মিষ্টি প্রেমের গল্প

আমার তুমি (সিজন ১ – শেষ খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini

আমার তুমি (সিজন ১ – শেষ খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini: বেডরুমে পরীকে না দেখে স্টাডি রুমে উঁকি দেয়। শাদাফ সোজা রান্নাঘরে চলে যায় পরীর জন্য কিছু বানাতে। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে শাদাফের চোখ একদম ছানাবড়া। শাদাফ অবাক হয়ে বলে


পর্ব ১৯

শাদাফ একটা প্যাকেট এনে পরীর হাতে দেয়।
~ কি এটা?
~ খুলেই দেখো।

প্যাকেট খুলে একটা কালো শাড়ি দেখতে পায়।
~ শাড়ি?
~ হ্যাঁ। পছন্দ হয়নি?

~ তোমার দেওয়া সব গিফ্টই আমার পছন্দের।
~ তাহলে শাড়িটা এখনই পড়ে নাও। নাকি আমি পড়িয়ে দিবো?
~ আমার ভালো লাগছে না।
~ তা বললে তো শুনবো না। আচ্ছা আমিই পড়িয়ে দিচ্ছি।
শাদাফ শাড়ি পড়াতে পড়াতে বললো,
~ ও বউ

~ হু
~ সারপ্রাইজটা কিন্তু এখনো দেইনি।
~ মানে? এইযে শাড়িটা? এটা কি ছিল?
~ এটা ভালোবাসার একটা উপহার ছিল। সারপ্রাইজ এখনো বাকি।
~ কি সারপ্রাইজ?

~ বলবো। আগে শাড়িটা পড়াই।
শাড়ি পড়ানো শেষে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসায় পরীকে। সুন্দর করে চুলগুলো আঁচড়িয়ে দেয়। মুখে হালকা মেকাপ আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়ে দেয়।
পরী বিরক্তি নিয়ে বলে,

~ আমি বললাম যে আমার ভালো লাগছেনা। তারপরও এসব সং সাজার কোনো মানে হয় এই রাতে?
~ ওমা! আমি কি দিনে বাসায় বসে থাকি নাকি যে তুমি দিনে সাজবা আর আমি দেখবো। রাতে আমি বাসায় ফিরি, কই একটু সাজুগুজু করে থাকবা। আমি এসে আদর করবো। তা না! একদম কেঁদেকেটে চোখমুখের কি অবস্থা করে রেখেছো।

~ হইছে তোমার সাজানো? আমি ঘুমাবো।
~ এহ্! বললেই হলো নাকি। এত কষ্ট করে সাজিয়েছি, সাজগুলো নষ্ট করবো না?
~ মানে?
শাদাফোর চোখেমুখে দুষ্টুমির হাসি।
~ মানেটা পরে বোঝাবো। আগে সারপ্রাইজটা দেই।

পরীকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে শাদাফ পরীর পাশে বসে। ফোনে কল ঢুকিয়ে পরীর হাতে দেয়।
~ কি করবো? কাকে ফোন দিচ্ছো?
~ আমার দিকে না তাকিয়ে ফোনের দিকে তাকাও। কলটা রিসিভড করেছে।

পরী ফোনের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। খুশিতে চোখের পানি টলমল করছে। ভিডিও কলে নিজের মাকে দেখে অনেক বেশিই অবাক হয়। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অথচ ঠোঁটে হাসি। এই পরিস্থিতিটা যেন সত্যিই সুখের।

~ মা!
পরীর মাও কাঁদছে। এতগুলো দিনপর পরীকে দেখছে। কথা বলতে পারতেছেন।
~ কেমন আছিস পরী?
~ আমি ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছো? বাবা কেমন আছে?
~ তোকে ছাড়া আমরা কিভাবে ভালো থাকি বলতো?

~ আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দিয়ো মা।
~ ধুর পাগলী মেয়ে! যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। আর নিজের ছেলে~ মেয়েদের ওপর কোন বাবা~ মা বেশিদিন রাগ করে থাকতে পারবে বলতো? আমিও পারিনি।
~ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো মা?
~ হ্যাঁ রে মা।

~ তাহলে আমি যে তোমাকে আগে ফোন দিলাম। ধরোনি কেন? আজও ফোন দিয়েছিলাম কিন্তু বন্ধ পেয়েছি।
~ আগের কথা তুলে এখন সময়টাকে নষ্ট করবি?
~ না, না একদম না। তুমি অনেক শুকিয়ে গিয়েছো মা। ঠিকমত খাও না?
~ আর খাওয়া!

~ আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না মা?
~ বাদ দে এসব। তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেমন?

~ সবাই অনেক ভালো।
~ যাক আলহামদুলিল্লাহ্‌! সবার সাথে মিলেমিশে থাকবি। কারো সাথে তর্ক করবিনা, কাউকে রাগ দেখাবি না।
~ আচ্ছা মা।

~ পরী
~ হুম বলো
~ তুই তো রান্না করতে পারিস না। রান্না কে করে?

~ বড় ভাবী করে।
~ জয়েন্ট ফ্যামিলি?
~ হ্যাঁ।
~ শোন মা, সংসার কিন্তু সহজ জিনিস না। বিয়ে যখন করেই ফেলেছিস তখন এই বন্ধন তো নষ্ট হওয়ার মত না। তোকে কিছু শেখানোর, বুঝানোর আগেই হুট করে বিয়ে করে ফেলেছিস। সেসব বাদ দেই। একটা কথা মনে রাখবি, আগে তুই থাকতি বাবার বাড়ি আর এখন থাকিস শ্বশুরবাড়ি। বাবার বাড়ি মানে জানিস? বাবা যতই গরীব হোক না কেন, তার মেয়েকে ঠিকই রাজকন্যা বানিয়ে রাখে। একটুও কষ্ট পেতে দেয়না।

কিন্তু শ্বশুরবাড়ি তা নয়। তুই আবার এটা ভাবিস না যে, শ্বশুরবাড়ি মানে অশান্তির জায়গা। অবশ্যই শ্বশুরবাড়ি সুখের জায়গা। তবে সেখানে তুই রাজকন্যা হতে পারবিনা। হলে রাণী হতে পারবি। বাবার বাড়ি রাজকন্যা হওয়া যতটা সহজ শ্বশুরবাড়িতে রাণী হওয়া ঠিক ততটাই কঠিন। একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে, অনেকের অনেক কথা মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। সংসারে প্রতিবাদ জিনিসটা মানায় না। সবার মন জুগিয়ে চলতে পারলে সংসার সুখের হয়। তবে আরেকটা দিকও মাথায় রাখবি, “স্বামী ঠিক মানে সব ঠিক”। কখনো কারো সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করবিনা। মনে থাকবে?
~ থাকবে মা।

~ জামাই কোথায়?
~ পাশেই।
~ খেতে দিয়েছিস?

~ না।
~ কয়টা বাজে দেখেছিস? যা খেতে দে।
~ আরেকটু কথা বলিনা মা।

~ জামাইকে খেতে দিতে আয়, তারপর বলি।
~ ও এখন খাবেনা।
~ কেন?
~ ইয়ে মানে
~ ইতস্তবোধ করছিস কেন আমার কাছে?
~ আসলে মা, আমি তো খাইনি। আর আমাকে রেখে খাবেওনা।

~ বাব্বাহ্! যাক জামাইটা তাহলে ভালো জুটেছে আমার মেয়ের কপালে। সারাজীবন স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাক মা, এই দোয়াই করি।
~ হুম মা। বাবা কেমন আছে?
~ ভালোই আছে।
~ তোমাদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে মা।

~ বাসায় আসবি?
~ কিন্তু বাবা আর ভাইয়া যদি কিছু বলে?
~ বৃহস্পতিবার তোর বাবা আর ভাই এক সপ্তাহের জন্য কোথায় জানি যাবে, প্ল্যানিং করছে।

~ আচ্ছা, আমি ওকে বলে দেখি, ও যদি অনুমতি দেয় তাহলে অবশ্যই আসবো।
~ অপেক্ষায় থাকবো তোর।
~ তুমি খেয়েছো?

~ না খাবো।
~ বাবা কোথায়? আমার সাথে যে কথা বলছো, শুনছে না?
~ না। তোর আপুকে নিয়ে তোর ঘরে এসে কথা বলতেছি। শোন মা, এখন রাখছি। কাল দিনে ফোন দিস। এখন জামাইকে নিয়ে খেয়ে নে। জামাইর কথা শুনে চলবি। ভালো থাকিস।
~ তুমিও ভালো থেকো মা।

ফোনটা রেখেই আচমকা পরী শাদাফকে জড়িয়ে ধরে। হুট করে জড়িয়ে ধরায় শাদাফ টাল সামলাতে না পেরে পরীকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
~ তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো। তুমি ভাবতেই পারবেনা যে, তুমি আমাকে কত্ত বড় সারপ্রাইজ দিয়েছো। সত্যি বলছি এই সারপ্রাইজটা আমাকে অনেক অনেক খুশি করে দিয়েছে।

শাদাফ পরীকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ আমি তো আগেও বলেছি, আমার পরীর মুখে কান্না মানায় না একদম। আমি চাই আমার বউপরী সবসময় হাসিখুশি থাকুক।
~ সত্যিই তুমি আমার বেষ্টগিফ্ট।
~ এখন আমার আদর?

~ কিসের আদর?
~ হায় হায়! কিসের আদর মানে? এইযে আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দিলাম এটার বিনিময়ে আমি আদর পাই। তাছাড়া আমি যে এত কষ্ট করে সাজিয়ে দিলাম, সাজ নষ্ট করবো না বুঝি?
শাদাফ পরীর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিতেই, পরী খিলখিলিয়ে হেসে উঠে।

~ উফফ শাদাফ! কতবার বলেছি আমার সুরসুরি লাগে। ছাড়ো।
শাদাফ মুখ তুলে বলে,
~ ছাড়বো কেন? ছাড়ার জন্য কাছে এসেছি নাকি।
~ আচ্ছা শুনো একটা কথা।
~ কি?

~ মা কি বলেছে শুনেছো?
~ মিসেস, তুমি যে হেডফোন কানে দিয়ে কথা বলছিলে ভুলে গিয়েছো?
~ উফস! স্যরি।

~ তো, মা কি বললো?
~ বাবা আর ভাইয়া এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে থাকবে না। তাই মা বললো, যদি একবার যেতাম। মানে অনেকদিন হলো মাকে দেখিনা।
~ যেতেই হবে?
~ তুমি অনুমতি দিলে যাবো।
~ কবে যেতে বললো?

~ এই বৃহস্পতিবার।

~ তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার কষ্ট হবে কিন্তু তবুও চাই তুমি যাও। এতে এতদিনের মনোমালিন্য, কষ্টগুলো দূর হবে।
~ আমি একা যাবো?

~ পাগল নাকি তুমি? এতদূর আমি তোমাকে একা ছাড়বো? বৃহস্পতিবার তোমাকে দিয়ে, শুক্রবারে সকালে চলে আসবো।
~ সেকি, তুমি একদিনও থাকবে না?

~ অফিস সামলানো মুশকিল হয়ে যাবে সোনা। যখন তোমার বাবা আর ভাই মেনে নিবে তখন গিয়ে পুরো ১ মাস থেকে আসবো কেমন।
~ ধুর! ভাল্লাগেনা।
~ আদর দেই? আদর দিলেই ভালো লাগবে।
~ নাহহ!
দুজনই হেসে দেয়। শাদাফ পরীকে উঠিয়ে বলে,
~ চলো, আজকে তুমি আমাকে খাইয়ে দিবে।

বাড়ির ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছে সুলতান। সুলতানের মা ছাদে আসতেই সিগারেট টা ফেলে দেয়।

~ ফেললি কেন? খা, সমস্যা নেই।
~ তুমি বলছো এই কথা?
~ না বলে উপায় আছে? তুই শুনিস আমার কথা?

সুলতানকে চুপ থাকতে দেখে উনি আবারও বললেন,
~ বাদ দে। তোর বাবা ডাকছে। শুনে যা।
~ চলো।

বাবার পাশে গিয়ে সুলতান বসলো।
~ আমায় ডেকেছো?
~ হ্যাঁ। কই থাকিস, দেখি না কেন?

~ ছাদে ছিলাম।
~ আচ্ছা যেটার জন্য তোকে ডেকেছিলাম, তোর ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করেছি।
সুলতানের চোখেমুখে হাসির ঝিলিক ফুটে ওঠে।

~ সত্যি? কুমিল্লায় তো?
~ হ্যাঁ। কুমিল্লায়। কিন্তু তোকে আমায় কিছু কথা দিতে হবে।
~ বলো।
~ আর কোনো পাগলামি করা চলবে না তোর। পরীর ভূত মাথা থেকে নামাবি। মাথায় এটাই রাখবি যে, পরী এখন অন্য কারো। ভুলেও কোনোভাবে ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করবিনা। যাকে ভালোবাসা যায় তার ক্ষতি করা যায়না, জানিস তো এটা?

~ হুম।
~ গুড। আর এইসব নেশাটেশা বাদ দিবি। মন দিয়ে কাজ করবি। তারপর কয়েক মাস গেলে, খুব সুন্দর একটা মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দিবো।
~ বিয়ে টিয়ের কথা বাদ দাও বাবা। এসব নিয়ে আমি এখন ভাবছিনা।

~ বেশ তোর যা ভালো মনে হয়। আর হ্যাঁ, তোর জয়েনিং কিন্তু এই বৃহস্পতিবারেই করতে হবে।
~ এই বৃহস্পতিবার?
~ হ্যাঁ। কেন তোর কোনো সমস্যা আছে?
~ না না। আচ্ছা তাহলে আমি একটু বাহিরে যাই। বন্ধুদের সাথে দেখা করে আসি।
~ যা।


পর্ব ২০

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়ে নিলো পরী। তারপর ভাবীর হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছিলো। সব কাজ শেষে শাদাফকে ঘুম থেকে উঠাতে যায়। শাদাফের মুখের দিকে তাকাতেই কেমন যেন মনের ভেতর প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে ৬:৪২ বাজে। ওদেরকে বের হতে হবে আট টায়। তার মানে এখনো কিছু সময় ঘুমাতে পারবে। তাই শাদাফকে আর না ডেকে ব্যালকোনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।

ব্যালকোনির গ্রিল আঙ্গুল দিয়ে পেঁচিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখছে। দূর~ দূরান্তে বড় বড় গাছপালা। বাড়িটা কুমিল্লার শহরে না হওয়ায় বাড়ির চারিপাশে অনেক গাছ~ গাছালি রয়েছে। যদিও শীত এখনো পড়েনি তবুও ঠান্ডাটা বেশ ভালোই লাগছে। পরীর খুব ইচ্ছে ছিল, শীতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটবে শাদাফের হাত ধরে। এসব অবশ্য গল্পেই মানায়। ইচ্ছেটা পরীর গল্প পড়েই হয়েছিল। পরী নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে “আচ্ছা সব ইচ্ছে কেন বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে? চাইলে তো কিছু স্বপ্ন আমরাও বাস্তবে রূপ দিতে পারি। কিন্তু শাদাফ চাইবে তো!”

আট টা পঁয়ত্রিশে পরীকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে শাদাফ অফিসে চলে যায়। পরীর ক্লাস তিন তলায়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময় খেয়াল করছিল, অনেকেই পরীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো চেনার চেষ্টা করছে বা ভুলে গিয়েছে এটার ব্যর্থতা নাকি এটাও ভাবছে। এতগুলো দিনে কলেজের সবাইকে চেনা সম্ভব না হলেও ক্লাসের সকলের মুখ চেনা অসম্ভব না। এটা পরী তিন তলায় গিয়েই বুঝেছিল।
ক্লাসে ঢুকতেই তিশা দৌড়ে এসে পরীকে জড়িয়ে ধরে।

~ কেমন আছো?
~ ভালো আছি। তুমি?
~ অনেক ভালো।
বেঞ্চে ব্যাগ রাখতে রাখতে পরী বললো,
~ আজ মনে হচ্ছে তিশুটা অনেক বেশিই খুশি!
~ এই! তুমি আমাকে তিশু বলে ডাকলে?

~ হ্যাঁ ডাকলাম। তোমার সমস্যা হলে ডাকবোনা।
~ না, না! সমস্যা কেন হবে?
~ তবে?

~ আসলে আমাকে আরেকজনও তিশু বলে ডাকে।
~ তাই? তা কে সে শুনি? বয়ফ্রেন্ড?
তিশা হেসে বলে,

~ আরে না। তেমন কেউ না। চলো ক্যান্টিনে যাই। ক্লাস শুরু হতে তো এখনো অনেক দেড়ি।
~ চলো।
তিশা পরীর হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। দুজনই চুপচাপ দেখে পরীই বললো,

~ বললে না তো আর কে তিশু ডাকে?
~ একটা ফ্রেন্ড।
~ শুধুই ফ্রেন্ড?

~ হ্যাঁ।
পরীর মুখে দুষ্টুমির হাসি।
~ আর কিছুনা?
~ আর কি?
~ হাহাহা কিছুনা।
তিশা চোখ পিটপিট করে পরীর দিকে তাকায়। ভ্রু কু্চকে বলে,

~ প্রথম দেখায় ভেবেছিলাম তুমি খুব শান্তশিষ্ট। কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি খুব দুষ্টু।
এতক্ষণে কথা বলতে বলতে ক্যান্টিনে চলে এসেছিল দুজনে। পরী একটা চেয়ারে তিশাকে বসিয়ে, তিশার মুখোমুখি বসলো।
~ তোমার প্রথম ধারণাটা ছিল ভুল। কিন্তু দ্বিতীয়টা ঠিক।

~ তুমি অনেক দুষ্টু তাই না?
পরী মুচকি হেসে বলে,
~ হ্যাঁ।
~ তোমার রাগ নেই?
~ রাগ ছাড়া আবার মানুষ হয় নাকি?
~ তবুও। কেমন রাগি তুমি?

~ সেটা আস্তে আস্তেই বুঝতে পারবা।
~ আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু শাদাফ কাকা কাজটা ভালো করেনি।
~ কোন কাজ?

~ এই যে আমাদের কিছুই বলেনি বিয়ের কথা। দাওয়াতও দাওনি।
~ পারিবারিকভাবে তো বিয়ে হয়নি তিশু।
~ তাহলে?

~ আমরা কোর্টে গিয়ে বিয়ে করেছি পরিবারকে না জানিয়ে।
তিশা অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে বললো,
~ সত্যি বলছো?

~ হ্যাঁ।
~ তার মানে লাভ ম্যারেজ?
~ একদম।

~ এই তোমাদের লাভ স্টোরিটা একটু বলো না!
~ এখন?
~ হ্যাঁ।

~ একটুপর ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। পুরোটা শুনতে পারবেনা। একদিন সময় করে বলবো।
~ কতদিন অপেক্ষা করবো কচু।
~ এই ধরো ১০/১২ দিন।

~ এত?
~ হ্যাঁ। বৃহস্পতিবার বাড়িতে যাবো। এক সপ্তাহের আগে তো আসবোইনা।
~ তোমার পরিবার মেনে নিয়েছে?
~ না। আপু আর আম্মু মেনে নিয়েছে।

~ হাউ সুইট!
পরী মুচকি হেসে পাশে তাকাতেই কোনাকুনি টেবিলে বসে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ যায়। একটুপর পরই ছেলেটা আড়চোখে তাকাচ্ছে। পরী তিশাকে বললো,
~ তিশু, ছেলেটা বারবার তোমায় আড়চোখে দেখছে।

~ কোন ছেলেটা?
~ ঐযে ঐ ছেলেটা।

~ আরে ও তো তামজীদ। আমাদের ক্লাসমেট।

~ তো ওভাবে চোরের মত কেন তাকাচ্ছে?
~ মেবি তোমার দিকে তাকাচ্ছে।
~ এই কথা ভুলেও আর মুখে এনো না। শাদাফ শুনলে একদম মেরেই ফেলবে।
~ হাহাহা।
~ বেশি হাসলে দাঁত পড়ে যাবে। ক্লাসে চলো।

ক্লাশে লেকচার দিচ্ছে স্যার। পরী সেগুলো খাতায় নোট করছে। পাশে বসে থাকা তিশা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ডাটা অন করতেই ম্যাসেঞ্জারে টুং করে শব্দে ম্যাসেজ আসে। ভাগ্যিস অনেক স্টুডেন্ট ছিল তাই আওয়াজটা স্যারের কানে যায়নি। তিশা ফোন সাইলেন্ট করে চ্যাটিং করা শুরু করেছে। পরী লিখছে আর একটু পরপর তিশার দিকে তাকাচ্ছে। কারণ তিশা চ্যাটিং করার সাথে সাথে মুচকি মুচকি হাসছিল।

~ কি ব্যাপার তিশু হুম?

~ কি?
~ কার সাথে চ্যাটিং করা হচ্ছে?
~ রাফিন।
~ এই রাফিনটা কে?

~ ঐ যে সে। যে তিশু বলে ডাকে।
~ ওহ আচ্ছা। বিয়ের আগে আমিও এরকম ক্লাসে বসে পড়া ফাঁকি দিয়ে শাদাফের সাথে কত চ্যাটিং করেছি হিহিহি।

রাতে যখন সবাই খেতে বসলো তখন শাদাফ পরীর বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বললো। খেতে খেতেই প্রসঙ্গটা তু্লছিল শাদাফ।
শাদাফের মা বললেন,
~ ওর পরিবার মেনে নিয়েছে? না মানে ডেকে নিয়ে তোর উপর আবার কোনো টর্চার করবে না তো?
~ না মা এমন কিছুই হবে না। আপাতত ওর মা আর বড় আপু মেনে নিয়েছে।

~ বুঝলাম। কবে যাচ্ছিস?
~ বৃহস্পতিবার।
~ থাকবি কয়দিন?
~ পরী সপ্তাহ্ খানেক থাকবে। আমি পরেরদিনই চলে আসবো।
~ সেই ভালো। তোর বেশিদিন থাকার দরকার নেই।

শাদাফ আর বিষয়টা নিয়ে ঘাটায় না। মা যে রাজি হয়েছে এটাই অনেক। আর পরী তো আগে থেকেই নিশ্চুপ।
খাওয়া~ দাওয়া শেষে শাদাফ বাহিরে যায়। পরী টেবিল পরিষ্কার করে, থালাবাসন ধুয়ে রুমে যায়। বিছানা ঠিক করে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে কিন্তু এখনো শাদাফের আসার নামগন্ধ নেই। ফোন করতে গিয়ে দেখে ঘরেই রেখে গেছে।

সময় কাটছে না দেখে পরী একটু ফেসবুকে যায়। ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে একটা ম্যাসেজ দেখে পরীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।”শুনলাম বিয়ে করেছো? এত তাড়াতাড়িই বিয়ে করে ফেললে?, তো টিকবে তো বিয়ে?”

আইডি দেখে বোঝার উপায় নেই মেয়ে নাকি ছেলে। কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে যে পরীর প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। ইচ্ছে করছিলো দু~ চারটা কথা শুনিয়ে দিতে। রিপলে দিতে যাবে তখনই শাদাফ রুমে আসে। ডাটা অফ করে ফোনটা রেখে দেয় পরী। রাগ সব কন্ট্রোল করে বলে,

~ এত সময় লাগলো আসতে?
~ স্যরি বউ। অনেকদিন পর একটা পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল। তাই আড্ডা দিতে গিয়ে দেড়ি হয়ে গিয়েছে।

পরীকে চুপ থাকতে দেখে একটা কোণ
আইসক্রিম পরীর দিকে এগিয়ে দেয়। পরী শাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ এটা কি লেট করে আসার ঘুষ?

~ না, না! আমি তো ভালোবেসে এনেছি।
~ যাও এবারের মত কিছু বললাম না।
শাদাফের হাত থেকে আইসক্রিম নিয়ে খাওয়া শুরু করলো পরী।
শাদাফ পাশে বসে পরীর চুলে নাক ডুবায়।
~ কি করছো?
~ দেখছো না?

~ দেখছি কিন্তু বুঝতে পারছিনা যে, তুমি প্রতিদিন কি মজা পাও চুলে?
~ তুমি বুঝবেও না। জানোনা চুল আমার ভালোবাসা? তোমার চুলকে আমি কত ভালোবাসি এটা কি তোমার অজানা?
~ ওহ আচ্ছা, চুলকেই ভালোবাসো। আমায় বাসোনা বুঝি?
~ তুমি তো আমার জীবন হয়ে গেছো।
~ ঘোড়ার ডিম হয়ে গিয়েছি।
~ হাহাহা।

~ আমার অপেক্ষার প্রহর কাটছে না।
~ কিসের অপেক্ষা?
~ ভুলে গেছো? ঢাকা যাবো। কতদিন পর মাকে দেখবো।
~ আর তো মাত্র একটা দিন।
~ হুম।
~ খাওয়া হয়েছে? এখন চলো ঘুমাবে।

বৃহস্পতিবার সকালঃ
আজ পরীর মন অনেক বেশি ফুরফুরে। কি যে এক আনন্দ লাগছে তা বলে বোঝানোর মত না। সকাল সকাল গোসল করে পরী ছাদে যায়। ছাদের গাছগুলোয় পানি দেয়। লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শ্বশুরের সামনে পড়ে যায়। মাঝ সিঁড়িতেই স্ট্যাচু হয়ে যায় পরী। শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে দেখে তিনি গোমড়া মুখে তাকিয়ে আছেন। পরী ইতস্তত করে বললো,
~ আসসালামু আলাইকুম বাবা

~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। বাপের বাড়ি যাবে বলে আজ খুব খুশি?
পরী কি বলবে বুঝতে পারছেনা। তিনি আবার বললেন,
~ যাও ঘরে যাও। এমন লাফালাফি করলে পড়ে গিয়ে পা ভাঙ্গবে।

~ হুম।
পরী চলে যেতেই তিনি মুচকি হেসে বলেন, “পাগলী মেয়ে। বাবার বাড়ি যাবে বলে কত খুশি”
বিকেলের দিকে শাদাফ আর পরী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পরী বাস স্টপে যাত্রীরা যেখানে বসে অপেক্ষা করে সেখানে বসে আছে। শাদাফ গিয়েছে টিকেট আনতে।

সকালবেলা বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব থাকলেও এখন গরম লাগছে। তারমধ্যে শাদাফের কড়া আদেশ, বোরকা নিকাব পড়ে তবেই বাহিরে বের হতে হবে।
কিছুক্ষণ পর পরীর সামনে একটা বাস এসে থামে। যাত্রীরা নামছিল। পরীর চোখ একটা ছোট্ট বাবুর দিকে। সামনের ছোট দুটো দাঁত বের করে হাসছে। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে নামছিল একজন ভদ্রলোক। সম্ভবত বাবুটার বাবা হবে। তারা নেমে যেতেই পারবর্তী মানুষটাকে দেখে থমকে যায় পরী।
“সুলতান এসেছে! কিন্তু কুমিল্লায় কেন”

বাস থেকে নেমে দোকানে যায় সুলতান। দোকান থেকে একটা ঠান্ডা কোকাকোলা খেতে খেতে পরীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পরীর হাত~ পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!

পর্ব ২১

সুলতান ধীরে ধীরে পরীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরীর থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বসলো সুলতান। পরী একবার আড়চোখে তাকালো। সুলতান হাতে রাখা ব্যাগটা পাশে রাখলো। পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেন কল দিচ্ছে। আরেক হাত দিয়ে একটু পরপর কোকাকোলার বোতলে চুমুক দিচ্ছে।
“সুলতান কি আমায় চিনতে পেরেছে!, চিনতে পারলে এত শান্ত হয়ে বসে থাকার ছেলে তো সুলতান না। এতক্ষণে তুলকালাম কান্ড বসিয়ে দিতো। না চিনারও কথা, যেহেতু হিজাব আর নিকাব পড়া সেহেতু মুখ না দেখে চেনার উপায় নেই”
উনিশ~ বিশ ভাবতে ভাবতেই শাদাফের ফোন আসে। ফোনের রিংটোন শুনে সুলতান একবার পরীর দিকে তাকিয়ে আবার ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পরী ফোন রিসিভ করে চুপ করে থাকে। ওপাশ থেকে শাদাফ বলছে,
~ পরী টিকেট কাউন্টারের সামনে আসো। বাস এখানেই থামিয়েছে।
পরী শুধু ছোট্ট করে বললো,

“হুম”
পরী উঠতে গিয়েও যেন উঠতে পারছে না। পা মনে হচ্ছে আঠার মত মাটির সাথে লেগে আছে। আরেকবার সুলতানের দিকে তাকালো পরী। সুলতান তখনও ফোনে কথা বলছে। পরী দ্রুত ঐখান থেকে ওঠে শাদাফের কাছে যায়।
শাদাফ পরী দুজনই পাশাপাশি বসে আছে। পরীর বাম হাত শাদাফের ডান হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে নেয়। শাদাফের দিকে তাকিয়ে পরী মুচকি হেসে শাদাফের কাঁধে মাথা রাখে।
~ পরী
~ হুম
~ ভালোবাসি।
~ এই কথাটা কতবার বলবে বলো তো?
~ সবসময় বলবো। প্রতিদিন, প্রতিসময়ই বলবো। আমার বলতে ভালো লাগে কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি।

~ আমি মনে হয় বাসি না?
~ বাসোই তো না। ভালোবাসলে বললে না কেন যে, আমিও তোমায় ভালোবাসি?
~ সবসময় ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়না। বুঝে নিতে হয় কিছু সময়।
~ আচ্ছা বুঝে নিলাম।

দুজনই চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পর পরী ফিক করে হেসে দেয়।

~ কি হলো? হাসলে কেন?
~ একটা কথা মনে পড়ে গেলো।
~ কি কথা?

~ একদিন কলেজ থেকে আমি আর আমার বান্ধবীরা বাড়িতে ফিরছিলাম। এক বাসেই উঠেছিলাম সবাই। আমি আর আমার বেষ্টফ্রেন্ড যেই সিটে বসেছিলাম তার সামনেই সিটেই বসেছিল কাপল। দেখে মনে হলো নতুন বিয়ে হয়েছে, স্বামী~ স্ত্রী। সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল এবং তখনো হচ্ছিলো। মেয়েটা ব্যাগ থেকে একটা উড়না বের করে ছেলেটার মাথা মুছিয়ে দিচ্ছিলো।
আমাদের সিঙ্গেল মেয়েদের সামনে এত ভালোবাসা কি আর সহ্য করার মত ছিল বলো। তাই আমি আর আমার বেষ্টফ্রেন্ড সেন্টারফ্রুট খেয়ে খুব সুন্দর করে ছেলেটার চুলে লাগিয়ে দিয়ে বাস থেকে নেমে গেলাম।
~ হাহাহাহা। জেলাস হচ্ছিলে তোমরা?
~ না হওয়ার কি কোনো কারণ ছিল?

~ তাই বলে একটা অচেনা ছেলের চুলে সেন্টার ফ্রুট লাগিয়ে দিলে?
~ স্কুল~ কলেজ জীবনে একটু দুষ্টুমি না করলে আর কবে করবো শুনি? এইযে এখন আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, এখন কি আর আমি পারবো এরকম দুষ্টুমি করতে?
~ মেরে ফেলবো একদম।
~ জানি। হুহ
~ দুষ্টুমি যা করার আমার সাথে করবা। অন্য কোনো ছেলের সাথে না।

বাড়ির সামনে গিয়ে দেখে, পরীর মা আর বড় আপু বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরী দৌড়ে গিয়ে ওর মাকে জড়িয়ে ধরে। দুজনের চোখেই আনন্দের অশ্রু।
~ মা, তুমি ভালো আছো?
~ হ্যাঁ মা। তুই কেমন আছিস?
~ অনেক অনেক অনেক ভালো আছি এখন।
মাকে রেখে এবার বড় বোনকে জড়িয়ে ধরে।
~ ভালো আছিস আপু?
~ হ্যাঁ রে ফাজিল।
~ একদম ফাজিল বলবি না আপু। আমি এখন ফাজলামি করি নাকি।

~ ভালো হয়ে গেছিস?
~ খারাপ ছিলাম কবে হুহ!
~ তুই দেখি আগের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে গিয়েছিস।
~ তুই হয়তো ভুলে গেছিস আপু, ছোটরা বরাবরই সুন্দর থাকে হু।

~ ওলে আমার সুন্দরী রে!
~ দুলাভাই আসেনি?
~ আসছিল। চলে গিয়েছে।
~ আর আমার কলিজা কই? আলভী?
~ বাবু ঘুমায়।

শাদাফ এসে পরীর মাকে সালাম করে।
শাদাফকে তুলে, গালে হাত দিয়ে চুমু খায়।
“বেঁচে থাকো বাবা”

~ ভালো আছেন মা?
~ হ্যাঁ বাবা। তুমি ভালো আছো?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌।
কেমন আছেন আপু?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভাই। আমার এই দজ্জাল বোনকে সাথে নিয়েও ভালো আছো তুমি?

~ বুঝেনই তো! কেমন থাকা যায়।
পরী এবার দাঁত কটমট করে তাকায় শাদাফের দিকে।
~ ঐ কেমন থাকা যায় মানে?
~ মানে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখি ব্যক্তি আমি আরকি!

শাদাফ যে মিথ্যা বলেছে, এটা বুঝতে পেরে পরীর মা আর আপু হেসে দেয়। সাথে শাদাফও।
পরীর মা হেসে বলে,
~ তোর ঝগরা করা বাদ দিবি এখন? নতুন জামাইকে ঘরে তো আসতে দে।
পরীর আগেই শাদাফ ফ্রেশ হয়ে নেয়। পরীর আপু শাদাফকে ডাইনিং রুমে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্য। পরী ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই দুচোখে ঘুম ভর করে। আর ঐদিকে সবাই পরীর জন্য অপেক্ষা করছে। পরী আসছে না দেখে পরীর মা ডাকতে আসে।
পরী তখন ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে। পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই চোখ মেলে তাকায়। এরপর মায়ের কোলে মাথা রেখে আয়েশ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়।
~ কিরে খাওয়া লাগবে না?
~ উমম! পরে খাবো।

~ জামাই বসে আছে।
~ ওকে খেতে দাও।
~ দিয়েছি। তোকে ছাড়া খাবেনা। চল খেয়ে তারপর ঘুমাস।
~ উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না মা।
~ কোলে করে নিয়ে যাবো?
~ হিহিহি নাও।

সবাই মিলে একসাথে খেয়ে নিলো।
সন্ধার সময়ে অনেকেই বাড়িতে এসে শাদাফকে দেখার জন্য। পরীর বন্ধু~ বান্ধবীরা কাল সকালে আসবে বলেছে।
সন্ধ্যার পর পরী নিজে শাদাফের জন্য ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস বানায়।
এটা দেখে পরীর মা আর বোন দুজনই অবাক হয়। পরীর বড় বোন পিংকি অবাক হয়ে বলে,
~ সাধারণ রান্না জানিস না অথচ ঘরে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস বানাচ্ছিস?
~ সব ইউটিউবের কামাল আপু।

ভোর ৫:৩০ মিনিট
পরীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। শ্বশুরবাড়িতে থাকা~ কালীনও সাড়ে পাঁচটা, ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠতো পরী। মূলত ঐ কারণেই এখনো একই সময়ে ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখে শাদাফ নেই।
“শাদাফ তো এত সকালে ঘুম থেকে উঠে না। বোধ হয় ওয়াশরুমে গিয়েছে। আজ বরং মা ঘুম থেকে উঠার আগেই আমি সবকিছু রেডি করে রাখি”
পরী রান্নাঘরে যাওয়ার সময়ে মায়ের সাথে দেখা হয়।
~ কিরে? এত সকালে ঘুম থেকে উঠলি যে?
~ তোমাকে সাহায্য করবো বলে।

~ লাগবেনা পাগলী। তুই গিয়ে ঘুমা।
~ জ্বী না। তা হবে না, তা হবে না।
দুজনেই রান্নাঘরে গিয়ে চমকে যায়। শাদাফ এত সকালে রান্নাঘরে! পরীকে দেখে হাসলেও শ্বাশুরীকে দেখে একটু লজ্জা পায় শাদাফ। নতুন জামাই বলে কথা!

পর্ব ২২

শাদাফ লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরীর মা বললো,
~ তুমি এত সকালে রান্নাঘরে কেন বাবা? তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে? দাঁড়াও আমি কিছু তৈরি করে দিচ্ছি এখনই।
~ না, না মা আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমার ক্ষুধা লাগেনি।
~ তাহলে?
~ ইয়ে আসলে, আমার ছোটবেলা থেকেই একটা ইচ্ছা ছিল।
পরী চোখ গোলগোল করে তাকায়।

~ কি ইচ্ছে? আমায় তো বলোনি।
~ ইচ্ছেটা কি তোমায় নিয়ে নাকি যে তোমায় বলবো।
~ কিহ্! এত্ত বড় কথা।
~ তাহলে ছোট কথা বলবো?

~ তোমায় তো আমি
দুজনের ঝগরা দেখে পরীর মা মুচকি মুচকি হাসতেছে। সামনে যে মা দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কারোরই কোনো খেয়াল নেই।
~ টোনাটুনির ঝগরা আপাতত বন্ধ কর তোরা।
~ মা, ও কি বললো তুমি শুনছো?
~ চুপ কর তো!

বাবা তুমি বলো, কি ইচ্ছে ছোট থেকেই?
~ কিছু মনে করবেন না তো।
~ না।
~ আমার খুব ইচ্ছে ছিল, শ্বশুরবাড়িতে গেলে একদিন শ্বাশুরীর সাথে রান্না করবো।
পরী এবার গালে হাত দিয়ে বলে,
~ এ আমি কাকে দেখছি! আমায় তো কখনো হেল্প করো না।
~ তুমি রান্না করলে তো হেল্প করবো।
~ আবার শুরু করলি তোরা? থাম।
শাদাফ বললো,

~ ইচ্ছে কি পূরণ হবে মা?
~ হবে বাবা। আমার বড় ছেলে ছোট থাকতে আমাকে কাজে কত হেল্প করতো। পরী যখন পেটে ছিল তখন ওর ভাই উঠোন ঝাড়ু দিতো, রান্নাবান্নার জন্য সব এগিয়ে দিতো। থালাবাসন মাজতো। তুমিও তো আমার আরেক ছেলে। তাহলে তুমি কেন পারবেনা শুনি? অবশ্যই পারবে।
ঝুড়ি থেকে একটা টমেটো নিয়ে খেতে খেতে পরী বললো,
~ ওকে আমি তাহলে জাজ ঠিক আছে?
শাদাফ পরীর হাত ধরে রান্নাঘর থেকে বাহিরে নিয়ে বললো,

~ তুমি আউট এখান থেকে। জামাই~ শ্বাশুরীর কাজের মধ্যে কোনো উটকো ঝামেলা এলাও না।
পরী রাগে দাঁত কটমট করে বললো,
~ তাই না? আমি এখন উটকো ঝামেলা হয়ে গেলাম? এখন তো কিছু বলতে পারবোনা। কিছু বললেই তো আপনার শ্বাশুরী কয়েক ঘা বসিয়ে দিবে আমায়। কিন্তু আমিও দেখবো, পরে আপনার শ্বাশুরী কিভাবে আপনাকে বাঁচায় হুহ।
যাওয়ার সময় পরী এভাবে গেল যে, চুলের বাড়ি সরাসরি শাদাফের চোখে মুখে লাগলো। শাদাফ চোখে হাত দিয়ে বললো,
~ কি তেজ রে বাবা!

রাগে হনহন করতে করতে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম আসছেনা। এই সময়ে না ঘুমানোর দরুণ এখন জেগে থাকা লাগবে।
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। শাদাফের কথা মনে পড়তেই রাগে ফুসতে থাকে। বিছানা ছেড়ে উঠে আপুর রুমের দিকে যায়। রুমে গিয়ে দেখে আপু গভীর ঘুম অথচ আলভী ঘুম থেকে উঠে গেছে। পাশে শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে হাসছে আর মুখে আঙুল দিয়ে কিসব শব্দ করছে। পরী গিয়ে আলভীর দিকে ঝুকে শোয় কোনো প্রকার ভর না দিয়ে। পরীকে দেখে এক গাল হেসে দেয় আলভী। গালে চুমু খেয়ে বলে,
~ আমার বাবাইটা ঘুম থেকে এত সকালে উঠে গেছে।
আলভী কি বুঝলো কে জানে। শুধু খিলখিল করে হাসছে। ছোট হাত দিয়ে পরীর গালে, ঠোঁটে হাত বুলাচ্ছে আর আ আ শব্দ করছে। আলভীকে কোলে তুলে নিয়ে ইচ্ছেমত চুমু খাচ্ছে আর সেসময়ই শাদাফ রুমে আসে।
~ এহেম এহেম!
পরী ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
~ এখানে কি হ্যাঁ? এখানে কেন আসছো? বের হও বলছি।

~ ওয় ম্যাম, আমি তোমার কাছে আসিনি ওকে। মা পাঠিয়েছে, আপুর কাছ থেকে চাবি নেওয়ার জন্য।
~ তো নিয়ে বের হও।

~ বলছিলাম কি, ছোট ঐ বাবুটা কি আর এত চুমু নিতে পারবে?
~ মানে?
~ না মানে, আলভীকে যতগুলা চুমু দিচ্ছো তার অর্ধেক যদি আমায় দিতে আরকি!
~ বের হবে তুমি নাকি লাঠি নিয়ে আসবো?
~ থাকতে আসিনি। আমি তো আলভীর ভালোর জন্যই বললাম।
~ তোমাকে ওর কথা ভাবতে হবেনা যাও রান্না করো জামাই শ্বাশুরী মিলে।

আলভীকে কোলে নিয়ে বাহিরে যাওয়ার জন্য শাদাফের কাছাকাছি যেতেই শাদাফ বললো,
~ কতদিন আর আপুর বাবুকে আদর করবা?
পরী চোখ গরম করে তাকায়।
~ না মানে, চলোনা আমরাও একটা বাবু নেই। তাহলে তুমিও যখন তখন আদর করতে পারবা।
পরী এদিক~ ওদিক তাকিয়ে বললো,
~ আপু যে লাঠি টা কই রাখছে!

~ না থাক, আপুর বাবুই তো আমাদের বাবু। বাবু লাগবেনা এখন। আমি তো মজা করছিলাম।
~ গুড।
যাওয়ার সময় কোমড় দিয়ে শাদাফকে একটা ধাক্কা দিলো। পরী যে এমন কিছু করবে এটা ভাবেনি শাদাফ। তাই পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য দ্রুত দেয়াল ধরলো।
~ বাবারে! মেয়ে নাকি বোম!
পরী পিছনে তাকিয়ে বললো,
~ বাচ্চা বউ থাকতে এখন আবার বাবু লাগে নাকি হুহ! আগে আমি বড় হই।

আলভীকে কোলে নিয়ে ছাদে হাঁটছে পরী। সূর্যকিরণ হালকা কুয়াশার মধ্যে একটু একটু উকি দিচ্ছে। চারপাশটা ভালো করে দেখছে। কতদিন পর এখানে আসা। আবার কবে আসা হবে তারও কোনো ঠিক নেই। পাশে তাকাতেই বুকটা ধুক করে উঠে পরীর। পাশের ছাদে সুলতান কতই না দাঁড়িয়ে থাকতো। একটা বিশ্রী অতীত পার করেছে পরী। যা সে কখনোই ফিরে পেতে চায়না। সুলতান নামক সাইকোটা দূরে থাকুক এটাই চায় পরী।
ছাদে বেশ কিছুক্ষণ থাকায় আরো অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে পরীর। সকলের সাথেই কথা বললো।
ছাদ থেকে নামার আগে সুলতানদের ছাদে সু্লতানের মা আসে। পেছন থেকে দেখে পরীকে ঠিক ততটা চিনতে পারেনি। তবুও পেছন থেকে ডাক দেয়,
~ পরী।
পরী পেছনে ঘুরে দাঁড়ায়।
~ আন্টি! কেমন আছেন?

~ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌। ভালো আছি। বাড়ির সবাই ভালো আছে?
~ হ্যাঁ। কবে আসছো?
~ কাল সন্ধ্যার একটু আগেই।
~ ভালোই হয়েছে এখন এসেছো।
~ কেন?

~ জানোই তো সুলতান কেমন পাগল তোমার জন্য।
পরী একটু ইতস্ততবোধ করে।
~ এসব কথা কেন তুলছেন আন্টি?
~ এজন্যই যে, এখন সুলতান বাসায় নেই। তাই শান্তিতে কয়েকটা দিন থাকতে পারবে।
পরী জানে যে সুলতান এখানে নেই। তবুও কিছু তথ্য জানার জন্য জিজ্ঞেস করে,
~ কোথায় গিয়েছে?

~ ওর ট্রান্সফার হয়েছে আবার।
~ কোথায়?
~ কুমিল্লায়।
~ ওহ। শিলা কোথায়?
~ ঘুমাচ্ছে।
~ আচ্ছা আন্টি শিলাকে নিয়ে আসিয়েন বাসায়।
~ আচ্ছা।
পরী চলে আসার সময় তিনি পেছন থেকে বললেন,

“সবসময় সাবধানে থেকো মা”
পরী শান্তচোখে বললো,
~ যতদিন শাদাফ আমার সঙ্গে আছে ততদিন আমার নিজেকে নিয়ে কোনো ভয় নেই আন্টি। আপনি অযথাই আমাকে নিয়ে টেনশন করবেন না। আর পারলে, আপনার ছেলের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিয়েন, তাহলে আমি নামক ঘোর থেকে বের হতে পারবে।
আসি এখন।
পরীর চলে যাওয়া দেখছেন তিনি। সু্লতানের বাবাও এর মধ্যে ছাদে চলে আসে।
~ কিগো, তুমি এখনো ছাদে দাঁড়িয়ে আছো?

~ পরীর সাথে কথা বললাম।
~ কবে এসেছে?
~ কালকে।
~ কি বললো?
~ অনেক কথাই তো হলো। তবে শেষের কথাটা ভাবাচ্ছে আমায়।
~ কি কথা?
~ পরী বললো সুলতানের বিয়ে করাতে। তাহলে নাকি পরীর ঘোর থেকে বের হতে পারবে। সত্যিই কি পারবে ও পরীর ঘোর থেকে বের হতে? পরীকে ভুলতে পারবে সু্লতান?
~ আসলেই কথাটা ভাবার বিষয়! পরীর কথাটা ফেলে দেওয়ার মত না কিন্তু। বিয়ে দিলে তখন ঘরে বউ থাকবে, একটা দায়িত্ব চলে আসবে তখন।
~ তাহলে কি মেয়ে দেখা শুরু করবো?

পর্ব ২৩

দেখতে দেখতে বাবার বাড়ি থাকার ৫দিন কেটে যায় পরীর। ৫ম দিনের রাতে শাদাফ শ্বশুরবাড়ি আসে পরীকে নিতে। মাঝখানে একদিন থেকে পরেরদিন আবার চলে যাবে। রাত নয়টা নাগাদ শাদাফ পরীদের বাসায় আসে। টায়ার্ড থাকায় কোনো রকম খেয়ে~ দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকাল সকাল পরী ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে। মায়ের সাথে রান্নায় সাহায্য করে। এই কয়দিনে পরী অনেক রান্নাবান্না কাজকর্ম মায়ের কাছ থেকে শিখে নিয়েছে।

পরীর মা রান্না করছিলো তখন পরী ছাদে যায়।
ঠান্ডাটা বেশ ভালোই পড়েছে। ছাদের গাছগুলোর পাতায় গুঁড়ি গুঁড়ি শিশিরবিন্দু। পরী আলতো করে গাছগুলোকে ছু্ঁয়ে দেয়। কয়েকটা গাছে রং বেরঙ য়ের ফুলও ফুটেছে। ফুলগুলোতে চুমু দেয় পরী। এটা ওর ছোট বেলার স্বভাব। গুটি গুটি পায়ে ছাদের রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে যায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আকাশের পানে চেয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। দৃষ্টি নিচে যেতেই পরীর চোখগুলো বড় বড় হয়ে যায়। অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেড়িয়ে পড়ে__
~ বাবা!
বাবার তো আজকে আসার কথা না। হায় আল্লাহ্! শাদাফ তো বাসায়। ধুর! শুধু শাদাফ বলছি কেন? আমিও তো বাসায়। আজ তো কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে রে! কি করি এখন।

দরজার সামনে গিয়ে পরীর বাবা কলিং বেল বাজায়। দরজা খুলে দেয় পরীর মা। পরীর মাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি বললেন,
~ কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?

~ তু তু তুমি?
~ হ্যাঁ আমি। তোতলাচ্ছো কেন?
~ কই? তোমার তো আজ আসার কথা ছিল না।
~ আর বলো না। বাড়ির জন্য মন কেমন জানি করছিলো তাই চলে আসলাম। প্রিয়ম ওখানেই আছে। ও কাল আসবে।

কথা বলতে বলতে তিনি নিজের রুমে চলে যান। পরীর মা সোজা রান্নাঘরে চলে যান। চুলোর আঁচ কমিয়ে দিয়ে পরীকে খুঁজতে ছাদে চলে যান।
পরী ছাদে এদিক থেকে ওদিক শুধু হাঁটাহাঁটি করছে। তা দেখে পরীর মা এগিয়ে গিয়ে পরীকে থামায়।
~ তুই এভাবে ঘুরছিস ছাদে আর ঐদিকে তোর বাবা যে বাড়িতে চলে এসেছে।
~ ঘুরছি কি আর সাধে মা? আমি নিজেও বাবাকে দেখেছি। কি করবো বুঝতে পারছি না।

~ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু হবে? চল নিচে যাই।
~ কি বলো না বলো মা। নিচে গেলে বাবা আমাকে কুচিকুচি করে ফেলবে।
~ আমি আছি তো!

~ তুমিই যাও।
~ শাদাফ কিন্তু নিচে। ভুলে গেছিস?
~ তাইতো!
~ যা হওয়ার হবে চলতো।
পরীর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকেন তিনি।
ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে আসে পরীর বাবা। আলভীর কান্নার শব্দ শুনে তিনি বড় মেয়ে পিংকির রুমে যান। কিন্তু সেখানে পিংকি বা আলভী কেউই নেই। তিনি ভালো করে শোনার চেষ্টা করছে কান্নার আওয়াজটা কোথা থেকে আসছে। কান্নার শব্দটা কমে এসেছে। পরীর রুমের দিকে এগিয়ে যান। দরজা ভেতর থেকে চাপানো। দরজা খুলে ভেতরে যায়।
~ পিংকি? এখনো ঘুমাচ্ছিস? আলভী কাঁদছিল কেন?

প্রশ্নের উত্তরের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি কাছে গিয়ে বসেন।
“দেখেছো কান্ড! ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে কেমন কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে”
তিনি আলতো করে ধাক্কা দিতেই, শাদাফ ঘুম ঘুম চোখে পরীর বাবার হাত টেনে কাছে নিয়ে এসে পরীকে ভেবে। পরীর বাবা তো মনে হচ্ছে আসমান থেকে পড়েছে। শাদাফ চোখ বন্ধ করেই বলে,
~ কোথায় গিয়েছিলে হুম? কাছে কাছে থাকতে পারো না!
পরীর বাবা তখনও পর্যন্ত চুপ করে আছেন। আসলে তিনি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। বোঝার চেষ্টা করছে যা দেখছে তা সব সত্যি নাকি।
কোন উত্তর না পেয়ে শাদাফ বলে উঠে,
“কিগো জান? কথা বলো না কেন?

এরপর শাদাফ চোখ খুলে তাকিয়ে পরীর বাবাকে দেখে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসে। চিৎকার করে!
~ এ্যা! আ আ আ পনি!
পরী আর ওর মা এই কান্ড দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পরীর মায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি রাগে কটমট করেন।
~ এসব কি?
পরীর মা ইনিয়েবিনিয়ে বলে,
~ ইয়ে মানে!
~ হেয়ালি কেন করছো? ওরা আমাদের বাসায় কেন?
~ তুমি শান্ত হও, আমি সব বলছি।
তিনি আর কোনো কথা না শুনে রাগে হনহন করতে করতে রুম থেকে বেড়িয়ে যান। পেছন পেছন পরীর মা~ ও যায়।

পরী এতক্ষণ টেনশনে থাকলেও শেষের সীনটুকু দেখে সব টেনশন উবে গিয়েছে। অনেক কষ্টে এতক্ষণ হাসি চেপে রেখেছিল কিন্তু এখন আর পারছে না। হো হো করে হেসে দেয় পরী। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা ধরে যায় তবুও হাসি কমছে না। এক পর্যায়ে পেটে হাত দিয়ে ফ্লোরে বসে পরী।
ভয়ে শাদাফ বিন্দু বিন্দু ঘামছিল। কিন্তু পরীর এমন হাসি দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় শাদাফের। বিরক্ত হয়ে বলে,
~ এমন গগনবিহারী হাসির কিছু হয়নি পরী!
পরী কোনো কথা বলে না। হাসতেই থাকে।
শাদাফ খাট থেকে নিচে নেমে পরীর সামনে ফ্লোরে বসে। পরীর দুই বাহুতে হাত রেখে বলে,

~ স্টপ প্লিজ পরী! এটা হাসার সময় না।
কোনো রকমে হাসি থামিয়ে পরী উত্তর দেয়,
~ আরে! তুমি আর বাবা এমন কান্ড করেছো যে না হেসে আর উপায় নেই।
~ আমি তো তুমি ভেবেছিলাম তোমার বাবাকে।
~ হাহাহাহা।
~ হয়েছে? হাসি শেষ? এবার যাও রেডি হও।

পরী কিছুটা দম নিয়ে বলে,
~ রেডি হবো কেন?
~ বাসায় যেতে হবে না? তোমার বাবা তো এসে পড়েছে।

~ হুম।
~ তো যাও রেডি হও। আমিও রেডি হচ্ছি।
~ কিন্তু মা?
~ মা কি?
~ মাকে বলবো না?
~ মা মনে হচ্ছে এখন বাবার সাথে কথা বলছে। আমরা রেডি হয়ে বিদায় নিয়ে যাবো।
পরী আর কিছু না বলে রেডি হতে চলে যায়। হাসির রেশ দুঃখে পরিণত হলো। একদম ইচ্ছে করছে না চলে যেতে। তবুও কোনো উপায় নেই। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
দুজনে রেডি হয়ে বাবা~ মায়ের রুমে যায়। বাবা পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছে আর মা বিছানার একপাশে বসে আছে।
পরী মাথা নিচু করে বলে,

~ আমরা চলে যাচ্ছি।
পরীর বাবা পত্রিকা রেখে শাদাফ আর পরীর দিকে তাকায়। মা কিছু বলার আগেই তিনি পরীর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
~ ওদেরকে বলে দাও, এমন অবেলায় যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। কাল যাওয়ার কথা যখন ছিল তখন কালই যাবে।
তুমি কি না কি খাইয়েছো, ঐ বাড়িতে গিয়ে পড়ে আবার বদনাম না করে আমাদের। সে সুযোগ তো আমি দিবো না। আমি আজ বাজার করবো। রান্নাবান্না হবে। খাবে তারপর কাল চলে যাবে।
পরী মনে মনে ভাবে,
~ বাবা, যতই তুমি কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলো না কেন আমি ঠিকই বুঝেছি। নতুন জামাই এসেছে বাড়িতে। জামাই আদর তো করতেই হয়। সেটা না বলে উনিশ~ বিশ বুঝাচ্ছো।

পরী আলভীকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াচ্ছিলো। শাদাফ সোফায় বসে ফোনে গেম খেলছিল। পরীর মা আর বড় বোন রান্নাঘরে টুকটাক খাবার ব্যবস্থা করছিলো। ড্রয়িংরুমে এসে তিনি বললেন,
~ শুনছো আমি বাজারে যাচ্ছি।
শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসে পরীর মা।
~ দাঁড়াও আমিও যাচ্ছি।
~ তুমি যাবে কেন?
~ এত বাজার তুমি একা আনতে পারবে না। আর প্রিয়মও তো বাসায় নেই।
এই পর্যায়ে শাদাফ মুখ খুললো।

~ না, না! মা কেন বাজারে যাবে আমি থাকতে।
শ্বশুর মশাইয়ের গম্ভীর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বলে,
~ না মানে বলতে চাইছিলাম যে, প্রিয়ম ভাইয়া বাসায় থাকলে তো আর মাকে যেতে হতো না। আর যেহেতু প্রিয়ম ভাইয়া এখন বাসায় নেই। তখন বরং আমিই যাই।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
~ বেশ! চলো।
শাদাফ খুশি হয়ে গেলো। শ্বশুর বাহিরে যেতেই শাদাফ পরীর কানে কানে বলে,

“জান, আমার এই ইচ্ছেটাও তাহলে পূরণ হচ্ছে” বলেই পরীর গলায় চুমু দিয়ে শ্বশুরের পিছু পিছু যায়।
শাদাফের কান্ড দেখে পরী মুচকি হাসে।

সারা বাজার ঘুরছে শ্বশুর আর জামাই।
~ বাবা, বাজার যে ঘুরছেন শুধু। কিনবেন না?

~ হুম কেনার জন্যই তো এসেছি। ভালো দেখে তরতাজা জিনিস কিনতে হবে তো নাকি।
~ হুম।
~ চলো আগে মাংস কিনি।
গরুর মাংসের দোকানে গিয়ে তিন কেজি মাংস কিনলেন। ২টা ফার্মের মুরগী কিনে দেশী মুরগীর দোকানে গেলেন।
শাদাফ বললো,
~ মুরগী তো দুইটা কিনলেন।

~ দেশী মুরগী কিনবো।
~ না, না এত মুরগী কেনার দরকার নেই।
তিনি ভাবলেশহীনভাবে বললেন,
~ দেশী মুরগীর মাংস পরীর খুব পছন্দ।
শাদাফ মনে মনে বলে,

~ বাব্বাহ্! বাহিরে রাগ আর ভেতরে মেয়ের জন্য কত্ত ভালোবাসা।
শ্বশুরের ডাকে হুস ফিরে।
~ শাদাফ
~ হ্যাঁ বাবা
~ কোন মাছ পছন্দ তোমার?
~ রুই মাছ, চিংড়ী মাছ, কাঁচকি মাছ।

~ আচ্ছা চলো।
~ বলেছিলাম কি বাবা, এতকিছু কেনার দরকার নেই।
~ আছে।
শ্বশুরের মুখের উপর আর কোনো কথা বলে না শাদাফ। ভাবে “এতদিন পর মেয়েকে কাছে পেয়েছে। তাই কোনো কিছুরই যে কমতি রাখবে না এটা ঢের বুঝতে পারছি”
দুই হাত ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন শ্বশুর আর জামাই। আহা! এই দৃশ্য দেখলে যেন মন এমনিতেই শান্ত হয়ে যায়।

আলভীকে ঘুম পাড়িয়ে টিভি দেখছিল দুবোন মিলে।
~ আপু দুলাভাই কবে আসবে রে?
~ আজকে আসতে বলেছি।
~ সত্যিই আজকে আসবে?

~ বললো তো আসবে।
~ তাহলে তো অনেক মজা হবে। কিন্তু খালামনি, নানু, পিচ্চি দুইটা আর প্রিয়ম ভাইয়াকে অনেক মিস করছি। এতদিন থাকলাম কিন্তু ওদের সাথে দেখা হলো না। তাছাড়া ওদের সামনে দাঁড়ানোর মত মুখই তো নেই।
~ যেটা হওয়ার সেটা হয়ে গেছে সোনা। এজন্য মন খারাপ করবি নাকি? মা যখন মেনে নিয়েছে তখন ধীরে ধীরে সকলেই মেনে নিবে দেখিস।
~ ঠিক তো?
~ একদম।
পরী খুশিতে বোনকে জড়িয়ে ধরে।
~ আমার লক্ষী আপু।
~ আমার পিচ্চি সোনা!
পিংকি পরীর কপালে চুমু খেয়ে বলে,

“পিচ্চি মেয়েটা নাকি এখন সংসারও করে। ভাবা যায়”
পরী কিছু বলতে যাবে তখন কলিংবেল বেজে উঠে।
~ আপু তুই বস। আমি দরজা খুলে আসছি।

পরী দরজা খুলে দিয়ে অবাক হয়ে যায়। সেই সাথে ভয় কাজ করছে মনে। এটা তো আশার বাহিরেই ছিল।
ভেতর থেকে পিংকি বললো,
~ কে এসেছে পরী? শাদাফ আর বাবা?
পরী কোনো রকমে ধীর গলায় বললো,
~ না!

পর্ব ২৪

পিংকি দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে খালামনিরা, খালাতো বোন, নানু আর প্রিয়ম ভাইয়া এসেছে। পরী বাড়ির সবার চেয়ে প্রিয়মকেই বেশি ভয় পেতো ছোট বেলায়। আগের মত ভয় না পেলেও ভয়টা মনে ঠিকই রয়ে গিয়েছে।
বিয়ের দিন কিছু না বললেও এখন নিশ্চয় ছেড়ে দিবে না।
পরীর ভাবনার অবসাদ ঘটিয়ে পরীর নানু জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়। পরীও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনা। সেও কান্না করে দেয়।
~ কেমন আছিস নানুভাই?
~ ভালো আছি নানু। তুমি কেমন আছো?
~ তোকে দেখার পর খারাপ থাকি কি করে বলতো।

~ তাহলে এমন শুকিয়ে গিয়েছো কেন? ঠিকমত খাও না?
~ খাই তো। তুই তো দেখি সুন্দরী হয়ে গেছিস।
~ মানে কি নানু? আমি কি আগে সুন্দরী ছিলাম না?
~ ছিলি তো। কিন্তু এখন আরো বেশি সুন্দরী হয়েছিস। তুই তো সত্যিই পরী। কারো নজর না লাগে আমার নানুভাইর উপর।

নানুকে ছেড়ে দিয়ে মেজ খালামনিকে জড়িয়ে ধরে।
~ কেমন আছো আমার ডাইনি খালামনি।
~ ফাজিল মেয়ে! আমি ডাইনি?
~ তাছাড়া আর কি শুনি? লিমাকে তো একদম ঝাড়ির উপর রাখো সবসময়।
~ ঝাড়ির কাজ করলে কি আদর করবো নাকি।
~ যাই হোক কেমন আছো বলো?

~ ভালো আছি রে মা। তোর খবর কি বল?
~ বর্তমানে আমার খবর তো বিন্দাস।
পরী হেসে আবার ছোট খালামনির দিকে তাকায়। ছোট খালামনি আর পরী একদম বান্ধবীদের মত। বয়সের পার্থক্য দুজনের অনেক হলেও ওদের ব্যবহার, আচার~ আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওরা বান্ধবী নাকি খালা~ ভাগ্নী। বান্ধবীর মতই মিশে দুজনে।

~ ও খালামনি তুই দিনদিন এটা মোটা হচ্ছিস কেন?
~ তোর চোখে তো আমি কোনোদিনও চিকন ছিলাম না।
~ তুই, মেজ খালামনি আর মা তোরা তিন বোন তো মাশআল্লাহ্! ছোটখাটো তিনটা হাতির বাচ্চা।
ছোট খালামনি কাঁদো কাঁদো স্বরে নানুকে বলে,
~ দেখছো মা, এতদিন পর দেখা হলো। তবুও তোমার নাতনি আমাদের হাতির বাচ্চা বললো।

লিমা আর সীমা বললো,
~ তোমরা থামো আর আমাদের পরী আপুকে ছাড়ো তো। তোমাদের কথা আর শেষই হয়না বাপু।
দুজনের কথা শুনে সবাই হেসে দেয়। পরী আশেপাশে এতক্ষণে খেয়াল করলো যে প্রিয়ম নেই এখানে। পিংকির দিকে তাকিয়ে বললো,
~ ভাইয়া কোথায় গেলো রে আপু?

~ ভাইয়ার রুমে।
~ ওহ।
পরী নানুকে জিজ্ঞেস করলো,
~ ভাবী আসলো না কেন?
~ ওর বোনের বিয়ের কাজ সব শেষ হলেই আসবে।

~ বাবুকে নিয়ে আসতে।
~ ছোট বাচ্চা মা ছাড়া থাকতে পারবে নাকি পাগলী।
~ বাই দ্যা ওয়ে, তোমাদের তো আজ আসার কথা ছিল না তাহলে?
পরীর কথা শুনে সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
~ কি হলো হাসছো কেন তোমরা?
সীমা বললো,
~ খালুই তো প্রিয়ম ভাইয়াকে ফোন দিয়ে বললো।
~ বাবা! কি বলেছে?
~ বলেছে যে, তুমি বাসায় এসেছো। আমরা যেন আজই চলে আসি।

~ খালামনি, নানু তোমাদের কি আমার উপর এখনো রাগ আছে? শুধু আব্বুর কথা রাখতে আজ চলে এসেছো?
~ না রে পাগলী! তোকে এতদিন না দেখে আমরা কতটা ছটফট করেছি তুই জানিস না। তুই বাড়িতে না থাকলে এই বাড়ি হাসে না। সবাই কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে থাকে। আর তুই থাকলে বাড়িটা ঝলমল করে। সবাই খুশির আমদে মেতে ওঠে। তাই তুই এসেছিস শুনে, আমরা যে যেভাবে ছিলাম সবাই শুধু কাপড়টা গুছিয়ে রওনা দিয়েছি।
~ তোমরা আমায় কত্ত ভালোবাসো। অথচ আমিই তোমাদের কষ্ট দিলাম।
~ যা হওয়ার হয়েছে। এখন বল আমাদের জামাই কই?

নানু দুষ্টুমি করে বললো,
~ তাই তো! আমার জান কই?
পরী অবাক হয়ে বললো,
~ তোমার জান কে?

~ শাদাফ আমার জান আর আমি শাদাফের জানু।
~ আরিব্বাস! তাহলে আমি কে?
~ তুই শাদাফের বউ হাহাহা
পরী হেসে বলে,
~ তোমার জান বাজার করতে গিয়েছে।

~ নতুন জামাইকে বাজার করতে পাঠিয়ে দিয়েছিস?
~ আমি মোটেও পাঠাইনি। ও নিজের ইচ্ছায় গিয়েছে। ওর নাকি অনেক ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর শ্বশুরের সাথে বাজার করবে।
~ তোর বাবাও সাথে আছে?
~ হ্যাঁ।

~ কি অদ্ভুত কান্ড! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।
~ আমি নিজের চোখে দেখেই বিশ্বাস করতে পারিনি আর তুমি শুনে কিভাবে বিশ্বাস করবে? শুধু কি বাবার সাথেই বাজারে গিয়েছে নাকি! ও তো মায়ের সাথে রান্নাও করেছে।
~ সত্যি?
~ হ্যাঁ।
~ যাক, ভাগ্য করে তাহলে জীবনসঙ্গী পেয়েছিস।

~ হ্যাঁ নানু।
সবাই ফ্রেশ হয়ে একটু রেষ্ট নিচ্ছিলো। শাদাফ আলভীকে নিয়ে খেলছে। পরীর কোনো কাজ না থাকায় একটু ফেসবুকে যায়। ফেসবুকে গিয়ে দেখে তিশার অনেকগুলো ম্যাসেজ এসেছে। ৫/৬দিনে এতই ম্যাসেজ করেছে যে চেক করতেও সময় লেগেছে। শেষ কয়েকটা ম্যাসেজের আগে তিশার ফোন নাম্বার দেওয়া আর লিখা “পরী তোমার সাথে অনেক জরুরী কথা আছে। প্লিজ আমার নাম্বারে ফোন দিয়ো”
কি এত জরুরী কথা, ভেবে পায় না পরী। ব্যালকোনিতে গিয়ে ফোনে নাম্বারটি তুলে ডায়াল করে। তিন/চারবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভড করে।
~ হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। তিশা আমি পরী।
~ পরী! এতদিন পর ফোন করলে তুমি।
~ এই কয়দিন ফেসবুকে যাইনি গো।

~ আমার হলো পোড়া কপাল।
~ কেন কি হয়েছে?
~ তোমার ফোন নাম্বারটা যে খাতায় লিখে রেখেছিলাম সেই খাতাটা হারিয়ে গিয়েছে। তাই তো ফোন দিতে পারিনি।
~ বুঝলাম। এখন বলো কি এত জরুরী কথা?
~ বাসা থেকে আমার বিয়ের কথা বলতেছে।
~ ওহ হো! দাওয়াতের জন্য ফোন দিয়েছো?

~ না পরী। বাবা যে ছেলের সাথে বিয়ের কথা বলে তাকে আমি বিয়ে করতে পারবো না।
~ কেন?
~ কারণ আমি অন্যজনকে ভালোবাসি।
~ কি বলছো! আগে তো বলোনি।
~ আগে ফিল করতে পারিনি পরী। যখন পারলাম তখন তোমাকে বলার সুযোগটাই তো পেলাম না।
~ তো কাকে ভালোবাসো তুমি?

~ রাফিনকে।
~ ওর সাথে তো মাত্র কয়েকদিনের পরিচয় তোমার!
~ তাতে কি বলো? শাদাফ কাকা তো তোমায় দ্বিতীয় দিন দেখেই ভালোবেসে ফেলেছিল।
~ তাও ঠিক। তো কি করবে ভেবেছো?
~ ভাবার কিছু নেই। করে ফেলেছি।
~ মানে?
~ মানে আমরা দুজনে গিয়ে কাজী অফিসে বিয়ে করে নিয়েছি।
~ হায় আল্লাহ্! তোমার বাড়িতে জানে?
~ না। কিন্তু রাফিনের বাড়ির সবাই জানে আর মেনেও নিয়েছে।

শাদাফের ডাক আসায় পরী বললো,
~ আচ্ছা তিশু, আমি পরে ফোন দিবো। শাদাফ ডাকছে। আর হ্যাঁ নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা রইলো ডিয়ার।
~ থ্যাঙ্কিউ ডিয়ার। টাটা
~ আল্লাহ্ হাফেজ।
ফোন রেখে পরী শাদাফের কাছে যায়।
~ ডেকেছো কেন?

~ কার সাথে কথা বলছিলে?
~ তিশা।
~ ওহ।
~ হুম।
~ একটা সারপ্রাইজ আছে।
~ কি?
~ আগামী সপ্তাহে আমরা সাজেক ঘুরতে যাবো।
~ সত্যিই?
~ হ্যাঁ।

~ ইয়েহ্! মজা হবে।
শাদাফ পরীকে জড়িয়ে ধরে বলে “পাগলী!”

সন্ধ্যার আজানের পর বসার ঘরে ছোটখাট একটা গল্পের আসর জমায় সবাই। সেখানে পরীর বাবা আর ভাইয়া বাদে সকলেই উপস্থিত। পরীর দুই খালু অন্য জায়গায় থেকে চাকরী করে। তাই তারা তো বাসায়ই আসে মাসে ২/৩ দিনের জন্য।
পরী সবার জন্য হালিম, চটপটি বানিয়েছে। পরীর মা আর আপু চা, কফি, চিকেন পাকোড়া বানিয়েছে।
আড্ডার টপিক হয়ে উঠলো পরীর ছোট বেলার কাহিনী। ছোট বেলার কথা উঠতেই পরী বলে,
~ আমি এই আড্ডায় নেই বাবা!
শাদাফ বলে,
~ কেন?

~ কেন আবার? ছোট বেলার কথা উঠলেই সবাই আমাকে পঁচায় শুধু।
শাদাফ হেসে বলে,
~ এজন্যই তো আরো বেশি করে শুনতে চাই।
আপু পরীকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
~ আমি স্কুলে যাওয়ার সময় কেমন করতি বলবো?
~ না আপু না। একদম না।

শাদাফ আগ্রহী হয়ে বলে,
~ কি করতো পরী?
পিংকি হেসে বলে,
~ আমি যখন স্কুলে যেতাম তখন পরীও সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরতো। সবসময় কি আর ওকে নিয়ে যাওয়া যেত নাকি। না নিয়ে গেলেই, পরী রাস্তায় মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি করতো আর কাঁদতো।
সকলেই এবার একসাথে হেসে দিলো। পরী মুখটা গোমড়া করে বললো,
~ এত হাসার কিছু নেই হু। ছোট বেলায় তো এমন আরো কত মানুষই করতো।
শাদাফ হাসতে হাসতে বললো,
~ পরী এখন একটু গড়াগড়ি করে দেখাও তো।
~ বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।

এবার মা বললো,
~ ছোট বেলায়ও তুই এমন পাজী ছিলি। পিংকিকে কোনো নতুন জামা বা জুতো যদি এনে দিতাম আর ওকে তখন না দিতাম তখন পরী কি করতো জানো?
শাদাফ বললো,
~ কি করতো?
~ ওর বোনের নতুন জামা আর জুতো বটি দিয়ে কেটে ফেলতো।
এবারও শাদাফ হেসে দিলো।
~ তুমি তো কম পাজী ছিলে না পরী!
পরী কিছু বলতে যাবে তখন পরীর ফোনটা বেজে উঠে। তিশা ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করে পরী ঘরে যায়।
~ হ্যাঁ তিশু বলো।
~ পরী আমি তো এখন শ্বশুরবাড়ি!
~ হোয়াট! কি বলছো?

~ হ্যাঁ। বাড়িতে বলেছি যে বান্ধবীর বিয়ে তাই ২ দিন থাকবো। বান্ধবীকে দিয়ে কথাও বলিয়েছি। অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছি।
~ কি বলছো তিশু! আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। তোমার শ্বশুর বাড়ি কোথায়?
~ ঢাকায়। তুমিও তো ঢাকায় থাকো তাই না? তোমাদের বাড়ির এড্রেস দাও আমি দেখা করবো।
~ কিন্তু তিশু
পুরো কথা বলার আগেই ফোনটা কেটে দিলো।
~ অদ্ভুত!
তখনই ফোনে তিশার ম্যাসেজ আসে, “স্যরি পরী। শ্বাশুরী মা এসেছে তাই না বলেই কেটে দিয়েছি। আমি ফ্রি হয়ে কল দিবো। প্লিজ কিছু মনে করো না।”
পরী রিপ্লে করলো, “ইট’স ওকে তিশু”
আবার গিয়ে আড্ডায় যোগ দিলো পরী। বসতে না বসতেই আবার কলিংবেল বাজালো। পরী উঠে দরজা খুলে দিলো। প্রিয়ম এসেছে। হাতে অনেকগুলো ফুচকা। পরী খুব ভালো করেই জানে যে, ওর জন্যই এনেছে। পরীর হাতে ফুচকাগুলো ধরিয়ে দিয়ে আবারও বাহিরে চলে গেলো।

পরী মুচকি হেসে, ফুচকা নিয়ে কিচেনে গেল। সবার জন্য প্লেটে সাজাতে লাগলো।
শাদাফ জিজ্ঞেস করলো,
~ প্রিয়ম ভাইয়া হঠাৎ ফুচকা আনলো যে?
পরীর মা উত্তর দিলো,
~ পিংকি আর পরী দুজনই ফুচকা খুব পছন্দ করে। যদিও পিংকি একটু বেশি ফুচকা খায়, পরী ততটা পারেনা। ওর নাকি অল্পতেই পেট ভরে যায়। কিন্তু তাও ও ফুচকার জন্য খুব পাগল। দূরে কোথাও গেলে প্রিয়ম ফোন দিয়ে বলতো, “পরী ফুচকা খাচ্ছি বুঝলি। তোকে খুব মিস করছি”
পরী জানতো যে, প্রিয়ম ওকে ছাড়া ফুসকা খাবে না তবুও রাগ করতো। বকতো। আর প্রিয়ম হাসতো।

~ সবাই কত ভালোবাসে পরীকে!
~ সবার হাসির সূচনা আর শেষই তো পরী, বাবা!

কলিংবেল এর টুংটাং আওয়াজ আসলো। পরীর মা দরজা খুলতে গেল আর শাদাফ পরীর কাছে গেল।
~ তুমি এসেছো।
~ বউ বুঝি আমাকে মিস করছিলো?

~ একদম না হুহ!
~ তাহলে?
~ আমার না নুডলস খেতে ইচ্ছে করছে চিকেন দিয়ে তোমার হাতে বানানো।
~ বউর আবদার ফেলি কি করে মহারাণী।
পরী শাদাফের গাল টেনে বললো,
~ আমার গুলুগুলু বর’টা। আমি ওদেরকে ফুচকা দিয়ে আসছি। তুমি আর আমি রান্নাঘরেই খাবো। আর তুমি নুডলস রান্না করবে।

~ আচ্ছা।
পরী ফুচকা নিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই চুপচাপ। তিশু দৌড়ে এসে পরীকে জড়িয়ে ধরে।
পরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলকও পড়ছে না। বুঝার চেষ্টা করছে, যা দেখছে সব সত্যি নাকি। পরীকে ছেড়ে দিয়ে বললো,
~ আমি তো ভাবতেও পারিনি এখানে তোমাকে পাবো। সত্যিই সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছি।
আসো পরিচয় করিয়ে দেই। এই হলো রাফিন। আমার হাজবেন্ড। আর ওটা হলো আমার ননদ শিলা।
পরী রাফিনের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। রাফিন পরীর দিকে এগিয়ে এসে বললো,
~ পুরো নাম বলতে পারো না তিশু?
রাফিন পরীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
~ সুলতান চৌধুরী রাফিন!

পর্ব ২৫

পরী এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, যা দেখছে তা সব সত্যি নাকি। সবই কল্পনা মনে হচ্ছে। তিশার আলতো ধাক্কায় পরী তিশার দিকে তাকায়।
~ এই পরী, শাদাফ কাকা কি তোমাদের বাসায়?
~ হ্যাঁ।
~ আল্লাহ্! আমাকে দেখে ফেললে তো নির্ঘাত বাবাকে বলে দিবে।
রাফিন প্লিজ চলো, আমরা চলে যাই। শাদাফ কাকা দেখে ফেললে খবর আছে।
~ রিলাক্স তিশু। এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমরা তো স্বামী~ স্ত্রী।
পরিস্থিতি আর নিজেকে সামলে পরী বললো,

~ সমস্যা নেই, আমি শাদাফকে বুঝিয়ে বলবো তিশু। তার আগে আজ সবাই মিলে তোমাদের লাভ স্টোরি শুনবো। কিভাবে হলো তোমাদের রিলেশন?
তিশু একটু লজ্জা পেলো। সুলতান তিশুকে বললো,
~ না, না তিশু! লাভ স্টোরি এমন সময়ে বলতে হয়না। একদিন সময় করে বলবো। আজ বরং চলো আমরা বাসায় যাই।
পরী বেশ বুঝতে পারলো যে, সুলতান কথাটাকে এড়িয়ে গেল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য পরীও আর কিছু বললো না। হাসিমুখে দুজনকে বিদায় দিলো।
সুলতান আর তিশা চলে যেতেই সীমা বললো,
~ এই সুলতানটার আবার কি হলো? কিছুদিন আগেও তো পরী আপুর জন্য একদম দিওয়ানা ছিল। আর এখন অন্য একজনকে বিয়ে করে নিলো।

পরীর মা হাফ ছেড়ে বললেন,
~ যা করেছে ভালোই হয়েছে। এবার বউকে নিয়ে থাকবে আর আমার মেয়েটাও শান্তিতে থাকবে।
সবার কথোপকথন শুনছে পরী কিন্তু মনে মনে ভাবছে অন্য কথা।
“মনের ভেতর খটকা একটা রয়েই গেল। আসলেই কি সুলতান তিশুকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে নাকি এরমধ্যে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য”

রাত ১১:২০ মিনিট
পরীর বাবার চোখে ঘুম নেই। রাত পোহালেই মেয়েটা কাল চলে যাবে। ভাবলেই বুকটা কেমন হাহাকার করে।
“আরে বাপু, আসছিস যখন এক দেড় মাস থেকে যা! তা না ২/৩ থেকেই দৌড়”
পরীর মা পরীর বাবাকে একটু ধাক্কা দিয়ে বললো,
~ কি বিড়বিড় করছো একা একা?

~ কই কিছুনা তো।
~ আমি শুনলাম।
~ কি শুনেছো?
~ কিসের যেন আসা থাকার কথা বলছিলে।
~ বাদ দাও। কাল কি ওরা চলে যাবে?
~ কারা?

~ শাদাফ আর পরী।
~ হ্যাঁ।
~ আর কয়টাদিন থাকলে কি হতো?
~ তুমি বলছো এই কথা?
~ এত অবাক হওয়ার কি আছে। তোমার জন্যই বলছি।
~ আমার জন্য মানে?
~ তুমি তো মেয়েকে একদম চোখে হারাও।
~ আমি একাই?
পরীর বাবা একটু কেশে ওপাশ হয়ে শুয়ে পড়লো। আর পরীর মা মুচকি হাসলো।

শাদাফ ঘুমাচ্ছে। পরী বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে। মনের মধ্যে ভয়টা জেঁকে বসেছে। সুলতানের কুমিল্লায় যাওয়া, তিশাকে বিয়ে করা এগুলো সবই যেন জটলা পাকাচ্ছে।
কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে শাদাফের দিকে ঘুরে শোয়। ডিম লাইটের আলোয় কি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে শাদাফকে। আলতো করে শাদাফের গাল ছুঁয়ে দেয়। শাদাফের হাতের উল্টো পিঠে চুমু খায়। এক হাত পরীর এক হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। শাদাফ ঘুমের মধ্যেই পরীকে টেনে বুকে নেয়। শাদাফের এমন কাণ্ডে পরী হেসে দেয়। আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে সুলতান। অন্য সব নেশা বাদ দিলেও সিগারেটের নেশা কিছুতেই ছাড়তে পারছে না। ঐদিকে তিশা কখন থেকে সুলতানের অপেক্ষা করছে।
ঘরে বসে বসে শিলার সাথে গল্প করছে। কিন্তু মনটা পড়ে আছে সুলতানের কাছে। অপেক্ষার প্রহর না কাটায় তিশা বলেই ফেললো,
~ শিলা একটু দেখো না তোমার ভাইয়া কোথায়?
~ তুমি বসো। আমি দেখে আসছি।

সারা বাড়ি খুঁজে না পেয়ে ছাদে গিয়ে সুলতানকে পেয়ে যায়।
~ তুমি সিগারেট খাচ্ছো আবার ভাইয়া?
~ তুই? এত রাতে ছাদে কেন আসছিস?
~ তোমাকে ডাকতে।
~ কেন?

~ ভাবী তোমাকে যেতে বলেছে।
~ যা, আসছি।
শিলা চলে যাওয়ার পর হাতের সিগারেট টা ফেলে রুমে যায়। রুমে যেতেই তিশা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে।
~ কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আর তুমি এখন আসলে।
সুলতান একটু আনইজি ফিল করলো। তিশাকে সরিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গেল। তিশা ততক্ষণে বিছানা করে শুয়ে পড়ে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে হাত~ মুখ মুছে তিশার অন্যপাশে সুলতান নিজেও শুয়ে পড়ে।
সুলতানের উল্টো দিকে শুয়ে আছে তিশা। তিশা চাইছে, সুলতান নিজে থেকে যেন তিশাকে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু এরকম কিছুই হলো না। উল্টো ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সুলতান। সুলতানের দিকে ঘুরে রাগে ফুসতে থাকে। শোয়া থেকে উঠে বসে জোরে। শব্দে চোখ মেলে তাকায় সু্লতান।
~ কি হলো? সাপের মত এমন ফোস ফোস করছো কেন?

~ কি বললে? আমি সাপ?
~ না, বলেছি সাপের মতন।
~ তুমি এত আনরোমান্টিক কেন রাফিন?
~ আমি আবার কি করলাম?
~ কি করো নাই, তাই বলো। বউ পাশে শুয়ে আছে অথচ একটু ভালো না বেসে তুমি ঘুমাচ্ছো!
~ একটু কেন আমি তো তোমায় অনেক ভালোবাসি।

~ সে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। সিনেমায় নায়ক নায়িকার কত রোমান্টিক সিন দেখেছি।
তুমি জানো শাদাফ কাকা পরীকে কত ভালোবাসে আর আদর করে? কত কষ্ট করে ওরা দুজন দুজনকে পেয়েছে। শাদাফ কাকা তো পরী বলতে অজ্ঞান।
সুলতান একটু বিরক্ত হলো। এক ঝটকায় তিশাকে টেনে বুকে নিলো।
~ চুপ! কাছে টানার অনেক সময় আছে এখনো। এত অধৈর্য হয়ো না। সময় আসুক।
~ কিসের সময়?
~ মানে ভালোবাসার আরকি!
~ তুমি হঠাৎ রোমান্টিক হয়ে গেলে।

~ রোমান্টিক হলেও দোষ?
~ একদম না।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনতে পেলো কাল রাতে কি কি বলেছে ওর বাবা। পরীর মা বলছে আর হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।
~ বুঝলি পরী, তোর বাবা যতই অভিমান করুক না কেন তোর জায়গা টা তার কাছে আগের মতই আছে।
~ আমি জানি মা। কিন্তু এতদিন কলেজে এবসেন্ট থাকলে পড়াশোনায়ও ক্ষতি হবে। তাছাড়া ঐ বাড়ির লোকজন কি না কি ভাববে বা বলবে।
~ এই বাসায় তো তোর বই আছেই। তুই বরং শাদাফকে রাজি করা।
~ আচ্ছা ও ঘুম থেকে উঠুক। মা তুমি কি এখন আচার বানাও না?
~ খাবি তুই?
~ বানিয়ে দিয়ো তো। নিয়ে যাবো।

~ আচ্ছা। আমার ঘরে দেখ তেঁতুল আর বড়ইর আচার আছে। ছাদে রোদে দিয়ে আয়। পরে খাস।
~ আচ্ছা।
আচারের বোয়াম নিয়ে ছাদে গিয়ে সুলতান কে দেখতে পেল পাশের ছাদে। রোদের মধ্যে বোয়ামগুলো রেখে চলে আসার সময় পিছু ডাকে সুলতান।
~ এখন তো হ্যাপী তুমি পরী?
সুলতানের এমন প্রশ্নে থমকে দাঁড়ায় পরী। নিজের মনেই প্রশ্ন করে, “খুশি হওয়ার মত কি হলো”
পিছন ঘুরে ভ্রু কুচকে তাকায় সু্লতানের দিকে।

পর্ব ২৬

সুলতান কিছু না বলে চুপ করে আছে। পরীই বললো,
~ আমার খুশি হওয়ার কারণটা কি বলুন তো?

~ আমি যে তোমার পথ থেকে সরে গেলাম তাই।
~ আপনি আমার পথ থেকে না গেলেও আমায় পেতেন না কখনোই। আমি শুধু শাদাফকেই ভালোবাসি।
~ হুম জানি। কিন্তু শাদাফ তোমায় কতটা ভালোবাসা পরী? শাদাফ তোমার?
~ হ্যাঁ আমার।
~ শোনো পরী, একটা “তুমি” যে কিভাবে কতটা পরিবর্তন হয়ে যায় তা আমরা মানুষরা বলতে পারিনা।
~ মানে?

~ কিছুনা।
~ শাদাফ কখনোই চেঞ্জ হবে না। আর যদিও আমাদের মধ্যে কিছু হয় তবে সেটা নিশ্চয়ই আপনি সৃষ্টি করতে চাইবেন এটা অজানা কিছু নয়।
রাগে গজগজ করতে করতে পরী ছাদ থেকে নেমে ঘরে গেল। শাদাফ আলভীর সাথে খেলছে। পরী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কি প্রাণবন্ত হাসি, মায়াবি চেহারা।”এই মানুষ কিভাবে পারবে পরিবর্তন হতে। আপদ টা আবারও এসেছে আমাদের মাঝে ঝামেলা পাকাতে”
পরীকে দেখে উঠে আসে শাদাফ।
~ কি ভাবছো?
~ কিছুনা।
শাদাফ পরীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
~ তাই?

~ হুম। আচ্ছা শাদাফ তুমি কখনো পাল্টে যাবে না তো?
~ এসব কি বলছো পরী? আমি তোমায় ভালোবাসি।
~ আমিও তোমায় অনেক ভালোবাসি। প্লিজ কখনো চেঞ্জ হয়ে যেয়ো না।
~ পাগল হয়ে গিয়েছে আমার বউটা। আমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না জান।

পরেরদিন শাদাফ কুমিল্লায় চলে যায়। কিন্তু পরী থেকে যায়। মাঝের একটাদিন ভালোই কেটেছিল। কিম্তু এরপর থেকে পরীর মনে কেমন যেন খটকা লাগে। ফোন দিলে শাদাফ যেন কেমন মনমরা হয়ে থাকে। খুব একটা কথা বলতে চায় না। পরীর অস্থির লাগা শুরু করে। শাদাফকে ফোন দিয়ে বলে নিয়ে যেতে।
পরেরদিন শাদাফ আসেও। কিন্তু মুখে হাসি নেই। কি নিয়ে যেন চিন্তিত।
কুমিল্লায় যাওয়ার পর পরী খেয়াল করলো বাড়িটা কেমন যেন থমথমে। কোনো হৈচৈ নেই। বোরকাটা খুলে পরী শ্বশুর~ শ্বাশুরীর রুমে যায়।
সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

~ কেমন আছেন বাবা? মা ভালো আছেন?
তারা কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেন। পরী কিছুই বুঝতে পারছে না। হয়েছেটা কি। এমন কেন করছে তারা। পরী তাড়াতাড়ি করে রুমে যায়। শাদাফ কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। পরী পাশে গিয়ে বসে।
~ কি হয়েছে শাদাফ? বাবা~ মা আমার সাথে কথা বললো না কেন? আশা ভাবি কই? টুম্পা কই?
শাদাফ নিরব।
~ এতদিন বাবার বাড়ি ছিলাম বলে কি বাবা মা রাগ করেছে?
শাদাফ শোয়া থেকে উঠে বসে। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে।
~ ভাই ভাবী আর টুম্পা নিজেদের বাড়ি করে আলাদা হয়ে গিয়েছে পরী।

~ কি বলছো! কেন?
~ ইচ্ছে তাদের।
পরী কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শাদাফ করুণ কন্ঠে বললো,
~ আমার বাবা~ মায়ের দায়িত্ব এখন তোমার হাতে। প্লিজ তাদের যেন কোনো অযত্ন না হয়।
পরী শাদাফকে আশ্বস্ত করে বলে,
~ তুমি একদম টেনশন করো না। আমি তাদের যত্নের কোনো ত্রুটি রাখবো না।

শাদাফ মৃদু হেসে পরীর কপালে চুমু খায়।

পরেরদিন সকালে পরী ৫টায় ঘুম থেকে উঠে। প্রতিদিন ৬টায় উঠলেও আজ ৫টায় উঠেছে। রান্না করতে হবে তাই। এখন তো আশা ভাবীও নেই।
৭:২০ মিনিট
পরী সব খাবার রেডি করে শাদাফকে ডেকে তোলে। নিজেও কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নেয়।
৮:৩০ এ শাদাফের সাথে বেড়িয়ে পরে পরী। পরীকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে শাদাফ অফিসে চলে যায়। কলেজের ভেতর প্রবেশ করতেই সুলতান আর তিশাকে দেখতে পায়। পরীকে দেখো তিশা দৌড়ে আসে সুলতানকে নিয়ে।
~ কেমন আছো পরী?
~ ভালো আছি। তোমরা?
~ হুম আমরাও ভালো আছি।
~ আচ্ছা আমি এখন ক্লাসে যাচ্ছি তিশু।
~ আরে দাঁড়াও। এত তাড়া কিসের?

~ সকালে পড়তে বসতে পারিনি। এখন পড়তে হবে।
তিশা দুষ্টু হেসে বললো,
~ কেন? কাকা বুঝি একটু বেশিই আদর করেছে আজ?
পরী সুলতানের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানেনা।
~ তিশু! এমন কিছুনা। রান্না করেছি তাই।
সুলতান এবার অবাক হয়ে বললো,

~ তুমি রান্না করো?
~ হু।
তিশা সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ এভাবে বললে কেন রাফিন? তোমার বাসায় যাওয়ার পর তুমি মনে হয় আমায় দিয়ে রান্না করাবে না!
~ নাহ্! তোমাকে দিয়ে কোনো কাজই করাবো না।
~ ইশ!
পরী ইতস্ততবোধ করছিল ওদের কথা শুনে। তাই “আসি” বলে দ্রুত চলে গেল।
সুলতান মনে মনে ভাবতে লাগলো “যে মেয়ে বাসায় একটা প্লেট ধুইতো না সে কি না এখন শ্বশুরবাড়িতে রান্না করে! অবশ্য বিয়ের আগে আর পরের জীবনের অনেক তফাৎ মেয়েদের”
ক্লাস শেষে জানিয়ে দেওয়া হলো কাল ক্লাসটেস্ট হবে। সবাই যেন সে অনুযায়ী প্রিপারেশন নিয়ে আসে।

পরী বাসায় গিয়ে কলেজের ইউনিফর্ম খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মাত্র। তখনই শ্বাশুরীর ডাক পড়লো। শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগা সত্ত্বেও পরী শ্বাশুরীর কাছে যায়।
~ জ্বী মা বলেন
~ কখন আসছো?
~ এইমাত্র।
~ ওহ। আমায় এক কাপ চা বানিয়ে দাও। তারপর ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও।
~ আচ্ছা।

চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে পরী ভাবতে থাকে, বাপের বাড়ি যদি থাকতো তাহলে দুনিয়া উল্টে গেলেও পরী শোয়া থেকে উঠতো না। পরী মা জোর করে উঠিয়ে খাইয়ে দিতো।
পানি ফুটলেই চা পাতা দিয়ে দেয়। মেকি একটা হাসি দিয়ে নিজেই নিজেকে বলে, “পরী এটা তোমার শ্বশুরবাড়ি। বাপের বাড়ি নয়। তাছাড়া শাদাফের ভালোবাসা পেলেই হয়। আর কি চাই আমার!”
শ্বাশুরীকে চা দিয়ে পরী ফ্রেশ হয়ে নেয়। খেতে বসলেও খাবারে রুচি পাচ্ছে না। মুখ থেকে খাবার বেড়িয়ে আসতে চাইছে। হাত ধুয়ে উঠে পড়লো। আপাতত কাজ না থাকায় ঘুমানোর কথা ভাবছিল পরী। খাবারগুলো গরম করে টেবিলে রাখছিল। তখন শ্বাশুরী এসে বললো,
~ আজকে গলদা চিংড়ি, ডাল আর বেগুন ভাজবা।
~ আচ্ছা।

~ হুম। খাবার ঢেকে সবকিছুর যোগার শুরু করে দাও।
~ এখনই?
~ নয়তো পরে আবার সময় কখন পাবে। বেশি দেড়ি হয়ে যাবে।
~ ঠিক আছে মা।

তিশার সাথে ফোনে কথা বলছিল সুলতান। তিশা বকবক করেই যাচ্ছে কিন্তু মনে শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না সুলতান।
~ এই রাফিন?
~ হ্যাঁ বলো।
~ কোথায় হারিয়ে গেলে?
~ তোমার মাঝে।
~ এহ্! কি ঢং।
~ ঢং এর কি হলো?

~ কিছুনা। রাফিন তোমায় ছাড়া আমি থাকতে পারছিনা।
~ আর কয়টাদিন। তারপর তোমার বাড়িতে প্রস্তাব পাঠাবো। রাজি না হলে আমার বাসায় চলে আসবে। আমার বাড়ির সবাই তো তোমার কথা জানেই।
~ আর কত দেড়ি করবো?
~ এত অধৈর্য হচ্ছো কেন তিশু?
~ কেন তোমার কি আমায় কাছে পেতে ইচ্ছে করে না?
সুলতান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
~ বলো না কেন?

~ করে তিশু। আচ্ছা তুমি কি চাইছো এখনই তোমার বাড়িতে বলি? পরে যদি তোমার পড়া বন্ধ হয়ে যায়?
~ আমি এতকিছু জানিনা। আমার শুধু তোমাকে চাই ব্যাস!
~ আচ্ছা আমি দেখছি।

সব কাজ শেষ করতে করতে হাঁপিয়ে গেছে পরী। আশা ভাবী থাকতেও এত কাজ করেনি।”মনে হয় নতুন নতুন সংসারের এত কাজ করছি তো। তাই এমন মনে হচ্ছে”
এখন শরীর অনেক বেশিই ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু কতগুলো পড়াও তো বাকি। ঘুমে চোখ লেগে আসছিল। অতশত আর না ভেবে শুয়ে পড়ে। ঘুমে তলিয়ে যায়। প্রায় ৩০ মিনিট পর শাদাফ ফোন করে। ফোন আসায় পরী বিরক্ত হয়। ফোন ধরে বলে,
~ হ্যালো
~ তুমি এখন ঘুমাচ্ছো?

~ হুম। খুব ঘুম পাচ্ছিল।
~ রান্না করেছো?
~ হ্যাঁ।
~ আট’টা বাজে। বাবা~ মা কে খেতে দাও। আর তুমিও খেয়ে নাও। তারপর পড়তে বসো।
~ আচ্ছা। তোমার ছুটি কয়টায়?
~ নয়টায়। আমার জন্য অপেক্ষা করো না। আমি বাহির থেকে খেয়ে আসবো।

~ আচ্ছা।
ঘুমের রেশ কাটতেই পরী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।”রাতে ও বাহিরে কার সাথে খেয়ে আসবে। আর বাহিরেই বা কেন খাবে”
রুমের মধ্যে পায়চারী করতে থাকে পরী।”আমি কি শাদাফকে সন্দেহ করছি। হতেও তো পারে অফিসের কোনো কলিগের সাথে খাবে। এক মিনিট! কলিগ ছেলে না মেয়ে? সে যাই হোক, আমি বাসায় থাকলে তো আমি ওকে আর ও আমায় খাইয়ে দেয়। না হলে নাকি ওর পেটই ভরে না। তাহলে?
উফফ না পরী! এসব কি ভাবছিস তুই”
আবারও পায়চারী শুরু করে। কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর থমকে দাঁড়ায় পরী।”তবে কি আমার সংসার জীবনে নতুন কোনো ঝড় আসতে চলেছে!”

পর্ব ২৭

তিশা আর সুলতানের সম্পর্ক তিশার পরিবার মেনে নিয়েছে। না নেওয়ারও কোনো কারণ ছিলো না। কারণ সুলতান ওয়েল সেটেল। সুলতানের পরিবার তো আগেই মেনে নিয়েছে। তিশার পড়াশোনা আর সুলতানের চাকরীর জন্য দুজনে একটা ফ্লাট নিয়ে কুমিল্লাতেই থাকে।

পরী পড়াশোনা আর সংসার দুটো সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। যত যাই করুক কিছুতেই শ্বশুর~ শ্বাশুরীর মন জয় করতে পারছে না। পরী যতই তাদের আপন করে নিতে চায় তারা ততই পরীকে দূরে সরিয়ে দেয়।
পরীর জীবনে মেঘের কালো ছায়া নেমে এসেছে। শাদাফের ভরসা আর বিশ্বাস আর ভালোবাসায় এখনো ঠিক আছে পরী। তবে এতটুকু পরী বেশ বুঝতে পেরেছে ওর শ্বশুরবাড়ির কেউ চায় না ও পড়াশোনা করুক। সেদিন পাশের বাড়ির প্রতিবেশী আন্টি এসেছিল বাড়িতে। চা নিয়ে আসার সময় আড়াল থেকে সবটা শুনেছে পরী।
~ কি ব্যাপার ভাবী, বাড়ির ছোট বউ কেমন?
~ ঐ আরকি! এই যুগের মেয়েরা যেমন হয়।
~ সেবাযত্ন করে তো নাকি?

~ তা করে।
~ ঝগড়াঝাঁটি করে না?
~ এত সাহস হবে নাকি। শাদাফ মেরে ফেলবে।
~ বিয়ের পর বাড়ির বউকে পড়াশোনা করাচ্ছো কেন বুঝিনা বাপু। যা দিনকাল পড়েছে এখন। স্কুল কলেজ মানেই তো এখন মেয়েরা ছেলেদের সাথে ঢলাঢলি করে।
শাদাফের মা এর কোনো উত্তর দিলেন না। চুপ করে রইলেন। তিনি আবার বলা শুরু করলেন,
~ শোনো ভাবী, ভাইজান এই এলাকার বিচার আচার করেন। কোনো সময় যদি তোমার এই ছেলের বউ কোনো পরপুরুষের সাথে অঘটন ঘটায় তখন? তখন কিভাবে নিজেরই ছেলের বউ এর বিচার করাবে? কিছুদিন আগে শুনলে না পাশের এলাকার কোন একটা মেয়েকে বিয়ের পরও পড়াশোনা করিয়েছে। ৪মাসও হয়নি অন্য ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। ছেলেটার যা করুণ অবস্থা! কি বলবো। পরিবারের মান~ সম্মানও গেল।
আমি বলছি না যে তোমার ছোট ছেলের বউও এমন হবে। বুঝোই তো এই যুগের মেয়ে। অল্প বয়স। সুন্দর দেহের গড়ন, সুন্দরী। হতে আর কতক্ষণ।

~ পড়াশোনা কি আর সাধে করাই? আমার মতামত তো কোনো কালেই ছিল না। কিন্তু ঐ যে আমার গুণধর ছেলে। বউকে নিয়ে একদম গদগদ করে। বিয়ের পরও পড়াশোনা করাবে।
~ কি বলছো এসব? শাদাফ তো মা ভক্ত ছিল। এখন বউর আঁচল ধরে আছে নাকি?
শাদাফের মা রাগে ফুঁসতেছেন।
~ বিয়ে হয়েছে কতদিন হলো?
~ ৬ মাস।
~ বাচ্চা নিতে বলো।
~ কি বলছো ভাবী? ঐ মেয়ে তো নিজেই বাচ্চা এখনো।
~ বিয়ে করার সময় মনে ছিল না? বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন আর বাচ্চা আছে নাকি।
~ আরে বাবা! কিছু হয়ে গেলে তো শাদাফ শেষ। ওর মধ্যে আমার শাদাফের প্রাণ আছে। এতই ভালোবাসে ওকে।

~ ধুর এমন কিছুই হবেনা। বাচ্চা হলে তখন আর এতকিছু সামলিয়ে পড়তে পারবে না। সংসার আর বাচ্চা নিয়েই থাকবে।
পরী আর ওদের কথা শুনতে পারলো না। চায়ের ট্রে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। এতক্ষণে চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। পরীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে রাগে দুঃখে কষ্টে। ইচ্ছে করছিল মহিলাকে ইচ্ছামত কথা শুনিয়ে দিতে। তার মেয়েও তো স্কুলে পড়ে। সেও কি স্কুলে গিয়ে ছেলেদের সাথে ঢলাঢলি করে! এতটা কুসংস্কারে আবদ্ধ এই জায়গার লোকজন। নাহ্ এসব আর সহ্য হচ্ছে না।
“আল্লাহ্ ধৈর্য দাও আমায়”

১ সপ্তাহ্ পর পরীর টেস্ট পরীক্ষা। বাড়ির সব কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করেই পড়তে বসে। শাদাফও অফিসের কাজ নিয়ে আজকাল বেশিই ব্যস্ত থাকে।

তিশাও ধুমছে পড়াশোনা শুরু করেছে। সুলতান যথেষ্ট কেয়ার করে তিশাকে। তবে ভালোবাসা এখনো পরীর জন্যই। কিন্তু তিশাকে এসব কিছুই বুঝতে দেয় না। বাড়ির টুকটাক কাজ নিজেই করে। এছাড়া রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়ার জন্য আলাদা কাজের লোক রেখেছে। তিশাকে হুকুম দিয়েছে ঘরের কোনো কাজ পরীক্ষার আগে করা যাবে না। সুলতানের এমন আদেশে তিশা যেন বারবার প্রেমে পড়ে।
রাতঃ১০টা
স্টাডি রুমে পড়ছিল পরী। শ্বাশুরীর রুম থেকে কান্নাকাটি আর হাউকাও শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দরজায় পর্দা ধরে দাঁড়ায়।
শ্বাশুরী কান্না করতে করতে বলছে,
~ আমার কি বয়স কম হয়েছে? মরে গেলে তখন বাচ্চা নিবি? কবরে আমার নাতি~ নাতনিকে নিয়ে যাবি?

~ মা! এসব কেন বলছো? পরীর কয়েকদিন পর পরীক্ষা। এখন এসব বাচ্চা~ কাচ্চা! বুঝো না কেন?
~ তো কি হয়েছে? পড়াশোনা চলাকালীন আর মেয়েরা কি বাচ্চা নেয় না? তাছাড়া বাচ্চা কি সাথে সাথেই হয় নাকি। বাচ্চা পেটে নিয়ে কত মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি তো বলিনি ওর পড়াশোনা বন্ধ করতে।
শাদাফ মাথা নিচু করে বসে আছে। শ্বাশুরী মা শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছে আর বলছে, “আমি মরে যাওয়ার পর বুঝবি আর তখন আফসোস করবি”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শাদাফ। পরী এতক্ষণ স্টাডি রুমে ছিল। শাদাফের পাশে এসে দাঁড়ায়।
~ কি হয়েছে শাদাফ?
~ কিছুনা।
~ বলো আমায়।
~ বললাম না কিছুনা।
~ আমি পড়াশোনা বন্ধ করে দেই। এটা চাও তোমরা?

~ না। পড়াশোনা তোমার স্বপ্ন। কিন্তু আমি আমার মাকে কষ্টও দিতে চাই না।
~ তবে কি চাইছো তুমি?
শাদাফ এবার পরীর দিকে ঘুরে দুই হাত ধরে বলে,
~ আমায় একটা বাচ্চা দাও প্লিজ।
~ শাদাফ তুমি বলছো এটা?
~ হ্যাঁ বলছি। কারণ এছাড়া আর কিছু করার নেই আমার। কেন? তুমি কি মা হতে চাও না?
~ চাই। তবে এখনো অনেক সময় পড়ে আছে। মাত্র তো ৬ মাস হলো বিয়ে করেছি।

~ বাচ্চা নেওয়াটা নিজেদের ব্যাপার পরী। প্লিজ পরী আমার দিকটা একটু ভাবো।
~ আমার দিকটা কেন ভাবছো না? এখন যদি বাচ্চা নেই তাহলে কোনটা ছেড়ে কোনটা সামলাবো আমি? পড়াশোনা সামলাবো নাকি সংসার আর নাকি বাচ্চা?
~ তাহলে তুমি বাচ্চা নিবে না?
~ মা হওয়ার ইচ্ছা সব মেয়েরই থাকে। আমিও এর ব্যতীক্রম নই। তবে আমি চাই না আমাদের বেবি আমার অনাদরে বড় হোক। আমি একসাথে এখনই সবকিছু সামলাতে পারবো না। এখন যদি আমাদের বেবি আসে তাহলে আমি বেবিকে আমার সব সময় দিতে পারবো না। এটা আমি চাই না। আমি চাই আমার সব সময় বেবি পাক। এর জন্য অন্তত ইন্টারের ফাইনাল এক্সামটা পর্যন্ত আমায় সময় দাও প্লিজ।
~ ধ্যাত! তোমায় বুঝিয়ে কিচ্ছু হবে না। তুমি তোমার পড়াশোনা নিয়েই থাকো।

পরী বুঝে উঠতে পারছে না। কি করবে। একদিকে পড়ালেখা। অন্যদিকে সংসার আর শাদাফ।
“শাদাফ যদি আমায় ছেড়ে দেয়? যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে। উফফ! আল্লাহ্ কোনো পথ দেখাও আমায়। আমি শাদাফকে হারাতে পারবো না”
বিছানায় অন্য পাশ হয়ে শুয়ে আছে শাদাফ। পরী বেশ বুঝতে পেরেছে শাদাফের রাগ। কিন্তু এই মুহুর্তে রাগ ভাঙ্গানোর মত মন~ মানসিকতা নেই পরীর। তাই উল্টো পাশ হয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। চোখটা লেগে আসছিল। ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস পড়তেই ধড়ফড়িয়ে উঠে পরী। শাদাফ পরীর মুখ চেপে ধরে।
~ চুপ! আমি।
শাদাফকে দেখে শান্ত হয় পরী।
~ আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
~ আমি থাকতে ভয় কিসের।
শাদাফ একটু একটু করে পরীর আরো কাছে যায়। শাদাফের প্রতিটা নিঃশ্বাস পরীর চোখে~ মুখে পড়ছে। পরীর চুলগুলো খুলে দেয়। পরীর মুখ দিয়ে যেন কথা বের হচ্ছে না। কামিজে হাত দিতেই শাদাফের হাত ধরে পরী। কোনোরকমে বলে, “কি কি করছো”
শাদাফ আস্তে করে বলে, “চুপ! আদরের সময় এত কথা বলতে নেই”

সুলতান বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তিশা বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে।
~ এত আনরোমান্টিক মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি। এমনিতে কত্ত কেয়ার করে অথচ ভালোবাসার বেলায় ঠনঠনা ঠন ঠন! একটু আদরও করে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, এগুলো বোধ হয় কোনো সতীনের জন্য জমিয়ে রাখছে।
শোয়া থেকে উঠে বসে তিশা। কপালে হাত রেখে ঘুমাচ্ছে সুলতান। ডিম লাইটের আলোয় সুলতানকে দেখে নেশা লেগে যায় তিশার।
~ আজ তো তোমায় আমার অধিকার দিতেই হবে রাফিন।
তিশা নাইট ড্রেসের লং পার্ট টা খুলে ফেলে। সুলতানের কপাল থেকে হাতটা সরায়। একটা একটা করে শার্টের বোতাম খোলে। গালে কপালে চুমু খেতে শুরু করে। জড়িয়ে ধরে ঠোঁট স্পর্শ করতেই সুলতান ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় তিশাকে। ছিটকে গিয়ে দেয়ালের সাথে বাড়ি খায়। ব্যথায় কান্না করে দেয় তিশা। ঘটনার আকস্মিকতায় নিজেই চমকে যায় সুলতান।
~ তিশু! তুমি?
তিশা কান্না করতে করতে বলে,

~ তুমি মনে হয় অন্য কাউকে আশা করেছিলে? এভাবে কেন ব্যথা দিলে আমায়? আমি কি পর কেউ? বিয়ের পর একদিনও আমায় আমার অধিকার দাওনি। যতবার আমি নিজে তোমার কাছে যেতে চেয়েছি তুমি নানারকম বাহানা দেখিয়ে দূরে রেখেছো। শুনেছি, ভালোবাসার মানুষকে সবাই নাকি কাছে পেতে চায়। নিজের করে পেতে চায়। আমিও তো চাই। খুব করে চাই তোমায় নিজের করে কাছে পেতে। কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি। তাহলে তুমি কেন চাইছো না? তুমি আমায় ভালোবাসো তো রাফিন?

পর্ব ২৮

সুলতান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তিশার প্রশ্নের উত্তর আদৌ সুলতানের কাছে আছে নাকি সেটা নিয়েও কনফিউজড সুলতান নিজেই। ঐদিকে তিশা কান্না করেই চলেছে। তিশার কাছে গেলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
~ একদম তুমি আমায় ছুঁবে না।

~ আই এম স্যরি তিশু।
~ লাগবে না তোমার স্যরি।
~ প্লিজ কান্না থামাও। আমি বুঝতে পারিনি যে তুমি এভাবে
~ আমি এভাবে কি হ্যাঁ? এত রাতে এই রুমে আমি ছাড়া আর কে থাকবে?
~ আচ্ছা স্যরি তো! এখন আসো ঘুমাবে।
এক প্রকার জোর করেই তিশাকে শুইয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে তিশা ঘুমিয়ে পড়ে।

পরেরদিন বিকেলে ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরে পরী। বাড়ির লোকজনের ব্যবহার দিনকে দিন কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। পরী ঠিক বুঝতে পারছে না যে এরা আসলে কি চায়। কেন এমন করে ওর সাথে।
দেখতে দেখতে পরীর টেস্ট এক্সামও চলে আসে। সারাদিন বাড়ির কাজ আর রাতে শাদাফকে সময় দিয়ে যেটুকুনি সময় পায় সেই সময়েই যা একটু পড়ে। বারবার নিয়ম করে শ্বশুর~ শ্বাশুরী এটা মনে করিয়ে দেয় যে, “এত টাকা পয়সা খরচ করে পড়াচ্ছি। রেজাল্ট যদি ভালো না হয় তাহলে আমাদের চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না সেদিন।”

এত কাজ করার পরও কিভাবে খুব রেজাল্ট করা সম্ভব সেটা বুঝে আসে না পরীর। এরচেয়েও কষ্টের বিষয় হচ্ছে আজকাল পরী শাদাফকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। এরকম চিন্তা~ ভাবনা, দোটানা নিয়ে পড়াশোনা কিছুতেই হচ্ছে না। কিন্তু হালও ছাড়েনি পরী। নিয়ম করে সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নাস্তা বানানো, দুপুরের খাবার তৈরি করা, রাতের খাবার তৈরি করা, ঘরের বাকিসব কাজ পরী একাই নিজ হাতে সামলিয়ে যাচ্ছে। শরীরটাও আজকাল ভালো যাচ্ছে না। তবুও কিছু করার নেই। কারণ এটা বাবার বাড়ি নয়, শ্বশুরবাড়ি!

লাস্ট পরীক্ষার দিন ঝিড়িঝিড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বাহিরে কোনো গাড়িও ছিল না। শীতের এই অসময়ে বৃষ্টি মোটেও ভালো না। এদিকে আর অপেক্ষা করাও সম্ভব না। দুপুরের খাবার গরম না করে দিলে শ্বশুর~ শ্বাশুরী খাবে না। তারা না খেয়ে থাকলে শাদাফের কাছে বকা খেতে হবে। এদিকে শাদাফও কাজের চাপে পরীকে আর নিয়ে যেতে পারে না। বাধ্য হয়ে পরী বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা শুরু করে। পেছন থেকে তিশার ডাকে থেমে যায়।
~ এই পরী গাড়িতে আসো।
গাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সুলতান ড্রাইভ করছে। করুণভাবে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে। পরী তিশার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে,
~ না গো! আমি একাই যেতে পারবো।
~ তোমার কি মাথা ঠিক আছে পরী? এই বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে।

~ সমস্যা নেই। আমি যেতে পারবো।
সুলতান খুব ভালো করেই জানে যে, পরী গাড়িতে আসবে না। তাই বাধ্য হয়ে নিজেই বললো,
~ তিশু, উনি বোধ হয় আনইজি ফিল করবে আমার সাথে এক গাড়িতে গেলে। তুমি বরং ছাতাটা দিয়ে দাও।
~ হুম এটা ভালো আইডিয়া।

পরীও আর কথা না বাড়িয়ে ছাতাটা নিয়ে হাঁটা শুরু করে। হাত ঘরির দিকে তাকিয়ে দেখে ১:২০ বাজে। গাড়িতে করে বাড়ি যেতেই তো ৩০ মিনিটের মত লাগে। না জানি হেঁটে যেতে কতক্ষণ লাগে। এইদিকে শ্বশুর~ শ্বাশুরীর খাওয়ার সময়ও পার হয়ে যাচ্ছে। পরী দ্রুত পা চালাচ্ছে। ছাতা দিয়ে শুধু মাথাটুকু ঢাকলেও শরীর প্রায় ভিজে গেছে অনেকখানি। হুট করে একটা বাইক এসে দাঁড়ায় পরীর সামনে। তাকিয়ে দেখে ওর ১ইয়ার জুনিয়র নিশান।
~ এভাবে পথ আটকে দাঁড়ালি কেন?
~ তুমি তো ভিজে যাচ্ছো আপু। এভাবে হেঁটে গেলে বাড়ি পৌঁছাবে কতক্ষণে?
~ আরে সমস্যা নেই। আমি যেতে পারবো। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি যা নয়তো ভিজে যাবি।
~ তুমি বাইকে উঠো। তোমার বাড়ির সামনে দিয়েই তো আমি বাড়ি যাই। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমি চলে যাবো।

~ না রে লাগবে না।
~ খুব লাগবে। তুমি না আমাকে ছোট ভাই ডাকো? আর ছোট ভাইর কথাটা রাখবে না?
পরী আরেকবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে দেড়টা পার হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছানোর জন্য এছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পেলো না।
পরীকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নিশান চলে যায়। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে নিশান আর পরীকে একসাথে আসতে দেখেছে শাদাফ। পরী তাড়াতাড়ি বাড়িতে গিয়েই আগে রান্নাঘরে যায় খাবার গরম করার জন্য। শাদাফ পেছন থেকে হাত জোরে চেপে ধরে বলে,

~ তোর খাবার গরম করতে হবে না। তোর কি মনে হয় এত বেলা হয়ে গেছে আর আমি আমার বাবা~ মাকে না খাইয়ে রেখেছি?
পরী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শাদাফের দিকে। এটা কোন শাদাফকে দেখছে পরী। রাগে শাদাফের চোখ দুইটা লাল টুকটুকে হয়ে আছে।
~ আয় আমার সাথে রুমে আয়।

টানতে টানতে পরীকে রুমে নিয়ে যায়। সামনে দাঁড় করিয়ে চার পাঁচটা থাপ্পর দেয় গালে। ডান হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে বলে,
~ আজ বুঝতে পারলাম যে, মা কেন তোকে পড়াতে বারণ করতো। ছেলেদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াস? বাড়িতে যে অসুস্থ শ্বশুর~ শ্বাশুরী আছে সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তোর না? বাইকে করে প্রেমিকের সাথে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে।
পরী কথা বলতে পারছে না। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কোনোরকমে শাদাফের হাত সরিয়ে বলে,
~ তুমি আমায় ভুল বুঝছো। রাস্তায় কোনো গাড়ি ছিল না। তাই আমি বাধ্য

পুরো কথা বলার আগেই আরেকটা থাপ্পর বসিয়ে দেয়।
~ চুপ করে থাক একদম! আমি তোর মুখের কথা বিশ্বাস করবো? নাকি নিজের চোখকে?
~ তুমি আমার কথাটা তো শোনো প্লিজ।
~ তোর কথা শোনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই আমার। স্বামী থাকতে প্রেমিক লাগে তোর? কলেজে যাস এসব করতে? বৃষ্টিবিলাস করিস? করাচ্ছি তোকে বৃষ্টিবিলাস।
পরীকে টেনে ছাদে নিয়ে যায় শাদাফ। ধাক্কা দিয়ে ছাদের এক কোনায় ফেলে দেয়। যাওয়ার আগে বলে যায়,
~ সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ছাদেই বৃষ্টিবিলাস কর।

পরী পেছন থেকে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে, “আমার আগের তুমি নেই শাদাফ। তোমার দেখার আড়ালেও অনেক কথা লুকিয়ে আছে যেটা বলার সুযোগও দিলে না আমায়। কেন এমন বদলে যাচ্ছো তুমি। আমার ওপর কোনো ভরসা নেই তোমার। আমার কথা শোনো প্লিজ।”
কথাগুলো শাদাফের কান পর্যন্ত গেলেও হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি।

সুলতান বিছানায় খাটের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তিশা দৌড়ে গিয়ে সু্লতানের বুকে মাথা রাখে। সুলতান একটু নড়েচড়ে উঠে।
~ আহ্! এভাবে নড়ছো কেন?
~ তুমি এখন ক্লান্ত। তোমার ঘুম প্রয়োজন।
~ আবার দূরে সরিয়ে দিচ্ছো?

~ আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বললাম।
~ লাগবে না আমার ভালো। আমার শুধু তোমাকে চাই।
~ খেয়েছো?
~ রাফিন!
~ কি?
~ আমার কথাটা ইগনোর করলে কেন?

~ কই?
~ কেন এমন করো তুমি আমার সাথে? কেন নিজেকে আমার থেকে দূরে রাখো? কেন বলো?
সুলতান তিশার দিকে তাকিয়ে ভাবে, “কি করে তোমায় কাছে টেনে নিবো তিশা। তোমার কাছে গেলেই যে পরীর হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠে আমার চোখের সামনে। ওর চঞ্চলতা তোমায় স্পর্শ করতে দেয়না। আমার মনে হয় আমার সব ভালোবাসা শুধুই পরীর জন্য। আমার সবকিছু তুমি নও বরং পরী।”
~ কি ভাবছো?
~ কিছুনা।

~ ধ্যাত।
তিশা রাগ করে অন্যপাশ হয়ে শুয়ে পড়ে।
সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিট
শাদাফ ঘুম থেকে উঠে চারদিকে তাকায়। পরীকে না দেখে হঠাৎই ওর মনে হলো, বৃষ্টির মধ্যে পরীকে তো ছাদে রেখে এসেছিল। বাহিরে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি নেই। তাড়াতাড়ি দৌঁড়ে ছাদে যায়। দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে কাচুমুচু হয়ে বসে আছে পরী। ভিজে একাকার হয়ে গেছে। ঠান্ডায় একনাগাড়ে কেঁপেই চলেছে। পরীর এমন অবস্থা দেখে বুকের ভেতর মোচর দিয়ে উঠে শাদাফের। পরীর হাত ধরে দাঁড় করায়। শরীর গরম। জ্বর এসে পড়েছে। জ্বরের ঘোরে শুধু এটাই বলছে, “তুমি আমার আগের তুমি নেই। তুমি আমার আগের তুমি নেই। তুমি আমার আগের তুমি নেই।”

পরীকে কোলে করে ঘরে নিয়ে যায়। ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে দিয়ে কিছু খাইয়ে দেয়। ওষুধ খাওয়ানোর সময় পরী পাগলামি শুরু করে দেয়। কিছুতেই ওষুধ খাবে না। পরক্ষণেই শাদাফের দুপুরের কথা মনে পড়ে যায়। একটা ছেলের সাথে বাইকে করে এসেছে ভাবতেই রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। সাথে সাথে পরীকে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। পরী কেঁদে দেয়। কান্না করতে করতেই বলে, “তুমি আমার আগের তুমি নেই।”
জোর করে পরীকে ওষুধ খাইয়ে দেয়। পরী এখনো কাঁদছে। রাগ কমেনি শাদাফের। কিন্তু এই অবস্থায় পরীকে কিছু বলতেও পারছেনা। এমনিতেও দুপুরে কম মারেনি আবার বৃষ্টিতে ছাদে রেখেও এসেছিল। বুকটা কেমন হাহাকার করছে। এই মুহুর্তে পরীকে বুকে না নেওয়া পর্যন্ত শান্তি পাবে না শাদাফ। পরীর দিকে তাকিয়ে দেখে শুয়ে পড়েছে। শাদাফ পরীর পাশে শুয়ে টান দিয়ে পরীকে বুকে নিয়ে আসে। শক্ত করে বুকের সাথে লাগিয়ে জড়িয়ে ধরে। পরী অস্পষ্টস্বরে বলে, “আমি তোমায় বুঝতে পারিনা। আমি তোমার ভালোবাসা বুঝতে পারিনা। তুমি আমার আগের তুমি নেই”

পর্ব ২৯

জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকতে বকতে পরী ঘুমিয়ে যায়।
ভোরের দিকে শাদাফের ঘুম ভাঙ্গে। পাশে তাকাতেই দেখে পরী ছোট্ট বিড়াল ছানার মত বুকের সাথে লেগে আছে। শরীরে হাত দিতেই দেখে জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। অনবরত কাঁপছে। ঘরে ল্যাপ, কম্বল, কাঁথা যা ছিল সব গায়ের উপর দিয়েছে। তবুও ঠান্ডায় কাঁপছে। পরীর জন্য মনটা নরম হলেই আবার কালকের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় রেগে যায়। এবারও তাই হলো। রাগে শাদাফ রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। বাবা~ মা বাহিরের খাবার খেতে পারে না। তাই শাদাফই কিচেনে গিয়ে সকালের নাস্তা বানায়। নাস্তা বানিয়ে বাবা~ মাকে ঘুম থেকে তোলে খাওয়ার জন্য। ব্রেকফাস্ট করে ড্রয়িংরুমে বসে ফোনে গেম খেলছিল শাদাফ। রুমে গেলেই পরীর উপর রাগ হবে। তাই আর রুমের দিকে পা বাড়ায়নি। সকাল ৯টা নাগাদ কলিংবেল বেজে উঠে বাড়ির। শাদাফ দরজা খুলে দিয়ে নিশানকে দেখতে পায়। রাগ যেন এবার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। শাদাফ রাগ আর বিরক্ত দুটোর সংমিশ্রণ করেই জিজ্ঞেস করলো,
~ কাকে চাই?
~ পরী আপু আছে?
~ পরীকে কি করে চিনো?

~ আমরা তো একই কলেজে পড়ি।
~ খুব ভালো। তো আমার সামনে ঢং করে আপু কেন ডাকছো?
~ স্যরি? ঠিক বুঝতে পারলাম না আপনার কথা।
~ না বুঝার মত তো কিছু বলিনি। পরীকে আপু কেন ডাকছো?
~ পরী আপু আমার সিনিয়র। তাহলে তাকে আপু ডাকবো না তো কি বলবো? তাছাড়া পরী আপুকে আমার আপন বড় বোনই ভাবি।

~ তোমাদের পরিচয় কিভাবে? আই মিন আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমার জানামতে পরী কলেজে কোনো ছেলের সাথে কথা বলেনা। তারমধ্যে তুমি তার জুনিয়র। কিভাবে কি?
~ আপনি ঠিকই জানেন ভাইয়া। পরী আপু কারো সাথে কথা বলে না। একদিন আমি বন্ধুদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে সিঁড়ি থেকে নামছিলাম আর পরী আপু সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল। হঠাৎই আমার পা পিছলে যায় তখন পরী আপু আমাকে ধরে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, তখন আমাকে একটা ধন্যবাদ বলারও সুযোগ দেয়নি আপু। ভাবলেশহীন ভাবে চলে গেছে। আপুর বান্ধবী তিশা আপু যাওয়ার আগে বলে গেছে “এভাবে দৌড়াও হাত পা ভাঙ্গলে মজা বুঝবে। আজকে না হয় পরী বাঁচালো। কিন্তু বারবার তো আর বাঁচাবে না” ব্যাস এটা বলে তিশা আপুও চলে গেল। আমি অনেক বেশি অবাক হলাম আর তখনই জানতে পারলাম আপুর নাম পরী। আপনি যদি কখনো কলেজে আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তাহলে শুনতে ও জানতে পারবেন যে, আমি কলেজের খুবই দুষ্টু আর ফাজিল ছেলে। কিন্তু বর্তমানে আমার পরিচয় পাবেন নিশানের মত ভদ্র শান্ত আর কেউ নেই আমাদের ডিপার্টমেন্টে। আর এর পুরো ক্রেডিটটাই পরী আপুর। ঐদিনের পর থেকে আমি আপুকে ফলো করা শুরু করি। তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে আমি মুগ্ধ হই। এটাও জানতে পারি যে আপু আপনাকে কতটা ভালোবাসে। যার জন্য সে ক্লাসের কোনো ছেলের সাথেও কথা বলেনা। খুব বেশি প্রয়োজন হলে তিশা আপুকে দিয়ে বলায়। আমার নিজের কোনো ভাই বা বোন নেই। আমি বাবা~ মায়ের একমাত্র ছেলে।

পরী আপুকে নিজের বোন বানানোর জন্য অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু আপু নারাজ। আমি আমার মা~ বাবাকে কলেজে নিয়ে আসি। আপুর সাথে কথা বলাই। আমার এমন পাগলামি আর আমার বাবা~ মায়ের আবদারে আপু রাজি হয় আমার বোন হতে। কিন্তু তবুও সে প্রয়োজন ছাড়া কখনোই আমার সাথে কথা বলেনি। আমি আমার বাবা~ মা জোর করার পরও আমাদের বাসায় যায়নি কখনো। বলেছিল যে, আমার জন্মদিনে আপনাকে আমাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে দেখাবে আর বলবে “এই দেখো আমার নতুন একটা পরিবার। আমার ছোট ভাই নিশান”
একনাগারে কথাগুলো বলে নিশান কিছুক্ষণ দম নিলো। শাদাফের চোখে পানি টলমল করছে। অনেক বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। নিশান আবার বললো,
~ কাল বৃষ্টিতে কোনো গাড়ি না পেয়ে আপু ভিজে ভিজে আসছিল। আমার জোড়াজুড়িতে আমার সাথে বাইকে এসেছিল। আপুর এই ফাইলটা আমার ব্যাগে ছিল। এটা দেওয়ার জন্যই আমি এসেছি।
ফাইলটা দিয়ে নিশান চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে শাদাফ পেছন থেকে ডাকে।
~ ভেতরে এসো। এক কাপ কফি খেয়ে যাও।

নিশান মনোমুগ্ধকর একটা হাসি দিয়ে বলে,
~ প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে। দশটায় আমার ক্লাস। আমার যেতে হবে। আর ধন্যবাদ এতক্ষণে অন্তত ভেতরে যেতে বললেন। আমি এটাও বুঝেছি কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে যে কারণে সাধারণ ম্যানার্সটুকুও আপনি ভুলে গিয়েছেন। আপনি অনেক লাকি ভাই, যে আমার বোনের মত একটা মিষ্টিপরী বউ পেয়েছেন। সন্দেহ করা ভালো। তবে মাত্রাতিরিক্ত নয় যেটাতে অপর মানুষটি আপনাকে বুঝে ফেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রিয় মানুষের দেওয়া কষ্টগুলো অসহনীয় হয়। আমার আপুটা আপনাকে অনেক বেশিই ভালোবাসে।

আসছি ভাই। ভালো থাকবেন।
নিশান চলে যাওয়ার পর দরজা আটকে দেয় শাদাফ। মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়ে।”এটা আমি কি করে ফেললাম। নিজের ভুলের জন্য এত শাস্তি দিলাম পরীকে”
শাদাফ দ্রুত ফোন বের করে রওশানকে কল দিয়ে ডক্টর নিয়ে আসতে বলে। নিজে রুমে গিয়ে পরীকে ডেকে তোলে। শরীরে হাত দেওয়া যাচ্ছে না তাপে। ছোট্ট একটা বালতি তে করে পানি নিয়ে আসে। বিছানায় পরীর মুখ ধুয়ে দেয়। তোয়ালে ভিজিয়ে শরীর মুছে দেয়। জোর করে ব্রেকফাস্ট করিয়ে দেয়।

ডক্টর বাড়িতে এসে পরীক্ষা~ নিরীক্ষা করে ওষুধ দিয়ে যায়। পরীকে ঘুমাতে বললেও পরী ঘুমায় না। পা মুড়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। শাদাফ চুপচাপ পরীর পাশে গিয়ে বসে। পরীর এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খায়।
~ আমাকে মাফ করে দাও পরী। আমি ভুল বুঝে তোমায় কত শাস্তি দিয়ে ফেলেছি।

~ আমার উপর তোমার কোনো ভরসা নেই। সত্যিটা জানার প্রয়োজনও মনে করোনি একবার।
~ আমি ভুল করেছি। প্লিজ ক্ষমা করে দাও। আমার উপর রাগ করে থেকো না। অনেক ভালোবাসি তোমায়।
~ তোমার ভালোবাসা এখন আমায় দোটানায় ফেলে দেয়। আমি চাই মনে প্রাণে তোমার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করতে। কিন্তু আমার মন তোমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দিহান। এ কেমন ভালোবাসো তুমি আমায়? যার উপর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই তোমার।

শাদাফ কিছু না বলে সেখান থেকে উঠে যায়। কোনো উত্তর নেই তার কাছে। কি উত্তর দিবে পরীকে।
“সত্যিই তো আমি কেমন হয়ে যাচ্ছি। কেন ওর ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলছি। কিভাবে পারলাম ওকে এত অত্যাচার করতে। সত্যিই কি আমি তাহলে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছি!”

একসময় পরী ঘুমিয়ে পড়ে। কয়েকদিন বাদেই পরী মোটামুটি সুস্থ হয়ে যায়। এখন আর কলেজে যেতে হয়না। যদিও প্রাইভেট আছে পরীর তবুও কলেজে না গিয়ে বাড়িতেই পড়ে। ঘরের কাজও করা শুরু করে দিয়েছে। শাদাফও এখন আগের মত পরীকে কাজে সাহায্য করে। পরীকে আগের মতই সময় দেয়। কিন্তু শুনশান নিরবতা দুজনের মধ্যেই বিরাজ করে। শাদাফ নিজের মাঝে নিজেই অনুতপ্ত হয়। ঐদিকে পরীর ভেতর চাপা অভিযোগ আর কষ্ট বসবাস করা শুরু করেছে।

অসুস্থ থাকায় পরী এখন আর স্টাডি রুমে পড়ে না। বইখাতা নিয়ে বিছানাতেই শুয়ে~ বসে পড়ে। কিন্তু এভাবে কি আর পড়া হয়। ঘনঘন ঘুম পায় পরীর। আধশোয়া হয়ে বইতে চোখ বুলাচ্ছিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো টেরই পায়নি। যখন ঘুম ভাঙ্গলো দেখলো পরীর গায়ে কাঁথা। বই খাতাগুলো পাশেই গুছিয়ে রাখা। অবাক হয় পরী।
“আমি তো এলোমেলো হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গায়ে কাঁথা জড়াইনি। বইখাতাও গুছাইনি। তাহলে!”
পাশে তাকাতেই দেখে তিনটা গোলাপ একত্রে রাখা। গোলাপগুলোর নিচে একটা চিরকুট। চিরকুট টা হাতে তুলে নেয়। চিরকুটে লিখা ছিল, “এখনও বুঝতে কষ্ট হচ্ছে কে আমি? এই তিনটা গোলাপের মানে জানো?”

পর্ব ৩০

শাদাফ রাগী চোখে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে। কিন্তু সেদিকে পরীর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। পরী রান্নার জন্য সবকিছুর জোগার করছে। এবার শাদাফ আর দাঁড়িয়ে না থেকে রাগে দাঁত কটমট করে বললো,
~ এটা কি হচ্ছে পরী?
পরী পিছনে ঘুরে শাদাফকে দেখে। কথাটা শুনে একটু অবাক হয়। ভাঙ্গা গলায় বলে,
~ কি হচ্ছে মানে? আমি তো রান্না করছি।
~ সেটা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি।

~ তাহলে?
শাদাফ এবার ধমক দিয়ে বলে,
~ তাহলে আবার কি হ্যাঁ? তোমার না ফাইনাল পরীক্ষা চলছে? তোমাকে বলেছি না রান্নাঘরের আশেপাশে এই কয়েকদিন না আসতে?
~ মানে কি? তাই বলে কি রান্না করবো না?
~ না করবে না। পরীক্ষার এই কয়েকদিন তুমি শুধু পড়বে। অফিস থেকে এসে আমি রান্না করবো।

~ তুমি টেনশন করো না তো। পরীক্ষায় আমার গ্যাপ আছে তো। আমি পুষিয়ে নিতে পারবো পড়া।
~ তার মানে তুমি আমার কথা শুনবে না?
~ অযথাই রাগ করছো তুমি। আচ্ছা ঠিক আছে আজকে রান্নাটা করি? বাকি ৪টা পরীক্ষার আগে রান্নাঘরে পা’ও মাড়াবো না।
~ ঠিক তো?
~ একদম।
~ ঠিক আছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। হাতে হাতে তোমাকে সাহায্য করবো।
~ না লাগবে না।

~ লাগবে মানে লাগবে।
শাদাফ ফ্রেশ হতে রুমে চলে গেল। তরকারি কাটতে কাটতে পরী আপন মনেই হেসে চলে।”তুমি যে কখন কি চাও। কেন এমন করো। প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও খু্ঁজে পাইনি আমি। কখনো মনে হয় আমি সত্যিই অনেক ভাগ্যবতী তোমায় পেয়ে। আবার কখনো কখনো মনে হয় সত্যিই তুমি আমার তো? নাহ্ এসব আমার উচ্ছিষ্ট ভাবনা। আমি কখনোই পাবোনা এগুলোর উত্তর। কিন্তু এভাবে দোটানা ভালোবাসাময় সম্পর্কও বুঝতে পারছি না আমি। সেদিনের ঐ তিনটা গোলাপের মানে আমি ঠিকই বুঝেছিলাম। শাদাফের বাবু চাই। আমি সায়ও দিয়ে দিয়েছি। এই পরিবারে টিকে থাকা আমার প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত বাবা~ মায়ের মন জয় করতে পারলাম না। পারলাম না তাদের মেয়ে হয়ে উঠতে। এই সংসারে শাদাফই আমার শেষ সম্বল। অনেক বেশিই ভালোবাসি ওকে। কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি ওকে হারাতে চাই না।”
শাদাফ পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরায় পরী চমকে যায়। শাদাফ হাসতে হাসতে বলে,
~ আরে রিলাক্স! আমি। এত ভয় কেন পাচ্ছো?
~ এভাবে হুট করে কেউ জড়িয়ে ধরে?

~ বাহ্ রে! তাহলে কি এখন জড়িয়ে ধরার জন্য পারমিশন নিবো বউয়ের থেকে?
~ সেটা নয়। এখন ছাড়ো।
~ না ছাড়বো না।
~ আশ্চর্য রান্না করছি তো!
~ হ্যাঁ জানি।

~ তো?
~ তো কি আবার?
~ উফফ! ছাড়ো তো।
~ না না না। ছাড়বো না একদম। আমি তোমাকে সাহায্য করছি। হাত ধরে রান্নায় সাহায্য করছি।
~ তার কোনো দরকার হবে না মিস্টার। এখন আর আমি রান্নায় কাঁচা নই।

~ এমা! পেঁকে গেছো?
~ শাট আপ শাদাফ!
শাদাফ হাসতে হাসতে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে পরীকে। রান্নার সময় এমন করায় পরী একটু বিরক্তি নিয়েই বলে,
~ আহ্! করছো টা কি? রান্নাঘরে কি রোমান্স উতলে পড়ছে তোমার?
~ বউকে কাছে পেলে তখন রান্নাঘরই কি আর শোয়ার ঘরই কি, রোমান্স এমনেই আসে।
~ গরম খুন্তি দেখেছো?
~ দেখলাম। কি করবে এটা দিয়ে?

~ পুড়িয়ে দিবো।
~ জল্লাদ বউ।
~ যাবে তুমি?
~ যাচ্ছি যাচ্ছি। এমন করলে না? একবার শুধু পাই মজা বুঝাবো।
শাদাফ রান্নাঘর থেকে চলে গেল। পরী হেসে দিলো। এটা সত্যিই মানতে হবে যে, সেদিনের পর থেকে শাদাফের ভালোবাসা দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। সবকিছুতেই সাপোর্ট করে, কেয়ার করে। আর অনেক বেশিই ভালোবাসে।
পেছন থেকে শাদাফ আবার ডাক দেয়,

~ জান
~ তুমি আবার আসছো?
~ না মানে ইয়ে একা একা রুমে ভালো লাগছিল না।
~ টিভি দেখো গিয়ে।
~ টিভি দেখতে ইচ্ছে করছে না।
~ তাহলে বাবা~ মায়ের কাছে যাও। গল্প করো।

~ ওখানে তো আরো যাওয়া যাবে না।
~ কেন?
~ ধুর! শুধু নাতি~ নাতনির জন্য কান্না করে মা।
পরী এবার শান্ত চোখে শাদাফের দিকে তাকালো। পরীর দিকে তাকিয়ে শাদাফ বললো,
~ না! না। আমি কিন্তু এখনই বাবু নিতে বলিনি। তুমি যখন চাইবে আমরা তখনই বাবু নিবো।
শাদাফের কথায় একটু হাসলো পরী।

~ এখানে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। কোনো দুষ্টুমি করবে না।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।

শাদাফ নিজে গিয়ে বাইকে করে পরীকে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। নিশানের সাথেও শাদাফের বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠেছে এখন। কখনো যদি পরীকে আনতে যেতে না পারে তাহলে নিশানকে কল করে বলে দেয় পরীকে নিয়ে আসার জন্য। নিশানও খুশি হয় অনেক যে বোনের সাথে দুলাভাইও পেয়েছে। এত সহজে যে সব মেনে নিবে এটা ভাবেওনি নিশান। এরই মধ্যে শাদাফ পরীকে নিয়ে নিশানদের বাড়িতে গিয়েছিল। নিশানের বাবা~ মায়ের সে কি খুশি! একদম নিজের মেয়ে আর জামাইয়ের মত আদরযত্ন করেছে। শাদাফ তো বলেই বসেছে, “যাক। এখন থেকে আমার দুইটা শ্বশুরবাড়ি। শুধু জামাই আদর খাবো আর খাবো।”
সকলেই শাদাফের কথা শুনে হাসলেও পরী একটু লজ্জামিশ্রিত হাসি দিলো। পরীর এমন লজ্জামিশ্রিত হাসির সময় গালটা লাল টুকটুকে হয়ে যায় যেটা শাদাফ খুব উপভোগ করে।

সকাল থেকেই পরীর খারাপ লাগছিল। মাথা ব্যথা করছিল। ঘুরছিল মাথা। রাত জেগে পড়ার কারণে এরকম হয় পরীর। তাই ততটা পাত্তা দেয়নি। কড়া করে একবার চা বানিয়ে খেয়ে নিয়েছে। তখন পরিস্থিতি পরীর অনুকূলে থাকলেও এখন বিষয়টা সেটা মনে হচ্ছে না পরীর। পরীক্ষার হলে দরদর করে ঘামছে পরী। কিন্তু বাহিরে তুলনামূলক ভালোই ঠান্ডা। মাথাটা ভনভন করে ঘুরছিল। হাতও চলছিল না যে লিখবে। কোনো রকমে উত্তর লিখে সবার আগে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়। অফিস রুমের কিছুটা দূরে পরীর হল রুম ছিল। ক্লাস থেকে বের হয়ে আসতেই অফিসের সামনে মহিলা দপ্তরিকে দেখতে পায়। পরী ক্ষীণ কন্ঠে তাকে বলে,
~ খালা একটু পানি খাওয়াবেন?

মহিলাটি পরীর অবস্থা দেখে আন্দাজ করতে পারে যে পরী অসুস্থ। একজন স্যারের পারমিশনের নিয়ে পরীকে ধরে টিচার্সরুমে নিয়ে যান। চেয়ারে বসে মাথাটা এলিয়ে দেয় টেবিলের উপর। মহিলাটি পানি এনে পরীকে দেয়। এক চুমুক পানি খেতেই মনে হচ্ছে সব পানি ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসছে। মহিলাটি পরীর হিজাব পিন খুলে দিচ্ছিলো। মাথায় অল্প করে পানি দিয়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলছিল,
~ তুমি কি আগে থেকেই অসুস্থ?
~ না। সকাল থেকেই এমন খারাপ লাগছে।

~ তোমাকে নিতে আসেনি কেউ?
পরী দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায়। পরীক্ষার সময় প্রায় শেষ। এতক্ষণে শাদাফ বা নিশান কেউ একজন যে ওকে নিতে এসেছে এটা শিওর পরী। আস্তে করে বললো,
~ আমার হাজবেন্ড নয়তো ছোট ভাই আসবে নিতে। আমাকে একটু ধরে মেইন গেটের বাইরে পৌঁছে দিবেন দয়া করে?
~ আচ্ছা চলো।
মহিলাটি পরীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। মেইন গেটের বাইরে যেতেই দেখলো নিশান বাইকে বসে ফোন টিপছে। পরীকে এভাবে ধরে নিয়ে আসতে দেখে দৌড়ে যায় নিশান।
~ আপু কি হয়েছে? ঠিক আছো তুমি?

~ হু। মাথাটা ধরেছে শুধু।
পরীর অবস্থা দেখে বুঝা যাচ্ছে ও নিজেকে নিজে ঠিক রাখতে পারছে না। মহিলাটি ধরে রেখেছে বলেই এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে। নিশান মহিলাটির উদ্দেশ্যে বললো,
~ আন্টি আপনি প্লিজ আপুকে ধরুন আমি একটা সিএনজি নিয়ে আসি।
পরী বললো,

~ কেন? বাইক তো এনেছিস?
~ তুমি অসুস্থ আপু। পেছন থেকে পড়ে গেলে আরেক অঘটন ঘটে যাবে।
নিশান কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সিএনজি নিয়ে আসে। হাতে কিছু খাবার আর ওষুধ। পরীকে ধরে সিএনজিতে উঠে। যাওয়ার আগে মহিলাটিকে ধন্যবাদ দিয়ে যায়। সিএনজিতেও ঠিকমত বসে থাকতে পারছে না পরী। শুধু এদিকওদিক হেলছে। নিশান কি করবে বুঝতে পারছে না। পরীর দিকে তাকিয়ে বলে ফেললো,

~ আপু আমি তোমাকে আমার মায়ের পেটের বোন মানি। আমার উদ্দেশ্যে সৎ। তুমি খুব বেশিই অসুস্থ। এই সময়ে তোমায় জড়িয়ে না ধরলে তুমি পড়ে যাবে শিওর। আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে নেই। আমি নিজের বোনকেই জড়িয়ে নিচ্ছি।
এই বলে বাম হাত দিয়ে পরীকে জড়িয়ে নেয় নিশান। নিশানের কাঁধে মাথা রাখতেই পরী বলে,
~ আমার খারাপ লাগছে অনেক।
ডান হাত দিয়ে পরীর মাথায় হাত রেখে বলে,

~ কিছু হবে না আপু। ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ পর পরী শরীরের সমস্ত ভর নিশানের উপর ছেড়ে দেয়। শরীর একদম হালকা হয়ে গিয়েছে। ডাকার পরও কোনো সাড়াশব্দ পেলো না। নিশান তাড়াতাড়ি করে শাদাফকে ফোন দিলো। চার বার রিং হওয়ার পর শাদাফ কল রিসিভড করলো।
~ হ্যাঁ নিশান বলো।
~ ভাইয়া তাড়াতাড়ি বাসায় আসুন।
~ কি হয়েছে নিশান?
~ আপু খুব অসুস্থ।
~ মানে কি হয়েছে?

~ বললো যে মাথা ব্যথা। আপনি বাসায় আসেন তাড়াতাড়ি।
~ আমি এখনই আসছি।
বাড়িতে নিয়ে পরীকে শুইয়ে দেয়। সেন্সলেস পরী। কিছুক্ষণ পর পরীর জ্ঞান ফিরলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। শরীরটা খুব দূর্বল লাগছে। পাশেই নিশান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। আরেকপাশে শ্বাশুরী চিন্তিতভাবে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর শাদাফ আসে। শাদাফকে দেখে নিশান উঠে যায়। সেখানে গিয়ে শাদাফ বসে। কপালে হাত রাখতেই পরী চোখ খুলে তাকায়। শাদাফ সাথে করে মহিলা ডাক্তারকে নিয়ে এসেছে। উনি পরীকে দেখার পর সবাইকে রুম থেকে বের হয়ে যেতে বললো। সবকিছু দেখে পরীকে বললো,
~ কবে থেকে এমন?
~ আজ সকাল থেকেই।

~ শুধু মাথা ব্যথা আর মাথা ঘুরায়?
~ বমি বমিও লাগছিল।
~ পিরিয়ড হয়?
~ নাহ! দুই মাস ধরে হয়না। আর এই মাসে এখনও হয়নি।
~ ডাক্তারের কাছে যাওনি কেন?
~ এর আগেও আমার এমন হয়েছিল তাই বিষয়টা আমার কাছে স্বাভাবিকই।
~ একটানা দুই মাস বন্ধ ছিল পিরিয়ড?

~ নাহ্ তিন মাস পর্যন্ত ছিল। আমি তখন নাইনে পড়তাম।
~ পরে?
~ পরে ডক্টরের কাছে যাই। কতসব ওষুধ দিলো তার পরের মাস থেকে আবার শুরু হয়।
~ এবার ব্যাপারটা অন্য রকম।
~ মানে?
~ মানে তখন তুমি অবিবাহিত ছিলে আর এখন বিবাহিত।
~ তো?
ডক্টর এবার মুচকি হাসলো।

~ তুমি বড্ড বাচ্চা। তোমার শরীর অনেক দূর্বল। ঠিকমত খাও না নাকি?
যাওয়ার আগে কিছু ওষুধ লিখে দিল। ঐগুলা ফার্মেসী থেকে নিয়ে আসতে বললো। আর শাদাফকে বলে গেল পরীর সব খেয়াল রাখতে আর বেশি বেশি খাওয়াতে। যাওয়ার আগে এটাও বলে গেলেন মাসের শেষের দিকে আবার আসবে উনি। নিশান ওষুধ আনতে চলে গেল। আর শাদাফ গরম দুধ এনে পরীকে জোর করে খাওয়াচ্ছিল।
যতই খাক না কেন শরীর দূর্বল লাগেই। খাবারও ভালো লাগেনা। সব খাবারই গন্ধ লাগে। দুইদিন পর তিশা কল দেয় পরীকে।
~ হ্যালো পরী
~ হ্যাঁ তিশু বলো।

~ তুমি কি বাসায়?
~ হ্যাঁ।
~ আমি তোমার বাড়ির নিচে।

~ বাড়িতে আসো।
~ আসবো কিন্তু তোমাকে আমার সাথে আমার বাসায় যেতে হবে।
~ আমি তো যেতে পারবো না গো।
~ প্লিজ না করো না। রাফিন বাসায় নেই। আমি একা। আমি শাদাফ কাকাকে কল করে বলেছি কাকা রাজি। তাই তো তোমায় নিতে আসলাম।
~ শাদাফ রাজি সত্যি?
~ হ্যাঁ।

~ ওকে।
তিশার সাথে তিশার বাড়িতে যায়। ফ্লাট টা বেশ বড় আর সুন্দর করে সাজানো।
~ তোমরা দুজনই থাকো শুধু?
~ হ্যাঁ। আর বুয়া এসে রান্নাবান্না করে দিয়ে চলে যায়। রাফিনের আজ কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেন আছে তাই আসতে লেট হবে।
এখন বলো কি খাবে?
~ মুখটা কেমন যেন তেতো তেতো লাগছে। আচার আছে?
~ আছে। কিন্তু ব্যাপার কি বলো তো? হঠাৎ আচার?

~ ধুর কিছুনা।
পরীকে আচার বের করে দিয়ে তিশা নুডুলস্, কফি বানিয়ে আনে। দুই চামচ নুডলস্ খেতেই গড়গড় করে বমি করে দেয় পরী। তিশা একটু ঘাবড়ে যায়। ওয়াশরুমে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
~ তুমি ঠিক আছো পরী?
~ শরীরটা খারাপ লাগছে তিশু।
পরীকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যায় তিশু। প্রেগনেন্সি টেস্ট করিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে দুজন। একটুপরই রিপোর্ট দিবে। পরীর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর রিপোর্ট আসলে তিশু যায় রিপোর্ট আনতে। থমথমে মুখে রিপোর্ট নিয়ে ফিরে আসে তিশু।
~ কি হয়েছে তিশু?

এক পলক পরীর দিকে তাকিয়ে হেসে দিয়ে জোরে জড়িয়ে ধরে পরীকে।
~ কংরাচুলেশন পরী। রিপোর্ট পজিটিভ!
“রিপোর্ট পজিটিভ” কথাটা শুনে চোখে পানি টলমল করছে। চোখ থেকে গড়িয়েও পড়ে। আনন্দের অশ্রু এটা।

পর্ব ৩১

বাড়িতে গিয়ে পায়চারী করছে পরী। কখন শাদাফ বাসায় আসবে আর কখন খবরটা দিবে। কিভাবেই বা বলবে।
“ইশ! ভাবতেই কেমন জানি লজ্জা লাগে”
শ্বাশুরী মাকেও এখনো খবরটা জানায়নি। কয়েকবার রুমে গিয়েও ফিরে এসেছে। একদিন বাদেই পরীক্ষা। কিন্তু পড়তে পারছে না। এক অজানা সুখ ভর করেছে মনে। স্টাডি রুমে বই নিয়ে বসে আছে পরী। পড়া আদৌ হচ্ছে না। বইয়ের ভেতর তাকিয়ে আছে আর মনে পড়ছে আগের কথাগুলো। শাদাফের সাথে প্রথম দেখা আর কথাগুলো মনে হতেই খিলখিল করে হেসে দেয় পরী। কি ঝাড়াটাই না ঝেড়েছিল শাদাফকে। পরমুহূর্তে মন টা আবার খারাপ হয়ে যায়। শাদাফ পাল্টে গিয়েছিল ওর মায়ের জন্য। অন্য কাউকে বিয়ে করতেও রাজি ছিল। এটা ভেবে আবার শান্তি পায় যে, দেড়ি হলেও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিল আর ফিরে এসেছিল। বইটা বন্ধ করে নিজের রুমে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেটে হাত রাখে।

“এখন তো সবেচেয়ে সুখের সময়। শাদাফ আর ওর মায়ের ইচ্ছেও পূরণ হচ্ছে। বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে। এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ্ কষ্টের পরই তো সুখ দেয়।”
আপনমনে হেসে চলেছে পেটে হাত দিয়ে। কলিংবেল বাজতেই দৌড়ে দরজা খুলে দেয় পরী। শাদাফ এসেছে। পরীর দিকে না তাকিয়েই গটগট করে রুমে চলে গেল। পরীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। দরজা লাগিয়ে পরীও রুমে যায়। শাদাফ ওয়াশরুমে গিয়েছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে পরী। কিছুক্ষণ পর টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসে। চুপ করে খাটে বসে পড়ে। দেখে মনে হচ্ছে মন খারাপ বা কিছু হয়েছে। চুপ করে না থাকতে পেরে পরী বললো,
~ তোমার কি মন খারাপ?
শাদাফ পরীর দিকে তাকালো। পরীর হাত ধরে পাশে বসিয়ে বলে,
~ না। খেয়েছো তুমি?
~ না।

~ এখনো খাওনি কেন?
~ তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
~ ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিবে কেমন।
~ হুম।
~ পড়তে বসছো? পরশু পরীক্ষা না?

~ হ্যাঁ।
পরীর কপালে চুমু খেয়ে বলে,
~ যাও পড়তে বসো।
শাদাফকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে যেটা পরীকে বলতে চাইছে না। ইতস্তত করে পরী বললো,
~ তোমায় একটা কথা বলতে চাই।
~ বলো।
~ ইয়ে মানে

~ কি?
~ আসলে
~ এমন করছো কেন? ঠিক আছো তুমি?
~ কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা।
~ ইতস্তত কেন করছো পরী?
~ মানে

~ মা কিছু বলেছে?
~ না।
~ তাহলে?

~ ধুর! আমি তো বলতেই পারছিনা।
~ আরে বলো তো। টেনশন হচ্ছে আমার।
~ আইডিয়া!
~ কি?
~ লিখে দেই?
~ তোমার মুখে কি হয়েছে? মুখে বলো।
~ মুখে তো বলতে পারছি না। তুমি দাঁড়াও আমি আসছি।

পরী দৌঁড়ে স্টাডি রুমে চলে যায়। খাতা বের করে সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে কিছু কথা লিখে পেজটা ছিড়ে ভাঁজ করে নেয়। বেডরুমে গিয়ে শাদাফের হাতে চিরকুট টা দিয়েই আবার দৌড়ে স্টাডি রুমে চলে আসে। পরীর এমন ব্যবহারে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় শাদাফ। পরীর বাচ্চামি স্বভাব দিনদিন বেড়েই চলছে। কি এমন কথা যে লিখে বলতে হবে। অতশত ভাবনা বাদ দিয়ে চিরকুট টা খুলে। যেটায় লিখা ছিল “জানিনা এই সময়ে একটা মেয়ে কিভাবে এই কথাটা তার প্রিয়জন তার স্বামীকে বলে। আসলে কখনো দেখিওনি। তোমাকে বলতে ভীষণ লজ্জা লাগছিল আমার। তারমধ্যে তোমায় দেখে মনে হলো তোমার মুড খারাপ। তাই লজ্জার সাথে সাহস চুপসে গিয়ে ভয় যোগ হলো। তবে আমি জানি এটা তোমার জন্য খুশির খবর। বুঝোনি? তিনটা গোলাপের তুমি আমি দুজনই ছিলাম। এবার তৃতীয় গোলাপটাও আসছে। ছোট্ট অতিথি আসছে আমাদের পরিবারে”
চিরকুটটা পড়ে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে শাদাফ। চিরকুট ভাজ করতে করতে ভাবে, “তার মানে আমি বাবা হবো” শাদাফ দ্রুত স্টাডি রুমে যায়। রুম ভেতর থেকে লক করা।
~ পরী দরজাটা খোলো প্লিজ।
পরীর হাত পা জমে যাচ্ছে। বুক দুরুদুরু কাঁপছে।

~ প্লিজ দরজা খোলো। যা বলছো তা কি সত্যি পরী? প্লিজ দরজা খোলো প্লিজ।
অনেক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পর পরী দরজা খোলে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় শাদাফের দিকে তাকাতে পারছে না।
~ সব সত্যি পরী?
পরী তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শাদাফ দু হাতে পরীর মুখ উপরে তোলে।
~ বলো
পরী লজ্জামিশ্রিত মুখে বলে, “হুম”

শাদাফ তখনই জড়িয়ে ধরে। পরীও শাদাফকে জড়িয়ে ধরে। শাদাফের চোখে পানি চিকচিক করছে। এই কান্না আনন্দের কান্না। পরীকে ছেড়ে দিয়ে দুহাতে পরীর গাল ছু্ঁয়ে বলে,
~ তুমি জানোও না পরী তুমি আমায় কি সুখ দিচ্ছো। মনটা খারাপ ছিল ঠিকই। তবে এই মুহূর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী ব্যক্তিটা আমি পরী আমি। আমি বাবা হবো পরী।
কথাগুলো বলে আবার জড়িয়ে ধরে পরীকে। শাদাফের খুশি দেখে পরী নিজেও কান্না করে দেয়। বেশকিছুক্ষণ নিজের সাথে জড়িয়ে রাখে পরীকে। এরপর পরীকে জিজ্ঞেস করে,
~ কিন্তু পরী?
~ কি?

~ তুমি খুশি তো?
~ মানে? কি বলছো তুমি?
~ আসলে তুমি তো এত তাড়াতাড়ি বেবি নিতে চাওনি।
~ শাদাফ! তুমি আমার ভালোবাসা। আর তোমার অংশ আসতে চলেছে। আমার ভালোবাসার অংশ। আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি। হয়তো চাইনি আমি এত তাড়াতাড়ি বেবি নিতে কিন্তু আমি খুশি অনেক বেশিই খুশি শাদাফ। আল্লাহ্ ভালোবেসে আমাকে উপহার দিচ্ছে। তুমি যেমন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ এখন ঠিক আমিও দুনিয়ার সবেচেয়ে সুখী মানুষ।
পরীর সারামুখে চুমুতে ভরিয়ে দেয়।
~ অনেক ভালোবাসি তোমায় পরী অনেক বেশিই। আমি অনেক খুশি।

পরী বিনিময়ে লজ্জামিশ্রিত হাসি দেয়।
~ বাবা~ মাকে বলেছো?
~ না।
~ কেন?

~ ধুর! আমার তো লজ্জা লাগে।
~ আমার লজ্জাবতী বউটা। আমি দোকান থেকে আগে মিষ্টি আনি তারপর বলছি।
~ না, আগেই বলো যাও।
~ কেন?
~ কারণ তুমি যে দোকানে গেলে সবাইকে বলে বেড়াবে সেটা আমি জানি। বাবা~ মা জানার আগে বাহিরের লোকজন কেন জানবে হুম?
~ সেটাও তো ঠিক। দাঁড়াও আমি এক্ষুনী বলছি।

~ যাও।
শাদাফ দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসে।
~ কি হলো?
শাদাফ কিছু না বলে পরীর গলায় চুমু দিয়ে দৌড় দেয়। পরী হেসে বলে,
~ পাগল একটা!

~ ও মা! মা গো!
শাদাফ নাচার ভঙ্গিতে আহ্লাদী ভাবে মায়ের কোলে মাথা রাখে। পাশে যে ওর বাবা বসা সেটাও গ্রাহ্য করছে না শাদাফ। খুশিতে সাহস মনে হয় দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে আর লজ্জা জিরো পারসেন্টে এসে পড়েছে।
~ কি হয়েছে? এত খুশি কেন?
~ রেডি হও মা রেডি হও।

~ এই রাতে রেডি হবো কেন? কোথায় যাবো?
~ তোমার যেতে হবে না। আমাদের বাড়িতেই আসছে। খেলার জন্য রেডি হও।
~ কি আবোল তাবোল বকছিস? এই বয়সে খেলবো মানে? আর কে আসবে?
~ তোমার নাতি~ নাতনি।
~ মানে?

~ এখনো বুঝোনি? তুমি দাদী হবে গো দাদী হবে।
~ কি বলছিস? সত্যি?
~ হ্যাঁ মা।
~ পরী তো আমায় বললো না।
~ লজ্জায় বলেনি মা। আমাকেই তো লিখে দিয়েছে।

~ কোথায় পরী কোথায়?
~ রুমে।
~ তুই তাড়াতাড়ি বাজারে যা। মিষ্টি নিয়ে আয়।
~ যাচ্ছি মা।

শাদাফ মিষ্টি আনতে চলে গেল। শাদাফের বাবা~ মা পরীর কাছে গেল।
~ পরী
~ হ্যাঁ মা
পরীকে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরে। জড়িয়ে ধরেই বলে,
~ অনেক সুখী মা অনেক সুখী হ।
শ্বশুর মশাই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

~ সারাজীবন সংসারে হাসি লেগে থাকুক।
পরী দেখেছে শ্বশুর~ শ্বাশুরী দুজনের চোখেই পানি। এই প্রথম শ্বশুর~ শ্বাশুরীর থেকে এত ভালেবাসা পাচ্ছে। পরী পেটে হাত রেখে মনে মনে বলে, “আর এই সব ক্রেডিটই তোর বাবু”

পরী ওর আপুকে ফোন করেছে।
~ হ্যালো আপু।
~ হ্যাঁ পরী বল। কেমন আছিস?

~ অনেক ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
~ আমিও ভালো আছি। তোকে অনেক খুশি মনে হচ্ছে।
~ হুম আপু।
~ কি কারণ রে?
~ আপু আমি
~ তুই?

~ আমি প্র্যাগনেন্ট!
~ সত্যিইই?
~ হ্যাঁ।
~ আমার পিচ্চি বোনটা দেখছি বড় হয়ে গিয়েছে।
পরী মুচকি মুচকি হাসছে।
~ মাকে বলেছিস?

~ না। লজ্জা লাগছে আমার
~ ইশ! আমার লজ্জাবতী। আচ্ছা আমি এখনই ফোন করে বলে দিচ্ছি। তোকে পরে কল দিচ্ছি।
~ আচ্ছা।
কল কাটতেই মায়ের কল আসে। পরী মনে মনে খুশি হয় অনেক। মায়ের আয়ু অনেক। ফোন রিসিভড করে হ্যালো বলে পরী। কিন্তু ওপাশ একদম নিশ্চুপ।
~ মা?
এবার ওপাশ থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসে।
~ ওমা? কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?

পরীর মা কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
~ আমার পিচ্চি মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে তাই না? আমার পিচ্চি মেয়েটা মা হবে।
পরী চুপ করে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। মাত্রই তো আপুর সাথে কথা হলো তাহলে মা জানলো কিভাবে।
~ তুমি খুশি না মা?
~ কি বলছিস পাগলী? খুশি না মানে? অনেক অনেক খুশি। আমার পরী মা হবে।

~ আচ্ছা তুমি কি করে জানলে গো?
~ শাদাফ কল দিয়ে বললো।
~ কি বলছো! ওর একটু লজ্জাও করলো না।
~ হাহাহা।

তিশা মুখ গোমরা করে বসে আছে। সুলতান বিষয়টা খেয়াল করলো।
~ কি হয়েছে তিশু?
~ আড়ি তোমার সাথে।

~ আমি কি করলাম?
~ কিছুই করোনি।
~ তাহলে?
~ একটা সুখবর।

~ কি?
~ পরী মা হবে। মানে পরী প্র্যাগনেন্ট।
~ সত্যিই?
~ হ্যাঁ।
~ এটা তো খুশির খবর। তাহলে তুমি মুখ গোমড়া করে বসে আছো কেন?
~ থাকবো না কেন? আমার কি মা হতে ইচ্ছে করে না?
তিশার কথা শুনে কাঁশতে থাকে সুলতান

পর্ব ৩২

সুলতানকে কাঁশতে দেখে তিশা তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আসে। এক চুমুকে সব পানি শেষ করে ফেলে সুলতান। তিশা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
~ এভাবে কাঁশতেছো কেন?

~ কি জানি! কে হঠাৎ নাম নিলো।
~ একদম মিথ্যা বলবা না।
~ মিথ্যা কখন বললাম?
~ তুমি আমায় বেবি দিবে কি না বলো?
~ বাচ্চামি করো না তো তিশু। পড়তে বসো।
~ না আমার বেবি চাই।

~ তুমি নিজেই তো একটা বাচ্চা এখনো।
~ তাতে কি হয়েছে? পরীও তো বাচ্চা। ওর ও তো বাবু হবে।
সুলতানের মুখটা মলিন হয়ে যায়। জোর করে মুখে হাসি টেনে বলে,
~ দেওয়ার মালিক আল্লাহ্। তিনি যেদিন দিবে সেদিন ঠিকই আমাদের বেবি আসবে।
কথাটা বলে সুলতান বাহিরে চলে গেল।

শাদাফ বাজারে গিয়ে মিষ্টি কিনছে আর বিলি করছে। শাদাফের বন্ধুরা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে।
~ ব্যাপার কি দোস্ত?
~ কিসের ব্যাপার?
~ এত মিষ্টি কেন খাওয়াচ্ছিস?
~ আরে আজ চাইলে পুরো মিষ্টির দোকানটাই তোদের খাওয়াবো।
~ কিন্তু কারণটা কি?

~ আরে তোরা চাচ্চু হবি।
~ মানে? সত্যি?
~ হ্যাঁ রে হ্যাঁ।
বন্ধুরা শাদাফকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ কংরাচুলেশনস দোস্ত। আহ্ ভাবতেই কি খুশি খুশি লাগছে। আমরা নাকি চাচ্চু হবো!
বেশকিছুক্ষণ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে যায়। পরী তখন স্টাডি রুমে পড়ছিল। বেডরুমে পরীকে না দেখে স্টাডি রুমে উঁকি দেয়। শাদাফ সোজা রান্নাঘরে চলে যায় পরীর জন্য কিছু বানাতে। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে শাদাফের চোখ একদম ছানাবড়া। শাদাফ অবাক হয়ে বলে,
~ মা তুমি? রান্নাঘরে কেন?
~ দুধ গরম করছিলাম।

~ তুমি তো দুধ খাও না। বাবা খাবে?
~ ধুর! পরীর জন্য।
শাদাফ কি বলবে বুঝতে পারছে না। যে মা এখন আগুনের তাপ সহ্য করতে পারে না সে নাকি পরীর জন্য দুধ গরম করছে। যখন রান্নাঘর থেকে শাদাফের মা বের হলো তখন দেখলো হাতে গরম দুধ আর সেদ্ধ ডিম। মায়ের পেছন পেছন শাদাফও যায়।

পরী মাথায় হাত দিয়ে পড়ছিল। শাদাফের মা রুমে ঢুকে বললো,
~ মাথায় হাত দিয়ে কেন পড়ছো? এত কিসের চিন্তা?
~ না মা কিছু না।
শ্বাশুরীর হাতের দিকে তাকালো পরী।
~ মা আপনার হাতে?
~ ওহ্! এগুলো তোমার জন্যই।

~ আমার জন্য মানে? এসব কি আপনি করেছেন?
~ হ্যাঁ। এখন কি তুমি একা নাকি? তোমার ভেতর একটা ছোট্ট প্রাণ বেড়ে উঠছে। সময় অসময়ে খেতে হবে তো নাকি! আমার নাতি~ নাতনি যেন নাদুসনুদুস হয়।
শ্বাশুরীর কথা শুনে পরী হেসে দেয়। সাথে চোখে পানিও চলে আসে। হোক না এত ভালোবাসা বাচ্চার জন্য পাচ্ছে তবুও যে পরী সবার ভালোবাসা পাচ্ছে এটা ভাবতেই এক চিলতে হাসি ফুঁটে ওঠে।
দরজার ওপাশ থেকে দাঁড়িয়ে শাদাফও সব দেখে। শাদাফের ঠোঁটেও ভেসে ওঠে এক টুকরো হাসি।
রাত জেগে আর পরীকে পড়তে দেয়না। সবার এমন পাগলামি দেখে বলে,
~ তোমরা কি শুরু করলে? এখনই এত উতলা হচ্ছো কেন? আমি এখনও সব কাজকর্ম করতে পারবো।
শাদাফ মুখ গোমড়া করে বলে,

~ নাহ্! আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না।
বাধ্য হয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে অন্যপাশে মুখ ঘুরে শুয়ে পড়ে। রুমের লাইট অফ করে ডিম লাইটটা জ্বালিয়ে দেয়। পরীর পাশে শুয়ে এক হাত পরীর কোমড়ে রাখতেই হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। পরীর এমন আচরণে হাসে শাদাফ। এবার পরীর পেটে হাত দেয়। আরো জোরে ঝাড়া দিয়ে হাতটা সরিয়ে দেয়। শাদাফের দিকে ঘুরে দাঁত কটমট করে বলে,
~ পেটে কেন হাত দিচ্ছো হ্যাঁ? আমি না খেলে বেবি হেলদি হবে না। আমি রাত জাগলে বেবির সমস্যা হবে ব্লা ব্লা। তাহলে তুমি যে তোমার হাতির মত হাত টা আমার পেটে রাখছো বাবু ব্যথা পাবে না?
পরীর কথা শুনে হা হয়ে যায় শাদাফ।

~ তুমি তো দেখছি বেশ কথা বলতে পারো পরী।
~ হুহ।
~ বুকে আসো।
~ না।
~ আরে আসো না।
~ বলছি তো না!
~ বাপ্রে! বাবুর মা কি রাগ করেছে?
~ আদিক্ষেতা! সরো।

~ না সরবো না। সরতে বললে আরো কাছে যাবো।
পরী মুখ ভেংচি দিয়ে অন্যপাশে ঘুরে। পরীর হাত ধরে শাদাফের বুকে নিয়ে আসে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
~ যত খুশি রাগ করো, বকো। কিন্তু দূরে যেতে দিবো না একদম।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে পরী তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। এবারও তার
ব্যতিক্রম হলো না। পরী ঘুমিয়ে পড়েছে।

সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখনও পরী স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শাদাফ ছাড়া আর কেউ হবে না এটা পরী জানে। কিছুক্ষণ মোচড়ামুচড়ি করে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু শাদাফ যে পারফিউম ব্যবহার করে এটা সেই পারফিউমের ঘ্রাণ নয়। তাড়াতাড়ি চোখ খুলে শোয়া থেকে উঠে বসে। পাশে তাকিয়ে দেখে তিশা খিলখিল করে হাসছে আর পাশেই সুলতান। শাদাফ ভেবে সুলতানকে জড়িয়ে ধরেছিল কিন্তু মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো তিশা।
পরীর মুখে কথা আটকিয়ে পড়ে। কি বলবে বুঝতে না পেরে ইতস্তত করে বললো,
~ স্যরি আসলে আমি শাদাফ ভেবে
তিশা খিলখিল করে হেসে বললো,

~ সেটা তোমায় দেখেই বুঝেছি গো। তাছাড়া আমি কিছু মনে করিনি। রাফিনও না। আমি যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম তখন তুমি এদিক সেদিক ঘুরে রাফিনকে জড়িয়ে ধরলে হাহাহাহা।

~ স্যরি তিশু। আমি বুঝতে পারিনি।
~ ধুর কিসের স্যরি? রাফিন তো উঠেই যেতে চেয়েছিল কিন্তু তোমার পাগলামি দেখার জন্য আমি বারণ করেছি। আর তাছাড়া সম্পর্কে রাফিন তোমার ভাগ্নি জামাই লাগে হিহিহি। সো ডোন্ট মাইন্ড লক্ষী পরী।
পরী সুলতানের দিকে একবার তাকালো। সুলতানের দৃষ্টি ব্যালকোনিতে। বোধ হয় আকাশ দেখছে। পরী জোর করে মুখে হাসি টেনে বললো,
~ শাদাফ কোথায়?
~ কাকা নাকি কি কাজে বাহিরে গেছে। তাই তো আমাকে আসতে বলেছে তোমাকে দেখার জন্য।
~ কিন্তু তিশু কাল তো পরীক্ষা আছে। পড়তে হবে না তোমার?

~ সমস্যা নেই বাবুর পিচ্চি মা। আমি বই নিয়ে এসেছি। ওপস! দুধ চুলায় বসিয়েছিলাম। দেখে আসছি দাঁড়াও।
পরী কিছু বলার আগেই তিশা দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। রুমে শুধু সুলতান আর পরী। তাড়াতাড়ি করে কাঁথা সরিয়ে খাট থেকে নামে পরী। পেছন থেকে সুলতান বলে,
~ ভয় পেয়ো না। আমি তোমার ক্ষতি করতে আসিনি।
পরী পিছন ঘুরে সুলতানের দিকে তাকায়। চোখে পানি টলমল করছে সুলতানের। ঠোঁটে কিঞ্চিত হাসি ফুঁটিয়ে বলে,
~ কংরাচুলেশনস পরী।
~ ধন্যবাদ।

সুলতান মাথা নিচু করে চোখটা এদিক সেদিক ঘুরাচ্ছে। হয়তো চোখের পানি আটকানোর জন্য। এরপর ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে,
~ জানো পরী, তুমি যেই সাইকোকে চিনতে সে আর সাইকো নেই। সে এখন একজন দায়িত্ববান ছেলে। কিন্তু আফসোস যার জন্য আমার এত পরিবর্তন তাকেই পেলাম না। যতবার তোমার ক্ষতি করতে চেয়েছি ততবারই তোমার হাসি মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যতবার তোমায় ভু্লতে চাই ততই যেন বেশি করে ভালোবেসে ফেলি।
~ এসব বলে কোনো লাভ নেই। আমি আগেও আপনাকে ভালোবাসিনি আর কখনো বাসবোও না। আমার সব ভালোবাসা শুধু শাদাফকে ঘিরেই। আমি সুখে আছি বিশ্বাস করুন। দেখছেন না আমাদের ভালোবাসার প্রাপ্তি আসতে চলেছে। হাত জোর করে বলছি প্লিজ কোনো ক্ষতি করার কথা কল্পনাতেও আনবেন না।

টলমল করা চোখ নিয়েই সুলতান বললো,
~ নিশ্চিন্তে থাকো। তোমাদের কোনো ক্ষতি আমি করবো না। তবে এটা সত্যি যে আমি এখনও তোমায় ভালোবাসি আর সারাজীবন ভালোবাসবো।
~ তিশু অনেক বেশি ভালোবাসে আপনাকে।
~ আর আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একই ভাবে ভালোবেসে যাবো।
পেছন থেকে তিশুর ডাক পড়ে।
~ রাফিন!

পর্ব ৩৩

গ্লাস ভর্তি দুধ এনে পরীর হাতে দেয়। চুপ করে সুলতানের সামনে দাঁড়ায়। বেশ থমথমা একটা পরিবেশ। নিরবতা ভেঙ্গে তিশাই বললো,
~ আমায় তো বলোনি এটা।
তিশার এমন প্রশ্নে পরী আর সুলতান দুজনই ঘাবড়িয়ে যায়। কোনরকমে সুলতান উত্তর দেয়,
~ কোনটার কথা জিজ্ঞেস করছো তিশু?
~ একটু আগে যে বললে।

~ কি বললাম?
~ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একই ভাবে ভালোবেসে যাবে। কই আমায় তো একবারও বলোনি কথাটা? নাকি পরীর কাছে বলে বোঝাতে চাচ্ছো যাচ্ছো যে তুমি আমায় খুব ভালোবাসো হুম?
কথাগুলো তিশা কোমড়ে হাত রেখেই বলে। এটা ভেবে পরী একটু সস্তি পায় যে, তিশা শুধু শেষের কথাটাই শুনেছে। ভাগ্যিস আর কিছু শোনেনি নয়তো খুব বেশিই কষ্ট পেতো মেয়েটা। তিশা এবার পরীর দিকে তাকিয়ে বললো,
~ জানো পরী, রাফিন না আমায় একটুও ভালোবাসে না। সবসময় শুধু দূরে দূরে রাখে।

তিশার এই কথায় পরী কি বলবে বুঝতে পারে না। জোর করে হাসতে চাইলেও পারছে না। খুব বিব্রতকর একটা পরিস্থিতি। পরীকে চুপ করে থাকতে দেখে তিশা বললো,
~ ও পরী রাফিনকে বলো না আমায় একটা বাবু দিতে।
~ এহেম এহেম!
সুলতান আবারও বিষম খায়। তিশা রাগি রাগি চোখে তাকিয়ে আছে।

~ আরে তিশু ওকে পানি দাও।
~ একদম না পরী। এসব ওর নাটক। যখনই বাবুর কথা বলি এভাবে কাঁশতে থাকে।

~ তিশু! এসব কি সবার সামনে বলতে হয় নাকি?
~ কই সবার সামনে বললাম? আমি তো শুধু তোমার সামনেই বললাম। তুমি আমার আপনজন। এত কথা বাদ, তুমি একটু রাফিনকে বুঝাও যাতে আমায় একটা বাবু দেয়।
পরী একবার সুলতানের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার তিশার দিকে। বিড়বিড় করে নিজ মনেই বলতেছে,
~ নাহ্! এই মেয়েটা এমন এক বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে কে জানতো!
গলাটা ঝেড়ে পরী বললো,
~ ওসব পরে দেখা যাবে। আমি তোমাদের জন্য খাবার বানিয়ে আনছি।
পেছন থেকে তিশা পরীর হাত টেনে ধরে।
~ কোথায় যাচ্ছো তুমি?
~ রান্নাঘরে।

~ একদম না। শাদাফ কাকার বারণ আছে।
~ শাদাফ একটা পাগল যে তাই। এমন একটা ভাব যেন দুদিন পরই বাবু আসবে।
~ অতশত জানিনা বাবা। শাদাফ কাকার আদেশ মানতে হবেই। তাছাড়া কাকা বাহির থেকে খাবার দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ওগুলো এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। আমি গরম করে আনছি তুমি বরং ফ্রেশ হয়ে নাও।
~ কিন্তু তিশু

~ কোনো কিন্তু না। যা বলেছি তাই হবে।
অগত্যা পরী ফ্রেশ হতে চলে যায়। ওয়ারড্রবের সামনে গিয়ে আটকিয়ে যায় জামা~ কাপড় নেওয়ার সময়। ইচ্ছে ছিল শাড়ি পড়ার। কিন্তু সুলতান তো ঘরে। শাড়ি তো রুমে এসে ঠিক করা যাবে না। তাই পরী গোলাপি কালার একটা লং কামিজ আর কালো কালার প্লাজু আর ওড়না নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। প্রথমে ব্রাশ করে নেয়। এরপর শাওয়ার ছেড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে। যতক্ষণ না তিশু ঘরে এসে ডাক দিবে ততক্ষণ ভিজবে বলে পণ নেয়। তবুও একা ঘরে সুলতানের সাথে বসে বিব্রতকর কোনো অবস্থায় পড়তে চায় না। প্রায় ২০ মিনিট পর তিশা আসে। চারপাশে তাকিয়ে পরীকে না দেখে সু্লতানকে জিজ্ঞেস করে,
~ পরীকে কোথায় গুম করলে?
সুলতান আমতা আমতা করে উত্তর দিলো,
~ কি যা তা ব~ বলছো? পরী গোসলে গিয়েছে।
~ জাস্ট কিডিং। আর পরী এখনো শাওয়ার নিচ্ছে?

~ হুম।
~ আশ্চর্য তো! এতক্ষণ শাওয়ার নিচ্ছে ঠান্ডা লেগে যাবে তো নাকি। একটু ডাকতে তো পারতে।
~ আরে আমি ডাকবো মানে?
সুলতানের কথার তোয়াক্কা না করে তিশা ওয়াশরুমের দরজায় নক করলো।
~ পরী, এই পরী।

পরী শাওয়ার বন্ধ করে বললো,
~ হ্যাঁ বলো।
~ বলবো না তোমার মাথা ফাঁটাবো আমি। এই ঠান্ডার মধ্যে তুমি এতক্ষণ ধরে শাওয়ার নিচ্ছো? ঠান্ডা লেগে যাবে না?
~ কিচ্ছু হবে না। আমি আসছি।
জামাকাপড় পাল্টে কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হয় পরী। সেই সাথে বড় বড় হা করে হাচ্চু দিচ্ছে।

সুলতানের খুব রাগ হচ্ছে।”কি দরকার ছিল এমন ঠান্ডা আবহাওয়ায় এতক্ষণ ধরে শাওয়ার নেওয়ার? এখন তো বাবুরও ঠান্ডা লেগে যাবে”
তিশা কোমড়ে হাত দিয়ে বলে,

~ অলরেডি ঠান্ডা বাঁধিয়ে ফেলছো?
~ কিচ্ছু হবে না তো!
~ তোমাকে বলে কিছুই হবেনা আমি জানি। যা বলার কাকাকেই বলবো। এখন খেতে আসো।
~ বাবা~ মা খেয়েছে?
~ হ্যাঁ শাদাফ কাকা সকালে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে।

~ আচ্ছা আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসি কিছু লাগবে নাকি।
~ না ম্যাম তার কোনো প্রয়োজন নেই। খাবার গরম করার সময় হালকা খাবার দিয়ে এসেছি। তুমি বরং খাও তো।
~ আচ্ছা।
সুলতান, তিশা আর পরী তিনজন মিলে সকালের খাবারটা খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষে পরী ব্যালকোনিতে গিয়ে চুলের খোঁপা খুলে টাওয়াল দিয়ে ভালো করে ঝাড়ছিল। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সামনের কাঁটা চুলগুলোর পানিতে জামার গলার অংশে অনেকখানি ভিজে গেছে। সুলতান যেখানে বসেছে সেখান থেকে ব্যালকোনিতে স্পষ্ট সবকিছু দেখা যায়। সুলতানের কেমন যেন নেশা নেশা লেগে যায়। দ্রুত সেখান থেকে উঠে দাঁড়ায়। তিশা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
~ এভাবে উঠে দাঁড়ালে যে?

~ আমার একটা ইম্পোর্ট্যান্ট কাজ আছে তিশু। এখনই যেতে হবে।
~ তুমি না বললে আজ কোনো কাজ নেই?
~ ওটা আমার জবের সাথে রিলেটেড। এখন আসি কেমন। পরে তোমায় নিয়ে যাবো।
~ আচ্ছা।

পরী আর তিশা মিলে স্টাডি রুমে পড়ছে। পরী মনোযোগ সহকারে পড়লেও তিশা বইয়ের পাতায় কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে। সেটা লক্ষ করে পরী তিশাকে আলতো করে ধাক্কা দিলো।
~ তিশু
~ হু হ্যাঁ বলো
~ কি করছো এটা?
~ কই?

~ না পড়ে কলম দিয়ে কি আঁকছো বইতে?
~ ধুর! শয়তানে ধরেছিল। এখন মনোযোগ দিয়ে পড়বো।
~ কিছু হয়েছে কি তিশা?
~ কি হবে?
~ মানে সংসারে? আমার সাথে শেয়ার করো মন হালকা হবে।
তিশা বইটা বন্ধ করে লম্বা করে একটা শ্বাস নিলো।

~ কি আর শেয়ার করবো পরী! ভালোবেসে বিয়ে করেছি এটা মনেই হয়না।
~ কেন?
~ রাফিনের সাথে আমার এখনো তেমন কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। রাফিন এখনো আমাকে আমার অধিকার দেয়নি।
~ জিজ্ঞেস করোনি কেন এমন করে?
~ করেছি। উত্তর পাইনি।

পরী ঢের বুঝতে পারছে সুলতানের এমন করার কারণ। কিন্তু তিশাকেই বা কি বলবে পরী। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পরী বললো,
~ জানো তিশু, যে ভালোবাসা খুব সহজেই পাওয়া যায় সেটার স্থায়িত্বকালও ঠিক সেরকমই স্বল্প হয়। দুই তিনদিনের ভালোবাসাটা সাধারণ মোহ থেকেই সৃষ্টি হয়। কিন্তু যারা সত্যিই ভালোবাসে তারা মোহকে সত্যি ভালোবাসায় রূপান্তর করে। একটা তুমিকে, ভালোবাসার মানুষকে আমার করে নিতে নিজের করে নিতে একটু সময় নেওয়া উচিত। এতে মানুষটা ধীরে ধীরে কাছে আসার সাহস যুগিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ভালোবাসার গভীরতা বাড়ে। কত বাঁধা বিপত্তিই তো আসবে তার জন্য কি ছেড়ে যেতে হবে? ভালোবাসলে একটু ভুল বুঝাবুঝি হবেই। সেই ভুলটা সংশোধন করার জন্য নিজেকে সময় নিতে হবে এবং অপর মানুষটিকেও সময় দিতে হবে। তবেই না প্রকৃত ভালোবাসার উন্মেষ ঘটবে।
~ শাদাফ কাকা তোমায় অনেক ভালোবাসে তাই না?
তিশার প্রশ্নে পরী একটু মুচকি হেসে বলে,
~ হয়তো হ্যাঁ আবার হয়তো না।

~ এটা কেমন উত্তর হলো পরী?
~ এটাই আপাতত আমার উত্তর তিশু। কেননা আমি নিজেই তো সন্দিহান। কখনো মনে হয় ও পরিস্থিতির শিকার আবার কখনো মনে হয় ও অনেক পাল্টে গিয়েছে।
~ আর এখন?
~ আগের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
~ আল্লাহ্ না করুক যদি কখনো তোমাদের মাঝে কোনো ঝগরা বা ভুল বুঝাবুঝি হয় তখন কি করবে?
~ ঝগরা প্রতিটা সম্পর্কে, প্রতিটা সংসারেই হবে। তাই বলে এই ঝগরাকে কোনোভাবেই ইস্যু করা যাবেনা। দুইজনের একজনকে সময় নিতে হবে নয়তো সময় দিতে হবে। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে সবই ঠিক হয়ে যাবে।
~ তুমি অনেক ট্যালেন্টেড পরী।
~ হাহাহা
~ হেসো না। সত্যি বলছি তুমি অনেক কিছু বুঝো।

~ তুমি এখনো জানোনা বাস্তবতা কি, সংসার কি। যখন সংসারের দায়িত্ব নিবে বাস্তবতার সম্মুখীন হবে সেদিন তুমিও সব বুঝতে পারবে। দিনদিন ম্যাচিউর হয়ে উঠবে। বাচ্চামো স্বভাবগুলোও বাস্তবতার ভাড়ে চাপা পড়ে যাবে।
তিশা বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
~ হুম!
~ তবে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন সবাই অনেক ভালো।
~ তুমি কি করে জানলে?
~ বাহ্ রে! আমাদের বাড়ি তো পাশাপাশিই।
~ ওপস! ভুলে গিয়েছিলাম। রাফিন মেবি তখন ট্রেনিং এ ছিল তাই তুমি রাফিনকে চিনতে না। আচ্ছা যাই হোক, শুনোনা রাফিনকে কি করে আমার বশে আনি বলো তো?
তিশার কথা শুনে পরী হেসে দেয়।
~ তুমি যাদুকর নাকি যে বশে আনবে?

~ তবে?
~ ভালোবেসে কাছে টেনে নিবে পাগলী।
~ আল্লাহ্~ ই ভালো জানে কখন তাকে কাবু করতে পারবো হুহ!

বিকালে সুলতান এসে তিশাকে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার আজানের আগেই শাদাফ বাসায় আসে। পরী তখন স্টাডি রুমে বইয়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। পরীকে এভাবে দেখে শাদাফ নিজে নিজেই বলতে থাকে,
~ একটুপরই সন্ধ্যার আজান দিবে আর মহারাণী এখন ঘুমাচ্ছে তাও আবার চেয়ার টেবিলে বসে। যদি একবার পড়ে যায় তখন কি হবে!
পরীর বাহু ঝাঁকিয়ে ডাকতে থাকে,

~ পরীএই পরী
পরী ঘুমঘুম চোখে তাকায়।
~ এসেছো তুমি?
~ হ্যাঁ এসেছি। এখানে কেন ঘুমাচ্ছো বেডরুমে এত্তবড় খাট রেখে?
~ আরে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

~ হয়েছে অনেক পড়ছো। এখন আসো।
পরীর চোখে~ মুখে পানি দিয়ে দেয় শাদাফ। টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছে দেয়। এতক্ষণে আজান দিয়ে দিয়েছে।
~ বসো তুমি।
শাদাফ এক হাতে গরম কফি অন্য হাতে এগ চিকেন নুডলস্ নিয়ে আসে। পরীর হাতে দিয়ে বলে,
~ খাও।

~ আমার একটুও ক্ষুধা নেই গো।
~ এতকিছু জানিনা। খেতে হবে।
বাধ্য হয়েই পরী খাওয়া শুরু করে। শাদাফ এটা বেশ কয়েকবার খেয়াল করেছে যে পরী একটু পরপরই নাক টানছে আর হাঁচি দিচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
~ গোসল কখন করেছো?
পরী ঢোক গিলে বলে,
~ সকালে।
~ কতক্ষণ করেছো?

~ কি বলো না বলো। আমি কি ঘড়ি দেখে গোসল করতে যাই নাকি।
~ কথাটা কাটিয়ে গেলেই হলো? অনেক সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়েছো তাই না?
পরী মাথা নিচু করে আছে। এখন যে এক গাদা বকা খেতে হবে সেটাও জানে। তাই খাবারগুলো পাশের টি টেবিলে রেখে বকা খাওয়ার জন্য রেডি হয়। শাদাফ পাশে বসে পরীকে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরে।
~ এমন কেন করো বলো তো? এভাবে এত শাওয়ার নিলে তোমার যে ঠান্ডা লেগে যাবে। তখন শুধু তোমার না বাবুরও কষ্ট হবে।
পরী একবার নাক টেনে বললো,
~ স্যরি আর করবো না এমন।
~ মনে থাকবে তো?
~ ঢের থাকবে।

তিশা রাগ করে বসে আছে। সুলতান পাশে বসেই গেম খেলছিল। তিশার দিকে তাকিয়ে বলে,
~ কি হয়েছে তিশু?
~ প্রশ্নটা তো আমি তোমায় করবো।
~ মানে?
~ কেন এমন করছো?

~ তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না
~ তুমি কি ভেবেছো আমার থেকে সব লুকিয়ে যাবে? আর আমি কিছু বুঝতেও পারবো না?
~ কিসের কথা বলছো তিশু?
তিশা সুলতানকে ধমক দিয়ে বলে,
~ চুপ একদম!
তিশা বসা থেকে সুলতানের দিকে এগিয়ে যায়

পর্ব ৩৪

তিশা ধীরে ধীরে সুলতানের দিকে এগিয়ে যায়। সুলতান একটু দূরে সরে যায়।
~ আমার আজ অধিকার আমার চাই’ই।
~ কি পাগলামো শুরু করলে তিশা?
~ কিসের পাগলামো আর কোনটাকে পাগলামো বলছো তুমি?

~ সরো এখান থেকে।
~ না।
~ ধ্যাত!
সুলতান তিশাকে সরিয়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যায়। ওদিকে তিশা আর্তনাদ করে কাঁদতে থাকে।
বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরে সুলতান।

পরেরদিন শাদাফ পরীকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিয়ে যায়।

~ আজ কি তুমি নিতে আসবে?
~ না গো। অনেক কাজ পড়ে আছে। সেগুলো আগে আগে শেষ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবো। নিশান তোমাকে নিতে আসবে।
~ আচ্ছা ঠিক আছে।
পরীক্ষা দিয়ে যখন ক্লাস থেকে বের হয় তখন তিশা পরী পরী করে দৌঁড়ে আসে। দৌঁড়ে আসাতে অনেকটা হাঁপিয়ে গিয়েছে।
~ আরে এভাবে দৌঁড়ে আসলে কেন?

~ আমি অনেক খুশি পরী অনেক খুশি।
~ আজ বুঝি এক্সাম অনেক ভালো হয়েছে?
~ না পরী। কারণ সেটা নয়।
~ তবে?
~ কিভাবে যে বলি!
~ আরে বলোই না। আমিই তো।
~ কাল তোমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনে মগজেও ঠুকিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু একটু ত্যারামো করেছি।
~ যেমন?

~ কাল রাফিনের কাছে যেতে চাইলে ও আমায় রেখে বাহিরে চলে যায়।
~ তারপর?
~ তারপর আর কি! আমি তো কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলেছি। রাত একটার দিকে রাফিন বাড়িতে আসে। তখনও আমি অনেক কাঁদছিলাম। এরপর মহোদয়ের আমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
তিশার কথা শুনে পরী অনেক খুশি হয়। যাক অবশেষে সুলতান তাহলে তিশাকে সত্যিই ভালোবাসলো।

এখন আর পরীকে তেমন কাজ করতে হয়না। টুকটাক কাজ বাদে সব কাজ শাদাফ আর শ্বাশুরী মিলেই করে। পরী কাজ করতে চাইলেও উল্টো বকা খায়। ক’দিন হলো পরীক্ষাও শেষ। এখন আর শুয়ে বসে ছাড়া পরীর কোনো কাজ নেই। বাবার বাড়ি যেতে চাইলেও শাদাফ আর শ্বাশুরীর কড়া নিষেধ। প্রয়োজনে তারা আসবে কিন্তু পরীকে এখন কিছুতেই চোখের আড়াল করা যাবে না।
এভাবে ১ মাস কেটে যায়। ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোচিং~ এ ভর্তি হতে চায়। কিন্তু শাদাফকে কি করে বলবে বা শ্বাশুরীই রাজি হবে নাকি সেটা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে পরী।
পরীর জন্য মাদার্স হরলিক্স বানিয়ে আনে শাদাফ। পরী গ্লাসটা টেবিলে রেখে শাদাফকে জড়িয়ে ধরে। শাদাফও হেসে দিয়ে পরীকে জড়িয়ে ধরে।
~ কি ব্যাপার হুম? আজ হঠাৎ আদর করতেছো?
~ হঠাৎ আদর করতেছি মানে কি হ্যাঁ? আমি কি তোমায় আদর করি না?
~ না না একশবার করো।

~ হুহ।
শাদাফের শার্টের বোতাম একবার খুলছে আরেকবার লাগাচ্ছে। শাদাফ শুধু ওর কাণ্ডকারখানা গুলো দেখছে।
~ শুনোনা!
~ শুনছি তো!
~ একটা কথা বলবো।
~ বলো।

~ রাগ করবা না তো?
~ না। বলো।
~ আমি কোচিং~ এ ভর্তি হবো।

~ কিসের?
~ ভার্সিটিতে এডমিশনের জন্য।
~ এই অবস্থায়? তুমি এখন প্র্যাগনেন্ট। এভাবে এত চলাফেরা বাহিরে যাওয়া মোটেও সুবিধাজনক না তোমার জন্য।
~ প্লিজ না করো না! আমার সাথে তুমি তো আছো। আমি জানি তুমি আমার সাথে থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না। প্লিজ শাদাফ প্লিজ।
~ আচ্ছা আমি দেখছি।
~ লাভ ইউ লাভ ইউ এত্তগুলা।
~ হইছে! আদর করার কারণ তাহলে এটাই ছিল।
~ হুহ্! মোটেও না। আমি সবসময়ই আদর করি।
~ কচু করো।

~ খাও তুমি।
~ তুমি খাও।
~ না তুমি।
~ তুমি।
এভাবেই দুজনের খুনসুটিতে কেটে যায় প্রতিটা সকাল আর বিকাল।

পরী আর তিশা দুজনই এক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। তিশা আর নিশানই শাদাফের ভরসা। ওদের ভরসাতেই পরীকে কোচিং~ এ ভর্তি করিয়েছে। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে শাদাফকে। সবচেয়ে কঠিন ছিল ওর বাবা~ মাকে রাজি করানো। প্রতিদিন সকালে পরীকে কোচিং~ এ দিয়ে আসে। কোচিং টাইমে তিশা পরীর সাথেই থাকে সবসময়। প্রয়োজন সমস্যা সব তিশাই দেখে। আর বিকেলে ছুটির সময় নিশান নিয়ে আসে। নিশানের কলেজ ছুটি হয় ৩:৩০ এ আর পরীর কোচিং শেষ হয় ৪টায়। তিশা জোর করলেও কখনোই পরী সুলতান আর তিশার সাথে যেতে চাইতো না।
একদিন বিকালে নিশান পরীকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল।
~ বাবা~ মা কেমন আছে রে নিশু?
~ ভালো আছে। তোমাকে দেখতে চেয়েছে অনেকবার।

~ নিয়ে আসিস না কেন?
~ তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছিল।
~ আমার তো তেমন সময় নেই রে।
~ সমস্যা নেই। একদিন বাবা~ মাকে সাথে করে নিয়ে আসবো সময় করে।

~ আচ্ছা। তোর পড়াশোনার খবর কি?
~ আগের থেকে ভালো।
~ হুম ঠিকমত পড়াশোনা করবি।
~ হ্যাঁ। তা তো করতেই হবে নয়তো পরে আবার তোমার বাবু বলবে যে মামা পড়াশোনায় একদম গোবর গণেশ।
~ হাহাহা
কিছুদূর আগাতেই পরী বাইক থামাতে বলে।

~ নিশান বাইক থামা।
~ কি হয়েছে আপু? কোনো সমস্যা?
~ তুই আগে থামাতো।
বাইক থামানোর পরই পরী নেমে পড়ে।
~ নাম তুই।

~ কি হয়েছে? তুমি আবার বাইক চালাবা নাকি?
~ ধুর কুত্তা! নাম তো। আমি ভেলপুরী খাবো।
~ এই না একদম না। শাদাফ ভাইয়া জানতে পারলে তোমার আগে আমায় মেরে ফেলবে।
~ কেন?
~ কেন আবার কি? বাহিরের খাবার খেতে বারণ করেছে তোমায়।

~ ধুর! আয় তুই।
জোর করে নিশানকে নিয়ে যায়। গুণে গুণে ১০টা ভেলপুরী খায় পরী।
~ আহ্ শান্তি! পেট টা আরো ফুলে গেলো রে।
নিশান মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে করতে বললো,
~ এগুলো এখন হজম করতে পারলেই ভালো। নয়তো তোমার সাথে সাথে আমারও গর্দানও যাবে।

বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয় পরী। শরীর কেমন যেন গুলাচ্ছে। বমি হবে মনে হয়। পেটও জ্বালা করছে। পরীর স্পষ্ট মনে আছে যে ঝাল খায়নি। তাহলে পেট কেন জ্বলছে! উনিশ~ বিশ ভাবতে ভাবতে পেট থেকে খাবার গলা পর্যন্ত উগ্রে আসে। পরী দৌড়ে ওয়াশরুমে যায়। গড়গড় করে বমি করতে থাকে। পেটের সাথে এখন গলা~ বুকও জ্বলছে। মুখ কেমন যেন তেতো হয়ে গিয়েছে। বমি শেষ করে বিছানায় গা এলাতেই আবার কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠে। আবার ওয়াশরুমে চলে যায় পরী। এই নিয়ে চার বার বমি করা হয়ে যায়। শরীরটা এখন একেবারে দূর্বল হয়ে গিয়েছে। এলোমেলো হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। শ্বাশুরী রুমে এসে পরীকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
~ এভাবে শুয়ে আছো যে?
~ শরীরটা খুব দূর্বল লাগছে মা।
~ কেন? কোচিং থেকে এসে খেয়েছো?
~ না। বমি হয়েছে।
~ সে কি! আমায় ডাকোনি কেন? এখন ঠিক আছো তুমি?

~ মোটামুটি।
~ তুমি একটু বসো। আমি খাবার নিয়ে আসছি।
~ না মা আমি খাবো না।
~ চুপ। বললেই হলো নাকি।
কিছু সময়ের মধ্যেই শ্বাশুরী মা খাবার নিয়ে এসে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়। তারপর শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আরামে নিদ্রা ভর করে পরীর চোখের পাতায়। শাদাফ আসে ৫টার দিকে। গালে হাত রেখে পরীকে ডাকতে থাকে।
~ পরী
পরী উঠো চোখ খুলে দেখো। পরী
~ হু

~ তাকাও
পরী ঘুমঘুম চোখে তাকাতেই শাদাফকে দেখতে পায়। আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমের রাজ্যে পা রাখতে যাবে তখনই শাদাফ ডাক দেয়,
~ এই পরী
পরী ঘুমঘুম চোখে জবাব দেয়,
~ কি?

~ ভালোমত চোখ খুলে তাকাও। দেখো সারপ্রাইজ।
ঘুম নষ্ট করে সারপ্রাইজ দেওয়া লাগে এটা কোন বইতে লিখা আছে। পরী বিরক্ত হয়ে তাকায়। শাদাফকে ঝাঁঝালো কিছু কথা বলতে যাবে তার আগেই পরীর চোখগুলো বড় বড় হয়ে যায়। শোয়া থেকে উঠে বসে। অবাক হয়ে বলে, “এটা সত্যিই সারপ্রাইজ নাকি স্বপ্ন!”

পর্ব ৩৫

রী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মা, ভাইয়া, পিংকি, দুলাইভাই, আলভী, রওশান, আদিল, রেখা, জান্নাত আর ওর স্বামী এসেছে। সবেচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ওর বাবাকে দেখে। পরী ঝড়ের বেগে গিয়ে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে।
~ বাবা তুমি এসেছো! আমি ভাবতেও পারিনি তুমি আসবে এখানে।
পরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
~ কেমন আছিস তুই?

~ অনেক ভালো আছি বাবা।
জান্নাত একটু ভাব নিয়ে বললো,
~ দেখেছিস বাবাকে পেয়ে আমাদের কথা একদম মনে নেই। কি আন্টি তুমি কিছু বলো? তোমার মেয়ে তো আমাদের দেখছেই না।
বাবাকে ছেড়ে জান্নাতকে জোরে চেপে ধরে। জান্নাত চেঁচিয়ে বলে,
~ ওরে ছাড়রে! মেরে ফেলবি নাকি?
~ মেরেই ফেলবো। খুব হিংসে না?

দুজনের খুনসুটিতে সকলেই হেসে দেয়।
বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় বড় করে পিকনিকের ব্যবস্থা করেছে সকলে। পরী শুধু চেয়ারে বসে সব দেখছে। শাদাফ, রওশান, আদিল, জান্নাতের বর, পরীর ভাই আর দুলাভাই এরা সকলে মিলে রান্না করছিল। পরী ইশারায় শাদাফকে ডাকলো। সকলকে পাশ কাটিয়ে পরীর কাছে যায়। ঘাসের উপর হাঁটু গেড়ে বসে পরীর কোলে হাত রেখে।
~ কি ব্যাপার বাবুর আম্মু? বাবু আমায় মিস

করছিল নাকি বাবুর মা হুম?
~ শাট আপ! সবসময় শুধু ফাইজলামি।

~ হাহাহা। বলো কি বলবে?
~ বলছিলাম সবাই তো এখানেই আছে যদি নিশান আর বাবা~ মাকেও আজ আসতে বলতে?
~ এহ্! আমি কি তোমার অপেক্ষায় বসে আছি নাকি? অনেক আগেই আমি ওদের আসতে বলেছি। গাড়িতে আছে ওরা।
~ সত্যিই বলছো?
~ হ্যাঁ।
~ তুমি সত্যিই অনেক ভালো।

~ এখন যাই? ওদের হেল্প করি?
~ আচ্ছা।
শাদাফ চলে যাওয়ার পর ফোন ঘাটতে থাকে পরী। কিছুক্ষণ গান শুনে, কিছুক্ষণ গেম খেলে। বোরিং হয়ে যায়। কোনো কাজই কেউ পরীকে করতে দিচ্ছে না। সকলেই কাজে ব্যস্ত কিন্তু বাবা~ মাকে দেখা যাচ্ছে না। আশেপাশে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পায়, বাবা~ মা আর শ্বশুর~ শ্বাশুরী মিলে হেসে হেসে গল্পগুজব করছে। গালে হাত দিয়ে চারপাশের সব দৃশ্য দেখছে।”ইশ! সময়টা যদি এখানেই থেমে যেত”
“পরী আপু! পরী আপু কই তুমি”

মেইন গেট থেকে তড়িঘড়ি করে আসতে আসতে পরীকে ডাকে নিশান। নিশানকে এভাবে আসতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। কোনো বিপদ ঘটলো নাকি। পরী আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে নিশানই কাছে এসে পড়ে। উপস্থিত সকলেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
~ এভাবে চেঁচাচ্ছিস কেন নিশান?
~ দেখো তোমার জন্য কি এনেছি?

~ কি এনেছিস?
~ আচার।
~ ইডিয়ট! ভাবটা এমন ধরেছিলি যেন বাসায় ডাকাত পড়েছে।

~ যাহ্! তুমি খুশি হওনি? আমি তো শুনেছি এই সময়ে নাকি মেয়েরা আচার অনেক পছন্দ করে?
~ হ্যাঁ ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু এভাবে আসায় একটু ভয় পেয়েছি। যাই হোক, বাবা~ মা কোথায়?

নিশান পিছনে তাকিয়ে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় “ঐতো”
সকলের সাথে দিনটা বেশ ভালোমতই কেঁটে যায়। সন্ধ্যার পর ড্রয়িংরুমে গল্পের আসর জমায় সকলে। গল্পের বিষয় হলো পরী আর শাদাফের বাবু হলে নাম কি রাখবে। একেকজন একেক নাম রেখে যাচ্ছে। একজনের পছন্দ হয় তো আরেকজনের পছন্দ হচ্ছে না। সকলের চিৎকার চেঁচামেচিতে পরীর মাথা ধরে যায়।

~ তোমরা কি নাম রাখছো নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধাচ্ছো বলো তো?
পরীর কথায় সকলে চুপ হয়ে যায়। নিশান বলে উঠলো,
~ পরী আপু তুমিই বলো তো বাবুর নাম কি রাখা যাবে?

~ আমি বলবো না। বাবুর নাম আমার তিন বাবা~ মা মিলে ঠিক করবে।
সকলে পরীর কথাই মেনে নেয়।

দেখতে দেখতে তিনটা দিন কেটে যায়। পরীর বাবা~ মা মূলত এসেছে পরীকে নিয়ে যেতে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির কেউই প্রথমে রাজি হয়না। কিন্তু পরীর বাবা যখন বললো তখন আর কেউ বারণ করতে পারলো না।

পরেরদিন রেডি হচ্ছে সবাই একটুপরই রওনা দিবে ঢাকার উদ্দেশ্যে। পরী জামা~ কাপড় বের করে গোছাচ্ছিল। শাদাফ চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। মুখটা একদম মলিন হয়ে আছে। পরী কাছে গিয়ে বসলেও কোনো ভাবান্তর আসে না শাদাফের মাঝে। শাদাফের হাত ধরে জিজ্ঞেস করে,
~ কি হয়েছে?

~ কিছুনা।
~ মন খারাপ?
~ না।
~ আমার দিকে তাকাও।
~ বলো কি বলবে?

~ আমার দিকে তাকাতে বলেছি।
পরী জোর করে শাদাফের মুখ নিজের দিকে ঘোড়ায়। একবার তাকিয়েই আবার চোখ সরিয়ে নেয় শাদাফ। চোখ দুইটা একদম লাল হয়ে আছে। সাথে নাকও।
~ কাঁদছো কেন তুমি?
~ কই?

~ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
হুট করেই শাদাফ পরীর দুই হাত পেঁচিয়ে ধরে।
~ প্লিজ যেয়ো না তুমি। দরকার হলে সবাইকে এখানে রেখে দাও। তাও যেয়ো না প্লিজ। তোমার এই অবস্থায় তোমাকে দূরে রাখতে পারবো না আমি। আমার খুব টেনশন হবে। বাবু হওয়ার পর আমরা সবাই একসাথে যাবো। তখন একমাস বেড়িয়ে আসবো। তবুও প্লিজ এখন যেয়ো না প্লিজ।
পরী কি বলবে বুঝতে পারছে না। যেখানে বাবা নিজে এসেছে নিতে সেখানে কি করে পরী সবাইকে ফিরিয়ে দিবে। এদিকে শাদাফকেও এভাবে রেখে যাওয়া যাবে না।

~ তুমিও আমাদের সাথে চলো ঢাকায়?
~ সম্ভব হলে এভাবে মনমরা হয়ে বসে থাকতাম না পরী। অফিসে কাজের অনেক চাপ তবুও বসকে তোমার কথা বলে বিকেল পর্যন্ত জব টাইম নিয়েছি। কিন্তু এতদিনের জন্য তো আর ছুটি দিবে না।
~ আচ্ছা। তুমি মন খারাপ করো না আমি দেখছি।

পরী ওর মাকে খুঁজছে। রান্নাঘরে গিয়ে পেয়েও যায়। শ্বাশুরী আর মা মিলে রান্না করছে আর গল্প করছে। পরী ইশারায় ওর মাকে বাহিরে আসতে বলে।
~ এভাবে ইশারায় ডাকলি কেন?

~ মা!
~ কি?
~ মা আমি ঢাকায় যেতে পারবো না।
~ মানে কেন?

~ শাদাফ কান্নাকাটি করছে।
এবার পরীর মা বুঝতে পারছে না হাসবে নাকি কাঁদবে। উনি একটু হেসেই বললো,
~ কান্নাকাটি করে মানে? শাদাফ কি বাচ্চা নাকি?
~ জানিনা মা। ওর মুখটা দেখেছো তুমি?

~ তাই বলে যাবি না?
~ ও যে কষ্ট পাবে মা।

~ আর তোর বাবা যে তোকে নেওয়ার জন্য এতদূর আসলো?

~ বাবাকে একমাত্র তুমিই ম্যানেজ করতে পারবে মা।
~ কিন্তু কি করে?
~ উমম! বাবাকে বলো যে আমার কোচিং করতেই হবে। এসময় কোচিং করা বাদ দিলে আমি ভার্সিটিতে এডমিশনের জন্য পরীক্ষা দিতে পারবো না।

~ তাহলে তুই সত্যিই যাবি না?
পরী মাথা নিচু করে বললো,
~ স্যরি মা!
পরীর মা হেসে পরীর কপালে চুমু খেয়ে বললেন,

~ সারাজীবন এভাবেই স্বামী, সংসার, সন্তান ভালোবাসা নিয়ে সুখী থাক।

দুপুরের খাওয়া~ দাওয়া শেষ করে সকলে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়ির সবাই গেলেও শাদাফ আসেনি। রওশান আর আদিল অনেকবার জোর করেছে তাও রাজি হয়নি। পরীর শ্বশুর আর ভাসুর সবাইকে বাস স্টপ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে নিয়ে যায়। শ্বাশুরী আর পরী মেইন গেট পর্যন্ত যায়। সকলে বিদায় দিয়ে নিজের রুমে যায়। শাদাফ তখন শুয়ে ছিল। পরী চুপি চুপি শাদাফের কাছে যায়।

~ ভাওওওওও।
শাদাফ চিৎকার দিয়ে বসে পড়ে। পরী হাসতে হাসতে শাদাফের উপর গড়িয়ে পড়ে।
~ পরী তুমি? যাওনি?

~ জ্বী না।
~ কেন?
~ কি করে যাবো? মুখটা যা বানিয়ে রেখেছো! মাকে বলে বাবাকে ম্যানেজ করিয়েছি।
~ আর এদিকে আমি ভেবেছি তুমি চলে যাচ্ছো আর তাই তো রাগ করে আমি এগিয়ে দিতে যাইনি।
~ হাহাহা।
~ পরী।

~ কি?
~ ভালোবাসি।
~ আমিও অনেক বেশি বেশি বেশিইইই ভালোবাসি।

পরেরদিন যথা সময়ে কোচিং~ এ পৌঁছে দিয়ে শাদাফ চলে যায় অফিসে। আজ শাদাফের পরীকে নিয়ে আসার কথা থাকলেও চারটা পাড় হয়ে যাওয়ার পরও শাদাফ আসছে না। প্রায় ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করার পরও যখন দেখলো যে শাদাফ আসছে না তখন পরী একটা রিক্সা নিলো বাড়ি যাওয়ার জন্য। কিছুদূর এগোতেই শাদাফ ফোন দেয়।

~ কোথায় তুমি? কতবার ফোন দিলাম। ধরলে না।
~ স্যরি জান। ফোন সাইলেন্ট ছিল। আর জ্যামে আটকে গিয়েছি আমি তাই লেট হচ্ছে।
~ কিন্তু আমি তো রিক্সায়।
~ নামো তাড়াতাড়ি। তুমি রিক্সা থেকে নেমে কোথাও দাঁড়াও আমি আসতেছি।

পর্ব ৩৬

রাস্তার বেশ কয়েকজন মানুষজন এসে পরীকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। আঘাত পেলেও পরী তখনও সেন্সলেস হয়নি। তবে প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীর ফোনে অনেকগুলো কল আসে। প্রত্যেকটা কলই শাদাফ করেছিল। আটবারের বেলায় একজন নার্স পরীর ব্যাগ থেকে ফোন বের করে রিসিভড করে। শাদাফ ঝাড়ি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
~ ফোন ধরতে এতক্ষণ লাগে? কোথায় আছো তুমি?
~ কে আপনি?
শাদাফ কান থেকে ফোন নিয়ে নাম্বারটা একবার দেখলো। নাম্বার তো ঠিকই আছে। তাছাড়া নাম্বারটা বউপরী দিয়ে সেইভ করা

ওপাশ থেকে নার্স হ্যালো হ্যালো করছে। শাদাফ উল্টো জিজ্ঞেস করলো,
~ আপনি কে?
~ আমি আয়েশা হসপিটালের একজন নার্স। এই ফোনটা যার সে এক্সিডেন্ট করেছে রাস্তায়। আমরা এক্ষুণী তার বাড়িতে যোগাযোগ করতাম। আপনি যদি তার পরিচিত হয়ে থাকেন তাহলে প্লিজ কাইন্ডলি তার পরিবারকে একটু খবরটা দিবেন।

শাদাফ কল কেটে দিয়ে তখনই হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বাইক স্টার্ট দেয়। হাসপাতালে পৌঁছে আবার কল দেয়। এবারও নার্সটি ফোন রিসিভড করে এবং তিন তলায় ৩৪ নং রুমে যেতে বলে। শাদাফ হন্তদন্ত হয়ে তিন তলায় যায়। একজন নার্সকে ডেকে জিজ্ঞেস করে,
~ ৩৪ নং কেবিনটা কোনদিকে?
~ আপনি কে?
~ আমি পেশেন্টের হাজবেন্ড।

~ ওহ আচ্ছা। আসুন আমার সাথে।

নার্সের পেছন পেছন শাদাফও যায়। নার্স শাদাফকে উদ্দেশ্যে করে বললো,
~ আপনি এখানে ওয়েট করুন। ডক্টর বের হলে তার সাথে কথা বলে নিবেন।
~ আচ্ছা।
টেনশনে শাদাফের হাত~ পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এক অজানা ভয় মনের মধ্যে দানা বাঁধছে। বেশকিছুক্ষণ পর ডক্টর বেড়িয়ে আসে। ডক্টরের পেছন পেছন শাদাফ যায়।
~ ডক্টর কি অবস্থা? বেবি ঠিক আছে তো?

ডক্টর ঘুরে একবার শাদাফের দিকে তাকালো। এরপর আবার হাঁটা শুরু করলো। নিজের চেম্বারে গিয়ে হাত ধুয়ে নিজের চেয়ারটায় বসলো। এরপর শাদাফকে ইশারা করলো সামনের চেয়ারটিতে বসতে। শাদাফ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ বলুন না বেবি ঠিক আছে তো?

~ হ্যাঁ।
শাদাফ খুশি হয়ে বললো,
~ আলহামদুলিল্লাহ্‌!
~ তবে পরবর্তীতে আপনার ওয়াইফ বা বেবির কোনো সমস্যা হলেও হতে পারে। সেটা আমরা শিওর বলতে পারছি না এখন। তবে এটা বলতে পারি যে, আল্লাহ্ এর রহমতে আর আপনার ওয়াইফের কারণেই আপনাদের বেবির কোনো ক্ষতি হয়নি।

~ কিভাবে?
~ আপনার ওয়াইফের এক্সিডেন্টটা মূলত রিক্সা আর বাইকের সংঘর্ষণে হয়েছে। আপনার মিসেস রাস্তায় পড়ে গিয়েও খুবই সাবধানতার সাথে পেট আগলে রেখেছিল যার কারণে পেটে তেমন আঘাত পায়নি। তবে হাত, পা, কাঁধ আর মুখের সাইডে অনেক ব্যথা পেয়েছে আর ব্লিডিংও হয়েছে। এখন আপনার যেটা করণীয় তা হলো, খুব সাবধানে কেয়ারফুলি রাখতে হবে তাকে। এরজন্য অবশ্য বাবার বাড়ি নিয়ে গেলে আরো বেশি ভালো হয়।
~ জ্বী। আমি কি একটু ওকে দেখতে পারি?

~ শিওর। তবে ঘুম থেকে জাগাবেন না প্লিজ।
~ ওকে। থ্যাঙ্কিউ।
পরীর কাছে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে। অনেক জায়গায় আঘাত পেয়েছে। আস্তে করে পরীর পেটে হাত রাখে। এখনো মনের ভেতর এক অজানা ভয় কাজ করে।
পরীর বাবা~ মাকে খবর দেওয়া হয়েছে তারা সবাই রওনা দিয়ে দিয়েছে এতক্ষণে।

২দিন পর পরীকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হয়। পরীর বাবা~ মা পরীকে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাইলেও শাদাফ না করে দেয়। অগত্যা পরীর মা কয়েকদিন মেয়ের কাছে থেকে বাড়ি চলে যান। পরীর বাবা~ মা চলে যাওয়ার পরই শুরু হয় পরীর প্রতি সকলের অবহেলা। যেই ভালোবাসাটা এতদিন সকলের কাছে পেয়েছিল তা যেন নিমিষেই বিলীন হয়ে গিয়েছে। শাদাফও আজকাল ঠিকমত কথা বলে না। শুধু সময়মত খাবার আর ওষুধটা দিয়ে যায়।
একটা দূর্ঘটনা না হয় ঘটেই গিয়েছে তাই বলে সকলেই যদি এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে পরী যাবে কার কাছে।

সময় পেড়িয়ে আরো এক সপ্তাহ্ চলে যায়। তবুও কারো কোনো পরিবর্তন নেই। শাদাফের কাছে গেলেই ইগনোর করে। শাদাফের এমন আচরণে পরীর অনেক কষ্ট হয়।
পরেরদিন নিশান অনেকগুলো গল্পের বই নিয়ে আসে। এরমধ্যে রয়েছে হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার, জহির রায়হান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলের ইসলামের বই।
~ আপু এগুলো তোমার জন্য। যখনই একা একা বোর হবে তখনই বইগুলি পড়বে।

~ অনেক ধন্যবাদ রে ভাই।

নিশান চলে যাওয়ার পর হুমায়ুন আহমেদের বইটা নিয়ে বসে পরী। দুইটা পাতা পড়ে যেই তিন নং পাতায় যাবে তখনই শাদাফ রুমে প্রবেশ করে। পরীর হাতে বই দেখে রাগে ফুঁসতে থাকে। ছো মেরে পরীর হাত থেকে বইটা নিয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেলে। শাদাফের এমন ব্যবহারে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা পরী।
~ বইটা এভাবে ফেললে কেন?

~ বই পড়ে কি বিদ্যাসাগর হবি? তোর এই পড়াশোনার জন্যই আজ আমার বেবির ক্ষতি হওয়া ধরছিল। এরপরও লজ্জা করেনা তোর পড়তে?

পরী বেশ বুঝতে পারছিল যে এতদিনের সব জমিয়ে রাখা রাগগুলো এখন প্রয়োগ করছে। কিন্তু শাদাফের এমন আচরণ কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না পরী। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে তবুও এক দৃষ্টিতে শাদাফের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এটাই কি সেই চিরপরিচিত শাদাফ! চুপ করে থাকায় আরো বেশি রেগে যায় শাদাফ। পরীর দুই গাল চেপে ধরে বলে,

~ মুখ দিয়ে কথা বের হয় না এখন? তোকে তো এই অবস্থায় আমি কিছু করতেও পারছি না। ইচ্ছে করছে তোকে খুন করে ফেলি।
পরী কাঁদতে কাঁদতে বলে,
~ তুমি এমন কেন করছো আমার সাথে? আমাদের বেবির তো কিছু হয়নি।
~ এজন্যই তোকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছি। সব নষ্টের মূল তো তুই।

~ আমার কি কষ্ট হয়নি? বাবুর কিছু হলে তোমার চেয়েও বেশি কষ্ট আমি পেতাম কারণ গর্ভে তো ওকে আমি ধরেছি।
~ চুপ! একদম চুপ। মুখে মুখে তর্ক করবিনা। যদি কখনো তোকে বইয়ের আশেপাশে দেখি তাহলে আগুন দিয়ে বইয়ের সাথে তোকেও পুড়িয়ে মারবো।
শাদাফ রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পরই সোফায় বসে পড়ে পরী। চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে,
~ কেন এত কষ্ট দিচ্ছো আমায়? এইসময়টাতে এমন করতেও কি তোমার বিবেকে বাঁধে না একবার?

ড্রয়িংরুম থেকে শ্বাশুরী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে,
~ কি হয়েছে রে শাদাফ? অলক্ষীটা এমন কাঁদছে কেন আর অসভ্যের মত চেঁচাচ্ছে কেন? দেখেছিস বাবা~ মায়ের অমতে কোন অলক্ষীকে বাসায় তুলে এনেছিস তুই!

পরী কাঁদতে কাঁদতেই স্টাডি রুমে যায়। সব বইগুলো নিয়ে ছাদে যায়। একসাথে জড়ো করে একটা একটা করে পুড়িয়ে দেয় বইগুলো। আর চিৎকার করে বলছে,
~ দেখো শাদাফ দেখো তোমার আর তোমার পরিবারের একমাত্র সমস্যা আমার স্বপ্ন আমার পড়াশোনা সব আমি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছি সব। তবুও প্লিজ তোমরা আমার সাথে এমন করো না প্লিজ করো না এমন।

শাদাফ ছাদে এসে পরীকে টানতে টানতে রুমে নিয়ে যায় আর বলতে থাকে, “অলক্ষী যেন কোথাকার! তুই নিজেও মরবি আর পেটের টাকেও মারবি? বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর তুই জাহান্নামে চলে যা। কিন্তু আমার বাচ্চার যেন এক তিল পরিমাণ ক্ষতিও না হয়।”

পরী আর্তনাদ করে বলে,
~ কেন বাচ্চাই সব? বাচ্চা যার মাধ্যমে আসছে তার কোনো মূল্যই নেই তোমার কাছে? এটা তোমার ভালোবাসা?
পরীর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে রুমে নিয়ে বাহির থেকে দরজা লক করে দেয়।

দরজার বাড়ি বাড়ি দিচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে, “আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কেন আটকিয়ে রাখছো আমায়? কেন দিচ্ছো না উত্তর?”

পর্ব ৩৭

চিৎকার চেঁচামেচি করে কাঁদতে কাঁদতে পরী ঘুমিয়ে পড়ে। প্রতিটা দিন বদ্ধ রুমেই কেটে যাচ্ছে। এরকম মানসিক অত্যাচার পরী কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। শুধুমাত্র বেবিটার জন্য নিজেকে ঠিক রাখতে পেরেছে নয়তো কবেই কিছু একটা করে বসতো। কষ্ট সহ্য করা যায় তবে ভালোবাসার মানুষটার দেওয়া কষ্ট কিছুতেই সহ্য করা যায় না। চোখের পানিগুলোও ফুরিয়ে আসছে। ফ্লোরে বসে বসে আগের সব কথাগুলো ভাবছিল।

কি করে একটা মানুষ এত পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।”পড়াশোনা শ্বশুরবাড়ির লোকজন আগে থেকেই পছন্দ করতো না। মানলাম কোচিং থেকে ফেরার পথে এক্সিডেন্টটা হয়েছে। এই এক্সিডেন্টটা তো অন্যভাবেও হতে পারতো। তাহলে কেন ওরা আমার পড়াশোনাকে ইস্যু করলো। বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি না হওয়া সত্ত্বেও শাদাফ এমন অমানবিক নির্যাতন করছে আমার উপর। যেই আমি গর্ব করে বলতাম, আমার তুমিটার মত কোনো মানুষই হয়না সেই আমারই এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে এ কোন মানুষটাকে আমি ভালোবেসেছি। তবে কি আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছি? কি চাইছে কি শাদাফ? আর ওর পরিবারই বা কি চাইছে?”

নিজেই কথাগুলো বলে দেয়াল ধরে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ায়। দু হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বলে,
~ ওরা কি চায় বা চাইছে আমি কিচ্ছু জানিনা আর জানতেও চাই না। তবে আমাকে আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে। এই পরিবেশে আর এই বাড়িতে থাকলে আমার বেবি ঠিক থাকবে না। আমাকে বাবার বাড়ি যেতে হবে হ্যাঁ যে করেই হোক।

ফোন কোথায় আমার ফোন!
চারপাশে ফোন খুঁজতে থাকে। বিছানা বালিশ সব অগোছালো। রাগে সবকিছু ছুঁড়ে ফেলেছিল পরী। খুঁজতে খুঁজতে খাটের নিচে ফোনটা পেয়ে গেল। বাবার নাম্বারে ডায়াল করতে যাবে তখনই রুমের দরজা খুলে দেয়। আশা ভাবী এসেছে। দরজা লাগিয়ে দিয়ে পরীর কাছে আসে। পরীর চোখের নিচে কালো দাগ। চোখ দুইটা ফুলে লাল হয়ে আছে। লম্বা চুলগুলো এলোমেলো আর জট বেঁধে আছে। শাড়ির আঁচলও ঠিক নেই। আশা ভাবী এক প্রকার কেঁদে দিয়েই পরীকে জড়িয়ে ধরে। পরী কিছুই বুঝতে পারছে না।

~ সময় থাকতে এখান থেকে বাপের বাড়ি চলে যাও পরী। আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। এরা তোমার থেকে তোমার বাচ্চাকে আলাদা করার আগেই এখান থেকে চলে যাও।
~ ভাবী?
~ শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি। আমি সব জানি।

~ কি জানেন আপনি?
~ আমাদের শ্বাশুরী শাদাফের বিয়ে তার বোনের মেয়ের সাথে ঠিক করে রেখেছে।
~ কিহ্! কি বলছেন ভাবী?

~ হ্যাঁ। কিন্তু শাদাফ এসব কিছু জানে না। খালাশ্বাশুরীর মেয়ের নাম রুমকি। পড়াশোনা শুনেছি এইট পর্যন্ত করেছে এরপর আর করেনি। রুমকি তোমার থেকে বয়সে বড়। ও ছোট থেকেই শাদাফকে পছন্দ করে। যখন জানলো যে শাদাফ তোমায় বিয়ে করেছে তখন অনেক কান্নাকাটি করেছে। এখানে আসতে চেয়েছিল তখনই কিন্তু শ্বাশুরী মা বারণ করেছে। কারণ কোনো সিনক্রিয়েট হলে শাদাফ তোমায় নিয়ে এখান থেকে চলে যেত। শ্বাশুরীর সাথে খালাশ্বাশুরীর সবসময়ই কথা হয়। সে বারবার শ্বাশুরীকে চাপ দেয় তোমার সাথে শাদাফের ছাড়াছাড়ি করানোর জন্য। তোমাকে প্রথম থেকেই এজন্য তারা কেউ মেনে নিতে পারেনি। শাদাফের মাথায় সব আজগুবি কথা ঢুকিয়ে তোমার প্রতি তিক্ত করে তুলছে। তোমাকে অসহ্য বানাচ্ছে শাদাফের কাছে।
সবটা শুনে পরীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। এতসব ভালোবাসার নাটক তবে কি সব এই বাচ্চাটার জন্যই!
~ আমি তো কোনোদিন তাকে দেখিনি ভাবী।
~ তোমাদের বিয়ের পর আর সে এই বাসায় আসেনি।

~ ওরা আমার থেকে বাচ্চা কেন নিতে চাইছে তাহলে?
~ কারণ রুমকি কোনোদিন মা হতে পারবে না। ওর জরায়ু ক্যান্সার হয়েছিল তখন অপারেশন করে জরায়ুটা কেটে ফেলা হয়। তোমার থেকে বাচ্চা আলাদা করার আইডিয়াও খালাশ্বাশুরীর।
~ ছিহ্! এত নিচু মনের মানুষ এরা। এত জঘন্য এরা। এদের শাস্তি হবেই ভাবী।

~ ভুলেও ওদের কাউকে কিছু জানিয়ো না। তাহলে আমার তো ক্ষতি করবেই সাথে তোমারও।

~ দরকার কি ওদের শাস্তি আমার নিজে দেওয়ার? উপরে একজন আছে। আল্লাহ্ এইসব মানুষের বিচার ঠিকই করবে। খালাশ্বাশুরীর প্ররোচনায় পড়ে শ্বাশুরী মা আমার প্রতি যেই অবহেলা, অত্যাচার আর কুবুদ্ধিতে সায় দিয়েছে একদিন তাকে আমার অনুপস্থিতিতে কাঁদতে হবে। আর বাকি রইলো শাদাফ? ও সব জেনে এমন করুক বা না জেনে এমন করুক ঠিক করেনি ও। আমার ভালোবাসার প্রতিদান ও আমাকে এভাবে দিলো তো এর প্রতিদানও আমি দিবো।

পরেরদিন এগারোটার দিকে পরীর বাবা~ মা আসে কুমিল্লায়। পরীকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই শ্বশুর~ শ্বাশুরীর মুখটা কালো হয়ে যায়। ড্রয়িংরুমে বসে সবাই কথা বলছিল। বেডরুমে কাপড় ব্যাগে ভরছিল পরী। শাদাফ এসে পরীর এক হাত জোরে চেপে ধরে। রাগে কটমট করে বলে,
~ কোথায় যাবে তুমি? কাপড় কেন গুছাচ্ছো?

পরী হাতটা সরিয়ে বলে,

~ অসভ্যের মত হাত ধরছো কেন? এই সময়টাতে ওয়াইফের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয় সেই ম্যানার্সটুকুও কি নেই?
পরীর এমন চটাং চটাং কথা শুনে শাদাফের আরো রাগ হয়। এবার একসাথে দুই হাত চেপে ধরে বলে,
~ তুমি কোথাও যাবে না।
~ আমি যাবোই। তাছাড়া তুমি এমন কেন করছো? তুমি কি জানোনা প্রথম বেবি সাধারণত বাবার বাড়িতেই হয়?

~ আমার বেবি এখানেই হবে।
~ তুমি বললেই তো আর সব হবে না শাদাফ। তুমি যেমন বেবির ভালো চাও তোমার থেকে দ্বিগুণ ভালো আমি চাই আর ভাবি আমার বেবির কথা।
পরীকে ছেড়ে দিয়ে জানালার রেলিং ধরে দাঁড়ায় শাদাফ। পরী মনে মনে বলে, “ইচ্ছে করছে সব সত্যিটা তোমায় জানিয়ে দেই। কিন্তু আমি জানি তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে না। তোমার মাকে নিয়ে কথা বললে উল্টো এর ভয়াবহ পরিণাম আমার হবে যেটার প্রভাব পড়বে বাবুর উপর। তোমার ভুলটা না হয় তুমিই বুঝে নিয়ো”

পরী আবার কাপড় ভাঁজ করায় মনোযোগ দেয়। শাদাফ আড়চোখে একবার তাকিয়ে কাছে এসে সবগুলো কাপর ব্যাগ থেকে বের করে ফেলে। চিৎকার করে বলে,
~ তুমি কোথাও যেতে পারবে না!
চিৎকারের শব্দে পরী আর শাদাফের বাবা~ মা ছুটে আসে। পরীর মা জিজ্ঞেস করে,

~ কি হয়েছে রে পরী?
~ কিছু না মা। তোমরা একটু অপেক্ষা করো। আমি ব্যাগ গুছিয়েই রওনা দিবো।

শাদাফ ওর মায়ের কাছে গিয়ে বলে,
~ ওকে যেতে বারণ করো মা। নাহলে কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি।
পরীর মা বললো,
~ তুমি এমন করছো কেন বাবা? পরীকে তো আমরা সারাজীবনের জন্য নিয়ে যাচ্ছি না।
~ আপনি ওর এক্সিডেন্টের কথা জানেন তো নাকি?

~ হু
~ তাহলে এরপরও আমি ওকে একা ছাড়ি কিভাবে? আমি কাউকে ভরসা করতে পারবো না। আমার বেবির ভার কাউকে দিতে পারবো না।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খুব ঠান্ডাভাবে পরী বললো,
~ তুমি টেনশন করো না। বেবি হওয়ার কয়েকমাস পরই চলে আসবো। তুমি অফিস থেকে ছুটি পেলে যেয়ো।
আগুনে ঘি ঢাললে যেমন হয় শাদাফের অবস্থাও ঠিক তেমন এখন। পরীর দিকে এগিয়ে বলে,

~ তুমি যদি এই বাড়ি ছেড়ে এখন যাও তাহলে আমি তোমায় ডিভোর্স দিবো বলে দিলাম।
পরীর মা এবার রেগে বললো,

~ এগুলো কি ধরণের কথাবার্তা শাদাফ? সামান্য একটা বিষয়কে এত বড় করছো কেন তুমি?
~ আপনি চুপ করুন। আপনার জন্যই তো সবচেয়ে বড় ভয়। আপনার জন্যই বেবি নষ্ট হতে গিয়েও বেঁচে গেছে আল্লাহ্~ এর রহমতে। আপনিই তো পরীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যার ফল আমায়ও ভোগ করতে হতো। আসল খারাপ তো আপনি আর আপনার মেয়ে তো অলক্ষী হবেই।

শাদাফের শার্ট পেছন থেকে টেনে ধরে ঠাস করে গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে।
~ পরী!

পরী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে,
~ খুব অবাক হচ্ছো থাপ্পড় খেয়ে? পরী তোমায় মারতে পারে এটা নিশ্চয় ভাবতে পারোনি। স্বামীর গায়ে হাত তোলা ঘোর অন্যায় কিন্তু কোনো মানুষরূপী কুকুরের উপর নয়। স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর জান্নাত এটা আমি যেমন ভুলে যাইনি ঠিক এটাও ভুলে যাইনি যে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। তোমার সাহস হয় কি করে আমার মায়ের সাথে এভাবে কথা বলার? ব্যবহার কি শিখায়নি পরিবার? বিয়ের প্রথম রাতেই বলে দিয়েছিলে, যাই হয়ে যাক না কেন তোমার মায়ের সাথে একটা টু শব্দ যেন না করি। তোমার সেই কথাটা এখনও পর্যন্ত মাথায় রেখে এতকিছুর পরও তোমার মায়ের দিকে একবারের জন্যও আঙ্গুল তুলিনি। তাহলে তুমি কোন সাহসে আমার মায়ের সাথে এমন আচরণ করলে?

তুমি মনে করো মায়ের অভিশাপের জন্য বাচ্চাটা নষ্ট হতে গিয়েছিলো আর আমি মনে করি, অভিশাপটা দেওয়ার পর মা যে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্ এর দরবারে দু হাত তুলে চোখের পানি ফেলেছে। কেঁদে কেঁদে নিজের অভিশাপ ফিরিয়ে নিয়েছে ঠিক সে কারণেই আমাদের বেবি ঠিক আছে। আমি যখন মাকে ভুল বুঝেছিলাম তখন এই তুমিই আমাকে বুঝাতে মা মন থেকে এটা বলেনি। আর সেই তুমি আজ মায়ের দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলছো? আরে আমার তো লজ্জা লাগে এটা বলতে যে, আমি গর্ব করে সবার কাছে বলতাম আমার শাদাফের মত কোনো মানুষই হয়। বেষ্ট হাজবেন্ড আমার তুমি। আসলেই তোমার মত সন্দিহান হাজবেন্ড কারো কপালে জুটে না। যে অবস্থায় তোমার আমায় সাপোর্ট করার কথা সে অবস্থায় তুমি আমায় দিনের পর দিন অবহেলা করে গিয়েছো। এরকিছুই আমি আমার পরিবারকে জানাইনি। আজও তারা কেউ কিছুই জানতো না। জানলো শুধুমাত্র তোমার দোষেই।

আরো কি যেন বলছিলে? তুমি আমায় ডিভোর্স দিবে? হাহ্! তুমি আমায় কি ডিভোর্স দিবে ডিভোর্স তো আমি দিবো তোমায়। তিন মাস! তিন মাস সময় নিলাম। এর মধ্যেই ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে।

চলো মা।
যাওয়ার আগে পেছন ঘুরে বলে যায়, “মানুষ হলে আজকের কথাগুলো আর আজকের এই থাপ্পড়টা খাওয়ার পরই মানুষ হবে নয়তো সারাজীবন একটা পশুতেই থাকবে।
পরী ওর বাবা~ মায়ের সাথে চলে যায়। শ্বশুর~ শ্বাশুরী আটকালেও কারো কথা শুনেনি। এদিকে শাদাফ ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে

পর্ব ৩৮

এক মাস হয়ে গিয়েছে পরী বাবার বাড়ি এসেছে কিন্তু শাদাফের নাম্বার থেকে কোনো কল বা ম্যাসেজ আসেনি। পরী না চাইলেও পরীর অবাধ্য মন শাদাফকে স্মরণ করা থেকে বিরত থাকতে পারতো না। যখন শাদাফের কথা খুব বেশি মনে পড়তো তখন পেটে হাত রেখে চোখের পানি ফেলতো আর বলতো,
~ স্যরি সোনা, তোর বাবার থেকে এভাবে দূরে আসার জন্য। নয়তো যে ওরা তোকেই আমার থেকে কেড়ে নিতো রে। আমি চাই তোর বাবা যেন নিজেই তার ভুল বুঝতে পারে।

পরীর বেবির এখন পাঁচ মাস চলছে। সারাক্ষণ বাড়ির সকলের সাথে হাসি~ ঠাট্টা করে সময় কাটালেও রাতে শাদাফের কথা খুব বেশিই মনে পড়ে। রাতে পরীর মা সাথে থাকে। পরীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন,
~ তোকে একটা কথা বলি?

~ অনুমতি নেওয়ার কি আছে মা? বলো।
~ তুই কি এখনো আমাকে ভুল বুঝে আছিস?
~ একদম না মা। আমি জানি আমার মা কেমন। তাছাড়া পুরনো কথা আর ভালো লাগেনা মা।
~ আচ্ছা আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি তুই ঘুমা।
সময় অতিবাহিত হতে হতে আরো দেড় মাস চলে যায়।

শাদাফের অবস্থা ভালো নয়। পরী চলে আসার পর থেকে প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে পরীর একাকিত্ব অনুভব করতে পেরেছে শাদাফ। কিন্তু নিজের আত্মসম্মানের জন্য হাজার চেষ্টা করেও ফিরে যেতে পারেনা। বারবার ফোন করতে গিয়েও থেমে গিয়েছে। সারাদিন সিগারেট নিয়ে মগ্ন থাকে। ঠিকমত খাওয়া~ দাওয়া করেনা কারো সাথে কথা বলে না।

আশা ভাবী ফোন করে সব বলেছিল। পরী উত্তরে বলেছে,
~ এটা তো হওয়ারই ছিল ভাবী। এগুলো ওর ভুলের মাশুল। ও যদি ভেবে থাকে আমি নিজে থেকে ফিরে যাবো আর ওকে বারবার ক্ষমা করবো তাহলে ও ভুল। মানুষের কষ্ট সহ্য করার একটা সীমা থাকে। নরম পেয়ে বেশি বাড় বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ও হয়তো এটা জানতো না যে, যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় তখন কিন্তু মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়।

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোনটা রেখে দেয়। মুখে এসব বললেও ভেতরটা ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা হচ্ছিল আর চোখ দিয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছিল। এসময় ডক্টর পরীকে অনেক হাসিখুশি থাকতে বলেছে। কোনোরকম চাপ নেওয়া যাবে না। চোখের পানি মুছে ব্যালকোনিতে যায়। এরমধ্যে তিশা ফোন করে। বেশকিছুক্ষণ কথা চলে ওদের। তিশার কথা শুনে মনটা ফুরফুরা হয়ে যায় পরীর। হঠাৎ কারো ডাকে পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। সুলতান এসেছে।

~ আপনি?
~ কেমন আছো?
~ ভালো আছি।
~ তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।
~ আপাতত আমার কথা বলার মত মুড নেই। আপনি এখন আসতে পারেন।
~ তিশার সাথে আমার পরিচয়, বিয়ে কিভাবে সেটা তো শুনতে চাইবে তাই না?
এবার পরী চোখমুখের ভঙ্গিতে সুলতানের কথায় সায় দিলো।

~ তাহলে শোনো। তুমি যখন বিয়ের পর কুমিল্লায় চলে যাও এবং ঐখানকার কলেজে ভর্তি হও তখন তিশা, শাদাফ আর তুমি মিলে কলেজ ক্যাম্পাসে ছবি তুলো। সম্ভবত ফুসকা খাওয়ার সময়। তিশা সেই ছবিগুলো ফেসবুকে আপলোড করে তোমাকে ট্যাগ দিয়ে। সেদিন শিলা পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ার কারণে ফেসবুকে ঢুকতে পারেনি তাই ফোনটা আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমি সব ঠিকঠাক করে যখন নিউজফিড স্ক্রল করে চেক করছিলাম তখন তোমায় ট্যাগ করা তিশার পোষ্ট’টা দেখতে পাই। কারণ তুমি শিলার লিষ্টে ছিলে। এরপর আমি আমার আইডি থেকে তিশার আইডিতে যাই।

তিশার আইডি ভিজিট করে জানতে পারলাম তিশা সিঙ্গেল। মনে একটা প্রশান্তি ফিরে পেলাম যে পথটা ক্লিয়ার। আমার বাবার ক্ষমতা সম্পর্কে তুমি জানোই। বাবাকে বলে আমার চাকরীটা কুমিল্লায় ট্রান্সফার করালাম। এর আগে থেকেই আমি তিশার সাথে ফেসবুকে টুকটাক কথা বলা শুরু করলাম।

কমেন্টে দেখেছিলাম তুমি তিশাকে তিশু বলে ডাকো আর যেটা ওর খুব পছন্দ। তখন থেকে আমিও ওকে তিশু ডাকা শুরু করলাম। ও আমাকে তোমার কথাও বলেছিল। ধীরে ধীরে আমাদের চ্যাটিং থেকে ম্যাসেঞ্জার কল থেকে নাম্বার আদানপ্রদান হয়। যেদিন আমি কুমিল্লায় যাই সেদিন তুমি ঢাকায় আসো তাই না? আমি বাস থেকেই দেখেছিলাম তুমি বাস স্টপে বসেছিলে। তুমি ভেবেছিলে, তুমি বোরকা, নিকাব পড়ে থাকায় আমি তোমায় চিনতে পারিনি। কিন্তু তুমি ভুল।

আমি তোমার চোখ দেখেই তোমায় চিনতে পেরেছিলাম। ইচ্ছে করেই তোমাকে না চেনার ভান করেছিলাম। তোমার আরো কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য আমি তিশাকে বিয়ে করলাম। আমাকে ভালো না বাসার মতও কোনো কারণ ছিল না তিশার। আমি যত তোমার কাছে যেতে চেয়েছি তুমি ততই দূরত্ব রেখে চলেছো। আমি তোমার ক্ষতি করতে আসিনি পরী। আমি শুধু তোমাকে আমার করার জন্যই এসব করেছি। শাদাফের সাথে তোমার ঝগরার কথাও সব জানতাম আমি। কিন্তু তুমি এত প্রতিবাদী মেয়ে হয়েও সব মুখ বুজে সহ্য করেছিলে। যখন শুনলাম তুমি এখানে এসে পড়েছো তখন আমার মনে হলো, এখন আমি তোমাকে সব বলতেই পারি। পরী বিশ্বাস করো, আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি। তোমার বেবি নিয়েও আমার কোনো সমস্যা নেই। তোমার বেবিকে আমি আমাদের বেবির মতই বড় করবো। ওকে কোনো কষ্ট দিবো না আমি। তুমি শাদাফকে ডিভোর্সটা দিয়ে দাও। অনেক সুখে রাখবো তোমায়।

সুলতানের কথা শুনে কান দিয়ে ধোয়া বের হচ্ছিল পরীর। কেন যেন চোখ দুইটা টলমল করছিল। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দেয় সুলতানকে।
~ এতদিন জানতাম তুই একটা সাইকো কিন্তু এখন দেখছি তুই একটা জানোয়ার। তুই শাদাফের চেয়েও অনেক বেশিই নিকৃষ্ট। তুই তো একটা বেঈমান, প্রতারক। তুই তোর স্বার্থের জন্য সব করতে পারিস। শুধু মাত্র আমাকে পাওয়ার লোভে তুই একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতেও দুবার ভাবিসনি। তুই কি জানিস, মেয়েটা তোকে কতটা ভালোবাসে? তোরা ছেলেরা মেয়েদের কি ভাবিস একটু বলতো আমায়?

যখন ইচ্ছা যেভাবে খুশি সেভাবে নাচাবি? হাতের পুতুল পেয়েছিস? তুই যদি তিশাকে ভালোই না বাসতি তাহলে ফিজিক্যালি ইনভলভ্ কেন হয়েছিলি? নিজের পুরুষত্ব দেখাতে? আমি জানি তিশু ওর অধিকারের জন্য অনেক জোর করতো আর তুই এড়িয়ে যেতি। শেষমেশ তো পারলি না? তখন কিভাবে ওকে মেনে নিলি? একটা মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে থাকলে ভালোবাসা এমনিতেই জন্মে যায় আর তুই কিনা তিশুকে ভালোনাবেসে আমাকে ভালোবাসিস? যে মানুষ কাছের ভালোবাসাকেই চোখে দেখে না সে কি করে আমায় ভালোবাসতে পারে? একটা কথা শুনে রাখ, আমি শাদাফকে ডিভোর্স দিই বা না দিই কখনোই তোর মত বেঈমানকে আমার জীবনে ঠাই দিবো না। আমি এখনো শাদাফকেই ভালোবাসি। আমার বেবির বাবা শুধু শাদাফই বুঝতে পেরেছিস?

আরে বেঈমানের বাচ্চা তুই তো নিজেই বাবা হবি। কিছুক্ষণ আগেই তিশুর সাথে আমার কথা হয়েছে। তুই কি জানিস তিশু প্রেগন্যান্ট? মেয়েটা তোকে সারপ্রাইজ দিবে বলে অপেক্ষা করে আছে আর তুই এখানে এসেছিস আমাকে ভালোবাসার কথা বলতে? আসলে তোদের মত জানোয়াররা কারো ভালোবাসারই যোগ্য না। আর আমরা সেই তোদেরই ভালোবাসি। এখনো সময় আছে আমার ভূত নামা। আমাকে তুই কখনোই পাবি না। যে তোকে ভালোবাসে তাকে আপন করে নে। তিশাকে নিজের করে নে। অনেক তো পাপ করেছিস এবার তো অন্তত প্রায়শ্চিত্ত কর।

তোর অভিনিত ভালোবাসাকে সত্যি প্রমাণ কর। দয়া করে এখন আবার তিশা বা বাচ্চাটার ক্ষতি করার কথা ভাবিস না। মানুষ হয়ে থাকলে সব ভুলে তিশাকে নিয়েই সুখে থাক। মেয়েটাকে কষ্ট দিস না। তোর মত জানোয়ারকে কখনো ক্ষমাই করা যায় না। তিশা যদি এসব জানতে পারে তাহলে অনেক বেশিই হার্ট হবে। কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। আমি চাইনা তিশা কোনো রকম কষ্ট পাক তাও আবার এই সময়টাতে। যদি আমায় সত্যিই ভালোবেসে থাকিস তাহলে সেই ভালোবাসার দোহাই লাগে, আমাকে ভুলে যা। তিশাকে আপন করে নে। এই সময়টাতে ওকে তোর খুব প্রয়োজন। সব ভালোবাসার মানুষকে পেতে নেই। কিছু ভালোবাসা দূর থেকেই ভালো। কাছে পেয়ে গেলে এক সময় অনীহা এসে পড়ে। তিক্ততায় ভরে যায় একটি সুন্দর সম্পর্ক।

পরী আর কিছু বলতে পারলো না। অন্যরুমে যাওয়ার জন্য ব্যালকোনি থেকে রুমের দিকে পা বাড়াতেই দেখলো শিলা দাঁড়িয়ে আছে আর কাঁদছে। আচমকা পরীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

~ তুমি অনেক ভালো আপু অনেক ভালো। তুমি একটা বাস্তব কল্পনা। যার থেকে অনেক কিছু জানার আছে, শেখার আছে। ইউ আর গ্রেট আপু ইউ আর গ্রেট!
শিলাকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,

~ তিশা অনেক ভালো একটা মেয়ে। ওর সাথে কোনো অন্যায় হতে দিয়ো না। না হলে ওর সাথে সাথে তোমাদের পরিবারের প্রতিটা লোক আমার ঘৃণার দৃষ্টিতে রয়ে যাবে আর তিশার অভিশাপে। এখনো অনেক সময় আছে। নিজের ভাইকে বোঝাও। তিশাকে আপন করে নিতে বলো।
পরী অন্য রুমে চলে যাওয়ার পর শিলা সুলতানের কাছে গিয়ে বললো,
~ ভাইয়া, পরী আপু যা বলেছে সব ঠিক বলেছে। তোমার জন্য কেন ভাবী কষ্ট পাবে বলো? তাছাড়া তুমি এখন বাবা হবে। বাবুর দিকে তাকিয়ে হলেও পরী আপুকে ভুলে যাও। বাবুকে অনাথ করো না ভাইয়া। প্রথমে ভাবীকে মন থেকে না মানতে পারলেও বাবুর জন্য ঠিক পারবে দেখো। যখন বাবু তোমাকে আব্বু বলে ডাক দিবে তখন তুমি আগের সবকিছু ভুলে যাবে দেখো। চলো ভাইয়া ভাবীকে নিয়ে আসি প্লিজ।
সুলতান শিলাকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
~ যাবো বোন যাবো! পরীকে আমি ভালোবাসি সত্যিই কিন্তু তিশা আর আমার বাচ্চাকেও আমার ভালোবাসা আর ওদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবো না। পরীর কথাই রাখবো আমি।

পর্ব ৩৯

সুলতান তখনই কুমিল্লায় রওনা দেয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজাতেই তিশা দরজা খুলে দেয়। সুলতান ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বেডরুমে যায়। পিছন পিছন তিশাও যায়। সুলতান কি বলবে বা কি থেকে শুরু করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সুলতানকে অবাক করে দিয়ে তিশা জিজ্ঞেস করলো,
~ পরীর কাছে গিয়েছিলে?

কথাটা শুনে সুলতান যেন অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে গিয়েছে। তিশার মুখে তখনও হাসি লেগে আছে।
~ তুমি কি ভেবেছিলে রাফিন? আমি কিছুই জানিনা? আমি সব জানি রাফিন। সেদিন যে তুমি পরীর বাসায় পরীকে যা যা বললে আমি সব শুনেছিলাম ঐদিন। বিশ্বাস করো এত পরিমাণ কষ্ট পেয়েছিলাম যে, যেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। পরক্ষণে মনে হলো অতীতে তুমি কাউকে ভালোবাসতেই পারো কিন্তু তোমার বর্তমানটা তো আমি। আমার বিশ্বাস ছিল কিন্তু সেটা তোমার ওপর নয়। আল্লাহ্~ এর ওপর। তোমার উপর বিশ্বাসটা তো তুমি সেদিনই ভেঙ্গে দিয়েছো। আল্লাহ্~ এর উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, একদিন ঠিকই তুমি তোমার ভুলটা বুঝতে পারবে।
~ তুমি সব শুনতে পেরেও সেদিন কিছুই বলোনি!

~ হু বলিনি! কারণ আমি সেখানে সিনক্রিয়েট করলে ক্ষতিটা কার হতো? পরীর হতো। আর ওর ক্ষতি আমি কেন করবো? পরীর তো কোনো দোষ নেই। তাই আমি যদি ঠান্ডা মাথায়ও কিছু বলতাম তাহলে বিষয়টা নিয়ে পরী টেনশনে থাকতো। অবশ্যই টেনশনটা আমায় নিয়েই করতো। আমি চাইনি পরীর এমন অবস্থায় ওকে কোনো টেনশন দিতে। তাই সব শুনেও না শোনার ভান করেছি। আমি যদি বাড়িতে এসে তোমায়ও কিছু বলতাম তাহলে হয়তো তখনও হিতে বিপরীত হতো। আজ হয়তো দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা হয়ে যেতাম।

আর এই সব কিছুর জন্যই পরী নিজে ভেতরে ভেতরে গুমরে গুমরে মরতো। আসলে কি বলোতো, পরীকে নিয়ে যদি কিছু বলি তাহলে সেটা খুব ক্ষুদ্রই থাকবে। মেয়েটাকে কখনো কিছু দিয়ে ব্যাখা করা যাবে না। ওর ব্যাখা যেন ও নিজেই। কোনো ভাষায় ওকে বর্ণনাও করা যাবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা কি জানো? তুমি কিংবা শাদাফ কাকা তোমরা কেউই কখনো পরীকে ডিজার্ভ করো না। তোমরা কেউই ওর যোগ্য না। টাকা~ পয়সা সম্পত্তির ক্ষেত্রে হয়তো ও তোমাদের থেকে অনেক নিম্ন কিন্তু ওর যে পবিত্র একটা মন সেটার কাছে তোমরা খুবই নগণ্য। পরীর মন, ভালোবাসা, মানসিকতা, মনোবলের কাছে তোমরা শুধুই তুচ্ছ। শাদাফ কাকাও পস্তাচ্ছে।

কি লাভ হচ্ছে এখন বলো? আমি তো মনে করি, শাদাফ কাকা হয়তো নিশ্চয় কোনো ভালো কাজ করেছিল যার জন্য পরীকে নিজের জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছে। রাফিন, আমি হয়তো পরীর মত কখনোই হতে পারবো না। কারণ পরী অতুলনীয়। আমি কখনো পরীর জায়গাটাও নিতে চাই না। আমি পরীকে ভালবাসতেও বারণ করবো না। সব ভালোবাসা তো পূর্ণতা পায় না, পেতেও হয়না। কিছু ভালোবাসা দূর থেকেও পূর্ণতা অর্জন করতে পারে শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে। আমি শুধু চাই, তোমার বুকে নিজের জন্য একটু জায়গা নিতে। একটু ভালোবাসা পেতে। আমাদের বেবির অধিকার ভালোবাসা শুধু এইটুকুই চাই। দিবে আমায়?
সুলতানের কিছু বলার ভাষা নেই। শুধু তিশাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়।

~ দিবো তিশু দিবো। আমাদের বেবি আর তোমায় তোমাদের পূর্ণ অধিকার দিবো। নিজের অন্তর থেকে ভালোবাসবো। শুধু আমায় ক্ষমা করে দাও। তুমি ক্ষমা না করলে যে পরী আমায় সারাজীবন ঘৃণা করে যাবে। ভালোবাসার মানুষটিকে না পাই কিন্তু তার চোখে ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকাটা ভীষণ কষ্টকর তিশু।
~ তোমার ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই তাই ক্ষমা করারও প্রশ্নই আসেনা। পরী তোমাকে আর ঘৃণা করবে না দেখো তুমি।
~ আচ্ছা আমি যে পরীর কাছে গিয়েছি এটা কে বললো তোমায়?

~ ভালোবাসার টান রাফিন। আমি জানতাম অফিস ব্যতীত এতটা সময়ের জন্য তুমি কোথায় যেতে পারো। জানো রাফিন, আমি খুব করে চাই, আমাদের যদি মেয়ে হয় তাহলে যেন পরীর মত হয়।
~ আমিন।

রুমকির মা রুমকিকে সঙ্গে করে এসেছে শাদাফদের বাসায়। শাদাফের মায়ের কাছে যায় উনি আর রুমকি যায় শাদাফের কাছে।
~ আপা অলক্ষীটা তো চলে গেল এখনই কিন্তু সূবর্ণ সময়।

~ কার কথা বলছিস?
~ পরীর কথা। দেখো পরী তো বলেছেই যে ডিভোর্স দিবে। তাই এখন তো আমরা শাদাফের সাথে রুমকির বিয়েটা দিয়ে দিলেই পারি। পরে না হয় কোর্ট~ কাচারি করে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসবো। আর না হলে একটা বাচ্চা দত্তক এনে দিবো। ওরাও সুখী হবে।
~ শাদাফের অবস্থা ভালো না রে।

~ এজন্যই তো বলছি, রুমকির সাথে এখন বিয়েটা দিয়ে দেই। সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।
শাদাফ চিৎকার করতে করতে মায়ের রুমে আসে।
~ মা তোমাকে না বলেছি যে আমার রুমে কাউকে ঢুকতে দিবে না? তোমরা কি চাইছো আমি বাড়ি থেকে চলে যাই?
আর খালা, তোমায় বলছি তোমার মেয়েকে ডক্টর দেখাও। পাগল হয়ে গেছে রুমকি। কিসব বিয়ের কথা বলছে।
~ পাগল হবে কেন রে? রুমকি তোকে ভালোবাসে। তোদের বিয়ের কথাই বলছিলাম আমরা।

~ মানে? রুমকির সাথে কি তুমিও পাগল হয়ে গেছো? একটা কথা ভালো করে শুনে নাও, পরী ছাড়া আমার লাইফে দ্বিতীয় কোনো মেয়ে আসবে না। তাই অযথাই এসব পরিকল্পনা করে নিজেদের সময় নষ্ট করো না। আমি আমার পরীকে ঠিকই ফিরিয়ে আনবো।
শাদাফ চলে যাওয়ার পর রুমকির মা ঝাঝালো গলায় রুমকিকে ধমক দেয়।
~ কেমন ভালোবাসিস যে শাদাফকে আটকে রাখতে পারিস না?

আর আপা, শোনো শাদাফকে বোঝাও। একমাত্র তোমার কথাই শুনবে শাদাফ।
~ তুই শুনলি না শাদাফ কি বললো? পরী ছাড়া ওর জীবনে দ্বিতীয় কোনো মেয়েকে এলাও করবে না?
~ তুমি বললে ঠিক তোমার কথা রাখবে।
~ না। আমার এই কথা ও কখনোই রাখবে না।

~ কেন?
~ ওকে দেখলি না? ওকে দেখেই তো বোঝা গেল পরীর প্রতি করা সব অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত। তাছাড়া কয়েকটা মাস ধরে তো আমি শাদাফকে দেখছি। পরীকে ও কতটা ভালোবাসে সেটা শুধু শাদাফই নয় আমিও বুঝতে পেরেছি।

~ তাহলে কি চাইছো তুমি?
~ পরী শাদাফের কাছে ফিরে আসুক। প্রয়োজনে আমি নিজে যাবো পরীর কাছে। তবুও চাই শাদাফ ভালো থাকুক পরীকে নিয়ে। পরী যে শাদাফের জান সেটা বুঝতে আর বাকি নেই আমার। আর আমি মা হয়ে কি করে নিজের ছেলের থেকে জান কেড়ে নেই বল?
~ দেখো আপা, যদি রুমকির সাথে শাদাফের বিয়ে না দাও তাহলে আজকের পর থেকে তোমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ আমার। আমার যে বড় কোনো বোন আছে সেটাও ভুলে যাবো আমি।

~ তাহলে বলবো তুই বরং এটাই কর। তোর সাথে সম্পর্ক থাকলে আবার তোর প্ররোচনায় পড়ে পরীর ক্ষতি চাইবো হয়তো। তাই শয়তান থেকে দূরে থাকাই ভালো। আর কোনো অন্যায় করতে চাই না। আজ থেকে আমি এটাই জানবো যে, আমার ছোট বোন মারা গিয়েছে। তোরা এখন আসতে পারিস।
রুমকিকে সাথে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায় শাদাফের খালা।

রওশানদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে শাদাফ আর রওশান।
~ দেখ দোস্ত, পরীর সাথে বাড়াবাড়ি রকমের অন্যায় করে ফেলেছিস তুই। অত্যাচার তো কম করিসনি। এরপরও পরী তোকে ক্ষমা করবে?
~ আমি জানি আমি অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছি। এটাও জানি যে এর ক্ষমা করাটা হয়তো অনেক কঠিন। কিন্তু দোস্ত বিশ্বাস কর, আমি এটা ঢের বুঝতে পেরেছি পরীকে ছাড়া আমার চলবে না। আমার সবটাজুড়ে পরীর অস্তিত্ব। যে করেই হোক, আমি পরীকে ফিরিয়ে আনতে চাই।
~ তুই একা গেলে পরী তোর মুখও দেখবে বলে মনে হয়না।
~ তাহলে?

~ কি আর করার বল? তোর উপর আমার নিজেরই তো রাগ হচ্ছে। কিন্তু বন্ধুর বিপদে যদি না থাকতে পারি তাহলে কিসের বন্ধু হলাম বল?
শাদাফ রওশানকে জড়িয়ে ধরে।
~ সত্যিই তোদের মত বন্ধু যেন সকলেরই হয়।
~ এখন চল শালা। আমি আদিল, রেখা আর জান্নাতকে ম্যাসেজ দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি ওরা যেন বাসস্টপে থাকে। ওখান থেকে একসাথে পরীর বাসায় যাবো।
~ ঠিক আছে চল।

পরী বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোনে গান শুনছিল। পরীর অনেক ভালো লাগার একটি গান।
“আমার একলা আকাশ থমকে গেছে, রাতের স্রোতে ভেসে!
শুধু তোমায় ভালোবাসে।
আমার দিনগুলো সব রঙ চিনেছে,
তোমার কাছে এসে,
শুধু তোমায় ভালোবেসে!

তুমি চোখ মেললেই ফুল ফুটেছে,
আমার ছাদে এসে
ভোরের শিশির মুখ ছু্ঁয়ে যায়, তোমায় ভালোবেসে।
আমার একলা আকাশ থমকে গেছে
রাতের স্রোতে ভেসে,
শুধু তোমায় ভালোবেসে!”

গানটা শুনলে মনের ভেতর শীতল হাওয়া বয়ে যায়। একধরণের ভালোলাগা কাজ করে। কিন্তু এভাবে বসে থাকতে থাকতে খুব বোর লাগে। মেজাজও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। এই রেগে যায় আবার ঠিক হয়ে যায়। এমন সব অদ্ভুত কাণ্ডের মানে পরীও বুঝতে পারে না। পরীর মা এক বাটি চিকেন স্যুপ নিয়ে আসে।
~ ধর খেয়ে নে এটা।
~ একটু আগেই না ভাত খেলাম?
~ তাতে কি হয়েছে? সবসময় খাওয়ার ওপরই থাকবি।
~ ভালো লাগে না মা।

~ কিসের ভালোলাগে না হ্যাঁ? এই সময়েই তো মেয়েদের বেশি বেশি খেতে ইচ্ছে করে। আমি কোনো কথা শুনবো না। চুপচাপ খেয়ে নিবি এটা।
~ না, না, না।
~ খাবি না তো?

~ উহুম!
~ আচ্ছা। ভেবেছিলাম আজ চালতার আচার বানিয়ে দিবো। এখন যখন তুই স্যুপ খাবি না তাহলে বানাবোও না আচার।
~ কে বললো আমি স্যুপ খাবো না? দরকার হলে আরো তিন বাটি স্যুপ আমি এখনই খেয়ে নিবো। দাও তুমি আমায়।
মেয়ের এমন পাগলামি দেখে পরীর মা হেসে দেয়।
~ তুই খা। আমি আচার বানাই তোর জন্য।
~ ওমা! শুনোনা।

~ বল।
~ আমি না কেমন যেন হয়ে গিয়েছি।
~ কেমন?
~ এইযে অল্পতে কেমন রেগে যাই। মেজাজটাও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গিয়েছে।
~ এই সময় এমন হয়ই। খা তুই।

রাতঃ ৮:৫ মিনিট
সোফায় বসে টিভি দেখছিল আর আচার খাচ্ছিলো পরী। পরীর বড় ভাই পাশে বসে পরীকে খোঁচাচ্ছে আচার দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরীর এক কথা, কিছুতেই আচার শেয়ার করবে না। পরীর মা কত করে ছেলেকে বললো, বয়ামে আরো আচার আছে ওখান থেকে নিয়ে খেতে কিন্তু পরীর ভাইয়া নারাজ। সে পরীর থেকে নিয়েই খাবে।

~ ভাইয়া তুমি এত ছোঁচা কেন?
~ এখানে ছোঁচার কি হলো? আমি তোর ভাই না? আমি তোর থেকে আচার নিয়ে খেতেই পারি।

দুই ভাই~ বোনের খুনসুটিময় ঝগরার সময় কলিংবেলের আওয়াজ হয়। পরীর ভাই দরজা খুলতে গেলে পরী বলে,
~ তুমি বসো। আমি খুলে দিচ্ছি। আজকে তো আপু আর দুলাভাইর আসার কথা। নিশ্চয় ওরা আমার জন্য মজা নিয়ে আসবে।
আচারের বাটিটা রেখে পরী দরজা খুলতে গেল। ইচ্ছে করেই পরী দরজা খুলতে গেল যাতে এই সুযোগে পরীর ভাই আচার খেতে পারে। বিষয়টা ভেবেই পরী মিটিমিটি হাসছে। দরজা খুলে দিতেই হাসিটা বিলীন হয়ে যায়। পরীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে রওশান, আদিল, রেখা, জান্নাত আর শাদাফ। শাদাফকে দেখেই পরীর বুকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়।

পর্ব ৪০

পরীর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে। জান্নাত পরীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
~ কেমন আছিস পরী?
~ ভালো আছি। তুমি?
~ ভালো। ভেতরে বসতে দিবি না?
পরী একবার শাদাফের দিকে তাকালো। তারপর বললো,
~ হুম। আসো।

সকলেই ভেতরে গিয়ে বসলো। শাদাফকে দেখে পরীর ভাইয়ের মাথায় আগুন ধরে যায়। পরী চোখের ইশারায় ভাইকে চুপ থাকতে বলে। কিছু বলতে না পেরে গটগট করে রুমে চলে গেল। পরী গেল রান্নাঘরে মায়ের কাছে।
~ কিরে তুই রান্নাঘরে আসছিস কেন? কিছু লাগবে?
~ চা বানাও।
~ কেন? কেউ এসেছে?
~ হুম। শাদাফ আর ওর বন্ধুরা।
~ কিহ্! শাদাফ এসেছে?

~ হুম। কিছু বলার দরকার নেই। শুধু নাস্তা নিয়ে চলো।
মায়ের সাথে একেবারেই ড্রয়িংরুমে যায় পরী। শ্বাশুরীকে দেখে শাদাফ শ্বাশুরীর পা ধরে মাফ চায়।
~ আমাকে মাফ করে দিন মা। সেদিনের ঐসব ব্যবহারের জন্য আমি খুবই দুঃখিত। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন।
পরীর মা শাদাফকে সরাতে চাইলেও শাদাফ সরে না। পা ধরেই বসে থাকে। পরীর বাবা এসে শাদাফকে তোলে।

~ সেই অন্যায়ের জন্য পরীর মা তোমাকে ক্ষমা করলেও পরীর প্রতি করা অন্যায়ের কোনো মাফ হয় না শাদাফ।
ছেলে মানুষদের কাঁদতে নেই সবার সামনে। তবুও শাদাফ নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। শ্বশুরের হাত ধরে কেঁদে ক্ষমা চায়।
~ এই যে আজ তুমি যেভাবে কাঁদছো, আমিও ঠিক সেভাবেই কেঁদেছি যখন তুমি আমার ছোট্ট মেয়েটাকে দিনের পর দিন অত্যাচার করেছো। কষ্ট দিয়েছে। আমার মেয়ের গায়ে আমি কখনো হাত তুলিনি। পুতুলের মত করে বড় করেছি। শুধু মাত্র তোমার জন্য, তোমাকে ভালোবেসে আমার মেয়েটা বাড়ি ছাড়তে দুবারও ভাবেনি। সেই তুমি এমন একটা সময়ে আমার মেয়েকে কষ্ট দিয়েছো। কেন শাদাফ? তোমার বুক কাঁপেনি একবারও?

~ দয়া করেন বাবা। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। পরীকে ছাড়া যে আমি নিঃস্ব বাবা!

শাদাফের সব বন্ধুরা পরীর বাবা~ মাকে বোঝাচ্ছে আর পরী পাথরের মত দাঁড়িয়ে সব দেখছে। দেখছে শাদাফের আকুলতা। পরীর কষ্ট হচ্ছে কিন্তু প্রকাশ করছে না।
শাদাফের বন্ধুদের জন্য এখনো ওদের বাড়ি থেকে যেতে বলতে পারছে না।
রাতঃ ১১টা

কলিংবেল বাজতেই সকলে একটু চুপ হয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে সকলেই পরীর পরিবারকে বোঝাচ্ছিল। পরীর দুই খালামনি, নানুও উপস্থিত এখানে। এত রাতে তাহলে আর কে আসবে। পরী গিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল। শাদাফের বাবা~ মা, বড় ভাই আর ভাবী এসেছে। পরীকে আরো অবাক করে দিয়ে শ্বাশুরী পরীকে জড়িয়ে ধরে। সকলের চোখেই যেন বিষ্ময়। সবাই পরীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। ড্রয়িংরুমটা এখন আলোচনার কক্ষ হয়ে গিয়েছে। পরী শুধু চেয়ে চেয়ে সবার কথা শুনছে। পরীর শ্বাশুরী আকুতি ভরা কণ্ঠে বললো,

~ বেয়াই, আমরা পরীর উপর অন্যায় অত্যাচার করেছি সেটা আমরা স্বীকার করি। দেঁড়িতে হলেও আমরা আমাদের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। পরীকে ছাড়া আমার বাড়িটা অসম্পূর্ণ। আর শাদাফও পরীকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না। তাছাড়া নতুন একটা সদস্য আসতে চলেছে। তার ভবিষ্যৎটা অন্তত একটু ভাবুন দয়া করে। বাচ্চাটার জন্য হলেও সব মিটমাট করে নিন।

~ দেখেন এখন আপনাদের এসব মনে পড়ছে। কিন্তু ওকে টর্চার করার পর এসব মনে পড়েনি? শাদাফকে আমার মেয়ে এখনোও বুঝতে পারেনা। আপনার ছেলে পরবর্তী সময়েও যে এমন কিছু করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে?

~ তার গ্যারান্টি আমি ভাই। আমার জন্যই মূলত শাদাফ এমন করতো। কিন্তু আমি তো আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছি এখন। আমি কথা দিচ্ছি আর কোনো ঝামেলা হবে না সংসারে।
সকলের বোঝাপড়া, কথা শেষে পরীর পরিবার অনেকটা রাজি হলো সব ঠিকঠাক করতে। পরী এতক্ষণ যাবৎ চুপ করেই ছিল। এবার বললো,
~ তোমাদের কি বলা শেষ?

শাদাফ উঠে গিয়ে পরীর হাত ধরলো,
~ আমায় ক্ষমা করে দাও পরী। সব ভুলে চলো জীবনটাকে নতুন করে সাজাই আমাদের বাবুকে নিয়ে।
পরী হাতটা ছাড়িয়ে নেয়।
~ স্যরি মিষ্টার শাদাফ। আমি কোনো পুতুল নই যে, আপনাদের মর্জিমত চলবো। তাছাড়া অনেক রাত হয়ে গিয়েছে আমাকে ঘুমাতে হবে। আপনারা সবাই এখন আসতে পারেন।

কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের রুমের দিকে যাওয়া শুরু করলো। অর্ধেক গিয়ে আবার ফিরে আসলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ এত রাতে উনারা কুমিল্লায় যেতে পারবেনা। বাবা~ মা, ভাই~ ভাবির থাকার জায়গা খালামনিদের বাসায় করে দাও।
আর কারো কোনো কথাই শুনলো না। রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজার কাছে গিয়ে শাদাফসহ পরীর বাবা~ মা সবাই অনেকবার ডেকেছে কিন্তু পরী দরজা খোলেনি।
একসময় দরজায় কড়া নাড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির সব লাইট বন্ধ হয়ে যায়।

ঘুম আসছিল না বিধায় ব্যালকোনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। নিচে তাকাতেই ল্যাম্পপোস্টের আলোয় শাদাফকে দেখতে পায়। বাড়ির সামনে খোলা একটা জায়গা আছে। বাচ্চারা খেলাধুলা করে ওখানে। ছোট্ট একটা মাচাও পাতা আছে ওখানে। শাদাফ মাচার ওপরই বসে আছে। পরীর বাবা~ মা সবার থাকার ব্যবস্থাই করেছে পরীর খালামনির বাসায়। সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর শাদাফ পরীর বাড়ির সামনে এসে বসে আছে। অজান্তে চোখ দিয়ে পানি এসে পড়ে।
“কষ্ট আমারও হয় শাদাফ!”

পরী বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। একসময় ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।
সকালে দরজায় ঠকঠকানির শব্দে পরীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১টা বাজে।
~ বাপ্রে! এত ঘুমিয়ে ফেলেছি!
দরজা খুলে দেখে তিশা আর সুলতান এসেছে।

~ তোমরা? কখন এলে?
তিশা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
~ ভোরেই এসেছি ঢাকায়। তুমি না খেয়ে এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছো?
~ আসলে কাল দেড়িতে ঘুমিয়েছি তো তাই। তোমরা বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।

পরীর মা তিশা আর পরীর জন্য আলাদা নাস্তা বানিয়ে আনে আর সুলতানের জন্য গরম কফি। তিশা পরীর মাকে সালাম করে বলে,
~ কেমন আছেন?

~ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
~ পরীর জন্য এখন অনেক ভালো আছি। ওর জন্যই তো আমার জীবনটা স্বাভাবিক ও সব ঠিকঠাক হলো।
পরীর মা বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
~ কিন্তু ওর জীবনটাই এখনো অস্বাভাবিক করে রাখলো!

~ চিন্তা করবেন না। আমরা ওকে বোঝাবো।
পরী ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসে। এরপর শুরু হয় সুলতান আর তিশার বোঝানো। পরী শুধু চুপচাপ খাচ্ছে আর ওদের কথা শুনছে। মোট কথা এক কান দিয়ে ঢুকাচ্ছে আর অন্য কান দিয়ে বের করছে।

ওদের বোঝানো শেষ না হতেই আদিল, রেখা, জান্নাত, রওশান আর ওর শ্বশুর~ শ্বাশুরী এসে হাজির হয়। সকলের এমন বোঝাপড়ায় পরী অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এমনিতেই এই সময়টায় মুড সুয়িং হয় তার মধ্যে এখন এসব কথাবার্তা পরীর কাছে বিরক্তই লাগছে। নিজেকে সংযত রেখে অসহায় ভাবে মায়ের দিকে তাকালো। নিজেই বললো,

~ আমি এখন একা থাকতে চাই।
সবাই পরীর অবস্থাটা বুঝতে পেরে চুপ হয়ে যায়। একে একে সবাই রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। এখন রুমে শুধু পরীর মা আর শ্বাশুরী। শ্বাশুরী পরীর হাত ধরে বললো,

~ আমাদের ওপর অনেক ক্ষোভ জমে আছে তাই না রে? একটা কথা তাহলে তুমিও ভালো করে জেনে রাখো, আমার বাড়ির বউকে না নিয়ে আমরা এখান থেকে যাচ্ছি না। আমরা অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।

শ্বাশুরী চলে যাওয়ার পর মা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। বুকশেলফ থেকে একটা বই নিয়ে পরী পড়া শুরু করলো। বই ধরতেই সেদিন শাদাফের আচরণের কথা মনে পড়ে যায়। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। মুহূর্তেই নিজেকে শক্ত করে বলে, “না আমি কাঁদবো না। আমি পড়াশোনাও ছাড়বো না।

বিয়ের পর যারা পড়াশোনার বিরুদ্ধে তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিবো ইচ্ছাশক্তি থাকলে বিয়ের পরও পড়াশোনা সম্ভব। আমি আমার বাবুকেও মানুষ করবো আর নিজেও প্রতিষ্ঠিত হবো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের হাতে আর নিপীড়িত হওয়ার সুযোগ দিবো না। সকলের মন যুগিয়ে চলার জন্যও আমার জন্ম হয়নি। প্রয়োজনে আমি ন্যাশনাল ভার্সিটিতে ভর্তি হবো তবুও আমার পড়াশোনা আমি চালিয়ে যাবো। এসব কুসংস্কারের ধার ধারলে চলবে না।”
বইটা পড়া শুরু করতেই প্রতিবেশী কয়েকজন আন্টি আসে। এরা পরীকে খুব ভালোবাসে। পরী সকলকেই সালাম দেয়।
~ কেমন আছিস মা?
~ ভালো আছি। তোমরা সবাই কেমন আছো?
~ ভালো আছি। শোন মা, তোকে কিছু কথা বলতে আসলাম।

~ বলো না! কি বলবে।
~ দেখ মা, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আমরা সব শুনেছি। ছেলেটা কেমন কান্নাকাটি করছে। পাগলের মত ঘুরছে। বলছিলাম বাচ্চাটার কথা একটু ভাব। বাচ্চার কথা ভেবে ওকে ক্ষমা করে দে।

পরী মনে মনে বলছে, “এই ছেলে তো দেখছি খুব প্যারায় ফেলছে আমায়। সবাইকে একদম হাত করে নিয়েছে।”
বিকেলে খাওয়া শেষ করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করে তখনই নিশান আর ওর বাবা~ মা আসে। ওদের দেখে পরী খুব খুশি হয়। সাক্ষাৎ বিনিময় শেষ হলে ওদেরও সেই একই কথা শুরু হয়।”শাদাফকে ক্ষমা করে দাও। ক্ষমা করে দাও”
পরী কৌশলে ওদের রেষ্ট করতে বলে অন্যরুমে নিয়ে যেতে বলে মাকে।

পরী এবার তিক্ত হয়ে যায় আর নিজেই নিজেকে বলে, “আর কেউ বাকি নেই আমাকে বুঝানোর? আমাকে বুঝানোর জন্য সেই কুমিল্লা থেকে নিশানকে আনতে পর্যন্ত ভুলেনি। নাছোরবান্দার পিছ ছাড়বে না সহজে। ইচ্ছে করছে গলা টিপে মেরে ফেলি। এত প্যারা আর সহ্য হচ্ছে না।”
কথাগুলো বলতে বলতেই বিছানা থেকে বালিশটা নিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। পরীর মা তখন রুমে আসছিল।
~ কি শুরু করলি এসব?
~ তার আগে তোমরা বলো আমার সাথে কি শুরু করেছো তোমরা? পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।
পরীর মা ড্রেসিংটেবিল থেকে নবরত্ন তেল নিয়ে পরীর কাছে যায়।
~ এখানে বস।

পরী লক্ষী মেয়ের মত বসে পড়ে। যত্ন করে মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। একটু একটু করে মাথাটা ঠান্ডা হয়। রাগ এখন একদম কমে গিয়েছে। চুলগুলো সুন্দর করে আঁচরে দিয়ে একটা হাতখোপা করে দেয়। এরপর পরীকে শুইয়ে দিয়ে চুলের ভেতর হাত দিয়ে বিলি কাটতে থাকে।
~ মা রে, আমার কথায় রাগ করিস না। আমি তো মা, তোর ভালো চাই সবসময়। বিয়ের পর ছোট বয়সটায় তুই অনেক কষ্ট সহ্য করেছিস। কিন্তু একটা কথা কি জানিস, একটা মেয়ের ভুল খুব সহজেই মানুষের চোখে পড়ে কিন্তু একটা ছেলের হাজার ভুলও চোখকে ফাঁকি দিতে পারে। তুই তো মেয়ে, ডিভোর্স হলে মানুষ তোর দিকেই আঙ্গুল তুলবে। শাদাফের দিকে না। তাছাড়া তোর বয়সটা এখনো অনেক কম।

এভাবে সঙ্গিহীন জীবন কাটানোও সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথাটা হলো, তোর মধ্যে এখন আরেকটা প্রাণ বেড়ে ওঠছে। যার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। ডিভোর্স হলে তোর সাথে সাথে ওর জীবনটাও নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া শাদাফ আর ওর পরিবার ভুল বুঝতে পেরেছে ক্ষমাও চেয়েছে। তাই তোর উচিত বাচ্চার উজ্জল ভবিষ্যতের কথা ভেবে শাদাফকে ক্ষমা করে দেওয়া। আমার মনে হয় এবার তুই ঠিক সুখী হবি। জীবনে চলার পথে তো কত বাঁধাই আসবে, ঝড় আসবে। এখন সেই ভয়কে যদি আঁকড়ে ধরে থাকিস তাহলে জীবনে সফলতা আনবি কিভাবে? আমি তোর উপর জোর করবো না। জীবনটা তোর আর সিদ্ধান্তও তোর। তুই প্রচন্ড বুদ্ধিসম্পন্ন একটি মেয়ে। আমি জানি তুই কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিবি না।
পরীর কপালে একটা চুমু দিয়ে উনি রুম ত্যাগ করেন

পর্ব ৪১

বিছানায় বসে বসে সবার বলা কথাগুলোই ভাবছে পরী। পরী যে এখনো শাদাফকে ভালোবাসে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কি করবে না করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না পরী। মাথা কাজ করছে না। পেটের দিকে তাকাতেই মনে হচ্ছে বাবু বলছে, “বাবার আদর, ভালোবাসা থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না মা”
পরীর বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। দোটানায় পড়ে গিয়েছে পরী।

রাতঃ১০টা
পরীদের বাড়ির সামনে যে খোলা জায়গাটা রয়েছে সেখানে শাদাফ বসে আছে। শুধু শাদাফ একা নয়। সাথে আছে আদিল, রেখা, রওশান আর জান্নাত। আদিল শাদাফের কাঁধে হাত রেখে বললো,
~ এভাবে আর কতক্ষণ এখানে বসে থাকবি?

~ যতক্ষণ না পরী আমাকে ক্ষমা করবে। শোন, তোরা এখানে আর বসে থাকিস না। বাসায় যা।
~ বাসায় যাবো মানে কি? তোর খারাপ সময়ে যদি পাশে থাকতে না পারি তাহলে কিসের বন্ধু আমরা?
~ আমার সৌভাগ্য যে আমার খারাপ সময়ে আমি তোদের সবাইকে পাশে পাচ্ছি। কিন্তু পরীর খারাপ সময়টাতে ও কাউকে পাশে পায়নি। কারো সাথে কিছু শেয়ারও করেনি। কেউ যেন আমার বা আমার পরিবারের দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে সেজন্য সব নিজে মুখ বুজে সহ্য করে গিয়েছে।
জান্নাত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

~ জানিস দোস্ত আমি কখনো ভাবতেও পারিনি পরী এতটা চাপা স্বভাবের। ওকে তো আমি ছোট থেকেই দেখছি। খুব চঞ্চল আর প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। ও সবসময় সরাসরিই কথা বলে। হোক সেটা খারাপ বা ভালো। ও যা সবসময় তাই প্রকাশ করেছে সকলের কাছে। ওর পরিবার থেকে কখনো দেখিনি ওকে কষ্ট দিতে। ওরা মধ্যবিত্ত হলেও ও কিছু চাওয়ার আগেই সব হাজির করতো।

ও হাসলে পুরো বাড়িটা যেন হাসিতে মেতে থাকতো। খুব অল্পতেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে। সত্যি বলতে কি একটা কথা জানিস, আমার মা আমার থেকেও পরীকে বেশি ভালোবাসতো। আমি যখন জেলাস ফিল করতাম তখন পরী হেসে কুটিকুটি হয়ে যেত। হাসতে হাসতে সেই আমার উপরই গড়িয়ে পড়তো আর বলতো “তুমি কি হিংসুটে বুড়ি গো আপু” ওর এমন হাসিতে আমার জেলাস কখন যে পানি হয়ে যেত কে জানে। আমিও ওর হাসির সাথে যোগ দিতাম। আর সেই মেয়ে কি না এতটা কষ্ট সহ্য করেছে।

~ সব আমার দোষ দোস্ত! আমার জন্যই পরীকে এত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলছি, যদি একটা শেষ সুযোগ আমি পাই তাহলে কথা দিচ্ছি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমি পরীকে ভালোবাসবো, ভালো রাখবো। সন্দেহ, ভুল বোঝাবোঝি সব মন থেকে ঝেড়ে ফেলবো।
~ ইনশাআল্লাহ্‌ ভালো কিছুই হবে।

রাতঃ১১টা
পরীর চোখে এখনো ঘুম নেই। পাশে মা, আপু আর আলভী শুয়ে আছে। বাড়ি ভর্তিই তো এখন মেহমান। আসলে মেহমানও ঠিক বলা যাচ্ছে না। এত মানুষ দেখে যে কেউ ভাববে এটা নিশ্চিত কোনো বিয়ে বাড়ি। আস্তে করে বিছানা ছেড়ে পরী ব্যালকোনিতে যায়। পরীর মন বলছিল শাদাফ বাড়ির সামনেই থাকবে। ব্যালকোনিতে গিয়েও ঠিক তাই দেখলো। পরীর মেজাজটা বিগড়ে গেলো। আর এসব সহ্য করা যাচ্ছে না। কিছু একটা করতেই হবে।
দরজা খুলে পরী ড্রয়িংরুমে গেল। ড্রয়িংরুম থেকে সোজা রান্নাঘরে যায়।

হঠাৎই রওশান, আদিল, রেখা, জান্নাত প্রত্যেকের ফোনে একটা করে টেক্সট আসে। কিছুক্ষণ পর ওরা ওঠে পড়ে।
~ দোস্ত আমাদের খুব খিদে পেয়েছে। আমরা দেখে আসি আশেপাশে কোনো দোকান খোলা আছে নাকি।
~ আচ্ছা যা।

নিশান টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। রান্নাঘরের লাইট জ্বলতে দেখে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। পরীকে দেখে চমকে যায়।
~ আপুউউ!

~ কে! ওহ তুই?
~ এত রাতে রান্নাঘরে কি করছো তুমি?
~ নাগিন ডান্স দিচ্ছি।
~ এ্যা?

~ এ্যা এ্যা করিস কেন? রান্নাঘরে কি করে মানুষ?
নিশান মাথা চুলকে বললো,
~ রান্না করে।
~ তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন?

~ এই আপু তুমি এটা কি বানাচ্ছো?
পরী হাত দিয়ে নিশানের মুখ আটকে ধরে।
~ চুপ! একদম আর কোনো কথা বলবি না। চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে দেখ, আমি কি করি!
পৌনে বারোটা বেজে গিয়েছে। নিশানের পেটে অনেকগুলো প্রশ্ন জমে আছে কিন্তু ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে না। নিশানকে দেখে বিষয়টা বুঝতে পারে পরী। মুচকি হেসে বলে,
~ একটুপরই সব প্রশ্নের উত্তর পাবি। এখন শুধু চুপটি করে বসে থাক।

১১টা ৫৮ মিনিট। নিশানের হাতে বড় একটা পেপার। কিন্তু গিফ্ট পেপার দিয়ে মোড়ানো। পরীর হাতে একটা বাক্স। নিশানকে নিয়ে মেইন দরজা খুলে বাহিরে যায়। এতক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে সবটা দেখছিল পরীর মা। পরী কি করতে চলেছে সেটা বুঝতে পারছেন না তিনি। পরীর রুমে ব্যালকোনিতে চলে যান। ওখান থেকে নিচে সবটাই পরিষ্কার দেখা যায়। বাহিরে যেতে যেতে বারোটা বেজে যায়। পরীকে দেখে অবাক হয়ে যায় শাদাফ।
~ পরী! তুমি এত রাতে এখানে?

~ কুকুরের মত বাড়ির সামনে বসে কেন থাকো? তুমি কি ভেবেছো এভাবে বাড়ির সামনে বসে থাকলে আমি গলে পানি হয়ে যাবো? আর কতবার ক্ষমা করবো তোমায়? একটা কথা পরিষ্কার করে শুনে রাখো, আমি তোমাকে ভালোবাসি না শাদাফ।
পরীর কথা শুনে শাদাফের চোখে পানি এসে পড়ে।

~ আমাকে ক্ষমা করে দাও পরী। শেষবারের মত আমায় ক্ষমা করে দাও। কথা দিচ্ছি আর কখনো এমন হবে না। আমি তোমার পায়ে ধরছি।
কথাটা বলেই শাদাফ পরীর পা ধরতে যায়। পরী সাথে সাথে দুই পা পিছিয়ে যায়।
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ”

অশ্রুশিক্ত চোখ নিয়ে শাদাফ পরীর দিকে তাকায়। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। শাদাফ তখনও মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। শাদাফের বন্ধুরা এত্তগুলা বেলুন ফুলিয়ে নিয়ে এসেছে আর সাথে মোমবাতি আর বাজি। বেলুন আর বাজি ফুটাচ্ছে আর সকলে একসাথে বলছে, “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ শাদাফ”
মাটি থেকে শাদাফ উঠে দাঁড়ায়।

~ তার মানে তোদেরও মনে ছিল আজ আমার জন্মদিন?
~ একদম না। পরী আমাদের সবাইকে ম্যাসেজ দিয়েছিল, আমরা যেন দোকান থেকে বেলুন, মোমবাতি নিয়ে আসি। তোকে যেন কিচ্ছু না জানাই। আর পরী এটাও বলে দিয়েছিল, ওকে যেন উল্টো কোনো প্রশ্ন না করি। এখন তোর সাথে আমরাও সারপ্রাইজড!
~ বাব্বাহ্! আমাদের ছাড়াই জন্মদিন পালন করা হচ্ছে?

পেছনে তাকিয়ে দেখে পরী আর শাদাফের পরিবারের সবাই। সাথে সুলতানের পরিবার, সুলতান আর তিশাও আছে।
পরী মাথা নিচু করে হেসে দেয়। সকলেই কেক কাটার জন্য তাড়া দিলো। নিশান এবার বললো,
~ এইজন্যই তাহলে এতরাতে কেক বানানো হচ্ছিল?
~ হুম।
কেক কাটার পর পরী শাদাফকে কেক খাইয়ে দেয়। সকলেই অনেক খুশি হয় পরী শাদাফকে ক্ষমা করে দিয়েছে তাই। শাদাফ পরীর হাত ধরে বললো,
~ আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো!

~ কে বললো আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি? আর তোমরা সবাই কি ভেবেছো, উইশ করেছি মানে আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি? হাহাহা। এখনো বড় সারপ্রাইজ তো বাকিই আছে মিষ্টার শাদাফ!

পরীর কথা শুনে সবার মুখের হাসি বিলীন হয়ে যায়। আনন্দের আমেজ সব শেষ হয়ে যায়। পরীর হাত ধরে রাখলেও শাদাফের হাতটা হালকা হয়ে যায়। অস্ফুট স্বরে বলে,
~ তা তাহলে তু তুমি কি আমায় ক্ষমা করতে পারোনি পরী?

পরী আর উত্তর দিলো না। শাদাফে হাতে গিফ্ট পেপার দিয়ে মোড়ানো প্যাকেটটা দিলো। শাদাফ কাঁদতে কাঁদতে বললো,
~ কি আছে এটাতে? ডিভোর্স পেপার? তুমি আমায় ডিভোর্স দিবে? আমি মানিনা এটা আর মানবোও না। ছিড়ে ফেলবো আমি এই ডিভোর্স পেপার। আমাকে ছেড়ে যেতে দিবো না তোমায়। আল্লাহ্ ছাড়া কেউ তোমায় আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। আর এটা তো সামান্য একটা কাগজ। এটা তো আমি এখনই ছিড়ে ফেলবো।

টেনে গিফ্ট পেপারটা ছিড়ে ফেলে। ভেতরের কাগজটা ছিড়তে যাবে তখন হাত থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে। নিচে তাকিয়ে হাতে থাকা ছিড়তে যাওয়া কাগজটা দেখে।

~ এটা তো ডিভোর্স পেপার নয়! মেডিকেল রিপোর্ট!
মাটি থেকে কাগজটা তোলে। খামের মত বড় কাগজটা থেকে আল্টাসোনোগ্রাফির কাগজ বের হয়। যেটাতে বাবুর আকৃতি দেখানো হচ্ছে। ছলছল চোখে পরীর দিকে তাকায়।
~ পরী!

~ এটা আল্টাসোনোগ্রাফির কাগজ। আমাদের মেয়ে হবে। তুমি কি ভেবেছিলে, ডিভোর্স দিবো? এত সহজ ডিভোর্স? আমার ভালোবাসা এতটা ঠুনকো নয় যে সামান্য ঝড়েই ভেঙ্গে যাবে। যে ভালোবাসতে পারে সে ক্ষমাও করতে পারে। আমিও যদি তোমার মত আচরণই করি তাহলে আমাদের পার্থক্য থাকলো কোথায়? একটা মেয়ে যখন মা হয় তখন সবার আগে সে তার বাচ্চার কথা ভাবে। একদিকে আমার ভালোবাসার মানুষ আর অন্যদিকে আমার বেবি। আমি কি করে ছাড়তাম তোমায়?

শাদাফ একা নয় সবার চোখেই পানি চলে এসেছে। শাদাফ পরীকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
~ আমাকে ক্ষমা করে দাও পরী ক্ষমা করে দাও। আমি কথা দিচ্ছি, আমি কখনো এমন করবো না। বেষ্ট হাজবেন্ড হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। তুমি যে আমার কতটা জুড়ে রয়েছো সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। অনেক ভালোবাসি তোমায় অনেক। সকলের সামনে আজ আমি গর্বের সাথে চিৎকার করে বলছি, সত্যিই আমি ভাগ্যবান এমন একটা তুমি পেয়ে। প্রত্যেকটা ছেলে যেন তোমার মতই কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পায়। এতদিন তুমি বলতে না যে, তোমার আমি? এটা তোমার নয় পরী এটা আমার বলা উচিত। হ্যাঁ আমি বুঝেছি আর বলবো শুধু আমার তুমি।
~ খুব ভালোবাসি তোমায় শাদাফ।

পাশাপাশি দুজনে শুয়ে আছে। শাদাফের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে পরী। শাদাফ পরীর কপালে চুমু খেয়ে বললো,
~ এখন তো তোমার নয় মাস চলছে আর কিছুদিন পরই আমার আম্মাজান আসবে।
~ আম্মাজান?
~ হ্যাঁ আমার ছোট্ট আম্মাজান।

~ আচ্ছা একটা ইম্পোর্ট্যান্ট কথা আছে শোনো।
~ বলো।
~ বাবু হলে কোথায় ঘুমাবে?

~ কোথায় ঘুমাবে মানে? বিছানায় ঘুমাবে।
~ ধুর! সেটা বলিনি। মাঝখানে ঘুমাবে নাকি কিনারে ঘুমাবে?
~ ওহ্! এই কথা? আমি এই কিনারে ঘুমাবো। মাঝখানে বাবু ঘুমাবে আর ঐ পাশে তুমি ঘুমাবে।

~ কিহ্? এখন বাবুই সব তাই না? বাবুই সব আদর পাবে! আমি কে? আমি তো কেউ না। এজন্যই তো দূরে সরিয়ে দিবে। সব আদর ভালোবাসা তো বাবুই পাবে।
~ এই যা! রাগ করছো কেন বউ? আচ্ছা যাও আমি মাঝখানে, তুমি আর আর বাবু আমার দুই পাশে ঘুমাবে।
~ একদম নাহ্! বাবুকে আমার থেকে দূরে রাখবে কেন?
~ তাহলে তুমিই বলো কি করবো?

~ আমি কেন বলবো? আমি কেন বলবো? তুমি বলবা।
~ উমমমমমমম! পেয়েছি। আমি এই কিনারে ঘুমাবো, তারপর তুমি আর ঐপাশে বাবু ঠিক আছে?
~ এবার ঠিক আছে।

~ কিন্তু পরী?
~ আবার কিন্তু কি?
~ না মানে বলছিলাম যে, বাবুকে যে কিনারে রাখবো যদি দেয়ালের সাথে মাথা লাগে আর ব্যথা পায়?
~ এহ্! বললেই হলো নাকি? আর তোমার মত বোকাও না আমি। ঐপাশে কোলবালিশ দিবো। প্রয়োজনে চারটা কোলবালিশ দিবো।
~ তবুও মাঝখানে বাবুকে দিবা না!

~ ঐ কি বললা? তার মানে আমাকে দূরে সরানোর ধান্দা?
~ না না একদম না। মজা করছি সোনা বউ আমার। তুমিই মাঝানে থাকবা। আমি তোমায় জড়িয়ে ধরবো আর তুমি বাবুকে জড়িয়ে ধরবা।
পরী হেসে দেয়। এক হাত শাদাফের গালে রেখে ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিয়ে বলে,
~ ভালোবাসি।

~ সারাজীবন ভালোবেসে যাবো তোমায়।
শক্ত করে পরীকে জড়িয়ে নেয় নিজের বুকে আর শান্তিতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।
দোয়া করবেন সবাই, যাতে সব ভালোবাসার মানুষগুলো সুখে থাকে।

লেখা – মুন্নি আক্তার প্রিয়া

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার তুমি (সিজন ১ – শেষ খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আমার তুমি (সিজন ১ – ১ম খণ্ড) – Notun bangla premer golpo kahini