ছোট গল্প

আমার আছে জল – ব্যর্থ প্রেমের ছোট গল্প

আমার আছে জল – ব্যর্থ প্রেমের ছোট গল্প: মেয়েটার সাথে গল্প করতে করতে একসময় কল্পনার জগতে চলে যাই। ওইতো মেঘলা আসছে আমার দিকে। তাঁর সাথে তাঁর স্বামীও আসছে, মেঘলার কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা। খুব সুন্দর লাগছে তাদের। আমি জানি এটা আমার কল্পনা।


পর্ব ১

আমার মামাতো বোন যেদিন কান্নাভেজা কণ্ঠে বাড়ির সবার সামনে বলেছিলো, আমি নাকি তাঁর বুকে হাত দিতে চেয়েছিলাম, তাঁর গায়ে হাত দিয়েছি, তাঁর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে নষ্ট করতে চেয়েছিলাম সেদিন আমার মামা আমাকে নানু বাড়ির সবার সামনেই কষে একটা থাপ্পড় মেরে তাদের বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।

আমি সেদিন খুব নিরুপায় হয়ে সবার দিকে নিরীহ চোখে তাকিয়েছিলাম। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার এই বাড়িতে থাকাটা কারো কখনো পছন্দ ছিলো না, সবাই আমার প্রতি অনেক বিরক্ত ছিলো। করুণা করে এতোটা দিন তারা আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন। আমি সবার কাছে বোঝা হয়েছিলাম এতোদিন। তাই তারা আমার চলে যাওয়াতে দুঃখী না বরং সুখী।

আমার যখন বারো বছর বয়স তখন আমার মা কঠিন এক রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমার মা অসুস্থ থাকা অবস্থায় আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। মাও বাবার বিয়েতে কিছু বলেননি কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর আর বেশি দিন এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকা হবে না।

মা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন বাবার কাছে আমি সুখী থাকবো না তাই মৃত্যুর আগে মামাদের কাছে আমাকে রেখে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই আমার মামার বাড়িতে থাকা শুরু। মামার বাড়িতে থেকেই আমি ইন্টার পাশ করে অনার্সে পড়ছি। আমার কয়েকটা মামাতো বোন ছিলো তাঁর মধ্যে একজন ছিলো আনিতা।

যে মেয়েটার সাথে প্রথম থেকেই আমার জমতো না। শহরের মেয়েরা যেমন সে তাদের থেকে একটু বেশিই স্মার্ট তাই হয়তো আমার মতো সহজ সরল অানস্মার্ট মানুষকে সবসময় এড়িয়ে চলতো। আমি বুঝতে পারতাম আমার তাদের বাড়িতে থাকাটা তাঁর পছন্দ নয়।

কিন্তু তাঁর বাবা চায় আমি যেনো তাদের বাসায় থেকেই মানুষের মতো মানুষ হই তাই সে এটা নিয়ে কিছু বলতে পারে না। কারণ মৃত্যুসম্ভাবনা আমার মাকে তাঁর বাবা কথা দিয়েছিলেন আমাকে তিনি তাঁর কাছে রাখবেন।

কিন্তু আজ সেই কথাটা তিনি রাখার প্রয়োজন মনে করছেন না।

কারণ আমি যে তাঁর মেয়ের ইজ্জত নিতে চেয়েছিলাম। আর পৃৃথিবীর কোনো বাবা চাইবেন না তাঁর ঘরে কোনো ধর্ষক থাকুক। তাই আমি আমার মামাকে কোনো দোষ দেই না। কারণ তাঁর জায়গা আমি থাকলেও হয়তো এমনই করতাম। তবে মানুষ যে নিজের প্রয়োজনে পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্যতম কাজটাও করতেও একবারও ভেবে দেখবে না সেটা আজ খুব করেই বুঝতে পারছি। আর সেটা যদি অপছন্দের মানুষ হয় তাহলে তো কোনো কথায় নেই।

আমার মামাতো বোন আনিতাকে যখন একটা ছেলের সাথে দিনের বেলায় আবাসিক হোটেল থেকে বের হতে দেখলাম তখন আমি তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে জিগ্যেস করি ছেলেটা কে? যদিও বুঝতে পেরেছিলাম ছেলেটা তাঁর বয়ফ্রেন্ড তবুও জিগ্যেস করার পর সে বলল জাস্ট ফ্রেন্ড।

তারপর ছেলেটা চলে গেলো। আমি যখন তাকে বললাম কাজটা তুমি ঠিক করোনি। প্রেম করছো ভালো কথা তাই বলে কি নিজের বয়ফ্রেন্ডের অন্যায় নোংরা চাহিদা গুলোও পূরণ করতে হবে? এটা ভালোবাসা নয়। আমি মামার কাছে সব বলে দিবো। তারপরেই আমি বাসায় চলে আসি।

বাসায় এসে দেখি কেউ নেই। আনিতা আমার রুমে এসে আমাকে বুঝাতে শুরু করলো, আমি যা দেখেছি তা যেনো কাউকে না বলি কিন্তু আমি তাঁর কথায় কোনো গুরুত্ব দিলাম না। আর সেটার ফল সবাই বাসায় আসার পরেই পেলাম। আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি একটা মেয়ের মনে এমন কিছু থাকতে পারে। আমার কথাটা এখন কেউ বিশ্বাস করবে না। আর আমি কাউকে বলতেও চাই না। যারা আমাকে বিশ্বাস করে না, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে তাদের ভালো মন্দ সম্পর্কে ভাববার কোনো প্রয়োজন মনে করলাম না।

দশ বছর পর আমি আমার বাবার কাছে ফিরে যাই। আমাকে দেখে কেনো জানি আমার বাবা মা খুব একটা খুশি হতে পারেননি। তবে আমার বোনটা অনেক খুশি হয়েছিলো যখন সে জানতে পেরেছিলো তাঁর ভাই এসেছে। যদিও সৎ ভাই আমি। তবে সে সেটা বোঝে না।

শহরে একজন মানুষকে আমি কোনো কিছু না বলেই চলে এসেছি। তাঁর কথা খুব মনে পড়ছে। মেয়েটার নাম মেঘলা। শহরে পড়ালেখা করলেও সেও আমার মতোই খুব সহজ সরল। মেয়েটাকে জানানো উচিত ছিলো কিন্তু আমি পারিনি।
দুইদিন পর বাবা হঠাৎ করে ডেকে নিয়ে বললেন,

“তোর মা চাচ্ছে না তুই এখানে থাক। তোর মা যেনো কার কাছ থেকে সব শুনেছে। তোকে কি জন্য তোর মামারা মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে সেটা সে জানে। তাঁর কথা তাঁরও একটা মেয়ে আছে। এখন অনেক ছোট। তুইতো ওর আপন ভাই না। তাই তোকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। ধর্ষকদের তো কোনো মা বোন নেই। তুই বরং অন্য কোথাও চলে যা আমি তোকে সব খরচ দিবো।”

সেদিন আমি পৃৃথিবীর প্রথম কোনো সন্তান হিসেবে নিজের বাবার গালে থাপ্পড় মেরেছিলাম। হ্যাঁ আমি আমার বাবার গালে থাপ্পড় মেরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম,
” তুই আমাকে ধর্ষক বলছিস? আমার কথা না ভেবে তুই নিজের কথা ভাব। তুইতো সেক্স পাগল একজন মানুষ।

আমার মা মারা যাওয়ার আগেই আরেকটা বিয়ে করেছিলি। তোকে আমার বাবা বলে কোনোদিন পরিচয় দিতে ইচ্ছে করেনি। আজ তুই আমার মন থেকে উঠে গেছিস। একজন বাবা কখনো তাঁর ছেলেকে এভাবে ধর্ষক বলতে পারে না। আর একজন সন্তানও কখনো তাঁর বাবার গায়ে হাত তুলতে পারে না।

কাজেই আজ থেকে আমাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। তুই আমার বাবা না। মা মারা যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে আমার কখনো কেউ ছিলো না, আজও নেই। সবাই শুধু আমাকে করুণা দেখিয়েছে।”

সেই রাতে বাবা লজ্জায় আমার রুম থেকে চলে যায়। পরের দিন আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করে বাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য বের করে দেয়। আমিও থাকার জন্য জোর করিনি। কারণ আমি জানতাম এমন কিছু হবে। তাই রাতে কিছু টাকা চুরি করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম। আমার সৎ মায়ের যতো গয়নাগাটি ছিলো সবকিছু আমার ব্যাগের ভিতরে রেখে দিয়েছিলাম রাতেই। কারণ এগুলো এক সময় আমার মায়ের ছিলো।

এগুলোর দাবিদার আমি। আমার মাকে যারা মুত্যুর কয়েকদিন আগেও সুখে থাকতে দেয়নি আমি তাদের কাছে আমার মায়ের কোনো কিছু রেখে যেতে পারি না।

আমি আমার বাবার বাড়ি থেকে চলে আসি। আমি বুঝতে পারি এতো বড় দুনিয়াতে এতো এতো মানুষ থাকলেও আমার কোনো আপন মানুষ নেই। এতো বড় দুনিয়াতে আমার থাকার কোনো জায়গা নেই। একজন মানুষ আছে যাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি, হয়তো বা ভালোও বাসি। সেও আমাকে ভালোবাসে। এখন সেই মেয়েটার জন্যই বেঁচে আছি। না হলে অনেক আগেই অবহেলার এই সস্তা জীবনটা শেষ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যেতাম।

সাতদিন পরে হঠাৎ করেই মেঘলা ফোন করে দেখা করতে বলে। আমি যখন তাকে বললাম এই কয়েকটা দিন কি একবারও ফোন করার প্রয়োজন মনে করোনি?

তখন সে বলল, দেখা করার পর সব বলবে। আমিও কিছু না বলে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য চলে গেলাম।
কি হয়েছে যে এভাবে দেখা করতে বললে? বিপরীত পাশের মানুষের অবস্থাটাও তো দেখবে।

  • বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। কিন্তু আমি এই বিয়েটা করতে চাই না। কেনো করতে চাই না সেটা তুমি জানো।
  • আমার কথা শুনো। তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নিও কি করবে।
  • আমি তোমার কোনো কথা শোনার জন্য এখানে আসিনি। তুমি কি করবে না করবে সেটা তোমার ব্যাপার। দশদিন পর আমার বিয়ে। তুমি আমাকে নিয়ে পালাবে নাকি নিজের প্রেমিকাকে অন্য কারো হাতে তুলে দিবে ভেব দেখো।

আমি কবুল বলার আগ পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। কিন্তু কবুল বলার পর আমি তোমাকে ঘৃণা করা শুরু করবো। এতোটাই যে এর আগে কেউ কখনো কাউকে এতোটা ঘৃণা করেনি।

  • আমার অবস্থাটা তো তুমি বুঝবে। আমার কথাটা শুনবে।

আমার কোনো কথা না শুনেই মেঘলা চলে যায়। আমাার নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হতে লাগলো। কেমন মানুষ আমি যে আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে বুঝতে পারলো না। এতো কষ্ট, অশান্তি নিয়ে কখনো বেঁচে থাকা যায় না। আমার একটু শান্তি দরকার। কোথায় পাবো? মৃত্যুই কি মানুষের একমাত্র শান্তির পথ?


পর্ব ২ (অন্তিম)

মেঘলা নিশ্চিত মনে চলে যায়, একবারও পিছু ফিরে তাকায় না আমার দিকে। আমি অনেক দূর পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি। একসময় সে অদৃশ্য হয়ে যায়। মেসে এসে অন্ধকার রুমে শুয়ে শুয়ে ভাবতি থাকি মেঘলার কথা কিন্তু আমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি না।

আমি যদি তাকে আমার কাছে নিয়ে আসি তাহলে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনটা কি হবে? তাকে কি সুখ দিতে পারবো আমি? অনার্সে পড়ুয়া একটা বেকার যুবককে কেউ কি এতো সহজেই চাকরি দিবে? যাকে মন থেকে ভালোবাসা যায় তাঁর সুখ চাওয়াটাই নাকি প্রকৃত ভালোবাসা।

আবেগে পড়ে তো মেয়েরা অনেক কিছুই বলে, অনেক কিছুই করতে চায়। মেঘলারও তো এখন আবেগের সময়। কেবল মাত্র সতেরো বছর, ইন্টারে পড়ে। এই সময়টাতে মেয়েদের মনে অনেক আবেগ কাজ করে। তাঁর মধ্যেও হয়তো করছে তাই সে এমন বলছে।

কিন্তু আমি তো সব বুঝি। বাস্তবতা কি আমি জানি। দুবেলা খাবারের জন্য কতো কি করতে হয়। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। আমি তো সবকিছু বুঝে মেঘলার মতো করতে পারি না। তাঁর আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ভবিষ্যতটা নষ্ট করতে পারি না, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎটাই অন্ধকার।

যেখানে নিজের থাকার কোনো জায়গা নাই, সেখানে অন্য একজনকে বিয়ে করে সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা হয়তো বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। মায়ের গয়নাগাটি বিক্রি করলে আর কতোই বা পাওয়া যাবে? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দশটা দিন পাড় হয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না।

আজ মেঘলার বিয়ে, সে নিশ্চয় খুব সুন্দর করে সেজেছে। সাজবেই তো। বিয়ের দিন মেয়েরা সাজবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে আজ অন্য কারো জন্য সাজবে। আমি তাঁর কথা রাখলাম না। তাঁর কাছে সারাজীবন ঘৃণার পাত্র হয়েই বেঁচে থাকবো আমি। তবুও আমার ভালোবাসার মানুষটা সুখী হোক।

আমার কষ্টের জীবনের সাথে আর কাউকে জড়াতে চাই না। হয়তো সে কিছুদিন আমাকে ঘৃণা করবে কিন্তু একসময় আমাকে ভুলে যাবে। স্বামীর ভালোবাসা পেলে এমনিতেই আমাকে মনে রাখবে না। এরকম অনেক শুনেছি খুব গভীর প্রেম ছিলো একসময় সেই প্রেমটা আর থাকে না। সময়ের সাথে ভালোবাসার মানুষটাও বদলে যায়। পরিস্থিতি বাঁধ্য করে বদলে যেতে।

মেঘলার বিয়ে হয়ে যায়। আমি সেদিন কেনো জানি তাঁর কাছে যাওয়ার সাহস পাইনি। আমার মনে হয়েছিলো তাঁর ভবিষ্যৎ সুখের জীবন নষ্ট করার কোনো অধিকার আমার নেই। কারণ আমি জানতাম একসময় সে আমাকে ভুলে গিয়ে তাঁর হাসবেন্ডকে নিয়ে সুখী হবে।

মেঘলার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে আমার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছে। কোনোদিন খেয়েছি আবার কোনোদিন খাইনি। নিজের পড়ালেখাটা চালানোর জন্য অনেক কিছু করেছি জীবনে। সেগুলো বলে কারো চোখের জল ফেলাতে চাই না।

আমি সবসময় ভাবতাম যাদের কেউ নেই তারা কিভাবে বেঁচে থাকে? কিন্তু আমিই যখন কাউকে ছাড়া বেঁচে থাকা শুরু করলাম তখন বুঝলাম বেঁচে থাকার জন্য কাউকে দরকার হয় না। দরকার হয় টাকার। দরকার হয় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার।

আমার মনে আছে, একসময় আমি বেঁচে থাকতে ভয় পেতাম। যখন আমার মায়ের গয়না বিক্রি করা টাকা ফুরিয়ে গেলো তখন আমার থাকা খাওয়া নিয়ে মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গেলো। আমার কাছে যা ছিলো সব তো শেষ, এখন আমি কি করবো। কে আমাকে খাবার দিবে, কে আমাকে থাকতে দিবে।

এসব নিয়ে ভাবতে খুব ভয় হতো। নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। তখন একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় দেখলাম একটা ছেলে চা বিক্রি করছে। ছেলেটার বয়স খুব বেশি হলেও সাত কিংবা আট বছর হবে। আমি সেদিন ছেলেটার দিকে তাকাতেই চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগলো।

যেই বয়সে ছেলেটার স্কুলে পড়ার কথা ছিলো, বাবা মায়ের আদর ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিলো। সেই বয়সে ছেলেটা ফুটপাতে চা বিক্রি করছে শুধুমাত্র নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য। কিংবা কে জানে এই সাত বছরের মানুষটাই হয়তো কারো না কারো ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।

হায়রে জীবন! এমন জীবনের প্রতি কেনো জানি আমার ঘৃণা হতে লাগলো। তবে ছেলেটাকে দেখে মনের মধ্যে কিছুটা হলেও সাহস হলো। আমার বারবার তখন একটা কথায় শুধু মনে হলো। সাত বছররের ছেলেটা যদি বেঁচে থাকার জন্য জীবন যুদ্ধে নেমে পড়তে পারে, বেঁচে থাকার জন্য ভয় না পায় তাহলে আমি কেনো ভয় পাচ্ছি।

সেদিন থেকেই আমার জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়। আমি দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য অনেক লজ্জাজনক কাজও করেছি যেটা কাউকে বলার নয়। এভাবেই মেঘলার বিয়ের পর আমার জীবনের একটা বছর কেটে যায়।

এই এক বছরে তাঁর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি। সেও কোনোদিন ফোন দেয়নি আমিও তাকে ফোন দেওয়ার সাহস পাইনি। তবে আজ একবছর পরেও আমার সিদ্ধান্তটাকেই বেস্ট মনে হচ্ছে। আমি এখনো আগের মতোই আছি। নিজের জীবন যাপনের কোনো গতি করতে পারিনি।

মেঘলা আমার সাথে থাকলে তাকেও এসব সহ্য করতে হতো। কিন্তু এখন সে হয়তো অনেক ভালো আছে। নাটক সিনেমায় যতো সহজে নিজের অভাব অনটন এর জীবনকে পরিবর্তন করে সুখময় করা যায় বাস্তবে ততোটা সহজ না। বাস্তব বড় কঠিন। নাটক সিনেমায় কষ্টের জীবন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু বাস্তবে কষ্টের জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

আমার অনার্স শেষ হয়ে গেলেও আমি কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারি না। একটা চাকরির জন্য কতো কিই না করেছি কতো জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু সবশেষে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কেউ টাকা চেয়েছে, কেউ দিতে চেয়েও পরে আর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। লোক ছাড়া ছাড়া চাকরি হয় না।

আমার তেমন কেউ ছিলোও না যে চাকরি দিবে। অনেক জায়গায় ভাইবা দিয়েছি কিন্তু রেজাল্ট খারাপ থাকার কারণে ভাইবা অনেক ভালো দেওয়ার পরেও চাকরি হয়নি। একসময় মনে হলো আমার জীবনটা এমনই থাকবে, কোনো পরিবর্তন হবে না। কতো চেষ্টা করলাম নিজের ভাগ্যটা বদলানোর জন্য কিন্তু পারলাম না।

হয়তো সৃষ্টিকর্তা চাননা আমার ভাগ্যটা পরিবর্তন হোক। সবশেষে যখন হাল ছেড়ে দিলাম। যেভাবে চলছে চলুক না। এই দুই টাকার সস্তা জীবন নিয়ে আর চিন্তা করবো না। যার জীবনের কোনো মূল্য নেই, যে মারা গেলে চোখের জল ফেলার কেউ নেই। সেই জীবনটা বাঁচলেই কি আর না বাঁচলেই কি।

তিনবছর পর,
ঢাকা শহরে খুব সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকার মতো একটা চাকরি পেয়েছি। দিনশেষে রাতে মাথার নিচে কিছুটা হলেও জায়গা হয়েছে। মাস শেষে পনেরো হাজার টাকা বেতন পাই। এটা দিয়েই চলে যায় আমার। এখন আর বেঁচে থাকার জন্য ভয় হয় না, বরং চো মনে হয় মৃত্যুই ভালো। এই পৃথিবীটা থাকার জায়গা না, এখানে যতো কম থাকা যায় ততোই ভালো।

আনিতা তাঁর ভুলের জন্য নিজেকে অনেক বড় অপরাধী ভাবে, সে এখন অনুতপ্ত। মামারাও আমার কাছে ফোন করে ক্ষমা চায়। তাদের কাছে যেতে বলে। সেদিন তারা না জেনে আমার প্রতি অনেক অন্যায় করেছিলো। আমার কোনে দোষ ছিলো না। বাবা মাও এখন ফোন দেয়। তারাও চায় তাদের ছেলেটা যেনো আবার ফিরে আসে।

নিজের বাপ দাদার ভিটেমাটি দেখাশোনা করে। আমি হয়তো চাইলে তাদের কাছে ফিরে যেতে পারবো কিন্তু তাদের প্রতি আমার মনে যে একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছি সেটা কোনোদিন ভালো হবে না। তাদের প্রতি যে শ্রদ্ধাটা ছিলো সেটা এখন নেই। আমি চাইলেও তাদেরকে আর কখনো ভালোবাসতে পারবো না, আপন ভাবতে পারবো না।

কারণ তারা যদি আমাকে সাপোর্ট করতো তাহলে আজ আমি এই অবস্থায় থাকতাম না। কিন্তু তারা করেনি। আমার খারাপ সময়ে আমাকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিলো। আজও হয়তো আমি ভালো নেই কিন্তু বেঁচে তো আছি? এটাই বা কম কিসে?

এই পৃৃথিবীর সবাই তো বেঁচে থাকে। কজনই বা সুখে থাকতে পারে, ভালো থাকতে পারে? আমি না হয় খারাপই থাকলাম।
মেঘলা সেদিন ফোন দিয়েছিল। আমার সাথে কথা বলার সময় অনেক কাঁদলো। তবে সে সুখে আছে সেটা জেনে খুব ভালো লাগলো। আমার এভাবে বেঁচে থাকাটা সে মেনে নিতে পারেনি।

আমি যেমন তাকে সুখে দেখতে চেয়েছি সেও চায় আমি যেনো সুখে থাকি। তাই সে চায় আমি যেনো বিয়ে করে নিজের জীবনে নতুন কাউকে নিয়ে নতুন ভাবে শুরু করি। কিন্তু মেঘলা হয়তো একটা চিরন্তন সত্য জানে না। পৃৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের কপালে কখনো সুখ লেখা থাকে না।

শত চেষ্টার পরেও তারা সুখের দেখা পায় না। হয়তো বা ক্ষণিকের জন্য একটু ভালো থাকতে পারে তবে সুখ তাদের জীবনে কখনো আসে না। আমার জীবনেও আসবে না আমি জানি। তাই আর সুখ নামক মরীচিকার পেছনে কখনো দৌড়াইনি কিংবা ভালো থাকার চেষ্টা করিনি।

উদ্যেশ্যহীন ভাবে যাযাবরের মতো ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম একটা বাচ্চা মেয়ে ফুল বিক্রি করছে। মেয়েটাকে দেখে প্রচন্ড মায়া লাগলো। মনে হলো আমার থেকেও অসহায় মানুষ পৃথিবীতে আছে।

আমার মনে হলো আমি চাইলে কিছুটা সময়ের জন্য ভালো থাকতে পারি, শান্তি খুঁজে নিতে পারি। এই ফুল বিক্রি করা ফুলের মতো নিষ্পাপ বাচ্চাটার সাথে কিছুটা সময় কাঁটানো যায়।

ফুল কতো করে বিক্রী করোস?

  • দশ টাকা।
  • সবগুলোর দাম কতো নিবি?
  • অনেক।
  • অনেক কতো?
    মেয়েটা কথা বলে না। বুঝলাম সে আমার কথা কোনো কিছু বুঝতে পারছে না। পকেট থেকে পাঁচশত টাকার একটা নোট বের করে দিয়ে বললাম,
    “তোর সবগুলো ফুল আমি কিনলাম। এখন সবচেয়ে দামি ফুলটার সাথে আমি গল্প করবো। আমার কাছে তুই হচ্ছিস সেই দামি ফুল।”

মেয়েটার সাথে গল্প করতে করতে একসময় কল্পনার জগতে চলে যাই। ওইতো মেঘলা আসছে আমার দিকে। তাঁর সাথে তাঁর স্বামীও আসছে, মেঘলার কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা। খুব সুন্দর লাগছে তাদের। আমি জানি এটা আমার কল্পনা। তবুও ভালো লাগছে সে আমার দিকে আসছে, আমার সাথে কথা বলবে। হোক না কল্পনায় তবুও তো অনেকদিন পর নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখতে পারবো।

লেখাঃ আমিনুর রহমান

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার আছে জল – ব্যর্থ প্রেমের ছোট গল্প” টি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অবিশ্বাস – সন্দেহমুলক ভালোবাসার গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!