মিষ্টি প্রেমের গল্প

সে কি জানে (১ম খণ্ড) – দু জনার গোপন সম্পর্কের গল্প

সে কি জানে (১ম খণ্ড) – দু জনার গোপন সম্পর্কের গল্প: অনেক চেষ্টার পরও যখন রেয়ানকে নিজের থেকে সরাতে পারলাম না। তখন উপায় না পেয়ে তাকে একটা জোড়ে কামড় দিলাম। এতে সে আহহ বলে আমাকে ছেঁড়ে দিলো। এ সুযোগে রুমের ভিতরে ডুকতে যাবো। অমনি রেয়ান আমার কাছে এসে আরও শক্ত করে চেপে ধরল আমায়।


পর্ব ১

~ ২০ বছর বয়সী মেয়েদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার মজাই আলাদা। তোমার তো ২০ বছর তাই না। তাছাড়া ১বার বিয়েও হয়েছে আর একটা ছেলেও আছে। সো তুমি আমার বেড পার্টনার হিসেবে একদম পার্ফেক্ট। তাই না? [বাঁকা হেসে]

সামনে থাকা ব্যক্তির এমন কথা শুনে আমার রাগ হওয়ার থেকে বেশি অবাক লাগছে। একজন অবিবাহিত ছেলে আমার অতীত জানা সত্ত্বেও আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দেখতে এসেছে। তার উপর তার বাবা দেশের একজন নামকরা বিজনেস ম্যান। আর সে একজন পুলিশ। ভাবতেও অবাক লাগছে। একজন পুলিশের ভাষা এমন কেমনে হতে পারে?

আমাকে চুপ থাকতে দেখে উনি আবার বললেন।
~ কি ঠিক বললাম তো?

~ দেখুন মিস্টার রেয়ান। আমি জানিনা আপনি এমন বাজে কথা কি জন্য আমাকে বলছেন। তার উপর বিয়ে করতে চাচ্ছেন। কেন?

~ মিসকি যেন নাম আপনার? [ভ্রুঁ কুঁচকে]
কথাটা শুনে আমার মাথাটা আরও খারাপ হয়ে গেলো। আরে আমার নাম জানে না আর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আমাকে দেখতে এসেছে। যত্তসব আবাল। ইচ্ছা করছে কথাগুলো মুখের উপর বলে দি। কিন্তু সে একজন অনেক বড় পসিসনের পুলিশ। বাজে ব্যবহার করা যাবে না। তাই মুখে হাসি রেখে বললাম।
~ আমার নাম মিরা।
~ ও মরুভূমি। তা যা বলছিলাম!

~ এক্সকিউজ মি। আমার নাম মিরা। মরুভূমি না
~ সে যাই হোক। শুনো আমি তোমার মতো মেয়েকে শুধু আমার বেড পার্টনার হিসেবে চাই। আর কিছু না।
~ তাহলে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন কেন?

~ তোমাকে যেন সমাজের মানুষ অন্য চোখে না দেখে। আর বিয়ে না করলে আমারও নাম খারাপ হবে। তাছাড়া তোমরা তো অনেক গরিব। তুমি আর তোমার মা তো হয়তো তোমার ছেলের লালনপালন করতে পারো না। তাই আমি করব। এতে তোমার লাভও হবে। এখন তুমি বলতে পারো। তোমাকেই কেন আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি। একচুয়েলি আই লাইক ইউর বডি। প্রতিদিন তোমার শরীরের স্বাদ নিতে চাই। তাই বিয়ে করব। [বাঁকা হেসে]

কথাটা শুনে নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারলাম না। বেয়াদবির লিমিট ছেড়ে চলে গেছে এই লোক। রাগে-জিদে পাশে তাকা চা উনার মুখে মেলা মারলাম। আর চেঁচিয়ে উঠে বললাম।
~ বের হন আমার বাসা থেকে এখনই। আর কোনো দিনও যেন আপনাকে আমার আশেপাশে না দেখি। বের হন!

রেয়ান কোনো কথা না বলে আমার দিকে রাগি ভাবে একবার তাকিয়ে তার গার্ডদেরকে নিয়ে চলে যান বাসা থেকে। উনি চলে গেলেও আমার রাগ কমেনি। কি। কি ভেবেছে~ টা কি ওই লোক আমাকে। আমি আমার ছেলেকে লালন পালন করতে পারবো না। বেশ পারবো। আমার ছেলে আমার পরিচয়ে বড় হবে। ওই লোকের কি। আমাকে কি পতিতা মনে করে। আমার ১বার বিয়ে হয়েছে দেখে যা ইচ্ছা তা বলবে। আসলে মার কথা শুনে ওই লোককে বাসায় আসতে দেওয়াটাই আমার ভুল।
হঠাৎ মার ডাকে আমার ধ্যান ভাঙ্গে।

~ কিরে। ছেলেটা এভাবে গেল গা কেন। কিছু কি উল্টাপাল্টা বলেছিস নাকি ছেলেটাকে?
~ আমি কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলি নি মা। ওই লোক বলেছে। কত বাজে বাজে কথা বলেছে আমাকে তুমি জানো? তোমাকে আমি আগেই বলেছিলাম মা। আমি এভাবে থাকতে পারবো। আমার ছেলেকে আমি একা মানুষ করতে পারবো। কাউকে লাগবে না আমার।
মা আমার কথা শুনে করুন চোখে তাকায় আমার দিকে। তারপর আস্তে করে আমার পাশে বসে আমার কাধেঁ হাত রাখে। আর নরম গলায় বলে।

~ মাফ করে দে মা। আমি আসলে তোকে এত কষ্টে দেখতে পারছিলাম না। তাই যখন ছেলেটা বিয়ের প্রস্তাব দিলো তখন আর মানা করতে পারি নি। আমি ভাবি নি এমন হবে। মাফ করে দে মা
বলতে বলতেই মা কেঁদে দিলেন। আসলে মা আমার অনেক ইমোসনাল। কথায় কথায় কেঁদে দেয়। হয়তো আমার কষ্টে উনি আরও বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। আমি মুচকি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরলাম।

~ কেঁদো না মা। শুভ যা করেছে তার জন্য ও শাস্তি পাবে। আর দেখবা। আমরাও একদিন না একদিন সুখে থাকবো। একবার আমার চাকরিটা ভালোভাবে হয়ে যাক। সব কষ্ট চলে যাবে আমাদের। তুমি আমি আর রিহান একসাথে আনন্দে থাকবো।

এরপর মার চোখ মুছে দিলাম। এরই মাঝে আমার ছেলে রিহান এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আর বলতে থাকলো।
~ মা। তুমি আর নানু কি কান্না করেছো। তোমাদের চোখে পানি কেন?

~ কই নাতো। আমরা তো হাসছি। এই দেখ
বলেই আমি আর মা হেসে দিলাম। আমাদের হাসি দেখে আমার ছোট্ট ছেলেটাও হেসে দিলো। কি মায়া ওর ভেতর। ওর জন্যই তো। এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও বেঁচে আছি।
রিহানের কপালে আদরমাখা একটাচুমু দিয়ে বললাম।
~ চকলেট খাবি। আয় নানু। আমি আর তুই একসাথে চকলেট খাবো আর গল্প করব। ওকে
~ হুম চকলেট খাবো-গল্প করব
বলেই রিহান খুশিতে নাচতে লাগলো। আসলেই আমার ছেলেটা অনেক দুষ্টু। সারাটা দিন দুষ্টুমি করবে। আর নাচানাচি করবে। একে নিয়েই তো আমার পৃথিবী!

এভাবে হাসি আনন্দে কেটে গেল দিনটা। কিন্তু রাতে। রাতে তো আর আনন্দে থাকতে পারি না। রিহানও যখন ঘুমিয়ে যায়। তখন তো আমার শুভর কথা মনে পড়ে। তাছাড়া ওই লোকটা। যে আমাকে এতগুলো বাজে কথা বলল। আসলেই কি এগুলো হওয়ার কথা ছিল আমার জীবনে। শুভ আর আমি তো ভালোই ছিলাম। তাহলে এমন কেন হলো। কেন ও ছেঁড়ে চলে গেল আমাকে? কেন?

রাতটা এভাবেই কষ্টে কেটে গেল আমার।
সকালে উঠেই আগে রেডি হয়ে নিলাম। কারন আজকে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে হবে আমার। রিহান এখনও ঘুমাচ্ছে। তাই তার কপালে একটা স্নেহভরা চুমু দিয়ে আর মাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলাম।

ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছি রিকশার খোঁজে। কিন্তু একটা রিকশাও পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে হাঁটা ধরলাম। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। কথা নাই বার্তা নেই। আমাকে গাড়িটার ভেতর জোড় করে ডুকালো। ভেতরে ডুকতেই দেখি রেয়ান এক হাতে জুস খাচ্ছে আর অন্য হাতে ফোন টিপছে। কিছু করতে যাবো তার আগেই হুট করে কিছু লোক আমার হাত। পা আর চোখ বেঁধে দিলো।


পর্ব ২

হুট করে কিছু লোক আমার হাত। পা। চোখ বেঁধে ফেলে। আমি ছোটার অপ্রাণ চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। হঠাৎ কেউ আমার হাতের বাহু খুব শক্ত করে চেপে ধরে। তার নিশ্বাস আমার মুখের উপর পড়ছে। বুঝতে পারছি। সে আমার খুব কাছে। হয়তো এটা রেয়ান।
~ রেয়ান? এটা কি আপনি?

আমার কথা শুনে উনি নেশা ধরানো কন্ঠে বললেন।
~ বাহ। তুমি তো দেখি অনেক স্মার্ট। মাত্র একদিনের পরিচয়ে আমাকে এতটা চিনে ফেললে।
~ দেখুন বাজে কথা বন্ধ করুন। একজন পুলিশ হয়ে এমন খারাপ কাজ করতে আপনার লজ্জা করে না?
~ কই? কিছুই তো এখন করি নি? যদি বলো এখন করব?
~ ছিঃ আপনি একটা নির্লজ্জ। বেহায়া মানুষ। সেটা আপনি জানেন।

~ আলবাত জানি। আচ্ছা একটা কথা বলত। তোমার স্বামী তোমাকে কেন ছেঁড়ে চলে গেছে। এত সুন্দর একটাউফফ আর কি বলব। তোমাকে দেখলেই আমার ইচ্ছা করে খেয়ে ফেলতে। ও কিভাবে ছেঁড়ে যেতে পারলো? তবে ভালোই হয়েছে। ওর জন্যই এখন আমি তোমাকে পেতে পারবো। কি বলো?
রেয়ানের এমন বাজে কথা শুনে আমার শরীর ঘৃণায় শিউরে উঠছে। রাগও হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু এখন আমি উনাকে যাই~ ই বলি না কেন উনি তাতে কোনো রিয়েক্ট করবেন না উল্টা আরও খারাপ কথা শুনাবেন আমাকে। তাই শান্ত কণ্ঠে উনাকে বলি।
~ রেয়ান প্লিজ আমার বাঁধনগুলো খুলে দিন। আর আমাকে যেতে দিন। আমার ছেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। প্লিজ যেতে দিন আমাকে।

এবার রেয়ান কিছু বলল না। আসতে আসতে সরে যেতে লাগলো আমার কাছ থেকে। এতে আমার ভয় যেন দ্বীগণ বেড়ে গেল। চিল্লিয়ে বলে উঠলাম।
~ প্লিজ রেয়ান আমাকে ছেঁড়ে দিন। আমার ছেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ও আমাকে ছাড়া বেশিক্ষন থাকতে পারে না। প্লিজ যেতে দিন আমাকে রেয়ান। প্লিজ!

এভাবে অনেক কাকুতিমিনতি করার পরও কোনো লাভ হলো না। প্রতিবারের মতোই আমি ব্যর্থ।
হঠাৎ মনে হলো গাড়িটা থেমে গেছে। আর আমি শূণ্যে ভাসছি। বুঝতে পারছি কেউ আমাকে কোলে নিয়েছে। আমি একটু নড়তে যাবো। তার আগেই আমার মুখে কেউ একজন একটা কাপড় ধরে। সাথে সাথে আমার শরীর যেন অবশ হতে শুরু করে। হাত পা নাড়ানোর সামান্যটুকু শক্তি নেই আমার। আর না আছে কথা বলার। কয়েক সেকেন্ড যেতেই আমার চোখে রাজ্যের ঘুম বিরাজ করে। পরক্ষনেই তলিয়ে যাই ঘুমের দেশে।

যখন জ্ঞান ফিরে তখন নিজেকে নিজের রুমেই আবিষ্কার করি। পাশেই বসে আছে আমার ছোট্ট ছেলেটা। তার চোখে স্পষ্ট পানি। খুব মায়া লাগছে আমার। কিন্তু মনে এক প্রশান্তি কাজ করছে আমার ছেলে আমার সাথে আছে। পরক্ষনেই মনে হলো। আমি এখানে কিভাবে? আমাকে রেয়ান কোথায় যেন নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কোথায়? আর আমাকে এখানেই বা আনলো কে?

আমাকে চোখ খুলতে দেখে রিহান খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আমায়। কাঁদতে কাঁদতে বলল।
~ কোথায় গিয়েছিলে মা তুমি? জানো কত কান্না করেছি আমি। এভাবে আর যাবে না কেমন। নাহলে কিন্তু কথা বলব না আমি তোমার সাথে।
ওর কথার বিনিময়ে আমিও ওকে জড়িয়ে ধরলাম। আর বললাম।
~ আর কক্ষনও যাবো না মা তোকে রেখে

প্রায় কিছুক্ষন এভাবে থাকার পর খেয়াল করলাম আমার ছেলেটা ঘুমিয়ে গেছে। আশেপাশে তাকাতেই দেখি মা দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের মা~ ছেলেকে দেখছে। আমি আসতে করে রিহানকে পাশে শুইয়ে দিয়ে মার কাছে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরি। কেন যেন একটা ভয় কাজ করছে মনে। মাকে আর আমার ছোট্ট ছেলেটাকে হারানোর ভয়। কেন যানি চোখের পানি গুলো আজ বাঁধা মানছে না। ডুকরে কেঁদে উঠি মাকে জড়িয়ে ধরেই। তা দেখে মা চমকে উঠে বললেন।
~ কি হয়েছে মিরা। কাঁদছিস কেন?

আমি মার কাছ থেকে সরে আসলাম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বললাম।
~ কেন জানিনা আজকে খুব কষ্ট লাগছে মা। তাই কান্না আটকাতে পারি নি।
আমার কথা শুনে মা কিছু একটা হয়তো আন্দাজ করেছেন। গম্ভীর কন্ঠে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন।
~ আচ্ছা মিরা। সত্যি করে বল তো তোর কি হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে কতগুলো লোক তোকে এনেছিল বাসায়। তুই নাকি রাস্তায় মাথা ঘুড়িয়ে পড়ে গিয়েছিলি!

মার কথা শুনে আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। তাড়াতাড়ি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১২টা বাজে। সাথে সাথে মনে এক ভয়ংকর ভয় গ্রাস করে আমাকে। আমি বাসা থেকে বের হয়েছি সকালে। আর এসেছি সন্ধ্যায়। এর মাঝে কি হয়েছে তা কিচ্ছু আমি জানি না। তাহলে কি রেয়ান আর আমার মাঝে খারাপ কিছু হয়েছে? না। না এগুলো আমি কি ভাবছি। কিন্তু হতেও তো পারে!

আমার ভাবনায় বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মা বলেন।
~ মিরা। সত্যি করে বল। কোথায় ছিলি তুই। তোর সাথে কি কোনো খারাপ কিছু হয়েছে?

মা জিনিসটা আসলেই অদ্ভুদ। নিজের সন্তানের মনে কথাটা তারা বেশ ভাবে বুঝতে পারেন। তাই অবাক হলাম না। এটা বেশ কয়েকবার হয়েছে আমার সাথে।
~ আসলে মা। আজকে অনেক গুলো চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছি তো। তাই বেশি প্রেসার পড়েছে মাথায়। এজন্যই হয়তো মাথা ঘুড়িয়ে পড়ে গেছি রাস্তায়।
আমার কথায় মা হয়তো সন্তুষ্ট হন নি। সন্দেহ বোধহয় একটা রয়েই গেল তার। কিন্তু তবুও কিছু বললেন না। চুপচাপ চলে গেলেন রুম থেকে।

রাত প্রায় ১টা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আজকের দিনটার কথা ভাবছি। কিছুতেই মনে করতে পারছি না কি হয়েছে আমার সাথে। হঠাৎ কেউ এক টানে আমাকে পেছনে ঘুড়ালো। সামনে তাকাতেই দেখি রেয়ান আমার দিকে নেশাক্ত চাহনি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে। আর বাঁকা হাসছে। আমি কিছু বলতে যাবো। তার আগেই সে আমাকে নিজের একদম কাছে নিয়ে আসে। তারপর কানে ফিসফিস করে বলতে থাকে।
~ আজকের দিনটা কিন্তু অনেক সুন্দর ছিল মরুভূমি!
কথাটা শুনে কি রিয়েক্ট দেওয়া উচিত বুঝতে পারছি না। রেয়ানের কথার মানে কি? তাহলে কি আমি যা ভাবছি তা সত্যি? মুহুর্তেই চোখে পানি এসে জমা হয় আমার। কিন্তু চোখ থেকে গড়িয়ে নিচে পড়েনি পানিগুলো।

কিছুক্ষন চুপ থেকে রেয়ানকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরানোর চেষ্টায় লেগে যাই। কিন্তু প্রতিবারের মতী আমি ব্যর্থ। এমনিতে বডিবিল্ডার। তার উপর পুলিশ। আমার শক্তি তার কাছে খুবই নুন্যতম।
অনেক চেষ্টার পরও যখন রেয়ানকে নিজের থেকে সরাতে পারলাম না। তখন উপায় না পেয়ে তাকে একটা জোড়ে কামড় দিলাম। এতে সে আহহ বলে আমাকে ছেঁড়ে দিলো। এ সুযোগে রুমের ভিতরে ডুকতে যাবো। অমনি রেয়ান আমার কাছে এসে আরও শক্ত করে চেপে ধরল আমায়।

পর্ব ৩

~ পেটের বাদামী তিলটা কি আমাকে দেখানোর জন্য বের করে রেখেছো? [বাঁকা হেসে]
কথাটা শুনা মাত্র আমি নিজের দিকে একবার চোখ বুলালাম। কী সর্বনাশ! আমার শাড়ির পেটের দিকটা থেকে কাপড় সরে গেছে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট পেট দেখা যাচ্ছে আমার। সাথে সাথে নিজেকে ঢাকতে শুরু করি। রেয়ানের দিকে রাগি চোখ নিক্ষেপ করে বলি
~ আপনি এত অসভ্য কেন? মাঝরাতে আমার বাসায় এসে ফাজলামি করছেন। আর। আর আমার রুমে ঢুকলেন কিভাবে?

রিহান ঘুমিয়ে আছে দেখে কিছুটা ফিসফিসিয়ে বললাম কথাগুলো। আমার দেখাদেখি রেয়ানও ফিসফিসিয়ে বলল
~ তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো। সেখান থেকেই ঢুকেছি তোমার রুমে।
কথাটা শুনে নিজের আশেপাশে তাকালাম। আমি তো বারান্দায়। তাহলে কি এ পুলিশ গুন্ডা পাইপ দিয়ে বেয়ে বেয়ে বারান্দা দিয়ে আমার রুমে এসেছে। কিন্তু আমি দেখলাম না কেন?

~ আপনি যদি বারান্দা দিয়ে আসেন। তাহলে আমি আপনাকে উঠতে দেখলাম না কেন?
~ মহারানী যে ভাবনায় ডুবে ছিলেন। সেখান থেকে বের হয়ে কোথায় কি হচ্ছে তা দেখার সময় ছিল কি আপনার। আপনি তো আপনার মহাবড় চিন্তায় ব্যস্ত ছিলেন। আচ্ছা কি চিন্তা করছিলে তুমি? নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে! [বাঁকা হেসে]

~ আম। আমি আপনাকে নিয়ে চি। চিন্তা করব কেন? আমাকে একটা কথা বলুন তো। পুলিশ হয়ে এসব বাজে কাজ করতে আপনার বিবেকে বাঁধে না? কিভাবে পারেন এগুলো? সকালে একবার উঠিয়ে নিয়ে গেলেন রাস্তা থেকে। কি করেছেন না করেছেন কিচ্ছু জানি না। এখন আবার মাঝরাতে বারান্দা দিয়ে আমার রুমে ঢুকেছেন। আপনিই বলুন এগুলো কি ধরণের অসভ্যতামি। কেন করছেন এমন আমার সাথে?

~ আমাকে বিয়ে করো। তাহলে এত কিছু সহ্য করতে হবে না তোমার।
~ জীবনেও না। আপনার মতো একজন খারাপ মানুষকে আমি কখনও বিয়ে করব না। আরে আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না আপনি আমার মতো একটা বিবাহিতা মেয়ে। যার একটা বাচ্চা আছে তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন কেন? নিশ্চয়ই একটা খারাপ মতলব আছে আপনার?

কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে দিলাম আমি। পারছি না এসব নিতে। এই রেয়ানটার জন্য বারবার অতীতটা তুলে ধরতে হয় আমার। বারবার মনে পড়ে যায় ওই ভয়ংকর অতীতটার কথা। শুভর কথা।
মেঝেতে বসে কান্না করছি। এতে বিন্দু মাত্র মাথা ব্যথা নেই রেয়ানের। সে একমনে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। হঠাৎ গম্ভীর কন্ঠে সে বলে উঠে।
~ তাহলে তুমি বিয়ে করবে না আমাকে?

কথাটা শুনে রাগ মাথায় উঠে গেল আমার। মেঝে থেকে উঠে রেয়ানের সামনা সামনি দাঁড়ালাম। রেয়ানের কলার ধরে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললাম

~ আপনার আসলেই লজ্জা করে না রেয়ান? এখনও কিভাবে বলছেন এগুলো? কি ভাবেন কি আপনি নিজেকে। পুলিশ বলে যা ইচ্ছে তা করবেন? পারবেন না। আপনাকে ভয় পাই না আমি। করব না আমি আপনাকে বিয়ে। বুঝেছেন। করব না বিয়ে আপনাকে।

কথাটা শুনে রেয়ান যেন আরও গম্ভীর হয়ে গেল। আমার হাত থেকে নিজের কলার ছাড়িয়ে। শান্ত ভাবে বলল
~ বিয়ে তো তোমাকে আমাকেই করতে হবে। তুমি সেটার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নাও। আর একটা কথা। ভয় পাও না আমাকে তাই না? এবার থেকে ভয় পাবা। ভীষণ রকমের ভয় পাবা।
কথাটা বলেই রেয়ান আর এক মুহুর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। এক লাফ দিয়ে বারান্দা থেকে নিচে নেমে গেল। আমরা থাকি একটা ২তালা বাসায়। নিচ থেকে আমার বারান্দাটা এত উপরে না। তাই হয়তো সহজেই এক লাফ দিয়ে নেমে গেছে রেয়ান।

এক দৃষ্টিতে রেয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। খুব ভয় হচ্ছে আমার। রেয়ান কথাটা শান্ত ভাবে বললেও। সেটা যে কতটা ভয়ংকর। তা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি আমি।

সকালে…

ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার ছোট্ট ছেলেটা আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে৷। ওর কপালে একটা স্নেহভরা চুমু দিয়ে ফ্রেস হতে চলে গেলাম। ফ্রেস হয়েই আগে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াই।
রান্না ঘরে ডুকতেই দেখি মা নাস্তা বানাচ্ছে। আমিও তার সাথে নাস্তা বানাতে লেগে যাই। ২ জন ২জনের সাথে অনেক গল্প করি। নাস্তা বানানো শেষে হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ আসে। তা শুনে মা বলে
~ মিরা তুই নাস্তাগুলো টেবিলে নিয়ে যা। আমি দেখছি কে এসেছে
~ আচ্ছা

মার কথা মতো আমি নাস্তাগুলো টেবিলে নিয়ে যাই। এদিকে মা দরজা খুলতেই কিছু লোক কথা নাই কোয়া নেই বাসার ভেতরে ঢুকে যায়। লোকগুলো ড্রইংরুমে ঢুকে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করে
~ আপনার নাম কি মিরা
~ জ্বী

~ আপনাকে আমাদের স্যার ডেকেছে। তাই আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে
~ মানে? আপনাদের স্যার কে? আর আপনারাই বা কারা? এভাবে আমাদের বাসায় ডুকে এসব তামাশা করার মানে কি। বের হোন আমাদের বাসা থেকে।

~ দেখুন আমরা পুলিশের লোক। যা বলছি তা করুন। নাহলে[বলতে না দিয়ে]
~ পুলিশের লোক হয়েছেন দেখে যা ইচ্ছে তা করবেন। দেখুন ভালোভাবে বলছি বের হোন আমাদের বাসা থেকে। নাহলে আমি চিল্লাচিল্লি করে মানুষজন ডাকব।
আমার কথায় যেন তাদের কোনো কিছুই যায় আসে না। তারা তাদের জায়গা থেকে এক ফোটাও নড়ে নি। হুট করে একজন মার মাথায় বন্দুক তাক করে বলল

~ দেখুন ম্যাম। আমাদের সাথে চলুন। নাহলে আমরা আপনার মা আর ছেলেকে মারতে বাধ্য হবো
কথাটা শুনে আমার লোকগুলোর উপর একটু সন্দেহ হলো। তারা কিভাবে জানে এটা আমার মা আর আমার একটা ছেলেও আছে। তাহলে কি এদের রেয়ান পাঠিয়েছে? কেননা রেয়ানও একজন পুলিশ।
~ আপনাদের কে পাঠিয়েছে?

~ কে পাঠিয়েছে তা আমাদের সাথে গেলেই বুঝবেন
~ আচ্ছা ঠিকাছে আমি আপনাদের সাথে যাবো
কথাটা শুনে মা রেগে গেলেন। উনি তার ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন
~ কি বলছিস মিরা। কে না কে এ লোক। যদি কিছু হয় তোর। তুই এদের সাথে যাবি না।
~ মা আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি রিহানের খেয়াল রেখো। আমি তাড়াতাড়িই চলে আসবো
~ কিন্তু

~ আমার কিচ্ছু হবে না মা। তুমি চিন্তা করো না
অতপর লোকগুলো আমাকে একটা ব্লেক কারে বসায়। আর নিজেরা বসে অন্য একটা গাড়িতে। প্রায় কিছুক্ষন পর গাড়ি পৌঁছে যায় তার গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি লোকগুলো আমাকে পুলিশ স্টেসনে নিয়ে এস

প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে বসে আছি পুলিশ স্টেসনে। আশেপাশে সবাই যার যার কাজ করছে। আমাকে যে লোকগুলো নিয়ে এসেছিল তাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। লোকগুলো আমাকে দিয়েই চলে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায় আমি যেন এখান থেকে কোথাও না যাই। ওদের স্যারের সময় হলে আমাকে তার কাছে ডাকবে
২ গালে ২ হাত দিয়ে বসে আছি। হঠাৎ একজন কন্সটেবল এসে আমাকে বলে
~ ম্যাম। আপনাকে স্যার ডাকছে। আমার সাথে আসুন
~ জ্বী

কন্সটেবল আমাকে একটা রুমের সামনে এসে দাঁড় করালো। তারপর বলল
~ ম্যাম। ভিতরে স্যার আছে। আপনি যান
আমি কিছু না বলে ঢুকে গেলাম রুমটার ভেতর। আমার যা ভয় ছিল তাই~ ই হলো। রুমটায় ডুকতেই দেখি রেয়ান পুলিশ ড্রেস পড়ে বসে আছে চেয়ারে। আর গম্ভীরভাবে খুব মনোযোগ দিয়ে একটা ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। ফাইলে তাকিয়ে থেকেই শান্তভাবে সে বলে উঠল।
~ মরুভূমি তাহলে তুমি এসেছো। বসো।

আমার নামটা এই লোক কোনোদিনও ঠিক করে বলে না। সবসময়ই মরুভূমি ডাকে। এতে আমার রাগ হয় প্রচুর। কিন্তু এখন রাগ থেকে ভয় লাগছে আমার। তার এই শান্ত রুপের বিপরীতে যে এক হিংস্র রুপ আছে।। কি করবে এ লোক আমার সাথে? কেন ডেকেছে সে আমায়।

পর্ব ৪

~ ঠাসসসস। আপনার লজ্জা করে না রেয়ান। একজন পুলিশ হয়ে এমন বাজে কাজ করতে। আর আমাকে এভাবে উঠিয়ে আনার মানে কি?

থাপ্পড় আর কথাটা বলে আমি নিজেই বোকা বনে গেলাম। রেয়ান ভয়ার্তক ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চোখ ২টো লাল হয়ে আছে। আর মুখ শক্ত করে রেখেছে সে।

এমন ভয়ংকর রুপ আমি কখনও দেখি নি। ভয়ে রিতিমতো হাত~ পা কাঁপছে আমার। থাপ্পড়টা মারা হয়তো উচিত হয়নি আমার। কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলেই তো হতো। থাপ্পড় মারার কি প্রয়োজন ছিল? এখন তো রেয়ান আমার কোনো কথা শুনবে না। যদি সে আরও খারাপ কিছু করে। যদি আমার ছেলেকে আর মাকেআল্লাহ জানে এ পুলিশ গুন্ডা এখন কি করবে!
কোনোমতে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বললাম
~ দে। দেখুন রেয়ান! এ। ভাবে তাকিয়ে লা। ভ নেই। দোষ কিন্তু আপনারই। আপনি এত বাজে কাজ কেন করে
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই রেয়ান আমার হাত ২টো দেওয়ালের সাথে খুব শক্ত করে চেপে ধরেলেন। দাঁতে দাঁত চেপে বলেন
~ অনেক সাহস না তোমার। আমাকে থাপ্পড় মেরেছো তুমি তাই না। এটার ফল ভুগবা তুমি এখন।
কথাটা বলেই আমাকে এক টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো রেয়ান। তারপর খুব রুডলি আমার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল।
~ আমার কাছে আসা তোমার পছন্দ না। তাই না? এখন থেকে আমার কাছেই থাকতে হবে তোমার।
বলেই আমাকে টানতে টানতে পুলিশ স্টেসনের বাইরে নিয়ে যেতে থাকে। পুলিশ স্টেসনের সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। খুব অসস্তি হচ্ছে আমার। রেয়ান থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছি। প্রতিবারের মতো এবারও ফলাফল শূণ্য। এবার না পেরে জোড়ে চিল্লিয়ে বলে উঠি
~ রেয়ান ছাড়ুন আমার হাত। আমার লাগছে। আমি আমার ছেলে কাছে যাবো। প্লিজ ছাড়ুন আমাকে।
কে শুনে কার কথা! রেয়ান নিজের মতো টানতে টানতে আমাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। এক ধাক্কায় গাড়ির ভেতরে ডুকিয়ে নিজেও গাড়িতে উঠে বসে।

গাড়িতে ডুকেই রেয়ান প্রথমে গাড়ি লক করে দেয়। এদিকে আমি গাড়ি খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করেই যাচ্ছি। তা দেখে সে বলে উঠে।

~ কোনো লাভ নেই মরুভূমি। গাড়ি লক। চুপচাপ বসে থাকো নাহলে
~ নাহলে কি করবেন কি আপনি? এত বাজে একটা মানুষ কেমন হতে পারে? আসলে কি জানেন আপনি মানুষই না। আপনি একটা অমানুষ। ভালোভাবে বলছি আমাকে আমার ছেলের কাছে যেতে দিন। নাহলে কিন্তু আমি

~ তুমি কি হ্যাঁ? কিছু করতে পারবে না তুমি আমার। তাছাড়া কি যেন বলছিলে। নিজের ছেলের কাছে যেতে চাও। তাই না? সেটা আমাকে থাপ্পড় মারার আর এগুলো বলার আগে ভাবা উচিত ছিল। এখন যেতে দিচ্ছি না তোমায় কোথাও। আমার কাছেই থাকবে তুমি।
~ প্লিজ এমন করবেন না রেয়ান। আমাকে যেতে দিন আমার ছেলের কাছে। ও মনে হয় এখন কান্না করছে আমার জন্য। আমি আমার ছেলের কাছে যাবো রেয়ান। প্লিজ যেতে
আর কিছু বলতে পারলাম না আমি। তার আগেই রেয়ান সেই আগেরবারের মতো আমার মুখে একটা সাদা কাপড় চেপে ধরলেন। সাথে সাথে আমি অজ্ঞা হয়ে গেলাম।

কিছুক্ষন আগে….

চেয়ারে বসতেই রেয়ান আমার সামনে একটা ফোন রাখে। একটা ভিডিও চলছে ফোনটায়। যেখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে আমার ছেলে আর মাকে কয়েকজন লোক বন্ধী করে রেখেছে। ভিডিও~ টা দেখে মুহুর্তেই মাথা গরম হয়ে যায় আমার। রেয়ানের তাতে কোনো খেয়াল নেই। সে আমার কাছে আসতে আসতে বলে
~ আমাকে এখন। এই মুহুর্তে বিয়ে করতে হবে তোমাকে। নাহলে তোমার ছেলে আর মাকে
এটুকু শুনেই রাগটা যেন আর হিংস্রতায় পরিণত হয়। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঠাসসসস করে থাপ্পড় মেরে দি রেয়ানকে। তারপর কথাগুলো বলি

জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে এক অন্ধকার রুমে আবিষ্কার করি। যতটুকু অনুভব করছি। আমাকে একটা চেয়ারে হাত~ পা বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছে। প্রচুর ভয় লাগছে আমার। সাথে অন্ধকার রুমটার কিছু বিকট আওয়াজ যেন আমাকে আরো ভয় পাওয়াতে সক্ষম!

ভয়েরচটে কয়েকবার জোড়ে জোড়ে রেয়ানের নাম ধরে ডাকি। কিন্তু কোনো সারা শব্দ নেই। ভয়টা যেন আরও বেড়ে গেল আমার। ছোট বেলা থেকেই অন্ধকার ভয় পাই আমি। যার জন্য রিতিমতো কপালে ঘাম জমে গেছে আমার।

হঠাৎ কারো কন্ঠে গানের আওয়াজ পাই
সে কি জানে। তোকে অভিমানে হাসাতে?
সে কি পারে। বুকে ধরে তোকে ভুলাতে?
তোর প্রিয় গান কে গেয়ে শোনাবে? বল
আমার থেকে কে তোকে ভালো জানে!
ইশারাতে তোকে খুঁজে বেড়াই স্বপ্নে তোর
নাম ডেকে হেসে ফেলি আনমনে। কে নিয়ে
যাবে তোকে রুপকথা দেশে? বল আমার
থেকে কে তোকে ভালো জানে!

পর্ব ৫

অন্ধকারে কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি কেও আমার দিকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে। তার পায়ের শব্দ পাচ্ছি আমি। এতে যেন আরও ভয় পেয়ে যাই। হাত~ পা ছোটাছুটির চেষ্টা করছি আর বলছি
~ রেয়ান! এটা কি আপনি? প্লিজ সামনে আসুন। আমার অনেক ভয় লাগছে
কথাটা বলে আমি থেমে যাই। কেউ কিছু বলে নাকি তা শুনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু না! কারো কোনো কথাই শুনা যাচ্ছে না। আর না শুনা যাচ্ছে সেই কাছে আসার শব্দ। আবারও বলে উঠি
~ রেয়ান আপনি কোথায় প্লিজ সামনে আসুন। আমি জানি আপনি এখানে।

বলতে না বলতেই কেউ হাওয়ার গতিতে এসে আমার হাত ২টো চেপে ধরে। চারদিকে অন্ধকার বিরাজ করেছে রুমটায়। তাই হয়তো চিনার উপায় নেই এটা কে! কিন্তু আমার বুঝতে বেগ পেতে হয়নি। এটা যে রেয়ান। তা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছি আমি। তাছাড়া রেয়ান ছাঁড়া কে হতে পারে যে আমাকে এভাবে হাত~ পা বেঁধে রাখবে
হঠাৎ রেয়ান আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে
~ শাস্তি পাওয়ার জন্য তুমি তৈরি তো মরুভূমি?

কথাটা শুনে বেশভাবে বুঝিতে পারছি আমার সাথে কিছু হতে চলেছে। কিন্তু এখন ভয় পেলে হবে না। এখান থেকে বের হতে হবে আমার। আমার ছোট্ট ছেলেটা যে আমার অপেক্ষা করছে। কোনোমতে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলি
~ প্লিজ রেয়ান আমাকে যেতে দিন।

আমি।
~ কি খালি। যেতে দিন। যেতে দিন করছো। আমি বলেছি না যেতে দেব না। মানে যেতে দেব না। [আমার কানে আলতো করে কামড় দিয়ে আবারও বললেন] আচ্ছা আমার কাছ থেকে তুমি এত পালাতে চাও কেন? তোমার পাখা গজিয়েছে তাই না? যদি পাখাটা কেটে দি তাহলে কেমন হয়?
রেয়ানের কথায় স্পষ্ট রাগ অনুভব করতে পারছি আমি। সাথে আমার ভয় তো আছেই। কিন্তু কথাটা দ্বারা কি বুঝাতে চাচ্ছে রেয়ান? কোনো কি খারাপ কিছু করবে সে
~ কেন এমন করছেন আপনি রেয়ান?

~ কারনটা তোমার অজানা নয়
~ রেয়ান বুঝার চেষ্টা করুন। আমি একজন ডিভোর্সি আর আমার একটা ছেলেও আছে।
~ সো ওয়াট! এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই ব্যস!
~ এটা সম্ভব না রেয়ান। আমার একটা অতীত আছে। একবার বিয়ে হয়েছে আমার। কারও বউও হয়েছি আমি। এখন আর কাউকে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই আমার। আর না আছে কারও বউ হওয়ার।
~ তাহলে রক্ষিতা হয়ে থাকবে তুমি আমার সাথে
~ মানে?
~ তুমিই তো বললে কারও বউ হওয়ার ইচ্ছে নেই তোমার। তাহলে রক্ষিতা হয়ে থাকো আমার সাথে।
~ আপনি আসলেই একটা অমানুষ রেয়ান। কথাগুলো বলতে আপনার বিবেকে বাঁধে না? কিভাবে বলছেন এগুলো? কোনো পুলিশ কি এমন হয়?

হয়তো। নাহলে আপনার মতো একটা জানোয়ার পুলিশ হলো কিভাবে।
কথাটা শুনে রেয়াম মনে হয় রেগে গেল। আমার গাল শক্ত করে চেপে ধরে রাগি কণ্ঠে বলল
~ তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি সব করতে পারব জান। তোমাকে চাই আমার। এট এনি কস্ট। আর কি যেন বললে? আমি অমানুষ। জানোয়ার তাই না? এখন জানোয়ার কি কি করতে পারে তা তো তোমাকে দেখাতেই হয়।
~ ক। কি করবেন আপনি?
রেয়ান আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন
~ জান। তুমি অনেক বোকা জানো। এটা জানা সত্ত্বেও যে তোমার ছেলে আর মা আমার কাছে বন্দী। তাও আমাকে এত বড় বড় কথা শুনাচ্ছো।

এটা জন্য এখন তোমাকে শাস্তি তো দিতে হয়। কি বলো?
বলতে বলতেই রেয়ান অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আগে রেয়ানের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারলেও এখন সেটার ছিটেফোটাও নেই। খুব ভয় লাগছে আমার। রেয়ান কি করবে আমার মা আর ছেলের সাথে? ভয়টা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। জোড়ে জোড়ে চিল্লিয়ে বলে উঠি
~ প্লিজ রেয়ান আমার মা আর ছেলেকে কিছু করবেন না। আপনি যা বলবেন আমি তাই~ ই করব। প্লিজ ওদের কিছু করবেন না।
এভাবে অনেক কাকুতিমিনতি করার পরও কোনো লাভ হলো না। কেউ আসলো না এই অন্ধকার রুমে

সকালে…
অনেক কষ্টের পর একটু আগেই চোখ লেগে আসে আমার। তখনই কেউ একজন এক জগ পানি আমার মুখে মেলা মারে। সাথে সাথে আঁতকে উঠলাম আমি। সামনে তাকাতেই দেখি রেয়ান প্যান্টের পকেটে ১হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর বাঁকা হাসছে। রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। কিছু বলতে যাবো তার আগেই রেয়ান আমার কানে ফোন ধরে। যেখানে আমার ছোট্ট ছেলে কান্না করছে আর আমাকে বলছে,
~ মা কোথায় তুমি? প্লিজ তাড়াতাড়ি আসো আমার কাছে। আমার না তোমাকে ছাঁড়া ভালো লাগছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে। প্লিজ চলে আসো মা।

কথাটা শুনে আমার বুক ধক করে উঠে। চোখ দিয়ে আপিনা~ আপনি পানি পড়ছে। আমার ছেলের সাথে কথা বলতে যাবো। তার আগেই রেয়ান এক ঝটকায় ফোনটা কান থেকে সরিয়ে ফেলে। একটু কথাও বলতে পারলাম না আমি আমার ছেলেটার সাথে।

একরাশ ঘৃণা নিয়ে রেয়ানের দিকে তাকাই আমি। ভেবেছিলাম রেয়ান হয়তো বাঁকা হাসছে। কিন্তু না। তার মুখে বিরাজ করেছে বিরাট বড় গম্ভীরতা। হুট করে রেয়ান আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে। তারপর এক এক করে আমার হাত~ পায়ের বাঁধন খুলতে শুরু করে।

গম্ভীর কন্ঠে বলে
~ আমাকে যতটা খারাপ ভাবো ততটা খারাপ আমি নই। কিন্তু অত ভালোও নই। এখন যেমন ভালো। তেমন খারাপ হতেও আমার বেশি সময় লাগবে না। আর রইল বিয়ের কথা। সেটা আমি তোমাকেই করব। তোমার ইচ্ছায় কিংবা তোমার অনিচ্ছায়। বউ তো তুমি আমারই হবে। আর যদি বউ হতে না চাও। রক্ষিতা হিসেবে রাখব তোমায়। ভালোই ভালোই আমি যখন বলব তখন বিয়ে করবে আমাকে। নাহলে আমার থেকে খারাপ কেও হবে না।

বলেই উঠে দাঁড়ায় রেয়ান। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে। আর ভাবছি। একদিক দিয়ে সে কি চায় তা বুঝতে পারছি। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে সব ধোয়াশা। আসলে সে কি চায়? আমাকে নাকি অন্য কিছু?
হঠাৎ রেয়ান আমার হাত টান দিয়ে দাঁড় করায়। তারপর বলে
~ চলো
~ কোথায়?
~ তোমার ছেলের কাছে
বলেই আমার হাত টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে। এদিকে আমি হাঁটতে পারছি। এতগুলো ঘন্টা এক ভাবে বসে থাকায় পা অবশ হয়ে গেছে আমার। কোনোভাবে লেছড়িয়ে লেছড়িয়ে হাঁটছি আমি। আমাকে এভাবে হাঁটতে দেখে রেয়ান হয়তো বুঝতে পেরেছে আমার অবস্থা। সাথে সাথে কোলে তুলে নেয় সে আমাকে। এতে কিছুটা চমকে যাই আমি। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলি
~ রেয়ান কি করছেন? ছাঁড়ুন আমাকে?

আমার কথা শুনে সে আমাকে একটা ধমক দেয়। তারপর বলে
~ হাঁটতে পারছে না আবার দেমাগ কত! যেভাবে হাঁটছ। গাড়ির কাছে যেতেই ১০ঘন্টা লাগবে। তখম আর যাওয়া লাগবে না নিজের ছেলের কাছে।

কথাটা শুনে আমি চুবসে গেলাম। সে তো ঠিকই বলছে। কিন্তু তার জন্যই তো আমার এই অবস্থা। মনে মনে রেয়ানকে বকতে লাগলাম আর অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন আমি রিহানের সাথে দেখা করব। পুরো একটা দিন আমাকে ছাড়া থেকেছে সে। হয়তো অনেক কান্না করেছে আমার জন্য।

বাসায় ডুকতেই আমার ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। আমিও কাদঁছি। ওর সারা মুখে চুমু দেওয়া শুরু করি। তারপর খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি
~ কিচ্ছু হবে না রিহান। মা এসে গেছি না। আর কাঁদিস না।

~ তুমি অন্নেক পঁচা মা। তুমি বলেছিলে আমাকে রেখে এভাবে আর যাবে না। কিন্তু তুমি ঠিকই গিয়েছো। জানো কত কান্না করেছি তোমার জন্য!

~ মাফ করে দে মাকে। মারও তো কষ্ট হয়েছে তাই না। মা ইচ্ছা করে যাই নি বাবুন।
এরই মাঝে রেয়ান বলে উঠল
~ তোমাদের মা ছেলের ভালোবাসা-বাসি শেষ হয়েছে?

কথাটা শুনে মা রেগে গেলেন। এতক্ষন মা রেয়ানকে খেয়াল করেন নি। তিনি তো আমাদের মা~ ছেলেকে দেখছিলেন। এখন রেয়ানকে দেখে তার রাগ উঠে গেল। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন
~ মিরা এ ছেলে এখানে কেন? একে বের কর আমাদের বাসা থেকে। এমন বেহায়া আর বেয়াদব ছেলে আমি জীবনেও দেখি নি।
কথাটা শুনে রেয়ান তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে মাকে একবার দেখল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল
~ আপনার কিছু দেখতে হবে না শাশুমা। আপনার মেয়ে দেখলেই হবে। আর ভালোভাবে কথা বলবেন আমার সাথে। জানেন তো কি করতে পারি আমি।

রেয়ানের কথা মা ঠিক হজম করতে পারলেন না। আবার কিছু বলবেন তার আগেই রিহান বলে উঠে
~ নানু! উনাকে বকছো কেন? উনি তো অনেক ভালো বাবা। উনাকে আমার অন্নেক ভালো লাগে
রিহান কি বলল এইমাত্র? অনেক ভালো বাবা। রেয়ানকে সে বাবা বলছে। কেন? কিছুটা আগ্রহি কন্ঠে রিহানকে জিজ্ঞেস করলাম
~ বাবা মানে?

~ হুম বাবা। উনি অনেক ভালো জানো মা। আমাকে কালকে অনেক গল্প শুনিয়েছে। সাথে বলেছিলো তোমাকে আমার কাছে আজকে নিয়ে আসবে। দেখো উনি উনার কথা রেখছে।
~ বুঝলাম। কিন্তু তুমি উনাকে বাবা কেন ডাকছো?
কথাটা আমি রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বললাম। সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে আর বাঁকা হাসছে। তার চোখ দিয়ে সে কিছু বলছে। যার অর্থ তুমি আমাকে পছন্দ না করলে কি হয়েছে মরুভূমি। তোমার ছেলে আমাকে পছন্দ করেছে! ধীরে ধীরে তুমিও করবে।

তার চোখের ভাষা বুঝতে পারলেও না বুঝার ভান করে রিহানের দিকে তাকালাম উত্তরের আশায়। সাথে সাথে সেও বলল
~ মা বাবা আমাকে বলেছিলো যদি উনি তোমাকে আমার কাছে সকালের মধ্যে এনে দেয় তাহলে আমাকে উনাকে বাবা ডাকতে হবে। উনি তো উনার কথা রেখেছেন তাই না?। তাছাড়া আমি বাবাকে প্রমিসও দিয়েছিলাম। আর তুমিও তো বলো প্রমিস ভাংতে হয় না। তাই আমিও উনাকে বাবা ডাকছি। আর ভালোই হলো না মা? আমার একটা বাবাও হয়েছে।

কথাটা শুনে কি বলব বুঝতে পারছি না। আমার ৪বছরের বাচ্চাটা কিই বা বুঝে। তার যেটা ভালো মনে হয়েছে সে সেটাই করেছে। তাকে কিছু কি বলা উচিত আমার। হয়তো না। তার তো কোনো দোষ নেই।
হঠাৎ রেয়ানের কণ্ঠ শুনতে পাই। সে নিজের হাতের ঘড়ি দেখতে দেখতে বলে
~ তোমাদের হয়েছে? আমার কাজ আছে অনেক।
জানি না কেন রেয়ানের কথাটা শুনে রেগে যাই। রাগি কন্ঠে তাকে বলি
~ তো আপনার দেড়ি হলে আমরা কি করব
কথাটা বলতে না বলতেই সে আমার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকায়। পরক্ষনে বলে উঠে
~ আমার ক্ষুধা লাগছে
~ তো আমি করব?

~ যাও আমার জন্য বিরিয়ানি বানাও আমি খাবো [দাঁতে দাঁত চেপে]
উনার কথা আর কথাবলার ভঙ্গি দেখে আমি অবাক। সাথে বিরক্তও। ক্ষুধা লাগছে তো বাইরে গিয়ে খাবে~ এ না। আমাকে বলার কি আছে? তার উপর কত শখ। আমি তার জন্য বিরিয়ানি বানাবো। খেয়ে দেয়ে কি কাজ নেই আর আমার। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। কোনোমতে ক্যাবলা হাসি দিয়ে বললাম
~ কঁচুর ডাল খাবেন
~ মরুভূমি তুমি তো দেখি বয়রাও!
~ মানে?
~ মানে। আমি তোমাকে বিরিয়ানি বানাতে বলেছি। কঁচুর ডাল না। বাই দা ওয়ে। এ কঁচুর ডাল কি?

~ এটা আমাদের স্পেসাল ডিস। খাস কুত্তাদের জন্য তৈরি
কথাটা শুনে রেয়ান আমার দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। রাগি কন্ঠে বলে উঠে
~ অনেক বাড়া বেড়েছো তুমি তাই না?

কালকে কি করেছি মনে আছে তো। ভালো ব্যবহার করছি দেখে ভেবো না মাথার উপর উঠিয়ে রাখব। খারাপ হতে কিন্তু আমার বেশি সময় লাগবে না। আর যা বলছি তা যেন ১ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। আমি বাইরে যাচ্ছি। এসেই যেন দেখি বানিয়ে ফেলেছো। আর যদি না দেখি তাহলে কি হবে তার কল্পনাও তুমি করতে পারবে না।

বলেই রেয়ান চলে যায়। আর আমি। আমি তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। আচ্ছা মানষটা এমন কেন? এই ভালো তো এই খারাপ। অনেক রহস্য ভরা এই মানুষটার ভেতর!

পর্ব ৬

~ আ খাইয়ে দাও আমাকে
~ মানে?
~ মানে বুঝো না? বিরিয়ানি খাইয়ে দাও আমাকে
~ কেন? আপনার নিজের হাত নেই? ওইটা দিয়ে খান না। আমাকে বলছেন কেন?
~ আমি বলছি তোমাকে খাইয়ে দিতে [দাঁতে দাঁত চেপে]
~ পারব না!

~ কি বললা আবার বলো তো
উনার কথা শুনে উনার দিকে তাকালাম। সাথে সাথে কয়েকটা ঢোক গিলে ফেললাম। কি ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছেন তিনি আমার দিকে। ভয়ে রিতিমতো হাত~ পা কাঁপছে আমার। কোনোমতে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বললাম
~ ইয়ে মানে বলছিলা কি রিহান আছে এখানে।

আমি কিভাবে কি করব আপনিই বলুন।
বলেই কিছুটা হাসার চেষ্টা করলাম। ভেবেছিলাম কাজ হবে। কিন্তু হলো না। বলে না যা হবার। তা শত চেষ্টা করার পরও আটকানো যায় না আমার সাথে ঠিক তেমনই হলো। আমার কথা শুনে রেয়ান রিহানের দিকে তাকালো। একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো
~ রিহান। তোমার মা যদি আমাকে আর তোমাকে খাইয়ে দেয় তাহলে কেমন হয়?
রেয়ানের কথা শুনে রিহান কি বুঝলো জানি না। কিন্তু সেও রেয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে একটা ক্যাবলা হাসি দিয়ে বলল

~ মা ভালোই হবে। বাবা আর আমি এক সাথে তোমার হাতে খাবো। খাইয়ে দাও না প্লিজ।
আমি কি করব বুঝতে পারছি না। একবার রেয়ানের দিকে তাকাচ্ছি তো একবার রিহানের দিকে। এবার রেয়ান কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল
~ কি হলো খাইয়ে দিচ্ছো না কেন? নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থা করব?

রেয়ানের কথা শুনে আমি কিছুক্ষন চুপ থাকলাম। অতপর খাইয়ে দেওয়া শুরু করলাম রেয়ান আর রিহানকে। প্রথমে রিহানকে খাইয়ে দিলাম। তারপর রেয়ানকে। রেয়ানকে খাইয়ে দিতে খুব অসস্তি হচ্ছে আমার। তাছাড়া রেয়ান বারবার আমার হাতে কামড় দিচ্ছে। এবার তো খুব জোড়েই কামড়টা দেয়। সাথে সাথে আমি আহহ বলে উঠি। রেয়ানএকটা বাঁকা হাসি দিয়ে নিজের নখ দেখতে দেখতে বলে
~ কি হয়েছে মরুভূমি? কোথাও কি ব্যথা পেয়েছ?

তার কথা শুনে ইচ্ছে করছে হাতের পাশে থাকা প্লেট~ টা দিয়ে তার মাথায় জোড়ে একটা বারি দি। কিন্তু আমি নিরুপায়। এটা যদি করি তাহলে পড়ে কি~ না কি করবে আমার সাথে। বলা তো আর যায় না। সে যদি পুলিশ হতো তাহলে মানা যেত। কিন্তু সে তো আস্ত একটা গুন্ডা পুলিশ!

প্রায় ১ ঘন্টা পর রেয়ান আর রিহানকে খাওয়ানো শেষ হয় আমার। আমি বুঝতে পারছি না রিহানও কি রেয়ানের সাথে মিলে গেছে নাকি? আজকে ২জনেই একাধারে খাবার খাচ্ছে যে খাচ্ছেই। পেট যেন তাদের ভরছেই না। অবশেষে ১ঘন্টা পর তাদের পেট মনে হয় একটু হলেও ভরেছে। আর আমি মুক্তি পেয়েছি।
খাওয়ানো শেষ হতেই রেয়ান রিহানকে নিয়ে ড্রইং রুমে চলে যায়। টিভি দেখার উদ্দেশ্যে!

আর আমি মার জন্য খাবার বাড়ছি। রেয়ান আসার পর থেকে মা একবারের জন্যও রুম থেকে বের হননি। তার নাকি রেয়ানকে ভালো লাগে না। খাবার খাওয়ার জন্য যখন মাকে ডাকতে গিয়েছিলাম। তখন মা সাফ সাফ মানা করে দেন যে তিনি রেয়ানের সাথে এক টেবিলে বসে খাবার খাবেন না। যদি খান। তাহলে নিজের রুমে খাবেন। তাই আমিও খাবার নিয়ে যাচ্ছি তার রুমে। সাথে আমার খাবারটাও।

মা আর আমি একসাথেই খাবো।
মার রুমে ঢুকতেই দেখি মা বসে আছেন বিছানায়। আমিও মার পাশে গিয়ে বসি। তারপর মাকে বলি
~ মা নাও খাবার এনেছি এখন তো খাও প্লিজ। দেখো খাবারের সাথে রাগ করে থাকা ভালো না।
~ আমি খাবো না
~ প্লিজ মা জেদ করো না। দেখো আমিও খাই নি খাবার। তোমার সাথে খাবো ভেবেছিলাম। এখন যদি তুমি না খাও তাহলে আমিও খাবো না।
আমার কথাটা শুনে মা খাবারের প্লেট~ টা নিতে নিতে বলে
~ তুই যা করছিস তা কি ঠিক মিরা

~ কি করেছি আমি?
~ এই যে ওই ছেলেটার সব কথা শুনছিস। আবার বাসায়ও আসতে দিচ্ছিস। কেন প্রতিবাদ করছিস না ওই ছেলেটার? আবার আমাকেও করতে দিচ্ছিস না।
~ আমি নিরুপায় মা। তুমি জানো না রেয়ান ঠিক কেমন। এমন কি আমিও জানিনা। ও যা চায় তা আদায় করেই নেয়। এতদিনে ঠিক বুঝে গেছি ওকে। আমরা কিছু করতে পারবো না ওর।
~ কেন পারবো না। ও পুলিশ বলেই যা ইচ্ছে করবে নাকি?

~ এটাই তো ব্যপার মা। ও শুধু পুলিশ না। ও বাংলাদেশের টপ বিজনেস ম্যানদের একজনের ছেলেও। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারবো না। পরে যদি কিছু বলি তাহলে হয়তো আমাদেরই ক্ষতি হবে! তাছাড়া তুমি দেখেছো রেয়ানের রিহানের সাথে কত ভালো ভাব হয়েছে। ও যদি রিহানের কিছু করে। আমি চাই না আমার কোনো ভুল সিদ্ধান্তের জন্য রিহানের কিছু হোক।
~ ও যদি তোকে বিয়ে করতে বলে। তাহলে করবি?
~
~ কি হলো বল?
~ না

~ তাহলে?
~ মা প্লিজ এ ব্যপারে আমাকে কিছু বলো না। এত প্রেসার নিতে পারছি না আমি।
কথাটা শুনে মা চুপ হয়ে গেলেন। হয়তো ভাবছেন। আসলেই আমি এত প্রেসার নিতে পারবো না! চুপচাপ খেয়ে নিলাম ২জনেই। খাওয়া শেষে সব ঠিকঠাক করে ড্রইং রুমের দিকে পা বাড়ালাম। ড্রইং রুমে যেতেই আমি অবাক! রেয়ান আর রিহান সেই লেভেলের দুষ্টামি করছে। আজ প্রথম মানুষটাকে হাসতে দেখলাম। খুব প্রাণবন্ধ ভাবে হাসছে সে। সাথে আমার ছেলেটাও। খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিয়েছে সে রেয়ানকে।
আমি তাদের মাঝে উপস্থিত হতেই রেয়ান হাসি বন্ধ করে দেয়। আমাকে বসতে বলে। রিহানকে বলে
~ রিহান। তুমি তোমার নানুর কাছে যাও তো। আমি আর তোমার মা একটা জরুরি কথা বলল
~ আচ্ছা বাবা

বলেই রিহান দোঁড় দিয়ে মার রুমে চলে যায়। রিহান যেতেই রেয়ান ঠিক হয়ে বসে। শান্ত কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে
~ রিহান বলছিল। ওর নাকি ৪ বছর।
~ হুম
~ তাহলে তোমার কি ১৫~ ১৬ বছরে বিয়ে হয়েছিলো?
কথাটা শুনে আমি রেয়ানের দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তো উত্তরের আসায়। আমি তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে ফেলি। আমাকে কিছু বলতে না দেখে সে আবারও বলল
~ আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস কিরেছি। উত্তরটা কি দেওয়া যায় না?
~ হুম

~ তাহলে বলো। তোমার কি ১৫~ ১৬ বছরে বিয়ে হয়েছিল?
~ হুম
~ কেন?
সে এবার কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে ফিরে বসল। সাথে আছে তার সেই তীক্ষ্ম দৃষ্টি। আমি মাথা নিচু করেই বলতে লাগলাম
~ আমি অনেক গরিব ঘরের মেয়ে। বাবা টাকার জন্য আমাকে একটা বড় লোক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন
আমার কথা শেষ হতেই রেয়ান সোফার সাথে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে। তারপর বলে
~ এবার বুঝলাম। তোমার মতো একটা মেয়ে ডিভোর্সি কেন? হয়তো তোমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে বুড়ো ছিল। তোমাকে অনেক মারতোও। আর তার নারীর নেশা ছিল। কয়েকদিন যাওয়ার পরও তোমাকে ভালো লাগছিল না তার। তাই তোমাকে ছেঁড়ে চলে গেছে। তাই না?

কথাটা শুনে আমি রেয়ানের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম
~ জীবনেও না। আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার ঠিক বয়সই ছিল। আর সে অনেক ভালো ছিল
~ তাহলে?
~
~ তুমি কিছু বলছ না মানে আমি যা ভাবছি ওইটাই সত্যি। তাছাড়া অন্য কোনো কারন তো দেখছি না আমি। তোমার এক্স হাসবেন্ড নিশ্চয় খারাপই ছিল।

উনার কথাগুলো শুনে রাগ হচ্ছে আমার। প্রচুর রাগ। রাগ সামলাতে না পেরে জোড়ে জোড়ে চিল্লিয়ে বললাম
~ আমার শুভ অনেক ভালো। বুঝেছেন অনেক ভালো। ও আমাকে অনেক ভালোবাসতো
কথাটা বলতে গিয়ে ২ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে আমার চোখ থেকে। রেয়ান কিছু বলতে যাবে তখনি তার একটা ফোন আসে। স্ক্রিনে থাকা নামটা দেখেই সে কিছু না বলে বের হয়ে যায় বাসা থেকে। আর আমি। আমি সেখানেই বসে আছি। আসলেই কেন শুভ আমাকে রেখে গিয়েছিল। কারনটা যে এখনও আমার অজানা!

সকালে….

কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাজারে যাচ্ছি আমি। রাস্তায় অনেক্ষন দাঁড়িয়ে আছি রিকশার অপেক্ষায়। কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ মনে হয় আমার পাশে একটা গাড়ি আছে। আর সেটা আমার সাথে সাথেই এগোচ্ছে। পাশে তাকাতেই দেখি রেয়ান। সে গাড়ি চালাচ্ছে। ঠিক চালাচ্ছে না! আমি যেভাবে হাঁটছি সে ঠিক সেই ভাবেই গাড়িটা আগাচ্ছে। আমাকে তার দিকে ফিরতে দেখে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে
~ হাই মরুভূমি

কথাটা শুনেও না শুনার ভান করে হাঁটতে থাকি। তার সাথে কথা বলার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই আমার। কি ভাবে কি সে আমাকে? আমার কি কিষ্ট হয় না। রাগ নেই আমার মাঝে। কাল যা হলো তার জন্য খুব রেগে আছি আমি তার উপর। আজ যাই করুক না কেন। কথা বলব না আমি তার সাথে।
এদিকে রেয়ান বকবক করেই যাচ্ছে। কিন্তু তাতে বিন্দু মাত্র পাত্তা দিচ্ছি না আমি। এবার বেশ বিরক্তি নিয়েই সে বলল
~ মরুভূমি গাড়িতে উঠো
~ …
~ তোমাকে আমি কি বলেছি। উঠুক গাড়িতে। এবার কিছুটা রেগেই বলল কথাটা রেয়ান। কিন্তু তাও আমি পাত্তা দিলাম না তাকে। নিজের মতো হাঁটছি। হঠাৎ রেয়ান গাড়ি থেকে নেমে আমাকে কোলে তুলে নিলো। সাথে সাথে আমি আশেপাশে তাকাতে শুরু করি। রাস্তার সব মানুষ আমাদের দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। কিছু মানুষ তো মুখ টিপে টিপে হাসছে। এসব দেখে আমি নিজেকে যথা সম্ভব রেয়ান থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু পারলাম না।

রেয়ান আমাকে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি লক করে দিলো। এতে কিছুটা জোড়েই রেয়ানকে বললাম
~ আপনি যা করছেন তা একদমই ঠিক না। সবসময় আপনি যা চাবেন তা কিন্তু হবে না।
আমার কথা শুনে রেয়ান আমার দিকে কিছুটা ঝুঁকে বলল,
~ সবসময় আমি যা চাইব তাই~ ই হবে। আজ তোমার অতীতটা জেনেই ছাঁড়বো!

পর্ব ৭

বাগান জাতীয় কোনো জায়গায় আছি আমি আর রেয়ান। চারপাশে ফুলের ঘ্রাণ ছঁড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিরাট বড় গাছের নিচে বসে আছি আমি। আর আমার পাশেই বসে আছে রেয়ান। সে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো উত্তরের আশায়। কিন্তু তা বুঝতে পেরেও কোনো কথা বলছি না আমি। চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে আছি। এবার কিছুটা অস্থির হয়েই রেয়ান জিজ্ঞেস করে
~ মিরা। তুমি কি আমাকে তোমার অতীতটা বলবে না?

~ কি ব্যাপার মিস্টার রেয়ান। আজ প্রথম আমার নাম ডেকেছেন আপনি
~ না প্রথমবার না। ২বার।
~ ও
~ কথা পেঁচিও না। যা জানতে চাই তা তাড়াতাড়ি বলো। নাহলে
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি বলতে শুরু করলাম
~ আপনাকে তো বলেছিলাম আমরা অনেক গরিব।

বাবা লালনপালন করতে পারতেন না আমার। তাই ১৬ বছর বয়সেই বিয়ে করিয়ে দেন আমাকে। যার সাথে আমার বিয়ে হয় বিয়ের আগ পর্যন্ত তার কোনো কিছু সম্পর্কেই জানতাম না আমি। শুধু শুনেছিলাম সে অনেক বড়লোক। আমাকে অনেক সুখে রাখবে। আমিও মেনে নিলাম। এছাড়া যে কোনো উপায় ছিল না আমার। না খেয়ে থাকা থেকে তো বিয়েটা করে ফেলাই উত্তম মনে করেছিলাম। যা কিছুই হোক না কেন? ২মুঠো ভাত তো খেতে পারবো! আপনি কালকে একটা কথা বলেছিলেন। হয়তো আমার স্বামী বুড়ো হবে অথবা তার নারীর নেশা আছে।

বিয়ের আগে আমার সেটাই মনে হয়েছিল। নাহলে আমার মতো একটা গরিব মেয়েকে একজন বড়লোক ছেলে বিয়ে করবে কেন? কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। বিয়ের রাতে যখন তাকে দেখলাম। তখন আমি পুরো অবাক! একজন সুপুরুষ আমার সামনে বসে ছিল। সত্যি বলতে এত সুন্দর পুরুষ আমি কখনও দেখি নি। তখনই তার প্রেমে পরে গিয়েছিলাম আমি। সে রাতে অনেক কথা বলি আমি তার সাথে। কথায় কথায় জানতে পারি তার নাম শুভ। সে নাকি আমাকে একটা পার্কে দেখেছিলো। তখনই আমাকে পছন্দ হয় তার। আর আমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

উনি অনেক ভালো ছিলেন। আমার অনেক খেয়াল রাখতেন। শুভর পরিবার বলতে আমি আর তার ছোট বোন রিহাই। এছাড়া আর কেউই ছিল না। ছোট বেলাই তার বাবা~ মা মারা যান। আত্বীয়~ সজনরাও সব দেশের বাইরে থাকেন।
শুভ চেয়েছিলেন আমি যেন কলেজে ভর্তি হই। ভর্তি হয়ই~ ও। কিন্তু কিছুদিন পরেই জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট। জানেন যেদিন উনাকে এ কথা বলি তখন তিনি অনেক কেঁদে ছিলেন। এজন্য না যে আমাদের বেবি হবে। কেঁদে ছিলেন কারন আমার কম বয়স।

এত কম বয়সে আমার বেবি হবে কিভাবে? আমি কিভাবে পড়ালেখা করব। অনেকবার চেয়েছিলেন বেবি টা নষ্ট করে ফেলতে। আমি একটু বড় হই। তখন বেবি নিবেন। কিন্তু আমি মানা করি। কেন যেন মনে হচ্ছিল বেবিটা আমার প্রয়োজন। দেখুন না আসলেই ও আমার প্রয়োজন। এখন তো ওকে আমার লাগে তাই না? ওকে ছাঁড়া যে আমি বাঁচতে পারতাম না।
যখন রিহান হয়। তখন শুভর চেহারা দেখার মতো ছিল।

অনেক খুশি ছিলেন তিনি। ভেবেছিলাম রিহান হওয়ার পর আমি আর পড়ালেখা করতে পারব না। কিন্তু জানেন শুভ আমাকে পড়ালেখা করতে দিয়েছিল। সারাটাদিন আমার সেবা করত। বলতে গেলে আমার থেকে রিহানকে সেই বেশি দেখাশুনা করত। তার সাথে আমার পরিবারকেও আগলে রেখেছিল। বাবাকে একটা চাকরি দেন। আমরা এখন যে বাসায় আছি। ওইটাও শুভ বানিয়ে দিয়েছিল বাবাকে। বেশ ভালোই চলছিল আমাদের। কিন্ত
কথাটা বলেই একটু থেমে যাই।

কয়েকটা জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করি।

~ তখন আমি ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে মাত্র অনার্সে উঠেছিলাম। বেশ ভালোই কাটছিলো আমাদের সংসার। আনন্দের শেষ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুভর একটা জরুরি কাজ পড়ে যায়। তাকে ইমার্জেন্সি আমেরিকা যেতে হবে। সবার কাছে বিদায় নিয়ে সে ওইদিন রাতে চলে যায় আমেরিকা। আমার স্পষ্ট মনে আছে। যাওয়ার আগে সে বলেছিলো আমেরিকা থেকে খুব জলদিই চলে আসবে আমাদের কাছে। কিন্তু আসে নি জানেন। তখন যে গেল এখন পর্যন্ত সে আর আমাদের কাছে ফিরে নি। আমার দোষ কি ছিল আমি জানি না। তবে ও আমেরিকা যাওয়ার ২০ দিন পর আমাদের কাছে একটা চিঠি আসে। সেখানে লিখা ছিল আমি যেন আমার বাবার বাড়ি চলে যাই। ও নাকি চায় না আমি ওর বাড়িতে থাকি।

শুভ ওর বোন কেও নাকি বলেছে যেন আমি এ বাসায় না থাকতে পারি। আমাকে যেন ঘাড় থাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় ওদের বাড়ি থেকে। তেমনটাই হয়। তবে এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমার বাবা যে ওদের কোম্পানিতে চাকরি করত। সেখান থেকে তাকে ঘাড় থাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। বাবা অনেক বুড়ো ছিলেন। এত কিছু একসাথে নিতে পারেন নি। তাই হয়তো অসুস্থ হয়ে যান।
কথাগুলো বলতে গিয়ে কথা বারবার আটকে যাচ্ছিল আমার। তবুও নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর আবার বলতে লাগলাম

~ এর ১ মাস পর আমাদের বাসায় ডিভোর্স লেটার আসে। সাথে ৬লাখ টাকাও। এসব দেখে বাবা আর মা ২জনেই আরও অসুস্থ হয়ে যান। ভাগ্য ক্রমে মার তেমন কোনো বড় অসুখ হয় নি। কিন্তু বাবার অবস্থা ভালো ছিল না। এ ৬ লাখ টাকার ৫লাখ টাকাই বাবার চিকিৎসা করতে চলে যায়। কিন্তু তবুও বাবা সুস্থ হন না। চলে যান আমাদের ছেঁড়ে। এ দুনিয়া ছেঁড়ে। এরপর থেকে শুরু হয় লোকেদের কথা। তারা কি বলত জানেন। আমি নাকি এটারই যোগ্য ছিলাম। সুখ জিনিসটা আমার কপালে নেই। আমি নাকি আমার স্বামকে আগলে রাখতে পারি নি। আমি একটা। এসব কথা শুনে ইচ্ছা করত মরে যেতে।

কিন্তু আমার যদি কিছু হয় তাহলে আমার মা আর ছেলে কিভাবে থাকবে। তাই নিজেকে শক্ত করে নিলাম। এরপর থেকে লোকেদের কথায় কান দিতাম না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। প্রতিদিন ছোট ছোট বাচ্চাদের টিউশনি করাতাম। এর থেকে বেশি তো করতে পারব না। আমি মাত্র ইন্টার পাশ। কেই~ বা আমাকে ভালো কোনো চাকরিতে নিবে। কিন্তু তাতেও আমি দমে যাই নি। যতটুকু পারতাম। ততটুকু কাজ করতাম। এভাবে কেটে যায় পুরো ১বছর ৫ মাস। এখন সব কিছু মানিয়ে নিয়েছি আমি। কিন্তু কেন যেন শুভর কথা মনে পড়লে নিজেকে আটকে রাখতে পারি না।

কথাগুলো বলে চুপ হয়ে যাই। রেয়ানও চুপ করে আছে। হঠাৎ সে আমার দিকে ফিরে বলে উঠে
~ আচ্ছা আমার যতটুকু মনে হয় শুভ খারাপ ছিল। তাহলে তুমি ওকে ভালো বলছিলে কেন?
~ কেমনে খারাপ বলুন তো। এতকিছু করেছে সে আমার জন্য তাকে খারাপ কিভাবে বলি আমি। হ্যাঁ ও যা করেছে তা ওর করা উচিত ছিল না। আবার হয়তো আমারই কোনো দোষ ছিল।

~ এইতো বাংলাদেশের ডিপিকা মাইয়া। যত কিছু হোক না কেন সব দোষ তাদেরই। স্বামীরা যেন ধোঁয়া তুলসি পাতা
~ মানে?
~ মানেদোষ ওর ছিল তোমার না। ওই খারাপ।
~ হয়তো!
~ আবার বলে হয়তো

আমি চুপ করে থাকলাম। আসলেই রেয়ান ঠিক বলছে। শুভ হয়তো খারাপই ছিল। কিন্তু এতগুলো বছর থেকেছি তার সাথে। কই কোনো বাজে দিক তো দেখি নি তার। তাহলে হুট করে এত পরিবর্তন কেন? এগুলো ভাবছি হঠাৎ রেয়ান আবার বলে উঠল

~ আচ্ছা এত কম বয়সে বেবি হয়েছিল তোমার। কোনো কি খারাপ ইফেক্ট পড়ে নি তোমার উপর?
~ না। হয়তো আমার ভাগ্যে এমন কিছু ছিল না।
~ হুম

~ আচ্ছা রেয়ান আপনি আমাকে কোথায় প্রথম দেখেছিলেন?
কথাটা শুনে রেয়ান আমার দিকে একবার তাকালো। পরক্ষনে উঠে দাঁড়ায় সে। প্যান্টের পকেটে হাত রেখে বলে
~ চলো তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি। পরে নাহলে অনেক দেড়ি হয়ে যাবে
উনার কথায় বেশ বুঝতে পারছি তিনি আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কেন? তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম
~ উত্তরটা কি দিবেন না আমাকে?
~ সময় আসুক। একদিন না একদিন পেয়ে যাবে
বলেই তিনি গাড়ির দিকে হাঁটা ধরলেন

রাতে…

ড্রইংরুমে রিহানকে খাওয়াচ্ছি আমি। সামনেই টিভি চলছে। রিহান টিভির রিমোট দিয়ে বারবার চ্যানেল পাল্টাচ্ছে। হঠাৎ সে আমাকে বলে উঠে
~ মা। মা দেখো।

তোমাকে আর বাবাকে টিভিতে দেখাচ্ছে
কথাটা শুনে আমি টিভির দিকে তাকালাম। সেখানে তাকাতেই আমার চোখ বাইরে আসার উপক্রম। টিভিতে আসলেই আমাকে আর রেয়ানকে দেখাচ্ছে। আজকে সকালের ঘটনা। যেখানে আমাকে রেয়ান কোলে করে গাড়িতে বসাচ্ছে। ভিডিওটা ২বার দেখিয়ে টিভিতে একজন মহিলার অভির্ভাব ঘটে। সে তার কাজ অনুযায়ী বলা শুরু করে

ব্রেকিং নিউজ। বাংলাদেশের টপ বিজনেস ম্যান আজিজ আহমেদের ছেলে রেয়ান আহমেদ একটা মেয়েকে কোলে করে গাড়িতে বসাচ্ছেন। গোপন সুত্রে জানা গেছে যে মেয়েটি একজন ডিভোর্সি আর তার একটি ছেলেও আছে। এখন কথা হচ্ছে রেয়ান আহমেদ এমন মেয়ের সাথে কেন? কোনো কি সম্পর্ক আছে তাদের মাঝে। তাছাড়া রেয়ান আহমেদ মেয়েটির এলাকারই একজন পুলিশও। আসলেই কি আছে তাদের মাঝে? আর কতদিন ধরে চলছে এসব। আসুন জেনে নি

বলেই আরও কয়েকটি ভিডিও দেখায় তারা। যেখানে আমার এলাকার কিছু লোকজন আছে। এই লোকগুলো সেই লোক যারা আমাকে আগে কথা শুনাতো। এখনও আমার নামে মদনাম করতে বাদ রাখে নি তারা। একজন তো আমাকে বেশ্যা বলছে। আরও কত বাজে কথা! এগুলো শুনে টপটপ করে চোখ থেকে পানি পড়ছে আমার। এরমাঝে হঠাৎ দরজার কলিংবেল বেজে উঠে। মা গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে রেয়ান। রেয়ানকে দেখতেই আমার রাগ উঠে যায়। সে কাছে আসতেই আমি তার কলার চেপে ধরি। রাগি কন্ঠে বলি
~ এখন তো খুশি আপনি?

দেখুন টিভিতে কি বলছে সবাই আমার নামে। আমি নাকি বে। বেশ্যা। সব আপনার জন্য হয়েছে সব।

কথাটা বলতে বলতেই রেয়ানকে মারা শুরু করলাম। তা দেখে রিহান মায়া ভরা কন্ঠে বলল
~ মা বাবাকে মারছো কেন?

~ কোনো বাবা না এ লোক তোর। আর একবার যদি কোনো অচেনা লোককে বাবা ডাকিস তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না বলে দিলাম।

কথাটা ধমক দিয়েই বললাম আমি। এ প্রথম রিহানকে ধমক দিয়েছি। পানিতে চোখ ভরে গেছে আমার ছেলেটার। মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর চোখের পানি দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তাও নিজেকে শক্ত রাখলাম।

মাকে উদ্দেশ্য করে বললাম
~ মা রিহানকে নিয়ে যাও এখান থেকে
আমার কথা শুনে মা ততক্ষনাত রিহানকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। এদিকে রিহানকে বকা দিতে দেখে রেয়ান আমাকে কিছুটা রাগি কন্ঠে বলল
~ আমার উপরের রাগ তুমি রিহানের উপর কেন ঝাঁড়ছো?
~ কেন কষ্ট হচ্ছে বুঝি? আচ্ছা আপনার কেন কষ্ট হচ্ছে?

কষ্ট তো আমার হওয়ার কথা তাই না? তাহলে আপনার এত দরদ কেন ওর প্রতি? আপনি আমাদের কেউ না। দূরে থাকবেন আমাদের কাছ থেকে।

~ দেখো মিরা। শান্ত হও
~ কেন? শান্ত হবো কেন আমি? আমি কোনো শান্ত হচ্ছি না। আমার কি মনে হয় জানেন। টিভিতে যা দেখাচ্ছে সব আপনি ইচ্ছা করে করেছেন। যাতে আমি আপনাকে বিয়ে করি তাই না। আরে আপনি এত নিচ যে আমাকে বেশ্যা বানিয়ে দিলেন?

কথাটা শুনতেই রেয়ান রেগে গেলো। আমার হাত শক্ত করে ধরে জোড়ে চিল্লিয়ে মিরা বলে উঠল। এতে আমি তার হাত এক ঝটকায় সড়িয়ে দিলাম। তারপর বললাম
~ ছুঁবেন না আপনি আমাকে। আপনার মতো পশু। জানোয়ার। অমানুষের হাতের ছোঁয়ায় আমার ঘৃণা হয় বুঝেছেন। ঘৃণা হয় আমার।

কথাটা শেষ হতেই রেয়ান আমার গাল চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠে
~ আমার ছোঁয়ায় ঘৃণা হয় না তোর। এ ছোঁয়াই তোর সহ্য করতে হবে।
বলেই রেয়ান আমাকে ছেঁড়ে দিলো। আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে চলে যায় বাসা থেকে। আর আমি। আমি সেখানেই বসে পড়ি। কেন যানি আজ চোখের পানি বাঁধা মানছে না!

রাত প্রায় ৩টা। হঠাৎ~ ই আমার ঘুম ভেংগে যায়। পানির পিপাসা লাগছে খুব। তাই উঠে রান্না ঘরে গেলাম পানি খেতে। হঠাৎ দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ পাই। দরজার কাছে যেতেই শুনতে পাই কেউ একজন মরুভূমি মরুভূমি বলে ডাকছে। বুঝতে পারছি সেটা রেয়ান। তাই সেখান থেকে চলে আসতে নিবো তখনই রেয়ান জোড়ে জোড়ে বলে উঠে
~ ওই মরুভূমি দরজা খুল। নাহলে কিন্তু দরজা ভেংগে ফেলবো

বলেই জোড়ে জোড়ে দরজা ধাক্কানো শুরু করলো। এমন ভাবে ধাক্কাচ্ছে যেন এখনই দরজা ভেংগে ফলবে। যদি সত্যি সত্যি ভেংগে ফেলে দরজা? ভেবেই দরজাটা খুললাম আমি। দরজা খুলতেই দেখি রেয়ান কিছু একটার বোতল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছে। আমাকে দরজা খুলতে দেখে সে একটা হাসি দিয়ে বলে
~ আই লাভ ইউ মরুভূমি

রেয়ান মুখ খুলতেই একটা বাঝে গন্ধ আসে আমার নাকে। সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলি
~ রেয়ান আপনি ড্রাংক?
~ ইয়াপ

~ ড্রাংক হয়ে এখানে কি জন্য এসেছেন। তামাশা পেয়েছেন নাকি। বের হোন আমার বাসা থেকে
~ নোপ
~ কি ইয়াপ। নোপ লাগিয়ে রেখেছেন। যান এখান থেকে
কথাটা শুনে রেয়ান তেড়ে আসে আমার কাছে। তারপর কি মনে করে বাসার দরজা লাগিয়ে দেয়। তা দেখে আমি কিছুটা ভিত কন্ঠে বললাম
~ দরজা লাগাচ্ছেন কেন?

সে আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে। তার হাতের বোতল আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে
~ মদ খাবা মরুভূমি। চলো দুজন একসাথে নেশা করি!

পর্ব ৮

~ মদ খাবা মরুভূমি। চলো ২ জন একসাথে নেশা করি।
কথাটা বলেই রেয়ান ঢুলতে ঢুলতে আমার দিকে এগুতে থাকে। এতে আমি পিছাতে পিছাতে কিছুটা ধমকের সুরেই রেয়ানকে বলি
~ দেখুন!

~ তো দেখাও না। মানা করেছে কে? ওয়েট। আমি দেখছি কেউ মানা করেছে নাকি। কার এত বড় সাহস আমার বেক্কল মরুভূমিকে মানা করে? আজকে ওই ব্যটার একদিন কি আমার একদিন।
বলেই নিজের চারপাশে তাকাতে শুরু করে। কেউ আছে কি~ না তা দেখার জন্য। এদিকে আমি বেক্কলের মতো তাকিয়ে আছি তার দিকে। নেশা করে কি এর মাথা গেছে নাকি? কি সব আবল তাবল কথা বলছে। ইচ্ছে তো করছে এক বারি দিয়ে তার মাথা ফেটে দিতে। কিন্তু এখন রাগলে চলবে না! তাই ইচ্ছেটা সাইডে রেখে শান্ত কণ্ঠে রেয়ানকে বলি
~ রেয়ান এখানে কেউ নেই। আপনি আর আমি আছি শুধু।

~ তাহলে তো ভালোই হলো। যত ইচ্ছে তত মদ খাইতে পারবো। কি বলো?

তার কথাশুনে আমি হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে পারছি না। তারে আমি কই কি আর সে আমারে কয় কি। উফফ। বিরক্তিকর একটা অবস্থা! বুঝতে পারছি না রেয়ানকে বাসা থেকে বের করব কিভাবে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মিষ্টি সরে রেয়ানকে বললাম
~ দেখুন রেয়ান। এখন অনেক রাত হয়েছে। এভাবে কারও বাসায় এত রাতে আসতে হয় না। লোকে দেখলে কি বলবে। আপনি প্লিজ যান এখান থেকে।

~ না আমি যাবো না। আমি আমার মরুভূমির সাথে নেশা করব।
~ এখন কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি রেয়ান। ভালোভাবে বলছি যান এখান থেকে নাহলে
~ নাহলে কি করবা? কিছুই করতে পারবে না তুমি আমার। আমি তোমাকে বলছি। তুমি আমার সাথে নেশা করো নাহলে আমি তোমাকে চুমু দিবো। তাও আবার লিপ~ এ
~ মানুষ যে এত বাজে হতে পারে তা আপনাকে না দেখলে তো আমি জানতেই পারতাম না। দেখুন আমি আবারও বলছি যান আমার বাসা থেকে। নাহলে আমি কিন্তু চেঁচামেচি করব। আপনি কি চান আমি চেঁচামেচি করে লোকজন ডাকাই?

~ ডাকো! দেখি তোমার কত বড় গলা। কিন্তু আমি সিউর! ফাটা গলা যেমন। তেমনই হবে তোমার গলার সর। তাছাড়া এতে তোমারই লস। তোমার চেঁচামেচিতে লোকজন তোমার বাসায় আসবে। আমাদের এভাবে এত রাতে দেখবে। তারপর অনেক বাজে বাজে কথা বলবে। এন্ড লাস্টে আমাদের বিয়ে দিয়ে দিবে। [একটা ক্যাবলা হাসি দিয়ে]

~ রেয়ান। আপনি এত বাজে কেন বলুন তো? এত কিছুর পরও আমার সামনে আসতে আপনার লজ্জা করে না? কিভাবে বলছেন এগুলো? মাতাল অবস্থায় থেকেও এত বাজে কথা বলছেন?
~ হ্যাঁ বলছি। কারন এই মদের নেশা আমাকে গ্রাস করতে পারে না। কে পারে জানো? তুমি। তোমার নেশা যে আমাকে খুব বাজে ভাবে গ্রাস করেছে। চাইলেও সেখান থেকে বের হতে পারবো না। মাতাল অবস্থায় থেকেও বারবার তোমার কথাই মনে পরে আমার। কি করব বলো? আমি যে নিরুপায়। তোমার বাঁধনে আমি খুব বাজে ভাবে আটকে পড়েছি।

~ আপনি জীবনেও সুধরাবেন না মিস্টার রেয়ান। এখনো আপনি এগুলো বলছেন? আমার আর এসব সহ্য হচ্ছে না রেয়ান। প্লিজ জান আমার বাসা থেকে। হাত জোড় করছি আপনাকে। প্লিজ চলে যান। আপনার এসব কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না!

আমার কথা রেয়ানের কানে গেছে নাকি জানি না। তবে সে কিছু না বলে দরজার দিকে যেতে লাগলো। এটা দেখে আমি ভেবেছিলাম রেয়ান হয়তো চলে যাবে। কিন্তু না। সে দরজার দিকে দু’পা এগিয়েই আবার আমার কাছে এসে আমাকে কোলে তুলে নিলো। তারপর আমার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল
~ এখানে মদ খেয়ে মজা নেই বুঝলে মরুভূমি। একটা কাজ করি। চলো ছাদে যাই। সেখানে খাবো। ছাদটা কোন দিকে বলতো?

~ জীবনেও বলব না ছাদ কোন দিকে। নামান আমাকে। কোলে নিয়ে আছেন কেন আমায়?
~ আমার ইচ্ছে। আর শুনো। তোমাকে ছাদ কোথায় সেটা বলতে হবে না। আমি যানি ছাদ কোন দিকে। জাস্ট ফরমেলিটির জন্য বললাম। এখন সেটার উত্তর না দিয়ে নিজের বেয়াদবির প্রমাণ দিলে তো আমার কিছু করার নেই।

~ কি বললেন আপনি? আমি বেয়াদপ? আর ফরমেলিটি। এখানে ফিরমেলিটির কি আছে?
~ হ্যাঁ তুমি বেয়াদব। চরম রকমের বেয়াদব। এন্ড আমার যা ইচ্ছে আমি তোমাকে তাই~ ই ডাকবো। ইচ্ছে করলে ফাজিল। বস্তি সব ডাকবো। তোমার তাতে কি হ্যাঁ?

~ আরে আমার ব্যাপারে বলছে আর আমাকেই জিজ্ঞেস করে আমার তাতে কি? মাথা~ টাথা কি গেছে নাকি আপনার? নামান আমাকে। আর এক্ষুনি বের হোন আমার বাসা থেকে।
আমার কথা তার কানে ডুকেছে বলে মনে হয় না। সে তার মতো করে ছাদে নিয়ে যেতে লাগলো আমাকে। আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগি কণ্ঠে বললো
~ বেক্কল মরুভূমি একটা

মাথার উপরে বিশাল চাঁদ বিরাজ করেছে। চাঁদের আলোয় চারপাশটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাথে দেখা যাচ্ছে রেয়ানের উদ্ভট কান্ডগুলোও। ছাদের এক পাশে বসে আছি আমি। আর আমার পাশে বসে আছে রেয়ান। আমাদের ঠিক সামনে রাখা হয়েছে মদের বোতলটা। রেয়ান এক দৃষ্টতে তাকিয়ে আছে সেটার দিকে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মদের বোতলটা নিয়ে তার কত শত চিন্তা। হঠাৎ সে আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল
~ আচ্ছা মরুভূমি। আমি মদের বোতলটা থেকে মাত্র এক ঢোক খেয়েছি। তাহলে বোতলের মদ অর্ধেক হলো কিভাবে? আমার অগোচড়ে এখান থেকে তুমি কি মদ খেয়েছো নাকি?

এমতাবস্থায় আমার কি রিয়েকসন দেয়া উচিত বুঝতে পারছি। মানে। আমি মদ খেয়েছি এটা রেয়ানের ধারণা। লাইক সিরিয়াসলি? ইচ্ছে তো করছে এখনি ছাদ থেকে ফেলে দি একে। আমি বুঝিনা এটা কি ধরণের পুলিশ। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই রেয়ান হুট করে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। আর খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমায়। এতে আমি কিছুটা কেঁপে উঠি। রেয়ানকে হালকা ধাক্কা দিতে দিতে বলি
~ মিস্টার রেয়ান। প্লিজ উঠুন আমার কোল থেকে।
~ উহু

~ কি উহু? আমি আপনাকে উঠতে বলেছি রেয়ান। উঠে তাড়াতাড়ি আমার বাসা থেকে বের হন। নাহলে কিন্তু
রেয়ানের দিকে তাকাতেই আমি চুপ হয়ে যাই। আমি এত কিছু বললাম। কিন্তু এ ব্যক্তির কানে মনে হয় কিচ্ছু যায় নি। সে তো আরামসে আমার কোলে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত অবস্থায় কেমন যেন লাগছে রেয়ানকে। একদম বাচ্চা বাচ্চা! ঠোঁট দু’টোও কেমন করে উল্টিয়ে রেখেছে। কেন যানি না এখন রেয়ানকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে আমার। ভাবছি ইচ্ছেটা পূরণ করেই ফেলি। তাই রেয়ানের দিকে তাকিয়ে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম
রেয়ানের চুলগুলো কালো না। কিছুটা লালচে রঙ্গের। সাথে সিল্কিও অনেক। সবসময় তার সামনের চুলগুলো। তার চোখের সামনে পরে থাকে। রেয়ানের ভ্রুগুলোও লালচে রঙ্গের। একদম পার্ফেক্ট। আর তার চোখের পাপড়িগুলো। সেগুলো অনেক ঘন ঘন। ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দিতে। চোখের বাম পাশে একটা ছোট তিল আছে। একদম আমার মতো। তার আর আমার ঠিক একই রকমের তিল আছে চোখের বাম পাশটায়। যাক। এতদিনে তার সাথে আমি আমার কোনো মিল পেলাম।

ভেবেই অনমনেই একটা হাসি দিয়ে দিলাম। পরক্ষনে আবার তাকে পর্যবেক্ষন করতে শুরু করি। রেয়ানের নাকটা অনেক সরু। আর তার ঠোঁট। সেটা তো অনেক গোলাপি। আচ্ছা কোনো ছেলের কি ঠোঁট এত গোলাপি হয়? তারউপর তিনি ঠোঁট উল্টে ঘুমাচ্ছেন! আসলে উনি সুন্দর। শুধু সুন্দর না অনেক সুন্দর। হঠাৎ খেয়াল করলাম তার গায়ের রঙ্গের দিকে। এখানেও সে ১০০ তে ১০০। আমার থেকেও তিনি তিন ডাবল সাদা। কেন যেন আমার আর তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে না। খুব হিংসে হচ্ছে আমার। এত সুন্দর কেন তিনি? তাও আবার আমার থেকেও!

ভোরের প্রথম আলো আমার চোখে পড়তেই আমার ঘুম ভেংগে যায়। রেয়ান এখনও আমার কোলে ঘুমুচ্ছে। তার দিকে একবার তাকিয়ে তাকে নিচে শুইয়ে দিলাম। তারপর চলে আসলাম নিচে। নিজের রুমে!

সকাল প্রায় অনেকআমি। রিহান আর মা সবাই নিচে। শুধু রেয়ান ছাঁড়া। সে এখনো মনে হয় ঘুমুচ্ছে ছাদে। নিচে আসার পর থেকে একবারও তার কাছে যাই নি আমি। হঠাৎ কলিংবেলের বেলের আওয়াজ পাই। দরজা খুলতেই দেখি একদল রিপোটার্স দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখতেই তারা নানা বাজে বাজে প্রশ্ন করতে শুরু করেন আমাকে। সাথে সাথে আমি দরজা বন্ধ করে দি। বিরক্তি লাগছে এগুলো আমার। এসব মিডিয়ার লোক এখন আমার বাসার সামনেও চলে এসেছে। তাদের জন্য হয়তো বাসা থেকেও বের হতে পারবো না আমি। আসতে আসতে রাগতে শুরু করি আমি। কেন যেন রাগ লাগছে প্রচুর।

আর তা আরও বেড়ে যায় রেয়ানকে দেখে। সে ধীর পায়ে আমার দিকে এগুচ্ছে। তাকে দেখে আমি রাগি কণ্ঠে বললাম
~ দেখুন আপনার জন্য কি অবস্থা হয়েছে আমাদের। এখন তো বাসা থেকে বেরও হতে পারবো না আমরা। সাথে লোকেদের কথা তো আছেই। কেন এমন হচ্ছে রেয়ান। আপনার জন্যই তো তাই না? তাহলে কেন চলে যাচ্ছেন না আপনি আমাদের জীবন থেকে?

কথাটা শুনে রেয়ান কোনো জবাব দিলো না আমায়। শুধু তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার দিকে এগুতে লাগলো। তা দেখে মা এবার তার ঝাঁঝালো কন্ঠে রেয়ানকে বলল
~ এই ছেলে। তুমি আমার বাসায় কিভাবে? আর আমার মেয়ের দিকে এভাবে এগোচ্ছ কেন? বের হও আমার বাসা থেকে।
মার কথা শুনে রেয়ান তার দিকে তাকালো।

কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে মাকে বলে
~ দেখুন শাশুমা। আমি এখানে কিভাবে তা আপনার না জানলেও চলবে। আর শুনুন। আমার নাম রেয়ান। আমাকে রেয়ান বলে ডাকলেই আমি বেশি খুশি হবো। আর আরেকটা কথা। আপনার মেয়ে আমার আমানত। তাই ওর সাথে আমি কি করি না করি তা আপনার না দেখলেও চলবে। ইস দেট ক্লিয়ার?
কথাটা বলে রেয়ান আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না। আমাকে কোলে নিয়ে সোজা পা দাঁড়ালো আমার রুমের দিকে। এদিকে সোফায় আরাম করে ঘুমিয়ে আছে রিহান।

এতক্ষন যে এতকিছু হলো তা যেন সে টেরই পায় নি!
রুমে ঢুকতেই রেয়ান থেকে আমি নিজেকে ছাঁড়িয়ে নিলাম। তার কলার ধরে রাগি কণ্ঠে বলালম
~ আপনার সমস্যা কি বলুন তো রেয়ান? লজ্জা বা অনুতপ্ত বোধ কিছুই কি কাজ করছে না আপনার মাঝে। এতকিছুর পরও আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? আর আপনার সাহস কিভাবে হলো আমাকে কোলে তুলার। কালকে রাতে কিছু বলিনি দেখে আপনি বারবার আমাকে কোলে নিবেন নাকি?

~ কোলে নিবো। ১০০বার নিবো। কারন তুমি আমার আমানত
~ কিসের আমানত আমি আপনার? আমি কারও কোনো আমানত না বুঝেছেন? আর আপনার তো জীবনেও না। আপনার মতো অমানুষের সাথে কথা বলতেও আমার ঘৃণা করে।

~ তাই? তাহলে তো এটার অভ্যেস করে নাও। কারন আমাদের যখন বিয়ে হবে তখন এগুলোই সহ্য করতে হবে তোমার।

~ কখনও না। যার জন্য আমার চরিত্রে দাগ লেগেছে তাকে আমি জীবনেও বিয়ে করব না। আমি মরে যাবো কিন্তু আপনাকে বিয়ে করব না বু
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই রেয়ান আমার ২হাতের বাহু খুব শক্ত করে চেপে ধরে। নিজের মুখ আমার মুখের একদম কাছে এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলে
~ কি বললি তুই? তুই মরে যাবি কিন্তু আমাকে বিয়ে করবি না তাই না? আরে আমি চাইলে তোকে এখন এই মুহুর্তে বিয়ে করতে পারবো। কিন্তু কেন করছি না জানিস। কারন আমি চাই তুই নিজে থেকে আমাকে বিয়ে করিস। জোড় করে না।

~ সে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিন রেয়ান। কারন আপনার এ স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না।
~ একটা কথা জানো কি মরুভূমি। আমি স্বপ্ন পূরণ করার জন্য দেখি। তা মাঝ পথে রেখে দেওয়ার জন্য না। এন্ড আম সিউর। এ স্বপ্নটাও পুরণ হবে। তাও অনেক তাড়াতাড়ি।
কথাটা বলেই রেয়ান আমাকে ছেঁড়ে দেয়। তারপর চলে যেতে নিলে আমি তাকে কিছুটা বিরক্ত কণ্ঠে বলি
~ কোথায় যাচ্ছেন আপনি?

~ এখানে তো তুমি থাকতে দিবে না। তাই বাইরে যাচ্ছি। কাজ আছে।
~ কিভাবে বাইরে যাবেন শুনি? মিডিয়ার লোক চারপাশ দিয়ে ঘেরে রেখেছে আমার বাসা। যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

~ তাহলে কি তুমি আমাকে এখানে থাকতে বলছ?

তার কথাটা শুনে আমি চুপ হয়ে যাই। কি বলব বুঝয়ে পারছি না। সে আমাকে চুপ থাকতে দেখে আমার দিকে কিছুটা এগিয়ে মুচকি হেসে বলে
~ তুমি আমাকে এত কাঁচা খেলোয়াড় ভাবো মরুভূমি। ভুলে যেও না আমি একজন পুলিশ। কোথায়। কিভাবে বের হতে হবে। সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।
বলেই আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে সে রুম থেকে বের হয়ে যায়।

দুপুর প্রায় ২টা। মাত্র রিহানকে খাইয়ে দিলাম আমি। এবার আমার আর মার খাবার পালা। টেবিলে খাবার বাড়ছি। এমন সময় দরজার কলিংবেল বেজে উঠে। ভেবেছিলাম হয়তো মিডিয়ার লোক হবে। তাই পাত্তা দিলাম না। কিন্তু ৫~ ৬ বার কলিংবেল বাজার পর বাধ্য হয়ে দরজা খুললাম আমি। দরজা খুলতেই দেখি রেয়ান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ~ মুখ শক্ত করে রেখেছে সে। চোখ দু’টো লাল হয়ে আছে। আর তার দৃষ্টি স্থির আমার চোখের দিকে। কেন যানি না রেয়ানকে খুব অস্বাভাবিক লাগছে আমার। ভালোভাবে রেয়ানের দিকে তাকাতেই আমার চোখ যায় তার হাতের দিকে। হাত থেকে টপটপ করে রক্ত ঝড়ছ

পর্ব ৯

বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির এক এক ফোটা অনুভব করছি। মনটা অনেকটাই শান্ত হচ্ছে এতে। আবার যখন হঠাৎ বাতাস এসে ছুঁইয়ে দেয় শরীরকে। তখন শরীরটা শিউরে উঠে আমার। এক অজানা অনুভূতি কাজ করা শুরু করে। কিছুক্ষন এভাবে থেকে এক প্রশান্তির নিশ্বাস নিয়ে চোখটা খুললাম আমি। ঝড়ের শেষটা আমার পছন্দ। যখন ঝড় থেমে যায় তখন প্রকৃতিটা অনেক শান্ত শান্ত লাগে। এখন ঠিক তেমনই লাগছে আমার চারপাশটা। প্রকৃতি যেন এক আলাদা সৌন্দর্যে মেতে আছে।

হঠাৎ নিচে তাকাতেই কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি আমি। লেমপোস্টের আলোতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা রেয়ান। বৃষ্টিতে ভিজছে সে। প্যান্টের পকেটে দু’হাত রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে আমার দিকে। আচ্ছা রেয়ান এমন কেন? তার সবকিছুতেই যেন একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। এই যে। সে যে এখন প্যান্টের পকেটে হাত রেখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটাও যেন তার এক নিজস্ব স্টাইল।

আর দাঁড়ালাম না বারান্দায়। রুমে চলে আসলাম। কেন যেন ভালো লাগছে না আর সেখানে দাঁড়াতে। হয়তো রেয়ান আছে বলে! রেয়ানকে দেখলেই মনে হয় তার ভেতরে কত শত রহস্য। আসলেই আছে। অনেক রহস্যই আছে তার মাঝে। যা দিন দিন মনে হচ্ছে বেড়েই যাচ্ছে। আচ্ছা। রহস্যের জোট খুললে কি খুব বেশি ক্ষতি হবে? হয়তো না। তাই না? তাহলে সব কিছু এত ধোয়াশা কেন? রহস্য খোলার চেয়ে যে আরও বেড়েই চলছে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে রহস্যের সব জোট খুলবে। আর তা খুব তাড়াতাড়িই হবে। রেয়ানই বলবে সেটা। কিন্তু কখন? তার যে কিছু ঠিক নেই। একসময় এটা করবে তো একসময় সেটা। তার সব কর্মকান্ডতেই আমি হতাশ। এবারও তাই!

রেয়ানের হাতে রক্ত দেখে আমি চমকে গেলাম। কিন্তু তবুও শান্ত দৃষ্টিতে রেয়ানের দিকে তাকিয়ে হালকা কন্ঠে বললাম
~ আপনার হাতে রক্ত কেন?

রেয়ান কিছু বলল না। তার দৃষ্টি এখনও আমার দিকে। কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে আমি মাকে বলে উঠলাম
~ মা রিহানকে নিয়ে যাও তো। আমার রেয়ানের সাথে কিছু কথা আছে।
~ মানে? এ ছেলের সাথে তোর কি কথা? আর আমরা যাবো কেন?
~ মা আছে কথা। তুমি প্লিজ যাও। কথা শেষ হতেই ডাকছি তোমায়।
~ কিন্তু
~ প্লিজ মা

মা আর কিছু বললেন না। গোমড়া মুখ করে রিহানকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। মা আর রিহান চলে যেতেই আমি রেয়ানকে নিয়ে সোফায় বসি। সে এখনও চুপ করে আছে। নিচের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। তার যে হাত কেটে গেছে। আর সেখান থেকে যে রক্ত পড়ছে। এতে যেন তার কোনো খেয়াল নেই।
কিন্তু আমি তো এড়াতে পারছি না এটা। একটা মানুষের হাত থেকে এভাবে রক্ত পড়ছে। আর আমি হাতে হাত রেখে বসে থাকবো। জীবনেও না! তাড়াতাড়ি গিয়ে ফাস্টএড বক্স নিয়ে আসি।

তারপর ঔষধ লাগাতে থাকি রেয়ানের হাতে। ঔষধ লাগানো শেষে রেয়ানের দিকে তাকাতেই দেখি সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চোখ দু’টো যেন অনেক কিছু বলছে আমাকে। কিন্তু আফসোশ! আমি সেগুলো বুঝতে পারছি না।
রেয়ানের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। সাথে অজানা কিছু প্রশ্নও। নরম কণ্ঠেই তাকে জিজ্ঞেস করলাম
~ আপনার হাত কাটলো কিভাবে?

~ আমি একজন পুলিশ। আমার কাজই মৃত্যুর সাথে লড়াই করা। এখানে এটা তো সামান্য হাত কাটা। হয়তো কোনো ভাবে কেটে গেছে?
~ সত্যি তো?

~ হুম
তার উত্তর শুনে হাসলাম আমি। হেসে হেসেই বললাম
~ খুব ভালো মিথ্যে বলতে পারেন আপনি রেয়ান। কিন্তু আফসোস। সে মিথ্যেটা আমার সামনে বেশিক্ষন টিকলো না।
~ মানে?
~ এতক্ষন আপনি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখনই আমি আপনাকে প্রশ্ন করলাম। তখন আপনি মাথা নিচু করে উত্তর দিলেন। একটা কথা কি জানেন। আপনি কখনও কথা বলার সময় মাথা নিচু করেন না। সবসময় চোখে চোখ রেখে কথা বলেন। একমাত্র মিথ্যা বলার সময়ই আপনি নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলেন।
কথাটা শুনে রেয়ান বাঁকা হাসলো।

পরক্ষনে শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন
~ সকালে বাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। দেখা করে আসার সময় কিছু মিডিয়ার লোক আমাকে দেখে ফেলে। তারপর শুরু হয় তাদের নানা প্রশ্ন। আমি সুন্দর ভাবেই তাদের সব কথার উত্তর দিচ্ছিলাম। বাট। একটা রিপোর্টার তোমাকে নিয়ে একটা বাজে প্রশ্ন করে। যা আমার সহ্য হয় নি আর আমি তাকে মারা শুরু করি। মারার এক পর্যায়ে ভুল বশত আমার হাত পাশে থাকা কাঁচের দেওয়ালে লেগে কেটে যায়।

কথাটা বলেই তিনি চুপ হয়ে যান। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করছি তাকে। এত কিছু হয়ে গেলো কিন্তু তাও তার মুখ স্বাভাবিক। সে স্বাভাবিকভাবেই সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
~ আপনি কি জানেন। আপনার এমন করায় কি হতে পারে?
~ হুম

~ তাহলে এমন করলেন কেন? আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনার এমন করায় মিডিয়ার লোক কতটা খারাপ খারাপ নিউজ বানাতে পারে আমাদের নামে। রাগটা কি একটু কন্ট্রোল করা যায় না? বুঝে শুনে কাজ কেন করেন না আপনি?

আমার কথায় রেয়ান এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে থেকেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল
~ আমি বুঝে শুনেই সব কাজ করি। তোমাকে আমাকে শিখাতে হবে না। আর রইল খারাপ নিউজের কথা। সেগুলো কোনোভাবেই কেউ বানাতে পারবে না। আমি বানাতে দিবো না।
~ কি করবেন আপনি?

রেয়ান আবার চুপ হয়ে গেলেন। তার এভাবে বারবার চুপ হয়ে যাওয়ায় বিরক্ত হচ্ছি খুব! বিরক্তি নিয়েই বললাম
~ চুপ থাকতে তো এখানে আসেন নি নিশ্চয়ই? কি জন্য এসেছেন তা বললে খুশি হবো।
~ না মানে। আমি ভেবেছিলাম ওই রিপোর্টাস গুলো আবারও হয়তো তোমার বাসায় এসেছে। তাই দেখতে আসলাম।
~ সকালেও তো এসেছিলো তারা। আমাকে অনেক বাজে বাজে কথাও শুনেয়েছে। তাহলে তখন কেন কিছু করেন নি আপনি? এখন এত রাগছেন যে?

~ কে বলল আমি তাদের কিছু করিনি?
বলেই বাঁকা হাসলেন তিনি। তার হাসির মানে কি? সে কি কিছু করেছে নাকি ওই লোকগুলোর সাথে। কৌতূহল নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম
~ কি করেছেন ওদেরকে?

~ ওয়েল আমার কাজ শেষ। তাই আমার যাওয়া উচিত এখন।
বলেই আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালেন না তিনি। সোজা চলে যান বাসার বাইরে। এদিকে তার কথায় আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি সে আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কিছু খারাপ তো করেনি সে তাদের সাথে?

সকালে মানুষের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গে আমার। চোখ খুলতেই দেখি রিহান এখনও ঘুমাচ্ছে। তাকে পাশে শুইয়ে দিয়ে আমি নিচে চলে যাই। কি হয়েছে তা দেখার জন্য। নিচে যেতেই দেখি যে লোকগুলো আমার নামে বাজে বাজে কথা বলে বেড়ায় তারাই আজ আমার কাছে ক্ষমা চেতে এসেছে। তাদের এমন ব্যবহারে আমি অনেক অবাক। হঠাৎ আমার কাছে ক্ষমা চেতে এসেছে কেন তারা? আমি লোকগুলোর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলি
~ আপনারা তো সবসময় মানুষের কাছে আমার বদনামই করে এসেছেন। আজ হঠাৎ ক্ষমা চাচ্ছেন যে?
আমার কথা শুনে একজন করুণ কণ্ঠে বলে উঠে
~ আমরা তো আর জানতাম না ওই পুলিশ তোমার কি হয়। জানলে হয়তো ওসব বাজে কথা বলতাম না। মাফ করে দাও আমাদের মা।

এবার আমি বুঝতে পারছি তারা কেন এমন ভালো ব্যবহার করছে আমার সাথে। রেয়ান যে এমনটা করেছে তা স্পষ্ট। কেন যেন মনে হচ্ছে সে এখানেই কোথাও আছে। তাই আর দেড়ি না করে বাসার বাইরে চলে যাই রেয়ান আছে কিনা তা দেখার জন্য। বাইরে যেতেই দেখি রেয়ান গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে ২হাত প্যান্টের পকেটে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেকতেই চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে
~ কেমন দিলাম মরুভূমি?

পর্ব ১০

~ আপনি আমাকে এখানে এনেছেন কেন?
~ তোমাকে বেচে দিতে!
~ মানে?
~ মানে বুঝো না? পাচার করব তোমাকে।

~ দেখুন রেয়ান। আমি একদম মজা করার মুডে নেই। আপনি আমাকে এক ঘন্টা যাবত বসিয়ে রেখেছেন এখানে। কেন সেটা বলছেন না। আবার আমার প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন না। আপনি কি চাচ্ছেন বলুন তো।
কথাটা বেশ বিরক্তি নিয়েই বললাম আমি। ১ঘন্টা ধরে আমাকে একটা নদীর তীরে বসিয়ে রেখেছেন তিনি। কি যেন বলবেন আমাকে। অথচ চুপ করে বসে আছেন। আবার আমার প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন না।
রেয়ান খুব অস্বস্তি নিয়েই আমাকে বলল
~ তুমি কি যেন প্রশ্ন করেছিলে?

তার কথা শুনে তার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালাম আমি। পরক্ষনে নিজেকে শান্ত রেখে বললাম
~ আপনি আমাদের আশেপাশের লোকদের কি বলেছেন? আমি আপনার কি হয়?
~ আমি তো শুধু ওদেরকে বলিনি। মিডিয়ার লোকদেরও বলেছি। তুমি নিউজটা দেখো নি?
~ না!

~ ও ভালো হয়েছে তাহলে। বাসায় যেয়ে দেখে নিও হ্যাঁ।
~ বাসায় গিয়ে দেখবো। কিন্তু তার আগে আপনি আমাকে বলুন। আপনি সবাইকে কি বলেছেন?
~ না বললে হয় না?

~ না!
~ আসলে আমি না ওদেরকে বলেছি
~ হুম কি বলেছেন?

~ আমি ওদেরকে বলেছি তুমি আমার বউ আর আমি তোমার বর। মানে আমাদের বিয়ে হয়েছে।
কথাটা শুনে আপনা~ আপনিই আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ততক্ষনাত আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। চিল্লিয়ে বললাম

~ কি বলছেন এগুলা আপনি হ্যাঁ? আমি আর আপনি স্বামী~ স্ত্রী? মাথা ঠিকাছে আপনার। আরে সবাইকে স্বামী~ স্ত্রীই বলতে হলো? অন্যকিছু বলতে পারলেন না।
~ অন্যকিছু আবার কি বলতাম?
~ কেন? ভাই~ বোন বলতে পারলেন না?

~ লাইক সিরিয়াসলি? আমি তোমাকে ভাই~ বোন বলে সবার কাছে পরিচয় দিবো? জীবনেও না। তাছাড়া কোন ভাই বোনকে কোলে করে গাড়িতে বসায়?
~ সেটা আপনার জানা উচিত। আপনি কেন আমাকে কোলে করে গাড়িতে বসিয়েছিলেন? সব আপনার দোষ?
~ ও রেইলি? শুনো দোষ আমার না তোমার। কি হতো যদি তুমি আমার কথা মতো গাড়িতে আসতে। কথা না শুনার পরিণাম ছিল ওটা। বুঝলে?

উনার কথা শুনে শরীর রাগে রিরি করছে আমার। মানুষটা আসলেই বাজে! ঝাঁঝাঁলো কণ্ঠে তাকে বললাম
~ আপনি অনেক বাজে রেয়ান।

~ আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতো মরুভূমি! তুমি কি আর কোনো কথা জানো না? আমার সাথে তোমার যখন থেকে দেখা হয়েছে তখন থেকে এ পর্যন্ত তুমি এই বাজে ওয়ার্ড~ টা কতবার ইউস করেছো বলতো?
~ আমার যতবার ইচ্ছে করবে আমি ততবার আপনাকে বলব। আপনি কে হন আমাকে বলার?
~ তোমার হবু বর।

তার কথা শুনে রাগটা যেন আরও বেড়ে গেল। আর এক মুহুর্তও থাকবো না আমি তার সাথে। রেয়ান পেয়েছি কি আমাকে! উনি যা বলবেন তা~ ই হবে। কক্ষনও না! রেয়ানের দিকে একবার রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমি সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। এদিকে আমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন রেয়ান।

কোমড়ে ২হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রেখেছেন তিনি। আর তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার যাওয়া দেখছেন। প্রায় ২মিনিট ওভাবে থেকে উনি হুট করে আমার কাছে এসে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। এতে আমি কিছুটা চমকে যাই। বারবার আশপাশে তাকাচ্ছি। আবারও যদি কেউ আমাদের এভাবে দেখে ফেলে। কিন্তু না। কেউ নেই এখানে। ভেবেই প্রশান্তির এক নিশ্বাস ফেললাম আমি। পরক্ষনে রেয়ান থেকে নিজেকে ছাঁড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

ড্রইং রুমে বসে আছি আমি। আমার পাশেই মা আর রিহান বসে আছে। আর আমাদের ঠিক সামনে বসে আছেন রেয়ান। রেয়ান খুব শান্ত মেজাজে মার সাথে কথা বলছেন। নিউজের ব্যাপারে! রেয়ান নানাভাবে চেষ্টা করছেন মাকে ইম্প্রেস করার। কিন্তু মা তো মা~ ই। একবার কাউকে খারাপ লাগলে। তার সাথে আর ভাব জমে না মার। তাই রেয়ান যতই চেষ্টা করুক না কেন। মা গলে যাওয়ার পাত্রী নন! এদিকে রিহান তো রিতিমতো রেয়ান বলতে পাগল। যখন থেকে রেয়ান বাসায় এসেছেন তখন থেকে তার বাবা বাবা ডাকা শুরু।

হঠাৎ রেয়ান কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে আমাকে বলেন
~ মিরা আজকে তুমি আমার বাবার সাথে দেখা করতে যাবে। রেডি হয়ে নাও।
~ মানে? কেন?

~ বাবা ওই নিউজ হওয়ার পর থেকেই তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। বিভিন্ন কারণে পারে নি। আজকে সময় আছে তাই তোমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে বলেছে।

কথাটা শুনে মা রেগে গেলেন। তবুও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন
~ তুমি কোথাও নিয়ে যাবে না আমার মেয়েকে। আর তোমার বাবা যদি আমার মেয়ের সাথে দেখা করতে চায় তাহলে তাকে আসতে বলো। আমার মেয়ে কেন যাবে।

~ শাশুমা। আমি চাইলে ওকে এমনেও নিয়ে যেতে পারবো। এতে আমার কারো পারমিশন লাগবে না। আমি শুধু আপনাকে জানানোর জন্য ওকে এখানে নিয়ে এসেছি। নাহলে সকালে যেখানে গিয়েছিলাম সেখান থেকেই ওকে বাবার কাছে নিয়ে যেতাম। আর এতে আপনি কিছু করতেও পারতেন না।

কথাটা শুনে মা যেন আরও রেগে গেলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। বুঝতে পারছি এখন কিছু বললে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। তাই কিছু না বলে রেডি হতে চলে গেলাম। সাথে রিহানও আছে।

গাড়িতে বসে আছি আমি। রেয়ান আর রিহান। আমি আর রেয়ান সামনের সীটে। আর রিহান পেছনের সীটে। বেশ খুশি খুশি লাগছে রিহানকে। বারবার রেয়ানকে জিজ্ঞেস করছে আমরা কোথায় যাবো বাবা? আর কতক্ষন লাগবে যেতে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি বেশ বিরক্তি হচ্ছি এসবে। বিরক্তি নিয়েই বললাম
~ না গেলে কি হতো না?

~ অবশ্যই না
বলেই আবার ২জনেই চুপ। রাস্তায় তেমন কথা হয় নি আমাদের। বলতে গেলে আমি কিচ্ছু বললেও রেয়ান জবাব দেন নি।

প্রায় আধা ঘন্টা পর আমরা পৌঁছে যাই গন্তব্যে। বিশাল বড় গেট দিয়ে ডুকছে গাড়ি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি চারপাশটা। কি সুন্দর বাড়ি রেয়ানের। এমন বাড়ি তো শুধু স্বপ্নেই দেখেছি আমি!

রেয়ানের এক হাতে আমার হাত আর অন্য হাতে রিহানের হাত। খুব শক্ত করে আমাদের হাত ধরে রেখেছে সে। কিন্তু কেন? হাত ছাঁড়াতে চাইছি বারংবার। কিন্তু ফলাফল শূণ্য। রেয়ান যেন হাত ছাঁড়বেই না। তাই আমিও আর চেষ্টা করলাম না। বাড়ির চারপাশটা দেখছি আমি। বাড়ির বাইরে যেমন সুন্দর। তার চেয়ে দ্বীগুণ সুন্দর বাড়ির ভেতরটা। জায়গায় জায়গায় শুধু বডি গার্ডস আর সার্ভেন্টস।

৫০০~ ৬০০ তো হবেই!
কিছুক্ষনের মধ্যেই রেয়ানের বাবা আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হন। ভদ্রতার খাতিরে সালাম দিলাম উনাকে। প্রতিউত্তর সেও দিলেন। তারপর খুব মিষ্টি সরে বললেন
~ কেমন আছো মিরা?
~ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?

~ আমিও আছি এক রকম। আচ্ছা রেয়ান তুমি আর রিহান যাও তো একটু আমি মিরার সাথে একা কথা বলব। তুমি বরং রিহানকে বাড়িটা ঘুরেঘুরে দেখাও। ওর ভালো লাগবে।
রেয়ান জ্বী বলে সেখান থেকে চলে গেলেন। কেন যেন খুব অস্বস্তি লাগছে আমার। অস্বস্তি নিয়েই রেয়ানের বাবাকে বললাম
~ আপনি মনে হয় আমাদের চিনেন।

~ হুম। রেয়ান অনেক বলেছে তোমার ব্যাপারে।
~ ও
বলেই একটু হাসার চেষ্টা করলাম। পরক্ষনে মাথা নিচু করে বসে রইলাম। এমন অবস্থায় কি বলা উচিত জানি না। তাছাড়া রেয়ানও কেমন। আমাকে এখানে একা রেখে উনার যাওয়া কি ঠিক হলো? মোটেও না!
আমাকে চুপ থাকতে দেখে রেয়ানের বাবা আবার বললেন
~ রেয়ান তোমাকে বিয়ে করতে চায়। সেটা তুমি জানো নিশ্চয়ই?

এখন তুমি কি চাও?
উনার কথার কি উত্তর দিবো বুঝতে পারছি না। আগের মতোই চুপ করে আছি। আমার চুপ করা দেখে উনি মনে হয় কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছেন। নিজের মতোইল করে আবার বলা শুরু করেন
~ আমার ছেলে কেমন তা তো এত দিনে জেনে গেছো নিশ্চয়ই।

ও যেটা চায় সেটা ওর চায়ই~ চায়। সেটার জন্য তার যা করা লাগবে সে করতে রাজি। এই যেমন দেখো না। এত বড় বিজনেস আমার। ও সেটা বাদ দিয়ে কি করছে। একটা সামান্য পুলিশের চাকরি! আমার টাকা~ পয়সার ওর কোনো লোভ নেই। ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। ওর কোনো কাজে আমি কখনও কোনো বাঁধা দেইনি।

এখনও দিবো না। ও তোমাকে চায়। ঠিক চায় না ওর তোমাকে প্রয়োজন। বিয়ে করতে চায় তোমাকে। জানি তুমি করতে চাও না। আর ওকে হয়তো ভালোও বাসো না। কিন্তু ও ভালোবাসে তোমাকে। অনেক ভালোবাসে। তবে এর জন্য কখনও নিজেকে পাল্টাবে না ও। ও যেমন তেমনই ভালোবাসতে চায় তোমাকে। তাই হয়তো তুমি ওর খারাপ রুপই বেশি দেখেছো। কিন্তু বিশ্বাস করো। ওর মন অনেক ভালো। ধীরে ধীরে তুমিও বুঝতে পারবে সেটা।

যাই হোক। শেষে এতটুকুই বলব। আমার ছেলে খারাপ না। তবে ও ওর ভালো দিকটা সহজে কাউকে দেখায় না। অন্যদের খুঁজে নিতে হয় সেটা। আশা করি তুমিও পারবে। আর যদি পারো তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু বুঝার চেষ্টা করো। সত্যি যদি কখনও ওকে ভালোবেসে ফেলো। তাহলে ফিরিয়ে দিও না ওকে। খুব কষ্ট পাবে আমার ছেলেটা।
বলেই তিনি চলে গেলেন সেখান থেকে। আর আমি। এখনও মাথা নিচু করে বসে আছি। মাথাটা কেন যেন ঘুড়ছে আমার।

বাসায় এসেছি প্রায় ২০ মিনিট হতে চলল। এখনও গাড়িতে বসে আছি আমি আর রেয়ান। পিছনের সীটেই ঘুমিয়ে পড়েছে রিহান।
বারবার খালি রেয়ানের দিকে চোখ যাচ্ছে আমার। কিছু বলার ছিল তাকে। খুব শান্ত কণ্ঠেই বললাম
~ আপনি যা করছেন তাতে তো আমার এটাই মনে হচ্ছে আপনি আমাকে জোড় করছেন বিয়ের জন্য।
কথাটা শুনে রেয়ান হাসলেন। তারপর হালকা কণ্ঠে বললেন
~ তোমার সেটা মনে হয়? ভালো!

বলেই একটু থেমে গেলেন তিনি। তারপর আবার বললেন
~ সত্যি বলছি জোড় করব না তোমায়। তুমি যখন চাবে তখনই বিয়ে করব। আমি শুধু চেয়েছি আমার সম্পর্কে তুমি জানো। আমার বাবার সাথে পরিচিত হও। এটাই!
~ ও

আমার ও বলার পরপরই রেয়ান আমার হাতে একটা চিঠি ধড়িয়ে দিলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন
~ তোমার যত প্রশ্ন আছে তুমি এই চিঠি পেয়ে যাবে। চিঠি পড়ার পর হয়তো রাগ করবে আমার উপর। কিন্তু বিশ্বাস করো। আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি। ভুল করে হয়ে গেছে। সত্যি বলছি! পারলে মাফ করে দিও আমায়।
বলেই অন্যদিকে তাকালেন রেয়ান। হয়তো চোখের পানি লুকাতে। কিন্তু সে কি জানে। আমি তার চোখের পানি দেখে ফেলেছি। সাথে কিছু হারানোর ভয়ও!

পর্ব ১১

ফ্রেস হয়েই রেয়ানের দেওয়া চিঠি নিয়ে বসে পরলাম সোফায়। রিহান বিছানায় আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তাই নিশ্চিন্তে চিঠি~ টা পড়া যাবে। চিঠি~ টা খুলতেই দেখি সেখানে সুন্দর করে লেখা

প্রেয়সী আমার কি করো? নিশ্চয়ই এখন ঠান্ডা মেজাজ নিয়ে আমার চিঠি পড়তে বসেছো! আমি জানি চিঠি~ টা সম্পূর্ণ পড়ার পর হয়তো তোমার আমার উপর অনেক রাগ~ অভিমান জমবে। সাথে কিছু অজানা প্রশ্নও। কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর তুমি এ চিঠিতে পাবে না। সব রহস্যের জোট তো আর খুলে না। তাই এখানেও কিছু অজানা প্রশ্ন অসমাপ্তই থেকে যাবে। যাই হোক। প্রথমবার চিঠি লিখছি কিন্তু। যদি কোনো ভুল হয় তাহলে সেটা না দেখার ভান করে রেখে দিও। আমি আবার অত শুদ্ধ করতে পারবো না বানান। তাহলে এখন মূল ঘটনায় যাওয়া যাক
তুমি তো জানো বাবার বিজনেসে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।

পুলিশের চাকরিই আমার সব। এতে কিন্তু বাবা কোনো বাঁধা দেয় নি। কিন্তু তাও তার এক মাত্র ছেলে৷ তার বিজনেস না দেখে। একটা সামান্য পুলিশের চাকরি করছে। নিশ্চয়ই বাবার এটা খারাপ লাগার বিষয়! বাবা সবসময় চাইতেন আমি যেন বাবার বিজনেস~ টা ধরে রাখি। আরও নামি~ দামি করি। তাই তিনি যখন বিভিন্ন কাজে দেশ~ বিদেশে যেতেন তখন আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন। যেন তিনি না থাকলেও আমি পুলিশের চাকরির সাথে সাথে বিজনেস~ টাও করতে পারি

সেবার বাবার একটা কাজ পড়ে যায় আমেরিকায়। আমাকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। সব ঠিক~ ঠাকই চলছিলো। বাবা যে কাজের জন্য এসেছিলেন সে কাজ খুব সুন্দর ভাবে হয়ে যায়। তাই সে খুশিতে বাবা আর তার বিজনেস পার্টনার মিলে আমেরিকায়ই একটা পার্টির ব্যবস্থা করে।

ওইদিন পার্টিতে আমি একটু বেশিই ড্রিংক্স করে ফেলি। তাই জ্ঞান ছিল না আমার তেমন। একটা মজার ব্যাপার কি জানো। ড্রাংক হওয়া সত্যেও আমি জিদ ধরি আমি একাই গাড়ি চালিয়ে বাসায় যাবো। এজন্য গাড়ি থেকে ড্রাইভারকেও ধাক্কা মেরে বের করে দি। বাবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পার্টিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই হয়তো আমাকে এসব করতে দেখেন নি। আর তাই আমি ড্রাংক অবস্থায় থেকেও খুব আরামেই গাড়ি স্টার্ট দি বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আসল ঘটনা শুরু হয় তখনি! আমি এক্সিডেন্ট করি। অন্য একটা গাড়ির সাথে! এক্সিডেন্টে আমি অত ব্যথা পাই নি। শুধু একটু পায়ে আর মাথায় পেয়েছিলাম। কিন্তু অপসিট সাইডে যার সাথে আমার এক্সিডেন্ট হয় তার অবস্থা ভালো ছিল না। সে মাথায় খুব বাজে ভাবে আঘাত পেয়েছিল। সাথে তার পেটে একটা বড় কাঁচ ডুকে গিয়েছিল।

আশেপাশের মানুষ আমাদের এক্সিডেন্ট দেখে আমাদের হস্পিটালে ভর্তি করান। আমি যেহেতু অত ব্যথা পাই নি। তাই আমি তাড়াতাড়িই সুস্থ হয়ে যাই। কিন্তু আমার সাথে যে ছেলেটার এক্সিডেন্ট হয়। তার সুস্থ হওয়ার চান্স খুব কম ছিল। আর যদি হয়ও তাও সে বাঁচবে না। ডাক্তারদের মতে এমনও সম্ভাবনা ছিল যে ছেলেটা সুস্থ হওয়ার ১~ ২ দিন কিংবা ১ মিনিটেও মারা যেতে পারে। এসবে আমি খুব অনুতপ্ত ছিলাম। আমার জন্যই তো ছেলেটার এমন অবস্থা হয়েছিক। প্রায় ১মাস ছেলেটার চিকিৎসা চলে। ফলে সে একটু একটু কথা বলতে পারতো। কিন্তু তার মৃত্যুর চান্স তখনও ছিল অনেক! এজন্য আমি আর বাবা অনেক ক্ষমা চাই ছেলেটার কাছে।

জানো মরুভূমি! ছেলেটা অনেক ভালো ছিলো। আমার জন্য সে মারা যাবে সেটা জানা সত্ত্বেও আমাদের ক্ষমা করে দেয় সে। তার শুধু একটা শেষ ইচ্ছে ছিল। তার ওয়াইফের সাথে যেন সে শেষবার দেখা করতে পারে। তাই আমরা তার ওয়াইফের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। করতে পারিও। কিন্তু একবার যোগাযোগ করার পরপরই তার ওয়াইফ আমাদের কোনো ফোন~ কল কিছুই ধরছিল না। একসময় তার ওয়াইফের ফোন সুইচড অফ দেখাতে শুরু করে। যোগাযোগের সব মাধ্যমই তখন বন্ধ। এদিকে আমার আর ওই ছেলেটার বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়।

ও ওর। ওর ওয়াইফ আর ওর পরিবারের সম্পর্কে অনেক কিছু বলে আমাকে। ছেলেটা তার ওয়াইফের ছবিও দেখায় আমাকে। বিশ্বাস করো! মেয়েটার ছবি দেখে কেন যেন আমার এক অজানা অনুভূতি কাজ করা শুরু করে। কিন্তু তাতে এত পাত্তা দেয়ই নি। তাছাড়া সে অন্য একজনের ওয়াইফ। আর তার একটা বেবিও আছে। এটা তো সম্ভব ছিল না। তাই না?

আমার ছেলেটার সাথে অনেক ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু একদিন ছেলেটা হঠাৎ~ ই মারা যায়। জানো মিরা ছেলেটার নাম কি ছিল? ছেলেটার নাম ছিল শুভ। তোমার শুভ।

কথাটা পড়ে থেমে গেলাম আমি। তাহলে রেয়ান যার কথা বলছে সে শুভ? শুভ কি তাহলে মারা গেছে? মুহুর্তেই চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো আমার। পরক্ষনে মুখে হাসি চলে এলো। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছে। আমার স্বামীকে আমি আমার করে রাখতে পেরেছিলাম। সে আমার সাথে কোনো বিশ্বাসঘতকতা করে নি। সত্যিই শুভ ভালোবেসেছিল আমায়। কিন্তু তাহলে ওই ডিভোর্স লেটার। চিঠি। ওগুলো কে পাঠিয়েছে? ভেবেই চোখের পানিগুলো মুছে ফেললাম বাম হাত দিয়ে। তারপর আবার চিঠি পড়া শুরু করলাম
শুভর মারা যাওয়ার ২~ ৩ দিন পরই আমি দেশে ফিরি।

দেশে এসে আমার প্রথম কাজ ছিল তোমাকে খুঁজে বের করা। শুভর মারা যাওয়ার খবরটা তো তোমাকে দিতে হবে। তাই শুভর দেওয়া বাসার এড্রেসে যাই আমি। সেখানে গিয়ে তোমাকে পাই নি। কিন্তু শুভর বোন রিহা থাকতো সেখানে। তাকে শুভর মৃত্যুর খবর দি। ও খবরটা শুনে অনেক কান্না করেছিল। ওকে শান্তনা দিয়ে বিভিন্ন ভাবে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি কোথায় তা জানার জন্য। কিন্তু না। সে বলছিলই না তুমি এখানে কেন থাকো না কিংবা এখন কোথায় থাকো!

এজন্য দিন~ রাত খোঁজা শুরু করি তোমার। পেয়েও যাই। কিন্তু এ অবস্থায় পাবো জানতাম না। তোমাকে যখন প্রথম খুঁজে বের করি আমি। তখন তোমাকে কাঁদতে দেখি। পার্কে বসে কোনো একটা বিষয়ে খুব কাঁদছিলে তুমি। তখন কি ইচ্ছে করছিল আমার জানো? তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে কেঁদো না মরুভূমি। সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু আফসোস! তখন কিছু করতে পারি নি আমি। তোমাকে দেখার পর থেকে কিছু কথা বেশ ভাবে ভাবাচ্ছিল আমাকে। প্রথমত তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি রিহার সাথে থাকো না কেন? আর আমি যে আমেরিকা থেকে কল করেছিলাম সেটা কে ধরেছিলো?।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তোমার এলাকার কাছাকাছি পুলিশ স্টেসনে ট্রান্সফার হই আমি। এন্ড তারপর আসলে কি হয়েছে তা জানার জন্য কাজে লেগে যাই। শুভ যাওয়ার পর তোমরা কি করেছো না করেছো। তোমাদের ফোন কলসের রেকড। সব কিছুর ডিটেলস জোগার করি। সবশেষে আমার সন্দেহ বারবার রিহার উপর যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কনফ্রম ছিল না। তাই তোমার সাথে নানাভাবে কথা বলার চেষ্টা করি। যাতে কথা বলতে বলতে একসময় তোমার সাথে পাস্টে এ কি কি হয়েছে তা জানতে পারি। আর যেটা চেয়েছিলাম সেটা হয়েও যায়। তুমি তোমার পাস্ট সম্পর্কে সবকিছু বলো আমাকে। আর তখনই আমি বুঝে যাই যে আসল কার্লপিট কে!

রিহাই ছিল যে এসব কিছু করেছে। প্রথম প্রথম ও কিছু শিকার করতে চায় নি। ওকে লাগাতার টর্চার করার পর ও মুখ খুলে। ওর এসব করার কারন কি ছিল জানো? ওর নাকি তোমাকে হিংসে হতো। এর মূল কারন এই যে। শুভ তার অর্ধেক প্রোপার্টি তোমার নামে লিখে দিয়েছিলো। তা ও সহ্য করতে পারে নি। তাও তেমন কিছু করে নি সে। কিন্তু যখন জানতে পারে শুভ এ পৃথিবীতে নেই। তখন ও ভাবে এখন হয়তো শুভর সব প্রোপার্টি ওর নামে হয়ে যেতে পারে। তাই তোমাকে নানা ভাবে চিঠি দেয়।

শুভর নকল সাইন দিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠায়। আর তাছাড়া তুমি জানতে না যে শুভ তোমার নামে এতগুলো প্রোপার্টি লিখে গিয়েছে। তাই হয়তো রিহা যা চেয়েছিলো তা খুব সহজেই পেয়ে যায় সে। এখন মূলত রিহা কারাগারে বন্দী। ওকে শাস্তি দিয়েছি আমি। এইতো কিছুদিন হলো। আমি জানি মিরা। এখনও কিছু প্রশ্ন আছে তোমার। ওগুলো তুমি যখন আমাকে জিজ্ঞেস করবে তখন আমি বলে দেবো। সবশেষে শুধু এতটুকুই বলব। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবে না। আমি তো আর ইচ্ছে করে কিছু করিনি। শুভর ব্যাপারটা এক্সিডেন্ট ছিল। হ্যাঁ একটু ভুল তো অবশ্যই ছিল আমার।

কিন্তু মিরা সবকিছু বিবেচনা করে তারপর না হয় আমাকে যা বলার বলো। চাইলে যত ইচ্ছা তত থাপ্পড় মেরো। কিন্তু কখনও ছেঁড়ে যেও না। শ্বাস আটকে মারা যাবো আমি। সত্যি! এখন যে তুমি বিহীন আমি কিছু না। তুমি থাকলেই আমি আছি। নাহলে নেই। আচ্ছা মিরা! আমি যাকে ভালোবাসি #সেকিজানে! আমি তার মাঝে আমার অস্তিত্ত্ব খুঁজে পাই?

পুরো চিঠিটা পড়া শেষ আমার। চিঠি~ টার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছি আমি। নিজেকে কেন যেন অনুভূতি শূণ্য মনে হচ্ছে। শুভ আর এ পৃথিবীতে বেঁচে নেই। ভাবতেই বুক ভেটে কান্না আসছে আমার। খুব ইচ্ছে করছে একটু কাঁদতে। কেন যেন ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখতে পারলাম না। ওয়াশরুমে গিয়ে ঝরনা ছেঁড়ে সেটার নিচে বসে পড়লাম। যত ইচ্ছে তত কান্না করব আজকে আমি। তাহলে একটু হলেও তো আমার কষ্টটা কমবে তাই না? আমার কিন্তু আগে খুব কষ্ট হতো এই ভেবে শুভ আমাকে ছেঁড়ে চলে গেছে। কিন্তু এখন এর চেয়ে দ্বীগুণ কষ্ট হচ্ছে এরজন্য যে শুভ এ পৃথিবী ছেঁড়ে চলে গেছে।

আমি আর রেয়ান কালকের সেই নদীর তীরটায় বসে আছি। প্রায় অনেক্ষন ধরে আমরা চুপচাপ বসে আছি এখানে। রেয়ান মাথা নিচু করে আর আমি নদীর দিকে তাকিয়ে! নিরবতা ভেঙ্গে রেয়ানই বলল
~ আমাকে মাফ করে দাও মিরা।
~ এতে আপনার কোনো দোষ ছিল না রেয়ান। ভুলে হয়তো হয়ে গেছে।
কথাটা শুনে রেয়ানের মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষনেই আমার কথা শুনে রেয়ানের মুখ আবার মলিন হয়ে গেল

~ আচ্ছা রেয়ান! আমার যখন আপনার সাথে প্রথম দেখা হয় তখন আমাকে এসব কিছু বলেন নি কেন? আর খারাপ ব্যবহারই~ বা কেন করেছিলেন?
~ আসলে আমি যদি তোমাকে প্রথমেই কিছু বলতাম তাহলে হয়তো তুমি আমাকে ভুল বুঝতে। কারন আমার কাছে তখন তেমন কোনো প্রমাণ ছিল না।

আর এতে হয়তো আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলতাম। খুব ভয় লাগতো কেন যেন! আর খারাপ ব্যবহার করি কারন। তখন তোমার মনে হতো শুভ তোমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। এসময় কেউ যদি তোমার জীবনে আসতে চায় তখন তুমি অবশ্যই তাকে না করবে। তাছাড়া ভালো ব্যবহার করলে তুমি আমাকে পাত্তা দিতে না। তাই খারাপ ব্যবহার করাটাই আমার কাছে উত্তম মনে হয়েছিলো।

~ আপনি ঠিকই বলেছেন। প্রথমে যদি সত্যি বলতেন তাহলে হয়তো আমি আপনাকে ভুলই বুঝতাম। কিন্তু খারাপ ব্যবহার করাটা আপনার মোটেও ঠিক করেন নি।

~ ও তাই? সরি
তার কথা শুনে আমি তার দিকে তাকালাম। শান্ত কণ্ঠে বললাম
~ আমাকে ভালোবাসেন?

~ জানি না।
~ বিয়ে করতে চান কেন?
~ জানি না।
~ তাহলে জানেনটা কি আপনি? আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলুন তো মিস্টার রেয়ান। এই যে আপনি খালি আমাকে বলেন বিয়ে করো। বিয়ে করো। কোনো দিন কি প্রোপোজ করেছেন আমাকে?
~ প্রোপোজ করলেই কি সব?
~ না! এমনি সুন্দর লাগে।

~ শুনো এগুলো আমার ভালো লাগে না। তাই করি না। আমি যেমন তেমনই থাকবো।
~ জীবনেও পাল্টাবেন না আপনি।

~ হুম ঠিক! আচ্ছা একটা কথা বলতো। আজকে হঠাৎ বিয়ে। ভালোবাসা। প্রোপোজ এগুলো নিয়ে কথা বলছ। কেন বলতো? সামথিং সামথিং?
~ অবশ্যই না। নাথিং নাথিং।

~ হুম। সেটা তো দেখাই যাচ্ছে মরুভূমি
~ এই। আপনি সবসময় আমাকে মরুভূমি ডাকবেন না তো। আমার বিরক্তি লাগে।
~ আমার ইচ্ছে আমি তোমাকে যা ইচ্ছা ডাকবো। চাইলে তুমিও আমার নাম রাখতে পারো।
~ গুড আইডিয়া। তাহলে আপনার নাম আমার জানের ভাই।
~ ওয়াট? জানের ভাই এটা কি ধরণের নাম? একটা কথা জানো কি মরুভূমি। তোমার মতো তোমার নামও খেত।
~ কি বললেন আপনি?

আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে রেয়ান নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ~ ই গান গাওয়া শুরু করলেন
~ কিস মিক্লোজ ইউর আইস এন্ড মিস মি
~ ছিঃ এটা কি ধরণের গান।
~ তোমার মতো মাথায় ভর্তি গোবর ওয়ালা মেয়ে বুঝবে না।
~ কি?
~ কিছু না।
বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সাথে আমার হাত টান দিয়ে আমাকেও দাঁড় করালেন। তারপর বললেন
~ চলো
~ কোথায়?

~ তোমাকে ভার্সিটিতে ভর্তি করাবো।
কথাটা শুনে আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। এত ভালো কেন উনি? আমার জন্য এত কিছু না করলেও তো পারেন!

পর্ব ১২

বৃষ্টিতে ভিজছি আমি। অনেকদিন পর এভাবে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টির এক এক ফোটা অনুভব করছি। কেন যেন অনেক শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে। বুকের ভেতর যে কষ্ট লুকিয়ে ছিল তা এই বৃষ্টির বিশুদ্ধ পানিতে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে। প্রাণ ভরে আজ বৃষ্টিতে ভিজবো। বৃষ্টি যে খুব ভালো লাগে আমার
হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পেছনে তাকাতেই দেখি রেয়ান! সে ছাদের দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চাহনিতে আমার খুব অস্বস্তি লাগছে। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে যেতে হবে আমার। তাই পা বাড়ালাম দরজার দিকে।

দরজার কাছে আসতেই রেয়ান আমার হাত ধরে ফেলে। আকাশের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েই বলে
~ আমাকে পাগল করার জন্য সবসময় তৈরি থাকো তুমি। তাই না?
~ হাত ছাড়ুন আমার।
~ যদি বলি ছাড়বো না!
~ কখন এসেছেন?
~ এইতো একটু আগে।

~ ও
আমার কথা শেষ হতে না হতেই রেয়ান আবার বলে উঠেন
~ আচ্ছা মরুভূমি! তোমার মাকে ইম্প্রেস করতে কি করতে হবে বলতো?
~ কেন কি হয়েছে?

~ না মানে উনি খালি আমাকে বকা দেন। এই যে একটু আগেও খেয়ে আসছি উনার বকা।
রেয়ানের কথা শুনে আমি তার দিকে তাকালাম। সে এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটা মুচকি হাসি দিয়ে তার হাত থেকে নিজের হাত ছাঁড়িয়ে নিতে নিতে বলি
~ ভালো

ব্যস এতটুকু বলেই চলে আসি সেখান থেকে। যাওয়ার আগে শুধু রেয়ানের একটা কথা শুনেছিলাম। আর সেটা হলো

~ একেবারে রেডি হয়ে নিচে এসো। মেরি জান। আজকে তোমার ভার্সিটির ফাস্ট ডে বলে কথা।
রেয়ানের কথা মতো একেবারে রেডি হয়েই নিচে আসি। ডাইনিং টেবিলের কাছে আসতেই দেখি সবাই সেখানে বসে আছে। রিহান তো দিব্যি রেয়ানের কোলে বসে বসে আরামে নাস্তা করছে। পাশেই মা মুখ কালো করে বসে আছেন। তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি বিরক্ত। প্রচন্ড রকমের বিরক্ত!
আমি চেয়ারে বসতেই রেয়ান দুষ্ট কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে
~ মিরা বলতোএ পৃথিবীতে কোন এক মহা ব্যক্তি আছে যে আমাকে পছন্দ করে না?
সাথে সাথে রিহান জবাব দেয়
~ নানু

~ রাইট মাই সান। তো শ্বাশুমা। আপনার কি মতামত এ বিষয়ে।
কথাটা রেয়ান মার দিকে তাকিয়ে বলে। কিন্তু এতে মার কোনো খেয়াল নেই। সে নিজ মনে রেগে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মার চেহারা লাল। নীল। বেগুনী হয়ে গেছে। যা দেখে আমি। রেয়ান আর রিহান মিটিমিটি হাসছি। হঠাৎ রেয়ান রিহানকে আবার বলে উঠে
~ জানো একটা কথা রিহান। তোমার নানু আসলে নানু না। তিনি হলেন একটা এটম বোমা। যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে।

কথাটা শুনে রিহান কি বুঝলো জানি না। কিন্তু সে আর রেয়ান হাড় কাঁপানো হাসি হাসলো তখন। এটা দেখে মার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। ততক্ষনাত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন মা। তারপর নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন

~ তুই যখন বাইরে যাবি তখন রিহানকে আমার রুমে দিয়ে আসিস।
বলেই তিনি চলে যান সেখান থেকে। মা চলে যেতেই আমি রেহানকে বললাম
~ এমনটা না করলেও পারতেন।
~ কেন?

~ দেখলেন না মা কত রেগে গেছেন।
~ আমি কি করব। উনার রাগাতে আমার অনেক ভালো লাগে। তাই এমন রাগাই। একচুয়েলি। আই লাইক হার রাগ্বানিত ফেস।
~ আপনি এমন কেন বলেন তো?

~ আমি আবার কেমন? আচ্ছা রিহান আমাকে তোমার কেমন লাগে বলতো?
রেয়ানের কথা শুনে রিহান এক গাল হেসে বলে
~ তুমি আমার বেস্ট বাবা।
আমি আর কিছু বললাম না। চুপচাপ রিহান আর রেয়ানের কান্ড দেখতে লাগলাম

খাবার খাওয়া শেষ হতেই আমি সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে ফেলি। তারপর রিহানকে মার রুমে নিয়ে যাই। মার রুমে ডুকতেই দেখি মা জ্বানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি এসেছি সেটা বুঝতে পেরে কঠিন কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করেন

~ রেয়ান ছেলেটাকে তুই কেন ঘরে আসতে দিস মিরা? আমার ওকে ভালো লাগে না একদম! আমি চাই না ও আমাদের বাসায় এরকম ঘনঘন আসুক।
মার কথার প্রতিউত্তরে হাসলাম আমি। এরপর শান্ত কণ্ঠে বললাম
~ খোদা হাফেজ মা। রিহানের খেয়াল রেখো।

কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার পাশেই রেয়ান গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আশেপাশে সব মেয়েরা রেয়ানকে যেন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। যা দেখে আমার রাগ লাগছে না মোটেও। আমি তো আছি আমার তালে। আমার ভার্সিটির ফাস্ট ডে আজকে। কিভাবে কি করব সে চিন্তায় আমি শেষ। রিতিমতো নখ কামড়াচ্ছি। যা দেখে রেয়ান হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। কোনো মতে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন

~ এত নার্ভাসনেস এর কি আছে? ভার্সিটি যাবা আর ভার্সিটি থেকে আসবা। শেষ! এতে আবার এতো কি?
রেয়ানের কথা শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকালাম তার দিকে। ঝাঁঝাঁলো কণ্ঠে বললাম
~ তাহলে আমার জায়গায় আপনি যান না। তারপর বুঝবেন কত ধানে কত চাল।
~ তাই নাকি?
~ হুম তাই!

বলেই আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালাম না সেখানে। ভার্সিটির ভেতর ডুকে গেলাম। আমি নিশ্চিত! রেয়ানের সাথে থাকলে আমার মাথা নষ্ট হবেই হবে। তাই তার ধারের কাছেও না যাওয়া এখন আমার জন্য উত্তম।
ভার্সিটির প্রথমদিন বেশ ভালোভাবেই কাটলো আমার। সাথে অনেক নতুন নতুন বন্ধুবান্ধবও হলো। যাদের একজনের নাম রাফি। ছেলেটা অনেক ভালো। আমাকে প্রথম দিনই বিভিন্ন নোট আর পড়ালেখার বিষয়ে অনেক হেল্প করেছে।

সব ক্লাস শেষ করে আমি আর রাফি গল্প করতে করতেই হাঁটছিলাম। হঠাৎ সামনে তাকাতেই আমি থমকে যাই। রেয়ান চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারি সে তার হাত মুঠো করে রেখেছে। বুঝতে পারছি রেয়ান রেগে আছে। ভীষণ রকমের রেগে আছে। আর কেন রেগে আছে। সেটা হয়তো আমার অজানা নয়!

তাই তাড়াতাড়ি রাফিকে বিদায় জানিয়ে আমি রেয়ানের সামনে এসে দাঁড়াই। সাথে সাথে রেয়ান গাড়ির দরজা খুলে দেয়। যার অর্থ গাড়িতে বসো আমিও ভদ্র মেয়ের মতো গাড়িতে বসে পড়ি

প্রায় ১০ মিনিট হয়ে গেছে। আমি আর রেয়ান গাড়িতে বসে আছি। রেয়ান কেন যেন গাড়ি চালাচ্ছে না। শুধু বাইরের দিকে তাকিয়ে। ২হাত দিয়ে নিজের চুল টেনে ধরেছে। রেয়ানের কেমন লাগছে জানি না। কিন্তু এভাবে বসে থাকতে আমার প্রচন্ড বিরক্তি লাগছে। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই রেয়ান আমার দিকে ফিরে বসে। তারপর নিজের দু’হাত আমার গালে আলতো করে রেখে শান্ত কণ্ঠে বলে
~ ওই ছেলেটা কে ছিল?

কেন যেন রেয়ানের কথা শুনে গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না আমার। তবুও কিছুটা তোতলিয়ে বললাম
~ আজকে ননতুন ববন্ধুত্ব হলো ওর সাথে। আআমাকে অনেক হহেল্প করেছে পড়ার ববিষয়ে।
~ আর যেন না দেখি ওই ছেলের সাথে তোমাকে। ইনফেক্ট ও কেন! অন্য কোনো ছেলে সাথেও যেন না দেখি। নাহলে জানে মেরে ফেলবো তাকে। তারপর লাশও কেউ খুঁজে পাবে না।
কথাগুলো বেশ শান্ত ভাবেই বললেন রেয়ান। বলেই গড়ি স্টার্ট দিয়ে ড্রাইভ করা শুরু করে দেন। এদিকে আমি এখনও তার দিকে তাকিয়ে আছি। চোখ বড় বড় করে!

প্রায় কিছুক্ষন পর রেয়ান একটা পাহাড়ি এলাকায় গাড়ি থামান। যেখানে চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। প্রকৃতির যেন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখছি আমি। হঠাৎ রেয়ান আমার দুই বাহু শক্ত করে চেপে আমাকে তার দিকে ঘুরান। তারপর কিছুটা হালকা কণ্ঠে বললেন
~ আমার খুব ভয় হয় মিরা। যদি তুমি আমাকে ছেঁড়ে চলে চাও? তাই যতটা সম্ভব তোমাকে নিজের করে রাখতে চাই। বিয়েও তাড়াতাড়ি করতে চাচ্ছি। কিন্তু তুমিই করছো না। কিন্তু আর না। আমি এখন এই মুহুর্তে তোমাকে বিয়ে করব। তুমি চাও আর না চাও।

~ মানে?
~ মানে আমি তোমাকে এখন বিয়ে করছি! বিয়ে করতে কি যেন বলে? ও হ্যাঁ! কবুল। কবুল। কবুল। নাও! এখন থেকে তুমি আমার বউ!

পর্ব ১৩

মাঝরাতে হঠাৎ ফোনের রিং টোনে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। ফোন রিসিভ করে কানে দিতেই অপর পাশ থেকে উত্তেজনায় ভরা একটা কণ্ঠ ভেসে উঠে
~ মরুভূমি! এক্ষুনি বারান্দায় আসো। আমি তোমাকে দেখবো।

ব্যস এতটুকু বলেই ফোনটা কেটে দেয় রেয়ান। আমাকে কিছু বলার সুযোগও দেয় নি সে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় ৩টা বেজে ৪৫ মিনিট! এত রাতে রেয়ান কেন ফোন করেছেন আমাকে? তাছাড়া বারান্দায়~ ই বা আসতে বলছেন কেন?

এসব ভাবতে ভাবতেই আমি বারান্দায় চলে যাই। সেখানে যেতেই দেখি রেয়ান আমার বাসার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। লেমপোস্টের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চাহনী বরাবরের মতোই শান্ত! কিন্তু মুখে কেমন যেন ক্লান্তির ছাপ। আমাকে দেখেই মুচকি হাসলেন উনি। তারপর ইশারা দিয়ে বললে ফোন ধরতে

ভাবনার জগতে এতই ডুবে ছিলাম যে ফোন কতক্ষন ধরে বাজছে তার কোনো খেয়ালই না। তাড়াতাড়ি ফোন ধরে হ্যালো বলতেই অপর পাশ থেকে খুবই নরম গলায় রেয়ান বলে উঠেন
~ সরি! এত রাতে তোমাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য। আসলে
~ কোনো কি সমস্যা হয়েছে আপনার? এত রাতে এখানে আসলেন যে?
~ না এমনিই! তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। তাই চলে আসলাম।

কথাটা বলেই আরেকটু হাসলেন তিনি। খুব মায়াবী সে হাসি। ভুবন ভুলানো হাসি যাকে বলে! তার হাসি দেখে আমিও হাসলাম। হঠাৎ উনি আবার বললেন
~ নিচে আসতে পারবা একটু। কাজ ছিল!
~ এত রাতে?
~ তো? লুকিয়ে লুকিয়ে আসো তাড়াতাড়ি।

বলেই ফোন কেটে দিলেন। আমি তার দিকে অসহায় ভাবে তাকাতেই সে আবার ইশারায় একই কথা বললেন। কি আর করার! তার কথা মতো লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে লাগলাম বাইরে। বুঝতে পারছি না নিজের বাসায় নিজেই আজকে চোরের মতো চলাফেরা করছি। ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর!

কোনো রকম পা টিপে টিপে বাসার বাইরে গেলাম আমি। সেখানে যেতেই দেখি রেয়ান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাত দু’টো পেছনে রাখা আর মুখে। মুখে রয়েছে গম্ভীরতা! আমি তার কাছে যেতেই সে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। আমি তো অবাক! উনি আবার কি করতে চাচ্ছেন? পায়ে ব্যথা~ ট্যথা পেয়েছেন নাকি? আমার ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে উনি পেছন থেকে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ ধরলেন আমার সামনে। আর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
~ নাও তোমার ইচ্ছে পূরণ করলাম। এখন গোলাপগুলো নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো!

এতক্ষন অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেও এখন আমার মুখে পুরো বিরক্তির ছাপ। এভাবে কেউ প্রপোজ করে? লাইক সিরিয়াসলি? এটা কি ধরণের কথা! কিছুটা রেগেই বললাম

~ আপনার গোলাপ আপনার কাছেই রাখেন। পারলে পানি দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলেন।
বলেই রাগি ভাব নিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে লাগলাম। কি ভাবে কি সে আমাকে? প্রপোজের তো একটা সৌন্দর্য আছে তাই না? আর এ মানুষটা আমাকে বলে নাকি গোলাপগুলো নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো যত্তসব! কথার কোনো ধাঁঝ নেই উনার। দু’কদম যেতেই হঠাৎ রেয়ান বলে উঠেন

~ প্রেয়সী আমার! এত রাগ করো কেন তুমি? আচ্ছা। আমার প্রেয়সী কি জানে। তাকে রাগলে কতটা সুন্দর লাগে। #সেকিজানে তার ওই ভ্রু কুঁচকানো। রাগে লাল হয়ে যাওয়া নাক আর গাল। কতটা পাগল করে আমায়? নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তাকে বলো! আমার এই গোলাপগুলো নিতে। তাকে বলো! গোলাপটা নেওয়ার সময় যখন সে লজ্জা পাবে। তখন তার সেই লজ্জা মাখা মুখ দেখতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। ইচ্ছেটা কি পূরণ করবে সে?

কথাগুলো শেষ হতেই পেছনে ফিরলাম আমি। রেয়ান এখনও হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। তার কথা। তার চাহনী সবকিছু আমার মনে শিতলতা বইয়ে দিচ্ছে। সাথে বেশ লজ্জাও লাগছে আমার। ধীর পায়ে একটু একটু করে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। তারপর গোলাপগুলো নিয়েই সোজা দৌঁড় দিলাম বাসার দিকে। আর এক মুহুর্তও যে থাকা যাবে না তার সামনে। আমার লজ্জা যে বেড়েই যাচ্ছে। আমাকে যেতে দেখে রেয়ান হেসে দিলেন। আর বললেন
~ সকালে রেডি থেকো। আমি তোমাকে ভার্সিটি নিয়ে যাবো!

ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রেয়ান। আমি বিরক্তি মাখা চেহারা নিয়ে তাকে চেয়েই যাচ্ছি। আর সে। সে ব্যস্ত তার সানগ্লাস পড়া আর চুল ঠিক করা নিয়ে…
~ আপনার সমস্যা কি রেয়ান। আপনি এক্ষুনি যদি এগুলো বন্ধ না করেন। তাহলে আমি কিন্তু একাই ভার্সিটির ভেতর ঢুকে যাবো।

~ সেটার প্রয়োজন নেই বুঝলে। এখন চলো! তোমার জন্য এমনিতেই দেড়ি হয়ে গেছে।
কথাটা বলেই হাঁটা ধরলেন উনি। আর আমি তার যাওয়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছি। লাইক সিরিয়াসলি? আমার জন্য ভার্সিটির দেড়ি হচ্ছে। আর উনি যে এতক্ষন কি কতগুলো করলেন তার জন্য কিছু হয় নি। আসলেই উনি একটা অসভ্য। চরম অসভ্য!

তার যাওয়ার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আমিও তার পেছন পেছন যাওয়া শুরু করলাম। আমি আর রেয়ান একসাথে হাঁটছি হঠাৎ রাফি এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। খুব ভদ্রভাবে বলল
~ কেমন আছো মিরা?

~ আলহামদুলিল্লাহ! আপনি?
~ আমিও। আচ্ছা উনি কে? তোমার ফ্রেন্ড? (রেয়ানে দিকে ইশারা করে)
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই রেয়ান আমার হাত খুব শক্ত করে ধরলেন। তারপর রাফির দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
~ ও আমার ওয়াইফ।

কথাটা শুনে আমি আর রাফি দু’জনেই বিষম খেলাম। রাফি নিজের হাত রেয়ানের দিকে বাড়িয়ে কিছুটা হাসার চেষ্টা করে বলল,
~ কংগ্রেচুলেসন
রেয়ানও হাত মেলালো রাফির সাথে। তারপর প্রায় সাথে সাথেই রাফি সেখান থেকে চলে গেল। তা দেখে রেয়ান আমাকে বললেন,
~ ও মেবি তোমাকে পছন্দ করে।
~ কিভাবে বুঝলেন?

~ তার হাবভাব দেখেই বুঝা যাচ্ছে। শুনো। ওর থেকে দূরে থাকবা। নাহলে মনে আছে তো আমি কি বলেছি?
~ এখন আপাতত মনে রাখার প্রয়োজন বোঁধ করছি না। আপনি আমাকে এটা বলুন। উনাকে আপনি বললেন কেন আমি আপনার ওয়াইফ?

~ ওয়াইফ হও নি তো কি হয়েছে? হবা! তাছাড়া কালকে অর্ধেক বউ বানিয়ে ফেলেছি তোমাকে। বাকি অর্ধেকও বানিয়ে ফেলবো।

~ হুম! তাই তো এখনও বাসর করি নি। আসল বিয়েটা হোক। তারপর নাহয় বুঝবে কিভাবে বিয়ে হয় আর কিভাবে
বলেই চোখ টিপ মারলেন আমাকে! আর আমি মাথা নিচু করে আছি। কেন যেন খুব লজ্জা লাগছে আমার। উনি কি কিছু বুঝেন না? এভাবে বাইরে আমাকে লজ্জা দেওয়াটা কি ঠিক হলো তার? মোটেও না! মাথা নিচু করেই বিড়বিড় করে বলে উঠলাম।

লেখা – ইশানুর তাসমিয়া

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “সে কি জানে (১ম খণ্ড) – দু জনার গোপন সম্পর্কের গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – সে কি জানে (শেষ খণ্ড) – দু জনার গোপন সম্পর্কের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!