ভুতের গল্প

কুহেলিকা – একটি সুন্দর প্রেম কাহিনী

কুহেলিকা – একটি সুন্দর প্রেম কাহিনী: রিশাদ নন্দিনীকে নিয়ে মুহিবের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। এই গ্রামে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। দিনদুপুরে কাউকে খুন করে ফেললেও কিছুই করার থাকবে না। একজন জ্যোতিষীকে দেখে রিশাদ থেমে যায়।


পর্ব ১

গলা কাঁটা লাশ মাটিতে পড়ে আছে। লাশটি একটি মেয়ের। শরীরের গঠন দেখে মনে হচ্ছে ১৫/১৬ বছর বয়সী কোনো কিশোরী। গ্রামে এটা নতুন নয়। প্রায়শই এমন লাশ পাওয়া যায় এই গ্রামে। ধারণা করা হয় গ্রামটিতে কালো যাদুর প্রকোপ রয়েছে। সাথে আছে কুসংস্কারে বিশ্বাস।

তবে কে বা কারা এর সাথে জড়িত আছে তার কোনো ক্লু তদন্ত করেও পাওয়া যায়নি। গ্রামের স্থানীয় পুলিশেরা নানাভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ লাভ কিছুই হয়নি। বরং বছরের পর বছর এসব ঘটেই যাচ্ছে।
আইনি চোখে এটাকে বলা হয় খুন বা মার্ডার। আর এই কেসটা তদন্তর দায়িত্ব পড়েছে এখানকার স্থানীয় পুলিশ দিদারের উপর। দিদার খুব ভালো করেই জানে যারা এই খুনের সাথে জড়িত তারা খুব চতুর ও সতর্ক।

তাই তাদের ধরা অতবেশি সহজ হবে না। এজন্যই দিদার সাহায্য নিয়েছে ডিটেকটিভ বন্ধু মুহিবের কাছে। মুহিব পার্মানেন্ট কোনো ডিটেকটিভ নয়। শখের ডিটেকটিভ বলা যায়। ছোট বেলা থেকেই মুহিবের রহস্য উদঘাটনে ব্যাপক ঝোঁক। এই পর্যন্ত যতগুলো কেস হাতে নিয়েছে ব্যর্থ হয়নি একটাতেও। এখন দিদারের একমাত্র ভরসা হচ্ছে মুহিব।

মুহিবকে আরো আগেই ফোন করা হয়েছে। মুহিব জানিয়েছে মুহিব আসছে। লাশটাকে পোস্টমর্টেম করতে নেওয়া হয়েছে। মুহিব সোজা থানায় যায়। দিদার তখন থানাতেই ছিল। থানার বাহির থেকেই মুহিব দিদারকে ফোন দেয়। দিদার ফোন তুলে বলে,
“কতদূর এসেছিস?”
“আমি তোর থানার সামনেই।”
“ভেতরে আয়।”

“না। ভেতরে যাব না। তুই বাহিরে আয়। বাহিরে বসেই সব শুনব।”
“আচ্ছা।”
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই দিদার বাহিরে এসে হাজির হয়। মুহিব বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দিদারকে আসতে দেখে বাইকে উঠে বসে বলে,
“বাইকে উঠ।”
“যাবি কোথায়?”

“যেখানে খুন হয়েছে সেখানে।”
“এভাবে বাইকে যাওয়াটা আমার ঠিক হবে না। আমার গাড়িতে চল।”
“শালা! তোদের পুলিশের কাহিনী এখনো বুঝলাম না। চল।”
দিদারের গাড়িতে করেই ওরা ঘটনা স্থলে পৌঁছায় যেখানে খুনটা করা হয়েছিল। জায়গাটা ভালো করে দেখে মুহিব বলে,
“রক্ত তো তেমন দেখছি না এখানে।”

“মাথা কেঁটে তারপর লাশ ফেলে গেছে এখানে।”
“কোনো শত্রুতার বশে কি এমনটা করেছে?”
“তেমনটা হওয়ার কথা নয়। শত্রুতা থাকলে এভাবেই তো মেরে ফেলা যায়। মাথা কেটে নেবে কেন?”
“প্রশ্নটা তো এখানেই।”

“এই গ্রামে কালো যাদুর প্রচলন অনেক। জানিস সেটা?”
“কিহ?”
“হ্যাঁ কালো যাদু। অর্থাৎ ব্ল্যাক ম্যাজিক। তবে যারা এই কাজের সাথে জড়িত তারা গোপনীয়তা বজায় রাখে। এত বছর ধরেও এদের ধরা যায়নি।”
“তোর কি মনে হচ্ছে এই খুনটা ব্ল্যাক ম্যাজিকের জন্যই করা হয়েছে?”
“আমার তো তাই মনে হয়।”

মুহিব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“মেয়েটার পরিবারে কে কে আছে?”
“বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। সৎ ভাই আর ভাবির কাছে থাকত।”
“আই সি! আচ্ছা এমনও তো হতে পারে ওর ভাই-ভাবিই কাজটা করেছে? কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে গলা কাটা লাশ দেখলেই সবাই ভাববে ব্ল্যাক ম্যাজিকের জন্য কেউ খুনটা করেছে?”
“তাই বলে নিজের লোক এমনটা করবে?”

“করবে বলিনি। করতেও তো পারে। তারমধ্যে আপন ভাই না। আগে আমাদের জানতে হবে ওদের মাঝে সম্পর্ক কেমন ছিল। তারপর বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে।”
“এখন কি মেয়েটার বাড়িতে যাবি?”
“হ্যাঁ চল। বাই দ্যা ওয়ে, মেয়েটার নাম কী”
“গঙ্গা।”

“হিন্দু?”
“হুম।”
“ওকে।”

“জয় দুগ্গা ঠাকুর,
ঢ্যাম কুড়াকুড়
তুই তো সবার মা,,
“তুই কোন লেবেলের
কোন খিলাড়ি,
কেউ তো জানে না।”

সাউন্ড বক্সে উচ্চস্বরে গানটা বেজেই চলেছে। গানের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় নন্দিনীর। চোখ মেলে আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে নন্দিনী বিছানায় শুয়ে আছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। পানিতে পড়ার কারণেই মূলত এমন হচ্ছে। পেটের মধ্যে ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছে। মাথার চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তখনই একজন পুরুষ ঘরে ঢোকে। নন্দিনীর উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেয় প্রশ্ন।
“এখন কেমন আছেন?”

নন্দিনী ফিরে তাকায় তার দিকে। ভ্রু যুগল কিঞ্চিৎ বাঁকা করে বলে,
“আপনি কে?”
“আমি রিশাদ।”
নন্দিনীর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল রিশাদ। নন্দিনী চুপ করে রইল। রিশাদ আবার বলল,
“নদীতে ঝাপ দিয়েছিলেন কেন?”
“বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই তাই।”

“সবাই জীবন উপভোগ করতে চায়। আর আপনি মরতে চান?”
“হ্যাঁ চাই। কারণ এভাবে জীবন চলে না।”
“মরার আগে পরিবারের কথা ভেবেছেন?”
“পরিবার থাকলে তো ভাবব।”
“মানে? আপনার পরিবারে কেউ নেই?”

“না। মা তো জন্মের সময়ই মারা যায়। বাবা ছিল। কিন্তু অসুস্থ হয়ে মারা যায় চিকিৎসার অভাবে। তারপর থেকেই চারপাশের মানুষের কুনজর পড়ে আমার উপর।”
“এজন্য মরতে যাচ্ছিলেন?”

নন্দিনী একবার রিশাদের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে রাখে। রিশাদ আর কিছু না বলে বাহিরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর একজন মহিলাকে সাথে নিয়ে ফিরে আসে। মহিলাটি হিন্দু। হাতে শাখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর। দুহাত আঁকড়ে ধরে আছে খাবারের প্লেট। তিনি প্লেটটা নন্দিনীর সামনে রেখে বলেন,
“খিদে পায়নি মেয়ে? খেয়ে নাও। আর ভুলেও দ্বিতীয়বারটি মরার কথা ভেবো না যেন।”
তিনি রিশাদকে বললেন,

“আমার অনেক কাজ পড়ে আছে বুঝলি। ওর খাওয়া শেষ হলে বাহিরে নিয়ে আসিস। সবার সাথে মিশলে ভালো লাগবে।”
“আচ্ছা।”
মহিলাটি চলে যাওয়ার পরই খাবারের প্লেটে হাত বাড়াল নন্দিনী। গরম গরম কচুরীর সাথে ডালটা বেশ লাগছে খেতে। গাপুসগুপুস খাচ্ছে। সামনে যে একজন অপরিচিত ছেলে সেদিকে যেন একদমই হুশ নেই।
শেষ কচুরীটা মুখে একসাথে পুরে গাল দুটো ফুলিয়ে রিশাদকে বলে,
“একটু পানি দেন প্লিজ।”

রিশাদ জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসটা নন্দিনীর দিকে দেয়। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে,
“এত জোরে গান শুনছে কেন সবাই?”
“বিয়ে বাড়ি যে তাই।”
“কার বিয়ে?”
“আমার বন্ধু রোহিতের বিয়ে।”
“ওহ।”

“তারপর? কোথায় যাবেন ভাবছেন?”
“জানিনা।”
“জানতে হবে না।বিয়ে পর্যন্ত এখানেই থাকুন। তারপর না হয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে।”
উত্তরে মিষ্টি হাসে নন্দিনী। রিশাদ বলে,
“চলুন বাহিরে যাই।”
“ঠিক আছে।”

রুম থেকে বের হয়েই দেখতে পায় বাড়িটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। উঠোনে অঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। ছোট বাচ্চারা দৌঁড়ে দৌঁড়ে খেলছে। রোহিত, তোয়া আর হাসিব একসাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। রিশাদ নন্দিনীকে সেখানে নিয়ে যায়। রোহিত হেসে বলে,
“এখন কেমন লাগছে?”
“জি ভালো।”

“নাম কি তোমার?”
“নন্দিনী।”
“অনেক সুন্দর নাম। ওদের সাথে পরিচিত হও। ও রিশাদ, ও হাসিব আর ও তোয়া। আমরা চারজন খুব ভালো বন্ধু।”
“আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।”
রিশাদ বলল,
“তোরা এখানে থাক। আমি ওকে পুকুর পাড় থেকে ঘুরিয়ে আনি।”
রিশাদ আর নন্দিনী যাওয়ার পর তোয়া বলে,
“মেয়েটাকে নিয়ে রিশাদ একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছে।”
রোহিত হেসে বলে,

“জ্বলছে নাকি তোর?”
“বাজে বকিস না তো। খুন করে ফেলব একদম।”
হাসিব আর রোহিত একসাথে হেসে উঠল।

সন্ধার পর গ্রাম ঘুরে বাড়িতে ফিরে দুজন। একটু পরই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে। গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির বিশাল ছাদটিতে। বাড়ির উঠোনে এসে রিশাদ বলে,
“একটু দাঁড়ান আসছি।”
“কোথায় যাবেন?”
উত্তরে রিশাদ কনিষ্ঠ আঙুল তুলে দেখায়। নন্দিনী তুলশী গাছের প্রদীপটা হাতে তুলে দেখছে। রিশাদকে আসতে দেখে প্রদীপটা রেখে দেয়। তারপর দুজনই সোজা ছাদে চলে যায়। সবাই রোহিতকে খুঁজছে। রোহিতের মা বলছেন,
“এতক্ষণ তো এখানেই ছিল। কোথায় গেল হঠাৎ?”

হাসিব বলল,
“নিচে যায়নি তো? আমি দেখে আসছি।”
হাসিব নিচে যায় রোহিতকে খুঁজে। বাসায় খুঁজে না পেয়ে বাড়ির পেছনটায় যায়।
তখনই হাসিবের আত্মচিৎকার শোনা যায়।অনেকেই ছাদ থেকে উঁকি দেয়। কিন্তু নিচে অন্ধকার থাকায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সবাই দ্রুত নিচে নামে। একটা লাশ পড়ে আছে। কিন্তু মাথা নেই। রিশাদ গিয়ে লাশের দিকে ফোনের আলো ফেলে। সবাই চমকে যায়। রোহিতের লাশ! রোহিতের মা চিৎকার করে কান্না শুরু করে। বিয়ের রাতে বরের লাশ!!


পর্ব ২

আরাম কেদারায় এক পা তুলে, আরেক পা মাটিতে রেখে সিগারেট ফুঁকছিলেন রমিজ মিয়া। রমিজ মিয়া এই গ্রামের মেম্বার। দিদার আর মুহিবকে এদিকে আসতে দেখে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে আগুনটা নিভিয়ে ফেললেন।

“কে রে কোথায় আছিস? দুটো চেয়ার দিয়ে যা তো।”
বাড়ির কাজের লোক দুটো চেয়ার দিয়ে চলে যায়। দিদার চেয়ারে বসতে বসতে বলে,
“কেমন আছেন?”
“আছি আরকি! তোমার খবর কী?”
“ভালো।”
“সাথে কে?”
“আমার বন্ধু।”
“পুলিশ?”

“না। ডিটেকটিভ।”
“অহ। ভালো। শুনেছি গোয়েন্দারা রহস্য উদঘাটন করে। তো আমার বাড়িতে কি কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে নাকি?”
এবার মুহিব হেসে বলে,
“না মশাই। আমরা এসেছি খুনের বিষয়ে কথা বলতে।”
“শুনে আর কী করবা? শোনা পর্যন্তই শেষ। এর রহস্য এখনো কেউ বের করতে পারেনি।”
মুহিব সাবলীলভাবে বলল,
“চেষ্টা করতে তো কোনো আপত্তি নেই।”

“তা নেই। তো বলো আমি কীভাবে তোমাদের সাহায্য করতে পারি?”
“আজ সকালে যে মেয়েটার লাশ পাওয়া গেল তার সম্পর্কে কি আপনি কিছু জানেন?”
“বিশেষভাবে কিছুই জানিনা। আমার মেয়ে আর বউ ভালো বলতে পারবে। আমাদের বাসায় প্রায়ই আসতো। মাঝেমাঝে পাঁচ/দশ টাকা হাতে তুলে দিতাম। খুব শান্ত আর লক্ষী স্বভাবের ছিল।”
“আপনার স্ত্রী বা মেয়ে কেউ বাসায় আছে?”
“আছে।”

“যদি একটু ডেকে দিতেন তাদের।”
মুহিবের কথামত দুজনকেই ডাকা হয়। মুহিব রমিজ মিয়ার মেয়েকে বলে,
“নাম কি তোমার?”
“রিমি।”
“কিসে পড়?”
“সেভেনে।”

“গঙ্গাকে চেনো?”
“হ্যাঁ। গঙ্গা দি খুব ভালো মানুষ ছিল। আমায় অনেক আদর করত। মাঝে মাঝেই আমরা একসাথে ঘুরতে যেতাম।”
“তুমি গঙ্গার বাসায় গিয়েছ কখনো?”
“হ্যাঁ। অনেকবার।”
“কে কে আছে ওর বাসায়?”
“গঙ্গা দির দাদা আর বৌদি।”

“আচ্ছা তুমি রুমে যাও।”
রিমি লাফিয়ে লাফিয়ে রুমে চলে গেল। মুহিব এবার উনার স্ত্রীকে বলে,
“গঙ্গার সাথে ওর দাদা-বৌদির সম্পর্কই কেমন? কিছু বলতো কি আপনাকে?”
“আসলে ওসব কথা গঙ্গার সাথে হতো না। মাঝে মাঝে শাকপাতা নিয়ে আসতো। কখনো রিমির জন্য আম, পেয়ারা নিয়ে আসতো। বাবা-মা কেউ নেই। মায়া হতো খুব। তাই বাড়িতে আসলেই ভালোমন্দ খেতে দিতাম। তবে ওর দাদা তো আপন নয়। বুঝেনই তো সৎ দাদা-বৌদি কেমন হয়।”
মুহিব হেসে বলে,

“আচ্ছা আপনি এখন আসতে পারেন।”
দিদার আর মুহিবও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রমিজ মিয়াকে সালাম দিয়ে বলে,
“আবার কোনো প্রয়োজন হলে আসব।”
গাড়িতে উঠতে উঠতে দিদার বলে,
“কী বুঝলি?”
“এখনো কিছুই বুঝিনি। গঙ্গার বাসায় গিয়ে দেখি আগে।”
গঙ্গার বাসার সামনে কয়েক বাসায় আগে খোঁজ নিয়েছে দুজন। প্রতিবেশীরা জানিয়েছে গঙ্গার দাদা তেমন একটা অত্যাচার করত না। কিন্তু বৌদিটা খুব দজ্জাল। মুহিব বলল,
“দিদার তুই এখানেই থাক। আমি একা যাব।”
“কেন? আমি সাথে গেলে কী সমস্যা?”

“তোর গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম আছে। তোকে দেখে ঘাবড়ে যেতে পারে। আমি চাচ্ছি শান্তভাবে কিছু জানতে।”
“বেশ! তবে যা।”
দিদারকে রেখে মুহিব একাই যায় গঙ্গার বাসায়। উঠোনে দাঁড়িয়ে উচ্চশব্দে বলে,
“বাড়িতে কেউ আছেন?”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে তরতাজা এক মহিলা। গায়ের মাংসের জন্যই বয়সটা একটু বেশি লাগছে। বিরক্তির স্বরে মহিলাটি বলে,
“কেডা আপনি?”

“আমি পুলিশের লোক।”
“আপনার গায়ে তো পুলিশের পোশাক নাই।”
“আমি তো পুলিশ নই। বলেছি পুলিশের লোক।”
গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছতে মুছতে বাড়িতে আসে একজন পাতলা গড়নের পুরুষ। যথাসম্ভব গঙ্গার দাদা হবে।

“কেডা আইছে পৌষি?”
“চিনিনা। কয় পুলিশের লোক।”
মুহিব তার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আদাব।”
“আপনারে তো চিনলাম না।”
“চেনার কথাও নয়। আমি ডিটেকটিভ।”
“ডিটেকটিভ মানে?”
“গোয়েন্দা।”

এবার দুজনই একটু চমকে উঠল। পৌষি বলল,
“এইখানে কী চান?”
“গঙ্গার বিষয়ে কিছু জানতে চাচ্ছি।”
“যা কওনের তা তো পুলিশরে কইছিই। আর কিছু কওনের নাই। আপনি অহন আইতে পারেন।”
মুহিব বুঝতে পারল এরা সহজে কিছু বলবে না। তাই দিদারকে ফোন করে আসতে বলল। দিদার আসার পরই পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যায়। দুজনই এবার মিনমিন গলায় বলে,
“কী জানতে চান কন?”
মুহিব বলে,
“গঙ্গা তো আপনার আপন বোন না তাই না?”
গঙ্গার দাদা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আপন বইন না হইলে কী হইব? ওরে আমি কম ভালোবাসি নাই।”
মুহিব দুজনের সাথেই বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল। গঙ্গার দাদার কান্না সত্যি না মিথ্যা বোঝা গেল না। তবে পৌষির যে কুমিরের কান্না সেটা ঢের বুঝতে পারে মুহিব। কথার পর্ব শেষ করে দিদার আর মুহিব হাঁটতে থাকে। মুহিব বলে,
“প্যাঁচটা খুব জোড়ালো বুঝলি।”
“তা বো বটেই।”
দিদারের ফোনে একটা ফোন আসে। অফিসের বড়কর্তার ফোন। হঠাৎ দিদারের মুখটা সিরিয়াস হয়ে যায়। ফোন রাখার পরে বলে,
“আবারও খুন!”

পুলিশকে ইনফর্ম করা হয়েছে। রোহিতের মায়ের আহাজারি করে কান্না সবার বুকে বিঁধছে। যেখানে বাড়িতে হৈহৈ একটা আমেজ ছিল সেখানে এখন বিষন্ন পরিবেশ। পুলিশ আসার পর জায়গাটা ভালো করে তল্লাশি করে। কনস্টেবল শফিক মিয়া হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠে বলে,
“স্যার স্যার।”

শফিক মিয়ার চিৎকার শুনে পুলিশ অফিসার সেদিকে এগিয়ে যান।
“স্যার দেখেন, মাথাটা এখানেই আছে।”
সবার মনেই এখন প্রশ্ন। যদি মাথা নেওয়ার জন্য খুনটা না’ই করা হয় তবে খুনটা করল কে? আর কেনই বা করল এই খুন? তবে এতটুকু তো পরিষ্কার মাথাটা কেটে ফেলেছে যাতে সবাই ভাবে এটা কালো যাদুর জন্যই খুন করা হয়েছে। উপস্থিতি কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ রোহিতের ডেডবডি নিয়ে চলে যায়। রোহিতের আত্মীয়রা রোহিতের বাবা-মাকে ভেতরে নিয়ে যায়।

বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে রিশাদ আর নন্দিনী। নন্দিনী ভয়ে গুমোট মেরে আছে। রিশাদ বলে,
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
“পাব না বলছেন? আমি লাশ দেখলে খুব ভয় পাই। তারমধ্যে এটা তো মার্ডার।”
“হুম বুঝেছি।”
“একটা কথা বলি?”
“জি।”

“আপনি এত স্বাভাবিক কীভাবে আছেন? আপনার তো বন্ধু মারা গেল। মানে খুন করা হয়েছে। কান্না তো দূরে থাক।আপনাকে একটু মন খারাপ করতেও দেখিনি।”
“কান্না বা মন খারাপ করলেই কি রোহিত ফিরে আসবে? তাছাড়া প্রায়ই এসব দেখে আর এমন খবর শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই গ্রামে এমন খুন নতুন না।”
“কিছু মনে না করলে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“জি।”

“আপনি কি তখন সত্যিই ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন?”
“আপনি কি আমায় সন্দেহ করছেন?”
“না। তেমন নয়।”
“আমার তো তেমনই মনে হচ্ছে। তবে আমি সত্যিই ওয়াশরুমেই গিয়েছিলাম। তাছাড়া এতটুকু সময়ে কাউকে খুন করে আবার গলা কেটে ফেলা সম্ভব আদৌ?”

নন্দিনী চুপ করে থেকে কতক্ষণ ভাবল। সত্যিই তো এত অল্পসময়ে মার্ডার করা সম্ভব হলেও গলা কাটা সম্ভব নয়। রোহিতের লাশ চোখের সামনে ভাসতেই গা শিউড়ে উঠে নন্দিনীর। রিশাদ বলে,
“বিয়ে যখন হচ্ছে না তখন বাড়িতে চলে যাব ভাবছি। আপনি কি যাবেন আমার সাথে?”
নন্দিনী মাথা নিচু করে বলে,
“আমার তো আর যাওয়ার জায়গাও নেই।”

“তাহলে তো হয়েই গেল। চলুন হাঁটা ধরি। সামনের রাস্তা থেকে রিক্সা নেব।”
নন্দিনী আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে হাঁটা ধরে। কিছুদূর এগোতেই রিক্সা পায়। রিক্সায় উঠে দুজনেই চুপ করে থাকে। নন্দিনী অন্যপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখছে। রিশাদ নন্দিনীর মুখের একপাশটা দেখতে পাচ্ছে শুধু। আজ পূর্ণ চাঁদ উঠেছে আকাশে। আকাশ ভর্তি রয়েছে তারার মেলা। চাঁদের আলোয় নন্দিনীর সাদা পাথরের নাকফুলটা চিকচিক করছে। খুব বেশি সুন্দর নয় নন্দিনী। উজ্জল শ্যামলা গায়ের রং। ডাগর ডাগর দুখানা চোখ। ঘনকালো চুলগুলো কোমড় পর্যন্ত ছুঁইছুঁই। ছিমছাম পাতলা গায়ের গড়ন। রিশাদ গলাটা খ্যাঁক করে পরিষ্কার করে বলে,
“একটা কথা বলতাম।”

নন্দিনী রিশাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“হ্যাঁ বলেন।”
“আমার বাসায় যখন যাচ্ছেন তখন বাড়ির লোকজনদের বিষয়ে একটু ধারণা দেই আপনাকে।”
“হুম।”
“বাড়িতে আমার দুটো মা। আমি ছোট মায়ের সন্তান। বড় মায়ের কোনো সন্তান নেই। আমার আর কোনো ভাই-বোনও নেই। বাড়িতে বাবা, দুই মা, আমি, হাসিব আর দুজন কাজের লোক থাকি। বড় মা খুবই শান্তশিষ্ট। কিন্তু ছোট মা একটু রাগী।”
“আচ্ছা।”
কথা বলতে বলতেই বাড়ির সামনে পৌঁছে যায় ওরা। রিশাদ রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে নন্দিনীকে নিয়ে বাসায় যায়। দরজায় বেশ কয়েকবার ঠক ঠক শব্দ করার পর একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলে দেয়। রিশাদকে বলেন,
“এত তাড়াতাড়ি চলে এলি যে?”
“তুমি খবর শোনোনি কিছু?”
“কী খবর শুনব?”

“ভেতরে গিয়ে বলছি।”
রিশাদ নন্দিনীকে দেখিয়ে বলে,
“ভেতরে এসো। এটা আমার বড় মা।”
“মেয়েটা কে?”
“ও নন্দিনী।”

বাড়ির বৈঠকঘরে বসে একে একে সব বলে রিশাদ। সব শুনে সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। এই খুনের শেষ কোথায় কে জানে! সব ঠিকঠাক থাকলেও ছোট মা নন্দিনীর বিষয়টা খুব ভালোভাবে যে নিল না এটা তার মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করলেন না। আলাপ-আলোচনা শেষে সবাই ঘুমাতে চলে গেল। নন্দিনীকে আলাদা একটা ঘর দেওয়া হলো। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। পেট জানান দিচ্ছে তার খুব খিদে পেয়েছে। সেই যে দুপুরে খেয়েছিল।

আর তো খাওয়াই হয়নি। এ বাড়ির কেউও তো খেতে দিল না। কত বাজে এখন? সবার খাওয়া কি আরো আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল? নাহ্! এভাবে আর শুয়ে থাকা যাচ্ছে না। আর যাই হোক, পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমানো অসম্ভব। বিছানা ছেড়ে উঠে নন্দিনী এগিয়ে যাচ্ছে রিশাদের রুমের দিকে। ঘুমানোর আগে রিশাদ সবার রুম দেখিয়ে দিয়েছে। রিশাদের রুমের আগের রুমটা রিশাদের ছোট মায়ের। ঐ রুমের সামনে যেতেই কানে ভেসে আসলো ছোট মায়ের কথা।তিনি রিশাদের বাবাকে বলছেন,

“বলি কি তোমার ছেলের কাণ্ডজ্ঞান কোনোদিন হবে না? অপরিচিত একটা মেয়েছেলে কীভাবে বাড়িতে আনে? কখন কি অঘটন ঘটে তা কি বলা যায় বাপু?”
“আহা! এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন তুমি? সকালে রিশাদের সাথে না হয় এ নিয়ে কথা বলব।”
“সবকিছুতেই তোমার শুধু পরে আর পরে। যখন কিছু ঘটবে তখন বুঝবে।”

কথাগুলো শুনে কেন জানি নন্দিনীর একটুও খারাপ লাগল না। বরঞ্চ ভালো লাগল। তিনি সব বিষয়েই সতর্ক সেটা বোঝা গেল। নন্দিনী পা টিপে টিপে হাঁটা ধরল। পাছে পায়ের শব্দ শুনে কেউ আবার চোর ভাবে? সব বাড়ির একটাই বারান্দা। বারান্দার শেষ মাথায় কোনো একটা ছেলের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। দূরের মৃদু আলোয় হাতের কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। নন্দিনী যদি খুব বেশি ভুল না হয় তাহলে হাতে এটা চাকু। অবয়বটি ওর দিকেই এগিয়ে আসছে।জোরে চিৎকার শুরু করে নন্দিনী। নন্দিনীকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“চুপ চুপ চুপ! আমি হাসিব।”

নন্দিনীর চিৎকারে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ছোট মা এসে বলে,
“কী হয়েছে? রাত বিরাতে চেঁচাচ্ছ কেন?”
হাসিব বলে,
“নন্দিনী অন্ধকারে আমায় দেখে ভয় পেয়েছিল।”
“অহ। তা মেয়ে রুম থেকে বের হয়েছ কেন?”

নন্দিনী এখন কী বলবে? কিছুই মাথায় আসছে না। থতমত খেয়ে বলে,
“বাথরুম! বাথরুমে যাচ্ছিলাম।”
ছোট মা আরো কিছু বলার আগেই বড় মা বলল,
“এমনিতেই মেয়েটা ভয় পাচ্ছে। আর তুই এখন অদ্ভুত সব প্রশ্ন করছিস। যা সবাই রুমে যা।”
ছোট মা বিরক্ত নিয়ে রুমে চলে গেল।রিশাদের ঘুম ভাঙেনি। ভাঙার কথাও নয়। কারণ রিশাদের ঘুম খুব গাঢ়। বড় মা বলে,
“উঠোনের বাঁ পাশেই বাথরুম আছে। একা যেতে পারবে? নাকি ভয় পাবে?”
“পারব।”

“আচ্ছা যাও।”
সবাই চলে যাওয়ার পর নন্দিনী হাসিবকে বলে,
“আপনার হাতে ওটা কী ছিল?”
“চাকু।”
“কেন? খুন করেন নাকি আপনি?”
উত্তরে হাসিব হোহো করে হেসে উঠে। ভয়ংকর সেই হাসি।

পর্ব ৩

সাত দিন হয়ে গেছে এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ টিম। গ্রামের কারো এটা নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। কারণ সবারই এই কাহিনী সহ্য হয়ে গেছে। এতদিনেও কেউ যখন খুনের কোনো হদিস মেলাতে পারেনি আর কেউ পারবেও না বলেই বিশ্বাস গ্রামবাসীর। সবাই সবার মতো দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু সবার মাঝেই আছে আতঙ্ক। কে জানে কখন কার গর্দান যায়।

চোখের সামনে প্রতিদিন নন্দিনীকে দেখতে দেখতে প্রেমে পড়ে গেছে রিশাদ। শুধু রিশাদ নয়। অন্য একজনও বোধ হয় না চাইতেই ভালোবেসে ফেলেছে নন্দিনীকে।
রিশাদ, নন্দিনী, তোয়া আর হাসিব একসাথে যায় পুকুর ঘাটে। রিশাদ আর হাসিব পুকুরে নামলেও তোয়া আর নন্দিনী নামেনি। ওরা ঘাটে বসে বসে গল্প করছে। তোয়া বলে,
“তুমি যাবে কবে?”

“কোথায়?”
“এই বাড়ি থেকে।”
“কেন?”
“এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
“আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই আপু। কোনো ব্যবস্থা করতে পারলেই চলে যাব।”
“রিশাদের সাথে তোমার কি কোনো সম্পর্ক আছে?”
“না তো। কেন?”
“ভালোবাসো রিশাদকে?”

“এসব প্রশ্ন করছ কেন?”
তোয়া কিছু বলার আগে হাসিব নন্দিনীকে ডেকে বলে,
“পুকুরে নেমে দেখো পানি কত ঠান্ডা।”
নন্দিনীর উত্তরের আগেই পিঠে কারো ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় নন্দিনী। রিশাদ আর হাসিব তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে নন্দিনীর কাছে আসে। রিশাদ নন্দিনীকে পাঁজাকোলে করে উপরে আনে। পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করে। পড়ার প্রায় সাথে সাথেই তুলেছে বলে জ্ঞান হারায়নি। রিশাদ ক্ষেপে গিয়ে তোয়াকে বলে,
“তুই জানিস না ও সাঁতার পারে না? তবুও পানিতে ধাক্কা দিলি কেন?”

“আমি বুঝতে পারিনি রে। হাসিব বলল তাই মজা করে”
“হাসিব বললেই তোকে মজা করতে হবে। ইচ্ছে করছে থাপ্রে তোর গাল লাল করে দেই।”
এরপর রিশাদ নন্দিনীকে কোলে করে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। তোয়ার চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে। হাসিব তোয়াকে শান্তনা দিয়ে বলে,
“থাক কাঁদিস না। জানিসই তো রিশাদ একটু রাগি।”

“তাই বলে এভাবে বকতে হবে বল?”
“বুঝতেছি না।”
“আমার তো মনে হচ্ছে তলে তলে দুজনে ঠিকই প্রেম করছে।”
“ধুর! এসব কিছুই না। আর হলেই বা কী?”
“আমি রিশাদকে ভালোবাসি হাসিব।”
“কী? কবে থেকে?”

“অনেক আগে থেকেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে রিশাদ নন্দিনীকে ভালোবাসে। আমার ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে খুন করে ফেলি।”
“নন্দিনীর উপর ক্ষেপছিস কেন বল তো? ওর কী দোষ? ও কিন্তু অনেক সহজ সরল। এত প্যাচ বুঝে না। ওর কোনো ক্ষতি করার কথা ভাবিস না।”
“তুই ওর এত সাফাই গাইছিস কেন?”

“যদি বলি ভালোবাসি তাই?”
“ভালোবাসিস! সত্যি বলছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে প্লিজ রিশাদের থেকে নিয়ে ওকে তোর করে নে।”
“এত পাগল হোস না তো। আরো কয়েকটা দিন যাক। তারপর সময় ও সুযোগ বুঝে ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেবো।

এখন সর বাসায় যাব।”
“আমিও যাব।”
“একটু আগেই না রিশাদের বকা খেলি?”
“তাতে কী? ভালোবাসার মানুষটার বকাও ভালো লাগে।”
হাসিব হেসে বলে,
“চল।”

বাড়িতে গিয়ে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খায় তোয়া। হাসিব ওর রুমে গেছে। আর তোয়া রিশাদের রুমে। কিন্তু রিশাদ রুমে ছিল না। তাই নন্দিনীর ঘরে যায়। নন্দিনী ঘুমিয়ে আছে। আর রিশাদ নন্দিনীর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ভালোবাসার মানুষটা অন্য একজনকে ভালোবাসছে এই কষ্টটা অসহ্যকর। রাগে নিজের উড়না চেপে ধরেছে তোয়া। গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে পেছনে ঘুরে তাকায়। হাসিব ইশারায় বলে,
“কাঁদছিস কেন?”

তোয়া মুখে কিছু না বলে নিজের জায়গায় হাসিবকে দাঁড় করায়। এই দৃশ্য দেখার জন্য হাসিব মোটেও অপেক্ষা করছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রুমে চলে যায়। পেছন পেছন আসে তোয়াও। রুমে গিয়ে হাসিবের উদ্দেশ্যে বলে,
“কী করবি এখন?”

“কিছু তো একটা করতেই হবে।”
“যা করার তাড়াতাড়ি কর হাসিব। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। রিশাদ কেন ভালোবাসবে নন্দিনীকে?”
“কাঁদিস না তো। আমার কষ্ট হচ্ছে না? তোর একাই হচ্ছে?”
“আন্টিকে জানাব?”

“না। আন্টিকে বললে নন্দিনীকে বের করে দিতে পারে।”
“তাতে তো তোরই ভালো। তুই ওকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবি।”
“বোকার মতো কথা বলিস না। রিশাদের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হোক এটা চাচ্ছিস?”
“জানিনা আমি কিছু। তুই যা করার কর। নন্দিনীর কথা ভেবে যদি তুই গুটিয়ে থাকিস তাহলে এর শেষটা আমিই দেখব বলে রাখলাম।”

কথাগুলো বলেই তোয়া বাড়ি থেকে চলে যায়। হাসিব ভাবতে থাকে কী করা যায়!

ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। তারা আছে কিন্তু চাঁদ নেই। মৃদু বাতাসে কানের পেছনে গুঁজে রাখা চুলগুলো সামনে এসে পড়ছে নন্দিনীর। উঠোনে একটা চেয়ার পেতে বসে আছে। বারবার তোয়ার কথাগুলো কানে বাজছে। আমি কি ওদের মাঝখানে চলে এলাম? চোখের কাঁটা কারো? কিন্তু আমি তো কারো চোখের কাঁটা হতে চাই না। আমাকে চলে যেতে হবে এখান থেকে। এবং সেটা আজই। অন্ধকার রাতে যেতেও ভয় করছে। কিন্তু কোনো উপায় নেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গুটিগুটি পায়ে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যায়। বারান্দা থেকে নন্দিনীকে যেতে দেখতে পায় রিশাদ। দুবার ডাকেও নাম ধরে। কিন্তু নন্দিনী থামেনি। দ্রুত পায়ে নিচে নামে রিশাদ।

হাঁটতে হাঁটতে একটা বাগানের মধ্যে এসে পড়েছে নন্দিনী। ঝিঝি পোকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দূরের কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ভয়ে নন্দিনী কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাঁটতে হাঁটতে আরো গহীনে চলে যায়। কিন্তু বাগান শেষ হয় না। এবার নন্দিনীর আরো ভয় হতে থাকে। একটু দূরের থেকে ভেসে আসে,
“এসেছ তুমি? তোমার অপেক্ষাই তো করছিলাম এতক্ষণ। এসো আমার সাথে এসো।”
ভয়ে পুরো শরীর কাঁপছে। শুকনো পাতার মর্মর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ক্রমশ সেই শব্দ আরো কাছ থেকে আসতে লাগল। ভয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে বসে পড়ল নন্দিনী। হাঁটুতে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমায় মেরো না প্লিজ মেরো না আমায়।”

কাঁধে শীতল হাতের ছোঁয়া পেতেই আরো জোরে কান্না শুরু করে নন্দিনী।
“মেরো না প্লিজ। মেরো না।”
“নন্দিনী! তাকাও আমার দিকে। আমি রিশাদ। কেন মারব আমি তোমায়?”
নন্দিনী এবার মুখ তুলে তাকায়। রিশাদ ফোনে ফ্লাশ ধরে রেখেছে। রিশাদকে দেখে জড়িয়ে ধরে নন্দিনী। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“একটু আগেই আমি কার কণ্ঠে যেন শুনলাম আমায় ডাকছে। বলছে আমার জন্য নাকি অপেক্ষা করছে।”
“কে বলেছে? আমি তো শুনিনি কিছু। তোমার মনের ভুল হয়ত।”
“না। আমি স্পষ্ট শুনেছি।”

“আচ্ছা ঠিকাছে। এখন এখান থেকে বের হতে হবে আমাদের।”
নন্দিনীর হাত ধরে বাগান থেকে বের হয়ে আসে রিশাদ। রাস্তায় এসে বলে,
“এখন বলো তো তুমি এত রাতে বের হয়েছে কেন?”
“বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছিলাম।”
রিশাদ অবাক হয়ে বলে,
“কেন?”

“আমি কারো পথের কাঁটা হতে চাই না।”
“কার পথের কাঁটা তুমি?”
“তোয়া আপুর। আমার মনে হয় তোয়া আপু আপনাকে ভালোবাসে।”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
নন্দিনী অবাক হয়ে তাকায় রিশাদের দিকে। অন্ধকারে মুখটা অস্পষ্ট। নন্দিনীকে চুপ থাকতে দেখে রিশার ওর হাত ধরে বলে,

“প্রথমদিন থেকেই তোমায় আমার ভালো লাগে নন্দিনী। আমি তোয়াকে না। তোমাকে ভালোবাসি।”
“কেন ভালোবাসেন আমায়? আমার পরিবার নেই, বাড়িঘর নেই। কিচ্ছু নেই। এসব জেনেও কেন আমায় ভালোবাসেন?”
“জানিনা। শুধু জানি ভালোবাসি।”
“ভুল করছেন আপনি।”
“হোক ভুল। তবুও আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তুমি ভালো না বাসলেও তোমাকেই ভালোবাসি। এখন সোজা আমার সাথে বাসায় যাবে।”

নন্দিনীকে আর কিছু বলতে না দিয়েই টানতে টানতে বাসায় নিয়ে যায়। বাড়ির উঠোনে পৌঁছাতেই বারান্দা থেকে ছোট মা দুজনকে দেখতে পায়। রিশাদ নন্দিনীর হাত ধরে আছে। রসিকতা করতে করতে আসছে। এত রাতে দুজন একসাথে। সিঁড়ির দিকে আসতেই ছোট মা রুমে চলে যান।

সকালে নন্দিনীর ঘুম ভাঙার পর একটা চিরকুট পায় বালিশের কাছে। চিরকুট খুলে দেখে তাতে লেখা,
“মরতে না চাইলে রিশাদের থেকে দূরে থাকো। আর এমনিতেও তোমাকে তো মরতে হবেই। এবং সেটা আমার হাতেই।”
সকাল সকাল এমন হুমকি বার্তা পেয়ে ভয়ে ঘামতে থাকে নন্দিনী। একবার ভাবে রিশাদকে দেখাবে। আবার কী ভেবে যেন বিছানাতেই রেখে দেয়। ভয়কে লুকিয়ে বাহিরে যায় ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে রিশাদ ওর রুমে বসে আছে। হাতে সেই চিরকুট। নন্দিনীকে দেখে বলে,
“এটা কী নন্দিনী? কে দিয়েছে?”

“জানিনা আমি। ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার বালিশের কাছে রাখা।
বিছানা গোছাতে গোছাতে উত্তর দেয় নন্দিনী। রিশাদ বলে,
“অদ্ভুত তো! এমন হুমকি বার্তা কে দিতে পারে? আর কেনই বা দেবে?”
নন্দিনী রিশাদকে ডেকে বলে,
“দেখুন।”

রিশাদ নন্দিনীর হাতের দিকে লক্ষ করে তাকায়। নন্দিনীর হাতে একটা সূঁচ আর শুকনো জবা ফুল।
“কোথায় পেলে এগুলো?”
“আমার বালিশের নিচে।”
“আমার জানামতে এসব দিয়ে কালো যাদু করা হয়!”

পর্ব ৪

বৈঠকখানায় সকলেই গম্ভীর হয়ে বসে আছে সেই হুমকি বার্তাটা নিয়ে। ছোট মা তো রীতিমত ক্ষেপে আছে নন্দিনীর উপর। রাগটা নিজের মধ্যে রাখতে না পেরে বলেই ফেললেন,
“একটা অপরিচিত মেয়েকে বাড়িতে আনার মজা বুঝতে পারছিস তো এখন? এই মেয়ে যদি আমাদের বাড়িতে কোনো ভাবে মারা যায় এর দায় কি তুই নিবি রিশাদ? শেষমেশ আমাদের বাড়িতে এসে জুটল ব্ল্যাক ম্যাজিকের কারবার!

আর রিশাদের বাপ তোমায়ও বলি, তুমি কিছু বলছ না কেন? এই মেয়েকে তুমি বাড়ি থেকে বের করবে নাকি আমি বেরিয়ে যাব বলো তো।”
অপমান আর লজ্জায় নন্দিনী মাটিতে মিশে যাচ্ছে। বড় মা ধমকে বলেন,
“আহ্ ছোট! এভাবে চেঁচাচ্ছিস কেন? মেয়েটা অসহায় বলেই তো রিশাদ এই বাড়িতে এনেছে। আজকে যদি নন্দিনী তোর মেয়ে হতো? পারতি এমন কথা বলতে?”

“আপা অযৌক্তিক কথা বলো না তো। ব্ল্যাক ম্যাজিকের কাণ্ডকারখানা হচ্ছে বুঝতে পারছ তুমি? এই মেয়ের কারণে যে আমাদের জীবন যাবে না তার কোনো ইয়ত্তা আছে?”
“আমার ছেলেমেয়ে নেই আমি বুঝি নিঃসন্তান হওয়ার কষ্ট ঠিক কতটা। মেয়েটাকে দেখলে আমার মায়া হয়। আমার মনে হয় আল্লাহ্ চাইলে আমাকেও একটা সন্তান দান করতে পারত।”

এবার ছোট মা চুপ হয়ে যায়। এমনিতে যাই হোক না কেন দুজনের মধ্যেই সম্পর্ক খুব ভালো। কেউ দেখলে বুঝবেই না যে ওরা সতীন। বরং সবাই ভাববে ওরা দু’বোন।
হাসিব বড় মায়ের উদ্দেশ্যে বলে,
“আমাদের আগেই কিছু করতে হবে। সতর্ক না হলে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে।”
তোয়া এখানেই উপস্থিত ছিল।

তোয়া বলে,
“কী করবি শুনি? পুলিশে জানাবি? এই পর্যন্ত পুলিশ কিছু করতে পেরেছে কি?”
“না পুলিশে না। এবার ডিটেকটিভের সাহায্য নেব। এখানকার যে পুলিশ আছে দিদার ভাই? উনার এক বন্ধু শুনেছি ডিটেকটিভ। তিনি নাকি খুনের রহস্য বের করার জন্য চেষ্টা করছেন।”
ডিটেকটিভের কথা শুনতেই তোয়া আর ছোট মা আৎকে উঠে। ছোট মা তড়িঘড়ি করে বলে,
“না, না। কোনো পুলিশে-টুলিশে জড়াবি না একদম।”

রিশাদের বাবা বলেন,
“এছাড়া আর করব টা কী আমরা? চুপ করে হাত-পা গুঁটিয়ে বসে থাকব? নন্দিনীর পরের টার্গেট তো তুমি, আমিও হতে পারি।
হাসিব তুই থানায় ফোন কর। আসতে বল তাদের।”
হাসিব বারান্দায় চলে যায় ফোন করতে। পেছন পেছন তোয়াও যায়। তোয়া হাসিবের হাত ধরে বলে,
“মাঝখানে গোয়েন্দা কেন টানছিস বুঝতেছি না।”

“অদ্ভুত! নন্দিনীকে কেউ মারার হুমকি দিচ্ছে আর আমি চুপ করে থাকব?”
“সেটা বলিনি। অন্যকিছু করার চেষ্টা কর। তবুও ডিটেকটিভ ডাকিস না।”
“তুই বাঁধা দিচ্ছিস কেন? নন্দিনীকে ঐ হুমকি বার্তা তুই দিয়েছিস?”
“আজব! আমি কেন এমনটা করতে যাব?”

হাসিব আর কোনো কথা না বলে দিদারকে ফোন দিয়ে সবটা জানায়। দিদার বলেছে বিকেলে মুহিবকে নিয়ে আসবে। ফোন রাখার পর তোয়া রেগে বলে,
“বারণ করার পরও শুনলি না তাই না? এর ফল না ভোগ করতে হয় কাউকে।”
কথাটা বলেই তোয়া চলে যায়।

নন্দিনী মনমরা হয়ে রুমে বসে আছে। হঠাৎ করে কে ওর পিছে লাগল? নন্দিনী তো কখনো কারো ক্ষতি করেনি। ব্ল্যাক ম্যাজিকের শিকার কি তবে শেষমেশ নন্দিনীও হলো!
বিকেলের দিকে মুহিব আর দিদার আসে। ওদের সামনে বসে আছে রিশাদ, নন্দিনী, হাসিব আর তোয়া। ছোট মা রান্না করছে। বড় মা ঘুম। রিশাদের বাবা ক্ষেতে গেছেন। হুমকি বার্তাটা নিয়ে মুহিব নাড়াচাড়া করছে
ছোট মা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে রিশাদকে বলে,
“ম্যাচটা দে তো। রান্নাঘরের ম্যাচের গ্যাস শেষ হয়ে গেছে।”

“তুমি এখনো রান্না করছ? উনারা এসেছে। এখানে বসো এখন।”
“চুলোর জ্বালটা ধরিয়ে দিয়েই আসছি। তুই কিসমতকে বাজারে পাঠা গ্যাস ম্যাচ আনার জন্য।”
“সেটা পরে পাঠাবনি। এখন আসো তো। বড় মাকেও ডাক দিয়ো।”
মুহিব জিজ্ঞেস করে,
“আমি কি বাড়িটা একটু ঘুরে দেখতে পারি? তার আগে নন্দিনী ম্যামের রুমটা দেখতে চাই।”
রিশাদ বলে,
“হ্যাঁ অবশ্যই। আমার সাথে আসুন।”
সবাই রিশাদের পেছন পেছন যায়। নন্দিনীর রুমটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মুহিব।
“নন্দিনীর বামপাশের রুমটা কার?”

“হাসিব আট আমার। আর শেষের ঘরটা মায়ের।”
মুহিব নন্দিনীর ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা হাসিব আর রিশাদের রুমে যায়। ওদের রুমটাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়েও দেখছে। শেষে যায় বড় মায়ের রুমে। কিন্তু সেখানে সকলেই অবাক হয় একটি ঘটনা দেখে। বড় মায়ের পিছনে একটা মোমবাতি জ্বালানো। শাড়ির আঁচলটাও কাছে। যেকোনো সময়ে আগুন লেগে যাবে। শীতের দিন বিধায় রুমের ফ্যানও বন্ধ। সবাই রুমের ভেতর যায়। রিশাদ মোমবাতিটা নিভিয়ে বড় মাকে ডেকে তোলে।
“বিছানায় মোম জ্বালিয়ে শুয়ে আছো কেন?”

বড় ঘুম ঘুম চোখে বলে,
“কীহ্! কোথায় মোম? আমি তো কোনো মোম জ্বালাইনি। দিনদুপুরে মোমই বা জ্বালাব কেন?”
“তাহলে কেউ কি ইচ্ছে করে এটা করেছে?”
মুহিব বলে,
“ঘটনা কিন্তু এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে মিস্টার রিশাদ। কেউ ইচ্ছে করেই কাজটা করেছে।”
“বাড়িতে এসব হচ্ছে কী!”

“চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়!”
সেদিনের মতো মুহিব সবার সাথে কথা বলে চলে যায়।

রাতের বেলায় খাওয়ার টেবিলে তোয়া একটা চিরকুট পায়। চিরকুটে লেখা,
“ভুলেও নন্দিনীর ক্ষতি করার চেষ্টা করো না। নন্দিনী আমার শিকার। ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করে নিজের মৃত্যু ডেকে এনো না।”

চিরকুটটা দেখে তোয়া একটু ঘাবড়ে যায়। এখানে চিরকুট রাখবে কে? ছোট ভাই? ও তো নন্দিনীকে চিনেই না। তাহলে কে রাখল? দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায় তোয়া। পরক্ষণেই ভাবে,
“নির্ঘাত এটা হাসিবের কাজ! কাউকে দিয়ে হয়ত লিখিয়েছে। কিন্তু গাঁধাটা তো আর জানে না, এই তোয়া কাউকে ভয় পায় না। নিজেরটা তো আমি আদায় করে নেবই।”

বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে নন্দিনী। রাত দুটো ছুঁইছুঁই। ঘুম আসছে না একটুও। সবকিছুই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সবকিছুর পেছনেই নন্দিনী নিজেকে দায়ী করছে।
“তুমি কি ভয় পাচ্ছো প্রিয়তমা?”

অচেনা পুরুষালী কণ্ঠ থেকে কথাগুলো শুনতে পেল নন্দিনী। আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেল না।
“আমায় তুমি দেখতে পাবে না। তবে শীঘ্রই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি। ভয় পেয়ো না কিন্তু।”
নন্দিনী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
“ককে আপনি?সামনে আসেন না কেন?”
বিদঘুটে হাসিব শব্দ শুনতে পায় নন্দিনী। ভয়ে দৌঁড়ে যাওয়ার সময় ধাক্কা খায় রিশাদের সাথে। পাশেই হাসিব দাঁড়িয়ে আছে। নন্দিনী ভয়ে ভয়ে সব বলে। রিশাদ বলে,
“এসব পরে শুনব নন্দিনী। এখন আমাদের তোয়ার বাসায় যেতে হবে।”
নন্দিনীকে পাশ কাটিয়ে বাবা-মাকে ডাকে রিশাদ।

বাবা দরজা খুলে বলেন,
“কী হয়েছে? এত রাতে ডাকাডাকি করছিস কেন?”
“বাবা! তোয়া বিষ খেয়েছে!”
রিশাদের কথা শুনে সবাই বেশ অবাক হয়ে যায়। ছোট মা বলেন,
“এসব কী বলছিস? কে বলল তোকে?”
“তোয়ার মা ফোন দিয়েছিল। এখন আমি আর হাসিব যাচ্ছি।”
“আমরাও যাব সাথে।”

“না। এত রাতে আসার দরকার নেই। সকালে এসো তোমরা।”
হাসিব আর রিশাদ যাওয়ার পরই ছোট মা কথা শোনাচ্ছে নন্দিনীকে।
“তোমার জন্যই সব হচ্ছে। অপয়া মেয়ে একটা। তোয়া বিষ তোমার জন্যই খেয়েছে। রিশাদ আর ওর মাঝে কেন এসেছিলে? প্রেম-পিরিতি চলে রিশাদের সাথে? তোয়া নিশ্চয়ই সহ্য করতে না পেরে বিষ খেয়েছে।”
একের পর এক কথা শুনিয়েই যাচ্ছেন তিনি। নিরবে চোখের পানি ফেলছে নন্দিনী। নন্দিনী রুমে যাওয়ার সময় রিশাদ ফোন করে বাবার ফোনে। ফোনে জানায় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তোয়া মারা গেছে।
নন্দিনীর কান্নার বেগ বেড়ে যায়। এখন তো আরো কথা শোনাবে সবাই। দেয়ালের সাথে স্কচটেপ দিয়ে লাগানো একটা লেখা দেখতে পায় নন্দিনী।

“তুমি তো আমার শিকার নন্দিনী। ঐ তোয়া কেন তোমায় মারবে? তাই আমিই ওকে সরিয়ে দিয়েছি আমার পথ থেকে। আর ঐ ডিটেকটিভের সাহায্য নেওয়া বন্ধ করো। নয়ত এর শিকার কিন্তু ঐ ডিটেকটিভও হতে পারে।”

নন্দিনী অবাক হয়ে যায় লেখাটা দেখে। তার মানে তোয়া স্বেচ্ছায় বিষ খায়নি! ওকে মার্ডার করা হয়েছে! নন্দিনী কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“কে তুমি? কেন এমন করছ? কেন খুন করছ? আমার সাথে কী শত্রুতা তোমার? আর যদি কোনো শত্রুতা থেকেও থাকে। তাহলে আমায় মেরে ফেলো। আমি আর এসব সহ্য করতে পারছি না।”

পর্ব ৫

ফ্লোরে বসে বিছানার উপর মাথা রেখেই কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে নন্দিনী।
ভোরের আলো ফুঁটতে শুরু করেছে মাত্র। হঠাৎই হাতে ব্যথা ও জ্বালা অনুভূত হয়। নন্দিনীর ঘুম ভেঙে যায়। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে হাত অনেকখানি কেটে গেছে। গলগল করে রক্ত পড়ছে কাটা স্থান থেকে। চোখের পলকেই সামনে দেখতে পায় একটা মানুষের অবয়ব। সম্পূর্ণ কালো পোশাকে আবৃত। হাতে একটা ছুড়ি। ছুড়ির কোণা বেয়ে রক্ত পড়ছে। নন্দিনী ভয়ে পিছিয়ে যায়।

“কে তুমি? আমার রুমে আসলে কীভাবে? আঘাত করছ কেন আমায়?”
অবয়বটি কোনো উত্তর না দিয়ে নন্দিনীর সামনে এগোতে থাকে। নন্দিনী বসেই পেছাতে থাকে। তবে কি মৃত্যু সন্নিকটে এসেই পড়েছে! নন্দিনী জোরে জোরে চিৎকার করে ডাকতে থাকে,
“বাড়িতে কেউ আছো! আমায় সাহায্য করো প্লিজ।”

কিন্তু নন্দিনীর আওয়াজ কারো কানেই পৌঁছায় না। কীভাবেই বা পৌঁছাবে! বাড়িতে নন্দিনী ছাড়া আর কেউ নেই। সবাই সেই রাতেই তোয়ার বাসায় গেছে। নন্দিনী পেছাতে পেছাতেই একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে নিচে পড়ে যায়। উপর থেকে নিচে পড়ায় বেশ খানিকটা ব্যথাও পায়। কিন্তু কোথায় পড়েছে সেটা বুঝতে পারছে না। চারদিকে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাটা হাতেই বেশি ব্যথা পেয়েছে। ধুলোবালি লেগে আরো বেশি জ্বলছে।

শরীরের ময়লা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই দেখতে পায় আগুনের মৃদু আলোতে দূরের দিকটা পরিষ্কার। সেখানে দুজন মানুষ বসে আছে। একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। পুরুষ যে জন তার পরনে কালো ধুতি শুধু। গলায় কীসব মাথার মতো মালা। কপালে লম্বা লাল তীলক। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কী জানি বলছে আর আগুনে লাল রক্তের ন্যায় কিছু ঢালছে। সামনে রয়েছে মানুষের মাথা, পুতুল, শুকনো জবা ফুল।

পাশের মহিলাটিও চোখ বন্ধ করে বসে আছে। চুলগুলো ছেড়ে রাখা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। নন্দিনী কী করবে বুঝতে পারছে না। একই তো এই অন্ধকারে বের হওয়ার কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। আর দ্বিতীয়ত এরা কালো যাদু করছে। এত মানুষের ক্ষতি এরাই করছে। নন্দিনী ভেবে নিয়েছে যা হবার হবে। তবুও সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। এমনিতেও তো নন্দিনীর পেছনে কেউ লেগেই আছে। মরতে যদি হয় তবে না হয় সব জেনেই মরব।

নন্দিনী গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায়। যতই সামনে এগোচ্ছে ততই যেন শরীর শিউরে উঠছে। যখন একেবারেই সামনে এগিয়ে যায় তখন নন্দিনীর চোখ চড়কগাছ। সামনে থাকা মানুষটাকে দেখে বুঝতেই পারছে না এই মানুষটাই ব্ল্যাক ম্যাজিকের সাথে জড়িত। না চাইতেও নন্দিনী মুখে হাত দিয়ে শব্দ করে চেঁচিয়ে উঠে। বড় মা সাথে সাথে চোখ তুলে তাকায়। কিন্তু গুরুজি তখনো যজ্ঞে ব্যস্ত। বড় মা নন্দিনীকে দেখে অবাক হয়ে বলে,
“তুমি এখানে?”

নন্দিনী কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“আন্টি! আপনি! আপনিই এই কালো যাদুর সাথে জড়িত? একের পর এক খুন আপনার দ্বারাই হচ্ছে?”
নন্দিনীর উপর বেশ ক্ষেপে যান তিনি। উঠে দাঁড়িয়ে নন্দিনীর কাছে গিয়ে বলেন,
“নিজের মৃত্যুকে নিজে এভাবে কাছে ডেকে

আনলে? গোপন আস্তানায় এসেই যখন পড়েছ তবে শোনো, হ্যাঁ আমিই এই কালো যাদুর সাথে জড়িত। এত বছরেও যেটা কেউ জানতে পারেনি মাত্র কয়দিনেই তুমি সেটা জেনে গেছ। তোমার মৃত্যু খুবই সন্নিকটে নন্দিনী।”
নন্দিনী কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“কেন সবাইকে এভাবে খুন করছেন? আমার সাথেই বা আপনার কীসের শত্রুতা?”

“তোমায় মেরে ফেলার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। তোমার বালিশের নিচে সূঁচ আর শুকনো জবা ফুল আমিই রেখেছিলাম। তবে আমি চেয়েছিলাম শুধু তোমাকে ভয় দেখাতে। যাতে তুমি এই বাড়ি ও রিশাদের জীবন থেকে চলে যাও। তা তো হলোই না বরং উল্টো তুমি সব জেনে গেলে। এবার তো তোমায় মরতেই হবে।”
“আমাকে মেরে ফেললেই আপনি পার পেয়ে যাবেন ভেবেছেন? সত্যি কোনোদিনও চাপা থাকে না। আজ না হয় কাল সেটা প্রকাশ পাবেই।”

তিনি নন্দিনীর চুলের মুঠি ধরে বলেন,
“তুই বেঁচে থাকলেই না প্রকাশ পাবে। তার আগেই তোকে উপরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।”
তখনই সাথে সাথে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। যজ্ঞের আগুন নিভে যায়। শেষ আগুনটুকু নেভার আগে দেখতে পায় গুরুর শরীর থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে গেছে। সেই কালো অবয়বটি। হাতে রাম-দা।
বড় মা নন্দিনীকে ছেড়ে দেন। অবয়বটির উদ্দেশ্যে বলেন,
“কে তুই?”

“তোর যম! তোদের ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না আমার। কিন্তু তোরা আমার শিকারের দিকে হাত বাড়িয়েছিস। এটা তো হতে পারে না। নন্দিনীকে মারার আগেই আমার হাতে তোর মৃত্যু হবে।”
মুহূর্তেই বড় মায়ের মাথাটা আলাদা করে ফেলল। নন্দিনী ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। চারদিকে দৌঁড়াতে লাগল। কাঠের ন্যায় দরজার মতো কিছু পেয়ে এলোপাথাড়ি ধাক্কাতে লাগল। অবয়বটি বলতে লাগল,
“ভয় পাচ্ছো কেন নন্দিনী? আমি তো এখনই তোমায় মারব না। তোমার শত্রুদের শেষ করলাম। সময় হলে তোমাকেও শেষ করে দেবো।”
নন্দিনী এবার সেন্সলেস হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

নন্দিনীর যখন জ্ঞান ফিরে তখন নন্দিনীর গায়ে জ্বর। ভয়ে তটস্থ হয়ে বিছানায় উঠে বসে। পাশেই রিশাদ, হাসিব বসে আছে। আর সামনে মুহিব। রিশাদ নন্দিনীকে শান্ত করে বলে,
“রিল্যাক্স নন্দিনী। ভয় পেয়ো না। তুমি এখন বিপদমুক্ত।”

মুহিব নন্দিনীর দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়। নন্দিনী এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু শেষ করে। বাড়ির মধ্যে পুলিশ, সাংবাদিকের কোনো অভাব নেই। সাথে তো রয়েছে গ্রামের মানুষজন। এত বছর পর আসল ঘটনা বের হলো। সাংবাদিকরা নন্দিনীর সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। মুহিব জিজ্ঞেস করছে,
“আপনি কি মিডিয়ার সামনে এখন কথা বলতে পারবেন নাকি নার্ভাস আছেন এখনো?”

“মিডিয়ার সামনে কথা বলব কেন?”
“কারণ সবাই এখন এটাই জানে এই রহস্য বের করেছেন আপনি।”
“কিন্তু আমি তো”

“হ্যাঁ, জানি আপনি রহস্য বের করেননি। বরং কেঁচো খুঁজতে গিয়ে কেউটে বেরিয়ে গেছে। পুরো ঘটনা কী হয়েছিল বলুন তো? আমরা যখন আসি তখন বাড়িতে কেউ ছিল না। আপনার রুমের দরজা খোলা ছিল। আপনার রুমে এসে আপনাকে পাইনি। তবে রুমের কোণায় একটা সুড়ঙ্গের মুখ দেখতে পাই। আমরাও সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে ঢুকি। ফোনের আলো দিয়ে চারপাশ দেখে দুজনের লাশ পেলাম। এক রিশাদের বড় মায়ের। আর দুই যার মাধ্যমে কালো যাদু করা হয়। আর কিছুটা দূরেই আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাই। এখন কথা হচ্ছে এদের খুন করল কে? আর আপনিই বা সেখানে গেলেন কীভাবে?”

“আমাকে যে হুমকি বার্তা দেয় সেই ওদের খুনী।”
“আপনি তাকে দেখেছেন?”
“সে মানুষ নাকি আমি তো সেটাই বুঝতে পারি না। শুধু দেখি একটি কালো অবয়ব। এবং সে বারবার শুধু এটাই বলে আমি নাকি তার শিকার। কিন্তু কে সে? কেন মারতে চায় আমাকে!”
“কী কী হয়েছিল সবটা একটু খুলে বলুন তো।”

নন্দিনী শুরু থেকে সবটা খুলে বলে। মুহিব চিন্তিত হয়ে বলে,
“আমিও তো এটাই বুঝতেছি না কেন সে আপনাকে খুন করতে চায়। আপনার কি কারো সাথে কোনো শত্রুতা ছিল?”
“জি না। আমি খুবই সাধারণ একটা মেয়ে। কখনো কারো সাথে উঁচু গলায় কথাও পর্যন্ত বলিনি।”
“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলব?”
“জি।”

“আপনার কি কোনো প্রাক্তন ছিল?”
নন্দিনী এবার রিশাদের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্ততবোধ করে। রিশাদ নন্দিনীকে অভয় দিয়ে বলে,
“সত্যিটা বলো। সমস্যা নেই।”
“জি ছিল।”

“সে কি মারা গেছে?”
“না। বছর দুয়েক আগে অন্যজনকে বিয়ে করেছে।”
“গোলমেলে লাগছে এখনো। আচ্ছা এমন কেউ ছিল যে আপনাকে পছন্দ করত বা ভালোবাসতো?”
“মনে পড়ছে না।”
“মনে করার চেষ্টা করুন।”
নন্দিনী কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
“হ্যাঁ, ছিল একজন। গ্রামের মাতব্বের ছেলে। প্রায়ই শুধু বলত তাকে বিয়ে করতে।”
“সে এখন কোথায়?”

“জানি না আমি। আমায় অনেক করে বোঝানোর পরও যখন রাজি হইনি তারপর থেকে তাকে আর দেখিনি।”
মুহিব কিছুক্ষণ চুপ থেকে কী যেন ভাবল। তারপর বলল,
“আচ্ছা। এখন মিডিয়ার সাথে কথা বলুন। সাংবাদিকদের এটা বলার দরকার নেই যে, কেউ আপনাকে মারার হুমকি দিচ্ছে।”
“আচ্ছা।”

রিশাদ নন্দিনীকে বাহিরে নিয়ে যায়। পুলিশ, মিডিয়া, গ্রামবাসীর অভাব নেই বাড়ির উঠোনে। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার পর সবাই বাড়ি থেকে চলে যায়। নন্দিনী বাড়িতে ঢোকার আগে ছোট মা পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলেন,
“কালো যাদুর রহস্য বের করে সব মানুষের সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ নন্দিনী। কিন্তু এই বাসায় তোমার আর কোনো জায়গা নেই। কেউ তোমাকে খুন করতে চাচ্ছে। তোমাকে সাহায্য করতে গিয়ে যদি আমাদের কোনো ক্ষতি করে? যেচে তো আর কেউ নিজের ক্ষতি করতে চায় না।”
রিশাদ বলে,
“মা এসব কী বলছ? বিপদের সময় তুমি ওকে থাকতে দেবে না?”

“না। দেবো না। তুইও আর ওর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবি না। ভেতরে আয় তুই।”
“আমি তোমার মতো এত স্বার্থপর নই মা। নন্দিনার জায়গা এই বাড়িতে না হলে, আমিও থাকব না।”
ছোট মা রাগেই বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন। নন্দিনী মাথা নিচু করে বলে,
“আমার জন্য শুধু শুধু নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করবেন না প্লিজ।”
মুহিব বলে,

“আপনাদের কারো সমস্যা না হলে নন্দিনী আমার বাসায় থাকতে পারে। বাড়িতে আমার মা-বাবা, ছোট দু’বোন রয়েছে।নন্দিনীর সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।”
“আপনি কি জানেন, আমায় সাহায্য করলে সে আপনারও ক্ষতি করবে বলেছে। রুমের দেয়ালে হুমকি বার্তাটা দেখেছেন নিশ্চয়ই?”

নন্দিনীর কথা শুনে মুহিব হেসে বলে,
“মরণ থাকলে মরব। ভয় পেয়ে আরেকজনকে তো মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিতে পারি না।”
সবাই বোঝানোর পর নন্দিনী রাজি হয়। মুহিব বাড়ির এড্রেস দিয়ে বলে,
“এটা আমার বাড়ির ঠিকানা। আমি বাড়িতে ফোন দিয়ে আপনাদের কথা বলে দিচ্ছি।”
রিশাদ জিজ্ঞেস করে,
“আপনি বাসায় যাবেন না?”
“থানায় আমার একটু কাজ আছে। আমি কাজটা কমপ্লিট করেই বাসায় আসব। আপনি নন্দিনীকে নিয়ে বাসায় যান।”
“ঠিক আছে।”

রিশাদ নন্দিনীকে নিয়ে মুহিবের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। এই গ্রামে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। দিনদুপুরে কাউকে খুন করে ফেললেও কিছুই করার থাকবে না। একজন জ্যোতিষীকে দেখে রিশাদ থেমে যায়। নন্দিনী জিজ্ঞেস করে,
“থামলেন কেন?”
“চলো জ্যোতিষীর কাছে হাত দেখাব।”
“আপনি বিশ্বাস করেন এসব?”

“না করার কী হলো? এর আগে অনেক কিছুই মিলে গেছে। তাই বিশ্বাস করি।”
“তাহলে আপনিই হাত দেখান। আমি এসব বিশ্বাস করি না।”
“বেশ! আমিই দেখাব চলো।”
জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে রিশাদ হাত দেখায়। পাশে নন্দিনী দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতিষী চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“মা তোমার হাতটা দাও তো।”

নন্দিনী বিরক্ত হলেও ভদ্রতার খাতিরে নিচে বসে হাতটা তার দিকে এগিয়ে দেয়। তিনি মনোযোগ দিয়ে হাত দেখছেন। হাত দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি। আননোন নাম্বার থেকে তখন ফোন আসে নন্দিনীর। জ্যোতিষী বলেন,
“দূরে গিয়ে কথা বলো মা।”

নন্দিনী উঠে একটু দূরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে বলে,
“হ্যালো কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে কোনো শব্দ নেই। নন্দিনী আবার জিজ্ঞেস করে,
“কে আপনি?”

এবার ওপাশ থেকে বিদঘুটে একটা হাসির শব্দ আসে এবং ফোনটা কেটে দেয়। নন্দিনী সাথে সাথে ফোন দেয় সেই নাম্বারে। কিন্তু ফোনটা বন্ধ। রিশাদ এসে বলে,
“চলো।”
নন্দিনীকে চিন্তিত দেখে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“বলো।”

“একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল। বিদঘুটে হাসি ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলাম না। ছাড়ুন এসব। জ্যোতিষী কী বলল? আর উনি আমার হাত দেখলেন কেন?”
“শুনতে হবে না। শুধু শুধু টেনশন করবে।”
“না শুনলে আরো বেশি চিন্তা হবে।”
“ঘাবড়ে যাবে না তো?”
“না।”
“উনি বলেছেন তোমার সামনে অনেক বিপদ। এবং তোমার সাথে সম্পর্ক রাখলে আমারও অনেক বিপদ হবে। কিন্তু তুমি এটা ভেবো না, আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাব। আমি তোমায় ভালোবাসি। তোমার বিপদ-আপদে সবসময় আমি তোমার পাশে থাকব।”

নন্দিনীর ফোনে তখন সেই নাম্বার থেকে একটা ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটা ওপেন করে দেখে,
“জ্যোতিষী তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। আর না পারবে ঐ ডিটেকটিভ। সে তোমায় সাহায্য করে নিজের বিপদ ডেকে আনল। তৈরি থেকো মৃত্যুর জন্য।”
রিশাদ নন্দিনীর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ঐ নাম্বারে কল দেয়। কিন্তু নাম্বারটা আবারও সুইচডঅফ!
রিশাদ নন্দিনীকে শান্তনা দিয়ে বলে,
“তুমি একদম চিন্তা করবে না।”

মুহিবের বাসায় সবাই খুব ভালোভাবেই মেনে নেয় নন্দিনীকে। মুহিবের ছোট বোনদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে সব খারাপ কথা ভুলে যায়। দুপুরের দিকে রিশাদ বাসায় চলে যায়। নন্দিনী মুহিবের ছোট দুবোনের সাথে আচার খাচ্ছিল আর গল্প করছিল। মুহিব বাসায় এসে প্রাণচঞ্চল নন্দিনীকে দেখে খুশি হয়। নন্দিনীকে জিজ্ঞেস করে,
“রিশাদ কোথায়?”
“ওতো বাসায় গেছে।”
“আমাকে ফোনে বলল, আবার নাকি সে হুমকি ম্যাসেজ দিয়েছে?”
“হুম।”

“নাম্বারটা একটু লিখে দেন। আমি ফ্রেশ হবো এখন।”
মুহিবের ছোটবোনের থেকে খাতা নিয়ে নাম্বারটা লিখে মুহিবকে দেয়। মুহিব ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাম্বারটা নিয়ে আবার থানায় চলে যায়।

রাতে ড্রয়িংরুমে মুহিবের ছোটবোনদের ক্লাসের পড়া শিখিয়ে দিচ্ছিল নন্দিনী। আটটার দিকে মুহিব আসে। সোফায় বসে বলে,
“কী করছেন তিনজনে?”

নন্দিনী মৃদু হেসে বলে,
“এইতো ওদের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছি।”
কথা বলার মধ্যেই লোডশেডিং হয়। নন্দিনী ফোনের ফ্লাশ অন করে। মুহিব ম্যাচ এগিয়ে দিয়ে বলে,
“এই নিন ম্যাচ। রান্নাঘরে মোম আছে। একটু কষ্ট করে জ্বালিয়ে আনুন। নয়ত আপনি ওদের কাছে বসুন আমি যাই।”

“সমস্যা নেই। আমিই যাচ্ছি। রান্নাঘরের কোথায় কী আছে আন্টির সাথে দুপুরে গল্প করার সময় দেখেছি।”
“তাহলে তো হয়েই গেল। যান।”
মোমবাতি জ্বালিয়ে আনার পর মুহিব বলে,
“বই-খাতা গুছিয়ে তোমাদের নন্দিনী আপুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়। দুষ্টুমি করবে না কিন্তু একদম।”
“আচ্ছা।”

সকালে নন্দিনীর ঘুম ভাঙার পর দেখে মুহিব একটা কাগজ নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। নন্দিনীকে দেখে বলে,
“আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
“কী হয়েছে?”

মুহিব কাগজটা নন্দিনীর দিকে এগিয়ে দেয়। নন্দিনী কাগজটা নিয়ে দেখে তাতে লেখা আছে,
“নন্দিনীকে সাহায্য করার চেষ্টা করো না। নন্দিনীর সাথে নিজেকে জড়িয়ে মরণ ফাঁদে পা দিয়ো না।”
নন্দিনী কাগজটা দেখে বলে,
“আমি আপনাকে বারবার বলেছিলাম। কিন্তু আপনি তো আমার কোনো কথাই শুনলেন না। আমি এখান থেকে চলে যাব।”

“এত ঘাবড়ে যাবেন না প্লিজ। শান্ত থাকুন আপনি। দেখি না পানি কতদূর গড়ায়। আমি রিশাদকে ফোন দিয়েছি। সে আসছে। আমি এখন দিদাদের কাছে যাচ্ছি। আপনি অযথাই কোনো টেনশন করবেন না প্লিজ।”
মুহিব চলে যাওয়ার পর নন্দিনী চুপ করে বসে থাকে। যতই বলুক চিন্তা করবেন না, মন তো আর তাতে সায় দেয় না।

সকাল ১০টার দিকে রিশাদ আসে। নন্দিনীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
“আমায় বিয়ে করতে তোমার কোনো সমস্যা আছে?”
নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“না।”

“তাহলে চলো। আমরা আজই বিয়ে করব। এবং তারপর ঢাকায় চলে যাব। এখানে থাকলেই তোমার বিপদের আশংকা বাড়বে।”
সবার থেকে বিদায় নিয়ে রিশাদ নন্দিনীর হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রিক্সা নিয়ে সোজা কাজী অফিসের দিকে যায়। রিক্সা কিছুদূর যেতেই হাসিবকে দেখতে পায় রিশাদ ও নন্দিনী।
রিক্সা থেকে নেমে রিশাদ বলে,

“ভালোই হলো তোর সাথে দেখা হয়ে। চল কাজী অফিসে যাব। নন্দিনীকে আজ বিয়ে করব আমি।”
“তুই বেঁচে থাকলে তারপর না নন্দিনীকে বিয়ে করবি!”
“হাসিব! এসব কী বলছিস তুই?”

হাসিব একটা ছুড়ি নিয়ে রিশাদের দিকে এগিয়ে যায়। রিশাদ রেগে হাসিবকে মারতে গেলে নন্দিনী রিশাদের হাত ধরে বলে,
“পাগল হলে তুমি? তুমি দেখছ না ওর হাতে ছুড়ি? আমাদের এখন থানায় যেতে হবে। চলো।”
রিশাদ আর নন্দিনী হাত ধরে দৌঁড়াতে থাকে। পেছন পেছন হাসিবও দৌঁড়ে আসতে থাকে

পর্ব ৬

জঙ্গলের ভেতর দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পথ হারিয়ে ফেলেছে দুজনে। এভাবে দৌঁড়ানোর ফলে হাঁপিয়ে উঠেছে নন্দিনী। হাঁপাতে হাঁপাতে নন্দিনী বলে,
“কোথায় আসলে? এখানে তো জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”

“বুঝতে পারছি না কোথায় এসে পড়লাম। চলো সামনে এগিয়ে দেখি। রাস্তা পেলেও পেতে পারি।”
নন্দিনী আর রিশাদ সামনে হাঁটতে থাকে। হাসিবকে আর দেখা যাচ্ছে না। পুরনো পরিত্যাক্ত একটা বাড়ি দেখে রিশাদ বলে,
“আপাতত কি এই বাড়িটায় আশ্রয় নেব?”
“কেন? থানায় যাবে না?”

“রাস্তা তো খুঁজে পাচ্ছি না।”
“তাহলে চলো। হাসিব হয়ত আশেপাশেই কোথাও আছে। আমাদের আগেই লুকাতে হবে।”
গাছপালায় আবৃত পুরনো পরিত্যাক্ত বাসাটিতে দুজনে প্রবেশ করে। চারদিকে ধুলোবালি, মাকড়শারজাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। হাত দিয়ে সামনে ঝাড়তে ঝাড়তে ভেতরে ঢোকে। বাড়িটার ভেতরে শুধু অন্ধকার। কিছুই ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। পেছন থেকে কেউ সজোরে রিশাদের মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে রিশাদ ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে। নন্দিনী চিৎকার করে বলে,
“রিশাদ!”

মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে রিশাদের। মাথাটা ঝিমঝিম করছে কেমন! ঝাপসা ঝাপসা চোখে রিশাদ তাকিয়ে দেখে পেছনে হাসিব দাঁড়িয়ে। এরপর সেখানেই জ্ঞান হারায় রিশাদ।
যখন জ্ঞান ফিরে তখন রিশাদকে একটা চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। সামনে হাসিব দাঁড়িয়ে আছে। রিশাদ ভাঙা ভাঙা গলায় বলে,
“হাসিব! তুই আমার বন্ধু হয়ে আমার সাথে বেঈমানী করছিস? নন্দিনী কোথায় হাসিব?”
হাসিব সামনে থেকে সরে যায়।

মৃদু আলোতে দেখতে পায় সামনের চেয়ারের সাথে নন্দিনীকে বেঁধে রাখা হয়েছে। নন্দিনী কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“রিশাদ কিছু করো! হাসিব কেন এমন করছে?”
“হাসিব নন্দিনীকে ছেড়ে দে বলছি। আমি যদি একবার ছাড়া পাই তাহলে তোকে খুন করে ফেলব বলে দিলাম।”

সজোরে বুকে লাথি খেয়ে চেয়ারসমেত নিচে পড়ে যায় রিশাদ। রিশাদের চোখে বিস্ময়।
“কুত্তার বাচ্চা! তুই বাঁচলে তারপরই না হাসিবকে খুন করবি।”
রিশাদ অবাক হয়ে বলে,
“নন্দিনী! তুমি!”

নন্দিনী শব্দ করে হেসে বলে,
“অবাক হচ্ছিস? তুই কি ভেবেছিলি হাসিব আমায় বেঁধে রেখেছে?”
“এসবের মানে কী?”

“মানে? হ্যাঁ, তা তো বলবই। মরার আগে তোর তো সব জানা উচিত।”
নন্দিনী এতক্ষণ রিশাদের সামনে বসে ছিল। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিবকে বলে,
“ওকে উঠিয়ে বসাও।”

হাসিব নন্দিনীর কথামত চেয়ার ধরে উঠায় রিশাদকে। রিশাদ বলে,
“তুই আমার বন্ধু হয়ে নন্দিনীর সাথে হাত মিলিয়েছিস?”
নন্দিনী বলে,
“আজ কথা হবে শুধু তোর আর আমার মধ্যে। আর কেউ কথা বলবে না আজ।
হাসিবকে তুই চিনিস কত বছর ধরে? ১ বছর ৬ মাস। হাসিবের সাথে তোর পরিচয় হয় ঢাকায়।

ঢাকায় রাতে তোকে গুণ্ডারা এট্যাক করে। সেখানে হাসিবই তোকে বাঁচায়। সেই থেকেই হাসিবের সাথে তোর বন্ধুত্ব। পরিবারহীন হাসিবকে আশ্রয় দিস তোদের বাড়িতে। আর হাসিব এগুলো সব করে আমার প্ল্যানমাফিক।”
“এসব কেন করেছ?”

“তোকে মারার জন্যই এত নাটক করতে হয়েছে। পানিতে পড়ে মরার নাটক করেছিলাম আমি। হাসিব আমায় জানিয়েছিল তোরা নদীর ঘাটে আসছিস। সেই প্ল্যান অনুযায়ীই আমি নদীতে ঝাপ দেই।”
“তোমাকে যে হুমকি বার্তা দিত সেগুলো?”

“এগুলোও নাটক। আমাকে কেউ কোনো হুমকি বার্তা দেয়নি। ঐগুলো আমি নিজেই লিখতাম। রোহিতের খুন কে করেছে জানিস? আমি করেছি। তুই যখন ওয়াশরুমে যাস তখন রোহিত নিচ থেকে ছাদে যাচ্ছিল। আমার প্ল্যান অবশ্য ওকে সেদিনই মারা ছিল না।

কিন্তু এমন সুবর্ণ সুযোগ যে পাব ভাবতেও পারিনি। রোহিতকে বললাম রিশাদ তোমায় বাড়ির পেছনে যেতে বলেছে। বেচারা আমার কথা বিশ্বাস করল। আমিও ওর পেছনে গিয়ে পেছন থেকে ছুরিটা ওর গলায় আর বুকে বসিয়ে দিলাম। সেখানেই পড়ে রইল রোহিত। ছুড়িটা আমি বাড়ির পাশে নদীতে ফেলে বাড়ির উঠোনে এসে প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকি।

তখনই তুই আসিস। ছাদে গিয়ে সবাই যখন রোহিতের খোঁজে ব্যস্ত তখন আমি হাসিবকে ম্যাসেজ করে সবটা জানিয়ে দিয়েছি। হাসিবকে আমিই পাঠাই রোহিতকে খোঁজার জন্য। আসলে খোঁজার জন্য নয় ওর মাথাটা আলাদা করে ফেলার জন্য। হাসিব আমার কথামতই রোহিতের শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। রাম-দা নদীতে ফেলে দেয়। না কখনো নদীর পানি শুকাবে আর না কেউ কখনো প্রমাণ পাবে। ভেবে দেখ হাসিব কিন্তু সাথে সাথে আসেনি। অনেকটা সময় পর ওর চিৎকার শোনা যায়।”

নন্দিনী আবারও হাসতে থাকে। রিশাদের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
“এরপর তোকে আমি আমার প্রেমের জ্বালে ফাঁসাই। তোর হাত ধরেই তোর বাড়িতে উঠি। আমার নেক্সট টার্গেট ছিল তোর বড় মা। কিন্তু মাঝখান থেকে খুব ঝামেলা করছিল তোর বান্ধবী তোয়া। বারবার আমার পথে চলে আসছিল। তাই তোর বড় মায়ের জায়গায় আমার পরবর্তী শিকার হয় তোয়া। তোয়ার বাসায় হুমকি বার্তা পাঠাই হাসিবকে দিয়ে। তোয়ার খাবারে বিষ হাসিবই মিশিয়েছে। সেইরাতে হাসিবকে কেউ দেখেওনি। তোরা সবাই জানিস তোয়া মারা গেছে। কিন্তু সত্যটা হলো তোয়াকে মার্ডার করা হয়েছে।”

“তার মানে তোয়ার খুনিও তুমি!”
“এখনই অবাক হোস না। আরো শোন, আমি বাড়ি থেকে জঙ্গলের ভেতর ইচ্ছে করেই যাই এবং তোকে দেখেই। তোর ডাকও আমার কানে এসেছিল। আমি তোকে বলেছিলাম, কেউ আমায় ডাকছে। আসলে কেউ আমায় ডাকেইনি। ঐগুলো ছিল আমার বানানো মিথ্যাকথা।

আমাকে যে ঘরে থাকতে দিয়েছিলি সে ঘরেই ছিল গোপন আস্তানা। ঘরের সুড়ঙ্গ দিয়েই কালো জাদুর আস্তানায় যাওয়ার রাস্তা। তোর বড় মা ভাবত আমি বোকাসোকা মেয়ে আমি এগুলো কিছু বের করতে পারব না। কিন্তু তোদের বাড়িতে থেকেই সব বের করেছি আমি। শুধু আমি নয় সাথে হাসিবও।

তোরা সবাই তোয়াকে দেখতে গেলেও বড় মা যায়নি। কারণ তার যে কালো জাদুর কাজ বাকি ছিল। ভোরের দিকে তোকে আর ঐ ডিটেকটিভকে আসতে দেখেই আমি সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে ঢুকেছি। দেয়ালে স্কচটেপ দিয়ে লাগানো হুমকি বার্তাটাও আমারই ছিল। যেই অবয়বের কথা তোদের বলেছি সেটা ছিল বানোয়াট। তোর বড় মাকে খুনটা আমিই করেছি।

তোর মা যখন আমাকে হুমকিধামকি দিচ্ছিল রাম-দা নিয়ে আগে ঐ গুরুর মাথাটা আলাদা করি। তারপর চোখের পলকেই তোর বড় মায়ের মাথাটা আলাদা করে ফেলি। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘটনা ঘটে যায়। রাম-দা টা ফেলে দেই আগুনের ভেতর। আর অজ্ঞান হওয়ার নাটক করি।
জ্ঞান ফেরার পর তোদের যা বলি সবই ছিল বানানো কথা।”

“কেন করেছ তুমি এসব? বড়মা না হয় ব্ল্যাক ম্যাজিকের সাথে জড়িত বলে তাকে খুন করেছ। কিন্তু রোহিত, তোয়া, আমি আমরা কী ক্ষতি করেছি তোমার?”
“তোর কী মনে হয় সুদূর বিদেশ থেকে আমি এই গ্রামে এসেছি এমনি এমনি? প্রতিশোধ নিতে এসেছি আমি প্রতিশোধ।”

“কিন্তু আমি তোমায় সত্যিই ভালোবেসেছিলাম নন্দিনী। আমি তোমার এসব নাটক, অভিনয়ের কথা জানতাম না। তোমার বিপদের কথা জেনেও আমি তোমার হাত ছাড়িনি। তোমায় ভালোবেসে গেছি।”
“হাহ্! ভালোবেসেছিলি। তাও তুই? নিজের স্বার্থে তুই আমায় ভালোবেসেছিস। ঐ জ্যাতিষীর কথা মনে আছে? সেদিন তুই আমায় যা বলেছিলি তা ছিল মিথ্যা। জ্যোতিষী সেদিন আমার বিপদের কথা নয় বরং তোর বিপদের কথা বলেছিল। তোর জীবনে অনেক বিপদ রয়েছে। এবং তোকে সব বিপদ থেকে একমাত্র আমিই বাঁচাতে পারব এটাই বলেছিলেন উনি।”

“তুমি এসব জানলে কী করে?”
নন্দিনী হাসতে হাসতে বলে,
“বোকা ছেলে! সেই জ্যোতিষীও যে আমারই ঠিক করা ছিল। হাসিবকে দিয়েই আমি বলিয়ে দিয়েছি উনাকে কী কী বলতে হবে। আননোন নাম্বার থেকে যে তখন ফোন আসে? ঐ ফোন করেছিল হাসিব। সেটাও আমারই কথামত। আমি চেয়েছিলাম আমার অনুপস্থিতিতে জ্যোতিষী এসব বলুক।”
“এটা কেন করেছ তুমি? কী লাভ ছিল?”

“লাভ ছিল। লাভ ছিল বিধায় তো করেছি। আমি জানতাম, তুই জ্যোতিষী বিশ্বাস করিস। যদি তুই ভয়ে আমায় ছেড়ে দিস তখন তো আমার প্ল্যান ভেস্তে যেত। এজন্য জ্যোতিষীর এই নাটকটা করতে হয়েছে। আর ম্যাসেজটা হাসিবও পাঠিয়েছিল। যাতে সেখান থেকে আমার সরে আসার কোনো সন্দেহ না করতে পারিস তুই।”

রিশাদ অবাক হয়ে নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে আছে। নন্দিনীকে দেখে কখনো মনেই হয়নি এতসব ঘটনা ওর ভেতর পুষে রেখেছিল। এত নিখুঁতভাবে খুন করেছে।
নন্দিনী বলে,
“রোহিত, তোয়া, বড়মা, গুরু আর তুই ছিলি আমার টার্গেট। চারজনকে খুন করা শেষ। আজ তোর পালা।”
“আমাদের অপরাধ কী ছিল নন্দিনী?”

“নাটক করিস না আমার সামনে। তুই, রোহিত আর তোয়াও যে এই কালো যাদুর সাথে জড়িত সেটা আমি জানিনা ভেবেছিস? গঙ্গার খুনটা তোরাই করেছিলি।”
“তুমি কি গঙ্গার কেউ? ওর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছ?”
“না। আমি আমার ভালোবাসার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার ছোট বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছি।”

“তোমার ভালোবাসা, ছোট বোন!”
“হ্যাঁ আমার ভালোবাসা। আমার স্বপ্নীল। স্বপ্নীল আর আমার ছোট বোনকে খুন করেছিস তোরা।
সেদিন আমি ছিলাম বিদেশে। আমার ছোট বোন আর স্বপ্নীল দেশে এসেছিল জমি-জমার বিষয়ে কথা বলতে। রাতে বাড়িতে ফেরার পথে স্বপ্নীল আমায় ফোন দিয়েছিল। কথা বলার সময়ই তোরা আসিস। ফোনের ওপাশ থেকেই আমি চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পাই। তোর মুখে শুনতে পাই তোয়া আর রোহিতের নাম। রোহিতের মুখে শুনতে পাই তোর নাম।

রোহিত কুত্তার বাচ্চা আমার ছোট বোনকে ধর্ষণ করেছিল। তুই আর তোয়া মিলে আমার স্বপ্নীলকে মেরে ফেলেছিস। রাতের অন্ধকারে ফোনটা দেখতে পাসনি। ফোনের ওপাশ থেকে আমি শুনেছিলাম আমার বোনের আত্মচিৎকার। শুনেছিলাম আমার স্বপ্নীলের আহাজারি। আমার তখন কেমন লেখেছিল বুঝতে পারছিস তুই? ওদের লাশটাও পর্যন্ত খুঁজে পাইনি আমরা। দুজনের মাথা তো আলাদাই করে ফেলেছিলি। দেহটাও রাখিসনি। হাসিব কে জানতে চেয়েছিলি না? হাসিব স্বপ্নীলের ছোট ভাই। আমার ছোট বোনের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রতিশোধ নিতেই আমরা দুজন এসেছি।”

রিশাদ আকুতিভরা কণ্ঠে বলে,
“আমার ভুল হয়ে গেছে নন্দিনী। ক্ষমা করে দাও আমায় প্লিজ।”
“সেদিন আমার বোন আর স্বপ্নীলও ঠিক এভাবেই কেঁদেছিল। শুনেছিলি ওদের আকুতি? স্বপ্নীল বারবার করে বলেছিল আমার বোনটাকে ছেড়ে দিতে। ছেড়েছিলি সেদিন তোরা?”
রিশাদের আর কোনো আকুতি না শুনেই হাসিব আর নন্দিনী ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে রিশাদের শরীর। ফ্লোরে রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। একের পর এক কোপ দিতে দিতে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে রিশাদের শরীর। হাসিব আর নন্দিনীর মন শান্তি হয়েছে এতক্ষণে।

নন্দিনী চিৎকার করে বলে,
“স্বপ্নীল দেখো আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। ছোট বোন আমার দেখ তোদের খুনের বদলা আমরা নিয়েছি।”
হাসিব বলে,
“আমাদের কাজ শেষ। দুটোয় আমাদের ফ্লাইট। ১২টা বাজে এখন। এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে আমাদের।”
“হ্যাঁ চলো।”

বুক ভরা প্রশান্তি নিয়ে নন্দিনী আর হাসিব পুরনো বাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসে। কত বছরের ইচ্ছে আজ পূরণ হলো দুজনের। প্রতিশোধের আগুন বুক থেকে নেমে গেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নন্দিনী। আকাশের মেঘের মাঝে দেখতে পায় স্বপ্নীল ও বোনের হাসিমাখা মুখ।

বোরকা পরে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে নন্দিনী। হাসিব বাসের টিকেট কাটতে গেছে।
একগুচ্ছ ফুলের তোড়া নিয়ে সামনে দাঁড়ায় মুহিব। ফুলগুলো নন্দিনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“কংরাচুলেশন নন্দিনী।”

নিকাব পরায় শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। সেই চোখেই ছিল বিস্ময়। মুহিব মৃদু হেসে বলে,
“অবাক হচ্ছেন মিস নন্দিনী? ভাবছেন ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি কেন? তাহলে শুনুন, আপনার খুনের বিষয়ে আমি সব জানি। রোহিত, তোয়া, রিশাদ, গুরু আর বড় মাকে যে আপনিই খুন করেছেন সেটা আমার কাছে পরিষ্কার। আপনার সম্পর্কে আগাগোড়া সব ডিটেইলস বের করেছি। আপনি প্রতিশোধ নিতেই বিদেশ থেকে এসেছেন। কিন্তু কোন দেশ থেকে এসেছেন সেটা এখনো আমার অজানা। ভাবছেন আমি কীভাবে জানলাম খুনেন ব্যাপারে?

আপনার সাথে যখন আমি কথা বলি, তখন বলেছিলেন আপনি পানিতে ঝাপ দিয়েছিলেন মরার জন্য। আপনি এটাও বলেছিলেন আপনি গ্রামের মেয়ে। আর গ্রামের মেয়ে হয়ে সাঁতার জানেন না বলেছেন। অদ্ভুত না এটা? আপনার বলা গ্রামে গিয়ে আমি খোঁজ-খবর নিয়েছি। আপনার ছবি দেখিয়েও আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু আপনাকে কেউই চিনতে পারেনি। তার কারণ আপনি সেই গ্রামের মেয়েই নন। এবং আপনার সেই গ্রামে কোনো প্রাক্তন ছিল না। আর না কোনো মাতব্বের ছেলে আপনাকে পছন্দ করত। এগুলো সবই ছিল মিথ্যা কথা। তাই তো?

তারপর বড় মায়ের রুমে মোমবাতিটা আপনিই রেখেছিলেন। আমি আসার পরই আপনি মোমটা জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে এসেছেন। আর তাড়াহুড়ো করে আপনার ম্যাচটাও ঐ রুমেই ফেলে এসেছেন। রিশাদের বাড়িতে কেউ কাঠি ম্যাচ ব্যবহার করত না। সেটা সেদিনই ক্লিয়ার হয়েছে। রিশাদের ছোট মা বলেছিল রান্নাঘরে ম্যাচের গ্যাস শেষ। বাড়ির কাজের লোককেও গ্যাস ম্যাচ আনতে বলেছিল। রিশাদের কাছেও ছিল গ্যাস ম্যাচ। কথায় কথায় জানতে পারি ঐ বাড়িতে কেউ কাঠি ম্যাচ ব্যবহার করে না। অথচ বড় মায়ের রুমে কাঠি ম্যাচ পড়ে ছিল। কারণ আপনি গ্যাস ম্যাচ জ্বালাতে পারেন না।”

নন্দিনী চুপ করে আছে। মুহিব মৃদু হেসে বলে,
“আমার বাড়িতে লোডশেডিং হওয়ার পর আমি আপনাকে গ্যাস ম্যাচ এগিয়ে দেই মোমবাতি জ্বালানোর জন্য। কিন্তু আপনি ম্যাচটা না নিয়ে রান্নাঘরে যান। কারণ রান্নাঘরে ছিল কাঠি ম্যাচ।

এরপর আপনি আরো দুটো ভুল করেন। সেগুলোও তাড়াহুড়োতেই করে ফেলেন। আপনি আমার বোনদের সাথে যখন আচার খাচ্ছিলেন তখন আমি আপনাকে বলেছিলাম, যে নাম্বার থেকে আপনাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে সেটা কাগজে লিখে দিতে। আপনার ডান হাতে আচার লেগেছিল বিধায় আপনি বাম হাতে নাম্বার লিখে দেন। সাথে লিখেন ‘হুমকি বার্তার নাম্বার।’ আপনি যে দুই হাতেই লিখতে পারেন সেটা আমি সেদিনই জানি। আর হুমকি বার্তাগুলো আপনি বাম হাত দিয়েই লিখতেন।

দ্বিতীয় ভুলটা করেন আমার রুমে। আমার রুমে হুমকি বার্তা রেখে আসার সময় আপনার উড়না আমার ড্রয়ারের সাথে আটকে যায়। তাড়াহুড়ো করে সেটা খুলতে গিয়ে আপনার উড়নার কিছু অংশ ছিড়ে ফ্লোরে পড়ে যায় যেটা আপনি খেয়াল করেননি। সকালে যখন আপনাকে হুমকি বার্তা দেখাই তখন আপনি উড়না দিয়ে কপাল মুছছিলেন। তখনই উড়না ছেঁড়া দেখতে পাই। ছেঁড়া অংশটুকু আমার রুমেই পেয়েছিলাম।

এগুলোই ছিল আপনার ছোটখাট ভুল। এছাড়া পুরো ঘটনাটা আপনি নিঁখুতভাবে সাজিয়েছেন। আমি সব জেনেও পুলিশকে কিছুই জানাইনি। কারণ আমি চেয়েছিলাম আপনি আপনার প্রতিশোধ নিন। তবে এরমাঝেও একটা সত্যি আছে। সেটা হচ্ছে আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি।”

মুহিব একটা রিং ও হ্যান্ডকাফ পকেট থেকে বের করে। দুহাতে দুটো নন্দিনীর সামনে ধরে বলে,
“এখন আপনিই সিদ্ধান্ত নিন। হ্যান্ডকাফ পরে জেলে যাবেন নাকি রিং পরে সারাজীবনের জন্য আমার হবেন?”

নন্দিনী হাসতে হাসতে নিকাবটা খুলে ফেলে। মুহিব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কারণ সামনের মেয়েটি নন্দিনী নয়। মেয়েটি বলে,
“নন্দিনীকে এতটা বোকা ভাবাই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় ভুল।”
“কে আপনি?”
“নন্দিনীর শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনার চোখের সামনে দিয়েই নন্দিনী চলে গেল অথচ আপনি বুঝতেও পারলেন না। এতক্ষণ আপনি যা যা বলেছেন সব ফোনের ওপাশ থেকে শুনেছে নন্দিনী। একটা ভয়েজ আপনার ফোনে পাঠাবে। শুনে নেবেন।”

সাথে সাথেই মুহিবের ফোনে একটা ভয়েজ আসে। ভয়েজটা ওপেন করে মুহিব।
“মিস্টার মুহিব, আপনি ভীষণ বোকা। আমি এত সহজেই আপনার কাছে ধরা দেবো এটা আপনি ভাবলেন কীভাবে? আমি আগেই জানতাম শেষ সময়ে আপনি আমাকে আটকাবেন। আপনি যে আমায় ভালোবাসেন সেটাও আমি জানতাম।

এখন ভাবছেন আমি এসব কীভাবে জানলাম? আপনার মায়ের কাছে জানতে পারি আপনার ডায়েরী লেখার অভ্যাস আছে। আপনার রুমে হুমকি বার্তা রেখে আসার সময়ে যেই ড্রয়ারের সাথে আমার উড়না আটকে যায় সেখানেই ছিল আপনার ব্যক্তিগত ডায়েরী। এবং ভুলবশত সেদিন আপনি চাবি ড্রয়ারের লকারেই আটকে রেখেছিলেন। কথায় বলে না, আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন? কথাটা আসলেই সত্যি। উড়না ছাড়াতে গিয়েই আমি ডায়েরীটা পাই এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসি।

সে রাতেই ডায়েরী পড়ে জানতে পারি আপনি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গেছেন। আমাকে ভালোবাসার কথাটাও ডায়েরীতে লেখা ছিল। উড়নার ব্যাপারটা ছাড়া আপনি সবকিছু লিখে রেখেছিলেন। খেলার গুটিটা আমি সে রাতেই পাল্টে ফেলি। আপনার লোকরা আজ আমায় ফলোও করে। কিন্তু আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আর আমি তাদের গোলকধাঁধায় ফেলি। তখন তারা আমার শুভাকাঙ্ক্ষীকেই আমায় ভাবে। আপনার পাশ দিয়েই আমি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে চললাম।

মিস্টার মুহিব, কাঁচা মাথা নিয়ে নন্দিনীর সাথে গোয়েন্দাগিরি করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া একই ব্যাপার। আমার ভালোবাসা শুধুই স্বপ্নীল। হয়ত ও আর পৃথিবীতে নেই। কিন্তু ওর প্রতি আমার ভালোবাসা এখনো বেঁচে আছে। আমি হলাম কুহেলিকা। কুয়াশায় আচ্ছন্ন নন্দিনী। কুয়াশায় ঢেকে থাকা ওপর পাশের যেমন কিছুই দেখা যায় না ঠিক তেমনিই আমাকে বোঝা সহজ নয়। গুড বাই মিস্টার মুহিব।”

ভয়েজটা শুনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মুহিব। সামনের মেয়েটাও চোখের আড়াল হয়ে গেছে। প্লেন উড়ার শব্দ পেয়ে আকাশের দিকে তাকায় মুহিব। হাত ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ২:২০ বাজে।

লেখা – মুন্নি আক্তার প্রিয়া

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “কুহেলিকা – একটি সুন্দর প্রেম কাহিনী” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – লেডি বাইকার (১ম খণ্ড) – একজন বাইকারের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button