স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক

স্ত্রীর চাওয়া – স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালবাসা

স্ত্রীর চাওয়া – স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালবাসা: প্রতিটা স্ত্রীই চায় তার ভালোবাসার স্বামীকে সব সময় কাছে পেতে, একটু বেশিই ভালোবাসা পেতে, আর আমার বেলায়ও ঠিক তেমন।


মুলগল্প

মাঘের শরীর কাঁপানো শীতের মধ্যেও সারারাত কোনো কম্বল ছাড়াই কাটিয়ে দেয় সেলিনা। শরীরে পড়া শাড়ি নিয়েই একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েই রাতে ঘুমিয়ে ছিলো। রাতে ঘুমের পূর্বেই নিজের স্বামীর সাথে অভিমান করেছিলো, আর সেই অভিমান এর পরিমাণ বেশি হওয়ায় সেলিনা নিজেকে কষ্ট দেওয়ার এই রাস্তাটাই ঠিক করে নেয়।

যেই মেয়ে একটু কষ্ট সহ্য করতে পারেনা সেই মেয়েই সারারাত কোনো শীতবস্ত্র ছাড়াই বিভোর হয়ে ঘুমিয়েছে।

নিজের স্বামীর উপর এতোই অভিমান যে, এই সকাল ৬টার সময়েই আবার গোসল করবে ঠাণ্ডাপানি দিয়ে, সেলিনার অভিমানটা একটু গভীর নিজের স্বামীর প্রতি।

রাতের ঠাণ্ডা যখন লাগেনি সেলিনার শরীরে, তাই এবার বাধ্য হয়েই ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করবে সে।

ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে সেলিনা রাতের কথাগুলো ভাবতে থাকে।
রাতের খাবার খেয়েই খুশী মনে নিজের স্বামীর কাছে ফোন দিয়েছিলো সেলিনা।

স্বামীর সাথে খুশগল্প করার একপর্যায়ে দুইদিন পর নিজের বার্থডের কথা বলে সেলিনা। সেলিনার জন্মদিন দুইদিন পর এইকথা শুনে মুহূর্তেই মন খারাপ হয়ে যায় মাহবুবের।

রাতে কী দিয়ে খেয়েছো সেলু? মাহবুব কোনোভাবে চাচ্ছে সেলিনার মাথা থেকে জন্মদিনের কথাটা সরাতে।

সেলিনা নিজের স্বামীর প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারছে, জন্মদিনের কথাটা ভুলাতে চাচ্ছে। সেলিনা অভিমানী সুরে বললো,

আমি তোমায় অন্য কিছু বলেছি! আর ফোনে কথা বলার প্রথমেই আমি সকাল থেকে তোমায় ফোন দেওয়ার আগ পর্যন্ত কী কী করেছি, সব বলেছি তোমায়। তাহলে আবার জানতে চাচ্ছো কেন?

মাহবুব নিজের স্ত্রীর কথাগুলো শুনে মন খারাপ করেই বললো, আমার প্রতি খুব অভিমান তোমার?

সেলিনা নিজের স্বামীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবারো একই কথা বললো, দুইদিন পর আমার জন্মদিন। কথাটা বলে চুপসে যায় সেলিনা, মাহবুবও চুপ, মাহবুব জানে আজ কিছু একটা হবে,
মাহবুব একটু সময় নীরব থেকে বলে।

সেলু তোমার জন্মদিনের কথা আমায় মনে করিয়ে দিতে হবে না। তোমার জন্মদিন এর তারিখ থেকে আমার সাথে তোমার বিয়ে এবং বিয়ের পরের বিশেষ বিশেষ দিন গুলো আমার সব সময় মনে থাকে।

মাহবুবের কথা শুনে সেলিনার খুশী হওয়ার কথা ছিলো, কেনো না! প্রতিটা মানুষই নিজেদের প্রিয় মানুষের মুখে এমন কথা শুনলে, খুশীতে আত্মহারা হবেই।

কিন্তু সেলিনা একটুও খুশী হয় নি৷ মাহবুবের কথা শুনে সেলিনার অভিমানের পাল্লা আরো দিগুণ হয়। সেলিনা এবার কান্না কান্না কণ্ঠে বললো, তুমি কী কাল আসবে বাসায়?

সেলিনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা কখনো মাহবুবের হবে না। কারণ সে যে একজন সেনাবাহিনী। সে চাইলেও কিছুদিনের ছুটি নিয়ে নিজের প্রিয় মানুষটির কাছে আসতে পারবেনা।

মাহবুব মায়া মায়া ভরা কণ্ঠে বললো, লক্ষী বউ আমার, তুমি তো জানোই আমি দেশের কাছে বন্দী। আমি চাইলেও অন্য দুই তিনজন স্বামীর মতো পারবো না অন্য দুই তিনজন স্ত্রীর ইচ্ছা গুলো পূরণ করতে!

সেলিনা নিজের স্বামীর কথা শুনে এবার কান্না করে দিলো, আর বললো।

প্রতিটা স্ত্রীই চায় তার ভালোবাসার স্বামীকে সব সময় কাছে পেতে, একটু বেশিই ভালোবাসা পেতে, আর আমার বেলায়ও ঠিক তেমন।
মাহবুব ছোট্ট করে বললো, কান্না করোনা সেলু! আমি পারছিনা তোমার সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে।

কেন পারছো না? আমি চাইনা তুমি সেনাবাহিনীতে কাজ করো, যে কাজে নিজের ইচ্ছা মতো ছুটি নেওয়া যায় না, চাই না আমি এসব।

মাহবুব নিজের স্ত্রীর কথায় চুপ থাকলো। সেলিনা আবারো বললো, তুমি কী আমায় কখনো বুঝবে না? তোমার সাথে বিয়ের পর চতুর্থ জন্মদিন যাবে আমার। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, চারটা জন্মদিনেই তুমি ছিলে?

মাহবুব আবার চুপ। মাহবুব এর চোখ বেয়ে দু ফোটা পানি পরলো।

বিয়ের ৪টা বছরে তোমায় গড়ে ৪মাসো আমি পাইনি। আমি কী তোমার কাছে কখনো টাকা চেয়েছি? বলেছি কী আমার টাকা লাগবে?

মাহবুব আর নীরব না থেকে বললো, লক্ষীটি আমার, শান্ত হও একটু।
মাহবুবের এমন আকুতি করা কথা গুলো সেলিনা শুনছেই না।
সেলিনা কান্না করেই যাচ্ছে।

সেলু আমি কিন্তু প্রতিটা বিশেষ বিশেষ দিন গুলো তে তোমায় সর্ব প্রথম উইশ করি, ভালো ভালো গিফট দেই, তবুও কেন তুমি এতো কষ্ট পাচ্ছো?

মাহবুবের কথায় এবার সেলিনা রেগে চিৎকার করে বললো,
তুই কী আমার প্রেমিক, যে ফোনে সব উইশ করবি? কুরিয়ারে গিফট পাঠাবি? তোর এমন উইশ আর গিফটকে আমি ঘৃণা করি, তোর সাথে বিয়ে হয়েই আমার জীবনটা শেষ। (কান্না করে দেয় সেলিনা)

মাহবুব একটুও রাগ করেনি নিজের স্ত্রীর কথা শুনে। হেসেই বললো মাহবুব,

এতো রাগ ভালো না, জানো স্ত্রীদের একটা রাগের জন্য স্বামীর ১০টা করে চুল পড়ে?

মনে হচ্ছে তোর সাথে আমি মজা করছি এখন?

না না, আমার লক্ষীটি এখন রেগে আছে, আর এই রাগের কারণে আমার মাথার চুল হেরে যাচ্ছে।

সত্যিই তুই খুব পঁচা, তোকে বিয়ে করে আমি একটুও সুখী না৷ তুই একটা আস্তো অভদ্র।

অভদ্রের কী দেখলে সেলু? অট্টহাসি দিয়ে বললো মাহবুব।
সেলিনা রেগেই বললো, অভদ্ররাই নিজের স্ত্রীর চাওয়া পাওয়া পূরণ করেনা, ভদ্র স্বামীরাই নিজের স্ত্রীর সব কিছু পূর্ণ করে।

মাহবুব আর কিছু না বলে কথা ঘুরাতে চায়,

অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাও তো?
আমায় নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, তোর এই লোক দেখানো ভালোবাসা আমি চাইনা।

মাহবুব মন খারাপ করে বললো, একজন তেত্রিশ বছরের পুরুষকে একজন চব্বিশ বছরের মেয়ে তুই করে ডাকছে। পুরুষটার কিন্তু কষ্ট হচ্ছে।

মাহবুবের কথা শুনে সেলিনা একটু সময় চুপ থাকে, তারপর আবার বলে,
তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও না, তোমার কী আমার মতো কষ্ট হয় না? তুমি কী চাও না নিজের স্ত্রীকে সারাক্ষণ কাছে পেতে?

মাহবুব নিজের স্ত্রীর প্রশ্ন গুলো শুনে নিজের চোখের পানি মুছে, আর বলে।

দুই মাস পর ছুটি আছে, তখন তো আসবোই, এই কয়দিনই তো মধ্যে!

মাহবুবের কথায় আবার সেলিনার রাগ হয়, সেলিনা এবার রাগলেও নরম কণ্ঠে বলে।

জানো তুমি? তোমার সাথে যখন আমার বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ২০, আর তোমার ২৯, লোকে বলেছিলো মেয়ে সরকারি চাকরি ওয়ালা বর পেয়েছে বলেই নিজের থেকে বয়সে ৯বছরের বড় ছেলেকে বিয়ে করছে।

লোকে আরো অনেক খারাপ খারাপ কথা বলছিলো, মেয়ে লোভী, সরকারী চাকরির ছেলে দেখেই নাচতে নাচতে বিয়ে করতে চাইলো। বিয়ের ৩মাস পর্যন্ত এমন কথা শুনেছি। কিন্তু ওরা জানেনা! একটা মেয়ে কখনো কোনো পুরুষকে পছন্দ করেনা।

একটা মেয়ে ছোট থেকেই বউ সাজতে চায়, চায় ভালো স্বামী, এখন স্বামী বুড়ো কী ছোট তা মেয়েটি কখনো দেখেনা, একটি মেয়ে স্বামী চায়, আর সেই স্বামীর আশা পূর্ণ করতে গিয়েই মেয়েটির পরিবার একজন পুরুষ পছন্দ করে।

আর মেয়েটিও পুরুষকে স্বামী হিসেবেই ভালবাসে, কখনো ভাবেনা বয়স কেমন? প্রতিটা নারীই পুরুষ শব্দটার চেয়ে স্বামী শব্দকেই ভালোবাসে, আর সেই স্বামী শব্দেই ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের রাজত্ব।

যারা আমায় বলছিলো আমি লোভী, এখন ইচ্ছে করছে! তাদের গালে থাপ্পড় দিয়ে বলতে, মেয়েরা কখনো টাকা বা সরকারি চাকরি ওয়ালা পুরুষ চায় না, মেয়েরা স্বামী চায়, যার কাছে ভালোবাসাটাই প্রথমে পাওয়া যায়।

মাহবুব নিজের স্ত্রীর কথা গুলো শুনে খুব মন দিয়ে। সত্যিই তো কথা গুলো, মাহবুব নিজেই বলতো, মেয়েরা সরকারি চাকরী ওয়ালা পুরুষ চায় বিয়ের সময়। কিন্তু সে বুঝতে পারছে। তার ভাবনা কথা গুলো মিথ্যে, মেয়ে টাকার চেয়ে ভালোবাসাটাই চায় বেশি। সেলু এর জীবন্ত প্রমাণ। মেয়েরা বুঝে সরকারী চাকরির লোককে বিয়ে করার পর কষ্টের অধ্যায় টা।

মাহবুব ভাবনায় না গিয়ে ছোট্ট করে বললো,
সেলু সকালে ডিউটি আছে, অনেক রাত হয়েছে, ঠাণ্ডাও খুব, আমাকে ঘুমাতে হবে, তুমিও ঘুমাও।

মাহবুব কথাগুলো বলেই ফোনটা রেখে দেয়, সে জানে সেলিনার অভিমান ভাঙাতে পারবে না। তাই রাত জেগে লাভ

মাহবুবের ফোন রাখতেই কিছুক্ষণ কান্না করে সেলিনা, তারপরেই সেলিনা মাহবুবের উপর রাগ অভিমান করে ঠাণ্ডার মধ্যে এই কষ্টটাই বেছে নেয়।

সেলিনা রাতের কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই গোসল করে নেয়। স্বামীর উপর করা অভিমান এর কাছে ঠাণ্ডা কিছুই না।

সেলিনা গোসল করে, আবার নিজের স্বামীর কাছে ফোন দেয়, কিন্তু ফোন বন্ধ। সেলিনা মুচকি হাসলো, নিজের স্ত্রীর চেয়ে কাজকেই বেশি মূল্যায়ন করলো লোকটা।

সকাল পেরিয়ে রাত হলো, মাহবুব ফোন দেয় সেলিনাকে। সেলিনা ফোন ধরে চুপ থাকে।

মাহবুব আদুরী কণ্ঠে বললো।
রাগ কমেছে কী আমার লক্ষীটির?

সেলিনা চুপ থাকলো। মাহবুব কয়েকবার কথা বললো, কিন্তু সেলিনা চুপ থাকলো। মাহবুব এবার মন খারাপ করেই বললো।

সেলু তুমি শুধু নিজের দিকটাই দেখলে, একবারো আমার দিকটা দেখোনি। একবারো ভাবো না, আমি যখন সারাদিন কাজ করে রাতে তোমায় ফোন দেই, তখন বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায় তোমার অভিমান ভাঙাতেই। আচ্ছা আমার কী তখন অভিমান হয় না?

অভিমান করা সহজ সেলু, কিন্তু অভিমান ভাঙানো কঠিন, আর সেই কঠিন কাজটাই করে যে অভিমান ভাঙায়। কখনো ভেবেছো আমার কথা, যখন কয়েকদিনের ছুটি পাই। খুশী হয়ে তোমার কাছে আসি, তখন তুমি অভিমান করেই থাকো।

তোমার অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতেই ছুটি শেষ হয়ে যায়। আচ্ছা তখন কী আমার কষ্ট হয় না?

লোকে তো আমায়ও বলতো, আমিও সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করেছি। কিন্তু কেউ ভাবেনি একজন সেনাবাহিনীর বউ থাকা বা না থাকা সমান, তাইতো অনেক সেনাবাহিনী বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়না। সেলু আর অভিমান করে থেকো না। তুমি যদি চাও!

তাহলে আমি চাকরি ছেড়ে দিবো। কিন্তু তোমার অভিমানী কণ্ঠ আমি শুনতে চাই না।

মাহবুবের চাকরী ছাড়ার কথা শুনে সেলিনার মুখে হাসি ফুটে উঠে।
খুব আনন্দের সুরেই বলে।

তাহলে আজকেই চলে আসো সব কিছু নিয়ে, চাইনা এতো টাকা পয়সা, যেখানে সুখ নাই সেখানে টাকা দিয়ে কী করবো।
সেলিনার আনন্দ দেখে মাহবুব বললো।

তোমাকে সুখে রাখার জন্য আমি সব করবো, তোমার জন্মদিনের ১সেকেন্ড আগে হলেও আমি আসবো সেলু।

সেলিনা নিজের স্বামীর কথা শুনে খুশীতে আত্মহারা হয়ে যায়, ফোনটা রেখে নিজের দুইজোড়া মাবাবাকে এই খুশীর খবর দিতে চায়, সেলিনা জানে, একজোড়া মাবাবা খুব খুশী হবেন মাহবুবের এমন ডিসিশন শুনে।

সেলিনা আজ খুব আনন্দিত, ভালোবাসার মানুষটিকে আবার পাশে পাবে, আর কখনো যাবে না দূরে।

লেখক: হানিফ আহমেদ

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “স্ত্রীর চাওয়া – স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালবাসা” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – কালো – মনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!