মিষ্টি প্রেমের গল্প

অসময়ে (১ম খণ্ড) – valobashar romantic prem er golpo bangla

অসময়ে – valobashar romantic prem er golpo bangla: সীমান্ত হতবাক, হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো দোয়ার হাসিজ্জ্যেল মুখের দিকে। কিন্তু কিছুখনের মধ্যে দোয়া চুপ মেরে গেলো সেই চট করে সীমান্তের হাতের দিকে তাকালো। যে হাতটি সেই ধরে রয়েছে শক্ত হাতে।


পর্ব ১

কবুল, কবুল, কবুল!
তিন বার কবুল আর একটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দোয়া হয়ে গেলো পর্দার ঐপাশে বসে থাকা লাজুক হাসি হাসি মুখের চশমা পরা সেই ছেলেটির।
কিন্তু দোয়া কোন অনুভূতি কারও চোখে পরলো না।

কবুল বলে মুখে উপরে তুলে সেই স্থির হয়ে গেলো। তাতে সবাই মধ্যে হট্টগোল পরে গেলো। একেক জন একেক কথা বলতে লাগলো। কেউ বলছে……
দেখো একটি মাত্র মেয়ে আর চোখে এক ফোঁটা পানি নেই!

কি আজব দুনিয়া গো!
বিয়ের দিন মেয়ে মানুষ বুঝি কান্না করেনা?

মেয়ে এমন ভাবে সবাইকে দেখছে যেনো তার সদ্য খবর হয়েছে আজকে তার বিয়ে!
যে যার মত করে কানাঘুষা করতে লাগলো। কিন্তু দোয়া যেনো এই দুনিয়াতে নেই সেই হতভম্ব, হতবিহ্বল ও হতবুদ্ধি চোখে তাকিয়ে আছে তার সদ্য হওয়া বরের বন্ধু দের দিকে। বর কে দেখা না গেলেও তার বন্ধ দের স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। তার হাত পা কাঁপছে মাথা ঝিরিঝিরি করছে।
এই, ছেলেগুলো, ওরা এখানে, এরা এখানে কীভাবে!

দোয়া হন্য হয়ে চারিদিকে তাকাতে লাগলো। আর কি যেনো বিড়বিড় করে পড়তে লাগলো। মিসেস জুলেখা সম্পর্কে দোয়ার মা তিনি চোখের ইশারা করলো দুইটি মেয়েকে। তারাও মাথা নাড়িয়ে কি যেনো সম্মতি জানালো। তারপর ভীড় ঢেলে দোয়ার পাশে এসে বসলো নিদা আর মাহা। সম্পর্কে তারা দোয়ার খালাতো বোন। এই দুটো খালাতো বোনের জন্য দোয়ার কখনও বন্ধু বান্ধবীর দেওয়া স্বার্থপরতা পরিচয় কখনও কাঁদায় নেই। নিদা দোয়া পাশে বসে এক হাতে জড়িয়ে ফিসফিস গলায় বললো,

কি হয়েছে দোয়া?
এতো অচিন অশান্তি লাগছে কেন তোকে?
দোয়ার যেনো কোন কথা কানে এলো না সেই বার বার চারিদিকে তাকাচ্ছে যেনো কিছু খুঁজছে। মাহা দোয়া কে আদুরে গলায় নরম কন্ঠে একটু ঝাঁকি দেওয়ার মত করে বললো,

কি হয়েছে দোয়া কাকে খুঁজছিস বল আমাদের?
দোয়া এইবার নিদা আর মাহার উৎসুক চোখের দিকে তাকালো। আর কোন রকম অস্পষ্ট স্বরে বললো, সেই এসেছে! সেই কি সত্যি তার কথা রেখেছে! সেই এসেছে! তারপর ঝাপসা চোখে ঢোলে পরলো নিদার গায়ে।

এইবার মাছ বাজারের মত কিচকিচ করা আত্মীয় স্বজন সবাই হতভম্ব। এটা তো ভারী বিপত্তি কান্না কাটি কিছু নেই দুমদাম জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। সবাই উৎসুক জনতার মত দোয়াকে দেখতে লাগলো। বর সহ তার প্রতিটা আত্মীয় স্বজন গিজগিজ করে উঠলো দোয়ার পাশে এসে। নিনি সম্পর্কে নিদার ছোট বোন সেই ঠোঁট কাটা স্বভাবের তাই চট করে সবাই উদ্দেশ্য বলে বসলো।

এখন হায় হায় করছেন কেন! এতোখন তো আপুকে দাঁত নিচে রেখে চাবাচ্ছিলেন। মেয়ে কেন কান্না করেনা। এখন দেখুন জ্ঞানে হারিয়ে ফেলেছে কাঁদতে না পেরে। যে যার জায়গা চুপ মেরে গেলো। মিসেস খুশবু সম্পর্কে দোয়ার ছোট খালা। তিনি মিনমিন গলায় নিনা কে ধমকে চুপ থাকতে বললো, তাতে নিনা গাল ভেংচি কাটলো।
মৃদু মৃদু চোখে দোয়া তাকিয়ে দেখলো মাথার উপরে চেনাপরিচিত সেই পাখাটি বিরামহীন ভাবে ঘুরছে। সেই এইবার তার পাশে তাকিয়ে দেখলো। তার সব ঘরোয়া আত্মীয় স্বজন তাকে অবাক ভাবে দেখছে। দোয়া হালকা করে উঠে বসলো। তারপর তার সামনে বসা নিদার দিকে তাকিয়ে বললো,

কি হয়েছে সবাই এই রকম আমাকে দেখছো কেনো?
ইশিয়া সম্পর্কে দোয়ার সেজো খালার মেয়ে। সেই একজন সুনামধারী চিকিৎসক। সেই তড়িঘড়ি করে বললো,
দোয়া তো শরীর কি বেশী খারাপ লাগছে এখন!

দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে বললো, না ইশিয়াপু আমি ঠিক আছে একটু দূর্বল লেগেছিলো তখন। জোনাকি সম্পর্কে দোয়ার মামাতো বোন সেই কিছু বলার জন্য মুখ খুলার আগে মিসেস জুলেখা এসে বললো,
ইশিয়া ওর টেস্ট করলি? পেটে বাচ্চা টাচ্চা নেই তো আবার?

মিসেস জুলেখার বোন রা তার বোন কে এইভাবে কথা বলতে বারণ করলো কিন্তু তাতে মিসেস জুলেখা তার মুখের ভাষা পরিবর্তন করলো না। সেই তার আগের ধাচে কথা বলতে লাগলো।
ইশিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে না বোধক মাথা দুলিয়ে বললো, এমন কিছু হয়নি খালামনি। ওর দূর্বলতা জন্য এমন হয়েছে। মিসেস জুলেখা দাঁত কিড়মিড় করে বললো, তোমরা সবাই রুম থেকে বের হয়ে যাও এখন। শুধু নিদা আর মাহা থাক। ওরা এই নষ্টার পেট থেকে কথা বের করুক। কি প্ল্যান করে সেইখানে ঘুরে পরেছে, বিয়ে না করার তামাশা বের করছি ওর। সবাই টুকটুক করে বের হয়ে গেলো। মিসেস জুলেখাও বের হয়ে গেলো যাওয়ার সময় তিনি তীক্ষ্ণ শব্দে দরজা লাগিয়ে গেলো পুরো রুমটা যেনো ভুমিকম্প মতো নড়ে উঠলো। নিদা আর মাহা কাতর চোখে দোয়ার দৃঢ় মুখের দিকে তাকালো এই মেয়েটার কি এখন কোন কথা গায়ে লাগে না? কেমনে পারে এতো বাজে কথা সহ্য করতে!

নিদা দাঁত কিড়মিড় করে বললো, আমি বুঝি না খালামনির সমস্যা কি? উনি নিজের মেয়েকে এতো নোংরা ভাষায় কথা কীভাবে বলতে পারে! আশ্চর্য! দোয়া সেই কথার উত্তর না দিয়ে মুখের পেশি আরো শক্ত করে বললো, তোরা কেউ আমার বর কে দেখেছিলি? নিদা আর মাহা বোকা বনে গেলো। তারা কোন রকম অস্পষ্ট ভাবে
বললো, না কবুলের আগে বর দেখার আমাদের বংশে রীতি নেই তুই তো জানিস! দোয়া নিদা আর মাহা দিকে শান্ত চোখে তাকালো। তারপর নিজের ফোনের গ্যালারি থেকে কি যেনো খুঁজে বের করলো। মাহা আর নিদা কপাল কুঁচকে দোয়ার কাজকর্ম লক্ষ্য করছে। হঠাৎ দোয়া একটি ছবি মাহা আর নিদার সামনে ধরলো। নিদা আর মাহা ছবিটির দিকে কিছুখন তাকিয়ে মৃদুস্বরে চিৎকার দিয়ে বললো, মানে কি! এটা কীভাবে সম্ভব! এরা তো মাত্র! দোয়া এইবার ছলছল চোখে তার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো, এরা সীমান্ত ভাইয়ার বন্ধু।

বরের প্রতিটি বন্ধু শুকনো ঢোগ খিললো দোয়ার এইভাবে জ্ঞান হারানোতে। আকাশ অনিকে কে গুঁতো দিয়ে বললো,
অনিক মামু এটা কি দেখছি! বউ দেখি তোমার ঘুরে পরে গেলো ব্যাপারটা তো সুবিধার লাগছে না!
অনিক কটমট চোখে তাকিয়ে বললো,
ব্যাটা চুপ কর চিন্তা লাগছে আমার।

সাব্বির হাক তুলে বললো, আর যে বলুক ভাই অনিক এই পুতুল তুই কেমনে পাইলি ঐটা বল? অনিক গর্বের চোখে বন্ধু দের দিকে তাকিয়ে বললো, আব্বার বন্ধুর মেয়ে। আমি তো ছবি দেখে কাত! তার উপরে মেয়ে একদমই লেভেল অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এইবার প্রথম বর্ষে। প্রিয়ম রসমালাই মুখ পুরে অবাক গলায় বললো, সালা আংকেল এইরকম শর্ট নোটিশে এই হুরপরী কেমনে পাইলো আমার তো মাথায় ধরলো না। এটা যেনে ভারী চিন্তার ভীষণ এমন ভাবে সবাই ভাবতে লাগলো। হাসিব বললো, আমি তো ভেবেছি ছবি ফেসবুকে দেওয়ার গুলো তোকে দিয়ে গোল দিয়েছে। বুঝিস তো ফেসবুকে মেয়েরা কেমন টিপটাপ করে ছবি দে। হাসিব ইশারায় সানজিদা কে দেখালো। সানজিদা তা খেয়াল করলো না। সেই তার আজকের তোলা ছবি ফেসবুকে আপলোড করতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। অনিকের বন্ধু মহলে হট্টগোল পরে গেলো একেক জন একেক কথা বলছে। হঠাৎ হাসিব বলল অনিক তোর বউয়ের নাম কি রে?

অনিক লাজুক গলায় বললো, দোয়া। হাসিব চমকে উঠলো তৎক্ষণিক তার কপাল কুঁচকে গেলো। সেই ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো মেয়ে যেনো কোন বর্ষে? অনিক জানালো প্রথম বর্ষে। হাসিব প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, দোয়া, মাদুয়া! আহ অনেকটাই মিল। সানজিদা হঠাৎ অনিকের কাছ ঘেঁষে বসে বললো, এতো কিচমিচ করার কি আছে! মেকআপে যে কেউ কে সুন্দর লাগে বউ কেমন সেটা কাল ভোরে বুঝা যাবে! কেউ সানজিদা কথা গায়ে
মাখালো না সানজিদা আর সীমা নিজেদের বাদে কারও রুপের সুনাম করতে অভ্যস্ত না। হাসিব কথা ঘুরানোর জন্য অনিকে উদ্দেশ্য করে চিমটি কেটে বললো, অনিক্কা এতো লেদু বউ পেলি আমি মানি না। সানজিদা হাসিবের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো, ইতরামি হচ্ছে! এতো লেদু পছন্দ হলে জুনিয়র মেয়ে ধরতে। সেইম এজ প্রেম করলা কেন! হাসিব মন খারাপ সুরে মিনমিন গলায় বললো, কত বার ব্রেকআপ করতে চাইলাম তুমি তো হাত পা কেটে বসে থাকতা। সেইজন্য তো বিয়ে পর্যন্ত গড়ালো। সানজিদা হাসিব কে মারতে লাগলো। সবাই উচ্চ হাসি ঠাট্টা তে মেতে উঠলো। ঠিক তখনি শুনা গেলো বউয়ের জ্ঞান ফিরেছে।

দূর্বলতার কারণে তখন এই পরিস্থিতি হয়েছিলো। অনিক ভ্রু নাচিয়ে বললো, কি রে এইবার বুঝলি কেন আমার বউ অসুস্থ হয়েছিলো। ব্যাটা তোদের চিন্তা ভাবনা সব নিচ থেকে উপরে আসে। সাব্বির হাসতে হাসতে বললো, এই প্রতিভা আমরা সীমান্ত থেকে অর্জন করেছি ভুলে গেলি? সবাই মন খারাপ হয়ে গেলো। মেহের সম্পর্কে সাব্বিরের স্ত্রী সেই মন খারাপ সুরে বললো, আহারে সীমা আর সীমান্ত কেউ নেই কবে যে দুই দিন যাবে কবে আমরা সবাই এক সাথ হয়ে যাবো। নেপাল আমাদের নেপাল আহা।

সীমান্ত দেখো দেখো অনিকের বিয়ের কিছু ছবি ফাটিয়েছে সাব্বিরে। সীমান্ত কাঠের তৈরীর বারান্দার দোলনা বসে কফি হাতে বললো, আমি পরে দেখবো সীমু দয়া করে আর আমাকে রিকুয়েষ্ট করো না। সীমা বেডে বসে গাল ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বললো, আবার হয়েছে উনি দেবদাস! কয়েকদিন পর পর এক নাটক!
সীমা হঠাৎ একটা ছবি দেখে চিৎকার দিয়ে বললো, জানো সবাই বলছে বউ নাকি পুতুলের মত আমার থেকে তো এতো আহামরি কিছুই লাগছে না এদের আসলে চোখ নেই বুঝলে! সীমা অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে দোয়ার দেয়া ছবির খুঁদ খুঁজতে লাগলো। সীমান্ত বারান্দায় থেকে গলা ছেড়ে বললো, সীমু কেন সবসময় মানুষের সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলো? মেয়েটি সুন্দর হতে পারে এতো মানুষ তো আর মিথ্যা বলবে না। সীমা হঠাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে গলা বাজি করে মৃদুস্বরে চিৎকার দিয়ে বললো, আশ্চর্য আমি সীমান্ত!

তুমি মেয়েটাকে না দেখে আমাকে কথা শুনাচ্ছো? আর যেটা সুন্দর না সেটা আমি অসুন্দর হাজার বার বলবো। এমনকি মুখের উপরে বলবো। বিশ্রী জিনিস নিয়ে আমার মুখে মিথ্যা মিথ্যা মানুষ খুশির করার বুলি আসে না। যত্তসব! সীমা তার হাতের ফোন বেডে ছুঁড়ে মেরে ওয়াশরুম ডুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো। সীমান্ত পিছনে ফিরে তাকালো না সেই তার মতো বারান্দায় সোফায় বসে রইলো। সেই তার হাতের কফিতে এক চুমুক দিয়ে বাইরে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর বিড়বিড় গলায় বললো, সেই ছিলো!
সত্যি সেই আলাদা ছিলো, অনেক আলাদা ছিলো। সেই কখনও কারও সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলতো না, সত্যি বলতো না! তার কাছে সব সৌন্দর্যের সব রুমের অপরুপ বর্ননা থাকতো! সীমান্ত তার এক হাত বুকে রাখলো আজ দুই দিন তার আবারও সেই পুরাণে অসুখ বেধেছে। এই অসুখ টা তার চেনা কিন্তু কারণ টা অজানা।

. দোয়া আমার কেন যেনো মনে হচ্ছে তোর বর সীমান্ত ভাইয়া! দোয়া চমকে জানালা থেকে মুখ সরিয়ে মাহা দিকে তাকালো। নিদা জিভ কাটলো হুদাই কিছু শুনার জন্য সুনামি ডাকলো। দোয়া স্বাভাবিক চেহেরায় বললো, মানে? মাহা জ্ঞানী জ্ঞানী গলায় বললো, দেখ প্রেমে কষ্ট পাওয়া এটা আমাদের কাজিনদের একটা অভ্যাস। নিদা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, তোর কষ্ট পাওয়ার পিছনে তোর ছ্যাচঁড়া আবেগ দায়ী, তোর নাটকীয় রামলীলা সাথে দোয়ার অনুভূতি কেন তুলনা করছিস?

মাহা গাল ভেংচি কাটলো নিদার কথাতে। দোয়া শান্ত গলায় বললো, মূল কথায় আয়! কি বলতে চাস সেটা বল। মাহা এইবার রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলো দেখ দোয়া আমার মনে হচ্ছে তোর বিয়ে সিমান্ত ভাইয়া সাথে হয়েছে। তুই যে সীমান্ত ভাইয়ার বিয়ে ছবি দেখেছিলি ঐটা ভুল দেখেছিলি। তুই দেখ সীমান্ত ভাইয়া না বললো, তার সব বন্ধু তোকে চেনে তাহলে ওরা কীভাবে তোকে দেখে কোন রিয়াকশন দিলো না? উল্টো হাস! চুপ! একদমই চুপ মাহা! মাহা আর কিছু বলার আগে দোয়া
ধমকে উঠলো। মাহা কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে খাটের কোনে গিয়ে বসলো। সর্বনাশ! কারণ দোয়ার চোখ মুখ হঠাৎ অসম্ভব শক্ত হয়ে গেছে। চোখ গুলো ভয়ংকর লাল বর্ন হয়ে গেছে। নিদা বিড়বিড় করে বললো, একদমই ভালো হয়েছে বেআক্কল একটা। মাহা কাঁদো কাঁদো চোখে নিদার দিকে তাকালো। নিদা মৃদু ভেংচি কাটলো। যার অর্থ হলো জিহ্বা একটা বানালি এক হাত এইবার সামলা অধম একটা। আত্মীয় স্বজন সবাই মুটামুটি দোয়ার ঠোঁট কাটা স্বভাবের জন্য ভয় করে। দোয়া খুব বেশী বড়দের সাথে উত্তর দে না কিন্তু ওর চুপটি ভয়ংকর। এমন একটা কথা হঠাৎ বলে বসবে যেটা সারাজীবন মশার মত ভো ভো করতে লাগে কানের ও মাথার আশেপাশে।

আর নিজ বয়সে মানুষ দের উদ্দেশ্য বলা ওর একেকটা কথা হাতের দশটা থাপ্পড় খাওয়ার মতো। মাহা ছোট্ট ঢোগ গিলে বললো, আমি তো এমনে বলছিলাম। দোয়া দৃঢ় গলায় বললো, এটা কোন নাটক বা টিভি জগৎ না মাহা। এটা বাস্তবিক জগৎ। সিমান্ত আর সিমাপুর বিয়ের ছবি আমি নিজ চোখে দেখেছি। এমন কি তোদের দিয়েছি ভুলে গেলি! নাকি তুই ভাবতাছোস বিয়ের পর তার বউয়ের সাথে মনমালিন্য হয়নি বলে সেই লেজ উঠিয়ে বন্ধু দের নিয়ে চলে আসছে আমাকে বিয়ে করার জন্য! বল! বল! এটা ধারণা করেছিলি! মাহা ভিতরে ভিতরে আল্লাহ কে ডাকতে লাগলো। কেউ একজন যেনো রুমে চলে আসে আর তাকে যেনো এই অগ্নি থেকে বাঁচিয়ে তুলে। কারণ দোয়ার মুখ আস্তে আস্তে আরো লাল বর্ন হচ্ছে এটা ঝড়ের আগ-মুহুর্তে তা বুঝাই যাচ্ছে। মাহা বিড়বিড় করে বললো, এতো মাসের রাগ সব তার উপরে জাহির হবে ও খোদা।

এক দোয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ কাছে করা আরেক দোয়া মাহার কবুল হলো। মিসেস নাছরিন সম্পর্কে দোয়ার মামি। তিনি রুমে এসে বললো, নিদা আর মাহা দোয়া কে নিয়ে আয় বরের সাথে ওকে বসাতে হবে। মাহা ঢোগ গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে উপর আল্লাহ কাছে শুকরিয়া জানালো। যেভাবে ঝোঁকের মুখে পরেছিলো। আজ শেষ হয়ে যেতো। মিসেস নাছরিন দোয়া সহ সবাই কে বরের ছবি দেখালো। নিদা আর মাহা একটি আরেকটির মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। মিসেস নাছরিন জানালো জলদি জলদি দোয়া কে নিয়ে যেতে। তারপর তিনি তার ফোন নিয়ে রুম থেকে বিদায় জানালো। দোয়া চোখ বন্ধ করে খাটে হেলান দিয়ে বসলো। তারপর বিড়বিড় করে বলে উঠলো কবুল তো আমি আরেকজন কে বলে দিয়েছি, কি জবাব দিবো আমি আমার মন কে, আমি যে আজ বড্ড জবাবহীন হয়ে গেছি।
আমি বোধহয় তোমাকে শেষ একটি বার ছুঁয়ে দেখার তীব্র এক তৃষ্ণা মরে যাবো।

চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো কয়েকটা ফোঁটা পানি দোয়ার। মাহা, নিদা ও কেঁদে দিলো। আজ যে গত মাস পর দোয়া তার কোন সত্যিকারী অনুভূতি প্রকাশ করেছে। হাসি কান্না তো দোয়ার জীবন থেকে যেনো দূর দূরত্বে গিয়ে বাসা বেঁধেছিলো। এক বছর আগের দোয়া সাথে এখনকার দোয়ার যে আকাশ পাতাল অমিল। আগের দোয়া যে তার কষ্ট ভিতরে লুকিয়ে রাখতে পারতো না। একটুখানি অভিমানে তার চোখে অশ্রু বন্যা বয়ে যেতো। তেমনি সুখের সময়েও। কিন্তু এখন কার দোয়ার সুখ, দুঃখ কোন অনুভূতি কারও চোখে পড়ে না। সেই হাসলেও যেনো পরিমাণ মাফিক অল্প খানি মুখটাতে প্ল্যাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে আনে। আর সেটা যেনো খুবই সীমিত সময়ের জন্য চোখে আসে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই আবার আগের ছন্নছাড়া চেহেরা করে আপন মনে কি যেনো ভাবতে থাকে। হয়তো গুরুজন রা সত্যি বলতো।
ক্ষুদ্র অভিমানে যে মানুষটা টুপ করে কেঁদে ফেলে।
একদিন হাজার অবহেলাতেও সে আর কাঁদেনা!

কারণ,
বিচ্ছেদ মানুষকে কংক্রিটের মতো শক্ত করে তোলে!


পর্ব ২

~ চুপচাপ বরের পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে দোয়া। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। যেনো এক ঝাঁক পোকা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। ফলস্বরূপ কিছুখন পর পর মাথা চেপে ধরছে দোয়া। হায়! সেই কি ভোঁতা যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা এতোটুকু কখনও বাড়তো না, যদি না মিসেস জুলেখা ওরপে দোয়া আপন রক্তের সম্পর্কে মা তাকে এইভাবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতো। নিজ বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আসার সময় তার মায়ের বলা শেষ কথাটা তার কানে এখনও ঝঙ্কার আওয়াজ তুলছে। তার মা তাকে এখন চোখের বিষ ভাবে, এটা সেই এই একবছরে সহ্য করে নিয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার চেহেরা পর্যন্ত দেখতে চাইনা এটা যেনো দোয়ার এই সহ্য কাতর শরীর হজম করতে পারেনি। তখনি যেনো শরীর টা হাল ছেড়ে দিয়েছে। পুরো দুনিয়া যেনো স্তব্ধ হয়ে গেছে দোয়ার কাছে।
~ মা!

এই মানুষ টা ছিলো তার জীবনে সবকিছু। সারাদিন মা মা করার জন্য সবাই তাকে নিয়ে মজা করতো আর ভেঙ্গিয়ে বলতো ম্যাঁ, ম্যাঁ দোয়ার ম্যাঁ কই। মা ছাড়া দোয়া যেনো অচল ছিলো। হল থেকে বাসায় আসার জন্য হন্য হয়ে থাকতো দোয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পাওয়ার পর তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে শাহবাগ জার্নিং করার মত এই মেয়েলি শরীর টা তার একদমই পেরে উঠতো। তার উপরে সকাল ৮ টা থেকে ক্লাস শুরু হতো। ছোট কাল থেকে কিছু অসুস্থতা ভুগছে বলে জার্নিং করা তার জন্য সবসময় দুষ্কর ছোট খাটো জার্নি তে বমি করে আশপাশ ভাসিয়ে দেওয়া দোয়ার জার্নি সময় ছিলো একটা দায়িত্ব।

তার উপরে হঠাৎ হঠাৎ ক্লাস ক্যান্সেল হয়ে যেতো। সেই লেকচার গুলো ভর দুপুর দিয়ে বসতো প্রফেসর রা। তাই পড়ালেখা সুবাধে তাকে হানা দিতে হয়েছিলো রোকেয়া হলে। বাবা নামকরা লোকদের সাথে হাত রয়েছে বলে তাকে গনরুমে ছাড়পোকা সাথে বসাবস করতে হয়নি। সুন্দর জানালার পাশে তিন তালার উপরে মার্জিত একটা রুম পেয়েছে দোয়া। ভাগ্য যে তার হলে এতো ভালো হবে তা তার জানা ছিলো না। সেই তার রুমে আটজন আপুদের সাথে থাকতো তারা সবাই ছিলো অত্যন্ত সুন্দর ব্যবহারের অধিকারী। মিসেস জুলেখা দোয়াকে সবসময় তার কৌশল হিসেবে বড় করেছে। তাই দোয়া খুবই চিন্তা ভাবনা সাথে সবাই সাথে কথা বলতো। তার রুচিসম্মত চিন্তা ভাবনা দেখে রুমের মেয়েগুলোর কাছে দোয়া আরো আদুরে হয়ে গেছে। মেয়েদের একটু তে বদনাম হয়ে যায় তা মিসেস জুলেখা অবগত। ফলস্বরূপ দোয়ার প্রতিটা মেয়ের বান্ধবীর সব খোঁজ খবর তার কানে আসতো।

কৌশলে তিনি মেয়ের থেকে জেনে নিতো সবাই ব্যাপারে। দোয়া মুখ পটু বলে মায়ের কাছে সব কিছু বলে বসতো। স্কুল, কলেজ মেয়েদের সাথে পড়াতো বলে সেই সুবাধে দোয়ার কোন ছেলে বন্ধু ছিলো না। কোন মেয়ের কোন বাজে খবর ফেলে মিসেস জুলেখা সাথে সাথে দোয়াকে সাবধান করে দিতো। দোয়া তার মায়ের কথা কখনও আমান্য করে নেই। মা বাবার কথা অক্ষর অক্ষরে পালন করতো সেই। তাই কখনও বদনামের তলে তাকে পড়তে হয়নি এটা তার বিশ্বাস। মিসেস জুলেখার জীবনে সবচাইতে বড় জিনিস হলো চরিত্র। তিনি চরিত্র জিনিস টা কে সবচাইতে বেশী গ্রাহ্য দেই। নিজের আপন বাবার চরিত্রের দোষের জন্য মিসেস জুলেখা কে অনেক পদে পদে অনেক হেনস্তা হতে হয়েছে, এমনকি বিয়ের পরেও।

সেই থেকে তিনি বুঝেছেন এই পৃথিবীতে সম্মানের সাথে বাঁচতে হলে পবিত্র চরিত্র টা যে বড়ই দরকার। তাই তো তার একটিমাত্র মেয়ের যেনো তার মতো কপাল না জুটে তাই এই রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো দোয়া হলে গিয়ে। বাসা দূরের জন্য মাঝে মাঝে ব্যস্ততার জন্য রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দোয়াকে হলে থাকতে হতো। আবার মাঝে মাঝে হুটহাট তিন দিন পর চলেও আসতো তার মা বাবার কোলে। হলে সারাদিন মিসেস জুলেখা সাথে ভিডিও কলে লেগে থাকতো দোয়া। আর প্রায় বিকালে মিসেস জুলেখা আর মি. ইমতিয়াজ চলে আসতো তার একটি মাত্র মেয়েকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। এতো ভালোবাসার মধ্যে শুধু মাত্র একটি ঘটনা দোয়ার পুরো জীবন টাকে তচনচ করে দিয়েছে। যে সম্পর্কে গুলোর কাছে তার চরিত্র ছিলো ভোরের সকালে উঠা সদ্য ফুল সেই সম্পর্ক গুলোর কাছে দোয়া হয়ে গেছে ড্রেনের পরে থাকা পঁচা নোংরা ফুল। যেটা দেখলে লোকে চোখ ফিরিয়ে নেই নাক চিটকে।

~ দোয়া আর ভাবতে পাচ্ছে না তার মনে হচ্ছে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে কিন্তু কই যাবে। সেই যে অচেনা জায়গা বড্ড ভয় পাই। যে যার মত বর-কনে ছবি তুলছে। বিশাল বড় একটি রুমে দোয়া আর অনিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা ড্রয়িংরুম তা অনায়াসে বুঝা যাচ্ছে। দোয়া চারিদিকে চোখ বুলালো বাসার সবাই রুচিসম্মত তা বুঝাই যাচ্ছে। মানতে হবে এইখানে গৃহিণী খুব যত্নের সাথে তার বাসায় সাজিয়েছে। ড্রয়িংরুমে মানুষ মাছ বাজারের মত গিজগিজ করছে, বাচ্চারা চিৎকার চেচামেচি করে ঝড় তুলছে।
অনিক আমার মনে হচ্ছে দোয়ার খারাপ লাগছে।

অনিকের কানের কাছে সাব্বির এসে ফিসফিস গলায় বলে উঠলো। অনিক ত্যাড়া চোখে তাকিয়ে বললো, তুই ব্যাটা আমার বউ দিকে তাকিয়ে আছস কেন? সাব্বির অনিকের মাথায় একটা খাট্টা মেরে বললো, শালা ইতর তোর বউয়ের দিকে খালি আমি না এখানে উপস্থিতি সব মানুষ তাকিয়ে আছে ছাগল। একটুপর নুবা একি গলায় বললো, অনিক তোর বউয়ের অবস্থা সত্যি ভালো না চোখ বিষাক্ত লাল হয়ে গেছে আমার মনে হয় আবারও জ্ঞান হারাতে পারে! অনিক এইবার পূর্ন দৃষ্টি দিয়ে দোয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
বেশী খারাপ লাগলে একটু সহ্য করে নাও, আর কিছুখনের ব্যাপার।

দোয়া নিঃশব্দে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো। তার একদমই ইচ্ছে করছে না উত্তর দিতে। শরীর টা যেনো একটু একটু করে হাল ছেড়ে দিচ্ছে। তাই চুপ থাকাই সেই শ্রেয় মনে করলো।
অনিকের কাছে ব্যাপারটা ভারী মজার লাগলো। বউ দেখি একদমই পুতুল বাহযেমন পুতুলের মত দেখতে, তেমনি কথাও মাথা হেলিয়ে দুলিয়ে শুনে। অনিক এইবার বেশ পুরুষতান্ত্রিক ভাব নিয়ে সামনে তাকিয়ে বললো, আবার কাতচিত হয়ে পরে যাবা না, আমার একটা সম্মান আছে পরিবারে কাছে। মানুষ ভুল বুঝে উল্টো পাল্টা ভেবে বসবে। তাই চুপচাপ বসে থাকো খারাপ লাগল কিছুই করার নাই ধৈর্য ধরতে শিখো। এই অবস্থা বসে থাকলে তুমি বুঝবা তোমার ধৈর্য কতটুকু, ধৈর্য অনেক ব….
হয়েছে!

অনিক আর আগানোর আগে দোয়ার কাঠকাঠ উত্তর। অনিক থমকে গেলো। সেই কপাল কুঁচকে দোয়ার দিকে আবার তাকালো। দোয়া শান্ত কন্ঠে মৃদুস্বরে বললো, জ্ঞান দেওয়া হয়েছে আপনার?
যদি না হয়ে থাকে তাহলে বলে রাখছি আমার ধৈর্য শক্তি অনেক কম, তাই এটার পরিক্ষা আমার করা লাগবে না।

অনিক যেনো বেলকি খেলো। সেই হা করে তাকিয়ে রইলো দোয়ার ক্লান্ত মুখ এবং দৃঢ় কন্ঠস্বরের দিকে। দোয়া নিজের মত করে বলতে লাগলো আমার শরীর একদমই ভালো লাগছে না আর ভালো নেই এটা আপনেও জানেন! যদি আমি আবার ঘুরে পরে যায় আপনি কি জবাবদিহি করবেন সেটা ঠিক করে রাখুন। কারণ তখন সবাই প্রশ্ন আপনাকে করবে আর আপনি ক্যাবলাকান্ত মতো না হেঁসে কথার উত্তর দিয়েন।
অনিকের মাথার আশেপাশে যেনো এক দল মৌমাছি নৃত্য করে উঠলো। সেই অসহায় চোখে তার বাবার দিকে তাকালো। মি. রাহিন সম্পর্কে অনিকের বাবা তিনি মিসেস ইরানি সম্পর্কে সীমান্তের মা তার সাথে দাঁত এক পাটি বের করে ছবি তুলছে।

আহা কি মধুর সময়!
অনিক বিড়বিড় করে বললো, তুমি বলেছিলে মেয়ে তো মেয়ে নই যেনো একখানা সোনার টুকরো, মুখেমুখে কোন উত্তর দে না, যা বলে চুপচাপ শুনে। আহা, এটা শুনার নমুনা! অনিক কোন রকম উচ্চ স্বরে তার মাকে ডাকলো।
~ কিছুখন পর মিসেস রোজিনা হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এসে বললো, কি হয়েছে ডাকছিস কেন বাবা? অনিক চুপসে যাওয়া বেলুনের মত মুখ করে মিসেস রোজিনা কে দোয়াকে ইশারায় দেখিয়ে বললো, ওর শরীর ভালো না সেটা তো শুনছো, তোমরা একটু…।

তুই চিন্তা করিস না আমি বউ মাকে রুমে নিতে এইদিকে আসছিলাম। অনিকের কথা শেষ না হতে মিসেস রোজিনা বলে উঠলো। তারপর তিনি নুবাকে কে ডেকে দোয়া কে এক হাতে জড়িয়ে রুমে নিয়ে গেলো। অনিক ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। এটা কি হলো! কি যে দরকার ছিলো তার লেকচার দেওয়ার এখন! আর কিছু সেকেন্ডের ব্যাপার ছিলো সাবান বাদে ধোয়া টাও সেই আর খেতো না।

কি রে ব্যাটা এমন হামড়া মত মুখ করে আছিস কেন? হাসিব অনিকে ধাক্কা মেরে বলে উঠলো। অনিক ভাঙা হাড়ের মত মুখ করে বললো, আজ আর বাসর হবে না রে মামা, বউ আমার তেলেবেগুনে জ্বলে আছে। অনিকের বন্ধু মহলের সবাই হো হো করে হেঁসে উঠলো। আকাশ রসিকতা সাথে বললো, বলিস কি শালা তোর লেদু বউ রাগ দেখিয়েছে! দূর মামা একটু বলবি না দেখতাম সুন্দরী বউদের রাগলে কেমন লাগে। শুধু আকাশের মুখের বুলি ছাড়া দেরী ছিলো আর মেহের খ্যাঁক করে উঠার দেরী ছিলো। মেহের মুটামুটি হাত পা নাচিয়ে বললো, দেখছো সব্বাই?

আকাশ তুই কি বলতে চাস? এখানে আমরা এই তিন তিনটা মেয়ে দেখতে বিশ্রী? তোর বউ? ও কি বিশ্রী? শালা তোরা পুরুষ জাত এতো খারাপ কেন রে? আকাশ চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো নুবা নেই সেই এইবার গলা ছেড়ে বললো, আরো ভাই তোদের থেকে কমে কমে তিন চার বছরের ছোট তাহলে বুঝ? বুঝিস তো কম বয়সী মেয়েরা বাচ্চা মুরগীর মতো আদুরে হয়। সবাই হাসি ঠাট্টা তে মেতে উঠলো সাথে অনিকও। নুজবা সম্পর্কে ওদের সবাই বান্ধবী। তার বিয়ে হয়েছে পারিবারিক ভাবে। প্রেম নামক সম্পর্কে সেই কখনও যাইনি। নুশবা অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে হতবুদ্ধি গলায় বললো,
সিরিয়াসলি অনিক!

অনিক ওরা তোর বউ কে এটা সেটা বলছে আর তুই দাঁত দেখিয়ে হাসছিস! অনিক ঠোঁট উলটিয়ে বললো, বন্ধু রা বলবে না তো কে বলবে? তুইও বল সমস্যা কি?
মেহের আর সানজিদা হেঁসে উঠে বললো, আমাদের বড় আম্মার সামনে কিছু বলিস না সেই অন্যায় পছন্দ করেনা। সানজিদা আর মেহেরের কথাতে সবাই তাল মিলিয়ে হাসতে লাগলো। নুশবা ডানে বামে মাথা করে উঠে চলে গেলো তার পাঁচ টা বন্ধু আর তাদের বউ গুলো কখনও ঠিক হবার না। এদের থেকে তো দ্বিগুণ সীমা। নুশবা হঠাৎ দোয়ার জন্য খারাপ লাগলো। শান্ত শিষ্ট এই মেয়েটাকে এরা চিবে খাবে। বিয়ে বাড়িতে মেয়ের অনেক গল্প শুনেছে প্রচন্ড শান্ত মেয়েটা সারাখন বইয়ের মধ্যে ব্যস্ত থাকে। একটু মন দূর্বলের দিকে নুবা টা খালি ভালো আর গুলো তো সব বদের হাড্ডি কথার নেই কোন ছিরি। এমনেতে সবগুলো নেপালে একি বাসাতে থাকবে। খোদা জানে কি আছে বাচ্চা মেয়েটার কপালে স্বামী টাও হলো আরো বেয়াদব।

ভারী মন ভার হলো নুশবার দোয়ার জন্য মেয়েটার সাথে সকালে কথা বলতো হবে।
~ অনিক ফাইজলামি পর রুমে গিয়ে দেখলো ফুলে সমাহার তার খাটে গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমাচ্ছে দোয়া। সেই তার বিয়ের সজ্জা সব খুলে সাধারণ একটি কমলা রঙের উপরে কালো সবুজ লতাপাতা ডিজাইন করা একটি সুতির শাড়ি পরে ঘুমাচ্ছে। অনিক তাকিয়ে রইলো সত্যি বেশখন। দারুন ব্যাপার তার জীবনে হয়ে গেলো হঠাৎ করে। এই সুন্দরী মেয়েটাকে তার বাবা কই থেকে এতো কম নোটিশ আনলো তার নিজেরই মাথায় খেলছে না।

হঠাৎ একটি মৃদু চিৎকারে অনিক ভড়কে গেলো। সেই হরগরিয়ে তাকিয়ে দেখলো তার সব বন্ধু রা এসে হাজির শুধু নুশবা বাদে। সবাই দাঁত কেলিয়ে হাসছে তার ভয়াতুর মুখের দিকে তাকিয়ে। অনিক এইবার খেয়াল করলো সেই দোয়ার ঘুমন্ত চেহেরা দেখতে এতোটাই ব্যস্ত ছিলো সেই দরজা পর্যন্ত আটকালো না। অনিক বআকারে একটি নোংরা খিস্তি দিয়ে আর কিছু বলতে গিয়েও পারলো না। হঠাৎ একটা মেয়ে কান্নার আওয়াজে অনিক চুপ মেরে গেলো। অনিকের বন্ধু মহলে সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। তারপর তারা যা সন্দেহ করলো তা হলো।

অনিকের সব বন্ধু এক সাথে খাটের দিকে তাকালো। দেখলো লম্বা কোমর সমান ভিজা চুলে একটি সুতি শাড়ি পরে চোখ বন্ধ করে ঠোঁট উলটিয়ে কাঁদছে দোয়া। সবাই চিৎকার দোয়ার ঘুম ছুটে গেছে। কিন্তু শরীরের অবস্থা এতো নাজেহাল যে চোখ খুলার মত শক্তি নেই। হঠাৎ চিৎকার সেই বসে কান্না করে দিলো ঘুমের মধ্যে। অনিক সব বন্ধু ঠোঁট কামড়ালো। অনিক চোখ গরম করে সবাই দিকে তাকানোর সাথে সাথে সবগুলো চট করে টুনটান করে রেললাইন মত বের হয়ে গেলো। অনিক হালকা শব্দে দরজা লাগিয়ে দোয়ার দিকে এগিয়ে আসলো। দোয়া এখনও ঠোঁট উলটিয়ে কাঁদছে আর চোখ খোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনিক আস্তে করে দোয়ার উদ্দেশ্য বললো, প্লীজদোয়া কান্না করো না তুমি ঘুমাও আর কোন আওয়াজ হবে না।

দোয়া যেনো এই কথার অপেক্ষা ছিলো সেই টুপ করে আবারও বালিশে পরে গেলো আর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো। অনিক আনমনে হেঁসে উঠলো। সেই তার রাতের ঘুমানোর মত পোশাক নিয়ে বাথরুম চলে গেলো।
~ সাব্বির বাইরে এসে হাসতে হাসতে মাটিতে বসে গেলো সেই এমন ভাবে হাসছে যেনো এহান মজার ব্যাপার তার জীবনে কখনও হয়নি। নুবা মুখে হাত দিয়ে হেঁসে বললো, কি যে হবে অনিক্কার এই বাচ্চা রে কেমনে সামলাবে? আমার তো মনে হচ্ছে এটা নবম দশম শ্রেণির কোন মেয়ে। এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে কারও বিশ্বাস ও হবেনা।

আকাশ আগ্রহ গলায় বললো, তুমি কীভাবে বুঝলে অনিকের বউ বাচ্চা স্বভাবের মানে অল্প কতখন তো হলো ওরে দেখলা তাইনা?
নুবা সোফায় বসতে বসতে বললো, যে মেয়ে ঘুমের মধ্যে এইভাবে কান্না করে সেই যে বাচ্চা স্বভাবের সেটা বুঝায় যায় আর সবচাইতে বড় কথা মেয়েটা ভারী মিষ্টি হবে।

প্রিয়ম তাল বাহানা করলো তার বড্ড আপসোস হচ্ছে অনিক কেন এতো জটিল বউ পেলো।
সাব্বির বললো, শালা কখনও প্রেম না করে একদমই ঝাক্কাস মাল পেয়েছে। সবাই সাব্বিরের কথা তে ভারী মজা পেলো, কিন্তু নুবা লজ্জা কাতর চোখে হাসলো। তারা সবাই একি বয়সের হলেও নুবা কখনও তার বন্ধু দের এইসব আলাপ আলোচনা তে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা। তাদের বন্ধুত্ব গভীর তাও যেনো এইসব কথা নুবা কে অনেক লজ্জায় পেলে দে। সবাই দোয়া কে নিয়ে বিভিন্ন গল্প তে মেতে উঠলো।

হঠাৎ মিসেস রোজিনা আর মিসেস ইরানি এসে বললো, তোমাদের কাল সকাল ১১ টায় তোদের ফ্লাইট আর তোরা এতো রাত হয়েছে ঘুমাচ্ছিস না কেন? সারাদিন কত দখল গিয়েছে খবর আছে? যাও, যাও, ঘুমাতে যাও।
সবাই এক মত হলো কারণ কাল সকাল তারা সবাই নেপালের উদ্দেশ্য রওনা দিবে। সত্যি এখন না ঘুমালে কাল বড্ড কষ্ট কর হয়ে যাবে তাদের জন্য। তারা পাঁচ বন্ধু নেপালে একি বাড়িতে একসাথে থাকে। সবাই যে যার মত করে ঘুমাতে চলে গেলো।

~ একটি ফোন অনবরত বাজছে। হাসিবের ফোন পকেট থেকে বের করে দেখলো তারই ফোন। হাসিব ফোন উঠিয়ে দেখলো অনলাইনে কল এসেছে। সেই ফোন হাতে নিয়ে বললো, কি রে সীমু কি হয়েছে ফোন দিলি যে?
সীমা গমগম গলায় বললো, হাসিব সীমান্তের আবারও বুকে সেই ব্যাথা টা উঠেছে। সেই কখন থেকে খাটের এই পাশ ঐপাশ করছে কি করবো বল তো?

হাসিব চট করে একটু সাইডে গিয়ে বললো, তোকে ভিডিও কল দিচ্ছি তুই সীমান্ত সামনে ফোন টা ধর। সীমা তাই করলো। হাসিব দেখলো সীমান্ত গাল লাল হয়ে গেছে চুল গুলো এলেমেলো। হাসিব থমকে গেলো। এই চেহেরা হাসিব সীমান্তের শেষ এক বছর আগে দেখেছিলো ঐদিন টাতে, যেদিন!
হাসিব আর ভাবতে পারলো না। সীমা সামনে সেই কি বলবে সেটাও বুঝতে পারছে না। হাসিব সীমা কে উদ্দেশ্য করে বললো, সীমু তুই সীমান্তের সামনে ল্যাবটপ টা রেখে একটু গরম দুধ করে আন ওর জন্য যা সীমা অত্যন্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে গেলো।

হাসিব তড়িঘড়ি করে সীমান্ত উদ্দেশ্য বললো, সীমান্ত শুন আমার কথা শুন, মাদুয়ার খবর আমি পেয়েছি। এই যে ওর রুমমেট রশ্মি নামের মেয়েটি থেকে। সীমান্ত চট করে উঠে বসে গেলো। সেই অবাক চাইনি তে হাসিবের দিকে তাকিয়ে বললো, সত্যি বলছিস হুরের খবর পেয়েছিস! ঐ কেমন আছে? ওরা কোথায় চলে গিয়েছে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে? ও-ও কারও সাথে সম্পর্কে গিয়েছে! হাসিব খেয়াল করলো এই কথাটা বলতে সীমান্তের গলা টা কেমন কেঁপে উঠেছে।

হাসিব শুকনো ঢোগ গিলে বললো, না, না তেমন কিছুই না, ঐ ওর মত পড়ালেখা করছে। ভালোই নাকি রেজাল্ট করেছে। শুনেছি পিএইচডি করবে বাইরে গিয়ে। সত্যি অসাধারণ ভাবে জীবনে ঐ গড়ে তুলছে। সীমান্তের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সেই উৎসাহ কন্ঠে বললো, আমি জানতাম আমার হুর একদিন অনেক বড় কিছু করতে পারবে। জানিস তুই হাসিব সারাখন পড়তো এই মেয়ে। হাসিব হালকা করে হাসলো। সীমান্ত কে অনেক হাসি খুশি দেখাচ্ছে আজ এক বছর পর। সীমান্ত হঠাৎ বললো, ওর বয়ফ্রেন্ড বা বিয়ের ব্যাপারে কিছু শুনেছিস? হাসিব থমকে গেলো সেই কোন রকম বললো, আমি খবর পেয়েছি ও নাকি বিয়েই করবে না। সীমান্ত মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। সেই হতাশ মুখে বললো, কেন এমন করছে, কেন নিজের জীবন সুন্দর করে পরিচালনা করছে না সেই?

হাসিব কোন রকম হাসি মুখে এনে বললো, দেখ তোর মাদুয়া ওরপে হুর তো ঠিক আছে তাহলে তোকে এতো ক্লান্ত অসুস্থ কেন লাগছে? সীমান্ত চট করে মনে পড়লো, সেই নিজের বুকে হাত দিয়ে বললো, সত্যি তো হাসিব!
আমার এমন কেন মনে হচ্ছে ওকে কেউ স্পর্শ করছে, আমার, আমার ভিতর টা কেন এতো জ্বলে যাচ্ছে?
সীমান্তের চোখ লাল হয়ে গেছে পূনরায়।
সীমান্ত গম্ভীর কন্ঠে বললো, তুই সত্যি বলছিস তো হাসিব?

হাসিব এইবার ভড়কে গেলো সেই তার মুখ চুলকাতে লাগলো। কি বলবে সেই এখন, আর যে হচ্ছে না কথা বানানো। সীমান্ত তাকিয়ে আছে হাসিবের মুখের দিকে। হাসিব আর কিছু বলার আগে সীমা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এসে হাজির হলো।
হাসিব ছোট্ট নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার পক্ষে যে আর সম্ভব হচ্ছে না তার প্রান প্রিয় ভাইয়ের কাছে মিথ্যা বলতে।

~ সীমা এসে ত্যাড়া গলায় বললো, বাহ এতোখন খাটে খাটে গড়াগড়ি করছিলে আর এখন দেখি উঠে বসে আছো ব্যাপারটা কি? নাকি আমাকে হয়রানি করার জন্য এইসব নকশা করো! সীমান্ত কিছুই বললো, না সেই হাসিব কে বিদায় জানিয়ে ভিডিও কল কেটে দিলো।
~ হাসিব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

আমি কেমনে তোকে বলি তোর মাদুয়া অন্য কারও হয়ে গেছে সীমান্ত আরো এক সপ্তাহ আগে। যদি বলতাম হয়তো তোর এই পুরানো বুক ব্যাথা তীব্র হয়ে যেতো। হাসিব তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। নকল ভালোবাসার দায়িত্ব পূরণ করতে গিয়ে সত্যি কারী ভালোবাসা টা তোর ভাগ্য থেকে চলে গেলো রে সীমান্ত।
এই কষ্ট হয়তো তোর সারাজীবন ভোগ করতে হবে। এটা যে আমি চাই না। কিন্তু কর্মফল যে বড়ই খারাপ। কেন যে তুই ঐ মেয়েটার অনুভূতির সাথে খেলা করলি কেন!

~ সীমান্ত দুধ খেলো না সীমা সাথে কথাও বললো, না। সেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। সবকিছু তার থেকে বিশ্রী রকমের অসহ্য লাগছে। সীমান্ত বিড়বিড় করে বললো, আমি কি সত্যি তোমায় ভালোবেসে ফেলছি দোয়া! তোমার করা দোয়া যে আমার জীবনে বদদোয়া রুপে এসে হানা দিলো। তুমি ঠিক আছো তো দোয়া? আমি যে কেউকে বলতে পাচ্ছি না আমার তোমাকে একটিবার দেখার ভীষন অসুখ করেছে। হয়তো এই একজীবনে তোমাকে একবার আমার করে পাওয়ার সত্যি অনেক দরকার ছিলো হুর।

~ দোয়া শান্ত মুখে তার পাশের শুয়ে থাকা অনিকের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। অনিক হাতপা ছড়িয়ে ছিটিয়ে এক গাল হা করে ঘুমাচ্ছে। তার একটি পা আরেকটি হাত দোয়ার শরীরে উপরে উঠানো। দোয়া মৃদু ধাক্কা দিয়ে অনিকে ডাকলো। উত্তর অনিক গন্ডারের মত আওয়াজ তুলে অন্য দিকে কাত হয়ে শুয়ে গেলো। দোয়া মাথা ঘুরিয়ে বালিশের পাশে তার ফোন খুঁজলো। কয়টা বাজে দেখা দরকার। এরা এমন রুম অন্ধকার করে ঘুমাই যে রুমে দুইটা মানুষ আছে তা কেউ বুঝতে পারবো না। কিন্তু না তার ফোন পেলো না। উল্টো তার হাতে অনিকের ফোন টা এলো।

সময় দেখার জন্য ফোন হাতে নিয়ে দেখলো নোটিফিকেশন স্বরূপ একটি মেসেজ এসে লক স্কিনে হানা দিয়েছে অনিকের। দোয়া মেসেজ টা উপরে থেকে পড়ে সময় দেখে অনিকের দিকে তাকিয়ে এক তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে ধীরে পায়ে বেড ছেড়ে উঠলো। তারপর দরজা খুলে যে রাস্তা দিয়ে সেই এসেছিলো রুমে ঐ রাস্তার মাধ্যমে ডাইনিং রুমে চলে গেলো। যখন ওকে রুমে আনছিলো তখন সেইখানে দোয়া একটি ফ্রীজ দেখেছিলো। কিছু খাওয়া দরকার তার খুদায় পেট ছো ছো করছে। দোয়া ফ্রীজ খুলে দেখলো খাবারের গিজগিজ করছে ফ্রীজ। হরেক রকমের মিষ্টি, কোক, পুডিং আর চকলেট কেক। দোয়া এগিয়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে সাজানো থেকে একি বাটি আর একটি চামচ নিলো। তারপর আবারও এগিয়ে এলো ফ্রীজের কাছে। হঠাৎ একটি গমগম গলায় একটি কন্ঠ স্বর ভেসে এলো তার কানে।
~ তুমি!

তুমি, এই রাতে ফ্রীজে সামনে কি করছো? দোয়া তাকিয়ে দেখলো তার এক কালের প্রাণ প্রিয় মানুষ টির জন্মদাত্রী, মিসেস ইরানি। দোয়া মিসেস ইরানি কে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, আসলে আমার অনেক খুদা পেয়েছিলো।

তো, তাতে কি হয়েছে? মিসেস ইরানি কপাল কুঁচকে বলে উঠলো। দোয়া চুপ করে রইলো। মিসেস ইরানি বললো, তোমার খুদা লাগছে তুমি অনিকে বলবা নিজে কেন আসলে? দোয়া প্রতিত্তোরে বললো, আমি উনাকে ডেকেছিলাম উনি বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন। মিসেস ইরানি অত্যন্ত অবাক গলায় বললো, সেইজন্য তুমি নেচে-কুঁদে চলে আসবে! দোয়া মাথা নিচু করে কোন রকম বললো, না মানে আমি! মিসেস ইরানি দেখলো মেয়ে কেমন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেছে ভালোই জব্দ হচ্ছে তাহলে মেয়েটি। তিনি এইবার জোর গলায় বললো,

তোমার উচিত হয়নি এখানে আসা আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি ঘন্টা খানিক আগে তোমার বিয়ে হলো আর তুমি রাতদুপুর বরের বাসার ফ্রীজ খাটাখাটি করছো! খুদা লাগলে পানি খেয়ে শুয়ে যেতে এটা কেমন বদ অভ্যাস রাতে উঠে খাওয়া! তোমার কি নূন্যতম বোধ শক্ত নেই, নাকি বাবা মা কিছু শিখিয়ে পরিয়ে দেই নেই। দোয়া অত্যন্ত শান্ত গলায় বললো, না আন্টি আমার নূন্যতম বোধ শক্তি নেই, আমি একদমই কান্ডজ্ঞান হীন একটি মেয়ে। এই যে আপনি আমাকে এতো কিছু বললেন তাও আমি ঠিক হবো না কারণ ঐ যে বললেন আমার বোধ শক্তি নেই। আমি যেমন আছি তেমনি থাকবো।

~ মিসেস ইরানি দাঁত কিড়মিড় করে বললো, তুমি তো আচ্ছা বেয়াদব মেয়ে!
দোয়া মুচকি হেঁসে বললো, মুরব্বিদের সামনে উচিত কথা বললে সবাই বেয়াদব হয়ে যাই।
~ মিসেস ইরানিকে হতবাক করে দিয়ে দোয়া কেকের বাটি হাতে রুমে দিকে রওনা হলো। তারপর পিছনের দিকে তাকিয়ে বললো, আসলে আমার আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।

মিসেস ইরানি কপাল কুঁচকে তাকালো সেই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছে এই মেয়ের এমন বিপরীত ব্যবহারে। তিনি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, কেনো?
দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে বললো, আপনি যদি মিষ্টি করে কথা বলতেন তাহলে আমি বুঝতাম আপনি ছেলে আপনার ধাচে গিয়েছে। আর এটা হতো খুবই ভয়ানক।
মিসেস ইরানি চমকে উঠে বললো, তুমি সীমান্ত কে কীভাবে চিনো?

দোয়া তাচ্ছিল্যের একটি হাসি দিয়ে বললো, সেই কি! উনার মতো এতো খ্যাতি মানুষ কে না চিনলে এই জগৎ সংসার তো আমাকে মেনে নিবে না।
তারপর মিসেস ইরানি কে আর কিছু বলতে না দিয়ে, দোয়া বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেলো।
মিসেস ইরানি হতবাক চেহেরায় আগের মত দাঁড়িয়ে রইলো। এই ঠোঁট কাটা মেয়ে রাহিন ভাই কই থেকে ধরে আনলো? এই যেনো লংকা। এর ঝাল যে কত জনের মুখ জ্বালাবে তা ভেবে কুল পাচ্ছে না মিসেস ইরানি।

তিনি সূর্য উঠার অপেক্ষা তে রইলেন সকালে উঠে তার কাজ হবে মিসেস রোজিনা কে এই বার্তা দেওয়া। কিন্তু তিনি আরো একটি বিষয় নিয়ে চিন্তায় পরেছে। এই মেয়েটি সীমান্তের ব্যাপারে এমন করে কথা কেন বললো,? যেনো মনে হচ্ছে বহুকাল ও বহুভাবে তার সীমান্ত সাথে পরিচয়। মিসেস ইরানি কি যেনো ভাবলে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে হানা দিলো। এই মেয়ের চোখে সীমান্তের জন্য সেই দেখেছে অসীম রাগ। এটা যে ভয়ানক কিছু হওয়ার ইঙ্গিত তা তার বুঝতে বাকী নেই।
~ সকাল বেলা দোয়া গোসল সেড়ে বাইরে এসে দেখলো অনিক রেডী হচ্ছে। দোয়া নরম স্বরে বললো, মা এসে ডেকে গিয়েছিলো নাস্তা করতে। অনিক দোয়া দিকে এক নজর তাকিয়ে পূনরায় তার কাজ করতে করতে বললো, তুমি নাস্তা করে সবকিছু রেডী করে নাও জানো তো আজ সকাল ১১ টা ০৫ নেপাল যাওয়ার ফ্লাইট আমাদের। আর মা বললো, তোমার কিছু আত্মীয় স্বজন আসলে এয়ারপোর্টে তাই একটু আগে যেতে হবে। দোয়া নিঃশব্দে মাথা দুলিয়ে ঘোমটা মাথায় তুলে অনিকের সাথে বের হয়ে গেলো।

~ মিসেস রোজিনা এটাসেটা ঠিক করছে আজ তার ছেলে বউ নিয়ে নেপালের উদ্দেশ্য রওনা দিবে। আহারে বউটকে একটু আদরযত্ন করতে পারলো না। হঠাৎ মিসেস ইরানি রুমে এসে বললো, আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে আপা। মিসেস রোজিনা একটু করে হেঁসে বললো, হ্যাঁ, অবশ্যই! বলো কি বলবে?
মিসেস ইরানি, মিসেস রোজিনাকে এক হাত ধরে খাটে বসিয়ে নিজে পাশের সোফায় বসলো। তারপর ধীরে সুস্থে কালকে রাতের সব ঘটনা তিনি বললেন, এমন কি তা
প্রচন্ড রসিয়ে রসিয়ে যাতে করে তার জব্দ করার ব্যবহার টা ঢাকা পরে। মিসেস ইরানি তার কথা শেষ করে মিসেস রোজিনা দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে দেখলো মিসেস রোজিনার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। তিনি অত্যন্ত শান্ত ভাবে কথা গুলো শুনছেন। মিসেস ইরানি বললো, আপনি কিছু বলছেন না আপা মেয়ে কতটা বেয়াদব, আমি ওর কত বড়, আমি ওর বরের আত্মীয় হই তাও সেই আমার সাথে এমন ভাবে কথা বললো,! তাহলে ভাবেন আপনাদের সাথে অনিকের সাথে তার ব্যবহার কেমন হবে? আমি বলি কি আপনি এই মেয়েকে আপনার কাছে রেখে দেন আর অনিক যাক। নেপাল থেকে বাংলাদেশে আসতে বা কতখন লাগে কয়েকমাস পর পর সেই আসবে। সত্যি বলছি আপা শান্তি দিবে না অনিকে। মেরে ফেলবে আমাদের ছেলেটাকে।

মিসেস রোজিনা শান্ত ভঙ্গিতে মিষ্টি করে হেঁসে বললো, না আপা এমন কিছুই হবে না। মেয়েটা কাল প্রচন্ড অসুস্থ ছিলো। তাই মেজাজ ও খিটখিটে ছিলো। তাই হয়তো এইভাবে বলে বসেছে। থাক বাচ্চা মেয়ে বাবা ও নেই কিছু মাস আগে মারা গেলো আবার হঠাৎ বিয়ে মনে অবস্থা ভালো নেই। মিসেস ইরানি যেনো আরো একটি ঝোঁক পেলো তিনি তড়িঘড়ি করে বলো উঠলো আপা আপনারা ভালো মত খোঁজ খবর নিয়েছেন তো? না মানে কান কথায় শুনলাম মেয়ের বাবা মারা যাওয়ার সাথে সাথে তারা তাদের নারায়ণগঞ্জে এতো সুন্দর দোতলা বাড়ি বিক্রি করে ভাইদের বাসার পাশে ফ্ল্যাট টা কিনে নিয়েছি ছড়া দামে। নারায়ণগঞ্জে খবর টবর নিলেন তো মেয়ে কেমন পরিবারের সবাই কেমন ছিলো। মিসেস রোজিনা তার হাতের কাপড় ভাঁজ দিতে দিতে বললো, না আপা সব খবর জানা আছে। আর উনি তো ইমতিয়াজ ভাইয়ের সেই কতকালের বন্ধু। ইমতিয়াজ ভাই হঠাৎ মারা যাওয়াতে পুরো বাসা উনাদের ফাঁকা হয়ে গেলো বুঝেন তো এত বড় দোতালা বাসা।

উপরের তালা তো পুরো উনারা থাকতো। মানুষ কে কি এখন অতো বিশ্বাস করা যায় এতো বড় মেয়ে আর জুলেখা আপা সাথে যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়? তাই তো বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। উনার ভাইদের সাথে রামপুরা বাড়ি নিলেন আর টাকা গুলো ব্যাংকে রেখে দিলেন। শুনেছি উনার দুটো বোনের মেয়ে উনার সাথে আগে থেকে থাকতো আমাদের বউয়ের বয়সের ওরা নাকি এখনও থাকবে। তার উপরে সবাই অনেক মিশুক যাওয়া আসা চলতে থাকবে। সেই আশাতে তো তিনি মেয়েকে এতো দূরে বিয়ে দিলেন।

মিসেস ইরানি ভারী অবাক গলায় বললো, দূর কোথায় ধানমন্ডি বুঝি দূর!
মিসেস রোজিনা হেঁসে বললো, আরে নেপাল চলে যাবে না সেই কথার ভিত্তিতে বললাম। মিসেস ইরানি কোন রকম নিম্ন স্বরে বললো, ও!
তারপর মিসেস ইরানির হাত চেপে ধরে মিসেস রেোজিনা বললো, আপনি কিছু মনে করবেন না আপা। আমি ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিবো। মেয়ে নাকি ভীষণ শান্ত আমার কথা বুঝবে।

মিসেস রোজিনার এমন কথায় মিসেস ইরানি যেনো আর কথা খুঁজে পেলো না বলার মতো। তিনি প্রাণপণে এটায় চেষ্টা চালাচ্ছিলেন যাতে করে মেয়েটা নেপালে না যাই তার কেনো যেনো কিছু বিপদের ইঙ্গিত লাগছে। মিসেস ইরানি আর কিছু বলার আগে অনিকের গলার আওয়াজ শুনা গেলো। তিনি একটু করে হেঁসে বললো, চলেন আপা আমরা বাইরে যাই আজ বাচ্চা গুলো চলে যাবে ওদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে নিই।
~ মিসেস ইরানি চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে মিসেস রোজিনা মনে মনে বললো, আমি আপনার আর দোয়ার কাল রাতের সব কথাবার্তা শুনেছি। আপনি হয়তো নিজেকে ভালো করার জন্য এটা স্বীকার যাবেন না আপনি মেয়েটির বাবা-মা তুলে কথা বলেছিলেন। যেটা আপনার একদমই অনুচিত ছিলো। কিন্তু এটা আমি আপনাকে বলতেও পারবো না কারণ আমি আপনাকে লজ্জাই ফেলতে চাইনা।

মিসেস ইরানি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে পরলো। তার যে বড়ই রাগ লাগছে। কে এই দোয়া? কি এই মেয়ের আসল পরিচয় তার সীমান্ত সাথে …..
~ এয়ারপোর্টে এসে দোয়া দেখলো তার খালা মামারা আর তার সব ভাইবোনরা এসে হাজির। নেই শুধু তার তার মা। নিদা আর মাহা ভীষণ কান্না করলো। উত্তরে দোয়া তাদের জড়িয়ে বলেছিলো আগের মেকআপ আর শাড়ি গুলো সব রেখে গেলাম। দুইজনে ভাগাভাগি করে নিয়ে নিস। আবার চুল টানাটানি করিস না। আমি নিজে ভাগ করে নাম লিখে দিয়েছি। আর নিনি তোর জন্য আপুর প্রিয় শাড়িটি রেখে এসেছি যেটা তোর ভীষণ প্রিয় ছিলো আর বইগুলোও। নিনি কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বললো, আমাদের মনে রাখবে তো দোয়াপু? দোয়া হাসলো তারপর সবাই কে বিদায় জানিয়ে সামনে দিকে এগিয়ে গেলো। আবারও পিছনে ফিরে মন ভরে সবাই কে দেখলো কি জানি হয়তো এটা তার সবাই সাথে শেষ দেখা। দোয়া বিড়বিড় করে বললো, যে যুদ্ধে আমি নেমেছি ঐ যুদ্ধে যদি সফল হই হয়তো তোমাদের কে সামনাসামনি আর দেখতে পাবো না। কারণ এই মুখ যে আমি আর তোমাদের দেখাতে পারবো না। ভালো থেকোও সবাই।

~ এয়ারপোর্টে এক পাশে দাঁড়িয়ে সীমান্ত কে অনবরত কল দিচ্ছে মিসেস ইরানি তার যে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। কই আছে ছেলেটা! তিনি বিড়বিড় করে বললো, সব ক্রাইমের পর যেমন পুলিশ এসে হানা দেই, তেমনি বিপদ তোর ঘাড়ে উঠে বসলে তুই আমার ফোন ধরবি।


পর্ব

~ বিমানে উঠে ওরা সবাই ডান সারির সিট নিলো। বিমান উঠে দোয়াকে মুটামুটি ভালোই ক্লান্ত লাগছিলো। অনিক দোয়ার ক্লান্ত অসাড় মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি ঠিক আছো? কেমন অস্থির লাগছে তোমাকে। দোয়া অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে বললো, আহ! আমি ঠিক আছি। দোয়া নিজের হাতের মিনারেল ওয়াটার থেকে ঢগঢগ করে পানি খেয়ে নিলো, তারপর ঢাকনা আটকাতে আটকাতে আবারও অনিকের মুখের দিকে তাকালো। অনিক আগের মত মুখভঙ্গি করে দোয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। দোয়া কম্বল আরো একটু জড়িয়ে বললো, আমি কি একটু ঘুমাতে পারি?

অনিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললো, ঘুমাও। এইখানে আমার অনুমতি নেওয়ার কি আছে আশ্চর্য!
দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে বললো, আপনি আমার সম্পর্কে স্বামী হন তার অনুমতি নেওয়া অবশ্যই আমার কতর্ব্য।
অনিক ঠাট্টা সুরে হেঁসে বললো, সিরিয়াসলি! তুমি এই যুগের মেয়ে তো! আর সত্যি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তো! মানে এই যুগের কোন মেয়ের চিন্তা ভাবনা এমন হয়! তাও এতো বড় বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়িও।

দোয়া এক পেশে হেঁসে বললো, সত্যি বিপদ হলো! মেয়ে মানুষের থেকেও কথা পেঁচিয়ে ধরেন আপনি।
অনিক চট করে রেগে গিয়ে কঠোর স্বরে বললো, স্যরি! কি বললে তুমি!
দোয়া জানালা দিয়ে বাইরে মেঘ ভরা আকাশ দেখতে দেখতে বললো, খুবই সাধারণ কথা। আপনার সাথে আমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আপনি অবশ্যই চাইবেন জার্নিতে আমার সঙ্গ। যার কারণে প্রশ্ন টা করেছিলাম। কিন্তু আমি কি আর জানতাম আপনি সাপের মত পেঁচিয়ে ধরবেন!
অনিক আগের মত গলায় তেজ রেখে বললো, এই মেয়ে সমস্যা কি তোমার একবার আমাকে মেয়েদের সাথে তুলনা করছো আবার সাপের সাথে। এতো বড় সাহস তুমি!!!!

আপনি এতো বড় সাহস কই পেলেন আপনার বন্ধুদের সাথে আমার শরীরের বিভিন্ন সাইজ নিয়ে কথা বলার? অনিকের কথা শেষ না হতে দোয়ার কাঠকাঠ প্রশ্ন। অনিক চুপসে গেলো তাকে তখন দেখাচ্ছিলো ফেটে যাওয়া বেলুনের মত। অনিক কোন রকম অস্পষ্ট স্বরে মৃদুস্বরে বললো, আহ! আসলে ওর!
শোধবোধ হয়ে গেলো কাল আপনি আমার ব্যাপারে কথা বললেন আজ আমি। অনিক আবারও কথা শেষ হতে দোয়া বলে উঠলো। দোয়ার দৃষ্টি ছিলো তখন অনিকের ভয়াতুর লজ্জাকাতর চোখের দিকে। অনিক হেঁসে উঠে বললো, হ্যাঁ-হ্যাঁ, শোধবোধ! তুমি ভালোই শোধ করতে পারো।

দোয়া রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো, অবশ্যই এটা মন্দ বলেনি, আমি ভালোই শোধ দিতে পারি। অনিক দোয়ার নাক আদুরে ভাবে টেনে দিলো। দোয়া অনিকের দিকে তাকিয়ে লাস্যময় হাসি দিয়ে তার চুল এলেমেলো করে দিলো। উড়োজাহাজের মত অনিকও যেনো শূন্য আকাশে উড়তে লাগলো। যাক ভালোই হলো মেয়েটা কালকে রাতের ব্যাপার গুলো মজার ছলে নিয়েছে। হঠাৎ অনিক পাশ থেকে কেউ একজনের খু খু করে কাশির আওয়ার শুনা গেলো। অনিক চমকে তাকিয়ে দেখলো নুবা ভ্রু নাচিয়ে হাসছে। দোয়া কে স্বাভাবিক লাগলো যেনো সেই জানতো কেউ একজন এইদিক টা আসছে। নুবা রসিকতা স্বরে বললো, আমি কি আপনাদের গভীর মুহুর্তে নষ্ট করে দিলাম?

অনিক ও একি সুরে বললো, না আমার সুন্দরী বান্ধবী আপনি আমাদের গভীর মুহুর্তে একদমই রোমান্টিক মুহুর্তে নষ্ট করে দিলেন।
নুবা অনিকের মাথায় খাট্টা মেরে বললো, ভালোই হয়েছে এইবার যা বিদায় হও আকাশের কাছে আমি দোয়ার সাথে গল্প করবো।
অনিক অত্যন্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো, যা তো বাল নিজের টার কাছে যা আমাকে শান্তিতে রোমাঞ্চ করতে দে যা ভাগ।
দোয়া অনিকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো, যাও তো কিছুখন বসো আকাশ ভাইয়ার সাথে আমি গল্প করিনি আপুর সাথে।
অনিক নুবার দিকে তাকালো নুবা ফুঁ দিয়ে তার সামনে কাটা চুল উড়ালো। অনিক দোয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, কিছু লাগলে ডাকিও।
দোয়া নিঃশব্দে হ্যা বোধক মাথা দুলালো। নুবা হাই হাই করে বললো, থাক আমাগো বউ পাগলা আপনি চিন্তা করিয়েন না আমি আছি এখানে। অনিক সিট ছেড়ে উঠতে উঠতে বললো, আমারও সময় আসবে দেখিস তখন কি রঙ দেখায়।

কালো আর সাদা রঙ মিক্স করলে কি রঙ ধারন করে দয়া করে সেটা দেখাবে আমার না ভীষন ইচ্ছা। অনিকের কথার প্রেক্ষিতে আবদারের সুরে দোয়া বলে উঠলো। অনিক আর নুবা একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। অনিক আর কিছু বলতে না পেরে গটগটিয়ে চলে গেলো।
অতঃপর নুবা মুখে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে অনিকের সিটে বসে গেলো।
~ কি রে ব্যাটা রোমাঞ্চ শেষ? আকাশ ম্যাগাজিন বই হাতে হাসতে হাসতে বললো, অনিক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, শালা ইতর তুই তোর বউ রে পাঠিয়েছিলি না?

আকাশ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, আর কাম নাই তো! বউ আমার নিজে নিজে গেছে। এমন কথা বলস মনে হয় নুবা আমার কথামতো চলে!
অনিক আগের মতো তেজি গলায় বললো, তাহলে তুই কেমনে জানলি আমার রোমাঞ্চ নষ্ট হয়ছিলো?
আকাশ ঠাট্টা সুরে বললো, তোর হাড়ের মত মুখ দেখে বুঝলাম তোর প্রেম শেষ।

অনিক হঠাৎ কি যেনো ভেবে বললো, জানিস আকাশ দোয়া সব কাজ করার আগে আমার অনুমতি নিয়ে করে, এমনকি একটু আগে ঘুমাতে গিয়েও অনুমতি চাইলো।
আকাশ হামড়া মত মুখ করে বাহানা ধরে বললো, বন্ধু চল চল বউ বদল করি। আমারে তোর বউ টা দিয়ে দে কি কপাল রে তোর!
অনিক গর্বের সাথে হাসলো। সত্যি তার কপাল আজকাল ভালোই যাচ্ছে।

~ নুবার এখনও হাসি থামছে না। পাশের সিট থেকে একজন চোখ রাঙিয়ে ছিলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। তার যেনো হাসি থামছে না। দোয়া নুবা কে উদ্দেশ্য করে বললো, আপু তুমি এক্কেবারে হেঁসে নাও, একটু হেঁসে আবার দম বন্ধ করলে তোমার শরীরের সমস্যা হবে। নুবা মন খারাপ সুরে বললো, এক্কেবারে তো হাসতে পাচ্ছি না আমার হাসির আওয়াজ অনেক বেশী। এর জন্য আকাশ অনেক বকাঝকা করে।
দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে বললো, তাহলে তোমাকে আমি একটা কৌশল জানিয়ে দিই হাসি আটকানোর। নুবা অবাক গলায় বললো, কেমন কৌশল!
দোয়া বললো, দেখো আমরা এমন অনেক পরিস্থিতি তে পড়ি যেখানে আমাদের হাসা টা একদমই অনুচিত কিন্তু আমরা আমাদের হাসি কন্ট্রোল করতে পাচ্ছি না তখন তুমি ঠিক তোমার নাক টা চেপে ধরবে দেখবে কন্ট্রোল হয়ে গেছে। নুবা যেনো এই কথায় ভারী মজা পেলো সেই উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠে বললো, এটা কখনও সম্ভব নাকি? আমি এমন কথা!!

নুবার হাসি বন্ধ হয়ে গেলো কারণ তার নাক চেপে ধরেছে দোয়া। একটুপর নুবার নাক ছেড়ে দিয়ে দোয়া ভ্রু নাচিয়ে বললো, বিশ্বাস হলো?
নুবা হতবাক হয়ে গেলো সত্যি সত্যি তার হাসি কন্ট্রোল হয়ে গেছে। নুবা হা হয়ে বললো, অসাধারণ বুদ্ধি তোমার ওয়াও এটা কীভাবে সম্ভব হলো। কই থেকে পেলো এই দুষ্ট বুদ্ধি। ভারী দুষ্ট তো তুমি!
দোয়া হালকা করে হেঁসে চুপ মেরে গেলো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি সজোরে তাকে ধাক্কা দিয়েছে। নুবা আবারও প্রশ্ন করলো আচ্ছা তুমি কি অনেক ভয় পেয়েছিলে পাসপোর্ট নিয়ে এয়ারপোর্টে সমস্যা হওয়াতে? দোয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো, না তো ভয় কেন পাবো। আমি তো জানতামই সমস্যা হবে কারণ আমার পাসপোর্ট একদমই ফ্রেশ ছিলো তাই তো আমি আমার আরো কিছু ডকুমেন্ট নিয়ে গিয়েছিলাম। নুবা প্রশ্ন চোখে বললো, তুমি কীভাবে জানতে সমস্যা হতে পারে?
দোয়া হাসলো উত্তরে কিছুই বললো, না।

~ বিমানে কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ম্যাগাজিন পড়ছে, কেউ বা গল্প করছে। দীর্ঘ সময় পর নুবা ঘুম থেকে উঠে দেখলো দোয়া মুনাজাত হাতে বসে আছে আর বিড়বিড় করে কি যেনো পড়ছে। নুবা সুন্দর করে আবার বসতে বসতে বললো, কি হলো দোয়া কিসের জন্য মুনাজাত ধরলে?
দোয়া চমকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে বললো, নুবাপু তুমি উঠে গেলে? আমি এই আকাশের মেঘ সরে যাওয়ার জন্য মুনাজাত করছিলাম যদি মেঘ না সরে তাহলে হিমালয় দেখা মিলবে না। নুবা হেঁসে উঠে বললো, তুমি অনেকটা আমাদের সীমান্তের মত ঐ হিমালয় অনেক পছন্দ করে পুরো জার্নিতে ঐ বাইরে তাকিয়ে থাকে। জানো তো সীমান্ত একবার!!!
আচ্ছা আপু তোমরা এমন বুদ্ধিমত্তার সাথে সিট কেমনে পাও? সীমান্তের প্রসঙ্গ বাদলানোর জন্য দোয়া নুবা কে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন করে বসলো। ব্যাপারটা তেমনি হলো নুবা চমৎকার করে হেঁসে বললো, সত্যি সবাই এটাই প্রশ্ন করে আমাাদের আমরা সবাই জানালার পাশে সিট কেমনে পাই!

দোয়া বললো, হ্যাঁ, প্রশ্ন আসতে পারে কারণ তোমরা যদি ১৩-১৪-১৫-১৬-১৭ নাম্বার সারির সিট পাও তাহলে বাইরের আকাশের এই অপরুপ সৌন্দর্য কখনও দেখতে পেতে না। কারণ ঐ সিট গুলো সব পাখার উপরে। নুবা আশ্চর্য জনক ভাবে হেঁসে বললো, আসলে আমরা নেপাল থেকে বাংলাদেশ আাসার পরে টিকেট করি পেলি তাই। কিন্তু জানালার পাশে বা কি লাভ বলো আমাদের একটাও হিমালয় বা আকাশের এই সৌন্দর্য দেখে না ওরা পুরোটা সময় জুড়ে পরে পরে কাতচিত হয়ে ঘুমাই। আগে সীমান্ত ও ঘুমাতো, কিন্তু পরবর্তী সময় হঠাৎ ঐ ও আমার মতো হিমালয় আর আর আকাশের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত হয়ে যেতো। দোয়া স্বাভাবিক গলায় বললো, তাহলে তো এটা অনুচিত কারণ যত টুকু আমি জানি এখন সেপ্টেম্বর সময় পর্যটক দের নেপাল যাওয়ার সময়।

সবাই চাইবে নেপাল যাওয়ার আগে বিমানে বসে বাইরের সৌন্দর্য দেখার। যারা ঘুমাই তারা পাখার সারি গুলো নিলে পারে। কারণ তাদের জন্য অনেক মানুষ এই সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই। নুবা দোয়ার সাথে সহমত গলায় বললো, তুমি একদমই ঠিক বলছো ওদের জন্য অনেক ভ্রমণ প্রিয় মানুষ বাইরের সৌন্দর্য দেখতে পারে না।
~ আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলো একটুপর দেখা মিললো হিমালয়ের। দোয়া অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো হিমালয়ের দিকে সাথে হাসি হাসি মুখে নুবা। দোয়া অস্পষ্ট স্বরে মিন মিন গলায় বললো, আপনি ঠিক বলেছিলেন সীমান্ত ভাইয়া নিজ চোখে এর সৌন্দর্য দেখার মজাই আলাদা।
দোয়ার চোখে পানি চলে আসলো ছোট্ট কাল থেকে তার দেখা স্বপ্ন পূরণ হলো।

নুবা অবাক গলায় হাই হাই করে বললো, ওমা! সেই কি তুমি তো কান্না করছো!
দোয়া চোখের পানি উল্টো হাতে মুছে আবেগের সুরে বললো, বিশ্বাস করো আপু! এই হিমালয়ের সৌন্দর্য দেখার ইচ্ছে আমি সেই ছোট্ট কাল থেকে দেখছি, কিন্তু আজ এতো বছর পর তা পূরণ হলো। এর সৌন্দর্য সত্যি অকল্পনীয়। নুবা হেঁসে দিয়ে আদুরে সুরে বললো,পাগলি মেয়ে। দোয়া আবারও তাকালো জানালার বাইরে তাকে অসাধারণ খুশি ও উৎফুল্ল মানুষ লাগছে। যেনো জীবনে বিরাট কিছু আজ সেই অর্জন করেছে। নুবা হঠাৎ দোয়াকে প্রশ্ন করে বসলো তুমি কি কখনও নেপাল ভ্রমন করেছো নাকি?

দোয়া চোখে পানি নিয়ে হেঁসে দিলো, তারপর দুহাত নাড়িয়ে বললো, না না এমন মোটেও না আজ এক বছর আমি কোথাও ঘুরাঘুরি করিনা।
নুবা চট করে ধরে বসে বললো, তার মানে এক বছর আগে ঘুরতে?

দোয়া চমকে গেলো কিন্তু সেই তার স্বভাব সুলভ ভাবে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো, হ্যাঁ, একটা ভরসা করার মত হাত ছিলো।
নুবা মিষ্টি করে হাসলো সেই কথাতে। দোয়া নজর জানালার বাইরে তাক করলো। পলাশী রোড থেকে শুরু হয়েছিলো এক বুয়েট আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অঘোষিত প্রেমের কাহিনী। সেই মানুষ টি দোয়ার স্পর্শকাতর নরম হাত দুটো কে ধরে ছড়ে বেড়িয়েছিলো পুরো ঢাকা শহর। আস্তে আস্তে দোয়ার চোখে ঘুম নেমে এলো। নুবা দোয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তাকে নিদা আর মাহা এয়ারপোর্টে বলেছিলো। দোয়া জার্নিতে গল্প করার মত সঙ্গী না পেলে অসুস্থ বোধ করে এমনকি বমি ও করে। অনিকের উপরে নুবার বিশ্বাস ছিলো না। দেখা যেতো অনিক বসে বসে ম্যাগাজিন পড়তো আর দোয়া বাথরুম সিট ছুটে বেড়াতো। কারণ অনিক চরম ঘৃণা করে বমি।
~ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এসে থামলো নেপালের সময় তখন দুপুর ১ ঘটিকা। এয়ারপোর্টে থেকে বের হয়ে ওরা আটজন গাড়ি ধরলো চন্দ্রগিরির উদ্দেশ্য। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু।

কাঠমাণ্ডু নেমেই গগণচুম্বি পাহাড় আর সবুজে ঘেরা চারপাশ দেখে দোয়ার মনে পড়ে গেল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের হিমালয়কবিতার দুটি লাইন-
‘তোমার বিশাল ক্রোড়ে লভিতে বিশ্রাম-সুখ; ক্ষুদ্র নর আমি এই আসিয়াছি ছুটিয়া। ’
~ কাঠমান্ডু থেকে দেড় ঘন্টার রাস্তা এই চন্দ্রগিরি শহর। এই শহর টির আরো পর্যটক একটি নাম রয়েছে মেঘ ছোঁয়ার শহর। এই শহর টির মাইল হিসেব করলে কাঠমান্ডু থেকে ১১/১২ মাইল দূরে। এই শহরে বেশীরভাগ সময় কনকনে শীত থাকে। সন্ধ্যার পর এই শীতমাত্রা দিনের পরিমান থেকে আরো একটু বাড়ে। পর্যটক এলাকা হলেও চন্দ্রগিরির রাস্তাঘাট তেমন সুবিধার না ছোট ছোট কণা তে ভর্তি এই শহরের বেশীর ভাগ রাস্তা গুলো।

~ গাড়িতে দোয়া বাদে ওরা সবাই চিৎকার চেচামেচি করে গান গেয়ে ঝড় তুলতে লাগলো। তাদের সাথে মাঝে মাঝে সঙ্গ দিচ্ছে নুবা। কিন্তু সারাটা রাস্তা দোয়া গ্লাস দিয়ে বাইরের কাঠের তৈরী বাড়িগুলো দেখতে লাগলো। দোয়ার শীত শীত লাগলো সেই তার হাত ব্যাগ থেকে শাল বের করে তা গায়ে জড়িয়ে নিলো। হঠাৎ সানজিদা বলে উঠলো দোয়া তুমি কীভাবে জানো এইখানে ঠান্ডা পরবে? বাহঃ শাল ও দেখী হাজির রেখেছো।
সানজিদার প্রশ্ন সাথে সবাই দৃষ্টি দোয়ার দিকে গেলো। কারণ নেপালে আসা যাওয়াতে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাই এইখানের শীত তাদের গায়ে সহনীয় হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ ওরা কেউ শীতের কাপড় নেই নি আর যত টুকু মনে আছে দোয়ার সাথে এই ব্যাপারে কোন কথায় হয়নি। দোয়া সবাই মুখের দিকে তাকিয়ে অনিকে উদ্দেশ্য করে বললো, আমাকে ও বলেছে।

অনিক হামড়া মত হা করে রইলো। সবগুলো রসিকতা সুরে বললো, ওলেবাবা লে আমাদের নতুন বর সাহেব বলেছে! কি প্রেম উনার। সবাই অনিকে কথার দ্বারা অদৃশ্য ল্যাঁ মারতে লাগলো। দোয়ার লজ্জাকাতর চোখের সবাই দিকে তাকালো। যেনো সেই ভারী লজ্জিত এমন কথায়। অনিক দোয়ার আর কাছ ঘেঁষে ফিসফিস গলায় বললো, আমি কখনও তোমাকে বললাম?
দোয়া ভারী অবাক হওয়ার ভান করে বললো, সে কি আমাকে তো কেউ বললো, না ছেলের ভুলার মন রয়েছে!
অনিক এমন ভাব করলো যেনো তার কিছু মনে পরলো তারপর সেই বললো, হ্যাঁ অবশ্যই আমি বলছি, আমি না বললে তুমি কীভাবে জানতা, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি বলছিলাম।

দোয়া রহস্যময় হাসি দিয়ে ডানেবামে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো।
~ দীর্ঘ এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট পর তাদের গাড়ি এসে থামলো একটি কাঠের গেটের সামনে। এই যেনো শুরু হলো দোয়ার চমকপ্রদ হওয়া। লম্বা এই কাঠের তৈরী গেটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে রডোডেনড্রন ফুলের দুটো বিশাল বড় গাছ। যা নেপালের জাতীয় ফুল নামে পরিচিত। এই ফুলের দ্বারা পুরো গেট ছায়াতলে পড়েছে।
এই যেনো কোন স্বর্গ পুরীতে ডুকার পথ। দোয়ার মনে হলো তার গলার মধ্যে কেউ শব্দ বিহীন ছোট ছোট কাচের ঢুকরো ডুকিয়ে দিলো। সেই কি রক্তবিহীন অসহ্য যন্ত্রণা। চাইতে যেনো দোয়া পাচ্ছে না চোখের পানি আনতে। এই গাড়ি যত এগিয়ে যাচ্ছে দোয়ার যন্ত্রণা তত বেশী বেড়ে উঠছে। গাড়িটি এসে থামলো তিন তালা কাঠের তৈরী অসম্ভব মনোমুগ্ধকর একটি বাড়ির সামনে। কিন্তু বাড়িটার দিকে নজর পড়ার আগে দোয়ার নজর চলে গেলো সামনের কৃত্রিম একটি মাঝারি মাপের পুকুরের দিকে। যেইখানে কৃত্রিম পদ্মা ফুল ভেসে আছে সারা পুকুরময়। সাথে ভেসে আছে গাছের গন্ডির রঙে একটি ভাসমান ছোট্ট নৌকা। তারই পাশে ছোট্ট একটি রডোডেনড্রন ফুল গাছ। যার থেকে ঝরে ঝরে কিছু ফুল সেই পুকুরটাকে আরো রঙিন করে তুলেছে।

~ দোয়া যেনো দম নিতে ভুলে গেলো সেই পাথরের চোখে তাকিয়ে রইলো সেই কৃত্রিম পুকুর টার দিকে। এই পুকুরেট মনোমুগ্ধকর রুপ আরো বহুপরিচিত তার। সবাই এক এক করে গাড়ি থেকে নেমে সীমা কে জড়িয়ে ধরতে লাগলো। নুবা দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমাকে স্বাগতম দোয়া তোমার আপন নিজ বাসায়। দোয়া যেনো কোন কথা শুনলো না তার দৃষ্টি এখনও একি জায়গা স্থির। নুবা এইবার গাড়িতে আবার উঠে দোয়া কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো, কি হয়েছে দোয়া গাড়িতে বসবাস করবা নাকি!

দোয়ার এইবার হুস এলো তার মনে হলো সেই এখন পৃথিবীতে প্রস্থান করেছে। এতোখন যা দেখলো সব স্বপ্ন ছিলো। সেই মন প্রানে চাইলো গাড়ি থেকে নেমে তাকে আরো কোন সহ্য না করার মত বাস্তবতা মুখামুখি না হতে হয়। কিন্তু দোয়ার যেনো আজ সব দেখার পালা হলো। প্রকৃতি নিয়তি যেনো আঙ্গুল দিয়ে তাকে দেখাচ্ছে সব। গাড়ি থেকে নেমে কাঠের তৈরী সেই তিনতালা বাসা দেখে দোয়া আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সেই ঢলে পরে যাওয়ার অনিক এক হাতে তাকে জড়িয়ে নিলো তাকে। কিন্তু দোয়ার দৃষ্টি সরলো না সেই বিড়বিড় করে বললো, আমি তোমার থেকে এতোখানি বিশ্বাসঘাতকতা আশা করিনি সীমান্ত ভাইয়া।
কাঠের তৈরী এই বাসাটা সামনে ঝুলে আছে হরেক রকমের বাহারি লতাপাতা ফুল। এই বাড়ির প্রতিটা কারু কাজ! হায় সেই চিরচেনা। হঠাৎ অনিক ব্যস্ত গলায় বললো, তুমি কি বেশী অসুস্থ হয়ে গেছো নাকি!

অনিকের কথার সুরে দোয়া নিজ জগৎ থেকে বের হয়ে অনিকের মুখের দিকে তাকালো। তারপর তার সোজা দৃষ্টি চলে এলো তার পায়ের নিচে ঘাসের কাছে। বাড়ির কারুকাজ দেখতে দোয়া এতো ব্যস্ত ছিলো যে তাকে আশ্চর্য, হতভম্ব, হতবাক চেহেরার কেউ একজন দেখছে তা সেই খেয়ালই করলো না। সেইকি ইচ্ছেকৃত ভাবে তাকে না চেনার না দেখার ভান করলো, সেটি বাসার কাঠের বারান্দায় রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির বোধগম্য হলো না। সেই মানুষ টি যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার মনে হলো তার হৃৎস্পন্দন এখনি বন্ধ হয়ে যাবে আর মুহুর্তের মধ্যে সেই লাশ হয়ে যাবে। সেই লোকটির আরো শক্ত হাতে রেলিঙ ধরলো তার মনে হচ্ছে এখনি সেই হাঁটু খেড়ে বসে যাবে।

~ হুর! তার হুর যাকে সেই পেলে এসেছিলো টিএসসি সেই চিরচেনা পথে। যার জন্য সেই প্রতিটা রাত দগ্ধ হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। সীমান্ত, এই সীমান্ত কি হয়েছে তোর? একটি পরিচিত আওয়াজে সীমান্ত তার গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলো হাসিব দাঁড়িয়ে আছে। হাসিব আবারও জিজ্ঞেস করলো তুই ঠিক আছিস?

সীমান্ত হাসিবের দিকে একটি ঘৃণা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভিতরে ডুকে গেলো। হাসিব কিছু না বুঝে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলো। সাব্বির অশ্লীল মজা ছলে বললো, কি রে সীমা আমাদের হিরো কে কি ধারে কাছে ঘেঁষতে দেস না যে এমন দেবদাস চেহেরা করে ঘুরতাছি। সীমা বিরক্ত গলায় ভেংচি কেটে বললো, এই চেহেরা এই নকশা ঐ আমাকে বিয়ে করার পর থেকে করে রেখেছে। সবাই উচ্চ স্বরে বললো, নুবা জানালো দোয়া অসুস্থ গল্প পরে হবে আগে ভিতরে ডুকা উচিত।
~ সোফায় বসে আছে সবাই। বিভিন্ন গল্পে সবাই মসকুল হয়ে গেলো। তাদের গল্পের মূল কাহিনী হলো দোয়া আর অনিকের বিয়ে। অনিক গিয়ে বসেছে সীমার সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে ফিসফিস করে তর্কে হচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে সবাই সাথে গল্পের আসরে মেতে উঠছে। দোয়া পুরো নিচতালা চোখ বুলিয়ে নিলো। তার আর বুঝতে বাকী নেই উপরে রুম গুলো কেমন হবে। এই একেকটা ডেকোরেশন তার মন আর মস্তিষ্কে অনেক আগে বাঁধা আছে। শুধু মাত্র বাস্তবিক রুপে এইখানে দেখছে। দোয়া হঠাৎ ইইই করে কাঁপতে লাগলো। শীত ভালো মত ঝেকে ধরছে তাকে এখন এক কাপ চা হলো মন্দ হতো না। শরীর টা অতিমাত্রায় ম্যাচম্যাচ করছে।

দোয়া ভাবার দেরী আর তার সামনে ধোঁয়া উঠানো এক কাপ চা হাজির। দোয়া অসম্ভব সুন্দর করে হেঁসে মাথা তুলে তাকানোর আগে থেমে গেলো। এই হাতটি তার চেনা। এই হাত ধরে কত কাল সেই কার্জনে সামনে বসে ছিলো তার হয়তো হিসেব নেই। দোয়া মুখ তুলে তাকালোও না এমন কি চা ও নিলে না সেই ঠাঁই বসে রইলো। হঠাৎ নুবা বলে উঠলো কি দোয়া কফি নাও সীমান্ত বড্ড ভালো কফি বানায়।
দোয়া এইবার হাত বারিয়ে চায়ের কাপ টা নিলো। সীমান্ত এক কাপ কফি হাতে তার জায়গা গিয়ে বসলো কিন্তু তার চোরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে দোয়ার শান্তশিষ্ট মুখের দিকে। সাব্বির বললো, ভাই তুই এতো ভালো কফি কেন করিস বল তো? সবাই সাব্বির সাথে একমত পোষণ করলো। ঠিক তখনি দোয়া বুঝলো তাকে আলাদা ভাবে চা দেওয়া হয়েছে কারণ সীমান্ত জানতো দোয়া কফি কখনও খেতে পারেনা।

~ সীমা এইবার পুরাপুরি লক্ষ্য করলো দোয়াকে। সবাই এই মেয়ের সুনামের বন্যা করে দিয়েছে। কিন্তু এই মেয়ের গায়ের রঙ তার থেকেও চাপা বলতে গেলে ময়লা। সানজিদা ফোনে বলেছিলো তার রুপ হার মানবে এই মেয়ের রুমের কাছে। সীমা সানজিদা কে মনে মনে একটি খিস্তি দিলো। প্রতিযোগিতা কথা আসলে সেই এই মেয়ে থেকে অনেক ধাপ আগে থাকবে সেটা নিশ্চিত। কারণ অত্যন্তের সুন্দরী খাতায় সেই স্কুল কলেজ থেকে প্রথম স্থানে ছিলো। সীমা আরো নিখুঁত ভাবে দোয়া কে দেখতে লাগলো। কিন্তু তার অবচেতন মন তাকে একটি কথা বলে উঠলো এই সত্যি আলাদা রকমের রুপবতী। সীমার রাগ ঈর্ষা দুটোই লাগলো দোয়ার প্রতি।
যে ব্যক্তির অন্তরে অহংকারে পরিপূর্ণ থাকে সেই ব্যক্তি নিজেকে ছাড়া অন্য কেউ কে উপযুক্ত মনে করে না। ব্যাপারটি সীমার ক্ষেত্রের তাই হলো।

~ সীমান্ত আশ্চর্য চোখে চেয়ে আছে দোয়ার দিকে। চঞ্চল অসংখ্য কথা বলা কথাই কথাই অযৌক্তিক তর্ক করা এই মেয়েটি কেমন শান্তশিষ্ট, এক কথায় এক অসাধারণ নারী হয়ে গেছে। সত্যি এই একবছর কি খুবই বেশী সময়! সীমান্তের ভ্রম ভাঙলো হঠাৎ সবাই অনিক আর দোয়ার ফুলশয্যা কথা উঠালো। ঠিক তখনি সীমান্ত কাঠ কাঠ গলায় বলে বসলো এক্সকিউজ মী, আমি একটু আসছি। এটা বলে আর এক সেকেন্ড ও না বসে সীমান্ত কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। দোয়া আয়েশের সাথে চা শেষ করতে লাগলো। সবাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারও আগে টপিকে গল্প করতে লাগলো।
~ হাসিব সীমান্ত কে ডাকতে এসে দেখলো একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছে সীমান্ত। হাসিব ভড়কে গিয়ে সীমান্তের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে বললো, পাগল হলি? মরার জন্য এই ধান্দা করতাছোস?

সীমান্ত আগুন জ্বরা চোখে তেড়ে গিয়ে হাসিবের কলার চেপে ধরলো। হাসিব হতবাক গলায় বললো, কি হয়েছে তোর সীমান্ত!
সীমান্ত হিসহিসিয়ে বললো, তুই বন্ধু নামের কলঙ্ক। তুই কি বলছিলি? আমার হুরের বিয়ে হয়নি? সেই বিয়ে করবে না জানোয়ার জাহিল। এতো বড় মিথ্যা কথা তুই কেমনে বললি?
হাসিব সীমান্ত কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তার কলার থেকে হাত ছাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ- হ্যাঁ আমি জাহিল, জানোয়ার। কারণ আমি আমার বন্ধু কে মরতে দিতে পারবো না।
সীমান্ত স্তব্ধ হয়ে গেলো সেই পিছপা হতে হতে ধড়াম করে দোলনাতে গিয়ে বসে গেলো। তারপর হাসিব কে আশ্চর্য করে দিয়ে হাউমাউ করে বাচ্চা দের মত কাঁদতে লাগলো।

এতোখন অনেক ধৈর্য সেই ধরেছিলো আর যে পাচ্ছে না সেই তার হুর আর অনিক এটা ভাবতে যেনো পুরো শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে তার। হাসিব যেনো নিজে জায়গা তে স্থির হয়ে গেলো। সীমান্ত কাঁদছে! সীমান্ত! হাসিব ছুটে হাঁটু খেড়ে বসে সীমান্ত কে পাশের টেবিল থেকে পানি দিলো। সীমান্ত পানি খেলো না উল্টো কান্নার গতি বারিয়ে দিলো। কাঁদতে কাঁদতে সীমান্ত অস্পষ্ট স্বরে বললো, সব শেষ হয়ে গেলো হাসিব। আমার-আমার হুর আমাকে ছেড়ে চলে গেলো হাসিব। ও-ওকে অন্য কেউ স্পর্শ করবে এখন। অন্যে কেউ ওর উপরে মুগ্ধ হবে। অন্যে কেউ ওর শরীরে!!

সীমান্ত আর বলতে পারলো না চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। হাসিব সীমান্ত কে কি বলবে ভাষা খুঁজে পেলো না। সীমান্ত কে এমন আগুন বিহীন দগ্ধ হতে আজ প্রথম দেখলো হাসিব। এতোটা ভালোবাসতো সীমান্ত মেয়েটিকে কই এক বছর আগে তো এমন পরিস্থিতি হয়নি। হাসিব হতবুদ্ধি হয়ে রইলো।
~ ক্লান্ত চেহেরায় পুরো রুমে চোখ বুলাচ্ছে দোয়া। অনিক উৎফুল্ল গলায় বললো, এটা আমার বেডরুমে, পাশের টা কিচেনরুম আর ঐটা বাথরুম। অসাধারণ না বাসার সিস্টেম টা? দোয়া সেই কথা উত্তর দিলো না সেই অবিশ্বাস্য চোখে দেখতে লাগলো রুম। এতো অপরিষ্কার! রুমটিতে বেশী কিছু নেই একটি বেড পাশে একটি ছোট্ট টেবিল রয়েছে একটি আলমারি আর একটি বিশাল গ্রিল বিহীন জানালা তাতে ঝুলছে একটি নোংরা পর্দা, সাথে রয়েছে ড্রেসিং টেবিল। দোয়া ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস নিয়ে ব্যাগ থেকে জামা বের করে বাথরুমে চলে গেলো।

~ চমৎকার একটি হট শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে দোয়া অসাধারণ ভাবে হেঁসে বললো, এতো কষ্ট তোমার না করলে হতো সীমাপু আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসতাম।
সীমা দাঁড়িয়ে আছে অনিকের মুখামুখি। অনিক আর সীমা ভয়াতুর মুখে বোকার মত দোয়ার মুখের পানে তাকিয়ে একটু খানি হাসলো। সীমা অত্যন্ত চালাকি গলায় বললো, আসলে খাবার বাইরে থেকে অর্ডার করেছিলাম, তোমরা ক্লান্ত তাই নিজে দিতে আসলাম।
দোয়া শান্ত দৃষ্টিতে সীমার পরিহিত কাপড়ের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো, তুমি সত্যি অনেক বেশী অমায়িক আপু।
~ সীমান্ত আচমকা পাগলের মত নিজের চুল ছিঁড়তে লাগলো। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো না না ওকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। আমি তোকে খুন করবো অনিক। আমার হুর কে তুই একদমই স্পর্শ করবি না একদমই না। ঐ আমার হুর শুধু আমার। আর কারও না মানে, আর কারই না।

~ হাসিব সীমান্তর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, কি সমস্যা তোর সীমান্ত? বল কি সমস্যা! কোন মেয়ে জন্য এমন করছিস ভুলে গেলি? ঐ মেয়ের তোর মায়ের সাথে কত দূর্ব্যবহার করেছে তা খেয়ে বসে আছস? ঐ মেয়ে জন্য তোর মা হসপিটাল বেডে পরেছিলো নাকি তাও ভুলে গেলি? আমি জাস্ট ভাবতে পাচ্ছি না সীমান্ত। আমার সম্পর্কে খালামনি হয় তোর মা তাও আমার এতো টা কষ্ট লাগে দেশে গেলে। আন্টি মুঠো ভরা ঔষধ খেতে দেখলে। আর তুই কিনা বেশরমের মত ঐ মেয়ের জন্য নিজেকে মাসের মাস নিজে যন্ত্রণা দিচ্ছিস? হ্যাঁ মানলাম তোর প্রথম ভুল ছিলো মেয়েটার অনুভূতি নিয়ে এইসব ঠিক হয়নি। কিন্তু ওর তো উচিত হয়নি তোর রাগ আন্টির উপরে উঠানো? তোর কি একটু ও শিক্ষা হয়নি এতো কষ্ট কেন পাইতাছোস বল?

সীমান্ত থেমে গেলো সেই কান্না মাখা লাল হয়ে যাওয়া মুখে হাসিবের দিকে দীর্ঘখন তাকিয়ে রইলো। কিন্তু হঠাৎ একটি কান্ড করে বসলো। মৃদু চিৎকার দিয়ে সটাৎ নিজের গায়ের শার্ট ছিঁড়ে ফেললো অতঃপর নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে পাশের টেবিল লাথি মারতে মারতে ভাঙতে লাগলো। হাসিব অসহায় চোখে দাঁড়িয়ে রইলো।
~ হাসি বিড়বিড় করে বললো, আমার ভয় লাগছে সীমান্ত ভীষন বড় ভয়। এমন বড় ধরনের কি পাপ করছিলি তুই? যার জন্য আজ একটি বছর মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছিস!

~ হঠাৎ সীমান্তের চিৎকারে অনিক আর সীমা ভড়কে গেলো। সীমা দ্রুত দৌড় দিলো সাথে অনিক সেই অতি দ্রুততার জন্য নিজের এক পায়ের জুতো পেলে চলে গেলো। সবাই সীমান্ত দরজা সামনে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নেই শুধু দোয়া। হাসিব দরজা লাগিয়ে বাইরে এসে সবাই কে উদ্দেশ্য বললো, ওর মেজাজ এখন ভালো না। সীমা তুই কোন রকমের প্রশ্ন ওকে করবি না এবং এখন রুমে ও যাওয়া দরকার নেই। ওকে আপাতত একা থাকতে দে তোর ঘুমাতে ইচ্ছে হলে নিচের গেস্ট রুমে যা। সীমা হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো তার বুক অস্বাভাবিক কাঁপছে সীমান্ত কেন এতো রেগে গেলো। ও কিছু জেনে গেলো না তো! জানা দরকার কিন্তু কীভাবে!
~ তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি,
ডুবতে রাজি আছি, আমি ডুবতে রাজি আছি॥

সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো,
রেখো না আর, বেঁধো না আর কুলের কাছাকাছি॥

মাঝির লাগি আছি জাগি সকল রাত্রিবেলা,
ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।
ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রুকুটিতে
দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফান পেলে বাঁচি।
অনিক রুমে দরজা সামনে এসে হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। দোয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল শুকাচ্ছে আর মনের আনন্দে রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীত গেয়ে বেড়াচ্ছে। বাসার মধ্যে এতো বড় বাকবিতন্ডায় যেনো ওর কানেও গেলো না। অনিক এগিয়ে এসে আশ্চর্য সুরে বললো, তুমি গান করছো?
দোয়া অনিকের দিকে না তাকিয়ে বললো, না তো রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীত করছি।

অনিক বিরক্ত স্বরে বললো, ঐ একি হলো। আচ্ছা তুমি কি সীমান্ত ঘরে দিকে যাও নি?
দোয়া হেয়ার ড্রাই রাখতে রাখতে বললো, আমি ঐখানে যাওয়ার কোন মানেই নেই। আর উনার সাথে আমার এমন বিশেষ সম্পর্ক নেই যে আমি উনার আসবাবপত্র ভাঙার সময় হাজির হবো।
অনিক অবিশ্বাস্য গলায় বললো, তাই বলে যাবা না? আমরা একি বাসায় থাকি। দোয়া স্বাভাবিক গলায় অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, তো? উনার সামনে আমি হাজির হলে উনিকি চুপ হয়ে যেতো?

অনিক না বোধক মাথা দুলিয়ে বললো, তারপরেও একটা দায়িত্ব!!!
দোয়া সেই কথার উত্তর না দিয়ে অনিকের কথা শেষ না হতে বলে উঠলো কাল আমায় বাজারে নিয়ে যাবে? এই রুমের জন্য কিছু আসবাবপত্র কিনতে হবে।
অনিক কতখন তাজ্জব চোখে তাকিয়ে কোন রকম হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো। দোয়া চোখের ইশারায় বললো, আরো একটা জুতো পরে নেন। অনিক নিজের পায়ের দিকে এইবার হুস এলো। সেই এইবার অতি ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের আরে এক পাটি জুতো খুঁজতে লাগলো। দোয়া খাবারের টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, জুতো খুঁজে খেতে আসো খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
অনিক একটা পর একটা চমক খেতে লাগলো। আসলে তার বাপ কি ধরে বিয়ে দিলো? প্রায় সময় এই মেয়েকে দেখলে গর্ব করতে ইচ্ছে হয় আর প্রায় সময় ভয় লাগে যেনো কোন রহস্যময় মেয়ে এটি!

~ সারারাত সীমান্ত রুম থেকে বের হয়নি। সেই শুনেছে আজ অনিক আর দোয়ার ফুলশয্যা জন্য রুম সাজাচ্ছে সবাই। এর পরে তো তার আর বিন্দু মাত্র ইচ্ছে জাগেনি কারও সাথে কথা বলার। তাও সীমা এসেছিলো এমনকি জিজ্ঞেস করে গিয়েছিলো অনিকের রুম সাজাতে সেই আসবে কিনা? সীমান্ত তখন কঠোর চোখে সীমা দিকে একটি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলো। তাতে সীমা বিরবির করে বকতে বকতে বের হয়ে গেলো। কিন্তু হঠাৎ সীমান্ত ডেকে তাকে অদ্ভুত এক কথা বললো, অনিক আর দোয়ার ফুলশয্যা রুম যেনো রডোডেনড্রন ফুল দিয়ে না সাজানো হয়। পুকুরের পাশের বাগান থেকে ফুল এনে সাজাতে বললো, তখন সীমা জানালো তারা বাজার থেকে ফুল আনবে।

সীমান্ত জানালো আজ বাজার বন্ধ থাকবে। সন্ধ্যা দিকে চন্দ্রগিরি আবহাওয়া ভালো থাকে না। আবার আজ সকাল থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে বাজারে গিয়ে সেই জেনে এসেছে আজ আর বিকালের পর দোকান খুলবে না। সীমা তখন ঠোঁট উলটিয়ে বললো, তাহলে বাগানের ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিই।
সীমান্ত ঠান্ডা গলায় আদেশের সুরে বললো, যা ইচ্ছে করো কিন্তু রডোডেনড্রন ফুল যেনো না দেওয়া হয়। এইসব বাঙালি মেয়েরা এই বিখ্যাত ফুলের মর্ম বুঝবে না। সীমা হাসতে হাসতে বললো, তুমি ঠিক বলেছো। এরা কি বুঝবে!

~ সীমান্ত সিগারেট হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রডোডেনড্রন গাছটির দিকে তাকিয়ে বললো, যে স্বপ্ন তুমি আমায় নিয়ে দেখেছিলে ঐ স্বপ্ন তুমি অন্য কারও সাথে পূরণ করতে পারবে না, কারণ তা আমি হতে দিবো না। সীমান্ত আরো একটা সিগারেট ধরালো। সত্যি আমাদের চোখ আর কপালের সাথে এক অদ্ভুত মিল চোখ তাকেই পছন্দ করলো যে যত চেষ্টার পরেও আমার কপাল ছিলো না।

পর্ব ৪

~ হিমালয় কন্যা নেপালের রূপ-বৈচিত্র্যের যেন কোনো শেষ নেই। পাহাড়-পর্বতে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেপালে পর্যটকদের মুগ্ধ করার জন্য আছে অনেক কিছুই। মাউন্ট এভারেস্ট, শত বছরের পুরনো মন্দির, গগনচুম্বী পর্বতমালা, জলপ্রপাত, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, বিভিন্ন উৎসব কি নেই এখানে।
~ হিমালয়ে কারণে নেপালে প্রায় সময় ভোরের দিকে কুয়াশা ডেকে থাকে। মাঝে মাঝে সূর্য মামা উঁকি দেয় বেশ সকালে। সেটি হয় বাংলাদেশী মানুষ দের জন্য চমৎকার দিন। বাংলাদেশে সবসময় উচ্চ তাপমাত্রা জন্য হঠাৎ হিমালয়ের কনকনে শীত তাদের শরীর নিতে পারেনা। কারণ তখন তাদের ঘুরাঘুরি থেকে অলস সময় শুয়ে বসে কাটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আজকে চন্দ্রগিরি সৌন্দর্য আসলে অন্যে রকম লাগছে সীমান্তের কাছে। সেই দাঁড়িয়ে আছে তার কাঠের বারান্দায় রেলিঙ ঘেঁষে হাতে তার এক কাপ কফি।

~ নিচ তালা থেকে একটি টুল কে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে দোয়া। অনেক কাঠখোট্টা পোড়ানোর পর সেই ঐ টুল টাকে রডোডেনড্রন গাছটির নিচে আনতে সক্ষম হলো। আবার সেই দৌড়ে গেলো বাসার মধ্যে তারপর একটি ফুলঝুরি হাতে ফিরত এলো। রডোডেনড্রন ফুল সবসময় গুচ্ছ বেঁধে থাকে। তাই দোয়া টুল টির উপরে উঠে সেই হাতের নাগালে যা যা পেলো সব গুচ্ছ থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজের ফুল ঝুরিতে রাখতে লাগলো।

~ আজকের চন্দ্রগিরি এতো সৌন্দর্য কেমনে বেড়ে গেলো তা সীমান্ত উদঘাটন করলো এইবার। এই সৌন্দর্যের জন্য সবকিছু এতো মনোমুগ্ধকর লাগছিলো তার কাছে। পরনে বেগুনি রঙের লং কূর্তি, মাথায় ভেজা চুল গুলো ছাড়ানো, গায়ে রয়েছে সবুজ রঙের একটি শাল হাতে ফুলঝুরি। সীমান্ত তাকিয়ে রইলো দীর্ঘখন। আচ্ছা কবি গুরুরা কি কখনও রডোডেনড্রন ফুলের সৌন্দর্য সাথে কোন নারীর সৌন্দর্য তুলনা করে কোন গল্প, কবিতা লিখেছে? না লিখুক তাতে কি! সেই তো হাজার কবিতা, হাজারো গল্প লিখতে পারবে। কারণ রডোডেনড্রন ফুলের সাথে তার হুরের রুপে যে এক বিচিত্র মিল রয়েছে। সীমান্ত ঘোর কাটলো দোয়া একি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে নুবা। সেই ইইই করে কাঁপতে কাঁপতে বললো, দোয়া এই সাত সকালে গাছের তলায় কি করছো?

দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে নিচের দিকে তাকিয়ে বললো, শুভ সকাল আপু।
নুবাও হেঁসে গুড মর্নিং জানিয়ে অবাক গলায় বললো, তুমি রডোডেনড্রন ফুল কেন কুড়াচ্ছো!
দোয়া উৎফুল্ল গলায় বললো, আমি এই ফুল কে রুমে সাজাবো আপু। তাজা ফুলে বেডরুমে দেওয়া হলো পরিবেশ অনেক সুস্থ থাকে।
দোয়া টুল থেকে নামার আগে পুরোটা ফুলঝুরি নিচে পরে গেলো। দোয়া কপালে ছোট্ট চাপড় মারলো। তারপর নিজে টুল থেকে নেমে এলো। নুবা দুঃখিত সুরে বললো, স্যরি আমার জন্য হলো।

দোয়া দুইহান নেড়ে বললো, না না মোটেও এটা তোমার জন্য হয়নি এটা একান্ত আমার দোষ ছিলো।
নুবা চিন্তিত সুরে বললো, কিন্তু তুমি ফুল সাজাবে কীভাবে এটা তো গুচ্ছ ফুল!
দোয়া অসাধারণ ভাবে বললো, মাঝারি একটি পাত্রে পানিয়ে দিয়ে তাতে এই ফুল গুলো ছড়িয়ে দিবো আর ছোট্ট একটি দিয়া মাঝখানে রেখে দিবো।
নুবা চমকপ্রদ গলায় বললো, অসম্ভব সুন্দর হবে একদমই রাজকীয় বলতে গেলে।
দোয়া হেঁসে নিচের ফুল গুলো কুড়াইতে লাগলো সাথে নুবাও।
নুবা জানালো সেইও এইবার থেকে ভোর বেলা ফুল কুড়াইবে আর এইরকম সাজিয়ে রাখবে। দোয়া আশ্বাস ভরা গলায় বললো, অবশ্যই কেনো না আপু তুমি চাইলে আজও করতে পারো।

নুবা হঠাৎ দোয়া কে প্রশ্ন করে বসলো আরো এতো ফুল বাগানে তুমি রডোডেনড্রন ফুল কুড়াচ্ছো কেনো?
দোয়া লজ্জা মাখা মুখে বললো, আমার রডোডেনড্রন ফুল ভীষণ প্রিয় আপু। এই ফুল নিয়ে আমার অনেক চাহিদা।
নুবা হতবুদ্ধি গলায় বললো, কিন্তু যতটুকু আমি জানি এই ফুল হিমালয় জায়গা গুলো জন্ম হয় তাহলে তুমি এই
ফুলের সৌন্দর্যের খোঁজ কই পেলে!
~ দোয়া চমৎকার করে হেঁসে ফুল কুড়ানো বন্ধ করে বললো, আমার বাইরের দেশে গল্প, উপন্যাস পড়ার ভীষণ ঝোঁক রয়েছে। তার থেকে রডোডেনড্রন ফুলের সৌন্দর্যের কথা পেয়েছি।

~ দার্জিলিঙ-কাঞ্চনজঙ্ঘায় ভ্রমণ স্মৃতিতে রডোডেনড্রনের রঙিন উচ্ছ্বাস অনেককেই নস্টালজিক করে।
রডোডেনড্রন ফুল নিয়ে যাদের জিজ্ঞেস করেছি অনেক মানুষ অনেক মন্তব্য করে
তার মধ্যে যে মন্তব্য আমার মস্তিষ্ক নাড়া দিয়েছিলো স্মৃতি ও অতীত ঝাপসা হলেও ঔজ্জ্বল্য হারায় না বহুবর্ণা ও বহু বাহারের প্রেমমথিত রডোডেনড্রন গুচ্ছ।
তুমি জানো আপু শুধু বাইরের দেশের ইংরেজি গল্প, উপন্যাস এই সৌন্দর্য ব্যাখ্যা না আমাদের বাংলার বিখ্যাত কবি গুরুরা ও এর সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর ব্যাখ্যা দিয়েছে তাদের গল্প, কবিতাতে। যেমন রবীন্দ্রনাথ এ ফুলের যথার্থ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অপরূপ করে রেখেছেন উনার শেষের কবিতা’য় উদ্ধৃত পঙক্তিকে।

সেই লাইনটি আমার এখনও কানে ভাজে
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে অরুণকিরণে তুচ্ছ/উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ।
এমন কি অমিত রয় আর কেটি মিত্তিরের আল্ট্রা-মর্ডান প্রেমের পরশ জাগিয়ে দিয়ে রডোডেনড্রন এখনও অনেকের মধ্যে নিয়ে আসে হারানো প্রেমের স্মৃতিকাতর আকুতি।

~ নুবা এক গাল হা করে দাঁড়িয়ে রইলো দোয়ার মুখের তাকিয়ে তাকে দেখলে মনে হবে সেই কোন সামান্য মেয়ে না স্বয়ং অসাধারণ এক নারী সাথে কথা বলছে। নুবা দুই হাত দুই গালে দিয়ে বললো, এই আমি কি শুনছি! দোয়া তুমি সাধারণ ছাত্রী তো নাকি কোন লেকচারর! এতো সাংস্কৃতিক বাংলা কথা তোমার কেমনে মনে থাকে!
দোয়া মুখ হাত দিয়ে হেঁসে দিলো তাকে দেখাচ্ছিলো ভারী লজ্জাবতীর মত। নুবা এখনও তার আশ্চর্য সীমা থেকে বের হয়নি সেই এক হাত বুকে রেখে বললো, আমার মনে হয় তুমি বাংলাতে অসাধারণ লেকচার হবা। দোয়া মন খারাপ সুরে বললো, কিন্তু আমি তো ইংরেজি উপরে পড়ছি আপু্। সেকেন্ড মধ্যে দোয়া আর নুবা তাদের কর্মে হেঁসে দিলো।

~ দোয়া হাসতে হাসতে বললো, তুমি জানো না শুধু আমি না ব্যক্তি মানুষের মতো সামাজিক মানবমণ্ডলীও রডোডেনড্রনের প্রেমে মগ্ন। নেপালের জাতীয় ফুল আর সিকিমের রাষ্ট্রীয় ফুলের জায়গাটি তাই রডোডেনড্রন ছাড়া অন্য কোনও পুষ্পই দখল করতে পারেনি। নুবা হতবাক গলায় বললো, সেকি এই ফুল গাছটি নেপালের জাতীয় ফুল! আমি তো জানতামই না। আমি ভেবেছি দেখতে সুন্দর বলে সীমান্ত লাগিয়েছে। দোয়া রহস্যময় হাসি দিলো।
তারপর প্রসঙ্গে বদলানোর জন্য বললো, হ্যাঁ এটি নেপালের জাতীয় ফুল। ইরান, মধ্য এশিয়া এবং বিশ্বের কোনও কোনও দেশে যেমন গোলাপ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাদৃত এবং উৎসব মুখরিত হয়, রডোডেনড্রনও তেমনিভাবে পূর্ব হিমালয়ান অঞ্চলের লোকসমাজে সমাদৃত ও উদযাপিত হয়।
নুবা অবাক গলায় বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের দেশেও তো হয়।
দোয়া অসম্ভব সুন্দর করে হেঁসে বললো, আপু আমার না সিকিমে যাওয়ার ভীষণ শখ। আর এই শখ নতুন নতুন পালাতাছি। নুবা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা সুরে বললো, কেনো!

দোয়া বললো, চলো হাঁটতে হাঁটতে বলি ফুল কুড়ানো শেষ। নুবা সহমত হলো।
~ দোয়া বললো, প্রতি বসন্তে সিকিমে আয়োজিত হয় ‘রডোডেনড্রন উৎসব’। উৎসবে সমবেত হয় বৃহত্তর হিমালয়ান জনগোষ্ঠী। সঙ্গে থাকে শত শত রঙ, বাহার ও প্রজাতির রডোডেনড্রন। পুষ্পালোকের সেই লনন্দন-কাননে ভিড় জমায় বিশ্বের হাজার হাজার পযটক।
নুবা হতবাক গলায় বললো,
ফুলকে ভালোবেসে এমন আয়োজন ও সমারোহ পৃথিবীতে আর কয়টি হতে পেরেছে সত্যি আমার জানা নেই।

দোয়া বললো, হচ্ছে তো চীনে ও বিশ্বের উদ্যানে উদ্যানে রডোডেনড্রনকে কেন্দ্র করে। চীনে রয়েছে শতাধিক মাইল বিস্তৃৃত রডোডেনড্রন উদ্যান।
নুবা বললো, আমাদের কয়েকবার সীমান্ত বলেছিলো বাণিজ্য, রাজনীতি, যোগাযোগ, সামরিক চিৎকারের সমকালীন বিশ্বায়নের পাশেই সংস্কৃতি ও প্রকৃতির মেলবন্ধন রচনা করার অপরাজেয় শক্তি ‘বিশ্বায়নের আদি দূত রডোডেনড্রন’ ছাড়া আর কে দেখাতে পেরেছে বল!
আমরা তো তখন হাসতে হাসতে ওরে বললাম ভাইরে ভাই একটা ফুল গাছ নিয়ে এতো বড় ব্যাখ্যা! কিন্তু এখন তোমার মুখ শুনে বুঝলাম সত্যি অসাধারণ এই ফুল। দোয়া হসালো। নুবা হঠাৎ বলে বসলো তুমি অনেকটা সীমান্ত মতো জানো তো।
দোয়া হাসি ধরে রেখো বললো, ও আচ্ছা।

~ সীমান্ত, সীমান্ত, ঐ ব্যাটা সীমান্ত। সীমান্ত মনে হলো কেউ একজন ওকে ঢাকছে সীমান্ত এইবার নিজের ঘোর থেকে বের হলো। এতোখন সীমান্ত মুগ্ধ নয়নে তার হুরের কথা শুনছিলো এই একি কথা গুলো তাকেও বলতে কান জ্বালাপোড়া করে দিতো। কিন্তু তাও সীমান্ত মুগ্ধ নয়নে শুনতো আজও তার ব্যতিক্রম হলো না, উল্টো আজ যেনো মুগ্ধতা কয়েকগুন বেড়ে গেছে।
~ আজ একটি বছর পর সেই আবারও আগের মত তার হুরের চঞ্চল রুপ দেখলো তা হয়তো রডোডেনড্রন ফুলের জন্য। তার হুরের কথা তে সেই এতো মগ্ন ছিলো যে নিচ থেকে নুবা ঢাকতে ঢাকতে গলায় ফাটিয়ে ফেলছে তা তার খবর রইলো না।

~ সীমান্ত নুবার দিকে তাকিয়ে বললো, গুড মর্নিং নুবা।
নুবা আদুরে সুরে বললো, তুই ঠিক আছিস?
সীমান্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, হ্যাঁ আমি একদমই স্বাভাবিক আছি।
হঠাৎ দোয়া কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো, ওকে গুড মর্নিং জানাও এই হলো সীমান্ত কাল অবশ্যই পরিচয় হয়েছিলো হয়তো।
হঠাৎ নুবা কি মনে করে আসছি বলে ভিতরে চলে গেলো।

~ দোয়া এইবার চোখ তুলে তাকালো উপরে সীমান্তের বারান্দায়। তারপর চমৎকার আওয়াজ তুলে বললো, শুভ সকাল সীমান্ত ভাইয়া!
সীমান্ত যেনো নিজ জায়গায় স্থির হয়ে গেলো। ভোরের সকালের সিগ্ধ আলোয় কুয়াশা মাখা এই হালকা রৌদ্রময় ছোঁয়াই শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে তারই হুর। এইখানে আসার দীর্ঘ -দীর্ঘ ১৯ ঘন্টা পর তার হুর তার দিকে দৃষ্টি দিলো। এটা যেনো কালকে সারাদিন সরারাতের আগুনবিহীন দগ্ধ হওয়া যন্ত্রণায় কাতরানো শরীরটাতে নিমেষে ঠান্ডা ভালোবাসার ছোঁয়া বিলিয়ে গেলো তার।

~ সীমান্ত চমৎকার হাসি দিয়ে বললো, তোমাকেও শুভ সকাল।
এই হাসি, এটি সেই হাসি যে হাসি তে প্রতিটা সেকেন্ড শেষ হতো দোয়া। সীমান্ত, দোয়ার দৃষ্টি বিনিময় হলো দীর্ঘখন। হঠাৎ দোয়া যেনো কি হলো সেই ছুটে ভিতরে ডুকে গেলো।
~ নুবা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলো। হঠাৎ দোয়া ছুটে আসা দেখে নিচে নেমে এসে হয়রান গলায় বললো, কি হয়েছে দোয়া ছুটে এলে যে?
দোয়া বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলো। তার চোখ মুখ নুবার কাছে অন্য রকম ঠেকালো। নুবা দোয়ার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললো, তুমি ঠিক আছো দোয়া? নাকি অসুস্থ বোধ করছো?

দোয়া চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে দারুণ করে হেঁসে বললো, আমি ঠিক আছে আপু। কিন্তু তুমি দৌড়ে চলে এলে যে যাচ্ছো কই?
নুবা লজ্জা মাখা মুখে বললো, আমি শাওয়ারে যাচ্ছিলাম। দোয়া রসিকতা স্বরে বললো, যত টুকু আমি জানি কাল হয়তো এই বাসায় দোয়া আর অনিকের ফুলশয্যা হয়েছিলো। নুবা হাই হাই করে দোয়ার মুখ চেপে ধরে বললো, কি বেশরম মেয়েগো তুমি! বড্ডা ফাজিল!
দোয়া নুবার হাত সরিয়ে উচ্ছাস ভরা গলায় হাসতে হাসতে চোখ মেরে বললো, আমি বেশরম সেটা তো তুমি কালই জানলে, বেশরম না হলে কি নিজের ফুলশয্যা জন্য তোমার কাছে রডোডেনড্রন ফুলের আবদার করতাম নাকি!
নুবা মুখে হাত দিয়ে উচ্চ স্বরে হেঁসে দিলো। তারপর চটজলদি বললো, সবাই ঘুম থেকে উঠতে ঘন্টা দুই বাকি আমি একটা হট শাওয়ার নিয়ে নিই আসি। দোয়া নিঃশব্দে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো। নুবা উপরে চলে গেলো।

~ দোয়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার আগে কেউ একজন দোয়ার এক হাতের কনুই টান দিয়ে সিঁড়ির নিচে নিয়ে আসলো। দোয়া ভয়ে যেনো পাথর হয়ে গেলো। সেই চিৎকার দেওয়ার যেনো সুযোগ টুকু পেলো না তার আগে তার মুখ চেপে ধরা হয়ে গিয়েছিলো। দোয়ার মুখের উপরে কারও গভীর নিঃশ্বাস পড়ছে। দোয়ার মনে হলো এই স্পর্শ, এই নিঃশ্বাসের শব্দ তার বহু আগের চেনা।
~ দোয়া চট করে চোখ খুলে মানুষটিকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে, আবারও ছুটে যাওয়ার আগে মানুষ টি আবারও তাকে সজোরে টান দিয়ে কাছে নিয়ে এলো। দোয়া এইবার দৃঢ় মুখে সীমান্তের ঘৃণাভরা দৃষ্টির দিকে তাকালো।

~ অনিক একটা অধম ছিলো। বুয়েটের পড়লে সবাই চমৎকার চাকরি করে এই ধারণা করো না, অনিকে আমি এইখানে এনেছি এবং আমি চাকরি টা দিয়েছি, কাঠ কাঠ গলায় বললো, সীমান্ত।
~ দোয়া এইবার দৃষ্টি স্বাভাবিক করে শান্ত কন্ঠে বললো, আমাকে এই কাহিনী শুনানোর কারণ?
সীমান্ত দোয়া কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তার থেকে দূরে সরিয়ে বললো, তুমি আমার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে আমার এমন বন্ধু সাথে কবুল বললো, যে আমার কথাতে চাকরি পেয়েছে। যার একটা চাকরি পাওয়ার যোগ্য ছিলো না।

~ দোয়া সীমান্ত কথায় কোন প্রতিবাদ করলো এমনকি উত্তর ও দিলো না সেই তার নিচে পরে যাওয়া ফুলঝুরি কে
উদ্দেশ্য করে বললো, বড্ড বেয়াদবি করছো তুমি, এতো বার পরে পরে আমার কাজ কেন বারিয়ে দিচ্ছো!
এরপর সেই নিচে তার পড়ে যাওয়া ফুল ঝুরিতে রাখতে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
~ এতে সীমান্ত রাগ যেনো সাত আসমানে পৌঁছালো। তার কথার উত্তর না দিয়ে ফুলঝুরি সাথে কথা বলছে! এতোটা অহংকার! তাও তার সাথে!
~ সীমান্ত হিসহিসিয়ে বললো, আসলে আমার আশ্চর্য হওয়া উচিত না, তোমার এমন কাজে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ অনেক বদলে যাই, হয়তো তুমি বেহায়া হয়ে গেছো।

~ দোয়া তার সব ফুল উঠিয়ে সীমান্তের প্রতি একটি শান্ত দৃষ্টি বিনিময় করে এক পা আগানোর আগে সীমান্ত দোয়ার ফুলঝুরি দিকে তাকিয়ে তেলেবেগুনে জ্বলে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, তুমি পারো বটে, স্বপ্ন দেখো এক পুরুষের সাথে আর বাসর করো আরেক পুরুষের সাথে তাও একি ফুল দিয়ে!
~ দোয়া এইবার পিছনে ফিরে সীমান্তের উদ্দেশ্য একটি মুচকি হাসি দিয়ে বললো, আপনি মাত্রাতিরিক্ত ভালো। ভালো মানুষ রা সবসময় সত্যি বলে। আপনি সত্যি বলছেন। হ্যাঁ আমি হলাম বিষাক্ত বেশরম। এতো টাই বেশরম গ্রিনিজবুকেও বেশরমের তালিকাতে আমার নাম পাবেন।
~ সীমান্ত রাগে ক্ষোপে অপমানে এক পেশে হেঁসে বললো, বাহঃ! কি সুন্দর স্বীকার খাচ্ছো। সত্যি! আমার এখন নিজের অনুভূতির উপরে ঘৃণা হচ্ছে। তোমার জন্য আমি ভিতরে ভিতরে এতোটা দগ্ধ হচ্ছিলাম। তোমার জন্য! হুদাই নিজের অনুভূতিকে নষ্ট দিয়েছিলাম।

~ সীমান্ত কে হতবাক করে দিয়ে দোয়া একটি কান্ড করে বসলো সেই। সেই আকষ্মিকভাবে দ্রুত এসে সীমান্ত শার্টের উপরের বোতম গুলো খুলতে লাগলো। সীমান্ত প্রথম এতো টা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলো যে বুঝতে একটু সময় নিলো দোয়া কি করতে চাচ্ছে ততখনে দোয়া তিনটা বোতম খোলা শেষ। সীমান্ত দ্রুততার সাথে দোয়ার দুই হাত চেপে ধরে তার বোতম গলা থেকে আটকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো, মানষিক সমস্যা দেখা দিয়েছে! কি করতে ধরছো তুমি এটা! ব্রেন কি বাংলাদেশে রেখে এসেছো?

দোয়া হঠাৎ কাঁদো কাঁদো ভাব করে বললো, আপনি তো বললেন দগ্ধ হচ্ছেন কত জ্বলে গেলো বুক তা দেখতে চাচ্ছিলাম।
তারপর সীমান্তের খালি বুকটা দিকে তাকিয়ে এক পেশে হেঁসে সীমান্তের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে তিরস্কার সুরে বললো, ইশ জ্বলে-পুড়ে একদমই ছারখার হয়ে গেছে। আহারে! চমড়া ঝুলে পড়েছে একদমই।

একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আর এক সেকেন্ড ও না দাঁড়িয়ে নিচ থেকে তার ফুলঝুরি আর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো দোয়া।
~ দোয়া সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ছিলো। নুবা নিচে নেমে এলো। দোয়া রসিকতা সুরে বললো, শাওয়ার শেষ বাহঃ!
নুবা লজ্জামাখা মুখে বললো, ধ্যাত বড্ড দুষ্ট তুমি। দোয়া হাসতে হাসতে নিচ তলার কিচেনে ডুকে গেলো। নুবা ম্যাগাজিন রেখে এগিয়ে এলো দোয়ার কাছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোয়া আর নুবা বিভিন্ন গল্পে মসকুল হলো।
~ সানজিদা কম্বল মুড়ে হাসিবের বুকে লেপ্টে ঘুমাচ্ছে। এক হাত দিয়ে সানজিদা কে জড়িয়ে অন্য হাত দিয়ে কপালের উপরে রেখে বন্ধ পাখার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাসিব। কাল রাত বেশীখন ঘুমাতে পারিনি সেই। একটু পর পর ঘুমটা অদৃশ্য এক কারণে ছুটে যাচ্ছে। একটি অপরাধ বোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে সারাটা সময়। দেশের যাওয়ার পরের দিন হাসিব এক বিশাল রহস্য উদঘাটন করেছিলো।

~ এক বছর আগে মিসেস ইরানি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়নি। সেটা ছিলো একটি ছলনা। মিসেস ইরানি কে সেই দেখছিলো ভিটামিন বোতল থেকে ঔষধ আরো একটি বোতলে ডুকাতে। সেটি আর অন্য বোতল না হসপিটাল থেকে হৃদরোগে ঔষধ বলে যে বোতল টি মিসেস ইরানি এনেছিলো ঠিক সেটি। এক বছর আগে এই মিথ্যা নাটক কেন করলো তার কারণ মিসেস ইরানি কে জিজ্ঞেস করেছিলো উত্তরে তিনি বলেছিলো সেটি নাটক না হৃদরোগে আক্রান্ত তিনি সত্যি সত্যি হয়েছিলো। ঔষধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাতে তিনি চুপ মেরে গেলেন এমন কি হাসিব যখন জিজ্ঞেস করেছিলো এক বছর আগে মাদুয়া উনাকে কিছুই বলেনি সেটা মিথ্যা রটনা ছিলো তখনও তিনি চুপ ছিলেন।

~ হাসিব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মিনমিন গলায় বললো, তোর হুর খারাপ ছিলো না সীমান্ত। তোর কপাল খারাপ ছিলো। নাহলে কি তোর মায়ের কথার ঝালে এইভাবে ফেসে যেতি। এতো দিন আমিও ঐ মেয়েকে ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু এইবার বাংলাদেশে গিয়ে সব পরিস্কার হয়ে গেলো। আন্টি ছলনা করেছে তোর সাথে আমাদের সবাই সাথে।

~ হাসিব কি যেনো চিন্তা করলো তারপর বললো, হয়তো নিয়তি চেয়েছিলো তুই তোর হুর কে পাবিনা। হয়তো বা একটি নিষ্পাপ মেয়ের অনুভূতি নিয়ে খেলার শাস্তি স্বরূপ তোকে দায়িত্ব হিসেবে সীমা কে আর কষ্ট হিসেবে হুরকে দূরে সরে দিয়েছে। একটি মেয়েকে কষ্ট দেওয়ার কর্মফল হয়তো এটা। আমি বার বার বিনা অপরাধী মেয়েটাকে তোর সামনে ছোট করি। শুধু মাত্র তুই যাতে কষ্ট না পাস। কিন্তু তাও এতো যন্ত্রণা! এতো কেন ভালোবাসলি মেয়েটাকে কেন!
~ নুবা গাছ থেকে আনা আপেল কেটে রেখে দম নেওয়ার আগে শুনা গেলো আকাশ নুবাকে অসম্ভব ডাকাডাকি করছে। দোয়া ইশারায় যেতে বললো, নুবা তড়িঘড়ি করে উপরে উঠে গেলো। এতো কেন ডাকছে এই ছেলে আজব!

~ কেকের জন্য ময়দা চালুনি দ্বারা পরিষ্কার করছিলো দোয়া। ফলস্বরূপ দুইহাত ময়দার গুঁড়োতে ভরে গেলো। বার বার উল্টো হাতে সামনের চুল গুলো সরিয়ে দিচ্ছে সেই, কিন্তু এই চুল গুলো নিজের কর্তার কথা যেনো শুনছে না। উল্টো চট করে একটু আগে করা হাত খোঁপা টা ঝরঝর করে খুলে পরলো কোমর সমান। দোয়া অত্যন্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো, ওহো আচ্ছা বিপদ হলো তো! দোয়া হাত পরিষ্কার করার জন্য পিছনে ফিরার আগে সেই চিরচেনা স্পর্শ। কপাল ছুঁয়ে সামনে চুল গুলো পিছনে টেনে আনলো সেই হাত দুটো। মানুষ টি দোয়ার কাছ ঘেঁষে অসাধারণ ভাবে হাত খোঁপা টা করে দিতে লাগলো। দোয়া অভিভূত হয়ে গেলো। সেই দ্রুততার সাথে পিছনে ফিরে সরে দাঁড়িয়ে সীমান্তের দিকে একটি অগ্নিশর্মা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, আসলে দোষ টা আপনার না। ভালোবাসায় ঘাটতি পড়েছে তো তাই।

বেচারী কি করবে বলুন? কত জন্য কে আদরের ভাগ দেওয়া যাই!
সীমান্ত অদ্ভুত এক অবাক করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দোয়ার দিকে, তারপর কেন রকম বললো, হুর আমি তো তোমাকে…!!!!
আর একটা কথাও না, দোয়া আঙ্গুল উঠিয়ে সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে গমগম গলায় বললো, তারপর দ্রুত গতিতে সিঁড়ির দিকে যেতে ধরলো।
সীমান্ত সীটবলে ক্যাবিনেটে হাত দ্বারা ভারী মারলে।

কেন সেই নিজের অনুভূতি দমিয়ে রাখতে পাচ্ছে না। কেন সেই নিজের পুরানো অভ্যাস নতুন করে জাগিয়ে তুলছে। সীমান্ত ভারী লজ্জিত হলো নিজের কাজে। সেই কি খেয়ে বসে আছে ওর হুর আর ওর হুর নেই তার বন্ধুর স্ত্রী! সীমান্ত লজ্জায় নিজের চুল ছিঁড়তে লাগলো। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার আগে দোয়া দেখলো হাসিব দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়িতে। দোয়া এক নজর হাসিবের দিকে তাকিয়ে ছুটে উপরে চলে গেলো।
~ হাসিব যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেইখান থেকে কিচেন রুপ স্পষ্ট দেখা যাই। হাসিব দাঁড়িয়ে রইলো বিনৎ অদ্ভুত চোখে। তাকে দেখে মনে হয়েছিলো এতো খন তার চোখের সামনে যে দৃশ্য ছিলো তা কেয়ামতের আগে ধাপ।

হাসিব সিঁড়ির রেলিঙ ধরে ফেললো। তার পা কাঁপছে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এটা কি করে হলো? এটা কি করে সম্ভব! হাসিব সীমান্তের লজ্জাকর মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, নিয়তি এটা কি খেলা শুরু করলো! মাদুয়া-হুর-দোয়া! একজনই!
~ বারান্দায় কাঠের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সীমান্ত পাশে রয়েছে হাসিব। তাদের দুজনের দৃষ্টি দূরের পাহাড়ের দিকে। তুই কি ভুলে গেলি মাদুয়া ওরপে দোয়া এখন আর তোর না সেই তোর বন্ধু স্ত্রী!
সীমান্ত চুপ রইলো।

~ হাসিব সীমান্তের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো, আমি মানছি সীমান্ত দোয়া কে সামনে দেখার পর তুই তোর অনুভূতি কাবু করতে পারিস নি। বাট একটি বার ভাব ঐখানে যদি আমি না থেকে অন্য কেউ থাকতো! মনে কর অনিক থাকতো! সেই তোকে কিন্তু কিছুই বলতো না কারণ তোর কারণে এই এখানে। অন্য কেউ হয়তো তোকে কিছুই বলবে না। কিন্তু সবাই আঙ্গুল উঠবে দোয়ার দিকে।

ওদের পারিবারিক বিয়ে একসাথে দুজনে এখনও ৪৮ ঘন্টাও এক সাথে থাকেনি। সেইখানে এতো বড় ঘটনার পর ঐ মরে গেলেও দোয়ার সাথে সংসার করবে না। আর সীমা তো আছে চিৎকার চেচামেচি করে অশ্লীল গালি দিয়ে পরিস্থিতি খারাপের থেকেও খারাপ করে দিবে। তুই জানস সীমা তোর জন্য কি ধরনের পাগলামি গুলো করে। তাহলে কেন এমন করছিস!
~ আমি জানি না আমি কি করেছি, আমি কোন কারণে চিন্তা নিয়ে ওর কাছে যাই নিই, আমি ওকে সাহায্য করছিলাম ঐ কাজ করতে কষ্টকর হচ্ছিলো দৃষ্টি সামনের রেখে সীমান্ত হাসিবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ হাসিব আকাশ থেকে পরে হতবুদ্ধি গলায় বললো, তুই সাহায্য করেছিলি তাও এইভাবে! সীমান্ত তুই যেটা করছিলি ঐটা একজন স্বামী দায়িত্ব হয়। বা অন্য কোন মহিলার। অন্য কোন পুরুষের না।

~ সীমান্ত ধম ধরে রইলো যেনো কোন মহান কিছু সেই ভাবছে।
~ হাসিব সীমান্ত কে বিনতি সুরে বললো, দেখ সীমান্ত বাচ্চা মেয়েটার সংসার বরবাদ করিস না। আর একটা কথা মনে রাখিস তুই দোয়ার দিকে যত বার নজর বুলাবি সীমা কে ততটা ধোঁকা দিবি। সীমা তোকে পাগলের মত ভালোবাসে ওর বিশ্বাস আর ভাঙিস না। এমনেতে এক বছর আগে অনেক তামাশা হয়ে গিয়েছিলো। আর না। কোন প্রশ্ন তোর দোয়াকে করা দরকার নেই, নেই কোন কৈফিয়ত চাওয়া। যা বলছি বুঝছস তুই!
~ সীমান্ত বুঝদার বাচ্চাদের মত হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো। যার অর্থ হলো হাসিবের প্রতিটা বাক্য পাই পাই করে সেই মেনে চলবে। হাসিব প্রশান্তির হাসি দিয়ে বললো, চল নাস্তা করতি চল। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়া বলছে আজ সেই ভালো ভালো খাবার পাবো। চল, চল। সীমান্ত জানালো সেই আসছে। হাসিব সামনে হাঁটা ধরলো।

~ আমি তোমাকে কখনও বদনাম হতে দিবো না হুর। কিন্তু তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে হুর। কৈফিয়ত বাদে তুমি এই সীমান্ত থেকে ছাড়া পাচ্ছো না। জাহান্নামে যাক পুরো দুনিয়া। আমার কৈফিয়ত চাই হুর। চাই-মানে-তো-চাই। আর সেটা জন্য আমাকে কি-কি করতে হবে তা আমার স্পষ্ট জানা আছে, ঘৃণা ভরা দৃষ্টি দিয়ে গড়গড় গলায় বলে উঠলো সীমান্ত।
~ নিচতলার যৌথ ডাইনিং টেবিলে বসে ঝিমাচ্ছে আকাশ। হাসিব বিরক্ত সুরে বললো, আকাশ আর এক বার টেবিলে বসো ঝিমাইবি বা নাক ডাকবি লাথি মারি বাইরে রাখি আসমু।

আকাশ ঠোঁট উলটিয়ে আবারও টেবিলে মাথা দিয়ে ঝিমাইতে লাগলো। সীমান্ত গুরুগম্ভীর ভাবে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে। অনিক বসে বসে মোবাইল খাটাখাটি করছে। হঠাৎ সাব্বির চারিদিকে নজর বুলিয়ে অনিকে পা দ্বারা লাথি মেরে দৃষ্টি আকর্ষন করে বললো, ঐ ব্যাটা কাল রাত কি কি হইলো ক জলদি। অনিক ভ্রু নাচিয়ে বললো, কি জানতে চাস? সাব্বির হিহিহি করে চাপা স্বরে হেঁসে বললো, মানে তোর বউ ভার্জিন তো নাকি আগেভাগে!!!
মেয়েরা সবাই কিছুদূরে রান্না ঘরে সবকিছু ঠিকঠাক করছে আর গল্প তে মেতে উঠছে তাই টেবিলের এই অশ্লীল গল্প তাদের কানে এলো না। কিন্তু পুরো টেবিলের প্রতিটা ব্যক্তির কানের তা আসছিলো।

আকাশের ঝিমানো বন্ধ হয়ে গেলো সেই চোখ বড় বড় করে আগ্রহ চোখে অনিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। হাসিব কে তখন দেখাচ্ছিলো সবচেয়ে অসহায় কারণ সাব্বির যে এখন কিছু উত্তম মধ্যম খাবে তা কোন সন্দেহ নেই। অনিক এক গাল হেঁসে রসিয়ে রসিয়ে মাত্র বলতে লাগলো। হঠাৎ সীমান্ত কাঠ কাঠ গলায় বললো, আচ্ছা আমরা এই চারজন বিয়ে করার পরে কখনও কেউ কে জিজ্ঞেস করেছি যে তোদের বউগুলো ভার্জিন কিনা!
~ সাব্বির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, জিজ্ঞেস করার কি আছে আমরা এক ক্যাম্পাসে পড়ছি আমরা জানি কে কেমন!
~ সীমান্ত হঠাৎ ভেটকি দেওয়ার সুরে সাব্বির কে উদ্দেশ্য করে বললো, আচ্ছা! তাহলে মেহের জানে তুই যে জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটির একটা মেয়ে সাথে দুইরাত কাটিয়ে এসেছিলি!

আর আকাশ নুবা জানে তার সাথে প্রথম রুম ডেট করে এসে তুই বলেছিলি ভাই মাইয়া মনে হয় খাওয়া রে! কিন্তু পরবর্তী তে কি বের হলো নুবা একটি পবিত্র মন আর শরীরের মেয়ে ছিলো যা প্রথম তোরে বিলিয়ে দিয়েছিলো।
~ সাব্বির আর আকাশ হতভম্ব হয়ে গেলো তাদের রক্তশূণ্য দেখালো। সীমান্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, আসলে তোরা নিজেরা ভার্জিন নেই তো তাই সবাইরে এক রকম লাগে। যদি মন থেকে পবিত্র থাকতি তাহলে সবাইকে পবিত্র লাগতো।

~ আকাশ আর সাব্বির নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। লজ্জাতে যেনো তাদের মাথা কেটে যেতে ধরলো। সীমান্ত এমন ধারালো জবাব দিবে তাদের জানা ছিলো না।
~ সীমান্ত অনিকের চোরা চোখের দিকে তাকালো। ঠিক সেই সময় সীমান্তের সাথে অনিকের দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেলো। সীমান্ত শুধু ঠান্ডা গলায় বললো, নিজের স্ত্রী কে সম্মান করে শিখ নিজের দায়িত্ব কে বুঝে নিতে শিখ। তোর স্ত্রী নিয়ে একটি কথা বলা মানে তোর সম্মান নিয়ে কথা বলা।
~ সবগুলো মেয়ে এক এক করে খাবার আনতে লাগলো। খাবার খেতে খেতে সবাই নুবা আর দোয়ার প্রশংসার পঞ্চমুখ হলো। কিন্তু সীমান্ত চুপ করে শুধু একটু হেঁসে বলেছিলো হ্যাঁ সত্যি ভালোই হয়েছে।

~ সীমান্ত বাধে সবাই জন্য চকলেট কেক তৈরী করা হয়েছে। আকাশ আর সাব্বির জন্মগত ভাবে চরম বেয়াড়া। বিশেষ কোন কথা ছাড়া এদের গায়ে লাগে না। এইবারও তেমনটা হলো। তারা এতোখনে সব ভুলে কেক বিভিন্ন রকমের মজাদার নাস্তা খাওয়ার জন্য খাম খাম করতে লাগলো।
~ হঠাৎ নুবা সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললো, তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে। সীমান্ত পুডিং এক চামচ মুখে দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো, কি!
নুবা হঠাৎ তার পাশের একটি প্লেটের ঢাকনা উল্টালো। বাদাম, কিচমিচ, তেজপাতা, সুজি, চিনি, মহিষের দুধ ( নেপালে সবসময় গরুর দুধ পাওয়া যাই না) সুজি রান্না করে পরে তা একটি পাত্রে রেখে ওভেনে রেখে দেওয়া হয়েছে অতঃপর তা বের করে উপরে আবারও কাজু বাদাম দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত কে দেখালো তখন আশ্চর্য রকমের খুশি।

সেই হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে নুবার দিকে। নুবা রহস্যময় হাসলো। সীমান্ত সাথে সাথে পুডিং রেখে সুজির কেক নিয়ে বসলো। কেকের উপরে কাজু বাদাম দেখে সীমান্তের বুক টা দক করে উঠলো সেই আঁড়চোখে দোয়ার মুখের দিকে তাকালো। দোয়া নীরবে পুডিং দিয়ে পরোটা খাচ্ছে। সীমান্ত এক চামচ মুখের দেওয়া পর অনেক কষ্ট পেট পর্যন্ত চালান করে ধীর গলায় নুবা কে উদ্দেশ্য করে বললো, তোর-তোর রান্না তো এমন না নুবা! কেমন অচেনা লাগছে!
নুবা দুষ্ট হেঁসে বললো, আজ আমি না দোয়া করেছে ও আবদার করলো তাই না করতে পারিনি কেমন হয়েছে রে?
সীমান্ত হাসবে নাকি কাঁদবে তার বোধগম্য হলো না। নুবা জিজ্ঞেস এক গাল হেঁসে বললো, কেমন হয়েছে রে স্বাদ টা তোর মন মতো হলো!
সীমান্ত একটি অবিশ্বাস্য ভরা হাসি দিয়ে বললো, নারায়ণগঞ্জের যে রেস্টুরেন্ট থেকে এই সুজির কেক খাওয়া উৎপত্তি ঠিক ঐ স্বাদ টা।

~ দোয়ার খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। সেই খু খু করে কাশতে লাগলো। সানজিদা দোয়া কে পানি এগিয়ে দিলো। দোয়া তা একটুখানি খেলো। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মজাদার স্মৃতি তার মনে পরে গেলো। সবাই দোয়াকে বাহ বাহ দিতে লাগলো। সাব্বির চকলেট কেক খেতে খেতে বললো, সীমান্ত একটু রাখিস তো যেহারে মাথা খেতি কয়দিন পর পর নারায়ণগঞ্জে সুজি খেয়ে এসে। কখনও তো যাওয়াই হয়নি আজ এই স্বাদ টুকু খেয়ে দেখবো। সাথে তাল মিলালো আকাশ আর অনিক। সানজিদা মেহের দুই পিচ করে আলরেডি নিয়ে নিলো। শুধু সীমাকে বিরক্ত দেখালো। যেনো এই টেবিলের সবাই উপরে সেই মহাবিরক্ত কেন সবাই এই দোয়া, দোয়া করছে তার মাথায় খেলছে না।

~ সীমান্ত সুজির কেকের সৌন্দর্য দেখে বুঝে ফেলছিলো এটার বানানোর পিছনে কার হাত। সীমান্ত একটি উজ্জ্বল হাসি দিয়ে দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, ধন্যবাদ।
দোয়া চোখ তুলে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে বললো, কোন ব্যাপার না।
~ হাসিব চোরা চোখে এই দিক ঐদিক তাকাচ্ছে। তার তার নজর এইবার স্থির হলো দোয়ার দিকে। সেই সীমান্ত কে হালকা পাতলা বুঝতে পারলেও এই মেয়েকে বুঝতে পাচ্ছে না। এই মেয়ে ভালোবাসার জন্য আজ সীমান্ত এতো বদলে গেলো। কিন্তু সীমান্ত কে চোখের সামনে দেখে ঐ এতো স্বাভাবিক ঘরসংসার কেমনে করছে তার মাথায় ঠুকছে না। তার উপরে আজ সকালে সীমান্ত সাথে এমন আচরণ আর এখন দেখছে সীমান্ত জন্য সেই নিজে আবদার করে কেক বানাচ্ছে, আসলে মেয়েটা চাই কি!
~ দোয়া চায়ে চুমুক দিচ্ছে বেশ আর্ট করে প্রথম ফুঁ দিচ্ছে তারপর আবারও এক চুমুক খাচ্ছে। সীমা পাউরুটি তে জেলি লাগাতে লাগাতে এক গাঢ় দৃষ্টি দিয়ে দোয়া কে পর্যবেক্ষণ করছে। এই মেয়ের এতো আর্ট করে চা খাওয়ার কি আছে! সেই বুঝতাছে না। সীমা অদৃশ্য ভেংচি কাটলো।

~ হঠাৎ সেই সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললো, এইরকম হেবি খাবার তুমি সকালে কেন খাচ্ছো আর কেমন বাদামে ভর্তি। কি যে খাও ভেড়াদের মত।
~ সীমান্ত কিছু না বলে খেতে লাগলো। এমন কি সেই সীমার দিকে তাকালোও না।
~ টেবিল সবাই ভ্রু কুঁচকে সীমার দিকে তাকালো। সীমান্ত কেক থেকে নজর তুলে দোয়ার দিকে তাকালো উত্তরের আশায়। সেই জানে দোয়া উত্তর দিবে। কিন্তু সবাই কে অবাক করে দিয়ে দোয়া চমৎকার করে হেঁসে আবারও নিজের চা খাওয়াতে মন দিলো। তার হাতের চা তার কাছে সবচাইতে প্রিয়। তাই আপাতত চা টা খাওয়া যাক উত্তর পরে দেওয়া যাবে।

~ টেবিলের সবাই একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এটা কি হলো! মেহের মুখ চিপে হেঁসে উঠলো। বেচারি সীমা কে কেউ পাত্তাই দিলো না। সীমা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে কফি হাতে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।
~ সীমান্ত কেউ না দেখার মত হালকা হেঁসে চুপচাপ খেতে লাগলো। এই মেয়ের চুপচাপ প্রতিবাদ যে এতো মজাদার তা সীমান্তের জানা ছিলো না। সীমান্ত মিনমিন গলায় বললো, সুজি নিয়ে কথা বলাতে টিএসসি তে কি ধোঁয়া টা না থাকে দিয়েছিলো তার হুর।
~ নুবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অনিকে উদ্দেশ্য করে একটি কথা বলে উঠলো। তার কথার প্রেক্ষিতে দোয়া উত্তরে সীমান্ত খাওয়া বন্ধ করে হয়ে গেলো।

পর্ব ৫

~ নেপালের সময় যখন ১০ঃ৩০। বাংলাদেশের সময় তখন ১০ঃ১৫। বাংলাদেশ আর নেপালের মধ্যে ১৫ মিনিটের পার্থক্য রয়েছে।
~ মিসেস ইরানি পায়ের উপরে পা তুলে কফিতে এক চুমুক দিয়ে তার সামনে বসা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললো, তো মি. ইমরুল আপনি যেটা বলছেন সেটা কি সত্যি!
মি. ইমরুল বিশ্বাস ভরা গলায় বললো, অবশ্যই আমি যে টা বলছি ঐটা সত্যি ম্যাডাম। আমি তো আর এমনে এমনে এই বাড়ি কিনবো না সব খবরাখবর নিয়ে কিনেছি।

মিসেস ইরানি কফির কাপ টা টেবিলে রেখে বললো, তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন মেয়ের চারিত্রিক সমস্যা রয়েছে?
মি. ইমরুল হাত নাড়িয়ে বললো, এক্কেবারে ঠিক বলছেন একদমই সমস্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিবাহিতা ছেলের সাথে নাকি কি লটরপটর করছে।
মিসেস ইরানি ভ্রু কুঁচকে বললো, বিশ্বিবদ্যালয়ের খবর এলাকাতে কেমনে এলো!
মি. ইমরুল ঠোঁট উলটিয়ে বললো, ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের এখানে অনেক ছেলে মেয়ে নাকি পড়তো তারাই বলছিলো।

মিসেস ইরানি গুরুগম্ভীর গলায় বললো, আমি শুনেছি বাবা টা হঠাৎ মারা যাওয়াতে ওরা বাড়ি বিক্রি করে অন্যথায় চলে গিয়েছিলো।
মি. ইমরুল হাই হাই করে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললো, কি যে বলেন ম্যাডাম। বাবা কি এমনে এমনে মরছে নাকি! মেয়ের এতো বদনাম হয়েছিলে ঘর থেকে বের হতে পারতো না বেচারা। ছিঃ ছিঃ করতো সবাই। একদিন শুনলাম বাসায় কি নিয়ে তর্কবির্তক হয়েছিলো মেয়ের সাথে ঠিক তখনি স্টক করছিলো।
মিসেস ইরানি একটু নড়েচড়ে বসলো এই কাহিনী এতো পরিচিত কেন লাগছে!
তিনি পায়ের উপর থেকে পা নামিয়ে সোজা হয় বসলো। যেনো তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনার জন্য।
মি. ইমরুল রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলো।

শুনেছি মেয়ের নানার চরিত্র ভালো ছিলো না। সেই সুবাধে জুলেখা সহ তার কোন ভাইবোনের বিয়ে হতো না। তারা সবাই প্রেম করে করে উঠে চললো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো জুলেখার সাথে। কার তার কোন প্রেমিক ছিলো না। তার উপরে বাপের চরিত্র দোষ। জুলেখা তো ইমতিয়াজ থেকে তিন বছরের বড় ছিলো। কোথাও বিয়ে হচ্ছিলো না। পড়ালেখা শেষ করে বাড়িতে বসে ছিলো ঠিক তখনি ইমতিয়াজ নাকি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলো কার দ্বারাই। পরে অনেক ঝামেলার পর বিয়ে হয়। ইমতিয়াজের পরিবার নাকি রাজি ছিলে না। কেমনে হবে বলুন কে বা চাইবো বয়স্ক বদনাম বাপের মেয়েকে বিয়ে করাতে! নানার মতো হয়েছে বুঝলেন ম্যাডাম চরিত্র ভালো না। আমার তো মনে হয় জুলেখার ও ভালো ছিলো না খারাপের ঘর থেকে খারাপই বের হয়।

~ মিসেস ইরানি কে মনে হয় কেউ বৈদ্যুতিক শক দিলো এক বছর আগে ঘটনা টি মনে হয় শাঁ করে তার সামনে এসে হাজির হলো। তিনি কোন রকম কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, একটু পানি হবে! পানি!
~ মি. ইমরুল দ্রুত পায়ে পানি আনলো। মিসেস ইরানি তা পুরোটুকু শেষ করে একটি ভয়াতুর নিঃশ্বাস ছাড়লো। এই কি বিপদ হলো! কি হচ্ছে নেপালে! তিনি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো।

~ মি. ইমরুল চিন্তিত গলায় বললো, আপনি ঠিক আছেন ম্যাডাম!
মিসেস ইরানি আশ্বাস ভরা হাসি দিয়ে বললো, হ্যাঁ হঠাৎ খারাপ লেগেছিলো এখন একদমই ঠিক আছি।
~ মি. ইমরুল হঠাৎ প্রশ্ন চোখে বললো, ম্যাডাম কি আপনার ছেলে কে বিয়ে করানোর জন্য এই মেয়ের খোঁজ খবর নিলেন!
~ মিসেস ইরানি মুহুর্তে চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। ঘৃনায় তার মুখ তেতো হয়ে গেলো। কাঠ কাঠ গলায় তিনি বললো, এমন নিম্ন শ্রেণির পরিবারের মেয়েকে আমি আমার ধারে কাছেও আসতে দিই না। সেইখানে আমার ছেলের বউ হিসেবে তো হাস্যকর। এই সব পরিবারের মেয়েদের সাথে কিছুদিন মনোরঞ্জন করা যাই, ফূর্তি করা যায় কিন্তু সংসার না। কারণ বিয়ের বাজার সবসময় বরাবরই সাথে হয়।

~ মি. ইমরুল হিহিহি করে হেঁসে বললো, ঠিক বলছেন ম্যাডাম ঠিক বলছেন। কোথায় আপনার উঠাবসা মন্ত্রীদের সাথে আর সাহেব (সীমান্তের বাবা) থাকে এই দেশ ঐদেশ ভ্রমণে আর সেইখানে একটি ছোট্ট পদে সরকারি চাকরিজীবী মেয়ের সাথে বিয়ে তাও দুনিয়ার বদনাম!
মি. ইমরুল নিজের গালে চাপড় মেরে বললো, তওবা তওবা! নাউজুবিল্লাহ! এইসব মুখে কি চিন্তা ভাবনা করাও লজ্জার।
মিসেস ইরানি তার চতুর হাসিটা দিয়ে মাথার উপরের সানগ্লাস চোখে পরে মি. ইমরুল কে উদ্দেশ্য করে বললো, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে এতো প্রয়োজনীয় সংবাদ দেওয়ার জন্য।

মি. ইমরুল তার পান খাওয়া দাঁতে হেসে চামচা গিরি গলায় বললো, না ম্যাডাম আপনার মতো এতো উঁচু পদের মানুষকে সাহায্য করে আমি নিজে ধন্য।
~ মিসেস ইরানি বাড়ি থেকে বের হয়ে তার গাড়িতে উঠার আগে মি. ইমরুল দৌড়ে এলেন তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন ম্যাডাম ম্যাডাম মেয়েটির নাম মনে পড়েছে। নাম মাদুয়া কিন্তু এলাকার অনেক মানুষ দোয়া বলে ডাকতো।
মিসেস ইরানি মুচকি হেঁসে বললেন আমার ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে আরো এক বছর আগে মি. ইমরুল। তারপর মি. ইমরুল কে উদ্দেশ্য করে, ভালো থাকবেন বলে, গাড়িতে উঠে শাঁ করে বাড়ির গেট দিয়ে বের হয়ে গেলো।

মি. ইমরুল বোকার মত মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তাহলে উনি মেয়েটার এতো খবর নেওয়ার দরকার বা কি ছিলো!
~ সীমার হঠাৎ নেচে-কুঁদে উঠে যাওয়াতে খাবার টেবিলের সবাই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো। যে যার ভিতরকার চিন্তায় ডুব দিলো। নুবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অনিকে উদ্দেশ্য করে বললো, শুন অনিক দোয়া নাকি অন্ধকার ভয় পাই, বউয়ের খেয়াল রাখিস বুঝলি?
অনিক ডানেবামে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো আপাতত সেই অন্য চিন্তায় মগ্ন।
~ দোয়া সান্ত্বনা সুরে বললো, না নুবাপু আমি এখন ভয় পাই না, তোমাকে যেটা বলেছি, সেটা অনেক আগের ব্যাপার। নুবা প্রশ্নের চোখে বললো, ধুর পাগলি ভয় কখনও কাটে নাকি! আর ছোট বেলার ভয় তো মোটেও না। কারণ সেই ভয় টা আমাদের একটি ঘটনার জন্য মস্তিষ্কে নাড়া দেই যার জন্য এটা মাঝে মাঝে চিরস্থায়ী হয়।

~ দোয়া শান্ত গলায় বললো, হয়তো কাটে হয়তো কাটে না আপু। কিন্তু আমি নিজেকে অনেক বদলে নিয়েছি। এক বছর আগের কোন দূর্বলতা এখন আমার মধ্যে বিদ্যমান নেই।
~ সীমান্ত চুপচাপ কফি খাচ্ছিলো। দোয়ার কথার প্রেক্ষিতে চট করে তার কফি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। সেই স্বাভাবিক চোখে দোয়ার মুখের দিকে তাকালো। দোয়া তাকিয়ে আছে নুবার মুখের দিকে। সীমান্ত নিভলো, সেই আবারও কফিতে মনোযোগ দিলো। কথাটা যে তাকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে সেটা সেই হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে।

~ নুবা হেঁসে বললো, তার মানে আমাদের দোয়া অকুতোভয় হয়ে গেছে তাকে আর কোন ভয় কাবু করতে পারবে না। দোয়া হেঁসে দিলো।
~ সীমান্ত চোরা চোখে তা দেখলো বারবারই। হাসিব চুপচাপ সুজির কেক খাচ্ছে। আর সানজিদা সাথে এটাসেটা তাল মিলিয়ে কথা বলছে। কিন্তু তার চোরা নজর আর একটি কান সর্বদা সীমান্ত আর দোয়ার দিকে তাক করা।

~ দোয়ার হঠাৎ সীমান্তের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। দোয়া নজর ফিরালো না সেই তাকিয়ে রইলো। কারণ সীমান্ত তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। দোয়ার ডানেবামে মাথা দুলিয়ে একটি ছোট্ট দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চকলেট কেকে কামড় বসালো। যার অর্থ হলো, এই হাসি সেই এড়িয়ে যেতে চাই এই হাসি তাকে বার বার একটি কথা বলে আমি নিষ্পাপ দোয়া আমি নিষ্পাপ।
~ আমি তো বলছি আমাকে না জানিয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেলছিলো। বিশ্বাস কর আমি বিয়ে করতে চাইনি। না না আগের কথা অনুযায়ী হবে সব। তুই যা বলবি তাই হবে। আমি তো বাবাকেও বলছি আমার আগে ক্যারি!!
অনিকের কথা বন্ধ হয়ে গেলো সেই পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলো ওয়াশরুম দরজা দোয়া দাঁড়িয়ে আছে। সেই এতোখনে খেয়ালই করলো না দোয়া ওয়াশরুম তৈরী হচ্ছে। অনিক দোয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আল্লাহ হাফেজ বলে ফোন টা রেখে দিলো।

~ দোয়া প্রথম চোখ মুখ শক্ত ছিলো পরমুহূর্তে মুচকি হেঁসে বললো, সবাই তো তৈরী হয়ে গেছে মনে হয়, চলুন না কাঠমান্ডু যেতে তো ঘন্টা দুয়েক লাগবে। অনিক ফোন রেখে ভিতরে ভিতরে একটি নিঃশ্বাস নিলো যা হক মেয়েটার কানে কিছু পৌঁছায় নেই। অনিক প্রফুল্লচিত্তে হাসি দিয়ে বললো, হঠাৎ শাড়ি পরলে যে!
~ দোয়া আয়নার সামনে এসে তার কপালে ছোট্ট টিপ টা বসিয়ে একটি ছাইরঙা শাল গায়ে পরে বললো, ইচ্ছার উপরে আর কোন হঠাৎ হয়না।
অনিক কিছু না বুঝে কাঁধ ঝাঁকালো তারপর দুজনে নিচে নেমে এলো।

~ নিচে এসে সবাই ধারালো প্রশংসা তলে পরতে হলো দোয়াকে। প্রতিত্তোরে দোয়া লজ্জাকাতর চোখে সবাইকে ধন্যবাদ জানালো।
সানজিদা বললো, তুমি শাড়ি পরে কাঠমান্ডু ঘুরতে পারবে তো? না মানে অনেক হাটাহাটি হবে তাই। দোয়া উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বললো, আমার অভ্যাস আছে আপু।

সানজিদা হাসলো।
~ দোয়া আঁড়চোখে চারিদিকে তাকালো যেনো কেউকে খুঁজছে। নুবা প্রশ্ন চোখে বললো, কেউকে খুঁজছো দোয়া!
দোয়া যেনো ভয়ে ফেলো সেই কথায় এমন ভাব নিলো, তারপর সেই কোন রকম না বোধক ডানেবামে মাথা দুলালো।
নুবা হালকা করে হেঁসে আবারও দোয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। কারণ দোয়া এখনও যেনো কেউকে খুঁজছে। নুবা খেয়াল করলো এইখানে সবাই আছে শুধুমাত্র! সীমান্ত!

~ দোয়া নুবার দিকে তাকিয়ে বললো,, আপু আমি কয়েকটা ছবি তুলিনি বাইরে থেকে তোমরা ঠিক করে নাও কই কই ঘুরবা। নুবা নীরবে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো।
~ দোয়া শাড়ির কুঁচি ধরে বাইরে গিয়ে রডোডেনড্রন গাছটির একটি ছবি তুললো। তারপর পুরোটা বাসা প্রতিটা জায়গার কিছু ছবি তুলে নিলো।
~ হঠাৎ দোয়ার মনে হলো কিছু পরিচিত জিনিসের ডাক। দোয়া শুকনো ঢোগ গিললো। সেই ভয়াতুর মুখ পিছনে ফিরে দেখলো কৃত্রিম নৌকাটিতে সাত থেকে আটটি হাঁস বসে আছে। দোয়া যেনো সেইখানে পাথর হয়ে গেলো।

~ চিৎকার দেওয়ার বোধটুকু যেনো ওর এলো না। সেই চারিদিকে তাকাতে লাগলো কাঁদো কাঁদো মুখে। কিন্তু তাকে সাহায্য করার মত কেউকে দেখতে পেলো না।
~ সেই হাঁস গুলো হঠাৎ উড়ে এসে দোয়ার সামনে চলে আসলো। দোয়া এইবার পুরো চন্দ্রগিরি অর্ধেক জায়গা জুড়ে এক চিৎকার দিয়ে উঠলো। তাতে হাঁস গুলো আরো ভড়কে গেলো। দোয়া এইবার উপায় না পেয়ে রশ্মি, পুতুলআপু, রভিন, সীমান্ত ভাইয়া আমাকে বাঁচা, ও আল্লাহ গো।
~ দোয়া তার শাড়ির কুঁচি ধরে পাগলের মত পুরো বাগান জুড়ে দৌড়াতে লাগলো। তার গায়ের শাল নিচে পরে গেলো। দোয়ার সাথে হাঁস গুলোও জোড়া বেঁধে দৌড়াতে লাগলো।

~ দোয়ার চিৎকারে সবাই বের হয়ে হতবাক হয়ে গেলো। কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না। কারণ দূর থেকে সীমান্ত না করলো। আকাশ বললো, আমরা এগিয়ে গেলে হয়তো হাঁস গুলো উড়াউড়ি শুরু করতে পারে এরা কিন্তু একধরনের পাখি! পরিস্থিতি খারাপ হবে তাহলে। দেখছিস না কেমনে ঘাবড়ে গেছে ঐ। অনিক এক গাল হা করে দোয়াকে দেখতে লাগলো।

~ সীমান্ত বাগানের ঠিক শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনে খুশিতে সিগারেট টানছে। যেনো আজকের মতো সুখময় দিন তার আর এক বছরে লাগেনি। আজ সেই প্রমান করবে দোয়ার সব দর্বলতা এখনো বিদ্যমান এমনকি সীমান্ত নামক দূর্বলতা ও।

~ দোয়া চিৎকার চেচামেচি করে এলোপাতাড়ি দিশেহারা হয়ে ছুটে সীমান্তের গায়ে ঝাঁপিয়ে পরলো। সীমান্ত যেনো এমন একটি পরিস্থিতি জন্য প্রস্তুত ছিলো না, তার হাত থেকে সিগারেট মাটিতে পরে গেলো। দোয়া কাঁপছে ভয়ে আর সীমান্ত কাঁপছে এক অজানা অনুভূতির ঢলে। তার যেনো হৃদপিণ্ডের ধকধক স্বর তুলে বাইরে এসে লাফিয়ে পড়বে। এক অজানা অনুভূতির সংমিশ্রণে সেই যেনো ভাসমান মানুষ হয়ে গেলো।
~ আবারও ডেকে উঠলো হাঁসগুলো। দোয়া সীমান্ত বুক থেকে লাফিয়ে সরে তার পিছনে লুকিয়ে তার এক হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বললো, ওরে আমাকে খেয়ে ফেলবে সীমান্ত ভাইয়া! বাঁচাও আমায়, আল্লাহ দেখো, দেখো এইদিক আসছে, ও আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।
দোয়া মুটামুটি সীমান্ত জড়িয়ে ধরা হাত টানাহ্যাঁচড়া শুরু করলো।

~ সীমান্ত স্তব্ধ অবস্থা থেকে বের হলো। সেই কোন রকম ভাঙা ভাঙা গলায় দোয়াকে আশ্বাস ভরা কন্ঠে বললো, কিছু হবে না, তুমি শান্ত হও হুর।
দোয়া সীমান্ত পিঠে আগের অভ্যাস অনুযায়ী হালকা চাপড় মেরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, আপনি ভীষণ খারাপ একটা লোক, আমাকে শান্তনা না দিয়ে ওদের ভাগিয়ে দিন, ওরা আমায় খেয়ে ফেলবে, আপনি কেন বুঝছেন না! দোয়া নিজের হাত পা নাচিয়ে বলতে লাগলো। সীমান্ত মুচকি হাসলো তারপর হঠাৎ একটি লোক ছুটে এসে নেপালী ভাষায় দুঃখিত বলে তার হাঁস গুলো নিয়ে চলে গেলো।
~ দোয়া এখনও সীমান্ত পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাতে মাথা রেখে হু হু করে কাঁপছে। হাঁস গুলো দারুচিনি রঙের বিশাল আকারের হাঁস ছিলো তাই দোয়ার ভয়ের মাত্রা বেড়ে গেলো।

~ সীমান্ত দোয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ধীর গলায় বললো, চলে গেছে হাঁস আর কোন ভয় নেই।
দোয়া জড়োসড়ো হয়ে ঘাসের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে লাগলো।
হঠাৎ সীমান্ত দুষ্ট হেঁসে বললো, ও তাহলে এটাকে বদলানোর নমুনা বলে!
~ দোয়া প্রথমে কিছু না বুঝে সীমান্তের মুখের দিকে তাকালো। তারপর সীমান্ত চেহেরার ভাবভঙ্গি দেখে যখন বুঝলো এইসব কারসাজি সীমান্তের, ততখনে সবাই এইদিকে চলে এসেছিলো।

~ সীমান্ত তার শার্ট ঠিক করতে করতে ভারী ব্যস্ত গলায় বললো, একদমই কুঁচকে গেলো শার্টটা। আহারে!
আর এইগুলো তো সাধারণ হাঁস ছিলো
এরা যুগল বেঁধে থাকে। কত সুন্দর মরিচা রঙের হাঁস নামটাও তো কত সুন্দর চখাচখি। আর এমন হাঁস তুমি ভয় পেলে!
সীমান্ত ভারী বিষ্ময় হওয়ার ভান করে দোয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,

দোয়া শুধু একটি তাকিয়ে রইলো সীমান্তের দিকে। তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না এমন একটি কাজ সীমান্ত করলো তাও মজার ছলে!
সবাই হাসাহাসি করতে লাগলো। অনিক মস্করা গলায় বললো, তুমি হাঁস কে এতো ভয় পাও! আল্লাহ!
সাব্বির হিহিহি করে হেঁসে বললো, বেচারি যেভাবো কান্না করছিলো আমাকে খেয়ে ফেলবে, আমাকে খেয়ে নিবে। যেনো বাঘ ভাল্লুক ঐটা।
সানজিদা আর মেহের ও হাসতে লাগলো কিন্তু সীমা কে তখন দেখালো হুতুমপেঁচার মত।

নুবা দোয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে গালে হাত রেখে বললো, তুমি ঠিক আছো দোয়া? আসলে আমি এতোটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম বুঝে উঠতে পারিনি এই পরিস্থিতি কি করবো। হয়তো আমরা এগিয়ে আসলে হাঁস গুলো আরো হল্লা করতো আর তুমি আরো ভয় পেয়ে যেতে। দোয়া হেঁচকি তুলে নিজেকে শান্ত করে বললো, আ-আমি ঠিক আছি আপু।

নুবা বললো, চলো আজ কাঠমান্ডু যেতে হবে না তুমি রুমে গিয়ে বিশ্রাম করো।
দোয়া তৎক্ষনিক জোর গলায় বললো, তার কোন দরকার নেই আপু আমরা আজই যাবো।
নুবা ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস নিয়ে বললো, তাহলে কিছুখন বসে রেস্ট করো আমি এক কাপ চা করে দিই তোমাকে। সবাই এক এক করে সামনে এগিয়ে চলে গেলো। নুবা চা বানানোর জন্য আগে চলে গেলো। দোয়া সীমান্ত হাসি হাসি মুখের দিকে এক কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। সীমান্ত ঠোঁট উলটিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সামনে হাঁটা ধরলো।
~ তুমি বাসায় না ডুকে বাগানের দিকে ছুটে এলে কেনো! অন্যের বর দেখলে শুধু ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে তাইনা? , সীমা পিছন থেকে তাচ্ছিল্যে সুরে বললো,
~ দোয়ার রাগ পরেনি তখন সীমান্তের উপরে। তাই সেই সীমাকে লক্ষ্য করে ঠাট্টা সুরে বললো, আমি তো বিপদে পরে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে অন্যের বরকে ঝাঁপিয়ে ধরেছে। কিন্তু আমি এমন নারীদের ও জানি যারা শারীরিক সুখের জন্য অন্যের বর দের গায়ে ঝাঁপিয়ে পরে।

সীমা দোয়ার খোঁচা বুঝলো না সেই হিসহিসিয়ে বললো, কি বললেন তুমি স্পষ্ট ভাষায় বলো!
দোয়া একটি দারুণ হাসি দিয়ে বললো, আপনি একজন নশ্বর মহিলা।
তারপর আর এক মিনিটেও না দাঁড়িয়ে গটগটিয়ে বাসার দিকে চলে গেলো। সীমা হতবিহ্বল চোখে দাঁড়িয়ে রইলো। এই মেয়ে এটা কি বললো,! নশ্বর ঐটা কি! সীমার মাথায় কিছুই ঢুকলো না। সেই বরাবরই বাংলা তে কাঁচা বলে দোয়ার কথার অর্থ টা সত্যি তার মাথা খেললো না। সেই প্রশ্নের চোখে দোয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।

~ সোফায় বসে দোয়া চা খাচ্ছে। তার নিজ হাতের চা বাদে কারও হাতে চা ভালো লাগে না।
~ নুবা চাতে অত্যধিক চা-পাতা, চিনি দিয়ে ভরিয়ে ফেলছে। তাও দোয়া চুমুক দিয়ে দিয়ে তা শেষ করছে। একটা মানুষ তার জন্য আগ্রহ নিয়ে কিছু করেছে এটায় অনেক জিনিস টা। কেমন হলো সেটা মূখ্য না। ভালোবাসা, আদর, আগ্রহ টা বেশী।
~ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে কফি বানাচ্ছে আর নজর দোয়ার দিকে স্থির করে রেখেছে সীমান্ত।
~ কান্নার জোরে মুখের সাজসজ্জা সব হাওয়া হয়ে গেলোও সীমান্ত যেনো চোখ সরাতে পাচ্ছে না। কারণ দোয়া এই সেই শাড়ি না তার দেওয়া শাড়ি পরেছে যেটা সেই তাকে পহেলা বৈশাখে উপহার স্বরূপ দিয়েছিলো।

~ ঘন কালো লম্বা চুলগুলো ছিলো ঘামের পানিতে সিক্ত। সাদা রঙের শাড়িটা ভিজে গিয়ে জাপটে লেগেছিলো দোয়ার শরীরে। ঘেমে জবজবে শরীরে ও ভয়াতুর মুখে কোন মানুষ কে এতোটা মনোমুগ্ধকর লাগতে পারে তা সীমান্তের জানা ছিলো না। তার মনে হলো তার চোখ দুটো খুঁজে পেয়েছে তার দৃষ্টিশক্তির স্বার্থকতা।
~ সীমান্ত মৃদুস্বরে মিনমিন গলায় বললো, তোমাকে তুলনা করার মত কোন উপমা নেই, থাকতে পারে না।
খুব বোধ হয়, নজরুল সেই বিখ্যাত গানটা আমার জন্যই লেখা হয়েছিলো
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ?

~ সীমান্ত নিজ মনে হাসলো বেচারি তার দেওয়া শাড়ি পরলো আর সেই কিনা তাকে পুরো বাগান জুড়ে হাঁসের রাম দৌড়ানি খাওয়ালো।
~ তুই ঠিক এমনই একটি শাড়ি বছর খানিক আগে সীমার জন্য কিনেছিলি মনে আছে? সীমান্ত পাশে এসে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে বসলো নুবা।
~ দোয়ার রুপে এতোটা মুগ্ধ ছিলো সীমান্ত তার পাশে এসে কখন নুবা দাঁড়িয়ে নিজের জন্য কফি বানাতে লাগলো তা খেয়ালই করলো না সেই।
~ সীমান্ত আশ্চর্য চোখে নুবার দিকে তাকালো তাকে দেখে মনে হলো এখুনি এই জায়গা ছেড়ে পালালে তার জন্য চরম ভালো কাজ হয়। কিন্তু নুবা তার দিকে তাকানোর আগে সীমান্ত প্রত্যুৎপন্নমতি সাথে নিজেকে স্বাভাবিক করে ধীর গলায় বললো, কেমন!
~ নুবা মুচকি হেঁসে চোখ সীমান্তের দিকে তাক করে তাকে দোয়া কে উদ্দেশ্য করে দেখলো। সীমান্ত শান্ত দৃষ্টিতে দোয়ার দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, কি যে আমার তো মনে পড়ছে না।

~ নুবা তার বানানো কফিতে এক চুমুক দিয়ে বললো, আমি ক্যাম্পাসে তোকে একটি প্যাকেট সহ দেখেছিলাম মনে আছে!
এমন কি জোরজবরদস্তি করে প্যাকেট টা খুলে ফেলছিলাম। তখন সেই প্যাকেটে এমনই একটি সাদা শাড়ির দেখেছিলাম। তোকে জিজ্ঞেস করাতে তুই বলেছিলি সীমার জন্য কিনেছিলি। কিন্তু পরবর্তী তে জানা গেলো তোর হল রুম থেকে শাড়িটা কে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো।
~ সীমান্ত হাসতে হাসতে মস্করা গলায় বললো, তাহলে তুই বলতে চাস দোয়া এসে আমার হল রুম থেকে শাড়িটা নিয়ে গেলো। নুবা এটা তো ভারী চিন্তার বিষয় হলো।
~ নুবা হাতের কনুই দিয়ে সীমান্ত কে গুঁতা দিয়ে সোফার কছে যাওয়ার আগে সীমান্ত নুবা কে ডাকলো নুবা শুন এই রকম শাড়ি ঢাকা শহরে প্রতিটা মার্কেটে পাবি বুঝলি! এইগুলা কমন।

~ নুবা হেঁসে বললো, হয়তো! তারপর দোয়ার সাথে গিয়ে বসলো। দোয়া প্রতিত্তোরে নুবার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটি হাসি উপহার দিলো। সীমান্ত কিচেনে দাঁড়িয়ে দোয়াকে আগের মতো দেখতে লাগলো।
~ আচ্ছা দোয়া তোমার শাড়িটা তো বেশ সুন্দর। কই থেকে নিলে এটা? দোয়ার পাশে বসে হালকা কন্ঠে হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো নুবা।
দোয়া মুচকি হেঁসে বললো, এটা আমি উপহার স্বরূপ পেয়েছি আপু আরো এক বছর আগে পহেলা বৈশাখের সময়।
নুবা হাসি ধরে রেখে বললো, আচ্ছা তাই তো যে দিয়েছে তাকে জিজ্ঞেস করোনি শাড়িটা কই থেকে নিলো।
দোয়া লজ্জাকাতর মুখে হেঁসে বললো, কি যে বলো আপু গিফট নিয়ে অতো কথা বলা যাই নাকি! নুবা জিজ্ঞেস করা আগে দোয়া নুবা কে উদ্দেশ্য করে বললো, এই শাড়ি আমাকে আমার এক বিশেষ লোক দিয়েছিলো বৈশাখে।

নুবা ও বলে বোকার মত হাসলো।
~ ঠিক তখনি দোয়া সীমান্ত দিকে তাকিয়ে একটি লাস্যভরা হাসি দিলো। সীমান্ত নুবা আর দোয়ার কোন কথা শুনে নি সোফায় বসা সবাই এতো হল্লা জন্য। কিন্তু একটু আগে সীমান্ত তাকে হাঁসের দৌড়ানি খাওয়ালো সেটা এতো জলদি ভুলে দোয়া তার দিকে তাকিয়ে হাসছে এটা দেখে সীমান্ত বিষ্ময় খেয়ে কফি আবার মুখ থেকে কাপে কুলির মাধ্যমে রেখে দিলো। তার মনে হচ্ছে দোয়ার এই হাসি তাকে বলছে আপনার এই আক্কেল সেলামির ( নির্বুদ্ধিতার দন্ড) কড়ায় গন্ডায় হিসেব দিবো।
~ নুবা যেনো সাদা কালো হয়ে গেলো। এইসব সেই কি দেখছে? সীমান্ত! দোয়া! বিশেষ মানুষ!

~ নুবা আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলো। সীমান্ত! সেই দোয়াকে এই শাড়ি কেন দিবো! দোয়ার সাথে সীমান্তের কি এমন সম্পর্ক ছিলো!
~ নুবা বিড়বিড় করে বললো, এই শাড়ি নরমাল কোন শাড়ি না। এটা উন্নতমানের সুতি দ্বারা তৈরী যা শুধু নেপালে পাওয়া যাই। আর এই শাড়ি নেপালের পাহাড়ি এলাকার ঐতিহ্যে বাহি শাড়ি। তাই এটি এই দেশ থেকে কখনও বাইরে বিক্রি হয়না। আর এটি তুই অনেক আবদার ও ছড়া দামে একটি পাহাড়ি মেয়ের থেকে চেয়ে এনেছিস। যেটা তুই নিজেই বলেছিলি আমাকে।

~ নুবা কিছুই হিসেব মিলাতে পাচ্ছে না। সুজি তৈরী থেকে সেই লক্ষ্য করছে এইসব কিছু। এমনকি ডাইনিং টেবিলে দোয়া আর সীমান্তের সেই চোখাচোখি! এতোটা কীভাবে সম্ভব!
~ সেইদিন কারও কাঠমান্ডু যাওয়া হয়নি ভয়ের চটে দোয়ার শরীর সত্যি ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। সীমান্ত ভাবতে পারিনি ব্যাপারটা এতো দূর গড়াবে সেই চিন্তিত ভঙ্গিতে নিচ তলার এইদিকে ঐদিকে হাঁটতে লাগলো।

~ যে যার রুমে গিয়ে বিশ্রামের চিন্তা ভাবনা করলো। দোয়া অসুস্থ থাকার কারণে সানজিদা, নুবা, মেহের তাকে রান্না তে আসতে দিলো না। তারা সবাই মিলে রান্না করতে লাগলো। ততখনে সীমান্ত তার বারান্দায় চলে গেলো। সীমা এসে টুকটাক কাজ করে আবারও সোফাতে বসে টিভি দেখতে ব্যস্ত হয়ে যেতো।
~ অনিক ঘাটে লম্বা তে শুয়ে এক পায়ের উপরে আরেক পা রেখে দুলাতে দুলাতে ফোনে গেমস খেলতে খেলছে। দোয়া শাড়ি বদলিয়ে পূনরায় জামা পরে নিলো। সেই তার ব্যাগ থেকে এক এক করে জামা কাপড় আলমারি তে রাখতে লাগলো।

হঠাৎ অনিক ঘাটে বসে দোয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি এইরকম হাবিজাবি ফুল এনে রুম কে এতো বিদ্ঘুটে কেন করলে!
দোয়া আলমারি তে কাপড় রেখে শান্ত দৃষ্টিতে অনিকের দিকে তাকিয়ে বললো, বড় বড় ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা এই ফুলের সৌন্দর্যের উপরে মুগ্ধ হয়ে বই লিখেছে, পৃথিবীর সব উন্নত দেশের মানুষ এই ফুলেকে ভালোবেসে নিজ বাসায় রোপণ করেছ, আর তুমি বলছো এটা হাবিজাবি!
~ অনিক ঠোঁট উলটিয়ে বললো, বাব্বাহ এতো গুন এই ফুলের! আমার এতো নকশা ভালো লাগেনা আবার আমার তো ফুলই পছন্দ না।

~ দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে বললো, এটা সম্পূর্ণ তোমার পছন্দের ব্যাপার, এটা নিয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই।
অনিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারও শুয়ে ফোন চাপতে লাগলো।
~ খাবার টেবিলে দোয়া এলো না শরীর খারাপ বলে কম্বল মোড় দিয়ে সেই ঘুমিয়ে ছিলো। সীমান্তের চিন্তার গতি আরো বেড়ে গেলো। এতোটা না করলেও সেই পারতো।
~ রাতে দোয়ার দাপিয়ে জ্বর নামলো। সারারাত মা মা করে গোঙাতে লাগলো, কিছুখন পর পর মায়াকান্না করতে লাগলো। তার মাথার কাছে অনেক রাত পর্যন্ত বসে ছিলো নুবা।

~ অনিক নিচে গেস্ট রুমে চলে গেলো ঘুমাতে। কারণ জ্বরের কারণে দোয়া দুই তিন বার বমি করেও ভাসিয়ে দিয়েছিলো। বাইরে তুমুল বৃষ্টি ডাক্তার আনারও কোন গতি রইলো না। অনিক মুটামুটি নাক চিটকে নিচে চলে গেলো।
~ সানজিদা আর মেহের বেশ কিছুখন ছিলো। দোয়ার এক অসহ্য রকমের যন্ত্রণা রয়েছে জ্বরের ঘোরে তার শরীর প্রচন্ড জ্বালা করে ফলস্বরূপ গায়ে কোন কাপড় সেই রাখতে চাইনা। দুই দুই বার সানজিদা মেহের জামা বদলিয়ে দিয়েছিলো। শেষ রাতে নুবা তাদের বিশ্রাম করতে বললো, কারণ তখন মুটামুটি জ্বর কমে গেছে দোয়ার।
~ দোয়ার রুম থেকে বের হয়ে নিচে দুধ নিতে এসে নুবা দেখলো সীমান্ত কিচেন রুম একটি ট্রে তে আলরেডী দুধ এক গ্লাস আর এক বাটি স্যুপ তৈরী করে নিয়ে বের হচ্ছে।

~ নুবা অবাক গলায় বললো, এতো রাতে এইগুলো খাবি!
সীমান্ত চমকিত গলায় হালকা করে একটু হাসার চেষ্টা করে বললো, আ-আসলে আমি এইগুলো হু-মানে দোয়ার জন্য নিচ্ছিলাম। শুনেছি বমি করেছে তাই।
নুবা কেমন করে যেনো সীমান্তের মুখের দিকে তাকালো, তারপর স্মিথ হেঁসে বললো, ঠিক আছে এটা আমার কাছে দে!
নুবা হাত বারিয়ে ট্রে টা নিয়ে নিলো।

সীমান্ত কোন রকম বললো, ও, ঠিক আছে! জ্বর কতটুকু!
নুবা মুচকি হেঁসে বললো, তুই চল দেখে আসিস ওকে এক নজর।
সীমান্তের চোখ মুখে যেনো এক অদ্ভুত খুশি খেলো উঠলো যা নুবার চোখে স্পষ্ট ধরা পরলো।
~ নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে তার হুর। এই কয়েকঘন্টা জ্বরে সীমান্তের হুরের চেহেরার যেনো বেহাল অবস্থা হয়ে গেলো। চুল গুলো এক পাশ করে ছেড়ে রেখেছে চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।

~ সীমান্ত নুবা কে উদ্দেশ্য করে বললো, ওর তো চুল ভেজা জ্বর আরো বেড়ে যেতে পারে।
নুবা মন খারাপ সুরে বললো, আসলে একটু আগে মাথায় পানি দিয়েছিলাম আমি ওর তাই। একা আছি তো ভুলে গেলাম ব্যাপারটা। সমস্যা নেই ওকে খাইয়ে দিয়ে হেয়ার ড্রাই দিয়ে শুকিয়ে দিবো।
~ নুবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দোয়া কে আদুরে সুরে ডাকলো। দোয়া হালকা হালকা চোখে তাকালো, তারপর আবারও বন্ধ করে ফেললো। নুবা আবারও নরম স্বরে ডাকলো।
দোয়া আর নড়লো না। নুবা হতাশ গলায় বললো, ওকে একা উঠানো তো আমার পক্ষে সম্ভব না বমি করে কাহিল হয়ে গেছে তাই হয়তো চোখ খুলতে পাচ্ছে না।
~ সীমান্ত কাচুমাচু গলায় বললো, আ-আমি সাহায্যে করবো তোকে?
নুবা শান্ত গলায় বললো, সেটাও নেওয়া যাই।

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে যেনো এই বৃষ্টির পানির সাথে পুরো চন্দ্রগিরি, কাঠমান্ডু পরিষ্কার করে এক সতেজ সকাল দেওয়া পণ করেছে।
~ সীমান্ত দোয়াকে এক হাতে জড়িয়ে পিছনে বালিশ দিয়ে ঠেকিয়ে বসালো। নুবা আদুরে গলায় দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, অল্প একটু খেয়ে নাও, নাহলে একদমই সুস্থ হবা না তুমি!
দোয়া চোখ বন্ধ অবস্থা মাথা দুলালো। যার অর্থ হলো সেই খাবে। সীমান্ত হাসলো।
~ নুবা ধীরে ধীরে দোয়া কে স্যুপ খাওয়াতে লাগলো। আর সেটি সুন্দর করে দোয়া চোখ বন্ধ অবস্থা খেতে লাগলো। সীমান্ত বুঝলে এটি দোয়ার জ্বরের অভ্যাস। , তাই অভ্যস্ত। হঠাৎ দোয়া হাঁচি দিলো। সীমান্ত চিন্তিত চেহেরায় নুবার দিকে তাকালো। নুবা সীমান্তের দিকে তাকিয়ে বললো, হয়তো ভেজা চুলের জন্য ঠান্ডা গায়ে ঢুকে যাচ্ছে ওর আবার।

~ সীমান্ত নুবা কে আর কিছু বলতে না দিয়ে দোয়ার ড্রেসিং টেবিল থেকে হেয়ার ড্রাই নিয়ে দোয়ার পাশে বসলো। তারপর হালকা স্পর্শে দোয়ার চুল আলতো হাতে মিশন দ্বারা শুকাতো লাগলো। নুবা শুধু তাকিয়ে রইলো। তার কোন অনুভূতি মুখে প্রকাশ পেলো না তখন।
~ দুধ অর্ধেক খেয়ে দোয়া ঠোঁট উলটালো যার অর্থ সেই আর খাবে না। নুবা জোর করলো না অযথা বমি করে যা খেয়েছিলে সব বের করে দিবে। নুবা সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললো, সেই করে দিবে সীমান্ত গিয়ে বিশ্রাম করার জন্য উল্টো সীমান্ত বললো, তোর অনেক দখল গিয়েছে একটু বিশ্রাম নে বসে। আমি করে নিচ্ছি। নুবা আর খাটালো না।

~ সীমান্ত দোয়ার সবগুলো চুল শুকাতে কিছু সময় লেগে গেলো লম্বা চুলের কারণে। কিন্তু যখন তাকালো দেখলো পাশের লম্বা সোফায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে নুবা। সীমান্ত বুঝলো না কি করবে। যতটুকু জানে নুবার ঘুম প্রচুর গাঢ় যদি দোয়ার শরীর খারাপ হয়ে যাই!
~ সারা রাতের এই মেঘ ফাঁটা বৃষ্টির পানি মাটি চুষে নিয়ে পরের দিন একটি সুন্দর রৌদ্রময় দিন শুরু হলো। সূর্য মামা উঁকি দিলো ঠিক দোয়ার জানালা বরাবর। যা সোজাসুজি এসে নুবার ঘুমন্ত চোখে তীক্ষ্ণ ভাবে লাগলো। নুবার ঘুম ছুটে গেলো। গায়ে দেখলো তার একটি চাদর। সেই তড়িঘড়ি করে উঠে বেডের দিকে তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলো।

~ দোয়ার বেডের পাশের ছোট্ট সোফাতে বসে আছে সীমান্ত আর দোয়া কম্বল মোড় দিয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু সবচাইতে চমকপ্রদ ব্যাপার যেটা, সেটা হলো দোয়ার এক হাত কে নিজের কোলের মধ্যে এনে ঘুমাচ্ছে সীমান্ত। আর দোয়া সীমান্তের দিকের খাটের কিনারা ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে।
~ নুবা ভয়াতুর মুখে দরজার দিকে তাকালো যেকোন সময় যে কেউ আসতে পারে। বিপদ ডাকা যাবে না। নুবা দ্রুত পায়ে সীমান্তের কাছে গিয়ে তাকে ডাকতে লাগলো। সীমান্ত প্রথমে ঘুম ছুটলো না। নুবা মৃদু ঝাঁকি দেওয়ার সাথে সাথে সীমান্ত হরগরিয়ে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো আমার হুর, আমার হুর ঐ ঠিক আছে!
~ কিন্তু তৎক্ষণিক নুবা কে দেখে সীমান্ত নিভলো। তার চোখ মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখালো। নুবা তাকিয়ে আছে তার দিকে ভূত দেখার মত। সীমান্ত শুকনো ঢোগ গিলে বললো, আহ-আসলে কাল তুই ঘুমিয়ে পরেছিলি, আর ওর শরীর কেমন না কেমন হয় তাই ভেবে আর যাওয়া হয়নি।

~ নুবা হালকা করে হাসার চেষ্টা করে আঁড়চোখে সীমান্তের হাতের মুঠোও দোয়ার হাতের দিকে তাকালো। যা সীমান্ত চট করে লক্ষ্য করলো। সেই খুবই সচেতনতার সাথে হাত টা ছাড়িয়ে নিলো। দোয়া একটু নড়েচড়ে উঠলো, কিন্তু ঘুম ভাঙলো না। সীমান্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমি ফ্রেশ হবে তুই ও যা, ওর জ্বর সেরে গেছে। আপাতত লম্বা ঘুম দিয়ে উঠুক।
~ নুবা মাথা দুলালো। সীমান্ত অর্ধেক পথ হেঁটে যাওয়ার পর নুবা পিছন থেকে শান্ত গলায় বললো, সীমান্ত!
~ সীমান্ত পিছনে ফিরে নুবার উদ্দেশ্য প্রশ্ন চোখে তাকালো। নুবা স্বাভাবিক গলায় বললো, দোয়া কে তুই হুর নামে জানতি আমাদের তো জানা ছিলো না!

পর্ব ৬

~ দোয়া আলমারি সামনে হাতে একটি বিশাল বড় চিত্র করার একটি খাতা নিয়ে হতভম্ব চোখে দাঁড়িয়ে আছে নুবা। তা হালকা ঘুমে আঁড়চোখে দোয়া বেড থেকে দেখলো কিন্তু কোন রকম হল্লা ছাড়া সেই আবারও ঘুমে তলিয়ে গেলো। যেনো এই খাতার মাধ্যমে যে বিপদ ডেকে আসবে তাতে তার কোন মাথা ব্যাথা নেই।
নুবা বিষ্ময় চোখে খাতাটির পৃষ্ঠা বদলাতে লাগলো। সব ছবিতে ডেট সহ দোয়া সাইন আর তাতে স্মৃতিময় কিছু লেখা।

কয়েক পৃষ্ঠার পর আসলো ঢাকা ভার্সিটি একটি ছবি। তারপর আসলো টিএসসি তারপর আসলো সুজির কেকের ছবি তারপর এলো দোয়ার একটি শাড়ি পরা ছবি নিচে ডেট পহেলা বৈশাখের হয়তো কেউ ছবি তুলে দিয়েছে তা থেকে স্কেচ করেছে।
~ নুবা কাঁপা কাঁপা হাতে পরের পৃষ্ঠা গেলো যেনো সেই জানতো আরো কঠিন জিনিস অপেক্ষা করছে তার জন্য। চোখের সামনে চিত্র টাতে হাত বুলাচ্ছে নুবা। তাকে বিষ্ময়ের উপরে স্তরে লাগলো। যেনো সব অন্ধকার দেখলো।

~ কারণ এটি আর কোন সাধারণ চিত্র না এই বাড়ির পেন্সিল স্কেচ। তাতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু আক্কেলগুড়ুম হলো নুবা পাশে এই চিত্র তৈরীর ডেট দেখে। নুবা আবারও পৃষ্ঠা উল্টালো এইবার সেই নিজের পায়ে তার শরীরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না পরে যেতে ধরার আগে আলমারি মাধ্যমে নিজেকে ব্যালেন্স করলো। নুবা অস্পষ্ট স্বরে তাকিয়ে বললো, সী-সীম-সীমান্ত!
পরের পৃষ্ঠাতে সীমান্তের একটি হাসিজ্জ্যেল চিত্র।

~ নুবা দ্রুত হাতে খাতাটি বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলো। তারপর যেখানেই সেই খাতাটি পেয়েছিলো দোয়ার কাপড়ের ভাঁজে সেইখানে রেখে এক নজর দোয়ার দিকে তাকিয়ে ছুটে বের হয়ে গেলো। তার আর বুঝতে বাকি নেই একবছর আগে দোয়া আর সীমান্ত তাদের স্বপ্নের সংসার করার জন্য এই বাসা তৈরী করেছিলো। হয়তো দোয়া ছবি হিসেবে তাকে নমুনা দিয়েছিলো আর সেটি পূরন করেছিলো সীমান্ত। কারণ এতো কোন ভুল নেই সীমান্ত আর দোয়ার কোন সম্পর্ক ছিলো না, এমন কি অনেক গভীর সম্পর্ক ছিলো। কারণ দোয়ার বিশ্বিবদ্যালয়ের পরে সব চিত্রে নুবা সীমান্তের সাথে সম্পর্কৃত লেগেছে। কারণ তারিখের নিচে একটি করে লাইন লিখা ছিলো।

শেষের লাইনটি ছিলো সবচাইতে অকল্পনীয় এই কন্যা শুনো বিয়ের পর কিন্তু আমার এমন হুটহাট ছবির বাহানা উঠবে পূরন করবে তো!
~ এইসব যে সীমান্তের লেখা তা হাড়েহাড়ে চেনা আছে নুবার, কারণ সীমান্ত তার অদ্ভুত পেঁচিয়ে লেখার জন্য অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে।
নুবা ছুটে নিজ রুমে চলে গেলো তাকে শাওয়ার নিতে হবে নাহলে এতো বড় ধাক্কা সামলিয়ে উঠা সম্ভব হবে না।
~ মেহের, সানজিদা আর নুবা নাস্তা তৈরী করছে। বেলা তখন ৭ টা। আজ তারা সবাই জলদি উঠে গেছে। কারণ কাল নুবা কে সাহায্য করার মত দোয়া ছিলো আজ মেয়েটা খাটে পরে আছে।

ওর কি জ্বর একদমই সেড়ে গেছে! সানজিদা জিজ্ঞেস করে উঠলো। মেহের বললো, হ্যাঁ আমি দেখে এসেছিলাম ঘুমাচ্ছিলো।
সানজিদা নরম সুরে বললো, এই কারণ টা জন্য যাই না কাল সারারাত কষ্ট পেয়েছে এখন যদি ঘুম ছুটে যাই।
নুবা চুপচাপ নাস্তা তৈরী করতে লাগলো। সানজিদা হঠাৎ বিরক্ত ভরা গলায় বললো, আমি বুঝিনা অনিক্কা কি অমানুষ! সারাজীবন একটা প্রেম করেনি। ভেবেছিলাম বউকে মাথায় উঠায় রাখবে, কিন্তু কাল ওর বউয়ের মর মর অবস্থা ছিলো আর ঐ রুমে পড়ে ঘুমাচ্ছে।

মেহেরা ও একমত হয়ে রাগ রাগ গলায় বললো, আমার তো অনিক্কারে স্যান্ডেল উড়িয়ে মারতে ইচ্ছে করছে জাহিল একটা।
প্রতিটা সময় নুবা চুপচাপ ছিলো তারপর হঠাৎ প্রশ্ন চোখে সানজিদা আর মেহের কে উদ্দেশ্য করে বললো, শুন তোরা তো সীমার সাথে অনেক ক্লোজ তোরা কখনও সীমান্ত সীমা কে হুর ডাকতে শুনেছিস!
সানজিদা আর মেহের একটি আরেকটির মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। তারপর ঠোঁট উলটিয়ে বললো, না তো সেই তো ক্যাম্পাসেও শুনি নাই। সীমু বলে তো শুধু ডাকতো। কেন!
নুবা হালকা হেঁসে না বোধক মাথা দুলালো।

~ বেডসাইডে দোয়ার ফোন অনবরত বাজছে। দোয়া নড়েচড়ে আবারও গভীর ঘুমে যেতে ধরলো। না আবারও একি রিংটোন। দোয়া বহুকষ্টে উঠে বসলো। পুরো শরীর যেনো বিষাক্ত রকমের ব্যাথা হয়ে আছে তার। সেই হাতড়ে হাতড়ে বেডসাইড থেকে তার ফোন টা নিয়ে দেখলো, মেসেঞ্জারে নিদা কল দিচ্ছে। দোয়া ভড়কে গেলো নিদা এতো জলদি উঠার মানুষ না তার উপরে আজ শুক্রবার ওর ক্যাম্পাস ও বন্ধ। দোয়া বেড থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর চট জলদি ফোন ধরলো। দোয়া হরগরিয়ে নিদা কে ডাকতে লাগলো। কিন্তু নিদার বদলে দোয়ার কানে ভেসে এলো তার প্রানপ্রিয় মায়ের গলা।

~মাদু!
দোয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো। সেই চুপ করে রইলো দীর্ঘক্ষণ। তেমনি ঐ পাশ থেকে পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ দোয়া বহুকষ্টে বলে উঠলো মা!
মিসেস জুলেখা ঐপাশ থেকে উজ্জ্বল হাসি দিলেন দোয়া তাকে আজ এক বছর পর মা ডেকেছে তার হাসি দেখলে মনে হবে, যেনো শত বছরের তৃষ্ণা মিটেচ্ছে উনার। দোয়া মৃদুস্বরে অস্পষ্ট কন্ঠে আবারও বলে উঠলো মা!
মিসেস জুলেখা এইবার হু হু করে কেঁদে দিলো। দোয়া হরগরিয়ে বললো, কি হয়েছে মা! তুমি কাঁদছো কেন! সব ঠিক আছে! নিদা মাহা কই! কি হয়েছে সবাই ঠিক আছে!
মাদু আমায় মাফ করে দে মা কান্নারত গলায় মিসেস জুলেখা বলে উঠলো। দোয়া পূনরায় স্তব্ধ হলো। সেই কোন রকম কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, কি-কি বল-বলছো মা! তুমি এমন কি দোষ করলে যে আমি মাফ করবো! তুমি কোন দোষ করোনি!
দোয়া কাঁদছে। টপটপ করে তার চোখ থেকে অগনিত অশ্রু পরছে।

~ মিসেস জুলেখা অশ্রু মাখা কন্ঠে বললো, আমি আমার কলিজাটারে বিশ্বাস না করে মানুষের কথা বিশ্বাস করেছি যে সময় টা আমার তোর পাশে থাকার কথা তোকে সামলিয়ে রাখার কথা সেই সময় আমি তোর ছায়াকেও ঘৃনা করতাম। মারে আমারে মাফ করে দে। দোয়া ফোনে কানে রেখে না বোধক জোরে জোরে মাথা দুলাতে লাগলো। যেনো মিসেস জুলেখা তার সামনে বাহিক্য ইশারায় মাধ্যমে তার মা বুঝে যাবে।
মিসেস জুলেখা আদুরী গলায় বললো, আমাকে মাফ করবি মা!

দোয়া কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বললো, না না মা তোমার কাছে বিনীত করছি এই কথা বলে আমাকে অপরাধী করো না। আমার জন্য তো বাবা চলে গেলো মহল্লায় আমাদের বদনাম হলো। দোষী তো আমি!
মিসেস জুলেখা কঠিন গলায় বললো, না না একদমই না। তোর কোন দোষ নাই। এইসব কিছু সাজানো ছিলো। মিথ্যা রটনা ছিল তোর মা সব জানছে।
দোয়া ফোনে কানে নিয়ে আরো জোরে হু হু করে কেঁদে দিলো।
মিসেস জুলেখা দোয়া কে সান্তনা দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো, আমার মাদু কেন এতো কান্না করছে কান্না তো আমার মাদু সাথে যাইনা। হাস মা একটু এক বছর হয়ে গেলো তোর হাসির আওয়াজ শুনি না।

দোয়া হেঁসে দিলো। আজ তার অন্য রকম খুশি লাগছে। জীবনে সেরা কিছু সেই ফিরত পেয়েছে আর যে কিছু দরকার নেই। মিসেস জুলেখা আর দোয়া এই কথা সেই কথা অনেক কথা বললো, যেনো কত শত বছর মা মেয়ের কথা হচ্ছে।
~ মিসেস জুলেখা হঠাৎ দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, তোর বর কেমন রে মাদু!
দোয়ার হাসি হাসি মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। তার মুখ থেকে অনিকে উদ্দেশ্য করে কোন কথা বের হলো না। বিপরীত পাশ থেকে মিসেস জুলেখা ও চুপ। হয়তে মেয়ের চুপটির মানে তিনি অক্ষরে অক্ষরে বুঝে ফেলছিলেন।

মাদু তোর মনে আছে মা, তুই সবসময় আমাকে তোর প্রিয় একটি লাইন বলতি।
যার কাছে তোমার গুরুত্ব নেই তার সাথে দূরত্ব বারিয়ে দাও।
মনে আছে তোর! আমি তর থেকে কিছুই জানতে চাইবো না। কারণ তার উপরে আমার বিশ্বাস আরো বেড়ে গেছে। কিন্তু শুধু একটি কথা বলবো আমি তোর একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি তুই আমার কোলে ফিরে আয়। আর কোন কষ্ট আমি তোকে পেতে দিবো না।

~ দোয়া হু হু করে শব্দ করে কেঁদে দিলো অতঃপর চট করে নিজের মুখ চিপে ধরলো যাতে করে মিসেস জুলেখা শুনতে না পাই। হঠাৎ মিসেস জুলেখা কে উদ্দেশ্য করে দোয়া বললো, ম-মা আমি তোমাকে পরে ফোন দিচ্ছি, দোয়া আর এক সেকেন্ড ফোন কানে না রেখে বেডে ছুঁড়ে মারলো। সেই যে আর কান্না থামাতে পাচ্ছে না। আজ এক বছর পর তার কান্নার বাঁধ ভেঙেছে তাতে হয়তো নিজেকে সামলাতে পাচ্ছে না দোয়া। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে হু হু করে কাঁদছে দোয়া।
~ হুর, হুর তুমি ঠিক আছো! কাঁদছো কেনো! শরীর কি খারাপ লাগছে আবারও! হুর কি হয়েছে তোমার! বমি পাচ্ছে আমায় বলো! ছুটে এসে দোয়ার দু কাঁধ ঝাঁকিয়ে চিন্তায় দিশেহারা হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো সীমান্ত।

~ দোয়া চোখের পানি নিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলো। সেই সীমান্ত কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বললো, আপনার এতো বড় সাহস কি করে হলো আমার বেড রুমে আসার!
সীমান্ত বোকা বনে গেলো। সেই দেনাপনা
কন্ঠে বললো, আ-আমি আসলে তোমার খবর নিতে এসেছিলাম!
দোয়া তাচ্ছিল্যে সুরে বললো, বাহ! এতো বড় খন্ড প্রলয় করে খবর নিতে এলেন! সত্যি মজার লোক তো আপনি!
সীমান্ত লজ্জিত চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।

দোয়া গলার আওয়াজ একি রকম রেখে সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললো, কারও রুমে আসতে হলে নক করতে হয় সেই বোধ টুকু আপনার নেই!
সীমান্ত ইতস্তত গলায় বললো, আমি প্রথম বার নক করেছিলাম, পরের বার নক করতে গিয়ে দেখলাম তুমি কাঁদছো তাই!!
তো আমি কাঁদছি বলে আপনি ছুটে এসে আমার রুমে আমাকে স্পর্শ করবেন?

সীমান্ত অসহায় গলায় বললো, তুমি কাঁদছিলে আমার মাথায় কাজ করছিলো না তখন কিছু।
দোয়া হিসহিসিয়ে বললো, এইসব আষাঢ়ে গল্প আমাকে শুনাতে আসবেন না মি. সীমান্ত কান্না আমার জন্য নতুন না।
সীমান্ত ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি করে বললো, বাদ দাও হুর, তুমি অসুস্থ দয়া করে নিজেকে শান্ত করো রাগারাগি করো না।
আমি শুধু এটার বলার জন্য এসেছিলাম তোমার শরীর কেমন আছে! যদি একটু সুস্থ বোধ করো তাহলে নিচে যেতে ঐখানে ডাক্তার এসেছে। আমি চাইনা উনি উপরে তোমার বেডরুম আসুক।
~ দোয়া ঠাট্টা সুরে বললো, কেনো বেডরুমে আসলে কি সমস্যা আপনি আসতে পারলে উনিও আসতে পারবে।

সীমান্ত চমকপ্রদ গলায় বললো, উনি বাইরের লোক হুর!
দোয়া এক পেশে হেঁসে বললো, ওমা তাই আপনি কি তাহলে ঘরের লোক! ওপস! আপনি তো ঘরেরই লোক আমার বরের বন্ধু! তাইনা!
~ সীমান্ত নরমসুরে বললো, আমি তোমার কাছে বাইরের লোক হুর!
~ দোয়া সেই কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গলায় আগের তেজ রেখে বললো,
তীব্রভাবে কাউকে ভালোবাসার এত্ত এত্ত স্বপ্ন দেখিয়ে তারপর হঠাৎ করেই একদিন হুট করে তাকে ছেড়ে দেয়াটা বিশ্বাসঘাতকতার কোন স্তরে পড়ে তা আপনার জানা আছে!!

একটা মানুষের হাতে হাত রেখে মাইলের পর মাইলে হেঁটে ব্যক্তিগত সাময়িক নিঃসঙ্গতার প্রহর পার করে আচমকাই একদিন হুট করে তাকে একা ফেলে রেখে চলে যাওয়াটা অকৃতজ্ঞতার কোন স্তরে পড়ে তা আপনার জানা আছে!!
নেই জানা আপনার কিছুই জানা নেই।

হুর আমি! সীমান্ত কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো। কিন্তু তার আগে দোয়া বলে উঠলো আপনাকে কে বললো, আমি আপনার কথা শুনতে চাই! আজ শুধু আমি বলবো।
~ যেদিন থেকে আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে সেইদিন থেকে এই চোখের পানিও আমার সঙ্গ দিয়েছে।

~ সীমান্ত হাত উঠিয়ে দোয়াকে কিছু বলার আগে দোয়া সীমান্তের বুকে সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে বললো, সবকিছু আপনার জন্য হয়েছে সবকিছু। যেদিন থেকে আপনি আমার জীবনে এসেছেন সেইদিন থেকে এই জীবন টা অভিশপ্ত হয়ে গেছে। বিশ্বাস হারিয়েছি, বাবা হারিয়েছি, মার ভালোবাসা হারিয়েছি, পড়ালেখা, হারিয়েছি আর সবচাইতে বড় কথা সবদিক দিয়ে শুধু মাত্র ঠকেছি। এইসব কিছুর মূল আপনি! আর আপনি জিজ্ঞেস করতে এসেছেন কেন কাঁদছি!
~ বের হয়ে যান আমার রুম থেকে, দ্বিতীয় বার আমার রুমে নক করা বাধে আসবেন না। এটা আপনার বেডরুম না আপনার বন্ধুর বেডরুম যেইখানে তার স্ত্রী রয়েছে।
~ সীমান্ত যেনো বুদ্ধি শক্তি লোম পেলো সেই দাঁড়িয়ে রইলো একি ভাবভঙ্গি তে যেনো কিছু বলতে গিয়ে গলায় কাঁটার দলা আটকিয়ে গেছে।
~ দোয়া নিজের মাথায় দুহাত দিয়ে চাপড় মেরে বললো, আসলে আমি বার বার আপনাকে কেন দোষারোপ করি, আমার তো বুঝা উচিত ছিলো সঙ্গ দোষ বলেও একটা বাক্য রয়েছে।

~ সীমান্ত স্তব্ধ, হতবিহ্বল, হতবুদ্ধি চোখে তাকিয়ে রইলো দোয়ার অশ্রু মাখা রক্তিম লাল রাগান্বিত মুখের দিকে। দোয়ার প্রতিটা কথা যেনো তার মাথায় মৌমাছির এক ঝাঁক পাল্লার মত আশপাশে ঘুরছে।
~ দোয়া চট করে একটি কান্ড করে বসলো যার জন্য সীমান্ত প্রস্তুত ছিলো না সেই সীমান্তের হাত ধরে তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে টেনেহিঁচড়ে রুম থেকে বের করে দিয়ে বললো, খবরদার আমার আশপাশে ভুলেও ঘেঁষবেন না। আমাকে আমার আগের রুমে আনবেন না। তাহলে এই দোয়ার বদদোয়া মাটিতে পরবে না। সীমান্ত আক্কেলগুড়ুম মুখের উপরে দোয়া ঠাস করে দরজা আটকিয়ে দিলো। ঠিক তখনি নিদার মেসেঞ্জার কল টি কাটা গেলো। হয়তো দোয়া তার কান্না চটে তখন তার মার কল কাটতে ভুলে গিয়েছিলো!

~ মূর্তির মত সীমান্ত দাঁড়িয়ে আছে দোয়ার বন্ধ দরজার সামনে। সবকিছু তাট থেকে শূন্য শূন্য লাগছে। এক বছর আগে দোয়া তাকে সেই টিএসসি সামনে কিছুই বলেনি শুধুমাত্র একটি কথা বাদে আমি আপনাকে বদদোয়া দিবো না শুধু এই দোয়ার পক্ষে থেকে একটি দোয়া রইলো আপনার জন্য, আপনি কেউ একজন কে বিষাক্ত রকম ভালেবেসে ফেলুন, ততটা ভালোবেসে ফেলুন যতটা ঐ মানুষটা বিহীন এক এক টা মিনিট মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।
~ হ্যাঁ লেগেছে তার হুরের দোয়া। ভালোবেসে ফেলছিলো সেই তার হুর কে। এই এক বছর একটি মিথ্যা বলার অনুশোচনা যে আগুন বিহীন যন্ত্রণা দগ্ধ হচ্ছিলো সেটি মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকেও কম না।

~ সিঁড়ির ঘরে অনিকের সাথে সীমান্তের দেখা হলো। অনিক অবাক গলায় বললো, তোকে এতো এলেমেলো লাগছে কেন আর তিন তালা কই গিয়েছিলি!
সীমান্ত অনিকের দিকে একটি নীরব দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, কাল সকালে সবাই পোখারার উদ্দেশ্য রওনা দিবো। সবকিছু রেডী করে নিস। অনিক কাচুমাচু গলায় বললো, আহ -আসলে আমার কাছে এখন কোন ক্যাশ নেই অতদূর তো কিছু টাকা হাতে নিয়ে যেতে হবে। সীমান্ত অনিকের ইঙ্গিত ধরতে পারলো কোন কথার প্রেক্ষিতে সেই কোন কথা তুলেছে সেই ভালো হজম হলো। সীমান্ত শান্ত গলায় বললো, বিকালের মধ্যে চলে যাবে।
অনিক এক উজ্জ্বল হাসি দিলো। যার বিনিময়ে সীমান্ত এক তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় চলে গেলো নিজের ঘরে।
~ কাল সারারাত তুমি কি নিচে ছিলে! সীমা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে উঠলো সীমান্ত কে।

সীমান্ত শাওয়ারের জন্য কাপড় নিয়ে গটগটিয়ে ওয়াশরুম চলে গেলো। সীমা রাগ রাগ গলায় চিৎকার দিয়ে বললো, তোর এইসব নকশা আমি বলে সহ্য করছি, অন্য কেউ হলে তোকে লাথি মেরে বুড়ো আঙ্গুল প্রদর্শন করে অন্য ছেলের সাথে সংসার করতো। আমার ঘৃণা ধরে গেছে তোর উপরে বুঝলি!
~ সবাই নিচে এলো শুধু মাত্র সীমান্ত বাদে। নুবা সীমা কে জিজ্ঞেস করাতে সীমা বললো, আমি ওর খবর রাখি! খেলে খাবে না খেলে নিজের মুখের থু থু খেয়ে থাকবে কার কি!
এতো সবাই এক নীরব দৃষ্টি সীমার দিকে নিক্ষেপ করলো।

~ যে যার মত নাস্তা করতে লাগলো। সবাই দোয়ার শরীরের অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলো। উত্তরে দোয়া বললো, সেই এখন সুস্থ বোধ করছে।
ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে ঐ অনুযায়ী খেলে আরো সুস্থ বোধ করবে সেই হয়তো!
~ দোয়া নুবা কে সানজিদা কে এবং মেহের কে ধন্যবাদ জানালো। উত্তরে সবাই মিষ্টি করে হেঁসে বললো, তুমি আমাদের ছোট বোনের মত তোমার যত্ন না নিলে আমরা নিজদের ছোট মনের মানুষ মনে করবো। সীমা তখন চুপচাপ খাচ্ছে। অনিকে অগনিত আনন্দিত লাগলো। দোয়া শুধু একটি নীরব দৃষ্টি তার দিকে নিক্ষেপ করলো খুশিতে উড়ালচন্ডির মত এতো উড়ে বেড়ানোর জন্য।

~ নাস্তা শেষে নুবা কে সাহায্য করতে দোয়া রান্না ঘরে এলো তখন নুবা জানালো কোন কাজ করা দরকার নেই। তুমি খালি রেস্ট করবা। দোয়া অনুরোধে স্বরে বললো, না আপু কাল থেকে তেমাকে প্যারা দিচ্ছি আর না তুমি রেস্ট করো কাল সারারাত তুমি আমার জন্য জেগে ছিলে। নুবা মুচকি হেঁসে বললো, আরে না আমি তো মোটেও না উল্টো সীমান্ত তোমার জন্য জেগে ছিলো। দোয়া আশ্চর্য গলায় বললো, মা-মানে!
নুবা কফি বানাতে বানাতে কালকের রাতের সব কথা বললো, কি যত্ন তাকে সীমান্ত করেছিলো।
~ দোয়া যেনো নিজ জায়গায় পাথর হয়ে গেলো। এক ঝাঁক অপরাধ বোধ তাকে যেনো আঁকড়ে ধরলো। মানুষ টা তার সুস্থতার জন্য রাগ জেগে পরিশ্রম করলো আর সেই কিনা!

সেই তো নাজুক পরিস্থিতিতে নিজেকে শক্ত রাখতে পারে তাহলে কেন তখন এতো হল্লা করে বসলো! কেন এতো কঠোর কথা মুখে চলে আসলো!
~ নুবা চোরা চোখে দোয়ার অন্ধকার মুখের দিকে তাকালো, তারপর উৎফুল্ল গলায় বললো, একটু পর থেকে আমরা কাপড় গুছানো শুরু করবো ঠিক আছে!
দোয়া নিঃশব্দে মাথা দুলালো। নুবা প্রশ্নের চোখে শান্ত গলায় বললো, তোমার পোখারা আর নাগরকোট কি খুবই পছন্দের!
দোয়া চমৎকার করে হেঁসে বললো, অনেক বেশী নুবাপু।

নুবা হাসি হাসি মুখে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো যা বুঝার তা সেই বুঝে গেছে। সীমান্ত এইসবকিছু দোয়ার জন্যেই করছে।
~ দোয়া হঠাৎ চিন্তিত চেহেরায় হাতের আপেলে কটমট কামড় বসালো। সীমান্ত পোখরার কথা কেন তুললো! সেই কি এটা তার জন্য করলো! কিন্তু সীমান্ত কীভাবে বা জানবে দোয়া যে প্রানপ্রিয় নেপালের জায়গা হলো পোখারা আর নাগরকোট!
~ সেইদিন আর একটি বারের জন্য সীমান্ত রুম থেকে বের হয়নি এমন কি সবাই নিচে আসার আগে তার খাবার নিয়ে উপরে চলে যেতো। কারণ জানতে চাওয়াতে সেই বলেছে পোখরার জন্য সবকিছু ঠিকঠাক করছে। তাই ব্যস্ত সময় পার হচ্ছে।
~ দোয়া তার মত ব্যাগে কাপড়চোপড় নিতে লাগলো। নুবা জানিয়েছিলো সেইখানে রাতে চমৎকার গান নাচের উৎসব জমে সেই কথার প্রেক্ষিতে দোয়া একটি অসাধারণ শাড়ি নিলো।

~ রাতে দোয়ার অসুস্থতা কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অনিকে তার কামুকতা তে এগিয়ে গেলো। তাতে দোয়া কোন আপত্তি করলো না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগলো। অনেক খন পর অনিক ক্লান্ত হয়ে দোয়ার পাশে শুয়ে গেলো। আর দোয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো উপরের দিকে।
মাঝে মাঝে নিজেকে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে ভীষণ কষ্ট যাতে করে তোমাকে ভালোবাসার অপরাধের জ্বালা মিটে। তোমাকে ঘৃণা করা তোমাকে কষ্ট দেওয়া তো এই শরীর পক্ষে সম্ভব না তাই নিজেকে দিতে হয়।

যখন শরীর মন চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করে কেন এতো নির্যাতন করছো আমাদের। তোকে তিরস্কার সুরে বলতে ইচ্ছে করে দোষ তোমাদেরই, কেন ভালোবাসতে গেলে ঐ মানুষটাকে? কেন করতে গেলে এই নিষিদ্ধ কাজ! তাহলে আজ আমার জীবন আরো সুন্দর হতো। ভালোবাসা পূর্ন হয়তো একজন জীবন সঙ্গী পেতাম যে আমাকে স্ত্রী না নিজের অস্তিত্বের অংশ ভাবতো। তোমরা এই মানুষ টাকে সত্যিকারী অর্থে না চাইলে হয়তো অনিক নামক এই কামুক কাপুরুষের হাতে আমাকে পরতে হতো না দোষী তোমরা দুজনেই দোষী সাথে দোষী আমার এই মস্তিষ্ক।
~ অনেক রাতে দোয়ার কানে গিটারে টুংটাং আওয়াজ ভেসে এলে। ফলস্বরূপ তার ঘুম ছুটে গেলো। রুমের ডিমলাইট আলোতে মৃদু আভা ছড়াচ্ছে। দোয়া ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।

~ আকাশের সেই অর্ধনগ্ন চাঁদ তার নিলর্জ্জতা প্রকাশ করে তার আলোতে পুরো চন্দ্রগিরি ভরিয়ে দিলো। চাঁদের আলোতে রডোডেনড্রন গাছটির সৌন্দর্য কানে আসছে গিটারে টুংটাং আওয়াজ দোয়ার কাছে মনে হলো এক টুকরো স্বর্গ এই যেনো।

দোয়া উপলব্ধি করলো তার পায়ের নিচ থেকে গিটার আওয়াজ আসছে। দোয়া চুপচাপ তার বারান্দায় দোলনাতে বসলো।
~ বেশ কিছুখন পর চট করে গিটারে আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলো। দোয়া দোলনা থেকে উঠে বারান্দায় রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ালো।
সবকিছু শুনশান নীরবতা। বাসার পাশে ঝোপঝাড় থেকে জোনাকি পোকারা নিজ দায়িত্ব আওয়াজ তুলছে। কাঠের তৈরী বাসার কারণে দোয়া কানে স্পষ্ট আওয়াজ এলো সীমান্ত জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। দোয়া বার বার নিচে উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগলো। তার মনে হচ্ছে সীমান্ত ঠিক নেই।

~ ভালোবাসি হুর। ভীষণ ভালোবাসি। এক বছর আগে মুখ ফুটে যে কথাটা তোমাকে বলতে পারিনি আজ এই রাতের অন্ধকার বলতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সেই অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি হুর। দোষ আমার। সত্যি আমার। একটি মানুষের প্রতি অধিকার বোধ হারানো যে কতটা যন্ত্রণার তা কেউ মুখে বুঝানো সম্ভব না। আমি আমার সব অধিকার হারিয়েছি তোমার প্রতি সব। সবকিছুর মূল আমি। আ-আমা-আমার দোষে আমি তোমাকে আজ অন্যের বেডরুমে দেখছি, শু-শুধু মাত্র আমার দোষে। সীমান্ত তার হাত দ্বারা বারান্দায় কাঠের রেলিঙে বারি মারলো। তারপর গটগটিয়ে রুমের দিকে চলে গেলো।

~ কাঠের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোয়া। সবকিছু তার কাছে মনে হলো ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। ভালোবাসি হুর!
এই কথাটা, এই একটি কথা শুনার জন্য কতদিন কতরাত সেই অপেক্ষা করেছিলো আর আজ এইভাবে তাকে শুনতে হলো!
দোয়া মুখে নাইট ড্রেসের অংশ দিয়ে মুখ চেপে কান্নার শব্দ আটকালো। কিন্তু চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগলো। দোয়া বিড়বিড় করে বললো, যাকে অন্যের পাশে দেখতে কষ্ট হয় তাকে নিজের কাছে যত্ন করে রাখতে হয় সীমান্ত ভাইয়া। সব মিথ্যা মেনে নেওয়া যেতো সীমান্ত ভাইয়া। সব মিথ্যা কে আমি ভুলে যেতাম যদি না আপনি তখন একজন বিবাহিত পুরুষ না হতেন!
দোয়া হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে নিচে বসে গেলো।

~ সকালে দোয়া নিজেকে বারান্দায় আবিষ্কার করলো। হেলে-দুলে উঠে রুমে গিয়ে দেখলো অনিক কাতচিত হয়ে ঘুমাচ্ছে। দোয়া ওয়াশরুম ডুকে গেলো একটি হট শাওয়ার নেওয়ার জন্য। সবাই হয়তো উঠে গেছে নুবা বলেছিলো সাতটার সময় তারা রওনা হবে পোখারার উদ্দেশ্য।
~ শাওয়ার নিয়ে বের দোয়া অনিকে জাগিয়ে তুললো। অনিক শাওয়ারের জন্য ডুকার সাথে সাথে দরজায় কে নক করলো। দোয়া এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো নুবা হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দোয়া ভ্রু নাচিয়ে বললো, বাহ আপু কি লাগছে!
নুবা লজ্জাকাতর মুখে বললো, সবাই ওয়েস্টার্ন পরছে তুমি পরো যদি কোন সমস্যা না থাকে! কথাটা বলার জন্য এলাম। দোয়া হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে বললো, অবশ্যই কোন সমস্যা নেই আপু আমি তো সব ওয়েস্টার্ন ড্রেসই নিয়েছি ঐখানরকার জন্য।

দোয়া নুবা হাত ধরে রুমে ডুকিয়ে আলমারি খুলে দেখিয়ে বললো, তুমি নিজে ঠিক করে দাও কোনটা পরে যাবো এখন!
নুবা দোয়া কে একটি কালো রঙের টপস বের করে দিলো। নাস্তা নিচে চলে এসেছে তাই জলদি নিচে যেতে বলে নুবা দোয়ার রুম থেকে প্রস্থান করলো।
~ নিচে নেমে খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত হলো। দোয়া আঁড়চোখে সীমান্তের দিকে তাকালো। সেই বিরক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সবাই ব্যাগ গুনছে।
~ নুবা গালে হাত দিয়ে বললো, ভারী বিপদ হলো ঐখানকার সবাই নজর তো তোমার দিকে থাকবে এ-তো ভয়ংকর সুন্দর লাগে তোমাকে ওয়েস্টার্ন ড্রেসে। সানজিদা আর মেহের এক মত হয়ে বললো, সত্যি বিষ্ময় আমরা।

~ নুবা দোয়া কে একটি ঔষধের পাতা এগিয়ে দিয়ে বললো, সীমান্ত সবাই জন্য এনেছি এই ঔষধ খেলে আর রাস্তা বমি বা কোন রকম অসহ্যকর যন্ত্রণা লাগবে না। দোয়া সেই ঔষধের পাতাটির দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলো। এই পাতাটির সাথে তার রয়েছে সুন্দর একটি অতীত। কেন এতো খেয়ালই মানুষটা!
~ সাব্বির সানজিদা কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফোড়ন কেটে বললো, তোর খেল শেষ এইবার অনিক্কার বউয়ের খেল শুরু।
সীমা সীমান্তের উপরে বিষে নীল হয়ে আছে। ফলস্বরূপ সাব্বিরকে মাইক্কা চিপা পরতে হলো। সীমা তার ধারালো তেজি গলায় বললো, এইসব ময়লা রঙের দিকে কেউ তাকায় না বুঝলি, ওর থেকে দিগুন ফর্সা আমি।

সাব্বির ভেংচি কেটে বললো, এখন ঐ যুগ নেই আপা যে সবাই সাদাকালো খুঁজে এখন উজ্জ্বল শ্যাম মানে মারাত্মক সুন্দরী মনে আছে আমাদের প্রফেসর বলছিলো!
সীমা এক অগ্নিশর্মা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, এইসব সাহিত্য লোক বলে বুঝলি এমনে মানুষ না।

সাব্বির মজাই লাগছে সীমা কে জ্বালাতে তাই সেই নিজের কাজকর্ম চালু রেখে বললো, সাহিত্য মানুষরাই তো সত্যি কারী অর্থে পুরুষ হয় আর গুলো তো কাপুরুষ। তার মানে তুই কাপুরুষ দের আশায়!
সীমা মনে মনে সাব্বির কে এক বিষাক্ত খিস্তি দিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে গেলো।
সাব্বির হাসতে হাসতে টেবিলে বসে গেলো।

~ নাস্তা শেষ করে সবাই রওনা পোখারার উদ্দেশ্য। সারাটা রাস্তা সীমান্ত একটিবার দোয়ার দিকে তাকালো না। দোয়া বুঝতে পারলো সকালের ব্যাপারটা নিয়ে হয়তো। অপরপক্ষে সীমান্ত তার অপরাধ বোধের বোঝার জন্য দোয়ার চোখের সাথে চোখ মিলাতে পাচ্ছে না।
~ দোয়া অবাক চোখে নেপালের রাস্তার সৌন্দর্য দেখতে লাগলো। নেপালী দের তাদের একটি সাংস্কৃতিক টুপি জন্য চেনা যাই পরণে তাদের যেমনিই পোশাক থাকে এই টুপি তাদের পরিধান করা নেপালী সরকারে আদেশ মানা হয়।

~ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পথ। অসাধারণ ছিলো সেই ভ্রমণ। মাটির যে কত বিচিত্র রূপ তা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। পানির ফিল্টারের জন্য যে পাথরের ফিল্টার ব্যবহার করে মানুষ, মাটির স্তরগুলো এমন বিভিন্ন ধরনের। নানান রঙের। মাটির যে এতো বিচিত্র রূপ তা আগে বিভিন্ন বইতে পড়েছি দোয়া। কিন্তু কখনও চোখে দেখেনি।

~ বেলেমাটির মধ্যে বিশাল বিশাল পাথর দিয়ে সাজানো পাহাড়। আবার কোথাও কঠিন শিলা। কোথাও বেলে ভঙ্গুর মাটি। কোথাও সাদা চুনের মতো। আবার কোথাও লাল বর্ণের এঁটেল মাটি। দোয়ার কাছে অবাক লেগেছে অনেকটা বালিমাটির সাথে পাথরের সমন্বয়ে যে পাহাড়। একটি ছাড়া কাঠমান্ডু থেকে পোখারা কোথাও পাহাড়ের গায়ে কোনো বিলবোর্ড দেখলাম না। দোয়া মনে মনে ভাবলো পাহাড়ের গায়ে দূরে হলিউডের মতো করে ওয়ালটন লেখা থাকলে মন্দ হতো না।
~ পোখারা ঢুকতেই দোয়াকে যে জিনিসটা সবচাইতে বেশী মুগ্ধ করলো তা হলো বাড়িঘর। শৈল্পিকভাবে সাজানো প্রতিটি বাড়ি। পাথরের টালির বাড়ি। দেখে মনে হচ্ছে সস্তা ধরনের বাড়ি। কিন্তু শিল্পের ছোয়ায় পরিপূর্ণ। রঙ বেরঙের দেয়াল আর সুন্দর বারান্দা। বারান্দায় নাই কোনো ঝুলানো কাপড়।

~ পোখারা শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪০০ মিটার উচ্চতায়। কাঠমান্ডু থেকে পোখারার দূরত্ব প্রায় ২১৫ কি.মি.। রাস্তা প্রায়ই ফাঁকাই ছিলো।
~ প্রথমবার যাত্রা বিরতি তে সবাই যে যার মন মতো খাবার নিতে লাগলো। ফ্রেশ হতে বাথরুমে ছুটলো। দোয়া হঠাৎ একটা বিষয় লক্ষ্য করলো, তা হচ্ছে বাথরুম ব্যবহার করে সবাই দরজা খোলা রেখে চলে আসছে। কিন্তু তাদের গাড়ি চালক গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে আসছে। ব্যাপারটা খুবই সামান্য। কিন্তু কাজটা অসামান্য।

~ বাথরুমের দরজা যখন খোলা থাকে, তখন রাস্তা থেকে দেখতে খুবই বাজে লাগে। কিন্তু বন্ধ দরজায় পরিবেশটা সুন্দর লাগে। বিশ্রামের স্থানে ছোট ছোট টেবিল চেয়ার সাজানো। পাহাড়ি পাতার ছাউনি। কোথাও কোনো চিপস্-এর প্যাকেট নেই। নেই প্লাস্টিকের বোতলের ছড়াছড়ি। এতোটুকুতেই সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। দোয়া বিড়বিড় করে বললো,, আসলে টাকা পয়সা দিয়ে সৌন্দর্য হয় না। সৌন্দর্যের জন্য লাগে সুন্দর মন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।

~ সবাই খাওয়া দাওয়ার পর উঠে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলো। বিপত্তি ঘটলো দোয়ার, অত্যন্ত ধীরে খাওয়ার ফলে সেই তখনও খাবার হাতে বসেছিলো। আশ্চর্যজনক ভাবে পাশে বসেছিলো সীমান্ত সেই ও একি গতিতে খাবার খাচ্ছে। দোয়া চোরা চোখে সীমান্তের দিকে তাকালো। দোয়া জানে এটা তার জন্য করছে। সীমান্ত খুবই দ্রুত খাই এখন এতো দেরী খাবার খাওয়ার মানে দোয়া হাড়ে হাড়ে জানে। কৃতজ্ঞতা দোয়ার চোখ মুখে এক উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠলো।
~ দোয়ার চট করে পুরানো কথা মনে পরে গেলো, দোয়া একা একা কখনও খেতে পারে না তাই সীমান্ত ও তার সাথে থাকলে সমান তালে খাবার খেতে।

দোয়া ভিতর থেকে হাহাকার করে উঠলো। কেন মানুষটা এতো কিছু মনে রেখেছে। এতোই যখন ভালোবাসতো খেয়াল করতো তাহলে কেন এতো আঘাত দিলো!
~ দোয়ার যখন খাওয়া শেষ হলো তাকে হতবাক করে দিয়ে সীমান্ত একটি কাগজের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে সামনে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, তোমার ঔষধ খেয়ে নাও। নাহলে শরীর খারাপ করতে পারে এই লম্বা জার্নিতে। দোয়া এক নজর সীমান্তের দৃঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে আবার নজর নিচু করে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো।
~ সীমান্ত উঠে যাওয়ার পিছনে নুবা এগিয়ে এলো তারপর দুঃখিত গলায় বললো, আসলে আকাশ জোর করে নিয়ে গেলো তখন অনিক কই!
দোয়া টিসু দ্বারা হাত পরিষ্কার করে বললো, সীমাপু সাথে উঠে গিয়েছে।
নুবার কপাল তৎক্ষনিক কুঁচকে গেলো এক অদ্ভুত কারণে।

~ পাহাড়ি রাস্তার কারণে তাদের সময় লেগেছে প্রায় ৮ ঘণ্টা। আরো দুইবার যাত্রাবিরতি ছিলো ওদের। সারাটা রাস্তা দোয়া এক অদ্ভুত মুগ্ধতা ভেসে ছিলো। তার মনে হচ্ছে পাহাড়ের সৌন্দর্যের এক স্নিগ্ধ ঘ্রান তার নাকে মৌ মৌ করে এসে দোলা দিচ্ছে।
~ পোখারা পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দেখা মিললো সাজানো গোছানো পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক শহরের। আর দূর পাহাড়ের পেছেনেই আপন রূপে মহিয়ান সুবিশাল হিমালয়।

সেইখানে একটি হোটেলে তারা রাতটি কাটিয়ে সকালে ভোরে রওনা হলো পুরো পোখারা শহর দর্শনে।
~ সূর্য যখন স্তিমিত ঠিক তখন হিমালয়ের অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ফেওয়া লেকের বুকে নৌকাভ্রমণ মনে জাগালো এক স্বর্গীয় অনুভূতি সবাই। লেকের বুকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য যেন নিজের অজান্তেই মন ভুলিয়ে দেবে যে কাউকে।
নৌকা নিয়ে আরেকটু এগোলেই লেকের ঠিক মাঝখানে এক টুকরো দ্বীপের মতো অবস্থান বরাহি মন্দিরের।
~ দোয়ার হাসি আর মুখের খুশির উৎফুল্ল ভাব যেনো সরছে না মুগ্ধতা ছিলো তার চোখে মুখে। আর তাকে দেখে আঁড়চোখে বুকে স্নিগ্ধ ছোঁয়ার ভালো লাগা উড়িয়ে বেরাচ্ছিলো সীমান্তের শরীরে।

~ অনিক, আকাশ আর সীমা কে ভারী বিরক্ত দেখালো। অনিক বিরক্ত ভঙ্গিতে দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, এতো হিহিহি করছো কেন আমার মাথায় ধরছে না ঘুরা বেড়ানো যে কতটা বিরক্তকর উপপ। দোয়া এক পলক তাকিয়ে আবারও পোখারা সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলো।

পর্ব ৭

~ অনিকের ফোন অনবরত বাজছে। অনিক ফোনে কানে নিয়ে কিছুখন কথা বলে দোয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, ইরানি আন্টি তোমার সাথে কথা বলবে
দোয়া হাসি হাসি মুখে ফোন টা কানে নিলো।
অনিকে দোয়ার উদ্দেশ্য বিরক্ত ভরা কন্ঠে বললো, আমি ঐদিক গিয়ে বসছি পা আমার যন্ত্রণা করছে কথা শেষ করে এগিয়ে আসিও।
দোয়া হ্যাঁ বোধক মাথা দুলালো।

দোয়া ফোন কানে নিয়ে মিসেস ইরানির উদ্দেশ্য সালাম দিলো।
মিসেস ইরানি তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বললো, তোমার মতো নিচু শ্রেনীর মেয়ের সাথে খেজুরী আলাপ করতে আমি ফোন দিই নেই।
দোয়া হাই তুলে বললো, জ্বী বলতে থাকুন। কান খোলা আমার।
মিসেস ইরানি কাঠ কাঠ গলায় বললো, আমার সীমান্ত থেকে দূরে থাকবে দূরে মানে একদমই দূরে।
দোয়া ঠাট্টা সুরে বললো, যদি না থাকি!

মিসেস ইরানি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, আমি জানতাম তুমি এমনই কথা বলবে, কারণ তোমার তো স্বভাবই এটা বিবাহিত ছেলেদের পিছনে ঘুরা।
দোয়া মুচকি হেঁসে বললো, তাহলে তো শুধু শুধু টাকা খরচ করলেন আন্টি, কারণ আপনি তো আমার স্বভাব সম্পর্কে অবগত।
মিসেস ইরানি ক্ষুব্ধ ভরা গলায় বললো, একদমই চালাকি করবা না বেয়াদব, বেহায়া মেয়ে। থাপ্পড় মেরে তোমার দাঁত ফেলে দিবো।
দোয়া তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, বারে! এতোই ক্ষমতাদার আপনি! মার্ক জাকারবার্গ আপনাকে ফোনের মধ্যে থাপ্পড় মারার সুযোগ করে দিলো! বাব্বাহ কি প্রতিষ্ঠিত মানুষ সাথে কথা হচ্ছে আমার!

মিসেস ইরানি যেনো বোবা হয়ে গেলো দোয়ার এমন খামখেয়ালী কথাতে। তিনি রাগে ক্ষোপে কথা বলতে যেনো ভুলে গেলো। কত কি ভেবে রাখলেন তিনি আজ এই মেয়েকে কথাতে জব্দ করবেন। আর এই মেয়ে কিনা তার রাগ এমন পর্যায়ে উঠিয়ে দিয়েছে যে উনি নিজেই কথায় খুঁজে পাচ্ছে না।
দোয়া রসিকতা গলায় বললো, কি গো আন্টি কই আপনি! বিমানে উঠে গেলেন নাকি আমাকে থাপ্পড় মারার জন্য!
মিসেস ইরানি ঝাঁঝের সাথে বললো, তুমি কি ভেবেছো অনেক চতুর তুমি! একদিন শুধু, একদিন লাগবে আমার নেপালে আসতে আর তোমার গাল লাল করতে।
দোয়া শব্দ করে হেঁসে ফেললো তো আসুন। মারুন থাপ্পড়। আর এরপরে আপনার আর আপনার দুলাল ছেলের মহাপ্রলয় আমি কোক আর চিপস হাতে উপভোগ করবো।

মিসেস ইরানি দাঁত দাঁতে চেপে বললো, তোমার মতো নিকৃষ্ট মেয়েলোক আমি আর জীবনেও দেখিনি মাত্রাহীন বেলাজ তুমি।
দোয়া আগের হাসি বজায় রেখে বললো, তাহলে তো ভারী উপকার হলো আপনার। জীবনে প্রথম দেখা জিনিস সত্যি মহামূল্যবান হয়।
মিসেস ইরানি নিজেকে যথেষ্ট ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে বললো, তুমি জানো তোমার ব্যাপারে আমি সব জানি সব তুমি কি চাও আমি তোমার বরের কাছে সব বলি!
দোয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললো, তো! বলুন! ফোন দিবো ওকে!

মিসেস ইরানি হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো পাখা চট করে কাটা পরে গেলো। তিনি যেনো আছাড়ে আকাশ থেকে নিচে পরলো। তিনি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
এই মেয়ে তোমার কোন ভয় নেই! নাকি নিজের সংসার বা নিজের মান সম্মানের প্রতি কোন মায়া নেই!
দোয়া আনন্দিত কন্ঠে বললো, আমার সংসার ভাঙা আর আপনার ছেলের সংসার ভাঙা একিই হবে মিসেস ইরানি আন্টি!
মিসেস ইরানি থমকে গেলো, সত্যি তো সীমান্ত কে উনার হাড়ে হাড়ে চেনা আছে হাতের নিচে যখন এই মেয়ে এসেছে এমনে ছাড়বে না!
তিনি তাও নত স্বীকার না করে বললো, আমার ছেলে যে তোমাকে মাঝ রাস্তায় ফেলে চলে এসেছিলো তা কি খেয়ে বসে আছো! আমার ছেলে তোমার জন্য কখনও নিজের সংসার ভাঙবে না। সেই পাগল সীমার জন্য।

দোয়া হেঁসে উঠে বললো, সময় কথা বলবে আন্টি। তারপর রসিয়ে রসিয়ে বললো, আর হ্যাঁ আন্টি একটি চমৎকার সংবাদ দিই আপনাকে!
মিসেস ইরানি কৌতূহল গলায় ঠাট্টা সুরে বললো, কি বাচ্চা টাচ্চা নিয়ে নিলা নাকি, তাহলে সত্যি চমৎকার সংবাদ হবে। বলো, বলো!
দোয়া মিসেস ইরানির এমন অশ্লীল ঠাট্টা কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বললো, পরশু সারারাত আপনার দুলাল ছেলে আমার জ্বরের জন্য পাশে বসে সেবা করেছিলো।
মিসেস প্রায় দিশেহারা হয়ে গেলো তিনি হতদন্ত গলায় বললো, মিথ্যা সব মিথ্যা। তুমি ছলনা করছো, তোমার এতো বড় স্পর্ধা তুমি আমার ছেলের উপরে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছো!

দোয়া বাঁকা হেঁসে বললো, এই নিকৃষ্ট মেয়ে আপনার একটা উপকার করবে আন্টি। সেই এখন আপনার ছেলের সাথে পোখারা শহরে এডভেঞ্চারে আছে। তাই জার্নি আজ না করে দুইদিন পর করবেন। দাওয়াত রইলো!
মিসেস ইরানি রাগ আর সরবরাহ না করতে পেরে বললো, ছোটলোক অসভ্য আমার ছেলে থেকে দূরে থাকো নাহলে তোমার জন্য জঘন্য বিপদ রয়েছে।
দোয়া অভিনয় করা অভিমান সুরে বললো, দেখুন কত্ত ভালো মেয়ে আমি আপনার উপকার করলাম নাহলে তো এসে তালা ঝুলা অবস্থায় পেতেন। আর আপনি কিনা আমাকে বকা দিচ্ছেন!

মিসেস ইরানি আর কথা খুঁজে না পেয়ে ছিঃ করে একটি শব্দ করে ফোন কেটে দিলো।
দোয়া এক পেশে হেঁসে ভারী ভদ্র গলায় বললো, আহারে আজকাল কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মানুষ বুঝি ছিঃ বলে। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে অনিকের কাছে এগিয়ে গেলো। যেনো মিসেস ইরানির ছিঃ মানে সেই বুঝলই না।
~ আজ দোয়া আরো বেশী ফুরফুরে মেজাজে হয়ে গেলো। সেই হাসি হাসি মুখে অনিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বললো, ভারী মজার আন্টি কথা বলে মন উৎফুল্ল হয়ে গেলো।

অনিক ভ্রু কুঁচকে দোয়ার উজ্জ্বল হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো যতটুকু সেই জানে মিসেস ইরানি প্রচন্ড অহংকারী বদমেজাজী এক মহিলা। তার মধ্যে মজার কি পেলো দোয়া তা অনিকের বোধগম্য হলো না। হঠাৎ সীমান্ত এগিয়ে এসে ভারী দুশ্চিন্তা গলায় বললো, তুই এখানে বসে আছিস কেন! তারপর দোয়ার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে বললো, শরীর খারাপ হয়েছে কারও!
~ দোয়া সীমান্ত কে হতবাক করে দিয়ে অসাধারণ ভাবে হেঁসে বললো, আমি ঠিক আছি সীমান্ত ভাইয়া চলুন সামনে যাওয়া যাক।
সীমান্ত অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো দোয়ার দিকে। দোয়া তার সাথে নিজ থেকে কথা বলছে! এটা হজম করতে সীমান্ত সেকেন্ড সময় লাগলো। তাকে দেখে মনে হলো তার ভিতরকার খুশি ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে আসছে।

সীমান্ত যেনো অমব্যাসর চাঁদ হাতে পেলো। সেই পূনরায় এক উজ্জ্বল হাসি বিনিময় করে বললো, কেনো না অবশ্যই চলো!
~ তারা সবাই আবার একত্রে হয়ে গেলো। যে যার মত করে সৌন্দর্যের বর্ননা দিতে লাগলো।
তাদের সাথে রয়েছে দেশ বিদেশি অনেক পর্যটক।
এক পর্যটক বললো, লেকের ঠিক মাঝখানে এই মন্দিরটি সত্যিই খুব সুন্দর।

সীমান্ত তার সাথে তাল মিলিয়ে মন্দিরের সৌন্দর্য আরো বর্ননা করতে লাগলো। আর তা মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো দোয়া।
~ আকাশটা আজ একটু মেঘলা। তাই হিমালয় পুরোপুরি দেখা না গেলেও, পাহাড়ে ঘেরা এই লেকটিতে এসে সত্যি খুব ভাল লাগছে দোয়ার। সেই বার বার আঁড়চোখে আজ সীমান্ত কে দেখতে লাগলো। এক অজানা কারণে আজ কেন যেনো বার বার সীমান্ত কে দেখতে ইচ্ছে করছে তার!
~ চীনের একজন পর্যটক বললো, পোখারার যে বিষয়টি সবচেয়ে ইতিবাচক তা হলো, এখানে কোন বায়ুদূষণ নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পুরোপুরি শান্ত একটি শহর।

হাসিব এক মত হয়ে বললো, এই জন্য তো নেপালের সবচেয়ে সৌন্দর্যের অধিকারী পাঁচটি দিক দিয়ে পোখারার স্থান দ্বিতীয় স্থানে আছে।
এখানকার মানুষজনও বেশ আন্তরিক।

একজন নেপালি পর্যটক বলেন, আমি নেপালি হলেও, পোখারায় এটাই আমার প্রথম ভ্রমণ। শুধু এই লেক না, লেকের আশপাশটাও খুব সুন্দর।
~ পোখারায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের আকর্ষণের আরেক নাম প্যারাগ্লাইডিং।
নগরীর সারাংকোটে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় গেলে দেখা মিলবে পাখির মতো আকাশে উড়ে বেড়ানো শত শত প্যারাগ্লাইডারকে।
~ হিমালয়ের অন্নপূর্ণা রেঞ্জ আর ফিশটেইল শৃঙ্গসহ পুরো পোখারাই যেন স্পষ্ট এই সারাংকোট থেকে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও, নিজ দেশের অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন নিয়ে আক্ষেপও হচ্ছিল বেশ দোয়ার।

~ নুবা হঠাৎ দোয়া কে লক্ষ্য করে বললো, তুমি তো বেশ ঘামাচ্ছো বেশ। অসুস্থবোধ হচ্ছে না তো!
দোয়া হালকা করে হেঁসে বললো, আসলে আপু ঔষধ খেয়ে রওনা হয়েছিলাম তো তাই একটু গরম লাগছে হয়তো জ্বর ছাড়ছে।
নুবা অনিকে উদ্দেশ্য করে বললো, এই তুই সাব্বির থেকে পানির বোতল টা নিয়ে আই তো যা দৌড় দে।
অনিক ভ্রু কুঁচকে বললো, কিন্তু কেনো!

নুবা বিরক্ত দৃষ্টিতে অনিকের দিকে তাকিয়ে বললো, দোয়া কে একটু পানি খাওয়াতে হবে ঐ যে অসুস্থ শরীর নিয়ে এসেছে তা কি ভুলে গেলি!
অনিক দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি সত্যি পানি খাবা!
নুবা এক বাজকাই ধমক দিয়ে বললো, যাবি তুই! কি বিচিত্র মানুষ রে তুই! এতো অলস মানুষ হয়!
অনিক গটগটিয়ে বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো।
নুবা দোয়া কে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি মাফলার টা খুলে নাও এখন একটি রিলাক্স বোধ করবে।

দোয়া তাই করলো। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নুবার দোয়ার গলার দিকে চোখ পরে গেলো। যা দোয়ার চোখেও এড়ালো না দুইজনে চোখাচোখি হয়ে গেলো। নুবার চোখমুখে প্রশ্ন। সেই বিষ্ময় কন্ঠে বললো, অনিক কি কাল!
দোয়া নুবার থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। তার চোখে হঠাৎ আশ্চর্য ভাবে পানি জমে গেলো। নুবা কিড়মিড় করে একটি বাংলা খিস্তি দিয়ে বললো, জানোয়ার বললেও ওরে ভুল হবে। ওর এই সময়ও কামুকতা নাড়া দিলো, ও কি নিজের আক্কেল মনুষ্যত্ব বিক্রি করে খেয়েছে যে অসুস্থ বউয়ের উপরে এইরকম ঝাপিয়ে পরলো!

দোয়া বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, এই ব্যাপারে তুমি ওকে কোন কথা বলো না আপু ব্যাপারটা আমাদের স্বামী স্ত্রী মধ্যে থাক!
নুবা হতবুদ্ধি গলায় বললো, পাগল হলে তুমি দোয়া! আর তুমি ঐ জাহিল কে বারণ করতে পারো নি!
দোয়া নুবার দিকে তাকালো। কিন্তু তার দৃষ্টি বেধ করে চলে গেলো নুবার পিছনে সীমান্তের দিকে।
সীমান্ত ক্রোধ ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো দোয়া। যার অর্থ সীমান্ত মুহুর্তের মধ্যে লুফে নিলো। যেনো তাকে তিরস্কার করে বলছে।
দেখো তোমার বদৌলতে আজ আমি এক কাপুরুষের হাতে দগ্ধ হচ্ছি!

সীমান্ত রক্তচক্ষু চোখে তাকিয়ে আছে দোয়ার গলায় আঁচড়ে দাগের দিকে যা অনিক থেকে সেই কাল রাতে অসুস্থ শরীরে উপহার হিসেবে পেয়েছে। সীমান্তের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলো সীমা তাকে দেখালো অস্বাভাবিক ক্রুদ্ধ। সেই হরগরিয়ে এক অজানা কারণে সেই জায়গা ত্যাগ করলো।
~ দোয়া নুবার দিকে তাকিয়ে পূনরায় সীমান্ত দিকে তাকালো। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যে যেনো সীমান্ত ভ্যানিশ হয়ে গেলো। দোয়া এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে দেখলো কিন্তু তার ছায়াও দেখা গেলো না।

~ অনিক বোতল নিয়ে এগিয়ে আসছিলো। তার নাম্বারে ফোন আসাতে সেই সবাই চোখের আড়ালে গিয়ে ফোন কানে নিয়ে এক বিরাশি চিক্কার ধমকের স্বীকার হলো। অনিক কোন রকম তোতলাতে তোতলাতে বললো, বিশ্বাস কর আমি বাসায় গিয়ে তোর কথামতো কাজ করা শুরু করবো। আরে ঐ আমার বউ আমি নিজেকে আটকাতে পারিনা।

আরে আজ কেমনে! আমি তো এখনও কোন প্ল্যানই করি নেই। তুই আমার উপরে আর একটু আস্থা রাখ। আমি বাসায় গিয়ে সব কাজ দ্রুত তার সাথে করবো নিজের কসম। অনিক সত্যি সত্যি নিজের মাথায় হাত রাখলো যেনো ফোনের ঐ পাশের ব্যক্তিটি তা দেখছে। ফোন রেখে অনিক এক বড় নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর তার নজর গেলো সীমার দিকে। ফোন হাতে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে সেই। অনিক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সেইদিকে এগিয়ে গেলো।

~ সেই খানে একটি লোক রয়েছে তিনি সব পর্যটক দের এই পোখারা শহরের ইতিহাস আর বিচিত্র সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করতে লাগলো।
~ অনিক বোতল নিয়ে আসলো বেশ কিছুখন পর নুবা ঘিন্না ভরা চোখে হিঁচড়ে বোতল নিয়ে বললো, তুই হাসিব আর সাব্বিরের সাথে ঘুর দোয়া এখন আমার সাথে থাক। অনিক কন্ঠে বিরক্ত এনে বললো, আশ্চর্য আমরা স্বামী স্ত্রী ঘুরবো তোর সমস্যা কি তুই যা হাসিবের কাছে।

নুবা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, ওর শরীর বেশ খারাপ হচ্ছে একটু পর পর ওর খেয়াল রাখতে হচ্ছে তোর সাথে এই অবস্থা ছেড়ে দিলে মরে গেলেও তুই জিজ্ঞেস করবি তুমি মরলা কেন!
অনিক কতখন বিষ্ময় চোখে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নুবার দিকে তাকিয়ে। দোয়া তখন চোখ বন্ধ করো পাশের একটি বসার জায়গায় বসে ছিলো। সত্যি তার খারাপ লাগছে।
অনিক খুঁজে পাওয়ার মত কোন কথা না পেয়ে দুমদাম পা পেলে চলে গেলো সাব্বির আর হাসিবের দিকে।

সানজিদা, মেহের আছার খাচ্ছে আর কি একটা ব্যাপার নিয়ে খিলখিল করে হেঁসে যাচ্ছে তাদের সাথে এসে একত্রে হলো সীমা।
~ নুবা খেয়াল করলো দোয়া সব কথাতে অতিমাত্রায় হাসে। হাসি যেনো সবসময় ওর মুখেই লেগে থাকে। হাসি যেনো এক মোক্ষম ছুরির মত কাজ করে মন ভাঙা মানুষগুলোর। কেউ যদি মন থেকে লক্ষ করে তারাই ঠিকই বুঝবে এই মানুষগুলো সবসময় হাসিখুশি থাকে।
~ পোখারায় সুবলং বা জাফলং এর মত সুউচ্চ ঝর্ণার দেখা না মিললেও, খুজে পেলাম ১০০ ফুট গভীর আর প্রায় ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ঐতিহাসিক জলপ্রপাত ডেভিস ফল।

~ ইতিহাসে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে ডেভিস নামে এক সুইস পর্যটক জলপ্রপাতটিতে পড়ে গেলে, বেশ কয়েকদিন পর উদ্ধার হয় তার লাশ। সুইস নারী ডেভিস এই জলপ্রপাতটিতে পতিত হওয়ার পরই এর নাম হয় ডেভিস ফল।

~ সারাটা দিন পোখারা শহর ছড়ে বেড়ানোর পর রাতে এক ফোঁটা ঘুম এলো না দোয়ার। তার চোখ মুখে ভাসছে সারাদিন সবচাইতে সুন্দর সুন্দর মুহুর্ত। আর ভাসছে সীমান্তের মুখ। না চাইতে দোয়া বার বার সীমান্ত কে ভেবে উঠছে। সীমান্তের প্রতিটা চালচলন তাকে মনে করিয়ে দেই অতীত। দোয়া এইপাশ ঐপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা চালালো।

পাশ থেকে অনিক অনবরত নাক ডেকে গন্ডার মত কাত হয়ে ঘুমাচ্ছে। যেনো চন্দ্রগিরি থেকে তাকে হেঁটে হেঁটে পোখারা শহর আনা হয়েছে।
~ যেমন জেগে রইলো দোয়া তেমনি জেগে রইলো সীমান্ত। তার চোখে মুখে ভেসে উঠছে তার হুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মনোমুগ্ধকর হওয়া মুখ। যা সেই পোখারা সৌন্দর্য দেখে তুচ্ছ করে দেখেছিলো।

তার হুর দেখছিলো পোখারার সৌন্দর্য আর সেই দেখছিলো তার হুরের সৌন্দর্য। আহা সেই কি ভাষায় প্রকাশ না করার মতো অনুভূতি।
~ হঠাৎ মনে উঠলো হুরের বেদনাদায়ক চেহেরা। মুহুর্তে সীমান্তের মুখের উল্লাস চলে গিয়ে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রুপ নেমে এলো। সীমান্ত বিড়বিড় করে বললো, তাই হয়তো কাল আমার ভিতরটা এতো দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিলো বুক টা হাহাকার করছিলো। কারণ তুমিও সেই অনুভূতি তোলে ছিলে।

~ দোয়ার সত্যি ঘুম এলো না সেই উঠে জানালার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো এই রাতের অন্ধকার কুয়াশার জন্য বাইরে কোন কিছুই চোখে দেখা যাচ্ছে না। সবকিছু কেমন ধোঁয়াশা আর ফ্যাকাশে লাগছে। দোয়া চোখ বন্ধ করে একটি লম্বা শ্বাস নিয়ে বললো, তোমার প্রতি ভালোবাসা মাত্রা দিন দিন কেন এতো বেড়ে যাচ্ছে বলতো পারে সীমান্ত ভাইয়া!
এটা যে ঘোর পাপ, তুমি তো আমার জন্য আরো এক ধাপ বেশী নিষিদ্ধ হয়ে গেছো।

তারপর অভিমান গলায় উপরে আল্লাহ কাছে বিচার দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো, তুমি কেন মানুষ কে এমন অদ্ভুত ধাতু দ্বারা তৈরী করেছো বলতে পারো! কেন যে জিনিস তাদের নিষিদ্ধ ঐ জিনিসের প্রতি তাদের মৃত্যু পর্যন্ত এক অভাবনীয় তীব্র টান থাকে বলতে পারো!
~ পোখারার সুখস্মৃতি নিয়ে পরের দিন তারা সবাই রওনা হলো হিমালয়ের দেশ তাদের শেষ গন্তব্য সুউচ্চু পাহাড়ে ঘেরা নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় আরেক স্থান/এলাকা নাগরকোটএর উদ্দেশ্যে।

~ সারাটা রাস্তা সীমান্ত মুখ অত্যন্ত দৃঢ় লাগলো। তা আঁড়চোখে লক্ষ্য করলো সবাই। সীমান্ত প্রচন্ড চতুর আর মেজাজি স্বভাবের বলে কেউ কম বেশী কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি করে না ওর উপর। আর রসিকতা তো নাই। কারণ কখনও সীমান্ত কোন মেজাজে থাকে তা সবাই বুঝা দায়।
~ সুউচ্চ পাহাড়ের বুকে মেঘের আড়ালে কিছুক্ষণ পরপরই উঁকি দেয় পুরো হিমালয়সহ এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট।
হিমালয়ের রূপ যেন আরও জাগ্রত এই নাগরকোট থেকে।

~ নাগরকোট গ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে এটি অবস্থিত। পৃথিবীর অন্যান্য গ্রামে বসবাসকারী মানুষজন যেখানে মাঠ থেকে আকাশকে দেখে। সেখানে নাগরকোটের বাসিন্দারা নিচে তাকিয়ে আকাশ দেখে। ঠিক যেন স্বর্গের অপার সৌন্দর্য অনুভব করার মতো অবস্থা।
~ যেতে যেতে দেখা যাই, পাহাড় থেকে খুব সরু ঝিরঝিরে ঝর্ণা নেমে এসেছে বিভিন্ন জায়গায়।
ঘরের উঠোনে মুরগি আর শূকরছানার ঘোরাঘুরি।

শুকোতে দেওয়া ভুট্টা আর আলু বোখারা (পিচ)।
লাল আপেলের মতোন গাল আর সরু চেরা চোখের শিশুরা।
ঘরের দ্বারে জপ মালা হাতে মন্ত্র পাঠরত ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি পোশাকের বৃদ্ধা।
~ দোয়া চোখ যেনো কোটর থেকে বের হতে লাগলো। শুকনো ঢোগ গিলে সেই দেখতে লাগলো নাগরকোটের এক অপরুপ সৌন্দর্য। নাগরকোটে প্রচন্ড ভীড় তাতে করে সবাই ছুটাছুটা পরে যাচ্ছে বার বার।

~ সবাই যখন যে যার মত ব্যস্ত দোয়া নিজের অজান্তেই চট করে সীমান্তের হাত ধরে ফেললো। সীমান্ত ভড়কে গিয়ে দোয়ার মুখের দিকে তাকালো।
দোয়া সীমান্তের হাত ধরে আগের অনুভূতি অনুযায়ী বাচ্চা দের মত ঝাঁকি দিয়ে খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে বললো, সীমান্ত ভাইয়া আমাকে ধরুন এই সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে আমি আজ সত্যি মারা পরবো।

~ সীমান্ত হতবাক, হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো দোয়ার হাসিজ্জ্যেল মুখের দিকে। কিন্তু কিছুখনের মধ্যে দোয়া চুপ মেরে গেলো সেই চট করে সীমান্তের হাতের দিকে তাকালো। যে হাতটি সেই ধরে রয়েছে শক্ত হাতে। তারপর দ্রুততার সাথে হাতটি সরিয়ে ছুটে ভিড়ের মধ্যে নুবা পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
সীমান্ত কোন রকম মুখ ভঙ্গি প্রকাশ না করে হাঁটতে লাগলো। তার মন মেজাজ সত্যিকারী অর্থে আজ ভালো নেই। সীমা আবারও সীমান্তের কাছ ঘেঁষে এই কথা ও কথা বলতে লাগলো।
~ মেঘকে স্পর্শ করতে করতে দোয়া হঠাৎ অনুভব করলো, মেঘেরও গন্ধ আছে, আছে মাতাল করা এক অদ্ভুত শক্তি।
সানজিদা বললো,, নাগরকোট সত্যই খুব সুন্দর।

হিমলায়কে দেখার জন্য এর চেয়ে সুন্দর কোন জায়গা আর আছে বলে মনে হয় না।
~ এলাকাটি এতই ছোট যে, ওর সবাই পায়ে হেটেই পুরো নাগরকোট ঘুরে দেখতে পারলো।
~ রাতে ক্লাব হোটেলে বাইরে জমজমাট উৎসবমুখর আয়োজন হলো। এখানে দেশ বিদেশের সব পর্যটক চমৎকার সাজগোছ করে বাইরে আসলো।
সীমান্ত দাঁড়িয়ে ছিলো অনিক, সাব্বির হাসিব আর কিছু ভ্রমণ পথের নতুন চেনা মুখের সাথে।
~ সীমান্ত বাদে সবাই এখানকার হুরপরী মত সুন্দরী মেয়েদের দেখতে লাগলো আর হাসি ঠাট্টা করতে লাগলো। কাল থেকে সীমান্তে সব কিছু অসহ্য লাগছে। যেনো তার ধৈর্য তার সাথ ছেড়ে দিয়েছে।

~ হঠাৎ সাব্বির গালে হাত দিয়ে বললো, মাইরি এইগুলো কি আমাদেরই বউ!
সাব্বিরের কথার প্রেক্ষিতে সবাই দৃষ্টি সামনে গেলো। সেইখান দিয়ে হেঁটে আসছে অসম্ভব সুন্দর শাড়ি পরিহিত চার রমনী।

~ সীমান্ত তাকিয়ে রইলো মুগ্ধ দৃষ্টিতে। তার চোখে যেনো পলক ও পড়ছে। যেনো সেই চোখের পলক কে কঠোর নিষেধ করেছে এক সেকেন্ডের জন্য যেনো না পরে।
~ সীমান্ত মনে হলো কাল থেকে তার বিষন্ন খন্ডহৃদয় ছুটে এসে একত্রে হয়ে গেলো। সেই আঁড়চোখে আশপাশের পরিস্থিতি দেখে চোখ নিচু করে আবারও দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তার হুরের দিকে দেখতে লাগলো তাকে আপাদম্তক ভাবে।

সীমান্ত বিড়বিড় করে অদ্ভুত এক কবিতা বানিয়ে ধরলো।
তোমার রুপে পথে হেঁটে যাওয়ার আমি যাযাবর,
তোমার রুপে পথে হেঁটে যাওয়া আমি নিচ্ছিন্ন ভবঘুর।

তোমার রুপের পথে হেঁটে যাওয়া আমি এক লাওয়ারিশ পথিক।
~ দোয়ার পরণে একটি লাল জুম শাড়ি, সাথে রয়েছে দু হাত ভর্তি লাল চুড়ি। লম্বা ঝরেঝরে চুল গুলো এক পাশ করে ছেড়ে দেওয়া। মুখে রয়েছে পরিমাণ মাফিক মেক-আপের আবরণ। সামনে আসার পর সবাই প্রশংসা করতে লাগলো সব রমনীর।
~ একজন হিন্দু লোক দোয়ার লেপ্টে যাওয়া কাজল দেখে বললো, আপনাকে পুরো আমাদের দূর্গার মত লাগছে। দোয়া মিষ্টি করে হেঁসে তাকে ধন্যবাদ জানালো। সেইখানে কিছু বাংলাদেশী লোক সীমার ও অত্যন্ত প্রশংসামূখর হলো।

সবাইকে সত্যিকারী অর্থে আজ অসাধারণ সুন্দর লাগছিলো। যে যার বরের সাথে দাঁড়ালো।
~ অনিক কিড়মিড় করে দোয়া কে ফিসফিস করে বললো, এই বিদ্ঘুটে রঙ ছাড়া কি আর রঙ পাও নেই!
দোয়া শান্ত গলায় বললো, রাতে পার্টিতে মানুষ লাল বা কালো পরে। আর সবচাইতে বড় কথা কোন রঙ বিদ্ঘুটে না। সব রঙের আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে।
অনিক মুখ বিকৃত করলো।

~ সীমা সীমান্ত কে জিজ্ঞেস করার পর সীমান্ত ঠান্ডা গলায় বললো, ভালো লাগছে তোমায়।
সীমা চতুর হাসি দিয়ে আঁড়চোখে দেয়ার দিকে তাকালো যেনো রুপের দিক দিয়ে সেই দোয়াকে প্রতিযোগিতা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
~ সুন্দরী তুই! হঠাৎ সবাই ঘোর আলাপের মধ্যে একটি মৃদু চিৎকার ভেসে এলো।
দোয়া সহ সবাই হকচকিয়ে তাকালো। দোয়া এক গাল হেঁসে চোখ বড় বড় আশ্চর্য গলায় একটি ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললো, রোভিন!
তারপর সবার মাঝখান থেকে কিছুদূরে ছুটে একটি ছেলের সামনে গেলো। সবাই তাকিয়ে রইলো ছেলেটির দিকে পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি মত লম্বা, মুখে উপজাতির ভাব, চুল গুলো অসাধারণ সুন্দর ঘাড়ে গিটার ঝুলানো।

মাই গড তুই এখানে! কি অসাধারণ সারপ্রাইজ! দোয়া মুখ হাত অভিভূত গলায় বললো,
রোভিন নামক ছেলেটি ছুটে এসে দোয়ার চুল টেনে দিয়ে বললো, সুন্দরী কি ধারালো সুন্দরী হয়ে গেলি রে! কোন খবরই তো তোর নেই কই ছিলি এতো দিন!
দোয়া মুচকি হেঁসে বললো, আমার বিয়ে হয়ে গেছে রে।
~ রোভিন চোখ মেরে একটু কাছ ঘেঁষে ফিসফিস গলায় বললো, আপনার সীমান্ত ভাইয়ার সাথে! যে প্রেম লাগাইছিলা ভেবেছিলাম যাইবা গা কিছুদিন পর। তারপর হঠাৎ রোভিন পিছনে নজর গেলো।

~ আরে ভাই উনি তো তোরই পিছনে হেই সীমান্ত ভাই কেমন আছেন! সীমান্তের উদ্দেশ্য রোভিন মৃদু চিৎকার দিয়ে হাত নাড়িয়ে বললো,
~ দোয়া ভড়কে গেলো সেই হুট করে রোভিনের হাত ধরে ফেললো। রোভিন যেতে ধরেছিলো সীমান্তের কাছে তাই চোখের ইশারায় দোয়াকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে বাঁধা দেওয়ার কারণ!
দোয়া না বোধক মাথা দুলালো তারপর হালকা করে হেঁসে পিছনে কিছু দূরে সবাই আশ্চর্য মুখের দিকে তাকালো। সীমান্ত কে লাগছিলো তখন ফ্যাকাশে।
রোভিন সবাই দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তৎক্ষনিক ধরে ফেললো একা সাদা শার্ট পরা ছেলেটির দোয়ার বর। কারও সবাই পাশে শাড়ি পরিহিত রমনী রয়েছে। রোভিন স্তব্ধ হয়ে কতখন দোয়ার আর সীমান্তের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।

~ তারপর দোয়ার উদ্দেশ্য একটি শান্ত দৃষ্টি দোয়ার দিকে নিক্ষেপ করে সীমান্তের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত মিলালোর ভঙ্গি করে রোভিন বললো, কেমন আছেন ভাইয়া! দীর্ঘ এক বছর পর দেখা!
সীমান্ত হাসিমুখে রোভিন কে জড়িয়ে ধরে বললো, আমি সত্যি অবাক হলাম!
রোভিন তাকিয়ে হেঁসে সবাই ছেলের সাথে হাত মিলালো। জানা গেলো, রোভিন দোয়ার সাথে একি ডিপার্টমেন্টে পড়ে। বন্ধুমহলের সবাই সাথে সেই নেপাল ট্যুরে এসেছে।

~ সীমা হাসি হাসি মুখে বললো, তুমি দোয়া কেও চিনো সীমান্ত কেও চিনো! ওহ! অসাধারণ তো!
রোভিন আঁড়চোখে সবাই উৎসুক দৃষ্টি দিকে তাকিয়ে সীমা কে উদ্দেশ্য করে বললো, না চেনার তো কোন কারণ নেই আপু! ভাইয়া আমাদের পাশের ক্যাম্পাসে পড়তো আর সবচাইতে বড় কথা উনি আমার কাজিনের বন্ধু!
সীমা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, ওহ!
~ দোয়া আগেই এগিয়ে এসেছিলো রোভিন সবাই সাথে খোশগল্পে মেতে উঠলো।

কথার প্রেক্ষিতে রোভিন সীমান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললো, ভাইয়া ঐদিকে গানের আসর হয়েছে বহুত দিন হলো আপনার গান শুনা হয়না চলুন না আসর টা একটু জমিয়ে দিবেন!
সীমান্ত মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললো, আরে না রে ভাই আজকাল কন্ঠে ভালো গান আসে না।
রোভিন সীমান্তের হাত চেপে বললো, এতো সুন্দরী রমনীদের রুপের বর্ননা দিয়ে যদি আজ আপনার গলা গান শুনা না হয় তাহলে সত্যি এই নাগরকোট বড়ই জিনিস মিস করবে।

সবাই সত্যি সীমান্তে কে জোর গলায় তাড়া দিতে লাগলো গানের জন্য।
সীমান্ত উপায় না পেয়ে গান নাচের আসরের দিকে সবার সাথে এগিয়ে গেলো।

~ মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে ঘিরে রয়েছে নানা রকমের দেশ বিদেশের মানুষ। রোভিন তার গিটার সীমান্তের দিকে এগিয়ে দিলো। সবাই বেশ মনোযোগী হলো। একজন ইন্ডিয়ান পর্যটক বললো, আপনি যেহেতু বাঙালি তাহলে প্রথম একটা বাঙালা গান দ্বারা শুরু হক!
সীমান্তের ঠিক বিপরীত পাশে এক আজানা কারণে দোয়া বসলো তাতে চক্ষুসূলে তাকালো হাসিব আর নুবা। নুবা বসেছে দোয়ার ডান পাশে আর সানজিদা বসেছে বাম পাশে আর সানজিদা পাশে রয়েছে সীমা। অনিক বসেছে সাব্বিরের সাথে। সানজিদা হঠাৎ গিয়ে হাসিবের সাথে বসে গেলো ফলস্বরূপ দোয়া পরে গেলো সীমার সাথে কিন্তু কেউ কারও মুখ দর্শন করলো না।

আগুনের আলোতে দোয়ার রুপ যেনো সীমান্তের কাছে একটি বিষাক্ত ধারালো তীর মনে হলো যেটি সরাসরি তার হৃদপিণ্ড এসে ছেদ করেছে।
সীমান্ত গিটার হাতে দৃষ্টি দোয়ার দিকে তাক করে গান ধরলো। কিন্তু অন্য ব্যক্তি তার চোখ দ্বারা দেখলে বুঝবে সেই তাকিয়ে আছে তার পরমাসুন্দরী স্ত্রী সীমার দিকে।
কন্যা রে, কন্যা রে,
তোর রূপের মধু মন ভোলায়
আঁকে বাঁকে রোদ ডাকে তোর গালে রাঙা রং মাখায়।

মিছে বায়না করে আয় না তোর চোখেরই ভাষায়,
চাঁদ লাজে এসে কাছে তোর কাজলে লুকায়।
উড়ে যাই ডানা মেলে আজ রে কন্যা,
দক্ষিণে উতলা বাতাস।

তোর আশায় পথ চেয়ে একতারাটা গাইছে গান,
তোর পথে রোজ ফোঁটে ফুলেদেরই অভিমান।
মিছে বায়না করে আয় না তোর চোখেরই ভাষায়,
চাঁদ লাজে এসে কাছে তোর কাজলে লুকায়।
উড়ে যাই ডানা মেলে আজ রে কন্যা,
দক্ষিণে উতলা বাতাস।

তোর কাঁধে ঢেউ দিলে মোর গাঙে ওঠে বান,
তোর চুলে মন ভুলে বাতাস ও গেয়েছে গান।
মিছে বায়না করে আয় না তোর চোখেরই ভাষায়,
চাঁদ লাজে এসে কাছে তোর কাজলে লুকায়।
উড়ে যাই ডানা মেলে আজ রে কন্যা,
দক্ষিণে উতলা বাতাস।

~ সীমান্তের সাথো জোড় হলো আরো অনেকেই। গানের প্রতিটা শব্দ দোয়ার মনে হলো তাকে উল্লেখ করে গাওয়া।
~ দোয়া যেনো দৃষ্টি ফেলতে পাচ্ছে না সীমান্তের এমন অদ্ভুত আচরণের জন্য। তার প্রতিটা কাজ দোয়াকে তার অতীত মনে করিয়ে দিচ্ছে। তেমনি সীমান্ত কেও। অতীতে জুড়ে মানুষ অতীতে জুড়ে সেই কন্যা শব্দ। যেনো অতীত নিজে তাদেরকে তাগিদ দিচ্ছে একবার চরণ করে আসতে সেই সুখকর, দুঃখকর ও বেদনাদায়ক স্মৃতিময় দিনগুলোর কাছে। দুজনে গানের মধ্যে ডুব দিলো তাদের অতীতে।

পর্ব ৮

~ মাস টা তখন ২১শে মাস ছিলো। উপলক্ষ্য মাস গুলো প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় এক অদ্ভুত সৌন্দর্য রুপান্তরিত হয়। তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপ সন্ধ্যার পর যেনো এক অদ্ভুত সুন্দর আকার ধারণ করে। কিন্তু দিনের আলোতে টিএসসি আর অডিটোরিয়ামের সৌন্দর্য মুখে প্রকাশ করার মত না। এই মাস টা বহিরাগত মানুষ ভীড় জমে থাকে টিএসসি নাম এই জনপ্রিয় জায়গায়।
~ হ্যাঁ হেনা শুন আমরা বাবলু ভাইয়ার দোকানে আছি পটাপট এইখানে চলে আই! সময় পাঁচ মিনিট নাহলে আছার বাদ, দোয়া ফোন রেখে দুঃখী ভরা কন্ঠে পাশের দুইটি মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললো,

জানিস, কাল না আমাদের হলে কারেন্ট ছিলো না আমি সীমান্তের নতুন কোন ভিডিও দেখতে পারিনি। এই শুন না রশ্মি নতুন কিছু আপলোড দিছে!
রশ্মি জলপাই আছার মুখে দিয়ে টক উঠিয়ে বললো, মানে গাঞ্জাপাতা আজ কাল কার সাথে খাস বলতো!
দোয়া প্রথমে ভ্রু কুঁচকে গেলো। তারপর কিছু মনে পড়ার ভঙ্গি করে বললো, হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝছি তুই তো আমারই রুম মেট।
ইতি দোয়ার মাথায় খাট্টা মেরে বললো, মানে তোর এখনও ঐ ছেমরার ভূত ঘাড় থেকে যাইনি তাইনা!
রশ্মি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, বাল যাবে!
ঐ পোলা বাদে ওর চোখেই আর কোন পোলাই পরে না।

দোয়া রশ্মির কথা কে অগ্রাহ্য করে দোকানদার তদারকি করে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো, বাবলু ভাইয়া আরো একটা আছার রেডী করো তো হেনার জন্য।
ইতি চোখ ছোট ছোট করে বললো, তুই হেনা কে বকশিস দিচ্ছিস! কিন্তু কেন! তুমি তো মনু কেউরে কলম ও দাও না তাহলে এটা কেমনে!
দোয়া লাজুক হেঁসে বললো, আ-আসলে আমি না ওরে সীমান্তের কালকেও নতুন ভিডিও টা ডাউনলোড করতে বলছিলাম।
ইতি নিজের মাথায় চাপর মেরে বললো, বইন তুই বিষ খা, আর নাহলে আমারে দে আমি খাই। এতো পাগলামি কেউ করে একটা ছেলের জন্য!
রশ্মি বিচার দেওয়ার সুরে বললো, তুই জানিস ফোন রে ঝুম… করে করে ঐ ছেমরারে দেখে।

ইতি হা করে তাকিয়ে বললো, কি দেখে ছেমরা তো নিজের চেহেরায় দেখাই নাই কেউকে।
রশ্মি টিপুনি কেটে বললো, চুল দেখে, পিঠের ঘাম দেখে, কান দেখে হাতের দামী ঘড়ি দেখে, শার্টের বোতাম কয়টা সামনে খোলা থাকে তাও দেখে।
দোয়া উৎফুল্ল গলায় ইতির পিঠের চাপর মেরে বললো, জানিস! ঐ শার্টের বোতাম দুইটা খোলা রাখে। কি ভদ্র রে! আমি ছেলে হলে তিন চারটা খুলে উদাম-দিগম্বর ঘুরে বেড়াতাম।

ইতি অসহায় চোখে রশ্মি দিকে তাকিয়ে বললো, আমার কি মনে হয় জানস! ঐ ছেমরার লক্ষ ফলোয়ার দের মধ্যে মাদুই ওরে চিনতে পারবো যেভাবে গিলে খাই ঐ পোলারে।
দোয়া ইতি আর রশ্মি কথাকে বুড়ো আঙ্গুল প্রদর্শন করে হেনা আসছে কিনা তা দেখতে লাগলো, আর অপেক্ষার প্রহর কাটছে তার। দোয়া বার বার পা নাড়াচ্ছে অভ্যাসগত ভাবে।

ইতি আর রশ্মি দোয়াকে রাগানোর জন্য বললো, এই সব ছেমরার গার্লফ্রেন্ডের অভাব হয়না বুঝলি!
দোয়া কোমরে হাত দিয়ে কপাট রাগ দেখিয়ে বললো, ঐ ছেমরা, ছেমরা কি রে! ওকে সীমান্ত ডাকবি! না, না সীমান্ত ভাইয়া ডাকবি বুঝলি নো ছেমরা ছেমরি।
রশ্মি আর ইতি হাতকে প্রজাদের ভঙ্গি করে মাথা ঝুকিয়ে সম্মান সাথে বললো, জো হুকুম আমাদের মহারানী। আপনার কথা না শুনে কি আমার আমাদের পিঠের উপরে আপনার হাতের তাল ফেলবো নাকি!

দোয়া হাত উঠিয়ে আর্শিবাদ করার ভঙ্গি করে বললো, সারাজীবন এই ভাবে অন্যের লেজ নিয়ে টানা হিঁচড়ে করো ভক্তরা।
অতঃপর সবগুলো একসাথে হেঁসে দিলো।
দোয়া চোখ মেরে বললো, শত গার্লফ্রেন্ড থাকুক আমি কি তাকে সংসার করার জন্য পছন্দ করি নাকি! আমার জাস্ট তার গান, তার কথা, তার লেখালেখি এইগুলো ভীষণ রকম পছন্দ।

ইতি ওহ্ করে টান দিয়ে একটি শব্দ করে উঠলো রশ্মি দোয়ার মুখের দিকে কিছুখন তাকিয়ে হালকা করে হাসলো।
বেশ কিছুখন পর হেনা আসলো হেলেদুলে রোভিন নামক একটি উপজাতি ছেলের সাথে।
দোয়া ছুটে গিয়ে হেনার পিঠে একটি উত্তম বসিয়ে দিয়ে বললো, এই অসময়ে আসতে বলছি! নাকি আরো জলদি বলছি!
হেনা মাগো করে মৃদু চিৎকার দিয়ে বললো, আল্লাহ এটা তোর হাত! মাটি কাটিস রাতে! এতো শক্ত কেন!

রোভিন হাসতে হাসতে বললো, যে হাড্ডির হাড্ডি মাটি কাটা লাগে এমনে শক্ত হবে।
দোয়া রোভিনের মাথায় খাট্টা মেরে বললো, শালা তোরে এইখানে কে দাওয়াত দিলো!
রোভিন রসিকতা সুরে বললো, কাল তোর নায়ক ব্যান্ডিস নিয়ে বক্তব্য দিছে তা দেখি তুই যে এখন কেঁদে ভাসাবি তার জন্য পাঁচ টাকার টিস্যু প্যাকেট কিনে আনছি।
দোয়া সত্যি মন খারাপ হয়ে গেলো তার এতোখন ঝাঁঝের কন্ঠস্বর মিইয়ে গেলো।

সেই হেনার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো, সত্যি রে সীমান্ত কি এক্সিডেন্ট করছে!
রোভিন হাই হাই করতে করতে বললো, এই সুন্দরী দেখ আমি দুষ্টামি করছিলাম কাঁদিস না মা তেমন কিছুই না।
দোয়া চটজলদি হেনার থেকে ভিডিও টা নিজ ফোনে নিয়ে নিলো। তারপর নিজের ব্যাগটা নিয়ে বললো, বন্ধুরা আজ আমি নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছি তাই এখন আল্লাহ হাফেজ।

দোয়া চলে গেলো মলচত্বরে বাস ধরার উদ্দেশ্য।
~ রশ্মি কপালে চাপড় মেরে বললো, আমি জীবনেও এমন অদ্ভুত মেয়ে দেখিনি। আজ এক বছর হলো জানিস এক বছর! ঐ এই ছেলের জন্য এতো পাগলামি করছে যে ছেলে কিনা চেহারাও দেখেনি।

হেনা আছার খেতে খেতে বললো, তাও এই সেই পাগলামি না, আমার তো মনে হয় ঐ পোলার উপরে কঠিন রকমের প্রেমে পরছে।
সবগুলো একমত হলো, তখনি রোভিন মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললো, দূর কি কছ! এইগুলো হলো বয়সের বাচ্চামি। কেউ কেউ ছোট্ট কালে এইরকম ফেমাস মানুষের জন্য পাগল থাকে আর কেউ কেউ বড় হলেও। বাট তাও একটা বয়সের ব্যাপার আছে দেখবি এক দুই বছর পর ঠিকই ভূত চলে যাবে।
রশ্মি উদাসীন গলায় বললো, যেনোও সেটায় হয়, কারণ হলে ওর লক্ষণ আমি এই ছেলেকে নিয়ে ভালো দেখছি না। একটা মানুষ কে না দেখে কেউ এতোটা পাগলামি করে তা আমি সত্যি মাদুকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।

~ মলচত্বরে এসে দোয়া দেখলো পুরো বাস খালি আজ তাদের ক্লাস ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিলো সেই সুবাধে এতো জলদি আসলো।
সিটে ব্যাগ রাখার সাথে সাথে কেউ একজন ছুটে এসে দুম করে তার ব্যাগ টা ফেললো সেই সিটে।
দোয়া অত্যন্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখলো অপূর্ব এক গাল হেঁসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দোয়া কোন রকম বিরক্ত লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললো, অপূর্ব দা তুমি উপরে তোলা যাও নিচে তো মেয়েদের জায়গা।

অপূর্ব পাশের সিটে হেলে বসে বললো, আজ আমি নিচে বসলাম সমস্যা কি তোরা মেয়েরা সব উপরে যা।
দোয়ার বিরক্তি এইবার ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে এলো সেই ভ্রু কুঁচকে বললো, এইগুলো বাড়াবাড়ি অপূর্ব দা, সারাজীবন এক নিয়ম আর এখন আরেক নিয়ম কেন? যাও তো তুমি উপরে, তোমায় দেখে দেখে তোমার ছ্যালা রা সব এইখানে এসে ভীড় জমাবে।
অপূর্ব চট করে ক্ষেপে গিয়ে বললো, এই বেয়াদব ছ্যালা কি শব্দ রে! বস্তুিতে থাকিস যে এইরকম ভাষা ব্যবহার শিখেছিস! লজ্জা শরম আসে না সিনিয়রদের সাথে এইভাবে কথা বলতে!

দোয়া এক পেশে হেঁসে ঝাঁঝের সাথে বললো, বস্তির মেয়েটির রাস্তা প্রতিদিন কালো বিড়ালের মত যে আটকাও তাতে লজ্জা শরম আসে না!
অপূর্ব দোয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললো, এই চুপ বহুত গাল বেড়েছে তোর একটা কথাও মাটিতে ফেলতে দিস না।
দোয়া সেই কথার উত্তর না দিয়ে তার ব্যাগ টা নিয়ে সামনে হাঁটা ধরলো উদ্দেশ্য দোতালা।
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো অপূর্ব দোয়ার পথ আটকিয়ে বললো, তোর সাহস দেখে আমি অবাক আমি তোর সিনিয়র, সাথে তোর এলাকার দাদা আর তুই আমার কথার কোন গ্রাহ্য না দিয়ে হেলেদুলে চলে যাচ্ছিস!

দোয়ার আজ বিষাক্ত রকমের মেজাজ খারাপ লাগছে। সেই কখন থেকে একটি নিরিবিলি জায়গা খুঁজছে তার সীমান্তের ভিডিও দেখার জন্য।
তার উপরে রোভিন যখন বলেছে সীমান্ত অসুস্থ তখন থেকে মন আরো বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। সেই দাঁতে দাঁত চেপে বললো, অপূর্ব দা তোমার আমার সাথে কথা বলার এতো বাহানা খুঁজতে হবে না আগেও বলছি এখনও বলছি আমাদের মধ্যে ধর্মের দেয়াল বলেও একটি কথা রয়েছে।
অপূর্ব মিইয়ে গেলো সেই কেমন অসহায় দৃষ্টিতে দোয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি মাকে বলেছি রে আমি ধর্ম বদলে নিবো।

দোয়া শান্ত কন্ঠে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, তুমি যা কিছু করো অপূর্ব দা তাতে সত্যি বদলাবে না আর সবচাইতে বড় কথা আমি তোমাকে প্রেমিকের চোখে দেখিনা।
অপূর্ব চট করে দোয়ার হাত ধরে ফেললো। তারপর ভারী নরম গলায় বললো, আমি কি দেখতে এতোই খারাপ মাদু! ক্যাম্পাসের কত মেয়ে আমার জন্য পাগল তুই কি দেখিস না!

দোয়া ভড়কে গিয়ে হাত টানাহ্যাঁচড়া করে ছুটাতে চেষ্টা করলো। কিছুখনের মধ্যে ছেলেমেয়েদের দুম পরবে কেউ দেখলে তিল কে তাল বানিয়ে ফেলবে।
দোয়া ক্রুদ্ধ ভরা গলায় অপূর্ব কে উদ্দেশ্য করে বললো, হাত ছাড়ো অপূর্ব দা, নাহলে আমার পরবর্তী ব্যবহার তোমার মোটেও পছন্দ হবে না।
অপূর্ব সত্যি হাত ছেড়ে দিলো। যতটুকু সেই জানে দোয়ার প্রচন্ড হাত আর মুখ চলে। তাই দোয়ার চেহেরা তার কাছে স্বাভাবিক ঠেকালো না।
দোয়া আঙ্গুল উঠিয়ে ধমকি দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো, আমাকে তোমার মৌমাছি গুলো ভাববে না যারা তোমাকে মধু মনে করে বার বার স্পর্শ করার বাহানা খুঁজে। আমার চুলেও হাত দেওয়ার আগে একশত বার ভাববে নাহলে ভালো হবে না।

অপূর্ব কিছু বলার আগে কিছু মেয়ে হুরমুর করে বাসে ডুকে গেলো।
অপূর্ব মিনমিন পায়ে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলো বাস থেকে।
দোয়া ছোট্ট একটি খিস্তি দিয়ে বললো, বালছালের জন্য ক্যাম্পাসে আসাও দায়। দোয়া সিটে বসে ঢগঢগ করে বোতলের অর্ধেক পানি শেষ করলো। ধীরে ধীরে পুরো বাস জমে গেলো।

~ আকাশে মেঘ জমেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে হচ্ছে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। ঠান্ডা বাতাসে এই ব্যস্ত শীতময় শহর কে মুহুর্তের মধ্যে আরো হিমশীতল করে দিলো।
জানালার পাশে বসে পিচপিচ করে কান্না করছে দোয়া।
সীমান্ত তার নতুন ভিডিও সাথে একটি ছবিও আপলোড করেছে।

তাও পিছনের দিকে তাতে বুঝা যাচ্ছে সেই আহত হয়েছে আর ফলস্বরূপ মাথায় ব্যান্ডিস।
বাসের মেয়েরা ঘুরঘুর করে দোয়াকে দেখছে। কেমন অদ্ভুত এক লাইনে কান্না করছে এই মেয়ে। যেমন ভ্যাঁ…….দুই সেকেন্ড পর আবারও থেমে যাচ্ছে।
~ বেশ কিছুক্ষণ পর পাশের একটি মেয়ে ফিসফিস করে বললো, আপু কান্না বন্ধ করো, বাসের মেয়েরা সমালোচনা করছে।
দোয়া বিরক্ত ভরা কন্ঠে মেয়েটির দিকে তাকানোর আগে বললো, আমার চোখ দিয়ে পানি পরছে, খরচ হচ্ছে আমার শরীরে পানি ওরা ভিনভিন করার কে!
তারপর হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখলো তাদের পাশের ডিপার্টমেন্টের একটি সিনিয়র আপু।

দোয়া অদৃশ্য জিভ কাটলো সর্বনাশ। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে দোয়ার দিকে।
দোয়া তৎক্ষনিক ইয়ারফোন কানে দিয়ে দিলো। আবারও শুনতে লাগলো সীমান্ত নামক নতুন ভাইরাল ইউটিউবারের গান।
স্কিনে ভেসে আছে রাতের চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাতে গিটার হাতে একটি সুদর্শন যুবক যার মাথায় রয়েছে সাদা ব্যান্ডিস। ছাদের হলুদ আভাতে তার মাথার ব্যান্ডিস স্পষ্ট।

~ বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেলো হঠাৎ ঢাকা মেডিকেলের সামনে বাস টা চট করে থেমে গেলো। সবাই উল্টে দেখতে লাগলো কারণ এই পথে কারও নামার কথা না।
হঠাৎ দোয়া দেখলো ঢাকা মেডিকেল ১নাম্বার গেট থেকে বের হলো একটি ছেলে এক হাত দিয়ে মাথার উপর ডাক্তার রিপোর্ট দিয়ে রেখেছে যাতে করে বৃষ্টি পানির স্পর্শ থেকে বাঁচতে পারে। তারপর ছুটে তাদেরই বাসে উঠলো। দোয়া পিছন থেকে উল্টো দেখলো ছেলেটি দোতলা তে দিকে যাচ্ছে।
বৃষ্টির বেগ আর বাসের ভীড়ের বেগ এতো বেশী ছিলো যে দোয়া ছেলেটির চেহেরায় দেখতে পেলো না অতঃপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারও সীমান্তের গান শুনতে ব্যস্ত হলো।

~ দীর্ঘ এক ঘন্টা পর দোয়া নারায়ণগঞ্জ নামলো তারপর রিকশা ধরে রওনা হলো নিজ বাসার উদ্দেশ্য।
বাসায় ডুকে মা বলে মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠলো দোয়া।
মিসেস জুলেখা তখন বসে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে সিরিয়াল দেখছিলো পাশে ঘাটে বসে ছিলো নিদা তার হাতে একটা গাজর যেটা সেই কিছু পর পর কামড় বসাছে, তারই পাশ ঘেঁষে মোবাইল ঘাটছে মাহা কানে তার ইয়ারফোন।
আর নিচে বসে সবজি কাটছে আর টিভি দিকে হা করে তাকিয়ে আছে তাদের কাজের মেয়ে নিলু।
কিন্তু মাহা বাদে সবার মনোযাগ ক্ষুন্ন হলো শুধুমাত্র দোয়ার চিৎকারে।

মিসেস জুলেখা মাথায় হাত দিয়ে বললো, তোকে না বারণ করছি মাদু এমন অস্বাভাবিক সময়ে চিৎকার না দিতে!
নিলু কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, আপামনি এখন যদি আমার আঙ্গুল টা চট করে কাটা পরতো তহন আমি কি করতাম আঙ্গুল কাটা নিলুরে কে বিয়া করতো!
দোয়া তার হাতের ব্যাগ সোফায় ছুঁড়ে মেরে ঠাস করে ঘাটে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বললো, আঙ্গুল কাটা নিলু রে কান কাটা রমজানের লগে বিয়া দিমু আর কি!
নিলু ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, ছিঃ ওরে আমার জুতা বিয়া করবো, তারপর বটি আর সবজি হাতে রান্নাঘরে চলে গেলো।

নিদা ভ্রু কুঁচকে বললো, রমজানের কান কবে কাটলো!
মাহা এতোখনে তার কান থেকে ইয়ারফোন সরালো তাই কোন কিছু না বুঝে মৃদু চিৎকার দিয়ে বললো, কি! মাদু তোর কান কাটা গেছে! খোদা এখন আমার কি হবে সবাই আমারে কান কাটা মাদুর বোন ডাকবো। আল্লাহ দেখি দেখি! মাহা ব্যস্ত ভঙ্গি তে দোয়ার দুকান বিজ্ঞ দের মত দেখতে লাগলো।
নিদা ত্যাড়া চোখে মাহার ভয়াতুর মুখের দিকে তাকালো তারপর সবাই মিলে একত্রে হেঁসে উঠলো।
মাহা তাতে মনোযোগ সরলো না সেই এখনও দোয়ার কান দেখছে।

মিসেস জুলেখা হঠাৎ দোয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, মাদু তোর চোখ লাল কেন!
দোয়া ধরা খাওয়ার ভঙ্গিতে বললো, আসলে মা জানালা খোলা রেখেছিলাম বৃষ্টির পানি ডুকে ছিলো তাই হয়তো।
মিসেস জুলেখা মৃদুস্বরে বকা দিতে দিতে রান্না ঘরে রওনা হলেন তোকে নিয়ে আর পারিনা মাদু! যখন যেটা মন চাই করস! তারপরে কি হবে তা ভাবিস না এই যে গায়ে বৃষ্টির পানি ডুকালি ঠান্ডা তো বেশ লাগাবি তোর বাবা আসুক বিচার বসাবো।

তিনি কাটা শাক গুলো সরিয়ে রেখে দিলেন। দোয়া সব শাক পছন্দ করে না তার মধ্যে পালংশাক হলো অন্যতম।
~ নিদা মাহা আর দোয়া গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করতে লাগলো।
মাহা সবসময় সব কথা একটু দেরী তে বুঝে। কিন্তু তারপরেও সেই সঠিক কোন মন্তব্য বা মতামত রাখতে পারেনা।
তাদের আলোচনার মূল ব্যক্তি হলো সীমান্ত।
নিদা প্রথমে ধরে ফেলেছিলো দোয়া কেঁদে কেটে ভাসিয়ে এসেছে।

কারণ সেই গতকাল রাতে সীমান্তের ভিডিও দেখেছিলো আর সেই যে আহত সেটা ও দেখেছিলো এটাতে দোয়ার কি রিয়াকশন হবে তা নিদা আগে ভেবে রেখেছিলো।
নিদা জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলাতে আছে। মাহা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম না আসাতে আপাতত দ্বিতীয় বার পরীক্ষা এডমিশন টেষ্ট দেওয়ার প্রস্তুতি আছে।
~ নিদা গাজরে কামড় বসিয়ে বললো, আচ্ছা এই পোলা যদি সুন্দর না হয় তখন ও তুই এরকম পাগলামি করবি!
দোয়া অভিমান সুরে বললো, খালি দেখা টা হক আচ্ছা করে বকে দিবো চেহেরা দেখাতে এতো নকশা কেন করছিলো তিনি! হুহ।

নিদা হেঁসে দোয়ার গাল টেনে দিলো।
দোয়া উঠে বসে তার রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, যা গোসল টা সেড়ে নে তোরা, ভাত খেয়ে বিকালে ছাঁদে যাবো আর আছার খাবো ঠাসাঠাসা পেয়ারা দিয়ে।

নিদা হাসলো মাহা অবাক গলায় বললো, এটা এই মাত্র না কান্না করতে ছিলো এক লাইন কান্না এটা কেমনে করে রে!
নিদা রিমোট দিয়ে চ্যানেল বদলাতে বদলাতে বললো, তুই যেমন সারাদিন মোবাইল গুঁতাই তে পারস! তেমনি ভাবে সবাই এক অদ্ভুত প্রতিভা থাকে।
মাহা নিদার খোঁচা ধরতে পারলো না সেই গভীর ভাবে দোয়ার এক লাইন কান্নার প্রতিভা সম্পর্কে ভাবতে লাগলো।

~ বৃষ্টি থেমে গিয়ে পুরো আকাশ লাল বর্নের এক অদ্ভুত সুন্দর আভা ছড়িয়েছে।
আশাপাশের গাছ গুলো থেকে এখনও বিন্দু বিন্দু পানি কুয়াশার ফোঁটার মত পড়ছে।
দোয়া হাত পা গুটিয়ে ছাদের দোলনা তে বসলো। পাশে রয়েছে নিদা সেই ও একি ভঙ্গিতে বসে আছে দুজনে বেশ আরাম করে আছারে মধ্যে পেয়ারা টুকরো ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে।

~ লম্বা পাঁচ ফিট এগারো ইঞ্চি, ফর্সা চেহেরায় খোচাখোচা দাাড়ি, চেহেরা অদ্ভুত এক বিত্তশালী ভাব। গিটার হাতে সেই বেশ মনোযোগ দিয়ে কি কি জেনো করছে। সবকিছু মুটামুটি কিন্তু বিপত্তি হলো ছেলে কেমন হাংলা পাতলা। লম্বা কারও শরীরে কমতি যেনো আর বেশী চোখে পরে। সেই ছাদের রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গিটারে সুর তুলছে।

নিলু ঠোঁট কে সরু করে বললো, ওহো আপামনি কি সুন্দর পোলা! কলিজা টা পুরি গেছে। কিন্তু
মনে হয় এক্সিডেন্ট করছে মাথায় তো পট্টি বাঁধা।
মাহা নিলুর কথার উত্তর না দিয়ে চোখ দিয়ে ছেলেটিকে আপাদম্তক দেখতে লাগলো। তার প্রশ্ন এই ছেলে কই থেকে আসলো! এটা তো অপূর্ব আর অভিদের বাসা! ভাড়া নই তো! ওহো! মাহা মনে মনে এক বাটি লাড্ডু খেয়ে নিলো।
~ হঠাৎ মাহার ফোনে কল আসলো। সেই আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখলো তাহার প্রেমিক পুরুষ কল করেছে।

মাহা ঠোঁট কুঁচকে ফোন টা কেটে দিলো এখন সেই সুন্দর ছেলে দেখছে আপাতত বয়ফ্রেন্ডে সাথে কথা বলার রুচি আসছে না।
~ মাহা আর নিলু কাতচিত হয়ে পাশের দু’তালা বাসাটার ছাদের দিকে তাকাচ্ছে। দোয়া নিলু কে উদ্দেশ্য করে বললো, মাহা তো অভিকে দেখার জন্য লাফালাফি করছে বুঝলাম, কিন্তু তুই কেন তাকিয়ে আছস সেটা ক!
নিলু লাজুক গলায় ওরনা পেঁচাতে পেঁচাতে বললো, ঐ বাসায় এক তালার বেচেলার একটা পোলা প্রায় আমার দিকে কেমন কেমন করে তাকায়।

দোয়া নিলুর লজ্জা কে চোখ বড় বড় করে দেখতে দেখতে বললো, সেইজন্য আপনি আসি উনারে ছাদে উঁকি ঝুঁকি মারতাছেন! চোখে দেখা পরে নাকি তাই তো!
নিলু হ্যাঁ বোধক জোরে জোরে মাথা দুলিয়ে বললো, আপনি যে সীমান্ত ভাইয়ার ছবি মন থেকে আর্ট করছেন একদমই ঐলাহেন।
~ দোয়া পেয়ারাই কটমট করে কামড় বসিয়ে বললো, ছাদ থেকে নিচেও ফেলবো না উপরেও উঠাবো না একদমই পাইপের সাথে ঝুলিয়ে রাখবো।
নিলু ভেংচি কেটে মাহার বিপরীত পাশ গিয়ে দাঁড়ালো। নিদা আর মাহা হাসতে হাসতে কুটিকুটি হলো এই কান্ড দেখে।

~ হঠাৎ মাহা মৃদু স্বরে চিৎকার দিয়ে বললো, নিদা, দোয়া দেখ দেখ অপূর্ব দাদার ছাদে লোভনীয় একটা পোলা। নিদা আর দোয়া সত্যি ছুটে এলো। এরা তিনজন একত্রে থাকলে এদের চোখে দেখা সুন্দর ছেলেদের নিয়ে নানা রকমের মন্তব্য না করলে এদের হয়না। বেশ মজাতে থাকে তারা এইসব নিয়ে আলোচনাতে।
~ ছেলেটাকে এইদিক আকর্ষন করানোর জন্য দোয়া ঠোঁট দ্বারা শিস বাজিয়ে উঠলো।
তৎক্ষনিক ছেলেটা দোয়াদের ছাদের দিকে তাকালো।

সাথে সাথে সবগুলো কোন কারণ ছাড়াই হিহি করে গোল হয়ে হাসতে লাগলো।
যেনো এইমাত্র শিস দ্বারা ছেলেটাকে ইভটিজিং করার মধ্যে তারা কেউই ছিলো না। বিপত্তি ঘটলো নিলু আঁড়চোখে উঁকি দিয়ে ছেলেটাকে আবারও দেখতে লাগলো।
~ ঠিক তখনি ছেলেটি এক পেশে হেঁসে উঠলো। তার আর বুঝতে বাকি নেই এই কান্ড এই বাচ্চা মেয়েগুলোই করছে। ছেলেটি ডানে বামে মাথা দুলিয়ে তার গানে মনোযোগী হলো।

টুংটাং গিটারের আওয়াজ তুলছে ছেলেটি কিন্তু পিঠ দোয়া দের ছাদের দিকে করে বসলো এইবার। শুধু এতোটুকুও বাকি ছিলো দোয়া হতভম্ব করার জন্য।
~ দোয়া ছুটে দোলনা থেকে তার মোবাইল টা নিয়ে পট পট কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। তার সাথে এক জোট হলো নিদা। মাহা নিলু ততখনে কিছু বুঝে উঠছে না। মোবাইলের ছবিটির সাথে বার বার আগের ছবি মিলাতে লাগলো দোয়া।

~ মাহা আর নিলু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দোয়ার কাজকর্ম দেখতে লাগলো। দোয়া সবগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও অপূর্ব দের ছাদের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললো, সীমান্ত!
~ নিদা চমকপ্রদ গলায় একটু জোরে বলে উঠলো এটা সীমান্ত!
ঠিক তখনি পাশের ছাদের ছেলেটি চট করে দোয়ার দিকে তাকালো।

~ দোয়া খুশিতে যেনো মুখে হাসি আভা আনতে ভুলে গেলো সেই একটি অদ্ভুত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ছেলেটির চোখে। তারপর হঠাৎ নিদার হাত ধরে লাফিয়ে উঠে বললো, পেয়েছি, পেয়েছি নিদু, মাহু আমি পেয়েছি সীমান্ত কে!
~ ছেলেটি ভড়কে গিয়ে বিষ্ময়ে গাল এক হাত লম্বা হয়ে গেলো। তাকে দেখে মনে হলো এমন পরিস্থিতি জন্য সেই একদমই প্রস্তুত ছিলো না।
ছেলেটি তাকিয়ে রইলো দীর্ঘখন। দোয়ার হঠাৎ লাফানো বন্ধ হয়ে গেলো সেই হাসছে তার গেজ দাঁতের হাসি।

ছেলেটির হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে গেলো সেই আবারও পিছনে মুড়ে গেলো। দোয়া এইবার দুষ্ট হেঁসে আবারও ডেকে উঠলো ঐ সীমান্ত ভাইয়া!
ছেলেটি তাজ্জব হয়ে উল্টে আবারও দোয়াদের ছাদে তাকালো। দোয়া খিলখিল করে হেঁসে নিজের হাত এপিঠ ওপিঠ দেখালো।
আশ্চর্য ভাবে ছেলেটি ও একি কাজ করলো দোয়া পূনরায় আবারও নেচে উঠে বললো, আর কি লাগে! পেয়ে গেছি ইয়াহু পেয়ে গেছি!
ছেলেটি কে দেখলে মনে হবে সেই আকাশ থেকে আছাড়ে মাটিতে পরেছে। এতো টা হতবিহ্বল চেহেরা করে রেখেছিলো যে সেই অদৃশ্য এক সুঁতার টানে দোয়ার উল্লাস ভরা রুম দেখে সেই নিজেও ফিক করে হেঁসে দিলো।

~ দোয়া থমকে গেলো। সেই এইবার আশ্চর্য চোখে দেখতে লাগলো ছেলেটির হাসি! সেই মাহা, নিদা এবং নিলুর হতবুদ্ধি মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে আবারও ছেলেটির দিকে তাকালো, ছেলেটি এখনও হাসছে দোয়ার মনে হলো এই হাসি টা কোন এক রাজ্যের রাজা। সেই শাস্তি স্বরূপ তার বুকে অদৃশ্য এক তীর নিক্ষেপ করছে, যা সরাসরি তার বুকে এসে ছেদ করছে।
নিদা হুড়মুড় করে দোয়া কে টেনে হিঁচড়ে ছাদ থেকে নামিয়ে আনলো। পিছনে পিছনে নিলু আর মাহা ও দৌড়ে এলো। ছেলেটি হাসতে হাসতে ডানে বামে মাথা নাড়ালো।

~ দোয়া কপাট রাগ দেখিয়ে নিদা কে উদ্দেশ্য করে বললো, তুই আমাকে এখানে আনলি কেন! তুই জানস ঐ সীমান্ত! আমি-আমি সীমান্ত কে চিনতে পেরেছি ও খোদা! আর তুই কিনা ওর সামনে কেমন গরুর মত টানতে টানতে নিয়ে এলি মান সম্মানের ছিটেফোঁটা রাখলি না!
নিদা দাঁতে দাঁত চেপে বললো, তুমি তোমার সীমান্ত কে নিয়ে মনে মনে যে খেয়ালি পোলাও রান্না করতাছো, তাতে তো খবর নেই যে ঐ ছেলের পিছন দিয়ে অপূর্ব দা আসছিলো! ঐ কুত্তার খবর জানিস না! যদি দেখে তুই উনাদের ছাদের ছেলের সাথে ইটিসিটি করছিস তাহলে সোজা এসে বিচার দিবে আন্টির কাছে।
দোয়া জ্ঞানী জ্ঞানী চোখে বললো, হ্যাঁ তো আমি তো খেয়ালই করলাম না। কিন্তু আমার সীমান্ত!
দোয়া মুহুর্তে চেহেরা আবারও কাঁদো কাঁদো করে ফেললো।

নিলু চালাকি গলায় বললো, খাঁড়ান আমি দেখি আসি আন্নের সীমান্ত ভাইয়া কি করে! কেউ কিছু বলার আগে নিলু গটগটিয়ে আবারও ছাদে চলে গেলো।
~ পাশের ছেলেটি তখনি হাতের ইশারায় নিলু কে দেখালো পাশের অপূর্ব আর একটি শ্যাম বর্নের ছেলেকে। অপূর্ব ক্ষিপ্ত গলায় নিলু কে উদ্দেশ্য করে বললো, এই নিলু কি সমস্যা হয়েছে রে!
নিলু ঝোঁকে মুখে লবণ পড়ার মত ও মাগো বলে চিৎকার দিয়ে নেচে-কুঁদে ছাদ ছেড়ে উঠে পালালো।

~ ছেলেটি হাসতে হাসতে পাশের শ্যামবর্ন ছেলেটির গায়ে গড়িয়ে পরলো। শ্যামবর্ন ছেলেটি অপূর্ব উদ্দেশ্য বললো, তোদের ছাদে জ্বীন-ভূত আছে নাকি রে!
অপূর্ব প্রশ্ন চোখে বললো, কি বলিস এইসব আবোল তাবোল হাসিব!
হাসিব তার পাশে গিটার হাতে ছেলেটিকে ইশারায় দেখিয়ে বললো, দেখ সেই সিগারেট নিয়ে নিচ থেকে আসছে ধরে ঐ হাসতাছে। একা রেখে গিয়ে তো বিপদ হলো।

~ অপূর্ব হাসতে হাসতে বললো, সীমান্ত সত্যি জ্বীন নাকি ভূত কোনটা!
সীমান্ত রহস্যময় হাসি দিয়ে এক চোখ মেরে বললো, হুরপরী!
তিন জনে হেঁসে উঠলো। সীমান্ত অপূর্ব কে উদ্দেশ্য করে বললো, ঐ ছাদে থেকে পরী ধরলো বুঝলি!
অপূর্ব রসিকতা সুরে বললো, নিলু কিন্তু কাজের মেয়ে ঐ বাসার।

সীমান্ত গিটার রেখে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো, না আরো তিনটা ছিলো অনেকক্ষণ থেকে খেয়াল করছিলাম দুটে পেয়ারা খাচ্ছিলো দোলনায় আরো দুটো এদিকে উঁকি ঝুঁকি মারছিলো।

অপূর্ব সন্দেহ চোখে দৃঢ় গলায় বললো, হুরপরী তুই কাকে বলছিস!
সীমান্ত সিগারেট ধোঁয়া ছেড়ে দোয়াদের ছাদের দিকে তাকিয়ে বললো, চুল লম্বা মেয়েটিকে। অপূর্ব বিরক্ত কন্ঠে বললো, মামু এখানে কাজের মেয়ে থেকে শুরু করে সবাই চুল লম্বা!
সীমান্ত হাসলো আর কোন উত্তর এই প্রেক্ষিতে দিলো না।

কিন্তু অপূর্বের মন খচখচানি গেলো না। সেই সীমান্তের সাথে তাল মিলিয়ে দোয়া দের ছাদে তাকালো। হঠাৎ অপূর্বের মনে উঠলো নিদার কথা। দোয়াদের কাজিনদের মধ্যে নিদা অত্যন্ত ফর্সা, তা চোখে ধরা পরলে সবাই নিদাকে পড়ে। কিন্তু অদ্ভুত এক মায়ার অধিকারী হলো তাহার মাদু। বড় বড় হরিণ টানা চোখ আর লম্বা চুল গুলোর জন্য শ্যাম বর্ন গায়ের রঙ টা যেনো সৃষ্টি কর্তা নিজ পছন্দ করে দিয়েছে। কি অদ্ভুত এই সৃষ্টির লীলা খেলা। এতো কোটি মানুষ কিন্তু সবাই চেহেরায় রয়েছে আলাদা রকমের মোহনীয় সৌন্দর্য। অপূর্ব যতটুকু জানে সীমান্ত কখনও দোয়ার দিকে নজর দিবে না তার নজর অবশ্যই নিদার দিকে পরেছে।
~ হাসিব দোয়াদের ছাদের দিকে তাকিয়ে বললো, ছাদটা ভীষণ সুন্দর যেনো কেউ নিজ হাতে পরিচর্চা করেছে।

দুহাত দূরত্ব দোয়াদের দোতলা ছাদে রয়েছে একটি বিশাল বড় দোলনা তার পাশে ছোট্ট একটি ট্যুল এক সাইড পুরো বিভিন্ন ফল গাছে ভরপুর, আবার দোলনার ঠিক বাম সাইডে বিভিন্ন ফুল গাছে ভরপুর, সব অদ্ভুত সুন্দর ফুলে ভর্তি যে ফুলগুলো খুব কম সংখ্যা মানুষ রোপণ করে থাকে।
~ অপূর্ব নিজ খেয়ালে হঠাৎ বলে উঠলো এই বাড়ি মেয়ে গুলো যেমন সুন্দরী তেমনি ছাদ টাও অনেক সুন্দর।
সীমান্ত হাসিব চট করে অপূর্ব প্রেমময় মুখখানার দিকে তাকালো।

~ দোয়া নিদার পেটের উপরে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে আছে সেই বার বার নজর দিচ্ছে সীমান্ত কালকে ছবি আর আজকে তার তোলা ছবির দিকে। নিদা হতবাক গলায় বললো, আমি বিশ্বাস করতে পাচ্ছি না যে ঐটায় সীমান্ত! আল্লাহ কি অদ্ভুত এক মহিমা উনার! আজ এক বছর তুই সীমান্ত কে এক নজর দেখার জন্য পাগল হয়ে রইলি আর সেই কিনা তোর বাসার পাশে! ভাবা যাই!
~ দোয়া ফোন পাশে রেখে উঠে বসে বললো, ঐ মোটেও আমাদের বাসার পাশে থাকে না বুঝলি। ঐ আজকে অপূর্ব ভাইয়া সাথে এসেছে।

নিদা প্রশ্ন চোখে বললো, তুই কেমনে জানস!
~ দোয়া সামনের প্লেট থেকে আলু চপ মুখে দিয়ে বললো, আজকে ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে একটা ছেলে বাসে উঠেছিলো। আর বাস থামানোর ক্ষমতা ঐ বাসে শুধু অপূর্ব দা ছিলো জানিস না দুনিয়ার নেতাদের মত ভাব। বাস থামিয়ে ঐ ছেলেকে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বাসে উঠিয়ে ছিলো। আমি দেখেছিলাম বাট বৃষ্টির জন্য ছেলেটাকে অতো বেশী খেয়াল দিই নেই।

মাহা মৃদুস্বরে চিৎকার দিয়ে হাত নাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ সেজন্য সেই অভির শার্ট পরেছিলো। আমি তো অভিই ভাবছিলাম!
~ নিদা আর দোয়া বিরক্ত ভঙ্গিতে মাহার দিকে তাকালো। নিদা হঠাৎ বললো, তাহলে তো সেই অবশ্যই তোদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে!
দোয়া জানালা আটকাতে আটকাতে বললো, তা সঠিক ভাবে বলতে পাচ্ছি না রে।
~ হঠাৎ মাহা বুদ্ধিমান গলায় বললো, মাদু তুই তো জানালা দিয়েও সীমান্ত কে দেখতে পারবি! আজ অবশ্যই সেই অপূর্ব দা রুমে থাকবে! আর অপূর্ব দা তো তোর প্রেমে এতো হাবুডুবু খাচ্ছে তোর জানালা বরাবর রুমটায় নিয়েছে।

নিদা আর দোয়া একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। দোয়া মাহা কে জাপটে ধরে বললো, এই ১৯ বছর জীবনে তুই প্রথম সঠিক মন্তব্য করলি!
নিদা দোয়া আর মাহা কে জাপটি থেকে আলাদা করে বললো, মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোনদের মত কোলাকুলি না করে এটা ভাব যদি অপূর্ব দা ধরতে পারে!
দোয়া মন খারাপ সুরে বললো, কালকে সেই বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে তাহলে।

~ রাত বেড়েছে দোয়া, মাহা আর নিদা কিছুখন পর পর জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে অপূর্ব জানালা দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু রুমে কোন আলো দেখা মিলছে না।
~ দোয়া বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললো, বালের বাল ঐ ব্যাটা কি এখনও ছাদে ঝুলে আছে নাকি! সালা রুমের বাতি জ্বালা। হঠাৎ অন্ধকারে মধ্যে কেউ একজন দোয়ার মুখ বরাবর টর্চ মারলো।

দোয়া তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, সালার বদের বদ মেয়ে দেখলে লাইট মারতে ইচ্ছে করে না! তোর চোখ গুলো খুলে এই মাদুয়া হাসান দোয়া মার্বেল খেলবে মনে রাখিস। জাহিল!
তারপর সটাৎ জানালাটা আটকিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। নিদা মাহা হতভম্ব চোখে বললো, এইরকম বকলি কেন তুই!
দোয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, সালা রে ফেলে জুতো পিটা করি।
নিদা দোয়ার মাথায় খাট্টা মেরে বললো, গাধীর গাধী ঐটা সীমান্ত ছিলো। তোর মাথায় এটা আসে নি ঐ বাসা থেকে এই বাসার জানালাতে আজ পর্যন্ত কেউ লাইট মেরে দেখেনি।

কারণ এটা নিয়ে আন্টি সাথে ঝগড়া হওয়ার পর কেউ আর করেনি। কারণ অপূর্ব দা নিজেই আন্টি করে কথা দিয়েছিলো।
আর অন্ধকার হলেও কি হয়েছে চাঁদের আলোতে বেশ বুঝা যাচ্ছিলো ছাদের ছেলেটাই।
রাগে দুঃখে দোয়ার মনে হলো কারেন্টের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে। এতো কেন অবুঝ সেই! দোয়া অসহায় চোখে
নিদা আর মাহার গরম চোখের দিকে তাকালো।

মাহা ভেংচি কেটে বললো, খালামনি বার বার বারণ করতো মুখচোরা স্বভাব বদলা এখন বুঝ!
সারাদিন বৃষ্টির কারণে ঠান্ডা যেনো আরো কয়েকগুন বেড়ে গেলো। নিদা, মাহা কম্বল মুড়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ঘুম এলো না দোয়ার। ঐ ঘটনার পর লজ্জা সেই আর জানালার ধারে কাছেও যাইনি।

লেখা – ফারু ইসলাম (ফারহানা)

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “অসময়ে – valobashar romantic prem er golpo bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অসময়ে (শেষ খণ্ড) – valobashar romantic prem er golpo bangla