স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক

পাজরের টানে (সিজন ২ – ১ম খণ্ড) – Gopon bhalobashar kotha bangla

পাজরের টানে (সিজন ২ – ১ম খণ্ড) – Gopon bhalobashar kotha bangla: উঠতে যাবে তখনি হেচকা টানে তানভীর নিজের বুকে লুকিয়ে নেয় লাবিবাকে। লাবিবা মৃদু হেসে বুকের পাশে ছোট্ট করে একটা কামড় বসিয়ে দেয়। তানভীর আহ করে উঠে।


পার্ট ১

ভাইজান অনেক তো আলাপ হলো এবার মেয়েকে ডাকুন। মেয়ের চাদঁ মুখখানা দেখি এবার। মেয়ের যা গুনের কথা শুনলাম তাতেই তো পছন্দ করে ফেলেছি। এবার দর্শন করে বিয়ের ডেট ফাইনাল করেই যাই। বয়স আজকাল মেটার করে না। আমাদের ছেলেওতো সব কিছু গুছিয়ে নিতে নিতেই চল্লিশ এর কোঠায় পা রাখলো। মেয়েকে নিয়ে আসুন।

এতোক্ষণ লেগে থাকা মুখের হাসিটা টুপ করেই উড়ে গেলো ফারুক সাহেবের। কলিজার ভেতর থেকে হতাশা বের হয়ে আসতে থাকে যা চেহারায় প্রষ্ফুটিত হতে থাকে। মেয়ে দায় গ্ৰস্থ পিতা সে। এতো বছর থেকে কন্যাকে পাত্রস্থ করার চেষ্টায় বার বার পরাজিত হয়ে আসছেন। অথচ তার কন্যা যেন আল্লাহর নেয়ামত স্বরূপ তার ঘর আলো করে এসেছে।

তার সাথে এমন কেন হয়? জুটি ছাড়া কি পৃথিবীতে কেউ আসে? আসে না তো। তবে কেন তার মেয়ের জুটি যার সাথে বাধা তার দেখা মিলছে না? ভাইয়ের এমন আধার কালো হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে হাতের উপর হাত রেখে আশ্বস্ত করে জোহান। দোলাকে ইশারায় মেয়েকে আনতে বলে, সোফা ছেড়ে উঠে দাড়ায় দোলা। ভেতরের রুমে চলে যায় পাত্রীকে আনার জন্য।

জোহানের জেঠাতো ভাই ফারুক চৌধুরী। একি পরিবারে থাকে তারা। নিজের ভাইয়ের থেকেও বেশী সখ্যতা তাদের দু ভাইয়ের মাঝে। তেমনি দু ভাইয়ের মিসেস দের মাঝেও বোনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
ফারুক আর কথা বলছে না দেখে জোহান পাত্রপক্ষের সাথে কথা বলতে থাকে।

ভেতর রুম থেকে দোলা এগোয় পাত্রীকে নিয়ে। হাতের শরবতের ট্রে টা টি টেবিলে রেখে সালাম জানায় পাত্রপক্ষ কে। পাত্রের মা সালামের জবাব দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করতে থাকে কন্যা কে। হলুদ রংয়ের শাড়ি পড়া, সুন্দর স্বাস্থ্যবান বদন, আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা, মাথায় ইয়া বড় করে ঘোমটা দেওয়া, হাত দুটো শাড়ির আচলে ঢাকা, পা দুটোও শাড়িতেই ঢাকা।

পাত্রের মা অবাক হয় আজকাল যুগে এমন করে মেয়ে দেখানোর স্টাইল দেখে। পরক্ষণেই মনে হয় মেয়ে পর্দায় থাকতে বেশি পছন্দ করে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। এরকম ছেলেবউ পাওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। ইতোমধ্যে মেয়েকে সামনে বসানোও হয়েছে। খুশিতে বাকবাকুম হয়ে ছেলের মা মেয়ের ঘোমটা খুলতে বলে, দোলা আস্তে করে ঘোমটা তুলে দেয়।

খুশিতে বাকবাকুম করা মুখটা নিমেশেই মলিন হয়ে যায়। ছেলের মা, ছেলে, ছেলের বড় ভাই আর ভাইয়ের বউ সবাই সবার দিকে তাকি তুকি করতে থাকে। এই মুহুর্তে সৌজন্যতা বোধ না দেখালে নিজেদের সম্মানে আঘাত লাগতে পারে। তারা চায়না যে কেউ বলুক যে মেয়ে দেখতে এসে মেয়ের মুখ দেখেই কিছু না বলেই পাত্রপক্ষের লোকেরা চলে গেছে। এটা অনেক টা বেয়াদবি হয়ে যায় বলতে গেলে। তাই ছেলের ভাই গলা খাকারি দিয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করে,
~ আপু নাম কি তোমার? কেমন আছো তুমি?

~ সিদ্রাতুল ফারাহ চৌধুরী। আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?
~ এতক্ষন ভালোই ছিলাম। মানে ভালো আছি। সবাই ভালো আছি আমরা।
ছেলের ভাইয়ের কথার ধরনে বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে যে তাদের পছন্দ হয়নি। হবেই বা কি করে? বয়স একত্রিশের কোঠায় কয়েক মাস আগেই পা রেখেছে। মা ~ ছোটমা যতই বলুক দেখতে ছোট ছোটই লাগে তবুও বয়স তো থেমে থাকে না আর। আর গায়ের বর্ণের কথা _
ছেলের মা বললো,
~ দেখি মা তোমার হাত দুটো।

ফারাহ হাত দুটো এগিয়ে দেয়। হাত না ধরেই ছেলের মা বলে, উঠে ~ ফারুক ভাই। আপনার মেয়ে সব দিক থেকেই মাশাআল্লাহ আমাদের পছন্দ হয়েছে। শুধু মেয়ের গায়ের রং টা একটু চাপা। আমার ছেলে দেখুন ধবধবে সাদা একেবারে ফরেনার দের মতো। আমার ছেলের সাথে কথা বলে, দেখি একটু। আমরা বাসায় গিয়েই আপনাকে জানাবো। কিছু মনে করবেন না কেমন হ্যাঁ। আমরা এবার আসি।

জোহান তোড়জোড় করে বলে, উঠলো ~ কিছু তো মুখে দিলেন না। একটু মুখে দিয়ে যান। আপনারা আমাদের অতিথি কিছু মুখে না দিয়েই চলে যাবেন এইটা কেমন দেখায় বলুন। ছেলের ভাই বলে, আংকেল আজ থাক। আমরা একটু আগে খেয়েই এসেছি। আসি আমরা। আসসালামু আলায়কুম।

ছেলের পরিবার চলে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফারুক সাহেব। স্ত্রী মাধুজা কে ইশারায় ঘরে আসতে বলে, নিজেও চলে এলেন। খাটে এসে শুয়ে পড়লেন চিৎ হয়ে বড় ক্লান্ত লাগছে কেন জানি। মাধুজা এসে এভাবে শুয়া দেখে রাগ দেখিয়ে বললেন ~ সেই সকাল থেকে রান্নাবান্না করে ক্লান্ত হলাম আমি আর উনাকে দেখুন সকাল থেকে আরামে বসে থেকে এখন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন রাজ্যের কাজ করে এসেছেন। বলি এতো কষ্ট করে প্রতিবার কেন রান্না করাও আমাকে? সেইতো না খেয়েই চলে যায় সবাই। আমার কষ্টটা কি তোমার চোখে পড়ে না? জানোই তো এমন হবে তবুও তোমার সেই দশ পদ করতেই হবে। এখন যাও সব গিল গিয়ে।

ফারুক জানে যে বকবকানি টিং মেশিন চালু হওয়ার প্রথম ধাপ এটা। এখনি কেটে পড়তে হবে তাই উঠে রুমের বেলকনিতে এসে মোড়ায় বসে পড়লো।
জিন গত একটা বৈশিষ্ট্য আছে বলে, জানা আছে। ফারুকের মামা ছিল ব্লেক ম্যান। কালো বলে, তাকে সবাই ব্লাক ম্যান বলেই ডাকতো। তার এপার গোষ্ঠী আর ওপার গোষ্ঠীতে তিনিই একমাত্র ব্লাক ম্যান ছিল। সেই বৈশিষ্ট্য যে তার মেয়ে ফারাহ এর মাঝে এসে স্থায়ীরুপ ধারন করবে কে জানতো সেটা?

হটাৎ চপ চপ আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। যখন কোন কিছু চেটে খাওয়া হয় তখন এইরকম শব্দ ‌বের হয় মুখ থেকে। আশে পাশে থেকেই শব্দ টা আসছে। ফারুক উঠে খুঁজতে থাকে শব্দের উৎস টিকে। চোখ কপালে উঠে যায় ফারুক সাহেবের। বেলকনির একপাশে কয়েকটি পাতাবাহার গাছ রাখা আছে। সেই গাছের ভিতরের দিকে বসে সারা মুখ হাত জামাতে আইসক্রিম লাগিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে। ফারুক সামনে গিয়ে বসে বলে, জারা মামনি।

জারা চমকে উঠে সামনে তাকিয়ে দেখে ফারুক বড় বড় চোখ করে বসে তার দিকে তাকিয়ে। হাত থেকে আইসক্রিম টা পড়ে যায় কোলের উপর বিছানো বড় চুল গুলোর উপর। মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসে ~ জেঠু।
~ এখানে বসে চুরি করে আইসক্রিম খাচ্ছিস মামনী।

জারা কি বলবে বুঝতে পারছেনা। তাই আমতা আমতা করে উঠে এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে আসে।
রুমে এসে সোজা বাথরুমে গিয়ে ঢুকে। আইসক্রিম ধুইতে গিয়ে পুরো ভিজে যায়। শেষমেষ লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে বের হয়। বের হতেই দেখে রুগ্নমূর্তি ধারন করে দোলা কোমরে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে। কলিজার সব মিঠা পানি শুকিয়ে যায়। ঢুব গিলে দেখে গলা শুকিয়ে গেছে। দোলা হুংকার ছেড়ে দেয় ধমক জারা কে। জারা কাঁপতে থাকে।

“সব তোর পাপার দোষ। পাপার আস্কারা পেয়ে আজ তুই গোল্লায় গেছিস। এই বয়সেই কথা শুনিশ না তাহলে আরেকটু বড় হলে কি করবি? হায় হায় রে এই মেয়েকে নিয়ে কি করি আমি। আমার কি হবে। আমি তো সন্তান হীন মা হয়ে যাবো গো। ওরে তোর যে আইসক্রিম খাওয়া একেবারেই নিষেধ তুই কি সেটা ভুলে গেছিস? মরবি মরবি ঠান্ডায় মরবি তুই। তখন কান্না কাটি করিস। আমি একটুও চেয়েও দেখবোনা তোর দিক।

দরজায় দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ শুনছিল জোহান। দোলার মুখ বন্ধ হবার নাম নেই দেখে দোলার কাছে এসে মুখ চেপে ধরে। দোলা রাগি চোখে তাকাতেই জোহান হাত সরিয়ে নেয় মুখ থেকে। দোলা এবার জোহানকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে ~ তাইতো বলি। সব কিছুর পেছনে তুমি। মেয়েকে আইসক্রিম কে এনে দিয়েছে বলো। তুমি দিয়েছো বলো তাইনা? আমার মেয়েকে মারতে চাও তুমি?

~ আরে আমি কি সৎ বাবা নাকি যে মারতে চাইবো? আজব আজব কথা বলো তো দেখি তুমি। হয়তো বাইরে যখন গিয়েছিল তখন কিনে নিয়েছে। আমি কেন আইসক্রিম কিনে দিবো?
~ জারা কই থেকে কিনে। একি কোথায় গেলো?

~ ইশ তোমার বকবকানিতে কেউ ঘরে টিকতে পারে না। আমার মেয়েটাও থাকতে পারলো না। হায়রে কপাল।
~ কিহহহহহ?
~ কিছুনা। বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় জোহান।

“এই পথ যদি না শেষ হয়।
তবে কেমন হতো তুমি বলোতো”
“তুমি বলো।”
“এই পৃথিবীটা যদি সপ্নের দেশ হয়। তবে কেমন হতো তুমি বলোতো।”
“ভীষন পচা হতো।”
“কেন কেন বউপাখি?”
“কারন সপ্নেতো সপ্নের পৃথিবি দেখিই। এখন যদি বাস্তব পৃথিবীও সপ্ন হয়ে যায় তাহলে একি রকম দুটো পৃথিবী মোটেই ভালো লাগবে না।”
“হা হা হা। তাই নাকি? তো আমি তোমার কোন পৃথিবীতে আছি বউ পাখি?”
“দুটোতেই।”

“তাহলে দুটো এক হয়ে যাক। অর্ধেক অর্ধেক করে দু পৃথিবী তে থাকা আমার জন্য কষ্টকর। এর থেকে এক পৃথিবীতে তুমি আমার পুরোটাই নিয়ে নাও।”
“যাহ তা হয় নাকি? আপনার পুরোটাকে নিয়ে আমি রাখবো কোথায়?”
“কেন তুমিই তো বলো আমি নাকি তোমার হৃদয়ে থাকি। সেখানে নাকি অনেক জায়গা। তো সেখানে রাখবে।”
“হি হি তখন গাড়ি টাকি আপনার দাদা এসে চালাবে?”

“একদমি না।”
তখনি ফোন বেজে ওঠে। ফোনের স্কিনে তাকিয়ে দেখে সরোয়াজ কল দিয়েছে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোন পিক করে তানভীর। কানে লাগিয়ে দেয় এক ধমক।
“তোদের জন্য লং ড্রাইভে এসেও শান্তি নেই। সারাদিন তো আমার বউ পাখি টাকে তোরাই নিয়ে রাখিস। এখন একটু লং ড্রাইভে বের হয়েছি তাও তোদের সহ্য হচ্ছে না বুঝি?”

সরোয়াজ তাজ্জব বনে এক পলক ঘুরে আসে। মিম পাশ থেকে বলে, “এই কি হলো?”
সরোয়াজ মিমকে বললো, “আচ্ছা আমিতো ভাবিকে নিজের কাছে রাখিনা সারাদিন। তুমি কি রাখো?”
মিম বললো, “আমার কাছে কিভাবে রাখবো বলো? প্রায় সময়ই ভাইয়া বাসায় থাকে। লাবিবাকে একপলক দুরে সরতে দেয় না। লাবিবাই যা জিদ করে কাজের জন্য বাইরে থাকে।”

“ওহ”
“তো ভাইয়াকে বলো যে আমরা তার গাড়ির সামনেই আছি।”
সরোয়াজ বলতে যাবে দেখে অনেক আগেই তানভীর কল কেটে দিয়েছে। আবার ব্যাক করে সরোয়াজ। তানভীর রিসিভ করে বলে,
“আবার কি?”

“তোমার গাড়ির সামনের গাড়িতে আছি আমরা। লং ড্রাইভে আমরাও এসেছি। পেছনে খেয়াল করতেই দেখি তোমাদের।”


পার্ট ২

সারাদিন লং ড্রাইভে থাকার কারনে ক্লান্ত হয়ে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে তানভীর। লাবিবা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে ড্রেস চেঞ্জ না করেই বিভোরে ঘুমোচ্ছে। পায়ের জুতো পর্যন্ত খুলে নি। রুমের লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জালিয়ে দেয়। খাটের কোনায় এসে বসে তানভীরের জুতো গুলো খুলে দেয়। শার্টের বোতাম গুলো একটা একটা করে গুনতে থাকে আর খুলতে থাকে। নতুন শার্ট তাই বোতাম গুলো খুবই শক্ত। অনেকক্ষন যুদ্ধ করার পর অবশেষে ছয়টি বোতাম বোতাম ঘর থেকে ছাড়াতে সক্ষম হয়।

উঠতে যাবে তখনি হেচকা টানে তানভীর নিজের বুকে লুকিয়ে নেয় লাবিবাকে। লাবিবা মৃদু হেসে বুকের পাশে ছোট্ট করে একটা কামড় বসিয়ে দেয়। তানভীর আহ করে উঠে। লাবিবাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলা সাসিয়ে বলে,
~ খুব দুষ্টু হয়ে গেছো দেখছি বউপাখি।
~ তুমিও কিন্তু খুব দুষ্টুমি করছো। না ঘুমিয়ে ঘুমের ভান ধরে সুয়ে আছো। আমি তো ভেবেছিলাম সত্যিই টায়ার্ড তুমি তাই ঘুমিয়ে গেছো।

~ ঘুমিয়েছিলাম তো। যুদ্ধের সময় কি ঘুমানো যায় নাকি? যেভাবে যুদ্ধ করছিলে আমার শার্টের বোতামের সাথে, না জানি বোতাম গুলো সম্পুর্ন অবস্থায় নিজেকে ঠিক রাখতে পেরেছে কিনা।
লাবিবা নিভল। পরক্ষনেই রাগ দেখিয়ে বললো,
~ পাশেই আছে দেখে নাও তোমার প্রিয় শার্টের বোতাম গুলো ঠিক আছে কিনা।
~ আপাদতো বোতাম দেখার কোন শখ নেই আমি অন্য কিছু দেখতে বিজি আছি। দেখবে?
~ কি?

~ সরি ঐটা শুধু আমিই দেখতে পাই তুমি পাও না।
লাবিবা বুঝে গেল। লজ্জা পেয়ে তানভীরের বুকে মুখ লুকালো। জড়িয়ে ধরে এক নৈস্বর্গীক সুখে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ গিয়ে বসে আছে মিম। সবাই খাওয়া শেষ করে একে একে উঠে গেলো কিন্তু মিম এখনো খেতে পারে নি। খাবার দেখে তার বমি আসছে।

তবুও ক্ষুদার কারনে টেবিল ছেড়ে উঠছে না। শেফ তার জন্য আচার আনতে গিয়েছে। আচার এনে দেখে মিম টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সামনে দাঁড়িয়ে তুষার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে মিম কে। শেফ তুষারকে দেখে খুশি হয়ে ডাকতে যাবে তখনি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শেফ কে চুপ করিয়ে দেয়। বড় বড় ভাব নিয়ে শেফ এর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ডোন্ট টক। ছোট নানু মনি স্লিপিং।

শেফ মিটি মিটি হাসে। আচারের প্লেট টা হাত থেকে নিয়ে এসে টেবিলের উপরে উঠে দু পা মুড়ে বসে। হাত দিয়ে আচার নিয়ে একটা করে চাট দিচ্ছে আর মিম কে দেখছে। অর্ধেক আচার খাওয়ার পর দাত টক হয়ে যায়। আর খেতে পারছে না। মিমের দিকে এগিয়ে এসে বসে। আচারে একটু পানি ঢেলে সুন্দর করে মেখে ঝোলা আচার বানিয়ে নেয়। তারপর মিমের মুখে আর চুলে হাত দিয়ে একটু একটু করে আচার নিয়ে ফুল আকাতে থাকে। এদিকে সরোয়াজ হসপিটালে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নেমে আসে। ডাইনিং এর উপর তুষার কে দেখে বলে, উঠে
~ আরে নানু ভাইযে। কখন এলে তুমি? মাম্মা আর পাপা আসে নাই?

হাসতে হাসতে কথা বলতে বলতে এগিয়ে এসে মিমের দিকে চোখ পড়তেই চিৎকার করে উঠে। মিম চিৎকার শুনে ধরফরিয়ে উঠে নিজেও চিৎকার করে উঠে। কারন ঘুম থেকে উঠেই তার সামনে মীররের দিকে চোখ পড়ে যায়।
লাগেজ নিয়ে বাসায় ঢুকার সময় ভিতরের চিৎকার শুনে লাগেজ রেখেই ভিতরে দৌড়ে চলে আসে তয়্যইবা। সে খুব ভালো করেই জানে তুষার ভিতরে গিয়েছে মানে নিশ্চয় কিছু একটা বাধিয়েছে। এসে দেখে মিম এর চুল মুখ আচার দিয়ে মাখো মাখো।

তুষার হাতে আচারের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের কপালে নিজেই একটা বাড়ি দেয়। সে যা ভেবেছিলো তাই হয়েছে। রেগে তুষারের দিকে এগোতে থাকে। তার আগেই মিম তুষারকে কোলে নিয়ে উপরের দিকে রোওনা দেয়। বাথরুমে এসে তুষারের হাত ধুয়ে দেয় আর নিজেও ফ্রেশ হয়ে নেয়। তুষারকে এনে বিছানায় বসিয়ে দিতে গেলে তুষার কোল থেকে না নেমে বলে,
~ ছোট নানু আমি নামবো না তোমার কোলে থাকবো। তুমার কোলে থাকতে ইচ্ছা করে আমার শুধু।

~ কেন রে? আমার সাথে যখন দুষ্টুমি করিস তখন কি মনে থাকে না যে আমার কোলেই তোকে উঠতে হবে।
~ তাইতো করি। দুষ্টুমি না করলে তো মাম্মা আমাকে বকবেনা আর তুমিও আমাকে কোলে তুলে নিবে না।
~ ওরে দুষ্টু। কে শিখিয়েছে তোকে এসব হুমম?
~ তাফিফ মামা।
~ কিহহহ?

~ হুম।
মিম মাথায় হাত দেয়। কেমন ছেলে তার এই ছোট্ট ভাগিনা টাকে পড়া শুনা, ছড়া, গল্প এগুলো না শুনিয়ে এসব দুষ্টুমি শিখাচ্ছে। ভাবা যায় এগ্লা?
উপুড় হয়ে শুয়ে নিচের ঠোঁট উপরের ঠোঁটের উপর তুলে সুখের নিদ্রায় আছে জারা। পরনে পিংক কলার গেঞ্জি আর হুয়াইট কালার প্লাজু পড়া। দুটোর একটাও ঠিক জায়গায় নেই। এক পায়ের প্লাজু হাটুর উপর উঠে আছে। গেঞ্জি পিঠের দিয়ে কিছুটা উপরে উঠে আছে। ধবধবে পিঠ টায় চোখ দুটো আটকে গিয়েছে। একটি বার খুব ছুয়ে দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু কোথা থেকে যেন প্রবল বাধা এসে হাত দুটোকে অদৃশ্য শক্তিতে বেধে রেখেছে। কিন্তু মন তো বেধে রাখা যায় না। একবার হাতটাকে জারার দিকে এগুচ্ছে তো একবার পিছোচ্ছে।

বার বার এমন করতে করতে একবার ছুয়েই দিলো বেরিয়ে থাকা দৃশ্যমান পিঠটুকু। ঘুমন্ত জারার কোন অনুভুতিই হলো না কিন্তু তাফিফ ঠিকই কেপে উঠলো। এক টানে হাত সরিয়ে নিলো। জারাকে কয়েকবার ডাকলো কিন্তু বেচারার ঘুমে একটুও ফোড়ন কাটতে পারলো না।

একঘন্টা থেকে এসেছে তাফিফ জারাদের বাসায়। জারার রুমে একটানা থাকতে পারছে না বাকিরা যদি কিছু বলে, সে জন্যে। এদিকে যার জন্যে আসা সেও বিভোরে ঘুমোচ্ছে। উঠার নাম নেই। দোলা বার বার খাওয়ার জন্য এসে ডেকে যাচ্ছে তাফিফ কে। শেষ মেষ খেয়েই আসলো। এসেও দেখে জারা ঘুমোচ্ছে। এদিকে জারার রুমেও থাকতে পারছেনা। যেভাবে এলোমেলো হয়ে ঘুমোচ্ছে এতে মাথা একটু খারাপ হওয়ার কথাই। উপায়ান্তর না দেখে তাফিফ খাটের গিয়ে কাপড় টেনে জারাকে ঠিক ঠাক করে দেয়। তার জোরে একটা ডাক দেয়
~ বেনীওয়ালি।

জারা ধরফরিয়ে উঠে বলে,
~ কই কই আমার আইসক্রিম কই? আইসক্রিম।
তাফিফ পারেনা নিজের মাথায় নিজে বাড়ি দেয়। কতক্ষণ থেকে এই মেয়ের ঘুম ভাঙার অপেক্ষা করছে সে আর এদিকে উঠতে না উঠতেই আইসক্রিম বলে, চিল্লাচ্ছে। একটু শান্ত হয়ে বলে,
~ সত্যি করে বলতো আমাকে কি তুই আইসক্রিম ফ্যক্টরি ভাবিস? উঠেই আইসক্রিম আইসক্রিম বলে, চিল্লাচ্ছিস কেন এভাবে?
জারা এবার নেকা কান্না শুরু করে দেয়।
~ কিরে কাঁদছিস কেন? এই শুন আমার সামনে একদম কাদবিনা। তোর কান্না আমি একদমি সহ্য করতে পারি না( আস্তে করে )।
~ আমি কতো সুন্দর আইসক্রিম এর খনি গোয়েন্দাগিরি করে উদ্ধার করতে গিয়েছিলাম। আর তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলে, নিয়ে চলে এলে। আমার আইসক্রিম।
~ সপ্নেও তুই আইসক্রিম এর খনি দেখিস?

জারা মাথা নাড়ায়। তাফিফ মুখ ঘুরিয়ে বসে ভাবতে থাকে
“তুই তোর আইসক্রিমের জায়গায় কবে আমার নামটা বসাবি বেনিওয়ালী? কবে কল্পনায় আইসক্রিম না দেখে আমার মুখটা দেখবি? তোর জন্য কতো অপেক্ষা করতে হবে আমাকে? যতো বড় হচ্ছিস ততোই আমি তোর মাঝে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছি। তোকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিনগুলো পার করছি। কবে বুঝবি তুই আমায়? কবে আমার গহীন সমুদ্রে তোর পা দুটো ভেজাবি? বয়সে বড়ো হচ্ছিস তো মাথায় কি একুটুও ঘিলুটা বড় হচ্ছেনা? কিবা আর বলবো তোকে? মাত্র চৌদ্দের কোঠা পেড়িয়ে পনেরোই পা রাখলি। আর আমি এখন ছাব্বিশে গড়াগড়ি খাচ্ছি। একটু তারাতারি বড় হ নারে বেনিওয়ালী। তোকে যে আমার চাই চাই।”

জারা তাফিকে ভাবান্তর দেখে বলে, ভাইয়া তুমি ভাবতে থাকো আমি আম্মুর কাছ থেকে খেয়ে আসি।
জারা বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে হাঁটা দিতেই তাফিফ লম্বা বেনীটা টেনে ধরে।
~ আহ আমার লাগছে ভাইয়া।
~ ওরনা নিয়ে যা।

জারা খেয়াল করে তার গায়ে উড়না নেই লজ্জা পেয়ে যায়। ওরনা খুঁজতে খাটের উপর। তাফিফ অন্যদিকে তাকিয়েই বলে, ~ ওড়না ফ্লোরে দেখ পড়ে আছে। জারা ওড়না তুলে নিয়ে দৌড়। পিছে পিছে তাফিফ ও বেরোলে। সোফায় বসা জোহান কে দেখতে পেয়ে পাশে গিয়ে বসলো। জোহান তাফিফের কাধে হাত রেখে বললো,
~ হ্যলো ইয়া মেন। হুয়াটস আপ?
~ অল গুড।

~ ডক্টরি কেমন চলছে বলো?
~ মাত্র তো জয়েন করলাম আংকেল। আস্তে আস্তে পপুলারিটি বাড়বে।
~ হুম একদম বাবার মতো ফেমাস হতে হবে।
~ অবশ্যই আংকেল।
এভাবে দুজনের কথা চলতে থাকলো।

জারা খেয়ে এসে দেখে তাফিফ তার বিছানায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে। জারা সামনে এসে বসে বলে, বললো,
~ খাওয়া শেষ।
তাফিফ ভ্রু কুঁচকে জারাকে পর্যবেক্ষণ করছে। জারা এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাচুমাচু হয়ে বসলো।
~ এভাবে কি দেখছো ভাইয়া?
~ দেখছি তুই কতোটুকু মোটা হলি।
~ আমি তো আইসক্রিম না খেয়ে না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছি। সেই কাল দুপুরে আইসক্রিম শেষ হয়েছে। আর তুমি বলছো আমি মোটা হয়ে গেছি?

~ বুঝলাম। এর জন্য বুঝি টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট তোর খেতেই লাগলো। কতোটুকু যে খেয়েছিস তা ভালো করেই জানি। ভাইয়া কথা বলবে তোর সাথে। তুই নাকি ফোনে কথা বলছিস না ভাইয়ার সাথে।
তাফিফ ভিডিও কল দিয়ে ফোনটা এগিয়ে দিলো জারার দিকে। জারা ফোনটা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলো।
ঐদিকে লাবিব বার বার জারাকে হাই দিচ্ছে। আর এদিকে জারা লাবিবের দিক তাকিয়ে আছে। লাবিব এবার ধমক দিয়ে বলে,
~ কথা বলিস না কেন? মুখে কি কুলু পেতেছিস? ফোন ধরিস না কেন আমার?
~ আমার মন খারাপ তাই।

~ কেন? মন খারাপ কেন?
~ বাড়ির অবস্থা ভীষন খারাপ।
~ কেন কি হয়েছে বাড়ির? সবাই ঠিক আছে তো?
~ কিচ্ছু ঠিক নেই। আপুকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছিল। আমার রিজেক্ট করে দিয়েছে। তার জন্য পুরো বাড়িতে থপ থপ গপ গপ কোন আওয়াজ নেই শুধূ শুনশান হয়ে আছে। তাই আমারো মন খারাপ।
~ বুঝলাম। তো তোর আপুর কি খবর?

~ আপুতো।
~ আপু কি?
~ বলবোনা।
~ কেন?

~ আপু বলে, ছে আপুর কথা আর ঘরের কথা কারো সাথে শেয়ার করতে নেই। আপুর কথা তো ভুলেই বলা যাবে না।
~ আমি কি তোর আপুর কথা আগ বাড়িয়ে শুনতে চাই নাকি? তুই তো বলে, বলে, আমার অভ্যাস করে দিয়েছিস। আর এখন বলছিস বলবিনা। তাফিফ কে দে ফোনটা। তোর রুমে আইসক্রিম ডেলিভারি হওয়া বন্ধ।
~ এই না না প্লিজ। এটা করো না। লক্ষি ভাইয়া আমার। আমার কোন, আমার ভ্যনিলা, আমার চকোলেট আইসক্রিম তুমি। আমার আইসক্রিমের খনি। তুমি যা বলবে সব শুনবো আমি।
~ হুম। এবার বল তোর আপু কোথায়?

~ আপুতো আপুর রুমে। রুম থেকে বের হয়না। বের হলেই জেঠুর মুখ দেখে আপুর মন খারাপ হয়ে যায়।
~ আচ্ছা বুঝলাম। আমি কিছুদিনের মধ্যেই আসছি।
~ সত্যিই? হুররাহ। _।
~ হুম। ভালো থাকিস। বাই।
~ বাই।

জারা এসে তাফিফ কে ফোনটা দেয়। তাফিফ ফোন হাতে নিয়ে বলে,
~ আসিরে বেনিওয়ালী। তোর জন্য অনেক টাইম লস হয়ে গেলো। হসপিটালে পৌঁছতে আরো একঘন্টা টাইম লাগবে যদি জ্যাম না থাকে আর কি।
তাফিফ বেরোতে নিলে দেখে জারা বসে আছে। মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তাফিফের।
~ কিরে বেনিওয়ালী তোরে কি আবার রিমেমবার দিতে হবে? কতো বার বলে, ছি আমি যাওয়ার সময় আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসবি।

জারা রাগ দেখিয়ে তাফিফের আগে আগে বের হয়ে যায়। লোকটা পেয়েছেটা কি আমাকে? যখন তখন ধমকায়। আইসক্রিম যদি না এনে দিতো তাহলে জীবনেও শুনতাম না খবিশটার কথা।
তাফিফ বাড়ির সবাইকে বলে, বেড়িয়ে আসে। জারা তাফিফের পেছন পেছন গেইটের দিকে আসে। গেইটে দাঁড়িয়ে পড়ে তাফিফ। পেছন দিক ঘুরে বলে,
~ বেনিওয়ালী শুন।

জারা সামনে এসে দাঁড়ায়।
~ যতটুকু পারিস ঠিক ঠাক হয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করবি। আর ওড়না ছাড়া যদি আর কখনো না দেখি। মনে থাকবে?
~ হুমম।
~ ভিতরে যা।
জারা ভিতরে ঢুকার পর তাফিফ ও চলে আসে।


পার্ট ৩

জারা রুমে এসে একোনা, ওকোনা, খাটের নিচে, বেলকনিতে, আলমারির উপরে সারা ঘর উলট পালোট করে দিয়েছে। দোলা আর মাধুজা পুরো রুমের অবস্থা দেখে মাথা চুলকাতে থাকে।

মাধুজা ~ দোলা আজকি সুনামি এসেছিলো? আমি এতোই ঘুমোলাম যে সুনামি এসে বয়েও গেছে কিছুই বুজতে পারলাম না।
দোলা কি বলবে মাধুজাকে বুঝতে পারছে না। তার তো এখন নিজেরি মনে হচ্ছে সুনামি এসেছিলো তার অগোচরেই। পরক্ষণেই মেজার হাই টেম্পারাচারে উঠে যায়। জারা বলে, দেয় একটা ধমক। জারা একমনে তার কাজ করেই যাচ্ছিলো।

মায়ের ধমকে কেপে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দোলা চেঁচিয়ে বলে, উঠল
~ কি করেছিস রুমটার দেখ একবার। এগুলো কি তোর পাপা এসে গুছিয়ে দিবে? নিজে তো কিছুই করতে পারিস না। আমাকেই তো সব ঠিক ঠাক করতে হবে। মাসে কত টাকা দেয় তোর পাপা আমাকে তোর কাজ করার জন্য? যাই হোক কি খুঁজছিলি বলতো এইভাবে?

দোলার ভ্রু কুঁচকে তাকানো দেখে জারা ভয়ে ঢুক গিলে। ঠোঁট নাড়িয়ে বির বির করতে থাকে।
এতোক্ষণ ঠিক ছিল কিন্তু এই প্রশ্ন টাই কেন করতে হলো? এতোক্ষন এই ভয়টাই তো পাচ্ছিলাম যে কখন আম্মু বুঝে ফেলবে যে আমি কিছু খুজছিলাম। আমি তো আইসক্রিম খুঁজছিলাম। তাফিফ ভাইয়া প্রত্যেক বার এসে তো আইসক্রিমের বক্স এখানে ওখানে যেখানেই পারে লুকিয়ে রেখে চলে যায়। তারপর আমি খুজে বের করে নেই। কিন্তু এবার কেন পাচ্ছিনা? তবে কি এবার আইসক্রিম আনেনি তাফিফ ভাইয়া?

দোলা মেয়েকে বির বির করতে দেখে বলে,
~ কিরে পাগল টাগল হলি নাকি? কি একা একা বলছিস বির বির করে? বুঝেছি কিছুই বলবিনাতো। বলতে হবে না। আপাদতো ঘর থেকে বের হ। আমি গুছাবো। আপুর কাছে যা। গিয়ে দেখ আপু কি করে।
দোলা আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। তার ভয়ের কোন কারন নেই। কারন আইসক্রিম যদি থাকতো তাহলে সে ঠিকই পেয়ে যেতো। তাই নিশ্চিন্তে ফারাহ এর কাছে চলে আসে।

ফারার রুমের দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে যায়। জারা ভিতরে ঢুকে ফারার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে কয়েকবার। কিন্তু কোন লাভ হয় না। ফারা ল্যাপটপ এ প্রেজেন্টেশন রেড়ি করতে ব্যস্ত। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করে জারা। মোটামুটি যা বেতন পায় তাতে একটা নিম্ন দরিদ্র পরিবারের খুব সুখেই দিন কেটে যাবে। আগামী পরশু অফিসে প্রেজেন্টেশন টা জমা দিতে হবে। তাই সে জারার দিকে খেয়াল করে সময় নষ্ট করলো না। অগত্যা জরা ফারার কথা মাথা থেকে আউট করে তাফিফ কে ইন করলো। হাত দুটো পিছনে গুজে রুমের ভিতর চিন্তিতো মুখ করে পায়চারি করতে থাকে। ফারাহ একবার দেখে আবার নিজের কাজে মন দেয়। জারা ফারারর কাছে গিয়ে বলে, আপু তোমার ফোনটা একটু দাও তো। আমার ইমপর্টেন্ট একটা কল করার আছে।

ফারাহ জারার কথার ভাব সাব দেখে অবাক হয়ে যায়। ইমপর্টেন্ট কল করবে তাও আবার এই পুচকিটা। জারা বিছানায় উঠে বালিশের নিচ থেকে ফোনটা নিয়ে আরাম করে বসে। তার পর তাফিফের নাম্বার তুলে ডায়াল করে।
রোগী দেখতে ব্যস্ত ডক্টর তাফিফ খান। একটার পর একটা রোগী দেখেই চলেছে। একটু রেস্ট নেওয়ার সময় নেই তার। ফোন বাজতেই কেটে দেয় তাফিফ। রেগে যায় জারা। আবার ডায়াল করে। কিন্তু এবার কেটেও দেয়নি আবার রিসিভ ও করেনি। তাই একটার পর একটা কল দিতেই থাকে। তাফিফ না পেরে সাথে থাকা সিস্টারকে ইশারায় পিক করতে বলে, সিস্টার ফোন কানে ধরণেই কান ফাটানো এক বিকট বাক্য শুনতে পায়। বাক্যটি ছিলো ~ আমার আইসক্রিম কোথায়?

এমন কিছু শুনবে সিস্টার ভাবেও নি। আমতা আমতা করে বলে, আইসক্রিম তো ফ্রিজে থাকে।
মেয়ে কন্ঠ শুনে জারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ~ আপনি কোথায় থাকেন?
~ আমিতো তাফিফ স্যার এর সাথেই থাকি।

এবার যেন ৪৪০ ভোল্টের শক খায় জারা। টুপ করে ফোনটা কেটে দেয়। চিন্তায় তার মাথা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। একটু আইস ব্যাগ লাগালে মনে হয় গরম লাগতো। স্কুলে যারা বাড়িতে না জানিয়ে লাভ লাভ খেলে তারাতো একসাথে থাকে একসাথে বসে। তাহলে কি তাফিফ ভাইয়াও লাভ লাভ খেলে? এতো বড় কিছু ঘটে যাচ্ছে আর কেউ জানবে না তা কি করে হতে দেওয়া যায়? এতে যদি রেগুলার আইসক্রিম আর শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

দোলা আর মাধুজা দু জা মিলে রান্নায় ব্যস্ত। পিছনে যে জারা সেই কখন গিয়ে দাঁড়িয়েছে কারো খেয়াল নেই। দুজনে কোমড়ে শাড়ির আচল গুজে গল্প করছে আর রান্না করছে। জারা গিয়ে পেছন থেকে দোলা কে জড়িয়ে ধরলো। হুট হাট এভাবে জড়িয়ে ধরা মানে জারার বায়না জুড়া হবে। পেছন ঘুরে বলে, কি আম্মু? মন খারাপ নাকি? মুখটা ওমন করে আছিস কেন?

জারা কাদো কাদো ভাব ধরে বলে,
~ আম্মু আমি সেইযে কতো বছর আগে আমার গুলুমুলু খালামনি টাকে দেখেছিলাম। এখন সে দেখতে কেমন হয়েছে কিচ্ছু জানি না। খালামনি টি বুড়ি হয়ে গেছে আম্মু? আচ্ছা খালামনির দাত পড়েছে? কয়টা দাত আছে আর? আচ্ছা খালামনির কয়টা চুল পেকেছে? সামনের গুলো নাকি পেছন গুলো?

~ কি মতলব রে তোর? এক মাস ও হয়নি আপুই এবাড়ি থেকে গেলো দুদিন। আর তুই এইসব কি আজাইরা কথা বলছিস?
মাধুজা ~ জারা আম্মু তোর কি খালামনির কাছে যেতে ইচ্ছে করছে?
জারা মাথা নাড়ায়। দোলা বলে, দুদিন পর স্কুল খুলবে তখন ফেরার পথে একদিন থেকে আসিস। এখন যা এখান থেকে পড়তে বস।

ভারি একটা শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে ফারার রুমে আসে মাধুজা। বিছানায় ব্যাগ টা রেখে একটা একটা করে কসমেটিকস ব্যাগ থেকে বের করতে থাকে। ফারাহ রেগে বলে, আম্মু। আবার তুমি এগুলো এনেছো? আমি এসব ইউজ করবোনা আম্মু। তুমি ভালো করেই জানো আমি এসব পছন্দ করিনা।

মাধুজা মেয়ের কথায় কান না দিয়ে হাত ধরে সামনে এনে বসায়। ফারার হাতে একটা করে কসমেটিক দিতে থাকে আর বলে,
~ আগের গুলো ফেলে দিয়েছিস। এইটা যেন আর না ফেলা হয়। এবার ফেলে দিলে আমি নিজে কুড়িয়ে রেখে দিবো। ধর এটা তোর হুয়াইটিং লোসন, এটা ফেইস এর নাইট ক্রিম, এটা ফেইস প্যাক, এটা স্ট্রেইটনার।
~ আম্মু থামবে তুমি?

~ আরো আছে তো। আরে তোর দশ টাকার মেগি নুডুলসের মতো চুল গুলোকে বিশ টাকার কোকোলা নুডুলস করতে হবে তো।
~ কিচ্ছু করতে হবে না আম্মু। আমি যেমন আছি আমাকে তেমনি থাকতে দাও।
মাধুজা রেগে যায়।

~ বুড়ো হয়ে যাচ্ছিস তবুও বিয়ে হচ্ছে না। আজকালকার মেয়েরা কতো কিছু করে আর তুই কি করিস হ্যাঁ? পাশের বাসার মলিটা পার্লারে গিয়ে গিয়ে ফর্সা হয়ে বিয়ে হয়ে গেল। আর তোকে পার্লারে ডুকাতেই পারলাম না আমি আজ পর্যন্ত। তোকে কি বিয়ে দিতে হবে না? আয়বুড়ো হয়ে থাকবি? ঘরের খুটি দিবো তোকে দিয়ে? বাইরে মুখ দেখাতে পারিনা তোর জন্য।

ফারাহ নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় মাথায় উড়নাটা ভালো ভাবে পেঁচিয়ে নিয়ে। জানে তার আম্মুকে আটকানো যাবে না। কিছুক্ষন পর আম্মু নিজেই কাঁদবে যা সহ্য করার শক্তি নেই ফারার। আম্মুকে কিছুতেই বুঝাতে পারে না সে যদি কারো পাজরের তৈরী হয় তাহলে একদিন ঠিকই সেই কারো টার সাথে বিয়ে হবে। বিয়ে না হবে না। সবার কপালে কি বিয়ে লেখা থাকে নাকি? তারা কি স্বাভাবিক জীবন যাপন করে না?

বাসা থেকে বেরিয়ে পেছনের গলির দিকে হাটা দেয় ফারাহ। বাসা থেকে তিন মিনিট হাটার রাস্তা শেষে সুন্দর একটা বসে থাকার মতো নিরিবিলি একটা জায়গা আছে। ফারাহ সেখানেই এসে থামে। একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ে। আকাশের দিকে মুখ তুলে তার কষ্টের কথা গুলো আল্লাহর কাছে বলতে থাকে। আস্তে আস্তে আকাশে মেঘ জমে যায়। টুপ টুপ করে কিছুক্ষন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে আবার আকাশ নীল হয়ে যায়। আবার কিছুক্ষন পর মেঘ উড়ে আসে। কিন্তু এবার আর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে না। এমন দিন দেখে ফারার অতীতের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।

জোহান আর ফারুক চাচাতো ভাই। জোহান বড় হয়েছে আমেরিকায়। ফারুক বড় হয়েছে বাংলাদেশেই। জোহান দেশে এসে বিজনেস শুরু করে আর ফারুক পড়াশুনা শেষ করে সরকারি চাকরি করে। চাকরির সুবাদে তার আর নিজের বাসায় থাকা হয়ে ওঠে নি। ফারাহ ফারুকের একমাত্র মেয়ে। চাকরির শেষ বয়সে এসে ফারুকের মেয়ের বয়স পঁচিশ এ দাড়ায়। তারো সাত বছর আগে থেকেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ফারুক। কিন্তু বিয়ে দিতে পারে না মেয়ে কালো বলে, ফারাহ তার লেখাপড়া শেষ করে। এখন সে চাকরি করতে চায়। মেধাবী হওয়ায় একটা কোম্পানি তে চাকুরিও পেয়ে যায়।

ফারুক না করেনি ফারাহ কে। ফারুক নিজেও চা চায় তার মেয়ে নিজের পায়ে দাড়াক। নিজের ও চাকরির শেষ বয়স। এদিকে মাধুজাও মেয়ের টেনশনে অসুস্থ হতে থাকে। ফারুক ও নিজে চিন্তিত খুব। এ বয়সে তার নাতি নাতনী নিয়ে খেলা করার কথা। আর মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেনা কিছুতেই। ফারাহ নিজেও কানা ঘুষা তার নামে অনেক কিছু শুনতে থাকে। এসব সইতে না পেরে ফারুক একবার পাত্রের সামনে অন্য একটা সুন্দরী মেয়েকে দেখিয়ে ফারার বিয়ে ঠিক করে। ছেলে ছিল রাজনৈতিক বড় নেতার ভাই। ফারার বিয়ে ঠিক হওয়াতে ফারুক মাধুজা দুজনেই খুশি। কোন মতে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলেই হলো তাদের।

এদিকে পাত্র প্রতিদিন ফারাহ কে ফোন দেয়। নানা রকম কথা বলে, ফারার রুপে ছেলে নাকি পাগল হয়ে গেছে। ফারাহ কে তার লাগবেই। ছেলের দেখা সেরা সুন্দরী ফারাহ। এই কথা গুলো অন্য কোন মেয়েকে বললে সব থেকে বেশী খুশি হতো সেই মেয়ে। কিন্তু ফারার গায়ে কাটা হয়ে লাগতে থাকে কথাগুলো। ছেলে তো আর তাকে দেখে এসব বলছে না। বলছে সেই সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে যাকে তার পরিবর্তে দেখানো হয়েছে। অগত্যা বিয়ের দুদিন আগে ফারাহ নিজে গিয়ে সেই ছেলের সাথে দেখা করে। সব কিছু খুলে বলে, মাফ চেয়ে আসে। ছেলেটা তার ভাই কে গিয়ে সবটা বলতেই তার ভাই রেগে যায়।

দল বল নিয়ে ফারুককে মারার জন্য আসে। এই খবর ফারুকের বাসায় একজন বলে, এসে। এদিকে ফারুক বাসায় নেই। গুডি গুডি বৃষ্টি বাইরে। কিছু না ভেবেই সব ফেলেই মাধুজা মেয়ে কে নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো নিয়ে পালিয়ে আসে। রাস্তায় ফারুকের সাথে দেখা হয়ে যায়। তারপর ফারুক মেয়ে বউ নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে আসে। পরবর্তী এক বছর সেই এলাকায় ঢুকতে পারে না ফারুক। একবছর পর গিয়ে সব ঠিক ঠাক করে আসে। রেখে আসা জিনিস পত্র গুলোও নিয়ে আসে।

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। মেঘেরা ঘন হয়ে অসুর আকার ধারণ করে। এই বুজি রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে আসবে। বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ফারাহ।
[ কেউ নাকি কিছুই বুঝছে না। আসলে সবাই সব কিছুই বুঝছে। কিন্তু এইটা বুঝছে না #পাজরের টানে গল্পের হিরো হিরোইন কে? এক্ষেত্রে আমি বলবো প্রত্যেক টা জুটি #পাজরের টানেই হয়। তাই গল্পের প্রত্যেক টা জুটিই গুরুত্বপূর্ণ। আর হিরো হিরোইন দের গল্পে সামনেই এনেছি। মাত্র তো শুরু হলো। জুটি নয় একটু বেশিই থাকছে গল্পে #পাজরের টানে বলে, কথা। একটু কষ্ট করে বুঝে নিন প্লিজ। আর আমার গল্প নাকি ছোট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমি চেষ্টা করেছি কিন্ত কিছুতেই একটু বড় করা সম্ভব হচ্ছে না। আমার মনে হয় না যে হবে। ভুল ত্রুটি মহান আল্লাহর পরম গুন ক্ষমার চোখে দেখবেন

পার্ট ৪

দুদিন ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিল তানভীর। বাসায় এসেই দেখে পুরো বাসা জুড়ে থমথমে পরিবেশ। তানভীর কে দেখে তুষার দৌড়ে এসে কোলে চড়ে। তানভীর কোর্ট খুলে তুষার কে কোলে নেয়। তুষার গলা জড়িয়ে বলে, আই মিস ইউ নানু ভাই। আমার জন্য কি গিফ্ট নিয়ে এসেছো?

তানভীর আলতো করে তুষারের গাল টেনে বলে,
~ আই মিস ইউ ট্রু নানু ভাই। তোমার জন্য অনেক খেলনা এনেছি আর অনেক চকলেট এনেছি।
~ আচার আনো নি?
~ আচার? আচার খেলে পেট ব্যাথা করবে। ওগুলো খাওয়া ভালো না। কে আচার খাওয়া শিখিয়েছে তোমায়?
~ ছোট নানু মনি।

তানভীর মিমের দিক তাকাতেই মিম হাত পা মাথা নাড়িয়ে না করতে থাকে। তানভীর বুঝতে পারে। ত্যয়ইবাকে জিজ্ঞাসা করে ~ বাড়ির এই অবস্থা কেন? জেতা বাড়ি মরা বাড়ি রুপ ধারণ করেছে কারন টা কি?
~ পাপা মাম্মা তুমি যাওয়ার পর থেকেই সারাদিন রাত না ঘুমিয়ে, ভালভাবে না খেয়ে সেই যে জায়নামাজে স্থান করে নিয়েছে এতো ডাকার পরেও উঠছে না। আর শুধু কাঁদছে।

তানভীর মৃদু হেসে বলে, তোর মাম্মা আর আমার খাবারটা উপরে পাঠিয়ে দেয়।
তানভীর দরজা নক করতেই লাবিবা দরজা খুলে দেয়। যেন সে জানতো তানভীর ই নক করছে। তানভীর ভিতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে একহাতে জড়িয়ে নেয় লাবিবা কে। আরেক হাতে চিবুক ধরে মুখ উপরে তোলে। লাবিবার চোখে এখনো পানি চিক চিক করছে। চোখের আশে পাশে গাল ভিজে আছে। তানভীর কপালে ঠোঁটের পরশ দিয়ে বলে, “আমি বেচে আছি মরিনি এখনো।”
লাবিবার চোখ থেকে একফোটা জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জলকে বৃথা যেতে না দিয়ে তানভীর নিজের ঠোঁট দুটো দিয়ে শুষে নিতে থাকে। এতো বছর একসাথে থাকার পরেও যেন তানভীরের প্রত্যেক টা স্পর্শ তার প্রথম স্পর্শের শিহরন জাগায়। সে এক প্রেমময় অনুভুতি। দু হাতে শার্ট ঘামচে জড়িয়ে ধরে লাবিবা। নিঃশব্দে বুকে মাথা রেখে চোখ বুঝে থাকে। তানভীর ও কিছু না বলে, চুপ করে সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। তানভীর জানে তাকে নিয়ে লাবিবার বুকে কতো ভয় জমা হয়ে আছে।

পাচ বছর আগে লাবিবাকে ছাড়াই ব্যবসার কাজে সিলেট গিয়েছিল তানভীর। যাওয়ার পথে ঢাকা~ সিলেট রোড়ে গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়। সেই গাড়িতে তানভীর সহ আরো দুজন এমপ্লয়ি ছিল আর একজন ড্রাইভার ছিলো। এমপ্লয়ি দুজন আর তানভীর মারাত্মক ভাবে আহত হয় আর ড্রাইভার টি তৎক্ষণাৎ মারা যায়। এরপর প্রায় একবছর লেগেছে তানভীর সুস্থ হতে। সেই থেকে লাবিবার মনে ভয় ডুকে যায়। একা ছাড়তে চায় না তানভীর কে। তানভীর কোথাও গেলে যেন তার প্রাণটা নিয়ে চলে যায়। সারাক্ষণ আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে যেন সুস্থ সাবলীল ভাবে তানভীর তার কাছে ফিরে আসতে পারে।

দরজায় কড়া নাড়তেই তানভীর কে ছেড়ে দরজা খুলে লাবিবা। মিম খাবারের ট্রে নিয়ে ভিতরে ঢুকে। তানভীর ফ্রেশ হতে বাথরুমে চলে যায়। খাবারের ট্রে দেখে লাবিবার চক্ষু চড়কগাছ। মিম কে জিজ্ঞাস করে ~ এতো ভাত কে খাবে? আপু আমাকে কি তোমার রাক্ষস মনে হয়? তোমার ভাইয়াও তো আগের মতো খেতে পারে না।
~ দুই দিন এ একবেলার খাবার খেয়েছো। এখন আর সব বেলার খাবার সহ এই বেলার খাবার টাও ভাইয়া তোমাকে খাওয়াবে দেখে নিও।

~ ও তোমার কমপ্লেইন দেওয়া কমপ্লিট?
~ আমি না। তোমার আদরের মেয়ে ত্যয়ইবা কমপ্লেইন করেছে।
~ মাম্মাকে পাপার হাতে মেরে ফেলতে চায় নাকি?

মিম মৃদু হেসে বেরিয়ে যায়। তানভীর ফ্রেশ হয়ে এসে প্লেটে ভাত নিয়ে লাবিবাকে খাওয়াতে থাকে। লাবিবা খুব কষ্ট করে খাচ্ছে। পেট ভরে উবু উবু হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু বলতেও পারছেনা। জানে কিছু বললেই শুছনেনা কেউ তার কথা। তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলে, এটাই কিন্তু আমাকে ছাড়া তোমার শেষ বিজনেস ট্রিপ। আমি আবার বিজনেসে জয়েন করবো।
~ সেটার আর প্রয়োজন পড়বেনা। লাবিব ফোন করেছিল। ও নাকি দেশে ব্যক করবে আর এখানেই বিজনেসের দায়িত্ব নিবে। তোমার ছেলের মতি গতি বুঝা বড় দায়। পড়াশুনা শেষ করে দেশে ব্যক করবেনা বলে, দিলো। সেখানেই বিজনেস এর কাজ শুরু করলো। এখন আবার তার মনে হয়েছে দেশে ফিরে আসবে।

~ লাবিব আসলেই ওকে সব বুঝিয়ে দিয়ে তুমি রিজাইন নিবে বিজনেস থেকে।
~ ও আমার আল্লাহ..ছেলেকে একটু চিল করার সুযোগ টাও দিবে না?
~ না। অনেক সুযোগ পেয়েছে। আর কোন সুযোগ নেই। এবার সব ছেড়ে তোমাকে বাসায় থাকতে হবে ব্যস।
~ আমি নাকি একজনকে খুব জালাই। একদম ফ্রি থাকতে দেই না। সেই আবার চাইছে আমি যেন সব সময় বাসায় থাকি। আমার জালা সহ্য করার ক্ষমতা দেখি বেড়ে গেছে তাই আরো বেশি লাগবে।
~ কচু।

স্কুল ছুটির দু মিনিট আগে পৌঁছে গেছে গাড়ি নিয়ে। দু মিনিট পর স্কুল ছুটির পর আরো পাচ মিনিট পর জারা বের হয় গেট থেকে। জারাকে দেখে তাফিফ নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু জারা তাফিফকে খেয়াল না করেই এগিয়ে চলে যায় হাটতে হাটতে। সাথে আরেকজন ছাত্রী। দুজনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। একচুয়েলি কথা বলছে নাকি ঝগড়া করছে কিছুই বুঝতে পারছেনা তাফিফ। হাত পা মুখ মাথা সহ ছুড়াছুড়ি করে হাটছে জারা। পেছন থেকে ডাকতে ডাকতে অস্থির তাফিফ।

কিন্তু তার দিকে জারার কোন খেয়াল নেই। তাই তাফিফ আর না ডেকে রাগ করে চুপটি করে তাকিয়ে থাকে। একসময় যখন জারার গল্প শেষ হবে তখন ঠিকই ফিরে আসবে। কিন্তু একি! দেখতে দেখতে জারা আর তার সাথের মেয়েটি চুল টানাটানি শুরু করে দিয়েছে রাস্তার মাঝেই। তাফিফ পারে না রকেটের গতিতে গিয়ে পৌঁছায় সেখানে। কিন্তু সেতো রকেট নয় মানুষ।

তাই দৌড়েই যায় যুদ্ধস্থানে। কিন্তু ততোক্ষনে বেশ ভালো একটা লড়াই হয়ে গেছে। জারা রিতীমতো কান্না করে দিয়েছে ব্যাথা পেয়ে। তাফিফ গিয়ে জারাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারছেনা। কারন দুজন দুজনের চুল ধরে ঝুলছে। তাফিফ কোন মতে জারা কে সরিয়ে নেয়। সাথের মেয়েটির হাতে কয়েকটা চুল দেখতে পায়। তাফিফ এর ইচ্ছা করছে ঐ মেয়েকে তুলে দেয় একটা আছাড়। কিন্তু পারছেনা। জারাকে তার দিকে ঘুরিয়ে দু কাধ ধরে ঝাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে,
~ হচ্ছে টাকি? স্কুলে চুল টানা টানি করার জন্য এসেছিস নাকি পড়তে এসেছিস?

জারা কোন রিয়েক্ট না করে একলাফে তাফিফের গলা জড়িয়ে তাফিফের ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দেয়। জারার এমন কান্ডে তাফিফ পুরো জমে ফ্রিজ হয়ে যায়। শরীর অবশ হয়ে যায়। মাথা পুরো হ্যাং হয়ে যায়। রাস্তার আশে পাশের মানুষ হা হয়ে দৃশ্যটি গিলতে থাকে। কেউবা ছি ছি করে বলে, কি হচ্ছে আজকাল।
রাস্তাঘাটে এসব না করে বদ্ধ ঘরে করলেই তো হয়। তোদের লজ্জা নেই তো অন্য লোকজনের তো লজ্জা আছে। সামনে দাঁড়ানো জারার ফ্রেন্ড যার সাথে চুলাচুলি হলো সেও পুরো অবাক।

মিনিট তিনেক পর জারা তাফিফের ঠোঁট ছাড়ে। গলা ছেড়ে নেমে আসে। ইউনিফর্মের কলার টেনে বাহাদুরি লুক নিয়ে সেই মেয়েটির সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটি কাপা গলায় বলে, সরি দোস্ত।
সরি বলা শুনে জারা অভিনয় করে একটা রিনাখান মার্কা হাসি দিয়ে বলে,
~ কি ভেবেছিলি তুই? আমি আনস্মার্ট আর তোরা স্মার্ট? হা হা হা। ঐ লিলিপুট ক্যান্ডি মার্কা ক্লাসমেট ছেলেদের বয়ফেন্ড বানিয়ে মনে করিস তোরা স্মার্ট? হাউ ফানি ইয়ার।

লুক হি ইজ মাই ওয়ান এন্ড অনলি হিরো নাম্বার ওয়ান তাফিফ খান। হি ইজ এ ডক্টর। তোদের বয়ফ্রেন্ড দের মতো সো কল্ড বড়লোকের বেটা নয়। একচুয়েলি বড়লোক সে। আর হাইট দেখেছিস, বডি দেখেছিস? একদম কোন আইসক্রিম। একদম নজর দিবি না কিন্তু। আর আমার সাথে না এই চুমু নিয়ে ঝগড়া করছিলি? বয়ফেন্ড কে চুমু খেলে নাকি বেবি হয়ে যায়। খেলাম চুমু। এবার দেখিস কিচ্ছুই হবে না। আবাল মার্কা মেয়ে মানুষ যত্তসব। আরে আবাইল্লা শুধু চুমুতে বেবি হয় নারে বোকা। আরো ইন এ যেতে হয় ইন এ। না বুঝলে তোর বিএফ এর কাছ থেকে জেনে নিস। এখন গেলাম আমি। বদ্দুয়া দিয়ে দিলাম আমার যে কয়টা চুল ছিড়ছিস আরো তিন কয়টা চুল তোর বেশি পড়বে।

তাফিফের হাত জড়িয়ে বলে, জান চলো আমরা চলে যাই বাসায়।
তাফিফের হুস পুরোপুরি ফিরে নি এখনো। তার কান সচল তাই জারার কথা গুলো শুনতে পেল। চোখ সচল তাই ড্রামা টা দেখতে পেল। ঠোঁট দুটো সেই যে জারা বন্ধ করে দিয়েছে এখনো খুলেনি তাই কথা বলতে পারে নাই। শরীরটা অবশ তাই নড়তে পারছে না। মাথাটা ঝিম ঝিম করে জানান দিচ্ছে এইটা দেখার আগে তার মঙ্গল গ্রহে চলে যাওয়া উচিত ছিল।

জারা ধাক্কা দিতেই নড়ে উঠে তাফিফ। জারা হাত ধরে টেনেই ওখান থেকে গাড়ির কাছে নিয়ে আসে। তাফিফ কিচ্ছু না বলে, ড্রাইভ করতে থাকে। জারা বক বক করেই যাচ্ছে। তাফিফের কানে কিছু ডুকছে না। জারার চিল্লানিতে গাড়ির ব্রেক কষে দাঁড়ায় তাফিফ।

জারার দিকে তাকিয়ে রাগ দেখিয়ে চিল্লিয়ে বলে,
~ বেনিওয়ালী আমাকে কিস দিলি কেন তুই?
জারা কেপে উঠে তাফিফের কথায়।

~ কি হলো বল। আমি তোর বিএফ? আমাকে চুমু দিলে তোর বেবি হবে?
জারা কেদে দেয় তাফিফের ধমকে। তাফিফ জারার চুল টেনে বলে, ঝুটি করেছিস? মানুষ যাতে চুল ছিঁড়তে পারে তার জন্য? আরেক দিন দেখি বেনী ছাড়া। আমি নিজে তোর চুল ছিড়বো।

জারা চোখ খিচে দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে আর মনে মনে তাফিফের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে থাকে।
“কি ভেবেছে সবসময় বকা ঝকা করবে শুধু? আমি কিছুই বলবোনা চুপ চাপ বকা খেয়ে যাবো। আমার আইসক্রিম ও মিস করবো? কিছুতেই হবে না। আমি কি ইচ্ছে করে মিথ্যা বলে, ছি নাকি? মিথ্যা না বললে যে আমার প্রেসটিজ পামচার হয়ে যেতো। আমি কখনোই মেনে নিতে পারতাম না। আমি যে কেন তোমাদের বাসায় যাচ্ছি তা তো জানোনা। তোমার প্রেমকীর্তি সবার সামনে পাবলিস করে দিবো। তারপর দেখি তোমার লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম কিভাবে চলে। হুহহ।”

বাসায় এসেই গোল মিটিং ডেকেছে জারা। বাড়ির সবাইকে ডেকেছে মিটিং এ। শুধু তাফিফ ছাড়া। কারন তাফিফ জারা কে নামিয়ে দিয়েই হসপিটালে চলে গেছে। সবাই এসে ড্রয়িং রুমে বসলে জারা বলতে শুরু করলো
“উপস্থিত মাননীয় আমার বড়দের ও ছোটদের আসসালামু আলায়কুম। আমি একটা গুরুত্ব পূর্ন রহস্য উদঘাটন করেছি। যা আপনাদের জন্য অতন্ত্য শিহরণ জাগানো ব্যপার। আপনাদের অগোচরে অনেক দিন থেকে এই বিষয় টি ঘটে আসছে। যা আপনাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক ও সম্মান হীনতার ব্যপার।

আপনাদের ছোট ছেলে ডক্টর তাফিফ খান এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। তিনি তার হসপিটালের একজন আয়া ~ যে ফ্লোর মুছে, বাচ্চাদের সামলানোর কাজ করে, বড় মানুষ দের পটিও সাফ করে, তার সহিত দীর্ঘদিন থেকে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন। শুধু তাই নয়, সেই আয়া টিকে তিনি বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিবাহ করছেন না। অথচ তার সাথে সবসময় থাকছেন ও। এই কথাটি একদম মিথ্যা কথা নয়। উক্ত আয়াটি নিজে আমাকে ফোনে এই কথা বলে, ছেন। প্রমান হিসেবে ভয়েজ রেকর্ড এনেছি আমি।”

জারা রেকর্ড টা শুনায় কিন্তু লাস্টের কথপোকথন টুকুই প্লে করে। এসব শুনে সবার মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা। তাদের এমন ছেলে কিনা একটা আয়ার সাথে। ছিহ।
ত্যয়ইবা তো পারলে কান্না জুড়ে দেয়। তার কতো শখ ছিল ভাই দুটোর বউ সে নিজে পছন্দ করবে কিন্তু একি শুনছে সে? তাফিফের জন্য জারাকে মনে মনে পছন্দ করে সে। তাফিফ ও তার কাছে স্বীকার করেছে যে জারাকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন কি করছে সে? শেষমেষ একটা আয়ার সাথে? আজ বাড়িতে আসুক তাফিফের সাথে বুঝাপড়া হবে আজ একদফা।

পার্ট ৫

তাফিফ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সোজা নিজের রুমে চলে আসে। দরজা খুলতেই চোখ পড়ে বেড়ের উপর। তুষার বেডের মাঝখানে সুন্দর করে দু পা মুড়ে বসে দু হাত গালে দিয়ে বসে আছে। তাফিফ কে দেখে জলদি তাড়া দিয়ে বললো, “পাচ মিনিট টাইম দিলাম। তারাতারি ফ্রেশ হয়ে আসো।”তাফিফ একটু হেসে গাল দুটো টেনে দিয়ে বলে, “ওকে মামা। কোথায় যাবে না। আমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আসছি। অনেক গল্প করবো আজ।”

তাফিফ ফ্রেশ হয়ে আসতেই তুষার বলে, মামা এখানে চুপটি করে বসো। আজ তোমার সাথে মাম্মা খেলবে বলে, ছে। তুমি এসেছো আমি খবরটা দিয়ে আসি।
তাফিফের টনক নড়ে গেছে। খেলবে মানে? আবার কি করেছে সে যে খেলবে?
ত্যয়ইবা খবর পেয়ে হাতে স্কেল নিয়ে দৌড়ে তাফিফের রুমে এসে দেখে যে তাফিফ নেই। চিল্লিয়ে বলে, তাফিফ কোথায় তুই? একদম আমার সাথে লুকোচুরি খেলবিনা। সামনে আয় বলছি। নয়তো তোর অবস্থা চব্বিশ দুগুনে কত জানি? অত টাই বাজাবো।

তুষার বলে, মাম্মা চব্বিশ দুগুনে আটচল্লিশ। মামা আলমারির উপরে মাম্মা ঐ দেখো।
ত্যয়ইবা উপরে তাকিয়ে দেখে আলমারির উপরে গুটিশুটি মেরে বসে আছে তাফিফ। তা দেখে ত্যইয়বার আরো রাগ উঠে যায়। এতোবড়ো ছেলে আলমারির উপরে উঠে আছে। আলমারিটা যদি এখন ভেঙে যায় তাহলে তো ত্যয়ইবাকেই নতুন কিনে আনতে হবে। কারন ত্যয়ইবার ভয়েই তো তাফিফ উপরে উঠেছে।

তাফিফ মিনতি করে বলে, আল্লাহ আপু ছেড়ে দাও প্লিজ। আমি কি করেছি আগে বলবেতো। তার পর না হয় শাস্তি দাও। তোমার এই নিষ্পাপ ভাইটার প্রতি কি তোমার একটুও মায়া নেই?
~ কিহ তুই নিষ্পাপ? আমার বোনকে ভালবেসে অন্য একটা মেয়ের সাথে পরকিয়া করিস তাও আবার হসপিটালের আয়ার সাথে তবুও বলবি তুই নিষ্পাপ?

তাফিফের এবার মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। দুপুরে একটা ডোজ খেয়েছে এখন আবার আরেকটা। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নেয়। ত্যইয়বা চিৎকার করে উঠে। তাফিফকে এই মুহুর্তেই নামতে বলে, তাফিফ ইতস্তত করে বলে, নামছি কিন্তু। মারবেনা একদম। মারলে তোমার জামাইয়ের কাছ থেকে এবার একটা নিউ ল্যাপটপ কিনে নিবো কিন্তু।
~ যা ইচ্ছে তাই নে। আমার কি? আমার টাকা যাবে নাকি? গেলে তোর ভাইয়ার টাই যাবে। নেমে আয় শুনছি সব। তাফিফ নেমে এসে সব শুনে ত্যয়ইবাকে বুঝিয়ে বলে, সবটা। ত্যয়ইবাতো হাসতে হাসতে শেষ। সাথে তুষার কি বুঝলো কি না বুঝলো সেও হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

ডিনারের সময় তাফিফ ডাইনিং এ গিয়ে টেবিলে বসতে বসতে একবার জারা কে দেখে নিলো। লাবিবা জারাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর জারা গিলছে শুধু। আর তাফিফের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। তাফিফের তো ইচ্ছা করছে এক লাথি দিয়ে জারাকে উগান্ডা পাঠিয়ে দিতে। বেদ্দপ মেয়ে। সাহস কতো বড় তার তাফিফ খানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনে। তোর ক্লাস তো আমি নিয়েই ছাড়বো বেনীওয়ালী।

প্রতিদিন সবাই কতো কথা বলে, আর আজ কেউ কিছু বলছে না। সব এই বেনীওয়ালির জন্যে। খেতে খেতে সরোয়াজ বললো, তাফিফ খাওয়া শেষে তোমার সাথে আমাদের কিছু কথা আছে। তাফিফ ঢুক গিললো। ত্যয়ইবা কাধে হাত রেখে আসস্থ করলো। তারপর খাওয়া শেষে তানভীর বললো, তাফিফ তোমাকে কিছু। তাফিফ তখনি ত্যয়ইবার দিকে তাকিয়ে বলে, ঐ আপু বলনা। ত্যয়ইবা তখন সবটা খুলে বলে, সবাইকে। মিম বলে, তাহলে ঐ ভয়েজ রেকর্ড টা? আবার শুনবো আ‌মি। জারা রেকর্ডটা শুনাও। জারা একবার তাফিফের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার নিজের বুকে থু থু দিচ্ছে। এই অবস্থা দেখে সকলে হাসতে হাসতে শেষ।

রাতে কিছুতেই ঘুম আসছেনা তাফিফের। আয়নার সামনে বার বার দাড়াচ্ছে আর নিজের ঠোঁট দেখছে। ঘুমোতে গেলেও বার বার জারার এই কির্তীর কথা মনে পড়ছে। পুচকো একটা মেয়ে তার মান সম্মান নিয়ে খেলে ভাবা যায় এগ্লা? রুম থেকে বেরিয়ে জারা যে রুমে আছে সেই রুমে যায়। কিন্তু জারা রুমে নেই। পুরো বাড়ি খুঁজে পায়না। হয়তো কারো সাথে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। কাল বোঝাপড়া হবে আজ থাক।
সকালে ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখে জারা সোফায় পা তুলে বসে আইসক্রিম চোখের সামনে ধরে মনে মনে গবেষণা করছে। তাফিফ গিয়ে সামনে বসে বলে, রাতে কোথায় ছিলি?

~ খালামনি আর বড় পাপার সাথে।
~ তোর লজ্জা করে না একজোড়া পায়রাকে সারাটা রাত আলাদা করে রাখতে?
~ তুমিও তো রেখেছো অনেকগুলো রাত। আমি দেখেছি। যখন তোমার মাম্মা মারতো তখন তো তুমিও খালামনি আর বড় পাপার মাঝখানে গিয়ে ঘুমোতে। তোমার লজ্জা করে না?

~ বড্ড পেকে গেছিস দেখছি। আজকাল যা তা বলছিস। বাবু হওয়া নিয়েও সব বুঝিস দেখছি। কে শিখিয়েছে রে এগুলা?
~ বুক শিখিয়েছে বুক। শারিরীক শিক্ষা, বিজ্ঞান বই পড়ে জেনেছি। আপুর বইয়েও দেখেছি এগুলো পড়া আছে।
তাফিফ চুপ হয়ে গেলো। কিছুতেই পেরে উঠবেনা এই মেয়ের সাথে। হাত থেকে আইসক্রিম টা ছো মেরে নিয়ে বলে, আইসক্রিম কি দেখার জিনিস নাকি খাওয়ার জিনিস? খাচ্ছিস না কেন?

~ ভাবছি এইটা ফাস্ট খাবো তো কেমন টেস্ট হবে। একটু খেয়ে দেখবে কেমন লাগে?
তাফিফ মুখে দিয়ে ওমনি ফেলে দেয়।
~ ঐ কি এটা? এমন কেন?
~ পায়েসের আইসক্রিম। আইসক্রিম গ্লাসে পায়েস রেখে মাঝখানে কাঠি দিয়ে বানিয়েছি। কি করবো তুমি তো আর আইসক্রিম কিনে দাওনা।

~ তাই বলে, পায়েশ দিয়ে আইসক্রিম বানাবি? ভাইয়া না করে দিয়েছে তোকে আইসক্রিম দিতে।
~ আবার কি করলাম আমি? আমি তো ভাইযার সাথে কথা বলে, সব ঠিক ঠাক করে নিয়েছি। তাহলে আবার কেন অফ করে দিলো?

~ ভাইয়া মনে হয় তোর কাছে একটা জিনিস চেয়েছিল তুই দিস নি। আমি আসছি মাম্মাকে বলে, দিস।
তাফিফ চলে যেতেই জারা গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। অবশেষে খুঁজে বের করে। লাবিব তার কাছে ফারার ছবি চেয়েছিল। কিন্তু ফারা তো ছবি উঠে না। তাহলে দিবে কি করে?

বাসায় ফিরে এসে এক দৌড়ে জারা ফারার রুমে চলে আসে। ফারাহ বাথরুম থেকে বেরহচ্ছিল। জারা সোজা গিয়ে ফারার কোলে উঠে। ফারাহ তাল সামলাতে না পেরে জারাকে নিয়েই ফ্লোরে পড়ে যায়। জারা উপরে থাকায় ব্যথা পায় না আর ফারাহ নিচে ব্যথা পেয়ে চিল্লাতে থাকে। ফারার চিল্লানি তে জারাও চিল্লাতে থাকে ~ ও আল্লাহ গো আমার আপুর কোমড় ভালো করে দাও গো। কোমড়ে খুব ব্যথা পায়ছে গো। কোমড় টা ভাঙলে আমার ভাইটার কি হবে গো। সারাজীবন কোলে করে নিয়ে ঘুরতে হবে গো। জারার প্রলাপ বকাতে ফারাহ চুপ করে জারার দিকে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে চেষ্টা করে জারা কি বলছে আজেবাজে কথা। জারা একসময় চুপ হয়ে যায় তারপর জারার দিকে তাকিয়ে দেখে ফারাহ তার দিকে তাকিয়ে আছে। জারা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলে, ব্যাথা কমে গেছে তাইনা?

দেখেছো আমার মুখ কতো পবিত্র। আমি বললাম আর আল্লাহ তোমার কোমড় ঠিক করে দিল।
~ কিচ্ছু ঠিক হয়নি। এখন মালিশ করে দে তুই।
~ দিতে পারি। একটা শর্ত আছে। তুমি যদি আমার সাথে কয়েকটা ছবি উঠো তাহলে দিবো।
~ আমি ছবি উঠিনা।

~ উঠোনা উঠবে। প্লিজ প্লিজ প্লিজ আপু। আমার সাথে কয়েকটা প্লিজ ছবি উঠো।
ফারাহকে রাজি করিয়েই জারা কোমড়ে মালিশ করে দেয়।

দোলার আলমারি থেকে দুটো শাড়ি নেয়। দুজনে দুটো শাড়ি পড়ে। চুল গুলো খোলে দেয় পিঠের উপর। মেকিং করে দুহাত ভর্তি চুড়ি পড়ে। কানে পাথরের ঝুলানো দুল পড়ে। ঠোঁটে লিপস্টিক, মুখে একটু পাউডার, চোখ জুড়া কাজল লাগায়। ছাদে গিয়ে সেলফি উঠতে থাকে। ফারাহ কাচু মাচু করতে থাকে। আশেপাশে মানুষ দেখলে কি বলবে? নিশ্চয় সং এর মতো লাগছে।

এদিকে জারা ছ‌বি তোলার সময় ফোনের স্ক্রিনে না তাকিয়ে ফারার দিকেই তাকিয়ে আছে। ফারাহকে একদমি চেনা যাচ্ছে না। কোন প্রেমিক পুরুষ তাকে দেখলে পুরো পাগল হয়ে যাবে। ফারার তাড়ায় জারা অল্প কয়েকটা ছবি তুলেই নিচে নেমে আসে। চুপি চুপি শাড়ি চেঞ্জ করে ফেলে। হাত মুখ ধুইয়ে জারাকে পড়তে বসায়। পড়া শেষ করে ঘুমোনোর আগে আজকের তোলা ফারার বেষ্ট ছবিটা লাবিবকে সেন্ড করে।

ওভার ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে গভীর রাতে মুক্ত হাওয়ায় নিজেকে মেলে ধরেছে লাবিব। দীর্ঘদিন থাকার কারনে মায়া পড়ে গেছে। তবুও দেশে ফিরে যেতে হবে। কেন যাবে সে নিজেও কনফিউজড। কোন এক অদৃশ্য টান তাকে দেশে যেতে বাধ্য করছে। কিসের টান এটা? দেশে ফেরা অনেক কারণ ই সামনে দৃশ্যমান। কিন্তু এই মেইন অদৃশ্য টানটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
ফোনের মেসেজ এর শব্দে ভাবনা কাটে লাবিবের।

ফোন হাতে নিয়ে দেখে জারা মেসেজ করেছে। লাবিব সেখানেই সিড়িতে বসে পড়ে। জারার দেওয়া মেসেজ পড়তে থাকে
“আই হেভ এ গভীর প্রশ্ন। যে ছেলে একেবারে ইউএসএ তে সেটেল হয়ে গেছে তার বিডি ভাললাগে না বলে, সেই ছেলের হটাৎ কি হলো যে নিজের কোম্পানি সেল করে দেশে চলে আসছে? তোমার ব্যাপার গুলো আমার কিন্তু একদমি ঠিক লাগছে না। রহস্যময় গন্ধ পাচ্ছি। আমার ফারাহ আপুর আপডেট গুলো তুমাকে না বললে তুমি আমার আইসক্রিম সার্ভিস লক ডাউন করে দাও। আবার ছবি দেইনি বলে, কথাও বললা না কয়েকদিন, সার্ভিস ও বন্ধ করে দিয়েছো। তুমার ব্যপারটা কি বলোতো?

আমার যা সন্দেহ তাই কি ঠিক? এই কথার জন্য আমি সরি। জানি এইটা ভাবা আমার উচিত না। কারন ফারাহ আপু আমার যেমন ষোল বছরের বড় আপু তেমনি তোমার ও তিন বছরের বড় আপু। এখন বলো তুমি কিসের টানে ব্যক করতে চাইছো?
লাবিব থ মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকে। ফারাহ। জারার কাছ থেকে ফারাহ চৌধুরীর সব কিছু সুনে সে নিজে নিজে ফারার রুপ দিয়েছে কল্পনায়। তার সব কিছু সেই কল্পনাকে করেছে মোহিত। তবুও চোখের দেখা দেখতে বড্ড ইচ্ছে জমে গেছে। হয়তো জারার সন্দেহ ই ঠিক। লাবিব রিপ্লাই দেয় জারাকে
“তোর ফারাহ আপুর ছবি চেয়েছিলাম। ঐটা দে তারপর ভেবে তোর উত্তর দিবো।”

জারা পিক সেন্ড করে। পিকে ক্লিক করতেই লাবিবের চোখ আটকে যায় ধুসর~ বেগুনী শাড়িতে মাথায় ঘোমটা দেওয়া এক কুমারী শ্যমাবধুর অবয়ব এর উপর। চোখ দুটো যেন চারিদিকে তার গভীর মায়া ছড়াতে ব্যতিব্যস্ত, বাশির মতো নাক, শিল্পীর আকানো রংতুলির ঠোঁট দুটোর কোনে এক মায়াবী চিলতে হাসি

পার্ট ৬

খুশিতে বাকবাকুম হয়ে দোলা রান্নাঘরে ঢুকেছে নাড়ু বানাতে। এতোদিন পর তার চাঁদের টুকরা ভাগিনা দেশে ফিরছে বলে, কথা। তার পছন্দের নাড়ু বানানো আজ থেকেই শুরু করে দিয়েছে। দোলার হাতের নাড়ু লাবিব খুব খেতে ভালোবাসে। আগে প্রতিদিন স্কুল শেষ করে এবাড়িতে আসতো লাবিব। এক বয়াম নাড়ু বসে বসে খেতো আর সাথে দুইটা করে বয়াম নিয়ে যেতো বাসায় গিয়ে খাবে বলে, ডেইলি তিন বয়াম করে নাড়ু দোলাকে লাবিবের জন্য রেড়ি করেই রাখতে হতো। একবার দোলা ব্যস্ততার জন্য বানাতে পারে নি। লাবিব এসে খালি হাতে ঘুরে গেছে। সেই থেকে প্রায় একমাস দোলার সাথে কথাও বলে, নি আর বাসায় আসেও নি। এদিকে আদরের ভাগিনাকে না দেখে দোলাও থাকতে পারে নি। এক লড়ি বয়াম নাড়ুতে ভর্তি করে লাবিবের মান ভাঙিয়েছে। কি যে জিদ ছিল ছেলেটার। সেই সময়ের কথা মনে পড়লে আজো দোলার হাসি পায়।

দোলাকে মাধুজা, ফারাহ, জারা সাহায্য করছে। এর মাঝেই দোলার ফোনে স্কাইপিতে কল আসে। দোলা হাত মুছে টেবিলে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে কল রিসিভ করে। ফোনের স্ক্রিনে লাবিবের হাস্যজ্জ্বল মুখ টা ভেসে উঠা দেখে দোলাও হেসে দেয়।
লাবিব : আসসালামু আলায়কুম খালামনি। কেমন আছো?
দোলা : ওয়ালাইকুম সালাম। ভালো বাবা।

লাবিব : এই মা। খালামনি তুমি তো দিন দিন বুড়ি হয়েই যাচ্ছ হয়েই যাচ্ছ। তুমার চুল পেকে গেছে। তুমাকে আমার ছেলের বউ কিভাবে করবো বলো তো। আমার ছেলে তো বুড়ো গ্ৰেনি কে পছন্দ করবে না।
দোলা : চুলে কালার করবো। চামড়ার টনিক ইউজ করবো। ডিজাইনার ড্রেস পড়বো। তোর ছেলের আমাকে পছন্দ করতেই হবে।

লাবিব : হা হা হা। আমার সব নাড়ু আমি হিসাব করে নিবো। আসছি দাড়াও।
দোলা : আমিও নাড়ু বানাতে বসে গেছি। দেখি কতো খেতে পারিস।
লাবিব : পাকা বুড়ি কোথায়?
দোলা : নাড়ু বানায়। ঐতো দেখ।

দোলা ফোনটা একটু কোনাচে করে ধরে। যাতে জারাকে স্পষ্ট দেখা যায়। আর ফারাহ কে অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। জারা হাই দেয়। লাবিব ও হাই দেয়। কিন্তু তার মন চোখ জারার পাশে মেরুন কালার সেলোয়ার কামিজ পড়া মাথায় ওড়না দেওয়া মায়াকুমারী কে দেখছে। লাবিবের ইচ্ছা করছে খুব একটু কথা বলতে। কেমন করে কথা বলে, তার মায়াকুমারী? লাবিব দোলাকে বলে, : খালামনি, পাকা বুড়ির পাশে উনি কি ফারাহ?
দোলা মিষ্টি হেসে বলে, হ্যাঁ।

লাবিব : ওহ। এমনি গেস করলাম আর কি। কখনো ফোনের সামনে তো আসেনি। দেখি নি তো কখনো। কথাও বলি নি।
দোলা : ভীষন লাজুক তো তাই। কথা বলবি? ফারার দিকে তাকিয়ে ফারাহ আম্মু এদিকে আসো। লাবিববের সাথে তো কখনো কথা বলো নি। কথা বলো এসো।

ফারাহ কাঁচুমাচু করতে থাকে। লাবিবের সাথে তো কখনো কথা বলে, নি। এখন কি কথা বলবে সামনে গিয়ে? না ও তো করা যাবেনা। লাবিব কে সামনে রেখে ওকে ডাকলো। না কথা বললে মান সম্মান এর প্রশ্ন। এতো ভাবার কি আছে? ছোট ভাই ই তো। জারা ফারাহ কে দেখে হেসে দেয়। মাথার কাপড় টা সুন্দর করে দিয়ে বলে, যাও কথা বলে, আসো। ফারাহ দোলার পাশে চেয়ার টেনে বসে ফোনের দিকে তাকায়। ছোট্ট করে একটা হাসি দিয়ে বলে, আসসালামু আলায়কুম।

হাসিটা ঠিক লাবিবের বুকে গিয়ে লাগে। একধ্যন এ তাকিয়ে দেখতে থাকে তার মায়া কুমারীকে। মায়াকুমারী সত্যিই একটা মায়াকন্যা। মুখ পানে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। ফারাহ আবার সালাম দেয়। এবার লাবিব ও সালামের উত্তর দেয়। ফারাহ বলে, কেমন আছো ছোট ভাই? কবে বিডিতে ল্যান্ড করছো?

শেষের বাক্যটা দারুন ছিলো। কিন্তু প্রথম বাক্যেই লাবিবের একটু মন খারাপ হয়ে যায়।
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। নেক্সট সানডে বিডিতে ল্যান্ড করছি। ছোট ভাই না ডাকলে খুশি হতাম।
ফারাহ একটু চকে গিয়ে বললো, তুমিতো আমার বড় ভাই নোও। ছোট ভাই ই।
~ বড় ভাই ছোট ভাই কিছু না ডেকে লাবিব বলে, ডাকলে খুশি হবো। নয়তো রাগ করবো।
ফারাহ মৃদু হাসলো। বললো, ওকে ঠিক আছে। লাবিব। হ্যাপি?
~ অন্নেক। আমার জন্য নাড়ু বানাচ্ছিলে?

~ হ্যাঁ। ছোট আম্মু বললো, ।
~ আমি নাড়ু অনেক লাভ করি। ভালো করে নাড়ু বানানো শিখে নাও। আমাকে বানিয়ে খাওয়াতে হবে।
~ আচ্ছা ভাই না লাবিব। আচ্ছা লাবিব। রাগ করো না প্লিজ।
লাবিব হাসে। ফারাহ লজ্জায় পড়ে যায়। আল্লাহ হাফেজ বলে, তারাতারি সামনে থেকে উঠে যায়।

দু ঘন্টা থেকে সাজছে ত্যয়ইবা। ঠিক সাজছে বলা যাবে না। বলতে হবে ড্রেস সিলেক্টিং করছে। একটা পর একটা ড্রেস পড়ছে আর খুলছে। কোনটাতে সব থেকে সুন্দর দেখাবে সেইটা বুঝতেই পারছে না। আমেরিকায় নিজের পরিবারের কাছে গিয়েছিলো ত্যয়ইবার হাজবেন্ড রোশান। আজ বিডিতে ব্যাক করছে সাথে বোন রিশিকে নিয়ে। সেই জন্য ত্যয়ইবার এতো তোড়জোড়। আর এই সব কিছু লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়াল করছে তুষার।

মমের এসব ড্রেস চেঞ্জ করার পাগলামি দেখতে দেখতে বিছানায় শুয়ে পড়েছে তুষার। চাদর টা টেনে নিয়ে ফোনের ভিডিও অন করে ফোনের স্কিনেই দেখছে মম কে। অবশেষে যখন চুজ করে লাস্ট ড্রেস টা পড়তে সক্ষম হয় তখন তুষার ভিড়িও অফ করে দেয়। হুয়াটস এপ এ গিয়ে পাপা রোশান কে সেন্ড করে দেয়। ত্যয়ইবা যখন মোড়া টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে কসমেটিক্স নিয়ে বসে পড়ে সাজার জন্য তখন তুষার হাফ ছেড়ে বাচে। উল্টো হয়ে শুয়ে মোবাইলে গেমস খেলতে থাকে।

দুদিন পড়ে ছেলে আসবে আর আজ মেয়ে জামাই আর পুত্রী আসছে জন্য অনেক ব্যস্ততার ভিতর দিয়ে কাটছে লাবিবা আর মিমের। বাড়ির লোক বেশি হলে কাজ ও বেশি হয়। তাই অতিরিক্ত সার্ভেন্ট ও হায়ার করা হয়েছে। তবুও হাতে সময় পায় না লাবিবা। এদিকে তানভীর ও রাগ করে ওভার টাইম অফিসেই কাটিয়ে আসে। মনে মনে সময় গুনছে কখন লাবিব আসবে আর সে মুক্তি পাবে। তানভীরের বউপাখিকে চাই। নিজের সাথে চাই সবসময়।

বাড়ির জামাই এর জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই। জামাই আসতেই সবার অপেক্ষার অবসান ঘটে। রোশান সবার সাথে কুশল বিনিময় করে। সবার সাথে কথা বলতে বলতে খেয়াল করে তুষার মুখে আঙুল ঢুকিয়ে গাল ফুলিয়ে সোফায় বসে পা দোলাচ্ছে। তার মান হয়েছে। পাপা তার অথচ পাপা তার দিকে নজর না দিয়ে অন্যদের সাথে এতো কি কথা বলে, ? রোশান হালকা হাসে ছেলেকে দেখে। বাড়ির সবার সাথে কথা বলে, তুষার কে কোলে নিয়ে উপরে যেতে থাকে। তুষারের গালে টুপ করে চুমু দিয়ে বলে, আমার পাপা টাকি এখনো রাগ করে আছে? তুষার উত্তর দেয় ~ রাগ করবো না কেন? আমার পাপা এতো দিন পর আমার কাছে এলো। কিন্তু আমার দিকে তাকালোই না। কথাও বললো, না। পাপা তুমি কি আমার আরেকটা পাপা?
রোশান থমকে গিয়ে বলে, আরেকটা পাপা মানে?

~ আরেকটা পাপা মানে নকল পাপা। রোশান হাসলো। মুহুর্তেই উল্টাপাল্টা ভেবে ফেলেছিল ছেলের কথায়। উচিৎ হয়নি একদম। তার রানি যে শুধু তারই।
~ তুষার পাপা জানো তুমার জন্য কতো গুলো চকলেট এনেছি? যাও নিচে গিয়ে দেখে আসো।
তুষার ওমনি কোল থেকে নেমে দৌড়ে নিচে চলে যায়।
রিশি এসেই ত্যয়ইবাকে নিয়ে রুমে চলে এসেছে। ত্যয়ইবাকে ভালো করে দেখে রিশি বলে, ভাবি ইউ সো বিউটিফুল। ভাইয়া দেখেতো পুরো ফিদা হয়ে যাবে।

~ হুম। তাই তো একবার তাকিয়েও দেখলো না।
~ উফ ভাবি। সবার সামনে দেখবে নাকি? রুমে আসতে দাও আগে।
~ এই। চুপ থাকো।

~ চুপ করার প্রশ্নই উঠে না। জানো ভাইয়া কি করতো? ভাইয়া রাতেও ঘুমোতো আবার দিনেও ঘুমোতো। মম শুধু বলতো রোশান তুই চব্বিশ ঘন্টা কিভাবে ঘুমাশ? ভাইয়া ঝারি মেরে রেখে দিতো। কিন্তু আমি তো জানি ভাইয়া রাতে ঘুমোতো। আর সারাদিন তোমার সাথে কথা বলতো। কারন ওখানে যখন দিন তখন এখানে রাত।
ত্যয়ইবা লজ্জায় পড়ে যায়। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলে, তো তুমি হুট হাট চলে এলে যে ভাইয়ার সাথে। কারন কি ননদিনী? আমি কি জানি সেটা?

~ হুম, জানো। তুমি ফোনে বললে যে লাবিব ব্যাক করছে। আমি আর কিভাবে থাকি বলো।
~ হই হই ননদিনী। আমার ভাবী হাওয়ার জন্য এতো তোড়জোড়।
~ উফ ভাবিই। তোমার ভাই লাবিব খান জাস্ট ওসাম। আমি তো পিক দেখেই পুরো ফিদা। দেখলেই নিজেকে পাগল পাগল লাগে গো। আমার তো চাই চাই চাই।

রোশান দরজায় এসে নক করে। রিশি ফ্রেস হয়ে রেস্ট নিবে বলে, চলে যায়। রোশান দরজা লাগিয়ে কোর্ট খুলে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে। একটানে ত্যয়ইবাকে বুকে টেনে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। নিজের সাথে মিশিয়ে প্রিয়তমার উত্তাপে নিজেকে মোহিত করতে থাকে। এতোদিনের শুন্য বুকটাকে ভরিয়ে নেয়। ত্যয়ইবা রোশানের বুকে ঠোঁটের পরশ একে দেয়। রোশান কানে কানে বলে, আমার রানীকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

ত্যয়ইবা লজ্জায় লাল হতে থাকে। রোশান বলে, আচ্ছা সবগুলো ড্রেস যে এলোমেলো করলে ওগুলো কে ভাজ করে দিলো? তুমি তো ভাজ করতে পারোনা ভালো করে। ত্যয়ইবা অবাক হয়ে বলে, আমি ড্রেস এলোমেলো করেছি কে বললো, তুমাকে? রোশান পকেট থেকে ফোন বের করে ত্যয়ইবাকে ভিডিও টা দেখায়। ত্যয়ইবা বেশ বুঝতে পারে এটা তুষারের কাজ। রাগে কটমট করতে থাকে। রোশান হেসে ত্যয়ইবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, এতো টেনশন করার জন্য থ্যাংকস। তবে আমার রানীকে সব সময় সবকিছুতেই আমি শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর উপাধিই দিতে রাজি।

সকাল থেকেই একটার পর একটা রান্না করেই যাচ্ছে। এদিকে তানভীর এতোক্ষন তার বউপাখিকে না দেখতে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠছে। বাড়ি ভর্তি মানুষের মধ্যে কিচেনে যেতেও পাচ্ছেনা। কি ভাববে তারা? একসময় আর না সইতে পেরে জোরে জোরে বউপাখি বউপাখি করে ডাকতে থাকে। ত্যয়ইবা বিরক্ত হয়ে বলে, উফ পাপা। তুমিকি মমকে কিছুক্ষনের জন্য ছাড়তে পারোনা একটু? আমাদের জন্য একটু রান্না করছে মম। তোমার জন্য মমের একটু আদর ও খেতে পারিনা আমি। সবসময় মমকে তোমার সাথেই রাখো।

তানভীর জোরে ডেকে উঠে রোশান বলে,
রোশান : জি পাপা।
: তুমি কি আজকাল আমার মেয়ের আদর যত্নে অবহেলা করছো?
শ্বশুর এর এমন উক্তিতে বিষম খায় রোশান। এমন প্রশ্ন কোন শ্বশুর তার জামাইকে করতে পারে তা জানা ছিলো না। ত্যয়ইবা রাগে দুঃখে স্থান ত্যাগ করে। রোশান কাশতে কাশতে বলে, আমি ঠিকঠাক কেয়ার করছি পাপা। ওর আর কেয়ারের অভাব হবে না।

~ ঠিক আছে। খেয়াল রেখো।

পার্ট ৭

বাসার পেছন দরজা দিয়ে ঢুকে পা টিপে টিপে চুপি চুপি সিড়ি বেয়ে উপরে চলে আসে। দরজা আগে থেকেই খুলা ছিল। রুমে ঢুকতেই দেখে লম্বা বেনী ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কন্টিনিউয়াসলি পায়চারি করে যাচ্ছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে তার রাজ্য ডাকাত পড়েছে আর সে তার সৈন্যদের ডাকাত দমনে পাঠিয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে যে তার সৈন্যরা রাজ্য উদ্ধার করতে পারলো কিনা? দশ মিনিট হতে চলল অথচ তার রুমে যে কেউ আছে আর তাকেই দেখছে সে দিকে তার নজর নেই বললেই চলে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে খাটে শুয়ে পড়ল তাফিফ। বেনীওয়ালীর বেনী যখন ঘুরানো বন্ধ করবে তখনই না হয় তার দিকে তাকাবে। কিছুক্ষন শুয়ে থাকার পর চোখে ঘুম চলে আসে। বেনীওয়ালির কাছে এলেই তার শান্তি পুষ্প ফুটে ওঠে। আর তার বিছানায় শুইয়ে পড়তেই তো ঘুমপরীরা ঘুমের বিস্তার ঘটায়।

হটাৎ করে চোখ পড়ে খাটের উপর। ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে মুখ চেপে ধরে জারা। আমতা আমতা করে বলে, “তাফিফ ভাইয়া, কখন এসেছো তুমি? আর সেই কখন থেকে যে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে মরেই বেঁচে যাচ্ছি।”
তাফিফের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। দেখে তাফিফ বিভোর ঘুমে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সামনের চুল গুলো কপাল বেয়ে চোখের সামনে এসে পড়েছে। এসির শিরশিরানি হাওয়ায় অল্প একটু করে নড়ে উঠছে। শার্টের উপরের তিনটা বোতাম খুলা থাকায় বুকটা স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। ছোট ছোট লোমে ঘেরা বুকটা মুগ্ধ হয়ে দেখে জারা। ছোট বেলা থেকেই তাফিফকে দেখে আসছে জারা।

কোন দিন খেয়াল করে দেখেইনি যে তার তাফিফ ভাইয়ার নাকটা কেমন? বুচা নাকি উচা? চোখ কেমন? ছোট নাকি বড়? এরকম তো কখনো ভাবেই নি। সব সময় একটা কথায় তার ব্রেন আর মন জেনে এসেছে। যে তার একটা তাফিফ ভাইয়া আছে। আর তাফিফ ভাইয়ার মনটা অনেক বড়। কারন তার তাফিফ ভাইয়া তাকে অনেক আইসক্রিম কিনে দেয়। পারমিশন টা লাবিব ভাইয়া দিলেও কষ্ট করে চুপি চুপি সবার চোখের আড়ালে রাত করে আইসক্রিম তো তাফিফ ভাইয়াই নিয়ে আসে। অনেক দিন তো বারান্দা দিয়েও উপরে উঠে। কি কষ্টই না করে তার জন্য। তাফিফ যতই বলুক যে লাবিব তার আইসক্রিম কেনার জন্য টাকা দেয় কিন্তু জারা জানে লাবিবের টাকা দিতে হয় না। তাফিফ নিজের টাকায় আইসক্রিম কিনে দিয়ে যায়। আর ঠাণ্ডা না লাগার ঐষধ গুলোও দিয়ে যায়। এই জন্যেই জারার কাছে তাফিফ অনেক ভালো আর বড় মনের মানুষ।

জারা তাফিফের ঠোঁট দুটোর দিকে তাকাতেই কেমন যেন কেপে উঠে। অদ্ভুত ফিলিংস লাগছে তার তাফিফের লাল ঠোঁট দুটো দেখে। এই ঠোঁটেই তো সেদিন তিন মিনিটের মতো নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রেখেছিল সে। কপালে হাত দিয়ে চুল গুলো সরিয়ে দিতেই তাফিফ একটু নড়ে উঠে। পরক্ষণেই আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। জারা এক বুক সাহস নিয়ে হাত দিয়ে তাফিফকে ছুতে থাকে। মুখ ছুয়েই ক্ষান্ত হয়নি বুকের লোম গুলো পর্যন্ত ছুয়ে দেয়। তাফিফের মুখের সামনে নিজের মুখটা এনে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
~ “তুমি কতো সুন্দর তাফিফ ভাইয়া। আইক্রিম ও তো এতো সুন্দর দেখতে হয় না।”

কথাটা একটু জোরেই বলে, তাফিফ জেগে যায়।
উঠে বসে বলে, “তোর বিছানায় শুইয়ে ঘুমাই শুধু আমি। কয়টা বাজে?”
জারা টাইম দেখে বললো, “৩ টা ৫ মিনিট”
“ইসস অনেক লেইট হয়ে গেছে। বাসায় যেতে হবে। ডেকে দিবিনা তুই?”
“বাসায় যাবে মানে? এতক্ষণ যে কতো কথা সাজালাম আই মিন ভাবলাম ওগুলো না শুনেই তুমি চলে যাবে?”
“পরশু ভাইয়া আসছে। কাল তো যাবিই আমাদের বাসায়। তখন বলিস”
“কিন্তু আমার আইসক্রিম?

তাফিফ একবার জারার দিকে তাকিয়ে দেখে মেকি হাসি দেয়। তারপর সামনে এসে বলে, “এইযে”
“এইযে মানে?”
“এইযে মানে এইযে। আমি নাকি কোন আইসক্রিম। তো তোর সামনেই আছি। নে খা আমাকে।”
জারা কি বলবে বুঝতে পারছে না। নিজের বনী ধরে নিজেই টান দিয়ে ব্যাথা পেয়ে আহ করে উঠে।
তাফিফ আরো সামনে এগিয়ে জারার কানের কাছে মুখটা নিয়ে যায়।
“আমার বেনীওয়ালী। কিভাবে খাওয়া শুরু করবি তোর কোন আইসক্রিম কে? লিক করবি আস্তে আস্তে নাকি প্রথমেই কামড় দিবি?”

জারা চটকে দুরে সরে যায়। তার সবকিছু এমন লাগছে কেন আজ? সে নিজেও জানে না। তাফিফ মনে মনে হাসতে হাসতে উঠে দাড়ায়। জারাকে বলে,
~ “আসি আমি। ভালো থাকিস।”
দরজার কাছে গিয়েও দেখে জারার নড়া চড়া করার কোন সম্ভাবনা নেই। এই একটা ব্যাপারে তাফিফের হাই লেভেলের রাগ উঠে। পেছন ফিরে বলে,
“বেডের পেছনে বক্স আছে।”
বেড়িয়ে আসে রুম থেকে। সিঁড়িতে পা দিতেই দেখে জারা তার পাশে। হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাফিফের সাথে পা মিলাচ্ছে। তাফিফের রাগ উধাও হয়ে যায়।

অফিস থেকে লাঞ্চ টাইমেই ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছে ফারাহ। বাসায় জারা একা আছে তাই আগেই চলে আসতে হয়েছে। লাবিব আসবে বলে, সবাই সেই বাসায় চলে গেছে। জারাটাকে অনেকবার যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু তার জিদ সে আপুকে ছাড়া কিছুতেই যাবে না। আপু যেখানে থাকবে সেও সেখানেই থাকবে। লাবিব রাগ করবে বলে, সবাই বুঝিয়েছে। তাও সে যেতে রাজি নই। জারা ভালো করেই জানে ফারাহ কে রেখে গেলেই তাফিফ রাগ করবে।

ফারাহ বাসায় এসেই দেখে জারা ডাইনিং টেবিল আইসক্রিম দিয়ে সাজিয়েছে। নিজেও সেজে গুজে আইসক্রিমের সাথে সেলফি তুলছে। ফারাহ অবাক হয়ে যায় এমন কান্ডে। জারা কাছে এগিয়ে বলে,
“এতো আইসক্রিম কোথায় পেলি তুই? তুই কি কারো কাছ থেকে টাকা চুরি করে এগুলো দোকান থেকে কিনে আনছিস? খালি বাসা রেখে বেরোতে না করেছিনা তোকে? আর কার কাছ থেকে চুরি করেছিস বল? আমি সব চাচ্চুকে বলে, দিবো কিন্তু।”
“উহ আপু… ঘেন ঘেন করো নাতো। আমার কতো দিনের ইচ্ছা ছিলো আইসক্রিমের সাথে মুচি মুচি ফটোসেশন করার। আজ আমার মনের আশা পূর্ণ হলো। বাড়ি ফাকা আর আমার কাজ হয়ে গেছে ঝাকানাকা।”

“তা বুঝলাম। কিন্তু আইসক্রিম কেনার টাকা কই পেলি? না হলেও কম করে এখানে পাচহাজার টাকার আইসক্রিম আছে। আর এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিস গলে যাচ্ছে তো।”
“ওহো আমার তো মনেই নেই এগুলো বাংলাদেশের ওয়েদার সহ্য করতে পারে না।”
জারা সব আইস বক্স এ ঢুকাতে থাকে। ফারাহ বলে,
“কি হলো বল কই থেকে টাকা পেলি?”

“আমি না আপু ঠিক তোমার কথা বুঝতে পারি না। তুমি আমাকে কি ভাবো বলোতো? একবার বলছো চুরি করেছিস। আমাকে কি তুমার চুর মনে হয়? কোনদিন দেখেছো চুরি করতে? আবার বলছো কই থেকে পেলি? আমি কি ফকিন্নি যে পেলাম আর তুলে নিলাম? ইউ হেব এনি আইডিয়া? হু আই এম? আমি হচ্ছি ফেমাস বিজনেস ম্যান জোহান চৌধুরীর এক পিস সুপুত্রী জারা চৌধুরী। বিখ্যাত বিজনেস ম্যান তানভীর খান আর লাবিবা খানের একমাত্র ভাগনী। বিখ্যাত বিজনেসম্যান লাবিব খানে পাকা বুড়ি বোন আমি। বিখ্যাত ডক্টর তাফিফ খান এর একমাত্র বেনীওয়ালী।”
“ঐ তুই থামবি এবার? পাগল হয়ে গেলাম আমি। দয়া করকরআমার প্রতি। রুমে গেলাম। আর এই আইসক্রিম তারাতারি শেষ করবি এক্ষুণি।”

“ওকে বেহেনা.. লাভ ইউ।”
বিকালে জারা ছাদে দাগ টেনে কুতকুত খেলছে। লাবিবা শিখিয়েছে তাকে এই খেলা। অন্যান্য দিন দোলা নয়তো মাধুজা সঙী হয় তার এই খেলার। বয়সের ভারে না পাড়লেও বেশ মজা হয় এই খেলায়। জারার একদমি একা খেলতে ইচ্ছা করছে না। ফারাহ আপুকে ডাকলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। ফারার রুমে এসে দেখে ফারাহ চুলে চিরুনি করছে। জারা ফারাহকে টেনে হিচড়ে ছাদে আনে। বাড়িটা তিন তালা হলেও একপাশে এক তালায় বড় ছাদ রয়েছে। সেখানেই জার খেলে। ফারাহকে টেনে আনতে বেশি বেগ পেতে হয় না। এদিকে ফারাহ বার বার বলছে”থাম থাম। কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? আচ্ছা আমি যাচ্ছি ছাড় আমাকে।”

“আপু দেখ এইটা আমার কুতকুত খেলার দাগ দেওয়া ঘর। এখন আমরা দুজনে কুত কুত খেলবো।”
“পাগল নাকি? সেই ছোট বেলায় খেলেছিলাম এখন বুড়ো বয়সে এসব খেলবো?”
“তাহলে কি বড়আম্মু আর আম্মু বাচ্চা? তুমি আর আমি বুড়ি?”
ফারার আর কোন কথা নেই। খেললেই বা দোষ কি?
কোমড়ে ওড়না গুজে গুটি নিয়ে দম নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে কুতকুত খেলতে থাকে। জারা তো মহা খুশি। দু বোনে তালে তালে খেলছে আবার ঝগড়াও করছে।

এদিকে লাবিব বিডিতে ল্যান্ড করে। তাফিফ আর সরোয়াজ গিয়ে পিক করে লাবিব কে। বাসায় এসে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে। মাকে জড়িয়ে ধরে কেদে দেয়। এতো বছর পর মাকে পেয়ে সব ভুলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নেয়। লাবিবা নিজে ছেলেকে খাইয়ে দেয়। কোলে শুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বিকালে ঘুম ভাঙে লাবিবের। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। এসে তার খেয়াল হয় সবাই আছে বাট তার পাকা বুড়ি আর মায়া কুমারী নেই। দোলাকে জিজ্ঞাসা করতেই বলে, ফারাহকে ছাড়া আসবেনা। ফারার অফিসে ছুটি পায়নি জন্য আসতে পারে নি। তার জন্য জারাও আসে নি।

লাবিব এক মুহূর্ত দেরি না করেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পাড়ি জমায় সেই পরিচিত রাস্তায়। জারাদের বাসার সামনে গাড়ি থামিয়ে ভেতরে ঢুকে। বাড়ির সামনে এসে উপর দিকে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায়। যেখানে জারা আর ফারাহ দুজনে কুত কুত খেলছে।

পার্ট ৮

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে এক হাতে কফি নিয়ে আরেক হাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো আকাশের অসংখ্য তারার ভিরে একটি তারা অন্য একটি তারা স্থানে কিভাবে প্রস্থান করে সেটাই দেখতে ব্যতিব্যস্ত। আর মস্তিষ্কে তার মায়া কুমারীর ভাবনা। কিছুক্ষন পর পর কফির কাপ টা জোড়া ওষ্ঠের ছোঁয়ায় তার ভেতরের কফি টুকু একটু একটু করে উজাড় করে দিচ্ছে। আর তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ছোট্ট তুষার সোনা। অনেক ক্ষন দাঁড়িয়ে থেকেও যখন তার দিকে কোন পাত্তা পাচ্ছে না তখন মনক্ষূন্ন হয়ে রেগে যায় তুষার। তেজী গলায় বলে, উঠে ~ হ্যালো মি. লাবিব খান। হাউ আর ইউ? আই এম ফাইন। থ্যাংকু।

বলেই পেছন ফিরে হাটা দেয়। লাবিব বুঝতে পারে না এসব কি বলে, গেলো তুষার। তাই তুষার কে দু বার ডাকে। কিন্তু বেচারা রাগে তেজে না দাঁড়িয়ে হাটতেই থাকে। লাবিব দৌড়ে এসে ভাগিনাকে কোলে তুলে নেয়। তুষার কোলেই লাফালাফি করতে থাকে আর বলে,
~ ছাড় ছাড় ছেড়ে দে শয়তান তুই আমার মন পাবি কিন্তু দেহ পাবি না।
লাবিব রীতিমতো টাস্কি। কি বলে, এসব তার এইটুকুন ভাগিনা? অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করে
~ মামা কি বলছো এসব? কেন বলছো? কই থেকে শিখেছো এসব?

~ এতো প্রশ্ন করছেন কেন? কে আপনি? বাই দ্যা ওয়ে, আজ আমার মামা এসেছে। তাকেই খুজছি। আমি তাকে খুজছি কিন্তু পাচ্ছি না। সেও আমাকে মনে করেনি। আপনি কি তাকে দেখেছেন?
~ বাব্বাহ আমার মামাতো বেশ ভালো গুছিয়ে কথা বলতে পারে।
~ কেন পারবোনা? আমার নানু খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে, তার থেকেই শিখেছি। আর আমি তো আর ছোট না, বড় ছেলে আমি।

~ তো ঐসব কথা কি তোমার নানু শিখিয়েছে?
~ না মম শিখিয়েছে। মম যখন রেগে রুম থেকে বেরিয়ে যায় তখন পাপা গিয়ে কোলে নেয় তখন মম বলে, এখন আমি রেগে বেরিয়ে যাচ্ছি তুমি কোলে তুলে নিলে তাই বললাম। এখন বলোতো আমার মামা কোথায়?

লাবিব হাসতে হাসতে বলে,
~ বুড়ো মামা আমার একটা। এইযে দেখুন এইটা আপনার মামা। (নিজেকে দেখিয়ে )
তুষার গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে। লাবিব অনেক গুলো চকলেট দেয় তুষার কে। বিছানায় বসে তুষার চকলেট খায়। লাবিব ল্যাপটপ এ কার্টুন ছেড়ে দেয়। দুজনে মিলে কার্টুন দেখতে থাকে।

পরিবারের সবাই আর মেহমান রা এক সাথে খেতে বসে। লাবিব এসে বসতেই ত্যয়ইবা পাশের চেয়ার টা ছেড়ে দেয়। রিশিকে ইশারায় বসতে বলে, রিশি বসার পর ত্যয়ইবা রোশানকে ইশারা করে। যার অর্থ দুজনকে কেমন মানিয়েছে? রোশান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জবাব দেয় গ্ৰেট। দুজনেই মুচকি হেসে উঠে। এদিকে রিশি কিভাবে কথা শুরু করবে সেটা ভেবে খেতেও পাচ্ছে না। দু বার আঙুলেও কামড়ে দিয়েছে। কোন মতে খাওয়া শেষ করে।

খাবার পর সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দেয়। তখন ত্যয়ইবা রিশিকে উদ্দেশ্যে করে লাবিব কে বলে,
~ লাবিব ওই হচ্ছে আমার ননদ রিশি। তুই তো আগেও কথা বলে, ছিলি শুধু দেখিনসনি। রোশানের সাথে এসেছে কয়েকদিন আগে এতোদিন আমার শশুড় শাশুড়ীর সাথে আমেরিকাতেই ছিলো।
~ ও আচ্ছা। হ্যালো রিশি আই এম লাবিব খান।
রিশি আনন্দে খুশি হয়ে বললো, হাই। নাইস টু মিট ইউ।

তারপর আর লাবিব কিছু বললো, না। রিশি অনেক আশা নিয়ে বসে ছিলো হয়তো লাবিব কিছু বলবে কিন্তু তার আশা নিরাশা হয়ে গেলো। লাবিব জোহানকে বললো, “আংকেল জারা একা থাকবে নাকি। চলে আসতে বলো। আর ওয়েদার ও খারাপ। ভয় পাবে। নিয়ে আসি গিয়ে।”
ফারুক বলে, উঠলো”ফারার জন্য জারা থেকে গেলো। মেয়েটার অফিস ছুটি দিচ্ছে না, প্রায়ইতো ছুটি কাটায় তাই। আর কারো বাসায় যেতেও চায় না।”

লাবিব কিছুক্ষণ ভাবলো। এটা বললেতো চলবে না মায়াকুমারী। তোমাকেতো আমার বাসায় আসতেই হবে। পার্মানেন্টলী থাকতেও হবে আজীবন।
“বুঝলাম না ব্যাপারটা। নিজেদের এত গুলো বিজনেস কোম্পানি থাকতে অন্য কোম্পানি তে কেন জব করতে হবে? আংকেল ফারাহ কোন কোম্পানি তে জব করে?”

“সাগর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি”
নাম শুনেই লাবিব মুচকি হাসি দিলো। জোহান কে বললো, “আংকেল ওদের দুজনকে আমি নিয়ে আসছি।”জোহান বুঝলো।
রুমে এসে ফেসবুকে লগ ইন করলো। মেসেন্জারে ফোন দিতেই ওপাশ থেকে সাগর কল রিসিভ করলো।
~ কিরে সালা কি অবস্থা?

~ তোর বোনকে বিয়ে করে তোকে এবার সালা বানাতে বিডি চলে আসছি।
~ সত্যিই দুলাভাই? কবে আসছোস বিডিতে? আমার বোনের দেখা পাইছোস?
~ হুম। তোর বোন তোর অফিসেই কাজ করে। ফারাহ চৌধুরী নাম।
~ মানে কি? কোন ফারাহ?
~ বোরখা পড়ে যে।
~ ওরে আল্লাহ তাই নাকি?

~ কাল ছুটি দে। যখনি ছুটি চাইবে তখনি দিবি।
~ আইচ্ছা মামা।
~ দুলাভাই ডাক শালা। রাখছি।
~ আইচ্ছা আইচ্ছা।
লাবিব লাবিবাকে বলে, মম পাকা বুড়ি টাকে আনতে যাচ্ছি।

~ এখন তো রাত বাবা। কাল সকালে যাস। আর মেঘ গুড় গুড় করছে বৃষ্টি হবে।
~ মম তাতে কি? যাবো আর আসবো। গেলাম।
~ তারাতারি আসবি কিন্তু।
~ ওকে মম।

লাবিব গাড়িতে বসে পাশে ফিরতেই দেখে তাফিফ বসে আছে।
~ গাড়িতে কি করিস?
~ আমাকে রেখে চলে যাচ্ছো এইটা কিন্তু ঠিক না।

লাবিব একটু হাসে। গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিছুদুর যেতেই বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তা পুরো ফাকা। ঝুম ঝুম আওয়াজে পুরোটা যেন এক মধুময় ভালোলাগা ছুয়ে দিচ্ছে দুজনকে। দুজনের মনে জেগে উঠছে চিরচেনা সেই মুখ দুটো যা তারা সারাজীবন মনের ক্যনভাসে জলতুলির রং এ একে রাখতে চায়। গাড়ি থেকে নেমে একদৌড়ে ভিতরে চলে আসে। ঝুম বৃষ্টি হোওয়ায় একটু ভিজে গেছে শার্ট। দরজায় কলিং বেল বাজাতে বাজাতে অস্থির হয়ে পড়ে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত এগারোটা বাজে। এই সময় তো ঘুম কাতুরে জারার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। আর ফারাহ? সেও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তাফিফ লাবিবের দিকে তাকিয়ে বললো, ভাইয়া পেছন দরজা বাইরে থেকে খুলা যাবে। আমি বাইরে থেকে খুলেই ডুকি।
~ তাহলে চল।

~ ঘুরে যেতে যেতে বৃষ্টি তে ভিজেই যাবে।
~ তাহলে কতক্ষণ এইভাবে দাড়িয়ে থাকবো? মাঝে মাঝে তো বাজ ও পড়ছে। জারা তো বাজ এ ভয় পায়।
~ জারা এতোক্ষনে ঘুমিয়ে পড়েছে গিয়ে দেখ। একবার ঘুমোলে তার আর দুনিয়া দারি হুস থাকে না। ফারাহ আপু তো আছেই।
~ চল ভিজেই যাবো। মনে হয় না বৃষ্টি কিছুক্ষনের মধ্যে কমবে।

দুজনে পেছন দরজা দিকে ভেতরে ঢুকে। ফোন, ঘড়ি, ওয়ালেট বের করে ড্রয়িং রুমে টেবিলে রাখে। ভিজে গেছে প্রায়। লাবিব তাফিফকে বলে, জারা আর ফারাহকে ডাক দে। তাফিফ উপরে উঠে আসে। জারার রুমে গিয়ে দেখে দরজা খুলা। ভেতরে অন্ধকার। তাফিফ লাইট জালিয়ে দেয়। কিন্তু রুম এ জারা নেই। হয়ত ফারার রুমে গিয়েছে ভেবে তাফিফ লাইট অফ করতে যাবে তখনি গুন গুন আওয়াজ শুনতে পায়। আওয়াজ টা কোথা থেকে আসছে ভেবে ধীর পায়ে সন্ধান করতে থাকে। একদম খাটের কোনায় চলে যায়। পর্দার আড়ালে শব্দ টা হচ্ছে।

পর্দা সরাতেই দেখে জারা চোখ বন্ধ করে কানে জোরে হাত চেপে কন্টিনিউয়াসলি ঠোঁট নাড়িয়ে দোয়া পড়ে যাচ্ছে। তাফিফ জারা বলে, ডাক দিতেই জারা চোখ খুলে। তাফিফ কে দেখে হাউ মাউ করে কেঁদে দেয়। এক লাফে বসা থেকে উঠে তাফিফ কে জড়িয়ে ধরে। তাফিফ বুঝতে পারে খুব বেশী পরিমান ভয় পেয়ে গেছে জারা। এতোটা ভয় পাবে ভাবতে পারে নি। কারন তাফিফ ভেবেছিল জারা তো একা নেই। ফারাহ আছে জারার সাথে। কিন্তু জারা তো একা এখানে।
তাফিফ জারাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু জারা তাফিফকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে।

কিছুক্ষণ পর জারা একটু স্বাভাবিক হয়। হেচকি তুলতে তুলতে বলে,
~ তুমি জানোনা আমি ভয় পাই? সবাই তোমার বাসায় চলে গেছে। এতো দেড়ি করলে কেন? আমার যদি ভয়ে হার্ট এটাক হয়ে যেতো তখন তুমি কি আমার উপর ডাক্তার গিরি করে আমার হার্ট আগের মতো করে দিতে পারতে বলো? একটুও ভাবো না আমার কথা। আমি মরে গেলে। _?

তাফিফ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আর কোন কথা বলতে দেয় না জারাকে। তাফিফ ভালো করেই জানে জারা এখন সব থেকে বেশী বিষাক্ত কাটা যুক্ত কথা গুলো তার দিকে ছুড়ে দিবে। যা সরাসরি তাফিফের বুকে গিয়ে পড়বে। আচড় কেটে বুকটা রক্তাক্ত করে দিবে। কিসের হার্ট এটাক হবে তোর? তোর হার্ট তো আমি এটাক করবো বেনীওয়ালী। যার সমস্তটা জুড়ে আমার বিচরন থাকবে। নিজেকে সামলিয়ে জারাকে প্রশ্ন করে ~ বেনীওয়ালী, তুই একা কেন? ফারাহ আপু কোথায়?
জারা কাদো কাদো গলায় জবাব দেয় ~ আপু হারিয়ে গেছে। আমি সারা বাড়ি খুজেছি কিন্তু আপু নেই। আপু কে ভুতে নিয়ে চলে গেছে।

~ ছিহ বেনীওয়ালী, ভুত বলতে কিছু নেই জানিসনা? আর তুই ভুতে ভয় পাস!
~ আমি নাতো আপু ভয় পায়। যে যেটাতে ভয় পায় তাকে সেইটাই খায়।
এর মধ্যে জোরে বাজ পড়ে। জারা আল্লাহগো বলে, আবার তাফিফ কে জড়িয়ে ধরে। তাফিফ ও বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় জারাকে।

বৃষ্টি ভেজা রাত অসহ্য যন্ত্রণাময় একটি রাত। যারা জীবনে লাঞ্চহা নিয়ে দিন যাপন করছে তাদের এই রাতে লাঞ্চহা গুলো অসহ্য যন্ত্রণার রুপ ধারণ করে।

ব্যথা গুলো তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে গভীরতা কতটুকু তার জানান দেয়। টুকরো টুকরো সৃতি গুলো বিরাট আকার ধারণ করে। প্রেমিকার মন প্রেমিকের জন্য ছটফট করে। ছোট ছোট প্রেমময় কথন গুলো সৃতিতে ভেসে উঠে। ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো চোখের সামনে বার বার ভেসে ওঠে। শরীর হৃদয় জুড়ে ভালবাসার কল্পনার বিন্যাস ঘটে। আজ এই বৃষ্টি ভেজা রাতে কষ্ট গুলো বুকে চারা দিয়ে উঠছে। শান্ত মনটা অশান্ত হয়ে উঠছে। বৃষ্টির জলে নিজের চোখের জল গুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে দিতে ইচ্ছা করছে। পা টিপে টিপে ছাদে পা রাখে ফারাহ। বর্ষার ধারা যেন তাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে যে আসো আমার পবিত্র জলস্পর্শে নিজের দুঃখ গ্লানি সব মুছে নিজেকে শান্ত করো, পবিত্র করো।

পা বাড়ায় ফারাহ। নিজেকে ভিজিয়ে নেয় পবিত্র জলে। প্রত্যেক টি বিন্দু কনা উপভোগ করতে থাকে চোখ বন্ধ করে।
তাফিফের পেছন পেছন এসেছিলো লাবিব। জারার কথায় চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাফিফ জারাকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখ দুটো বন্ধ করে। দেখে মনে হচ্ছে একজন আরেকজনে মিশে যেতে চাইছে। ভাই বোন কে এভাবে দেখে সরে আসে লাবিব। তাদের ডাকার সাহস অথবা ইচ্ছা কোনটাই নেই তার। ভালোলাগার মুহুর্ত গুলোতে কখনো ডিস্টার্ব করতে নাই। তার মাথায় একটাই কথা বার বার ঘুরছে। খুজতে থাকে তার মায়া কুমারীকে।

পার্ট ৯

প্রত্যেকটি ফোটা স্পর্শ করুক
তোমার হৃদয়গহীনে,
গড়িয়ে পড়ুক সমস্ত কালোমেঘ
শ্যামলতার স্নিগ্ধবদন বেয়ে,
যে স্মিগ্ধতায় মরিয়াছি আমি
‌মায়াকুমারীর প্রেমে।

ফারাহ চোখ খুলে। কথাগুলো তার কানে বাজতে থাকতে। পুরুষ কন্ঠ স্পষ্ট বুঝতে পারে। পুরো বাসায় তো জারা আর শুধু ও। তাহলে পুরুষ কন্ঠে কে কথা বলবে? তাছাড়া জারা তো ঘুমুচ্ছে দেখে আসছে। আর এতোরাতে ছাদে কে কথা বলবে? একদম স্টেচু হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে ফারাহ।

তখন লাবিব আবার ডেকে ওঠে ~ মায়াকুমারী…
ফারাহ চমকে উঠে। আশে পাশে খুঁজতে থাকে কে কথা বললো, । কয়েক কদম দূরে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাবিব কে দেখে থমকে যায়। ছাদে ইলেকট্রিক লাইট থাকা সত্ত্বেও বার বার বিদুৎ চমকে উঠছে। যার কারনে আরো স্পষ্ট লাগছে সবকিছু। সাদা শার্ট পরিহিত ফর্সা লম্বা মানুষ। বৃষ্টিতে ভিজে জুব জুব করছে কাপড়, দেয়ালে ঠেস দিয়ে এক পায়ের উপর আরেক পা ভাজ করে দিয়ে দু হাত বুকের উপর ভাজ করে দিয়ে মুখে একক্রোশ হাসি রেখা টেনে দাড়িয়ে আছে। সামনের সাদা দাত গুলো কিঞ্চিৎ দৃশ্যমান হয়ে আছে। সে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে।

পুরো মুখে হাতে যত টুকু দেখা যায় আর কি ~ বৃষ্টির ফোঁটা ছোট ছোট করে জমে আছে। সাদা চামড়ার উপর সাদা সাদা বৃষ্টির ফোটা জেসমিনের উপর কুয়াশা জমলে যেমন নৈস্বগীক সৌন্দর্য বিস্তার করে ঠিক তেমনি সৌন্দর্যে ভরপুর। ভেজা চুল গুলো একপাশে চোখের সামনে চলে আসছে তবুও চুলের ফাকে মনিজুড়া চিক চিক করে উঠছে। ফারাহ অবাক চোখে লাবিবকে পর্যবেক্ষণ করছে। ফারার এভাবে তাকানোতে লাবিব শুধু হাসছে।

ছেলেরা এত সুন্দর দেখতে হয় সেটা ফারার একদমি জানা ছিলো না। কিন্তু কে এই সুপুরুষ? এতো রাতে এই বৃষ্টিতে এখানে কি করছে? বাসার মেইন ডোর লক করা। কেউ আসবেই বা কিভাবে? আচ্ছা ইনি মানুষ তো নাকি ভুত? নাহ ভুত বলতে কিছু নেই। কিন্তু জ্বীন তো আছে। জ্বীন রা নাকি অসম্ভব সুন্দর দেখতে। ইনিও তো অসম্ভব সুন্দর। ইনি কিছুতেই মানুষ হতে পারে না। জ্বীন মানুষের রুপ ধরে এসেছে। শুনেছি বৃষ্টির রাতে নাকি বৃষ্টি জ্বীন গুলো নিজেদের বাসা ছেড়ে ভিজে ভিজে বেড়ায়। ফারাহ ভয়ে পুরো কাঁপতে থাকে।”আল্লাহ গো ভেজা জ্বীন বাচাও”বলে, দৌড় দেয় ফারাহ।”জ্বীন ভাই আমাক খেও না প্লিজ… আমি আর বৃষ্টিতে ভিজবো না।”বলে, চেঁচাতে থাকে।

ঘটনা কি ঘটছে বুজতে একটু সময় লাগে লাবিবের। পরক্ষনেই নিজেও দৌড়াতে থাকে। লাবিবকে পিছু পিছু দৌড়াতে দেখে ফারাহ আরো জোরে চিৎকার করতে থাকে। ফুলের টবের সাথে পা বেজে পড়ে যায় ফারাহ। ব্যাথা পেয়ে বসে পড়ে ফ্লোরে। লাবিব পাশে এসে বসতেই ভয়ে গলা ফাটিয়ে দেয় এক চিৎকার। লাবিব কানে হাত চেপে ধরে। হাত সরিয়ে দেখে ফারাহ সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। কোলে তুলে ছাদ থেকে চলে আসে। জারা আর তাফিফকে ডাকে। জারা আর তাফিফ দৌড়ে আসে। লাবিবের কোলে ফারাহ কে দেখে জারা আপু আপু বলে, চেঁচাতে থাকে। তাফিফ ইশারায় চুপ করতে বলে, লাবিবকে বলে,
~ কি হয়েছে ভাইয়া? আপুর এই অবস্থা কিভাবে হলো?

লাবিব বলল ~ ভেজা জ্বীন করেছে।
জারা ~ ও আমার আল্লাহ, আপুকে জ্বীনে খেয়ে। ফেলেছে? এখন আমি আপু কই পাবো? সত্যি সত্যি তাহলে জ্বীন আছে।
তাফিফ দেয় এক ধমক। এদিকে একজন সেন্সলেস হয়ে আছে আর আরেকজন আজাইরা কথা শুরু করে দিয়েছে। লাবিব ফারাহকে শুইয়ে দেয়। তাফিফ ফারার জ্ঞান ফেরানোর জন্য ট্রিটমেন্ট করে। জারা কান্না শুরু করে দিয়েছে ইতোমধ্যে। বার বার বলছে ~ আপু তুমি মরে গেলে কেনো? তুমি বেঁচে ওঠো না…। লাবিব তাফিফের রাগ হলেও কিছু বলে, না। জানে জারা চুপ হবে না। কিছুক্ষন পর ফারার সেন্স ফিরে আসে। এক লাফে উঠে বসে বলে, বাচাও বাচাও ভেজা জ্বীন।

তাফিফ হাসতে হাসতে বলে, হ্যাঁ ভেজা জ্বীন। তুমি ভেজা পরী আর তুমার সামনে ভেজা জ্বীন বসে আছে। তো ভেজা জ্বীন পরী বাসায় ফিরতে হবে তো। পরী সাহেবা আপনি চেঞ্জ করে নিন। ঠাণ্ডা লাগবে। বেনীওয়ালী চল চল কাপড় গুছিয়ে নে।
তাফিফ জারাকে ঠেলেই নিয়ে চলে আসে। লাবিব এর দিকে ফিরে ফারাহ। এখনো লাবিব মুখে হাসি টেনেই ফারার দিকে তাকিয়ে আছে। ফারাহ বুঝতে পারে ব্যপারটা। লজ্জা পেয়ে যায়। এতোক্ষণ লাবিবকে জ্বীন ভেবে কি কান্ডটাই না করলো।

লাবিব হেসে বলে,
~ মাত্র তো আসলাম। এর মধ্যেই আর কতো রুপ দেখাবে বলো?
ফারাহ জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই লাবিব আমতা আমতা করে বলে, না মানে তোমার সম্পর্কে যা শুনেছিলাম তুমি কিন্তু ঠিক তেমনটা নোও।
~ কি শুনেছিলে? কেমন আমি?

~ শুনেছিলাম তুমি নাকি কুচবরন কন্যা। কিন্তু সরাসরি দেখছি তুমি তো শ্যামলতা মায়াকন্যা। আমি কিন্তু তোমাকে মায়াকুমারী বলেই ডাকবো। আমার মায়াকুমারী।
ফারাহ কি বলবে বুঝতে পারছে না। লাবিব একবার কথা হয়াতেই কি সুন্দর ফ্রি মাইন্ডে কথা বলে, যাচ্ছে আবার তার প্রশংসাও করছে অথচ সেই ফ্রি হতে পারছে না। তবুও বললো, আচ্ছা ডাকো।
~ মায়াকুমারী চেঞ্জ করে এসো। বৃষ্টি কমে গেছে আমরা বের হবো। আর তোমার অফিস থেকে ছুটি নেওয়া হয়ে গেছে।
লাবিব বেরিয়ে আসে রুম থেকে।

গাড়িতে লাবিব ড্রাইভিং সিটে বসে। জারা গিয়ে লাবিবের পাশে বসে পড়ে। লাবিব দেখেও কিছু বলে, না। কিন্তু তাফিফ রেগে যায়। জারাকে বলে,
~ বেনীওয়ালী পেছনে আয়।
~ না আমি সামনেই বসবো। তোমার সাথে বসবো না আমি। তুমি পচা।
~ আমি কিভাবে পচা হলাম?

~ আমি পাশে বসলেই তুমি আমার উপর।
~ আরেকটা কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবিতো স্কুলে কি করিস সব ভাইয়াকে বলে, দিবো।
জারা চুপ হয়ে যায়। সত্যি সত্যিই যদি বলে, দেয় তখন আমার আইসক্রিম এর ফ্যক্টরিতে আগুন লেগে যাবে। চুপ থাকি।
এদিকে লাবিব মনে মনে আর হাসতে পারলো না জোরেই হেসে দিলো। এতোক্ষন বুড়িটা আমার ভাইয়ের বুকে লেপ্টে ছিল আর এখন হা হা হা..।

তাফিফ ~ জারা দুজনেই নিভল। তারমানে ভাইয়া সব দেখে ফেলেছে। ফারাহ কিছুই জানে না তবুও লাবিবের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলো। তাফিফ রাগতে লাগলো ভেতরে ভেতরে আবার কাদতেও লাগলো। এই মেয়ের ক্লাস নিতে নিতেই না তার জীবন ফুরিয়ে যায়। কবে বড় হবি তুই বেনীওয়ালী? প্লিজ তারাতাড়ি বড় হয়। আমাকে আর অপেক্ষা করাস না।

বাসায় ফিরতে ফিরতেই রাত সাড়ে তিনটা বেজে যায়। ভেতরে ডুকে দেখে লাবিবা ড্রয়িং রুমে বসে আছে। জারা একলাফে গিয়ে লাবিবার কোলে উঠে গেছে। লাবিবা কোল থেকে নামাতে নামাতে বলে, বড় হয়েছিস তো এখন কি আমি কোলে নিতে পারি নাকি?

~ কেন পারবেনা? আজকেইতো আপুকে ভাইয়া কোলে। _।
লাবিব জারার মুখ চেপে ধরে। লাবিবা বলে, কি হয়েছে বলতে দে ওকে। মুখ চেপে ধরেছিস কেন?
লাবিব বলে, না মম কিছুনা। জানোই তো ও একটু উল্টাপাল্টা বলে, জারার কানে কানে বলে, তোর আইসক্রিম এর কথা সবসময় মাথায় রেখে কথা বলবি বুঝেছিস। উপরে চল।

লাবিব জারাকে টেনেই উপরে নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় একবার পেছন দিক ফিরে তাকায়। ফারাহকে দেখে মুখটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জার আভা দু গালে ফুটে উঠেছে।
লাবিবা তাফিফকে রুমে যেতে বলে, ফারাহকে সাথে নিয়ে প্রস্থান করে।

সকালে লাবিব ফ্রেস হয়ে নিচে নামতে নামতে দেখে তাফিফ আর জারা সবার সাথে বসে আছে। সবাই খোশগল্পে মত্ত কিন্তু তাফিফ একদৃষ্টিতে জারার দিকে তাকিয়ে আছে। আর জারা কাদো কাদো ফেস নিয়ে একবার তাফিফের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার নিচে নিজের পায়ের দিকে তাকাচ্ছে। ঘটনা তো কিছু একটা ঘটেছেই। তাফিফ লাবিব কে দেখে কিচেনের দিকে চোখে ইশারা করে। লাবিব এসে ডাইনিং এ বসে কিচেনে চোখ রাখতেই অবাক।

মায়াকুমারী শাড়ী পড়েছে। অফ হোয়াইট কালার ফুল হাতা ব্লাউজের সাথে বাসন্তী কালার শাড়ী পরেছে। মাথার চুল গুলো মুঠি করে পেছনে খোপা করেছে। কোমড়ে শাড়ীর আচল গুঁজে লাবিবার সাথে রান্না করছে। মনে হচ্ছে নতুন বউ নতুন সংসারে জয়েন করেছে আর তার শাশুড়ীর থেকে হাতে হাতে কাজ শিখে নিচ্ছে। লাবিব কে দেখে লাবিবা হেসে বললো, ঘুম ভেঙেছে তাহলে আমার শাহজাদার…।

লাবিব ও হেসে দিলো। কারন বেলা বারোটা বাজে তখন। লাবিবা বলে, লাঞ্চ করবি নাকি ব্রেকফাস্ট?
~ দুটোই মম। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ছেলে বউকে হাতে হাতে কাজ শেখাচ্ছ।
ফারাহ বলে, আমি খালামনিকে হেল্প করছিলাম।
~ আরো তো অনেক এ আছে তুমি কেন করছো? সরি বলতেই হচ্ছে তোমাকে বাড়ির বউ ই লাগছে। একদম শাড়ী পড়ে শাশুড়ীর সাথে কাজ করছো।

লাবিবা বলে, দেখ লাবিব মজা করবিনা। ফারাহ হয়তো মাইন্ড করতে পারে। ওতো আমার মেয়েরি মতো। আমার সাথে কাজ করছে অসুবিধা কোথায়। আর শাড়ি পড়তেই পারে।
~ ওকে ওকে খাবার দাও।

লাবিবা ফারার হাতে লাবিবের খাবার তুলে দেয়। ফারাহ খাবার এনে টেবিলে সার্ভ করে। লাবিব নিজ হাতে কিছুই নেয় না। ফারাহ প্লেটে ভাত বেড়ে দেয়। তরকারি তুলে দেয়। লাবিব এক ধেনে ফারার দিক তাকিয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে তার সহধর্মিণী তাকে ভাত বেড়ে দিচ্ছে। ফারাহ কাছাকাছি দাঁড়ানোর জন্য ফারার গা থেকে মৃদু একটা স্মেল নাকে আসছে। ঘোর লাগানো স্মেল এ লাবিবের ইচ্ছা করছে আরেকটু কাছে ঘেসে হালকা স্মেলটার কড়া সুগন্ধীটা লুফে নিতে। কোন এক অজানা কারনে লাবিব পারছে না। ফারাহ খাবার বেড়ে দেওয়া শেষ হতেই চলে যেতে নেয়। লাবিব পেছন থেকে ডেকে বসে। ফারাহ ঘুরে বলে, কিছু বলবে? লাবিব মাথা নাড়িয়ে না বলে, ফারাহ চলে যায়। কিন্তু তার মন তো কিছু বলতেই চাইছে।

খুব বলতে ইচ্ছা করছে আমার মায়াকুমারী…. সবই তো ঠিকই ছিল। সেজেছো তো নতুন বউ, রান্নাটাও সামলাচ্ছো, সার্ভ ও করছো বাকিটুকু কেন বাদ রাখবে? খাইয়ে দিতেই পারো কেউ কোন মাইন্ড করবেনা গেরান্টি দিচ্ছি।”
তাফিফের রুমে জারা খাতা কলম নিয়ে হাজির। তাফিফ জিজ্ঞাসা করে ~ খাতা কলম নিয়ে এসেছিস কেন?
জারা বসতে বসতে উত্তর দিলো ~ তুমিই তো বললে ক্লাস নিবে আমার। এখন যদি খাতা কলম ছাড়াই ক্লাস করতে চলে আসি তাহলে তো বলবে আমার ছাত্রী হওয়ার কোন যোগ্যতাই নেই। আমি ছাত্রী নামের কলঙ্ক। বাই দা ওয়ে তুমি কি বের হচ্ছো নাকি? তাহলে আমার ক্লাস নিবে কিভাবে?
~ ইমার্জেন্সি আছে।

~ বুঝি বুঝি। সেইতো নার্স, আয়া, এসিসটেন্ট, লেডি ডক্টর।
~ আরেকটা ওয়ার্ড মুখ থেকে বের করবি তো থাপ্পড় খাবি। কোন গ্রুপে পড়ছিস তুই?
~ সাইন্স।
~ ডক্টর হবি?
~ না সাইনটিস্ট হবো। হয়ে এমন একটা আইসক্রিম আবিস্কার করবো যে আইসক্রিম খেলে ঠান্ডাও লাগে না আবার আম্মু পাপা বকাও দেয় না।

~ মাথা মোটা একটা। তোর আইসক্রিম আর ঠান্ডা না লাগার জন্য তো আমিই আছি। অন্য কিছু ভাব। দেখ তোকে আমি বলছি। তুই যদি ডক্টর হোস তাহলে আমার সাথে ডাক্টারি করতে পারবি। আর আমাকে পাহারায় ও রাখতে পারবি যাতে কোন নার্স, আয়া আমার কাছে না ঘেসতে পারে। এখন যদি একটা আয়া আমার বউ হয়ে যায় তাহলে তুই কি তাকে ভাবি বলে, মেনে নিতে পারবি? সবাই বলবে আয়ার ননদ জারা। মান সম্মান কই যাবে তোর বলতো?
~ হুম এটাও তো ভাবার বিষয়।

~ ভাবতে থাক। আর রাতে তোর ক্লাস হবে। বই খাতা কলম নিয়ে না। অন্যকিছু নিয়ে। বেরোলাম আমি।
~ ওকে। আইসক্রিম নিয়ে এসো।
তাফিফ মুচকি হেসে চলে যায়।

পার্ট ১০

রিশি পা টিপে টিপে লাবিবের রুমে ঢুকে। লাবিব কে রুমে পায় না। রিশির রাগ হতে থাকে। আসছে থেকে একটু একা পাচ্ছে না লাবিব কে। হয় ঘুমোচ্ছে নয়তো বাইরে ঘুরাঘুরি করছে। সোফায় গিয়ে বসে পড়ে রিশি। সামনে আমার মতো সুন্দরী একটা মেয়ে থাকতে কিভাবে পাত্তা না দিয়ে থাকতে পারে সেটাই বুঝি না। অন্যকেউ হলে পেছন পেছন ঘুর ঘুর করতো। আমার প্রতি এর কোন ইন্টারেস্ট ই তো দেখছি না। নাকি আমার থেকে তার গার্ল ফ্রেন্ডরা বেশী সুন্দর ছিলো? না না তা কি করে হয়.. ভাবি তো বলে, ছিলো লাবিব কারো সাথে রিলেশনশিপে যায় নি এখনো। তবে যাবে এবার আমার সাথে।
বাথরুমের দরজা খুলার শব্দ হয়। রিশি আনন্দে লাফিয়ে উঠে। এতোক্ষন লাবিব বাথরুমে ছিলো তার মানে। আজ তাহলে একা গল্প করতে পাবরো।

লাবিব টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হয়ে আসে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মাত্র সাওয়ার নিয়েছে। পিঠ বেয়ে সাওয়ার জল এখনো পড়ছে। পরনে শুধু একটা টাওজার। রিশি কে খেয়াল না করেই লাবিব মিররের সামনে দাঁড়িয়ে চুল হাত দিয়ে ঠিক করছে।
রিশিতো মনে মনে বলছে হায় আব তেরা দেখে ম্যা তো মারগায়া। মনে মনে বলতে বলতে জোরেই বলে, ফেলে
“ইসস কি হট বডি মাইরি, মাসলটা জাস্ট ওয়াও।”

কথা শুনে লাবিব পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে রিশি হাসি হাসি মুখ করে ড্যাব ড্যাব করে তার বডির দিক তাকিয়ে আছে। রিশিকে দেখেই লাবিবের রাগ উঠে যায়। প্রথমত নক না করে কোন ছেলের রুমে প্রবেশ করেছে, দ্বিতীয়ত কতোটা নিলজ্জ হলে একটা মেয়ের মুখ থেকে একটা ছেলেকে দেখে এরকম কথা বের হতে পারে। রিশির সামনে তেড়ে এসে বলে,
~ Hey dirty girl, what are you doing in my room? Get out of my room now. যাত্তসব থার্ড ক্লাস মেয়ে কথাকার।

রিশি অপমানে প্রায় কেদেই দেয়। একদৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে ত্যয়ইবার রুমে চলে আসে। ত্যয়ইবা ঘাবড়ে যায় রিশিকে এভাবে কাঁদতে দেখে। রিশিকে চুপ করিয়ে বলে, কি হয়েছে তোমার বলো আমাকে? কাদছো কেন তুমি?
রিশি বলে, তোমার ভাই আমাকে অপমান করে রুম থেকে বের করে দিয়েছে।
~ কিহহহ.. কিন্তু কেন? কি করেছো তুমি?

~ আমি কিছুই করিনি। শুধু ওর রুমে গিয়েছিলাম কথা বলতে। তাই আমাকে ডার্টি গার্ল বলে, ছে, রুম থেকে বের করে দিয়েছে।
~ আমি দেখছি বেপার টা। তুমি প্লিজ কেঁদো না।
ত্যয়ইবা লাবিবের রুমে এসে দেখে লাবিব টি শার্ট পড়ছে। ত্যয়ইবা খাটে গিয়ে ধপ করে বসে বলে, তোর কি এটিকেট মেনার কিছুই জানা নেই? দিন দিন কি বুদ্ধি সুদ্ধি লোপ পাচ্ছে নাকি? গেস্টদের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় জানিসনা? রিশিকে অপমান করেছিস কেন?

~ তোর ননদ হলো ওটা? থার্ড ক্লাস মেয়ে একটা। মুখ দিয়ে অসভ্য কথা বলে,
~ আমেরিকায় ছিলো।
~ আমিও ফ্লোরিডা তেই ছিলাম। দেখ আমি হয়তো সত্যি একটু বেশী করে ফেলেছি। এর জন্য সরি বলে, দিবো। তবুও ওকে বলে, দিবি এমন যাতে আর না হয়।
ত্যয়ইবা মুখ পায় না। সে বুজতে পেরেছে রিশি হয়তো এমন কথা বলে, ছে যা লাবিব নিতে পারেনি। চলে আসে রুম থেকে।

রাত ১১ টা বাজে ছাদ থেকে নেমে এলো লাবিব। উদ্দেশ্য তার মায়াকুমারী। রুমে দরজায় নক করতেই ফারাহ বলে, উঠে ~ আসুন, ডোর অপেন করা আছে।
লাবিব রুমে ডুকে। দেখে ফারাহ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে। গোল পূর্ণিমার চাদটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জানালার গ্ৰীলে হাত রাখা দেখে লাবিব বুজতে পারে তার মায়াকুমারি চাদ দেখতেই ব্যস্ত ছিলো এতোক্ষণ। জারাকে চিন্তিত ভাব ধরে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করে ~ বুড়ি তোর নাকি ক্লাস আছে?

জারা অসহায় দৃষ্টিতে লাবিবের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ ভাইয়া…….।
লাবিব হেসে দেয়। বলে, এগারটা বাজে ওকে? ছাদে যা। তোর টিচার তোকে ডাকছে। ভয়ের কিছু নেই। ক্লাসটাতে আমার সায় আছে। তুমি ভুল করেছ। তোমার ভুলটা আমাদের শুদ্ধ করা কর্তব্য।
~ কি নিয়ে যাবো?
~ ফ্রিজ থেকে একটা কোকের বোতল নিয়ে যা।
~ ওকে।

জারা বের হয়ে যায়। লাবিব জোরে বলে, উঠে
~ জানালায় তারাই চোখ রেখে চাদ দেখে যারা হাটতে পারে না, বাইরে খোলা আকাশের নিচে যেতে পারে না বা পরিবারের বিশেষ শাসনের ভিতরে থাকে। মায়াকুমারীর কোনটা?
ফারাহ মুচকি হেসে বলে, বাসায় থাকলে ছাদে চলে যেতাম। এখন এখানে এতো রাতে।
~ আমি কেন আছি?

~ আমি কারো সামনে জোসনা বিলাস করি না।
~ করলে সমস্যা টা কোথায়?
~ আমার জোসনা বিলাস করা আর লোকহাসানো একি কথা। যার জীবন টাই অন্ধকার তার কাছে আলো বড়ই দুস্পাপ্য।
~ কেউ যদি সেই আলো দিতে চায় নিবে তুমি সেই আলো?
~ কে দেবে আমায় এই আলো?

~ আমি দিবো।
~ লাবিব….. (অবাক হয়ে )
~ এতো অবাক হোওয়ার কি আছে? আমি আছি তো। তুমি বললেই বাইরে নিয়ে জোসনা বিলাস করাতে পারি। তাছাড়া আমিও তো অনেক বছর হলো নিজ দেশের জোছনা বিলাস করিনি।
~ ওওওওও।

~ এসো। ফারার হাত ধরে বাইরে নিয়ে চলে আসে।
~ লাবিব.. এতো রাতে বাসার বাইরে কেন? ছাদ থেকেই তো চাদ দেখা যেতো।
~ এতোদিন তো ছাদ থেকেই দেখেছো। ছাদের জোসনা বিলাস কেমন জানো কিন্তু গভীর রাতে ফাকা রাস্তার চন্দ্রবিলাস কেমন সেটাতো জানো না।
~ হুম।

লাবিব ফারার হাত ধরেই মেইন রোড়ে চলে আসে। এদিকে ভিড় হয়না। আর রাতের কারনে মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি যাচ্ছে শুধু। ফারাহ নিশ্চুপ। বাইরের বলতে নিজের ফেম্যেলি ছাড়া অন্য কোন পারসন তার হাত অব্দি ছুইনি আজ পর্যন্ত। আর এখন লাবিব দিব্যি তার হাত ধরে রাস্তায় হাটছে। ফারাহ খুবই নরমাল ভাবে নিচ্ছে বিষয় টা। লাবিবের পরিবার তার পরিবারের মধ্যেই পড়ে। আর ছোট ভাই হয় লাবিব। এ ব্যপারে একদমি মাইন্ড করতে পারছেনা ফারাহ। হটাৎ করে প্রশ্ন করে
~ লাবিব.. আমি তোমাকে ছোট ভাই বলে, ডাকলে তুমি মাইন্ড করো কেনো? তুমিও তো আমাকে আপু বলে, ডাকো না। এক মিনিটের বড় হলেও কিন্তু আপু ডাকতে হয়।

~ সবাইকে সবটা ডাকা যায় না।
~ আমার উপর কোন কারনে কি রেগে আছো তুমি?
~ হুম।
~ কেন?

~ ভাই ডাকতে চাও তাই। আর কখনো চাইবে না। সবাই কে ভাইয়া আপু ডাকা যায় না। তোমাকে আমি বোন বলে, কখনো মনে করি না। তুমি আমার একটা ফ্রেন্ড যাষ্ট। যদি মানো তাহলে বলতে পারি আমি তোমার আর তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
~ তুমি খুব ভালো লাবিব। একদিন কথা বলেই কেমন আমাকে বেষ্ট ফ্রেন্ড বানিয়ে দিলে। অথচ আমার সম্পর্কে কিছুই জানো না।

~ আমি তোমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। বলতে পারো তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জানো না। আর আমি অতটা ভালো না। আই এম সিউর বেশী দিন আর আমাকে ভালো বলতে পারবে না।
~ কেন?

~ এতো কিছু বলার জন্য আনিনি তোমায়। চাদ দেখতে এনেছি। চলো বসি।
ফারাহ এবার খেয়াল করে হাটতে হাটতে খেলার মাঠে চলে এসেছে তারা। আর মাথার উপর খোলা আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। লাবিব ফারার হাত ছেড়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে হাতের উপর মাথা রেখে। ফারাহ পাশেই বসে পড়ে। চাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। লাবিব বলে, অনেক মায়াবী লাগছে।
ফারাহ লাবিবের দিকে তাকিয়ে দেখে লাবিব তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
~ কি মায়াবী লাগছে?

~ চাঁদের মায়াবী আলোতে মায়াকুমারীকে আরো মায়াবী লাগছে।
~ লাবিব…..
~ আমি মিথ্যা বলি না। শুয়ে শুয়ে দেখো।

ইশারায় পাশে দেখিয়ে দেয়। ফারাও লাবিবের মতো করে শুয়ে পড়ে। লাবিব ঝটপট উঠে ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নেয়। ফারাহ হুরমুরিয়ে উঠে বলে,
~ লাবিব কি করছো টাকি?
~ প্রুভ দিচ্ছি। বলে, ফোনটা ফারার দিকে এগিয়ে দেয়। ফারাহ নিজের পিক দেখে অবাক হয়ে যায়। সত্যিই কেমন জানি নিজেকে মায়াবি লাগছে। লাবিব ফোনটা নিয়ে নেয় হাত থেকে। বলে, জায়গাটা সেফ। তুমার যত ক্ষন ইচ্ছা জোসনা বিলাস করতে পারো।

আবার দুজনে শুয়ে পড়ে। চোখ রাখে রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের উপর।

জারা কোক হাতে ছাদে এসে বসে আছে। পাশেই তাফিফ শুয়ে আছে চাঁদের দিকে চোখ রেখে। জারা আর বসে থাকতে না পেরে কোকের বোতলটা রেখে তাফিফের এক হাত টেনে হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তাফিফ তবুও কিছু বলছে না। জারার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।

~ ও আমার আল্লাহ.. তুমি কেন আমাকে চাঁদের মতো রুপ দিলেনা? কেউ আমার দিকে তাকায় না। কি দোষ করেছি আমি?
হেসে দেয় তাফিফ। হাসতে হাসতে বলে,
~ চাঁদের রুপ লাগবে না। একবার আল্লাহ আমাকে কোনভাবে জানাক যে তুই আমার পাজরে গড়া দেখবি এই চোখদুটোকে তোর থেকে নামাতেই পারবিনা।

~ ভাইয়াও এই কথা টাই বলে, ছিলো।
~ কি বলে, ছিলো?
~ বলে, ছিলো পাজরের টানে বিডিতে চলে এসেছে। তুমিও বলছো পাজরের গড়া। আমি কি এসব শুনতে এসেছি নাকি? আমার দোষটা কি সেটা জানতে এসেছি যার জন্য আজকের এই বিষেশ ক্লাস।
উঠে বসে তাফিফ। জারাও উঠে বসে পড়ে তাফিফের সামনে।

“তোর দোষ হলো আজকে তুই জোড়া পাখিকে আলাদা করেছিস।”
“কিভাবে করলাম?”
“এর পর থেকে সবসময় ভাইয়ার পাশে শুধু মাত্র ফারাহ আপু ছাড়া আর কেউ যেন না ঘেসতে পারে সেইটা খেয়াল রাখবি ঠিক আছে? ওরা যেখানে থাকবে তার থেকে তুইও দুরে থাকবি। গাড়িতে তুই ভাইয়ার পাশে বসছিলি বোকার মতো। বুঝিস না কেন ইটস লাভ কেস।”

“ওওওওওওও লাভ ..আই মিন ভালুপাসা, আই মিন প্রেম।”
“তুই অনেক টা বড় মমের মতো হয়েছিস”
“কার ভাগনি দেখতে হবে তো।”
“আজ তোকে প্রেমের ক্লাস করাবো।”

“প্রেমের ক্লাসসসসসসসস….”
“হুম। তোদের স্কুলে তো অনেক এ প্রেম করে। বলতো প্রেম ভালোবাসা কাকে বলে, ?”
“এইটা তো সহজ প্রশ্ন। একটা ছেলে একটা মেয়ের হাত ধরে ঘুরাঘুরি করাকে, ফুসকা খাওয়াকে, চুমাচুমি করাকে প্রেম ভালুপাসা বলে, “

“কচু জানিস তুই। ওসব কে প্রেম ভালোবাসা বলে, না।”তাহলে কাকে বলে, ?”
“এদিকে আয় বলছি।”
জারা তাফিফের কাছে চলে আসে।

“ভালবাসা একটা হার্ট ফ্যাক্ট ব্যপার, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা টান। একজনের প্রতি আরেকজনের ছোট ছোট অনুভূতি আকুলতা। তুই যাকে ভালোবাসিস তার জন্য তোর বুকে টান অনুভব হবে। তাকে তুই মিস করবি খুব, । বার বার তার কথা মনে পড়বে।”

“তারপর”
“তাকে বার বার দেখতে ইচ্ছা করবে। তার প্রতি তো আকৃষ্টতা বাড়বে।”
“তারপর”
“যত দেখবি ততোই দেখতে ইচ্ছা করবে। সে হবে তোর চোখে সবথেকে সুন্দর ব্যক্তি। তার চলা ফেরা, কথার ধরন, কাজ কর্ম সবি তোকে আকৃষ্ট করবে”
“হ্যাঁ করেতো। আমাদের উপরের ক্লাসে পড়ে রহিম নাম। যা হ্যান্ডসাম না ভাইয়া। ওকে দেখলে আমার শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। বি এম ডাবলিউ কার করে প্রতিদিন স্কুলে আসে। কিযে স্টাইলিশ না ভাইয়া। আমার তো চোখ ই সরে না।”
“তুই যাবি এখান থেকে?”

ভয় পেয়ে যায় জারা তাফিফের গর্জন শুনে। তাফিফের দিকে তাকিয়ে আরো ভয় পেয়ে যায়। রাগে কটমট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাফিফ জারাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জারার পায়ে দেয় একটা লাথি। জারা কেঁদে ফেলে।

“দুর হ আমার চোখের সামনে থেকে। তুই আমার ক্লাস করার কোন যোগ্যতাই রাখোস না। মাথা মোটা একটা। তোর বয়সী মেয়েদের বেবি হয়ে যাচ্ছে আর তোর থেকেই আমি বেবির বিহেবিয়ার মেন্টালিটি চেঞ্জ করতে পারছিনা। বয়স ষোল তে চলে যাচ্ছে এদিকে তুমি সাত বছরের বাচ্চার বাচ্চামি করো। যাবি নাতো আমার চোখের সামনে থেকে? থাক তুই গেলাম আমি।

পার্ট ১১

সিঁড়িতে উঠার সময় রিশি আর লাবিব মুখোমুখি হয়। রিশি পাশ ফিরে যেতে নিলে লাবিব বলে, উঠে
~ আই এম সরি। রিশি থমকে দাঁড়ায়। লাবিব রিশির সামনে এসে বলে,
~ আই এম সরি রিশি। তোমার সাথে সেদিন এরকম বিহেব করা হয়তো ঠিক হয়নি। আমি আসলে রেগে গেলে কাকে কি বলি কি করি কিছুই ঠিক থাকে না। না বুঝে তোমাকে অপমান করেছি। তুমি আমাদের গেস্ট তোমাকে কাঁদিয়েছি আমি। আই এম সরি ফর দেট।

রিশি মনে মনে আপ্লুত হতে থাকে। উফফ এতো সুন্দর করে কেউ কখনো সরি বলতে পারে তার জানা ছিলো না।
লাবিব রিশির চুপ করা দেখে আবার বলে, প্লিজ রিশি ফরগিভ মি।
রিশি ধ্যান থেকে বেরিয়ে আসে।
~ একটা কন্ডিশনে সরি এক্সেপ্ট করতে পারি। যদি আমার সাথে এক কাপ কফি কেউ খায়।
লাবিব হেসে দেয়।

~ কফিটা কি আমি মেক করবো নাকি তুমি করবে?
~ আমিই করে আনছি। তুমি রুমে যাও।
~ পারবে তো? ওকে। কাম হারিয়াপ।

রিশি দু কাপ কফি হাতে নিয়ে লাবিবের রুমে যায়। লাবিবকে বেলকনিতে দেখতে পায়। রুমের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। রিশির সেদিনের কথা মনে পড়ে যায়। এই রুমে আসার জন্য আর কথার জন্য অপমানিত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গিয়েছিলো। মনে মনে প্রমিজ করে নেয় এই রুম তার হবে আর শুধু ঐটুকু কেন.. আরো যত রকম প্রেমবাক্য আছে সব এই রিশির মুখ থেকেই তুমি শুনবে লাবিব খান।

রিশি লাবিবের সামনে একটা কাপ ধরে। লাবিব হেসে কাপ টা হাতে নেয়। চুমুক দিতে যাবে তখনি চোখ আটকে যায় কাপে। এক সাইটে স্পষ্ট ঠোঁটের লিপিস্টিক এর দাগ। লাবিব কাপ টা টি টেবিলে রেখে রিশির দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। রিশি ইশারায় জিজ্ঞাসা করে ~ খাচ্ছনা কেন? রেখে দিলে কেন?

লাবিব বলে,
~ পরে খাবো। আগে তুমি খাও। আমি চেয়ে চেয়ে তোমার খাওয়া দেখি।
রিশি বিল্ডিং হতে থাকে। সে খাবে আর লাবিব তার দিকে তাকিয়ে থাকবে ভেবেই আত্মহারা। রিশি লাবিবের চোখে চোখ রেখে খুব স্টাইলিশ ভাবে খেতে থাকে। লাবিবকে প্রশ্ন করে
~ আমাকে তোমার কেমন লাগে?
~ কেমন লাগবে?

~ মানে আমি দেখতে কেমন? আমার বিহেবিয়ার আই মিন যতোটুকু জানো আমার সম্পর্কে।
~ খারাপ নোও। তুমি দেখতে সুন্দরী। স্মার্ট। ইডুকেটেট। সব মিলিয়ে ভালোই।
~ তুমার পাশে রাখা যায় কি?
~ মতলব টা কি তোমার?
~ এটা আবার কেমন কথা?

~ এটা নরমাল একটা বাংলা কথা। আমার পাশে দাঁড়াতে চাও তুমি?
~ ইয়াহ।
~ কি হিসেবে?
এবার রিশি চুপ হয়ে যায়। কিভাবে বলবে ও? ভিষন লজ্জা করছে। কিন্তু বলতে হবে। স্মার্ট মেয়েদের স্পষ্ট ভাষী হওয়া উচিত। এবার বলেই দেয় রিশি
~ ওয়াইফ হিসেবে।

~ তুমি আমার মনের মতো নও রিশী। আই এম এগেইন সরি। যা ভাবছিলে সেটা সেখানেই স্টপ করে দাও।
~ কি নেই আমার? কোন দিক থেকে আমি তোমার মনের মতো নই?
~ কোন দিক থেকেই নোও।
~ লাবিব…. আমি কিন্তু সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
~ আমি পারবোনা। তোমার মধ্যে এমন কিছু নেই যা আমাকে আকৃষ্ট করে। আর তুমি আমার মমের সাথে কখনোই মেচ করবে না।

~ আমি করবো। প্লিজ তুমি আমাকে বলো কি করলে আমি তোমার মনের মতো হবো? কিভাবে থাকলে তুমি আমার প্রতি আকৃষ্ট হবে?
~ পারবেনা রিশি। প্লিজ স্টপ যাও।
~ না আমি জানতে চাই কি তোমার পছন্দ? কিসের অভাব আমার মাঝে?
~ মায়ার…….। আই নিড মাই মায়াকুমারী। তোমাকে দেখলেই আর্টিফিসিয়াল লাগে রিশি। কিসব মেখে ভুত সেজে থাকো ছিহহ।

~ এর জন্য তুমি আমার প্রতি আকৃষ্ট হও না?
~ আমার আকৃষ্টতা সবার মতো তোমার সাদা চামড়াতে না রিশি। আমি চাই আমার স্ত্রী হোক শ্যামালতা। যে থাকবে শ্যামা সৌন্দর্যে ভরপুর। তার চেহারায় থাকবে অফুরন্ত মায়া। যে তার মায়াবী দৃষ্টিতে আমাকে ঘায়েল করতে পারে। তার মায়াবী হাসিতে আমাকে পাগল করতে পারবে। তার চেহারায় থাকবে নুরের অদৃশ্য আলো। সে হবে পবিত্র। আল্লাহর হেফাজতে থাকবে। তার সর্বাঙ্গ থাকবে পর্দার আড়ালে। সকল পর পুরুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যার শরীরে অবৈধ ভাবে হোক আর বৈধ ভাবে হোক আমার ছোঁয়া লেগে থাকবে। সে হবে একমাত্র আমার সম্পত্তি। তার মন থাকবে ফুলের মতো পবিত্র। তার ব্যবহার হবে অমাইক। যার মনে থাকবেনা কোন হিংসা অহংকার।

~ লাবববিবব…….
~ তোমার কোনটা আছে রিশি? পারবে আমার শ্যামলতা হয়ে দেখাতে? লাস্ট কবে নামাজ আদায় করেছো রিশি? আদৌ কি তুমি নামাজ আদায় করতে জানো? এখনো তুমি স্লিভলেস মর্ডান ড্রেস পড়ে আছো। হাটুর নিচ থেকে পা দেখা যাচ্ছে। কতোজন ছেলের সাথে মেলামেশা করেছো? হিসাব রেখেছো কি? তুমি কোন দিক থেকেই আমার জন্য নোও রিশি। প্লিজ তুমি তোমার রাস্তা মাপো। আর কফির মগটা নিয়ে যাও। আমি কোন এটো খাবার খাই না।

রিশি কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। লাবিবা রিশিকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে দরজা বন্ধ করা দেখে ভয় পেয়ে যায়। দরজায় বার বার কড়া নাড়তে থাকে আর রিশিকে ডাকতে থাকে। ডাকা ডাকি শুনে বাড়ির সবাই দরজার সামনে এসে ভিড় জমায়। অনেক ক্ষন ডাকার পরে রিশি দরজা খুলে। সবাই কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে বলে, কিছুই হয়নি। মমের জন্য মন খারাপ লাগছে। রোশান গিয়ে বোনকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে থাকে। তানভীর তখন রোশানকে বলে, দেখো বাবা রোশান।

তুমার বাবা মা কিন্তু এইটা ঠিক করছেন না। মানছি তোমরা লাভ ম্যারেজ করেছো তাই তারা ফাস্টে মেনে নেয় নি। তারপর তো আমার মেয়েকে ঠিকই মেনে নিয়েছে। এখন তো সব ঠিক ঠাক হয়ে গেছে। তোমার বাবা মা তো আসতে পারে এখন আমাদের বাড়ি। বেয়াই বাড়ি আসতে তাদের এতো কি সমস্যা বুঝতে পারি না আমি। বার বার আমন্ত্রন জানাচ্ছি ফোনে। ফোনেও ভালোভাবে কথা বলে, না আবার আমন্ত্রণ ও রাখে না। তোমাদের বিয়ের এতোবছর হয়ে গেলো তবুও দেখা সাক্ষাত হলো না।

~ আমি ব্যপারটা দেখছি পাপা। রিশির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, মন খারাপ করে না একদম। মমের সাথে কথা বলিয়ে দিচ্ছি। সবাই এক এক করে চলে যায়। লাবিবা রিশির মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যায়।
রোশান রিশিকে নিয়ে রুমে আসে। পিছু পিছু ত্যয়ইবা তুষারকে কোলে নিয়ে রুমে আসে। রিশি রোশানকে ছেড়ে ত্যইবার গলা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
~ ভাবি লাবিব আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে। আমার লাবিবকে চাই চাই। কিছু একটা করো।

রোশান বলে, তুই কান্না বন্ধ কর আমি দেখছি ব্যপারটা। যা করার মম করবে। মমকে জানাচ্ছি আমি ব্যপার টা।
তুষার লাবিবের সামনে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে বলে, মি. লাবিব মামা। তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে।
লাবিব তুষারের দাড়ানোর স্টাইল দেখে হেসে দেয়। তুষার রাগ দেখিয়ে বলে,
~ আমি কি হাসির কথা বলে, ছি? সিরিয়াস মুডটা নষ্ট করে দেয়। এর জন্য বলে, কারো ভালো করতে নেই।
~ ওকে মামা হাসবো না। এবার বলো তোমার সিরিয়াস কথা।

~ যড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তোমার বিরুদ্ধে ঘোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
~ ও তাই বুঝি? তো কে যড়যন্ত্র করছে?
ত্যইবার হটাৎ উপস্থিতি তে চুপ হয়ে যায় দুজনে। ত্যইবা এগিয়ে এসে বলে, তুষার কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে? চুপ করে গেলি কেন?
তুষার অসহায় দৃষ্টিতে লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিব ব্যপারটা মেনেজ করার জন্য বলে, আমি চকলেট খেতে না করেছি জন্য মামা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে বলছে। যাতে ফেসে গিয়ে আমি ডেইলি অনেকগুলা করে চকলেট দেই। তাইনা মামা? ত্যইবা তোর আমাদের মধ্য থাকতে হবে না। তুই কি করছিস এখানে?

~ তোর মামার ঘুমের সময় হয়ে গেছে। তাই নিতে আসছি। তুষার বাবা এসো ঘুমোবে।
লাবিব ~ যাও মামা। আমরা পরে গল্প করবো।

এদিকে তাফিফ আর কথা বলে, না জারার সাথে। জারা বার বার ফোন দেয় কিন্তু তাফিফ জারাকে সব কিছু থেকে ব্লক করে দিয়েছে। টেনশনে ঘুমতোও পারে না। ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে। শুধু মনে হয় কখন জানি ফোন দিয়ে দিবে এক ধমক। বলবে ~ বেনীওয়ালী রাত কয়টা বাজে? এখনো ঘুমোস নি কেন? তোর আইসক্রিমের ফ্যক্টরি বন্ধ।

কিন্তু তাফিফ আর কথা বলে, না। দুইদিন তিনদিন চার দিন এভাবে পার হয়ে যাচ্ছে তাফিফ একবারো ফোন দেয় না। লাবিবের কাছে দু বার জিজ্ঞাসা করেছিলো তাফিফের কথা। লাবিব বলে, ছে তাফিফকে ফোন দিতে। কিন্তু তাফিফ যে সব কিছু থেকে ব্লক করে দিয়েছে সেটা লাবিব কে বলতে পারে না। জারা তাফিফের হসপিটাল চিনে না। চিনলে হয়তো স্কুল থেকে ফেরার সময় তাফিফের কাছে চলে যেতো। তাফিফ কে সরি বলে, ওর মান ভাঙাতো। কিন্তু তাফিফ সামনে আসে না। জারা লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে কেটে চোখ মুখ ফুলিয়ে রাখে। এদিকে তাফিফের ও একি অবস্থা। লাবিব ব্যপারটা খেয়াল করে তাফিফ কে বলে,
~ জারাকে লাভ করিস?

তাফিফ কোন জবাব না দিয়ে নিচ দিকে তাকিয়ে থাকে।
~ আমি কি ধরে নিবো নিরবতা সম্মতির লক্ষন? ত্যইবাটাকে দেখে রাখতে পারিনি। ঠিকি প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। দেশের বাইরে ছিলাম এর জন্য জারার সকল আবদার, খামখেয়ালী দেখাশুনার দায়িত্বটা তোকে দিয়ে গিয়েছিলাম। কবে আসবো ঠিক ছিলো না। বয়সটা খুব খারাপ। তাই তোকে নজর রাখতে বলে, ছিলাম। শেষ মেষ তুই প্রেমে পড়ে গেলি?

~ আমি কিছু করিনি ভাইয়া। আমি দেখে শুনেই রাখছিলাম। জারা নাকি ওর একক্লাস সিনিয়র একটা ছেলেকে পছন্দ করে বলে, ছে আমাকে। এখন তুমি চলে এসেছো তুমি কিভাবে তুমার বোনকে কন্ট্রোল করবে তুমি দেখো। আর আমাকে ভুল বুঝ না। আমি ওকে বোনের মতই আগলে রেখেছিলাম। ও ভীষন ছেলেমানুষী। সামনে ওর কেরিয়ার পড়ে আছে। এখনি যদি ছেলেদের উপর হেলে পড়ে তাহলে পড়াশুনার ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি এবার তোমার দায়িত্ব তোমার হাতে তুলে দিলাম।
তাফিফ চলে গেলে লাবিব জারাকে ফোন দেয়। পাচবার ফোন দেওয়ার পর জারা ফোন পিক করে।
~ কোথায় থাকিস ফোন রেখে?

~ এখানেই আছি।
~ তাহলে ফোন তুলতে এতো দেড়ি হলো কেন?
~ পরে কথা বলবো। এখন রাখছি।
~ রাখবিনা। মন খারাপ কেন? বল কি হয়েছে? কেউ কিছু বলে, ছে? মেরেছে? বল আমাকে।
~ ভাইয়া আমার আপু কাঁদছে।

~ মায়াকুমারী কাঁদছে? কেন কাঁদছে? তুই তো বলে, ছিলি কষ্ট পেলেও ও কখনো কাদে না। তাহলে কেন কাদছে?
~ আজকে আপুকে দুইটা লোক দেখতে আসছিল। আপুকে দেখে আপুর সামনেই বড় আম্মু আর জেঠুকে অপমান করেছে। এর জন্য আপু লুকিয়ে কাঁদছে।
~ কি বলে, ছে ওরা?

~ ওরা জেঠুকে বলে, ছে এই মেয়ের জন্য জামাই চান এতো কোয়ালিফাইড? একে তো গরীবের বাচ্চাও বিয়ে করবেনা। বুডি হয়ে গেছে আপনাদের মেয়ে। বিয়ের চিন্তা এখন মাথা থেকে দুর করেন। ঘরের খুটি দেন।
বড় আম্মুকে বলে, ছে আপনি সাদা আপনার হাজবেন্ড সাদা তাহলে এই কালিটাকে কই থেকে নিয়ে এসেছেন? কালোর প্রতি এতোই ঝুক নাকি?

লাবিব এতোক্ষন দাতে দাত লাগিয়ে সহ্য করলেও এখন আর সহ্য করতে পারলো না। জারাকে বললো,
~ চুপ কর। তোর আপু কই?
~ আপু বারান্দায়।
~ তোর আপুকে ফোনটা দে।
~ আপু তো কথা বলবে না।
~ কানে ফোন ধরে থাকবি।

জারা ফারার কাছে গিয়ে বলে,
~ আপু লাবিব ভাইয়া কথা বলবে।
~ আমি কথা বলবো না এখন বলে, দে।
~ বলছে তোমার কানে ধরতে।

জারা ফারার কানে ফোন ধরে। লাবিব বলে,
~ মায়াকুমারী……….
ফারাহ নিজেকে সামলিয়ে বলে,
~ হুমম।
~ শোন আর কখনো কারো সামনে নিজেকে দেখাতে বসবেনা। আর সং সেজে অপমানিত হতে হবে না তোমাকে। আমি বিয়ে করবো তোমাকে।

~ লাবিব….
~ কোন এক্সকিউজ শুনতে চাইনা। আমি বিয়ে করবো তোমায়। আর কোন কথা নয়।
~ মাথা ঠিক আছে তোমার? উল্টাপাল্টা কথা বলছো কেন?
~ আমি ঠিকই বলছি। আমার হব বউ যেন আর কারো সামনে না গিয়ে বসে। মনে থাকে যেন। রাখছি।

পার্ট ১২

তাফিফ চুপ চাপ দরজা বন্ধ করে বসে আছে। কারো সাথে কথা বলে, না। চুপচাপ থাকে। হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়েছে। মিম সরোয়াজ দুজনেই খুব চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। এমনতো কখনো করে না। লাবিবাও মেনে নিতে পারে না ব্যাপারটা। তাফিফের দরজায় নক করলে তাফিফ দরজা খুলে দেখে লাবিবা খাবার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে মিম দাঁড়িয়ে। লাবিবা মিম কে ইশারায় যেতে বললো, । কারন ছেলেমেয়েরা কিছু বিষয় নিয়ে ডিসটার্ব থাকলে সেটা বাবা মার থেকে অন্য জনের সাথে ভালোভাবে শেয়ার করতে পারে।

লাবিব রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো। বিছানায় গিয়ে বসতেই তাফিফ ও গিয়ে লাবিবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। লাবিবা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
~ আমার ছোট্ট ছেলেটার আকাশে এতো মেঘ কেন জমেছে? আমি কি নীল আকাশে কালচে মেঘের আগমনের কারনটা জানতে পারি? প্রমিজ করছি আমি যতটুকু পারি কালচে মেঘের সাথে লড়াই করবো।
~ আমার খেতে ইচ্ছা করছে না বড় মাম্মা। তুমি খাবার নিয়ে চলে যাও।

~ এভাবে না খেয়ে থাকলে যে শরীর খারাপ করবে। কষ্ট হবে পাপা। তুমি কি জানোনা যে তুমার কষ্ট হলে তুমার মাম্মা, বড় মাম্মা, পাপা, বড় পাপার ও কষ্ট হয়। কত বড় হয়ে গিয়েছো তুমি। দুদিন পর বিয়ে করে বউ আনবে ঘরে তবুও বুঝ না?
~ না বুঝলেই ভালো হত মাম্মা। বুঝি জন্যই তো কষ্ট পাই।
~ কিসের কষ্ট আমার ছেলেটার? মাম্মা কে বলো।

~ আমি খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি মম। এই ভুলের মাসুল আমাকে সারাজীবন দিতে হবে। আমি খারাপ মানুষের পরিচয় দিয়েছি মম। কথায় বলে, না শেয়ালের কাছে মুরগী বাগী দেওয়া…। আমি সেই শেয়ালের কাজ করেছি।

~ তাফিফ…
~ আমার কাছে একটা জিনিস আমানত রাখা ছিল ‘যাতে কেউ সেই জিনিসটাই নজর না দিতে পারে। ছোতে না পারে ভক্ষণ না করতে পারে.. অথচ আমিই আগে খেয়ানত টা করলাম। নজর দিয়ে দিলাম সেই জিনিসটায়। তুমি বলো আমি কতবড় অন্যায় করেছি। আমার কি মাফ হবে মম?
লাবিবা তাফিফের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
~ তোমার তো তাহলে সেই জিনিসটার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উচিত।

~ আমি পারছিনা.. আমি পারবো না.. সম্ভব না মম। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আমি কি করবো?
~ তাহলে যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার সাথে কথা বলো। জিনিসটা তুমি পেতে পারো কিনা জিজ্ঞাসা করো। যদি তোমার পাওয়ার চান্স থাকে তাহলে নিয়ে নাও। কেমন? এর জন্য মন খারাপ করে না পাপা। আমি খাইয়ে দিচ্ছি ভদ্র ছেলের মতো খেয়ে নাও তো।
লাবিবা খাইয়ে দেয়।

লাবিবের কথা গুলো ভাবতে ভাবতে প্রায়ই ফারাহ আনমনা হয়ে থাকে। অফিসের কাজে মন বসে না। ফাইল সামনে খুলে আনমনা হয়ে বসে থাকাই এখন ফারার কাজ। দেখতে দেখতে অনেক গুলো ফাইল জমে গেছে। এখনো চেক করা হয়নি। কিন্ত এতে মন নেই একদমি ফারার। তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরঘুর করছে। ফারাহ ভেবে পাচ্ছে না কিছুতেই যে লাবিব কি বললো, এগুলো। লাবিবের ব্যবহার প্রথম থেকেই অন্যরকম। কিছু ভাবেনি এতে ফারাহ। কিন্তু লাবিবের মনে এটা ছিলো ভাবতে পারেনি কখনো।

অফিস কলিগ এর ডাকে হুস ফিরে ফারার। কলিগ বলে, কি ব্যপার মেডাম? আজকাল দেখি সবসময় অনমনা হয়ে বসে থাকেন। দেখতে দেখতে তিনদিনের ফাইল জমিয়ে ফেলেছেন। তবুও দেখি আপনার ভাবনা নেই এতে। কবে শেষ করবেন এগুলো? স্যার তো ঠিক টাইমে দেখতে চাইবে।
~ না মানে.. শেষ করে নিব ইনশাআল্লাহ।

~ হুম। এখন বসের কেবিনে যান। বস আপনাকে ডাকছে।
~ কেন? ফাইল কি নিয়ে যেতে বলে, ছে?
~ আমি জানি না। এক্ষুনি ডাকলো আপনাকে।
~ ওকে। থ্যাংকস। যাচ্ছি।

ফারাহ দরজা নক করে মে আই কাম ইন বলার আগেই শুনতে পেল ~ কাম ইন।
ফারাহ ভেতরে ঢুকে সাগরকে সালাম দেয়। সাগর সালাম নিয়ে চেয়ারে বসতে বলে, ফারাহ পেছন থেকে দেখে টেবিলের সামনে দুটো চেয়ারের মধ্য একটা চেয়ারে একজন বসে আছে আবার আরেকটা চেয়ার খালি। ফারাহ গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে।

সাগর বলে,
~ মিস ফারাহ চৌধুরী আপনাকে যে কাজ গুলো দেওয়া হয়েছিল আপনি কি সবটা করতে পেরেছেন?
~ একচুয়েলি স্যার আমি এখনো একটাও ফাইল কমপ্লিট করতে পারি নি। আমি প্রমিজ করছি কালকের মধ্যে ফাইল গুলো জমা করে দিবো।

~ সারারাত তো জাগতে হবে তাহলে মেডাম। আর এখানেই একা একা সারারাত থাকবেন নাকি?
~ স্যার তা ছাড়া তো উপায় নেই। ফাইল তো বাসায় নিতে যাওয়া নিষেধ।
~ কাওকে সাথে দিবো নাকি?
~ দিলে তো ভালোই হয়।

~ ওকে ফাইল শেষ করুন। কাল জমা করে দিবেন। আর নেক্সট সেটার ডে থেকে আপনি অন্য অফিসে বসবেন।
~ অন্য অফিসে মানে? কোন অফিসে?
~ আপনাকে ট্রান্সফার করা হয়েছে আমাদের অন্য অফিসে। আমার বিজনেস পার্টনারের অফিসে।

~ কিন্তু স্যার….
“এতো কিন্তুর কি আছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি দেখি সব কিছুতেই কিন্তু কিন্তু করো মায়াকুমারী”
চমকে উঠে পাশ ফিরতেই অবাক হয়ে যায় ফারাহ।
চোখ গুলো বড় হয়ে যায়।

লাবিব সাগর কে বলে, “জানিস সাগর তোর ভাবী এমনিতেই মায়াকুমারী। বড় চোখ গুলো যখন আরো বড় করে না.. তখন আরো মায়াবী লাগে।”
সামনে ফিরে সাগরের দিকে তাকাতেই সাগর বলে,
~ আপনার লাভার মি. লাবিব খান মাই ক্লোজ ফ্রেন্ড এন্ড মাই বিজনেস পার্টনার। আপনি আপনার প্রেমিকের অফিসেই সিফট করছেন।

~ আমি পারবোনা। দরকার হলে আমি জব ছেড়ে দিবো।
~ হাহাহা ভাবীজি ওহ সরি ফারাহ মেম আপনি জব পাওয়ার সময় কন্টাক্টে জবে জয়েন করেছেন। কিভাবে ছাড়বেন জব?
ফারাহ পারে না কান্না করে দেয়। এখন তাহলে লাবিবের অফিসে কাজ করতে হবে। আদৌ ছেলেটা কাজ করাবেতো আমাকে নাকি উল্টা পাল্টা কথা বলবে শুধু? স্যার কে বলে, ছে সে নাকি আমার প্রেমিক। কিভাবে পারে এইসব ফাজলামো করতে?

আমি যে তার রিলেটিভ হই সম্পর্কে বড় বোন জানার পর ও এরকম ফাজলামো কিভাবে করতে পারে? এতোদিন বাইরের মানুষের ফাজলামোর পাত্রী ছিলাম এখন কি তাহলে রিলেটিভ দের ও ফাজলামোর পাত্রী হয়ে গেলাম? চোখ থেকে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। ফারার চোখে জল দেখে লাবিব অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। টেবিলের উপর থেকে টিস্যু পেপার নিয়ে চোখ মুছতে গেলে ফারাহ উঠে পড়ে বসা থেকে। রাগে কটমট করতে করতে লাবিবকে বলে,
~ তুমি একটা অভদ্র।

~ প্রেমিক।
~ লজ্জা করে না বয়সে বড় আপুর সাথে এরকম ফাজলামো করতে?
~ কি করবো বলো অভদ্র প্রেমিক তো।
ফারাহ তখনি হন হন করে বেরিয়ে আসে রুম থেকে। নিজের কেবিনে এসে ফাইল গুলো চেক করতে থাকে কেঁদে কেঁদে। যে করেই হোক ফাইল গুলো তারাতারি শেষ করতে হবে। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে হবে। রাতটুকু এখানে কাটানো সম্ভব না। কিভাবে থাকবে সারা রাত এটা ভেবেই কান্না পাচ্ছে। কতোগুলো ফাইল ও শেষ করতে হবে। মাথা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। জোরে জোরে কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কোন উপায় নেই।

ফারাহ বেরিয়ে যেতেই সাগরের মুখ হা হয়ে যায়। লাবিব বলে,
~ মুখ বন্ধ কর হারামী। এক্সপ্রেশন দেখাইতে হবে না আমাকে।
~ মামমা তুই এইটা কি করছিস?
~ কি করলাম?

~ শালা তুই ফারাহ ভাবীর প্রেমে পড়ছিস মেনে নিলাম। ভাবী যথেষ্ট একটিভ একটা মেয়ে যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে তোর বউ হবার জন্য। কিন্তু এগুলো কি বলে, গেলো এতোক্ষণ? আমার তো মাথা ঘুরতেছে।
~ বলছিনা নাটক বন্ধ করতে।
~ আরে আমার নাটক তো আসতেছেই না। শেষ মেষ তোর থেকে বড় মেয়েকে পছন্দ করলি? তাও আবার ভাবী নাকি তোর বড় বোন?

~ হ্যাঁ তো?
~ তো মানে? কে মানবে এই রিলেশন শিপ? আর ভাবীতো নিজেই মানছেনা তোকে। এটা কিভাবে কি করবি তুই?
~ তুই মেনেছিস তো? তুই আমাকে সাপোর্ট কর আমি অবশ্যই সবটা সামলাতে পারবো।
~ আমি অলয়েজ তোর সাথে আছি। কিন্তু ভাবীকে কিভাবে মানাবি?
~ প্রেমিক হতে হবে আমার। মায়াকুমারীর জন্য আমি অভদ্র প্রেমিক হতেও রাজি আছি। ও সহজে মানবে না। ওকে পেতে হলে আমাকে অভদ্র হতে হবে।

রাতে কাজ করতে করতে টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে ফারাহ। মাঝ রাতে যখন ঘুম ভাঙে তখন তখন মনে পড়ে যে সে একা অফিসে আছে আর যে আসার কথা ছিলো সে আসেনি। এখনো অনেক গুলো ফাইল চেক করার আছে। ধপ করে মাথা তুলে সামনে তাকাতেই বড় সড় একটা সক খায়। লাবিব সামনে চেয়ারে বসে একের পর এক ফাইল চেক করছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তিনটা পঞ্চাশ বাজে। তারমানে একটু পর আযান দিয়ে দিবে। লাবিব ফারার দিকে খেয়াল করে দেখে ফারাহ তাকি তুকি করছে। মুচকি হেসে লাবিব বলে, গুড মর্নিং মায়াকুমারী।

~ লাবিব তুমি এখানে….
~ এতোবড়ো অফিসে তোমাকে একা কিভাবে রাখি? যদি কোন অচেনা জ্বীন চলে আসে তখন কিভাবে বাঁচাবো আমি আমার মায়াকুমারীকে?
~ লাবিব তুমি সারারাত এখানে ছিলে?
~ হুম। ফাইল গুলো রেডি হয়ে গেছে। নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।

~ তুমি সারারাত বাসায় না ফিরে এখানে আমার কাজ গুলো করছো। ব্যপারটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে লাবিব।
~ কোথায় বাড়াবাড়ি? আমি তো কোন বাড়াবাড়ি দেখছিনা? আমি কি তোমাকে বলে, ছি যে মায়াকুমারি আমি তোমাকে ভালবাসি? আর বললে বললাম… আমি তোমাকে ভালবাসি। প্রবলে, ম টা কি? তোমাকে বলবোনাতো কাকে বলবো শুনি?
লাবিবা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। তারপর সিট থেকে উঠে এসে চেয়ার টেনে লাবিবের সামনে বসে।

লাবিবের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“শোন লাবিব। তুমি যথেষ্ঠ বুদ্ধিমান আর বড় হয়েছো। অনেক সুদর্শন একজন পুরুষ তুমি। তুমি এতোদিন কোন রিলেশনশীপে জাড়াওনি। তোমার জন্য নিশ্চয় কোন অল পারফেক্ট মেয়ে তুমার পরিবার পছন্দ করে তোমার বউ করে আনবে। যে তোমার যোগ্য। তুমি তাকেই ভালবাসবে। আমার সাথে তুমি ফাজলামো করছো কেন? যদিও তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি সিরিয়াস। তুমি যদি সিরিয়াস হোও তাহলে আমার কথা মাথা থেকে আউট করে দাও। আমি কুৎসিত একটা মেয়ে।

না আছে রুপ না আছে গুন। কোন দিক থেকেই আমি তোমাকে ডিজার্ব করিনা এইটা অসম্ভব। সম্পর্কে আমি তোমার রিলেটিব হই। তোমার বড় আপু। তোমার থেকে তিন বছরের বড়। ভাবতে পারছো তুমি? আমি সবার অবহেলিতো একজন মেয়ে। বিয়ের বয়স পাড় হয়ে গেছে অথচ বিয়ে করেনি কেউ। ডাস্টবিনের আবর্জনা আর আমার মাঝে এখন কোন পার্থক্য নেই।

কোন ভাবেই তোমার সাথে আমার যায় না। তুমি মেনে নিলেও আর কেউ মানবে না আমাকে। আমাকে নিয়ে তুমি সমাজের সামনে দাড়াতে পারবেনা। সবাই আমাকে দেখে তুমাকে নিন্দা করবে। আমি বড় তোমার থেকে বুঝার চেষ্টা করো।”
“কথা শেষ তুমার?”

“লাবিব একটু বুঝ প্লিজ।”
“আমি আমার টা ভালোই বুঝে নিয়েছি। এবার তোমার বুঝার পালা। আমি কোন ফাজলামো করছি না। আমি আমার জন্য তোমাকে পারফেক্ট মনে করি অন্য কাউকে না। আমার বউ হওয়ার যোগ্যতা শুধু তুমিই রাখো। তুমি আমার মায়াকুমারী। তুমি কতোটা সুন্দর তা তুমি নিজেও জানো না। মানুষের চোখ নেই তাই দেখতে পারে না। আর গুন…. একটা মেয়ের যা যা গুন থাকার কথা তার কোনটা তোমার মাঝে নেই তা একটু বলবে প্লিজ? তুমি আমার বড় তাতে কি আসে যায়?

বড় ছোট কি বিয়ে হয়না? নাকি তারা হেপি হয়না? বলিউডের হিরোইন প্রিয়াঙ্কা থেকে তার হাজবেন্ড দশ বছরের ছোট। বলিউডের ধারনা তুমার নাই থাকতে পারে কিন্তু ধর্মীয় ধারনা তো আছে? তুমি আমি আমরা যে নবীর উম্মত সেই নবী হযরত মুহাম্মাদ সাঃ এর সহধর্মিণী হযরত খাদিজা রঃ পঁচিশ বছরের বড় ছিলো। তাহলে আমাদের প্রবলে, ম টা কোথায়? আমি তোমাকে বিয়ে করবো অন্য কেউ না। আমার বউ হবে তুমি কোন মডেল হবে না যে তোমাকে নিয়ে আমি রেমশো করবো। কারো তোমাকে ভালোলাগবেনা তাই আমাকে কথা শুনাবে। আমি শুধু তোমাকে চাই এটাই জানি এটাই বুঝি।”

“পাগল হয়ে গেছো তুমি লাবিব। যতো সহজে বলছো ততো সহজ নয়। আজ হয়তো তুমি পাগলামো করছো কাল তুমি ঠিকই আমাকে দুরে সরিয়ে দিবে। আমার মধ্যে তেমন কিছু নেই যা দিয়ে আমি তোমাকে কাছে টেনে নিবো।”
“আমায় একটু ভালবাসলেই চলবে।”

“জিদ করোনা লাবিব। তুমি বুঝনা।”
“আপাতত কিছু বুঝার প্রয়োজন ভাবছিনা। সাগরের কেবিনে ফাইল গুলো রেখে আসো। ব্যাগ নাও বের হবো আজান অনেক আগেই হয়ে গেছে। নামাযটা কাযা পড়ে নিবে। তুমার গাড়ি বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।

পার্ট ১৩

লাবিব গ্ৰাউন্ড ফ্লোরের কার পার্কিং এরিয়া থেকে কার নিয়ে আসে। ফারার সামনে এসে দাড়াতেই ফারাহ পেছনে গিয়ে বসে। লাবিব কিছু বলে, না। চুপটি করে ড্রাইভ করতে থাকে। একটা রেস্টুরেন্ট এর সামনে এসে পার্ক করে। ফারাহ মাথা চেপে তখনো বসে আছে। লাবিব পেছন ফিরে জিজ্ঞাসা করে
~ এখনো মাথা ঝিমঝিম করছে?

মাথা তুলে লাবিবের দিকে তাকিয়ে থাকে ফারাহ। কোন উত্তর দেয় না। লাবিব গাড়ি থেকে নেমে আসে। পেছনের গেট খুলে বলে,
~ বেরিয়ে আসো। ফ্রেস হয়ে কিছু খেয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। ফারাহ বেরিয়ে আসে। দুজনে রেস্টুরেন্ট এর ভেতরে ঢুকে। লাবিব ফারাহকে ফ্রেস হতে পাঠিয়ে ওয়েটার এর সাথে কথা বলে, ফারাহ বেরিয়ে এসে দেখে লাবিব কর্ণারের দিকে বসে বাইরের সকালটাকে দেখছে। ফারাহ এসে বসতেই লাবিব ফারার দিকে তাকায়।
~ চোখ গুলো লাল হয়ে আছে। কখন ঘুমিয়ে ছিলে রাতে? আমি তো একটার দিকে এসেছি। এসে দেখি তুমি ঘুমিয়ে আছো টেবিলে মাথা রেখে।

ফারাহ তবুও কোন কথা বলে, না। ওয়েটার খাবার নিয়ে চলে আসে। খাবার রেখে চলে যায়। লাবিব ফারাহকে খেতে বলে, নিজে নিয়ে খেতে থাকে। ফারাহ খাচ্ছেনা দেখে হাতে করে ফারার সামনে খাবার ধরে। ফারাহ এবার নিজেই নিয়ে খেতে থাকে। লাবিব মুচকি হেসে বলে, আমি কিন্তু ভালোই খাইয়ে দিতে পারি। তাফিফ আর জারাকে খাইয়ে এক্সপার্ট হয়ে গেছি।

খাবার শেষ করে লাবিব ফারাহকে নিয়ে বাইরে চলে আসে। ফারাহ পিছনে যেতে নিলে লাবিব সামনের গেট খুলে দেয়। ফারাহ দাঁড়িয়ে থাকলে হাত ধরে গাড়িতে উঠায় লাবিব। পুরো রাস্তা ফারাহ চুপ করেই থাকে। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামায়। ফারাহ গাড়ি থেকে নেমে আসে। লাবিব ও নেমে আসে। এবার ফারাহ মুখ খুলে বলে, ধন্যবাদ।
~ ভালোবাসি বললে বেশি খুশি হতাম।

~ অভদ্রতা করবেনা লাবিব।
~ সিনিয়র প্রেমিকার শাসিয়ে কথা বলা বেশ ইনজয় করছি।
ফারাহ হন হন করে হেঁটে বাসার ভেতরে চলে আসে। লাবিব ও পিছু পিছু বাসার ভেতরে আসে।
দোলা লাবিব কে দেখে খুশি হয়ে যায়। লাবিবকে নিয়ে নিজের রুমে যায়। বেশ গল্প করে ভাগিনার সাথে।

রাতে অনেক বার ফোন দিয়েছে তাফিফকে। ফোন প্রথমে অন পেলেও পরে অফ পায়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আবার কল দেয় জারা। দুবার রিং হয়ে কেটে যায়। তিনবারের সময় ফোন কানে নিয়েই জোরে ধমক দেয় তাফিফ।
“ফোন দিস কেন এতোবার? তোর জন্য কি আমি ফোন অন করতে পারবোনা? সিম চেঞ্জ করতে বলিস তাহলে? আমার কি কোন কাজ নেই নাকি? ফোন দিয়েছিস কেন তুই?”

“তাফিফফ ভাইয়া.. সরি সরি সরি।”
“হুয়াট সরি? হুয়াই সরি? শোন তুই আর আমাকে ফোন দিবিনা। আমি তোর কেউ না। তুই আমার কেউ না। মাইন্ড ইট। তোর রহিম আছেনা? ওকে ফোন দে তুই।”

“তাফিফ ভাইয়া শোন.. ভাইয়া..”
তাফিফ তখনি ফোনটা কেটে দেয়। জারা এবার জোরে জোরে কেঁদে ফেলে। তাফিফ সব সময় ওকে বকে কিন্তু কখনো এভাবে বকেনি। আর সব সময় বলে, ছে আমি তোর অনেক কাছের একজন বেনীওয়ালী। আজ হটাৎ করে কেন বললো, আমার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই?

জারার কান্নার আওয়াজ শুনে বাড়ি শুদ্ধ সবাই হাজির। এতো করে বলছে যে কি হয়েছে বল কিন্তু জারা কেদেই যাচ্ছে। কাউকে কিছু বলছেনা। লাবিব এসে সবাই কে চলে যেতে বলে, ব্যপারটা সে দেখছে বলে, লাবিবকে দেখে জারা লাবিবকে ধরে আরো কান্না করে। সবাই বুঝতে পেরে চলে যায়। লাবিব মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় জারার। কিছুক্ষন পর কান্না কমে এলে লাবিব জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে আমার পাকা বুড়িটার? এভাবে কাঁদছিস কেন?

কেউ কিছু বলে, ছে? আইসক্রিম খাবি? দেখি দেখি.. কি অবস্থা করেছিস চোখের মুখের? তুই কি অসুস্থ বুড়ি? বলল.. ভাইয়াকে বলবিনা?
~ হু। আইসক্রিম ফ্যক্টরি।
~ এইতো বল।
~ লাবিব ফ্যক্টরি না। তাফিফ ফ্যক্টরী।

লাবিব এবার ভাবনায় পড়ে যায়।
~ কি করেছে তাফিফ?
~ আমাকে বকেছে। বলে, ছে আমি নাকি ওর কেউ না। আমাকে ফোন দিতে কথা বলতে না করেছে। তুমাদের বাড়ি থেকে আসার পর থেকে আমার সাথে কথা বলে, না। আমাকে বকে না। আই মিস হিম।
~ ওওওও।

~ ও কি? আমার সাথে কথা বলতে বলোনা ভাইয়া আমার কষ্ট হচ্ছে।
লাবিব জারাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমোতে বলে, জারা কাঁদতে কাঁদতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। লাবিব জারাকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসার জন্য নিচে নেমে আসে। কি একটা ভেবে আবার উপরে চলে আসে। ফারার রুমের সামনে এসে দেখে দরজা খুলা। ভেতরে ঢুকতেই দেখে ফারাহ ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। সামনে থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে নিতেই ফারাহ চমকে উঠে। লাবিবের দিকে তাকিয়ে বলে,
~ একি তুমি এখানে?

~ অন্য কাউকে কল্পনাও করো না।
~ সবসময় এভাবে কথা বলো কেন? বাসায় যাও। তুমি ঘুমাওনি। তোমাকে টায়ার্ড লাগছে।
~ ছেলেদের প্রতি সবসময় নজর রাখে তার মা। মার পরেই যে নজর রাখে সে হচ্ছে বউ। আজ তার প্রমান মিলল। যদিও বউ হোওনি.. হবে তো। আগের থেকে নজর রাখার জন্য ধন্যবাদ।

~ অভদ্র একটা। বের হোও তুমি। যাও এখান থেকে।
~ যাচ্ছি যাচ্ছি। ল্যাপটপ রেখে একটু ঘুমিয়ে নাও। অফিসে যেতে হবে না তোমায়। সাগরকে বলা আছে। রেস্ট নাও।
~ যাবে তুমি?

তাফিফ বসে বসে পাবজি খেলছে নিজের রুমে। লাবিব যেতেই ফোনটা রেখে লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিব একবার তাফিফকে দেখে লাফ দিয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়ে। তাফিফকে বলে,
~ ফোন রাখলি কেন? হাতে নে।
লাবিব ফোন হাতে নেয়।

~ হুম। এবার তোর বেনীওয়ালীকে একটা কল দে।
~ তুমি কথা বলবে ভাইয়া। আমি কথা বলতে পারবো না।
~ কেন?
~ আমি চাইনা আর কথা বলতে।

~ রাগটা কিসের জন্য জানতে পারিকি? কেন তুই কথা বলা বন্ধ করেছিস? কেন কাটাচ্ছিস আমার বোনটাকে? আরো নাকি বলে, ছিস যে আমার বোন তোর কেউ না?
~ হুম। বলে, ছি।
~ সেটাইতো জানতে চাচ্ছি কেন বলে, ছিস?
~ বলতে পারবোনা।

~ সবাইকে সবটা বলতে হয়না। ভালোবাসিস ভালো কথা। আগলে রাখ। ছোট মানুষ ভুল করে বলে, ছে যে একটা ছেলেকে তার ভালো লাগে। এর জন্য কথা বলা বন্ধ করে দিবি? আবার শুনলাম মমকে বলে, ছিস তুই আমানতের খেয়ানত করবিনা। ব্যপারটা কি তোর?
~ আমি তোমাকে বুঝতে পারছিনা ভাইয়া। তুমি কি আমার ফ্রেন্ড নাকি বড় ভাই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছি।
~ আমি দুটোই। ফ্রেন্ড হয়ে তুমাকে বুঝতে হয় তোমাকে ভালো রাখার জন্যে আবার বড় ভাই হয়ে শাসন ও করতে হয় তোমাকে নিজের সীমার মধ্য রাখার জন্য।
~ কি করতে বলো তুমি?

~ আমানত টাকে সুরক্ষিত রাখো আঠারো পর্যন্ত। সময় মতো তোমাকে ভক্ষন করার পারমিশন দেওয়া হবে।
~ ভাইয়া……।
~ এখন আমি ঘুমাবো। অনেক টায়ার্ড। সারারাত তোর ভাবীর সাথে ছিলাম।
~ হ্যাঁ? রিয়েলি ফাইনাল খেলা শেষ হয়ে গেছে?
~ কানের গোড়ায় দিবো একটা থাপ্পড়। অভদ্র কথাকার একটা। আমি ঘুমোচ্ছি। পিঠটা চুলকে দে।
~ ভাইয়া..।

~ পেন পেন করবিনা। চুলকায় বলছি।
~ আইচ্ছা..।

স্কুলের সামনে আসতেই লাবিবের লাল গাড়িটা দেখে অবাক হয়ে যায় জারা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে থাকে। গাড়ির ভিতরেও খুজে কিন্তু লাবিব কে দেখতে পায় না। ফোন করবে ভেবে ফোন বের করতে নিবে তখন মনে পড়ে যে স্কুলে ফোন নিয়ে আসা নিষেধ। লাফাতে লাফাতে স্কুলের ভিতরে চলে আসে।

ক্লাস রুমে ঢুকতেই ফ্রেন্ড রা এসে এক এক করে মুখ ভার করে জড়িয়ে ধরে জারাকে। জারাও তাদের সাথে তাল মেলায়। কিন্তু ভেবে পায় না হটাৎ করে রাক্ষসী গুলার হলোটা কি যে এতো আদর দেখাচ্ছে। সব সময়তো আমার বড় চুল গুলার উপর নজর থাকে হিংসুটে টার। কিভাবে আমার চুল ছিড়বে সেটাই ভাবে। কিন্তু এখন আজ হাগ দিচ্ছে। হাগ দেওয়া শেষ না হতেই দপ্তরী এসে বলে,
~ জারা আপা তোমারে প্রিন্সিপাল স্যার ডাকতেছে এক্ষুনি।

জারার তো মাথা ঘুরছে রিতীমতো। প্রিন্সিপাল টা হটাৎ করে এমন কেন করবে? বড় ভাবনার বিষয়। ভাবতে ভাবতে প্রিন্সিপাল এর রুমের দরজায় গিয়ে দাড়াতেই দেখে ভিতরে লাবিব বসে কাগজ পত্র ঘাটাঘাটি করছে।
প্রিন্সিপাল কে উদ্দেশ্য করে বললো,
~ ম্যা আই কাম ইন স্যার।
~ ইয়েস কাম ইন।

জারা ভিতরে ঢুকে লাবিবের পাশে এসে দাঁড়ালো। কেরানী এসে জারার হাতে পেপার আর কলম দিয়ে বললো, সাইন করো। জারা সাইন করে বললো,
~ কিসের জন্য সাইন নিচ্ছেন?
প্রিন্সিপাল জারাকে বললো,
~ তোমারকে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তোমার ভাই এপ্লিকেশন করেছে তোমার ট্রান্সফার এর জন্য। আজি তোমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করা হবে।

জারার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এতো ভালো স্কুল এতোগুলো ফ্রেন্ড ছেড়ে কোন স্কুল এ পড়বে আবার? স্কুল চেঞ্জ করার প্রয়োজন টা কি ছিল? ভাইয়া কেন এটা করলো? কিছুই ভেবে পাচ্ছে না জারা। শুধু ফেলফেল করে লাবিবের দিক তাকিয়ে আছে। লাবিব জারাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে বলে, ব্যাগ নিয়ে আয় আর সবার থেকে বিদায় নিয়ে আয়। আমি গাড়িতে ওয়েট করছি। জারা ক্লাসে চলে যায় বিদায় নিতে। খুব মন খারাপ তার।

আধ ঘন্টা পরে জারা স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে। মুখ ঘোমড়া করে গাড়িতে উঠে বসে। লাবিব চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারে কেঁদেছে জারা। এমনিতেই কয়েকদিনে চেহারার অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে তাফিফটার জন্য। লাবিব পানির বোতল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল ~ মুখটা ধুয়ে নে।
জারার অভিমান উপচে পড়ে এবার ~ স্কুল চেঞ্জ কেন করলে? এই স্কুল কি ভালো ছিলো না?

~ না। এবার গার্লস স্কুলে ভর্তি করাবো। কারো উপর ক্রাস খেতে পারবি না। তুই খারাপ হয়ে যাচ্ছিস। যাকে তাকে দেখে তাকিয়ে থাকিস। এর জন্যই তাফিফ কথা বলে, না। ভর্তি করিয়ে আমার সাথে বাসায় যাবি। তাফিফের রাগ ভাঙাবি তাহলেই তোর সাথে কথা বলবে।

~ এর জন্য আমার সাথে রাগ করে আছে? আমি তো জানিই না। আমি জানলে তো আগেই রাগ ভাঙিয়ে ফেলতাম। কিন্তু এখন কথা হচ্ছে কিভাবে রাগ ভাঙাবো বলোতো?
~ অন্যদের যেভাবে রাগ ভাঙাস।
~ আচ্ছা। দোয়া করে দাও।
~ দিলাম।

~ কি দোয়া করলে?
~ স্বামী সন্তান নিয়ে সুখী হ।
~ হি হি হি হি হি হি।
~ হাসছিস কেন?
~ বলবোনা। আমার লজ্জা করে।
~ পাকা বুড়ি একটা।

সুইমিং পুলে সাতার কেটে রোদেই বসে বসে গা শুকাচ্ছে তাফিফ। হাতে জুস নিয়ে সবুজ পানির দিকে তাকিয়ে আছে। রোদের তাপে গায়ের থ্রি কোয়ার্টার পেন্ট আর গেঞ্জি শুকিয়ে গেছে। এবার রোদ ছেড়ে গাছের ছায়ায় এসে বসে জুসটা শেষ করে নেয়। নিচের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। জারা সামনে এসেই দু হাতে কান ধরে উঠবস করতে থাকে আর বলতে থাকে
~ “আই এম সরি.. অনেকগুলা সরি.. এত্তোগুলা সরি। আমার দিকে তাকাও ভাইয়া। দেখ আমি উঠবস করছি। কানেও ধরেছি।

আর কোনদিন এই রহিম বাচ্চার কথা বলবোনা, ঐ বেটাকে দেখবোও না। আমি গার্লস স্কুল এ ভর্তি হয়েছি। আমি গুড গার্ল হয়ে যাবো। আর বেড গার্ল থাকবো না। রাস্তাঘাটে ছেলের দিকে আর তাকাবোনা। তোমার সব কথা শুনবো। একটা কথাও ফেলবো না। সব সময় বেনী করবো। ওড়না পরবো। ডাক্তার ও হবো। আমাকে শুধু আইসক্রিম কিনে দিলেই চলবে। আমার দিকে দেখোনা একবার তাকিয়ে। আমি তো হাপিয়ে যাচ্ছি এই রোদের ভিতর। ও ডাক্তার.. মাফ করে দাওনা গো। আমার জন্য কি তোমার একটুও কষ্ট হয়না? তুমি রাগ করে থাকো আমি খুব কষ্ট পাই। সরি সরি সরি… আর কতো বার বলবো? প্লিজ মাফ করে দাও।”
তাফিফ নিচের দিকে তাকিয়ে ছায়াতে মগ্ন হয়ে জারার উঠবস করা দেখে। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পুলে ঝাপ দেয়।

পার্ট ১৪

তাফিফ নিচের দিকে তাকিয়ে ছায়াতে মগ্ন হয়ে জারার উঠবস করা দেখে। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পুলে ঝাপ দেয়।
জারা কেঁদে দেয়। ভয় পেয়ে যায়। তবে কি তাফিফ সত্যিই তাকে ক্ষমা করবেনা? জারাও গিয়ে পুলের জলে পা ভিজিয়ে বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে থাকে। তাফিফ একবার পুরো পুল সুইম করে জারার সামনে আসে। হাতে পানি নিয়ে জারার মুখে ছুড়ে দেয়। জারা ওরনা দিয়ে মুখ মুছে তাফিফের দিকে তাকায়। তাফিফ এক দৃষ্টিতে জারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তাফিফের চোখে জারার চোখ দুটো আটকে যায়। জারার চোখ জ্বালা করছে। চোখ দুটো বন্ধ করে নিতেই তাফিফ বলে,
~ চোখ নামালি কেন? আমাকে কি দেখতে ইচ্ছা করছেনা? দেখতে যখন ইচ্ছা করছেনা তাহলে এলি কেন? এসেছিস এসেছিস তো আমার সামনে কেন এলি? সরি কেন বলছিস? তুই কি কোন অন্যায় করেছিস? কাদছিস কেন? কার জন্য কাদছিস? আমার জন্য? মরে গেছি আমি তাই?

~ ভাইয়া…… এসব কথা বলছো কেন তুমি? এতো কেনো রাগ করছো? আমার কষ্ট হচ্ছে।
~ কিসের কষ্ট? আমার জন্য তোর কিসের কষ্ট? তোর তো ঐ ডেসিং বয়।
~ আরেকবার যদি ওর কথা বলো তাহলে এবার কিন্ত আমি ঐ রহিমের বাচ্চাকে মেরে জেলে যাবো। ও ভাইয়া আমি সরিতো। একদম গুড হয়ে যাবো। আমার কষ্ট হচ্ছে গো।
~ ভালোই তেজ আছে দেখছি। তো এতোই যখন কষ্ট হচ্ছিলো এত দিন পর এলি কেন? আমার কথা ভাবার তোর সময় আছে নাকি?

জারা এবার আবার কেদে দেয়।
~ বেনীওয়ালী। আবার কাদছিস কেন? আমার সামনে একদম কাদবিনা।
~ তুমি আমায় বোঝ না তাফিফ ভাইয়া। একটুও ভালুপাস না।
~ তুই বুঝিস আমাকে? তুই ভালুপাসস? ভালুপাসলে অনেক আগেই আসতি। এতো দেরি করতি না।

~ আমি …আমি..
একটানে জারাকে পুলে ফেলে দেয়। জারা চিৎকার করে উঠে। তাফিফ জারাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে,
~ চিল্লাচ্ছিস কেন?
~ আমি সুইমিং পুলে কখনো নামি নি। সুইম পারি না।
~ তো কি হয়েছে?
~ ভয় করছিলো।

~ এখন করছে না?
~ উহু। আর করবেও না। তুমি আছো তো।
~ চোখ মুখের এই অবস্থা করেছিস কেন? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। শুকিয়ে গেছিস তো। ঘুমোসনি কেন? খাওয়া দাওয়া করিস নি কেন ভালো করে? দুদিন পর যখন বিয়ে দিয়ে দিবো তখন চাইলেও দেখা হবে না আমাদের না।
~ তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো। তাহলে সবসময় তোমার সাথে থাকতে পারবো।
~ হা হা হা হা …. তুই বড় হতে হতে তো আমার একটা বউ হয়ে যাবে।

~ তাহলে আমি তোমার বউয়ের সতীন হবো। তারপর ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তোমাকে নিয়ে নিবো।
~ তাই? এতো কিছু বুঝিস?
~ তুমি বুঝবেনা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তুমি রাগ করে থাকো একটুও কষ্ট হয়না আমার জন্য তোমার? আমাকে ছাড়া কিভাবে থাকো তুমি?
~ পারি নাতো। আমারো কষ্ট হয়। কোথায় হয় জানিস? এই বুকে। হাত রাখ।
~ কোথায়?

~ বুকের বা পাশে।
জারা হাত রাখে।
~ এখানে কষ্ট হয়েছে তুমার?
~ হুম।
~ আমি কি করে বুঝবো?
~ মাথা রাখ।
~ মাথা তো রাখলাম। এখন?

~ কান পেতে অনুভব কর। কিছু শুনতে পাচ্ছিস?
~ হুম। ধুকপুক ধুকপুক আওয়াজ।
~ তুই না থাকলে এই আওয়াজটা হয়না। কঠিন রুপ ধারন করে। তখন খুব কষ্ট হয়। তোর কোথায় কষ্ট হয়েছে?
মাথা তুলে তাফিফের দিকে তাকায়।
~ জানিনাতো। আমার খুব কান্না পায়।

~ আর?
~ তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করে। তোমার বকা মিস করি। তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে। আমাকে মাফ করে দাওনা গো।
~ দিয়েছি।
~ সত্যি? আমি প্রমিজ করছি আর কখনো কোন পচা ছেলের দিকে নজর দিবো না।
~ একটা কথা শুনবি?
~ বলো।

~ ভালোবাসি ….তোকে আমার বেনীওয়ালী…। খুব ভালোবাসি জানিস ….। জানিস আমার বুক পৃথিবীতে তিনটা কান্ট্রি। একটাতে জুড়ে আছে আমার পরিবার।
আরেকটায় আমার পেশেন্টরা। আরেকটা জুড়ে শুধু তুই। তোকে না দেখলে কথা না বললে আমার খুব কষ্ট হয়। ফাকা ফাকা লাগে সবটা। তোকে প্রতিদিন দেখার জন্য আমি রাত জেগে তোর কাছে আইসক্রিম নিয়ে যাই জানিস? খুব কম করে নিয়ে যাই যেনো পরদিন ই তুই ফোন করে বলিস তোর আইসক্রিম লাগবে। তোকে একটিবার না দেখে কথা না বলে, আমি ঘুমাতে পারিনা। সেই আমি আজ কতগুলো দিন তোকে ছাড়া আছি বুঝতে পারছিস কতটা কষ্টে ছিলাম আমি? আর তুই কিনা। তুই এখন থেকে শুধু আমার দিকে তাকাবি। যতো ইচ্ছা ততো নজর দিবি। আমি পুরোটাই তোর।
~ কোন আইসক্রিম।

~ খাবি নাকি? এখন তো খেতে দিবো না। এখন শুধু দু চোখ ভরে দেখতে পারিস। দুই বছর পর যখন তোর আঠারো হবে তখন তোর আম্মু পাপাকে বলে, আমাকে বিয়ে করে নিস। তারপর তোর যা ইচ্ছা তাই করিস।
~ তাহলে আমি তোমার প্রথম আর শেষ বউ হবো সতীন আনবে না কিন্ত।
~ ভুলেও না। তুই এতো শান্ত আছিস কি করে বলতো?

~ তুমি ছেড়ে দিলে যে আমি পড়ে যাবো তাই। আর এই কাঠফাটা রোদে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যাই তখন কি হপ্পে?
~ পুলে রোদের মাঝে গোসল করেছিস কখনো? চল আজকে তোকে ভেজাবো। পা রাখ নিচে আমাকে ধরে।
~ ওমা এতো পানি কেন? আমার কান ছুই ছুই।
~ হুম।

গালে হাত দিয়ে রোদের মাঝে বসে আছে জারা। রাগে তাফিফের গা শুকিয়ে যাচ্ছে। পাগল নাকি মেয়েটা। এমনিতেই ভেজা শরীরে কাপড় লেপ্টে আছে তার মধ্য আমাকে সামনে রেখে বসে আছে। লজ্জা টা তোর কবে হবে রে বেনীওয়ালী? আমাকে না পুড়িয়ে কি তোর শান্তি হবে না? তেড়ে এসে হাত ধরে একটানে উঠিয়ে বললো,
~ তুই কি নিচে যাবি নাকি আমাকে যেতে দিবি?
~ উফ ব্যথা লাগে তো। আমি মরি আমার চিন্তায়।
~ কিসের চিন্তা?

~ আমাকে তো ভিজিয়ে দিলে। এখন আমি তো ড্রেস আনিনি। কি পড়ে বাসায় যাবো? ত্যইবা আপুতো তার ড্রেস কাউকেই দেয় না। রোদেই জামা শুকাক।
~ পাগল নাকি? নিচে যা। গিয়ে মমকে বলবি মম তোকে শাড়ি পরিয়ে দিবে।
~ শাড়ি .. লাল শাড়ি। বউ সাজবো।
~ শোন ..। আজকে থেকে যা প্লিজ। তোকে অনেকদিন দেখিনা রে ..। একটু কাছে চাই।

মিম রুম গুছাচ্ছিলো। জারা এসে সামনে দাড়িয়ে পড়লো। মিম রুম গোছানো বাদ দিয়ে জারার দিকে একবার পর্যবেক্ষন করে বললো,
~ কিরে তুই কাকভেজা হয়ে কই থেকে আসলি? ভেজা গায়ে দাড়িয়ে আছিস কেন এভাবে? ঠান্ডা লেগে যাবে তো।
~ ছোট মম আমাকে চেঞ্জ করিয়ে দাও। শাড়ি পড়বো।
~ আচ্ছা আয়।
আলমারি খুললে জারা গিয়ে বেছে বেছে লাল খয়ারী একটা শাড়ি নেয়। মিম যত্ম করে জারাকে শাড়ী পরিয়ে দেয়।

লাবিবের কেবিনে ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসে আছে ফারাহ। বসে বসে একবার লাবিবকে দেখছে তো একবার হাত দেখছে। কাজ করতে এসে কাজ না করে একটা অভদ্র প্রেমিক এর সামনে বসে থাকা কতটা অসস্তিকর তা হারে হারে টের পাচ্ছে। রাগে দুখে কান্না আসছে তার। কিন্ত সে কাদবেনা। অফিসে এসে এতোবড় একটা মেয়ে কাদবে এটা খুবই লজ্জাজনক একটা বিষয়। কিছু বললেও কানে নেয় না। কি করবে এখন? আঙুল মুখে দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে ভাবছে। লাবিব একবার ফারার দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার ল্যপটপের দিকে তাকাচ্ছে। চুপি চুপি ফারার কান্ড দেখে হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ।

মুখে দুষ্টুমির ছোয়া লাগিয়ে ফারার দিকে কোনাচে ভাবে তাকিয়ে বলল
~ আঙুলটাকে পেইন দিচ্ছো কেন? সামনেই আছি। যতো ইচ্ছা কামড়াতে পারো। আমি মাইন্ড করবো না।
~ তুমি আচ্ছা অভদ্র ছেলে তো।
~ মায়াকুমারীর জন্য।

~ আমাকে কি সামনে স্টেচু করে রাখার জন্য এই অফিসে নিয়ে এসেছো?
~ তুমি ভাবলে, তাই।
~ তাই না। আমি বসে বসে পেমেন্ট নিতে পারবো না। আমাকে কাজ দাও। আমি আমার কেবিনে যাবো।
~ কাজ করবে তুমি। ওকে কাজ দিচ্ছি। এই নাও ফাইলটা।

ফারাহ ফাইল হাতে নিয়ে এক দৌড়ে নিজের কেবিনে চলে আসে। ফারার দৌড় দেখে লাবিব জোরে হেসে দেয়। হাসির শব্দে ফারাহ সত্যি সত্যি কান্না করে দেয়।

পেয়েছেটা কি তাকে? ছোট ভাইয়ের মতো একটা ছেলে এভাবে তাকে নিয়ে মজা করছে ভাবা যায় এগ্লা? কিভাবে তাকে নাচাচ্ছে। চোখ মুছে ফাইলের পাতা উল্টায়। প্রথম পৃষ্টায় চোখ পড়তেই চোখ কপালে উঠে যায়। একের পর এক পাতা উল্টাতে থাকে। আর বসে থাকতে পারে না। আবার এক দৌড়ে লাবিবের কেবিনে ডুকে ফাইলটা ডেস্কের উপরে রেখে বলে,
~ এসব কি লাবিব? পুরো ফাইলে শুধু একটাই লেখা
আই লাভ ইউ।

~ আই লাভ ইউ থ্রু।
~ কিহহ।
~ থ্যংক ইউ সো মাচ। আমার প্রপোজাল এক্সেপ্ট করার জন্য। আই লাভ ইউ সো সো মোর মোর মাচ। আসো মায়াকুমারী আমার জান আমরা হাগ করি।

~ এইটা কিন্ত চিটিং। আমি বলিনি।
~ রেকর্ড আছে। একদম মিথ্যা কথা বলবেনা।
~ আম্মুনি
~ আহারে বাবুটা কাদে না। আসো আসো বুকে আসো আদর করে দেই।
~ লাগবেনা তোমার আদর। অভদ্র প্রেমিক একটা।

~ এগেইন থ্যংক ইউ আমাকে প্রেমিক বলে, সমোন্ধন করার জন্য।
~ না …… মর তুই।
~ মরলেও ভুত হয়ে তোমার পিছু পিছু ঘুরবো।
ফারাহ বেরিয়ে আসে ছুটির পর। লাবিব গাড়ি নিয়ে সামনে দাড়ায়। ফারাহ গাড়িতে উঠে বসে। সকালেও লাবিব পিক করেছে তাকে। তাই না উঠে উপায় নেই। পুরো রাস্তা লাবিব ফারাহ একটাও কথা বলে, নি। লাবিব জানে এখন কিছু বললে ফারাহ সিউর কাদবে।

আমি তো কাদাতে চায় না তোমাকে আমার মায়াকুমারী। আমি চাই তুমি সব সময় হাসিখুশি থাকো। কোন দুঃখ তোমাকে না ছুক। এতো ভালোবাসি কেন বুঝনা তুমি? আমার ভালোবাসা কোন মজা নয়। কোন ফাজলামি নয়। একবার বিলিভ করো আমাকে। একবার হাতটা ধর নিজের মনের সব ভয় দুর করে। দেখবে নিজের সবটা দিয়ে আগলে রাখবো তোমাকে।
লাবিব বাসার সামনে এসে দাড়ায়। ফারাহ গাড়ী থেকে নেমে দৌড়ে ভিতরে চলে যায়। লাবিব গাড়ি ঘোরায়। কিছু রাস্তা এসে কিজানি ভেবে আবার ব্যক করে। দোলার কাছে চলে আসে সরাসরি। দোলা লাবিবকে বসতে বললে লাবিব বলে,

~ টাওয়েল দাও খালামনি। ফ্রেস হবো। খুব ক্ষুদা লেগেছে। টেবিলে খাবার দাও।

~ দিচ্ছি বাবা। কিন্ত জারা কোথায়?
~ আজকে আমরা প্লেস চেঞ্জ করেছি। এখন তুমি আমার মম আর মম বুড়ির মম। আজ আমি এই বাসায় আর ও ঐ বাসায় থাকবে।
~ হা হা হা .. তোরা পারস ও বটে। যা ফ্রেস হয়ে আয়। সাওয়ার নিস। আমি তোর আংকেল এর শার্ট প্যন্ট বের করে রাখছি। দুজনের মাপ একটাই হবে।
~ ওকে মম।

পার্ট ১৫

লাবিব ফ্রেস হয়ে ডাইনিং এ গিয়ে দেখে ফারাহ খেতে বসে গেছে। ফারাহ একবার লাবিবের দিকে তাকিয়ে আবার নিচের দিকে তাকিয়ে খেতে থাকে। লাবিব চেয়ার টেনে ফারার পাশে বসে পড়ে। দোলা ভাত বেড়ে দেয়। লাবিব ও খেতে থাকে। এর মাঝে জোহানের ডাক শুনা যায়। দোলা চলে যেতে যেতে ফারাহ কে বলে, ফারাহ লাবিবের যা যা লাগবে দিস।
ফারাহ লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিব চোখ টিপ দিয়ে বলে, আমার যা যা লাগবে দাওনা মায়াকুমারী।
ফারাহ লাবিবের প্লেটের দিকে তাকায়। প্লেটে পরিমানের থেকেও বেশী ভাত রয়েছে। ফারাহ চামচ হাতে নিয়ে বলে, কোন তরকারী দিবো তোমাকে?

~ আমি কি তরকারী চেয়েছি?
~ বললে যে লাগবে ..
~ তোমাকে।

~ লাবিব তুমি থেকে গেলে কি আমার সাথে অভদ্রতা করার জন্য?
~ নাতো। তোমার হাতে ভাত খাওয়ার জন্য। হা…। খাইয়ে দাও।
~ মানে? আমি কেন খাইয়ে দিবো? হাত নেই তোমার?
~ আপাদত অবশ হয়ে গিয়েছে। তোমার হাতে খাবে জন্য।
~ আমি পারবো না। যা যা লাগবে নিজে নিয়ে হাত দিয়ে খাও।
ফারাহ নিজের খাবারে মনযোগ দেয়। হাতে লোকমা তুলতেই লাবিব হাত টেনে নিজের মুখে পুরে দেয়।
ফারাহ হা করে তাকিয়ে থাকে। লাবিব কোন মতে গিলে হো হো করে হেসে দেয়।
~ আহ..মায়াকুমারী .. তোমার হাতে জাদু আছে। খাবারের টেস্টই পাল্টে গেছে। আমার ভাগ্যটা দেখছি খুব ভালো। সারাজীবন ঐই হাতে খেতে পারবো।
~ কচু পারবে।

~ খাইয়ে দাওনাগো …আমি না তোমার একটা মাত্র অভদ্র প্রেমিক …।
ফারাহ জানে এই ছেলের সাথে পেরে উঠবে না। প্লেটে আরো ভাত, তরকারী আর এক গ্লাস পানি নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। লাবিব বুজতেও পারেনি যে ফারাহ চলে যাবে। অগত্যা নিজের হাতেই নিজে খায়। দোলা এসে দেখে লাবিব এর খাওয়া প্রায় শেষ। দোলাকে দেখে লাবিব বলে,
~ শোন খালামনি। আমি আর একা একা নিজের হাতে ভাত খেতে পারবোনা। এখন থেকে এখানে এলে তুমি খাইয়ে দিবে আমায়।
~ আচ্ছা দিবো। তর আংকেল ডাকছে। হাত ধুয়ে উপরে যা।

জোহান লাবিবের সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। তাদের গল্প দোলার একদমি ভালো লাগছেনা। লাগবেই বা কি করে .. খালু ভাগিনা এক হলে শুরু হয় গল্প। আর তাদের গল্প মানে বিজনেসের গল্প। এগুলো দোলা বুঝে না জানে! তাই ভোর হতে থাকে। একপর্যায়ে ওদের কথা শুনা বাদ দিয়ে টিভি চালিয়ে দেয়। স্টার জলসা দিয়ে জোরে সাউন্ড দিয়ে দেখতে থাকে। কিন্ত বেশীক্ষন আর দেখতে পারে না জোহান~ লাবিব এবার বিজনেসের গল্প ছেড়ে টিভির দিকে ফোকাস করে। চ্যনেল পাল্টিয়ে খেলা ইনজয় করতে থাকে। দোলার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। লাবিবকে বলে,

~ দেখতো কয়টা বাজে?
~ সাড়ে এগারোটা।
~ যা ঘুমোতে যা এবার। টিভি অফ। আমিও ঘুমোবো।
জোহান বুঝতে পারে। জোহান বলে,
~ আচ্ছা এবার গিয়ে ঘুমাও। সকালে বেরোতে হবে তো আবার।

লাবিব রুমে এসে শুয়ে পড়ে। পরক্ষনেই মনে পড়ে আমিতো ঘুমোতে আসেনি। আসল কারনটার কথা তো মনেই ছিলো না। মায়াকুমারীর কাছাকাছি থাকার জন্য এখানে থাকছি। উঠে পড়ে ফারার রুমের সামনে আসে। দরজায় হাত দিতেই দরজা খুলে যায়। লাবিব অবাক হয়ে যায়। তার মানে তার মায়াকুমারী রাতে দরজা লক করে ঘুমায়না। দরজা আস্তে খুলে ভিতরে ঢুকে। রুমে ড্রিম লাইট দেওয়াতে সব দেখা যায়। মায়াকুমারী আবার ভুতে ভয় পায় কিনা। লাবিব কোন দ্বিধা না করে ফারার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। এতে যেন একটুও শান্তি পাচ্ছেনা লাবিব। ফারার গায়ের কম্বল টেনে সে নিজেও কম্বলে, র নিচে ডুকে পড়ে। চোখ পড়ে ঘুমন্ত মুখটার উপর। মুগ্ধতার সাথে দেখতে থাকে লাবিব। মায়াবী চেহারা ঘুমোলে আরো মায়াবী লাগে। একটা ভ্রু কুচকে একটু উপরে উঠে আছে। নিশ্বাস গুলো মুখের উপর পড়ছে। সামনের অবাধ্য চুলগুলো গালের উপর পড়ে আছে। ঠোটের উপর ও লেপ্টে আছে। চুলগুলোকে খুব হিংসে হচ্ছে লাবিবের।

এই প্রথম মায়াকুমারীর এতোটা কাছে সে। এক বিছানায় এক কম্বলে, র নিচে হাজবেন্ড ওয়াইফের মতো শুয়ে আছে। কাজটা কি ঠিক হলো? না হবার কি আছে? যা দুদিন পর হবে তা একটু আগেই হলে প্রবলে, মটাকি? সবতো তার ই। খুব ছুয়ে দিতে ইচ্ছা করছে। কিছু না ভেবেই কোমড়ে হাত রাখে লাবিব। ফারার কোমল কোমড়ে হালকা চাপ দিয়ে নিজের সাথে লাগিয়ে নেয়। ফু দিয়ে মুখের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে জড়িয়ে ধরে। কোমড়ে চাপ দেওয়াতে জেগে যায় ফারাহ। চোখের সামনে লাবিবকে দেখে ভয় পেয়ে ভুত বলে, চিৎকার করে উঠে। লাবিব মুখে হাত চেপে ধরে ফারার।

~ মায়াকুমারী করছো টাকি? সবাই জেগে যাবে তো। এখানে এলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে একেবারে।
এক ঝটকায় হাত সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে ফারাহ। রেগে লাবিবকে বলে,

~ কি করছো তুমি এখানে? এতো রাতে কোন মতলবে এসেছো এখানে? অভদ্র ছেলে। লজ্জা করে না এতো রাতে বয়সে বড় একটা আপুর রুমে এসে অসভ্যতামি করতে? বাড়ির সবাইকে বলে, দিবো আমি তোমার আসল চেহারাটা কি।
~ মায়াকুমারী আস্তে কথা বলো। কেউ জানতে পারলে তোমার ই মান সম্মান যাবে বুঝার চেষ্টা করো।
~ বের হও তুমি আমার রুম থেকে।
~ থাকতে এসেছি। বের হবো কেন? আর এটা আমারো রুম।
~ ওকে আমি চলে যাচ্ছি।

ফারাহ বেড়িয়ে আসে রুম থেকে। লাবিব থ মেরে বসে থেকে ভাবে। ব্যপারটা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললাম নাতো? হয়তো উচিত হয়নি এভাবে কাছে চলে যাওয়ার। আমিকি আমার মায়াকুমারীকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম? কিসের কষ্ট? না বুঝে কষ্ট পাচ্ছে। আমাকে ওর কষ্ট দুর করতে হবে। হাজার বার কাছে যাবো লক্ষ বার কাছে যাবো। ছাড়ছিনা তোমায় মায়াকুমারী।
লাবিব সারা বাড়ি খুজে ছাদে গিয়ে দেখে ছাদের এক কোনায় বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। লাবিব গিয়ে পাশে বসে। তারও খারাপ লাগছে খুব। আলতো ভাবে ডাক দেয় ~ মায়াকুমারী ….
ফারাহ অশ্রুসজল চোখে লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিব ফারার হাত দুটো নিজের হাতে মুষ্টিবন্ধ করে চোখ চোখ রেখে বলে,
~ একজন প্রেমিক কখন সবচেয়ে অসহায় ফিল করে জানো? যখন সে এতোটা ভালোবেসেও ভালোবাসার মানুষটিকে বোঝাতে পারে না সে তাকে কতোটা ভালোবাসে। খুব ভালবাসি মায়াকুমারী। খুব খুব।

~ কেন ভালোবাসো? কি দেখেছো তুমি আমাতে?
~ তোমার চোখে দেখেছি গো আমার সর্বনাস।
~ সত্যিই নিজের সর্বনাস করতে চাইছো তুমি।
~
সর্বনাসের জালে ডুবেছে মন
ভাসাবি কি করে?
দার খুলে দেয় তোর মনের রাজ্যের
প্রেমিক পুরুষ আছে দাড়িয়ে,
ভালোবাসায় রাঙাতে তোকে
অপ্রস্তুত এই দুটি হাতে।
~ তুমি যাও এখান থেকে লাবিব। আমি এখন একটু কাদবো।

~ ভুত আসবে।
~ আসুক।
~ তোমাকে নিয়ে চলে যাবে।
~ যাক।
~ আর ইউ সিউর?
~ হু।
~ ওকে যাচ্ছি।
~ যাচ্ছি কিন্তু।
~ যাও।
~ একটা জিনিস দেখবে?
~ কি?
~ ঐ দিকে তাকাও।
~ কেন?

~ দেখো আম গাছে সাদা কাপড়ে কে যেন ঝুলছে।
~ ফারাহ আম গাছের দিকে তাকিয়ে ওমাগো………….এক চিৎকারে এসে লাবিবকে আকড়ে ধরে ভুত ভুত করে চিল্লাতে থাকে। ফারার চিল্লানিতে লাবিব হাসতে থাকে। হাসির শব্দে ফারার চুপ হয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে আম গাছে হুয়াইট কালার একটা চঙ ঘুড়ি ঝোলানো যেটা জারা উড়ায়।
লাবিবের দিকে তাকিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে,
~ এটাতো ঘুড়ি। অভদ্র ছেলে। যা এখান থেকে।
লাবিব হাসতে হাসতে মাথায় হাত দিয়ে চুলকিয়ে নেয়। পেছন ফিরে চলে যেতে নিয়ে আবার ফারার দিকে তাকায়। একটা চোখ মেরে গাইতে গাইতে চলে আসে ~

তুমি কতো কোমল তাতো তুমি জানো না . .
নেশায় আমি পাগল তাতো বুঝ না .
বারে বারে ফিরে আসি আমি.. তোমার চুপ ইশারায়,
মনে মনে ডাক যে আমায় তা কেন স্বীকার করো না
অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে তাই ..হ্যা..
অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে তাই …হ্যা..।

লাল শাড়ি অফ হলুদ ব্লাউজ, মাথায় বড় মোটা লম্বা বেনী, দু হাত ভর্তি হলুদ চুড়ি, কানে সোনার ঝুমকো পড়ে সারা বাড়ি হেলে দুলে বেড়াচ্ছে জারা। তাফিফ মুগ্ধ হয়ে তার বেনীওয়ালীর চঞ্চলতা উপভোগ করছে। শাড়ি পড়ে সেজে গুজে তার আনন্দ যেন আর ধরে না। ডিনার এর সময় খাবার খেতে গিয়ে জারা আটকে যায়। তাফিফকে বলে,
~ তাফিফ ভাইয়া আমি তো খেতে পারছিনা। দেখো চুড়ি পড়েছি। হাত নাড়াতে প্রবলে, ম হচ্ছে। খাইয়ে দাও না।

তাফিফ কি করবে বুঝতে পারছে না। জারার একটা কথাতেই মনে মনে বকা ঝকা করতে থাকে। মম বড় মম আপু সবাই থাকতে আমাকে কেন বলিস খাইয়ে দিতে। সাথে কেউ না থাকলে তোর বলতে হতোনা। আমি নিজেই খাইয়ে দিতাম। কিন্তু বাড়ির সবার সামনে কিভাবে বলিস আমাকে খাইয়ে দিতে? বুদ্ধি সুদ্ধি কবে হবে তোর?
তানভীর বলে, সত্যিই তো আমার মামনিটার প্রবলে, ম হচ্ছে। কতো সুন্দর করে সেজেছে আমার মা টা। বউ পাখি .. আমার মা টাকে খাইয়ে দাও তো।
তাফিফ যেন এবার নিঃশ্বাস ফেলে। লাবিবা যত্ম করে জারাকে খাইয়ে দেয়।

বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে তাফিফ। মেয়েরা মিলে গল্প জমিয়েছে ঘুমানো বাদ দিয়ে। এদিকে জারাকে কাছে পাওয়ার জন্য তাফিফের পরান যায় যায় অবস্থা। একদম পিচ্চি বউ লাগছে জারাকে। তাফিফের ইচ্ছা করছে বউটাকে নিজের বুকে লুকিয়ে রাখতে। কিন্তু বউ এর শাশুড়ীরা আর ননদ বউকে নিয়ে গল্প শুরু করে দিয়েছে। অবশেষে গল্পের বুলি বন্ধ করে যে যার রুমের দিকে পা বাড়ায়। জারা বের হয়ে লাবিবার রুমের দিকে যেতে থাকে। তাফিফ এসে সামনে দাড়াতেই চমকে উঠে জারা। বুকে দু বার থু থু দিয়ে বলে,
~ এভাবে কেউ সামনে দাড়ায়? আরেকটু হলেই আমার আত্মা উড়ে যেতো।
~ উড়ে আমার কাছেই আসতো। ঐ দিকে কোথায় যাচ্ছিস?
~ খালামনির কাছে ঘুমাবো।

~ না করে আয়। রাতে আইসক্রিম পার্টি হবে ছাদে।
~ সত্যি? সবাইকে ইনভাইট করে আসি।
~ সবাই জানলে কি হবে জানিস মাথামোটা? তুই আর আমি দিবো।
~ সরি। ওক্কে।
জারা ছাদে পায়চারি করছে। তাফিফ হাতে আইসক্রিমের বক্স নিয়ে ছাদের ডোর লক করে আসে। জারা খুশিতে বাকবামুক হয়ে লাফাতে থাকে। তাফিফ বসে বক্সটা রেখে একটানে জারাকে নিজের কোলে ফেলে দেয়। জারা আহহ করে উঠে। তাফিফ ভ্রু উচু করে তাকাতেই জারা বলে,
~ এভাবে কেউ ফেলে নাকি? যদি ব্যথা পেতাম?

~ ব্যথা না পেয়ে আহ করিস কেন? আমাকে শেষ করতে চাস নাকি? ব্যথা পেলে কি আর হতো? মালিস করে দিতাম ব্যথা হাপিস হয়ে যেতো।
~ আহ করার সাথে তোমাকে শেষ করার কি কানেকশন?
~ সেটা যদি তুই বুঝতি তাহলে তো হতোই। কোন এনেছি শুধু। আমি খাইয়ে দিবো আর তুই খাবি।
তাফিফ আইসক্রিমের মলাট খুলে জারাকে খাইয়ে দেয়। আর জারা খায়।
~ উফ.. এতো নড়াচড়া করছিস কেন? চুপটি করে বসতে পারিস না? এটাতো আমার কোল নাকি?
~ ওকে আমি আর নড়বনা।

~ গলা জড়িয়ে বসতো।
জারা তাফিফের গলা জড়িয়ে ধরে আইসক্রিম খেতে থাকে। আস্তে আস্তে জারা তাফিফের বুকে মাথা রাখে। চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়। তাফিফ জারার চোখ বন্ধ করা দেখে বলে,
~ ঘুম পাচ্ছে? চল নিচে চলে যাই।
~ উহু। একটু থাকি না তোমার বুকে। তোমার বুকে ধুকপুকানি শুনতে খুব ভালো লাগে। এখানেই ঘুমাবো।
~ সকালে সবাই দেখে ফেলবে। তারপর তোকে আর আমাকে আলাদা করে দিবে।
~ আচ্ছা তাহলে ঘুমাবোনা। কিছুক্ষন থাকি।
~ আচ্ছা দশ মিনিট।
~ হুম। তাফিফ ভাইয়া …
~ বল।

~ আমাকে যে শাড়ি পড়তে বললে আমি পরলাম। কেমন লাগছে আমাকে বললে নাতো।
~ আমার নতুন বিয়ে করা বউ লাগছে। বউ হবি আমার?
~ লাল বেনারসি পড়ে, অন্নেক গুলা গহনা পড়ে বউ হবো।
~ হুম হবি তো। ।
~ ভাইয়া আমি তো তখন তোমার উত্তর টা দিলাম না। এখন দেই? কাল তো চলে যাবো।
~ হুম।
~ আমিও তোমাকে এত্তোগুলা ভালুপাসি।
~ আর আমি তোকে ভুবন ভরা ভালোবাসি।

পার্ট ১৬

কেবিনের পাশে জীমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তানভীর নিজে ছেলের জন্য এই ব্যবস্থাটি করে দিয়েছে। পাপার মতো লাবিব নিজেও জীম প্রিয় মানুষ। নিজেকে ফিট রাখতে সবসময় সচেতন। দিনের বেশীর ভাগ সময় এখানেই কাটাতে হয়।
লাবিব সকাল সকাল এসেই জীম করতে শুরু করেছে। কাজের কোন চাপ নেই বললেই চলে। যা ছিলো তা ফারার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। বেচারা ফারাহ কাজ করছে করছে আবার এক পলক লাবিবের দিকে তাকাচ্ছে।

শার্ট খুলে একটা স্লিভলেস গেঞ্জী পড়ে সিক্স প্যাক বডি নিয়ে জিম করে ঘর্মাক্ত শরীরে কোন মেয়ের সামনে থাকলে মেয়ের চোখ যাবেই। ফারার খুব অসস্তী হচ্ছে। না চাইতেও চোখ ঐ দিকে চলে যাচ্ছে। মনে মনে একশ একটা বকা দিতে থাকে। শেষ মেষ চেয়ার ঘুরিয়ে অন্য দিক ফিরে তাকালো। লাবিব একমনে পুশ আপ দিচ্ছে। এতোক্ষন আড় চোখে ফারার দিকে লক্ষ্য করছিল আর ফারার কাচুমাচু দেখে হাসছিল। চেয়ার ঘুরিয়ে নেওয়াতে লাবিব সিঊর হলো যে আর এই দিকে তাকাবেনা।

ডোরে নক না করেই ঢুকে পড়ে রিশি। ডুকে দেখে একটা মেয়ে চেয়ারে বসে কাজ করছে। হবে হয়তো পিএ তাই এখানে বসে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। আবার দেখে মুখোশধারী…। আর লাবিব কর্ণারে পুশ আপ দিচ্ছে। সিক্স প্যক সাথে ফোটা ফোটা ঘাম উইথ মাসল …মাথা ঘুরে যেতে যেতেই নিজেকে সামলে নেয় রিশি। এই মুহুর্তে চেয়ারে বসা মেয়েটাকে অসহ্য লাগছে তার। একটা পার্ট নিয়ে সামনে দাড়িয়ে ফারার দিকে না তাকিয়ে লাবিবের দিকে তাকিয়েই বলে,
~ ও হ্যলো ..।

ফারাহ মাথা তুলে দেখে রিশি দাড়িয়ে। দু বার দেখা হয়েছিল রিশিকে লাবিবদের বাড়িতে তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি। মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে,
~ আসসালামু আলায়কুম। কেমন আছো রিশি?
রিশি ফারার দিকে তাকিয়ে বলে,
~ তুমি জারার বোন না? এখানে জব করো?
~ হা।

~ ওহ। আই সি। তোমার কেবিন কোনটা? এখানে বসে কাজ করছো যে।
~ পাশেই আমার কেবিন। এইতো একটু দরকার ছিলো তাই এখানে বসেছি।
রিশি ফারার সামনে চেয়ার টেনে বসে বলে,
~ ফারাহ বোন আমার শোননা .. তুমি ফাইলটা নিয়ে একটু তোমার কেবিনে যাবে প্লিজ। আমি একটু লাবিবের সাথে প্রাইভেট কাজ আছে। আমাদের মধ্যে তুমি নিজেকে কাবাব মে হাড্ডি কেন বানাবে বলো?

~ আচ্ছা আমি তাহলে বলে, যাচ্ছি লাবিবকে।
~ এই না না। তুমি ডাকলেতো আমাকে দেখে ফেলবে। সারপ্রাইজ ম্যাটার বুঝনা কেন?
ফারাহ চুপ করে উঠে নিজের কেবিনে চলে এলো। মনটা খচ খচ করছে। না বলে, এলাম লাবিব যদি পরে কিছু বলে, আর কি এমন প্রাইভেট কথা? রিশিকে একদম সুবিধা লাগে না আমার।

লাবিব ফ্লোর থেকে উঠে দাড়াতেই রিশি পেছন থেকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। লাবিব শক খেয়ে যায়। রুমে ফারাহ ছাড়া আর কেউ নেই। ফারাহ হুট হাট করে জড়িয়ে ধরবে অবিশ্বাস্য। পেছন ফিরে তাকাতেই রিশিকে দেখে লাবিব। এক ধাক্কায় ফ্লোরে ফেলে দেয়। রিশি চটকে ফ্লোরে পড়ে যায়। ব্যথা পেয়ে কেদে ফেলে। জল ভরা চোখে লাবিবের দিকে তাকিয়ে দেখে লাবিব রাগে লাল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ভয় পেয়ে যায় রিশি। তবুও সাহস করে উঠে দাড়িয়ে বলে,
~ এভাবে ছুড়ে ফেললে কেন? রত্ম পাওয়ার জন্য সবাই কতো কাঠখড় পোড়ায় তবুও অনেকেই ব্যর্থ হয়। আর তুমি কাঠখড় না পুড়াতেই পেয়ে গেছো জন্য মূল্যহীন ভেবে ছেড়ে দিচ্ছো?

~ রাস্তার নোংরা পচা জিনিস কখনো রত্ম হয়না। ময়লাকে লাবিব খান ছুড়ে ফেলতে ভালো করেই জানে। নাউ গেট আউট ফ্রম মাই অফিস। কোন সাহসে তুমি আমার কেবিনে পা রেখেছো?
~ আমাকে তুমি বের করে দিতে পারোনা লাবিব। জাষ্ট কয়েকটা দিন ওয়েট করো। তারপর তোমাকেই আমি নিজের করে নিবো। আমার ভালোবাসায় বন্ধি করবো। তখন এই সব এ আমার অধিকার হবে শুধু।
~ তোমার আশা আশাই থেকে যাবে। জেগে জেগে সপ্ন দেখা বন্ধ করো। নাউ বের হোও এখান থেকে। গেট আউট।
লাবিব রিশির হাত ধরে টেনে অফিস থেকে বের করে দেয়। অফিসে কর্মরত ইমপ্লয়িরা এ দৃশ্য দেখে দাড়িয়ে পড়ে।

দারোয়ানকে দেখিয়ে বলে,
~ নেক্সট টাইম যেন এই মেয়েটা আমার অফিসে না ডুকতে পারে।
ভিতরে এসে এমপ্লয়িদের বসতে বলে, ফারার কেবিনে এসে ডোর লক করে দেয় শব্দ করে। ফারাহ চমকে উঠে লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিবের ভয়ংকর চেহারা দেখে ভয় পেয়ে যায়।
~ লাবিব কি হয়েছে তোমার?
~ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরো।

~ কিহ?
~ যা বলছি তাই করো। হারি আপ।
~ লাবিব কি বলছো তুমি?
~ শেষ বারের মতো বলছি জড়িয়ে ধরো।
ফারাহ কাপতে কাপতে পেছনে আসে জড়িয়ে ধরার জন্য। দুবার ধরতে গিয়েও ধরতে পারে না। তার দারা এটা কিভাবে সম্ভব? লাবিব ফারাকে দেখে বলে,
~ যদি ধরতে চাও তাহলে ধরো নয়তো চলো আমার সাথে গোছল করবে।

ফারার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এইটা আরো অসম্ভব। দুহাতে জড়িয়ে নেয় লাবিবকে। জড়িয়ে ধরে কুকড়ে যায় ফারাহ। হৃদপিন্ডের গতি বেড়ে যায়। ছাড়তে চেয়েও ছাড়তে পারে না। লাবিব দুহাতে ফারার হাত দুটো চেপে ধরেছে। লাবিব হাত দুটো ছেড়ে ফারাহকে নিজের কেবিনে আসতে বলে, ওয়াশরুমে চলে যায়।
সাওয়ার নিয়ে নিজেকে শান্ত করে। বেরিয়ে এসে দেখে ফারাহ বসে আছে। লাবিব সামনে এসে দাড়িয়ে বলে,
~ বেরিয়ে গিয়েছিলে কেন?

~ রিশি বললো, তোমার সাথে প্রাইভেট কথা আছে তাই গিয়েছিলাম।
~ আমাকে বলে, গিয়েছিলে?
~ না মানে ..
~ যেখানে তুমি আর আমি আছি সেখানে অন্য কাউকে কেন এলাও করলে? প্রাইভেট কি কথা বলে, ছে তুমি জানো?
~ তোমাদের প্রাইভেট কথা আমি কিভাবে জানবো?
~ একটু আগে তুমি যা করলে সেটা ছিলো রিশির প্রাইভেট কথা।

~ কিহহ?
~ হ্যা। আমি তাই তোমাকে ধরতে বলে, ছি। আমি চাইনা যা তুমার থেকে পাওয়ার কথা তা অন্য কেউ দিক। আমার শরীরে শুধু তোমার ছোয়া থাকবে।
~ লাবিব আমি বুঝতে পারিনি ব্যপারটা।
~ আমি বের হচ্ছি। ফাইল গুলো ঠিক করে রেখো।
~ ঠিক আছে।

লাবিবা, ত্যয়ইবা, তুষার আর তাফিফ এসেছে জারাদের বাসায়। দুদিন পর তুষারের জন্মদিন। ছয় বছরে পা দিতে যাচ্ছে তুষার। দাওয়াত দিতে এসেছে সবাইকে। ড্রয়িং রুমে বসে সবাই গল্পে ব্যস্ত। শুরু জারা আর ফারাহ নেই। তাফিফ নিঃশব্দে উঠে ধীর পায়ে জারা রুমে চলে আসে। জারা বসে টেবিলে বসে লিখছিল। তাফিফ কলমটা কেড়ে নিয়ে খাতায় লিখে
~ আই লাভ ইউ বেনীওয়ালী।

জারা তাফিফের হাত দেখে বুঝতে পেরে হেসে দেয়। তাফিফের দিকে তাকায় মুগ্ধ চোখে। যে চোখে চোখ রেখে তাফিফ দুষ্টু মিষ্ঠি প্রেম লুটে নিতে থাকে। চেয়ার টা একটু সরিয়ে কোলে তুলে নেয় জারাকে। বেলকনিতে এসে ডিপিতে বসে। জারা দু হাতে তাফিফের গলা জড়িয়ে ধরে থাকে। তাফিফ নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় জারাকে। জারা তাফিফের বুকে মাথা রাখে। মধ্য দুপুরের অসংখ্য ভালোলাগা ছুয়ে দেয় দুজনকে। জারা বুক থেকে মাথা তুলে তাফিফের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তাফিফ মুচকি হেসে জিঞ্জাসা করে
~ কিহ?

~ সারাক্ষন বলতে ইচ্ছা করে।
~ কি?
~ ভালোবাসি।
~ আচ্ছা। আমিও ভালোবাসি।
~ চুমো খাবো।
~ হা হা হা .. এখন তোর চুমো খেতে ইচ্ছা করছে?
~ হুম।

~ মাইর চিনিস মাইর? মেরে হাড্ডি ভেঙে দিবো। যতসব আজেবাজে কথা মাথায় ঘুরে তাইনা?
~ ডাক্তার বর ট্রিটমেন্ট করবে। ভাইয়া শোননা .. একটা চুমো দেই না তোমায়। না না দুটো শুধু তিনটাই দিবো। চারটার বেশী একটাও দিবো না।
~ হয়েছেটা কি তোর? সত্যি করে বলতো তোকে কে শিখালো এসব?
~ আশিকি 2 মুভি। ইস ভাইয়া কি যে সুন্দর করে কিস করছিল বৃষ্টিতে ভিজে .. এক জ্যকেট এর নিচে ..উফ .. মে তো মার গায়া উসকো কিস ..।

~ স্টপ যা এখানেই। এই তুই এর পর কিছু দেখিসনিতো?
~ দুররররর… আম্মু এসে চ্যনেলটাই পাল্টিয়ে দিলো। সাথে এত্তোগূলা বকা দিয়ে দিলো।
~ আল্লাহ বাচাইছে। নয়তো তুই আবার কিস করার কথা বাদ দিয়ে..থ্যংকস খালামনি সরি হবু শাশুড়ী।
~ দরজাটা বন্ধ করে আসি। তার পর চুমু দিবো নয়তো কেউ এসে দেখে ফেলবে।
জারা দৌড় দিতে নিলেই তাফিফ আটকে ফেলে সামনে বসিয়ে দেয়। জারা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলে,
~ তুমি কি আমাকে চুমু দিতে দিবে নাকি?

~ তোর দিতে হবে না আমিই দিচ্ছি।
তাফিফ জারার কাছে এসে কপালে ঠোটের পরশ দেয়। জারা কপালে উষ্ণ ছোয়া পেয়ে কেপে উঠে।
তাফিফ দুহাতে জারার মুখ উঠিয়ে বলে,
~ বিয়ের পর যতো ইচ্ছা ততো চুমু দিবি কেমন? এখন না।
~ আমার এখনি চাই। চলো আমরা বিয়ে করে নিই।

~ তোর আঠারো হতে হবে তো।
~ চিটিং করবো। চলো বিয়ে করে নিই।
~ কেউ রাজি হবে না। আর ভাইয়ার বিয়ে না হলে আমি কিভাবে বিয়ে করবো বলতো?
~ তারমানে তুমি চুমু খেতে দিবে না?
~ না।
~ সত্যিই দিবে না?

~ না।
~ ওকে আড়ি তোমার সাথে। আর কথা বলবেনা আমার সাথে।
~ কোন আড়ি না। আমি বাচবোনা কথা না বলে,
~ তো আমার কি? তুমি তো আর চুমু দিবে না।
~ কিসের চুমু? বোঝার চেষ্টা কর। যা দেখবি তাই নিয়ে মাতামাতি করবি নাকি? ছেলেমানূষী বন্ধ কর।
~ করবোনা। আড়ি।

পার্ট ১৭

তুষারের বার্থডে এবার নানু বাড়িতেই সেলিব্রেট হচ্ছে। পুরো বাড়ি ডেকোরেট করা হয়েছে অসংখ্য ফেইডি লাইট, ফ্লাউয়ারস দিয়ে। তাফিফ, লাবিব, তুষার, রোশান সেইম ড্রেস পড়েছে। ব্লাক সুজ, ব্লাক ডেনিম প্যান্ট, হুয়াইট শার্ট এর উপর ব্লাক কোর্ট, বসোম পকেটে রেড় রুমাল ভাজ করা, রিচ ওয়াচ, জেল দেওয়া হেয়ার ~ চারজন কেই জাস্ট ওসাম লাগছে। ত্যয়ইবা এসে তুষার কে কোলে তুলে নেয়। রোশান পাশে এসে দাড়িয়ে ত্যইবার হাত ধরে কাছে টেনে নেয়। লাবিব আর তাফিফ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায় রুম থেকে। রোশান তুষার সহ ত্যইয়বাকে জড়িয়ে নেয়। ত্যইয়বার কপালে একটা চুমু দেয়। তারপর তুষারের কপালে চুমু দিয়ে বলে,

~ Many Many Happy Returns of the day my son. God bless you. Papa, live for many years.
ত্যইয়বার দিকে তাকিয়ে বলে,
I have become a father to you. Thank you very much for giving me so much happiness.
ত্যইয়বা ~ তুষার একসাথে বলে, উঠে ~ we love you more more and more.

লাবিব গেষ্ট দের ওয়েলকাম করছে আর তাফিফ সোফায় বসে আঙুল কামড়াচ্ছে। লাবিব ব্যপারটা খেয়াল করে এসে পেছন থেকে দেয় মাথায় একটা থাপ্পর। তাফিফ হকচকিয়ে দেখে লাবিব পেছনে দাড়িয়ে। ভাব নিয়ে আবার সামনে তাকিয়ে আঙুল কামড় দেয়। লাবিব পাশে বসে বলে,
~ any problem?
~ don’t know.
~ why? Did zara do anything?
~ she has been listening to me for two days .
~ কি করেছিস?

~ আমার কাছে একটা জিনিস চেয়েছে আমি দিতে। পারিনি।
~ পারিসনি এবার পারতে হবে। আমার বোনের কোন চাওয়া যেন অপূর্ন না থাকে। মনে থাকবে?
তাফিফ অসহায় ভঙিতে মাথা নাড়ায়। নিজের হাতে নিজেই মাথায় বাড়ি দেয়। এ কোন মেয়ের পাল্লায় পড়ল রে বাবা..।
জারাল ভীষন মন খারাপ। তাতে কি? সাজতে বাধা নেই। ভাগিনার বার্থডে পার্টি আর সে সাজবেনা তাতো হবার নয়। পিংক কালারের একটা গাউন পড়ে মাথায় হিযাপ করে নেয়। মুখে হালকা মেকাপ করে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখতে থাকে। দোলা রুমে ডুকে চমকে উঠে বলে,
~ আপুই তুমি এখানে কেন? তোমার নাতির বার্থডে পার্টি ঐ বাড়িতে। আপুই তুমি কি আমাদের নিতে এসেছো?

আমরাই তো যাচ্ছি।
~ আম্মু ….. তুমি কাকে আপুই বলছো? আমি তোমার বেবি জারা।
দোলা আমতা আমতা করে বলে, ওও জারা। সরি মা। চিনতে পারি নি। তোকে আর আপুইকে গুলিয়ে ফেলেছি। একদম আপুই এর মতো দেখতে হয়েছিস তুই। ‌আজ আপুই এর মতো ড্রেস পড়াতে আপুই ই লাগছে।
~ হি হি হি। আগুন সুন্দরীর ভাগনী আমি ..বুঝতে হবে ব্যপারটা।
~ হুম দেখতো ফারার হলো কিনা?

~ ওকে দেখছি।
জারা ফারার রুমে ডুকে দেখে ফারাহ বোরখার পেছনের বেল্ট লাগাচ্ছে। জারা তাড়া দিয়ে বলে,
~ এখনো হয়নি তোমার? সবাই তো রেড়ী।
~ আমার পাচ মিনিট লাগবে আর। এতো তাড়াতাড়ী গিয়ে কি হবে বলতো? মাত্র ছয়টা বাজে। বারোটা সময় কেক কাটবে।
~ দেখতে দেখতেই বারোটা বেজে যাবে। আজকে আমি তোমার হিযাপ করে দিবো।
~ ওকে দে।

লাবিব সাগরকে ওয়েলকাম করতে গেইটে আসে। সাগর আর লাবিব দাড়িয়ে কথা বলতে থাকে। তখন একটা গাড়ি এসে পাশে দাড়ায়। গাড়ির দিকে দুজনেই তাকায়। গাড়ির গেইট খুলে ব্লাক পার্টি ড্রেস পরিহীতা গ্লাম্যারাস একটি মেয়ে নেমে আসে। মুখের দিকে তাকাতেই দেখে এটা আর কেউ নয় মিস রিশি। লাবিব সাথে সাথে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। মেয়েটাকে একদম সহ্য হয় না। তবুও রিলেটিভ হয়ায় সহ্য করতে হয়। রিশি এসে লাবিবের পাশে দাড়িয়ে লাবিবের ডান হাতের নিচ দিয়ে হাত দিয়ে হাত ডুকিয়ে দেয়। লাবিব রেগে হাত ছাড়াতে নিবে তখনি সাগর বলে, উঠে

~ woww…so nice lady . Hello I am Mr. Sagor Hossain. (হাত বাড়িয়ে দিয়ে )
রিশিও হাত বাড়িতে দিয়ে বলে,
~ I’m Risi Raisa. You call me Risi. Labib your’s Friend?
~ Yes we are best friend.
রিশি লাবিবের হাত ধরেই বলে, Lets go baby…

আশেপাশে অনেকেই আছে তাই লাবিব কিছু বলতে পারছেনা। কিন্ত রাগে ঠিকই ফুসছে। একা থাকলে দিতো গালে লাগিয়ে দুটো ইচ্ছামতো। কিন্ত তা আর হচ্ছেনা। ভিতরে আসতেই কয়েকজন কমেন্ট ও করে দিল ~ নাইস জুটি, অনেক মানিয়েছে, পারফেক্ট মেচ। লাবিব এর রাগ মুখ দেখে তাফিফ এসে লাবিবকে সাইডে নিয়ে আসে। লাবিব এবার রেগে তাফিফকে বলে,
~ এই উটকো ঝামেলাটাকে জাস্ট সহ্য করা যায় না। গায়ে পড়া মেয়ে একটা। মনে হচ্ছে আমার হাতটাই কেটে ফেলি। কোর্টটাই নোংরা করে দিলো।

~ come down my bro. .
~ ok.
জারারা সবাই আসতেই তাফিফ বুকে হাত রেখে পড়ে যেতে নেয়। লাবিব ধরে ফেলে। কি হয়েছে জিঞ্জাসা করলে সামনের দিকে ইশারা করে। লাবিব সামনে তাকাতেই দেখে জারাকে। বুড়িকে খুব সুন্দর লাগছে তার জন্য তাফিফের এই অবস্থা ভালোই বুঝতে পারে। জারার পেছনে খেয়াল করতেই লাবিবের ঠোটে হাসি ফুটে উঠে। তখনি তুষারের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। লাবিব তাফিফকে সোজা করে দাড়িয়ে দিয়ে তুষারের কাছে আসে। ত্যইয়বা তুষারকে কোলে নিয়ে চুপ করতে বলছে কিন্তু তুষার কিছুতেই চুপ হচ্ছে না। লাবিব কে ত্যইয়বা বলে, তুষারের ফ্রেন্ডরা নাকি দুটো কেন্ডেল নষ্ট করে দিয়েছে। এখন কেন্ডেল আছে চারটা।

এখন ছয়টা কেন্ডেল ফু দিয়ে নিভাবে কিন্তু এই রকম কেন্ডেল এখানে আর নেই। ছয়টাই আনা হয়েছিল। বাড়ির অন্য কেন্ডেল নিবে না তার এটাই লাগবে।
লাবিব তুষারের চোখ মুছে দিয়ে বলে,
~ মামা হে না? মামা কেন্ডেল এনে দিচ্ছে। কেমন?
তুষার চুপ করে। লাবিব গাড়ির চাবি এনে গাড়ি বের করে। হটাৎ ফারার কথা মনে পড়ে। লাবিব আবার বাড়ির ভিতরে এসে দেখে ফারাহ আর জারা গল্প করছে। লাবিব ফারার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এসে গাড়ির গেট খুলে বলে,
~ উঠো
~ কোথায় যাবো এখন?

~ কেন্ডেল কিনতে স্টোরে যাবো তুমি আর আমি। কোন কথা নয় উঠে বসো।
ফারাহ উঠে বসে। লাবিব গাড়ি স্টার্ট দেয়। জ্যাম ছাড়িয়ে ফাকা রাস্তায় চলে আসে গাড়ি। ফারাহ রাস্তা দেখে বলে,
~ এদিকে কোথায় যাচ্ছো? স্টোর তো পেছনে ফেলে আসলাম।
~ তা‌তে কি? মুক্ত হাওয়ায় ড্রাইভ করতে ভালো লাগছে তাই এখানে এলাম। খেয়াল করো বাইরে …. অনেক সুন্দর একটা ওয়েদার।

ফারাহ বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে, হুম। অনেক সুন্দর।
~ থ্যাংকস।
~ কেন?
~ নেক আপ করে আসার জন্য।

ফারাহ ওহ বলে, বাইরের দিকে আবার চোখ রাখে। মনে মনে বলে, আমি জানি আমি কালো। কালো মেয়েদের নাকি কোন শুভ অনুষ্টানে থাকতে নেই। কালোদের মুখ দেখলে নাকি শুভ অশুভতে পরিণত হয়। আমি নিজেও চাইনা আমার মুখ কেউ দেখুক। কারো অশুভ কিছু হোক। আমি কোথাও যেতে চাইনা। পরিবারের জন্য তাদের সাথে সাথে ঘুরতে হয়। আমাকে কারো না দেখাই ভালো। পর্দার আড়ালে আমি ঠিক আছি। বাইরের এই রং দুনিয়া দুদিনের তাসের ঘর। সুন্দর হলেও মাটিই খাবে অসুন্দর হলেও মাটিই খাবে। পার্টিতে আমাকে দেখে কেউ কিছু বললে হয়তো তুমার খারাপ লাগতো। তাই আমি নেকাপেই ঠিক আছি।

লাবিব ফারার মুখ শুকনো দেখে বুঝতে পারে ফারার মনে কালো মেঘ জমছে। লাবিব গাড়িটা থামিয়ে দিতেই ফারাহ চমকে লাবিবের দিকে তাকায়। লাবিবকে বলে,
~ কি হলো?
~ আকাশে কালো মেঘ জমেছে।
ফারাহ বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে তারা ভরা আকাশ।

লাবিব ফারার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,
~ তারা ভরা আকাশে মেঘ জমলে উজ্জলতা কমে যায়। আমি চাইনা আমার মায়াকুমারীর কখনো উজ্জল মুখে মেঘের ছায়া পড়ুক। আমি চাইনা বাইরের অসংখ্য মানুষ আমার মায়াকুমারীকে দেখুক। আমি চাই আমার মায়াকুমারী নিজের পরিবারের বাইরে আর কাউকে নিজের চেহারা না দেখাক। আর তার সৌন্দর্য…তার উত্তরাধী একমাত্র আমি।
~ লাবিব..।

~ হিসসসসস.. কোন কথা নয়। আপাতত স্টোরে যেতে হবে।
এক প্যাকেট কেন্ডেল এনে তুষারের হাতে দেয়। বারোটা বাজতে আরো আধঘন্টা বাকি। এদিকে তাফিফ জারার সাথে কথা বলার অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু জারা একদমি পাত্তা দিচ্ছে না। এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে। করতে করতেই ধাক্কা খেয়ে তাল সামলিয়ে দাড়িয়ে পড়ে। সামনে তাকিয়ে দেখে সাগর দাড়িয়ে। সাগর হেসে বলে,
~ পাকা বুড়িনা? তো এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছো কেন? পিছনে কি ডাকাত পড়েছে নাকি?
~ সাগর ভাইয়া যে। আপনি কখন এসেছেন? আমিতো দেখিইনি আপনাকে এতোক্ষন।
~ ছিলাম ছিলাম। সন্ধ্যায় এসেছি।

~ ও আচ্ছা। একা একা ঘুরছেন কেন?
~ জুনিয়র সুন্দরীরা আমাকে পাত্তা দিচ্ছেনা তাই।
~ হি হি হি। এখানে অনেক সুন্দরী আছে। কিন্তু শুনে খারাপ লাগলো আপনাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না।
~ তুমিও তো দিচ্ছো না। হা হা হা।

জারা আড়চোখে একবার তাফিফকে দেখে নেয়। কোল্ড ড্রিংস নিয়ে শকুনের চোখে জারার দিকে তাকিয়ে আছে। জারার মাথায় দুষ্টুমি খেলে যায়। সাগরকে বলে, চলুন ঐদিকে বসি। সাগর আর জারা এক কর্ণারে গিয়ে বসে। সাগর জারাকে বলে,
~ আজ অনেক সুন্দরীর দর্শন পেলাম। একজনের দিকে চোখ আটকে গেছে। তুমি ভালো করেই চিনবে। হেল্প করবে একটু বোন?

~ আইসক্রিম……না থাক লাগবেনা। আমার অলরেডী দুইটা ফ্যক্টরী আছে। আপনি বড় ফ্যক্টরীর ফ্রেন্ড তো তাই এমনিতেই হেল্প করে দিবো।
~ থ্যংক ইউ সো মাচ। এখন বলোতো রিশি মেয়েটা কেমন?
~ রিশি আপু তো অনেক ভালো।

আরো অনেক ভালো ভালো কথা সুনিয়ে দেয় সাগরকে। সাগর সব কিছু সুনে টোটালি ইমপ্রেসড। তাফিফ এসে জারাকে বলে, এইযে বেনীওয়ালী চল এখন কেক কাটবে। সাগরের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আপনিও আসুন।
তুষারকে মাঝে রেখে সবাই চারদিকে ঘিরে দাড়ায়। কেক কাটা শেষ হলে সবাই সবাইকে খায়িয়ে দেয়। জারা দেখে তাফিফ জারাকে কেক খাওয়াতে আসছে সাথে সাথেই জারা এক টুকরা কেক হাতে নিয়ে সাগরের সামনে দাড়ায়। সাগরের মুখের সামনে ধরতেই সাগর হেসে হা করে। একটু খায়। তারপর বলে, আমি কি কেকটা পেতে পারি?

জারা হেসে কেকের টুকরোটা সাগরের হাতে দিয়ে বলে, রিশি আপু লাবিব ভাইয়ার সামনে। সাগর কেকটা নিয়ে রিশির সামনে যায়। রিশি তখন লাবিবকে খাওয়াবে বলে, কেকটা উপরের দিকে তুলে ধরতেই সাগর কেকটা মুখে পুরে নেয়। এমন কাজে রিশি রেগে যায়। বলে,
~ মি. সাগর আমার কেক আপনি খেলেন কেন?

~ আপনিতো খাওয়ানোর জন্য আমার সামনে ধরলেন। তাই খেলাম। এতে রাগ করার কি আছে? বাই দা ওয়ে, আমাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য থ্যংকস। আর রাগ করা ভালো। কজ রাগলে সুন্দরী মহাসুন্দরী হয়ে উঠে।
~ রাবিস।

রিশি চলে গেলে হাতের কেকটাও সাগর মুখে পুড়ে নেয়। ফারার সামনে দাড়িয়ে আছে লাবিব। বেচারা ফারাহ রীতিমত চুপ হয়ে দাড়িয়ে আছে। মনে মনে কুকড়ে যাচ্ছে। লাবিবকে খাইয়ে দিতে হবে। কিভাবে পারবে সবার সামনে খাইয়ে দিতে? যদিও কেউ খেয়াল করবে না। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। ভীষন লজ্জা করছে। একবার কেক ছুচ্ছে আরেকবার ছেড়ে দিচ্ছে। কেকে হাত দিতেই লাবিব হাতের উপর হাত রাখে। হাত ধরে মুখের কাছে নিয়ে আসে। হাতে অনেকটা ক্রিম লেগে গেছে। লাবিব মেকি হাসি দিয়ে একটা আঙুল পুরে দেয় মুখে। লাবিবের এমন কান্ডে স্তব্ধ ফারাহ। নিচের দিকে চোখ চলে যায়। চাইলেও লাবিবের দিকে তাকাতে পারে না। প্রত্যকটি আঙুলে লাবিবের মুখের উষ্ণতায় ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে থাকে ফারাহ। এই মধুক্ষনের অবসান ঘটে তাফিফের আড্ডার ঘোষনায়।

গিটার হাতে বসেছে লাবিব। পাশেই বসেছে রিশি। রিশির ঠিক মুখোমুখি বসেছে সাগর। জারা এসে সাগরের পাশ ঘেসে বসে পড়ে। অগত্যা তাফিফ ত্যইয়বার পাশে এসে বসে। পাশেই বসেছে রোশান আর ফারাহ। প্রত্যেকের নজর প্রত্যেকের প্রিয় মানুষটির উপর। গিটারে টুং টাং আওয়াজ তুলে লাবিব। গান ধরে সাগর ~

একটু যদি তাকাও তুমি
মেঘ গুলো হয় সোনা।
আকাশ খুলে বসে আছি
তাও কেন দেখছোনা ……

সবাই মিলে মজা করতে করতে কথা উঠে আসে কে কখন প্রথম ক্রাস খেয়েছে?
রোশান মজার ছলে আগে লাবিবের দিকে প্রশ্নটা করে।
লাবিব বলে, তোমাদেরটা আগে বলো।

~ তা তো হবে না। আমাদেরটা আমাদের জানাই আছে। একমাত্র তোমার টা রহস্যময় লাগে আমার কাছে। বলে, ফেল এবার ক্রাস টাস কি কখনো খেয়েছিলে কোন সুন্দরীর উপর?
লাবিব হেসে মাথা নাড়ায়। একবার ফারার দিকে তাকায়। ফারাও সবার মতো নিরব দর্শক হয়ে শুনছে। কিন্তু মনের কোনে কোথায় যেন আপত্তিরা ছুয়ে দিচ্ছে। লাবিবের মতো একজন ছেলের ক্রাস প্রেমিকা থাকতেই পারে তবে তার কি? বুঝিয়ে আপত্তিদের দরজা বন্ধ করে দেয়। লাবিব একটা জোরে নিশ্বাস টেনে নেয়।

“পড়ন্ত দুপুর বেলায় এক বাড়ির ছাদে এক শ্যমলতার প্রেমে পড়েছিলাম। হালকা রংয়ের সেলোয়ার কামিজ পড়নে ছিলো। ওড়নাটা কোমড়ে বেধে এক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে কুতকুত খেলছিলো। সে ছিলো ডাগর নয়নী শুশ্ক ওষ্ঠী লম্বা ঢেউ খেলানো কোকড়া চুলের শ্যমা রংয়ের মায়াবী চেহারার মায়া কন্যা। আর আমার প্রেম মায়াকুমারী।”

সবাই অবাক হয়ে যায় লাবিবের কথা শুনে। রিশিতো কেদে দিবে দিবে ভাব। তাফিফ~ জারা~ সাগরের ঠোটে মিষ্টি হাসি। ফারাহ চোখ বন্ধ করে নেয় আবেশে। এতো প্রেম যে তার কপালে ছিলো তা সত্যিই ভাবনার অতীত। নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে আজ। সত্যিই সে ভাগ্যবতী।

পার্ট ১৮

রোশান রিশির মম আর পাপা সকাল দশটায় বিডি তে ল্যান্ড করবে। এখন বাজে নয়টা। আয়োজনে ব্যস্ত সকলেই। তাফিফ আর রোশান গিয়েছে তাদের পিক করতে। লাবিবের অফিসে জরুরী মিটিং আছে তাই যেতে পারেনি। তুষার বড্ড খুশি তার দাদা দাদী আসার কারনে। রিশি চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এদেশে আসার একটাই কারন রিশি আর লাবিবের বিয়ে দেওয়া। সেদিন লাবিব যে কথাটা বলল তারপর আর কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছেনা। লাবিবকে কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না।

হাত ছাড়া করলে এতোদিনের আশা আকাঙ্ক্ষা মাটিতে মিশে যাবে। তা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। রিশির মম পাপা এলে না জানি কি ঝামেলাটা বাধবে .. সব টা মেনেজ করতে না পারলে সব শেষ। সাড়ে এগারোটার দিকে গাড়ি এসে বাড়ির এরিয়ায় ঢুকে। বাড়ির সবাই ড্রয়িং রুমে পৌছে যায়। এই প্রথম বাড়ির একমাত্র মেয়ের শ্বশুর শাশুড়ী এ বাড়িতে পা রাখবে বলে, কথা।

তাফিফ গাড়ি থেকে নেমে দারোয়ানকে বলে, লাগেজ গুলো উপরে নিয়ে যেতে। রোশান তার মম ডেডকে নিয়ে ভেতরে যায়। দরজায় পা রাখতেই থেমে যায়। একনজরে বাড়ির ভেতরটা দেখে নেয়। তানভীর, সরোয়াজ, লাবিবা, মিম চমকে যায় রোশানের মম ডেড কে দেখে। লাবিবা তানভীরের হাত খুব শক্ত করে ধরে নেয়। তানভীর অবাক হয়ে বলে,
~ মিশু থামস…. তোমরা রোশানের পেরেন্টস?

মিশু চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে রোশানের হাতে দেয়। এগিয়ে এসে তানভীর লাবিবার সামনে হাতজোড় করে বসে পড়ে। মিশুর এরকম কাজে সবাই হতবাক। তানভীর নিজেও অবাক। মিশুকে বলে,
~ হচ্ছেটাকি মিশু? গেট আপ।
~ ক্ষমা চাইছি। এতোবছর পরে হলেও জীবনে বেচে থাকা অবস্থায় ক্ষমা চাইতে পারছি যা আমার কল্পনায় ছিলোনা।
~ তুমি ক্ষমার অযোগ্য মিশু।

~ তবুও আমি ক্ষমা চাইছি। তানভীর লাবিবা তোমাদের আমাকে ক্ষমা করতেই হবে। আমি জানি আমি ভুল করেছিলাম। তোমাদের প্রতি লোভ করেছিলাম। তোমাকে ঠকিয়েছি তানভীর। সেদিন যখন তুমি চলে এসেছিলে তারপর আমার মম মারা যায়। আমার মম আমাকে তার সব কিছু বলে, যায়। আমাকে তোমার জীবন থেকে সরে যেতে বলে, তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে বলে, কিন্ত আমি তোমার সামনে আসিনি কখনো। আমি চাইনি আমার ছায়া তোমাদের উপর পড়ুক কখনো।

আমি যদি আসতাম তাহলে তোমাদের মাঝে মন মালিন্য হতো আবার। তোমরা যেন সুখে থাকো সেইজন্য আমি ক্ষমাটাও চাইতে পারিনি। বড্ড একা হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে খুব অসহায় লাগতো। নিজের করা ভুল গুলো কুড়ে কুড়ে খেতো আমাকে। সেই মুহুর্তে থামস আমার পাশে দাড়ায়। থামস ভেবেছিল তার সাথে সম্পর্ক জন্যই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে এসেছো। সে জানতো না ভুলটা আমার। আমি তখন সব কিছু থামস কে বুঝিয়ে বলি। থামস আমার অবস্থা দেখে আমাকে বিয়ে করতে চায়।

আমিও ভেবে দেখি আমি যেমন অগোছালো তেমন থামস ও ছন্নছাড়া। ওকে নিয়ে নিজেকে ভালো রাখলে সমস্যা কোথায়? তারপর আমরা বিয়ে করি আস্তে আস্তে আমাদের মাঝে ভালবাসার সংসার জমে যায়। দুটো ছেলেমেয়ে হয়। পরিবার নিয়ে অনেক সুখী আমরা। কিন্তু আমার মধ্যে আমার অন্যায়বোধ ঠিকই জালাতো আমায়। একটু ক্ষমা চাওয়ার জন্য ছটফট করতাম। আজ আমার সেই সুযোগ টা এসেছে। আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দাও।
থামস এগিয়ে আসে।

তানভীরের হাত ধরে বলে,
~ মানুষ মাত্রই ভুল করে। মিশুও ভুল করেছে। আন্টি মিশুকে যে পথে চালিয়েছে মিশুও সেই পথে এগিয়েছে। এতে মিশুর দোষ কোথায়? তুমি কি পারবেনা ক্ষমা করতে? এই শেষ বয়সে এসে ক্ষমা চাইতে পারছে তোমার কাছে। প্লিজ তানভীর আমাদের ক্ষমা করো। আমরা অনেক ভালো একটা সম্পর্কে রিলং করছি। আমাদের সম্পর্ক আরো মজবুত করতে পারিনা বলো?
তানভীর লাবিবা কি বলবে বুজতে পারছে না। মিশু কেদেই চলেছে। লাবিবা তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলে, একটা মানুষ যখন তার ভুল বুঝে অনুতপ্ত হয় তখন তাকে আমাদের ক্ষমা করা উচিত। আর মিশু এখন আমাদের মেয়ের শাশুড়ী আমাদের বেয়ান নিকট আত্মীয় আমাদের। যা হবার হয়ে গেছে। সব ভুলে গিয়ে আমরা এক হয়ে থাকতে পারি। একটু বুঝো প্লিজ।
তানভীর মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে,

মিশু উঠে এসে লাবিবার হাত ধরে বলে,
~ তুমি আমার বোনের মতো লাবিবা। তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। এর জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত। তাই কখনো তোমার সামনে আসিনি। তবে তোমাদের জন্য মন থেকে ঠিকই দোয়া রেখেছি আমি। আমি আজো আসতামনা। এক প্রকার বাধ্য হয়েই আসতে হয়েছে। আমার সন্তানদের জন্য আসতে হয়েছে আমাকে। আমার ছেলে যখন তোমার মেয়েকে বিয়ে করে ইউ এস এ তে নিয়ে যায় সত্যি মানতে পারিনি আমি। কোন মা চায় বলো তার ছেলে না জানিয়ে হুট হাট কাউকে বিয়ে করে ঘরে তুলে আনুক? রোশানের দিকে তাকিয়ে আমি আমার বাসায় থাকতে দিয়েছিলাম ত্যইয়বাকে।

কিন্ত ওর মাঝে আমি যেন তোমাকে খুজে পাচ্ছিলাম। তারপর পরিচয় জেনে জানতে পারি আমার ছেলের বউ আর কেউ নয় তোমার আর তানভীরের মেয়ে। বুকে আগলে নিয়েছিলাম আমি। আল্লাহ আমার সহায় আছেন। তোমাদের মেয়ে আমার ঘর আলো করেছে। এই মেয়েকে নিজের মেয়ে না ভাবলে, আমার যে আরো পাপ হতো। তুমি যেমন ওর মা আমিও তেমনি ওর আরেকটা মা। তবুও আমি চেয়েছিলাম তোমাদের থেকে দুরে থাকতে। কিন্তু এট লাস্ট আমাকে আসতেই হলো। তোমার মেয়ে যেমন আমার বাড়ি আলো করেছে তেমনি আমার মেয়েও যে তোমার বাড়ি আলো করতে আসতে চাইছে। মা হয়ে মেয়েকে ভালো রাখার সব দায়িত্ব যে আমারি। আমি আমার মেয়ের চোখের পানি সহ্য করতে পারবোনা। আমার করা ভুলের জন্য আমার মেয়ে কেন শাস্তি পাবে বলো?

লাবিবা অবাক হয়ে যায় মিশুর কথা শুনে।
~ কি বলছো তুমি এসব?
~ লাবিবা আমি চাই তোমার মেয়ে যেমন আমার ঘরে দিয়েছো তেমনি আমার মেয়েকেও তুমার ঘরে দিয়ে আমাদের সম্পর্ক আরো দৃঢ করতে। আমি মা হয়ে বলছি আমার রিশির মতো মেয়েই হয়না। তুমিতো চেনো ওকে। ও মাঝে মাঝেই এখানে এসে থাকে। লাবিবের জন্য আমার রিশিকে নাও না গো। আমি গেরান্টি আমার মেয়ে লাবিবের যোগ্য স্ত্রী হয়ে দেখাবে।
~ আমাদের ভাবতে হবে। লাবিব কে বলতে হবে।

রোশান বলে, মম রিশি লাবিবকে লাভ করে অনেকদিন থেকেই। আর আপনি দেখেননি ওদের একসাথে কতো ভালো মানায়। সেদিন পার্টিতে ওদের দেখেতো একদম পারফেক্ট মেচ মনে হচ্ছিলো।
লাবিবা মাথা নাড়ায়। পার্টিতে সেও খেয়াল করেছে। দুজনে একসাথে কাপলের মতো ছিলো। আর লাবিবের পাশে রিশিকে মানায় ও ভালো। তাছাড়া এখানে তার মেয়ের সংসারের ও ব্যপার। এই বিয়ের মাধ্যমে দুটো পরিবার এক হয়ে আরো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ছেলে মেয়ে দুজনেই সুখী থাকবে। তবে এখনি এটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা উচিত। বেয়ান বেয়াই বলে, কথা। লাবিবা বলে,
~ আমরা পরে কথা বলি এই ব্যপারটা নিয়ে। এখন ফ্রেশ হওয়া যাক। জার্নিটা লং ছিলো।

ত্যইয়বা মিশু থামসকে গেস্ট রুমে নিয়ে যায়। তাফিফের মাথা পুরো আওলে যায়। কি হচ্ছে এসব? ভাইয়া আর ফারাহ আপু লাভ বার্ড। ওদের মধ্য এই বাজ পাখিটা কি করে ডুকে পড়লো? ফোন বের করে লাবিব কে কল দেয় তাফিফ। লাবিব মিটিং এ থাকায় ফোন পিক করতে পারে না। রুমে এসে চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিকালে সবাই বসে এক প্রকার ঠিকই করে নেয় বিয়ের ব্যপারে। গার্ডিয়ানের দিক থেকে সব কথা বার্তা শেষ। কনের দিক থেকেও কনফার্ম। রিশি বরাবর ই ভালো মেয়ে। ভালো ব্যবহার, বিনয়ীতা, স্মার্টনেস কাজের ব্যপারে আগ্ৰহীতা সবার নজর কাড়ে। বাড়ির সবাই খুশি এই ব্যপারে। শুধু খুশি হতে পারছেনা তাফিফ।

লাবিবা ফোনে দোলাকে জানায় ব্যপারটা। দোলাও খুব খুশি। রিশিকে দোলার ও খুব ভালো লাগে। খবর শুনে ড্রয়িং রুমে এসে সবাইকে মিষ্টি মুখ করায়। ফারুক চৌধুরী মিষ্টি আর দোলার মুখের হাসি দেখে বলে,
~ কি ব্যপার? হটাৎ মিষ্টি যে। আমাকে তো মিষ্টি দেওয়ায় হয় না। তো আজ মিষ্টি দিলে যে?
~ একটু খান আজ ভাইজান। খুশির খবর শুনার আগে একটু মিষ্টি মুখ করতে হয়।
জোহান বলে, কি খুশির খবর?

~ আমাদের লাবিবের বিয়ে ঠিক হয়েছে ত্যইয়বার ননদ রিশির সাথে। রিশির মম আর ডেড নিজে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। রিশির মতো একটা ভালো মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার।
অফিস থেকে সবে ফিরেছে ফারাহ। বাড়িতে ঢুকতেই শুনতে পায় এই কথপোকথন গুলো। তবে যেন সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সবকথাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। সত্যিই কি লাবিব রিশিকে ভালোবাসে? এতোদিন তাহলে সত্যিই লাবিব এসব মজা করেছে? কিন্তু লাবিব তো মজা করা মতো ছেলে নয়। দোলার সামনে এসে বলল
~ এতো খুব খুশির সংবাদ। ছোট আম্মু এই বিয়েতে কি, সবাই রাজি? আংকেল, খালামনি, ত্যয়ইবা, রিশি এমনকি লাবিব?
~ হা রে সবাই রাজি। রিশি নাকি ভালোবাসে লাবিবকে। যার নিজের ভালোবাসার সাথে বিয়ে হচ্ছে অনেক ভালো হচ্ছে। আমার লাবিব অনেক সুখী হবে ইনশাআল্লাহ।

এই কথা শুনার পর ফারাহ আর এক মুহুর্ত দাড়িয়ে থাকতে পারে না সেখানে। রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। মুখে বালিস চেপে বুকের ভেতর চাপা কান্না বের করে দেয়। ফোন নিয়ে লাবিব কে বার বার কল দেয়। কিন্তু লাবিব গাড়িতে থাকায় ফোন পিক করতে পারে না। ফারাহ দেয়ালের সাথে এক ডিলে ফোনটা ভেঙে ফেলে। বার বার বলতে থাকে
“তুমি আমার মনটা নিয়ে কেন খেললে লাবিব? যদি রিশিকেই বিয়ে করার কথা ছিলো তাহলে আমার সাথে এরোকম না করলেও পারতে। আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি লাবিব। এতো কেন কষ্ট হচ্ছে আমার?

আমি তো আর পারছিনা। তোমার মাঝে আমি আমার সুখ খুজে নিয়েছিলাম। বিশ্বাস ছিলো তোমার উপর শত বাধা এলেও আমার হাতটা তুমি ছাড়বেনা কখনো। আমাকে কাদিওনা লাবিব প্লিজ। আমি যে না চাইতেও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। সব আমার বোকামো। আমিই বুঝি নি। সব বুঝেও না বুঝে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। পুরো ভুলটাই আমার। আমি কিভাবে তোমার সাথে নিজেকে চিন্তা করলাম?

বত্রিশ বছর বয়সে টিন এজার এর মতো কাজ করে ফেললাম। তোমার সাথে আমি কখোনোই যাইনা লাবিব। আমি যে তোমার যোগ্য নয়। এতো দিনের অবহেলা অপমান সব ভুলে গিয়েছিলাম তোমাকে পেয়ে। আমি নির্বোধের মতো কাজ করেছি। এই ভুল আমাকেই শুদ্ধে নিতে হবে। আমি দুরে সরে যাবো তোমার কাছ থেকে। তোমার পাশে রিশির মতো মেয়েকেই মানায়। আমি তো ছাই পাশ রাস্তার ছেলের পাশে দাড়ানোর ক্ষমতা রাখি না। এ শহরে সাদা চামড়ার দাম অনেক বেশী। অনেক।”

লাবিব গাড়ি থামিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখে ফারা ফোন দিয়েছিল। ডায়াল করতেই মধুর কন্ঠে সুর ভেসে আসে”আপনি যে নাম্বার টিতে কল দিয়েছেন তা এই মুহুর্তে বন্ধ আছে।”তাড়াতাড়ির সময় এখন পরে ফোন দিবে বলে, ফোন টা রাখতেই বেজে উঠে। তাফিফের নাম্বার স্কিনে ভেসে উঠে। ফোন কানে নিয়ে বলে, হ্যা বল
~ মম বলল তুই নাকি চিটাগাং যাচ্ছিস?
~ হা পরশু ফিরবো।

~ ভাইয়া তোর সাথে অনেক কথা আছে। আমাকে একটু সময় দে।
~ আমি বাসায় ফিরে তারপর শুনবো। আমি সিগনালের বাইরে থাকবো কাল। ফোন দিস না।
~ কিন্ত ভাইয়া ইটস আর্জেন্ট।
~ আমি বাসায় ফিরি দেন শুনবো। বাই।

লেখা – লাবিবা তানহা লিজা

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “পাজরের টানে – Gopon bhalobashar kotha bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – পাজরের টানে (সিজন ২ – শেষ খণ্ড) – Gopon bhalobashar kotha bangla