মিষ্টি প্রেমের গল্প

আমার তুমি (সিজন ১ – ১ম খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini

আমার তুমি (সিজন ১ – ১ম খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini: শাদাফ পরীকে পেছন থেকে জড়িয়েই হাত ধরে ধরে রান্না শেখাচ্ছে। কোনটার পর কোন মশলা, কতটুকু পরিমাণ সব। পরী মুচকি মুচকি হাসছে আর মনে মনে বলছে….


পর্ব ১

“নাভি দেখা যায় এমন শাড়ি কি না পড়লে হয়না?” এতটুকু কথা বলেই অন্যদিকে তাকালো শাদাফ।
কথাটা শুনে পরী পেছনে তাকালো শাদাফের দিকে।

~ লুচ্চা ব্যাডা! মেয়ে মানুষ দেখলেই লুচ্চামি করতে মন চায়? ফালতু ছেলে জানি কোথাকার। চোখ কি কপালে নিয়ে ঘুরিস? আমি কি শাড়ি পড়েছি চোখে দেখেছিস? সুতী কাপড় পড়েছি। আমি পেট বেড় করেই শাড়ি পড়িনা আর তুই বলতেছিস নাভি দেখা যায়? আসলে এগুলা তো সব লুচ্চামি করার ধান্দা। ফাউল ছেলে যত্তসব।

কথাগুলো বলেই পরী হনহন করে চলে গেল। শাদাফ আর ওর বন্ধু রওশান হা করে তাকিয়ে আছে। রওশান বললো,

~ দোস্ত! মেয়েটা কে? কি বলেছিস ওকে তুই? এতগুলা কথা তোকে বলে গেল কেন?
~ ওহ শিট! মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে। আমি রেখা ভেবে মেয়েটিকে কথাটা বলে ফেলেছি।
~ কি বলেছিস?

~ আগে বল রেখা কোথায়?
~ এখানেই তো ছিল। আশেপাশেই কোথাও আছে হয়তো।
~ চলতো দেখি।

কোথাও রেখাকে খুঁজে না পেয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ে শাদাফ। বেশ কিছুক্ষণ পর রেখা আসে।
~ কি রে দোস্ত? বিয়ে বাড়িতে ইনজয় না করে এখানে মুখ গোমরা করে বসে আছিস কেন?
~ তোর জন্যই হইছে সব রেখার বাচ্চা।
~ রেগে আছিস কেন? কি হয়েছে?
~ কোথায় গিয়েছিলি তুই?

~ আর বলিস না। আদিল বললো,
এটা কি শাড়ি পড়েছো? সব বুঝা যাচ্ছে! মশারির মত একটা শাড়ি পড়ছো। যাও এখনি চেঞ্জ করে আসো। তাই জান্নাতের মাকে বলে এই শাড়িটা পড়ে আসলাম।
~ তুই কি হলুদ শাড়ি পড়েছিলি আগে?
~ হ্যাঁ কেন বলতো?

~ জান্নাত বললো, তুই কি একটা শাড়ি পড়েছিস তা নিয়ে অনেকেই বাজে কমেন্ট করছে। এখানে আসার পর আমি তো তোকে দেখিনি। জান্নাত দূর থেকে দেখিয়ে দিলো। তোর কাছে যাওয়া ধরেছি এর মধ্যে রওশানের সাথে দেখা। পরে ওকে সাথে নিয়েই গেলাম। পেছন থেকে তোকে ভেবে অন্য একটি মেয়েকে বলে ফেলেছি ‘নাভি দেখা যায় এমন শাড়ি না পড়লে হয়না’
~ পরে? (অবাক হয়ে)

~ পরে আবার কি! মেয়েটা আমাকে ইচ্ছামত বকাঝকা করে গেল।
~ পাগল নাকি তুই? ভালো করে দেখবি না কাকে কি বলতেছিস? আর বলেই যখন ফেলেছিস তখন একটা স্যরি তো বলবি!

~ মেয়েটা আমাকে সেই সুযোগ দিলে তো।
~ মেয়েটার নাম জানিস?
~ তার নাম আমি কি করে জানবো? চিনি নাকি আমি?
~ আচ্ছা নেক্সট টাইম দেখা হলে স্যরি বলিস।
~ সব তোর জন্য হয়েছে।

~ স্যরি দোস্ত আর এমন হবে না।

শাদাফ, জান্নাত, রেখা, আদিল, রওশান এরা হলো কলেজ লাইফের ফ্রেন্ড। রেখার সাথে আদিলের সম্পর্ক ইন্টার পরীক্ষার পর থেকেই। আদিল একটা ভালো চাকরী পেলেই রেখাকে বিয়ে করে নিবে। শাদাফ আর রওশান বেষ্টফ্রেন্ড। সেই ছোটবেলা থেকে একে অপরের বন্ধু। দুজনেই এখন নিজেদের বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত।

জান্নাতের বিয়ে উপলক্ষে আজকে ওর গায়ে হলুদে এসে হয়ে গেল এক এলাহি কাণ্ড।

গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান শেষে শাদাফ আর রওশান চলে যেতে চাইলেও জান্নাত যেতে দেয়না। জান্নাতের এক কথা,
~ বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই থাকতে হবে।
অগত্যা শাদাফ আর রওশানও থেকে যায়।
রাত প্রায় ২টা,

সকলেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেও ঘুম আসছেনা শাদাফের। এই হলো শাদাফের এক সমস্যা নতুন জায়গায় কিছুতেই ঘুম আসেনা। জান্নাতদের বাসায় আজ যে প্রথম এসেছে এমন নয়। এর আগেও বহুবার এসেছে কিন্তু কখনো রাত থাকেনি। মাকে খুব মিস করছে শাদাফ। ছাদে গিয়ে মাকে ফোন করে।

~ হ্যালো মা
~ কি হয়েছে শাদু? এত রাতে ফোন দিলি যে? কোনো সমস্যা?
~ না মা। কোনো সমস্যা নেই। আসলে তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল তাই ফোন দিলাম।
~ পাগল ছেলে। রাতে খেয়েছিস?
~ হ্যাঁ। তুমি খেয়েছো?
~ হুম।
~ বাবা?
~ সবাই খেয়েছো।

~ ওষুধ খেয়েছো তো?
~ হ্যাঁ বাবা।
~ আচ্ছা মা এখন তাহলে ঘুমাও। আমি সকালে ফোন দিবো।
~ আচ্ছা।

ফোন কেটে দিয়ে শাদাফ ছাদের একপাশে রাখা চেয়ারটায় বসে। এখন মনটা বেশ শান্ত লাগছে। মায়ের সাথে কথা বলেছে বলে কথা! এক কথায় শাদাফ ভীষণ মা ভক্ত।
ছাদে বাতাস বইছে খুব। তাই শাদাফ আর ঘরে না গিয়ে ছাদেই বসে রইলো। গান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে!

সকালে শাদাফের ঘুম ভাঙ্গে পানির ছিটায়। শাদাফ চোখ খুলে তাকাতেই দেখে, একটা মেয়ে কাপড় ঝাকি দিয়ে দিয়ে তারপর দড়িতে দিচ্ছে। সেই পানির ফোটাই শাদাফের মুখে গেছে। কিন্তু সেটাতে অবাক হয়নি শাদাফ।

শাদাফ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির চুলের দিকে। ভেজা লম্বা চুল। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। মেয়েটার মুখ দেখতে পাচ্ছে না শাদাফ। আনমনে শাদাফ মেয়েটির চুলের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,

~ মেয়েটা কি ঠিকমত চুল ঝাড়তে পারে না? কিরকম পানি পড়ছে চুল থেকে! তবে মাশআল্লাহ্ মেয়েটার চুলের কোনো প্রশংসা হয়না। সাক্ষাত পরী একটা! যদিও এখনো পরীর মুখটা দেখতে পারিনি।

শাদাফের ঘোর কাটে একটা পিচ্চি মেয়ের ডাকে।
~ পরী আপু পরী আপু।
~ কিরে এভাবে চেঁচাচ্ছিস কেন?
~ আমাকে সাজিয়ে দিবা না?
~ এত সকালে কিসের সাজগোজ?

~ বাহ্ রে! তুমি মনে হয় জানো না যে আজ জান্নাত আপুর বিয়ে।
~ জানি তো! কিন্তু বিয়ে তো রাতে শুরু হবে এখন কিসের সাজ?
~ ধুর তুমি কিছু বুঝো না। চলো তো আমাকে সাজিয়ে দিবা।
পরীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রাব্বানা।

শাদাফ ওদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে।
~ মেয়েটার নাম সিরিয়াসলি পরী! কিন্তু এই পরীটাকে কেন জানি চেনাচেনা লাগছে।
ওহ, হ্যাঁ! মনে পড়েছে। এইতো সেই মেয়ে যাকে কাল আমি রেখা ভেবেছিলাম।
রওশান ছাদে এসে শাদাফকে বলে,

~ তুই এখানে? আর তোকে সারা বাড়িতে খুঁজে মরতেছি।
~ আমি রাতেই এসেছি। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি।
~ জানিস সিঁড়িতে না ঐ মেয়েটার সাথে দেখা হয়েছে, যে তোকে রাতে ঝাড়লো।
শাদাফ একটু কেশে বললো,
~ পরী?

~ মেয়েটার নাম পরী নাকি?

~ সকালে ঐ স্নিগ্ধ ভেজা চুল দেখে পরীই লেগেছিল আমার কাছে। যখন ঐ স্নিগ্ধ মুখটা দেখলাম তখন মনে হলো মেয়েটা আসলেই পরী। তারপর যখন পিচ্চি মেয়েটা এসে ওকে পরী আপু বলে ডাকলো তখন মনে হলো মেয়েটা আসলেই বিশেষ কেউ!
~ দোস্ত তুই কি আবার ওর প্রেমে পড়লি নাকি?
~ ধুর কি বলিস! তুই তো জানিসই লম্বা চুল আমার দূর্বলতা।
~ হুম বুঝি বুঝি।

~ কিন্তু জানিস রওশান, রাতের পরী আর সকালের এই পরীটার মধ্যে কত্ত তফাৎ। রাতে কি রাগিণী দেখলাম আর সকালে একটা স্নিগ্ধ মায়াবিনী।
~ স্বাভাবিক দোস্ত। একটা অপরিচিত মেয়েকে ঐ কথা বললে রাগ করাটাই স্বাভাবিক।
~ তা ঠিক। কিন্তু মেয়েটা কে? ও কি জান্নাতের কোনো রিলেটিভ নাকি?
~ জান্নাতকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

~ ধুর! জান্নাত কি ভাববে?
~ ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমার ওপর ছেড়ে দে। এখন চল অনেক কাজ পড়ে আছে।
~ হুম চল।

ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা করে শাদাফ, রওশান আর আদিল বাড়ির অন্যান্য কাজে সাহায্য করছে। আর রেখা, আরো বান্ধবীদের নিয়ে জান্নাতের সাথে হাসি~ ঠাট্টা করছে।
কিছুক্ষণ পর শাদাফ দেখতে পেল পরীকে। জান্নাতের মায়ের সাথে কাজে হেল্প করতে চাইছে পরী কিন্তু জান্নাতের মা দিচ্ছে না।

~ আন্টি, আমাকে কোনো কাজে সাহায্য করতে না দিলে আমি জান্নাত আপুর বিয়েতে থাকবোনা বলে দিলাম।
~ পাগল হলি তুই পরী? তুই যা জান্নাতের আরো বান্ধবীরা আছে সবার সাথে পরিচিত হ গল্প কর। ভালো লাগবে।

~ আমি গুণে গুণে পাঁচটা দিন কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছি জান্নাত আপুর বিয়েতে থাকবো বলে। আর সেখানে আমি তোমাকে হেল্প না করে শুধু ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়াবো? এত স্বার্থপর আমি?
~ দেখো তো! আমি তোকে এ কথা কখন বললাম?

~ তাহলে দিচ্ছো না কেন কাজ করতে?
~ আচ্ছা বেশ। আমার রুমে গিয়ে দেখবি অনেকগুলা ফুল আছে ঐ জান্নাতের রুমে একটু দিয়ে আয়।
~ ব্যাস এতটুকুই?
~ আগে এটা কর, পরে কাজ থাকলে আরো দিবোনি।

শাদাফ পরীর এমন আচরণ দেখে আরো একবার মুগ্ধ হয়ে যায়।
~ একটা মেয়ে এত লক্ষী হতে পারে! কিন্তু কে এই মেয়েটা!
রাব্বানা ওর বয়সী ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শাদাফ রাব্বানাকে ডাক দিলো।
~ বাবু শোনো তো।

~ আমার নাম বাবু না। আমার নাম রাব্বানা।
~ বাহ্! অনেক সুন্দর নাম।

~ থ্যাঙ্কিউ
~ পরী তোমার কি হয়?
~ আমার বোন হয়।
~ আপন বোন?

~ হুম। আন্টির মেয়ে।
রাব্বানার কথা শুনে হাসলো শাদাফ। পকেট থেকে দুইটা চকোলেট বের করে রাব্বানার হাতে দিলো।
হঠাৎ ই শাদাফের মনে পড়লো,

~ আন্টি না পরীকে ফুল নিয়ে জান্নাতের রুমে যেতে বললো? তার মানে পরী এখন জান্নাতের রুমে।
শাদাফও জান্নাতের রুমের দিকে পা বাড়ায়। জান্নাতের রুমের দরজার সামনে যেতেই জোরে ধাক্কা খায়। না, না কোনো দরজার সাথে না আর অন্য কোনো মেয়ের সাথেও না। পরীর সাথে ধাক্কা খেয়েছে। শাদাফ স্ট্রং থাকায় পড়েনি কিন্তু পরী নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে একদম ফুলের ওপর গিয়ে পড়েছে!

~ মাগো! আমার কোমড় গেল!
জান্নাত আর রেখা এসে পরীকে ধরে তুলে। পরী শাদাফের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
~ লুচ্চা ছেলে! ধাক্কা দিলি কেন?
ঘরে উপস্থিত সকলের চোখ যেন চোখের কোটর থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইছে পরীর কথা শুনে!


পর্ব ২

জান্নাত আর রেখা এসে পরীকে ধরে তুলে। পরী শাদাফের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
~ লুচ্চা ছেলে! ধাক্কা দিলি কেন?

ঘরে উপস্থিত সকলের চোখ যেন চোখের কোটর থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইছে পরীর কথা শুনে!
জান্নাত জিজ্ঞেস করলো,
~ পরী তুই কাকে কি বলছিস? চিনিস ওকে?

~ চিনিনা আবার! খুব ভালো করেই চিনি। অভদ্র ছেলে একটা।
~ আহ্ পরী! ঠিকমত কথা বল। ও আমার ফ্রেন্ড হয়।
~ আমাকে কেন ধমক দিচ্ছো তুমি? তোমার ফ্রেন্ড বলে কি সাত খুন মাফ হয়ে যাবে নাকি। আর আমার তো জানা ছিল না যে তোমার লুচ্চা কোনো ফ্রেন্ড আছে।

~ আজিব! কি হয়েছে সেটা না বলে আলতুফালতু কি বলছিস এসব?
~ কি হইছে তা তোমার ফালতু ফ্রেন্ডকেই জিজ্ঞেস করো, কথাটা বলেই পরী রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।
সকলেই শাদাফের দিকে তাকালো। মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। করুন চাহনী দিয়ে তাকিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
~ তোরা এভাবে কি দেখছিস?
জান্নাত বললো,

~ দোস্ত কি করেছিস তুই পরীকে?
শাদাফ এবার ওদের সামনে গিয়ে ওদের সরিয়ে একটা চেয়ারে আয়েশ করে বসে। জান্নাত রেগে গিয়ে বলে,
~ তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।

~ আরে বলছি। এত তাড়া কিসের?
~ তাড়া কিসের মানে? তুই কিছু না করলে পরী কি এভাবেই এতগুলো কথা বলে গেল?
~ আমি কিছু করিনি, কিছু বলেছিলাম।
~ কি বলেছিলি?

শাদাফ রেখার দিকে তাকালো। রেখা উপস্থিত সকলকে কাল রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বললো। জান্নাত সব কথা শুনে খাটে ধপাস করে বসে পড়লো।
~ শাদাফ রে! তুই কি আর কোনো মেয়ে পাস নাই? ভুল মানুষই করে ঠিক আছে তাই বলে এমন ভুল!
~ যেভাবে বলছিস পরী বাঘ নয়তো ভাল্লুক কিছু একটা হবে মনে হয়।
~ সেটা কি তুই ওর কথা শুনে বুঝিসনি?

~ আচ্ছা ও কি হাসতে পারে না? সবসময় এমনই?
~ হাসতে পারে না আবার? যখন হাসে তখন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। কিন্তু যখন রাগে তখন খবর আছে। খুব রগচটা পরী। কথায় কথায় রেগে যায়। ওর মা ওকে রাগিণী বলে ডাকে।

কিন্তু রাগ আর, জেদ বেশি হলে কি হবে! মনটা অনেক ভালো। খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে।
~ বুঝলাম। কিন্তু ও তোর কি হয়?
~ আমার কিছুই হয়না। আমাদের বাসায় ভাড়া থাকে।
~ কারা কারা থাকে?

~ ওর বাবা মা আর পরী। ওর খালামনিরাও আমাদের বাসায় থাকে। লিমা(রাব্বানার পরিবর্তিত নাম) ওর খালাতো বোন।
~ কিন্তু দোস্ত, আমি যে ভুল করে বলে ফেলছি কথাটা তা ওকে কি করে বলবো?
~ কি করে বলবি আবার? মুখ দিয়ে বলবি।

~ বিশ্বাস করবে আমার কথা?
~ মনে হয়তো না! রেখাকে বরং সাথে নিয়ে যাস। রেখা বললে হয়তো বিশ্বাস করবে।
~ আচ্ছা।

জান্নাতের বিদায়পর্ব শেষ করে সকলেই বাসায় চলে যায়। বেশ খাটনি গিয়েছে তাই শরীরটাও ক্লান্ত লাগছে শাদাফের। বিছানায় গা এলাতেই চোখে ঘুম এসে পড়ে।

সকালে আজান দেওয়ার সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠে পড়লো পরী। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো।
~ না! আলসেমি করলে চলবে না। চটপট নামাজটা পড়ে আসি।
নামাজ শেষ করে পরী ছাদে গেল। এটা পরীর নিত্যদিনের স্বভাব। এসময় আবহাওয়াটা অনেক বেশিই ভালো লাগে। কিছুক্ষণ ছাদে হাঁটাহাঁটি করে রুমে চলে গেল। কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হওয়ার সময় পরীর মা বললো,
~ কলেজে যাবি নাকি?

~ হুম।
~ জান্নাত না বারবার করে তোকে বললো ওর বৌ~ ভাতে যেতে?
~ তাতে কি হয়েছে মা? বিয়েতে তো ছিলাম। বৌ~ ভাতে যাওয়া লাগবেনা। কত মানুষজন আসে আমার ভাল্লাগে না। তাছাড়া কলেজেও যাই না বেশ ক’দিন হলো।
~ তোর যা ভালো মনে হয়।

~ হুম। আমার টিভিন দাও।
ব্যাগ~ ট্যাগ গুছিয়ে পরী কলেজে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ব্যাগ টেনে ধরলো জান্নাতের মা।
~ সাহস কি তোর বেশি হয়ে গেছে না?
~ ও আন্টি আমি আবার কি করলাম?
~ কলেজে যাচ্ছিস কেন?

~ ওমা! মানুষ কলেজে যায় কেন? পড়তেই তো নাকি!
~ আজকে জান্নাতের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা না।
~ আমি না গেলে কিছু হবে না।
~ চুপ। ঘরে গিয়ে রেডি হয়ে নে। জান্নাতের বন্ধুরা আসবে ওদের সাথে যাবি।
~ কোন বন্ধুরা?

~ তুই চিনিস ওদের। যা রেডি হ।
অগত্যা পরী কলেজ যাওয়া বাদ দিয়ে জান্নাতের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য রেডি হতে চলে যায়।
রেডি হয়ে এসে দেখে জান্নাতের বিয়েতে যারা এসেছিল তারাই এসেছে। গাড়িতে উঠতে যাবে তখন দেখে শাদাফের পাশের সিট’টাই শুধু খালি আছে। শাদাফকে দেখেই ভ্রু কুচকে ফেললো পরী।

আদিল আর রেখা পাশাপাশি বসেছিল। পরী আদিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ ভাইয়া আপনি ঐ সিটে বসেন তো।
~ কেন পিচ্চি আপু? তুমি বসো।
~ আপনি বসলে কি সমস্যা?
~ না, মানে আসলে।
~ থাক আপনার ইয়ে মানে বাদ দেন।

পরী রেখার হাত ধরে শাদাফের পাশে বসিয়ে দিলো আর নিজে আদিলের পাশে বসলো।
উপস্থিত সকলেই হতবাক। সকলের মনে একই কথা,
~ এই মেয়ে ভীষণ সাংঘাতিক!
রেখা শাদাফকে ফিসফিস করে বললো,

~ শাদাফ রে! পরী কে পাশে বসানোর জন্য যে তোর পাশের সিট ফাঁকা রাখলি। কোন কচুটা হলো বল? উল্টো আমার বিএফের পাশে ও বসে আমাকে তোর পাশে বসিয়ে দিলো।

~ থাক কান্দিস না। কি আর করার?
~ ওর ভুল ধারণাটা ভাঙ্গতে হবে বুঝলি।
~ কিন্তু কিভাবে?
~ জান্নাতের বিয়ের সব ঝামেলা আগে মিটুক।

৫ দিন পরঃ
পরী কলেজে যাওয়ার সময় খেয়াল করলো, প্রতিদিনই ওর কলেজ ছুটির সময় কেউ একজন বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু মাথায় হেলমেট থাকার কারণে জানেনা কে সে। প্রথম ২দিন বিষয়টাকে পাত্তা না দিলে ৫দিন পরও একই ঘটনার পুনরাবৃতি দেখে কেমন যেন সন্দেহ লাগছে ওর। কিছু না বলেই পরী চলে যায়।

পরেরদিন সেই ছেলেটাকে দেখে বেশ অবাক হয় পরী। কারণ ছেলেটা শাদাফ। সাথে রেখাও আছে। দুজনই পরীর দিকে এগিয়ে আসছে।
পরী চোখমুখ কালো করে বললো,

~ আপনারা ছেলেধরার মত আমার পথ আটকে ধরেছেন কেন?
পরীর কথা শুনে রেখা ফিক করে হেসে দেয়।
~ হাসির কি হলো?
~ তোমাকে তুলে নিয়ে আমার ভাইর বউ করবো বুঝছো?
~ বললেই হলো?

~ রেখা কাজের কথাটা বল আগে। (শাদাফ)
~ হুম। আসলে পরী, জান্নাতের গায়ে হলুদের রাতে শাদাফ তোমাকে যে কথাটা বলেছে সেটা আমি ভেবে বলে ফেলেছে। আর তুমিও ওকে ভুল বুঝে বকাঝকা করেছো। তাই শাদাফ তোমাকে স্যরি বলতে এসেছে।
~ এই স্যরি বলতে কি ৬ দিন ধরে কলেজের সামনে আসতে হয়?

~ ভয় পাচ্ছিল। তাছাড়া তুমি ওর কথা বিশ্বাস করবে নাকি করবে না এটা ভেবে ও একা বলেনি। আমাকে সাথে নিয়ে আসছে।
~ আপনাকে কে বললো রেখা আপু যে, আমি এখন কথাটা বিশ্বাস করেছি?
পরীর কথা শুনে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় শাদাফের।
~ আমি তোমাকে মিথ্যা বলবো বলো?

~ উনি যখন আপনার বন্ধু তখন আপনি উনার সাফাই গাইতেই পারেন স্বাভাবিক।
~ তিন সত্যি করে বলছি পরী, আমি তোমাকে সত্যিটাই বলেছি।
~ আচ্ছা বিশ্বাস করলাম।

শাদাফের দিকে তাকিয়ে রেখা বললো,
~ তুই হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? স্যরি বল।
~ ওহ হ্যাঁ। আমিই সত্যিই দুঃখিত আর লজ্জিত পরী।
~ ঠিক আছে ঠিক আছে মাফ করে দিছি যান।

~ তাহলে কালকে আমাদের বাসায় আসবে? (রেখা)
~ কেন?
~ জান্নাত আর ওর স্বামীও আসবে। শাদাফ, রওশান, আদিল, আমি আর তুমি ঘরে মিলে আমরা ছোটখাটো খাবারের আয়োজন করবো। রওশান খুব ভালো রান্না করে খেলে বুঝতে পারবা।

~ ওহ! আমি এত খাওয়ার পাগল না আপু। আমি আসছি না।
~ প্লিজ লক্ষী সোনা বোন আমার। আমি নিজে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো। আর সেখানে জান্নাতও তো থাকবে। প্লিজ না করো না।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। বেশিক্ষণ কিন্তু থাকতে পারবোনা।
~ আচ্ছা।

পরেরদিন বিকালে রেখার সাথে রেখার বাসায় যায়। জান্নাত পরীকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে।
~ কিরে কেমন আছিস?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ আপু। তুমি কেমন আছো?

~ আলহামদুলিল্লাহ্‌। বস
পরীকে বসতে দিয়ে জান্নাত ওর স্বামীর সাথে গল্প জুড়ে দিলো। শাদাফ বসে টিভি দেখছে। আদিল ফোনে গেমস খেলছে। রেখা সবার জন্য বাটিতে করে নুডলস এনে দিলো। আদিল আর ওর জন্য নুডলস নিয়ে আদিলের পাশে বসে ওরাও নুডলস খেতে খেতে আড্ডা জমিয়ে দিলো।
পরী শুধু এপাশ ওপাশ দেখছে। নুডলস খেয়ে পরী জিজ্ঞেস করলো,

~ জান্নাত আপু তোমার আরেকটা বন্ধু কই?
~ ও তো রান্নাঘরে রান্না করে।
~ ওহ। নুডলসটা কি সে রান্না করেছে? দারুণ হয়েছে কিন্তু।
~ না রে। নুডলস শাদাফ রান্না করেছে।

পরী শাদাফের দিকে তাকিয়ে বাটিটা রেখে বললো,
~ আমি একটু দেখে আসি রওশান ভাইয়া কি কি রান্না করছে।
~ যা।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখে রওশান রান্নাবান্না নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।
~ রওশান ভাইয়া।
~ পরী তুমি?

~ হুম আমি। এত অবাক হলেন কেন? আমি তো আর আকাশের পরী না যে আপনাকে বশ করে তুলে নিয়ে যাবো। আমি মাটিতে গড়া রক্ত মাংসে পরী।
পরীর কথা শুনে রওশান শব্দ করে হেসে দেয়।

~ এত হাসির কিছু বলিনি আমি।
~ আমি জানতাম তুমি খুব রাগী মেয়ে। কিন্তু এখন দেখছি তুমি অনেক চঞ্চল আর দুষ্টুও।
~ একটু আধটু আরকি! তা কি কি মেনু হচ্ছে শুনি?
~ অনেক কিছু। ভাত, বিরিয়ানি, চিকেন ফ্রাই, ধুন্দল ভাজি, ঢেঁড়স ভাজি আর মরিচ ভর্তা।
পরী অবাক হয়ে বললো,

~ রওশান ভাই! সিরিয়াসলি এতকিছু আপনি একা রান্না করবেন?
~ হ্যাঁ। কেন?
~ আল্লাহ্ আপনাকে মনে হয় ভুল করে ছেলে বানিয়ে ফেলেছে।
~ ধুর! কি বলো এসব।
~ সত্যি বলছি। নাহলে এত রান্না কোন ছেলে পারে?

~ পারে। ব্যাচেলর থাকলে কতকিছুই রান্না পারে ছেলেরা।
~ আপনার ফ্রেন্ডসরা হেল্প করেনা।
~ না। আমি করতে দেইনা। আমার একাই রান্না করতে ভালো লাগে। তবে তুমি চাইলে আমাকে হেল্প করতে পারো। আমি কিছু মনে করবো না।
রান্না করার কথা শুনে পরীর হাসিমাখা মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পরী মনে মনে বললো,
~ আমি আর রান্না!

~ কি হলো করবে? বেশিকিছু করতে হবেনা। শুধু ধুন্দল আর ঢেঁড়স ভাজি করে দাও।
~ না পারলেও পারতে হবে রওশান ভাই! আপনি তো আমাকে চিপাকলে ফেলে দিলেন। যেখানে কেউ আপনাকে হেল্প করলে ভালো লাগেনা সেখানে আপনি যেচে চাইছেন আমি যেন হেল্প করি। এখন যদি না করি তাহলে মান সম্মান থাকবে না। (মনে মনে)
~ হ্যাঁ শিওর।

~ আচ্ছা ওখানে দেখো ধুন্দল, ঢেঁড়স, কাচামরিচ আর পেঁয়াজ কাটা আছে।
রওশানের ফোন আসায় রওশান কোথায় কি আছে বলে দিয়ে একটু বাহিরে গেলে ফোনে কথা বলার জন্য।
পরী নিজের মনেই বলছে,

~ পরী রে! কোন কুলক্ষণে তুই রান্নাঘরে আসছিলি।
ধুন্দল ভাজিতে পানি দিছে তো দিছে শুকানোর আর নাম নেই। চুলার জ্বাল বাড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু পানি আর শুকানোর নাম নাই বরং পানি বাড়তেছে।
শাদাফ রান্নাঘরে আসে।
~ আপনি রান্নাঘরে আসছেন কেন?

~ রওশানের আসতে একটু দেড়ি হবে তাই আমাকে পাঠালো। তোমার ভাজি করা হয়ে গেছে?
~ আর ভাজি! পানিই তো শুকাচ্ছে না।
~ কি ভাজি?

~ ধুন্দল আর ঢেঁড়স ভাজি করতে বলেছে। ধুন্দল ভাজি বসিয়েছি কিন্তু পানিই শুকাচ্ছে না।
~ পানি শুকাচ্ছে না মানে? ধুন্দল ভাজিতে পানি দিছো নাকি?

~ হ্যাঁ কেন?
শাদাফ তাড়াতাড়ি কড়াইর ঢাকনা উঠালো। ঢাকনা উঠিয়ে দেখে কড়াই ভর্তি পানি।
শাদাফ হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতেছেনা। শেষে আর না পেরে হেসেই দিলো। শুধু হাসি না একদম দম ফাটানোর মত হাসি।
পরী বোকার মত তাকিয়ে আছে।

~ এভাবে হাসার কি আছে?
শাদাফ হাসতে হাসতেই বললো,
~ তুমি কত বোকা পরী! তুমি কি জানো না ধুন্দল ভাজিতে পানি দিতে হয়না? ধুন্দলে এমনিতেই পানি উঠে। ভাগ্যিস তুমি আগে ঢেঁড়স ভাজি করোনি তাহলে তো ঢেঁড়সেও পানি দিতে আর ওগুলা দেখতে কেমন হতো জানো?
নাকের ইয়ের মত!, বলেই আবারো জোরে জোরে হাসা শুরু করলো শাদাফ।

শাদাফের এমন কান্ড আর নিজের বোকামির জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। কাঁদো কাঁদো স্বরে পরী বললো,
~ নাকের ইয়ের মত মানে?

~ আরে ঠান্ডা লাগলে নাক থেকে যে পড়ে!
এরমধ্যে রওশানও রান্নাঘরে এসে পড়েছে। শাদাফকে এভাবে হাসতে দেখে কারণ জানতে চায় রওশান। পরীর বোকামির কথা শুনে রওশানও যোগ দেয় সেই দম ফাটানো হাসিতে। শাদাফ তো ফ্লোরে বসে পড়েছে হাসতে হাসতে। আর রওশান কিচেনের বেসিংয়ে হেলান দিয়ে পেটে হাত রেখে হাসতেছে।
পরী কাঁদো কাঁদো মুখ করে একবার নিচে শাদাফের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার সামনে রওশানের দিকে তাকাচ্ছে!

পর্ব ৩

পরী কাঁদো কাঁদো মুখ করে একবার নিচে শাদাফের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার সামনে রওশানের দিকে তাকাচ্ছে!

রান্নাঘর থেকে এমন হাসির শব্দ পেয়ে জান্নাত, জান্নাতের স্বামী, রেখা ও আদিলও রান্নাঘরে আসে। রেখাই শাদাফকে জিজ্ঞেস করে,
~ কিরে এভাবে হাসছিস কেন?

শাদাফ বা রওশান কেউই কোনো উত্তর দিচ্ছে না। দুজনেই সমানতালে হেসেই চলেছে। শেষমেশ শাদাফ অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে পরীর বোকামির কথা সবাইকে বলে।

এবার শাদাফ আর রওশানের সাথে উপস্থিত সকলেই হাসিতে যোগ দেয় শুধু জান্নাত ব্যতীত। জান্নাতের হাসি পেলেও সে হাসছেনা তার কারণ জান্নাত জানে যে পরী রান্না করতে পারেনা। জান্নাত এটাও জানে যে, পরীর এখন খুব রাগ হচ্ছে কিন্তু পরী ওদের ওপর রাগ খাটাতে পারবেনা।
আর পরীর একটা স্বভাব হলো, পরী রাগ খাটাতে না পারলে কান্না করে দেয়।
সকলকে এভাবে হাসতে দেখে জান্নাত ঝাড়ি দিয়ে বললো,
~ হচ্ছেটা কি? সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এভাবে হাসার কি আছে?

জান্নাতের ধমকে সকলে চুপ হয়ে গেলো সাথে ভীষণ অবাকও হয়েছে। কারণ বন্ধুমহলে এরচেয়েও সাধারণ বিষয় নিয়ে জান্নাত বেশি হাসতো। আর সেই জান্নাতই কি~ না ওদের হাসি থামিয়ে দিচ্ছে!
এবার পরী কেঁদেই ফেললো। কেঁদে কেঁদে বললো,
~ আপনারা সবাই প্লান করে এটা করেছেন তাই না? সব আমাকে অপমান করার জন্য করেছেন আমি জানি। এজন্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।

জান্নাত পরীর কাছে এগিয়ে গিয়ে পরীকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ নারে পাগলী মেয়ে! ওরা তোকে অপমান করতে চাইবে কেন। ওরা তো জানেনা যে তুই রান্না করতে পারিসনা। রওশান তোকে রান্না করতে বললো আর তুই রাজি হয়ে গেলি কেন? বলিস নি কেন যে তুই রান্না জানিস না।

পরী কোনো কথা বলছে না। জান্নাতের কথায় যেন পরীর কান্নার বেগ আরো বেড়ে যাচ্ছে। পরীকে এভাবে কাঁদতে দেখে শাদাফের কেন জানি অনেক বেশিই কষ্ট হচ্ছে। শাদাফ নিজের মনেই বলছে,
~ এই পরীটাকে হাসিতেই মানায়!
কিছুক্ষণ কান্নার পর পরী বললো,
~ আমি ঘুমাবো।

জান্নাত পরীকে একটা রুমে শুইয়ে দিয়ে রান্নাঘরে আসলো।
~ রওশান, তুই কি রে? তুই তো আমাদের কাউকে তোর কাজে সাহায্য করতে দিস না। তাহলে পরীকে কেন রান্না করতে বললি?

~ স্যরি জান্নাত। আমি বুঝতে পারি নাইরে যে ও রান্না পারেনা। ও কেমন চঞ্চল জানিসই তো। ওর চঞ্চলতা ভালো লাগছিল।

~ হু এখন যে পরী কাঁদছে। এখন খুব ভাল্লাগছে তাই না?
আর শাদাফ তোকে বলি, এভাবে গড়াগড়ি করে হাসির কোনো মানে হয়?
~ যাহ বাব্বাহ্! আমি আবার কি করলাম?

~ শোন, পরী মিডেল ক্লাস পরিবারের মেয়ে হতে পারে কিন্তু কষ্ট কি তা ও বুঝে না। পরিবারের লোক যতই কষ্ট করুক পরীকে একটুও কষ্ট পেতে দেয় না। পরিবারের ছোট মেয়ে পরী। সকলের অনেক বেশিই আদরের। ওর মা ওকে কখনো রান্না করতে দেয়নি। ওর মা কখনো অসুস্থ হলে ওর বাবা রান্না করতো তবুও পরীকে রান্নাঘরে যেতে দিত না। তাহলে সে মেয়ে কি করে জানবে যে ধুন্দলে পানি দিতে হয়না?

~ আমরা কি এতকিছু জানতাম নাকি দোস্ত। আচ্ছা বেশ, পরী ঘুম থেকে উঠুক তারপর সকলে মিলে পরীকে স্যরি বলবো।
সকলেই শাদাফের সাথে একমত হলো।

রান্নাবান্না শেষ করে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে সবাই। জান্নাতের উদ্দেশ্যে শাদাফ বললো,
~ পরী তো এখনো ঘুমুচ্ছে। ওকে তো আবার ফ্রেশ হতে হবে। ওকে গিয়ে ঘুম থেকে তুলি?
~ তুই তুলবি ওকে ঘুম থেকে?

~ যদি তুই পারমিশন দিস আরকি!
~ পারমিশন কোনো ফ্যাক্ট নয়। আমি বলতে চাচ্ছি তুই ওকে ঘুম থেকে তুলতে পারবি তো?
~ কেন বলতো?
~ কারণ পরী খুব ঘুমকাতুরে।

~ চেষ্টা করে দেখতে তো সমস্যা নেই।
~ হুম যা।
শাদাফ চলে গেলো পরীকে ডাকতে। পরীকে ঘুম থেকে ডেকে আর কি তুলবে। শাদাফ নিজেই ঘুমন্ত পরীর প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। পরী কেমন এলোমেলো হয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই গরমের মধ্যেও পরী কাঁথা গায়ে দিয়ে রেখেছে। পরীর এমন কাণ্ড দেখে মুচকি হাসলো শাদাফ।

ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো শাদাফ। পরী বাচ্চাদের মত ঘুমাচ্ছে। কান্না করার কারণে চোখের পাপড়িগুলো কেমন একজোট হয়ে রয়েছে।
শাদাফ বেশ আস্তে করেই ডাক দিলো,

~ পরী। এই পরী উঠো।
পরীর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শাদাফ পরীর হাত আলতো করে ধরে ডাকছে।
কিন্তু পরীর আর ঘুম ভাঙ্গার কোনো নামগন্ধ নেই।

১০ মিনিট যাবৎ পরীকে এভাবে ডেকেই চলেছে শাদাফ কিন্তু পরী বেশ আরাম করে ঘুমুচ্ছে। ঘুমন্ত অবস্থাতেই শাদাফের একটি হাত নিজের গালের নিচে রেখে হাতটা পেঁচিয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে পরী। শাদাফ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

~ আল্লাহ্ গো! এই মেয়ের যেমন রাগ তার চেয়েও দেখি বেশি ঘুম। ওকে ডাকতে এসে আমার নিজেরই ঘুম এসে পড়েছে।

এতক্ষণ হওয়ার পরও যখন শাদাফ পরীকে নিয়ে আসছে না তখন জান্নাত গেল ডাকতে।
শাদাফকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে হাসতে হাসতেই শেষ জান্নাত।
~ কিরে দোস্ত পারলি না পরীকে ঘুম থেকে তুলতে?
~ হাসিস না হারামি। এটা কেমন মেয়েরে? এরে ঘুম থেকে তুলে কে?

~ দেখ কিভাবে তুলি।
জান্নাত বিছানায় বসে পরীকে শোয়া থেকে উঠিয়ে বসায়। পরী একবার বসে আবার শুতে যায়। কিন্তু জান্নাত শুতে না দিয়ে ধরে আস্তে আস্তে নিচে নামায়। হাত ধরে ওয়াশরুমে দিয়ে আসে। ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
~ ও জান্নাত আপু আরেকটু ঘুমাই?

~ ওয়াশরুমে ঘুমা।
~ ইয়াক ছিঃ!
পরী দরজা লাগিয়ে দিলো। জান্নাত হাসলো আর শাদাফ অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে।
~ কিরে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?

~ পরীকে কি সবসময় এভাবে ঘুম থেকে তু্লতে হয়?
~ সকালে নামাজ পড়ার সময় ও একাই উঠে। অনেক সময় উঠতে না পারলে ওর বাবা নয়তো মা ডাক দেয়। তখন আবার এক ডাকেই উঠে যায়।

~ কি অদ্ভুত ব্যাপার রে! আচ্ছা তুই এতকিছু কিভাবে জানলি?
~ ওর মা সময় পেলে বা আমার মা সময় পেলে ওদের রুমে যায়। তখন পরীর এসব কাহিনী বলে। আম্মু পরে আমাকে বলে।
~ হুম বুঝলাম। তুই পরীকে নিয়ে আয় আমি যাই।
~ আচ্ছা।

ধীরে ধীরে কেটে যায় তিন মাস। এর মধ্যে শাদাফের সাথে কয়েকবার কথা হয়েছিল ফোনে। তবে ফেসবুকে টুকটাক ভালোই কথা হয় ওদের। শাদাফও পরীর মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু এখনো নিজের মনের কথা জানাতে পারেনি শাদাফ।

কুমিল্লা চলে যাওয়ার আগে শাদাফ নিজের মনের কথা পরীকে জানাতে চায়। বলা তো যায় না আবার কখন কার হয়ে যায় পরী।

জরুরী কথা আছে বলে দেখা করতে চায় শাদাফ। শাদাফের কথামত নির্দিষ্ট জায়গায় আসে পরী।
~ কি ব্যাপার? কি এমন জরুরী তলব শুনি?
~ বলছি। এই নাও তোমার চকোলেট।
~ ধন্যবাদ।
~ ফুসকা খাবে না?
~ এটাতে আবার আমার না আছে নাকি।
শাদাফ দুই প্লেট ফুসকা অর্ডার দেয়।

~ ফুসকা বানাতে বানাতে বলে ফেলেন কি বলবেন।
~ কয়েকদিনের মধ্যে আমি কুমিল্লা চলে যাচ্ছি।
~ কেন?
~ ওখানে বাবা~ মা একা। দেখাশোনা করার মত কেউ নেই। তাই রওশান আর আমি এখানকার বিজনেসটা বাদ দিয়ে একেবারে কুমিল্লা চলে যাবো।
~ হুম বুঝলাম।
~ হুম।
~ শুধু এটা বলার জন্যই ডেকেছেন?
~ তোমার কি মনে হয়?

~ আমার কিছুই মনে হয়না। তবে কুমিল্লা যাবেন এটা তো আপনি ফোনে বা ফেসবুকেও বলতে পারতেন।
শাদাফ কিছু বলার আগেই ফুসকা নিয়ে আসে ওয়েটার। পরীর কথাটাকে কাটিয়ে শাদাফ বললো,
~ ফুসকা এসে পড়েছে। আগে ফুসকা খাও।

পরী ফুসকা খাচ্ছে আর শাদাফ আড়চোখে দেখছে পরীকে। বিষয়টা খেয়াল করে পরী।
~ এভাবে চোরের মত দেখছেন কেন? দেখবেন যখন ভালোমতই দেখেন।
পরী বিষয়টা বুঝে ফেলেছে জেনে লজ্জা পায় শাদাফ। থতমত খেয়ে বলে,
~ না মানে আসলে!

~ বাদ দেন। আমার মাত্র একটা ফুসকা বাকি আর আপনি এতক্ষণে মাত্র একটা ফুসকা খেয়েছেন? আচ্ছা সমস্যা নেই। আসেন অদল~ বদল করি, বলেই
পরী নিজের প্লেট’টা শাদাফকে দিলো আর শাদাফের প্লেট’টা নিজে নিলো।
শাদাফ তখন মনে মনে বললো,

~ এভাবে যদি মনটাও অদল~ বদল করতে!
ফুসকা শেষ করার পর শাদাফ বললো,
~ আরো ফুসকা খাবে?
~ না।
~ আচ্ছা চলো নদীর পাড়টায় হেঁটে আসি।
~ ওকে।

দুজনেই চুপচাপ হাঁটছে। বেশকিছুক্ষণ হাঁটার পর একটা জায়গায় বসে পড়লো পরী।
~ বসে পড়লে কেন?
~ বাবারে! এত হাঁটা যায় নাকি?

~ আচ্ছা ঠিক আছে। বসেছো ভালো করেছো। চোখটা বন্ধ করো তো!
~ কেন? ধাক্কা দিয়ে আবার পানিতে ফেলে দিবেন নাকি? আমি কিন্তু সাঁতার জানিনা।
~ আমার উপর বিশ্বাস নেই তোমার?
~ উমম! আছে।
~ তাহলে চোখ বন্ধ করো।

পরী চোখ বন্ধ করলো। শাদাফ পকেট থেকে এক জোড়া নূপুর বের করে পরীর পায়ে পড়িয়ে দিলো।
~ এবার চোখ খুলো।
পরী বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।

~ এসবের মানে কি?
~ (চুপ)
~ বাই এনি চান্স আপনি আমাকে ভালোবেসে ফেলেননি তো?
~ যদি বলি হ্যাঁ?
~ তাহলে আমার উত্তর’টা না হবে।

~ পরী! আমি সত্যিই তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কখন কিভাবে ভালোবেসে ফেলেছি আমি জানিনা। কিন্তু বলতে পারি, তোমার ঐ লম্বা ভেজা চুলের প্রেমে পড়েছি। তোমার ঐ চঞ্চলতার প্রেমে পড়েছি। তোমার ঘুমন্ত চেহারার মায়ায় পড়েছি। ভালোবাসি পরী। বিশ্বাস করো।

পর্ব ৪

শাদাফের কথার উত্তরে কিছু না বলেই পরী চলে যাওয়া ধরে। পথ আটকে দাঁড়ায় শাদাফ।
~ আমার উত্তরটা কিন্তু আমি পেলাম না পরী।
~ আমি তো বললামই আমার উত্তরটা “না” হবে।
~ কিন্তু কেন পরী? তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?
~ না।
~ তাহলে আমাকে ভালোবাসতে কি সমস্যা পরী?
~ ভালোবাসার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ বা বিশ্বাস নেই।
~ একবার ভালোবেসেই দেখো।
~ পারবোনা।
~ প্লিজ পরী!
~ কি শুরু করলেন আপনি? আপনার আর আমার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস এক না। তাই আপনার আর আমার সম্পর্কও সম্ভব নয়।
~ স্ট্যাটাস দেখে কি ভালোবাসা হয়?
~ হয়। এই যুগে হয়। এখন ভালোবাসবেন পরবর্তীতে গিয়ে বলবেন আপনার পরিবার আমায় মেনে নিবে না। শেষে আপনি কি করবেন জানেন? আপনিও আপনার পরিবারের পছন্দ করা মেয়েটিকে বিয়ে করে নিবেন। মাঝখান থেকে বিসর্জন হবে আমার জীবন।
~ আমার পরিবার এমন না। আমি যেটা বলবো তাতেই রাজি তারা।
~ এরকম কথা তো কম শুনলাম না।
যাই হোক আমি এখন আসি।
পরী চলে যাচ্ছে আর শাদাফ পরীর চলে যাওয়া দেখছে। শাদাফ মনে মনে এটা ভেবে অন্তত খুশি যে, পরী অন্য কাউকে ভালোবাসে না।
~ যতই এড়িয়ে যাও না কেন পরী, তুমিতো আমারই!

পরীদের কলেজে আজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে। তাই পরী সকাল সকাল রেডি হয়ে কলেজে চলে গেল।
কলেজে অনুষ্ঠানে বসার সারির দ্বিতীয় সারিতে পরী ও ওর কিছু বান্ধবীরা বসেছে।
নৃত্য পরিবেশ করবে পরীর বান্ধবীরা তাই ওরা রেডি হতে চলে গেল। মঞ্চে ওদের ইংরেজি শিক্ষক গান গাওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন তার বন্ধুকে!
তার বন্ধু আর কেউই নয় বরং শাদাফ। বেশ অবাক হয় শাদাফকে দেখে।
~ যেখানে যাই সেখানেই কি এই লোকটার বন্ধু থাকে নাকি আশ্চর্য!
শাদাফ মঞ্চে এসে আগেই পরীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো। এরপর সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
~ গানটি একজনকে ডেডিকেটেড করে গাওয়া। যদিও জানিনা সে শুনবে কি~ না!
পরী উঠে যাওয়া ধরলে দুপাশ থেকে আদিল আর রেখা পরীর হাত জড়িয়ে বসে পড়লো।

~ আলাদিনের দৈত্যের মত তোমরা কোথা থেকে উদয় হলে?
~ বাহ্ রে! আমাদের বন্ধু গান গাইবে আর আমরা থাকবো না? (রেখা)
~ ছোট বোন মনে করে হাত ধরেছি, শাদাফের মত আবার আমাকেও গালি দিয়ো না প্লিজ। (আদিল)
~ সে তোমরা তোমাদের বন্ধুর গান শুনতেই পারো। কিন্তু আমার হাত ছাড়ো।
~ দুজন দুপাশে বসে থেকে তোমার হাত ধরেছি কি ছেড়ে দেওয়ার জন্য? এটাই মনে হলো তোমার?
চুপ করে এখানে বসে থাকো।
পরী কিছু বলতে যাবে, তখনই শাদাফের কন্ঠে গান শুনতে পেল!
“পরীর মুখে মিষ্টি হাসি, দেখতে চমৎকার,
এক নিমিষেই কাইড়া নিলো মনটা যে আমার।

পরীর মুখে মিষ্টি হাসি, দেখতে চমৎকার
এক নিমিষেই কাইড়া নিলো মনটা যে আমার!
তার গালেতে আছে হায়রে ছোট্ট একটা তিল,
পলক পড়ার আগেই বুকে মারলো প্রেমের ঢিল!
নাইরে নাইরে নাইরে আমার বাঁচার উপায় নাই,
চাইরে চাইরে চাইরে আমি পরীটারে চাই,
নাইরে নাইরে নাইরে আমার বাঁচার উপায় নাই
চাইরে চাইরে চাইরে, আমি পরীটারে চাই”!

পুরো গান শেষ হতেই সকলের জোরে হাত তালিতে ঘোর কাটে পরীর।
~ মনে হচ্ছিল যেন একটা ঘোরের মধ্যে আমি! এভাবে যতই ইম্প্রেস করার চেষ্টা করেন। কোনো লাভ নেই মিষ্টার শাদাফ! (মনে মনে)
রেখা পরীর দু’গালে হাত রেখে মুখটা এদিক~ ওদিক করছে।
~ কি করছো রেখা আপু?
~ পরী! একি তোমার ডান গালে তো দেখি সত্যি সত্যিই তিল আছে।
~ তাতে কি?
~ শাদাফ তাহলে গানটা তোমাকেই মিন করে বললো তাই না?
~ এ আবার কেমন কথা রেখা আপু? গান তো গানই। আমাকে মিন করে বলার কি আছে।
~ বুঝবা পরে।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। পরী ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে। পেছন পেছন শাদাফও আসছে।
পরী হাঁটা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। পিছনে ঘুরে কোমরে হাত রেখে বললো,
~ কি সমস্যা আপনার? এভাবে ফলো করছেন কেন?

~ ফলো করছি না। তোমাকে সেফটি দিচ্ছি।
~ সেফটি দিচ্ছেন মানে?
~ মানে, সন্ধ্যা বেলায় একা তুমি বাড়ি যাচ্ছো যদি কেউ পিছু নেয়? মানে বিপদ তো আর বলে আসেনা।
~ আমার বিপদ হলে আপনার কি?
~ আমার কি মানে? আমি তোমাকে ভালোবাসি।
পরী রাগ নিয়ে বললো,
~ এইসব প্রেম~ ট্রেম আমি করতে পারবোনা। বিয়ে করতে পারলে বইলেন।
পরীর কথা শুনে শাদাফ যেমন অবাক হয় তারচেয়েও বেশি খুশি হয়। কথাটা বলে পরী নিজেই মনে মনে অবাক হয়।
~ এটা আমি কি বলে ফেললাম!
~ সিরিয়াসলি পরী? সত্যি বলছো তুমি? আমি আমার পরিবারকে কবে আসতে বলবো বলো?
~ আগে আমি মাকে বলে দেখি, কি বলে তারপর।
~ ওকে আমাকে কিন্তু জানাবে। এখন চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

বাসায় এসে বিছানায় বসে ভাবছে পরী।
~ ছেলেটা বিয়ের কথায় সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল। তবে কি সে আমাকে সত্যিই ভালোবাসে?
পরীর মা ঘরে এসে পরীকে জিজ্ঞেস করে,
~ কি এত ভাবছিস?
~ মা, তুমি এসেছো। বসো তোমাকে কিছু কথা বলবো।
~ কি কথা?
~ আমি তো তোমাকে সব কথাই শেয়ার করি মা।
~ তা তো আমি জানি।
~ জান্নাত আপুর বিয়েতে তার বন্ধু~ বান্ধবীরা এসেছিল না?
~ হ্যাঁ। কেন?
~ জান্নাত আপুর একটা বন্ধু আছে শাদাফ। সে আমাকে ভালোবাসে নাকি। আমি তো না করে দিয়েছিলাম কিন্তু সে কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। তাই ভাবলাম বিয়ের কথা বলি, তখন নিশ্চয় কেটে পড়বে। কিন্তু অবাক করার বিষয় কি জানো মা? সে না সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল।
~ পরী, ওরা হলো হাই সোসাইটির লোকজন। ওদের সাথে কি আমাদের মানায় বল?
~ ও তো আমাদের আর্থিক অবস্থার কথা জানেই। আর এমন তো না যে আমি ওর জন্য পাগল!

~ যদি সবকিছু জেনে ওর পরিবার রাজি হয় আর ছেলেও ভালো হয় তাহলে আমাদের বিয়ে দিতে কোনো সমস্যা নেই।
~ হুম।
~ নাস্তা করবি এখন আয়।
~ তুমি যাও, আমি আসতেছি।
~ তাড়াতাড়ি আসবি।
পরী ফোনটা বের করে শাদাফকে কল দিতে যাবে ঠিক সে সময় শাদাফই ফোন দেয়।
~ হ্যালো পরী
~ হুম
~ কি করছো?
~ বসে আছি। আপনি?
~ শুয়ে আছি।
~ সন্ধ্যার সময় কেউ শোয় নাকি?
~ ক্লান্ত লাগছিল তাই একটু শুয়েছিলাম। যাও তোমার জন্য উঠে বসলাম।
~ মাকে আপনার কথা বলেছি।
~ সত্যি? কি বলেছো?
~ আপনি যা যা বলেছেন সব।
~ মা কি বললো?

~ বললো, আপনার পরিবার রাজি হলে নাকি তারাও রাজি।
~ সত্যি বলছো? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।
~ হু।
~ তার মানে তো তুমিও রাজি পরী?
~ আমার পরিবারের মতেই আমার মত।
~ ভালোবাসো আমায়?
~ এখন ভালোবাসি কি~ না জানিনা। তবে বিয়ে হলে, বিয়ের পর ভালোবাসবো।
~ এখন একবার লাভ ইউ বলো না প্লিজ?
~ না। বিয়ের পরই বলবো।
~ একবার প্লিজ প্লিজ প্লিজ!
~ রাখছি এখন। নাস্তা করবো। আপনিও খেয়ে নিয়েন।
পরী ফোনটা রেখে দেয়। শাদাফ ফোনটা বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে।

পরী আর শাদাফের কথা এভাবে ভালোই চলছিল। কিন্তু শাদাফের মনে হলো, পরীর মনে ভালোবাসার জায়গা করে নিতে পারেনি শাদাফ এখনো। ভালোবাসি বলতে বললে, বিয়ের পর বলবে বলে। শাদাফ লাভ ইউ বললে, পরীর উত্তর হয় এটার উত্তর পরে দিবো। মোট কথা ভালোবাসার কথাগুলো এড়িয়ে যায় পরী। এটা নিয়ে শাদাফের অনেক মন খারাপ হয়। রাগ করে একদিন কথা বলেনি শাদাফ। কিন্তু পরী শাদাফের রাগটা বুঝেনি। পরেরদিন শাদাফই আবার ফোন দেয় পরীকে। দুজনের মধ্যে এতটুকুই কথা হয়,
~ কেমন আছো?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌। আপনি?
~ ভালো। কি করছো?
~ বসে আছি। আপনি?
~ কিছুনা। খাইছো?
~ হুম। আপনি?
~ হুম। কলেজে গিয়েছিলে?
~ হুম। বাড়ির সবাই কেমন আছে?
~ ভালো আছে। আপনার?
~ হুম ভালো।
এভাবে কেটে যায় বেশ কয়েকদিন। পরীর মনে ভালোবাসা কিছুতেই সৃষ্টি করতে পারছেনা শাদাফ। এভাবে থাকতে না পেরে একদিন অভিযোগ করেই ফেললো,
~ এভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়না পরী। আমার প্রতি তোমার কোনো কেয়ার নেই, ভালোবাসা নেই।
~ এক লাফে তো আর গাছে উঠা যায় না তাইনা। অপেক্ষা করুন, ধৈর্য ধরুণ। ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়।
~ আমাকে হারানোর পর ফল পেয়ে লাভ কি?
~ মানে?

~ অবহেলায় আমি আর আমার ভালোবাসা একসময় ঠিকই হারিয়ে যাবো।
~ এত অধৈর্য কেন আপনি? আমাকে ভালোবেসে থাকলে অবশ্যই চেষ্টা করবেন, আমার মনে ভালোবাসা জন্মানোর।
তাছাড়া আমি এটা বিশ্বাস করি যে,
“যে আমার সে আমারই থাকবে। হাজার বিপদ~ আপদ বা যাই হোক না কেন সে আমারই থাকবে”
~ ভালোবাসা দিয়ে সব আগলে রাখা সম্ভব। ভালোবাসা ছাড়া কিছুই ধরে রাখতে পারবে না তুমি।
~ তার মানে কি বলতে চাইছেন? আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছেন?
~ আমি না তুমি চাচ্ছো এটা।
~ আমাকে একটু সময় দিন। আপনি এভাবে আমার ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করে কোনো লাভ হবেনা। তাছাড়া বিয়ের পরও ভালোবাসা যায়।
~ আমার ইচ্ছে, আমি ভালোবেসে বউ আনবো।
~ আপনার ইচ্ছেই পূরণ হবে। শুধু আমাকে একটু সময় দিন।
~ পরী?
~ কি?
~ একবার বলো না ভালোবাসি?
~ পরে বলবো।
~ প্লিজ। আই লাভ ইউ। উত্তর দাও প্লিজ।
~ (চুপ)
~ শুধু একবার বলো প্লিজ একবার
~ লাভ ইউ টু!
পরীর মুখে “লাভ ইউ টু” শুনে যেন এতদিনে স্বস্তি পেল শাদাফ!

পর্ব ৫

পরীর মুখে “লাভ ইউ টু” শুনে যেন এতদিনে স্বস্তি পেল শাদাফ!
পরী পড়তে বসেছিল। সেসময়ে ওর মেজ খালামনি রুমে আসলো।
~ কি করিস পাখি?
~ দেখো না পড়তেছি।
~ হুম দেখলাম তো। নতুন নতুন প্রেমে পড়ছিস তাই দেখতে আসলাম বই পড়িস নাকি মোবাইল পড়িস।
~ মাঝে মাঝে আমি অবাক হই, তুমি আমার খালামনি নাকি বান্ধবী। যাক এটা বাদ দাও। আমি নতুন নতুন প্রেমে পড়েছি মানে?
~ বাবালে! কিচ্ছু জানেনা আমার পিচ্চি মেয়েটা।
~ সিরিয়াসলি আমি বুঝতেছিনা, কি বলছো তুমি!
~ শাদাফ কে হুম?
~ কেন? জান্নাত আপুর বন্ধু।
~ আর তোর?
~ আমার কি?
~ তোর কিছু হয়না?
~ হয়না। তবে হতে পারে।
~ কই ছবি দেখা তো দেখি।
~ ওয়েট।
পরী শাদাফের কিছু ছবি বের করে দিলো। ওর খালামনি বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
~ নাহ্! ছেলে মাশআল্লাহ্। লম্বা আর সুন্দরও আছে।
~ হু।
~ আমাদের সাথে দেখা করাবি না?
~ করাবো। কালকে ও কুমিল্লা চলে যাচ্ছে। কুমিল্লা থেকে আসুক তারপর দেখাবো।
~ কুমিল্লা কেন যাবে?
~ ওদের বাড়ি তো কুমিল্লাতে।
~ ওহ।

পরেরদিন শাদাফ পরীর সাথে দেখা করে কুমিল্লা চলে যায়।
বাড়িতে পৌঁছেই আগে মাকে জড়িয়ে ধরে।
~ কেমন আছো মা?
~ ভালো আছি বাবা। তুই কেমন আছিস?
~ হুম অনেক ভালো আছি এখন।
~ যা ফ্রেশ হয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি।
~ আচ্ছা।
শাদাফ ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসেছে। পাশে শাদাফের বাবা আর মা বসে আছে। শাদাফের মা বললো,
~ তা বিয়েটিয়ে কবে করবি?
~ এত তাড়াতাড়ি কিসের বিয়ে মা? সময় হোক করবো।
~ আমরা বেঁচে থাকতেই বিয়েটা কর। দেখে মরি।
~ কিসব আজেবাজে কথা বলছো মা? তোমাদের নাতিপুতি হবে তাদের সাথে খেলবে। এখনো কতকিছু বাকি।
শাদাফের বাবা এবার বললো,
~ সে তুমি বিয়ে যেদিন খুশি করো কিন্তু ব্যবসার বিষয়ে কিছু ভেবেছো?
~ হুম। ৩ মাস পর কানাডায় যাবো আমি আর রওশান। ২বছরের মত থাকবো। তারপর বিডিতে এসে দুজনে একত্রে বিজনেস করবো।
~ আর এই তিন মাস?
~ এই তিন মাস ঢাকাতেই একটা চাকরী করবো। ভাবিরা আছে তারা তোমাদের দেখাশোনা করবে।
~ এখানে থেকে কাজ করলে হয়না? (শাদাফের মা)
~ প্লিজ মা। ঢাকায় যেতে বারণ করো না।
~ তোর যেটা ভালো মনে হয়।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিকেলে একটু ঘুমিয়ে নেয় শাদাফ। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠার পর ফোন দেয় পরীকে।
~ আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি। আপনি?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌। কি করছো?
~ নামাজ পড়লাম। আপনি?
~ ঘুম থেকে উঠলাম।
~ এই আপনি কি নামাজ পড়েন না?
~ মাঝে মাঝে পড়ি তো!
~ আজ কয় ওয়াক্ত পড়েছেন?
শাদাফ কন্ঠটা নিচু করে বলে,
~ এক ওয়াক্তও না।
~ এরকম করলে চলবে না। নামাজ পড়ার অভ্যাস করতে হবে।
~ আচ্ছা পড়বো।
~ সত্যি তো?
~ একদম।
~ ধন্যবাদ। আপনার বাবা~ মা কেমন আছে?
~ ভালো আছে। তোমার?

~ হুম ভালো। কাল খালামনিকে আপনার ছবি দেখিয়েছি।
~ কি বললো?
~ বললো সুন্দর আছে। আর দুই পরিবার রাজি হলে কারোর’ই কোনো সমস্যা নেই।
~ ইনশাআল্লাহ্‌ সকলেই রাজি হবে।
~ তাই যেন হয়।
~ নাস্তা করেছো তুমি?
~ না, আপনি?
~ না। আচ্ছা তুমি আমাকে এরকম আপনি আপনি করে বলো কেন?
~ তাহলে কি বলবো?
~ তুমি বলবা।
~ পারবোনা।
~ কেন?
~ ধুর। এরকম হুটহাট করে তুমি ডাকা যায় নাকি।
~ চেষ্টা তো করবে।
~ হু।
~ তুমি বলে ডাকো।
~ কচু। রাখি এখন। পড়তে বসতে হবে।

পরীর বাবার নতুন অফিস বাড়ি থেকে অনেক দূরে হয়ে যায়। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের বাড়ি পাল্টাতে হবে। এক মাস আগেই, পরীর বাবা~ মা জান্নাতের বাবা~ মাকে বিষয়টা জানায়। মন খারাপ হলেও কারোরই কিছু করার ছিল না।
১ তারিখঃ
পরী’রা বাড়ি চেঞ্জ করে নতুন বাড়িতে আসে। নতুন বাসা, নতুন এলাকা, নতুন প্রতিবেশী। পরীর অনেক বেশিই আনইজি লাগছে। কিন্তু কিছু তো করার নেই।
পরী প্রাইভেটে যাওয়ার সময় খেয়াল করলো কিছু ছেলে একটু জোড়েসোড়েই বলছে,
~ মনে হয় নাইনে পড়ে।
পরী কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে এটা ভেবে যে হয়তো অন্য কাউকে বলছে।
কিন্তু না পরপর তিনদিনই এই কথা শুনছে পরী এবং প্রতিবারই ওর সামনে বলছে। পরী নিশ্চিত হলো যে কথাটা ওকেই বলছে। পরী কিছু না বলে দাঁতে দাঁত চেপে প্রাইভেটে যায়।
কলেজে যাওয়ার সময় ছেলেগুলোকে দেখেনা পরী। বিকেলে প্রাইভেটে যাওয়া আর আসার সময়ই দেখে ক্রিকেট খেলতে।
পরীদের প্রাইভেট ব্যাচে একটা নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছে যার বাড়ি পরীদের বাড়ির পাশেই। মেয়েটার নাম শোভা। পরী এখন শোভার সাথেই যাতায়াত করে।

একদিন প্রাইভেট থেকে ফেরার পথে শাদাফ ফোন দেয়। ফোন রিসিভ করে কথা বলতে থাকে পরী।
~ কি করছে আমার পরী?
~ হাঁটছে।
~ হাঁটছে মানে?
~ হাঁটছে মানে হাঁটছে।
~ কোথায় যাচ্ছো?
~ প্রাইভেট থেকে বাড়িতে যাচ্ছি।
~ নতুন এলাকা কেমন লাগছে?
~ খুব বোরিং।
~ কেন?
~ কাউকে চিনিনা কিছুনা।
~ এত চিনতে হবেনা কাউকে। কোনো ছেলে আবার ডিস্টার্ব করে না তো?
~ নাহ্।
~ আচ্ছা শুনো একটা কথা।
~ বলেন

শাদাফ কথা বলার আগেই একটা বল এসে পরে পরীর পাশে। একটুর জন্য লাগেনি পরীর গায়ে।
শাদাফকে কিছু বলতে না দিয়ে পরী বললো,
~ আমি বাড়িতে গিয়ে আপনাকে ফোন দিচ্ছি।
~ কেন? কি হয়েছে?
~ কিছুনা। পরে ফোন দিবো রাখছি।
পরী ফোন দিয়ে ছেলেগুলোর দিকে রাগান্বিত চোখে তাকায়। এই এতদিনে ছেলেগুলোর দিকে তাকায় পরী। রাগের সাথে সাথে অবাকও হয় পরী। পরী ভেবেছিল ছেলেগুলো ওর সিনিয়র হবে। কিন্তু ছেলেগুলো পরীর চেয়েও ছোট।
ছোট মানুষ বলে পরী কিছু না বলে শোভার সাথে বাড়িতে চলে যায়।
ছেলেগুলোর ফাইজলামি দিনদিন বেড়েই চলছে। তার মধ্যে একটা ছেলেরই আগ্রহ বেশি পরীর প্রতি। পরীর রাগ দিনকে দিন বাড়তেই লাগলো। পরী শোভাকে নিয়ে ঐ ছেলেটার থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়ালো।
~ এই ছেলে এদিকে আসো।
~ আমি?
~ হ্যাঁ তুমিই।
ছেলেটা এসে পরীর সামনে দাঁড়ায়।

~ কিছু বলবেন?
~ কিছু বলার জন্যই তো ডেকেছি। আমাকে কি তোমার পিচ্চি মনে হয়?
ছেলেটা পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে পরীকে।
~ দেখে তো পিচ্চিই মনে হয়।
~ নাম কি?
~ শিহাব।
~ কিসে পড়ো?
~ এইটে।
~ আমি কিসে পড়ি জানো?
~ কিসে আর পড়বেন। সিক্স, সেভেনে!
~ ইডিয়ট! আমি কলেজে পড়ি।
পরীর কথা শুনে শিহাব হাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
~ আজিব! এভাবে হাসির কি হলো?

~ পিচ্চি মেয়ে নাকি কলেজে পড়ে( হাসতে হাসতে)
~ আচ্ছা বেশ, আমি যদি প্রমাণ করতে পারি আমি কলেজে পড়ি। তাহলে?
~ তাহলে আপনি যা বলবেন তাই শুনবো আমি।
~ আমি যদি প্রমাণ করতে পারি যে, আমি কলেজে পড়ি তাহলে তুমি ও তোমার বন্ধুরা আমাকে আপু বলে ডাকবে।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।
পরী ব্যাগ থেকে আইসিটি বইটা বের করে শিহাবের হাতে দেয় আর বলে,
~ আমার নাম পরী। আমি পাশের কলেজটাতেই পড়ি। এরপরও যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে কলেজে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে পরী কে? আশা করি সব উত্তর পেয়ে যাবে।
শিহাব বইটা এদিক~ ওদিক করে দেখছে। বইতে পরী নামটা দেখতেছে। শিহাবের মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেছে। পরী বললো,
~ দেখেছো বই?
~ হুম।
~ কি বই এটা?
~ আইসিটি
~ কি নাম লেখা?
~ পরী।
~ কিসে পড়ি তাহলে আমি?
~ কলেজে।
~ এবার বলো, এখন থেকে আমি তোমার কি হই?
শিহাব মাথাটা নিচু করে বললো,

~ আপু!
পরী শিহাবের হাত থেকে বইটা নিয়ে বললো,
~ গুড বয়। আসি এখন।
পরীর এমন চঞ্চলতা আর শায়েস্তা করা দেখে অবাক হয়ে যায় শোভা। পরক্ষণে পরীর হাসি দেখে নিজেও হেসে দেয় শোভা।
পরী ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে শাদাফকে ফোন দেয়। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া সবকথাগুলো শাদাফকে বলছে পরী। ফোনের ওপাশে শাদাফ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে আর পরী তো হাসতেছে তখন থেকেই।
কিন্তু কেউ একজন পরীর হাসি দেখে থমকে যায়। দূর থেকে আটকে যায় পরীর হাসিতে!
শাদাফ হাসতে হাসতেই বলে,
~ পরী তুমি আসলেই জিনিয়াস। পিচ্চি ছেলেটাকে কিভাবেই না শায়েস্তা করলে।
~ হিহিহিহি। বেশি বাড় বেড়ে গেছিলো। ডানা ছেঁটে দিলাম।
~ আচ্ছা শুনো একটা গুড নিউজ আছে।
~ কি?
~ আমি আবার ঢাকায় আসতেছি।
~ সত্যি?
~ হুম। ঢাকায় জব নিবো।
~ তাহলে বাবা~ মাকে কে দেখবে?
~ ভাই ভাবি আছে ওরা দেখবে।
~ কবে আসবেন?
~ এই সপ্তাহ্ পর আসবো।
~ আচ্ছা অপেক্ষায় রইলাম।
~ ওকে রাখছি এখন। রাতে ফোন দিবো।
~ আল্লাহ্ হাফেজ।
~ আল্লাহ্ হাফেজ।

ফোন কেটে, ব্যাগে ফোন রাখে পরী। মাথা তুলে সামনে তাকাতেই দেখে একটা ছেলে অপলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আচমকা দেখায় ভয় পেয়ে যায় পরী। পরীর থেকে মাত্র এক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে তাকিয়ে আছে যে চোখের পলকই পড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যায় পরী। বিরক্তিমাখা মুখে পরী কিছু বলতে যাবে তার আগেই ছেলেটা বলে,
~ আবার একটু হাসেন তো!
একজন অচেনা ব্যক্তির মুখে প্রথম দেখায় প্রথম কথায় এমন কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় পরী।
~ কি হলো? হাসেন না একটু!
~ স্যরি? কে আপনি?
~ আমি সুলতান!

পর্ব ৬

পরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
~ সে আপনি সুলতান হোন বা পাতলা খান সেটা বিষয় না। কথা হচ্ছে এরকম পথ আগলে দাঁড়িয়েছেন কেন?
~ এই না, না ঐ পিচ্চিগুলোর মত আমি আপনাকে বিরক্ত করতে আসিনি।
~ তো?

~ আপনার কোনো সাহায্য লাগলে আমাকে বলবেন।
~ আপনার সাহায্য আমার কেন লাগবে?
~ না মানে, আমিও তো এই এলাকারই। আর আপনাকে দেখে মনে হলো আপনি এলাকাতে নতুন। তাই বললাম আরকি!
~ নতুন তাতে কি হইছে? আমাকে কি কেউ খেয়ে ফেলবে? হাত পা ভেঙ্গে ঘরে বসিয়ে দিবো তাকে।
~ এত শক্তি?

~ হুহ! যাই হোক, আর কিছু বলবেন?
~ তেমন কিছু বলার নেই। তবে নামটা জানতে পারি?
~ পরী।
~ অনেক সুন্দর নাম।
~ ধন্যবাদ। আসি।

পরী বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। কিছু খেয়ে যেই ঘুমাতে যাবে তখনই দরজায় কে যেন কড়া নাড়ে। দরজা চাপানো ছিল। পরী গিয়ে দরজা খুলে দেখে সেই পিচ্চি ছেলে শিহাব।
~ তুমি এখানে?
~ আসসালামু আলাইকুম আপু।

~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। বাড়িতে আসছো কেন?
~ এই বাড়িতে আমার এক বন্ধু থাকে। ওর কাছেই এসেছিলাম তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু দেখা করে যাই।
~ আপু ডাকতে বলছি বলে কি সময় অসময়ে বাড়িতে আসতে হবে?
~ আপু আপনি কি রাগ করলেন?

~ না! তুমি আসছো বলে এখন আমার খুশিতে ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে।
~ রাগ করছেন কেন আপু?
~ ঐ ছেলে চুপ! ফাইজলামি করস আমার সাথে? সিনিয়র আপুকে লাইন মারিস? আর যদি কখনো দেখছি তোরে আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে তাহলে হাত~ পা ভেঙ্গে দিবো বলে দিলাম।
~ আ

পরী আর কিছু বলতে না দিয়ে মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেয়।
~ হায় আল্লাহ্! এটা কোন এলাকায় এসে পড়লাম যেখানে পিচ্চিপুচ্চি ছেলেপুলে সিনিয়র আপুকে লাইন মারে!
নিজে নিজেই রাগে গজগজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে পরী।

কিছুক্ষণ পরই পরীর মা আসে রুমে। সে একটু পাশের বাড়ি গিয়েছিল।
~ পরী এই পরী।
~ হুম(ঘুমঘুম কন্ঠে)
~ এই ভর সন্ধ্যায় কেউ ঘুমায়? উঠ তাড়াতাড়ি।
~ ধুর কিচ্ছু হবেনা।

~ বললেই হলো কিছু হবেনা? উঠ বলছি তাড়াতাড়ি।
মায়ের সাথে জোড়াজুড়িতে না পেরে উঠে বসে পরী। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে। দেখতে পায় শাদাফ একটিভ। পরী নক দেওয়ার আগেই শাদাফ নক দেয়।
~ আমার পরী’টা কি করে?
~ এরকম ঢং করে কথা বলবেন না তো!
~ এখানে ঢং কই করলাম আবার?

~ আমার পরী আমার পরী কি হ্যাঁ?
~ তাহলে কি তুমি অন্য কারো?
~ না আপনারই।
~ তাহলে?
~ কিছুনা।
~ মন খারাপ?

~ না, মেজাজ খারাপ।
~ কেন?
~ ঘুমিয়েছিলাম একটু। আম্মু উঠিয়ে দিলো।
~ তুমি না বলতে সন্ধ্যায় ঘুমানো ভালো না? তাহলে তুমি কেন ঘুমালে সন্ধ্যায়?
~ হু বলতাম। কিন্তু ঘুম আসলে কি করবো?
~ আচ্ছা আজানের পর ঘুমাইয়ো।
~ হুম।
~ কি করছো এখন?

~ বসে আছি, আপনি?
~ আমিও। আচ্ছা এখনো কি আমাকে তুমি আপনি আপনিই বলবে?
~ বলেছি তো তুমি বলার চেষ্টা করবো।
~ কিন্তু সেই চেষ্টা টা কখন করলে শুনি?
~ ইয়ে মানে!

~ ইয়ে টিয়ে বাদ দাও আর প্রাকটিস করা শুরু করো।
~ আচ্ছা করবো।
~ করবো বললে হবে না, এখনই বলতে হবে।
~ আমার কেমন কেমন জানি লাগে।
~ কেমন লাগে?
~ লজ্জা লাগে আমার। (মুখ ঢাকার ইমুজি দিয়ে)
~ ওরে আমার লজ্জাবতী বউগো! (কিসি ইমুজি দিয়ে)
~ হুহ! (ভেঙ্গচি ইমুজি দিয়ে)
~ বলো না!

~ কি বলবো?
~ তুমি করে।
~ আচ্ছা তুমি।
~ তুমি কি?
~ তুমি তুমিই!
~ তুমি করে কিছু বলতে বলছি।

~ কেমন আছো?
~ এইতো বলে ফেলছো। ভালো আছি তুমি?
~ আমিও। কি করেন?
~ আবার আপনি?
~ ধুর বাবা! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
~ হাহাহা আচ্ছা।

~ তো আপনি ঢাকায় কবে আসবেন?
~ কেন, আমাকে না দেখে বুঝি থাকতে পারছো না?
~ হুহ মোটেও এমন কিছুনা। এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম।
~ বুঝি বুঝি!
~ কচু বুঝেন।
~ কবে আসবো সেটা বলবো না।

~ কেন কেন?
~ সারপ্রাইজ দিবো তোমাকে এসে।
~ আচ্ছা অপেক্ষায় রইলাম।
~ কতদিন অপেক্ষা করতে পারবে আমার জন্য?
~ যতদিন না আপনি আসেন।

~ যদি দূরে কোথাও যাই দীর্ঘসময়ের জন্য। তাহলে?
~ তাহলে কি?
~ তাহলে অপেক্ষা করবে নাকি আমায় ছেড়ে চলে যাবে?

~ অবশ্যই অপেক্ষা করবো।
~ প্লিজ আমাকে কখনো ছেড়ে যেয়ো না পরী। অনেক অনেক বেশিই ভালোবাসি তোমাকে। আমাকে ছেড়ে গেলে মানতে পারবোনা আমি।
~ বললাম তো কখনোই ছেড়ে যাবো না। নিশ্চিন্তে থাকেন।
~ ভাবিকে তোমার কথা বলেছি।

~ কি বললেন?
~ তোমাকে ভালোবাসি তা। ছবি দিয়ো তো কিছু বাবা~ মাকে দেখাবো।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। এখন যাই? পড়তে বসতে হবে।
~ আচ্ছা।
~ আল্লাহ্ হাফেজ।
~ পরী?
~ কি?
~ ভালোবাসি!
~ আমিও।
~ আমিও কি?
~ ভালোবাসি।

পরেরদিন সকালে পরী রেডি হয়ে কলেজে চলে যায়। কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখে বাড়ির সামনে মাঠে অনেক ভিড়। কি হয়েছে দেখার জন্য ভির, ঢেলে একটু সামনে আগায়। যা ঘটছে তা দেখে মাথা ঘুরে যাওয়ার মত অবস্থা!

~ আল্লাহ্! কাল এই ছেলের সাথে আমি চটাং চটাং কথা বললাম, আর এই ছেলে এভাবে অন্য একজনকে পিটাচ্ছে। কিন্তু সু্লতান মারছে কেন ছেলেটাকে! আমি কি গিয়ে আটকাবো? না, বাবা পরে যদি আমাকেও মারে! ধুর, আমি একটা মেয়ে আমাকে মারা কি এত সহজ নাকি!

মনে মনে কথাগুলো বলেই পরী সুলতানের কাছে যায়। সুলতান ছেলেটাকে যেই আরেকটা থাপ্পড় দিতে যাবে, ওমনি গিয়ে পরী সুলতানের হাত ধরে। সুলতান পিছনে ঘুরে পরীকে দেখে ভড়কে যায়।
~ মাস্তানি করা হচ্ছে এখানে?
~ আমার হাত ছাড়ুন।

~ আপনার হাত সারাজীবন ধরে থাকবো বলে ধরিনি ওকে? আমি তো জাস্ট হাত ধরে থামালাম।
~ থামাবেন কেন আপনি?

~ এভাবে ছেলেটাকে মারছেন কেন আপনি?
~ আপনি জানেন ও কি করেছে?
~ না জানিনা।
~ ও আমার বোনকে টিজ করেছে। বাজে বাজে কথা বলেছে ও আমার বোনকে। ওর সাহস হয় কি করে আমার বোনকে ইভটিজিং করার!

পরী বিষয়টা বুঝতে পারে। বোনকে কেউ খারাপ কথা বললে সব ভাইয়েরই এভাবে রাগ করাটা স্বাভাবিক। তবুও বিষয়টা এড়ানোর জন্য বলে,
~ দেখে তো মনে হচ্ছে না কম মেরেছেন। ছেলেটাকে দিয়ে আপনার বোনের কাছে মাফ চাওয়ান সবার সামনে তারপর ছেড়ে দেন। এভাবে এত লোকের সামনে সিনক্রিয়েট করা মোটেও ভালো কাজ না।
কথাগুলো বলে পরী বাড়িতে চলে যায়।

বিকালে প্রাইভেট না থাকায় ছাদে যায় পরী। যদিও ছাদ পরীর অনেক প্রিয় একটা জায়গা তবুও এখানে মন টিকছে না পরীর। সবাই সবার মত ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজেকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছেনা পরী।

পাশের ছাদে তাকাতেই দেখে সুলতান ছাদ থেকে পরীকে, দেখছে।
~ এই ছেলেটা এভাবে কেন দেখছে আমাকে! রাগ দেখাতেও ভয় করে। মাস্তান ছেলে যদি আবার কিছু করে বসে।
ছিঃ পরী! তুই ভয় পাচ্ছিস তুই? না তোকে ভয় পেলে চলবে না।

মনে মনে কথাগুলো বলে পরী ছাদের রেলিংয়ের একদম কাছে ঘেষে যায়।
~ এই এই এত কাছে আসছেন কেন? ছাদ থেকে পরে যাবেন তো!
~ আপনি আমার কথা বাদ দেন। আগে বলেন এভাবে চোরের মত কেন দেখছেন আমায়?
~ আপনি চাইলে এরপর থেকে সামনে এসেই দেখবো।
~ মানে কি এসবে?

~ তেমন কিছুইনা। আপনার ফোন নাম্বারটা দেওয়া যাবে?
~ একজন অপরিচিত লোককে আমার ফোন নাম্বার কেন দিবো?
~ আপনি না দিলেও সমস্যা নেই। আপনার ফোন নাম্বার পেতে এই সুলতানের খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

~ আপনার সমস্যা কি বলুন তো?
~ আপনার হাসি।
~ মানে?
~ আপনার হাসিতে ফেঁসে গেছি আমি।
~ এটা আবার কেমন কথা!

~ বুঝতে পারছেন না তো! ওকে সোজা কথা সোজা ভাবেই বলি।
প্রথম দেখাতেই আপনার হাসির ওপর ফিদা হয়েছি। তারপর এখন আবার এত সুন্দর লম্বা চুল! আমার মন বলছে যে আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
~ পাগল আপনি? কয়দিন ধরে আমাকে দেখেছেন বা চিনেন? আর এর মধ্যেই ভালোবেসে ফেললেন? হাহাহা।

~ ভালোবাসা কি বলেকয়ে হয় পরী?
~ সেটা আমার জানার বিষয় না। কিন্তু আপনার যেটা জানার বিষয় তা হচ্ছে, আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।
~ আমি এতটাও বোকা না পরী। আমি আপনার কলেজে সব খোঁজখবরই নিয়েছি।
~ বাহ্! এতদূর চলে গেলেন? কিন্তু একটু মিস্টেক হয়ে গেল যে আপনার মিস্টার সুলতান।
~ মানে?

~ আপনাকে কে বললো যে আমি কলেজে রিলেশন করি? আমি যাকে ভালোবাসি তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে আর সে এখানে থাকে না।
~ এসব নাটক করে কোনো লাভ হবে না। আমি আপনার পিছু ছাড়ছি না।
~ আমি কোনো নাটক করছিনা। যেটা সত্যি সেটাই বলছি।

~ তাই? তা কে সেই ব্যক্তি শুনি? নাম কি? কি করে? কোথায় থাকে?
~ এতকিছু জেনে আপনি কি করবেন?
~ তার শরীর থেকে হাত~ পা গুলো আলাদা করে দিবো।

~ চুপ! মুখ সামলে কথা বলেন। সব জায়গায় নিজের মাস্তানগিরি ফলাতে আসবেন না একদম।
~ আপনার আর আমার মাঝে আমি কাউকেই এলাও করবো না মিস পরী।
~ ভুল বললেন। আপনার আর আমার মাঝে নয় বরং আপনিই আমাদের মাঝে এসে পড়েছেন। আর আমিও আপনাকে এলাও করবোনা আমাদের মাঝে।
পরী হহনহন করে ছাদ থেকে নেমে গেল।

~ নাহ্! এই ছেলের এমন বাড়াবাড়ি মানা যাচ্ছে না। এই আপদটা যে কই থেকে উদয় হলো।
শাদাফের ফোন এলো। ফোনটা রিসিভ করলো পরী। কিন্তু পরীর কণ্ঠ বেশ বিরক্তিমাখা। কি হয়েছে জানতে চাইলে পরী উত্তরে বলে কিছুইনা। কারণ এটা নিয়ে অযথাই চিন্তা করবে শাদাফ। কিন্তু শাদাফও নাছোরবান্দা।

~ পরী সত্যি করে বলো কি হয়েছে? প্লিজ কিছু লুকাবে না আমার কাছে। আমরা দুজনের কেউই কখনো কারো কাছে কিছু লুকাবো না এটাই কিন্তু কথা ছিল।
শাদাফের সাথে আর কথায় না পেরে পরী সুলতানের কথা সব বলে শাদাফকে। শাদাফ বেশকিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
~ প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।

~ এটা ছাড়া কি আপনার মুখে আর কোনো কথা নেই? কখন বললাম আমি আপনাকে ছেড়ে যাবো?
~ ঐ ছেলে তো গুন্ডা। যদি কিছু করে বসে। আমার ভয় করছে পরী। যদি তোমাকে জোর করে বিয়ে করে ফেলে!
~ মগের মুল্লুক নাকি? অযথাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এমন কিছুই হবে না।
~ তুমি তো বিনাবাক্যে বলে ফেললে কিছু হবেনা। কিন্তু আমার খুব ভয় করছে।
~ মেয়েদের মত এত ভয় পান কেন বলেন তো?

~ তুমি কি বুঝবা? যে বেশি ভালোবাসে তার হারানোর ভয়টাও বেশিই থাকে।
~ হু সব ভালো আপনিই বাসেন।

~ আমিই তো বাসি। তুমি একটু সাবধানে থেকো প্লিজ।
~ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। বাড়ির সবাই কেমন আছে?
~ ভালো তোমার?
~ ভালো। বাবা~ মাকে ছবি দেখিয়েছেন?
~ হুম।
~ কি বললো তারা?

~ বললো আমার পছন্দই তাদের পছন্দ।
দুই বছর পরই তোমাকে বউ করে আমার বাড়িতে নিয়ে আসবো।
~ আমি কিন্তু বিয়ের পরও পোড়াশোনা করবো।
~ বিয়ের পর আবার পড়াশোনা করার কি দরকার?

~ এরকম ব্যাকডেটেট কথাবার্তা বলছেন কেন আপনি? বিয়ের পর কি মেয়েরা পড়াশোনা করে না?
~ করে। কিন্তু আমার মতে না করাই ভালো। বিয়ে হবে, ঘুরবো ফিরবো, সংসার করবে। বাচ্চা হলে বাচ্চা সামলাবে! ব্যাস বিন্দাস লাইফ।
~ আপনার কি মনে হয় যে আমি ঠিক এগুলাই করবো? তাহলে আপনি ভুল। আমি পড়াশোনা করবোই।

~ আর যদি করতে না দেই তাহলে?
~ তাহলে এখনই বলে দেন। অযথাই এতদূর সম্পর্ক আগানোর কোনো মানে হয়না।
দেখেন, পড়াশোনাটা হলো আমার স্বপ্ন। আর আমি যাকে ভালোবাসি সেই যদি আমার স্বপ্নপূরণে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে কিছুতেই মানতে পারবো না আমি। এত কষ্টের মধ্যেও আমার বাবা~ মা আমার পড়াশোনা বন্ধ করেনি।

~ বেশ! তোমার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব আমি নিলাম।
~ সত্যি?
~ হ্যাঁ। কারণ তোমাকে আমি ছাড়তে পারবোনা। অনেক বেশিই ভালোবাসি তোমাকে।

পরেরদিনঃ
আজকে কলেজ বন্ধ। তাই পরী সকালে উঠে নামাজ পরে ছাদে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। তারপর ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ে।
সকালঃ১০টা ৪৫মিনিট
মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে পরীর।

~ ড্রয়িং রুমে একটা মেয়ে বসে আছে। তোর সাথে দেখা করতে এসেছে।
~ আমার সাথে! মনে হয় শোভা আসছে। তুমি নাস্তা দাও আমি আসছি।
চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে যায় পরী। কিন্তু মেয়েটা শোভা নয়। আর চিনেও না পরী মেয়েটাকে। মেয়েটা আগ বাড়িয়ে বলে,
~ হ্যালো।
~ হাই

~ তুমিই পরী?
~ হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কে? চিনলাম না তো!
~ আমার পরিচয় পরে দিচ্ছি। আপাতত নামটুকু জানো। আমি রিয়া।
~ আমাকে চিনো?
~ তেমনভাবে না। আমার হাতে না এখন বেশি সময় নেই। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি।

~ কি কথা?
~ শাদাফ তোমার কি হয়?
কথাটা শুনে পরীর বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। এক অজানা ভয় বুকের ভেতর কড়া নাড়ছে। পরী উত্তর না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করে,
~ শাদাফকে তুমি চিনো কি করে?

পর্ব ৭

~ শাদাফ তোমার কি হয়?
কথাটা শুনে পরীর বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। এক অজানা ভয় বুকের ভেতর কড়া নাড়ছে। পরী উত্তর না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করে,
~ শাদাফকে তুমি চিনো কি করে?

~ আগে তুমি বলো তারপর আমি বলছি।
~ শাদাফের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আমরা দুজনই দুজনকে ভালোবাসি।
~ ওহ।
~ বললে না তো তুমি শাদাফকে কি করে চিনো?
~ তুমি রেখা আপুকে তো চিনো?
~ হ্যাঁ। শাদাফের বন্ধু।

~ আমি রেখা আপুর ছোট বোন রিয়া।
~ ওহ আচ্ছা! রেখা আপু বলেছিল যে তার আমার মত ছোট একটা বোন আছে। গ্রামে থাকে।
~ হুম। কালই এসেছি গ্রাম থেকে।

~ এই নাও কফি খাও (মা)
~ না আন্টি আমি কিছু খাবো না।
~ তা বললে তো চলবে না। তুমি রেখা আপুর বোন। কিছু না খেলে আমার খারাপ লাগবে।
~ আচ্ছা ঠিক আছে খাচ্ছি।
~ থ্যাংকস

~ তো তোমাদের বিয়ে কবে?
~ দুই বছর পর। একটা কথা বলো তো, তুমি আমাকে কি করে চিনলে?
~ রওশান ভাইয়া বললো শাদাফ নাকি তোমাকে ভালোবাসে। তাই তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হলো।
কফি খাওয়া শেষে রিয়া উঠে দাঁড়ালো। মুখটা মলিন কিন্তু মুখে জোর করে হাসি টেনে বললো,
~ আজ আসি পরী। সময় করে একদিন অবশ্যই আমাদের বাড়িতে এসো। ভালো থেকো আর তোমাদের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

পরী কিছু না বলে প্রতিউত্তরে হাসলো। রিয়া গেট অবদি যেতেই পরী পেছন থেকে বললো,
~ তোমার সাথে শাদাফের রিলেশন ছিল তাই না?

কথাটা শুনে রিয়া পরীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। পরী রিয়ার সামনে আগাতে আগাতে বললো,
~ যাকে সোজা বাংলায় বলে প্রাক্তন। আর যুগের সাথে এটিটিউড নিয়ে বলতে গেলে এক্স!
~ তোমাকে এসব কে বললো?
~ কোন সবের কথা বলছো বলো তো?
~ আমাদের রিলেশন ছিল এটা!

পরী মুচকি হেসে বললো,
~ তুমি বড্ড বোকা রিয়া। আমি কি বাচ্চা? কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এসব বুঝার হিতাহিত জ্ঞান বিধাতা আমাকে দিয়েছেন।
আমি সত্যিই জানতাম না তোমাদের রিলেশন ছিল! জানার প্রয়োজনবোধও করছি না।
কিন্তু মিথ্যা বলে কোনো লাভ হলো না। তুমি রেখা আপুর বোন হিসেবে আমার বাসায় আসতেই পারো তবে সেটা অবশ্যই রেখা আপুর সাথে। কেন বলো তো? কারণটা হলো আমাকে তোমার একদমই চেনার কথা না।

আবার কি যেন বলেছিলে? রওশান ভাইয়ার কাছে শুনেছো যে শাদাফ কাউকে ভালোবাসে বা রিলেশনে আছে। আর তুমি কি করলে? সত্যিটা যাচাই করার জন্য এড্রেস নিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে আসলে। আচ্ছা রিয়া একটা কথা বলো তো, রওশান ভাইয়া এমনি এমনি নিজে থেকে কেন বলবে যে শাদাফ রিলেশনে আছে? নিশ্চয় তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে? আর তাছাড়া শাদাফ রিলেশন করুক বা না করুক। তাতে তোমার কি? সত্য যাচাই করার এত আগ্রহ কিসের তোমার?
রিয়া কিছু বলছে না চুপ করে আছে।

পরী আবার বললো,
~ এতকিছু বললাম, নিশ্চয় আমি কোনো ভুল বলিনি?
~ বেশি কিছু বলবো না। শুধু বলবো তোমার ধারণা আর বলা কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। অনেক ভালোবাসি শাদাফকে। অনেক বেশি!

রিয়া চলে যায়। পরী ওর যাওয়ার পথে চেয়ে রয়। চলে যাওয়ার আগে যে শেষ কথাগুলো বললো তা যেন পরীর বুকে তীরের মধ্যে বিধলো।

~ তবে কি শাদাফ আমাকে ঠকাচ্ছে! নাহ্ এই প্রশ্নের উত্তর তো শাদাফকে দিতেই হবে।

পরী দৌড়ে রুমে যায়। শাদাফকে ৩/৪ বার ফোন দেয় কিন্তু রিসিভ করে না। ৬বারের বেলায় ফোন রিসিভ করে ঘুমঘুম কন্ঠে বলে,
~ হ্যালো
~ ঘুমাচ্ছেন এখনো?

~ হুম।
~ ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে ফোন দেন।
~ বলো এখন সমস্যা নেই।
~ আমি ফ্রেশ হয়ে এসে ফোন দিতে বলছি।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।
ফোন রাখার পর হাজারো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।

~ এই রিয়ার সাথে শাদাফের কি সম্পর্ক ছিল! আর শাদাফ কেনোই বা বললো না আমাকে রিয়ার কথা!
সব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র শাদাফই দিতে পারে।
ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে শাদাফের ফোন আসায়। ফোন রিসিভড করে পরী বলে,
~ ফ্রেশ হয়েছেন?

~ হুম। এখন বলো কি যেন বলবা।
~ আপনি কি আমাকে কোনোভাবে ঠকাচ্ছেন?
~ মানে? এসব তুমি কি বলছো পরী? আমি কেন তোমাকে ঠকাতে যাবো? কি হয়েছে বলো প্লিজ।
~ রিয়া কে?

~ রেখার বোন। কেন রিয়া তোমাকে কিছু বলেছে?
~ কিছু বলার ছিল বুঝি?
~ রিয়া কি বলেছে তোমায় সেটা বলো।
~ আপনার সাথে রিয়ার সম্পর্ক ছিল?
~ না।

~ মিথ্যা বলবেন না একদম।
~ রিয়া তোমাকে বলেছে যে ওর সাথে আমার রিলেশন ছিল?
~ প্লিজ আর নাটক কইরেন না তো! কেন ঠকাচ্ছেন এভাবে আমায়?
~ আমার কথা বিশ্বাস করো প্লিজ। ওর সাথে আমার কোনো রিলেশন ছিল না। কিন্তু এটা সত্যি যে রিয়া আমাকে অনেক ভালোবাসতো।

~ তাই? তাহলে রিয়ার প্রস্তাবে রাজি হননি কেন?
~ আমি তোমাকে ভালোবাসি পরী।

~ আমি এখনকার কোনো কথা জানতে চাইনি।
~ রিয়া অনেক পাগলামি করতো আমার জন্য। অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম ওর এসব পাগলামি দেখে। আবার ভয়ও হতো রিয়া যদি রেখাকে এসব বলে দেয় তাহলে আমাদের এত বছরের পুরনো বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

মিথ্যা বলবো না যে ওর প্রতি আমার কোনো ফিলিংস ছিল না। ছিল আর তাই আমি ওর থেকে ভাবার জন্য কয়েকটা দিন সময় চেয়েছিলাম। রিয়া সময় দিয়েও ছিল কিন্তু সবসময় সবকিছুতে আমাকে প্যারা দিত। ও যখন যা বলতো আমাকে তাই শুনতে আদেশ করতো। এসব আমার পছন্দ ছিল না। ও আমার ইগোতেও হার্ট করেছিল তাই আর আমি ওর সাথে কোনো রিলেশনে জড়াইনি আর কোনো যোগাযোগও রাখিনি।

~ বাহ্! এইসবকিছু আপনি আমার থেকে লুকিয়ে গেলেন?
~ আমি তোমাকে সবই বলতাম ট্রাস্ট মি। সম্পর্কটা আরেকটু গভীর হলেই আমি তোমাকে সব বলে দিতাম।

~ কেন? তখন যেন ছেড়ে যেতে না পারি তাই?
~ আমাকে ভুল বুঝো না।
~ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না রাখছি।

পরী ফোন’টা কাটতেই পরীর মা একটা মেয়েকে সাথে করে নিয়ে আসে।
~ দেখ পরী কে এসেছে।

~ কে এটা?
~ শিলা।
~ তুমি কি করে চিনো?
~ আমাদের বাড়িওয়ালার ভাইর মেয়ে। পাশের বাড়িটায় থাকে।
~ ওহ। বসো শিলা।

শাদাফ বেশ কয়েকবার ফোন দেয়। ফোন কাটতে গিয়ে টাচ লেগে ফোন এরোপ্লেন মুড হয়ে যায় যেটা পরী খেয়াল করে না। বালিশের নিচে রেখে দেয় ফোন।
~ কেমন আছো পরী আপু?

~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি। তুমি?
~ হুম ভালো। তোমার নামও পরী আর তুমি দেখতেও একদম পরীর মত।
~ হাহাহা তাই!
~ হ্যাঁ গো।
~ কিসে পড়ো তুমি?

~ এইটে। তুমি তো কলেজে পড়ো তাই না?
~ হুম।
~ চলো আমাদের বাসায় যাই।
~ আজ না। অন্য একদিন যাবো।
~ আজ তো তোমার কলেজ বন্ধ। কাল থেকে আবার কলেজ। এরপর আর সময়ই পাবে না প্লিজ চলো। আজ আমার কিট্টির জন্মদিন।

~ কিট্টি কে আবার?
~ আমার বিল্লি। তুমি আর আমি মিলে ওর বার্থডে কেক কাটবো।
~ হায় খোদা! বিড়ালেরও নাকি জন্মদিন পালন করে। অবশ্য বড়লোকদের কারবার বুঝা যে বড়~ ই দ্বায়! (মনে মনে)
~ কি হলো, চুপ করে আছো কেন? চলো?

~ আচ্ছা চলো।
পরী ফোনটা নিয়ে শিলার সাথে ওদের বাসায় যায়। এদিকে শাদাফ ফোনের ওপর ফোন দিয়েই যাচ্ছে কিন্তু ফোন বন্ধ।
~ এভাবে রাগ করে ফোন বন্ধ করে রাখলে তো তুমি! বেশ আমি আর ফোন দিবো না। সত্যি বলার পরও তুমি আমায় ক্ষমা করলে না। কিছু বললেও না উল্টো ফোন বন্ধ করে রাখলে।
এত রাগ আর জেদ তোমার!

পরী শিলার সাথে বেলকোনিতে বসে আছে। শিলা একাই সব খাবারের আয়োজন করছে দুজনের জন্য আর পরীকে বলেছে, “তুমি দোলনায় চুপটি করে বসে থাকো”

কথা বাড়ায় না পরী। মনটা খুব খারাপ থাকলেও শিলার মন রক্ষার্থে আসতে হয়।
~ শাদাফই বা কি! মাত্র তিনবার ফোন দিয়েই ফোন দেওয়া শেষ! আর ফোন দেওয়া গেলো না? একটাবার রাগ ভাঙ্গানোরও চেষ্টা করলো না? আমার প্রতি শাদাফের এই ভালোবাসা! (মনে মনে)
~ আপু আসো সব রেডি।

শিলার ডাকে দোলনা থেকে উঠে শিলার সাথে ওর রুমে যায়। শিলা কেক কেটে বিড়ালকে একটু দিলো। কিন্তু বিড়াল কি আর কেক খায়! এক বাটি দুধ ফ্লোরে দিলো সেগুলোই তৃপ্তিসহকারে খাচ্ছে।
~ আপু আইসক্রিম খাও।

~ বাব্বাহ্! শুধু তাকেই আইসক্রিম দিলি? আর দুজনের জন্য খাবার রেডি করলি? আমার খাবার কই?, কথাগুলো বলেই একটা চেয়ার টেনে পরীর মুখোমুখি বসে সুলতান।
~ আপনি! আপনি এখানে কেন?

~ বাহ্ রে! নিজের বোনের ঘরে কি আসতে পারি না?
~ কে আপনার বোন?
~ কে আবার? শিলা।
~ তার মানে এটা আপনাদের বাড়ি?
~ জ্বী।

~ শিলা আমি আসছি। তুমি পরে আমাদের বাসায় এসো।
~ ও আপু। কিছু না খেয়েই চলে যাচ্ছো কেন?
সুলতান গিয়ে পরীর সামনে দাঁড়ায়।
~ যখনই খবর পেয়েছি তুমি আমাদের বাসায় এসেছো। সব কাজ বাদ দিয়ে ছুটে এসেছি বাসায়। আর তুমি চলে যাচ্ছো?

~ আপনার কাজ মানেই তো মাস্তানি।
~ তুমি বললে ছেড়ে দিবো।
~ মাস্তানি ছেড়ে দিলে খুশি হবো। তবে আমার জন্য নয়। নিজের মা আর বোনের কথা ভেবে। এবার সরেন
~ চলে যাবে?

~ আপনার বাড়িতে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।
~ কিন্তু সারাজীবন তো তোমাকে এই বাড়িতেই থাকতে হবে বিয়ের পরে।
~ সেগুড়ে বালি আপনার!
সুলতানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাড়িতে চলে যায় পরী।

দুপুর থেকে বিকাল, বিকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কিন্তু শাদাফের কোনো ফোন আসেনা। আর আসবেই বা কিভাবে পরীর ফোন যে এরোপ্লেন মুড করা সেটাও তো পরী খেয়াল করেনি।
ঐদিকে শাদাফ ভাবছে পরী রাগ করে ফোন বন্ধ করে রেখেছে তাই তার নিজেরও অভিমান হচ্ছে পরীর ওপর।

পরীও আশায় বসে আছে শাদাফ রাগ ভাঙ্গাবে।
~ বাহ্ বাহ্! কত্ত ভালোবাসা তার আমার প্রতি। একটা টেক্সট, একটা কলও অব্দি দেয়নি। ভালো খুব ভালো। থাকুক সে তার মত করে।

রাতঃ ১১টা
অন্যদিকে শাদাফ ভাবতে থাকে,
~ নাহ্! এভাবে আর কথা না বলে রাগ করে থাকতে পারছি না। ফোন দিয়ে লাভ নেই। খোলা থাকলেও এখন রিসিভড করবে না জানি। যেই রাগ আর জেদ। তার চেয়ে ভালো কালই আমি ঢাকায় যাই। নিশ্চয় আমাকে দেখে সারপ্রাইজড হবে আর রাগ করেও থাকতে পারবে না। আর যদি রাগ করেও তাহলে হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিবো। হুম এটাই করতে হবে।

পরেরদিন সকালে ভোরেই রওনা দেয় ঢাকায় শাদাফ। এর মধ্যে আর একবারও ফোন দেয়নি, সারপ্রাইজ দিবে বলে।

পরীও রাগে কলেজে যাওয়ার সময় ফোন নেয় না।
বিকালে কলেজ থেকে ফিরছিল পরী। রাস্তায় আবারও সুলতানের সাথে দেখা হয়ে যায়। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলেও পথ আগলিয়ে দাঁড়ায় সুলতান।

~ সবসময় এমন এড়িয়ে চলো কেন বলো তো?
~ রাস্তাঘাটে কি শুরু করলেন? মানুষ দেখলে খারাপ বলবে। পথ ছাড়েন।
~ আমার হবু বউকে খারাপ বলবে এত সাহস কার শুনি!

~ সবসময় আপনার এসব আলতু~ ফালতু কথা ভালো লাগে না বলে দিলাম।
~ বুঝছি। টায়ার্ড হয়ে আছো তো তাই এত রাগ হচ্ছে। দাও ব্যাগটা দাও আমি নিয়ে দিচ্ছি।
সুলতান একপ্রকার জোর করেই পরীর ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করে। রাস্তায় কোনো সিনক্রিয়েট করতে চায় না পরী। তাই কিছু না বলেই চুপচাপ হাঁটা শুরু করে।

বাসায় গিয়েই আগে ফোনটা হাতে নেয় পরী, যদি শাদাফ ফোন দেয় এই আশায়। কিন্তু মনটা হতাশ হয়ে যায় কারণ কোনো ম্যাসেজ বা ফোনই আসেনি।

যখন ফোনটা রাখতে যাবে তখন ওর খেয়াল হলো যে ফোন এরোপ্লেন মুড করা।
~ ওহ শিট! ফোন এরোপ্লেন মুড করলো কে? আমার ফোন তো কেউ ধরেও না। নিশ্চয় টাচ লেগে হয়ে গেছে। আর আমি অযথাই বেচারাকে ভুল বুঝছি। না জানি কতবার ফোন দিয়েছে।
ফোনের নেট চালু করতেই একটা ম্যাসেজ আসে,

~ এতক্ষণে বুঝতে পারলাম যে কেন তুমি আমার ছোট ভুলটাকে ক্ষমা করতে পারোনি। আসলে পারোনি বললে ভু্ল হবে তুমি ইচ্ছে করেই ক্ষমা করোনি। কারণ তোমার জীবনে তো এখন নতুন কেউ আছে। তাই একবার ভুল ভাঙ্গানোরও সুযোগ দাওনি। ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিলে।

ভেবেছিলাম ঢাকায় এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো। কিন্তু আমি নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেছি। কত ভালোবাসা তোমাদের। তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, ব্যাগও নিয়ে দেয়। বাহ্! ভালোই সুখে আছো তুমি। ভালোই হয়েছে আজ ঢাকায় গিয়েছিলাম নাহলে তো তোমার আসল চেহারা দেখতেই পারতাম না। তোমার ঐ মায়াবী মুখখানার পিছনে যে ছলনাময়ী মুখটা লুকিয়ে ছিল তা আমি বুঝতে পারিনি।
ভালো থাকো তুমি তোমার ভালোবাসাকে নিয়ে। আমার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না।

ওপস! স্যরি, তুমি তো করবেও না যোগাযোগ কখনো কারণ আমাকে তো তোমার জীবনে আর দরকারই নেই। কত মেয়ে আমার জন্য পাগল। কত পাগলামি করতো রিয়া। আর সেখানে আমি তোমাকে পাগলের মত ভালোবেসেছিলাম। আফসোস তুমি বুঝলে না। আসলেই ব্যর্থতা আমার নাকি তোমার বুঝতেছি না আর জানিও না। (শাদাফ)

ম্যাসেজটা দেখে খুব কষ্ট হয় পরীর। চোখ দুইটা ছলছল করছে। তাড়াতাড়ি করে শাদাফকে কল করে কিন্তু নাম্বারটি ব্যস্ত বলছে। পরীর বুঝতে বাকি নেই যে নাম্বারটা ব্লাকলিস্টে ফেলেছে।
তাড়াতাড়ি করে ফেসবুকে ঢুকে। কিন্তু আশার আলো সেখানেও বন্ধ! ফেসবুক থেকেও শাদাফ পরীকে ব্লক করে দিয়েছে।

প্রচন্ড রকম হাত~ পা কাঁপছে পরীর। শরীরটা কেমন ছেড়ে দিচ্ছে। পরী বিছানায় বসে পড়ে

পর্ব ৮

~ শাদাফ তোমার কি হয়?
কথাটা শুনে পরীর বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। এক অজানা ভয় বুকের ভেতর কড়া নাড়ছে। পরী উত্তর না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করে,
~ শাদাফকে তুমি চিনো কি করে?

~ আগে তুমি বলো তারপর আমি বলছি।
~ শাদাফের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আমরা দুজনই দুজনকে ভালোবাসি।
~ ওহ।
~ বললে না তো তুমি শাদাফকে কি করে চিনো?
~ তুমি রেখা আপুকে তো চিনো?
~ হ্যাঁ। শাদাফের বন্ধু।
~ আমি রেখা আপুর ছোট বোন রিয়া।
~ ওহ আচ্ছা! রেখা আপু বলেছিল যে তার আমার মত ছোট একটা বোন আছে। গ্রামে থাকে।
~ হুম। কালই এসেছি গ্রাম থেকে।

~ এই নাও কফি খাও (মা)
~ না আন্টি আমি কিছু খাবো না।
~ তা বললে তো চলবে না। তুমি রেখা আপুর বোন। কিছু না খেলে আমার খারাপ লাগবে।
~ আচ্ছা ঠিক আছে খাচ্ছি।
~ থ্যাংকস

~ তো তোমাদের বিয়ে কবে?
~ দুই বছর পর। একটা কথা বলো তো, তুমি আমাকে কি করে চিনলে?
~ রওশান ভাইয়া বললো শাদাফ নাকি তোমাকে ভালোবাসে। তাই তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হলো।
কফি খাওয়া শেষে রিয়া উঠে দাঁড়ালো। মুখটা মলিন কিন্তু মুখে জোর করে হাসি টেনে বললো,
~ আজ আসি পরী। সময় করে একদিন অবশ্যই আমাদের বাড়িতে এসো। ভালো থেকো আর তোমাদের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

পরী কিছু না বলে প্রতিউত্তরে হাসলো। রিয়া গেট অবদি যেতেই পরী পেছন থেকে বললো,
~ তোমার সাথে শাদাফের রিলেশন ছিল তাই না?
কথাটা শুনে রিয়া পরীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। পরী রিয়ার সামনে আগাতে আগাতে বললো,
~ যাকে সোজা বাংলায় বলে প্রাক্তন। আর যুগের সাথে এটিটিউড নিয়ে বলতে গেলে এক্স!
~ তোমাকে এসব কে বললো?
~ কোন সবের কথা বলছো বলো তো?
~ আমাদের রিলেশন ছিল এটা!

পরী মুচকি হেসে বললো,
~ তুমি বড্ড বোকা রিয়া। আমি কি বাচ্চা? কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এসব বুঝার হিতাহিত জ্ঞান বিধাতা আমাকে দিয়েছেন।

আমি সত্যিই জানতাম না তোমাদের রিলেশন ছিল! জানার প্রয়োজনবোধও করছি না।
কিন্তু মিথ্যা বলে কোনো লাভ হলো না। তুমি রেখা আপুর বোন হিসেবে আমার বাসায় আসতেই পারো তবে সেটা অবশ্যই রেখা আপুর সাথে। কেন বলো তো? কারণটা হলো আমাকে তোমার একদমই চেনার কথা না।

আবার কি যেন বলেছিলে? রওশান ভাইয়ার কাছে শুনেছো যে শাদাফ কাউকে ভালোবাসে বা রিলেশনে আছে। আর তুমি কি করলে? সত্যিটা যাচাই করার জন্য এড্রেস নিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে আসলে। আচ্ছা রিয়া একটা কথা বলো তো, রওশান ভাইয়া এমনি এমনি নিজে থেকে কেন বলবে যে শাদাফ রিলেশনে আছে? নিশ্চয় তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে? আর তাছাড়া শাদাফ রিলেশন করুক বা না করুক। তাতে তোমার কি? সত্য যাচাই করার এত আগ্রহ কিসের তোমার?
রিয়া কিছু বলছে না চুপ করে আছে।
পরী আবার বললো,

~ এতকিছু বললাম, নিশ্চয় আমি কোনো ভুল বলিনি?
~ বেশি কিছু বলবো না। শুধু বলবো তোমার ধারণা আর বলা কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। অনেক ভালোবাসি শাদাফকে। অনেক বেশি!

রিয়া চলে যায়। পরী ওর যাওয়ার পথে চেয়ে রয়। চলে যাওয়ার আগে যে শেষ কথাগুলো বললো তা যেন পরীর বুকে তীরের মধ্যে বিধলো।
~ তবে কি শাদাফ আমাকে ঠকাচ্ছে! নাহ্ এই প্রশ্নের উত্তর তো শাদাফকে দিতেই হবে।

পরী দৌড়ে রুমে যায়। শাদাফকে ৩/৪ বার ফোন দেয় কিন্তু রিসিভ করে না। ৬বারের বেলায় ফোন রিসিভ করে ঘুমঘুম কন্ঠে বলে,

~ হ্যালো
~ ঘুমাচ্ছেন এখনো?
~ হুম।
~ ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে ফোন দেন।
~ বলো এখন সমস্যা নেই।
~ আমি ফ্রেশ হয়ে এসে ফোন দিতে বলছি।

~ আচ্ছা ঠিক আছে।
ফোন রাখার পর হাজারো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।
~ এই রিয়ার সাথে শাদাফের কি সম্পর্ক ছিল! আর শাদাফ কেনোই বা বললো না আমাকে রিয়ার কথা!
সব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র শাদাফই দিতে পারে।
ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে শাদাফের ফোন আসায়। ফোন রিসিভড করে পরী বলে,
~ ফ্রেশ হয়েছেন?
~ হুম। এখন বলো কি যেন বলবা।

~ আপনি কি আমাকে কোনোভাবে ঠকাচ্ছেন?
~ মানে? এসব তুমি কি বলছো পরী? আমি কেন তোমাকে ঠকাতে যাবো? কি হয়েছে বলো প্লিজ।
~ রিয়া কে?
~ রেখার বোন। কেন রিয়া তোমাকে কিছু বলেছে?
~ কিছু বলার ছিল বুঝি?
~ রিয়া কি বলেছে তোমায় সেটা বলো।
~ আপনার সাথে রিয়ার সম্পর্ক ছিল?
~ না।
~ মিথ্যা বলবেন না একদম।
~ রিয়া তোমাকে বলেছে যে ওর সাথে আমার রিলেশন ছিল?

~ প্লিজ আর নাটক কইরেন না তো! কেন ঠকাচ্ছেন এভাবে আমায়?
~ আমার কথা বিশ্বাস করো প্লিজ। ওর সাথে আমার কোনো রিলেশন ছিল না। কিন্তু এটা সত্যি যে রিয়া আমাকে অনেক ভালোবাসতো।
~ তাই? তাহলে রিয়ার প্রস্তাবে রাজি হননি কেন?
~ আমি তোমাকে ভালোবাসি পরী।
~ আমি এখনকার কোনো কথা জানতে চাইনি।

~ রিয়া অনেক পাগলামি করতো আমার জন্য। অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম ওর এসব পাগলামি দেখে। আবার ভয়ও হতো রিয়া যদি রেখাকে এসব বলে দেয় তাহলে আমাদের এত বছরের পুরনো বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মিথ্যা বলবো না যে ওর প্রতি আমার কোনো ফিলিংস ছিল না। ছিল আর তাই আমি ওর থেকে ভাবার জন্য কয়েকটা দিন সময় চেয়েছিলাম।

রিয়া সময় দিয়েও ছিল কিন্তু সবসময় সবকিছুতে আমাকে প্যারা দিত। ও যখন যা বলতো আমাকে তাই শুনতে আদেশ করতো। এসব আমার পছন্দ ছিল না। ও আমার ইগোতেও হার্ট করেছিল তাই আর আমি ওর সাথে কোনো রিলেশনে জড়াইনি আর কোনো যোগাযোগও রাখিনি।

~ বাহ্! এইসবকিছু আপনি আমার থেকে লুকিয়ে গেলেন?
~ আমি তোমাকে সবই বলতাম ট্রাস্ট মি। সম্পর্কটা আরেকটু গভীর হলেই আমি তোমাকে সব বলে দিতাম।
~ কেন? তখন যেন ছেড়ে যেতে না পারি তাই?
~ আমাকে ভুল বুঝো না।
~ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না রাখছি।

পরী ফোন’টা কাটতেই পরীর মা একটা মেয়েকে সাথে করে নিয়ে আসে।
~ দেখ পরী কে এসেছে।
~ কে এটা?

~ শিলা।
~ তুমি কি করে চিনো?
~ আমাদের বাড়িওয়ালার ভাইর মেয়ে। পাশের বাড়িটায় থাকে।
~ ওহ। বসো শিলা।

শাদাফ বেশ কয়েকবার ফোন দেয়। ফোন কাটতে গিয়ে টাচ লেগে ফোন এরোপ্লেন মুড হয়ে যায় যেটা পরী খেয়াল করে না। বালিশের নিচে রেখে দেয় ফোন।
~ কেমন আছো পরী আপু?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি। তুমি?
~ হুম ভালো। তোমার নামও পরী আর তুমি দেখতেও একদম পরীর মত।
~ হাহাহা তাই!
~ হ্যাঁ গো।

~ কিসে পড়ো তুমি?
~ এইটে। তুমি তো কলেজে পড়ো তাই না?
~ হুম।
~ চলো আমাদের বাসায় যাই।
~ আজ না। অন্য একদিন যাবো।
~ আজ তো তোমার কলেজ বন্ধ। কাল থেকে আবার কলেজ। এরপর আর সময়ই পাবে না প্লিজ চলো। আজ আমার কিট্টির জন্মদিন।
~ কিট্টি কে আবার?

~ আমার বিল্লি। তুমি আর আমি মিলে ওর বার্থডে কেক কাটবো।
~ হায় খোদা! বিড়ালেরও নাকি জন্মদিন পালন করে। অবশ্য বড়লোকদের কারবার বুঝা যে বড়~ ই দ্বায়! (মনে মনে)
~ কি হলো, চুপ করে আছো কেন? চলো?
~ আচ্ছা চলো।

পরী ফোনটা নিয়ে শিলার সাথে ওদের বাসায় যায়। এদিকে শাদাফ ফোনের ওপর ফোন দিয়েই যাচ্ছে কিন্তু ফোন বন্ধ।
~ এভাবে রাগ করে ফোন বন্ধ করে রাখলে তো তুমি! বেশ আমি আর ফোন দিবো না। সত্যি বলার পরও তুমি আমায় ক্ষমা করলে না। কিছু বললেও না উল্টো ফোন বন্ধ করে রাখলে।
এত রাগ আর জেদ তোমার!

পরী শিলার সাথে বেলকোনিতে বসে আছে। শিলা একাই সব খাবারের আয়োজন করছে দুজনের জন্য আর পরীকে বলেছে, “তুমি দোলনায় চুপটি করে বসে থাকো”

কথা বাড়ায় না পরী। মনটা খুব খারাপ থাকলেও শিলার মন রক্ষার্থে আসতে হয়।
~ শাদাফই বা কি! মাত্র তিনবার ফোন দিয়েই ফোন দেওয়া শেষ! আর ফোন দেওয়া গেলো না? একটাবার রাগ ভাঙ্গানোরও চেষ্টা করলো না? আমার প্রতি শাদাফের এই ভালোবাসা! (মনে মনে)
~ আপু আসো সব রেডি।

শিলার ডাকে দোলনা থেকে উঠে শিলার সাথে ওর রুমে যায়। শিলা কেক কেটে বিড়ালকে একটু দিলো। কিন্তু বিড়াল কি আর কেক খায়! এক বাটি দুধ ফ্লোরে দিলো সেগুলোই তৃপ্তিসহকারে খাচ্ছে।
~ আপু আইসক্রিম খাও।

~ বাব্বাহ্! শুধু তাকেই আইসক্রিম দিলি? আর দুজনের জন্য খাবার রেডি করলি? আমার খাবার কই?, কথাগুলো বলেই একটা চেয়ার টেনে পরীর মুখোমুখি বসে সুলতান।
~ আপনি! আপনি এখানে কেন?
~ বাহ্ রে! নিজের বোনের ঘরে কি আসতে পারি না?

~ কে আপনার বোন?
~ কে আবার? শিলা।
~ তার মানে এটা আপনাদের বাড়ি?
~ জ্বী।
~ শিলা আমি আসছি। তুমি পরে আমাদের বাসায় এসো।
~ ও আপু। কিছু না খেয়েই চলে যাচ্ছো কেন?
সুলতান গিয়ে পরীর সামনে দাঁড়ায়।
~ যখনই খবর পেয়েছি তুমি আমাদের বাসায় এসেছো। সব কাজ বাদ দিয়ে ছুটে এসেছি বাসায়। আর তুমি চলে যাচ্ছো?

~ আপনার কাজ মানেই তো মাস্তানি।
~ তুমি বললে ছেড়ে দিবো।
~ মাস্তানি ছেড়ে দিলে খুশি হবো। তবে আমার জন্য নয়। নিজের মা আর বোনের কথা ভেবে। এবার সরেন

~ চলে যাবে?
~ আপনার বাড়িতে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।
~ কিন্তু সারাজীবন তো তোমাকে এই বাড়িতেই থাকতে হবে বিয়ের পরে।
~ সেগুড়ে বালি আপনার!
সুলতানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাড়িতে চলে যায় পরী।

দুপুর থেকে বিকাল, বিকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কিন্তু শাদাফের কোনো ফোন আসেনা। আর আসবেই বা কিভাবে পরীর ফোন যে এরোপ্লেন মুড করা সেটাও তো পরী খেয়াল করেনি।
ঐদিকে শাদাফ ভাবছে পরী রাগ করে ফোন বন্ধ করে রেখেছে তাই তার নিজেরও অভিমান হচ্ছে পরীর ওপর।
পরীও আশায় বসে আছে শাদাফ রাগ ভাঙ্গাবে।

~ বাহ্ বাহ্! কত্ত ভালোবাসা তার আমার প্রতি। একটা টেক্সট, একটা কলও অব্দি দেয়নি। ভালো খুব ভালো। থাকুক সে তার মত করে।

রাতঃ ১১টা
অন্যদিকে শাদাফ ভাবতে থাকে,

~ নাহ্! এভাবে আর কথা না বলে রাগ করে থাকতে পারছি না। ফোন দিয়ে লাভ নেই। খোলা থাকলেও এখন রিসিভড করবে না জানি। যেই রাগ আর জেদ। তার চেয়ে ভালো কালই আমি ঢাকায় যাই। নিশ্চয় আমাকে দেখে সারপ্রাইজড হবে আর রাগ করেও থাকতে পারবে না। আর যদি রাগ করেও তাহলে হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিবো। হুম এটাই করতে হবে।
পরেরদিন সকালে ভোরেই রওনা দেয় ঢাকায় শাদাফ। এর মধ্যে আর একবারও ফোন দেয়নি, সারপ্রাইজ দিবে বলে।

পরীও রাগে কলেজে যাওয়ার সময় ফোন নেয় না।
বিকালে কলেজ থেকে ফিরছিল পরী। রাস্তায় আবারও সুলতানের সাথে দেখা হয়ে যায়। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলেও পথ আগলিয়ে দাঁড়ায় সুলতান।

~ সবসময় এমন এড়িয়ে চলো কেন বলো তো?
~ রাস্তাঘাটে কি শুরু করলেন? মানুষ দেখলে খারাপ বলবে। পথ ছাড়েন।
~ আমার হবু বউকে খারাপ বলবে এত সাহস কার শুনি!

~ সবসময় আপনার এসব আলতু~ ফালতু কথা ভালো লাগে না বলে দিলাম।
~ বুঝছি। টায়ার্ড হয়ে আছো তো তাই এত রাগ হচ্ছে। দাও ব্যাগটা দাও আমি নিয়ে দিচ্ছি।
সুলতান একপ্রকার জোর করেই পরীর ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করে। রাস্তায় কোনো সিনক্রিয়েট করতে চায় না পরী। তাই কিছু না বলেই চুপচাপ হাঁটা শুরু করে।

বাসায় গিয়েই আগে ফোনটা হাতে নেয় পরী, যদি শাদাফ ফোন দেয় এই আশায়। কিন্তু মনটা হতাশ হয়ে যায় কারণ কোনো ম্যাসেজ বা ফোনই আসেনি।

যখন ফোনটা রাখতে যাবে তখন ওর খেয়াল হলো যে ফোন এরোপ্লেন মুড করা।
~ ওহ শিট! ফোন এরোপ্লেন মুড করলো কে? আমার ফোন তো কেউ ধরেও না। নিশ্চয় টাচ লেগে হয়ে গেছে। আর আমি অযথাই বেচারাকে ভুল বুঝছি। না জানি কতবার ফোন দিয়েছে।
ফোনের নেট চালু করতেই একটা ম্যাসেজ আসে,

~ এতক্ষণে বুঝতে পারলাম যে কেন তুমি আমার ছোট ভুলটাকে ক্ষমা করতে পারোনি। আসলে পারোনি বললে ভু্ল হবে তুমি ইচ্ছে করেই ক্ষমা করোনি। কারণ তোমার জীবনে তো এখন নতুন কেউ আছে। তাই একবার ভুল ভাঙ্গানোরও সুযোগ দাওনি। ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিলে। ভেবেছিলাম ঢাকায় এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো। কিন্তু আমি নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেছি।

কত ভালোবাসা তোমাদের। তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, ব্যাগও নিয়ে দেয়। বাহ্! ভালোই সুখে আছো তুমি। ভালোই হয়েছে আজ ঢাকায় গিয়েছিলাম নাহলে তো তোমার আসল চেহারা দেখতেই পারতাম না। তোমার ঐ মায়াবী মুখখানার পিছনে যে ছলনাময়ী মুখটা লুকিয়ে ছিল তা আমি বুঝতে পারিনি।
ভালো থাকো তুমি তোমার ভালোবাসাকে নিয়ে। আমার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না।

ওপস! স্যরি, তুমি তো করবেও না যোগাযোগ কখনো কারণ আমাকে তো তোমার জীবনে আর দরকারই নেই। কত মেয়ে আমার জন্য পাগল। কত পাগলামি করতো রিয়া। আর সেখানে আমি তোমাকে পাগলের মত ভালোবেসেছিলাম। আফসোস তুমি বুঝলে না। আসলেই ব্যর্থতা আমার নাকি তোমার বুঝতেছি না আর জানিও না।
(শাদাফ)

ম্যাসেজটা দেখে খুব কষ্ট হয় পরীর। চোখ দুইটা ছলছল করছে। তাড়াতাড়ি করে শাদাফকে কল করে কিন্তু নাম্বারটি ব্যস্ত বলছে। পরীর বুঝতে বাকি নেই যে নাম্বারটা ব্লাকলিস্টে ফেলেছে।
তাড়াতাড়ি করে ফেসবুকে ঢুকে। কিন্তু আশার আলো সেখানেও বন্ধ! ফেসবুক থেকেও শাদাফ পরীকে ব্লক করে দিয়েছে।
প্রচন্ড রকম হাত~ পা কাঁপছে পরীর। শরীরটা কেমন ছেড়ে দিচ্ছে। পরী বিছানায় বসে পড়ে

পর্ব ৯

পাশাপাশি রিক্সায় বসে আছে দুজনে। শাদাফের চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। কিন্তু পরী তার চেয়েও বেশি রেগে আছে। শাদাফ রিক্সার এক কোণায় বসে আছে।

~ কিরে ওত দূরে বসছিস কেন তুই? পরে গিয়ে হাত~ পা ভাঙ্গলে বিয়ের পর কি আমি রোজগার করে তোকে খাওয়াবো আর তুই বাড়ির রান্নাবান্না করবি?
শাদাফ কিছু না বলে চুপ করে বসে আছে।
~ মুখে কি চাল ভিজাইছিস?
~ এসবের মানে কি?

~ ওরে বাবুরে! মানে বুঝো না তাই না? ঐ শালা রিয়ার সাথে এত ঘেঁষাঘেঁষি কিসের তোর? ওর প্রতি কি নতুন করে তোর ফিলিংস উতলাইয়া উঠছে!

~ তোমার যদি অন্য কারো প্রতি ফিলিংস থাকতে পারে তাহলে আমার থাকলে দোষ কি? না মানে তুমি এটা বলতে চাইছো যে, তোমার বেলায় ষোল আনা আর আমার বেলায় চার আনাও না?
~ রাখ তোর আনা গোনা! মানুষের দেখার আড়ালেও অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে যা তোর মত গণ্ডমূর্খ বুঝেনা। আমাকে অন্তত একবার জিজ্ঞেস করতে পারতি সেদিনের ঘটনা আসলে কি ছিল!
~ নিজের চোখকে কি অবিশ্বাস করতে বলছো?
~ ঐ যে বললাম, দেখার আড়ালেও লুকিয়ে থাকে অনেক আজানা কিছু।
~ তার মানে এটাই বলতে চাইছো আমার চোখে সমস্যা?
~ গাধা! তোর মাথায় সমস্যা।

রিক্সাচালক ছিল এক পিচ্চি ছেলে। বয়স আনুমানিক ১৩/১৪ হবে। পরী ছেলেটাকে বললো,
~ পিচ্চি এখানেই রাখো।

শাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ নামো রিক্সা থেকে।
শাদাফ একটু অবাক হয়। কারণ আজ পরী নিজে থেকেই তুমি বলতেছে।
~ হা করো তাকিয়ে আছো কেন? নামো।
~ হু।
রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়ায় শাদাফ। শাদাফের আগেই পরী নামে। পরী এদিক~ ওদিক তাকাচ্ছে।
শাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,

~ স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন আজিব! ওর ভাড়াটা কি আমি দিবো? লজ্জা করে না বউ ভাড়া দিবে আর তা তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে।

শাদাফ একটু ভ্রু কুঁচকে তাকায় পরীর দিকে। পরী আমতা আমতা করে বলে,
~ ওর ভাড়া দিয়ে আমাকে ফলো করো। আমি সামনে এগোচ্ছি।
দুই পা এগিয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়ায়। ততক্ষণে শাদাফ মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করছে। শাদাফকে উদ্দেশ্যে করে জোরে বললো,

~ ও ছোট মানুষ। রোদের মধ্যে অনেক কষ্ট করে আসছে। ২০টাকা বেশি দিয়া দিবা।
পরী হাঁটা শুরু করে। ভাড়া ছিল ২০টাকা। পরী বলেছে বলে ৩০টাকাই বেশি দিয়েছে। ছেলেটা তখন বললো,

~ না ভাইয়া, আমার এত ট্যাকা লাগবো না। আপনে আফামনির কথায় ট্যাকা বেশি দিতাছেন ক্যান!
~ আরে রাখো। তোমার আপামনি যদি পরে জানে যে আমি তোমাকে টাকা বেশি দেইনি তাহলে আমাকে আলুভর্তা বানাবে।
~ আপনে আফামনিরে অনেক ডরান নাকি?
~ শুনোনি ওর কথা। যেই রাগী।

~ হ শুনছি সব। আমার কাছে ভালাই লাগছে কথাগুলা। হাসছিলামও আমি। কেমনে শাসন করলো। আমি এত ভালোবাসা কি বুঝিনা। তয় মনে অইলো আফামনি আপনেরে সত্যিই অনেক ভালোবাসে। ভালো থাইকেন।

ছেলেটা ৫০টাকাই নেয়। ছেলেটার কথা শুনে একটু মুচকি হাসলো শাদাফ। এরপর পরীর কাছে যাচ্ছে। বিকাল হলেও এখনো রোদের তেজ বোঝা যাচ্ছে। পরী ব্যাগ থেকে ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতেছে। কাঠফাটা রোদে শাদাফের মনে হচ্ছে মাথার ঘিলু এখনই গলে যাবে। তাড়াতাড়ি হেঁটে পরীর পাশে যায়, এই ভেবে যে পরী নিশ্চয় ছাতাটা শেয়ার করবে। কিন্তু হলো তার উল্টো।
~ এত তাড়াতাড়ি এসে লাভ নেই। ছাতা শেয়ার করবো না আমি।

শাদাফের আশার আলো নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু পরীকে বুঝতে না দিয়ে বললো,
~ তোমাকে কে বললো যে আমি তোমার ছাতার নিচে যাবো? লাগবে না তোমার ছাতা আমার। আমরা ছেলেরা অনেক স্ট্রং। তোমাদের মেয়েদের মত না যে সামান্য রোদের তাপই সহ্য করতে পারবো না।
~ কত যে স্ট্রং তোমরা তার উদাহরণ তো তুমিই।
~ মানে?
কথা বলতে বলতে লেকে আসে দুজনে। ব্যাগটা রেখে ছাতা বন্ধ করতে করতে পরী বলে,
~ মানে হলো, এতই যদি স্ট্রং হতে তাহলে ঐ ছেলেটাকে গিয়ে অন্তত জিজ্ঞেস করতে কে সে? আমার ব্যাগ নিচ্ছে কেন!
~ জিজ্ঞেস করার কি আছে? তুমি কিছুই বলোনি তাকে। তার মানে ছেলেটা তোমার পরিচিত ছিল।
~ কিছু বলিনি তার কারণ রাস্তায় সিনক্রিয়েট করার কোনো ইচ্ছে ছিল না। আর ছেলেটাকে তুমিও চেনো।

~ আমি কিভাবে চিনবো? আমি তো তাকে আগে কখনো দেখিইনি।
~ দেখোনি ঠিকই। কিন্তু ওর কথা আমি তোমাকে বলেছিলাম। ঐ ছেলেটাই সু্লতান।
~ কিহ্! তার মানে তুমি সুলতানের সাথে রিলেশনে গেছো?

কথাটা বলতে যতটা দেড়ি হয় কিন্তু শাদাফকে থাপ্পড় দিতে একটু দেড়ি করে না পরী।
থাপ্পড় দিয়েই শাদাফকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে।

~ সবকিছুতে এত বেশি কেন বুঝো তুমি? আমি কখন বললাম যে আমি সু্লতানের সাথে রিলেশন করি? তুমি কি বুঝো না কিছু। ও একটা ছেলে আর আমি একটা মেয়ে। সেদিন যদি কিছু বলতাম তাহলে রাস্তায় একটা সিনক্রিয়েট হয়ে যেত আর তার জন্য কিন্তু ওর কোনো মান~ সম্মান যেতো না। মান~ সম্মান গেলে আমারই যেত। এত সহজ একটা জিনিস তুমি না বুঝে উল্টো আমাকে ভুল বুঝলে।

কিন্তু এই ভুল বোঝারও কিছু উপকারিতা পেয়েছি। এই কয়দিন কথা না হওয়ায় আমি এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি যে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।

আর থাপ্পড় দিয়েছি বলে ইগো দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ো না। তাহলে কিন্তু এর তিন গুণ থাপ্পড় দিবো। বিয়ের পর তো স্বামীর গায়ে হাত তুলা পাপ। তাই এখনই মেরে নিলাম। কিন্তু অযথাই মারিনি হু। তুমি ঐ রিয়ার সাথে এত ঢলাঢলি করো কেন? সামান্য কয়দিন কথা হয়নি তাতেই তুমি রিয়ার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছো। এই ভালোবাসা তোমার!
এতক্ষণ সব কথা চুপ করে শুনছিল।
পরীর দুই হাত ধরে বুক থেকে পরীকে সরিয়ে সামনে দাঁড় করায়।

~ তোমাকে কে বললো যে আমি রিয়ার প্রতি দূর্বল হয়ে গেছি? আমি তো ঐসব তোমাকে দেখানোর জন্য করেছি। জান্নাত বলেছিল তুমি আসবে। তাই আমি ইচ্ছে করেই রিয়ার সাথে ঘেঁষে বসেছি যাতে তুমি ভুল বুঝে চলে যাও। সামনে না আসো। কারণ তুমি সামনে আসলেই আমি দূর্বল হয়ে যাই।

~ আহা! এটা কি বাংলা সিনেমা পাইছো? এই শুনো আমি কোনো বাংলা সিনেমা বা নাটকের হিরোইন না যে নায়ককে অন্য মেয়ের সাথে দেখে কান্নাকাটি করে ভু্ল বুঝে দূরে চলে যাবো। আমি কি করি বা করতে পারি তা তো দেখলেই। আমি আমার ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারি।
কিন্তু তুমি কি বললে এটা? তুমি ইচ্ছে করেই চাওনি আমি তোমার সামনে আসি? তার মানে তুমি আমার প্রতি বিরক্ত? ভালোবাসো না আমাকে?

শাদাফ কিছু না বলে পরীকে বুকে টেনে নেয়।
~ এই বুকে কান পেতে শুনো, প্রতিটা স্পন্দন শুধু তোমাকেই খোঁজে। বারবার তোমাকেই চায়। তোমাকেই ভালোবাসে। এতকিছুর পরও বলতে হবে ভালোবাসি?
আচ্ছা বেশ এবার মুখেও বলছি, ভালোবাসি পরী। অনেক ভালোবাসি।

~ পাবলিক প্লেসে কি এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকবে? ছাড়ো আমায়।
~ এহ্! একটু আগে যখন নিজে ধরলে তখন পাবলিক দেখেনি আর আমি ধরলেই দেখবে তাই না?
~ হু কারণ কি বলো তো?
~ কি?
~ ঐযে আমার বেলায় ষোল আনা আর তোমার বেলায় চার আনাও না হিহিহি।
~ ফাজিল।
~ তোমার বউ।

~ তুমিই তো!
~ হুহ্।
~ উত্তরটা পাইনি কিন্তু।
~ কিসের?
~ ভালোবাসি
~ অনেক বেশিই ভালোবাসি।

সূর্য ডোবার মুহুর্তে দুজনই হাত ধরে হাঁটছে। কিছু ভু্ল বুঝাবুঝি সম্পর্ককে নষ্ট করে না বরং সম্পর্কটাকে আরো গাঢ় করে। দুজনই অভিমান করে থাকলে সম্পর্ক নষ্ট হবে এটা নিশ্চিত। অন্তত একজনকে হলেও সম্পর্কটা ঠিক করার দায়িত্ব নিতে হবে। হোক তা পরীর মত রাগে নতুবা সিরিয়াসভাবে!
আজ থেকে শাদাফ পরীর সম্পর্কের সূচনা নতুন করে হলো। যেখানে দুজনই এখন উপলব্ধি করতে পেরেছে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারবে না।

সুলতানের ডাকে পিছনে ঘুরে দাঁড়ায় পরী।
~ কলেজে যাচ্ছো?
~ এত সকালে কলেজ ড্রেস পড়ে কলেজে যাবো না তো কি প্রেম করতে যাবো?
~ আমাকে ছাড়া প্রেম করতে পারবা নাকি।

~ অবাক হওয়ার কিছু নেইতো। আমি তো আগেই বলেছি যে আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তাই আমার আশা ছেড়ে দেন।

সুলতান কিছু বলার আগেই পরীর ফোনের রিংটোন বেজে উঠে। শাদাফ ফোন করেছে।
~ কোথায় তুমি?

~ এইতো বাড়ি থেকে বের হয়েছি।
~ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতেছি। তাড়াতাড়ি আসো।
~ আচ্ছা আসতেছি।
ফোন রেখে সুলতানের উদ্দেশ্যে বলে, ~ কলেজে দেড়ি হয়ে যাচ্ছে আসি।
~ তোমার ক্লাস তো ১০টায়। এখন বাজে নয়টা। এত তাড়া কিসের?
~ আসলে তাড়া হলো যে আমার সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
~ সে মানে?

~ সে মানে বফও বলতে পারেন আবার হবু স্বামীও।
~ মজা করছো?

~ আপনার সাথে কখনো মজা করেছি বলে মনে হয়না। তাই আজও করছি না।
পরী চলে যাচ্ছে। সুলতান পেছন থেকে ডাকছে। পরী থামছেনা দেখে সুলতানও পরীর পিছনে পিছনে যায়। কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায় সুলতান। পা যেন আর চলছে না। পরী শাদাফের বাইকে উঠে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে। খুব হাসাহাসি করছে দুজনে। শাদাফ হেলমেট পড়া ছিল বলে মুখ দেখতে পারেনি।

পরী ইচ্ছে করেই শাদাফকে জড়িয়ে ধরেছে। কারণ ও জানে যে সুলতান ওকে ফলো করছে। পরীর কথা বিশ্বাস করেনা বলেই ইচ্ছা করে বুঝিয়ে দিলো এই সেই ছেলে যাকে পরী ভালোবাসে। পরীর একটাই চাওয়া, সুলতান ওর পথ থেকে বিদায় হলেই বাঁচে।
সুলতানের খুব কষ্ট হচ্ছে। ছেলেদের
কাঁদতে নেই। তবুও কান্না পাচ্ছে ওর। সুলতানের বন্ধু মিঠু দৌড়ে আসে সু্লতানের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,

~ দোস্ত, ভাবিরে দেখলাম এক পোলার লগে বাইকে করে যাইতাছে। তুই কি চিনোস পোলাডারে? আমার কিন্তু মেজাজ খারাপ হইয়া যাইতাছে।
~ (চুপ)
~ কিরে? কিছু তো বল।

~ দেখছি আমি।
~ তুই দেইখাও কিছু কস নাই?

~ পরী ভালোবাসে ঐ ছেলেরে।
~ তুইও তো ভালোবাসিস ভাবিরে।

সুলতান কিছু না বলে বাড়িতে চলে যায়।
~ মা, ও মা!

~ কিরে? কি হইছে?
~ আমাদের বাসায় কতদিন ধরে কোনো পার্টি হয়না বলো তো!
~ হুটহাট আবার কিসের পার্টি করবো?
~ আজকে বেশি করে বিরিয়ানি রান্না করো। সন্ধ্যার পর আমার বন্ধুরা, শিলার বান্ধবীরা আসবো। তোমার বান্ধবী থাকলে তাদেরও আসতে বইলো।

~ হুম মা প্লিজ প্লিজ প্লিজ!
~ আচ্ছা। পাগল ছেলেটা।
সুলতান এবার শিলার ঘরে যায়।
~ কিরে কি করছিস?

~ দেখো না ছবি আঁকি।
~ হুম তা তো দেখতেই পাচ্ছি। বাসায় আজকে বিরিয়ানি রান্না হবে জানিস?
~ সত্যিই?
~ হুম। আমার বন্ধুরা আসবে। আম্মুর বান্ধবীরা আসবে।
~ তাহলে আমার আর বাবার ফ্রেন্ডসরা কি দোষ করলো ভাইয়া?
~ আরে আব্বু তো রাত ১০টায় আসবে। সেসময় কি করে বন্ধুদের নিয়ে আসবে! তবে তুই চাইলে তোর কাছের বান্ধবীদের আসতে বলতে পারিস।
~ আচ্ছা।
~ তোর পরী আপুকে ডাকবি না?
~ পরী আপু তো আমার বড়। আমার বান্ধবী নাকি!
~ বড় আপু হিসেবেও আনতে পারিস
~ আচ্ছা আনবো।

সন্ধ্যার দিকে পরী বইখাতা নিয়ে পড়তে বসে। সু্লতানের মা আসে পরীর মাকে নিতে আর শিলা আসে পরীকে নিতে। যদিও শিলা না আসতো তাহলে পরীকেও সাথে নিতো। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় সুলতানের মায়ের সাথে পরীর মায়ের বেত খাতির জমে যায়।
পরীর মা যেতে রাজি হলেও পরীর সুলতানদের বাসায় যেতে নারাজ। পড়ার বাহানা দিয়ে কথাটা কাটিয়ে দিতে চায়। কিন্তু শিলা কান্নাকাটি করছে পরীকে না নিয়ে যাবে না।
অবশেষে মায়ের জোড়াজুড়িতে যেতে রাজি হয়।

পরীর মা সুলতানের মায়ের রান্নার কাজে টুকটাক হেল্প করছে আর গল্প করছে। সু্লতান আর ওর বন্ধুরা ছাদে বক্স বাজাচ্ছে। শিলা ওর বান্ধবীদের নিয়ে রুমে গল্প করতেছে। পরীও এতক্ষণ শিলার রুমেই ছিল। কিন্তু পিচ্চিদের গল্প আর কি শুনবে! তাই পরী ড্রয়িং রুমে গিয়ে টিভি অন করে।
হঠাৎ করে সুলতান পরীর মুখ চেপে ধরে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।
~ একদম চিৎকার করো না। তাহলে কিন্তু তোমারই ক্ষতি। আর চিৎকার করলেও আওয়াজ কারো কানে যাবে না, বক্সে গান চলছে। তাই সাবধান।

পরী খুব ভয় পেয়ে যায়। যতই রাগী হোক আর যাই হোক পরী একটা মেয়ে। নিজের মান~ সম্মানের ভয় সব মেয়েই পায়। পরী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
~ আমাকে এই ঘরে এনেছেন কেন? আর দরজাই বা লাগিয়েছেন কেন?
সুলতান একটা সিগারেটের ধরাতে ধরাতে বলে,
~ ভয় পেয়ো না। তোমার সম্মান নষ্ট হবে এমন কোনো কাজ আমি করবো না। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সুলতান পরীর দিকে এগিয়ে যায়। ডান হাতটা কাছে আনে।
~ আপনি আমার হাত ধরছেন কেন? হাত ছাড়েন বলছি।
সুলতান কিছু বলে না। খুব যত্নসহকারে কিছুক্ষণ হাতের দিকে তাকায়। এরপর পরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ এই হাত দিয়েই বাইকে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরেছিলে তাই না?
পরী সুলতানের চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পায়। চোখ দুটো পানিতে চিকচিক করছে। যেকোনো সময় চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়বে।

~ কি হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো? এই হাত দিয়েই তো!
কাঁপা কাঁপা গলায় পরী বলে,
~ আআমার হাত ছাড়েন বলছি!
সুলতান কিছু না বলে পরীর মুখ একটা ওড়না দিয়ে বাঁধে। বাম হাত আর পা চেয়ারের সাথে বাঁধে। জোরাজুরি করেও সুলতানের সাথে শক্তিতে পেরে উঠেনা পরী। কয়েকবার চিৎকারও করে কিন্তু শব্দ ঘরের বাহিরে যায়না। জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে পরীর ডান হাতে ছ্যাক দিচ্ছে সুলতান। পরীর দম ফাঁটা আর্তনাদ কেউ শুনে না।

টপটপ করে পানি পড়ছে পরীর চোখ থেকে। সুলতান সিগারেটের ছ্যাক দিচ্ছে আর বলছে,
~ বলেছিলাম না তুমি শুধু আমার! তবুও অন্য কাউকে কি করে ভালোবাসো তুমি? আমি তো এটা মানতে পারবো না। সহ্য হবেনা আমার। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে জান? কষ্ট পেয়ো না আর একটু সহ্য করো। পোড়ার জ্বালা খুব তাই না? আমারও তখন ভেতরে পুড়ে যাচ্ছিল যখন তুমি ঐ ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।

কথাগুলো বলতে বলতে সু্লতানও কাঁদছিল।
সিগারেট পুরোটা শেষ হওয়া অব্দি ছ্যাক দেয় পরীর হাতে। এরপর একটা ব্লেড নিয়ে নিজের হাত নিজেই ক্ষত~ বিক্ষত করে সুলতান।
রক্ত দেখে আরো ভয় পেয়ে যায় পরী।

পর্ব ১০

পরীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়েই যাচ্ছে। সুলতান পরীর মুখের বাঁধনটা খুলে দেয়। পরীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।
~ তোমাকে কষ্ট দিতে আমার একদম ভালো লাগেনা পরী। তোমার চোখের পানিও আমার সহ্য হচ্ছে না। তাইতো দেখো নিজের হাত নিজেই কেমন ক্ষত~ বিক্ষত করলাম। কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি স্যরি বলবো না। কেন জানো? কারণ এটা তোমার প্রাপ্য ছিল। তুমি কেন ঐ ছেলেকে জড়িয়ে ধরলে!

পরী চুপ করে আছে। পায়ের বাঁধণ খুলতে খুলতে বললো,
~ যেই ভুলটা করেছো আজ। এই ভু্লটা যেন আর না হয়। তুমি শুধুই আমার। আমি যদি তোমাকে না পাই তাহলে অন্য কেউও তোমাকে পাবে না বলে রাখলাম।
চোখের পানি মুছে দিতে গেলে পরী মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। জোর করেই পরীর দুইগালে হাত রেখে কপালে চুমু খেতে এগোতেই পোড়া হাত দিয়েই থাপ্পড় দেয় সুলতানকে।

~ অনেকদিন আর অনেকক্ষণ ধরেই তোর এইসব পাগলামি আমি সহ্য করতেছি। আসলে আমারই ভুল ছিল। যেই থাপ্পড় টা আজ তোকে দিলাম এটা আরো আগেই দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কি করবো বল, আমি তো মেয়ে! আমার সম্মানের ভয় অনেক বেশিই। কিন্তু আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেছি তোর এসব আচরণে।

প্রথম প্রথম তোর বলা কথাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই নিতাম। কারণ কেউ কাউকে ভালোবাসতেই পারে এটা দোষের কিছুনা। কিন্তু এখন তো দেখছি তুই একটা সাইকো। আর একজন সাইকো কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতে পারে না।
তোর মাকে বলবি একজন ভালো সাইকিয়াট্রিকের পরামর্শ নিতে। নয়তো অতি শিঘ্রয় তোকে পাবনায় এডমিট হতে হবে।

আর একটা কথা, তুই কি ভেবেছিস, সিগারেটে দিয়ে হাত পুড়িয়ে দিয়েছিস বলে আমি ভয়ে তোকে ভালোবাসবো? এটা যদি ভেবে থাকিস তাহলে প্লিজ ভুলে যা। তোর মত অমানুষকে দয়া করা যায়, ভালোবাসা যায় না। আমি শাদাফকে ভালোবাসি আর শাদাফকেই বিয়ে করবো।

যদি মানুষ হয়ে থাকিস তাহলে আমার পথে আর কাঁটা হয়ে দাঁড়াস না কখনো। মনে রাখিস, তোর ঘরেও কিন্তু তোর একটা বোন আছে। তোর বোনের সাথে কেউ এমন করলে নিশ্চয় এতক্ষণে তাকে মেরে কবরে শুইয়ে রাখতিস? ভয় নেই তোর এই অপকর্মের কথা আমি কাউকে বলবো না। কেন জানিস?
সুলতান এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় পরীর দিকে।

~ উহু! এটা ভালোবাসা ভাবিস না আবার। ঐযে বললাম তোর মত সাইকোকে দয়া করা যায়। আমি তোকে দয়াই করে গেলাম।
পরী কাউকে কিছু না বলেই দৌড়ে ওদের বাসায় চলে যায়।
হাতটা জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে হাতটা ড্রেসিং করে।
~ এ কোন অভিশাপ আসলো আমার জীবনে!

রাত নয়টা নাগাদ পরীর মা বাসায় আসে।

~ পরী
~ হ্যাঁ মা বলো।
~ কিরে, না বলে চলে আসলি কেন?
~ কত পড়া বাকি ছিল জানো? ঐখানে বসে থাকলে কি আমার পড়াগুলো কমপ্লিট হতো বলো? তাই বাসায় চলে এসেছি।
~ আমাকে বলে আসতে পারতি। কত ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি।
~ তোমরা মায়েরা না কেমন জানি! অল্পতেই ভয় পেয়ে যাও। তুমি আন্টির সাথে রান্নায় ব্যস্ত ছিলে বলেই তোমাকে আর বিরক্ত করতে যাইনি।

~ এখানে বিরক্তর কি হতো শুনি?
~ উফফ মা! তুমি না বড্ড প্রশ্ন করো আজকাল। আমার না ক্ষুধা পেয়েছে খুব। কিছু খেতে দাও।
~ আনছি।

প্রায় ১৭ দিন পর শাদাফ জরুরী কথা আছে বলে, দেখা করতে বলে।
কয়েকটা ক্লাস করে শাদাফের সাথে দেখা করতে যায়।
~ কি এত তাড়া কেন?
শাদাফ চুপচাপ বসে আছে।
~ কি হলো?

~ একটা খারাপ খবর আছে।
পরীর মুখটা শুকিয়ে যায়। শাদাফ একটু হাসলো।
~ খারাপ খবর?
~ ভালো খবরও আছে।
~ কি?
~ আগে ভালো খবর দিবো নাকি খারাপ খবর?
~ ভালো খবরই দাও! না না আগে খারাপ খবর।
~ আমি আর ১সপ্তাহের মধ্যে ইংল্যান্ডে যাচ্ছি।

~ কিহ্! কেন?
~ বিজনেসের জন্য। সাথে রওশানও যাবে।
~ কয়দিনের জন্য?
~ কয়দিন না বলো কয় বছর!
পরীর মনটা খারাপ হয়ে যায়। শাদাফ পরীর হাত ধরে নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।
~ আমার দিকে তাকাও।
~ হুহ!
~ আরে তাকাও না!
~ তাকিয়ে কি হবে? মায়া বাড়িয়ে কষ্ট দিবে?
~ এজন্য কি আমার দিকে তাকাবেও না!
~ না, না, না!
~ খুব তাড়াতাড়িই চলে আসবো।

~ কত তাড়াতাড়ি শুনি?
~ ১ বছর তিন মাস।
~ ১ বছর! আবার তিন মাস! এটা খুব তাড়াতাড়ি?
~ আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না?
~ পারবো। কিন্তু আমার অনেক কষ্ট হবে তোমাকে ছাড়া থাকতে।
~ কষ্ট তো আমারও হবে গো। আচ্ছা এবার ভালো নিউজটা শুনবে না?
~ হু
~ আমি চাচ্ছিলাম, চলে যাওয়ার আগে তুমি আর আমি মিলে কোর্ট ম্যারেজ করে আসি।
~ কেন? তুমি আর আমি কেন?

~ ইংল্যান্ড থেকে এসে পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবো।
~ আমি ১ বছর ৩মাস অপেক্ষা করতে রাজি আছি। কিন্তু এভাবে লুকিয়ে বিয়ে করতে পারবো না।
~ প্লিজ পরী! নয়তো আমার প্রতিটা মুহুর্তে তোমাকে হারানোর ভয়ে থাকতে হবে। তার মধ্যে আবার ঐ সুলতান। আমি শান্তি পাবো না।
~ আমায় বিশ্বাস করো তো?
~ করি।
~ তাহলে ভয় পেয়ো না। আমি শুধুই তোমার। আর তোমারই থাকবো।
~ ভালোবাসি পরী। প্লিজ কখনো আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা।
~ যাবোনা। আমিও যে অনেক ভালোবাসি তোমাকে।

এক সপ্তাহ পর শাদাফ আর রওশান ইংল্যান্ডে চলে যায়।
সারাদিন কলেজ, পড়াশোনা আর দিনশেষে শাদাফের সাথে রাতে কথা বলা।
এভাবেই কাটছিল শাদাফ আর পরীর সম্পর্ক।

ঐদিনের পর আর সুলতানকে দেখেনি পরী। এটা নিয়ে পরী সন্তুষ্ট হয় এটা ভেবে যে “মনুষ্যত্ববোধ আছে তাহলে সাইকোটার”
এভাবে কেটে যায় ১০টা মাস। আর ৫মাস পরই শাদাফ আসবে। এটা ভেবেই যেন আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরী।
ভিডিও কলে কথা বলছিল দুজনে।

~ দেখছো সময় কেমন করে চলে যাচ্ছে দেখতে দেখতে!
~ কেন মিষ্টার? তুমি মনে হয় খুশি না।
~ কি বলো এসব? আমি অস্থির হয়ে আছি। কবে দেশে যাবো, আমার পরীটাকে বুকে জড়িয়ে নিবো। লাল টুকটুকে শাড়ি পড়িয়ে আমার বাড়ি নিয়ে যাবো।
~ এহ্! আমি শাড়ি পড়বোনা।

~ তাহলে কি পড়বা?
~ আমি লেহেঙ্গা পড়বো।
~ না, শাড়ি আমার অনেক পছন্দের। তুমি শাড়িই পড়বা।
~ ধুর কচু! শাড়িটাড়ি সামলানো অনেক কষ্টের।
~ আমি আছি না?
~ তুমি কি করবে শুনি?

~ কেন তোমার শাড়ি ঠিক করে দেবো।
~ পাগল! আচ্ছা যাও তোমার কথাই থাক। শাড়িই পড়বো।
~ লাভ ইউ বউটা।
~ লাভ ইউ টু।

ডাটা অন করেই পড়ছিল পরী। শাদাফ টেক্সট করেছে,
~ কই গো তুমি?

ফোনের স্ক্রিনে শাদাফের টেক্সট দেখে বইটা বন্ধ করে অনলাইনে যায়।
~ এইতো আমি।
~ কোথায় ছিলে?
~ পড়তেছিলাম।
~ পড়া শেষ?
~ না।

~ তাহলে অনলাইনে আসলে কেন?
~ তোমার জন্য।
~ যাও যাও, আগে তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করো।
~ পরে পড়বো। বলো কি বলবে?
শাদাফ একটা কাপলের ছবি সেন্ট করলো। ছবিটা বিয়ের। ছেলে মডেল পাঞ্জাবি পড়া আর মেয়ে মডেল লেহেঙ্গা পড়া।

~ কিগো? বিয়ের ছবি কেন?
~ অনলাইনে মেয়েদের বিয়ের শাড়ি দেখছিলাম তোমার জন্য।
~ এখনই কেন? অনেক সময় তো পরে আছে।
~ তাতে কি? দেখে রাখতে তো সমস্যা নেই। আচ্ছা ঐ কথা বাদ দাও, আমার কথা শুনো।
~ বলো।

~ মেয়েটা কি ড্রেস পড়েছে ওটা?
~ লেহেঙ্গা।
~ তুমি কি এগুলার কথাই বলেছিলে?
~ হ্যাঁ।
~ ড্রেসটা অনেক সুন্দর না?

~ হ্যাঁ কিন্তু আমি তো বিয়েতে শাড়ি পড়বো।
~ না, না শাড়ি তো বিয়ের পর থেকে পড়বেই। বিয়েতে লেহেঙ্গা পড়বা।
~ এমা! তুমিই না সকালে বললে শাড়ির কথা।
~ তখন কি জানতাম নাকি লেহেঙ্গা এত সুন্দর। তুমি তো এমনিতেই পরী, তখন আরো পরী পরী লাগবে।
কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
~ কি সমস্যা?
~ দেখো পেট দেখা যাচ্ছে।

~ তাতে কি হয়েছে?
~ কি হয়েছে মানে? আমার বউর পেট অন্যরা দেখবে নাকি?
~ আমি কি পেট বের করে রাখবো নাকি।
~ হু একদম যেন দেখা না যায়।
পরী মুচকি মুচকি হাসছে আর টেক্সট করছে।
~ আচ্ছা, ঠিক আছে।

~ মা~ বাবাকে তোমার বাসায় পাঠাবো।
~ কিহ্! কবে?
~ খুব তাড়াতাড়িই। বিয়ের কথাটা পাকা করে আসতে বলবো।
~ তুমি তো থাকবে না।
~ আমি তো আসবোই আর ৫মাস পর।
~ তুমি দেখতে আসবে না?

~ বাবালে! আমাকে দেখতে বুঝি খুব ইচ্ছে করছে।
~ আমার তো করেই। তোমার তো আর ইচ্ছে করেনা কারণ আমি তোমাকে বেশি ভালোবাসি।
~ তাই? আচ্ছা বিয়ের পর দেখাবো কে বেশি ভালোবাসে।
~ হুহ।

“মনে হচ্ছে আজকাল খুব খুশিতেই আছো” কথাটা শুনে পিছনে ঘুরে দাঁড়ায় পরী।
~ আপনি!
~ হ্যাঁ আমি। চিনতে পারছো না? আমি সু্লতান।
পরী কিছু না বলে চুপ করে আছে।

~ ভাবছো এতদিন পর কোথা থেকে আসলাম?
জানি, তুমি এটাই ভাবছো। সেদিন তোমার বলা প্রতিটা কথা আমার মনে দাগ কেটে গিয়েছে। একটা জিনিস আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছি যে তোমাকে কাবু করা এত সহজ নয়। তাই ভাবলাম তোমাকে বিয়ে করতে হলে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে। আর আমি করলামও সেটা। কি করলাম জানো?

ভালো একটা চাকরীর জন্য ঘুরছিলাম। আব্বুকে জানালাম, আমি কাজ করতে চাই। তুমি হয়তো জানোই যে আমার বাবা একজন আর্মি অফিসার। বাবা তো ট্রান্সফার হয়ে ময়মনসিংহ থাকে। আমি কাজ করবো শুনে আব্বু অনেক বেশিই খুশি হয়। কারণ এত চেষ্টা করেও আব্বু অথবা মা কেউই আমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাতে পারেনি। সেখানে আমি নিজে থেকে বলেছি কাজ করবো। আব্বু আমাকে ময়মনসিংহ যেতে বললো।

আজ আমিও একজন প্রতিষ্ঠিত আর্মি।
এতকিছু কেন করেছি জানো? তোমার জন্য। একজন গুন্ডা ছেলের হাতে কোনো বাবা~ মা মেয়ে তুলে না দিলেও একজন প্রতিষ্ঠিত ছেলের হাতে নিশ্চয়ই তুলে দিবে?
~ ভালো। আপনার উন্নতি দেখে আমি খুবই খুশি হয়েছি। আমার জন্য হলেও যে কেউ একজন প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে এটা জেনে খুবই ভালো লাগলো। এবার একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিন।
সুলতান জোরে শব্দ করেই হাসলো।

~ হাসির কি হলো?
~ হ্যাঁ বিয়ে করবো তো! টুকটুকে একটা পরীর মত বউ আনবো।
সুলতানের চোখে~ মুখে রহস্যের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পেলো পরী।
সু্লতান আর কিছু না বলে চলে গেল।

পরবর্তীতে অবশ্য সুলতান আর আগের মত বিরক্ত করেনি পরীকে। কিন্তু পরীর চোখের সামনে সুলতানের রহস্যময় চেহারাটা ভেসে উঠছে।
~ আবার কোনো নতুন চাল চালছে নাতো!

আগামীকাল শাদাফের বাবা~ মা আসবে পরীকে দেখতে।
এটা নিয়ে পরী খুব নার্ভাস। কিভাবে যাবে তাদের সামনে। কি কি প্রশ্ন করবে। কি উত্তর দিবে।
পরীর এমন নার্ভাস হওয়ার কথা শুনে শাদাফ হাসতে হাসতে শেষ।
~ এভাবে হাসছো কেন তুমি?

~ তোমার অবস্থা দেখে।
~ হুহ! তোমার আর কি। তোমাকে তো আর দেখতে যাবে না।
~ এত নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই পরী।
~ তুমি তো বলেই খালাস! আমার নার্ভাস তো আর কমছে না।
~ আচ্ছা শুনো না!
~ বলো
~ তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
~ কি?
~ এখন তো বলা যাবে না।
~ তাহলে কখন বলবে শুনি?
~ যখন সারপ্রাইজ দিবো
~ আচ্ছা অপেক্ষায় রইলাম।

পরেরদিন শাদাফের বাবা~ মা, ভাই~ ভাবিরা দেখতে আসে পরীকে।
পরী আজ সোনালী পাড়ের একটা লাল খয়েরী জামদানী শাড়ি পড়েছে। মাথায় একটা লম্বা ঘোমটা দিয়েছে।
পরীর হাতে শরবতের ট্রে দিয়ে তাদের সামনে নিয়ে যায় পরীর বড় বোন।
পরীর লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে! এত লজ্জা আল্লাহ্!
শাদাফের পরিবারের সবাই পরীকে দেখে খুব খুশি। পরীর লম্বা চুল সকলের মন কেড়ে নিয়েছে।
শাদাফ আসলে তারা আবার আসবে আর বিয়ের দিন~ তারিখ ঠিক করবে বলে সেদিনের মত মিষ্টিমুখ করে বিদায় নিলো তারা।

তারা যাওয়ার পর ভালোই চলছিল দুজনের সম্পর্ক। শাদাফের ফোন আসে। নাম্বার দেখে অনেক অবাক হয় পরী। কারণ এটা শাদাফের আগের নাম্বার। নাম্বারটা বাংলাদেশের। পরী ফোন রিসিভ করলো।
~ হ্যালো
~ পরী?
~ হ্যাঁ। তুমি বাংলাদেশের নাম্বার দিয়ে কিভাবে ফোন করলে?
~ গতকাল আমি ইংল্যান্ড থেকে এসেছি।

~ অথচ আমাকে একবার জানালেও না? ওহ হো! বুঝেছি এটাই তোমার সারপ্রাইজ তাই না? এভাবে কেউ সারপ্রাইজ দেয়? না বলেই যখন এসেছো তখন দেখা করেই সারপ্রাইজ দিতে।
শাদাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সিরিয়াসভাবে বলে,
~ কাল একটু দেখা করতে পারবে?

~ পারবো। কিন্তু তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? কি হয়েছে?
~ কালই বলবো। রাখছি এখন।
~ যাহ্ বাবা! কি হলো ওর!
পরীর মা ঘরে আসে।

~ কিরে কি করছিস একা ঘরে?
~ কিছুনা। কিছু বলবে?
~ সুলতানের বাবা আর বোন আসছে। তুই গিয়ে ওদের একটু সঙ্গ দে। আমি চা বানিয়ে আনছি।
~ আচ্ছা।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে সুলতানের বাবাকে সালাম দেয়।
~ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল।

~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো মা?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ আঙ্কেল। আপনি কেমন আছেন?
~ আল্লাহ্ রাখছে একরকম। অনেকদিন পর গতকাল বাড়িতে আসছি। শিলা বায়না ধরলো আমাকে নিয়ে তোমাদের বাসায় আসবে, তাই আসলাম আরকি!
~ ভালো করেছেন আঙ্কেল।
আরো অনেক কথাই বলছিল তারা পরেরদিন পরী একটা নীল শাড়ি পড়ে। শাদাফ শাড়ি অনেক পছন্দ করে। এতদিন পর দেখা হচ্ছে। নিশ্চয় শাড়ি পড়া দেখে চমকে যাবে।
দূর থেকে দেখতে পায় শাদাফ পুকুরের পাড়ে বসে আছে আর পানিতে ছোট ছোট ইটের টুকরো ঢিল মারছে।

পরী আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে শাদাফের কাছে যায়। পেছন থেকে শাদাফের চোখ দু’হাত দিয়ে আটকে ধরে। শাদাফ পরীর হাত ধরেই বলে,
~ ছাড়ো পরী।
~ ধুর!, বুঝে ফেললে।

চোখ খোলার পর শাদাফ পরীর দিকে একবার তাকিয়ে আবার পানির দিকে চোখ স্থির করলো। পরী অবাক হলো। যে ছেলে শাড়ির জন্য পাগল। সে কিছুই বললো না। মুখটা কেমন মলিন।
~ তোমার কি মন খারাপ?
~ না।
~ তাহলে?
~ কিছুনা।

~ মিথ্যা বলবানা একদম। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তোমার মন খারাপ।
পানি থেকে চোখ সরিয়ে এবার পরীর চোখের দিকে তাকালো শাদাফ।
~ আমাকে ভুলে যাও!

~ মানে? কি বলছো এসব?
~ ঠিকই বলছি।
~ কি হয়েছে তোমার? এসব কেন বলছো? মজা করছো তাই না?
~ না। আমি সিরিয়াস।
~ মানে কি এসবের?

~ আমার বাবা~ মা এই বিয়েতে রাজি না। তারা অন্য মেয়ে দেখেছে।
~ ফাইজলামি করতেছো তুমি আমার সাথে?
~ বুঝতে চাইছো না কেন? আমি সিরিয়াস। জানি কথাগুলো হজম করতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমার কিছু করার নেই পরী। আমি আমার বাবা~ মাকে কষ্ট দিতে পারবো না। তুমি কি পারবে তোমার বাবা~ মাকে কখনো কষ্ট দিতে? জানি পারবে না। কারণ আমরা দুজনই আমাদের বাবা~ মাকে অনেক ভালোবাসি। তাদের অমতে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবোনা। ক্ষমা করে দিয়ো আমায়।

পরী এতক্ষণ বিষয়টা মজা ভেবে নিলেও এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে, শাদাফ কোনো মজা করছে না। কিন্তু ও কিভাবে অবলীলায় কথাগুলো বলছে!
পরী শাদাফের ডান হাতটা পেঁচিয়ে ধরে।

~ প্লিজ শাদাফ আমার সাথে এমন করো না। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। অনেক ভালোবাসি তোমাকে। তুমি তোমার বাবা~ মাকে একটু বুঝাও। তারা নিশ্চয় বুঝবে।
পরীর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে শাদাফ বললো,

~ বুঝিয়েছি। আসার পর থেকে অনেক বুঝিয়েছি। লাভ হয়নি। তারা চায়না এই বিয়ে হোক। আমি তাদের মতের বিরুদ্ধে যেতে পারবোনা। আমাকে ভুলে যাওয়াই উত্তম তোমার জন্য।
পরীকে আর কিছু বলতে না দিয়ে শাদাফ চলে যাচ্ছে। পরীর চোখ থেকে পানি পড়ছে। হাতা~ পা অনবরত কাঁপছে। তবুও পরী শাদাফের পিছনে দৌড়ানো শুরু করে।

~ প্লিজ শাদাফ। আমার কথা শুনো দাঁড়াও। শাদাফ এমন করো না প্লিজ!
শাদাফ পিছন ঘুরে তাকায় না, দাঁড়ায়ও না। আশেপাশের মানুষ অবাক চোখে দেখছে পরীর কান্ড কিন্তু সেদিকে পরীর কোনো ভাবান্তর নেই। শাড়ি বারবার পায়ে পেঁচিয়ে যাচ্ছে তবুও দৌড়াচ্ছে। পরেরবার শাড়িতে পাড়া লেগে মাটিতে পড়ে যায়। প্রচন্ড রকম ব্যথা পেয়েও কোনোরকমে উঠে দাঁড়ায়। ততক্ষণে গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে আড়াল হয়ে যায় শাদাফ। দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তার মাঝখানে চলে আসে পরী। পানিতে চোখ দুইটা ঝাপসা হয়ে আসছে।
আচমকা চলন্ত একটা রিক্সার সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে পরী!

পর্ব ১১

পরী পড়ে যাওয়ায় রাস্তায় বেশ কয়েকজন মানুষ এগিয়ে আসে। ছোটখাটো একটা ভীর হয়ে যায় সেখানে। কয়েকজন রিক্সাওয়ালাকে মারতে গেলে পরী একটু চেঁচিয়েই বলে,
~ উনাকে কেউ মারবেন না প্লিজ। তার কোনো দোষ নেই। আমিই তার রিক্সার সামনে চলে এসেছি।
পরীর এমন কাণ্ড দেখে আশেপাশের লোকজন অবাক হয়। কয়েকজন তো বলাবলিও করছে, “নিজে বাঁচে না আবার রিক্সাওয়ালারে মারতে না কয়”

কয়েকজন মহিলা পরীকে ধরে তুলতে গেলে ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠে পরী। শেষে একটা ছেলে কোলে করে গাড়িতে উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসে। ক্ষতি তেমন না হলেও কম হয়নি।
ডান হাতের কনুইতে বেশ খানি কেটে গিয়েছে। শাড়ির সাথে পেঁচিয়ে পড়ে যাওয়ায় হাঁটুতে ছিলে গেছে। পা~ ও অনেকক্ষানি কেটেছে। ডাক্তার হাত পা ভালোমত ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। ঐ ছেলেটাই সব খরচ মিটিয়ে পরীর কাছে আসে।
~ কোথায় যাবেন আপনি?

~ আপাতত এখন বাড়ি ছাড়া আর কোথায় যাবো।
~ আপনি তো একা যেতে পারবেন না। চলুন আমি দিয়ে আসি।
কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছে পরী। শাড়ির কুঁচি খুলে গিয়েছে। বাম হাত দিয়ে কুঁচিগুলো পেটের সাথে চেপে ধরে আছে। ছেলেটা হাত ধরে উঠাতে গেলে পরী বাঁধা দেয়।
~ না প্লিজ
~ কি হলো?
~ না মানে, ডাক্তারকে তো টাকা দিতে হবে। আমার পার্সে দেখুন টাকা আছে। বিল যা হয় দিয়ে আসুন।
~ আমি এতটাও ইররেসপন্সিবল না। টাকা না দিয়েই কি আপনাকে দিয়ে আসতে যাচ্ছি নাকি। টাকা আমি দিয়ে এসেছি।

~ আপনি কেন দিবেন? আচ্ছা টাকা যা হয়েছে আমার ব্যাগ থেকে নিয়ে নিন।
~ আজ যদি আমার বোন বা কাছের কেউ এক্সিডেন্ট করতো তাহলে নিশ্চয় তার থেকে আমি টাকা নিতাম না? সো লিভ ইট!

পরী কি করবে বুঝতে পারছেনা। একদিকে শাড়ির কু্ঁচি অন্যদিকে ছেলেটাকে কিছু বলতেও পারছে না। অবশেষে একজন নার্সকে ডেকে এনে কুঁচিগুলো ভালোমত গুঁজে নেয়।
পরীকে ধরে একটা গাড়িতে উঠিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। ছাদ থেকে শিলা দেখেছে পরীর হাতে আর পায়ে ব্যান্ডেজ। দৌড়ে গিয়ে ওর মাকে বলে কথাটা। সুলতান তখন খাচ্ছিলো। শিলার কথা শুনে খাবার রেখে দ্রুত পরীর বাসায় যায়। সাথে শিলা আর ওর মা।

~ কোথায় গিয়েছিলি তুই? আর এসব হলো কিভাবে?
পরীর মায়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিচ্ছে না। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। কিন্তু এই কষ্টটা এক্সিডেন্টের নয় বরং শাদাফের। বাড়িতে কি করে জানাবে যে শাদাফ আর আমাকে ভালোবাসে না!
শিলার মা ঘরে এসে বলে,

~ পরীর কি হয়েছে ভাবি?
এবার আর পরীর মা কান্না আটকে রাখতে পারলো না। হাউমাউ করে কান্না করে দিলো।
~ এতবার করে বলি যে সাবধানে চলবি রাস্তাঘাটে তবুও আমার কোনো কথা শুনেনা। যদি আজকে বেশিকিছু হয়ে যেত!

দুজনে কথা বলছিল। শিলা আগে গিয়েই পরীর পাশে বসে আছে। সুলতান এবার এক পা দু পা করে এগোচ্ছে। পরীর পায়ের কাছে বসে। অনেকটা সরারসরিই। মাথা নিচু করে চোখের পানি ফেলছে আর সু্লতান পরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
সুলতান কিছু বলছে না। কি বলবে বা কি বলা উচিত সেটাও বুঝতে পারছে না।
৫/৬ মিনিটের মত বসে সুলতান চলে যায়।

পাঁচটা তেইশ মিনিট
বাবা~ মা আর ভাবির সাথে মেয়ে দেখে বাসায় ফিরলো মাত্র। মেয়েকে সবার মোটামুটি ভালো লাগলেও পছন্দ হয়নি শাদাফের। বুকটা কেমন যেন চিনচিন করছে। এক অজানা ভয় কাজ করছে। কি হচ্ছে বা কি হতে যাচ্ছে বুঝতে পারছে না কিছু।
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় শাদাফ। চোখটা বন্ধ করতেই চলে যায় অতীতের স্মৃতিতে।

~ শুনো, তুমি যখন বাবা~ মার সাথে আমাকে দেখতে আসবে তখন কিন্তু আমি শাড়ি পড়বো।
~ সেটা তুমি না চাইলেও জোর করে পড়াতাম।
~ এহ্! তুমি মনে হয় শাড়ি পড়িয়ে দিতে।
~ এমন ভাবে বলছো কেন? আমি মনে হয় শাড়ি পড়াতে জানিনা!
~ সত্যিই তুমি শাড়ি পড়াতে পারো?
~ হ্যাঁ।

~ কে শিখালো?
~ কেউ না। ইউটিউব দেখে একা একাই শিখেছি।
পরী ভ্রু কুঁচকে শাদাফের দিকে তাকায়।
~ ইউটিউব দেখে?
পরীর এমন লুক দেখে বিষয়টা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে শাদাফের। এরপর চট করেই বলে,
~ এই না, না! তুমি যেটা ভাবছো তা নয়। কোনো মেয়ে পড়ছিলো না তো, পুতু্লকে পড়াচ্ছিলো।
~ তাই বলো!

~ কোনো মেয়েকে পড়তে দেখলে কি হতো?
~ তাহলে আর কোনোদিন শাড়িই পড়তাম না।
~ জেলাস?
~ মোটেও না হুহ!
শাদাফের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে ওঠে, সেই সাথে চোখের কোণা দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে।

~ আমি কি এটা ঠিক করছি পরীর সাথে! কিন্তু আমারই বা কি করার আছে। এত কষ্ট করে বাবা~ মা বড় করেছে সেই আমি কি করে তাদের কষ্ট দিবো। কি করেই বা তাদের অমতে আমি পরীকে বিয়ে করবো। কয়েক বছরের ভালোবাসার জন্য এতগুলো বছরে বাবা~ মায়ের ভালোবাসার প্রতিদানে কষ্ট কি করে দিবো আমি!
~ শাদাফ!
ভাবি ঘরে প্রবেশ করতেই চোখের পানি মুছে নেয়।
~ এসো ভাবি।
~ মন খারাপ?

~ না। কিছু বলবে?
~ হুম। আজ যে মেয়েটাকে দেখলে কেমন লাগলো তাকে?
~ বাবা~ মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ।
~ তবুও, তোমারও তো একটা পছন্দ অপছন্দ আছে!
~ সত্যিই কি আমার পছন্দের কোনো দাম আছে ভাবি?
~ পরীর জন্য কষ্ট হচ্ছে তাই না? দেখো বাবা~ মা যা করে ভালোর জন্যই করে।
~ কেমন ভালো ভাবি? আর্থিক অবস্থাই কি সব? ওর আর্থিক অবস্থা ভালো না তাতে কি মেয়ে তো ভালো। কিন্তু বাবা~ মায়ের কাছে সম্পত্তিই সব!

শাদাফের মা হাতে কিছু ছবি নিয়ে আসে।
~ ভুল বুঝিস না আমাদের। আর্থিক অবস্থা খারাপ শুধু এটাই কারণ না বিয়েটা না মানার।
~ তাহলে আর কি কারণ?

~ পরীর চরিত্র ভালো না। এলাকায় ওর বিষয়ে খবর নিয়েছিলাম। কার সাথে নাকি ওর সম্পর্ক আছে। যেই মেয়ে তোর সাথে সম্পর্ক করেও অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারে সে কি বিয়ের পর তোকে ছেড়ে চলে যেতে দু’বার ভাববে?

~ আমি এটা বিশ্বাস করিনা মা। পরী এমন হতেই পারে না।
~ তোর বিশ্বাস বরং তোর কাছেই থাক। তুই তো এখন ওর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিস। তাই ওর ভালো ছাড়া খারাপ দিক তোর চোখে পড়ে না। তোর কাছে পরী বড় নাকি আমরা বলতো?
~ এতদিন ধরে তোমরা আমায় লালনপালন করে বড় করেছো, সেখানে তোমরাই আমার কাছে আগে।

~ তাহলে পরীর ভূত মাথা থেকে নামা। আমরা মেয়ে দেখতেছি। যাকে তোর ভালো লাগবে তার সাথেই তোর বিয়ে হবে। এই নে ধর এখানে অনেকগুলো মেয়ের ছবি আছে।
চলে যাওয়ার আগে শাদাফের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
~ কোনো বাবা~ মা তার সন্তানের খারাপ চায় না বাবা। আমরাও চাই তুই সুখী হ। তবে ভালো কারো সাথে।

পরী অনেকবার চেষ্টা করেছে শাদাফের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু সব মাধ্যম বন্ধ। ফোনটাও পর্যন্ত বন্ধ। ফেসবুকে রওশানকে নক দিলো পরী।
~ রওশান ভাইয়া
~ হ্যাঁ পরী বলো।

~ কেমন আছেন?
~ আছি তো ভালোই। তোমার কি খবর?
~ বেঁচে আছি।
~ শুনলাম তুমি নাকি এক্সিডেন্ট করেছো?
~ কে বললো?
~ জান্নাত।
~ ওহ।
~ বেশি কিছু হয়েছে কি?

~ না তেমন না। শাদাফের কি খবর?
~ তোমাদের সম্পর্ক নষ্ট হলো কেন বলো তো? ওর জন্য মেয়ে দেখতেছে।
~ আপনার বন্ধু পরিবারের অমতে আমাকে বিয়ে করতে পারবে না।
~ এমন কেন করছে ও?

~ জানিনা ভাইয়া।
~ আচ্ছা তুমি চিন্তা করো না। আমি শাদাফকে বুঝাবো।
~ হুম।
ফোনটা রেখে খাটের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে পরী। চোখ দুটো বন্ধ করে আছে। অঝোর ধারায় পানির স্রোত গাল বেয়ে নামছে। বুকের ব্যথাটা প্রবল আকার ধারণ করেছে। এই ব্যথা যে বড্ড বেশিই অসহনীয়। এই ব্যথা হারানোর ব্যথা যা হাজার কষ্টকেও বুঝি হার মানায়।
কারো স্পর্শে চোখ খুলে তাকায়। মা এসেছে।

মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
~ কাঁদিস না। ঠিকমত ওষুধ খেলেই আবার ঠিক হয়ে যাবে।
পরী কিছু না বলে চুপ করে আছে। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করছে,
~ এই ব্যথা কি সত্যিই ঠিক হওয়ার মত? তোমাকে কি করে আমার মনের ব্যথাটা দেখাবো বলো তো!
~ ধর! গরম দুধটুকু খেয়ে নে। ভালো লাগবে।

মায়ের হাত থেকে দুধের গ্লাসটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখে। হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে কোলে মাথা রেখে নিরবে চোখের পানি ফেলে।

~ এখনো মন খারাপ করে আছিস? খুব ব্যথা করছে রে মা?
~ খুব অসহায় লাগছে আমার।
~ পাগলী মেয়ে বলে কি! কিচ্ছু হবে না।
~ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আর যে কিছু বাকি নেই গো মা!
পরীর হাত ধরে উঠিয়ে বসায়।
~ কি হয়েছেরে মা?

~ শাদাফ আমাকে বিয়ে করবে না মা!
~ মানে? কেন?
~ ওর পরিবার নাকি আমার সাথে বিয়ে দিবে না। ওর জন্য অন্য মেয়ে দেখতেছে।
কথাগুলো বলার সময় কাঁদছিল পরী। এখন কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে। ঠিকমত কথা বলতে পারছে না। তাড়াতাড়ি পরীকে বুকে জড়িয়ে নেয় ওর মা।

~ মাগো! আমি যে শাদাফকে সত্যিই অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। কি করে থাকবো আমি ওকে ছাড়া? কি করে মেনে নিবো ও অন্য মেয়েকে বিয়ে করবে। বলো না মা বলো!

শান্তনা দেওয়ার মত কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না ওর মা। নিজেই এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। কি করে শাদাফ পাল্টে যেতে পারে! পরী যে মানসিকভাবে খুব আঘাত পেয়েছে সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। মেয়ের এমন কষ্টে নিজের বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে। এত অভাব~ কষ্টের মধ্যেও কখনো ছেলে~ মেয়েদের একটুও কষ্ট পেতে দেননি। গালে হাত দিয়ে আবিষ্কার করলো পানি পড়ছে তার চোখ থেকে।

পরীকে কিছু বলতে পারেননি উনি। শুধু শক্ত করে বুকে চেপে ধরেছে। যার অর্থ বুঝিয়েছেন, “কষ্ট পাস না মা। আমি আছি তোর পাশে। আমি রাখবো তোকে আগলে”
পরীকে ঘুম পাড়িয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে নিজের রুমে চলে যায় উনি।
দমটা কেমন জানি বন্ধ হয়ে আসছে। যেভাবেই হোক পরীকে এই কষ্ট থেকে উদ্ধার করতে হবে।

রাতে প্রচন্ড জ্বর আসে পরীর। মাথায় পানি দিয়ে দিচ্ছে আর চোখের পানি ফেলছে পরীর মা। পাশে পরীর খালামনি আর নানি বসে আছে। তাদের চোখও পানিতে ছলছল করছে।

কয়েকদিনেই পরীর দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। বাড়ির ছোট সদস্য যখন কষ্টে থাকে তখন পুরো বাড়িটাই যেন কষ্টের সমুদ্রে পরিণত হয়
সকাল দশটা পাঁচ মিনিট,
শিলা দৌড়ে পরীর রুমে আসে।
~ দেখো আপু আমরা তোমার জন্য কি নিয়ে এসেছি।

পরী তখনো শুয়ে ছিল। জ্বরে গা পুড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। শিলা পরীকে ধরে বসায়। পরী দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে সুলতান হাতে করে অনেকগুলো ফুসকা নিয়ে এসেছে।
সুলতান এসেই পরীর কপালে হাত দেয়। বিরক্ত হয় পরী।
~ গায়ে তো দেখি এখনো অনেক জ্বর। ঠিকমত ওষুধ খাচ্ছো?
~ হু
~ একটা খবর দেওয়ার ছিল।
~ কি?
~ সিলেটে ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছি কাল। তোমাকে অনেক মিস করবো।
পরী চুপ করে আছে।
~ শাদাফ দেখতে আসেনি তোমাকে?

এবার পরী সুলতানের দিকে তাকায়। সুলতানের চোখে~ মুখে জানার আগ্রহ।
~ কথা বলতে খারাপ লাগছে? আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তাহলে পরে আসবো কেমন। তুমি ফুসকাগুলো খেয়ো।
সুলতান চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে পরী বলে,
~ দাঁড়ান
~ কিছু বলবে?
~ শিলা তুমি ফুসকাগুলো নিয়ে মায়ের কাছে যাও। প্লেটে ঢেলে নিয়ে এসো। আমিই যেতাম কিন্তু আমার পায়ে তো ব্যথা। তাই তুমি যদি কিছু মনে করে যেতে!

~ না, না আপু কোনো সমস্যা নেই। আমিই যাচ্ছি।
প্রতিউত্তরে পরী একটু হাসলো। শিলা চলে যেতেই সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ শাদাফ এসেছিলো নাকি আসেনি সেটা কি সত্যিই আপনার অজানা?
~ আমি কি করে জানবো?
~ শাদাফ অন্য কাউকে বিয়ে করবে এটা নিশ্চয়ই জানেন?

~ না তো! এখন জানলাম।
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে পরী।
~ হাসালেন মিষ্টার! আমি জানি এইসবকিছুর পেছনেই কোনো না কোনো ভাবে আপনার হাত আছে।
~ তুমি সবকিছুতে আমাকেই কেন সন্দেহ করো বলো তো?
~ এটা কি শুধুই সন্দেহ? সত্যি নয়?
~ কিভাবে সত্যি বলো?

~ শাদাফ অন্য কাউকে বিয়ে করবে তার মানে তো আপনার পথ পরিষ্কার।
~ আমার পথ পরিষ্কার মানে?
~ শাদাফ আমার জীবনে না থাকলে আমাকে বিয়ে করাটা তো আপনার জন্য সহজ হয়ে গেল। সহজ হয়ে গেল বলছি কেন, সহজ তো আপনি করে নিলেন।
~ আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

~ তাই? আচ্ছা আমাকে ভালোবাসেন?
~ এসব বলে লাভ কি। তুমি তো আমায় ভালোবাসো না।
~ আমি যা বলেছি তার উত্তর দিলে খুশি হবো।
~ হ্যাঁ ভালোবাসি।
~ তাহলে আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেন তো যা হয়েছে এর কিছুই আপনি জানেন না?
সুলতান কিছু না বলে চলে যাওয়া ধরলো।

~ আমার কসম লাগে, এভাবে উত্তর না দিয়ে চলে যাবেন না!
সুলতান থমকে দাঁড়ায়। পেছন ঘুরে পরীর কাছে এসে বসে। অনেকটা কাছে।
~ তুমি অনেক ব্রিলিয়ান্ট পরী!
পরী চুপচাপ সুলতানের দিকে তাকিয়ে আছে।
~ আমি তোমার মাথায় হাত রেখে মিথ্যা বলতে পারবো না। তাই এড়িয়ে চলে যাচ্ছিলাম কিন্তু সেখানেও তুমি তোমার কসম দিয়ে দিলে। কসম কাটা ভালো না, জানো না?
~ আমার উত্তর?

~ ভেবেছিলাম এঙ্গেজডের পর সব তোমায় বলবো। কিন্তু তার আগেই ঠিক ধরে ফেললে সত্যিটা। হ্যাঁ, এসবের পিছনে কিছুটা হাত আছে আমার। স্বভাবতই বিয়ের আগে দুই পরিবারই এলাকায় মানুষজনের কাছে খোঁজখবর নেয় মেয়ে বা ছেলেটা কেমন।

ব্যাস, এই সুযোগটাই আমি কাজে লাগালাম। নিজের পরিচয় লুকিয়ে শাদাফের বাবা~ মাকে জানালাম তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কথা। প্রমাণ হিসেবে আমার কয়েকজন বন্ধু বান্ধবীকে সাক্ষী বানালাম। শাদাফের এলাকায় আমি খোঁজখবর নিয়ে শুনেছিলাম শাদাফ খুব ভালো একটা ছেলে আর ভীষণ মা ভক্ত। কাজেই এটা শিওর হয়ে গেলাম যে, ওর পরিবার মেনে না নিলে শাদাফও তোমাকে বিয়ে করবে না।
রাস্তাটা আমার পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার মাকে দিয়ে তোমার মায়ের কাছে প্রস্তাব পাঠালাম আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

তোমার বাবা~ মাও সবকিছু বিবেচনা করে রাজি হয়ে গেলো। তবে অবশ্যই বিয়ের কথাটা জানিয়েছিলাম তোমাদের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পর।
মেয়ের এমন কষ্ট কোনো মা~ ই মেনে নিতে পারবে না। বিয়ে দিলে হয়তো সব কষ্ট ভুলে যাবে, এইভেবে বিনাবাক্যে রাজি হলো তোমার মা। তাছাড়া আমার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস ভালো, আর্থিক অবস্থা ভালো। আমিও এখন আর গুণ্ডা বাউণ্ডলে নই বরং একজন আর্মি। এমন সুপাত্রের হাতে আদরের কন্যাকে কে আবার না তুলে দিবে বলো তো?

প্রচন্ড জ্বর থাকায়, পরীর গায়ে শক্তি ছিল না এক ফোঁটাও। কিন্তু এসব কথা শোনার পর পরীর কান গরম হয়ে আসছিল। সু্লতানকে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। সুলতান হেসে ফেলে।
~ তুমি মারলেও মনে হয় আমি তোমার ভালোবাসা খুঁজে পাই। এটা তো এবার বিশ্বাস করো, তুমি আমার!

~ আপনি যতই ছলচাতুরী করেন না কেন, কোনো লাভ হবে না। আমার ভালোবাসা এতটাও ঠুনকো না। আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে শাদাফ নিশ্চয় ই ফিরে আসবে। ওর বাবা~ মা মানুক আর না মানুক!
~ সেই সুযোগটাই আমি দিবো না। রেডি থেকো এঙ্গেজডের জন্য।
সুলতান চলে যায়। পরীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে।
~ প্লিজ শাদাফ ফিরে এসো। আমি যে তুমি ছাড়া আর অন্য কারো হতে পারবো না। তাহলে তুমি কি করে পারবে অন্য কারো হতে? আমি জানি, শুধুমাত্র আমার তুমি!

পর্ব ১২

এখন মোটামুটি অনেকটাই সুস্থ পরী। বাসায় থেকে বোর হয়ে গিয়েছে। তাই ফ্যামিলি রাজি না হওয়া সত্ত্বেও কলেজে যায়।
সুলতান ট্রান্সফার হয়ে সিলেটে চলে গিয়েছে। যাওয়ার আগে অবশ্য এঙ্গেজড করতে চেয়েছিল কিন্তু পরী কৌশলে ডেট টাকে পিছিয়ে নিয়েছে। পরীর ছোট্ট মনে এখনো বাসা বাঁধে যে, শাদাফ ফিরে আসবে। হু পরীর পরিবার বিয়েটা ঠিক করে। এটা ভেবে যে, হয়তো পরী শাদাফকে ভুলে যাবে আর সুলতানের সাথে সুখী হবে।

অনেকদিন পর কলেজের সবার সাথে দেখা হলো। বন্ধুদের মাঝে থাকলে কষ্ট যেন অটোমেটিকলি ভ্যানিশ হয়ে যায়। মন খারাপ যে কোথায় উধাও হয়ে যায় বুঝাই দ্বায়। সবার সাথেই কুশল বিনিময় করে নিজের জায়গায় বসে পড়ে। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করতেই বুকের ভেতর মোচর দিয়ে উঠে কারণ ফোনের ওয়ালপেপারে শাদাফের ছবি। কলেজে ক্লাস চলাকালীন কত যে শাদাফের সাথে দুষ্টুমি করেছে তার কোনো হিসেব নেই।

ক্লাস চলছে। ম্যাম ক্লাসে লেকচার দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে পরীর মনোযোগ নেই। অনেক করে চেয়েও ব্যর্থ হয়। শেষে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। পরীর সাথে সাথে যেন আকাশেরও মন ভারী আজ। চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথা নিচু করে চোখের পানি মুছে নেয়।
ক্লাস শেষ হতেই ওয়াশরুমের কথা বলে ফাঁকা রুমে গিয়ে কাঁদতে থাকে পরী। ভেবেছিল কলেজে এসে কষ্টটা ভুলে থাকতে পারবে। কিন্তু পরী ভুল। শাদাফের স্মৃতি যে বড্ড বেশিই পোড়াচ্ছে পরীকে।

৩ ক্লাস করে কলেজ থেকে বেড়িয়ে পড়ে। সিএনজিতে উঠতেই জান্নাতের সাথে দেখা হয়।
~ পরী তুই?
~ হু। কেমন আছো?

~ ভালো। তুই কলেজে আসিস কবে থেকে?
~ আজই আসলাম। ভালো লাগছেনা তাই বাসায় চলে যাচ্ছি।
~ তোর চোখমুখের এই অবস্থা কেন? ঠিকমত খাস না নাকি? রাতে মনে হয় ঘুমাসও না।
~ না তেমন কিছুনা।

~ তুই তো বাড়িতে চলে যাচ্ছিস, তার আগে চল রেষ্টুরেন্টে যাই।
~ না আপু আমি যাবো না। তোমরা যাও।
~ চুপ। কতদিন পর দেখা হলো, তোকে কিছু না খাইয়ে ছাড়ছি না। তোকে আজ ফুসকা, আইসক্রিম, চকোলেট সব খাওয়াবো।
~ আমি কিছু খাবো না।

~ আচ্ছা আমরা খাবো, তুই তাকিয়ে দেখিস কেমন।
জান্নাতের কথায় স্মিত হাসলো পরী। মন খারাপটাকে কিছুতেই জান্নাত আপুর কাছে প্রকাশ করা যাবে না।

রেষ্টুরেন্টে গিয়ে জান্নাতের হাজবেন্ড কফি, ফুসকা অর্ডার দেয়। পরী চুপচাপ বসে আছে দেখে দুষ্টুমি করছে জান্নাতের বর। তাতে পরী শব্দ করে না হাসলেও মোটামুটি হাসতেছে আর জান্নাত তো হেসে একদম কুটিকুটি অবস্থা।

দূর থেকে কেউ একজন খুব করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে। বুকটা মোচর দিয়ে ওঠছে। কেমন যেন চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। হু শাদাফ! দূর থেকে শাদাফই পরীকে দেখছে। জান্নাতের সাথে শাদাফ দেখা করতে এসেছিল কিন্তু জানতো না যে পরীও আসবে। পরীর সামনে যেতে ইচ্ছে করছেনা। কিন্তু মনও মানতে চাইছে না। কতদিন পর পরীকে দেখলো। তাই কাছ থেকে দেখার স্বাধ’টা আর দমিয়ে রাখতে পারলো না।

শাদাফ এসে জান্নাতের পাশের চেয়ারটায় বসলো। যেখান থেকে শাদাফ আর পরী একদম মুখোমুখি। শাদাফের দিকে চোখ পড়তেই পরী চমকে যায়।
শাদাফ খেয়াল করলো, পরীর চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে। আগের থেকে অনেক শুকিয়ে গেছে। কেমন যেন রোগা রোগা লাগছে।
পরী মূর্তির মত চুপ করে আছে। শাদাফ জান্নাত আর স্বামীর সাথে কথা বলে পরীকে জিজ্ঞেস করলো,

~ কেমন আছো তুমি?
প্রশ্নটা শুনে পরীর খুব রাগ হলো। ইচ্ছে করছে এখনই খুন করে ফেলতে। কিন্তু এখানে কোনো সিনক্রিয়েট করা যাবে না। পরী তাচ্ছিল্যর হাসি দিয়ে বললো,
~ আল্লাহ্ আমাকে অনেক ভালো রেখেছে।
~ এমন শুকিয়ে গেছো কেন তুমি? ঠিকমত খাও না?

এবার পরী আর রাগটাকে কন্ট্রোল করতে পারলো না। বলেই ফেললো,
~ না খাই না। আপনার বিয়েতে খাবো বলে না খেয়ে থাকছি এখন থেকে।
এবার জান্নাত শাদাফকে বললো,
~ হ্যাঁ রে, তোর বিয়ের কি খবর? রওশান বললো কাল যে মেয়েটাকে দেখে এসেছিস তাকে নাকি পছন্দ হয়েছে তোর আর সবার?
শাদাফ একবার পরীর দিকে তাকিয়ে বললো,
~ হুম।

সাথে সাথে যেন মনে হলো, পরীর বুকে কেউ পাথর নিক্ষেপ করছে। এত যন্ত্রণা কেন হচ্ছে ওর!
ওয়েটার খাবার দিয়ে গেছে। শাদাফ টুকটাক খেলেও পরীর গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তবে কি শাদাফ সত্যিই অন্য কাউকে বিয়ে করবে!
জান্নাত ধমক দিয়ে বললো,
~ পরী খাচ্ছিস না কেন?

~ অস্থির লাগছে আপু। মনে হচ্ছে জ্বরটা আবার বেড়েছে। আমি বরং এখন উঠি কেমন?
~ কি বলিস! একা যাবি কিভাবে তাহলে? চল তোর সাথে তোর বাসায় যাই।
~ চলো।
জান্নাত ওয়াশরুমে যায়। জান্নাতের স্বামী বিল পে করতে যায়। পিছু পিছু পরীও যায়। শাদাফ পেছন থেকে বলে উঠে,
~ আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো পরী। আমি হাজার চেষ্টা করেও পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারলাম না। জানি তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমারও যে কিছু করার নেই। তাই বলছি এমন করে থেকো না। নিজের কেয়ার করো। ঠিকমত খাও।

পরীর ঠান্ডা মস্তিষ্ক যেন মুহুর্তেই বিশাল আকার ধারণ করলো। পরীর এত রাগ হলো শাদাফের কথা শুনে যে সেই মুহুর্তে হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে গিয়েছে। পরী ঘুরে গিয়ে শাদাফের শার্টের কলার ধরে দাঁড় করিয়েই কষে একটা থাপ্পড় দেয়।
~ কুত্তার বাচ্চা ফাইজলামি করস তুই আমার সাথে? আমি মানুষ না? আমার মন নেই? রোবট আমি? অন্য মেয়েকে বিয়ে করবি আবার আমাকে বলিস কেয়ার নিতে।

সিম্প্যাথি দেখাস তুই আমাকে? আমি তো তোর কাছে ভালোবাসার জন্য যাইনি। বরং তুই আমার পিছনে কুত্তার মত ঘুরেছিস। আমাকে স্বপ্ন দেখিয়ে সেই স্বপ্ন মাটিতে পিষিয়ে দিচ্ছিস। আমি তো বলেই ছিলাম যে তোর পরিবার যখন মানবে না তখন তুই পিছিয়ে যাবি। কিন্তু তুই কি বলেছিলি? পরিবার মানুক আর না মানুক তুই আমাকে বিয়ে করবি। তা কোথায় গেল এখন তোর ভালোবাসা?
ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে বললি কোর্ট ম্যারেজ করার কথা। তখন যদি কোর্ট ম্যারেজ করতাম তাহলে এখন আমার অবস্থাটা কি হতো? তুই তো আমাকে অস্বীকার করতে দু’বারও ভাবতি না। আসলে কথায় আছে না, আল্লাহ্ যা করে ভালোর জন্যই করে।

আরেকটা জিনিসও ভালো হয়েছে। কি জানিস? সুলতান ভালোই করেছিল তোর পরিবারকে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে। নাহলে তো তোর এই চেহারা আমি দেখতেই পারতাম না। মা ভক্ত ছেলে তুই এটা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা ছিল না বরং আমি অনেক খুশি হতাম যে তুই মাকে অনেক ভালোবাসিস। আপন করে নিয়েছিলাম তাদের। তারা হঠাৎ করেই অমত হলো বিয়েতে। কেন হলো?

সেটা জানার প্রয়োজন মনে করলি না। তুই এখন যে কাজটা করছিস সেটা তোর জায়গায় কোনো মেয়ে থাকলেও করতো না। আজকে সুলতানকে আমার সাপোর্ট করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়। তোর মত একটা জানোয়ারকে ভালোবাসি আমি। আরে গবেষণা করলে হয়তো দেখা যাবে জানোয়ারেরও একটা মন আছে যেটা তোর নেই। তুই জানিস ভালোবাসা কি? বুঝিস তুই? বিয়ে করবি তাই না? কর। দোয়া করি সুখী হ।

তোকে তো সুখী হতেই হবে। না হলে তো আমার পুড়বে। কারণ আমার ভালোবাসা সত্যি। তোর মত অভিনয় ছিল না আমার ভালোবাসা। তবে খারাপ লাগে এটা ভেবে যে আমি তোকে এত বেশি ভালোবেসেছি। প্রতিটা রাত তোর কথা ভেবে বালিশ ভিজিয়েছি। প্রতিটা রাতে এই আশা নিয়ে ঘুমিয়েছি যে সকাল হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যায় রাত আসে আমার আশার আলো নিভতে থাকে। তোকে ভুলে থাকা আমার জন্য অনেক কষ্টকর কারণ আমি যে বড্ড ভালোবাসি রে!
শেষের কথাগুলো বলার সময় পরীর গলাটা ধরে আসছিল। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
আর হ্যাঁ, আমার আর সু্লতানের বিয়েটাও খেয়ে যাস কেমন! তোর জন্য স্পেশাল খাবারের আয়োজন করবো। অবশ্যই সাথে বউকে নিয়ে আসিস।

কথাগুলো বলে পরী আর অপেক্ষা করলো না। বেড়িয়ে গেল রেষ্টুরেন্ট থেকে। রেষ্টুরেন্টে থাকা কিছু কাপলের চোখ ছলছল করছে। জান্নাত এতদিন ওদের সম্পর্কের কথা জানতো না। আজ জেনে নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। গুটি গুটি পায়ে শাদাফের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
~ ঐ মেয়েটাকে কি কষ্ট না দিলে পারতি না? ওর সম্পর্কে সব জেনেও কেন করলি এমন ওর সাথে? ওর ভালোবাসা জয় করে এভাবে ওকে ছুড়ে ফেলে দিলি? তুই নিজেও জানিস না তুই কি হারাতে বসেছিস। পস্তাবি তুই একদিন। সময় গেলে সাধন হয়না। সো সিদ্ধান্ত এখন তোর, তুই কি করবি!
জান্নাত ওর স্বামীকে নিয়ে রেষ্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গেল। শাদাফ চেয়ারে বসে পড়লো।

পর্ব ১৩

পরীর জ্বরটা অনেক বেশিই বেড়ে গিয়েছে। ওর মা মাথায় পানি দিয়ে দিচ্ছে আর বলছে,
~ এতবার বললাম যে কলেজে যাওয়ার দরকার নেই আজ। আমার কোনো কথাই শুনিস না তুই। জান্নাত না থাকলে কোথায় পড়ে থাকতি তার কি কোনো ঠিক ঠিকানা আছে!
জান্নাত বললো,
~ থাক খালামনি, তুমি আর ওকে বকা দিয়ো না। এবার পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কলেজে যেতে দিয়ো না।

~ হুম।
~ শুনলাম, পরীর নাকি বিয়ে ঠিক করেছো?
~ হ্যাঁ। আমাদের বাড়িওয়ালার ভাইয়ের ছেলের সাথে। সুলতান নাম। আর্মিতে জব করে। অনেক সুখে থাকবে।
~ হুম।

~ তোমার ঐ বন্ধু শাদাফকে বলো আমার মেয়ের বিয়েতে এসে যেন দেখে যায় ওর চেয়েও ভালো স্বামী আমার মেয়ে পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।
জান্নাত একটা বড় নিঃশ্বাস নিলো।

কয়েকদিন ধরেই শাদাফকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। শাদাফের মা পাশে বসে বললো,
~ কিরে কি এত ভাবছিস?

~ কিছুনা।
~ এই সপ্তাহের মধ্যে এঙ্গেজড। মনে আছে তো?
~ হুম।
~ তোর ভাবিকে সাথে নিয়ে মেয়ের জন্য আংটি পছন্দ করে নিয়ে আয়।
শাদাফ কয়েক মুহুর্ত চুপ করে রইলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বললো,
~ আমি এই বিয়ে করবো না মা।

~ মানে? কি বলছিস তুই এসব? বিয়ের দিন তারিখ সব ঠিক করা আর তুই এখন বলছিস, বিয়ে করবি না?
~ তো কি হয়েছে? তোমরা তো পরীকেও দেখে এসেছিলে। কই ওর সাথে তো বিয়ে দিচ্ছো না।
~ ও একটা চরিত্রহীনা মেয়ে শাদাফ।

~ মা! না জেনে কারো ব্যাপারে কিচ্ছু বলবে না প্লিজ। পরীর ব্যাপারে তো একদমই না।
~ দুই দিনের মেয়ের জন্য তুই আমার মুখে মুখে কথা বলছিস?

~ অন্যায় করে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। তুমি আমার কাছে অনেক বেশিই। মায়ের ভালোবাসার সাথে অন্য কোনো ভালোবাসার তুলনা হয়না। তুমি তোমার জায়গায় আর পরী পরীর জায়গায়।
~ কি বলতে চাচ্ছিস তুই?
~ আমি পরীকেই বিয়ে করবো।
~ মাথা ঠিক আছে তোর?

~ আগে ছিল না। এখন আছে। পরীর প্রতি আমি অনেক অবিচার করেছি। ওর নিষ্পাপ ভালোবাসাকে অবহেলা করেছি। দিনের পর দিন ওকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। বিনা অপরাধে ওকে কষ্ট দিয়েছি।
ও চরিত্রহীনা নয় মা। যারা তোমাকে পরীর সম্পর্কে বলেছিল যে পরী সু্লতানের সাথে রিলেশন করে, তারা সুলতানেরই লোক ছিল। আর সুলতানও পরীকে ভালোবাসে। কিন্তু পরী তো আমায় ভালোবাসে। পরীকে পাওয়ার জন্যই সুলতান এই চাল’টা চেলেছে।

আমি পরীকে ছাড়া থাকতে পারবো না। যেই ভুলটা করেছি। সেটা সংশোধন করতে হবে এবং তা খুব তাড়াতাড়িই। নয়তো যে আমি চিরদিনের মত আমার পরীকে হারিয়ে ফেলবো।

কথাগুলো বলে শাদাফ বাড়ি থেকে বের হয়। পেছন থেকে ওর মা অনেকবার ডাকে কিন্তু ফিরে তাকায়না শাদাফ।

ঐ সময়ই শাদাফ কুমিল্লা থেকে ঢাকায় রওনা দেয়। যাওয়ার সময় জান্নাতকে ফোন করে সবটা জানায়। রেখা, আদিলকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে বলে। শাদাফের সাথে রওশানও যায়। সবাই চায় পরী শাদাফেরই হোক। আর তাই তো বন্ধুর সব দোষ ক্ষমা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিট।

পরীর জ্বর এখন অনেকটাই কম। ঘুমুচ্ছিলো পরী।

শাদাফ, রওশান, জান্নাত, রেখা, আদিল সবাই মিলে পরীর বাসায় আসে। ড্রয়িং রুমে আসতেই পথ আগলে দাঁড়ায় পরীর মা। শাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ তুমি এই বাড়িতে কোন সাহসে এসেছো? কেন এসেছো তুমি?

~ আন্টি, আমি একবার পরীর সাথে দেখা করতে চাই প্লিজ।
~ তোমার ঐ মুখে আমার মেয়ের নাম নিয়ো না। নজর লাগবে আমার মেয়ের। নতুন করে আবার কোন কাহিনী করতে এসেছো তুমি?

পরীর খালামনি এসে যোগ দিলো।

~ মেয়েটা কি তোমায় কম ভালোবেসেছিল শাদাফ? স্বপ্ন দেখিয়ে স্বপ্ন ভেঙ্গেও দিলে। এখন যখন ও ভালো আছে, তখন কেন আসছো আবার ওর জীবনে? মেয়েটা দিনরাত না খেয়ে তোমার জন্য তো কম কষ্ট করেনি। এমন কোনো রাত ছিল না যে পরী তোমার জন্য কাঁদেনি। এক্সিডেন্ট করে ঘরে বসেছিল। জ্বরে মরে যাওয়ার মত অবস্থা, কই তখন তো একবারও দেখতে আসোনি। তাহলে আজ কিসের কথা ওর সাথে?
~ প্লিজ খালামনি! আপনাদের পায়ে ধরি আমি, আমাকে একটাবার পরীর কাছে যেতে দিন প্লিজ।
পরীর মা গম্ভীর মুখে বলে,

~ মানুষ জেনেশুনে ভুল একবারই করে। তোমাকে পরী আগে ভালোবাসতে চায়নি। বিয়ের মাধ্যমে আগানোর কথা বলতেই তুমি রাজি হও। সে কথা জেনে আমরাও রাজি হই। আর এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। তখন যদি ওকে বাঁধা দিতাম তাহলে ও তোমাকে ভালোবাসতো না আর এত কষ্টও ওকে পেতে হতো না।

~ আমি মানছি, আমি অনেক অন্যায় করেছি। প্রয়োজন হলে আমি পরীর পা ধরে ক্ষমা চাইবো। তবুও প্লিজ একটা বার
~ তুমি বের হও তো বাড়ি থেকে। তোমার মত অভিশাপ বেশিক্ষণ সময় বাড়িতে থাকলে আমার মেয়ের দম আটকে আসবে। যাও বের হও এখনি। আমি চাইনা পরীর বাবা আর ভাই বাড়িতে এসে তোমাকে দেখুক আর তোমার গায়ে হাত তুলুক।

শাদাফকে আর কিছু বলতে না দিয়ে এক প্রকার জোর করেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটাই শুনছিল পরী। চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু বাহিরে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি পরীর। শাদাফের চোখের পানি দেখলে যে নিজেকে আটকাতে পারবে না। আর এটাও খুব ভালো করেই জানে, পরীর পরিবার আর কিছুতেই শাদাফকে মেনে নিবে না। তারা সুলতানের সাথেই বিয়ে দিবে।

শাদাফ পরী দুজনই কাঁদছে। একজন খোলা আকাশের নিচে, আরেকজন চারদেয়ালে আবদ্ধ ঘরটির মধ্যে।

২১ দিন পর।
পরী এখন পুরোপুরি সুস্থ। তাই কলেজে যাওয়ার অনুমতিও পেয়ে যায়। পরীর বাবা সাথে করে নিয়ে যায় কলেজে।

কলেজ ছুটির পর একাই আসছিল পরী। কিছুটা দূরে দেখতে পায় শাদাফকে। যে কেউ এই অবস্থায় দেখলে বলবে, পার্বতীকে হারিয়ে দেবদাস সেজেছে। ~ আচ্ছা সেই পার্বতীটা কি আমি? যদি হইও তবে কিন্তু আমাকে দেখে বোঝার উপায় নেই আমিই সেই পার্বতী! কষ্টগুলো জমে পাথর হয়ে গেছে। খুব সহজে এখন আর চোখের পানি আসেনা।

পরীকে দেখেই দৌড়ে আসে শাদাফ। পরী জানে, শাদাফ এখন পরীকে জড়িয়ে ধরবে। শাদাফ করতেও যাচ্ছিল তাই! হাত দিয়ে শাদাফকে থামিয়ে বললো,

~ এটা পাবলিক প্লেস মিষ্টার। যখন তখন এরকম অন্যের বউকে জড়িয়ে ধরাটা ঠিক নয়, জানেন না?
~ আমাকে ক্ষমা করে দাও পরী প্লিজ। আমি আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছি। তুমি যা শাস্তি দিবে আমি মেনে নিবো। তবুও আমাকে ছেড়ে যেয়ো না প্লিজ।
~ আপনার পরিবার আমাকে মেনে নিয়েছে?

~ তোমার বাড়ি থেকে আসার পর থেকে আর বাড়িতে যাইনি। রওশান আর আমি এতদিন হোটেলে ছিলাম। একবার বিয়ে করে ফেললে সবাই ঠিক মেনে নিবে।
~ আর যদি না নেয়?

~ না নিলে নাই। আমার বাড়ি আছে, টাকা আছে। তুমি আমার বাড়িতে থাকবে, আমার টাকায় খাবে। কেউ না মানলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
~ আমার আছে!

~ প্লিজ পরী! আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না।
~ আপনি তখন আপনার বাবা~ মাকে কষ্ট দিতে পারবেন না বলে, আমাকে হার্ট করেছেন। আজ ঠিক একই কাজ আমিও করবো।

শাদাফ পরীর হাত ধরে বললো,
~ না পরী। আমি জানি তুমি এমন কিছু করবে না। তুমি তো আমায় ভালোবাসো। বিয়ে হয়ে গেলে আমাদের দুই পরিবারই মেনে নিবে প্লিজ পরী!

সিম্পল লাল একটা শাড়ি পড়ে কাজী অফিসে এসেছে পরী। সাথে শাদাফ, রওশান, জান্নাত, রেখা আর আদিল।

শাদাফকে পরী ফিরিয়ে দিতে পারেনি। কারণ পরীর ভালোবাসা ঠুনকো ছিল না। যেই পরী নামাজ পড়ে প্রতিটা মোনাজাতে কান্না করে শাদাফকে চাইতো তার পক্ষে শাদাফকে ফিরিয়ে দেওয়া খুব কঠিন।

পরী এটাও জানে যে, বাড়িতে এখন কিছুতেই শাদাফকে কেউ মেনে নিবে না। শাদাফ যা করেছে তা হয়তো পরী ক্ষমা করতে পারে কিন্তু ওর পরিবার না। তাই তাদের না জানিয়েই বিয়েটা করতে হচ্ছে। পরী জানেনা, এরপর কি হতে যাচ্ছে তার জীবনে! আর কি~ ই বা হবে। তবে মনেপ্রাণে খুব করে চাইছে বাবা~ মা বিয়েটা মেনে নিক।

কাজী অফিসে আসার আগে দুজনে কোর্টে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে এসেছে। এখন কাজী অফিসে।

কাজী বিয়ে পড়ানো শেষে সই দিতে গিয়ে পরী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। হাতে কলম নিয়ে শাদাফের দিকে তাকায়। শাদাফ করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে। পরী একটু মুচকি হেসে সই করে দেয়।

শাদাফ আর পরী পরীদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে।
রওশান, জান্নাত, আদিল, রেখা ওরা গাড়িতে বসে আছে।

পরীর বুক ধুকধুক করছে ভয়ে। না জানি কি হয়!
অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে বাড়ির ভেতর ঢুকে মাকে ডাকে। পরীর মা তখন রান্না করছিল। হাত মুছতে মুছতে আসছিল আর বলছিল,
~ কিরে আজ এত দেড়ি করলি কেন?

কথাটা শেষ করে সামনে তাকাতেই যেন বিশাল একটা ধাক্কা খায়।
বউ না সাজলেও পরীকে দেখে যে কেউই এখন বলবে নববধূ। নাকে নাকফুল, হাতে চুড়ি, মাথায় ঘোমটা দেওয়া।

পরীর মা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
~ এসব কি পরী? শাদাফ তোর সাথে কেন? আর তুই শাড়ি, চুড়ি কেন পড়েছিস?

পরী ভয়ার্ত কণ্ঠে মাথা নিচু করে বললো,
~ আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো মা। আমি তোমাদের অনুমতি ছাড়াই শাদাফকে বিয়ে করে ফেলেছি। আমি জানি তোমাদের বললেও তোমরা রাজি হতে না। সুলতানের সাথেই আমার বিয়ে দিতে। কিন্তু সু্লতানকে তো আমি ভালোবাসি না মা। ওর সাথে আমি সুখী হতে পারতাম না।

পরী কথাগুলো বলার সময় ওর বাবা, নানু, ভাই আর খালামনিও ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ায়। ওর বাবা আর মা পাশাপাশি। পরী তাদের মুখোমুখি।

মেয়ের এত সাহস আর কর্ম দেখে পরীর গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় ওর মা। দ্বিতীয় থাপ্পড় দিতে গেলে পরীর বাবা ওর মাকে আটকায় আর শাদাফ পরীকে সরিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে।
পরীর মায়ের রাগ এবার কান্নায় পরিণত হলো। ওর বাবার বুকে হাত রেখে কান্না করতে করতে বললো,

~ দশটা মাস এই মেয়েকে আমি পেটে ধরেছি বলো? নিজে না খেয়ে ওকে খাইয়েছি। ওর অসুখ হলে আমি ঘুমাতাম না। আর সেই মেয়ে এমন একটা কাজ করলো। কেন বলো তো? কি পাপ করেছিলাম আমি?

পরী কান্না করছিল প্রথম থেকেই। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি ওঠে গেছে। পরীর বাবা ওর মাকে সরিয়ে মেয়ের সামনে দাঁড়ায়। চোখদুটি ছলছল করছে কিন্তু কাঁদছে না। হয়তো সবার সামনে ছেলেদের কাঁদতে নেই তাই!

বুকে হাত দিয়ে বললেন,
~ তুমি যখন খুব ছোট ছিলে, তখন এই বুকে তোমায় ঘুম পাড়িয়েছি। খুব কম দুপুরই হয়তো তুমি বিছানায় ঘুমাতে। প্রতিদিন দুপুরে খাওয়া শেষে তোমাকে বুকে নিয়ে ঘুমাতাম। সারাদিন কষ্ট করে কাজ শেষে যখন তোমার ঐ হাসি মুখটা দেখতাম, বিশ্বাস করো আম্মু আমি সব কষ্ট ভুলে যেতাম। তোমার ঐ ছোট ছোট মুখে আধো বুলিতে যখন প্রথম আমায় বাবা ডেকেছিলে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ তখন নিজেকে মনে হয়েছিল। তোমার ঐ ছোট ছোট আঙ্গুল ধরে উঠোনজুড়ে যখন তোমাকে হাঁটা শিখাতাম তখন তুমি খিলখিল করে হেসে উঠতে। সেই হাসি দেখে মনে হতো আমি সারাটা জীবন কষ্ট করতে রাজি আছি তোমার ঐ হাসির বিনিময়ে।

তোমার মা তো তোমাকে মেরেছে। আমার ইচ্ছে করলেও আমি পারছিনা। কেন জানো? কারণ তোমার দুই গালে যে আমি অজস্র চুমু খেয়েছি। বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে কষ্টে। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। তোমার মা তো কাঁদতে পারে আমি তো তাও পারছি না।

পরী কাঁদতে কাঁদতে বাবার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে।
~ আব্বু আমাকে একটাবার ক্ষমা করে দাও। এভাবে দূরে সরিয়ে দিয়ো না প্লিজ।
বুক থেকে জোর করে সরিয়ে দেয় পরীকে।

~ আজ থেকে আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। আমার ছোট মেয়েটা মারা গেছে। তুমি আমার পরী নও। পরীর মা তোমাকে মারার আগে তুমি এই বাড়ি থেকে তোমার স্বামীকে নিয়ে চলে যাও।
উপস্থিত সকলের চোখে এখন পানি। পরীর বাবা দ্রুত পায়ে হেঁটে ঘরে চলে যান যাতে চোখের পানিগুলো মেয়ে না দেখে। পেছন থেকে দৌড় দেয় পরী,
~ ও আব্বু! আব্বু! তুমি দরজা খোলো না। ও আব্বু শুনো না। আমাকে ভুল বুঝো না। আব্বু ও আব্বু শুনছো তুমি।

শাদাফ পরীকে টেনে দরজা থেকে সরায়। পরীর মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
~ তুই আমার বুক খালি করলি না? আমি তোকে অভিশাপ দিচ্ছি তুইও মা ডাক শুনতে পারবি না। তোর ঐ মুখ যেন আর আমি না দেখি।

বাড়ি থেকে বের হয়ে যা বলছি।
পরী ফ্লোরে বসে পড়ে। সবাই সবার ঘরে চলে যায়। শাদাফ পরীকে জোর করেই বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। বাহিরে এতক্ষণ রওশান জান্নাত ওরা অপেক্ষা করছিল। পরীর অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে ভেতরে কি হয়েছে!

পরী কাঁদতে কাঁদতে শাদাফের বুকে ঢলে পড়ে। জান্নাত উত্তেজিত হয়ে বলে,
~ পরীর কি হলো! সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে মেবি। তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়ি নিয়ে চল।
~ না।
~ না মানে?

~ পরীকে নিয়ে সরাসরি আমাদের বাসাতেই উঠবো এখন।
~ অনেক দেড়ি হয়ে যাবে যেতে।

~ হোক। রওশান তুই গাড়ি ঘুরা। আমরা এখন কুমিল্লাতেই যাবো। আর জান্নাত তুই পরীর বড় আপুর সাথে পারলে একটু যোগাযোগ করিস। আর হ্যাঁ তোরা সবাই সময় বের করে কালই আমাদের বাসায় আসিস প্লিজ। পরীর এই মুহুর্তে আমি একা মেন্টালিটি সাপোর্ট দিতে পারবো না। তোরা থাকলে ইজি হবে ওকে সুস্থ করা, মানসিক চাপ থেকে বের করা।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।
~ সাবধানে যাস।
গাড়িতে বসে আছে শাদাফ আর পরী। রওশান আর ড্রাইভার সামনের সিটে বসা। পরীকে বুকে শক্ত করে আগলে জড়িয়ে ধরে শাদাফ!

পর্ব ১৪

রাত ১১টার দিকে পরীকে নিয়ে কুমিল্লায় পৌছায় শাদাফ। গাড়িতে জ্ঞান ফিরেছিল কিন্তু এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পরী। পরীকে কোলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে দরজায় নক করে। শাদাফের ভাবি এসে দরজা খুলে দেয়। শাদাফের কোলে পরীকে দেখে খুব একটা অবাক হয়না সে। কারণ শ্বাশুরী মায়ের কাছে আগেই সব শুনেছিল।

কারো সাথেই কোনো কথা না বলে সোজা নিজের রুমে গিয়ে খাটে শুইয়ে দেয় পরীকে। শাড়িটা চেঞ্জ করা দরকার পরীর। আলমারি থেকে একটা নাইটি বের করলো শাদাফ। ইংল্যান্ড থেকে আসার সময় পরীর জন্য এনেছিল। বিয়ের পর পড়াবে বলে। কিন্তু মাঝখানে ঘটে গেল কত অঘটন। শাদাফ ড্রয়িং রুমে গিয়ে ভাবির উদ্দেশ্যে বললো,

~ ভাবি বিছানায় দেখবে একটা নাইট ড্রেস আছে। পরীর শাড়িটা চেঞ্জ করে নাইটি পড়িয়ে দাও।
~ তোমরা বিয়ে করোনি?
~ করেছি।
~ তাহলে তো তুমিই চেঞ্জ করাতে পারো।

~ না ভাবী। পরী সজ্ঞানে না থাকা অবস্থায় প্রথমেই এমনটা আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে না।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি বসো, আমি চেঞ্জ করিয়ে আসি।
শাদাফ সোফায় বসলো। কিছুক্ষণ পর ভাবির সাথে শাদাফের বাবা~ মাও আসলো। শাদাফের মা বললো,

~ তুই তাহলে শেষ পর্যন্ত পরীকেই বিয়ে করলি?
~ হুম। আর এটা নিয়ে এখন বা পরে কোনো কথা শোনাবে না প্লিজ মা। মেয়েটা আমার জন্য নিজের বাবা~ মায়ের কাছে পর হয়েছে। অপমানিত হয়েছে। আমি চাইনা আমার জন্য পরী আমার বাড়িতে কারো কাছে ছোট হোক বা অপমানিত হোক।

~ হুম। বড় বৌ মা ওকে খেতে দাও।
শাদাফের বাবা~ মা বিষয়টাকে আর প্যাঁচালো না। ছেলে যদি সুখে থাকে তাহলে এ নিয়ে আর হাজার আপত্তি করেও লাভ হবে না।
~ শাদাফ খেতে এসো।
~ না, ভাবি। খিদে পায়নি আমার।

~ মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে সারাদিনেও কিছুই খাওনি। পরীও বোধ হয় খায়নি। এক কাজ করো খাবার নিয়ে ঘরে যাও। পরীকেও খাইয়ে দাও আর তুমিও খাও।
ভাবির কথাটা শাদাফের পছন্দ হলো। যেভাবেই হোক পরীকে খাওয়াতে হবে। এক প্লেটেই দুজনের জন্য খাবার নিয়ে এগোলো বেডরুমের দিকে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ১২টা ছুঁই ছুঁই।

রুমে গিয়ে অবাক হলো শাদাফ। পরী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল নাকি!
~ পরী?
চোখের পানি মুছে পেছনে ঘুরে তাকায়।
~ হু।

~ ঘুমাও নি?
~ ভেঙ্গে গেল ঘুম।
খাবারের প্লেট টা টেবিলে রেখে পরীর কাছে গেলো। পরীর এক হাতে টান দিয়ে বুকে নিয়ে এলো।
~ বাবা~ মার জন্য মন খারাপ করছে?
পরী নিঃশব্দে কাঁদছে।

~ এই পাগলী! কাঁদছো কেন?
~ আমি খুব পঁচা তাই না? পঁচা বলেই তো এভাবে বাবা~ মাকে কষ্ট দিলাম।
~ কে বললো তুমি পঁচা? তুমি তো আমার লক্ষী বউ। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। সবাই মেনে নিবে।
~ কবে?
শাদাফ দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বললো,

~ একটা ওয়া ওয়া আসলেই।
শাদাফের বুক থেকে মাথা তুলে, মুখের দিকে তাকায় পরী।
~ ওয়া ওয়া মানে?
~ বাবু হলে।
পরীর মনে পড়ে গেল মায়ের কথাটা। মা তো অভিশাপ দিয়েছিল, আমি মা হতে পারবো না! পরীর মুখটা আরো মলিন হয়ে গেলো।

~ কি হলো? তুমি চাও না আমাদের একটা ওয়া ওয়া আসুক?
~ মা যে আমায় অভিশাপ দিলো গো। শুনেছি, মা অভিশাপ দিলে তা ফলে যায়।
কথাগুলো বলেই আরো জোরে কেঁদে দিলো পরী।
শাদাফ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
~ কিচ্ছু হবে না পাগলী। মা তো রাগের মাথায় বলে ফেলেছে কথাটা। মন থেকে তিনি এরকম কখনোই চাইবেন না।

~ সত্যি বলছো?
~ তিন সত্যি। এখন চলো খাবে।
~ আমার খিদে নেই।
~ কিন্তু আমার আছে।
~ তাহলে তুমি খাও।

~ তোমাকে ছাড়া আমি কি করে খাবো বলো তো? অল্প হলেও খেতেই হবে।
ভাত মেখে নিজ হাতে খাইয়ে দেয় পরীকে।
শাদাফের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে পরী। বাবা~ মার কথা অনেক বেশিই মনে পড়ছে।
শাদাফ পরীর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।

~ শুনছো?
পরীর উত্তরে বলে,
~ হ্যাঁ বউ
~ তোমার বাবা~ মা কিছু বলেনি?
~ কি বলবে?
~ তাদের না জানিয়ে যে বিয়ে করলে।

~ না। তবে, তোমার কাছে আমার একটা রিকোয়েস্ট পরী, মা বাবা যদি কখনো তোমাকে কিছু বলে তাহলে তাদের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করো না প্লিজ। প্রয়োজনে আমি বাড়িতে আসার পর রুমে এসে আমাকে মেরো, বকো আমি কিচ্ছু মনে করবো না। তবুও তাদেরকে কিছু বলো না।
~ আমাকে কি তোমার বাজে বউ মনে হয়?
~ সে কথা কখন বললাম?
~ তুমি তো এটাই বোঝালে।
~ একদম না।

~ আমি বাড়ির লক্ষী বউ হয়ে দেখিয়ে দিবো হুম।
~ তুমি তো আমার লক্ষী বউই!
~ ভালোবাসি।
~ আমিও ভালোবাসি বউটা!

পরেরদিন সকাল ১০টা
পরীর মা পরীর ঘরে বসে জামা~ কাপড়গুলো হাতাচ্ছিলেন। পরীর একটা ওড়না থেকে ঘ্রাণ শুকছিলেন আর চোখের পানি ফেলছিলেন।
পরীর খালামনি রুমে ঢুকে দেখছিল দৃশ্যটা। সে নিজেও কান্না করে দিলো।
~ কি করছো আপা?

পরীর মা তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে নিলেন।
~ কাপড়গুলো গুছাচ্ছিলাম।
খালামনি পাশে এসে বসে বললো,
~ আমার কাছে লুকিয়ে কি হবে রে আপা? তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি।
পরীর মা কান্না করে বললো,

~ তুই বুঝলে কি হবে, সে তো বুঝলো না! আমাদের কথা একবার ভাবলোও না।
যে ছেলে এত কষ্ট দিলো, তাকেই কেন
বিয়ে করতে হলো ওর? সুলতান কি শাদাফের চেয়ে কম ভালো ছিল? কি জবাব দিবো আমি তাদের?
~ পরী না হয় একটা ভুল করেই ফেলেছে। কিন্তু এ কথাটা ভাবো যে, পরী যদি শাদাফের সাথে সুখী হতে চায়। তাহলে হোক না!

~ এভাবে আমি মানতে পারছি না রে। প্রতিদিন সকালে ওকে টেনে ঘুম থেকে উঠাতে হতো। আজ সকালে এসে আমি পরীকে পেলাম না। আমার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে। কখনো গায়ে হাত তুলিনি। কালকে থাপ্পড়ও দিয়েছি এই হাত দিয়ে।

~ একটা জিনিস তোমার উচিত হয়নি আপা।
পরীর মা কিছু বললেন না। কেঁদেই যাচ্ছেন।
~ ঐভাবে অভিশাপ না দিলেও পারতে।

~ তোরও কি মনে হয় কথাটা আমি মন থেকে বলেছি? রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।
~ তাই বলে এমন একটা কথা? আল্লাহ্ না করুক যদি তোমার অভিশাপ আল্লাহ্ কবু্ল করে তাহলে পরীর কি হবে ভাবতে পারছো? সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে।

~ আমি তো মন থেকে বলিনি রে। যদি কখনো এমন হয় তাহলে কি পরী আমাকেই দোষী করবে? নিশ্চয় তখন ও আমাকে ভুল বুঝবে। না, না এমন কিছুই হবে না। আমি নামাজ পড়ে আল্লাহ্~ এর কাছে বলবো আমার পরীর সাথে যেন এমন না হয়। যে সুখের আশায় ও আমাদেও ছাড়তে পেরেছে সে সুখ থেকে যেন ও বঞ্চিত না হয়।
~ বাহ্ আন্টি! পরী আপনার মেয়ে বলে ওর সুখের কথা ভাবছেন। আমার দোষটা কোথায় বলতে পারেন?

~ সুলতান তুমি।
~ কেন আন্টি? আমাকে বুঝি আশা করেননি? সবটা গোপন রাখতে চেয়েছেন?
~ আমরা এসবের কিছুই জানতাম না।
~ যখন জানলেন তখন কিছু করলেন না কেন?

~ কি করতাম তখন? ওরা বিয়ে করেই এসেছিল।
~ সো হোয়াট? ডিভোর্স বলতেও কিন্তু একটা শব্দ আছে।

~ মাথা ঠিক আছে তোমার?
~ না আন্টি না। আমি পাগল হয়ে গেছি পাগল। কেন পরী এমন করলো। আর আপনারা কেন পরীকে আটকালেন না।
~ আটকালেই কি ও শুনতো আমাদের কথা? তাছাড়া তুমি বুঝতে চাইছো না কেন পরী এখন বিবাহিত।

~ দেখেন আন্টি অতশত আমি বুঝিনা। পরী যদি ভালোই ভালো আমার কাছে ফিরে আসে তাহলে ভালো আর নয়তো কিন্তু আপনার অভিশাপটা আমি সত্যি করে দেবো!
~ মানে?

~ মানে খুব পরিষ্কার। যদিও আমরা জানি যে আপনি মন থেকে ঐ বদদোয়াটা দেনননি! মানলাম পরীও বিশ্বাস করলো যে আপনি মন থেকে ওকে অভিশাপ দেননি। কিন্তু সত্যিই যদি ওর বাচ্চা মারা যায় তখন? তখন কিন্তু ঐ অবস্থাতে পরী আপনাকেই দোষী মনে করবে।
~ তোমার কি মাথা ঠিক আছে সুলতান? এমন কিছুই হবেনা।

~ হবে আন্টি হবে। পরী ফিরে না আসলেই হবে। পরী আমার কাছে না ফিরলে শাদাফের আর পরীর সংসার আমিই ভাঙ্গবো এবং সে মাধ্যমটা হবে বাচ্চা। প্রতিটা মেয়েই তো চায় মা হতে। পরীও নিশ্চয় এর ব্যতীক্রম না?

~ ছিহ্! তোমার মানসিকতা এত নিচু? ভালোবাসলেই যে তাকে পেতে হবে এমন কোনো কথা আছে?
~ আছে। পরীর জন্য আমি গুণ্ডা থেকে ভালো হয়েছি। শুধু ওকে পাবো বলে। আর ঐ অন্য কারো হয়ে যাবে? এটা তো হতে পারেনা। তাই বলছি পরীকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে এনে আমার হাতে তুলে দিন।

সুলতান চলে গেল। পরীর মায়ের মনে অজানা এক ভয় কাজ করছে। মেয়ের কোনো ক্ষতি হোক এটা কোনো মা’ই চায় না। পরীর খালামনি বললো,
~ আপা এটা কোন সুলতানকে দেখলাম আমরা? ওর হাতে আমরা মেয়ে তুলে দিতে চেয়েছিলাম! ভালোই হয়েছে ও শাদাফকে বিয়ে করে।

~ বুঝতেছি না কিছু। মাথা কাজ করছে না।

সুলতানের সাথে কথা চলাকালীন সময়ে অনেকবার ফোন দেয় পরীর মায়ের কাছে। কিন্তু তখন ফোনটা ছিল ওর মায়ের বেডরুমে। পরীর মনটা খারাপ হয়ে যায়। ফোনটা রেখে মাথা নিচু করে বসে থাকে পরী।

শাদাফ পরীর কোমড়ে হাত দিয়ে টেনে শুইয়ে দেয়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। ঘুমঘুম কণ্ঠে বলে,
~ সকাল সকাল কি হলো আমার বউপরীটার?
~ মাকে কতবার ফোন দিলাম। ধরলো না। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। মা কি আমাকে পর করে দিচ্ছে?

শাদাফের নিজেরও মন খারাপ হয়ে গেল। ঘুমঘুম ভাবটা কেটে গেলো। কোনো না কোনোভাবে শাদাফ নিজেকেই দোষী মনে করে। আগে যদি বাবা~ মার জন্য পরীকে অবহেলা না করতো তাহলে নিশ্চয় আজ পরীকে ওর বাবা~ মা থেকে আলাদা হতে হতো না। তবে শাদাফ বিশ্বাস করে যে সবাই ঠিক মেনে নিবে। দুইদিন আগে আর পরে এই যা পার্থক্য আরকি!
কিন্তু এই মুহুর্তে পরীকে এই চিন্তা থেকে দূরে সরাতে হবে।
শাদাফ পরীকে আরেকটু কাছে এনে বললো,

~ চলো তাড়াতাড়ি ওয়া ওয়া নিয়ে ফেলি। দেখবে বাবুর দিকে তাকিয়ে সবাই আমাদের মাফ করে দিবে।
কথাগুলো বলেই পরীর ঘাড়ে মুখ ডুবালো শাদাফ। সঙ্গে সঙ্গে পরী খিলখিল করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতেই বললো,

~ ছাড়ো আমাকে! আমার সুরসুরি লাগে।

পর্ব ১৫

সকালে সোফায় বসে টিভি দেখছিল পরী। তার আগে অবশ্য রুমেই ছিল। শাদাফের ভাবি রুম থেকে ডেকে বললো,

~ শাদাফ তো ঘুমাচ্ছে। তুমি একা রুমে কি করবে শুনি? আমি তরকারি কাটি তুমি আমার পাশে বসে টিভি দেখো।
পরীর টিভি দেখার কোনো ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু ভাবিকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য বিনাবাক্যে রাজি হয়ে যায়।

টিভির চ্যানেল একটার পর একটা পাল্টেই চলেছে কিন্তু মনের মত কিছু পাচ্ছে না।”জি এ্যাকশন” চ্যানেলে আসতেই পরীর হাত স্থির হলো।”টু” হেডেড সার্ক এ্যাটাক” মুভি দিয়েছে। ইংলিশ মুভি কিন্তু হিন্দি ভাষা করে দিয়েছে। ভাবী তরকারি কাটায় ব্যস্ত আর পরী মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখছে। ছবিটা যতবারই দেখে ততই যেন বেশি ভালো লাগে।

টিভির দিকে পরীর মনোযোগ এতই প্রবল ছিল যে কখন ওর শ্বাশুরী পাশে এসে বসেছে সেটাও খেয়াল করেনি। পরী একটু চেঁচিয়েই বললো,

~ ভাবী দেখেন দেখেন সার্ক টা এখন মানুষটাকে খেয়ে ফেলবে।
কথাটা বলে পাশে তাকাতেই আত্মা শুকিয়ে যায় পরীর। ওর শ্বাশুরী যে পাশে এসে বসেছে সেটা একবারও খেয়াল করেনি।

মাথায় ঘোমটা টেনে কাঁচুমাচু হয়ে বসলো।
~ তুমি তো দেখছি পুরোই বাচ্চা! এমন বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পড়েছে শাদাফ!
পরী কিছুটা ইতস্ততভাবে তাকালো শ্বাশুরীর দিকে আর নিজের মনেই বললো, “পরীরে একগাদা কথা শোনার জন্য রেডি হয়ে যা”
মাথা নিচু করে বসে আছে পরী।

~ সকালে খেয়েছো তুমি?
পরী দুবার মাথা এদিক~ ওদিক করে বোঝালো খায়নি।
~ এত বেলা হয়ে গিয়েছে, এখনও খাওনি তুমি?

বড় ছেলের বউ আশাকে বললেন,
~ তোমার কি আক্কেলজ্ঞান নাই বউমা? এখনো ওকে খেতে দাওনি?
~ আমার কোনো দোষ নেই মা। আমি ওকে অনেকবার জোর করেছি। খাবেনা সে এখন।
~ কেন?

~ আপনার ছোট ছেলে উঠলে তারপরই নাকি খাবে।
~ ও কখন না কখন ঘুম থেকে ওঠে তার কোনো ঠিক আছে নাকি।
পরীর দিকে তাকিয়ে বললো,

~ টেবিলের উপর খাবার আছে, এখানে নিয়ো আসো যাও।
~ আপনি এখনো খাননি আন্টি?
তিনি একটু বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
~ আন্টি? আমি তোমার আন্টি হই?
~ না মানে

~ কি? আচ্ছা শাদাফ কি তোমাকে এটা বলেছে যে আমি ওর খালা হই?
~ এমা! ছিঃ ছিঃ। না ও এসব কিছু বলেনি।
~ তাহলে তুমি আন্টি ডাকলে কেন?
~ আসলে অভ্যাস নাই তো আন্টি। না মানে মা।
তিনি একটু মুচকি হাসলেন। বললেন,

~ যাও খাবার নিয়ে এসে এখানে বসে খাও।
শাদাফ বারবার করে বলে দিয়েছে, মা যা বলবে সব শোনার চেষ্টা করবে। তাই পরীও বিনাবাক্যে রাজি হয়ে যায়। খাবার প্লেট হাতে ড্রয়িং রুমে এসে আবার আগের জায়গায় বসলো। শ্বাশুরীর দৃষ্টি তখন টিভির দিকে।

তিনি পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ পরী! ছিঃ ছিঃ টিভিতে কি ছেড়েছো এগুলা? কিসব জামা~ কাপড় পড়েছে।
পরী তখন মাত্র এক লোকমা ভাত মুখে দিয়েছিল। শ্বাশুরীর কথা শুনে সাথে সাথে বিষম খেলো। ভাবী তাড়াতাড়ি করে পানি খাইয়ে দিল। পরী মনে মনে একবার ভাবলো,

~ কি এমন খারাপ ছিল! ওপস! শিট। ইংলিশ মুভি হওয়ায় তাদের কাছে এসব পোশাক কোনো ম্যাটার করেনা। কিন্তু বাংলাদেশে এটা অনেক বড়কিছু। তার মধ্যে তারা আগের যুগের মানুষ।
পরী যখন মুভিটা দেখে তখন সার্কের কথাই মাথায় ঘুরপাক খায়। পোশাক~ আশাক এসব কিছু মাথায় ঢোকে না।

এতকিছুর মধ্যেও পরীর মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। একবার বোনরা মিলে মুভিটা দেখছিল। সময়টা ছিল সন্ধ্যার পর। মা, খালামনি, নানু হুড়মুড়িয়ে ড্রয়িং রুমে এসে বলে তারা নাটক দেখবে। মানে খুবই সিরিয়াল ভক্ত তারা। তখন আপু আর পরী বললো,

~ ছবিটা আর ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হবে। তখন তোমরা সিরিয়াল দেইখো।
তাদের প্রিয় নাটক শুরু হতে দেড়ি আছে বিধায় আর কোনো জোড়াজুড়ি করেনা। ছবি দেখার এক পর্যায়ে নানি বলে,
~ আল্লাহ্ আল্লাহ্! মাইয়াগুলো জামা পড়ে নাই নাকি।

নানির সাথে মা আর খালাও যোগ হয়ে বললো,
~ এগুলা কি ছবি দেখোস রে তোরা। ওদের কি বেশি কাপড় কেনার টাকা ছিল না?
পরী হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছিল না। দাঁত কটমটিয়ে বললো,

~ তোমাদের পায়ে ধরি পোশাকের কথা বাদ দিয়ে ছবিটা দেখো। ভাল্লাগবে।
পরীর কথাই ঠিক হলো। সার্ক যখন এক এক করে মানুষ খাচ্ছিল তখন নানি, মা আর খালার জানার উত্তেজনা যেন আরো বেড়ে যাচ্ছিল। ওদের এই অবস্থা দেখে পরী তখন মুচকি মুচকি হাসতো।
কথাগুলো মনে পড়তেই চোখের কোণে পানি ভরে উঠলো। শ্বাশুরীর আলতো ধাক্কায় পরী অতীতের স্মৃতি থেকে ফিরে এলো।

~ দেখো পরী, মাছটা কিভাবে মানুষগুলো খেয়ে ফেলছে।
~ মা, চ্যানেলটা পাল্টে দিবো?

~ না। না দেখছোনা, কি হচ্ছে। আমি দেখবো। তুমি খাও।
আশা ভাবী আর পরী দুজনই একটু হাসলো। আর পরী অস্ফুটস্বরে বললো,
~ মায়েরা বুঝি এমনই হয়!

খাওয়া~ দাওয়া শেষ করে টেবিল গোছাচ্ছিল পরী। তখন শ্বাশুরী গিয়ে বললো,
~ দুপুরের খাবারটা তুমি রান্না করো তো দেখি।
রান্না করার কথা শুনে পরীর হাত~ পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ফিসফিসিয়ে বললো,

~ আমার রান্না খেতে পারবেন তো!
~ কি বললে?
~ কি কি রান্না করবো?
~ বিরিয়ানি রান্না করো। আর শাদাফের জন্য মুরগীর মাংস রান্না করো। জানোই তো মনে হয় শাদাফের প্রিয় খাবার এগুলি।

~ হুম মা। ভুনা খিচুরী, আর মরিচ ভর্তাও তো তার প্রিয়।
~ হ্যাঁ। এতকিছু আজ রান্না করতে হবেনা। তুমি শুধু বিরিয়ানি আর মুরগির মাংস রান্না করো।
আশা ভাবী বললো,
~ আজ কি তবে আমার রান্না করতে হবে না?
~ না।
~ তাহলে আমি পরীকে সাহায্য করি রান্না করতে?
~ একদম না। পরী একাই সব করবে। কি পরী পারবে তো?
পরী মুখে জোর করে হাসির রেখা টেনে বললো,

~ হ্যাঁ মা। এ আর এমন কি!
~ যাও তাহলে শুরু করে দাও। আর আশা তুমি আমার সাথে ঘরে আসো। মাথায় তেল দিয়ে দাও তো একটু।
~ আচ্ছা মা।

শাদাফ ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করতে আসে। অদ্ভুত! ড্রয়িং রুমে কেউ নেই। শাদাফ বড় ভাইয়ের রুমে গিয়ে দেখলো, ভাইয়ের মেয়ে ড্রয়িং করছে।

~ আম্মু, তোমার মা আর চাচি কোথায়?
~ নানুর ঘরে মনে হয়।
শাদাফ গিয়ে নাস্তা করে নিলো। অনেকক্ষণ ধরে পরীকে দেখেনা। মনটা কেমন জানি করছে। তাই একবার মায়ের রুমের দিকে পা এগোয় পরীকে দেখার জন্য।

মায়ের রুমে গিয়ে দেখে ভাবী মায়ের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। শাদাফকে দেখে ভাবী বললো,
~ ঘুম ভাঙ্গলো তাহলে?
~ হুম।
~ খেয়েছো?
~ হ্যাঁ। তোমরা সবাই খেয়েছো?
~ অনেক আগেই।

কথা শেষে শাদাফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পরীর কথা কিভাবে জিজ্ঞেস করবে বুঝতে পারছে না তার মধ্যে আবার মায়ের সামনে। কি না কি ভাববে। শাদাফের মা এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিল। চুলে বিলি কাটলে আরামে চোখে ঘুম চলে আসে। তিনি চোখ খুলে শাদাফকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
~ কিছু বলবি?
~ না মানে, পরীকে তো কোথাও দেখছি না।
~ ও তো রান্না করছে।

ভাবলেশহীন ভাবে শাদাফ উত্তর দিলো প্রথমে “ওহ” পরক্ষণেই মায়ের বলা কথাটা মস্তিষ্কে টনটন করে বেজে উঠলো।”পরী রান্না করছে” ওহ গড!
~ কিরে? কিছু দরকার নাকি তোর?
~ না মা।

শাদাফ দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গেল। পরীকে দেখে শাদাফের ইচ্ছে হচ্ছে হেসে লুটিয়ে পড়তে। কিন্তু বেশি জোরে হাসাহাসি করলে মা আর ভাবী চলে আসতে পারে ভেবে মুখে হাত দিয়ে হাসছে।
পরী পা মুড়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সামনে চেয়ারের উপর ফোনে ইউটিউব অন করা। একপাশে খাতা আর কলম।
শাদাফ হাসতে হাসতে পরীর কাছে গিয়ে পরীর মত ফ্লোরে বসলো। শাদাফকে হাসতে দেখে পরী রেগে বললো,
~ মিচকা শয়তানের মত এভাবে হাসতেছো কেন?

~ আস্তে আস্তে! মা শুনলে এক্ষুনী চলে আসবে।
পরী কণ্ঠস্বর নিচু করে ফিসফিস করে বলছে,
~ তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করো না তো! আমি বিরিয়ানি রান্না করা শিখছি।
পরীর এভাবে কথা বলা শুনে শাদাফের যেন আরো বেশি হাসি পাচ্ছে। পরী সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ইউটিউবের দিকে চোখ স্থির করলো। শাদাফ হাসি থামিয়ে খাতা~ কলম একপাশে রেখে ফোনের ডাটা অফ করে দিলো।

~ কি হলো এটা? দেখছোনা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি আমি।
~ আপনার এভাবে রান্না শিখতে হলে আগামী দু’বছরেও আপনার শেখা রান্না আমাদের খেতে হবে না ম্যাম!
~ এভাবে কেন বলছো হু?
শাদাফ আর কিছু না বলে পরীর হাত ধরে দাঁড় করায়। এরপর পেছন থেকে পরীকে জড়িয়ে ধরে চুলা অন করে।
~ কি করছো এটা? তুমি কি রান্নাঘরেও রোমান্স করবে নাকি?
~ সবজায়গায়ই করবো।

~ দেখো, আমি কিন্তু সিরিয়াস মুডে আছি। মা রান্না করতে বলেছে। আমাকে রান্না করতে হবে।
~ সেজন্যই তো আমি কিচেনে আসলাম। কি কি রা

~ বাহ্! আচ্ছা আজ বিরিয়ানি আর মুরগির মাংসা রান্না শিখাবো। আজই প্রথম আর আজই শেষ। এটা কিন্তু আর শেখাবো না।
~ আচ্ছা।

শাদাফ পরীকে পেছন থেকে জড়িয়েই হাত ধরে ধরে রান্না শেখাচ্ছে। কোনটার পর কোন মশলা, কতটুকু পরিমাণ সব।
পরী মুচকি মুচকি হাসছে আর মনে মনে বলছে,
~ সত্যিই তুমি অনেক ভালো শাদাফ। আর আমি লাকি বলেই তোমাকে পেয়েছি।
~ সবকিছু ভালোমত খেয়াল করেছো বউটা?

~ হু। আমার না একটা ইচ্ছে ছিল জানো।
~ কি ইচ্ছে?
~ বিয়ের পর শ্বাশুরীর কাছে রান্না শেখার। এজন্যই কখনো বাড়িতে রান্না শেখার আগ্রহ হয়নি।
~ কিন্তু এটা তো হবেনা সোনা। আমার মায়ের বয়স হয়েছে তাই সে রান্নাঘরে এই গরমে রান্না করুক এটা আমি চাইনা।

~ এতে আমার কোনো আফসোস নেই গো! তখন তো আর এটা জানতাম না বা ভাবতাম না যে আমার কপালে এত ভালো একটা স্বামী জুটবে।
~ বউটা আমার!

~ এই তুমি বিরিয়ানিতে লবণ দিয়েছো?
শাদাফের উত্তরের অপেক্ষা না করে সাথে সাথে বিরিয়ানির মধ্যে লবণ দিয়ে দিলো।
~ এই! কি করলে এটা? লবণ দিয়েছিলাম তো।
~ না দাওনি তুমি।
~ আমার মনে আছে আমি দিয়েছিলাম।
~ না কচু।

খাবার সব রান্না শেষে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে পরী, আর শাদাফ গোসলে গিয়েছে। খাবার সব ঠিকঠাকমত সাজিয়ে রুমে যায়। শাদাফের গোসল শেষ হলে পরী হালকা আকাশী আর সাদার কম্বিনেশন একটা থ্রি পিছ নিয়ে ওয়াশরুমে যায়।

গোসল শেষে ছাদে ভেজা কাপড়গুলো শুকাতে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে চুল ঝাড়ে। শাদাফ বিছানায় বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা উপভোগ করছে আর পরীর সাথে দেখা দ্বিতীয় দিনের সকালের কথা মনে পড়ে গেল। এই ভেজা লম্বা চুলেই শাদাফ মুগ্ধ হয়েছিল আর কোনোকিছু ভাবার বা বুঝে উঠার আগেই পরীর ভালোবাসার মায়ায় আবদ্ধ হয়ে যায়।

পরী চুল ঝেড়ে এসে বলে,
~ ওমন করে কি দেখছো?
~ তোমাকে।
~ আগে দেখোনি মনে হয়।

~ দেখেছি। তবে এই রূপে দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।
কথাটা বলেই পরীর হাত ধরে টান দিতে গেলে পরী দুই পা পিছিয়ে যায়।

~ এখন উল্টাপাল্টা কিছু করলে খবর আছে বলে দিলাম। আমার অনেক খিদে পেয়েছে। চলো প্লিজ।
শাদাফ হেসে বললো,
~ শুধু তোমার ক্ষুধা লেগেছে বলে এখন ছেড়ে দিলাম নয়তো
~ চুপ! চলো।
~ এখন ছাড়লেও পরে কিন্তু ছাড়ছি না।
~ ধুর ঘোড়ার ডিম! চলো তো।

ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখে বড় ভাইয়ার মেয়ে টুম্পা খাবার সামনে নিয়ে কান্না করছে। কিছুটা খাবার খেয়েছে বলেও মনে হচ্ছে। কিন্তু কান্না করার বিষয়টা দুজনের কেউই বুঝতে পারছেনা।
আশা ভাবী এসে বললো,

~ রান্না শেষে খাবার একটু মুখে দিয়ে দেখোনি যে সব ঠিকঠাক আছে নাকি?
পরীর আত্মা এবার শুকিয়ে যায়। না জানি মা কি বলে। তবে কি শাদাফের কথাই সত্যি? ও আগে লবণ দিয়েছিল উল্টো তখন আমিই খেয়াল করিনি! পরী তুই আজ শেষ!

পর্ব ১৬

পরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাশুরী মা এসে জিজ্ঞেস করলেন,
~ কি ব্যাপার? টুম্পা কান্না করছে কেন?

আশা ভাবি উত্তরে বললো,
~ জানিনা, মা। একটুখানি খেয়েই কেমন কান্না করছে।
শাদাফের মা পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,
~ উল্টাপাল্টা রান্না করোনি তো? মানে আদৌ রান্না জানো?

পরী এবার শাদাফের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। শাদাফ চোখের ইশারায় বোঝালো, “সব ঠিকঠাক আছে”
পরীর উত্তরের অপেক্ষা না করে শ্বাশুরী মুখে একটুখানি খাবার তুলে মুখে দিলেন। পানি খেয়ে পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ ঝালটা অনেক বেশি দিয়ে ফেলেছো। সবাই যে ঝাল খেতে পারেনা এটা একটু বুঝে নেওয়া উচিত ছিল পরী।

শাদাফ মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
~ মা, পরীর কোনো দোষ নেই। আমিই বেশি ঝাল দিতে বলেছিলাম। তুমি তো জানোই আমি ঝাল খেতে পছন্দ করি।
শাদাফের কথা শুনে আর কিছু বললেন না উনি। এই যাত্রায়ও পরীকে বাঁচিয়ে নিলো শাদাফ।
ল্যাপটপে কাজ করছিল শাদাফ। পরী কাপড় ভাঁজ করছিল আর ভাবছিল, “সংসার জিনিসটা আসলেই বড্ড কঠিন। সবার মন জুগিয়ে চলা চারটেখানি কথা নয়। তবে শাদাফকে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। আচ্ছা সব সময়ই কি এভাবেই শাদাফ আমাকে বাঁচিয়ে নিবে?

নাকি কখনো আবার চেঞ্জ হয়ে যাবে শাদাফ? মনের ভেতর ভয় ঢুকে যাচ্ছে।” আড়চোখে একবার শাদাফের দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজের মাথায় আস্তে একটা থাপ্পর দেয়।
“ছিঃ পরী! তুই কি রে! যে মানুষটা তোকে এত্ত ভালোবাসে তুই কি না তাকেই ভরসা করতে পারছিস না”
কাপড়গুলো ভাজ করে শাদাফের কাছে যায়। কোল থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে শাদাফের বুকে মাথা রাখে।
~ সবসময় এত কিসের কাজ গো? ঘরে যে পিচ্চি একটা বউ আছে, সেদিকে খেয়াল নেই?

পরীর কথা শুনে শাদাফ মুচকি হাসে। পরীর কোমড়ে হাত রেখে আরো কাছে টেনে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়।
~ কে বলেছে আমি আমার বউর খেয়াল রাখি না?
~ কচু রাখো। কাউকে বলতে হবে কেন? আমি নিজেই তো দেখি হুহ।

~ আদর চাই?
~ জ্বী না।
~ তবে?

~ তোমার মাথা।
~ আমার মাথা দিয়ে কি করবে?
~ খাবো।

~ সে তো কবেই খেয়ে নিয়েছো।
~ কি? কি বললে তুমি?
~ কই কিছুনা তো। বললাম আমার বউ কত্ত ভালো।

~ মন ভালো না তাই কিছু বললাম না।
~ কেন? বাড়ির কথা মনে পড়ছে?
~ সে তো সবসময়ই মনে পড়ে। এটা কারণ নয়।

~ তাহলে?
~ আমার ভয় হয় গো! আমি কি তোমার মা~ বাবার মনে জায়গা করে নিতে পারবো? তারা কি আমাকে মেনে নিবে
~ টেনশন করো না জান। সব ঠিক হয়ে যাবে। মা কি কিছু বলেছে তোমায়?
~ না। কিন্তু মায়ের আচার~ আচরণ, ব্যবহারে মনে হচ্ছে উনি আমাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।
~ তোমার মত লক্ষী বউকে না মেনে কোথায় যাবে শুনি? মেনে নিবেই।
~ হুম। আমিও ভালো বউ হয়ে ঠিক তাদের মন জয় করে নিবো।

~ ভালোবাসি বউটা।
~ আমিও ভালোবাসি গো।

ড্রয়িং রুমে টুম্পার সাথে বসে দুষ্টুমি করছিল পরী। রুম থেকে শ্বশুরকে বেড়িয়ে আসতে দেখে মাথায় কাপড় দিলো। সম্ভবত উনি বাহিরে যাচ্ছে কোথাও। পরী মনে মনে ঠিক করে নিলো, “মন তো জয় করবোই এবং মেয়ে হবো বাড়ির, বউ নয়”

সোফা থেকে উঠে গিয়ে শ্বশুরের কাছে গিয়ে সালাম দেয়,
~ আসসালামু আলাইকুম বাবা।
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম।

~ কোথায় যাচ্ছেন বাবা?
~ বাজারের দিকে যাচ্ছি একটু।
~ ওহ। আসার সময় আমার জন্য চটপটি নিয়ে আসিয়েন।

শাদাফের বাবা কিছুক্ষণ পরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ আচ্ছা।
শ্বশুর চলে যাওয়ার পর আশা ভাবীর দিকে তাকাতেই দেখে, উনি বড় বড় চোখ করে পরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
~ কি হলো ভাবী? ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
~ তুমি বাবাকে কি বললে পরী?
~ চটপটি আনতে বলেছি। কেন আপনি খান না ভাবী?

~ সেটা নয়। আমরা কখনো বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পাইনা আর তুমি বাবাকে চটপটি আনতে বললে?
পরী এবার দুষ্টু হেসে ভাবীর গলা জড়িয়ে ধরিয়ে বললো,

~ ওহ ভাবী! আপনারা এই বাড়ির বউ আর আমি হবো এই বাড়ির মেয়ে। বউয়ের চেয়ে মেয়ের আদর বেশি জানেন না?
~ ওরে দুষ্টু।

দুজনের হাসির শব্দে শাদাফ দরজার সামনে এসে উঁকি দেয়। পরীর এমন আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়। এত সহজে যে পরিবারের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে এটা ভাবতে পারেনি শাদাফ।

পরেরদিন সকাল সকাল ঢাকার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে শাদাফ। জান্নাত পরীর বড় আপুর সাথে যোগাযোগ করেছে আর তার মাধ্যমেই পরীর সব ডকুমেন্টস আর টিসি কলেজ থেকে আনিয়েছে। এবং পরীর বড় বোন খুব সহজেই ওদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছে, এটাও বলেছে যে কয়েকদিনের মধ্যে পরীর সাথে দেখা করবে।
বর্তমানে জান্নাতের কাছেই সব ডকুমেন্টস আছে। সেগুলো আনতেই মূলত ঢাকায় যাচ্ছে শাদাফ। কুমিল্লাতেই কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে।

শাদাফ চলে যাওয়ার পরই বাসায় বোর হচ্ছিল পরী। বন্দি জীবন বন্দি জীবন লাগে। পড়া নেই কোনো। কাজও করতে হয়না। কারো সাথে কথাও হয়না। ফ্রেন্ডসগুলোর কথা অনেক মনে পড়ছে। রুমের দরজা চাপিয়ে ফোনটা নিয়ে ফেসবুকে যায়। প্রায় অনেকদিন পরই ফেসবুকে আসা। ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দেখে অনেক ম্যাসেজ। ফ্রেন্ডসগুলোর ম্যাসেজ দেখে কষ্ট হচ্ছে আবার ঠোঁটের কোণে হাসিও ফুটে। একেকজনের ম্যাসেজগুলো এরকম,
“কেমন আছিস দোস্ত? এভাবে বিয়ে করে নিলি? না বলে চলেও গেলি। তোকে অনেক মিস করিরে”
“ঐ তুই ফেসবুকে আসিস না কেন? কলেজেও আসিস না। এভাবে পর করে দিলি আমাদের”

“বড়লোক হয়ে গেছিস তাই না রে? ফোন দিলেও পাইনা। ফেসবুকেও আসিস না। স্বামী পেয়ে এখন ভালোবাসায় ব্যস্ত?”
“দোস্ত তোর বাসায় গেছিলাম। তোকে না পেয়ে অনেক খারাপ লাগলো রে। এখন আর একসাথে কলেজে যাওয়া হয়না। তুই কি আর ঢাকায় আসবি না? প্লিজ প্লিজ ঢাকায় আসিস। তোকে অনেক দেখতে মনে চায়”

“জানু! না তুই একটা সেলফিস কুত্তি। কিভাবে এভাবে ভুলে গেলিরে? মনে পড়েনা আমাদের?”
এরপর পরী ফ্রেন্ডসদের নিয়ে ওপেন করা গ্রুপে যায়। ওখানে সবার ম্যাসেজ,
“দুলাভাইর সাথে তোর কাপল ছবি দিস। আর ট্রিট দিতে ভুলে যাস না আবার”

পরী এক এক করে সবার ম্যাসেজের রিপলে দিলো।

বিকালের দিকে শাদাফ বাড়িতে আসলো।
রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিলো। পরীকে কাছে ডেকে বললো,
~ তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
~ কি গো?
~ এখন না। সন্ধ্যার সময় বলবো। এখন ঘুমাবো। মাথায় হাত বুলিয়ে দাও তো।

~ পরেই যদি বলবে এখন কেন বলতে গেলে? এখন মনের ভেতর শুধু খুতখুত করবে।
~ হাহাহা। কাছে আসো তো এখন। খুব টায়ার্ড লাগছে আর ঘুমও পাচ্ছে।
পরী শাদাফের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর শাদাফ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সন্ধ্যার দিকে শাদাফকে ডেকে তুলে।

শাদাফ উঠে ঝিম ধরে বসে আছে। বোঝা যাচ্ছে, ঘুম এখনো পুরোপুরি হয়নি। আজান শেষ হতেই আবার শুয়ে পড়ে। পরী দ্রুত টেনে তুলে শাদাফকে।
~ আর ঘুমানো হবে না সাহেব। মনের ভেতর এমনিতেই আমার ভুমিকম্প হয়ে যাচ্ছে জানার জন্য আর তুমি কি না আবার ঘুমাতে যাচ্ছো! ওঠো বলছি।
এক প্রকার ধাক্কাতে ধাক্কাতে উঠিয়ে ওয়াশরুমে পাঠায়। বিছানায় বসে শাদাফের অপেক্ষা করছিল পরী। ফোনের রিংটোনে তাকাতেই দেখে জান্নাত কল দিয়েছে। বেলকোনিতে গিয়ে কথা বলে পরী। ততক্ষণে শাদাফ ফ্রেশ হয়ে এসে পড়েছে। টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছছিল। কথা শেষ করে রুমে এসে পেছন থেকে শাদাফকে জড়িয়ে ধরে পরী। শাদাফ মুচকি হেসে পরীর হাত ধরে সামনে এনে কোমড় জড়িয়ে ধরে।

~ কি ব্যাপার হুম? হঠাৎ এত ভালোবাসা?
~ বাহ্ রে! আমি মনে হয় ভালোবাসিনা!
~ হুম তা বাসো। কিন্তু আজকে আদর একটু বেশিই দেখছি।
~ তুমি তো সবকিছুই বেশি দেখো। এখন বলো না কি সারপ্রাইজ!

~ ওহ আচ্ছা! এত আদরের কারণ তাহলে এটা?
শাদাফকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজেই রাগি লুক নিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ায় পরী। শাদাফ ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,
~ স্যরি স্যরি। মজা করেছি জান।
সব ডকুমেন্টস এনে পরীর হাতে দেয়।
~ কি এগুলা?

~ এখানে তোমার সব ডকুমেন্টস আছে আর সাথে টিসিও।
~ টিসি?
~ হুম। তুমি বলেছিলে না তুমি পড়াশোনা করতে চাও? আর তোমার ইচ্ছা অপূরণ রাখি কিভাবে বলো তো?
পরীর চোখে পানি চিকচিক করছে। শাদাফের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। শাদাফ স্মিত হাসে।
~ তোমাকে কি বলবো বুঝতে পারছি না। তবে তোমাকে পেয়ে সত্যিই নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে হয় আমার।
পরীর কাঁধে ধরে সামনে দাঁড় করায়। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

~ জানি এটা আনন্দের অশ্রু। কিন্তু তোমার চোখে আমি পানি নয় সবসময় হাসি দেখতে চাই তোমার মুখে। আর অনেক অনেক ভালোবাসায় আবদ্ধ করে রাখো আমায় এটা চাই।
পরী হেসে দিয়ে শাদাফের বুকে মুখ লুকায়।

সন্ধ্যার নাস্তা করার জন্য সকলেই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয়। পরী রান্নাঘর থেকে ট্রে তে করে চা~ বিস্কুট, নুডলস নিয়ে আসে। এসব আশা ভাবীই তৈরি করেছে।
চা খেতে খেতে শাদাফ বাবার উদ্দেশ্যে বললো,
~ পরীকে কোন কলেজে ভর্তি করলে ভালো হয় বাবা?

~ এখন আবার কিসের কলেজে পড়বে?
~ ওর পড়া শেষ হয়নি তো বাবা। এবার ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে উঠতো। আর একমাস পরই ওর ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষা ছিল কিন্তু তার আগেই তো বিয়ে করে ফেললাম। আর পরী তো এখন কুমিল্লাতেই থাকে। তাই চাইছিলাম এখানে একটা ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দেই।
~ সে তো অনেক ঝামেলা এখন।

~ কোনো ঝামেলা নেই বাবা। আমি ওর কলেজ থেকে ওর আপু আর জান্নাতকে দিয়ে টিসি আনিয়েছি।
~ সব ব্যবস্থাই তো করে ফেলেছো দেখছি।
~ নয়তো পরে বেশি দেড়ি হয়ে যাবে।

এতক্ষণ ছেলে আর তার স্বামীর কথা শুনছিল শাদাফের মা। এ পর্যায়ে তিনি মুখ খুললেন। পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
~ তুমি পড়াশোনা করতে চাও?
~ হ্যাঁ মা।
~ বিয়ের পর পড়াশোনা করার কি দরকার বুঝিনা। বিয়ে যখন হয়ে গেছে তখন পড়ার দরকার কি? মন দিয়ে সংসার করো। সংসারের কাজকাম শিখো, দায়িত্ব নাও। বছর গেলে বাচ্চা~ কাচ্চা হবে তখন কোনটা রেখে কোনটা সামলাবে?
পরী অসহায় চোখে তাকায় শাদাফের দিকে। এবারও শাদাফ ইশারায় পরীকে আশ্বস্ত করে।

~ মা সমস্যা নেই। এখনো তো পরী অনেক ছোট। আস্তে আস্তে সব শিখে নিবে আর সবদিকই সামলাবে।
~ তোদের যা ভালো মনে হয় কর।
কথাটা বলেই উনি রুমে চলে গেলেন। শাদাফও উঠে দাঁড়ালো। পরীর উদ্দেশ্যে বললো,
~ নাস্তা খেয়ে রুমে আসো। কোন কলেজে ভর্তি হতে চাও তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে তো। আবার কলেজে কথা বলতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই।
পরী মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। শাদাফের দিকে তাকিয়ে মলিন মুখে বললো,

~ হুম।
সেই সুযোগে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে পরীকে চোখ মারলো শাদাফ সাথে ঠোঁটের ভঙ্গিমায় চুমুও দেখালো। পরী চোখ বড় বড় করে তাকালো। শাদাফ দুষ্টু হাসিমুখে রুমে চলে গেল। এবার পরীও হেসে দিলো।

পর্ব ১৭

আজ নতুন কলেজে প্রথম ক্লাসের জন্য যাবে পরী। কলেজ ড্রেস পড়ে রেডি হয়ে আসে শাদাফের কাছে।
~ চলো আমি রেডি।
শাদাফ আপাদমস্তক দেখছে পরীকে।
~ কি হলো? কি দেখছো?

~ তুমি এত পিচ্চি কেন?
~ মানে?
~ শাড়িতে তোমাকে এত ছোট লাগে না কিন্তু কলেজ ড্রেসে পুরোই পিচ্চি পিচ্চি লাগে।
~ তোমার মাথা। এখন চলো তো।
~ ওয়েট।
~ কি?

~ মুখ ঢাকো আগে।
~ হিজাব পড়েছি তো। মুখ ঢাকতে হবে কেন?
~ ঢাকতে হবে আমি বলেছি তাই।
~ আচ্ছা ২ মিনিট ওয়েট করো।
২ মিনিট পরে ফিরে আসে পরী।
~ হয়েছে এবার?

~ একদম। এখন আর আমার বউর ওপর কারো নজর পড়বে না।
পরী হেসে বলে,
~ পাগল!
বাইক চালাচ্ছে শাদাফ। পরী এক হাত দিয়ে পেছন থেকে শক্ত করে বুকের দিকটায় শার্ট চেপে ধরে আছে।
~ পরী
~ হুম
~ কলেজে গিয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলবে না কেমন।
~ আচ্ছা

~ তোমাদের ক্লাসে আমার এক পরিচিত ভাইয়ের মেয়ে পড়ে। এক এলাকাতেই থাকতাম আমরা আগে। এখন তারা পাশের এলাকায় থাকে। ভাইয়ের মেয়ের নাম তিশা। আমি ওকে তোমার কথা বলেছি। ওর সাথেই বসবে। বেশি মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার দরকার নেই আর ছেলেদের সাথে কিন্তু একদম না।
~ ঠিক আছে।
পরীকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে শাদাফ অফিসে চলে যায়।
ক্লাসে বসে আগের ফ্রেন্ডসগুলোর কথা খুব বেশিই মনে পড়ছিল পরীর। পাশ থেকে তিশা বললো,
~ এই পরী
~ হ্যাঁ বলো।

~ সম্পর্কে তুমি আমার কাকি হলেও আমি কাকি বলবো না। তার অবশ্য দুইটা কারণ আছে। এক আমরা ক্লাসমেট আর দুই এত পিচ্চি মেয়েকে কাকি ডাকতে আনইজি লাগবে।
পরী হেসে উত্তর দিলো,

~ তুমি নাম ধরেই ডাকো। কোনো সমস্যা নেই।
~ তুমি অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে।
~ তুমিও।
~ তোমার মত না। এই এক ক্লাস পরই তো টিফিন দিবে। ফুসকা খাবে?
~ ইশশ! ফুসকা আমার অনেক পছন্দ। কিন্তু শাদাফ যদি রাগ করে?
~ রাগ করবে কেন?

~ এইযে নিচে যাবো।
~ আমি আছি না, কিছু বলবে না।
~ সত্যি তো?

~ হ্যাঁ।

সুলতান বেশ কয়েকদিন হলোই বাড়িতে। যখন সুলতান অন্য জায়গায় থাকতো তখন বাড়িতে আসার জন্য মনটা ছুটে যেত। কখন বাড়িতে আসবে আর কখন পরীকে দেখবে। কিন্তু এখন সুলতান সারাক্ষণ বাসায় থাকে অথচ পরীর দেখা পায় না। রুমের দরজা লাগিয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর ফোনের স্ক্রিনে পরীর ছবি দেখছে। ছবিটা পরীর ফেসবুক আইডি থেকে নিয়েছে। ছবির দিকে তাকিয়ে বলছে,

~ এই মেয়ে, এত সুন্দর করে হাসো কেন তুমি? সরাসরি তো হাসিতে পাগল করেছোই আবার ছবিতেও হাসো। পাগল করার জন্য আমায়? পাগল! পাগল! পাগল তো আমি হয়েই আছি। তুমি নিজেও তো আমায় বলেছিলে, আমি নাকি সাইকো। আচ্ছা সাইকোরা কি করে?
তুমি খুব সুখে আছো তাই না? তোমার এই সুখ বেশিদিন টিকবে তো?
দরজায় কড়া নাড়ে সুলতানের মা।
~ সুলতান দরজা খোল।

সিগারেটের আগুন নিভিয়ে দরজা খোলে।
সুলতানের মা ঘরে প্রবেশ করতেই সদ্য খাওয়া সিগারেটের খোসা আর সাথে গন্ধও পায়।
~ তুই আবার নেশা করা শুরু করেছিস?
~ না। শুধু সিগারেট খেয়েছি।
~ বাদ দিয়েছিলি কিন্তু এসব।
~ হ্যাঁ দিয়েছিলাম। কিন্তু যার জন্য দিয়েছিলাম সেই তো নেই আমার লাইফে।

~ ও কখনো তোর লাইফে ছিলোও না সুলতান। পরী আগে থেকেই শাদাফকে ভালোবাসতো। আর এটা তুই নিজেও নাকি জানতি।
~ মাঝখানে ওদের সম্পর্ক নষ্ট হয় তখন তো আমার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাহলে কেন পরী শাদাফকে বিয়ে করলো।
~ বিয়ে ঠিক হয়েছিল কিন্তু হয়নি তো। ভালোবাসার মানুষ ভুল করলে তাকে ক্ষমা করা যায়।
~ কিন্তু আমি পরীকে ক্ষমা করবো না মা।
~ পাগলামো করিস না। পরীকে ওর মতই থাকতে দে। আমরা ভালো একটা মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দিবো।
~ হাহ্! হাসালে মা। তোমরা ভাবলে কি করে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো?
~ তুই এখনো পরীর আশায় আছিস?

~ উফফ মা! প্লিজ বাদ দাও এসব কথা।
~ তুই জবটাও আর করবি না?
~ জানিনা। ভেবে তোমাকে জানাবো। এখন আমাকে একটু একা থাকতে দাও প্লিজ।
সুলতানের মা চলে যায়।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিট।
হাতঘড়িতে তাকাতেই শাদাফের মনে পড়ে গেল পরীর কথা।

পরীকে তো সাথে কোনো টিফিন দেওয়া হয়নি। তাহলে ও খাবে কি! চটজলদি শাদাফ বাইক নিয়ে পরীর কলেজের দিকে যায়।
১২টা ৩০ মিনিট থেকে টিফিনের সময় শুরু। তিশা পরীকে নিয়ে নিচে যায়।
~ কি খাবে পরী?
~ ফুসকা তো অবশ্যই খাবো, সাথে ভেলপুরীও।
~ আচ্ছা। আমি অর্ডার দিয়ে আসি।

শাদাফ কলেজের গেটের সামনে এসে পরীকে ফোন দিচ্ছে। ফোনটা যে ব্যাগে রেখে এসেছে সে খেয়ালও নেই পরীর।
ফোনে না পেয়ে বাধ্য হয়ে ক্লাসে যায় শাদাফ। সেখানেও পরীকে না পেয়ে কলিজা কেঁপে ওঠে শাদাফের। পরক্ষণেই মনে হলো, “বাহিরে খেতে যায়নি তো তিশার সাথে”
তাড়াতাড়ি সিড়ি বেয়ে নিচে নামলো শাদাফ। সব দোকান খুঁজে খুজে দূর থেকে দেখতে পেলো পরীকে। তিশার সাথে বসে ফুসকা খাচ্ছে। এতক্ষণ পর মনে হয় প্রাণ ফিরে পেল শাদাফ।

তিশা ফুসকা খেতে খেতে বললো,
~ পরী, তুমি অনেক মজা করে ফুসকা খেতে পারো। আর কারো সাথে খেয়ে মজা পাই না কারণ সবাই মজা করে খেতে পারেনা।
পরী হাসতে হাসতে পাশে তাকাতেই থমকে যায়। তখন একটা ফুসকা মুখে পুরে নিয়েছে কিন্তু চাবাচ্ছে না, পারছেনা। শাদাফকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। ততক্ষণে শাদাফ অনেকখানি এগিয়ে এসেছে ওদের দিকে। পরীর কাছে এসে একটা চেয়ার টেনে পরীর পাশে বসে।
~ কি গো ফুসকা মুখে নিয়ে বসে থাকবে? চাবাও।
শাদাফের কথা শুনে তাড়াতাড়ি ফুসকাটা খেয়ে বলা শুরু করলো,

~ আসলে বাসা থেকে টিফিন আনিনি তো। তাই তিশার সাথে বাহিরে খেতে এসেছি। তোমাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করার কথা মনে ছিল না। কিন্তু আমি কোনো ছেলের সাথে কথা বলিনি। তিশাকে জিজ্ঞেস করে দেখো।
শাদাফ ফিক করে হেসে দেয়। এক গ্লাস পানি পরীর দিকে এগিয়ে দেয়।

~ শান্ত হও। ধরো পানি খাও।
আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? কিন্তু তোমাকে না দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ফোনটা সাথে রাখতে পারো না?
~ স্যরি।
~ পাগলী! স্যরি বলার কি আছে? টেনশন হয়তো বুঝো না?
~ আর হবে না এমন।
আমি বিল দিয়ে দিচ্ছি। খাওয়া শেষে সোজা ক্লাসে চলে যাবে। ছুটির সময় আমি নিতে আসবো।
~ আচ্ছা।
~ আসি এখন। টেক কেয়ার।

শাদাফ চলে যেতেই তিশা বললো,
~ বাব্বাহ্! কাকা তোমায় কত্ত ভালোবাসে। চোখে চোখে হারায় একদম।
পরী লজ্জামিশ্রিত একটা হাসি দেয়।
~ আমার লজ্জাবতী গো! আর লজ্জা পেতে হবে না।
~ ফাজিল হাহাহা।

ড্রয়িংরুমে বসে একটার পর একটা চ্যানেল পাল্টাচ্ছিল সুলতান। কিছুই ভালো লাগছে না।
~ ধুর! টিভিতে কি কিছু ভালো জিনিসও দেয় না।

হুট করে শিলা দৌড়ে আসে।
~ ও ভাইয়া
~ কি হয়েছে?
~ দেখো না, আমি না আমার ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড ভুলে গিয়েছি।
~ ভালো হয়েছে। এই বয়সে ফেসবুক চালাতে হবে কেন রে?
~ ইশ! অপরিচিত কেউ আছে নাকি আমার আইডিতে? সবাই তো পরিচিত। ঠিক করে দা
ও না।
~ ফরগোটেন পাসওয়ার্ড দে।
~ আমি এসব পারি নাকি? তুমি ঠিক করে দাও।
~ জিমেইল এড করা নাকি ফোন নাম্বার?

~ জিমেইল।
~ দে।
শিলার আইডি ঠিক করে নিউজফিড স্ক্রল করতেই সামনে কয়েকটা ছবি চলে আসলো। খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখলো সুলতান। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠলো আর বলে উঠলো, “বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার আমি তোমার বধিবো পরাণ!”

পর্ব ১৮

সুলতান ওর বাবার কাছে গেল।
~ আব্বু তোমার সাথে কিছু কথা ছিল আমার।
~ হ্যাঁ বলো।
~ আমার কুমিল্লায় ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করে দাও যেভাবেই পারো।
~ কেন?

~ নাহলে আমি কোনো চাকরী করবো না।
~ কুমিল্লায় কেন যেতে হবে আমি তো সেটাই বুঝতেছি না।
~ ইচ্ছে আমার।

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
~ আচ্ছা আমি চেষ্টা করে দেখবো।

কলেজ ছুটির পর পরীকে সাথে নিয়ে বাসায় ফিরে শাদাফ।
~ তুমি ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হও তারপর খেয়ে নিয়ো কেমন।

~ তুমি কোথায় যাচ্ছো?
~ আমার অফিসের কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। সেগুলো কমপ্লিট করে সন্ধ্যার মধ্যেই এসে পড়বো।
~ খাবে না?
~ বাহিরে খেয়ে নিবো। এখন আসি কেমন।

~ সাবধানে যেয়ো।
শাদাফ পরীর কপালে চুমু খেয়ে বললো,
~ আচ্ছা।

শাদাফ চলে যাওয়ার পর ফ্রেশ হয়ে নিলো পরী। হালকা কিছু খেয়ে বিছানায় এসে বসতেই শরীরটা যেন একদম নুইয়ে যাচ্ছে। চোখে ঘুম আছড়ে পড়ছে। টায়ার্ডের জন্য একসময় বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে চোখজোড়া ঘুমে বন্ধ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর পরী টের পেলো কেউ ওর বাহু ধরে ঝাঁকাচ্ছে। মাত্র ঘুমে চোখ দুটো লেগে এসেছিল। কাঁচা ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল পরীর। চোখ মেলে তাকাতেই দেখে ওর শ্বাশুরী। তাড়াতাড়ি শোয়া থেকে উঠে বসে।
~ এইসময়ে ঘুমাচ্ছো যে?

~ না আসলে, সারাদিন কলেজ আবার জার্নি তাই একটু ক্লান্তবোধ হচ্ছিল। আর তাই ঘুম চলে এসেছিল।
তিনি একটু ব্যাঙ্গ করে বললেন,
~ কোনো রাজকার্য তো আর করে আসোনি। কলেজে সারাক্ষণ বসেই তো থাকো। এত ক্লান্ত হওয়ার কি আছে?
পরী কিছু না বলে মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
তিনি আবার বলেন,

~ যাই হোক, কতগুলো মাছ এনেছে ঐগুলা একা আশা কাটতে পারবেনা। তুমিও যাও সাথে গিয়ে মাছগুলো কাটো।
মাছ কাটার কথা শুনেই চোখ বড় বড় করে তাকায় শ্বাশুরীর দিকে। বিয়ের আগে শুধুমাত্র একবারই মাছ কাটার চেষ্টা করেছিল পরী। তাও আঁশ ছাড়াতে গিয়ে মাঝখান থেকে দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেটা নিয়ে বাড়িতে সবার সে কি হাসাহাসি! এরপর আর পরী কখনো মাছ কাটতে যায়নি। পরীর মা অবশ্য বলতো যে “আমি মাছ কাটি। তুই পাশে বসে দেখ। আস্তে আস্তে শিখে যাবি”
পরী উত্তরে বলতো,

~ কাঁচা মাছের গন্ধ খুব বিশ্রী হয় মা। কেমন যেন গা গুলায়।
মেয়ের কথা শুনে তিনি হেসে বলেন,
~ বাপের বাড়ি এসব কথা বলিস ভালো কথা কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ভুলেও এসব বলিস না।
~ কেন? বললে কি হবে শুনি?

~ মেয়ে হয়েছিস যখন, তখন বিয়ের পর তো সংসার তোকেই গুছাতে হবে তাই না? তখন এমন সব কথা বললে চলবে? দেখা যাবে শ্বাশুরীও বকাঝকা করবে।
~ বাহ্ রে! আমি তো এখনো কোনো কাজ পারিনা আর করিও না। কই তুমি তো আমাকে বকো না।
~ বোকা মেয়ে এখন এতকিছু বুঝতে হবে না। শুধু আস্তে আস্তে টুকটাক কাজ শিখে নে।

শ্বাশুরীর ধমকে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে পরী।
~ কি হলো? কি বললাম আমি? এখনো বসে না থেকে তাড়াডাড়ি আসো।
~ হ্যাঁ! মুখে একটু পানি দিয়েই আসছি।

শ্বাশুরী মা চলে যেতেই পরী মুখে পানির ঝাপটা দিলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ভাবলো, “না জানি আজ কি আছে কপালে”

রান্নাঘরে গিয়ে দেখে অনেক বড় বড় সাইজের দুইটা রুই মাছ, তিনটা ইলিশ মাছ আর সাথে মাঝারি সাইজের পুঁটি আর চিংড়ী মাছ।
পরী কি করবে বুঝতে পারছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশা পরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ এসেছো? তুমি বরং পুঁটি আর চিংড়ি মাছগুলো কাটো।

পরী তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
~ পরী?
~ হ্যাঁ ভাবী!
~ কি ভাবছো?
~ কিছুনা তো।

~ মাছ কাটতে পারো?
পরী কিছু বলেনা। কিন্তু চেহারার ভঙ্গি আর অসহায় চোখের চাহনী দেখে আশা ঠিক বুঝে গেল যে পরী মাছ কাটতে পারেনা।
~ আচ্ছা, তুমি আমার পাশে বসে দেখো আমি কিভাবে মাছ কাটি।

পাশ থেকে শ্বাশুরী মা বললেন,
~ বাহ বাহ্! কাজের বেলায় একদম আমড়া গাছের ঢেকি। কাজকর্ম কিছুই পারোনা অথচ ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঠিকই বিয়ে করে নিয়েছো। আমি তো এটা ভেবেই পাইনা যে শাদাফ তোমার মধ্যে এমন কি দেখলো। বাপের বাড়ি কি করতে বলো তো? শুধু ঘুম খাওয়া আর পড়ালেখা? এসব শ্বশুরবাড়িতে চলবে না একদম। তোমার মা কি তোমায় কোনো কাজই শেখায়নি?
পরীর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। পরীকে কখনো কেউ এভাবে কিছু বলেনি। শাদাফ বলে দিয়েছে, মায়ের মুখে মুখে যেন কোনো কথা না বলে তাই নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে পরী।

ঐদিকে শ্বাশুরী মা আরো যা তা বলেই যাচ্ছেন। বুঝাই যাচ্ছে এতদিনের সব রাগ আজ একসাথে উসুল করছে। উনি যে পরীকে মেনে নিতে পারেননি এটাও ক্লিয়ার হলো আজ। অবশ্য না মানাটাই স্বাভাবিক।”শাদাফ তো আমার চেয়েও আরো ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে”
শ্বাশুরীর এতসব কথা শুনে কান্নাটা আর নিঃশব্দে আটকে থাকেনা বরং এবার কান্নার আওয়াজ জোরে হয়। একসময় হেঁচকি উঠে যায় কাঁদতে কাঁদতে। শ্বাশুরী চলে যাওয়ার পর পরী দৌড়ে নিজের রুমে যায়। বিছানায় উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে থাকে।

“উনি কি কখনোই আমায় মেনে নিতে পারবেন না। আমি কি এতই খারাপ! মা, আমি কি কোনো ভুল করেছি শাদাফকে ভালোবাসে। ভালোবাসা তো বলেকয়ে হয়না মা। আমি যে শাদাফকে অনেক ভালোবাসি। আর ওর জন্য হলেও সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করতে হবে আমায়। তবে যেভাবেই হোক, আমিও ঠিক তার মনে জায়গা করে নিবো”

ফোনের শব্দে বালিশ থেকে মুখ তুলে ফোনটা হাতে নেয়। শাদাফ ফোন করেছে। নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণ স্বাভাবিক করে ফোনটা রিসিভ করে।
~ হ্যালো
~ আমার পরীটা কি করে?
~ এইতো শুয়ে আছি। তুমি কি করছো?
~ আমি অফিসে। কিন্তু তোমার গলার স্বর অমন শোনাচ্ছে কেন?
~ কেমন?

~ তুমি কি কান্না করছো পরী?
শাদাফের মুখে কান্নার কথা শুনে আরো বেশি চোখের পানি পড়ছে পরীর। প্রায় মানুষই যখন কান্না করে তখন তাদের শান্তনা দিতে গেলে বা কান্না করার কারণ জানতে চাইলে আরো বেশি কান্না পায়। তাদের মধ্যে পরী নিজেও একজন।

~ কি হলো পরী? কথা বলছো না কেন?
~ কাঁদছি না তো আমি।
~ মিথ্যা বলবা না একদম। বলো কি হয়েছে?
~ আসলে আমার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছিল। মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।
~ এভাবে ভেঙ্গে পড়লে হবে? তুমি একটা ফোন দিয়ে দেখো।
~ হু

~ প্লিজ কান্না করো না জান। আচ্ছা বেশ, আমি বাসায় আসি তারপর আমার বুকে এসে যত খুশি কান্না করো কিন্তু এখন একদম কাঁদবেনা বলে দিলাম।
~ হুম।
~ আচ্ছা শুনো, আমার আসতে লেট হবে। তুমি খেয়ে নিয়ো কেমন।

~ হুম।
~ ভালোবাসি বউ।
~ আমিও ভালোবাসি।
ফোন রাখতেই পরীর মনে হলো, “সত্যিই তো একবার মাকে ফোন দিয়ে দেখতে পারি। কিন্তু আমার নাম্বার থেকে নয়, আশা ভাবীর ফোন থেকে ফোন দিয়ে দেখি”

পরী ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। আশা ভাবীর থেকে ফোনটা নিজের ঘরে নিয়ে এসে মায়ের নাম্বারে ডায়াল করলো। কিন্তু ওপাশ থেকে একটা বিরক্তিকর মহিলার কন্ঠ ভেসে আসছে। যেটা পরীর বরাবরই পছন্দ না।
“আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। ধন্যবাদ”। যতবার ফোন দিচ্ছে এই এক কথাই ভেসে আসছে।

এবার যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে বাবার নাম্বারে ডায়াল করলো। ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে চির পরিচিত কন্ঠস্বরটা ভেসে আসলো। না চাইতেও পরীর চোখে অশ্রুকণা জড়ো হলো সেই সাথে শুষ্ক ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করছে। পরী এবার আস্তে করেই বললো,
~ বাবা!

পরীর কথা শোনার পর ওপাশ থেকে নিরবতা বজায় রেখেছে। কিছুক্ষণ পর পরীর বাবা বললেন,
~ কে বলছেন?
~ বাবা তুমি আমায় চিনতে পারছো না? আমি তোমার পরী।

~ দুঃখিত। আমি তো পরী নামে কাউকে চিনিনা। আপনি হয়তো ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন।
~ বাবা! ও বাবা, প্লিজ আর অভিমান করে থেকো না। বাবা

পরীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। পরী ফোনটা বুকে নিয়ে কাঁদতে লাগলো।
পরীর মা রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন,
~ কে ফোন করেছিল?

~ পরী।
~ পরী! আমাকে দিলেনা কেন? আমি একটু কথা বলতাম। কতদিন কথা বলিনা মেয়েটার সাথে।
~ এত উতলা হয়েও না তো! তোমার মেয়ে কোথাও ঘুরতে বা বেড়াতে যায়নি। সে আমাদের পর করে দিয়ে অন্য একটা ছেলের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। তার সাথে কথা বলার কি আছে? পরী নামে আমার কোনো মেয়ে নেই। যে ছিল সে মারা গেছে।

শেষের দুইটা কথা বলার সময় পরীর বাবার গলা আটকে আসছিলেন। কথাগুলো বলেই তিনি রুম ত্যাগ করেন। হয়তো কষ্টগুলো বুঝতে না দেওয়ার জন্য। তার চোখের পানি কারো সামনে প্রকাশ হোক এটা চায়না তিনি। পরীর মায়ের চোখ থেকেও পানি পড়ছে।

রাত ১০:২০ মিনিট।

শাদাফ বাড়িতে এসে দেখে সব ঘরের লাইট বন্ধ। তার মানে সবাই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে। নিজের বেডরুমে এসে লাইট অন করে দেখে পরী এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে। পরীর কাছে গিয়ে, খোলা চুলগুলো আগে বেঁধে দেয়। বালিশে হাত দিতেই দেখে বালিশের কিছুটা অংশ ভেজা। তার মানে পরী কাঁদছিল এখনো। পরীর গালে আলতো করে হাত রাখলো।
~ পরী। এই পরী উঠো।

পরীকে ধরে উঠিয়ে বসায়। ঘুমে চোখ খু্লতে পারছেনা পরী। শাদাফের বুকে হেলে পড়ে।
~ খাওনি এখনো তাই না?

~ খাবো না।
~ এমন করলে চলবে বলো? তুমি যদি এভাবে না খেয়ে থাকো তাহলে আমার কষ্ট হবেনা বলো? যাও উঠে মুখ ধুয়ে আসো।
~ টেবিলে খাবার রাখা আছে। তুমি খেয়ে নাও। আমি খাবো না।
~ আবার বেশি কথা বলে।

শাদাফ নিজেই পরীকে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। মুখ ধুইয়ে কোলে করে রুমে নিয়ে এসে দাঁড় করায়। এক টানে পরীর শাড়িটা খুলে ফেলে। পরী অবাক চোখে তাকায় শাদাফের দিকে। শাদাফ পরীর কাছে গিয়ে কানে কানে বলে, “অবাক হওয়ার কিছু নেই ম্যাম! তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।”

লেখা – মুন্নি আক্তার প্রিয়া

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার তুমি (সিজন ১ – ১ম খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আমার তুমি (সিজন ১ – শেষ খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini