রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

রাকা (১ম খণ্ড) – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প

রাকা (১ম খণ্ড) – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প: আমি টুপ করে আংকেলের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। আংকেল আবার ধরতে নিচ্ছিলো। আমি শরীরের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে নেমে পড়ি তার কোল থেকে।


পর্ব ১

মাসখানেক আগে আমার আম্মু পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলো অন্য একজন পুরুষকে। লোকটাকে আমি আগেই চিনতাম। সে মাঝেমধ্যেই আমাদের বাসায় আসতো। কখনো বা দেখা করতে যেতাম আম্মু আর আমিই।

আমি ছোট ছিলাম,
তাই আম্মু আমাকে নিয়েই দেখা করতে যেত, স্কুল~প্রাইভেটে নেওয়ার বাহানা দিয়ে।
ঐ আংকেল আমাকে ভীষণ আদর করতো।

তাই তাকে আমার ভালো লাগাটা ও স্বাভাবিক। আমি তাকে পছন্দ করতাম। কিন্তু আমার আব্বু আমার মত করে তাকে পছন্দ করতে পারেনি কখনোই। আমি তো তখন ক্লাস সেভেনে। হয়তো সেজন্যই আমাদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিলো।
আমি ঐ আংকেলকে শুধু আংকেলই ভাবতাম। কিন্তু আব্বু ভাবতো অন্যকিছু। অর্থাৎ আমাদের দুজনের মধ্যে বোঝাবুঝির বিস্তর ফারাক ছিলো। সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আর নেই।

আমার বড় বোন তানিশা আর আমি পিঠাপিঠি বয়সেরই প্রায়। বোন ক্লাস এইটে পড়ে আর আমি ক্লাস সেভেনে। আমি রাকা। আমি খুব সুখী পরিবারের একজন সুখী সদস্য বলছি। দু:খিত, সুখী সদস্য ছিলাম, এখন আর নেই সম্ভবত।
আমার আব্বা একজন ব্যবসায়ী।

আমাদের অবস্থা ভালোই চলছিলো। একেবারে ধনী ও না আবার একেবারে গরীব ও না।
মানে সংসারে টানাপোড়নের কোনো ছাপ ছিলো না।
কিন্তু সেই সুখীচিত্র যে এভাবে বিরহাতুর হয়ে ফলবে তা কে জানতো?
আমি ভীষণভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে আছি।

শুধু আমি না। আমার পুরো ফ্যামিলিচিত্র এখন ভয়াবহ রুপ ধারণ করে আছে।
সত্যি বলতে আমি নিজেও আমার আম্মুকে অতটা পছন্দ করিনা।
তার পেছনেও অনেক কারণ আছে।

এখন আমি আমার আব্বু আর বোনের সাথে আমাদের বাসায় আছি।
আম্মু নেই। আম্মু আম্মুর নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বোন, আব্বু আর আমি~ আমরা সবাই সব ভুলে এখন ভালোই আছি। আব্বু বলেছে,
যে সব বাঁধন ছেড়ে চলে যায়, তাকে নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। সে যখন নতুন জীবন শুরু করতে পেরেছে তখন আমরা কেন পারবোনা?
আমরাও পারবো।

বোন আর আমি একযোগে সেদিন বলেছিলাম,
হ্যাঁ আব্বু।
কিন্তু আমরা দুজনেই জানি, আব্বুর এই কথা মন থেকে আসেনি। আমার আব্বু আমার আম্মুকে মনে~প্রাণে ভালোবাসে।
সেটা হয়তো আমার আম্মু কখনো বুঝেনি।

আমার বোন বুঝে কিনা জানিনা। তবে আমি বুঝি। আমি মাঝেমধ্যে গভীর রাতে জেগে যাই। কেন?
আমার আব্বুর স্তব্ধ, গম্ভীরস্বর কান্নার আওয়াজে।
সে আওয়াজ আর কেউ শোনেনা।
শুধু আমিই শুনি।

আমি ছুটে যাই তার ঘরের দরজায়।
নিজের বাবাকে আবিষ্কার করি মায়ের ছবি আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায়।
আব্বু অঝোর ধারায় কাঁদে।

অশ্রুসিক্ত অবস্থায় অস্পষ্ট স্বরে বার বার শুধু আওড়ায়,
“কেন চলে গেলে অনু? কী আছে তার যা আমার নেই? আমি তোমায় কী দিতে পারিনি? আমাদের এত সুখের সংসার! দুই মেয়ে! তুমি পারলে? এত পাষাণ তুমি হতে পারলে?”
আমি কখনো আমার আব্বুর কান্না দেখিনি। আজকে দেড়মাস যাবত প্রতিদিনই প্রায় দেখছি।

পুরুষের কান্না ও খুব ভয়াবহ, করুন হতে পারে~ সেটা তো আমরা অনেকেই জানিনা। আমরা মনে করি কাঁদবে শুধু মেয়েরা। ছেলেরা বুক ফুলিয়ে থাকবে। তাদের জন্য কান্না নয়। কিন্তু না! কান্না! অশ্রু! সে তো অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে আসে! পরম কষ্টের ফলাফলই হলো অশ্রু।

পুরুষের ও তাদের পরম কষ্টে কান্না চেপে না রেখে প্রাণ খুলে কাঁদা উচিত। অন্তত এই বিধান করা উচিত।
আমার আব্বু প্রতিদিন রাতে কাঁদে।
আমি দেখি। কাছে যাইনা। সাহস হয়না যে!

কারণ আমি জানি, আমি এখন তার কাছাকাছি গেলে, আমি নিজেও কেঁদে দিবো। আমার আব্বু তো আমার কান্না সহ্য করতে পারবেনা। সে তখন আরো কষ্ট পাবে। আমার আম্মু আমার আব্বুকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু আমি জেনে~শুনে কোনোভাবেই আমার আব্বুকে কষ্ট দিতে চাইনা।

আমি জানি, আমি কাছে গেলে আব্বুর যন্ত্রণা আরো বেড়ে যাবে। তাই আমি দাঁড়িয়ে থাকি। ততক্ষন, যতক্ষন না আব্বুর কান্না থামে।
কান্না থেমে গেলে আম্মুর ছবিটা হাত থেকে নামিয়ে বালিশের নিচে রাখবে। তারপর কিছুক্ষন সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকবে স্থির চোখে।

তখন শুধু চোখের পানিগুলো দু পাশ দিয়ে বেয়ে পড়বে। তারপর আস্তে আস্তে আব্বুর চোখের পাতা ছোট হতে থাকবে। এরপর সে ঘুমিয়ে যায়।
ঠিক তখনই আমি তার ঘরে প্রবেশ করি।

তার মাথায় কিছুক্ষন হাত বুলিয়ে দেই আর আমার অসহায় আব্বুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি। ভাবি, কি দোষ করেছিলো এই মানুষটা?

বালিশের নিচে পড়ে থাকা আম্মুর ছবির অনাবৃত অংশ যেন আমাকেই আকৃষ্ট করছে। তাকাতে চাইনা! তবুও দেখে ফেলি।

তার চোখের এক অংশ দেখতে পাই। দেখেও না দেখার ভাণ করার চেষ্টা করি। তবুও কান্না চলে আসে!
আম্মুতো আব্বুর ঐপাশে শুয়ে থাকার কথা!
কই আম্মুকে দেখছিনা তো!
আম্মু এখন কোথায়?

ওড়না দিয়ে কোনোমতে মুখ চেপে ধরি।
কোনোভাবেই কান্নার আওয়াজ বের হওয়া যাবেনা!
আব্বুর গায়ে কাঁথা দিয়ে দেই।

তারপর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ি।
আপু ঘুমায় নির্বিঘ্নে। এসব নিয়ে তার হয়তো কোনো চিন্তা নেই। কোনো আপত্তি আছে বলে ও মনে হয়না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আম্মু যেদিন চলে গেছিলো, সেদিন একবারের জন্য ও আপুকে কাঁদতে দেখা যায়নি। সে হয়তো মনে মনে আম্মুকেই সাপোর্ট করে। কেন করে তা এখনো জানা হয়নি।

যেদিন আব্বুর এই করুণ দৃশ্য দেখি সেদিন রাতে আমার আর ঘুমে আসেনা।
শুয়ে থাকি। কিন্তু ঘুম আসেনা।
আমি শুধু স্মৃতিচারণ করি তখন।

আহা, কি সুখী ছিলাম, কি ভালো ছিলাম আমরা..
আমরা এখন আর কোথাও বের হইনা।
বের হলেই লোকের কটু কথা শুনতে হবে।

প্রথম দুই সপ্তাহ তো নিজের ঘর থেকেই বের হতাম না। আপু রান্না করতো। কোনোমতে খেয়ে বেঁচেছি বলা চলে। আব্বু তখন পাগলের মত হয়ে ছিলো। তার কোনোকিছুরই কোনো হদিস ছিলোনা তখন।
আমি মোটামুটি রকমের স্টুডেন্ট। স্কুলে প্রথম পাঁচজনের তালিকায় সবসময় আমার নাম থাকে।

পড়াশোনা করতে আমার ভালোই লাগে।
কিন্তু এখন আর আমার স্কুলে যাওয়া হয়না।
স্কুলের বন্ধু~বান্ধব এমনকি স্যার~মিসরাও ছেড়ে দেয়না। যে যেভাবে পারে টিপ্পনী কাঁটে।
যেন এটা একটা প্রতিযোগিতা!

কে কত বেশি করে আঘাত করতে পারে, সে_ই উইন।
দুই সপ্তাহ পর যখন স্কুলে গেলাম,
দারোয়ান চাচা গেইটে আমাকে দেখেই বলে উঠলেন,
ওমা তোমাকে তোমার মা নেয়নি?

ইচ্ছা করছিলো মুখের উপর বলি,
নিলে এখানে আসতাম? আপনি নিবেন?
আমি উত্তর না দিয়ে চলে গিয়েছিলাম ভেতরে।

মাঠে সবাই তখন রুমাল চুরি খেলায় বিভোর। সেখানে পৌঁছাতেই সবাই দাঁড়িয়ে একযোগে হাত তালি দিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,
~ ঐ যে দেখ রাকা,
যার বাবা ফাঁকা,
বউ গেছে ভেগে,
তাদের দিন যায় কেঁদে! হাহ্ হা হা।
আমি তাদের এই জঘণ্য ছড়া শুনেও না শোনার ভাণ করি।
ভেতরে চলে যাই। ক্লাসে ঢুকি।

কিছুক্ষন পর স্যার আসে।
সেও তীরচক্ষু নিয়ে তাকায়।

সব জানা সত্ত্বেও সবার সামনে আবার হেয়ালী করে জিজ্ঞেস করে,
~ রাকা, তোমার আম্মু নাকি পালিয়ে গেছে? তার কী খবর? আর তোমার আব্বু কেমন আছে? ~ প্রশ্নগুলো শুনেই ক্লাসের সবাই আবার হাসি~ঠাট্টা~তামাশা করতে শুরু করে। স্যার একবার শুধু হাস্যজ্জ্বল মুখে থামিয়ে দিয়ে বলে,

“এই তোরা চুপ কর। রাকাকে বলতে দে।”
আমি কোনো জবাব দিতে পারিনা।

চোখে পানি চলে আসে কেবল। লুকাতে হবে।
তাই মাথা নিচু করে থাকি।
এভাবে পালাক্রমে সব স্যার~মিস আসতে থাকে আর আমাকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে এসব জিজ্ঞেস করতে থাকে। সে কি লজ্জ্বা!
শুধু একজন স্যার কখনো কিছু বলেনি।

সে এসেই তার ক্লাস শুরু করে দিতো।
স্কুল ছুটি হলে প্রতিদিন ডেকে নিয়ে যেত।
গোপনে এসব জিজ্ঞেস করতো।
সান্ত্বনা দিতো। আর বলতো,
“কখনো হেরে যাবেনা রাকা। লাইফে স্ট্রাগল করতে হয়। ইটস এ্য ওয়াকিং শ্যাডো।
সবকিছুরই একটা সমাধান থাকে। তোমার যেকোনো সমস্যার কথা আমাকে বলবে। আমি সবসময় আছি তোমার পাশে।”

স্যারের নাম আপন। আপন স্যার নামেই খ্যাত।
এভাবে ক’দিন স্কুলে যাই। পথে~ঘাটে তো যে যা পারে বলতোই। স্কুলেও সারাক্ষন এসব শুনতে হতো। কি মুশকিল।

আম্মু আমাদের ছেড়ে চলে গেছে তার পছন্দের মানুষের কাছে। এখানে আমাদেরই এত লাঞ্ছনা সইতে হবে, আমাদেরই কেবল কষ্ট সইতে হবে! কেন?
অত:পর আমি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। আমি হেরে গেলাম।
সবাই জিতে যাক। ভালো থাকুক আমার আম্মু।


পর্ব ২

আমি যে স্কুলে যাচ্ছিনা এই বিষয়টা আব্বুর চোখ এড়ায়নি। আব্বু এখন আমাদের বাসার সর্বেসর্বা। একাধারে কর্তী~কর্তা দুটোই। তাই তার সবদিকেই খেয়াল থাকে। আমাকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে কেন স্কুলে যাচ্ছিনা, কেন ঘরকুনো হয়ে বসে থাকি সারাক্ষন, ইত্যাদি সব প্রশ্ন। আমি বলেছি, সামনে এক্সাম। ভালো প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই বাসায় বসে পড়াশোনা করছি। এভাবে ওভাবে অনেক বাহানা দিয়ে, বলে, বুঝিয়ে কোনোমতে চুপ করিয়ে রেখেছি।

ক্লাস সিক্সের ফাইনাল এক্সামে আমি ফেইল করেছিলাম। এমনিতেও ভালো করছিলাম না কোনো সেমিস্টারেই।
আসলে আমাদের পারিবারিক পরিবেশটা আর যাই হোক পড়াশোনার জন্য উপযোগী নয়। আমার রোল এক ছিলো ক্লাস সিক্সে। কিন্তু এক বিষয়ে ফেইল আসছিলো। তাই তারা বিশেষ বিবেচনায় আমাকে পাশ দিয়েছিলো।

অবশ্য একটা এক্সাম হয়েছিলো আমার, অফিস কক্ষে। যে মেয়ের রোল ১, সে কেন ফেইল করবে এটার কারণ দর্শাতে। আমার হেডস্যার আমার দাদার খুব কাছের বন্ধু বলেই হয়তো সেটা আরো বেশি করে সম্ভব হয়েছে। আপন স্যারের ও কিছুটা অবদান আছে। স্যার মোটামুটি অনেক কিছুই জানতো যে কেন আমার এই দশা হয়েছিলো। সে বছরেই উনি ঐ স্কুলে জয়েন করেছিলো। হয়তো আমার ভাগ্যের টানেই।

ক্লাস ফাইভে আমি প্রথম বুঝতে পারি,
আমার আম্মু আর আমার আব্বুর সম্পর্কটা ঠিক ভালো যাচ্ছেনা।
অন্যদের বাবা~মায়ের মত আমার বাবা~ মা নয়।
আমাদের বাসায় ঝগড়াটা প্রায় প্রতিদিনই হতো। আম্মু গ্রামের মেয়ে তাই অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতো। আব্বু শহরেই বড় হয়েছে তাই গালাগাল কম দিতো। আম্মু যখন গালিগালাজ করতো তখন আব্বুর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখলে আরো বেশি চটে যেত।
আর মাঝেমধ্যে কাঁদতো কেন যেন।

আব্বু শুধু রাগ করে গম্ভীর হয়ে বসে থাকতো। কিছু বলতো না। আসলে আমি তখন খেয়াল করে দেখিনি আব্বু আসলে কি করতো তখন।
হয়তো তখন খেয়াল করলেই বুঝতাম, আমার আব্বুর ও কষ্টে বুক ফেঁটে যাচ্ছে।
আমার পড়াশোনার বিষয়টা তারা দুজন মিলেই হ্যান্ডেল করতো। কিন্তু পারিবারিক অশান্তির জন্য সেটা খুব ভালোভাবে যে চলতো, তা নয়। আমার টিউটর আমাকে দেখতো বলেই সেবার আমি কোনোমতে ভালোভাবেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম।

আমার টিউটর মাস্টারের নামই আপন। তখন তিনি চাকরীর আবেদন করে ঝুলে ছিলেন, আমাদের স্কুলে এইতো সেদিনই জয়েন করেছেন। আপন স্যার থাকাকালীন ও আম্মু আব্বুর ঝগড়া শুরু হতো মাঝেমধ্যে। তখন স্যার জিজ্ঞেস করলে, আমিও পটপট করে সব বলে দিতাম। এতকিছু বুঝতাম না। এসব পারিবারিক বিষয় যে অন্য কাউকে বলতে নেই, সেই সেন্সটুকু তৈরী হয়নি তখনো। সে অনেক আগের কথা।

ক্লাস ফাইভের ঘটনা,
একদিন দেখলাম আব্বু আম্মুর ঝগড়া খুব বেশি গভীর হয়ে গেছে। তখন সন্ধ্যাবেলা। বোন আর আমি পড়ার টেবিলে। আমি আমার হোমওয়ার্ক করছিলাম। ঐ রুমে তুমুল ঝগড়া চলছে। ওসব দেখা, শোনার জন্য আগে দৌঁড়ে ছুটে যেতাম।
স্থির চোখে তাকিয়ে শুনতাম তাদের ঝগড়া।

আব্বু আমাদের দেখলেই বকা দিত। বলতো,
মা তোমরা এখানে কেন? যাও ভেতরে যাও। মায়ের থেকে এসব শিখতে হবে না।
তবুও যেতাম। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতাম।
বুঝতামই না,
হঠাৎ করে এসব কেন হচ্ছে।
আস্তে আস্তে বুঝে গেছি। রোজ রোজকার এইসব ঝগড়াফ্যাসাদ আর কত দেখবো, শুনবো?

সবই তো জানা, সবই মুখস্থ। কখন আম্মু কোন গালি দিবে সেটাও জানি। আব্বু কখন কি কি বলবে তাও জানি। রোজ এক জিনিস আর কত ভালো লাগে? না। ভালো লাগেনা। অসহ্য লাগে।
তাই চুপ করে বসে থাকতাম।
যেদিন রাতে তুমুল ঝগড়া লেগেছিলো তার পরেরদিনই আমার একটা ক্লাস টেস্ট ছিলো।
এত জোরে জোরে চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিলো যে কোনোভাবেই পড়তে পারছিলাম না। তাই কানে আঙুল গুজে পড়ছিলাম জোরে জোরে।
অমন সময় শুনলাম, ঐ ঘর থেকে বিকট আওয়াজ আসছে। যেন জিনিসপত্র ভাঙচুর হচ্ছে ক্রমাগত।

আমি আর বসে থাকতে পারলাম না।
দৌঁড়ে গিয়ে ঐ রুমে গেলাম।
আপু দরজার পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেখলাম, আব্বু আম্মুকে মারছে।

আমি যখন গেলাম তখন দেখলাম আব্বু আম্মুকে থাপ্পড় মারছিলো আর তার হাতে একটা লাঠি। এটা দেখে আমি প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাসই করে উঠতে পারছিলাম না, আব্বু কি আম্মুকে মারছে? আম্মু জোরে জোরেই কাঁদতেছিলো। আম্মু যত যাই করতো তবুও তাকেই তখন বেশি পছন্দ করতাম।

আব্বুকে সামান্য ভয় পেতাম। দৌঁড়ে গিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরছিলাম সেদিন। আব্বুর দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলছিলাম,
~ আব্বু তুমি এত পঁচা কেন? তুমি আমার আম্মুকে মারছো? লাঠি দিয়েও মারছো? তুমি আর কখনো আমাকে আদর করবানা আব্বু। কখনো না। তুমি একটা বাজে আব্বু।

আব্বু আমার দিকে অসহায়ের মত কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিলো। তারপর হাত থেকে লাঠি ফেলে দিয়ে শার্ট পরে বাইরে চলে গেছিলো সাথে সাথে।
আম্মু কিছুক্ষন কেঁদেকেটে আবার উঠে রান্নাঘরে গিয়ে রান্নার আয়োজন করে।
আম্মু ভোজনরসিক। দুনিয়া তোলপাড় হয়ে যাক, তবুও তার খাওয়াটা ঠিক থাকতে হবে।
কিছুটা অমনই।
আম্মু যতক্ষন রান্নাবান্না করলো, ততক্ষন আমি বসে ছিলাম। পাহারা দিচ্ছিলাম, আম্মু কাঁদছে না তো? আম্মুর কষ্ট হচ্ছে না তো? আম্মুর কিছু চাই কিনা। কত কেয়ার করতাম আম্মুকে। আম্মু সেদিন ও সুন্দর করে রান্নাবান্না শেষ করলো। আপুকে ডেকে খেতে বসলেন। সবাই মিলে খেলাম। আব্বুকে ছাড়া আমি খেয়েছি এমন দিনের সংখ্যা কম। সেদিন জেদের বশত খেয়েছি।

আম্মু একদম স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। আব্বুকে ছাড়াই খাওয়া~দাওয়া শেষ করে আম্মু ঘুমাতে চলে গেলো। এরপর আপু আর আমি বসে থাকতাম পড়ার টেবিলে। কিছুই তো পড়া হয়নি। স্কুলে গিয়ে পড়া দিবো কিভাবে?

যেদিন ঝগড়া বেশি হতো সেদিন আব্বু বাসায় ফিরতো একটু রাত করে।
সে এসেই খাওয়া শেষ করে একবার আমাদের রুমে এসে আমাদের দেখে যেত, আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে চলে যেত। পরদিন সকালে আবার সব আগের মত।

সব স্বাভাবিক। আব্বুও স্বাভাবিক। আম্মুও স্বাভাবিক।
কিন্তু মারামারির ঘটনাটা ঐ একদিন হয়েই থেমে যায়নি।
এরপর থেকে বার বারই হয়েছে।
আব্বু আম্মুর গায়ে হাত তুলতো।
আমরা শুনতাম, দেখতাম।

কেন তুলতো, কেন এত বিদ্বেষ কিছুই বুঝতাম না। আম্মু কাঁদতো, কিছুই বলতো না আমাদের সামনে। আব্বুর প্রতি আস্তে আস্তে একটা ঘৃণা চলে আসতে লাগলো। ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার পর তো অশান্তি আরো বেড়ে গেলো। তখন আর ঘরেই থাকা যেত না।
আগে তো শুধু আব্বুর গলার আওয়াজ পেতাম। কিছুদিন পর থেকে আম্মুও সমান তালে যোগ দিলো।

আব্বু বলতো,
~ দুশ্চরিত্রা! বেয়াদব! কয়জন লাগে তোর? কী মনে করছোস আমি কিছু বুঝিনা?
আম্মু আরো এক ধাপ উঁচু গলা করে বলতো,
~ আমার জীবনের চরম ভুল আপনারে বিয়ে করা বুঝলেন? চল্লিশ বছরের বুড়া! চরম ভুল করছি। আমার জীবন ধ্বংস করছেন আপনি।

আব্বু আবার বলতো,
~ আমার জীবন না শুধু তুই আমার মেয়েদের জীবন ও ধ্বংস করছোস বেয়াদব। তোর মত বউ আমার শত্রু যে তার ও না হোক। অসভ্য, দুশ্চরিত্রা!
….চলতেই থাকে এভাবে।

ঝগড়া, অশান্তির পর আব্বু ব্যবসার কাজে চলে গেলে আম্মু দম~মুখ খিঁচে বসে থাকতো।
আমি ছোট ছিলাম। এটা ওটা চাইতে গেলে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাতো।
ভাত নিজে নিয়ে খেতে হতো।
কখনো বা আপুই বেড়ে দিতো।

তারপর নিজে ও খেত। আপু এমনিতেও খুব বেশি একটা কথা বলে না।
আমি মাছ খুঁটে খেতে পারতাম না।
তাই ভাতের থালা নিয়ে আম্মুর কাছে চলে যেতাম।

আম্মু নিজে অনেক আগেই খেয়ে দেয়ে শুয়ে থাকতো। টিভিতে সিরিয়াল দেখতো।
তাই আমি কোনো কিছু না ভেবেই আম্মুর কাছে চলে যেতাম, আম্মু খাইয়ে দিবে এই আশায়। কিন্তু আম্মু দিতো না। হঠাৎ করেই আম্মুর আমুল পরিবর্তন হয়ে গেছিলো। আম্মু আমাদের কোনো কাজই করতে চাইতোনা। আমাদের সাথে কেমন যেন বিরুপ আচরণ করতো।

একদিনের ঘটনা বলি।
আম্মুর কাছে গিয়ে”খাইয়ে দাও না আম্মু”বলতেই আম্মু বজ্রকণ্ঠে জানালো,
~ এত বড় মাইয়্যা হইছো এখনো নিজের খাওনডাও খাইতে পারোনা? হইছো তো পুরা বাপের মতন। সবই পারো, কিন্তু করবানা।

ঐ আমি আছিনা? তোমাগো মুনি~চাকরাণী।
আমি কাতর কণ্ঠে বলি,
~ আম্মু মাছের কাটা হাতে লেগে যায়। পারিনা খেতে। এগুলা আমার ফেভারিট মাছ আম্মু। একটু খাইয়ে দাওনা। আচ্ছা আমি হোমওয়ার্ক করে দিবো তোমাকে।
আম্মু গলা উঁচায়ে বলে,
~ তোর হোমওয়ার্ক করলে আমার কী? ঐ তুই দেখোস না আমি কাজ করতেছি? আমি এখন সারাদিন কাজ কাম কইর‍্যা টিভি দেখতে আসছি, এখন আবার তোরে নিয়া পইড়্যা থাকমু? আমারে শান্তি দিবিনা তোরা?
আম্মু তখন খুব ব্যস্ত।
সিরিয়াল দেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আমার গলায়, হাতে কাঁটা আটকাক, এতে কার কী? আমি চলে আসি।
সামান্য কারণে আম্মুর এত গরম বকাবকি শোনার কোনো মানে হয়না তো।
আপু যখন দেখে আমি আর পারছিই না, তখন নিজের খাবার ছেড়ে আমার থালা হাতে নেয়।
মাছ খুটে দিয়ে বড়ার মত করে বানিয়ে দিয়ে বলে, নে, এবার খা। এইবার পারবি তো? নাকি মুখে তুলে দিবো?
আমি হাসি হাসি মুখ করে খেয়ে নেই।

তানিশা আপু পড়াশোনায় অতটা ভালো না। এক ক্লাসে দুইবার থেকে থেকে সে এখন আমার এক বছরের সিনিয়র। এমনিতে বয়সের ক্ষেত্রে সে আমার সাড়ে তিন বছরের বড়। তবে পরিবেশ ~প্রতিকুলতার খাতিরে সে একটু বেশিই বুঝদার। আমার আম্মু আমার আপুকে বেশি আদর করতো। কারণ আপু তার মনের মত। ও তো সব বুঝতো। তাই আম্মুর কাছাকাছি কম ঘেষতো, কম ঘাঁটতো। আম্মু যা বলতো তাই শিরোধার্য করে চলতো। এমন কিছুটা।

মাঝখানে আমিই ছিলাম সমস্যা।
আম্মু আমাকেই হয়তো ভালোবাসতো না।
মাঝেমধ্যে ভাবতাম,
আমি আমার আম্মুর মেয়েই তো?

আমি সারাক্ষন ভাবতাম, কখন আপন স্যার আসবে পড়াতে। ঐ সময়টুকুতেই আমি শান্তি পাই।
আমাদের বাসায় তখন আমার সমবয়সী কোনো ছেলে~মেয়ে ছিলো না। সব বড় বড়।
আমার খেলার সাথী বলতে শুধু আমার আপুই ছিলো। কিন্তু ও আমার সাথে খেলতো না।
ওকে ফোন কিনে দিয়েছিলো আম্মু। ওর বার্থডে গিফট হিসেবে। আব্বু রাজি ছিলো না তাই টাকা দেয়নি। তবে কেক এনে অনুষ্ঠান করেছিলো।

আম্মু তবুও কোথা থেকে যেন একটা ফোন এনে তুলে দিয়েছিলো আপুর হাতে।
ফলপ্রসূ, সে ওটা নিয়েই সারাক্ষন ব্যস্ত থাকতো।
আপন স্যার আমার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে আমি বলে দিতাম।
স্যার আমার আম্মুকে ডেকে নিয়ে একদিন বলেছিলো,
~ আপা, রাকা তো অনেক ছোট। বেচারি নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। ওকে একটু সময় দিয়েন। এরকমভাবে অনেক বাচ্চারাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

আম্মু বলেছিলো,
~ আপনার যা কাজ, তাই করেন দয়া করে। বাকিটা আমরাই দেখবো।
স্যার বলছিলো,
~ বুঝলাম। কিন্তু একটা রিকুয়েস্ট, ওর সামনে আপনারা আপনাদের পারিবারিক অশান্তিগুলো করবেন না দয়া করে। মেয়েটা কষ্ট পায়।

~ পারিবারিক অশান্তি বলতে? আম্মু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে।
স্যার কিছুটা ইনিয়েবিনিয়েই বলেছিলো,
~ না মানে ঝগড়াঝাঁটিগুলো যদি একটু আড়ালে করতেন.. আসলে এটা বাচ্চাদের উপর খুব বাজেভাবে এফেক্ট ফেলে। জানেন ই তো।
আম্মু রেগে আগুন হয়ে চেয়ার থেকে উঠে বলেছিলো,
~ এখন আমরা ফ্যামিলিতে কি করবো না করবো সব আপনি ঠিক করে দিবেন? বাচ্চা আপনার না আমার? আপনার যা কাজ তাই করেন। পড়াতে আসছেন, পড়ায়ে চলে যাবেন। আমাদের পারিবারিক বিষয়ে এত নাক গলাবেন না দয়া করে। বলে চলে গেলেন।
আমি টেবিলেই মাথা নিচু করে বসেছিলাম।

স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন।
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছিলেন,
~ ভালো করে পড়ো রাকা। তোমাকে অনেক বড় হতে হবে। ফাইট কররে হবে সবকিছুর সাথে, হুম?

এসব দেখে মন খারাপ করবেনা একদম।
কথাগুলো বলে সে তার ব্যাগ থেকে একটা পুতুল বের করে দিয়ে বলেছিলো,
~ এটা হচ্ছে আরেকটা রাকা। এখন থেকে এটার সাথেই খেলবে। আর আমি তো আসবোই। এবার আসি। বলে চলে গেলেন।

আমি পুতুল হাতে নিয়ে রুমে চলে যাই।
রুমে গিয়ে পুতুলটার পিছনে সাইন পেন দিয়ে বড় বড় করে লিখে দেই, আ~প~ন স্যার। একপাশে গুটি গুটি করে লিখি রাকা। আরো কিছু নাম লিখতাম। যেমন, আব্বু~আম্মু~তানিশা..

কিন্তু কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি।
ঘুম থেকে উঠেই একটা থাপ্পড় খাই আম্মুর হাতে। আম্মু কিসব যেন বলছে! কেন এগুলা শুনতে হচ্ছে আমায়? বুঝে উঠতে পারছিলাম না কিছুই।


পর্ব ৩

আম্মু আমাকে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই চড় দিতে শুরু করলো।
আমি হা করে তাকিয়ে ছিলাম।
আপু এসে জিজ্ঞেস করলো,
~ কী হইছে? কী করছে ও আম্মু?

আম্মু তখন আমার দিকে চোখ পাঁকিয়ে বলে,
~ এই তোর এত বড় স্পর্ধা ক্যান? এত বড় সাহস কে দিছে তোরে? ঐ বেয়াদবের বাচ্চা!
আমি ভ্রু কুঁচকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করি,
~ কী করছি আমি?

আম্মু রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গলার স্বর সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে উত্তর দেয়,
~ আপন স্যার কে হয় তোর? তোর বাপ না তোর জামাই? এই বল, এই বেয়াদব তোর কে হয় উনি?
আমি কথাগুলো শুনে ভড়কে যাই।
আম্মু আগে আমাকে খুব কম ধমকাতো।

এখন আর সেই দিন নেই। মারধর চলে হরহামেশাই। কোনো কারণে রাগ উঠলেই সেটা আমার উপর ঝাঁড়া আবশ্যক। তবে এরকম শব্দ ব্যবহার করেনা তেমন। আর করবেই বা কি করে, আম্মুর সাথে আমার কথাবার্তাই হয় নগণ্য।
বাসার কেউই তো আমাকে সময় দেয়না।

আগে দেখতাম আপুকে প্রচুর গালিগালাজ করতো। আজ আমার উপর দিয়েও যাচ্ছে।
কিন্তু আমি আমার দোষটা বুঝতে পারছি না এখনো। কী করলাম আমি!
ভালো মেয়ের মত চুপচাপ খেলা করে ঘুমাচ্ছিলাম, এটাই কি আমার দোষ?
আম্মু আবার আমাকে জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করে,
~ আমরা আমাদের বাসায় কি করি না করি সব তোর ঐ স্যারের কাছে বলতে হইবো? কি? কিছু বলিস না ক্যান?

পড়াশোনা তো কিচ্ছু নাই। উল্টা স্যারেরে দিয়া আমারে বুঝাও? বাপের মত হইছোস? সব দোষ খালি আমার? ক্যান? তুই তোর বাপের কাছে তারে নিতে পারলি না? আমারে ক্যান কথা শুনাইলো?

আমি তোর খেয়াল রাখিনা?
আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,
~ আমি কিছু বলিনাই তো। স্যার জিজ্ঞেস করছে, হোমওয়ার্ক কেন করিনা। আমি শুধু বলছি বাসায় খুব শব্দ হয়, তাই পড়তে পারিনা। মাথায় ঢুকে না কিছুই। বাসায় আমার মনোযোগই বসে না পড়ায়।

আম্মু আমার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বললো,
~ তাই বুঝি? কি সাধু রে তুই! তা যখন শোরগোল হয়না তখন পড়তে পারোস না? বাহানা বানাস না? আর এতটুকু মেয়ে হইছো এখনই এত তিড়িংবিড়িং করো ক্যান মা? এই পুতুল কে দিছে তোমারে হ্যাঁ? আর কী লিখছো এইখানে?

আপন স্যার? ও আবার রাকাও লিখছোস! বাব্বা! মনে মনে এতদূর! এখনো তো ডিম থেকেও ফুঁটোনাই। এহনি? এক্কেবারে ভালো হইছে। এইবার তোর বাপ বুঝবে। আমি খুশি হইছি।

আমি চোখ চুলকাতে চুলকাতে বললাম,
~ এটা আপন স্যার আমাকে দিছে আম্মু। স্যার বলছে, এই পুতুলের নাম ও রাকা। তাই এইটার গায়ে এইটার নাম লিখে দিয়েছি। আর স্যার দিয়েছে তাই স্যারের নাম ও লিখছি। স্যার খুব ভালো আম্মু।

পুতুলটা দেখো। লিখাগুলো ও দেখো। সুন্দর না আম্মু? দাঁড়াও আমি তোমাদের নাম ও লিখে দেই! রাগ করোনা আম্মু, আমি ঘুমায়ে পড়ছিলাম। নয়তো রাকার পাশে তোমার নাম, আব্বু আর আপুর নাম ও লিখতাম…
কথাটা শেষ না হতেই আম্মু চোখ রাঙিয়ে বললো,
~ হইছে? শেষ হইছে তোর ন্যাকামিগুলো?

এই ঢং দেখাস তুই আমারে? বুঝাস আমাকে যে তুই কিচ্ছুই বুঝোস না? আমি কি পিটার খাই? বেয়াদব। এই তুই এইটা নিলি কেন? বল কেন নিলি? এখনি বিয়ে দিয়া ফেলমু? না বলনা! দিয়ে দেই বিয়ে। আমিও বাঁচি। এমনিতেও তোদের সংসারে আমার আর মন টিকেনা।

সামান্য কারণে আম্মু এখন রেগে যায়।
তার হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে।
কিছু একটা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন।
আমি আপন স্যারকে কেন বললাম, আমাদের বাসায় ঝগড়াঝাঁটি করে আমার আব্বু~আম্মু, তাই আমার ভালো লাগেনা। এজন্য আমি পড়তে পারিনা। এটা আমার অপরাধ। কিন্তু প্রতিদিন পড়তে না পেরে, ইনকমপ্লিট হোমওয়ার্কের জন্য যে শাস্তি পেতে হতো, লজ্জ্বা পেতে হতো ক্লাসে~ ওটা তো কোনো বিষয় না।

আম্মুর রাগের আসল কারণ কি জানিনা।
তবে আম্মুর ঐ অজ্ঞাত কারণের রাগ আমার উপরে ঝেড়েছিলো সেদিন।
দরজা খোলা রেখেই হাতের সামনে যা পেয়েছে, তা দিয়েই মেরেছিলো।
আপু ধরতে এসেও ধরেনি।

কারণ তার গায়ে কোনোভাবে একটা মার পড়ে গেলে তার সমস্যা হয়ে যাবে। অথবা সে এমন কিছুই চাচ্ছিলো মনে মনে।
কেন? ঐ যে সেদিন রাতে আব্বুকে বলে দিছিলাম,
“আব্বু তানিশা আপু পড়ার টেবিলে বসে পড়েনা। ফোনে কথা বলে সারাক্ষন।”
সেজন্য শাস্তিস্বরুপ আপুর ফোন একদিনের জন্য নিয়ে গেছিলো আব্বু।

তাইজন্যই সে সেদিনের প্রতিশোধ নিলো আমাকে বিনা কারণে মারার মত একটি অমায়িক দৃশ্যের একজন নির্বাক দর্শক হয়ে। অবশ্য এমনিতে ও আপুর কাছ থেকে আমি এমন কিছু আশা করিনা।
আম্মু আমাকে প্রায়াশই এভাবে মারে।
আপু প্রথম প্রথম থামাতে আসতো।

এখন আর থামায় না। সরে যায়।
আম্মু আমাকে সেদিন কি না দিয়ে মারছে?
ঝাড়ু, স্কেল, ফুলদানি, কলমদানি ছুঁড়ে মারা হতে শুরু করে যা আছে সবই ব্যবহার করেছে এক এক করে।

আমার অপরাধ একটাই, আমি আমার মন খারাপের কারণ আমার আব্বু আম্মুর প্রতিদিনের করা অশান্তিগুলো~ আপন স্যারকে বলেছি।
এটাই আমার ভুল! ভুল নয় শুধু! মহাভুল!
কতবার কান ধরে, আম্মুর হাতে পায়ে ধরে মিনতি করেছি,
~ আম্মু আম্মু প্রমিস! আর কখনো স্যারকে বলবো না কিছু! জীবনেও না। আম্মু…. আর মাইর‍্যো না! প্লিজ!

না! আম্মু শুনেনি।
শুধু মেরেই গেছে। কারণ আম্মুর সম্মানে আঘাত লাগছে। আম্মুর সম্মান আম্মুর এই অসহায় মেয়ের মিনতি, ব্যাথার চেয়েও বেশি।
অথবা অন্য কোনো কারণ।
যেটা আমাকে মারলেই কমে যায়।

রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না।
আব্বু আসবে আসবে করে অপেক্ষায় রইলাম সারা রাত। আম্মু রাত এগারোটায় আপুকে পাঠিয়েছিলো খেতে যাওয়ার জন্য। আমি জানিয়েছি, আমি খাবো না। আব্বু আসলে খাবো। আম্মু জোরে জোরে বলেছে,
~ থাক তানিশা। তুই আমার কাছে আয়। উনি বাপকা বেটি। বাপে আসলেই খাবে। যত্তসব ঢং!

আমার রাগ হচ্ছিলো ভীষণ!
না, আম্মুর প্রতি না। আমার প্রতি।
কেন আমি মন ভালো করতে গিয়ে এতগুলো ব্যাথা ডেকে আনলাম? তাই!
আব্বু সেদিন রাতে আর আসেনি।
সেদিন কেন যেন ভোর রাতে উঠে গেছিলাম।

উঠে দেখি আম্মু আমার পাশে শুয়ে আছে।
আমি তাড়াতাড়ি উঠে দেখলাম, এই অবিশ্বাস্য জিনিস সত্য কিনা।
দেখলাম, না! সত্যিই তো আম্মু!
এত বেশি মারছে, মায়ের মন, আর দূরে থাকতে পারেনি। মনে মনে অভিযোগ জানালাম আম্মুকে, তাহলে এত মারো কেন শুধু শুধু?

আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমালাম সারা রাত।
আর খুব খুশি হয়ে ইচ্ছা করেই কিছু”ইচ্ছে স্বপ্ন”দেখতে লাগলাম..
ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে ভাবতে লাগলাম,
আম্মু নিশ্চয়ই আমাকে আদর করেছে
এতক্ষন। আমার ব্যাথার জায়গাগুলোয় হয়তো মলম ও লাগিয়ে দিয়েছে! ইত্যাদি..
ঘুমন্ত আম্মুর গালে কয়েকটা চুমো খেলাম। তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।

শান্তির ঘুম হয়েছিলো সেদিন!
পরের দিন আব্বু আসলো।
রেজাল্ট শিট নিয়ে আমি বাসায় এসেই আব্বুর হাতে ওটা দিতে হলো। কারণ রেজাল্ট শিটে সিগনেচার লাগবে অভিভাবকের।
আর আব্বুতো যখন তখন চলে যায়।

তাই দেখামাত্রই দিয়ে দিলাম।
আব্বু শিটের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
~ রাকা মা। তোমার রেজাল্ট এমন হলো কেন? এটাতে তো তোমার নাইন্টির বেশি পাওয়া উচিত ছিলো! মাত্র ৭৩ পাইলা কেন! বাসায় কি পড়াশোনা করোনা নাকি?

আম্মু শুনে রান্নাঘর থেকে জোর গলায় বললেন,
~ দেখেন দেখেন, আমি বলছিনা? আপনার মাইয়্যার পড়াশোনায় কোনো মন নাই! মেয়ে এখন পড়েনা, খালি স্যার দেহে। স্যার ও দেখি এটা ওটা আনে। আবার স্যারের কাছে নালিশ ও দেয় আমগো পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে! আপনেরে বলছিনা? পড়াশোনা একটুও হয়না আপনার মাইয়্যার। এই স্যারডাই সমস্যা। উনারে পাল্টান। আমার কথা শুনেন তানিশার বাপ।

আব্বুই আপন স্যারকে বলেছিলো আমাদের পড়ানোর জন্য। কিন্তু আপু পড়েনি। আপুকে অনেক বলার পর আপু জানিয়েছে, সে কিছুতেই পড়বেনা এই স্যারের কাছে।
আব্বু রেজাল্ট শিটের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চিন্তিত স্বরে বললেন,
~ আপন তো এমন ফাঁকি দেওয়ার কথা নয়! ছেলেটা তো খুব ভালো পড়ায় শুনলাম! ফার্স্ট ক্লাস একটা ছেলে… ও তো এতটা নেগ্লেক্ট করার কথা না…
আম্মু বললো,

~ ঐ আরকি! পোলাপাইনগরে পড়ায় না শুধু এইডা ঐডা কিন্না দিয়া মন যোগায়ে মাস গুণে আরকি!
আমি চোখ সরু করে তাকালাম দুজনের দিকে।
ইচ্ছা করছিলো বলি,
বাসায় এত ঝামেলা তার উপর আবার রেজাল্ট ও একেবারে নাইন্টি আপ লাগবে তোমাদের!

না পেলেই বকাঝকা। সাথে আপন স্যারের দোষ!
কিন্তু এটা তো দেখো না যে আমরা আসলে পড়ার মত পরিবেশ পাচ্ছি কি না। আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু আমাদের সামনে আছে কিনা।
সবশেষে যেটা জরুরি,
আমাদের মন ভালো আছে কিনা।

না! তা দেখবে কেন? তোমাদের নিজ নিজ কাজই তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা বাচ্চারা মরি আর বাঁচি, তোমাদের নাইন্টি আপ রেজাল্ট এনে দিতে হবে।
শারীরিক শিক্ষা ক্লাসে ভজন স্যার এসব বলেছিলো।
সবাই জানে, শুধু তোমরাই জানো না।

আপন স্যারের প্রতি আম্মুর প্রথম থেকেই ক্ষোভ কেন যেন! প্রথম ক’মাস কিছুই হয়নি। আম্মুও সন্তুষ্ট ছিলো। কিন্তু হঠাৎ ক্লাস ফাইভের মাঝখানে আম্মু আর আপন স্যারকে সহ্য করতে পারেনা।
তাই যেভাবেই হোক, আম্মু প্রমাণ করতে চায়, আপন স্যার খারাপ, সে পড়ায় না।
কিন্তু আব্বু স্যারকে চেনে। এবং রোজ সে খবর নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলো বলেই স্যারকে পাল্টায় নি।

এটা নিয়েও কয়েকবার ঝগড়া হয়েছিলো আব্বু আম্মুর মাঝে।
কিন্তু আব্বু সেল্ফ ডিপেন্ডেড মানুষ।
নিজের যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করে।
আর আব্বুর এই গুণের জন্য আমিও খুশি ছিলাম।
আব্বু তখন বাসায় থাকতো না।

আম্মু বাসার সব কাজ কোনোমতে শেষ করে কোথায় যেন বেরিয়ে পড়তো।
ক্লাস ফোরের দিকে আমি ও যেতাম সাথে।
ক্লাস ফাইভে উঠার পর আর নিজ থেকে যেতে বলতাম না।
আম্মুর ইচ্ছা হলে বা জোর করলে তবেই বাধ্য হয়ে যেতাম।
একদিন আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলো। আমাকে সাথে নেয় কেন তার কারণ তখন বুঝতাম না।

আমরা আজিমপুর পেরিয়ে নীল ক্ষেত মোড়ে যেতেই লক্ষ্য করলাম একজন হাত উঁচায়ে ইশারা করছে আমাদের।
লোকটাকে আমি চিনি।
ইনিই সেই আংকেল যার সাথে আমার আম্মু হরহামেশাই দেখা সাক্ষাৎ করে।
আংকেল বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের থামতে বলছে।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

আম্মু সাধারণত বোরখা পরেই বেরোয়।
কিন্তু আংকেলের সাথে দেখা করতে আসলে সবচেয়ে ভালো, দামী, ইস্ত্রি করা থ্রি~পিসটাই নামিয়ে পড়ে। সুন্দর করে সাজগোজ করে।
এক কথায় পরিপাটি হয়েই আসে। আর আমাকে কোনোমতে একটা জামা পরাতে পারলেই শেষ।

আমরা নিউ মার্কেটের প্রথম গেইটের সামনে গেলাম সবাই।
আংকেল আমাকে দেখেই গাল টিপে জিজ্ঞেস করলেন,
~ কেমন আছো রাকা মামণি?
আমি ও সবসময় হাসি দিয়েই বলতাম,
~ ভালো আছি আংকেল। তুমি?

আংকেল আমার হাত ধরতো এক হাতে।
অন্য হাত দিয়ে ধরতো আমার আম্মুকে।
আমরা একসাথে নিউ মার্কেটের অলিগলিতে ঘুরতাম। আংকেল আমাকে বেলুন কিনে দিতো। হাওয়াই মিঠাই, ফুসকা, চানাচুর, বার্গার কত কি কিনে দিতো! আর আম্মুর জন্য কিনতো চুড়ি, কানের দুল, ঘড়ি এটা ওটা সহ আরো অনেক কিছু!
আমি তো তখন মাত্র ক্লাস ফাইভে।

অনেক বড় হয়ে গেছিলাম।
তাই তখন আমার কোলে না উঠলেই বরং ভালো লাগতো।
কিন্তু আংকেল কথার ফাঁক~ফোঁকোরে পট করেই আমাকে কোলে তুলে ফেলতেন। খুব বেশি শক্ত করে ধরে রাখতেন বিধায় আমার আংকেলের কোলে একদম সস্তি লাগতো না। কোল থেকে নেমে যাওয়ার কথাও বলা যাবেনা। বললেই আম্মু চোখ রাঙাবে। অথবা বলবে, রাকা এরকম করলে তোকে এখানে একা রেখেই চলে যাবো। আর কখনো বাসা ফিরতে পারবি না।

আমি আর কি বলবো?
চুপচাপ হয়ে থাকি আংকেলের কোলে।
আর অপেক্ষা করতে থাকি, কখন নামাবে, কখন আমি হাঁটতে পারবো।
আমাদের শপিং শেষে, আমাকে একটা দোকানে রেখে তারা আধ ঘন্টা সময়ের জন্য উধাও হয়ে যেত।

দোকানদার চাচা আমার আম্মুর পরিচিত। আস্তে আস্তে আমারো পরিচিত হয়ে উঠেছিলো।
আমি ঐ চাচার কাছে বসে থাকি। একটা টুলে বসে হাওয়াই মিঠাই আর আইসক্রিম খেতে খেতে চারপাশ দেখতে থাকি।
আর অপেক্ষার প্রহর গুণি, কখন আম্মু আসবে, কখন আমরা বাসায় যাবো।

পর্ব ৪

সেদিন নিউমার্কেট থেকে ফিরে আসতে আসতে দেরী হয়ে গিয়েছিলো অনেক। আম্মু আর আংকেল ফিরে আসতে প্রায় এক ঘন্টার বেশি দেরী করে ফেলেছিলো। তারপর জ্যাম পেরিয়ে বাসায় আসতে আসতে হয়ে যায় সন্ধ্যা। আব্বু প্রতিদিনই সন্ধ্যার দিকে বাসায় আসে। চা টা খায়, টিভিতে নিউজ দেখে, আম্মুর সাথে কিছুক্ষন খোশগল্প করে আবার দোকান দেখতে চলে যায়।

আমরা বাসায় পৌঁছে দরজার সামনে গিয়েই বুঝে যাই, আব্বু এখন বাসায়। বাইরে আব্বুর জুতা পড়ে আছে। আম্মু সাথে সাথে আমার স্কুল ব্যাগ থেকে কালো বোরখাটা বের করে তাড়াতাড়ি ওটা পরে নেয়। ভেতরের ওড়না দিয়ে লিপস্টিক মুছে ফেলে আস্তে আস্তে কড়া নাড়ে দরজায়।

দরজা খুলে দিলো আমার আপু। আপু চোখের ইশারায় জানিয়ে দেয়, ঘরে আব্বু আছে।
আম্মুকে আবার ফিসফিস করে বলে,
~ আমি আব্বুকে বলছি তুমি পাশের বাসার একটা অনুষ্ঠানে গেছো রাকাকে নিয়ে। আমি যাইনাই কারণ আমার এসব ভালো লাগেনা। তুমি তাড়াতাড়ি বোরখাটা খুলে আমার কাছে দাও। আর তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকো।

আম্মু ও ফিসফিস করে বলে,
~ তুই আবার এটা বলতে গেলি কেন! আমিই তো ম্যানেজ করে নিতে পারতাম। এখন যদি ধরা পড়ে যাই!
আপু বলে,
~ আমি কি করবো। আব্বু এসেই রাগারাগি করছে কিছুক্ষন। বার বার জিজ্ঞেস করতেছিলো তোমার কথা। তাই হুট করে মাথায় যা আসছে তাই বলে দিছি।
আম্মু আর কথা বাড়ালো না।

আমাদের ভেতরে ঢুকতে হলো খুব সাবধানে। আব্বু ড্রয়িংরুমে টিভি দেখতে দেখতে চা, সিগারেট নিচ্ছিলো।
আমরা ডায়নিং রুম কোনোরকমে পেরিয়ে যেতেই আব্বুর ভারী স্বর শোনা গেলো।
~ কই গেছিলা এত সাজগোজ করে?

আম্মু হকচকিত হয়ে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়,
~ ঐ তো তানিশা বলছে না আপনারে, পাশের বাসায়…
আব্বু জোরে বলে উঠে,
~ থামো তুমি! তানিশা বলছে! এই মেয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা বলে আমি জানি। ও, তুমি পাশের বাসায় গেছো?

কই পাশের বাসায় তো আজকে কোনো অনুষ্ঠান নাই। আমি তো ভাইয়ের সাথেই আজ বাসায় ফিরলাম। সারাক্ষন ঐ ভাইয়ের সাথেই ছিলাম। এমন কিছু হইলে কি আমাকে বলতো না? আর আমি যতদূর জানি, তোমার তো কোনো বাসার কোনো ভাবীর সাথেই বনিবনা হয়না। তাইলে?

আর ঐ বাসায় তো আজকে শোক দিবস। বুড়িটার মরমর অবস্থা। তুমি আমাকে বুঝাও? কই গেছিলা বলো।
আম্মু থর থর করে কাঁপতে থাকে।
আব্বু টিভির দিকে তাক হয়ে সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে।
আপু ততক্ষনে ভয় পেয়ে চলে গেছে তার রুমে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি নিঃশব্দে।

আব্বু আবার চেঁচিয়ে উঠলো,
~ কী হইছে? উত্তর দেওনা কেন?
আম্মুর মুখ তখন ছানাবড়া হয়ে কুৎসিত কোনো পোকার রুপ ধারণ করে আছে।
আমার দিকে একবার তাকিয়ে আব্বু বলে,
~ আচ্ছা অনু, তুমি আমার এই মেয়েটাকে সাথে নিয়ে যাও কেন? তোমার প্রেম পিরিতি দেখাইতে? তুমি না মা! নিজের মেয়েকে এই শিক্ষা দাও?
কথাগুলো বলতে বলতে আব্বু উঠে আসে।

আম্মুর হাত থেকে টান দিয়ে শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে নেয়।
তারপর সব এক এক করে বের করে টেবিলে রাখতে রাখতে বলে,
~ বাহ্! হাজার হাজার টাকার জিনিস দেখছি! তোমাকে কি আমি এগুলা কিনে দেইনা অনু? তোমাকে তো আমি প্রতি মাসেই তোমার প্রয়োজনীয় টাকাটা দিয়ে দেই। তাহলে কেন এগুলা অন্য কারো থেকে নাও? বলো?

আম্মু এবার টেনে টেনে বলে,
~ আমার এক বান্ধবী কিনে দিছে। না করি ক্যাম্নে বলেন…
আব্বু কঠিন চেহারা করে বলে,
~ ধুর, রাখো তোমার বান্ধবী। কোন বান্ধবীর এত দরদ উঁতলায়ে পড়ছে যে এতকিছু কিনে দিবে! আর তোমার যে ঘনিষ্ঠ কোনো বান্ধবী টান্ধবী নাই, এইটা আমি জানি। আমাকে গাঁধা পাইছো? কার সাথে গেছো মার্কেটে? বলো অনু।

আম্মু ভ্রু কুঁচকে চোখজোড়া দিয়ে এলোপাথাড়ি তাকাতে থাকে।
আব্বু উত্তর না পেয়ে আম্মুর খুব কাছাকাছি এসে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে আবার,
~ বলো কই গেছো, কার সাথে গেছো। না বললে আজকে আর রক্ষা নাই তোমার।
আম্মু উত্তর দেয়না। বাসে করে আসতে আসতে আম্মু আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছে, কোনোভাবেই যেন আব্বুকে কিছু না বলি। কোনো কথাই না বলার জন্য বলেছে।
কিন্তু উত্তর না পেয়ে আব্বুর রাগ বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় চলে যায় যে, আব্বু আম্মুকে ধাক্কা দিয়ে দেয়।

আমি মনে মনে ভয় পেতে লাগলাম।
আজকে আবার মারবে নাতো?
এবার তো নিশ্চয় মারবে!
আমি আর সহ্য না করতে পেরে বলেই দেই।
নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বলে দিলাম,
~ আব্বু আম্মু আর আমি মার্কেটে গেছিলাম আজকে। একজন আন্টি ও ছিলো আমাদের সাথে।

আব্বু আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
~ তাই! আচ্ছা বাবা, তোমার আন্টির নাম কী? ফোন নাম্বার দিতে বলো তো তোমার আম্মুকে।
আম্মু এবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো আমাকে। তারপর আমি আন্দাজে নাম বলতে নিলে, আম্মুই হাতের আঙুলে ইশারা দিয়ে বলে, চুপ করো।
তাই আমি চুপ করে গেলাম তখনই।

আব্বু উত্তর না পেয়ে বুঝলো, আমিও মিথ্যা বলেছি।
তারপর আমাকে কোলে করে নিয়ে গেলো আমার রুমে। নিয়ে গিয়ে বাইরে দিয়ে দরজা লক করে দিয়েছিলো।
ঘন্টাখানেক যাবত এভাবেই পড়ে ছিলাম।
মাঝেমধ্যে আঁ, উঁ আওয়াজ পেয়েছি, বুঝেছিলাম আম্মুকে মারছে, আবার কিছু তর্কাতর্কি ও শুনলাম। আম্মুর গলার আওয়াজই বেশি।
কিছুক্ষন চিৎকার করে কেঁদেছি, আব্বুকে ইচ্ছামত বকেছি। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে গেছিলাম।

পরের দিন সকালে।
ঘুম থেকে উঠে দেখি আম্মু ব্যাগ গুছিয়ে সব রেডি করে ফেলছে।
আমরা আমাদের নানুর বাড়িতে যাচ্ছি।
আহ্ কি আনন্দ। আমাদের নানুর বাড়ি হলো গ্রামে। টিনের তিন তিনটা বাড়ি, তিন মামার। পুকুরঘাট আছে। পুকুরেই গোসল করতে হয়।

কিন্তু আমি ছোট মানুষ, শহরে বড় হয়েছি, সাঁতার ও জানিনা।
তাই নানুবাড়ি গেলে কলেই গোসল সারতাম।
হাঁস মুরগীর খোঁয়াড় আছে সেখানে। প্রতিদিন সকালে উঠে সবার আগে ওখানে যেতাম নানুসহ। ওখান থেকে মুরিগীর ডিম, হাঁসের ডিম সংগ্রহ করতাম। ঐ ডিম ভেজে রুটি দিয়ে খেতাম। পুকুরের মাছ ধরতাম ছিপ~বালাম দিয়ে।

মাটির চুলায় রান্না। সে কি মজার দিনাতিপাত ছিলো!
তাই এতদিন পর নানুর বাড়িতে যাওয়ার কথা শুনে তো খুশিতে গদগদ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা আমার।

তারপর আর কি, আম্মু আব্বুর সাথে রাগ করে চলে আসে গ্রামের বাড়িতে। আমরা প্রায় তিন~চার মাস নানু বাড়িতেই ছিলাম। এত লম্বা সময় আমি আমার জন্মের পরে এই প্রথম কাটালাম।

আমার নানা নেই।
তিন মামা আছে। বড় মামা গ্রামের খুব নামীদামী মানুষ। আম্মুর মুখে যখন শুনলো, আব্বু আম্মুকে প্রায়াশই মারে, তখনই সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো~”ক্ষমা না চাইলে, অনুকে আর কখনোই ওখানে যেতে দিবোনা। ওকে ওর বউ ফেরত দেওয়া হবে না ততদিন যাবত। ব্যস।

কত বড় স্পর্ধা, আমার বোনের গায়ে হাত তোলে!”
আব্বু অনেকবার ফোন করেছে তবুও।
মামাদের কাছে, নানুর কাছে।

বার বার শুধু বলতো, আমার মেয়ে দুইটাকে ছাড়া কেন আমাকে থাকতে হচ্ছে? আমার মেয়েদের সাথে কথা বলতে দেন না কেন আপনারা?
আমরা দুই মেয়েই আব্বুর প্রাণ বলা চলে।
কিন্তু আব্বু ফোন করলে আমাদের সাথে কথা বলতে দিতো না।
আমরাও কথা না বলেই ছিলাম।

আসলে ঠিক তা না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আব্বুকে ফোন দিতাম মাঝেমধ্যে।
কখনো নানুর ফোন দিয়ে, কখনো বা কোনো মামির ফোন দিয়ে। যখন যেটা সামনে পেতাম ওটা দিয়েই ফোন দিতাম। কারণ স্কুলের একটা লেসনে সেল্ফ সেইফটির জন্য বাবার নাম্বার মুখস্থ করতে হয়েছিলো। তারপর আবার ডায়াল লিস্ট চেক করে ডিলেট করে দিতাম।
আপু তো একবারের জন্য ও ফিরতে চায়নি। আমিই বার বার বলেছিলাম, আব্বুর কাছে যাবো। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

আম্মুসহ যখন নানুর বাড়িতে ছিলাম, তখন এক অন্য আম্মুকে আবিষ্কার করেছিলাম আমি।
দিন~রাত মিলিয়ে আনুমানিক বিশ~ত্রিশবার কল আসতো তার। মাঝেমধ্যেই তার দেখা পাওয়া যেত না ঘন্টার পর ঘন্টা।

একদিন আমাদের কিছু না বলেই কোথায় যেন থেকে যায়।
বড় মামা ফোন করলে জানায়,
চাচাতো বোনের বাসায় গিয়েছে।

রাতে আর ফিরবে না।
কোন চাচাতো বোনের বাসায় বা কোন জায়গায়, সেটা আর জানালো না। মামা ও জানার চেষ্টা করেনি। মামারা কেউই ঘাঁটায় না তাকে। নানুও না।
আম্মুর দেখাদেখি এখন আপুও তাই করে।

তাকে ও সারাক্ষন ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। বিছানায় আমরা তিনজন শুতাম।
রাতে দেখা যেত, আম্মু একপাশে শুয়ে বা বসে ফোনে কথা বলছে। কখনো চুপচাপ হয়ে শুনছে কখনো বা কোনো হাসির কথা শুনে খিল খিল করে হাসছে।

আরেকপাশে তানিশা আপু ও একই কাজ করছে। তবে একটু সাবধানে। আপু বেশি জোরে কথা ও বলছে না, হাসছেও না। মাঝখান দিয়ে আমিই শুধু একা একা এসব দেখে যাচ্ছি।
যদি আম্মুর কাছে গিয়ে বলতাম,
কার সাথে কথা বলো আম্মু? আব্বুর সাথে? আমাকে ও একটু দাওনা। আমিও একটু বলি।
আম্মু আমাকে হয় চোখ পাঁকিয়ে ইশারায় চলে যেতে বলতো, নতুবা বলতো, তোর নানুর কাছে যা।

অথবা বলতো, ঘুমাগে যা।
এরপর একদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে।
আব্বু আমার এক্সামের আগে আগেই গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। আব্বু আসার পর আদর~আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি ছিলো না।
মেয়ে জামাই বলে কথা।

আম্মু তখন ও বাড়িতে নেই।
তানিশা আপু আব্বুকে দেখে তটস্থ হয়ে আছে। আর সন্ধিক্ষণ দেখছে, কখন আম্মু এসে হাজির হবে। নাজানি আবার দুজনকে নিয়েই বাসায় চলে যায়। আপু ভুগছিলো এসব উদ্বিগ্নতায়।
আব্বু আসার পর আপু একবারো আব্বুর সামনে যায়নি। একবার ও জিজ্ঞেস করেনি, আব্বু কেমন আছো? আমি আসামাত্রই আব্বুর কোলে উঠে বসেছিলাম। আব্বুই পরে নিজেই ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো তানিশা আপুকে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করলো, আপু উত্তর দিলো।
বিকেল বেলার দিকে, আব্বু পারিবারিক আলোচনার এক ফাঁকে গোপনে বড় মামাকে আম্মুর অবৈধ কোনো সম্পর্ক আছে, এমন দাবি জানায়।

মামা তাচ্ছিল্যের স্বরে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলে,
~ ধুর মিয়া! এই বয়সে এগুলা কি বলেন! অনুর দুই মেয়ে আছে না? এহন এমন করার কোনো অর্থ আছে? আর অনু খুব বুঝদার মেয়ে। এমন কিছুই না। আমি বললাম তো, আপনি মিলায়ে নিয়েন।

আব্বু যখন জিজ্ঞেস করলো,
~ আচ্ছা! তো কই? এখন কই আপনার বোন? আমি তো সকালে আসার পর থেকে একবারের জন্য ও তাকে দেখলাম না। কোথায় সে?
মামা তখন কাচুমাচু করতে থাকে।

মামিদের ডেকে জিজ্ঞেস করার পর উত্তর আসে, অনু সম্ভবত ওর চাচাতো বোনের বাসায় গেছে।
মামা হাসিমুখে বলে তখন,
~ ঐযে.. শুনলেন ই তো। অনু ওর চাচাতো বোনের বাসায় গেছে। চলে আসবে। দাঁড়ান! আপনি চা খান তো নিশ্চিন্তে!
আব্বু কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করে,
~ কোন চাচাতো বোনের বাসায় গেছে আপনার বোন? দয়া করে ঐ বোনের ফোন নাম্বার দিতে পারবেন?

~ ফোন নাম্বার! ফোন নাম্বার দিয়ে কী করবেন?
~ ফোন নাম্বার দিয়ে যা করে লোকে, তাই করবো। কল করবো ওকে। অনুর বর্তমান অবস্থা জানবো। আসলেই ও ওখানে আছে কিনা।

বড় মামা হচ্ছে মাথা গরমওয়ালা মানুষ। তাই অল্পতেই রেগে আগুন হয়ে যায়।
মামা কঠিন চোখে তাকিয়ে এবার জিজ্ঞেস করে,
~ ভাই সাহেব, আপনি তো দেখছি সত্যি সত্যিই খুব প্যাঁচাল মার্কা মানুষ! আপনি কি সন্দেহ করেন নাকি ওরে? আমার তো এইবার মনে হইতেছে, সমস্যা আপনের আছে। আমার বোনের না। আপনিই খুব একটা সুবিধার লোক না। শুনছিলাম, আপনি ওর গায়ে ও হাত তুললেন।

আব্বু নরম স্বরে বলে,
~ ভাই কম দু:খে এসব করিনা। বুঝলেন? আপনার যেমন বোন, আমার তেমন স্ত্রী। ও আমার দুই মেয়ের মা ও। আমি ওকে কোন পজিশনে গেলে মারি একবার বোঝার চেষ্টা করেন। আচ্ছা, আপনি এখনই আমাকে ওর নাম্বারটা অথবা ওর চাচাতো বোনের নাম্বারটা দেন না। আমি আপনাকে প্রমাণ দিচ্ছি।

~ দাঁড়ান। আমি নাম্বার নিয়ে আসতেছি। আমি নিজেই কল দিবো ওকে।
বলে মামা মামিদের কাছে চলে যায়।
নানুও উপস্থিত সেখানে।
কিন্তু কেউ সেই অজ্ঞাত চাচাতো বোনের নাম্বার জানেনা। চেনে কিনা তাও নানু স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাচ্ছেনা।

মামা ফিরলেন হতাশ হয়ে।
নাম্বার জোগাড় করা যায়নি।
অনুর নাম্বারে তিনি নিজেই কয়েকবার ডায়াল করে ব্যর্থ হয়েছেন।
তার নাম্বার অফ আসছে বার বার।

আব্বুর সামনে এসে মাথা নিচু করে বললেন,
~ আপনি একটু অপেক্ষা করেন। ও চলে আসবে। আজকে রাতে না আসলে কালকে সকালেই চলে আসবে।

আব্বু কঠিন গলায় বলে তখন,
~ এরকম কি দুই দিন পর পরই করে নাকি? বাহ্, ভাবলাম বাড়িতে গেলে হয়তো ফ্যামিলির চাপে একটু ঠিক হবে। এখন তো দেখছি, রাত কাটানোর স্টেপটাও আর বাকি নেই। আপনারা আপনাদের মেয়ে রাতে বাড়ি ফিরছে না, অজ্ঞাত কোনো চাচাতো বোনের কাছে যাওয়ার নাম করে অন্য ছেলেপুলের কাছে গিয়ে রাত কাটায়, নিজের দুই দুইটা মেয়ে থাকা সত্ত্বেও।

এরপর ও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না আপনারা? ওকে তো আপনারাই বুঝিয়ে ঠিক করতে পারতেন। আমি তো আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেও পারিনাই।
এমন একটা অবাধ্য মেয়ে আমার কাছে ছেড়ে দিয়েছিলেন আপনারা?
আমার জীবন তো ধ্বংস করে দিয়েছেন আপনারা ভাই। কী ক্ষতি করছিলাম আপনাদের?
মামা কোনোভাবেই আর বোঝাতে পারলো না আব্বুকে।

আব্বুকে জোর করে রেখে দেওয়া হলো পরের দিন সকাল পর্যন্ত। মনে মনে সারাক্ষনই অপেক্ষা করে গেলো আব্বু, এই বুঝি আম্মু দরজায় টোকা দিচ্ছে!
কিন্তু না। আম্মু আর ফেরেনি।
এমনকি সকালে ও না।

সকালে উঠেই আব্বু আমাদের কাছে এসে বললো, সব গুছিয়ে নিতে।
আমরা আজকেই ঢাকায় চলে যাচ্ছি।
কথাটা শুনে আপু খুশি হলো না।

বাসায় চলে গেলে তার এই বাঁধাহীন সুন্দর জীবন আর উপভোগ করা যাবেনা।
আপুর জীবনের আইকন হচ্ছে আমার আম্মু।
তাই সে আম্মুর মতই আনন্দঘন লাইফ চায়।
আব্বু কোনোভাবেই আপুকে রাজি করাতে পারলো না।

আব্বুর নিখাদ আদর, সোহাগ কোনোটাই তার মন গলায় নি।
আব্বু বাধ্য হয়ে আমাকে নিয়েই চলে আসে বাসায়।
তারপর আমার এক্সামের প্রস্তুতি চলতে থাকে দু মাস। আপন স্যার আমাকে এক্সামের জন্য খুব ভালোভাবেই তৈরী করে দেয়।

আমার আম্মু মাঝখানে একদিন ফোন করে আব্বুকে সাফ কথা জানিয়ে দেয়,
সে আর ফিরবে না আমাদের বাসায়। তার বড় মেয়েকে যেন সে নিয়ে যায় তার কাছে। সে পারবে না রাখতে।
আব্বু কিছুই বলেনি।

দু মাস পর মামারা আম্মুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কোনোমতে আবার ঢাকায় নিয়ে আসে। আব্বুর হাতে~পায়ে ধরিয়ে মাফ চাওয়ায় আম্মুকে দিয়ে। আব্বু খুব কঠোর থাকা সত্ত্বেও আর কঠিন থাকতে পারলো না। ক্ষমা করে দেয় আরো একবার।

আম্মু ওয়াদা করে সবার সামনে, আর কখনো এমন কিছুই করবেনা। দুই মেয়ে রেখে এমন কিছু করলে নাকি তার রুহ্ তাকে বদ~দোয়া দিবে। আমাদের ছাড়া নাকি থাকতে পারেনা। আরো কত কী….
আব্বু আরো একবার বিশ্বাস করে…
বাসায় আবার আশ্রয় দেয় আম্মুকে।
আমার ক্লাস ফাইভের পরীক্ষা শুরু হয়ে যায় কিছুদিন পরেই। আম্মু আমার খেয়াল রাখছিলো মোটামুটি ভালোই। আব্বু যখন বাসায় থাকতো তখন একটু বেশিই যত্ম করতো। হয়তো আব্বুর মন যোগানোর জন্যই। অথবা অন্য কোনো কারণ ছিলো এর পেছনে।
তবে আপুকে শাসন করা যেত না।

আব্বু কিছু বললেই ও ওর আত্বহত্যা করার হুমকি শুনিয়ে দেয়। আর আম্মু তো ওকে কিছুই বলেনা। কোনোদিন কোনো বিষয় নিজের চোখে দেখলেও ডাক দেয়না।
আমার পরীক্ষা শেষ হলো নির্বিঘ্নে।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাসখানেক পর আবার সব আগের মত হয়ে যায়।
আম্মু আবার একই কাজ করতে শুরু করে। ফলপ্রসূ, প্রতিদিন বাসায় ঝামেলাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হতে লাগলো।

পর্ব ৫

ক্লাস ফাইভের এক্সাম শেষ হওয়ার পর পরই আম্মুর নির্মমতা ক্রমশ বেড়ে যায়। কারণে অকারণে রেগে যেত শুধু। তখন তো আগের চেয়েও বেশি তার রাগের দহন।
ভালো কথা জিজ্ঞেস করলেও রেগে যেত, খারাপ কথা বললে তো বলাই বাহুল্য।
মানে তার সামনা~সামনি কিংবা তার ধারে~কাছে কোথাও আমি বা আমরা না ঘেষলেই সে খুশি।

আর আপু তো আপুর মতই থাকে।
বাসায় এখন আর থাকেই না।
ওর অনেক বন্ধু~বান্ধব হয়েছে।
দিন~রাত আড্ডাবাজি, এটা ওটা করে বেড়ায়।
এক কথায় সে থাকে তার মত।
তাই আম্মুর এই আচরণগুলো তার সহ্যই করতে হয়না। পারিবারিক কোনো আলোচনাতেও সে শামিল হয়না।

সে পারিবারিক সবকিছুতেই উদাসীন।
একদিন আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই বায়না করলাম, আজকে নুডুলস খাবো। আর খাবো চিকেন রোল। কারণ আমাদের বাসায় নাস্তা বানানোর হার এখন একেবারে নেই বললেই চলে।

অনেক ইনিয়েবিনিয়ে যখন কথাটা বললাম, আম্মু তখন ও রেগে অস্থির।
আমি খেতে চাইছি কেন এর জন্য আমাকে সারা সকাল~দুপুর নানান ধরণের কথা শোনালো।

ফলপ্রসূ, না খাওয়া হলো নাস্তা। না পেলাম ভাত। কথা শুনেই পেট ভরে গেলো।
আপু সেদিন বাসায় ছিলো।
আমার তখন এক্সাম শেষ হয়েছে কেবল।
তাই তখন আমার কত কি খেতে, করতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।
পাশের বাসার আন্টি, রাহেলা আন্টি, আমাকে খুব আদর করে।
আন্টি সেদিন আচমকা বাসায় আসেন।
হাতে এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানী।

আমাকে ডেকে নিয়ে প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“তানিশা আর তুমি খেয়ো মা। আজকে মেহমানদের জন্য রেঁধেছিলাম তো, তাই ভাবলাম তোমাদের ও একটু দিয়ে যাই। তোমরা তো খুব পছন্দ করো কাচ্চি। খেয়ে অবশ্যই জানাবা। হ্যাঁ?”

সারা সকাল থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত খালি পেটে পড়ে থাকা যেন তখন স্বার্থক হয়ে গেছিলো।
মনে হচ্ছিলো, যাক! সবুরে মেওয়া ফলে!
আম্মু রাহেলা আন্টির সাথে তেমন একটা কথা বলে না। তাই আন্টি আসছে এটা বুঝেও এদিকে আসেনি, একটু কথা বলার জন্য।

তবে যখন আন্টি আমার সাথে কথা বলছিলো, তখন কান খাড়া করে শুনছিলো। আমি রান্নাঘরে গিয়ে প্লেট রেখে, ঢাকনা দিয়ে এসে তাড়াতাড়ি গোসল, নামাজ সারতে যাই।
আপু সকালেই ভাত খেয়ে নিয়েছিলো।
তাই এখন ঘুমাচ্ছে।

গোসল সেরে এসে নামাজ পড়া শেষ করলাম।
তারপর আপুকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললাম,
~ আপু আয়, কাচ্চি খাবি।
বলেই দৌঁড় দিয়ে রান্নারুমের দিকে চলে যাই।
কিন্তু কি আশ্চর্য!

ওখানে গিয়ে প্লেটটা আর দেখলাম না।
অনেকক্ষন খুঁজে ও না পেয়ে হতাশ হয়ে যখন ডায়নিং’এ আসলাম, তখন দেখলাম আম্মু পায়ের উপর পা তুলে ঐ প্লেটের কাচ্চি বিরিয়ানীগুলো খাচ্ছে।

প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখি, আর বেশি নেই ও। খাওয়া প্রায় শেষের পথে।
আমাদের ডায়নিং রুম থেকে ড্রয়িংরুমের টিভি দেখা যায়। আম্মু চোখ বড় বড় করে সিরিয়াল দেখছে আর গোগ্রাসে খাচ্ছে।
আমি ব্যাপারটা সহ্য করতে পারলাম না ঠিক। সকালে সামান্য নুডুলস, রোল খেতে চাইলাম। দিলো না। সারা সকাল~দুপুর বকলো।

কিসব আজেবাজে কথা শুনলাম সামান্য খাওয়ার আবদার করায়। নিজের মায়ের কাছেও খাওয়ার আবদার করা যাবেনা। নিজের মায়ের কাছাকাছি বেশিক্ষন থাকতে নেই~ আমার মধ্যে তখন এরকম ধ্যান ধারণাই সৃষ্টি হয়েছিলো।

স্কুলে গেলে দেখতাম, মোটামুটি সবার মায়েরাই বাইরে বসে অপেক্ষা করতো, কখন আমাদের ব্রেক আওয়ার হবে তার জন্য।
যখনই ঘন্টা দিতো তখনই সবাই ছুটে চলে যেত যার যার মায়ের কাছে।
তারা আদর করে টিফিন খাইয়ে দিত ওদের।
তাকিয়ে থাকতাম ওদের দিকে।

এসব দেখতেই ভালো লাগতো।
আমার আম্মুও আসতো কোনো~এক~সময়।
এই ক্লাস ওয়ান, টু তে থাকা~কালীন।
কিন্তু এখন কেন যেন আর আসেনা।

একদিন একজন বান্ধবীর মা এসে আমার হাতে জেলি মাখানো একটা ব্রেড দিয়ে বলেছিলো,
~ তোমার নাম রাকা না? নাও এইটা খাও। আর এখান থেকে চলে যাও। ঐ যে ওখানে যাও।
আমি জিজ্ঞেস করছিলাম,
~ হুম। আমার নাম রাকা। ওখানে যাবো কেন আন্টি? ওটাতো ক্লাস ফাইভের আপুদের বসার জায়গা।

তখন উনি ঠোঁট চেপে বলেছিলেন,
~ তুমি এইভাবে তাকিয়ে থাকো কেন? আমার বাচ্চার পেট ব্যাথা হবে তো। তোমার আম্মু তোমাকে খাওয়ায় না নাকি? যেটা খেতে ইচ্ছা করে ওটা মাকে গিয়ে বলবা। এভাবে কারো দিকে তাকিয়ে থাকবা না।
আমি আর কিছু বলতে পারিনি।

সোজা ক্যান্টিনে এসে হাতের ব্রেডটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে টেবিলের উপর দু হাত রেখে, তার উপর মাথা রেখে বসেছিলাম। মনে মনে বলছিলাম,
“আমার আম্মু কেন আমার জন্য টিফিন নিয়ে আসেনা? টিফিন দিয়েও দেয়না। প্রতিদিন ১০/১৫টাকা দেয় টিফিনে জন্য। প্রতিদিন একটা ব্রেড আর কলা খেতে হয়। কোনোদিন বা খেতে হয় ক্যান্টিনের সিঙ্গারা, পুরি। কেন?”

যাক সেসব এখন আর মনে হয়না।
এখন অনেক বড় হয়ে গেছি!

সেদিন সারা সকাল, দুপুর পেরিয়ে তখন বেলা তিনটার বেশি বাজে। তখন ভাবলাম একটু খাবো। আম্মুতো কিছুই বানায়ে দেয়নি। দিবেনা এটাও জানি। কিন্তু আমার বিরিয়ানীর ও প্রায় সবটাই সে খেয়ে নিয়েছে। আর মাত্র এক মুঠোর সমান পড়ে আছে থালায়। আম্মুর খাওয়া দেখে মনে হচ্ছেনা, সে এক চামচ ও টেস্ট করার সুযোগ দিবে বলে।

আপুকে ডেকে এসেছিলাম তাই ও মাত্রই পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে এই বিষয়টা খেয়াল করলো।
সে এটা দেখেই জিজ্ঞেস করে ফেললো,
~ ওমা আম্মু! এইটা তো নাকি রাহেলা আন্টি রাকাকে দিয়ে গেছে! তুমি যে খেয়ে ফেললা?
আম্মু চিবানো বন্ধ করে খাওয়া মুখে নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললো,

~ রাকাকে দিছে মানে? আমার বাসায় দিয়ে গেছে। তাই আমার ইচ্ছা করলে আমি খাবো। আর মহারাণী আমার রান্না করা খাবার খাবেনা, অন্য ঘরের আন্টির রান্না দেখলেই খুশিতে লকলক করবে! ক্যান? আমি কি ঘরে রান্নাবান্না করিনা নাকি? ঘরের রান্না খায়না ক্যান? যা দিবো তাই খেতে হবে। বলে দে।

আপু বললো,
~ ও তো রাগ করে সারা সকাল, এমনকি এখন পর্যন্ত কিছু খায়নি আম্মু। তুমি ওর জন্য কিছুতো রাখতে পারতে।
আম্মু চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
~ ঐ তুই আমাকে শাঁসাচ্ছিস? আমার খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছিস? তারে বল ভাত খেয়ে নিতে। তোর যখন এতই দরদ। যত্তসব ঢং।

তানিশা আপু বললো,
~ আম্মু তুমি ডাল আর ঝাল দিয়ে শুটকি বিরান করছো। এগুলো ও খেতে পারেনা। এজন্যই তো এতক্ষন না খেয়ে বসে ছিলো।

আম্মু বললো,
~ তাইলে মহারাণীরে ফ্রিজ থেকে ডিম নিয়া ভাইজ্যা খেতে বল। খাক উনি। সবাই যেডা খায়, ঐডা তো মহারাণীর মুখে রোচে না। এইডারে বিয়ে দিবো ক্যাম্নে?
আপু বলে,
~ ও ডিম ভাজি করতে পারে নাকি?

আম্মু নাক টেনে বলে,
~ আরে করতে দে তো ওরে। দুই একদিন গায়ে তেলের ছিটা পড়ুক। এরপর দেখবি কয়দিন হাত পুইড়্যা ট্যুইড়া আমনা~আমনিই শিইখ্যা যাইবো।
আমার কাচ্চি বিরিয়ানী খুব প্রিয়।

তার উপর সকাল থেকে কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। পেটের ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে।
মেঘের ডাকের মত আওয়াজ করছে।
ক্ষিধায় আমার সব জ্বলে যাচ্ছে যেন।
তাই না চাইতেও কান্না চলে আসলো।
আমি হেঁচকি তুলে কেঁদেই দিলাম।

আম্মুর সেদিকে বিন্দুমাত্র ও ভ্রুক্ষেপ নেই।
সিরিয়ালের ছোট মেয়েটাকে আজ অন্যায়ভাবে মেরে ফেলা হবে~ ওটা এখন আম্মুর দেখার বিষয়।

ততক্ষনে প্লেটের সব কাচ্চি শেষ অবশ্য।
তাই এখন সিরিয়ালে মনোযোগ বেশি।
তানিশা আপু এই প্রথম আমার পক্ষে কিছু বললো। তার পিছনে অবশ্য একটা কারণ আছে। আপুর ও কাচ্চি খুব পছন্দ। আর রাহেলা আন্টির কাচ্চি হলে তো কথাই নাই। অনবদ্য স্বাদ। আম্মুর জন্য সে ও একটু চেখে দেখতে পারেনি।

আপু আমার কান্না দেখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
~ ডিমের রোল খাবি? আয়। ডিমের রোল আর ডিম, মরিচ, পেয়াজ দিয়ে তোকে ডিম~বিরিয়ানী বানিয়ে দেই। খুব মজার!
আমি কিছু বললাম না।

আপুর পিছনে পিছনে গেলাম।
আপু দুইটা রুটি বানিয়ে তার ভেতরে ডিমের পুর দিয়ে ওটা ভাজ করে মাইক্রোওভেনে রেখে আবার বের করে নিলো। তারপর কিছু ভাত একটা কড়াইয়ে নিয়ে তেল, মরিচ, পেয়াজ, লবণ দিয়ে ভেজে দিলো।
সুন্দর করে পরিবেশন করে সোজা আমাদের রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
আপু আর আমি মিলে খেলাম।

কাচ্চির জন্য আর আফসোস লাগলো না।
ভাত~ভাজাটাই দারুন ছিলো।
কি জানি, হয়তো অতিরিক্ত ক্ষুধায় অখাদ্যও অমৃত লেগেছিলো তখন!
তারপর ভাবলাম, থাক, আমার আম্মুই তো খেয়েছে।
আর কেউ না তো।

আপন স্যার তখনো আসতো।
ক্লাস সিক্সের ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমাকে নানা টিপস দিতো। ভর্তি পরীক্ষার জন্য অনেক এক্সট্রা তথ্য জানা লাগে। কারণ পাঠ্য বইয়ের বাইরের কিছু কোয়েশ্চন ও আসে। ওগুলোই শিখাচ্ছিলো তখন।

কিন্তু আপন স্যারকে আম্মু দু ~ চোখে সহ্য করতে পারতো না। তার কারণ আগে জানতাম না। এখন বুঝেছি। এখন তো আমি একজন চল্লিশা বুড়ির চেয়েও বেশি বুঝি।
আম্মু সপ্তাহে ২/৩ বার বাইরে বেরোতো।
আগে আমাকে প্রতিনিয়ত নিতো।

এখন আমি যাইনা। জোর করলেও যাইনা। শুধুমাত্র আংকেলের সাথে দেখা করার প্রস্তাব দিতে আসলেই আম্মু আমাকে আদর করে কথা বলতো।
বলতো, চল রাকা। আজ আমরা বাইরে যাবো। অনেক কিছু খাবো। তোর ফেভারিট ডিশগুলো খাওয়াবো। তোকে অনেকগুলো টেডিও কিনে দিবো। তুই যা কিনতে চাইবি, তাই তাই কিনে দিবো!

সেদিন আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না।
সমাপনী পরীক্ষা শেষ করেছিলাম তখন।
আর কতদিন এভাবে ঘর বন্ধি থাকবো?
তাই গেলাম।

আংকেলে আসবে এরকম কিছু আমাকে বলা হয়নি। সেজন্যই মূলত যাওয়া। কিন্তু সি.এন.জি থেকে নামতেই দেখলাম, উনি একটু দূরেই হাসি হাসি মুখ নিয়ে, খুব পরিপাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার আব্বু একটু কালো। কিন্তু এই লোক দেখতে একদম আমার আম্মুর মতই ফর্সা। লোকটার বেশভূষা ও অনেক স্মার্ট আর বড়লোকি ভাবসাব। চেহারায় কোনো চিন্তার বলিরেখা নেই যতটা আমার আব্বুর চেহারায় বিদ্যমান।
এই লোকের ও থাকতো।

কিন্তু এই লোকের তো আমার আব্বুর মত দুই মেয়ে, বউ, সংসার আর এতগুলো ব্যবসা নেই যে চিন্তাটিন্তা করবে।
তাই সে দিব্যি বয়স ধরে রেখেছে।
যদিও তার বয়স আমার আব্বুর চেয়েও বেশি।
আমি আংকেলকে দেখেই দমে গেলাম।

হ্যাঁ, এখন এসেই আমাকে কোলে তুলে নিবে। কোলে তুলে শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঝাপ্টে ধরবে। এত জোরে ধরে রাখবে যে আমার চোখে পানিও চলে আসবে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে চিৎকার করে নেমে যাই।
আমি তখন ক্লাস ফাইভের এক্সাম দিয়ে ফেলেছি। সবকিছু না বুঝলেও কিছু কিছু জিনিস কিভাবে যেন বুঝে যেতে লাগলাম। বয়সের চেয়েও বেশি বুজুর্গ যাকে বলে তাই হবে হয়তো।
আমার আংকেলের কোল, আংকেলের আদর এখন আর একদমই ভালো লাগে না। অসহ্য লাগে। সে আমাকে ধরলেও আমার বিরক্ত লাগে।
ইচ্ছা করে ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেই।

ঐদিন আংকেলের কোলে বেশিক্ষন থাকতে হলো না। সে নিজেই নামিয়ে দিয়েছিলো। আমি ইচ্ছা করেই ভার ভার করে বসেছিলাম, যাতে তার হাত ব্যাথা হয়ে যায়। আমাকে যেন নামিয়ে দেয়।

সেদিন মার্কেটে আর বেশি দেরী করা হয়নি।
এদিক~ওদিক ঘুরাঘুরি করে চলে আসলাম আমরা।
বাসে করে আসার সময় আম্মু আর আংকেল বসলো পিছনের সিটে। আর আমি বসলাম সামনের সিটে, একলা। আমার সাথে একজন বৃদ্ধ বসে ছিলেন।
কিছুক্ষন যেতেই উনি চলে গেলেন।

উনি চলে যাওয়ার পর হুট করে পেছন থেকে আংকেল আমাকে টেনে তুলে নিয়ে গেলেন তাদের সিটে।
কিন্তু উনি আমাকে সিটে বসালেন না।
বসালেন তার কোলে।
আমি বার বার সিটে বসতে চাইলাম।

বললাম, অল্প একটু জায়গা হলেই চলবে।
কিন্তু আংকেল বললো,
~ না কেন! তুমি আমার কোলেই আরাম করে বসো মামণি। সমস্যা কী? আমি তোমার আংকেল না?

আমি তবুও রাজি হলাম না। ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলাম।
আম্মু তখন আমার হাতে চাপ দিয়ে বললো চোখ বড় করে বললো,
~ রাকা! বস তোর আংকেলের কোলে। তোকে খেয়ে ফেলবে নাকি ও? এত ঢং করিস কেন?
আমি আবারো না সূচকভাবে মাথা নাড়ালে আম্মু আমাকে থাপ্পড় দিতে উদ্যত হয়। তখন আংকেল আমাকে সামলে নেয়। তার কোলে আরো ঝাপ্টে ধরে বসে থাকে। আমার অস্বস্তিকর অবস্থা ক্রমশ বাড়তে থাকে। আংকেলে আমাকে এত জোরে কেন ঝাপ্টে ধরে আমি জানিনা। কিন্তু সেদিন তার হাত আস্তে আস্তে নড়াচড়া করতে ও আরম্ভ করে।

কখনো একদম উপরে উঠে যাচ্ছে কখনো বা একদম নিচে চলে যাচ্ছে।
আম্মু কি এসব দেখছে না? না! আম্মু তখন আংকেলের কাঁধে মাথা রেখে ঘুম ঘুম অভিনয় করছে। সে এসব দেখছে না।

দেখলেও সন্দেহ করার মত মনোভাব নেই।
আমি তার কোল থেকে যতই সাইডে গিয়ে বসি, সে ততই আরো চাপ দিয়ে বসায়।
আর না পেরে একসময় আমি তার হাত টান দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। সে তখন আমার পিঠে চুমো দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ কী হলো মামণি? ভালো লাগছে না?

আমি চোখ বন্ধ করে সয়ে যাই।
আমার তার চুমোর ধরণ ও অস্বস্তিকর লাগছিলো। তার মুখের লালা, থুথুতে ভিজেই গেছিলো বোধ হয় পিঠটা। ভীষণ গা ঘিনঘিন করছিলো।
বুঝতেই পারছিলাম না সে এমন কেন করছে।
সেই প্রশ্নের উত্তর ও আমার জানা ছিলো না।

যদি জানতাম তাহলে হয়তো আম্মুকে বলে দিতাম, আম্মু আংকেল আমাকে… …
কিন্তু বলেও বা ফায়দা কি?
আম্মু তো এসব বিশ্বাস করবেনা কখনো।
কই আমার আব্বু যখন আমাকে চুমো দেয়, যখন আমি আমার আব্বুর কোলে বসে থাকি, তখন তো এরকম অস্বস্তি হয় না!

বাসে উঠলে তো আমি ইচ্ছা করেই বরং আব্বুর কোলে উঠে বসি। বাসাতেও আব্বুর কোলে বসেই সারাদিনের সব ঘটনা বলতে বলতে কখন যে ঘুমায়ে যাই তার হদিস ও পাই না।
এরকম ভাবতে ভাবতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই।
আর অপেক্ষার প্রহর গুনি, কখন বাস থামবে। কখন আমরা বাসায় যাবো।
ঠিক তখনই দেখলাম, আপন স্যার বাসে উঠেছে। সে এগিয়ে আসছে এদিকেই।
তাকে দেখেই আমার চোখ~মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
এই তো সুযোগ!

আমাদের সামনের সিটের কাছার সিটটাই খালি পড়ে ছিলো। আপন স্যার এসে ওখানেই বসলো।
আমি টুপ করে আংকেলের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। আংকেল আবার ধরতে নিচ্ছিলো। আমি শরীরের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে নেমে পড়ি তার কোল থেকে।
তারপর টুপ করে আপন স্যারের সামনে চলে যাই।
স্যার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলো।

তাই আমাকে দেখতে পাচ্ছিলো না।
আমি তার পায়ে ধরে নাড়া দেই।
সে আমার দিকে তাকিয়ে হকচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ রাকা! তুমি এখানে! একা নাকি? তোমার আব্বু কোথায়?

পর্ব ৬

আপন স্যার আমাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতেই আমি মাথা নিচু করে ফেললাম। স্যার আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করে,
~ কী হয়েছে রাকা? তোমার সাথে আর কেউ নেই? একা কোথায় গেছিলা?
আমি কোনোরকমেই কিছু বলতে পারছি না। স্যারকে বললাম শুধু,
~ আমাকে একটু আপনার সিটে জায়গা দিবেন?
স্যার উঠে গিয়ে বললো,
~ কেন দিবোনা! বসে পড়ো।

এই কথাটা বলতেই সে যখন পেছনের সিটে চোখ নেয়, তখন হকচকিয়ে যায়।
হয়তো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলো না।
আংকেল নামের ঐ ভয়াবহ লোকটা ও তখন আপন স্যারের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। আমি কেন হুট করে তার কোল থেলে উঠে গিয়ে আপন স্যারের কাছে গেলাম, সে সেটা বুঝতে পারেনি।

আপন স্যার দেখে খুব অবাক হলো,
আমার আম্মু একটা অন্য একটা পুরুষের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।
স্যার কিছু না বলে আমাকে জানালার সাইডে বসালো। আর ঐ পাশের লোকটাকে অন্য সিটে ট্রান্সফার করে যখন নিজে সেখানে বসতে গেলো তখন আংকেল ডেকে বললো,
~ এই যে মিস্টার, ওকে এইদিকে দিয়ে দিন তো। এই মেয়েটা আমাদের। জানিনা কেন ও পট করে আপনার কাছে চলে গেলো।
কথাটা আমার কানেও আসলো।

আপন স্যার কিছু একটা বলতে গিয়ে ও চেপে গেলো। আমার দিকে তাকালো কিছু শোনার আশায়। আমি কিছুই বলিনি। শুধু কাঁদো কাঁদো চেহারায় অসহায়ত্বের আভাস ফুঁটিয়ে তাকালাম তার দিকে।
সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তখন আংকেলকে বললো,
~ বাচ্চাটা আমার স্টুডেন্ট। আমার সাথে বসতে চাইছে যখন, বসুক না। সো, ওকে আমি চিনি। আচ্ছা, আপনার নাম কী?

আপন স্যার কথাগুলো বললো খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যেন সে একটুও চমকায় নি।
কিন্তু লোকটা কথাগুলো শুনে মুখ শক্ত করে ফেললো।

কথার আওয়াজে উঠে গিয়ে যখন আম্মু দেখলো তার সামনে আপন স্যার দাঁড়িয়ে আছে, তখনই সে তৎক্ষণাৎ তার ওড়নাটা মুখের উপর দিয়ে দিলো। আপন স্যার আস্তে করে বললো,
~ মিসেস অনু, আমি দেখেছি আপনাকে। এখন আর মুখ ঢেকে বা লুকিয়ে কোনো লাভ নেই। শুধু বলবো, সাবধান হয়ে যান।
আংকেলের দিকে তাকিয়ে স্যার আবার জিজ্ঞেস করলো,
~ কই আপনার নাম বললেন না তো?

লোকটা কিছুক্ষন ইতিউতি তাকিয়ে উত্তর দিলো,
~ আমার নাম যাই হোক, আপনাকে বলতে বাধ্য না।
আপন স্যার হেসে দিলো কথাটা শুনে।
মুখে হাসি রেখেই জিজ্ঞেস করলো,
~ না, বলেন না। ক্ষতি কোথায়?

লোকটা তখন দাঁত~মুখ এক করে ক্রুদ্ধ গলায় জানালো,
~ আপনি ওর টিচার, আমার না। আর আপনি আমার হাঁটুর বয়সী। বেশি কথা না বলে, বসে থাকেন।
স্যার আর কথা বাড়ালো না।
আমার পাশে বসে পড়লো।

আমাকে কিছুক্ষন এটা ওটা জিজ্ঞেস করলো। আমি কোনোমতে হ্যাঁ, হুঁ করেই উত্তর দিলাম। ইচ্ছা করছিলো না বেশি কথা বলতে। আংকেল যেভাবে ধরে ছিলো এতক্ষন, আমার তো শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
কথা বলবো কী করে!

কিন্তু স্যার আমার দিকে মিনিটে দুইবার করে তাকাচ্ছিলেন।
উনি হয়তো বুঝেছিলেন,
আমি কোনো একটা দুশ্চিন্তায় মহাচিন্তিত।
এজন্যই তো সারাক্ষন বক বক করতে থাকা মেয়েটাও এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
এক ফাঁকে স্যার আমার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
~ রাকা, এই লোকটার নাম কি? তুমি জানো?

আমি বললাম,
~ হ্যাঁ। আজমল উদ্দীন।
স্যার উদাস কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
~ লোকটা কি কিছু করতেছিলো নাকি তোমার সাথে? না মানে তুমি এভাবে উঠে আসলা যে তাই জিজ্ঞেস করলাম..
~ স্যার লোকটা খুব অদ্ভুতভাবে আদর করে, কোলে নেয়। আমার ভালো লাগেনা উনাকে।
এই কথাটা বলার পর আর কোনো কথা বললো না উনি। একদম চুপ করে গেলেন।
বাস থেমেছে, বাসার মোড়েই নামায়।

স্যার আরেকটু পরে নামার কথা। কারণ উনার মেছ একটু সামনেই। কিন্তু উনিও আমাদের সাথে নেমে পড়লেন। আজমল উদ্দীন নামেনি।
শুধু আম্মু, স্যার আর আমি নামলাম।
আম্মু আমাকে না ধরেই সোজা হেঁটে চলে যাচ্ছিলো।
বিষয়টা দেখে স্যারই আমার হাত ধরে হাঁটছিলো।
আম্মু আমাকে ফেলে এভাবে চলে যাচ্ছে কেন, এইভেবে আমি তাকে জোরে ডাকলাম,
~ আম্মু, আম্মু!

সে একবারের জন্যও ফিরে তাকালো না।
এত জোরে হাঁটছে যেন তার কোনো একটা জরুরি কাজের জন্য সময় ফেরিয়ে যাচ্ছে।
স্যার ও আমাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। আম্মুর কাছাকাছি গিয়ে স্যার ধমকের স্বরেই বললেন,
~ থামেন ম্যাডাম। থামেন। সমস্যা কী আপনার? ওকে সাথে নিচ্ছেন না কেন?
আম্মু থামলো এবার।

আম্মু থামতেই স্যার আমাকে ইশারা করলো আম্মুর হাত ধরতে।
ততক্ষনে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
চারপাশে আঁধার নেমে এসেছে।

চারপাশ থেকে কেবল কুকুরের ধ্বনি ভেসে আসছে। আজকের আকাশ সোনালী। আমাদের গলিটা একদম চিপায়। তাই এ রাস্তায় এই সময়ে হাঁটা খুব দুর্লভ। আমাদের বাসাটাও তাই ছিমছাম হয়েই থাকে। আলো~আঁধারের খেলায় সজ্জ্বিত থাকে সন্ধ্যাবেলায়।
আমার উচ্চতা একটু কম। তখন খুব খাটো ছিলাম। বড় হচ্ছিলাম না।
তাই স্যারের ইশারা দেখে নিজেও ইশারা করলাম একটু উবু হওয়ার জন্য।

সে উবু হতেই ফিসফিস করে বললাম,
~ স্যার, আপনি আব্বুকে আংকেলের ব্যাপারে কিছু বইলেন না। আব্বু আম্মুকে মারবে। ঘরে খুব সমস্যা হবে।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। বলবো না। তুমি এখন তোমার আম্মুর হাত ধরো।
আমি তখন স্যারের হাত ছেড়ে দিয়ে একছুটে আম্মুর কাছে গিয়ে তার হাত ধরলাম।
অন্ধকারে তার মুখটা ও যেন দেখতে পেলাম খানিক।
কি ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!

আজ আবার কোন ভুল করলাম?
আমি তো আম্মুর ভালোর জন্যই স্যারকে বললাম কিছু না বলতে।
স্যার কিছু না বলেই যখন পিছনে ফিরে হাঁটা দিলো তখনই আম্মু বলে উঠলো,
~ আআপন… শুনো, তু_তুমি তো সব জেনে গেছো.. রাকার আব্বুকে কি সব বলে দিবা? আসলে ও আমার ক্লাসমেট ছিলো..
স্যার আম্মুর দিকে ফিরে কিছুক্ষন হাসলেন। তারপর বললেন,
~ হাহ হা..হ্যাঁ। আজকেই জানলাম পুরোপুরি।

এতদিন অবশ্য সন্দেহ করেছিলাম। ধোঁয়াশায় ছিলাম। এখন সব বুঝতে পারছি। আর ক্লাসমেট! হাসালেন আপনি।
আম্মু তখন বলে উঠলো,
~ আচ্ছা কী কী দেখছো?
স্যার অবলীলায় বলে দিলেন,
~ লোকটার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন আর রাকাকে তার দায়িত্বে ছেড়ে দিয়েছেন। নিজ চোখে দেখলাম সেই দৃশ্যটা। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। আপাতত এটুকুই দেখে নিলাম। আর কিন্তু দেখতে চাইনা ভবিষ্যতে।

আম্মু তখন একরাশ অস্বস্তি নিয়ে উত্তেজিত হয়ে বললো,
~ কাউকে কিছু বলবা না তুমি আপন। আমার হাজবেন্ডকে তো না_ই। এর বিনিময়ে তুমি যা চাও তাই পাবে। আর আমাকে ভয় দেখানো বন্ধ করতে হবে।
স্যার ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
~ তাই! আচ্ছা, কী কী পাবো?

~ আমার গলায় এখন একটা স্বর্ণের চেইন আছে। ওটা এখনই আমি তোমাকে দিয়ে দিবো। তুমি চাইলে কিছু নগদ ক্যাশ ও দিতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কি দেখছো ওটা কাউকেই কোনোভাবে বলা যাবেনা। মরে গেলেও না। কাগজে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
বলে আম্মু তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে লাগলো।
স্যার কঠিন অবয়ব নিয়ে তাকিয়ে আছে।

এমন সময় আপন স্যারের ফোন বেজে উঠলো।
“রাকার আব্বু”কলিং…
স্যার এটা দেখে সোজা মোবাইলটা তার মুখোমুখি ধরে বললো,
~ আপনি শুধরাবেন? নাকি আপনার স্বামীকে বলে তার হাতেই ছেড়ে দিবো? তার হাতেই শুধরান। ওটাই ভালো। তাইনা বলেন?
এত বড় বড় দুইটা বাচ্চা ফেলে কিভাবে আপনি… ছি:!

উনি কত ভালো, নিষ্পাপ একটা মানুষ। জানেন আপনি? আর আপনি কি করছেন এসব?
বিশ্বাসঘাতকতা..!
আম্মু স্যারের মোবাইলের স্ক্রিনে আব্বুর কল দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। স্যারের কথাগুলো শুনে একেবারেই দমে গেছিলো তখন। আম্মু অস্ফুটস্বরে বললো,
~ না আপন। রিসিভ করো না!
আপন স্যার ফোন রিসিভ করেছে।

করতে না করতেই আব্বু বললো,
~ তুমি আজকে বাসায় আসোনাই নাকি রাকাকে পড়াতে। কেন বলোতো?
স্যার বললো,
~ আজকে বাড়িতে গেছিলাম তাই আসতে পারিনি চাচা। আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
আপনার সময় হবে?

বলে যখনই আম্মুর দিকে তাকালো তখনই সে হাতজোড় করতে আরম্ভ করলো।
তাড়াতাড়ি করে গলায় চেইনটা খুলে স্যারের সামনে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
~ প্লিজ! দোহাই তোমার আপন। বইলো না কিছু। আমার সংসার ধ্বংস কইরো না।
আপন স্যার ফোন কেটে দিয়ে সহজ গলায় বললেন,
~ কলের পুতুল নাকি?

আমাকে এগুলো দিচ্ছেন কেন! আপনি আমাকে এত লোভী ভাবেন নাকি! আজ এত বছর ধরে দেখছেন.. আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, এই লোকটা খুব বেশি একটা ভালো না। আমি উনাকে চিনি। উনার আগের ঘরে একজন স্ত্রী আছে। আপনার হাজবেন্ড তো ঠিকই আছে। এই লোকটার মনে কোনো দাগ নেই, বিশ্বাস করেন। উনাকে আমি ভালো করেই চিনি। আমার আব্বার সাথেও ভালো সম্পর্ক। খুব ভালো মনের মানুষ।

কথাটা আম্মু পাত্তা না দিয়েই বললো,
~ তুমি ব্যাস আমার হাজবেন্ডকে এই কথাগুলো জানাইয়োনা। আমি আর কখনো যাবো না এভাবে। বললাম তো। যাও।
স্যার বললো,
~ ওকে। রাকাকে নিয়ে বাসায় যান। আমি চাচাকে বলে দেই আপনারা বাসায় ফিরছেন।
আম্মু আমার হাত ধরে তড়িঘড়ি করে বাসায় চলে গেলো তারপর।
আব্বু টিভির রুমে বসে অপেক্ষা করছিলো।

সেদিন আর কিছুই বলেনি। কারণ আপন স্যার ফোন করেছে বলেছে হয়তো, আমরা তার সাথে গিয়েছিলাম।
সেদিনের পর থেকে আম্মু আর একদমই আপন স্যারকে সহ্য করতে পারেনা।
আপন স্যারের সাথে আব্বুর সম্পর্ক ও ভালো। কখন কি বলে দেয়, কে জানে। এই ভয় থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো, আপন স্যারকে আমার টিউটর থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া। সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া তার সাথে।
রাতে খাবার টেবিলে আম্মু কথাটা তুলেছিলো ও সেদিন।
কিন্তু আব্বু পাত্তা দেয়নি।

আমার আব্বুর নাম রেজা চৌধুরী।
আম্মুর নামে ও তাই চৌধুরী যুক্ত হয়েছে।
দুজনের ভালোবাসা~বাসির অবস্থা ছিলো দহরম~মহরম টাইপ। এই সম্পর্কে কিভাবে ছেদ এসেছে জানা নেই।

আরকদিন ও তাদের ঘরে আরেক ধপায় আপন স্যারকে নিয়ে কথা হলো।
তাদের কাছাকাছি আসার মুহূর্তে হঠাৎ করেই মিসেস অনু চৌধুরী ওরফে আমার মা বললেন,
~ আপনি আমাকে ভালোবাসেন?
রেজা সাহেব ওরফে আমার বাবা সাথে সাথে উত্তর দিলো, হ্যাঁ।
~ তাহলে আমার একটা কথা রাখবেন?

~ হ্যাঁ। আমার প্রাণ দিয়ে হলেও রাখার চেষ্টা করবো।
আম্মু, চোখ গরম করে বললো,
~ আচ্ছা। তাইলে বলি। আপনি আপনকে মানা করে দিবেন। আর কোনোদিন আমাদের বাসার ত্রিসীমানায় না আসতে বলবেন। ব্যস।

আব্বু জিজ্ঞেস করলো,
~ কেন? হঠাৎ করে এভাবে কেউ না করে দেয়? আর ওকে না করার কোনো কারণ ও তো নেই। ওর বাবার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক অনু। এভাবে কিভাবে না করে দেই?
আর ভালো ছেলে তো। সমস্যা কোথায় তোমার?
আম্মু নাক কুঁচকে বলেছিলো,
~ আমার ওকে খুব একটা সুবিধার মনে হয় না। রাকার সাথে বেশিই ঘেষাঘেষি করে। আর ও খুব সেন্সিটিভ ছেলে। মতি~গতি ভালো না। ঘরে আমরা তিনজন মেয়ে থাকি। বাকিটা আপনি বুঝে নেন। আপনার কার প্রতি দায়িত্ব পালন করা উচিত, ভাইব্যা নেন।
আব্বু চিন্তিত হয়ে গেলো কথাগুলো শুনে।
আম্মু আরো যোগ করলো,
~ শুনেন, এই ছেলের নজর খারাপ। পাশ কইর‍্যা বইস্যা আছে। চাকরী~টাকরী হয়না। ভালো~মন্দ কিছু একটা ঘটলেও কি মেয়ে বিয়া দিবেন তার কাছে? আর চরিত্র খারাপ তো। দেখেন না, তানিশারে কোনোমতেই বুঝাইয়া তার কাছে দিতে পারলাম না? আপনার ছোট মাইয়্যাডারে তো মনে হয় তাবিজ করছে। সারাক্ষন শুধু আপন স্যার, আপন স্যার.. আবার এইড্যা ওইড্যা মাইয়্যারে দেয় ও। ওইদিন দেখলাম কি হাসি~ঠাট্টা চলে তাগো..
আব্বু গম্ভীর স্বরে জানালেন,

~ আচ্ছা। আমি ওকে আগামীকালই না করে আসবো।
আম্মু তখন গলায় জড়িয়ে ধরে বললেন,
~ শুনেন, তার সাথে দেখা করার দরকার কী? এমনি ফোনেই না করে দিয়েন। আর ভুলেও কথা কওয়ার দরকার নাই। পরে জুইড়্যা বসবো।
আব্বু জানায়, আচ্ছা।

ব্যস। আব্বু এক কথার মানুষ।
স্যারকে না করে দিলেন আসতে।
স্যারের সাথে সব যোগাযোগ ও বন্ধ করে দিলেন।
স্যারের সাথে একদিন দেখাও হয়েছিলো তার।

স্যার হালকা ইঙ্গিত দিতেই আব্বু তাকে ইচ্ছামত কথা শোনায় সবার সামনে।
অথচ আব্বু নিজেও জানতো, প্রমাণ ও পেয়েছিলো, এমন কিছু আছে আম্মুর জীবনে।
কিন্তু তার ওয়াদা, অতিরিক্ত ভালোবাসার অভিনয়.. সবকিছু ভুলিয়ে রাখছিলো আব্বুকে।
স্যারকে তখন এরকভাবে অপমান করায় আর যোগাযোগ করলেন না তিনি। আব্বুর থেকে এরকম ব্যবহার সে আশাই করতে পারেনি হয়তো।
তারপর থেকে আমি একা একাই পড়াশোনা শুরু করি।
স্কুলে যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে দেখা হতো স্যারের সাথে। স্যার না পারতে হাসতো, কথা বলতো।

তবুও সামনে পড়ে গেলে জিজ্ঞেস করতো,
ভালো আছি কিনা। সব ঠিক আছে কিনা।
বেশিক্ষন কথা ও বলা যেত না, আব্বুর কড়া পাহারার দরুন।
আমার একাকিত্বতা ক্রমশ বেড়ে গেলো।
খুব কষ্ট হতো এই দেওয়ালের জন্য।
কেন? জানা নেই।
ভাবতাম মাঝেমধ্যে,
“আচ্ছা, আপন স্যারের ও কি আমার জন্য একইভাবে কষ্ট হয়?
ছি:! এসব আমি কি ভাবছি!”

বাসায় ও সব শান্তিতে চলমান রাখা আর সম্ভব হলো না।
আম্মুর সাথে অবশ্য আর কোথাও যেতে হয়নি। কিন্তু সমস্যার শুরু অন্যভাবে হলো।
ক্লাস সিক্সে…
একদিন আব্বুকে দিয়ে ইচ্ছামত বাজার করানো হলো। সব ধরণের আইটেমই আনা হলো।
কিছুই বাদ পড়েনি।

আব্বু বাজার করে এনে যখন জিজ্ঞেস করলো, কেন বা কার জন্য এত আয়োজন তখন জানতে পারে, আম্মুর নাকি দূর সম্পর্কের এক জেঠাতো ভাই আজ বাসায় আসবে।
তার জন্যই এত আয়োজন।
আব্বুর ব্যবসার জন্য সেদিনই কিছুদিনের জন্য চট্টগ্রামে যেতে হলো। তাই সকালের নাস্তা খেয়েই সে চলে গেছিলো।

যাওয়ার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো,
~ তোমার জন্য কি আনবো আম্মু?
আমি বলেছিলাম,
~ তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসবা। ব্যস। কিছুই আনতে হবেনা।
ততদিনে আমার সাথে আমার মায়ের সম্পর্ক আগের চেয়ে কিছুটা ভালোর দিকে। বুঝতে পারতো, আসলেই কতটা ভালোবাসতাম। তাই আর এভাবে এতটা অবহেলা করতে পারেনি।

আসলে বড় হচ্ছিলাম তো আস্তে আস্তে, তাই ছেলেমানুষি আবদারগুলোও কমিয়ে দিচ্ছিলাম ক্রমশ। তাইজন্যই খুব দ্রুত আপুর মত ভালো মেয়ের তকমা পেয়ে গেছিলাম।
সেদিন রান্নাবান্নার কাজে আমিও হাতে হাত লাগালাম। আপু তো করলোই।

হঠাৎ করে আম্মু মাঝখান দিয়ে সব ফেলে রেখে উঠে চলে গেলেন।
ফোন এসেছিলো দেখছিলাম।
কথা শেষ হতেই উঠে গেলেন।

তারপর আপু আর আমি মিলেই বাকিটা করলাম।
পুরো ঘর পরিষ্কার করা হতে শুরু করে রান্না, সব আমরাই করলাম।
ততক্ষনে আম্মু গোসল করেছে।
নতুন শাড়িও পড়েছে।
দেখলাম, লিপস্টিক ও দিচ্ছে..
চুল ও ছেঁড়ে দিয়েছে।

সাহস হলো না জিজ্ঞেস করতে, কোথায় যাচ্ছে বা কেন এত সাজগোজ।
আপু আর আমি দরজার কোণে আম্মুকে দেখে কিছুক্ষন বিড় বিড় করে চলে আসলাম।
বিড়বিড়ের বিষয় বস্তু,
কোনো বিশেষ অতিথিই আসছে বোধ হয়..

পর্ব ৭

বিশেষ কোনো অতিথী আসবে আজ।
তানিশা আপু আর আমি মিলে সব কাজ শেষ করে, বসে বসে কিছুক্ষন গল্পগুজব করছিলাম। গোসল করে এমনি সাধারণ, বাসার জামা~কাপড় পড়ে পিঠা~পায়েস খেলাম দুজন। দারুন হয়েছে!
অতিথী তখনও আসেনি।

আম্মুর ও সাজগোজ এখনো শেষ হয়নি।
মিনিটখানেকের মাথায় আম্মু আমাকে ডাকলো। আমি দরজা অবধি যেতেই তার সাথে আমার ধাক্কা লেগে যায়।
সেও এই ঘরের দিকেই আসছিলো।
ধাক্কা লেগে আম্মু শাড়ির আঁচল একটু খুলে নিচে পড়ে যায়, চুল ও খানিক এলোমেলো হয়ে গেছিলো সামনে চলে এসে।

ফলপ্রসূ কটমট করতে লাগলো আমার দিকে তাকিয়ে। ডাকার সাথে সাথে না গেলে আবার রেগে যায় সে। তাই শোনামাত্রই ভোঁ দৌঁড় দিয়েছিলাম। সেও যে এদিক পানেই আসছে, তা তো আর আমি জানতাম না। নাক ছিটকে বললো,
~ দিলি তো সব নষ্ট করে!
গলা কর্কশ করে আবার বললো,
~ এত খুশি কিসের তোর? বেয়াদব, আমার সব নষ্ট করে দিছে।
আমি বিমূঢ় হয়ে বললাম,

~ আমি তো বুঝিনাই তুমিও যে এদিকে আসছো!
~ থাপ্পড় খাবি, আবার মুখে মুখে কথা বলিস!
আমি কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেললাম।
সে কিছুক্ষন স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তারপর শান্ত গলায় বললো,
~ কী পরে আছিস এটা? তোকে তোর বাপ জামা~কাপড় কিনে দেয়না নাকি? যা আলমারি থেকে ভালো দেখে একটা জামা পরে আয়।

আমি মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ আচ্ছা। আম্মু, আমরা কি আজকে কোথাও ঘুরতে যাবো উনি আসলে?
~ না। সে এত জার্নি করে আসবে, আবার ঘুরতে যাবে কিভাবে। নাহ্।
আমি কিছু না বলে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আম্মু তখন আমার মাথার চুল ধরে নাক কুঁচকে বললো,
~ কয়দিন চুল আঁচড়াস না তুই? চুলে তেল দিয়ে আবার গোসল করগে, যা। আর আমার থেকে একটা শ্যাম্পু নিয়ে যাস। ছি:! কি অবস্থা! এত বড় মেয়ে এখনো নিজেকে ঠিক রাখতে শিখেনাই! যখন আমি থাকবো না তখন কী করবি?

বাসায় একটা মানুষ আসবে… এরপরেও এইভাবে আছোস! দেখলে তো কাজের মেয়ে ভাববো তোরে।
তানিশা আপুর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বললো,
~ ঐ দেখ, ঐটা আমার যোগ্য মেয়ে, বুঝলি? একদম আমার মত হইছে। দেখ দেখ, কি সুন্দর করে থ্রি~পিস পরে, ঠিকঠাক হয়ে বইস্যা আছে!
আমাকে আবার গোসল করতে হলো।

সুন্দর জামা পরে চুল ও আঁচড়াতে হলো।
অনেক দিন পর এরকমভাবে একটু ঠিকঠাক করলাম নিজেকে। তাই আম্মুকে দেখানোর জন্য গেলাম। আম্মু সেদিন মুখে হাসি রেখে একজন মমতাময়ী মায়ের মতই বলেছিলো,
~ বাহ্! এইতো সুন্দর লাগছে রাকা। এদিকে আয় দেখি। চোখে কাজল দিবি?
আমি না করতাম। যদি অন্য সময় হতো।

সেদিন আর করতে পারিনি।
আম্মু খুব খুশি ছিলো সেদিন।
আমি দেখতে অত সুন্দর না।
একটু বেশিই মোটা। গায়ের রঙ শ্যামলা।
চুলগুলো বেশি বড় না। কাঁধে পড়ে।

কিন্তু আমার তানিশা আপু একদম আমার বিপরীত। দেখতে একদম আমার আম্মুর মত হয়েছে। ফর্সা, চিকন, লম্বা~ঘন চুল। সব ঠিকঠাক। আর আমি হয়েছি আমার আব্বুর মত দেখতে। আব্বু দেখতে কালো। আমি শ্যামবর্ণ। এইটুকুই কেবল তফাৎ। এজন্যই সবসময় আম্মু আমাকে বাপকা বেটি বলে খোঁটা দেয়।

ছোটবেলায় আব্বু আমাকে আপুর চেয়েও বেশি আদর করতো।
আম্মু বা অন্য কেউ যখন জিজ্ঞেস করতো,
~ এই মেয়ের প্রতি আপনার আদর একটু বেশিই, তাইনা? কেন?

আব্বু তখন এক কথায় উত্তর দিতো,
~ আমার বড় মেয়ে দেখতে ফর্সা~সুন্দর, তাই ও সবার নয়নের মণি। কিন্তু আমার ছোট মেয়ে দেখতে একটু কালো হয়েছে। তাই সে অন্য কারো নয়নের মণি না। সবাই ওকে আদর ও করেনা। এজন্য সবার আদর আমি ওকে একাই দিবো। আমার আদরে আদরেই বড় হবে আমার ছোট মেয়ে। কাউকে আর ওকে ভালোবাসতে হবেনা। আমিই আছি, আমার মেয়ের জন্য। আমার জন্য আমার দুই মেয়েই সমান।

এই কথাগুলো আমি বড় হয়েও অনেকবার শুনেছি। সবার সামনেই সবসময় এগুলো বলে আব্বু।
হয়তো আমার আম্মু আমাকে এজন্যই খুব বেশি একটা আদর করতো না। কারণ আমি তানিশা আপুর বা তার মত দেখতে হইনি। কিন্তু সেদিন আম্মুর এই সামান্য খেয়ালে, আদরে আমার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠেছিলো। খুশির জোয়ার বয়ে যাচ্ছিলো।

আম্মুর কাছে গিয়ে বললাম,
~ দাও আম্মু। কাজল লাগিয়ে দাও।
সে লাগিয়ে দিলো।
প্রথমবার চোখে কাজল দিয়েছি। সে কি কান্না!
টপ টপ করে চোখের পানি পড়ছিলো।
তাই দেখে আম্মু বেদম হাসতেছিলো তখন।

আর বলতেছিলো, ~ হায়রে রাকা… কি হবে তোর..
তারপর আমাকে তার কিছু সাজগোজের জিনিসপত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলো,
~ নে এগুলো এখন থেকে তোর। মাঝেমধ্যে একটু সাজবি। চোখে কাজল লাগাবি। ঠোঁটে রঙ ছোঁয়াবি। এই বয়সে এত নীরস হয়ে গেছিস কেন মা?

আমি কিছু বললাম না। আম্মুর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। চোখ ছল ছল করছিলো। এই তো আমার মা। এটাই তো আমার সেই মমতাময়ী, স্বপ্নের মা।
কতদিন পর এভাবে আদরমাখা স্বরে কথা বলছে।
ইচ্ছা করছিলো জড়িয়ে ধরে চুমো দেই।
আহা আমার আম্মু!

আমি আমতা আমতা করে অনেক ভয় নিয়ে বললাম,
~ আম্মু, আমি তোমাকে একটু জড়ায়ে ধরি? প্লিজ?
আম্মু ঠোঁট উল্টে বললো,
~ ওমা ক্যান? এগুলা দিছি তাই? একটু হেসে বললো, লাগবেনা। তুই যা, শরবত নামা ফ্রিজ থেকে। নাস্তা রেডি কর যা। ও কাছাকাছি চলে আসছে।
আমি আবার বললাম,
~ একটু দিবা না? প্লিজ?

আম্মু তখন বাধ্য হয়ে বিরক্ত নিয়ে অসূয়াপরবশ হয়ে বললো,
~ আচ্ছা আয়। কিন্তু সাবধানে। আমার কিছু যেন নষ্ট না হয়। আর এইসব ঢং, আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগেনা। মনে রাখবি।
~ কিচ্ছু নষ্ট হবেনা আম্মু। আচ্ছা, মনে রাখবো।

বলেই আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম তাকে।
কিন্তু মিনিটের মধ্যেই ছেড়ে দিতে হলো।
দরজার কলিংবেল বাজছে। মামা এসেছে হয়তো।
কলিংবেল বাজতেই আম্মুর মুখ চকচক করে উঠলো। খুশিতে যেন তার আটখানা হয়ে যাবার জোগাড়। সে খুব ব্যস্ত হয়ে গেলো আবার।
দাঁড়িয়ে আছি দেখে আমাকে ধমক দিয়ে বললো,

~ দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা! দরজা খোল গিয়ে। নাস্তা, শরবত যা যা বানিয়েছিস তানিশাসহ সবকিছু আমার রুমে দিয়ে যাবি। হুঁ? আর টি টেবিলটা এখানে আন। আর শুন, সে এখানে আমার ঘরে আসবে। আমি ডাকা না পর্যন্ত এদিকে আর ভুলেও আসবি না তোরা। কেউ আসলে দরজা ও খুলতে হবে না। ঠিক আছে?

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ ঠিক আছে।
আপু দরজা খুলেছে। আমাকে আর খুলতে হয়নি। আপুর লজ্জ্বা একটু কম আমার থেকে।
তাই দরজায় দাঁড়িয়েই তাদের এক দফা কথা হয়ে গেলো।

আম্মুর জেঠাতো ভাই, আমার সম্পর্কে হয় মামা, উনি ভেতরে ঢুকতেই আমি পর্দার আড়াল থেকে আপুকে ডেকে বললাম, টি টেবিল যেন আম্মুর রুমে দিয়ে আসে। ওখানেই সব নাস্তা দিতে হবে। ভাত দেওয়ার কথা বলেনাই। নাস্তা আমি রেডি করছি। তুমি টি টেবিল ওখানে দিয়ে এসে, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আইস্যো।
আপু তাই করলো।

দুজন মিলে সব ঠিক করলাম।
পিঠা~পায়েস, ফল, শরবত ইত্যাদি নিয়ে এখন যেতে হবে।
আপু নিলো কিছু। আমিও নিলাম কিছু।
আপু প্রথমে ঢুকলো।
ঢুকেই সালাম দিলো।

আম্মু পরিচয় করাচ্ছে, এই হলো আমার বড় মেয়ে, তানিশা। ক্লাস সেভেনে পড়ে।
আপুকে মামা এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে শুনলাম।
তারপর আমি ঢুকলাম। লজ্জ্বায় মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে তবুও ঢুকলাম কারণ আমার হাতে গরম গরম পিঠার থালা। দেরীতে গেলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। খেতে ভালো লাগবে না।
আমি ঢুকেই সালাম দিলাম।

তার দিকে এক পলক তাকালাম।
কিন্তু বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারলাম না।
বুকটা ধক করে উঠলো।
এটা কাকে দেখলাম আমি?
লোকটাকে তো আমি চিনি। ইনিই তো সেই আংকেল, সেই অভদ্রোচিত লোক, যার জন্য আমাদের পরিবারে এত এত অশান্তি, এত এত সমস্যা।

আমি চোখ বড় বড় করে আবার তাকালাম।
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললো,
~ হ্যাঁ অনু, এবার তোমার ছোট মেয়েটাকে ও পরিচিত করাও। হাহ্ হা হা। এদিকে আসো রাকা।

আম্মু ও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে বললো,
~ ধুর আজমল, কি যে বলো.. তুমি তো ওকে চেনোই।
আমি একবার আম্মুর দিকে তাকাই,
একবার তাকাই আজমল উদ্দীনের দিকে।
লোকটা আজকে বাড়ি বয়েও চলে এলো?
এত বড় সাহস!

কিন্তু আম্মু তো বলছিলো, আম্মুর জেঠাতো ভাই আসবে। তাহলে ইনি কেন আসলো?
সব তালগোল পাঁকিয়ে আমার মাথা ঘুরে গেলো। তাড়াতাড়ি ট্রে রেখে দৌঁড়ে চলে এলাম।
আমাকে এইভাবে দৌঁড় দিতে দেখে আপুও পেছন পেছন আসলো। আম্মু বলছিলো,
~ এই বদমাইশ, বেয়াদব মেয়ে! তোকে ডাকলো না ও? কথা শুনে যা রাকা, এই রাকা…
তার কথার তোয়াক্কা করলাম না ইচ্ছা করেই।

আমি রুমে এসে নিথর হয়ে বসে আছি আর কাঁপছি অনবরত। না! কোনোভাবেই তার কাছে যাওয়া যাবেনা।
আপু এসে জিজ্ঞেস করলো, কেন এমন করছি। আমি তাকে বললাম,
~ আপু, তোকে বলছিলাম না ঐ লোকটার কথা? ইনিই তো সেই লোক। আজমল উদ্দীন।
আপু তেমন একটা চমকালো না।

তবুও বললো,
~ হায় হায়, বলিস কি! আব্বুও তো নাই ঘরে! তারপর আবার নিজে নিজেই বিড়বিড় করে বললো,
কিন্তু উনি এখন এখানে আসার সাহস করলেন কিভাবে!
আমি আপুর হাত ঝাপ্টে ধরে কেঁদেই দিলাম। বললাম,
~ আপু এই লোকটা কি আজকে আমাদের সাথেই থাকবে?

আপু হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নাড়িয়ে বললো,
~ হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে। আম্মু তো বলছিলো, এক সপ্তাহের জন্য আসবে।
আমি হা হয়ে তাজ্জব বনে গেলাম।

জিজ্ঞেস করলাম,
~ তাহলে এই ইনিই আম্মুর সেই জেঠাতো ভাই? ইনাকে তুই চিনিস আপু?
~ না। তবে তোর কথায় যা বোঝার বুঝছি।
বানানো জেঠাতো ভাই আরকি। দেখলি না, ঘরে নিয়ে গিয়েছে নিজেই। ইনিই সেই লোক, যার জন্য এত আয়োজন। যাক, বাদ দে।
বড়দের ব্যাপার, বড়রাই বুঝবে।

আমি ঠোঁট উল্টে ভ্রু কুঁচকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,
~ আম্মু এতগুলো মিথ্যা বললো আমাদের সবাইকে! আম্মু একটা মিথ্যাবাদী।
আপু থামিয়ে দিয়ে বললো,
~ থাক এইভাবে বলেনা রাকা।

আমি রাগী স্বর নিয়ে বললাম,
~ আব্বুকে এখন ফোন করে সব বলে দেই আপু?
আপু চোখ সরু করে বিরক্তি নিয়ে বললো,
~ উনি এখন কাজে গেছে। তুই এখন অশান্তি বাড়াবি? চিন্তা করবেনা আব্বু? কে জানে, হয়তো আসলেই জেঠাতো ভাই হয় আম্মুর। হয়তো তুই, আমি জানি না। কিন্তু আব্বু চেনে।

আমি দমে গেলাম। কিছু বললাম না আর।
লোকটার সাথে আম্মুর খোশগল্প হচ্ছে।
তাদের হাসি~ঠাট্টার আওয়াজ এখানে ও ভেসে আসছে। আপু সেদিকে কর্ণপাত করছে না। সে একমনে মোবাইল চ্যাটিং নিয়ে ব্যস্ত। আমি খুব সাবধানে পা ফেলে আম্মুর রুমের দিকে গেলাম।

কি করছে / বলছে তারা, খুব জানতে ইচ্ছা করলো।
ক্লাস সিক্সে তো আর একেবারেই কচি খুকি না,
তাই হালকা সন্দেহের বীজ ও দানা বেঁধেছিলো।

রুমের সামনে গিয়ে দেখলাম রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
আজমল উদ্দীনের সাথে আম্মু এভাবে একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে! তাও আবার আমাদের বাসাতেই।

আমি সহ্য করতে পারলাম না। ইচ্ছা করছে এখনি আব্বুকে ফোন দিয়ে সব বলে দেই। এতদিন চুপ ছিলাম, শুধুমাত্র আম্মুর কথা ভেবে। আম্মুকে মারবে, ঘরে অশান্তি হবে এসব ভেবে।
কিন্তু এখন তো ঘরের মধ্যেই আস্ত একটা অশান্তি এসে পড়েছে!
সব দোষ তো দেখছি অনু চৌধুরীর ই!

আমি আবার দৌঁড়ে এসে আপুকে বলি,
~ আপু দেখছিস, আম্মু আর আংকেল ঐ ঘরে দরজা লক করে কি যেন করছে। আচ্ছা, দরজা খোলা থাকলে কী হতো, বল তো?
আপু ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,

~ বড় মানুষদের অনেক পার্সোনাল কথাবার্তা থাকে। বুঝলি? তুই এত টেনশন করিস না।
বলে আমাকে তার ফোন থেকে একটা ছবি দেখিয়ে বললো,
~ দেখতো এইটাকে কেমন লাগে তোর?
সে মুখ হাস্যজ্জ্বল করেই তাকিয়ে আছে আমার উত্তরের প্রত্যাশায়।
একটা ছেলের ছবি দেখা যাচ্ছে।
বাদামী কালারের মধ্যে চেক শার্ট। কলার ঠিক করেনি। বোতাম ও সবগুলো লাগায়নি। মাস্তানদের মত নিচের দিকে বটে বেঁধে রাখছে। চুলের কিছু অংশে হলুদ আর বাদামী কালার করে মাথার উপরে মোরগের ন্যায় ঝুঁটি ও করে রাখেছে,
দেখা যাচ্ছে।

কানে মেয়েদের মত দুল দিয়েছে।
হাতে শিকল আর তাবিজের মত ১০০টা পরেছে!
এসব আমার ভালো লাগেনা।

পাগল~ছাগল ও তো এত ভয়াবহ সাজ দেয়না।
আমি দেখেই কিছু না ভেবে বলে দিলাম,
~ বখাটে, গুন্ডা টাইপ লাগে! কে এটা?
আপুর হাসি মুখ এক নিমিষেই অন্ধকার হয়ে গেলো, আমার মুখের এই তিক্ত কথাগুলো শুনে।
সে আর কিছু বললো না।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
~ কে এইটা বল?

আপু গম্ভীর গলায় বললো,
~ বন্ধু। চুপ, আর কথা বলবিনা তুই।
আমি আবার তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে ছবিটা দেখলাম। বেশিক্ষন দেখতে পারলাম না। আপু টান দিয়ে নিয়ে গেছে আবার।
খুব চেনা চেনা লাগছিলো ছবিটা।

মনে হচ্ছিলো, স্কুলে যেতে বা অন্য কোনো জায়গায় কয়েকবারই এই ছেলেকে দেখছিলাম আমি।
কিন্তু কিছুতেই আর মনে করতে পারলাম না।
দুই ঘন্টার বেশি হয়ে গেলো।
আমাদের এখনো কোনো ডাক পড়েনি।

ডাক পড়লে তবেই দুপুরের খাবারের আয়োজন করতে হবে।
অত:পর আড়াই ঘন্টা পর শোনা গেলো,
“তানিশা, তানিশা… রাকা… কোথায় তোরা? তানিশা মা…”
দুজনেই একছুটে চলে গেলাম।

দেরী করলেই আম্মু রেগে যাবে তাই প্রাণপণে দৌঁড় দিলাম দুজন।
এসে দেখলাম, আম্মু দরজা সবটা খুলেনি।
হালকা একটু খুলেছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, তার চুল এলোমেলো হয়ে আছে। লিপস্টিক ও উধাও। আমাদের দিকে না তাকিয়েই উদাস গলায় বললো,

খাবার গরম করে তোরা তোদের রুমে সব নিয়ে যা, তারপর খেয়ে নে। আর আমাদের জন্য টেবিলে সব রেখে যা।
যা, তাড়াতাড়ি কর।

আমি হা করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ইচ্ছা করছে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে দেই। দেখি লোকটা এখন কি করছে, অথবা পরিস্থিতি দেখে বোঝার চেষ্টা করি, ভেতরে কি হচ্ছিলো এতক্ষন।

পর্ব ৮

আমরা মিসেস অনু চৌধুরী আর তার ছদ্মবেশী জেঠাতো ভাইয়ের খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে, নিজেদের খাবার নিজেদের রুমে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
আপু পোলাও, মাংস সবই নিয়ে আসছে একটু একটু করে। কত বেলা হয়ে গেছে। তার উপর এত এত পদের রান্না, তাই ওর মনে হচ্ছিলো আজ ও একাই সব খেয়ে সাবাড় করে ফেলতে পারবে।

কিন্তু আমার খাওয়া হচ্ছেনা।
এই লোকটা আমাদের সাথে একই বাড়িতে থাকবে, এটা হতেই পারে না।
মেনে নেওয়া তো দূর, সহ্যই করতে পারছি না তাকে। এই লোককে যেভাবেই হোক তাড়াতে হবে আমাদের বাসা থেকে।

এইসব চিন্তায় চিন্তায় কোনো খাবারই মুখে রোচে না আমার।
তবে আমি আমার রাগ ঝেঁড়ে এসেছি একভাবে।
ইচ্ছা করেই তাদের জন্য রাখা খাবারের কিছু তরকারিতে বেশি করে লবণ ঢেলে এসেছি।
খাক, ভালো করে। অনু চৌধুরী খুব রাগারাগি করবে, মারধর ও করতে পারে, সে বিষয় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কাজটা করেছি খুব গোপনে। আপুও টের পায়নি। অতিরিক্ত জেদের বশত আর সামলে রাখতে পারিনি নিজেকে।

এসব ভাবতে না ভাবতেই অনু চৌধুরী এসে হাজির।
আপু মুরগীর রান আর ইলিশ মাছের ডিম, চিতল মাছের পেটি, সবজি ইত্যাদি নিয়ে বসেছে।
খুব মজা করেই সে খাচ্ছে।
আমি শুধু ডাল আর এক পিস মাংস নিয়ে বসে আছি, খাচ্ছি না।
ঠিক তখনই ‘অনু চৌধুরী এসে হাজির হয়েছে। তাকে এখন আর আম্মু ডাকতে ইচ্ছা করেনা।

ভাগ্যিস তার একটা নাম আছে, তাই মনে মনে ঐ নাম ধরেই ডাকতে পারছি।
এসেই দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
~ এই, সবগুলো তরকারিতে এত লবণ দিয়েছিস ক্যান? লবণের বয়াম কি ঢেলে দিয়েছিস নাকি?

তারপর তানিশা আপুর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,
~ ও মা! তুই তো দ্যাখতাছি এক্কেবারে সব খেয়ে কাবার করে দিবি! তোর জন্য এগুলা রান্না করা হইছে? সব নিজেই গিলবি? এগুলা মেহমানের জন্য রান্ধা হইছে না? তুই সব বড় বড় টুকরাগুলা পাতে নিলি ক্যান? জীব লকলক করে খুব, না? আরে বাটি ভরে ও নিয়ে আসছে দ্যাখো দ্যাখো!

তানিশা আপু খাওয়া বন্ধ করে শীতল চাহনিতে তাকিয়ে বললো,
~ ওমা, তুমি এইভাবে বলতেছো কেন? এগুলা আমার খাওয়ার অধিকার নাই?
আম্মু অগ্নিচক্ষু নিয়ে বললো,
~ বাবারে অধিকার খাটাতে আসছে উনি। তো কিভাবে বলবো আপনাকে নওয়াবের বেটি? আফনে একাই সব গিলে ফেললে বাকিরা খাবে কি?

আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম,
~ ডেকচিতে তো সবই পড়েই আছে। ভর্তি সব। এতগুলো রান্না করা হইছে। এরপরে ও এইভাবে বলতেছো কেন?
আপু শান্ত গলায় বললো,
~ তোমার গলা নামাও বুঝলা। ঠিক করে কথা বলো তুমি। খাওয়ার খোঁটা দেওয়া ও শুরু করছো।

বেশি মিল দিয়া চলি দেইখ্যা, বেশি ফেলনা মনে কইর‍্যো না আমাকে। অনেক কিছু বুঝি এখন।
আম্মু আমার কথার ভ্রুক্ষেপ না করে আপুর কাছে গিয়ে তার চুলে হেঁচকা টান দিয়ে বললো,
~ এই কি বললি তুই? গলা নামায়ে কথা বলতে বলছিস আমাকে? তোর এত বড় সাহস? কী বুঝোস তুই? আমারে কথা বলা শিখাস?
দাঁড়া আজকে তোর খাওয়া কেম্নে হয় আমিও দেখি। ফেলনা না কি, বুঝবি হাড়ে হাড়ে। বলে আপুর আঙুল ডুবে থাকা পোলাওভর্তি খাবারের থালাটা টান দিয়ে নিয়ে নিলো সে।
আপু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

অনু চৌধুরী আজ এত বাজে ব্যবহার কেন করছে, সে ভেবেই পাচ্ছে না।
তাই গলা শক্ত করে বললো,
~ সব রান্নাবান্না করলাম আমরা। তুমি সারাক্ষন তোমার সাজগোজ নিয়া পইড়্যা থাকলা। এখন খেতে আসছি। খেতেও দিলা না।

আমার বাপের টাকার খাবার আমি খাবো, তোমার এত আপত্তি কিসের? আমার হক নাই? সত্যিই বেশি বাড় বাড়ছো তুমি। আব্বু ঠিকই বলে।
সে সাথে সাথে কষিয়ে দুটো চড় দিয়ে দিলো আপুর গালে। তারপর আমাদের সামনে থাকা বাটির তরকারিগুলো চেখে বললো,
~ গলা উঁচাস কারে? আমি আগেই বুঝছিলাম, তরকারিতে এত লবণ এমনে এমনে আসেনাই। তোরাই দিছোস। নিজেদেরগুলা আলাদা রাইখ্যা আমাদের গুলায় লবণ ঢাইল্যা দিছোস, যেন আমরা না খেতে পারি। নে, এইবার তোরাও না খাইয়্যা থাক। বদের হাড্ডিগুলা।

সমবয়সী মনে করোস আমারে?
আপু হুট করে শব্দ করে কেঁদে দিলো।
আমি অনু চৌধুরীর হাত টেনে ধরে শক্ত গলায় বললাম,
~ খাইতে ও দিবা না আমাদের, তাই না? এজন্যই আব্বু তোমাকে হেডেক বলে।
সে হাত ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বললো,

~ তরকারিতে বাড়তি লবণ দিলি ক্যান? তুই দিছোস, না? তুই দিছোস? বল্!
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম পলকহীনভাবে।
সে গলা খাকি দিয়ে আবার বললো,
~ হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝছি, তুই ই দিছোস। বুঝছি তো আমি। কারণ তুই তো ওরে অনেক আগে থেইক্ক্যাই সহ্য করতে পারোস না। তোর কোন ক্ষতিটা করছে ও শুনি? কত আদর করে তোরে। এমন করলি ক্যান বল?

আমি অন্য দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম,
~ ঠিক করছি একদম। আবার করবো। কী করবা তুমি..
সে ঝাঁকুনি দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো,
~ ক্যান এরকম করলি বল? আজকে মাইর‍্যাই ফেলমু একদম।

আমি তার দিকে তাকিয়ে সোজাসাপ্টাভাবে সহজ বাংলায় বলে দিলাম,
~ আমার ভালো লাগেনা ঐ লোকটাকে। ঐ লোকটা একটা বেয়াদব। একটা বদমাইশ, পাজি লোক।
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে আর কুলালো না।
একটার পর একটা থাপ্পড় পড়তে লাগলো নাক~ মুখের উপর।
এভাবেই টানা অনেকক্ষন থাপড়াতে থাপড়াতে নিজেই কাহিল হয়ে গেলো।
যাওয়ার আগে বলে গেলো,
~ তুই মরোস না ক্যান? মর তুই, মর। ও খারাপ লোক, বেয়াদব, না? দাঁড়া। আমিও দ্যাখতেছি তোকে।

আপু থামাতে আসলে তাকেও মেরে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।
এরপর আমাদের সব খাবার নিয়ে সে চলে গেলো।
আমার নাক দিয়ে ততক্ষনে রক্ত পড়তে লাগলো। নাকে পলিপ ছিলো। ওটা ফেঁটে রক্ত পড়তেছিলো অবাধে। আমি দম মুখ খিঁচে বসে রইলাম তবুও। নাকটা জ্বলছে, চিন চিন করে সুইঁ ফোঁটানোর মত ব্যাথা করছিলো। কিন্তু কিছুই করলাম না।

আপু আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,
~ রাকা! কিভাবে হইলো এইটা! বলে আমার মুখ টেনে ওর দিকে ফিরিয়ে উত্তেজিত হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন।

তারপর তাড়াতাড়ি সে ব্যস্ত হয়ে টিস্যু নিয়ে এসে নাকে ধরলো। একে একে ৪টা টিস্যু রক্তে ভিজে গেলো। আপুর কি করা উচিত বা উচিত না সে এসব না ভেবেই তাড়াতাড়ি আমার নাক, মুখ মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের ওড়না গরম করে এনে আমার নাকে চেপে ধরলো।

তার মতে গরম কিছু লাগালে ভালো হবে তাই।
রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে ততক্ষনে। নাপা খাইয়ে দিলো যেন ব্যাথা কমে যায়। আমার নাকে ব্যাথা করছিলো কিনা বা কোনোপ্রকার কষ্ট হচ্ছিলো কিনা, কিছুই বুঝিনি। চুপচাপ বসে ছিলাম। রাগেই সব ফেঁটে যাচ্ছিলো।
অনু চৌধুরী আর আজমল উদ্দীন ডায়নিং এ বসে তখন খাচ্ছে। হাসি~তামাশার ও জোয়ার বইছে।

আপু বার বার দৌঁড়াদৌঁড়ি করে তাদেরকে ডিঙিয়েই রান্নাঘরে গেলো। ঔষধের জন্য ড্রয়িংরুমে, এই রুমে সেই রুমে দৌঁড়াদৌঁড়ি করলো।
তারা দেখলো। কিন্তু একবার ও জিজ্ঞেস করলো না, কি হয়েছে বা কেন আপু এরকমভাবে দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে।

আমার হঠাৎ করে মাথাব্যাথা শুরু হয়ে গেলো। প্রচন্ডরকমের ব্যাথা। এত ব্যাথা যে আর সহ্যই করতে পারলাম না। হাত ধুঁয়ে এসে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো আর রাতে।
উঠে দেখলাম, চারদিক শুনশান হয়ে আছে।
শুধু আপুর কথা শোনা যাচ্ছে।

জানালার পাশে বসে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে সে। আমি উঠেই আপুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ আপু ঐ লোকটা কি বাড়ি থেকে গেছে?
আপু মাথা নাড়িয়ে বললো, না।

কিছুক্ষন পর দেখলাম, জানালা দিয়ে আপু কিছু একটা দেখছে। কেউ একজন ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলাম, কাগজে মোড়ানো কিছু একটা আপুর হাতে দিলো। অন্ধকারে তার মুখটা স্পষ্ট দেখা গেলো না। আপু তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তাই চেহারাটা মোটেও দেখতে পারলাম না। বুঝলাম ও না, কে সে।

সে চলে যাওয়ার পর আপু কাগজে মোড়ানো ঐ প্যাকেট আমার সামনে নিয়ে এসে হাসি মুখেই বললো,
~ খুব খিধা লাগছে নারে বোন?
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, না।
ও আদুরে গলায় বললো,
~ লাগছে। আমি জানি। আমি তো তাও একটু খাইছিলাম। তুই তো একটুও খাস নাই। এখন খাবি, আয়।
আমি কিছু বললাম না।

ও দরজা বন্ধ করে প্যাকেট খুলে বসলো।
দুটো বিরিয়ানির প্যাকেট, একটা কোক আর কিছু চকলেট।
আমি হা হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ এগুলা কোত্থেকে পাইলি আপু? কে দিলো?
সে প্রশ্নটার গুরুত্ব না দিয়ে বললো,
~ পাইছি একভাবে। এখন তুই খা।

আমি আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম,
~ জানালা দিয়ে কে আসছিলো আপু?
আপু চোখ বড় বড় করে বললো,
~ রাকা! সবসময় তোর এত প্রশ্নের উত্তর দিতে ভাল্লাগেনা আমার। বন্ধু দিছে। হইছে এইবার?

আর কোনো কথা না। খেতে বলছি, খা।
আমি আর কথা বাড়ালাম না।
আসলেই তো। আপুর তো বন্ধুর অভাব নেই।
নির্বিঘ্নে খেয়ে নিলাম দুজন।

ওয়াশরুম থেকে দুজন ফিরে এসেই দরজা বন্ধ করে দিলাম আবার। আর খুললাম_ই না।
আমি বসে বসে পড়ছিলাম।
আপু শুয়ে শুয়ে কিছু একটা করছিলো।
হঠাৎ দরজায় খট খট আওয়াজ হলো।

আওয়াজ কানে আসতেই আমার শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। কে আসলো এত রাতে!
ঐ লোকটা নিশ্চয়?
আপুও চোখ সরু করে তাকালো দরজার দিকে।
আবার আওয়াজ হলো।

বেশি জোরে না। আস্তে আস্তেই নক করছে।
আমি উঠে আপুর কাছে গিয়ে তার হাত ঝাপ্টে ধরে বললাম,
~ আপু, ঐ লোকটা আসছে বোধ হয়..
আপু বললো,
~ দাঁড়া দেখি আগে, কে..
~ দরজা খুলবি?

~ না। যেই আসুক, দরজা খোলা হবেনা।
তারপর আপু জোর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
~ কে?
কোনো সাড়া~শব্দ এলো না।
আপুও দরজা খুললো না।

তারপর থেকে আর আওয়াজ হয়নি।
আমি আর পড়ায় মনোযোগই আনতে পারলাম না। খুব মিস করছিলাম আব্বুকে। আমার নিজের কোনো ফোন নেই। আপুর ফোন আছে।
কিন্তু আপুকে সারাক্ষনই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়, এই ফোন নিয়ে।
আপুর কথা শেষ হয় সেই ফজরের পর।
ততক্ষনে আমি ঘুমে কাতর।

আপুর কাছে গিয়ে অনেকক্ষন ইনিয়েবিনিয়ে অনুরোধ করলাম, আব্বুর সাথে কথা বলবো।
ভাগ্য ভালো আপুও রাজি হলো।
সে নিজেই আব্বুকে কল দিলো।
ফোন বন্ধ আসছে নাকি।
আমিও ট্রাই করলাম কয়েকবার।
কিন্তু আব্বুর ফোন বন্ধ আসছে বার বার।
আব্বুর ফোন তো কখনোই বন্ধ থাকেনা।

ব্যস্ত মানুষ, কাজের জন্য কত শত গুরুত্বপূর্ণ ফোন আসে তার।
কিন্তু আজকে ফোন বন্ধ আসছে কেন!
রাত বারোটায় আব্বুর কল আসলো।

তখন আমি ঘুমে।
আপু তাড়াতাড়ি তার নিজের ঐ উড়ো কল কেটে দিয়ে আব্বুর কল রিসিভ করলো।
আব্বু খুব কাতর স্বরে বললো,
~ হ্যালো মা। ঘুমায়ে গেছো তোমরা?
আপু বললো,
~ রাকা ঘুমাচ্ছে। আমরা এখনো ঘুমাইনাই।

আব্বু বললো,
~ তোমরা কল দিছিলা অনেকবার, তাই না? আসলে খুব চাপে আছি মা। ফোন বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম তাই। তা, তোমরা ভালো আছো তো? তোমাদের মামা আসছে শুনছি। অনু বলছিলো। কথা বলছো তোমরা?

আপু উত্তর দিলো,
~ ভালো আছি আমরা। হ্যাঁ, কথা বলছি। তুমি কবে আসবা?
আব্বু বললো,
~ এইতো দেখি সব ম্যানেজ করতে পারলে দুদিনের ভেতরেই। আচ্ছা, ঘুমাও তোমরা। এখন রাখি।

আপু বললো,
~ আব্বু দাঁড়াও। রাকা খুব বায়না করতেছিলো তোমার সাথে কথা বলার জন্য। ওর সাথে একটু কথা বলো। আজকে আবার ওর নাক দিয়ে অনেক রক্ত পড়ছে।
আব্বু ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কি বলো! আচ্ছা, ওকে দাও দেখি।

আমাকে টেনে তুললো তারপর।
আমি ফোন কানে দিয়েই ঘুম ঘুম গলায় বললাম,
~ হ্যালো।

আব্বুর কন্ঠ ভেসে আসলো,
~ হ্যালো মা। কেমন আছো তুমি?
আমার অন্তর শীতল হয়ে গেলো আব্বুর কণ্ঠস্বর শুনে। এই বিশাল দুনিয়ায় এই একজনই আমাকে মা বলে ডাকে। আমাকে এত ভালোবাসে।
আর কেউ কি এভাবে ভালোবাসে?

আপন স্যার ও হয়তো বাসে।
কিন্তু তারটা কেমন ভালোবাসা?
আম্মুর মত নকল? নাকি আব্বুর মত আসল?

আমি উঠে বসে ফোন চেপে ধরে ফোনের স্ক্রিনেই কয়েকবার চুমু দিয়ে বললাম,
~ আব্বু.. আব্বু.. ..
~ বলো মা। কেমন আছো? তোমার নাক দিয়ে আবার রক্ত গেছে নাকি?
আমি কান্না জড়ানো গলায় বললাম,
~ আব্বু আমি ভালো নাই। আব্বু, তুমি কবে আসবা? কালকে চলে আসো না প্লিজ।
~ আসলামই তো আজকে সকালে। আগামীকাল কিভাবে আসবো মা? ভালো নাই কেন তুমি? রাতে কী খাইছো?

~ রাতে বিরিয়ানি খাইছি। তুমি?
~ আমি ভাত, মাছ খাইছি মা।
~ তুমি কালকেই চলে আসো আব্বু।
~ আমি ব্যবসার কাজে আসছি রে মা.. আরো দুই, তিন বা আরো বেশি ও লাগতে পারে… তুমি ঔষধ খাইছো তো? তোমার আম্মু খাওয়াইছে নিশ্চয়। তোমার আম্মু আমাকে বললো না কেন বিষয়টা!

আমি রাগী স্বরে বললাম,
~ আম্মুর এতকিছু দেখার সময় নাই তো। জানেও না উনি। দুপুরে তো খেতেও দেয়নাই, জানো? আমার আর আপুর সামনে থেকে খাবারের থালা নিয়ে চলে গেছে।
আব্বু গম্ভীর স্বরে বললো,
~ কি! কেন? কই এসব কিছুই তো আমাকে বলেনি অনু! আমি শুনছি, তোমরা নাকি দুষ্টামি করছো খুব। খাবারে লবণ ঢেলে দিছিলা, কথা শুনোনা তোমাদের আম্মুর। এরকম কেন মা?
আমি আরো গম্ভীর স্বরে বললাম,

~ আব্বু আমার ঐ আংকেলকে ভালো লাগেনা। এজন্য উনার খাবারে লবণ দিয়ে দিয়েছি বেশি করে। ঐ আংকেল তো খুব বাজে।
~ এরকম করতে হয়না! বাজে কেন হবে? তোমার মামা হয় না? তুমি তো এটা ভালো করোনি একদম।

আমি বললাম,
~ জানি ভালো করিনি। এজন্যই তো মার খাইছি ইচ্ছামত। মার খেতে খেতে নাকের পলিপ ও ফাঁটায়ে দিছে তোমার বউ।
এখন তুমিও আর কথা শুনাইয়োনা। এটার জন্য শাস্তি পাইছি আমরা।
আব্বু গলা নরম করে বললো,

~ অনুকে আমি বার বার নিষেধ করে আসছি না মারতে। আমি আগামীকাল ফোন করে ওকে প্রচুর বকা দিয়ে দিবো মা। এখন ঘুমাও তোমরা। রাখি।
আমি শক্ত গলায় বললাম,
~ তুমি আম্মুকে বিয়ে করছো কেন আব্বু? আর কোনো মেয়ে ছিলো না?
আব্বু এবার হাসলো।

অস্ফুটস্বরে বললো,
~ আমার ভাগ্যে যে তোমার আম্মুই ছিলো। তাই!
বাবা, এখন রাখি। ঘুমাও তুমি। গুড নাইট।
আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠলাম,
~ না দাঁড়াও! আমি আরো কথা বলবো। আব্বু আম্মু আমাদের একটুও ভালোবাসে না। আর ঐ আংকেলকে আমি আগে থেকেই চিনি। এই লোকটা একদম ভালো না।
আব্বু ততক্ষনে ফোন কেটে দিয়েছে।

আরেকটু কথা বললে কী ক্ষতি হতো?
না, সে এখন চিন্তা করবে।
কিন্তু আমাদের চিন্তায় ফেলবে না।
জানি আগামীকাল অনু চৌধুরীকে সত্যিই খুব বকবে। কিন্তু এর ফল হবে খুব খারাপ।
ঐ মহিলা আবার এসে, হিংস্রভাবে আমাকে মারবে।
আব্বু তো এসব জানেনা।

কারণ আব্বুর সামনে তো সব ঠিকঠাক।
তাই জানালেও তেমন গুরুত্ব দিবে বলে বলে মনে হয়না।
কারণ ছোটদের কথায় এত গুরুত্ব দিতে নেই।
এবার সে যতই সত্য বলুক।
আমি আবার ফোন দিলাম।

আব্বু ফোন ধরে বললো,
~ ঘুমায়ে যাও। আমি আগামীকাল অনুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করবো, এত বড় সাহস সে কেন দেখালো, আমার মেয়েদের কেন মারলো, কেন খাবার নিয়ে গেছে, এসব নিয়ে খুব বকবো। এখন আমার খুব মাথাব্যাথা করছে মা। ঘুমাবো এখন। রাখি।
বলেই রেখে দিলো।

আমি হ্যালো ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না। খুব অভিমান হলো। যদি সব জানতাম তাহলে হয়তো অভিমান হতোনা। কষ্ট লাগতো।
কিন্তু আব্বু তো আমাদের কাউকেই কিছু বলেনি।
বললে বুঝতাম, বোঝার চেষ্টা অন্তত করতাম।

সে একাই সব সয়ে যাচ্ছিলো।
বিরাট বিরাট পাহাড়সম দুশ্চিন্তাগুলো একা একাই পোহাচ্ছিলো আর অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ।
দিনকে দিন ভেঙে পড়ছিলো।

আব্বুর ব্যবসায়িক কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিলো তখন। তার কয়েকটা জায়গায় শুধু লোকসান হচ্ছিলো। কয়েকজনের সাথে শেয়ারে কোনো একটা ব্যবসা শুরু করে ধোঁকা ও খেয়েছিলো। বিশ্বস্ত বন্ধুগুলোই ধোঁকাটা দিয়েছে।
ফলস্বরুপ, লাখ লাখ টাকা টাকা জলে গেছিলো।

ব্যাংকের টাকাও অপরিশোধিত ছিলো, যেহেতু বিপুল পরিমাণ লোন নিয়েই বন্ধুদের বিশ্বাস করে নতুন ব্যবসা শুরু করেছিলো। তাই ব্যাংক ও লোন দিচ্ছিলো না। ওখানে কোনোভাবেই কোনো সুরাহা করতে পারছিলো না বলে নতুন, পুরাতন ব্যবসাগুলোও দাঁড় করাতে পারছিলো না কোনোভাবে। আর এত বিপুল অর্থ কেউ সহসা ধার ও দিতে চাচ্ছেনা। আত্মীয় ~স্বজন বলতে ভালো অবস্থায় তেমন কেউ নেই ও।

যারা আছে তারা আব্বুকে জানে~প্রাণে হিংসা করে।
তার চিন্তার পাল্লা ক্রমশ ভারি হয়ে যাচ্ছিলো সেই মুহূর্তে।
তার উপর আবার আমি সব গড় গড় করে বলে দিয়েছি। আব্বু কখনো আমাদের মারার পক্ষে না। সে সবসময় অনু চৌধুরীকে বলতো,
“বাচ্চাদের মেরে কখনো কিছু শেখানো যায়না। ওদের শেখাতে হয় আদর~স্নেহ~ভালোবাসা দিয়ে।”

আমার সব অভিযোগ সে কড়ায় গন্ডায় উসুল করবে জানি।
কিন্তু সে তো বুঝবে না,
সে দূরে আছে এখন। আমাদের কাছে নেই।
তাই সে যতটা কঠোর হবে ওখান থেকে,
তার চেয়ে বহুগুন কঠোরত্বের স্বীকার হবো আমরা।
এখানে থেকে।

আপু চোখ গরম করে বললো,
~ তুই এসব বলতে গেলি কেন? এখন কালকের মার খাওয়ার জন্য আবার তৈরী হ। গাঁধা।
আমি হাসলাম। আমি ও প্রস্তুত, মার খাওয়ার জন্য। আব্বুর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েই বললাম,
যার কথা ভাবার জন্য পৃথিবীতে কেই নাই, তার এভাবে মার খেয়ে খেয়ে মরে যাওয়াই উচিত।

পর্ব ৯

পরের দিন সকালে উঠে আর কিছুই করতে পারলাম না। উঠেই দেখলাম এক পাশে আপু বসে আছে। আর অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে অনু চৌধুরী। আপুর চোখ ছল ছল করছে আর অনু চৌধুরীর চোখে সামান্য মায়া মায়া ভাব লক্ষ্যার্থ।

আমি চোখ খুলতেই আপু তাড়াহুড়ো করে এসে বললো,
~ রাকা, এখন কেমন লাগতেছে তোর?
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
~ কেন? কেমন লাগবে আবার? ভালোই।

আমার গায়ে জ্বর। সারা রাতই নাকি জ্বর ছিলো। আপু খেয়াল করেছে ফজরের সময়। গায়ে হাত পড়তেই সে হকচকিয়ে যায়। সকাল হতেই অনু চৌধুরীকে ডাকতে যায় কিন্তু সে দরজা খুলেছে কিছুক্ষন আগে।

দরজা খুলেই আপুকে চোখ গরম করে জিজ্ঞেস করছে, কী চাই? সকাল সকাল ঘুম নষ্ট করলি ক্যান?
আপু বলছিলো,
~ আম্মু রাকার গায়ে খুব জ্বর।

আম্মু উদাস গলায় উত্তর দিয়েছিলো,
~ পানিপট্টি দে, ঔষধ খাওয়া মহারাণীকে। আমার কাছে আসছোস ক্যাঁন? মহারাণীর তো আমারে পছন্দ হয়না। আমি এখন যাবো ক্যান?

আপু বলে,
~ খাওয়াইছি প্যারাসিট্যামল। কমে না তো। সেই চারটার সময় খাওয়াইছি। মাথায় পানিও দিছি। কমেনা তো আম্মু।
~ আরে কইম্যা যাইব্যো। ঔষধের রিএকশন তো হইতে দিবি? যা আমার জন্য এক কাপ দুধ চা বানায় আন তানিশা। আর এক কাপ রং চা ও দিবি। পিঠা আর ব্রেড রেডি কর। মেহমানের নাস্তা দিতে হবে তো।

~ রাকাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে না?
ওর জন্য কী নাস্তা বানাবো?
~ ডাক্তার দেখাইবো সামান্য জ্বরের জন্য? এমনি সাধারণ জ্বর, ডাক্তার লাগবোনা। আর ওর এহন জ্বর। যা খাইবো সবই তিতা লাগবো। ওর জন্য এখন নাস্তা বানানো লাগবো না। জ্বর কমুক। তুই তোর আংকেলের নাস্তাটা আগে রেডি করে দে।

আপু অনু চৌধুরীর রুমের ভেতর উঁকিঝুঁকি দিতে দিতে বলে,
~ উনি কোথায় এখন আম্মু?
সে খুব বিরক্তির চোখে বললো,
~ তার খোঁজ নিয়া তোর কী হইবো? বাথরুমে গেছে।
~ আংকেল রাতে কই ঘুমাইছিলো?

~ ক্যান? তোর কাছে সব জবাবদিহি করা লাগবো? তোর মামারে জিগাইস।
~ গতকাল রাতে তুমি দরজায় টোকা দিছিলা?
~ আমি! আমি তোগো দরজায় টোকা দিতে যামু ক্যান?
~ তাহলে কে দিচ্ছিলো?

~ ভূতে। বকবক কইর‍্যা মাথা খাইস না। যা তো এখন। সে আইস্যা পড়বে। নাস্তা রেডি করগে, যা।
তানিশা আপু এবার খানিক আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ ইনিই কি উনি যে আমাকে মোবাইল ফোন কিনে দিছিলো?
~ হ। ইনিই তিনি। নইলে আমি অত টাকা পামু কই? তোর কথা বলতেই পরের দিন ফোন নিয়া আইস্যা হাজির! তোদের বড্ড বেশি ভালোবাসে লোকটা।
কথাটা শুনেই সে গলে একেবারে জল হয়ে গেলো। সব রাগ~কষ্ট ধুঁয়ে~মুছে একাকার!
জিজ্ঞেস করলো,

~ এইবার আর কিছু আনেনাই আম্মু?
~ কী আনবো? তোর কিছু লাগবো? লাগলে তারে গিয়া বল। দেখ, আইন্যা দেয় কিনা।
আপুর এবার খুশিতে চোখ মুখ চকচক করতে লাগলো। তব্ধা খেয়েই জিজ্ঞেস করলো,
~ যা চাইবো, তাই দিবে আম্মু?
~ চাইয়্যাই দেখো না মা।

~ আচ্ছা! ঠিক আছে! তো, কী কী খাবে আংকেল? রুটি করবো?
~ না। তার সময় নাই এখন। তুই তাড়াতাড়ি পিঠা নামা। এক কাপ দুধ রেডি রাখিস। ব্রেড, জেলি, কলা সামনে আইন্যা রাখিস। যেটা ইচ্ছা হবে ঐটাই খাবে। বড়লোক মানুষ, কি খায় না খায় জানি না তো। বুঝোস না!

আপু আর তর্ক করলো না।
মাথা নাড়িয়ে সে খুশি মনে দৌঁড়ে চলে গেলো নাস্তা বানাতে।
তার অনেক অনেক কেনাকাটা জরুরি হয়ে আছে। কিন্তু আব্বু তাকে হাত খরচের বাইরে খুব বেশি টাকা দেয়_ই না।

আর চাইতে গেলে ও দেওয়া লাগে হাজারটা কৈফিয়ত। এত কৈফিয়ত দিতে কার ভালো লাগে?
কত রকমের দরকারি কাজই তো থাকতে পারে।
কিন্তু না! হাজারটা প্রশ্ন করে বসবে সে।
সব কি বলা যায় নাকি!
সে অনেক বড় হয়েছে এখন।

তাই সে ভাবছে, আংকেলের কাছেই বরং চেয়ে নেওয়া যাক। সে দিলেই সবকিছুর একটা সমাধা হবে। দিলে তো আর কম দিবেনা!
টাকাটা খুব জরুরিভিত্তিক হয়ে পড়েছে যে!
সে নাস্তা বানিয়ে টেবিলে রাখতে যাবে তখনই আওয়াজ পেয়ে ছুটে আসে আমাদের রুমে।
বমি করে সব ভাসিয়ে দিয়েছি আমি।

আওয়াজ হয়েছে বেশ জোরেই।
বমি করেই আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়েছি। গায়ে কোনো শক্তি নেই। দিন~দুনিয়ার কিছুই কান বা ব্রেইনে পৌঁছাচ্ছেনা। আবার শুয়ে পড়েছি।
আওয়াজ যেহেতু জোরেই হয়েছে তাই অনু চৌধুরী ও ছুটে এসেছে।
আর না বোঝার ভাণ করে থাকতে পারলেন না। এসে কিছুক্ষন ইচ্ছামত বকাঝকা করে আপু আর সে মিলে সব পরিষ্কার করেছে।

তারপর আজমল উদ্দীনকে নিয়ে খেতে বসেছে। লোকটা বাইরে যাবে। ফিরবে বিকেলের দিকে। অনু চৌধুরী তাকে বিদায় দিয়ে এসে এখন আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি চোখ মেলতেই আপু জিজ্ঞেস করলো কেমন লাগছে, তারপর অনু চৌধুরী জিজ্ঞেস করলো,
~ এখন কেমন লাগতেছে তোর?

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ বললাম তো, ভালো।
সে আবার বললো,
~ কী খাবি বল। নুডুলস খাবি তো? জ্বর তো ছাড়ছে।
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
~ কিছু খাবো না।

~ কিছু খাবি না মানে? সুস্থ হইতে হইবো না? নাকি এমনেই শুয়ে বসে কাজকাম বাদে খাবি আর মানুষ খাটাবি? কার এত সময় পইড়্যা আছে তোর জন্য? আমাদের তো নিজস্ব কাজ~কারবার আছে। নাকি?
আমি কিছু বললাম না।

এমন সময় ফোন এসেছে অনু চৌধুরীর।
ফোন আসতেই সে খুশিতে গদগদ।
ভাবলো প্রিয় মানুষটার ফোন এসেছে বুঝি।
বাসা থেকে যেতে না যেতেই লোকটা তার অভাব অনুভব করা আরম্ভ করেছে।
কিন্তু না!

ফোন করেছে তার বিরক্তিভাজন স্বামী মহাশয়, আজিজ।
ফোন ধরার জন্য সে নিজের রুমে রওনা হওয়ার আগে তানিশা আপুকে বলে গেলো,
~ রাকা কী খাইতে চায় দেখ। তারপর বানিয়ে খাওয়া। আমি গেলাম। বলে চলে গেলো।
ফিরেছে ঘন্টাখানেক পর।
ততক্ষনে আমি উঠে বসেছি।

জ্বর বেশি নেই।
তবে শরীর হালকা লাগতেছে।
অনু চৌধুরী আমার রুমে এসেই জিজ্ঞেস করলেন,
~ কী ব্যাপার মহারাণী? বাপের কাছে কী কী নালিশ করলেন আমার নামে? আপনের বাপ আমার উপর এত চটে আছে ক্যান?

আমি একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
সে আবার বললো,
~ ঐ বল, কী বলছোস তারে? আমারে এইভাবে গালাগাল করলো ক্যান ঐ ইতরের বাচ্চা? ঐ হারামজাদা কী ভাবছে আমার আর যাওনের জায়গা নাই? …
.
আপু আর আমি তড়াক চোখে তাকালাম তার দিকে, এরকম বিশ্রী ভাষা শুনে।
সে এসব কী ভাষা ব্যবহার করছে আমাদের সামনে!
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
~ তুমি আব্বুকে একদম গালি দিবানা বললাম।

সে আরো এক ধাপ গলা উঁচায়ে বললো,
~ তোরে আমি এমনে এমনে মারছি? তুই দুষ্টামি করবি আমি শাসন করমুনা? তোর বাপের আসলে আমার কোনো কিছুই সহ্য হয়না। পোলাপাইন মানুষ হয় এমনে এমনে? না মাইর‍্যা কিছু শেখানো যায়? আমারে এতগুলা কথা শুনাইলো তোরে মারার জন্য!
আমরা কেউই কিছু বললাম না।

সে আমাদের দিকে ঝুঁকে এসে বললো,
~ খালি আমিই খুব খারাপ। তাইনা রে?
তা বল তো, তোদের ভালো বাপ এতদিন আটকাইয়া আছে ক্যান ঐ জায়গায়? দুইদিন পর পর ঐখানে ক্যান যায়? হুম? ওইখানে কিসের এত কাজ তেনার?
তানিশা আপু বললো,

~ কারণ ওখানে আব্বুর ব্যবসা আছে। তুমি ভুলে গেছো নাকি আম্মু?
অনু চৌধুরী নাক ছিঁটকে বললো,
~ না রে না। তোর বাপের ঐখানে শুধু ব্যবসাই না। আরো অনেক কিছুও আছে।
তানিশা আপু জিজ্ঞেস করলো,

~ তুমি কিভাবে জানো? আর কী আছে ওখানে?
সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো,
~ এগুলা জানোনের লাগি বুদ্ধি লাগে তানিশা, বুদ্ধি। খালি তোরা আছোস দেইখ্যাই আমি এই বদ~লোকটার সংসার করতেছি।

নয়তো কবেই চইল্যা যাইতাম।
আমার কী যাওনের জায়গার অভাব আছে রে? ক? আছে? আমার মত মহিলাদের বিয়া হওনডা কি কোনো ব্যাপার আজকাল? আর আমার কোনটা কম আছে, চাইলে আমিও আজকেই বিয়ে করতে পারি।

আপু কিছু বললো না।
আমাদের সামনেই অবলিলাক্রমে মুখে যা আসছে তাই বলে যাচ্ছে মানুষটা!
আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম,

~ ঐ লোকটাকে আমাদের বাসায় আনলা কেন তুমি? ঐ লোকটার সাথে থাকো কেন তুমি? আমি যে বার বার বলছি, ঐ লোকটা ভালো না। আমার কথা কি তোমার বিশ্বাস হয়না তোমার, আম্মু? কী করলে বিশ্বাস করবা?

অনু চৌধুরী বললো,
~ ঐ লোকটাকে কেন আনছি? বড় হ। একদিন বুঝবি। তোর বাপের যেমন আরেকজন লাগে, আমার ও তেমন লাগে। আমি মেয়ে দেখে কি ফেলনা নাকি? তোর বাপের চেয়েও ভালো কাউরে আমি আমার জীবনে আনতে পারি। বুঝুক সে।

তানিশা আপু নাক~মুখে হাত নিয়ে অনু চৌধুরীকে টেনে ধরে বললো,
~ আম্মু, ঐ রুমে চলো… রাকা আবার এগুলা ডেলিভারি করে দিতে পারে আব্বুর কাছে!
সে এখন তালে তাল মেলাচ্ছে।

কারণ তার প্রচুর টাকা চাই।
আর টাকা পেতে হলে তো আসল জায়গায় ভালো থাকতে হবে।
অনু চৌধুরী বললো,

~ করুক করুক। আমি কাউরে ভয় পাই নাকি?
আমি একবার অসহায়ের ভঙ্গিতে বললাম,
~ তুমি আমাদের সাথে আর থাকতে চাও না। তাইনা আম্মু?
অনু চৌধুরী এবার মলিন মুখে বললো,

~ না। চাইনা। না পারতে থাকতেছি। না পারতে। আমার যদি সাধ্য থাকতো, তোরা যদি না থাকতি, তাইলে কবেই চইল্যা যাইতাম। এই সংসার আমার কাছে নরক নরক লাগে। বুঝলি?

আমি শক্ত গলায় বললাম,
~ তাহলে চলে যাও না। আর ঐ লোকটাকেও তোমার সাথে করে নিয়ে যাবা। তুমি কিন্তু আবার ফিরে আসবা আম্মু। কিন্তু তাকে কক্ষনো নিয়ে আসবা না। আসবা না আর আম্মু? আমাদের ছাড়া থাকতে পারবা তুমি?

সে এবার খুব কৌতূহলী হয়ে আমার কাছে এসে ঝুঁকে বসলো। জিজ্ঞেস করলো,
~ আচ্ছা তুই আমাকে বলতো, তুই কেন ওকে সহ্য করতে পারিস না? এত আদর করে তোকে তাও কেন!

আমি বললাম,
~ এমনিতেই করি না। তাছাড়া এই লোকটা আমাকে কোলে নেওয়ার সময় সারাক্ষন শুধু ব্যাথা দেয়।

অনু চৌধুরী সামান্য ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
~ ক্যাম্নে ব্যাথা দেয়?

~ জোরে, শক্ত করে ধরে রাখে। আমি তখন ব্যাথা পাই খুব। ঐদিন বাসে চুমো দিয়ে সব ভিজিয়ে ও দিছিলো। ইয়াক! জানো?

অনু চৌধুরী হেসেই দিলো এবার।
তারপর শান্ত গলায় বললো,

~ আরে শক্ত করে ধরে দেখেই তো তুই পড়ে যাস না কোল থেকে। তুই যা তিড়িংবিড়িং করিস, তাই শক্ত করে ধরে রাখে, যাতে পড়ে না যাস।

তো তুই এটা ওকে বললেই তো হয়। এত ঘৃণা থাকবেনা দেখবি। ও মানুষ হিসেবে খারাপ না রে। তোর আব্বুর মতই তোদের ভালোবাসে। আর চুমো দিতে গেলে একটু তো লালা পড়েই। ধুঁয়ে ফেললেই তো চলে। তোকে কি জীবনেও কেউ চুমো দেয় নাই নাকি?

আমি আবার বললাম,
~ না হয়না! না, এভাবে কেউ চুমো দেয়নি। আর ওকে একদম আমার আব্বুর সাথে তুলনা করবা না। খবরদার।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।

তারপর তানিশা আপুর দিকে তাকিয়ে ওকে শোনার আহ্বান করে বললো,
আচ্ছা এখন শোন তোরা,

আজকে বিকেলে আজমল আমাদের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। জাদুঘর, চিড়িয়াখানায়। আরো অনেক জায়গায় যাবো আমরা। রাকা, তুই এখন খেয়ে নে। আর বিকেলে রেডি থাকিস তোরা, হুম?
আমি বললাম,
~ আমি যাবো না কোথাও।

আপুও একই কথা বললো কারণ ওর কোথাও কোনো বিশেষ কাজ আছে।
আমাদের আগ্রাহ্য শুনে অনু চৌধুরী এবার কড়া গলায় বললো,
~ দেখ আমি তোদের মা। তোদের বাপের সাথে আমার যাই হোক, তোরা তো আমার পেটের সন্তান। আমাকে বার বার এভাবে চটিয়ে দিস না। কথার অবাধ্য হোস না বার বার। তোরা জানোস আমি এক কথার মানুষ। আমি তোদের ভালো রাখতে চাই। ঘুরে আসবি, মন ভালো হবে, এখানে আপত্তি কিসের?

একটু থেমে আবার বললো,
~ আজমল শখ করে বলছে, আমাদের তিনজনকে নিয়েই সে জাদুঘরে, চিড়িয়াখানায় যাবে। আরো অনেক অনেক জায়গায় নাকি ঘুরে আসবে। এরকমভাবে কে করতে চাইবে বল? কে নিতে চাইবে নিজ খরচে? তোর বাপে ও তো জীবনে বলেনাই।

আমি বললাম,
~ আমরা নিজেরাই তো ঘুরে আসতে পারি। উনি না নিলেও বা কি? আমরা যেতে পারিনা? আব্বু আসলে আমরাও যাবো আম্মু। আব্বুকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। ডান?
অনু চৌধুরী দাঁত গিজগিজ করতে করতে বললো,

~ রাকা, মুখে মুখে একদম তর্ক করবি না একদম। ইশ, আব্বুর সাথে যাবে! ঐ লোক জীবনেও এসবে রাজি থাকেনা। তার শুধু কাজ আর কাজ। আর তোর আব্বু তো শোনার আগেই বলবে, দরকার কি এসবের, বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসো বরং। তোদের ঐ নোংরা বাড়ি, তোর ঐ জঘণ্য দাদি, আমার দুই চোখের বিষ।

জীবন থাকতেও আর যামুনা ওইহানে।
মরণ হোক আমার, ঐ বাড়ি যাবার আগে।
আমি যা বললাম, তাই ফাইনাল। বিকেলে রেডি থাকবি। আমরা প্রথমেই জাদুঘরে যাবো।
তানিশা আপু এরকম ঘুরাঘুরি একা একা করতে বেশি পছন্দ করে। ফ্যামিলির সাথে সে কোথাও যেতে সহসা রাজি হয় না।

তবুও কেন যেন আজ সে বলে উঠলো,
~ আচ্ছা আম্মু, সিনেমা~হলে গেলে কেমন হয় বলো তো?
অনু চৌধুরী তানিশা আপুর আগ্রহ দেখে খুশি হয়ে গেলেন। হাসিমুখে আপুর গালে হাত বুলিয়ে, চুমো খেয়ে বললেন,

~ আচ্ছা তুই তোর আংকেলকে এই প্রস্তাব দিস। না করবে না, দেখবি।

কথাটা বলেই অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ গোমড়া করে বললো,
~ কিন্তু তোদের বাপ হলে তো ঠিকই না করে দিতো। বলার আগেই না করে দিতো। আমি সিউর। একটা নীরস লোকের সাথে বিয়ে দিছে আমার মা। আমার জীবনটাই শেষ।
আমি বললাম,

~ কেন আব্বু ও তো আমাদের নেয়। আপুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
কি আপু? নেয়না?

আপু শুকনো মুখে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
~ কবে নিছিলো তোর মনে আছে? কয় বছর আগের কথা? আমার তো মনেও আসেনা কবে নিছে।

আমি কিছুটা আঘাত পেয়েই বললাম,
~ আব্বুকে বলে দেখলেই তো দেখতি নেয় কিনা..
গত বছর ও তো গেলাম চন্দ্রীমা উদ্যানে, পার্কে.. মনে নাই তোর?
~ ধুর। ঐগুলা তো আসতে যাইতে কতই দেখি। ঐগুলা কি দেখার মত কিছু নাকি?
অনু চৌধুরী আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারলেন না।

উঠে যেতে যেতে বললেন,
~ এই তানিশা, ও না গেলে না যাবে। এত জোরাজোরি করার দরকার নাই। ওর আব্বু ওরে মরার আগে যখন নিবে, তখন ই ও যাবে। যাক। তুই আর ওর সাথে তর্ক করিস না। বিকেলে রেডি হয়ে থাকিস তুই। আমরা তিন জন যাবো।
মহারাণী বাসায় একা থাকবে।

আপু হাসি হাসি মুখ করে আজ্ঞাবহ উত্তর জানিয়ে বাইরে চলে গেলো, তার বিশেষ কোনো দরকারে।

আমি বসে রইলাম একা একা।
আপন স্যারের দেওয়া পুতুলটা বের করে কিছুক্ষন কথা বললাম ওটার সাথে।
আপন স্যারকে ফোন দিতে ইচ্ছা হলো খুব।
তার নাম্বার তো নেই। হঠাৎ মনে পড়লো, একদিন সে নিজেই তার নাম্বার লিখে দিয়েছিলো আমার নোট খাতায়।

কিন্তু ঐ খাতাটা কোথায়?
খুঁজে বের করতে হবে!
আমি প্রাণপণে লেগে পড়লাম, খোঁজার কাজে।
অবশেষে নোট খাতা আর তার নাম্বার দুটোই জোগাড় হলো।
কিন্তু ফোনটা জোগাড় হলোনা। আমার তো ফোন নেই। অনু চৌধুরী ছাড়া বাসায় আর কেউ নেই। বাসার এক্সট্রা ফোনটাও তার রুমেই পড়ে থাকে।

আমি অতি সন্তপর্ণে তার রুমের দিকে রওনা হলাম।
রুমের কাছাকাছি যেতেই শুনলাম তার ফোনের কিছু আলাপন।
“আজমল, বাসার কাজটা কবে সারবা? বেশি দেরী করা যাবেনা কিন্তু, সব কাজ আগে আগে করে রাখতে হবে। তানিশার আব্বু কখন এসে পড়ে কে জানে। তুমি কতদিন থাকবা এখানে? ফ্ল্যাট দেখছো তো? কয় রুমের? বারান্দা আছে তো? ঐ টাকাটা তো তোমার কাছেই না?”

ইত্যাদি সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনতে পেলাম। কিছুই বুঝলাম না। বোঝার মত বয়সই হয়নি তখন। কিংবা বুঝতেই চাইনি।
আমি তার রুমে ঢুকে টুপ করে এক ফাঁকে ড্রয়ার থেকে ফোনটা নিয়ে নিলাম।
সে একমনে কথা বলে যাচ্ছে।
আমি ফোন নিয়েই ভোঁ দৌঁড় দিলাম।

তারপর আপন স্যারের নাম্বারে ডায়াল করলাম। কি ভাগ্য! ডায়াল করতে না করতেই রিসিভড!
~ হ্যালো, কে?
~ স্যার… আমি রাকা…
~ ও। কী খবর তোমার? সব ঠিকঠাক?
আমতা আমতা করে বললাম,
~ মোটামুটি।

~ মোটামুটি কেন? তোমার শরীর ঠিক আছে তো? গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
~ আমার জ্বর আসছিলো রাতে। এখন ভালো আছি। আপনি?
~ আচ্ছা.. আমি আছি কোনোরকম। কিন্তু রাকা, আমার মনে হচ্ছে, তোমার শরীর খুব দূর্বল। তোমার আব্বু কই?
~ আব্বু চট্টগ্রামে।

~ তারমানে তুমি তোমার আম্মুর সাথে একা আছো বাসায়?
~ হুম।
~ হোয়াট! কোথাও নিয়ে যায় এখন?
~ না। তবে আজকে মনে হয় নিয়ে যাবে।
~ কোথায়? কার সাথে?

~ ঐ লোকটার সাথেই। স্যার আপনি কাউকে কিছুই বইলেন না। আম্মু আমাকে খুব মারবে, যদি জানে আমি আপনাকে এসব বলছি।
~ বলবো না। কিন্তু তুমি আগে সবটা খুলে বলো..
~ আসলে আমার একটু ও ইচ্ছা করেনা ঐ লোকটার সাথে কোথাও যেতে…
~ কোন লোক? বাসের ঐ লোকটা?
তখনই অনু চৌধুরী এসে হাজির।

~ কার সাথে কথা বলছিস? এই মেয়ে! কার সাথে আবার বেজাল পাকাচ্ছিস বেয়াদবের বাচ্চা?
বলে ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিজের কানে নিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
~ হ্যালো কে? কে আপনি?

স্যার হয়তো বুঝতে পেরে তখনই ফোনটা কেটে দিয়েছে।
অনু চৌধুরী রাগে কটমট করতে করতে,
তুমুল রাগের বশীভূত হয়ে, ফোনটা আছাড় মেরে ফেলে দিলো ফ্লোরে। ফোনটা পার্টে পার্টে খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো চারপাশে।

আমার চুলের মুঠি ধরে আবার জিজ্ঞেস করলো,
~ কার সাথে কথা বলছোস বল? কার কাছে সব বলে দিছোস? ঐ শয়তানের বাচ্চা।
আমি গলা কাঁপাতে কাঁপাতে বললাম,
~ আম্মু এইটা আমার বান্ধবী… তিথী ওটা। ও জিজ্ঞেস করতেছিলো আমি স্কুলে যাইনি কেন আজ…
অনু চৌধুরী বোধ হয় কথাটা বিশ্বাস করেনি। সে আমার সামনে তানিশা আপুর রেঁধে যাওয়া নুডুলস এনেছিলো। ওটা টেবিলে রেখে বললো, খেয়ে নে এটা। না খাইলে মর তুই।
আর যদি তোর বাপ এখন আমাকে ফোন করে কিছু বলে তাইলে আজকে আমিই তোরে মাইর‍্যা ফেলবো। খতম করে দিবো একদম।

চিনোস না আমারে।
বিকেল বেলায় আজমল সাহেব বাসায় এসেই তাড়া দিতে লাগলো সবাইকে।
অনু চৌধুরীর জন্য একটা রঙীন শাড়ি, দামি দামি গহনা আর আমাদের জন্য ড্রেস কিনে এনেছে সে।
আমার জন্য একটা লেহেঙ্গা এনেছে।
লাল রঙের। কিন্তু ওটা পরার মত না।

একে তো শর্ট হাতা, তার উপর উপরের অংশ সাইজে খুব ছোট। ওটার স্টাইলই নাকি অমন।
হাত সামান্য উপরে তুললেও পেট দেখা যায়।
কি বিচ্ছিরি! এমন ড্রেস আমি জীবনেও পরিনি।
সবার গুলোই ঠিক আছে। শুধু আমারটাই এমন! আমি রাগের তাড়নায় ড্রেসটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে এলাম।
অনু চৌধুরী চোখ গরম করে তাকিয়ে রইলেন।

কিন্তু আপু তার মর্ডান লেহেঙ্গা পেয়ে মহা~খুশী।
সে হাতে পেয়েই পরতে চলে গেছে।
আজমল উদ্দীন আমার চলে যাওয়া দেখে অনু চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
~ কী হলো অনু? তোমার ছোট মেয়ের কি আমার আনা জামাও পছন্দ হয়নি নাকি? আচ্ছা, মানলাম আমাকে ওর ভালো লাগেনা, কিন্তু আমার আনা ড্রেসটাও ওর ভালো লাগলো না? এটার প্রাইস কত পড়ছে জানো? বসুন্ধরার সেরা দোকান বেছে কেনা।

পর্ব ১০

আজমল উদ্দীনের উস্কানিতে অনু চৌধুরী আরো এক ধাপে রেগে গেলেন। তিনি আমার রুমে তড়িঘড়ি করে আসলেন। তারপর আমার দিকে হিংস্র জন্তুর ন্যায় তেড়ে এসে ঐ লেহেঙ্গার প্যাকেট গায়ের উপর ছুঁড়ে দিলেন।
~ এইটা পরে আয় এখনি। এখন মানে এখন ই।
আমি মুখের উপর বলে দিলাম, না।

রাগের উত্তালতায় কর্কশ গলায় কান ফাঁটিয়ে অনু চৌধুরী বলে উঠলো,
~ তুই পরবি, তোর বাপ ও পরবে। কুত্তার বাচ্চা। খুব মেজাজ হইছে তোর, না? তুই এখনি এইটা পরবি। না পরলে এখনি তোকে ঘর থেকে বাইর কইর‍্যা দিমু। তোর ঘরে জায়গা নাই।
আমি নির্বিকার চিত্তে জবাব দিলাম,
~ ঘরটা কার? বাসাটা কার? তোমার? আব্বুর বাসা থেকে তুমি তাড়াবা কেন?
এইটা কি তোমার বাসা নাকি?

~ ঐ কুত্তারবাচ্চা, হারামজাদী, তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করিস? এইটা আমার বাসা। এই সবকিছু আমার। তোরটা তোর শ্বশুরবাড়িতে। তোর বাপের সবই আমার। তুই আমাকে বলিস আমি তাড়ানোর কে?
আমি আর কথা বললাম না।

শুধু প্যাকেটটা গা থেকে একটু সাইডে সরিয়ে দিয়ে তাকে পিছ দিয়ে বসলাম। কারণ আমি তার এই ধরণের অশ্লীল গালাগাল আর শুনতে চাচ্ছিনা।
কিন্তু সে আমার এইভাবে পিছ ফিরে বসাটাকে তার প্রতি বিরুদ্ধাচরণ মনে করলো।
তাই আবারো তেড়ে আসলো বিছানার ঝাড়ু হাতে নিয়ে।
শলাটা এবারেই এনেছিলো।

সেবার নানু বাড়ি থেকে সে শুধু এটা নিয়েই এসেছিলো।
তখন আমি এটা দেখিয়ে আব্বুকে বলেছিলাম,
নতুন ঝাড়ু ফ্রম নানু বাড়ি।

সেই ঝাড়ু দিয়ে গায়ে, পিঠে, হাতে যেখানে পারছে সেখানেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে মারলো। যেখানেই পড়ছে সেখানেই যেন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিংবা গরম খুন্তি দিয়ে যেন আঁকাবুঁকি চলছে আমার পিঠে।

সুইঁ দিয়ে কি সেলাই করছে নাকি আমার শরীর! আমি কাঁদলাম না। একটুও চিৎকার করিনি। জ্বর থেকে উঠে বসতে না বসতেই এই মারের প্রকোপ।
খুব শান্তিতে আছি!

কান্না এসে যায় যায় করে আবার থেমে যাচ্ছে।
কিন্তু আমি কাঁদবো না।
চোখ~মুখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে এই অসহ্য যন্ত্রণা সয়ে যাচ্ছি আর বলছি,
না! আমি কাঁদবো না! কিছুতেই কাঁদবো না আমি।
কিন্তু সে থামছে না। অনবরত মারছে।
মারুক, আমিও আর কাঁদবো না।

আমি দুর্বল নই।
তখনই আজমল উদ্দীন ছুটে এসে অনু চৌধুরীকে আটকালেন।
~ অনু, কী করছো তুমি! এত বড় মেয়েকে মারছো! কী হইছে?
অনু চৌধুরী এবার থামলেন।
~ মারতে হয় একটু ~ আধটু। তোমার হলে তুমিও বুঝবা আজমল। নইলে এগুলা বেয়াদব তৈরী হবে এক একটা।

আজমল উদ্দীন টুপ করে এসে আমার সামনে চলে আসলেন।
সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
~ তোমার ড্রেসটা পছন্দ হয়নি মামণি? আচ্ছা যাও, আজকে সব ক্যান্সেল। আজকে আমি শুধু তোমাকে নিয়ে শপিংমলে যাবো। তোমার যতটা ইচ্ছা, ততটা নিবা। যেটা ভাল্লাগবে সেটাই কিনে দিবো। চলো। এখনি যাবো। যাবা তো?
আমি দম মুখ খিঁচে বসে আছি।

ইচ্ছা করছে, যে যে জায়গায় ঝাড়ুর মার পড়েছে সেই জায়গাগুলোয় হাত দিয়ে একটু ঘষা দেই। জ্বলে যাচ্ছে।
কিন্তু অপ্রতিভ রাগের তাড়নায় চুপচাপ বসে আছি। জ্বললে জ্বলুক।
জ্বলে জ্বলেই ঠিক হয়ে যাক।
আমার মত মেয়েদের এইসব সামান্য ব্যাথার দিকে ঝুঁকতে হয়না।
আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলেন আজমল উদ্দীন,
~ কী মামণি? যাবা না?

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
~ না। যাবো না আমি।
তারপর অনু চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম,
~ আমি যাবো না।
বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনের কাঁধ চেপে ধরে বললেন,
~ আজমল, চলো, এখনি চলো। আমরা এখনি রওনা হবো। এই বেয়াদব এখানে একাই থাকবে আজ। দেখি ও কিভাবে থাকে।
আজমল উদ্দীন আর কিছু বললেন না।

উঠার আগে আমার দুই উরুতে হাত রেখে চেপে ধরে বললেন,
~ কেন এমন করো রাকা? আমি তোমাকে কী করছি বলো? হুম? বলে ঠোঁটের কোণের সামান্য হাসি লুকালেন। আমার চোখ তা এড়ায়নি।
আমি তো অনু চৌধুরী না। আমি রাকা।

লোকটা উঠলেন স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি সময় নিয়ে। ততক্ষন এইভাবেই চেপে ধরে রাখলেন।
সে আর অনু চৌধুরী আমার রুম ত্যাগ করতেই আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম।
দরজা বন্ধ করার সময় ঐ প্যাকেটটা দরজার বাইরে রেখে দিলাম। ওটা আমি পরবো না। ঐ জঘণ্য লোকের জামা আমি কিছুতেই পরবো না। তাই।

তারপর জামা তুলে দেখলাম উরু লাল হয়ে আছে। আর একটু হলে হয়তো ছিলেই যেত।
তারপর সারা গায়ে একবার এলোমেলোভাবে হাত দিয়ে ঘষলাম। ভালোই মারছে আজ।
টেবিলের উপর বসে পড়ে এবার নিজের অজান্তেই শব্দ করে কেঁদে দিলাম।
খুব জ্বলছে। এত কষ্ট আগে কখনো লাগেনি।

কিন্তু আমার চোখের এই নোনা পানির অর্থ কি কেউ আদৌ বুঝবে?
ওদিকে বাইরে থেকে অনু চৌধুরী বলছে,
~ তানিশা খাবার তো বেশি নেই। যা আছে তাও খাওয়ার অযোগ্য। তাও তুই সব ফ্রিজে ঢুকিয়ে ফ্রিজ লক করে ফেল। দেখি মহারাণী কতক্ষন না খেয়ে থাকতে পারে। আমরা ওখানের বেস্ট রেস্টুরেন্ট থেকে আজ খেয়ে আসবো। বুঝলি?
কথাগুলো বললো জোরে জোরে।

খাবারের লোভে পড়ে হলেও যেন আমি অন্তত রাজি হই, তাদের সাথে যাওয়ার জন্য, তাই।
কিন্তু আমি বের হইনি।
তারা বের হওয়ার পর তানিশা আপু বলে গেলো, ~ ~ রাকা, এই রাকা! বাইরের দরজা বন্ধ করে দে। আমি চলে যাচ্ছি। উনারা চলে গেছে।

আমি কিছুক্ষন পরই দরজা খুলে বের হলাম। বের হতেই চমকে গেলাম।
তারা সবাই আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ যায়নি।

অনু চৌধুরীর হাতে আজমল সাহেবের আনা সেই লেহেঙ্গাটা।
আমি বের হতেই অনু চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে বললো,
~ কী? কথায় কথায় দরজা আটকানো কোন ধরণের স্বভাব? খুব বড় হয়ে গেছোস?
আমি একবার তানিশা আপুর দিকে তাকালাম। আপুও আমার সাথে এমন করলো!
ওকে তো আমি সব খুলে পর্যন্ত বলেছিলাম!
তাহলে কেন?

আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনা কেন?
অনু চৌধুরী আমার কপালে হাত দিলেন।
তারপর তৃপ্তিদায়ক ভঙ্গিমায় বললেন,
~ না জ্বর নাই। আয়, এদিকে আয়, আমার সাথে একটু আয় তো।
বলে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন।

আমিও তার সাথে গেলাম।
না গিয়েও উপায় নেই।
এখানে কেউই তো আমার কোনো কথা বা রাগই আমলে নিবেনা।
অনু চৌধুরী পেছনে ফিরে আজমল উদ্দীনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ ১০মিনিট জাস্ট!

আজমল উদ্দীন বললেন,
~ ওকে ডার্লিং।
আমি এখন আম্মুর রুমে।
আমাকে কখনোই সে নিজ হাতে আদর করে সাজায়নি। ছোট্টবেলায় হয়তো আদর করে কখনো কখনো কপালের এক পাশে কালো টিপ লাগিয়ে দিতো। কারণ সবাই_ই দেয়। না দিলে ঘোর অনর্থ!

হয়তো সেও দিয়েছে। ওটা দেয় কেন? যেন নজর না লাগে! কিন্তু আমার মা জননী আমাকে সাজাবেন অন্য উদ্দেশ্যে, যেন নজর লাগে।
যদিও সে এসব জানেনা।
জানার চেষ্টাও করেনা।

কারণ সে তো অন্ধ।
এজন্যই হয়তো গানের কথায় আছে,
“চোখ থাকিতেও অন্ধ।”
সে আমাকে জোর করে ঐ লেহেঙ্গাটা পরিয়ে দিলো।
পরানোর আগে যখন জামা খুলে দেখলো তার মারের দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লম্বা~লম্বা, লাল~লাল দাগের মাধ্যমে; তখন সে একটু ছুঁয়ে দেখলো। অস্ফুটস্বরে একবার বলে উঠলো, ইশ!

তারপর কিছু একটা লাগালো ঐ জায়গাগুলোয়। কি লাগালো জানিনা তবে খুব শান্তি পেলাম। হয়তো তার হাতের শীতল স্পর্শটুকুই ছিলো আমার সেই শান্তির খোরাক।
বলছিলো,
~ কেন এমন করিস বলতো? আমার কি তোকে মারতে ভাল্লাগে, বল? তুই এইভাবে মুখে মুখে তর্ক করিস কেন? আগে তো এমন ছিলি না।
কেন এমন তৈরী হচ্ছিস দিনকে দিন?
আমি কোনো কথারই কোনো উত্তর দেইনি।

কিছু কিছু সময় চুপ থাকাই শ্রেয়।
উপভোগ করতে হয়। সবার জন্য তো আর তার মায়ের আদর দীর্ঘস্থায়ী, সহজলভ্য হয়না।
তাই যখন সময় আসে তখন চুপ থাকাই উত্তম লক্ষণ।
সে তার কাজ শুরু করলো।
কপালে একটা ছোট পুতির টিপ, চোখে কাজল আর কানে দুল। ঠোঁটেও লাল লিপস্টিক এঁটে দিলো। হাত খালি। তাই নিজের একটা কি যেন ব্রেসলেটের মত, ওটা চেপে ছোট করে হাতে পরিয়ে দিলো।

তারপর সে নিজেই কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। হয়তো সে বুঝতেই পারছে না, তার এই কালো মেয়েটাও এত সুন্দর!
হয়তো ততটা না সুন্দর না।
কিন্তু একটা অন্য রকমের মায়া মায়া ভাব আছে।
যার চোখ~মুখের অসীম মায়ায় গ্রাস হতে পারে শত শত নর~নারী। সে জানতোই না, তার ছোট মেয়ে এত মায়া নিয়ে জন্মেছে!

কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আমাকে কাছে টেনে এনে বললো,
~ তোকে খুব সুন্দর লাগছে এখন, রাকা। কেন যে এমন করিস তুই… কত সুন্দর লাগছে জানিস? এখন চল।

বলে আজমল উদ্দীনের সামনে নিয়ে গেলো। তারপর হাসিমুখে বললো,
~ দেখছো আজমল, আমার এই মেয়েও কিন্তু কম সুন্দর না। একটু দুষ্ট আর জেদি স্বভাবের কিন্তু রুপে~গুণে একদম পাক্কা। একটু জেদি আরকি। কী বলো?
আজমল উদ্দীন হেসে বললেন,

~ হ্যাঁ। তোমার মেয়ে দুইটাই তোমার মত সুন্দর। রাকা আরো সুন্দর হতো, কিন্তু তোমার বর কালো তো তাই এই মেয়ের উপর এফেক্ট পড়ছে একটু। এনিওয়েজ, রাকা, দারুন দেখাচ্ছে কিন্তু!
আর কি, আমাকেও যেতে হলো।

আমি যতক্ষন পারছি ততক্ষন অনু চৌধুরীর হাত চেপে ধরেছিলাম।
তার পিছু পিছু, তার গা ঘেঁষে ঘেঁষেই হাঁটার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার বোধ হয় আমার এই গা ঘেঁষাঘেঁষির বিষয়টা পছন্দ হচ্ছেনা।
সে আমাকে একবার বলেই ফেললো,
~ রাকা, কী করছিস? একটু দূরে দূরে হাঁট! গায়ে পড়ে যাবি নাকি! শাড়িটা নষ্ট করে ফেলবি তো!

তারপর তানিশা আপুর হাত ধরলাম।
কিন্তু সেই হাত ও মিনিট পাঁচেকের বেশি ধরতে পারলাম না। তানিশা আপু ও ব্যস্ত।
সেল্ফি আর ভিডিও করা নিয়ে সে তুমুল ব্যস্ত।
জায়গাটা সুন্দর।

আমরা জাদুঘর থেকে এখন চিড়িয়াখানায় এসেছি। পথিমধ্যে ঘোড়ার গাড়িতে উঠতে হলো দুজন দুজন করে।

অনু চৌধুরী আর আজমল উদ্দীন প্রথমে উঠলেন। তারপর তানিশা আপু আর আমি। আমাকে তুলে দিলেন আজমল উদ্দীন। সেই একই কাজ।
সে কোলে তোলার বদৌলতে পেট ছুঁয়ে দিলো আচমকা। শিউরে উঠতেই গাড়ি চলা আরম্ভ করলো।
এরপর যখন চিড়িয়াখানায় আসলাম, সেখানেও আমি মা আর বোনদের সাথে সাথে থাকার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেউই আমাকে সময় দিচ্ছেনা। যে যার কাজে ব্যস্ত। অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনের এক হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটছে। কিন্তু আমার হাত ধরলো না।
আমাকে দেখার সময়ই নেই কারোর।

এদিকে বল ছুটে আসছে, ওদিকে ঢিল ছুটে আসছে, সবাই এটা ওটা করে এভাবেই দুষ্টামি করছে।
আমারও ওদের সাথে যোগ দিতে ইচ্ছা করছে।
কিন্তু আমি এখন ওদের সাথে যোগ দিতে পারবো না। আমার যা ড্রেস! কিভাবে কি খেলবো!
তাই বড়দের মতই চুপচাপ, সংযত হয়ে হাঁটতে লাগলাম।
এক সময় আবার অনু চৌধুরীর হাত চেপে ধরলাম।

সে বিরক্ত হয়ে আজমল উদ্দীনকে বললো,
~ এই তুমি ওকে ধরো তো। ওর এক হাত ধরে হাঁটো। আমার শাড়ি ঠিক করতে হয় তো। দুজনকে কিভাবে ধরবো! মেয়েটা তখন থেকে এরকম করতেছে। বোধ হয় ভালো লাগতেছে না ওর।

আজমল উদ্দীন যেন এই অপেক্ষাতেই এতক্ষন সময় পার করছিলেন। শোনা মাত্রই কাজ সারা যাকে বলে তাই হলো।
সাথে সাথেই আমাকে কোলে তুলে নিলো।
আমি বাঁধা দেওয়ার সুযোগটুকুও পেলাম না।

তারপর অনু চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ নাও! এবার তুমি তোমার শাড়ি ইচ্ছামত সামলাও। আমরা দুজন ঝামেলাই এখন এক হয়ে গেলাম। হাহ্ হা।
অনু চৌধুরীও হাসিতে যোগ দিলেন।

আজমল উদ্দীনের এত এত আদর তার মেয়েদের প্রতি, দেখলেই তার খুশিতে মরে যেতে ইচ্ছা করে। মানুষটা খুব ভালো। এরকম কাউকেই তো দরকার জীবনে। ভাবছে অনু চৌধুরী। আর আমি!

আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। ক্লাস সিক্সে তখন।
আমার ভীষণ অস্বস্তি লাগছিলো।
এদিক দিয়ে টান দিয়ে ধরি তো ঐ দিক দিয়ে উঠে যায়। কি একটা অবস্থা..
সে কি আর বুঝে অনু চৌধুরী?
কিছুক্ষন যেতে না যেতেই সে আবার শুরু করলো। তার হাত নিচের দিকে বার বার নাড়াচাড়া করতে শুরু করলো।

একসময় একটা হাত ভেতরেই ঢুকিয়ে দিলো।
অন্য হাত দিয়ে ঝাপ্টে ধরে আছে। তার অবাধ্য চলমান হাত পা টপকিয়ে আস্তে আস্তে উরুর দিকে ধাবিত হতেই আমি তার ভেতরে ঢুকানো হাতটা চিমটি দিয়ে সরিয়ে দিলাম। কিন্তু ওটা সরিয়ে দিতে না দিতেই আবার সেটা ছুটে আসলো বুকের উপর।
পিছন থেকে ধরেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সেটা জায়গামত চলে আসবে বলে ঠাওর করা যায়।

আমি জোরে বলে উঠলাম,
~ আপনি আমাকে নামিয়ে দিন আংকেল। নামান। প্লিজ!
আজমল উদ্দীন বললো,
~ কেন? ভালো লাগতেছেনা? নেমে কী করবা?
~ নামান আমাকে। প্লিজ।

অনু চৌধুরী আর তানিশা আপু তখন একসাথে ছবি তুলছে।
সেই সুযোগে আজমল উদ্দীন একটু দূরে চলে গেলেন জোরে হেঁটে।
তারপর ফিসফিস করে বললেন,
~ কী সমস্যা তোমার রাকা? সবার সামনে এরকম আচরণ কেন করো?
তুমি এরকম আচরণ করলেও কোনো লাভ হয়না। দেখলেই তো। তাহলে কেন করো? আমি তোমাকে কী করি বলোতো? মারি? বকি? আদর করি তো!
তখনই তার কোল থেকে টপকে পড়ে গেলাম।

রাগান্বিত স্বরে বললাম,
~ আপনি আমাকে বিরক্ত করেন। আমার আপনাকে অসহ্য লাগে। আর এইভাবে হাত দিয়ে এমন করেন কেন? আমি আব্বুর কাছে বলে দিবো সব।
লোকটা শব্দ কর হেসে দিলো এবার।

বললো,
~ সত্যি! বাব্বা, খুব ভয় পাইছি তো আমি! তো, কী বলবা?
~ আপনি যা যা করেন, সব। সব বলে দিবো।
~ আচ্ছা! তাই বুঝি? ওকে, বলেই দিবা যখন, তখন আরো বেশি বেশি করে করবো। কী বলো? যদি না বলো তাহলে আর কিছুই করবো না। ধরা যখন খাবোই তখন কিছু করেই খাইনা! হাহ্ হা হা।

আমি তোমাকে কিছুই করিনা, বুঝলা?
বি পজিটিভ। বড় হবা কবে মাই ডিয়ার বেবি গার্ল!
আমি তার থেকে সরে চলে আসলাম।

আপন স্যারকে বলা হলো না আমরা কোথায় কোথায় যাবো। বললে হয়তো সে ছুটে আসতো আর আমাকে বাঁচাতো এই অসভ্য লোকটার হাত থেকে।
আপুর অনুরোধে সিনেমাহলেও যাওয়া হলো অবশেষে। ওখানে আমাদের দুই বোনকে তার দুই সাইডে বসতে হলো। তার রিকুয়েস্ট রক্ষার্থে। যদিও অনু চৌধুরীর তার সব বাড়াবাড়ি ভালো লাগেনা। তবুও মেনে নেয় মেয়েদের প্রতি তার উপচে পড়া ভালোবাসা দেখে।
তাই অনু চৌধুরীকে বসতে হলো আমাদের সামনের সিটে।

সেখানে বসে বসে পপকর্ণ খাওয়ার পাশাপাশি একটা সিনেমা দেখা হচ্ছে।
ওখানে ও একই কান্ড।
লোকটা দুই হাত দু পাশে প্রশস্ত করে আমাদের দুই বোনকেই ধরেছে।
তানিশা আপু কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাচ্ছেনা।
তার সাথে ও যে এমন কিছু হচ্ছে কিনা, কে জানে?
হলেও মনে হয়না কিছু বলবে বলে।

কিন্তু আমি তার হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিতেই সে আবার সেটা আমার গায়ে তুলে দিলো। আমার দিকেই হেলে সে আবার তার চাহিদা মেটালো। চুপচাপ সয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার রইলো না। জ্বর, তার উপর দিয়ে মার আর তার সাথে সাথে ফ্রিতে সহ্য করতে হচ্ছিলো তার এই অসভ্যতামিগুলো।
বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হলো।

এসেই আমি ফ্রেশ হয়ে ভাঙা ফোনটা জোড়া দেওয়ার কাজে লেগে গেলাম। অনেক কষ্টে, অনেক সময় নষ্ট করে তারপর ওটাকে সচল করা গেলো।
আব্বুকে ফোন দিতে হবে। আপন স্যারকে আজকের বিষয়টা জানাতে হবে।
আমি সমানে ফোন করতে লাগলাম দুজনকে। কেউই ফোন তুলছে না।

আব্বুর ফোন বেজে যাচ্ছে, সে রিসিভ করছে না। আর আপন স্যারের নাম্বার বিজি। তাই আমি বাধ্য হয়ে প্রথমেই আব্বুকে একটা মেসেজ দিলাম,
যতটুকু পারি সিলেবল ভাগ করে করে লিখতে ততটুকুই লিখলাম,
“আব্বু, তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। নইলে আমি মরে যাবো। তখন তুমি অনেক অনেক কাঁদলেও আর আসবো না। প্রমিস! বলে দিলাম কিন্তু।”

তারপর আপন স্যারকে একটা লিখলাম,
“স্যার কালকে পানির ট্যাংকির ওখানে
থাকবেন তো? আমি আপনার সাথে কথা বলবো একটু।”
এরপর ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে উঠে দেখি দাদি আমাদের বাসায় এসেছে। দাদিকে বাসায় দেখে আমি খুশিতে হতবিহ্বল। অনেকদিন পর দাদির মুখ দেখলাম। দাদি অবশ্য আমাকে ততটা আদর করেনা। কারণ সে মনে করে আমি তার বউয়ের রক্ত, জাত। যদিও সে জানে, আমি তার বউয়ের কোনো গুণ বা রুপই পাইনি।
যা রপ্ত করেছি সবটাই তার ছেলের।
সেক্ষেত্রে সামান্য হলেও আদর পাই।

কিছুক্ষন পর দেখলাম, কাকা, ফুফু~ফুফারাও এসেছেন।
আজ সবাই কেন দল বেঁধে আসছে জানিনা।
আমি আমার জন্মের পর থেকে কাউকে কখনো আমাদের বাসায় এক রাত ও থাকতে দেখিনি। আসলেও আসে বছরে একবার। সারাদিন বা ঘন্টাখানেক থেকে আবার ঐদিনই চলে যায়।

আর দাদি তো একসময় আমাদের সাথেই থাকতো।
কিন্তু এখন আর থাকে না।
আমাদের সাথে তার না থাকার বয়স আজ অনেক বছর। সে আমাদের সাথে না থাকার মূল কারণ হলো, তার সাথে অনু চৌধুরীর বনিবনা হয়না। আর দাদু অনু চৌধুরীকে প্রথম থেকেই পছন্দ করতেন না। একবার সামান্য একটা কারণে ঝগড়ার প্রকোপ এমন পর্যায়ে গেছিলো যে পরে দাদি বাধ্য হয়েই একা একা ছোট ছেলের বাসায়, আমার কাকার বাসায়, চলে গেছিলেন। আব্বুকে বার বার বলতো,
“এই বউ ছাড়, তোর জীবন ছার~খার করে তবেই এই মেয়ে শান্ত হবে। আমি বললাম। তুই আমার কথা মিলায়ে নিস বাপ।”

কিন্তু আব্বু বড্ড বেশিই ভালোবাসে অনু চৌধুরীকে। মায়ের কথা ভেবে অনেকবার ছুটে গেছিলো, আমাদের ও সাথে করে নিয়ে গেছিলো। বার বার মাফ চেয়েছিলো। তবে অনু চৌধুরীকে কখনোই কোনোভাবে নিতে পারেনি সাথে।

তার মাও এক কথার মানুষ,
~ এই মেয়েকে বিদায় করলে আমি তোর বাড়িতে পা রাখবো। নতুবা আমি মরে গেলেও না। গেলে আমার লাশ যাবে।
অনু চৌধুরী প্রথম যখন বিয়ের পর এই বাড়িতে আসে, তখন সে শুধু আব্বুরই নয়, আমার দাদির ও নয়নের মণি ছিলো। বড় ছেলের বউ।
তাকে মূলত তাড়াতাড়ি আনানোর কারণ একটাই, দাদির দেখাশোনা। কিন্তু সে প্রতিদিন বেলা ১০/১১টায় উঠতো। আব্বু তো সকালেই চলে যায় কাজে। সে এসব জানতোও না।
প্রথম প্রথম দাদি সব ছাড় দিয়ে একা হাতে নিজেই সবটা করতেন। অনু চৌধুরী উঠতে উঠতে তার বাসার সব কাজ শেষ ও হয়ে যেত।

সে উঠে কোনোমতে তার খাওয়া খেয়ে, সেই যে ফোন নিয়ে বসতো… আর উঠার নামগন্ধ নেই। গোসলের বেলা ফেরিয়ে যায়, ফেরিয়ে যায় নামাজের বেলা…. না, তার কথা শেষই হয়না। বছর যেতেই এই ফোনে কথা বলার হার ক্রমশ বাড়তে থাকে।
দাদি সন্দেহ করতো কারণ সে বেশিরভাগ সময়ই ছাদে গিয়ে কথা বলতো।
আর বাসায় থাকলে বলতো দরজা বন্ধ করে।

এত কিসের কথা বা কার সাথে এত কথা ~ সেসব একদিন সে নিজ কানেই শুনে নেয়। দরজা খোলা ছিলো সেদিন। দরজা লক করলেও অমনোযোগের কারণে সেটা লক হয়নি ঠিক করে।

দাদি তার কিছু বেফাঁস কথা শুনে চিৎকার দিয়ে যখন বলে,
~ বউ, কি কও, কার লগে এগুলা কও!
অনু চৌধুরী চমকে উঠে আমতা আমতা করে বলে,
~ কেকেন মা! আপনার ছেলের সাথে!

~ ও মা! আমার ছেলেতো কাজে গেছে। তার তো কাস্টমারের সাথে, লোকজনের সাথে কথা কওনের ই সময় হয় না। আর সেই ছেলে তো বইস্যা বইস্যা এত কথা কইবো না তোমার লগে! আর যদি এত কতা কওনের দরকার ই পড়ে তয় সে বাসায় থাইক্যা যাউক না! কাজে যাইতে কয় কে? আমি তো তারে কইলাম বাসায় থাকতে কয়দিন! হে নিজেই তো মানা করলো।

~ ও…
~ দাঁড়াও আমি তারে এহনি আবার কমু।
~ কেন মা? আপনার আমার কথা বিশ্বাস হয়না?
~ না মা। তারে খালি বলমু এহনি যেন চইল্যা আসে। আর সপ্তাহ খানেকের জন্য যেন ছুটিও আনে। তুমি তো এইভাবে অসুস্থ হইয়্যা যাইবা মা। নাওয়া~খাওয়া সব তো তোমার লাটে উঠছে।

তখনই সে তার ছেলেকে ফোন করে জানতে পারে, তার ছেলে এখন মহা ব্যস্ত।
সে এখন মিটিং এ আছে। আজ তার নিশ্বাস ফেলার ও সুযোগ নেই।
দাদির আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছুই।

দাদি কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ ও বউ! আমার পোলা তো কাজে ব্যস্ত। তুমি তাইলে কার লগে ব্যস্ত থাহো?
অনু চৌধুরী চোখ রাঙিয়ে বলে,
~ আপনার মাথার লগে। বুড়ি বয়সে বেশি
বাড়াবাড়ি কইর‍্যেন না। ভাগাইয়া দিমু কইলাম। ঝামেলা একটা।
~ তুমি আমারে ভাগাইবা? ও বউ কি কও?

এইডা আমার পোলার বাড়ি না?
আমার পেডের পোলা!
~ তয় এইডা আমার ও স্বামীর বাড়ি। আম্নে আমার নামে যেন তেন অভিযোগ আনবেন, আর আমি চুপ থাউম নাকি?

তারপর আব্বু আসার পর আব্বুকে দাদি বোঝালো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাচ্চা নাও।
নয়তো, এই বউ মনে হয় না টিকবো।
আব্বু পর পর দুটো বাচ্চা নিলো।
দাদির তো খুশির কোনো অন্ত নেই।

সে একাই সব কাজ করে গেছে, সব সয়ে গেছে এতদিন। একটা মাত্র বউ। সে না দেখলে কে দেখবে, এই ভেবে।
কিন্তু বাচ্চাদের জন্ম হওয়ার পর ও সে তার এই অভ্যাস ছাড়েনি। সে তখন ও তার একই নিয়ম ধরে রাখলো।

দাদির কষ্ট একটাই,
“বউ আনছি শখ কইর‍্যা নিজের কামের পাল্লা কমার লাগি। হেই বউ যদি পায়ের উপর পা তুইল্যা বইয়্যা থাইক্যা আমারে দিয়াই সব করায়ে উসুল করে, তাও মানা যায়। কিন্তু এই বউ তো দেহি দুশ্চরিত্রা।”

মাঝেমধ্যেই দাদি শোনার চেষ্টা করতো তাদের আলাপন।
এরপর এমন এমন করে একদিন সে গৃহত্যাগ করে।
আব্বুর হাজার অনুরোধ, মিনতিও আর কাজে লাগেনি। আস্তে আস্তে ফুফুরাও সব জেনে যায়।

তারাও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
একমাত্র কাকা, সেও তাই করে।
আব্বু সব সহ্য করে যায়।
কারণ অনু চৌধুরী তার প্রাণ।
সে ভাবতো, একদিন ঠিক হয়ে যাবে সব।

সে বোঝাতো। আর ভাবতো, মেয়েরা বড় হলে আপনা~আপনিই ঠিক হয়ে যাবে একদিন।
কিন্তু না! মেয়েরা বড় হওয়ার পর আরো বেড়েছে বৈ কমেনি।
(চলবে)
ফারজানা রহমান তৃনা।

রাকা (১১)

দাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ দাদি, কী হইছে? তোমরা সবাই আজকে আমাদের বাসায় আসছো যে!
দাদি কিছুই বলছেনা শুধু নাক টেনে কাঁদছে।

তার মুখের বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। সবার মুখই কালো হয়ে আছে। খারাপ কিছু কি হয়েছে?
ছোট ফুফির কাছে গিয়েই তার সাথে চেপে বসে জিজ্ঞেস করলাম,
~ ও ফুফি, কী হইছে? কারো কিছু হয়েছে? দাদি কাঁদে কেন?

ছোট ফুফি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
~ তোর বাবা অসুস্থ হইয়্যা পড়ছে রে রাকা, তোর বাবার খুব খারাপ অবস্থা..
কথাটা শুনেই আমি ফুফির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

~ কী হইছে আমার আব্বুর? বলো না ফুফি, ও ফুফি..
ফুফি কান্না জড়ানো গলায় বললো,
~ এক্সিডেন্ট করছে তোর বাপে। এক্সিডেন্ট।
কথাটা শুনেই বুকটা যেন ধক করে উঠলো সাথে সাথে।
আর কথা বলতে পারলাম না।

ফুফিরা জোরে জোরেই বিলাপ করতে লাগলেন,
~ ভাইয়ের কি এমন দুশ্চিন্তা, কি এমন সমস্যা যে ভাই আমার এতটা অমনোযোগী হয়.. ক্যান আমার ভাইডার এমন হইলো। আমার ভাইয়ের তো কোনোদিন ও এত চিন্তা ছিলোনা। তাইলে এহন ক্যান এমন হইলো? আমরা কি কিছু বুঝিনা?

তারপর তাদের কথার শোরগোলে বুঝে নেই,
গতকাল রাতেই আব্বু এক্সিডেন্ট করেছিলো।
মাত্রাতিরিক্ত উদ্বিগ্নতায় তার বুকের ব্যাথা আর মাথাব্যাথা বেড়ে গেছিলো। তাই আর সহ্য করতে না পেরে ঔষধ আনার জন্য নিজেই বের হইছিলো। পথিমধ্যে আচমকা তার মাথা ঘুরে যায় আর একটা বাসের সামনে পড়ে যায়।

এক পা আর এক হাত পুরোই থেতলে গেছে। মাথায় ও আঘাত পেয়েছে। অনেক রক্তপাত হয়ে গেছিলো কারণ ঐ রাস্তায় অত রাতে লোকজনের আনাগোনা কম ছিলো। একজন এসে দেখেছে তাও অনেক দেরীতে।

আর বাসওয়ালা তখনই পালিয়েছিলো। ততক্ষনে প্রচুর ব্লাড খরচ হয়ে যায়। ডাক্তারখানায় নিতে নিতে আরো বেশি। আব্বুর অবস্থা এখন ভালো না। পায়ের হাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে।

তার মানসিক চিন্তা, দুশ্চিন্তার দরুন
ব্রেইনে খুব এফেক্ট ফেলছে।

এই প্রভাব এক দুদিনের না, বহুদিনের পোষা রোগ। যার ফলে মাথা ঘুরে গেছিলো।
এরকম আবার হতে পারে। হয় তার সব সমস্যা সমাধা করতে হবে নতুবা তাকে রিল্যাক্সেশনে রাখতে হবে। একদম চিন্তামুক্ত পরিবেশ চাই তার জন্য। হাসপাতালে সারা রাত সে ব্যাথায় কুঁকড়ে গেছিলো। সারা রাত শুধু রাকা রাকা, আমার কী হবে ইত্যাদি সব কথাবার্তা বলে বিড়বিড় করে যাচ্ছিলো।

অনু চৌধুরীকে হাজারবার ফোন করার চেষ্টা করা হয়েছিলো, আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করেছে, এইতো সকালেই।
ধরেই যখন জানতে পারে এই খবর, তাড়াতাড়ি আজমল উদ্দীনকে উঠিয়ে তাকে বের করে দেয় ঘর থেকে।

তাই আজ ও কেউই জানতে পারলো না আজমল উদ্দীনের ব্যাপারটা।
অনু চৌধুরীকে দাদি, ফুফুসহ সবাই মিলে খুব বকলো। এত উদাসীন কিভাবে থাকে সে, ফোন তোলেনি কেন, আব্বুর উপর কেন চাপ দিচ্ছে, কিসের এত দুশ্চিন্তা এসব অনু চৌধুরী জানেনা কেন ইত্যাদি ইত্যাদি বলে…
সেবার আব্বুর এই এক্সিডেন্টই আটকিয়ে রেখেছিলো অনু চৌধুরীকে।
নচেৎ সেবারই হয়তো সে পালাতো।

আব্বুর সেবাযত্নের জন্য দাদি বাধ্য হয়েই থেকে গেলো কয়েক মাস। তার ধারণা, বউয়ের অযত্ন, উদাসীনতা, বদ~অভ্যাসই ছেলের এই অসুখের কারণ।
ফুফুরাও আসা যাওয়া করতো তখন।

সেজন্য এক হিসেবে আমাদের জন্য সুবিধাই হচ্ছিলো।
নির্বিঘ্নে চলছিলাম। ভালোই চলছিলো সব।
মাসখানেকের মধ্যেই যখন আব্বু সুস্থ হয়ে যায় তখন দাদি আবার চলে যায় আমাদের বাসা থেকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেতে হয়েছে বলা বাহুল্য।

এ ক’দিন থেকেই তার দফারফা এক হয়ে গেছে অনু চৌধুরীর অনিয়ম, অত্যাচারে।
কিন্তু সমস্যার শুরু হলো দাদি চলে যাওয়ার পর। আব্বু তখন ঘরে বসেই সব সামলায়।
অনু চৌধুরী একদিন নিজে যেঁচে এসে বলে,
~ শুনো না, তুমি তো অনেকদিন ব্যবসায় যেতে পারো না। আমি মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখে আসি সব? তুমি আমাকে বুঝায়ে দিলা সব, আমি সব তেমনভাবেই দেইখ্যা আসবোনে। সব ঠিক আছে কিনা, তারা আসলেই কাজ করে কিনা ভালো কইর‍্যা… এইভাবে আর কয়দিন কও?

নিজের ব্যবসা এইভাবে অন্যদের উপর বিশ্বাস কইর‍্যা চালানো যায়? দুনিয়ায় কাউরে বিশ্বাস করা যায় নাকি?

আব্বু প্রথমে রাজি হয়নি। পরে একসময় অনু চৌধুরীর জোরাজোরিতেই রাজি হয়ে গেলেন। আমি আজমল উদ্দীনের ব্যাপারটা অনেকবার শেয়ার করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আব্বুর মানসিক চিন্তার কথা, অসুখের কথা শুনে আর কিছুই বলিনি। তাছাড়া অনু চৌধুরীর তুমুল নিষেধাজ্ঞা, যদি কিছু বলছোস ওর নামে তাহলে ঐদিনই তোরে, তোরে বাপরে মাইর‍্যা এরপর আমি নিজেও মরমু।
তোদের সুখের সংসার জ্বালায়ে দিমু।

অনু চৌধুরী এই বাহানা দিয়ে (ব্যবসা দেখার) হরহামেশাই চলে যেতেন আজমল উদ্দীনের কাছে। কিন্তু সেটা রেজা চৌধুরী ওরফে আব্বু জানতেন না।
কয়েকবারই অবশ্য লোকজনের কাছ থেকে খবর আসছিলো যে অনু চৌধুরীকে একজন মধ্যবয়সী লোকের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটতে, চলতে দেখা গেছে অমুক~তমুক জায়গায়।

সে দোকানপাটে ও তার বেশি সময় ব্যয় করেনা। তাহলে থাকেটা কোথায় ঘন্টার পর ঘন্টা?
আব্বুর সমস্যা হচ্ছে অন্ধ~বিশ্বাস।
সে শক্ত হাতে ধরতে গিয়েও ধরেনি।
সে যখন বিষয়টা ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে যায়, তখন আবার অনু চৌধুরী সাবধান হয়ে যেতেন।

গড়িমাসি করে এভাবেই চললো কয়েকমাস। মাঝেমধ্যেই দেখতাম সে তেঁতুল, চাটনী এটা ওটা খুব বেশি খেতো।

এত বেশি খেত যেন সে মরিয়া হয়ে যায় এগুলোর জন্য।
আব্বু এসব লক্ষ্য করার মত সময়ই পেতেন না। তবে সে তার ইচ্ছা আর ভালোবাসার বশীভূত হয়ে কয়েকবারই অন্তরঙ্গ মুহূর্তে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অনিচ্ছাসত্ত্বে ফিরে আসতে হয়েছে বার বার।

অনু চৌধুরীর সারা মাসই পিরিয়ড চলে। কিন্তু রেজা চৌধুরী বুঝতো না, ওটা পিরিয়ড না। বাচ্চা মিসকারেজের জন্য, বাচ্চা স্বেচ্ছায় নষ্ট করার ফলাফল। সে তার সবকিছু বিলীন করতো আজমলের জন্য, রেজা চৌধুরীর জন্য নয়। রেজা চৌধুরী ছিলো অনু চৌধুরীর দেখানো, নামমাত্র স্বামী। কিন্তু ততদিনে সে মনে প্রাণে ভালোবাসে আজমল সাহেবকে।

আজমলের অসাবধানতার জন্যই বাচ্চা মিসকারেজের কিছু ঝামেলা পোহাতে হতো তাকে।
সে এরকম কয়েবারই কন্সিভ করেছে আবার নষ্ট ও করে ফেলেছে। তার শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো। তাই এতবার মিস্কারেজ করেও সে দিব্যি সুস্থ ছিলো।
মিস্কারেজ করতো কারণ তখনো সে তার কার্যসিদ্ধি করতে পারেনি।

বিষয়টা নিয়ে একদিন রেজা চৌধুরী চিন্তা করে। ভাবলো, অনুর কোনো বড় অসুখ হয়নি তো?
ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার পর সে(মহিলা ডাক্তার) অনু চৌধুরীকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেন,

~ কী ব্যাপার ম্যাডাম? হাজবেন্ডকে জানান না এসব? এখন বাচ্চা কয়টা আপনার? আর নিতে চান না?
অনু চৌধুরী সেই ধাপ ও ছলে বলে কৌশলে অতিক্রম করে আসে।
আজমল উদ্দীনের সাথে একদিন সামনাসামনি দেখাও হয়ে যায় রেজা চৌধুরীর।
অনু চৌধুরী ও তখন সাথেই ছিলো।

অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনের পরিচয় দেন, জেঠাতো ভাই। রেজা চৌধুরী বাইরে দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গি দেখালেও ভিতরে ভিতরে সন্দেহ করছিলেন। জেঠাতো ভাই হলে তো একে চেনার কথা, কিন্তু তিনি কিছুই চিনতে পারলেন না।
বাসায় এসে জিজ্ঞেস করলেন,
~ অনু, তোমার ঐ জেঠাতো ভাই আমাদের বিয়েতে আসেনি? কই আমার সাথে তো কেউ তাকে পরিচয় করায়নি।

~ কিভাবে আসবে বলেন? ও তো দেশে ছিলো না।
দেশের বাইরে থাকে ও। এইবারই তো আসছে।
এইভাবে হাজারো মিথ্যার আশ্রয়েই ধামাচাপা পড়ে যায় তার পাপ~কর্ম।
আমার ক্লাস সিক্সের শেষের দিকে রেজা চৌধুরীর সাথে ঝগড়া বেঁধে যায় অনু চৌধুরীর।
আমিও এর পিছনে দায়ী।

যখন দেখলাম, তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে”আজমল উদ্দীন আসলে কে?”~ এই বিষয় নিয়ে তখন খুব ইচ্ছা করতো আব্বুকে সব বলে দেই।
ফ্যামিলির এইসব অস্বাভাবিক কার্যকলাপ নিজের চোখে দেখতে দেখতে, এসবের মুখোমুখি হতে হতে আমি বয়সের চেয়েও দ্বিগুন বড় হয়ে গেছিলাম। আমিও সবটাই বুঝতাম ততদিনে।

একদিন অতি সন্তপর্ণে আব্বুর কানে কথাটা তুলে দেই। ইনি আজমল উদ্দীন, এনার সাথেই আম্মুর মেলামেশা, ইনি আমাদের বাসায় ও এসেছিলেন, ইনি আসলে অনু চৌধুরীর জেঠাতো ভাই না, ইত্যাদি সব…
কিন্তু আজমল উদ্দীনের আমার সাথে করা ব্যবহারগুলোর কথা লজ্জ্বার কারণে আর বলতে পারিনি।

এই নিয়ে একদিন তুমুল ঝগড়া বাঁধে।
অনু চৌধুরীকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। বাসায় সারাদিন কেউ থাকেনা। আব্বু সারা দিন~রাত থাকে বাইরে বাইরে। তাই আমাদের ও সাথে করে নিয়ে গেলেন অনু চৌধুরী।
আমাদের সাথে করে নিয়ে যাওয়াটা ছিলো তার একটা টোপ।
আমরা সাথে গেলে মাসে মাসে আমাদের খরচ পাঠাবে আব্বু, আর সেটা ও তার চাই, নিজের খরচের জন্য।

আমরা নানুর বাড়ি অনেক দিন কাটাই।
সেই আগের মতই আবার শুরু হলো।
একদিকে অনু চৌধুরী অন্যদিকে তানিশা চৌধুরী। দুজনেই যেন প্রতিযোগিতার মাঠে নেমে পড়েছিলো।
অনু চৌধুরীর ফ্যামিলিকে যখন তার অবৈধ সম্পর্কের কথা আব্বু জানায় তখন তারা একটু রুক্ষ ভাবাপন্ন হয় তার সাথে।

কিন্তু যখন নিজেরাই ঘটনা পরখ করে দেখলো, আসলেই ঘটনা সত্যি। অনু চৌধুরীর সত্যিই আরেকটি অবৈধ সম্পর্ক আছে এবং সে সেই সম্পর্কের সাথে গুরুতরভাবেই জড়িয়ে পড়েছে তখনই তারা শক্ত হাতে ধরে। বিষয়টার গুরুত্ব দেয়। বড় মামার বড় বড় কথা তখন যেন নিমিষেই ভেজা বেড়ালের মত চুপসে যায়।

সে এবং পুরো ফ্যামিলি তাকে নানানভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে।
দুই মেয়ে আছে, এত ভালো~স্বাবলম্বী স্বামী আছে, তাহলে কেন তুই অন্য একটা সম্পর্কে যাবি~এসব বোঝানো হলো কয়েক ধাপে।
কিন্তু ততদিনে খুব বেশিই দেরী হয়ে গেছিলো।

নিজের মা, ভাই, বোনদের কথাও কানে তুললেন না অনু চৌধুরী।
তার আর রেজা চৌধুরীকে ভালো লাগেনা।
তাকে আর তার চাই ই না।

এটাই মূল এবং শেষ কথা।
মাস যেতেই আবার সে কন্সিভ করে।
মাঝেমধ্যেই তো নিঁখোজ থাকে।

তাই সবার আর বুঝতে বাকি রইলো না বিষয়টা আর স্বাভাবিক নেই।
অনু চৌধুরীর মা প্রথম প্রথম খুব শক্তভাবেই ধরেছিলেন। খুব বোঝাতেন, শাসন করতেন।
এসব অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনকে জানালে আজমল উদ্দীন তার টাকার খেল দেখানো আরম্ভ করেন।

সে প্রতিনিয়ত নানান ধরণের ফলমূল, শাড়ি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে লাগলেন শাশুড়ি, ভাবী, বোনদের।
ফলপ্রসূ সবাই ই আস্তে আস্তে চুপ করে যায়।

হতদরিদ্র ফ্যামিলি একটু কিছু পেলেই মহানন্দে থাকে ~ এই আরকি।
তারা আগের মত আর শক্ত হাতে ঘায়েল করলো না অনু চৌধুরীকে বরং সাপোর্টিভ হয়ে গেলো ক্রমশ। কিন্তু বড় মামা আর মেঝো, ছোট মামারা এসবের ঘুণাক্ষর ও জানতেন না। জানলে, তারা হয়তো তাদের বোনকে এই বিপথে যেতে সাহায্য করতো না। অনু চৌধুরীকে কড়া চোখে দেখেশুনে রাখার দায়িত্ব যাদের হাতে দিলো তারাই ছিলো দায়িত্বজ্ঞানহীন, লোভী।

তারাই আরো আস্কারা দিতে লাগলো।
অনু চৌধুরীর খাওয়ার হার আরো বেড়ে গেলো।
সে দিনে দিনে নিজেকে সুন্দরী বানাতে থাকে। প্রতিমাসে দুবার করে পার্লারে যাওয়া আরম্ভ করে।

গ্রাম্য প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে,
১০দিন চোরের, একদিন গেরস্তের।

একদিন সবটা ফাঁস হয়ে যায় মামাদের কাছে। তারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে অনু চৌধুরীকে সাত আট মাসের ও বেশি সময় পর আবারো রেজা চৌধুরীর কাছে পাঠায়। রেজা চৌধুরী দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে আর অনু চৌধুরীর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আবারো মেনে নেয়। সে ভাবলো, এতদিন পরিবারের কাছে ছিলো। হয়তো আমার কথা না হোক, মেয়েদের কথা ভেবে হলেও শুধরে গেছে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে।
সে বরং নিজেই নিজেকে আরো শুধরানোর চেষ্টা করলো। এবার থেকে অনুকে, বাচ্চাদের বেশি সময় দিবো। এই সেই…
কিন্তু না!

পরের দিনই সে আমাদের বাসায় রেখে পালিয়ে যায়।
অনেক রাত অবধি ফিরছে না অনু চৌধুরী।
পাগলের মত এদিক~ওদিক ছোটাছুটি করছেন রেজা চৌধুরী।
কাঁদতে কাঁদতে অসহায়ের মত সব জায়গায় ফোন করছেন। কোনো জায়গায় বাদ রাখেন নি।

কিন্তু, কোত্থাও নেই অনু চৌধুরী!
রাত বারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট, তখন ও রেজা চৌধুরীর দরজা খোলা,
“অনু চৌধুরী আসবে বলে।”
কিন্তু সে আর আসেনি।
তখনই রেজা চৌধুরী বুঝে যান,
সে ভুল করেছে আবার। নিজের বউকেও বিশ্বাস করতে নেই এভাবে। এতটা ভালোবাসতে নেই!

বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হয়েছে সে!
চরম অন্যায় হয়েছে তার সাথে।
সব মিথ্যা!
সব অভিনয় ছিলো!

(চলবে)
ফারজানা রহমান তৃনা।
(এই গল্পটি একটি সত্য ঘটনারই গাল্পিক রুপ। ঘটনাটাস্থলে উল্লেখিত”নানুবাড়ি”আমার ও নানুর বাড়ি। তাই বিস্তারিত জানি বলে লিখছি।

গল্পের তানিশা আর রাকা আমার কাছে নাচ~গান শিখতো, নিজেও ছোট ছিলাম তখন, অনেক কাছ থেকেই দেখেছি সব। কিন্তু আপনারা বলছেন কাহিনীর গতিময়তা নেই, ভালো লাগেনা ইত্যাদি। সব গুছিয়ে আনতে গিয়ে হয়তো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। )

রাকা (১২)

অনু চৌধুরী চলে যাওয়ার মাস দেড়েক পর ও আমরা কেউ স্বাভাবিক হতে পারি নি। যতই হোক, সে একজন স্ত্রী ছিলো, একজন মা ছিলো।

বাসার আনাচে~কানাচ যেন তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই আছে। আলস্য কিংবা পরিশ্রমের অথবা হোক তা অবিশ্বাসের..যেমনই হোক, আমরা যেমনভাবে পেয়েছিলাম আমাদের মাকে এতদিন, তেমনভাবেই চিনি তাকে।

আমাদের মা’কে চেনা আর অন্যদের মা’কে চেনার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই আমরা তেমনভাবেই তার সামান্য অভাব অনুভব করছি।
আমার ক্লাস সেভেনের পড়াশোনা কোথায়,
কোথায় আমার বাল্যকাল?
সব শেষ। সব নষ্ট।

সব আমার আম্মুর সুখের জন্য খুন হয়েছে।
ক্ষতবিক্ষত, নষ্ট হয়ে গেছে তিন তিনটি জীবন।
অনু চৌধুরী যাওয়ার সময় তার সব বিয়ের গহনা, শাড়ি, তার প্রয়োজনীয় কিছু হাড়ি~পাতিল, ব্লেন্ডার ইত্যাদি নিয়ে গেছে।

সে হয়তো একেবারে না পারতে ঘরের সব আসবাবপত্র ছেড়ে গেছে। যদি সম্ভব হতো, তাহলে পুরো বাসার সবকিছু নিয়েই সে চলে যেত।
সবই আব্বুর দেওয়া। আব্বুর টাকায় কেনা।

সামনে দুই দুইটা মেয়ের বিয়ে দিবে, এই ভেবে হলেও সে কিছু গহনা অন্তত রেখে যেতে পারতো। রেখে যাওয়াই তো উচিতব্য ছিলো, মাতৃবৎ আচরণের তাড়নায়?
কিন্তু অনু চৌধুরীর মাতৃত্ববোধ, তার সাধারণ ন্যুনতম হিতাহিত জ্ঞান সব কিছুর উর্দ্ধে চলে গিয়েছে।

এই সবকিছুর চেয়ে তার কাছে দামী একজনই।
আজমল উদ্দীন। আমরা তিনজন, সে একজন। তবুও তার পাল্লাই ভারী।

অনু চৌধুরীর বাড়ি থেকে পালানোর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ও দাদি বা ফুফুরা কেউই একটা ফোন করে একবারের জন্য ও খোঁজ নেয়নি আমাদের। দাদির ক্ষোভ মূলত আব্বুর উপর। আর আমাদের উপর আছে রাগ, কারণ আমরা অনু চৌধুরী গর্ভজাত সন্তান। ফুফুরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাচ্ছে কারণ তাদের ছেলে~মেয়ের বিয়ে দিতে হবে সামনেই। বড় ফুফু তো ঢাকা ছেড়েই চলে গেছেন। ওখান থেকেই পাত্রী দেখেছেন, সম্বন্ধ ও করে ফেলেছে। রেজা চৌধুরী নামে তার কোনো ভাই নেই~ পাত্রীপক্ষকে এমনটাই জানানো হয়েছে।
অথচ একসময় এই রেজা চৌধুরীর টাকাতেই তাদের সংসার চলতো।

আপন স্যারের ফোন এসেছিলো ইতোমধ্যে অনেকবার।
স্কুলে কেন যাইনা, এটা জানার জন্যই সে ফোন করে, জানি।
কিন্তু আমার কথা বলার কোনো ইচ্ছা নেই।
কারণ এসবের কৈফিয়ত দিয়ে আব্বুকে টপকানো গেলেও তাকে টপকানো যাবেনা। ধরা পড়তে হবেই।

আব্বুর সাথে এখন আপন স্যারের সম্পর্ক ভালো। কয়েকদিন আগেও দুজন মিলে মতি চাচার দোকানে বসে চা খেয়েছে, গল্প করেছে। এই একজনই মানুষ যে আব্বুকে টিটকারি করে বা খোঁচা দিয়ে কোনো কথা বলেনি এখন পর্যন্ত।
এই বিশারদ কোনো কথাই জিজ্ঞেস করেনি।
কিন্তু দিনে অন্তত হাজারখানেকবার অগণিত মানুষের প্রশ্নের পাহাড়ে ডুবে কাহিল হয়ে সে ফিরে আসে।

“ঐ মিয়া, কেমন পুরুষ আফনে? নিজের বউ ধইর‍্যা রাখতে পারেন না?”
“এই ভাই এই, আফনের বই নাকি ভাইগ্যা গেছে?”
“ভাই আপনার মধ্যে পুরুষত্ব নাই নাকি? না কি কোনো অক্ষমতা আছে? সব ঠিক থাকলে বউ অন্য লোকের কাছে যায় ক্যান ভাই?”

“ভাই শুনছি আপনার পালাইন্যা বউয়ের ওইহানেও ছানাপোনা হইছে?”
“আফনে কেমন পুরুষ ভাই? বউ প্রেমিক নিয়া আফনের নিজের ঘরে ও থাওনের সাহস পায়! এতটা উদাসীন কেম্নে আফনে ভাই?”
ইত্যাদি সব অশালীন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তার, রোজ রোজ।
সে প্রসঙ্গ বাদ দিলাম।

তবুও সে এখন তার দুই মেয়ে নিয়েই ভালো থাকার চেষ্টা করছে।
দাদিকে ফোন করলে দাদি ফোন ধরেনা,
কেটে দেয়।

তাই একদিন আমাকে ও সাথে করে নিয়ে গেলো দাদির কাছে।
দাদির কাছে মিনতি করে বললো,
সে যেন আমাদের সাথেই এখন থেকে থাকে।
দাদি কিছুতেই রাজি হলেন না।

তার এখন আবার একটাই কথা,
~ রেজা, তোকে আমি আবার বিয়ে দিবো। আমার ছোট বোনের মেয়ের সাথে। ওর আগের স্বামী মারা গেছে। কিন্তু মেয়েডা খুবই বালা। এমন মেয়ে পাওন ভাইগ্যের ব্যাপার।
আসলেই ঐ মহিলা দেখতে~শুনতে ভালো। ছিমছাম গঠন, টিপটপ চলন।
আমিও তাকে চিনি। মাঝেমধ্যে দাদির বোনের সাথে সেও আমাদের বাসায় আসতো।
অনু চৌধুরী তো তখন বিষ খেয়ে বিষ হজম করতো।
ঐ মহিলা আমাকে খুব আদর করতো।

তার চোখের মধ্যে বিধাতা এক গাদা মায়া ঢেলে দিয়েছেন বোধ করি। ঐ আন্টিকে আমার এতটাই ভালো লাগতো যে ছোটবেলায় সে চলে যাবে শুনলে তার ব্যাগ লুকিয়ে রাখতাম।
তারপর প্রমিস করিয়ে নিতাম,
তুমি আবার কালকেই চলে আসবা তো?

ঐ আন্টির জীবনের গল্পটাও খুব মর্মান্তিক।
তার স্বামী বিয়ের পাঁচ বছর পরই মারা যায়।
তার প্রথম সন্তান ও স্বামী মারা যাবার ছয় মাসের মাথায় মারা যায়। বাচ্চাটার শ্বাসকষ্ট উঠছিলো।

ওর পায়খানায় ও সমস্যা ছিলো।
কালো রঙের পায়খানা করতো নির্দিষ্ট সময় পার হবার পরেও।
তারপর হঠাৎ সামান্য শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েই নিস্তেজ হয়ে যায় শেষ সম্বলটুকুও।
বিধাতার লেখা নিয়তি আমাদের দুই কুলের দুইজনের জন্যই খুব নিষ্ঠুর, পাষণ্ডতায় ভরপুর।

কেন? আমাদের জন্য তাহলে পৃথিবীতে আসা বরাদ্দ হয়েছিলো কেন?
সবার জন্য পৃথিবী এত সুখ~সাফল্যের।
আমাদের বেলায় তাহলে কেন এত নিষ্ঠুরতা,
হে বিধি!
এখন সে নি:স্ব।

এখন পর্যন্ত উনার বিয়ের জন্য অনেক পাত্রই এসেছে। রুপে গুণে লক্ষী তো। কিন্তু যাদের প্রতি সে সামান্য এগিয়েছে বা তার ভালো লেগেছে; তারাই পরে পিছিয়ে গেছে। দু দু বার এনগেইজমেন্ট রিং ও পরিয়ে গিয়েছিলো।
এক সপ্তাহ পর আবার না করে দিয়েছে বিনা কারণে।
অবশ্য ভিত্তিহীন একটা কারণ আছে,
সে অপয়া মেয়ে।

তাছাড়া সমাজে নিন্দুক আর বিয়ে ভাঙার কমিটির তো অভাব নেই, তাইনা?
তাদের কথা,
যার স্বামী, বাচ্চা দুটোই একসাথে মরে, তার মত অপয়া~অভাগী আছে নাকি দুনিয়ায়?
অপয়া মেয়ে~মানুষ!
ঐ আন্টির নাম রিমা। রিমা আক্তার।
সে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলো।

উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই বিয়ে।
আর তারপর এই সব…
একের পর এক ঘটে গেলো।
দাদি এখন সর্বস্ব দিয়ে চায় রিমা আক্তারকে আমাদের বাবার বউ করে আনতে।
কিন্তু আব্বু কোনোভাবেই রাজি নয়।

সে কিছুতেই অনু চৌধুরীকে ভুলতে পারছেনা। পারবে বলে মনেও হয়না।
অনু চৌধুরীর মায়া কাটিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার পাতা, তার পক্ষে অসম্ভব।
তার মা বলে,
~ ঐ দুশ্চরিত্রা ফিরলেও কি তুই তারে মাইন্না নিবি? সমাজে চলতে পারবি তুই?
আমরা তো কেউ মুখ ও দেখাইতে পারুম না।

~ মেনে নিবো মা। মেনে নিবো। অনু আমার দুই মেয়ের মা, আমার স্ত্রী, আমার সব।
~ ওরে নিমকহারাম, তুই বুঝলি না এখনো? তুই এখনো বুঝলি ঐ কাল~নাগিনী আসলে শয়তান ছিলো। অয় তোর টাকার লোভে এতদিন পইড়্যা ছিলো? আরে ওর এই প্রেম পিরিতি অনেক আগে থেইক্যাই চলে বাপ, আমি নিজেও দ্যাখছি।

বিয়ে কইর‍্যা আহনের পর ও এই মাইয়্যা তার পিয়ারের প্রেমিকগো লগে কথা কইতো। আমি নিজ কানেও শুনছি। এহন এইডা কোনডার লগে ভাগছে তা তো আর বলতে পারিনা বাপ। ঘাট হইছে আমার। তুই এই বউয়ের কথা ভুইল্যা যা বাপ। দোহাই লাগে তোর।
রেজা চৌধুরীর চোখ মুখে আড়ষ্টতা।
সে বিকারহীন।

প্রলম্বিত শ্বাস নিচ্ছে।
কিঞ্চিৎ অবসাদ আর ঘোরের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে,
অনু চৌধুরী তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে।

সে তার অধিকার ফিরে পেতে চাচ্ছে।
সে কি মায়াবী চাহনিযুক্ত আঁখিপল্লব!
করুন মুখায়বে বলছে,
~ রেজা, আপনি আরেকটা বিয়ে করে নিলেন? আমার ঘর কোথায়? কোথায় আমার সংসার?

রেজা চৌধুরী অস্ফুটস্বরে বলে,
~ তুমি ও তো সব ভেঙে দিয়ে চলে গেলে অনু।
এত কিছুর পরেও অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধলে তুমি।
~ আমার মতিভ্রম হয়েছিলো। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনার পায়ে পড়ি। আর হবেনা এমন।

রেজা চৌধুরী ভাবছে,
তখন সে কি করবে?
যদি অনু ফিরে আসে?

যদি আবার দৃঢ়ভাবে ক্ষমা চায়?
বার বার কেউ ঠকায় নাকি?
না! নিয়তি এত নিষ্ঠুর হতে পারেনা।
অনুর দুই দুইটা মেয়ে আছে।
অনু ফিরে আসবে।

তারপর আমরা দুজন মিলে
আমাদের মেয়েদের বড় করবো, বিয়ে দিবো। আসুক এবার অনু, ওকে আমি আমার ভালোবাসায় ভরিয়ে দিবো!
অনু আসবে, ও আসবে।

আমার ভালোবাসা তো মিথ্যা ছিলো না।
এখনো খুব ভালোবাসি। আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়। আমার ভালোবাসা, মেয়েদের ভালোবাসার টানে হলেও সে ফিরে আসবে।
সে এসব ভেবে মনে মনে আশ্বস্ত হয়।
দাদি ছেলের চোখের এই আশা~ভরসার ছাপ স্পষ্ট দেখেন। বুঝতে পারেন, তার এই ছেলে অন্ধ।
এই ছেলে কোনোদিন ও শুধরানোর নয়।
দাদি ও ছাড়ার পাত্রী নয়।

দাদিও গোঁ ধরে রইলেন।
আমরা দাদিকে ছাড়াই বাসায় ফিরে এসেছি।
সে ফেরেনি আমাদের সাথে আমাদের বাসায়।

যা হয় হোক, ছেলের এই কষ্ট উনি নিজ চোখ দেখতে পারবেন না আর।
তাই ছেলেকে আবার বিয়ে করাবে,
তারপর ছেলের কাছে গিয়ে থাকবে।
ছেলের সুখ দেখে যেতে চায় এই অভাগী মা।

আজকের আকাশ কয়েক মুহূর্ত আগেও স্বচ্ছ ছিলো। সন্ধ্যে নেমে এসেছে।
এখন মনে হচ্ছে দাপুটে হাওয়া বইবে।
আকাশ কালো হয়ে গেছে, হয়তো এখনি তাণ্ডবনৃত্যের ভঙ্গিতে ঝড়~বৃষ্টি নামবে।
কিন্তু আজকে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আমাদের বাসার আরেকজন সদস্য নিরুদ্দেশ।
তানিশা আপু বাসায় এখনো ফিরেনি।

সকালে নাস্তা করে বেরিয়েছিলো কিনা জানিনা। আমি ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম সে বাসায় নেই। আব্বু দরজা বাইরে দিয়ে লক করে ততক্ষনে কাজে চলে গেছে।
আমি একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠি।
কাজ নেই, পড়াশোনা নেই, করবোটা কি সারাদিন.. তাই।
আব্বুকে এ নিয়ে দুবার ফোন দিলাম।

~ আব্বু, তানিশা আপু তোমাকে কিছু বলে গেছে? দুপুরে তো খেতেও আসেনাই।
~ না মা। কোন বান্ধবীর বাসায় গেছে হয়তো। চলে আসবে।
আবার সন্ধ্যায় ফোন দিলাম।
~ আব্বু আপু কি কল দিছে তোমাকে?
~ কেন? তানিশা এখনো বাসায় যায়নি?

পর্ব ১১

দাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~ দাদি, কী হইছে? তোমরা সবাই আজকে আমাদের বাসায় আসছো যে!
দাদি কিছুই বলছেনা শুধু নাক টেনে কাঁদছে।

তার মুখের বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। সবার মুখই কালো হয়ে আছে। খারাপ কিছু কি হয়েছে?
ছোট ফুফির কাছে গিয়েই তার সাথে চেপে বসে জিজ্ঞেস করলাম,
~ ও ফুফি, কী হইছে? কারো কিছু হয়েছে? দাদি কাঁদে কেন?
ছোট ফুফি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
~ তোর বাবা অসুস্থ হইয়্যা পড়ছে রে রাকা, তোর বাবার খুব খারাপ অবস্থা..
কথাটা শুনেই আমি ফুফির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

~ কী হইছে আমার আব্বুর? বলো না ফুফি, ও ফুফি..
ফুফি কান্না জড়ানো গলায় বললো,
~ এক্সিডেন্ট করছে তোর বাপে। এক্সিডেন্ট।
কথাটা শুনেই বুকটা যেন ধক করে উঠলো সাথে সাথে।
আর কথা বলতে পারলাম না।

ফুফিরা জোরে জোরেই বিলাপ করতে লাগলেন,
~ ভাইয়ের কি এমন দুশ্চিন্তা, কি এমন সমস্যা যে ভাই আমার এতটা অমনোযোগী হয়.. ক্যান আমার ভাইডার এমন হইলো। আমার ভাইয়ের তো কোনোদিন ও এত চিন্তা ছিলোনা। তাইলে এহন ক্যান এমন হইলো? আমরা কি কিছু বুঝিনা?
তারপর তাদের কথার শোরগোলে বুঝে নেই,
গতকাল রাতেই আব্বু এক্সিডেন্ট করেছিলো।

মাত্রাতিরিক্ত উদ্বিগ্নতায় তার বুকের ব্যাথা আর মাথাব্যাথা বেড়ে গেছিলো। তাই আর সহ্য করতে না পেরে ঔষধ আনার জন্য নিজেই বের হইছিলো। পথিমধ্যে আচমকা তার মাথা ঘুরে যায় আর একটা বাসের সামনে পড়ে যায়। এক পা আর এক হাত পুরোই থেতলে গেছে। মাথায় ও আঘাত পেয়েছে।

অনেক রক্তপাত হয়ে গেছিলো কারণ ঐ রাস্তায় অত রাতে লোকজনের আনাগোনা কম ছিলো। একজন এসে দেখেছে তাও অনেক দেরীতে। আর বাসওয়ালা তখনই পালিয়েছিলো। ততক্ষনে প্রচুর ব্লাড খরচ হয়ে যায়। ডাক্তারখানায় নিতে নিতে আরো বেশি। আব্বুর অবস্থা এখন ভালো না। পায়ের হাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে।
তার মানসিক চিন্তা, দুশ্চিন্তার দরুন
ব্রেইনে খুব এফেক্ট ফেলছে।

এই প্রভাব এক দুদিনের না, বহুদিনের পোষা রোগ। যার ফলে মাথা ঘুরে গেছিলো।
এরকম আবার হতে পারে। হয় তার সব সমস্যা সমাধা করতে হবে নতুবা তাকে রিল্যাক্সেশনে রাখতে হবে। একদম চিন্তামুক্ত পরিবেশ চাই তার জন্য। হাসপাতালে সারা রাত সে ব্যাথায় কুঁকড়ে গেছিলো। সারা রাত শুধু রাকা রাকা, আমার কী হবে ইত্যাদি সব কথাবার্তা বলে বিড়বিড় করে যাচ্ছিলো।

অনু চৌধুরীকে হাজারবার ফোন করার চেষ্টা করা হয়েছিলো, আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করেছে, এইতো সকালেই।
ধরেই যখন জানতে পারে এই খবর, তাড়াতাড়ি আজমল উদ্দীনকে উঠিয়ে তাকে বের করে দেয় ঘর থেকে।

তাই আজ ও কেউই জানতে পারলো না আজমল উদ্দীনের ব্যাপারটা।
অনু চৌধুরীকে দাদি, ফুফুসহ সবাই মিলে খুব বকলো। এত উদাসীন কিভাবে থাকে সে, ফোন তোলেনি কেন, আব্বুর উপর কেন চাপ দিচ্ছে, কিসের এত দুশ্চিন্তা এসব অনু চৌধুরী জানেনা কেন ইত্যাদি ইত্যাদি বলে…
সেবার আব্বুর এই এক্সিডেন্টই আটকিয়ে রেখেছিলো অনু চৌধুরীকে।
নচেৎ সেবারই হয়তো সে পালাতো।

আব্বুর সেবাযত্নের জন্য দাদি বাধ্য হয়েই থেকে গেলো কয়েক মাস। তার ধারণা, বউয়ের অযত্ন, উদাসীনতা, বদ~অভ্যাসই ছেলের এই অসুখের কারণ।
ফুফুরাও আসা যাওয়া করতো তখন।

সেজন্য এক হিসেবে আমাদের জন্য সুবিধাই হচ্ছিলো।
নির্বিঘ্নে চলছিলাম। ভালোই চলছিলো সব।
মাসখানেকের মধ্যেই যখন আব্বু সুস্থ হয়ে যায় তখন দাদি আবার চলে যায় আমাদের বাসা থেকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেতে হয়েছে বলা বাহুল্য।

এ ক’দিন থেকেই তার দফারফা এক হয়ে গেছে অনু চৌধুরীর অনিয়ম, অত্যাচারে।
কিন্তু সমস্যার শুরু হলো দাদি চলে যাওয়ার পর। আব্বু তখন ঘরে বসেই সব সামলায়।
অনু চৌধুরী একদিন নিজে যেঁচে এসে বলে,

~ শুনো না, তুমি তো অনেকদিন ব্যবসায় যেতে পারো না। আমি মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখে আসি সব? তুমি আমাকে বুঝায়ে দিলা সব, আমি সব তেমনভাবেই দেইখ্যা আসবোনে। সব ঠিক আছে কিনা, তারা আসলেই কাজ করে কিনা ভালো কইর‍্যা… এইভাবে আর কয়দিন কও?
নিজের ব্যবসা এইভাবে অন্যদের উপর বিশ্বাস কইর‍্যা চালানো যায়? দুনিয়ায় কাউরে বিশ্বাস করা যায় নাকি?

আব্বু প্রথমে রাজি হয়নি। পরে একসময় অনু চৌধুরীর জোরাজোরিতেই রাজি হয়ে গেলেন। আমি আজমল উদ্দীনের ব্যাপারটা অনেকবার শেয়ার করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আব্বুর মানসিক চিন্তার কথা, অসুখের কথা শুনে আর কিছুই বলিনি। তাছাড়া অনু চৌধুরীর তুমুল নিষেধাজ্ঞা, যদি কিছু বলছোস ওর নামে তাহলে ঐদিনই তোরে, তোরে বাপরে মাইর‍্যা এরপর আমি নিজেও মরমু।
তোদের সুখের সংসার জ্বালায়ে দিমু।

অনু চৌধুরী এই বাহানা দিয়ে (ব্যবসা দেখার) হরহামেশাই চলে যেতেন আজমল উদ্দীনের কাছে। কিন্তু সেটা রেজা চৌধুরী ওরফে আব্বু জানতেন না।
কয়েকবারই অবশ্য লোকজনের কাছ থেকে খবর আসছিলো যে অনু চৌধুরীকে একজন মধ্যবয়সী লোকের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটতে, চলতে দেখা গেছে অমুক~তমুক জায়গায়।

সে দোকানপাটে ও তার বেশি সময় ব্যয় করেনা। তাহলে থাকেটা কোথায় ঘন্টার পর ঘন্টা?
আব্বুর সমস্যা হচ্ছে অন্ধ~বিশ্বাস।
সে শক্ত হাতে ধরতে গিয়েও ধরেনি।
সে যখন বিষয়টা ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে যায়, তখন আবার অনু চৌধুরী সাবধান হয়ে যেতেন।

গড়িমাসি করে এভাবেই চললো কয়েকমাস। মাঝেমধ্যেই দেখতাম সে তেঁতুল, চাটনী এটা ওটা খুব বেশি খেতো।
এত বেশি খেত যেন সে মরিয়া হয়ে যায় এগুলোর জন্য।

আব্বু এসব লক্ষ্য করার মত সময়ই পেতেন না। তবে সে তার ইচ্ছা আর ভালোবাসার বশীভূত হয়ে কয়েকবারই অন্তরঙ্গ মুহূর্তে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অনিচ্ছাসত্ত্বে ফিরে আসতে হয়েছে বার বার। অনু চৌধুরীর সারা মাসই পিরিয়ড চলে। কিন্তু রেজা চৌধুরী বুঝতো না, ওটা পিরিয়ড না। বাচ্চা মিসকারেজের জন্য, বাচ্চা স্বেচ্ছায় নষ্ট করার ফলাফল। সে তার সবকিছু বিলীন করতো আজমলের জন্য, রেজা চৌধুরীর জন্য নয়। রেজা চৌধুরী ছিলো অনু চৌধুরীর দেখানো, নামমাত্র স্বামী। কিন্তু ততদিনে সে মনে প্রাণে ভালোবাসে আজমল সাহেবকে।

আজমলের অসাবধানতার জন্যই বাচ্চা মিসকারেজের কিছু ঝামেলা পোহাতে হতো তাকে।
সে এরকম কয়েবারই কন্সিভ করেছে আবার নষ্ট ও করে ফেলেছে। তার শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো। তাই এতবার মিস্কারেজ করেও সে দিব্যি সুস্থ ছিলো।
মিস্কারেজ করতো কারণ তখনো সে তার কার্যসিদ্ধি করতে পারেনি।

বিষয়টা নিয়ে একদিন রেজা চৌধুরী চিন্তা করে। ভাবলো, অনুর কোনো বড় অসুখ হয়নি তো?
ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার পর সে(মহিলা ডাক্তার) অনু চৌধুরীকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেন,
~ কী ব্যাপার ম্যাডাম? হাজবেন্ডকে জানান না এসব? এখন বাচ্চা কয়টা আপনার? আর নিতে চান না?

অনু চৌধুরী সেই ধাপ ও ছলে বলে কৌশলে অতিক্রম করে আসে।
আজমল উদ্দীনের সাথে একদিন সামনাসামনি দেখাও হয়ে যায় রেজা চৌধুরীর।
অনু চৌধুরী ও তখন সাথেই ছিলো।

অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনের পরিচয় দেন, জেঠাতো ভাই। রেজা চৌধুরী বাইরে দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গি দেখালেও ভিতরে ভিতরে সন্দেহ করছিলেন। জেঠাতো ভাই হলে তো একে চেনার কথা, কিন্তু তিনি কিছুই চিনতে পারলেন না।
বাসায় এসে জিজ্ঞেস করলেন,
~ অনু, তোমার ঐ জেঠাতো ভাই আমাদের বিয়েতে আসেনি? কই আমার সাথে তো কেউ তাকে পরিচয় করায়নি।

~ কিভাবে আসবে বলেন? ও তো দেশে ছিলো না।
দেশের বাইরে থাকে ও। এইবারই তো আসছে।
এইভাবে হাজারো মিথ্যার আশ্রয়েই ধামাচাপা পড়ে যায় তার পাপ~কর্ম।
আমার ক্লাস সিক্সের শেষের দিকে রেজা চৌধুরীর সাথে ঝগড়া বেঁধে যায় অনু চৌধুরীর।
আমিও এর পিছনে দায়ী।

যখন দেখলাম, তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে”আজমল উদ্দীন আসলে কে?”~ এই বিষয় নিয়ে তখন খুব ইচ্ছা করতো আব্বুকে সব বলে দেই।
ফ্যামিলির এইসব অস্বাভাবিক কার্যকলাপ নিজের চোখে দেখতে দেখতে, এসবের মুখোমুখি হতে হতে আমি বয়সের চেয়েও দ্বিগুন বড় হয়ে গেছিলাম। আমিও সবটাই বুঝতাম ততদিনে।

একদিন অতি সন্তপর্ণে আব্বুর কানে কথাটা তুলে দেই। ইনি আজমল উদ্দীন, এনার সাথেই আম্মুর মেলামেশা, ইনি আমাদের বাসায় ও এসেছিলেন, ইনি আসলে অনু চৌধুরীর জেঠাতো ভাই না, ইত্যাদি সব…
কিন্তু আজমল উদ্দীনের আমার সাথে করা ব্যবহারগুলোর কথা লজ্জ্বার কারণে আর বলতে পারিনি।

এই নিয়ে একদিন তুমুল ঝগড়া বাঁধে।
অনু চৌধুরীকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। বাসায় সারাদিন কেউ থাকেনা। আব্বু সারা দিন~রাত থাকে বাইরে বাইরে। তাই আমাদের ও সাথে করে নিয়ে গেলেন অনু চৌধুরী।
আমাদের সাথে করে নিয়ে যাওয়াটা ছিলো তার একটা টোপ।
আমরা সাথে গেলে মাসে মাসে আমাদের খরচ পাঠাবে আব্বু, আর সেটা ও তার চাই, নিজের খরচের জন্য।

আমরা নানুর বাড়ি অনেক দিন কাটাই।
সেই আগের মতই আবার শুরু হলো।
একদিকে অনু চৌধুরী অন্যদিকে তানিশা চৌধুরী। দুজনেই যেন প্রতিযোগিতার মাঠে নেমে পড়েছিলো।
অনু চৌধুরীর ফ্যামিলিকে যখন তার অবৈধ সম্পর্কের কথা আব্বু জানায় তখন তারা একটু রুক্ষ ভাবাপন্ন হয় তার সাথে।

কিন্তু যখন নিজেরাই ঘটনা পরখ করে দেখলো, আসলেই ঘটনা সত্যি। অনু চৌধুরীর সত্যিই আরেকটি অবৈধ সম্পর্ক আছে এবং সে সেই সম্পর্কের সাথে গুরুতরভাবেই জড়িয়ে পড়েছে তখনই তারা শক্ত হাতে ধরে। বিষয়টার গুরুত্ব দেয়। বড় মামার বড় বড় কথা তখন যেন নিমিষেই ভেজা বেড়ালের মত চুপসে যায়।

সে এবং পুরো ফ্যামিলি তাকে নানানভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে।
দুই মেয়ে আছে, এত ভালো~স্বাবলম্বী স্বামী আছে, তাহলে কেন তুই অন্য একটা সম্পর্কে যাবি~এসব বোঝানো হলো কয়েক ধাপে।

কিন্তু ততদিনে খুব বেশিই দেরী হয়ে গেছিলো।
নিজের মা, ভাই, বোনদের কথাও কানে তুললেন না অনু চৌধুরী।
তার আর রেজা চৌধুরীকে ভালো লাগেনা।
তাকে আর তার চাই ই না।
এটাই মূল এবং শেষ কথা।

মাস যেতেই আবার সে কন্সিভ করে।
মাঝেমধ্যেই তো নিঁখোজ থাকে।
তাই সবার আর বুঝতে বাকি রইলো না বিষয়টা আর স্বাভাবিক নেই।
অনু চৌধুরীর মা প্রথম প্রথম খুব শক্তভাবেই ধরেছিলেন। খুব বোঝাতেন, শাসন করতেন।
এসব অনু চৌধুরী আজমল উদ্দীনকে জানালে আজমল উদ্দীন তার টাকার খেল দেখানো আরম্ভ করেন।

সে প্রতিনিয়ত নানান ধরণের ফলমূল, শাড়ি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে লাগলেন শাশুড়ি, ভাবী, বোনদের।
ফলপ্রসূ সবাই ই আস্তে আস্তে চুপ করে যায়।

হতদরিদ্র ফ্যামিলি একটু কিছু পেলেই মহানন্দে থাকে ~ এই আরকি।
তারা আগের মত আর শক্ত হাতে ঘায়েল করলো না অনু চৌধুরীকে বরং সাপোর্টিভ হয়ে গেলো ক্রমশ। কিন্তু বড় মামা আর মেঝো, ছোট মামারা এসবের ঘুণাক্ষর ও জানতেন না। জানলে, তারা হয়তো তাদের বোনকে এই বিপথে যেতে সাহায্য করতো না। অনু চৌধুরীকে কড়া চোখে দেখেশুনে রাখার দায়িত্ব যাদের হাতে দিলো তারাই ছিলো দায়িত্বজ্ঞানহীন, লোভী।

তারাই আরো আস্কারা দিতে লাগলো।
অনু চৌধুরীর খাওয়ার হার আরো বেড়ে গেলো।
সে দিনে দিনে নিজেকে সুন্দরী বানাতে থাকে। প্রতিমাসে দুবার করে পার্লারে যাওয়া আরম্ভ করে।
গ্রাম্য প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে,
১০দিন চোরের, একদিন গেরস্তের।

একদিন সবটা ফাঁস হয়ে যায় মামাদের কাছে। তারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে অনু চৌধুরীকে সাত আট মাসের ও বেশি সময় পর আবারো রেজা চৌধুরীর কাছে পাঠায়। রেজা চৌধুরী দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে আর অনু চৌধুরীর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আবারো মেনে নেয়। সে ভাবলো, এতদিন পরিবারের কাছে ছিলো। হয়তো আমার কথা না হোক, মেয়েদের কথা ভেবে হলেও শুধরে গেছে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে।
সে বরং নিজেই নিজেকে আরো শুধরানোর চেষ্টা করলো। এবার থেকে অনুকে, বাচ্চাদের বেশি সময় দিবো। এই সেই…
কিন্তু না!

পরের দিনই সে আমাদের বাসায় রেখে পালিয়ে যায়।
অনেক রাত অবধি ফিরছে না অনু চৌধুরী।
পাগলের মত এদিক~ওদিক ছোটাছুটি করছেন রেজা চৌধুরী।
কাঁদতে কাঁদতে অসহায়ের মত সব জায়গায় ফোন করছেন। কোনো জায়গায় বাদ রাখেন নি।

কিন্তু, কোত্থাও নেই অনু চৌধুরী!
রাত বারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট, তখন ও রেজা চৌধুরীর দরজা খোলা,
“অনু চৌধুরী আসবে বলে।”
কিন্তু সে আর আসেনি।
তখনই রেজা চৌধুরী বুঝে যান,
সে ভুল করেছে আবার। নিজের বউকেও বিশ্বাস করতে নেই এভাবে। এতটা ভালোবাসতে নেই!

বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হয়েছে সে!
চরম অন্যায় হয়েছে তার সাথে।
সব মিথ্যা!
সব অভিনয় ছিলো!

পর্ব ১২

অনু চৌধুরী চলে যাওয়ার মাস দেড়েক পর ও আমরা কেউ স্বাভাবিক হতে পারি নি। যতই হোক, সে একজন স্ত্রী ছিলো, একজন মা ছিলো।
বাসার আনাচে~কানাচ যেন তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই আছে। আলস্য কিংবা পরিশ্রমের অথবা হোক তা অবিশ্বাসের..যেমনই হোক, আমরা যেমনভাবে পেয়েছিলাম আমাদের মাকে এতদিন, তেমনভাবেই চিনি তাকে।
আমাদের মা’কে চেনা আর অন্যদের মা’কে চেনার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই আমরা তেমনভাবেই তার সামান্য অভাব অনুভব করছি।
আমার ক্লাস সেভেনের পড়াশোনা কোথায়,
কোথায় আমার বাল্যকাল?
সব শেষ। সব নষ্ট।

সব আমার আম্মুর সুখের জন্য খুন হয়েছে।
ক্ষতবিক্ষত, নষ্ট হয়ে গেছে তিন তিনটি জীবন।
অনু চৌধুরী যাওয়ার সময় তার সব বিয়ের গহনা, শাড়ি, তার প্রয়োজনীয় কিছু হাড়ি~পাতিল, ব্লেন্ডার ইত্যাদি নিয়ে গেছে।

সে হয়তো একেবারে না পারতে ঘরের সব আসবাবপত্র ছেড়ে গেছে। যদি সম্ভব হতো, তাহলে পুরো বাসার সবকিছু নিয়েই সে চলে যেত।
সবই আব্বুর দেওয়া। আব্বুর টাকায় কেনা।

সামনে দুই দুইটা মেয়ের বিয়ে দিবে, এই ভেবে হলেও সে কিছু গহনা অন্তত রেখে যেতে পারতো। রেখে যাওয়াই তো উচিতব্য ছিলো, মাতৃবৎ আচরণের তাড়নায়?
কিন্তু অনু চৌধুরীর মাতৃত্ববোধ, তার সাধারণ ন্যুনতম হিতাহিত জ্ঞান সব কিছুর উর্দ্ধে চলে গিয়েছে।

এই সবকিছুর চেয়ে তার কাছে দামী একজনই।
আজমল উদ্দীন। আমরা তিনজন, সে একজন। তবুও তার পাল্লাই ভারী।
অনু চৌধুরীর বাড়ি থেকে পালানোর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ও দাদি বা ফুফুরা কেউই একটা ফোন করে একবারের জন্য ও খোঁজ নেয়নি আমাদের।

দাদির ক্ষোভ মূলত আব্বুর উপর। আর আমাদের উপর আছে রাগ, কারণ আমরা অনু চৌধুরী গর্ভজাত সন্তান। ফুফুরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাচ্ছে কারণ তাদের ছেলে~মেয়ের বিয়ে দিতে হবে সামনেই। বড় ফুফু তো ঢাকা ছেড়েই চলে গেছেন। ওখান থেকেই পাত্রী দেখেছেন, সম্বন্ধ ও করে ফেলেছে। রেজা চৌধুরী নামে তার কোনো ভাই নেই~ পাত্রীপক্ষকে এমনটাই জানানো হয়েছে।
অথচ একসময় এই রেজা চৌধুরীর টাকাতেই তাদের সংসার চলতো।

আপন স্যারের ফোন এসেছিলো ইতোমধ্যে অনেকবার।
স্কুলে কেন যাইনা, এটা জানার জন্যই সে ফোন করে, জানি।
কিন্তু আমার কথা বলার কোনো ইচ্ছা নেই।
কারণ এসবের কৈফিয়ত দিয়ে আব্বুকে টপকানো গেলেও তাকে টপকানো যাবেনা। ধরা পড়তে হবেই।

আব্বুর সাথে এখন আপন স্যারের সম্পর্ক ভালো। কয়েকদিন আগেও দুজন মিলে মতি চাচার দোকানে বসে চা খেয়েছে, গল্প করেছে। এই একজনই মানুষ যে আব্বুকে টিটকারি করে বা খোঁচা দিয়ে কোনো কথা বলেনি এখন পর্যন্ত।
এই বিশারদ কোনো কথাই জিজ্ঞেস করেনি।
কিন্তু দিনে অন্তত হাজারখানেকবার অগণিত মানুষের প্রশ্নের পাহাড়ে ডুবে কাহিল হয়ে সে ফিরে আসে।

“ঐ মিয়া, কেমন পুরুষ আফনে? নিজের বউ ধইর‍্যা রাখতে পারেন না?”
“এই ভাই এই, আফনের বই নাকি ভাইগ্যা গেছে?”
“ভাই আপনার মধ্যে পুরুষত্ব নাই নাকি? না কি কোনো অক্ষমতা আছে? সব ঠিক থাকলে বউ অন্য লোকের কাছে যায় ক্যান ভাই?”

“ভাই শুনছি আপনার পালাইন্যা বউয়ের ওইহানেও ছানাপোনা হইছে?”
“আফনে কেমন পুরুষ ভাই? বউ প্রেমিক নিয়া আফনের নিজের ঘরে ও থাওনের সাহস পায়! এতটা উদাসীন কেম্নে আফনে ভাই?”
ইত্যাদি সব অশালীন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তার, রোজ রোজ।
সে প্রসঙ্গ বাদ দিলাম।

তবুও সে এখন তার দুই মেয়ে নিয়েই ভালো থাকার চেষ্টা করছে।
দাদিকে ফোন করলে দাদি ফোন ধরেনা,
কেটে দেয়।

তাই একদিন আমাকে ও সাথে করে নিয়ে গেলো দাদির কাছে।
দাদির কাছে মিনতি করে বললো,
সে যেন আমাদের সাথেই এখন থেকে থাকে।
দাদি কিছুতেই রাজি হলেন না।

তার এখন আবার একটাই কথা,
~ রেজা, তোকে আমি আবার বিয়ে দিবো। আমার ছোট বোনের মেয়ের সাথে। ওর আগের স্বামী মারা গেছে। কিন্তু মেয়েডা খুবই বালা।

এমন মেয়ে পাওন ভাইগ্যের ব্যাপার।
আসলেই ঐ মহিলা দেখতে~শুনতে ভালো। ছিমছাম গঠন, টিপটপ চলন।
আমিও তাকে চিনি। মাঝেমধ্যে দাদির বোনের সাথে সেও আমাদের বাসায় আসতো।
অনু চৌধুরী তো তখন বিষ খেয়ে বিষ হজম করতো।
ঐ মহিলা আমাকে খুব আদর করতো।

তার চোখের মধ্যে বিধাতা এক গাদা মায়া ঢেলে দিয়েছেন বোধ করি। ঐ আন্টিকে আমার এতটাই ভালো লাগতো যে ছোটবেলায় সে চলে যাবে শুনলে তার ব্যাগ লুকিয়ে রাখতাম।
তারপর প্রমিস করিয়ে নিতাম,
তুমি আবার কালকেই চলে আসবা তো?

ঐ আন্টির জীবনের গল্পটাও খুব মর্মান্তিক।
তার স্বামী বিয়ের পাঁচ বছর পরই মারা যায়।
তার প্রথম সন্তান ও স্বামী মারা যাবার ছয় মাসের মাথায় মারা যায়। বাচ্চাটার শ্বাসকষ্ট উঠছিলো।

ওর পায়খানায় ও সমস্যা ছিলো।
কালো রঙের পায়খানা করতো নির্দিষ্ট সময় পার হবার পরেও।
তারপর হঠাৎ সামান্য শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েই নিস্তেজ হয়ে যায় শেষ সম্বলটুকুও।
বিধাতার লেখা নিয়তি আমাদের দুই কুলের দুইজনের জন্যই খুব নিষ্ঠুর, পাষণ্ডতায় ভরপুর।

কেন? আমাদের জন্য তাহলে পৃথিবীতে আসা বরাদ্দ হয়েছিলো কেন?
সবার জন্য পৃথিবী এত সুখ~সাফল্যের।
আমাদের বেলায় তাহলে কেন এত নিষ্ঠুরতা,
হে বিধি!
এখন সে নি:স্ব।

এখন পর্যন্ত উনার বিয়ের জন্য অনেক পাত্রই এসেছে। রুপে গুণে লক্ষী তো। কিন্তু যাদের প্রতি সে সামান্য এগিয়েছে বা তার ভালো লেগেছে; তারাই পরে পিছিয়ে গেছে। দু দু বার এনগেইজমেন্ট রিং ও পরিয়ে গিয়েছিলো।
এক সপ্তাহ পর আবার না করে দিয়েছে বিনা কারণে।
অবশ্য ভিত্তিহীন একটা কারণ আছে,
সে অপয়া মেয়ে।

তাছাড়া সমাজে নিন্দুক আর বিয়ে ভাঙার কমিটির তো অভাব নেই, তাইনা?
তাদের কথা,
যার স্বামী, বাচ্চা দুটোই একসাথে মরে, তার মত অপয়া~অভাগী আছে নাকি দুনিয়ায়?
অপয়া মেয়ে~মানুষ!
ঐ আন্টির নাম রিমা। রিমা আক্তার।
সে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলো।

উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই বিয়ে।
আর তারপর এই সব…
একের পর এক ঘটে গেলো।
দাদি এখন সর্বস্ব দিয়ে চায় রিমা আক্তারকে আমাদের বাবার বউ করে আনতে।
কিন্তু আব্বু কোনোভাবেই রাজি নয়।

সে কিছুতেই অনু চৌধুরীকে ভুলতে পারছেনা। পারবে বলে মনেও হয়না।
অনু চৌধুরীর মায়া কাটিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার পাতা, তার পক্ষে অসম্ভব।
তার মা বলে,
~ ঐ দুশ্চরিত্রা ফিরলেও কি তুই তারে মাইন্না নিবি? সমাজে চলতে পারবি তুই?
আমরা তো কেউ মুখ ও দেখাইতে পারুম না।

~ মেনে নিবো মা। মেনে নিবো। অনু আমার দুই মেয়ের মা, আমার স্ত্রী, আমার সব।
~ ওরে নিমকহারাম, তুই বুঝলি না এখনো? তুই এখনো বুঝলি ঐ কাল~নাগিনী আসলে শয়তান ছিলো। অয় তোর টাকার লোভে এতদিন পইড়্যা ছিলো?

আরে ওর এই প্রেম পিরিতি অনেক আগে থেইক্যাই চলে বাপ, আমি নিজেও দ্যাখছি। বিয়ে কইর‍্যা আহনের পর ও এই মাইয়্যা তার পিয়ারের প্রেমিকগো লগে কথা কইতো। আমি নিজ কানেও শুনছি। এহন এইডা কোনডার লগে ভাগছে তা তো আর বলতে পারিনা বাপ। ঘাট হইছে আমার। তুই এই বউয়ের কথা ভুইল্যা যা বাপ। দোহাই লাগে তোর।
রেজা চৌধুরীর চোখ মুখে আড়ষ্টতা।
সে বিকারহীন।
প্রলম্বিত শ্বাস নিচ্ছে।

কিঞ্চিৎ অবসাদ আর ঘোরের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে,
অনু চৌধুরী তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে।
সে তার অধিকার ফিরে পেতে চাচ্ছে।
সে কি মায়াবী চাহনিযুক্ত আঁখিপল্লব!
করুন মুখায়বে বলছে,
~ রেজা, আপনি আরেকটা বিয়ে করে নিলেন? আমার ঘর কোথায়? কোথায় আমার সংসার?

রেজা চৌধুরী অস্ফুটস্বরে বলে,
~ তুমি ও তো সব ভেঙে দিয়ে চলে গেলে অনু।
এত কিছুর পরেও অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধলে তুমি।
~ আমার মতিভ্রম হয়েছিলো। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনার পায়ে পড়ি। আর হবেনা এমন।

রেজা চৌধুরী ভাবছে,
তখন সে কি করবে?
যদি অনু ফিরে আসে?

যদি আবার দৃঢ়ভাবে ক্ষমা চায়?
বার বার কেউ ঠকায় নাকি?
না! নিয়তি এত নিষ্ঠুর হতে পারেনা।
অনুর দুই দুইটা মেয়ে আছে।
অনু ফিরে আসবে।

তারপর আমরা দুজন মিলে
আমাদের মেয়েদের বড় করবো, বিয়ে দিবো। আসুক এবার অনু, ওকে আমি আমার ভালোবাসায় ভরিয়ে দিবো!
অনু আসবে, ও আসবে।

আমার ভালোবাসা তো মিথ্যা ছিলো না।
এখনো খুব ভালোবাসি। আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়। আমার ভালোবাসা, মেয়েদের ভালোবাসার টানে হলেও সে ফিরে আসবে।
সে এসব ভেবে মনে মনে আশ্বস্ত হয়।
দাদি ছেলের চোখের এই আশা~ভরসার ছাপ স্পষ্ট দেখেন। বুঝতে পারেন, তার এই ছেলে অন্ধ।

এই ছেলে কোনোদিন ও শুধরানোর নয়।
দাদি ও ছাড়ার পাত্রী নয়।
দাদিও গোঁ ধরে রইলেন।

আমরা দাদিকে ছাড়াই বাসায় ফিরে এসেছি।
সে ফেরেনি আমাদের সাথে আমাদের বাসায়।
যা হয় হোক, ছেলের এই কষ্ট উনি নিজ চোখ দেখতে পারবেন না আর।
তাই ছেলেকে আবার বিয়ে করাবে,
তারপর ছেলের কাছে গিয়ে থাকবে।
ছেলের সুখ দেখে যেতে চায় এই অভাগী মা।

আজকের আকাশ কয়েক মুহূর্ত আগেও স্বচ্ছ ছিলো। সন্ধ্যে নেমে এসেছে।
এখন মনে হচ্ছে দাপুটে হাওয়া বইবে।

আকাশ কালো হয়ে গেছে, হয়তো এখনি তাণ্ডবনৃত্যের ভঙ্গিতে ঝড়~বৃষ্টি নামবে।
কিন্তু আজকে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আমাদের বাসার আরেকজন সদস্য নিরুদ্দেশ।
তানিশা আপু বাসায় এখনো ফিরেনি।

সকালে নাস্তা করে বেরিয়েছিলো কিনা জানিনা। আমি ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম সে বাসায় নেই। আব্বু দরজা বাইরে দিয়ে লক করে ততক্ষনে কাজে চলে গেছে।
আমি একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠি।
কাজ নেই, পড়াশোনা নেই, করবোটা কি সারাদিন.. তাই।
আব্বুকে এ নিয়ে দুবার ফোন দিলাম।

~ আব্বু, তানিশা আপু তোমাকে কিছু বলে গেছে? দুপুরে তো খেতেও আসেনাই।
~ না মা। কোন বান্ধবীর বাসায় গেছে হয়তো। চলে আসবে।
আবার সন্ধ্যায় ফোন দিলাম।
~ আব্বু আপু কি কল দিছে তোমাকে?
~ কেন? তানিশা এখনো বাসায় যায়নি?

পর্ব ১৩

আমি বাসায় বসে বসে খুব বিরক্ত হচ্ছিলাম।
একা থাকা যায়, কিন্তু কতক্ষন?
সারা দিন গেলো, সন্ধ্যা ও চলে যাচ্ছে..
এই একাই পড়ে আছি বাসায়.. সারা বাসা শূন্য, কেউ নেই। মা নেই, বাবা ও নেই। বোন থাকতো কিছুক্ষন, এখন বোন ও নেই। আচ্ছা তানিশা আপু এতক্ষন বাইরে কী করছে? কোনো বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গেছে নিশ্চয়? কিন্তু আব্বু এত বিচলিত হলো কেন? এমন সময় কলিংবেল বাজলো।

আব্বু এসেছে। তার চোখ~মুখ গম্ভীর হয়ে আছে।
~ আব্বু, তানিশা আপু কি ওর বান্ধবীর বাসায় গেছে?
আব্বু চোখ গরম করে বললো,
~ রাকা, বিরক্ত করিস না। রুমে যা।
~ আব্বু…
~ যাও মা, তুমি রুমে যাও। আমি তানিশার খোঁজ নিচ্ছি।

আমি খুব করুণ কন্ঠে বললাম,
~ আব্বু আমার সারাদিন একা একা বাসায় থাকতে আর ভাল্লাগেনা। দম বন্ধ হয়ে আসে। কেউ নাই। কারো সাথে খেলতে পারিনা, কথা পর্যন্ত বলতে পারিনা। তুমিও থাকো না বাসায়।
আবার জোর গলা যোগ করে বললাম,
আমি কি করবো টা কি সারাদিন? বলো!

আব্বু এবার শান্ত চাহনিতে তাকিয়ে ভাবলেশহীন স্বরে বললেন,
~ মা, তোমার আপু তো সারাদিনই থাকে তোমার সাথে। আজ হয়তো ছিলো না। এখন তুমি একটু আমাকে একা ছেড়ে দাও। তোমার জন্য আজকে বার্গার এনেছি, ব্যাগে দেখো। নিজের রুমে গিয়ে খাও এটা? আমি একটু পরে তোমার রুমে আসছি। আজকে আমিই তোমার সাথে গল্পগুজব করবো।

আব্বু মনে করে, তানিশা আপু সারাক্ষন বাসায় থাকে, আমার সাথে খেলে, আমাকে সময় দেয়।
কিন্তু আসল কাহিনী তো ভিন্ন।

আপু মোটেও আমাকে সময় দেয়না।
সে সারাক্ষন তার নিজ কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
আমি লক্ষ্য করেছি,
বেশ ক’দিন যাবত সে কিছু একটা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন।
আমি বার্গার নিয়ে নিজ রুমে গেলাম না।
ড্রয়িংরুমে টিভি অন করে বসলাম।

আব্বু তখনই তাড়াতাড়ি নিজের রুমে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সে তার সব কাজ একদিকে ঠেঁসিয়ে চলে এসেছে। তার বুকটা ধকধক করছে।
তানিশা তার অবাধ্য~হেয়ালীস্বভাবের মেয়ে,
তাই তানিশাকে নিয়ে তার খুব দুশ্চিন্তা হয়।
তার হৃদয়চূর্ণ মন শুধু কু গাইছে,
কোথায় চলে গেলো মেয়েটা হঠাৎ?

তানিশা আপুর কাছে তার বান্ধবীদের নাম্বার অনেকবার চাওয়া সত্ত্বেও দেয়নি।
এখন যে জরুরি প্রয়োজনে ফোন করে দেখবে তার ও জোঁ নেই।
আব্বু আমাদের রুমে গিয়ে আপুর সব বই~পত্র খুঁজে খুঁজে হট্টোগোল করে ফেললো।
অবশেষে মাত্র দুটো নাম্বার পেলো।
সাথে সাথে ওখানে ফোন দিলো।
তানিশা আপু ওখানেও যায়নি।

আব্বু ভাবতে লাগলো,
আর কোথায় যেতে পারে মেয়েটা?
ও তো ওর ফুফুদের বাসাও ঠিক করে চেনেনা। অনেক দূরে তো।
আর ওর বড় ফুফুও তো এখন আর ঢাকায় নেই।
কাকার বাসা তো চিনবেই না।

আর ওর ছোট ফুফু থাকে উত্তরায়।
ওখানে কয়েকবার গেছিলো অবশ্য।
কিন্তু তবুও, এতদূরে কি একা একা যেতে পারবে?
গেলেও চিনবে কি করে?

আব্বু তৎক্ষণাৎ ফোন দেয় ছোট ফুফুর কাছে। কেউ ফোন তুললো না।
একাধারে ৫/৬বার ফোন করলো।
রিং হচ্ছে কিন্তু ফোন ধরছে না।

কারণ তারা আব্বুর সাথে যোগাযোগ তো দূরে থাক, কথা বলতে ও নারাজ।
তাই বাধ্য হয়েই সে ছোট ফুফাকে ফোন করলো। ছোট ফুফা হচ্ছে সাদাসিধে ধরণের একজন নিতান্ত ভালো মানুষ। আব্বুর সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক। তাই প্রথম কলেই রিসিভ হলো।

আব্বু হ্যালো বলা ছাড়াই ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কায়সার, তানিশা কি তোমাদের বাসায় গেছে?
~ কই ভাই আমি তো জানিনা। আপনার বোনকে ফোন করলে জানা যাবে। আমি তো এখন দোকানে আছি।

~ আমার বোন তো আমার ফোন ধরবে না ভাই। নিজ হাতে বড় করছি তাকে। কিন্তু এখন তার কাছে আমি খুব খারাপ মানুষ। তার বড় ভাই তাকে এতবার কল করলো তবুও সে ফোন তোলেনি। ভালো ভালো, খুব ভালো হোক তার। দোয়া করি।

~ ভাই আপনি কষ্ট পাইয়েন না তো। আমি ফোন করে খবর দিচ্ছি আপনাকে।
কিছুক্ষন পরই আবার কল ব্যাক,
~ রেজা ভাই, তানিশা তো ওখানে যায়নি। কেন তানিশার হঠাৎ কি হলো?
~ মেয়েটা এখনো বাসায় ফেরেনি কায়সার।
~ কি বলেন!

এভাবে একে একে ফোন দেওয়ার মত সব জায়গায় ফোন করা শেষ হলো।
রাত ১১ টায় আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারলো না আব্বু।
ফোন দিলো অনু চৌধুরীর কাছে।

আব্বু আশাও করেনি অনু চৌধুরীর এই নাম্বার খোলা থাকবে বলে।
কিন্তু না।
অনু চৌধুরীর নাম্বার অন ছিলো এবং সৌভাগ্যবশত সে প্রথমবারেই ফোন রিসিভ করলো।
~ হ্যালো অনু!

~ হ্যাঁ। বলেন..
~ আচ্ছা, তানিশা কি তোমার কাছে গেছে নাকি?
~ কই না তো। এখানে কিভাবে আসবে? ও তো চেনে না। কেন? কী হইছে?
~ তানিশা তো এখনো বাসায় ফেরেনি। আজকে সকালে বের হইছে। এখনো বাসায় আসেনি। কোনো বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা হলে তো বলে যাবে। কিছু বলেনি আমায়।

এত রাত হয়ে গেছে, মেয়ে এখনো বাসায় আসেনাই। ও এত রাত বাইরে থাকছে কখনো বলো?
কোনোদিন তো থাকার সাহস_ই করেনি!
~ ওমা! তানিশাকে ফোন করেন তাহলে!
মেয়ে কই যাবে তাহলে!
~ তোমার কী মনে হয়? আমি করিনাই? ওর ফোন বন্ধ। আমি হাজারবার ট্রাই করছি। ফোন বন্ধ মেয়ের।

~ আচ্ছা দাঁড়ান! দাঁড়ান! আমি দেখছি।
বলে সে ফোন কেটে দিয়েই তানিশা আপুকে কল দিলো। সেই একই অবস্থা, ফোন বন্ধ।
অনু চৌধুরীর এবার সামান্য খটকা লাগলো।
তানিশা আপুর খুব কাছের একজন বন্ধু আছে।
নাম রফিক।

সে সবসময়ই তার কথা বলতো অনু চৌধুরীর কাছে। একদিন কথায় কথায় ছবিও দেখিয়েছিলো ছেলেটার।
কি অদ্ভুত বাজে দেখতে!

মাঝেমধ্যেই তো মা মেয়ের আড্ডা বসতো, সেই খাতিরেই ছবি দেখিয়ে বলেছিলো একদিন,
~ আম্মু দেখো, এটা হলো রফিক। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ও খুব খুব ভালো। জানো?
অনু চৌধুরীর মেয়ের বন্ধু হিসেবেও এই ছেলেকে ভালো লাগেনি। কারণ সে উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
তার স্বপ্ন সে তার এই মেয়ের বিয়ে দিবে খুব বড় কোনো ঘরে।

এমন ছেলের কাছে দিবে যে ছেলে দেখতে হবে রাজপুত্রের মত। ধনাঢ্য সেই ফ্যামিলির ও নামডাক ছড়িয়ে থাকবে চারপাশে।
রাকা তো অত সুন্দর হয়নি, কালো হয়েছে বাপের মত। তাই তানিশাকে নিয়েই তার কত শত আশা~ভরসা! বুকভরা স্বপ্ন!

কিন্তু সেখানে তানিশার এরকম একটা ছেলে বন্ধু আছে, তাও আবার বেস্ট ফ্রেন্ড।
এক কথায় অনু চৌধুরীর ভালো লাগেনি।
ছেলেটা ঐ পাড়ারই, একই এলাকার।
বস্তিটস্তিতেই থাকে।

অনু চৌধুরী তাকে চেনে অল্পস্বল্প।
ভবঘুরে, বখাটে ছেলে।
রাস্তাঘাটে বিড়ি~সিগারেট টানে।
পথেঘাটে সুন্দরী মেয়ে দেখলে শিঁস দেয়,
এমন টাইপের। দেখলেই গা ঘেন্না দিয়ে উঠে তার।
এমন ছেলে তানিশার বন্ধু হয় কি করে?

সে কয়েকবার মেয়েকে মানাও করেছে এই ছেলের সাথে এত বেশি না মিশতে।
কিন্তু তানিশা সেটাকে আমলেই নেয়নি।
সেও আর অত গুরুত্ব দেয়নি, দেওয়ার সময় ও অবশ্য পায়নি। ভেবেছে, বন্ধুই তো। থাক না! এরকম ছেলে বন্ধু সবারই থাকে, তার ও তো কত ছেলে বন্ধু ছিলো!
গুনে শেষ করা যাবে কি?

উহুম। সুন্দরী মেয়েদের জীবনে ছেলে বন্ধুর অভাব থাকে না তো!
কিন্তু অনু চৌধুরীর বুকের ভেতরটা এখন কেমন যেন খচ খচ করছে!
তার কেন যেন মনে হচ্ছে তানিশা এই ছেলের সাথেই…না! না! ছি:! কি ভাবছি আমি এসব!
সে পর পর একনাগাড়ে ফোন দিতেই লাগলো।
তীব্র রাগে ফেঁটে পড়ছিলো, ফোন বন্ধ দেখে।
সে ভাবছে,
“তানিশা এই ছেলের সাথে কিছু করে ফেলেনি তো! হায় হায়! ”
মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগলো,
“তানিশারে, ফোন ধর মা। ফোন ধর্!”

অনু চৌধুরী নিজেও খুব একটা সুখে নেই এখন। তার নতুন সংসারেও ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। আজমল উদ্দীন আসলে এত বড়লোক কেউ না। সে আসলে একজন গাড়ির ড্রাইভার। কিন্তু সামান্য গাড়ি চালিয়ে সে এতদিন এত টাকার বাহার কিভাবে দেখালো কিছুতেই সেই অংক মেলাতে পারছে না অনু চৌধুরী।

সে ইতোমধ্যেই আবার কন্সিভ করেছে।
সব মিলিয়ে তার জীবন এখন ভাঙা ব্রিজের ন্যায়। যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে যেতে পারে। যদি বড় কোনো ট্রাক বা বাস ঐ ব্রিজে উঠে পড়ে তাহলে তো হলোই। আর কোনো কথাই নেই।

সব ভেঙে চুরমার হয়ে ভেসে যাবে।
এখন আবার তানিশার এই খবর।
তার মাথা ঠিক নেই।
সে অনবরত মেয়েকে কল দিয়েই যাচ্ছে।
পাগলের মত এদিক~ওদিক ছোটাছুটি করছে। আর উত্তেজিত মনে ভাবছে,
হায়রে, তানিশা আবার ঐ ছেলের সাথে চলে যায়নি তো? এইসব ভেবে ভেবে সে মরিয়া হয়ে উঠলো।

অত:পর তানিশা আপুর ফোনে কল ঢুকলো।
তখন রাত প্রায় একটা ছুঁই ছুঁই।
তানিশা আপু ফোন রিসিভ করেই খুব আনন্দঘন গলায় বললো,
~ হ্যালো আম্মু!

অনু চৌধুরীর তির্যকপ্রক্ষেপণ গলায় বললো,
~ হ্যাঁ মা! তুই কই? কোথায় চলে গেছিস?
~ ওমা! তুমি কিভাবে জানো আমি চলে গেছি কিনা? কে বললো?
~ তোর আব্বু কল দিয়ে বলছে, তুই আজকে সারাদিন বাসায় ফেরোস নাই। রাত ১১টায় ও বাসায় যাস নি। কোথায় তুই মা? কোথায় গেলি?

তানিশা আপু উত্তেজিত কণ্ঠে বললো,
~ আম্মু আমি রফিকের সাথে পালিয়ে আসছি!
কথাটা এমনভাবে বললো যেন সে কোনো বড়সড় পরীক্ষায় টপ মার্কস পেয়েছে, তার এখন চাকরী নিশ্চিত।

অনু চৌধুরী এবার খাবি খেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ কোন রফিক? ঐ কোন রফিকের সাথে গেলি?
~ আরে আম্মু, ঐ যে ও, তোমাকে না ছবি দেখাইছিলাম! ও ই তো! আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আমার লাভার! এখনো চেনোনাই?

অনু চৌধুরীর নিজের এত এত প্রিয় মেয়ের মুখে এরকম একটা দু:সংবাদ শুনে একেবারেই দমে গেলো। নিজের এই মন্দ নসিবের উপর এবার খুব আক্ষেপ হলো তার।
তার হৃদপৃন্ডের গতি ক্রমশ প্রবল বেগে ছুটতে আরম্ভ করলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো নিজের মেয়ের মুখে এই অলুক্ষুনে কথা শুনে।
তোঁতলাতে তোঁতলাতে জিজ্ঞেস করলো
~ তুতুই কি বললি? তুই শেষমেশ রফিকের সাথে পালিয়ে গেলি!
~ হ্যাঁ আম্মু! কেন?

অনু চৌধুরী বিষম খেয়ে সন্দিগ্ধ কন্ঠে বললো,
~ ওরে গাঁধা, ঐ পোলা তো বখাটে, মূর্খ, বস্তির একটা ছেলে। তুই এরম একটা ছেলেরেই পাইলি? ওরে শুওরের বাচ্চা, তুই আমার কত স্বাদের মেয়ে, কত ভালো জায়গায় আমি তোরে বিয়ে দিমু বলে ভাইব্যা রাখছি। কত শখ আমার। আর তুই এইডা কি করলি! হায় হায়!
তানিশা আপু এবার গম্ভীর গলায় বললো,
~ ও তাহলে তুমিও আমাকে সাপোর্ট দিবানা? আর গালিগালাজ করবা না একদম। খবরদার!
অনু চৌধুরী বজ্রধ্বনির ন্যায় হুংকার ছেড়ে বললো,
~ তুই ঐ কুত্তার বাচ্চাটারে ফোনটা দে। তাড়াতাড়ি দে। হায় হায় রে সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার।

তানিশা আপু কঠিন গলায় বললো,
~ তুমি একদম আমার হাজবেন্ড কে গালি দিবা না আম্মু। তুমি ওকে এইভাবে বলার সাহস করো কিভাবে হ্যাঁ? আমি তো তোমাকে ফোন দিয়ে মনে হয় ভুল করছি।
আহাজারি করতে করতে সে বললো,

~ ওরে তানিশা, ঐ পোলা ভালো না একদম। ও একটা বখাটে, বস্তির ছেলে। তুই জানোস না। আমি নিজেও ওরে রাস্তাঘাটে বিড়ি~সিগারেট টানতে দেখছি। বদমাইশি করতে দেখছি।
কেউ ওরে ভালো বলে না। বাজে ছেলে।

~ কেন আম্মু? আজমল আংকেল ও তো সিগারেট খায়। আংকেল ও তো রাকার সাথে বদমাইশি করছে। কই তবুও তো তুমি ঐ আংকেলের সাথেই পালায়ে গেছো! কেন বলোতো? কারণ তুমি তাকে ভালোবাসো। তুমি শাহ্ রুখ খানের ঐ মুভিটা দেখোনি? প্রেম~ভালোবাসার কাছে সব তুচ্ছ আম্মু। রাবনে বানায়ে দিয়া জোড়ি। সব নাটক, মুভিতেই তো দেখায় এসব। আর রফিক ও তেমন। ও আমাকে খুব ভালোবাসে আম্মু। আমার জন্য ও মরে যেতেও পারবে। আমাকে এটা প্রতিদিন বলে তো!
অনু চৌধুরী নিজের মেয়েকে আর বোঝাতে পারলো না।
কিভাবে বোঝাবে?
মেয়ে তো এখন তার দিকেও আঙুল তুলছে!

~ রাকাকে আদর করছে। বদমাইশি করছে কই? আর সিগারেট টানে সে, তার এখন কত বয়স হইছে জানোস? তুই আজমলের সাথে ঐ বেয়াদব ছেলেটাকে একদম মিলাবি না।
~ তাহলে তুমিও আমার হাজবেন্ডকে নিয়ে এসব বাজে কথা একদম বলবানা। তোমার যেমন তোমার দ্বিতীয় জামাইকে নিয়ে কোনো বাজে কথা শুনতে ভালো লাগেনা; তেমন আমারো আম্মু। আমারো ভালো লাগেনা। কারণ আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না আম্মু। বিশ্বাস করো।
অনু চৌধুরী এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
কপাল কুঁচকে গেছে তার।

মেয়েকে সে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছেনা। মেয়ে উল্টা তাকেই কথা শোনায়ে দিচ্ছে।
সে খুব কষ্টে কপট রাগের প্রতাপ কমিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ হাজবেন্ড হাজবেন্ড বলছিস কেন তানিশা?

তারপর আবার খুব আবেগ জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
~ মা, তোরা কি বিয়ে করে ফেলছোস নাকি?
সত্যি করে বল তো?
তানিশা আপু এবার স্বাভাবিক হলো।
সে খুব সবিনয়ের সাথে বললো,
~ না। তবে ভোরেই করবো।

~ ভোরে করবি মানে? কোথায় করবি? তোরা এখন কোথায় আছিস?
~ কাজী অফিসে করবো। রফিকের বন্ধুরা মিলে সব ম্যানেজ করে রাখবে। আম্মু সাক্ষী কয়জন লাগে? আমার দিক থেকে কেউ একজন লাগবে তো। কাকে বলবো বলো! ধুর!
~ আমি জানিনা কিছু। তুই কোন জায়গায় আছিস এখন, আমাকে বল। দোহাই তোর।
~ কোন জায়গায় আছি…
আমতা আমতা করতে করতে পাশেই বসে থাকা রফিককে জিজ্ঞেস করলো,
এই আমরা এখন কোথায় আছি?
এই জায়গার নাম কী? আম্মু জিজ্ঞেস করতেছে।

রফিক ফিসফিস করে বললো,
তোমার মাথা নষ্ট নাকি তানিশা? তোমার আম্মু তো এই বিয়ে এখনো মানেই নাই। এখন তুমি জায়গার নাম বলে দিলে তো সে এখানে তোমার আব্বুসহ চলে আসবে। আইস্যা তোমারে আমার কাছ থেকে নিয়া যাবে। তখন কি হবে? তোমাকে যেটা বলতে বলছি শুধু ওইটা বলেই ফোন কেটে দাও বেবি, তাড়াতাড়ি করো!
অনু চৌধুরী তাদের ফিসফিসানি শুনলো।
কিন্তু কিছুই বুঝলো না।

সে পাগলের মত আবার জিজ্ঞেস করলো,
~ তানিশা, তানিশা.. মা তুই এখন কোথায় আছিস? বল মা.. কোন জায়গায়?
তানিশা আপু তার বয়ফ্রেন্ডের কথাই মানলো।

সে খুব কঠিন গলায় বললো,
~ শুনো আম্মু। আমি তোমাকে শুধু দুইটা কারণে ফোন দিছি। এক, আমি চাই আমার বিয়েতে আর কেউ না থাকুক, অন্তত তুমি থাকো। তাই তোমাকে ফোন দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, তুমি মোল্লা কাজী অফিসে ভোর ছয়টায় একা চলে আসবা।
~ মোল্লা কাজী অফিস কোথায়? ঠিকানা দে।
~ ঠিকানা দেওয়া যাবেনা। তুমি রেডি থাকবা। রফিকের বন্ধুরা তোমাকে নিতে আসবে। তুমি তোমার বাসার ঠিকানা দাও।

~ তানিশা, তুই এরকম করিস না… তোর আব্বু তোর অনেক ভালো জায়গায় বিয়ে দিবে, এই বখাটে ছেলে তোর জীবন ধ্বংস করে দিবে মা। তুই কোথায় আছিস আমাকে বল। রাতারাতি সব ধামাচাপা দেওয়া যাবে। নইলে পরে ভালো জায়গায় বিয়েও দিতে পারমু না আর। আমার কথা শোন তুই…
তানিশা কন্ঠ ভারী করে বললো,
~ আব্বু থাকা সত্ত্বেও, তোমার দুই মেয়ে থাকা সত্ত্বেও তুমি আজমল আংকেলের প্রেমে পড়েছো।

তার সাথে পালিয়ে ও গেছো সব ফেলে। তুমি যদি তোমার প্রেমের জন্য এতকিছু করতে পারো, তাহলে আমি বা অন্য কেউ করবে না কেন? অন্য কেউ কি কাউকে কখনো ভালোবাসতে পারেনা? আমি তো তোমাকে সবসময় সাপোর্ট করেছি। তুমি কেন করবা না? তোমাকে আমি সবসময় হেল্প করছি আংকেলের সাথে দেখা করতে। এটা ওটা করতে, সব কাজে হেল্প করছি।

তোমাকে সাপোর্ট করি দেখেই তো তুমি পালিয়ে যাওয়ার আগের রাতে তোমার সবকিছু এই আমিই গুছিয়ে দিছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে। আব্বুকেও কিছু বলিনাই। কারণ আমি জানি তুমি আব্বুর চেয়েও আংকেলকে বেশি ভালোবাসো। আর আমি জানি, ভালোবাসা কোনো নিয়ম মানে না আম্মু।

তাইজন্যই তো তুমি আমার আব্বুকে ফেলে চলে গেছো।
অনু চৌধুরীর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।
তার নিষ্পেষিত মন চূর্ণ~বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে লজ্জ্বায়, নিজের ১৫/১৬ বছরের বাচ্চার মুখে এরকম কথা শুনে শুনে।

সে কান্নার রোলে ভেঙে পড়লো।
ভ্রুকুটি চেহারায় আতঙ্কিত হয়ে বললো,
~ থাম তুই! আমার কথা শোন, ঐ ছেলে ভালো হবেনা। তুই সুখী হবি না।
তানিশা আপু নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,

~ আমার ভালো ছেলে চাইনা আম্মু। আমার রফিককেই চাই। তুমি যদি আমার ভালো চাও, তাহলে এই ব্যাপারে আর একটা কথা ও বলবা না। আর হ্যাঁ, কাউকে ঘুণাক্ষর ও জানাবা না এই ব্যাপারে। যদি আমার বিয়েতে থাকতে চাও তাহলে সকালে কাজী অফিসে চলে আসবা। যদি না আসো বা কাউকে কিছু বলো তাহলে কিন্তু খুব খারাপ কিছু হবে, বলে দিলাম।
~ কী খারাপ হবে আর?

~ আমি গলায় দঁড়ি দিবো। মরে যাবো। আল্লাহর কসম।
অনু চৌধুরী চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগলেন। নিজের মেয়ের এই অন্যায় আবদার তার আজকে মেনে নিতেই হবে।

কারণ মেয়েকে সে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছেনা, নিজের অপকির্তীর জন্য।
কিছু বললে মেয়ে পাল্টা তীর ছুঁড়ে।
সে শব্দ করে কেঁদেই দিলো এবার।
আজমল উদ্দীন তার পাশে এসে বসলো।
সে অনু চৌধুরীর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
~ কী হইছে অনু?

অনু চৌধুরী তার হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে বললো,
~ তুমি এখান থেকে যাও এখন আজমল। যাও। আমার সব আশা~ভরসা শেষ। আমার মেয়ে এইটা কি করতেছে! হায়রে! হায় হায়! এটা কী হলো!
ভোরের দিকে রফিকের সাঙ্গপাঙ্গ আসলো।
এসে অনু চৌধুরীকে নিয়ে গেলো মোল্লা কাজী অফিসে। অনু চৌধুরী নিজের সর্বস্বটা দিয়ে নিজের মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।

কিন্তু তার পেটের মেয়ে তার চেয়েও বেশি বুঝদার।
অনু চৌধুরীর চোখের সামনে তার বড় মেয়ের একটা বখাটে, বস্তির ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো।

সে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসলো।
রেজা চৌধুরীকে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানালো। তার মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো কথাটা শুনে।

আঁতকে উঠে শুধু বললো,
~ আহ্, আমার তানিশা… আমার তানিশা…
তারপর আমাকে আঁকড়ে ধরে গগণচুম্বী চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো আর আল্লাহর দরবারে আহাজারি করে বললো,

“হে আল্লাহ, আমি কি এমন পাপ করছি? কী পাপ করছিলাম আমি? তুমি আমার জীবন তছনছ করে দিলা। মেনে নিলাম। আমি পাপী। এখন আমার কলিজার টুকরা, আমার বড় মেয়ের জীবনটাও শেষ করে দিলা?

লেখা – ফারজানা রহমান তৃনা

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “রাকা – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ। )

আরো পড়ূন – রাকা (শেষ খণ্ড) – দুষ্টু মিষ্টি প্রেম এর গল্প