মিষ্টি প্রেমের গল্প

প্রেমের টানে️ – Dustu misti premer golpo

প্রেমের টানে️ – Dustu misti premer golpo: আস্তে আস্তে পা বাড়াতেই মনে হলো কেউ হঠাৎ করে আমাকে দেয়ালে চেপে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ঠোঁটে চুমু খেতে শুরু করলো। আমি তো পুরো অবাক। কি হচ্ছে আমার সাথে!


পর্ব ১

সকাল ৮:১০ মিনিট।

(আফ্রা………৫মিনিটে আমার সামনে আসবি! )

সকালে সবাই মিষ্টি রোদ গায়ে মাখিয়ে উঠলেও আমার ক্ষেত্রে আজ বিষয়টা একদম উলটো। সকালেই আপুর চিৎকারে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলাম। উঠেই ঢোক গিলে নিজে নিজে বলতে লাগলাম,

  • আমি তো আজ এই মাত্র আপুর চিল্লানিতে উঠলাম। এখনো তো কিছু করি নি। আপু চিল্লাচ্ছে কেন? ওয়েট আমি তো এখনো ঢাকায় মানে আমার বাসায়! এখানে আপু কোথা থেকে আসবে?
    (হাফ ছেড়ে) স্বপ্ন ছিলো।

বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বাবা মায়ের রুমে গেলাম। গিয়েই শুরু হয়ে গেলো আমার দুষ্টুমি। বাবাকে কাতুকুতু দিলাম। মায়ের পেটে মাথা দিয়ে ঘষে উঠে মাকে বললাম,

  • আম্মু জানো! আজকে আমি খুবই বাজে স্বপ্ন দেখেছি। দেখেছি আপু আমাকে চিৎকার করে ঘুম থেকে তুলছে। কি ভয়টাই না পেয়েছি!
    আম্মুঃ শোন মেয়ের কথা! তোর উপর আজ পর্যন্ত কেউ চিৎকার করেছে? তাই তো এতো মাথায় চড়ে বসেছিস! আর সেখানে আফিয়া তোকে কিছুই বলে না। তার আহ্লাদী হলি তুই। নিজে তো কিছু বলবেই না আর আমাদের ও কিছু বলতে দিবে না!
  • তুমি কি জেলাস! হয়েও লাভ নেই। ওর মতো বোন আমার এক পিসই আছে। তাইতো ওর কাছে চলে যাবো।
    বাবাঃ আফ্রা তুই ভালো করে সিদ্ধান্ত নে মা। আমাদের ছেড়ে ওতো দূর থাকতে পারবি?
  • বাবা! তুমি কিন্তু আমাকে ইমোশনাল ব্যাকমেইল করছো। প্লিজ বাবা রাগ করো না। আমি তো অন্য কোথাও থাকছি না। আপুর কাছে থাকবো। আর আমার যে দুলাভাই আছে! তোমার কি মনে হয় আমাকে নিয়ে সে কোন প্রকার রিক্স নেবে?
    বাবাঃ তবুও টেনশন হয়তো!
  • টেনশন না করে। দোয়া করো। বাবা তুমি তো জানো আমি একজন প্রফেসর হতে চাই। আর পড়ার জন্য চট্টগ্রাম এর থেকে ভালো পরিবেশ আমার জানা নেই। আমি ওই শহরটাকে অজান্তেই অনেক ভালোবাসি। আর সেখানে তো আপুও থাকে তাই আর না বলো না বাবা। প্লিজ!
    বাবাঃ (মুচকি হেসে, মাথায় হাত বুলিয়ে) আমি কখনোই আমার মেয়ের সিদ্ধান্তে অমত করবো না। আমি জানি আমার মেয়ে ভেবেই সিদ্ধান্ত নেবে।
  • থ্যাংকিউ বাবা (বাবাকে জড়িয়ে ধরে)

রুমে এসে সুন্দর করে ব্যাগ গুছাতে শুরু করলাম। আর আপুর সাথে ফোনে বকবক! আপু তো খুব খুশি। তার পিচ্চি বোন তার কলিজার টুকরা তার কাছে থাকবে। ভেবেই আনন্দে নাচছে। আর আমার পুচকু দুটোর কথা নাই বলি।”মিমি আসবে। মিমি আসবে”বলে পাগল।

( এখন একটু পরিচয় হই। আমি আফ্রা তাবাসসুম তুরফা। বাবা মায়ের দুইমাত্র মেয়ের ছোট মেয়ে আমি। বড় আপু আফিয়া মাহমুদ বিবাহিত। বড় ভাইয়া ড. আদীব হাসান, উনিও বিবাহিত। আমার ভাবী ড. আয়শা হাসান আর খুবই সুইট একজন মানুষ। বকা জিনিসটা আমার কপালে পড়ে নি বললেই চলে। এতো এতো দুষ্টুমি করেও বকা খাই না। আর আমার দুলাভাইয়ের পরিচয়টা পরে দিবো। বাসার সবাই বিভিন্ন নামে ডাকলেও বাচ্চারা আমায় মিমি বলে ডাকে। বাকিরা আফ্রা বা তুরফা )

বাসার সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাবা আর ভাইয়াকে নিয়ে ট্রেনে বসে পড়লাম। দুপুর ২:৩০ মিনিটে ট্রেন। ভাইয়া আমায় এত্তোগুলো চকলেট এনে দিলো। বসে বসে খাচ্ছি আর বাইরের পরিবেশ উপভোগ করছি। বাবা আর ভাইয়া নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। আর আমি বসে বসে ঘুমিয়েই গেলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি ভাইয়া আমার মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখে বলল,

ভাইয়াঃ ঘুম কেমন হলো? তুই তো দিব্বি ঘুমিয়েছিস আর আমার পা টা ব্যাথা হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে মটু হচ্ছিস!

  • আমায় জাগিয়ে দিলেই পারতি! এভাবে ইনসাল্ট করার কি মানে? (মুখ ফুলিয়ে)

ভাইয়াঃ আফ্রা রে। তোকে রাগলে যা লাগে না। তোর ভাবীকে এক্ষুনি তোর ছবি পাঠাই নয়তো আজ আস্ত রাখবে না।
ভাইয়া কথাটা বলতেই খিলখিল করে হেসে দিলাম আমি। আর ভাইয়া বলে, “প্ল্যান সাকসেসফুল!”
কি পাজি আমাকে হাসানোর জন্য এমন বলল। দাড়াও দেখাচ্ছি মজা!

  • ভাইয়া তোমার ফোনটা দাও আমি একটু ভাবীর সাথে কথা বলবো!
    ভাইয়াঃ তোর ফোন কোথায়? (ভ্রু কুচকে)
  • আরে আছে হয়তো কোথাও! তুই দিবি কিনা বল! (বেশ রেগে)
    ভাইয়া আমার রাগ সম্পর্ক এ জানে তাই কথা না বাড়িয়ে ফোনটা দিলো। আমি ভাবীকে ফোন করেই কান্না শুরু করলাম,
  • ভাবী তোমার বর আমাকে ইনসাল্ট করেছে। আমি নাকি মটু হয়ে যাচ্ছি আর আমাকে চকলেট কিনে দেয় নাই!
    ভাবীঃ আরে, আমার ময়নাপাখি কান্না করে না। ভাবী এত্তোগুলা চকলেট কিনে দিবো। দেখি ভাইয়াকে দাও!
  • (মুচকি হেসে) ভাইয়া তোমার ফোন!
    ভাইয়াঃ এভাবে বাঁশ দিতে পারলি!
    ভাইয়া ফোনটা কানে ধরতেই ভাবী ভাইয়াকে এত্তোগুলা ঝাড়ি মারলো। আর আমাকে চকলেট কিনে দিতে বলল। ভাইয়াও ভাবীর কথা মতো আমাকে আরো চকলেট এনে দিলো। কিন্তু আমার জন্য যে সে এতো বকা খেলো তাও আমাকে কিচ্ছু বলল না। আমার ফ্যামিলিকে দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই।

দীর্ঘ সাড়ে সাত ঘন্টা জার্নি করে পৌছালাম আমার অন্যতম প্রিয় শহর চট্টগ্রামে। স্টেশনে নেমে দুলাভাইকে দেখে হাত নেড়ে ডাকলাম। ভাইয়া এসে আমাদের পিক করলেন। গাড়িতে বসে বাবা, আর আমার দুই ভাই মিলে গল্প করতে লাগলেন। কিন্তু এই গল্পে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমি তো ব্যস্ত এই শহরের শ্বাস নিতে। যেমন সবুজ চারিদিক তেমনই শীতল এর আবহাওয়া। গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে আমি সব পর্যবেক্ষণ করছি। হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে। দুলাভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম আজ হঠাৎ করেই বৃষ্টি পড়ছে। তাহলে কি প্রকৃতি আমায় এভাবে বরণ করে নিচ্ছে? ভেবেই মুচকি হাসলাম।

বাসায় পৌছাতে দেড়ি পুচকু দুটো দোড়ে আমার কোলে উঠতে দেড়ি নেই।
আপুঃ দেখি! আমার পিচ্চিটা! তোর আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো? (আমাকে জড়িয়ে ধরে)

  • আরে না। আপু তুই টেনশন নিস না তো। আমি একদম ঠিক আছি। শুধু ঘুম পেয়েছে আমার।
    আপুঃ হ্যাঁ ঘুমাবি কিন্তু খাবার খেয়ে। নয়তো ঘুম নেই।
  • সে আবার বলতে! তুমি যে আমায় না খাইয়ে ঘুমাতে দিবে না। তা আমি বেশ জানি! (হেসে)
    আপুঃ হুম। (ভাব নিয়ে)
  • রাইসা! রাফিন! আমার পুচকু দুটো। মিমির কাছে আসো! তা আমার পুচকু দুটো কেমন আছে? (ওদের গালে, কপালে চুমু দিয়ে)
    রাইসাঃ মিমি জানো ভাই আগের থেকে অনেক দুষ্টু হয়ে গেছে। (মুচকি হেসে)
    রাফিনঃ না মিমি! আপু মিথ্যা বলচে…..
  • তাই? আচ্ছা এখনই প্রমান হয়ে যাবে! দেখি কে আগে আমাকে আদর করতে পারে?
    কথাটা শেষ করার আগেই আমার গালে দুজনেই পাপ্পি দিতে লাগলো। ( রাইসা আপুর মেয়ে। বয়স ৭ বছর। আর রাফিন আপুর ছেলে। বয়স ৩ বছর। )

সকাল ৪:৩০ মিনিট….

আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। বিছানা থেকে উঠে আগে আলহামদুলিল্লাহ বলে নিলাম। তারপর ফজরের নামাজ আদায় করে নিলাম। নামাজ পড়ে বারান্দায় গিয়ে চারপাশে তাকিয়ে হাত ভাজ করে দুবাহুতে রেখে চোখ বন্ধ করে পরিবেশটা উপভোগ করছি। কেমন শান্তি শান্তি লাগছে। আমি সবসময় এই শান্ত প্রকৃতির মাঝে নিজে হারিয়ে চাই। চোখটা খুলে মুচকি হেসে সামনে তাকালাম। চুপচাপ বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটতে থাকলাম। এমনেতেই সবটা সুন্দর তার উপর এটা ক্যান্টনমেন্ট। সব একদম নিট আর ক্লিন। (এবার দেই আমার দুলাভাইয়ের পরিচয়। ভাইয়ার পরিচয় ল্যান্স কর্পোরাল রিয়াদ মাহমুদ, বাংলাদেশ আর্মি। তাই সেই সুবাদে চট্টগ্রামে আমাদের ক্যান্টনমেন্টে থাকা। )

আমি একদম নিজের মতো হাটছি আর এই সুন্দর মিষ্টি সকালটাকে উপভোগ করছি আর মুগ্ধ নয়নে উচু নিচু পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে হাসছি। সময়ের দিকে খেয়ালই ছিলো না। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আমাকে হালকা ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নজরটা আমার কাছে একদমই বাজে মনে হয় নি। তাই আশে পাশে তাকালাম কিন্তু কাউকেই দেখতে পাইনি। কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে দেখি আপু আর ভাইয়া আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।


পর্ব ২

বাসায় এসে দেখি আপু আর ভাইয়া ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আজব! এভাবে তাকানোর কি আছে? আমি প্রথমে চমকে গেলেও পরক্ষনে স্বাভাবিক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • তোমরা দুজন এভাবে কেন তাকিয়ে আছো?
    আপুঃ আফ্রা বোন আমার এভাবে না বলে কেন বেরিয়ে গেলি?
  • না বলে কোথায়? আর তোমরা দুজনে ঘুমুচ্ছিলে। তাই ডাকি নি। আর আমি তো দূরে কোথাও যাই নি। রাস্তার ওই পাশটায় পাহাড়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়ে উঠিও নি।
    ভাইয়াঃ কিন্তু আমাদের তো ভয় হয় শালিকা! আমার একটা মাত্র অবিবাহিত শালিকাকে কেউ যদি কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়? তাহলে আমাদের কি হবে?
    ভাইয়ার কথা শুনে আমি হা হয়ে গেছি। এই লোক বলে কি!
  • ভাইয়া এটা ক্যান্টনমেন্ট! আর তুমিও সাধারণ কেউ নও! তাহলে ভয় কেন পাচ্ছিলে?
    ভাইয়াঃ তবুও! (বাচ্চাদের মতো করে)
  • ভাইয়া…..!

আপুঃ এই থামো তো! আমার বোনটাকে এভাবে কেন বলছো! ওর যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবে। কিন্তু আফ্রা এর পর থেকে আমাকে একটু বলে যাস! তাহলে টেনশন কম হবে।

  • ওকে আপু! ওকে! তোমায় বলে যাব। হ্যাপি?
    আপুঃ হুম। হ্যাপি। এবার গিয়ে বিচ্ছু বাহিনীর কাছে যা। চাইলে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারিস!
  • না আপু! আমার মনটা এখন খুবই ভালো। ঘুমালে মুড খারাপ হয়ে যাবে। তাই নো ঘুম। চাইলে আমি তোমায় হেল্প করতে পারি!
    আপুঃ না না। আমার হেল্প লাগবে না। তুই যা। একটুকু কাজ আমি পারবো।
  • ওকে মাই সুইট সিস্টার। (হেসে দিয়ে)
    আপুঃ তুই তো ভেজা! ড্রেসটা তাড়াতাড়ি চেঞ্জ কর!
  • হুম ওকে।

রুমে এসে দেখি পুচকু দুটো ঘুমিয়ে আছে খাটের দুই কোনায় আর মাঝখানে দুজন ঘুমানোর মতো ফাঁকা রেখে। আমি গিয়ে মাঝখানে শুতেই দুইজনে একসাথে আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিলো। আর আমিও জড়িয়ে ধরলাম।

  • গুড মর্নিং বেবিস! উঠে পরো! সকাল হয়ে গেছে। আর মর্নিং কিস নিতে হলে আগে উঠতে হবে!
    ব্যস বলতে দেড়ি এদের লাফ দিয়ে উঠতে দেড়ি নেই। আমিও দুইজনকে কিসসি দিয়ে ওয়াশরুমে পাঠালাম। আর আপুর কাছে চলে গেলাম সাহায্য করতে।

ডাইনিং টেবিলে।

  • বাবা! তুমি আর ভাইয়া কাল না গেলে হয় না? (করুন সুরে)
    বাবাঃ না রে। মা আমার ব্যবসার কাজ আছে আর তোর ভাইয়া এমনেই কদিন হসপিটাল যায় নি। রুগিদের কথাও তো একটু ভাব!
  • হ্যাঁ ঠিকই বলেছো। (মন খারাপ করে)
    আপু আমার মন ভালো করার জন্য বলল,

আপুঃ আফ্রা কাল তোকে নিয়ে ঘুরতে যাবো। বাবা আর আদীব রওনা হলে। রেডি থাকিস!

  • ওকে আপু।
    রিয়াদ (ভাইয়া): আচ্ছা আমার শালিকার মন টা এখনো কেন খারাপ? আচ্ছা আজ যদি তাকে নিয়ে ফুচকা খেতে যাই তাহলে কি তার মন ভালো হবে?
  • (খুশি হয়ে) সত্যি?
    ভাইয়াঃ ১০০% সত্যি। (হেসে)

বিকেলে আপু, ভাইয়া, আমি আর পুচকু দুটো। আদীব ভাইয়া আর বাবাকে এতো করে বললাম তাও আসলো না। বাবা বসে বসে নিউজ দেখবে আর ভাইয়া আছে কনফারেন্সে। ভাইয়াকে এতো করে বললাম ক্যান্টনমেন্ট এর বাইরে চলো কিন্তু না। তার কোন স্যার এর সাথে মিটিং আছে তাই বাইরে যেতে পারবে না। কাল নিয়ে যাবে। আমিও আর কিছু বলি নি। মানুষের ব্যস্ততা থাকতেই পারে।

  • আপু! ভাইয়া! ওই তো ফুচকার গাড়ি! আমি যাই!

বলেই দোড়ে চলে গেলাম। আর পিচ্চি দুটো হাসছে। কারন ওরা আমার মতো এতটাও এক্সাইটেড নয় ফুচকার ব্যাপারে। বিষয়টা আমার জন্য ভারী লজ্জাজনক। কিন্তু বলে না সব বিষয় লজ্জাটা ঠিক মানায় না। তাতে পস্তাতে হয়। আমি কথাটা মনে প্রানে মানি তাই আর কিছু বললাম না।

  • (ফুচকাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে) মামা! ঝাল দিয়ে দুই প্লেট ফুচকা কিন্তু দিবেন এক প্লেটে।
    ফুচকাওয়ালাঃ আইচ্ছা।
  • আর তিন প্লেট আলাদা। দুইটা নরমাল আর একটা বাচ্চাদের!
    আপু, ভাইয়া আর বাচ্চারা ইতিমধ্যে চলে এসেছে।
    আপুঃ অর্ডার দেওয়া শেষ?
  • হুম! তা আর বলতে।

আমি তো ফুচকা খেতে ব্যস্ত। আশেপাশে কি হচ্ছে তা সম্পর্কে কোন ইন্টারেস্ট নাই আপাতত। এর মধ্যেই ভাইয়ার মোবাইলে ফোন আসে আমাদের বসিয়ে কথা বলতে একটু দূরে যায়। হয়তো কেউ আসবে!

আমি তো মনের সুখে ফুচকা খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে আপু আর বাচ্চাদের সাথে কথা বলছি। আমার ওরনাটা বড্ড জ্বালাচ্ছে। বাতাসের জন্য বারবার উড়ছে। আর তা দেখে রাফিন আমার ওড়নাটা ধরে নিজে নিজে লুকোচুরি খেলতে লাগলো। বিষয়টা অস্বাভাবিক কিউট লাগছে। আমি খাওয়া শেষ করে রাফিনের সাথে খেলতে লাগলাম। দূরে ভাইয়াকে দেখতে পারছি। একটা লোকের সাথে কথা বলছে। লোকটা ভাইয়ার থেকেও খানিকটা লম্বা।

কিন্তু আমি লোকটার চেহারা দেখতে পারছি না। ভাইয়ার মুখটা আমার দিকে ফিরানো আর ওই লোকটার পিছন দেখতে পারছি। লোকটা সেই এটিটিউড নিয়ে পকেটে হাত গুঁজে ভাইয়ার সাথে কি কথা বলছে। যেন কিছু আদেশ দিচ্ছে। আমার দিকে ভাইয়ার চোখ পড়তেই ইশারায় জিজ্ঞাসা করলো কিছু লাগবে কিনা! আমি ইশারায় না বলে বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করা শুরু করলাম আর ওই দিকে তাকাইনি। তাকালে হয়তো দেখতে পেতাম অবাক চোখে কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষন পর ভাইয়া হাসতে হাসতে আমাদের কাছে এলো।

  • কি ভাইয়া অনেক খুশি মনে হচ্ছে। ব্যাপারটা কি বলোতো?
    ভাইয়াঃ আমার শালিকা যে এতো লাকী হবে আমার জন্য তা ভাবি নি।
  • (অবাক হয়ে) মানে?
    ভাইয়াঃ আজকেই আমাদের একটা কেস সলভ হলো। যেটা নিয়ে বেশ কদিন চিন্তায় ছিলাম।
  • (হেসে দিয়ে) তাই বলে সব ক্রেডিট আমায় দিয়ে দিলে? তোমরা তো নিশ্চই অনেক পরিশ্রম করেছো!
    ভাইয়াঃ হ্যাঁ তা ঠিক। আচ্ছা তোমাদের খাওয়া শেষ? তাহলে চলো।
    আপুঃ সেকি? তুমি খাবে না?
    ভাইয়াঃ নাহ! এখন সময় নেই। আমায় একটু বের হতে হবে। তোমাদের বাসায় দিয়ে আমি আবার এক জায়গায় যাবো।
    আপুঃ আচ্ছা।
    তারপর ভাইয়া আমাদের বাসায় দিয়ে বের হলেন।

পরদিন খুব সকালে বাবা আর ভাইয়া ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমার মন টা খুব খারাপ হয়ে গেলো। বাবা আর ভাইয়া যাওয়ার আগে এত্তোগুলা চকলেট আর টাকা দিয়ে গেলেন। বুঝি না এতো টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আমি তো চকলেটেই খুশি।

রিয়াদ ভাইয়াকে বলে ঠিক করলাম একদম সকাল সকাল বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বের হবো। যেহেতু ভার্সিটিতে ভর্তি হতে আরো কিছুদিন বাকি আছে তাই এই কদিন খুব ঘুরবো। তাই ঠিক করলাম বান্দরবানের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরবো। প্রথমে যাবো বগাকাইন হ্রদে।
“বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগাকাইন হ্রদের অবস্থান কেওক্রাডং পর্বতের গা ঘেষে, রুমা উপজেলায়।

এটি একটি আবদ্ধ হ্রদ। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির হ্রদের মধ্যে একটি। রুমা উপজেলার পূর্ব দিকে শঙ্খ নদীর তীর থেকে ২৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি মৌজার নাম ‘ নাইতং মৌজা ‘ এই মৌজার পলিতাই পর্বতশ্রেনীর অন্তর্গত একটি পাহাড়ের চূড়ায় হ্রদটি অবস্থিত। হ্রদটি যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা ‘বগা ছড়া’ নামে পরিচিত। হ্রদের পানি কখনো পরিষ্কার আবার কখনো ঘোলাটে হয়ে যায়। কারন হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণপ্রস্রবন রয়েছে।”


পর্ব ৩

সকাল সকাল আমরা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সকাল ৭ টার দিকেই ভাইয়া ড্রাইভ করা শুরু করে। আমি সামনে বসেছি ভাইয়ার পাশে। আর আপু বাচ্চাদের নিয়ে পিছনে বসেছে। আমি পিছনে গিয়ে আপুকে সামনে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভাইয়া আর আপু দুইজনেই মানা করলো। কেন করলো তার বিষয়ে আমি এখনো সন্ধিহান। রাস্তায় আপু আর বাচ্চাদের সাথে অনেক মজা করছিলাম। হঠাৎ ভাইয়া আমাকে বলল,
ভাইয়াঃ শালিকা!

  • জ্বি ভাইয়া!

ভাইয়াঃ আমাদের সাথে আরেকজন যাবে! (কাচুমাচু করে)
অটোমেটিক আমার ভ্রু কুচকে এলো।

  • কিন্তু আমরা মনে হয় ফ্যামিলি ট্রিপে এসেছি রাইট?
    ভাইয়াঃ হ্যাঁ কিন্তু…… একজনই তো! আর তাছাড়া উনি আমার সিনিয়র স্যার। আমাদের ক্যাপ্টেন।
    আমি কিছু বলার আগে আপু বলল,
    আপুঃ আফ্রা রাজি হয়ে যা। মানুষ বেশি থাকলেই তো মজা।
  • হুম। ঠিক আছে।

বেশ কিছুক্ষন পর। ভাইয়া গাড়িটা সাইট করে কাউকে ফোন করলেন। ফোন কেটে গাড়ি থেকে নামলেন।

  • ভাইয়া গাড়ি থেকে কেন নামলে?
    ভাইয়াঃ ওয়েট করো!
    ভাইয়া লোকটাকে দেখে তার কাছে গিয়ে কি যেন বললেন আর গাড়ির চাবি দিয়ে গাড়ির পিছনে বসলেন। আর ভাইয়ার স্যার ড্রাইভিং সিটে বসে আমার দিকে একবার তাকিয়ে ড্রাইভ করা শুরু করলেন। আমি ভ্রু কুচকে ভাইয়াকে বললাম,
  • ভাইয়া তুমি তো সামনেও বসতে পারতা! আমি আর আপু পিছে বসতাম!

আমার কথা যেন লোকটার পছন্দ হয়নি। আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে লুকিং গ্লাসে ভাইয়ার দিকে তাকালেন। তৎক্ষনাত ভাইয়া আমাকে বললেন,
ভাইয়াঃ আসলে শালিকা….বউয়ের সাথে বসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তাই! (মেকি হেসে)

  • শুরুতে এতোবার করে বললাম। তখন বসতে ইচ্ছে হয়নি?
    ভাইয়া উত্তর দেওয়ার আগে ওই লোকটা আমাকে ধমকে বলল,
  • চুপচাপ বসো। এতো কথা বলো কেন?

উনার কথা শুনে আমি কেঁপে উঠলাম কেননা আজ পর্যন্ত এভাবে কেউ ধমক দেয় নি। চোখের কোনে পানি চলে এলো। মুখ ফুলিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। একবার ভাইয়া আর আপুর দিকে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাগুলো যে ঘুমিয়ে গেছে তার ভালোই সুযোগ নিচ্ছে এরা! আর এই ফাজিলটা আমাকে বারবার আড়চোখে দেখছে। যা আমি বেশ উপলব্ধি করতে পারছি। আর আমি কি বলবো। জানালার কাচঁ নামিয়ে বাইরের বাতাস আর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছি। সকালে গোসল করে আসায় চুলগুলো এখনো ভেজা।

তাই চুলগুলো ছাড়াই রেখেছি। একবার লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম। নিঃসন্দেহে একজন সুদর্শন পুরুষ। যেমন হাইট, তেমন স্টাইল আর হ্যান্ডসাম। তার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধুক করে উঠেছে। তাই ভয়েও আর তাকাইনি। তার মধ্যেই ভাইয়া পরিচয় পর্ব শুরু করলেন।
ভাইয়াঃ আফ্রা! ইনি হলেন ক্যাপ্টেন আরফান চৌধুরি আদ্র। আর ক্যাপ্টেন। এই হলো আমার শালিকা।
ভাইয়া বলার আগেই উনি বলে উঠলেন,

আদ্রঃ “আফ্রা তাবাসসুম তুরফা! বয়স ১৯ বছর। সাইকোলজি নিয়ে চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পড়ে। বাবা ব্যবসায়ী, ভাই ডক্টর।”দ্যাট মাচ অফ হার আইডেন্টিটি ইস এনাফ ফর মি!
আমি পুরো অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। এই লোক আমার পরিচয় কিভাবে জানলো? তাও এতো! আমি যখন তার দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছি। তা খেয়াল করে সে আমার দিকে না তাকিয়েই হালকা হাসলো। আমি আর কিছু না বলে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ভাইয়া আর আপুকে দেখে মনে হলো তারা বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি। বরং আমি ভুল করে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম।

প্রায় ৪ ঘন্টা ৪৫ মিনিট পর আমরা বান্দরবান সিটিতে পৌছাই। আজ মেঘবাড়ি রিসোর্টে থেকে সিটির আশেপাশে ঘুরবো। গাড়িতে আমি ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম। চোখ খুলতে দেখি আপু আমায় ডাকছে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম সবাই নেমে গেছে আর আদ্র কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। কথা বলতে বলতে বেশ কয়েকবার আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়েছে। ফোনে কথা বলা শেষ হতেই আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। আর ভাইয়াকে বলল,
আদ্রঃ রিয়াদ ভাইয়া আমরা কিন্তু সিটিতে ঘুরে ক্যান্টনমেন্ট যাচ্ছি। এন্ড এটাই ফাইনাল।

ভাইয়াঃ কিন্তু ক্যাপ্টেন! …
আদ্রঃ ডোন্ট কল মি ক্যাপ্টেন। এখন ছুটিতে আছি তুমিও আর আমিও সো এখন আমি তোমার ছোটভাই পরিচয়ে আছি!
ভাইয়াঃ ওকে আদ্র। কিন্তু কথা হচ্ছে আমার শালিকাকে নিয়ে! সে যদি যেতে না চায়?
আদ্রঃ আমি তো তার মতামত চাইনি। (ভাবলেশহীন ভাবে)

এবার আর চুপ করে থাকতে পারলাম না।

  • এই যে হ্যালো মিস্টার! ভাবেন কি নিজেকে? আমরা এখানে ঘুরতে এসেছি তো ক্যান্টনমেন্ট কেন যাবো? (ভ্রু কুচকে)
    আদ্রঃ কারন বগাকাইন হ্রদে আমরা কালকে যাচ্ছি। আজ রেস্ট নিতে হবে।
  • তাই বলে ক্যান্টনমেন্ট কেন? …
    এর মধ্যে আপু বলে উঠলো,

আপুঃ চল না আফ্রা! তুই তো বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টে তো কখনো আসিস নি। ঘুরে নে না!
আপুর কথা আর ফেলতে পারলাম না। তাই বললাম,

  • ওকে। যেমন তোমরা বলবে।
    আদ্র আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে সানগ্লাস চোখে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো। এবারও আমায় অগত্যা সামনে বসতে হলো। সিটিতে ঘুরাঘুরি করে শেষ করে রওনা দিলাম ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে। গাড়ি ড্রাইভ করে ক্যান্টনমেন্ট এর ভিতরে খুব সুন্দর একটা বাড়ির কাছে থামালো। বাড়িটা বাইরে থেকেই এতো সুন্দর না জানি ভেতরে কত সুন্দর!

আদ্র আগে গিয়ে গেট খুলে আমাদের ভিতরে নিলেন। ভিতরটা আসলেই সুন্দর। ভাইয়ার থেকে জানতে পারলাম এটা ওনার কোয়াটার বাড়ি। আমাকে উপরে একটা রুম দেওয়া হলো। খানিকটা দূরে আপু, ভাইয়ার রুম। আজ তাদের প্রাইভেসি দিতে চেয়েছি তাই পুচকু দুটোকে আমার কাছে রেখেছি।

সকালে গোসল করলেও জার্নি করার জন্য মাথাটা ভার হয়েছিলো তাই আবার গোসল করলাম। গোসল করে বের হয়ে রুম থেকে বের হলাম। পরনে একটা ছাই রঙের থ্রি-পিস। চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে খোপা করা তবুও কিছু অবাধ্য চুল সামনে মুখে পড়ে রয়েছে। রুম থেকে বের হয়ে কিছুদূর যেতেই আলো চলে গেলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভাগ্যিস পুচকু দুটোকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। কিন্তু আমার তো ভয় লাগছে!

আস্তে আস্তে পা বাড়াতেই মনে হলো কেউ হঠাৎ করে আমাকে দেয়ালে চেপে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ঠোঁটে চুমু খেতে শুরু করলো। আমি তো পুরো অবাক। কি হচ্ছে আমার সাথে! আমি অবয়বটাকে এতো ঠেলছি কিন্তু সে বিন্দুমাত্র নড়ার নাম করছে না। বরং স্পর্শটা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আমি আর নিতে পারলাম না। অজ্ঞান হয়ে সামনে থাকা ব্যক্তির গায়ে হেলে পড়লাম। পরে আর কিছু মনে নেই।

সকালে উঠে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করি। কিন্তু আমি এখানে কি করে এলাম? কাল তো লবিতে। আমার সাথে। কিন্তু আমায় এখানে কে নিয়ে এলো? মাথা ব্যাথা করছে একটু একটু। উঠে দেখি পুচকু দুটো আমার পাশে নেই। দরজার শব্দে সামনে তাকালে দেখি আপু ট্রেতে করে ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসেছে।

  • কষ্ট করে উপরে আনলে কেন? আমি নিচেই তো খেতে পারতাম!

আপুঃ আরে না! কোন কষ্ট হয় নি। কাল তোর জ্বর এসেছিলো। তাই এখন কিছুক্ষন রেস্ট নিবি তারপর আমরা বের হবো!

  • ইশ রে। আমার জন্য তোমরা সাফার করছো! সরি!
    আপুঃ মার দেবো ধরে! বেশি কথা বলে। আর কাল অতো রাতে তুই কেন গোসল করতে গেলি?
  • আসলে শরীরটা ভালো লাগছিলো না। তাই!
    আপুঃ আচ্ছা আয় খাইয়ে দি। তারপর কিছুক্ষন রেস্ট নিবি।

আমি খেতে খেতে আপুকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • আচ্ছা আপু আমি এখানে কি করে এলাম?
    আপুঃ তুই লবিতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি। তোকে আদ্র দেখতে পেয়ে রুমে নিয়ে এসে আমাকে ডাকে।
  • উনি ওইখানে কি করছিলো? (ভ্রু কুচকে)

আপুঃ আরে আলো চলে গিয়েছিলো না তাই দেখতে গিয়ে তোকে অজ্ঞান অবস্থায় পায়।
আপুর কথা শুনেও কেমন যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনের কোথাও যেন একটা সন্দেহ রয়ে গেছে।


পর্ব ৪

সকালে আপু আমাকে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। একটা লম্বা ঘুম দিয়ে উঠলাম। আসলেই ফ্রেশ লাগছিলো।

গোলাপি রঙের একটা লং কুর্তি পড়লাম সাথে লেডিস জিন্স। ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক, চোখে কাজল, চুলগুলো নিয়ে উঁচুতে একটা পনিটেইল করে গলায় একটা স্কার্ফ পেঁচিয়ে নিয়েছি। আর পায়ে হাইকিং সু। ব্যস আমি রেডি। রুম থেকে রেডি হয়ে বের হতেই সবার দেখা মিললেও আদ্রর দেখা পাওয়া যায় নি।

হয়তো রেডি হচ্ছে। পুচকু দুটো আমাকে দেখে দোড়ে কাছে আসে। আমিও নিচু হয়ে ওদের গালে, কপালে আদর দিলাম। ওরাও আমার গালে চুমু দিলো। আর এই সব কান্ড দুই ক্যামেরায় বন্ধি হয়েছে। এর আদ্রর চোখে আর এক ভাইয়ার ক্যামেরায়। আদ্র রেডি হয়ে নিচে নেমেই আমাদের এভাবে দেখে থমকে দাঁড়ায়। তার মুখে আনমনেই এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। আমি উঠে দাঁড়াতেই দেখি আদ্র মুগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এবার বেশ অস্বস্তি বোধ হলো আমার। কারোর দিকে এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকার কোন মানেই হয় না। আর সেখানে আমি আহামরি সুন্দরিও না।

উজ্জল শ্যামবতী কন্যা আমি। যাইহোক তবুও কম জ্বালায় ভুগি নি! স্কুল, কলেজ এমন কি বাসায়ও বহুত প্রপোজাল এসেছে কিন্তু কেউই পাত্তা পায় নি। আমার স্বপ্ন পূরণে কাউকে বাধা হতে দেই নি। তাই লাইফে প্রেম জিনিসটা কেমন তা বলতে পারবো না। বান্ধবিদের প্রেম দেখেছি কিন্তু আমার কাছে তা নিছক সময় নষ্ট বলেই মনে হয়েছে। প্রেমের প্রতি আমার এমন অনিহা দেখে আমার প্রায় বান্ধবিই বলতো,

  • আফ্রা তুই ঠিকই প্রেমে পড়বি। তখন #প্রেমের_টানে শত মাইল দূরে যেতেও দ্বিধা বোধ করবি না।
    প্রেমকে যে আমি ঘৃণা করি তা কিন্তু মোটেই না। আমিও চাই প্রেম করতে কিন্তু স্বপ্নকে তার চেয়েও বেশি প্রাধান্য দেই। হয়তো কেউ আসবে আমার জীবনে যে নিজের ভালোবাসা দিয়ে আমাকে এক অন্য অনুভূতির সাথে পরিচয় করাবে! আমি সেই দিনটার অপেক্ষা করবো।

বান্দরবান থেকে প্রায় ৩ ঘন্টা সফর করতে হয় বগাকাইন হ্রদে পৌছাতে। এমনেতেই আমি এই চিরহরিৎ বনকে খুব পছন্দ করি তার মধ্যে। চারপাশে সবুজ আর মাঝের এই গভীর হ্রদ যেন সকলের মন কাড়ে। আমি গাড়ি থেকে নেমে হাটতে হাটতে হ্রদের কাছে চলে যাই। বাতাসের সাথে সাথে হ্রদের পানিও সমান তালে বইছে। অসাধারণ সৌন্দর্য এই জায়গার।

ঠিক করলাম এখানে অনেকটা সময় কাটাবো। আমি তো আশে পাশে ঘুরতে লাগলাম। ঘুরাঘুরি করে হ্রদের পাড়ে বসলাম। আপু আর ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দেখি তারা তাদের ফ্যামিলি ফটো তুলতে ব্যস্ত। আমাকেও একবার ডাকা হয়েছে। কিন্তু আমি মানা করে দিয়েছি। আমার মতে প্রকৃতি উপভোগ করা উচিত। প্রকৃতিকে উপলব্ধি না করে কিছু ছবি তুললেই তার সঠিক মর্ম বোঝা যায় না। আশে পাশে এমন সুন্দর পরিবেশ। খুঁটিনাটি সৌন্দর্য উপলব্ধি না করলে ট্রাভেল করাটাই বৃথা হয়ে যাবে। বিভিন্ন ভাবনা ভেবে হ্রদের পানিতে নজর দিলাম। আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবীতে ছোট ছোট অনেক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে যা আমরা আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ততায় হারিয়ে ফেলছি। সাথে হারিয়ে ফেলছি আমাদের ইচ্ছাশক্তি!

হঠাৎ করে চোখ গেলো আদ্রর উপর। লোকটা ভারী অদ্ভুত। এখানে অনেক পর্যটক এসেছে। এবং সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। হয়তো কেউ ছবি তুলছে নয়তো আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু আদ্রকে একদম আলাদা মনে হলো। হ্রদের নিরবতাই যেন তার কাম্য ছিলো। নিজের মনে হ্রদের পাড়ে বসে ডায়রিতে কিছু লিখছেন আর আনমনে হাসছে। কি সুন্দর সেই হাসি। আগে ভালো করে খেয়াল না করলেও এখন তাকে ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার ইচ্ছাটা ফেলতে পারলাম না। তার হাসিটা যেন এই পরিবেশের সাথে একদম মানানসই। চোখের পাপড়ি ফেলার সাথে সাথে সেই অদ্ভুত সুন্দর হাসি।

এ যেন প্রকৃতির সাথে মিলে নতুন এক ছন্দের তাল সৃষ্টি করছে। একটা বিষয় অবাক লাগলো। এই যুগে ডায়রি লেখার চল একদমই দেখা যায় না। মানুষকে কি বলবো আমি নিজেও ডায়রি লিখি না। মনে হয়। মনের কথা যাকে লিখছি সে না পড়ে অন্য কেউ পড়লেই মারাত্মক বিপদ! যেখানে সবাই স্মার্ট ফোন হাতে নিয়ে আধুনিকতার সাথে তাল মিলাচ্ছে সেখানে উনি বসে ডায়রি লিখছে। ভারী অদ্ভুত। ভেবে আনমনেই হেসে দিলাম। বড্ড ইচ্ছে করলো ওই ডায়রির লেখা গুলো পড়তে। কিন্তু কারো ডায়রি এভাবে পড়া একদমই শোভা পায় না। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো আদ্রর সাথে বসে একটু গল্প করে প্রকৃতি বিলাস করা যাক। ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলে গেলাম আদ্রর কাছে।

  • আমি কি এখানে বসতে পারি?
    আদ্র আমার দিকে কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে ডায়রিটা ঝট করে বন্ধ করে বলল,
    আদ্রঃ অবশ্যই। এটা আমার জায়গা নয়। এখানে আপনি আমি সবাই বসতে পারি!
  • হ্যাঁ তা তো অবশ্যই পারি কিন্তু পাশে কেউ থাকলে তাকে জিজ্ঞাসা করাটা হলো ভদ্রতা।
    আদ্রঃ (মৃদু হেসে) ভালো বলেছেন। বসুন।
    আমিও ঝট করে ওর পাশে বসে পড়লাম। কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম,
  • আপনি এখানে একা বসে কি করছেন?

আদ্রঃ ডায়রি লিখছিলাম। (ভাবলেশহীন ভাবে)

  • এই যুগে কেউ ডায়রি লিখে শুনি নি তো? (হালকা হেসে)
    আদ্রঃ এই যুগে কেউ ছবি না তুলে প্রকৃতি বিলাস করতেও আগে দেখিনি! (মুচকি হেসে)
    আমিও হেসে দিলাম। তারমানে উনি আমাকে লক্ষ্য করেছেন! তাও বললাম,
  • আমার কাছে আধুনিকতার চেয়ে প্রকৃতি বেশি প্রাধান্য পায়! তাই।

আদ্রঃ আমার কাছেও ডায়রি লেখাটা বেশি প্রাধান্য পায়। কেননা অনেক অব্যক্ত কথা যা হয়তো সবসময় সেই মানুষটির কাছে পৌছে দেওয়া যায় না তা ডায়রিতে লিখে মনটাকে হালকা করা যায়।
আমি কিছু না বলে হালকা হাসলাম।

  • আপনার ডায়রিটা খুব পড়তে ইচ্ছে করছে! জানি এটা অন্যায়। কিন্তু বাঙালিদের তো নিষিদ্ধ জিনিসে বরাবরই বেশি আগ্রহ।
    আদ্রঃ আপনার জন্য যদি লেখা হয় তবে হয়তো নিয়তির মাধ্যমে ডায়রিটা আপনার কাছে পৌছে গেলেও যেতে পারে!

বলেই খুব অদ্ভুত ভাবে হাসলো। কিন্তু তার কথার বা হাসির কোনটারই আমি মানে খুঁজে পেলাম না। তাই আর চেষ্টাও করি নি।
এর মধ্যে দেখলাম আপু আর ভাইয়া আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। আর বাচ্চা গুলো আমাকে দেখে দোড়ে আমার কাছে আসলো। ভাইয়া হয়তো বারণ করেছিলো তা সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করে ছুটে চলে এসেছে। রাফিন এসেই আমার গালে একটা চুমু দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।

আদ্র ওকে দেখে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলো। আর রাইসা আমার গলা জড়িয়ে গালে চুমু দিয়ে আমার পাশ ঘেঁষে বসলো। ভাইয়া সুযোগের ঠিক ব্যবহারটাই করলো। আমি হেসে আদ্রর দিকে তাকানো আর আদ্র হেসে বাচ্চাদের আদর করছে। এই অবস্থার একটা কেন্ডিড ছবি তুললেন ভাইয়া। ছবিটা এত্তো কিউট উঠেছে যা বলার বাহিরে। দেখে মনে হচ্ছে একটা কিউট, সুইট ফ্যামিলি! যদিও প্রথমে ছবিটা দেখি নি। পরে দেখেছি।

আমরা লাঞ্চটা ওইখানেই সারলাম। তারপর আস্তে আস্তে থানচির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এবার আমাকে আর বলতে হয়নি নিজেই সামনের সিটে বসেছি। আদ্র পাশে ড্রাইভ করছেন আর সবাই পিছনে। আজ অজান্তেই কেন যেন আমার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে আছে। আদ্রকে খেয়াল করলাম সেও বেশ খুশি।

প্রায় ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর আমারা থানচি পৌছালাম। বগাকাইন লেকের পাশেই কেওক্রাডং পাহাড়েও আমাদের ঘুরা হয়েছে। আর আমার ইচ্ছেতে আবার উলটো পথ ধরে এসেছে থানচি। লোকটার আসলেই ধৈর্য আছে। নিলগিরিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেছে। এমনেতেই পথ অনেক দূর্গম কিন্তু আমাদের কাছে তো এমনেই দুইজন পাওয়ারফুল আর্মি আছে তাই চেকিং নিয়ে তেমন সমস্যা হয় নি। তার উপর আদ্রকে যতবার দেখেছে ততবার সম্মান দিয়ে পথ ছেড়েছে। বিষয়টা আমার কাছে আসলেই বেশ লেগেছে। তাও খুব সাবধানতার সাথেই ড্রাইভ করেছে আদ্র। বাচ্চারা তো গাড়িতে সেই কখন ঘুমিয়ে গেছে। টের পাচ্ছি আপু আর ভাইয়া ফুসুরফাসুর করে তাদের প্রেমালাপ করছে। যা শুনে আমার ব্যাপক হাসি পাচ্ছে আর আদ্র বারবার ভীষম খাচ্ছে। আমি বুঝিনা বিয়ের এতো বছর পরও এদের মাঝে এতো প্রেম কথা থেকে আসে? আসলেই ভালোবাসা জিনিসটা একটা ম্যাজিকের মতো। পাশে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়। জানি না আমার সেই সুপ্ত ভালোবাসা কার জন্য রয়েছে, কবে আমার জীবনেও আমাকে ভালোবাসার জন্য সেই নির্ধারিত মানুষটি আসবে!


পর্ব ৫

আদ্রর বাসা আমাদের আগে পরে তাই সে আগেই নেমে গেছে আর বাসা পর্যন্ত ভাইয়া ড্রাইভ করেছে। বাসায় আসতে আসতে প্রায় অনেক রাত হয়ে গেছে। আদ্র চেয়েছিলো আমাদের বাসা পর্যন্ত দিয়ে যেতে কিন্তু ভাইয়া জোর করে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। কেননা আমাদের দিতে আসলে তার বাসায় যেতে অনেক দেড়ি হয়ে যেত। বাসায় পৌছে দেখি পুচকু দুটো ঘুমিয়ে গেছে। অবশ্য গাড়িতেও অনেক ঘুমিয়েছে। আপু একা কোলে নিতে পারছিলো না তাই ভাইয়াও ওদের কোলে নিয়ে বাসায় দিয়ে আসতে গেলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগ নিতে গিয়ে দেখি আদ্র তার ডায়রিটা ভুলে ফেলে গেছে। তাই আমি নিয়ে নি। পরে ফেরত দেওয়া যাবে। তারপর আমি বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে একটা লম্বা ঘুম দেই।

আজও সকালে নামাজ পরে বের হয়ে গেলাম প্রকৃতি বিলাসে। ক্লান্ত থাকলেও এই কাজটা কখনোই বাদ দেওয়া যাবে না। আজ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর এসে গেছি। সময়ের বিষয়ে খেয়ালই ছিলো না। যখন দেখলাম রাস্তায় আর্মিরা সবাই এক্সারসাইজ করছে। তখন খেয়াল হলো আমাকে বাসায় যেতে হবে। বাসায় এসে দেখি আপু অলরেডি নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে। সবার সাথে বসে নাস্তা করলাম। কিন্তু ভাইয়াকে দেখে মনে হলো সে খুব তাড়ায় আছে। আমি ভ্রু কুঁচকে ভাইয়ার কান্ড দেখছি। আপুকে ইশারা করলে সে শুধু একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। তাই আমিই ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • ভাইয়া! তুমি এতো তাড়াহুড়া কেন করছো?
    ভাইয়াঃ বইন রে….. ১ সেকেন্ড লেট হলে ক্যাপ্টেন আমার খবর করে দিবে! তাই এতো তাড়াহুড়া!
  • তাকে কালকে দেখে তো এতো স্ট্রিক্ট মনে হলো না। আর তাছাড়া কালকে উনিও আমাদের সাথে ঘুরেছেন তাই দেখো গিয়ে হয়তো নিজেও দেড়ি করেই ঘুম থেকে উঠবে!
    ভাইয়াঃ হুহ! দেড়ি করে উঠবে! দেড়ি করে উঠলে তোকে পাহারা কে দিবে? (আনমনে)
  • আমাকে পাহারা দিবে মানে? (ভ্রু কুচকে)

ভাইয়াঃ নাহ! কি। কিছু না। (মেকি হেসে)
আর তাছাড়া তুই গত কাল ওতো রাতে ঘুমিয়ে এতো সকালে কিভাবে উঠলি?

  • আরে আমি তো নামাজ পড়তে এমনেই উঠি। তাই আমার অভ্যাস আছে। আর আমাকে প্রকৃতি ডেকে বাইরে নিয়ে যায় তাই ওতো সকালেই ঘুম ভেঙে যায়। (হেসে)
    ভাইয়াঃ এই রে। অনেক লেট হয়ে গেলো তোর সাথে কথা বলতে বলতে। আমি গেলাম। বাই!
    বলেই একপ্রকার দোড় দিলো ভাইয়া আর আমি আর আপু দুজনেই হেসে দিলাম। আমার আর আদ্রর ডায়রির কথা মনেই ছিলো না।

আজ ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস। আমি একটু সাজুগুজু করছি। যতই হোক আজ প্রথম দিন। তাতেও বিশেষ কোন সাজ নেই। আমি নীল রঙের একটা লং ড্রেস পড়েছি। আমার চুলগুলো প্রায় কোমর ছাড়িয়ে হাটু ছুঁই ছুঁই তাই একটা বিনুনি করে নিয়েছি। চোখে কাজল যা সবসময়েই আমার চোখে থাকে, কানে ছোট ঝুমকা আর সামনে সম্পূর্ন ঢেকে ওড়না নিয়েছি। আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়েছি, ব্যস। আমার সাজ শেষ। আজ ভাইয়া আমাকে দিয়ে আসবে। প্রথম দিন তাই। এরপর থেকে ভাইয়া চাইলেও আর সাথে নেবো না। হুহ! আমি কি বাচ্চা নাকি!

ভাইয়া নিচে গাড়িতে ওয়েট করছে। আপু আমাকে দেখে মাশাল্লাহ বলে কপালে চুমু খেলো আর আমি আপুর গালে চুমু দিয়ে বাই বলে চলে এলাম। রাফিন ঘুমুচ্ছে আর রাইসা স্কুলে তাই কারো সাথে দেখা হয় নি।
নিচে নেমে দেখি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আমি আর সাত পাঁচ না ভেবে ফ্রন্ট সিটে বসে পরলাম। ভাইয়াকে সরি বলতে বলতে যে অনেক টা লেট হয়ে গেলো,

  • ইশ! সরি ভাইয়া! আমার জন্য তোমার লেট হয়ে গেলো।

এমনেতেই তোমার ওই ক্যাপ্টেনকে তুমি যা ভয় পাও।
আর বলতে পারলাম না। কারন ড্রাইভিং সিটে আদ্র বসা। আমি তার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে ঢোক গিলছি। আশেপাশে তাকিয়ে ভাইয়াকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু কোথাও তাকে না পেয়ে নিরাশ চোখে আদ্রর দিকে তাকালাম। তার দৃষ্টি এখনো আমার দিকে। মনে মনে ভাবলাম একেই বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়। ইনি এখানে কি করছে? ভয় ভয় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • আপনি এখানে কি করছেন আর ভাইয়া কোথায়?
    আদ্র শান্ত স্বরে জবাব দিলেন,
    আদ্রঃ আমি এখানে তোমাকে নিতে এসেছি আর মি. মাহমুদ পরে আমাদের জয়েন করবে! তার কাজ আছে।
  • কিন্তু ভাইয়া তো বলেছে আমাকে ভাইয়া কলেজ নিয়ে যাবে। তাহলে?
    আদ্রঃ কেন? আমি নিয়ে গেলে সমস্যা? (ভ্রু কুচকে)
  • (হাসার চেষ্টা করে) না না। স। সমস্যা হবে কেন? আপনার মূল্যবান সময় এভাবে নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। আমি চলে যেতে পারবো!
    বলেই গাড়ি থেকে নামতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার আগে আদ্র আমার হাত টেনে ধরলেন! এক ঝটকায় নিজের কাছে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
    আদ্রঃ চুপচাপ বসো! বেশি কথা আমি পছন্দ করি না।

আমার আর কি করার! চুপ করে বসে রয়েছি। আর উনি আমার দিকে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। আমার যে খারাপ লাগছিলো তা কিন্তু নয় বরং ভালোই লাগছিলো। ওনাকে আমি আর্মি পোশাকে দেখি নি। আজও উনি ফরমাল ড্রেস পরেছেন। আজব বিষয় হলো উনিও আজ নীল পরেছে। নেভি ব্লু শার্ট সাথে অ্যাশ জিন্স। চুলগুলো সুন্দর গোছালো আর মারাত্মক এটিটিউড। উফফ! আবার বুকটা ধুক করে উঠলো।
হঠাৎ উনি আমার কাছ থেকে আমার ফোনটা চাইলেন,
আদ্রঃ তোমার ফোনটা দাও!

  • কেন? আমি আমার ফোন আপনাকে কেন দেবো? (ভ্রু কুচকে)
    আদ্রঃ আমি তোমার ফোন খেয়ে ফেলবো না! দাও। (একটু জোরে)
    আমিও আর কি করবো অগত্যা ফোনের লক খুলে ওনার হাতে ধরিয়ে দিলাম। আর উনি ফোনে কি যেন করলেন। আমার ফোন দিতে তেমন অসুবিধে হয়নি কারন আমার ফোনে তেমন কিছুই নেই। বেচারা কি করতে নিয়েছে সেই জানে!

তাকাতে তাকাতে দেখি আমার ভার্সিটি এসে গেছে। আদ্রকে এখনো ডায়রির কথা বলা হয়নি। মনে পরতেই বলবো তার আগে ভাইয়া ডাক দিলেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে ভাইয়ার কাছে গিয়ে একটু রাগি গলায় বললাম,

  • আমাকে না তোমার নিয়ে আসার কথা ছিলো?
    ভাইয়াঃ (হাসার চেষ্টা করে) আসলে কাজে আটকা পরে গিয়েছিলাম। তোর কোন সমস্যা হয়নি তো?
    খেয়াল করলাম ভাইয়া কথাটা বলতেই আদ্র ভ্রু কুচকে ভাইয়ার দিকে তাকালো আর ভাইয়া আমতাআমতা করতে লাগলো! বিষয়টা আমার একদমই বোধগম্য হলো না। তাই আর কিছু বলিও নি। আমাকে ভার্সিটিতে দিয়ে ভাইয়া আর আদ্র চলে গেলো।

আমাদের ভার্সিটিটা অসাধারণ। এক তো পুরো পরিবেশটাই আমার পছন্দের তার উপর এখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকাও বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করে। আর স্টুডেন্টরাও বেশ ভালো। এখানে খাপ খাওয়াতে বেশি বেগ পেতে হলো না। তার মধ্যে আমার কিছু বন্ধুও হয়ে গেলো। তার মধ্যে নিপা, সুমি, আয়ান আর আবির। আমরা ভালোই এক সাথে সময় কাটিয়েছি। যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন কেন যেন আমার শুধু আদ্রর কথাই মনে হচ্ছিলো। প্রথম দেখতেই উনি আমায় ধমকেছিলেন। ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর। যখন আমি একা একা চিন্তা করে হঠাৎ হেসে উঠলাম তখন পাশে তাকিয়ে দেখি সব আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা যখন বুঝতে পারলাম ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলাম। সুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,

সুমিঃ আফ্রা তুই ঠিক আছিস?

  • হ্যাঁ ঠিক আছি। ও কিছু না। এমনিই হাসছিলাম।
    আয়ানঃ বাহ! এই তোর বন্ধুত্ব? (মুখ ফুলিয়ে)
  • মানে? কি বলছিস? (অবাক হয়ে)
    আয়ানঃ এমনি এমনি কেউ হাসে না। কোন কারন লাগে! আর তার মানে তুই আমাদের থেকে কথা লুকাচ্ছিস!
  • (হালকা হেসে) আরে তেমন কিছু না। বিশ্বাস কর!

আবিরঃ নিজ দায়িত্বে বলে ফেল দেড়ি না করে।
আমার আর কি করার বলে দিলাম ধমক খাওয়ার স্টোরি! সবাই শুনে হাসতে হাসতে শেষ।

ভার্সিটিতে ক্লাস শেষ করে বাইরে বের হতেই দেখি আদ্র গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু উনি এখানে কি করছে? আমাকে দেখেই একটা হাসি দিলেন। উফফ আবার ওনার সেই মারাত্মক হাসি! আচ্ছা উনি কি পাগল? বুঝে না কেন ওনার হাসি আমার সহ্য হয় না। ইচ্ছে করে। ওনাকে ধরে হাসিটা খেয়ে ফেলি গপ করে! ছিঃ ছিঃ আফ্রা! কি সব ভাবছিস তুই! তোর মাথার ভার্জিনিটি শেষ! এবার কি হবে?
প্রেমের টানে

Dustu misti premer golpo


পর্ব ৬

আদ্র হালকা হেসে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ তার কথায় ঘোর কাটলো,
আদ্রঃ কেমন গেলো ভার্সিটির প্রথমদিন?

  • হুম ভালো! আগে বলুন আপনি এখানে কেন?
    আদ্রঃ কেন খুশি হওনি?
  • (ভ্রু কুচকে) আমি কেন খুশি হবো?

আদ্রর এবার যেন হুশ আসলো। আমাকে এবার ধমকে বলল,
আদ্রঃ বেশি কথা না বলে চুপচাপ গাড়িতে গিয়ে বসো। গো। (একটু জোরে)
তা শুনেই আমার আত্মা লাফাচ্ছে। এই লোকটার সাথে আমার যতবার দেখা হয়েছে ততবার লোকটা আমাকে ধমক দিয়েছে। সমস্যা কি ওনার? আমি দোড়ে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়লাম। কিন্তু মনটা আমার বেজায় খারাপ! হবারই কথা। জীবনে বকা কি জিনিস তাই জানি না।

কিন্তু এই লোক আমাকে প্রতিদিন ধমকায়। পাজি লোক একটা। আমার ভাইয়াকে দেখে ভাবতাম সব আর্মি বোধ হয় অনেক রোমান্টিক হয় কিন্তু আমি ভুল এর মতো দু একটা খারুসও আছে যারা সারাদিন মানুষকে ধমকের উপরে রাখে। এর জন্যই ভাইয়া উনাকে এতো ভয় পায়। হুহ!

গাড়ি চলছে আপন মনে আর আমি মুখ ফুলিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। হয়তো আদ্র বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। আড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
আদ্রঃ আফ্রা সরি। তখন তোমার সাথে ওভাবে কথা বলা উচিত হয় নি। এগেইন সরি।
আমি কোন কথা না বলে চুপ থাকলাম। যদিও মনে মনে খুব খুশি হচ্ছিলাম। এক আমি বকা খেতে পেরেছি। কারন আমি এতো এতো দুষ্টুমি করি তাও কেউ কিছু বলে না আর এই লোক কিছু না করাতেই দিলো এক ধমক। আরেকটা বিষয় ওনাকে দেখলেই তো আমার মন ভালো হয়ে যায়। রাগ কিভাবে করবো!

আদ্র ক্যান্টনমেন্টের গেটে চেকপোস্টে গাড়ি থামিয়ে অফিসারদের কি যেন বলছে হয়তো কাজের কথা। কথা শেষ হতেই দেখলাম আদ্র যার সাথে কথা বলছে সে আমাকে উদ্দেশ্য করে আদ্রকে জিজ্ঞাসা করলো,

  • স্যার ইনি কি ভাবী?

বলে কি আমাকে ভাবী বানিয়ে দিলো! আমার ভ্রু কুচকে এলো। আদ্র কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠলাম,

  • কেন? অবিবাহিত থাকলে অন্য কারো ভাবী বানানোর ইচ্ছে আছে?
    আদ্র আর ওই লোকটা আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে মানে তারা কিছুই বুঝে নি! তা বুঝতে পেরে আমি আবার বললাম,
  • আরে বুঝেন নি? অন্যের ভাবী মানে আপনার ওয়াইফ!

এবার দুজনেরই বিষয়টা বোধগম্য হলো। দুজনেই হেসে দিলো। তারপর আদ্র উনাকে কিছু একটা ইশারা করলো। ইশারা করা মাত্র লোকটা হেসে দিয়ে আদ্রকে বলল,

  • পারর্ফেক্ট!
    আদ্রও হেসে থ্যাংকস বলে গাড়ি চালানো শুরু করলো। বিষয়টা আমার মাথার উপর দিয়ে গেছে। সারা রাস্তা আমি চিন্তা করলাম কি যেন ভুলে গেছি। কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।

এর মধ্যে বাসায় পৌছে গেছি। আদ্রকে বাই বলে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে দেখি আরেক কান্ড!
রাইসা স্কুল থেকে এসে নিজের ড্রেস এলোমেলো ভাবে ছিটিয়ে রেখে খাটে শুয়ে রয়েছে আর রাফিন সবগুলো নিজের হাতে কুড়িয়ে কাপড়ের ঝুড়িতে রাখছে সাথে রয়েছে অনেক বকা! কারন অগোছালো তার একদমই পছন্দ নয়, সে বিষয়টাতে মহা বিরক্ত। ওর কান্ড দেখে আপন মনে হেসে নিলাম।

ফ্রেশ হয়ে আপুর কাছে গিয়ে আজকের সবকিছু খুলে বললাম। এটা আমার অভ্যাস। আপুও শুনে হাসলো।

আজ সারাদিন আপুকে জ্বালিয়েছি। কথা একটাই আজ আমাকে নিয়ে ক্যাফে24 যেতেই হবে নয়তো রক্ষে নেই। আমার সাথে আমার পুচকু দুটোও যোগ দিলো। ওদের মতে মিমি যখন বলছে তার মানে বিষয়টা ব্যাপক মজাদার। আপু আর কি করবে অগত্যা রাজি হলো। আর আমাদের খুশি কে দেখে! ঘুরতে যাওয়া মানেই আনন্দ।

বিকেলে একটা লং টপস সাথে লেডিস জিন্স চুলগুলো উপরে পনিটেইল করে নিয়েছি আর হালকা সাজ। আজ লাল রঙের জামা পড়েছি। আমি রেডি হয়ে বাচ্চাদেরও রেডি করিয়ে দিলাম। কিন্তু তার মধ্যেও আমার বোন মহাশয়া নিজের সাজ শেষ করতে পারে নি। হায় রে…..দুলাভাইটার জন্য বড্ড মায়া লাগে! বউকে না পারে কিছু বলতে না পারে কিছু করতে! হাহাহা।

অবশেষে সবাই রেডি হয়ে রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যে। সারা বিকেল ঘুরলাম। প্রথম যখন ক্যাফে24 এসেছিলাম তখন ভেবেছি এটা একটা নরমাল ক্যাফে হবে হয়তো। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর। ছোট ছোট পাহাড় সাথে পাশেই সুন্দর একটা হ্রদ। সেখানে বোডে চড়া যায়। আর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হলো এখানে চেয়ার টেবিল সহ সবকিছুই গাছ কেটে ডিজাইন করে বানানো।

প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তাই আপু বলল একা যাওয়া ঠিক হবে না তাই ভাইয়াকে ফোন করে এখান থেকে আমাদের পিক করতে বলল। আমরাও সবাই অপেক্ষা করছি কিন্তু আমি টেবিলে মাথা দিয়ে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি একদমই খেয়াল ছিলো না। ভাইয়া এসে আপুকে আসতে বললে আমাকে দেখে আমি ঘুমিয়ে গেছি। আমাকে ডাক দিবে তার আগেই কেউ বলল,

  • ওকে ডেকো না আমি ওকে নিচ্ছি।
    বলেই আমাকে কোলে তুলে নিলো। আর ভাইয়া আপু হাসছে। বাচ্চাগুলো নাচতে নাচতে বলছে,
    রাফিনঃ ইয়ে। মিমিকে আদ্দ আংকেল কোলে নিয়েছে। কি মজা! (হাতে তালি দিয়ে)
    হ্যাঁ লোকটা আদ্রই ছিলো। আমি বুঝিনা এই লোকটা কোথা থেকে টপকে যায়!

রাত ১০:১০ মিনিট।
ঘুম থেকে উঠে নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করে অবাক হই। আমি এখানে কি করে এলাম। আপুর রুমে যেয়ে দেখি সবাই মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছে। আমাকে দেখে তাদের মনোযোগ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবো তার আগেই ভাইয়া আপুকে বলে,
ভাইয়াঃ আফিয়া ডিনার রেডি করো। আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। আর আফ্রা তুই ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়। বাচ্চারা চলো!

বলেই চলে গেলো। কি হলো বিষয়টা? আমি অবাক হয়ে এদের কান্ড দেখছি। কিভাবে আমাকে এড়িয়ে চলছে। আমি ফ্রেশ হয়ে গিয়ে ডাইনিং এ বসলাম। দেখলাম আমি কিছু বলতে গেলেই ভাইয়া আটকে দিচ্ছে। এবার তো আমার মেজাজ পুরো তুঙ্গে। টেবিলে হাত দিয়ে আওয়াজ করে বললাম,

  • কেউ যদি এখন আমার কথা এড়িয়ে যাও তো আমি খাবো না। (রেগে)
    দেখলাম আমার আওয়াজে সবাই চুপ আর মাথা নাড়িয়ে আমার কথায় সম্মতি জানালো।
  • আমাকে বাসায় কে নিয়ে এসেছে? সত্যি বলবা!
    ভাইয়াঃ আমরাই তো নিয়ে এসেছি। (মেকি হাসি দিয়ে)
  • তোমরা এনেছো তা আমিও জানি। আর তোমরা আমাকে এভাবে এড়িয়ে কেন যাচ্ছো?
    ভাইয়াঃ তোর রাগের ভয়ে!
  • আমার রাগের ভয় মানে? আর আমাকে উপরে কে নিয়ে এসেছে? দেখো আমি খুব ভালো করে জানি। ভাইয়া কখনোই আমাকে ঘুম থেকে না তুলে কোলে নিয়ে আসবে না! তবে আমাকে কে এনেছে?
    রাইসাঃ আদ্র আংকেল! (মৃদু স্বরে)
  • (ভ্রু কুচকে) আদ্র আংকেল মানে? উনি এখানে কি করছিলেন? আর আপু তুই ওনাকে কিছু বললি না? আমাকে এমনি এমনি কোলে তুলে নিলো?
    আপুঃ ইয়ে। না। মানে। আসলে! (ইতস্ততভাবে)
  • স্পষ্ট কথা বলো। আমতাআমতা আমার পছন্দ নয়!
    ভাইয়াঃ না বোঝার কি আছে আফ্রা? উনি আমার সাথে এসেছিলেন তোমাকে ঘুমাতে দেখে ডাক দিতে মানা করলো। কারন কাঁচা ঘুম ভাঙলে তোমার মাথা ব্যাথা করে। তাই! এবার তো বুঝলি কেন? (নরম সুরে)
  • হুম!

বলেই খাবার খেয়ে ঘরে চলে এলাম। কিন্তু কেন যেন মনে হলো কথাগুলো ভাইয়া বললেও শব্দগুলো অন্যকারো।
অপরদিকে।
ভাইয়াঃ আজ আদ্র জোর বাঁচা বাঁচিয়েছে। (হাফ ছেড়ে)
আপুঃ মানে?

ভাইয়াঃ আমি আদ্রকে টেক্সট করেছিলাম। আদ্রই পরের কথাগুলো আমাকে টেক্সট করেছে।
আপুঃ ছেলেটা বড্ড ভালো! কিন্তু আমার বোনকে নিয়ে আমি শতভাগ চিন্তিত। (অসহায় ভাবে)
ভাইয়াঃ দেখা যাক কি হয়! ক্যাপ্টেন এতো তাড়াতাড়ি হার মানবে না। আমি শিওর।
আপুঃ হুম।
এদিকে আদ্র আফ্রার ছবির সামনে এসে বাঁকা হাসছে। আর মনে মনে বলছে,
আদ্রঃ ক্যাপ্টেন আরফান চৌধুরি আদ্রর বউয়ের একটু আধটু জেদ না থাকলে কি হয় নাকি! বাট ইউ আর ভেরি জিনিয়াস। আমাকে নিমিষে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখো। নিজেকে তোমার সামনে সামলানোর চেষ্টা করি তবুও মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয়ে যাই! খুব বড় অন্যায় করেছো! শাস্তি তো পেতেই হবে! মাই লেডি! যেমনটা বান্দরবানে পেয়েছো।


পর্ব ৭

রাত ২:১০ মিনিট। ,
রুমে বসে এখনো ভাবছি যে সবটাই কিভাবে কো-ইন্সিডেন্ট হয়! না চাইতেও আদ্রর সাথে প্রতিদিন দেখা হওয়া! আদ্রর আমার প্রতি এতো কেয়ার নেওয়া! বিষয়গুলো আমাকে ভীষণ ভাবায়। কেন যেন আদ্রর আচরণগুলো আমাকে ভীষন ভাবায়! কিভাবে জানতে পারবো ওর বিষয়ে?

অনেক ভাবার পর মনে হলো আরে আমার কাছে তো ওর ডায়রি আছে। ওইটাতেই কিছু পাওয়া যাবে! যা ভাবা তাই কাজ। ডায়রিটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ করে বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পেলাম। ভয়ে কানে হাত দিয়ে রেখেছি। এই একটা জিনিস আমার একদমই পছন্দ নয়। গুটিসুটি মেরে বসে রয়েছি। এখন আমার কারো সঙ্গ দরকার। এতো রাত হয়ে গেছে তাই আপুকেও ডাকতে পারছি না। কি করি! হঠাৎ করে আমার ফোনে মেসেজের টিউন বাজলো। ফোন নিয়ে দেখি আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে।

“ভয় পেয়ো না। সাথেই আছি। ফোন হাতে রাখো। আমি কল করছি!”
মেসেজটা পড়তে না পড়তেই আমার ফোন বেজে উঠলো। কলটা দেখে আমার ভ্রু কুচকে এলো। এতো রাতে আমাকে কে কল দিবে আবার বলছে ভয় পেয়ো না! মানে? সে কি করে জানলো আমি ভয় পাচ্ছি?

বলতে বলতে একবার ফোনটা কেটে গেলো। আবার ফোনটা বাজতেই রিসিভ করি। তখনই আবার বজ্রপাতের শব্দ। ভয়ে আমার নাকমুখ খিচে বন্ধ করে ফেলেছি। ফোনটা কানে নিতেই ওইপাশের কন্ঠস্বর শুনে আমি স্তব্ধ। থেকে থেকে ঢোক গিলছি। কারন কন্ঠস্বর শুনেই বুঝতে পেরেছি কলটা আদ্র করেছে! কিন্তু উনি।
আদ্রঃ আফ্রা! (নরম সুরে)

  • হুম!

আদ্রঃ আমার সাথে কথা বলো! ভয় কেটে যাবে!

  • আপনি আমার নাম্বার কোথা থেকে পেলেন? (অবাক হয়ে)
    আদ্রঃ (হালকা হেসে) তুমি কি বারবার ভুলে যাও যে আমি একজন আর্মি? এইসব ইনফরমেশন বের করা আমার জন্য কিছুই না।
  • তা ঠিক আছে কিন্তু আপনি আমাকে এতো রাতে কেন ফোন দিলেন?
    আদ্রঃ তোমার ভয় কাঁটাতে।
  • আপনি কি করে জানেন আমি বজ্রপাতে ভয় পাই?
    আদ্রঃ জানি! এমন অনেক কিছুই জানি যা হয়তো তুমিও জানো না তোমার বিষয়ে!
  • আমার বিষয়ে আর আমিই জানি না! (অবাক হয়ে)
    আদ্রঃ হুম!
  • তা কি এমন বিষয়?
    আদ্র হাসলো। আর বলল,
    আদ্রঃ বললে তো লজ্জা পাবা!
  • (ভ্রু কুচকে) লজ্জা পাবো মানে?
    আদ্রঃ তুমি বলো তুমি লাইফে কখনো মিথ্যা বলোনি?
  • হ্যাঁ তো? মিথ্যা বলিনি তো বলবো কেন? (মনে মনে আল্লাহ প্লিজ ক্ষমা করো। নাহলে আজ আমার মান ইজ্জত সব শেষ হয়ে যাবে! )
    আদ্র আবারো হাসলো।
    আদ্রঃ আচ্ছা রান্না করতে গিয়ে হাত কিভাবে পুরেছে?
  • (মনে মনে। যা ভয় পাইছি তাই হইছে) দেখুন হাত রান্না করতে গিয়ে পুরে নি! ওইটা তো চুরি করে খেতে গিয়ে।
    এবার আমার হুশ আসলো আমি কি বলছি! শালা! আমার মুখ থেকে সত্যি কথা বের করে ফেলল।
    আদ্র এবার অট্টহাসি দিলেন।

আদ্রঃ কি বলেছিলাম না এমন কিছু জানি যা তুমিও জানো না! তুমি সবাইকে বলেছো যে রান্না করতে গিয়ে হাত পুরেছে! কিন্তু কারন তো অন্যকিছু।

  • আপনি কি করে জানলেন?
    আদ্রঃ কারনটা না জানাই থাক!
  • কেন কেন?

আদ্রঃ কারন সময় হলে আমি নিজেই বলবো।

  • আচ্ছা আপনি রাতে ঘুমান না?
    আদ্রঃ কেন? ঘুমাই তো!
  • তাহলে এতো রাত জেগে আমার সাথে পকপক করছেন কেন?
    আদ্রঃ পকপক কোথায় করলাম? আমি তো তোমার ভয় দূর করার জন্য ফোন দিলাম!
  • এখন আর শব্দ হচ্ছে না। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

আদ্রঃ আফ্রা! (আহ্লাদী সুরে)
ওনার মুখে আমার নামটা শুনে বুকে কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠলো! এতো আহ্লাদী ভাবে কেউ ডাকে? নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে লাগলাম,

  • হুম!
    আদ্রঃ বাই। তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো আর। কিছুনা! গুড নাইট!
    বলেই ফোনটা কেটে দিলো। কেন যেন মনে হচ্ছিলো উনি আমায় অনেক কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু কিছু বাঁধা তাকে আটকে দিয়েছে।

সকাল ৫:০০ মিনিট।
উঠে তাড়াতাড়ি নামাজ পড়ে নিলাম। আজ আর বাইরে যাই নি। এমনিতেও আজ উঠেছি একটু দেড়ি করে। রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য ব্রেকফাস্ট বানালাম। তারপর গোসল করে ভার্সিটির জন্য রেডি হতে লাগলাম। এর মধ্যে আপুও উঠে গেছে। আজ নাস্তায় পুডিং, চা, রুটি, ভাজি, আর বাচ্চাদের জন্য দুধ। সবাই কেবল নাস্তার টেবিলে বসেছি এর মধ্যেই কলিং এর আওয়াজ। ভাইয়া গিয়ে গেট খুলে দিলো। আমি ফোনে সুমির সাথে কথা বলছিলাম তাই ওতোটা খেয়াল করি নি। বুঝতে পারলাম পাশে কেউ বসেছে। ফোনটা কেটে পাশে তাকাতেই দিলাম এক চিৎকার।

আদ্রঃ কি হলো? এবার চিৎকার দিলে কেন? (ভ্রু কুচকে)

  • আপনি এখানে কি করছেন? (অবাক হয়ে)
    আদ্রঃ কি আর করবো? নাস্তা করছি! ভাবী। ভাজিটা কিন্তু সেই হইছে। পুডিং টাও খুব টেস্টি। (খেতে খেতে)
    আপুঃ এগুলো আমি বানাই নি। আফ্রা বানিয়েছে! (হেসে)
    আদ্রঃ মাশাল্লাহ! আমার ভাগ্য খুলে গেছে।
  • আমার রান্নার সাথে আপনার ভাগ্য খুলার কি সম্পর্ক? (ভ্রু কুচকে)
    আদ্রঃ (হালকা হেসে) ও। তুমি বুঝবে না পিচ্চি!
  • বুঝবো না যখন সামনে বসে বলেন কেন? (রেগে)

আদ্র কিছু না বলে শুধু হাসলো। আজব পাবলিক! রাইসা আর রাফিন নাস্তা করে আমার কাছে এসে গালে চুমু দিলো। কারন পুডিং তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। তারপর হাতের পিঠে চুমু দিলো কারন রান্নাটা তাদের খুব ভালো লেগেছে। আদ্র জিজ্ঞাসা করতেই ওরা চুমু দেওয়ার কারন বলতে লাগলো। আমি চা খাচ্ছিলাম। এর মধ্যে আদ্র ওদের জিজ্ঞাসা করলো,
আদ্রঃ আচ্ছা পুরো মানুষটা পছন্দ হলে কোথায় কোথায় পাপ্পি দিতে হয়? (চিন্তিত ভাবে)

আদ্রর কথা শুনে আমার মুখের চা বাইরে বাইরে অবস্থান করলো। সাথে সাথে আমি ভীষম খেলাম। চোখগুলো বড় বড় করে আদ্রর দিকে আকিয়ে আছি। লোকটা কোন লেভেলের অসভ্য। বাচ্চাদের জিজ্ঞাসা করছে কোথায় কোথায় চুমু দেবে? আনবিলিভেবল! আমার অবস্থা দেখে আদ্র বলতে লাগলো,
আদ্রঃ সাবধানে খাও! কাম ডাউন! (ভাবলেশহীন ভাবে)

আমি কিছু না বলে খেতে শুরু করলাম কিন্তু আমার বাচ্চাগুলোও হয়তো চায়না আমি খাই! আদ্রকে তারা নির্ভীক ভাবে উত্তর দিলো,
রাইসাঃ পুরো মানুষটা পছন্দ হলে সব জায়গায় পাপ্পি দিতে হয়! কারন আমার কোন ডল পছন্দের হলে আমি ডলটাকে ধরে সব জায়গায় চুমু খাই!
এবার আর আমি থাকতে পারলাম না। মানে এটা কোন কথা! লজ্জা নামক একটা বিষয় আছে! যা এদের মাঝে বিন্দুমাত্র নেই। বাচ্চাগুলো তো কিছু বুঝে না! কি বলবে! আমি উঠে জাস্ট একবার সবার দিকে তাকালাম। সবাই মিটমিট করে হাসছে। আর এই অসভ্য আদ্র। উনি নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসছে! আমি সোজা রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম!

প্রায় অনেক্ষন হওয়ার পরেও যখন দরজা খুলছি না তখন আপু এসে ডাকতে শুরু করলো।
আপুঃ আফ্রা! তুই ভার্সিটি যাবি না? আদ্র আর রিয়াদ তোর জন্য অপেক্ষা করছে!

  • আপু আমি পরে যাবো। আই নিড রেস্ট! তাদের চলে যেতে বলো। আমি একা চলে যেতে পারবো।
    আপুঃ কিন্তু!
  • কোন কিন্তু নয়! যাও! এই দাড়াও!
    দরজাটা খুলে আদ্রর ডায়রিটা আপুকে দিয়ে বললাম দিয়ে দিতে! আর বললাম বলতে যে আমি তার ডায়রি বিন্দুমাত্র পড়িনি।
    আদ্র বেশ বুঝতে পেড়েছে আমি লজ্জায় তাদের সামনে আসছি না। তাই আপুকে বলল আমার জন্য গাড়ি আর ড্রাইভার রেখে যাবে। তারপর আপুর থেকে ডায়রিটা নিয়ে বেড়িয়ে পরলো। আর আমিও তাদের যাওয়ার কিছুক্ষন পর ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হলাম।

পর্ব ৮

ভার্সিটির চত্তরে বসে আছি আমি, সুমি, নিপা, আয়ান, আবির। বসে বসে বোর হয়ে গেছি। এর মধ্যে নিপাকে দেখলাম কার দিকে তাকিয়ে যেন মুচকি মুচকি হাসছে! আরে ব্যস! ইনি তো এখানে কাহিনী করছে। দেখতে হচ্ছে তো! আমি মুচকি হেসে আয়ান, আবির আর সুমিকে ইশারা করলাম। ওরাও দেখে হাসতে লাগলো,

  • নিপা! কাহিনী কি দোস্ত?
    নিপাঃ কিসের কাহিনী? কোন কাহিনী নাই! (থতমত খেয়ে)

সুমিঃ ওও। ঠিক আছে! ভাবছিলাম তোর সাথে কিছু হলে আয়ান আর আবিরকে দিয়ে কিছু একটা মেনেজ করবো! কিন্তু না। তুই তো বললি কোন কাহিনী নাই।

  • হ্যাঁ! একদম ঠিক!
    নিপাঃ না। মানে। আসলে আমার কাছে রিফাতকে খুব ভালো লাগে! (আমতাআমতা করে)
  • এই! তুই না একটু আগে বললি কোন কাহিনী নেই! তাহলে? (ভ্রু কুচকে)
    নিপাঃ এমন বলিস না দোস্ত! আসলে রিফাত আমাকে পছন্দ করে কিনা তা জানি না! (মন খারাপ করে)
  • উমম। বিষয়টা দেখতে হচ্ছে!
    নিপাঃ (খুশি হয়ে) কবে দেখবি দোস্ত?
  • কেন? তোর বিয়ে করার বেশি শখ জাগছে?
    নিপাঃ যাহ! (লজ্জা পেয়ে)
  • ওলেলে! সর যাহ! আমাকে যেতে দে!
    আয়ানঃ তুই আবার কই যাস আফ্রা?
  • আরে আজকে ১০ই বেংগল আর ১৯ই বেংগলের খেলা আছে। আর আমার দুলাভাই ১০ই বেংগলের তাই সেও খেলবে!
    আবিরঃ ১০ই বেংগল আর ১৯ই বেংগল! এগুলো কি?
  • ওহ! তোরা জানিস না? এগুলো হলো ইউনিট! আর্মিদের আলাদা আলাদা ইউনিট থাকে।
    আবিরঃ ওহ আচ্ছা।
  • আচ্ছা তোরাও চল আমার সাথে।
    আয়ানঃ কিন্তু ভিতরে ঢুকতে তো পারমিশন লাগবে! আমাদের কাছে তো নেই।
  • তুই কি পাগল? আমাকে চোখে পড়ে না?
    আয়ানঃ হো দোস্ত পড়ে! চল।

সবাই মিলে চেকপোস্টের কাছে এসে আমি সবার পরিচয় দিলাম। কিন্তু বেশি কিছু বলা লাগলো না। ওই দিনের ওই অফিসারটা এসে আবার ভাবী ভাবী লাগাইছে! রিডিকিউলাস!
অফিসারঃ ভাবী আপনি যান। কোন সমস্যা নাই।

  • (বিরক্ত হয়ে) আচ্ছা আমি আপনার কোন জন্মের ভাবী লাগি?

অফিসারঃ সেটা তো স্যার জানে! (হেসে)
আমি আর কিছু না বলে বন্ধুদের নিয়ে খোলা মাঠে চলে গেলাম। মাঠটা অনেক সুন্দর। চারপাশে ছোট ছোট টিলা, মাঝখানে খোলা মাঠ। আমরা একটু দেড়ি করেই এসেছি। কারন মাঠের চারপাশে মানুষ ভর্তি। খেলাও মেবি কিছুক্ষন পর শুরু হয়ে যাবে। এর মধ্যেই আপুকে দেখতে পেলাম। বন্ধুদের নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বাচ্চা দুটো দোড়ে আমার কাছে আসলো। আপুকে ওদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। এর মধ্যে রাফিন আর রাইসা খুব সুন্দর ভাবে ওদের সাথে মিশে গেছে। আয়ানের কোলে গিয়ে রাফিন আমার দিকে ফিরে কিছুক্ষন তাকিয়ে বলল,
রাফিনঃ আমার আদ্দ আংকেলই বেষ্ট!

আমি ভ্রু কুচকে ওর দিকে তাকিয়ে হেসে দিলাম। এই ছেলে বলে কি!

  • আমি কি জিজ্ঞাসা করেছি কে বেষ্ট? আর আয়ান আংকেলকে কেন পছন্দ হলো না?
    রাফিনঃ আদ্দ আংকেল আমাকে বেশি আদর করে। আর এই আংকেলটাও আদর করে কিন্তু আদ্দ আংকেলই বেষ্ট!
  • আয়ান কিছু মনে করিস না। এই ছেলের মনে যা থাকে তাই বলে দেবে। কাউকে পরোয়া করে না!
    আপুঃ হুম! তোর মতো যে হয়েছে!
  • হুহ! আমার ছেলে আমার মতো হবে না?
    আমার কথায় সবাই হেসে দিলো। রাইসা এতোক্ষন ড্যাবড্যাব করে নিপাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো। নিপা বিষয়টা খেয়াল করে নিচু হয়ে বসে রাইসার গাল ধরে জিজ্ঞাসা করলো,
    নিপাঃ কি হয়েছে প্রিন্সেস?
    রাইসাঃ কিছু না। জানো আন্টি! তোমাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
    নিপাঃ (হেসে) তাই নাকি?

রাইসাঃ হুম।
নিপা রাইসার গাল ধরে আলতো করে টানলো!

  • ব্যস! হয়ে গেলো। আমাকে আর কোন দরকার নেই। (অভিমানী কন্ঠে)
    রাইসাঃ কি বলো তুমি এসব মিমি? তুমি তো খুব ভালো করেই জানো যে তুমি আমার ছোট মা! তাহলে?
  • হ্যাঁ! জানি আমার আম্মা! আমি মজা করছিলাম। (হেসে)

এর মধ্যেই খেলা শুরু হওয়ার অ্যানাউন্সমেন্ট হলো।
আমি সবাইকে নিয়ে সিটে বসে গেলাম! সব প্লেয়াররা মাঠে প্রবেশ করছে, ভাইয়াকেও দেখলাম। কিন্তু শেষে আদ্রকে দেখে সবচেয়ে বেশি অবাক হলাম। অটোমেটিক আমার ভ্রু কুচকে এলো। সচরাচর এইসব খেলায় ক্যাপ্টেনরা অংশগ্রহণ করে না। তাই আপুকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • আপু! উনি এখানে কি করছে?
    আপুঃ উনি কে?
  • উফফ! আমি আদ্রর কথা বলছি!
    আপুঃ ওও। আদ্র থেকে উনি! (ভ্রু উচিয়ে)
  • তো কি ডাকবো? বয়সে আমার চেয়ে বড়, আর হয় দুলাভাইয়ের স্যার! তো আমার কি হয়? (বিরক্ত হয়ে)
    আপুঃ টেনশন নট! হয়ে যাবে!
  • কি হয়ে যাবে?

আপুঃ কিছুনা খেলায় কনসেন্ট্রেশন কর!

  • সেটাই জিজ্ঞাসা করছিলাম! উনি কেন খেলবে? উনি তো ক্যাপ্টেন না?
    আপুঃ আরে গেম তো ক্যাপ্টেনরা মিলেই ঠিক করেছে। তাই সবাই খেলতে পারবে।
  • ওহ!

খেলা চলছে। প্রথমে ভাইয়াদের টিম পিছিয়ে ছিলো। বলতে গেলে প্রথমে দেখলে যেকেউই ভাববে যে ১০ই বেংগল হারবে। কিন্তু এই আদ্র শেষে পুরো গেম উলটে দিয়েছে। যেখানে প্রথমে ০-৫ ছিলো এখন তা ৭-৫। ৪৫ মিনিটের পর এখন বিরতি চলছে। সবাই ঘেমে একাকার। কিন্তু আমার বেহায়া চোখ খালি আদ্রর দিকেই যাচ্ছে। অসভ্যটা মাঠেই টি-শার্ট চেঞ্জ করছে! আর এদিকে আমার অবস্থা খারাপ। আমার দিকে আড়চোখে তাকাতে আমি চোখ ফিরিয়ে নি। তা দেখে আদ্র মুচকি হেসে দেয়। সুমি আমাকে বলে,
সুমিঃ এই আফ্রা! তোর দুলাভাইয়ের টিমের ক্যাপ্টেন তোর দিকে বারবার তাকাচ্ছে কেন?

  • আমি কি করে বলবো!

আপুঃ হবু বউয়ের দিকে তাকাবে না তো কার দিকে তাকাবে? (আনমনে)

  • (ভ্রু কুচকে) কি হইছে?
    আপুঃ (থতমত খেয়ে) না। কিছুনা! আমি তো বলছি এমনি তাকিয়েছে!
    আমার ভোলাভালা বোনটা দিন দিন কেমন যেন রহস্যময়ী হয়ে উঠছে। অবশেষে ভাইয়াদের টিমই জিতেছে। আদ্র খুবই স্থিরবুদ্ধির সাথে খেলেছে। খেলা শেষে আমার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে মাঠ থেকে চলে গেলো। লোকটা ভীষণ অদ্ভুত। আমাকে দেখে বারবার হাসে কেন? আমি কি জোঁকার নাকি?

আজকাল আমি আদ্রর উপস্থিতি অনুভব করতে পারি। অনুভূতিটা একদম আলাদা! কাছাকাছি থাকলেই যেন আমার মনে আলাদা এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। একা একা যখন আমি ভাবনায় বিভোর তখন রাইসা আমার কাছে এসে বসলো। তার কথায় আমার ভাবনায় ছেদ পড়লো,
রাইসাঃ মিমি! মিমি! চলোনা পার্কে যাই। ভাই ঘুমায় তাই আম্মু যেতে পারবে না।

  • হুম! চল। রেডি হয়ে নি।

রেডি হয়ে পার্কে চলে এলাম। আমার একমাত্র দুর্বলতা হলো দোলনা। যেটা রাইসা খুব ভালো ভাবে জানে। আমি ওর দিকে তাকাতেই ও দোড়ে দোলনার কাছে গিয়ে বাকি বাচ্চাদের কি যেন বলল আর বাচ্চারা সাথে সাথে জায়গাটা খালি করে দিলো। রাইসা আমাকে ইশারায় বসতে বলল। আমিও বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়লাম। দোলনায় দোল খেতে খেতে রাইসাকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • রাই! ওদের এমন কি বললি যে সুন্দর করে দোলনা খালি করে দিলো!
    রাইসাঃ কিছু না মিমি! ওরা আমার কথা শুনে আর তোমার কথা বলায় জায়গাটা ছেড়ে দিলো।
  • ভালোই দাপট আছে তোর! (হেসে)
    রাইসাঃ হুম!

আরো কিছুক্ষন রাইসাকে নিয়ে পার্কে ঘুরলাম। এর মধ্যেই দেখি রাফিন কান্না করতে কর‍তে আমার কাছে দোড়ে এলো। পিছন পিছন আপুও আসছে। আমি রাফিনকে কোলে নিতেই আমার গালে চুমু দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে আমার কাধে মাথা রাখলো। বুঝাই যাচ্ছে মাত্র ঘুম থেকে উঠেই আমার কাছে এসেছে। আমিও ওর গালে, কপালে চুমু দিলাম।

  • কি হয়েছে আমার বাবাটার? কান্না কেন করেছো? কেউ বকেছে?
    রাফিন আমার কাধে মাথা রেখেই মাথা নাড়িয়ে না বলল।

রাফিনঃ আমাকে ফেলে কেন চলে এসেছো?

  • তোমাকে ফেলে আসি নি তো। তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে বাবা!
    এর মধ্যেই আপু এসে হাজির।
    আপুঃ ঘুম থেকে উঠেই জিজ্ঞাসা করে মিমি কোথায়? আপু কোথায়? তোদের না পেয়েই কান্না শুরু।

আমি রাফিনকে কোলে নিয়েই ক্যান্টিনে চলে যাই। চকলেট কিনে বাচ্চাদের দেই। রাইসার বন্ধুদেরও দিয়েছি। বাচ্চাগুলো অনেক কিউট। সবাই চকলেট পেয়ে ভীষন খুশি।

রাতে ভাইয়া এসে জানালো কাল পার্টি আছে। পরিবারের সবাইকে যেতে হবে। প্রথমে যেতে চাই নি, কিন্তু ভাইয়ার জেদের কাছে হার মানতে হলো। তার এক কথা আমাকে না নিয়ে সে কিছুতেই যাবে না। যেহেতু এটা ইউনিটের পার্টি তাই সবাইকে থাকতে হবে।

ডিনারের পর।
আপু তো তখন থেকে শাড়ি সিলেক্ট করা শুরু করেছে কিন্তু তার কিছুই ভালো লাগছে না। আমি আড়চোখে আপুর দিকে তাকিয়ে ফোন চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অবশেষে আমিই সিলেক্ট করে দিলাম একটা খয়েরি রঙের শাড়ি। আপুতো ভীষণ খুশি। আর ভাইয়া রীতিমত আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে। আজ আমি শাড়ি সিলেক্ট না করে দিলে ভাইয়াকে আপু সারারাত ঘুমাতে দিতো না।
সকাল ৪:৫০ মিনিট।

তাড়াতাড়ি উঠে নামাজ আদায় করে নিলাম। আজ মনটা খুব ভালো তাই বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। একা একা পার্কে বসে আছি। দোলনায় বসে বসে খালি গলায় গান গাইছি। এটা আমার অভ্যাস। যখন মন খুব বেশি ভালো থাকবে তখন গান গাইবো।
“মেলেছো চোখ, উড়েছে ধুলো।
দূরের পালক তোমাকে ছুঁলো।
তবু আজি আমি রাজি
চাপা ঠোঁটে কথা ফোঁটে
শোন।

আমাকে রাখো চোখের কিনারে। গোপন মিনারে।
jo wada kiya woh nibhana parega
roke zamana chahe roke khudayi
tumko aana parega…..

ঘুম ভেঙে কিছু মেঘলা দিনও হোক
ওড়নার পাশে সেফটিপিনও হোক
বিকেলের নাম অ্যাল পাচিনো হোক
খেয়ালি ছাতে।

কফি কাপে একা ঠোঁট ছোঁয়ানো দিন
চুপি চুপি কেঁদে রোদ পোহানো দিন
ভালো হয় যদি সঙ্গে আনো দিন
যেকোন রাতে।

জানি দেখা হবে। ঠোঁটের ভিতরে। ঘুমের আদরে।
চকমকি মনি মন জ্বালাতে চাই
দিনে ব্যালকনি বৃষ্টি রাতে চাই
পিছু ডাকে ঘুম সাজাতে চাই
বিছানা ঘিরে।

ছোট ল্যাম্পশেড অল্প আলো তার
চুল খুলে কে যে রুপ বাড়ালো তার
তুমি বোঝো না কি মন্দ ভালো তার
যেওনা ফিরে।

জানি দেখা হবে রাতের সোহাগে তোমার পরাগে।
jo wada kiya woh nibhana parega
roke zamana chahe roke khudayi tumko aana parega…..”

  • বাহ! কন্ঠটা তো দারুন! গান শেখেন বুঝি?
    আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি লোকটির দিকে।

পর্ব ৯

লোকটির কথা শুনে আমি চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি একজন সুদর্শন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে। মুখে মুগ্ধতার ছোঁয়া। আমি ভ্রু কুচকে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছি। লোকটি আমাকে ভ্রু কুচকাতে দেখে মৃদু হাসলো। তারপর আমাকে বলতে লাগলো,
আদিলঃ হাই! আমি আদিল জামান।

  • হাই! (হাসার চেষ্টা করে)
    আদিলঃ আপনার পরিচয়?
  • তা জেনে আপনার কোন উপকার হবে বলে আমার মনে হয় না!
    আদিলঃ না। এমনিই জানতে চাইছিলাম।
  • কিন্তু আমি বলতে ইচ্ছুক না।
    আদিলঃ আপনি অনেক সুন্দর গান করেন।
  • ধন্যবাদ।
    বলেই ওইখান থেকে চলে এলাম। অপরিচিত লোক। সেধে সেধে কথা বলতে আসছে! আজব!

বাসায় এসে দেখি আপু নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে। নাস্তা করে ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে নি। আজ এক প্রফেসরের ক্লাস আছে। তিনি নাকি খুব কম ক্লাস নেয়। বেশিরভাগ ঢাকায় ক্লাস করায়। তাড়াতাড়ি একটা ব্লু আর গোলাপি কম্বিনেশন এর একটা লং ফ্রক পড়ে, চুলে একটা বেনুনি করে নি। আমার সাজের মধ্যে শুধু চোখে কাজল আর কানে ঝুমকা। আপুকে বলে নিচে নেমে দেখি ক্যাপ্টেন সাহেব গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক হলাম। কিছু না বলে তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই আমার হাত ধরে খুব স্টাইলিশ ভাবে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলো।

আদ্রঃ আমাকে এভোয়েড করে কোথায় যাচ্ছো? (ভাবলেশহীন ভাবে)

  • আজব! আমি তো আমার ভার্সিটি যাচ্ছি। আপনাকে কখন এভোয়েড করলাম?
    আদ্রঃ এই যে আমাকে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছো?
  • আপনি তো এখানে হয়তো কোন কাজে এসেছেন। তো কাজ না করে আমার সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
    আদ্রঃ হ্যাঁ! কাজেই এসেছি। গাড়িতে বসো।
  • আমি কেন আপনার গাড়িতে বসবো? আমার ক্লাস আছে।
    আদ্রঃ আমি তোমাকে ভার্সিটি নামিয়ে দেবো তাই গাড়িতে উঠো।
  • আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমি একাই চলে যেতে পারবো।
    আদ্রঃ জানি পারবে। আমি যখন এসেছি, তাই আমিই তোমাকে নিয়ে যাবো।
  • কোন দরকার নেই।

আদ্রঃ বেশি কথা না বলে গাড়িতে উঠো! (ধমকে)
আমি একটু লাফিয়ে উঠলাম এর ধমকে। তবুও তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই একপ্রকার কাধে তুলে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে গাড়ি লক করে দিলো। আর নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে দরজা লাগিয়ে দিলো। আমি তাকে কতকিছু যে বলছি তার কোন ইয়াত্তা নেই। কিন্তু উনি এক ধ্যানে সিটে গা এলিয়ে বসে আছে কপালে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ বুঝে আছে। যেন তার কান অবধি আমার কথা পৌছাচ্ছে না। আমি ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ আমার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
আদ্রঃ এভাবে কেন জ্বালাচ্ছো? কোন কাজে মন দিতে পারছি না। টেল মি! কি সমস্যা?

  • আমিও সেটাই বলছি! কি সমস্যা আপনার? সব জায়গায় কিভাবে টপকে যান?
    আদ্র ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকালো। তারপর আপনমনে হেসে আমাকে বলল,
    আদ্রঃ তা যদি বুঝতে তাহলে তো আমার সমস্যারই সমাধান পেয়ে যেতাম।
  • মানে? (ভ্রু কুচকে)
    আদ্রঃ কয়টা বাজে? (ঘড়ির দিকে ইশারা করে)

আমি হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একপ্রকার চিল্লিয়ে বললাম,

  • ৯:২০ বাজে! আমার ১০:০০ টায় ইম্পরট্যান্ট ক্লাস আছে! আমি কি করবো!
    আদ্র হালকা হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। ভার্সিটি যেতে যেখানে প্রায় এক ঘন্টা লাগে আদ্রর স্পেশাল ড্রাইভের কারনে সেখানে মাত্র ২৫ মিনিটে পৌছেছি। ভাবা যায়! আমার মনে হচ্ছিলো এই বুঝি আমার প্রান ভোমরাটা উড়ে গেলো। আদ্র একদম স্বাভাবিকভাবে বসে আছে। আর আমি এক ধ্যানে সামনে হা করে তাকিয়ে আছি। জাস্ট এতোটুকুই বললাম,
  • আপনাকে কে লাইসেন্স দিয়েছে?

আদ্র হেসে কিছু না বলে আমার কাছে এসে গালে চুমু দিয়ে বলল,
আদ্রঃ বায়!
আমি এবার অবাকের শেষ সীমানায় পৌছে গেলাম। এই লোকটা কি করলো। আমি চোখ বড় করে গালে হাত দিয়ে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে আমি কোন ঘোরের মধ্যে আছি। যেখানে আমার আদ্রর গালে এক চড় বসানো উচিত ছিলো সেখানে আমি বোকার মতো বসে আছি গালে হাত দিয়ে। ভিতরে ভিতরে রাগে ফেটে যাচ্ছি। আর বাইরে মনে হচ্ছে কেউ এক বালতি লজ্জা ঢেলে দিয়ে গেছে। রিডিকিউলাস! আমি জাস্ট গেট খুলে ব্যাগ নিয়ে আদ্রকে বললাম,

  • আই উইশ আপনার সাথে আমার আর জীবনে দেখা না হয়! নাহলে হয়তো আপনার কিছু করে দেবো আর না পারলে নিজের! (প্রচন্ড রেগে)
    বলেই হনহন করে ক্লাসে চলে এলাম। ইচ্ছে করছে সবকিছু তছনছ করে দি। সবকিছু জাস্ট অসহ্য লাগছে। আবির, আয়ান তখন থেকে জিজ্ঞাসা করছে আমার কি হয়েছে! কিন্তু আমি কোন মতে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারছি না। তারমধ্যেই আমাদের ক্লাসে ঢুকলেন নতুন প্রফেসর! যাকে দেখে এবার মনে হচ্ছে রাগ আমার সপ্তম আকাশে উঠে গেছে। এই সেই লোক যে সকালে আমার গান লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছে। নিজেকে কোন মতে সামলে নিয়ে ক্লাস শেষ করলাম। আর এই লোক আদিল না ফাদিল! আমাকে দেখে ওনার ২৪টা দাত বের করে হেসেছে! উফফ অসহ্য! ক্লাস শেষ করে ভার্সিটির ডান দিকে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। কি সুন্দর তার লাল লাল ফুলগুলো। গাছটার নিচে বসে আছি। এতো কেন রাগ লাগছে নিজেই বুঝতে পারছি না।

কিছুক্ষন পর আয়ানকে বললাম,

  • এই তুই আজ গিটার নিয়ে আসিস নি?
    আয়ানঃ হ্যাঁ আছে তো। কেন?
  • নিয়ে আয়!

আয়ান জানে এখন আমাকে প্রশ্ন করা মানে আগুনে ঘি ঢালা! চট করে গিটারটা নিয়ে এলো। আমাকে দিলে আমি শুকনো মুখে থ্যাংকস বলি। সবাই অবাক! আমি গিটার নিয়ে কি করবো! আসলে বেশি রাগ লাগলেও আমি গান গাই। আর যেহেতু এখানে আমি আমার গিটার নিয়ে আসি নি তাই আয়ানেরটা চেয়েছি। কিন্তু ওরা কেউই জানে না আমি গিটার বাজাতে পারি। কিছুক্ষন আপন মনে গিটারের তারে হাত বুলালাম। তারপর সবাইকে অবাক করে গিটারে সুর তুল্লাম। চোখ বন্ধ করা অবস্থায় বুঝতে পারছি সবাই চরম অবাক। কিন্তু এখন আমি নিজের মাঝে নেই। সুরের সাথে তাল মিলিয়ে ধরলাম গান।

“চলোনা একই পথে মিলেমিশে হারাই
একই আকাশে ভেসে বেড়াই।
দেখবো আড়াল থেকে
তুমি আছো কোথায়।
আমি একা বসে আজও
তোমারি আশায়।

তবে কেনো শূন্য খেয়ালে
আটকে আছো নিরব দেয়ালে।
তবে কেনো চলে গেলে।
কি হতো বলে গেলে।?
দূরে একা নীরবে আমি
নিজের মতো আঁকি তোমাকে।

তোমার আকাশে আমার বিচরণ
মনে পড়ে সেই তোমাকেই সারাক্ষন।
তবে কেনো শূন্য খেয়ালে
আটকে আছো নিরব দেয়ালে।
তবে কেনো চলে গেলে।
কি হতো বলে গেলে।?
তবে কেনো।”

গানটা গেয়ে আমার এতো ফ্রেশ লাগছিলো! মনে হচ্ছিলো কোন রাগ আর অবশিষ্ট নেই। আপন মনে হেসে চোখটা খুলে দেখলাম ভার্সিটির প্রায় সবাই জড়ো হয়ে আমার গান শুনেছে। আর এতক্ষন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। গান কখনোই শিখিনি। ওটা ভাইয়াকে দেখে আয়ত্ত করা। স্কুল, কলেজ লাইফে অনেক গান গেয়েছে ভাইয়া ইভেন এখনো গায়। কিন্তু আমি কখনো বাইরে ট্রাই করিনি।

সবার হাত তালিতে আমার হুশ ফিরলো। সবাই গুণগান করতে লাগলো। আমি সবাইকে থ্যাংকস বলে উঠে চলে গেলাম। আর আমার ফ্রেন্ডস গুলোও পিছু পিছু আসছে! আমার এখন ব্যাপক হাসি পাচ্ছে। কারন আমার ফ্রেন্ডগুলো সেই তখন থেকে আমার কান খেয়ে ফেলছে।
আয়ানঃ বইন তুই এতোদিন ধরে আমাদের থেকে তোর ট্যালেন্ট লুকিয়েছিস! পাপী!
সুমিঃ এই আমারে কেউ চিমটি কাট! এটা কি সত্যি?

আমি হেসে দিয়ে সুমিকে জোরে চিমটি কাটলাম। আর বললাম,

  • তোদের অবাক হবারই কথা বাট আসলে তেমন পরিস্থিতি ছিলো না গান গাওয়ার! আমি বেশি খুশি হলে আর বেশি রেগে গেলেই গান গাই। (হেসে দিয়ে)
    আদ্রঃ তাহলে তো ভবিষ্যতে তোমাকে বেশি করে রাগাতে হবে!
    আমি পিছনে ফিরে আদ্রকে দেখে মটেও অবাক হইনি। কিন্তু আমার বন্ধুমহলের সব অবাকের শেষ পর্যায়।
  • আপনি এখানে কি করেন?

আদ্রঃ দেখতে আসছি আমাকে আবার দেখলে জানি কি করবা বলছিলা! (হেসে)

  • দেখেন আমার এখন মনটা অনেক ভালো তাই উল্টাপাল্টা কথা না বলে এখান থেকে যান।
    আদ্রঃ তোমার সাথে কথা আছে! আমার সাথে চলো! কাম! এক্সকিউজ আস এভ্রিওয়ান!
    বলেই আমার হাত টেনে ওখান থেকে নিয়ে এলো।

Dustu misti premer golpo


পর্ব ১০

আদ্র আমাকে একপ্রকার টেনে ওখান থেকে নিয়ে এলো।

  • আরে আরে। কি সমস্যা টানছেন কেন? হাত ছাড়ুন!
    আদ্রঃ (ভ্রু কুচকে) চুপচাপ থাকো।
  • আরে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেনটা কোথায়?

আদ্র কোন কথা না বলে আমাকে নিয়ে গাড়িতে বসালেন। আর গাড়ি ড্রাইভ করে পতেঙ্গা নিয়ে এলেন। আমি তো অবাক উনি আমায় এখানে কেন নিয়ে এলেন!
আদ্রঃ সকালে কিছু খেয়েছো?

  • আপু আমাকে না খেয়ে বের হতে দেয় না তাই খেয়েই বের হয়েছি।
    আদ্রঃ কিন্তু আমি খাইনি। আমরা এখন একটা রেস্টুরেন্টে যাবো খেতে!
  • আপনি পতেঙ্গা এসেছেন সকালের নাস্তা করতে! এখন বাজে কয়টা জানেন?
    আদ্র হাত ঘড়ি দেখে বলল,
    আদ্রঃ ১২:৩৪ মিনিট! কিছু করার নেই! আমাকে এখনই খেতে হবে!
  • হ্যাঁ তো! এখানে আমাকে আনার মানে কি?
    আদ্রঃ চুপচাপ চলো।

আমি বসে বসে আদ্রর খাওয়া দেখছি। আর উনি এক ধ্যানে বসে খাবার খাচ্ছে। খাওয়া শেষ করে আমাকে বলল,
আদ্রঃ ঘুরতে যাবে?
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। এই লোকটা আসলেই পাগল নয়তো!

  • ঘুরতে যাবো মানে? আর আপনার কোন কাজ নেই? ক্যাপ্টেন হয়ে কাজে ফাঁকি মারেন? (ভ্রু কুচকে)
    আদ্র হালকা হেসে বলল,

আদ্রঃ কে বলল আমি কাজে ফাঁকি মারি?
বলেই নিজের ফোনটা এগিয়ে দিলো। আমি তো অবাক। একদিকে খাচ্ছিলো আর অন্যদিকে কাজও করছিলো। অদ্ভুত!

  • আচ্ছা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
    আদ্রঃ করো!
  • আপনি আমার পিছনে কেন পড়ে আছেন?
    আদ্রঃ কে বলল আমি তোমার পিছনে পড়ে আছি?
  • এভাবে আমাকে নিয়ে প্রতিদিন ভার্সিটি নিয়ে যান নিয়ে আসেন! আমাকে নিয়ে হুটহাট ঘুরতে যান! বিষয়টা কি?
    আদ্রঃ জানিনা! ঘুরতে ভালো লাগে তাই যাই। আর তোমার বিষয়ে কেন এমন করি তাও আমার অজানা!
  • (এক শ্বাস ফেলে) আপনার কিভাবে অজানা হয়?

আদ্রঃ তাহলে তোমার কিকরে না জানা হয়?

  • আপনি কিন্তু কথা ঘুরাচ্ছেন!
    আদ্র কিছু না বলে শুধু হাসলো! আমি কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ির সামনে ডেস্কে আদ্রর ডায়রিটা চোখে পড়লো। এমনিতেই মেজাজ খারাপ। ডায়রিটা দেখে মনে হলো এই আমাকে এই আদ্র রহস্য খুলতে সাহায্য করবে। আজকে চুপ করে ডায়রিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছি। দূর থেকে দেখলাম আদ্র আসছে। তাই চুপচাপ রইলাম। খুব ভালো করেই জানি এই ডায়রি এখানে পড়া সম্ভব নয়! আদ্র এসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।

আদ্রঃ আজ আমাদের পার্টিতে আসছো তো?

  • হুম (আনমনে)
    আদ্রঃ (হেসে) ওকে!
    আমি কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলাম।

আমাকে বাসায় ড্রপ করে আদ্র চলে গেলেন। এর মধ্যে আমার বন্ধুরা ফোন দিয়ে অস্থির করে তুলছে। কি বিষয়! উনি আমাকে কেন টেনে নিয়ে গেলেন! এতো করে বলছি যে শুধু শুধুই কিন্তু এদের বিশ্বাস করার নাম নেই।

দুপুর ২:০০ মিনিট।

গোসল করে জোহরের নামাজ পড়ে লাঞ্চ করলাম। খাওয়ার পর আপু বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাতে গেলেন আর আমি আমার রুমের দরজা লাগিয়ে ফ্যান ফুল পাওয়ারে ছেড়েছি চুল শুকাতে। আমার হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাতে একদম ভালো লাগে না। চুল লম্বা হওয়ার জন্য ভেজাও থাকে অনেক্ষন। হঠাৎ মনে পড়লো ডায়রির কথা। ডায়েরিটা হাতে নিতে নিতে ফোনের শব্দ পেলাম। এই দুপুরে কে! ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম আদ্র ফোন দিয়েছে! আদ্র নামটা দেখেই একটা ঢোক গিললাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলতেই ওইপাশ থেকে খুব অস্থির কণ্ঠস্বর শুনা গেলো।

আদ্রঃ আচ্ছা তুমি কি কোন ডায়রি পেয়েছো! সবুজ রঙের?
আমি চুপ করে রইলাম! কি বলবো এখন? আমি যে বিপদ ছাড়া কখনো মিথ্যা বলি না। তাও সাহস জুগিয়ে বললাম,

  • ডায়রি? কিসের ডায়রি?
    আদ্রঃ ওইযে ডায়রিটা যেটাতে লেকে বসে লিখেছিলাম।
  • কি জানি আমি কিভাবে বলবো?
    আদ্র কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল,
    আদ্রঃ আচ্ছা।

ফোন কেটে আমি স্থির হয়ে কিছুক্ষন বসলাম। আর ভাবছি যে ওইদিনও তো ডায়রিটা আমার কাছে ছিলো তখন তো এরকম রিয়েক্ট করে নি! তাহলে আজ কেন? কি আছে এই ডায়রিতে?

অন্যদিকে।
আদ্রঃ ডায়রিটা কোথায় গেলো? ওইদিনের ডায়রিটা তো পারসোনাল ছিলো না তাই আফ্রাকে কিছু বলি নি। কিন্তু আজ আমার ডায়রিটা কোথায় যাবে? (চিন্তিত ভাবে)

আফ্রা মাত্র ডায়রিটা খুলল।
প্রথম পেজে শুধু আদ্রর নাম লেখা। পরের পেজ উল্টাতেই আফ্রার চোখে পড়লো একটা তারিখ। তারমানে এটা ২৫ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের লিখা! এতো পুরনো! সাথে কিছু লেখা আছে,
“আজ ভার্সিটি যাবার পথে এক নীলপরীর সাথে দেখা হলো। এতোটা ম্যাচুয়ারিটি একটা বাচ্চার মধ্যে কি করে থাকে! নীল রঙের কুর্তি সাথে হাত ভর্তি নীল চুড়ি! হাত নাড়ানোর সাথে সাথে তার চুড়ির রিনঝিন শব্দ। আমাকে তো প্রথম দর্শনেই ঘায়েল করলো। এখন আমার পালা!”

তারপরের পেজ উল্টাতেই চোখে পড়লো আরেকটা লেখা।
“সকালবেলা এই শ্যামবতির চেহারায় যে কি জাদু আছে তা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না! যদিও সবটাই হয় তার অগোচরে!”

ভাবতে শুরু করলাম! আদ্র যে কথা গুলো একটা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলেছে তার কোন সন্দেহ নেই। আর লেখাগুলো পড়ে মনে হচ্ছে মেয়েটা তার স্বপ্নকন্যা! আদ্রর ডায়রিটা যত পড়ছি। মনে হচ্ছে পুরো টা একেবারে শেষ করি। বেশ ইন্টারেস্টিং!
ডায়রিটাতে খুব সুন্দর করে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হয়েছে।
তোমাকে জড়িয়ে ধরে তোমার চুলে মুখ গুঁজতে! প্রান ভরে তোমার ওই চুলের সুবাস নিতে! কেন এভাবে চুল খুলে আমাকে মাতাল করো? তুমি বড্ড অপরাধী! আমার অপরাধী!

লেখাটা পড়ে আমি চোখ বড় করে আছি। একটা মানুষ কি করে এতোটা কাব্যিক হয়? প্রতিটি লেখাই যেন জীবন্ত!

ডায়রিটা পড়ে যখন নিজ মনে সবটা গুছাচ্ছিলাম তার মধ্যেই পড়লো আপুর ডাক! আমি ডাকে সাড়া দিয়ে, একটা নিরাপদ জায়গায় ডায়রিটা লুকিয়ে রাখলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে আদ্র ডায়রিটা খুঁজতে আসতে পারে!

আপু পার্টির জন্য রেডি হচ্ছে। বাচ্চাদের আমি রেডি করে নিজে রেডি হতে শুরু করলাম। ডায়রি পড়তে পড়তে খেয়ালই ছিলো না কখন বিকেল হয়ে গেছে। আমি রেডি হয়ে নিলে ভাইয়া সহ সবাই পার্টির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। অনেক মানুষ এখানে। কিন্তু কেন যেন আমার চোখ শুধু আদ্রকেই খুঁজছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেয়েও গেলাম আদ্রকে! ব্লু রঙের সুটে তাকে কোন নায়কের চেয়ে কম লাগছে না। অস্বাভাবিক সুন্দর! এই লোকটা কি জানে তাকে দেখলে আমার রক্তের সঞ্চালন অনেক বেশি দ্রুত হয়ে যায়! মনে মনে বলতে বলতেই আদ্রর সাথে চোখাচোখি হলো। আর আদ্র ভ্রু টা কুচকে ফেলল। আল্লাহই জানে কেন!


পর্ব ১১

আদ্র আমাকে দেখে কেন ভ্রু কুচকালো বুঝতে পারলাম না৷ আমি একবার আদ্রর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

আপু আমাকে তার কোন কোন ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো। আজ আমি একটা লাল জামা পড়েছি, সাজের মধ্যে আহামরি কিছু না। ইচ্ছে করেই সাজি নি আমি। তার কারন হলো আপুর এই সো কল্ড ভাবিদের জন্য। একবার আপুর সাথে একটু সেজে পার্কে গিয়েছিলাম। বাবা রে বাবা! সব ভাবিরা একদম ঝেঁকে ধরেছিলো! আর কি দুষ্টু দুষ্টু কথা! আমার এতো লজ্জা লাগছিলো যা বলার বাহিরে!

কথা বলছি এর মধ্যে আমার জামায় এত্তোগুলা জুস ফেলে চলে গেলো একটা লোক। কি পরিমান যে রাগ লাগছিলো তা বলার বাহিরে! উফফ! একটু দেখে চললে কি হয়! মনে মনে এত্তোগুলা গালি দিতে দিতে ওয়াশরুমে গেলাম। কিন্তু এখন পড়লাম বিপত্তিতে! জামাটা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। এভাবে বাইরে যাওয়া যাবে না। কি করি! এর মধ্যেই আপুর আগমন। আমাকে নিয়ে একটা রুমে গেলো।
আপুঃ আফ্রা কোন কথা না বলে এই শাড়িটা পর! ভিজে কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।

আমি শাড়িটা হাতে নিয়ে দেখলাম খুব সুন্দর একটা ব্লু রঙের শাড়ি। কিন্তু এটা কোথা থেকে এলো?

  • শাড়িটা কোথায় পেলে?
    আপুঃ অনলাইন অর্ডার করেছিলাম! ভেবেছি হয়তো কোন কাজে এসে যাবে! দেখ কাজেও এসে গেলো।
  • অনলাইনে কিনলে তা তো বাসায় যাবে এখানে কি করে?

আপুঃ আ। আসলে বাসায়ই দিতো বাট আমরা এখানে তাই এখানের ঠিকানা দিয়েছি পরে!

  • (সন্দেহজনকভাবে) ওহ!
    আপুঃ বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি শাড়িটা পর!
  • শাড়ি তো পেলাম কিন্তু ব্লাউজ, পেটিকোট?
    আপুঃ সাথেই আছে দেখ!

আমিও প্যাকেট খুলে অবাক! কারন শাড়ির সাথে ম্যাচিং অর্নামেন্টসও আছে।
আমি আর বেশি কিছু না ভেবে শাড়িটা পড়ে নিলাম। অদ্ভুতভাবে মনে হলো শাড়িটা আমার জন্যেই কেনা! কেননা ব্লাউজ আর পেটিকোট একদম পারফেক্ট সাইজ। কিন্তু আপু তো আমার থেকে একটু মোটা। মানে আপু পারফেক্ট আমিই একটু পাতলা!

আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে শাড়িটা পড়ে শুধু কানের দুলটা পড়লাম। শাড়ির সাথে শুধু কানের দুলই আমার পছন্দ। লিপস্টিক টা মুছে আপুর ব্যাগ থেকে একটা গোলাপি লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে দিলাম। অপ্রিয় হলেও সত্যি যে আমার আপুর ব্যাগে প্রায় পাঁচ রঙের লিপস্টিক থাকে সাথে মেকআপ তো আছেই। তা দিয়েই মোটামুটি সেজে নিলাম। আপু আবার এসে আমাকে দেখে মাশাল্লাহ বলল আর কানের পিছনে কাজলের টিপ দিলো। আমি শুধু অবাক হয়ে এর কান্ড দেখছি।

আপুঃ আমার পিচ্চিটাকে অনেক সুন্দর লাগছে। কারোর নজর না লাগুক!

  • আপু তোমার শেষ? (অসহায়ভাবে)

আপুঃ (মুচকি হেসে) হুম শেষ। কিন্তু আজ কেউ তোকে দেখে বেহুশ হতে চলেছে!

  • (ভ্রু কুচকে) কে বেহুশ হতে চলেছে?
    আপুঃ আব। কিছু না। চল বাইরে!
    আমিও আর কিছু না বলে আপুর সাথে যাচ্ছি। শাড়ি পড়ে হাঁটার অভ্যাস আছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়েছি তাই।

চুলগুলো খোলা থাকায় বাতাসের তালে তালে তা উড়ছে। আর মুগ্ধ চোখে কেউ তাকিয়ে আছে। এই সেই নজর যার সাথে আমি খুব ভালো ভাবে পরিচিত! কিন্তু এখানে কি করে? আমি চিন্তিত ভাবে আশে পাশে খুঁজছি সেই নজরের মালিককে! আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়েছি নিজের অগোচরে। হঠাৎ হাতে টান অনুভব করলাম সাথে সাথে নিজেকে একটা অন্ধকার রুমে আবিষ্কার করলাম।

চিৎকার দিতে নিলে মনে হলো কেউ আমার মুখ চেপে রেখেছে হাত দিয়ে।
আমি শুধু উম্ম উম্ম করছি কিন্তু অবয়বটা মুখ ছাড়ার নাম করছে না। তখনই কানে এলো ফিসফিস করে কথার শব্দ। আমি পুরো শকড। এ তো আদ্রর গলার আওয়াজ!
আদ্রঃ তুমি জানো তোমাকে কতটা মারাত্মক সুন্দর লাগছে! ইচ্ছে তো করছে!

বলেই আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এলো। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছি। এর মধ্যে আদ্র রুমের আলো জ্বালিয়ে দিলো। আমি চোখ খুলে দেখি আদ্র কেমন যেন ঘোরলাগা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আর তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। কেমন যেন মনে হচ্ছে এখনই হারিয়ে যাবো ওই অতল দৃষ্টিতে! আদ্র এখনো এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটু সাহস করে বললাম,

  • আমাকে এখানে কেন এনেছেন?
    সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,
    আদ্রঃ ম্যারি মি। আই লাভ ইউ! বি মাইন!

আমি হা করে তাকিয়ে আছি আদ্রর দিকে। কি নিঃসংকোচ আবেদন!

  • কিহ! (চিল্লিয়ে) আপনি পাগল হয়ে গেছেন? আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছেন কখনো?
    আদ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
    আদ্রঃ কেন? আমার চেহারা খারাপ বুঝি? কত মেয়েতো ক্রাশ খায় আমার উপর!
  • ক্রাশ খাওয়ার মতো তো খাবে না?

আদ্রঃ মানে? (ভ্রু কুচকে)
আমি আদ্রকে আয়নায় নিয়ে দাড় করিয়ে বললাম,

  • দেখুন নিজের চেহারা!
    আদ্র আয়নায় তাকিয়ে বোকার মতো বলল,
    আদ্রঃ আমাকে এতো খারাপ দেখতে?

এবার আমার ভ্রু কুচকে এলো। ওনাকে খারাপ দেখতে মানে?

  • আপনাকে কেন খারাপ দেখতে হবে? আপনার চেহারাটা কত সুন্দর তা দেখতে বলেছি!
    আদ্রঃ তো?
  • আরে। আপনি এতো সুন্দর! তো আমার পিছে পড়ছেন কেন? এতো এতো সুন্দরি চোখে পড়ে না?
    আদ্র এবার বুঝলো বিষয়টা কি। আমার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
    আদ্রঃ আই ওয়ান্ট ইউ! আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনিওয়ান এলস!
  • বাট ওয়াই?
    আদ্র কিছু না বলে শুধু আমার গালে চুমু দিয়ে মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলো। এই লোকটার সমস্যা কি! এতো রহস্য কেন ওনার মধ্যে?

বাইরে বেরিয়ে আদ্রকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। আপুর কাছে গিয়েও মনটা কেমন উশখুশ করছে। আদ্র কি করতে চলেছে? এর মধ্যেই ভাবিদের বেশ ভীর হয়ে গেছে আমার আশেপাশে। আর শুরু হয়ে গেছে তাদের আজাইরা কথা! এর মধ্যেই এক ভাবি আপুকে জিজ্ঞাসা করলো,
ভাবি: আপনার বোনকে বিয়ে দেবেন না রিয়াদ ভাবি?

আমি আপুর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওখান থেকে কোন মতে বেরিয়ে আসলাম। দূরে থেকে ওনাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আপু কি যেন বলল সাথে সাথে ওই ভাবির মুখটা বাংলার পাঁচ হয়ে গেলো। জানি না কি বলেছে, কিন্তু জা বলেছে বেশ বলেছে! ওই ভাবির মুখটা দেখে আমার বেশ লেগেছে। আমার একটা বিষয় খুব ভালো লাগে আর তা হলো। সেনাবাহিনীতে সকল ভাবিরা একে অপরকে তাদের হাসবেন্ডের নামের পর ভাবি লাগিয়ে ডাকে। যেমন হাসবেন্ডের নাম রিয়াদ বলে আপুকে তারা রিয়াদ ভাবি বলে ডাকে। ব্যাপারটা আমার কাছে ব্যাপক লাগে। মাঝে মাঝে আমিও আপুকে মজা করে রিয়াদ ভাবি ডাকি!

আমি পার্টিতে ভাইয়াকে খুঁজছিলাম। কারন ভাইয়াই আমাকে এই মহিলাদের কাছ থেকে সেভ করতে পারবে। ভাইয়াকে তো পেলাম না কিন্তু আমার পুচকু দুটোকে পেয়েছি তাতেই আমার হবে। আমি ওদের কাছে যেতেই দোড়ে আমার দিকে আসলো। আমিও নিচু হয়ে ওদের ধরলাম। এর মধ্যেই আমার সাথে আদ্র চোখাচোখি হলো। উনি দাঁড়িয়ে অন্য লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। আমাকে দেখে একটু মুচকি হাসলেন।

স্টেজ থেকে একজন আদ্রর নাম নিলেন। সবাই ওইদিকে মনযোগ দিলেন। যতটুকু স্টেজের লোকটার কথা শুনে বুঝলাম আদ্র ভার্সিটি পড়াকালীন ডিফেন্স এর এক্সাম দিয়ে টপ করেছে আর ট্রেনিং এও সবার ফার্স্ট ছিলো। আর বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করে খুব অল্প সময়েই ক্যাপ্টেন হয়েছে। আমিতো পুরো অবাক। এতো ট্যালেন্টেড পারসোন! আমি আদ্রর দিকে তাকাতেই আদ্র বা চোখ টিপ দিয়ে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে। আমার দৃষ্টি এখনো আদ্রর দিকে। আমাকে আরেক ধাপ অবাক করে, সবার অনুরোধে গান ধরলেন। চমৎকার ভাবে গিটারের সুর তুলে গাইতে আরম্ভ করলেন,
“বলোনা কেনো তুমি বহুদূর
কেন আমি একা?

হৃদয়ে ভাংচুর
জানো না
তুমি হীনা এ আমার
স্বপ্ন মেঘে ঢাকা
নামে না রোদ্দুর!
দেয়ালে দেয়ালে, খেয়ালে খেয়ালে
হিসেবে বেহিসেবে তোমাকেই খুঁজি
আড়ালে আড়ালে, কোথায় হারালে?
ফিরে তুমি আর আসবে না বুঝি?

কত রাত কেটে গেছে আঁধারে
নেইতো ভোরের দেখা
বোঝাবো কিভাবে?
কত ঘুম মিশে গেছে অজানায়
জানে শুধু দু’চোখ
ভুল সে স্বভাবে

দেয়ালে দেয়ালে, খেয়ালে খেয়ালে
হিসেবে বেহিসেবে তোমাকেই খুঁজি
আড়ালে আড়ালে, কোথায় হারালে?
ফিরে তুমি আর আসবে না বুঝি?

তবু আমি তোমার অপেক্ষায়
দেখবো নতুন দিনের আলো
বেঁচে থাকার আশ্রয় তুমি
তোমাকেই শুধু বাসি ভালো
দেয়ালে দেয়ালে, খেয়ালে খেয়ালে
হিসেবে বেহিসেবে তোমাকেই খুঁজি
আড়ালে আড়ালে, কোথায় হারালে?
ফিরে তুমি আর আসবে না বুঝি?

বলো না কেনো তুমি বহুদূর
কেন আমি একা
হৃদয়ে ভাংচুর
জানো না
তুমি হীনা এ আমার
স্বপ্ন মেঘে ঢাকা
নামে না রোদ্দুর!”

গান শেষ হতেই সবার হাত তালিতে পুরো পরিবেশ এক উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। আমিও মুগ্ধ চোখে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছি। আদ্র স্টেজ থেকে নেমে সবার সাথে কথা বলছে। আমিও এদিকওদিক তাকাচ্ছি। একটা কথা শুনে থমকে গেলাম। কেউ আদ্রকে জিজ্ঞাসা করলো,

  • তা ক্যাপ্টেন! আমরা কবে আমাদের ভাবিকে পাচ্ছি?
    আদ্র নিঃসংকোচ ভাবে বলল,
    আদ্রঃ খুব তাড়াতাড়ি!

বলেই আমার দিকে আড়চোখে তাকালো। আমি তৎক্ষনাত ওই স্থান ত্যাগ করলাম। ভাইয়াকে দেখে তার কাছে চলে গেলাম। আমার মুখ ফুলানো দেখে বলল,
ভাইয়াঃ কি হয়েছে আমার শালিকার?

  • সবকিছু বিরক্ত লাগছে! (ফিসফিস করে)
    ভাইয়াঃ কেন?
  • জানিনা!
    বলেই আবার মুখ ফুলিয়ে বসলাম। আদ্র আমার সাথে সাথেই এসে এতোক্ষন আমার কান্ড পর্যবেক্ষণ করছিলো। আমার কাহিনী দেখে ভাইয়া আর আদ্র দুজনেই হো হো করে হেসে দিলো।

পর্ব ১২

ভাইয়া আর আদ্রকে এভাবে হাসতে দেখে আমার আরো রাগ হলো। মুখ ফুলিয়ে চলে এলাম তাদের কাছ থেকে।

অবশেষে এই পার্টি নামক আজাইরা জিনিস থেকে মুক্তি পেলাম। বাসায় এসে কোন রকম চেঞ্জ করে ঘুমিয়ে পরলাম। ফোনটাকেও সাইলেন্ট মোডে রেখেছি।

সকাল ৪:৪৮ মিনিট।
তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে বসে পড়লাম আদ্রর ডায়রি নিয়ে। ডায়রিটা আমার কৌতুহলকে দ্বিগুণ মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। পেজ গুলো যত খুলছি তত অবাক হচ্ছি। কি সুন্দর করে নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছে।
“এই মেয়ে! তুমি এতো বোকা কেন? তোমার জন্য এখানে কারো ঘুম হারাম হয়ে গেছে আর সে তার ঘুম ঘুম কন্ঠ দিয়ে আমার মাদকতা বাড়াচ্ছে! খুব পাজি তো তুমি! একবার আমার কাছে এসে পরো তখন বোঝাবো মজা!”
কি সাংঘাতিক! মেয়েটাকে বোকা বলছে… এহ! উনি মনে হয় বিশ্ব পণ্ডিত! হুহ!

মনে মনে কথা বলে আবার ডায়রিতে মন দিলাম।
“প্রতিদিন যে ছাদে বসে চন্দ্রবিলাস করি সাথে গিটারের সুর। কবে এসে আমার পাশে বসে, আমার কাধে মাথা রেখে আদুরে গলায় বলবে, আদ্র আজ তুমি আমার জন্য গিটারে সুর তোলো!”
আরেকটা পাতায় দেখলাম লেখা।

“আমার শ্যামবতির মন কেন খারাপ? আমি কিন্তু জানি আমার শ্যামবতির মন কিভাবে ভালো করতে হয়! পাশে চকলেট পেয়ে যে বাচ্চাদের মতো লাফিয়েছো তা আমি মুগ্ধ নয়নে গ্রাস করেছি তা কিন্তু তোমার অজানা! হাহা!”
আমি অবাক! একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে তার অগোচরে নিজের প্রিয়তমার খুশির জন্য এতোটা করে! আপন মনেই হেসে উঠলাম আমি। কিন্তু আদ্রর এই শ্যামবতি টা কে? ডায়রির কিছু পাতা পরে একটাতে লেখা,
তারিখঃ ১ ডিসেম্বর ২০১৫

“তুমি খুব খারাপ! এভাবে কেন চলে গেলে? আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আদ্র কখনো হার মানবে না। আমি তোমাকে আপন করেই ছাড়বো। আজ কিছু বলতে পারিনি তো কি হয়েছে। পরেরবার সম্পূর্ণ অধিকারে বেধে রাখবো। #প্রেমের_টানে আমার কাছে তুমি আসবে! এবং আমি সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি।”

আমি ভাবতে লাগলাম আসলেই কি এমন কিছু হয়? প্রেমের টানে কেউ কিভাবে আসে? আর সেই মেয়েটাই বা কে? তাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে!

আজ বাইরে বের হইনি। কেন যেন ভালো লাগছিলো না। ডায়রিটা পেয়ে এটাই শুধু পড়তে ইচ্ছে হয়। আমি এক ধ্যানে ডায়রি পড়ছিলাম। ধ্যান ভাঙল আপুর ডাকে। তাড়াতাড়ি ডায়রিটা লুকিয়ে ফেললাম।

আদ্র এখনো তার ডায়রি খুঁজে চলেছে। গেলো কোথায় ডায়রিটা? যদিও লেখাগুলো তার স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট আছে তবুও ওর ডায়রিতে সেই লেখাগুলো যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো। আদ্রর কেন যেন মনে হচ্ছে ডায়রিটা যার জন্য লেখা তার কাছেই আছে। কিন্তু তা হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবে নয়তো অনিচ্ছাকৃত ভাবে। কিন্তু গেছে অতোটুকু বলা যায়। ভেবেই হেসে দিলো। সেও দেখতে চায় তার শ্যামবতি তাকে কতটুকু বুঝতে পারে! সে ডায়রিতে সরাসরি কিছুই উল্লেখ করে নি। শুধু নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছে।

নাস্তা করে রাইসাকে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। আজ উনি ঘুম থেকে উঠতে না পারায় বাস মিস করেছে। তাই রাইসাকে স্কুলে দিয়ে আমি ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কিন্তু তার আগেই দেখি আদ্র গাড়ি নিয়ে রাইসার স্কুলে দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকটা জীবনে শুধরাবে না। আদ্র আমার কাছে এসে গাড়িতে বসতে বলল। আমিও আর কথা বাড়াই নি, কারন জানি বলে কোন লাভ হবে না। আদ্র ড্রাইভ করা শুরু করেছে। আমি আদ্রকে বললাম,

  • আচ্ছা আপনি কি আমাকে আনা নেওয়ার চাকরি নিয়েছেন?
    আদ্রঃ (মুচকি হেসে) নিলে দোষের কি?
  • মানে কি? আপনি একটা আজব মানুষ! আপনার রহস্য আমি কিছুতেই ধরতে পারি না। (মুখ ফুলিয়ে)
    আদ্রঃ এই রহস্য জানতে হলে আমায় জানতে হবে। আরো গভীরে যেতে হবে! পারবে যেতে?
    আমি মনে মনে ভাবলাম। আদ্র কিছু বুঝে যায়নি তো? ওর কথাগুলো কেমন যেন রহস্যপূর্ণ! আমি আর কিছু না বলে চুপ থাকলাম। মাঝরাস্তায় দেখা মিলল একটা মেলার! আমি তো দেখেই চিৎকার দিয়ে আদ্রকে গাড়ি থামাতে বললাম। আদ্র আমার দিকে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো,
    আদ্রঃ এভাবে চিৎকার করার কারন?
  • (দাঁত কেলিয়ে) ওই দেখুন মেলা!
    আদ্রঃ তো?
  • আমি যাবো ওখানে! (বাচ্চাদের মতো করে)

আদ্র আমার এক্সাইটমেন্ট বুঝে নিয়ে গেলো মেলায়। আমি প্রতিটা স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছি। একটা বিষয় আমার খুব ভালো লাগলো যে এখানের মেলায় গ্রামীন ছোঁয়া বেশি আছে। ১০০ ভাগ বাঙালিয়ানা যাকে বলে। আমি দোড়ে গিয়ে চুড়ি দেখা শুরু করলাম। কারন এই একটা জিনিস আমার অত্যন্ত প্রিয়। আদ্র মুগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তো এটা সেটা দেখতে ব্যস্ত কিন্তু তার মধ্যেও ফিল করলাম সেই নজরকে! আমার সাথে তো আদ্রই এসেছে। তার মানে! আমি আশেপাশে তাকিয়ে আদ্রকে খুঁজে পেলাম না। এবার আমার মনে বেশ সন্দেহ হলো। এই আদ্রর রহস্য আমাকেই ভেদ করতে হবে। কে এই শ্যামবতি?

আমি এখনো ওই নজরটাকে ফিল করছি। আশে পাশে তাকাতেই হঠাৎ আদ্র পিছন থেকে এসে আমাকে চমকে দিলো। আমি বেশ রেগেই বললাম,

  • কোথায় চলে গিয়েছিলেন?
    আদ্রঃ কেন আমায় মিস করছিলে?
  • এটা মিস করার বিষয় না। একটা মেয়েকে এভাবে একা ফেলে যাওয়া টা কি ঠিক?
    আদ্রঃ ওকে সরি বাট আমি তোমাকে একা ছাড়ি না। তোমার পাশেই ছিলাম। তোমার অগোচরে।
    আমি খেয়াল করলাম আদ্রর প্রতিলাইন যা সে আমাকে বলে তার প্রায়শই ডায়রির সাথে মিলবদ্ধ! তার মানে কি? নাহ! এভাবে হুট করে আমি বলতে পারি না। আমাকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। অদ্ভুত বিষয় হলেও আমি খেয়াল করেছি আদ্র পাশে থাকলে সেই নজর আমি ফিল করি না। ওই নজরটা আমাকে সবার আড়াল থেকে দেখে কিন্তু কেন?

মনে মনে যখন আকাশ পাতাল ভাবছি তখন হঠাৎ করে আদ্র আমার হাতে লাল রঙের কাঁচের চুড়ি পড়িয়ে দিয়েছে। চুড়িগুলো অনেক সুন্দর। আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে। আপাতত চিন্তা করা বাদ দিয়ে মেলা থেকে অনেক কিছু নিলাম। রাইসার জন্য ছোট ছোট চুড়ি, মালা, রাফিনের জন্য খেলনা। এখানে খুব সুন্দর তাঁতের কাপড় পাওয়া যায়। একটা স্টলে খুব সুন্দর সুন্দর পাঞ্জাবি চোখে পড়লো। আদ্র তখন কি যেন কিনছিল তাই হয়তো আমায় চোখে পড়ে নি। আমি রাফিনের জন্য একটা লাল, ভাইয়ার জন্য সবুজ আর আদ্রর জন্য খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি কিনেছি। যদিও তা আদ্র দেখতে পায় নি।

অনেক কেনা কাটার পর আমি ভার্সিটি চলে গেলাম। জানি আদ্র আবার আসবে নিতে তাই তখন ওর পাঞ্জাবিটা ওকে দেই নি। ঠিকই। ক্লাস শেষে বের হয়ে দেখি জনাব গাড়ির সাথে হেয়ান দিয়ে স্টাইল মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আর কত মেয়ে যে একে চোখ দিয়ে গিলছে তা হয়তো ওনার জানা নেই। আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো যদিও কেন হলো তা আমার অজানা। আমি আশেপাশে অগ্নিদৃষ্টি দিচ্ছি দেখে। আশেপাশে তাকালো। আর কাহিনী বুঝতে পেরে হেসে দিলো। আদ্রর হাসির শব্দে আমার হুশ আসলো! কি করছিলাম আমি? পাগল হয়ে গেলাম নাকি? ইশ! কি লজ্জা!

আমাকে আদ্র বাসায় ড্রপ করে বাসায় যাবে। আমি গাড়ি থেকে বের হয়ে পাঞ্জাবির প্যাকেট টা আদ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,

  • এটা আপনার জন্য কিনেছি। পছন্দ হলে পড়বেন। আর ধন্যবাদ আমাকে মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
    আদ্র অবাক চোখে তাকিয়ে হাতের প্যাকেট টা নিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
    আদ্রঃ অবশ্যই! তাহলে এটা কি থ্যাংকইউ গিফট?

আমি মুচকি হেসে বললাম,

  • হতেও পারে!

বলে বাসায় চলে এলাম। পিছনে না ফিরেও বুঝতে পারলাম আদ্র আজ মারাত্মক খুশি হয়েছে। আমিও হেসে দিলাম ওনার কান্ডে।
বাসায় এসে সবাইকে সবার গিফট দিলাম। রুমে এসে আমার গিফটের প্যাকেট খুলে আমি অবাক। আমার জন্য ছিলো দুইটা প্যাকেট কিন্তু এখানে তিনটা কি করে?
কিছু না ভেবেই তিন নম্বর প্যাকেট খুলে আমি হা হয়ে গেছি। এটা আদ্র দিয়েছে। একটা ছোট্ট চিরকুটে লেখা আমার নাম। আর এটা যে আদ্রর লেখা তা আমি শতভাগ নিশ্চিত। এটা কখন কিনলো? প্যাকেটে একটা সুন্দর লাল রঙের শাড়ি সাথে সুন্দর কাঁচের চুড়ি আর একটা ঝুমকা! আজব! উনি কি করে জানলো আমি শাড়ির সাথে ঝুমকা পড়ি?


Dustu misti premer golpo

পর্ব ১৩

একটা লেখা দেখে আমি নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না। তার মানে আদ্রর শ্যামবতি আর কেউ নয় আমি? কিন্তু এটা কিভাবে?
“আজকের সকালে যে আমি আমার হুরকে এভাবে ফেরত পেয়ে যাবো তা কল্পনাতেও ভাবি নি। আজ এই রাস্তায় না এলে হয়তো আমার এই শ্যামবতিকে আমি খুঁজেই পেতাম না। আড়াল থেকে দেখছি আমার শ্যামবতিকে! বৃষ্টির সাথে তার শুভ্রতার ছোঁয়ায় তাকে লাগছে সবচেয়ে বেশি স্নিগ্ধ। তাকে দেখে কামনার অনুভূতি হয় না। অনুভূতি নতুনত্বের। অনুভূতি হয় নিজেকে চেনার। তাকে দেখে বিশুদ্ধ প্রকৃতি প্রেমিকও প্রকৃতিকে ছেড়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হবে। এমনটাই তুমি। আমার তুমি। আমার শ্যামবতি। আর আমার হবু অর্ধাঙ্গিনী!”

এবার আমি সবটা মিলিয়ে দেখছি! তাড়াতাড়ি আপুর ফোনটা নিয়ে এসে মিলাতে শুরু করলাম। আমি চট্টগ্রাম আগেও এসেছি। রাইসা তখন বেশ ছোট ছিলো। আমি প্রতিদিন রুটিন করে আপুর ফোনে আমার ছবি তুলতাম। বলতে গেলে আপুর ফোনটা আমার কাছেই থাকতো। তাই ছবিগুলো বের করতে বেশি সময় লাগলো না। আমার নীল রঙের কুর্তি পড়া অবস্থায় ছবিটা বের করে দেখলাম। মিলে গেছে। তারিখ সেম, বর্ণনা অনুযায়ী ও সম্পুর্ন মিল। তার মানে ওইদিন রাস্তায় আদ্র ছিলো। আর সেই আড়াল নজরও আর কারোর নয় বরং আদ্রর। এবার আমার আস্তে আস্তে স্মৃতিতে স্পষ্ট ভাসছে। ৩ তারিখ পরিক্ষা থাকায় ১ তারিখ আমি ভাইয়ার সাথে ঢাকায় চলে যাই। যাওয়ার কথা শুনে আমার মন খুব খারাপ হয় তাই পার্কের বেঞ্চে মুখ ফুলিয়ে বসে ছিলাম সেদিন। কিন্তু হঠাৎ পাশে তাকিয়ে অনেক গুলো চকলেট পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো ভাইয়া আশেপাশে থেকে দিয়েছে কিন্তু আমি ভুল ছিলাম চকলেটগুলো দিয়েছিলো আদ্র!

এই ডায়রিতে সব আমার বর্ণনা দেওয়া। এমনকি আমরা যেদিন বগাকাইন হ্রদে গিয়েছিলাম সেদিনের তারিখ দেওয়া আর লেখা,
“তুমি বরই অদ্ভুত! আমি আমার জীবনে প্রথম কোন মেয়েকে দেখলাম যে কিনা প্রকৃতিকে এতোটা গুরুত্ব দেয়। গোলাপি রঙের কুর্তি, জিন্স, হাইকিং সু! তোমার ওই ড্রেসিং সেন্স অনেক ভালো। আর আমি তো তোমার ওই কাজলে ডুবে যাওয়া চোখেই শেষ। এতোকাছে থেকেও তোমাকে ছুঁতে পারছি না! এর চেয়ে আর কষ্টকর কি হতে পারে? এতোগুলো বছরের অপেক্ষা! কবে বুঝবে তুমি আমায়?”
আরেকটায় একই তারিখ আর লেখা,
“তুমি যে আমায় এভাবে লক্ষ্য করো তা কিভাবে বুঝলাম না। লক্ষ্য যেহেতু করেছো তাড়াতাড়ি প্রেমে পড়ে যাও না! হায়! কপাল। কবে যে আমার অপেক্ষার অবসান ঘটবে?”

আমি দোড়ে আপুর কাছে চলে গেলাম। আমাকে এভাবে দৌড়াতে দেখে আপু বোকা বনে গেলো।
আপুঃ কিরে! আফ্রা এভাবে দোড়াচ্ছিস কেন?

  • আপু এগুলো কি?
    তারপর একে একে আপুকে সব বললাম। আর আপুও কষ্ট করে অগত্যা মুখ খুলল।

আপুঃ তোর আর আদ্রর বিয়ের কথা প্রায় পাকা হয়ে গেছে। দু একদিনের মধ্যে ওরা তোকে দেখতে আসবে! আমি তোর রাগ খুব ভালো ভাবে জানি। তাই কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। আর আমার মনে হয় তুই আমার মুখের উপর না বলবি না! এম আই রাইট? (সিরিয়াস ভঙ্গিতে)

  • আপু তুমি বললে তো জানও দিয়ে দিবো তাই বলে আমার কি জানার কোন অধিকার নেই? (অসহায়ভাবে)
    আপুঃ তার জন্য আমি দু:ক্ষিত। এর জন্য গিয়ে আদ্রকে ধর। আমি তোকে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু আদ্র বলল ও নিজে তোকে বলতে চায়!
  • খুব বলছে! এক্কেবারে বাহাদুরের মতো! দেখো এর ডায়রি!

আপু আমার কথা শুনে হাসতে শুরু করলো। এবার আমি আপুকে বললাম সবটা যেন সিক্রেট থাকে। এবার আমি আদ্রকে মজা দেখাবো! আমাকে কচু চেনে! এবার দেখাবো আফ্রা কি জিনিস! হিহি!

আমি যে আদ্রকে অপছন্দ করি তা কিন্তু নয়। আমিও মনে মনে আদ্রকে খুব পছন্দ করি। কিন্তু প্রেম নামক জিনিসটায় আমার বরাবরই খুব ভয় লাগে। কিন্তু এখন যেহেতু এই কথাটা বিয়ে পর্যন্ত গেছে তাই আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তার আগে আদ্রকে একটু শাস্তি দেওয়া যাক!

সারাদিন আমি আদ্রকে নিয়ে ভাবলাম। আজ কৌশলে আদ্রর সাথে কোন রকম যোগাযোগ করি নি। বাসা থেকে খুব তাড়াতাড়ি বের হয়েছিলাম। যেহেতু আপুকে বারন করেছি তাই আপুও আর আদ্রকে কিছু বলে নি আমার ব্যাপারে। এবার বুঝলাম আদ্র কিভাবে আমার সব তথ্য পেতো। আমার নিজের বোনটাই ছিলো বিভীষণ। আবার কলেজ থেকেও বন্ধুদের নিয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেছি। আজ বন্ধুদের সাথে অনেক আড্ডা দিয়েছি, ফোনটাও অফ করে রেখেছি। বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে কোনরকমে ঘুমিয়েছি। বিকেলে পার্কেও যাই নি।

কিন্তু আমি তো আমি। জীবনেও সকালের প্রকৃতি উপভোগ না করে আমি থাকতে পারবো না। বাসায় বারান্দাতে অনেক গাছ লাগিয়েছি। ছাদে তো আছেই। ভোরবেলায় চলে যেতাম ছাদে। দোলনায় বসে সকালের ঠান্ডা হাওয়া সাথে বিভিন্ন গাছ, ফুল দিয়ে সাজানো কৃতিম প্রকৃতি দেখতাম। আর এখন আসল পেয়ে লোভ সামলাতে পারি নি। নামাজ পড়েই বেরিয়ে পরলাম বাইরে। ছোট ছোট পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছি। পাহাড় থেকে খুব সুন্দর একটা হরিনের বাচ্চা নেমে এলো। আমি শুধু অবাক চোখে দেখেছি। বাচ্চাটা অতি মাত্রায় কিউট। হাঁটতে হাঁটতে পার্কের বেঞ্চিতে বসলাম। দূর থেকে দেখলাম কেউ রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

কাছে আসতে আসতে একদম এগিয়ে এলো আমার দিকে। আমি আদ্রকে দেখেই একটা ঢোক গিললাম। কি ভয়ানক সেই চাহনি। বলতে বলতেই আমার হাত অটোমেটিক গালে চলে গেলো। কারন আদ্র আমার গালে এক রাম চড় বসিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে গালটা কেউ ছিড়ে নিয়ে গেছে। জীবনে মার তো দূরে থাক বকাটাও খাই নি আর এ আমার গালে চড় বসিয়ে দিলো! চোখের পানি যেন কোন বাঁধা মানছে না।
আদ্রঃ (প্রচন্ড রেগে) এতোগুলো ফোন কল, এতোগুলো মেসেজ! ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা! আমাকে মানুষ মনে হয় না? (চিৎকার করে)
আমি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কিছু না বলে বললে ভুল হবে, আসলে আমি কিছু বলতে পারছি না। গলা থেকে যেন কোন স্বরই বের হচ্ছে না। আদ্র আমাকে ঝাঁকিয়ে বলতে শুরু করলো,

আদ্রঃ কি হলো কথা বলছো না কেন? প্রায় দুইদিন তোমার কোন খবর আমি পাই নি। বুঝতে পারছো কতটা কষ্টে ছিলাম। হাহ! তুমি কি করে বুঝবে! তুমি তো বুঝতেই চাও না।
এবার আর আমি চুপ করে থাকতে পারলাম না। মানে অপমানেরও একটা লিমিট থাকা উচিত!

  • কি বুঝবো আমি? কি বুঝবো? কি বুঝিয়েছেন আমাকে? আর কি যেন বললেন আমি আপনার ফোন কলস, মেসেজ দেখিনি তাইতো? কেন দেখবো! কে হন আপনি আমার? (বেশ জোরে)

আদ্রঃ কি হই তুমি জানো না?

  • আমি কি করে জানবো? আপনি কখনো আমায় বলেছেন?
    আদ্রঃ ডায়রিটা পড়েও কিছু বুঝোনি? নাকি না বুঝার ভান করছো?
    আমি এবার আদ্রর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। ভাবছি উনি কি করে জানলো যে আমি ডায়রিটা পড়েছি। আমার আপুকে আমি যতটা জানি ও কখনোই নিজের ওয়াদা ভঙ্গ করে না, তাহলে?

আদ্র হয়তো বুঝতে পেরেছে তাই বলল,
আদ্রঃ কি ভাবছো যে আমি কি করে জানলাম তোমার কাছে ডায়রি? তাহলে শোনো! আমি একজন সেনাবাহিনীর লোক। তাই নিজের জিনিস হারিয়ে ফেলে বোকার মতো বসে থাকার মানুষ আমি নই। ডায়রিটা আমি গাড়ি থেকে হারিয়েছি আর গাড়িতে শুধু তুমি আর আমি ছিলাম। এটা ছিলো এক নাম্বার পয়েন্ট। আবার গত দুইদিন ধরে তুমি পার্কে আসনি মানে তুমি বাসায় বসে আমার ডায়রি পড়ছিলে। এটা ছিলো দুই নাম্বার পয়েন্ট। তিন নাম্বার পয়েন্ট ছিলো রাইসার কথা! রাইসাকে জিজ্ঞাসা করায় সে সুন্দর ভাবে বলেছে আমার সবুজ রঙের ডায়রিটা তুমি দিনরাত এক করে পড়ো। আর কোন প্রমান লাগবে তোমার?

আমি এবার বেশ লজ্জায় পড়েছি। শেষে কি না চোর উপাধি? আল্লাহ কিছু একটা করে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করো। আমি গালে হাত দিয়ে অসহায় লুক দিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছি। আমি লজ্জায় তো পরেছি কিন্তু সাথে রয়েছে এক বস্তা রাগ! আমাকে এভাবে থাপ্পড় মারতে পারলো? বেটা ফাজিল। তোর জীবনে বিয়ে হবে না! হুহ! মনে মনে যখন এত্তোগুলা বকা দিচ্ছি উনাকে তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে বলতে শুরু করলেন,
আদ্রঃ তোমার কি আমাকে শাস্তি দেওয়া শেষ হয়েছে? আর নাহলেও আমার সামনে থেকে শাস্তি দাও মানা করবো না। কিন্তু আমার চোখের আড়াল হওয়া যাবে না। (এক ভ্রু উঁচিয়ে)

আমি কিছু না বলে চোখ পাকিয়ে ওখান থেকে চলে এলাম। রাগের চটে আমার গা জ্বলছে। বাসায় এসে প্রায় ঘন্টা খানেক গোসল করেছি। তাও অসহ্য লাগছে। যে এক চড় মেরেছে। আজ নির্ঘাত জ্বর আসবে!


পর্ব ১৪

আজ তিনদিন জ্বরে ভুগে উঠলাম। জ্বরের জন্য না ভার্সিটি গিয়েছি আর না বাইরে। আপু তো সারাক্ষন আমার পাশে ছিলো। কিন্তু জানতে দেই নি জ্বরটা কেন এসেছিলো! আদ্রর প্রতি এতো রাগ উঠেছে যা বলার বাইরে। অসুস্থতার জন্য ফোনটাও ধরিনি। অফ করে ফেলে দিয়েছি রুমের কোন এক কোনায়। জানি না এখন ফোনটা কই আছে। আমি আপুকে সহ সবাইকে বলেছি আমার জ্বরের খবর যেন কোন ভাবে আদ্র না জানতে পারে। জিজ্ঞাসা করলে বলবে ভালো আছি, ব্যস!

কিন্তু হয়তো কোন ভাবে আমার এই নিউজটা লিক হয়েছে। ব্যস। পুরো সৈনিক দল নিয়ে বাসায় হাজির! একেকজনের কাছে একেকটা জিনিস। দেখেই আমার রাগ লাগছে। এগুলোর কোন মানে আছে। নিজেই থাপ্পড় দিয়ে জ্বর বাধিয়ে দিলো এখন আসছে সিমপ্যাথি দেখাতে…হুহ! আমার রুমে এসে মাথার পাশে বসে ছিলো আর আমি মুখ ফিরিয়ে বসে ছিলাম। অনেক চেষ্টাতেও যখন আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় নি। বেচারা রাগে দু:ক্ষে আমার কপালে জোর করে একটা চুমু দিতে বের হয়ে গেছে। আর যাওয়ার সময় বলেছে,

আদ্রঃ আমার জন্য ব্যাথা পেয়েছো, এবার আমার পালা!

  • (ভ্রু কুচকে) মানে?
    আদ্র আমাকে কিছু না শুধু মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলো। আল্লাহই জানে এ কি করতে চলেছে! এবার তো আমার রীতিমত টেনশন হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখলাম সবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করায় কেউ কিছুই বলছেনা।
  • ভাইয়া! আদ্র কোথায়?

ভাইয়াঃ জানি না।
আমি প্রচণ্ড রেগে টেবিলের উপর থেকে পানির পট নিয়ে এগিয়ে গিয়ে এক প্রকার চিৎকার করে বললাম,

  • তুমি বলবা? নাকি অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করবো?
    সবাই বেশ ভয় পেয়েছে আমার কান্ডে, কিন্তু আপাতত এসবে আমার মন নেই। শুধু কানে বাজছে আদ্রর বলা শেষ কথা, “এবার আমার পালা “লোকটা কি পাগল! আমাকে চড় দিয়েছে আর আমি রাগ করে থাকতে পারবো না? রিডিকিউলাস!
    ভাইয়াঃ আমি আসলেই জানি না। হয়তো বাসায় গেছে!
  • বাসার ঠিকানা দাও!
    আমি এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেছি। আজ আদ্রকে যে কি করবো আমি নিজেও জানি না। অসভ্য লোক! অসুস্থ রুগী দেখতে এসে আরো অসুস্থ বানিয়ে দিয়ে গেছে। আমি রাস্তায় শুধু ছুটছি। এর মধ্যে একটা সাইকেল দেখতে পেয়ে উঠে পড়লাম। কত স্পিডে যে সাইকেলটা চালিয়েছি নিজেই জানি না।

আদ্রর বাসায় গিয়ে কোনমতে ওড়নাটা সামলে নিয়ে দোড়ে উপরে উঠে দেখি আদ্র নিজের হাতের অবস্থা খা রাপ করে ফেলেছে। যে হাত দিয়ে আমাকে চড় মেরেছিল। রক্তে দেয়াল রঙিন হয়ে গেছে। আর উনি এখনো হাতে বারি দিচ্ছে! আমি দোড়ে গিয়ে হাত চেপে খাটে বসিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • ফার্স্ট এইড বক্স কোথায়?

আদ্র অবাক হয়ে আমার কাহিনী দেখছে। আমার চিৎকার করায় হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো। আমি ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে হাতের ড্রেসিং করিয়ে দিয়ে আদ্রর দিকে রক্তচক্ষু দিয়ে তাকিয়ে আছি। আদ্র কিছু বলতে যাবে তার আগেই যত শক্তি ছিল গায়ে তা দিয়ে আদ্রর গালে বসিয়ে দিয়েছি এক চড়। আদ্র নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। আর আমি চিৎকার করে বলছি,

  • কি ভাবো নিজেকে? তুমি আমাকে মারতে পারবা আর আমি রাগ করতে পারবো না? কেন? আর।
    আর কিছু বলতে পারি নি। হয়তো আমার শরীর আর আমাকে সায় দেয় নি।

চোখ খুলতেই নিজেকে এক অজানা রুমে আবিষ্কার করলাম। অনেক কষ্টে উঠে বসলাম। আমার শরীরে একদম শক্তি পাচ্ছিলাম না। এর মধ্যেই আদ্র ট্রেতে কিছু খাবার আর ওষুধ নিয়ে আসলো। আমাকে উঠতে দেখে মুচকি হেসে আমার পাশে বসলো।
আদ্রঃ তোমাকে কে বলেছে এই শরীর নিয়ে আমার বাসায় আসতে?
আমি কিছু বললাম না। কিন্তু আমার হাতের ছাপ আদ্রর গালে স্পষ্ট। লাল হয়ে আছে। আদ্র খাবার বাড়ছিল, আমি আলতো করে আদ্রর গাল ছুঁয়ে দিতেই আদ্র আহ করে উঠলো। আমি আতকে উঠলাম। আমার গায়ে এতো শক্তি কোথা থেকে এসেছিল? আমি শুধু মাথা নিচু করে ঠোঁট উল্টিয়ে বললাম,

  • সরি!

আদ্র আমাকে এভাবে সরি বলতে দেখে হেসে দিলো। আমি ওভাবে থেকেই শুধু চোখ তুলে একবার আদ্রকে দেখলাম। আদ্র এখনো হাসছে। দু হাতে আমার গাল ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
আদ্রঃ আই এম সো সরি! মাই শ্যামবতি!
আমি কেঁপে উঠলাম। কেন যেন ওর মুখে এই ডাকটা শুনে এতো ভালো লাগলো যা বলার বাহিরে। এত্তো আদুরে ডাক! আমি চোখ বন্ধ করে শুধু অনুভব করছিলাম। খেয়াল করলাম আমার গালটা ভিজে যাচ্ছে। আদ্রর হাত টা নিয়ে দেখি রক্তে গজ ভিজে গেছে। তাড়াতাড়ি করে আদ্রর হাতের গজ বদলে দিলাম। আদ্র আমার দিকে এখনো তাকিয়ে আছে। তা দেখে আমি ইশারায় জিজ্ঞাসা করলাম কি! আদ্র মাথা নাড়িয়ে না বলল।

  • এরকম পাগলামো আর করবেন না। মনে থাকবে?
    আদ্র মুচকি হেসে বলল,
    আদ্রঃ তাহলে তুমিও আর পাগলামো করবে না।
  • (ভ্রু কুচকে) আমি আবার কি পাগলামো করলাম?
    আদ্রঃ কি করেন নি? (ভ্রু নাচিয়ে)
  • মানে?

আদ্রঃ কিছু না। শুধু আমার ফোন ঠিক টাইমে ধরবে! মেসেজের রিপ্লাই দিবে! আর।

  • ব্যস! ব্যস! আমি আপনার সব কথা শুনবো কিন্তু আমাকে নিয়ে ঘুরতে হবে! রাজি? (উত্তেজিত হয়ে)
    আদ্রঃ (দুষ্টু হেসে) ভেবে বলছো সব কথা শুনবে?
    এবার আমার হুশ আসলো কি বললাম আমি!
  • (আমতাআমতা করে) আ। আমি ফোন কলস এর কথা বলছি!
    আদ্রঃ হুম! (হেসে)

বাসায় এসে দেখি আপু আর ভাইয়া ঝগড়া করছে। তাদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম এটা রোমান্টিক ঝগড়া তাই আর তাদের মাঝে যাই নি। রুমে গিয়ে রেস্ট করছি তখনই আদ্রর ফোন এলো। আমাকে বাসায় দিয়ে সে চলে গিয়েছিলো। আমি ফোন রিসিভ করে জানতে পারি সে বাসায় পৌছে গেছে।
আদ্রঃ এই আফ্রা! এতো আওয়াজ কিসের?

  • আপু আর ভাইয়ার ঝগড়ার! (ভাবলেশহীন ভাবে)
    আদ্রঃ ঝগড়া মানে? ঝগড়া কেন করছে? (চিন্তিত ভাবে)
  • আজব করছে ঝগড়া! তাদের মন চাইছে তাই ঝগড়া করছে! বাদ দেন!
    আদ্রঃ বাদ দেন মানে? কি নিয়ে ঝগড়া করছে?
  • তাদের পারসোনাল ইস্যু নিয়ে!
    আদ্রঃ সিরিয়াস কিছু?
  • হুম! অনেক বেশি সিরিয়াস! গাড়ির ভিতরের কথা মনে আছে? ওইরকম টাইপ কিছু!
    আদ্র বোধহয় বেশ লজ্জা পেয়েছে। খুকখুক করে কাশতে লাগলো আর আমি হাসছি। বেচারা আগের বারও বেশ লজ্জা পেয়েছিল।

দুপুরের দিকে আমার আবার জ্বর উঠেছিল। তাই সারা দুপুর ঘুমিয়েছি। এখন মোটামুটি অনেকটাই সুস্থ! আপু, ভাইয়ার একটা দাওয়াত আছে। বলতে গেলে সেখানে আজ রাতে তাদের কি পার্টি আছে কিন্তু আমার জন্য যেতে চাইছিল না। আমি জোর করে পাঠিয়েছি।

সন্ধ্যে ৭:৫০ মিনিট।
বাসায় একা আছি। খাওয়ার জন্য আজ নিজে রান্না করবো তাই আপুকে কিছু রান্না করতে দিই নি। চলে গেলাম রান্নাঘরে। হাতের কাছে যা ছিল তাই দিয়ে রান্না করেছি। ভাত, গরুর কালো ভুনা, মুরগি ছোট ছোট টুকরা করে ঝাল করে ঝোল রান্না করেছি। রান্না করতে করতে প্রায় ১০ টা বেজে গেছে। তার মধ্যেই বাইরে তুমুল ঝড় শুরু হয়েছে। এতো সাহস নিয়ে বলে তো দিয়েছি যে থাকতে পারবো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভীষণ ভুল করেছি। বার বার বজ্রপাতের শব্দের জন্য আমি কান চেপে ধরছি।

আপু ফোন দিয়েছিল কিন্তু আমি সাহস করে বললাম থাকতে পারবো। সবাই এতো আশা করে গেলো আমার জন্য সব মাটি হবে তাই আর কিছু বলি নি। এর মধ্যেই দরজায় কলিং এর শব্দ কানে এলো! এতো রাতে কে এলো? আস্তে আস্তে আমার ভয় বাড়ছে। এক ঢোক গিলে আস্তে আস্তে দরজার কাছে এগুচ্ছি। দরজা খুলে আমি হা! আদ্র দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ওর চোখগুলো এতো লাল কেন?


পর্ব ১৫

আদ্র আমার দিকে তাকিয়ে ভিতরে চলে গেলো। আমি এখনো অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। এতো রাতে এখানে আসার মানে কি? আপু ভাইয়াও নেই। গেট লাগিয়ে ভিতরে গেলাম। দেখি আদ্র আমার বিছানায় বসে আছে। তখনই আবার জোরে বাজ পড়লো আর আমি কানে হাত দিয়ে চোখ মুখ কুচকে রেখেছি। আদ্র দোড়ে আমার কাছে এসে বলল,
আদ্রঃ আফ্রা! দেখো সব ঠিক আছে। ভয় পেয়ো না।
আমি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম। আদ্র আমার হাত ধরেছে। ওই শরীর প্রচন্ড গরম ছিল। আমি আতকে উঠে ওকে ধরি।

  • আদ্র! আপনার শরীর প্রচন্ড গরম! এদিকে বসুন।

আমি আদ্রকে বসিয়ে থার্মোমিটার নিয়ে ওর জ্বর মাপলাম! ১০৩ ডিগ্রী জ্বর! কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আদ্রও আস্তে আস্তে ঝিমুনি দিচ্ছে। আদ্রকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একটা বাটিতে পানি নিয়ে আদ্রর কপালে জলপট্টি দিতে থাকি।

  • আদ্র আপনি এতো জ্বর নিয়ে এখানে কেন এসেছেন? রাস্তায় আপনার কিছু হয়ে যেত!

আদ্র এই অবস্থাতেও হাসছে! পাগল নাকি! আদ্রর কোন হুশই নেই। কেবিনেট থেকে মোটা ব্লাংকেট নিয়ে আদ্রর গায়ে দিয়েছি। তাতেও কাঁপছে। আদ্রকে এখন ওষুধ খাওয়াতে হবে। হাতের গজটাও বদলে দিয়েছি। রান্নাঘর থেকে খাবার এনে আস্তে আস্তে আদ্রকে খাইয়ে দিয়ে দুটো প্যারাসিটেমল আর গ্যাস্ট্রিক এর ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি। এর মধ্যেই কারেন্ট চলে গেলো। এখন আমি কি করি? বাইরে ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আদ্রর জ্বর বাড়ছে!

বালতিতে পানি এনে ওর মাথায় পানি ঢালছি। জ্বরের ঘোরে কতকিছু যে বলছে তার ইয়াত্তা নেই! আপুকে ফোন দিয়ে সব জানাই। আপু বলছে এই ঝড়ে কিভাবে বাচ্চা নিয়ে বের হবে তাই হয়তো সকাল ছাড়া আসতে পারবে না! আর এদিকে আমি অসহায়ের মতো আদ্রকে নিয়ে পড়ে আছি। অনেক কষ্টে আদ্র ঘুমিয়েছে। আমার আর খাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই খাবার সব ফ্রিজে রেখে দিয়েছি। আদ্রর শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে তাই না চাইতেও ওর শার্ট খুলে দিয়েছি। পাশে বসতে বসতে আমিও ঘুমিয়ে গেছি কখন টের পাইনি।

সকাল ৪:৪৫ মিনিট। ,
আমি উঠে আদ্রকে চেক করে দেখি এখন আর জ্বর নেই। কি যে একটা রাত গেছে তা শুধু আমিই জানি…..
উঠে গোসল করে নিয়েছি। যতই হোক আদ্রর ঘাম বা মাথায় দেওয়া পানি লাগতে পারে শরীরে তাই রিস্ক নিই নি। গোসল করে নামাজ পড়ছিলাম। তখনই হয়তো আদ্র উঠেছে। নামাজ শেষে সালাম ফিরাতেই দেখি আদ্র দেয়ালে হেলান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোনে রয়েছে এক চিলতে মুচকি হাসি।
আমি দোয়া পড়তে পড়তে জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে আদ্রকে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • এখন কেমন লাগছে? জ্বর আছে এখনো? কিছু লাগবে?

আদ্রঃ (অবাক হয়ে) তুমি সত্যি আছো?

  • (ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে) কি? আমি থাকবো না কেন?
    আদ্র এবার আমার গাল ছুঁয়ে বলল,
    আদ্রঃ আমি তোমাকে কবে বিয়ে করলাম?
    আমি এবার বোকা বনে গেলাম। মানে? আমাকে কেন বিয়ে করবে?
  • আপনি ঠিক আছেন? জ্বর বাড়েনি তো?
    কি আবোলতাবোল বলছেন?
    আদ্রঃ আবোলতাবোল মানে।

এবার আদ্র দেখে সে আমাদের বাসায়। আর নিজের গায়েও কিছু নেই! আর কি লাগে! আমাকে প্রায় জোরেই জিজ্ঞাসা করছে,
আদ্রঃ আমি এখানে কি করে এলাম? আমার শার্ট কোথায়?
আমার এবার বেশ মেজাজ খারাপ হলো। মানে এটা কি? সারা রাত ধরে ওনার সেবা করলাম আর সকালে উঠে সব ওনার মেমোরি থেকে ডিলিট হয়ে গেলো। বেশ রেগেই বললাম,

  • আমি আপনাকে ইনভাইটেশন দিয়েছিলাম তো! তারপর আপনি এলেন আর গিফট হিসেবে আমাকে আপনার শার্ট দিলেন। (দাঁতে দাঁত চেপে)
    আদ্রঃ (চোখ পিটপিট করে) মানে?

আমি এবার অসহায় লুক নিয়ে একটা হাফ ছাড়লাম। আর আদ্রকে কালকের সবকিছু ডিটেইলসে বললাম। কিন্তু ওনার এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে উনি বিন্দু মাত্র আফসোস করছে না, বরং খুশি হয়েছে আমাকে সারারাত জ্বালাতে পেরে! হায় কপাল!

আদ্র ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। আমি আদ্রকে জায়নামাজ দিয়ে বললাম নামাজ পড়তে। তিনিও ভদ্র ছেলের মতো নামাজ পড়ে নিলেন। আমি ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করেছি। এখন কিছু বানাতে ইচ্ছে করছে না। তাই কালকের খাবার দিয়েই চালিয়ে দেবো। আদ্রকে আসতে দেখে বললাম,

  • আচ্ছা কালকে এখানেই কেন এসেছিলেন?
    আদ্রঃ এসেছিলাম তুমি একা আছো আর বাইরে প্রচুর ঝড় হচ্ছিলো! ভেবেছি তুমি একা একা ভয় পাবে তাই! (অপরাধী সুরে)
  • আর এসে আমার ভয় আরো বাড়িয়ে দিলেন!

আদ্র করুনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে সরি বলল। আমি ওর সরি বলার স্টাইল দেখেই ফিক করে হেসে দিলাম। আর বললাম,

  • ইটস ওকে! এবার বলুন আমার রান্না কেমন হয়েছে?
    আদ্রঃ আমি কিভাবে বলবো? আমি কি খেয়েছি?
    আমি হা করে আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছি। আর কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। কারন জিজ্ঞাসা করেও লাভ নেই। এর যে কাল রাতের কিছুই মনে নেই তা বেশ বুঝতে পারছি। কাল রাত থেকে কিছু খাইনি বলে আমার বেশ ক্ষুধা লেগেছে। আদ্রকে বললাম,
  • আপনি এগুলো খেতে পারবেন? নাকি নাস্তা বানিয়ে দেবো?
    আদ্র আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,
    আদ্রঃ তুমিই তো বললে আমি কাল রাতে এগুলো খেয়েছি। তো এখন কেন পারবো না? তুমি দাও আমি খেতে পারবো।
    আমি কিছু না বলে দুইটা প্লেটে খাবার বেড়ে আদ্রকে ডাক দিলাম। দুজনেই খাচ্ছি। নাহ! খারাপ হইনি। আদ্র তো বেশ মজা করে খাচ্ছে।
    আদ্রঃ এগুলো কি তুমি রান্না করেছো?
  • (খেতে খেতে) তো আর কে রান্না করবে?
    আদ্রঃ অনেক মজা হয়েছে। স্পেশালি এই কালো ভুনা। বিয়ের পর থেকে আর মেইডের হাতের রান্না খাবো না। তুমি রান্না করবে?
  • কার বিয়ে?
    আদ্রঃ (ভাবলেশহীন ভাবে) তোমার আর আমার বিয়ে!
  • আর আমি যদি না করে দিই?

আদ্রঃ (মুচকি হেসে) তুলে এনে বিয়ে করবো!

  • আমি না করলে কিন্তু বিয়েটা হবে না! আমাদের ইসলাম ধর্মে মেয়েদেরও সমান ভাবে সম্মতি নেওয়া হয় বিয়ের জন্য যতটা ছেলেদের নেওয়া হয়। তাই বিয়ের ব্যাপারে জোর করলে হয় না। (আমি মুসলিম ধর্মের বিষয়ে জানি তাই বলছি অন্য ধর্মের বিষয়ে জানা নেই। তাই পাঠকরা কিছু মনে করবেন না। )
    আদ্রঃ হুম! সেটা ঠিক। কিন্তু আমার সামনে বসিয়ে তো রাখতে পারবো। আমার চোখের সামনে থাকবে এটাই তো অনেক।

কথা বলতে বলতে দেখি আপু ভাইয়া এসে গেছে। দুইজনের কোলে পুচকু দুটো। আমি এগিয়ে গিয়ে ওদের কোলে নিয়ে শুয়ে দিয়েছি। আদ্র আর ভাইয়া একসাথে বেরিয়ে গেলেন। আর আমি ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে রওনা দিলাম।

আজও ওই প্রফেসর আদিল জামান এর ক্লাস ছিলো। ঢাকা থেকে এখানে মাঝেমাঝে ক্লাস নিতে আসবে। আসলে বলতে গেলে উনি ভালোই পড়ায়। উনি “সাইকোলজি অফ ইমোশন”সাবজেক্ট টা পড়ায়। কিন্তু আমি বুঝি না, আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেওয়ার কি মানে? আজব!
ক্লাস শেষে প্রফেসর আমাকে ডাকলেন।
আদিলঃ আচ্ছা! তোমার নাম তো আফ্রা! রাইট?

  • ইয়েস স্যার!

আদিলঃ তুমি তো ঢাকায় থাকো, তাইনা?

  • কে বলল আপনাকে?
    আদিলঃ কেউ বলেনি জানতে পেরেছি। তোমার স্কুল, কলেজ সব ঢাকায় তাই আন্দাজ করলাম!
  • হুম! বাপের বাড়ি ঢাকায়!
    আদিল চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলো,
    আদিলঃ বাপের বাড়ি মানে?
  • ওমা! আপনি বাপের বাড়ি বুঝেন না? বাপের বাড়ি মানে আমার বাবার বাড়ি। যেটা উনি বানিয়েছে।
    আদিলঃ না সেটা বুঝতে পেরেছি। তা তোমার কি শ্বশুরবাড়িও আছে?
  • হুম আছে! থাকবে না কেন?
    আদিলঃ (আতংকিত চোখে) কিহ? কোথায়?
  • উম্ম! তা তো বিয়ের পর জানতে পারবো। তখন না হয় আপনাকে বলবো।

উনি আমার কোথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে তা বেশ বুঝতে পারছি। আমি হেসে দিয়ে ওখান দিয়ে চলে এলাম। আমার সিক্সথ সেন্স বলে উনি আমার প্রতি ক্রাশড। বাট আমার কাছে পাত্তা পাবে বলে মনে হয় না। মনে মনেই একদফা হেসে নিলাম। ভার্সিটি থেকে বের হতেই দেখি আদ্র দাঁড়িয়ে আছে। এই এক লোক! যা কিছুই হয়ে যাক, আমাকে ঠিকই নিতে আসবে। আমিও বন্ধুদের বাই বলে আদ্রর কাছে চলে গেলাম। গিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম,

  • আপনি আজকেও এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এসেছেন?

আদ্রঃ নিজের বউকে নিতে আসতে অসুস্থতা বাহানা হতে পারে না! (হেসে)

  • হইনি এখনো বউ! তাই দূরে!
    আদ্র হেসে দিয়ে বলল,
    আদ্রঃ হতে কতক্ষন? (ভ্রু নাচিয়ে)
    আমিও হেসে দিলাম আদ্রর কথায়। কিন্তু দূর থেকে আদিল যে আমাকে পর্যবেক্ষন করে ফুঁসছে তা আমার বা আদ্রর কারোরই জানা ছিলো না।

পর্ব ১৬

আজ আদ্রও আমার সাথে বাসায় এসেছে। প্রতিদিন পুচকু দুটো আমার কোলে লাফ দিয়ে আসে আর আজ আদ্র কোলে ঝাঁপিয়ে পরেছে। আদ্রও খুব আদর করে বাচ্চাদের। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছি আর হাসছি।

  • আমাকে তো এখন আর কেউ চিনবে না! থাক আমি যে চকলেট গুলো এনেছি তা আমিই খেয়ে নিবো! (অসহায় ভাবে)

আমার কথা শুনে রাইসা আর রাফিন দুইজনেই দোড়ে আমার কাছে এসে গলা জড়িয়ে গালে চুমু দিলো। আমি চকলেট গুলো ওদের হাতে দিবো এর মধ্যেই আদ্র অনেক গুলো চকলেট বের করে ওদের দিকে ধরে জিজ্ঞাসা করলো নিবে কিনা। এখন বেচারা আমার পুচকু দুটো পরলো বিপাকে! কার কাছে যাবে! রাইসা আমার থেকে চকলেট নিয়ে গালে চুমু দিলো আর রাফিন আদ্রর থেকে চকলেট নিয়ে ওর গালে চুমু দিয়ে দুইজনেই দোড় লাগালো।
ওদের কাহিনী দেখে আমরা সবাই হেসে দিলাম। আপু তো তখন থেকে আদ্রর খাতিরদারিতেতে লেগে পরেছে, যেন নতুন জামাই! হুহ!

তখন থেকে আপুকে জ্বালাচ্ছি যেকরেই হোক আমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে হবে! ব্যস! বাচ্চাদের মতো পা নাচাচ্ছি আর বায়না করছি। আর আপু কিছু না বলে তার মতো কাজ করে যাচ্ছে। আদ্র আমাকে এরকম করতে দেখে ভ্রু কুচকালো। আর ভাইয়াকে জজ্ঞাসা করলো,
আদ্রঃ আচ্ছা ভাইয়া! আফ্রা এমন করছে কেন?
ভাইয়া হেসে দিয়ে উত্তর দিলো,

ভাইয়াঃ ও এরকমই! কিছু চাই মানে চাই। যতক্ষন না পাবে ততক্ষন এরকমই করবে!
আদ্রঃ (মুচকি হেসে) তাই বলে এভাবে বাচ্চাদের মতো লাফালাফি?
ভাইয়াঃ আফ্রা হাতে পায়েই বড় হয়েছে! আমাদের কাছে তো এখনো সেই লিটেল আফ্রা! আগে এর থেকে বেশি কিউট ছিলো! আর এখন হয়েছে সুন্দর!
আদ্রঃ আমার চেয়ে ভালো কে জানে? (বিড়বিড় করে)
ভাইয়াঃ কিছু বললে?

আদ্রঃ না ভাইয়া! তা এতো নাচানাচি কেন?
ভাইয়া কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠি,

  • আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, ব্যস!
    আপু অসহায় লুক নিয়ে ভাইয়া আর আদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমি আমার জেদ ধরে বসে আছি। বাচ্চাগুলো ঘুমায় নয়তো দলটা ভারী হতো। কি আর করার! আমাকেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আদ্র কি যেন ভেবে বলল,

আদ্রঃ ওকে! আমার সাথে যাবে? আমার সাথে গেলে ঘুরতে পারবে নয়তো কেউ নিয়ে যাবে না।

  • আমি আপনার সাথে কেন যাবো?
    আদ্রঃ (ভ্রু কুচকে) কেন যাবে না?
  • আমি অচেনা মানুষের সাথে যাই না! (মুখ ঘুরিয়ে)
    আদ্রঃ (অবাক হয়ে) আমি অচেনা মানুষ?
  • নাহ! একদম অচেনা না। একটু একটু চিনি।
    আদ্রঃ আমার সাথে গেলে চলো, নয়তো কেউ নিয়ে যাবে না।
  • কেন আপু নিয়ে যাবে!

আপুঃ আদ্র সাথে গেলে যা! আমার সময় নেই। রাইসার স্কুলে প্যারেন্ট মিটিং আছে। আমার সেখানে যেতে হবে।
আমি কিছুক্ষন ভেবে যাওয়ার জন্য হ্যাঁ বলে দিলাম। আদ্র একটু বাঁকা হাসলো। যার কিছুই আমি বুঝি নি। কেন হাসলো?

পরদিন সকাল সকাল আমি রেডি হয়ে বসে আছ। আজ ভার্সিটি যাবো না, ঘুরতে যাবো! কিছুক্ষন পরই আদ্রর আগমন ঘটলো। আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। আদ্র নিজের গাড়ি সাথে নিয়েছে নয়তো ঘুরে মজা পাওয়া যাবে না। আমার এক্সাইটমেন্ট দেখে আদ্র হেসে দিয়েছে।
আদ্রঃ তোমার মতো প্রকৃতি প্রেমী তাও মেয়ে খুব কম দেখেছি। তুমি সত্যিই অনন্যা!

  • আমি অনন্যা কেন হবো আমি তো আফ্রা! (কিউট ফেস বানিয়ে)

আদ্রঃ (হেসে দিয়ে) হ্যাঁ! কিন্তু এই অনন্যা মানে অন্যরকম! সবার চেয়ে আলাদা! বুঝেছো?

  • হুম। আচ্ছা এই সীতাকুণ্ড পাহাড় সম্পর্কে কিছু জানেন? আমি কিছুই জানি না। তবে আজ জানবো!
    আদ্রঃ চন্দ্রনাথ পাহাড় বা সীতাকুণ্ড পাহাড় হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ। এই পাহাড়টি হিমালয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব দিক ঘুরে ভারতের আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিশেছে। চট্টগ্রাম অংশে ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার। এখানে সহস্রধারা আর সুপ্তধারা নামে দুইটা জলপ্রপাত আছে। মীরসরাই অংশে রয়েছে খৈয়াছড়া, হরিনমারা, হাটুভাঙ্গা, নাপিত্তছড়া, বাঘবিয়ানী, বোয়ালিয়া, অমরমানিক্যসহ অনেক ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। পশ্চিম দিকে মহামায়া, মিঠাছড়াসহ আরো কয়েকটি ছড়াও ঝর্ণা বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। বর্তমানে মহামায়া ছড়ার উপর একটি রাবার ড্যাম নির্মিত হয়েছে। এই লেক দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক। তাছাড়া নীলাম্বর হ্রদ নামে একটি মনোরম লেক এর পাদদেশে অবস্থিত। এই পাহাড়ের নিচে সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক আছে। তোমাকে নিয়ে যাবো।
  • ওয়াও! আপনি তো অনেক কিছু জানেন! নিশ্চই সব জায়গায় ঘোরা হয়েছে?
    আদ্রঃ তা মোটামুটি সব জায়গায়ই ঘুরা হয়েছে। আর এখন তো এমনিতেও কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়।
  • হুম।

প্রায় ১ঘন্টা২০মিনিট পর আমরা সীতাকুণ্ড পৌছাই। সকাল সকাল বেরিয়ে পরেছিলাম তাই তাড়াতাড়িই পৌছে গেছি। আদ্র আমাকে চন্দ্রনাথ পাহাড়টার সম্পর্কে বলছিলো আর অনেক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখাচ্ছিলো। প্রকৃতির মাঝে এলে আদ্রকে অন্যরকম সুন্দর লাগে আমার কাছে।

আমি মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির সাথে সাথে আদ্রকেও দেখছি। আর সে ব্যস্ত আমাকে সব তথ্য দিতে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ঘুরে এর নিচে অবস্থিত ইকো পার্কে এসেছি আমরা। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ৮০৮ হেক্টর জমি নিয়ে এই অভয়ারণ্যটি গঠিত। পার্কটি দুইটি অংশে বিভক্ত। ১০০০ একর জায়গায় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ৯৯৬ একর জায়গা জুড়ে ইকো পার্ক এলাকা। এখানে বিরল প্রজাতির গাছপালা, হাজারো রকমের ফুলের গাছ, কৃত্রিম লেক ও নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র‍্য বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশের প্রথম এবং এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম এ ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনটির অবস্থান।

মূল ফটক পেরিয়ে একটু এগোলেই রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভ। কবি এসেছিলেন পাহাড়ের এ জনপদে। এরই বিস্তারিত লেখা আছে স্তম্ভটির পাশে সাঁটানো সাইনবোর্ডে। এর কিছুদূর এগোলে ম্যাপে পার্কটির দর্শনীয় স্থান নির্দেশিত রয়েছে।
সেখানে নির্দেশিত পথ ধরে দেড় কিলোমিটার এগোলে সুপ্তধারা ঝর্ণার সাইন বোর্ড ‘সুপ্তধারা ঘুমিয়ে পড়ি জেগে উঠি বরষায়’।

এরপর প্রায় এক কিলোমিটার পাহাড়ি ট্রেইল পেরিয়ে দেখা পাবেন অনিন্দ্যসুন্দর ঝর্ণা ‘সুপ্তধারা’র। আবার এক কিলোমিটার পর্যন্ত গেলে চোখে পড়বে সহস্রধারা ঝর্ণার সাইন বোর্ড। এই এক কিলোমিটার পথে রয়েছে পিকনিক স্পট, ওয়াচ টাওয়ার, হিম চত্বর। সেখানে সেট করা চেয়ারে বসে দূর সমুদ্রের রূপ চোখে পড়বে। সহস্রধারা ঝর্ণা দেখে এসে বোটানিকাল গার্ডেনের উত্তরে গেলে চোখে পড়বে পাহাড় আর পাহাড়। সহস্র ধারা ও সুপ্তধারা ঝর্ণা থেকে বহমান জলকে কৃত্রিম বাঁধ তৈরির মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে কৃত্রিম লেক।

এ পার্কটির মূল আকর্ষণ চন্দ্রনাথ মন্দির। টিকেট কাউন্টার থেকে মন্দির পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারের পথ পায়ে হেঁটে অথবা গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায়। মন্দিরের নিচে থেকে পাহাড়ি পথে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা মিলবে মন্দিরের। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজায় মগ্ন থাকেন এখানে। ফাল্গুনে শিবসংক্রান্তি পূজার সময় দেশ বিদেশের বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের কীর্তনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো চন্দ্রনাথ।

এখানে চোখ পড়বে পাহাড়ে জন্মানো নানা প্রজাতির ফুল। এখানে রয়েছে দুর্লভ কালো গোলাপসহ প্রায় ৩৫ প্রকার গোলাপ, জবা, নাইট কুইন, পদ্ম, স্থলপদ্ম, নাগবল্লী, রঙ্গন, রাধাচূঁড়া, কামিনী, কাঠ মালতী, অলকানন্দা, বাগানবিলাস, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, ফনিকা মিলে রয়েছে ১৫০ জাতের ফুল।
এখানে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আর বন্যপ্রাণীর। পার্কটিতে রয়েছে মায়া হরিণ, বানর, হনুমান, শূকর, সজারু, মেছোবাঘ, ভালুক, বনরুই ও বনমোরগ। এছাড়াও আছে দাঁড়াশ, গোখরা, কালন্তি, লাউডগাসহ নানা প্রজাতির সাপ ও জলজ প্রাণী।

আমি আর আদ্র সারাদিন ঘুরেছি। দুপুরে ওখানকার একটা হোটেলে লাঞ্চ করেছি। পরিবেশটা খুব সুন্দর! যত দেখি তত আরো দেখতে ইচ্ছে হয়। অসাধারণ একটা জায়গা। এর জন্য অবশ্যই আদ্রকে ধন্যবাদ দিতে হয় এতো সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। সারাদিন ঘুরে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আমরা বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছি। আজ প্রকৃতি বিলাসের সাথে সাথে দু একটা ছবিও তুলেছি। স্মৃতি হিসেবে। আমি গাড়িতে বসে আজকের মুহূর্তগুলো মনে করছি আর মুচকি মুচকি হাসছি। আদ্ররও একই অবস্থা! কারন আজ আদ্র আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে!

আদ্র আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে দূরের দৃশ্য দেখাচ্ছিল! আমার মধ্যেও অনেক এক্সাইটমেন্ট ছিলো বিধায় বুঝতে পারিনি আদ্র আমার অনেকটা কাছে দাঁড়িয়ে। হয়তো আদ্রও খেয়াল করে নি। আদ্র আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
আদ্রঃ জানো এই প্রকৃতির মতো আরেকটা সত্যি আছে। দ্যাট। আই। লাভ। ইউ!
যা শুনা মাত্র আমার পুরো শরীরে শিহরণ দিয়ে উঠলো। আমি চোখ বন্ধ করে জাস্ট আদ্রর কথা শুনছিলাম। হয়তো বোঝার চেষ্টায় ছিলাম প্রকৃতি আমাকে কি বলে!

Dustu misti premer golpo


পর্ব ১৭

আমাকে বাসায় পৌছে দিয়ে আদ্র নিজেও বাসায় চলে গেছে। আর আমি বাসায় পৌছে থেকে শুধু মুচকি মুচকি হাসছি। আমার শুধু ওই মুহূর্তগুলোই মনে পড়ছে।
আসতে আসতে আমাদের প্রায় রাত ৮ টা বেজে গিয়েছিলো। আপু আমাকে এতো খুশি দেখে হয়তো কিছু আন্দাজ করেছে। সেও খুব খুশি। আমাকে খুশি দেখে। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোনটা নিয়েছি সুমিকে কল করবো বলে। কিছুক্ষন রিং বাজতেই সুমি কলটা রিসিভ করলো।
সুমিঃ হ্যাঁ আফ্রা বল! কেমন ঘুরলি?

  • হুম ভালোই! আজ ভার্সিটিতে কি কি হয়েছে?

সুমিঃ কি কি হয়েছে? উফ! খুবই বাজে দিন গেছে!

  • কেন? কি হয়েছে? (চিন্তিত সুরে)
    সুমিঃ (হাফ ছেড়ে) শোন তাহলে।
    সুমির কথা মতে, ক্লাসে সুমি, নিপা, আয়ান, আবির সহ সবাই মোটামুটি উপস্থিত ছিলো। আজও ওই প্রফেসর আদিলের ক্লাস ছিলো। আজ ক্লাসে আসার পর ওনার মুড একদমই ঠিক ছিলো না। তার উপর আমি উপস্থিত না থাকায় ওনার মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো। সবার সাথেই আজ খুব রুড বিহেভ করেছে। তাতে আমার কি? আমি তো ছিলাম না। কিন্তু আমি কেন যাইনি তার জন্য মোটামুটি জেরা করেছে আমার বন্ধুদের। তারাও কম যায় না! সোজাভাবে আয়ান বলে দিয়েছে,
    আয়ানঃ স্যার! আফ্রা তো ওর বরের সাথে ঘুরতে গেছে।
    তার এই একটা কথা যে কতটা এফেক্ট করেছে তা বলার বাইরে। বজ্রকন্ঠে বলে উঠেছে,
    আদিলঃ ওর বিয়ে হয়েছে কবে?

আয়ানঃ (থতমত খেয়ে) স্যার হয়নি কিন্তু হবে।
আদিলঃ (রেগে) বিয়ে ছাড়াই ঘুরাঘুরি?
আয়ানঃ সমস্যা কি? ফিয়োন্সি হয়!
আয়ানও খুব ভালো করে আদিলের ইংগিত বুঝে গেছে তাই একটু বানিয়েও বলেছে কথাটা। কথাটা শুনে রীতিমত চটে গিয়েছিলো আয়ানের উপর! কি সাংঘাতিক! এ নিয়ে সে প্রিন্সিপাল এর সাথেও কথা বলেছে। বিষয়টা এখন রীতিমত খুবই জটিল হয়ে যাচ্ছে। আদ্রকে বিষয়টা জানাতে হবে।

সুমির সাথে কথা বলা শেষ করে ডিনার করে নিয়েছি। রুমে এসে দেখি আমার ফোমটা বিরতিহীন ভাবে বাজছে! আর লোকটারো কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই। ফোনটা যখন তুলছে না তার মানে তো সে বিজি থাকতে পারে! না আর ধৈর্য্য কই? গিয়ে ফোনটা তুলতেই খুব সুন্দরভাবে কিছুক্ষন আদ্রর স্পেশাল বানী শুনলাম। যেমন,
আদ্রঃ ফোনটা মানুষ কেন রাখে? অবশ্যই কাজের সময় বা কেউ কল করলে তা রিসিভ করতে! রাইট? শ্যামবতি?
আমি কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছি না। তাই একটু জোরেই বললাম,

  • আমি কি কিছু বলার সু্যোগ পাবো, জনাব?
    আদ্র এবার চুপ করে ছোট্ট করে বলল,
    আদ্রঃ হুম বলো!
  • আমি ডিনার করছিলাম। তাই ফোন পিক করতে পারিনি। এখন বলুন আপনার অভিযোগ!
    আদ্র একটু হেসে খুব নেশাক্তভাবে বলল,
    আদ্রঃ আমার অভিযোগ শুনতে যে আমার কাছে আসতে হবে! খুব কাছে। আসবে?
    আমি একটু কেঁপে উঠলাম। এই লোকটা একদিন আমায় নির্ঘাত খুন করবে। এভাবে কেউ বলে? আমার সারা গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু আদ্রর মাঝে একটু পরিবর্তন পেলাম না। আবার শুরু করেছে নিজের অসভ্য কথা!
    আদ্রঃ কি হলো বলছো না যে?
  • আপনি আপনার এই অসভ্য কথা থামাবেন নাকি আমি ফোনটা কেটে দেবো?
    আদ্রঃ দাঁড়াও! একবার বিয়েটা হইতে দাও। তারপর অসভ্য কথা, কাজ সবকিছুর সাথে পরিচয় করাবো। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি!
    আমি চুপ করে আদ্রর কথা শুনছি। এছাড়া আমার আর কোন কাজ নেই। এবার আমার হঠাৎ খেয়াল হলো আদ্রকে আদিলের কথাটা বলা প্রয়োজন।
  • আদ্র আপনার সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কথা ছিলো।
    আদ্রঃ হুম বলে ফেলো!
  • ওইযে প্রফেসর মি. আদিল জামান আছে না? উনি মেবি আমার প্রতি দুর্বল!
    আদ্রঃ তুমি কি করে বুঝলে?
  • আচ্ছা আপনি কি ভুলে যান আমি একটা মেয়ে? (একটু রেগে)
    আদ্রঃ আচ্ছা রাগ করো না। ভুলি নি আমি। কি হয়েছে ডিটেইলসে বলো।
    তারপর আমি আদ্রকে আজকের ঘটা সব কথাই বললাম। সব শুনে আদ্রও কিঞ্চিৎ ভ্রু কুচকালেন, যা আমি দেখিনি কিন্তু কিভাবে যেন অনুভব করেছি।

পরেরদিন।
ভার্সিটি পৌছে আমি অনেক বড় একটা ধাক্কা খেলাম একটা কথা শুনে। এই প্রফেসর আদিল যেখানে মাসে দুইটা ক্লাস করাতো এখন থেকে তিনি সপ্তাহে দুইটা ক্লাস নেবেন! ক্লাসে ঢুকতে না ঢুকতেই প্রিন্সিপাল এর ডাক পড়লো। গিয়ে সাধারণ ভাবেই আমি তাকে সম্মান প্রদর্শন করলাম। সে আমাকে দেখে মুচকি হাসলো। আমিও তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। আদিল এবার বেশ গম্ভীর ভাবে প্রিন্সিপাল স্যারকে ওই কথাটা আবার মনে করালো।
প্রিন্সিপালঃ (গলা খাঁকারি দিয়ে) তো মিস আফ্রা তাবাসসুম তুরফা! আপনি ক্লাস বাঙ্ক দিয়ে বরকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান?

  • কিহ? বরকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই মানে?

প্রিন্সিপাল এর বলার আগেই আদিল তার কথা শুধরে দিয়ে বলল,
আদিলঃ বর নয় স্যার! এমনেই একটা লোক।
আমি এর মধ্যেই বলে উঠি,

  • এক্সকিউজ মি? এমনেই একটা লোক মানে? (ভ্রু কুচকে)
    আদিলঃ তারমানে স্বীকার করছো যে ঘুরতে গিয়েছিলে?
  • মানা কখন করলাম?

প্রিন্সিপালঃ তা আপনি কেমন ঘুরলেন? (মৃদু হেসে)

  • (মুচকি হেসে) হুম অনেক ভালো। টুরিস্ট গাইডটা ভালো ছিলো।
    প্রিন্সিপাল স্যারও হেসে দিলো। আদিল চটে গিয়ে বলল,
    আদিলঃ স্যার! আমি আপনাকে ওর নামে বিচার দিয়েছি আর আপনি জিজ্ঞেস করছেন টুর কেমন ছিলো?
    এর মধ্যেই আগমন ঘটলো আদ্রর।

আদ্রঃ তাহলে কি জিজ্ঞাসা করবে, প্রফেসর মি. আদিল জামান?
আদ্রকে দেখে যে প্রফেসর বেশ অবাক হয়েছে তা তার চেহারা দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। আদ্র বাঁকা হেসে প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে হাগ করলো। আমার মুখেও হাসি কিন্তু হাসি নেই আদিলের মুখে! সে অবাক চোখে চেয়ে আছে। প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতে স্যার হেসে উত্তর দিলেন,
প্রিন্সিপালঃ প্রফেসর! মিট মাই সান ক্যাপ্টেন আরফান চৌধুরি আদ্র। এন্ড শী ইস মাই উড বি ডটার ইন লো আফ্রা তাবাসসুম তুরফা। কাল আদ্র নিজে এসে আফ্রার ছুটি নিয়ে গেছে। তাই আই থিংক আর কোন সমস্যা হবে না আপনার?

আদিল বেশ লজ্জায় পড়ে গেলো। কিছুটা অস্বস্থি নিয়ে বলল,
আদিলঃ ইয়েস স্যার! সরি।
বলেই ওখান থেকে বেড়িয়ে গেলো। কেননা এখানে যে ওনার কোন ভূমিকা নেই তা তিনি সুন্দরভাবে বুঝে গেছে। আংকেল আমাকে ইশারা করে কাছে ডাকলেন। আমি এগিয়ে গেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় একটা চুমু দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

আংকেলঃ কেমন আছো মাই প্রিন্সেস?

  • অল সেট। বাট আংকেল তুমি কি একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলতে পারতে না? মজা পেলাম না!
    আমার কথা শুনে আদ্র আর আংকেল দুইজনেই হেসে দিলো।

এবার আমি বলি আসল কাহিনী! রাতে যখন আদ্রকে সবটা বললাম তখন সেই রাতে আদ্র আমাকে নিয়ে তার বাবার বাসায় যায়। আসলে আদ্র ক্যান্টনমেন্টে থাকলেও আংকেল আন্টি নিজেদের বাড়িতে থাকে। আদ্র সেখানে মাঝে মাঝে থাকে। কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় ক্যান্টনমেন্টেই থাকে। আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমাদের দুই পরিবারই আমাদের বিয়ের বিষয় জানে। শুধু আমি জানতাম না। আংকেলকে দেখে আমি ৪৪০ ভোল্টের ঝটকা খেয়েছিলাম। কারন আমার হবু শ্বশুরই হলো আমার প্রিন্সিপাল। আমি আদ্রর দিকে তাকালে দেখি সে মুচকি মুচকি হাসছে। কি পাজি!

তারপর সব কথাই বলে আদ্র। আর আংকেল তো আমায় রীতিমত প্রিন্সেস ডাকে। তারপর আমরা আজকের প্ল্যানটা বানাই। আন্টি তো আমাকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে! আদ্র তাদের একমাত্র সন্তান। তাই এখানেও আমার আদর বরাবরের মতো এক্সট্রা।


পর্ব ১৮

অনেকক্ষণ কথা বলার পর আমি ক্লাসে চলে যাই। আদ্র আমাকে কপালে চুমু দিয়ে বায় বলে চলে যায় যা নজর এড়ায় নি প্রফেসর এর। আমার বন্ধুগুলোও ছিলো। কিন্তু পার্থক্য হলো। ওরা ছিলো ভীষন খুশি। সারাটা ক্লাসই প্রফেসর আমার প্রতি ক্রুদ্ধ ছিলো। তাতে আমার কি?

আজ আদ্র একটু দেড়ি করেই এসেছে আমাকে নিতে। হয়তো কাজের চাপ বেশি!
গাড়িতে বসে আমি আদ্রকে বললাম,

  • আচ্ছা এতো ব্যস্ততার মধ্যে কেন আমাকে নিতে আসতে হবে?
    আদ্রঃ আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি?
  • নাহ! তা করেন নি। কিন্তু বলাটা আমার নৈতিক দায়িত্ব।
    আদ্রঃ আজ মা তোমাকে বাসায় যেতে বলেছে! (আমার দিকে ফিরে)
  • (ভ্রু কুচকে) কেন?
    আদ্রঃ যেভাবে দুইজনে ভাব পাতিয়েছো! আমি ভয়ে আছি বিয়ের পর তোমাকে ভাগে পাবো তো! (করুন ভাবে)
    আমি ওর কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলাম। আদ্রও হেসে দিয়ে গাড়ি চালানো শুরু করলো।
  • বিকালে আপুকে নিয়ে যাব। এখন ভালো লাগছে না। আই নিড টু বি ফ্রেশ।
    আদ্রঃ আর ইউ ওকে আফ্রা?
  • ইয়াহ! জাস্ট।
    আদ্র হয়তো বুঝতে পেরেছে। তাই বলল,
    আদ্রঃ ইটস নরমাল! বি ইজি।

আমি একবার আদ্রর দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলি। আসলে আমার মাথাটাও একটু ব্যাথা করছিলো।
আদ্র আমাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে এলো। এতো বারণ করলাম তাও শুনলো না। কি আর করার! তার মতে আমি না খেয়ে থাকি তাই এমন মাথা ব্যাথা সাথে অন্যকারন তো আছেই। অগত্যা আমাকে আদ্রর কথা শুনে খাবার খেতে হলো। খারাব হিসেবে আদ্র একদম নরমাল ফুড অর্ডার করেছে নয়তো কিছুই খেতে পারতাম না। খাওয়া শেষ করে আদ্র আমাকে বাসায় পৌছে দিলো। যাওয়ার আগে বলল,

আদ্রঃ আজ বাসায় যেতে হবে না। আমি মাকে বলে দেবো তুমি অসুস্থ!

  • না। না। সমস্যা হবে না। আমি পারবো যেতে।
    আদ্রঃ মোটেও না। তুমি আজ সারাদিন রেস্ট করবে। কাল রেডি হয়ে এসো ভার্সিটি শেষে নিয়ে যাবো।
  • ওকে।
    আজ আসলে এমনেতেও খারাপ লাগছিলো। তাই আমিও আর কথা বাড়াইনি। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে লম্বা একটা ঘুম দিয়েছি।

রাত ৮:১০ মিনিট।
রাইসাকে পড়াতে বসেছি। কিন্তু উনি একেক সময় একেক বাহানা দিয়ে পড়া থেকে উঠে যাচ্ছে। আর আমি প্রথমে ভালো মতো বল্লেও যখন দেখছি কোন কাজই হচ্ছে না বেচারি খেলো এক ধমক আমার কাছে। তাতেও তার মন খারাপ হয় নি। সে উঠে আমার কাছে এসে গালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
রাইসাঃ মিমি! রাগ কমেছে?

আমি আর কি করবো? এতো সুন্দর করে বললে কেউ রাগ করে থাকতে পারে। আমিও রাইসাকে চুমু দিয়ে বললাম,

  • রাগ করি নি তবে আমার কথামতো না পড়লে রাগ করবো!
    রাইসাও আমার কথা শুনে লক্ষ্মী বাচ্চার মতো পড়তে বসেছে আর দুষ্টুমি করে নি।
    রাইসাকে পড়াতে বেশ মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ আদ্রর ফোন আসায় চমকে উঠলাম। ফোনটা রিসিভ করে সালাম দিলাম। আদ্রও সালামের উত্তর দিলো।
    আদ্রঃ কি করছিলে?
  • রাইসাকে পড়াচ্ছি। কেন কোন প্রয়োজন ছিলো?
    আদ্রঃ কেন? তোমাকে প্রয়োজন ছাড়া ফোন দিতে পারি না?
  • আজাইরা কথা প্যাঁচান কেন? আমি এমনেই জিজ্ঞেস করছি!
    আদ্রঃ আরে রাগ করো কেন? আমিও মজা করেছি।
  • হুম।

আদ্রঃ ডিনার করছো?

  • আরে নাহ! সন্ধ্যার নাস্তাই একটু আগে খেয়েছি। আপনি খেয়েছেন?
    আদ্রঃ হুম খেয়েছি। আজ অনেক কাজ ছিলো। বোধহয় রাতেও ইউনিটে থাকতে হবে!
  • তাই বলেকি একটু রেস্টও নিবেন না?
    আদ্রঃ সমস্যা নেই অভ্যেস আছে।
  • কাল আপনাকে আসতে হবে না। আমি একাই ভার্সিটি চলে যাবো।
    আদ্রঃ একদম না। আমিই নিয়ে যাবো। শুধু তুমি রেডি থেকো।
  • কিন্তু।
    আদ্রঃ কোন কিন্তু নয়। ওই টাইমটাই তো তোমার সাথে আমার থাকা হয়! তাও তুমি চাও না?
  • এমন কিছু নয়। আমি তো আপনার জন্যই।

আদ্রঃ আর আমিও আমার জন্যই বলছি!

  • আচ্ছা ঠিক আছে। আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু এখন রেস্ট করুন পরে কথা বলবো।
    আদ্রঃ আমি রেস্টই করছি।
  • এভাবে? কথা বলে?

আদ্রঃ তোমার কথা শুনলেই আমার অর্ধেক রেস্ট হয়ে যায়।

  • এমা! আপনার তো তাহলে মানসিক রোগ আছে! আমার ভয়েস শুনলে আপনি ঠিক হয়ে যান!
    আদ্রঃ না গো প্রিয়শি! এটা মানসিক রোগ নয়! এটা প্রেম রোগ! (নেশাক্ত কন্ঠে) আর এই প্রেম রোগের জন্যই এতো কিছু। এই #প্রেমের_টানেই আপনি আমার কাছে এসেছেন।
  • বলছে আপনাকে? আমি তো এখানে পড়তে এসেছি।

আদ্রঃ আচ্ছা মানলাম পড়তে আসছো। তাহলে এই শহরেই কেন? কোথাও না কোথাও রিজনটা আমি।

  • তখন তো আপনাকে চিনতামও না।
    আদ্রঃ চিনতে না তো কি হয়েছে। মনের কানেকশন তো ছিলো। আমি তো তোমাকে চিনতাম।
  • হুহ!

পরদিন সকালে যথারীতি আদ্র এসে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নেমে গাড়ির কাছে যাচ্ছি এমন সময় একটা মেয়ে ধুপ করে আদ্রর গায়ের উপর পড়লো। আদ্র নিচে পরতে পরতে সামলে নিলো। মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম বেশ মর্ডান। টাইট ফিট জামা পড়েছে। আদ্র তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে সোজা দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি প্রব্লেম? মেয়েটা সরি বলে বলল স্লিপ করে পরতে গিয়ে আদ্রকে ধরে ফেলেছে। যেহেতু পাহাড়ি অঞ্চল তাই রাস্তায় উচু নিচু তো থাকবেই। আমি মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি দেখে একটু হেসে দিলাম। গাড়িতে বসতে বসতে আদ্রকে চলে আসতে। আদ্র ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট লাগাচ্ছিলো। আমি তো সামনেই বসা। মেয়েটা হঠাৎ বলল,
মেয়েটাঃ আমাকে একটু লিফট দেওয়া যাবে?

  • কোথায় যাবা তুমি? (ভাবলেশহীন ভাবে)
    মেয়েটাঃ আসলে আমি উনার কাছে লিফট চেয়েছি। তোমার সাথে তো কথা বলি নি।
    এই মেয়ে যে চরম বেয়াদব তা এর কথায় দিব্বি বুঝা যাচ্ছে। কিছু কড়া কথা বলার জন্য মুখ খুলবো তার আগেই আদ্র বলল,
    আদ্রঃ আমি বেয়াদব মানুষকে লিফট দেই না। আর ওর এখানে কথা বলার ১০০% রাইট আছে। শী ইস মাই ওয়াইফ। নাও ইউ গেট লস্ট।
    বলেই আদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে এলো। আমি পিছনে উকি দিয়ে দেখি মেয়েটা পা নাচাচ্ছে! আমি দেখেই হেসে দিলাম। আদ্রকে হাসতে হাসতে বললাম,
  • মেয়েটা এতোক্ষন মিথ্যে কথা বলছিলো।

আদ্রঃ তুমি কি করে জানলে? আর তোমার জেলাস ফিল হয়নি?

  • আমি সাইকোলজির স্টুডেন্ট। এই মেয়ের ভাবভঙ্গি দেখেই বলতে পারবো এর মনের কথা। আর আপনারও। তাই উল্টাপাল্টা চিন্তা আনলে আমিই আগে জানবো। সো এখানে জেলাস ফিল হওয়ার কিছু নেই।

আদ্র আমার কথা শুনে অবাক চোখে আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো। ভার্সিটি এসে আদ্রকে বাই বলে ক্লাসে চলে গেলাম। ক্লাস শেষে বাইরে বের হতেই প্রফেসর মি. আদিল জামান আমাকে ডাকলেন। আমিও ভদ্রতার খাতিরে গিয়েছি। ওনার কথা শুনে আমি অবাক।
আদিলঃ আফ্রা! আই এম সরি। আসলে তোমাকে এভাবে অপমান করতে চেয়েছি! আই এম সো সরি।

  • ইটস ওকে স্যার। আমি বুঝতে পেরেছি।

আদিলঃ আসলে সত্যি বলতে আমি তোমাকে পছন্দ করতাম, তাই হয়তো এতোটা রিয়েক্ট করেছি।

  • ইটস ওকে স্যার। আমি ভেবেছি হয়তো নতুনভাবে রিভেঞ্জ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। বাট আই ওয়াজ রং।
    প্রফেসর একটু হেসে দিয়ে বললেন,
    আদিলঃ টিন এজের সময়টা পার করে এসেছি। আর আমি একজন প্রফেসর। এতো নিচু মন মানসিকতা আমি পোষন করি না। বাট তোমার মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। আই থিংক আজকে কথা বলার পর এটা মনে হবে না।
    আমিও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্বোধন করলাম। আজ আসলেই খুব খুশি লাগছে। এই প্রফেসর এতোটাও ভিলেন নয়।

ভার্সিটি শেষে আদ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার মুখের হাসিটা যেন আরো বৃদ্ধি পেলো। আমার হাসি দেখে আদ্রও হেসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,
আদ্রঃ আজ এতো হাসির কারন?


পর্ব ১৯

আদ্র আমাকে হাসতে দেখে খুব খুশি হলো। আমিও খুশি মনে আদ্রকে আজকের সকল ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলাম। আদ্রও বেশ খুশি প্রফেসর এর আচরণে। আদ্রর বাসায় আসতেই আমি নেমে কলিং বেল দিলাম। আন্টি গেট খুলে আমাকে দেখেই খুব খুশি হলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
আন্টিঃ আমার মেয়েটা সুস্থ আছে? কেমন লাগছে মা?

  • আন্টি আমি একদম ঠিক আছি, দেখো।

আন্টি আমার কথায় মন খারাপ করে ফেললেন।
আন্টিঃ আমাকে আন্টি বলে এতোটা পর করে দিলি?

  • মানে?
    আন্টিঃ জানিস আমি আর তোর মা বেস্ট ফ্রেন্ডস ছিলাম।
    আমি অবাক চোখে আন্টির দিকে তাকাতেই আন্টি বলল,
    আন্টিঃ আমি রুবিনা! তোর মা নিশ্চয় বলেছে আমার কথা!

আমি তো অবাক সাথে এত্তোগুলা খুশি। বেশ জোরেই বললাম,

  • তুমিই রুবিনা মামুনি?
    মামুনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হ্যাঁ বলল। আমার খুশি দেখে কে? আমি জানতাম চট্টগ্রামে আমার এক মামুনি থাকে এবং তার একটাই ছেলে। যার জন্য অতো দূরে থাকে। তার মানে যার জন্য মামুনি দূরে ছিলো সে আদ্র। ছোটবেলায় এতো বকা উনাকে দিয়েছি যা বলার বাহিরে কারন আম্মু প্রায়ই মামুনির জন্য মন খারাপ করতো। আদ্রকে দেখলাম সে মিটমিট করে হাসছে। তার মানে ইনি সব জানতেন। ওরে পাজি! মামুনির থেকে জানতে পারলাম ছোটবেলায় নাকি আম্মু আর মামুনি ঠিক করেছিলেন বেয়ান হবে। এখানে আদ্র তো একা আর আপু অনেক বড়। তাই পারফেকশন হিসেবে আমিই ঠিক আদ্রর জন্য। আর আদ্রর ভালোবাসার মানুষও সৌভাগ্যবশত আমি। এখানেই হয়ে গেলো দুয়ে দুয়ে চার।

আদ্র ফ্রেশ হয়ে দেখে আমি আর মামুনি এখনো গল্পই করছি। আর উনি তো এমনিই ডিফেন্স এর লোক। সব টাইমলি হতে হবে। এসেই লাঞ্চের জন্য তাড়া দিচ্ছেন। মামুনি আর আমি দুইজনে গল্প করতে করতে খাবার সার্ভ করছি। আমি মামুনির কথা মায়ের কাছে শুনলেও কখনো তাকে দেখিনি তাই চিনতেও পারিনি। খাওয়া শেষ করেও আমার আর মামুনির আড্ডা চলল। বেচারা আদ্র অনেকবার আমাকে একটু একা চেয়েছিলো। ইশারা করে ডেকেছিলো। যা আমি আর মামুনি দুইজনেই অগ্রাহ্য করে আড্ডায় মেতে ছিলাম।
বিকেলের দিকে আদ্রর সাথে বাসায় ফিরে আসছি। গাড়িতে আদ্র বেশ গম্ভীর ভাবে ছিলো। একবার তো সরাসরি বলে ফেলল,

আদ্রঃ বিয়ের পর তোমাকে এখানে রাখা যাবে না!

  • (চমকে) রাখা যাবে না মানে কি?
    আদ্রঃ মানে তোমাকে বিয়ের পর মায়ের কাছে রাখলে আমার আর জীবনে বাবা ডাক শুনা লাগবে না! তাই আমি কোনরকম রিস্ক নিতে চাই না।
    আমি আদ্রর কথা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছি। এই লোকটার মুখে কোন লাগাম নেই। অসভ্য!

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আপুর কাছে গিয়ে বসলাম। রাইসা পার্কে আর রাফিন আমার পাশে বসে গাড়ি নিয়ে খেলছে। আর আপু আমার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে।
আপুঃ এই তুই চুলের একটুও যত্ন নিস না কেন?

  • কে বলেছে নিই না? তুমিই তো সবসময় তেল লাগিয়ে দাও। তাই নিজে থেকে আর তেল দিই না। (চাটনি খেতে খেতে)
    আপুঃ আচ্ছা! বিয়ের পর কে দিয়ে দিবে চুলে তেল?
  • কেন? মামুনি দিয়ে দিবে। মামুনি না পারলে আদ্র দিয়ে দিবে।
    কথাটা বলেই বুঝতে পারলাম বেফাঁস কথা বলেছি। জ্বিভ কামড়ে ধরে আমতাআমতা করতে লাগলাম। বেশ লজ্জা লাগছে আমার! আপুও মিটমিট করে হেসে আমার মাথায় চাটি মেরে বলল,
    আপুঃ পাগলি!

পরেরদিন সকালে নামাজ পরে আর বের হই নি। ঘুম পেয়েছিলো তাই ঘুমিয়ে গেছি। হঠাৎ মনে হলো কেউ আমায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে! একবার মনের ভুল ভাবলেও পরক্ষনে আর নিতে না পেরে হো হো হেসে দিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি পুরো পরিবার হাজির, ইভেন আদ্রর পরিবারও।
আর আমাকে আমার ভাই সুড়সুড়ি দিচ্ছিলো। কি পাজি! ভাইয়াকে দেখে মনে পড়লো তাই একটু চেঁচিয়েই বলে উঠলাম,

  • আজ তো আমার হ্যাপি বার্থডে!

সবাই মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। তারপর একে একে আমাকে গিফট দিয়ে উইশ করলো। কিন্তু আদ্র আমাকে কিছুই দেয় নি। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত লেগেছে। কিন্তু আমি কিছুই মনে করিনি। আজ মনটা বেশ খুশি। আপুর সাথে মিলে সবার জন্য খাবার রেডি করছিলাম তার মধ্যেই ভাবী এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
ভাবীঃ দেখতে দেখতে আমার ময়নাপাখিটা ২০ বছরের হয়ে গেলো।
আমি মুচকি হেসে ভাবীর গালে চুমু দিলাম।

  • তোমার ময়নাপাখি কি কখনো বড় হবে?
    ভাবীঃ একদমই না!
    বলেই হেসে দিলো। এর মধ্যেই আদ্র এসে একটু গলা খাঁকারি দিলো। আপু আর ভাবীর পারমিশন নিয়ে আমার হাত টেনে বারান্দায় নিয়ে গেলো। দুজনেই কিছুক্ষন চুপ ছিলাম। আমিই নিরবতা ভেঙে জিজ্ঞাসা করলাম,
  • এখানে টেনে নিয়ে আসার কারন?

আদ্রঃ আচ্ছা আমি যে তোমাকে গিফট দেই নি তোমার খারাপ লাগে নি?

  • উহুম! (মাথা ডানে বামে নাড়িয়ে) খারাপ কেন লাগবে? আমার কাছে গিফট এর চেয়ে অনুভূতির দাম বেশি। সো চিল!
    আদ্র অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
    আদ্রঃ আমি তোমাকে অন্য স্পেশাল কিছু গিফট করবো!
    আমি ভ্রু কুচকে আদ্রর দিকে তাকালাম। কি চায় সে?

সবচেয়ে অবাক হলাম যখন শুনলাম আজ আমার এংগেজমেন্ট। এটাই ছিলো আমার গিফট আদ্রর তরফ থেকে। সবাই সকল প্রিপারেশন নিয়ে এসেছে। একজন হুজুরও এসেছে। দুপুরে সবার সামনে আমাদের এংগেজমেন্ট হয়। আর আমাদের বিয়ে হবে দুই বছর পর! আদ্র মিশন থেকে ফিরলে। আমি একদিকে খুশি হয়েছি আমাদের এংগেজমেন্ট নিয়ে। আরেকদিকে খারাপ লাগছে আদ্র মিশনে যাবে। অনেকটা দিন ওকে ছাড়া থাকতে হবে। কি আর করার। ক্যাপ্টেনের বউ হলে এই জ্বালা তো সহ্য করতেই হবে।

অবশেষে এলো সেই দিন! আদ্র আজ মিশনের জন্য বিদেশ যাচ্ছে। গাড়িতে আদ্র আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলো। কেননা আমার মনটা অনেক খারাপ। এতোটা দিন কিভাবে আদ্রকে ছাড়া থাকবো ভাবতেই কান্না পাচ্ছে! আদ্র আমাকে অনেক বুঝিয়েছে।
আদ্রঃ শ্যামবতি! এভাবে মন খারাপ করলে আমি কিভাবে থাকবো? রোজ আমাদের কথা হবে। ভিডিও কল করবো তোমায়। রোজ আমায় দেখতে পাবে!

  • তোমায় ছুঁতে তো পারবো না।

আদ্র কিছু না বলে আমার কপালে চুমু দিলো।
আদ্রঃ আমি আমার পাগলিটার কাছে খুব তাড়াতাড়ি ফির আসবো। অপেক্ষা করবে না?

  • অপেক্ষাতেই তো আছি! (নাক টেনে)

এইমাত্র আদ্রর ফ্লাইট টেক অফ করলো। আর আমার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘশ্বাস।


পর্ব ২০

দুই বছর পর….

আজ আদ্র বাংলাদেশে আসছে। ফ্লাইট অলরেডি ওই দেশ থেকে টেক অফ করছে। এই দুই বছরে আদ্রর সাথে আমার প্রতিদিন কথা হয়েছে। মাঝেমাঝে আদ্রর অগোচরে ওর জন্য অনেক কেঁদেছি। মিশনে গিয়ে একবার অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি ছিলো কিন্তু আমাকে বলে নি। লুকিয়েছে কথা। ভাইয়াকে বলার সময় কোনভাবে আমার কাছে ধরা খায়। আজ সারাদিন মামুনির সাথে মিলে ওর পছন্দের সকল খাবার রান্না করেছি।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর দেখা মিলল আদ্রর। আমি ওর দিকে তাকাতে পারছি না। কি অবস্থা করেছে চেহারার! অজান্তেই চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লো। আমি আস্তে করে লুকিয়ে পরলাম। আদ্রকে আমার চোখের পানি দেখানো যাবে না আবার আমি কন্ট্রোলও করতে পারছি না। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি আদ্রর চোখ হয়তো আমাকেই খুঁজছে। আমি কোনমতে নিজেকে কন্ট্রোল করে চোখ মুছে এগিয়ে আদ্রর দিকে। আমাকে দেখেই আদ্রর ঠোঁটে এক প্রশান্তিময় হাসি ফুটলো। সবার সামনেই আমার কাছে এসে কপালে চুমু দিলো। আমি তো অবাক, পাগল নাকি! সবার সামনে! এর মধ্যে দেখি কেউই আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। হয়তো সবাই বুঝেছে যে একটু প্রাইভেসি দরকার আমাদের। আমার চোখ এখনো ছলছল করছে।

আমরা সরাসরি আদ্রদের বাসায় এসেছি। আম্মু আব্বুও আছে। ভাবী ৮ মাসের প্রেগন্যান্ট। তাই ভাইয়া ভাবীকে নিয়ে আসতে পারেনি। তাছাড়া সবাই আছে। আমার স্টাডিও প্রায় শেষের দিকে। আব্বুর কাছে আংকেল সরাসরি বলল এবার তার ঘরের লক্ষ্মীকে যতদ্রুত সম্ভব ঘরে তুলবেন। আমার বেশ লজ্জা লাগছিলো তাদের কথায়। আদ্রও কিছুটা লজ্জা পেয়েছে কিন্তু প্রকাশ করে নি। আমাদের বিয়ে ঠিক হলো দুই সপ্তাহ পর।

সকল আয়োজনের জন্য এতটুকু সময় তো লাগবেই। কিন্তু কোনভাবেই দেড়ি করতে রাজি নয়। এর মধ্যেই বাবা আর আংকেল নিজেদের কাজে লেগে পড়েছে। ভাইয়া ভাবীকে কথাটা জানানো হয়েছে। যেহেতু ভাবী অসুস্থ তাই বিয়েটা ঢাকায় হবে। আর বউভাত চট্টগ্রাম। বিয়েতে যাওয়ার জন্য গেস্টদের জন্য আলাদা ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে আদ্র। যতই হোক ক্যাপ্টেনের বিয়ে! সব বড় মাপের মানুষজন আসবে। কোথাও কোন কমতি না থেকে যায়। আম্মু আর মামুনি তো সেই খুশি।

বাচ্চাদের কথা নাই বলি! ওরাতো পুরো বাড়ি মাথায় করে নিয়েছে। সবাই ড্রয়িংরুমে বসা ছিলাম। আদ্র আমাকে ইশারা করে ওর রুমে যেতে বলল। আর মুখে বলল কফি নিয়ে আসতে। যদিও সবাই বুঝেছে ওর এখন আমাকে একান্তে প্রয়োজন। মামুনি আমাকে কফি করে নিয়ে যেতে বলল। আমিও ভদ্র মেয়ের মতো কফি করে ওর রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।

ওর রুমে গিয়ে ওকে ডাকলাম। আদ্র বারান্দায় ছিলো। আমি কফিটা ওর স্টাডি টেবিলে রাখতেই দেখি ও দরজা লক করেছে। আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। ওকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছি।
আদ্রঃ শ্যামবতি! এভাবে কান্না করলে কিভাবে হবে। শান্ত হও প্লিজ। দেখি!
আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

  • কি অবস্থা করেছো নিজের? তাকানো যাচ্ছে না তোমার দিকে! আমি কিভাবে কান্না অফ করবো? (কাঁদতে কাঁদতে)
    আদ্রঃ কেন? আমাকে কি বেশিই খারাপ লাগছে দেখতে?
  • হুম! বেশি শুকিয়ে গেছো!
    আদ্রঃ আয়! হায়! তাহলে কিভাবে হবে? সামনে আমার বিয়ে আর এখন দেখতে খারাপ হলে কিভাবে হবে?
  • (বিরক্ত হয়ে) আদ্র।

আদ্র হেসে দিয়ে বলল,
আদ্রঃ চিন্তা করো না বউ! জিমে গেলে আবার ঠিক হয়ে যাবো। আর ঘরের খাবার তার ম্যাজিক দেখাবে। বুঝলে?

  • হুম।
    আদ্রঃ আজ কতোদিন পর তোমাকে সামনা সামনি দেখছি। মনে হচ্ছে আমি আমার প্রান ফিরে পেয়েছি। (কপালে কপাল ঠেকিয়ে) আই লাভ ইউ।
  • আই লাভ ইউ টূ!
    আদ্র অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছে কেননা এই প্রথম আমি তাকে এই কথার জবাব দিয়েছি। এই দুই বছরে অসংখ্য বার আদ্র আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে কিন্তু আমি তাকে কিছুই বলতাম না।

আদ্রঃ ছে এগেইন! প্লিজ লাভ!

  • আই। লাভ। ইউ!
    আদ্র এতোই খুশি হয়েছে যে আমার ঠোঁট আঁকড়ে ধরেছে। কিছুক্ষন পর কপালে চুমু দিয়ে বলল,
    আদ্রঃ আজকে আমি অনেক খুশি।
  • আমিও।

আদ্রঃ আফ্রা! কালকে রেডি থেকো!

  • কেন?
    আদ্রঃ কালকে আমাদের ইউনিটে পার্টি আছে। অবশ্য রিয়াদ ভাইয়াও যাবে। বাট তুমি আমার সাথে যাবে। আমার উডবি হয়ে। যদিও তোমায় সবাই চেনে।
  • ওকে।

পরদিন সন্ধ্যেবেলা।
মামুনি আমাকে জোর করেই নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলো। তাই বাসা থেকেই আদ্রর সাথে পার্টির উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। আমি একটা লং পার্টি ফ্রক পড়েছি। আদ্র তো ফুল কমপ্লিট ব্ল্যাক কালারের সুট পড়েছে। আমার ড্রেসও ব্ল্যাক। পার্টিতে একসাথে দেখে সবাই চিয়ার করে উঠলো। আপু আমার দিকে এগিয়ে এলো। আবার পরলাম ভাবীদের চক্করে! কিন্তু আজ তেমন নাস্তানাবুদ করলো না। কারন আপু কিছু বলার আগেই আদ্র স্টেজে এসে সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো। সবাই খুব খুশি।
সবাই আদ্রকে গানের জন্য রিকুয়েস্ট করে তাই আমি আর আদ্র দুইজনে ডুয়েট গান ধরি। আদ্রকে বলে গিটার আজ আমি বাজাই।
“হেঁটেছি স্বপ্নের হাত ধরে,

পেরিয়ে রাত একাকি ভোরে
ডেকেছি কতোবার নাম ধরে যে তোমায়.. (আদ্র)
মেলেছি দুই ডানা বৃষ্টিতে,
খেয়ালি কোন অনাসৃষ্টিতে
খুঁজেছি অনিবার ডাকে কে আমায়.. (আমি)
দাও বলে দাও, কোন ঠিকানায়,

লিখবো চিঠি, খুঁজবো তোমায়.. (আদ্র)
হেঁটেছি স্বপ্নের হাত ধরে,
পেরিয়ে রাত একাকি ভোরে
ডেকেছি কতোবার নাম ধরে যে তোমায়.. (আদ্র)
দাও বলে দাও, কোন ঠিকানায়,
লিখবো চিঠি, খুঁজবো তোমায়.. (আমি)

ও.. রেখেছি আজ সংগোপনে
টুকরো স্মৃতি মনের কোনে (আদ্র)
ও.. রেখেছি আজ সংগোপনে
টুকরো স্মৃতি মনের কোনে (আমি)
ও.. ভেবেছি যতবার তোমাকে
হারিয়েছে চেনা কথা রেখে
ভেসেছি আমি যে অন্তহীন তোমাতে.. (আদ্র)

দাও বলে দাও, কোন ঠিকানায়,
লিখবো চিঠি, খুঁজবো তোমায়.. (আমি)
অচেনা পথ, দু’হাত বাড়ায়
উতলা মন আজ তার ইশারায় (আমি)
অচেনা পথ, দু’হাত বাড়ায়
উতলা মন আজ তার ইশারায় (আদ্র)

ভেবেছি যতবার তোমাকে
হারিয়েছে চেনা কথা রেখে
ভেসেছি আমি যে অন্তহীন তোমাতে.. (আমি)
দাও বলে দাও, কোন ঠিকানায়,
লিখবো চিঠি, খুঁজবো তোমায়.. (আদ্র)

খুব ভালো ভাবেই আমরা পার্টি এটেন্ড করি। সবাই আমাদের গানের প্রশংসা করেছে।
পরদিন থেকে ধুমধামে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। কেনা কাটা, এই কাজ, ওই কাজ! যদিও আমার খুব কম কাজ করতে হয়েছে। বড়রা অনেক কাজ করছে ইভেন আদ্রও। আর আমি সময় পেলেই বই নিয়ে পড়াশোনা নয়তো বাচ্চাদের সাথে খেলি। হিহি! আদ্রর এক কথা বিয়ের পর আমাকে নিয়ে সে তার নিজের বাসায় যাবে। পরদিন শ্বশুরবাড়ি আর তার পরদিন বাপের বাড়ি। মাঝে মাঝে চিন্তা করি আমার একটা আলাদা বাড়ি থাকলে বাপের বাড়ির পরদিন সেখানে যেতাম! হাহা!

আদ্র এতো কাজের মধ্যেও প্রতিদিন আমাকে নিয়ে ঘুরবে! এটা তার একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ বলে তার মনে হয়। ফোন তো বেলায় বেলায় করবে। দেখতে দেখতে দুই সপ্তাহ শেষ।
আজ আমার গাঁয়ে হলুদ।
আমি কাঁচা হলুদ আর সাদা মিশ্রনের একটা লেহেঙ্গা পড়েছি সাথে হালকা সাজ। আদ্র সাদা সিম্পল শেরওয়ানি। স্টেজে দুইজন বসে আছি আর একেকজন এসে আমাদের গাঁয়ে হলুদ ছুঁয়ে দিচ্ছে। একটু একটু মিষ্টি খেতে খেতে আর পেট ফুল। এদিকে বারবার আদ্র আমার দিকে তাকাচ্ছে। তাতে আমার অবস্থা আরো খারাপ। যখনি জিজ্ঞেস করছি কেন তাকাচ্ছো? সে সোজাসাপ্টা উত্তর দেয়, আমার বউ আমি তাকিয়েছি তোমার কি সমস্যা? আমি অবাক তার কথা শুনে!

গাঁয়ে হলুদের পরেরদিন সবাই মিলে ফ্লাইটে উঠেছি ঢাকার উদ্দেশ্যে। আল্লাহই জানে কি হবে। সব যেন ভালোয় ভালোয় হয়! আল্লাহ ভরসা!


পর্ব ২১

ঢাকায় ও আদ্রদের বাড়ি আছে, তাই বিয়ের আয়োজনে কোন সমস্যা হয় নি। ধুমধামে বিয়ের সব আয়োজন হচ্ছে। আমার সকল বান্ধবিরা এসে গেছে বাড়িতে। এতটুকু সময় পাচ্ছি না একা। কেউ না কেউ সাথে রয়েছে। তার মধ্যেও আমার ভাবী আমাকে নিয়ে ব্যস্ত। এতো বারন করছি সে শুনছেই না। ৮ মাস শেষ হয়ে ৯ মাসে পড়লো। এখন খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হচ্ছে। ভাইয়া এতো কাজের মধ্যেও ভাবীকে সময় দিচ্ছে। কিন্তু আদ্রর কড়া নির্দেশ ভাইয়া সবসময় ভাবীর কাছে থাকবে, তার ছুটি।
আজ বিয়ে।

সকালে নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলাম। কে জানে কোথা থেকে এতো ঘুম এলো! একেকজন এসে আমাকে ডাকছে কিন্তু আমি ঘুমে বেহুঁশ! হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার ফোনটা বাজছে! ঘুম ঘুম চোখে রিসিভ করে কানে ধরে হ্যালো বললাম,

  • আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন? (ঘুম ঘুম কন্ঠে)
    আদ্রঃ তোমার বাচ্চার আব্বু!
  • আমার। বাচ। বাচ্চা! কোথায় সে?

আদ্রঃ আপতত আমার আর তোমার মধ্যে ভাগ হয়ে আছে! আজকে মিলিয়ে দেবো! এখন ঘুম থেকে উঠো!

  • মিলিয়ে দেবেন? কিন্তু আপনি কে?
    আদ্রঃ (জোরে) আফ্রা! ওয়েক আপ!
    আদ্রর চিল্লানিতে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম।
  • কে? কোথায়?

ফোনটা কানে ধরতে আদ্র বলল,
আদ্রঃ আমি তোমার হবু বর! তোমার বাচ্চার হবু আব্বু!

  • ধ্যাত! (লজ্জা পেয়ে)
    আদ্রঃ এখন লজ্জা পাচ্ছো? আর এতোক্ষন যে বললাম!
  • (চমকে) কি বললেন?

আদ্রঃ এই যে জিজ্ঞাসা করলে বাচ্চা কোথায়! আমিও বললাম আমাদের মধ্যে!

  • ছিঃ!
    আদ্রঃ ছিঃ এর কি আছে? যা সত্যি তাইতো বললাম!
  • আপনি জানেন আপনি একজন লাগামহীন ব্যক্তি?
    আদ্রঃ হুম জানি। এবার তুমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠো। ভাবী আমাকে ফোন দিয়ে তোমাকে জাগাতে বলেছে।
  • হুহ! আমার সাধের ঘুম! (কাঁদোকাঁদো কন্ঠে)

আদ্র হেসে দিয়ে ফোনটা কেটে দিলো। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলতে এক ঝাঁক মানুষ আমার রুমে ঢুকলো। এতো বিরক্ত লেগেছে! উফ!

  • কি চাই তোমাদের? এভাবে ঢুকলে কেন? (জোরে) আপু! ভাবী! প্লিজ রুম খালি করো নয়তো আমি এখনই সেন্সলেস হয়ে যাবো!
    তৎক্ষনাত আমার রুম খালি হলো। মেক আপ আর্টিস্টরা এসে আমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি তো আমি। এখানে সেখানে ছুটোছুটি করছি। এ নিয়ে পাড়াপড়শির কানাকানি তো রয়েছেই কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি আমার কাজিনদের সব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছি গেট ধরার জন্য। কিন্তু ওরা তো ওরা। সবসময় আমি ছিলাম এসবের লিডার। আর লিডারের বিয়েতে এরা ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। হায় কপাল! বধূবেশেই ছুটলাম গেট ধরতে! ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর, কিন্তু তাতে আমার কি! বরপক্ষের সবাই আমাকে দেখে হা হয়ে গেছে। তারা এই প্রথম কনেকে গেট ধরতে দেখলো। আদ্র তো আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছিলো। টাকা তো দিয়েই দিতো কিন্তু আমাকে দেখে ওনার একটু কাহিনী করতে মন চেয়েছিলো তাই ইনিয়েবিনিয়ে অনেক পড়ে টাকা দিয়েছে।

কাজি সাহেব এসে আমাদের বিয়ে পড়ালেন। বিয়ে পড়ানো শেষে হঠাৎই ভাবীর চিৎকার শুনা গেলো। পেইন উঠেছে। সবাই ভাবীকে নিয়ে হসপিটালে যাই। সবার মধ্যেই টেনশন। অনেকক্ষণ পর বাচ্চার কান্নার শব্দ ওটি থেকে আসে। একজন ডাক্তার বাইরে এসে জানায় আমার একটা ফুটফুটে ভাইঝি হয়েছে। সর্বপ্রথম আমিই ওকে কোলে নিই। আমার পাশে আদ্র ছিলো। সবার মুখেই হাসি, আর আমার চোখে খুশির জল। আদ্র আমাকে এক হাতে আগলে নেয়। ভাবীও সুস্থ আছে। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ভাইয়ার কোলে বাবুকে দেই, ভাইয়া ওকে কোলে নিয়ে সারামুখে চুমু দিতে লাগে!

আজ দুইদিন হলো ভাবীকে বাসায় আনা হয়েছে। ভাবী অসুস্থ ছিলো তাই আমাকে বিদায় দেওয়া হয়নি। শুধু বিয়েটা হয়েছিলো। আজ আবার ধুমধাম দিয়ে সব আয়োজন করা হয়েছে। আমার বিদায়ের আর আবিরার স্বাগতমের। সবাই খুব খুশি। আমি স্টেজে বসে আছি, পাশে আদ্র। এর মধ্যেই আমি ইশারায় লাইট অফ করতে বলি। আমার কথামতো সব লাইট অফ হয়ে যায়। আদ্র চমকে আমার দিকে ফিরতে আমাকে পায়না!
আমি তো গ্রাউন্ডে এসে কাজিনদের সাথে নাচের তাল করছি,

“Saajan Tumse Pyaar Ki Laraayi Mein
Saajan Tumse Pyaar Ki Laraayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein, Kalaayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein

এর মধ্যেই আদ্র এসে আমার সাথে তাল মিলিয়ে নাচলো।

Jaanam Tumse Pyaar Ki Laraayi Mein
Jaanam Tumse Pyaar Ki Laraayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein, Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Pal Pal Har Pal Teri Lagan

Teri Ada Ne Le Gayi Man
Gore Gore Haathon Pe Mehndi Ka Rang
Us Pe Yeh Sharmaane Ka Dhang
Us Pe Yeh Sharmaane Ka Dhang
Haan Main Sharmaayi Pyaar Ki Laraayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein, Kalaayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein

Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein
Bechaini Tadpaati Rahi
Chaandni Dil Dhadkaati Rahi
Seene Pe Bijli Si Chali
Karwat Leke Raat Dhali
Karwat Leke Raat Dhali

Neendiya Na Aayi Pyaar Ki Laraayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein, Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Jaanam Tumse Pyaar Ki Laraayi Mein

Jaaga Main Akela Rajaayi Mein, Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Jaaga Main Akela Rajaayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein
Toot Gayi Choodiyaan Kalaayi Mein. “

সবাই জোরে হাত তালি দিলো। অবশেষে এলো আমার বিদায়ের পালা! আব্বু, আম্মু, ভাইয়া, ভাবী, আপু সবাইকে ধরে অনেক কান্না করেছি। রিয়াদ ভাইয়া আমাকে জোর করে গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজেও আপু আর বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের পিছু পিছু আসছে। এতোক্ষন কনে পক্ষ হয়ে কাজ করলেও এখন বরপক্ষের হয়ে কাজ করবে। তারা শুধু আমাদের ফ্লাইটে তুলে দিতে এসেছে। যেহেতু আদ্র বলেছে সোজা তার বাসায় নিয়ে যাবে।

আর বাকি সবাই কাল ধীরেসুস্থে এসে বাকি অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। প্রায় ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম চট্টগ্রাম। আদ্র আমাকে নিয়ে তার বাসায় যায়। আমি বাসার অবস্থা দেখে পুরো অবাক! এতো সাজালো কখন? আদ্রর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে ও শুধু মুচকি হাসলো। ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের পৌছানোর কথা। এখানে আদ্রর কিছু বন্ধুও আছে। তারাই মূলত এইসব আয়োজন করেছে। অনেক সুন্দর করে আমাদের বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। এখানে এসে আরেকদফা অবাক হই সুমি আর নিপাকে দেখে। ওরাও আমাদের সাথেই কখন যেন এসেছে। আমাকে ফ্রেশ করিয়ে একটা শাড়ি পরিয়ে হালকা সাজিয়ে দেয় আর আমাকে বাসর ঘরে বসিয়ে রাখার কাজটাও তারা করেছে।

রাত ১১:৫৬ মিনিট। ,
আদ্র ঘরে এসে হঠাৎ লাইট অফ করে দিয়েছে! আমি চমকে উঠে বলি,

  • আদ্র! লাইট কেন অফ করেছো?
    আদ্রঃ হুশ! এসো আমার সাথে! (হাত বাড়িয়ে দিয়ে)

পর্ব ২২ (অন্তিম)

আদ্র আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে গেলো। আমি অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ও আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল,
আদ্রঃ আমার খুব ইচ্ছা ছিলো তোমাকে বাসর রাতে প্রকৃত আলোয় দেখবো, কৃত্তিম আলোয় নয়। তাই লাইট অফ করেছি। এমনকি চোখ ও অফ করেছিলাম।
এবার আমিও খেয়াল করলাম অনেক সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে। আজ পূর্ণিমা, আর চাঁদ তার জোছনা আমাদের মুখে ছড়িয়ে দিচ্ছে। খুব ভালো ভাবেই আদ্রকে আর আমাকে দেখা যাচ্ছে। আদ্র মুগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার বেশ লজ্জা লাগলো। তাই দুষ্টুমির ছলে বললাম,

  • চাঁদের কিন্তু নিজস্ব কোন আলো নেই! এটাও নকল! তাহলে?

আদ্র বেশ বুঝতে পেরেছে আমি কথা ঘুরাচ্ছি। তাই এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
আদ্রঃ দেখাচ্ছি কি আসল!

পরদিন আমাকে নিয়মমতো শ্বশুরবাড়ি নেওয়া হলো। সেখানে একদফা অনুষ্ঠান শেষ করে আবার ছুটলাম বাপের বাড়ি। আমি আদ্রকে স্পষ্ট বলেছি আমি বাপের বাড়ি বেশ কিছুদিন থাকবো। বিশেষ কারন হচ্ছে আমার পুচকুটা। বাকি দুইজনের সঙ্গে এখন উনিও যোগ হয়েছে। আমি তো সারাদিনই পারলে আবিরাকে নিয়ে থাকি। আর সেও বেশ ফুপু পাগল বলা যায়। মায়ের নয়তো আমার কোলেই বেশি। আমি কোলে নিলেই চুপটি করে বুকের সাথে লেগে ঘুমিয়ে থাকে। আদ্র বেচারা জামাই আদর খেতে খেতে অবস্থা কাহিল।

আদ্রর ছুটি প্রায় শেষ। আমাকে এখন আদ্রর সাথে ক্যান্টনমেন্টে কোয়াটারে থাকতে হয়। মাঝে মাঝেই শ্বশুর বাড়ি যাই। মামুনি, বাবাইকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসে। কিন্তু আদ্র আমাকে কখনই একা ছাড়ে না। যা দরকার হয় ওকে বললে এনে দেয় নয়তো সাথে নিয়ে যায়। দেখতে দেখতে আমার পড়াশোনাও শেষ। কিন্তু প্রফেসর হতে হলে আমাকে আরো বেশ কয়েক ধাপ পড়তে হবে। সেই পড়াই কন্টিনিউ করছি।

আজ শরীরটা বড্ড খারাপ করছিলো। দুইবার পিরিয়ড মিস করেছি তাই আদ্রকে দিয়ে প্রেগন্যান্সি কিট এনে টেস্ট করি। রিপোর্ট পজিটিভ। আদ্রকে বলতে সে খুশিতে পাগল প্রায়। তবুও সিএমএইচে গিয়ে আবার টেস্ট করাই। এবার ও পজিটিভ। বিয়ের প্রায় বছরের মাথায় আমি প্রেগন্যান্ট। আদ্র অনেক খুশি! বারবার এটা সেটা খাওয়াচ্ছে। মামুনি আর বাবাই আমাদের বাসায় চলে এসেছে খবর পেয়ে। এখন থেকে এখানেই থাকবে।

আমার সাত মাস চলছে। বাসায় মেহমান ভর্তি। আদ্রই সব সামলাচ্ছে, আম্মু, আপু, ভাবী, মামুনি মিলে আয়োজন করেছে। আদ্রর কলিগদের মিসেসরাও এসেছে। দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছে। খুব ভালোভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো।
রাত ৯:০৫ মিনিট।
আমার পেটে মাথা দিয়ে আদ্র শুয়ে আছে। বেচারা আজ অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছে। তখন থেকে পেটে চুমু দিচ্ছে আর বলছে,
“পাপা লাভস্ ইউ বেবী, উম্মাহ!”

  • (হেসে দিয়ে) আদ্র! কি করছো? আমার কাতুকুতু লাগছে!
    আদ্রঃ (ভ্রু কুচকে) আমি তোমাকে কিছুই করিনি। আমি আমার বেবীকে আদর করছি। তোমার কেন লাগে?
  • আদ্র।
    কিছুক্ষন দুইজনেই চুপ থেকে আদ্র বলল,
    আদ্রঃ শ্যামবতি!
  • হুম!

আদ্রঃ আমার একটা প্রিন্স হবে! আমি আর আমার প্রিন্স সকল আউটডোর গেমস খেলবো! কি মজা!

  • না! আমার মেয়ে হবে! আমার একটা প্রিন্সেস চাই!
    আদ্রঃ আচ্ছা! আল্লাহ যেটা দিবে। তার উপরে তো কোন কথা নেই। যেই আসুক, সুস্থ ভাবে আসুক। মাম্মা, পাপা দুইজনেই তাদের সমান আদর করবে।
  • হুম।

হসপিটালে বেডে শুয়ে আছি। পাশে আদ্র বাবুকে নিয়ে বসে আছে। সিজারিয়ান হওয়ার জন্য বাবুকে ফিডারিং করাতে পারছি না। এখনো দুধ আসে নি। ডাক্তার সেলাইন দিয়েছে। আমার ছেলেটা কান্না করছে, আর আমি অসহায়ের মতো শুয়ে আছি। প্রায় অনেকক্ষণ চেষ্টার পর বাবুকে খাওয়াতে পারি। ওর কান্না থামতেই যেন প্রান ফিরে এসেছে। ফিডারিং শেষে আদ্র বাবুকে নিয়ে বাইরে গেছে। আর আমি আবার ঘুমিয়েছি। এভাবেই বেশ কয়েকদিন হসপিটালে থাকতে হয়েছে।

এর মধ্যে আবার আমার প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিলো। তাই বেশ কিছুদিন থাকতে হয়েছে। আজ তিনদিন হলো বাসায় এসেছি। বাবুকে সবাই কোলে কোলেই রাখে, শুধু ক্ষিদে পেলে মাকে দরকার হয়। আর রাতে ঘুম পেলে বাবাকে দরকার হয়। আদ্র রাতে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়ায় বাবুকে। আমার কোন টেনশনই নেই।

দেখতে দেখতে আমাদের বিয়ের ৩০ বছর পেড়িয়ে গেছে। আদ্রও রিটায়ার নিয়েছে। এখন আমি একজন প্রফেসর। তবুও দুই বুড়ো বুড়ি এই চট্টগ্রামে প্রকৃতির প্রেমের টানে রয়ে গেছি। এক সুখি দম্পতি। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যাই প্রকৃতি বিলাসে।

লেখা – সুমাইয়া ইসলাম মিম

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “প্রেমের টানে️ – Dustu misti premer golpo” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – চুক্তির বউ যখন প্রেগন্যান্ট – Bangla love story