ভালোবাসার গল্প

শ্রাবণের বর্ষা – ভালোবাসার গল্প কাহিনী (শেষ খণ্ড)

শ্রাবণের বর্ষা – ভালোবাসার গল্প কাহিনী: কয়দিন পর তো বোন বিয়ে করে চলে যাবে। তখন কি করবে? বোন তো আর সবসময় তোমার কাছে থাকতে পারবে না। একা থাকতে শিখতে হবে।


পর্ব ১৬

কু_ঝিক ঝিক রেল গাড়ির শব্দ মনে করিয়ে দেয় ভ্রমণের কথা। শহরের কোলাহল ক্লান্তি থেকে সবুজের স্নিগ্ধতা খুঁজে নেওয়ার জন্য এক টুকরো ভ্রমণ আবশ্যক। আর সেই ভ্রমণের সঙ্গী যদি হয় মনের মানুষ। তাহলে অনুভূতি হয় সম্পূর্ণ আলাদা। রাতের আকাশের নিচে হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা, মজাটাই সম্পূর্ণ আলাদা। কাজের ব্যস্ততায় বাইরের জগত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অভিজিৎ আর দুর্গা। নিজেদেরকে সময়টুকু দিতে পারে না।বিচ্ছিন্নতার জন্য বেশির ভাগই দায়ী তাদের পেশা।

তারা এমন পেশায় নিযুক্ত, যেখানে ছুটি থাকে খুব কম।তাই আজ তারা কয়েকদিনের জন্য বেরিয়েছে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে। এই কয়েকদিন অফিসের সমস্ত দায়িত্ব উৎপল সামলাবে। ট্রেনের একদম জানালার পাশে বসে রয়েছে দুর্গা। মৃদু শীতল বাতাস চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ে পড়ছে অভিজিৎ বাবুর মুখে। ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা খুবই কম। সাধারণত কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার জন্য যাত্রীরা লোকাল ট্রেন ব্যবহার করে। মাত্র ছয় ঘন্টার রাস্তা।

দুর্গা ট্রেন কিংবা বাসে উঠলেই বমি করতে শুরু করে, তাই তারা এক্সপ্রেস ট্রেনে যাচ্ছে। প্রায়ই অনেক বছর পর তারা ভ্রমণ করছে। কলেজে পড়াশোনার সময় বন্ধু_বান্ধবদের সঙ্গে গেছে কোন একবার। দুজনের মনই ভীষণ উত্তেজিত। জানালা দিয়ে বাইরে আকাশ সষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। মাঝ আকাশে এক ফালি চাঁদ চারিদিকে তারার ঝিকিমিকি। কখনো ট্রেন শহরের উপর দিয়ে কখনো গ্রামের পথ দিয়ে চলছে। শহরের মধ্যে দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় চোখের সামনে ভেসে উঠছে বিভিন্ন আলোর ঝলকানি।

বড় বড় বাড়ি, আর কোলাহল। খানিকটা মাঝ রাতে আকাশের মত। আকাশের প্রতিটা তারা শহরের বুকে প্রতিটা ঘরে যেন আলো মতো জ্বলছে। কেউবা বাড়ির ছাদে বসে মেতে রয়েছে প্রেমের সখ্যতায়। দুজনে হারিয়ে গেছে কোন এক কল্পনার রূপকথার দেশে। ওরা এতটাই প্রেমে মগ্ন যে গায়ে বসে থাকা মশাকে ও ক্ষমা করে দিচ্ছে আজ। কিন্তু গ্রামের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামের ছবি পুরোপুরি অনুভব করা যায় না।দূরের দিকে তাকালে দেখা যায় অগুনতি বাড়ি কিংবা চাষীর ক্ষেত বা জেলের জলাশয় রয়েছে ছোট ছোট আলো।

ওইখানে জ্বলতে থাকা আলোগুলো দূর থেকে মনে হচ্ছে, ওখানে যেন কোন এক উৎসব হচ্ছে। তাই এত আলোর ঝলকানি। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অনেকক্ষণ ধরে অনুভব করতে লাগলো দুজনে। দুর্গার বেশ ভালোই লাগছে। সে খেয়াল করেনি তার চুল অভিজিৎ এর মুখের ওপর এসে পড়েছে। অভিজিৎ কিছু বলেনি। চুলের মধ্যে এক অজানা গ্রান রয়েছে।সেটাই অনুভব করছে। অনেকক্ষণ একি ভাবে বসে থাকার পর দুর্গা বলল, “চলুন, খাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হবে।

“অভিজিৎ ভাবতে লাগলো। এমন রোমান্টিক পরিবেশে নিশ্চয়ই কোনো প্রেমিক ঘুমাতে চায় না। ইচ্ছে করে প্রেমিকার হাতটা চেপে রেখে সারারাত গল্প করতে। অচেনা, অচেনা কল্পনার দেশে ভেসে যেতে। অচেনা দেশে নিজেদেরকে একটুখানি খুঁজে নিতে। অভিজিৎ এর খুব ইচ্ছে করছে সারারাত দুর্গার সাথে গল্প করতে। দুর্গা কে বুঝিয়ে বলল, দুর্গা একটা কথাতেই রাজি। সেও চায় তার হবু বরের সাথে সারারাত গল্প করতে। কিন্তু শুধু গল্প করলে হবে না। কিছু খেতে হবে।আসার সময় প্ল্যাটফর্ম থেকে দু প্লেট বিরিয়ানি নিয়েছিল দুর্গা। এখন সেগুলো বার করতে থাকলো। অভিজিৎ ইশারা করে বললো এক প্লেটো বের করতে।একটা দুজন মিলে খাবে। দুর্গা অভিজিৎ এর সমস্ত কথা শুনল।

সে প্লেট বের করে খেতে শুরু করলো কিন্তু অভিজিৎ খাচ্ছে না। সে শুধু দুর্গাকে লক্ষ করে রয়েছে। অভিজিৎ এর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা দেখে বলল, “কি মশাই! খাবেন না বুঝি? না খাবেন তো বলুন আমি একা খেয়ে নিচ্ছি।” অভিজিৎ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। দুর্গার কথা ভালোমতো শুনেনি। মনে মনে বিয়ের পরিকল্পনা করছিল। মাথা নাড়িয়ে বলল তাকে খাইয়ে দিতে। সে তার হবু বর। দুজনের বাড়িতে সবাই জেনে গেছে। আর উনারাও বিয়েতে রাজি। দুর্গা মুচকি হেসে অভিজিৎ কে খাইয়ে দিতে লাগল।

দুর্গার কোমল হাতের স্পর্শ খাদ্যের স্বাদ বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। আপন মনে দুর্গার চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আর দুর্গা খিলখিল করে হাসছে। তার মনেও আলাদা এক অনুভূতি। আলাদা এক উত্তেজনা।কিন্তু কিছুতেই অভিজিৎ কে বুঝতে দিচ্ছে না। সব অনুভূতি বুঝতে দেওয়া ভালো নয়। কিছু অনুভূতি মনের গোপনে রাখা উচিত।খাওয়া শেষ হতে, অভিজিৎ লক্ষ করল দুর্গার ঠোঁটে এক টুকরা মাংস জড়িয়ে রয়েছে।অভিজিৎ আঙ্গুল দিয়ে মাংসের টুকরোটি তুলে খেয়ে নিল।

দুর্গার গোটা শরীর কম্পিত হয়ে উঠল। এবার আর হাসতে পারল না। লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকলো। অভিজিৎ এর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরলো। চোখের জল লক্ষ করতে পারল না দুর্গা। অনেকক্ষণ অভিজিৎ কে চুপ থাকতে দেখে, দুর্গা ওকে দেখার চেষ্টা করল। জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অভিজিৎ, আর চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে।এতক্ষণ হাসিখুশিতে থাকা মানুষটি চোখের জল আসার কারণ কি হতে পারে? ওকে তো কোনো খারাপ কথা বলেনি। ওর কোনো কাজেও বাধা দেয়নি। তবে চোখে জল কেন? দুর্গা অভিজিৎ এর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, “তুমি ঠিক আছো তো?”

_ “হ্যাঁ।”
_ “তাহলে চোখে জল কেন?”
_ “তেমন কিছু না। আসলে ঋতুকে ছাড়া কখনো বাড়ির বাইরে বেরোই নি। সকালে কিংবা রাতে আমি না খেতে বসলে, সে কিছুতে খাবে না। তাই মনটা কেমন একটা হয়ে গেল।”অভিজিৎ চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, দুর্গা অভিজিৎ এর কোমর জড়িয়ে ধরল আর তার কাঁধে মাথা রেখে বলল,

“কয়দিন পর তো বোন বিয়ে করে চলে যাবে। তখন কি করবে? বোন তো আর সবসময় তোমার কাছে থাকতে পারবে না। একা থাকতে শিখতে হবে। মন খারাপ হলে বোনকে কল করে নিও।”দুর্গার কথা শেষ হতেই অভিজিৎ ঋতুকে কল করতে লাগলো। তখন রাত প্রায় একটা। কল করা হয়তো ঠিক হয়নি। কিন্তু না, ঋতুর কল এত রাতেও বিজি। অভিজিৎ বাবু আশ্চর্য হল। এত রাতে কার সাথে কথা বলতে পারে? দুর্গা আবার হাসতে লাগল। দুর্গার হাসি বুঝিয়ে দিল ঋতু ঠিক কার সাথে কথা বলছে।

অভিজিৎ আর দেরি না করে উৎপলকে কল করল। উৎপলও কলে বিজি। অভিজিৎ এর ভীষন রাগ হল। ইচ্ছে করছিল এক্ষুনি উৎপলের পেছনে দিতে। প্রেম করার সময় থাকে না। এত রাতে না ঘুমিয়ে ফোনে কথা বলছে। চোখের নিচে কালি জমাচ্ছে। অভিজিৎ আবার কল করতে যাচ্ছিল, তখনই দুর্গা ফোন ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, “ছাড়ো তো, ওদেরকে কথা বলতে দাও। বিরক্ত করে কি লাভ?”

_ “আমি বিরক্ত করছি না। অন্তত একবার কল রিসিভ করতে তো পারে। এত রাতে কেউ জরুরি ছাড়া নিশ্চয়ই কল করবে না। আমার কথা বাদ দাও, অন্য কেউ তো কল করতে পারে।”
_ “হ্যাঁ, ওটা তারা ভুল করছে। আমি ওদেরকে বুঝিয়ে বলব। তুমি চিন্তা করো না।”

তারপর তারা আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করে দেয়। কোন আঠারো বছরের যুবক যুবতী আর সাতাস_আঠাস বছরের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেমের মধ্যে পার্থক্য থাকে অনেক। যুবক যুবতীদের মধ্যে সাধারণত কল্পনা বেশি থাকে, আর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে থাকে বাস্তবতা।বাস্তবতার ধরাছোঁয়ার একটু বাইরে গেছে দুজন। দুজনের মনে হাজার কল্পনার বাসা বেঁধেছে। সেই কল্পনার সৌন্দর্য অনুভব করছে দুজন। কল্পনার গল্প কনাতে বাধা দেয় অভিজিৎ এর কল। দুর্গা লক্ষ করে উৎপল ফোন করেছে।

অভিজিৎ যে উৎপল এর উপর রাগ প্রকাশ করবে সেটা ভাবতে দেরি করেনি দুর্গা। তাই সে অভিজিৎ কে কল দিলো না, নিজেই রিসিভ করল। ওদিকে সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। ঋতুও কোন সমস্যা নেই। মাঝেমধ্যে কল করে ওই দিকের খবর জানাতে বলল দুর্গা। তারপরে ‘গুড নাইট’জানিয়ে কল কেটে দিল।বেশ কিছুক্ষন নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা দু এর কাছাকাছি। তখনই অভিজিৎ একটু গম্ভীর স্বরে বলল, “বিয়ে করবে?”আচমকা এমন প্রশ্নে দুর্গা একটু হতভম্ব হলো।

অভিজিৎ এর হলো টা কি? যে মানুষটাকে কতবার বিয়ের কথা বলেছে, কাজের ব্যস্ততায় রাজি হয়নি। আর এখন নিজেই বিয়ে করতে চাইছে। দুর্গা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, “আমি তো বিয়ে করতে চাই।

কিন্তু তুমি রাজি হও না। আমার বাড়ি থেকে আজ পাঁচ বছর ধরে বিয়ের কথা বলছে।”
_ “সামনে ডিসেম্বরেই বিয়ে করবো। একসাথে দুদুটো বিয়ে।” “দু_দুটো বিয়ে!”

_ “বোনের আর আমার। একসাথে দুটো কাজ সেরে ফেলব।”দুর্গা আর আনন্দে তর সইতে পারল না। ইচ্ছে করছিলো এক্ষুনি বিয়ে করে ফেলতে। কিন্তু সম্ভব নয়। প্রত্যেক মানুষের একটা স্বপ্ন অবশ্যই থাকে। তার বিয়ে হবে, ছেলেমেয়ে হবে, ছোট্ট একটা সংসার হবে। তার ব্যতিক্রম দুর্গা হবে কেনো? অবশেষে দুর্গার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। খুব কম মানুষই তাদের প্রথম ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে পারে। দুর্গার মনে পড়ে অভিজিৎ এর সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। তখন তারা খুব ছোট ছিল।

অভিজিৎ হাফপ্যান্ট পড়ে ছুটে ছুটে স্কুলে আসতো। একসাথে কত খেলাধুলা করেছে, করেছে কত মারপিট। যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করত, তখন অনেক ছেলে ইয়ারকি ফাজলামি করে অভিজিৎ এর প্যান্ট খুলে দিত। অনেক মজা ছিল সেই সব দিন। যা কখনো ফিরে আসবে না। আজ সেই মানুষটাকে সে বিয়ে করতে যাচ্ছে। ছোটবেলার কথা মনে পড়তে দুর্গা আবার খিল খিল করে হেসে উঠল। দুর্গা হাসতে ভালোবাসে। আসলে বড্ড সুন্দর লাগে।

মিষ্টি চোখে দুষ্টু হাসি আরো বেশি ভালো লাগ ছিল তাকে। অভিজিৎ পা বিছিয়ে দিয়ে দুর্গার কোলে মাথা রাখল। তারপর দুর্গাকে ইশারা করে বললো একটু ঘুম পাড়িয়ে দিতে। দুর্গা আপন মনে অভিজিৎ এল মাথায় হাত বোলাতে লাগলো।তার মায়াবী চোখ ভীষণ উজ্জ্বল। ওর চোখ আজ একটু কিছু বলতে চাইছে। সেটা বুঝতে বাকি থাকল না দুর্গার।তবে তারা যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক। নিজেদেরকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতাও অনেক। একসময় অভিজিৎ ঘুমিয়ে পড়ল। আর তার মায়ায় ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল দুর্গা।সে আর ঘুমাতে পারল না।

পড়ন্ত বিকেলে খোলা আকাশের নিচে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটে বেড়াচ্ছে। বৃদ্ধ দ্ধারা নিজেদের মধ্যে বার্ধক্য কিছুটা দূর করার জন্য হাঁটছে। চৌধুরী বাড়ির কিছুটা দূরে বেশ বড় একটা মাঠ রয়েছে। মাঠটিকে পার্কও বলা যায় এইকারনে, ওখানে আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে দোলনা, বসার জন্য বাঁশের বেঞ্চে রয়েছে। যেগুলি সাধারণত পার্কে দেখা যায়।শেষ বিকেলের আলো মেখে নিতে আশেপাশে মানুষজন ছুটে আসে এই মাঠে। বৃদ্ধবৃদ্ধারাও বের হয় তাদের বাড়ির ছোট্ট ছেলে মেয়েকে নিয়ে।

খুশির আঙ্গিনায় ভরে ওঠে দুজন। মাঠে ক্রিকেট কিংবা ফুটবল নয়, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করে। বিশাল মাঠে নিজেদের মতো করে খেলতে থাকে। পূজারিণী এই মাঠে শ্রাবনকে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চায়। তাই সে শ্রাবনকে মাঠে নিয়ে এসেছে। পূজারিণী এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে, বাড়িতে না বলে মাঠে নিয়ে এসেছে! শ্রাবণ কিছুই কুল খুঁজে পাচ্ছে না।শ্রাবণ প্রথমে না বললেও, পূজারিণীর জোরজবস্তি তাকে বাধ্য করে আসতে। বাঁশের বেঞ্চে কাছে হুইল চেয়ারে বসে রয়েছে শ্রাবণ।

যদিও ওই গুলো বাঁশ দিয়ে বানানো নয়। আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি। দেখতে পুরো বাঁশের বেঞ্চের মতো। পাশেই রয়েছে একটা দোলনা। পূজারিণী সেখানে বসে আপন মনে নিজেকে দুলিয়ে যাচ্ছে। অনেকবার শ্রাবণ বাধা দিয়েছে, দোলানোর জন্য। যেকোনো মুহূর্তে সে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু পূজারিণী শুনেনি। একসময় পূজারিনীর খোপা করা চুল খুলে গেল। দমকা বাতাসে চুল গুলো বারবার উঠে পড়ছে। সেদিকে খেয়াল নেই পূজারিণীর। শ্রাবণ স্থির চোখে ওর পবিত্র মুখখানা দেখছে।

চুল ছেড়ে দেওয়ায় ওকে সাক্ষাত দেবী দুর্গা মতো লাগছে। ছোট্ট মুখখানার মধ্যে গোলাপি ঠোঁটে হাসি বড্ড অপূর্ব লাগছে তাকে। তার সৌন্দর্য বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছিল কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ। এমন মুখখানির দিকে তাকিয়ে থাকতে আজীবন রাজি আছে শ্রাবণ। কিন্তু এত মানুষের উপস্থিতিতে তাকিয়ে থাকতে একটু লজ্জা করছে। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে পূজারিণীকে বলল, “চলো, বাড়ি ফিরে যাই।” পূজারিণী এবার দোলনা থেকে নেমে পরল। বাঁশের বেঞ্চের কাছে গিয়ে বসলো। তারপর শ্রাবণ কে বলল, “আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম একটা কথা বলার জন্য। এখনো কথা বলা হয়নি, আর আপনি বাড়ি ফিরে যাবেন।”

_ “কি বলতে চাও বল? সন্ধ্যে হয়ে আসছে।”শ্রাবণ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
_ “এখনো বুঝতে পারছেন না আমি কি বলতে চাইছি।”
_ “আজব! আপনার মনের কথা আমি কি করে বুঝবো?”

_ “আমার মধ্যে প্রতিভা রয়েছে ওটা জানতে পারো আর মনের কথা জানতে পারো না। পুরো ঘটি কারবার।”পূজারিণীর মুখে ঘটি কথাটি শুনে শ্রাবণ হেসে উঠলো। কথায় কথায় পূজারিণী ঘটি ব্যবহার করে। কিন্তু এই ঘটির মানে এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। শ্রাবণ একগাল হেসে বলল, “মনের কথা তার প্রতিভা দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক।আর আমি কোন জাদুকর নই যে তোমার মনের কথা জানতে পারবো। আশাকরি ওটার বোঝার ক্ষমতা তোমায় হয়েছে। কি বলতে চাইছো তাড়াতাড়ি বল।”

_ “আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?”কোন কিছু পরোয়া না করে পূজারিণী তাড়াতাড়ি বলে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। শেষমেষ বলতে পেরেছে এটাই অনেক। কিন্তু শ্রাবণ এই কথার জন্য মটেও প্রস্তুত ছিল না।সে আঁতকে ওঠে বলে, “হোয়াট?”পূজারিণী আর লজ্জা পেল না।একজন যোদ্ধা কখনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে পিছপা হয় না। একজন প্রেমিকার ক্ষেত্রেও তাই।প্রেমে পড়লে যতই বিপদ আসুক না কেন পেছনে না ফিরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। সে একরাশ সাহস নিয়ে বলল, “আমিতো শুধু আপনাকে বিয়ে করতে চাইলাম। আপনি যেমন ভাবে রিয়াক্ট করছেন, মনে হচ্ছে আমি জোর করে আরো অন্য কিছু করতে চাইছি।

“শ্রাবণ দ্বিতীয়বারের মতো আশ্চর্য হল। পূজারিণী ঠিক আছে তো? কি সব কথাবার্তা বলছে। একসময় শ্রাবণের দুটো চোখ দেখলে চুপচাপ হয়ে যেত সে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যেত। আর এখন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে পূজারিণী। এটা কি সম্ভব? শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অফুরন্ত ভালোবাসা। বুঝতে পেরে গেছে পূজারিণী। তাই তার সাহস দ্বিগুণ হয়েছে। হ্যাঁ, শ্রাবণও পূজারিণী কে ভালোবাসো। কিন্তু কখনোই বিয়ে কথা ভাবেনি। বিয়ের জন্য একটা মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। তাছাড়া পূজারিণী তার ছাত্রী হয়। একজন ছাত্রীকে কি করে বিয়ে করতে পারে সে? যদিও বহু শিক্ষক নিজের ছাত্রীকে বিয়ে করে।কিছু না ভেবে শ্রাবণ বলল, “তুমি সিরিয়াস তো?”

পূজারিণী সামনের দিকে তাকাতে এবার লজ্জা পাচ্ছে। সে মাথা নিচু করে বলল, “আমি সিরিয়াস। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি শ্রাবণ।আই রিয়েলি লাভ ইউ শ্রাবন। আর এই ব্যাপারটা তোমাদের বাড়ির সকলেই জানে।”
_ “মানে?”

_ “আমি তোমাকে ভালোবাসি, এই খবরটা তোমার মা থেকে দিদি সবাই জানে। উনারা সবাই রাজি। এতদিন শুধু তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করতে চাই না। তোমার যদি আমাকে ভালো না লাগে, তাহলে বল। ফিরে যাবো। কখনো জোর করে ভালোবাসা চাইবো না। সবার নির্দিষ্ট একটা পছন্দ অপছন্দ থাকে। তোমার পছন্দ অপছন্দের উপর জোর করার অধিকার আমার নেই।”

শ্রাবণ অবাক হয়ে শুধু পূজারিণীর কথা শুনেছে। পূজারিণীকে এতোটা সিরিয়াস আগে কখনো দেখেনি শ্রাবণ। তার উত্তেজনা, চোখের জলে, মুখের ভাষা বলে দিচ্ছে, সে কতটা শ্রাবনকে ভালোবাসে। তার হার্টবিট দ্বিগুণ হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটাতে পারে সে। শ্রাবণ আর কথা বাড়ালো না।সে এক গাল হেসে বলল, “বাড়ি ফিরে চলো।”
তারপর দুইজন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। একসময় পূজারিণী শ্রাবণের হুইল চেয়ার ধরে এগিয়ে নিয়ে গেল বাড়ির পথে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পূজারিণী আবার বলল, “উত্তর দেবে না?”

_ “পূজারিণী আমায় কিছু দিন সময় দাও। বিয়ে ভালোবাসা এগুলো একদিনের জন্য নয়। জন্ম_জন্মান্তরের ব্যাপার। বিবাহ শুধু একটি ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এর মূল্য বহুগুণ। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক জড়িয়ে যাওয়া যত সহজ, ওখান থেকে মন থেকে বেরিয়ে আসা বড্ড কঠিন। উত্তেজনার বশে কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।”

পূজারিণী মাথা নাড়িয়া বলল, সে উত্তরের অপেক্ষায় থাকবে। নিস্তব্ধ ভাবে দুইজন এগিয়ে চলল। দুজনের মুখেই ভাবান্তর। পূজারিণীকে বিয়ে করতে শ্রাবণের অসুবিধা নেই।সে সবকিছুতেই পারদর্শী। রূপবতী সে। কিন্তু পূজারিণী নখেরও সমান নয় শ্রাবণ। পূজারিণী একজন বড় গায়িকা আর সেখানে শ্রাবণ প্রতিবন্ধী। একজন বড় গায়িকার স্বামী প্রতিবন্ধী হবে!তারা মেনে নিলেও সমাজ কি মেনে নেবে? আবার ব্যতিক্রমভাবে সে? ভালোবাসার জন্য কি যোগ্যতা প্রয়োজন? যোগ্যতা দিয়ে ভালবাসাকে কখনো মাপা যায় না। ভালোবাসা তো একটা পবিত্র সম্পর্ক। মানে না ধর্ম_ বর্ণ। শুধুমাত্র মনের মিল থাকলেই হল।


পর্ব ১৭

ঐতিহাসিক শহর মুর্শিদাবাদ। পশ্চিমবঙ্গে নবাব আমলের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে মুর্শিদাবাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাদের উত্থান থেকে পতন সব ইতিহাসের স্মৃতি রয়েছে এখানে। মুর্শিদাবাদের মূল আকর্ষণী হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। রেল স্টেশন থেকে এখানে আসার জন্য রয়েছে ট্যাক্সি। ভোর সাড়ে চারটার দিকে তারা ট্রেন থেকে নেমে পড়ল। বেশিরভাগ মানুষ এই শহরে আসে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। তাই যাতাযাতের কোন অসুবিধা নেই, ভোর হোক কিংবা গভীর রাত। তবে দুর্গা আর অভিজিৎ দুজনই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলো। সকালে ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায়।খোলা আকাশের নিচে সকাল_সকাল ঘোড়ার গাড়িতে বসে ভ্রমণ করার মজাটাই আলাদা।

ঘোড়ার গাড়ি চড়ে প্রায় সকাল 8 টার কাছাকাছি হাজারদুয়ারি প্রাসাদের কাছে পৌঁছাল।এত সকালে প্রাসাদ বন্ধ থাকে। তারা ক্যামেরা নিয়ে প্রাসাদের বাইরে ফটো তুলতে লাগলো। প্রাসাদের ভেতরে ক্যামেরা নেওয়া সম্পূর্ন নিষেধ। তারা আরও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। এরই মধ্যে অভিজিৎ দুবার উৎপলকে কল করে, ওখানকার খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে অভিজিৎ। এতে একটুও খুশি হয়নি উৎপল বরং বিরক্ত বোধ করেছে।

এত যদি কাজের প্রতি দায়িত্বশীল আর বোনের প্রতি ভালোবাসা থাকে তাহলে ভ্রমণ করার কোন প্রয়োজনই নেই। বারবার ফোন করে বিরক্ত করা হয়তো ঠিক নয়। দুর্গা অনেকবার বারণ করেছে কিন্তু সে শুনেনি। অভিজিৎ নিজের বোনকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে চাইছিল।দূর্গা না বলে। কিছু সময় দুজন একসাথে কাটাতে চাই ছিল। হারিয়ে যেতে চাইছিল রূপকথার দেশে। কিন্তু অভিজিৎ বোনের জন্য এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে সেটা ভাবতে পারেনি। আগে জানলে অবশ্যই ঋতুকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতো।

ঋতুকে এত ভয় পাওয়ার কারণ অবশ্য রয়েছে।সে প্রায় সব সময় অসুস্থ থাকে। সামান্য কোন কিছু চিন্তা করলে মাথা ঘুরে পড়ে যায়।এর আগে বহুবার কলেজ যাওয়ার পথে এমন হয়েছে। এমনকি বাড়িতে বসে থাকতে থাকতেও হয়েছে। অভিজিৎ বহুবার বোনকে ডাক্তার দেখিয়েছে। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। ডাক্তার ঋতুর দুর্বলতাকে দায়ী করেছে।তার শরীর ভীষণ দুর্বল। ফাস্টফুড ছাড়া কোন খাবার খায় না বলে চলে। দাদার রাগান্বিত চোখ দেখে দুমুঠো ভাত খায়। এই কয়দিন যে সে খাবে না সেটা অভিজিৎ খুব ভালোভাবে জানে।

দুর্গা অভিজিৎ এর কাঁধে হাত চাপড়ে কিছুটা আশ্বস্ত করে। ঋতুর কিচ্ছু হবে না।ওর মা রয়েছে, উৎপল রয়েছে। অবশেষে প্রাসাদ খুলল।দুর্গা অভিজিৎ এর হাত ধরে প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করছে সাথে রয়েছে গাইড এবং আরো কয়েকজন মানুষ। এই হাজারদুয়ারি প্রাসাদ কেল্লা নিজামত এলাকা নামেও পরিচিত। নবাব মুর্শিদ উদ্দিন খান থেকে মীরজাফর বংশধর এই প্রাসাদে থেকেছেন। প্রাসাদে প্রবেশের জন্য দুটি পদ রয়েছে। একটি ত্রিপোলি পথ, অণ্যটি দক্ষিণী দরজা।তারা দক্ষিণী দরজা দিয়ে প্রবেশ করল।

হাজারটি দরজা নিয়ে তৈরি এই প্রাসাদটিকে হাজারদুয়ারি বলা হয়। যদিও অনেক দরজা নকল। শত্রুদের বোকা বানানোর জন্য বেশ কয়েকটি দরজা নকল করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ ইউরোপীয় ধাঁচে তৈরি করা এই প্যালেসটি বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। কথিত আছে এর গাঁথুনি কাজে ডিমের কুসুম ব্যবহার করা হয়েছিল। এখানে মোট কুড়িটি গ্যালারি রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন নবাবদের অস্ত্র রয়েছে।এমনকি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যে অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ওই অস্ত্রও রয়েছে।

রয়েছে নবাবদের খাবারের টেবিল।ফরাসি এবং ইতালি শিল্পীদের আঁকা অয়েল পেইন্টিং, মার্বেলর মূর্তি, ধাতব জিনিসপত্র, চিনা মাটির বাসন এবং পাথরের মূর্তি, বিরল বই, পুরনো মানচিত্র, পান্ডুলিপি, ভূমি রাজস্রর রেকর্ড রয়েছে। হাতির দাঁত, রুপোর পালকিও আছে। প্রায় রাজাদের ব্যবহার্য সমস্ত জিনিসপত্র আছে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক কিংবা তারও আরো বেশি সময় ধরে ঘুরে দেখল। প্রাসাদের মধ্যে প্রতিটি জিনিসই চোখ ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্যালেসের ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে ইমামবারা। মনে করা হয় এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ইমামবারা। যদিও প্রথমে সিরাজউদ্দৌলা কাঠের ইমামবারা তৈরি করেছিলেন। 1846 সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ইমামবারাটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।পরবর্তীতে 1847 সালে হুমায়ূন ঝাঁ এর ছেলে নাজিম মনসুর আলী ফেরাছন ঝাঁ বর্তমান ইমামবারাটি তৈরি করেন। ইমামবারা এবং হাজারদুয়ারি মধ্যবর্তী স্থানে নির্মিত হয়েছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট সাদা রংয়ের মদীনা মসজিদ। এই মসজিদে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত।

বাইরে থেকে অপরূপ ভাবে সজ্জিত রয়েছে এই মসজিদ। বাইরের সৌন্দর্য দেখে যেকোনো মানুষের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইবে।কিন্তু তা সম্ভব নয়। ভেতরে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র মহরমের সময় দশ দিন এই মসজিদের দরজা খোলা হয়। কথিত আছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা মক্কা থেকে নিজের মাথায় করে মাটি নিয়ে এসেছিলেন। সেই মাটি এবং মসজিদের ভিত্তি মাটি মিশিয়ে এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষদের কথা ভেবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা মক্কা থেকে মাটি আনিয়ে ছিলেন।মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় তাদের মন কিছুটা হলেও খারাপ হয়। তবুও কিছু করার নেই।

মদীনা মসজিদের সামনে রয়েছে একটি বিশাল আকৃতির অষ্ট ধাতু দিয়ে তৈরি কামান। যেকোনো মানুষের চোখ আকৃষ্ট করবে এই বিশাল আকৃতির কামান। সবাই কামানে হাত দিয়ে দেখতে থাকলো। কেউ বাধা দেওয়ার মতো নেই। গাইড কামানের কাছে গিয়ে বলল, ওটা আগেকার দিনে সবচেয়ে বড় কামান। যেটা মাত্র একবার চালনা করা হয়েছিল। কিন্তু তার শব্দ এতটা জোরালো ছিল, দশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত প্রায় সমস্ত গর্ভবতী মহিলা গর্ভধারণ করে ফেলে। তাই এই কামানকে বাচ্চাবালী তোপ বলা হয়। কথাটি শুনে সবাই একটু আঁতকে উঠলেও দুর্গা অস্পষ্ট ভাবে হেসে ওঠে। তার হাসি দেখে বোঝা যায় একটা কথাও বিশ্বাস করেনি সে। অভিজিৎ তার হাতটি জোরে করে আঁকড়ে ধরল এবং ইশারা করে হাসতে বারণ করল। গাইডের কথা শেষ হতেই অভিজিৎ বলল, “তখন ওই ভাবে হাসছিলে কেন?”

_ “হাসবো না কি করব? উনি কি সব আজব কথা বলছিলেন। ওই লোকটি মনে হয় দশ কিলোমিটার দূরত্ব টা বোঝে না। বুঝলে নিশ্চয়ই বলতো না ওমন কথা।”
_ “মানছি দশ কিলোমিটার যথেষ্ট দূরত্ব কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়। কামান এর দৈর্ঘ্য যথেষ্ট বড়। সেখানে দাঁড়িয়ে হলেও হতে পারে।”

_ “আচ্ছা ঠিক আছে তুমি বিশ্বাস করো আমি পারবো না বিশ্বাস করতে। একটা প্রেগনেন্সি সাধারণ ঘটনা নয়।আর সেখানে একটা কামানের শব্দে দশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গর্ভবতীরা গর্ভধারণ করে ফেলল। ঘটনাটা কেমন ভৌতিক লাগছে!”দুর্গা আবার হাসতে লাগলো। ওর হাসি মোটেও পছন্দ হলো না অভিজিৎ এর। নিশ্চয়ই কোন একটা ঘটনা রয়েছে। না হলে এত মানুষ বিশ্বাস করতো না। তাছাড়া কামান মাত্র একবার চালানো হলো, অসুবিধা না থাকলে দ্বিতীয় বার অবস্যই চালানো হতো।

কিন্তু হয়নি। আবার দুর্গার কথায় যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।তবে আজকের দিনে যুক্তি_পাল্টা যুক্তিতে যেতে চাইলো না অভিজিৎ।সে দুর্গা পাঁচটা আঙুল এর ভেতরে নিচের পাঁচটা আঙুল ভরে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। দুর্গাও অভিজিৎ এর আঙ্গুলগুলো জাপটে রাখলো। দুজনের শরীর ভয়াবহভাবে কেঁপে উঠল। বুকের স্পন্দন দ্বিগুণ। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো।

সাকসেস হওয়ার জন্য তিনটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ__অনুশীলন, অপেক্ষা, উপযুক্ত সময়। কোন কাজ সম্পূর্ণ সঠিক ভাবে করতে চাইলে দীর্ঘ অনুশীলনীর প্রয়োজন।শুধু অনুশীলন করলে হবে না, তারপর করতে হবে ধৈর্য শক্তি দিয়ে অপেক্ষা। অপেক্ষার পর আসে উপযুক্ত সময়। যেটা সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়।আজ পূজারিণীর জীবনে উপযুক্ত সময় এসে গেছে। এ বছরের সেরা বাংলা সংগীতশিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে পূজারিণী অধিকারী। এর আগে দুটো বাংলা ছবিতে গান গেয়ে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তার গান মুগ্ধ করেছে বাংলার মানুষকে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, দুঃখ যখন আসে তখন চারদিক দিয়ে আসে।

সম্ভবত সুখের ক্ষেত্রে এমন কোন প্রবাদ নেই। থাকলে অবশ্যই পূজারিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো। দীর্ঘ যন্ত্রণা কষ্টের পর সুখের দেখা পেয়েছে। আর সুখ কতদিন থাকবে কেউ জানে না। শ্রাবণও বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে। সামনে নভেম্বরে দশ তারিখ বিয়ে। যদিও এই খবর শুধু মাত্র পারিবারিক মধ্যে নিবন্ধ। সোশ্যাল মিডিয়ায় জানানো হয় নি। প্রথমে শ্রাবণের মাথায় অনেক ভাবনা আসে। পূজারিণীকে বিয়ে করা কি ঠিক হব? সে পূজারিণীকে ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষ নিজে থেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? সেখানে তো ভালোবাসাকে অপমান করা হবে। সে যদি পূজারিণীকে ভালোবাসতো না, তাহলে ঘটনাটা সম্পূর্ণ আলাদা থাকতো। আবার ভাবে, একজন বড় গায়িকা পাশে থাকবে একজন প্রতিবন্ধী। সেটা কি সম্ভব? পূজারিণীর ফ্যানেরা ওকে নিয়ে ট্রোল করবে। ওই ট্রোল সহ্য করতে পারবেতো? ওর প্রতিবন্ধীর জন্য ও দায়ী নয়, দায়ী সমাজের দায়িত্বহীন মানুষজন। যারা নিজের একটু সুবিধার্থে অন্যকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে লজ্জাবোধ করে না।

ওটা সমাজের একটা কলঙ্ক।আর সেই কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে শ্রাবণ চৌধুরী। সবাই দেখুক ওদের জন্যই আজ তার এই অবস্থা।আর তারাই যদি ওকে নিয়ে ট্রোল করে তাহলে করুক। অসুবিধা নেই! তার তো শুধু দুটো পা নেই। কিন্তু এই সমাজের বুকে অনেক মানুষ রয়েছে যাদের দুটো চোখ নেই, পা নেই, কারুর বা দুটো হাত নেই। তারাও দেখে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। কেউ এগোতে পারে, কেউ পারে না। তাহলে শ্রাবণ চৌধুরী কেন পারবে না? পারতেই হবে!পারতেই হবে! আর পারবেও! তাই তো সেদিন শ্রাবণ বিয়েতে রাজি হয়েছিল।
বিভিন্ন আলোর ঝলকানি দিচ্ছে মঞ্চে। রংবে রঙ্গের বেলুন এবং বিভিন্ন ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

রয়েছেন বাংলার নাম্বার ওয়ান সব নিউজ টিভি চ্যানেল। অল্প সময়ের মধ্যে উপস্থিত হলেন পাঁচবার সেরা বাঙালি সংগীতশিল্পী অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী অঞ্জনা বসু। তিনি আজকের অনুষ্ঠানের মূল অতিথি। সামনে বসে রয়েছে পূজারিণী অধিকারী। বিভিন্ন মানুষ অটোগ্রাফ নিতে ব্যস্ত। টেবিলে রয়েছে অসংখ্য খাতা। আপন_মনে পূজারিণী অটোগ্রাফ দিচ্ছে। মনের মধ্যে আনন্দ উচ্ছাস সীমানা পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। আজ তার মনের মানুষ শুভাকাঙ্ক্ষীও উপস্থিতি রয়েছে। পূজারিণীর চোখ বারবার ওই মানুষটিকে খুঁজছে।

কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে শ্রাবনকে খুঁজে পাচ্ছে না পূজারিণী। যে মানুষটার জন্য এতদূর উঠে আসা সেই মানুষটাকে আজ দেখতে পাচ্ছে না।বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে। এই সময় যদি একবারের জন্য মানুষটিকে দেখতে পেত, তাহলে মন্দ হতো না। শ্রাবণ আছে তার হৃদয়ের মধ্যে। তার বলা প্রতিটি বাক্যের মধ্যে। তার প্রতিটি বাক্য পূজারিণীর সাফল্যের মূল কারণ। অবশেষে পূজারিনীর নাম ঘোষণা হল। পূজারিণী স্টেজে উঠে আসতেই, চতুর্দিক থেকে কত মানুষের কলতানি ভেসে আসতে লাগলো।

চারিদিকে শুধু কান ফাটানো করতালি। একদম পেছনে হুইল চেয়ারের উপর বসে রয়েছে শ্রাবণ চৌধুরী।সেও হাতের তালি দিচ্ছে। চোখের কোনে জল চিকচিক করছে। বুকটা কেমন একটা হচ্ছে। ইচ্ছে করছে শুধুমাত্র একবার দাঁড়িয়ে পূজারিণীকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সম্ভব নয়। অঞ্জনা বসু পূজারিনীর হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দিলেন। বারবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে পূজারিণী। এত মানুষের ভিড়ে সে একজনকেই খুঁজছে। কিন্তু ওর দেখা নেই। পূজারিণীকে ইতস্তত বোধ করতে দেখে অঞ্জনা বসু বললেন, “এনি প্রবলেম।”পূজারিণী নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল হাসি দিয়ে ‘না’ বলল,

সবার অনুরোধে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইলো পূজারিণী। তারপরে শুরু হলো মিডিয়ার নানা ধরনের প্রশ্ন।
_ “আপনার এই সাফল্যের পেছনে যার অবদান রয়েছে , উনি কে? আমরা উনাকে দেখতে চাই।”
_ “আমার বাবামা। যারা আমাকে জন্ম দিয়েছে। উনারা না থাকলে আমি কখনো এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।”উত্তর দিল পূজারিণী। “আপনার এত দূরে উঠে আসার মূল কারণ কি ছিল?”

_ “আমি যখন গান শিখতাম তখন আমার শিক্ষক একটা কথা বলতো। আমিও সেই কথাটি আজ আবার একবার রিপিট করবো।আর আমার মনে হয় সেই একটা বাক্য আমার সাফল্যের কারণ।’যখন তুমি সাফল্যের উঁচু জায়গায় পৌঁছে যাবে তখন যারা জিজ্ঞেস করবে, তুমি এখানে এলে কি করে? হাসি মুখে বলে দিও দারিদ্রতা’।”
_ “আমরা ওই শিক্ষককে দেখতে চাই। উনার নাম শুনতে চাই? আপনার এতদূর উঠে আসার পেছনে উনার অবদান অনেক।”
_ “হ্যাঁ, আমার এত দূরে উঠে আসার পেছনে যার অবদান অসীম, তিনি আমার শিক্ষক। কিন্তু উনার নাম এখানে নিতে পারবো না। আমায় ক্ষমা করবেন।”
_ “কিন্তু কেন?”

_ “অযথা প্রশ্ন বাড়াবেন না।এটা আমাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার।”গলায় জোর দিয়ে কথা বলল পূজারিণী। গলায় দৃঢ়তা থাকলেও অন্তরে পুড়ে যাচ্ছিল সে। সে চাই ছিল শ্রাবণের নাম নিতে। কিন্তু পারেনি। শ্রাবণ নিজেই ওর নাম নিতে বারণ করেছে। শ্রাবণ পূজারিণীকে গান শিখিয়েছে। তার পাওনা হিসেবে শ্রাবণ পূজারিনীর কাছে বড় একটা গিফট নেবে। ছোট্ট গিফট নেবে না সে। সে চায়, পূজারিণী আরো অনেক বড় গায়িকা হবে।আজ সে বাংলার সেরা সঙ্গীত শিল্পী হয়েছে।

কিন্তু কাল কিংবা পরশু বা বহুকাল পর সে দেশের সেরা সঙ্গীত শিল্পী হবে। বাংলা গান সারা দেশে ছড়িয়ে দেবে।সে দিন শ্রাবণ নিজে থেকে গিফট পেয়ে যাবে।কলকাতায় নয় মুম্বাইতে দাঁড়িয়ে পূজারিণী তার গুরুর নাম বলবে। সারা দেশের মানুষ পূজারিণীর পাশাপাশি শ্রাবণের নাম নিবে।সেটাই হবে তার জীবনের সাফল্য। সেটাই তার জীবনে আশা আকাঙ্ক্ষা। তার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করতে রাজি শ্রাবণ। কিন্তু শ্রাবণের ওই সব কথা শুনে পূজারিণী অবাক হয়েছিল।

পূজারিণী বলেছিল, সে এতদুর নাও পৌঁছতে পারে। তখন কি হবে? পূজারিণী উত্থানের পেছনে যে মানুষটি ছায়ার মতন ছিল। সে যে ছায়ায় থেকে যাবে। কখনো প্রকাশ পাবে না। সেই মানুষটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে। তখন এক অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিল শ্রাবণ, “এই বিশ্বে তোমার সাফল্য কেবল একজন আটকে দিতে পারে, আর সেটা হচ্ছে তুমি নিজেই।”

বিঃদ্রঃ উল্লেখিত নবাবদের কথা আমি আমার বাবার মুখ থেকে শুনেছি। তাই ওইগুলো কতটুকু সত্য তা আমার সত্যি অজানা।


পর্ব ১৮

উসখুস বোধ করছে শ্রাবণ। কিছুক্ষণ আগে বর্ষা সমস্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অন ছিল।আর এখন সমস্ত অনলাইন প্লাটফর্ম ডিলিট করে দিয়েছে। হঠাৎ এমন করল কেন? কিছুই বুঝতে পারছে না সে। বর্ষাকে কল করলো। কিন্তু সে ধরল না। অফিসের কাজে ব্যস্ত রয়েছে। বর্ষার মধ্যে এমন পরিবর্তন শ্রাবনকে চিন্তায় ফেলল। রোজ সকালে খবর কাগজ পড়ায় অভ্যস্ত সে। আজ সকাল সকাল খবর কাগজও খুঁজে পায় নি। বাড়িতে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না।

সে দ্রুত হুইলচেয়ার চালিয়ে মায়ের রুমে প্রবেশ করল। সেখানে মা নেই। খাটের উপর বসে মোবাইলে আগ্রহের সাথে কিছু দেখছে পূজারিণী। ভীষণ উত্তেজিত এবং মুখে করুন ছাপ। এত খুশির মধ্যে পূজারিনীর মুখে করুন ছাপ মটেও ভালো লাগলো না শ্রাবণের।সে পূজারিণীর কাছে গেল। শ্রাবণের হঠাৎ প্রবেশে পূজারিণী বিব্রতবোধ করল। তাড়াতাড়ি ফোন লুকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারল না। শ্রাবণ তখনো কিচ্ছু বুঝতে পারে নি।

শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলল, “কি হয়েছে কি? সবাই আমার কাছ থেকে সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া লুকিয়ে বেড়াচ্ছো কেন?” পূজারিণী আমতা আমতা করতে লাগলো। একটু থেমে বলল, “কই কিছু না তো।” পূজারিনীর মুখখানা বলছে সে কিছু লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন কি ঘটনা ঘটেছে যেটা সবাইকে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। শ্রাবণ এবার ধমক দিয়ে পূজারিণীকে বলল, পূজারিণী সইতে না পেরে কান্না করে ফেলল। পূজারিণী কান্না দেখে শ্রাবণের দুটি চোখ ছল ছল করে ওঠে।

নিশ্চয়ই কিছু একটা খারাপ ঘটেছে। অনেক কষ্টে নিজে থেকে খাটের উপর উঠে পূজারিনীর পাশে বসে। তারপর ঠান্ডা মাথায় পূজারিণীকে সব কিছু বলতে বলে। পূজারিণী কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, “জানেন, আমাদের বিয়ের খবর সারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

আর পাবলিক এটা মোটেও ভালো নেয়নি। তারা আমাদের দুজনকে নিয়ে ট্রল করতে শুরু করেছে।”কথাগুলো বলে পূজারিণী শ্রাবণের বুকের উপর ঝাপিয়ে পরল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। শ্রাবণের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল পুরো ব্যাপারটা। দাদাকে নিয়ে কটু কথা কিংবা ট্রোল কখনো সহ্য করতে পারেনি বর্ষা।তাই সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া ডিলিট করে ফেলেছে সে। সম্ভবত সেইজন্য মা খবরের কাগজ সরিয়ে রেখেছে।

শ্রাবণ কি করে তার মাকে বোঝাবে, টিভি চ্যানেলগুলো শুধুমাত্র নিজেদের টিআরপি বাড়ানোর জন্য বিয়েকে একটা ইস্যু করে তুলেছে। কিন্তু পূজারিণীকে কি বলে সান্ত্বনা দেবে? যার ক্যারিয়ার একটু উঠতে চাইছিল। উঠতে না উঠতেই নামিয়ে দিল তার ফ্যানেরা। এই তাদের ভালোবাসা।কদিন আগে বলেছিল, পূজারিণীর গানে তারা মুগ্ধ। আর আজ তা পরিবর্তন হয়ে গেল।

তাছাড়া পূজারিণী তো কোন অন্যায় করেনি? একজন সেলিব্রেটি একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে করা যদি অন্যায় হয়, তাহলে সেটা জাতির কাছেও কলঙ্ক। আজব এই বাঙালি সমাজ! যারা আজ ট্রোল করছে। তাদের ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল চেক করলে দেখা যাবে, কয়েকদিন আগে তারা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছেলে কিংবা মেয়ে হয়ে কথা বলেছে। কেউ কোনো প্রতিবন্ধকতা ছেলেকে সাহায্য না করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে।

সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছে।আর আজ যখন তাদের প্রিয় গায়িকা একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে করছে, সেটা তারা মানতে পারছে না। অদ্ভুত এই সমাজের মানুষ। একদিন ট্রোল, অপমানের ভয় গায়ক হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছিল শ্রাবণ। কিন্তু আর নয়। এবার ওর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এমন ভাবে চলা সম্ভব নয়। সমাজে যেমন খারাপ মানুষ রয়েছে তেমন ভালো মানুষও রয়েছে। খারাপ গুলো এভোয়েড করতে হবে। শ্রাবণ পূজারিনীর মাথায় হাত দিয়ে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিছুক্ষন পর বলল, “শান্ত হও পূজারিণী! আমি জানতাম এমন একটা পরিস্থিতি আসবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে সেটা ভাবতে পারিনি।”

_ “জানেন, ওরা কত খারাপ খারাপ কথা লিখেছে। সেলিব্রেটিরা নাকি আসলে এমন। আজকে একজনের কাছে থাকবে তো পরে অন্যের কাছে থাকবে। আমার না কী বহু মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি প্রেগনেন্ট।আর এটাকে ধামা চাপা দেওয়ার জন্য আমি আপনাকে বিয়ে করছি। না হলে কি এত বড় একজন গায়িকা একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে করে। আর আপনার নাকি ছোটবেলা থেকে এঁটো খাবার খাওয়ার অভ্যাস। ছোটবেলায় আপনি না কি যে কেউ এঁটো দিলে খেয়ে নিতেন। আর এই বয়সে এসেও অভ্যাস ছাড়তে পারেন নি। তাইতো আজ একটা এঁটো মেয়েকে….”

পূজারিণী আরো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু শ্রাবণ চিৎকার করে বলে উঠলো, “চুপ করো পূজারিণী! চুপ করো! কি সব আজেবাজে বকে যাচ্ছ।” পূজারিণী আবার জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে। পূজারিণী শ্রাবনের ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে বললো, “এগুলো একটাও আমার কথা নয়। এগুলো পাবলিক লিখেছে। এখানেই শেষ নয় আরো অনেক গালি দিয়েছি।”
_ “আচ্ছা ওইগুলো বাদ দাও। যারা যেমন তাদের তেমন থাকতে দাও। জোর করে কখনো কিছু বদলানো যায় না, আর যাবেও না। এত কিছুর মধ্যে কোথাও একটু হলেও দেখবে তোমার নামে প্রশংসার বার্তা রয়েছে। তুমি ওটাকে নাও। ওদেরকে একটা কথা বললে তারা আরো দশটা কথা শোনাবে। তার চাইতে ইগনোর করা বেস্ট হবে।”

দুজনই চুপচাপ হয়ে গেল। শ্রাবণ পূজারিনীর চোখ থেকে জল মুছে দিল।তারপর আবার দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে।পূজারিণীকে কিছুটা আশ্বস্ত করার জন্য পিঠে হাত চাপড়ে বললো, “একদম চিন্তা করবে না। যারা আজ তোমাকে ব্যঙ্গ করছে‌। অপমান করছে। কয়েকদিন পর দেখবে তারা অন্য কাউকে তাদের বাড়ির লোকেশান বোঝাতে প্রথমে তোমার নাম ব্যবহার করছে।”পূজারিণী চোখেমুখে এতক্ষণে হাসির রেখা ফুটে উঠল।

কপাল কুঁচকে ধীর কন্ঠে বলল, সে কখনো দাঁড়াতে পারবে কি না! হাঁটতে পারবে কি না! পূজারিণীর কথা শুনে শ্রাবণ স্নান হাসলো। তারপর বলল, “তা কখনো সম্ভব নয়। আমি কখনো দাঁড়াতে পারবো না। শুধুমাত্র নামে আমার দুটো পা রয়েছে। কিন্তু কোনো শক্তি নেই। মাথার চুলের মত আমার পা দুটো নিষ্ক্রিয়।” দুজনের চোখ আবার ছল ছল করে উঠলো। শ্রাবণের মন মুহূর্তের মধ্যে খারাপ হয়ে গেল। পূজারিণী প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো। সে তাড়াতাড়ি করে বলল, “একটা জায়গায় যাবেন?”

_ “কোথায়?”
_ “ঐ সামনের রাস্তায়‌।”
_ “কেন?”
_ “একটা সারপ্রাইজ রয়েছে।”

_ “সারপ্রাইজ!” একটু আশ্চর্য বোধ করে শ্রাবণ বলল,
_ ” হ্যাঁ, গ্রাম থেকে আমার মা বাবা আসছে। উনাদের আনতে যাব সামনের রাস্তা পর্যন্ত। অনেকদিন দেখা হয় নি তাই মনটা সইছে না।”
শ্রাবণ হেসে উঠলো। এখনই এটা সারপ্রাইজ দিতে চাইল। আবার নিজে থেকে বলে ফেলল।

পূজারিণী নিজেও বুঝতে পেরে মাথায় হাত চাপড়ায়। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। তারপর রেডি হতে শ্রাবণ নিজের রুমে ফিরে যাচ্ছিল, তখনই পেছনে ঘুরে একগাল হেসে বলল, “মন খারাপ একদম করবে না।
একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, অন্যের উপর হেসে সফল হওয়া যায় কেবল নিজের কাছে। পৃথিবীর বুকে সফল হতে গেলে নিজের ওপর হাসতে হবে।”

বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। শীতের তীব্রতা শহরে রাতের জাগ্রতা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে। বাসও প্রায় খালি। তার মধ্যে বসে রয়েছে অভিজিৎ আর দুর্গা। শহরে রাতের একটুকরো চাঁদের আলো মেখে নিচ্ছে তারা। সম্ভবত পূর্ণিমা। তাই চাঁদ বিশাল আকারে গোল হয়ে উঠেছে। বাসের ছুটে চলার সাথে আসছে দমকা হাওয়া।

দুর্গার এলোমেলো চুল বড্ড প্রফুল্ল। অভিজিৎ এর কাঁধে মাথা রেখে একটু ঝুলে পড়েছে দুর্গা। তারাও সাতপাকে বাঁধা পড়তে চলেছে সামনে দোসরা ডিসেম্বর। বিয়ের আগে এটাই তাদের শেষ ভ্রমণ। শহর হোক কিংবা গ্রাম বাঙালি সমাজে বিয়ের আগে প্রায় পরিবার একে অপরের সাথে মিশতে দেয় না। তাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটবে না। আজকাল অভিজিৎ দুর্গার উপর একটু বেশি ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কদিনের মধ্যে তার প্রতি ভালোবাসা দ্বিগুণ হয়েছে। নিশ্চুপ নিরবে বসে রয়েছে। দুজনের মুখে কোন কথা নেই।

হঠাৎ কন্ডাক্টর এসে টিকিট নিতে বললে সচেতন হয়। আবার ঘাবড়েও যায়। তারা কোথায় যাবে নিজেরাও জানে না। অভিজিৎ দুর্গার দিকে তাকালো। তার দুটো চোখ ছল ছল করছে। সে অত সহজে নামতে চায় না। আরো অনেক অনেক দূর ঘুরতে চায়। তার কাছে থাকতে চায়।
“লাস্ট স্টপেজ কোথায়?”কন্ডাক্টরকে বললো অভিজিৎ।

_ “ধর্মতলা।”

_ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমাদের দুটো ধর্মতলা টিকিট দিয়ে দিন।” অভিজিৎকে দুটো টিকিট দিয়ে কন্ডাক্টরর ফিরে যেতে দুর্গা বলল, “এত রাতে কতদূর যাবে!”
_ “হ্যাঁ, তোমার কিছু প্রবলেম আছে বুঝি।”
_ “না, জাস্ট এমনি বললাম।”

আবার কিছুক্ষন নিস্তব্ধতা। শুধু মাঝেমধ্যে গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে। বাসের মধ্যে যাত্রীরাও শীতে জড়স্থ। চারিদিকে আলোর ঝলকানি।বাসটি হঠাৎ একটি ছোট্ট ব্রিজের উপর দিয়ে চলতে শুরু করলো।সেখান থেকে জানালার দিকে তাকাতেই বাইরের অপরূপ দৃশ্য যে কোন মানুষের মন মুগ্ধ করলো। শহরের রাতের সৌন্দর্য সেই জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। কেউ যদি অনন্তকাল ধরে এমনভাবে শহর ভ্রমণ করতে বলে, তাহলে তারা দুজন রাজি।

দুর্গা আবার অভিজিৎ কাঁধে মাথা রাখল। অভিজিৎ আরো দুর্গার কাছে ঘেঁষে আসলো। একহাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে রাখল। বেশ ভালো লাগছে দুর্গার। তবু মনটা একটু বেশি বিচলিত। এক অজানা কারণে তার মন ভেঙে দিচ্ছে বারবার। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, “একটা কথা বলি তোমায়। রাগ করবে না বল।”
_ “রাগ করবো কেন? যা আছে বলে ফেলো?”

_ “আমি যদি কোনদিন হারিয়ে যাই, তাহলে কি তুমি খুঁজবে?”এমন পরিস্থিতিতে দুর্গার মুখে এমন কথা এক্সপেক্ট করেনি অভিজিৎ। অভিজিৎ দুর্গার আরো কাছে গেল। সেও একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, “তুমি হারিয়ে গেলে খুঁজে নেব, কিন্তু নিজে থেকে হারিয়ে গেলে খুজবো না আর।”অভিজিৎ এর কথা শুনে দুর্গা ওর চোখের দিকে তাকাল।ওর চোক কেমন যেন একটা। মায়া ভরা একটি চোখ। সেই ছোট্টবেলা থেকে অভিজিৎ কে জানে সে। সম্পর্কও ছোট্টবেলা থেকে। কিন্তু কখনো সম্পর্কের তাগিদে অন্য কিছু দাবি করেনি।

হাতে হাত রেখে, পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হেঁটে চলা ছাড়া আর অন্য কিছু দাবি কখনোই তুলেনি অভিজিৎ। এমন মানুষ আজ অনেক বিরল।এত বিরলের মধ্যে একটি মানুষ অভিজিৎ। তাই হয়তো দুর্গাও এত বেশি ভালোবাসে অভিজিৎকে। দুর্গা আবার একটু থেমে বলল, “আচ্ছা, তুমি কতগুলো সন্তান চাও?”এবার একটু বিরক্ত বোধ করলো অভিজিৎ। কী সব কথা বলছে দুর্গা। এর আগে বহুবার একটা কথা জিজ্ঞেস করেছে সে। অভিজিৎ একই উত্তর দিয়েছে। আজও তাই দিল।

_ “আমার দুটো হলে হবে।”
_ “দুটো নয়, আমার তিনটে চাই।” অভিজিৎ দুর্গার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। এখনো বিয়ে হয়নি আর সন্তানের চিন্তা। অভিজিৎ হেসে বলল, “তিনটা কেন তুমি যত চায় তত হবে। আমরা একটা ফুটবল টিম বানিয়ে ফেলবো।”দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠলো।

_ “বিয়ের পর আমি কি চাকরি ছেড়ে দেবো? দুর্গা বলল,
_ “না, তুমি তোমার চাকরি করবে। তাতে আমাদের কোন অসুবিধা নেই।

_ “তোমার মা কিছু বলবে না। উনিও তো নিশ্চয়ই চায়, বৌমা বাড়িতে থাকবে, রান্নাবান্না করবে। উনা কি এই বয়সে কাজ করতে চাইবে? উনি সেবা সুস্থতা চায় এই বয়সে।”
_ “কাজের মধ্য দিয়েও ওইগুলো করা যায়। নিজের স্বপ্নকে বাদ দিয়ে কখনো তুমি সুখে থাকতে পারবে না। স্বপ্ন আছে বলে মানুষ বেঁচে রয়েছে। স্বপ্নকে কখনো বিসর্জন দিও না।মেয়ে মানে বাড়িতে রান্নাবান্না করবে, শশুর শাশুড়ির দেখাশোনা করবে এমনটা নয়, তারাও পারে তাদের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে। তোমাকে তাই করতে হবে।”

_ “তাহলে তো ভালোই হলো। বিয়ের পর রোজ তুমি মোটর সাইকেলে বসিয়ে আমাকে অফিসে নিয়ে আসবে। আর আমি তোমার কাঁধে হাত রেখে পেছনে বসে থাকবো চুপটি করে। রোজ সকালে উঠে চা করে রুমে নিয়ে যাবো। তোমাকে ঘুম থেকে তুলব। তারপর তুমি বলবে আমি চা খাব না। আমি বলব কেন? তুমি বলবে, আমার অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। তখন আমি আবার বলব , দূর দুষ্টু মানুষ।”দুর্গা কথাগুলো বলে খিল খিল করে হেসে উঠল। তারপর আবার বলতে লাগলো,

“আমি ছুটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো, কিন্তু তুমি হাত ধরে টেনে ধরবে। তারপর…..”
_ “তারপর কি বল?”
_ “লজ্জা লাগছে তো।”
_ “তুমি আবার আমাকে লজ্জা পেতে কবে থেকে শুরু করলে।”অভিজিৎ একটু মৃদু হেসে বলল,

_ “এখন থেকে। তবে আরো একটা জিনিস বাকি থেকে গেছে। আমি যখন রান্না করবো তুমি তখন গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরবে কেমন।”
_ “তুমি তো সব সিনেমা থেকে কপি করে বলে দিলে। নিজে থেকে কিছু চাও না?”
_ “চাইতো, অনেক কিছু চাই। অনেক স্বপ্ন আছে আমার।সব পূরণ করব তোমাকে দিয়ে।”

অভিজিৎ এবার মুখটা জানালার দিকে ঘোরালো। ছোটবেলা মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মা সব সময় বলতো, আমরা যেটা মন থেকে চাই, যেটাতে অতিরিক্ত স্বপ্ন_আশা থাকে সেগুলো কখনোই পূর্ণ হয় না। গভীর জলে হারিয়ে যায়। তাদের জীবনে এমন স্বপ্ন হারিয়ে যাবে না তো?


পর্ব ১৯

অবশেষে বিয়ের দিন চলে এলো। সবাই বেশ হই হুল্লোর করে কাটাচ্ছে। অপরূপ সাজে সেজে উঠেছে অধিকারী বাড়ি।আগের সেই মাটির বাড়ি আর নেই। বাড়ি এখন পাকা এবং যথেষ্ট বড় হয়েছে। অতিথি আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখেননি অনিমেষ বাবু। গোটা বাড়িই রঙিন আলোয় আলোকিত হয়েছে। সামনে রয়েছে বড়ো গেট। বাগানেও করা হয়েছে প্যান্ডেল। সেখানেও নানা রঙে আলো দিয়ে সজ্জিত। একমাত্র কন্যার বিয়ে। আগে থেকেই কোনো খামতি রাখতে চাই নি অনিমেষ বাবু। বাড়ির চিৎকার_চেঁচামেচিতে মিউজিকের শব্দ ক্ষীণ হয়ে গেছে।

গত দশ দিন আগে পূজারিণী চৌধুরী পরিবার থেকে ফিরে এসেছে নিজের বাড়িতে। দশটা দিন কিভাবে কাটিয়েছে জানে না সে। প্রতিটা মুহূর্ত মিস করেছে শ্রাবনকে। কিন্তু সারা জীবন ওর পাশে থাকতে হলে দশটা দিন আলাদা হতেই হবে। আজ সেই দশদিনের অবসান ঘটেছে। আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা।তার পর সারা জীবনের জন্য শ্রাবণের হয়ে যাবে সে। ভাবতেও অবাক লাগে। একদিন যে মানুষটাকে জীবনের সবচাইতে বেশি ভয় পেত, আজ সে তার স্বামী হবে। তার সবকিছু অংশীদারে থাকবে শ্রাবণ।

হঠাৎ যেন তার সমস্ত স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেল। তার আর কিছু চাই না। শুধু শ্রাবণ হলে হবে। পাড়া_প্রতিবেশী প্রায় অনেকেই উপস্থিত রয়েছে পূজারিনীর বাড়িতে। নিজের অপমান লাঞ্ছনা আপাতত ভুলে গেছে। খাটের উপর চুপটি করে বসে রয়েছে পূজারিণী। হঠাৎ দরজা খুলে বেশ কয়েকজন মহিলা প্রবেশ করল। পূজারিণী প্রথমে চমকে উঠে, পরে নিজেকে সামলে নেয়। তারা শুধুমাত্র বউকে দেখতে এসেছে। বউয়ের সাজে তখনও পুরোপুরি সেজে উঠেনি পূজারিণী। তবে হাতে মেহেন্দি, গয়না পরানো, গায়ে হলুদ সম্পন্ন হয়েছে। পূজারিণী একদম পাশে বসে রয়েছে তার ছোটবেলার বন্ধু টিকলি। ছোটবেলা তার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া থেকে আড্ডা দেওয়া সবই ওর সাথে হতো।

টিকলি এখন বিবাহিত। সে পূজারিনীর হাতে শুকিয়ে যাওয়া মেহেন্দি তুলতে লাগলো। আর পূজারীর সাথে নানা ধরনের কথা আলোচনা করল। এই কয়েকদিন পূজারিণীও বেশিরভাগ সময় টিকলির সাথে কাটিয়েছে।এর মধ্যে একজন মেহেদীর রঙ দেখে দুষ্টুমি করতে লাগলো। মেহেন্দি রং একেবারে কালচে খয়রি। বাকিরা দুষ্টুমিতে তাল মিলাতে লাগলো। বাকি থাকল না টিকলিও। মেহেন্দি রং নাকি স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসার প্রতীক। সবার মুখে বাসর রাতের কথা। যত অশ্লীল কথা আছে সবই শুনাচ্ছে তাকে।

পূজারিণী বসে বসে সব শুনছে মন দিয়ে। একটুও লজ্জা পাচ্ছে না বরং ভালোই লাগছে। দুষ্টুমি করতে করতে ওদের মধ্যে একজন মাত্রা অতিরিক্ত ছাড়িয়ে গেল। সেটা কখনো কল্পনা করতে পারেনি পূজারিণী। এত কিছুর আনন্দে মধ্যে ছোট্ট একটা ক্ষীন কষ্ট ছিল তার বরকে নিয়ে। শ্রাবণকে বিয়ে করছে পূজারিণী। প্রথমে গ্রামে কেউই মেনে নেয়নি। পরে মেনে নিলেও তীক্ষ্ণ একটা আক্রোশ থেকে যায়।

তাদের বিশ্বাস পূজারিণীর সাথে শ্রাবণের শারীরিক একটা সম্পর্ক রয়েছে। না হলে একজন গায়িকা, কী করে একজন প্রতিবন্ধীকে বিয়ে করতে পারে? সেই আক্রোশ আরো বেশি বাড়িয়ে দিল একজন মহিলা। তিনি বললেন, “বাসর রাতের আবার কি প্রয়োজন? ওরা অলরেডি অনেক আগেই বাসররাত সেরে ফেলেছে।” উনার কথা শুনে কেউ চুপ হয়ে গেল আবার কেউ হাসাহাসি করলো। এটা মোটেও ভাল নিল না পূজারিণী। চোখ থেকে জল ঝরে পরলো। যে মানুষটাকে একবারের জন্য স্পর্শ করার সাহস হয়নি, সেই মানুষটার নামে কত বাজে বাজে কথা বলছে। সব সহ্য করে যাচ্ছে সে। সমস্ত অপমান জমিয়ে রাখছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যোগ্য জবাব দেবে। টিকলি ঠিক বুঝতে পারল পূজারিনীর কষ্ট।

টিকলির বিশ্বাস, তার বন্ধু আর যাই হোক এমন সম্পর্কে কখনো যাবে না। তবে সেও মন থেকে শ্রাবনকে মেনে নিতে পারে নি। পূজারিণী কত সুন্দর দেখতে আর কত বড় গায়িকা। আর সেখানে তার স্বামী হবে একজন প্রতিবন্ধী। যে কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবে না। স্ত্রীর সমস্ত দায়িত্ব নিতে পারবে না। কোথাও কখনো ঘুরতে যেতে পারবে না। একজন নায়িকার তো নায়কের মতো বর চাই। সেখানে নায়ক তো দূরের কথা, শ্রাবণ ঠিকঠাকভাবে কখনো দাঁড়াতেই পারবে না। আবার নিজেকে বোঝায় সে। বিয়ে তো সে করছে না।

বিয়ে করছে পূজারিণী। তার যেখানে অসুবিধা নেই, সেখানে এই সব কথা বলাই বৃথা। শ্রাবণের কাছে টিকলি থাকবে না, থাকবে পূজারিণী।তাছাড়া শ্রাবণও তো একজন মানুষ।তারও ইচ্ছে করে সংসার করতে। প্রতিবন্ধী বলে অবহেলা করা উচিত নয়।

সবকিছু থেকে যেটা মানুষ করতে পারে না সেটা করে দেখিয়েছে শ্রাবণ। তাহলে অসুবিধা কোথায়? প্রতিবন্ধী তো শ্রাবণ নয়। প্রতিবন্ধী আমরা। আমাদের সবকিছু থেকেও পারবো না বলে সরে আসি। কিন্তু শ্রাবণের অনেককিছু না থেকেও এগিয়ে গেছে। লড়াই করে গেছে। তাকে প্রতিবন্ধী বলা যায় না। প্রতিবন্ধী তাদেরকে বলা উচিত, যারা নিজেদের দায়িত্ব, কর্তব্য থেকে সরে আসে শুধুমাত্র অজুহাত দেখিয়ে। প্রতিবন্ধী তারা কখনোই হতে পারে না, যারা আজীবন ধরে লড়াই করে যায়। হেরে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে।

পরিস্থিতি সামলাতে টিকলি মহিলাদেরকে রুম থেকে বাইরে যেতে বলে। পূজারিণীর সাথে কিছু কথা আছে। মহিলারা বাইরে যেতে দরজা লাগিয়ে দিল টিকলি। পূজারিণীর পাশে বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো, “ওদের কথায় কান দিস না। ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দে। তুই শুদ্ধ, পবিত্র সেটা নিজে জানলেই হলো। অন্যের কথায় কী আসে যায়।”

_ “আমি কিছু মনে করি নি। আমি শুধু দেখছিলাম মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে।”
_ ” আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসছি।”

টিকলি উঠে বাইরে বেরিয়ে গেল। পূজারিণী চোখ থেকে আবার জল ঝরে পরলো।এক অজানা কারণে বারবার কান্না করতে ইচ্ছে করছে। সুখ যেন কিছুতেই থাকতে চাইছে না। একটু দেখা পেতে না পেতেই উড়ে যাচ্ছে। এই সময় কেবল একজনই তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে। একজন পারে তার মনকে ভালো করে খুশিতে ভরিয়ে দিতে। সে ফোন তুলে নিয়ে শ্রাবণকে কল করল। সাথে সাথে ওপাশ থেকে কল রিসিভ করল। শ্রাবণও যেন ওর কলের অপেক্ষায় ছিল।

বিপরীত পাশে থেকে পুরুষ কণ্ঠস্বর পূজারিণীকে থমকে দেয়। হ্যাঁ, এটাই তার শ্রাবণ। তার অস্তিত্ব। তার বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। কোন কিছুর বিনিময়ে ওকে ছাড়তে রাজি নয়। শ্রাবণের কণ্ঠস্বর পূজারিণীকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে বাধ্য করে। শ্রাবণ বুঝতে পারল না তার কান্না করার আসল কারণ কী? সে খুব ধীর কন্ঠে বলল, ” কিছু সমস্যা হয়েছে? আজকের দিনে এভাবে কাঁদছো কেন?”

_ “কই কান্না করছি?”
_ “আমিতো স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারছি।আমি কি কচি খোকা, কোনটা কান্না আর কোনটা হাসি বুঝতে পারবো না।” হাসির সুরে বলল শ্রাবণ।
_ “হ্যাঁ, তুমি কচি খোকা। এখনো বুঝতে পারোনি কোনটা আনন্দের কান্না আর কোনটা দুঃখের কান্না।”
_ “আচ্ছা বাদ দাও। এখন কল করলে কেন?”

_ “কল করলে অসুবিধা আছে বুঝি? বরকে কল করেছি অন্য কাউকে তো করিনি।”
_ “আমি তো এখনো তোমার বর হয়নি। তাছাড়া অন্য কাউকে কল করার ইচ্ছা আছে মনে হয়।”
_ “হ্যাঁ, আছে তো।”

_ “তাহলে ওর সাথে কথা বল। আমি রাখছি।”
_ “ধুর ভালো লাগে না। সব সময় ঘটির মতো কাজ।”

শ্রাবণ এবার মাথা চাপড়াতে লাগলো।মেয়েটি প্রতিটা কথায় ঘটি কেন ব্যবহার করে? এই ঘটির মানেটা কি? পূজারিণী কে বলে লাভও নেই। সে কিছুতেই ঘটির মানে বলবে না। শ্রাবনকে চুপ থাকতে দেখে পূজারিণী বলল, “তুমি তৈরী হয়ে নিয়েছো? বরের পোশাকে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে তাইনা!”শ্রাবণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তারপর বললো, “না, আমি এখনো তৈরি হয়নি। এখন সবে বিকাল যেতে অনেক বাকি।”

_ “ঠিক আছে! তাড়াতাড়ি আসবেন কিন্তু।” শ্রাবণ‌ হাসি আর থামিয়ে রাখতে পারল না। বউ বলছে বরকে তাড়াতাড়ি আসতে, বিয়ে করার জন্য। কি অদ্ভুত মেয়ে রে বাবা! অল্প বয়স তাই এমন করছে। বিয়ের পর অবশ্যই বুঝতে পারবে। বিয়ে করা যতটা মজা। বিয়ের পর দায়িত্ব কর্তব্য পালন করাও ততটা…..
রাতের দিকে কলকাতা থেকে গাড়ি ছুটতে লাগল মেদিনীপুরের দিকে। যদিও বরযাত্রী খুব কম।

কারণ শ্রাবণের আত্মীয়_স্বজন তেমন কেউ নেই।একমাত্র ছেলের বিয়েতে কোন খামতি রাখেনি অনন্যা দেবীও। তাছাড়া তার ছেলে কোন সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করছে না। বিয়ে করছে এ বছরের সেরা সংগীতশিল্পী অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী পূজারিণী অধিকারীকে। বর্ষা আজ গাড়ির ড্রাইভিং করছে না।

গোলাপি রঙের একটা টুকটুকে শাড়ি পরে বসে রয়েছে শ্রাবণের পাশে। দুজনের মধ্যে চলছে অদ্ভুত খুনসুটি। শ্রাবণের আনন্দে চোখে জল চলে এলো। উত্তেজনায় ছটফট করছে। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে।তার একঘেয়েমি মন আর থাকবে না। দুটো মন এক হয়ে যাবে। সত্যি ভাবতেও অবাক লাগে! বিবাহ নামক জটিল সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। হঠাৎ শ্রাবণ আর বর্ষা দুজন কিছু একটা আলোচনা করল, খুব ধীর কন্ঠে। তারপর দুজনের চোখে_মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত হাসি এবং ঘৃণা ও আক্রোশ। হয়তো কেউ কখনো এমন অদ্ভুত দৃশ্যে দেখেনি দুজনকে।

অবশেষে দুজনকে ছাদনা তলায় নিয়ে আসা হলো। লাল টুকটুকে জামদানি শাড়ি পড়ে রয়েছে পূজারিণী। বিয়ে মানে মেয়েদের কাছে একটু ভয় একটু লজ্জা থাকে। কিন্তু পূজারিনীর কাছে সেটা নেই। তার মধ্যে আনন্দের উচ্ছ্বাস বইছে। আসলে জীবনটা বড্ডো রকমের অদ্ভুত। কাছের মানুষকে কাছে পেলে কষ্ট কখনোই আসে না। যতই জীবনে দুঃখ_কষ্ট আসুক না কেন, কাছের মানুষ পাশে থাকলে সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা ভোলা যায়।

পূজারিণী ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। ভালোবাসার মানুষকে কাছে পেয়েছে। এর চাইতে সুখ আর কি হতে পারে! জীবনের সব চাওয়া সে যেন পেয়ে গেছে। তাই সে আজ এত খুশি। দু’জনকেই বেশ সুন্দর লাগছে। তবে পূজারিনীর চোখ শ্রাবণের ঘাড়ের দিকে। এত মানুষের ভীড়েও সে ঠিক ইশারা করে বুঝিয়ে দিলো ওর ঘাড় খুবই সুন্দর। পূজারিণী এমন দৃশ্য দেখে শ্রাবণ আর বর্ষা খিল খিল করে হেসে উঠল। এমন সময় ভাই বোনের খিলখিল করে হেসে ওঠা, অনেককে অবাক করে।তবে খনিকের জন্য। হিন্দু ধর্মের সমস্ত নিয়ম অনুযায়ী তারা একে অপরের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। শুভদৃষ্টি থেকে শুরু করে সাত পাকে বাঁধা সবগুলো সম্পন্ন হল।

“তাহলে অবশেষে পূজারিণী আর শ্রাবণের বিয়ে হয়ে গেল।”কথাটি বলে টেবিলের উপর খবরে কাগজ রেখে দিলো অভিক। অভিজিৎ বাবু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল, উনি একটু অন্যমনস্ক। এই প্রথম অফিসে দেরি করছে আসতে দুর্গা। এর আগে এমন কখনো হয়নি। সকাল থেকে ফোন রিসিভ করেনি। অভিজিৎ কে একটু চিন্তিত দেখে অভিক বলল, “স্যার, আপনি কি কিছু ভাবছেন?”

_ “না, আসলে আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।”
_ “মানে।”
_ “মানেটা খুব সোজা অভিক! এখানে এসেছিলাম ওই কেসের তদন্ত করতে। কিন্তু আজ প্রায় সাড়ে তিন বছর হয়ে গেল কিচ্ছু করতে পারিনি। মনে হয় আমার এখানে থাকা আর ঠিক হবে না।”

অভিজিৎ গালে হাত দিয়ে বসে রইল। অভিজিৎ এর সঙ্গে অভিকের পরিচয় অনেক বছর। কিন্তু কাজ মাত্র তিন বছর করেছে। তিন বছরে আরো অনেক আপন হয়ে গেছে অভিজিৎ। পুলিশের চাইতে সব সময় তারা বন্ধুর মতো থাকতো। অভিজিৎ চলে যাওয়ার পর কোন অফিসার আসবে তা কেউ জানে না। উনার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে কিনা তাও জানে না। তবুও উনাকে ছাড়তে হবে। সামনে বছরে অভিজিৎ অফিস ছেড়ে দেবে। শুধু থেকে যাবে আগের তিনজন_অভিক, দুর্গা, উৎপল।

ভাবতেই বুকটা চিনচিন করে উঠছে। এই মানুষটার সাথে কাজ করে মজাই আলাদা। কাজের পাশাপাশি খুনসুটিও বেশ চলত। হয়তো সেগুলো আর হবে না। অভিক মৃদু কণ্ঠে বলল, “কিন্তু স্যার আমরা এখনো তো ওই কেসের কিছুই করতে পারলাম না।”

_ “হ্যাঁ অভিক, ওটাই বড্ড যন্ত্রণা। ওই যন্ত্রনা আমাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারছে। জীবনে প্রথম কোনো কেস হেরে গেলাম। এতগুলো নিরীহ মানুষের হত্যাকারীর শাস্তি হলো না। আমার মনে হয়, এটা আমাদের কাজ না এটা সিবিআই এর কাজ। ওরা ঠিক খুনিকে বার করতে পারবে।”দুজন আবার চুপচাপ হয়ে গেল।

সত্যি কি তারা এই কেসের তদন্ত করতে ব্যর্থ। নাকি এর পিছনে রয়েছে বড় কোনো কারণ! খুনি ও বড্ড চালাক। এমন ভাবে হত্যা করেছে কিছু বোঝার উপায় নেই। আজ সাড়ে তিন বছরের মধ্যে কোন নতুন খুন হয়নি। খুনি কেন খুন করছে? খুন করার উদ্দেশ্য কি? সব অজানা। নিজেকে ব্যর্থ পুলিশ অফিসার মনে করছে। ওই ভাবেই কিছুক্ষণ বসার পর অভিজিৎ বলল, “সামনের মাসেই আমাদের বিয়ে। আমার একমাত্র বোনের বিয়ে। গোটা শহর দেখবে। আমার বন্ধুবান্ধব বলতে তেমন কেউ নেই। নিশ্চয়ই উৎপল আসবে না। তোমাকে সামলাতে হবে সবকিছু। পারবে তো সবকিছু দেখাশোনা করতে?”

_ _ “অবশ্যই পারব স্যার। আমার স্যারের বিয়ে বলে কথা। আমি বিয়ের পনেরো দিন আগে থেকে আপনার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হবো। না বলতে পারবেন না কিন্তু।” অভিকের কথা শুনে দুজনেই মৃদু হেসে উঠল। সেই সময় হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে প্রবেশ করল উৎপল। এত ঠান্ডার মধ্যেও গোটা শরীর ভিজে রয়েছে ঘামে। গায়ে পরে থাকা কোট খুলে গলায় জড়িয়ে রেখেছে। দেখে বোঝা যায় কান্না করে চোখ দুটো রক্তের মতো লাল করেছে। দুটো গাল ফুলে উঠেছে। চুলগুলো খুব এলোমেলো। ওকে দেখে দুজনেই আশ্চর্য হয়।

উৎপল এমনিতেই অফিসের দেরি করে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে আসে, তার প্রেমের কাহিনীর জন্য। কিন্তু আজ সম্পূর্ণ আলাদা।কিছু একটা ঘটেছে তার সাথে। অভিজিৎ তার কাছে গিয়ে বসলো। উৎপল কেঁদে যাচ্ছে। অভিজিৎ খুব মৃদু স্বরে বলল, “কি হয়েছে উৎপল? ওইভাবে কান্না করছো কেন?”উৎপল কিছু বলল না। অভিজিৎ কে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। উৎপল কে এমন অবস্থায় কেউ কখনো দেখেনি।

ছেলেটা কিছু একটা নিশ্চয়ই হারিয়েছে। অভিজিৎ তার পিঠে হাত চাপড়ে, কি হয়েছে শান্ত মাথায় বলতে বলল, উৎপল কাঁপা কাঁপা কন্ঠে এবার বলল, “স্যার, আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। দুর্গা কাল রাতে মারা গেছে।” মুহুর্তের মধ্যে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। অভিজিৎ বিশ্বাস করতে পারলো না। কাল রাতে দুর্গার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কলে কথা হয়েছে। আজ সে মৃত। এটা কল্পনারও বাইরে। অভিজিৎ সপাটে উৎপলের গালে চড় মারল।

“ইয়ার্কি মারার জায়গা পাও না। কার সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাও জানো না। ইয়ার্কির একটা লিমিট থাকা দরকার।” কথাগুলো বলে অভিজিৎ নিজেই কেঁদে উঠলো। এত বড় একটা ইয়ার্কি উৎপল নিশ্চয়ই করবে না। অভিকও তাই মনে করলো। তিনজনের চোখ থেকে অশ্রু ধারা বয়ে গেলো। উৎপল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি সকাল থেকে একটা ফাইল খুঁজছিলাম। কিন্তু ওই ফাইল আমার কাছে ছিল না, ছিল দুর্গা ম্যামের কাছে। উনাকে ফোন করি। উনি রিসিভ করলেন না। অফিস আসার সময় ওনার বাড়ির পথ ধরি।কিন্তু উনার বাড়ির কাছে গিয়ে যা শুনলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কাল রাতে দুর্গাকে কেউ খুন করেছে। নিস্তব্ধ দেহে দুচোখ শুধু উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।”


পর্ব ২০

নিথর দেহ সাদা চাদরে ঢাকা রয়েছে। মৃত্যুও দুর্গার এক চিলতে হাসি কেড়ে নিতে পারেনি। সুস্পষ্ট মুখে হাসির আবছা রয়ে গেছে। দুর্গার মাথার কাছে তার মা বসে রয়েছে। চোখে এক ফোঁটাও জল নেই। চোখ দুটো ধূসর। চারিদিকে নিস্তব্ধতার মধ্যে চাপা কণ্ঠস্বর এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। ভীর হটিয়ে অভিজিৎ প্রবেশ করল। সেও দুর্গার মাথার কাছে গিয়ে বসলো। দুর্গার সেই পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কদিন আগেই হাসি আড্ডা একগাদা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে ছিল। আর আজ সেই মানুষটা নেই।

চলে গেছে না ফেরার দেশে। চাইলেও ফিরিয়ে আনা যাবে না। অভিজিৎ এর চোখের নোনা জল দুর্গার গালে পরতে থাকলো। মেয়েটির জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল সে বিয়ে করবে, তার স্বামী হবে, বাচ্চা হবে। অভিজিৎ কে বার বার বলেছে বিয়ে করতে। আজ আর কেউ বলবে না বিয়ে করার জন্য। ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন আপন মানুষ হারিয়ে গেল সেটাও বুঝতে পারল না সে। নিজেকে আর কন্ট্রোলের মধ্যে রাখতে পারল না অভিজিৎ।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।তার কান্না দেখে উপস্থিত মানুষ আরো কান্নার রেস বাড়িয়ে দিল। দুর্গার নিথর দেহ বারবার নাড়িয়ে বলতে থাকলো, “এই দুর্গা! ওঠো না!ওঠো! এই দেখো আমি এসেছি। আমি অভিজিৎ! তুমি চাইছিলে না আমাদের বিয়ে হোক। আমি এখনই বিয়ে করব। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো। তোমাকে দেখে স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন কি জিনিস তা তুমি শিখিয়েছিলে।আর তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবে। কি নিয়ে বাঁচবো আমি? কি নিয়ে বাঁচবো বল

জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল অভিজিৎ। কিন্তু নিথর দেহ একবারের জন্যও নড়লো না। অভিক উনার পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কী বলে সান্ত্বনা দেবে তার জানা নেই। তবুও চেষ্টা করল। দুর্গা শুধু অভিজিৎ এর কাছের মানুষ ছিল না। অভিক দুর্গাকে নিজের বোন ভাবতো। কত আড্ডা দিয়েছে ওর সাথে। কিন্তু আজ থেকে আর দেওয়া যাবে না।

বড্ড আশ্চর্য! যে মানুষটার মৃত্যু হল সে কখনো জানত পারলো না তার মৃত্যু হবে। স্বপ্ন দেখেছিল নতুন সকালের, কিন্তু সেই সকাল আর দেখা হলো না। অফিস থেকে ফিরে বাড়ির একটু আধটু কাজ করে। মায়ের শরীর অসুস্থ থাকায় তিনি রান্না করেননি। মাকে চিঁড়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। নিজের জন্য অনলাইন থেকে পিজ্জা অর্ডার দেয়। কিন্তু কে জানত পিজ্জা কাল হয়ে দাঁড়াবে।

তার মধ্যে বিষ মেশানো রয়েছে। পিজ্জা নিয়ে হাসিমুখে খেতে থাকে। এক টুকরো খেতে না খেতে গোঙ্গানো শুরু করে। তার বীভৎস শব্দ শুনে মা রুম থেকে ছুট্টে বেরিয়ে আসে। মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। এইটুকু সময়ের মধ্যে কি ঘটে গেল? এক চামচ জল দিতে না দিতেই উত্তেজিত দেহ স্থির হয়ে যায়। সারারাত মেয়ের মৃতদেহের পাশে বসে কাটিয়ে দিলেন। কতবার বলেছিলেন, ওইসব পুলিশের চাকরি করতে হবে না।

ঐগুলোতে শত্রু তৈরি হয়। দেশে আরো অনেক কাজ আছে। এগুলো করুক। কিন্তু দুর্গা শুনেনি। নিজের পেশাকে ছাড়েনি। দেশের জন্য জাতির জন্য কিছু করতে চাইছিল। তার মায়ের দাবি, তার পেশাই তাকে কেড়ে নিয়েছে।
পরিবেশ কিছুটা শান্ত হওয়ার পর দুর্গার মা সবকিছু বলে অভিজিৎ কে।

দুর্গার মৃতদেহ ফরেনসিক ল্যাব এ পাঠানো হয় এবং পিজ্জা ডেলিভারি কারী ব্যাক্তির খোঁজ নিতে শুরু করে। মায়ের কথা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, দুর্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এটা নিছক মৃত্যু নয়। সবাই চুপচাপ রয়েছে এমন সময় উৎপল মাকে বলল, “আপনার মেয়ে শুধুমাত্র একটা পিজ্জা অর্ডার করলো কেন? আপনি রয়েছেন, আপনার একটা ছেলেও রয়েছে। ওদের জন্য করল না কেন?” উৎপলের প্রশ্ন শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। কান্নার রেস অনেকটা কমে গেল। দুর্গার মা চোখ থেকে জল মুছে বলল, “আমরা কেউই পিজ্জা খেতাম না। বাড়ির মধ্যে ওই একা খেতো।”

উৎপল অভিজিৎ এর দিকে তাকায়। সবার চোখেমুখে একটা উত্তেজনা ফুটে উঠল। পুরো ঘটনা পরিষ্কার। খুনি খুব ভালোভাবে দুর্গাকে চিনে। খুনি দুর্গার খুব আপনজন। সে খুব ভালোভাবে জানতো, পিজ্জা কেবল দূর্গাই খাবে। বাড়ির অন্য কেউ মুখেও তুলবে না। তাই সে পিজ্জাতে বিষ মিশায়। আর সে সূক্ষ্মভাবে হত্যা করে। কেড়ে নেয় একটা নিষ্পাপ প্রাণ। চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় সমস্ত স্বপ্ন।

“দুর্গার কোনো ভালো বান্ধবী ছিল!”স্বাভাবিকভাবে আবার প্রশ্ন করে উৎপল।
_ “না, তোমরা ছাড়া তার অন্য কেউ ভালো বন্ধু ছিল না। আর কেউ কখনও বাড়িতেও আসে নি।”

সবাই নিশ্চুপ। দুর্গার কোন বান্ধবী নেই। অথচ দুর্গার সমস্ত খবর জানে। কখন সে কি করে? কি খেতে ভালোবাসে? তার পরিবারের সদস্য কত? সবই তার জানা। এটা কি করে সম্ভব হতে পারে? নানা প্রশ্ন মাথায় আসছে, কিন্তু যুক্তির কাছে সেই সব প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। তখনই অভিক বলল, “স্যার একটা কথা বলব?”
_ “বল।”

_ “স্যার আপনার একটা কথা ঠিক মনে আছে কি আমি জানি না। তবে আমার খুব ভালোভাবে মনে আছে। দুর্গার সাথে বর্ষার খুব গভীর সম্পর্ক ছিল। সেটা দুর্গা বারবার স্বীকার করেছে।এমনকি বর্ষার গাড়িতে দুর্গা অনেকবার যাতায়াত করেছে।” সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। এবার আর কান্না নয়। যে খুন করেছে তার উপযুক্ত শাস্তির প্রয়োজন। নিরীহ মানুষকে হত্যা করার শাস্তি তাকে পেতেই হবে। অভিজিৎ আবার ভীষণ আশ্চর্য হল। একটা কেস বারবার ঘুরেফিরে সেই চৌধুরী পরিবারে আসছে। এই কেসের রহস্য একমাত্র চৌধুরীর পরিবারের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। সেটা উনি খুব ভালোভাবে অনুমান করতে পারলো।

“বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ওসব কিছু জানে। ওর মুখোশ এবার টেনে ছিঁড়ে বার করতে হবে। কতদিন আর এইভাবে ঘুরে বেড়াবে।” অভিজিৎ উত্তেজিত স্বরে বলল, চোখেমুখে রাগ, অভিমান সব বিদ্যমান। তাহলে কি ভালো মানুষের আড়ালে বর্ষার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটা অশরীরী রূপ। যেরূপ কেউ কখনো দেখেনি। অভিজিৎ আরো পুরোপুরি নিশ্চিত হয। যখন অভিক বলল, কয়েকদিন আগে ব্যস্ততার জন্য দুর্গা সিগন্যাল না মেনে রাস্তার মাঝখানে পাথর সরিয়ে বেরিয়ে যায়।

আর ফিরেও পাথরগুলো পূর্বের অবস্থায় রাখেনি। মাঝ রাস্তায় পাথর গুলো পড়ে থাকে।কথাটি শুনে অভিজিৎ প্রথমে চমকে ওঠে। কিন্তু পরে নিজেকে সামলে নেয়।সে নিশ্চিত, তার দিদিভাইর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একটার পর একটা হত্যা করে চলেছে। একজন মানুষ পাথর সরিয়েছে আর তাতেই তার দিদির মৃত্যু হয়েছে। এমন বীভৎস মৃত্যু যাতে কোন পরিবারের সাথে না ঘটে। সেই জন্য সে যে পাথর সরিয়ে ফেলছে, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।যাতে দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা না ঘটে।

কিন্তু পরক্ষনে উৎপলের যুক্তি অভিজিৎ যুক্তিকে হারিয়ে দিল। গতকাল রাতে শ্রাবণের বিয়ে ছিল। তাদের পুরো পরিবার সন্ধ্যে থেকে গ্রামে বেরিয়ে যায়।কলকাতা থেকে মেদিনীপুরে দূরত্ব প্রায় 130 কিলোমিটার।দুর্গার বাড়ি থেকে কলকাতার মেনরোড এবং মেদিনীপুর থেকে পূজারিনীর বাড়ি পর্যন্ত আরও কুড়ি তিরিশ কিলোমিটার হয়ে যাবে। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার উপরে রাস্তা।সেখানে দাঁড়িয়ে কিভাবে হত্যা করা সম্ভব? এক রাতে মেদিনীপুরে যেতে আবার সেখানেই ফিরে আসতে এবং আবার ফিরে যাওয়া সময় যথেষ্ট প্রয়োজন। প্রায় বারো ঘন্টা সময় সাপেক্ষ।অর্থাৎ অভিজিৎ এর অনুমান সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেউ ইচ্ছে করে বারবার চৌধুরী পরিবারকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। পুলিশও ওই পথে চলছে। মাঝখান থেকে বেঁচে যাচ্ছে খুনি।

রাত প্রায় একটার কাছাকাছি। পালঙ্কের উপর দুটো পায়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রয়েছে পূজারিণী। আজ মনটা যেমন ভীষণ প্রফুল্ল, তেমন দুঃখীও। মা বাবার জন্য মনটা বারবার কেমন হচ্ছে। আজ তাদের ফুলশয্যা। চারিদিকে রজনীগন্ধা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। শ্রাবণের আগের রুম আর নেই। সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।এই রুমের মধ্যে সব সময় শ্রাবণ আর বর্ষা থাকতো। পাশাপাশি দুটো খাটে দুই জন ঘুমাতো। কতরাত গেছে দুই ভাইবোন না ঘুমিয়ে কাটিয়ে ফেলেছে গল্প করে।

নিজেদের মতো রুম সাজিয়েছিল। কিন্তু আজ সম্পুর্ণ ভিন্ন। রুমের মধ্যে রয়েছে একটা বড় পালঙ্ক। বিছানার মধ্যে রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ। বর্ষার প্রায় সব ছোট_বড় জিনিস গুলো রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, গোটাকয়েক ফটো বাদে। ওই জায়গা গুলো পূর্ণ করে ফেলেছে পূজারিনীর নতুন জিনিস। তার পছন্দকে দাম দিয়েছে। তার মতো করে রুম সাজানো হয়েছে।আজ পর্যন্ত বর্ষা যে রুমে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারত, কাল থেকে হয়তো পারবে না। প্রবেশ করার আগে দরজায় নক করতে হবে।

যে দাদাভাই বর্ষার একটি কথা মর্যাদা সম্মান করতো। না বলত না। কাল তাকে ‘না’ বলতে শিখতে হবে। পৃথিবীর নিয়ম বড় আজব। যতই ভাই বোনের সম্পর্ক গভীর হোক। বিয়ের পর কিছুটা হলেও দূরত্ব বাড়বে।দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করতে করতে কখন কাছের বোন হারিয়ে যাবে, সেটা সে বুঝতেও পারবে না। হুইলচেয়ার গড়িয়ে রুমের মধ্যে প্রবেশ করল শ্রাবণ। তার মন ভারাক্রান্ত ও দুর্বল। রুমের মধ্যে এত কিছু পরিবর্তন দেখে তার চোখ রীতিমতো কপালে উঠে যায়।

পূজারিণী তাড়াতাড়ি পালঙ্ক থেকে নেমে এসে দরজা লক করে। তারপর শ্রাবনকে প্রণাম করে। শ্রাবণ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু সে শুনল না। রুমের মধ্যে এত কিছু পরিবর্তন শ্রাবণ ভালোভাবে নিল না। বিশেষ করে বর্ষার জিনিসগুলো অনুপস্থিতি দেখে। ওই সময় পূজারিণী বলল, “আপনি পালঙ্কে একা উঠতে পারবেন। না আমি একটু সাহায্য করবো।” শ্রাবণ কিছু বলল না। চুপ করে থাকলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, “দিদি ভাই কই?”

_ “উনিতো বাবার রুমে রয়েছে।” শ্রাবণ আবার কিছুক্ষণ চুপ থাকলো তারপর বললো, “পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও পূজারিণী। দিদিভাই ছাড়া আমি কখনো ঘুমোতে পারিনি। অন্তত আমাকে দশ মিনিট সময় দাও। আমি ওর কাছ থেকে একটু ঘুরে আসি।”

_ “দশ মিনিট কেন? আপনি দশ ঘন্টা গেলেও আমার আপত্তি নেই। বর্ষাদিদি তো আপনার সবকিছু। আপনি যান আমি অপেক্ষা করে থাকব।” পূজারিণী হাসিমুখে কথা গুলো বলে দরজা খুলে দিল। শ্রাবণ একটা ‘থ্যাঙ্কস’ জানিয়ে হুইলচেয়ার গড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পূজারিণী আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এলো। পুরো বাড়ি রংবেরঙের আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। ব্যতিক্রম ঘটেনি তার বাবার রুমও।

শ্রাবণ প্রথমে দরজার নক করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দরজায় হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায়। ভেতর থেকে দরজা লক করা ছিল না। বর্ষাকে কখনো এমন দায়িত্বহীন কাজ করতে দেখেনি সে। রুমের মধ্যে ঘন অন্ধকার। তারমধ্যে থেকে ভেসে আসছে একটি চাপা কণ্ঠস্বর। শ্রাবণ রুমের মধ্যে প্রবেশ করে আশ্চর্য হয়। বর্ষা কখনো এত অন্ধকারে থাকেনি। রাতে ঘুমানোর সময়ও আলো জ্বালিয়ে রাখতো। কিন্তু আজ অন্ধকার বেছে নিয়েছে। শ্রাবণ ‘দিদিভাই’ বলে ডাকলো। শ্রাবনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর অন্ধকারের বুক চিরে বর্ষার কানে পৌঁছোলো। বর্ষা ইতঃস্তত বোধ করে উঠে লাইট অন করল। রুম আবার আগের মতো আলোয় ভরে গেল। শ্রাবণ পুরোপুরিভাবে বর্ষার কাছে গেল। তারপর বলল, “কিরে মন খারাপ?”

_ “কই না তো।”
_ “তাহলে এতক্ষণ ঘুমাসনি কেন?”
_ “দীর্ঘ দিনের অভ্যাস তো। তুই না ঘুমালে আমি কখনো ঘুমোতে পারি না।ছাড়তে একটু সময় লাগবে। ইচ্ছে করছিল তোকে একটু দেখার। দেখা হয়ে গেছে এবার ঘুমিয়ে পড়বো।”

_ “যদি দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল তাহলে আমাদের রুমে গেলি না কেন?” শ্রাবণ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
_ “রুমটা আগের মতো আমাদের নেই। এখন থেকে ওটা তোর আর পূজারিণী।”
_ “এমন কথা একদম বলবি না। ওটা আমাদের ছিল সারা জীবন থাকবে।”

_ “তুই কি এত রাতে ঝগড়া করতে এলি! পূজারিণী রুমের মধ্যে একা রয়েছে। ওকে সময় দিবি যা। বর্ষা হাসির ছলে কথাগুলো বলল, কিন্তু বুকের মধ্যে পুরে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। সে চায় সব সময় তার দাদাভাই তার পাশে থাকুক। দাদাভাই অন্য কারোর হয়ে যাক সেটা সে চায়নি। কিন্তু তাকে বিয়ে করতে হবে। তার ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে শ্রাবণকে ছাড়তে বাধ্য। পৃথিবীর নিয়ম যতই কঠোর হোক তাকে মানতে হবে।

কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল বর্ষা। পাশে বসে রইল শ্রাবণ। আলতো করে মাথায় হাত বোলিয়ে দিতে থাকল।বর্ষা চোখটা বন্ধ করে রেখেছিল কিন্তু চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারল না। অশ্রুধারা বেরিয়ে এলো। শ্রাবণ চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “তুই বিয়ে করবি না?”
_ “হঠাৎ এমন প্রশ্ন….”

_ “এমনি, বল না!”
_ “না।”
_ “কেনো?”

_ “তোর ভালোবাসা অন্য কাউকে ভাগ দিতে পারব না।এই পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের চরিত্র আলাদা।তাই পৃথিবীতে এত বৈচিত্র্য দেখা যায়। আমার মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। একটা মানুষ যতই খারাপ হোক না কেন, ওর পাশে থাকতে থাকতে একদিন ওকে ভালোবেসে ফেলব। ওর প্রতি দায়িত্ব ভালোবাসা বাড়তেই থাকবে। আমি যদি বিয়ে করি। তাহলে আমি আমার স্বামীর কাছে থাকতে থাকতে একদিন ওকে ঠিক ভালোবেসে ফেলবো। তার ভালবাসায় আমি ডুবে যাব। আর তোর প্রতি ভালোবাসা কিছুটা হলেও কমে যাবে। এই কিছুটাও কমাতে চাই না আমি। আমি সবসময় তোর কাছে থাকতে চাই। আমার দাদাভাই হলেই আমার হবে।”

দুজনের চোখে মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। শ্রাবণ বর্ষার গালে একটা চুম্বন দিয়ে বলল, “এইজন্য তো আমি আমার দিদি ভাইকে এতটা বেশি ভালোবাসি। শ্রাবণও বর্ষা ছাড়া অচল। শ্রাবণের অবশ্যই বর্ষার প্রয়োজন।”
_ “অনেক হয়েছে। এবার বউয়ের কাছে যা। মেয়েটা হয়তো কান্না শুরু করে দিল। অনেক রাত হয়েছে আমিও একটু ঘুমিয়ে পড়ি।” হাসিমুখে কথা বলল বর্ষা। হুইলচেয়ার গড়িয়ে শ্রাবণ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বর্ষা এবার দরজা লক করে ঘুমিয়ে পরল।


পর্ব ২১

প্রায় দু’ঘণ্টা জেরা করার পর পিজ্জা ডেলিভারিকারীর মুখ থেকে যেসব ঘটনা বেরিয়ে এলো, সত্যি অভাবনীয়। ঘটনা পুরোপুরি প্ল্যানমাফিক করা হয়েছিল। একি জায়গা থেকে দুজন পিজ্জা অর্ডার করে। প্রথম জন একটি এবং দ্বিতীয়জন তিনটি। লোকেশনও একটা ছিল সিভি গার্লস হোস্টেল। দুর্গার বাড়ির প্রায় পাশেই রয়েছে সিভি গার্লস হোস্টেল। আশেপাশে বেশিরভাগ মানুষই এই লোকেশন ব্যবহার করে নিজেদের বাড়ির ঠিকানা বোঝাতে। ডেলিভারি কারীর দুজনকে পিজ্জা দেয়নি।
একজনকে চারটা পিজ্জা দিয়েছে। এখান থেকে বেশির ভাগ সময়ই গার্ল হোস্টেলের মেয়েরা পিজ্জা অর্ডার করে। ধারণা ছিল, চারটা পিজ্জা ওই মেয়েরা অর্ডার দিয়েছে। তাই সে একজনকে দিয়ে দেয়।

“আপনি এমন কিছু ঘটনা দেখেছেন? যেটা আপনার কাছে স্বাভাবিক ছিল না।” উৎপল স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করল। লোকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “হ্যাঁ স্যার, মেয়েটি একটাও কথা বলেনি। সব কথা ইশারা করে বুঝিছে। আমি ইচ্ছে করে ওকে দুর্গার পিজ্জা দেয়নি। ও নিজে থেকে নিতে চাইল।”

_ “আপনি তো বড্ড অদ্ভুত মানুষ। একজন মানুষ কথা বলছে না, ইশারা করে বোঝাচ্ছে। আপনার একটুও সন্দেহ হলো না। আর আপনি তাকে অন্যের অর্ডার দিয়ে দিলেন!” রাগান্বিত স্বরে কথাগুলো বলল অভিজিৎ। লোকটি এবার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তার ভুল হয়েছে সে বারবার স্বীকার করতে থাকলো। একটু কাঁদো কাঁদো গলায় সে আবার বলল, “স্যার, মেয়েটি বোরখা পড়ে ছিল। বোরখা উপর আবার সাদা চাদর জড়িয়ে রেখেছিল। হাতে গ্লাভসও ছিল।ভেবেছিলাম মেয়ে টি হয়তো মুসলিম পরিবারের আর সে পর্দা করে। তাই এত কিছু ভাবি নি।”

সবাই চুপ হয়ে গেল। কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে গেছে ভাবতেই অবাক লাগছে। ঘটনা পুরোপুরি সাজানো। অনেক আগে থেকেই দুর্গাকে হত্যা করার প্ল্যান চলছিল। দুর্গার ফোন থেকে পরিবার সব কিছুই তার জানা। সবকিছুতেই ছিল তার তীক্ষ্ণ নজর। কিন্তু কে ছিল ওই মেয়েটি? যে দুর্গার খুব আপন ছিল। খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছাড়া এমন ভাবে হত্যা করা সম্ভব নয়।

“আপনি চলে যান। আমাদের প্রয়োজন হলে আবার ডেকে নেব।”অভিজিৎ বাবুর কথা শেষ হতেই লোকটি উঠে চলে যায়। কিছুদুর যাওয়ার পর আবার ঘুরে আসে। লোকটিকে ঘুরে আসতে দেখে তারা অবাক হলো। তারপর উৎপল বলল, “কিছু বলবেন?”
_ “স্যার, কাল রাতে আরো একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল।”
_ “অদ্ভুত ঘটনা!”

_ “হ্যাঁ, আমি ওই গলির মোড় প্রবেশ করার আগে দুর্গাকে কল করি। আর উনি বলে একটু অপেক্ষা করতে। তিনি রুমের মধ্যে রয়েছেন।আর আমি কল রেখে সঙ্গে সঙ্গে মোড় ঘুরেছি।আর উনি এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রথমে আমি খুব আশ্চর্য হই, একজন মানুষ এত তাড়াতাড়ি কি করে আসতে পারে?”

লোকটি চুপ হয়ে গেল। অভিজিৎ ওকে বাড়ি যেতে বলল, লোকটির কোন দোষ নেই। অভিজিৎ উৎপলকে গাড়ি বার করতে বলে। দুর্গার বাড়িতে খুনের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। কেউ নয় কেউ ওই মেয়েটাকে রাতে দেখে থাকবে। সাধারণত লেডিস হোস্টেলের মেয়েরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। তারা কিছু নয় কিছু অবশ্যই দেখেছে। উৎপলকে ফোনের নাম্বারটি চেক করতে বলল, ওই নাম্বারটি কার? এই নাম্বার থেকে কোথায় কোথায় এবং কাকে কাকে কল করা হয়েছে? অবশ্যই জানা দরকার।সেখান থেকে মেয়েটাকে খুঁজে বের করা যেতে পারে। গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে দুজন যেতে লাগলো।

কাহিনীটা ঠিক এমন ভাবে সাজানো যায়। মেয়েটি দুর্গার খুব পরিচিত। আর সে সব কিছু জানতো। দুর্গা কোথায় যাচ্ছে? কি করছে? দুর্গা পিজ্জা অর্ডার দিয়েছিল। সেও পিজ্জা অর্ডার দেয়। দুর্গার আগে গিয়ে সে দুজনের পিজ্জা নিয়ে নেয়। আর দুর্গার পিজ্জাতে বিষ মিশিয়ে দেয়। ফেরার পথে মেয়েটির সাথে দুর্গার অবশ্যই দেখা হয়। আর মেয়েটি বলে, সে তার পিজ্জা নিয়ে চলে এসেছে। যেহেতু দুজন একি জায়গা থেকে পিজ্জা অর্ডার করেছিল। লোকটির সুবিধার্থে ওকে দিয়ে দেয়। দুর্গাও নিশ্চিন্তে পিজ্জা নিয়ে নেয়।মেয়েটিও দুর্গার খুব পরিচিত তাই সে সন্দেহ করার কোন সুযোগ পায়নি।কিন্তু দুর্গা কখনোই জানতো না তার প্রিয় মানুষটি তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

গাড়ি বেশ অনেকটা দূর চালিয়ে নিয়ে গেল। অভিজিৎ কিছু ভাবছে সঙ্গে উৎপল। এত ঠান্ডার মধ্যে দুজন ঘামিয়ে রয়েছে।এটা শুধু তাদের দায়িত্ব নয়, তাদের প্রিয় মানুষ তাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে। এতদিন এই কেস তাদের কাছে দায়িত্ব ছিল, কিন্তু এখন থেকে প্রতিশোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ হয়ে কত মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দিয়েছে। আজ যদি তার প্রিয় মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দিতে না পারে, তাহলে তার পুলিশ হওয়াটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এতদিন তার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা চূর্ণ_বিচূর্ণ হয়ে যাবে।

একজন ব্যর্থ মানুষ হবে যাবে। দুর্গার আত্মাও কখনো শান্তি পাবে না। তার প্রিয় মানুষ তার হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারল না। হত্যাকারী নির্বিধায় শহরের বুকে ঘুরে বেরিয়ে চলছে। অভিজিৎ বুক জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া। অন্যদিকে এই কেসে হেরে যাওয়া। নিজেকে সামলে নেওয়া বড্ড কঠিন। জানে না, এর পরে কেমন করে সে দিন কাটাবে। একদিন দুর্গাকে না দেখলে সারাদিন কাটাতে পারে না। বছরের পর বছর কী করে কাটাবে? গালে হাত দিয়ে ভেবে যাচ্ছে অভিজিৎ। উৎপল একটু হাসিমুখে বলল, “স্যার, আমার মনে হয় ম্যাম আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু লুকিয়েছে।”

অভিজিৎ সোজা হয়ে বসলো তারপর বললো, “হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ কি উৎপল?”

_ “আমরা ম্যামের সবচাইতে ভালো বন্ধু ছিলাম। কিন্তু উনি কখনো আমাদেরকে জানতে দেয়নি। এমনকি উনি নিজের মাকেও জানায়নি।কোন অপরিচিত মেয়ের দেওয়া পিজ্জা ম্যাম নিশ্চয়ই নেবেন না। যতই নিজে অর্ডার করুক না কেন, দুর্গা যথেষ্ট সাহসী এবং বুদ্ধিমতী। এত সহজে বোকা কাজ করতো না কখনোই। আর মেয়েটাও খুব ভালোভাবে জানতো দুর্গা কিছুতেই মাকে তার কথা বলবে না। বলে দিলে, ম্যাম মারা যাওয়ার পর মেয়েটা ফেঁসে যেতো।”

_ “তোমার কথা মোটেও অমূলক নয় উৎপল। দুর্গা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই লুকিয়েছে। কিন্তু কেন? তা আমার সত্যিই জানা নেই।
যখন একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে আঘাত করে।তখন আমরা সাধারণত আঘাতকারী মানুষকে দোষ দিয়ে থাকি। খুব সহজেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করি এবং ওর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি তুলি। কিন্তু উনি কি জন্য আঘাত করলেন? তার পেছনে আসল কারণ কি? সেটা কখনো ভাবি না। আঘাত কারীর পাশাপাশি যিনি আঘাত হয়েছেন তারও দোষ থাকতে পারে। আমরা সেটা কখনো ভাবি না। অবশ্যই আঘাত করাটা অন্যায়। তেমনি আঘাত করার পেছনে কারণটা জানাও আবশ্যক।

দুর্গার বাড়ির কাছে পৌঁছে অনেক মানুষের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করল। কিন্তু কেউ কিচ্ছু দেখেনি। ঠান্ডার মধ্যে এত রাতে বাড়ি থেকে সাধারণত কেউ বের হয় না। ঠান্ডার মধ্যে বাড়ির জানালা গুলোও বন্ধ করে রাখে। লেডিস হোস্টেলের মেয়েরাও একিভাবে জানালা বন্ধ করে রেখেছিল। তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসতে উদ্যত হয়।তখনই উৎপলের চোখে পড়ে লেডিস হোস্টেলের সামনে সিসিটিভি ক্যামেরা। ওই ক্যামেরায় কিছু নয় কিছু অবশ্যই পাওয়া যাবে।

অভিজিৎ আর উৎপল এক মুহুর্তও দেরি না করে ওদের কাছে যায়। প্রথমে যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজ হলো না। হোস্টেলেরও যথেষ্ট নিয়ম_কানুন রয়েছে। সেখানে প্রায় তিরিশ মিনিট দেরি হয়ে গেল। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের গায়ে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। দুজনেই অটোমেটিক কাঁপতে শুরু করেছে। মেয়েটি অনেক আগে থেকে জানতো সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। আর সেই ইচ্ছে করে সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে হাত বাড়িয়েছে। ইশারা করে বুঝিয়েছে তাকে কখনো ধরতে পারবে না। মেয়েটা নিজের দেহে একটু অংকও দেখায়নি। নিজের চোখ পর্যন্ত চশমা দিয়ে ঢেকে রেখেছে।

এমন সময় অভিজিৎ এর ফোন বেজে উঠল। একটু বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করল।অভিক করেছে। অভিকের মুখ থেকে যা শুনলো তাতে তাদের হার্টবিট দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। এই কেস কোথায় শেষ হবে কেউ জানে না। চোখে_মুখে ফুটে উঠল ক্লান্তির রেখা। ওই নাম্বারটা আর কারোর নয়। সেটা দুর্গার নাম্বার।ওই নাম্বারে দুর্গার আধার কার্ডের লিঙ্ক রয়েছে। দুর্গা একটা নাম্বার থেকে একটা পিজ্জা অর্ডার করেছে। আবার একটা নাম্বার থেকে তিনটা পিজ্জা অর্ডার করেছে। কিন্তু কেন? তার উত্তর কি আছে? উত্তর নেই। মেয়েটা আদৌ অন্য কেউ ছিল তো? না বোরখা পরা মেয়েটা আসলেই দুর্গা ছিল। নানা প্রশ্ন উঠে আসতে লাগল।

উষ্ণতায় মাধুর্যতা শ্রাবণ পূজারিণী ভালোবাসায় মেতে উঠেছে। রঙ্গিন রঙ্গিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তারা।ইতিমধ্যে বিয়ের বেশ কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফেলেছে। সম্পর্ক অনেক গভীর হয়ে উঠেছে।বেশ খানিকক্ষণ ধরে শ্রাবণ কয়েকটা ফাইল উল্টেপাল্টে দেখছে। আবার মাঝে মাঝে কিছু লিখছে। পূজারিণী কিছুটা দূরে বসে শ্রাবনকে দেখছে। আজব মানুষ! বিয়ে করেছে কোথায় বউকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাবে, গল্প করবে, ঐসব বাদ দিয়ে এখন কাজে মগ্ন। বিরক্ত হচ্ছে সে। কিছুক্ষণ এইভাবে বসার পর, শ্রাবণের কাছে এসে বসলো। দুজনের চোখাচোখি হতেই দুজন মৃদু হেসে উঠলো। তারপর খুব স্বাভাবিক কন্ঠে পূজারিণী বলল, “এই যে মশাই শুনছেন!”

_ “হ্যাঁ, শুনছি তো।”
_ “আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমি আপনার বউ। সেটা খেয়াল আছে তো!”
_ “হ্যাঁ আছে।”
_ “রক্ষে করলেন আমায়। অন্তত এইটুকু মনে রেখেছেন।”

শ্রাবণ পূজারিণী দিকে তাকালো। চোখেমুখে হাসির রেখা স্পষ্ট। মৃদু হেসে বলল, “ওই ভাবে কথা বলছো কেন?”
_ “বোলবো না কেন? তার কোনো রিজন রয়েছে? আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে কোথায় বউকে নিয়ে একটু গল্প করবেন……”
পূজারিণীকে থামিয়ে শ্রাবণ বলল, “গল্প শুনবে তো। আমি অনেক গল্প জানি। গোপাল ভাঁড় না ঠাম্মার ঝুলি গল্প শুনবে বলো।” পূজারিণী রেগে আগুন হয়ে গেল। গা হাত উসখুস বোধ করল। বড্ড ইচ্ছে করছে শ্রাবনকে কিল ঘুষি মারতে। নিজেকে একটু কন্ট্রোল করে বলল, “আমি কি কোনো দশ বছরের খুকি। আমাকে ঐসব গল্প শোনাবে। তুমি খুব আনরোমান্টিক।”

_ “আমি তো ওই সব গল্প ছাড়া অন্য গল্প জানি না।”
_ “কি আর করা যায়। যেমন বর পিয়েছি তেমন থাকতে হবে। বর চেঞ্জ করা গেলে, না হয় করে নিতাম।” হাসিমুখে কথাগুলো বলল পূজারিণী।
_ “তাহলে করে নিন। আমিও একটা ভালো মেয়ে দেখেছি। ভাবছি বউটাকে চেঞ্জ করে নেব।”

_ “কি!”
_ “কিছু না।” হা হা করে হেসে উঠল শ্রাবণ। তারপর দুজন কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকলো।

“আমি একটা ভালো গল্প জানি শুনবে।”শ্রাবণ পূজারিণী কে বলল,

_ “গোপাল ভাঁড়ের গল্প বুঝি!”
_ “না না, আমার মা ছোটবেলায় গল্প শোনাতো। ওই গল্পটা তোমায় শোনাতে চাই।” পূজারিণী আগ্রহ বেড়ে গেল। অনন্যা দেবীর কাছে রাতে ঘুমনোর সময় অনেক গল্প শুনেছে। খুব ভালো গল্প বলতে পারেন। শ্রাবণও নিশ্চয়ই ভালো গল্প বলবে। শ্রাবনকে তাড়াতাড়ি গল্প বলতে বলে। শ্রাবণ একগাল হেসে গল্প বলতে শুরু করে, “এক বস্তা নুন। আমার গল্প শুন। এত বড় দেশ। আমার গল্প শেষ।”

শ্রাবণ গল্প বলা শেষ হতেই মুখ নিচু করে হাসতে লাগলো। কিছুতেই সেই হাসি পূজারিণী সামনে প্রকাশ করল না। পূজারিণী ভাবতে লাগলো। এক লাইনে কি করে গল্প হতে পারে। এক লাইনের মধ্যে কিছু কী লুকিয়ে রয়েছে। অনেক ভাবনা চিন্তা করল। কিন্তু কোথাও কিছু খুঁজে পেল না। এক লাইন এর মধ্যে কিছু একটা রয়েছে। কিন্তু সেটা পূজারিণী বুঝতে পারল না। শ্রাবণের সামনে এমন ভাবে ভান করলো যেন সে সবকিছু বুঝতে পেরে গেছে।

পূজারিণী হাসি মুখে আবার একটা গল্প বলতে বলে।
” ‘গ’গেল গোপালপুর, ‘ল’ গেল লচ্ছোন পুর, ‘প’গেল পুরী আমার গল্প গেল সরি।” শ্রাবণ এবার না হেসে পারল না। সে হা হা করে হেসে উঠলো। পূজারিণী বুঝতে পেরে গেল গল্পের মধ্যে কোন মানে নেই। শ্রাবণ ততক্ষণ থেকে মজা করছিল। তার আগ্রহকে জলাঞ্জলি দিয়ে মজা করছে।পূজারিণী রেগে শ্রাবনকে কিল ঘুষি মারতে লাগলো। রাগে হাঁফাছে খুব।রেগে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখনই পূজারিণীর হাত ধরে টেনে আনলো শ্রাবণ। নিজের কোলে পূজারিণীকে বসিয়ে নিয়ে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরল।

দুজনের মুখ খুবই কাছাকাছি। দুজনেই দুজনের গরম নিঃশ্বাস ভালোভাবে অনুভব করতে পারছে। মুহুর্তের মধ্যে কি হয়ে গেল পূজারিণী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এর মধ্যেই শ্রাবণ পূজারিনীর গালে আলতো করে চুম্বন করল। পূজারিণী গোটা শরীর শিহরিত হয়ে উঠছে। সে খুব উত্তেজিত। এত তাড়াতাড়ির মধ্যে এতো কিছু হয়ে যাবে সে বুঝে উঠতে পারেনি। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। শ্রাবণ ওকে আরো কাছে জড়িয়ে বলল, “সামান্য এইটুকুতে রেগে যাও কেন? আমি তো শুধু মজা করছিলাম।”

পূজারিণী মুখ তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল। শ্রাবণ পূজারিনীর মুখে আংগুল ঠেকিয়ে বারণ করে। তারপর বলে, “ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কিছু করে। নিজের প্রাণ দিয়ে দেয়। আমি হয়তো নিজের প্রাণ দিতে পারবো না। কিন্তু আমার ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখার জন্য তোমার পেটে নতুন প্রাণের জন্ম দিতে পারব।”
পূজারিণী আরো বেশি লজ্জা পেয়ে গেলে। শ্রাবণের কথা বেশ ভালই লাগছিল। কত ভালো একটা মানুষ। খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে। শ্রাবনকে জড়িয়ে ধরল। মানুষটাকে যত আনরোমান্টিক ভেবছিলো ততটা মোটেও নয়। পূজারিণী একটু হেসে বলল, “বাইরে থেকে তোমাকে যতটা শান্তশিষ্ট মনে হয়, ততটা কিন্তু আপনি আদৌ নয়। ভেতরে ভেতরে খুব দুষ্টু আছো।”

_ “আমিতো জামা প্যান্ট পরে রয়েছে, ভেতরে কি করে দেখলেন?
_ “আবার শুরু করলেন।”
_ “আমি তো নিজের বউয়ের সাথে দুষ্টুমি করছি। অন্যের সাথে তো করছি না।”
_ “অন্যের সাথে করার ইচ্ছে আছে নাকি?”

_ “হ্যাঁ।”
_ “কার সাথে করার ইচ্ছে আছে শুনি।”
_ “পূজারিণীর সাথে।”দুজনে আবার হেসে উঠল। পূজারিণী শ্রাবনের দু গাল টিপে দিয়ে বলল, “তুমি ভয়ঙ্কর সুন্দর। ভয়ঙ্কর রকমের মানুষ।”


পর্ব ২২

রাতের অবসান ঘটিয়ে দিনের সূচনা হয়। দিনের পূর্ণ লগ্নে মানুষ দেখে হাজার রকম স্বপ্ন। কনকনে ঠাণ্ডা এবার শহরেও জাঁকিয়ে বসেছে। চারিদিকে কুয়াশায় ঢাকা। সূর্যের আলো‌ তা ভেত করে আসতে পারছে না। বেলা কত হয়েছে তাও বুঝার উপায় নেই। প্রত্যেকদিন সকালে উঠার অভ্যাস ছাড়তে পারেনি পূজারিণী। অনেক ভরে তার ঘুম ভেঙে গেছে। তবুও শুয়ে রয়েছে। শ্রাবণ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। তার বাঁধন ছেড়ে বেরোতে চায় না। কিন্তু ঘুমহীন চোখে অনেকক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকতে পারাও যায় না। উসখুস করতে লাগলো। অনেকক্ষণ পর শ্রাবণের ঘুম ভেঙে গেল। সেও কখনো এত দেরিতে ঘুম থেকে উঠেনি। বিয়ের পর একটু অভ্যাস বদলে গেছে। একটা লম্বা হাই তুলে বললো, “তুমি এখনো ওঠোনি? আর কত ঘুমাবে?” পূজারিণী শ্রাবণের গাল টিপে বলল, “এই যে মশাই! আমি তোমার অনেক আগে ঘুম থেকে উঠেছি। আপনার মতো আমি অলস নই।”
_ “অনেকক্ষণ থেকে উঠেছো তো এখানে কি করছিলে?”

_ “আপনি উঠলেন না, আমিও ঘুমিয়ে থাকলাম। বরকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না।”
_ “আমাকে এতটা ভালবাসো!”পূজারিণীকে কাছে টেনে নিল শ্রাবণ। দুজনেরই মুখমন্ডল একেবারে কাছাকাছি। একে অপরের চোখে নিজেদেরকে দেখতে পারছে। দুজনের চোখই রয়েছে অসম্ভব মায়া। ওই মায়া ছেড়ে কখনো বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দুজনেই দুজনের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করছে। পূজারিণী শ্রাবণের নাকে নিজের নাক লাগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো। আপনাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি।”
_ “কখনোই না। সারা জীবন তোমার পাশে থাকবো।

পূজারিণী শ্রাবণের কপালে আলতো করে চুম্বন করল। মুহুর্তের মধ্যে দুজনের শরীর ভয়ানক ভাবে কেঁপে উঠল। একটা উত্তেজনা কাজ করছে।পূজারিণী কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বলল, “এই বিশ্বে সমস্ত কিছুর বিনিময়ও আমি আপনাকে ছাড়তে পারি না। আপনি শুধু আমার পাশে থাকুন আর কিচ্ছু চাই না। আমি তোমাকে সব সময় ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখবো। কখনো কষ্ট পেতে দিবো না।”

দুজনেই নিশ্চুপ। একে অপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। না আছে লজ্জা, না আছে ভয়। ভিষন একটা উত্তেজনা রয়েছে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে মহাসমুদ্রে। এমন সময় বাইরে থেকে দরজায় টোকা পড়ল। তাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না। টোকা বর্ষা মারছে। দরজার বাইরে থেকে বর্ষা বলল, “এই যে মহারাজা আর মহারানী। আপনারা কি আজ ঘুম থেকে উঠবেন না! আমার কিন্তু অফিসের টাইম হয়ে গেছে। আমি ব্রেকফাস্ট করে নিলাম।” বর্ষার মজা করে কথা বলা বেশ ভালো লাগলো দুজনের। পূজারিণীও একটু মজা করে বর্ষাকে বলল, “রাজকুমারী একটু অপেক্ষা করুন। আমাদেরও হয়ে গেছে। একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো।

” ‘আমাদেরও হয়ে গেছে’এই কথাটি শুনে বর্ষা খিল খিল করে হেসে উঠল। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললো, “আচ্ছা মহারানী তাড়াতাড়ি আসুন।” বর্ষা বলে ছুটে চলে যায়। পূজারিণী খুব একটা মিষ্টি আর রোমান্টিক মেয়ে। তার কয়েকটি বাক্য সবার বুক ভরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কোন কিছুতেই তার অলসতা কিংবা একঘেয়েমি নেই। সব সময় হাসি খুশিতে থাকতে পছন্দ করে। আর এমন মানুষকে সবাই ভালবাসে খুব তাড়াতাড়ি। শ্রাবণের বাঁধন ছেড়ে পূজারিণী উঠে পড়ল।

গায়ে বসন এলোমেলো। মাথায় খোঁপা করা চুল খুলে গিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নিজেকে ঠিক করতে লাগল পূজারিণী। মুগ্ধ হয়ে শ্রাবণ এলোমেলো বসনে পূজারিণীকে দেখছে। দেখছে তার খোলামেলা চুল, তার মায়াবী চোখ। পূজারিণী আট চোখে শ্রাবণকে দেখলো। খিলখিল করে হেসে উঠলো।তার হাসিতে শ্রাবণ চোখ ফিরিয়ে নিল। পূজারিণী স্বাভাবিকভাবে বলল, “কি মশাই! চোখ ফিরিয়ে নিলেন কেন? আপনি তো আপনার স্ত্রীকে দেখছেন। অন্য কোন নারীকে দেখলে অসুবিধা হতো, কিন্তু নিজের স্ত্রীকে দেখাতে কোন অসুবিধা নেই।”

শ্রাবণ একটু ঘাবড়ে গেল। এই মেয়েটা সব কিছুই বুঝে যায়। বুঝলেও নিজের মধ্যে গোপন রাখে না। সবার সামনে প্রকাশ করে। শ্রাবণ একগাল হেসে বলল, “মোটেও না। আমি আপনাকে দেখতে যাব কোন দুঃখে?”
_ “আপনি কোন দুঃখে আমাকে দেখেছেন তা জানি না। তবে আপনি দেখেছেন। আর আপনার দৃষ্টিটা স্বাভাবিক ছিল না।

আপনার দৃষ্টি অন্য কিছু বলছিল।”
শ্রাবণ গালে হাত দিয়ে বসে থাকল। পূজারিণী তার স্ত্রী। তাকে সম্পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখার অধিকার রয়েছে। কিন্তু পূজারিণী কি করে বুঝলো তার দৃষ্টি স্বাভাবিক ছিল না। শ্রাবণ একগাল হেসে বলল, “আমার দৃষ্টি স্বাভাবিক ছিল না তা কি করে বুঝলে? তুমিও নিশ্চয়ই ঐ দৃষ্টিতে অন্য কাউকে দেখেছ!”

_ “হ্যাঁ দেখেছি তো। আপনাকে বহুবার দেখেছি। আপনি আমাকে গান শেখাতে আর আমি আপনাকে দেখতাম।” দুজন দুজনের চোখাচোখি হতেই হেসে উঠলো। মেয়েটি পারেও বটে। সব সময় হাসি খুশিতে থাকার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে পূজারিণীর। সকলের মধ্যে থাকে না। ক্ষমতা নিজেকে তৈরি করতে হয়। এটা একটা নিজের পার্সোনালিটি। এতক্ষণে পূজারিণী পোশাক_আশাক ঠিক করে ফেলেছে। মাথায় চিরুনি করে নিয়েছে।

“চলুন” বলে পূজারিণী এগিয়ে যাচ্ছে। তখনই পেছন থেকে শ্রাবণ ডেকে বলল, “আমাকে হুইল চেয়ারে বসে তো দাও। না হলে আমি কি করে যাব? পূজারিণী মাথায় হাত চাপড়ে মারে। হঠাৎ এতটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল কেন? এমন ভুল তো সে করে না। পালঙ্কের কাছে হুইল চেয়ার নিয়ে এলো পূজারিণী। তারপর শ্রাবনকে ধরে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিল। শ্রাবণের এলোমেলো হয়ে যাওয়া জামা ও চুল ঠিক করে দিতে লাগলো। শ্রাবণ মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখছে।

তার জীবনে এমন কিছু নারীর সন্ধান পেয়েছে। যারা কখনোই তার প্রতিবন্ধকতাকে বাধা হিসেবে দেখেনি। না চাইতে প্রচুর সাহায্য পেয়েছে। পেয়েছে অফুরন্ত ভালোবাসা। এতকিছুর মধ্যেও পূজারিনীর মধ্যে রয়েছে একটা চাপা কষ্ট। সে কষ্ট বোঝার ক্ষমতা কারোর নেই। শ্রাবনকে ঠিক করতে করতে কখন তার চোখের জল চলে এসেছে সে জানে না। তার চোখে জল দেখে শ্রাবণ বলল, “তুমি কাঁদছো?”

_ “কই নাতো।”
_ “তাহলে চোখে জল কেন?”পূজারিণী চোখের পাতায় হাত দিয়ে দেখল। অজান্তেই চোখ থেকে জল পড়ে গেছে। কিন্তু কেন? সে জানে না। অনেক ভাবতে লাগলো। ভাবনা চিন্তা করার পর বলল, “আপনি কি সত্যিই কখনো দাঁড়াতে পারবেন না? দুপায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবেন না?”শ্রাবণ নিশ্চুপ। তার কাছে কোন উত্তর নেই।একই প্রশ্ন পূজারিণী তাকে বারবার কেন করে। এমন প্রশ্ন শুনতে তার যচ ভালো লাগে না, সেটা কি পূজারিণী বোঝে না। শ্রাবনকে নিশ্চুপ দেখে পূজারিণী আবার বলল, “প্রত্যেক স্ত্রীর জীবনে অন্তত একটা স্বপ্ন থাকে। স্বামীর হাত ধরে ঘুরবে পায়ে পা রেখে হেঁটে চলবে। স্বামীর সাথে হেঁটে মন্দিরে যাবে…. আমারও একই স্বপ্ন আছে।”

শ্রাবণ স্তব্ধ হয়ে গেল। পূজারিণীর মুখে এমন কথা মানায় না। সে সবকিছু জেনেই শ্রাবনকে বিয়ে করেছে। বিয়ে করার আগে পর্যন্ত শ্রাবণ তাকে অনেক বুঝিয়েছে। তার পরেও এমন কথা কেন? শ্রাবণ নিজের প্রতি নিজেই ঘৃণা চলে এলো। সে একটু উত্তেজিত হয়ে বললো, “তুমি সব কিছুই জানতে। তারপরে তুমি বিয়ে করেছো।এখন এমন কথা তোমার মুখে মানায় না পূজারিণী।”

পূজারিণী কথাগুলো এমনি বলছিল। শ্রাবণ সেটা সিরিয়াসলি নিয়ে নেবে সে ভাবতে পারেনি। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য দ্রুত শ্রাবণের কপালে চুম্বন করল। তারপর বলল, “আমি কখনো আর এমন কথা বলবো না। আপনি যেমন, আপনি তেমনই থাকুন। আমার তাতেই আপনাকে পছন্দ।”

পূজারিণীকে বিয়ে করলেও শ্রাবণ আর বর্ষার মধ্যে একটুও দূরত্ব বাড়ে নি। তারা এখনো একসাথে সব কিছু আলোচনা করে। তাদের বিশ্বাস, ভাই বোনের ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যাবে না। শ্রাবণ আর বর্ষা টেবিলের এক পাশে বসেছে, আর একপাশে অনন্যা দেবী এবং পূজারিণী রয়েছে। নানা ধরনের কথা আলোচনা চলছে তাদের মধ্যে। দ্বিরাগমন সময় বেশি দিন গ্রামে থাকেনি পূজারিণী আর শ্রাবণ। পূজারিণী ইচ্ছা আবার একবার গ্রামে যেতে।

বাধা দেওয়ার মত তেমন কেউ নেই। তবুও বাড়ির পারমিশন খুবই জরুরী। খুব অল্পতেই পারমিশন পিয়ে গেলো। নানা কথা আলোচনা হতে একসময় বর্ষার বিয়ে নিয়ে কথা উঠলো। অনন্যা দেবী বর্ষাকে বিয়ে দিতে চায়। পূজারিণীও মার কথায় একমত হয়। শ্রাবণ নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু বর্ষা রেগে আগুন। সে কখনো বিয়ে করবে না। বাড়িতে বারবার জানিয়ে দেওয়ার পরও একই কথা কেন বলছে বারবার। তার এই সব ভালো লাগে না।

খাওয়ার থালা ছেড়ে উঠে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু দাদার করুন চোখের দিকে তাকিয়ে পারছে না। রাগান্বিত কন্ঠে বলল, “মা, আপনাকে আমি কতবার বলেছি, আমি বিয়ে করবো না। তবুও কেন বারবার জোর করো। আমার এগুলো ভালো লাগে না। তোমাদের যদি আমাকে নিয়ে অসুবিধা হয়। তাহলে বলে দিও। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। শুধু মাঝেমধ্যে একবার আসতে দিও। দাদাভাই কে না দেখে আমি থাকতে পারবো না……..”

বর্ষা আর কথা বলতে পারল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মুহুর্তের মধ্যে পরিবেশটা বদলে গেল। একটা চাপা বেদনা বেরিয়ে আসছে। পূজারিণীও কিছু বললো না।
“দিলে তো সবকিছু শেষ করে।সে বিয়ে করতে চায় না। তাকে জোর করার কি দরকার আছে! প্রত্যেক মানুষের ভালোলাগা ভালোবাসা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে দিদিভাইয়ের ভালোলাগা ভালোবাসা কেও সম্মান করা উচিত। আর দিদিভাই যদি কোনদিন এই বাড়ি থেকে চলে যায় তাহলে আমিও চলে যাব।

ওকে ছাড়া আমি কখনো থাকতে পারবো না।”খুব রাগান্বিত স্বরে কথাগুলো বলল শ্রাবণ। পূজারিণী আর‌ অনন্যা দেবী কিছু বললেন না। শুধু দেখতে লাগলেন। শ্রাবণ নিজে আর খেলো না। সে বর্ষা কে সান্ত্বনা দিলো। অনেকক্ষণ সান্ত্বনা দেওয়ার পর বর্ষা ঠিক বুঝলো। বর্ষাকে নিজের হাতে আর খেতে হল না। তাকে শ্রাবণ খাইয়ে দিল। বর্ষার মুখে আবারও ফুটে উঠল প্রসন্ন হাসি। শ্রাবণ একহাতে বর্ষার মাথায় হাত বোলাতে থাকলো, আর এক হাতে তাকে খাইয়ে দিল। অপর পাশ থেকে দুজন মুগ্ধ হয়ে ভাই_বোনকে দেখছে। এইভাবে অটুট থাকুক প্রত্যেক পরিবারের প্রত্যেক ভাই বোনের ভালোবাসা।


পর্ব ২৩

শ্রাবণ বেশ খানিকক্ষণ কার সঙ্গে ফোনে কথা বলে রেখে দিল। একরাশ ভালোবাসা নিয়ে পূজারিণীকে গান শিখিয়েছিল। আজ সেই পরিশ্রমের যোগ্য সম্মান পেতে চলেছে। পূজারিণী নতুন একটি মুভিতে তিন তিনটা গান গাওয়ার অফার পিয়েছে। এই মুভিতে গান গাওয়ার পর পূজারিণী একজন বড় সংগীতশিল্পী হয়ে উঠবে, তা আর বলার বাকি থাকে না। এখন শুধু পূজারিণীকে রাজী করাতে হবে। বড্ড ছেলেমানুষী সে। বিয়ের এই এক মাসে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে তার মধ্যে।

একদিনের জন্য প্র্যাকটিসে বসেনি। নতুন করে আবার প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে। শ্রাবণ পূজারিণীকে খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু পেল না।সে কয়েক মিনিটের আগেই গ্রামে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বেরিয়েছে। বেশ কয়েকদিন আগে শ্রাবণ আর পূজারিণী গ্রামে এসেছে বেড়াতে। নতুন ভাবে একে অপরকে চিনতে। নতুন ভাবে একে অন্যের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে নিতে।

“জামাই বাবা, তোমোর কি কিছো দরকার? (তোমার কি কিছু দরকার? ) বর্ণালী দেবী শ্রাবণের কাছে এসে বলল,
_ “না না, তেমন কিছু নয়। ওর সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল তাই খোঁজ করছিলাম।”
_ “ও এখনি চলে আসবে। ওই একটু বারিছি আর কি।আমি ঠিকঠাক প্রচলিত বাংলা ভাষা বলতে পারি না কিছু মনে করব না।”(একটুখানি বাইরে বেরিয়েছে। আমি ঠিকঠাক প্রচলিত বাংলা ভাষা বলতে পারি না, কিছু মনে করবে না)

শ্রাবণ হাসিমুখে না বলল, তারপর বর্ণালী দেবী শাড়িটা একটু পেঁচিয়ে নিয়ে চলে গেলেন। শ্রাবণ সেদিকে খেয়াল করলো। তাদের চলার ধরনও কিছুটা আলাদা। মেদিনীপুরের ভাষা বেশ মিষ্টি লাগছে তার কাছে। কিন্তু পূজারিণী কোথায় গেছে? তাকে একা রেখে দিয়ে নিজে ঘুরছে। এই তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসা। আবার নিজেও হেসে উঠে। ওকেও নিয়ে যেতে পারত।তারও গ্রাম দেখতে ভালো লাগে। ডিসেম্বরের শীত বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। ঠান্ডার মধ্যে পূজারিনীর বেরোনো উচিত হয়নি।

ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। পূজারিণী এমন ছেলেমানুষি দেখে শ্রাবণের বেশ ভালই লাগলো। একজন গায়িকা হয়ে তার মধ্যে কোন অহংকার নেই। গ্রামে আর সাতটা মানুষের মতো সেও তাদের সঙ্গে মিশে গেছে। এখনকার বেশিরভাগ সেলিব্রেটি তো একটু নাম হয়ে গেলে অন্যদের সাথে মিশতে চায় না। বাড়ি থেকে বের হতে চায় না। রোদে কিংবা বৃষ্টিতে ত্বক খারাপ হয়ে যাবে। নিজেদেরকে অনেক কিছু মনে করে। বেরোলে আবার থাকবে বডি গার্ড। সেখানে পূজারিণী পুরো ব্যতিক্রম।

বডিগার্ড তো দূরের কথা, খোলামেলাভাবে সবার সাথে মিসছে, কথা বলছে। এমনই একটা জীবনসঙ্গী চেয়েছিল শ্রাবণ। অবশেষে তা পূর্ণ হয়ে গেল। সন্ধ্যের দিকে পূজারিণী গোটা গ্রাম ঘুরে বাড়ি ফিরল। বাড়িতে এসে বেশ কয়েকটা জায়গায় আলো অন করল। পাকা বাড়ি হলেও ততটা আধুনিক কিংবা আভিজাত্যের ছাপ নেই। গ্রামের বাড়ির মতো তাদের বাড়ি।বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো।

তারপর একটা সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে শ্রাবণের কাছে এসে বসলো। নানা ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে থাকে শ্রাবণ। গ্রামে অনেক কিছুই জানতে পারে সে। কালকে শ্রাবনকে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখাবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়। কথায় কথায় শ্রাবণ নতুন গানের কথা বলে।

পূজারিণী চমকে ওঠে। সে এখন গান গাইতে চায় না। সদ্য বিয়ে হয়েছে। সে পরিবারের সাথে বেশ কয়েকটা মাস একই সাথে আনন্দে কাটাতে চায়। তারপর ক্যারিয়ারের কথা ভাববে। মানুষের জীবনে ক্যারিয়ার সবকিছু নয়। ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে যদি পরিবারের মানুষগুলোর ভালোবাসা পাওয়া না হয়। তাহলে জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে। এতদিন সে ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটেছে। সফল হয়েছে।ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে কাছের মানুষগুলোর ভালোবাসা অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে।

সেগুলো সে আবার নতুন করে ফিরে পেতে চায়। তারপর না হয় আবার ক্যারিয়ারের দিকে তাকাবে। মানুষের জীবন অনেক ছোট। একটা জীবন যেমন পুরোপুরি অলস ভাবে কাটানো উচিত নয়, তেমনই পুরোপুরি ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটে নষ্ট করাও উচিত নয়। জীবন মানে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নয়। জীবন মানে সম্পূর্ণ পরাধীনতাও নয়। জীবন মানে স্বাধীনতা এবং পরাধীনতার মাঝখানে আনন্দ খুঁজে নেওয়া। ছোট ছোট মুহূর্ত পরিবার বন্ধুদের সাথে কাটানো।

এই ছোট্ট জীবনে অন্তত নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। নিজেকে চেনা ভীষণ প্রয়োজন।পূজারিণীও তার জীবনটা তেমন ভাবে পরিচালনা করতে চাইছে। কিন্তু জীবন জীবনের মতো চলে। কারোর নিয়ন্ত্রণে সে কখনো নিয়ন্ত্রিত হবে না। তবে বদলানোও অসম্ভব নয়। শ্রাবণ অনেকবার চেষ্টা করে পূজারিণীকে গানের জগতে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু পূজারিণী কিছুতেই রাজি হলো না।অন্তত কয়েকটা মাস পরিবারের সাথে কাটাতে চায়। তারপর আবার সে তার পুরনো জীবনে ফিরবে।

শ্রাবণ বেশি জোর করেনি। পূজারিণীর কথায় যথেষ্ট যুক্তি ছিল।সারা জীবন ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে কাছের মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলার কোন মানে হয় না। পূজারিণী তো সারা জীবনের মতো নিজেকে গানের জগত থেকে সরিয়ে নিচ্ছে না। মাত্র কয়েকটা মাস নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। এই কয়েক মাসে হয়তো তার পপুলারিটি কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু সে তার পপুলারিটি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। শ্রাবণ মিউজিক ডিরেক্টরকে ফোনে না করে দেয়। পূজারিণী এখন গান গাইতে পারবে না। সে ব্যস্ত রয়েছে।

পূজারিণী শ্রাবনকে নতুন কিছু দেখানোর জন্য, তাদের বাগানে নিয়ে যায়। এত শিশিরের মধ্যে প্রথমে যেতে চায়নি শ্রাবণ।কিন্তু নতুন অ্যাডভেঞ্চারের লোভ ছাড়তে পারেনি। চারিদিকে কুয়াশার ছিয়ে রয়েছে। কোনো কিছু দেখার সাধ্য নেই। তারমধ্যে আকাশে বেশ কয়েকটা তারা মিটমিট করছে। এক ফালি চাঁদ উঠেছে। বেশ কয়েকটা জোনাকিও মিচমিচ করে আলো দিচ্ছে।আশেপাশে খড়কুটো এবং শুকনো পাতা ভিজে রয়েছে।তাই পূজারিণী বেশ খানিকটা শুকনো পাতা আর খড় নিয়ে এলো বাড়ি থেকে।ক

সাথে বেশ কয়েকটা বেগুন, ঢেড়স, আলু নিয়ে আসলো। পূজারিণী কি করতে চাইছে শ্রাবণ কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে বেশ ভালো লাগছে। নতুন একটা অ্যাডভেঞ্চার। অল্প সময়ের মধ্যে পূজারিণী শুকনো পাতায় আগুন ধরালো। তারপর আগুনে আলু, বেগুন, ঢেড়স ফেলে দিল। আগুন জ্বালানোর পরে পরিবেশটা বেশ গরম হয়ে গেলো। আগের মতো আর ঠান্ডা লাগছে না। আগুনের তাপে আশেপাশে কুয়াশাগুলো সরে গেল। ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

রোমাঞ্চকর এক পরিবেশ। শ্রাবণ বেশিক্ষণ হুইল চেয়ারে বসে থাকতে পারলো না। সেও আগুনের পাশে গিয়ে বসতে চাইলো। পূজারিণী সেটা ঠিক বুঝতে পারল। সে শ্রাবনকে হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে আগুনের কাছে বসালো। আরো ভালো ভাবে তাপ অনুভব করতে পারল। পূজারিণী বারবার প্রসন্ন হাসি দিচ্ছে। দুটো হাতে আগুনের তাপ মেখে নিয়ে নিজের গালে দিচ্ছে। আবার কখনো কখনো শ্রাবণের গালেও দিচ্ছে। শ্রাবণের আনন্দে চোখে জল চলে এলো।

গ্রামের মধ্যে এমন একটা অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধান পাবে সে কখনোই ভাবতে পারেনি। খোলা আকাশের নিচে কেউ কোথাও নেই। শুধু দুজন রয়েছে। একে অপরের স্নিগ্ধতা নিচ্ছে। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখে রয়েছে অসম্ভব মায়া। সেই মায়া থেকে দুজনের চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। বেশ খানিকক্ষণ পর পূজারিণী বলল, “জানেন, আমাদের গ্রামের মানুষ গুলো খুবই সাধারণ। তারা সবাই মিলেমিশে একসাথে থাকতে পছন্দ করে।

একে অন্যের বিপদে না চাইতেও উপস্থিত হয়। পুজোয় তাদের নতুন পোশাকের প্রয়োজন হয় না। শীতকালে গোলাভরা ধান আর বর্ষাকালে সমুদ্রের মাছ হলেই হল। এটাই তাদের জীবিকা। এইটুকু উপার্জনে তারা সন্তুষ্ট থাকে। তারা আর বেশি কিছু চায় না। অল্পতেই খুশি ওরা। এজন্য আমি আমার গ্রামেকে বড্ড ভালোবাসি।”
শ্রাবণ একটা প্রচন্ড হাসি দিল। তারপর বলল, “আমি ও তোমার গ্রামের প্রেমে পড়েছি।বিশেষ করে তোমাদের ভাষা। প্রত্যেক জায়গায় নিজের একটা আঞ্চলিক ভাষা থাকে। তবে আমার দেখা সেরা আঞ্চলিক ভাষা এই মেদিনীপুরের ভাষা। বড্ড আপন মনে হচ্ছে। বারবার আমি এই গ্রামে ফিরে আসব…..”

শ্রাবণ কথাগুলো বলে চলেছে। ইতিমধ্যেই আগুন অনেকটাই নিভে গেছে। তার তাপ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। পূজারিণী ওর মধ্যে রাখা আলু, ঢেঁড়শ, বেগুন খুঁজতে লাগলো। বেশ কয়েকটা খুঁজে পেল তবে সবকটাই কিছু অংশ পুড়ে গেছে। পূজারিণী সেইগুলো একটা জায়গায় গুটিয়ে রাখল। তারপর নিজে একটা খায় আর‌ একটা শ্রাবনকে দেয়। শ্রাবণ সেগুলোকে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। সেগুলো খাওয়ার উপযুক্ত থাকলেও এই ভাবে খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পূজারিণী খেয়ে যাচ্ছে। শ্রাবণকেও খেতে বলে। শ্রাবণ গম্ভীর কণ্ঠে বলে, “এমন ভাবে কেউ খায়? শরীর খারাপ করবে।”

_ “কিচ্ছু হবে না। আমি খাচ্ছি তো।”
পূজারিণী দেখাদেখি শ্রাবণও খেতে লাগলো। বেশি ভালো লাগছে না, আবার তেমন খারাপও লাগছে না। অর্থাৎ এক কথায় মন্দ বলা যায় না। একে অপরকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর খাচ্ছে। এর মধ্যে আগুন পুরোপুরি নিভে গেলো। আবার ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। শ্রাবণ ঠান্ডায় থর থর করে কাঁপছে। পূজারিণী নিজের চাদর খুলে শ্রাবনকে পরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে কি হয়ে গেল শ্রাবণ ঠিক বুঝতে পারল না। তবে অনুভব করতে পারল বেশ গরম অনুভব করছে।

কিন্তু পূজারিণী এত ঠান্ডার মধ্যে কি করে থাকবে। সেও মানুষ। তাকে অবশ্যই ঠান্ডা লাগবে। শ্রাবণ বলল, “তোমাকে ঠান্ডা লাগছে না? এইভাবে কেউ বসে। চলো বাড়ি ফিরে যাই।”পূজারিণী কিছু বলল না। শিশির ভেজা ঘাসে হাতটা মুছে নিয়ে শ্রাবণের কোলে গিয়ে বসলো। একটা চাদর দুজনে ডেকে নিল। শ্রাবণের কোলে গুটিসুটি হয়ে বসে রয়েছে পূজারিণী। বেশ গরম অনুভুতি হচ্ছে সাথে চরম এক অনুভূতি। এই অনুভুতির নাম নেই।

তবে এমন অনুভূতি বারবার চায়। শ্রাবণ পূজারিনীর ঘাড়ে কাছে মাথায় রেখে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। পূজারিণী গোটা শরীর শিরশির করে উঠল। গোটা শরীর কাঁপুনি দিচ্ছে। তবুও সে শ্রাবনে বাঁধন ছেড়ে যাবে না। শ্রাবনের খোঁপা খোঁপা দাঁড়ি তার ঘাড়ে লাগছে। চরম উত্তেজনায় পূজারিণী চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ থেকে জল ঝরে পড়ছে। চারিদিকে নিস্তব্ধ পরিবেশ। শিশির গুলো আবার তাদের মাথায় এসে পড়তে শুরু করেছে। চারিদিকে ঘন কুয়াশায় ঢাকা। তার মধ্যে দুজন একে অপরের ভালোবাসায় বেঁধে রয়েছে।

সময় গতিশীল। সময়ের সাথে কেউ তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলে কেউ বসে থাকে। মানুষ উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য। উপযুক্ত সময়ে উপস্থিত হয় কিন্তু অনেক স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। কেউ কেউ স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের পরিশ্রম বা নিজের আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বাস করে। আবার কেউ নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করে। অভিজিৎ বাবু নিজে‌ কী বিশ্বাস করেছিলেন তা জানা নেই। তবে তার স্বপ্ন পূরণ হলো না। নির্দিষ্ট দিনে উৎপল আর ঋতু বিয়ের পিঁড়িতে বসল।

একই দিনে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল অভিজিৎ আর দুর্গার। কিন্তু তা হলো না। ভাগ্য তাদের প্রতি সহায়ক ছিল না। এত আনন্দের মধ্যেও একটা চাপা কষ্ট তার বুকটাকে পুড়ে ছারখার করে দিচ্ছে। কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। নিস্পলক দৃষ্টিতে উৎপল আর ঋতুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এইভাবে তাকিয়ে থাকা মোটেও ভাল দেখাচ্ছে না।উৎপল আর ঋতু যখন সাত পাকে বাঁধা পড়ল তখন সবাই হৈ হুল্লোর করে আনন্দ করলো আর ওদের দিকে ফুল ছুঁড়তে থাকলো।

অভিজিৎও ফুল ছুঁড়ল। কিন্তু সে সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না। বারবার বুকটা কেঁপে উঠছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে দুর্গার মুখশ্রী। কি মায়াবী চোখ। কতবার বিয়ে করার কথা বলেছিল, সেদিন যদি তার কথায় বিয়ে করে নিতো তাহলে অন্তত কয়েকটা দিন তার সাথে সংসার করতে পারত। দুর্গার একটা স্বপ্ন পূর্ণ হতো। হয়তো অকালে তাকে চলে যেতে হতো না। ভাগ্য সম্পূর্ণ উল্টো দিকে যেতে। যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন দেখেছিল। আজ সেই মানুষটা নেই। ভাবতেও অবাক লাগে।

বিয়ের বেশ কিছুক্ষণ পর অভিক অভিজিৎ বাবুকে খোঁজ করতে লাগলো। তাকে কেউ কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। এমন সময় অভিজিৎ কোথায় যেতে পারে? তিনি কখনো এমন দায়িত্বহীন কাজ করে না। আজও করবে না। বেশ কয়েকদিন ধরে অভিজিৎ নেশা জাতীয় বস্তু সেবন করতে শুরু করেছে। এমন নেশা করলে তার চাকরি যে থাকবে না সেটা হয়তো তিনি ভুলে গেছেন। অভিক ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। তার আশঙ্কা অমূলক নয়।

নির্জন রাস্তায় এক পাশে চুপচাপ বসে রয়েছে। তার দৃষ্টি বলে দিচ্ছে সে মদ্যপাণ করেছে। চোখেমুখে ভাবান্তর। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একা হাসছে। সে এক জন ব্যর্থ প্রেমিক। অভিক তার পাশে গিয়ে বসল। কাঁধে হাত চাপড়ে বলল, “স্যার, বাড়ি ফিরে চলুন। ওখানে অনেক আত্মীয়_স্বজন অপেক্ষা করে রয়েছে।”
অভিজিৎ চুপ। অভিকের উপস্থিতি সে খেয়াল করতে পারেনি। সে তাকিয়ে রয়েছে খোলা আকাশের তারার দিকে।

তারা গুলো তাকে কিছু বলছে। কোনো মানুষ কখনো সারা জীবন পাশে থাকে না। একা থাকতে শিখতে হয়। একা চলতে শিখতে হয়। একা থাকার মধ্যেও অদ্ভুত আনন্দ রয়েছে। সেই আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। রাতের আকাশের চাঁদ একা থাকে। তার কেউ নেই। অন্যের আলোয় আলোকিত। তবুও সে খুশি। সবাই রাতের চাঁদকে ভালোবাসে।
_ “স্যার, বাড়িতে সমস্ত আত্মীয়_স্বজন অপেক্ষা করে রয়েছেন। চলুন……”

অভিজিৎ হাসলো। হাসতে হাসতে বলল, “আমার আবার আত্মীয়_স্বজন। আমার কেউ নেই অভিক। আমি একা, আমি নিঃস্ব। গ্রীষ্মকালে খোলা আকাশের নিজে একটা বটগাছ যেমন নিঃস্ব, একা আমিও ঠিক তেমন। আমার আকার আকৃতির বৃহৎ, কিন্তু আমি আমার পাতা ঝরিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি।” অভিজিৎ চোখ থেকে জল ঝরে পরলো কথাগুলি বলতে বলতে। আবার নিজের চোখের জল মুছে নিজেই হাসলো।

অভিক একটু করুন স্বরে বলল, “স্যার, দিনের শেষে ওই বটগাছ কিন্তু একজন পথিককে বিশ্রামের জন্য ছায়া দেয়। ওর ছায়ায় কোনো পথিককে প্রাণ দেয়।”দুজনেই চুপ হয়ে গেল। একে অপরের দিকে তাকালো। অভিজিৎ কে উঠতে না দেখে অভিক আবার বলল, “স্যার আপনি একবার নিজের বোনের কথা ভাবুন। উৎপল যতই আপনার বন্ধু হোক না কেন, ওর নিজের একটা পরিবার রয়েছে। তার পরিবার যদি আপনাকে এই অবস্থায় দেখে।

তাহলে তারা কি ভালোভাবে নেবে? কখনোই নেবে না। চলুন স্যার বাড়ি ফিরে যাই।”অভিজিৎ কোন কথা বলল না। আরো বেশ খানিকক্ষণ বসে রইল ওইখানে। তারপর একসময় দুজনে হেঁটে বাড়ির পথে রওনা দিল। যেতে যেতে অভিজিৎ বলল, “আমরা যখন বন্ধু ছিলাম তখন কত সুখে ছিলাম। একে অপরের বিপদে সব সময় ছুটে যেতাম। সব সময় হাসি মজা করে কাটিয়ে দিতাম। একদিন জীবনে প্রেম এলো আর সব হারিয়ে গেল;তাই না অভিক!” অভিজিৎ টলমল করছে। অভিক উনাকে ভালোভাবে ধরল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “স্যার, বন্ধুত্ব হলো চরম এক সুখের জিনিস। তাকে কখনো হারিয়ে দিতে নেই।

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ প্রেমে পড়লে তা হারিয়ে ফেলে। প্রেমের আগে পর্যন্ত তারা বন্ধুত্ব রাখা চেষ্টা করে একে অপরের মধ্যে।কিন্তু প্রেম করার পর সেটাকে তারা পাত্তা দেয় না। তারা যদি প্রেমের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেই সম্পর্ক আরো অনেক মধুর হয়ে উঠবে।”


পর্ব ২৪

সকাল সকাল বাড়ির কলিংবেল বাজতে শুরু করেছে। এত ঘনঘন কলিংবেল হয়তো এর আগে কখনো বাজেনি। কলিং বেলের শব্দে পূজারিণীর প্রথমে ঘুম ভেঙ্গে গেল। এত সকালে কে আসতে পারে? তেমন কেউ আসার কথাও নয়।সে ইতস্তত বোধ করে শ্রাবণ কে ডাকলো। শ্রাবণ স্বচক্ষে বলে, খবরের কাগজ সম্ভবত দিতে এসেছে। তারপর সে আবার জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেল। পূজারিণী একটু হতভম্ব হয়ে উঠে আসে।

এত সকালে সে কখনো উঠিনি। খবরের কাগজ সব সময় বাড়ির গেটের সামনে রেখে দিয়ে যায়। তাহলে আজ কলিং বেল বাজাচ্ছে কেন? এত সকালে বর্ষা আর অনন্যা দেবীও ঘুম থেকে ওঠেনি। তারা কখনও এমন করে না। ঠান্ডার জন্য হয়তো বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে রয়েছে। পূজারিণী দরজা খুলে বাইরে বের হলো। তেমন কিছু ভয়ের নেই। খবর কাগজ দিতে এসেছেন। পূজারিণীকে দেখে লোকটি চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার হাসি কারণ পূজারিণী ঠিক বুঝতে পারল না। পূজারিণী তার কাছে গিয়ে খবর কাগজ নিল। পূজারিণী ফিরে আসছিল এমন সময় লোকটি ‘ম্যাম’বলে ডাকলো। পূজারিণী পিছনে ঘুরে হাসিমুখে বলল, “কিছু বলবেন?

_ “আসলে ম্যাডাম একটা অটোগ্রাফ….”

পূজারিণী ভীষণ খুশি হলো। সকাল_সকাল এমন একটা সুন্দর দৃশ্যের সন্ধিক্ষণে সাক্ষী থাকবে, সে ভাবতে পারেনি। লোকটি অটোগ্রাফের জন্য কলিং বেল বাজিয়ে ছিল। পূজারিণী অটোগ্রাফ দিয়ে ছুটে রুমে চলে আসে। এতটা দ্রুত ছুটে গেল যে, সে হাঁফাতে লাগলো। এতক্ষণে শ্রাবণ ঘুম থেকে উঠে পরেছে। বিছানার উপর বসে ছিল। পূজারিণী এত জোরে ছুটতে দেখে অবাক হলো।

_ “বাচ্চা মেয়ের মতন গোটা বাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছো কেন? পড়ে যাবে তো।”
পূজারিণী শ্রাবণের প্রশ্নের উত্তর দিল না।সে চুপচাপ শ্রাবণের কোলে গিয়ে বসলো। বড্ড ছেলে মানুষ সে। যখন যা ঘটবে সে ছুটে গিয়ে শ্রাবণের কোলে বসবে। শ্রাবণ তার সবকিছু। শ্রাবণের কাছ থেকে সে কখনো কোন কিছু লুকোই নি। আজও লুকালো না। শ্রাবণকে সব কিছু বলল, শ্রাবণ বড্ড খুশি হলো। পূজারিণী কে জরিয়ে ধরল। নিজের মুখ খানা পূজারিনীর ঘাড়ের কাছে নিয়ে গেল। তার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি পূজারিনীর ঘাড়ে লাগছে। তবুও পূজারিণী কিছু বলছে না। শুধু হেসে যাচ্ছে। শ্রাবণ একটু অবাক হয়ে বলল, “এই যে রূপবতী! আমার দাড়ি তোমার ঘাড়ে লাগছে, তুমি বিরক্ত বোধ করছো না!”

_ “না, আমার ভালই লাগছে। এমন যদি সারাদিন বসে থাকো তাহলেও অসুবিধা হবে না। আরো যদি কিছু নতুন চাও তাহলেও……”
পূজারিণী খিল খিল করে হেসে উঠল সাথে শ্রাবণও।
_ “তোমার মাথায় কি সবসময় দুষ্টুমি ঘুরে? এমনি সাধারণ ভাবে কথা বলতে পারো না।”

_ “এই ছোট্ট জীবনে হেসে খেলে কাটিয়ে দেওয়াই ভালো।”
_ “এই যে তুমি যখনতখন ছুটে এসে আমার কোলে বসে যাও। আমাকে কিল ঘুষি মারো। যখনতখন কিস করে বসো। আমি তো তোমার উপর রাগ হতে পারি, বিরক্তবোধও করতে পারি।”শ্রাবণ খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললো। পূজারিণী কিছু একটা বলো। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, “আমার উপর রাগ করতেই পারেন। তাতে আমার অসুবিধা নেই। রাগ তো তারাই করে যারা অপরজনকে ভীষণ ভাবে ভালবাসে।কাছের মানুষগুলোর রাগ অভিমান আসলেই রাগ অভিমান নয়। ওইগুলো ভালোবাসা।”

পূজারিণী থামল। এখনো একই অবস্থায় দুজন বসে রয়েছে। শ্রাবণ বিছানা থেকে লেপ তুলে নিয়ে দুজনের গায়ে জড়িয়ে নিল। এবার বেশ গরম অনুভব করছে। একে কোলে বসে রয়েছে তার উপর গায়ে রয়েছে লেপ। পূজারিণী মৃদু হেসে উঠল। সে শ্রাবণের আরো কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সম্ভব নয়। সে যথেষ্ট বড়। সেখানে শ্রাবণের কোলে বসা সম্ভব নয়, আর সে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পূজারিণী আবার বলতে শুরু করল।

“জানেন, যখন ছোট ছিলাম তখন রোজ মায়ের হাতে বানানো নারকেল নাড়ু চুরি করে খেতাম। একদিন খুব ভালোভাবে লক্ষ করলাম। মা সবসময় নারকেল নাড়ু নিচে রাখে। উপরে কখনো রাখতো না। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, মা সবসময় নারকেল নাড়ু নিচে রাখেন কেন? মা‌ সেদিন হাসিখুশিতে বলেছিল, নারকেল নাড়ু যদি ওপরে রাখে তাহলে আমার হাত পাবে না। আর আমি চুরি করে খেতে পারব না। আমি সেদিন বড্ড অবাক হয়েছিলাম।মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম।

আসলে ভালবাসার মানুষগুলো এমনই হয়। শাসনের আড়ালে লুকিয়ে রাখে অফুরন্ত ভালোবাসা। আপনিও ঠিক তেমন। এখানে মা নেই, আপনি রয়েছেন। তাই আপনার সাথে দুষ্টুমি করছি।”

পূজারিণী চোখ ছল ছল করে উঠলো। তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেছে। যেকোনো মানুষের মন ভালো করার জন্য ছোটবেলার স্মৃতি যথেষ্ট। কিন্তু ছোটবেলার কিছু কিছু স্মৃতি থাকে যেগুলো সত্যি বেদনাদায়ক। এমন স্মৃতি পূজারিনীর জীবনেও রয়েছে। শ্রাবণ তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “যাও ব্রেকফাস্ট বানাও। প্রচুর খিদে পেয়েছে।”
_ “এভাবে বসে থাকতে বুঝি কষ্ট হচ্ছে?”

_ “মোটেও না। সারাদিন বসে থাকতেও রাজি আছি। কিন্তু বাড়ির অন্যান্য কাজ তো আছে। ওই গুলো করতে হবে। তুমি ব্রেকফাস্ট বানাও। আমি একটু দিদি ভাইয়ের কাছ থেকে আসছি।”
_ “আচ্ছা যান। এত বেলা হয়ে গেছে কিন্তু বর্ষা দিদি এখনো ওঠেনি। উনাকে আমি এত দেরি করে উঠতে কখনো দেখিনি।”
_ “আমি গিয়ে ডেকে দিচ্ছি। হয়তো কাল রাতে ঘুমোতে দেরি করেছে।”

বর্ষার রুমের দরজা খোলা। শ্রাবণ নির্বিধায় রুমে প্রবেশ করল। অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে পরেছে বর্ষা। সে এখন নিজের রূপ চর্চায় ব্যস্ত।
“রাজকুমারী! এতক্ষণ রুমের মধ্যে কি করছিস? বাইরে যাসনি কেন?”যখন হাসিমুখে বর্ষাকে কথাগুলো বলল শ্রাবণ। বর্ষা ঘুরে দেখল তার রুমে শ্রাবণ এসেছে। তার পোশাক_আশাক, মাথার চুল এলোমেলো। শ্রাবণকে দেখে হাসলো। হেসে হেসে বলল, “নতুন বিয়ে করেছিস।সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে নিজের মুখটা আয়নায় দেখবি তারপর বেরোবি। না হলে কিন্তু বিপদ আছে।”

_ “কেনো?”
_ “নিজের মুখটা আয়নায় দেখলেই বুঝে যাবি।”
বর্ষা কি বলতে চাইছে শ্রাবণ বুঝে গেল। দুজনে মিটমিট করে হেসে উঠলো। তারপর শ্রাবণ হুইল চেয়ার ছেড়ে বর্ষার খাটে উঠে বসলো। বর্ষা হাতে নেলপালিশ লাগাছে। তার হাতে নেলপালিশ লাগানো পর্যন্ত চুপ করে বসে থাকল শ্রাবণ। নেলপালিশ লাগানো শেষ হতেই শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে বলল, “আমায় লাগিয়ে দিবি না?”
“তুই কি মেয়ে? নেলপালিশ লাগাবি কেন?”একটু আশ্চর্য হয়ে বলল বর্ষা।

_ “ছোটবেলায় না চাইতেও সব সময় নেলপালিশ লাগিয়ে দিতিস। মনে আছে তোর, আমি হাতে নেলপালিশ লাগাবো না বলে কত কান্নাকাটি করতাম। কিন্তু তুই শুনতি না। আমাকে নেলপালিশ লাগিয়ে দিতিস। আর আজ নিজে থেকে লাগাতে চাইছিস না। এত তাড়াতাড়ি বদলে গেলি?”

শ্রাবণের কথা শুনে বর্ষার চোখ ছল ছল করে উঠলো। ছোটবেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে ভাইবোনের মধ্যে। শ্রাবণ একটাও কথা ভুল বলে নি। কত সুন্দর ছিল তাদের দিন। আজ সেগুলো হারিয়ে গেছে। বর্ষা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, “কিন্তু এখন তো তুই বড় হয়ে গেছিস? এখন কি আর নেলপালিশ লাগাবি।”
_ “আকারে দৈর্ঘ্যে হয়তো আমরা অনেক বড় হয়ে গেছি। সবার চোখে আমরা এখন প্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু মা আর ভাই বোনের কাছে আমরা সেই ছোট্টবেলার শিশু। আমরা যতই বড় হই না কেন, ওদের কাছে আমরা সব সময় শিশুই থেকে যাই।”

বর্ষার কিছু বলল না।সে শ্রাবণের হাতে নেলপালিশ লাগিয়ে দিতে লাগল। নেলপালিশ লাগাতে লাগাতে বললো, “দাদাভাই! আমাদের ছোটবেলায় কত সুন্দর ছিল তাই না! এখন আর সেই সুন্দর টা নেই।”
_ “ছোটবেলা সুন্দর কারণ তখন আমরা ছোট ছিলাম। বড় বেলায় সুন্দর হতে গেলে আমাদের ছোট হতে হবে বারবার। এই ছোট হওয়া বয়সের ছোট হওয়া নয়। এই ছোট হওয়ার মানে অন্য। কিন্তু আমরা কেউই ছোট হতে চাই না। যদি আমার ছোট হতে পারি তবে বড়বেলাও সুন্দর হবে।”

দুজনেই দুজনের দিকে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকিয়ে রইল। তাকানোর মধ্যে রয়েছে জন্ম_জন্মান্তর ভাই বোনের ভালোবাসার প্রতীক। হারিয়ে যাবে না কখনো তাদের ভাই বোনের ভালোবাসা। তারা মাতৃগর্ভে একই সঙ্গে থেকেছে। একই খাওয়ার দুজনে ভাগ করে খেয়েছি। আজও তারা খায়। আর জন্ম জন্মান্তর একি ভাবে থেকে যাবে। বর্ষা একটু করুণ স্বরে বলল, “আচ্ছা দাদা ভাই! তোর দিদি ভাইয়ের কথা মনে পড়ে না!”

_ “পড়ে, ভীষণ মনে পড়ে। একটাও কারণ নেই, যে দিদি ভাইকে ভুলে যাব।”

অবশেষে অভিজিৎ বাবু নিজের দায়িত্ব হারিয়ে ফেললেন। কেস এখন সিবিআইয়ের হাতে।
এক সপ্তাহ ধরে উনারা তদন্ত করছে। তারাও এই কেসের কিছু সমাধান করতে পারেনি। কারণ খুনি একটাও প্রমাণ রাখে নি। যেটুকু প্রমাণ আছে ওইগুলো খোঁজ করলে দেখা যাবে খুনি নিজেই খুন হওয়ার জন্য দায়ী। কিন্তু খুন কে করছে? তাকে দেখতে চায় সমাজ। কফিশপে শান্তভাবে বসে রয়েছে অভিক আর অভিজিৎ বাবু।

অভিক এখন বেশিরভাগ সময়ই অভিজিৎ বাবুর সঙ্গে কাটার। উৎপল মাঝে মাঝে আসে তবে আগের তুলনায় অনেক কম। নতুন বিয়ে করেছে এখন পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। একিভাবে অনেকক্ষণ বসার পর অভিক খুব শান্ত মাথায় বলল, “স্যার, আপনি বিয়ে করে নিন। আপনার নিজের একটা পরিবারকে রয়েছে। ওদের কথা একবার ভাবুন। এইভাবে জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর কতদিন কষ্ট পাবে?”অভিজিৎ বাবু চুপচাপ। মুখে কোন কথা নেই। কি উত্তর দিবে তাও জানা নেই।
_ “স্যার, কিছুতো বলুন? এইভাবে চুপচাপ বসে থাকলে কেমন…….”

_ “না পারছি দুর্গাকে ভুলতে, না পারছি দুর্গার জায়গায় কাউকে বসাতে। যে এতদিন ধরে আমার জীবনে জড়িয়ে ছিল তাকে কি করে ভুলবো; অভিক।
_ “জানি দুর্গাকে ভোলা সম্ভব নয়। তবুও ভুলতে হবে। জীবনে এগিয়ে যেতে হলে অতীত ভুলতেই হবে। আজ বলছেন ওকে ভুলতে পারবেন না। কিন্তু আপনি বিয়ে করে দেখুন, নিজেকে আবার আগের মতো ব্যস্ত করে ফেলুন। দেখবেন, একটু একটু করে দুর্গাকে ভুলতে শুরু করেছেন।”

অভিকের কথা শেষ হতেই দুজনেই চুপচাপ হয়ে গেল। বেশ একটা নীরবতা বিরাজ করছে। নীরবতা কাটিয়ে তোলার জন্য অভিক আবার বলল, “একটা কথা বলি!”
_ “বল?”
_ “আপনি বর্ষা চৌধুরীকে বিয়ের প্রস্তাব দিন। সে অনেক ভালো একটা মেয়ে। নিজের পরিবারের জন্য কত কিছু করেছে সেটা কারোর অজানা নেই। আপনি ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে কিছুতেই না করতে পারবে না।”

এখনো অভিজিৎ কিছু বলল না। সে কিছু একটা ভাবছে। অভিক একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি যদি কিছু বলবেন না। তাহলে আমি চললাম।”
অভিজিৎ বাবু এবার মুখ খুললেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, “আমি বিয়ে করতে রাজি। তার আগেই খুনিকে বের করতে হবে। ওই মানুষটিকে জানার পর আমি সবকিছু করতে রাজি।”

অভিক আশ্চর্য হল। অভিজিৎ এখনো ওই কেস নিয়ে পড়ে রয়েছে। যে কেস তাদেরকে পাগল করে ছেড়েছে। অভিজিৎ আবার তাকে নিয়ে ঘাঁটতে চাইছে। অভিক একটু রাগান্বিত ভাবে বলল, “স্যার, ওই কেস এখন সিবিআইয়ের হাতে। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারবো না। তারা ঠিক আসামিকে খুঁজে বের করবে।”
_ “আমিও ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকব। খুনিকে দেখব তারপর বিয়ে করবো।”

অভিক আর কিছু বলল না। এতকিছু বোঝানোর পরও অভিজিৎ বাবু বুঝলো না। আর বুঝিয়ে লাভ নেই। অভিজিৎ বাবু তখনও কিছু একটা ভাবছে। হঠাৎ তার মনে একটা আনন্দের ছাপ দেখা দিল। এমন মুহূর্ত আনন্দের কারণ অভিক বুঝতে পারল না। আনন্দের কারণ জানতে চাইল। অভিজিৎ বাবু হাসিমুখে বলল, “অভিক, তুমি একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছ। যারা খুন হয়েছে তারা প্রত্যেকেই কোথাওনাকোথাও পাথর সরিয়ে রাস্তা পার হয়েছে। আর সেই পাথরগুলো মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে।”
_ ” কিন্তু এই পাথরের সঙ্গে কি সম্পর্ক খুনের?”অভিক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

_ “জানি না। তবে আমার বিশ্বাস, আমি পাথর গুলো সরিয়ে যদি রাস্তা পার হই তাহলে খুনি ঠিক আমাকেও খুন করতে আসবে। আর আমি খুনিকে দেখে ফেলব।”
অভিকের চোখ কপালে উঠে গেল। কি সাংঘাতিক কথা বলছে অভিজিৎ বাবু। যে খুনি আজ পর্যন্ত কাউকে ছাড়িনি সেখানে অভিজিৎ বাবুকেও ছাড়বে না। অভিজিৎ বাচ্চা ছেলের মত কথা বলছে। খুনি যে কোনোভাবেই হোক অভিজিৎ কে মেরে ফেলবে।অভিক অনেক বুঝিয়ে অভিজিৎ বাবুকে আটকানোর চেষ্টা করে।

তাছাড়াও অভিজিৎ বাবুর মতো মানুষ যদি এমন দায়িত্বহীন কাজ করে। তাহলে সমাজের মানুষ উনাকে কোন চোখে দেখবে? এমন কাজ করা অভিজিতের মোটেও ঠিক হবে না। অভিজিৎ বাবু অভিকের একটা কথাও শুনলেন না। তিনি বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। অভিকে ট্যাক্সি করে বাড়ি চলে যেতে বলল, কলকাতা শহরে এমন রাস্তা অনেক রয়েছে। তবে তাদের কাছের রাস্তা হল বেহালা। যেখানে দুর্গাও একইভাবে রাস্তা পেরিয়ে ছিল। দ্রুতবেগে অভিজিৎ বাবু ওইখানে পৌঁছে গেল।

আশেপাশে লক্ষ্য করে দেখলো বেশ অনেক মানুষজন রয়েছে। অভিজিৎ আস্তে আস্তে করে পাথরগুলো মাঝরাস্তায় সরিয়ে ফেললো। তারপর বাইকে নিয়ে বিপরীত রাস্তায় চলে যায়। ঘুরে দেখল পাথরগুলো মাঝ রাস্তায় পড়ে রয়েছে, কিন্তু ভুলেও সেগুলো পূর্বের অবস্থায় রাখলো না। সেখান থেকে দ্রুতগতিতে আবার বেরিয়ে গেল।


পর্ব ২৫

প্রায় একটা বছর হাসিখুশিতে কাটিয়ে ফেলল চৌধুরী পরিবার। এক বছরে অনেক দুঃখ, কষ্ট, বেদনা এসেছে। সব প্রতিহত করেছে তারা। কষ্টকে প্রতিহত করে আপন করে নিয়েছে সুখকে। কিন্তু এই সুখ যে বেশিদিন থাকবে না, সেটা কয়েকদিন ধরে শ্রাবণের ব্যবহার দেখে বোঝা যায়। শ্রাবণ এখন খুব রাগী এবং খিটখিটে মেজাজী হয়ে গেছে।

তার এমন রূপের কারণ পূজারিণী। এই এক বছরে পূজারিনীর জন্য অনেক গানের অফার আসে। সে সব গুলো ফিরিয়ে দিয়েছে। একটাতেও গান গায়নি। একদিনের জন্যও সকালে উঠে প্র্যাকটিস করে নি। গানের জগৎ থেকে পুরোপুরি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। সে দাবি করেছে আর কখনো গানের জগতে ফিরে যাবে না। শ্রাবণ অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু সে শুনেনি। পূজারিণী ব্যস্ত জীবন যাপন করতে চায় না।সে চায় একটু সুখ। আর এই সুখ কেবল পরিবারের মধ্যে রয়েছে।

পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সঙ্গে কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্তের মধ্যে সে সুখ খুঁজে পেতে চায়। ব্যস্ত ভাবে শহরের এখানে ওখানে ঘুরতে তার বড্ড বিরক্ত। তাই সে গানের জগতে আর ফিরে যাবে না। সেখানে হয়তো প্রচুর টাকা আছে, সম্মান, খ্যাতি আছে কিন্তু সুখ_শান্তি নেই। সুখ শান্তি কেবল প্রিয় জনের মধ্যে রয়েছে। পূজারিণী শুধু এখানে থামে নি। তার দাবি, যাদের জন্য সে গান করে, নিজেকে উজাড় করে তোলে তারাই তাকে নিয়ে ট্রোল বানায়। কেন সে তাদের জন্য গান গাইবে? গাইবে না সে গান।

এই অদ্ভুত যুক্তি মানতে চায় না শ্রাবণ। সব সময় পরিবারের লেগে থাকে ঝগড়া, দ্বন্দ্ব। এমনভাবে যে চলা সম্ভব নয় সেটা অনেক আগেই বুঝে গেছে শ্রাবণ। তাদের পরিবারের আর্থিক সমস্যা দেখা দেয় নি। তবে খুব শিগগিরই দেখা দিতে চলেছে। বর্ষার পক্ষে একা সংসার সামলানো সহজ নয়। পরিবারের হাল অন্য একজনকে ধরতে হবে। তার জন্য উপযুক্ত মানুষ নেই।

বিকেলবেলায় বারান্দায় চুপচাপ বসে রয়েছে শ্রাবণ। দিদিভাইর অফিস থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছে।মনের মধ্যে ভেসে উঠেছে অতীতের স্মৃতি। কত স্বপ্ন দেখেছিল গানকে নিয়ে। নতুন গান সৃষ্টি করবে। গানের একটা নতুন জগৎ তৈরি হবে। সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যেতে বসেছে। পূজারিণী এইভাবে বদলে যাবে সে কখনো ভাবেনি। তার সমস্ত আবদার মেনে নিয়েছিল। তার আবদার রাখতে, তাকে বিয়েও করে। কিন্তু তার প্রতিদান যে পূজারিণী এমনভাবে ফিরিয়ে দেবে সে কখনোই জানতো না।

জানলে হয়তো কখনোই বিয়ে করত না। অজান্তেই চোখ থেকে জল পড়ে গেল।সমাজের আর চারটা মানুষের চাইতে শ্রাবণের পার্থক্য এখানেই, সেই স্বপ্নকে নিয়ে বাঁচতে চায়, স্বপ্নের জন্যে সে সবকিছু ত্যাগ করতে পারে। হয়তো সমাজের আর চারটা মানুষ এমন কাজ করতে পারবে না। শ্রাবণের কাছে স্বপ্নই সব। তার কাছে সুখ_দুঃখ এগুলোর কোনো দাম নেই। তার কাছে সফলতাই সবকিছু।সে নিজেকে একটা সাকসেসফুল মানুষ হিসেবে দেখতে চায়। মানুষ কখনো অমর হতে পারে না।

কিন্তু তার কাজ অমর হতে পারে। তার কাজের মাধ্যমে সে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে পারে। শ্রাবণ তার কাজের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে চায়। সফলতার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে হবে। যে যত বেশি ত্যাগ করতে পারবে সে তত বেশি সফল হতে পারবে।
কিন্তু পূজারিণী শ্রাবণের ভাবনা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এক মানুষ। তার কাছে সফলতার কোন দাম নেই। সে চায় সুখ।

আজ মরে গেলে কাল দুই দিন। যেটুকু সময় বেঁচে আছে সেটুকু সময় হাসি খুশিতে কাটাতে চায়। তার সফলতা তাকে যুগ যুগ ধরে অমর করে রাখতে পারবে। কিন্তু সুখ দিতে পারবে না। সে ব্যস্ত জীবন একদমই পছন্দ করে না। যেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সবার মাঝে ফুচকা খেতে পারবে না। ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবে না। গ্রামের পুকুরে এপার থেকে ওপার সাঁতার কাটতে পারবে না।

দেবতার পূজো ঠিক মতো করতে পারবে না। সেই জীবন সে কখনোই চায় না। সে খুব সাধারণভাবে বাঁচতে চায়। বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে চায় না। চায় না সম্মান, খ্যাতি। চায় শুধু এক টুকরো হাসি খুশি জীবন।
দুটো মানুষের চিন্তা ধারাই সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রত্যেকে যে যার চিন্তাধারায় সঠিক। কিন্তু দুটো বিপরীত চিন্তাধারার মানুষ একই সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়।

সম্ভব হলেও শ্রাবণ সেটা আমি মেনে নেবে না। পূজারিণী চিন্তা ধারাকে কোনমতেই সে পাত্তা দেবে না। তার চিন্তাধারা নিতান্ত পাগলামো বলে উড়িয়ে দেবে। এর আগে বহুবার এমনটাই করেছে শ্রাবণ। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সে কতটা কঠোর হতে পারে সেটা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো পূজারিণী ও খুব ভালোভাবে জানে।

তার জেদের কাছে বারবার সবাই হেরে গেছে, আজও হারবে। কিন্তু তার এই জেদি মানসিকতা মোটেও ভালো নয়, সেটা হয়তো সে বুঝেও বুঝে না। তার এই জেদি মানসিকতা তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিতে পারে। সেটা হয়তো শ্রাবণ জানে না।
আপন_মনে গান গাইছিল শ্রাবণ। এমন সময় পূজারিণী এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। শ্রাবণ সেটা ভালোভাবে নিল না।

তাকে ইগনোর করে গান গাইতে থাকলো। পূজারিণী একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আমাকে এই ভাবে ইগনোর করছো কেন? আমিতো তোমাকে কিছুই বলিনি। বিয়ের পরে তুমি কত স্বপ্ন দেখিয়েছিলে আমাকে। না চাইতে অনেক ভালোবাসা পেয়ে গেছিলাম। আর এখন আমার থেকে দূরে থাকতে চাইছ?” শ্রাবণ কিছু বলল না।

তখনও সে গান গিয়ে যাচ্ছে। পূজারিণীকে কিছুতেই পাত্তা দিচ্ছে না। পূজারিণী রেগে গিয়ে শ্রাবণের কাছ থেকে গিটার ছাড়িয়ে নিল। করুণ চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আপনাকে কিছু বলছি। অন্তত ওইটুকুই জবাব দাও।”শ্রাবণ তখনও চুপ। যেন তার সামনে একটা পাথর পড়ে রয়েছে। আর তার সঙ্গেই কথা বলছে পূজারিণী। পূজারিণী রাগের চোটে চোখে জল চলে আসলো।

চোখের জল মুছে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, “তবে সমাজে আর চারটা মানুষের মতো এটাই কি সত্যি।বিয়ের পরে কয়দিনের জন্য স্বামীদের ভালোবাসা থাকে। তারপর কর্পূরের মতো উবে যায়। বাড়ির বউ হয়ে যায় বাড়ির চাকর। তুমিও কি তেমন স্বামী? এমনটা করছো কেন শ্রাবণ? তোমাকে ভালোবাসি তাই! মানুষ অতিরিক্ত ভালোবাসা পেয়ে গেলে অবহেলা করতে শুরু করে। তুমিও তাই করছ? কিন্তু অবহেলা বড্ড খারাপ জিনিস।

অবহেলার কারণে যদি কোন মানুষ কখনো হারিয়ে যায়। হাজার চেষ্টা করলেও তাকে ফিরে পাবে না শ্রাবণ।”
_ “আমি ডিভোর্স চাই পূজারিণী।” স্পষ্টভাবে শ্রাবণের মুখ থেকে কথা বেরিয়ে এলো। তার কথায় আশেপাশে কি ঘটতে পারে সে ভাবলো না। পূজারিণী যেন আকাশ থেকে পড়লো। তার কাছে এটা অবিশ্বাস্য। শ্রাবণ এমন কথা কখনোই বলতে পারে না।

তাদের মধ্যে কোন ঝগড়া ঝাটি হয়নি। সকাল পর্যন্ত হাসিখুশিতে কথা বলেছে শ্রাবণ। বেশ কয়েকদিন মুখ কালো করে বসে ছিল। তবে সেটাকে পূজারিণী পাত্তা দেয়নি। বিভিন্ন কারণে মন খারাপ হতে পারে। পূজারিণীর কোনো আচরণে তার খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু তা বলে ডিভোর্সের মত একটা সিদ্ধান্ত শ্রাবণ নেবে।সেটা তার কল্পনারও বাইরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে পূজারিণী। মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে থাকার পর পূজারিণী শ্রাবণের হাত ধরে কিছু কথা বলতে চাইল। কিন্তু শ্রাবণ পূজারিনীর হাত ছুড়ে দিল। চিৎকার করে বলল তার হাত স্পর্শ করতে না। তাকে স্পর্শ করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে সে। পূজারিণী দ্বিতীয়বারের মতো আশ্চর্য হয়।কিছুক্ষণের মধ্যে একটা মানুষ কি করে এতটা বদলে যেতে পারে। এমনটা করছে কেন শ্রাবণ? তবুও নিলজ্জের মতো পূজারিণী আবার তার পায়ের কাছে গিয়ে বসলো।

তারপর তার পা জড়িয়ে ধরল। শ্রাবণ চাইলেও তাকে ছাড়াতে পারল না। খুব কষ্ট হচ্ছে পূজারিণীর।নদীর বাঁধ ভেঙ্গে গেলে যেমন জল হু হু করে বেরিয়ে আসে তেমনি পূজারিনীর চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসছে।সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? তুমি কি বলছো সেটা তুমি জানো তো?”
_ “আমি সব জেনে বুঝেই বলছি। আমাকে বোঝাতে এসো না। আমার বোঝার মত বয়স হয়ে গেছে।”

পূজারিণী অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। সে কিছু একটা বলতে চাইছিল। কিন্তু পারল না। তার আগেই গাড়ির হর্ন বেজে উঠলো। বর্ষা এসে গেছে। তার সামনে চুপ থাকাই ভালো হবে। নিজেদের ব্যাপার নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিবে। তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে ফেলল সে। শ্রাবণও নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। বর্ষা বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। বর্ষা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পূজারিণীও ফিরে গেল।

দুজনের মনের মধ্যে এক ঝড় শুরু হয়ে গেছে। সে ঝড় থামবে কিনা কেউ জানে না।
শ্রাবণের বিয়ের পর চৌধুরী পরিবারে দুপুরের খাবার প্রায় উঠে গেছে। বিকালে বর্ষা অফিস থেকে ফিরলেই তারা একসঙ্গে খাবার খায়।যদিও অনন্যা দেবীর অসুস্থতার কারণে তিনি আগে খেয়ে নেন। অপেক্ষা করতে পারে না। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

বর্ষা ফ্রেশ হতে হতেই পূজারিণী খাওয়ার থালা সাজিয়ে ফেলেছে। তিনজন খেতে বসেছে তবে আগের মতো আজকে কারুর মুখে হাসি নেই। শ্রাবণ আনমনে খেয়ে যাচ্ছে। পূজারিণী ভাতের থালায় আঙ্গুল দিয়ে বিভিন্ন আঁকিঝুকি করছে। তার চোখে_মুখে আজ সেই প্রাণোচ্ছল নেই। ভরে উঠেছে করুন এক হতাশা। এই হতাশার কারণ বর্ষা জানে না। তবে কিছু একটা ঘটেছে সেটা ভালো ভাবেই বোঝা যাচ্ছে। তাদের খাবার প্রায় শেষ হয়ে এল তবুও পূজারিণী খাচ্ছে না। চোখ থেকে জল ভেসে এসেছে। ফোঁটা ফোঁটা জল ভাতের থালায় পড়ছে। বর্ষা বেশ ভালভাবে লক্ষ করল।পূজারিণী এমন অবস্থায় দেখে নিজেও হতাশায় ভেঙে পড়ল।

চেয়ার সরিয়ে তার কাছে গিয়ে বসলো। মাথায় হাত বোলিয়ে বলল, “কি হয়েছে তোর? খাচ্ছিস না কেন?”পূজারিণী কোনো কথা বলল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। বর্ষা তাকে সামলানোর চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। পূজারিণী খাওয়ার তালা ছেড়ে দিয়ে রুমে চলে গেল। বর্ষা ভীষণ অবাক হয়ে শ্রাবণের দিকে তাকালো।শ্রাবণ একবারের জন্যও পূজারিণীকে আটকালো না। নির্বিধায় সে খেয়ে যাচ্ছে। তার মনে কোন কষ্ট নেই।

কদিন আগেই শ্রাবণ পূজারিনীর চোখের জল সহ্য করতে পারত না। আর আজ তার চোখের জলের কারণ। একটা মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে কি করে? বর্ষা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারলো, পূজারিণী কষ্টের পেছনে শ্রাবণ রয়েছে।তার জেদ পূজারিণীকে কষ্ট দিয়েছে। বর্ষা খুব গম্ভীর স্বরে শ্রাবণের কাছে থেকে সমস্ত ঘটনা জানতে চাইল। কিন্তু শ্রাবণ কিছু বলল না। পূজারিণী কেন কাঁদছে তা ও জানে না সে।

“অন্যের কান্নায় আমার কিছু যায় আসে না।”খুব দৃঢ়তা সাথে কথা বললো শ্রাবণ।
_ “কি বলছিস কি? তোর মাথা ঠিক আছে তো?”খুব রাগান্বিত ভাবে কথা বলল বর্ষা। তার দাদা ভাই এমন কথা বলতে পারে না কখনো। কী সব কথা বলছে শ্রাবণ। শ্রাবনকে এইভাবে কখনো দেখতে চায়নি সে। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল। কি হয়েছে জানার চেষ্টা করল। কিন্তু শ্রাবণ মুখ খুললো না। শুধু মৃদু স্বরে একটা কথা বলল, “ভগবান আমাদের প্রত্যেককে হাজার হাজার স্বপ্ন দিয়েছে। কিন্তু এই হাজার হাজার স্বপ্নের মধ্যে পেটের খিদেও দিয়েছে, আর এই খিদে কেড়ে নিয়েছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন।”

অতীত ভুলে এখন স্বাভাবিক জীবন_যাপন করছে অভিজিৎ। সেদিন রাস্তা পার হওয়ার পরও তাকে কেউ খুন করতে আসেনি। সেদিন অভিজিৎ খুব রেগে যায়। তার সন্দেহ হয় খুন গুলো অভিক কিংবা উৎপল করছে। না হলে তাকে কেন খুন করল না? খুনি নিশ্চয়ই জানতো অভিজিৎ ইচ্ছা করে রাস্তা পাথর সরিয়েছে। তাই তাকে খুন করে নি।কিন্তু পরে আরও যুক্তি একের পর এক সাজিয়ে নিশ্চিত হয় খুন গুলো তারা করেনি।

তবে কে খুন করছে সেটা জানতে পেরে গেছে অভিজিৎ। অভিক বার বার বলেছে খুনিকে এরেস্ট করার জন্য। কিন্তু অভিজিৎ করেনি। খুনির খুন করার মধ্যে একটা লজিক রয়েছে। সেই লজিক বেশ ভালই লাগছে অভিজিতের। খুনি বিনা কারণে কাউকে হত্যা করেনি। প্রত্যেক খুনি এক এক জন আসামি। সামনেথেকে কেউ আবর্জনা সরানোরনোর চেষ্টা করে আবার কেউ পেছন থেকে আবর্জনা সরানোর চেষ্টা করে।

ওই হত্যাকারী পেছন থেকে আবর্জনা সরানোর চেষ্টা করছে। আইনের চোখে সে অপরাধী। কিন্তু অভিজিৎ এর চোখে সে একজন হিরো। সামনে থেকে পুলিশ যেটা করতে পারেনি, ওটা ওই মেয়েটা করে দেখিয়েছে। ওই মেয়েটার জন্য এখন প্রাউড বোধ করে অভিজিৎ। অভিজিৎ এর এমন আচরণে ক্ষুব্ধ উৎপল এবং অভিক। যে মেয়ে তার শুভাকাঙ্ক্ষীকে মেরে ফেললো এখন তার জন্য সে প্রাউড ফিল করে। দুর্গার জন্য একটুও মায়া নেই অভিজিতের। হঠাৎই যেনো সবকিছু বদলে গেছে। বদলে গেছে অভিজিৎ।


পর্ব ২৬

সূর্যি মামা সকালের স্নিগ্ধ রশ্মি মিলে ধরেছে। চারিদিকে ঝলমলে পরিবেশ। ভেসে আসছে পাখিদের গুঞ্জন। জানালায় বাধাপ্রাপ্ত হালকা আলোকরশ্মি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে। বেশ মনোরম একটা পরিবেশ।কিন্তু প্রত্যেক সকালের মতো আজকের সকাল সম্পূর্ণ আলাদা চৌধুরী পরিবারের। গতরাতে শ্রাবণ বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে তাদের বিচ্ছেদের কথা। তারা আর একই সাথে থাকতে চায় না। শ্রাবণের এমন কঠোর সিদ্ধান্তে সবাই হতাশ হয়। শ্রাবণের মুখের উপর কেউ কথা বলার সাহস পায়নি। অনন্যা দেবী একটাও কথা না বলে রুমের মধ্যে যে প্রবেশ করেছেন এখনো বের হননি। রাতের খাবারও কেউ খায়নি।

বর্ষা অনেক বুঝিয়েছে। লাভ হয়নি। শ্রাবণ নিজের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। সে বিচ্ছেদ চায়। এই বিচ্ছেদের কারণ জানতে চাইলে, সে যুক্তিহীন জবাব দেয়। পূজারিণী সাথে তার থাকতে ভালো লাগছে না।পূজারিণীর সামনে শ্রাবণ এমন একটা কথা বলতে পারবে সেটা কখনো ভাবেনি পূজারিণী। নিজের অপমান সহ্য করছে। একটাও কথা বলেনি শ্রাবণের বিরুদ্ধে।

প্রায় সকাল নয়টা হতে যায় তখনও বিছানা ছেড়ে কেউ ওঠেনি। কিছুক্ষণের মধ্যে বর্ষার তৈরী হয়ে অফিসে চলে যায়। শ্রাবণ জানতে চাইলো, সে কিছু খেয়েছে কিনা। কিন্তু বর্ষা কোন উত্তর দিল না। শ্রাবণের দিকে একটা করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। শ্রাবণের খিদে চোটে পেটে ইন্দুর লাফানোর মতো অবস্থা। তবুও কাউকে বলতে পারছে না তার খিদের কথা। কাল রাতে সবার সাথে যা ব্যবহার করেছে, তারপর তাদের সামনে মুখ দেখানোটাই পাপ। বেলা বেশ খানিকটা বেড়ে যাওয়ার পর অনন্যা দেবী শ্রাবনকে ব্রেকফাস্ট করতে বলে। শ্রাবণ আনন্দের সহিত ব্রেকফাস্ট করে। কিন্তু তার মা তার সাথে ভালোভাবে কথা বলল না। তিনি ব্রেকফাস্ট করলেন না।

শ্রাবণের বুঝতে বাকি থাকল না, বাড়ির সবাই তার সাথে এমন আচরন করছে কেন? তার এমন আচরণই প্রাপ্য।
পূজারিণী দুটো হাঁটুর মধ্যে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সারারাত কান্না করেছে সে। পাশে শ্রাবণ ঘুমিয়ে ছিল। একবারের জন্যও সে তাকে বোঝায়নি। তার কান্না থামায়নি।তার কান্নার কারণ জানতে চায়নি।এত বেলা হয়ে গেল অথচ একবারও এসে জানতে চায়নি সে খেয়েছে কিনা!

যে মানুষটা কয়েক দিন আগে পূজারিণী না হলে চলত না। পূজারিণী না খেলে খেত না।সেই মানুষটা আজ বদলে গেছে। মানুষ এত তাড়াতাড়ি কি করে বদলে যায়? এতটা নিষ্ঠুর কি করে হয়? কত স্বপ্ন দেখেছিল পূজারিণী। রামধনুর রং এর মত স্বপ্নগুলো শেষ হয়ে যেতে শুরু করেছে। যোগ্যতার চাইতে মানুষ বেশি কিছু পেয়ে গেলে পশুর মত আচরণ করে। শ্রাবণ তাই করছি। শ্রাবণ রুমের মধ্যে প্রবেশ করলো। একটা তীক্ষ্ণ কান্নার সুর ভেসে আসছে। ঘরের ভেতর ভীষণ অন্ধকার এবং গুমোট এক পরিবেশ। আজ ঘরটাও যেন কেঁদে উঠেছে পূজারিনীর কান্নায়। তার দুঃখে সেও দুঃখী। পূজারিণী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না দেখে শ্রাবণের চোখ ভিজে গেল।

তার পাষাণ হৃদয় গলতে শুরু করেছে। না তেমনটা হলে হবে না। তাকে শক্ত হতে হবে। নারিকেলের মতো হতে হবে। নারকেলের ভিতর সুস্বাদু পানীয় একজন তৃষ্ণার্থ ব্যক্তিকে নতুন জীবন দিতে পারে। কিন্তু সেই নারকেলের বাইরের আবরণ খুবই শক্ত, যে কোন মানুষকে খুব সাংঘাতিক ভাবে আঘাত করতে পারে। শ্রাবনকে এখন খুব শক্ত হতে হবে তার ভেতরের সরল মানসিকতা দেখানো যাবে না।বাইরে একটা কঠিন রূপ রয়েছে।

যে রূপ মানুষকে আঘাত করতে পারে, তাকে এখন সেই রুপ দেখাতে হবে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করতে পারে।বিচ্ছেদ এর চাইতে আরো অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও প্রস্তুত সে। পূজারিণী সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক। পরিবারের সাথে রয়েছে নাড়ির সম্পর্ক। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরোতে হবে। চ্যাম্পিয়নরা কখনো ভেঙে পড়ে না। তারা ঘুরে দাঁড়ায়। লড়াই করে। শ্রাবণ ড্রয়ার থেকে ডিভোর্সের পেপার বার করলো।

তারপর ওটা পূজারিনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সাইন করে দিতে বললো। পূজারিণী মুখ তুলে শ্রাবণের দিকে তাকালো। তার দুটো চোখ গাড়ো লাল রং ধারণ করেছে। গাল দুটো ফুলে উঠেছে। মাথার চুল এলোমেলো। শাড়ীটাও ঠিকমতো পরেনি।একটা রাত্রিতে নিজের রূপ পুরো বদলে ফেলেছে সে। তার দিকে তাকাতে পারলো না শ্রাবণ। খুব মায়া হচ্ছে তার জন্য। দুজনের মুখে কোন কথা নেই।কিছুক্ষণ পর পূজারিণী বিছানা ছেড়ে উঠে এসে শ্রাবণের পায়ের কাছে লুটিয়ে পরল।

জোরে জোরে কান্না করে বলল, “তুমি এমনটা করছ কেন? তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আমার জীবন এগোনো সম্ভব নয়। তুমি ছাড়া আমার ভুবন শূন্য। প্লীজ এমন টা করো না। আমি না হয় তোমার বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে থেকে যাব। কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিও না। আমি পারবো না তোমাকে ছাড়া বাঁচতে। তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি শ্রাবণ। ভীষণ ভালোবাসি।”

শ্রাবণ কিচ্ছু বলল না। নিজেকে আরও কঠোর করছে। সে খুব কঠোর ভাবে বলল, “সাইন করে দাও। এতে দুজনেরই ভালো হবে।”
_ “সাইন!সাইন!সাইন! সাইন ছাড়া কি আর কোন কথা নেই তোমার কাছে?”

_ “না নেই।”দুজনেই খুব জোরে জোরে কথা বলল, কিন্তু পরক্ষনে পূজারিণী আবার স্তব্ধ হয়ে যায়। শ্রাবণের সাথে এমন জোর গলায় কখনো কথা বলেনি। সে আবার কান্না করছে। চোখের অশ্রু বাঁধ মানছে না। ঝরনার মত জল ঝোরে পড়েছে। গলা শুকিয়ে গেছে। তবুও নিলজ্জর মতো আবার বলল, “প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিও না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। একবার বোঝার চেষ্টা করো।”

_ “তা কখনো সম্ভব নয় পূজারিণী। আমি ডিভোর্স চাই।”
পূজারিণী কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছলো। তারপরে স্বাভাবিক ভাবে বলল, “আমি সাইন করে দিচ্ছি। শুধু একটা কথা বল, তুমি ডিভোর্সৈর মত এমন কঠোর সিদ্ধান্ত কেন নিলে?”

_ “লাইফ ইজ চেঞ্জেস। আমিও আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছি। আমার তোমাকে ভালো লাগে না। তোমার প্রতি আমার কোন ফিলিংস নেই। একজন মানুষের সাথে সারা জীবন থাকবো অথচ তার প্রতি কোন ফিলিংস নেই। এটা কখনো সম্ভব হতে পারে না। ফিলিংস ছাড়া কোনো মানুষের কাছে কখনো থাকা সম্ভব নয়।”
_ “কী? আমার প্রতি তোমার কোন ফিলিংস নেই?”অট্টহাসি দিয়ে কথা বলল পূজারিণী।

_ “না।”
_ “তাহলে কেন বিয়ে করেছিলে আমাকে? কেনো রোজ রাতে আমার পাশে ঘুমিয়েছিলে? কেন রোজ রাতের সোহাগে দেখাতে আসতে। কেন রোজ রাতে নতুন একটা ভালোবাসার স্বপ্ন দেখাতে? ফিলিংস নেই এই অজুহাত দিও না।আমার মধ্যে নতুন কিছু আর নেই সেটা পরিষ্কার বলে দাও।স্বামী_স্ত্রীর পবিত্র ভালোবাসার সম্পর্ক টা কে অপমান করো না।”

_ “পূজারিণী তুমি তোমার লিমিট ক্রস করে যাচ্ছো। আমি এতকিছু জানাতে বাধ্য নই তোমাকে। বিয়ের প্রস্তাব প্রথমে তুমি দিয়েছিলে আমি নই।”শ্রাবণ খুব জোরে জোরে বলল কথাগুলো। পূজারিণী কি বলবে কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। এটা কি সেই শ্রাবণ। যে তাকে প্রতিটা রাতে স্বপ্ন দেখাতো নতুন ভালোবাসা। রোজ রাতে নতুন রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যেত। আর আজ সেই বলছে কিনা তার প্রতি কোন ফিলিংস নেই। শুধুমাত্র তার কথা রাখতে তাকে বিয়ে করেছিল। পূজারিণী খুব জোরে হাসলো। হাসতে হাসতে বলল, “তাহলে এতদিন আমাকে স্ত্রী হিসেবে রাখোনি। নিজের রক্ষিতা হিসেবে রেখেছিলে। শুধুমাত্র নিজের শারীরিক সুখ মেটানোর জন্য।”

_ “হ্যাঁ! হ্যাঁ! হ্যাঁ! আমি তোমাকে রক্ষিতা করে রেখেছিলাম। আমার শারীরিক সুখ মেটানোর জন্য।”চিৎকার করে বলল শ্রাবণ।
_ “শ্রাবণ, তুমি কি বলছ তা তুমি জানো তো?”কান্না করতে করতে বলল পূজারিণী।

_ “আমি সবই বুঝতে পারছি। আর আমি যা বলেছি সবগুলো সঠিক। গেট আউট মাই লাইফ। তুমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়ে আমাকে একটু শান্তি দাও।”চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে শ্রাবণ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পূজারিণীকে অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছে সে। পূজারিণী ঘরের একটা কোনে পড়ে থাকল। জোরে জোরে কাঁদছে সে। আর কানে একটা বাক্য বারবার ভেসে আসছে, “গেট আউট মাই লাইফ! তুমি আমার জীবন থেকে বিদায় নিয়ে আমাকে শান্তি দাও”। এতদিন সে কেবল একটা মানুষের জীবনে বিরক্তিকর হয়ে ছিল।সে এতটা খারাপ, যে তার সঙ্গে থাকা যাবে না। আর নয়।

এবার ফিরে যাবে। শ্রাবনকে আবার আগের মতো শান্তি ফিরিয়ে দেবে।তার বিরক্তের কারণ হবে না।

গভীর রাত। চারিদিকে গভীর নিস্তব্ধতা।ঘন অন্ধকারে মধ্য দিয়ে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। শ্রাবণ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু পূজারিণী ঘুমিয়ে পড়তে পারেনি। এই বাড়িতে আজ তার শেষ দিন। কত স্মৃতি ঘিরে রয়েছে এই বাড়িকে ঘিরে। প্রতিটা মানুষ তার কত আপন। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য।

কাল থেকে তার পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা। আলাদাভাবে তাকে বাঁচতে হবে। যে মানুষটার পাশে রাতের পর রাত ঘুমিয়ে ছিল, কাল থেকে ওই মানুষটার সঙ্গে দেখা হলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে হবে।একবারের জন্যও চিৎকার করে বলতে পারবে না ওই মানুষটা তার।হয়তো শহরের ভিড়ে কোথাও না কোথাও আবার দেখা হবে। সেদিন চিনেও না চেনার ভান করতে হবে।ওই মানুষটার সম্পূর্ণ অধিকার কেবল আমার বলতে পারবে না। পূজারিণী চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

একি ভাবে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পর নিজের চোখের জল নিজে মুছে ফেলল। নিজের চোখের জল এখন থেকে নিজেকে মুছতে হবে। চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য শ্রাবণ নামক মানুষটা আর নেই। নিজেকে শক্ত করছে পূজারিণী। চাইলে আইনের দিক দিয়ে শ্রাবণের কাছে থাকতে পারতো। কিন্তু থাকবে না। যে মানুষটার কাছে তার কোন মূল্য নেই সেখান থেকে কি হবে! শ্রাবণ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে এতদিন সে কেবল তাকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছিল।

তার প্রতি কোন ফিলিংস ছিল না। পূজারিণী আস্তে করে উঠে গিয়ে শ্রাবণের কপালে চুম্বন করল। চুম্বন করতে গিয়ে অজান্তেই তার চোখের জল শ্রাবণের মুখে পড়ল। পূজারিণী বুঝতে পারল শ্রাবণও ঘুমাইনি। ঘুমের ভান করে পড়ে রয়েছে। পূজারিণী শ্রাবণের ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরল। মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। শ্রাবণ হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। তার মনও বিচলিত। পূজারিণী খুব ধীর কণ্ঠে বলল, “একবার ভেবে দেখলে হয় না। আমি তোমার সব কথা শুনব। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তোমার কাছে আমাকে রেখে দাও।”

শ্রাবণ নিস্তব্ধ। তার চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ছে তবে অন্ধকারে তা বোঝা যাচ্ছে না। শ্রাবণের ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। তাকে শক্ত হতে হবে। সে খুব গম্ভীর কণ্ঠে বলল”না হয় না। আমি তোমার সঙ্গে থাকতে পারবো না।”
_ “তুমি পারবে আমাকে ভুলতে?”

_ “অবশ্যই।”
পূজারিণী গুমিয়ে গুমিয়ে কাঁদতে থাকলো। একটা মানুষ কি করে এতটা স্বার্থপর হতে পারে।এতদিন একসঙ্গে থাকার পরও বলছে ভুলে যেতে পারবে। শ্রাবণের মত মানুষের কাছ থেকে এর চাইতে বেশি এক্সপেক্ট করায় অনুচিত। পূজারিণী আবার থেমে থেমে বলল, “তোমার মনে পড়বে না আমাকে? আমার দুষ্টুমিগুলো একবারের জন্যও তোমাকে ভাবিয়ে তুলবে না? রোজ সকালে উঠে বলবে না পূজারিণী এটা করো, ওটা করো, এটা এনে দাও, ওটা এনে দাও।”

_ “তোমার আর আমার মধ্যে এমন কোনো স্মৃতি নেই যেটা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে ভুলে যাবো। নতুন একটা জীবন শুরু করব।”শ্রাবণ বেশ হাসিমুখে বলল,
_ “তুমি তাহলে আবার বিয়ে করবে?”
_ “অবশ্যই।”

_ “পারবে আমার জায়গায় তাকে বসাতে?”
_ “হ্যাঁ পারব। তুমিও বিয়ে করে নাও। নতুন জীবন শুরু কর।”

পূজারিণী হাসতে লাগলো। হেসে হেসে বলল, “একটা জীবন তো শেষ করে দিলে। আবার একটা নতুন জীবন শুরু করতে বলছো। কে গ্যারেন্টি দেবে ওই জীবন শেষ হয়ে যাবে না। তুমি হয়তো আমাকে ভুলে যেতে পারো। কিন্তু আমি পারি না। তোমাকে আমি ভালবেসেছিলাম। যদিও তোমার কাছে ভালবাসার মানেটাই অজানা।”
শ্রাবণ বেশ খানিকক্ষণ চুপ রইল।

তারপর পূজারিণীকে ঘুমিয়ে পড়তে বলল, পূজারিণী একটু সাহস নিয়ে বলল, “আজকে আমাদের শেষ রাত। হয়তো আর কোনদিন আমাদের মধ্যে দেখা হবে না। আজকের রাতটা অন্তত ‌তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই। কালকে থেকে তো তোমার পাশে অন্য কেউ থাকবে।”
শ্রাবণ আর কিছু ভাবল না। পূজারিণী ইচ্ছাতে রাজি হয়ে গেল। পূজারিণী শ্রাবনকে জড়িয়ে ধরল।

তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। একটা চরম উত্তেজনা রয়েছে। তবুও কান্নার কাছে তা হারিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে কাটানো আজ তাদের শেষ রাত্রি। কাল থেকে যে যার ঠিকানায় খুঁজে বেড়াবে। পূজারিণী ফিরে যাবে। শ্রাবণের খেয়াল আবার বর্ষা রাখতে শুরু করবে। উজ্জ্বল হয়ে উঠবে তাদের ভাই বোনের ভালোবাসা। হয়তো পূজারিণী চলে যাওয়ার পর আবার কোন নতুন অতিথির আগমন ঘটতে পারে এই বাড়িতে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।


পর্ব ২৭

“একবার ভেবে দেখলে হয় না! তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না শ্রাবণ।”
শ্রাবণের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে করতে পূজারিণী বলল, শ্রাবণ কথা না শোনার ভান করল। পূজারিণী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বেশ খানিকক্ষণ চোখাচোখি হতেই শ্রাবণ প্রথমে চোখ ফিরিয়ে নিলো। আজ সকালে পূজারিণী গ্রামের বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আর কোনদিন এই বাড়িতে আসবে না। ব্যাগ পত্র সব গোছানো হয়ে গেছে। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পূজারিণী আবার করুন কন্ঠে বলল, “নিজের খেয়াল রেখো!”

শ্রাবণ মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল, পূজারিণীর উদ্দেশ্যে একটাও বাক্য প্রয়োগ করল না। রুম থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হয়তো শ্রাবণ কিছু বলবে। কিন্তু শ্রাবণ বাইরে এলো না। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে অনন্যা দেবীর রুমে গেল পূজারিণী। অনন্যা দেবী খুব দুখী। পূজারিণী কে নিজের বৌমা নয় নিজের মেয়ে মনে করতেন। মাকে ছেড়ে আজ মেয়ে চলে যাবে। কোন মা ভালো থাকতে পারেন না।

তিনি ভীষণ কান্না করছেন। কেউ থামাতে আসেনি। পূজারিণী উনাকে প্রণাম করলেন। দুচোখ ভর্তি জল। দুজনের চোখাচোখি হতেই দুজনেই দুজনকে চোখের ইশারায় বললো কান্না করতে না। আবার দুজনেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে উঠলো। চোখের জল ধারা আজ বাঁধ মানছে না। কোন এক হারানো প্রাপ্তিতে জল অটোমেটিক বেরিয়ে আসছে। তবুও শেষ আশা টুকু দিয়ে অনন্যা দেবী কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “ভালো থাকিস মা। অনেক বড়ো গায়িকা হবি একদিন। ভুলেও কোন দিনের জন্য এই বাড়িতে ফিরে আসিস না।

এটা একটা বাড়ি নয়, নর পিশাচ।”কথা বলতে বলতে কেঁদে উঠলেন অনন্যা দেবী। উনার চোখের জল মুছে দিয়ে পূজারিণী বলল, “যতই হোক এটা আপনার বাড়ি। এমন কথা বলবেন না। এছাড়া শ্রাবণ আপনারই ছেলে। আজ হয়তো আপনার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কাল আমাকে ভুলে ঠিক আপনার ছেলেকে আপন করে নেবে।”
অনন্যা দেবী আর কোন কথা বলতে পারল না। তিনি শুধুই কেঁদে চলেছেন। উনার অবস্থার কথা ভেবে পূজারিণী আর কথা বাড়ালো না। শুধু আরষ্ট চোখে তাকিয়ে রইল।

মানুষটিকে একা থাকতে দেওয়া দরকার।নিজেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য কান্না করাও খুব দরকার। কান্না করলে নিজেকে অনেক হালকা মনে হয়। অনন্যা দেবীকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলো পূজারিণী।
বাড়ির সামনে গাড়িতে অপেক্ষা করে রয়েছে বর্ষা। সে পূজারিণীকে গ্রামের বাড়িতে ছাড়তে যাবে। বাড়ির সমস্ত সদস্যরা ভেঙে পড়লেও বর্ষা ভেঙে পড়েনি। তার মনের কোঠায় এখনো হাসি স্পষ্ট। কোন কিছুতেই সে এত সহজে ভেঙ্গে পড়ে না। খুব শক্ত একটা মানুষ। পূজারিণী গাড়ির দরজা খুলে সিটে বসলো। বর্ষা ধীরে ধীরে গাড়ি স্টার্ট দিল।গাড়ি খুব হালকা গতিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আর পূজারিণী বাঁকা চোখে তাকিয়ে রয়েছে বাড়ির দিকে। এই বাড়িতে আসা থেকে প্রতিটা মুহূর্ত কত আনন্দ করে কাটিয়েছে।

বাড়ির প্রতিটি কোনায় কোনায় লেগে রয়েছে স্মৃতি। হাজারো স্মৃতি ফেলে চলে যেতে হচ্ছে তার গ্রামে। কোনদিন কি পারবে এই স্মৃতি ভুলতে? কত মানুষ আপন হয়েছিল। কত অজানা জানতে পেরেছিল। শহরে বর্ষা কিংবা অনন্যা দেবীর সাথে ঘুরে বেড়ানো, বাড়িতে শ্রাবণের স্নেহ_ভালোবাসা দায়িত্ব কত মধুর ছিল। আজ সবই অতীত। অতীত নিয়ে তাকে বাঁচতে হবে। রাস্তার একটা মোড় ঘোরার পর পূজারিণী চোখের সামনে আর বাড়িটা ভেসে উঠলো না। হয়তো সারা জীবনের মতো হারিয়ে গেল এই বাড়িটা। আর কোনদিন ফেরা হবে না। জানালার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল পূজারিণী। সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সমাজের কতো অবহেলিত মানুষের মুখ।

ফুটপাতের ধারে সামান্য খাবারের জন্য দিনরাত খেটে মরছে কত মানুষ। তারা যদি এইটুকুতে সুখে থাকতে পারে। তাহলে পূজারিণী কেন পারবে না। পূজারিণীকে ও সুখে থাকতে হবে। পূজারিণীকে পজিটিভ ভাবতে থাকে। কিন্তু যখনই শ্রাবণের মুখখানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিজেই দুর্বল হয়ে যায়। শ্রাবণের সেই গোল মুখখানা তাকে বারবার দুর্বল করে ফেলে। তার সমস্ত শক্তি, তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়। তার অস্তিত্ব কেবল শ্রাবণের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। শ্রাবণ ছাড়া সত্যি অচল সে। সে চূর্ণ_বিচূর্ণ। কথা বলার ক্ষমতা নেই। চোখ দুটো ছল ছলে হয়ে উঠেছে।

“বিয়ে করার সাধ মিটে গেল!”কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা মতো বর্ষার প্রশ্নে খুব আঘাত পেল পূজারিণী। পূজারিণী কিছু বলল না।এখন শ্রাবণের মতো বর্ষাকে ও পাষাণ হৃদয় কারী মানুষ মনে হচ্ছে তার। পরিবারে এত বড় একটা বিচ্ছেদ ঘটল তবুও বর্ষার মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং টিপটিপ করে হাসছে। পূজারিণী কে কোন কথা বলতে না দেখে বর্ষা বলল, “আমি জানি তুই আমাকে খারাপ ভাবছিস। কিন্তু আমারও কিছু করার নেই। আমি চাইলে হয়তো তোকে ওই বাড়িতে রাখতে পারতাম। কিন্তু যে বাড়িতে তোর কোনো সম্মান নেই, কোন পরিচয় নেই, কোন মূল্য নেই। সেখানে না থাকাই ভালো। ফিরে যা। নতুন করে জীবন শুরু কর। মূল্যহীন মানুষের পায়ের তলায় পড়ে থাকার চাইতে।

নিজের পাকে সোজা করে দাঁড়ানো অনেক ভালো।”
পূজারিণী মন দিয়ে বর্ষার কথাগুলো শুনল। কিন্তু নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারলো না। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “আমি পারবো না নতুন করে জীবন শুরু করতে।”
_ “তোকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো জিনিস আমার কাছে নেই। তোর সাথে যেটা হয়েছে সেটা অন্যায়। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো কোন ভাষা আমার কাছে নেই। শুধু একটা কথাই বলবো, কোন মানুষকে না পেলে কেউ কখনো মরে যায় না। কষ্ট হবে দশ দিন, পাঁচ দিন তারপর একদিন ঠিক ভুলে যাবি। কারোর জন্য জীবন কখনই থেমে থাকে না। তোর ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।”

পূজারিণী কিছু বলল না। বর্ষা আবার বলল, “এবার বুঝলি তো আমি কেন বিয়ে করতে চাই না? বিয়ের আগে জীবনটা অনেক সুখের থাকে। কিন্তু বিয়ের পর সম্পূর্ণ বদলে যায়। বিয়ের পর শারীরিক সুখ ছাড়া অন্য কোন সুখ পাওয়া যায় না। সবকিছু হারিয়ে যায়।দায়িত্ব_কর্তব্য পালন করতে করতে, নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে দিন শেষ হয়ে যায়। তোর ক্ষেত্রে হয়তো স্বামী মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু অনেক পরিবারে স্বামী মেনে নেয় পরিবার মানতে পারে না। শুরু হয় ঝগড়াঝাঁটি। মান অভিমান।

কেউ মানিয়ে নেয়, কেউ কখনোই মেনে নিতে পারে না। ঘটে বিচ্ছেদ। না হলে বেঁচে থাকে না বাঁচার মত করে। প্রত্যেকটি পরিবারে বিয়ের পর কোন না কোন গণ্ডগোল লেগেই থাকে। বিয়ের পর নিজের জীবনটা আর নিজের থাকে না। অন্য কারোর হয়ে যায়। অন্যের ভালো থাকা, খারাপ থাকা এগুলো দেখতে দেখতে কখন নিজের ভালোলাগা খারাপ লাগাটা হারিয়ে যাবে বুঝতে পারবি না…….”

নানা ধরনের গল্প করতে করতে তারা কখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে গেল বুঝতে পারল না। বাড়ির সামনে পৌছতেই বর্ষা পূজারিণীকে গাড়ি থেকে নামতে বলল, গাড়ি থেকে নেমে পূজারিণী ব্যাগ গুলো নিয়ে নিল। তারপর বর্ষাকে বাড়িতে আসার কথা বলে। কিন্তু বাসায় যেতে রাজি হলো না বর্ষা। কোন একদিন অবশ্যই আসবে। আগের মতো হয়তো ততটা আসা হবে না। তবে অবশ্যই আসবো। পূজারিণী বাড়ির উঠোনের দিকে যাচ্ছে। তখনই তার দুটো চোখ আবার ছল ছল করে উঠলো।

বর্ষা মানুষটাও তার জীবনের সাথে অনেক জড়িয়ে রয়েছে। তাকেও ভোলা সম্ভব নয়। নিজের জীবন তোয়াক্কা না করে অনেক কিছু করেছে সে। আজকাল পরের মেয়ের জন্য এমন কেউ করে না। বর্ষার কাছে অনেক ঋণী সে। সে আবার জানালার কাছে ফিরে এসে বলল, “নিজের খেয়াল রাখো। শ্রাবনকে সময় মতো ওষুধ দেবে। অনেক ছেলেমানুষ। আজ থেকে তুমি ছাড়া তার কেউ নেই।ওকে আগলে রেখো। সে একটু ঘুরতে পছন্দ করে। অফিসের ফাঁকে ফাঁকে ওকে ঘুরতে নিয়ে যাবে।”

বর্ষা আর নিজের হাসি মুখ দেখাতে পারলো না। সেও কেঁদে উঠলো। একটা মেয়ে একটা ছেলেকে কি করে এতটা ভালোবাসতে পারে? যে মানুষটা অপমান করে তাড়িয়ে দিলো। সেই আবার বলছে তার খেয়াল রাখবে। তাকে সময় মতো ওষুধ দিতে। সত্যি অনেক ভাগ্যবান ছিল তার দাদা। কিন্তু সে এতটাই আনলাকি পূজারিনীর মত একটা মানুষকে হারালো। চাইলেও কখনো এমন মানুষ আর কোনদিন পাবে না শ্রাবণ। বর্ষার নিজের চোখের জল মুছে পূজারিণী কে বলল,

“অবশ্যই খেয়াল রাখবো। তার চাইতেও বেশি তুই নিজের খেয়াল রাখবে। একা একদম থাকবে না। বোকার মত কখনো কাঁদবে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন ভাবে জীবন শুরু কর। আবার গানের জগতে ফিরে যা। ওই গান তোকে সব কিছু ভুলিয়ে দেবে।”
_ “চেষ্টা করব সবকিছু ভুলে যাওয়া।” চোখের জল মুছলো পূজারিণী।

বর্ষা গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। ধীরে ধীরে তাদের বাড়ি থেকে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। পূজারিণী রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানালো বর্ষাকে। গাড়ি চোখের আড়াল হতেই বর্ষা ধীর পায়ে নিজের বাড়িতে প্রবেশ করল। মনের মধ্যে চাপা কষ্ট বেড়েই চলেছে। একের পর এক প্রিয় জন হারিয়ে ফেলছে।
গাড়ির হর্ন শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন বর্ণালী দেবী। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখছেন। গাড়ির ভেতরে কে রয়েছে সেটা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারলেন না।

পূজারিণী হন হন করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। কি ঘটছে কিছুই বুঝতে পারলো না বর্ণালী দেবী। তিনিও পূজারিনির পেছনে পেছনে রুমের ভেতর গেল। রুমে প্রবেশ করেই পূজারিণী বিছানার দিকে হাত দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, “মা ঐখানে বসো।”পূজারিণীকে ঠিক ছোট্ট শিশুর মত দেখাচ্ছে। ভীষণ কষ্ট পেলে ছোটবেলায় এমন করত সে।

মাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেত। আজ ও তাই করল।বর্ণালী দেবী বিছানা বসার সাথে সাথে পূজারিণী মায়ের কোলে মাথা রেখে কোমরটা জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ পূজারিণী এমন করছে কেন বুঝতে পারলেন না তিনি। পূজারিণীর মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে লাগলেন। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি বললেন, “জামাইকে বাড়িতে আসতে বললি না! বাড়ির সামনে এলো অথচ ভেতরে আসলো না।”

পূজারিণী নীরব হয়ে থাকল। বেশ অনেকক্ষণ নিরব। তাকে নিরব দেখে একই প্রশ্ন আবার করল বর্ণালী দেবী। পূজারিণী মুখ খুলল। আরষ্ট ভাবে কথা থেমে থেমে বললো, “উনি আর কখনোই আসবেন না।”
_ “মানে!”

_ “আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে মা।”
_ ” কী পাগলামো কথাবার্তা বলছিস? সম্পর্ক মানে বুঝিস? সম্পর্কের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হবে এটাই স্বাভাবিক। তা বলে বাড়ি ছেড়ে চলে আসবি? তোকে তো আমরা এই শিক্ষা কখনো দেয়নি।”

খুব কড়া ভাবে কথা বললো বর্ণালী দেবী। পূজারিণী মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। কিছু একটা বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেটা ঠিক অনুভব করতে পারছে বর্ণালী দেবী। তিনি পূজারিনীকে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু পূজারিণী কিছুতেই মায়ের কোল ছেড়ে বেরোলো না। পৃথিবীর সবচাইতে শান্তির জায়গা মায়ের কোল। আর সে সেটা পেয়ে গেছে। তার শান্তির জায়গা পাওয়া হয়ে গেছে আর কিচ্ছু চাই না। বর্ণালী দেবী গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তুই ফোন কর আমি কথা বলছি।”

_ “থাক মা। কল করার দরকার নেই। আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে আসি নি। তারা আমাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”
বর্ণালী দেবী হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। চোখ থেকে জল গড়িয়ে আসলো। তিনি সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে চাইল।পূজারিণী অনেকক্ষণ ধরে ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। বর্ণালী দেবী ভীষন আশ্চর্য হলেন। তবে তিনি শ্রাবনকে দায়ী করলেন না। এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ রয়েছে।

তিনি পূজারিণীকে বোঝানোর চেষ্টা করে। পূজারিণী বোঝলো না। যে মানুষ পরিষ্কারভাবে বলে দিল তার প্রতি কোন ফিলিংস নেই। রক্ষিতা করে রেখেছিল। তারপর আর ওকে বিশ্বাস করা যায় না। বর্ণালী দেবী ফোন নিয়ে বারবার শ্রাবনকে কল করল। কিন্তু কল গেল না। ইতিমধ্যেই শ্রাবণ পূজারিণী সমস্ত নাম্বার ব্ল্যাকলিস্ট করে দিয়েছে।

দ্বিতীয়বারের মতো আশ্চর্য হলেন বর্ণালী দেবী। তবে পূজারিনির কথা কি সত্যি!এইভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিল তার মেয়েকে। যেখানে মেয়ের কোন দোষ নেই। পূজারিণী বলে অপমান মেনে নিয়েছে। অন্য কেউ কখনই মানতো না। মাকে চিন্তা করতে দেখে পূজারিণী হা হা করে হেসে উঠলো। এমন সময় পূজারিণী হাসির কারণ তিনি ঠিক বুঝতে পারলেন না। করুন চোখে তাকিয়ে বলল, “হাসছিস কেন?”

_ “তোমার আদরের জামাই তোমাকেও ব্লক করে দিল? এর পরেও বলবেন উনি একটা ভালো মানুষ।”
_ ” হ্যাঁ, বলবো। একশো বার বলবো। কোন মানুষের একটা কাজ খারাপ কিংবা ভালো কাজ দেখে তার চরিত্র বিচার করা যায় না।”
পূজারিণী আর কিছু বলল না। চুপচাপ মায়ের কোলে পড়ে রয়েছে। শূন্যর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনে পড়ছে অতীতের সেই রঙিন দিনগুলোর কথা।

কত না রঙিন আলোয় উজ্জ্বল দিন ছিল। আজ গভীর অন্ধকারে ভরে গেছে। শুধু তার ভুলের জন্য। নেটিজেনরা সেদিন ট্রোল করেছিল তাকে নিয়ে। আজ তারা আরো বেশি করে ট্রোল করবে। সংসার বেশিদিন টিকেনি। তাদের প্রত্যেকটা কথাই সত্য।ওদের নিয়ে আরো কত কিছু লিখবে তা কল্পনা করতেই মাথা যন্ত্রণা চলে আসছে পূজারিণীর। আর চিন্তা করতে পারছে না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মাকে বলল, “মা, ওমা! মাগো?”
_ “কি হয়েছে বল?”

_ “আমি কি সত্যি খারাপ!আমার সাথে সারাজীবন থাকা যায় না? সংসার করা যায় না? এতটাই খারাপ যে আমার প্রতি কোন ফিলিংস আসে না, রক্ষিতা হিসেবে দেখতে হয়। আমি বড্ড খারাপ। তোমার গর্বে এক কলঙ্কিত সন্তান; তাই না!”
পূজারিণী তখনো কান্না করে যাচ্ছে। তাকে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেয়েটাকে সান্তনা দেওয়ার মতো কিছুই নেই। শ্রাবনের যদি ভালো না লাগতো, তাহলে বিয়ে করার প্রয়োজন ছিল না। এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার কোন মানে হয় না। অপমানের বোঝা তার মেয়ে বয়ে বেড়াতে পারবে না। এখন ওকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

হুট করে কিছু করে ফেলতে পারে সে। বড্ড ছেলেমানুষি পূজারিণী। এই ভাবে কষ্ট দেওয়া একদম উচিত হয়নি শ্রাবণের। তিনি পূজারিনীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “তুই মোটেও খারাপ নয়।যে যেমন তার কাছে তোকে তেমনই লাগবে। তুইতো আমার ছোট্ট রাজকণ্যা। আমার প্রাণ। আমার অস্তিত্ব। আমার বেঁচে থাকার চাবিকাঠি।”


পর্ব ২৮

সারারাত ধরে হালকা বর্ষণ সকালের গরমের প্রাচুর্যতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে ঝলমল করে উঠেছে আকাশ। তীব্র গরমের মধ্যে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে সবুজ পরিবেশ। স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে। পরিবেশ স্নিগ্ধতায় ভরে উঠলেও শ্রাবণের মন বিষন্নতা ভরে গেছে। সে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না। পূজারিণী সঙ্গে যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে সে। মন মানছে না। সব সময় একা ঘরের মধ্যে বসে থাকে। বর্ষার যেটুকু সময় পায় ওইটুকু শ্রাবনকে দেয়।

ওই সময়ের মধ্যে শ্রাবণের মুখে থাকে প্রসন্ন হাসি। অন্য সময় থাকে গভীর বিষন্নতা। নিজের মাও ভালোভাবে কথা বলে না শ্রাবণের সাথে। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে মিথ্যা আশ্বাস বারবার দিয়ে যায় বর্ষা। নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলতে চায় শ্রাবণ। তাই আজ সকাল সকাল দোকানে এসেছে। প্রায় এক বছর পর দোকান খোলা হলো। ধুলো ময়লায় জমা হয়ে ছিল। বর্ষা কিছুটা পরিষ্কার করে অফিসে চলে যায়। তারপর শ্রাবণ নিজের সক্ষম এর মত পরিস্কার করে নতুন করে দোকান সাজিয়েছে। আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চায় শ্রাবণ। পূজারিণীকে জীবন থেকে ভুলে যেতে চায়। কিন্তু কিছুতেই মন বসছে না। প্রতিটা স্মৃতি পূজারিণীকে ঘিরে রয়েছে। দোকানে কখনো একা আসে নি শ্রাবণ।

সব সময় সঙ্গী হত পূজারিণী। শ্রাবণকে কাজ করতে না দিয়ে অর্ধেকর বেশি কাজ নিজে করে ফেলত। ভুল করলে শাসন করতো। কখনো কোনো কথা মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখত না। সব কথা প্রকাশ করত। নিজের ভালবাসার কথা এক মুহূর্তের জন্য লুকিয়ে রাখেনি। খুব চঞ্চল এবং একটা প্রাণোচ্ছল মেয়ে ছিল। সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিল। তার অগাত স্বপ্নে বিষ ঢেলে দেয় শ্রাবণ। সে মানুষটা আজ হারিয়ে গেছে। একরাশ অভিমান নিয়ে ফিরে গেছে। শ্রাবণ চাইলেও হয়তো আর কোনদিন ফিরে আসবে না।

শ্রাবণ পূজারিণী কে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত হয়ে ওঠে।তার মাথায় আঁকিঝুকি দিয়ে ওঠে পূজারিনীর সাথে কাটানো বিশেষ কয়েকটি মুহূর্ত। পূজারিণী এখন কোথায়? সে কি সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেছে? না এখনো ওই একই ভাবে থেকে গেছে? নতুন করে আবার বিয়ে করে নেবে না তো!পূজারিণীর পাশে অন্য কাউকে সে কখনো দেখতে পারবে না। সব সময় নিজেকে দেখতে চাইবে।

দোকানে আগের মতো খরিদ্দার এলো না। এত দিনের পর দোকান খুলেছে সম্ভবত তার জন্য। তবে দু_একজন মানুষ এলো। নানা ধরনের কাজ করে নিজেকে একটু ব্যস্ত করে ফেলেছে সে। দুপুরে খাওয়ার সময় মনে পড়ে গেল পূজারিনীর সেই গোল খানামুখ। দোকানে থাকাকালীন পূজারিণী নিজে গিয়ে খাবার কিনে আনতো। নিজে খেত তাকে খাইয়ে দিত। আজ নিজে খাবার কিনতে যাওয়ার মত সামর্থ্য নেই শ্রাবণের।নিজের দুটো পা পঙ্গু। তারই দায়িত্ব নিয়েছিল এক রূপবতী মেয়ে।

তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিল শ্রাবণ। এর মতো পাপ কি পৃথিবীতে আর আছে? সম্ভবত নেই। পাপের শাস্তি শ্রাবনকে একদিন ঠিক পেতে হবে। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে পেটের খিদেকে চাপা দিতে হলো। চাইলেও সে বাইরে যেতে পারবে না। অজান্তেই চোখের কোনে জল ফোঁটা জমে হয়ে যায়। স্থির চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বারবার এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ লক্ষ্য পড়লো খবর কাগজের দিকে। স্পষ্ট ভাবে তাদের বিচ্ছেদের কথা লেখা রয়েছে।

বেশিরভাগই কটু কথা লেখা হয়েছে পূজারিনীর নামে। জঘন্য ভাষায় ব্যবহার করেছে পূজারিণী নামে। শ্রাবণের নামেও ট্রোল হয়েছে তবে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। স্থিরভাবে বসে রয়ে পূজারিণী মঙ্গল কামনা করল শ্রাবণ। সব দোষ তার। তবে পূজারিণী কেন দোষী হবে? ভগবান যেন তাকে শাস্তি দেয়, পূজারিণীকে নয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। সূর্য প্রায় অস্ত মুখে। তখনো শ্রাবণ ভাবার্থ ভাবে বসে রয়েছে। কিছুতেই পূজারিণীকে ভুলতে পারছে না।

আজকে পূজারিণী সমস্ত কষ্টের জন্য কেবল সে নিজে দায়ী। আর সাত_পাঁচ ভাবতে পারল না। ফোন তুলে পূজারিণীর নাম্বার আনব্লক করল। এসএমএস টাইপিং করল, আবার মুছে দিল। বারবার এমন করতে লাগলো। হাত শুধু কাঁপছে। পূজারিণীকে সে হারিয়ে ফেলেছে। তাকে এসএমএস করার অধিকার নেই।

সেটা সে নিজেই হারিয়েছে। এমন সব কথা ভাবতে ভাবতে দোকানের সামনে বর্ষার গাড়ি এসে দাঁড়ালো। এবার তারা বাড়ি ফিরবে। বর্ষা দোকানের কিছু জিনিস গুছিয়ে দিল। তারপর দোকান ঝাঁট দিয়ে শ্রাবনকে গাড়িতে তোলার জন্য এগিয়ে গেল। তখনই ভালো ভাবে লক্ষ্য করলো শ্রাবনকে। তার চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে রয়েছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট দুটো কুঁচগে রয়েছে।তার এমন রূপের কারণ বুঝতে বাকি থাকল না বর্ষার। একটা চেয়ার টেনে এনে শ্রাবণের সামনে বসল।

তারপর তার দুই হাত শ্রাবণের দুই গালে চেপে ধরে বলল, “যদি কাউকে ভুলতে পারবি না, তাহলে তাকে তাড়িয়ে দিলি কেন?” শ্রাবণ নিশ্চুপ। কিছু কথা বলল না। জোরে জোরে কেঁদে উঠলো। প্রাপ্ত বয়স্ক একজন ছেলে এত মানুষের ভিড়ে কাঁদা শোভা পায় না। বর্ষা তার পিঠে হাত চাপড়ে বলল, “চুপ কর দাদাভাই! এমন করিস না। আমি আছি তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”

_ “কিচ্ছু ঠিক হবে না। আমি চাই না পূজারিণী কখনো আমার কাছে ফিরে আসুক।”
_ “তাহলে কান্না করছিস কেন?”

_ “ওর সঙ্গে কাটানো কিছু স্মৃতি আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে। না পারছি ভুলতে। না পারছি এগিয়ে যেতে। কিছু ভালো লাগছে না আমার।”
বর্ষা নিজের রুমাল দিয়ে শ্রাবণের চোখ থেকে জল মুছে দিল। নিজের ব্যাগের মধ্যে থাকা একটা ক্যাডবেরি বের করে শ্রাবণকে দিল। শ্রাবণের ক্যাডবেরি খেতে ভালো লাগে। ক্যাডবেরি তাকে কিছুটা হলেও ঠান্ডা করলো। শ্রাবণ ক্যাডবেরির কিছু অংশ নিজে নিল আর কিছুটা অংশ বর্ষাকে দিল। বেশ অনেকক্ষণ পর শ্রাবণ স্বাভাবিক হলো। তারপর বর্ষা বলল, “আমাকে একটা সত্যি কথা বলবি?”

_ “কখনো কি কোন মিথ্যা কথা বলেছি তোকে?”মুখে পেঁচিয়ে বলল শ্রাবণ।
_ “না, তবুও বলছি।”
_ “আচ্ছা, বলে ফেল কোন কথা?”

_ “কয় দিন আগে পর্যন্ত তো পূজারিণী সঙ্গে বেশ ভালোভাবে ছিলি। তাহলে হঠাৎ করে এমন জঘন্য সিদ্ধান্ত কেন নিলি? মেয়েটার কথা একবারের জন্য ভাবলি না! সে কতটা আঘাত পেয়েছে সেটা জানিস? ঘরের বউ সবার সামনে এত সহজে কাঁদে না।আর সেখানে পূজারিণী সারাদিন সারারাত কান্না করেছে। বারবার বেহায়ার মত তোর পা ধরে থাকতে চাইলো। আর তুই তাকে ফিরিয়ে দিলি।”

শ্রাবণ নিশ্চুপ। শ্রাবণ কখনো বর্ষাকে কান্না করতে দেখেনি। আজ প্রথম দেখলো। পূজারিণীর চাইতে যেন বর্ষা বেশি কষ্ট পেয়েছে। পূজারিণীকে হারিয়ে ভীষণ অসুখি সে।পূজারিণী ও বর্ষার জীবনে বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে থেকে গেছিল। পূজারিণী সাথে আর থাকতে পারছে না বর্ষা। তাই তার এই কান্না। শ্রাবণ একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,

“আমি ওকে ইচ্ছে করে তাড়িয়ে দেয়নি। আমি বাধ্য হয়েছি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে। আমি কত স্বপ্ন দেখেছিলাম, নিজের হাতে একজন বড় গায়িকা বানাবো। আর পূজারিণী আমার সমস্ত স্বপ্নে জল ঢেলে দেয়। ওকে বিয়ে করার পর ও সংসার নিয়ে মেতে ওঠে। গানের জগত থেকে পুরোপুরি নিজেকে সরিয়ে নেয়। শুধু আমার স্বপ্ন নয়, তার বাবা মার স্বপ্ন ছিল তার মেয়ে একজন গায়িকা হবে। তার বাবা মাকে কথা দিয়ে নিয়েছিলাম, তার মেয়েকে একজন বড় গায়িকা বানাবো।

সেখানে তাকে আমরা একজন বউ বানিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। তার বাবা মাকে আমরা কখনো মুখ দেখাতে পারতাম না। তোদের চাইতে গ্রামে বেশি আমাকে যেতেই হত পূজারিণীকে নিয়ে। আমি মানুষ গুলোকে কি উত্তর দিতাম? তাদের স্বপ্ন ছিল তাদের গ্রামের মেয়ে একজন বড় গায়িকা হবে। আর আমি ওকে বাড়ির একজন কাজের মেয়ে হিসেবে রেখে দিয়েছি। আমার সেবা সুস্থতা করতে করতে পূজারিনীর জীবন কেটে যাবে।

যদি সে গ্রামে থাকতো বড় গায়িকা না হলেও ছোটখাটো একজন গায়িকা হয়ে যেত।আমি জানি আমাদের কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের সন্তান চলে আসতো। সে সম্পর্কের টানাপোড়েন সমস্ত কিছু ভুলে যেত। নিজের ক্যারিয়ার ভবিষ্যৎ কোন কিছুতেই পাত্তা দিত না। সংসারের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নিজের জীবনটা শেষ করে ফেলত।

পূজারিণীর সংসার করার জন্য জন্ম হয়নি। তার জন্ম হয়েছিল বিশ্বকে নতুন কিছু দেওয়ার জন্য। ছোটবেলা থেকে হারকে আমি কখনো মেনে নেয়নি আর আজও পারলাম না। ভবিষ্যতে আমি কখনো হার মানবো না। আমার কাছে স্বপ্ন পূরণই সবকিছু। স্বপ্ন ছাড়া আমি আর কখনো কোন কিছু ভাবিনি আর ভবিষ্যতেও ভাববো না। আমার মনের মধ্যে কি চলছে সেটা কেউ একবারের জন্যও বোঝেনি। সবাই ভুল বুঝতে শুরু করে দিয়েছে। এমনকি মা ও আমার সঙ্গে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে।”

শ্রাবণ থেমে গেল। কথা বলতে বলতে নিজের চোখ থেকে জল চলে এসেছে। আবার রেগে কাঁপছে ও। বর্ষার তখন খুব স্পষ্ট ভাষায় বলল, “তা বলে বিচ্ছেদের মতো এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবি? এতে কি আদৌ পূজারিণী গানের জগতে ফিরে যাবে…..”

বর্ষা আরো কিছু বলছিল। শ্রাবণ বর্ষার কথা আটকে বলল, “হ্যাঁ পূজারিণী আবার গানের জগতে ফিরে যাবে। তাই আমি তাকে স্বাভাবিকভাবে বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি। অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছি। যেকোনো মূল্যে হোক পূজারিণী অপমানের বদলা নিতে চাইবে।আর তার বদলা নেওয়া টা হবে; তার সাফল্য। তাকে বদলা নেওয়ার জন্য তাকে আবার গানের জগতে ফিরে আসতেই হবে। আমার বিশ্বাস সে অবশ্যই ফিরে আসবে।”

শ্রাবণের কথা বলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষা বলল, “তাহলে পূজারিণী কে তুই কখনো ফিরিয়ে আনবি না?”
_ “অবশ্যই ফিরিয়ে আনবো।সে বড় গায়িকা হয়ে যাক। তারপর নিজে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে তাকে আবার আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসব।”

বর্ষা হা হা করে হেসে উঠলো।শ্রাবণ এমন কোন হাসির কথা বলেনি যেখানে বর্ষাকে হাসতে বাধ্য হবে। শ্রাবণ ভীষণভাবে রেগে গেল বর্ষার উপর। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “হাসার কি আছে? আমিতো কোন হাসির কথা বলিনি!”

_ “তোর কি মনে হয় পূজারিণী ফিরে আসবে। তোকে ক্ষমা করে দেবে। কখনোই না। তুই যেগুলো ভাবছিস সেগুলো একটাও হবে না। জীবন কখনো প্ল্যানমাফিক চলে না দাদাভাই। জীবন জীবনের মতোই চলে। তাকে প্ল্যান করে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। পূজারিণী কে হারিয়ে ফেলেছিস চাইলেও ফিরে পাবি না।”
দুজনে চুপ করে রইলো। তবে কি বর্ষার কথাই সত্যি? পূজারিণী কখনোই আর ফিরে আসবে না।

অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে শ্রাবণ তারপর কোন মুখে সে ফিরে আসবে। তার সামনে দাঁড়াতেই যে ঘৃণা বোধ করবে। বর্ষা আবার বলল, “ভাঙ্গা কাঁচ কখনো দেখেছিস? তাকে যতই জোড়া লাগাস না কেন, তার মাঝখানে একটা দাগ থেকে যাবে। তেমনি একটা সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে ওই সম্পর্ক যতই‌ জোড়া লাগাক না কেন, তার মধ্যে একটা দাগ থেকে যাবে।”

_ “পুরো কাঁচকে একটা সাদা পর্দা দিয়ে ঢেকে দেব। দিলে তো আর কাটা জায়গাটা দেখা যাবে না এবং কাঁচও আরো বেশি সুন্দর দেখাবে।সমস্ত কিছু শেষ দিয়ে একটা নতুন কিছু শুরু হয়। আমিও তাই করব।”শ্রাবণ হাসিমুখে বলল, বর্ষাও একগাল হাসি দিয়ে বলল, “দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়……”
গাড়ি একটা বাঁক নিয়ে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলেছে। দুজনেই চুপচাপ। একটি মৃদু নীরবতা বিরাজ করছে। সাথে রয়েছে হালকা শিহরণ। কিছুটা যাওয়ার পর বর্ষা বলল, “ফেসবুকে পোস্ট গুলো দেখেছিস?”

_ “হ্যাঁ, আমাদের নিয়ে ট্রোল করছে তাই তো!
_ “ট্রোল এবার মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে শুরু করেছে তারা।”
_ “এগুলো হওয়ার কথা ছিল হচ্ছে। অসুবিধা কোথায়?”

_ “একবারের জন্য পূজারিনীর কথা ভাববি না? বেচারা কিচ্ছু না করেও এত কিছু সহ্য করছে। কমেন্টে কেউ কেউ ওকে ‘ব্যাশ্যা’ মতো খারাপ ভাষায় গালি দিচ্ছে। এটা মোটেও ভালো লাগছে না আমার।”
_ “ব্যাশ্যা!”

_ “পূজারিণী আমাদের বাড়ির বউ। তাকে এভাবে কেউ অপমান করবে সেটা আমরা মেনে নিতে পারি না। এখনো সময় আছে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আয়। সময় থাকতে তাকে নিয়ে না এলে সে সারা জীবনের জন্য হারিয়ে যাবে।”
বর্ষার নরম কথা শ্রাবণের পাষাণ হৃদয় গলাতে পারল না। সে ভয়ানক একটা কঠিন মানুষ। এতো সহজে হার মানবে না।সে গম্ভীর কন্ঠে বলল, “আমি ওকে কিছুতেই ফিরিয়ে নিয়ে আসবো না। ওকে ওর মতোই থাকতে দে।”

_ “তোর কাছে স্বপ্ন ক্যারিয়ার ছাড়া কি আর কোন কিছুই নেই?”
_ “না নেই। আমার কাছে আমার ক্যারিয়ারই সবকিছু।”
_ “দাদাভাই!”জোরে জোরে বলল বর্ষা।

_ “আমাকে বলে লাভ নেই। চাইলেও আমার মনকে পরিবর্তন করতে পারবি না।”
_ “আমি হয়তো তোর মনকে পরিবর্তন করতে পারব না। কিন্তু কথা দিলাম তুই যেটা করছিস সেটা ভুল।এই ভুল একদিন ঠিক বুঝতে পারবি। ক্যারিয়ার সবকিছু নয়। পরিবারের চাইতে দ্বিতীয় কোনো সুখের জিনিস হতেই পারে না।পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে থেকে যে সুখ পাওয়া যায় সেটা সারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করেও পাওয়া যায় না।”

বর্ষা থামল কিন্তু শ্রাবণ কোন উত্তর দিল না।শ্রাবনকে কোন কথা বলতে না দেখে বর্ষা আবার বলল, “তোকে যদি বলা হতো তোর স্বপ্ন আর আমাকে এই দুটোর মধ্যে একটা জিনিস বেছে নিতে, তাহলে তুই কাকে বেছে নিতিস?” শ্রাবণ কোনো কিছু না ভেবেই বলল, তার দিদিভাইকেই বেছে নিত। বর্ষা তখন হাসিমুখে বলল, “আসলে তুই ঠিক কথাই বলেছিস তুই কখনো মন থেকে পূজারিণীকে ভালবাসিসনি। তার প্রতি তোর কোন ফিলিংস নেই। আমার জন্য যদি স্বপ্ন বিসর্জন দিতে পারিস, তাহলে পূজারিনীর জন্য কেন দিতে পারবি না?”

শ্রাবণ একটু থেমে বলল, “কারণ পূজারিণী সংসার করার জন্য জন্ম হয়নি। তার জন্ম হয়েছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। সংসারের মায়া ছেড়ে বের হতেই হবে।পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে কোন না কোন ট্যালেন্ট রয়েছে। কেউ স্বভাবে আবার কেউ অভাবে তাদের ট্যালেন্ট কে হারিয়ে ফেলে। পূজারিণীর অভাব নেই। সে তার স্বভাবে তার ট্যালেন্টকে হারিয়ে ফেলছে। আমি বেঁচে থাকতে কখনোই তার ট্যালেন্টকে হারিয়ে যেতে দেবো না। সে একদিন চ্যাম্পিয়ন হবেই! হবে!”


পর্ব ২৯

পূজারিণী চলে যাওয়ার পর প্রায় তিন মাস কেটে যায়। শ্রাবণ সবকিছু ভুলে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছে আবার আগের মতো।রোজ সকালে দিদির সঙ্গে দোকানে যায় আবার রাতে দিদির সঙ্গে ফিরে আসে। রাতে খানিকটা হাসি আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে ফেলছে দিনকাল। গত কয়েকদিন আগে শ্রাবণ সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়ে।

তার আর দোকান যাওয়া হয় না। ইউটিউবে বারবার পূজারিনীর একটা গান শুনে যাচ্ছে। মনমুগ্ধকর তার সেই গান।গত কয়েকদিন আগেই নতুন মুভির গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছে পূজারিণী। তার মধ্যে একটা গান ইতিমধ্যে রিলিজ হয়েছে। সেই গান বারবার শুনছে শ্রাবণ। গানের মধ্যেই পূজারিণীকে অনুভব করছে সে। পূজারিণী এখন শহরে থাকে। মাঝেমধ্যে হয়তো গ্রামে যায়।তার বাবা_মা এখন কোথায় সেটা জানা নেই চৌধুরী পরিবারের কারোরই। শ্রাবণের মতো পূজারিণীও নতুন জীবন শুরু করেছে।

ফিরে এসেছে তার গানের দুনিয়া। কয়েকদিন আগেই শ্রাবণ একটা নিউজ দেখে অবাক হয়ে যায়। পূজারিণী বলিউড থেকে ডাক পেয়েছে। বলিউড মুভিতে গান গাইবে। শ্রাবণের সমস্ত স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। পূজারিণী পারবে তার স্বপ্ন পূরণ করতে। তার প্ল্যান মাফিক জীবন চলছে। কিন্তু পূজারিণী আগের পূজারিণী নেই। আগের পূজারিণী জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ছাই থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন এক পূজারিণী। যে পূজারিণী সবসময় খিটখিট করে। কোন কিছু ভালো লাগে না তার। কোন সামান্য কথায় খুব রেগে যায়।

বেশি কথা পছন্দ করে না, মুখমন্ডল সবসময় গাম্ভীর্যে ভরা। নিজেকে অনেক আধুনিক করে তুলেছে। আজকাল কাউকেই পাত্তা দেয় না সে। এর মধ্যেই বর্ষা অনেকবার পূজারিনীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। পূজারিণী কথা বলেনি। ফেসবুক থেকে শুরু করে ইনস্টাগ্রাম সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বর্ষা শ্রাবণ দু’জনকেই আনফলো করে দিয়েছে। নতুন করে শুরু করেছে একটা নতুন জীবনের অধ্যায়। যে জীবনে অতীতের কোন দাগ নেই। রয়েছে ভবিষ্যতের শুধু উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা।

উজ্জল আলোকচ্ছটায় ঝলসে যাবে সমস্ত পুরনো অতীতের কালো দাগ। মুছে ফেলেছে তার অতীতের বিষন্নতা। তবুও এক অজানা কারণে বারবার কেঁদে ওঠে শ্রাবনের জন্য। মানুষটাকে বুক ভরে ভালোবেসেছিল। স্বপ্ন দেখেছিল রঙ্গিন রঙ্গিন।আর মানুষটা খুব ভালোভাবেই তার স্বপ্নগুলোর সম্মান করেছে। এখনো সে খুব কান্না করে, কিন্তু কাউকে দেখাতে পারে না। আড়ালে অঝোরে অশ্রু ঝরিয়ে দেয়। শ্রাবণের ও খুব মনে পড়ে পূজারিণীকে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে পূজারিণী আমি তোমাকে ভালোবাসি। ফিরে এসো আমার কাছে। তোমাকে ছাড়া আমি এক মুহূর্ত ভাল নেই। কিন্তু নিজের জেদের কাছে নিজেই হারিয়ে যায়।

রুমের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে একা একা বসতে ভালো লাগছে না শ্রাবণের। রিমোট নিয়ে বারবার টিভি চ্যানেল পাল্টাতে লাগল।বেশ অনেকগুলো টিভি চ্যানেল পাল্টানোর পর হঠাৎ লক্ষ্য করলো পূজারিনীর রাতে করা প্রোগ্রাম দেখাচ্ছে। বেশ কয়েকদিন আগে পূজারিণী একটা স্টেজ শো করেছিল। সেটাই রিপিট হচ্ছে। শ্রাবণ সেটা দেখতে লাগলো।

কয়েকমাসের মধ্যে পূজারিণী ভীষন রোগা হয়েছে।ঝোরে পড়েছে তার সুগঠিত শরীর।ভেঙে পড়েছে তার সেই উজ্জ্বল মায়াবী মুখ খানা। চোখে মুখে কালো রেখা স্পষ্ট। একটা গোলাপী রঙের শাড়ি পড়ে রয়েছে। গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হালকা নাচও করছে। সামনের দর্শক আনন্দে আপ্লুত।এক একটা গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান ঝাঁজালো হাতের তালি। একটা মানুষকে দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছে। একটা মিলন তীর্থ তৈরি হয়ে উঠেছে। দর্শক এতকিছুর মধ্যেও শ্রাবণের লেখা”আজ এই শ্রাবণের ভরা মরশুমে” গান বারবার গাইতে বলছে। কিন্তু পূজারিণী কিছুতেই ওই গান গাইলো না। বারবার এড়িয়ে যেতে থাকলো। শ্রাবণ বলে যেন তার জীবনে কেউ ছিল না।

পূজারিণী এমন ভান করছে যেন সে শ্রাবনকে কোন দিনের জন্য দেখেনি।ওকে চিনেও না। শ্রাবণের মনটা হতাশায় ভরে গেল। গালে হাত দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ লক্ষ্য করলো পূজারিনীর মাথার দিকে। সে এখনো সিঁদুর পরে রয়েছে, হাতে রয়েছে শাঁখা_পলা। অর্থাৎ সে এখনো শ্রাবনকে ভুলে যেতে পারেনি। এখনো নিজেকে শ্রাবণের স্ত্রী মনে করে।শুধুমাত্র মানুষকে দেখানোর জন্য শ্রাবনকে ভুলার অভিনয় করছে। এখনো শ্রাবনকে গভীর ভাবে ভালবাসে। শ্রাবণের জায়গা কেউ কখনো নিতে পারবে না।

শ্রাবণ টিভিতে প্রোগ্রাম দেখছে আর একা একা হাসছে। এমন সময় একটা ছায়া তার সামনে এসে পড়ল।ছায়া যে তার দিদিভাইয়ের সেটা বুঝতে বাকি থাকল না। সে ঘুরে দেখল। বর্ষা দাঁড়িয়ে রয়েছে করুন মুখে। কোন কথা নেই, শুধু চোখ থেকে জল পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্ষা এখন কোথা থেকে এলো? সে অফিসে গিয়েছিল। বর্ষা কখনো তার কাজে ফাঁকি দেয় না। নিজের কাজের প্রতি ভীষন দায়িত্বশীল। এমন সময় কাজ ফেলে কিছুতেই সে বাড়ি ফিরে আসবে না। নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।

তাহলে কি চাকরি হারিয়ে ফেলেছে? সেটাও সম্ভব নয়। বর্ষা একটা অফিসের দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এত সহজে তাকে চাকরি থেকে ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়। তবে কি এমন ঘটলো, যেখানে দিদি ভাইকে বাড়ি ফিরে আসতে হলো। শ্রাবণ উঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। বর্ষা তার কাছে বসে পড়ে হেসে ফেললো। শ্রাবণ একটা জোরে শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।তারপর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই বর্ষা বলল, “ভয় পেয়ে গেছিস তো?”
_ “ভয় পাব না মানে…. ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম।”

_ “আর ভয় পেতে হবে না। তুই তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে। আমরা একটা জায়গায় যাব।”
_ “এই দুপুরে এখন কোথায় যাব? তাছাড়া তুই তোর অফিসে কাজ ফেলে চলে আসলি কেন?”
_ “সব কথা বলছি। আগে তৈরি হয়ে নে।”

শ্রাবণ প্রথমে না না বলছিল। কিন্তু দিদি ভাইয়ের জোরজবস্তিতে সে বাধ্য হল তৈরি হতে। বর্ষার সাহায্যে সে খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। অনন্যা দেবী ওদের রুমে প্রবেশ করল। উনার মুখেও প্রসন্ন হাসি। সবাই এমন করছে কেন শ্রাবণ বুঝতে পারল না। সে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এবার তো অন্তত বল কি হয়েছে?”
_ “আরে পাগল তুই বাবা হতে চলেছিস, আর আমি পিসি।”

_ “কি?”
বর্ষা সকালের খবরের কাগজ শ্রাবণের দিকে বাড়িয়ে দিল। শ্রাবণ তীক্ষ্ণ চোখে হেডলাইনস পড়ল। খুব স্পষ্ট ভাবে লেখা রয়েছে, বর্তমানে জনপ্রিয় গায়িকা পূজারিণী চৌধুরী মা হতে চলেছে।চৌধুরী পরিবারের খুব তাড়াতাড়ি নতুন অতিথির আগমন ঘটতে চলেছে। নতুন অথিতির আগমনে আনন্দে উদ্বেলিত চৌধুরী পরিবারের প্রত্যেক সদস্য। তবে অভিনেত্রী চৌধুরী পরিবারের সদস্যের সম্পর্কে একটাও কোন কথা বলেনি………..

আরো অনেক কিছুই লেখা রয়েছে। সবটা পড়লো না না শ্রাবণ। চোখের জল ধারা বিয়ে পড়ছে। বাবা হওয়ার অনুভূতি অনুভব করছে সে। শুধুমাত্র একটা বাবা ডাক ভুলিয়ে দেয় পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট।দুনিয়ার সব কিছু স্বপ্ন মায়া ছেড়ে দিতে হয় এই একটা ডাকের জন্য। ‘বাবা’ শব্দ টা বড্ড ভয়ানক। ‘বাবা’ ডাকটা শোনাটা অত সহজ নয়। ‘বাবা’ শব্দের পেছনে থাকে একরাশ ভালোবাসা, থাকে দায়িত্ব কর্তব্য, থাকে কঠোর পরিশ্রম। সব বাধা_বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া মানুষটি হয় ‘বাবা’।

কিন্তু শ্রাবণের মন হৃদয় কাঁপতে লাগলো। সে কি আদৌও বাবা হওয়ার যোগ্য? বাবা হওয়ার একটাও দায়িত্ব পালন করে নি সে। বরং দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন আর ক্ষমা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শব্দ নেই। তাকে ক্ষমা চাইতে হবে পূজারিনীর কাছে। স্বপ্ন নয় এবার সংসারে মন দিতে হবে। তার ভুলের জন্য তার ছেলে কেন পিতৃহীন পরিচয়ে বড় হবে? এখনই গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে।সে গ্রামে যাবে বর্ষার সাথে। শুধু শ্রাবণের আনন্দ হচ্ছে না, বর্ষাও ভীষণ আনন্দিত। মাঝেমধ্যে আনন্দে নেচে যাচ্ছে। অনেক দিনের পর তাদের ঘরে ছোট্ট একটা সোনা আসতে চলেছে। তাদের দুঃখ কষ্ট সব ভুলিয়ে দেবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করে যিনি তিনি হচ্ছেন বাবা।’বাবা’, শুধুমাত্র এই একটা শব্দের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে হাজারো স্বপ্ন ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। অজানাকে জানতে হয়। সমস্ত রাগ, অভিমান, জেদ ভেঙ্গে যায় এই একটি শব্দের মাধ্যমে। শ্রাবণের ও সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় শুধু বাবা হওয়ার অনুভূতিতে।সে ছুটে চলেছে গ্রামের দিকে। অনেক ভুল করে ফেলেছে। পূজারিণীকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। অজান্তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠছে। বিকেলের হালকা আলোকচ্ছটা গাড়ির কাচ ভেদ করে তার মুখে পড়ছে।

মুখটি প্রচন্ড উজ্জ্বল এবং মায়ায় ভরা। পূজারিণী যদি এমন অবস্থায় তাকে দেখে তাহলে কি হবে? নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে যাবে। সে ভাবতে পারবে না, তার শ্রাবণ তাকে ফিরিয়ে আনতে এসেছে। এতো মানুষের সামনে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলবে। ভাবতেই অবাক লাগছে শ্রাবণের। অনেকগুলো দিন একই সাথে থাকা হয়নি। অনেকগুলো দিন পাশে ঘুমিয়ে গল্প হয়নি। বড্ড উসখুস করছে শ্রাবণ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পূজারিনীর সাথে দেখা হবে। কিন্তু পূজারিণী কি আদৌ তাকে ক্ষমা করবে?

ক্ষমা করবে না কেন? পূজারিণীর ভালোর জন্য ডিভোর্স দিয়েছিল, এবং সেটা সফল হয়েছে। পূজারিণী সবকিছু জানার পর নিশ্চয়ই তাকে ক্ষমা করে দেবে। শ্রাবনকে বারবার এমন হাসি মুখে দেখে বর্ষা বলল, “মুখে এত প্রসন্ন হাসি কেন?”
_ “এমনি।”

_ “বুঝতে পারছি হাসির কারণ কি? সংসারের মায়ার যে একবার আবদ্ধ হয়েছে তাকে কখনো ওইখান থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তোর ক্ষেত্রেও তাই হল। জীবনে যত বড়ই স্বপ্ন থাকুক না কেন সংসারের মায়ার কাছে একদিন ঠিক হারিয়ে যাবে। সংসার বড্ড জটিল জিনিস। সংসার নামক সম্পর্ক যতটা রোমান্টিক তার চাইতেও বেশি বেদনাদায়ক।”
শ্রাবণ মৃদু হাসি দিয়ে মাথা নাড়ালো। সত্যি সংসার নামক শব্দটি বড্ড জটিল। ওই মায়ায় একবার ঢুকলে বেরোনো এত সহজ নয়। সমস্ত স্বপ্নের বাক্য সংসার নামক শব্দটি কাছে ছোট হয়ে যায় বারবার। এক সময় হাসি খুশিতে থাকা ছেলে কিংবা মেয়ে মুখে হাসি হারিয়ে যাওয়ার কারণ থাকে ওই সংসার।

কিন্তু গ্রামে ফিরে তারা হতাশা হলো। তাদের বাড়িতে তালা লাগানো। শ্রাবণের হাসিমুখ মুহূর্তের মধ্যে বিষণ্ণতায় ভরে উঠলো। হৃদয়ের মধ্যে পূজারিণীকে হারানোর বেদনা শুরু হয়েছে। বুকটা বার বার ধুকপুক করে উঠছে। বর্ষা আশেপাশে তাদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করল। বেশ কয়েকজন মানুষকে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারল, তাদের পুরো পরিবার এখন শহরে থাকে। শহরে কোথায় থাকে তা জানা নেই। বেশ কয়েক মাস আগেই তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেছে।

মাঝেমধ্যে আসে। হতাশা হয়ে বর্ষা পূজারিণীকে কল করল। কিন্তু তাও হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারল না। নাম্বারটা ব্ল্যাকলিস্টে ফেলা। অনেক আগেই শ্রাবণের নাম্বার ব্ল্যাকলিস্ট করে রেখেছে পূজারিণী। পাশেই একটা দোকান থেকে ফোন নিয়ে কল করলো। অনেকবার রিং হওয়ার পর পূজারিণী ফোন ধরল। পূজারিণী কথা বলে যাচ্ছে। শ্রাবণ কিছু বলছে না। শুধু তার ভয়েস শুনছে। কত দিনের পর তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে। শ্রাবণ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। বর্ষা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি করে কথা বল, না হলে সে কল কেটে দিতে পারে!”

শ্রাবণ বর্ষার কথামতো তাড়াতাড়ি বলল, “হ্যালো”।
_ “কে বলছেন?”পূজারিণী বলল,
_ “আমি শ্রাবণ। তোমার শ্রাবণ।”কেঁপে কেঁপে বলল,
এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পূজারিণী কড়া স্বরে বলল, “সরি, আমি ওই নামে কাউকে চিনি না।”


পর্ব ৩০

পাঁচ বছর পর….

সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় মানুষ, সম্পর্ক, অনুভূতি এমনকি আমরা নিজেরাও। চেনা যায় বন্ধুরূপে শত্রু শত্রু রুপে বন্ধু। শীতে জবুথবু খাচ্ছে শহরবাসী। অভিজিৎ বাবু ছোট্ট আরাধ্যাকে কোলে নিয়ে রোদে বসে রয়েছে। আরাধ্যা শুধু কেঁদে চলেছে। মায়ের কাছে যাবে। ঋতু একটু কাজে ব্যস্ত। কয়েক মাস আগে ঋতুর কোল আলো করে আরাধ্যা আসে। আরাধ্যা এখন অনেক ছোট। মামার কাছে কিছুতেই থাকছে না। মায়ের কাছে যাবে। বাচ্চা ছেলেকে কোলে করে ঘোরাতে বেশ ভালই লাগে অভিজিৎ এর।

আরাধ্যা যতই কাঁদছে অভিজিৎ ততই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আরাধ্যা কিছুতেই শুনছে না। সে একমুহূর্তের জন্যও অভিজিৎ বাবুর কাছে থাকতে চায় না। অভিজিৎকে দেখেই ভয় পাচ্ছে। আরাধ্যার কান্না শুনে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এল ঋতু। একটা মাংকি ক্যাপ নিয়ে পরিয়ে দিল আরাধ্যাকে।

মাকে দেখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল আরাধ্যার মুখে। বাচ্চার মুখে তৃপ্তির হাসি যেকোনো মাকে ভুলিয়ে দেয় হাজারো কষ্ট। মাকে দেখার পর আরাধ্যা কিছুতেই মামার কোলে থাকলো না। মায়ের কোলে গিয়ে উঠল। অভিজিৎ ঋতুকে বাচ্চা দিয়ে হেসে উঠল। বাচ্চাটাও মায়ের কাছে গিয়ে হাসতে লাগল খিলখিল করে। ঋতু হাসির ভঙ্গিতে আরাধ্যাকে বলল, “উনি তো মামা। মামাকে ভয় পাচ্ছ কেন?”

আরাধ্যার জ্বলজ্বল করা দুটো চোখ অভিজিৎ এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে থাকলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আরাধ্যা কেঁদে উঠলো। ঋতু তার পিঠে হাত চাপড়ে বলল, “আচ্ছা সোনা যেতে হবে না। এবার কান্না থামায়।”

অভিজিৎ আর ঋতু পাশাপাশি দুজন বসলো। উৎপল এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। আরাধ্যা কিছুক্ষণ কান্না করার পর থেমে গেল। তারপর মায়ের কোলে খেলতে লাগলো। ঋতু এখন আর আগের মতো দাদাভাইকে ভয় পায় না।খুব অপছন্দের কাজ ছাড়া অভিজিতও তার কোন কাজে বাধা দেয় না।ঋতু একটু থেমে থেমে দাদাভাইকে বলল, “দাদাভাই একটা কথা বলি?”

_ “হ্যাঁ বল?”
_ “আর কতদিন এইভাবে থাকবে? বলতে বলতে 35 বছর হয়ে গেল। এবার তো বিয়ে করে নাও? এইভাবে সারা জীবন একা থাকা যায় না।”
অভিজিৎ মৃদুভাবে হাসতে থাকলো। ঋতুর মাথায় হাত বোলিয়ে বলল, “কে বলেছে একা থাকা যায় না? কত মানুষ আজও একা রয়েছে। নিজের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি এখনো দুর্গাকে ভুলতে পারিনি।তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আজও আমাকে পুড়িয়ে মারছে। ওর জায়গায় আমি কাউকে বসাতে পারবো না। তার হত্যাকারীকে ও আমি শাস্তি দিতে পারছি না। বিবেক আত্মবোধের কাছে আমি বারবার হেরে যাচ্ছি।”

_ “কে এই খুনি? যাকে তুমি অ্যারেস্ট করতে পারছ না। এতগুলো খুন করার পরও সে সমাজের চোখে নির্বিধায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
_ “সে খুনি নয়? সে সমাজে অনেক ভালো একটা মানুষ। সে যা করছে সমাজে ভালোর জন্য করছে। হয়তো আইনের চোখে সে অপরাধী।”
_ “যতই সে ভালো মানুষ হোক না কেন, সে আমার বৌদি মনিকে হত্যা করেছে।

তাকে শাস্তি একদিন পেতেই হবে। আমরা ক্ষমা করলেও ভগবান কোনদিন ক্ষমা করবে না।”
অভিজিৎ চুপ করে রইলো। কোন কথা বলছে না।এদিকে আরাধ্যা টিপটিপ করে তাকিয়ে রয়েছে দুজনের দিকে। অভিজিৎ কে দেখে এখন আর কান্না করছে না সে। হেসে উঠছে বারবার। সেও যেন খুব মন দিয়ে তাদের কথা শুনছে। অভিজিৎ হালকা স্বরে বলল, “তুই ভাব, উৎপল একটা ভুল কাজ করলো। তার ফলে আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলাম। তখন তুই কি করবি?”
অভিজিৎ এর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঋতু জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে দিল। তার কান্না দেখে আরাধ্যাও কান্না জুড়ে দিল। সামান্য কথায় ঋতু এমন রিঅ্যাক্ট করবে বুঝতে পারেনি অভিজিৎ। বোনকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বলল, “আরে পাগলি, আমি তো জাস্ট একটা উদাহরন দিয়ে বললাম। আমি কখনোই তোকে ছেড়ে যাবো না। সবসময় পাশে থাকবো।

_ “আর এমন কথা বলবে না বলো?”
অভিজিৎ বোনের চোখে চোখ রেখে ‘না’ বলল, তারপর একই প্রশ্ন পুনরায় করল। ঋতু কোনো কিছু না ভেবেই বলল, “আমি উৎপলকে মেরে ফেলবো।”
অভিজিৎ একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “দেখেছিস তুই সামান্য একটা ব্যাপারে এত রিঅ্যাক্ট করছিস। তাহলে ওই মেয়েটা কেন করবে না! যে‌ নিজের চোখের সামনে দিদি ভাইকে পিসিয়ে হত্যা করতে দেখেছে। রক্ত মাংস মাখা টুকরো টুকরো দেহ মাঝ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছে। রক্ত মাংস মাখা দেহের টুকরোগুলো নিজে হাতে কুড়িয়েছে।দাদাভাইকে প্রতিবন্ধী হতে দেখেছে। তারপর সে কি করে চুপ থাকতে পারে? এমন ঘটনা যাতে কোনো পরিবারে না ঘটে সে তার জন্যই হত্যা গুলো করছে..……

সে যাতে আর হত্যা করতে না পারে তার ব্যবস্থা আমি করে দেব।”
কিছুক্ষণ থামার পর অভিজিৎ আবার বলল, “কথায় কথায় তোকে সব বলে ফেললাম। আশা করি, এতক্ষণে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝতে পেরে গেছিস খুন গুলোকে করেছে। এই কথা যেন আমরা দুজন ছাড়া কেউ না জানে।আমি চাই না সমাজের আর চারটা মানুষ এই খুনের ব্যাপারে জানুক…..”

অভিজিৎ কথা শুনে ঋতু ভীষণ অবাক হয়। তার কাছে পুরো ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যায়। খুনগুলো বর্ষা করেছে। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বলতে পারবে না বর্ষা একজন খুনি। একের পর এক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুন করে গেছে। প্রতিশোধ নিয়েছে নিজের দিদিভাইয়ের মৃত্যুর। কিন্তু কাউকে একবারের জন্যও বুঝতে দেয়নি সে একজন হত্যাকারী। এতক্ষণ ধরে ঋতু খুনিকে ঘৃণা করলেও এখন প্রাউড ফিল করতে শুরু করেছে। কিছু কিছু সময় আসে যেখানে আইন কাজ করে না।

সব সময় আইনের উপর ভরসা করা যায় না। আইনের কাঠগড়ায় অনেক সময় নিরপরাধী অপরাধী হয়ে যায়, আবার অনেক অপরাধী নিরপরাধী হয়ে যায়। একটা ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেও অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়।একটা ছোট্ট মেয়ে কিংবা মহিলাকে ধর্ষণ করে ও ছাড় পেয়ে যায় অপরাধী। তার হয়েও উকিল পাওয়া যায় আমাদের সমাজে। যদি সমাজের বুকে ধর্ষণকারীর কিংবা ছোট্ট পবিত্র শিশুর হত্যাকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আইন থাকে, তাহলে সেই সমাজে বারবার বর্ষার মতো নারীর জন্ম নেবে।তারা সমাজে ভালো মুখোশ পরে আড়াল থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করে দেবে।যাতে জঞ্জাল রুখে দাঁড়ানোর সময় একবার হলেও ভয় পায়।

সেদিন গ্রাম থেকে ফিরে এসে তন্ন তন্ন করে শহরের প্রতিটি কোনায় খুঁজেছে পূজারিণীকে। কিন্তু কোথাও পায়নি।কয়েক মাস খোঁজার পর তারা জানতে পারে পূজারিণী এখন মুম্বাইতে থাকে। শ্রাবণ প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে করে দিদিভাইকে নিয়ে হাজির হয় মুম্বাইতে। মুম্বাইয়ের প্রতিটা শহরে খুঁজতে থাকে পূজারিণীকে। একসময় পূজারিণী খোঁজ পিয়ে যায়। কিন্তু পূজারিণী তাদের চিনতে পারেনি। শ্রাবণ যেভাবে অপমান করে পূজারিণী কে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিন পূজারিণীও একিভাবে বদলা নেয়। জঘন্য ভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। বর্ণালী দেবী অনেক বুঝিয়ে ছিল পূজারিণীকে। পূজারিণী শোনেনি। মানুষ মাত্রই ভুল করে। শ্রাবণও ভুল করেছে। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। কিন্তু পূজারিণী করেনি। রাগ অভিমান এখনও সে জমিয়ে রেখেছে।

পোড়া কপাল নিয়ে ফিরে আসে কলকাতা।বেহায়ার মত বর্ষা অনেকবার পূজারিনীর সাথে যোগাযোগ রাখে। মাঝে মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে যেতে থাকে।যাওয়া পিছনে একটাই উদ্দেশ্য কি ছিল। যে কোনোভাবেই হোক পূজারিণী কে আবার তাদের বাড়িতে নিয়ে আসবে। কিন্তু পূজারিণীকে আনা সম্ভব হয়নি। সে এখন মুম্বাইতে থাকে।এখন ইন্ডিয়ায় প্রথম সারির গায়িকার মধ্যে উজ্জ্বল একটি নাম পূজারিণী। সারাদেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে।কিন্তু প্রতিটা প্রোগ্রামের তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তার গুরু কে? পূজারিণী এড়িয়ে যায়। তার কোন গুরু নেই। সে নিজেই গান শিখেছে। নিজেই নিজের গুরু। তার সমস্ত কাজে তাঁর আত্মার স্বরূপ জড়িয়ে রয়েছে তার বাবা_মা।

এছাড়া তার জীবনে আর কেউ নেই। প্রতিটি ইন্টারভিউ কিংবা পাবলিক প্লেসে নাম না করে খুব ভালোভাবেই অপমান করে শ্রাবনকে। অদ্ভুত এই শ্রাবণ।সেই সব ইন্টারভিউ দেখতে তার ভালো লাগে। বর্ষা অনেক বুঝেছে, সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু সে আসেনি। পূজারিণী তাকে অপমান করছে। তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সেগুলো তার পাওনা ছিল, আর সে পাচ্ছে। পূজারিণীকে নিজে হাতে করে গান শিখেছিল। হয়তো তার ভাললাগাকে প্রশ্রয় দেয়নি।

কোথাও সে তার নাম বলেনি। তাতেও তার অসুবিধা নেই। কিন্তু কষ্ট হয় তখন, যখন সে বাংলা গানকে অপমান করে।শ্রাবণ পূজারিণীকে গান শিখিয়েছিল শুধুমাত্র একটা উদ্দেশ্য, বিশ্বের দরবারে আবার একবার বাংলা গানকে সেরার সেরা করতে।তার মাধ্যমে বাংলা গান বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে। বহু বছর আগে বাংলা সিনেমা কিংবা গান বিদেশেও চলত। দিনের পর দিন তা হারিয়ে যায়। পুরনো গৌরব কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে চাইছিল পূজারিনীর মাধ্যমে।

কিন্তু পূজারিণী বাংলা গানকে ভুলে গেছে। বছরে অনেক বাংলা গানের অফার আসে পূজারিনীর কাছে। কিন্তু সবগুলো না বলে দেয়। সে বলিউডে কাজ করতে পছন্দ করে। বাংলা গান তার সহ্য হয় না? সে নাকি বাংলা গানকে ঘৃণা করে। তার জীবনের সবচাইতে অপছন্দের যদি কোন জিনিস থাকে, সেটা হল বাংলা গান। যে মানুষগুলো তাকে ট্রোল করেছিল তাদের জন্য সে কিছুতেই গান গাইবে না। তার কোন ভুল না থাকা সত্ত্বেও যারা তাকে গালি দিয়েছিল জঘন্য ভাবে।

তাদের হয়ে সে কখনোই লড়বে না। তাদের গান সে উচ্চারণ করবে না। পূজারিণীর এমন যুক্তিহীন বক্তব্যের কোন বাক্য নেই। পূজারিণী এমন করছে কেন তা জানা নেই। তবে তার অহংকার বেড়ে গেছে। খুব বিলাসবহুল ভাবে জীবন যাপন করেছে। পূজারিণী হয়তো ভুলে গেছে অহংকারই পতনের কারণ। তার পতন অতি শীগ্রই ঘটবে।
প্রতিদিনের মতো আজও দোকানে এসেছে শ্রাবণ।দু_ একটা কাজ ছাড়া তেমন কাজ করতে পারে না।

যতটুকু সম্ভব ততটুকুই করে। আজ কতগুলো বছর পূজারিণীর সঙ্গে কথা হয়নি। বারবার মনে পড়ে তার কথা। কিন্তু পূজারিনীর কি একবারও মনে পড়ে না? হয়তো পড়ে বা ভুলে গেছে সবকিছু। একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি শ্রাবণের। কি করছে? কেমন আছে? তাও জানা নেই পূজারিনীর। শ্রাবণ ফোন তুলে নিয়ে পূজারিনীর নাম্বার খুঁজতে লাগলো। আজ সে পূজারিণীকে কল করবে। আবার অপমান করবে। করুক! অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য তো তার সঙ্গে কথা বলা যাবে।

এটাই অনেক তার কাছে। শ্রাবণ পরপর দুবার কল করলো কেউ রিসিভ করল না। তিনবার কল করতেই একটা বাচ্চা মেয়ে কল ধরল। তার গোলাপী ঠোঁট তুলে বললো, “হ্যালো, কে বলছো?”
শ্রাবণ নিস্তব্ধ। চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল পড়লো। মেয়েটাকে হয়তো শ্রাবণ চিনে না।কিন্তু তার পুরোপুরি বিশ্বাস মেয়েটি অন্য কেউ নয়, তার সন্তান। তার মেয়ে পূজা। শুধু নেই কোনো অধিকার। আছে অগাধ ভালোবাসা। শ্রাবণকে কোন কথা বলতে না দেখে মেয়েটি বলল, “আপনি কথা বলছেন না কেন? আপনি কে বলুন?”

শ্রাবণ চোখের জল মুছলো। মৃদু কণ্ঠে বলল, “আমি তোমার বন্ধু সোনা।”
_ “এ মা…. আপনি কি সব বলছেন। এত বড় একটা মানুষ ছোট্ট বাচ্চার বন্ধু হতে পারে?”
শ্রাবণ হালকা হাসলো। মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতি। উপস্থিত বুদ্ধি প্রচুর রয়েছে তার সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়। শ্রাবণ হাসিমুখে বলল, “আমি তোমার মায়ের ভালো বন্ধু। তোমার মা কই?”

_ “বাথরুমে…..”
পূজা আরো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু পারল না। তার আগেই রুমের মধ্যে প্রবেশ করল পূজারিণী। সে জানতে চাইলো কে ফোন করেছে? কার সঙ্গে কথা বলছে সে? পূজা খুব মিষ্টি গলায় সব কিছু বলল, এদিকে শ্রাবণ বসে বসে সব কিছুই শুনতে পাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পূজারিণী ফোন ধরল। তারপর খুব স্বাভাবিক এবং হাসিমুখে বলল, “কেমন আছেন?”

_ “ভালো। তুমি কেমন আছো?”
_ “অনেক ভালো।”
শ্রাবণ ভীষন আশ্চর্য হল। পূজারিণী এত কমফোর্টেবল ভাবে কথা বলছে কেন? সে কি তাহলে সবকিছু ভুলে গেছে। সে এবার ফিরে আসতে চায়? না কি তাকে চিনতে পারছে না? মনের খটকা দূর করার জন্য শ্রাবণ বলল, “আমি শ্রাবণ বলছি পূজারিণী।”

পূজারিণী হা হা করে হেসে উঠলো। তার হাসি মটেও ভাল লাগলো না শ্রাবণের। তবুও সহ্য করতে হলো। হেসে হেসে পূজারিণী বলল, “আরে মশাই আমি জানি। তোমার দিদিভাই রয়েছে বর্ষা। এবার তো বিশ্বাস হল, আমি তোমাকে চিনতে পারছি।”
_ “হ্যাঁ। কিন্তু……”

_ “কি? কিন্তু…..”
_ “তোমাকে বড্ড খুশী দেখাচ্ছে। এতকিছুর পরও অনেক খুশিতে আছো দেখছি।”
_ “দুঃখ পাওয়ার কোন কারন তো নেই। দুঃখ পাবো কেন? আজ কাল কে কি বলছে? কি করছে? সে সব আর জানতে ইচ্ছে করে না। নিজের একটা জগত বানিয়ে নিয়েছে আর সেখানেই আমি খুব ভালো আছি।”

শ্রাবণ চুপ হয়ে থাকল। পূজারিণী হাসির কারণ বুঝতে বাকি থাকল না। পূজারিণীর কাছে সব কিছুই রয়েছে। ঢাকা, বাড়ির, নাম, খ্যাতি কোন কিছুর অভাব নেই। বাড়িতে এলে ছোট্ট পূজা রয়েছে। তার সঙ্গে হাসিখুশিতে কাটিয়ে দেবে। তাইতো তার কোন দুঃখ যন্ত্রণা নেই। আজকে শুধু সুখ আর সুখ। তবে শ্রাবণের এত দুঃখ কেন?

তারও বর্ষা রয়েছে। এতগুলো বছর সে বর্ষার সঙ্গে থেকেছে। আজও থাকবে ভবিষ্যতেও থাকবে। বর্ষা তার সবকিছু। তাকে কখনো কষ্ট পেতে দেয়নি। তাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল এক নতুন জগৎ। সেই জগৎ থেকে কিছুক্ষণের জন্য হয়তো বিদায় নিয়েছিল সে। কিন্তু আবার ফিরে আসবে বর্ষার কাছে। এই পৃথিবীতে শ্রাবনকে একমাত্র খুশিতে রাখতে পারবে একজন, সে হচ্ছে বর্ষা।”শ্রাবনের বর্ষা”। শ্রাবণ আবার থেমে থেমে বলল, “সবকিছু ভুলে আবার ফিরে আসা যায় না?”

পূজারিণী কোনো কথা না ভেবেই তাড়াতাড়ি জোর গলায় উত্তর দিল, “না, ফিরে আসা যায় না। জীবনে ছেড়ে যাওয়া মানুষটি দ্বিতীয়বার ফিরে না আসাই ভালো।”
_ “পূজারিণী, একবার বোঝার চেষ্টা করো। আমি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আজ পাঁচ বছর ধরে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। একবার ক্ষমা করে দাও।

আমি বুঝেছি স্বপ্ন সব কিছু নয়। পরিবার সবকিছু। আগে পরিবার তারপর স্বপ্ন।পরিবারের সুখের চাইতে স্বপ্ন কখনোই বড় হতে পারে না। একদিন আমি স্বপ্নের জন্য সব কিছু ছাড়তে চাইছিলাম। কিন্তু আজ পরিবারের জন্য সব কিছু ছাড়তে রাজি আছি। তুমি ফিরে আসো। আমরা আবার আগের মত হয়ে যাই। এখন বুঝতে পারি বাবা হওয়ার অনুভূতিটা কতটা কষ্টের। বাবা হয়েও ‘বাবা’ ডাকটা শুনতে পাই না। খুব নিষ্ঠুর আমি। তাও এই নিষ্ঠুর মানুষটাকে একবার ক্ষমা করে দাও।”

শ্রাবণের নরম কণ্ঠস্বর পূজারিনীর পাষাণ হৃদয় গলাতে পারল না। সে হাসিমুখে বলল, “কিছু সিদ্ধান্ত ভালোবাসার আগে নিতে হয়।কারণ ভালোবাসার পর তো দায়িত্ব নিতে হয়।”
শ্রাবণ চুপ হয়ে গেল। পূজারিণীও কোন কথা বলল না। অনেকক্ষণ নীরবতা বিরাজ করল। একসময় শ্রাবণ আবার বলল, “তুমি তাহলে আবার বিয়ে করবে?”
_ “হ্যাঁ করব। তাতে তোমার অসুবিধা কোথায়?”

_ “আমার কোন অসুবিধা নেই। শুধু তোমার পাশে দাঁড়ানো মানুষটাকে সহ্য করতে পারবো না।”
পূজারিণী আবার অট্টহাসি দিল। শ্রাবণের ইমোশনাল নিয়ে খেলা করছে।সে এক চরম উত্তেজনায় মেতে উঠেছে। জীবনে এতটা কষ্ট পেয়েছে সে এখন আর কারোর ইমোশনালকে গুরুত্ব দেয় না। এখন সবকিছুই তাঁর কাছে নাটক লাগছে। একবার মন ভেঙে যাওয়ার পর আবার নতুন করে মন গড়তে ইচ্ছে করে না। তবুও স্বাভাবিকভাবে বলল, “যাকে অন্যের পাশে দেখতে কষ্ট হয়। তাকে নিজের পাশে যত্ন করে রাখতে জানতে হয়। আপনি সেটা করেননি। হারিয়ে ফেলেছো সারা জীবনের মতো। শ্রাবণ আবার বলল, “তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ পূজারিণী।”

_ “ঠিকই বলেছেন। আপনাকে যদি আমি সত্যি বুঝতাম তাহলে কখনো এত ভালোবাসতাম না।”হাসির ছলে বলল পূজারিণী।
মধ্যরাত। যদিও মুম্বাই শহরের মতো মধ্যরাত বলাটাই ভুল। এখানে রাত নামে অনেক দেরিতে আবার খুব অল্প সময়ের জন্য। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে পূজারিণী। স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে শহরের দিকে। এত রাতেও আলোয় ঝলমল করছে শহর। গাড়ির সংখ্যা খুবই কম।

তবুও যেগুলো চলছে সেগুলো খুব স্পিডে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির স্পিডের মতো তার জীবনও যেন এমন দ্রুতভাবে বেরিয়ে গেল। কিভাবে এতগুলো বছর কাটিয়ে ফেলল সে জানে না। গ্রামের সেই সাদাসিধে মেয়ে আজ ভারতের প্রথম সারির একজন গায়িকা। পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না তার প্রমাণ পূজারিনী। কখনো লড়াই থেকে পিছুপা হয়নি। এগিয়ে গেছে, বারবার লড়াই করে গেছে, কখনো নিজের সঙ্গে, কখনো অন্যের সঙ্গে। তারপরই এসেছে এই সাফল্য।

কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে যে মানুষের অধিক অবদান, আজ সে সেই মানুষকেই অপমান করছে। বিশ্বের যদি ভগবান বলে কিছু থাকে তাহলে তাকে কখনো ক্ষমা করবে না। এর পাপের শাস্তি একদিন তাকে পেতে হবে। তার নাম_খ্যাতি সমস্ত কিছুর পেছনে রয়েছে শ্রাবণ চৌধুরী। আর সেই শ্রাবণ চৌধুরীকে আজ অপমান করতে ভালো লাগে পূজারিণীর। এটা বিধাতার কেমন খেলা? বিধাতার লীলা বোঝা বড় কঠিন

পূজারিণী তাকে কেন অপমান করে? তার জানা নেই। অপমান করে সে শান্তি পায়। মনে করে নিজের অপমানের সমস্ত প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আদৌ কি সে প্রতিশোধ নিতে পারছে? না নিজেই নিজেকে অপমান করছে?
মধ্যরাতে বেলকনিতে দাঁড়ালে শহরটাকে নিজের প্রেমিক মনে হয় আজকাল। রোজ পূজারিণী এখানে এসে দাঁড়ায়। আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ভাবছে অতীতের সেই দিনগুলোর কথা। কত সুখের ছিল ওই সব দিন। এমন সময় রুম থেকে বেরিয়ে আসলো পূজা। মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে বলল, “চলো…ঘুমাবে চলো।”
পূজারিণী পেছনে ঘুরে দেখল। পূজা তাকে ধরে টানছে। পূজারিণী পূজাকে কোলে তুলে নিল। বর্ষা মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বললো, “তুমি কাঁদছো কেন?”
_ “এমনি।”

_ “এমনি কেউ কাঁদে বুঝি।”
পূজারিণী হাসিমুখে বলল, “না, তবুও মাঝে মধ্যে কান্না করা ভালো। অন্তত নিজেকে অনেক হালকা মনে হয়।”


পর্ব ৩১

শ্রাবণ মাস। সারারাত অঝোরে বর্ষণ হয়েছে। সকালেও বেশ অনেকক্ষণ ধরে বর্ষা চলল।সকাল সকাল খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসল শ্রাবণ।প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় রাজ্যের বিরক্তকর রাজনীতির ঘটনা ছেপে রেখেছে। বিরক্তকর নিউজগুলো না পড়ে পুরো শেষের পাতায় চলে গেল। আচমকা লক্ষ করল পূজারিনীর একটি আর্টিকেলস বেরিয়েছে। সম্ভবত কয়েকদিন আগে ইন্টারভিউ দিয়েছিল। নানা ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছে। সে খুব নতুন ভঙ্গীতে গুছিয়ে উত্তর দিয়েছে। শ্রাবণ তাড়াহুড়ো করে পড়তে শুরু করল।
প্রশ্ন: আপনার কাছে ভালোবাসার মানে কি?

উত্তর: ভালোবাসা মানে শুধু আকর্ষণ নয়। ভালোবাসা মানে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সম্মান।
প্রশ্ন: আপনার গুরুর সম্বন্ধে কিছু বলবেন।শুনেছি আপনি গ্রামে বড়ো হলেও গানের প্রায় শিক্ষায় চৌধুরী পরিবার থেকে নিয়েছেন।
উত্তর: গ্রাম থেকে শহরে আসা যথেষ্ট কষ্ট সাধ্য ছিল। আর আমি ওই পরিবার থেকে গান শিখেছি। এতে ওই পরিবারের কোনো অবদান নেই। আমি টাকার বিনিময়ে ওদের বাড়িতে ছিলাম। এমনি এমনি থাকিনি। আমার গুরু আমার বাবা_মা।

এতদূর পড়ে আর পড়তে পারল না শ্রাবণ। এতটা রাগ পূজারিনীর। টাকা দিয়ে সব কিনে নিতে চায়। পারবে টাকা দিয়ে তার ঋণ শোধ করতে? দিনের পর দিন তাকে নিজে হাতে তৈরি করেছে। আজ তার এই উজ্জ্বল_চকচকে দিনের প্রশংসাযোগ্য কেবল শ্রাবণ। শ্রাবণ না থাকলে সে কখনোই এতদূর আসতে পারত না। আর দশটা প্রতিভাবান মানুষের মতো সেও হারিয়ে যেত। কিন্তু পূজারিণী আজ সব ভুলে গেছে। পড়ার ইচ্ছা না থাকলেও জোর করে পড়তে লাগল শ্রাবণ। মানুষটি কতটা নিচে নেমে গেছে সেটা অন্তত জানা যাবে। আবার গড় গড় করে পড়তে শুরু করল শ্রাবণ।

প্রশ্ন: আমাদের প্রত্যেকের জীবনে হেটার্স থাকে। আপনার জীবনেও নিশ্চয়ই রয়েছে। ওদের উদ্দেশ্যে কি বলবেন?
উত্তর: কুকুর আর হেটার্সদের মধ্যে একটা ভালো মিল পাবেন, দুজনেই পেছনে চেল্লায়। সামনে আসতে সাহস পায় না।
এই অংশটুকু পড়ার পর শ্রাবণ হেসে উঠলো। হেটার্সদের উদ্দেশ্য যোগ্য জবাব দিয়েছে পূজারিণী।
প্রশ্ন:আপনার সঙ্গে শ্রাবণের বিয়ে হয়েছিল এক বছরের মধ্যে তা বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আপনার কষ্ট হয় না?

উত্তর: দিনশেষে একা কিভাবে শক্ত থাকা যায় এটা শেখা অনেক জরুরী। আমি শিখে নিয়েছি।
প্রশ্ন: আপনার জীবনে শুধু সফলতার নয় ব্যর্থতাও এসেছে। ব্যর্থতার সময় নিজেকে কিভাবে প্রতিহত করেছে?
উত্তর:জীবনের কিছু মুহূর্ত আছে শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
প্রশ্ন: আপনার জীবন থেকে শ্রাবণ চলে গেল। আপনি একবারের জন্য ওকে আটকানোর চেষ্টা করেননি?

উত্তর: চলে যেতে চাইলে কারণ ছাড়া যাওয়া যায়। থেকে যেতে চাইলে নিয়ম ভেঙেও থাকা যায়।
প্রশ্ন: আমার শেষ প্রশ্ন, নতুন যারা সংগীত জগতে আসতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কিছু বলুন?
উত্তর: তাদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই কথা, লড়তে থাকো!লড়তে থাকো! সফলতা আপনার বাড়ির উঠোনে আসবে। আপনি সফলতার কাছে যাবেন না সফলতা আপনার কাছে আসবে।

আর্টিকেল পড়া শেষ হতেই চুপচাপ বসে রইল শ্রাবণ। কিছুক্ষণ পর বর্ষা দু’কাপ চা নিয়ে আসলো। একটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল আর একটা নিজে নিল। শ্রাবনকে গোমড়া মুখে বসে থাকতে দেখে বর্ষা বলল, “কি ব্যাপার, সকাল সকাল বাংলা পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছিস কেন?”
শ্রাবণ চুপচাপ বসে থাকলো। একজন বকবক করে যাচ্ছে আর অপরজন চুপচাপ বসে আছে, এটা কখনোই ভালো দেখায় না। শ্রাবণ বারবার এমন করে। একটু বিরক্ত সুরে বর্ষা বলল, “কিছু তো বল? এইভাবে চুপচাপ বসে আছিস কেন?”

_ “কিছু না। পূজারিণীর একটা আর্টিকেলস পড়ছিলাম।”ধীর কন্ঠে বলল শ্রাবণ। বর্ষা চায়ের কাপে চুমুক দিল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোকে অপমান করেছে তো!”
_ “না….”
_ “তাহলে….”

_ “কিছু না…”
_ “আমার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই। এই অপমানের জন্য তুই নিজে দায়ী। ওকে ওর মতো থাকতে দে। পূজারিণী ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক সংগীতশিল্পী আছে, রয়েছে আরও অনেক সেলিব্রেটি। ওদের আর্টিকেল পড়। জানিস পূজারিণী তোকে ঠিক অপমান করবে। আর জেনে বুঝেই তুই নিজের পায়ে কুড়ুল নিজেই মারছিস। আমার কিছু বলার নেই।”
শ্রাবণ চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিল। বেশ অনেকক্ষণ ধরে দুজন চুপ থাকল। একইভাবে বসে থাকার পর শ্রাবণ এক সময় বলল, “আমি একবার পূজারিণী সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমাকে নিয়ে যাবি?”

_ “ঠিক আছে। আজকে রাতে যাবো।”
_ “আজ!”
_ “হ্যাঁ। কলকাতায় আজ পূজারিনীর একটা প্রোগ্রাম আছে। আমরা ওই প্রোগ্রাম দেখব আর পূজারিণী সঙ্গে দেখাও করবো। কাল সকালে পূজারিণী আবার মুম্বাই ফিরে যাবে।”
শ্রাবণ হালকা হাসি দিল। তারপর হাসিমুখে বলল, “তাড়াতাড়ি যাব কিন্তু.….”
_ “বউকে দেখার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিস?”

দুজনই মৃদু হেসে উঠলো। অনন্যা দেবী ওই সময় ওদের কাছে আসলো। উনি কিছু একটা বলতে চাইছিলেন তবে বলেন না। ওদের মুখে হাসি দেখে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন। উনি নিজের মতো করে কোন ছেলে মেয়েকে তৈরি করতে পারেননি। নিজে যে স্বপ্ন দেখেছিল সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। চাইছিল শ্রাবণকে একটা নতুন জীবন দিতে। শ্রাবণের ছেলে হবে, মেয়ে হবে, একটা সুখের সংসার হবে। কিন্তু শ্রাবণ সব সময় স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকলো। স্বপ্ন ছাড়া কিছু ভাবলো না।

পূজারিণীর মতো ফুটফুটে মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।বর্ষাকে নিয়ে একি স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বর্ষা বিয়েই করল না। নিজের মতো করে একজন কে পেয়েছিল, সন্ধ্যা। কিন্তু ঈশ্বর তাকেই কেড়ে নিল। তারপর উনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয় পূজারিণীর। কিন্তু ঈশ্বর ওকেও বেশিদিন উনার কাছে রাখলেন না। সবই বিধাতার লীলা।বিধাতার লীলা নিজের সমস্ত স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেছে। সুখ শান্তি নেই। নিজের ছেলে মেয়েরা কখনোই উনাকে বুঝলেন না। যদি কেউ বুঝে থাকে সেটা সন্ধ্যা আর পূজারিণী। নিজের গর্ভের সন্তানরা কখনই বুঝতে পারল না। হয়তো এর জন্যই সমাজে একটা বাক্য প্রচলিত আছে, ‘রক্তের সম্পর্কের চাইতেও অনেক বড় গভীর সম্পর্ক হতে পারে’।

রাত প্রায় দশটা। চারিদিকে জাপানি আলোয় ঝলমল করছে স্টেজ। কিছুক্ষণ আগেই প্রবেশ করেছে পূজারিণী। ওকে একটা মুহূর্তের দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক উপস্থিত। উত্তেজনা চরমে পৌঁছে গেছে।এত দর্শকের মধ্যেও উপস্থিত রয়েছে শ্রাবণ আর বর্ষা। পূজারিণী স্টেজ শো করবে প্রায় সাড়ে দশটার দিকে। এখন থেকে প্রায় তিরিশ মিনিট গ্রিনরুমে থাকবে সে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইলে শ্রাবণ।সে একেবারে স্টেজে পেছনে আসলো সঙ্গে বর্ষা। প্রবেশ করার সময় তাদেরকে কেউ বাধা দিল না।

অনেকেই জানতো শ্রাবণ পূজারিণী স্বামী। তাই তারা খুব স্বাভাবিক নিল। গ্রিনরুমে পূজারিণী ছাড়া রয়েছে আরও অনেক মেয়ে। সেখানে শ্রাবনকে প্রবেশ করতে দিল না। ওদের মধ্যে একজন গিয়ে পূজারিণীকে সব বলল, শ্রাবণ এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। পূজারিণী এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে পূজাকে নিয়ে বেরিয়ে আসলো।
তার সঙ্গে আরো কয়েকজন আসার চেষ্টা করল। পূজারিণী বাধা দিল। তাদের ওইখানে থাকতে বলল, তারা দাঁড়িয়ে গেল। পূজা শুধু পূজারিনীর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। বাইরে পূজারিণী বেরিয়ে আসতে লক্ষ করল, শ্রাবণ হুইল চেয়ারে বসে রয়েছে। পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্ষা। দুজনের চোখে মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। অনেক দিনের পর তাদের সঙ্গে দেখা হলো। শ্রাবণের উজ্জ্বল চেহারা আর নেই। যে কোনো মানুষই দেখলে বলে দিতে পারবে তার বয়স যথেষ্ট। সাথে বর্ষার সেই মেদবহুল, উজ্জ্বল ত্বক কোথায় হারিয়ে গেছে। হঠাৎ করে যেনে তাদের জীবনে বার্ধক্য নেমে এসেছে। 35 বছর বয়সে তারা বার্ধক্য হয়ে গেছে। পূজারিণী চোখে জল আসলো।

কিন্তু কিছুতেই বুঝতে দিল না। নিজেকে শক্ত করল। আশেপাশে তেমন কেউ লোক নেই। কয়েকটা নিউজ চ্যানেল রয়েছে। তারা ক্যামেরা করছে। পূজারিণী বাধা দিল না। শ্রাবণের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। দুজন বেশ খানিকক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। দুজনকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে দেখে বর্ষা বলল, “এখানে শুভদৃষ্টি না করলেও চলবে। এটা পাবলিক প্লেস।সব ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে। যা বলার তাড়াতাড়ি বল।”

শ্রাবণ কিছুক্ষণ থেমে শান্ত মাথায় বলল, “পূজারিণী আমার ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ ফিরে চলো?”পূজারিণী অট্টহাসি দিল। মায়ের এমন হাসি দেখে পূজা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে মায়ের হাত জোরে আঁকড়ে ধরল। পূজা ধীর কন্ঠে বলল, “মা, এমনভাবে হাসছো কেন? আমার ভীষণ ভয় করছে।”পূজারিণী কোন উত্তর দিল না। শ্রাবণ হুইলচেয়ার একটু এগিয়ে নিয়ে পূজাকে কোলে নিতে চাইল। পূজারিণীর বাধা থমকে দাঁড়িয়ে গেল শ্রাবণ। পূজাকে আর কোলে নিতে পারল না। পূজারিণী জোর গলায় বলল, “একদম স্পর্শ করবে না। জোর করে সম্পর্ক জড়ানোর চেষ্টা করো না। ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।”

শ্রাবণ আবার পিছিয়ে আসলো। সেও জোর করে কোন সম্পর্কে জড়াতে চায় না। জোর করে কোন কিছু সম্ভব নয়, সেখানে সম্পর্ক তো অনেক দূরের ব্যাপার। শ্রাবণ একটু হেসে বলল, “পূজারিণী তুমি কি শুধু নিজের প্রতিভার জোরে গায়িকা হয়েছো। আমার কোনো অবদান ছিল না!আমি যদি তোমাকে গান না শেখাতাম তাহলে এত বড় গায়িকা হতে পারতে?”

_ “শ্রাবণ তুমি কি বলতে চাইছো? আমার কোনো প্রতিভা ছিল না। আমি পরিশ্রম করিনি? তোমার ইচ্ছাতে আমি গান গিয়েছি?”পূজারিণী উচ্চ স্বরে বলল,
_ “সেটা বলছি না। তোমার প্রতিভা ছিল। তুমি অনেক পরিশ্রম করেছ।কিন্তু তোমার মত হাজার হাজার মানুষের এমন প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু তাদের শ্রাবণ চৌধুরীর মত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়নি।শুধুমাত্র সঠিক পরিচর্যার অভাবে তোমার মত গায়িকা হয়ে উঠতে পারেনি। এত অহংকার কিসের?”

_ “কোনটা অহংকার কোনটা গর্ব সেটা আমার থেকে কেউ ভালো জানে না। আমার লাইফ আমাকে বুঝতে দাও। পারলে আমাকে বিরক্ত করা বন্ধ করো। আমি নতুনভাবে কোন সম্পর্কে জড়াতে চাই না। সব ভুলে গেছি। তুমি ঠিকই বলেছিলে লাইফ ইজ চেঞ্জেস। আমিও চেঞ্জ হয়ে গেছি।”
পূজারিণী কথা শেষ হতেই শ্রাবণ মৃদু কণ্ঠে বলল, “ঠিক আছে। আমি চলে যাচ্ছি। আমি তোমাকে গান শিখেছি আর তুমি আমার ঋণ টাকার মাধ্যমে শোত করতে চাইছ। আমি টাকা চাই না। একটা জিনিস চাইবো দেবে।?”

_ “কি?” মুখ পেঁচিয়ে পূজারিণী বলল,
_ “পূজাকে আমায় দিয়ে দাও। আমি ওকে অনেক সুখে রাখবো। আমি জানি সে তোমার কাছে ভালো নেই। তুমি ব্যস্ত তাই ওকে একটু সময় দিতে পারো না। তুমি এত ব্যস্ত যে তোমার পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে না। কিন্তু আমার মনে পড়ে।পূজাকে পেলে অন্তত কিছুটা সময় হলেও আমি সব ভুলে যাব। একটা শিকড় ধরে বাঁচতে পারব।”
_ “নো, নেভার। পূজা তোমার কেউ নয়। পূজা শুধু আমার মেয়ে।”

শাড়ির আঁচল ঠিক করে পূজারিণী হন হন করে গ্রিন রুমে চলে গেল। পূজার যাওয়ার সময় বারবার শ্রাবনকে দেখতে থাকলো। যতই হোক সে তার বাবা। বাবার প্রতি একটা অদ্ভুত টান রয়েছে। নিরবে বসে থাকল শ্রাবণ। পাশে বর্ষা দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। পূজারিণী এতটা বদলে যাবে কখনো ভাবেনি সে।শ্রাবণের দোষ ছিল কিন্তু ওই দোষের পেছনে কারণটা জানাও ভীষণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পূজারিণী কখনো জানার চেষ্টা করল না। শুধু ভুল বুঝে গেল।

অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার হালকা বর্ষা শুরু হলো। শ্রাবণ_বর্ষা আর প্রোগ্রাম দেখল। মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসলো। সামনে লম্বা রাস্তা। শ্রাবণ হুইল চেয়ারে বসে রয়েছে পেছনে বর্ষা ধরে আছে। গড় গড় করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে পূজারিনীর সুরেলা কণ্ঠ। বৃষ্টির ঝনঝন শব্দ তার মধ্যে পূজারিনীর সুরেলা কন্ঠ মিশে একাকার হয়ে গেছে।এই বৃষ্টি যেন হৃদয় ভাঙ্গা কষ্টে কেঁপে উঠেছে।তাই হয়তো জোরালো বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের বর্ষা আবার একটা বিচ্ছেদের সাক্ষী থাকলো। অনেকক্ষণ ধরে দুজন বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল। একসময় বর্ষা বলল, “কষ্ট হচ্ছে?”

_ “না তো। শ্রাবণের কাছে যতদিন বর্ষা আছে, শ্রাবণের কিচ্ছু হবে না। শ্রাবণের সুখের কারণ শুধু বর্ষা। অন্যান্য মাসের তুলনায় শ্রাবণ মাসে বর্ষাকে একটু বেশি মানায়। তেমনি শ্রাবণের পাশে কেবল বর্ষাকে মানায় অন্য কাউকে নয়।”

বর্ষা মৃদু হাসলো। এখনো বৃষ্টি চলছে। গানের শব্দ আর আসছে না। হয়তো বৃষ্টির কারণে প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা এক অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল, “সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই খুনগুলো আমরা কবে বন্ধ করব? কত খুন করবো নিজের হাতে।”
_ “আমার দিদি ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য যে মানুষটা দায়ী ওই মানুষটাকে যতদিন না খুঁজে পাচ্ছি ততদিন একি আসামি গুলোকে খুন করে চলবো।”
_ “যদি কোনদিন ওই মানুষটাকে না পাই!”

_ “তাহলে আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত খুন করে চলবো।”
শ্রাবণ থামল। বর্ষা একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “পূজারিণী কাল কোথায় একটা যাচ্ছিল। ভীষণ ব্যস্ত সে। কোন মানুষকে তোয়াক্কা না করে রাস্তায় পাথর গুলো সরিয়ে বিপরীত রাস্তায় যায়। ব্যস্ততার কারণে সে পাথরগুলো পূর্বের অবস্থায় রাখেনি। মাঝ রাস্তায় পাথর গুলো ফেলে দেয়। হয়তো এখনো পড়ে আছে।”
_ “পূজারিণীকে শেষ করে দে।”শ্রাবণ কোন কথা না ভেবেই বলে গেল।

_ “কি!”বর্ষা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
_ “ঠিক শুনেছিস। আজ রাতেই পূজারিণীকে শেষ করে দে।”
_ “সে তোর বউ। তাছাড়া আমি নিজের হাতে থাকে বড় হতে দেখেছি। তাকে আদর করে যত্ন করে গুছিয়ে দিয়েছি। পারব না তাকে আমি হত্যা করতে।”বর্ষা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, কিন্তু শ্রাবণ জোর গলায় বলল, “আমাদের দিদিভাই এর চাইতে বড় কিছু হতে পারে না। তোকে হত্যাই করতে হবে।

না হলে আমাদের দিদি ভায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। আমরা কখনো কারোর পরিবারের কথা ভাবি নি। আজও ভাববো না।নিজের পরিবারের কথা ভাবলে চলবে না। নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে যাবো। যতই ভালো মানুষ হোক একজন ক্রিমিনালের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে ক্রিমিনাল, অন্য কিছু নয়।”
_ “ঠিক আছে। আজকের রাত হবে পূজারিনীর শেষ রাত।”

গভীর রাত।শ্রাবণকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আবার এক রক্তাক্ত খেলায় মেতে উঠতে বর্ষা বেরিয়ে পড়লো। রাস্তায় লোকজন খুবই কম। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল বর্ষা। তাকে খুন করতেই হবে, পূজারিণী যতই প্রিয় জন হোক। তাকে পারতেই হবে। এগিয়ে যাওয়ার সময় শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ছিল বারবার। ‘যে অন্যায় করে আর যে অন্যায় সয় দুজনেই সমান অপরাধী।


পর্ব ৩২ (অন্তিম পর্ব)

গভীর রাত। চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।ঘন অন্ধকার।মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে আলোকউজ্জ্বল হয়ে উঠছে শহর। বৃষ্টি প্রায় কমে গেছে। রাস্তার চারিদিকে জল জমা হয়ে রয়েছে। তারই মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বর্ষা। তার মধ্যে কোন ভয় নেই। রয়েছে তীব্র ঘৃণার ও আক্রোশ। বর্ষা এক অন্যরূপে মেতে উঠেছে। তবুও আজ কিছু একটা বাধা দিচ্ছে।এর আগে অনেকগুলো খুন করেছে কিন্তু এমন লো ফিল কখনো করেনি। আজ করছে।বর্ষা হেঁটে যাচ্ছিল তখনই চারিদিকে জল ছিটিয়ে একটা বাইক এসে সামনে থামল।

এত রাতে গাড়ি_ঘোড়া প্রায় চলছিল না। এমন সময় নিজের সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়াতে দেখে, একটু চিন্তিত বোধ করলো। তবে ভয় পেলো না।যে মেয়ে ভালো মুখোশের আড়ালে একের পর এক খুন করে চলেছে , সে সামান্য একটা ছেলেকে কিছুতেই ভয় পাবে না।তাকে ঠিক কব্জা করে নেবে।কিন্তু ছেলেটির দিকে তাকাতেই ভীষণ আশ্চর্য হল। খুব চেনা চেনা লাগছে। লোকটি বর্ষার দিকে ঘুরতে পুরো পরিষ্কার হয়ে গেল। তাদের থানার বড়বাবু অভিজিৎ ব্যানার্জি। অভিজিৎ বর্ষার কাছে এসে বলল, “বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাবে তো?”বর্ষা কড়া গলায় জবাব দিল, “না”।

_ “পূজারিণী ওই পথ দিয়ে যাবে।”হাসিমুখে বলল অভিজিৎ। বর্ষার মটেও ভালো লাগলো না। তবে অভিজিৎ কি সবকিছু জানতে পেরে গেছে! তাকে এরেস্ট করার জন্য এসেছে। পূজারিণী তখনো ভয় পেল না। মনকে দূঢ় করতে লাগলো। কড়া কন্ঠে জবাব দিল, “পূজারিণী সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। সে যেতে পারে তাতে আমার কি?”
_ “আপনার সুবিধার জন্য বলছি। আমি ওই রাস্তা দিয়ে যাব। আপনার এত দূর হেঁটে যেতে কষ্ট হবে। আপনাকে ওখানে ছেড়ে দিয়ে আমি চলে যাব। তারপর আপনি যা খুশি করুন।”

বর্ষা অনেক বাধা দিল। কিন্তু অভিজিৎ এর বারবার রিকুয়েষ্ট ফেলতে পারল না। হিতে বিপরীত হতে পারে। অভিজিৎ এর সন্দেহ চরম পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। সে বাইকে উঠে বসলো। সামান্য পথ। খুব জোরে বাইক চালালো না অভিজিৎ। ধীরেসুস্থে চালালো তার উদ্দেশ্য সফল করার জন্য। একটু দূর যেতেই অভিজিৎ হাসির ছলে বলল, “কাল সকালে আবার নিউজের প্রথম পাতায় থাকবে শহরে আবার এক খুন কিন্তু পুলিশ কিছু করতে পারছে না।

এভাবে আর কত নিরীহ মানুষ মরবে? তা সত্যি আমার জানা নেই।”
বর্ষা অভিজিৎ এর কথায় সহমত প্রকাশ করল। সে এখনো নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করলো।ধীর গলায় বলল, “সত্যি এটা খুবই খারাপ হচ্ছে। একের পর এক খুন করে যাচ্ছে। কিন্তু কি জন্য খুন করছে পুলিশ ধরতে পারছে না।আর পারবেও না।”

অজান্তেই যেন বর্ষা সত্যি কথা বলে ফেলল। কিন্তু অভিজিৎ ওকে ধরার চেষ্টা করল না। নিজের কথায় নিজেকে ফাঁসানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না।সে ঘুরিয়ে বলল, “খুন গুলো চাইলে তো বন্ধ করা যায়। চেষ্টা করো অবশ্যই পারবে।”
_ “মানে?”

_ “কিচ্ছু না।”
অভিজিৎ বাবু একটা তৃপ্তির হাসি দিল। তারপর আপন মনে বলল, “তোমার দিদিভাইয়ের এক্সিডেন্ট এর জন্য দায়ী মানুষটাকে খুজতে চাও না?”
_ “চাইতো। কিন্তু পাচ্ছি না।”

_ “ওই মানুষটা আর কেউ নয়। উনি তোমার বাবা আদিত্য চৌধুরী। উনার ভুলের জন্যই সন্ধ্যা মারা যায় শ্রাবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। ওই রাস্তায় কোন সিসিটিভি ফুটেজ নেই। তবে দূরের হাইরোডে সিসিটিভি ফুটেজ ছিল।ওইটা দেখে পুরো পরিষ্কার ঐদিন ওই সময়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে কেবল তোমার বাবাই ওই রাস্তা দিয়ে গেছিল। আর কেউ যায়নি। সন্ধ্যা মৃত্যুর জন্য তোমার বাবা ছাড়া অন্য কেউ দায়ী কখনোই হতে পারে না।”

স্প্রিং এর মতো ছিটকে পড়লো বর্ষা। সবই তার কাছে অবিশ্বাস্য। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, আবার বিশ্বাস না করে উপায় নেই।তার খুব ভালোভাবে মনে রয়েছে, তার বাবা সেদিন ওই রাস্তা দিয়ে গিয়েছিল। বাবা এমন কাজ করতে পারবে না, এমনটাই তার বিশ্বাস ছিল।সন্ধ্যার মৃত্যুর জন্য তার বাবাই দায়ী। সে যে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে। একের পর এক হত্যা করে গেছে। ভেবেছিলো এদের মধ্যেই কেউ পাথর সরিয়ে ছিল। সবার একটা বদ অভ্যাস থাকে।

যারা একবার খারাপ কাজ করে বিপদে পড়লে যদি ওই খারাপ কাজ দিয়ে বিপদ কাটানো যায়, তাহলে সে ওই কাজ বারবার করতে পিছুপা হবে না। বর্ষার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল তাদের মধ্যেই ওই দিন কেউ পাথর সরিয়ে ছিল। যারা পাথর সরিয়ে ছিল, সে তাদেরকে খুন করেছে। কিন্তু আজ সে কি শুনলো। এতগুলো নিরীহ মানুষের হত্যার শাস্তি তাকে পেতেই হবে। অজান্তেই তার চোখে জল চলে আসলো। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারল না। পরিষ্কার বুঝতে পারল অভিজিৎ সবকিছুই জানে।

নিশ্চয়ই তাকে এরেস্ট করবে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে কখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেল বুঝতে পারল না। বাসস্ট্যান্ডে বর্ষাকে নামিয়ে দিল। তারপর অভিজিৎ একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “পূজারিণী এই পথ দিয়ে যাবে। পারবে তো…..”

অভিজিৎ আর কিছু বলল না। শুধু হেসে উঠলো। বর্ষা তখনও মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। অভিজিৎ একটা লকেট যুক্ত হার বের করে বর্ষার দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর বলল, “এই হারটি সম্ভবত আপনার। শ্রাবণের বিয়ের দিন হয়তো তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুলে ফেলে গিয়েছিলেন। দুর্গা কোনভাবে এই হারটি খুঁজে পায়। নিজের কাছে রেখে ছিল। কিন্তু বেচারা ওই দিন মারা গেল।”

বর্ষা মৃদু হাসলো। তার হারটি হারিয়ে যায় নি। দুর্গা কে খুন করার পর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হারটি ওইখানে থেকে যায়। লকেটের মধ্যে বর্ষা আর শ্রাবণের ছবি রয়েছে। খুব সহজে অভিজিৎ ওটাকে শনাক্ত করে। আর সে বুঝতে পেরে যায় খুনগুলো বর্ষা করছে। একের পর এক যুক্তি সাজাতে থাকে। এবং আসামি বেরিয়ে আসে। তবে বর্ষা এখানে এক অদ্ভুত কাজ করলো। সে একজন যুদ্ধ না করে নিজের রাজ্য ছাড়বে না এমন এক রাজার মতো বলল, “এই হারটি আমার নয়।”

_ “কি?”অভিজিৎ বাবু বললেন।
_ “হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। এই হারটি আমার নয়। দুর্গা হয়তো আমাদের ফ্যান ছিল তাই নিজেও এমন একটা হার বানিয়েছিল।”
অভিজিৎ বাবু ভীষণ আশ্চর্য হল। মেয়েটির দারুন সাহস রয়েছে মানতে হবে। এতকিছুর পরও নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। তার সবকিছু গোপন তথ্য ফাঁস, তবুও নিজেকে আড়াল করছে। মনে মনে প্রাউড ফিল করল অভিজিৎ। তবে বর্ষা নিজের কথা রাখলো। গলা থেকে তার লকেট বের করে দেখালো।

একই লকেট তার কাছে রয়েছে। অভিজিৎ হাসল। সে বুঝতে পেরে গেল। লকেটে আসল রহস্য কি? দুর্গাকে একটা স্যালুট জানিয়ে রাস্তা বরাবর এগিয়ে যেতে থাকলো। তখনই বর্ষা পেছন থেকে অভিজিৎ বাবুকে ডাকলেন।
“স্যার, অ্যারেস্ট মি।”

_ “হোয়াই? একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল অভিজিৎ। বর্ষাও হেসে উঠলো। কিন্তু অভিজিৎ এক চরম ভদ্রতার পরিচয় দিলেন। অনেক সময় আইনকে ফাঁকি দিতে হয় কিছু কিছু ভালোর জন্য। অনেক সময় আইন হেরে যায় নিজের বিবেক বুদ্ধি কাছে। তিনি সেটাই করলেন। হাসিমুখে বলল, “আমি খুনিকে পেলে অবশ্যই অ্যারেস্ট করব। আপনি থাকুন এখানে। আশা করছি আর ঘুম হবে না।”

বর্ষার উত্তর পাওয়ার আগেই অভিজিৎ বাইক স্টার্ট দিল। রাতের অন্ধকারে আসতে আসতে করে হারিয়ে যেতে লাগলো। জীবনে কিছু মানুষ এমন আসে। অন্ধকারময় জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দেয়। তারপর সে নিজেই অন্ধকারে তলিয়ে যায়। অভিজিৎ তাই করল।
বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকলো বর্ষা। রাত প্রায় একটা। অভিজিৎ এর কথা বারবার মনে পড়ছে তার। কত ভালো একটা মানুষ। সবকিছু জেনেও এরেস্ট করলো না। উনি জানেন আর খুন হবে না। তাই হয়তো নিজেকে লুকিয়ে চলে গেল বহু দূরে।

বর্ষা হাসবে না কাঁদবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো আর খুন করবে না। কারণ, যে মানুষটার জন্য খুন করছিল সেই মানুষটা যে নিজের বাবা। আর উনি উনার পাপের শাস্তি অনেক আগেই পেয়ে গেছেন। আল্লাহ কিংবা ঈশ্বর কোনো পাপীকে কেউ কখনো ছাড়েননি। আমাদের কাছ থেকে ছাড়া পেলেও ঈশ্বরের কাছ থেকে কিছুতেই পাবে না। পাপের শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে যে কোনো মূল্যে।

এদিকে পূজারিণী গাড়ির ড্রাইভিং করছে। পূজা ঘুমিয়ে পড়েছে। বারবার মনের কোঠায় ভেসে উঠছে শ্রাবনকে বলা কটু কথা গুলো। ওইসব কথা বলা কি আদৌ ঠিক হয়েছে? এইভাবে অপমান না করলেও পারত। সে তো শ্রাবনকে ভীষণ ভালোবাসে। এইভাবে একটা অভিমান পুষে রেখে কোনো লাভ হবে না। শ্রাবনকে ছাড়া একটা দিনও ভালো ছিল না। ভবিষ্যতেও থাকতে পারবে না। শ্রাবনকে তার চাই। একবার ক্ষমা চাইলে শ্রাবণ নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবে।

এত রাতে সে শ্রাবণের বাড়িতে যেতে চাইলো। গাড়ি দ্রুত বেগে চালালো। বাসস্ট্যান্ডের কাছে আসতেই অবাক হয়ে গাড়ি দাঁড় করালো। এত রাতে বর্ষা এখানে কি করছে। আশেপাশে কেউ নেই। তার শরীরে কি একটুও ভয় নেই? গাড়ি থেকে পূজারিণী বেরিয়ে গেল। গাড়ির মধ্যে পূজা তখনো ঘুমিয়ে রয়েছে। পূজারিণী বর্ষার কাছে গিয়ে বসলো। বর্ষা ঠিক বুঝতে পারল তার পাশে পূজারিণী বসেছে। কিন্তু সে কথা বলল না। পূজারিণীর উপর তার ভীষণ রাগ। তার প্রানের মানুষ কে অপমান করেছে। তাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না। পূজারিণী ধীর গলায় বলল, “বর্ষা দিদি, বাড়ি চলুন।”

বর্ষা কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল। পূজারিণী কে ইগনোর করছে সে। পূজারিণী আবার একই কথা বলল, বর্ষা তখন রেগে বলল, “কোন বাড়ি?”
_ “যেই বাড়িতে শ্রাবণ আর বর্ষা থাকে।”
_ “কি?”
পূজারিণী দুটো কান ধরে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে। একদিন তুমি আমাকে গ্রাম থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলে, সেদিন কেউ বাধা দেয়নি। তোমার উপর কেউ কথা বলতে সাহস পায়নি। আজ আবার আমাকে নিয়ে চলো। আমার বিশ্বাস আজও কেউ বাধা দেবে না।”

বর্ষা আনন্দে নেচে উঠলো। একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “সত্যিই তুমি ফিরে যেতে চাও?”
_ “হ্যাঁ, তবে আমি একা নয়। আরো একজনকে নিয়ে যেতে হবে।”
বর্ষা একটু অবাক হয়ে বলল, “কাকে?”
_ “আমার মেয়েকে।”
দুইজন হেসে উঠলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। একে অপরের পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা বিনিময় করলো।

বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেল পূজারিণী ফিরে আসার পর। এখন আনন্দের সহিত দিন কাটছে।পূজারিণী এখন গান গাওয়ার ইচ্ছে সম্পূর্ণ নিজের উপর। শ্রাবণ জোর করে না। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কথা বলে না। যেটা ভালো লাগে সেটাই করে। পরিবারের বন্ধন এর কাছে হেরে গেছে তার স্বপ্ন।ভালোবাসার বন্ধন এর চাইতে বড় কিছু কখনোই হতে পারে না।এখনো সে রোজ দোকানে যায়।দোকান থেকে যেটুকু আয় হয় ওইটুকু সংসারে দিয়ে দেয়। বর্ষাও আগের মত কাজ করে অফিসে।

স্বাভাবিকভাবে তাদের জীবন চলছে। ওই রাতের পর বর্ষা অনেকবার অভিজিৎ কে খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও পায়নি। তিনি এখান থেকে বদলি নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন। ছোট্ট পূজা সারাদিন বাড়ির এদিক_ওদিক ঘোরাফেরা করে। অনন্যা দেবীও নিজের একঘেয়েমি জীবন কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন পূজাকে পিয়ে। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। পূজা বেশিরভাগ সময় অনন্যা দেবীর সঙ্গে থাকে। অল্পদিনে খুব ভালো লেগে গেছে তার ঠাম্মিকে।

অনেক রাত। পূজারিণী আর পূজা ঘুমিয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতো শ্রাবণ হুইলচেয়ার গড়িয়ে বর্ষার রুমের দিকে এগিয়ে গেল। প্রায় প্রতি রাতেই শ্রাবণ এমন করে। ঘুমানোর আগে একবার হলেও বর্ষাকে দেখবে। বর্ষা যেন তার প্রাণ। দিদিভাই ছাড়া অচল সে। এমন ঘটনা রোজ দেখে আসছে পূজা। কখনো কিছু জানতে চায়নি। কিন্তু আজ জানতে চাইল। মাকে জড়িয়ে ধরে পূজা বলল, “মা, বাবা আমাদের ভালোবাসে না; তাই না!”মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে পূজারিণী ভীষন আশ্চর্য হল।

মেয়ে এমন কথা বলছে কেন? শ্রাবণ তো কখনো কোন কিছুতে অভাবে রাখেনি! অসম্ভব ভালোবাসে মেয়েটাকে। পূজারিণী একটু বিব্রত মুখে বলল, “এমন প্রশ্ন করছ কেন? বাবা কিছু বলেছে বুঝি?”
_ “না, কিন্তু বাবা রোজ রাতে পিসির কাছে চলে যায়। কিছুক্ষণ পিসির কাছে থাকার পর আমাদের কাছে আবার ফিরে আসে। এমনটা করে কেন? আমাদের কাছে সব সময় থাকলে অসুবিধা কোথায়?”

পূজারিণী হাসলো। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, “তোমার বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তার চাইতেও বেশি ভালবাসে নিজের বোনকে। একইসঙ্গে মায়ের পেটে থেকেছে। একইসঙ্গে বড় হয়েছে। বড্ড আদরের বোন। আমি কখনো বাধা দেইনি। এই পৃথিবীতে ভাই বোনের মত এমন ভালোবাসার সম্পর্ক কোথাও নেই। আমার মাঝে মাঝে অনেক গর্ব হয় এমন ভাই বোনের সম্পর্ক দেখে।”

_ “তোমার কষ্ট হয় না?”
_ “প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। কিন্তু পরে মানিয়ে নিয়েছি। বুঝতে শিখেছি। তোর বাবা ঘুমানোর আগে বোনের সঙ্গে দেখা করতে যেত।বোন ঘুমিয়েছে কিনা! বোন কষ্ট পাচ্ছে কিনা! বলতো দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে। কোনদিন ফিরে আসতো। কোন দিন আসতো না।

বোনের সঙ্গে গল্প করতে করতে বোনের পাশেই ঘুমিয়ে পড়ত। তখন আমার একা ঘুমাতে ভীষন ভয় করত। কিন্তু মানিয়ে নিয়েছে শুধুমাত্র বর্ষার কথা ভেবে। সে নিজের দাদাভাইকে এতটাই ভালোবাসে যে, নিজের জীবনটা শেষ করে ফেলল অথচ বিয়ে করল না। সে বিশ্বাস করে, যদি তার বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তার ভাইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা কমে যাবে।তাই সে কখনো বিয়ে করল না।”

পুজা বসে বসে ভাবতে লাগলো। ছোট্ট মেয়ে মায়ের কথা সব শুনেছে কিন্ত কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। একটু হেসে বলল, “মা, আমারও একটা ভাই চাই। আমিও আমার ভাইকে এমন ভালোবাসবো।”

_ “সবার কপালে ভাই বোন জুটে না। জুটলেও এত গভীর সম্পর্ক হয় না। এমন সম্পর্ক পুরো বিশ্বে খুবই নগণ্য। তবে যেটুকু রয়েছে ওটাই অনেক।”
বর্ষার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো শ্রাবণ। প্রতি রাতের মতো আজও তারা গল্প করতে থাকলো। অতীতের দিন থেকে বর্তমান সব আলোচনা করল। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো তাদের সেই উজ্জ্বল অতীতের জীবন। বেশ অনেকক্ষণ খুনসুটি চলার পর বর্ষা হাসিমুখে বলল, “এবার বউয়ের কাছে যা। একা একা ঘুমিয়ে রয়েছে। মেয়েটাকে একটু বেশি সময় দে।”
_ “আজ ভালো লাগছে না। তোর কাছে অনেক দিন ঘুমায়নি। আজ তোর পাশেই ঘুমাবো।”

_ “তুই এখনো বাচ্চা থেকে গেলি। আমাদের যদি এখনো দিদিভাই বেঁচে থাকতো, তাহলে আরো অনেক মজা হত।”কথাগুলো বলতেই বর্ষার চোখ ছল ছল করে উঠলো। শ্রাবণ বর্ষার চোখের জল মুছে দিল। তারপর তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি বসে আছি, তুই শান্তিতে ঘুমা।”একে অপরে দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন হাসি বিনিময় করল।
অদ্ভুত এই মানব সমাজ। ঘুমেই শান্তি, তবুও এই পৃথিবীর মানুষ শান্তিতে ঘুমোতে চায়।

লেখাঃ শুভজিৎ জানা (রাজা)

___সমাপ্ত___

পাঠক আপনাদের জন্যই আমরা প্রতিনিয়ত লিখে থাকি। আপনাদের আনন্দ দেয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ। তাই এই পর্বের “শ্রাবণের বর্ষা” গল্প টি আপনাদের কেমন লাগলো পড়া শেষে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

আরো পড়ুন _ ভালোবাসার গল্প কাহিনী ১ম খণ্ড