রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

তার শহরে – সিজন ২ | আবেগি প্রেমের গল্প

আবেগি প্রেমের গল্প

তার শহরে – সিজন ২ – আবেগি প্রেমের গল্প: গত সিজনে আমরা ঘাত প্রতিঘাত মান অভিমান আর ভালোবাসার গল্প খুঁজে পেয়েছি দুজনের মধ্যে। চলুন এবার তবে দেখি কি হয়? কত দূর যায় তাদের ভালোবাসা ও শুদ্ধ প্রেমের গল্প।

পার্ট: ১১

এরই মাঝে ঝড়ের বেগে কোথা থেকে যেন জেনি আসলো, এসেই সুইট হার্ট বলে সিফাত ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরল। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি!

  • জেনির এভাবে উনাকে জড়িয়ে ধরায় আমার বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। চোখ জ্বলছে খুব, ইচ্ছে করছে কাঁদতে বিষণ কাঁদতে। আমি চোখের ছলছল জল লুকানোর জন্য নিচের দিকে চেয়ে আছি।

সিফাত ভাইয়া গর্জে উঠে বললেন,

  • জেনি তুমি আমায় ছাড়ও, নয়তো খারাফ হবে।

জেনি ন্যাকা ন্যাকা ভাবে বলল,

  • কেন সিফাত তোমাকে ছাড়ব কেন? আমি তো তোমায় সারা জীবন এভাবে জড়িয়ে থাকতে চাই ডারলিং।

জেনির ন্যাকামো দেখে আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে, এই মেয়ে আরো বেশি নির্লজ্জ বেহায়া। কি একটা ড্রেস পরেছে হাঁটু অব্দি দেখা যাচ্ছে। মনে মনে এসব ভাবছি।
জেনি সিফাত ভাইয়াকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল।

  • সিফাত এই মেয়ে এখানে কি করে, এই মেয়ে না ভার্সিটি যাবে বলে বের হলো? তাহলে তোমার অফিসে কি করছে সিফাত?

আমি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি সিফাত ভাইয়ার চোখ থেকে যেন,

লাল আভা টিকরে টিকরে পড়ছে। উনি যে প্রচন্ড রকম রেগে গেছেন বুঝতে পারছি। উনি স্তির চোখে তাকিয়ে জেনি কে বললেন,

  • আমার সব কিছুর কৈফৎ তোমাকে দিতে আমি বাধ্য নই জেনি। আনি কে আমি আমার দরকারে এখানে নিয়ে এসেছি। তুমি কেন আমার অফিসে এসেছ?

উনার এমন রাগ দেখে জেনি যে ভয় পাচ্ছে তা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি। জেনি তাও সিফাত ভাইয়ার রাগ কে কোনো তোয়াক্ষা না করে বলল,

  • এই সাধারণ একটা মেয়ের সামনে তুমি আমায় অপমান করছ সিফাত?

উনি গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

  • তোমার কাছে আনি সাধারণ মেয়ে হতে পারে বাট আমার কাছে নয়। আর ওঁকে এই মেয়ে, এই মেয়ে না বলে ওর নাম ধরে ডাকো। ভালো দেখাবে।

আমি শুধু নিরব শ্রোতা হয়ে শুনছি। জেনি বোধ হয় সিফাত ভাইয়া কে ভালোবাসে তাই তো আমাকে দেখে এমন রিয়্যাক্ট করছে। জেনি আমাকে বলল,

  • এই মেয়ে তাকাও আমার দিকে।

আমি তাকালাম জেনির দিকে, তাকাতেই জেনি বলে উঠল,

  • ধনি ছেলে দেখে লোভ সামলাতে পারছনা না, ওমনি পিছুনিয়েছ। তোমরা বাংলাদিশি মেয়েরা এতো লোভী কেন? পড়া লেখা করতে এসেছ না সিফাত এর সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে এসেছ। জেনির এমন কথা শুনে আমার পায়ের তলার মাঠি সরে গেল, এক মূর্হতের জন্য যেন আমার পৃথিবী থমকে গেছে। জেনি কি বলছে এসব?আমার চোখ থেকে কয়েক দন্ড নুনা জল গড়িয়ে পরল জেনির এমন যুক্তিহীন কথা শুনে।

আমি কিছু বলার আগেই সিফাত ভাইয়া এক ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে বললেন,

  • এনাফ ইজ এনাফ জেনি। এতক্ষণ তোমায় সহ্য করেছি আর না। তুমি আনি সম্পর্কে আর একটা বাজে কথা বললে আমি ভুলে যাব তুমি একজন নারী। তোমার মন মানসিকতা এতো চিপ কেন জেনি? নিজের মতো সবাই কে ভাববে না, তুমি তো আমার পিছন ঘুরো আমার জন্য না আমার প্রাচর্যের লোভে। আনি তুমার মতো লোভী না, আর ওর বাবার দেশে যতো সম্পত্তি আছে তা তোমার কল্পনার বাহিরে। আনির নামে আর একটা মন্তব্য করলে তোমার জ্বিব আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। মাইন্ড ইট!

তুমি সিফাত মেহবুব কে চিনোনা জেনিফার। বলেই সিফাত জোড়ে দেয়ালে একটা ঘুষি মারলো।

উনার ভয়ানক রূপ দেখে আমি কাঁপছি। উনি যেন বাঘের ন্যায় কেঁপে উঠেছেন। জেনি আর কিছু না বলে চলে গেল। যাওয়ার আগে আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গেল।
আর আমি কাঁদছি ভয়ে, অপমানে। সিফাত ভাইয়ার সাথে তো আমার কোনো রিলেশনও নাই তাহলে, জেনি আমাকে অপমান করল কেন? আমি কেন অন্যের সম্পত্তির উপর লোভ করতে যাব? কাঁদতে কাঁদতে আমার হেচকি উঠে গেছে।

সিফাত ভাইয়া আমার পাশে বসে খুব শান্ত গলায় বললেন,

  • বোকা মেয়ে কাঁদছ কেন? জেনি মেয়েটাই এমন আমাকে কারো সাথে সহ্য করতে পারে না। তোমাকে ও সহ্য করতে পারেনি তাইতো এতো বাজে বিহেভ করেছে। কান্না থামাও আনি প্লিজ, বলেই উনি আমাকে উনার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।
  • আমার কি হলো আমি জানি না আমিও উনাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছি। উনার বুকে কেমন যেন একটা শান্তি শান্তি লাগছে।

উনি আমার মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

সিফাত মনে মনে বলছে, কান্না থামাও আনি তোমার কান্না আমার বুকে তুমুল ঝড় সৃষ্টি করে। তোমাকে কি করে বুঝাব?

সিফাত ভাবছে,

জেনি এখন আনির পিছন নিবে। নানা ভাবে আনির ক্ষতি করতে চাইবে এটা আমি হলপ করে বলতে পারি। এই মেয়ে কে আমার হারে হারে চিনা আছে। কিন্তু এই সিফাত মেহবুব থাকতে তার ভালোবাসার গায়ে একটা আঁচ ও লাগতে দিবেনা। এটা আমার নিজের কাছে করা নিজের প্রমিজ।

সিফাতের ভাবনায় ছেদ পড়ল অনিতার ডাকে। অনিতা বলছে,

  • সিফাত ভাইয়া আমি বাসায় চলে যাবো। আমার ভালো লাগছে না।

উনি আমার দিকে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,

  • আই এম সরি আনি। আমার জন্য জেনি তোমায় এত্তগুলা বাজে কথা বলে গেল।

আমি নিরব কন্ঠে বললাম,

  • ইট স ওকে সিফাত ভাইয়া আমি কিছু মনে করিনি। বলেই একটা ফেইক হাসি দিলাম। যাতে উনার মনটা ভালো হয়ে যায়। উনিও মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,
  • চলো বের হওয়া যাক।

আর কোনো কথা না বলে উনার পিছনে হাঁটতে লাগলাম।

  • জেনির কথা গুলো বার বার কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। আবার কান্না পাচ্ছে খুব। এই মেয়ের মাইন্ড এতো নোংরা ছি! “সুন্দর হলেই না ভেতরটাও সুন্দর হওয়া প্রয়োজন”। জেনি যতটা সুন্দর তার চেয়ে দ্বিগুন কুৎসিত তার মন!

আমার আর কোনো দিকে খেয়াল নেই। এলোমেলো পায়ে গাড়ির কাছে আসলাম। এসেই গাড়ির ভেতর ধপ করে বসলাম। কিছু ভালো লাগছে না চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আমাকে কেউ কখনো লোভী বলে গালি দেয়নি, মিথ্যা অপবাদ টা আমার বুক ভারি করে দিচ্ছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, এই মূর্হতে লোভী শব্দটা ছাড়া মাথায় আর কোনো শব্দ নেই।

সিফাত ভাইয়া গাড়ি ড্রাইব করছেন আর আড়চোখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। আমি ইচ্ছে করে আমার চুল থেকে রাবার টা খুলে দিলাম। যাতে আমার কান্না মাখা মুখটা সিফাত ভাইয়ার চোখের ওগুচরে থাকে।

  • বাতাসে ঝাপটায় চুল গুলো আমার চোখে মুখে লেপ্টে আছে। এখন ইচ্ছে মতো কাঁদতে পারছি উনি বুঝতে পারলে কষ্ট পাবেন, নিজেকে অপরাধি ভাববেন।

গাড়ি ব্রেক করায় আমি চোখ মুছে উনাকে বললাম,

  • আমরা এসে গেছি সিফাত ভাইয়া?তাকিয়ে দেখি এটা বাসা নয়। বড় একটা শপিংমল।

আমি কিছু বলতে যাব তখনি উনি গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

  • নামো আনি এখানে আমার দরকার আছে।

বাধ্য মেয়ের মতো নেমে গেলাম।

আমরা লিফ্টে উঠলাম উপরের মল গুলোতে যাওয়ার জন্য।

লিফ্টে উঠে উনি সুইচড বাটন চেপে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি লিফ্টের এক কোণায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

হঠাৎ করে সিফাত ভাইয়া আমাকে হ্যাচকা টানে উনার বুকে নিলেন। তারপর বলতে লাগলেন,

  • আনি তুমি এখনো কাঁদছ কেন?সারা রাস্তা কেঁদেছ ভাবছ আমি দেখব না? তুমি যদি আর কাঁদবে তাহলে মেরে তক্তা বানিয়ে দিব।

বলেই আরো শক্ত করে উনার বুকে চেপে ধরলেন। আমার কান্না টা আরো বেড়ে গেল, উনার বুকে মুখ গুঁজেই কেঁদে চলছি। কান্না থামাতে পারছি না।

সিফাত ভাইয়া আমার মুখটা উপরের দিকে তুলেই, উনার ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে চুমু বসিয়ে দিলেন। আর আমি উনার এমন কান্ডে ফ্রিজড হয়ে গেলাম। সব কিছু আমার মাথার উপর দিয়ে গেল। এখনো আমি আমার ঠোঁটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

যখন বুঝতে পারলাম কি হয়েছে, তখন উনার দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালাম?

আর উনি বাঁকা হাসি দিয়ে বললেন,

  • তোমার কান্না থামছে না বলে চুমু দিলাম।

দেখনা আমার চুমু খাওয়ার জন্যই তো এতো সময় কাঁদলে। চুমু দিতেই কান্না থেমে গেছে।

বললেই পারতা আনি, তুমি আমার চুমু খেতে চাও, তাহলেই তো হয়ে যায়। এতো কান্না- কাটির দরকার কি? বলেই শয়তানি হাসি দিলেন উনি।

আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছি। হাসিও পাচ্ছে খুব উনার কথা বলার ধরন দেখে।

মনে মনে বজ্জাত টা কে গালি দিলাম, ব্যাটা চুমুকুর।

ইতিমধ্যে আমরা লিফ্ট থেকে নেমে গেছি। এখন আর কান্না পাচ্ছে না, মন কিছুটা ভালো হয়ে গেছে। বজ্জাতটার দিকে তাকাতে ও পারছি না লজ্জায়। উনি মল থেকে কি কি যেন কিনলেন।

তারপর বাসার দিকে রওনা হলাম। বাহিরে তাকিয়ে দেখছি কানাডার শহর। সন্ধ্যা হয়ে গেছে আভছা আলো দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার গুলো কানাডার শহরটা কে ঘিরে ধরছে। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় কানাডার শহর কে আরো মনো মুগ্ধকর দেখাচ্ছে।

বাসায় ঢুকে একটু অবাক হলাম, বাসায় এতো সাঁজ সজ্জা কেন? বাসাকে খুব মনোরম ভাবে সাঁজানো হয়েছে। চারিদিকে লাইটিং লাগানো। সিফাত ভাইয়া আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে উঠলেন,

  • ভেতরে চলো আনি, ভেতরে গেলে বুঝতে পারবে এই সাঁজ- সজ্জার কারণ!(চলবে)

পার্ট : ১২

  • ভেতরে চলো আনি, ভেতরে গেলে বুঝতে পারবে এই সাঁজ- সজ্জার কারণ!
  • আমিও আর কোনো প্রশ্ন না করে ভেতরের দিকে হাঁটা দিলাম। ভেতরে ড্রইংরুমে ঢুকতে মামিমা আমাকে বললেন,
  • তাড়াতাড়ি রুমে যাও মামনি, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর কিছু খেয়ে তৈরী হয়ে নিচে আসো।

মামিমার কথার মাথা, মুন্ডু কিছুই তো বুঝলাম না। আমি রেডি হবো কেন, আর বাড়িতেই বা এতো সাজঁ- সজ্জাঁ কিসের জন্য? নিজের অধীর আগ্রহ আর চেপে রাখতে না পেরে মামিমা কে জিজ্ঞেস করলাম,

  • আচ্ছা মামিমা বাড়িতে আজ কি কোনো বিশেষ পার্টি আছে?

মামিমা একটু লজ্জা পেলেন যেন আমার প্রশ্নে, লজ্জামাখা মুখ করেই বললেন,

  • আজ তোমার মামা র আর আমার ৫০তম এনির্ভাসারি। তাই সিফাত একটা পার্টি এরেন্জ করেছে। আমি অবশ্য না করে ছিলাম কিন্তু কে শুনে কার কথা!

সাথে সাথে আমি মামিমা কে জড়িয়ে ধরে উনার এনির্ভাসারির শুভেচ্ছা জানালাম।

মামিমা আমাকে তাড়া দিয়ে বললেন,

  • যাও মামনি রেডি হয়ে নাও, গেস্ট রা আসা শুরু করে দিয়েছে।

উপরে উঠছি আর ভাবছি,

  • আমার তো জিন্স, শার্ট, টি- শার্ট, প্লাজু, থ্রি- কোয়াটার ছাড়া আর কোনো ড্রেস ই নেই! তাহলে আমি পরব টা কি? এসব ড্রেস পড়ে তো আর গেস্টদের সামনে যেতে পারব না। এক কাজ করি মামিমার কাছ থেকে একটা শাড়ি নিয়ে পরলেই তো হয়ে যায়!শাড়ির কথা মনে পড়তেই সেদিনের ঘটনা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। না, না দরকার হলে আমি পার্টিতে যাব না, তারপরও শাড়ি পড়ব না। আমি চাই না এমন বিশ্রী ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি হউক। দুর আমাকে কেউ আগে জানালে তো একটা ড্রেস কিনে রাখতাম।

এসব ভাবনার মাঝে রুমে ঢুকে আমার চোখ গেল, আমার বেডের মধ্যেকানে রাখা একটা শপিং ব্যাগের উপর।

চটজলদি গিয়ে ব্যাগটা হাতে নিলাম, ছোট খাটো একটা শক খেলাম। কারণ এর ভেতর সুন্দর, হোয়াইট কালারের একটা গাউন ছিল। ভাবছি কে রাখতে পারে এটা? হঠাৎ করেই গাউনের মধ্যে একখানা চিরকুট দেখলাম, চিরকুট টা খুলে আরেক দফা শক খেলাম। চিরকুটের মাঝে বাংলায় বড় বড় করে লেখা “এটা তোমার জন্য পরি”।
বুঝলাম না কে দিলো গাউন!

অনিতা আবার কি মনে করে যেন একটা মুচকি হাসি দিয়ে রেডি হওয়ার জন্য উঠে পড়ল।

অনিতা প্রত্যেক সময়ের মতো আজও সেজেঁছে। হাল্কা মেকাপ, চোখে গাড় করে কাজল, ঠোঁটে লাল কালার লিপস্টিক। চুল গুলো খুলাই রাখলো। এই সামান্য সাজেঁই অনিতা কে পরির মতো লাগছে। মনে হচ্ছে কোনো পরি ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। আয়নার দিকে চেয়ে বুঝতে পারছি না এটা কি আমি?

হোয়াইট কালারে যে আমায় এতো ভালো মানায় এই গাউন না পড়লে জানা হতো না।

আমি আরো হোয়াইট কালারের কাপড় পরেছি কিন্তু এত্ত ভালো লাগেনি, আজ একটু বেশিই লাগছে।

দরজায় নক পরায় আয়না থেকে সরে এসে দরজা খুলে দিলাম। দেখি জিসান দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে দেখে জিসান চোখ বড় বড় করে বলে উঠল,

  • আপু তোমায় আজ এতো সুন্দর দেখাচ্ছে বলে বুঝাতে পারব না। কতোজন যে ক্রাশ খাবে তার কোনো ইয়াত্তা নেই।

জিসানের এমন প্রশংসায় আমি খানিক টা লজ্জা পেয়ে বললাম,

  • তুমি যতো টা সুন্দর বলছো জিসান আমাকে ততোটাও সুন্দর লাগছে না। একটু বারিয়ে বলছো। আর তোমাকেও কম লাগছে না কিন্তু কোনো অংশে।

জিসান আমার কথায় বলল,

  • সুন্দর আমাকেও লাগছে কিন্তু তোমার থেকে কম আপু, ট্রাস্ট মি!

আমি হেসে বললাম,

  • ওঁকে ট্রাস্ট করলাম। জিসান মামা- মামিমা কি রেডি হয়ে গেছেন?

জিসান বলল,

  • হ্যাঁ, আপু। মম আমাকে পাঠিয়েছেন তোমাকে নিচে নিয়ে যেতে। তুমি কি রেডি হয়ে গেছ?
  • হ্যাঁ জিসান চলো আমি রেডি।

আমি আর জিসান উপরের সিঁড়ি দিয়ে এক সাথে নিচে নামছি। তখন জিসান আমাকে ফিসফিসিয়ে বলল,

  • দেখ আপু তোমার দিকে কি ভাবে সবাই তাকিয় আছে।

জিসানের কথায় আমি নিচে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সবাই আমার দিকে তাকালেও আমার চোখ তাকিয়ে আছে সিফাত ভাইয়ার দিকে। সিফাত ভাইয়াকে আজ যেন অন্য রকম সুন্দর লাগছে। উনিও হোয়াইট কালার স্যুট পরেছেন। স্যুটের নিচে ব্লাক শার্ট, চুল গুলোকে স্পাইক করে রেখেছেন। হাতে ব্লাক একটা ঘড়ি, পায়ে ব্লাক সু। কথা বলছেন আর মাঝে মাঝে হাসছেন, এতেই যেন উনাকে আকর্ষনীয় করে তুলছে।

উনি এতো কিউট কেন? মাঝে মাঝে গিলে ফেলতে ইচ্ছে করে। আর উনার হাসিতে যে কেউই পাগল হয়ে যাবে।

আমি নিচে নামতেই মামিমা আমাকে ঝাপটে ধরে বললেন,

  • আমার মামনি কে দারুন লাগছে তো। না জানি কার নজর লাগে আবার।

মামিমার কথায় আমি মৃদু হেসে বললাম,

  • কি যে বলো মামিমা! তোমায় আজ অনেক সুন্দর লাগছে, মামা চোখ সরাতে পারবে বলে মনে হয় না। আমার কথায় মামিমার চেহারায় এক রাশ লজ্জা দেখা গেল। উনি লজ্জায় লাল হয়ে বললেন,
  • যাহ ফাজিল মেয়ে, শুধু দুষ্টমি। বলেই মামিমা চলে গেলেন গেস্টদের কাছে।

মামিমা চলে যেতেই মামার আগমন ঘটলো।

মামা আমাকে দেখে বলছেন,

  • মাসাআল্লাহ আমার অনিতা কে তো আজ বেশ লাগছে। মামার কথায় আমি বেশ লজ্জা পেলাম।

মামা আবার বললেন,

  • চলো অনিতা তোমাকে গেস্টদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমিও সম্মতি দিয়ে চললাম মামার সাথে।

মামার গেস্টদের সাথে পরিচিত হয়ে আমি এসে একটা সোফায় বসে পরলাম। সিফাত ভাইয়াকে দেখছি না উনি কোথায় গেলেন ভাবছি।

কোথা থেকে যেন পলাশ ভাইয়া হাজির হলেন আমার সামনে। আমাকে দেখেই উনি বলে উঠলেন,

  • হেই, অনিতা কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখলাম।

আমি মনে মনে বলছি,

  • এই আপদটা আবার কোত্থথেকে আসলো? বজ্জাতটার চোখে পরলে আমাকে গিলে খাবে।

পলাশ ভাইয়া আবার বললেন,

  • অনিতা কথা বলছো না কেন? তোমাকে জাস্ট অস্থির লাগছে।

এবার আমি মৃদু হেসে বললাম,

  • ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?

উনি বললেন,

  • আমি ভালো আছি অনিতা। তোমাকে আজ একজনের সাথে আলাপ করিয়ে দিবো। ওয়েট করো নিয়ে আসছি। বলেই উনি চলে গেলেন। উনি কার কথা বললেন কিছুই তো বুঝলাম না!

আচমকা ভাবে কে যেন আমাকে পিছন দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তাকানোর সাহস পাচ্ছি না। ভয়ে ভয়ে বললাম,

  • কে?

সোহেল ভাইয়া আমার সামনে এসে বললেন,

  • আরে অনিতা আমি। এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এখানে একা বসে আছো কেন?

সোহেল ভাইয়ার আমাকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরায় আমার প্রচন্ড রাগ হলো। কিন্তু কিছু বললাম না। রাগ সংযত করে বললাম,

  • ভালো লাগছে না ভাইয়া তাই এখানে বসে আছি।

সোহেল ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

  • তোমাকে খুব খুব সুন্দর লাগছে অনিতা।

এদিকে সোহেল এর কার্যকলাপ দেখে একজন প্রচন্ড রাগে ফেটে পরছে। সোহেল আর অনিতা কেউই অজ্ঞাত ব্যক্তিটি কে দেখছে না।

জেনি হঠাৎ করেই সিফাতের সামনে এসে বলছে,

  • ওওউ সিফাত ইউ লুকিং সো হট বেবি! বলেই সিফাতের মুখের দিকে তাকালো জেনি, সিফাতের মুখ তিব্র রাগে লাল হয়ে আছে। শরীর রাগে কাঁপছে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এখনি সব ধংস করে দিবে। জেনি আর কোনো কথা বলার জোঁ পেল না।

সিফাতের এমন ভয়ানক রাগের কারণ কি হতে পারে জেনি ভাবছে।

সোহেল অনিতার সাথে কথা বলেই যাচ্ছে আর অনিতা শুনছে। অনিতার ইচ্ছা না থাকা সত্তে ও শুনতে হচ্ছে কারণ সোহেল অনিতার হাত ধরে আছে।

এরমাঝে পলাশ মধ্য বয়সি একজন মহিলা কে সাথে নিয়ে এসে অনিতার সামনে উপস্থিথ হলো। পলাশ আসতেই সোহেল অনিতার হাত ছেড়ে দিল, অনিতা যেন প্রাণ ফিরে ফেলো। সোহেল এর এরকম হুটহাট জড়িয়ে ধরায়, হাত ধরায় অনিতা ভেজায় বিরক্ত।

পলাশ অনিতার উদ্দেশ্য বলল,

  • অনিতা এই যে আমার মাম্মি। মাম্মির সাথেই তোমাকে পরিচয় করানোর কথা বলে ছিলাম। মাম্মি তোমাকে দেখতে চেয়ে ছিলেন।

পলাশের মা অনিতার পাশে বসতেই পলাশ সোহেল কে বলল,

  • সোহেল ব্রো চলো ওদিকে। আর তার মার দিকে চেয়ে বলল, তোমরা কথা বলো আমরা আসছি।

পলাশের মা আর অনিতা অনেকক্ষণ কথা বললেন। পলাশের মা কথায় কথায় বললেন,

  • তোমাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে মা। এরকম মেয়েই আমি চাই।

অনিতা পলাশের মায়ের কথার মানে বুঝলো না। তাই বলল,

  • আন্টি কি বললেন ঠিক বুঝলাম না।

পলাশের মা মিষ্টি হেসে বললেন,

  • তোমার বুঝতে হবে না মা। ওটা আমাদের বড়দের ব্যাপার।

অনিতা সন্দিহান কন্ঠে বলল,

  • ওহ!

জিসান এসেই অনিতা কে বলল,

  • আপু আমার সাথে চলো তো ওইদিক টায়, কাজ আছে। অনিতা পলাশের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
  • আন্টি আমি আসছি, আপনি বসুন। মৃদু হেসে অনিতা জিসানের সাথে চলে গেল।

জিসানের উদ্দেশ্য অনিতা বলল,

  • জিসান, সিফাত ভাইয়া কোথায় দেখছি না যে?

জিসান দুষ্টমির সুরে বলল,

  • কেন আপু ভাইয়া কে কি মিস করছো?

অনিতা চোখ গরম করে জিসানের দিকে তাকাতেই, জিসান বলে উঠল,

  • এভাবে তাকিয়ও না আপু ভয় করে। ভাইয়া আছে এদিকে কোথা ও।

অনিতা মনে মনে বলল,

  • যাহ আমাকেও কেউ ভয় পায়, শুনে একটু শান্তি পেলাম।

জিসান কে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? জিসান বলল,

  • ছাদে সবাই ডান্স করছে তাই তোমাকেও নিয়ে যাচ্ছি দেখানোর জন্য।

আমি বললাম,

  • এসব ডান্স আমি পারি না, আমাকে কোনো ধরণের রিকুয়েস্ট করবা না আগেই বলে দিচ্ছি জিসান।

জিসান হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

  • আমি জানি আপু তুমি যে ডান্স পারো না। জাস্ট দেখবা আর ইনজয় করবা।

ছাদে দাঁড়িয়ে আমি ডান্স দেখছি। জিসান, সোহেল ভাইয়া, পলাশ ভাইয়া ডান্স করছিল। ওরা তিনজন ই খুব ভালো ডান্স করছে।

হঠাৎ করে অনুভব করলাম আমি শূন্যে ভাসছি!

আমাকে কেউ পাজোঁ কোলে করে নিয়ে চলে যাচ্ছে যার জন্য আমার মনে হচ্ছে আমি শূন্য ভাসছি!


পার্ট : ১৩

আমাকে কেউ পাজোঁ কোলে করে নিয়ে চলে যাচ্ছে যার জন্য মনে হচ্ছে আমি শূন্যে ভাসছি!

কে আমায় নিয়ে যাচ্ছে দেখার জন্য আমি উক্ত ব্যক্তিটির দিকে তাকালাম, তাকিয়ে দেখি সিফাত ভাইয়া! উনাকে দেখে আমি শুকনো একটা ঢুক গিললাম। বিস্ময়ে আর ভয়ে চাপা চিৎকার দিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,

  • সিফাত ভাইয়া আমাকে কোলে নিয়েছেন কেন? প্লিজ নামান বলছি।

আমার কথায় যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো দাউদাউ করে সিফাত ভাইয়ার রাগ জ্বলে উঠল। উনি অগ্নি দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

  • আনি চুপচাপ বসে থাকো, নয়তো কোল থেকে ফেলে দিব। আমি যা বলি তাই করে দেখিয়ে দেই।

উনার এমন ভয়ংকর গলা শুনে আমার বুক অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল। আমি কি আজ কোনো বড় ভুল করেছি যার জন্য উনি এমন আগুন হয়ে আছেন? কই আমার তো মনে পরছে না। সিফাত ভাইয়া অন্য সময়ের তুলনায় আজ যেন একটু বেশি রেগে গেছেন। এর কারণ কি হতে পারে, আর উনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমাকে মেরে ফেলবেন না তো? উনি যা রেগে আছেন এটাও করতে পারেন। ভয়ে আমার মুখ রক্ত শূন্য হয়ে আছে। এর মাঝে উনি আমাকে নিচে নামিয়ে দিয়েছেন।

আমাকে নিচে নামাতেই যেন আমার প্রাণ পাখি ফিরে ফেলাম। ভালোকরে তাকিয়ে দেখি এটা আমার নিজের রুম। বুঝতে পারছিনা পার্টি থেকে এখানে নিয়ে আসার মানে কি? ভয়ে ভয়ে উনার দিকে তাকালাম, তাকিয়ে দেখি উনি পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আমার দিকে অগ্নি চোখে চেয়ে আছেন। উনার এমন ভয়ংকর চাহনি দেখে ভয়ে আমার হৃৎপিন্ড টা যেন ট্রেনের গতিতে ছুটছে।

আস্তে আস্তে উনি আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন, আর আমি পেছনে পিছাতে লাগলাম। এভাবে পিছাতে পিছাতে এক সময় আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল।
সিফাত ভাইয়া উনার দু হাত দেয়ালের দু পাশে রাখলেন, উনার দু হাতের মধ্যকানে আমায় আবদ্ধ করে নিলেন। উনার চোখের দিকে তাকাতে পারছি না, রাগে লাল হয়ে আছে। ভয়ে জড়সড় হয়ে নিচের দিকে চেয়ে আছি।

তখনি সিফাত ভাইয়া শান্ত কন্ঠে বললেন,

  • আনি তোমাকে না করে ছিলাম না সোহেল থেকে দূরে থাকবে? সোহেলের সাথে মিশবে না।

মনে মনে ভাবছি, আরে উনি দেখলেন কি ভাবে সোহেল ভাইয়ার সাথে যে কথা বল ছিলাম? উনি তো কোথাও ছিলেন না!

এর মধ্যে সিফাত বেশ ঝাঁজালো গলায় বলল,

  • স্পিক আউট ডেম ইট, আনসার মি, কেন তুমি সোহেলের সাথে কথা বলেছো? আর সোহেল কেন তোমায় জড়িয়ে ধরলো? শুধু জড়িয়ে ধরেনি হাতও ধরেছে, কেন আনি কেন? সিফাত এখন ভয়ংকর ভাবে রেগে গেছে।

উনার এমন হিংস্র রাগ দেখে আমার শরীর কাঁপছে, প্রচন্ড পানির তৃষ্ণনা পেয়েছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাট হয়ে আছে। তারপর ও কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম,

  • আসলে সোহেল ভাইয়া আমার পিছন দিকে এসে জড়িয়ে ধরে ছিলেন আমি দেখতে পাইনি।

অনিতার কথা শুনে সিফাত আরো রেগে বলল,

  • ও তোমার হাত ধরে যখন কথা বলছিল তখন কি ওর হাতও দেখতে পাওনি?

অনিতা কে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সিফাত অনিতার হাত চেপে ধরল।

উনার এমন হাত ধরায় আমি ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠে বললাম,

  • সিফাত ভাইয়া প্লিজ ছাড়ুন আমার লাগছে। আমার কথা যেন উনার কান অব্দি পৌঁছালো না, উনি আমাকে ওয়াশরুমের দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। ওয়াশরুমের ভেতর গিয়ে আমাকে শাওয়ার এর নিচে দাঁড় করালেন, তারপর শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে বাহিরে চলে গেলেন। উনার করা কান্ডে আমি থ বনে গেলাম।

শাওয়ারের পানি পরছে আমার উপরে আমি ভিজে একাকার। সাথে চোখের পানিও অবিরাম ধারায় ঝরছে। উনি আমার সাথে এরকম করেন কেন? উনাকে কেন আমি এতো ভয় পাই, কেন কিছু বলতে পারিনা?

এদিকে সিফাত অনিতার রুম থেকে বাহিরে এসে তার নিজের রুমে গিয়ে চিৎকার করে বলছে,

  • আই এম সরি মায়াকুমারী তোমাকে এতো কষ্ট দেওয়ার জন্য। আমি জানি এখানে তোমার কোনো দোষ নেই, সোহেলই তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি চাইনা আমি ছাড়া, আমার মায়াকুমারীর শরীরে আর কারো স্পর্শ লাগোক তাই তো তোমার সাথে এরকম টা করলাম। তোমার ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে বিষণ মায়া হচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল আমার বুকে জড়িয়ে নেই, অশান্ত মন কে শান্ত করি। কিন্তু রাগের জন্য পারিনি। এভাবে আর চলতে দেওয়া যাবে না, তোমাকে আমার নিজের করে চাই আনি। আজ মম- পাপার ৩২তম এনির্ভাসারি। এনির্ভাসারির দিনটা তাদের কাছে বিশেষ দিন। এনির্ভাসারির দিনে তারা খুশি হয়ে আমরা তিন ভাইকে কিছু চাইতে বলেন। যা তারা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি কখনই কিছু চাইনি, সোহেল জিসান বরাবরই চেয়ে এসেছে। সিফাত গম্ভীর কন্ঠে বলল, এবার ঘটবে তার ব্যতিক্রম। আমি চাইব !

ইসাবেলা আমি তোমার কাছে কিছু চাইব, দেবে? পলাশের মাম্মি মিসেস ইসাবেলা কে বলছেন। মিসেস ইসাবেলা উনার স্বভাব অনুযায়ী হেসে বললেন,

  • জি আপা বলেন, আমার সাধ্যের ভেতরে থাকলে দেওয়ার চেষ্টা করব। পলাশের মা বললেন,
  • অনিতা কে আমার খুব পছন্দ হয়েছে ইসাবেলা। অনিতাকে আমার একমাত্র ছেলে পলাশের বউ বানাতে চাই।

মিসেস ইসাবেলা একটু অপ্রস্তুত গলায় বলে উঠলেন,

  • কোন অনিতা আপা? কার কথা বলছেন?

পলাশের মা বললেন,

  • ওই যে অনিতা বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

মিসেস ইসাবেলা এবার বুঝলেন উনি কার কথা বলছেন। মিসেস ইসাবেলা মৃদু হেসে বললেন,

  • ওহ আপা বুঝেছি কার কথা বলছেন। অনিতা আমার ননদের মেয়ে। অনিতা তো এখানে পড়া লেখা করতে এসেছে, ওঁকে বোধহয় এখন বিয়ে দেবেন না। পড়ালেখা শেষ হলে ওর পছন্দ মতো ছেলে দেখে বিয়ে দিবে অনিতার বাবা- মা, এরকম টাই বলেছেন উনারা। পলাশের মা তারপর ও মিসেস ইসাবেলা কে বললেন,
  • ইসাবেলা তুমি একটু অনিতার বাবা- মার সাথে কথা বলে দেখো তো উনারা কি বলেন। আর অনিতার মামার সাথেও কথা বলো। মেয়েটা কে আমার বেশ ভালো লেগেছে, মোট কথা আমার পলাশ অনিতা কে পছন্দ করে। মিসেস ইসাবেলা একটু চিন্তিত ভাবে বললেন,
  • ঠিক আছে আপা আপনি এত করে যখন বলছেন, আমি অনিতার মামার সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলবনে।

পলাশের মা বলে গেলেন ঠিক আছে আমাকে জানিয়ও।

পলাশের মা যাওয়ার পরই মিসেস ইসাবেলা একটা রহস্যময় হাসি দিলেন।

ইতিমধ্যে পার্টি শেষ হয়ে গেছে, গেস্ট রা চলে গেছে। বাড়ি একদম ফাঁকা হয়ে গেছে। তখনি মিসেস ইসাবেলার মনে পড়ল।

  • অনিতা কোথায়, ওঁকে তো অনেক্ষণ হলো দেখছি না। তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে অনিতার রুমের দিকে পা বাড়ালেন।

অনিতার রুমের সামনে য়েয়ে মিসেস ইসাবেলা বললেন,

  • মামনি ভেতরে আসব?

অনিতা বেডের একোণে গুটিশুটি মেরে বসে কাঁদছিল, মিসেস ইসাবেলার গলার আওয়াজ পেয়ে অনিতা চোখ মুছে বলল,

  • মামিমা এসো ভেতরে এসো। মিসেস ইসাবেলা রুমে ঢুকে অনিতা কে বলে উঠলেন,
  • কি হয়েছে মামনি তোমায় দেখছি না যে অনেক্ষণ হলো?

শরীরঠিক আছে, চোখ মুখের এমন অবস্থা কেন মামনি কি হয়েছে?

মামিমার এমন হুটহাট শ্রশ্ন করায় আমি একটু ভরকে গেলাম, এখন কি বলবো? তারপর একটু অপ্রস্তুত গলায় জবাব দিলাম,

  • মামিমা আমার প্রচুর মাথা ব্যাথা করছিল তাই পার্টির ওকান থেকে চলে এসেছিলাম।

মামিমা সন্দিহান চোখে চেয়ে বললেন,

  • সত্যিই কি তাই মামনি!

মামিমার কথায় ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় করছে, মামিমা কি বুঝে ফেললেন না কি কিছু? না, না বুঝতে দেওয়া যাবে না এতে প্রবলেম হতে পারে। তাই বললাম, না মামিমা সত্যিই মাথা ব্যাথা করছে। মামিমা আমাকে ডিনার করার জন্য বললেন, আমি খাব না বলে না করে দিয়েছি। উনি চলে গেলেন, আর আমি আমার রুমের বেলকোনির দিকে পা বাড়ালাম।

সিফাত, সোহেল, জিসান তিন জন বসে আছে তাদের মম- পাপার সামনে। জনাব আলী মেহবুব বললেন,

  • তোমরা নিশ্চয়ই জানো তোমাদের তিন ভাই কে কেন ডাকা হয়েছে?

তিন জনই একসাথে বলে উঠল, জি জানি।

জনাব আলী মেহবুব আবার বললেন,

  • তোমরা তিন ভাইয়ের মধ্যে জিসান সব ছোট তাহলে জিসানই প্রথম বলুক, তার কি চাই? বলো জিসান,

জিসান হেসে বলল,

  • আমার আর কি চাই তা তোমরার অজানা নয় পাপা? ভালো ব্রানডের ঘড়ি, আর দামি ফোন হলেই আমার হবে। জিসানের কথা শুনে সবাই একসাথে হেসে উঠল। মিসেস ইসাবেলা হাসি থামিয়ে সোহেলের উদ্দেশ্য বললেন,
  • সোহেল তোমার কি চাই তা তো আমাদের জানা, তোমার ট্যুরে যাওয়ার জন্য টাকা লাগবে তাই তো? তুমি তো এটাই চাও প্রতিবার, ওকে পেয়ে যাবে।
    সোহেল তার মম কে বলল,
  • না মম এবার আমার অন্যকিছু লাগবে।

সোহেলের অন্যকিছু চাই কথা টা শুনে সিফাতের বুক এক অজানা আশংকায় কেঁপে উঠল।

এরমধ্যে জনাব আলী মেহবুব সিফাত কে বললেন,

  • তোমার কি কিছু চাই সিফাত?

সিফাত হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়াল। সবাই যেন সিফাতের হ্যাঁ শুনে বিস্ময়ে অবাক হলো!

বিস্ময় কাটিয়ে জনাব আলী মেহবুব অধীর আগ্রহে বলে উঠলেন,

  • তোমার কি চাই সিফাত বলো, তাড়াতাড়ি বলো!

পার্ট : ১৪

  • তোমার কি চাই সিফাত বলো, তাড়াতাড়ি বলো।

সিফাত কিছু বলার আগেই মিসেস ইসাবেলা বলে উঠলেন,

  • আগে সোহেলের কি চাই শুনবো, তারপর সিফাতের।

সিফাত মনে মনে বলল,

  • না জানি সোহেল কি চাইবে, যদি আনি কে চায়?

সিফাতের মাথা ঘুরছে, অজানা ভয় তার মনের ভেতর কুড়ে খাচ্ছে। না, না সোহেল কে আমি আমার জান দিতে পারব না। আনি যে আমার জান পাখি, আমার ভালো থাকার ট্রনিক।

এরমধ্যে সোহেল বলে উঠল,

  • আমি যা চাইব দিতে হবে কিন্তু মম! না করতে পারবে না।

মিসেস ইসাবেলা বুঝতে পারছেন না সোহেল কি চাইবে? তাই তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,

  • বলো তোমার কি চাই, আমরা দেওয়ার চেষ্টা করব।

সোহেল তার মমের কথায় যেন ভরসা পেল তাই সে বলল,

  • মম আমার নিউ মডেলের দামি গাড়ি চাই।

সোহেলের জবাব শুনে সিফাত একটা স্বস্থির নি:শ্বাস ফেললো। তার ধমটা এতোক্ষণ আটকে ছিল, সোহেল কি চাইবে ভেবে।

মিসেস ইসাবেলা মৃদু হেসে বললেন,

  • ওহ এই ব্যাপার পেয়ে যাবে। টাকা কখন লাগবে সোহেল?

সোহেল জবাব দিল তার কাল লাগবে।

সোহেল মনে মনে ভাবছে,

  • আজ গাড়ি চাওয়ার কারণ এক মাত্র অনিতা। গাড়ি কিনেই অনিতা কে নিয়ে আমি লং ড্রাইবে যাবো। একথা ভাবতেই এক অনাবীল আনন্দে সোহেলের মন পুলকিত হয়ে গেল।
    জনাব আলী মেহবুব উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
  • আমি আমার সিফাতের কথা শুনতে চাই, ও কি চায়। সিফাত তো কোনো দিন কিছু চায় না, তাই ও কি এমন চাইবে সেটা শুনার জন্য আমি এক্সসাইটেড!

সোহেল, জিসান আর মিসেস ইসাবেলা ও অধীর আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছেন সিফাতের দিকে।

সিফাত অস্থিত্ব ফিল করছে কি ভাবে কথা টা বলবে, আর লজ্জাও আছে সাথে।

সিফাত অস্থিত্ব আর লজ্জা কে পাত্তা না দিয়ে যখনি বলতে গেল,

  • পাপা আমার আ

সিফাত আর অনিতার কথা বলতে পারল না তার ফোনে অফিস থেকে জরুরি কল আসল। সিফাত বলতে চাইছিল, পাপা আমার আনি কে চাই!

সিফাত ফোন রিসিভ করার জন্য এক মিনিট টাইম চেয়ে সবার কাছ থেকে আড়ালে গেল।

সবাই বসে রইল সিফাতের অসমাপ্ত কথা শুনার জন্য।

সিফাত ফোন কল সেড়ে যখন ফিরে আসলো তখন সে শুনতে ফেল তার মম তার পাপা কে বলছেন,

  • পলাশ নাকি অনিতা কে পছন্দ করে, সে অনিতা কে বিয়ে করতে চায়। পলাশের মা আমার সাথে এই ব্যাপারে আজ আলাপ করে গেছেন। সাথে এ ও বলে গেলেন, আপনার সাথে আর অনিতার বাবা- মার সঙ্গে যেন কথা বলি।

মিসেস ইসাবেলা আর কিছু বলতে পারলে না তার আগেই সিফাত এক চিৎকার দিয়ে বলে উঠল,

  • মম, আই জাস্ট কিল পলাশ!

সিফাতের এমন হঠাৎ করে ভয়ংকর ভাবে রেগে যাওয়ার কারণ কেউ ই বুঝল না। আর পলাশ কে কেন খুন করতে চায় সিফাত, সবার মনে একি প্রশ্ন।

তাই মিসেস ইসাবেলা সিফাত কে জিজ্ঞেস করলেন,

  • কি হয়েছে সিফাত, এমন করে রেগে গেলে কেন? পলাশ কি করেছে?

সিফাত রাগে গজগজ করতে করতে বলল,

  • মম পলাশ কেন আনি কে বিয়ে করতে চায়? ওর চোখ আমি উপড়ে ফেলবো ও আনির দিকে তাকিয়েছে। পলাশের সাহস কি করে হয় সিফাত মেহবুবের কলিজায় হাত দেওয়ার?

সিফাত ঠিক কি বলতে চাইছে তা সবার কাছে স্পষ্ট নয়।

এরমধ্যেই সোহেল সিফাত কে জিজ্ঞেস করল,

  • ভাইয়া তুমি ঠিক কি বুঝাতে চাইছ, একটু ক্লিয়ার করে বলো?

সিফাত চিৎকার দিয়ে বলল,

  • আমার আনি কে চাই, আর এটাই আমি বলতে চেয়ে ছিলাম মম- পাপার কাছে। এ কথা বলেই সিফাত রুম থেকে রেগেমেগে হনহন করে চলে গেল।
    সোহেল খানিকটা মন খারাফ করে তার রুমে চলে গেল,
  • জিসান খুশি হয়েছে যাক এতোদিন বাদে তার ভাই তার মনের কথা প্রকাশ করতে সক্ষম হলো।

মিসেস ইসাবেলা আর জনাব আলী মেহবুব একটু চিন্তিত মুখে একজন অপর জনের দিকে চেয়ে তারপরই ঘর কাঁপানো শব্দে হো, হো করে হেসে উঠলেন।

তারা দুজনে আগেই বুঝতে পেরে ছিলেন সিফাত অনিতা কে ভালবাসে, আর সেটা তারা বুঝেন জন দের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিন। সিফাত অনিতার ব্যাপারে দুর্বল হয়ে গেছে, শুধু প্রকাশ করতে পারেনি এতো দিন।

মিসেস ইসাবেলা জানেন সিফাত অন্যদের মতো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না।

তাই মিসেস ইসাবেলা সুযোগ বুঝেই জনাব আলী মেহবুবের সাথে পলাশের কথা তুলেন, যাহাতে সিফাত শুনতে পায় উনার বলা কথা। আর রেগে তার মনের অনুভূতি গুলো প্রকাশ করতে পারে। হ্যাঁ তাই হলো সিফাত রেগে বলেই দিল তার ভালবাসার কথা। অনিতার মামা- মামিমা ও অনিতাকে পছন্দ করেন, তারা এরকম ছেলের বউ ই আশা করেন।
জনাব আলী মেহবুব আর মিসেস ইসাবেলা খুশি হলেন এটা ভেবে যে, তাদের ছেলে অবশেষে কোনো মেয়ে কে ভালবেসেছে।

অনিতা বেলকোনির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার অনেক প্রশ্ন সিফাত কে নিয়ে, কেন সিফাত তার সাথে এতো রুড বিহেভ করে?

  • আজ কেন জানি কানাডার এই শহরটা কে অসহ্য লাগছে। ইচ্ছে করছে নিজের দেশে নিজের শহরে ছুটে যাই। মা কে খুব মিস করছি, শিউলির অভাব টা এখন বুঝতে পারছি। মন খারাপের সময় গুলোতে শিউলি আমার পাশে থাকে, মন ভালো করার জন্য অনেক গল্প শুনাতো। হাসানোর চেষ্টা করতো।

নাহ আর পারছি না সিফাত ভাইয়ার এমন বাজে আচরণ মেনে নিতে। আমি কি উনাদের বাসা থেকে চলে যাব, তাহলে হয়তো উনার অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবো? উনাকে বুঝা বড় দায়, কখনো বুকে টেনে নেন কখনো রুড বিহেভ করেন। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি উনার বড় কোনো ক্ষতি করেছি, যার জন্য এতো অত্যাচার করেন।

সিফাত ভাইয়ার প্রতি যে আমার দুর্বলতা কাজ করে সেটা আমার কাছে স্পষ্ট। কিন্তু উনার কি কোনো দুর্বলতা কাজ করে আমার প্রতি?

হঠাৎ কারো গিটার বাজানোর আওয়াজে আমার ভাবনার ঘোর কাটল। অনিতা বিচলিত কন্ঠে বলল,

  • এই বাড়িতে কে গিটার বাজায়, তাও আবার এতো রাত্রে? গিটারের মাঝে বিষাদের সুর কেন, কার মনের আকাশে আজ এতো বিষাদের ছায়া? গিটারের আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে ছাদ থেকে আওয়াজ টা আসছে। একবার কি গিয়ে দেখে আসব, কে গিটারে সুর তুলেছে। গিটারের সুরটা আমার কাছে খুব ভালো লাগছে। নাহ দেখে আসি একবার!

আমার রুম থেকে সাবধানে বের হলাম, পা টিপে টিপে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম। দেখার কৌতূহল কে আর চেপে রাখতে পারছি না। ধীরে ধীরে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম, বুকের ভেতর কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে। ছাদে উঠে চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, গিটারের সুরটাও আর শুনা যাচ্ছে না।

মূর্হতেই আমার শরীর ভয়ে ঠান্ডা হয়ে আসছে, হাত পা ক্রমাগত কাঁপছে। তাহলে কি আমার মনের ভুল ছিল, আমি ভুল শুনলাম? কোনো ভূত টোত নয় তো আবার, যদি আমাকে একা পেয়ে ঘাড় মটকে রক্ত খেয়ে নেয়?

না, না ঘাড় মটকানোর আগেই পালাই এখান থেকে।

যেই অনিতা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়লো, অমনি কেউ অনিতা কে টান দিয়ে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল। অনিতা ভয়ে চিৎকার করতে গেলে অনিতার মুখ চেপে ধরে। অনিতার শ্বাসরূদ্ধ হয়ে আসছে।

অজ্ঞাত ব্যক্তিটি যখন অনিতা কে এভাবে চেপে ধরে তখনই ছাদে একজন তৃতীয় ব্যক্তির আগমন ঘটে। আর রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখ লাল করে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তারপর দেয়ালে একটা ঘুষি মেরে হনহন করে ছাদ থেকে চলে যায়!


পার্ট : ১৫

চোখ লাল করে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তারপর দেয়ালে একটা ঘুষি মেরে হনহন করে ছাদ থেকে চলে যায়!

অজ্ঞাত ব্যক্তিটি অনিতার মুখ চেপে ধরায় সে কোনো চিৎকার দিতে পারছে না। আর অজ্ঞাত ব্যক্তিটি লাইটের অল্প আলোয় অনিতার দিকে এক নজরে চেয়ে আছে।
যেন অনেক বছর ধরে দেখেনি অনিতা কে। অনিতা কি করবে ভয়ে তার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। অনিতা না পেরে অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে কামড় বসিয়ে দেয়, যে হাত দিয়ে অনিতার মুখ চেপে ধরে ছিল।

সাথে সাথে লোকটি আউচ! বলেই হাত সরিয়ে নিল। অনিতা লোকটির কন্ঠ শুনে স্তব্দ হয়ে গেল!

লোকটি অনিতার দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে দাঁতেদাঁত চেপে বলল,

  • এতো জোড়ে কেউ কামড় দেয় ডেম ইট!

অনিতা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো,

  • আমি কি জানি সিফাত ভাইয়া আপনি এখানে থাকবেন, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম। অনিতা এখানো ভয়ে কাঁপছে সেটা সিফাতের চোখ এড়ায়নি।

সিফাত আর এক মিনিট ও লেট না করে অনিতা কে টান দিয়ে তার বুকে জড়িয়ে নিলো। সিফাত অনিতা কে বুকে নিয়ে সে এক প্রশান্তি অনুভব করছে। আচমকা ভাবেই অনিতা সিফাত কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

সিফাত হতবাক নয়নে চেয়ে আছে অনিতার দিকে। তখনি অনিতা তীব্র রাগ নিয়ে বলে উঠল,

  • আপনি নিজে কে কি ভাবেন বলুন তো? যখনি ইচ্ছা বুকে টেনে নিবেন, যখনি ইচ্ছা টর্চার করবেন। আপনার এ সবের মানে কি সিফাত ভাইয়া? আমাকে কারো সাথে মিশতে দেন না এমন কি আপনার আপন ভাইয়ের সাথেও না, কেন?

সিফাত অনিতার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, এটা কি সেই অনিতা যে সিফাতের ভয়ে কাঁপতো?

অনিতা আরো কিছু বলতে যাবে তখনি সিফাত অনিতার ঠোঁট দু টো তার দখলে নিয়ে নিল।

সিফাতের কাছ থেকে ছুটার জন্য অনিতা সিফাতের বুকে অজস্র কিল ঘুষি মারছে, কিন্তু সে দিকে সিফাতের কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। সে তার কাজে ব্যস্ত, অনিতাও হাল ছেড়ে দিয়ে রোবটের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল।

কিছু সময় বাদে সিফাত নিজে অনিতা কে ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে দাঁড়াল। অনিতা ছাড়া পেয়ে জোড়ে জোড়ে কয়েকটা নি:শ্বাস ফেললো।

তারপর অনিতা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

  • আপনি এমন করেন কেন সিফাত ভাইয়া, আমি কি আপনার খুব বড় ক্ষতি করেছি?

সিফাত বাঁকা হাসি দিয়ে বলে উঠল,

  • হ্যাঁ, আনি তুমি আমার খুব বড় ক্ষতি করেছো। একথা বলেই সিফাত অনিতার কাছে গেল, গিয়ে নরম সুরে বলল,
  • আই এম সরি, হোয়াইট এন্জেল। রাগের সময় আমার মাথা কাজ করে না, সরি আনি তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।

অনিতা জড়ো পদার্থের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, আর চোখ থেকে অঝর ধারায় জল গড়িয়ে পরছে। সে বুঝার চেষ্টা করছে একটু আগে তার সাথে কি হলো! যখন বুঝতে পারলো অনিতা কান্না মাখা মুখেও লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, তার কান দিয়ে যেন গরম ধোয়া বের হচ্ছে।

সিফাত অনিতার চোখের জল সহ্য করতে পারে না। অনিতার একদম কাছে গিয়ে তার ঠোঁট দিয়ে অনিতার চোখের জল মুছে দিল।

সিফাতের এমন স্পর্শে অনিতা কেঁপে উঠল। তারপরই সিফাত অনিতা কে পাজোঁ কোলে তুলে নিয়ে, ছাদের কোণায় রাখা বেতের সোফার মধ্য বসল।

অনিতা এখনো ঘুরের মধ্যে ডুবে আছে। অনিতা যেন কথা বলার বাঁক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

সিফাত ভাইয়া এমন করছেন কেন, উনি আমার এতো কাছে আসায় আমার ধম বন্ধ হয়ে আসছে। উনার শরীরের পারফিউমের ঘ্রাণ টা ও আমার নাকে এসে লাগল, কেমন ঘুর লাগানোর মতো।

সিফাত অনিতা কে কোলে নিয়ে সোফায় বসে আছে কোনো কথা বলছে না।

কিছুক্ষণ নিরবতার মধ্যদিয়ে কাটল। প্রথমে সিফাতই নিরবতা ভেঙ্গে বলল,

  • আনি এই ঠান্ডার মধ্য তোমার গায়ে সাল নেই কেন? সিফাতের করা প্রশ্ন যেন অনিতার কর্ণপাত হলো না, সে এক গভীর ভাবনার মাঝে চলে গেছে।

সিফাত এইবার ঝাঁজালো গলায় বলে উঠল,

  • এই মেয়ে কথা কানে যায় না, কি এতো রাজ্যের ভাবনা ভাবছো শুনি?

সিফাতের ঝাঁজালো গলা শুনে অনিতা তার ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে এলো।

ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

  • আপনি আমায় কোলো নিয়ে বসে আছেন কেনো সিফাত ভাইয়া? আমার অস্থিত্ব লাগছে, নামান প্লিজ আমি রুমে যাবো।

অনিতার এমন কথায় সিফাতের রাগটা সপ্তম আকাশে উঠে গেল, সিফাত তার রাগ কে কন্ট্রোল করার জন্য কয়েক টা লম্বা শ্বাস নিল। সিফাত চায় না এখন অনিতার সাথে কোনো রুড বিহেভ করতে।

তাই সিফাত ঠান্ডা কন্ঠে অনিতা কে বলল,

  • তোমার ঠান্ডা, ভয় দুটোই লাগছিল আনি, তার জন আমার কোলে নিয়ে বসে আছি, দেখো তোমার শরীর টা কেমন বরফ হয়ে গেছে?

অনিতা ও উপলব্ধি করতে পারছে তার শরীর কেমন হিম শীতল হয়ে আছে। অনিতা মনে মনে ভাবছে তাড়াহুড়া করে আসতে গিয়ে আমার গায়ের সাল টা রুমেই ফেলে আসছি। বাহিরে যে এতো ঠান্ডা পরেছে সেদিকে তো আমার খেয়ালই ছিল না, রুমের ভেতর গরম হিটার থাকায় ঠান্ডা বেশ একটা বুঝা যায় না।

অনিতার ভাবনার মাঝেই সিফাত নরম সুরে ডাক দিল,

  • আনি, এতো রাতে ছাদে কেন এসে ছিলে?

সিফাত ভাইয়ার কথায় আমি খানিক টা অপ্রস্তুত গলায় বললাম,

  • ইয়ে, মানে আমার ঘুম আসছিলো না তখনি কারো গিটারের সুর শুনলাম, শুনে ইচ্ছে হচ্ছিল কে গিটার বাজায় দেখতে। অনুমান করলাম আওয়াজ টা ছাদ থেকে যাচ্ছে তাই ছুটে আসলাম দেখতে, কিন্তু আমি আসতেই সুর টা গায়েব হয়ে গেল। তাই তো ভয়ে চলে যেতে ছিলাম আর আপনি আটকে দিলেন। কি ভয়টাই না পেয়ে ছিলাম, ভাব ছিলাম এই বুঝি শেষ আমি!

আমার কথায় উনি উচ্চ শব্দে হেসে উঠলেন, আমি জিজ্ঞাসা চোখে তাকালাম উনার দিকে। আমি কি কোনো জোকস বলছি না কি যে অতো জোড়ে হেসে উঠলেন।
অনিতা গাল ফুলিয়ে বসে রইল,

সিফাত অনিতা কে আরেকটু শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে বললো,

  • এই পাগলি মেয়ে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে, সিফাত মেহবুব ছাড়া তোমাকে কেউ ছুতেঁও পারবে না। এ কথা বলেই উনি আমার কপালে গভীর ভাবে একটা চুমু একেঁ দিলেন, উনার এমন স্পর্শে আমি আবারও কেঁপে উঠলাম।

আজ উনার কি হয়েছে বুঝতে পারছি না।

উনার বুকে আমার নিজে কে খুব নিরাপদ মনে হয়, খুব শান্তি লাগে। উনার প্রস্তুত বুকে আমাকে যেন এক খরগোশের বাচ্চার মতো লাগছে। ইচ্ছে করছে এই বুকে এভাবে মাথা রেখে শত শত যুগ পাড় করে দেই।

আমার ভাবনার মাঝে সিফাত ভাইয়া ঠান্ডা মিশ্রিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

  • আনি তোমার কি গিটারের সুর ভালো লাগে?

আমি উনার কোলে আরেকটু গুটিশুটি হয়ে বসে উত্তর দিলাম,

  • হুম খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে আজ যে গিটার বাজাচ্ছিল ওই সুর টা খুব ভালো লেগে ছিল। কিন্তু কে বাজালো দেখতে পেলাম না। আচ্ছা আপনি কি জানেন কে গিটার বাজাচ্ছিল? আপনি তো ছাদেই ছিলেন!

সিফাত অনিতা কে দেখে গিটার বাজানো বন্ধ করে দিয়ে ছিল,

অনিতার করা প্রশ্নে সিফাত কিছুটা বিব্রত বোধ করে উত্তর দিলো,

  • হ্যাঁ, জানি!

আমি উনার বুক থেকে মাথা তুলে উনার মুখের দিকে চেয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম,

  • কে বাজাচ্ছিল!

সিফাত ভাইয়া মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,

  • গিটার টা আমি ই বাজাচ্ছিলাম আনি।

উনি বাজাচ্ছিলেন শুনে আমি বিস্ময়ে হা হয়ে গেলাম। উনি এতো সুন্দর গিটার বাজাতে পারেন তা আমার জানা ছিল না!

আমি বিস্ময় কাটিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম,

  • সিফাত ভাইয়া আপনার তো অনেক গুন দেখছি!

আমার কথায় সিফাত ভাইয়া কিছু টা অবাক হওয়ার ভান করে বললেন,

  • তা আমার কি কি গুন আনি একটু বলতো দেখি,

উনার বলা কথায় আমি থতমত গলায় বললাম, অনেক গুনই আছে।

সিফাত ভাইয়া একটু হেসে বললেন,

  • বলো না শুনি কি গুন আছে?

এবার আমি একটু বিরক্তি ভাব নিয়ে বললাম,

  • কারো সামনা সামনি তার প্রশংসা করা মানে তাকে জ্যান্ত জবাই করা। কাজেই কারো প্রশংসা করতে হলে তার আড়ালে করতে হয়, আপনার গুনটাও একটা প্রশংসা তাই সেটা আড়ালে করাই শ্রেয়।

সিফাত অনিতার কথা শুনে বললো,

  • বাহ! মেডাম দেখি অনেক কিছুই জানেন দেখছি,

অনিতা সিফাতের মুখে তার নিজের প্রশংসা শুনে লাজুক হাসি দিল।

সিফাত অনিতা কে আবার প্রশ্ন করলো,

  • আনি তুমি এই কথা কোন বইয়ে পরেছো?

উনাকে বললাম,

  • এই কথা টা (হযরত আলী রা ) বলেছেন।

উনি এবার বললেন,

  • অহ, ঠিক আছে মানার চেষ্টা করব।

মনে মনে ভাবছি উনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, কিন্তু সাহস পাচ্ছি না। অনেক ভাবনার পর কিছুটা সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

  • আচ্ছা সিফাত ভাইয়া আপনার গিটারে আজ এতো বিষাদের সুর ছিল কেন?

উনি মৃদু হেসে বললেন,

  • মন ভালো ছিল না, আমার মন ভালো না থাকলে আমি প্রায়ই গিটার বাজাই।

ভাবছি উনার এতো মন খারাপের কারণ কি হতে পারে! এর মাঝেই উনি বলে উঠলেন,
এই আনি তোমার ভয় করছে না এই ভাবে যে আমার কোলে বসে আছো, যদি উল্টা পাল্টা কিছু করে বসি?

অনিতার ভাবলেশহীন জবাব,

  • নাহ, ভয় করছে না, উল্টা পাল্টা কিছু যদি করতে চাইতেন তবে সেদিন ই করতে পারতেন। যেদিন রাতে আপনার রুমে একা গিয়ে ছিলাম, সে সময় যখন কোনো কু চিন্তা মাথায় আনেনি তবে এখনও আনবেন না আমার বিশ্বাস।

অনিতার এতো বিশ্বাস দেখে খুশিতে সিফাতের মন ভরে গেল। তাহলে সে সঠিক মানুষকেই বাচাই করছে, তার জীবন সঙ্গী হিসেবে একথা ভাবতেই সিফাতের এক আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল সারা হৃদয় জোড়ে।

কারণ যে কোনো সম্পর্কের বিত্তিই হলো বিশ্বাস। যেখানে “বিশ্বাস” নামক ছোট শব্দটা নেই, সেখানে আর যাই হোক ভালোবাসা থাকতে পারে না। “বিশ্বাস” শব্দটা ছোট হতে পারে কিন্তু এই একটা শব্দই যে কোনো সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি।

অনিতা সিফাত কে একমনে ভাবতে দেখে বলে উঠল,

  • কি এতো ভাবছেন সিফাত ভাইয়া?

সিফাত অনিতার কথায় তার সম্মতি ফিরে পেয়ে বললো,

  • কিছু না আনি, রাত অনেক হয়েছে চলো এবার ঘুমাতে যাবে। কাল তো তোমার ভার্সিটি আছে। রাত যতো হবে ততো ঠান্ডাও বাড়বে, পরে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।

অনিতা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো, সিফাত অনিতা কে ওইভাবেই কোলে নিয়ে আসতে চাইলে অনিতা বাঁধা দিয়ে বলে,

  • না, সিফাত ভাইয়া আমাকে নামিয়ে দিন। আমি হেঁটে যেতে পারব, যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে কি ভাববে বলুন তো?

আমার কথায় মূর্হতেই উনার রূপ পাল্টে ফেললেন যেন, রাগে উনার নাক লাল হয়ে গেল। আমি ভয়ে একটা শুকনো ঢুক গিললাম। এই জল্লাদটাকে বুঝা বড় মুশকিল, এই রোমান্টিক মুডে চলে যানতো, এই উনার ভিলেন রূপে ফিরে আসেন, আজব এক্কান চিজ ব্যাটা বজ্জাত।

মনে মনে এইসব কথাই আওড়াচ্ছিলাম, তখনি শুনতে ফেলাম উনি কাটকাট গলায় বললেন,

  • কে কি ভাবলো আমি পরয়ো করি না আনি, কোলে করে যেতে তোমার কোনো প্রবলেম হলে বলো নামিয়ে দেই।

উনার এই রাগ দেখে আমি ভয়ে উনার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আমার দুহাত দিয়ে, বলাতো যায় না যদি নিচে ফেলে দেন। ভয়ে ভয়ে বললাম,

  • না, না আমার কোনো প্রবলেম নেই চলুন।

ছাদ থেকে আসার আগে আমাকে নিয়ে ছাদের রেলিং এর কাছে গেলেন, তারপর একটা গিটার দেখিয়ে বললেন,

  • গিটার টা হাতে নাও, আমি নিতে পারবো না তোমায় ধরে আছি। গিটার নিতে গেলে তুমি পরে কোমর ভাঙ্গবা, বলেই উনি বাঁকা হাসি দিলেন। আমি আর কিছু না বলে উনার গিটার নিয়ে শক্ত হাতে ধরে রইলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে উনি আমার রুমে আমাকে নিয়ে চলে আসলেন। উনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে গুড নাইট বলে উনার গিটার নিয়ে আমার রুমের দরজা অব্দি চলে গেলেন। তারপর আবার কি মনে করে ফিরে এসে বললেন,

  • আজ হোয়াইট গাউনে তোমায় একদম পরির মতো লাগছিল। ঠিক যেমনটা কল্পনা করছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর লাগছিল। বলেই বাঁকা হাসি দিয়ে চলে গেলেন।
    আর আমি অপলক চোখে তাকিয়ে আছি উনার যাওয়ার দিকে।

আজ এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে, আমি আমার প্রশ্ন গুলোর উত্তর একটু হলেও পেয়েছি। সিফাত ও মুখে বাঁকা হাসি রেখেই ভাবছে, আমি অনেকটাই নিশ্চিত অনিতার ব্যাপারে, সে দুর্বল হয়ে গেছে আমার প্রতি।

রাতের শেষ দিকে কিছু একটা ভাঙ্গার শব্দে জেনির ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেনি এখনো সিফাতদের বাড়িতেই আছে, কয়েক দিন থাকবে বলে এসেছে।

জেনি কান কাড়া করে অনুমান করার চেষ্টা করছে শব্দটা কোথা থেকে আসলো।

সে ধীর পায়ে উঠে রুমের বাহিরে আসলো, হ্যাঁ তার অনুমানই সঠিক শব্দটা সোহেলের রুম থেকেই আসছে। জেনি লেট না করে দ্রত পায়ে হেঁটে গেল সোহেলের রুমের দিকে।
দেখলো সোহেলের রুমের দরজাটা হাল্কা ফাঁক করা। তাই সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলো সোহেল কি করছে, সোহেল কে দেখেই জেনি চিৎকার দিয়ে রুমের ভেতর ঢুকে বলে উঠল,

  • ব্রো তোর কি হয়েছে, এভাবে হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে কেন? আনসার মি, ব্রো!

পার্ট : ১৬

  • ব্রো তোর কি হয়েছে, এভাবে হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে কেন? আনসার মি, ব্রো!

জেনি এক নাগারে সোহেল কে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, কিন্তু এতে সোহেলের কোনো ভাবান্তর নেই। সোহেল রক্ত চোক্ষু নিয়ে চেয়ে আছে ফ্লোরের দিকে। জেনি এবার বাজকাই গলায় সোহেল কে বলল,

  • কি হয়েছে সোহেল বলবি তো, না বললে বুঝব কেমনে? আর এভাবে হাত কেটে ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করে দেব দাস হয়ে বসে আছিস কেন?
    সোহেল এবার মুখ খুলে বললো,
  • আমার জগের পানি শেষ হয়ে গিয়ে ছিল, তাই পানি আনতে আমি নিচে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হই। তখনি দেখলাম অনিতা তার রুম থেকে বাহির হয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায়। আমি ভাবলাম ও এতো রাতে ছাদের দিকে যাচ্ছে কেন? দেড়ি না করে নি:শব্দে আমিও অনিতার পিছু নিলাম। আমার কানে ভেসে আসছিল ভাইয়ার গিটারের সুর, আরেকটু আগ্রহ নিয়ে অনিতার পিছু পিছু যাই। অনিতা যখন ছাদে উঠে তখনি ভাইয়া গিটার বাজানো বন্ধ করে দেয়। গিটারের সুর না পেয়ে অনিতা হয়তো ভয় পেয়ে ছিল। তাই সে ছাদ থেকে চলে আসার জন্য উদ্বেত হলেই, ভাইয়া এসে অনিতা কে জড়িয়ে ধরে।

জেনি বললো,

  • আর তুই সে দৃশ্য দেখে রেগে রুমে চলে এসে ভাংচুর শুরু করেছিস না?

জেনি সিস ভাইয়া আর অনিতা কে আমি এক সাথে সহ্য করতে পারি না, সোহেল বললো।

জেনি রোষপূর্ণ গলায় বললো,

  • ব্রো এই মেয়ে আমার সিফাত কে ও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল। আমি একটা ব্যাপার ভেবে আশ্চর্য না হয়ে পারছি না সোহেল, যে সিফাত কোনো মেয়ে কে ধার কাছ ঘেঁষতে দিতোনা সে অনিতা কে আজ জড়িয়ে ধরেছে। প্রচন্ড রাগ নিয়ে জেনি বললো, এই মেয়ের মধ্যে তোর ভাই দেখেছে টা কি? যা আমার মাঝে নেই? আমি তো ওই মেয়ে থেকেও অনেক গুন সুন্দরি।

সোহেল জেনির উদ্দেশ্য বললো,

  • আমি কিছু জানি না সিস, আমার অনিতা কে চাই। আর আজ আরেকটা কান্ড করেছে ভাইয়া, তুমি তখন তোমার রুমে ছিলে। তুমি বা অনিতা তোমরা কেউই এই ব্যাপারে জানো না।

জেনি অতি আগ্রহী হয়ে বললো,

  • সিফাত কি করেছে, সোহেল?

সোহেল কিছু সময় নিরব থেকে উত্তর দিল,

  • ভাইয়া মম- পাপা কে বলেছে তার অনিতা কে চাই। পলাশ ব্রো ও অনিতা কে পছন্দ করে তার মায়ের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে মমের কাছে। একথা বলে সোহেল থামল, সোহেল থামার সাথে সাথে জেনি অবাক কন্ঠে বলল
  • ব্রো এত কিছু ঘটে গেছে আর তুই আমাকে এখন বলছিস, হোয়াই সোহেল হোয়াই?

সোহেল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,

  • সরি সিস আর হবে না, আর তুমি তো পার্টি শেষে রুম থেকে বাহির হওনি তাই বলার সুযোগ পাইনি।

জেনি কি যেন ভাবল তারপর সোহেল কে বলল এদিকে শুন,

  • তর চাই অনিতা কে, আমার চাই সিফাত কে। তাহলে সেই অনুযায়ী প্লান করতে হবে, মাইন্ড ইট যাতে সাপও মরে লাঠি ও না ভাঙ্গে। বলেই একটা শয়তানি হাসি দিল জেনি।
    জেনির কথার কোনো মানে সোহেলের মাথায় ঢুকল না, তাই সে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকাল জেনির দিকে, জেনি সোহেলের তাকানোর মানে বুঝতে পেরে বলল,
  • বুকা ছেলে তর এতো বুঝতে হবে না, তুই শুধু আমার প্লান মতো কাজ করবে। তাহলেই কেল্লা ফতে, বলেই আরেকটা শয়তানি হাসি দিল। জেনি সোহেলের কার্বাড থেকে ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে সোহেলের হাত ব্যান্ডেজ করে দিল। সোহেল এক মনে ভেবেই যাচ্ছে,
  • সিস কি করতে চাইছে, আর কিসের প্লান এর কথাই বা বলল? সোহেল আবার খানিক বাদে জেনি কে বলল, সিস একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলি?
    জেনি মাথা নাড়িয়ে বলল,
  • হুম, বল “

সোহেল কিছুটা ভয়ার্ত চেহারা করে বলল,

  • সিস তুমি যা ই প্লান করো না কেন, একটু ভেবে চিন্তে করবে। তুমি তো ভাইয়া কে চিনও ভাইয়া কি ভয়ংকর রাগি? যদি কিছু টের পায় তো আমরা শেষ। জেনিও চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
  • হ্যাঁ, সোহেল আমি সে বিষয় মাথায় রেখেই কাজ করব। সিফাত কে আমিও বিষণ ভয় পাই যা রাগি ও, জেনি সোহেল কে আশ্বাস দিল সে কোনো কাঁচা কাজ করবে না। সোহেল শান্তনা ফেলেও ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় পাচ্ছে, সিফাত খুব চতুর তাকে ফাঁকি দেওয়া অতোসোজা না।

জেনি সোহেলের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে বলল,

  • ব্রো তুই ঘুমিয় পর, ভোর হতে বেশি সময় বাকি নেই। সকালে কথা হবে, এতো ভাবিস না অনিতা তরই হবে। বলেই জেনি সোহেলের রুম ত্যাগ করল।

জেনি রুমে এসে ভাবছে,

  • এই মেয়েটা কে তো আমার রাস্তা থেকে সরাতে হবে, এট এনি হাউ, এনি কস্ট।

সোহেল টা ও খুব বোকা তার গার্লফ্রেন্ড গুলোই তো ভাল ছিল, কেন যে এই মোয়েকে ভালবাসতে গেল? এই বাঙ্গালী মেয়ের মধ্যে এরা দুই ভাই কি এমন দেখলো যে, দুই ভাই পাগল দেওয়ানা হয়ে গেল? উফ গড ই ভাল জানেন।

সিফাতের কোনো মেয়েকেই তার ভাল লাগত না তাই সে পাত্তাই দিত না, তিনি এখন অনিতার প্রেমে মজনু হয়ে গেছেন। আর উপর জন ডজন খানেক গার্লফ্রেন্ড রেখে এই অনিতার নেশা পেয়েছে। এই দু ভাই কি পেয়েছে কি এই বাঙ্গালী মেয়ের মাঝে, যা এই দেশের মেয়েদের মধ্যে নেই? জাস্ট অসহ্য! আবার পলাশও চায় অনিতা কে, কি অসহ্য। পৃথিবীর সব মেয়ে কি মরে গেছে নাকি, যার জন্য এক জন কে নিয়ে তিনজন টানা হেঁচড়া শুরু করছে? সব দোষ এই মেয়ের ওঁকে আমি দেখে নিব, জেনি তীব্র রাগে ফেটে পরছে যেন।

মিসেস ইসাবেলা সিফাত কে বলছেন,

  • কি হচ্ছে সিফাত নাস্তা করছো না কেন? সিফাত অপ্রস্তুত কন্ঠে বলল,
  • হ্যাঁ, মম নাস্তা করছি।

মিসেস ইসাবেলা বুঝতে পারলেন ছেলের অপ্রস্তুত ভাব, আর সাথে এ ও বুঝলেন সিফাত কেন নাস্তা করছে না। তাই তিনি উচ্চ আওয়াজে ডাক দিলেন,

  • মামনি তুমি কই, তোমার হলো নাস্তা কখন করবে? তাড়াতাড়ি নিচে আসো তো ওয়েট করছি।

সিফাত লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে মনে ভাবছে,

  • মম জানলেন কিভাবে আমি যে, আনি র জন্য ওয়েট করছি? আনি র মুখ না দেখে সকালে নাস্তা করতে ভাল লাগে না তাই ওয়েট করে আছি। আজ ঘুম থেকে উঠতে লেট করছে হয়ত কাল রাতে দেড়িতে ঘুমিয়েছে বলে? নাকি আনি কাল রাতের ঘটনার জন্য লজ্জায় আসতে পারছে না আমার সামনে? বলা যায় না উনার তো আবার অনেক লজ্জা, লজ্জাবতী লতা। এর মাঝেই জেনির কন্ঠ শুনা গেল,
  • হেই, গুড মর্নিং এভরি বডি। বলেই জেনি সিফাতের পাশে একটা কালি চেয়ারে বসল।

অনিতা তাড়াহুড়া করে নিচে আসল এসেই বলল,

  • আই এম সরি মামিমা, ঘুম থেকে উঠতে লেট হয়ে গেছে। অনিতা মিথ্যা বলেছে কারণ সে কাল রাতের কথা মনে করেই লজ্জায় আসতে চাইছিল না সিফাতের সামনে। এখনও লজ্জায় সিফাতের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না সে।

সোহেল বলল,

  • ঠিক আছে অনিতা এখন নাস্তা করতে বসো। তোমার জন্য ওয়েট করে আছি সেই কখন থেকে। সোহেল ডাহা মিথ্যা বলছে, অনিতার এটেনশন পাওয়ার জন্য। অনিতা আসার আগে সোহেল কয়েক পদের নাস্তা করে নিয়েছে। সোহেলের এই ডাহা মিথ্যা কথা শুনে সিফাতের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগ নিয়ে সে নিচের দিকে চেয়ে আছে, সে চায় না কোনো সিনক্রিয়েট করতে।

অনিতা সোহেলের দিকে চেয়ে ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে নম্র হেসে বলল,

  • সরি, সোহেল ভাইয়া এখন খাওয়া শুরু করুন। অনিতা সিফাতের অপোজিট চেয়ারে বসল, এখনও সে তাকাতে পারছে না সিফাতের দিকে।

সবাই যে যার মতো খাচ্ছ, অনিতা মুখ তুলে দেখল সিফাত একমনেই খেয়ে চলছে।

তার দিকে চোখ তুলেও তাকালো না, এতে অনিতার মনক্ষুন্ন হলো। সিফাতের পাশে জেনি কে বসা দেখে অনিতার রাগ হলো জেনির উপর। অনিতা মনে মনে বলল,

  • এই মেয়ের দেখি ল্জ্জা শরমের কোনো বালাই নাই, কিভাবে গা গেষে বসে আছে উনার পাশে।

জেনি সিফাত কে বলে উঠল,

  • কি ব্যাপার সিফাত খাচ্ছ না কেন, এভাবে মুড অফ করে আছো কেন?

সিফাত জেনির দিকে না তাকিয়েই বলল,

  • আমার মুড ঠিক আছে জেনি, তুমি তোমার খাওয়াতে মন দাও আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। বলেই সিফাত নাস্তা করতে শুরু করল। আর জেনি চাপা রাগ নিয়ে বলে উঠল,
  • হোয়াট স ইউর প্রবলেম সিফাত, তুমি আমাকে সবার সামনে অপমান করছো কেন? আমি কি এমন বললাম যে তুমি এতো রিয়েক্ট করলে?

জনাব আলী মেহবুবও জেনির কথার সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,

  • সত্যিই তো সিফাত তুমি জেনির সাথে এরকম রুড বিহেভ করছো কেন? জেনি তো খারাফ কিছু বলছে না। সিফাত নম্র শব্দে বলল,
  • পাপা জেনির সাথে আমার রুড বিহেভ করার অনেক গুলো রিজন আছে, যা আমি তোমাদের কাউকে বলতে চাই না। একথা বলেই সিফাত অনিতার দিকে দৃষ্টি দিল, এবং সাথে সাথে দুজনের চোখা চোখি হলো।

অনিতা চোখা চোখি হতেই দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে নিল লজ্জায়। মিসেস ইসাবেলা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে, সিফাতের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,

  • জেনি কি করেছে সিফাত, আমাকে বলো?

সোহেল, জিসানও তাকিয়ে আছে সিফাতের দিকে। জেনি ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে চেয়ারে, যদি সিফাত সেদিনের ঘটনা বলে দেয় আন্টিকে। নিশ্চয়ই আন্টি কষিয়ে কয়েকটা চড় দিবেন আমার গালে, আন্টিরও সিফাতের মতো রাগ। জেনি ভয়ে চেয়ে রইল সিফাতের দিকে সিফাত কি বলে।

সিফাত তার মম কে বলল,

  • মম বাদ দাওতো ওসব, ও ছোট মানুষ তাই ভুল করে ফেলেছে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।

মিসেস ইসাবেলা গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

  • তদের নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিলেই ভালো। আর মনে মনে বললেন, এই জেনিকে আমি ছোট থেকেই চিনি ও কোন ধাঁচের মেয়ে। জেনি খুব হিংসুটে আর লোভী টাইপের। না জানি এখন আবার কি করে, ভালোই ভালোই কয়েক দিন থেকে চলে গেলেই বাঁচি।

জেনি যেন ভয়ংকর এক বিপদ থেকে রক্ষা পেলও।

তারমধ্যে অনিতা নাস্তা করে দাঁড়িয়ে পরল ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য। জনাব আলী মেহবুব অনিতাকে বললেন,

  • মামা আমার খাওয়া শেষ, ভার্সিটি যেতে লেট হয়ে যাচ্ছে। অনিতার মামা বললেন,
  • তুমি কি একাই যাবে ভার্সিটি?
  • হ্যাঁ, মামা আজ একাই যাবো। সিফাত অনিতার কথা মধ্যেই বলল,
  • আনি তোমার একা যেতে হবে না, জিসানের সাথে যাও। আমার একটা কাজ আছে তাই ড্রপ করে দিতে পারব না। অনিতা আর বাঁধা দিল না, সেও একা যেতে ভয় পায়। এখনও কানাডার অতো কিছু তার জানা নেই। সোহেল, জেনি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে শুধু। অনিতা, জিসান বিধায় নিয়ে বেড়িয়ে পরল।

সিফাতও বেড়িয়ে গেল তার অফিসের উদ্দেশ্য।

জিসান ধীর গতিতে ড্রাইব করছে। অনিতা কাল রাতের ঘটনা মনে করে লজ্জায় লাল হচ্ছে। এগুলো মনে হতেই তার শির ধারা দিয়ে এক শীতল শ্রোত বয়ে গেল। এরমাঝে জিসান বলে উঠল,

  • আপু তুমি জেনি সিস থেকে সাবধানে থেকও। জেনি সিস কিন্তু খুব একটা সুবিধার না।

অনিতা জিসানের দিকে ভ্রকুচকে বলল,

  • কেন জিসান, আমি জেনির কি করেছি?

জিসান হাল্কা হেসে বলল,

  • সময় হলে বুঝবে তুমি কি করেছ সিস এর! তবে ভাইয়া যতো দিন আছে সিস তোমার কিছুই করতে পারবে না।

জিসান কি বলতে চাইছে, অনিতা অল্প হলেও বুঝেছে। অনিতা চিন্তিত ভাবে বসে রইলো, জেনির কথা ভাবছে।

কিছু সময় বাদে তারা এসে পৌঁছালো ভার্সিটি। জিসান কে বাই জানিয়ে ভার্সিটির ভেতর চলে এলো অনিতা।

অনিতা ভার্সিটি এসে চার্লস, চার্লি কে খুঁজ ছে। অবশেষে ওরা দুজন কে খুঁজে পেল অনিতা। চার্লি অনিতা কে দেখেই দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো, আর বলল,

  • আনিটা কেমন আছো? অনিতা হেসে বলল,
  • হুম, ভালো আছি চার্লি। তুমি কেমন আছো? চার্লি অনিতা কে ছেড়ে দিয়ে বলল,
  • আমিও ভালো আছি ডিয়ার, চার্লস অনিতার দিকে হাত বারিয়ে দিয়ে বলল,
  • হোয়াট স আপ আনিটা?

অনিতাও হ্যান্ডশেক করে বলল,

  • ফাইন, এন্ড ইউ?

চার্লস একটু হেসে বলল,

  • ফাইন।

তারপর তারা ক্লাসের দিকে চলল।

অনিতা যখনি ক্লাস রুমে ঢুকতে যাবে তখনি একটা পরিচিত কন্ঠ শুনে থমকে গেল, পেছন থেকে কেউ ডাকদিল,

  • হেই, দাঁড়াও!

অনিতার মুখ বির্বণ হয়ে গেছে ভয়ে। তার পা অল্প কাঁপছে। অনিতা তাকানোয় চার্লস, চার্লিও তাকালো সে দিকে,


পার্ট :১৭

অনিতার মুখ বির্বণ হয়ে গেছে ভয়ে। তার পা অল্প কাঁপছে। অনিতা তাকানোয় চার্লস, চার্লিও তাকালো সে দিকে

অনিতা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,

  • পলাশ ভাইয়া আপনি এখানে?

পলাশ হাল্কা হেসে উত্তর দিলো,

  • তোমাকে দেখতে মন চাইছিল অনিতা, তাই চলে এলাম। খুশি হওনি?

অনিতা নিজেকে সামলে একটু কঠিন গলায় বলে উঠল,

  • জি না পলাশ ভাইয়া আমি খুশি হতে পারিনি। আপনি যদি আমার বাসায় দেখা করার জন্য যেতেন তাহলে খুশি হতাম।

অনিতার এমন খরা কথা শুনে পলাশ লজ্জা পেলও। পলাশ নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে এমন বোকামি করার জন্য। এরকম না করলে ও পারতাম, অনিতা যে কি ভাবছে আমাকে?

পলাশ কিছু সময় পর নিজেকে সামলে নিয়ে অনিতা কে বলল,

  • আসলে অনিতা আমি এইদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোমাকে দেখে যাই।

অনিতা বুঝতে পারছে পলাশ অপ্রস্তুত বোধ করছে। তাই সে বলল,

  • ইট স ওকে পলাশ ভাইয়া, একদিন বাসায় যাইয়েন বসে গল্প করবনে। এখন আমার ক্লাস টাইম, আমি ক্লাসে গেলাম। বলেই অনিতা চার্লি আর চার্লস কে নিয়ে চলে গেলও। পলাশ বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ অনিতার ভার্সিটিতে আসার মূল কারণ হলো, অনিতা কে বিয়ের কথা বলা। মিসেস ইসাবেলা পলাশের মা কে ফোনে না করে দিয়েছেন, অনিতা কে পলাশের সাথে বিয়ে দেবেন না। অনিতা কে সিফাত পছন্দ করে। এ কথা শুনে পলাশ জানতে চেয়ে ছিল অনিতাও কি সিফাত কে পছন্দ করে। তাই সে কথাই এখন বলতে চেয়ে ছিল। পলাশ ভয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করার জোঁ পায়নি, অনিতা যে রিয়েক্ট করলো ভার্সিটি আসায়। বিয়ের কথা শুনলে তো পুরাই ধুয়ে দিবে। পলাশ চলে এলো। আর বললো,
  • অনিতা আমার নই, সে সিফাত মেহবুবের হবে। অনিতা এমন এক প্রকৃতির মেয়ে যে কেউই ওর প্রেমে পরে যাবে। সবার সাথে তার অমায়িক ব্যবহার, নম্র, ভদ্র। কথাবার্তার মাঝে কোনো অহংকারের লেশমাত্র নেই, এমন মেয়েতো প্রত্যেক ছেলেই আশা করে। আমিও করে ছিলাম, কিন্তু সে তে আমার হবে না। অনিতা যার কাছে ভালো থাকবে তার কাছেই থাক। সিফাতের কাছে যে, ভালো থাকবে তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। সিফাত রাগি হলেও মনটা সচ্ছ কাচের মতো পরিষ্কার।

চার্লস ক্লাসে এসে অনিতা কে জিজ্ঞেস করল,

  • আনিটা ছেলে টা কে?

অনিতা আপন মনে বলল,

  • আমার মামাতো ভাইয়ের বন্ধু। এরমধ্যে চার্লি বলে উঠল,
  • আনিটা ছেলেটা খুব সুন্দর, খুব স্মার্ট ও বটে।

অনিতা মৃদু হেসে বলল,

  • কি ব্যাপার চার্লি প্রেমে পরে গেলে নাকি? লক্ষ্য করলাম, মূহুর্তেই চার্লির ফর্সা মুখকানা লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করল। তাই চার্লি কে আরেকটু লজ্জা দেওয়ার জন্য বললাম, তাহলে তুমি পলাশ ভাইয়ার প্রেমে পরেই গেছ। আমার কথা শুনে চার্লি কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
  • আরে না আনিটা তেমন কিছু না। তুমি বেশি বেশি ভাবছো।

চার্লস সন্দেহ গলায় বলল,

  • আনিটা ওই পলাশ এমনি এমনি তোমার সাথে ভার্সিটিতে দেখা করতে আসেনি।

চার্লস এর কথায় আমি অবাক হলাম, চার্লস এর দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালাম,

  • চার্লস খুব আত্মবিশ্বাস এর সহিত বলল, হ্যাঁ আনিটা পলাশ কিছু একটা তোমায় বলতে চেয়েছিল। ওর মুখ দেখে আমার এরকমই মনে হলো। আমি কিছু বলার আগেই চার্লি বলে উঠল,
  • তুই কিভাবে এতো আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলছিস চার্লস যে, উনি আনিটা কে কিছু বলতে এখানে এসেছিলেন?
    চার্লস চার্লি কে বলল,
  • তুই তো জানিস চার্লি আমি মানুষের চোখ, মুখ দেখে অনেক কিছু আন্দাজ করে বলতে পারি। পলাশের চোখে মুখে কিছু একটা বলতে না পারার অস্থিরতা কাজ করছিল, সেটা আমার চোখ এড়ায়নি। চার্লি আর কোনো প্রশ্ন করলো না, চার্লস যে এ ব্যাপারে খুব পটু তার জানা আছে।

আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে তাদের কথাবার্তা শুনছি, পলাশ ভাইয়া কি বলতে এসেছিলেন? না বলে চলেই বা গেলেন কেন? প্রশ্ন গুলো মনে মনে ঘুরপাক করছে। সত্যিই কি উনি কিছু বলতে এসেছিলেন?

ক্লাসে এ নিয়ে আর কোনো কথা হলো না আমাদের কারো মধ্যে। ক্লাস শেষে বের হবো তখনি চার্লি বায়না করে সে বাইরে খাবে আজ। আমি অনেক বার না করলাম যাবো না, ভয় পাচ্ছি যদি সিফাত ভাইয়া জানতে পারেন। তাহলে নিশ্চয়ই রক্ষা পাবনা উনার শাস্তি থেকে? চার্লস, চার্লির জন্য যেতেই হলো ওদের সাথে। চার্লস গাড়ি নিয়ে এসেছে, ওর গাড়ি দিয়েই রেস্টুরেন্টে গেলাম।

রেস্টুরেন্টে ঢুকে অবাক হলাম, রেস্টুরেন্ট টা অনেক সুন্দর ভাবে সাঁজানো। ভেতরে গেলাম ভেতর টা আরো পরিপাটি, আমরা তিনজন একটা গোল রাউন্ড টেবিলে বসলাম। চার্লি আমাকে জিজ্ঞেস করল,

  • আনিটা তুমি কি খাবে?

ভাবছি কি অর্ডার করা যায়? বেশি কিছু খেতে পারব না লেট হয়ে যাবে তাই একটা কুল কফি বললাম। চার্লস বলল,

  • জাস্ট কফি কেন আনিটা? অন্য কিছু অর্ডার করো। হাল্কা হেসে চার্লস কে বললাম,
  • না, অন্য কিছু খাবনা। কফি হলেই চলবে।

ওরা ভাই – বোন অনেক খাবার অর্ডার করলো, খানিক বাদে ওয়েটার খাবার গুলো সার্ভ করে চলে গেল। কফিতে চুমুক দিতেই আমার মন ভরে গেল, কফিটা অসাধারণ হয়েছে। কফি খাচ্ছি আর আমার সাইডের কাচের জানালা দিয়ে বাহিরের মানুষ জন দেখছি। চার্লস, চার্লি তারা একমনে খেয়েই যাচ্ছে। তাদের কোনো দিকে যেন তাকানোর টাইম নাই, ওরা দু জনই খাদক টাইপের লোক। খাবার ফেলে আর কোনে হুঁশ থাকে না যেন তাদের।

কানাডার শহর টা সত্যিই খুব সুন্দর, সব কিছু কেমন যেন গোছালো। এদেশের মানুষের চিন্তা ভাবনা অনেক উন্নত, তাই তো তাদের জীবন ধারাও অন্যরকম।

কখন যে কফি শেষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারলাম না।

মনে মনে বললাম,

  • এখানে আবার আসব কফি খাওয়ার জন্য। কফির স্বাদটা ভুলবার মতো নয়।

চার্লস, চার্লির খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, তাই তাদের তাগাদা দিলাম বাসায় যাওয়ার জন্য। রেস্টুরেন্ট থেকে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়িতে বসে ভাবছ,

  • বজ্জাত টা যদি জেনে যায় আমি এখানে এসেছি, না, না কিভাবে জানবেন আমি বললে তবেই না জানবেন? আর আমি তো এই কথা ঘুর্নাক্ষড়েও বলব না। দূর আমি বেশিই ভাবছি অযতা।

সিফাত অফিসে জরুরি কাজ করছে, এরমাঝে ফোনে মেসেজ এর টুংটাং শব্দে তার কাজের মনোযোগ ভাঙ্গল। অনেক কানি বিরক্তি ভাব নিয়ে দেখলো, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আনন নাউন নাম্বারে কে একটা ফটো পাঠিয়েছে।

সিফাত কোনো চিন্তা ভাবনা ছাড়াই ফটো ওপেন করল। ফটো দেখেই সিফাত চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, রাগে সিফাতের শরীর গরম হয়ে গেছে। এসির নিচে থেকেও গামছে প্রচন্ড রাগে। রাগে তার কপালের শিরা গুলো ধপধপ করে ফোলে উঠছে।

সিফাত হাত মুষ্টি করে দেওয়ালে কয়েকটা ঘুষি মারল, এতেও যেন রাগ কমছে না। তার সবুজ চোখদ্বয় অতিমাত্রায় লাল বর্ণ হয়ে গেছে। সে কাজ ফেলে রেখে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো।

বিকাল ৫:৩০ দিকে অনিতা বাড়ি ফিরলো। মিসেস ইসাবেলা এতো লেট করে ফিরার কারণ জানতে চাইলেন।

অনিতা শান্ত ভঙ্গিতে তার লেট হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করল। মিসেস ইসাবেলা মিষ্টি হেসে অনিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

  • আচ্ছা মামনি যাও ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে নাও।

আমিও আর কিছু না বলে ফ্রেশ হওয়ার জন্য আমার রুমের দিকে চললাম।

মিসেস ইসাবেলা আর জনাব আলী মেহবুব উনাদের রুমে বসে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখনি দরজার অপর পাশে কেউ নখ করলো রুমে আসার জন্য।
মিসেস ইসাবেলা বললেন,

  • কে, ভেতরে আসো।

অনুমতি পেয়ে সোহেল আর জেনি রুমে প্রবেশ করল। সোহেল আর জেনি কে এক সঙ্গে দেখে মিসেস ইসাবেলা কিছুর আবাস ফেলেন যেন। তারপরও তিনি মুখ সাবাভিক রেখেই বললেন,

  • কি ব্যাপার সোহেল, জেনি? কিছু বলবে?

সোহেল, জেনি দুজনেই ভয় পাচ্ছে, কি ভাবে কথাটা শুরু করবে তারা ভেবে কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না।

জনাব আলী মেহবুব দুজনের এমন অবস্থা দেখে বলে উঠলেন,

  • তোমরা এতো অপ্রস্তুত বোধ করছো কেন? কি বলতে চাও নির্ধায় বলো।

সোহেল জেনিকে ইশারায় বলল,

  • সিস বলা শুরু করো। জেনি তাও বলছে না ভয় করছে তার। সে সোহেল কে ইশারার মাধ্যমে বলল,
  • তুই বল ব্রো, আমার ভয় করছে।

মিসেস ইসাবেলা এবার একটু রাগের সুরেই বললেন,

  • তোমরা কি এভাবে ইশারায় ই কথা বলবে, নাকি স্পষ্ট করে বলবে কি বলতে চাও?

এর মধ্যে শুনা গেলও তীব্র আওয়াজে কে যেন বাহিরের কলিং বেল চাপছে। নন স্টপলি কলিং বেল চেপেই চলছে, পারলে যেন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যাবে এমন লাগছে। মিসেস ইসাবেলার কাছে ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর তাই তিনি কপাল কুচকে রইলেন।


পার্ট : ১৮

নন স্টপলি কলিং বেল চেপেই চলছে, পারলে যেন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যাবে এমন লাগছে। মিসেস ইসাবেলার কাছে ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর তাই তিনি কপাল কুচকে রইলেন।

খানিক বাদে বাসার কাজের লোক দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই সিফাত ঝাঁজালো গলায় কাজের লোককে বলল,

  • দরজা খুলতে এতো সময় লাগে কেন, কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। কাজের লোকটা সিফাতের এমন রাগ দেখে আমতা আমতা করে বলল,
  • কিচেনে কাজে ব্যস্ত ছিলাম স্যার, শুনতে পাইনি।

সিফাত খরা কন্ঠে শাসিয়ে গেল নেক্সট টাইম যেন আর এরকম না হয়।

সিফাত ভয়ানক রাগ নিয়ে উপরের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। কাজের লোক এখনও সিফাতে যাওয়ার পথে চেয়ে আছে, আর নিজ মনেই বলল,

  • আজ সিফাত স্যার ভয়ানক রকম কেঁপে আছেন, না জানি এই ঝড় কার উপর দিয়ে যাবে?

কলিং বাজা বন্ধ হতেই জনাব আলী মেহবুব বললেন,

  • বলো জেনি কি বলতে চেয়েছিলে তোমরা?

জেনিই প্রথমে বলল,

  • আংকেল সোহেল একজন কে ভালবাসে। মিসেস ইসাবেলা একটু বিরক্তিকর ভাবে বলে উঠলেন,
  • এ আর নতুন কি জেনি? সোহেলের তো অনেক গার্লফ্রেন্ড থাকে এক সাথে, তা আমাদের কারো অজানা নয়! সোহেল থতমত গলায় বলল,
  • না, মম এবার আমি সত্যি সত্যি ভালবেসেছি ওকে।

সোহেলের মম- পাপা বললেন, তাহলে একদিন মেয়েটা বাসায় নিয়ে আসিস।

এরমধ্যেই জেনি আগবাড়িয়ে বলে উঠল,

  • মেয়েটি আর কেউ নয় আ

জেনির কথা অসম্পূর্ণ থেকে গেলে, সিফাত চিৎকার দিয়ে অনিতা কে ডাকছে।

সিফাতের এমন হুটহাট চিৎকারে মিসেস ইসাবেলা আর জনাব আলী মেহবুব ঝড়ের গতিতে রুমের বাহিরে এলেন। সোহেল, জেনি শয়তানি হাসি দিল একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে।

সিফাত অনিতার দরজায় জোরে জোরে করাঘাত করছে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা।

সিফাত কে অনিতার দরজায় দেখে মিসেস ইসাবেলা ভয় পেয়ে গেলেন, নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটবে আজ সিফাত ভয়ংকর ভাবে রেগে আছে।

জনাব আলী মেহবুব সিফাতের কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

  • কি হয়েছে সিফাত, তোমাকে এতো হাইপার দেখাচ্ছে কেন? সিফাত তার পাপার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে, আবার অনিতা কে ডাক দিল।

অনিতা ওয়াশরুমে থাকায় সিফাতের ডাক শুনতে পায়নি, যখন বের হলো তখন শুনতে পেলও সিফাতের গলা।

সিফাত ভাইয়ার গলা শুনে ভয়ে কয়েকটা শুকনো ঢুক গিললাম, না জানি আবার কি করে বসেন?

শুনতে পেলাম সিফাত ভাইয়া ডাকছেন আমার নাম ধরে। উনার কন্ঠে ছিল তীব্র রাগ। দরজা খুলার সাহস পাচ্ছি না। মামা- মামিমার কন্ঠও কানে আসলো সাথে। ভাবছি উনি কি জেনে গেলেন আমার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কথা? ভয়ে আমার হৃৎপিণ্ড ট্রেনের গতিতে ছুটছে। যেন এখনি ধম আঁটকে শ্বাস রূদ্ধ হয়ে মারা যাবো।

ওপাশ থেকে দরজা খুলার জন্য উনি আবার ডাক দিলেন। প্রচন্ড ভয় নিয়ে দরজা খুলার জন পা এগিয়ে গেলাম, ভয়ে পা যেন জমে গেছে। হাঁটার শক্তি পাচ্ছি না, পায়ের মধ্যে কাঁপন ধরে গেছে।

দরজার কাছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলে দিলাম। দরজা খুলতেই সিফাত ভাইয়া হাওয়ার গতিতে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। উনার এভাবে দরজা বন্ধ করায় আমি বিষণ ভয় পেয়ে গেলাম। দরজা বন্ধ করে উনি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন, আমি তো উনার চোখ দেখেই ভয়ে থরথর করে কাঁপছি।

উনি কিছু না বলেই আমাকে হ্যাচকা টান দিয়ে উনার বুকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলেন, যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাব। আমার সদ্য শাওয়ারের পানিতে বিজানো চুলে অজস্র চুমু খেয়ে চলছেন।

উনার স্পর্শে আমি কেঁপে উঠছি, উনার পরনের স্যুট এক হাত দিয়ে আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সিফাত ভাইয়ার এমন কান্ডের মানে কিছুই বুঝলাম না, আমি উনার স্পর্শ গুলো শুধু অনুভব করছি।

দরজার বাহিরে মামিমা করুন কন্ঠে সিফাত ভাইয়া কে বললেন,

  • সিফাত বাবা প্লিজ মামনি কে কোনো শাস্তি দিয়না।

কি হয়েছে আমাদের কাছে বললেও না।

জনাব আলী মেহবুব ও সিফাত কে দরজা খুলার জন্য রিকোয়েস্ট করছেন, কিন্তু সিফাতের কোনো ভাবান্তর নেই এতে। সোহেল, জেনিও সেখানে উপস্থিত হলো। সোহেল, জেনিকে ফিসফিসিয়ে বলল,

  • সিস তোমার প্ল্যান কাজ করছে বোধ হয়, ভাইয়া যা রেগে গেছে। আজ তো অনিতার রক্ষা নেই ভাইয়ার হাত থেকে।

জেনিও বিশ্ব জয় করার মতো হাসি দিয়ে বলল,

  • আগে আগে দেখো ইয়ার কিয়া হ তা হে।

হঠাৎ করেই সিফাত ভাইয়া উনার বুক থেকে ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরিয়ে দিলেন।

আমি ঠাল সামলাতে না পেরে কিছু দূর ছিটকে পরলাম। ঘুরে উনার দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালাম,

  • উনি রাগে হুংকার ছেড়ে বলে উঠলেন,
  • তোমার সাহস কি করে হয় আনি পলাশের সাথে ভার্সিটিতে যেয়ে কথা বলার? শুধু পলাশ ই নয় আরো একটি ছেলেও ছিল তোমার পাশে। পলাশ কেন ভার্সিটি গিয়েছিল আনি? আনসার মি!

উনার প্রশ্ন শুনে আমি হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলাম, উনি কি করে জানলেন পলাশ ভাইয়া ভার্সিটি গিয়েছিলেন?

উনি এখন যে হিংস্র বাঘের মতো কেঁপে আছেন, কিছু বললেও কাজ হবে না।

সিফাত ভাইয়া আবার আমার কাছে এসে আমার দুই বাহু শক্ত করে ধরে চেঁচিয়ে বললেন,

  • আনি তুমি বুঝনা কেন, তোমাকে কারো সাথে দেখলে আমার রক্ত গরম হয়ে যায়। আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, মনে হয় এই বুঝি তোমাকে হারিয়ে ফেললাম। রাগে উনার সবুজ চোখদ্বয় ঝলঝল করছে, যেন এখনি আমাকে ভস্ম করে দিবেন উনার সবুজ রংয়ের চোখ দিয়ে।

আমি চুপ করে আছি দেখে উনি আমার বাহু ঝাঁকি দিয়ে বলে উঠলেন,

  • কথা বলছো না কেন? পলাশ কেন গিয়ে ছিল ভার্সিটি, তোমার সাথে দেখা করতে?

উনার উন্মাদের মতো আচরণ দেখে আমার গলা প্রায় শুকিয়ে গেছে, কালি গলায় একটা ঢুক গিললাম। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,

  • পলাশ ভাইয়া কেন গিয়ে ছিলেন তা সঠিক জানি না, তবে আমি জিজ্ঞেস করে ছিলাম আমার ভার্সিটি আসার কারণ কি? উনি বললেন এই দিকে নাকি একটা কাজে যাচ্ছিলেন, তাই আমাকে ও দেখতে এলেন।

সিফাত ভাইয়ার রাগ কিছু নিভেছে মনে হলো, উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,

  • আর কি কিছু বলেছে পলাশ?

আমি মাথা নাড়িয়ে না, বললাম। উনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

  • তোমার পাশে যে আরেক টা ছেলে ছিল, ব্রাউন কালার চোখ, চুলটা ও ব্রাউন কালার ও কে?

তাৎক্ষণিক ভাবে উত্তর দিলাম,

  • ও চার্লস, আমার নিউ ফ্রেন্ড। আর ওর বোন চার্লি। তারা দু জনই খুব ভালো আর মিশুক।

সিফাত ভাইয়া রক্তচুক্ষু করে রাগি কন্ঠে বললেন,

  • তোমাকে কতবার না করেছি কোনো ছেলে ফ্রেন্ড বানাবা না? মনে আছে এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে বাংলাদেশে প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হয়ে ছিল?
    আর আমি কানাডা ফিরে আসি।

উনার কথায় আমার অতীতে ডুব দিলাম।

বাংলাদেশে আমার এক ফ্রেন্ড ছিল নাম রনক। ছোট থেকেই ওর সাথে বড় হয়েছি, লেখাপড়াও এক সাথেই করতাম। সিফাত ভাইয়ারা যখন বাংলাদেশে যান তখন রনক একটা কাজে আমাদের বাসায় গিয়েছিল। রনক কে মামা- মামিমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আদুল ভাইয়ার সাথেও পরিচিত হলো রনক। সিফাত ভাইয়া আর রনক এক সঙ্গে বসে অনেক্ষণ গল্প করলেন। এর ঘন্টা খানিক পর রনক আমাদের বাসা থেকে চলে গেল।

সন্ধ্যার পরে আমি পড়তে বসেছি, এ সময় উনি আমার রুমে ঢুকে কোনো ভাব ভঙ্গি ছাড়াই বলে উঠলেন,

  • আনি তুমি আর রনক এর সাথে মিশবে না।

আমি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেন মিশব না? উনি সোজা উত্তর দিলেন,

  • রনক তোমাকে ভালবাসে, শুধু বলতে পারছে না।

একটু রাগি ভাবে বললাম,

  • না, সিফাত ভাইয়া আপনি যে ভাবে ভাবছেন ওরকম কিছু না ও আমার ভালো ফ্রেন্ড। দ্যাট স ইট

উনি মূহুর্তেই রেগেমেগে আমার হাত চেপে ধরে বললেন,

  • আমি যা বলেছি তা চিন্তা ভাবনা করেই বলেছি। তুমি রনক এর সাথে মিশবে না এটাই ফাইনাল।

সেদিন আমিও রাগের বসবর্তী হয়ে উনাকে অনেক কথা শুনিয়ে দিয়ে ছিলাম। যা সিফাত ভাইয়া মানতে না পেরে সবাই কে দেশে রেখে উনি কানাডা ফিরে এসেছিলেন।

তার কয়েকদিন পরই রনক আমায় প্রপোজ করে বসে, তখন বুঝি আমি ভুল ছিলাম আর সিফাত ভাইয়া সঠিক। মনে মনে সিফাত ভাইয়া কে সরি ও বলি। উনি হয়তো রনক এর হাবভাব বুঝে ছিলেন।

রনক কে না করে দিয়ে ছিলাম। তাও সে অনেক জামেলা করে।

হাতে টান পরায় আমার অতীতের ভাবনা কেটে গেল, চেয়ে দেখি সিফাত ভাইয়া আমার হাত ধরে আছেন। আমি তাকাতেই উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে আমার কোমড় জরিয়ে ধরলেন, আমি আবার কেঁপে উঠলাম। একদম উনার বুকের কাছে নিয়ে গেলেন আমাকে, উনার হার্টের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সিফাত ভাইয়া এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আমার দিকে।
সিফাত অনিতার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

  • সরি, মায়াকুমারী তোমাকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি রাগের মাথায়। তোমাকে দেখলে আমার রাগ চলে যায়, খুব স্নিন্ধ লাগছে তোমাকে। ইচ্ছে করছে আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখি তোমায়। আমি জানি জান পাখি তুমি এসবের কিছুই জানোনা, তোমাকে যে বা যারা ফাঁসাতে চেয়েছিল তাদের আমি ছেড়ে দিবনা। তারা চেয়েছিল আমি তোমায় ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিব, কিন্তু তারা তো জানে না আমি আমার মায়াকুমারী কে কত টা জানি। এতো নোংরা কার কাজ হতে পারে আমি ভালো ভাবেই জানি, তার শাস্তি তো ওদের পেতেই হবে। লক্ষ্য করলাম উনার চোখে মুখে এখন আর আগের মতো রাগ নেই, উনার চোখে কি একটা যেন আছে আমায় খুব টানছে। আমার অজানতেই উনার গালে আমার হাত রাখলাম, উনি উনার একটা হাত আমার হাতের উপর রাখলেন।

তারপর নেশা লাগানো কন্ঠে বললেন,

  • আমায় ভালোবাস আনি!

পার্ট : ১৯

আমার অজানতেই উনার গালে আমার হাত রাখলাম, উনি উনার একটা হাত আমার হাতের উপর রাখলেন। তারপর নেশা লাগানো কন্ঠে বললেন,

  • আমায় ভালোবাস আনি!

উনার এমন প্রশ্নে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম, আমি কল্পনাও করিনি উনি এখন এই প্রশ্ন করবেন।

ভেবে পাচ্ছি না কি বলব? উনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম।

সিফাত ভাইয়া আবার মাদক মিশানো গলায় বলে উঠলেন,

  • কি আনি! আমায় ভালবাস না? তাকাও আমার দিকে।

আমি অনেককানি জড়তা নিয়ে, লজ্জা মাখা চোখে তাকালাম উনার দিকে।

উনি আরো মোলায়েম সুরে বললেন,

  • আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো আনি আমাকে ভালবাস কি না?

আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, ঝাঁপিয়ে পড়লাম উনার সু দীর্ঘ, প্রস্তত বুকে। উনিও উনার বাহুদ্বারা আমাকে শক্ত করে আবদ্ধ করে নিলেন।

তারপর হাল্কা হেসে উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এরকম ঝাঁপিয়ে পরার কারণ কি?

সিফাত ভাইয়ার বুকে মুখ গুজে লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বললাম,

  • আমি আপনার এই বুকের অধিকার কাউকে দিতে পারব না, এই বুকের মধ্যে আমি এক অনাবিল শান্তি খুজেঁ পাই যা আর কোথাও পাব না। আপনার সবুজ চোখের চাহনির সুন্দরর্য আমি আর কোনো মেয়ের সাথে ভাগ করতে পারব না। আর রইল আপনার ওই গোলাপি ঠোঁটের মুচকি হাসি, এই হাসিতে হাজার মেয়ে পাগল হবে। কিন্তু আমি চাই আপনার এই পাগল করা হাসিটা শুধু আমার জন্য হোক।

সিফাত ভাইয়া আমার বলা কথা গুলো শুনে মজা করার জন্য বললেন,

  • তা আনি তুমি তো দেকি আমার সব সুন্দরর্য একদম নিখুঁত ভাবে গিলে খেয়েছ? কখন থেকে এইসব গিলে খাওয়া শুরু করলে বলো তো?

উনার প্রশ্নে সত্যিই আমি লজ্জা পেলাম, নিজের উপরই রাগ হচ্ছে কেন যে আবেগি হয়ে কথা গুলো বলে দিলাম? না বললে তো উনি জানতেও পারতেন না, দূর লজ্জায় এখন তাকাতেও পারছি না উনার দিকে। আবেগের ঠেলায় সব বলে দিলাম এখন তো বজ্জাতটা আমাকে প্রতি পদে পদে লজ্জা দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকবে।

আমার এইসব আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনার মাঝে সিফাত ভাইয়া বলে উঠলেন,

  • এই যে মহারাণী আমাকে কি মেরে ফেলবেন নাকি? যেভাবে ধরে আছেন তাতে তো ধম আঁটকে আমার প্রাণ পাখি উড়াল দিবে। ছাড়ো আর লজ্জা পেতে হবে না, আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি।

আমি লজ্জায় নতজানু হয়ে গেলাম উনার কথা শুনে, ধীরে ধীরে উনাকে ছেড়ে একটু দূরে এসে মাথা নিচের দিকে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম। পৃথিবীর সব লজ্জা যেন আমাকে ঝেঁকে বসেছে।

সিফাত ভাইয়া আমাকে মিষ্টি কন্ঠে বললেন,

  • আনি তোমার হাত টা কি ধরতে পারি।

আমার কাছে মনে হলো উনার এই কথার মধ্যে মাদক মিশানো ছিল যা আমাকে পাগল করে দেয়, আমার কাঁপা কাঁপা হাত বারিয়ে দিলাম উনার দিকে। আমার এই কাঁপা কাঁপি দেখে উনি এক ঝটকায় আমার হাত উনার হাতে পুরে নিলেন। তারপর আলতো ভাবে আমার হাতের উপর পৃষ্ঠায় একটা চুমু এঁকে দিলেন। আমি আমার সভাব মতোই কেঁপে উঠলাম।

আমার কেঁপে উঠা দেখে উনি হাসলেন, খানিক বাদেই গম্ভীর মুখ করে বললেন,

  • তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো আনি?

আমি কিছু টা অবাক হলাম হঠাৎ উনার এমন প্রশ্নে! উনি কেন এই প্রশ্ন করলেন বুঝতে পারছি না।

সিফাত ভাইয়া মুখ গম্ভীর রেখেই বললেন,

  • কি ব্যাপার আনি উত্তর দিচ্ছ না কেন?

মনে মনে ভাবছি আজ উনার কি হয়েছে উনি এরকম উল্টা পাল্টা কথা বলে আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছেন কেন? উনার আজব আজব কথায় তো আমার রীতিমতো ভয় করছে, একটু অপ্রস্তুত গলায় বললাম,

  • হ্যাঁ, বিশ্বাস করি তো।

সিফাত ভাইয়ার গম্ভীর করা মুখকানা নিমিষেই উবে গেল, সেই মুখে ফুটে উঠল এক টুকরা তৃপ্তির হাসি। উনি হাসি হাসি মুখ রেখেই আমার দিকে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,

  • তাহলে আনি আমি যা বলব তা মানতে নিশ্চয়ই তোমার কোনো আপত্তি থাকবে না।

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। সিফাত ভাইয়া আমার আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ালেন, তারপর মৃদু কন্ঠে বললেন,

  • আমি যা করবো এখন সেটা আমার আর তোমার ভালোর জন্যই করব। তুমি শুধু আমার পাশে থাকবে কথা দাও আনি?

জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালাম উনার দিকে, উনি কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি না।

আমার তাকানো উনি বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বললেন,

  • আমি তোমার কোনো প্রশ্নের এখন কোনো উত্তর দিতে পারব না, তবে কিছু মানুষের নোংরা কাজের মোক্ষম জবাব দেবও আজকে। আমার সাথে রুমের বাহিরে আসো, বলেই উনি আমার হাত ধরে বাহিরে যাওয়ার জন্য দরজা খুললেন।

এক অজানা ভয় আমাকে গ্রাস করছে, সিফাত ভাইয়ার কি হয়েছে, উনি কার নোংরা কাজের জবাব দিতে চাইছেন? আমার মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে, ভয়ে মুখ রক্ত শূন্য হয়ে গেল।
আমি আর সিফাত ভাইয়া যখন বাহিরে আসলাম তখন মামিমা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর ধরা গলায় বললেন,

  • তুমি ঠিক আছো মামনি, সিফাত তোমাকে কোনো শাস্তি দেয়নি তো?

মামিমার এমন কথায় আমার হাসি পেলও, হাসি আঁটকে রেখে বললাম,

  • জি না মামিমা উনি আমাকে শাস্তি দেননি, বিড়বিড় করে বললাম আমাকে আদর করেছেন।

মামিমা আমার কথা হয়তো স্পষ্ট বুঝেনি, তাই সন্দিহান গলায় বলে উঠলেন,

  • শেষের কথা গুলো কি বললে শুনতে পাইনি, কিছু কি বলে ছিলে?

আমি হাসি হাসি মুখ করে বললাম,

  • জি না মামিমা কিছু বলিনি। একথা বলে সিফাত ভাইয়ার দিকে তাকালাম, তাকিয়ে দেকি উনি চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। উনার এমন চাহনি দেখে একটা শুকনো ঢুক গিললাম, মনে মনে ভাবছি বজ্জাত টা কি আমার কথা শুনে ফেললো?

এরমধ্যে মামা সিফাত ভাইয়ার উদ্দেশ্য বললেন,

  • সিফাত তোমার কি হয়েছিল যার জন্য এমন ভংকর ভাবে রেগে গিয়ে ছিলে? অনিতা কি কিছু করেছে?

সিফাত জেনি আর সোহেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

  • না, পাপা আনি কিছু করেনি, করেছে তো কিছু নোংরা মনের মানুষ। তাদের মনে সব সময় নোংরামি লেগেই থাকে, কাকে দিয়ে কাকে ফাঁসানো যায় এই চিন্তায় রাতে মনে হয় তাদের ভাল ঘুম হয় না?

সিফাতের বলা কথায় সোহেল জেনি দুজনের ভয়ে মুখ রক্ত শূন্য হয়ে গেছে।

তাদের দুজনের মনেই একি প্রশ্ন সিফাত কি তাহলে তাদের কারসাজি ধরে ফেললো? জেনি ভয়ে শুকনো গলায় কয়েকটা ফাঁকা ঢুক গিলল, কারণ প্ল্যান টা তারই ছিল।

জেনির এভাবে ভয়ে ঢুক গিলা সিফাতের চোখ এড়ায়নি, সিফাত জেনির দিকে রক্তচুক্ষু নিয়ে তাকালো। জেনি আরো ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সিফাত গম্ভীর কণ্ঠে তার বাবা- মা কে বলল,

  • মম- পাপা আমি আনি কে বিয়ে করতে চাই।

সিফাত ভাইয়ার এরকম হুটহাট বিয়ের কথা বলায় আমি যেন আাকাশ থেকে পড়লাম।

সোহেল জেনি এক জন উপর জনের দিকে অবাক চোখে তাকাল!

তারা তো এমন প্ল্যান করেনি, সোহেল জেনি ভেবে ছিল সিফাত অনিতা কে ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিবে। আর তারা সুযোগে সৎ ব্যবহার করবে, কিন্তু হলো তার উল্টো।
জনাব আলী মেহবুব বললেন,

  • বিয়ে করবে ভালো কথা সিফাত, এই বিষয়ে কি অনিতার মত আছে? আর কখন বিয়ে করতে চাও?

সিফাত গম্ভীর মুখে বলল,

  • পাপা বিয়েটা আমি আজ করতে চাই, আর এখনি।

মিসেস ইসাবেলা যেন এমনটাই চেয়ে ছিলেন তিনি খুশি হয়ে বলে উঠলেন,

  • আচ্ছা আগে মামনির মতামত কি জানতে চাই?

বলো মামনি তুমি কি সিফাত কে বিয়ে করতে চাও?

আমি কি বলব এই মূহুর্তে, আর উনি কি আগে আমাকে এটাই বুঝাতে চেয়ে ছিলেন? কানাডা আসার মূল কারণ আমার পড়া লেখা, আর বাবা – মার অনুপস্থিতিতে বিয়ে করা টা কি আমার উচিত হবে? আমার কি করা উচিত আমি বুঝতে পারছি না, সিফাত ভাইয়া কে ভালবেসে ফেলেছি উনাকে ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু আমার বাবা- মা?
সিফাত ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দেকি উনি আমার দিকে কেমন মায়াভরা চোখে চেয়ে আছেন।

উনার এমন তাকানো আমার হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে দিয়েছে, উনাকে হারানোর ভয়ও হচ্ছে।

মামিমার দিকে তাকিয়ে বললাম,

  • মামিমা আমার বাবা – মা কে ছাড়া বিয়েটা কিভাবে করি বলুন তো? আর আমার পড়ালেখা ও অনেক বাকি আছে, আমার পড়ালেখা আমার বাবা- মায়ের সপ্ন ছিল।
    জনাব আলী মেহবুব জোর গলায় বললেন,
  • অনিতা তুমি একদম চিন্তা করো তোমার মা – বাবা কে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার আর তোমার মামিমার, তুমি কি চাও সেটা বলো?

সিফাত এরমাঝে অনিতাকে বলল,

  • আনি তুমি পড়ালেখা চালিয়ে যাবে এতে আমার কোনো প্রবলেম নেই, তোমার পড়ার সব খরচও আমি দেব। কারণ আমি চাই না আমার ওয়াইফের পড়ালেখার খরচ তার ফ্যামেলি চালাক। যদিও তোমার ফ্যামেলি তোমার খরচ অনায়েসে চালিয়ে যেতে পারবেন, কিন্তু আমার কাছে সেটা বেমানান লাগে।

অনিতার চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে তো এমন একজন জীবন সঙ্গিই চায়, যে থাকে বুঝবে তার চাওয়া পাওয়া কে মূল্যায়ন করবে। তার সব কাজ কে সম্মান করবে, সে বুঝে গেছে সিফাতই সেই ব্যক্তি। যে সব সময় তার পাশে থাকবে।

মিসেস ইসাবেলা ও তাল মিলিয়ে বললেন,

  • হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমার ওয়াইফের দায়িত্ব তুমিই বহন করবে সিফাত।

সিফাত তার পাপার দিকে তাকিয়ে বলল,

  • পাপা একটা কথা বলার ছিল।

জনাব আলী মেহবুব বললেন,

  • বলো সিফাত কি বলতে চাও?

সিফাত গম্ভীর গলায় বলল,

  • আমার আর আনির বিয়ের কথা এখন ফুফি কে আংকেল কে জানানোর দরকার নেই। একমাস পরে আমাদের আবার অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে তখন তাদের জানাবো।

আমি গুমরা মুখ করে রইলাম এ আবার কেমন কথা বাবা মাকে পরে জানাবেন কেন?

মিসেস ইসাবেলা সিফাতের উদ্দেশ্য বলে উঠলেন,

  • তাহলে কি এখন পারিবারিক ভাবেই বিয়ে করে নিতে চাও? আর এরকম হুটহাট বিয়েই বা করার কারণ কি সিফাত?

সিফাত মিসেস ইসাবেলার প্রশ্নে শান্ত ভাবে বলল,

  • মম এর কারণ অন্যদিন বলব প্লিজ এখন না, আমি যা করছি তা আমরা দুজনের ভালোর জন্যই করছি।

মিসেস ইসাবেলা, জনাব আলী মেহবুব তারা সিফাতের ডিসিশন এর উপর কিছুই বললেন না। তাদের জানা আছে সিফাত কোনো ভুল কাজ করবে না, যা করছে হয়তো তার পিছনে বড় কোনো রিজন আছে।

সোহেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আর অনিতা কে তার পাওয়া হবে না। জেনির উপর সোহেল মনে মনে অনেক টা কেঁপে গেল।

  • সিস এর এমন বুদ্ধিহীন কাজের জন্য অনিতা কে পাওয়া হলো না।

অন্যদিকে জেনি রাগে ফোলছে সে কিছুতেই মানতে পারছে না অনিতা সিফাতের বউ হয়ে যাবে?

নিজের উপরও তার বিষণ রাগ হচ্ছে জেনির, কেন এমন বোকামি করতে গেল?

  • যদি এখন এরকমটা না করতাম তাহলে সিফাত এখন এই মেয়েকে বিয়ে করতো না। দূর নিজেই নিজের জালে ফেঁসে গেলাম। না, না জেনি তুই এভাবে হেরে যেতে পারিস না, আই হ্যাভ টু ডু সামথিং! বলেই জেনি তার স্থান ত্যাগ করল।

সোহেলও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে চলে গেল।

অনিতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছুই লক্ষ্য করছিল, সব কিছু বুঝতে না পারলেও অল্প কিছু আন্দাজ করেছে।

সিফাত ভাইয়া এমন করার পেছনে নিশ্চিত বড় কোনো কারণ আছে, না হলে এভাবে কেউ বিয়ে করতে চায়?

রাত ১২ বেজে এক মিনিট, অনিতা বধু বেশে বসে আছে সিফাতের রুমে। সিফাতের অপেক্ষায়।

কয়েক ঘন্টা আগে ধর্ম মতো কাজি ডেকে তাদের বিয়ে পড়ানো হয়েছে। বিয়ের সময় সিফাতের দু তিনজন ঘনিষ্ট বন্ধু কে সিফাত ডাকে, সেখানে পলাশ ও আসে। তার বন্ধুরা অবাক হয়ে যায় সিফাত কে বর সাজে দেখে, পলাশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

  • কি ব্যাপার সিফাত তুই এভাবে বরের সাজসেজে আছিস কেন?

সিফাত মুচকি হেসে বলে আমার বিয়ে তে আমি বর সাজে সাজব না তো তুই সাজবি না কি?

পলাশ আরো অবাক হওয়া কন্ঠে বলল,

  • তর বিয়ে মানে কি বলছিস কার সাথে?

সিফাত পলাশ কে বলে,

  • এতো উতলা হয়ে পরছিস কেন পলাশ, তর ভাবি নিচে আসলে দেখতে পারবি এখন গিয়ে বস।

পলাশ আর বাকিরাও সোফায় বসে রইল। খানিক পর জিসান আর মিসেস ইসাবেলা সিঁড়ি দিয়ে অনিতা নিয়ে নিচে নামলেন। অনিতা কে দেখামাত্রই সিফাতের হার্টবিট দ্রুত গতিতে ছুটছে, অনিতা কে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। হোয়াইট কালারের একটা লেহেঙ্গা পড়েছে অনিতা, তারমধ্যে গোল্ডেন কালারের স্টোন এর কাজ করা। সিফাতের হোয়াইট কালার পছন্দ বলেই হোয়াইট কালারের লেহেঙ্গা এনেছে তার মায়াকুমারীর জন্য।

অনিতার মুখে তেমন কোনো সাজ নেই, হাল্কা মেকাপ করেছে, চোখে গাড় করে কাজল, ঠোঁটে রেড কালার লিপস্টিক এতেই যেন তাকে অপ্সরীর মতো দেখাচ্ছে। দুই হাত ভর্তি হোয়াইট কালার আর গোল্ডেন কালার চুড়ি। সিফাতের এক ধ্যানে তাকানো দেখে বাকিরাও ওই দিকে তাকালও, সবাই ই হা করে তাকিয়ে আছে অনিতার দিকে।

সিফাত তার বন্ধুদের ধমক দিয়ে বলল,

  • আমার বউয়ের দিকে এভাবে নজর দিস না ও তদের ভাবি, সম্মানের নজরে দেখবি।

সিফাতের কথায় সবাই লজ্জা পেল, তারা তাৎক্ষণিক ভাবে চোখ সরিয়ে নিল। পলাশ নিচের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,

  • সিফাত শেষমেশ অনিতাকেই বিয়ে করে নিল? আচ্ছা বিয়ে যখন করছে তাহলে পারিবারিক ভাবে কেন?

অনিতা কে সিফাতের পাশে বসানো হলো, লজ্জায় অনিতা সিফাতের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না।

সিফাত একটা হোয়াইট কালারের পাঞ্জাবি পড়েছে অনিতার সাথে মেচ করে, তাকেও কোনো অংশে কম লাগছে না অনিতার থেকে। সিফাত সবার আড়ালে ফিসফিস করে অনিতা কে বলল,

  • আনি আজ তোমায় খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, ইচ্ছে করছে খেয়ে ফেলি। বলেই এক চোখ টিপ মারল অনিতার দিকে তাকিয়ে।

অনিতা সিফাতের কথায় লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।

সোহেল আর জেনি সেখানে উপস্থিত হলো না, তারা নানা কাজের এক্সকিউজ দেখিয়ে বাহিরে চলে গেল। ব্যাপারটা মিসেস ইসাবেলা, জনাব আলী মেহবুব এর কটকা লাগল।
তিন কবুল বলে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো, কবুল বলার সময় অনিতার চোখ বেয়ে কয়েক দন্ড জল গড়িয়ে পরল। শুধু সিফাত দেখলো অনিতার চোখের জল, আর কারো চোখে পরল না। অনিতা হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে মুছে নিল।

সিফাতের বন্ধুরা জানতে চেয়ে ছিল এরকম হুটহাট বিয়ে করার কারণ কি, সিফাত সে বিষয় এড়িয়ে গেছে খুব চালাকির সাথে। সবাই কে ডিনার করিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসতে আসতে সিফাতের রাত বারোটা বেজে গেছে।

তার বন্ধুদের বিদায় করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে সিফাত, তার হৃৎপিণ্ড ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

তার আনি তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ভাবতেই কেমন একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে সিফাতের।

সিফাত যখনি তার রুমে ঢুকতে যাবে তখনি জেনি এসে সিফাতের হাত ধরে আঁটকে দেয়।


পার্ট : ২০

সিফাত যখনি তার রুমে ঢুকতে যাবে তখনি জেনি এসে সিফাতের হাত ধরে আঁটকে দেয়।

হঠাৎ করে হাতে টান পড়ায় সিফাত খানিকটা চমকে তাকায়, জেনি কে দেখামাত্রই সিফাতের রাগ সপ্তম আকাশে উঠে যায়। সিফাতের চোখ মুখ মুহূর্তেই রাগে লাল বর্ণ ধারণ করে। সিফাত রাগ কন্ট্রোল করে জেনি কে জিজ্ঞেস করে,

  • তুমি এখানে কি করছো জেনি, আর আমার হাত ধরেই বা আঁটকালে কেন?

জেনি ঢোলো ঢোলো গলায় বলল,

  • আমি তোমাকে ভালবাসি সিফাত, রিয়েলি আই লাভ ইউ। তুমি ওই মেয়েটাকে বিয়ে করেছ কেন সিফাত?

সিফাত বুঝতে পারছে জেনি অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রিংকস করেছে, যার জন্য জেনি ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছে না। কথাগুলো বার বার অস্পষ্ট শুনাচ্ছে।
সিফাত শান্ত কন্ঠে জবাব দিল,

  • জেনি তুমি ড্রিংকস করেছ তোমার মাথার ঠিক নেই তুমি রুমে যাও, অযতা বিরক্ত করো না।
    জেনি জেদি গলায় বলে উঠল,
  • আমার প্রশ্নের উত্তর দাও সিফাত? আমি ঠিক আছি ড্রিংকসে আমার কোনো প্রবলেম করছে না।
    সিফাত এবার ঝাঁজালো গলায় বলল,
  • দেখতেই তো পারছি কেমন ঠিক আছো, ঠিক ভাবে দাঁড়াতেই পারছ না, আবার ঠিক আছো?

জেনি আমি আনি কে ভালবাসি আর আনিও আমাকে ভালবাসে তাই আমরা বিয়ে করেছি।

জেনি ন্যাকা কান্নার ভান করে বলল,

  • আমিও তোমাকে ভালবাসি সিফাত। ওই আনির থেকেও বেশি ট্রাস্ট মি বেবি।

সিফাত রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,

  • জেনি আমার জানা আছে তুমি আমাকে কেন ভালবাস, জেনি একটা কথা শুনে রাখ, তোমাকে ঘোড়ায় চড়াতে গিয়ে আমি শূলে চড়তে পারব না। আমি অতো মহান না, আমি আমার রুমে চলে যাচ্ছি, তুমিও তোমার রুমে যাও।

সিফাত যেই না ওর রুমের চলে যেতে উদ্বেত হলো অমনি জেনি গিয়ে পিছন দিক দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল।

সিফাত আর নিজের রাগ কে কন্ট্রোল করতে পারল না। সিফাত জেনি কে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিল, আর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলতে লাগল,

  • জেনি, ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট! তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে জড়িয়ে ধরার? তুমি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আছো বলে কোনো সিনক্রিয়েট করতে চাইছিলাম না। কিন্তু তুমি বারাবাড়ি শুরু করেছো।

জেনি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়, তারপর রাগি গলায় বলে আমাকে এভাবে ধাক্কা কেন দিলে সিফাত?

সিফাত রক্তচুক্ষু করে জেনির দিকে তাকিয়ে, প্রচন্ড রাগ নিয়ে বলল,

  • তোমাকে তো শুধু ধাক্কা দিয়েছি, তোমাকে গাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া উচিত ছিল। তুমি হয়তো ভাবছো তোমার করা কুকর্ম গুলো আমি বুঝতে পারিনি, কিন্তু আমি সে দিন ই বুঝতে পেরে ছিলাম এই নোংরা চাল কার হতে পারে?

জেনি সিফাতের কথায় ভয় পেয়ে গাবড়ে গেল, তাই ধাতস্থ হওয়া গলায় বলল,

  • তু তুমি কি ব বলছি সিফাত, আমি কি কুকর্ম করলাম? আমি কোনো কুকর্ম করিনি।

সিফাত ভেঙ্গ সুরে বলল,

  • ওহ রেয়েলি জেনি, এখন তোমার কুকর্ম গুলো মনে পরছে না বুঝি? তা আমি কি নতুন করে মনে করিয়ে দিবো?
    জেনি মিইয়ে যাওয়া গলায় বলে উঠল,
  • আমি যা করেছি সিফাত সব তোমাকে পাওয়ার জন্য। আমি তোমাকে ভালবাসি সিফাত।

সিফাত কঠিন কন্ঠে বলল,

  • “জোর করে ভালবাসা পাওয়া যায় না জেনি”।

জেনি যেন সিফাতের এমন কথায় রেগে আগুন হয়ে গেল, জেনি রাগে ক্ষুভে বলে উঠল,

  • আমি জোর করে হলেও আদায় করব তোমার ভালবাসা, দরকার পড়লে ওই মেয়ে কে খুন করে ফেলব।

সিফাত আর নিজের রাগ কে কন্ট্রোল রাখতে পারল না, কষে জেনির গালে একটা চড় বসাল।

তারপর ভয়ংকর রাগি গলায় বলল,

  • একবার এই কথা উচ্চারণ করেছ দ্বিতীয় বার করার সাহস দেখিয় না, তুমি যদি কোনো ভাবে আনির কোনো ক্ষতি করতে চাইবে তাহলে এই সিফাত মেহবুব তোমাকে দুনিয়া থেকে সরাতে দুই সেকেন্ড ও টাইম নেবে না। মাইন্ড ইট!

জেনি গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, সিফাত তার রুমের দিকে চলে গেল।

জেনি সিফাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতেদাঁত চেপে বলে উঠল,

  • আমার গায়ে হাত দিয়ে তুমি ভালো করোনি মি সিফাত মেহবুব, এর শাস্তি তোমার ভালবাসার আনি পাবে। কারণ ওই মেয়ের জন্যই তুমি আমাকে চড় মেরেছো। এর চরম মূল্য তোমায়ও দিতে হবে, জেনিফার গায়ে হাত দিয়ে ভুল করেছো।

অন্যদিকে অনিতা রুমে বসে থাকতে থাকতে বোর হচ্ছে, তার ঘুম ও পেয়েছে।

বজ্জাতটা যে কোথায় গেল, এই বারি লেহেঙ্গা পরেতো আমার অসয্য লাগছে। কোথায় যে উধাও হলেন এই মধ্যে রাতে।
চিন্তা ও হচ্ছে বাবা- মা কি বিয়ে টা মেনে নিবেন?

নাহ আমি অযতাই দুশ্চিন্তা করছি, বাবা – মার উপর আমার ভরসা আছে। বাবা- মা আমার পছন্দ কে ফিরিয়ে দিবেন না। উনারা তো আমার সুখ দেখতে চান, আমায় ভালো দেখতে চান। আমি সিফাত ভাইয়ার সাথেই ভালো থাকব সুখে থাকব। অনিতার এসব ভাবনার মধ্যে সিফাত রুমে ঢুকল। সিফাত কে দেখা মাত্র অনিতার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল, কারণ সিফাত প্রচন্ড রেগে আছে। সিফাত তার রাগ কমানোর জন্য লম্বা করে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিলো, তারপর স্বাভাবিক গলায় অনিতা কে বলল,

  • কি ব্যাপার আনি এখনো ড্রেস চেঞ্জ করো নি? অনিতার আরেকটু কাছে এসে বলল, যাও ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসো।

অনিতা কোনো কথা না বলে সিফাত কে সালাম করার জন্য এগিয়ে গেল, তখনি সিফাত অনিতা কে বাঁধা দিয়ে বলে,

  • এই এই তুমি পায়ে ধরে সালাম করছো কেন আনি?

অনিতা মৃদু হেসে বলে,

  • স্বামী কে তো পায়ে ধরেই সালাম করে। তাই আমিও করছি।

সিফাত মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠল,

  • বোকা মেয়ে তোমার স্থান আমার পায়ে নয় আমার বুকে, এই কথা বলে সিফাত দুই হাত দু দিকে প্রসারিত করে দিল আর অনিতা সিফাতের বুকে হুমড়ি খেয়ে পরল। সিফাতও অনিতা কে জড়িয়ে রইল অনেক্ষণ তাদের মধ্যে বিরাজ করছে এক পিনপতন নীরবতা। নীরবতা ভেঙ্গে অনিতাই প্রথম বলে উঠল,
  • আচ্ছা আপনি এতে রেগে ছিলেন কেন?

সিফাত অনিতা কে বাহু থেকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

  • নাহ, কই না তো। আনি তুমি যাও ফ্রেশ হয়ে আসো, পরে আমি ফ্রেশ হবো।

অনিতা আর কোনো কথা বাড়াল না ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল।

সিফাত বসে বসে ভাবছে জেনি আবার কোনো নতুন প্ল্যান করবে আমি নিশ্চিত। এই মেয়ে কে দিয়ে বিশ্বাস নেই।

খানিকক্ষণ বাদে অনিতা ওয়াশরুম থেকে বাহির হলো, অনিতা কে দেখে সিফাত কিছু সময় চেয়ে রইল। অনিতা সিফাতের তাকানোয় অপ্রস্তুত ভাবে বলে উঠল,

  • কি হয়েছে সিফাত ভাইয়া আপনি এরকম তাকিয়ে আছেন কেন?

অনিতার কথায় সিফাত সারা ঘরময় কাঁপিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল, সিফাতের এমন হাসির কোনো কারণ খুঁজে পেলও না অনিতা।

তাই জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিফাতের দিকে, সিফাত হাসি থামিয়ে বলল,

  • বিয়ের রাতে কেউ থ্রি- কোয়াটার, টি- শার্ট পরে আমার জানা ছিল না আনি? বলেই আবার হাসতে লাগল সিফাত।

অনিতা লজ্জায় মাথা নিচের দিকে করে রইলো, আর মনে মনে বলল,

  • ইশ সিফাত ভাইয়া ও না খুব অসভ্য, এরকম কেউ কাউকে লজ্জা দেয়?

সিফাত অনিতার এরকম লজ্জা পাওয়া মুখ দেখে বলে উঠল,

  • এতো লজ্জা পেতে হবে না লজ্জাবতী, আমি জানি তুমি শাড়ি পরতে পারো না। এই ড্রেসে তোমাকে পুরাই বাচ্চা টাইপ লাগে, আদর করতে ইচ্ছে করছে, এ কথা বলেই সিফাত ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। অনিতা লজ্জায় মুখ তুলতে পারছে না, লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেল। এই লোকটা এমন কেন কোনো কথা মুখে আঁটকায় না।

অনিতা সিফাতের বেডে এক পাশে জড়সড় হয়ে বসে আছে। সিফাত ওয়াশরুম থেকে একদম খালি গায়ে বের হলো, পরনে শুধু একটা থ্রি – কোয়াটার। অনিতা সিফাতের দিকে একবার তাকালো আর সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল লজ্জায়, আর অস্বস্থিতে। এর আগে কখনো সিফাতকে এভাবে খালি গায়ে অনিতা দেখেনি।

সিফাত অনিতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর অনিতা কে আদেশের কন্ঠে বলে উঠল,

  • আনি আমার তোয়ালে নিয়ে এসো তো। আমি এখানে বসছি। অনিতা বসা থেকে উঠে তোয়ালে নিয়ে এসে দাঁড়াল।

সিফাত অনিতা কে বলল,

  • তোয়ালে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন, আমার মাথা মুছে দাও। অনিতা কাঁপা কাঁপা হাতে সিফাতের মাথা মুছে দিচ্ছে, আর সিফাত মিটিমিটি হাসছে।

অনিতা মাথা মুছা শেষ করে যখনই সরে যাবে তখন সিফাত অনিতা কে টান দিয়ে তার কোলে বসিয়ে দিলো। অনিতা চোখ বড় বড় তাকিয়ে আছে সিফাতের দিকে। সিফাত অনিতার এমন তাকানো দেখে হাল্কা হেসে বলে উঠল,

  • আনি এতো বড় বড় চোখে তাকিয়ো না, চোখ বের হয়ে আসবে। সিফাতের কথায় অনিতা আবার লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে মুখ করে রইল।
    সিফাত অনিতার উদ্দেশ্য বলল,
  • তুমি আমাকে এতো লজ্জা পাও কেন আনি? এখন তো আমি তোমার স্বামী তাহলে লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমাকে খালি গায়ে দেখেও লজ্জা পেয়েছো বলে তোমাকে দিয়ে মাথা মুছালাম। তাও লজ্জায় তাকালে না। এতো লজ্জা রাখ কোথায় আনি?

অনিতা সিফাতের গলা জড়িয়ে বসে আছে, বার বার সিফাতের ফর্সা লোমযুক্ত বুকের দিকে চোখ যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই সিফাত অনিতা কে বলল,

  • আনি তুমি চোরা চোখে আমার বুকের দিকে তাকাচ্ছ কেন? সোজাসোজি তাকাতে পারো আমি তোমার বিয়ে করা বর।

অনিতা যেন সিফাতের এমন কথায় লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চাইছিল। অনিতা থতমত গলায় বলে উঠল,

  • ক ক কই না তো!

সিফাত মুচকি হেসে বলল,

  • সিফাত মেহবুবের চোখ ফাঁকি দেওয়া অতো সোজা না মিসেস সিফাত মেহবুব।

অনিতাও হেসে লজ্জায় সিফাত কে জড়িয়ে ধরল।

রাত ২ :৩০, সিফাত অনিতা কে নিয়ে ছাদে বসে আছে। অনিতা সিফাতের বুকে মাথা দিয়ে দূর আকাশের তারা দেখছে। আজ আকাশে কোনো চাঁদ নেই।

সিফাত অনিতা কে বলে,

  • আনি আই এম সরি।

আমি অবাক হওয়া কন্ঠে বলে উঠলাম।

  • আপনি সরি বলছেন কেন সিফাত ভাইয়া?

আমার কথায় উনি ধমকের সুরে বললেন,

  • তুমি আমায় ভাইয়া ডাকছো কেন, আমি কি তোমার ভাইয়া?

উনার কথায় লজ্জা পেলাম, সত্যিই তো উনাকে ভাইয়া ডাকছি কেন, দূর উনি তো এখন আমার বর।

উনাকে বললাম,

  • আসলে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে তো, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে, আর বলব না সরিইইই।

উনিও হেসে আমাকে আবারও বুকে জড়িয়ে নিলেন। আমি আবার বললাম,

  • কিসের জন্য সরি বললেন, বললেন না তো।

উনি উনার সভাব মতো মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলেন,

  • আমরা এখন কোনো স্বামী- স্ত্রীর মতো সম্পর্কে জড়াবো না। উনার কথা টা আমি ঠিক বুঝলাম না উনি কি বুঝাতে চাইছেন, তাই আবার প্রশ্ন করলাম কি বললেন বুঝলাম না তো আমরা তো স্বামী- স্ত্রী ই? আমার বলা কথায় উনি হাসলেন তারপর বললেন,
  • তোমার অতো সতো বুঝতে হবে না, শুধু এটুকু যেন রাখও আমরা তোমার বাবা- মার দোয়া ছাড়া নতুন জীবন শুরু করব না। একমাস পর তোমার আমার নতুন ভাবে বিয়ে হবে সবাই কে জানিয়ে, এমনকি ফুফি – আংকেল ও আসবেন।

আমি খুশি হলাম বাবা- মা আসবেন শুনে, কিছু সময় পর আমার আনন্দ টা মাটি হয়ে গেল একথা ভেবে যদি তার রাজি না হন, তবে?

উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত ভাবে বললেন,

  • আনি তুমি খুশি হওনি ফুফি আর আংকেল আসবেন শুনে?

আমি মন খারাপ করে বললাম,

  • খুশি হবনা কেন? আমার এর জন্য ভয় হচ্ছে যদি বাবা – মা রাজি না হোন?

উনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলে উঠলেন,

  • দূর, তুমি খামোকাই এসব চিন্তা করছ, উনারা মানবেন না কেন? আমি তো সব দিকেই পারফ্যাক্ট, আমাকে রিজেক্ট করার কোনো এক্সকিউজ আছে বলো? সব কিছুর পরে আমরা একজন অন্যজন কে ভালবাসি।

সিফাত অনিতার দিকে তাকিয়ে হতবাক, কারণ অনিতা ঘুমিয়ে পরেছে সিফাতের বুকে।

সিফাত অনিতার কপালে গভীর ভাবে চুমু এঁকে দিল, হেসে অনিতাকে পাঁজো কোলে করে রুমের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে বলছে এই মেয়েটা দেকি পুরাই ঘুম কাতুরে, কি রকম কথা বলার মাঝে ঘুমিয়ে গেল? রুমে এসে অনিতা কে বুকের মধ্যে নিয়েই ঘুমিয়ে গেল, অনিতাও ঘুমের ঘুরে সিফাত কে আসটেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। সিফাতের শূন্য বুক আজ পূর্ণ হলো তার ভালবাসা কে বুকের মধ্যে আগলে ধরে।

সকালে অনিতার ঘুম ভাঙলো ভার্সিটির টাইমে, ঘুম ভাঙতেই অনিতা নিজেকে আবিষ্কার করলো সিফাতের বুকে। সিফাত তাকে জড়িয়ে ধরে আছে, অনিতা সিফাতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে অনেক্ষণ তাকিয়ে রইল, সিফাতের ঘুমন্ত চেহারা দেখতে অনেক মায়াবী লাগছে। অনিতা সিফাতের চুলে হাত বুলিয়ে দিল, এক সময় সিফাতের কপালে আস্তে করে চুমু দিল। সিফাত ঘুমের মাঝেই মুচকি হাসল। অনিতা সিফাতের দিকে তাকিয়ে একমনে বলে উঠল,

  • আপনি খুব ভালো, সত্যিই আপনাকে বিয়ে করে আমি কোনো ভুল করিনি। বলেই অনিতা ওয়াশরুমের দিকে গেল ফ্রেশ হতে।

অনিতা চলে যেতেই সিফাত চোখ খুলে মিটমিটিয়ে হাসল, আর মনে মনে বলল,

  • আমি তোমার মনকে ভালবেসেছি আনি, অন্যকিছু না।

অনিতা ফ্রেশ হয়ে বাহিরে আসতেই বেডের দিকে নজর গেল, সাথে সাথেই অনিতার চোখে মুখে ফুটে উঠল বিরক্তি ভাব। বিরক্তির কারণ হলো জেনি, বেডে জেনি বসে আছে, ।
অনিতা সিফাত কে দেখতে পেলনা,

এরমধ্যে জেনি বলে উঠল,

  • সকাল বেলা সিফাতের রুমে আসার কারণ তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি!

সমাপ্ত

সিজন ১ এখানে – তার শহরে – সিজন ১ | আবেগি ভালোবাসার গল্প

সিজন ৩ এখানে – তার শহরে – সিজন ৩

Related posts

তার শহরে – সিজন ৪ | অনেক কষ্টের গল্প

valobasargolpo

রোমান্টিক প্রেমের গল্প – বান্ধবী যখন বউ – শেষ পর্ব

valobasargolpo

Leave a Comment

error: Content is protected !!