মিষ্টি প্রেমের গল্প

মন বিয়োজন – নতুন প্রেমের গল্প

সোফাতে বসে প্রিয় কার্টুন সিরিজ ‘বেন টেন দ্যা আলটিমেট এলিয়েন’ দেখছি। রোদেলা টিভির সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি ঘাঁড় কাঁত করে টিভি দেখবো, রোদেলা আবারো আমার সামনে টিভি আগলে দাঁড়ায়। আমি অন্য জায়গাতে এসে বসলাম। কয়েক মিনিট পর রোদেলা আবারো আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“আবির, কি সমস্যা তোমার? তুমি চুপ চাপ থাকো কেনো এমন?”

রোদেলার কথা শুনে ওর মুখের দিকে তাকালাম। রোদেলা আমার দিকে কিঞ্চিৎ মুখ বাঁকা করে কপালের চামড়া কুঁচকে তাকালো। মেয়েটা দেখতে এমনিতেই যথেষ্ট সুন্দরী। ওর রাগী মুখটা দেখতে এ জন্য অনেক বেশি আকর্ষনীয় লাগছে। তবে আমার কেনো জানিনা ভয় লাগছে আজ। সুন্দরী মেয়েরা রাগলে তাঁদেরকে প্রজাপতির মতই আকর্ষনীয় লাগে। কিন্তু সুন্দরী মেয়েদের মন খারাপ করে থাকা মুখটা দেখলে মনে হয়, তারা আসলেই অসুন্দর।

আমি আবারো সরে এসে বসি। ‘গোয়েন আর কেবিন লেভিনের’ রোমান্টিক একটা সিন হচ্ছিল। বেন আসাতেই কেবিন বোরিং ফিল করে। সেটা দেখে মুচকি হাসছিলাম আমি। রোদেলা হয়ত সেটা খেয়াল করে, টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে আসে।

  • আরে, টিভি বন্ধ করলে কেন? দেখছো না, আমার ভেবারিট সিরিজ হচ্ছে?
  • আবির, আমি তোমার সাথে কথা বলছি। তোমার সমস্যাটা কি?
  • কি সমস্যা? (আমি)
  • কি সমস্যা মানে? তুমি কি ভুলে গিয়েছো?
    আমি মুচকি হাসলাম। রোদেলার হাত ধরে আমার পাশে বসালাম। রোদেলা আমার দিকে কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়ত ভাবছে আমি কি বলতে পারি এখন। রোদেলা প্রশ্ন করে..
  • আবির, কেনো তুমি তখন চুপ ছিলে? কিছু বললে না কেনো?
  • কি বলবো আমি?
  • কিছু না।

রোদেলা অন্যদিকে তাকালো। আমি সোফাতে হেলান দিয়ে বসলাম। রোদেলার গায়ে এখনো বিয়ের পার্টির ওয়েস্টার্ন ড্রেস। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম..

  • চেন্জ হয়ে নাও।
  • তোমাকে বলতে বলিনি। চুপ থাকো।
  • রেগে কেনো আছো?
  • তুমি জানোনা রেগে কেনো থাকবো?
    মেয়েরা রেগে গেলে সচারচার দুটো কাজ করে। যদিও রাগ প্রকাশের জন্য যদি প্রিয় মানুষ না থাকে। তখন তারা একদম চুপ থেকে হুট করে কান্না করে দেয়। আর না হয় ভাঙচুর করতে থাকে। তবে রোদেলা দুটোর কোনোটাই করছে না। কেনো করছে না সেটার কোনো কারনও দেখছি না।

আসলে আজকে গিয়েছিলাম রোদেলার রিলেটিভের একজনের বিয়ের ফাংশনে। ছোট থেকে বিয়ে বাড়ার অনুষ্ঠান আমার একদমই ভালো লাগে না। এর প্রথম ও প্রধান কারন, আমি দেখতে ছেলে হিসেবে অনেকটা কালো। সবাই এটাই ভাবে, ছেলে কালো তো কি হয়েছে? মেয়েরা কালো হলেই তো যত সমস্যা? আসলে তানা, কালো ছেলে মেয়েদের কেবল গল্পে আর নাটকেই নায়িকার পাশে মানায়। কোনো বাস্তবে না। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে।

আমি অনেকটা কালো। সত্যি বলতে কি, আমি হাসলে আমার দাঁতটাই কেবল দেখা যায়। এ জন্য সবার সামনে, বিশেষ করে মেয়েদের সামনে আসতে আন-কম্পারটেবল ফিল করতাম। এমনিতেই রোদেলা আমার বিপরীত। ওর গায়ের রঙ সম্পূর্ণ আমার থেকে আলাদা। মানে এক কথায় সে সুন্দরী, ফর্সা, মায়াবী আর আমি কালো, চেহারাটাও ভালো না।
আজ যখন রোদেলা আমার হাত জড়িয়ে ধরে ফাংশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি পিছন থেকে কে যেন বলে ওঠে..
“এই দেখ দেখ, আমাদের রোদেলার স্বামীটা কি কালো। এর থেকে রাস্তায় থাকা গোবরটাও অনেক সুন্দর হয় দেখতে। এহ… ছিহ.. কি দেখে রোদেলা ছেলেটাকে বিয়ে করেছিল। কাইলা ভুত।”

রোদেলা দাঁড়িয়ে পড়ে। আমরা দুজনেই ঘুরে তাকায়। রোদেলার মামি হয়, মহিলাটি। রোদেলা এগিয়ে যাবে। আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরি। রোদেলা ছাঁড়ানের চেষ্টা করলেও আমি ধরে রাখি। মুচকি হেসে কোনো রকমে রোদেলাকে মামির সামনে থেকে নিয়ে আসি।

  • তুমি আমাকে কেনো, ওদের সামনে থেকে নিয়ে আসলে? (রোদেলা)
  • বাদ দাও না। এসবের জন্য আমি আসি না। তুমি সুন্দর আমি কালো। আচ্ছা কি দেখে তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে বলোতো?
    রোদেলা আমার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকায়। কিছু না বলে ঠোঁট চিবাতে থাকে। রোদেলার একটা অভ্যাস হল, সে যখন রাগ করে, আর তা প্রকাশ না করতে পারলে ঠোঁট চিবাতে থাকে। বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে থাকা সব লোকজন রোদেলার পাশে আমাকে দেখে হাসছিল। এটা নতুন কিছু না। কালো ছেলে হয়ে, যদি সুন্দরী বউ পাওয়া যায় তবে এলাকার ছেলেপুলেরাও ফোঁড়ন কেঁটে গোপনে বলে.
    “এই রকম কালো দেখতে ছেলে কি একখান মাল পাইছে রে। বউটা একটা জিনিস, কিভাবে পাইলো মাইয়াটারে?”
    সত্যিই মানুষদের চিন্তাধারাগুলো অন্যরকম। একশো জন মানুষের মধ্যে ৯৫ জন মানুষ সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলে। বাকি ৫ জন যদি অসুন্দরের পাশে আসে, তখন অন্যরা সেটা সহ্য করতে পারে না।
    .
    বিয়ের খাবার খেতে বসবো, ঠিক তখনি রোদেলার কয়েকজন কাজিন আসে আমাদের পাশে। কথায় কথায় একজন বলে ওঠে..
  • রোদেলা আপু, তোর বরটা এমন বাজে দেখতে কেনো? কালো দেখে বিয়ে করেছিস তুই? ভাইয়ার পাশে তোকে একদমই মানায় না। দেখ ওনাকে কত বিশ্রি লাগছে দেখতে। বুঝলাম না, আংকেল আন্টিরাও কিভাবে ওনার সাথে তোর বিয়ে দিয়েছিল? আমার বয়ফ্রেন্ডটা দেখিস, একদম ললিপপ বয়ের মত। দেখলেই ক্রাশ খাবি। ছেলে তো ওরাকমই হওয়া দরকার।

ব্যস, আর কি। রোদেলা খাবার প্লেট রেখে উঠে দাঁড়ায়। মেয়েটার হাত ধরে বসা থেকে টেনে তোলে। কিছু বোঝার আগেই শাট শাট করে দুটো চড় বসিয়ে দেয় রোদেলা। আমি বোকার মত রোদেলার পিছনে দাঁড়িয়ে ওর কান্ডগুলো দেখছি। আরো একটা চড় মারতে যাবে, আমি ওর হাত ধরি। রোদেলা চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে..

  • আর কে কে যেন বলেছিল আমার বর দেখতে খারাপ, বাজে, কালো,সাহস থাকলে সামনে আসো। তাদের উদ্দেশ্যে বলি, কালো সে কি ইচ্ছে করে হয়েছে? নাকি সে বলেছিল সৃষ্টিকর্তার কাছে, আমাকে কালো বানিয়ে দিন। এখানে প্রতিটা মানুষ সৃষ্টি কর্তার ইচ্ছেতে তৈরি। উনি যেভাবে বানিয়েছে সেভাবেই এসেছে। আপনি এমন হলে কি করতেন? সবাই হয়ত ভাবছেন, ছেলেটার টাকা আছে তাই বিয়ে করেছি আমি? এমনটা ভাবলে বহু আগে ওর থেকে হাজারটা ছেলেকে বিয়ে করতে পারতাম। কিছু বলবো না আপনাদের। আপনারা তো শিক্ষিত, অনেক শিক্ষা আছে আপনাদের, কিন্তু ভুলেও আমার বরকে নিয়ে যদি কেউ হাসি তামাশা করে, তাকে খুন করতেও আমি ভয় করবো না।

এরপর রোদেলা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে বাড়িতে। আসার পথে রোদেলা একটা কথাও বলেনি। আমি রোদেলার এমন কান্ড দেখে অবাক হয়েছি। কারন মেয়েটাকে আমি প্রথম এত বেশি রাগতে দেখলাম। শুনেছিলাম সে অনেক রাগি, ও জেদি। কিন্তু বিয়ের সাত মাস হয়ে গেলো, রোদেলা কখনো আমার সাথে জোর গলাতে কথা বলেনি। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে এসে কার্টুন দেখতে বসি। কিন্তু রোদেলার রাগটা তখনো শেষ হয়নি। এ জন্য আমার কাছে এসে রাগ প্রকাশের বাহানা খুজছিল।

“খেতে আসো। টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে।”
রোদেলার কথা শুনে ভাবনা থেকে ফিরলাম। বসা থেকে উঠে খাবারের টেবিলে গেলাম। প্লেটে ভাত বেঁড়ে দেওয়ার সময় রোদেলা বলল..

  • তুমি কেনো কালো হয়েছিলে? কেনো যখন তোমাকে সবাই ওরাকম করে বলেছিল তুমি চুপ ছিলে? কিছু বলোনি কেনো? সমস্যাটা কি তোমার? কেনো সবার সামনে যাওনা?
    রোদেলার কথা শুনে হাসলাম। ডাল নিয়ে মাখিয়ে মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বললাম…
  • একটু আলা ভাঁজা দিবা? আলু ভর্তা করোনি?
    রোদেলা কিছু সময় ধরে আমার দিকে সরু চোখে তাকাল। তারপর আলুভাঁজা বেঁড়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি মুখে খাবার দিতে যাবো রোদেলার দিকে বেশ ভালো মত তাকিয়ে দেখলাম ওর গাল বেঁয়ে পানি পড়ছে। আমি ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আরামছে খাবার খেতে থাকি। কিছু সময় পর খাবার শেষ করে ব্যালকণিতে এসে দাঁড়ালাম।
    সময়গুলো কেমন যেন বিষাদময় ছিল। কিন্তু কেনো? আমি কালো বলে? নাকি আমাকে এমন ভাবে সৃষ্টি করেছে বলে? দোষটা কার? কারো না। চাইলে আমি সবাইকে অনেক কিছুই বলতে পারি, পারতাম। কিন্তু বলিনি। আজ চুপ ছিলাম, তবে সেদিন চুপ থাকিনি। যেদিন মায়া বলেছিল ‘আবির, আমাদের বাসায় আসো, আম্মু আব্বু তোমাকে দেখবে।’ ওর অফারটা ছিল অনেকদিনের। আবদারটা ছিল জোরালো।
    তিন বছর আগে, মায়া নামের মেয়েটার সাথে আমার রিলেশন ছিল। দেখতে কালো ছিলাম। কিন্তু কিছু মেয়ে থাকে যাদের ব্যতিক্রম কিছুই ভালো লাগে। মায়ার ক্ষেত্রেই এমনটা হয়। ফেসবুকে টুকটাক গল্প লিখতাম। গল্প লেখার সুবাদে মায়ার সাথে পরিচয়। প্রথম প্রথম তার অনেকগুলো মেসেজ আসতো। নিজের চেহারা কালো বলে মেয়েদের থেকে সর্বদা দুরে থেকেছি আমি।
    “এই যে আবির সাহেব, আমার মেসেজ সিন করে রিপ্লে করেন না কেনো? আপনি তো বেশ বজ্জাত, ফাজিল একটা।”
    এরাকমই মেসেজ থাকতো মায়া নামের আইডি থেকে। আমি এসে দেখতাম, মুচকি হেসে তাড়াতাড়ি চলে যেতাম অফলাইনে। রোজ মেসেজের বৃষ্টি বর্ষন করতো মায়া।

“আবির, সাহেব। জানেন আপনাকে নিয়ে আমি একা একা কল্পনা করি। আপনাকে নিয়ে কল্পনাতে অনেক কিছু ভাবি। আচ্ছা কখনো যদি বিয়োজনের শেষে এসে আপনাকে খুবটি করে চাই, আপনি হবেন আমার? কি সব বাচ্চামো কথা বলি আমি বলেন? এই ছেলে খেয়েছেন, কি করছেন? আমার মেসেজ দেখে হাসেন তাই না? হাসবেন না বুজলেন? বজ্জাত, পাজি,বদমায়েশ ছেলে।”
এভাবে একসময় চলতে চলতে আমিও রেসপন্স করি। একসময় অনেক কথা বলার পার্ট চলে আসে আমাদের।

আস্তে আস্তে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। কিন্তু মজার ব্যাপার ছিল, আমি তাকে আসার পিক কখনো দেখায়নি। আগেও বলে নিয়েছিলাম ‘আমি কালো দেখতে, তোমার পছন্দ হবে না।’ কিন্তু সে ছিল আমাতে বিভোর। তাই সংকোচতা থাকতেও তাকে খুব করে ভালোবেসে ফেলি। ভালোবাসার পরিমান এত বেশি ছিল যে তার সাথে প্রথম দেখা করতে যায় তাদের বাঁড়িতে।
আমি আর আমার ভাইয়া গিয়েছিলাম মায়ার বাড়িতে। পড়ন্ত বিকেলের শেষ প্রান্তের, অবেলা ক্লান্ত সময়ে ওদের বাড়িতে আসি। সে আগেই বলে রেখেছিল, আবির আসবে। মায়ার মা যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, আমি বসা থেকে উঠে বলি..

  • আন্টি আমি আবির।

উনি সাথে সাথেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। ভুলেও আমাদের সামনে তিনি আসেন নি। এরপর মায়ার বাবা আসে। ওনার সাথে ভাইয়া টুকটাক কথা বলে। ভিতর থেকে খবর আসে, আমার নয়, বরং আমার ভাইয়াকে তারা পছন্দ করেছে। ব্যাপারটা মজার হলেও আমার কাছে ছিল সত্যিই বেদনাপূর্ণ। তখন কেবল ভদ্রতা রক্ষার্তে মুচকি হেসে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলাম। মায়ার বাবা যখন আমাদের সামনে আসে। ওনার মুখের দিকে সবটা সময় আমি তাকিয়ে ছিলাম। উনি একটা বারের জন্যও আমার দিকে তাকান নি। কারন একটাই, আমি দেখতে বাজে, কালো।
.
সেদিন যখন চলে আসবো, তখন মায়ার মা, মায়াকে বলছিল, অবশ্য সেটা আমাকে শুনিয়েই বলছিল ‘এরাকম একটা বাজে দেখতে ছেলের সাথে তোর সম্পর্ক এটা কখনো সম্ভব না। শুয়োর চরায় কাওরা চিনিস না, যেমন গরু চরায় রাখাল আর শুয়োর চরায় কাওরা। ওদের মত দেখতে। ছিহ, যদি কখনো তুই ঐ ছেলেকে বিয়ে করিস, বা সম্পর্কটা রাখিস তবে আমাকে মা বলে ডাকবি না।’
মায়া হয়ত আন্টির সাথে কথা বলছিল কিন্তু আমার আনটির কথাগুলো কানের গভীরে বারবার বাজছিল। ভদ্রতাকে দুরে সরিয়ে মাথাটা নিচু করে ওনাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই বলি..

  • সরি আনটি, আসলে ভুল করে আপনার মেয়ের সাথে আমার একটা রিলেশন হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপার না। নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবো আমি। একটা কথা কি জানেন আনটি? আপনি সুন্দর, আপনার মেয়েও দেখতে মাশাল্লাহ। আপনারা সাদা চামড়ার বলে কালো চাঁমড়ার মানুষকে অপমান করলেন। আচ্ছা আজ যদি দুটো ছেলে আপনার মেয়েকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পরেরদিন ফিরিয়ে দিয়ে যায় বাসার সামনে। আপনার মেয়ের সৌন্দর্যটা তখন কোথায় যাবে?

পারবেন তখন আপনার মেয়ের সৌন্দর্য নিয়ে ভালো কোথাও বিয়ে দিতে? পারবেন না। কারন সমাজে তখন আপনার মেয়ে হয়ে যাবে খুব খারাপ চরিত্রের। তখন কি করবেন? মেয়েকে বিয়ে দেবেন খুব নিম্ন মানের একটা ছেলের সাথে, কারন বিয়ে বিদায় করতে পারলেই বাঁচবেন। যাইহোক, আপনার মেয়েকে রাজকুমারের সাথেই বিয়ে দিয়েন। আসি, সালামু আলাইকুম।
এরপর মায়া অনেকবার ফোন দিয়েছিল, কান্না করে বলেও ছিল, ‘আবির চলো না পালিয়ে যায়, আমি তুমি ঠিক থাকলেই তো হবে। আমার পরিবারকে তুমি চাওনা, আমাকে চাও। আমিও তোমাকে চাই, চলো না আমাকে বিয়ে করো।’ সেদিন হেসেছিলাম। চাইলেই যদি সব হতো তবে কষ্ট বলে কিছু থাকতো না।

“ঘুমাবা না তুমি? এখানে দাঁড়িয়ে কি মায়ার কথা ভাবছো? হুহ, আমার কথা তো কোনোদিন ভাববে না।”
আমি ঘুরে রোদেলার দিকে তাকালাম। রোদেলা চুল বাধা গুলো ছাঁড়াতে ছাঁড়াতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। রোদেলাকে দেখে আমি অবাক হই সবসময়। আম্মুর পরিচিত মেয়ে। মায়ার সাথে আর কথা বলিনি সেদিনের পর। কেঁটে যায় তিন বছর। নতুন শহরে এসে পরিচয় হয় রোদেলার সাথে।

পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। কবুতর পোষতাম আমি সেসময়। রোদেলারও কবুতর ছিল। দুজনের কথোপকথন কবুতর বদলের মাধ্যমে হয়ে যায়। তারপর টুকটাক রোজ কথা হতো। বন্ধুত্বের বাধনে আবদ্ধ হই। রোদেলার কাছে ছিলাম আমি ভিন দেশী রাজকুমারের মত। আমার আচরণগুলো নাকি ওকে খুব করে টানতো। একদিন হুট করে এসে বলে,
“আবির আমাকে বিয়ে করবা?”
আমি অবাক হয়েছিলাম। কারন জানতে চাইলে সে বলে..

  • তোমাকে ভালোবাসি তাই।
  • আমি তো কালো।
  • আমি তো রঙ দেখে ভালোবাসিনি। তোমার ভিতরে থাকা মানুষটা অনেক বেশি ভালো, বুঝছো।
  • হিহিহিহি.. তোমার পরিবার মেনে নেবে?
  • চলো তাহলে…
    রোদেলা সেদিন আমার হাত ধরে ওর মা বাবার সামনে নিয়ে যায়। মায়ের সাথে পরিচিত ছিল আগে থেকে। আর পাশাপাশি থাকায় আমাকে চিনতেও কষ্ট হয়নি। তবে রোদেলাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার জন্যই মূলত রোদেলা আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। যদিও পরে জেনেছিলাম রোদেলা আমাকে আগে থেকে ভালোবাসতো।
    বাড়ির সবার সামনে রোদেলা যখন বলেছিল..”ছেলে দেখতে এরাকমই। তোমার মানো আর না মানো, আমি ওকেই বিয়ে করবো। তোমরা তো জানোই ছেলেটা কেমন চরিত্রের। দেখতে কালো, আমার কোনো সমস্যা নেই। ভালোবাসি খুব। আমি তার জীবন থেকে মায়ার মত করে হারিয়ে যেতে চাই না। তোমাদের কাছে অনুরোধ, হয় তার সাথে বিয়ে দেবে না হয় আমরা পালালে আমাদের মেনে নিতে হবে। অবশ্য পালালে আপনাদেরই মান সম্মান নষ্ট হবে।”
    রোদেলার এমন, আমার প্রতি ভালোবাসা আর আমাকে নিয়ে জোর গলায় কথাগুলো শুনে আমি হাবার মত দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম ওর মুখে কয়েকটা চড় থাপ্পড় এসে পড়বে। কিন্তু না। আংকেল আনটিরাও রাজি হয়ে যায়। তারপর থেকে দুজন একসাথে।

“আবিরের বাচ্চা আবির, আমার সাথে কথা বলিস না কেনো?”
আমি রোদেলার দিকে তাকালাম। আমার দিকে রাগি মুখে চেয়ে আছে। আমি বললাম..

  • বরকে কি কেউ তুই বলে?
  • হু।
  • আচ্ছা সরি, আসলে ভাবছিলাম তোমার কথা।
  • হু, জানি। মন খারাপ হলেই তুমি আমাদের আগেকার কথাগুলো ভাবো।
  • আসলে মনে রাখি কথাগুলো। আমাদের বাবু হলে তাদের শোনাবো তো। (আমি)
  • এহ ফাজিল, রাগ ভাঙানোর ধান্দা। এত সহজে হবে না। প্রপোজ করো আমাকে। (রোদেলা)
  • পারি না।
  • করবা তুমি? (রোদেলা)
  • আচ্ছা… শোনো..
    বালিকা দেখো একটা ভালো জামাই বা বয়ফ্রেন্ড হওয়ার যোগ্যতা কিন্তুু আমারও আছে
    নীল শাড়ী, কিছু চুড়ি যদি তোমার ভালোলাগা হয় তবে সেই ভালো লাগার দায়িত্ব যদি আমি নেই; আমার হতে তোমার আপত্তি থাকবে না তো?
    বৃষ্টিতে ভিজতে চাওয়া তোমার শত দিনের ইচ্ছে। তোমার ইচ্ছে কেউ তোমার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ঘুম পাড়িয়ে দিক। কারো বুকে মাথা রেখে খুব ঘুমাতে তোমার ইচ্ছে। সেই ইচ্ছে পূরনের পূরক সাহেবটা যদি আমি হই; তুমি আমার হবে?
    মাঝে মাঝে অবাক করে দেয়া, গোধূলির বিকেল দেখা, ফুচকা-আইসক্রিম, চিপস্ খাওয়ার বায়না ধরা, মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে গল্প শোনার আবদার করা, বিরক্তি সহ্য করা, এতো সব পাগলামু মেনে নেয়ার মানুষটা যদি আমি হই; নির্দ্বিধায় তুমি আমার হবে তো?
    তোমার মন খারাপের বারণ, তোমার ঠোঁটে শুকনো হলেও একটু হাসির কারন, তোমার প্রতিটা দিনের শুভ সকাল থেকে শুভ রাত্রি যদি আমি হই; এক কথায় কি তুমি আমার হবে?

আচ্ছা মাঝে মাঝে রেঁধে খাওয়াবো, থালা বাসন মেজে দেবো, তরকারি কেঁটে দেবো! তোমার প্রতিটা কাজের অংশীদার হওয়া ভালো স্বামীটা যদি এই আমিই হই; তুমি পারবে তো আমার হতে?
টিভির রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি করবো না, শুধু প্রতি ওয়াক্তে সময় মতো নামাজ পড়তে একটু-আদটু বকা দেবো। যদি এক সাথে মরতে চাওয়া, বাঁচতে চাওয়ার সঙ্গীটা আমিই হই; চোখ বুঝেই নিজেকে আমার নামে দলিল করে দিতে তুমি পারবে?

রোদেলা কিছু বললো না। শত স্পীডে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। আমি আর কি, রোদেলাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরি।

গল্প: মন বিয়োজন
Abir Hasan Niloy

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!