স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক

এক পড়ন্ত বিকেলে (১ম খণ্ড) – ভালোবাসার গোলাপ খাট এ

এক পড়ন্ত বিকেলে – ভালোবাসার গোলাপ খাট এ: বিকেলের শেষের দিক। সূর্য পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। আজ তরুর এক অজানা অনুভূতি মনে হানা দিয়েছে যখন সে অনুকে পড়াচ্ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি ২ টা টিউশনি করায় সে। তবে সপ্তাহে ৩ দিন করে।


পর্ব ০১

~ এটা আপনি কি বললেন?
~ কেন? শুধু প্রশ্ন করলাম, জানার জন্য।
~ বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে এসে সেই মেয়েকেই প্রস্টিটিউট বলছেন আপনি? কেন? কি এমন জানেন যে আমাকে সরাসরি প্রস্টিটিউট এর সাথে তুলনা করলেন?

কতকটা চিৎকার করেই কিন্তু শান্ত ভাবেই সামনে বসা ছেলেটিকে বলে উঠল তরু।
~ সকাল দুপুর যেখানে তুমি ছেলেদের সাথে চিপকে ঘুরে বেড়াতে পারো, সেখানে আমি বললেই দোষ?

শয়তানী হাসি মুখে রেখেই জবাব দিল জালাল।
~ আর কি কি জানেন আমার ব্যাপারে?
~ আর জানার কি আছে? এইতো বললাম, আরে বললাম কি, আজই তো দেখলাম সকালেও দেখলাম আর কিছুক্ষণ আগেও। সকালে অবশ্য আরেক ছেলে ছিল। আর এখন আরেকজন। তবে যাই হোক, মা পছন্দ করেছিল বলে তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে তো দেখলাম অন্য ঘটনা। অন্য ছেলে দের সাথে চিপকাচিপকি। আর কি কি করো? আগেই বলে দেও। যেহেতু তোমার সাথে আমার বিয়ে হবে, আমার জানা উচিত আর কি কি করে থাক তুমি? আই মিন ওই লাইনে আছো নাকি? অবশ্য থাকতেও পারো, বলা তো যায় না, তোমাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড তো দেখলামই। কি? ওই লাইনে আছো না কি? আর বিয়ের পরও কি থাকবা? আমি তো অবাক হচ্ছি তোমার ফ্যামিলি তোমাকে সাপোর্ট করে?

বলতে বলতে চোখের থেকে সানগ্লাস খুলল জালাল নামের লোকটি। হাত মুঠো করে শুধু শুনে যাচ্ছিল তরু, আর কি কি বলতে পারে লোকটি।

বাড়িতে লোকে গিজগিজ করছে বলা যায়। মেয়ে দেখতে এসেছে শুনে পাশের বাড়ির অ্যান্টিরা তাদের বাচ্চা রা, পাড়ার বড় ভাই বোন এসেছিল তরুর বাড়িতে। জালাল নামক লোকটির মা-ই তরুকে দেখে পছন্দ করেছিল। নাহ; তেমন দেখা হয় নি। রাস্তায় কোন ক্রমে দেখা হয়ে যায়। সেই সূত্রে তিনি তরুর বাড়ির ঠিকানা জগার করেন। এই সময় মেয়ের বিয়ে দিতে ও রাজি ছিলেন না তন্ময় শিকদার ; তরুর বাবা। আর না তরু নিজে। তবে মেয়েকে শুধু দেখতে আসবেন এইটুকু বলে রাজি করিয়েছেন তন্ময় শিকদার কে। বাড়ির বড়রা কথা বলবেন, আলোচনা করবেন। তাছাড়া যাদের সিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে তাদেরও কথা বলা দরকার ভেবে পাশের রুমে জালাল এবং তরুকে পাঠানো হয়। কিন্তু জালাল গিয়ে না নাম জিজ্ঞেস করে আর না অন্য কিছু। শুরুতেই যে কথাটি বলে সেটি ছিল,
~ তুমি কি প্রস্টিটিউট?

তরু নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারে নি প্রথমে, সে প্রচণ্ড অবাক হয়েছিল।জেহেতু প্রথম বার তাকে কেউ দেখতে এসেছে। কারণ এর আগে তরু বিয়েতে রাজি ছিল না। তাই তার বাবা তন্ময় শিকদার কিংবা মা তুলি শিকদার তাকে জোর ও করেন নি। এটাই প্রথমবার তার ক্ষেত্রে। হঠাৎ করেই বাড়ি চলে আসে জালাল আর তার পরিবার। আর সেজন্যই মেয়েকে কোন মতে রাজি করিয়ে একটি শাড়ি পড়িয়ে সামনে বসিয়েছিলেন তুলি শিকদার। পরে তাদের ঘরে পাঠানোর পর যে সে এমন কিছু শুনবে, ভাবতেও পারে নি।

তবু প্রতিটা পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে রাখার অভ্যাস থাকায় শান্ত ভাবেই কিন্তু জোরে বলে ওঠে কথাটা। ওর জোরে কথা বলতে শুনে যেসব বড় ভাই আর বনেরা এসেছিল আর সমবয়সীরা ছিল তারা দরজা হালকা ফাঁকা করে বাকি ঘটনা দেখতে থাকে। পাড়ার ছেলেগুলো জালাল নামক লোকটিকে মারতেই আসছিল, কিন্তু তার আগে তরু তাদেরকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে। বাকিটা সবার জানা।

দরজার কাছে কিছু অ্যান্টিও দেখতে এসেছিলেন তরুকে। কিন্তু এসে ওদের কথা শুনে ফেললেন, এরপর শুরু করলেন তাদের কাজ। এক অ্যান্টি গিয়ে বললেন আরেক অ্যান্টিকে। এর থেকে ঘরে অবস্থান করা প্রতিটা মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল কথা গুলো। শুধু কথা গুলোই যে ছড়াল, টা নয়। সেই কথার সাথে আরও মশলা মিশিয়ে কিছু বানানো কথাও ছড়িয়ে পড়ল বাড়িতে। বাড়িতে আসা বৃদ্ধ দাদি নানি গুলো তো নিজেরদের মধ্যে আলোচনা করছিলেনই। তাদের সাথে যুক্ত ছিলেন সমাজসেবক অ্যান্টিরা; যারা কথার সাথে আরও কথা জুড়ে দিচ্ছেন। এভাবে পুরো রমরমা পরিবেশ তৈরি হল সম্পূর্ণ বাড়িতে।

কথাটা সত্য, বিয়ে বাড়ি র মতো পরিবেশে কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে কিংবা তারও আগে। তার ব্যতিক্রম হয় নি তরুর বাড়িতে। তবে তরুর বাবা মায়ের কান পর্যন্ত এই কথা পৌঁছানোর পর তাদের যেমনটা অনুভুত হওয়ার কথা ছিল, তেমনটা দেখা গেল না। এতে বাড়িতে থাকা বাকিরাও অবাক হলেন। তুলি শিকদার শান্ত ভাবে অন্যদের খাবার পানির ব্যবস্থা করছিলেন।

কানে ওই কথা পৌঁছানোর পরও তিনি রান্না ঘর থেকে বাটি ভোরে বিস্কুট – ফল নিয়ে এনে ড্রয়িং রুমের টি টেবিলে রাখলেন। তারপর গেলে শরবতের গ্লাস গুলো আনতে। তবে তন্ময় শিকদার শান্ত আছেন। বসে আছেন তবে তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি এখন কি মনে করছেন, বা তার অনুভূতি কি? তবে যারা তাদের তন্ময় কাকুকে চেনে তারা একবার তন্ময় শিকদারের কপালের দিকে তাকাচ্ছে তো এক বার হাতের দিকে তাকাচ্ছে। কারণ তিনি রেগে গেলে কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে শান্ত রাখতে পারেন, তবে তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে আর হাত মুঠ করা থাকে।

~ আপনার আর কিছু বলার আছে?
~ কেন?
~ কিছু না বলার থাকলে চলুন, যাওয়া যাক।

হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজে উৎসুক সকল জনতা সেদিকে তাকাল। সকলের দৃষ্টি তরুতেই আটকে আছে। এখন তাদের চিন্তা কি হতে পারে। তবে দৃষ্টি একদিকে থাকলেও তাদের মধ্যে ফিসফিস করে আলোচনা বিদ্যমান। ফলে সাড়া ঘরে গুনগুন করে আওয়াজ কানে ভেসে আসছে। তরু বের হয়েই চারদিকে তাকাল। পরিবেশ দেখার পরও শান্ত ভাবেই এগিয়ে গেল সোফার কাছে। সেখানে বাকিরা বসে আছে। তরুর পিছনে পিছনে বেরিয়ে এলো জালাল। সোফার কাছে দুজনে পৌঁছতেই তরু জালালকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
~ বসে পড়ুন।

এমন শান্ত আচরণে জালাল সহ বাকিরাও একটু ভড়কে গেলেও শান্ত ছিল তন্ময় শিকদার ও তুলি শিকদার। জালাল দাঁড়িয়েই রইল।
~ কি হল বসুন। এই নিন মিষ্টি খান।
বলেই তরু মিষ্টির বাটিটা উঁচু করে ধরে জালালের দিকে এগিয়ে দিল। জালাল ও বসা থেকেই একটা মিষ্টি নিয়ে খেতে শুরু করল।
এদিকে এমন ব্যবহার দেখে অন্যরাও ভাবল মনে হয় রাজি হয়ে গিয়েছে তরু।

~ ঝুম্পা, আমার ঘর থেকে টুলটা নিয়ে আয় তো।
তরুর বলা দেরি কিন্তু মুহূর্তেই ঝুম্পা টুল নিয়ে আমার কাছে রাখল। তরুও সেটা সামনের সোফা বরাবর রেখে তাতে বসে পড়ল। সামনের সোফায় জালাল আর তার বাবা মা বসে আছে। আর চারদিকে ওদের আত্মীয়। এবার তরু বলতে আরম্ভ করল,
~ অ্যান্টি, আপনাকে কিছু বলার আছে আমার। আপনি অনুমতি দিলে আমি শুরু করতে পারি, তবে আমার কথার মাঝে কেউ কথা বলবেন না।
জালালের মা ভ্রূ কুঁচকে বললেন,
~ হ্যাঁ বলো।

~ আজ আমার একটা পরীক্ষা ছিল ভার্সিটিতে। আপনি যদি এতক্ষণ বাবা মায়ের সাথে কথা বলে থাকেন তাহলে অবশ্যই জেনে গিয়েছেন যে আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আর আজ আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল যেটা না দিলে ফেইল পর্যন্ত করতে পারতাম। তার উপর দেরি হয়ে গিয়েছিল কিছু সমস্যার কারণে। আপনারা আসার সময় হয়তো দেখে থাকবেন যে এখানে বাড়ির সামনে খুব একটা রিকশা বা সিএনজি পাওয়া যায় না। ভার্সিটিতে যেতে হলে এখান থেকে ১৫ মিনিট হেঁটেই তবে বাস ধরা যায়। তাই আমি বাধ্য হয়েই আমার ভাই তূর্য শিকদার এর বাইকে বসে সেখানে যাই। এটা দেখে আপনার ছেলে আমাকে প্রস্টিটিউট বা সহজ বাংলায় যাকে আপনারা ‘পতিতা’ বলে থাকেন তার সাথে তুলনা করেছে। নিজের ভাইয়ের সাথে গেলে কি আপনিও আপনার মেয়েকে প্রস্টিটিউট বলে ডাকবেন?

এই পর্যন্ত বলে থামল তরু। আশেপাশে চোখ বুলালো সে। যারা এতক্ষণ আলোচনা করছিলেন তারা মুখ কালো করে বসে আছেন। তরু এবার পায়ের উপর পা তুলে বসে মাথা ডানে বামে নড়িয়ে নিল যেন এতক্ষণ তার ঘাড় অবশ হয়ে এসেছিল। সামনে জালাল বসে ছিল। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তরু হাত তুলে বলল,
~ কেউ কোন কথা বলবেন না। আমি অ্যান্টির কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই কথা বলছি আর আমার কথা এখনো শেষ হয় নি।

তারপর তরু বাবার দিকে তাকাল। উনি ইশারা করে বললেন বাকি কথা বলতে। তরু আবার শুরু করল,
~ আর আজ দুপুরের ঘটনা। আপনারা মনে হয় ঢাকা শহরের পুরনো বাসিন্দা। তাহলে এটুকু তো জানারই কথা যে দুপুরে সকল প্রতিষ্ঠানে ব্রেক দেওয়ায় এই সময় সকল কর্মচারী ছুটে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বেশিরভাগের যানবাহন হয় বাস। কিংবা রিকশা পাওয়াও তখন দুষ্কর হয়ে ওঠে। একে তো বাসে থাকে ভিড়। মনে হয় মানুষ পড়ে যাবে। এক কথায় ঝুলে ঝুলে যাওয়া আসা করে তখন। তাই মেয়েদের কে সেই বাসে উঠতে দেওয়া হয় না। তাছাড়া যতগুলো বাস তখন যায়, সবগুলোরই এক দৃশ্য। তাই অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরই বাসে ওঠা যায়। এজন্যই বাসের অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় মা ফোন করে বলল দ্রুত বাসায় পৌঁছতে। তারপর ফোন কেটে দিল। আর কিছু বলে নি।

আমি চিন্তায় ছিলাম কোন সমস্যা হয়েছে কিনা। তাই দ্রুত আসতে এক বড় ভাইয়ের সাহায্য নিয়েছিলাম। তার গাড়িতে করে পৌঁছে দেয় আমাকে। এটাও আপনার ছেলে দেখে এবং আর কিছু বিচার বিবেচনা না করে প্রস্টিটিউট এর উপাধি দিয়ে দেন। এটা যদি আপনার মেয়ের সাথে হত, তাহলে আপনি কি করতেন অ্যান্টি?

এটুকু বলে আবার তরু আশেপাশে তাকাল। এবার যাদের মুখ কালো হয়েছিল তাদের মাথা একেবারে নিচু হয়ে গেল। বাবার কপালের ভাঁজ সেই কখনই চলে গিয়েছিল। তবু মুখ গম্ভীর করে রেখেছেন এখনো। তুলি শিকদারের হাসি তো একেবারে আকাশে পৌঁছে গিয়েছে যেন।
বাকি ভাই বোনেরা পারলে এখনই সিটি বাজিয়ে তালি বাজাত, কিন্তু গম্ভীর আলোচনা চলছে বলে সবাই বসে আছে। তবে যারা নিজেদের আটকে রাক্তে পারে নি তারা লুকিয়ে তরুর রুমে গিয়ে একদফা নেচে এসেছে। এজন্য তরুর রুমে লাইন পড়ে গিয়েছে ওদের।
ঝুম্পা তো সাদিয়াকে টেনে নিয়ে গিয়েছে নাচার জন্য।

কয়েকজন ঢুকছে, তারা বের হলে আরও কয়েকজন ঢুকছে। তূর্যর ঘরের দরজাও একই অবস্থা। এই দৃশ্য দেখে সবার আড়ালে একবার ফিক করে হেসে উঠল তরু।
~ আসা করি আমি বুঝাতে পেরেছি যে আমি আপনাদের ছেলেকে উদ্দেশ্য করে কি বলতে চেয়েছি। সাধারণত বিয়ের বাড়িতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হলে আপনারা মেয়েদেরই প্রথমত দোষারোপ করেন কোন কিছু বিচার বিবেচনা না করেই। এতে আরও মশলা লাগিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে আরও অন্য কথা বলেন কতজন মানুষ। কিন্তু আপনারা ছেলের দিক দেখেন না। কিছুক্ষণ আগেই তো শোনা যাচ্ছিল গুঞ্জন। এখন আবার থেমেছে। কিন্তু আপনাদের মেয়েকে যদি এই মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হত তাহলে কি করতেন আপনারা? আমি আর কিছু বলছি না। অ্যান্টি আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। এবার আপনারা কথা বলুন।
বলে একেবারে স্ট্যাচু মোডে চলে গেল তরু।

~ আপনারা কি তাহলে রাজি? আমি কি দিন দেখব বিয়ের জন্য?
হঠাৎ এমন আওয়াজ পেয়ে সবাই দরজার দিকে তাকাল কে এই কথাটি বলেছে সেটি দেখার জন্য।


পর্ব ০২

আমেরিকার রাজধানী নিউ ইয়র্ক। এটি উত্তর-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বন্দর শহর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ও সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী মহানগরী এটি। নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে বাস করে অর্ণব চৌধুরী। সে পেশায় একজন ডাক্তার। ৬ বছর আগেই বাংলাদেশ থেকে সেখানে চলে গিয়েছে। এই ৬ বছরের বেশিরভাগ যাত্রার ক্ষেত্রেই হাসপাতাল থেকে হোটেল, আবার হোটেল থেকে হাসপাতাল এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ যেন তার ক্ষেত্রে। সময়টা রাত। অর্ণব হাসপাতাল থেকে তার হোটেলে ফিরেছে। ফ্রেশ হয়ে হালকা খেয়ে সে জানালার পাশে দাঁড়াল। জানালা বলতে গেলে বলা যায়, এখানে ছাদ থেকে ফ্লোর পর্যন্ত কাঁচ দিয়ে ঘেরা সেদিকটা। তার সামনে দাঁড়িয়েছে। রাতের নিউ ইয়র্ক দেখতে আরও সুন্দর। কিন্তু সে এই দৃশ্য উপভোগ করছে না। শুধু অর্থহীন ভাবে তাকিয়ে আছে। যেন সে সুধুই দেখছে, কিন্তু দেখা কোন কিছুই মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌছায় নি আর না পৌঁছাতে পারছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সেভাবে।

পাশেই ছিল ছোট একটি বুকশেলফ যার উপরের তাকের ডান কোণ টি সিগারেটের জন্যই বরাদ্দ। সেখান থেকে সিগারেট নিয়ে নিল হাতে, একটা নয়, পুরো এক প্যাকেট। অবশ্য এতে বুকশেলফের কোণ হতে যে কিছু পরিমাণ জায়গা ফাঁকা হয়েছে টা বোঝার উপায় নেই, তার উপর পুরো ঘর অন্ধকার। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। সে ডাক্তার বলে নেশা জাতীয় জিনিসের দিকে যায় নি। তবে সিগারেট তার সঙ্গী। সে এটাকে ছাড়তে পারবে না। ৬ বছর ধরেই ওর পাশে আছে। তবে ধূমপান করে মানে এই না প্রচুর সিগারেট শেষ করে একদিনে। সে নিজের সিমার মধ্যে সামান্যই ধূমপান করে।
সিগারেটে আগুন জ্বালাতে যাবে তার আগের ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল, চোখে মুখ বিরক্তি নিয়েই ফোনটা তুলল অর্ণব।

~ গুড আফটারনুন ডক্টর অর্ণব।
~ গুড আফটারনুন।
~ আপনার যাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।
~ ধন্যবাদ।
~ আপনি কি সত্যিই বাংলাদেশে ফিরে যাবেন?
~ আমি সেখানে ফিরে যাচ্ছি কারণ আমার আত্মীয় অসুস্থ। তার চিকিৎসা করেই আবার এখানে ফিরব। শুধু কিছুদিনের ছুটিই নিয়েছি। আসা করি সবাইকে বুঝিয়ে দিবেন। আমার যেন আর কিছু না বলা লাগে। বুঝতে পেরেছেন? (দাঁতে দাঁত চেপে)
~ জজ্বি ডক্টর অর্ণব।
~ থ্যাঙ্কস এগেইন।
বলেই ফোনটা রেখে দিল অর্ণব। সে কোনোদিনই বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায় নি। তবে মায়ের বোন অসুস্থ হওয়ায় অনেক জোর করে তাকে রাজি করিয়েছেন অর্ণবের মা। তাই বেশ কয়েকদিনের ছুটি নিয়েই সে বাংলাদেশ ফিরে যাবে। কিন্তু সে কি তার তরুলতার মুখোমুখি হবে- জানা নেই তার। হয়তো হবে না। ওদের বাড়ি তরুলতার বাড়ি থেকে ভিন্ন জায়গায়। সেখানে ওকে পাওয়া সম্ভব নয়। আর যদি বিয়ে করে থাকে তাহলে
আর ভাবতে চাইছে না অর্ণব। তাই দেরি না করে ডান হাতে থাকা সিগারেটে আগুন ধরাল। সেটার ধোঁয়া যেন তার সব কিছু শেষ করে দেয় এই আশায়।

~ আচ্ছা তুমি কি আমাকে ভুলে যাবে?
~ কক্ষনো না।
~ ধর একদিন তুমি আমাকে ভুলে গেলে
~ আমি আপনাকে ভুলতেই পারব না, প্রশ্নই ওঠে না। তরুলতা আপনি এমন কথা কেন বলছেন?
~ হতেও তো পারে, একদিন সত্যিই আমাকে ভুলে গেলে তুমি।
~ সেটা কখনই হবে না, দেখে নিয়েন আপনি তরুলতা।

~ দেখলেন তো তরুলতা, আমি আজও আপনাকে ভুলতে পারি নি। আমি বলেছিলাম তো, কিন্তু দসেদিন তো আপনি বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু আমি ঠিকই আপনাকে মনে রেখেছি। আজ ৬ বছরে চেয়েও ভুলতে পারি নি। সিগারেটের সাহায্য নিলাম, কিন্তু সেও তো ব্যর্থ। আনার কাছে হেরে যাচ্ছে প্রতিবার। প্রতিরাতে এই তো একমাত্র সঙ্গী আমার। কেন করলেন তেমন তখন। না করলেও পারতেন। আমি তো আপনাকে ভুলতে পারছি না। তবে আপনার প্রতি আমার অনুভূতি বেড়েই চলেছে। আপনি কি বুঝতে পারছেন না। ওহ আপনি বুঝবেন কি করে? আপনি তো
বলেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিল অর্ণব। এর থেকে বেশি আর মনে করতে চায় না সে। কিন্তু বেহায়া মন শুধু তার তরু লতার কথাই ভাবে। না চাইলেও ভাবে, বারবার ভাবে। তাই সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজের কষ্ট গুলোকে শেষ করতে উদ্যত হয়েছিল ৬ বছর আগেই। কিন্তু পারল কোথায়? কষ্ট গুলো তো দিন দিন বেড়েই চলেছে।

[তিলোত্তমা শিকদার তরু। তন্ময় শিকদার ও তলি শিকদারের মেয়ে। তরুরা দুই ভাই বোন। ভাই বড়, সে ছোট। ভাইয়ের নাম তূর্য শিকদার তৃণ।]
গতকাল বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর আজ মনমরা হয়ে ভার্সিটিতে বসে আছে। তরু। চোখে মুখে হাসি নেই। যে মেয়েটা মায়ের মতো হাসি মুখে কথা বলে সবসময় তার মুখেই আজ হাসি নেই। বাইরে থেকে যতই শক্ত হোক না সে, কিন্তু ওই বাজে কথাগুলো তো সত্যিই তার খারাপ লেগেছে। যতই কঠোর হোক, দিন শেষে কোন ভুল না করেই যে অপরাধীর তকমা লেগে যাবে সেটা তো সে মেনে নিতে পারছে না। তার উপর যতই মুখ চালাক না কেন, অন্যদের মুখ বন্ধ রাখা তো যাবে না। তারা কথায় কথায় এই কথা টেনে আনবে। প্রতি মুহূর্তে তাড়া করবে। বাবা মা যতই শক্ত হোক, তাদের মেয়েকে যে এইরকম কথাও শুনতে হবে জীবনে ভাবতেও পারে নি।

সত্য কথা বলতে কিছু কিছু মানুষ এতো নিচ স্বভাবের আর চিন্তাধারার যে তাড়া সকল কাজকেই নিচ চোখে দেখে। হয়তো ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকে, কিন্তু তাদের চিন্তা ধারা সেই পর্যায়েই থাকে। কিছু মানুষ তো কোন কারণ ছাড়াই সেই চিন্তা ভাবনাকে অনেক বাজে ভাবে সম্বোধন করে। হয়তো সবার চোখে পড়ে না এমন মানুষ। তবে এমন মানুষ আছে, দেখা যাবে আমাদের সমাজেই আছে। কিন্তু আমরা হয়তো দেখি নি। যারা দেখেছে তাদের, যারা ওই খারাপ ব্যবহারের শিকার হয়েছে, তারাই জানে কেমন লাগে কোন অপরাধ ছাড়াই এমন ব্যবহার পেতে।

এসব নানান চিন্তা ভাবনায় ডুবে আছে তরু। ভার্সিটিতে বসে তার এমন ব্বুবহার মানতে পারছে না প্রাপ্তি। তার বান্ধবী মনমরা হয়ে বসে থাকবে, এটা কিছুতেই হতে পারে না। তবে সে যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, সেটার পর কোন মেয়েই স্বাভাবিক হতে পারে না। কতজন তো যোগ্য জবাব ও দেয় না। আর অপমান মুখ বুজে সহ্য করে। এক সময় সহ্য সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সে দিক থেকে তরু ভিন্ন। সে এমন ঘত্নার পরবর্তী দিন ভার্সিটিতে এসেছে এর শান্ত ভাবেই কথা বলছে। তবে তার মুখে আগের ন্যায় উজ্জ্বলতা টা নেই।
এটা কিছিতেই মানতে পারছে না প্রাপ্তি। সেই কখন থেকেই তরু কে সাহস জুগাতে তার কানে শান্তি বার্তা চালান করে চলেছে সে। কিন্তু সেই কথাগুলো যে তরুর কানে বেল বাজিয়ে দরজা লক পেয়ে ফিরে চলে যাচ্ছে, মস্তিষ্ক পর্যন্তও যাচ্ছে না সেটা প্রাপ্তি খেয়াল করে নি। পরে অনেক কথা বলেও তরুকে ভাবলেশহীন ভাবে দেখে একটু জোরেই বলে ওঠে,
~ তরুলতা।

কিন্তু বলার পর বুঝতে পারে যে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে সে এমন কিছু বলে ফেলেছে যেটা বলা উচিত হয় নি তার। তরু সবাইকেই এই নামে ডাকতে মানা করেছে। এই কথা মাথায় আসতেই সে নিজের দাঁত দিয়ে জিহ্বা চেপে ধরে। একটু জোরেই ধরার দরুন ‘আহ্‌’ বলেই ক্ষান্ত হয় সে।
তারপর আমতাআমতা করে বলে,
~ ইয়ে মানে বলছিলাম কি তরুলতা পাতা ডাল শিকড়, না না, পুরো গাছটাই আমাদের পরিবেশের জন্য কত উপকারী তাই না, বল।
তরু প্রাপ্তির এমন কাজে ফিক করে হেসে উঠল। সত্যিই, এই মেয়েটাই পারে তরু কে সবসময় হাসাতে।
প্রাপ্তির মুখে তরু এক চিন্তার ছাপ দেখতে পেল। বুঝল কার জন্য এই চিন্তা। তাই বেশি কিছু করল না, শুধু একটু ক্যাবলাকান্তের মতো হাসল। এতেই কাজ হল।
প্রাপ্তি তরুকে এভাবে হাসতে দেখে বুঝল সে স্বাভাবিক আছে,
~ তার মানে তুই বিয়ে ভেঙেছিস? এবার বল কিভাবে ভাঙলি? এ টু জেড সব ব্যাখ্যা স্বরুপ বলবি আমাকে। যদি তখন গাছের একটা পাতাও নড়ে থাকে তো সেটা কিভাবে নড়েছে সেটা ব্যাখ্যা করে বলবি। নে শুরু কর।

তরু প্রাপ্তিকে এক এক করে সব বলল, ওই লোকের আসার আগ পর্যন্ত। বলে এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। একবারে বলতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে সে।
তরু বার জিজ্ঞেস করল,
~ এই নিউ ক্যারেক্টার আবার কে?

তরু আবার শুরু করল-

ফ্ল্যাশব্যাকঃ-
~ আপনারা কি তাহলে রাজি? আমি কি দিন দেখব বিয়ের জন্য?
হঠাৎ এমন আওয়াজ পেয়ে সবাই দরজার দিকে তাকাল কে এই কথাটি বলেছে সেটি দেখার জন্য।
দেখল এক লোক নতুন পাঞ্জাবী আর লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে অনেক বড় একটা কালো ছাতা। বাইরে বৃষ্টি বা রোদের রেশ মাত্রও নেই। তবে হাতে ছাতা আবিষ্কার করেই ত্রু মুলত ভ্রূ কোঁচকাল। সবাইকে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রথমে হয়তো লোকটি নিজেকে এলিয়েনের আসনেই বসিয়েছিল। পরে যখন মনে পড়ল যে সে এলিয়েন না, বরং মানুষ, তখন হালকা আওয়াজ করে কেশেই নিজের পরিচয় দিলেন। তার কথা থেকে বোঝা গেল যে তিনি জালালের পরিবারের পারিবারিক ঘটক, সংক্ষেপে এভাবেই বলা যায়। তিনি ওই বাড়ির প্রতিটা বিয়ের তারিখ ঠিক করে থাকেন। আজ তার একটু দেরি হয়ে গেল নতুন লুঙ্গিতে যে স্টিকার লাগানো থাকে সেটা উঠাতে গিয়ে।

কিন্তু লোকটি বলতে বলতে যে ভিতরের কথা বাইরে বলে ফেলেছে বুঝতেই পারে নি। এদিকে সবাই মুখ চেপে হাসছে।

ঝুম্পা আর রুম্পা দুজনেই একদফা নেচে তরুর ঘর থেকে বের হয়েছিল। দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ চোখে আলো এসে পড়ায় সেদিকে নজর ঘোরায় তারা। তাদের চোখে প্রথমেই পড়ে ঘটকের চকচকে লুঙ্গি টা। দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়।
এর মানে হল আমি যা ভাবছি তুইও কি সেটাই ভাবছিস।
আরেকজনের হাসির মানে হল হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি।
ক্লাস ফাইভে পড়া একটি প্রবাদ,
”All that glitters are not gold”
যার বাংলা মানে চকচক করিলেই সোনা নাহি হয়।
এই কথা তাই মনে পড়ে দুজনের, ওই চকচকে লুঙ্গি দেখে।

এমন সময় তাদের মা ডাক দেয় পড়তে বসার জন্য। সেই কোণ দুপুরে তরুর বাড়ি এসেছিল পড়া আকাশে তুলে। সেই আকাস থেকে ভূপৃষ্ঠে আনার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অ্যান্টির ডাকে দুজনেই দৌড় দেয় দরজার দিকে এই বলতে বলতে যে,
~ চকচক করিলেই সোনা নাহি হয়, সেটা নতুন লুঙ্গিও হতে পারে।
দুজনের কথা শুনে যারা এতক্ষণ মুখ চেপে হাসছিল, সব বড় ভাইয়েরা, আপুরা আর বাচ্চারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কিন্তু বড়রা তখনও মুখ চেপেই হাসছেন আর আগে এক হাত মুখের সামনে ধরেছিল, এবার দুহাত দিয়ে হাসি ঢাকার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছেন।

কিন্তু ঝুম্পা যে টর্নেডোর গতিতে ছুট লাগিয়ে অঘটন গতিয়ে বসবে, সেটা সে নিজেও জানত না।

ঝুম্পার হাতে বেঁধে গিয়ে ঘটকের নতুন লুঙ্গি টা খুলে পড়ল আর বাকিটা ইতিহাস।

এই ইতিহাসে কিছু অংশ –
বাড়িতে যেই নানি – দাদিরা ছিলেন, তাড়া চোখে হাত দিয়েই বলে উঠলেন,
~ এসব কি হচ্ছে? ঠিক কর, লজ্জা নেই নাকি।
ঘটক বোঝার সাথে সাথেই লুঙ্গি তুলে দৌড়। কিন্তু যে এই অঘটন ঘটাল সে মানে ঝুম্পা জানেই না এ সে কি করেছে। সে তখন তার বোনকে নিয়ে বই নিয়ে বসেছে।

আর বেশিক্ষণ তারা তরুদের বাড়িতে থামে নি। একে তো ছেলে লাগামহিন কথা বার্তায় নিজেদের সম্মান যা গিয়েছিল, এবার ঘটকের চক্করে সেটা পুরোই মাটিতে মিশে গেল। তাই আর থামা থামি না করে ছেলের হাত ধরেই যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে গেলেন। তার পিছনে বাকিরা চলে গেলেন। জালালের মা এই ভেবে শান্তির নিঃশ্বাস ছারলেন যে, তাদের বাড়ি অন্য পাড়ায়, এই পাড়ায় না। নাহলে রোজ যা যা হত, তাতেই বাড়ি বদলাতে হত তাদের।

অন্যদিকে এতো বড় ভুল করেও ক্ষমা না চেয়েই ফিরে গেল- এতে ক্ষুব্ধ হল বাকি জনতা। তবে সবাই নিজ নিজ বাড়ি চলে গেল। সবাই চলে যেতেই তন্ময় শিকদার নিজের ঘরে গিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিলেন। তারপর মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে একটু জোরেই হেসে ফেললেন। বাইরে দিয়ে যতই শক্ত দেখান না কেন, উনি অনেক ভালো এবং নরম মনের মানুষ।
তন্ময় শিকদার কে ঘরের দিকে যেতে দেখেই তুলি শিকদার আর তরু বুঝে যায় যে কি হতে চলেছে, তাই তন্ময় শিকদারের হাসি দেখা মুহূর্ত হাতছাড়া করতে চায় না কেউ ই। তাই তার পিছু পিছু নিঃশব্দে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা হালকা সরিয়ে দেয় তরু। সে নিচে মাথা রাখে, তার উপর মাথা রাখে তুলি শিকদার। তূর্য ও সেই সময় ঘরে ঢুকছিল। মা আর বোন কে নিঃশব্দে বাবার ঘরের দিকে যেতে দেখে সেও তাদের পিছনে যায়। আর এক পর্যায়ে মায়ের মাথার উপর নিজের মাথা রাখে। দেখতে রেল লাইনের মতো হয়ে যায়। তরুর উপর মা তার উপর তূর্য, সবার মাথা একত্রে। তন্ময় শিকদার কে হাসতে দেখে সবার মুখ হাসি চলে আসে। তুলি শিকদারের মুখের হাসি অনেকখানি প্রশস্ত হয়।

রাতে তূর্য কে সব বলার পর সে একটা ক্যাবলাকান্তের মতো একটা হাসি দেয় ৩২ টা দাঁত বের করে। যার অর্থ যে সে কাল সূর্যের আলো সহ বাকি সব ঘোলা দেখবে। আর কিভাবে দেখবে সেটা তূর্য ভাই আর ভাইয়ের গ্যাং ই ভালো জানেন।
~ ভাই, হাসিস আর যাই করিস, একেবারে ফিনিস করে দিস না ওটাকে, আমি এখনো একটাও থাপ্পড় মারতে পারি নি, আমারও তো সুযোগ পাওয়া উচিত। একবার এই ছোট বোনটার কথা ভাবিস।

তূর্য আর ওর বাকি বন্ধু বান্ধব সবাই তরুকে অনেক ভালোবাসে। বলতে গেলে বলা যায়, ওরা তরুর ভাই বোন সবাই। তাই তরুর কিছু হলে বনের অনেক যত্ন করে। তার উপর তরু মেয়ে কম, ছেলে বেশি স্বভাবের।

অনেক সময় রাস্তায় তন্ময় শিকদারকে দেখে অন্যরা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে,
~ আপনার দুই ছেলে কেমন আছে? তূর্য আর তরু?
তন্ময় শিকদার ও শান্ত ভাবেই জবাব দেন,
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
তম্নয় শিকদারের মুখ দেখে বোঝা যায় না যে তিরি রেগে আছেন না শান্ত। তবে মনে মনে তিনি খুবই গর্বিত হন। তার মেয়ে শুধুমাত্র মেয়ে বলেই পিছিয়ে পড়ে নি।

আর বাকি থাকল তূর্যর বন্ধুরা। তারা তরুকে সেকেন্ড বস বলেই চিনে আর ওকে মান্য করে। প্রথম বস তূর্য। জালালের বেহাল দসা করতে ওদের এক জনই যথেষ্ট, তবে সবাই ওকে মারতে চেয়েও পারেনি কারণ তরু মানা করেছিল। তাই হজম করে নিয়েছে তখন। আর পরে তূর্যর অনুমতি যে পেয়েই যাবে সেটা তারা ভালো করেই জানে, আর না পেলেও রাজি করিয়ে নিত। তাই ভাইয়ের হাসি দেখেই তরু বুঝেছে
-তু তো গায়া বেটা।
এমন অবস্থা করার কথাই বলেছে তূর্য ওর হাসির মাধ্যমে। আর ভাই কি পর্যায়ে যেতে পারে সেই ভয়েই তরু প্রতিবার এই কথা বলে যে ”পুরোপুরি মারিস না, আমার জন্য রাখিস।”

এতক্ষণ বলে আবার থামল তরু। প্রাপ্তি তো যেন গল্পের মধ্যে ডুবে গিয়েছে আর কপনা করছে কি কি হয়েছিল। হঠাৎ থামায় তার কল্পনায় ব্যাঘাত ঘটে। তাই বিরক্তিতে ফোঁসফোঁস করতে থাকে আর বলে,
~ তারপর?
সবা ঘটনা বলার পরও যখন কেউ বলে ওঠে যে তারপর তখন কি অবস্থা হতে পারে্‌ সেটা কল্পনাতীত। তরুর ও সেই অবস্থা। নিজের রাগ কে নিয়ন্ত্রণ করতে পাড়ায় সেই সমস্যা হয় না তার। তাই শান্ত ভাবেই জবাব দিল মুখে কোন অনুভুতির ছাপ না রেখেই,
~ তোর ছাতা আর আমার মাথা, ছাতার মাথা।


পর্ব ০৩

বিকেলের শেষের দিক। সূর্য পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। আজ তরুর এক অজানা অনুভূতি মনে হানা দিয়েছে যখন সে অনুকে পড়াচ্ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি ২ টা টিউশনি করায় সে। তবে সপ্তাহে ৩ দিন করে। তাই শনি, সোম আর বুধ একজনকে পড়ায় আর বাকি ৩ দিন আরেকজনকে। আর শুক্রবার ছুটিতে থাকে। এর থেকে বেশি পড়ানোর জন্য অনুমতি তন্ময় শিকদার তাকে দেননি। মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছেন আর সীমানাও ঠিক করে দিয়েছেন। তরুও জানে যে তার বাবা ভুল কিছু করবেন না। তাই আর জোর করে নি এতেই রাজি হয়ে গিয়েছিল।

আজ হঠাৎ পড়তে পড়তে অনু বলে ওঠে,
~ জানেন ম্যাম, আজ আমার ভাই দেশে ফিরবে। অনেক বছর পর। তাই আম্মু খুব খুশি। অবশ্য অনেক কষ্টে রাজি করানো হয়েছে। কিন্তু এতো বছর পর ভাইয়া ফিরে আসবে শুনেই আমার অনেক ভালো লাগছে।

এছাড়াও অনেক কিছু বলছিল অনু। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই তরুর। সে তো ওর ভাই এর আসার কথা শুনেই নিজেই কারো কথা মনে পড়ল। কিছু মুহূর্তের জন্য ভাবল,
~ ও কি ফিরে আসবে আমার কাছে?
পরে আবার ভাবল,
~ কি করে আসবে? আমিই তো
আর কিছু ভাবতে চাইল না। বলতে গেলে বলা যায় ও নিজের ভাবনাকে থামাল কিছুক্ষণের জন্য। কারণ প্রতিটা মুহূর্ত যে তার কথা ভেবেই কাটে। বুকে চিনচিনে ব্যাথা অনুভুত হল তরুর।

থামাতে চাইল নিজের ভাবনাকে, কিন্তু পারল কোথায়? মনটা বড্ড বেহায়া। আবার ভেবে চলল তার কথা। এদিকে অনু ওর ভাইয়ের কথা সেই কখন থেকে বলে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই তরুর। আজ পুরোটা সময় উদাসীন ভাবেই বসে ছিল তরু। কেন জানি মনে হচ্ছে সে আসবে। কিন্তু আবার নিজেকেই সামলাচ্ছে এই ভেবে যে সে আসলেই বা কি হবে? কিছুই হবে না। কিছু হওয়ারও নেই। পাশ কাটিয়ে চলে যাবে শুধু। তবেই এই ‘সে’ এর কথা যে তরুকে বড্ড পোড়ায়। কিন্তু নিজে পুড়লেও মানতে নারাজ তরু নিজেই।

হঠাৎ অনুর মা লাবণ্য চৌধুরীকে দেখে তরু হালকা চমকে ওঠে। এতদিন লাবণ্য চৌধুরীকে দেখেছে তরু। কিন্তু কোনোদিন হাসি মুখে দেখে নি সে। আজ যেন সেই লাবণ্য চৌধুরীর হাসি মুখ দেখে অনেক বড় কিছু দেখতে পেয়েছে বলে মনে করল তরু। তার এই চেহারাকে তরুর কাছে এখন সদ্য ফোঁটা ফুলের ন্যায় লাগছে। যেটা হালকা বাতাসে দুলছে আর হাসছে। হাসিমুখে সব কাজ করে যাচ্ছে। আজ প্রথমবার তরুর হাতে চা ধরিয়ে হেসে বললেন,
~ নেও মা, খেয়ে নিও।

আগে কথা বলেননি এমন না। তবে হাসিমুখে কথা বলেন নি। সবসময় এড়িয়েই চলতেন, খুব জরুরি না হলে ১ টা লাইনও বেশি বলতেন না। আর যা বলতে কড়া ভাবেই বলতেন। যেন তার থেকে রাগী মানুষ দুনিয়াতে নেই। তরুকে সবাই ভয় পেলেও তরু যেই কিছু মানুষকে ভয় পায়, তাদের তালিকায় ইনি টপ ফাইভে আছেন। তাই আজ হাসিমুখ দেখে বেশ অবাক হয়েছে তরু। কিন্তু যখন হেসে হেসে লাবণ্য চৌধুরী কথা বলছিলেন সবার সাথে, কাজে সাহায্য করছিলেন, কাউকে কড়া কথা শোনাচ্ছিলেন না ; তখন তরুর মনে হল সে এই লাবণ্য চৌধুরীর উপর ক্রাশ খেলেও খেতে পারে। তার খুশির কারণ বের করতে অনুর দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই অনু ছোট্ট করে জবাব দিল,
~ ভাইয়া।
বলেই মুচকি হাসল অনু। অনুকে হাসতে দেখে তরু নিজেও হালকা হাসল। বলা তো যায় না কখন সুইট অ্যান্টি হতে আবার রাগী লাবণ্য ম্যামে রূপান্তরিত হয়ে যান- পড়ার সময় না পড়িয়ে গল্প করার জন্য।

পড়ন্ত এক বিকেলে সেও এসেছিল তরুর জীবনে। সেই পড়ন্ত আরেক বিকেলে তাকে কাছে পেয়েছিল। আর ভাগ্যের উপহাসে সেই পড়ন্ত এক বিকেলেই তরু তার ‘সে’ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল। বহু দূরে।

ভাবতে ভাবতে সামনে দেখল এক রিকশাওয়ালা পড়ে আছেন। রিকশাও বাঁকা হয়ে পড়ে আছে। এই সময়টায় আশেপাশে কেউ নেই যে তুলবে। কি করেই বা তুলবে, যেই রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে সেখানে অন্ধকার হওয়ার পর তো তেমন মানুষ আসেই না। পুরো অন্ধকার হয়ে আসে। তরু ভাবতে ভাবতে যে কখন অন্য রাস্তায় চলে এসেছে বুঝে উঠতেই পারে নি। আশেপাশে তাকাল কিন্তু ফলাফল শূন্য। কেউ নেই। সাহায্য নিতে পারবে না। রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বুঝল বেশিক্ষণ হয়নি এক্সিডেন্টের। তাই উঠার সুযোগ পায় নি, আর না আছে সেজন্য প্রয়োজনীয় শক্তি। তাই ওভাবেই শুয়ে আছেন। কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। পরনের শার্ট টাও রক্তে ভিজে গিয়েছে। তরু দেরি না করে সেখানে গেল। প্রথমে রিকশা সোজা করল। রিকশাটা হেলে থাকায় বেশি কষ্ট করতে হল না। রিকশা সোজা করে রিক্সাশাওয়ালাকে উঠিয়ে রিকশার সিটে বসাল। তারপর নিয়েই চালিয়ে হাসপাতালে গেল। শখের বসে রিকশা চালানো এভাবে কাজে দিবে ভাবতেই সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালো।

মানবতা সত্যি কোথায় পৌঁছে গিয়েছে। কিছু মানুষ নিজে কারো এক্সিডেন্টের কারণ হয়ে তাকে ওই অবস্থায় ফেলে যেতে পারে। হাসপাতাল বেশি দূরে না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কেসের ভয়ে বা নিজের ন্য কাজের জন্য তার চিকিৎসার কথাও ভাবে না। জিজ্ঞেস করলে হয়তো উত্তরটা এমন
-সময় নেই, অথবা। আমার কাজ আছে।
নিজের কাজের থেকে কি একজন মানুষের জীবন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। উত্তরটা কারোর ঠিক মতো জানা নেই। কারণ যেই মানুষটি এই কাজ করল সেও কোন না কোন সময় অনুশোচনায় ভোগে। মানবতার চেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে সময় আর পরিস্থিতির উপর। তবে কখন যে পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানুষ এমন করে, আর কখন অবহেলা করে করে সেটাও জানা নেই সবার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল হাসপাতালে। বেশি দূর ছিল না সেখান থেকে। তাই দ্রুত সেখানে গিয়ে যাবতীয় সব দেখে নিয়েই একেবারে সেখানে একটি চেয়ার এ হেলিয়ে দিল নিজেকে। রিকশা চালানো কম কঠিন কাজ না। প্রচুর শক্তির ব্যাপার। তাই হাসপাতালে পৌঁছে তারপর ডাক্তারের ব্যাবস্থা করা। কি কি লাগবে না লাগবে সব দেখা। এসব করতে গিয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই ক্লান্তিরা এসে পুরো শরীর দখল করে নিল তরুর। মনে হল এখানেই একটা বেডে গিয়ে নিজের ক্লান্ত শরীরকে হেলিয়ে দিতে। কিন্তু নিজের মনকে একপাশে রেখে বিবেক দিয়ে ভাবল যে কাজটা আদৌ ঠিক হবে কি না। কিছু হোক বা না হোক, নিজের সম্মানের ১২ টা পর্যন্ত বাজতে পারে ভাবতেই ক্লান্তি পালাতে চাইল। তখন আবার মন কোথা থেকে এসে বলল -‘ না রে, একবার ওই খাটে নিজেকে হেলিয়ে দিলে কিছু হবে না বাছাধন। আরামই শ্রেয়।’ আবার তখন মস্তিষ্ক মনের সিধান্ত কে চাটি মেরে বলছে, ‘নিজের সম্মান খোয়াতে চাস, কর। কিন্তু তোর জন্য যে সাধারণ জনতা বলবে ওই মেয়ের মাথায় কি কিছু নেই সেটা আমি মানতে পারব না। তাই ফুট এখান থেকে এখন।’

মন আর মস্তিস্কের এমন ঝগড়া দেখে তরুর ইচ্ছে করল এখন একটা হাতুড়ি দিয়ে ওখানে একটা চেয়ার এর উপর বাড়ি দিবে আর বলবে
-অর্ডার অর্ডার অর্ডার।
আর সাথে জাজদের ওই বিশেষ টুপি পড়তে ইচ্ছে করল তরুর। চেয়ার এ বসে থাকা অবস্থায় আশেপাশে তাকাল। যদি কোথাও ওই টুপি আর হাতুড়ি পাওয়া যায় তো। কিন্তু আশেপাশে পেল না। তাই উঠে দাঁড়াল একটু হেঁটে দেখবে l

হঠাৎ একটা মহিলা এসে তরুকে জড়িয়ে ধরল আর ধন্যবাদ বলতে লাগল কাঁদতে কাঁদতে।

তরুও তাকে সামলাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আর বলতে লাগল
~ চাচার কিছু হবে না, উনি ঠিক আছেন।

এমন সময় সামনে চোখ পড়তেই থমকে গেল তরু। সামনের ব্যক্তিও তার দিকেই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে আছে প্রশান্তি, ভয়, অভিমান সাথে আরও নানা অনুভূতি যেটা কেউ না বুঝলেও তরু ঠিকই বুঝতে পারছে। সে চায় না তার মুখোমুখি হতে। হঠাৎ সামনের ব্যক্তি তরুর দিকে আসতে লাগল। এই বিষয়ে খেয়াল হতেই কোন মতে ওই মহিলাকে সামলিয়ে সেখান থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল। শুধু ছুট লাগানোর আগে মুখ থেকে একটি শব্দই বের হল,
~ মাস্টারমশাই?



পর্ব ০৪


আজ নিজের পড়ায় কিছুতেই মন বসাতে পারছে না তরু। হাসপাতালে অরনবকে দেখার পর নিজেকে শান্ত রাখতে পারে নি। দৌড়ে চলে এসেছিল বাড়ি। বাড়ি পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় তুলি শিকদার প্রশ্নের ঝুড়ি নিজে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু টা আর পারলেন না তরুর চেহারা দেখে। যেখানে ক্লান্তি আর ভয় একসাথে বাসা বেঁধে আছে। নিজের মনের মধ্যেই ভয় পেয়ে অথেন তুলি শিকদার, তবু সেটা কাউকে জানতে না দিয়ে কাঠ গলায় বলে ওঠেন,
~ ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও।
তিনি জানেন যে তার মেয়ের কিছু একটা হলে অবশ্যই তাকে জানাবে। তাআর জন্য একটু সময় দিতে চান তিনি। নিজেকে শান্ত করা জরুরি কারো সাথে কথা বলার আগে।

তরুও মায়ের কথা শুনে ব্যাগ নিয়ে সোজা রুমে চলে যায়। নিজের বাম হাতের পিঠ মুখের সাথে চেপে ধরে নিজের কান্নাকে থামানোর চেষ্টা করতে থাকে। অনেক দিন পর অর্ণবকে দেখল তরু। তার মাস্টারমশাইকে। কিন্তু মাস্টারমশাই কি সত্যিই এখনো তারই আছে?

এসব ভাবতে ভাবতে কান্নার বেগ আরও বেড়ে চলেছে। টেবিল থেকে খাতা নিয়ে তার একটা অপ্রয়োজনীয় কাগজ ছিঁড়ে মুখে ঢোকাতে গিয়েও দিল না। মুড়ে ফেলে দিল কাগজ টা। ফ্লোরে বসে পড়ল সে। ডান হাত দিয়ে মাটিতে বাড়ি মারতে থাকল। বাম হাতের পিঠ তখনও মুখের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। দাতের দাগ বসে গিয়েছে সেখানে। তবুও কান্না থামাতে পারছে না। ছয় বছর পর মানুষটাকে দেখে নিজেকে সামলানো যেন বড় দায় হয়ে পড়েছে। আজ যখন হাসপাতালে দেখল, প্রথমে নিজের মনের ভুল বলেই চালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর হেঁটে আসতে দেখে কোনোমতে চলে এসেছিল সে। চায় না তার সামনে যেতে। কেন তরুর দিকে আসছিল সে? তরু তো পুরো ভেঙে যাচ্ছে। পারছে না কাছে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে আর না পারছে দূরে থাকতে। কি করবে তরু।

~ অর্ণব বাবা এসেছিস তুই? আয় ঘরে আয়, কত বছর পর এলি।
মুখে প্রাপ্তির হাসি নিয়ে বলে উঠলেন লাবণ্য চৌধুরী। তার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে। কত বছর পর দেখ হল। কথাই তো বলতে চাইতো না অর্ণব। ফোন দিলেই একটু কথা বলেই রেখে দিত এই বলে যে সে ব্যস্ত।
~ আমি রুমে যাচ্ছি মা, খুব ক্লান্ত লাগছে।
বলতে না বলতেই অর্ণবের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটি মেয়ে। সে দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল সে,
~ ফিউচার ড অনামিকা চৌধুরী অনু, পড়াশোনা বাদ দিয়ে এখানে কি করছেন?
~ আপনার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নিতে এসেছি ভ্রাতা।
বলেই দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল।
~ আমি যাই, ফ্রেস হয়ে আসি।
~ ঠিক আছে, যাও ভাইয়া।
অর্ণব ও হালকা হেসে নিজের রুমে চলে গেল। এদিকে লাবণ্য চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এবারও অর্ণব তাকে এড়িয়ে গেল।

নিজের রুমে যেতেই অর্ণবের মনে পড়ল আবার তরুলতার কথা। সে যে আজ ছয় বছর পর তাকে দেখেছে। তার তরুলতাকে। সত্যিই কি সে এখনো তার তরুলতাই আছে, যে সবসময় তার মাস্টারমশাইকে জ্বালাতো। জানে না অর্ণব। আজ হঠাৎ ই দেখা হয়ে গেল। কিন্তু কথা বলার আগেই সে তো পালালো। কিন্তু অর্ণব নিজ থেকে তার সামনে যেতে পারবে না। সে যে তার তরুলতাকে কথা দিয়েছে। সে কথা খেলাপ করতে পারবে না। তবে অর্ণবের ইচ্ছে করছে তাকে জড়িয়ে ধরতে। এমনভাবে ধরতে যাতে সে দূরে চলে না যেতে পারে। নিজের দুহাত দিয়ে তার মুখ ধরে কপালে ঠোঁটের স্পর্শ দিতে। কিন্তু সে পারবে না তার তরুলতার কাছে যেতে।
~ আচ্ছা তরুলতা কি আমার কথা মনে করে কখনো? ওর মনের এক কোণে কি আমি আজও আছি?

ফ্রেস হয়ে নিজেকে এলিয়ে দিল খাটে। বড্ড ক্লান্ত সে। কিন্তু মনে বারবার হানা দিচ্ছে তরুর চেহারাটা। না চাইতেও বার বার সামনে ভাসছে। আজকের দেখাটা আরও ইচ্ছা বাড়িয়ে দিয়েছে অর্ণবের। সে দেখেছিল তার তরুলতার চোখের কোণে জলের অস্তিত্ব। মনে হচ্ছিল একটু হলেই সেই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল অর্ণবের, ওর দুহাত দিয়ে মুখ ধরে চোখের পানি মুছে দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলাতে না পেরে হাঁটা ধরে ছিল ওই দিকে। কিন্তু তার আগেই তরু অর্ণবের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। পালিয়ে গেল।

~ এই ভাইয়া খেতে আয়।
অনুর ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়ে অর্ণবের। কোন মতে গিয়ে একটু খেয়েই উঠে পড়ে। ঘরে আবার যাওয়ার আগে বাবার সাথে দেখা করে নেয় একবার। কথাবার্তা বলে আবার নিজের ঘরের দিকে পা বারায়।
ঘরে পৌঁছে নিজেকে বিছানার কাছে সঁপে দিলেও ঘুম ধরা দিল না তার চোখে। অনেকক্ষণ বিছানার এপাশ ওপাশ করেই উঠে পড়ল সে। পুরনো সঙ্গীকে আবার হাতে নিল। জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে জানালা পুরো খুলে দিল। লাইটার দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়ার স্বাদ নিতে লাগল। তবে আজ মনে হয় নিজের সীমার মধ্যে সে ধূমপান করতে পারবে না। আজ সিগারেটটা একটু বেশিই লাগবে।
মনে পড়ে যায় শেষ যেদিন তরুলতার সাথে দেখা হয়েছিল সেদিনের কথা;

~ কেমন আছেন, তরুলতা?
~ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি কেমন আছো?
~ আমিও আছি আলহামদুলিল্লাহ। ডেকেছিলেন আবার?
~ হুম বলতে চাইছি যে তুমি আমাকে ভুলে
~ ভুলে যাবো এই তো?
~ হুম
~ কিন্তু কিভাবে? রোজ রোজ একই কথা কেন বলছেন আপনি? আমকে বলেন, আমি সব ঠিক করে দিব। নিজেকে আপনার মন মতো করে গড়ে তুল্ব তাও ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবেন না। প্লিজ। আমি তো এতদিন ধরে জানতে চাইছি, তাও আপনি আমাকে ইগনোর করে যাচ্ছেন কেন বারবার। আমি যদি জান্তেই না পারলাম তাহলে
~ তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে যে এমার একটা কথা রাখবে।
~ কিন্তু আপনি আমাকে এই কথা রাখতে বলবেন না এখন প্লিজ
~ ভুলে যাও আমাকে মাস্টার মশাই। আমার সামনে আর কখনো এসো না, আমাকে তুমিই কথা দিয়েছিলে, এখন সেটা রাখার পালা তোমার। আর তুমি কথা না রাখতে পারলে আমি
~ চলে যাব। কখনো আপনার সামনে আসবো না।
বলেই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল অর্ণব। আর কখনো দেখা হয় নি। আর না কথা হয়েছে।

খুব মনে পড়ছে আজ সে দিনের কথা অর্ণবের। কেন দিতে গিয়েছিল ওই কথা সে। তাই রক্ষা করতেই তো দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ আবার দেখা হল।
~ আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছি। আমি নিজ থেকে আপনার সামনে আসি নি তরুলতা। নিজের কোন ক্ষতি করবেন না প্লিজ।

সময় পেরিয়ে যায়। চোখের পলকেই। কখন শেষ হয়ে যায়, কেউ বুঝতে পারে না। সময় পার হয়েছে এক্ষেত্রেও। বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে তারপর। তরু অর্ণবের ছোট বোন অনুকেই পড়ায়। তবে আজও জানতে পারে নি যে ওটা অর্ণবের বাড়ি।
কারণ অর্ণব সকালেই বাড়ি থেকে বের হয় আর বাসায় ফিরে দেরিতে। কখনো রাতে অনেক দেরি হয়। দেখা যায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অর্ণবের সাথে লাবণ্য চৌধুরীর দুরুত্ব কিছুটা কমেছে। অর্ণব দেরি করে ফিরলেও লাবণ্য চৌধুরী ততক্ষণ জেগে থাকেন। ছেলেকে খাইয়েই সারাদিনের খোঁজ খবর নেন। এতে অর্ণব তার মায়ের প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। অবশ্য সে আগে থেকেই মায়ের উপর রেগে আছে এমনটা না। তবে অজানা এক রাগ হত লাবণ্য চৌধুরীর উপর। বলা যায় অভিমান হত। কারণটা অর্ণব সম্পূর্ণ জানে না। তবুও মন মানত না তাই এড়িয়ে চলত তার মা কে। কিন্তু এখন সেই অভিমানের বরফ গলছে হয়তো। অর্ণবের খালার অবস্থা আগে থেকে ভালো।

তরু ভার্সািটিতে বসে ভাবছে কি হচ্ছে তার সাথে। অনেক চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরছে তার। প্রাপ্তি এদিকে নিজের মতো বকবক করলেও তরু শুধু হু হা করে ছেড়ে দিচ্ছে। প্রাপ্তি তো কথা বলছেই, কিন্তু সেই কথাগুলো তরুর মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

প্রাপ্তির কথার মূল বিষয় হল জালাল নামক লোকটি, যে তরুকে সেদিন দেখতে গিয়েছিল। জালাল তরুকে খুব বিরক্ত করছে। নানা ভাবে তরুর পিছনে পড়ে আছে। আর তরু, সে তো ঠাণ্ডা মাথায় প্রতি কথার উল্টো কথা বলে জবাব দিচ্ছে। এমন ভাবে বলছে যেন জালাল নিজেই সাধারণ জনতার মাঝে লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। জালাল এসেছিল সবার সামনে তরুকে অপমান করতে, যেখানে সে নিজেই অপমানিত হয়ে ফিরে যায়। অন্যদিকে এই ঘটনা ঘটার পর প্রাপ্তি তরুর কাঁধে হাত দিয়ে হালকা ভাবে মেরে সাবাস বলে উঠছে। এই একটা মারের পরিবর্তে তরু প্রাপ্তির কাঁধে দুবার মারছে। সেজন্য প্রাপ্তি উল্টো ঘুরে দৌড় দিয়েছে আর তরু ওর পিছনে দউ লাগিয়েছে। পরে দুজনেই একসময় হাঁপিয়ে মাঠের ঘাসে বসে পড়ছে। প্রাপ্তি ভেবেছিল যে তরু আর ওকে মারবে না। কিন্তু শেষে তরু আবার মেরেছে। সেই নিয়ে আজও প্রাপ্তি রাগারাগি করছে। কিন্তু তরুর মন পড়ে আছে অর্ণবের কাছে।

তরু নিজের ভার্সিটি শেষ করে আবার অনুকে পড়িয়ে বাড়ির দিকের রাস্তা ধরেই হাঁটছে। আজকাল কেন জানি তরুর মনে হয় মাস্টার মশাই আশেপাশেই আছে তার। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব। বিশেষ করে তরু যখন অনুকে পড়াতে যায় তখন সে না চাইতেও আশেপাশে তাকায়। যদি দেখা যায় তাকে। সে অর্ণবকে দেখতে চায়, আবার দেখতে চায় না। একেক সময় একেক কথা মনে হয় তার। সে কি চায়, যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তবে কেন জানি মনে হয় দেখা হলেও হতে পারে। বিশেষ করে তরু যখন শুনল যে অনুর ভাই ফিরে এসেছে তখন এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হয়েছিল
~ অর্ণবই কি অনুর ভাইয়া?
জানে না তরু নিজে। তবে এরপর অনু যতবার তার ভাইয়াকে নিতে তরুর সাথে কথা বলেছে, তরু মন দিয়ে শুনেছে। প্রথম দিনের মতো বেখেয়ালি হয়ে যায় নি। এজন্যই তার ভয় বেশি বাড়ছে কারণ অনুর ভাইয়ার সাথে অর্ণবের মিল পাচ্ছে তরু। তার এখন কি করা উচিত সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তরুর মতো বিচক্ষণ মেয়ে নিজেই পড়ে গিয়েছে সমস্যায়।

আজ আর তরুর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। সময়টা পড়ন্ত বিকেল। আর সেখান থেকে নদীর দূরত্ব বেশি না। তাই সেখানে যাবে বলেই মনস্থির করল সে। যেই ভাবা সেই কাজ। নদীর পারে গিয়ে বসে পড়ল সেই গাছটার নিচে। এটা তরুর পছন্দের জায়গাগুলোর মধ্যে একটি। গাছের ডালে এখনো পাখির বাসা আছে। ওটার জন্যই তো অর্ণবের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল ওদের। চোখে পানির উপস্থিতি টের পেল তরু। কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেও পারছে না। সারাদিন যেমনই থাকুক না কেন, একলা হলেই তো কান্না গুলো বের হয়ে আসতে চায়। পারে না নিজেকে সামলাতে। কত রাত নিজের কান্নায় বালিশ ভিজিয়েছে। কেউ জানতে পারে নি। পুরনো স্মৃতিতে ডুব দিবে কিন্তু এমন সময় এক ডাকে তার ধ্যান ভাঙল। স্মৃতিতে ডুব দিতে গিয়ে ফিরে এলো চিন্তার জগত থেকে। চিনতে ভুল হল না তরুর যে এটা কার আওয়াজ ছিল। কিন্তু পিছনে ফিরবে কি ফিরবে না এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে সে। আবার সেই ডাক পড়ল। আর অজান্তেই তরুর চোখ থেকে বেয়ে পড়ল এক বিন্দু জল। তার অজান্তেই। ডাক্তারের সাদা এপ্রোনে বেশ লাগছে অর্ণবকে।
~ তরুলতা।

তাও জবাব পেল না অর্ণব। এবার বিরক্ত হয়েই তরুর কাঁধে হাত রাখল। তরু সাথে সাথে পিছনে ফিরল। যা ভেবেছিল তাই। এটা অর্ণব।
~ কেন এসেছ এখানে? তুমিই তো কথা দিয়েছিলে আমার সামনে আর আসবে না।
~ প্রথমে আমার সামনে আপনিই এসেছিলেন। আর এখন আমি এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম। আপনাকে দেখে থেমে গেলাম।
~ মানে?

~ বাদ দাও। এতো বছর পর দেখা হল খোঁজ খবর নিবেন না?
~ ওহ কেন আছো তুমি? সরি, ভুলে বলে ফেললাম, কেমন আছেন আপনি? আপনার স্ত্রী সন্তান কেমন আছেন?
~ কি বলতে চাইছেন?

~ আমি তো আপনার বিয়েতে যেতে পারলাম না। আর গিফটও দিতে পারলাম না। সরি। কেমন আছেন সবাই?
~ এসব আপনি
~ ওহ সরি, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি আসি এখন।
বলেই তরু দ্রুতপদে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল।
~ আনি আমকে আজও ভুল বুঝলেন। আমি তো এখনো বিয়ে করি নি। কিন্তু আপনি বাচ্চা পর্যন্ত যাই হোক। আপনি নিজ থেকে না চাইলে আমি জোর করে কিছু আগ বাড়িয়ে জানাতে যাবো না তরুলতা।


পর্ব ০৫

তরু নিজের বাড়ি ফিরে এলো স্বাভাবিক ভাবেই। যেন কিছুই হয় নি। সে নিজের বাড়ি ফিরে এসে হাত মুখ ধুয়ে নিল। রাতে খাওয়া দাওয়া করল। সে আর ওই জন্য নিজের ভেতরের অনুভূতি বাইরে প্রকাশ করল না। সে চায় না তার পরিবারের কেউ চিন্তা করুক। আগেরদিন মায়ের চিন্তিত মুখ দেখেই তার অনেক খারাপ লেগেছিল। তাই সে আবার সেই পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। রাতে সবাই যখন ঘুমাতে গেল তখন তরুও নিজের ঘরের লাইট বন্ধ করল। তারপর পর্দা সরিয়ে জানালা সম্পূর্ণ খুলে দিল। টেবিলের সামনের চেয়ার টা টেনে জানালার পাশে রাখল। তারপর সেখানে বসে পড়ল। তরুর হাতে ফোন। সেই ফোনে এয়ার ফোন গাইয়ে নিল। এয়ারফোন কানে গুঁজে গান ছেড়ে দিল।

আকাশে অন্য সব রাতের মতই চাঁদ আছে। সেই চাঁদ আকাশকে আলোকিত করছে। মেঘেরা ঘুরে বেরাচ্ছে আকাশে। তবে সব দিকের মেঘ দেখা যাচ্ছে না। শুধু চাঁদের আশেপাশের মেঘ গুলো দেখা যাচ্ছে। মেঘগুলো কখন চাঁদকে আড়াল করে দিচ্ছে। আবার তারপর চলে যাচ্ছে। যেন মেঘগুলো চাঁদের সাথে খেলা করছে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। সেই বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তরুর শরীর। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই তার। কানে লাগিয়ে রাখা এয়ারফোনে গান বেজে চলেছে অনবরত। কিন্তু সেই গানের দিকে মন নেই তরুর। গায়ে কাঁটা দেয়ার মতো ঠাণ্ডা বাতাসেও খেয়াল নেই তার। পাতলা একটা কামিজ পরে আছে সে। ওড়নাটাও পাতলা। কিন্তু কিছু অনুভুত হচ্ছে না যেন তার। সব দিক থেকে অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়েছে সে। মেঘের আড়ালে চাঁদের লুকোচুরি খেলায়ও নজর নেই তরুর। অন্যদিন হয়ে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকত আকাশ পানে। কিন্তু আজ সে অতীতের স্মৃতিতে হাত বুলাতে ব্যস্ত। অতীতের কথা মনে পড়তেই প্রথমে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।

৮ বছর আগে (বর্তমান থেকে) –
তরুদের বাড়ি থেকে নদীটা বেশি দূরে না। আবার বেশি কাছেও না। তবে স্কুল শেষে সেখানে যাওয়া প্রতিদিনের স্বভাব তার। সেখানে খেলতে বেশ লাগে তার।
তরু স্কুল শেষে বাচ্চাদের সাথে খেলছিল সেই নদীর কাছেই। খেলতে খেলতে অনেক সময় পার হয়ে গেলে সবাই নিজ নিজ বাড়ি চলে যায়। কিন্তু তরু যায় নি। সে সেই পড়ন্ত বিকেলে নদীর পাড়ের সবুজ ঘাসে বসে পড়ল। একটা গাছের নিচে বসে সূর্যের পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার দৃশ্য দেখতে বেশ লাগছে তার। কিন্তু দেরি করে বাড়ি ফিরলে বাই এর পক্ষ হতে তার পিঠে দুই ঘা উপহার হিসেবে পড়তে পারে সে কথা মাথায় আসতেই বসা থেকে উঠে পড়ে তরু। কিন্তু সে একবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার ঘাসের দিকে।
রাস্তা যেন তাকে বলছে – বাড়ি ফিরে যা।

আবার ঘাস যেন তাকে বলছে- একটু বসে থাক, সূর্যাস্ত টা দেখে যা।
কিন্তু তরু কি করবে, ভেবে পাচ্ছে না। তরুর মনে হল রাস্তা আর ঘাস মিলে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। তাই দু হাত দিয়ে দু কান চেপে ধরে সে উল্টো দিকে ঘুরে গেল। সেখানে ঘুরতেই নজরে পড়ল সামনের গাছের দিকে। গাছের নিচে একটি পাখির বাচ্চা পড়ে আছে। সে কিছু না ভেবেই সেখানে চলে গেল। পাখিটা হাতে নিতে নিতে ভাবল হয়তো গাছ থেকে পড়ে গিয়েছে। আর উঠতে পারছে না। উপরে গাছের দালের দিকে তাকাতেই তার ভাবনা সঠিক হল, সেখানে গাছের ডালে একটা পাখির বাসা ছিল। সেখান থেকে পড়েছে বাচ্চা পাখিটা। মনস্থির করল সে পাখিটাকে তার বাড়ি পৌঁছে দিবে।
কিন্তু কিভাবে?

সে তো আর গাছে উঠতে পারে না।
আশেপাশে তাকাল যদি সাহায্যের জন্য কাউকে পাওয়া যায়। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ওই সময় ওখানে কেউ ছিল না। হতাশ হয়ে মাথা নিচু করতে যাবে কিন্তু তার আগেই নজরে পড়ল একটি মোটর সাইকেল ওর দিকে আসছে। নাহ, মোটর সাইকেলটি একা আসছে না, সাথে একটি লোক ও আসছে। মানে লোকটি বাইক চালিয়ে নিয়ে আসছে।
তরু আর কিছু না ভেবেই চলে গেল রাস্তায়। সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মোটর সাইকেলে থাকা ব্যক্তি অনেকক্ষণ হর্ন বাজানোর পরও যখন তরুকে সরাতে পারল না, তখন সে ব্রেক কষল। তারপর নিজের হেলমেট খুলে তরুকে বলল,

~ আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
~ আপনি কি গাছে উঠতে পারেন?
~ কি?
~ আপনি কি গাছে উঠতে পারেন?
দুবার ই একই প্রশ্ন করায় অবাক হল অর্ণব। তার থেকেও বেশি অবাক হল সামনে থাকা তরুকে দেখে। কারণ একটি মেয়ে স্কুল ড্রেস পরে এই অসময়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে সেটা বুজতেই কিছু সময় নিল সে। তবুও স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল,
-হ্যাঁ পারি।
~ তাহলে এই পাখিটাকে ওই গাছটাতে (হাত দিয়ে দেখিয়ে) উঠিয়ে দিতে পারবেন? এই পিচ্চি পাখিটাকে ওর বাসায় পৌঁছে দিবেন? প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
~ ঠিক আছে।

বলেই অর্ণব ওই পাখিটাকে গাছে উঠিয়ে দিয়ে সেখান থেকে নেমে গেল।তারপ্র নিজের জামা ঝাড়তে লাগল। তরু আবার বলে উঠল,
~ একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?
~ হ্যাঁ?
~ আপনি কি মেডিকেলের স্টুডেন্ট?
~ হ্যাঁ।

~ তাহলে আপনার নিশ্চয়ই চেনাজানা পাখির ডাক্তার আছে? থাকলে তাকে দিয়ে একবার এই পিচ্চি পাখিটাকে চেক করিয়ে নিবেন। আসলে একে তো পিচ্চি, তার উপর এতো উঁচু থেকে পড়ে গিয়েছে। ব্যথা পেয়েছে হয়,তাই বলছিলাম আমি আর কি।

অর্ণব কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আযানের ধ্বনি আসলো তরুর কানে। আযানের ধ্বনি কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই সে অর্ণবের জবাবের অপেক্ষা না করে ‘আজ আসি’ বলেই চলে গিয়েছিল বাড়ি।
তার কয়েকদিন পর তরু অর্ণব আর সাথে আরেকজনকে দেখতে পায় যে পাখিটাকে দেখছিল। সেই নদীর পাড়েই। কিন্তু তরু তখন রিকশায় বসে ছিল। তাই আর নেমে সেখানে যেতে পারে নি। সে ভাবছিল যে রিকশা থামিয়ে অর্ণবের কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানাবে। কিন্তু তার ভাবতে ভাবতেই রিকশা এক টানে এই স্থান পার করে চলে আসে। তাই আর কথা বলা হয় নি অর্ণবের সাথে।
পরেরদিন সে সেই নদীর পাড়ের গাছের কাছে যায়। আর একটা কাগজে ”পাখিটার জন্য ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব। -তরু” লিখে একটা পাথর দিয়ে গাছে নিচে চাপা দিয়ে রেখে চলে যায়। কিন্তু চিরকুটটা অর্ণব পেয়েছিল কি না জানা নেই তার।

তারপর তার অর্ণবের সাথে আর দেখা হয় নি। সে তখন ক্লাস এইটে পড়ত।


পর্ব ০৬

৬ বছর আগে (বর্তমান থেকে)

আজ তরুর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। কিন্তু এতে তরুর কোন ভাবাবেগ এর পরিবর্তন হতে দেখা যায় নি। সে সাধারণ ভাবেই আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। খাওয়া দাওয়া করে টিভি নিয়ে বসেছে।

পরীক্ষার পর থেকে এটা ওর রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালে একটু দেরিতেই ওঠে সে। তারপর খেয়ে হয় খেলতে যায় নাহয় টিভি নিয়ে বসে।

দুপুর ১২ টা কি সাড়ে ১২ টা। প্রাপ্তি ফোন দিয়ে ওর রেজাল্ট জানিয়ে দেয়। তুর গোল্ডেন এ প্লাসপেয়েছে। সাথে নিজেরটার পাশাপাশি অন্যদের খবর বলে। তরু একবার শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন রেখে দেয়। প্রথমে নিজের বাবার কাছে যায়। তন্ময় শিকদারকে বলতেই তিনি একবার মুচকি হেসে আবার আগের ন্যায় কঠোরতা ধারন করেন, কেউ তাকে দেখে বলতেই পারবে না যে তিনি তার মেয়ের রেজাল্ট শুনেছেন কি না।

তারপর মাকে জানায়। তুলি শিকদার এমনিই হাসি মুখে ছিলেন। রেজাল্ট ভালো হয়েছে শুনে হাসি মুখটাকে আরও প্রসারিত করেন। আর বলে আজ বিরিয়ানি বানাবেন।

তারপর পালা আসে তূর্যর। তূর্য বাইরে ছিল বলে ওকে ফোনে জানাতে হয়। তবে তূর্যর সাথে এক দফা ঝগড়া হতে হতে হয় নি। বলা যায় তূর্য ই সেটা হতে দেয় নি। রেজাল্টের ট্রিট নিত তরু ভাই এর কাছ থেকে। কিন্তু তার আগেই তরু যখন রেজাল্ট বলল তখন তূর্য নিজেই বলল সে তাকে ডেইরী মিল্ক খাওয়াবে। ব্যস, এক দফা ঝগড়াটা আর হল না। ডেইরী মিল্কের নাম শুনতেই তরু থেমে গেল। নিজেকে ঝগড়ার জন্য প্রস্তুতিটা বৃথা গেল তার। তাই আর বেশি কথা বাড়াল না।

সোজা গেল টিভি দেখতে। সেখানে তখন ‘কার্টুন নেটওয়ার্ক’ চ্যানেলে একটা বারবি মুভি হচ্ছিল। সেটা তরু মিস করতে চায় না। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই তরুকে এক দফা বকে জোর করেই স্নান করতে পাঠালেন তুলি শিকদার।

দুপুরে খাওয়ার সময় ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে বসে আছেন। এক পর্যায়ে তন্ময় শিকদার বলে উঠেন,
~ তরু?
~ হুম বাবা?
~ আমি চাচ্ছি তোমায় প্রাইভেটে পড়াতে। আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে সে। তুমি রাজি থাকলে আমি তার সাথে কথা বলব।
~ ঠিক আছে বাবা। আমি পড়বো।
~ ঠিক আছে, আমি তাহলে কথা বলব। তুমি কয়েক দিন রেস্ট নেও। তারপর তোমাকে চিনিয়ে দেব।
~ ওকে বাবা।

কয়েকদিন পর তন্ময় শিকদার তরুকে নিয়ে যায় তার স্যার এর বাড়ি। তন্ময় শিকদার তার সাথে আগেই কথা বলে রেখেছেন। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল স্যার এর বাড়ি তরুর বাড়ির বরাবর সামনের বাড়িটা। তাই বেশি দূরে যেতে হয় না। এখানে তরুর বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় তন্ময় শিকদার নিশ্চিত থাকবে পারে। কারণ ছেলেটা তার পরিচিত। অনেক বিশ্বস্ত। তাছাড়া সে নিজেও পড়াশোনা করে বলে বেশি স্টুডেন্ট পড়ায় না। আর ছেলেটা ছাত্র হিসেবে বেশ ভালো। তার উপর মেডিকেলের ছাত্র। কয়েকদিন পর ডাক্তারও হয়ে যাবে। তন্ময় শিকদারের ইচ্ছা ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন যদি ভাগ্য এ থাকে।

তন্ময় শিকদার বাড়ির বেল বাজাতেই একজন দরজা খুলে দিল। দরজা খোলা পেয়ে সামনে তাকাতেই অবাক হল তরু। অর্ণবকে সে এখানে আশা করে নি। ২ বছর পর সে অর্ণবকে দেখছে। শেষবার রিকশা থেকে দেখেছিল। তারপর আর দেখা হয় নি।

তবে অবার হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হল সে অর্ণব কে দেখে ক্রাশ খেয়েছে। কারণ অর্ণব তখন সদ্য স্নান সেরে বেরিয়েছিল হয়তো। পরনে টি শার্ট আর ট্রাউজার। কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুল থেকে পানি পড়ছিল।

তখন তরুর মনে এর ভয়ানক বাসনা জেগেছিল। কিন্তু সেটাকে মাটিচাপা করতে হল। কারণ সেটা বয়স সঙ্গত নয়। আর পাশাপাশি তার বাবাও সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে অন্তত হবু স্যার এর সাথে কিছু কথা ঠিক হবে না। এটা নিশ্চয়ই কোন ঠিক কাজ হবে না।

কিন্তু তরুর খুব করে ইচ্ছে করছিল অর্ণবের ভেজা চুলে হাত ডুবিয়ে সেটা নাড়াচাড়া করে খেলা করতে। কিন্তু সেটা আর করা হল না। কারণ সে অবশ্য এমন মেয়ে নয় যে ইচ্ছে হলেই সেটা পুরন করে।

তন্ময় শিকদার নিজের মেয়ের সাথে অর্ণবের পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে যান। অর্ণব সেখানে একা থাকা সত্ত্বেও নিজের মেয়েকে একা রেখে যাওয়ার অনেক যুক্তি নিজে নিয়েই মেয়েকে অর্ণবের কাছে পড়ানোর কথা ভাবেন।

তিনি অর্ণব কে চিনেন। আর পাশাপাশি নিজের মেয়েকেও চিনেন। অর্ণব কোন ক্ষতি করবে না। আর তরুও নিজের রক্ষা করতে পারে। তাছাড়া প্রতিবেশি আছে যাদের উপর তিনি ভরসা করতে পারেন। অর্ণব তরুর থেকে ৭ বছরের বড়। নিজের ছোট বনের মতো তরুর খেয়াল রাখতে পারবে। কারণ তিনি মানুষ চিনতে ভুল করেন না। এইটুকু ভরসা আছে তার নিজের সিদ্ধান্তে। (ইশ্‌ অর্ণবকে শেষমেশ কিনা তরুর ভাই ভাবলেন? লেখিকা শিহরিত! )

এছাড়াও অনেক ভেবেই তন্ময় শিকদার তরুকে অর্ণবের কাছে পড়ানোর সিধান্ত নেন।

তন্ময় শিকদার যেতেই অর্ণব দরজা লাগিয়ে তরুকে বসতে বলে সোফায়। সামনে একটা ছোট টেবিল আছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল তরু, কেউ নেই। হয়তো একাই থাকে অর্ণব, এই ভাবল তরু।

সোফায় বসতে বসতে তরু বলে উঠল,
~ ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব, সেদিন পাখিটার জন্য।
~ ওহ তাহলে চিনতে পেরেছেন?
~ হুম, চিনব না কেন তোমাকে, অবশ্যই চিনেছি।
~ কিন্তু পাখিটার জন্য মানে বুঝলাম না।
~ আমি দেখেছিলাম, তুমি পাখিটার চেক আপ করিয়েছিলে সেদিন। কিন্তু তারপর আর তোমার সাথে দেখা হল না। আমি একটা ছোট চিরকুট রেখে দিয়েছিলাম, সেটা মনে হয় উড়ে গিয়েছিল। যাই হোক।
~ আচ্ছা আজ যেহেতু প্রথম দিন তাই বেশি কিছু পড়াব না।
~ যেমন তোমার ইচ্ছা, মাস্টার মশাই।

অর্ণব এতক্ষণ কথা বলছিল ঠিকই কিন্তু সে তরুর ‘তুমি’ করে বলাটা খেয়াল করে নি। তাই কিছুই বলে নি। শুধু একটু পড়িয়ে কিছু পড়া দিয়ে ছুটি দিয়ে দিয়েছিল।

তরু বাসায় ফিরে নিজের ব্যাগ বিছানায় ফেলে নিজেকে এলিয়ে দিল বিছানায়। সেখানে শুয়ে থাকা অবস্থায় ভাবতে লাগল সেদিনের কথা। ২ বছর আগের কথা। তখন তো এমন অনুভূতি হয় নি তার। সাধারণ একজন মানুষের ন্যায় ভেবেছিল। কিন্তু আজ তার কাছে অর্ণবকে বেশ অন্যরকম লেগেছে। কিছু অদ্ভুত ইচ্ছে জেগেছে তার মনে। যা সম্পর্কে সে অবগত কিন্তু তার নাম কি, সেটা তরু জানে না।

অন্যদিকে অর্ণব তরু যাওয়ার পর নিজের বেডরুমে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চিরকুট বের করল। এটা সে সেদিন ই পেয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে আর তরুর সাথে দেখা হ্য নি। প্রায়ই সে তরুর সাথে দেখা করতে সেই নদীর পাড়ে আসতো, কিন্তু আর দেখা হয় নি। তাই সেদিকে তেমন না ভেবে আবার নিজের পড়ায় মন দিয়েছিল অর্ণব। আজ আবার দেখা হয়ে গেল তরুর সাথে। আর এখন রোজ ই দেখা হবে। তবে শুক্রবার ছাড়া। অবশ্য শুক্রবার ও দেখা হতে পারে। বাড়ির সামনেই তো তরু থাকে। ভাবতেই একটা চওড়া হাসি চলে এলো অর্ণবের মুখে।

~ তরু এই তরু, দরজা খোল মা, সকাল হয়ে গিয়েছে। ভার্সিটি যাবি না?
মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল তরুর। নিজেকে মাটিতে আবিষ্কার করে কিছুক্ষণ ভাবল কি হয়েছে। তারপর মনে পড়ল গত রাতে সে অতীতের কথা ভাবছিল। তাই ভাবতে ভাবতে মাটিতেই শুয়ে পড়েছে। নিজেকে ঠিক করে জবাব দিল সে,
~ আসছি মা।
মেয়ের জবাব পেয়ে তুলি শিকদার নিজের কাজে ফিরে গেলেন। তরুও নিজে তৈরি হয়ে নিল ভার্সিটিতে যাবে বলে। খেয়ে দেয়ে একেবারে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হল। কিন্তু ঘটল এক বিপত্তি।

ওড়নায় টান অনুভব করতেই থেমে গেল তরু। সে তখনও ভার্সিটিতে ঢুকতে পারে নি। সে তখনও বাইরে ছিল। পিছনে ফিরতেই দেখল জালাল ওর ওড়না ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে ছিল আরও কয়েকজন। হয়তো ওর পরিচিত। কিন্তু তাদের নজর সুবিধার ঠেকল না তরুর কাছে। সবার মুখেই সয়তানির হাসি লেগেই আছে। বুঝতে দেরি হল না তরুর যে ওরা কি ইঙ্গিত করতে চাইছে। কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না। কারণ জালাল আর তার বন্ধুরা এখনো কিছুই করে না।

সে বাইরে থেকে ঠাণ্ডা থেকেই একটু ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। যার অর্থ দাঁড়ায় যে ওরা কি করতে চাইছে সেটা জিজ্ঞাসা করছে তরু। এতেই কাজ হল। ভড়কে গেল ওরা। কিন্তু আবার ওরা হাসি মুখ করল। তরু আগেই আশেপাশে তাকিয়েছিল যে ডাকলে কোন সাহায্য পাওয়া যাবে কি না। কিন্তু না, সাহায্যের কোন সম্ভবনা নেই। তার মানে যা করার তাকেই করতে হবে। ওরা ইতিমধ্যে তরুকে নিয়ে বাজে কথা বলাও শুরু করে দিয়েছে। প্রথম দিন সামান্য কারণে যখন প্রস্টিটিউট বলেছিল, সেদিনই বুঝে গিয়েছিল তরু যে জালাল কোণ পরজায় পরজন্তনামতে পারে। কিন্তু এখন রাগ দিয়ে কাজ করলে হতে বিপরীত হয়ে ওরই ক্ষতি হবে। তাই ওদের কথার কোন জবাব দিল না।

এখানে দুটো রাস্তা খোলা থাকলেও একটা রাস্তায় কাজ করা তার জন্য নিরাপদ। প্রথমত অন্যদের সাথে লড়াই করে নিজেকে বাঁচানো। কিন্তু এতে নিজে ওদের শক্তির সাথে পেরে উঠবে না। ওরা বেশি মানুষ। তাই ২য় রাস্তায় চলার সিদ্ধান্ত নিল সে। প্রথমে ওদের একটু ভড়কে দিয়েই ওখান থেকে পালাবে বলে মনস্থির করল সে।

প্রথমে নিজের ব্যাগ দিয়ে এক ধাক্কা দিয়ে ওদের দূরে সরানোর চেষ্টা করল। এতে সফল ও হল সে। এক দৌড়ে সেই নিরব জায়গা ছাড়িয়ে দূরে চলে এলো। কিন্তু রাস্তায় পায়ে কিছুতে বেঁধে পড়ে গেল সে। নিজে উঠতে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তার আগে পিছনে তাকিয়ে দেখল জালাল রা তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

তবে তাদের আসার আগেই সেখানে পৌঁছল অর্ণব। অর্ণব তরুকে পড়ে যেতে দেখেই ওর দিকে এগিয়ে এসেছিল। সে মুলত হাসপাতালের দিকেই যাচ্ছিল। তরুকে দেখে গাড়ি থামাল। তারপর নিচে নেমে তরুর কাছে গেল।

অন্য একজন ব্যক্তিকে তরুর দিকে আসতে দেখে ওরা ফিরে গেল। কারণ একেই একজন ব্যক্তি আছে তরুর সাথে। তারুপর তারা এখন আর গলির ভিতর নেই। তারা মূল সড়কে। তাই কিছু করলে নিজেরাই গণধোলাই খাবে সেজন্য আর সেদিকে গেল না তারা।

অর্ণব তরুকে উঠতে সাহায্য করল। প্রথমে অর্ণবকে দেখে ওর মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কারণ আগে এমনিই একা ওদের সাথে পেরে উঠত না, তার উপর পড়ে পায়ে ব্যথা পেল। তাই অর্ণবকে দেখে যখন ওরা চলে গেল তখন ওর হুঁশ হল যে সামনে থাকা ব্যক্তিটি অর্ণব। তাই অর্ণবের সাহায্যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
~ আপনাকে ধন্যবাদ মাস্টার মশাই সরি, ড অর্ণব।
~ তুমি থেকে সোজা আপনিতে?
~ আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি আসি।
তরুকে চলে যেতে দেখে অর্ণব আর অবাক হয় নি। কারণ এটাই হওয়ার ছিল। সে যতবার তরুর সামনে এসেছে, ততবারি তরু ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছে। কিন্তু এবার সে তরুর চোখে ভয় দেখেছিল। কারণ সে তরুকে দেখেই বুঝতে পারে তরুর অনুভূতি।

চোখ মানুষের এমন একটি প্রত্যঙ্গ যেটি মানুষের সকল অনুভূতির প্রকাশ করে থাকে। মানুষ না চাইলেও তার চোখে তার আসল অনুভূতি ফুটে ওঠে। সাধারণত মানুষ কখন মিথ্যা কথা বলে কিংবা অন্য অনুভূতি প্রকাশ করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সেটা তখন তার চোখে ফুটে ওঠে। মানুষের চোখ দেখেই অনেকে বুঝে নেয় সামনের ব্যক্তি।

অর্ণবও তেমনি তরুর মুখের কথার থেকে বেশির চোখের ভাষায় বিশ্বাস করে। আর আজ যখন ও গাড়ি থেকে নেমে তরুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল, তখন তরুর চোখে সে চিন্তা আর ভয় স্পষ্ট দেখতে পায়। পরে তরু নিজের অনুভূতি লুকালেও অরনােরব চেোখ এড়ায় নি। সে দেখেছিল। তরু যখন মুখ তুলে তার দিকে তাকাল, তখন এক টুকরো আশার ঝলক। তাই অর্ণবের খটকা লাগল, কি এমন হল যে তরু ও ভয় পেয়েছিল। হয়তো খারাপ কিছু।

তরু আজ আবার অনুকে পড়াতে এসেছে। অনুও তরুর কাছে পড়ছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় সে আজ কোন কথা বলছে না। তরু অনেকক্ষণ জাবত লক্ষ্য করছে অনু কোন কথা বলছে না। অন্যদিন হলে অনু এতক্ষণে নিজের ভাইয়া কে নিয়ে কমপক্ষে ২০ -২২ লাইন বলে বস্ত। কিন্তু সে আজ টু শব্দ টিও করছে না। এর কারণ কি?
~ এই অনু, আমার একটা বই পাচ্ছি না, একটু খুজে দিয়ে যা তো, আসলে আম

পর্ব ০৭

~ এই অনু, আমার একটা বই পাচ্ছি না, একটু খুজে দিয়ে যা তো, আসলে আম
অর্ণব তরুকে নিজের বাড়িতে দেখে বেশ অবাক হল। অর্ণব জানত তার বোনকে কেউ একজন পড়াতে আসে। তবে সে কে? ছেলে না মেয়ে সেটা আর জানা হয় নি তার। বলতে গেলে বাংলাদেশে আসার পরও নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রেখেছে সে। সকালে হাসপাতালে চলে যায় আর রাত করে বাড়ি ফেরে। তাই এর মাঝে কি হয় না হয় সেটা জানে না অর্ণব। আর না কখনো জানার আগ্রহ দেখিয়েছে সে। মাঝেমধ্যে দ্রুত বাড়ি ফিরলে অনু তার কাছে এসেই গল্প জুড়ে দেয়। সেই সূত্রেই জানতে পেরেছে যে অনুকে কেউ পড়াতে আসে। এর বেশি সে শোনে নি। রাতে বেশি জাগা হয়ে যায় বলে অনুকে পাঠিয়ে দিয়েছিল ঘুমাতে।

আজ অর্ণব একটা কারণে ছুটি নিয়েছে। তাই সে বাসায়ই আছে। বিকালে তরু অনুকে পড়াচ্ছিল। সেই সময় অর্ণব নিজের একটা বই খুঁজতেই বাইরে আসে। ভেবেছিল অনুকে বললে খুজে দিতে পারবে। কিন্তু এসেই তরুকে দেখে অবাক হয়। বিশেষ করে বেশি অবাক হয় তরুর বসে থাকার স্টাইল দেখে। চেয়ারে বাঁকা হয়ে এক পায়ের উপর পা তুলে বসে ছিল। ডান হাতে কলম ছিল যেটার আরেক প্রান্ত তরুর মুখের সাথে লাগানো ছিল। কানে একটা লম্বা পেন্সিল গুঁজে রাখা। ছোট চুলগুলো মুখের কাছে বাড়ি খাচ্ছে। এতেই অপরুপ লাগছে অর্ণবের কাছে তার তরুলতাকে।

আর তরুর তো কোন কথাই নেই। যদিও সে মনে মনে ভাবত এই অনুর ভাইয়াই যেন অর্ণব। কিন্তু সেটা যে খাপে খাপ মিলে যাবে, বুঝতেই পারে নি সে। অর্ণব একটা চশমা পড়েছিল। বাসায় ছিল বলে হয়তো টিশার্ট আর ট্রাওজার ছিল পরনে। হাতে একটা বই খোলা অবস্থায়ই ছিল। সেই দিকে মন দিয়েই কথা বলতে বলতে আসছিল। হালকা হাওয়ায় কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো নড়ছিল। তরুর আবার সেই দিনের মতো ইচ্ছা জাগল ওই চুলে হাত ডুবিয়ে দিতে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ইচ্ছা হল নিজেকে কষিয়ে একটা চড় মারতে। কি ভাবছিল সে এতক্ষণ। আবার অর্ণবকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনে পড়ল যে ও কিভাবে বসে আছে। তাই নিজেকে ঠিক করল। সোজা হয়ে বসে পড়ল।

তারপর আড়চোখে আবার তাকাল। কিন্তু না, অর্ণব এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এবার নিজের অন্য অবস্থার কথা মনে পড়ল। কলম কামড়ানোর স্বভাব তরুর না থাকলেও সেটা মুখে ধরে রাখার স্বভাব বেশ আছে। সাথে সাথে সরিয়ে ফেলল সেটা।

এবার আর চোখে তাকাল। নাহ, মশাই এখনো আগের মতই আছেন। কি জন্য এভাবে তাকিয়ে আছেন ভাবতে ভাবতে তার হাত চলে গেল কানে। মুলত নিজের ছোট চুল গুলোকে গুঁজে দেওয়ার জন্যই। কিন্তু পেন্সিলের অস্তিত্ব প্বত্বি সেটা নামিয়ে টেবিলে রাখল।

এবার সে ভাবল সে আর অর্ণবের দিকে তাকাবে না। কিন্তু মনের ভিতর অসস্থি লাগছে তরুর। মনে হচ্ছে না, সে নিশ্চিত যে অর্ণব এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে, পলকহীন ভাবেই, বেহায়ার মতো।

এতোসব কিছু নিরব দর্শকের মতো চোখ বড় বড় করে দেখছিল অনু। ভাবল আরও কিচ্ছুক্ষন এই সিনেমা দেখা যাক। কিন্তু মা খালামনির বাড়ি থেকে ফিরে আসতে পারে এমন কথা মাথায় আসতেই শুকনো ঢোক গিলল সে। দেরি না করে সাথে সাথে কেশে উঠল অনু। একটু জোরেই কাশল, যাতে ওরা বুঝতে পারে। তারপর সে নিজেই বলতে শুরু করল,
~ ম্যাম, ইনি আমার ভাইয়া ড অর্ণব চৌধুরী, আর ভাইয়া, ইনি আমার ম্যাম তিলোত্তমা শিকদার তরু।
~ আমি চিনি উনাকে।
~ কি করে ভাইয়া? তুমি তো ম্যাম কে আজই দেখলে।
এতক্ষণে অর্ণবের হুঁশ হল যে সে কি বলে ফেলেছে।
তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
~ উনি আগে আমার কাছে পড়তেন।
~ হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি আগে উনার কাছে পড়তে যেতাম।
অনু শুধু একটু টান দিয়ে ‘ও’ বলে থেমে গেল। কারণ তখন লাবণ্য চৌধুরী ঘরে ফিরছিলেন। অর্ণব বলল,
~ তোর পড়া শেষ হলে আমাকে বই খুঁজতে হেল্প করিস। আমি আসি তাহলে।
শেষ কথাটা অর্ণব তরুর দিকে তাকিয়েই বলে চলে গেল।

অর্ণব চলে যেতেই অনু জিজ্ঞাসা করল,
~ ম্যাম, আপনি আমার ভাইয়াকে চিনতেন আগে বলেন নি তো?
~ আমি জানতাম না যে উনি তোমার ভাইয়া। তাই চিনতে পারি নি। আর এই কথা বেশি বলার দরকার নেই। অ্যান্টিকেও না। পড়ায় মন দাও।
~ ম্যাম?
~ কি?
~ আমি না
~ তুমি কি?
~ আমি না
~ এরপর?
~ রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।
~ তুমি না পদার্থ বিজ্ঞানের ১০ম অধ্যায় টা খুব ভালো করে বোঝো? তাহলে আজ আমি তোমাকে স্থির তড়িৎ থেকে অঙ্ক দিব কেমন?
~ ম্যাম আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমার ঠাণ্ডা লেগেছে, যার কারণে আমি কোন গন্ধ নিতেই পারছি না কিছুক্ষণ আগে থেকে।
~ গুড গার্ল।

আজ তরু অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। কারণটা প্রাপ্তি। সাধারণত ওর মুখ বন্ধ করে রাখা আর হাত দিয়ে লোহা কাঁটার চেষ্টা একই। এতে কোন লাভ হয় না। বরং নিজের শক্তির ব্যয় হয়। কিন্তু সেই প্রাপ্তি কি না আজ কোন কথাই বলছে না।

আগে থেকেই ওরা ঠিক করে রেখেছিল যে প্রাপ্তি তরুর বাসায় এসে পড়বে দুজনে একসাথে। সেই জন্যে আজ প্রাপ্তি তরুর বাড়ি এসেছে কিন্তু কোন কথা বলছে না। একে দেরি করে এসেছে। তারপর এই এলিয়েনের মতত আচরণ তরুকে অবাক করছে। কিন্তু কি করবে সেটা বুঝতে পারছে না। প্রাপ্তি দেরি করে পড়তে আসতেই পারে। সেটা কোন ব্যপার না। কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল যে আজ মনে হচ্ছে ওর পেটে বোম ফাটিয়েও কথা বের করা যাবে না।

তরু আর না পেরে বলেই উঠল,
~ কি হয়েছে তোর প্রাপ্তি? এতো চুপচাপ।
~ ছেলেটা কি হট দোস্ত!
বলতে না বলতেই নিজের পিঠে দু ঘা পড়ার আভাস পেল প্রাপ্তি। আর চিৎকার দিয়ে উঠল। তবে এতে কাজের কাজ একটাই হয়েছে, প্রাপ্তি কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছে।
~ ছিঃ ছিঃ, কি সব ছিঃ মার্কা কথা বলছিস তুই প্রাপ্তি। এতক্ষণ ভাবছিলাম কি এলিয়েনের মতো আচরণ করছিস, এখন তো দেখছি পুর এলিয়েন হয়ে গিয়েছিস তুই। সত্যি করে বল আসল প্রাপ্তি কই?

আসলে প্রাপ্তি ছেলেদের ব্যপারে সবসম্য দূরে থাকতে চায় এমন এক মেয়ে। বলতে গেলে ছেলে নাম শুনলেই দূরে পালায়। সব সময় যেই ছেলে দেখে তাকেই গরু চোর, ছাগল চোর এমনকি গাধা চোর বানিয়ে দিয়ে ২ সেকেন্ড ভাবে না। সে যদি কোন ছেলের প্রশংসা করে, তাও একেবারে সেই পর্যায়ের প্রশন্সা, তাহলে তরু যে এখনো অজ্ঞান হয় নি এটাই অনেক।

নিজের বুকে থুতু দিয়ে নিজেকে শান্ত করল তরু। আবার বলল,
~ কি হয়েছে তোর?
~ ইশ্‌ তরু সোনা, ছেলে টা কি হ
~ থেমে যা ওখানে, আবার যদি বলিস তাহলে আমি তোকে এই ৪ তলার বারান্দা থেকে ফেলে দিব কিন্তু। কি সব ছিঃ মার্কা কথা বলছিস তুই?
~ আরে ইয়ার, আমি তো হ্যান্ডসাম বলতে চেয়েছিলাম।
এবার তরু এবার প্রাপ্তির কপালে হাত দিয়ে দেখল,
~ তোর কি জ্বর আছে?
~ না।
~ তাহলে অন্য কোন রোগ?
~ না।
~ কাল কিছু উল্টাপাল্টা খেয়েছিস?
~ না।
~ আজ?
~ না রে।
~ এখানে আসার আগে মদ গিলেছিস?
~ আরে তরু সোনা, কি বলছিস? থাম এবার।
~ আচ্ছা চল তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ইঞ্জেকশন দিতে হবে তোকে। তাও বড়টা।
~ এখনই চল, আমি রাজি।
বলেই বসা থেকে উঠে দাঁড়াল প্রাপ্তি।

কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে ভেবে মুচকি হাসল তরু। প্রাপ্তিকে এক হাত দিয়ে ধরে বসিয়ে বলল,
~ তার মানে তুই যার উপর ক্রাশ খেয়েছিস, সে একজন ডাক্তার।
~ তুই বুঝলি কি করে?
~ নাহলে তোর এমন অদ্ভুত এলিয়েনের মতো আচরণ আর ইঞ্জেকশনের প্রেমে পড়া দেখেই মিলিয়ে নিয়েছি।
~ ইউ আর জিনিয়াস তরু বেবি। এবার চলো হাসপাতালে যাই।
~ চুপচাপ হোমওয়ার্ক কর। (ধমকের সুরে)
তরুর ধমক শুনেই প্রাপ্তি আবার নিজের বইয়ের দিকে চোখ ঘুরাল ঠিকই কিন্তু মনোযোগ টা বোধ হয় ওদিকে নেই। তরু আবার নিজের বইয়ের দিকে মন দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অতীত ভেসে উঠল চোখের সামনে।

বেশ কয়েক মাস হয়েছে তরু অর্ণবের কাছে পড়ে। ত্রুও ১১ দশে উঠেছে। কিন্তু তরুর অর্ণবের প্রতি অনুভূতি বেড়েই চলেছে। সাথে পাগলামিও। তবে প্রথম দিকে অর্ণব অতটাও খেয়াল করে নি।

বেশ কয়েকদিন ভাবার পর অর্ণব একদিন তরুকে জিজ্ঞেস করেই বসল,
~ আপনি আমাকে ‘তুমি’ করে ডাকেন কেন?
~ ওহ তাহলে খেয়াল করেছ?
~ হুম।
তরু কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল,
~ আই লাভ ইউ।
~ কি?
~ হুম।
~ মানে?
~ আমি তোমাকে ভালোবাসি।
~ আমি অর্থ জানতে চাইনি।
~ ওকে। মানে হল আমি তোমাকে ভালবাসি।
~ দেখেন তরু আপনি
~ আমি জানি আমি ছোট। তাই এখন বলতে চাইনি। কিন্তু আজ যখন জিজ্ঞেস করলে তখন মনে হল তোমাকে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখা দরকার। নাহলে যদি অন্য কেউ বলে দেই। তাই আমি বলে রাখলাম তোমাকে। এখন ত্মি আমি। চিন্তা কর না। আমি নিজে বড় না হওয়া পর্যন্ত তমোমাকে জোর করব না। তবে ততদিন নিজেকে অন্য মেয়েদের থেকে দূরে রাখবে।
~ মামানে?

~ উফ্‌ তুমি বুঝলে না এতক্ষণ আমি কি বললাম? আচ্চা আমি তোমাকে আবার বোঝাই। আমি
~ থাক আপনি ম্যথ করেন। এখন আর কোন কথা না।
~ তুমি কি ব্যপারটা বুঝতে পেরেছ?
~ হু হু, এখন আপনি ম্যাথ করেন।
~ ওকে।
এর পর ও বেশ কয়েকবার অর্ণব তরুকে বোঝাতে চেয়েছে। কারণ একে তো অর্ণব তরুর থেকে ৭ বছরের বড়। কেউ যদি এভাবে কথা বলতে শোনে তাহলে কি না কি ভাববে? তিল কে তাল বানাবে। এই ভেবে পায় না অর্ণব।

একদিন অর্ণব নিজে তরুর বাড়ি গিয়েছিল তন্ময় শিকদারের সাথে দেখা করতে। উনিই দেখেছিলেন তাকে।

তারপর কথার মাঝে তন্ময় শিকদার তরুকে ডাক দেন।
~ তরু।
~ হ্যাঁ বাবা।
~ তোর এখন পড়ার সময় হয়ে এসেছে না?
~ হ্যাঁ বাবা।
~ বের হবে কখন?
~ এইতো এখনই।
~ তাহলে অর্ণবের সাথে যাও।
~ ঠিক আছে বাবা। আমি তাহলে আপনার সাথে যাবো স্যার।
~ ওকে।
কথা শেষ করে তরুর সাথে বের হল অর্ণব নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। অর্ণব তো ভয় পেয়ে গিয়েছিল, এখানেই না তুমি করে বলে ফেলে তরু। কিন্তু আপনি করে বলেছিল।

বাড়ি ঢুকেই তরু অর্ণবকে বলল,
~ আসসালামু আলাইকুম অর্ণব, কেমন আছো?
~ আপনি আমাকে এখন আবার তুমি করে ডাকছেন, তাও নাম ধরে।
~ হুম, ওটা তো টেম্পোরারি ছিল। এটা পার্মানেন্ট।
~ ‘আপনি’ করে ডাকলে কি হয়?
~ ‘তুমি’ করে ডাকলে কি হয়?
~ জানি না।
~ তাহলে আমি তুমি করেই ডাকব, আর নাম ধরেই ডাকব মাস্টার মশাই।
বলেই দাঁত কেলিয়ে একটা হাসি দিয়ে সোফায় বসতে গেল তরু।

~ এই তরু, এবার তুই কোথায় হারালি?
~ না না, আমি তো ভাবছিলাম কিছু পুরনো স্মৃতি।
~ ও তাই বলি মুচকি মুচকি হাসছিলি কেন?
~ আমি হাসছিলাম?
~ টা নয় তো কি?
~ ও

~ ভাইয়া?
অন্যদিকে অতীতের স্মৃতিতে ডুব দিয়েছিল অর্ণব নিজেও। হঠাৎ একটা পুরুষালী কণ্ঠ কানে আসতেই দরজার দিকে তাকাল সে। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখে মুচকি হেসে ভিতরে ঢুকতে বলল। ছেলেটি ভিতরে ঢুকে আবার বলে উঠল,
~ কি করছিলে ভাইয়া?
~ কিছু না। আজ ছুটি নিলাম, কিন্তু কোন কাজ নেই তাই বসে আছি।
~ জানি তো। আমার জন্যই তো ছুটি নিলে। পরশু দিন ও আমার জন্য তোমাকে ছুটি নিতে হল। কিন্তু সকালের ট্রেন টা ছাড়ল না। তাই রাতের ট্রেনে আসলাম। আর তুমি আমার জন্য বিনা কারণে ছুটি নিলে।

~ হয়েছে, আর মুখ গোমড়া করতে হবে না সাগর, সরি ; ড সাগর চৌধুরী।
~ কি যে বল তুমি ভাইয়া?
~ হুম হয়েছে, তো ঢাকায় এতো চাকরি করার ইচ্ছা জাগল কি করে?
~ তোমার আন্ডারে কাজ করা আমার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন পূরণ করার কোন সুযোগ কি আমি হাতছাড়া করতে পারি?
~ হয়েছে। এবার বুকে আয়।
সাগর অর্ণবকে জড়িয়ে ধরে বলল,
~ থ্যাক্স ব্রো, আই ওয়াজ মিসিং ইউ আ লট।
~ মি টু, মাই লিটল ব্রাদার।

পর্ব ০৮

সাগর অর্ণবের সাথে দেখা করে ফিরে যেতেই অর্ণব আবার অতীতের ভাবনায় মগ্ন হল। হাতে রয়েছে এক জলন্ত সিগারেট। কিছুক্ষণ আগেই জ্বালিয়েছে। সাগর রুম থেকে বের হওয়ার পরপরই। এখন সে পুরনো কিছু স্মৃতি ভাবছে, যেগুলো মনে করতেই তার মুখে আপনাআপনি হাসি চলে আসে।

তরুর ঘুমন্ত মুখ দেখতে বেশ লাগছে অর্ণবের। শুধুমাত্র কয়েকটা লেখা লিখতে দিয়েছিল সে। কিন্তু সেটা শেষ করতেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যায় তরু। তরু যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না অর্ণব। সে নিজেও ওকে লিখতে দিয়ে পড়তে বসেছিল একটি বই নিয়ে। তরুকে জাগানোর আগে ওর খাতার দিকে তাকাল। শেষ লাইনটা লিখেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে বলে মনে হল অর্ণবের।

তাই অর্ণব খাতাটা নিজের হাতে নিল কোনোমতে। নিয়ে সব দেখল। লেখা শেষ করেছে তরু। তারপরই ঘুমিয়েছে। অর্ণব প্রথমে তরুকে জাগাতে গেল। কিন্তু পারল না। তরুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হল তার। সে এক পলকে তাকিয়ে আছে তরুর দিকে।

টেবিলের উপর তার হাত আর হাতের উপর মাথা দিয়ে হেড ডাউন অবস্থায় আছে সে। ছোট চুল গুলো মুখের উপর আছড়ে পড়ছে। আর চোখ পর্যন্ত পৌঁছতেই তরু ভ্রূ কুঁচকে ফেলছে। কানে একটা পেন্সিল গুঁজে রেখেছে। এতে বেশ হাসি পাচ্ছে তার। যে কয় মাস ধরে অর্ণব তরু কে পড়াচ্ছে, প্রতিদিনই তরু একটা পেন্সিল এক কানে গুঁজে রাখে। আর কলম দিয়ে লেখে। এর কারণ জানে না অর্ণব। তবে এতেই তরুকে অসাধারণ লাগে অর্ণবের কাছে।

আরেকবার তরুর মুখের কাছে চুল এসে পড়ায় কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। তাই দেখে অর্ণব হালকা হেসে তরুর চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দেয়। আবার যখন হুঁশ এলো যে সে কি করেছে। তখনই নিজের হাত গুতিয়ে নিল।

কতক্ষন অর্ণব তরুর দিকে তাকিয়েছিল জানা নেই তার। তবে ভালোই লাগছিল। কিন্তু আযানের ধ্বনি কানে পৌঁছতেই ঘুম ভেঙে যায় তরু। অর্ণব ও হাতে থাকা খাতার দিকে তাকায় আর বলে ওঠে,
~ আপনার সবগুলো উত্তর ঠিক আছে।
তরুও ভাবে অর্ণব হয়তো বুঝতে পারে নি যে তরু ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই সেও বলে,
~ ওকে মাস্টার মশাই।
বলে হাই তুলল তরু।
~ আপনার মনে হয় ঘুম পাচ্ছে। তাহলে আজ আপনি যান, রেস্ট নিন। আগামীকাল পড়াব আবার।
~ ধন্যবাদ মাস্টার মশাই।
বলেই ব্যাগে বই খাতা ধুকিয়েই দৌড় দিল তরু।

এদিকে তরু বেরিয়ে যেতেই অর্ণব গিয়ে দরজা আটকাল আর তারপর জোরে হেসে দিল সে। তবে অর্ণব তরুর ঘুমন্ত মুখ দেখে যা অনুভব করছিল সেটা সামলে রাখা অর্ণবের সীমার মধ্যে ছিল। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর তরুর মুখের দিকে থাকিয়ে থাকতে পারল না সে। নিজীক সামলে রাখা বড্ড কঠিন হয়ে পড়ছিল তার পক্ষে। তরুর ঘুম জোরানো চেহারা তার উপর ঘুম থেকে উঠার পর তার আওয়াজ। আর সহ্য করতে না পেরেই তরুকে চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু এরপর বাচ্চাদের মতো দৌড়ে যেতে দেখে নিজেই হেসে ফেলল সে।

আবার নিজের হাসি থামিয়ে কিছুক্ষণ আগের কথা ভাবল সে। আর একটু দেরি হলে আজ কি না কি করে বসত অর্ণব, নিজেও জানে না।

আজ অর্ণব এসেছে ছাদে। তার জামাকাপড় দুপুরে শুকাতে দিয়েছিল সে। এটা নিয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে যাবে। তবে এখনকার পরিবেশ অনেক ভালো লাগছে অর্ণবের। সময়টা বিকাল। সে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। রোদ আছে তবে এতে উত্তাপ অতটা নেই। এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে অর্ণব একদিকে যেমন পরিবেশ উপভোগ করছে, তেমনি তরুর কথা মনে করছে। তরুকে পড়ানোর প্রতিটি মুহূর্ত, তরুর কথা বলা, সব কাজ, ওর পাগলামি সব। ঠোঁটের কোণে একটি হাসি লেগেই আছে।

এদিকে অর্ণবের ছাদে আশা দেখে তরু নিজের রুমে চলে যায়। সে অনেকক্ষণ আগেই এসেছিল তার বাড়ির ছাদে। তবে আড়ালে ছিল। অর্ণবের আসার অপেক্ষা করছিল। বাড়ি দুটো সামনাসামনি হওয়ায় ভালোই দেখা যায় কে ছাদে আসলো, আর কে আসলো না। তাই তরু দেখছিল। অর্ণবকে ছাদে আসতে দেখেই সে নিজের বাড়ি যায়। তারপর নিজের ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসে অর্ণবের ঘরে। অর্ণবের বাড়ির দরজা শুধু লাগিয়ে দেওয়া ছিল কিন্তু লক করা ছিল না। এতে তরুর লাভ হয়েছে। সে চুপচাপ অর্ণবের ঘরে ঢুকে পড়ল।

অর্ণব বেশ কিছু সময় ছাদে কাটিয়ে জামা গুলো নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে সে দেখল তার ঘরের দরজা হালকা খোলা।কিন্তু সে তো লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। জামা গুলো হাত থেকে নামিয়ে নিজের বাড়ির সব দিকে তাকাল সে। কিন্তু কেউ নেই। চোর ঢুকেছিল নাকি?

অর্ণব হঠাৎ আওয়াজ পেল রান্না ঘর থেকে। সে নিজে রান্নাঘরের দিকে গেল। রান্না ঘরে গিয়েই সে অবাক। সেখানে তরু ছিল। শুধু ছিল বললে ভুল হবে। সে রান্না করছিল, যা প্রায় শেষ।
~ আপনি এখানে?
~ ওহ মাস্টার মশাই এসে গিয়েছ? আসসালামু আলাইকুম।
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন?
~ আমি কি করব? আমার যা করার ছিল সেটা শেষ। এবার একটু দেখ তো কেমন হয়েছে?
~ কি?
~ রান্না।

~ কিন্তু আপনি রান্না কেন করেছেন?
~ অনেক দিন ধরে ইচ্ছা ছিল আর আম্মুও রান্না করতে দেয় না। তাই ভাবলাম বাড়ির কাছে রান্নাঘর থাকতে দূরে কেন যাব। তাই তোমার এখানেই ট্রাই করলাম। এবার একটু টেস্ট করে দেখ কেমন হয়েছে। আমি অতটাও খারাপ রাধি নি।
~ কিন্তু
~ কোন কিন্তু না, নাহলে আজ আমি পড়বো না। আগে খেতে হবে।
তরু জোর করে অর্ণবকে খাইয়ে দেয়। অর্ণব নিজে খেত চাচ্ছিল না, কিন্তু তরু জোর করে অর্ণব কে প্রথমে চেয়ারে বসায়। তারপর ওর মুখে একটুখানি ভাত তরকারি মেখে পুরে দেয়। ব্যাস। পুরো টা না খাওয়া পর্যন্ত অর্ণবের কাছে ওই দিন পড়তে বসে নি তরু।

অর্ণব মেডিকেলে গিয়েছিল। মূলত এক গেটটুগেদারে। সব বন্ধুরা মিলেই আয়োজন করেছিল। অর্ণব শুধু সেখানে গিয়েছিল কিছুক্ষণ থেকে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু ওরা ছাড়ল কোথায়? উল্টো অর্ণবকে আটকাল তারা। বেশ দেরি করেই ছাড়ল। বলতে গেলে বিকেল পার হতে লাগল।

তাই সে নিজের ঘরে ফিরে এসে ফ্রেস হয়ে নিজেকে এলিয়ে দেয় বিছানায়। কিন্তু দরজা ঠিকমত লক করে নি। আর সেদিকে খেয়াল ও নেই তার। আজ ও নিজেই তরুকে পড়ানোর কথা ভুলে যায় ক্লান্তির জন্য।

এদিকে তরু বিকেলে এসে ফিরে যায়। কারণ অর্ণব বাসায় ছিল না তখন। তাই আবার সে উকি মারতে এসে দেখে অর্ণবের বাড়ির দরজা খোলা। সে ভিতরে ঢুকে ফেলে।

ভিতরে ঢুকেই আশেপাশে তাকায় সে, সবই ঠিক আছে। কিন্তু অর্ণব নেই। অর্ণবের বেড রুমে গিয়ে দেখে অর্ণব শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে গিয়েছে সে। অর্ণবের চোখে মুখেই ক্লান্তির ছাপ। তাই সে নিজে রান্না ঘরে গেল। আর দেখল যে কোন খাবার ই নেই। তাই অর্ণব ঘুম থেকে উঠে কি খাবে তাই ভাবতে ভাবতে নিজেই রান্না করল, ভাত আর দু রকম তরকারি। করেই সে নিজের বাড়ি চলে গেল। তার আগেই একটা চিরকুট এ লিখে রেখে গেল যে
”রান্নাটা সে করেছে, না খেলে পরের দুই দিন পড়তে আসবে না।”
লিখে সেটা অর্ণবের মাথার কাছের ওর ফোন দিয়ে চাপা দিয়ে রেখে গেল।


পর্ব ০৯

অনুকে পড়াতে এসে বাড়ির বেল বাজালো তরু। অনুও হাসি মুখে দরজা খুলল। কিন্তু তরুর সাথে আরেক প্রাণের অস্তিত্ব টের পেয়ে অবাক চোখে তাকাল। কিন্তু পরে যাকে দেখল তাকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।
~ প্রাপ্তিপু।
বলেই প্রাপ্তি কে জড়িয়ে ধরল অনু। এদিকে প্রাপ্তিও অনুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
~ সো মিস ফিউচার ড অনামিকা চৌধুরী, কেমন আছেন?
~ খুব ভালো।
মুখে এক প্রশস্ত হাসি রেখেই জবাব দিল অনু। ওরা নিজের মতো কথা বলাতে ব্যস্ত। কিন্তু এদিকে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে তরু। আশেপাশে কাউকে খুজে বেড়াচ্ছে যেন। সেই মানুষকে দেখার জন্য অনেক আগে থেকেই মন ছটফট করছে। তার চেয়ে বড় কথা তাকে ছুঁয়ে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠছে। তবু সেটা বাইরে প্রকাশ করছে না। তবে যখন জানতে পারল যে অর্ণবই অনুর ভাই তখন থেকে তাকে দেখতে চাওয়ার ইচ্ছা আরও প্রবল হয়েছে তরুর।

হঠাৎ অনুর ডাকে হুঁশ ফিরল তার।
~ ম্যাম, আপনিও ভিতরে আসেন। বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
তরু মনে মনে ভাবল তার সাথে হয়তো দেখা হবে না আর। তাই মন খারাপ করেই ভিতরে ঢুকল সে। আর অনুকে পড়াতে বসল।

প্রাপ্তির আজ তরুর সাথে আসার তেমন কোন কারণ নেই। কেন জানি হঠাৎ ইচ্ছে হল তার যে সেও তরুর সাথে অনুদের বাড়িতে যাবে। তাই এলো তরুর সাথে। তরুকে অনুকে পড়ানোর আইডিয়া প্রাপ্তিই দিয়েছিল। বলতে গেলে অনুর প্রতিবেশি সে। বেশিদুর না তাদের বাড়ি। তাই ইচ্ছে হওয়ার সাথে সাথেই ভাবল তরুর সাথে একবার অনুর সাথে দেখা করা যাক। অনেক দিন পর দেখাও হয়ে যাবে। আর কথাও হবে।

তরু অনুকে পড়ানোতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ তার কানে প্রাপ্তির আওয়াজ এলো।
~ তরু আজ তো তুই আমাকে সোজা হ্যান্ডসামের বাড়িতে নিয়ে এলি রে বোন। ইস আমার মনের ডাক্তার। দেখ আজও ওকে যা লাগছে না! কি হ
বলতে না বলতেই প্রাপ্তি নিজের পিঠে ঢোল বাজানোর আওয়াজ পেল। বুঝতে পারল যে ও কি বলতে যাচ্ছিল যার কারণে তরু ওর পিঠকে ঢোল ভেবেই বাজিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এদিকে কোনোমতে প্রাপ্তির লাগাম হিন কথা থামিয়েই বলে উঠল তরু,
~ একদম চুপ, আজ তুইও অনুর সাথে পড়বি, তোরও না কি সমস্যা আছে। বই বের কর।
কিন্তু প্রাপ্তির মন পড়ে আছে বাড়ির সিঁড়ির দিকে। সে যেন আবার বারবার ক্রাশ খাচ্ছে।

অনুর মন নিজের বইয়ের দিকে আছে। সে চাইলেও আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, মাথায় ঢুকাতে পারছে না। আজ তরু অনুকে রসায়নের জৈব যৌগ অধ্যায় পড়ান শুরু করেছে। এতদিন বাদ দিয়ে চললেও আজ যে সে পালাতে পারবে না বেশ বুঝতে পারছে। সেই শোক প্রকাসে ব্যস্ত সে। নিজের বইয়ের দিকে তাকিয়ে হাজার জল্পনা কল্পনা করছে অনু।

এদিকে তরুর হঠাৎ মাথায় আসলো যে অনুদের বাড়িতে ডাক্তার বলতে অর্ণব ই আছে। তার মানে কি প্রাপ্তি অর্ণবকেই ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে চোখ পড়তেই দুটো ছেলে দেখতে পেল, একটা অর্ণব আরেকজন কে তরু চিনে না। ভাবতেই মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল যেন।

কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য না। হঠাৎ ওর কানে প্রাপ্তি আর অনুর কথোপকথন এলো।
~ এই অনু তোদের বাড়ির ডাক্তারের নাম কি?
অনু সম্পূর্ণ নিজে দুঃখে ডুবে ছিল। তাই কিছু না ভেবেই জবাব দিল,
~ চশমা ওয়ালাটা না কি চশমা ছাড়া টা?
~ চশমা ছাড়াটা।
~ সাগর ভাইয়া, আমার চাচাতো ভাই।
শুনতেই তরু বিষম খেলো। অনু এক গ্লাস পানি তরুর দিকে এগিয়ে দিল। প্রাপ্তি তরুর পিঠে হাত বোলানো শুরু করল।

এদিকে তরুর অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতেই বাকি দুটো প্রাণ ওদের দিকে তাকাল। তারা নিজ নিজ রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল তখন। সাগর প্রাপ্তি কে দেখতেই বলে উঠল,
~ আপনি?
~ হ্যাঁ আমি।
সেদিকে ধ্যান না দিয়েই কথাটা বলল প্রাপ্তি। তার কাছে এখন তরুকে ঠিক করা জরুরি। কিছুক্ষণ পর তরু শান্ত হতেই অর্ণবের দিকে তাকাল। অর্ণব এক ধ্যানে তরুর দিকে তাকিয়ে আছে। যা তরু আবার একটা সবুজ শাড়ি পরেছে। অর্ণব তো আবার তরুর উপর নিজের মনটা ঝপাং করে ফেলে দিল যেন। তার নজর সরছে না। সরবেই বা কি করে? কত বছর পর তরুকে শাড়ি পড়তে দেখল। পুরনো কথা মাথায় চলে এলো তার। প্রথম যেদিন সে তরুকে শাড়িতে দেখেছিল।

সরকারি ছুটি হওয়া সত্ত্বেও তরুকে কলেজে আসতে হয়েছে। ২৬ এ মার্চ এর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে। স্বাধীনতা দিবস আজ। তার উপর ছুটির দিনে একে তো অনুষ্ঠান বলে বান্ধবীরা বায়না ধরেছে সবাই একই শাড়ি পড়বে। রং ও নির্বাচন শেষ, সবুজ। তরুর শাড়ি পড়তে সমস্যা নেই। সে নিজে শাড়ি পড়তে পারে। তাও কয়েক স্টাইলে। আর সে শাড়ি পরে অলিম্পিকেও দৌড়াতে পারবে। কিন্তু এই নিয়ে রেগে নেই সে। রাগ হল এই জন্য আবার নতুন একটা শাড়ি কিনতে হল। অবশ্য এতে ওকে বেশি টাকা দিতে হয় নি। তরুকে রাজি করাতে ওরাই বলেছিল যে তরুর শাড়ি ওরাই কিনে দিবে। কিন্তু তরু তাও শাড়ীর ৪ ভাগের ৩ ভাগ তাকাতা ওদের অগোচরে দিয়ে দিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষ করে সে নিজের পরিচিত নদীর পারে এসে বসল। এখানে ওই গাছটার ডালে এখন আর আগের পাখিটা নেই। সেই জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে। তরু গিয়ে ওই গাছের ছায়া বসে এক ধ্যানে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। সময়টা ৩ টা বাজে হয়তো। সূর্য তির্যক ভাবে কিরণ দিচ্ছে। তবু সে রকম উত্তাপ নেই। অর্ণব ও সেই সময় সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তরুকে দেখে থমকে যায় সে। তরুকে আজ একদমই বাচ্চা বলে মনে হচ্ছে না, ওকে অনেক বড় লাগছে অর্ণবের কাছে। সবুজ শাড়ি পরে নদীর পাড়ে সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে। সূর্যের আলো তার মুখের উপর এসে পড়ছে। এতে অপূর্ব লাগছে তরুকে। এক ভাবে নদীর দিকে তাকিয়া থাকা তরুকে দেখে আজ অর্ণবের মনে অন্য এক অনুভূতি নাড়া দিচ্ছে।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ওর কাছে চলে গিয়েছিল টের পায় নি। একদম কাছে পৌঁছে ও নিজের অজান্তেই বলে ফেলে,
~ তরুলতা?
নিজের নাম অন্য ভাবে কিন্তু চেনা কণ্ঠে শুনতে পেরে উপরের দিকে তাকায় তরু।
~ মাস্টার মশাই, তুমি এখানে?
~ এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম আর কি, দেখলাম আপনাকে।
~ ওহ, আজ কলেজে সবাই শাড়ি পরার বায়না ধরেছিল তাই আজ শাড়ি পড়তে হল, কেমন লাগছে আমাকে? বল তো।
~ মাশাল্লাহ, অনেক ভালো। আজ কি আপনি ছুটি নিবেন?
~ না, না, আমি বই নিয়ে এসেছি। চলো পড়তে যাই।
~ ঠিক আছে। চলুন।
বলেই হাঁটা ধরল অর্ণব। তরুও পাশে থেকে ওর ব্যাগ ধরে এক কাঁধে তুলে নিল। তারপর হাঁটা ধরল ওর পিছনে।

কিন্তু কি একটা মনে আসতেই সে কিছুটা দৌড়ে গিয়ে অর্ণবের পাশে হাঁটতে লাগল।

এতে অর্ণব নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে একটু হেসে আবার নিজের মতো হাঁটতে লাগল।

সাড়ে তিনটার দিকে ওরা বাড়ি পৌঁছল। অর্ণব ফ্রেস হয়ে একটা সবুজ পাঞ্জাবী পরে নিল। কেন জানি আজ তার এটা পরতে ইচ্ছে হল। বাইরে এসে দেখে যে তরু বই নিয়ে পড়া শুরু করে দিয়েছে। এক ঘণ্টা পড়ার পর শেষের দিকে তরু বলে উঠল,
~ আজ আর না মাস্টার মশাই।
~ ঠিক আছে, তাহলে ছুটি আজ।
~ ইয়েয়ে, থ্যাংক ইউ মাস্টার মশাই। কিন্তু এবার আমি তোমাকে ছুটি দিব না।
~ মানে?
~ মানে এই এখন তুমি আমার সাথে আবার নদীর কাছে হাঁটতে যাবে আর আমাকে বাদাম কিনে দিবে।
~ এয়্যা?
~ হুম। চলো চলো,
বলতে বলতেই অর্ণবের হাত ধরে বাইরে বের হয়ে দরজা লক করে চলে গেল তরু।

নদীর পাড়ে হাঁটছে তরু, পাশে অর্ণব ও হাঁটছে। কিছুক্ষণ আগে জোর করেই ওকে দিয়ে বাদাম কিনিয়েছে সে। অর্ণব যদিও বলেছিল যে পরের দিন ও অনেক বাদাম কিনে এসে রেখে দিবে। কিন্তু তরু রাজি হয় নি। তরু এক হাতে বাদামের প্যাকেটটা ধরে রেখেছে আর অন্য হাতে অর্ণবের হাত। এজন্যই অর্ণবকে ওর পাশে হাঁটতে হচ্ছে। তরু নিজের শাড়ীর আঁচল দিয়ে ওর হাত আর অর্ণবের হাত ধরে রাখাটা ঢেকে রেখেছে। তাই কেউ খেয়াল করছে না।

পড়ন্ত বিকেল সময়টা সত্যি দারুন। এমন একটা সময় যখন সূর্যের উত্তাপ থাকে না। দিনের শেষভাগে নিরিবিলি ভাবে কাটানোর জন্য ‘নদী’ নামক জায়গাটা একদম মানান সই। আর পাশে হাত ধরে চলার মানুষ থাকলে তো কথাই নেই। হাত ধরার মানুষটি যে কেউ হতে পারে। নিজের বাব মা, ভাইবোন, বন্ধু কিংবা ভালোবাসার মানুষটি। কিন্তু এই হাত ধরে যদি ভালোবাসার মানুশ্তির সাথে পথ চলা হয় তাতে অন্য অনুভূতি অনুভুত হয়। যা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না কেউ। একেবারে আলাদা অনুভূতি, সব অনুভূতি থেকেই ভিন্ন।

কিছুক্ষণ হেঁটে তরু অর্ণবের হাত ছেড়ে দিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। অর্ণব আশেপাশে তাকিয়ে দেখল এটা সেই গাছটা, যেখানে ওদের প্রথম দেখা হয়েছিল। তারপর তরুর দিকে তাকাতেই তরু চোখ দিয়ে ইশারা করে বসতে বলল ওকে।
~ আমি আসি তাহলে।
বলেই অর্ণব চলে যেতে চায়। কিন্তু তরু ওর হাত ধরে ফেলে। তাই অর্ণব আর বেশি কিছু না ভেবে বসে পড়ে তরুর পাশে। তারপর তরু ওর হাত ছেড়ে দেয়।

তরু বাদাম নেওয়ার সময় দুটো প্যাকেট নিয়েছিল। একটায় বাদাম ছিল আরেকটা খালি। প্রতিবার এমন করে ও। একটা প্যাকেট থেকে বাদাম নিয়ে সেটার খোসা ছাড়িয়ে খাবে আর খোসাটা অন্য প্যাকেটে ফেলবে। তরু সেভাবেই প্রথমে বাদাম নিয়ে খায়। তারপর আবার আরেকটা বাদাম নিয়ে সেটা খোসা ছাড়িয়ে অর্ণবের দিকে দেয়। অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তরু আবার বলে,
~ এটা ধর।
অর্ণব সেই বাদাম টা নিজের হাতে নেয়। তরু আবার নিজের মতো বাদাম খেতে থাকে আর আবার যখন অর্ণবকে দিতে যাবে তখন দেখে আগের বাদামটা অর্ণব তখনও খায় নি।
~ ওটা এখনো খাও নি অর্ণব?
~ নিজের নাম তরুর মুখে শুনে মনে একটা ভালো লাগা কাজ করলেও অবাক হয়ে তাকায়।
~ ওটা শেষ কর আর এটা ধর।
তরুর কথা শুনে অর্ণব নিজের হাতে থাকা বাদাম টুকু মুখে পুরে নেয় আর তরু নিজের হাতে থাকা খোসা ছাড়ানো বাদাম অরনবকে ধরিয়ে দিয়ে নিজের কাজ করতে থাকে।

বাদাম খাওয়া শেষ হতেও তরু একটা প্যাকেট দিয়ে আরেকটা প্যাকেট মুড়ে দেয় যেন কোন বাতির উপর ঢাকনা লাগানো হল এভাবে।

তারপর সূর্য এর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু অর্ণব সেই থেকে শুধু তরুকেই দেখে যাচ্ছে। ওর মুখ থেকে আবার আপনাআপনি বেরিয়ে আসে,
~ তরুলতা।
~ হুম।
সূর্যের দিকে তাকিয়ে থেকেই জবাব দেয় তরু।
~ চলুন বাড়ি যাওয়া যাক, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।
~ হ্যাঁ।
অর্ণব উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তরু তখন ও বসে আছে। অর্ণব কিছু একটা ভেবে তরুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তরুও প্রাপ্তির হাসি হেসে নিজের হাত দিয়ে অর্ণবের এগিয়ে দেওয়া হাতটা ধরল আর অর্ণব তরুকে টেনে তুলল। তরু বাদামের প্যাকেটটা নির্দিষ্ট স্থানে থাকা ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে অর্ণবের পাশাপাশি হেঁটে বাড়ি ফিরে গেল।

~ এই ভাইয়া?
অনুর ডাকে অতীত থীক ফিরল অর্ণব। তরুর দিকে তাকিয়ে দেখল তরু নিজের মাথা নিচু করে রেখেছে।

আসলে তরু বুঝতে পেরেছিল যে অর্ণব কি নিয়ে এতক্ষণ ভাবছে। তাই নিজে লজ্জা পেয়েই মাথা নিচু করে নিয়েছিল সে।
~ কি ভাবছিস তুই?
~ না কিছু না।
বলেই সাগরকে ইশারা করল ওর সাথে যেতে। সাগর আর ও মিলে হাসপাতালের জন্য বের হল।

তরুও আর কোন সুযোগ না দিয়ে অনুকে পড়ান শুরু করল।

অনুকে পড়ান শেষে তরু আর প্রাপ্তি বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। তরু নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারল না। সে অনেক কৌতূহলী হয়ে ছিল প্রাপ্তিকে জিজ্ঞাসা করার জন্য। কিন্তু সেটা বাইরে প্রকাশ করল না। নিজেকে শান্ত রেখে খুবই শান্ত ভাবেই হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল,
~ প্রাপ্তি?
~ হুম।
~ তোর সাথে অনুর ভাইয়া আই মিন, সাগর ভাইয়ার দেখা হয়েছিল কি করে?

লেখা – সাদিয়া সৃষ্টি

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “এক পড়ন্ত বিকেলে – ভালোবাসার গোলাপ খাট এ” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – এক পড়ন্ত বিকেলে (শেষ খণ্ড) – ভালোবাসার গোলাপ খাট এ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!