগে আম্মু।
~ আচ্ছা রাখ। ফোন দিস তুই।
~ আম্মু শোনো,
~ বল।

~ তোমার কাছে কিছু টাকা হবে?
~ ক্যান? টাকা দিয়া কী করবি?
~ আমার একটু লাগতো….
~ তোর কি লাগবে বল, আমি কিনে পাঠিয়ে দেই।
~ কিছু লাগবে না। শুধু টাকা লাগবে।
~ কত টাকা?

~ এই ১০~১৫, ০০০’র মত…
~ তুই এত টাকা দিয়ে কি করবি!
~ এত কিছু বলতে পারবো না। আমার খুব জরুরি..
~ কিন্তু এত টাকা তো আমার হাতে নাই। আমি কিভাবে দিমু তোরে?
~ কিভাবে দিবা আর? জোগাড় করে দিবা! আংকেলের তো টাকার অভাব নাই!
~ আরে…. বুঝোস না…তোর আংকেলতো এখন এত টাকা দিতে পারবো না, মাসের শেষ সময়…

~ থাক থাক হইছে! বুঝছি। লাগবেনা আমার তোমার টাকা।
বলে পট করে ফোনটা কেটে দিলো তানিশা।
অনু চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন।
আব্বুকে কল দিয়ে বললেন,
~ আপনার মেয়ের ২০, ০০০ টাকা লাগবে।
~ কোন মেয়ের?
~ বড়টার আরকি!

~ তো ওর টাকা লাগলে আমি কী করবো? ও আমার মেয়ে, আমার কাছে থাকলে ওর যত টাকা লাগবে আমি দিতে রাজি। কিন্তু ঐ ছেলের সাথে থাকলে তো আমি তাকে ১টাকাও দিবোনা। কেন দিবো?

~ মেয়ে এতদিন পর একটা জিনিস চাইছে…
~ চাইছে মানে! ওর চাওয়ার কোন জিনিসটা আমি ওকে দেইনি?
~ আচ্ছা শুনেন, মেয়েদের বিয়ে হলে তো মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে অনেক কিছুই দেওয়া লাগে। আপনি তো কিছুই দেন নাই। এখন কিছু হলেও দেওয়া লাগে ওর জামাইরে। আপনার তো মেয়ের সুখের কথা ভাইব্যা হলেও কিছু পাঠানো উচিত ঐ বাড়িতে।

~ মানে! আমি আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে লাখ লাখ টাকার জিনিস পাঠাবো। আমার এত ব্যবসা, এত টাকা~পয়সা সব তো ওদের জন্যই। কিন্তু আমিতো তানিশার শ্বশুরবাড়িকে শ্বশুরবাড়ি বলে মানিই না। তাহলে আমি কেন ঐ বাড়িতে জিনিস পাঠাতে যাবো। পাগল হইছো নাকি?

~ আহা… আচ্ছা মেয়ের জামাইরে কিছু না দেন ঠিক আছে। কিন্তু এই ২০, ০০০ টাকা তো আপনার মেয়ে তার নিজের জন্য চাইছে। এইটা তো অন্তত তারে দেন?
আব্বু হেসে বললো,
~ হাহ্ হা! মেয়ের নিজের জন্য। যেই মেয়ে
আমার কথা ভাবেনা, তার জন্য আমি ভাববো কেন? আর তার টাকার দরকার হলে সে আমাকে ফোন করবে।

আমার সাথে কথা বলবে। তোমার সাথে কিসের কথা বলে? শিক্ষা নেয় নাকি? তোমার নিজের অভিজ্ঞতার শিক্ষা দাও?
অনি চৌধুরী এবার রেগে গেলেন।
ফোঁস ফোঁস করে ফুলতে লাগলেন।

~ আপনি আমার এই নাম্বারের বিকাশে ২০, ০০০ টাকা পাঠায়ে দেন, মেয়ের সুখ দেখতে চাইলে। এই টাকা আপনার জন্য কিছুই না, আমি জানি।
আব্বু শব্দ করে হেসে বললো,
~ ও আচ্ছা, টাকার দরকার পড়লেই মা ~ মেয়ের আমার কথা মনে পড়ে। নতুবা ভুলেও না! তাইনা? হাহ্ হা হা।

গম্ভীর গলায় অনু চৌধুরী বললেন,
~ আমার আপনার টাকার দরকার নাই। আপনার মেয়ের দরকার। সে ফোন করে বলছে তার কিছু টাকা লাগবে।

~ তাকে বলবা আমাকে ফোন দিতে। আর বলবা আমার কাছে ফিরে আসতে।
~ আপনি বুঝতেছেন না, মেয়েটা সুখে নাই। ছেলেটা শান্তি দিতে পারেনা তো।
আপনি বুঝেন না, তানিশা ঐখানে ক্যাম্নে ম্যানেজ করতাছে? মেয়ের কষ্টের দিকটা দ্যাখতে হইবো তো!

~ ওর কষ্টের দিক আমি বুঝি বলেই আমি তোমাকে বলতেছি, ওকে বলো আমার কাছে চলে আসতে। বলবা, ওর আব্বু ওর জীবন আবার আগের মত করে গুছিয়ে দিবে। আমি ওর সব প্রয়োজন, সব ইচ্ছা মিটায়ে দিবো। আমি ওকে আবার পড়াশোনা করতে দিবো। প্রয়োজনে ওদের দুই বোনের জন্য বাসায় টিউশন মাস্টার রাখবো।

সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ্। তুমি শুধু মেয়েকে বোঝাও। ঐ বেয়াদব ছেলেটাকে ফেলে চলে আসতে বলো। আর আমাকে আর এই ব্যাপার নিয়ে কিছু বলবা না। আমার এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলা শেষ।
অনু চৌধুরী একপ্রকার বাধ্য হয়েই ফোন কেটে দিলেন। ভাবলেন, মেয়ের উছিলায় নিজে ও পাঁচ, ছয় হাজার টাকা পাবে। এই টাকা দিয়ে সে তার শখের থ্রি~পিস সেটগুলো কিনতে পারতো। কিন্তু লোকটা খুব নটখটে। কিছুতেই রাজি হলো না। নিজের মেয়ের জন্য ও না!
নিজের টাকা থেকেও দিতে ইচ্ছুক না সে।

এখন এই অভাবের সংসারে ১০০ টাকাও এদিক~ওদিক খরচ করা বোকামি।
তাই সেও আর কোনো উদ্যোগ নিলো না।

রিমা খালা ইদানিং আমাদের বাসায় আসা শুরু করেছে। খুব সম্ভবত এটা দাদিরই কারসাজি। খালা নিজেও একা মানুষ, সারাদিন বাসায় পড়ে থাকে একা একা, একদম আমার মত। আমাদের দুজনের দশাই এখন এক। তাই আমিও খুব ভালো আছি এখন। খালা যতক্ষন থাকে, ততক্ষন যেন আমাদের বাসাটায় প্রাণ থাকে।
যখনই চলে যায়, তখনই নিষ্প্রাণতায় ছেঁয়ে যায় সারা বাসা।
সে আব্বু আসার আগে আগেই চলে যায়।
কিন্তু সেদিন বিকেলে খুব জোরে বৃষ্টি নামলো। সারাক্ষন ভালো আবহাওয়া, গাঢ় রোদ ছিলো।

যখনই খালা রওনা দিবে তখনই ঝুম বৃষ্টি নামলো। তাই ছাতা নিয়ে বের হতে গেলো কিন্তু তখন শুরু হলো দমকা হাওয়া। দাঁড়িয়ে ও থাকা যায়না, যেন বাতাসই উড়িয়ে নিয়ে যায়। চারদিক কালো হয়ে গেলো। তুমুল গতিতে ঝড়~তুফান শুরু হলো। আব্বুও বাসায় নেই। আমি একা একা এত বড় বাসায়।
খালা চলে যাওয়ার জন্য দরজায় এসে হাপিত্যেশ করছে। আমিও খালার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। খালা খুব আফসোস করছে আজকের এই অদ্ভুত আবহাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি মনে মনে খুব খুশি হচ্ছি!
ইশ!

রিমা খালা মনে হচ্ছে আমাদের বাসায় আজকের রাতটা থেকেই যাবে!
অনেকদিন তো হলো আম্মুর সাথে ঘুমাই না।
আর ঘুমানোর ইচ্ছা বোধ করিনা। বাজে মহিলা। সব নিয়ে পালিয়েছে।
আজকে সেই খালি জায়গা হয়তো পূর্ণ হবে।
আমি খালাকে সারারাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো। খালা আমার চুলে বিলি কেটে দিবে সারাক্ষন।

এসব মনে মনে কল্পনা করতেই আমার চোখে জল এসে গেলো।
আমি সবার কাছে সব লুকাতে পারলেও
এই খালার কাছে কখনো কিছু লুকাতে পারিনা।
সে ঠিকই ঠাওর করে নিলো আমার চোখের কোণে চিকচিক করতে থাকা সেই নোনা জল।
~ কিরে রাকা? ভয় পাচ্ছিস নাকি?

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ হুম খুব। তুমি আজকে থেকে যাওয়া না আন্টি।
~ আবার আন্টি! বল খালামণি। কী বলবি?
~ আচ্ছা খালামণি! ভুলে যাই!
এমন সময় কাকভেজা হয়ে আব্বু ঘরে ঢুকলো।

সে হন্য হয়ে ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো তার জামা~কাপড় নিয়ে। তাড়াহুড়ো করে আসার সময় বাঁশের কঞ্চিতে তার হাত ছিলে গেছে অনেকটা। রিমা খালা খুব গোপনে সুক্ষ্মভাবে সেটা লক্ষ্য করলো। কিন্তু এগোলো না।
কারণ আব্বু খালামণির সাথে কথা বলতে একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।


পর্ব ১৫

আব্বু যখন ঘরে ঢুকলো খালাও তার পেছন পেছন আসলো। বৃষ্টি থামছে না। বাইরের দাপুটে হাওয়ায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে সব। বিদ্যুৎ একবার গিয়ে আবার পাঁচ মিনিটের মাথাতেই চলে এসেছে। আজ বিদ্যুৎ থাকার সম্ভাবনা নেই।

ঝড়~তুফানের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ব্যাপারটা আসলেই খুব জঘণ্য একটা বিষয়। তাকে আনার সময় I’m at your service টাইপ একটা প্রতিশ্রুতি দেওয়া~নেওয়ার বিষয় যোগ করা উচিত। যাতে ঝড় তুফানের সময় ও বিদ্যুৎ না যায়।
বিপদের সময়েই সার্ভিস না পেলে কিভাবে হবে।
~ রাকা, এই রাকা, এদিকে আয় দেখি মা!

খালা আমাকে ডাকতেই আমি চলে গেলাম তার কাছে।
~ কী খালামণি?

খালা তার হাতের ফার্স্ট এইড বক্সটা আমার হাতে দিয়ে বললো,
~ এই দেখ, এটা রুই। এটাতে স্যাভলন দিয়েছি একটু। তুই তোর আব্বুর হাতে~পায়ে যেখানে যেখানে কাটা দেখবি ওখানে ওখানেই এটা দিয়ে ওয়াশ করে দিবি। ব্যথা করে কিনা জিজ্ঞেস করিস। আমি তার কথা মোতাবেক তাই করলাম।

করে এসে বললাম,
~ খালামণি, আব্বু নিজেই সব ওয়াশ করছে। বলে, তেমন কিছুই হয়নাই। সেরে যাবে নাকি। আমি জোর করায় একটু করছে আরকি!
খালামণি চিন্তিত স্বরে বললেন,
~ কি বলিস, আমি স্পষ্ট দেখলাম অনেকটাই ছিলে গেছে..
~ হুঁ।

~ আচ্ছা জিজ্ঞেস কর তো, চা খাবে নাকি স্যুপ খাবে? গরম কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে আয়। করে দেই। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আসছে মানুষটা।
আমি তখনই গেলাম আব্বুর কাছে।
~ আব্বু, ও আব্বু, চা খাবা?

আব্বু আমাকে টেনে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
~ কে করবে মা? তুমি?

~ না। আমি করবো কেন! খালামণি আছে নাহ?
~ ও। আমিই করে আনি। তোমরা ড্রয়িংরুমে বসো। সে আমাদের মেহমান তো।
~ না তুমি বসো। তুমি ব্যথা পাইছো।
চা খাবা তাই তো? আচ্ছাহ্।

আব্বু ইনিয়েবিনিয়ে কিছু বললো, আমি শুনলাম না।
খালামণিকে গিয়ে বলে দিলাম, চা বানাও।
সে একা মানুষ। কারো জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করে।
এত ভালো মনের মানুষ মুখ দেখলে কেউ বুঝবেনা। অথচ তার কি পোড়া কপাল দেখো!
আমার আব্বুরও তাই।

আমার মনে হয়, জগতের সব ভালো ভালো মানুষদের জীবনে শত কষ্ট আর শত শত ব্যর্থতার গল্প নিবন্ধ থাকে।
খালার চা বানানোর গন্ধে সারাবাড়ি মৌ মৌ করছে। আমি চা খুব পছন্দ করি।
বজ্রপাত হচ্ছে তাই টিভি চালাতে দিলো না আব্বু। আব্বু ডিশ লাইন কেটে আমার পাশে বসে গল্পসল্প করতে লাগলো।

আমিও দুনিয়ার সব গল্প জুড়ে দিলাম।
সারাদিন কি কি করছি, কে কি বলছে সব কিছু আব্বুর কানে তুলে দিলাম!
এটা আমার নিত্যদিনের কর্ম।
আব্বু সামান্য হেসে বললো,
~ আচ্ছা আচ্ছা… তা, নামাজ পড়ো তো? তোমার আপুর জন্য যে দোয়া করতে বললাম, করছিলা?

~ ও হ্যাঁ হ্যাঁ। ঐ যে আপু বাসায় আসেনা সেটা? হ্যাঁ বলছি, সবার আগে এটাই বলছি, আপু যেন আমাদের কাছে ফিরে আসে। আচ্ছা আব্বু, আপু কই গেছে? রিতু আমাকে বার বার শুধু লজ্জ্বা দেয় জানো?
~ কী বলে ও?

~ বলে এই তোর আম্মুও পালাইছে, তোর বোন ও পালাইছে। তুই কবে পালাইবি রে? তারপরই সবাই হাসি~ঠাট্টা শুরু করে।
~ রিতু কে? নাম ঠিকানা বলো। আমি ওকে ওর উত্তর দিয়ে আসি গিয়ে। বেয়াদব ছেলেমেয়ে!

অমন সময় খালা ডাক দিলো।
~ রাকা, এইদিকে আসো তো মা।
আমি তার কাছে গেলাম।
সে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়েছে। এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেন সে আব্বুকে দেখতে পায়, কিন্তু আব্বু যেন না দেখে।

ফিসফিস করে বললো,
~ নাও। এই কাপটা তোমার আব্বুকে দিয়ে আসো। আর তারপর স্যুপটা রেখে আসো ওখানে। খেতে ইচ্ছা হলে খাবে। চিকেন স্যুপ, বলে দিবা।

আমি ট্রে হাতে নিয়ে আব্বুর সামনে গিয়ে খালার ডিরেকশনগুলো বললাম।
খালার কাছে গিয়ে দেখলাম, সে আমার রুমে বসেছে। সামনে দু কাপ চা, বিস্কুট পিঠা আর স্যুপ।

বিস্কুট পিঠা আজ খালাই বানিয়ে নিয়ে এসেছে।
আমার খুব পছন্দের তাই প্রায়শই বানিয়ে নিয়ে আনে। এইসব বানানোর জন্য ভালোই খরচ পড়ে। দুধ, চিনি, আটা, বিস্কুট ইত্যাদি..
এসব দিয়ে বানাতে গেলে তাকে অনেক কথা শুনতে হয়। ভাইয়ের বাসায় বাড়তি ঝামেলা হয়ে পড়ে আছে তো! ভাবীর কথার আঘাতেই ছিন্ন~বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সব। তাই লুকিয়ে লুকিয়েই করে আনে।

আমি তার সামনে যেতেই আব্বুর ডাক পড়লো।
দৌঁড়ে গেলাম। আব্বু চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,
~ রিমা কই? একা একা ওখানে কী করে?
~ আমার রুমে বসছে। ওখানেই চা খাবো আমরা দুজন।
~ তো, আমার সাথে বসে খেলে কী হয়ে যাবে? ওখানে কেন?
~ কি জানি…
~ এখানো আসো তোমরা।

আমি গিয়ে খালাকে বলতেই খালা দাঁড়িয়ে গেলো। আমি কিছুতেই বুঝিনা, খালা কেন আব্বুকে এত ভয় পায়!
সে কাচুমাচু করতে করতে ঐ রুমে গেলো।
সে আব্বুর থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে বসলো।

আব্বু চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,
~ রিমা, তোমার আম্মা কেমন আছে?
~ আছে ভালোই। বাতের ব্যথা বাড়ে কমে। হাঁটতে সমস্যা হয় একটু..
~ ও.. তোমার কী অবস্থা?
~ আছি ভাই, এইতো ভালোই।

~ তো, আজকে এত ঝড়~তুফান যখন, থেকে যাও বাসায়। সমস্যা তো নাই। তাইনা?
~ না.. ঠিক আছে ভাই।
~ খালা ফোন করছিলো একটু আগে।
বললো, তুমি নাকি থাকতে চাও না এই সেই… এত কিসের সমস্যা? আমার রাকাকে তোমার ভালো লাগেনা নাকি?

~ না না! কি বলেন! রাকা তো আমার মেয়ের মত ভাই। ও অনেক লক্ষী একটা মেয়ে।
আব্বু এবার খুব নরম স্বরে বললো,
~ আমার মেয়েটা তোমাকে কাছে পেলে যে খুব খুশি হয়, তাকি তুমি বুঝো?
খালা আমতা আমতা করে বললো,
~ জ্বী।

আব্বু উদাস গলায় কণ্ঠস্বর ভারী করে বললো,
~ ওকে একটু সময় দিও.. মেয়েটার তো আমি ছাড়া আর কেউই নাই…
~ দেই তো। আমি প্রতিদিনই ওর কাছে আসার চেষ্টা করি। আপনি এত চিন্তা কইর‍্যেন না।
আমি চা নিয়ে বারান্দায় গেলাম। বড় মানুষদের বিদঘুটে আলাপ~আলোচনা শোনার চেয়ে বারন্দায় গিয়ে ঝড়~তুফান দেখা ভালো।

তখন আব্বু বললো,
~ আমি জানি। তোমাকে ও খুব পছন্দ করে। তুমি চলে যাওয়ার পর রাতে তো আমার কাছেই থাকে। সারাক্ষন শুধু তোমার কথা বলে মেয়ে।
এই কথা শেষ করেই হেসে দিয়ে বললো,
~ আমিতো তোমার সুনাম শুনতে শুনতে রীতিমত পাগল হয়ে যাচ্ছি! হাহ্ হা। ও ওর মায়ের নাম ও এতবার নেয় না। কি আশ্চর্য, এই বাচ্চা মেয়েটাও তার মাকে মিস করেনা। আমি তো ওকে অনুর নামই নিতে শুনিনা! আর অনুও.. মেয়ের খবর নিতে নামেমাত্র ফোন করে।
খালা কিছু বললো না। শুধু হুঁ, হ্যাঁ করে গেলো।

আমাকে ডেকে আনা হলো।
আমরা সবাই একসাথে বসে ফ্যামিলির মতই সময় কাটালাম। আমি কিছুক্ষন আব্বুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলাম।
তারপর আবার শুলাম খালার কোলে।

এত আনন্দ, এত ভালো লাগা আমার এই প্রথমবার অনুভব হলো।
মনে হচ্ছে, এই তো আমার স্বর্গ!
আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুটি মানুষ,
আব্বু, খালামণি!

তারা দুজনেই এখন আমার কাছে!
কে বলে আমি দুখী, আমার কেউ নেই?
আব্বু হঠাৎ বলে উঠলো,
~ রাকা ওটা কি খাচ্ছো তুমি?

~ বিস্কুট পিঠা আব্বু। খালামণি বানাইছে। খুব মজা! তুমি খাবা?
~ কই আমাকে যে দিলানা! শুধু স্যুপ ধরায়ে দিলা!
~ তুমি খাবা?
~ কই দাও! আবার জিজ্ঞেস করে!
খালা উঠে তাড়াতাড়ি আমার হাতে বিস্কুটের প্লেট দিয়ে দিলো। তার খুশিতে মুখ চকচক করছে।

আব্বুর এই সামান্য চাওয়াটুকুর জন্যই তার খুশিরা ঠিকরে পড়ছে।
আব্বু একটা হাতে নিতে নিতে বললো,
~ রাকা, ভাত আছে আম্মু? ভাত খেয়ে নিতে হবে। আজকে দুপুরেও কিছু খাইনাই। ক্ষিধা লাগছে খুব।

আমি হা করে রইলাম। ভাত নেই। রান্না করতে হবে। খালা আর আমি মিলে খেয়ে ফেলছি।
খালা কথাটা শুনেই উঠে দাঁড়ালো ব্যস্ত হয়ে।
সে দৌঁড়ে চলে গেলো রান্না ঘরে।
চাল ধুয়ে ভাত বসিয়ে দিলো।

ভাত হতে অল্প কিছুক্ষন।
এই সময়ে তরকারি রেডি করে ফেলতে হবে।
দৌঁড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো আব্বুকে,
~ ভাই, আপনি মাছের ভর্তা খান? টাকি মাছের ভর্তা খাবেন? আচ্ছা, ঝাল করে রসুন দিয়ে শুটকি মাছের ভর্তা করে দেই?
~ না থাক থাক। ব্যস্ত হওয়া লাগবেনা রিমা। বৃষ্টি একটু কমুক তাহলে। হোটেল থেকে নিয়ে আসা যাবে।

~ আমি আছি যখন, তখন কি দরকার? আর আমার রান্না করতে ভালোই লাগে। এখন পাঁচ মিনিটে কিছু একটা করে দেই। খেয়ে ফেলেন। হোটেলে এখন ভালো কিছু পাবেন না। আমি দুটোই করি। রাকার জন্য ডিম ভাজা.. বলে ওড়নার একটা পার্ট কোমরে গুজে ব্যস্ত ঘরণির ন্যায় রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলো।
আব্বু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

তার চোখ দেখছে এটা রিমা নয়, সেই প্রথম দিনের অনু। হ্যাঁ তো, ওটা অনু!
আমি খালার পেছন পেছন যাবো বলে হাঁটা দিবো তখনই দেখলাম, আব্বু কেমন যেন করছে ফোন হাতে নিয়ে।
আমি আব্বুর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম,
~ কী করো আব্বু? কাকে ফোন দাও?

আব্বু আমার কথা শুনেই আমাকে জড়িতে ধরে হু হু করে কেঁদে দিলো।
খুব আস্তে কাঁদার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। পুরুষ মানুষ, যখন বেসামাল কষ্ট পেয়ে যায় তখন যদি কান্না আসে/চোখের জল এসে পড়ে তাহলে আর সহসা সেটা থামাতে পারেনা। অনেকে বলে এটা মেয়েলি স্বভাব। কিন্তু না! এটাই তো হওয়া উচিত। তাদের ও মন বলে কিছু আছে।

আমি অবাক হয়ে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে আর বাকি রইলো না, আব্বু আবার অনু চৌধুরীকে মিস করছে। চোখ বাঁকিয়ে দেখলাম, পর্দার নিচে দুটো পা এসে দাঁড়িয়েছে। ওটা খালাই। তা নয় তো আর কে হবে!
খালা রান্নাবান্নায় খুব এক্সপার্ট। এক হাতেই সব করে ফেললো।
ডায়নিং’এ খাবার বেড়ে আব্বুকে ডাক দিলো। আমরা গেলাম।

আমাকে খাইয়ে দিবে তাই আমাকে আগে দিলো না। আব্বুকে বেড়ে দিয়ে তারপর আমাকে খাইয়ে দিবে।
আব্বু খালার দিকে চোখ কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তাকায় আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।
এমন সময় বিদ্যুৎ চলে গেলো।

খালা ব্যস্ত হয়ে পড়লো লাইট, মোমবাতির জন্য। কিন্তু সে তো জানেই না কোথায় কি আছে।
দুজন একসাথেই উঠে দাঁড়ালো। আব্বু বললো,
রাকা, তুমি উঠবা না। বসে থাকো।

বলে সেও উঠলো, খালাও উঠলো। আব্বু ভুলবশত, অন্ধকারে, খালার নরম পায়ের উপর পাড়া দিয়ে দিলো। খালা শব্দ করতেই আব্বু পা সরিয়ে নিলো। তারপর তাকে চেপে ধরে আস্তে করে বললো,
~ ধুর, তুমি উঠতে গেলা কেন! নখটা তো মনে হয় গেছে। বসো তো তুমি। আমি মোমবাতি আনি।

খালার হৃদয়ের কম্পন বেড়ে গেলো।
আজ কতগুলো দিন কেটে যাওয়ার পর এই প্রথম নিজ স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ স্পর্শে সে শিউরে উঠলো।
এই স্পর্শে তার একটুও অস্বস্তি হলোনা। মনে হলো, এই স্পর্শের অনুভূতি যেন শেষ না হয় কখনো!

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেটার অবসান ঘটলো।
আব্বু মোমবাতি আনতে গেলো।
আনলো এবং নিঃশব্দে খাওয়া আরম্ভ করলো।
খালা আমাকে ভাত খাওয়াচ্ছে।
আমি দুজনের মাঝখানে বসেছি।

আব্বু দুদিনের অভুক্তের মত খাচ্ছে আর খালা সেটা মুগ্ধ চোখে দেখে যাচ্ছে।
তারপর সে খেয়ে শুতে চলে গেলো।
খালা আর আমি আমাদের রুমে শুলাম।
আমি খালাকে যতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি ; সে তার চেয়েও বেশি শক্ত করে ধরেছে।
একদম তার দেহের সাথে মিশিয়ে দিলো আমায়। কি অদ্ভুত ভালো লাগা!
ভাবলাম, গল্প টল্প শুনবো।

কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরে তার উষ্ণতা পেতেই ঘুমের দেশে চলে গেলাম।
আমি তখন ঘুমে।
হঠাৎ করে আব্বুর রুম থেকে গোঁ গোঁ করে কিছু অদ্ভুত শব্দ আসতে শুরু করলো।
মোমবাতি নিভু নিভু করে জ্বলছে।
বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজে সৃষ্টি হয়েছে এক ভুতুড়ে পরিবেশ।
খালা কৌতূহলপরবশ হয়ে উঠে গেলেন।
কিসের শব্দ ওটা? জানতে।

খালা খুব কষ্টে, খুব সাবধানে আব্বুর রুমে গিয়ে উঁকি দিলেন। আব্বু ঠান্ডায় হাত পা এক করে শুয়ে আছে আর গোঁ গোঁ করে শব্দ করছে। যেন কিছু বিড়বিড় করে যাচ্ছে অনবরত। আব্বুর এমনিতেও মানসিক আঘাতজনিত কারণে একটা বাজে সমস্যা আছে। সেটা খালা জানে।
সে অন্যায়, অনুচিত এসব কিছু বিবেচনা করলো না আর।
গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো আব্বুর কাছে।
সে অস্ফুটস্বরে ‘অনু চৌধুরীর নাম আওড়াচ্ছে।

খালা তার কপালে হাত দিয়ে দেখলো, গায়ে জ্বর জ্বর ভাব। মাথাব্যথা করছে নির্ঘাত।
সে নিঃশব্দে রান্না ঘরে গেলো। কপালে, মাথায় পানি ঢেলে তাকে ঘুমের মধ্যেই ঔষধ খাওয়ালো। মাথা টিপে দিলো নিক্স দিয়ে। ঝাঁঝালো বাম বুকে আর মাথায় ম্যাসাজ করে দিতে দিতে একসময় সে শব্দ করা বন্ধ করে দিলো।
খালা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

উঠে চলে আসবে বলে দাঁড়ালেন।
এক পা বাড়াতেই খেয়াল করে দেখলেন,
এই মানুষটার অসহায় মুখখানা কতটা ঝলসে গেছে। কতটা কষ্টে আছে সে সেটা তার মুখ দেখলেই বোঝা যায়..
সে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকতেই দেখলো তার প্রয়াত স্বামীর মুখ ভেসে উঠেছে তার মুখে। সে হাত দিয়ে তাকে কাছে যাওয়ার জন্য ডাকছে। খালার হেঁচকি উঠে গেলো।
সে দৌঁড়ে চলে আসলো আমার রুমে।

তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শব্দ করে কিছুক্ষন কাঁদলো।
কিন্তু আমরা কেউই শুনলাম না।
মেয়েদের লুকানো, গোপন জিনিসের টের~ সহসা কেউ পায়না। আমরাও পেলাম না।

অনু চৌধুরীর সংসারে আগুন লেগেছে।
আজমল উদ্দীন আজকে এক সপ্তাহ বাসায় ফেরেনা। ইতোমধ্যেই একদিন সে একজনের কাছ থেকে কিছু আজগুবি কথা শুনেছে। যার থেকে শুনেছে সে আজমলের একজন বিশেষ বন্ধু।

সেই বন্ধু একদিন নিজেই যেঁচে ফোন দিয়ে এসব বললো। এসব শুনে তো অনু চৌধুরীর চক্ষু চড়কগাছ!
সেসব সত্য~মিথ্যা যাচাই করার জন্য আজমলকে জিজ্ঞেস করার পর থেকেই আজমল উদ্দীন গায়েব। সে আর বাসায় ফিরছে না।
কয়েকবার মাত্র ফোনে কথা হয়েছে।
কিন্তু আজমল যেন খুব ব্যস্ত।

কথা বলার সময়ই পায়না।
আজমল উদ্দীনের বাড়ি আছে।
তার মা~বাবা কেউই নেই। সেও শহরে শহরেই ঘোরে। তাই তার ভাইয়েরা সুযোগ করে গ্রামের বাড়ির প্রায় সবই দখলে নিয়ে নিয়েছে। এসব শুনেছে অনু চৌধুরী। কিন্তু এখন এতদিন এভাবে কোথায় গিয়ে পড়ে আছে লোকটা?
সে একজন অন্তসত্ত্বা নারী।

এসময় স্বামীর যত্নটা কতটা জরুরি!
অথচ এই নিরিবিলি, একা একটা বাসায় তাকে ফেলে আজমল উদ্দীন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।

ফোন দিলে এখন ফোন ও তুলতে চায়না। কয়েকবার করলে একবার রিসিভ হয়!
ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো অনু চৌধুরী বুঝে উঠতে পারছে না।
সে এর বিহিত করবেই।

এই নিয়ে ১৫বার কল দিয়েছে।
ফোন রিসিভ করছে না।
কতক্ষন রিসিভ করবেনা? সে ও করেই যাচ্ছে।
১৭বারের সময় ফোন রিসিভ হলো।
একটা মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো,
~ হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।

নারী কন্ঠ পেয়েই অনু চোধুরীর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।
~ হ্যালো! কে আপনি? এটা আজমলের ফোন না?
~ জ্বী।

~ তাহলে আপনি রিসিভ করলেন কেন? আপনি কে হন ওর? বোন?
~ আজমলের বোনেরা কেউ বাড়িতে নেই।
~ তাহলে আপনি কে? ওর ফোন আপনি রিসিভ করলেন কেন? চেঁচিয়ে বলে উঠলো।
ওপাশ থেকে শান্ত গলায় বললো,
~ আমি কেন রিসিভ করলাম.. আমি কে হতে পারি বা কেন রিসিভ করলাম, এসব আজমল আপনাকে এখনো জানায়নি?

~ মানে! কি জানাবে?
~ আচ্ছা। আপনি এখন রাখুন বোন। ও আসুক। আসলে ও_ই জানাবে।
~ ও কোথায় গেছে?
~ বাজারে গেছে। ভুল করে ফোন রেখে চলে গেছে।
~ বাজারে গেছে! বাজারে কেন গেছে? কার জন্য বাজার করতে গেছে?
~ কার জন্য মানে? আমার জন্য গেছে। ঘরে বাজার~সদয় লাগেনা? তাই!
অনু চৌধুরী থ হয়ে গেলেন এসব শুনে।

পর্ব ১৬

অনু চৌধুরীকে আজমল উদ্দীন আর ফোন দিলেন না। অনু চৌধুরীর প্রাণ যায় যায় অবস্থা।
কে এই মেয়ে, কেন এভাবে বললো কোনো উত্তরই পাওয়া যাচ্ছেনা।
এদিকে তানিশার ও কোনো খবর নেই।
মেয়েটার একটা খোঁজ পেলে ভালোই হতো।

আর রাকা নামে যে তার কোনো সন্তান ছিলো তা হয়তো সে ভুলেই গেছে। কয়েকবারই আব্বুর সাথে ফোনে কথা হয়েছিলো। তন্মধ্য একবার কি দুইবার আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো, কথা বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমি লুকিয়ে থাকি ঐ সময়। হয় বাইরে চলে যাই নতুবা বাথরুমে বসে সময় পার করি তখন। জানিনা, কেন যেন তার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে গেছে। ইচ্ছাই করেনা তার সাথে কথা বলতে। চাই না তার সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হোক।

আজমল উদ্দীন আর তানিশার কথা মনে পড়লেও আমার জন্য তার কোনো দুশ্চিন্তা হয়না। আমি স্কুলে যাই কিনা, ঠিকমত খাওয়া~দাওয়া করছি কিনা এসবেও তার কোনো আগ্রহ নেই।

অনু চৌধুরী ভাবছে,
আজমলের ফোন ধরেছে কোনো মেয়ে!
কে হতে পারে, ওর কোনো ভাবী বা পিসতুতো বোন? আমার সাথে ঠাট্টা~মস্করা করেছে নাকি?
এরকম ভেবে ভেবে কিছুদিন পার করতেই আজমল উদ্দীন ফোন দিলেন।
~ হ্যালো অনু। কেমন আছো?

~ ভালো। আপনি কি মানুষ? আপনি কিভাবে আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে গেলেন? ফোন পর্যন্ত করেন না!
~ আরে আর বইল্যো না। খুব ঝামেলায় আছি।

~ কিসের ঝামেলা? আপনার ফোন মেয়ে মানুষ ধরে ক্যান? কার জন্য টাকা খরচ করে বাজার~ সদয় করেন? আপনার নাকি টাকা~পয়সা নাই নাই! তাইলে?
~ আরে আর বইল্যো না। ভাইয়ের এখানে থাকি। কিছু বাজার সদয় করা লাগে তো নাকি?
~ ক্যান ওইহানে থাকা লাগবো আপনার? আপনার বউ যেখানে থাকে, আপনি ও ওখানেই থাকবেন। আপনার ঐখানে কিসের এত কাজ? দুইদিন পর পরই দৌঁড় দেন! ক্যান, বলেন তো আমারে?

~ আচ্ছা শুনো, এসব বাদ দাও। ব্যস্ত ছিলাম কাজে। তাই খবর নিতে পারিনি। আমি আজকেই আসতেছি তোমার কাছে। তোমার জন্য একটা শাড়ি কিনছি ভাবিসহ। এইখানে ভালো ভালো শাড়ি কম দামে পাওয়া যায় তো তাই।

অনু চৌধুরী খুশিতে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন শাড়ির কথা শুনে।
~ ওমা! তাই! কত দাম? কী কালার? টিস্যুর মত নরম শাড়ি পরার শখ আমার। বেশি ভারী কিন্তু এখন পরতে পারমু না।
~ দাম জিজ্ঞেস কইর‍্যো না। উপহার। নরমই।
~ কিসের উপহার?

~ এইযে, আমাকে বাচ্চার বাপ হতে দিবা, তাই।
এভাবে এভাবেই কথা ঘুরায়ে, অনু চৌধুরীকে মানিয়ে নিলেন আজমল উদ্দীন।
ছয় মাস পর।

অনু চৌধুরীর প্রথম বাচ্চা জন্ম নিলো।
আট মাসেই ব্যথা উঠে গেলো, বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হলো। এবারেও মেয়ে বাবু।
অনু চৌধুরীর ভাগ্য ছেলে নেই হয়তো।
পর পর তিনটাই মেয়ে হলো।

আজমল উদ্দীনের খুশির যেন সীমা নেই।
একটু বেশিই খুশি হয়েছে লোকটা।
এর পিছনের কারণটা কেউই জানেনা।
কারণ তখনো কিছুই জানানো হয়নি।
বাচ্চা নিয়ে দুজনেই ভীষণ খুশি।

অনু চৌধুরীর খুশি বলতে পুরাতন অভিজ্ঞতা, তাই অতটাও খুশি হয়নি। বাচ্চা হওয়ার ছিলো, হইছে। এই!
তাছাড়া কতবার মিস্কারেজ করা হয়েছিলো।
কম কষ্ট পোহাতে হয়নি তো তাকে।

এই মধ্যে অনু চৌধুরীর সাথে আমাদের কারোরই কোনো যোগাযোগ হয়নি।
আব্বু, আমি ভালোই আছি।
খাওয়া~দাওয়ায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
রিমা খালাই সবটা দেখছেন।

আমি তখন ভালোই ছিলাম। খুশিতে ছিলাম।
কিন্তু সেই খুশি দীর্ঘায়ু পেলো না কেন?
কেন মানুষের জীবনের সামান্য খুশিরা ও স্থায়ী হয়ে থেকে যায়না?
তানিশা আপুকে আমরা প্রায় ভুলেই যাচ্ছি।

সে ইচ্ছা করেই আব্বুর সাথে বা আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
কে জানে, হয়তো সে মনে করে, আমরাই তার জীবনের পরম শত্রু। একমাত্র অনু চৌধুরীই তার জীবনের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী।

আমরাও আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি। আব্বু এক কথায় ধৈর্য্য হারা হয়ে গেছেন। তার আর এসব নিয়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে না।
অনু চৌধুরীর বাচ্চা জন্ম নেওয়ার এক সপ্তাহ পরই আবার অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো।

সে বুঝেই নিলো, এটা আর কেউ নয়,
তানিশাই। সেটাই হলো।
তানিশা আপু ফোন দিয়েছে অনু চৌধুরীকে।
খুব ব্যস্ত হয়ে বললো,
~ হ্যালো আম্মু।

~ হ্যাঁ তানিশা বল। এতদিন পর মনে হলো?
~ সেইম প্রশ্ন আমারো। এতদিন পরে ও একবার মনে করলা না?
~ আমি কি তোর নাম্বার জানি নাকি?

~ যেগুলা জানো ওগুলাতে একবারো ট্রাই করে দেখছিলা? দেখোনি। আমিও দেখলাম। আমার আম্মু আমাকে কতটা মিস করে। নাহ্, আমাকে কেউই মিস করেনা। আমি মরে গেলেও কারো কোনো সমস্যা হবেনা।
~ বড়দের মত এত পাকনা পাকনা কথা বলিস না। কেমন আছিস বল।
~ ভালো।

~ আসলেই? কণ্ঠস্বর শুনে তো মনে হয় না।
তানিশা আপু এবার চুপ করে গেলো।
ওপাশ থেকে নাক টেনে কাঁন্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।
~ কী হলো তানিশা? তুই কাঁদতেছোস নাকি?

সে নাক টেনে বললো,
~ আম্মু, প্লিজ আমাকে কিছু বুদ্ধি দাও। আমাকে সাহায্য করো।
~ কী? টাকা লাগবে?
~ হুম। আর পারতেছি না আমি।
~ পারতেছোস না বলতে?

~ এখানে আমি উঠতে বসতে মাইর খাই আম্মু। আমার পুরা শরীরে শুধু মাইরের দাগ। আর পারছি না। আর নিতে পারছি না আমি। এখন গায়ে কেউ ধরলেও ব্যথা পাই। ঠিক করে শুতেও পারিনা। বসতে পারিনা। চোখ ব্যথা করে। সব ব্যথা হয়ে গেছে আমার আম্মু। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না।

~ তোকে রফিক এত বেশি মারে?
~ শুধু ও না। ওর মা ও মারে। দুদিন তো ওর আব্বাও মারছে। ঝাড়ু দিয়ে একবার। আরেকবার চড় মারছিলো।

~ ওমা কি কস! তিনজনেই মারে! ক্যান? তোরে তো আমি সব শিখাইছি। রান্নাবান্না, কাজ~কাম হতে সব। তুই তো সবই পারোস। তাইলে?
~ কাজ কাম সবই তো আমি করি। কিন্তু তাদের তো শুধু কাজ কাম দিয়েই সব হবেনা। ছেলে বিয়ে দিলে মানুষ কত কিছু পায়। তাদের তো কিছুই দিলা না তোমরা। এগুলো তো আগেও বলছি তোমারে। তুমি তো কিছুই করলা না আমার জন্য।

~ বার বার এক কথা বলোস। তোকে তো
আমরা বিয়ে দেইনাই। তোরা নিজেরা নিজেরা করছোস। তোর আব্বু তো তোর এই বিয়ে এখনো মানেই না। তাকে টাকার কথা বলছিলাম আমি। সব তো শুনছোস ই।
সে এক টাকাও দিবেনা। মা, আমি বলি কি, তোর আর সহ্য না হলে তুই চলে আয় না। তোর বাপের কাছে চলে যা। তোকে সে এখন আসলে এখনো ঘরে জায়গা দিবে। যতই হোক তুই তার প্রথম সন্তান তো। কী বলোস? আসবি?
~ না।

~ ক্যান? এমনেই ওইহানে পইড়্যা পইড়্যা মরবি ঠিক করছোস? তাইলে মর। আমারে আর ফোন দিস না।
~ ঠিক আছে। আমি মরি। তোমরা ভালো থাকো।
~ তানিশা!

~ আমি রাখলাম। আর কখনো আমার সাথে কথা বলতে হবেনা তোমার। তোমরা সবাই আমার থেকে মুক্ত। আমি মরবো।
~ তোর কী ওর কাছে ঠেকা আছে কোনো? বুঝেই তো গেছোস, ভালোবাসা টালোবাসা কিচ্ছুনা। তোর বাপের সম্পত্তি, টাকার লোভ শুধু। তুই আইস্যা পড়, তাদের মুখে ঝামা ঘষে।
~ আমি আসতে পারবো না। আসলে আব্বু আর যেতে দিবেনা। আমাকে এখানেই পড়ে থাকতে হবে, যত কষ্টই হোক।

কারণ আমি প্রেগনেন্ট। আমার পেটে রফিকের বাচ্চা বড় হচ্ছে।
অনু চৌধুরী আকাশ থেকে পড়লেন।
~ কি! কি বললি তুই!

~ হ্যাঁ। এত চকমকানোর কিছু হয়নাই। বিয়ে হইছে, বাচ্চা তো হবেই। আচ্ছা, তোমার মনে হয় বাবু হইছে আবার, তাইনা? বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসতেছে।
~ হ্যাঁ। তোর বোন হইছে।

~ আমার? আমার বোন তো একটাই। রাকা। তোমার এখন যে মেয়ে বাবু হইছে, সে আমার কিছুই হয়না। দূর সম্পর্কের বোন বলা যায়।
মূলত তুমিও এখন আর আমার কেউ হওনা।
তুমি এখন অন্যের বউ, অন্যের মা।
~ সে যাই হোক। এখন তাহলে কী করবি?
~ কিছুই না। এখানেই পড়ে থাকবো কাজের বুয়ার মত। তারপর একদিন মরে যাবো।
~ চুপ কর। এসব কোনো ব্যাপারই না। শুন, তুই আমার কাছে চলে আয়। কিছুদিন থেকে যা।
~ রফিক যেতে দিবে না।
~ রফিকের সাথে আমি কথা বলবো। তুই ওরে ফোন দে।
~ না আম্মু। ওর মুখের ভাষা খুব জঘণ্য। তোমাকে অপমান করে ছাড়বে।
~ করুক। তবুও দিস। আমি তার সাথে কথা বলবো।
~ কী বলবা?
~ তোর আব্বুর সাথে তোদের ভালো সম্পর্ক তৈরী করে দেবার রাস্তা করে দিব। এখন তো আর কিছু করার ও নাই। তুই তো ওকে ফেলে আসবিও না।
~ হ্যাঁ। আসবোনা। কারণ আমি রফিককে ভালোবাসি। আচ্ছা, আব্বুর সাথে কিভাবে সম্পর্ক ভালো করে দিবা?
~ তুই আর রফিক আমার কাছে একদিন আয়। সব বুঝিয়ে বলা যাবে।
~ আচ্ছা আম্মু, আসবো। এটা করলে তো খুবই ভালো হবে। কিন্তু আব্বু তো মনে হয়না জীবনে ও কোনোদিন রফিককে মানবে।

~ মানবে। না মাইন্যা যাইব্যো কই। পানিতে পড়লে সাঁতার না কাইট্যা যাইব্যো কই?
এসব শুনে তো তানিশা আপুর খুশির কোনো অন্ত নেই।
তার রাগের ইস্তফা ঘটতে শুরু করেছে।
সে কিছুক্ষন অন্যান্য কথা ও বললো।
অনু চৌধুরী কথার মাঝখানে ভেজা গলায় বলে ফেললেন,
~ তানিশা শুন, আরেকবার কী ভেবে দ্যাখবিনা?
~ কী?

~ শুন, আমার জানা~শোনা আছে। তুই আমার কাছে তোর সব গুছিয়ে চলে আয়।
~ আসবো তো। দেখি রফিককে বলে। ও রাজি হবে। কিন্তু কী জানা~শোনা আছে তোমার? আর সব গুছিয়ে আসবো বলতে?
~ রফিককে আনতে হইব্যো না।
~ কেন?

~ শুন, বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলার ব্যবস্থা করবো।
তুই আমার কাছে আয়, আমি তোকে তোর বাপের কাছে পাঠায়ে দেই। বিশ্বাস কর, তোর জীবন পাল্টে যাবে। এখনো সময় আছে।
তানিশা আপু হাপুস নয়নে আঁখি ভিজিয়ে ত্বরিতগতিতে জবাব দিলো,
~ ছি:! আম্মু! তুমি এটা কী বললা? তুমি কি আমাকে তুমি মনে করো নাকি?
অনু চৌধুরী বাঁজখাই গলায় চেঁচিয়ে বললেন,
~ মানে! কি বললি তুই!

সে স্তব্ধ গলায় বললো,
~ তুমি যে দুদিন পর পরই তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চা নষ্ট করতা, সেটা তো আমি জানতাম ই। আর তোমার খাওয়ার রুটিন ও ওরকম হতো। এসব আমাদের বইয়েই আছে। আর আমিও অনেক কিছুই জানি। তাছাড়া পাশের বাসার আন্টিদের কানাঘুষা আমার কান ছুঁয়েছিলো বহুবারই।

অনু চৌধুরী রাগে গোঙাতে গোঙাতে বললেন,
~ মাইয়্যা, তোর মুখ বেশিই খ্যুইল্যা গেছে। বেশিই বুইজ্যা গেছোস এই বয়সে। আমি তোর ভালোর কথা ভাইব্যা বলি আর তুই! আচ্ছা যা, তোর জীবন তোর। আমি আর কিছুই বলমুনা। আল্লার কিরা।

~ কিছু বলতে হবেনা। শুধু আব্বুর সাথে ভালো কানেকশনের পথ বলে দাও, আমার মৃত্যু না চাইলে। নইলে আমি বেশিদিন বাঁচবো না।
~ বাসায় আয় জামাইসহ। একটা কিছু ভেবে বের করা যাবে। আর তোর মরণের ভয় আমারে দেখায়ে কোনো লাভ নাই। তাই আর দেখাইস না।

এক মাসের মাথাতেই,
তানিশা আপু কল দিয়ে জানালো,
~ আম্মু আমরা আজকেই আসবো।
~ চলে আয়।
~ আংকেলের গাড়িটা পাঠাতে পারবা? ভাড়া নাই তো!
~ আচ্ছা পাঠাবো। জায়গার নাম বল।
~ টিক্কাতলী রোডে আসলেই হবে।
~ আচ্ছা।

খুব উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
~ শুনো, তুমি আজকে হাঁসের মাংস, দেশী মুরগী, চিতল মাছ, বোয়াল, শিং, কৈ, লাউ পাতা, শিমের বিচির ডাল, পোলাও, গরুর ঝোল করা মাংস রান্না করবা। সাদা ভাত আর ডাল~আলুর ভর্তা একদম করবা না। এগুলা এখন আমার অসহ্য লাগে। প্রতিদিন এগুলাই খাই। প্লিজ আম্মু!

এসব শুনে অনু চৌধুরীর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।
সে নিজেও এগুলো অনেক দিন চোখে দেখে না।
কিন্তু নিজের দুঃখী মেয়েটার এমন আবদার, ফেলাও যায়না।
ঢোঁক গিলে বললো,

~ আচ্ছা দেখি। তুই নিজেই নিজের ইচ্ছামত রান্না করে খাবি। আয়।
অত:পর তানিশা আপুর বর, রফিক, অধমের মত কিছু না নিয়েই অনু চৌধুরীর বাসায় আসলো।

আর এদিকে আজমল উদ্দীনকে দিয়ে অনু চৌধুরী কত রকমের বাজারই না করালেন, মেয়ে জামাইকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু জামাই এতটা ছ্যাঁচড়া হবে, তা কে জানতো!
আজমল উদ্দীনের গাড়ি হাঁকিয়েই রাজকীয় জামাইয়ের পদার্পণ হয়েছে।
ব্যাপারটা কতটা বেমানান, শ্বশুর সমতুল্য আজমল উদ্দীন গাড়ি চালাচ্ছেন আর তার সৎ মেয়ের জামাই, পায়ের উপর পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিমায় আসছে।
আজমল উদ্দীনের ও রফিককে বেশি একটা ভালো লাগেনি।

তার মতে, তানিশার মত এত সুন্দর, ফুটফুটে একটা মেয়ে বিয়ে করবে রাজপুত্রের মত কোনো ছেলেকে।

মেয়েটার বাপের ও তো কাড়ি কাড়ি টাকা।
সে কিনা বিয়ে করেছে এই অসভ্য, কুলাঙ্গারকে!
কি যে রুচি…
কথাটা অনু চৌধুরীর কানে তুলতেই অনু চোখ রাঙিয়ে তাকালো আর মিনমিন করে বললো,
~ এই একই ভুল তো আমিও করছি। কাড়ি কাড়ি টাকা, সম্পত্তি পালাইয়া তোমার চক্করে পইড়্যা সব হারাইছি। মেয়েও আমার পথ ধরছে এক্কেবারে।
জীবনডা এক্কেবারেই নিষ্ঠুর!

মেয়ে জামাইয়ের আদর~আপ্যায়ন অনু চৌধুরী তার সাধ্যমতই করলেন।
মেয়ের সাথে বনিবনার বিষয়টা নিয়ে জামাইকে বোঝালেন।
কিন্তু জামাই কেমন যেন অমনোযোগী।

চোখ টকটকে লাল। তাকানোই যায়না তার দিকে।
অনু চৌধুরী শুধায় একটা, সে শুনে আরেকটা, উত্তর দেয় ধরা~ছোঁয়ার বাইরে।
নেশা করে আসছে এই ছেলে। সারারাত মনে হয় সস্তা গাঁজা, ভদকা খেয়ে সকালে তড়িঘড়ি করে শাশুড়ির কাছে চলে এসেছে।

এই ছেলেকে তার স্বামী, রেজা চৌধুরী মরে গেলেও মেনে নিবেন না। তাই একে আগে মানুষ করতে হবে। এর আগে রেজা চৌধুরীর সামনে নেওয়া যাবেনা। নয়তো মেনে নেওয়া তো দূর, ঘরের ত্রিসীমানাতেও জায়গা দিবেনা।

রিমা খালা নেই।
আজকে নয় দিন খালার কোনো খোঁজ খবর নেই। খালার ফোন নষ্ট, ফোন চার্জে দিয়ে কথা বলতে হয়। এমনিতে বন্ধ হয়েই থাকে। আব্বু একটা ফোন কিনে দিতে চেয়েছিলো আমার জোরাজোরিতে।

কিন্তু খালার খুবই আত্মসম্মানবোধ।
সে কিছুতেই নিবে না।
দাদি এখন স্বাভাবিক।

বাসায় কয়েকদিন এসে থেকেও গেছে।
ফোনেও কথা বলে আব্বুর সাথে।
কিন্তু বাসায় এসে থেকে যাচ্ছেনা, কারণ তার কথা এখনো রাখেনি তার ছেলে।
আব্বু প্রতিদিনের ন্যায় আজ ও কাজে চলে গেছে।
আজ শুক্রবার, তবুও সে কাজে গেছে।
নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।

ভালো ফিডব্যাক পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংক থেকে আড়াই লাখ টাকা উঠিয়ে এনেছে কিছুদিন আগে।
অল্প অল্প করে নিচ্ছে আর ব্যবসার উন্নতি করছে। একসাথেই তুলে এনেছে কারণ কখন কত লাগতে পারে তার নিশ্চয়তা নেই। ওদিকে কাপড়ের ব্যবসাটাও উঠে দাঁড়িয়েছে। ভালো ভালো কিছু কাপড় ও দোকানে তুলতে হবে।

সব মিলিয়ে এখন টাকা হাতে থাকা ভীষণ জরুরি।
তাছাড়া ধোঁকা খাওয়ার পর থেকে আব্বুর অন্যরকম চিন্তাধারা জন্মেছে। টাকা বেশিদিন ব্যাংকে রাখতেও তার ভয় হয়, ভালো লাগেনা, রাতে ঘুম কম হয়।
তাছাড়া ব্যাংকের প্রিভিয়াস রেকর্ড ও ভালো না।

তার এখন বড় বড় কাজ~কারবারের সাথে শামিল হতে হয়। তাই কোনোভাবে টাকার হেরফের হলেই বহুত বড় লোকসান হয়ে যাবে।
দুপুরের দিকে আমি বারান্দায় বসে বসে বিস্কুট খাচ্ছিলাম আর গুনগুন করে গান গাচ্ছিলাম। আচমকা দেখলাম রিকশা এসে থেমেছে আমাদের গেইটের সামনে। ওটা কাকে দেখলাম আমি?

তানিশা আপু না!
আমি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালাম।
হাতের বাটি পড়ে গেছে হাত থেকে।
আমার শরীর কাঁপছে।
বিদ্যুৎের গতিতে দরজা খুলতে গেলাম।

দরজা খুলে যা দেখলাম,
তা চোখে… দেখে বিশ্বাস করার মত নয়!
আমার বুক ধড়ফড়ানি বেড়ে গেলো।
চোখ কঁচলে আবার দেখার চেষ্টা করলাম।
আমি যা দেখছি, তা কি সত্য?

পর্ব ১৭

দরজার সামনের এই দৃশ্য আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা। যে সম্পর্কে আমার বড় বোন হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না সে আমার বোন হয়। এটা কি সত্যিই আমার সেই স্টাইলিশ, ফ্যাশনদুরস্ত বোন, তানিশা?
না অন্য কেউ!

তার হাতে একটা বড় ব্যাগ।
সেই ব্যাগে কিছু আছে বলে মনে হয়না।
শুধু শুধুই এই এত বড় ব্যাগ বহন করে নিয়ে আসার অর্থ ও বেমালুম।
স্বাভাবিকভাবে, আমার তাকে দেখেই কেঁদে দেওয়ার কথা। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে মরা কান্না জুড়ে দিবো~এমনটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু আমার শুধু শরীরের কম্পন ব্যতীত আর কোনো উপদ্রব দেখা গেলো না।
যেন এটাই স্বাভাবিক।
আমি করুন কন্ঠে বললাম,
~ আপু, ভালো আছিস?
সে টান টান চোখে উত্তর দিলো,
~ ভালো আছি। তুই? ভেতরে ঢুকতে দিবি তো নাকি?
~ ও হ্যাঁ হ্যাঁ আসো!

তানিশা আপু তার হাতের এই বস্তা টাইপ ব্যাগটা আগে ভেতরে রাখলো।
আপু ভেতরে ব্যাগ রাখছিলো তখন আমি দরজা আটকাতে গেলাম। দরজা আটকানোর সময় অত খেয়াল ছিলো না কিছুরই।
আচমকা আপু চেঁচিয়ে উঠে বললো,
~ ওমা! রাকা, কী করছিস!

আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,
~ কী করছি! দরজা আটকাচ্ছি!
সে ব্যস্ত হয়ে আমার সামনে এসে বিরক্তি নিয়ে বললো,
~ তোর চোখে কি ছানি পড়ছে? তুই বাইরে দেখোস না তোর দুলাভাই দাঁড়ায়ে আছে? একটাবার তো ভালোর খবর ও নিলি না, তার উপর ওর মুখের উপর দরজা দিয়ে দিচ্ছিস!
আমি তাজ্জব বনে গেলাম। আমার দুলাভাই নাকি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। কই আমি তো আমার দুলাভাইয়ের মত কাউকে দেখছি না। অদ্ভুত তো!

জিজ্ঞেস করলাম,
~ কই আপু? আমি তো দেখতেছি না। কোথায় উনি? তুই বিয়ে করেছিস? কবে?
আপু রাগে গিজগিজ করতে করতে বললেন,
~ আজব। তুই বোকাই থাকবি আজীবন।
এই তুমি ওখানে দাঁড়ায়ে আছো ক্যান? আমার বোন তো তোমাকে দেখতেছে না। এদিকে আসো!

দুলাভাই সাহেব টগবগ করতে করতে চলে এলো আমার সামনে।
হাতে বিড়ি। গলায় নকল রুপার চেইন।
চুলের মাঝখানে ঠেঁসে ঝুটি বাঁধা।
এটাতো সেই ছেলেটা!

যার ছবি একদিন আমাকে দেখিয়ে আপু
জিজ্ঞেস করছিলো, ছেলেটা দেখতে কেমন।
আমি বোধ হয় বলেছিলাম, জঘণ্য।
তোঁতলাতে তোঁতলাতে জিজ্ঞেস করলাম,
~ আপু, এএইটা আমার দুলাভাই?
~ হুম। ওকে নিয়ে ভেতরে আয়। আমি রান্না চাপিয়েই গোসলে যাবো। বুঝলি?
আপু ভেতরে চলে গেলো।

দুলাভাই বিড়ি টানতে টানতে ভেতরে ঢুকলো। আমি দরজা আটকে আমার রুমের দিকে রওনা হলাম।
দুলাভাই পিছন থেকে বললো,
~ নাম কী তোমার? রাক্কা? উফ, কি নাম রে ভাই! একজনের নাম তান~ঈশা, আরেকজনের নাম রাক্কা!
যত্তসব ফালতু নাম রাখছে শ্বশুর আব্বা।

আমি চোখ ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে আবার ফিরিয়ে নিলাম।
সে এবার আমার সামনে এসে ধুঁয়া ছাড়লো, একদম আমার মুখের উপর।
তারপর বললো,
~ রাকা, শালিকা আমার! যাও! টেবিলে তাড়াতাড়ি খাওন দেও। খুব ক্ষিধা লাগছে।
আমি জবাব না দিয়ে জোর পায়ে হেঁটে চলে এলাম।

ভাবতেই অবাক লাগছে, এরকম একজন অসভ্য, রুচিহীন, বাজে লোককে আমার তানিশা আপু বিয়ে করেছে!
বাসায় কোনোপ্রকার রান্না নেই।
ডিম ভাজা দিয়েই পার করছি কিছুদিন, কারণ রিমা খালা আসছে না ইদানিং।
ছুটা বুয়ার ও খবর নেই।

তানিশা আপু নিজে ফ্রিজ থেকে মাছ, মাংস নামিয়ে এনে রান্না চাপিয়ে দিলো। ওদিকে দুলাভাই সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে ফুল স্পিডে পাখা ছেড়ে, হাই ভলিয়্যুম দিয়ে হিন্দি গান দেখছে। পেট, পিঠ দেখানো কি বিশ্রী নাচ! এসব বিনা দ্বিধায় সে আমাদের সামনেই দেখছে।
আপু কিছুই বললো না।

সে আপন মনে কাটাকুটি করে যাচ্ছে।
তাকে দেখতে দেখতেই আমি ব্যস্ত।
কি পরিবর্তন হয়েছে তানিশা আপুর!
মোটা হয়ে গেছে অনেক!
একদম আমাদের মা~খালার মত গড়ন হয়েছে।
চুলে এলোমেলো করে খোপা করা।

মাথাভর্তি তেল। বিদঘুটে গন্ধ সেই তেলের।
কে জানে হয়তো কেরোসিন হবে ওটা!
আমি আমার ড্রয়ার থেকে কয়েকটা শ্যাম্পু নিয়ে আপুর কাছে গেলাম।
জিজ্ঞেস করলাম,
~ আপু, গোসলে যা তুই। আমি দেখি এগুলো।

তানিশা আপু নাড়ানো বন্ধ করে দিলো সাথে সাথে। তারপর বললো,
~ কেন রে? আমার গায়ে দুর্গন্ধ খুব, তাইনা? সহ্য হচ্ছে না তোর?
~ ওমা! এসব কি বলিস! তুই_ই তো বললি রান্না চাপিয়ে গোসলে যাবি। তাই বললাম।
~ ওহ্। তো আব্বু কেমন আছে রে?
~ ভালোই।

~ কখন আসবে?
~ ঠিক নাই। বিকেলেই আসতে পারে। দেরীও হতে পারে।
সে তীক্ষ্ণাগ্র কন্ঠে বললো,
~ তোর দুলাভাইকে তোর পছন্দ হয়নাই, আমি জানি। কিন্তু কিছু বলিস না। যেমনই হোক, ও এখন আমার হাজবেন্ড। আর এটাই আমার কপাল। তাই ওর ব্যাপারে আমাকে আর কিছুই বলবিনা। ঠিক আছে?
~ ঠিক আছে।

আপু আমার দিকে ফিরে কথা বলছে দেখে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সে আসলেই মাত্রাতিরিক্ত মোটায়ে গেছে। চোখ ফুলে গেছে।
কাজের বুয়া, খালাদের মত তেলমাখা চুলের মাঝখানে সিঁতা করে খোপা করা।
আমি রীতিমত অবাক হচ্ছি তাকে দেখে।
এক ফাঁকে বলেই দিলাম,

~ আপু, তুই খুব চেইঞ্জ হয়ে গেছিস! এত মোটা হয়ে গেলি কিভাবে?
আপু হেসে উড়িয়ে দিলো কথাটা।

বললো,
~ বিয়ে হয়ে গেলে সবাই ই মোটা হয়ে যায়! হিহ্ হি!
~ কেন কেন? বিয়ে হলেই কেন মোটা হয়? আমি ও তো মাঝারি সাইজের মোটা। আমার তো বিয়ে হয়নাই। তাহলে? আমি বললাম।
~ ধুর তুই এখনো খুব অবুঝ। এগুলা এখন বুঝবি না! এগুলা বুঝতে হলে অনেক জানতে হবে।
আরো বড় হতে হবে। বিয়ে করতে হবে।

আপু আমার ৩/৪ বছরের বড় হবে।
অথচ তার ভাষ্যমতে, আমি একজন কচি খুকি আর সে একজন মধ্যবয়স্কা।
এমন সময় ড্রয়িংরুম থেকে চেঁচিয়ে উঠলো দুলাভাই।
~ তানিশা, ঐ বেয়াদবের বাচ্চা, আর কহন খানা দিবি তুই? পেটের আতুড়ি সব শুকাই গেলে দিবি? হারামজাদি কোথাকার!
আমি আচমকা এসব গালিগালাজ শুনে হকচকিয়ে গেলাম!
এসব কি বলছে লোকটা!

আপু কোনোমতে তার মুখের লাগাম ধামাচাপা দিতে দৌঁড়ে চলে গেলো তার কাছে। গিয়ে কিসব যেন বললো, তারপর লোকটা চুপ করলো।
আপু আবার আমার কাছে ফিরে এসে বললো,
~ রাকা, তুই শুধু নাড়া। লবণ হইছে কিনা দেখিস। না হলে এক চামচ দিয়ে দিস। আর ভাত ফুটলে ঢাকনা সরিয়ে আঁচ কমিয়ে দিস। আমি ১০মিনিটের মধ্যে গোসল সেরে আসতেছি। তুই কষ্ট করে দেখ একটু।

বলেই সে দৌঁড়ে বাথরুমে চলে গেলো।
যে তানিশার গোসল সারতে ঘন্টা দুয়েকেও পোষায় না, সে এখন ১০মিনিটের মধ্যে গোসল সেরে আসবে বলছে। যাকে কেউ সাধারণ কিসিমের ১টা কথা ছোঁয়ালেও সে ১০টা শুনায়ে দেয়, সে আজ বিনা কারণে তার স্বামীর কাছ থেকে একগাদা গালিগালাজ শুনেও কিছু না বলে নিচু গলায় কি কি যেন বলে, বুঝিয়ে ফিরে আসলো!
এসব কিভাবে সম্ভব, আমার জানা নেই।

আব্বুকে ফোন দিতে যাবো, তখনই দেখি দুলাভাই সাহেব আমাদের ড্রয়িংরুমের ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন করছেন। উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম কি করে। সে ফ্রিজ খুলে অবলিলায় যা পাচ্ছে, তাই খাচ্ছে। এমনভাবে খাচ্ছে যেন তার বাবার জন্মে ও সে এত খাবার চোখে দেখেনি।

সে খাওয়া শেষ করে সটান হয়ে শুয়ে পড়লো সোফায়। ততক্ষনে তানিশা আপু বেরিয়ে রান্নার কাজে লেগে পড়েছে।
সে বিদ্যুৎের গতিতে কাজ করছে আর মাত্রাতিরিক্ত হাঁপাচ্ছে।
এত হাঁপাচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না।
আমি গিয়ে হাতে হাত লাগাতে চাইলাম।

সে মানা করে দিলো। বললো,
~ তুই যা। তোর দুলাভাইয়ের সাথে বস গিয়ে। আমি এগুলা একাই করতে পারবো। আর বেশিক্ষন লাগবে না। এটা ওটা বলে ১৫ মিনিট ভুলায়ে রাখ। ওর আবার একটু রাগ বেশি তো! আমি সব রেডি করছি। আর একটু!
আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম,
~ কী দরকার? তার এখন পেট ঠান্ডা। মাথাও ঠান্ডা।
~ মানে?

~ সে নিজেই ফ্রিজ খুলে যা যা খাওয়ার সব খেয়ে নিছে। তুমি এখন আস্তে আস্তে নিশ্চিন্তে কাজ করো। চিন্তা করোনা। ফ্রিজে অনেক খাবারই ছিলো। সে অনেকক্ষন লাগায়েই খাইছে। আমি দেখছি।
আমার কথা শুনে তানিশা আপু সামান্য লজ্জ্বা পেয়ে গেলো।
সে তরকারির আয়োজন এমনভাবে করছে যেন এসব তার আর তার স্বামীর আগে থেকেই প্ল্যান করা। একদম প্ল্যান মোতাবেক সব চলছে।
আপু একা হাতেই সবটা সামলাচ্ছে।

আমাকেও কাছে~ধারে ঘেষতে দিচ্ছেনা।
সে কিছুক্ষন পর পরই বুক ফুলিয়ে, জোরে জোরে শ্বাস নেয়। চোখ যেন বেরিয়ে যায় তখন। আর মাঝেমধ্যে তলপেটে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলছে। হয়তো কোনো কিছুর তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করছে।

মনে হচ্ছে, কিছু তরকারির ঝাঁজ আর গন্ধ সে সহ্যই করতে পারছে না। আঁচল দিয়ে নাক চেপে ধরে তরকারি নাড়াচ্ছে। আপু খুব অসুস্থ, বোধ করছি।
আমি কয়েকবারই টুকটাক করতে গেলাম।

কিন্তু ও কি ভেবে যেন আমাকে কিছুই করতে দিলো না।
জোরাজোরি করায় বললো,
~ আহ্ হা রে! তুই গিয়ে ওর সাথে একটু বস না।

আম্মু নাই, বাসায় কি খাইছোস না খাইছোস তোরা, তা কি আমি বুঝিনা? শান্তিমত একটু কিছু খাওয়াতে দে, খেতে দে। আমি নিজেও যে খাইয়্যা ভাসায়ে ফেলছি এমন না। একটু নিজের মত করে রাঁধতে দে। আজ আসুদা পুরাইয়া খাবো রে।

আমি ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইলাম।
এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপুর কষ্ট দেখাই ঢের ভালো, দুলাভাইয়ের কাছে গিয়ে তার নোংরামি আর তার গায়ের অমন বিশ্রী, পাঁঠার মত বোটকা গন্ধ সহ্য করার চেয়ে।
এমন সময় দুলাভাই আসলেন হনহনিয়ে।

এসেই রক্তচক্ষু নিয়ে তানিশা আপুর ঘা ঘেষে দাঁড়ালেন।
~ আর কতক্ষন লাগাবি তোর রান্ধন শেষ কইরতে? খাইতে না দেওয়ার ফন্দি, না?
আপু তার দিকে ফিরে পিটপিট করে তাকিয়ে, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
~ তুমি একটু বসো! এইতো শেষ! অনেক আইটেম তো, তাই দেরী হচ্ছে! এইতো ভাতের মাড় গালবো এরপর শুধু মুরগীটা ভাজবো। অল্প কিছুক্ষন আর।

কথাটা শেষ না করতেই দুলাভাই আমার সামনেই অকথ্য ভাষায় কিছু গালিগালাজ করলো তানিশা আপুকে। সেসব লিখলাম না আর।

এই অশ্লীল গালিগুলো আমরা সবসময়ই কোনো না কোনোভাবে শুনি।
কিন্তু লেখক তার গল্পে লিপিবদ্ধ করলে কিছু পাঠক বলবে, লেখক কি অশ্লীল!
এই লেখকের গল্প আর পড়া যাবেনা!

দুলাভাইয়ের কান্ডকির্তী আমার জন্য একেবারেই নতুন। এরকম কিছু আমি জীবনেও দেখিনি।
তাই তাজ্জব বনে শুধু দেখেই যাচ্ছি।
আপুর লজ্জ্বায়, কষ্টে চোখ ভিজে গেলো।
সে মিনমিনিয়ে শুধু বলছে,
~ একটু দাঁড়ান না। শেষ তো, এইতো।
বলে সে ভাতের মাড় গালতে যাবে তখনই দুলাভাই চুল ধরে টান দিলো।
ব্যস, ভাতের মাড় পড়ে গেলো তার হাত বেয়ে পেট অব্দি। তানিশা আপু চিৎকার করলো না।

শুধু চোখের জলের পরিমাণ বেড়ে গেলো।
এরকম অবস্থায় তার জোরে চিৎকার~চেঁচামেচি করে বাসা উঠিয়ে ফেলার কথা ছিলো।
কারণ আপু সবসময়ই একটু বেশি আধিখ্যেতা, ঢং টাইপ স্বভাবের।

সেখানে সে চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করলো না। বেশ শান্তভঙ্গিতেই মাড় ফেললো। তারপর উঠে মগভর্তি পানিতে হাত ভিজিয়ে রাখলো। পেটে বেশি পড়েনি। তবুও ভেজা কাপড় দিয়ে ধরে রাখলো কিছুক্ষন। আমি থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
কি করবো না করবো বুঝতেছি না।

দুলাভাই আমার দিকে তাকিয়ে তারপর ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে যেতে যেতে বললেন,
~ তানিশা তাড়াতাড়ি খানা দে কইলাম। আমার রাগ উঠাইস না।

দুলাভাই যাওয়ার পর আমি আপুর কাছে ঘেষবো তখনই সে আবার কাজে লেগে পড়লো। আমি আপুকে বললাম, সরে যাও, তুমি রেস্ট নাও।
কিন্তু সে আমার কোনো কথাই কানে তুললো না।
কি অদ্ভুত!

আমার এত ছোট বোনটাও আজ কত বড় হয়ে গেছে!
তাকে দেখে আমার সন্দেহ হলো।
নিশ্চয় তার কোনো বড় অসুখ হয়েছে।
কেমন কেমন যেন করছে।
আব্বুকে বিষয়টা জানাতে হবে।
আমাদের খাওয়ার পর্ব শেষ হলো।

তানিশা আপু এত কষ্ট করে রাঁধলো কিন্তু সে তৃপ্তি করে কিছুই খেতে পারলো না। শুধু ছোট মাছের টক নিলো একটু, আর শেষ পাতে নিলো কচুর লতি দিয়ে রাঁধা চিংড়ি। ওর রাঁধার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিলো আজ বুঝি সব ও একাই খেয়ে নিবে। অথচ তার খাওয়ার এই বেহাল দশা দেখে আমি চুপসে গেলাম।

কিন্তু তার জামাই কব্জি ডুবিয়েই খেয়েছে।
সব খাবারের তিন চতুর্থাংশই তার পেটে বাঁধা পড়েছে। সে চিকনাচাকনা হলেও একজন প্রথম শ্রেণীর পেটুক। বলা সমীচীন।

খাওয়া শেষে তানিশা আপুরা দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি প্রস্তুতি নিয়ে বসেছিলাম, আজ আপুর সাথে গল্পসল্প করবো। কিন্তু তা আর হলোনা। আব্বুকে ফোন দিলাম। তাকে ফোনে পাওয়া গেলো না।
এখন বাসায় একটা ভালো ফোন আছে।
ওটা আমার জন্যই আনা হয়েছে।
আমি চুপ করে বসে আছি।

হাতে কমিক্সের বই। অমন সময় দেখলাম ফোন বাজছে।
নাম্বার অজানা, তবুও চেনা।
কারণ ঐ নাম্বার যে আমার মুখস্ত!
অনু চৌধুরীর ফোন!
আজ সব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে।
তানিশা আপু হুট করে এসে হাজির হয়েছে।
এখন আবার অনু চৌধুরীর ফোন! এতদিন পর তার আমার কথা মনে পড়লো?
অনিচ্ছাসত্ত্বে ও ফোন রিসিভ করলাম।
~ হ্যালো।

~ হ্যাঁ মা, আমি তোর আম্মু। কেমন আছিস মা?
~ জানি। ভালো।
~ কী করছিস? খাওয়া~দাওয়া হইছে?
~ হুম।
~ বাসায় কেউ গেছে?
~ জানোই যখন তখন জিজ্ঞেস করো কেন?
~ আমার সাথে তুই সবসময় এইভাবে কথা বলিস ক্যান রাকা? কারা গেছে বল।
~ তানিশা আপুরা আসছে।
~ ও.. তানিশারা কখন গেছে? (না জানার ভান)
~ সকালের দিকেই।

~ এখন কী করে?
~ জানিনা।
~ কেন? তুই তানিশার কাছে যাস নাই? এতদিন পরে নিজের বোনটারে কাছে পাইলি!
~ গেছি। ওরা এখন দরজা বন্ধ করে রেস্ট নিচ্ছে।
~ ও। তোর শরীর ভালো আছে? সব ঠিকঠাক?
~ হুম।

~ তোর যে আরেকটা বোন হইছে জানিস?
~ না।
~ কয়ডা নাম ক দেহি। ওর নাম রাখবো তোর পছন্দে।
~ আমার তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করতেছেনা। রাখি।
~ আচ্ছা শুন, তুই তানিশার জামাইয়ের কাছাকাছি কম ঘেষবি। না পারতে কথা বলবি। ঠিক আছে?

~ কেন?
~ আমি বলছি তাই।
~ আর রাতে দরজা লাগায়ে ঘুমাবি। তোর আব্বু আসবে কখন?
~ জানিনা।
~ আচ্ছা, তোর আব্বুর তো ঘুমের সমস্যা আছে। জানিস?
~ না।

~ তুই উনাকে রাতের খাবারের পরে ঘুমের ঔষধ খেয়ে শুতে বলবি। তাহলে দেখবি, সুস্থ হয়ে যাবে অল্পদিনেই।
~ আচ্ছা। তোমার এত চিন্তা কেন? তুমি তোমার নতুন মেয়ে নিয়ে ভালো থাকো না। আমি রাখলাম।
~ শুন, রাকা..
আমি আর সুযোগ দিলাম না।
রেখে দিলাম।

আব্বুর যে রাতে ঘুমের সমস্যা হয় সেটা আমি জানি। কিন্তু আব্বু এই সমস্যার জন্য ঘুমের ঔষধ খায় কিনা তা আমার জানা নেই।
আজ আসলেই বলবো।
এতদিনে অনু চৌধুরী একটা ভালো কাজ করেছে!
বলতেই হয়!

আপুর দরজার সামনে গিয়ে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিলাম।
~ আপু, এই আপু, বাইরে আয় না।
ভেতর থেকে কড়া গলায় পুরুষালি আওয়াজ এলো,
~ ঐ ঘুমানোর টাইমে প্যাঁচাল পাড়িস ক্যান? যা এইখান থেকে।

কিছুক্ষন ধস্তাধস্তির আওয়াজ ও পাওয়া গেলো। তারপর আপু বেরিয়ে এলো।
আমরা সুখ~দু:খের গল্প করলাম কিছুক্ষন। আপুর গড়নে পরিবর্তন আসলেও কথার ধরণে সেই আগের আঁচই রয়ে গেছে।

কথার এক ফাঁকে মুচকি হেসে বললো,
~ রাকা জানিস, আম্মুর যে আবার একটা মেয়ে হইছে?

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, হুম আজকেই জানছি।
সে আরো লজ্জ্বিত হয়ে কণ্ঠস্বর নরম করে বললো,
~ কি সুন্দর দেখ! আমরা মা মেয়ে দুজন একসাথেই বাচ্চার মা হচ্ছি! হিহ্ হি!
আমি হকচকিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ মানে? বুঝলাম না।

সে চোখ~মুখে উত্তেজনা আর হাসি চেপে বললো,
~ আরে বোকা, তুই খালামণি হবি কিছুদিনের মধ্যেই! হাহ্ হা হা!
আমি হাসার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু পারলাম না। বরং অবাক হলাম।
সবাই কত বিয়েসাদিতেই না যায়।

কত অনুষ্ঠান, কত আনন্দ~ফুর্তি হয় সেখানে।
তারপর গিয়ে তাদের বাচ্চাকাচ্চা হয়!
অথচ আমার ফ্যামিলিতে দু দুটো বাচ্চা চলে আসছে অথচ একটা বিয়েও সাধারণ বিয়ের মত হলো না!
আমি তো তাদের বিয়ে হতেই দেখলাম না।
রিমা খালার ও তো বিয়ে হলোনা, বাচ্চাও আর হলোনা। এই বিষয়গুলো আব্বুকে জানাতে হবে। কিছু প্রসেস কিভাবে হয় কিছুই বুঝিনা।

গুগল ক্রোমেও উত্তর মিলেনা। আব্বুই তো আমাকে সব বোঝায়। তাই সেই আমার একমাত্র ভরসা। আসুক সে, আজকেই বলবো।
বিকেলের দিকে আব্বু ফোন দিলো।
~ হ্যালো রাকা। কী করো মা?
~ শুয়ে আছি। গেইম খেলছিলাম এতক্ষন।
আব্বু তুমি আজকে কখন আসবা?

~ মা, আজকে তো মনে হয় রাতে ফিরতে পারবো না। তোমার রাহেলা আন্টিকে ফোন দিয়ে বলবো, আজ যেন তোমার সাথে থাকে।
~ তার আর দরকার নেই।
~ কেন?
~ তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসো আব্বু! প্লিজ!
~ বললাম তো, চাপে আছি আজ।

~ রাখো তো তোমার কাজ! তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে! প্লিজ আব্বু, তাড়াতাড়ি আসো।
~ সারপ্রাইজ পরে দিবা। এখন রাখি। আজ ফিরবো না। আগামীকাল সকালে দেখা করে যাবো। আল্লাহ হাফেজ।
~ আব্বু! শুনো, তানিশা আপু বাসায় আসছে আজকে। তুমি আসবানা?
আব্বুর মুখ দিয়ে আর কোনো কথাই বের হলো না।
আমি কিছুক্ষন হ্যালো হ্যালো করলাম।
কোনো সাড়া শব্দ নেই।

ফোন কেটে গেলো।
কিছুক্ষন বসে থেকে চেষ্টা করলাম বার বার।
আব্বু আর ফোনই তোলেনা। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই লক্ষ্য করলাম, তানিশা আপু আর দুলাভাই আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
আপু কঠিন চোখে জিজ্ঞেস করলো,
~ কিরে? আব্বুকে বলে দিয়েছিস আমি যে আসছি? আসতেছে নাকি এখনি?
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ হ্যাঁ। তবে এখন আসছে কিনা জানিনা।

পর্ব ১৮

তানিশা আপু তার কথার উত্তর পেয়েই আবার চলে গেলো। তারা হঠাৎই যেন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লো। দুলাভাই একপ্রকার টেনে হিঁচড়েই নিয়ে গেলো তাকে। আমার রুমটাই হয়েছে এখন তাদের থাকার রুম। আমি কখনো আব্বুর রুমে, কখনোবা এক্সট্রা রুমে গিয়ে গিয়ে দিন কাটাচ্ছি।
সন্ধ্যা হয়ে এলো।
দরজায় কলিংবেল বাজছে।

আমার কেন যেন মনে হলো অনু চৌধুরী এসেছে। কিছুক্ষন চুপ হয়ে বসে ছিলাম। ভাবলাম আপু এসেই খুলুক। কিন্তু ওরা আবার দরজা আটকিয়ে কি যেন করছে।
আপুর দরজা খোলার সম্ভাবনা নেই।
তার সব কাজ ঐ বন্ধ রুমে, রফিকের ওরফে আমার দুলাভাইয়ের সাথে।
আমিই দরজা খুললাম।

আব্বু এসেছে। যাক, অনু চৌধুরী ফেরেনি!
তার চোখ মুখ কেমন যেন পরিষ্কার।
দরজা খুলতেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ আম্মু, তোমার আপু কই? তুমি না বললা ও আসছে? কই আমার মেয়ে?
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, হুম আসছে তো।
ঐ যে ওখানে।

আব্বু যেন খুশিতে আত্বহারা হয়ে গেলো।
গলা ছেড়ে ডাকলো,
~ তানিশা… তানিশা… কই তুই মা..
তার হাতের ব্যাগ আমিই নিয়ে রেখে দিলাম।
তার কোনোদিকেই কোনো হুঁশ নেই খুশিতে, উত্তেজনায়।
এখন যেন তানিশা আপুকে একবার দেখাই তার জন্য এভারেস্ট জয়ের মত আনন্দের সমতুল্য।

আমি দরজার কাছে গিয়ে জোরে জোরে ডাকলাম,
~ আপু, বেরিয়ে আয়! আব্বু আসছে।
পাঁচ মিনিট পরই সে দরজা খুলেছে।
আব্বু তখন ও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে আর হাতে হাত ঘষছেন ক্রমাগত। এটা হচ্ছে আব্বুর মাত্রাতিরিক্ত উত্তেজনার লক্ষণ।

আপুকে বেরিয়ে আসতে দেখেই সে দৌঁড়ে চলে গেলো তার কাছে।
গিয়ে দুই হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে বললো,
~ মা, তুই ফিরে এসেছিস? তুই আমার সাথে এটা করতে পারলি? তুইও এত কষ্ট দিতে পারলি আব্বুকে? তুই জানিস না তানিশা, তোরা আমার কলিজার টুকরা। আমি তোদের ছাড়া বাঁচতে পারবো না। আমার সবকিছু তো তোদের জন্যই।
তানিশা আপু আব্বুকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কান্না শুরু করে দিলো। আব্বুও নিঃশব্দে কাঁদলো।

কিছুক্ষন পর,
আপুর পিছন থেকে সামনে এসে দাঁড়ালো রফিক ওরফে আমার বাউণ্ডুলে দুলাভাই সাহেব।
আব্বু দুলাভাইকে দেখা মাত্রই তানিশা আপুকে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
~ এই এইটা কে! এ তোদের সাথে এখানে কী করছে? এখানে ঢুকতে দিলো কে ওকে?
সে হুট করে দেখেই চিনে উঠতে পারলো না তাকে।

তানিশা আপু ঠোঁট কামড়াচ্ছে আর ভয়ে নিচের দিকে মাথা দিয়ে রেখেছে।
আব্বু এবার রুঢ় কন্ঠে রফিককে বললো,
~ এই তুমি এখানে কেন? এখানে আমার বাসায় ঢুকছো কিভাবে?
সে দাঁত বের করে হাসছে।

তারপর আঙুল দিয়ে দাঁতের চিপা থেকে কি যেন বের করতে করতে বললো,
~ আব্বা, আপনি বুঝতেছেন না আমি কে? হিহ্ হি।
এরকম একটা উদ্ভট, বখাটে ছেলের মুখে
‘আব্বা ডাক শুনে আব্বু বিকারহীন হয়ে গেলো।

~ আব্বা মানে? মস্করা করো? থাপড়ায়ে গালের দাঁত ফেলে দিবো। বেয়াদব।
তারপর উত্তরের আশায় তানিশা আপুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ তানিশা, এটা কে? এখানে ঢুকলো কিভাবে?

সে প্রচন্ড উত্তেজনায় দুলাভাইয়ের চেহারা মনে করে পারছে না। সে আবছা আবছা চিনতো।
তানিশা আপুর কপাল কুঁচকে গেছে।
সে অনিমেষ চোখে ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত করে উত্তর দিলো,
~ আব্বু, ও..মানে..ও…ও হচ্ছে রফিক। আমার হাজবেন্ড!
কথাটা শুনেই আব্বু এক পা পেছনে নিয়ে মৃদ্যুস্বরে বলে উঠলো, কি!

তারপর রক্তচক্ষু নিয়ে বললো,
~ তোর এত বড় সাহস, তুই এই ছেলেকে নিয়ে আমার বাসায় ঢুকছোস? তোর মা তোকে বলেনাই কিছু?

তানিশা আপু আমতা আমতা করে বললো,
~ বলছে তো। তুমিই নাকি বলছো, আমি যেন ফিরে আসি তোমার কাছে।
~ হ্যাঁ আমি বলছি তুই ফিরে আসতে।
কিন্তু এই ছেলে আসছে কেন? ওকে তো দেখলেও আমার ঘেন্না লাগে। ওকে নিয়ে আসতে বলিনাই আমি। বলছি?

তানিশা আপু বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
~ আব্বু, আমি এখন আর একা নই। আমার সাথে এখন ও জড়িয়ে আছে। আমি মানেই ও। আমাকে আসতে বলা মানেই ওকে আসতে বলা। এখন তো বিয়ে হয়েই গেছে। এখন তো মেনে নাও আব্বু! আর মুখ ফিরিয়ে নিওনা। প্লিজ!

~ তোর স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হচ্ছি তানিশা! তুই আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস? আমাকে? তুই এই ছেলেটাকে ছাড়তে পারবিনা, ঠিক আছে! থাক তুই ওর সাথে। কিন্তু আমার কাছে কেন আসলি তাহলে? আমি এই ছেলেকে কোনোদিন মেনে নিবো না। মরে গেলেও না।
~ তাহলে কার কাছে যাবো আব্বু? কেন মেনে নিবানা?

~ জানিনা। তোর তো গুণবতী মা আছে। তার কাছে যা। সে তো তোকে নিজেই বিয়ে দিয়েছে। নিজের পথের অনুসারী বানাইছে তোকে। মেনে নিবো না কেন, সেটা অনেবার বলা হইছে।

~ আব্বু, আম্মু তো এখন আর শুধু আমাদের আম্মু নাই। এখন সে অন্য কারো আম্মু, অন্য কারো বউ। আমি কিভাবে তার কাছে গিয়ে থাকবো? ওখানে আম্মুর নতুন সংসারে আমি কেন যাবো? আর এইটা তো আমারো বাসা। এখানে আসবো না তো কই আসবো?
~ মুখে মুখে তর্ক করবিনা একদম।

বলে আব্বু সামান্য চুপ করে গেলো।
হয়তো সে এখন মনে মনে ভাবছে,
অনুর কি ওখানে বাচ্চাও হয়ে গেছে?
এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে অনু?

কিচুক্ষন পর কঠিন গলায় বলার চেষ্টা করলো,
~ তানিশা, তুই এখনি আমার বাসা থেকে চলে যা। এখনি। নইলে খুব খারাপ হয়ে যাবে বললাম।

দুলাভাই উঠে বললো,
~ আব্বা, আমার মধ্যে আফনে এমন কি সমস্যা দেহেন বলেন, আমি ঠিক কইর‍্যা ফালাই। আর প্যাঁচাল কইরেন না তবুও। আফনে এখন ব্যবসায় নাই, ঘরে আইছেন আব্বা। বোঝেন একটু। আমি ছেলে হিসেবে খুব ভালো দেইখাই তো আপনার মত একজনের মাইয়্যারে বউ হিসাবে পাইছি। বোঝেন না ক্যান!

আব্বু তার কথা শুনে আরো চটে গেলো।
সে উঠেই ঠাঁস করে একটা চড় বসিয়ে দিলো রফিকের গালে।
রফিক রাগে সাপের মত শব্দ করছে, ফোঁসফোঁস।
তানিশা আপু মুখে হাত দিয়ে দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে।
দুলাভাই আপুর দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বললো,
~ তানিশা, তুই তোর বাপরে ক, সে কামডা ঠিক করেনাই। একেবারেই ঠিক করেনাই। এইডার মাশুল তারে দিতে হইবো।

আব্বু রফিকের কলার ধরে অগ্নিদৃষ্টিতে বললো,
~ ঐ বেয়াদবের বাচ্চা, তুই আমার সামনেই ওকে তুই তুকারি করছিস? আমার মেয়েকে থ্রেট দিচ্ছিস? ঐ শুওর, তোর এত বড় সাহস হয় কি করে?
তানিশা আপু তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আব্বুকে সরিয়ে নিলো।
আমি কিছুই করছি না।
শুধু দেখছি।

কারণ আমার মনে হচ্ছে এসব অবাস্তব কিছু অথবা আমার কল্পনা।
আব্বুকে সরিয়ে এনে তানিশা আপু পূর্ণ দৃষ্টি রেখে বললো,
~ আব্বু, তুমি এটা ঠিক করোনি। ও চলে যাবে আজকেই। এইতো কিছুক্ষন পর।
আব্বু রুঢ় কন্ঠে বললো,
~ তুই ও চলে যাস। আমার তোর মত মেয়ের দরকার নাই। এত নিচ প্রকৃতির মেয়ে না থাকাই ভালো।

~ সত্যি? আমি নিচ প্রকৃতির? আমি চলে গেলেই খুশি হবে তুমি?
~ হ্যাঁ।
~ বাহ্, কিন্তু আমি তো ভাবলাম তোমাকে তোমার নাতির মুখ দেখিয়ে তবেই ফিরবো। ও ততদিন এখানে থাকবেনা। কারণ ওকে তোমার পছন্দ না।
কথাটা শুনেই যেন আব্বুর রাগ~অভিমান সব ধুঁয়ে জল হয়ে গেলো।
সে পূর্ণ নজরে বিস্ময়ের চোখে বললো,
~ কী বললি তুই? নাতির মুখ মানে?

তানিশা আপু করুন চোখে তাকিয়ে চোখের পল্লব কাঁপাতে কাঁপাতে বললো,
~ তুমি আমাকে দেখে এখনো বোঝোনি? আর কিভাবে বোঝাবো?
এই কথা বলেই সে অন্যদিকে ফিরে গেলো লজ্জ্বায়। তারপর গম্ভীর গলায় বললো,
~ রফিক এখনই চলে যাবে আব্বু।
ও আমাকে দিতে আসছে।

একা একা চলতে~ফিরতে পারিনা তো তাই। এখনি চলে যাবে।
আব্বু সামান্য কঠিন গলাতেই না পারতে বললো,
~ না। তুইও চলে যা। তুই আমার কাছে থাকলে এই ছেলেকে ছেড়ে দিতে হবে। ব্যস। আমার এক কথাই।

তানিশা আপু এবার আব্বুর দিকে ফিরলো।
দুলাভাই চড় খেয়েই হনহনিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফেলেছে। তাই সে এখন এখানে নেই।

তানিশা আপু প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে কপাল কুঁচকে বললো,
~ আব্বু, আআমি আসলে ওকে ছেড়ে চলে আসছি। কারণ তুমিই বলো,
আমি কিভাবে ওরকম একটা পরিবেশে থাকবো সারাজীবন…কিন্তু তোমার জামাই ছেঁড়ে দিয়েছি শুনেও আমাকে একা ছাঁড়েনি।

তার আমাকে নিয়ে তোমার মতই কত দুশ্চিন্তা। সে বলেছে, সে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবে শুধু। তারপর চলে যাবে। আর কখনো আমি না চাইলে আসবেনা। বুঝলা এবার, মানুষয়া কতটা ভালো?

আব্বু যেন আশ্বস্ত হয়ে গেলো আপুর মুখে এরকম কিছু শুনে।
সে ভাবতেও পারেনি এই মুহূর্তে এরকম কিছু শুনতে পারবে বলে।
সে তানিশা আপুর মাথায় হাত রেখে বললো,
~ আসলেই? তুই সত্যি বলছিস তো?

তানিশা আপু হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নাড়ালো।
আব্বু আবার উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
~ আমার বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তুই সত্যিই ওকে ছেড়ে দিয়েছিস? সত্যি?
~ হ্যাঁ আব্বু। সত্যি।

~ তো, হঠাৎ কিভাবে ছেড়ে দেওয়ার মত কারেক্ট চিন্তাটা মাথায় আনলি?
আপু নাসিক্য ধ্বনি প্রয়োগ করে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
~ কারণ আমি আর তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারছি না আব্বু। বিশ্বাস করো! তুমি তো আমার ভালোই চাও। তুমি যখন চাও_ই না তখন ঠিক আছে। রাখবো না আমি এই সম্পর্ক।

আম্মুও তো তাই বুঝাইছে। তোমরা তো আমার ভালোই চাও। কেন যে আমি এমন করত গেলাম..
আব্বুর মুখে সামান্য হাসির আভা।

~ তাহলে ও এইভাবে কথা বলতেছিলো কেন? আব্বা আব্বা করতেছিলো কেন?
~ ও মুখে কিছু বলে না আব্বু। শুধু রাগ দেখায় সবার উপর। ওর সাথে আমার কিছু না থাকলেও আমি তো আজীবনই ওর স্ত্রী হয়েই থাকবো। আর আমি ওর স্ত্রী মানে তুমি ওর আব্বা। তাই বলছে হয়তো। মানুষটা তোমার মেয়েকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে নিজে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে, অথচ তুমি তাকে বিনিময়ে চড় দিলা। তাই কষ্ট পেয়ে… যাই হোক। বাদ দাও ওর কথা।

~ এসব তো আগেই বলতে পারতি। প্রথমে এত নাটক করলি কেন? প্যানপ্যানিয়েই তো মাথা গরম করলি। আচ্ছা, তুই এখনি ওকে চলে যেতে বল।
~ আচ্ছা।
~ আচ্ছা শুন, ডিভোর্স পেপারে সাইন করছে ও? অফিশিয়ালি ডিভোর্স হইছে?
~ না আব্বু। সেই ব্যবস্থা তো তুমি করবা। তুমিই করে দিও।
~ আচ্চা, ওকে ওর নাম্বার রেখে যেতে বলিস।

~ তুমিই বলো না।
~ না। আমার ওই ছেলের সাথে কথা বলার রুচি নেই।
~ আচ্ছা আব্বু। আমি বলে দিচ্ছি। ও এখনই চলে যাবে।
কথা শেষ না হতেই রফিক সাহেব দরজা খুলে বেরোলেন। বেরিয়েই তানিশা আপুর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন।

আপুও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তারা যেন চোখে চোখেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা সেরে নিলো।
দুলাভাই আব্বুর সামনে এসে সালাম দিয়ে বললো,
~ আব্বা, গেলাম। আপনার মেয়েরে রাইখ্যা গেলাম কিন্তু। বলে আবার হাসছে।

আব্বু চেয়ারে বসে আছে নিচের দিকে তাকিয়ে। সে তার কথার ভ্রুক্ষেপ ও করলো না।
এই কথা শেষে আবার কিছুটা টিটকারির ছলে বললো,
~ শ্বশুরআব্বা, আপনি এত নিষ্ঠুর ক্যান? প্রথম মেয়ে জামাই আমি, অথচ আফনে আমারে কিছুই দিলেন না। আজকে যাও দিলেন তাও ভালো কিছু দিলেন না। চড় দিলেন! আপনার ব্যবস্থা করা যায় কিভাবে বলেন তো?

শেষের কথাটা বললো খুব আস্তে।
আব্বু সামান্য শুনতে পেয়েছে হয়তো।
কিংবা শোনেনি।
সে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে চেয়ার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ভেতরে চলে গেলো।
আব্বু চলে যাওয়ার পর দুলাভাই আমার সামনেই তানিশা আপুকে জড়িয়ে ধরে বেদমে কিছুক্ষন চুমু খেলো।

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
আমার এখনই এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।
উঠে দাঁড়াতেই সে আমার সামনে এসে বললো,
~ শালিকা, গেলাম হ্যাঁ? খাওয়া দাওয়া কি ঠিকমত করোনা? শরীরের মাংস তো ঠিক জায়গায় নাই দ্যাখতাছি। বলে এত বাজেভাবে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো যে আমার লজ্জ্বায় ইচ্ছা করছিলো মরে যাই। আমি দৌঁড়ে চলে গেলাম বারান্দায়।

আপু দেখলাম হাস্যজ্জ্বল চোখে বললো,
~ ধুর! তুমিও না! ও এরকম ইয়ারকি বুঝে না। আচ্ছা এখন তাহলে যাও..
দুলাভাই চলে গেলেন।

অনু চৌধুরীর আজমল উদ্দীনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে সকালে।
সে আজমল উদ্দীনের বাড়িতে যেতে চায়।
কিন্তু আজমল উদ্দীন নিতে নারাজ।

~ আচ্ছা, এত জেদি কেন তুমি? তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে কোথায় থাকবা অনু? তোমাকে তো সব বলছি, ওখানে আমার কোনো ঘর~দুয়ার নাই। মাঝেমধ্যে ভাইদের সাথে গিয়া দুদিন থাকি, এই। বাড়িতে কয়দিন কাটায়ে আবার শহরে, তোমার কাছেই তো চলে আসি। এখন তোমাকে গ্রামে নিলে কোথায় রাখবো আমি? বলো!

~ ক্যান? তুমি যেইহ্যানে থাকতে পারো, ওইহানে আমি ক্যান পারুম না? তোমার ভাইদের বাড়িতে না হয় আমিও থাকলাম। সমস্যা কী এইহানে, বুঝতাছি না আমি।
~ কেন? কী দরকার?

অনু চৌধুরী শীতল গলায় বললেন,
~ দ্যাখো, অধিকার ছাইড়্যা দিলেই লস। তোমার বাপের বাড়িতে তোমার ও অধিকার আছে। তোমার ভাইগো নিজস্ব বাড়ি আছে, তোমার নাই ক্যান? তোমারো তো লাগবো। তোমার বউ বাচ্চা নাই নাকি?

~ আমার লাগবেনা। আছে, সেই ব্যবস্থা আমি করবো। শ্রীগ্রই করবো। তোমার এত ভাবা লাগবে না।
~ লাগবে। সম্পত্তি লাগবো না তোমার? আজীবন কি এই বাসা বাড়ি নিয়াই থাকবা? এত টাকা তো জোগান দিতা পারবা না। বাচ্চাকাচ্চা পালন করা
কি মুখের কথা? এত অল্প আয় তোমার!
~ সম্পত্তি ভাগ হওয়ার সময় এমনিতেই আমাকে ভাগ দিবে ভাইরা। আমার তাদের উপর আস্থা আছে।

~ ছাঁই আছে। কিচ্ছু পাইবা না তুমি, কিচ্ছু না। আমরা আগামী সপ্তাহেই বাড়িতে যামু। শেষ। যাইয়্যা গোঁ ধইর‍্যা তাগো উপরে বইস্যা থাকলে, খাইলে বাড়ির জায়গা, সম্পত্তি না দিয়া যাইবো কই? দৌঁড়াইয়া আইস্যা দিবো, কইলাম তোমারে, যাও, মিলাইয়া নিও।
আজমল উদ্দীন ভীষণ বিরক্তিভাজন মুখ করে তাকিয়ে আছে অনু চৌধুরীর দিকে।
সে অনু চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ভাবছে,
সারাক্ষন শুধু টাকা টাকা, সম্পত্তি সম্পত্তি!

এরকম মেয়ে মানুষ খুব বিপজ্জনক।
তাছাড়া অনুকে কোনোভাবেই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। নিয়ে গেলেই সসর্বনাশ!
খাল কেটে কুমির আনার কোনো মানে হয়?

পর্ব ১৯

আজমল উদ্দীনের সাথে অনু চৌধুরীর রাগারাগির পর্ব শেষ। এখন চলছে কথা না বলার অনশন ধর্মঘট। আহা, কেউ কারো সাথে কথা বলেনা। এদিকে আজমল উদ্দীনের ফোন এসেছে।

তাকে এক্ষুনি একবার বাড়ি যেতে হয়।
কিন্তু কিভাবে যাবে? অনু চৌধুরী তো গোঁ ধরে বসে আছে। সে এখন মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করা মানেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা।
অনু চৌধুরী একবার মুখ খুললে তো আর থামানোই যাবেনা।

এখন তাকে যেভাবেই হোক অনু চৌধুরীর রাগ ভাঙাতে হবে। সে বিড়ালের মত লেজ গুটিয়ে বউয়ের পিছন পিছন ঘুরতে লাগলো।
কিন্তু তার বউ এখন ফোনে ব্যস্ত।
কার সাথে যেন হাসি হাসি মুখ নিয়ে কথা বলছে! আজমল উদ্দীনের মাথায় দুশ্চিন্তা এসে ভর করলো।

জীবনে অনেক পাপ করছে সে।
সেই পাপের শাস্তি ইতোমধ্যে অনেকবারই পেয়েছে।
এখন কি আবার নতুন কোনো শাস্তি পাওয়ার সময় হয়েছে?
অনু কার সাথে কথা বলছে অমন হাসি হাসি মুখ নিয়ে?
আজমল উদ্দীন এক টানে ফোন কেড়ে নিলো অনু চৌধুরীর হাত থেকে।
তার চোখ লাল হয়ে গেছে।

অনু চৌধুরীর দিকে তাকিয়েই সে ফোন কানে তুললো। তার সন্দেহের বাণ প্রক্ষেপিত হলো অনু চৌধুরীর দিকে।
সে মনে মনে ভাবছে, যে নিজের এত ভালো স্বামীকে ফেলে আমার সাথে এসে যেতে পারে, সে তো আমার মত খারাপ~গরীব স্বামীকে ফেলে যেতেই পারে! এটাতে তো আশ্চর্য হওয়ার কথা না!

ফোন কানে নিয়ে আজমল উদ্দীন ‘হ্যালো বললো। ওপাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো।
~ কে? আংকেল?
ওটা তো তানিশার গলা!
আজমল উদ্দীন নিশ্চিন্ত হলেন।

কিন্তু কথা না বলেই কেটে দিলেন। তানিশাকে তার ভালো লাগেনা। মেয়েটা কেমন যেন, আজমল উদ্দীনের বিরক্ত লাগে। একদম মায়ের ডুপ্লিকেট। সে তো এক অনু নিয়েই আর পারছে না, এখন আবার দ্বিতীয় অনু উদয় হলে তো সমস্যা!
ভাগ্যিস, ওকে রেজা মেনে নিছে, নইলে আমার এখানে আইস্যাই অন্ন ধ্বংস করতো জামাই নিয়ে।

অনু চৌধুরী আরো এক ধাপ ফুলে গেলেন। আজমল উদ্দীনের সামনে দিয়ে রাগ দেখিয়ে উঠে চলে যাবে তখনই আজমল উদ্দীন হাত ধরে ফেললো তার।
~ অনু, আমি তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবো। কিন্তু ওখানে এখন গেলে প্রচুর খরচ হবে। কারণ তোমার এখন যত্ন দরকার। সেইফলি থাকতে হবে। মাত্রই তো বাচ্চা হলো তোমার। আর ওখানে তোমার থাকা, খাওয়ায় অনেক সমস্যা হবে। বোঝার চেষ্টা করো অনু!
অনু চৌধুরী ঘুরে দাঁড়ালেন।

~ আমার কোনো সমস্যা হবেনা। আমার এইটা প্রথম বাচ্চা না। তাই আমার সমস্যা টমস্যা হইব্যোনা। আমার সব অভ্যাসই আছে। তুমি শুধু ব্যবস্থা করো।
~ আসলে… আচ্ছা, তাহলে সামনের মাসে যাও। ততদিনে আমি কিছু টাকার ব্যবস্থা করি।
অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
~ টাকা পয়সার কথা ভাবতে হইব্যো না। ওইডার ব্যবস্থা আমি করমু।
~ কিভাবে?
~ সে যেমনেই হোক। পরে জানামু কেম্নে ব্যবস্থা করমু।
~ আচ্ছা।

তো, তানিশার সাথে কথা বলতেছিলা?
কী অবস্থা ওর? রেজা মাইনা নিছে?
~ নিছে মানে! হাহ্ হা হা! না নিয়া যাইব্যোডা কই আজমল!
আজমল উদ্দীন কিছু বললেন না আর।
উঠে চলে এলেন।

তার আবার ফোন এসেছে। ফোনের ওপাশ থেকে খুব বিনয়ের স্বরে কেউ একজন বলছে,
~ শুনছেন? আপনি কি আজকে একবার আসতে পারবেন?
~ না। আমি আজকে ম্যানেজ করতে পারবো না। অনু খুব রেগে আছে।
~ ম্যানেজ করেন। আপনার জন্য একটা উপহার আছে। এখন আর আপনি আমাকে ছেড়ে এতদিন ওখানে গিয়ে থাকতে পারবেন না। আসবেন একবার? না আসলেও সমস্যা নেই। আপনি আনন্দ করুন। আমি তো আপনাকে সুখ দিতে পারিনাই। ছোট বোন সেটা দিতে পারছে।

~ বার বার এসব বইল্যো না। বিরক্ত লাগে।
~ ঠিক আছে। আপনি আসা লাগবেনা। আমি এরকম আবদার করতে করতে একদিন এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যাবো। আপনি ছোট বোনের সাথেই ভালো থাকেন। রাখলাম।
~ হ্যালো শাহানা? শুনো, দেখো, আমি কিছুতেই ম্যানেজ করতে পারছিনা। আচ্ছা শুনো,
ততক্ষনে ফোন কেটে দিয়েছে।

আজমল উদ্দীনের বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠলো। সে ভাবছে,
একবার তো যেতেই হবে।
মেয়েটা আমার জন্য কি না করে!
আমার বিয়ের সব কিছু সে ই জোগাড় করে দিলো। আমি না চাইতেই আমার হাত ভরিয়ে টাকা দিয়ে দেয়। কত ভালোবাসে মেয়েটা আমায়।
আমি কিভাবে ওকে এতটা কষ্ট দিতে পারি?

অত:পর অনু চৌধুরীকে অনেক কষ্টে মানানো গেলো। শর্ত হলো,
সামনের সপ্তাহেই বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে তাকে।
অনেক কিছু ঠিক করতে হবে এই মধ্যেই।
সব সরিয়ে ফেলতে।
কিছু যোগ~বিয়োগ~গুণ~ভাগ তো না করলেই নয়!
আজমল উদ্দীন ছুটে চলে গেলেন।

আব্বু, তানিশা আপু আর আমি ড্রয়িংরুমে একসাথে বসে আছি। আব্বুর দুই পাশে আমরা দুজন বসে আছি। তানিশা আপুর কাজকর্ম দেখে আমরা মুগ্ধ। সে নিজেই সব রান্নাবান্না করছে। পুরো বাসা নিজেই পরিষ্কার করেছে।
আব্বুর আমার কিছু অপরিষ্কার জামা~কাপড় ছিলো, কখন যে সব নামিয়ে ধুঁয়ে দিয়েছে, জানিইনা।

আব্বু অনেকবার নিষেধ করেছে।
কিন্তু সে শোনে নি। কিন্তু আমার মন এখনো সন্দিহান। আব্বু তো বলছে দুলাভাইকে ছেড়ে দিতে। আপুও তাই মেনে নিলো দেখলাম। কিন্তু শেষের দিকে ওটা কিসের ক্লাইম্যাক্স ছিলো!
আব্বু খুব নরম গলায় বললেন,

~ তানিশা, তোর এই অন্ধকার জীবন আমি ঠিক করে দিবো। তুই চিন্তা করিস না। তোর এই বাচ্চাকে আমি আমার কাছে রেখে দিবো। আমার তো কোনো ছেলেপুলে নেই। তাই নাতিকেই সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমি না ফেরার দেশে চলে যাবো ভাবছি। আর তোকে আমি আবার বিয়ে দিবো। অনেক ভালো জায়গায়। তোর নতুন সংসার হবে। তুই সুখী হবি। তবে আমাকে শুধু তোর ছেলেটাকে দিয়ে যাস। ও আমার কাছেই থাকবে সবসময়। কেমন?
~ আচ্ছা আব্বু। তোমার যা ইচ্ছা তাই হবে।

~ তোকে ওখানে অনেক কষ্ট দিছে ওরা। তাই না রে?
আপু উত্তর দিবে তখনই আমি পট করে বলে দিলাম,
~ হুম আব্বু। দুলাভাই তো আপুকে মারে অনেক! আজকেও মারছে। আমি নিজে দেখছি।
আব্বুর ভ্রু কুঁচকে বললো,

~ কি বলিস? আজকে কখন মারছে? কিভাবে মারছে? আগে বললি না কেন?
~ আজকেই তো দুইবার দেখলাম! যা বাজে গালি দেয় উনি! কিছুটা আম্মুর মত! খাবার দিতে দেরি হওয়ায় আপুকে ধাক্কা দিয়েছিলো। আপু তখন ভাতের মাড় গালতেছিলো। আপুর হাত দেখো তুমি! দুলাভাই একটুও ভালো না। একটুও না।
তানিশা আপু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করছিলো আমাকে থামার জন্য। আমি শুনলাম না। কথা শেষ করে তারপর ওরদিকে তাকিয়ে মৃদ্যু হাসলাম।
আব্বুর চোখ ছল ছল করছে।

~ আমি আমার মেয়েটাকে আজ পর্যন্ত একটা টোকা পর্যন্ত দেই নাই। অথচ অন্য একটা বখাটে ছেলে আমার মেয়েকে এতদিন মারছে! এখানে অবশ্য ছেলের দোষ না। দোষ আমার মেয়ের।

আপুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুই কেন এমন করলি বলতো? কেন নিজের জীবন নিজেই নষ্ট করতেছিলি?
তানিশা আপু মিনমিনিয়ে বললো,
~ ভুল করছি আব্বু। আর হবেনা।
আমরা সারা সন্ধ্যা গল্পগুজব করেই কাটালাম।
আপুকে যখন একা পেলাম তখন খুব আগ্রহ নিয়েই প্রশ্ন ছুঁড়লাম,
~ আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

~ কর। আগে বল আব্বুর সামনে এরকম
কালারিং করলি ক্যান তোর দুলাভাইরে? এমনেই আব্বু পছন্দ করেনা। ছাইড়্যা চইল্যা আসছি। এরপরেও শান্তি হয়না তোগো?
আমি বিষম খেয়ে বললাম,

~ তোকে ওই লোকটা আমার সামনে মারছে। আমি এটা বলবোনা আব্বুকে? আম্মু যখন তোর গায়ে একটু হাত দিতো, তখন কে নালিশ দিতো আব্বুর কাছে? আমিই তো!
~ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এরকম মাইর টাইর সবাই ই টুকটাক খায়। তুই বুঝবিনা। কথায় আছে, শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। এখন বল, কি বলবি।

আমি খুব আড়ষ্টভাব নিয়েই বললাম,
~ আপু তুই দুলাভাইকে ছেঁড়ে একাবারে চলে আসছোস না?
~ হুম।
~ আর যাবিনা। ঠিক তো?
~ হুম।

~ তাহলে দুলাভাই যাওয়ার সময় আদর করলি কেন? আব্বুর কাছে বললি ছেড়ে দিছোস অথচ যাওয়ার সময় এরকম করলি। কেন?
আপু আমার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন।
তারপর আমার হাত পেটে রেখে বললো,
~ এই দেখ। এটা তোর বোনপো। আমার ছেলে।

ও কিন্তু তোর দুলাভাইয়েরই সন্তান। এখন আমার ছেলের বাপকে আমি একটু ভালোবাসবো না? এখানেও কৈফিয়ত লাগবে?
আমি চুপ করে গেলাম।

আপু আবার বললো,
~ ছেড়ে দিলেই তো সব শেষ হয়ে যায় না রাকা।
আমি আর কিছু বললাম না।
বড়দের ব্যাপার~স্যাপার খুব জটিল।
আমার মাথায় ঢুকে না এসব থিওরি।
আমি একজনকে ছেড়ে চলে আসলাম কারণ সে খুব খারাপ, বখাটে, আমাকে মারে, তাহলে আমি কেন তাকে ভালোবাসতে যাবো?

আমার আম্মুও তো এমন, মিসের অনু চৌধুরী। অবশ্য সে আরো খারাপ।
কই, আমি তো তাকে আর ভালোবাসিনা।
তাহলে আপু…

পরের দিন সকালে।
ঘুম থেকে উঠলাম বেলা ১০টায়।
দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে মনে পড়লো, আমার টাওয়েল আনা হয়নি।
আনতে গেলাম।

আপু তখন নাস্তা বানাচ্ছে আমার জন্য।
সে আর আব্বু খেয়ে নিয়েছে আগেই।
আমি টাওয়েল এনে বাথরুমে ঢুকবো তখনই দেখলাম আপন স্যার এসেছে।
সে আমাদের ড্রয়িংরুমে বসেছে।
আব্বু কথা বলছে তার সাথে।

আব্বুর মুখ হাসি~হাসি।
সে তানিশা আপুকে ফিরে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।
সেই খুশিতেই কি আপন স্যারকে ডেকে আনলো?
আমাকে দেখতে পেয়েই জোরে ডাক দিলো আব্বু।
~ এই মেয়ে। এখানে আয়।

আমি ছুটে চলে গেলাম তার সামনে।
আমার সামনেই দুজন।
আব্বু বললো,
~ যা, তানিশাকে বল, আপন আসছে। ওকে নাস্তা দিতে বল। সকালে যে গোপিকে দিয়ে কুমিল্লার রসমালাই এনেছি, ওটা দিতে বলবি আগে। যা..
আমি বললাম, আচ্ছা।

বলতেই মুখে থাকা টুথপেস্টের ফেনা বেয়ে পড়ে গেলো অনেকটা।
আপন স্যার বেদমে হাসছে।
আব্বু বললো,
~ তুই ব্রাশ না করেই চলে আসলি! দেখো আপন দেখো, এই মেয়ে এখনো বাচ্চাই রয়ে গেছে।

আমি লজ্জ্বা পেয়ে তাড়াতাড়ি মুখ ধুতে চলে আসলাম।
এসে আপুকে বলে নিজেই সব ঠিক করে দিলাম। তারপর আপুকে বললাম,
~ আপু প্লিজ! তুই এগুলা একটু ওখানে দিয়ে আয়না!
~ ওমা! কেন! আমি তো কাজ করতেছি! দেখতেছোস না?
~ কী কাজ করতেছোস দেখি! ও আচ্ছা। পেঁয়াজ, আলু এগুলা আমিই কেটে দিচ্ছি। তুই এগুলা দিয়ে আয়। প্লিজ!

~ ও! বুঝছি! মনের মধ্যে কি চলে তোর রাকা? এমনে তো কিছুই বুঝোনা! অথচ মনে মনে এতদূর..!
~ কি! ধুর! আরে কিছুনা! পরে বলবো তোকে। এখন ওখানে যেতে পারবো না কারণ লজ্জ্বা লাগতেছে।

আব্বু আবার জোর গলায় ডাকলো আমাকে। আমি আপুকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলাম। আপু গেলো। আমি আর গেলাম না।
আব্বু আবার আমার জন্য আপন স্যারকে
এনেছে। আমার পড়াশোনার জন্য।
তাছাড়া আব্বু মনে মনে আপন স্যারকে ভীষণ পছন্দ করে। প্রথম থেকেই।
কে জানে তার মধ্যে কোন ইচ্ছা লুক্কায়িত আছে!

পর্ব ২০

আব্বুর সাথে আপন স্যারের অনেকক্ষন যাবত খোশগল্প চললো। ততক্ষন পর্যন্ত আমি আমার রুম থেকে আর বেরোই নি।
আবার ডাক পড়তেই ছুটে যেতে হলো সব লজ্জ্বা, জড়তা উপেক্ষা করে।
কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর বুঝলাম, আপন স্যারের আর ওটা মনে নেই।
সে তো অনেক বড় মানুষ।

আমার ক্লাসমেট কিংবা সমবয়সী কেউ না।
অমন কেউ হলে নিশ্চিত এখন খিলখিল করে হাসতো, লজ্জ্বা পাওয়ার জন্য টিটকারি করতো।

আপন স্যার বসে আছেন হাতে একটা ফাইল নিয়ে। খুব মনোযোগ সহকারে সে সেই ফাইলটা হাতাচ্ছে।
আমি যেতেই আব্বু বললো,
~ মা, তুই নাকি নিয়মিত স্কুলে যাস না? ব্যাপার কী বলতো?
আমি চুপসে গেলাম ভয়ে। ধরা পড়েছি এবার!

আপন স্যার উঠে বলে উঠলেন,
~ চাচা, আপনাকে কি বোঝালাম এতক্ষন?
ওকে এইভাবে এসব জিজ্ঞেস করার কিছু নেই তো। আপনাকে এতক্ষন যা যা বললাম তাই ই বলেন না, প্লিজ।

আব্বু ইতস্তবোধ করে বললো,
~ হুম। আচ্ছা আচ্ছা। রাকা, তুই এখন থেকে আবার আপনের কাছে পড়া শুরু করবি। তোর বোনকেও সাথে বসাবি। আর স্কুল একদিন ও মিস দিবিনা। কথা কি কানে গেছে?
আমি হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নাড়ালাম।

~ তোর আপু কই? তারে ডাক তো।
আমি ডাকলাম। আপু কোমরে কাপড় গুজে কোনোমতে হাজির হলো।
তারপর বললো,
~ বলো আব্বু।
আব্বু বললো,
~ তুই ও রাকার সাথে বসিস। কোনো সমস্যা নাই। আপন আমাদের কাছের মানুষ। ওকে সব বলা হইছে।

আপন স্যারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ ঠিক বললাম কিনা আপন?
স্যার মাথা নাড়ালো।
আপু কিছু না বলেই ঠোঁট উল্টে চলে গেলো।
আব্বু কিছুক্ষন তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আপুর চলে যাওয়ার দিকে।
তারপর বললো,
~ মেয়েটা এখনো সামাজিকতা শিখেনাই।

একে যে কবে আমি মানুষ করতে পারবো,
আল্লাহ জানে।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
আচ্ছা, রাকা, তুই আজকে থেকেই শুরু কর। আপন ও তাই চায়।
আমি আপন স্যারের দিকে তাকালাম।

সে মৃদ্যু হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
আমি এক পলক তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলাম। ইদানিং কেন জানিনা আমার লজ্জ্বা~শরম একটু বেশিই বেড়ে গেছে। সহসা কারো সামনে যেতে পারি না। কথা বলতে পারিনা। আর সেটা যদি আপন স্যার হয়, তাহলে তো হলোই।
আর দ্বিতীয় কোনো কথাই হবেনা!

স্যারকে এখন দেখলেই আমার কেন যেন অন্যরকম লাগে, হার্টবিট বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে যায়, লজ্জ্বা করে খুব! ইচ্ছা করে তাকিয়ে থাকি এক দৃষ্টিতে। কিন্তু পারিনা, স্যার তো! যদি বকা দেয়!
ব্যস, আবার শুরু হয়ে গেলো আমার লেখাপড়ার অধ্যায়।
স্যার আমার আড়ষ্টতার কিছু বুঝলো কিনা জানিনা, ডেকে বললো, এক গ্লাস পানি দিও তো রাকা।

আমি নিয়ে আনলাম।
তারপর বললো,
~ আজকে থেকেই স্টার্ট। বই খাতা কই? যাও নিয়ে আসো।
বাধ্য মেয়ের মত তাই করলাম।
বই নিয়ে বসার পর সে তার ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরী আর কতগুলো চকোলেট বের করে আমার সামনে রেখে বললো,
~ নাও। এগুলো হচ্ছে তোমার উপহার।

~ কিসের? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
~ এত কিছু বলতে পারবো না। অংক বইটা আগে নাও।
__
আপন স্যার চলে যাওয়ার পর দেখলাম আব্বু আপুর হাতে কিসের যেন একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো,
~ তানিশা, এই নে।
আপু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কী এইটা আব্বু?

আব্বু স্বাভাবিকভাবেই বললো,
~ ডিভোর্স পেপার। রফিকের সাথে কথা বলে ওর কাছে পাঠায়ে দিছিলাম। সে সাইন করে দিছে। এবার তুই করে দে। জলদি কর। আমার কাজে বেরোতে হবে।
আপু একটু স্তব্ধ হয়ে গেলো। বললো,
~ আব্বু, তুমি রেখে যাও। আমি সাইন করে দিবো। এখন রান্না শেষ করে, গোসল করে একটু ঘুমাবো। শরীরটা ভাল্লাগতেছেনা।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। রেস্ট নে। আমি গেলাম। তুই সাইন করে রাখিস।
আব্বু ব্যবসার কাজে চলে গেলেন।

দাদিকে বলে রিমা খালাকে একবার পাঠাতে বললেন, কিন্ত রিমা খালা আসার নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারেনি। রিমা খালা নাকি এখন চাকরী খুঁজছে হন্য হয়ে। তাই তার হাতে সময় একেবারেই নেই।

বিকেলের দিকে তানিশা আপুকে বারান্দায় দেখলাম অনেকক্ষন যাবত কথা বলছে ফোনে।
আমি যেতেই আপু চিৎকার করে বলে উঠলো,
~ এইযে রাকা আসছে আম্মু! কথা বলো এবার।
বলেই আমার কানের কাছে তুলে দিলো কিন্তু আমি আবার ওটা ওর কাছে ফিরিয়ে দিয়ে দৌঁড়ে চলে এলাম ভেতরে।

আপু এখনো কথা বলছে।
হাসি~ঠাট্টা চলছে তাদের মধ্যে।
তাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা প্রথম থেকেই কত মধুর! শুধু আমার বেলাতেই সবেতে কাঁচকলা।

তানিশা আপু আর অনু চৌধুরীর আলাপ আমি শুনলাম না। ভেতরে গিয়ে টিভি ছেড়ে বসলাম।
স্যারের ডায়েরীটা কোলেই পড়ে আছে।
কলম এনেছি। কী লিখবো ভাবছি..
লিখার মত তো অনেক কিছুই আছে।
তারপর ভাবলাম, যে দিয়েছে তার ব্যাপারেই কিছু লিখা যাক। কিছুই করার নেই।
এই কাজটা তো মন্দ না। ব্যস, টিভি অফ করে দিয়ে স্যারকে নিয়ে কয়েকটা লাইন লিখলাম।

নিজেকে তখন কেন যেন হিরোয়িন হিরোয়িন লাগছিলো। সোফায় উবু হয়ে বসে ডায়েরীতে স্যারকে নিয়ে লিখছি!
আমি ও মনের কথাই শুনলাম।
কিছুক্ষনের জন্য হিরোয়িন হয়ে গেলাম।

যা যা মনে আসলো তখন; তাই তাই লিপিবদ্ধ করলাম ডায়েরীর পাতায় পাতায়।
ওদিকে তানিশা আপু অনু চৌধুরীকে বলেছে,
আব্বু তার জন্য ডিভোর্স পেপার নিয়ে এসেছে।
অনু চৌধুরী মনে মনে একবার ভাবলো, এইবার বোধ হয় তাকেও পাঠাবে।
তানিশা আপুকে সে খুব ইনিয়েবিনিয়ে বললো, তাড়াতাড়িই যেন সে তার কাছে ফিরে যায়। তানিশা আপু কিছুক্ষন কথা বলে জোর করেই ফোন রেখে দিলো।

আজমল উদ্দীন বাসায় নেই। সে ফিরছে না। ওখানে গেলেই সে আটকে যায়। কিসের এত টান কে জানে! অনু চৌধুরীর আর ভালো লাগেনা। তাই সে তানিশাকে তাড়া দিলো নিজের কাছে আসার জন্য। কিছুদিন থেকে যাওয়ার জন্য।
পরের দিন আব্বু আবার আসলো ডিভোর্সের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে।
কিন্তু তানিশা আপু একবার এক কথা বলে। একবার বলে সে হারিয়ে ফেলছে ডিভোর্স পেপার। আরেকবার বলে, সে এখনি ডিভোর্স দিতে চায়না। আব্বু আবারো ধৈর্য্য ধরে সব বোঝালো।

কিন্তু সে কোনোভাবেই মানলো না।
জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলার বাহানায় মুখে মুখে তর্ক করলো অনেকক্ষন।
একসময় ধৈর্য্যহারা হয়ে আব্বু বিরক্ত হয়ে গেলেন।
শেষমেশ চলেই গেলেন।

প্রতিদিন রাতেই দেখলাম, আপু রাতের খাওয়া শেষে আব্বুকে জোর করে ঔষধ খাওয়াচ্ছে। আব্বুর নাকি হাই প্রেসার, ঘুমের সমস্যা ভীষণ। আমি ঘুমের ঔষধ খাওয়ার কথা বলছিলাম কিন্ত আব্বু শোনেনি। আপুর জোরাজোরিতে এখন শুনছে। আমাকে যে ছেড়ে দিচ্ছে, তা না।

আমাকে ও প্রতিদিন রাতে গরম দুধ খেয়ে শুতে যেতে হচ্ছে এখন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো,
রাতের খাবার খাওয়া মাত্রই ঘুমে গদগদ হয়ে যাই আমরা দুজন। আমার রাতে ঘুম আসে একটু দেরীতে। সেই আমিই এখন রাত ১০ টা বাজতেই বিছানায় কাত হয়ে পড়ে যাই। আব্বুও তাই। সেই ঘুম এতটাই গভীর হয় যে রাতের কোনোপ্রকারেরই কোনো ঘটনা বা কোনো শব্দ, কিছুই আর আমাদের কানে পৌঁছায় না। তাই ঘুম ও ভাঙেনা কোনোভাবেই। এত ভারী ঘুম যে রাত ১০টায় ঘুমালে আর উঠি একদম সকালে।
মানে এক ঘুমেই পুরো রাত কাভার।
আব্বুও ইদানিং এমন করছে।

সে ৬/৭টাতেই বসুন্ধরার মলে চলে যেত প্রতিদিন।
ওখানে তার অনেক কাজ। সেই আব্বু ও ইদানিং কাজে যাচ্ছে ১০টার পরে।
আব্বুর, আমার দুজনেরই ইদানিং মাথা কেমন যেন ভারী ভারী হয়ে থাকে।
বুঝিনা, কেন হঠাৎ এমন হচ্ছে।

তানিশা আপু আসছে, কোথায় ওকে একটু দেখেশুনে রাখবো, যত্ন করবো, সেখানে আমাদের নিজেদের অবস্থা এখন ওর চেয়েও বেশি খারাপ।
একদিন আমি কেন যেন ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।
তাই সেদিন আর আমাকে ভাত বা দুধ কিছুই খেতে হলো না।
আপু আসার তৃতীয় দিন ছিলো সেদিন।

রাত ১২টায় আমার হঠাৎ ঘুম ভাঙে।
আপু আমার সাথেই শোয়।
কিন্তু সে পাশে নেই তখন। আমি বাথরুম করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম আব্বুর রুম থেকে সামান্য সামান্য আলো আসছে।
ওখানে কে? আব্বু এখন উঠলো নাকি?
আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাবো তখনই মনে হলো কি দরকার, বাথরুম সেরে এসে শুয়ে পড়ি। ঘুম ঘুম ভাবে বললাম, ধুর, আব্বুর রুমে আব্বুই তো হবে।
তাই করলাম। এসেই শুয়ে পড়লাম।

এভাবে এভাবে কেটে গেলো ৩দিন।
চতুর্থ দিন ঘুম থেকে উঠেই আবিষ্কার করলাম তানিশা আপু আবার লাপাত্তা হয়ে গেছে।
আমি এবারে আর অপেক্ষা করলাম না।
সাথে সাথে ফোন দিলাম আব্বুকে।
আব্বু ও সব ছেড়ে চলে এলো।

আব্বু মাত্রই গেছে, আবার ফিরে আসতে হলো এই দূর্বল শরীর নিয়ে।
তানিশা আপুর ফোন স্বভাবগতভাবেই বন্ধ।
আব্বুর চোখ~মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো।
খুব সুন্দর সাজানো~গোছানো একটা প্ল্যান!
কিন্তু আব্বুর সন্দেহ হলো এবার।

তানিশা যখন থাকবেই না তখন এখানে এ ক’দিন এভাবে পড়ে থাকার কি দরকার ছিলো?
ওর কি কোনো উদ্দেশ্য ছিলো?
কোনো কার্যসিদ্ধি করে নিলো না তো ঐ বদমাইশ রফিক?
আব্বু সন্দেহভাজন দৃষ্টিচালন করে বাসার ভেতরের সব চেক করতে লাগলো।
জানা গেলো, আমাদের একটা নতুন ফোন পাওয়া যাচ্ছে না, যেটা কিছুদিন আগেই আব্বু উপহার হিসেবে পেয়েছিলো। খুব দামী ফোন।

তাছাড়া ও আব্বুর কিছু পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট উধাও।
আব্বু বুঝলো সব প্ল্যান করা একটা চক্র ছিলো কেবল।
সে সন্দেহ নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজ রুমে গেলো।
সব চেক করতে হবে।

কিছুদিন আগেই টাকা তুলে এনেছিলো।
সব এই ঘরের আলমারিতে আর বিছানার তলায় রাখা হয়েছিলো।
আলমারির চাবি তো তানিশার বা রফিকের কারোরই পাওয়ার কথা না।
আব্বু খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আলমারি খুললেন।

পর্ব ২১

আব্বু আলমারি খুলছে চাবি দিয়ে।
তার হাত কাঁপছে অনবরত, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আমি মনে মনে ‘আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগলাম। সবকিছু যেন স্বাভাবিক হয়ে যায় আবার, আপু যেন ফিরে আসে আবার! এসব বিড়বিড় করতে লাগলাম। আব্বু আলমারি খুলে ভেতরে অনেকক্ষন পর্যন্ত সব উল্টিয়ে~পাল্টিয়ে দেখলো। অনেক সময় অতিক্রমের পর আমি উত্তেজিত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম,
~ কী আব্বু? সব ঠিকঠাক আছে না?

আব্বু উত্তর দিলো না।
আগের চেয়েও আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে গেছে বলেই জানান দিচ্ছে তার মুখায়ব।
সে উঠে দাঁড়ালো খুব ব্যস্ত হয়ে।
এবার খাট চেক করার পালা।
আব্বু বিছানার পাশে উবু হয়ে বসলো।
বিছানার নিচে তিনটা তোশক আছে।

একটা নতুন। বাকি দুটো পুরোনো, অনেক আগের, ফেলা হয়নি, ব্যবহার করা হচ্ছে। একে একে সবগুলোই তোলা হলো। লাস্টটা তোলার আগে আব্বু আরো বেশি কাঁপতে লাগলো।
তোলার পরই আব্বু সাথে সাথে মাথায় হাত দিয়ে নিচে ধপ করে পড়ে গেলেন। তার চোখ মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা।
চোখ ছল ছল করছে আব্বুর।

প্রায় দেড় লাখ টাকার বেশি উধাও।
আব্বু কিছুক্ষন হাপিত্যেশ করলো গলা নামিয়েই।
তারপর অনু চৌধুরীকে ফোন দিলো।
ফোন তুলেই অনু চৌধুরী বললেন,
~ হ্যাঁ, বলেন। কেমন আছেন?

~ তানিশা কোথায়? তোমার কাছে গেছে না?
সে একশো বিশ ডিগ্রি এংগেলে ঘুরে অবাক হওয়ার মত করে জবাব দিলো,
~ ওমা! কি বলেন! ও আমার কাছে কেন আসবে! ওমা! তানিশা কোথায় এখন?
আব্বু তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,

~ ছি:! অনু, ছি:! তুমি এতটা খারাপ হবে আমি কল্পনাও করিনি। তুমি শেষমেশ নিজের মেয়েটাকে দিয়েও ক্রাইম করালে? এত নিষ্ঠুর তুমি! আমি আমার শরীরের এই অবস্থা নিয়েও আমার বিজনেস চালাচ্ছি এত কষ্ট করে, আর তুমি শেষ পর্যন্ত আমার টাকা চুরি করালে তোমার মেয়েকে দিয়ে?

তোমার শরীরে কি এক ফোঁটাও দয়া মায়া ও নেই অনু?
~ আপনি এসব কি কইতেছেন তানিশার বাপ! আমি কখন এমন করলাম! আমি তো তারে বুঝাইয়্যা শুনাইয়্যা আপনার কথামতই আপনার কাছেই পাঠাইলাম। এখন সে কি আবার পালায়ে গেছে? পালানোর কথা বাদ রাখলাম কিন্তু টাকা চুরি করার কথা তো ছিলোনা!
আচ্ছা আমাকে বলেন আগে, আমিতো কিছুই বুঝতাছিনা।
আব্বু অগ্নির মত জ্বল জ্বল করে উঠলেন।

~ তোমার এইসব ঢং দেখার ইচ্ছা নেই আমার, বুঝলা? বিলিভ মি, আমার একটুও ইচ্ছা নেই। আমার বুঝা হয়ে গেছে, তুমি একটা লোভী, একটা নিচ প্রকৃতির মহিলা। এখন ভালোয় ভালোয় আমার আমার টাকা ফেরত দাও অনু। আমার টাকা ফের‍ত দাও বললাম। নইলে খুব খারাপ হবে। আমি আর তোমাকে ছাড় দিবো না। খুব গুরুতর উদ্যোগ নিবো এবার। আমি কারো কথা ভাবিবো না আর।

অনু চৌধুরী নরম গলায় বললো,
~ বিশ্বাস করেন, আমি এসবের কিছুই জানিনা। আর তানিশা আমার বাসাতে এখনো আসেনাই। ওকে আমি আসতে বলছিলাম একবার। কিন্তু টাকা চুরি কইর‍্যা আসতে বলিনাই। আজমলের কি টাকার অভাব পড়ছে নাকি যে আমি আপনার কাছ থেকে চুরি কইর‍্যা টাকা আনতে যামু? আমি এত হেংলা না তানিশার বাপ। আমার কথা শোনেন, মেয়ে কই গেছে খোঁজ নেন। আর শুধু এক মেয়ের উপরেই দোষ চাপালে হয়না। মাইয়্যা তো ঘরে দুইটা। একটারে নিয়াই সারাদিন সন্দেহে থাকার কী কোনো মানে আছে বলেন?

আব্বু নিজের সর্বোচ্চ গলা দিয়ে চিৎকার করে বাজখাঁই গলায় জবাব দিলো,
~ ঐ কুত্তার বাচ্চা, তুই নিজের দোষ আমার মেয়েদের উপর চাপাচ্ছিস? তানিশাকে তো তুই নিজের ডুপ্লিকেট বানাইছোস। সব তোর দোষ। আমার রাকা অমন হয়নাই। এখন তুই ওর ঘাড়েও দোষ চাপাইতেছোস? তুই আমার টাকা ফেরত দিবি কবে বল।

আর কোনো কথা আমি শুনতে চাইনা। আমি থানায় কেইস করবো তোর নামে শুওরের বাচ্চা। তুই আমার জীবন তছনছ করে দিছোস। তোর কোনোদিন ভালো হবেনা। কোনোদিন তুই সুখী হবিনা।

~ ও। ভালো কথা তো। আচ্ছা আচ্ছা, তো করেন কেইস। যা ইচ্ছা করেন গে। আমারে আর ফোন দিবেন না। আমি টাকাটুকার এই ব্যাপারে নাই। আমারে আর জালাইয়্যেন না। আমি কিছুই জানিনা, আল্লার কিরা।
বলে ফোন কেটে দিলো।

আব্বু মাথায় হাত দিয়েই বসে আছে।
ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যাচ্ছে।
আব্বু এভাবেই পড়ে আছে।
কাউকে খবর দেয়নাই।

এই লজ্জ্বার কথা কাকেই বা বলবে?
কে আছে শোনার মত?
বললেও বা কি বলবে, আমার বড় মেয়ে আবার পালাইছে? মান~সম্মান কই গিয়ে দাঁড়াইছে!
হায় হায় হায়!

আব্বুর মনের ভেতর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে গেছে। তার চোখে আজ জল নেই।
লাল টকটকে হয়ে গেছে।
মুখ মলিন। এই মানুষটা আর কতবার এরকম দুর্ধর্ষ ঘটনার স্বীকার হবে?
আর কতবার সে এভাবে মানসিকভাবে আঘাত পাবে? মানুষটা তো খুব অসুস্থ এমনিতেও।

বিকেলের দিকেই তানিশা আপুর ফোন এসেছে।
অনু চৌধুরী ফোন বাজতে না বাজতেই রিসিভ করেছে।
~ হ্যালো আম্মু।
~ হ্যাঁ, তুই কই আছিস?

~ আমি তোমার কাছে আসতেছি।
আর ১০ মিনিট। দরজা খোলা রাইখো।
~ ওই তুই কি টাকা নিয়েই ভাগছোস নাকি?
~ হুম।

~ ওমা, ক্যান? কত টাকা নিছোস?
~ পরে বলবো। আমি আগে এসে নেই। বেশিক্ষন থাকবো না। শুধু ভাত খেয়েই চলে আসবো। বাসা থেকে ভাত খেয়ে আসতেই ভুলে গেছি। এক্সাইটমেন্টের জন্য মনেও ছিলো না খাওয়ার কথা। এখন তোমার কাছে এসে খাবো। আর হ্যাঁ, তোমার জামাই ও সাথে আসতেছে।

তানিশা আপুরা ভেতরে ঢুকতেই অনু চৌধুরী শব্দ করে বেশ জোরেই দরজা বন্ধ করে দিলো।
আসতে না আসতেই শঙ্কাহর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ এবার বল তানিশা, কত টাকা আনছোস?
~ এক লাখ আশি হাজার টাকা।

~ তোর আব্বু যে বললো, দেড় লাখ?
~ আব্বুর হয়তো হিসেব ছিলো না আরকি। আর একটা আই ফোন ও আনছি। রফিকের খুব শখ একটা আই ফোনের…
তাই এইটা আর রেখে আসতে পারিনি।

~ ওমা… তো তুই এইভাবে এতগুলা টাকা নিয়ে চলে আসলি?
~ হুম। আর কি করবো বলো? নিজ থেকে তো আর এক টাকাও সে দিবেনা। এই টাকায় তো আমার ও অধিকার আছে, নাকি? তো আমি আমার অধিকারের টাকাটা নিয়ে আসছি। এইবার কি করে আমিও দেখি!

~ তোর অধিকারের টাকা এটা?
~ হ্যাঁ।
~ কে বলছে?
সে তীরচক্ষুজোড়া নিয়ে বললো,
~ কেন আমার জামাই বলছে! আব্বুর যেহেতু ছেলে নাই, সেহেতু তার অর্ধেক সম্পত্তি তো আমারই হওয়ার কথা। তাইনা? তো আব্বু তো আমাকে সোজাসাপ্টাভাবে জানিয়েই দিলো যে রফিকের সাথে থাকলে সে আমাকে এক টাকাও দিবেনা। কেন দিবেনা? আমার নিজের ইচ্ছা~অনিচ্ছার দাম কেন থাকবেনা তার কাছে?

~ তোর আব্বুতো বলছিলো রফিকের সাথে ডিভোর্স করিয়ে তোকে অনেক ভালো জায়গায় বিয়ে দিবে। তখন তো আর তোর নিজের আব্বুর টাকার কথা মাথাতেই থাকতো না! এখন তোর জামাইয়ের টাকা নেই বলেই তো তুই টাকা টাকা করছিস। কেন বুঝিস না?

~ আচ্ছা, ডিভোর্স করালে কি সত্যিই আবার বিয়ে হওয়া এত সহজ আম্মু? আর আমার আদৌ হবে আর বিয়ে? যার আম্মু পালায়ে গেছে, যে নিজেও পালায়ে গেছিলো একদিন, এমন মেয়েকে কে ঘরে তুলবে বলো? নিজের জীবন এভাবে ধ্বংস করার চেয়ে তো রফিকের সাথে এভাবে কাটিয়ে দেওয়াই অনেক ভালো! আর রফিক তো আমাকে ভালোবাসে। আমিও ওকে ভালোবাসি!

~ তুই কার কথায় এতগুলা টাকা আনছোস?
~ তুমি আবার কাউকে বইলো না। বললে রফিক খুব রেগে যাবে।
~ আচ্ছা কাউকে বলবো না। তুই উত্তর দে।

~ হুম, আমি রফিকের কথাই শুনছি। ও_ই আমাকে বলেছে কোথায় কোথায় টাকা থাকতে পারে। আর এটাও বলছে, যদি টাকা না নিয়ে ওর কাছে যাই, তাহলে ও আমাকে আর কখনো গ্রহণ করবেনা। আমি না করে দিছিলাম দেখে ও আব্বুর পাঠানো ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিছিলো। এইটা আমি সহ্য করতে পারিনি আম্মু।

আমি তো ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না! কিভাবে ওকে ডিভোর্স দিবো! তাই ওর কথাই মেনে নিলাম। খারাপ কিছু তো করিনাই! নিজের অধিকারের কিছুটা হাতিয়ে নিয়ে চলে এলাম। রফিক ও বলছে, এখানে আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনাই। যা করছি ঠিক করছি, আমি এরচেয়েও অনেক বেশি ডিজার্ব করি, যেটা আমার আব্বু দিতে অপরাগ।

অনু চৌধুরী হতাশ গলায় বললেন,
~ তাও তুই কাজটা ঠিক করিস নাই তানিশা। লোকটা অসুস্থ, সম্পর্কে তোর বাবা হয়। আমাকে কিছুক্ষন আগেও কল দিছিলো। খুব হতাশ হয়ে আছে লোকটা, কিনা কি হয় আবার কে জানে!

সে তোকে খুঁজে বের করবেই।
যদি শুধরাতে চাস, তাহলে টাকাগুলো সব আমার কাছে দিয়ে দে। আমি আবার সব পাঠিয়ে দিবো তার কাছে।

এ পর্যায়ে রফিককে ডেকে তানিশা ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলো।
রফিক ঠোঁট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চোখের মধ্যে শয়তানি হাসি দৃশ্যমান রেখে বললো,
~ শাশুড়ি, ও শাশুড়ি! কি ব্যাপার বলেন তো! নিজের মেয়েকে তার স্বামীর অবাধ্য হতে শিক্ষা দিতাছেন? কামডা কি ঠিক করতাছেন আম্নে?

অনু চৌধুরী চোখ গরম করে উত্তর দিলো,
~ তুমি চুপ করো। দূরে গিয়া বসো, তোমার গা থেকে পঁচা ইঁদুরের গন্ধ আসে। দূরে গিয়ে বসো, যাও।
রফিক সেসব কথা কানেই তুললো না।
~ তো শাশুড়ি কী করতে চান? টাকা ফেরত পাঠাতে চান?
~ হ্যাঁ।

~ না দিলে কী করবেন?
~ কিছু একটা তো করবোই।
~ হিহ্ হি! পুরান স্বামীর জন্য ও এত দরদ?
~ রফিক!

~ আইচ্ছা, শাশুড়ি আম্মা, তাইলে চলেন শেয়ারে যাই। আম্নেও কিছু পাইবেন। এইবার বলেন কোনো গিরিঙ্গি লাগাইবেন কিনা?
বলেই সে দাঁত বের করে হাসলো।
অনু চৌধুরী এবার একটু নড়ে বসলেন।

তার ও তো টাকার ভীষণ প্রয়োজন এই মুহূর্তে!
নরম গলায় বললেন,
~ শেয়ারে কত টাকা আমার?
~ আম্নে ৩৫, ০০০ টাকা রাখেন।
অনু চৌধুরী তব্ধা খেয়ে বললো,
~ কত বললা?
~ কত আর, পঁয়ত্রিশ হাজার।

আহত গলায় বললেন,
~ তোমরা প্রায় দুই লাখের ও বেশি টাকা হাতাইছো। আর আমাকে শেয়ারে দিবা মাত্র ৩৫, ০০০ টাকা?

~ ওম্মা! তো কত দিমু আম্নেরে? আম্নে তো নিবেন খালি মুখ বন্ধ রাখার জন্য। আম্নে তো আর আমার কোনো কাজেই লাগেন নাই। হুদাই। এদ্দুর দিমু কইছি যে এডাই তো অনেক বেশি শাশুড়ি আম্মা! হিহ্ হি! এইবার কন কী করবেন! টাকা নিবেন না মুখ খুলবেন?

পর্ব ২২

টাকা শেয়ারের ব্যাপারটা কানে আসতেই অনু চৌধুরীর ভাবান্তর হলো। সে এখন আর রেজা চৌধুরী নামের কারো জন্য ব্যথিত না।
না চিন্তিত অন্য কারো জন্য।

তার এখন একটাই লক্ষ্য, টাকার পরিমাণ কিভাবে একটু বাড়ানো যায়।
সে গলা উঁচিয়ে রফিককে বললো,
~ শোনো রফিক, তুমি তো টাকার সাথে সাথে আই ফোন ও একটা নিছো। টাকাও তো কম না। তো, আমার সাথে কি এইডা ঠিক হইতাছে? অন্যায় হইতাছে না কও?
আমি তো চাইলেই তোমাগরে ধরায়ে দিতে পারি।

তখন এই টাকাও যাইবো লগে জীবন ও যাইবো।
রফিকের সাথে কয়েক দফা তর্ক~বিতর্ক শেষে অবশেষে অনু চৌধুরী ৫০, ০০০ টাকাই হাতিয়ে নিলো। একদম হাতে হাতেই।
রফিক আর তানিশা বাদ বাকিসব নিয়ে চলে গেছে।
তানিশা যাওয়ার আগে একবার শুধু বললো,

“আম্মু দোয়া কইর‍্যো। আমি ঠিক করছি না, বলো?”
অনু চৌধুরীর সেদিকে মন নেই দেখে সে কিছু কথা বলে গেলো।
“আম্মু শোনো, আমরা এখানে আর থাকবো না। এই টাকা দিয়ে রফিক বলছে, ও ব্যবসা শুরু করবে, অন্য শহরে গিয়ে। এজন্যই মূলত এতকিছু করলাম। আব্বু তো চাইলে ওকে যেকোনো একটা দোকান বা ব্যবসা ধরায়ে দিতে পারতো। আব্বুর তো অভাব নাই দোকান, ব্যবসার। তখন তো আমরা কোনোমতে হলেও চলতে পারতাম। কিন্তু আব্বু তো খুব জেদ ধরে বসে ছিলো। কত বোঝালাম, কোনোভাবেই বুঝলো না! যাক গে, আমরা আগামীকাল ভোরেই চলে যাবো। আমার মনে হয় না আর কখনো তোমাদের কাউকে দেখবো বলে। কারণ যোগাযোগ রাখলেই ধরা খেয়ে যাবো। আচ্ছা, এবার আসি। আল্লাহ হাফেজ।”
অনু চৌধুরীর অত শত খেয়াল করার সময় নেই। তার হাতে এখন এতগুলো টাকা!
ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
এবার তো আজমলের সাথে ওদের বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারটা নির্ধারণ না করলেই নয়। জমি~জমার বিষয় আশয়, টাকাকড়ি দিয়ে কোনোমতে বেশ খানিকটা অথবা পুরোটাই নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়ে নিলে কেমন হয়? একটা বাড়ি ও তো উসুল করে নিলে মন্দ হয়না! হাতে টাকাকড়ি আছে, সমানে টাকা ফেলে~টেলে যা যা নেওয়া যায় তাই ই তো লাভ!
মেয়েকে কোনোমতে বিদায় দিয়ে দিয়েই সে ব্যস্ত হয়ে পড়লো নিজ কাজে। অত:পর আজমল উদ্দীনের ফোনে সীমাহীন উত্তেজনায় অনু চৌধুরী ফোন দিয়েই দিলো। ফোন রিসিভ হতেই আজমল উদ্দীন কাঁচুমাচু করে বললেন,
~ হ্যাঁ অনু? এইতো আমার আসতে আর ১ঘন্টা লাগবে। চলে আসছি।

~ কোথায়, কোন জায়গায় আছো?
~ এইতো সায়দাবাদ।
~ তুমি ওখানেই থাকো। আমি আসতেছি।

~ কেন কেন? তুমি আসবা কেন?
~ আমি আজকে, এখনই তোমার বাড়িতে যাবো।
আজমল উদ্দীন হকচকিয়ে গেলেন এই কথা শুনে।
~ আমার বাড়িতে যাবা মানে? এক মাস সময় দিছিলা না?
~ এখন আর এক মাস অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
~ মানে কি!
~ মানে হইলো, এক মাস চাইছিলেন টাকা পয়সা জোগাড়ের জন্য। সেই টাকা পয়সা জোগাড় হয়ে গেছে। তার চেয়েও অনেক বেশিই হয়েছে বরং।
আজমল উদ্দীন এবার চাপা কন্ঠে জবাব দিলেন,

~ অনু, এত কম সময়ে কিভাবে তুমি এত টাকা জোগাড় করতে পারলে? কিভাবে সম্ভব?
~ আপনি আর কথা বাড়াইয়েন না তো। আমি এখনি রওনা হবো। আপনি ওখানেই অপেক্ষা করেন।
এবার তিনি কঠিন গলায় বললেন,
~ না। আমিই বাসায় আসতেছি। তুমি এক চুল ও নড়বা না। আমি আসতেছি।
বাসায় এসেই এক প্রকার হাঙ্গামা বেঁধে গেলো তাদের মধ্যে।
বিষয়বস্তু হলো, এত কম সময়ে, এত তাড়াতাড়ি কিভাবে এতগুলো টাকার জোগাড়যন্ত্র করলো অনু চৌধুরী?
আজমল উদ্দীন অনু চৌধুরীর চোখের সামনে বসে নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
~ কত টাকা জোগাড় করছো?
~ যতই হোক। বলা যাবে না।

~ কেন? কেন বলা যাবে না?
ঢোঁক গিলে চোখ ঘুরিয়ে সে জবাব দিলো,
~ বললেই তো আপনি সব একসাথে শেষ কইর‍্যা দিবেন। আমি জানি। আর আমি সেটা কখনোই হতে দিতে পারবো না। কারণ এই টাকার সাথে আরো কিছু যোগ করে অনেক কিছু করার মতলব আছে আমার।
~ তোমার মতলব খুব বেশি সুখনীয় হয়না অনু।
এবার ভালোয় ভালোয় বলো, কোন কাজে জড়ায়ে এত বিপুল পরিমাণের টাকা আনলে।
এবার সে বিষম খেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ আজমল, আপনি আমাকে অবিশ্বাস করছেন?
সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিলো,

~ দেখো, আমি নিরুপায় অনু। আমি নিরুপায়। তোমার হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছে তুমি অনেক টাকাই এনেছো। কিন্তু কোথা থেকে?
~ যেখান থেকেই হোক, এনেছি। বেশি না, মাত্র ৩০, ০০০ টাকা। আরো ৩০, ০০০ টাকা আপনার ব্যাংক একাউন্ট থেকে উঠায়ে নিয়ে গেলেই হবে।
~ এত টাকা কে দিলো তোমাকে? এটা এমন কী কাজ যে কাজে এত অল্প সময়েই ৩০, ০০০ টাকা মাইনে দিয়ে দেয় একেবারে? আর আমি যতদূর জানি, তোমার পরিবার ও তোমাকে টাকা বা সাপোর্ট কোনোটাই দিচ্ছে না এখন। তাহলে কোথা থেকে আনলা বলো?
~ আপনি তো খুব ঝামেলার মানুষ! বিয়ের আগে তো এমন করেন নাই!
সে ভ্রুকপাটি কুঞ্চিত করে বললো,
~ বিয়ের আগে তুমি আমার বউ ছিলে? না। এখন তুমি আমার দায়িত্ব, আমার মেয়ের মা। এখন তোমার সব খবরাখবর রাখাটা আমার শুধু দায়িত্বই না, উচিতব্য।

~ হইছে। এত জ্ঞানী জ্ঞানী কথা কওন লাগবো না। আমি কোনো মন্দ কাজ করছি, এমন ভাবতেছেন না তো?
~ তুমি না বললে তো না ভেবেও উপায় নেই।
~ ছি:! আপনি এসব কি বলতেছেন!
আজমল উদ্দীন চোখ গরম করে জিজ্ঞেস করলেন,
~ বলো, তোমাকে এত টাকা কে দেয়?
কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,
স্বামী পাল্টাতেই ভাল্লাগে খুব?
অনু চৌধুরী এবার রেগে গেলেন।
সে মুখে যা আসলো তাই তাই বলে আজমল উদ্দীনকে আহত করলো। তারপর বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো দেখে আজমল উদ্দীন আর মুখ খুললেন না।

আজমল উদ্দীন একা একা নিথর দেহ নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছেন চুপচাপ।
তার নিজের কপাল নিজেরই চাপড়াতে ইচ্ছা করছে। সে ভাবছে,
হায়রে কি ভুল করলাম!
এই অনু, যে নিজের স্বামী, এত বড় বড় সন্তান থাকা সত্ত্বেও আমার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়াতে দ্বিধাবোধ করেনি, সে যে একই কাজ আমার সাথেও করবেনা তার কি গ্যারান্টি? নিশ্চয় সে টাকার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করছে!
অথবা অন্য কোনো বাজে কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে হয়তো।
কিন্তু ওকে তো ছেড়েও দেওয়া যাবেনা।
ওকে দরকার নেই আমার, ঠিক আছে।

কিন্তু ওর বাচ্চা, আমার মেয়েটার মা তো ও। মেয়ের জন্যই আমার অনুকে সহ্য করতে হবে!
না করে আর কোনো উপায় নেই। অনুকে ভালো করার জন্য ওকে এই শহরে আর না রাখাই শ্রেয়। ওকে গ্রামের বাড়িতে রাখলেই ও হাতে থাকবে। নয়তো কখন কোন দিকে কি করে বসবে তার তো ঠিকঠিকানা নেই!
আচ্ছা, শাহানাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ওর বাপের বাড়িতে একটা ব্যবস্থা করা যাবে কি?
ও কি এত সহজে নিজের অধিকারটুকু ছাড়তে রাজি হবে?
আজমল উদ্দীনের প্রাক্তন স্ত্রী শাহানা।
তাকেই তিনি অতি সন্তপর্ণে ফোন লাগালেন, খুব দু:খ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে।
শাহানার সাথে কথা বলে দেখা যাক ও মানে কিনা। কিন্তু কি অদ্ভুত টান আর মায়ার খেলা।

আজমল উদ্দীন কিছুতেই তার প্রথম স্ত্রীকে এই প্রস্তাব দিতে পারলেন না যে, যাও, তুমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকো। কারণ এখানে এখন আমার নতুন বউ থাকবে।
এটা ওটা নিয়েই কিছুক্ষন আলাপ চললো তাদের। যতক্ষন কথা হলো ততক্ষন যেন আজমল উদ্দীন তার জীবনের সব দু:খ, কষ্ট, ব্যর্থতা ভুলে গেলেন।
ভাবলেন, ইশ, কেন বিধাতা একটি মেয়ের জীবনে সব ক্ষমতাই একটু একটু করে দিয়ে দেন না? কিছুক্ষন কথা বলার পর তার অশান্ত মন শান্ত হয়ে গেলো।
কিন্তু যখনই শাহানা ফোন কেটে দিলো, আবার সে মানসিক চাপে বিধ্বস্ত হয়ে গেলো।
মোদ্দাকথা হলো, অনুকে ভালোবাসার চেয়েও সন্দেহই বেশি হয় তার। চাইলেও সে কমাতে পারে না তার এই সন্দেহ বাতিকের সমস্যাটা।
এভাবে কি সাংসারিক জীবন সুখের হতে পারে?
এত সন্দেহ, এত চাহিদা নিয়ে কেউ কিভাবে সংসার করবে?
অনুর কি আদৌ আমার সংসারে মন বসবে?
ও কি আসলেই আমাকে ভালোবাসে?
আমার বাচ্চাটাকে নিশ্চয় আগের ঘরের বাচ্চাদের মত ওরকম অযত্ন, অবহেলা করবেনা!
মনে হচ্ছে না, তবুও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে।
অনেক বড় ভুল।
আনমনে বসে বসে ভাবছেন আজমল উদ্দীন।

পরের দিন আবার আব্বু কল দিলো অনু চৌধুরীকে। তানিশা আপুর জন্য আমাদের দিনগুলো এখন খুবই জঘণ্য আর অগোছালো হয়ে গেছে। আব্বু কেমন যেন পাগলামি করে এখন।
এই দুই দিন সে দুই চোখের পাতা এক করেনি। যদিও বা ঘুমের তাড়নায় চোখের পাতা একটু লেগে আসে, তাও সে ধপ করে উঠে বসে হঠাৎ হঠাৎ।
উঠেই উত্তেজিত হয়ে ‘তানিশা তানিশা’ বলে চিৎকার করা আরম্ভ করে।
আর তখনই বেশি সমস্যা শুরু করে, ভীষণ পাগলামি শুরু করে তখন।
আমার এই ছোট্ট জীবনটায় কত কিই না দেখতে হচ্ছে আমায়, একবার ভাবুন তো!
মায়ের নোংরামি,
বোনের বিশ্বাসঘাতকতা,

বাবার পাগলামি!
কেউ নেই পাশে দাঁড়ানোর মত।
কোনো আত্মীয়~স্বজন ও নেই।
ফুফা আসলেও বেশিক্ষন থাকতে পারেনা, যোগাযোগ করলেও তা করে খুব গোপনে। কারণ ফুফুর কড়া নিষেধাজ্ঞা, আমাদের মত নষ্ট ফ্যামিলির সাথে কোনোভাবেই কোনো যোগাযোগ রাখা যাবে না। কলঙ্ক লাগবে, কলঙ্ক।
সামান্য সান্ত্বনা দেওয়ার মত ও কেউ নেই আমাদের।
আপন স্যার থাকলেও চলতো, কিন্তু স্যার ও এখন নেই। স্যার ১৪দিনের ট্রেনিয়ে চলে গেছেন।
আব্বুর জন্য ডাক্তার আনা হয়েছে।
রিমা খালা আজ ভোরেই চলে এসেছেন।
আসতেন না, আমি ফোন করে বেদমে কাঁদলাম বলেই ছুটে চলে এসেছেন।

রিমা খালা আসার সময় সাথে করে ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। ডাক্তার বলতেছে, তাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়া উচিত। নার্সের আন্ডারে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা রাখতে হবে।
ঘুমই এখন তার জন্য প্রধান এবং একমাত্র ঔষধ। মেয়ের শোকে মানসিক আঘাত পেয়েছে ভীষণ তাই।
কিন্তু রিমা খালা রাজি হচ্ছেন না।
খালা রাজি হচ্ছেন না কারণ আব্বু এখনো ভালোই সজ্ঞানে আছেন। সে নিজেই নিষেধ করতেছে, আমাকে ওখানে পাঠাইয়ো না রিমা।
আমি ওখানে গেলে আরো শেষ হয়ে যাবো। আমাকে এখানে থাকতে দাও। তানিশার খবর না পেলে আমার মরণেও সুখ হবে না।
~ইত্যাদি সব কথাবার্তার জের ধরে সে বার বার শুধু ডাক্তারকে বলতেছে, যা করার এখানেই করেন।
ওদিকে কায়সার ফুফা খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছেন, তানিশারা আগের বাড়িতে নেই এমনকি আশেপাশে বা অন্য কোথাও আছে কিনা তার ও ইয়েত্তা পাওয়া যাচ্ছে না।

ওই চোর দম্পতি পুরো এলাকা থেকে একেবারেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
এই বিষয়টা না চাইতেও আব্বুকে জানাতে হলো।
সে অনেক জোর জবরদস্তি করে রিমা খালার সাহায্য নিয়ে অনু চৌধুরীকে ফোন দিলো।
শুধুমাত্র জানার জন্য, তানিশার আসল বিষয়টা কি। ও এখন কোথায়? টাকা কি আসলেই ও নিয়েছে? ও সুখী আছে কিনা? রফিকের সাথেই প্ল্যান করে এই কাজ করছে?
অনু চৌধুরী জানালো,

“দেখেন, আমার তানিশার সাথে মাত্র একবার
কথা হইছে। ও টাকা চুরি করছে এবং বলছে এই টাকায় তার অধিকার আছে। তাকে দেওয়া হচ্ছে না দেখে সে সেটার কিছু অংশ কেবল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আর তাকে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো লাভ নেই। সে অনেক দূরে চলে গেছে। এবং আরো বলেছে, সে আর কখনোই আমাদের কারো সাথে যোগাযোগ করবেনা। আমি এর বেশি আর কিছুই জানিনা।”
আব্বু জিজ্ঞেস করলো,
~ তানিশা আমাকে এইভাবে ধোঁকা দিলো? এতগুলো মিথ্যা বললো মেয়েটা আমার সাথে?
ও আমার মেয়েই তো, অনু? বিশ্বাসঘাতকতা! চরম বিশ্বাসঘাতকতা! নিজের বাবার সঙ্গে! আমার প্রথম কন্যা সন্তান আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে অনু! ও ওর নিজের বাবাকে এতটা ছোট করলো সবার সামনে? এতটা কষ্ট দিতে পারলো মেয়েটা!
অনু চৌধুরী আঁতকে উঠে বললো,
~ আপনে শান্ত হন তানিশার বাপ। যা হওনের তা হইয়্যা গেছে। আপনার জন্য এই টাকা জোগানো কোনো বিষয়? আবার দেখবেন সব ঠিক হইয়্যা গেছে। শান্ত হন আপনে।
আব্বু তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে বলে উঠলো,
~ আমি আজ এই মুহূর্তে আমার বড় মেয়ে, তানিশাকে ত্যাজ্য কন্যা ঘোষণা করলাম। এই নামে আমার কোনো মেয়ে নাই। আমার একটাই মেয়ে আছে।
অনু চৌধুরী বিরহের স্বরে বললেন,
~ কি বলতেছেন আপনে!

আব্বু ফোন কেটে নীরবে কিছুক্ষন কাঁদলো।
আমি কাছে যেতাম।
কিন্তু রিমা খালা বললো,
~ থাক, কাঁদতে দে। আজকে অনেক বড় একটা কাজ করছে তোর আব্বু। আজ সে নিজের অস্তিত্বকে ত্যাজ্য করেছে। তাকে কিছুক্ষন শোক করতে দে রাকা। এখন যাস না ওখানে।
আমি বুঝলাম না তার কথার মর্মার্থ; তবুও তার কথাই শুনলাম। দিলাম, আব্বুকে কাঁদতে।

এরপর আর কি করার?
কিছুই করার রইলো না আব্বুর।
সে অশান্ত হয়েই কাটিয়ে দিলো কয়েকদিন।

আব্বুর ব্যবসার অবস্থা নুঁইয়ে পড়বে, এতে সে মোটামুটি নিশ্চিত। তবুও যা আছে তা দিয়ে চলা যাবে। ব্যবসা, দোকান তো তার একটা দুইটা না। অনেক আছে। তন্মধ্যে বেশ কয়েকটিই বন্ধ করে দিতে হবে। যা পাওয়ার না, যেটা চুরি হয়ে গেছে সেসব নিয়ে ভেঙে পড়লে কোনো লাভই হবে না।
রিমা খালা একজন কাজের বুয়া, একজন নার্স, একজন বউয়ের চেয়েও বেশি খাটুনি খাটছে।
তার পরিশ্রম, তার যত্নের কাছে আব্বুর অসুস্থতা হার মেনেছে ইতোমধ্যে।
সে এখন ভারসাম্যহীনতা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক, শান্ত হতে চলেছে আস্তে আস্তে।
কিছুটা শান্ত হওয়ার পরই তার মাথায় এক অন্য চিন্তা ঢুকলো।
একটা না। কয়েকটাই।
তন্মধ্য কয়েকটি চিন্তা কিছুদিন পরই আমার জীবনের মহা কাল হয়ে দাঁড়াবে।
এই ব্যাপারে যদি আমি আগে আগে জানতাম, তাহলে আমি নিশ্চিত হতে পারতাম, আমার সর্বনাশ সামনেই ওঁৎ পেয়ে বসে আছে।

(চলবে)
ফারজানা রহমান তৃনা।
[ আগামী রোববার আমি রাকার বাসার সামনে দিয়েই যাবো, ইনশাল্লাহ্। আবার ঢাকায় যাচ্ছি, আমার পড়াশোনাজনিত কারণে। তাই বলছি, আপনারা যারা রাকাকে নিয়ে চিন্তিত এবং তাকে একটুখানি ভালোবাসা দিতে ব্যাপক আগ্রহী; তারা যোগাযোগ করুন আমার পার্সোনাল একাউন্ট বা পেইজে। আপনাদের ভালোবাসার অংশবিশেষ তার নিকট পৌঁছে দেওয়ার মত সামান্য ব্যবস্থাটুকু তো করতেই পারি! এত কষ্ট করে বোনটার জীবন কাহিনী বললাম যখন, তখন সবাই মিলে কিছু করতে পারলেই বোধ হয় ভালো হবে। উল্লেখ্য, এরকম একটা জীবন কাহিনী অবশ্যই পার্মিশন নিয়ে লেখা যায়না। ঘটনাক্রমের বেশিরভাগই আমার চোখের সামনে ঘটেছে বলেই লিখে ফেলেছি। এবং আমি এই গল্পের শেষে কিছু বার্তা দিয়ে যাবো বলে ঠিক করেছি।

পর্ব ২৩

আজমল উদ্দীনের মাথায় বাজ ভেঙে পড়েছে। অনু চৌধুরী তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য গোঁ ধরে বসে আছে। এবার এমনভাবে কব্জা করেছে যে আর কোনোভাবেই তাকে নিষেধ করা যাবেনা!
কোনোভাবেই না! আজমল উদ্দীন প্রাণপণে চাচ্ছেন, অনু চৌধুরী তার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুক। কারণ অনুর এই সিদ্ধান্তের জন্য তার জীবন বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা সুদৃঢ়।
সে অনু চৌধুরীর পিছন পিছন হাঁটছে আর বার বার শুধু একই কথা আওড়ে যাচ্ছে।
~ অনু, ও অনু, পাখি আমার, না গেলে হয় না? ছেঁড়ে দাও না অনু! বললাম তো পরে নিবো! আচ্ছা, একটা মাস সময় দাও?

অনু চৌধুরীও ছাড়বার পাত্রী নয় যে!
তার উত্তর অপরিবর্তনশীল এবং অভিন্ন।
~ না। আমি হয় আজকে যাবো নয়তো আগামীকাল সকালে। আর কোনো কথা বলবা না। এমনিতেও আজকে বহুত বলছো তুমি। তোমার জিহ্বা খুব বেশিই চালু হইছে আজমল।
~ আচ্ছা আমাকে ক্ষমা করে দাও না অনু। তুমি এক মাস পরে যাও।
~ না।
~ তো, কবে যাবা?
~ আজকেই যাইতে চাই। যাইব্যা?
~ মাত্রই তো ফিরলাম। আবার আজকেই যাবো?
~ ঠিক আছে। কালকে সকালে তাহলে। তুমি হাত মুখ ধুইয়্যা আসো, ভাত দেই টেবিলে।

আজমল উদ্দীন এরপর ও অনেকক্ষন ঘ্যানঘ্যান করলেন বৃথাই।
অনু চৌধুরীকে সে এক চুল ও নড়াতে পারলো না।
দুপুরে এবং রাতে দুশ্চিন্তায় আর ভাত খাওয়া হলো না তার। শুকনো মুখেই ঘুমাতে গেলো।
ঘুম ও হলো না সারারাত।
শেষ রাতে তার গায়ে জ্বর এলো।

অনু চৌধুরীর অত খেয়াল নেই।
সে নিজেই ঔষধ খেয়ে শুয়েছে আবার।
কিন্তু না, ঘুম আর হলোই না।
সারারাত নির্ঘুমেই কাটলো তার।
ফলপ্রসূ সকালের দিকে তীব্র জ্বর আর মাথাব্যাথা অনুভূত হলো তার।
অনু চৌধুরী তার নতুন মেয়ে ইরাকে ঘুমে রেখেই সকাল সকাল নিজের যাবতীয় সব কাজ শেষ করে, সবকিছু গুছিয়ে একেবারে প্যাক করে নিলো।
কিন্তু জ্বরে কাতর আজমল উদ্দীনের দিকে ফিরেও তাকালো না। যখনই আজমল উদ্দীনকে এসে বলতে যাবে রেডি হওয়ার জন্য; তখনই দেখলো তার অবস্থা ভালো নেই খুব একটা।
অনু চৌধুরী তার কপালে হাত দিয়ে দেখেন মহাকেলেঙ্কারি! তার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থা হঠাৎ কিভাবে হলো কে জানে!
মাথাব্যাথা ও নাকি খুব বেশিই।
সেবা~শুশ্রূষা করার অত সময় ও নেই তার।
কোনোমতে তাড়াতাড়ি স্যুপ রান্না করে খাওয়ালো দু চামচ। তারপর আবার ঔষধ দিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেলো না বলেই।
আজমল উদ্দীন মনে মনে হাসছেন আর ভালোই খুশি হয়েছেন তিনি।
আজ আর তাহলে বাড়িতে যেতে হচ্ছে না।
বেঁচে গেছে আজকের জন্য ও।

অনু চৌধুরী কোথায় যাচ্ছে এখন, সেটা অনুসরণ করলে ভালো হতো। কিন্তু তার তো নিজের ওঠার শক্তিটুকুও নেই! থাকলেও সে উঠবেনা! রিস্ক আছে।
বাচ্চাটা বেদমে কাঁদছে।
অনু এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কিভাবে হয়?
এই মাসুম, দুধের বাচ্চা ফেলে গেলোটা কই ও? ভাবতে ভাবতে তিনি নিজেই উঠে মেয়েটাকে নিজের পাশে শুইয়ে দিয়ে জোর গলায় ‘অনু অনু বলে চেঁচালেন।
অনু চৌধুরী সাড়াই দিচ্ছে না।
এদিকে বাচ্চাটার কান্নাও ক্রমশ ভারী হচ্ছে।

তাই তার নিজেকেই উঠতে হলো।
এই বাচ্চাটা তার কলিজার টুকরা।
এর কান্না সে এক সেকেন্ড ও সহ্য করতে পারেনা।
তাই বাধ্য হয়ে নিজেই এখন দুধ গরম করে খাওয়াবে। এছাড়া তো আর কিছু করার ও জায়গা নেই। কোলে করে আদর ও তো করা যাবে না এই জ্বরের শরীরে।
সে বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।
বাচ্চার কান্না থামলো।
কিন্তু না খেয়েই আবার ঘুম দিলো।
এমন সময় অনু চৌধুরী ফোন দিলো।
আজমল উদ্দীন ফোন তুললেন।
~ হ্যাঁ অনু। কই তুমি? তুমি কি মানুষ?

অনু চৌধুরী নিশ্চুপ।
~ কথা বলো না কেন? তুমি দেখলা আমি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি। তবুও তুমি এই বাচ্চাটাকে আমার কাছে রেখে চলে গেলা! বাচ্চা সামলাতে পারবো আমি এই শরীরে?
অনু চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন,

~ ভালোই তো সামলাইছো। ওইযে ইরা ঘুমাচ্ছে তার বাবার পাশে।
~ তুমি জানলা কেম্নে? কই তুমি?
~ আমি বাসাতেই। তুমি তো খুব অভিনয় জানো আজমল!
~ মানে!
~ এইযে জ্বরের ভাণ করলা গায়ে গরম কাপড়ের শ্যাক দিয়ে, থার্মোমিটার চুলার সামনে ধরে গরম করে, তা কি আমি বুঝিনাই ভাবছো?
~ কি! আচ্ছা ঠিক আছে, আমার গায়ে আসলেই জ্বর আছে কিনা তুমি নিজেই এসে দেখে যাও।
আড়াল থেকে বেরিয়ে সে হাসিমুখে বললো,

~ আসছে কিন্তু বেশি না। তুমি চুলায় জামা কাপড় গরম কইর‍্যা নিজের শরীর গরম কইর‍্যা এরপর নাম দিছো তোমার জ্বর। থার্মোমিটার ও গরম কইর‍্যা..যাক গে, মানলাম তোমার জ্বর, মাথাব্যাথা। কিন্তু সবই তো করতে পারছো দেখলাম, তারমানে তুমি বাড়িতে যাইতে পারবা। আর প্যাঁচাল পাইড়ো না, রেডি হও।
আজমল উদ্দীন হাল ছেড়ে দিলেন।
তার গায়ে জ্বর আছে, মাথাব্যাথা ও প্রচন্ড। কিন্তু কিছুই করার নেই। এই বউ তাকে কোনোভাবেই ছাড়বেনা।
সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও শার্ট গায়ে দিচ্ছে।
আজকে তার এই অসুখ আরো দ্বিগুন বাড়বে।
মহাপ্রলয় হবে আজ।

আজমল উদ্দীনের স্ত্রী শাহানা বেগম একজন ধার্মিক, পরহেজগার নারী। সে অনু চৌধুরীর মত অত রুপবতী, আকর্ষণীয়া নয়। কিন্তু ব্যবহার এবং চরিত্রগত দিক দিয়ে তার মত নিঁখুত ভালো মহিলা এই যুগে পাওয়া হয়তো সত্যিকার অর্থে দুষ্কর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পাশাপাশি তার দয়া মায়ার এবং গুনের কথার ও ছড়াছড়ি সবদিকে।
তার বাবার পরিবার এবং তার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস ও উচ্চ মার্গের।
আজমল উদ্দীনের সাথে প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো। ভার্সিটি লাইফের প্রেম।
কিভাবে যেন ভালো লেগে যায় তার আজমল উদ্দীনকে।
আজমল উদ্দীন ও মরিয়া ছিলো শাহানা বেগমের জন্য। তার তখন আয় প্রাণ যায় প্রাণ টাইপ ভালোবাসা ছিলো।
শাহানা বেগম ভাবতো, আমার মত এমন একজন কালো গড়নের, গুণহীন মেয়েকেও কেউ এতটা ভালোবাসতে পারে বুঝি?

সে নিজেকে একদম সাধারণ আর অযোগ্য ভাবতো সর্বদা।
অথচ তার বাবার অবস্থা কত ভালো ছিলো। নির্বিঘ্নে কত ভালো জায়গায় তার বিয়ে হতে পারতো।
কিন্তু শাহানা বেগম আজমল উদ্দীনের মধ্যেই নিজেকে হারিয়েছিলেন।

আজমল উদ্দীনের কোনো একটা দিক তাকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিলো যে সে একেবারে তাকে বিয়েই করে নেয় একদিন।
বিয়ের পর তাদের সংসার ভালোই চলছিলো।
সে যেহেতু খুব ভালো ফ্যামিলির মেয়ে তাই আজমল উদ্দীনের এই নাই নাই ধাঁচের অভাব~অনটনেরন সংসারে মানিয়ে~গুছিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো তার।
কিন্তু ভালোবাসার টানে সব সয়ে গেছিলো।
কারণ বিয়ের পর ৬/৭মাস তার বাবার ফ্যামিলি তার সাথে কোনোপ্রকার যোগাযোগই রাখেনি।
কারণ সে তাদের সবার অমতে একজন গাড়ির ড্রাইভারকে বিয়ে করেছিলো।
তাই না পারলেও পারতে হবে করে করে পেরেও গেছিলো।
শাহানা বেগম নিজেও শিক্ষিত।
সে টিউশন করার পাশাপাশি গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে গেস্ট টিচার হিসেবেও নিয়োগ দিয়েছিলো। সে হিসেবে অনেক আয় হত তার।

আজমল উদ্দীনের চেয়েও তার রোজগার ভালো ছিলো। এক কথায় বেশ কয়েক বছর আজমল উদ্দীন শুয়ে বসে বউয়ের টাকাতেই সংসার চালিয়েছিলেন।
সাংসারিক কত ঝামেলা, ঝগড়াঝাঁটিই থাকে। কিন্তু কোনোদিন ভুল করেও শাহানা বেগম তার স্বামীকে তার দুরাবস্থার খোঁটা তুলে কিছু বলেন নি।
স্বামীকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে সে তাকে হরহামেশাই গাড়ি চালাতে নিষেধ করতো। বলতো, আপনি সপ্তাহে একবার গাড়ি চালাইয়েন। আপনার হাত কেমন হয়ে গেছে দেখেন! ইত্যাদি ইত্যাদি ধরণের কত মায়া~মোহাব্বতের ফুলঝুড়ি!
উপর্যুপরি,
আজমল উদ্দীনের গাড়িখানাও শাহানা বেগমের বাপের টাকায় কেনা।
আজমল উদ্দীনের মা বেঁচে ছিলেন তখন।

মহিলা খুব বদমেজাজি আর খিটখিটে স্বভাবের ছিলেন। সবসময় শুধু খুঁত ধরতেন সবার।
শেষ জীবনে এসেও সে সেটা অব্যাহত রেখেই মরেছে।
তার শাহানা বেগমকে পছন্দ হতোনা, দিন রাত শুধু এটা ওটার খোঁটা আর খুঁত ধরতেন। কারণ তার স্বপ্ন ছিলো ছেলের জন্য পরীর মত মেয়ে আনবে ঘরে। সেখানে শাহানা বেগম ছিলেন কালো।
ছেলের কান ও খেয়ে দিয়েছিলেন বুড়ি।
শাহান বেগম চুপচাপ স্বভাবের মানুষ।
ভুলেও টু~শব্দটি পর্যন্ত করতেন না।
নীরবে সব সয়ে যেতেন।

তার চাকরী, টিউশন নিয়েও ছিলো তার শাশুড়ির ঘোর আপত্তি।
এরকমভাবেই কেটে গেছিলো এক বছর।
কিন্তু শাহানা বেগম কন্সিভ করেনি তখনো।
শাশুড়ি কটুক্তির জন্য সে প্রাণপণে লেগে পড়ে।
কিন্তু দু বছর গড়িয়ে তিন বছর অতিক্রমের পথে; তখন ও তার বাচ্চা হওয়ার নামগন্ধটুকুও নেই!
চারপাশের নাক ছিটকানো, আজেবাজে কথা উপেক্ষা করা যায় কিন্তু নিজের ঘরেই যদি রেডিওর মত সারাক্ষন এইসব কটুক্তি চলতে থাকে অনবরত, কতক্ষন সহ্য করা যায় সেটা?
উঠতে বসতে, দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা এসব শুনতে হত তার।
তবে আজমল উদ্দীন কিছুই বলতেন না এ ব্যাপারে।
শুধু বলতেন, এত তাড়া কিসের? হবে হবে।
তার ওরকম কোনো দুশ্চিন্তাই ছিলোনা এই বিষয়ে।

তার চিন্তা ছিলো, সে পারছে না, তার ব্যর্থতা। একদিন সুখবর আসবেই।
তবে তার সামান্য কিছু অশান্তি ছিলো মনে মনে।
কারণ শাহানা বেগম তাকে স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি দিতেও অনেকটাই ব্যর্থ। তবুও আজমল উদ্দীন কোনোদিন কিছু বলেনি তার স্ত্রীকে। কারণ তার জন্য তার স্ত্রীই ছিলো সব। যদিও মাঝেমধ্যে সে সীমালঙ্ঘন করে ফেলতো, নিজের অজান্তেই।
শাহানা বেগম এত নামাজী, এত আল্লাহর অনুগত ছিলো না প্রথম প্রথম।

এসবের থেকে মুক্তি পাওয়ার আশাতেই সে শান্তির পথে অগ্রসর হয়।
দীর্ঘ সময় নিয়ে সে নামাজ পড়তো।
ঘন্টার পর ঘন্টা সিজদাহ্, মোনাজাতে পড়ে থাকতো, খুব কান্নাকাটি করতো।
পানি~পড়া হতে মোকছুদুল মোমিনীনের সবকিছু অনুসরণ করতো। সব ধরণের টোটকা নিজের উপর ফলাতো, যেখানেই যা পেতো। কারণ তাকে বাচ্চা প্রসব করতে হবে, যেকোনো মূল্যে।
নিজের পছন্দে বিয়ে করায় তার
বাবার বাড়ির সাথেও তার যোগাযোগ তেমন ভালো না। এরা তাড়িয়ে দিলে কোথায় গিয়ে উঠবে সে?
কিন্তু তাতেও তার শাশুড়ির ঘোর আপত্তি!

তিনি বলে বেড়াতেন,
শাহানা বেগম সারাদিন আসলে নামাজ~কালাম করেনা, কালা যাদুর আশ্রয় নিয়ে তাবিজ করতেছে তার ছেলের উপর। এইজন্যই নাকি যবে থেকে শাহানা বেগম এরকম সময় নিয়ে ইবাদাতের অভিনয় আরম্ভ করেছে; তবে থেকেই নাকি তার ছেলে তার হাতের বাইরে চলে গেছে। তার ছেলে তার কোনো কথাই শোনেনা। তার ছেলেকে বশ করেছে তার শয়তান বউ।
(চলবে)
বিয়ের এক বছরের মাথাতেই জায়েদের গর্ভবতী স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলো। এই স্ত্রী ছিলো তার জীবনের চেয়েও প্রিয়। স্ত্রীর মৃত্যশোক কোনোভাবেই কাটাতে পারছে না সে। জায়েদের ধন~দৌলতের কথা বলে বাক্য ব্যয় করে সময় নষ্ট করছিনা। সে একজন প্রথম কাতারের ধনী, বলা বাহুল্য।
একদিন সে স্বপ্নে দেখলো, তার স্ত্রী তাকে খুব আকুতি মিনতি করে বলছে, সে যেন যেভাবেই হোক একটা বাচ্চা নেয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

জায়েদ স্বপ্নের মধ্যেই বললো, আমি তোমাকে জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারবো না এরিন। আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবো না। কোনোদিন না।
তার স্ত্রী তাকে জানিয়ে গেলো,
তাহলে বিয়ে ছাড়াই বাচ্চা নেওয়ার ব্যবস্থা করো জায়েদ। কারণ হাতে একদম সময় নেই!

তোমাকে এটা করতেই হবে!
জায়েদ প্রাণপণে জানার চেষ্টা করছে কিন্তু তখনই তার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। বিয়ে ছাড়াই বাচ্চা নেওয়ার কথা বলেছে তার সদ্য প্রয়াত স্ত্রী। কেন? এটা কিসের ইঙ্গিত?
…একটি অতিপ্রাকৃত, নতুন গল্প। দুর্বল হার্টের কেউ গল্পটি পড়বেন না। পেইজেই পোস্ট করা হবে। পেইজে নজর রাখবেন।
আসছে..

পর্ব ২৪

অত:পর ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হলো আজমল এবং শাহানা দম্পতির। কিন্তু ঐ ডাক্তার তেমন কোনো জটিলতা খুঁজেই পায়নি। শাহানা বেগম তারপর ও স্ব~খরচে, স্ব~উদ্যোগে ঢাকায় এসে পরীক্ষা করান। পরীক্ষার ফলাফল যে এতটা ভয়ংকর হবে তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
তার জরায়ুতে টিউমার ছিলো। এবং সেটা ততদিনে এতটাই গুরুতর হয়ে গেছিলো যে তা ক্যান্সারের উপক্রম। ডাক্তার জানালেন, তাকে ইমেডিয়েটলি অপারেশন করে জরায়ু কেটে বাদ দিতে হবে।
এবং এই টিউমারের জন্যই সে ব্যর্থ ছিলো শারীরিক কার্যকলাপে।
আজমল উদ্দীন এসব শুনে তদ্ধা খেয়ে গেলেন। কি বলছে এই শহুরে ডাক্তারনী?
অবশেষে তাই করতে হলো।
শাহানা বেগমের জরায়ু কেটে বাদ দিতে হলো। এবং তখন থেকেই সে বন্ধ্যাত্ব লাভ করে। শাহানা বেগম আর কখনোই মা হতে পারবেন না এবং তার স্বামীর প্রয়োজনীয় সুখ, আহ্লাদ ও দিতে অক্ষম তিনি।

এরপর থেকেই আজমল উদ্দীনের সামান্য মানসিক উত্তেজনা, সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে; তার প্রচন্ড যৌন উত্তেজনাহেতু কারণে।
ফলপ্রসূ সে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বাচ্চাকাচ্চাদের সাথেও অপ্রীতিভাজন আচরণ অনিচ্ছাসত্ত্বে ও করে ফেলতো। পরে অবশ্য নিজেই আফসোস করতো। কিন্তু নারী দেহ দেখলে সে আর কোনোভাবেই সামলাতে পারতো না নিজেকে। ডাক্তার বলেছে, তার স্ত্রীর এই অক্ষমতা সে মেনে নিতে পারছে না বলেই এরকমটা হচ্ছে। এটা আস্তে কমে যাবে। যদি না কমে বা একান্তই যদি সে আর সংবরণ করতে না পারে নিজেকে, তাহলে তার জন্য বিয়ে অবধারিত।
একদিকে চির বন্ধ্যাত্ব লাভ; অন্যদিকে স্বামীর এই মনের অসুখ। পাশাপাশি শাশুড়ি মায়ের কথার খোঁটা শুনে শুনে তো সে একপ্রকার গোলকধাঁধায় পড়ে গেছিলো তখন। মানুষের কথা দিয়েই আঘাত করার ক্ষমতা সীমাহীন বেশি হয়, সে তার শাশুড়ি মাকে দেখে তা বুঝে যায়।

সে বুঝতে পারে, আজমল উদ্দীনের ভালোর জন্যই তাকে আবার বিয়ে করাতে হবে। একসময় সে টের ও পেয়ে যায় যে আজমল উদ্দীন ইতোমধ্যে একটা সম্পর্কে জড়িয়েও গেছে।
আস্তে আস্তে আজমল উদ্দীন স্বাভাবিক হতে শুরু করেন। শাহানা বেগম ও প্রমাণ পেতে শুরু করলেন, তার স্বামী এখন আর শুধু তার সম্পদ নেই, অন্য একজন ও তাকে ব্যবহার করছে, ভোগ করছে। শাহানা বেগম স্বামীর এই সুস্থ, সুখীচিত্রে আর ব্যাঘাত ঘটালেন না। বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে সবটা সয়ে গেলেন।
মাঝেমধ্যেই আজমল উদ্দীনের মন খারাপ থাকতো। শাহানা বেগম বুঝতেন, তার স্বামীর প্রেমিকার কোনো নতুন আবদার এসেছে আবার, যেটা তার স্বামী পূরণ করতে পারছে না টাকার অভাবে। সে তখনই নিজের জমানো টাকার অনেকটাই আজমল উদ্দীনের হাতে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যেত। আজমল উদ্দীন অবাক হতেন,
তার স্ত্রীর এই অগাধ ভালোবাসা এবং ক্ষমতা দেখে।
তিনি তার স্ত্রীকে ফেলে যার প্রেমে মশগুল ছিলো তিনিই হলেই আমার মা, মিসেস অনু চৌধুরী।

অনু চৌধুরীর প্রতি আসলে আজমল উদ্দীনের ভালোবাসার পাল্লা ছিলো শূণ্য। উনি মূলত তার প্রথম স্ত্রীকেই মন প্রাণে ভালোবাসেন। আর অনু চৌধুরীকে সামান্যই পছন্দ করেন তাও শুধুমাত্র দৈহিক, শারীরিক সুখের/চাহিদার জন্য।
এই বিষয়টি আজমল উদ্দীন আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলেন তখন, যখন তিনি অনু চৌধুরীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
আজমল উদ্দীন অনু চৌধুরী কখনোই বিয়ে করতেন না;যদিনা তার মুমূর্ষু মা এমন শেষ আবদার করে যেত।
আজমল উদ্দীনের মা, গুলনাহার বেগম, মারা যাওয়ার আগে হেঁচকি তুলে শুধুমাত্র এ কথাটিই বলে গেছেন ছেলেকে,
” বাবা, তুই ঐ মেয়েটাকে বিয়ে কর। নাতি~পুতনি আন। এই মুখপুড়ির জন্য নিজের জেবন নষ্ট করিস না বাপ।”
ঘটনাস্থলে শাহানা বেগম ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি শব্দ করে সূরা, কে’রাত পড়ছিলেন শাশুড়ির শান্তিময় মৃত্যুর জন্য। কথাগুলো তার কান পর্যন্ত আসলেও সে তোয়াক্কা করেনি। শুধু চোখের জলে ভিজে গেছিলো তার সামনের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো।
অবশেষে আজমল উদ্দীন মায়ের মৃত্যুর কয়েক বছর পরই বিয়ে করলেন।

তার মৃত মায়ের নাতনি হলো, ইরা।
আজমল উদ্দীন আজ তার দ্বিতীয় বউ নিয়ে বাড়িতে ও এসে হাজির হয়েছেন।
অনু চৌধুরীর ভয়ে সে সবই মিথ্যা বলেছে।
তবে আসলেই তার বাড়ি তার ভাইয়েরা দখল করে নিয়ে তাকে পথে বসানোর মত একটা ষড়যন্ত্র করেছিলো একসময়।
কিন্তু শাহানা বেগম সেটা হতে দেন নি।

সে নিজের টাকার সাথে বাপের বাড়ির ও কিছু টাকা যোগ করে সেই বাড়ি নিজের নামে লিখিয়ে নেয়। সেখানেই আজমল উদ্দীন এসে মাঝেমাঝে উঠে। কারণ এখানে তার প্রাণ~প্রিয় স্ত্রী, শাহানা বেগম থাকেন।
বাড়িটা সে নিজ নামে কিনে নিয়েছে কারণ আজমল উদ্দীনের স্মৃতি, তাদের সাংসারিক জীবনের সব স্মৃতিই এই বাড়িকে ঘিরে। আজমল উদ্দীন ও অবশ্য জানে, কেন শাহানা বেগম বাড়িটা কিনে নিয়েছিলো এভাবে।
নিজের স্বামীর নামে কেন কিনে নি সেটা অস্পষ্ট হলেও যৌক্তিক অর্থে বলা বাহুল্য, যেহেতু আজমল উদ্দীনের মতিভ্রম হয় মাঝেমধ্যে, সেহেতু তার নামে বাড়িটা না কেনাই শ্রেয়।
অনু চৌধুরীকে নিয়ে উঠার মত ঐ একটা জায়গাই আছে। শাহানা বেগমের অধীনে থাকা বাড়ি।
কারণ আজমল উদ্দীনের নামে কিছুই অবশিষ্ট নেই। জমি~জমার সবকিছুই ভাইয়েরা নিয়ে নিয়েছে।

অনু চৌধুরী যখন জানতে পারলেন, আজমল উদ্দীনের আগের ঘরেও একজন স্ত্রী আছে, সে তাণ্ডবলীলার চিত্র বলে বোঝানোর নয়।
রাগ দেখিয়ে চলে যাওয়ার মতলব এঁটেও তার ফায়দা নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই আর।

আব্বু আর আপন স্যার অনেকক্ষন যাবত ফোনে কথা বললো।
কি বললো তার সবটা পরিষ্কার না।
শুধু বুঝলাম অনু চৌধুরীকে নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে তাদের মধ্যে। আমার নামটাও দু একবার শোনা গেছে। কিন্তু স্পষ্ট বুঝলাম না। আব্বু চাচ্ছে না আমি তাদের কথোপকথন শুনি।
রিমা খালা আর আমি বারান্দায় বসে বসে আচার দিচ্ছি।
সৌভাগ্যবশত খালা এই দু সপ্তাহ আমাদের কাছেই থেকে গেছেন।

খালার জন্যই আজ আব্বু সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে মূলত। আমিও পারছি, কথা বলতে।
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রিমা খালার মুখ সকাল থেকেই হাসি হাসি।
সে বার বার আব্বুর রুমের দিকে উঁকি দিচ্ছে কেবল, আব্বু ফ্রি হয়েছে কিনা দেখার জন্য। খুব সম্ভবত কোনো সু~খবর আছে আব্বুকে দেওয়ার মত। আমি জিজ্ঞেস করেছি, খালা না শোনার ভাণ ধরে আছে। মানে আমাকে বলা অত গুরুত্বপূর্ণ না।
যেইনা আব্বু ফোন রাখলো অমনি খালা ছুটে গেলো তার কাছে। আমিও পেছন পেছন গেলাম।
মাথা একদম নিচু করে প্রজাদের বেশে সে বললো,
~ ভাই, একটা সু~খবর আছে। তিন প্যাকেট মিষ্টি আনায়ে দিতে পারবেন?
আব্বু হতচকিত হয়ে বললো,
~ কী সু~খবর? তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে নাকি?

কথাটা বলতেই খালা লজ্জ্বায় লাল হয়ে গেলেন।
~ না না, সেরকম কিছু না!
~ তো?
~ ভাই, আমি চাকরী পাইছি। দুইটা টিউশন ও পাইছি। অনেক বড় ফ্যামিলির দুইটা বাচ্চাকে বাসায় গিয়ে পড়ায়ে আসতে হবে। ৫, ০০০ করে দিবে বলছে। আর চাকরীটাও ভালো। শুধু হিসাব~নিকাশ করবো। এই ই কাজ। মাসিক বেতন ও ভালো।
আব্বু মুখ গম্ভীর করে বললো,
~ হ্যাঁ ভালোই তো। মিষ্টি আনিয়ে দিচ্ছি আমি। কিন্তু তিন প্যাকেট কেন?
খালা খুশির ছলে বলছে,

~ এক প্যাকেট আমাদের বাড়িতে।
এক প্যাকেট আপনার আম্মার কাছে, আরেক প্যাকেট এই বাসার জন্য। আপনি আর রাকা খাবেন। রাকা তো মালাইকারির মিষ্টিটা বেশি পছন্দ করে। ওর জন্য এটাই আইন্যেন।
~ তাহলে দুই প্যাকেট আনো। আমাদের জন্য লাগবেনা।
এই কঠিন কথা শুনে খালা আহত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

~ কেন?
~ কয়েককটা জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী কারণের জন্য আমি আমার বাসায় মিষ্টি এলাউ করতে পারিনা।
~ মানে?
~ মানে খুব সোজা রিমা। আমার জীবন তছনছ হয়ে গেছে। গৃহিনী বউ হয়েও তাকে সামলে রাখতে পারিনি। সেখানে তুমি চাকরী করবা। তোমাকে যে বিয়ে করবে তার সংসার ও যে আমার মতই হবে একদিন, তা আর বুঝতে বাকি নেই আমার। তাই আমি মিষ্টি খাবো না। কারণ তোমার বাইরে বাইরে ঘোরার সাথে আমি একমত নই।
খালা চুপসে গেলেন এরকম কঠিন কথা শুনে।

তার কষ্টে চোখ ভিজে গেলো।
করুন স্বরে বললো,
~ ভাই, স্বাদে কি আর চাকরী করতে বলি? নিজের ভরণ~পোষণের দায়িত্বটা তো এখন নিজের উপরই। স্বামী~সংসার কিচ্ছু তো নেই! একজন বিধবা নারীর ভাইয়ের বাসায় গিয়ে থাকার জীবনটা যে কতটা দু:খের, কতটা নির্মম হয়, তা কী আর আপনি বুঝবেন?
আব্বু হালকা গলায় বললেন,
~ কত খরচ লাগে আমাকে বললেই হবে। আমিই দিয়ে দিবো না হয়।

খালা হাস্যজ্জ্বল স্বরে বললেন,
~ থাক। আর লোককথা প্রশ্রয় দেওয়ার দরকার নাই। আমি কারো দয়া নিতে চাইনা। আপনাকে মিষ্টি খেতে হবে না। আসলাম।
বলেই খালা তাড়াহুড়ো করে সব গোছগাছ শুরু করলেন।
আব্বুর হাতে ডিভোর্স পেপার।

সে রিমা খালার সাথে তার এই রূঢ় ব্যবহারের কারণটা বলে বোঝাতে পারবে না বলেই হাতে এই পেপারটা নিয়ে এসব বলেছে এতক্ষন।
ভাবলো, খালা হয়তো বুঝবে।
সে নিজের কষ্টগুলো খামোখাই রিমা খালার উপর ঝেড়েছে এতক্ষন, কঠিন কথা বলে বলে।

কিন্তু খালা এতটাই সেন্টিমেন্টাল, সে একবার ও ওদিকে চোখ ই দেয়নি!
আব্বু মনে মনে ভাবলো, না, মেয়েটার সাথে আমার এতটা শক্ত আচরণ করা ঠিক হয়নি। সে নিজেও আমার মতই দু:খী, অসহায়।
খারাপ হওয়ার মনস্থ থাকলে, তাকে বন্দি করে রাখলেও লাভ হয়না।
আব্বু খুব ভেবে~চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো,
আর পিছুটান রেখে লাভ নেই।
অনু আর ফিরবে না।
ওকে এবার আমার জীবন থেকে মুক্ত করে দেওয়াই উত্তম।

কোথায় আছে ও? আজকেই ওকে ডিভোর্স দেওয়ার ক্রম শেষ করে ফেলা যাক।
সে ডিভোর্স পেপারের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তার বুকটা ফেঁটে গুড়িয়ে যাচ্ছে।
এই একটা অনুই যথেষ্ট, হাজার হাজার রেজার জীবন ধ্বংস করার জন্য!
সত্যিই কি আর ফিরবেনা তুমি? অনু?
আব্বুর চোখের কোণের জল এসবের জানান দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার কলম জানান দিচ্ছে অন্যকিছু।

এবার আর থামা যাবেনা। সব কাটসাফ করে ঠিক করে ফেলতে হবে।
আমি এসব নিয়ে চিন্তিত না।
নতুন কম্পিউটার, নতুন ক্লাস, ক্লাস মনিটরিং এবং নতুন নতুন প্রজেক্টে ধ্যান দিয়েছি।
ভালোই এগোচ্ছে সব।
আপন স্যারের দেওয়া সব হোমওয়ার্কস, তার নোটবুক সবই এখন আমার চলার পাথেয়।
আমার জীবন তখন ও খুব গোছানো ছিলো।
সুন্দর ছিলো। আমি সুখে ছিলাম খুব।

কিন্তু ভাগ্য যে খুব নির্মম, নিষ্ঠুর আমার জন্য, বোধগম্য ছিলো না।
(চলবে)
[ যারা সত্য ঘটনাটাই শুধু জানতে চেয়েছেন, তাদের জন্য রাকা আজ এখানেই সমাপ্ত। নিজের ক্ষতি করেই বলে দিচ্ছি, রাকাকে এখন অনু চৌধুরীই পালতেছে। ব্যস। কোনো সমাধানবিহীন এই সত্য ঘটনা এখনো এভাবেই চলমান। সবাই দোয়া করবেন রাফার জন্য। সে যেন আল্লাহর অশেষ রহমতের দেখা যথাসম্ভব দ্রুত পায়। আর আজকের এই পর্বের পর থেকে আমি একদম নিজের মত করে #রাকা লিখবো। রাকা এখানে বড় হবে, অনেক কিছু হবে। বাস্তবে রাকা এখনো ছোট। ক্লাস এইটে উঠবে সম্ভবত। যদিও বর্তমানে ওর পড়াশোনা বন্ধ।

পর্ব ২৫

অনু চৌধুরী তুলকালাম কান্ড পাঁকিয়ে ফেলেছে। আজমল উদ্দীনের মাথা ভনভন করছে। যেকোনো মুহূর্তে সে ঘুরে পড়ে যেতে পারে। অনু চৌধুরীর মুখ থেকে অনর্গল, যাচ্ছেতাই গালিগালাজ বের হচ্ছে। সেসব শাহানা বেগম কানেই তুলছেন না। তার অযথা অশান্তি ভালো লাগেনা। সে অনেক বারই আজমল উদ্দীনকে বলেছিলো, অনুকে এখানে নিয়ে আসার আগে সব জানিয়ে শুনিয়ে তবেই যেন এই বাড়িতে আনে। অন্যথা ভুলেও না।
কারণ তার অশান্তি ভালো লাগেনা।
আজমল উদ্দীন ও তাই ই চাচ্ছিলেন।

কিন্তু সে তো শুনলো না।
শাহানা বেগম দেখতে সুন্দর না।
এই নিয়েও কয়েকবার কথা তুললো অনু চৌধুরী। একাধিকবার জিজ্ঞেস করলো,
তুমি ওইডার মধ্যে কি দেইখ্যা বিয়া করলা? কি আছে ওর? হিজড়ার মত চেহারা, কালা মহিলা।

আরো বললো, কেন আমারে না জানাইয়া এই কাজ করলা! তোমার গোটা একটা সংসার আছে!
এরকম এরকম হাজারো প্রশ্ন, হাজারো গালিগালাজ, কটাক্ষ ফেরিয়ে যাওয়ার পর আজমল উদ্দীন বাধ্য হয়েই তার চোখের সামনে শাহানা বেগমের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আজমল যেন শুধু একটা ঘরের দরজাই না তার মনের দরজাটাও যেন বন্ধ করে দিলেন তার জন্য! অনু চৌধুরীর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠে বুক~পেটে জ্বলন শুরু হয়ে গেলো এটা দেখে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই দরজা খুললেন শাহানা বেগম। দরজা খুলেই সে সোজা অনু চৌধুরীর রুমে ঢুকলেন। দেখলেন অনু চৌধুরী ইরাকে খাওয়াচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে শাহানা বেগমের চোখে জল এসে গেলো। এরকমটা তো তার জীবনেও হওয়ার কথা ছিলো। তার ও তো একটা বাচ্চা থাকার কথা ছিলো। অথচ বিধাতা কি নির্মম নিয়তি দিয়েছে তার! তার ভাগ্যে মা হওয়ার মত এই বিশাল সুখটুকুই নেই!
~ অনু, বোন আমার, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে! তুমি আর এটা নিয়ে অশান্তি করিওনা বোন। আমি তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলবো। মাত্রই তো আসছো। গোসল করো, কিছু মুখে দাও আগে।
অনু চৌধুরী রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বললো,

~ এই তুই যা। তুই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ, শয়তান।
পিছন থেকে আজমল উদ্দীন হুংকার ছেড়ে বললেন, এই অনু! এই! তুমি কাকে কি বলতেছো! ও তোমার বড় বোনের মত! এইভাবে কেন কথা বলছো!

অনু চৌধুরী রাগে গিজগিজ করতে লাগলো।

শাহানা বেগমের অনু চৌধুরীর ফুটফুটে মেয়েটাকে দেখে ভীষণ লোভ হলো। ইরাও চোখ বড় বড় করে তাকেই দেখছে আর আঁ উঁ করে কথা বলার চেষ্টা করছে। তার ইচ্ছা করছে এক্ষুনি বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলতে!
এই পাড়ার কেউই তো তার কোলে তাদের বাচ্চাদের দিয়ে চায়না, দেয়না।

কারণ অলক্ষী, অভিশাপগ্রস্ত, কলঙ্কিনী উপমা তার। তার কোলে তাদের বাচ্চা দিলে তাদের বাচ্চাদের অমঙল হবে।
তাই এখন নিজের সতীনের বাচ্চা দেখে মনে মনে ভাবছে,
এই বাচ্চাটাতো আজমলেরই!
আর আজমল তো তারই স্বামী!
সে হিসেবে এই বাচ্চাটা তো তার ও বাচ্চা!
সে লোভ সামলাতে পারছেনা।

তবুও চেপে রেখে বললো,
~ অনু, দেখো, আমি তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলবো পরে। এখন ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি খাবার দিচ্ছি টেবিলে। গরম পানি দিবো? গোসলে যাবা?
অনু চৌধুরী জবাব দিলো না।
শুধু নড়েচড়ে বসলো একটু।
শাহানা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।

সে পট করে ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে বেদমে আদর করতে লাগলো।
বাচ্চাটাও যেন চিরচেনা কারো কোলেই উঠেছে।
হাসছে, কথা বলছে শব্দ করে।
অনু চৌধুরী টান দিয়ে ইরাকে শাহানা বেগমের কোল থেকে নিয়ে বললো,

~ পাগল নাকি? আমার বাচ্চা নিয়ে টানাটানি করোস ক্যাঁ? একজনের বাচ্চা যে হুট কইর‍্যা এইভাবে কোলে নেওয়া যায়না, এইডা তুই জানোস না নাকি? অনুমতি নিছোস আমার? তারপর আস্তে করে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
এই তোর কি এখনো বাচ্চা টাচ্চা পয়দাই হয়নাই নাকি? কই দেখিনা তো কাউরে!
এত বছর করলিটা কি?
আজমল উদ্দীন এসব দেখে তাজ্জব বনে গেলেন।

সে গলা ছেড়ে বললো,
~ অনু! তুমি কাকে কি বলতেছো! তুমি কার বাড়িতে এখন জানো? এটা কার বাড়ি? কার বাড়িতে এসে উঠছো? বলো!

অনু চৌধুরী জিজ্ঞেস করলো,
~ কার বাড়ি আর, তোমার বাড়ি! যার বাড়িই হোক, এই সব ভিটামাটি আমিই কিইন্না নিমু।
আজমল উদ্দীন শান্ত গলায় বললেন,
~ হ্যাঁ, কিন্নো, স্বপ্নে কিনিও। এই বাড়িটা শাহানার অনু। তুমি প্লিজ ওর সাথে এইভাবে কথা বইলো না। দোহাই তোমার!
শাহানা বেগম কিছু বললেন না।

সোজা উঠে চলে গেলেন নিজের রুমে।
খাবার বেড়ে দেওয়ার কথা ছিলো।

কিন্তু তার এসব দেখে আর রুচিতে কুলালো না।
আজমল উদ্দীন শাহানা বেগমের চেয়েও বেশি ব্যথিত হলো। কারণ শাহানা বেগমের কষ্ট সে সহ্য করতে পারেনা। সে যথাসম্ভব চেষ্টা করে তার মন ঠিক রেখে চলতে।
অনু চৌধুরী বাচ্চাকে এইভাবে রেখে দিয়েই গোসলে গেলেন। বাচ্চা কাঁদতেছে, আজমল উদ্দীন সামলাতে পারছেনা। বাচ্চার কান্না শুনে শাহানা বেগম ছুটে আসলেন। কোলে নিলেন।
বাচ্চার কান্না থামলো। শাহানা বেগমের গজলের টানে ঘুম ও চলে আসলো তার। তারপর তাকে শুইয়ে দিয়ে সে আবার হুড়মুড়িয়ে চলে গেলো, পলাতক কোনো চোরের ন্যায়। আজমল উদ্দীন সবিস্ময় চোখে শুধু দেখলেন তাকে। আহা, একটা নারীর জীবনের কত বড় একটা আকাঙ্ক্ষা শুধুমাত্র একটি বাচ্চা!
অনু চৌধুরী গোসল সেরে এসে কাউকে কিছু না বলেই ভাত বেড়ে নিজে খেয়ে নিলেন। এমনভাবে সব করছে যেন এটা তারই বাড়ি। আর ওদিকে যার বাড়ি সে এক রুমে নিজেকে বন্দী করে রেখেছে।
কিছুক্ষন পরেই তার টেলিফোন এলো।

অনু চৌধুরীর হাতে কিছুক্ষনের মধ্যেই ডিভোর্স পেপার এসে পড়বে। সে বিস্মিত হয়ে গেলো এই খবর শুনে। সে ভাবছে আনমনে, ডিভোর্স তো এইভাবে, এত সহজে দেওয়া যাবেনা! এই উসিলা দিয়ে যদি আরো কিছু উশুল করে নেওয়া যায়, তাহলে তো আরো কিছু লাভ হবে! এত সহজে ডিভোর্স পেপারে সই করা যাবে না। টালবাহানা করে আগে কিছু আদায় করে নিতে হবে! এমনিতেও তো অনেক পাওয়ার কথা!
নরম মনের মানুষ, কিছু চাইলেই দিয়ে দিবে।
আগে তানিশার দেওয়া ক্ষতটা শুকিয়ে নিক বেচারা। তারপর আবার নতুন ক্ষত করা যাবে!

একসাথে দুই ঘা দেওয়া সমীচীন হবে না! এত পাষাণ ও না আমি! মনে মনে ফন্দি আঁটলেন অনু চৌধুরী।
পরের দিন।
শাহানা বেগম নিজের রান্না ঘরে গেলেন।
গিয়ে সে তুমুল পরিমাণে চমকালেন।
অনু চৌধুরী বসে আছে।
সে রান্নাবান্না করছে।

সকালে উঠে সে নিজেই মাল~মসলা, তরু~তরকারি কিনে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু কি অদ্ভুত, যার বাড়ি ~ যার রান্নাঘর তার অনুমতি ছাড়াই সে এভাবে বিনা দ্বিধায় নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
শাহানা বেগম কড়া কিছুই বললেন না।
সে আদরমাখা স্বরে বললেন,
~ বাহ্ অনু। তা আজকে থেকেই রান্নাবান্না না শুরু করলেই পারতে, বোন। তোমার বাচ্চা আছে, আমিই না হয় সেরে নিতাম! তুমি কেন … আচ্ছা যাই করছো, রেখে যাও এখন, বাকিটা আমি করি।
অনু চৌধুরী চক্ষু গরম করে প্রত্যুত্তর দিলো,

~ আমি যতক্ষন রান্না ঘরে থাকবো ততক্ষন আপনি এখানে আসবেন না। আপনি ও যতক্ষন রান্না ঘরে থাকবেন, ততক্ষন আমি আসবো না। ভুলেও না। মনে থাকবে?
সে নরম কণ্ঠে বললো,
~ এত রাগ রাখতে নেই বোন। আসো আমার সাথে। বারান্দায় বসে তোমার মাথায় তেল দিয়ে দেই। আমার জীবনের গল্পটা শোনাবো তোমাকে আজ।
অনু চৌধুরী হাই তুলে খুব ব্যঙ্গবাণী করে বললো,
~ কিসের গল্প বলবেন তা আমার শোনা শেষ। আমার এত সময় নাই। আর তেল দেওয়ার নাম কইর‍্যা চুল কাইট্যা দিবেন, ভালো কইর‍্যাই জানি। এখন যান এইখান থেকে।
~ কী জানো তুমি? আজমল বলছে নাকি?
~ না। বাড়ির বাইরে বের হলেই সারে। খারাপের গন্ধ তো সবাই চেনে।

~ মানে?
~ মানে আপনে একজন বন্ধ্যা নারী। বন্ধ্যা নারীদের সাথে এক ছাদের নিচে বসবাস করা ভালো না। এরকম শুনে আসছি। আপনি কবে আমগোরে একা ছাড়বেন সইত্য কইর‍্যা কন দেহি! অপয়া মাইষ্যের লগে তো এক ছাদের তলায় থাওন ঠিক না! ছোট মাইয়্যা আছে তো আমার! আপনার নজর লাগলে কি হইবো আমার মাইয়্যার!
শাহানা বেগম আর কিছুই বলতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে চলে গেলেন।
দুপুরের খাবার বাড়া হলে সে শুধু দুইজনের প্লেটেই ভাত দিলো।
ওদিকে শাহানা বেগম তখন থেকেই শুধু কাঁদছেন। নামাজ পড়ছেন অনবরত। অতিরিক্ত

কষ্ট পেলে সে রান্না খাওয়া সব ভুলে যায়।
অনু চৌধুরীর উচিত ছিলো তার জন্যও রান্না বসানো। কিন্তু সে তা করেনি।
আজমল উদ্দীনের এসব দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেলো।
শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

~ এই তুমি শাহানার জন্য রান্না করোনি?
শুধু দুজনের জন্যই করছো? ওর কী হইছে?

সে গলা হাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কী কইলেন আম্নে? আপনার ওই শাহানার চাকরানী হইয়্যা আমি এই বাড়িতে আসছি? আমি তার জন্য রান্নাবান্না করুম বইস্যা বইস্যা! দেহেন, এত বালা না আমি! নিজেরডা নিজেরেই কইর‍্যা খাইতে কন! ঢং যত্তসব!
সে আবারো শান্ত থাকার চেষ্টা করলো।
জিজ্ঞেস করলো,
~ তুমি আবার কিছু বলছো ওরে?
~ সত্য কথা গায়ে লাগছে এখন আমি কি করমু বলেন?
~ কী সত্য কথা?
~ বলছি সে একটা বন্ধ্যা। আমগো গ্রামে সবাই কয়, বন্ধ্যাদের লগে এক ছাদের নিচে থাকা নাকি খুব খারাপ। সকালে তরকারি কিনতে যাওয়্যায়ো তাই শুনলাম অনেকের থেকে। এইডাই কইছিলাম! ব্যস! মহারাণীর গায়ে লাগছে, সত্য কথা বালা লাগলো না।
আজমল উদ্দীন সাথে সাথে টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন। শাহানা বেগমের কাছে গিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন।
এইভাবে বার বার রুমে ঢুকে ঠাঁস করে দরজা বন্ধ করতে দেখলেও অনু চৌধুরীর গা রি রি করে ওঠে। একে কিভাবে বাদ দেওয়া যায়?
আগাছা ছাটাই করার উপায় কি?
অনু চৌধুরী তার পাতের ভাতগুলোকে পিষতে লাগলেন জোরে জোরে। আর দলা পাকানো ভাতের দিকে হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে উপায় বের করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন।

রিমা খালার সব গোছানো শেষে, সে চলে যাবে তখনই আব্বু বাঁধা দিলো।
হঠাৎ করে খুব নরম স্বরে বললো,
~ আমি খুব দু:খিত রিমা। কষ্ট পাইছো জানি। আসলে আমার মাথা ঠিক নাই। এইভাবে রাগ করে চলে যেও না।
রিমা খালার এইটুকুতেই মন গললেও সে তা বাইরে প্রকাশ করলো না।
আব্বু এখনো দু:খ বোধ করছেন।
সে আবার শুধালো,
~ রিমা!
সাথে সাথে জবাব এলো,

~ জ্বী।
~ আগামীকাল আমরা বেড়াতে যাবো।
আমার ডাক্তার কি বলছে? মনে নাই?
~ হুম। হাসিখুশি থাকতে হবে। মনকে আনন্দে রাখতে হবে সবসময়।
~ তো এই পিচ্চি মেয়ে আমাকে কতটুকুই বা আনন্দ দিতে পারবে? বলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, নাহ্, ওই অবশ্য আমার জন্য অনেক।

~ এখন আমি কী করবো বলেন।
আব্বু হঠাৎ আদেশের স্বরে তুচ্ছার্থক প্রয়োগ করে বললেন,
~ তুই থাক! আরো কিছুদিন থেকে যা। ব্যস। আমি এখন আসলাম।
রিমা খালার মনে খুশির ঝিলিক দেখা দিলো। এই প্রথম রেজা চৌধুরী তাকে বেড়াতে যাওয়ার জন্য অফার করেছে।
কিন্তু তার কি যাওয়া উচিত হবে?
উল্টোটা যদি হয়?

আবার যদি তার জন্য পাঁচজনে পাঁচ কথা শোনায় উনাকে? তখন কি হবে!
আমি আমার রুমে ঢুকে আমার বিগি ব্যাংকটা ভাঙলাম।
সতেরশো টাকা হলো।
এই টাকা দিয়ে আমি অনেক কিছু কিনবো।
রিমা খালার জন্য একটা শাড়ি, আব্বুর জন্য একটা শার্ট আর আপন স্যারের জন্য একটা ঘড়ি।
এই টাকায় হবে তো?
কিন্তু এখন খুব আফসোস করি!
ইশ, ওই টাকাটাও যদি এখন আমার কাছে থাকতো! …

পর্ব ২৬

রিমা খালাকে আব্বু আদেশের স্বরেই বলে গিয়েছে, রিমা তুই এখানেই থাকবি। আজকে কোথাও যাবিনা, ব্যস। আর হ্যাঁ, আমি সত্যিই খুব দু:খিত আমার দুর্ব্যবহারের জন্য।
আব্বু চলে যাবার পর খালা কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকলেন। তারপর আমাকে ডেকে বললেন,
রাকা মা, বল তো তুই আজকে কী কী খাবি?
আমি হাসিমুখে একটার পর একটা বলতে লাগলাম। সব হাবিজাবি খাবার।
সে কিছুক্ষন ভুরু উঁচিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ব্যাগ রেখে সোজা চলে গেলো রান্নাঘরে। এখন সে তার পক্ষে যা যা সম্ভব তাই তাই ই বানাবে। না হলে কিনে আনবে। আমি জানি।

খালা চলে যাওয়ার পর আমি নিজেই তার ব্যাগ থেকে তার সব জামা কাপড় বের করে রেকে, আলনায় রাখছি। এটা গোছানো থাকা মানেই বিপদ, খালা টুপ করে উধাও হয়ে যেতে পারে। তাইজন্যই নিজেই গুছিয়ে রেখে দিলাম।
হঠাৎ একদম সবার নিচে একটা ছোট ব্যাগ হাতে পড়লো।
অনুমতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়া বা দেখা ঠিক না। তবুও কোন শয়তান যেন ঘাড়ে চেপেছিলো, খুলে ফেললাম। ছোট একটা ডায়েরী পেলাম ভেতরে আর সাথে কিছু ছবি। দুটো ছবি। একটাতে খালার সাথে একজন ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে। আরেকটায় আরেকজন ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মুখটা মনে হচ্ছে যেন অস্পষ্ট অথবা ইচ্ছে করেই কেউ মুখের অংশটা নষ্ট করে দিয়েছে।
লোকটা কে?

রিমা খালার আগের বর মারা গেছে তা জানি। এই ই হয়তো সেই লোক, যার মুখ বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই ছবিটার লোকটার সাথে তো এইটার কোনো মিল নেই। এরপর ছোট ডায়েরীটা কিছুক্ষন ঘাঁটলাম। একটা জায়গায় দেখলাম বাচ্চাদের নিয়ে নানান ধরণের কথাবার্তা লিখা। শেষ পেইজগুলো উল্টাতেই দেখলাম বোল্ড হরফে আমার আব্বুর নাম লিখা।
খুবই ছোট্ট একটা লিখা। লিখাটা এমন,
রেজা ভাই,
আপনি আজো বুঝলেন না আমাকে?
আর কী করলে আপনি বুঝবেন আমাকে?
আর কতদিন, কত বছর অপেক্ষা করাবেন আমাকে? আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না।

মরলেও তো আমি শান্তি পাবো না, আমার কবর ফাঁক হয়ে যাবে।
এই লিখা পড়ে আমার মাথা ভনভন করতে লাগলো। এসবের মানে কী?
খালা আমার আব্বুকে নিয়ে এসব কী লিখছে, কেন লিখছে কিছুই বুঝলাম না।
ডায়েরী বন্ধ করে ব্যাগের কোণায় রাখবো তখনই খালা আমার সামনে এসে দু হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে কঠিন দৃষ্টি স্থাপন করে জিজ্ঞেস করলেন,
~ এসব কী হচ্ছে রাকা?
আমি আস্তে করে বললাম, কই খালামণি, কিছু না তো!

সে আবার ভীষণ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ তুই আমার ব্যাগ নিয়ে কী করছিস? বল!
আমি ইনিয়েবিনিয়ে বললাম,
~ খালামণি কিছুই করিনি তো। তোমার জামা~কাপড় গুছিয়ে রাখছি আমি। ওইযে দেখো?
খালা আবারো চাপা গলায় বললো,
~ না বলে অন্য কারো জিনিসে হাত দেওয়া ঠিক না। এটা তুই জানিস? আমি তোকে পার্মিশন দিছিলাম?
আমি ভয় পেয়ে মাথা নিচু করে বললাম,
~ না। দাওনি। সরি খালামণি, খুব ভুল হয়ে গেছে।

খালা তখনই আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললো,
~ হাহ্ হা হা! কী হইছে! ভয় পেয়েছিস? ওমা! আমি তো ঠাট্টা করলাম!
বিছানায় বসে আমার মাথা তার বুকে রেখে, চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে সে বললো, তুই অনেক ভাগ্যবতী রে রাকা। এই বয়সেই তুই নিজ থেকে কত কি করে ফেলিস, কত কি বুঝিস নিজ থেকে! তোর মা~বোন নাই তো কি হইছে তুই নিজেই সব পারিস। এত লক্ষী মেয়েকে যে মশাই বিয়ে করবে সে তো মহাভাগ্যবান হবে রে!
আমি তখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি।
আমার এখন অল্প কিছুতেই ভীষণ সমস্যা হয়।
ভয় পেয়ে যাই। ছোটখাটো ভুল করলে কেউ সামান্য কিছু বললেও মনে হয়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ কাজটিই বোধ হয় আমি করে ফেলেছি।
তখন নিজেকে ফাঁসির আসামির মত মনে হয়।
এইতো আর মাত্র কয়েক মিনিট! পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক কাউন্ট হলেই আমি ঝুলে যাবো।
খালা ঝাঁকাচ্ছে।
আমি চোখ ফেরালাম।
সে আমার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
~ রাকা, তুই আমার ব্যাগ থেকে জামা~কাপড় বের করে গুছিয়ে রেখে দিয়েছিস যাতে আমি না যেতে পারি, তাইনা?

আমি হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নাড়ালাম।
খালা হাসিমাখা স্বরে বললো,
~ আমার কেন জানিনা মনে হয়, তুই আমারই সন্তান। আমারই মেয়ে। আমার যা যা ভালো লাগে, সব গুণই তোর মধ্যে আছে।

আমি হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম,

~ আজকে তুমি থাকবা

সে অন্যদিকে চোখ নিয়ে খুব খুশির ছলে বললো,
~ খালামণি যাবো না তো আজ। আজকে বিকেলের দিকে আমরা পার্কে যাবো। তোর জন্য কয়েকটা ফ্রক কিনবো। ফ্রক ভালো লাগে তোর?
আমি বললাম,

~ না খালামণি। আমি আর ফ্রক পরবো না। আমার অনেক ফ্রক আছে। তুমি আমাকে যদি কিনেই দাও তাহলে থ্রি~পিস কিনে দিও। আমার এখন বড়দের ড্রেস পরতে ইচ্ছা হয় খুব।
খালা শব্দ করে হাসলেন। বললেন,
~ বাব্বাহ্! বড় হয়ে গেছিস! আচ্ছা ঠিক আছে! তোকে থ্রি~পিস কিনে দিবো। শাড়ি লাগবে?
আমি খুব দ্রুত মাথা ঝাঁকালাম, শাড়িও লাগবে আমার!
খালা উঠে যেতে যেতে বললেন,
~ আচ্ছা আচ্ছা! সব কিনে দেওয়া হবে! পাগলি মেয়ে একটা। তোর চিকেন বার্গার রেডি হয়ে যাবে এখন। সস নিয়ে আয়।
আমি খুশিমনে চলে গেলাম। বার্গার খেলাম।
খালা এখনো রান্নাঘরে।

সে সব তৈরী করলো আমার জন্য, যা যা আমি বলেছি। আমিও ভীষণ আয়েশ করে খেলাম। খালার রান্না ভীষণ ভালো। যেহেতু আমি মোটা, সেহেতু বলা বাহুল্য আমি অনেক খাই। খালাও খুশি হলো আমার তৃপ্তিকর ভজনবিলাস দেখে।
দুপুরে আব্বুও আসলো।
সেও আয়েশ কর খেলো। রান্নার খুব প্রশংসা ও করলো। খালা তো আমাদের প্রশংসায় একদম খুশিতে আত্মহারা! তার মনে হচ্ছে, এ যেন তার নিজেরই সাজানো~গোছানো স্বাদের সংসার।
খালা আমাকে ডেকে বললো,
~ রাকা! আজকে না বের হবো আমরা?
আমি মাথা ঝাঁকালাম।
~ তো তোর আব্বু এখন কই যায়?
~ কেন দোকানে!

আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
~ দাঁড়াও! আমি আব্বুকে গিয়ে বলে আসি?
খালা চাপা গলায় বললো,
~ শুধু বললেই হবে না, রিকুয়েস্ট করতে হবে। নয়তো তোর যেই আব্বু, আজকে বললে আজকেই ভুলে যায়। দেখ গিয়ে মনে আছে কিনা!
আমার আব্বুকে রিকুয়েস্ট করতে হলো না। শুধু কথা উঠিয়েছি।
~ আব্বু তুমি না বলছো ঘুরবে যাবা?
~ এরকম কথা ছিলো নাকি?

~ ভুলে গেছো তুমি!
~ হাহ্ হা। না ভুলিনি। বলছি, আগামীকাল যাবো।
~ আজকেই চলো না প্লিজ।
~ আজকে! আজকে তো আমার মালামাল আসবে। আজকে তো যাওয়া যাবেনা।
আমি আব্বুর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললাম,

~ আজকে যেতেই হবে আব্বু।
আব্বুও ফিসফিস করে বললো,
~ কেন?
~ আজকে না গেলে রিমা খালামণি চলেই যাবে।
~ তোমাকে এরকম কিছু বলছে নাকি?
~ উহুম। আমি আইডিয়া করে বলছি।
~ তাহলে ঠিক আছে। তোমার আইডিয়া রং। আগামীকালই যাবো আমরা।

~ না আব্বু, আজকেই চলো।
আব্বু উঠতে উঠতে জোরেই বললো,
~ আজকে না। আজকে সময় নেই। কাজ আছে।
খালা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আব্বুর নিষেধাত্মক বাণী শোনার সাথে সাথেই সে স্থান ত্যাগ করায় আব্বুর ভ্রম ভাঙলো যে এই প্ল্যান একা আমার না। খালাও এর শামিল।

আব্বু কি যেন ভাবলো কিছুক্ষন, তারপর বললো,
~ রাকা মা, যাও তোমরা রেডি হয়ে নাও। আমরা একটু পরেই বেরোচ্ছি।
আমি শুনেই ভোঁ দৌঁড় দিয়ে খালাকে সংবাদ দিতে গেলাম।
বিকেলের দিকে..

আমরা এই মুহূর্তে একটি পার্কে আছি।
খুব সুন্দর একটা জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে, সেখানেই বসে আছি তিনজন। আমি আব্বুর গা ঘেষেই বসে ছিলাম এতক্ষন।
খালা একটু দূরে বসেছে।
আব্বু বললো, তুই ওর কাছে যা। একা একা বসে আছে।
আমি গেলাম।

খালা বললো,
~ কিরে আর কখন যাবি মার্কেটে? বাবার কোলেই বসে আছিস! আমাকে তো কেউ মনেই রাখেনা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
~ আব্বুকে বলবো?

~ আমি জানিনা।
আমি আব্বুকে ডেকে বললাম, আমরা আজকে মার্কেটে যাবো।
আব্বু খালাকে জিজ্ঞেস করলো,

~ তোমরা আজকে মার্কেটে যাবা নাকি?
খালা হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নাড়ালো।
~ কেন? কেনাকাটা আছে?

~ হুম।
~ এখনি উঠবা নাকি আরো কিছুক্ষন থাকবা? আমার মনে হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে বসে থাকা উচিত। পরিবেশটা দেখার মত হবে তখনই। এজন্যই তো এখানে নিয়ে আসলাম।
খালা রাগী স্বরে বললো,
~ হ্যাঁ। মূর্তির মত এভাবেই এখানে বসে থাকতে হবে। কেউ তো কিছু বলবেনা, কোনো কথা হবেনা, সামান্য আড্ডা দিবে তা তো দূরের কথা। বাচ্চা নিয়ে আসছি। একটু কিছু কিনে খাওয়াবো ও না। কেবল মূর্তির মত বসে বসে অন্য সবার আনন্দ দেখবো!
আব্বুর দিকে তাকিয়ে বললো, শাস্তি দিচ্ছেন নাকি ভাই? আপনার ব্যবসায় ব্যাঘাত ঘটালাম বলে? আচ্ছা থাক। আপনি চলে যান। আমি রাকাকে নিয়ে একটু নিউ মার্কেটে যাবো। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরবো।

আব্বু খালার দিকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষন। খালার কথা শেষে দূরের দিকে
তাকিয়ে খুব উদাস গলায় বললো,
~ এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। অনুকে বিয়ে করার পর এখানেই প্রথম আমাদের ভাব হয়। অনুরও ও এই জায়গাটা খুব পছন্দের। প্রতি সপ্তাহেই বায়না করতো এখানে আসার জন্য।
কিন্তু আমি মাসে একবার ও আনতাম না।
কয়েকটা নতুন ব্যবসার শুরু ছিলো তখন, ব্যস্ত ছিলাম খুব। কিন্তু অনুতো এসব বুঝতোই না।

এসব বলে আব্বু এভাবে উদাসীন হয়েই বসে রইলেন।
খালা আব্বুর মন খারাপ দেখে চুপ করে রইলেন কিছুক্ষন। আমি কিছুই বললাম না। কারণ আমার অনু চৌধুরীকে নিয়ে বেশি ভাবাভাবি করতে ভালো লাগেনা। দূরের কিছু ছেলেমেয়ে বাবল ফুলিয়ে মজা করছে, কেউ দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে কেউবা করছে খেলাধুলা।
সেসবই দেখছি। কিন্তু নিজে গিয়ে তাদের সঙ্গ দিচ্ছিনা কারণ আমি অসামাজিক হয়ে গেছি। কারো সাথেই এখন আর আমার জমে না।
আব্বু আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
~ রাকা তুমি ইচ্ছা করলে ওখানে গিয়ে খেলতে পারো।

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ না, ঠিক আছে।
খালা ও গলা মিলিয়ে বললো,
~ রাকা তুই ওখানে যাবি। তার আগে একটা হাওয়াই মিঠাই কিনে নে। বলে সে বাচ্চাদের মত চিৎকার করে হাওয়াই মিঠাইওয়ালাকে ডাকলো। তিনটা নিলো।
আব্বু জীবনেও এই জিনিস মুখে দিবেনা। , আমি জানি, খালাও অবশ্যই জানে। অথচ সে তিনটা কিনলো।

আমার হাতে একটা ধরিয়ে দিয়ে ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার বয়সী কিছু মেয়েদের প্রতি ইঙ্গিত করে খালা বললো,
~ ওই দেখ, ওরা দোলনায় উঠে কি মজা করছে। তুই ও যা। মজা কর। আমিও আসতেছি।
আমি দোলনা খুব পছন্দ করি। উঠে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম,
~ খালামণি, আরেকটা হাওয়াই মিঠাই কে খাবে?
~ তোর আব্বু।
~ আব্বু তো খায়না এগুলো।
~ আজকে খাবে।
~ কেন! আজকে খাবে কেন?

~ এমনিই। আচ্ছা, বাদাম কিনবো। এখন খাবি?

~ না, আমি দোলনায় উঠে আসি আগে।
~ আচ্ছা যা।
আমি চলে গেলাম ওদের কাছে। গিয়ে ওদের সাথে কথা বললাম। ভাগ্য ভালো। সবাই আমাকে সঙ্গ দিলো। অনেক মজার মজার দুষ্টামিও করছি আমরা। আমাদের কোম্পানি ভালো জমেছে কারণ সবাই একই স্বভাবের।
আমি চলে যাবার পর খালা আব্বুকে জিজ্ঞেস করলো,
~ এই জায়গায় যে আপনার আর আপার এত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, আমি জানতাম না। জানলে কিছু বলতাম না।
আব্বু বললো,
~ ঠিক আছে। বাদ দাও।
তোমার চাকরীর কী খবর?

~ করবো না।
আব্বু হতচকিত হয়ে খালার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ করবা না মানে? কেন?

“আপনি মানা করছেন তাই”~ এই কথাটা না বলে খালা বললো,
~ ইচ্ছা করেনা। টিউশন করলেই হয়ে যাবে আমার।
~ টিউশন করতে পারলে চাকরী ও করতে পারবা। পাইছো যখন ছাড়ার দরকার কি!
খালা অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন,
~ আপনিই তো কত কি বললেন! কত জ্ঞান দিলেন!
~ এখন আমিই আবার বলছি, নিজের পায়ে নিজেই দাঁড়াও। আসলে আমি ভুলেই গেছি তুমি তোমার ভাইয়ের বাসায় থাকো। আমি তোমার ভাইকে চিনি। ও আমার ক্লাসমেট। খুব বাজে কিছু স্মৃতি আছে ওর সাথে। যার দরুন সে এখনো আমাকে সহ্য করতে পারেনা।
~ আসলেই! কী রকম স্মৃতি?
~ থাক সেসব। এগুলা জেনে কি হবে! চলো রাকার কাছে যাই।

~ না, বলেন না প্লিজ। কিসের স্মৃতি আপনাদের মাঝে?
~ ওই আরকি.. ও একটু আনসোশ্যাল, বখাটে টাইপ ছিলো কলেজে।
তাছাড়া ও রাজনীতি করতো, নেতা টাইপ।
তাই সবাই ই একটু ভয় পেয়ে চলতো ওকে। একটা মেয়েকে পছন্দ করতো ও। কিন্তু ওই মেয়েটা ওকে প্রত্যাখান করে। এবং কি দুর্ভাগ্য আমার, ওই মেয়ে এমন হাবভাব শুরু করে যে সবাই ই জেনে যায় এই মেয়ে আমাকেই পছন্দ করে। বাস স্টপে একদিন প্রপোজ ও করে বন্ধুদের সামনে। ব্যস, তোমার ভাইয়ের কানে চলে যায় এই খবর। সে থেকেই শুরু হয়ে যায় দুশমনির। এই নিয়ে সে কয়েকবার আমাকে মারছিলো পর্যন্ত। তবুও রাগ মিটেনি। তোমার মায়ের সাথে আমার মায়ের কত বোঝাপড়া হয়েছিলো এ নিয়ে। পরে অবশ্য ওই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছিলো। কিন্তু তোমার ভাইয়ের রাগ এখনো কমেনি। কমবে বলে মনেও হয়না! হাহ্ হা।
খালা চুপ করে শুনে ছিলো এতক্ষন।

তারপর বললো,
~ আচ্ছা আচ্ছা! এইজন্যই ভাই আপনার নাম শুনলেই ক্ষেপে যায়!
~ হুম।
খালা কিছুক্ষন নীরব রইলেন তারপর জিজ্ঞেস করলেন স্তিমিত কন্ঠে,

~ ভাই একটা কথা জিজ্ঞেস করবো আপনাকে?
~ করো।
~ আপনি রেগে যাবেন না তো?
~ নাহ্। করে ফেলো।
খুব সমীহ করে অত:পর জিজ্ঞেস করেই ফেললো,

~ আপনি অনু ভাবীকে ডিভোর্স দিবেন না?
তার আসলেই বিয়ে হইছিলো তো ওই লোকের সাথে?
আব্বু গলা ভারী করে বললো,
~ আসলেই আই মিন অফিশিয়ালি বিয়ে হবে না। কারণ আমাদের এখনো অফিশিয়ালি ডিভোর্স হয়নি। বেয়াইনীভাবে ওরা বসবাস করতেছে আরকি। এনিওয়েজ!
ও এতটা খারাপ হবে; এটা যদি আমি আগে জানতে পারতাম, তাহলে হয়তো ওকে এতটা ভালোবেসে ফেলতাম না। আমার দুর্ভাগ্য, সব দিকেই দুর্ভাগ্য।
~ ডিভোর্স? দিবেন না?

~ অবশ্যই দিতে হবে। ওকে জানানো হইছে। দুদিনের ভেতরেই ওর কাছ থেকে আমার সারাজীবনের জন্য নিষ্কৃতি হয়ে যাবে, আশা করছি।
~ তারপর কী চিন্তাভাবনা?
~ তারপর আর কী? কিছুই না..
~ বিয়ে করবেন না?
~ না।

~ রাকা একা একা বাসায় পড়ে থাকবে এভাবে! ওর একজন সঙ্গীর, একজন কথা বলার মানুষ হলেও তো একজনকে দরকার! বাচ্চা মানুষ কিভাবে এভাবে সারা বাসায় একা একা থাকবে, এ নিয়ে কিছু ভাবেন নি?
আব্বু কথাগুলো শুনে কিছুটা ভড়কে গেলো। আসলেই সে এরম কিছু আগে ভাবেনি।
রাকা তো এভাবে দিনের পর দিন একা থাকলে মানসিকভাবে নিসঙ্গ হয়ে যেতে পারে!
আব্বু বললো,
~ কিছু করার নেই। আমিই সময় দেওয়ার চেষ্টা করবো আরকি। আমাকেই দিতে হবে। আর তুমি তো আছোই।
~ কিন্তু আমি তো প্রতিদিন থাকতে পারবো না। আমার ও তো আলাদা কাজ থাকতে পারে। টিউশন করলে টিউশনের জন্য, চাকরী করলে চাকরীর জন্য, এসবের জন্য হয়তো রাকার কাছে আসতেই পারবো না, ওকে বেশি সময় দিতে পারবো না। আবার ওকে যে নিজের কাছে নিয়ে রাখবো, তার ও উপায় নেই, কারণ আমি নিজেই তো ভাইয়ের বাসায় থাকতে পারিনা, সেখানে আরেকজন। তাই আমার মনে হয় আপনার ওকে নিয়ে আরেকটু ভাবা উচিত।
আব্বু স্বাভাবিক স্বরে বললো,
~ জানি। যতদিন পারো, ততদিনই না হয় আমার মেয়েটার কাছে থাকবা। আর আমি একজন বয়স্ক কাজের মানুষ রাখবো। উনি সারাক্ষন বাসায় থাকবে, বাসার সব কাজকর্ম করবে। পাশাপাশি রাকার নি:সঙ্গতা কাটবে।
খালা খুব আহত গলায় বললো,
~ রাকার ভাগ্য খুব খারাপ। আমার মনে হয়না ওকে এভাবে একা একজন কাজের মানুষের সাথে রাখা ঠিক হবে বলে। একদিন দেখা যাবে, সে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে গেলো অথবা রাকাকে দিয়ে খারাপ কিছু করিয়ে নিলো অথবা বেচে দিলো! কত কিই তো হতে পারে। যেখানে ওর নিজের মা ই..
আব্বুকে এবার চিন্তিত দেখা গেলো।

সে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে একটু পানি পান করলো। খালা তার হাতে থাকা হাওয়াই মিঠাইয়ের প্যাকেটটা আব্বুকে নিতে বললো।
~ ভাই, এইটা নিন। খেতে খেতে রাকার কাছে চলুন।
~ তা চলো। কিন্তু এইটা কেন? বাচ্চাদের জিনিস!

~ ওর ভালো লাগবে। মানসিক প্রশান্তি ফিরে আসবে ওর। অনেকদিন হয়েছে মেয়েটা নিজের চোখের সামনে ভালো কিছু, তার আনন্দ লাগার মত কিছু দেখেনা। আসুন, ওকে একটু খুশি করাই আজ। আমরা দুজন মিলে কি এইটুকু ও করতে পারবো না? আজকে ও কি করছে জানেন? বলে আমার ব্যাগ গোছানোর কাহিনী ছাড়াও আরো কিছু কাহিনী বলতে লাগলো খুশি খুশি চেহারা নিয়ে।
আব্বু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খালার দিকে। তার চোখে কৃতজ্ঞতার ভারী বর্ষণ! কিন্তু খালা দেখছে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি দোলনায় উঠেছি। দুলছি। খালা আমাকে দেখছে আর হাসছে।

আব্বু খালার হাত থেকে হাওয়াই মিঠাই নিজের হাতে নিলো।
তারপর ইশারা করে বললো,
~ চলো যাই। রাকার কাছে।
আমি লক্ষ্য করলাম, তারা এদিক পানেই আসছে। এতক্ষন যতটুকু ভালো লাগছিলো এখন তারচেয়ে দ্বিগুন বেশি ভালো লাগছে।
খালা আর আব্বু দুজনেই একসাথেই খেতে খেতে আসছে। কি সুন্দর দৃশ্য!

খালা দু প্যাকেট বাদাম কিনেছে, ধরতে পারছে না ভালো করে;তাই আব্বু খালার ব্যাগ ধরেছে।
আমি তাকিয়ে আছি তাদের দুজনের দিকে।
ভাবছি,
আহা, আমার কি দুর্ভাগ্য।

এই দৃশ্যে কেন অনু চৌধুরী শামিল হলো না?
কেন এই দৃশ্যটা আমি আমার আব্বু আম্মুর মাঝে এখন আর দেখতে পাইনা?
আর কি কখনো দেখবো?
না!
হঠাৎ করে আম্মুর জন্য ভীষণ খারাপ লাগলো। কি পাষাণ আমার আম্মু! চলে গেছে আমাকে ছেড়ে!
এতদিন পর এসব মাথায় আসতেই আমার চোখে জল এসে গেলো।
আজকে সত্যিই আমি অনু চৌধুরীকে মিস করছি।

পর্ব ২৭

আব্বুর পুরোনো একটা প্রাইভেট কার ছিলো, ওটা দিয়েই আমরা আমাদের যাতায়াতের সমস্যাটা মেটাতাম।

কিন্তু ওটা বহুদিন যাবতই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। মেরামত করেনি কারণ নানান দুর্যোগ, নানা সমস্যা অতিক্রম করতে হয়েছে ইতোমধ্যেই। তাছাড়া অনু চৌধুরীর বেহিসাবি চলাফেরা, খরচ সামলে গাড়ি কেনা দুর্বিষহ ছিলো বৈকি। ইদানিং আব্বুর ব্যবসার প্রশস্ততা বেড়েছে তাই একটা গাড়ির ও প্রয়োজন হয়েছে বিস্তরভাবে।
আমাদের পার্কেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। মার্কেটে আজ আর যাওয়া হবে বলে মনে হয়না। তবে আমার বা খালার এ নিয়ে কোনো আপত্তি বা কষ্ট ও নেই। কারণ আজকের আব্বুকে আমরা অন্যভাবে পেয়েছি। আব্বু আজ আমাদের সাথে ঘাসের উপরে বসেছে, মজার মজার গল্পগুজব করেছে, হাওয়াই মিঠাই খেয়েছে পর পর তিনটা। সেই আগের আব্বু। দোলনায় ও উঠেছে। খালাকে আর আমাকে ও উঠিয়েছে। আব্বুর দুর্ভাগ্য, সে দ্বিতীয়বার উঠতে গেছিলো তখনই দোলনার শক্ত দড়ি ছিঁড়ে পড়ে গেছিলো। সবার সামনে সে কি লজ্জ্বা! আমরা ভাবলাম আব্বু বুঝি এখনি ছুটে চলে যাবে, রাগারাগি করবে। কিছুই করেনি। সে উঠে বেদমে হাসলো কিছুক্ষন। তারপর কতৃপক্ষের কাছে জরিমানা দিয়ে তিনজনই হাসতে হাসতে এসে বসে পড়লাম পার্কের নিরিবিলি, লাল~হলুদ আলো মিশ্রিত একটি মুখরিত পরিবেশে।

পাশেই একটা ছোট পুকুরের মত। কিন্তু তবুও এটার রাজকীয় নাম, ভিক্টোরিয়া সাগর। এটার চারপাশের এখন লাল, নীল, সবুজ বাতি জ্বলছে, পানিগুলো একদম নীল আর স্বচ্ছ। কিছু দূরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিশাল পানির ফোয়ারা। আমরা বসে আছি অনেক দূরে। সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে এই সুন্দর সুন্দর দৃশ্যগুলো। আব্বু আর খালা এক পাশে, আমি একটু সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছি।
আমি শুনতে পাচ্ছি, খালা আর আব্বু আজকে একটু বেশিই খোশগল্পে মেতে গেছে। আব্বু কিছু বলছে, খালা শুধু হাসছে। আবার খালা কিছু বলছে, আব্বু আস্তে আস্তে হাসছে। কিছুক্ষন পরেই আব্বুর ফোন আসলো। আব্বু ব্যস্ত হয়ে
উঠে চলে গেলো। খালা আমাকে ডেকে এনে তার কাছে বসালো। আমার চুল নষ্ট হয়ে গেছে সে আবার ঠিক করে দিচ্ছে।
এমন সময় আব্বু পিছনে এসে হাজির।

~ রাকা, এই আম্মু, এইদিকে আয় তো দেখি!
আমি বিদ্যুতের গতিতে সব ছেঁড়েছুঁড়ে আব্বুর কাছে চলে গেলাম।
আব্বু ডান পাশে ইশারা করে বললো,
~ দেখ তো কেমন হইছে?

আমি তাকিয়ে রইলাম বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে। ওটা একটা গাড়ি। সাদা রং। কি সুন্দর! আমি গাড়ির কাছে এগোতেই দেখলাম গাড়ির ভেতরে কেউ বসে আছে। কিছুক্ষন পরই বেরিয়ে এলো আপন স্যার। আমি গাড়ি দেখে যতটা না চমকালাম তার চেয়েও বেশি চমকালাম স্যারকে দেখে।
স্যার বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
~ কী অবস্থা? কেমন আছো?
আমি আস্তে করে বললাম,
~ আপনি, স্যার, আমি ভালো আছি, আপনি না ১৪দিনের ট্রেনিং’এ গেছেন?
সে মৃদ্যু হেসে বললো,

~ হ্যাঁ গেছি। আজকে ব্রেক দিছিলো। তাই ভাবলাম তোমাদের কাছে আসি একটু। দেখে যাই কেমন আছো তুমি! তোমার আব্বু ও বললো, সে নতুন কার কিনবে একটু দেখে শুনে যেন দেই। তো আর কি, চলে আসলাম!
আব্বু আর খালা ততক্ষনে এসে হাজির।
আব্বু আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
~ কী মা? পছন্দ হইছে?
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, হ্যাঁ।
আব্বু বললো, এখন কী করবা? ঘুরে আসবা আপনের সাথে? যাও, যাও, সামনে যাও তোমরা। আমার একটু কাজ আছে এদিকে।

খালা বলে উঠলো,
~ ওকি গাড়ি চালাতে জানে?
আপন স্যার বললো,
~ জানিনা ম্যাডাম। শিখতেছি। এখন আপনাদের নিয়ে একবার ট্রায়াল করে দেখবো।
খালা ভয় পেয়ে বললো,
~ তুমি আর মানুষ পাইলা না! মেয়েছেলে নিয়ে তুমি ট্রায়াল দিবা?
আব্বু হেসে বললো,
~ আরে না! রিমা, ও গাড়ি চালাতে পটু। গাড়ির সব আগাগোড়া তার মুখস্থ দেখেই তো তাকে ডেকে এনে গাড়ি কিনালাম! যাও তোমরা, চিন্তা নাই।

আমি কিছুই বলছি না। একটু একটু পর পর শুধু আড়চোখে স্যারের দিকে তাকাচ্ছি। কেন তাকাচ্ছি তা নিজেও জানিনা। যেন একটা অন্য রকম টান! সে সামনে আসলেই তাকে লুকিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। না দেখলে যেন আমার পেটের ভাতই হজম হয়না!

খালা বললো,

~ কিন্তু আমাদের তো মার্কেটে যাওয়ার কথা ছিলো! রাকার জন্য কিছু কেনাকাটা করার কথা ছিলো।
আব্বু বললো, সেটাই তো বললাম। যাও তোমরা, নতুন গাড়ি নিয়ে মার্কেট বা এনিহয়্যার, ঘুরে আসো!
আমি আব্বুকে ডেকে বললাম,

~ এই গাড়িটা তুমি কিনছো আব্বু?
আব্বু মলিন মুখে বললো,
~ আমি কিনছি বলতে এটা মূলত আমাকে গিফট হিসেবেই দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক অনেক ইস্যু আছে, তুই বুঝবি না। আমার একার পক্ষে এই মুহূর্তে এরকম একটা গাড়ি কেনা সম্ভবপর ছিলো না।

খালা জিজ্ঞেস করলো,
~ কেন? তাহলে কিনলেন কেন? আর কিনছেন ই বা কিভাবে?
~ কারণ আমার প্রায় দুই, তিন লাখ টাকা নিয়ে তানিশা চলে গেছে। তারউপর আমার দুই তিনটা নতুন ব্যবসা। এতকিছু সামলে গাড়ি কেনার সাধ্য ছিলো না। নতুন ব্যবসাগুলো শুরু করেছিলাম যাদের সাথে, তারাই খুশি হয়ে গাড়ি দিতে চেয়েছিলো। তাই আমি ভাবলাম দিবেই যখন তখন আমিও কিছু দেই, ভালো দেখেই কিনি। এই আরকি।

~ আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি চলেন, আমরা নিউ মার্কেটে যাবো। এখান থেকে রিক্সায় ১৫টাকা ভাড়া।
~ ভাড়া লাগবে কেন? গাড়িই তো আছে।
~ গাড়িতে করে রাকারা যাক, ও ওর স্যারের সাথে ঘুরে আসুক। আপনি আর আমি নিউ মার্কেটে গিয়ে ওর জন্য কিছু কেনাকাটা করে আবার ওদের সাথেই ফিরবো।
খালা খুব করে চাচ্ছে, আব্বুর সাথে একটু আলাদা সময় অতিবাহিত করতে। সেখানে আমার বা কারোরই উপস্থিতি হয়তো তার ভালো লাগছে না। তাই সে চাচ্ছেনা তাদের সাথে আমিও থাকি।

আব্বু রাজি হচ্ছিলো না, তবুও অনেক বলার পর আব্বু ও রাজি হলো। আমি তেমন একটা বাঁধা দিলাম না। আমার ও ইচ্ছা করছে, নতুন গাড়িতে করে ঘুরতে। আপন স্যার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। সে আনমনে কথা বলে যাচ্ছে কারো সাথে।
অত:পর আপন স্যারের পাশের সিটেই আমি বসলাম।
স্যার গাড়িতে বসেও ফোনে কথা বলে যাচ্ছে। আমি বাইরে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, আজকে আব্বু আমাদের এটা ওটা বলে এইজন্যই পার্কে এতক্ষন রেখেছিলো; যাতে গাড়িটা সারপ্রাইজ হিসেবে দিতে পারে! কিন্তু আমি তো গাড়ি পেয়ে অতটা সারপ্রাইজ হই ই নি। সেটা কি আর আব্বু জানে? আমি তো সারপ্রাইজ হয়েছি স্যারকে দেখে।
ইশ, স্যার কি সুন্দর দেখতে!
হালকা আকাশী কালারের একটা শার্ট আর নীল কালারের জিন্স। লম্বা চুলগুলো এলোমেলোভাবে আছে। হাতে দামী, কালো রং’র ঘড়ি।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, সারাজীবন যদি তাকে দেখতে দেখতেই কাটিয়ে দেই, তবুও হয়তো আমার তাকে দেখা শেষ হবেনা!
স্যারের কথা শেষ হয়েছে।
সে ফোন নামিয়েই বললো,
~ কোথায় যাবা বলো। আজকে তুমি যেখানে বলবা সেখানেই ঘুরে আসা হবে।
আমি বললাম, আমি জানিনা। আপনার যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই চলেন স্যার।
স্যার হাস্যজ্জ্বল মুখে বললো,
~ রাকা, তুমি ভালো আছো তো? সব ঠিকঠাক না এখন?

আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,
~ হুম। ভালোই আছি স্যার। এখন আমার কোনো সমস্যাই হচ্ছেনা।
~ ভালোই! আচ্ছা, তোমার খালাকে তোমার কেমন লাগে?

আমি খুশিমনেই বললাম,
~ খুব ভালো লাগে।
~ খুব?
~ হ্যাঁ।

স্যার একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ আচ্ছা, গুড! তোমার রিমা খালাকে যদি আম্মু হিসেবে পাও, তাহলে তোমার আপত্তি থাকবে না তো?
এই প্রশ্ন শুনে আমি চমকে গেলাম।
চমকিত স্বরে বললাম,
~ কেন! আমার তো একজনই আম্মু, তার নাম অনু, অনু চৌধুরী। এখন আবার আরেকটা আম্মু কেন?
~ হুম। একটাই আম্মু তোমার। কিন্তু এখন আর নেই। সে চলে গেছে তোমাদের ছেড়ে। তাই আরেকটা আম্মু আসলেও সমস্যা নেই। স্যার বললো।

আমি কিছুক্ষন ভাবলাম। তারপর বললাম,
~ কিন্তু স্যার, সে ও যদি আমার আম্মু হওয়ার পর অনু চৌধুরীর মত হয়ে যায়?
স্যার গম্ভীর গলায় বললো,
~ না। তেমন কিছু তো মনে হয়না। তবে অচিরেই সে তোমার স্টেপ মাদার হবে। এটা মনে হচ্ছে।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম,
~ স্টেপ মাদার কেমন হয়? খুব খারাপ হয় তাইনা?
~ তুমি স্টেপ মাদারের মানে বুঝো?

~ হ্যাঁ। আমার আসল আম্মুই তো আমার সাথে ওরকম ব্যবহার করছে।
~ তোমার আম্মুর মত আম্মু পাওয়া দুর্লভ। এরকম স্বার্থপর মা সাধারণ হয়না।
~ তাহলে স্যার, আমার মনে হয় আমার ক্ষেত্রে উল্টোটাই হবে! আমার স্টেপ মাদারই ভালো মা হবে!
~ মেবি। স্টেপ মাদার মানেই কিন্তু সৎ মা। জগতের ৮০% সৎ মা খারাপ ই হয়। সো, বি কেয়ারফুল রাকা। সাবধান থাকবা সবসময়।
আমি আগে থেকেই জানি স্টেপ মাদারদের বৈশিষ্ট্য। সমাজ বইয়ে এই নিয়ে সামান্য কিছু টপিক পড়েছিলাম।
কিন্তু স্যারের মুখে বাংলা নাম,”সৎ মা”নামটা শোনার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেলাম।
সৎ মায়েরা খারাপ ই হয় বেশিরভাগ, এইটার মমার্থ বুঝতেই যেন বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো।
রিমা খালাও কি এমন হবে?
আল্লাহ এমন না করুক।

আব্বু আর খালা এক রিকশায়।
তারা নেমে পড়তেই আব্বুকে চেনে এমন কয়েকজন এসে টিটকারি মারলো,
~ কী ভাই? নতুন ও পাইয়া গেছেন? এত তাড়া আপ্নের? যেমন বউ, তেমন তার জামাই! বউ ভাগছে এখন জামাই ও মাইয়্যা নিয়া ঘুরে!
খালা কথাটা শুনে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
আব্বু কিছুই বললো না।
সোজা কাপড়ের দোকানে গিয়ে কেনাকাটা শুরু করলো।
হঠাৎ আব্বু বাথরুমে যাওয়ার জন্য ফোনটা খালার কাছে দিয়ে গেলো।
কিছুক্ষন পরই ফোন বেজে উঠলো।
অন্ধকার আর ব্যস্ততার জন্য সে ফোন তুললো না। কিন্তু বার বার ফোন আসছিলো, নাম্বার আননোউন, তাই সে বাধ্য হয়েই ফোন ধরলো। ধরেই বললো,
~ আসসালামু আলাইকুম। কে? একটু পরে ফোন করেন।

কথা শেষ না হতেই ওপাশ থেকে বাজখাঁই গলায় কেউ বললো,
~ ওই তুই কে বল! আমারে জিগাস আমি কে? তুই কার ফোন ধরছোস বল?
অনু চৌধুরীর হাতে ডিভোর্স পেপার এসেছিলো। সে সেটা সাথে সাথেই কুচি কুচি করে কেটে ফেলে দিয়েছে।
সে এত সহজে ডিভোর্স দিবেনা। কিছুতেই না। সেই খবর দিতেই আব্বুকে ফোন করছিলো। মনে মনে সে অনেক ফিকিরবাজিই করে রেখেছে, জোর করলেই নারী নির্যাতনের মামলায় ফাঁসিয়ে দিবে অথবা অন্য কোনো সমস্যায় ফেলে দিয়ে ঠিক নিজের চাহিদা মত সবটা উসুল করে নিবে।

পর্ব ২৮

অনু চৌধুরীর মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেছে।

সে কিছুতেই ভাবতে পারেনা তার ওইরকম সাদাসিধে বরটার ফোন থেকে কোনো মেয়েলি কণ্ঠস্বর আসবে বলে।
কিন্তু আজ তাই ই হলো।
অনু চৌধুরী বিড়বিড় করছে অনর্গল, মেয়ের কণ্ঠস্বর রেজার ফোন থেকে আসছে!
তারমানে কি রেজা বিয়ে করছে সামনেই!

নিশ্চয়ই তানিশার দাদির কাম এইডা!
ওই মহিলা যা দজ্জ্বাল! মনে হয় তার ওই বইনের মাইয়্যাডারেই গছাইয়া দিছে, হ্যাঁ, কি যেন নাম? রিমা? হ, রিমাই তো।
মাঝেমাঝে বাসায় আসতো তো ওই লাটসাহেবের বেটি। সুরুত তো নাই ই, গুণ ও নাই ছেমরির; অথচ ভাবখানা দেখো! এহন সুযোগ পাইয়্যাই চাইপ্যা বসছে। আল্লাহ! আমার লগে কি হইতাছে এগুলা?
একদিক দিয়া এই শাহানা বেগম আরেকদিক দিয়া এখন এই রিমা আইস্যা পড়ছে!
এমন সময় শাহানা বেগম ভেতরে ঢুকে পড়লো। ভেতরে এসেই সে অনু চৌধুরীকে অনেকবার করে ডাকলো।

ইরা কাঁদছে, ওকে খাওয়ানো বাকি, গোসল করানো বাকি, কখন করাবে ইত্যাদি সব ও জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু কোনোপ্রকার সাড়াই দিচ্ছেনা সে।
কারণ এখন সে অন্য চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।
তাই শাহানা বেগম বাধ্য হয়েই ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে হাতের বাটি থেকে কি যেন নিয়ে খাইয়ে দিলেন। ভ্রম ভাঙতেই এই দৃশ্য দেখে সে চিৎকার করে সারা বাড়ি করলো।

আজমল উদ্দীন দৌঁড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী হইছে অনু?
অনু চৌধুরী কিছু না বলে তার সামনেই শাহানা বেগমের সামনাসামনি গিয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ এই কি খাওয়াইলি তুই আমার মাইয়্যারে? মাইর‍্যা ফেলতে বিষ খাওয়াই দিছোস? বল না, বিষ দিছোস আমার মাইয়্যারে?
শাহানা বেগম অবিরত বলে যাচ্ছে ওটা এমনি হরেক রকমের পদ দিয়ে রান্না করা খিঁচুড়ি।
ভর্তা করে একদম ভালো করে পিষেই সে এনেছে, ইরাকে খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু অনু চৌধুরী সেসব কথা কানেই তুলছে না। ইরা ঐ মুহূর্তেই ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। ইরার কান্নাটা ছিলো স্বাভাবিক কান্না। এত জোরে জোরে চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে বিধায় সে ভয় পেয়ে গিয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু অনু চৌধুরীর নষ্ট মাথায় নষ্ট চিন্তাই আসলো। সে ধরেই নিলো ইরাকে বিষ দেওয়া হয়েছে, যার দরুন কাঁদতে আরম্ভ করেছে তার মেয়ে।
সে কিছুমাত্র না ভেবেই আজমল উদ্দীনের সামনে শাহানা বেগমের দুই গালে দুইটা চড় বসিয়ে দিলো।

শুধু এটুকুই নয়, ঘটনা মারামারির দিকেও পা বাড়িয়েছিলো। সারাবাড়ির মানুষ এসে হাজির হয়েছে। নতুন বউ আসতে না আসতেই ঘরে চুলাচুলি লেগে গেছে; এই দৃশ্য দেখার জন্য লোকের অভাব হলো না।
শাহানা বেগমকে কষে থাপ্পড় মারার পর যখন অনু চৌধুরী চুপ হলো একটু, তখন শাহানা বেগম অশান্ত গলায় বলে উঠলেন,
~ অনু! এইযে হুটহাট বড়দের গায়ে হাত তুলিস, লজ্জ্বা করে না রে তোর? ওটা বিষ ছিলো না রে, ওটা এমনি খিঁচুড়ি ছিলো। তুই তো ওর একটুও খেয়াল রাখিস না দেখছি। বাচ্চাটা কাঁদতেছে আর তুই চুপচাপ বসে আছিস। অন্য কেউ বাচ্চাটাকে ভালোবাসে তাই ছুটে এসেছে; যেখানে তুই সামনেই বসে আছিস। অথচ তুই বললি আমি বিষ দিছি তোর মেয়েরে?

এই বলে শাহানা বেগম বসে থাকা অনু চৌধুরীর কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো,
~ খুব অহংকার তোর, তাই নারে অনু?
তারপর আজমল উদ্দীনের দিকে তাকিয়ে বললো, শুনেন, ওকে আজকেই এখান থেকে বিদায় করে দিবেন। আর পারলে আপনিসহ চলে যাবেন।
বলে সে ওই মুহূর্তেই স্থান ত্যাগ করলো কাঁদতে কাঁদতে।
আজমল উদ্দীন এসব দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে আছেন। পরিস্থিতি এখন তার চিন্তাভাবনার বাইরে। অনু চৌধুরী এতটা হিংস্র, এতটা স্বার্থান্বেষী এসব সে জানতোই না!

যেখানে তার প্রথম স্ত্রী, শাহানা বেগম, এতটা শান্ত, এতটা নীরব প্রকৃতির একটা মেয়ে!
শাহানা বেগম নিজের রুমে গিয়ে তার মাকে ফোন করে বিষয়টা জানালেন।
অর:পর তার মা তার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দিয়ে দিলো।
যা শুনেই শাহানা বেগমের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো।
সে এই প্রস্তাবে কেবল রাজিই নয় বরং এক পায়ে খাড়া, বলা সমীচীন।

ওদিকে অনু চৌধুরী খিঁচুড়ি চেখে দেখে নিশ্চিত হয়েছে, ওটাতে বিষ টিষ কিছুই নেই, সুস্বাদু জিনিস। এতই টেস্টি লাগছে যে নিজেই ওটা খেয়ে নিয়েছে ইরাকে আর দেয়ইনি।
সবাই চলে যাওয়ার পর যখন রান্না ঘরে গেলো তখন আরো একধাপে চমকালো সে।
রান্নাঘরে নানান পদের রান্না পড়ে আছে।
এতক্ষন ধরে সব রান্না করে শাহানা বেগম নিজেই ভাগ করে অর্ধেকের বেশিই দিয়ে দিয়েছেন অনু চৌধুরীর ভাগে।
এই অবস্থা দেখে অনু চৌধুরীর সামান্য ইতস্তবোধ হলো।

তখনই পিছন থেকে আজমল উদ্দীন এসে বললেন,
~ অনু, তুমি রেডি হও এখনি।
সে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করে, কেন?
আজমল উদ্দীন রাগান্বিত স্বরে বলেন,

~ কেন তুমি শুনোনাই? এই বাড়ি যার সে তোমাকে আজকেই এই বাড়ি ছাড়তে বলছে। তাই। রেডি হও। তোমাকে দিয়ে আসি গিয়ে। আসছি পর্যন্ত একটা দিন শান্তিতে থাকতে পারলাম না তোমার জন্য। তুমি যেখানেই যাও ওখানেই দেখি সমস্যা।
অনু চৌধুরী আকাশ থেকে পড়ার ভাণ করে বললো,

~ তোমারে দিয়া আসি মানে? তুমি কই থাকবা? আর কি কইলা! এখন বাচ্চা হয়ে যাবার পর আর আমারে ভাল্লাগেনা তোমার? কও!
~ আমি এখানেই থাকবো কিছুদিন। সত্যি বলতে, আসলেই লাগে না। শান্তি?
~ ক্যান? আমি ওইহানে একা একা করমুটা কি?
~ তোমার যা ইচ্ছা। তবে আমি তোমার সাথে আর বেশিদিন থাকতে পারবো না মনে হয়। তুমি অতিরিক্ত উগ্র স্বভাবের অনু। আমার অসহ্য লাগতেছে তোমারে, সত্যি কথা বলতে আমার আর ভাল্লাগতেছেনা।

~ তাই! তো কই থাকবা? এই বাড়ি আমার ছিলো কিন্তু এখন এইড্যা শাহানার। তুমি এখানে থাকবা কই? কার বাড়িতে?
~ আমার ব্যবস্থা আমি করতেছি।
~ না কোনো কথা না। তুমি চলো এইখান থেকে। তুমি শহরে চলো। বাসা খালি পইড়্যা আছে।

সে দৃঢ় প্রতিভ গলায় বললো,
~ থাউক পইড়্যা। আমি আর যামুইনা ওনে। দুই রুমের পাখির বাসার মত একটা বাসা! আর এইহানে কত বড় বাড়ি পইড়্যা আছে! আমি তো এইহানেই থাকমু। আমার কিছুদিন লাগবো কেবল। আপনে একটা কাজ করেন, আপনার শাহানা বেগমরে কন, আর কোনো ঝামেলা হইবো না, আমি গ্যারান্টি দিছি। শুধু একটা শর্ত, ওই অভিশপ্ত মহিলা যেন আমার মাইয়্যারে ভুলেও না ধরে। ব্যস।
আজমল উদ্দীন অনেক বুঝালেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেন।
এক পর্যায়ে ক্রোধান্বিত হয়ে চলে গেলেন শাহানা বেগমের কাছে।

শাহানা বেগমের মুখে সেরকম কোনো কষ্টের ছাপ নেই। আজমল উদ্দীনের বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে শাহানা বেগমের অপমান দেখে দেখে।
সে হাত জোর করে ক্ষমা চাইলো।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, শাহানা বেগমকে কিছুদিনের জন্য ওর বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে।

সে শাহানা বেগমকে খুলে বললো অনু চৌধুরীর কথা। সে যাবেনা… এরকম এরকম বলতেছে..
শাহানা বেগম মলিন হাসি দিয়ে বললো,
~ ঠিক আছে। থাকুক সে। তবে তারে বইল্যেন দ্বিতীয় বার ঝামেলা করলে আর নিস্তার নাই। এত গুমোটওয়ালা মেয়েছেলে ভালো হয়না। ওর বাচ্চা নিয়ে ওর খুব বেশি অহংকার। আমিও দেখতেছি কিভাবে ওর ব্যবস্থা করা যায়।
আজমল উদ্দীন বহুবছর পর আবার সেই আগের দৃঢ়প্রত্যয়ী শাহানা বেগমকে দেখে খুশিতে ভেঙে পড়লেন।

~ শাহানা, অনু এরকম হবে এটা আমি আগে বুঝতেই পারিনাই বিশ্বাস করো! তুমি ওকে এত পাত্তা দিও না। বেশি দাম দিলে বেশি উপরে উঠবে।
আসলেই নিজের রুপ গুণ নিয়ে খুব অহংকার ওর। খুব লোভীও।
শাহানা বেগম বললেন,
~ শুধু রুপ~গুণ ই না, বাচ্চা ও জন্ম দিতে পারছে। সে ভাগ্যবতী। অবশ্য আমার তো তাদের সারাজীবনই এভাবে দাম দিতে চলতে হবে। কারণ তারা বাচ্চা জন্ম দিতে পারছে, আমি পারিনাই।
আমি অভিশপ্ত, অপয়া, বন্ধ্যা একজন নারী। আমার জায়গা ওই ঘরের কোণাতেই। বলে সে হু হু করে কেঁদে দিলো।

আজমল শাহানা বেগমের কপালে চুমো এঁকে দিলো।
এক লহমাতেই যেন তার কম্পমান শরীর নিশ্চুপ হয়ে গেলো। যোগ করলো,
~ বাচ্চা লাগেনা শাহানা। একজন ভালো মনের অধিকারী হওয়াটাই আসল। আমি আগে বুঝিনি। এখন বুঝতেছি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমার ভুলের কোনো অভাব নাই আসলে।
শাহানা বেগম আস্তে করে বললো,
~ ঠিক আছে। বাদ দেন। তবে আমার ও দিন আসতেছে…

আজমল উদ্দীন শাহানা বেগমের শেষ উক্তিটায় অত জোর দিলেন না।
দোকানে যাওয়ার সময় সে ঘরের পিছনে, অনু চৌধুরীর রুমের পিছন দিকটায় কতগুলো ছিঁড়া কাগজের টুকরো দেখে থমকে যায়। তার বড্ড বেশি সন্দেহ হয় এখন অনু চৌধুরীকে। সে খুব বেশি একটা সুবিধার মানুষ নয়, সেটা ইতোমধ্যেই সে টের পেয়ে গিয়েছে।
অনুর ব্যাগভর্তি অত টাকা, চুরি করে ফোনালাপ কোনো কিছুই তো আর তার চোখ এড়ায় না!
সে কেবল হাতে নাতে কোনো একদিন ধরবে, সেই অপেক্ষাই করছে। এখন চুপচাপ দেখে যাওয়াই শ্রেয়। কাগজগুলো তুলে নিয়ে সে থমকে গেলো। ভালো করে দেখে বুঝলো, ওটা ডিভোর্স পেপারই ছিলো! এইটা এখানে আর কে ফেলবে! নিশ্চয়ই এটা অনুকেন্দ্রিক ঘটনা! ওকে নিশ্চয়ই রেজা ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে!

ওর তো এই পেপারে সাইন করে দেওয়া উচিত ছিলো! কিন্তু করলো না কেন? আর আমাকে একটা বারের জন্যও বললো না কেন!
ভাবছেন আজমল উদ্দীন।
সে বাজারের ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অনু চৌধুরীর ঘরে গিয়ে, দরজা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলো তাকে,
~ রেজা তোমাকে ডিভোর্স পেপার পাঠাইছে আমাকে বলোনাই কেন?
~ রাগে জিদ্দে। এই কতা আর তুইল্যো না ইরার বাপ। দোহাই লাগে তোমার।
~ আশ্চর্যজনক কথা অনু! তুমি আমার স্ত্রী। তোমার তো তোমার জীবনের সবকিছুই আমার সাথে শেয়ার করার কথা ছিলো। এরকম একটা সাংঘাতিক, জরুরি কথা লুকাইলা কেন?

~ আরে লুকাইছি কই? রাইত্যে ঠিকই বলতাম বিষয়টা। সময়ই তো পাইলাম না। যা নাটক শুরু করছিলো তোমার বড় বিবি!
~ থামো! বুঝলাম ডিভোর্স পেপার পাঠাইছে, বলার সময় পাওয়নাই। কিন্তু এইটা এইভাবে টুকরো টুকরো করার কারণ কী?
~ হেইডা আমার ইচ্ছা।
~ তোমার ইচ্ছা মানে! এই তোমার মতলব কী বলো তো?

~ কিছু না। তুমি যাও। আমি কামে যাই।
~ আমার উত্তর দিয়ে যা ইচ্ছা করোগে। উত্তর দাও আগে। ছিঁড়লা কেন? ওকে ডিভোর্স দিবানা?
~ ছিঁড়ছি কারণ আমার ইচ্ছা হইছে তাই। না, কার্য হাসিল করা ছাড়া এই অনু চৌধুরী কিছু করেনা। বুঝলা? এই নিয়া আর কোনো প্রশ্ন করলে সংসারে আগুন লাগায়ে দিমু কইলাম। গেলাম আমি।

আজমল উদ্দীন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন।
এ কাকে নিয়ে আসলো সে ঘরে!

অনু চৌধুরীর এই আচরণ দেখে তার ঘৃণায়, রাগে, ক্রোধে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে যেন!

আমরা বাসায় ফিরেছি।
খালা আর আব্বু আসার আগেই আমরা বাসায় চলে আসছিলাম।
তাদের ই আসতে দেরী হলো।

স্যার ওইদিক দিয়েই গাড়ি ঘুরায়ে আসছিলো যেন তাদের পথিমধ্যে পেয়ে গেলেও পিক করা যায়। কারণ দুজনের একজন ও ফোন ধরছে না।
তারা ফিরলো আমাদের ফেরার ও আধ ঘন্টা পর।

আমরা ভিতরে ঢুকে সব গোছগাছ করে সবাই রেস্ট নিয়ে আড্ডায় বসলাম।
খালা আমার জন্য অনেকগুলো থ্রি~পিস কিনেছে। সাথে বেন্ট, ক্লিপ ছাড়াও নানান সাজসজ্জার জিনিস!
আমি তো খুশিতে আটখানা।
এত খুশি, আড্ডার মাঝেও আপন স্যার আমার পড়া ধরলেন। কতটুকু শেষ করলাম, না করলাম জিজ্ঞেস করছে। আমি একে একে সব বলছি, সে কখনো খুশি হচ্ছে; কখনো বা মুখ ভার করছে।
লক্ষ্য করে দেখলাম,
রিমা খালা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে।

হুট করে কি হইছে কে জানে! নির্ঘাত আব্বুর সাথে মার্কেটে ঝগড়া বা ঝামেলা হয়েছে! নয়তো আর কি হবে! গাড়িতে উঠার আগেও তো সব ঠিকই দেখছিলাম!
আমার ভ্রান্ত ধারণা আসলে মিথ্যা ছিলো।
খালা আর আব্বু যখন মার্কেট থেকে বের হয়েছিলো, তখন রিমা খালার ভাই আর ভাবীও বের হয়েছিলো তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে।
খালা কোনোরকমে মুখ ঢাকা দিয়ে বের হচ্ছিলো কিন্তু শেষ নিস্তার আর হলো না।
খালার ভাই তাকে জোর করে ডেকে নিয়ে গেলো।
আব্বু করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো, সে করমর্দন করা তো দূর, আব্বুর দিকে ফিরেও তাকায়নি।

আব্বু এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো বিব্রতভাবে।
পরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূরেই চলে গেছিলো।
আব্বুও এই লোকটাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।
খালাকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে কি কি যেন বললো সে, সেসব তো আর আব্বু শোনেনি।
তাই জানে ও না।
ওদিকে খালার উপর দিয়ে বয়ে গেছিলো এক তুমুল ঝড়। সবার সামনে তাকে পা পর্যন্ত ধরতে হয়েছিলো তবুও তার ভাই তার কোনো কথাই শুনলো না।

পর্ব ২৯

রিমা খালার ভাই, রিপন সাহেব, তাকে নিউ মার্কেটের প্রথম গেইটের সামনে এনে, সবার সামনে খুব বাজেভাবে অপমান করছিলো।
খালা অবাক হচ্ছিলো এতটা বিরুদ্ধাচরণ দেখে।
সে ক্রুদ্ধ গলায় বলছে,
~ রিমা শোন, আজকের পর থেকে তুই আর আমার বাসায় আসবি না। আমার বাসায় তোর আর কোনো জায়গা নাই। তুই তোর ব্যবস্থা করে নিবি। কিভাবে কী করবি আমি জানিনা। জানতেও চাইনা। আমি অনেকবার বুঝাইছি, ছাঁড় দিছি। আর না।
খালা হাত জোর করে কপাল কুঁচকে বললো,

~ কি বলেন এসব ভাই? আপনার বাসা মানে কি শুধু আপনারই বাসা? আর এই বাসা তো আমার ও। কারণ এইটা আমার আব্বার বাসা।
~ হ। আব্বার। আব্বার বাসা মানে আমার বাসা। তোর না। তোর বাসা হবে তোর হাসবেন্ডেরটা। কিন্তু তোর তো হাজবেন্ড ও নাই। এরপরেও তোর একটু লজ্জ্বা হয়না রে? তুই ব্যাটা নিয়া ঘুরোস রাইতের বেলায়? আরে তোর মত মেয়ে~ছেলে বাসায় রাখলেও সমস্যা। আমার বাচ্চাকাচ্চা আছে, এদের তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে তোর সংস্পর্শে থাকলে। কী শিখবে তোর মত ফুফির কাছ থেকে? কিছু শেখার আছে আদৌ?
~ ভাই, আমি তো ইজমা আর কাঁকনকে নিয়মিত পড়াই। শিখাইনা কে বললো? আর ব্যাটা নিয়ে ঘুরি মানে? রেজা ভাই তো আমাদের আত্মীয়ই। আপনি সবসময় এত রাগেন কেন তার কাছে আসলে?
এত বেশি রাগার কারণটা আমি বুঝিনা ভাই। রাকাসহই আসছিলাম, ওর জন্য কেনাকাটা করার জন্যই মূলত আসছিলাম। কিন্তু..
কথা শেষ না হতেই রিপন সাহেব বলে উঠলেন,
~ কিন্তু রাকা থাকলে তো তোমাদের নষ্টিপষ্টি

করতে অসুবিধা হবে, তাই ওরে রাইখ্যা আর ঝামেলা বাড়াসনাই। তাইনারে?
~ ভাই! আপনি এইভাবে ক্যান কথা বলতেছেন! আচ্ছা আপনি চলেন। বাসায় চলেন এখনি, আমিও যাই, মা কি সিদ্ধান্ত দেয় শুনি।
~ কার বাসায় যাবি? আমার বাসায় তো তোর আর জায়গা হবে না। তুই তোরটা বুঝে নে। আমি আসলাম। আর আমারে আর তুই ভাই বলে ডাকবি না। তুই নষ্ট হয়ে গেছোস, নষ্টা মেয়ে। তুই যে আমার বোন, এইটাও আমার মানতে কষ্ট লাগে।

~ ভাই, আপনার পায়ে পড়ি, এগুলা এইভাবে এইখানে এত জোরে জোরে বইল্যেন না, লোকজন জড়ো হইতেছে, সবাই শুনতেছে! আমি এখন কই থাকবো তাইলে বলেন?
~ কই থাকবি মানে? যা ওরে নিয়া ওর বাসায় যা। একজন তো জুটাইছোস ই।
আর লোকজনের শোনা উচিত তো এসব। তুই যে কত খারাপ একটা মহিলা ওইটা সবার জানা উচিত।
বলে সে উদ্ভ্রান্তের মত লোকজন ডেকে এনে এনে নিজের বানানো কাহিনী বলতে লাগলো।

খালা তখন নিরুপায় হয়ে পায়ে ধরে বললো,
~ ভাই দোহাই লাগে। বন্ধ করেন। আপনি বাসায় চলেন।
~ বাসায় তো তোরে আমি জায়গা দিমুনা।
~ অল্প কিছু দিন রাখেন। আমি জব পাইছি। কিছুদিন সময় দেন। আমি নিজের খরচ নিজেই দিতে পারবো। শুধু বাসায় থাকতে দিলেই হবে।
~ কোনো দরকার নাই। এরপরে তো আর চিনবিই না। এমনেও যথেষ্ট জ্বালাইছোস তুই। কত বছর অন্ন ধ্বংস করতেছোস তুই বল তো? বিয়ে শাদী ও তো দিতে পারিনা, কেউ আসেনা। এখন সেই চেষ্টা ও বৃথা, তুই রেজার বাসায় আসা~যাওয়া করোস, ওইখানে আবার থাকোস ও।

~ আম্মাও তো চায়। আম্মায় বলাতেই তো গেলাম।
~ ওই মহিলাই তো সব নষ্টের গোড়া। তার জন্যই তো আজ এই অবস্থা তোর। তার আস্কারা পাইয়াই তুই এখন উড়াল দিচ্ছিস এই বয়সে।
ওই আম্মা কী বোঝে? তার বয়স কত? ওই কি বুঝে বল? রেজার বউ পালাইছে, মেয়েও পালাইছে। তুই জানোস? তার উপর সে নিজেও মানুষ ভালো না। ভালো হইলে কি নিজের বউ, বেটিরে ধইর‍্যা রাখতে পারতো না? পারছে? নিশ্চয়ই তার কোনো গুরুতর সমস্যা আছে। যার জন্য বউ, মেয়ে পর পর পালাইতে বাধ্য হয়।
~ আপনি বাসায় চলেন। ওখানে গিয়ে কথা হবে।
~ না। আমি আমার বাসায় তোরে আর জায়গা দিবোনা। কোনোভাবেই না।
খালা এই পর্যায়ে এসে পা ধরে যখন আবার বলছিলো, ভাই আপনি আমারে জায়গা না দিলে আমি কই গিয়া উঠমু? কই থাকমু ভাই? আমার আর কে আছে কন?
তখনই লোক জড়ো হতে শুরু করলো আবার। কিন্তু তার স্বার্থপর, কঠিন মনের সেই ভাই তবুও শোনেনি তার কথা, তার মিনতি।

বাসে উঠে গেলো তারা। মিরপুরে বাসা। খালাও বাসে উঠতে চাইলো কিন্তু তার ভাই তাকে উঠার চান্স দিলো না, চলে গেলো। তাই নিরুপায় হয়ে সে আব্বুকে খুঁজে বের করে আবার আমাদের বাসায় এসেছে।
বাসায় এসে কাউকেই কিছু বুঝতে দিচ্ছেনা।
আমি খেয়াল করলাম।
তার মন খারাপ এটা সামান্য বুঝেও অতটা গুরুত্ব দিলাম না।
সে চুপচাপ গিয়ে চা বসালো।

আব্বু আর আমি খাবো দুধ চা।
আপন স্যারের ঠান্ডা লাগছে তাই তার জন্য বানানো হচ্ছে মশলা চা। আর খালা তো রাতে চা খায় ই না।

আব্বু ফোন চেক করে থ হয়ে আছে।
অনু চৌধুরী ফোন দিয়েছিলো!
এবং সেটা রিসিভ ও করা হয়েছিলো দেখাচ্ছে। আব্বু বারান্দায় গিয়ে ব্যাক করতেই কল রিসিভ হলো।
~ হ্যাঁ অনু, ডিভোর্স পেপারে সাইন করছো?
~ না।

~ কেন?
~ তার আগে বলেন কোন জায়গায় গেছিলেন। মাইয়্যাছেলের কন্ঠ আসে আজকাল আপনের ফোন থেইক্যা। ব্যাপার কী? কই যান?

~ ব্যাপার যাই হোক, তোমার চিন্তার বিষয় না সেসব।
~ আসলেই? তো বলা না কওয়া না, ডিভোর্স পেপার পাঠাইয়া দিলেন হঠাৎ!
~ আশ্চর্য! এখানে আর বলা কওয়ার কী আছে? অনেক আগেই তো করে ফেলা উচিত ছিলো! এখন এত কথা বলার ইচ্ছা নাই, সব কমপ্লিট কিনা বলো।

সে গলা নরম করে জিজ্ঞেস করলো,
~ আচ্ছা, আপনি দেখা করতে পারবেন একবার?

~ মানে! কেন? আবার কি প্ল্যান তোমার?
~ আরেনা! আমার আবার কিসের প্ল্যান! আপনি আসবেন কিনা বলেন।
~ না। তুমি আমাকে আগামীকালের মধ্যেই পেপার পাঠিয়ে দিবে।
~ আপনি আমার ঠিকানা জানলেন কিভাবে?
~ লোকেশন ট্রেস করে। মোবাইল নাম্বার দিয়ে। তুমি বুঝবা না। যাক, আগামীকাল থেকে ইনশাল্লাহ্ তোমার আর আমার জীবনের সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে।
~ শুনেন না, আপনি আসেন না একটু! দেখা করি।
~ বাচ্চাদের মত আবদার করো না। আর আবদার করেও লাভ হবেনা। আমি তোমার আর কোনো আবদার রাখতেই বাধ্য নই।

~ আমি তো বাচ্চাই। মনে নাই প্রথম রাতে আমি বেশি হাসায় কি বলছিলেন?
~ আমি কিছুই মনে রাখতে চাইনা। পেপারে সাইন হয়ে গেলে বলো, লোক পাঠাবো।
~ আমার শেষ আবদারটা রাখেন না। দেখা করবো।
~ কেন? কী কাজ?
~ এমনি। শত হলেও আপনি আমার দুই মেয়ের বাপ তো। ডিভোর্সের আগে একটাবার সামনাসামনি দেখতে চাই। এই..
~ সরি অনু।
~ আপনার পায়ে পড়ি তানিশার বাপ! আসেন না!
~ আমি ফোন রাখছি। আল্লাহ হাফেজ।
সে তখনি হুড়মুড়িয়ে বলে ফেললো,

~ আমি আপনার ডিভোর্স পেপার ছিঁইড়্যা ফালায়ে দিছি।
~ হোয়াট!
~ হ্যাঁ, ছিঁইড়্যা ফালায়ে দিছি।
~ সমস্যা কী?
~ আমি আপনার সাথে দেখা না করা অবধি ডিভোর্স দিমুনা।
~ দেখা করে কী এমন করার ইচ্ছা তোমার? আসলে আমি এখন আর চাইলেও তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি না।
~ একবার দেখবো, একটু কথা হবে.. এই..

আপনার কাছে এই আমার শেষ চাওয়া! দোহাই লাগে আপনার! আমার কথাটা শোনেন।
আব্বু কিছুক্ষন ভেবে বললো,
~ আচ্ছা ঠিক আছে। আমি দেখছি কি করা যায়।
ফোন কেটে ঘরে আসতেই দেখলো আপন স্যার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
স্যার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতেই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আব্বু অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
~ কি একটা সমস্যায় পড়ছি বলো তো… তুমি এখানে কেন? চা দেয়নি এখনো?
~ হ্যাঁ। চা দিয়েছে, একসাথে খাবো বলেই তো আপনাকে ডাকতে আসছিলাম। এসে দেখি আপনি ব্যস্ত..

~ ও আচ্ছা। চলো তাহলে।
~ চাচা,
~ হুম?
স্যার গলা ভারী করে বললো,
~ আপনি কি শেয়ার করতে ইচ্ছুক? আমি জানি এটা অন্যায় তবে আমি শুনে ফেলছি অনেকটাই। আপনি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। তবে আপনি তো অসুস্থ, আপনার একা কোনো দুশ্চিন্তায় যাওয়া ঠিক না। খুব খারাপ ফল হবে এর। আপনি চাইলে নির্দ্বিধায় আমার সাথে সব শেয়ার করতে পারেন। যদি আমাকে বিশ্বাস হয় তো..
~ না না। কি বলো আপন! বিশ্বাস করবো না কেন! আসলে, অনু ফোন দিছিলো..

~ আচ্ছা.. তারপর?
~ ডিভোর্স পেপার পাঠাইছিলাম। তাই ভাবলাম এই বিশারদ কিছু বলতেই হয়তো ফোন দিয়েছিলো, তাই ব্যাক করছিলাম।
~ হ্যাঁ। এটাই হওয়ার কথা। সমস্যা কী হয়েছে?
~ সমস্যা হলো, ও ডিভোর্স পেপার ছিঁড়ে ফেলছে।

~ কি! এটা কি বললেন! যাকে এত বুঝিয়ে শুনিয়ে, ধরে বেঁধেও রাখা গেলো না। তাকে এখন ডিভোর্স পেপার পাঠানো হয়েছে, সে ছিঁড়ে দিলো! কেন?
~ সেটাও আরেক সমস্যা। সে একবার দেখা করতে চায় ডিভোর্স দেওয়ার আগে।
আপন স্যার আর ভদ্র থাকতে পারছে না। যদি ও সে খুবই নিরিবিলি এবং ভদ্র স্বভাবেরই একজন মানুষ।
সে গলা খাকি দিয়ে বললো,
~ চাচা, কিছু মনে করবেন না, মুখ খারাপ

করতে ইচ্ছা হচ্ছে, তার কি এখন আবার আজমলকে ফেলে আপনার জন্য দরদ, ভালোবাসা উতলায়ে উঠছে? নাকি আজমল ড্রাইভার আর আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী, তাই এখন আবার তার চোখ ঘুরছে?
আব্বু কিছু না বলে একপাশে চোখ স্থির করে তাকিয়ে রইলো।
স্যার আবার কাছে এসে তীব্রভাবে বললো,

~ চাচা, এটা আরেকটা ফাঁদ! আপনি সাবধান হন এবার চাচা। এইবার আপনি আর বোকামি করবেন না দয়া করে। আপনার বড় মেয়েটার লাইফ হেল হয়ে গেছে শুধুমাত্র তার জন্য। সেই গাইড লাইন দিয়ে মেয়েটাকে বিপথে চালিত করছে দেখেই আজ আপনার বড় মেয়েটাকে বস্তিতে, একটা মাতালের সাথে ঘর করতে হচ্ছে। ও কি বুঝে?
সবেমাত্র টিনেজের স্টেজ পার করা একটা বাচ্চা মেয়ে কতটুকুই বা বোঝে? আমি জানি আপনি তাকে এখনো ভালোবাসেন। তবে আপনার কাছে আমার অনুরোধ, নিজের জীবন, আচ্ছা তাও বাদ দিলাম, নিজের দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে, তানিশার এই পরিণতির কথা ভেবে হলেও আপনি উনাকে ভুলে যান, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা অন্তত করেন। ওই মহিলা ভালো না চাচা। সে আবার আপনার একটা ক্ষতি করতে চায়, এজন্যই দেখা করতে চাইছে। আমি নিশ্চিত।
আব্বু চোখ তুলে বললো,
~ তুমি তাহলে ফাইনালি কী বলো? দেখা করবো না?

ততক্ষনে খালা আর আমিও এসে হাজির।
খালা এতক্ষনে কত প্রশ্ন, কত তোলপাড় করতো কিন্তু আজ তার মুখ রা শব্দটিও কাটে না।
সে তো নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করেই কূল~কিনারা পাচ্ছে না।

সেখানে আমাদের এইসব তো…
খালার এখন মাথার উপরে ছাদ নেই।
এই কথা সে কিভাবে আব্বুকে বলবে, কিভাবে নিজের ভাইকে ম্যানেজ করতে পারবে, তার মা তাকে সাপোর্ট দিবে কিনা আগামীকাল বাসায় গেলে ইত্যাদি সব চিন্তার ভীড়ে সে আব্বুর আর আপন স্যারের কোনো কথা শুনলোই না।
অথচ সব কথাই তার সামনে হলো।
আমি সব শুনলাম আড়ালে বসে বসে।
কারণ বড়দের আলোচনার মধ্যে ছোটদের থাকা অনুচিত। মহা~অন্যায়।

আপন স্যারের কথায় আব্বু অত:পর সায় দিলো।
আব্বু স্পষ্ট ভাষায় বললো,
~ হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলছো। তুমি চিন্তা কইরো না। আমি কায়সারের সাথে আলাপ আলোচনা করে অতি শিগগির ব্যাপারটা এনসিউর করে ফেলবো।

আমরা সবাই চা, বিস্কুট পিঠা খেলাম।
শুধু একজন কিছুই মুখে তুললো না।

উদাস চোখে দৃষ্টি স্থির করে শুকনো মুখ করে বসে আছে।
কেউ কারো দিকে তাকানোর স্কোপ নেই।

আপন স্যার অসুস্থ। তার সাইনুসাইটিস,
পলিপের সমস্যা আছে, তাই ঠান্ডা লাগলেই গুরুতর হয়ে যায়।
সে কোনোমতে মশলা চা খেয়েই ঔষধ খেয়ে শুয়ে পড়েছে।
ঘুমিয়েছে ভেবে তাকে আর কেউ ডিস্টার্ব করলো না।
আব্বু চলে গেলো আব্বুর রুমে আর খালা শুয়ে পড়লো আমার রুমে।
আমাকে আপন স্যার ডেকে নিলো তার মাথা টিপে দেওয়ার জন্য।

আমি বাম লাগিয়ে স্যারের মাথা টিপে দিচ্ছিলাম। স্যার ঘুমিয়ে গেলেন অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই।
এমন সময় ফোন এলো স্যারের। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে মেহেদী কলিং। সে স্যারের ছোট ভাই। স্যারের এই অবস্থা, স্যার কথা বলতে পারবে না, কেটে দেওয়া উচিত; এই ভেবে আমি ফোনে স্পর্শ করতেই ওটা অফ হয়ে গেলো। আবার এলো সাথে সাথেই আমি বাটন চেপে সাউন্ড কমিয়ে দিলাম। পরের বারের ফোন আসতেই ওটা টেবিল কাঁপিয়ে ভাইব্রেশন দেওয়া আরম্ভ করলো।
স্যারের পাতলা ঘুম, সে উঠে গেলো।
মোবাইল চেক করে বুঝতে পেরে আমাকে বকা দিলো বিষমভাবে। কড়া গলায় বললো,

~ না বলে অন্যের ফোনে বা কোনো কিছুতে হাত দেওয়া বেয়াদবি। এইটা জানো না তুমি? ফোন হাতে নিয়ে কয়েকবার লক খোলার ও চেষ্টা করছো দেখলাম! হোয়াট ইজ দিস রাকা? কি? তোমার স্যার আমি। কি আমি?
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম, স্যার।

স্যার কঠিন গলায় বললো,
~ এটা খুব খারাপ করছো তুমি। এনিওয়েজ, এখান থেকে চলে যাও এখন। লিভ দিস রুম।
তৎক্ষণাৎ উঠে গেলাম তার পাশ থেকে।
ঘুমাতে চলে আসলাম।
খুব কষ্ট লাগলো আজ, স্যারের এই আচরণ দেখে। সামান্য ফোনই তো। একটু হাতে নিয়ে দেখলে ও যে এত বড় অপরাধ হয়ে যায়, জানতাম না। জানলে তো ওই লোকের ওই দামী ফোন নিয়ে অত নাড়াচাড়া করতাম না।

রুমে এসে দেখলাম খালা পাগলের মত কান্নাকাটি করছে। তার সাথে শুধুশুধু কিছুক্ষন বকবক করলাম, কেন কাঁদছে জানতে চাইলাম, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সে নীরবে কেঁদেই যাচ্ছে। কোনো উত্তরই মিলছে না।
কিছুক্ষন পর স্যার হঠাৎ করে এসে খালাকে ডেকে নিয়ে কি যেন বলে গেলো। খালা আসার পর জিজ্ঞেস করতেই শুনলাম, স্যার বাড়ি চলে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? খালা নাক টেনে বললো, স্যারের মা খুব অসুস্থ। জ্বর আর শুধু বমি করতেছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে কিনা তা নিয়ে সবাই দ্বিধান্বিত। তাই স্যারকে এক্ষুনি বাড়িতে যেতে হবে।
আমি কথাটা শুনতেই তাড়াতাড়ি রুমের বাইরে এসে আশেপাশে দেখতে লাগলাম।
স্যার চলে গেছে!

সে তো অসুস্থ ছিলো খুব! কিভাবে যাবে!
বারান্দায় এসে গ্রিলে হাত রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম, স্যারকে একবার দেখার জন্য।
ভাগ্য ভালো ছিলো আমার।
“সেদিন শেষ দেখা হয়েছিলো আমাদের।”

স্যার কাঁধে ব্যাগ চেপে হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
আমি বারান্দায় খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছি।
সে বাসার সামনেই একটা অটো রিকশা পেয়ে গেছিলো।
রিকশায় উঠে একবার বাসার দিকে তাকিয়েছিলো।
অন্ধকারে স্পষ্ট বুঝলাম না কোনদিকে তাকিয়েছিলো।

কে জানে, হয়তো আমার দিকেই।
আমিও নিজেকে আড়াল করিনি সেদিন। ভাবলাম আমিই যখন স্পষ্ট করে দেখছি না, সেও দেখবেনা।
খুব খুশি হলাম তখন,
যখন দেখলাম স্যার হাত উচিয়ে টাটা দেওয়া আরম্ভ করলো। বুঝলাম, স্যার আমাকে দেখেছে! তাই ইশারায় বিদায় জানাচ্ছে হাত উচিয়ে। রিকশাটার অস্তিত্ব মিশে না যাওয়া অবধি দাঁড়িয়ে রইলাম ওভাবেই। তারপর ঘরে ফিরে আসলাম। এসে দেখলাম, খালা ঘুমাচ্ছে।
কিন্তু আব্বুর রুমে লাইট জ্বলছে।
আব্বুর রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী করো, সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো প্রশ্ন শুনে, যেন আমার কথা সে বুঝেই নি।

তারপর জিজ্ঞেস করলো,
~ তোমার রিমা খালামণির খুব মন খারাপ। দেখছো?
~ হুম।
~ কেন? কিছু বলছে?
~ না।
~ তোমার ও কি মন খারাপ নাকি?

~ না।
~ আচ্ছা। যাও তোমার রিমা খালামণিকে ডেকে আনো। বলো আমি ডাকছি।
~ খালামণি ঘুমায়।
~ তবুও ডেকে তোলো। খুব জরুরি কথা আছে।
আমি খালাকে উঠাতে চলে এলাম।
জরুরি কথার বিষয়বস্তু আগে জানতে পারলে হয়তো উঠাতাম না।

পর্ব ৩০

রিমা খালাকে ডেকে আনতে গেলাম।
সে শুয়ে আছে সাড়া~শব্দহীনভাবে।
আমি যেতেই চোখের পলক ফেললো।
পিটপিট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
তারপর ম্লান হেসে বললো, কিরে মা? আপনের কথা জিজ্ঞেস করেই কই গেছিলি দৌঁড় দিয়ে?
আমি হাসির জবাব না দিয়ে বললাম,
~ কোথাও না। তোমাকে আব্বু ডাকে।

~ কেন?
~ জরুরি কথা আছে নাকি।
~ আমার সাথে আবার কিসের জরুরি কথা! আচ্ছা চল। বলে আমার আঙুলে ধরে টান দিতেই আমি ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,
~ তুমিই যাও। আমি গেলে আব্বু ধমক দিয়ে বলবে, বড়দের কথার মাঝখানে তুমি আসো কেন?
খালা বললো,
~ নাহ্। তুই চল তো!
আমি গোঁ ধরে বসে রইলাম।

আব্বু আবার ডাকতেই খালা দৌঁড়ে চলে গেলো।
আমি বসে রইলাম একা একা।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন ইন্টারনেটে এটা ওটা দেখলাম।
কোনো কাজ না পেয়ে অনেক্ষন চেষ্টা করে একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলে ফেললাম আচমকা।
খুলেই চেনা~অচেনা সবাইকে রিকুয়েস্ট পাঠাতে লাগলাম।

আবার কারো কারো একাউন্ট ও ঘুরে ঘুরে দেখা শুরু করলাম।
জেদ ধরলাম অকারণে, আজকে আর পড়বোই না।
এভাবেই সময় নষ্ট করবো ভেবে, নতুন ক্ষেত্রেই সময় ব্যয় করতে লাগলাম দ্বিধাহীনভাবে।
একজনের একাউন্টে ঢুকে আরেকজনের, ওখান থেকে আবার আরেকজনের এমন করে করে আমি মোটামুটি এলাহীকান্ড করে ফেলছি।
হঠাৎ চোখে পড়লো, আমার অধম দুলাভাইয়ের একটি ছবি।
কুখ্যাত পোজের সেই ছবির মানুষকে দেখে চেনাও যেন দায়।
অনেক কষ্টে, অনেক চেষ্টার পরে একাউন্টে ঢুকে দেখলাম, কারেন্ট সিটি কিশোরগঞ্জ দেওয়া। আইডির ছবিগুলো দেখে নাক মুখ কুঁচকে যাচ্ছিলো আমার। কি রংচঙে, বখাটে একটা ছেলে সে!
কোথাও আমার তানিশা আপুর কোনো ছবি দেখলাম না। কিন্তু তার এই একাউন্ট ভর্তি লাইকস, কমেন্টস। সবগুলা কমেন্ট খুঁটে খুঁটে দেখছি, আপুর আইডির সন্ধান পাওয়া যায় কিনা জানতে।

আপুকে পেলাম না কিন্তু একগাদা নোংরা জিনিস দেখে নিয়েছি।
দুলাভাই লোকটা সুবিধার না আসলেই।
ফেসবুকে দক্ষ এমন একজন বান্ধবীকে ফোন করে, তার থেকে সব জেনেশুনে তবেই সব তথ্য উদ্ধার করতে পারলাম।
দেখলাম, দুলাভাইয়ের নামে অনেকগুলোই আছে একাউন্ট। দুটোর মধ্যে এটাতেই (যেটা প্রথম খুঁজে পেয়েছিলাম) তার সময় দেওয়া হয় বেশি।
ওখানে বা কোনো একাউন্টেই তানিশা আপুর কোনো চিহ্ন নেই।
রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আপডেট করা আছে অন্য একটা মেয়ের সাথে।

এক জায়গায় একজনকে দেখা যাচ্ছে।
অদ্ভুত! দুলাভাইরা এখন কিশোরগঞ্জে আছে, এই খবর কি এক্ষুনি আব্বুকে দেওয়া উচিত নয়?
যদি আপুকেও খুঁজে বের করা যায়!
ভেবে দৌঁড়ে চলে গেলাম আব্বুর রুমে।

গিয়েই থমকে গেলাম।
আব্বু আর খালার মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে।
তাও আবার তাদের কথা কাটাকাটির পিছনে মূল দায়ী ব্যক্তিটি আমিই।
এমতাবস্থায় এই খবর আর কিভাবে দিবো, তাই পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাদের কথা শুনতে লাগলাম।
কথাগুলো এতটাই মারাত্বক যে আমার হাঁটু কাঁপছিলো। বুক ধড়ফড় করছিলো।
আমার আব্বু এই সব বলছে?

রিমা খালা আব্বুর কাছে যেতেই আব্বু উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,
~ রিমা! খুব চিন্তায় আছি, একটা বিহিত করতে চাই তোর সাথে পরামর্শ করে!
খালা কৌতূহলপরবশ হয়ে বললো, কী? বলেন।
আব্বুর উত্তেজনা যেন বেড়েই যাচ্ছে ক্রমশ।
সে গলা পরিষ্কার করে বললো,
~ আমি আর এইসব ঝামেলা, দুশ্চিন্তা নিতে পারবো না। বল তো কী করলে ভালো হয়?
~ কেন? কিসের চিন্তা আপনার?
~ এইযে আমার জীবনটা এভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে…

~ গেছে বলেন। সব ঠিক হয়ে যাবে। ওগুলো ছিলো দুর্ভাগ্য! এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে কি ভালো কিছু হয়ে যাবে? এসব দুশ্চিন্তা প্রশমন করার জন্য আপনার শুভ চিন্তা করা উচিত ভাই।
~ আমার পক্ষে আর শুভ চিন্তা করা সম্ভব না। আমার জন্য এখন আগে একটা সিদ্ধান্তে যাওয়া জরুরি। সিদ্ধান্তে গেলেই শুভ চিন্তার সময় হবে।
~ মানে? বুঝিনি কিছু।
আব্বু খানিক হতাশাগ্রস্থ হয়েই বললো,
~ দেখ, অনু তো এরকম করলোই, সব ছেড়ে চলে গেলো, একটা বার ও ভাবলো না আমাদের তিনটা মানুষের কথা… তারপর বড় মেয়েটা… সেও সেইম কাজ করলো। শুধু তাই নয়। প্ল্যান করে এসে আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মেয়ে আমাকে ধোঁকা দিতে পর্যন্ত দ্বিধাবোধ করেনি।
~ তো? এগুলা নিয়ে পড়ে থাকলে কি জীবন চলবে? এগুলো ভুলে যান না।

~ হ্যাঁ। ভুলতে চাই। তাইজন্যই তোর সাথে পরামর্শ করতে আসছি।
~ হুম। কিন্তু আপন থাকলে ভালো হতো। তিনজন মিলে একটা সিদ্ধান্তে যাওয়া যেত।
~ আপন নাই দেখেই কথাটা তুলছি। ও থাকলে এই কথা তোলা যেত না। কারণ আমি জানি ও আমার কথায় কিছুতেই সায় দিবেনা। ভীষণ একঘেয়ে ছেলে।
খালা এবার কিছুটা নড়েচড়ে বসে প্রশ্ন নিক্ষেপ করলো,
~ কী এমন কথা?
আব্বু গম্ভীর গলায় বললো, রাকাকে নিয়ে।

খালা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
~ রাকাকে নিয়ে! কী করছে রাকা?
~ নাহ্। কিছুই করেনাই। তবে করবে না যে, তার গ্যারান্টি কে দিবে?
~ ভাই! কি বলতেছেন এসব! আচ্ছা, আপনি কী বলতে চাইতেছেন আসলে? খোলাখুলি বলেন তো!

~ রিমা, তুই তো সম্পর্কে ওর ফুফি হস, যদিও অনুর মন গলানোর জন্য ওদের ছোট থেকেই খালামণি বলা শিখিয়েছিস। তুই তোর ভাইঝিটাকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে দিস তো…
খালা স্তম্ভিত গলায় বললো,
~ হ্যাঁ, অনু আপা তো আমাকে সহ্যই করতে পারে নি কোনোদিন। কখনোই সে আমাকে ভালো চোখে দেখতে পারেনি। তবে আমি তাকে বোনের আসনেই বসিয়েছিলাম, আপনারা সবাই তো জানতেন? আমার তো আর একটাও বোন নেই। তাই আপনার মেয়ে দুইটাকে খালামণি বলা শিখায়েছিলাম। যাতে আপা একটু হলেও বোঝে, আমার মনে সে যেমন ভাবে তেমন কোনো ময়লা নাই। ভাই আপনি তো জানেন, তানিশা আর রাকা যে আমার কলিজার টুকরা? কথায় আছে, মায়ের চেয়ে মাসির আদর বেশি। তাই ওদের খালা ডাক শিখিয়েছিলাম। এ নিয়েও তো আপা কত কান্ড করলো, আহা, মনে নাই ভাই? তানিশার জন্মদিনে, আমার আনা চারা গাছে সে গরম পানি ঢেলে দিয়ে পর্যন্ত রাগ মিটাইছিলো।
একটু থেমে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

~ আমাকে সরাসরি একবার ফোন করে বলেও দিয়েছিলো,”রিমা, তুমি যে কত বাজে বেহায়া একটা মেয়ে তা আমার জানা আছে, এখন আবার আমার বোন সাজছো ঢং করে? আমার মেয়েদের খালা বলা শিখাও তুমি, হ্যাঁ? ভাবছো বুঝিনা কিছু? পরে একদিন সুযোগ বুঝে আমার সব নিজের করে নেওয়ার ধান্ধা?”
সেদিনের পরে আর আসিনাই আপনার বাসায়। আপনিও যোগাযোগ করেন নি, একবার জানতেও চান নি যে কেন রিমা হঠাৎ করে বাসায় আসা বন্ধ করে দিলো…
আব্বু সামান্য হেসে বললো,
~ ছাড়্ তো এসব। এগুলা সব আমার ভুল। আর মনে করাইস না এসব। অনু তো সবসময়ই এমন। প্রতিহিংসাপরায়ণ, ঈর্ষায় ভরপুর। এটাতো সবাই ই জানিস তোরা। ও এরকম করতো বলেই তো ভাবতাম, ও বুঝি শুধু আমাকেই ভালোবাসে, সেজন্যই হয়তো আমার পাশে অন্য কাউকেই সে সহ্য করতে পারেনা। আমিও এজন্য সবাইকে এড়িয়ে চলতাম, চলার সর্বাত্মক চেষ্টা করতাম, যাতে অনু কষ্ট না পায়! আর দেখ! ফলাফল কি হলো! হাহ্ হা! সেই অনু এখন অন্য সংসারে, অন্যের বউ, অন্যের বাচ্চার মা!
খালা ঠোঁট কামড়ে বললেন,

~ আচ্ছা বাদ দিন আপার কথা। যার যা মতি সে তেমন গতিই করবে। মন খারাপ করে লাভ নাই। এখন বলেন, রাকাকে কি বুঝিয়ে বলতে হবে? আপনিই তো বলতে পারেন! আর আমি তো সবই বুঝিয়ে বলি ওকে। বলা শেষ_ই বলতে গেলে। আপনার এই মেয়ে তো লক্ষী। সব বলার আগেই বুঝে ফেলে।
আবু ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,
~ নাহ্। আমি মনে হয়না কিছু বলতে বা বোঝাতে পারবো ওকে। আমার বুক ফেঁটে যাবে, সম্ভবত হার্ট এট্যাক করবো, এই মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে।
রিমা খালা বিষম খেয়ে বললেন,

~ মানে! রাকা আপনাকে ছেড়ে যাবে কেন? ও আচ্ছা! ধুর! রাকা আপনাকে ছেড়ে যাইতে যাইতে এখনো অনেক দেরী আছে! কি যে বলেন! মেয়ে কি এখনি বিয়ে দিয়ে দিবেন নাকি? বাচ্চা মেয়ে। ক্লাস সেভেনে উঠছে সবেমাত্র। এখনি বিয়ে দিয়ে দিলে তো পুলিশে ধরবে।
আব্বু ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে বললো,
~ না। বিয়ে তো এখন আমি দিবো না। তাছাড়া আমার তো বিয়ে দেওয়া লাগেনা। তারা নিজেরা নিজেরাই করে নেয়। দেখলিই তো, ওর মাও করছে, ওর বোন ও করছে। কেউ আমারে জিজ্ঞেস করছে? করেনাই!
~ আপনি এইসব কথা বার বার তুলতেছেন কেন?

আব্বু অশান্ত গলায় বললো,
~ রাকার ভালোর জন্য। ওর বড় বোন, তানিশা নষ্ট করে ফেলছে নিজের জীবন। শুধুমাত্র আমার গাফিলতির জন্য। আমিও তো মহিলা মানুষ না যে সারাদিন বাসায় বসে থাকবো, মেয়েদের এটা ওটা শেখাবো বা ওদের দেখাশোনা করবো। যদি আমি সময় দিতে পারতাম তাহলে হয়তো এতটা বিপথে যেতে পারতো না মেয়েটা। ও তো পুরাই বখে গেছে। বাপকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেছে। ধোঁকা দিয়েছে নিজের বাপকে। ওদের জন্য তো আমি এখন সারাদিন বাসায় ও বসে থাকতে পারি না। আবার বিয়েও করা সম্ভব না।
খালা শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
~ তা, আপনি রাকার ভালোর জন্য কি করতে চান ওর সাথে? ওকে বিদেশ পাঠায়ে দিবেন নাকি হোস্টেলে?
আব্বু খালার দিকে দৃষ্টি নিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ ওকে ওর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিবো।
খালা এই কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো।
আর আমার মাথায় যেন ভেঙে পড়লো বাজ।
খালা জিজ্ঞেস করলো,

~ কেন? আপনি কি মরে যাওয়ার চিন্তা~ভাবনা করছেন নাকি? মেয়েকে ওখানে পাঠাতে চান কেন?
আব্বু নিচের দিকে তাকিয়ে করুন হাসি হেসে বললো,
~ মরে যেতে পারলে তো দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি আমিই হতাম, রিমা। আমি মরবো কিনা জানিনা, তবে অনেক দূরে চলে যাওয়ার চিন্তাভাবনা আছে। এখানে এভাবে পড়ে থাকলে এমনিতেও আমি বাঁঁচবো না।
খালা কম্পমান গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ অনেক দূর বলতে? কোথায়? কোথায় যাবেন আপনি?

আব্বু নিরুত্তর। খালার ইচ্ছা করছে গলা ফাটিয়ে বলতে,”আপনি একাই শান্তির খোঁজে চলে যাবেন? আমাকে সাথে নিবেন না? আমিও তো মরে যাবো, এখানে পড়ে থাকলে। আমার মাথার উপরের ছাদটুকুও যে আজ আর নেই!”
এদিকে আব্বুর ভাষ্য শুনে আমার সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে আরম্ভ করলো।
আমাকে অনু চৌধুরীর কাছে পাঠিয়ে দিবে আব্বু? মানে ওই আজমল উদ্দীনের বাসায়?
(চলবে)
বি:দ্র:~ আগামী ২~০১~২০২১ তারিখ থেকে আমার ফাইনাল এক্সাম। সিলেবাস~ফুল বই! তাই আগামী ২~১৩ তারিখ অবধি হয়তো আমি এবং আমার পেইজ একেবারেই নিস্তেজ হয়ে থাকবে।
এদিকে আমার #রাকা এবং #রাকারদ্বিতীয়খন্ড(রাকার অসমাপ্ত প্রেমকাহিনী) আপনাদের ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে কিছুদিন এভাবেই পড়ে থাকবে। ইনশাল্লাহ্ আবার ফিরে আসবো, রাকা এবং অন্যান্য সব গল্প নিয়ে, টেস্ট শেষ হওয়া মাত্রই। কিন্তু ততদিনে হয়তো আমি (বর্তমানে ১৩, ০০০+ পাঠক) পাঠকশূন্য হয়ে যাবো। দ্বিতীয় খন্ড হয়তো আর শুরুই করা হবেনা! ভালোবাসা নিবেন! কৃতজ্ঞ এতদিন পাশে পেয়ে! :3

পর্ব৩১

আব্বুর সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ।
সে আমাকে আমার সেই নিষ্ঠুর, স্বার্থপর মায়ের কাছে পাঠানোর এই কঠোর, নির্মম সিদ্ধান্তেই তৎপর। আব্বুর প্রতি আমার ভালোবাসার ব্যাখ্যা ভাষায় প্রকাশের জোঁ নেই।
আমার পৃথিবী বলতে তো শুধু আমার আব্বুই। মা নেই, বোন নেই, কেউ নেই আমার, একমাত্র এই আব্বু ছাড়া।
সেই আব্বুর জন্য ও আজ বোঝা হয়ে গেলাম আমি।
আমাকে সে আর তার কাছে রাখতে পারছে না।

তার সন্দেহ আমি আমার মা~বোনের উত্তরসূরি; তাই আমিও যে তাদের অনুসরণ করবো না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাছাড়া আমার দাদিও চায়না, আমার মায়ের কোনোপ্রকার চিহ্ন তার ছেলের কাছে থাকুক।
কে জানে হয়তো আব্বুর এই নির্মম, কঠিন সিদ্ধান্তের পিছনে আমার দাদির ও একটা বিরাট অবদান ছিলো!
রিমা খালা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ এই মেয়েকে ওদের সাথে তুলনা করলে চলবে না ভাই। রাকা ওদের মত হয়নাই। সম্পূর্ণ আলাদা। ও এমন কিছু করবেনা যাতে আপনার মানসম্মান নষ্ট হয়। ছোট থেকেই তো নানারকম কাহিনী দেখে আসতেছে, তাই ভালো~মন্দের তফাৎ করতে জানে। ও বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক বুঝে ও, ভাই। এখনই নিজের মেধা দিয়েই ঠিক ভুল বিচার করতে পারে। আপনি ওকে বিশ্বাস করলে কখনো ঠকবেন না, এই গ্যারান্টি আমি আজকে আপনাকে দিলাম।

আব্বু কেমন যেন একটা করলো কথাগুলো শুনে।
আমি বিস্ফোরক দৃষ্টিতে কেবল এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে যাচ্ছি!
আব্বু ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
~ তুই আমাকে আমার মেয়ের ব্যাপারে গ্যারান্টি দিচ্ছিস? বাহ্!
~ হ্যাঁ। কারণ পুরুষ মানুষ সবসময় সবকিছু বুঝে না। রাকা মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে কিছুটা বুঝতেন।
আব্বু গলা খাকি দিয়ে বললো,

~ আমি তো তোকেও ভরসা করতে পারিনা, সেখানে তোর কথার মূল্য আমি কিভাবে দিবো বল? আমি এই দুনিয়ায় এখন আর কাউকেই বিশ্বাস করিনা।
খালার চোখ ছল ছল করতে লাগলো এই কথা শুনে। সে মুখ অন্ধকার করে বললো,
~ ও। সেটা আপনার ব্যাপার, আপনার বুঝ। অথবা আমার ব্যর্থতা।
আব্বু খুব শান্ত, স্বাভাবিক স্বরে বললো,
~ হ্যাঁ। তুই রাকাকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে দিস। আগামীকালই হয়তো ওর শেষ দিন, বাবার কাছে থাকার। বলিস, এই বাবার বুক ভেঙে গেছে। এই বুকে আর কোনো ঝড় সামলানোর শক্তি নেই। বলে দিস, ওর বাবার প্রাণ ও। সবসময় তাই থাকবে।
খালা ভুরু কুঁচকে বললো,
~ কি বলেন এসব! এটা ঠিক হবে না ভাই। একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করেন দয়া করে। ওর ওই মায়ের কাছে ওকে পাঠানো মানে ওকে ইচ্ছা করে নষ্ট করে ফেলা। মেয়েটা খুব ভালো। ওর সাথে এটা করা ঠিক হবেনা। তাছাড়া আপা ও ওকে রাখবে বলে মনে হয় না।
~ ঠিক বেঠিক আমি বুঝবো। রাখবেনা কেন?

~ আপার নতুন সংসার তো! শুনছি বাচ্চাও আছে এখন। সামনে আরো হবে।
এখন কি আর আগের ঘরের বাচ্চার প্রতি তার আগের মত স্নেহ~ভালোবাসা থাকবে বলেন? রাকাকে তো সে যত্ন করবে না। তাছাড়া বাড়তি একজনকে তার বর্তমান স্বামীও রাখতে চাইবে না। আমার যা মনে হয়।
আব্বু গম্ভীর গলায় বললেন,
~ রাখবে। আমি মাসে মাসে রাকার জন্য টাকা পাঠিয়ে দিবো। ওর ভরণ~পোষণের দায়~দায়িত্ব সারাজীবন আমিই বহন করবো, যতদিন সম্ভব হয়।
খালা খানিক হেসে বললো,
~ নাহ্ ভাই। আপা ওর খেয়াল রাখবে না, আগেও যে রাখতো তাও বলবো না। কারণ আমি আগে পিছে কিছু কিছু জিনস শুনছি। বিশ্বাস করেন, নষ্ট হয়ে যাবে মেয়েটা। ও কত ভালো পড়াশোনায়, তাও ও আর হবে না। আপনার নিজের মেয়ে, আপনি না বুঝলে কে বুঝবে?
আব্বু খালার দিকে তাকিয়ে অসহায় চাহনি নিয়ে বললো,
~ কিছু করার নেই রিমা। আমার এটা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
খালা আব্বু চোখের এক রহস্যময় অসহায়ত্বের আভাস পেয়ে চুপসে গেলো।
ভাবতে লাগলো, কি হয়ে গেলো হঠাৎ মানুষটার?
এমন কি হলো এই মধ্যে!

আব্বু শান্ত গলায় বললো,
~ তোর ভাইয়ের আর তোর মধ্যে সমস্যা হয়েছে আমি জানি। আমার জন্যই হয়েছে তাও জানি। আমি সব ঠিক করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার দরকার নেই। তোর এখন শুধু একটাই কাজ,
কথা শেষ না হতেই খালা জিজ্ঞেস করলো, ~ কিভাবে জানেন? আমি তো বলিনাই, আপনিও ছিলেন না ওখানে।
আব্বু হেসে বললো, আমার জানা লাগেনা, সব জানা হয়ে যায়। ওখানে আমার কলিগ ছিলো কয়েকজন। তারাই বললো।
খালা কিচ্ছুক্ষন চুপ থেকে শেষমেশ আর না পেরে কেঁদেই দিলো।
আব্বু গম্ভীর গলায় বললো,
~ কাঁদার কিছু নেই। রাকার বিষয়টা মিটমাট হওয়া অব্ধি তুই আমার বাসাতেই থাকবি। এটা আমি খালাকে বলে দিয়েছি কিছুক্ষন আগে।
খালা এবার চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলো,

~ সব ঠিক করে রেখেছেন আপনি! কখন করলেন এসব! আপনি কি সত্যি সত্যিই ওকে পাঠিয়ে দিবেন নাকি?
~ হুম। আর কোনো উপায় নাই। ওর দেখাশোনা আমি করতে পারবো না। আমি বিয়েও করবো না যে ওর দেখাশোনা ওর নতুন মা করবে। তাছাড়া ওর রক্তে অনুর রক্ত মিশে আছে। এই মেয়েও আমাকে আঘাত দিবে। আম্মা তো রোজই বলতেছে। আমার বুকের ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে ইদানিং। রাকা কিছু করে বসলে সেই ধাক্কা আমি আর সামলাতে পারবো না। তুই আর কোনো কথা বাড়াইস না রিমা। ভুলে যাস না, এই মেয়েটা আমার কলিজা। ওকে এভাবে পাঠিয়ে দিতে আমার ও ইচ্ছা করেনা। কিন্তু উপায় নাই। তাছাড়া আম্মার কথা..
খালা তড়িৎ গতিতে বললো,
~ কিন্তু অনু আপা তো ওকে দেখবেনা!
~ অনু যেমনই হোক, ও রাকার মা, আমি না থাকলে অবশ্যই সে নিজের মেয়েকে দেখেশুনে রাখবে। তানিশা কিন্তু ওর মা যতদিন ছিলো ততদিন কোনো বেহায়াপনা করেনি। যখনই মা চলে গেলো, তখনই মেয়েটা বখে গেলো। সব আমার দোষ। আমি আর রিস্ক নিবো না।

~ আপনি এসব কি বলতেছেন! সব উল্টা বুঝতেছেন কেন? অবুঝের মত কথা বলেন কেন? তানিশার বখে যাওয়ার পিছনে তো আপারই অবদান! মেয়ে তো এসব নিজের মাকে দেখে দেখেই শিখছিলো!
আব্বু খালাকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলে বললো। ক্রুদ্ধ গলায় বললো, সকালে উঠতে হবে। তুই এক্ষুনি চলে যা রুম থেকে।
খালা গলা পরিষ্কার করে আবার বলতে গেলে আব্বু রক্তলাল চোখে তাকিয়ে নির্দেশনা দিলো, চলে যাওয়ার। তাই খালা বাধ্য হয়েই চলে আসার জন্য উদ্যত হয়।

আমি আমার রুমে এসে বসে আছি আর
ভাবছি নানানরকমের ভয়ংকর সব কাহিনী।
খালাকে হয়তো এতক্ষনে আব্বুর বোঝানো শেষ! খালা এখন আসবে আমার রুমে। আদর~সোহাগভরা মুখে বোঝাবে, আমি আমার মায়ের কাছে থাকলেই ভালো হবে… এই… সেই…

আমার ভালো শুধু তারাই বোঝে।
আমি বুঝতেও চাইলেও অনুচিত।
কিছু বললে যে আগ্রাহ্য হবে না, তা বেশ ভালো করেই জানি।
আমি তো কিছুতেই যেতে চাইনা ওখানে!
ওখানে অনু চৌধুরীর মত একটা মহিলা ছাড়াও আজমল উদ্দীনের মত একটা খারাপ লোক ও আছে। ওখানে আমি কিভাবে থাকবো!
কোথায় সেই জায়গা?
আমার তো এখানেই সব কিছু!
আমার স্কুল, আমার গুটিকয়েক বন্ধু~বান্ধব, আমার বাসা, আমার গাছ, আমার বারান্দা, আমার ছাদ..

সবচেয়ে বড় কথা আমার আব্বু, সেও তো এখানেই!
আর আমার আপন স্যার!
সামনে আমার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা, দু সপ্তাহ পর বিজ্ঞানমেলায় আমার প্রজেক্ট ডিসপ্লের ডেট, বার্ষিক প্রতিযোগিতায় আমার গান আর রচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য আপন স্যারের উৎসাহ, আমার প্রাইস পাওয়ার স্মৃতি…. সব তো এখানেই হয়! এখানেই হবে! এই সবকিছু ছেড়ে আমি চলে যাবো? এসব ভাবতেই আমার মাথা ঘুরে গেলো।
আমি কি একবার আব্বুকে গিয়ে অনুরোধ করে দেখবো? যেন আমাকে এখান থেকে না সরিয়ে দেয়! নাহ্। আমি নিশ্চিত!
আব্বুও এই সবকিছু জানে!
কখনোই আমাকে আমার আব্বু ওখানে পাঠাবে না!
আমার কোনোকিছুই কখনো সে কেড়ে নেয় নি, আমার কোনো চাওয়াই সে আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রাখেনি।
সেখানে সে আমার সবকিছু, আমার সব আনন্দ কেড়ে নিবে?

এটা হতেই পারেনা।
আমি নিশ্চিন্তে পড়তে বসে গেলাম।
অজানা কারণে পড়তে ইচ্ছা করছেনা।
মনে হচ্ছে যেন বুকের ভেতরে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
খালা আমার রুমে এসে বললো,
~ মা, আয় তো এখানে। কিছু কথা বলবো তোকে।
আমি খালার কাছে গেলাম।
খালা আমার চুলে বিলি কেটে জিজ্ঞেস করলো,

~ তোর আম্মুর কথা মনে পড়ে তোর?
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, পড়ে।
খালা ঢোক গিলে আবার জিজ্ঞেস করলো,
~ একবার গিয়ে দেখে আসবি মাকে? অনেকদিন তো দেখিস না।
খালা আমাকে এখনো আমার বয়সী বাচ্চা মনে করে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
সে কথা ঘুরাচ্ছে। অথচ আমি সবই জানি।
সে ইনিয়েবিনিয়ে বলতে চাচ্ছে,
“তোকে তোর মায়ের কাছে সারাজীবনের জন্য দিয়ে আসা হবে। সব গুছিয়ে নে। আগামীকালই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

পর্ব৩২

খালার সাথে আমার বেশিক্ষন কথা হলো না এই নিয়ে। এই বিষয় টপকে আমরা আবার আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার~স্যাপার নিয়েই আলোচনা করে সেরে ঘুমোতে চলে গেলাম সে যাত্রায়।
আমার মনের অশান্তিটা তখন ও ছিলোনা, আসেই নি! কারণ আমার মনে একটাই ভরসার চিন্তা বাসা বেঁধেছিলো তখন, আমার আব্বু আমার সাথে কখনোই এই অন্যায় করবে না।

অনু চৌধুরী সকালে ঘুম থেকে উঠেন অনেক বেলা করে। যেখানে আজমল উদ্দীন উঠে বসে থাকেন সকাল সাতটার আগে~পরে। বাড়িতে আসার আগে যখন বাসায় ছিলো তখন বাইরে গিয়ে, গাড়ি চালানোর সময় সামান্য নেশাটেশা করে আসতো বলে বেলা করেই উঠতো অনু চৌধুরীর সাথে সাথে। কিন্তু এখন তো সেই সুযোগ নেই।
বাড়িতে এখন বড় ভাই, মেঝো ভাই, দুই বউ আছে..
ঘুম থেকে উঠেছেন অনু চৌধুরী। পাশে কেউ নেই।

আজমল উদ্দীন ইরাকে নিয়েই কোথাও গেছে, কারণ ঘুম থেকে উঠে কাউকেই পাশে দেখতে পাচ্ছেনা সে। মুখ ধুতে গিয়ে স্পষ্ট শুনতে পেলো, একটা বাচ্চা ছেলের আওয়াজ।
অনু চৌধুরী মুখ, হাত ধুঁয়ে আওয়াজের উৎস খুঁজে বের করেই সেদিকে হম্বিথম্বি হয়ে চলে যান। গিয়ে দেখলেন, শাহানা বেগমের ঘর থেকেই ঐ বাচ্চা ছেলের আওয়াজ আসছে।
দরজা আলতোভাবে ধরতেই খ্যাঁক করে খুলে গেলো, অনেক দিনের পুরোনো কাঠের দরজা বলেই অমন ভারী শব্দ।
গিয়ে দেখলেন, শাহানা বেগমের কোলে ইরা আর আজমল উদ্দীনের কোলজুড়ে বসে আছে একটা ৪/৫ বছরের মিষ্টি, বাচ্চা ছেলে।

এই দৃশ্য দেখে অনু চৌধুরীর চক্ষু চড়কগাছ!
সে গলা ভারী করে ক্যাঁচক্যাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ এই পোলা ক্যাডা? ওই ইরার বাপ? এই পোলারে সকাল সকাল বাড়ির মইধ্যে আইন্যা নাটক করে ক্যাঁ আপনার বড় বিবি? কাজ কাম নাই? ঢং খালি।
আজমল উদ্দীন উত্তর দিলেন,
~ না ঢং না অনু। এখানে ঢং দেখো কোথায়? এই ছেলে শাহানার।
অনু চৌধুরী ভুরু কুঁচকে বললো,
~ শাহানার মানে? অয় না বন্ধ্যা? বাচ্চা পাইলো কই?

আজমল উদ্দীন একরাশ হাসি চোখ~মুখে ফুটিয়ে তুলে বললেন,
~ এই বাচ্চাটা আমার বড় বিবির দত্তকপুত্র অনু। সুন্দর হইছে না দেখতে? এই বাচ্চার বাবা~মা দুজনেই রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে কিছুদিন আগে। তাই বাচ্চাটা একটু ভয় পেয়ে আছে। এই ছাড়া বাদবাকি সবই ঠিক আছে একদম। আর শাহানাকেও পছন্দ হইছে ওর।
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকে চুমো দিয়ে আজমল উদ্দীন বললেন,
বাবা তোমার নামটা বলোতো এই আন্টিকে?
ছেলেটা আধো আধো স্বরে টেনে বললো,
তা~মি~ম।

অনু চৌধুরীর গা জ্বলে যাচ্ছে এইসব আদিখ্যেতা দেখে।
সে খপ করে শাহানা বেগমের কোল থেকে ইরাকে তুলে নিয়ে বললো,
~ অন্যের রক্তকে নিজের মনে করলেই ওইডা নিজের হয়ে যায়না, অন্যের ই হয়। কথাটা মাথায় রাইখ্যেন। বাচ্চা ভাড়া কইর‍্যা আনছে।
বলে হাসতে হাসতে চলে গেলেন।
শাহানা বেগম হাসি মুখেই তাকিয়ে রইলেন।
সে তামিমকে পেয়ে এতটাই খুশি যে কারো কোনো কটুক্তি ও তার এখন কানে যাচ্ছে না।
তামিম নামের ছেলেটাও কিছুক্ষন পর পরই তার দিকে তাকিয়ে আম্মু, আম্মু বলে ডাকে।

আল্লাহর অশেষ কৃপা। কে জানে হয়তো ছেলেটার আসল আম্মুর চেহারার সাথে মিল আছে শাহানা বেগমের। অথবা এই মাসুম বাচ্চা শাহানা বেগমের মুখের দিকে তাকালেই নিজের মাকে দেখতে পায়! নইলে আসামাত্রই এভাবে এরকম একটা বাপ~মা মরা বাচ্চা সামলিয়ে আনা দুষ্কর বৈ আরকি?
শাহানা বেগমের সাথে আজমল উদ্দীনের ভাব এখন আগের চেয়ে যেন আরো বেড়ে গেছে। ওদিকে নিজের এত সৌন্দর্য, নিজের বাচ্চা, এত এত টাকা দিয়েও সে তার এই স্বামীকে নিজের কাছে ধরে রাখতে অক্ষম।
ইরাকে খাইয়ে সে রান্নাবান্না সব ফেলে শুয়ে পড়লো।

ওদিকে শাহানা বেগম রান্না চাপিয়েছে, আজমল উদ্দীন ও তাকে সাহায্য করছে তাও সে বুঝতে পারছে। অথচ তার রান্নার সময় আজমল উদ্দীনকে সে তার ধারে কাছেও খুঁজে পায় না।
এসব আর তার সহ্য হচ্ছেনা।
দাঁতে দাঁত চেপে সব সয়ে যাচ্ছে।
তখন সকাল দশটা বেজে পনের মিনিট।
অনু চৌধুরীর ফোন বাজছে।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোন রিসিভ করতেই রেজা চৌধুরীর কণ্ঠস্বর পেয়ে কিছুটা শান্ত হলো।
~ হ্যালো অনু?
~ হ্যাঁ বলেন।
~ তোমার ডিভোর্স পেপারে সাইন করার শর্তটা কি ছিলো?
~ আপনার সাথে একবার দেখা করবো।
~ আর কিছু?
~ না।

~ নিজের মেয়েটার কথা কি একবারো জানতে ইচ্ছা করেনা তোমার? ওর কথা তো জিজ্ঞেস ই করোনা তুমি! কেন বলো তো? রাকা আসলেই তোমার মেয়ে তো?
অনু চৌধুরী নাক কুঁচকে গ্রাম্য ভাষায় যাচ্ছেতাই রকমের কিছু গালি দিয়ে বললো,
~ আপনার সন্দেহ থাকলে মেয়েরে গলা টিপ্পা মাইর‍্যা ফেলান। আমার কিচ্ছু হইবো না।
আব্বু বিষম খেয়ে বললো,
~ উহুম। আমার কোনো সন্দেহ থাকলেও আমি বলবো, রাকা আমার ই মেয়ে। কারণ আমিই ওকে ছোট থেকে বড় করছি। এখন আমার মেয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ে, অনেক বড় হয়ে গেছে।
~ তাইলে তো ভালোই। এহন কিজন্যে ফোন দিছেন ওইডা বইল্যা ফেলেন।

~ তোমার রাকার জন্য খারাপ লাগে? মেয়েটা এই বয়সে একা একা থাকে…
~ লাগবোনা ক্যান, ওইডাতো শুধু আম্নের একার মাইয়্যা না, আমারো। এহন মাইয়্যার কপালে মা নাই, কিছু করার নাই। আর আল্লা দিলে যা চ্যাঁটাং চ্যাঁটাং কতা কয় আপনের এই ছোডো মাইয়্যা!
~ স্পষ্টভাষী আরকি। আচ্ছা, আজকে তাহলে চলে আসো তাহলে। দেখা করি। তারপর আমার সামনে বসে আমাদের ডিভোর্স ফাইনাল করবে। কেমন?
~ ঠিক আছে। কিন্তু আজকে আর পারমুনা। আজকে মন~মেজাজ ভালো নাই।
~ কবে পারবা?

~ আমি আপ্নারে জানামু।
~ আচ্ছা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানাও। আমার তাড়া আছে।
~ কিসের তাড়া? বিয়ে করবেন? আপনার ওই বইনডারে তাইনা?
~ যাই করি, করবো, তোমার জানার বিষয় না। তবে যেদিন দেখা করবা ওইদিন তোমার জন্য একটা স্পেশাল সারপ্রাইজ আনা হবে।
~ কি?
~ ডেট ফাইনাল করে জানাও কবে ফাইনালি দেখা করবা। সেদিন নিজেই দেখবা কি সারপ্রাইজ।
~ আচ্ছা। তবে আমি আপ্নারে একটা কথা কইতে চাই।

~ বলো।
~ আমারে আপনি আরো একটা মাস সময় দেন।
~ কেন?
~ এক মাস পরে দেখা করমুনে।
~ এতবেশি সময় নেওয়া যাবেনা। সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ।
~ ঠিক আছে।
~ অনু…
~ বলেন!
~ এক মাস নিয়ে কি করতে চাইছিলা? তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে ওখানে?
~ না… মানে… সমস্যা তো হয় ই!

মলিন কন্ঠে আবার ডাকলো, অনু…
~ কি কইবেন কন না, বার বার অনু অনু বইল্যা থাইম্যা যান ক্যান?
চাপা স্বরে বললো,
~ আরেক বার কি ভেবে দেখবে? আমি আবার সুখী হতে চাই তোমাদের নিয়ে।
~ দেখা কইর‍্যা নেই, তারপর বাকিডা হইব্যো।
তাদের এই কথোপকথন আমার জন্য এক বিশাল আশীর্বাদস্বরুপ বার্তা বয়ে আনলো।
আমার আর যেতে হবেনা এখনই। যদিও আমি মনে মনে বিশ্বাসই করতাম না, আমার কখনো ওখানে যাওয়া লাগবে বলে।
খালা আমাদের সাথে এক সপ্তাহ কাটালো। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হলাম আবার। খালা আর আব্বু দুজনেই খুব খুশি।
বেদম খুশিতে ভেঙে পড়ে, রেজাল্ট জানাতে অনু চৌধুরীকে ফোন দিলাম।

সেদিন ভালো রেজাল্টের তাড়নায় অনু চৌধুরীর প্রতি সব রাগ ভুলে গেছিলাম। বললাম,

~ হ্যালো আম্মু! কেমন আছো?
সে অবাক কণ্ঠে বললো,
~ ভালোই আছি। তো, তুই? এতদিন পর তুই তোর মারে ফোন দিলি কি মনে কইর‍্যা?
~ একটা গুড নিউজ দিতে ফোন করছি তোমাকে।
~ কী কী?

আমি এক বুক আনন্দ নিয়ে বললাম,
~ আম্মু আমি প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ফার্স্ট হইছি!
সে বিন্দুমাত্র উৎসাহ তো দিলোই না বরং বললো,
~ ধুরো! এইডা জানানোর কি আছে! তোরে তো আমি আগেই বলছি, এইসব পড়াশোনা, ফার্স্ট~ টার্স্ট দিয়া কিচ্ছু হয়না, হুদাই, এরচেয়ে তুই আমারে বল, তুই রান্না কয়ডা শিখছোস নতুন, কোনদিন তুই বাজার সদাই করছোস নিজে, কাপড় চোপড় ধুঁইতে পারোস। সবচেয়ে বড় কথা হইলো, কালা ছিলি, এহন কি একটুও ধলা হইছোস? ওইডি হইছে কামের কাম! এইসব তেনাতুনা টাইন্না কি কাম, হেই তো থালা বাসন ই মাজন লাগবো।

আমি শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
~ তো তুমি চাও, আমি আর পড়াশোনা না করি?
~ না কর, তোর যহন ইচ্ছা আছে। ম্যাট্রিকটা দে। এদ্দুরেই সারবো, এরপর তোর বাপরে বইল্যা বিয়ের কামডা সাইর‍্যা ফেললেই হইবো। শুন, রাকা, আবার নিজের বড় বইনডার মত আকাম~কুকাম করিস না, দেহিস! ভালো ঘরে বিয়া দিমু তোরে।

এক মাস পর…

আমার জীবনে পর পর কয়েকটা দুর্ঘটনার অধ্যায় রচিত হয়ে যায়।
আপন স্যার আমার স্কুল থেকে বদলি হয়ে যায়, আচমকা! ফলপ্রসূ, স্যারের কাছে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে আব্বু আর অনু চৌধুরীর দেখা করার দিন ক্রমশ এগিয়ে আসতে শুরু করলো।
অত:পর একদিন অনু চৌধুরী ফোন দিয়েই ফেললেন!

তাদের মধ্যে সব কথার অন্তিম শেষে আব্বু আমার কাছে এসে একদিন মাথা নিচু করে জানালো,
~ মা! রাকা মা! তুমি তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নাও। আজ তোমাকে তোমার আম্মুর কাছে রেখে আসবো। তুমি ওখানে ভালোই থাকবে মা। তোমার আম্মু তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। তুমি চাইলে মাঝেমধ্যে আমার সাথে দেখা করতে আসতে পারবা। তবে থেকে যাওয়ার জন্য আর আসতে পারবা না। তোমাকে ওখানেই বাকি দিনগুলো কাটাতে হবে। তবে তুমি চিন্তা করোনা মা, কোনোপ্রকার সমস্যা হলেই তুমি আব্বুকে জানাবে, আমি তোমাকে তৎক্ষণাৎ নিয়ে আসবো বা অন্য কোনো ব্যবস্থা করবো।
তখন আমার হাতের ফোনটাও নষ্ট।
বিপদ আসলে চারদিক থেকেই আসে।

আপন স্যারকে বা খালাকে যে ফোন করে জানাবো তার ও কোনো রাস্তা খোলা রইলো না। খালা তো খালার ভাইয়ের বাসাতেই অবস্থান করছে আর আপন স্যার এখন অনেক দূরে লজিং টিচার হিসেবে আছে।

আমার একটা ফোনেই সব পাল্টে যেতে পারে! কিন্তু তখনই আমার ফোনটা ঠিক ছিলো না।
ভালো দেখে কিনবো করে করে আর কেনাই হয়ে উঠেনি, তাছাড়া আমার এখন ফোনে তেমন কিছু করাও লাগেনা। দিনরাত মিলিয়ে ৯/১০ঘন্টা আমি পড়াশোনাতেই কাটিয়ে দেই, বাকি সময়ে স্কুল, বাসার কাজকর্ম। বাসার টুকটাক সব কাজকর্মই আমি করি। নিজেই শিখে নিয়েছি। খালাও খুব যত্ন করে শিখিয়ে
দিয়ে গেছে কিভাবে কোনটা রান্না করতে হয়। আমার রান্নার নোটবুক ও আছে এখন। সব রিমা খালার অবদান। আমার জীবনের একটি সুখী অধ্যায় সে।
আমি বাধ্য হয়ে মনে চাপা কষ্ট পুষে রেখেই সব গুছাতে লাগলাম।
মাঝখানে একবার গিয়ে আব্বুকে বললাম,
~ আব্বু একটু ফোনটা দিবা?
আব্বু জিজ্ঞেস করলো, কেন?

আমি বললাম, আমার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই একটু দরকার ছিলো।
আব্বু গম্ভীর গলায় বললো,
~ সমস্যা না। যাওয়ার সময় তোমাকে একটা নতুন ফোন কিনে দিবো। তুমি এখন কি কি নিবা তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও। তারপর আমার কাছে এসে একটু বসো।
আমি বললাম,
~ কেন আব্বু? আমাকে আম্মুর কাছে রেখে আসবে সারাজীবনের জন্য, তাই?
আব্বু এক বুক শূণ্যতা নিয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। আব্বুর চোখে জলেরা ভীড় করতেই সে অন্যদিকে ফিরে গেলো। ওদিকে ফিরেই বললো,
~ যাও, যা করতে বললাম করো।
তাড়াতাড়ি আমার কাছে আসো সব গুছিয়ে।
আমি নিঃশব্দে শ্বাস তুলে বললাম,
~ আমার গোছাতে বেশিক্ষন লাগবে না। আর লাগলেও লাগাবোনা, প্রয়োজন হলে গোছাবো না।
আব্বু জিজ্ঞেস করলো, কেন?

আমি মলিন মুখ করে বললাম,

~ কারণ আমার হাতে এখন সময় খুব কম! আব্বু, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার কাছ থেকে আমি অনেক দূরে চলে যাবো কিছুক্ষন পর, আর কখনো দেখা হবেনা তোমার সাথে আমার! তাই এই শেষ মুহূর্তটুকু আমি তোমার কোলে শুয়ে থাকতে চাই। শুবো আব্বু?
আব্বু করুন চোখে বললো,
~ নাহ্! কি সব আবোলতাবোল বলো তুমি! আসো, শোও।
আমি আব্বুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। আব্বু হেঁচকি তুলে কাঁদছে। তার হাঁপানির সমস্যা আছে, এছাড়াও আছে নানান ব্যাধি। সে প্রাণপণে চাচ্ছে, কান্নাটা গোপনে সারতে, কিন্তু কিছুতেই সংবরণ করতে পারছে। তার চোখের জলের প্রত্যেকটা ফোঁটা আমার গালে, কপালে এসে পড়ছে। আমি সেসব সরাচ্ছি না।
সরাবো ও না। আব্বুকে তো সাথে করে নিয়ে যেতে পারবো না। আব্বুর চোখের জল তো নিয়ে যেতে পারছি! ওগুলো যেখানে যেখানে পড়ছে, ওখানেই শুকিয়ে যাক।
আজীবন আব্বুর স্মৃতিফলক হিসেবে লেগে থাকুক।
আমি কিন্তু কাঁদছিনা।
একটুও কাঁদছিনা!

তবে মনের ভিতর যুদ্ধ বেঁধে গেছে। চোখজোড়া রক্তজবার ন্যায় লাল হয়ে গেছে। আমার ও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! কিন্তু আমার জলকান্না আসছে না, আমার কান্না রক্তলাল!
মনে মনে ভাবছি,
যদি আম্মু আমায় ভালো না বাসে তখন কি হবে? আচ্ছা দাদি কি আমায় রাখবে? উহুম! দাদিও তো আমায় ভালোবাসেনা! কোনোদিন রাকা* বলে ডাকে ও নি! আদর ই তো করেনা দাদি!
আচ্ছা আমার বড় আর মেঝো ফুফি? তারা রাখবে তো? উহুম!
তারা তো যোগাযোগই বন্ধ করে দিয়েছে!
রিমা খালা? উহুম! তাও হবেনা! সে তো নিজেই কোনোমতে মাথার উপরের ছাদটা নিশ্চিত করে দিন পার করছে, আমাকে রাখবে কোথায়?
আচ্ছা, আপন স্যার?
উহুম!
সমাজ বলবে, দুশ্চরিত্রা! অল্প বয়সেই এরকম দুর্নামগ্রস্ত হওয়ার স্বাদ নেই! তাছাড়া এরকম কিছু মাথায়ও আনা যাবেনা! আনিনি, তবুও আব্বু আমায় তার কাছে রাখার সাহস পাচ্ছেনা, সেখানে আনলে কি হবে?

তাই, আপন স্যার, আমার আপন স্যারের কোনো সাহায্য আমি নিবো না।
আমি একদিন কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দিবো আমার আব্বু এবং এই কলুষিত সমাজকে, আমাদের রক্ত এক, কিন্তু মানুষ হিসেবে এক নয়!
বেশ তো বেশ!
আমি আমার আম্মুর কাছে গিয়েই না হয় থাকবো! একটু কষ্ট হবে, তবে মানিয়ে গুছিয়ে নিবো।
ভালো থাকুক সবাই।
আব্বু, আপন স্যার, রিমা খালা এবং আমার জীবনের গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্র।
আশা করছি আমিও ভালো থাকবো!

কিন্তু আমি এখানে, আমার আম্মুর কাছে এতটাই ভালো আছি যে আমার কাছে এখন আমার জীবনের প্রত্যেকটা দিন এক বছর মনে হয়!
মনে হয়, এই আলিশান পৃথিবী বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর! কাউকে দিয়েছে অঢেল ভালোবাসা, কাউকে দিয়েছে মৃত্যু!

লেখা – ফারজানা রহমান তৃনা

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “রাকা – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ। )

আরো পড়ূন – রাকা (শেষ খণ্ড) – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প