কষ্টের প্রেমের গল্প

আমার সংসার (১ম খণ্ড) – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প

আমার সংসার – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প: সাহিল শুয়ে আছে কিন্তু চোখের কোণে ঘুম নেই। মাথার উপরে ফ্যান চলছে বাহিরে ঠান্ডা আবহাওয়া তবুও প্রচন্ড গরম লাগছে তার।


পর্ব ১

লাল বেনারসি শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে খাটের উপরে বসে আছে নববধূ সোনিয়া।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১৪৫ বাজে। এত রাত হয়ে গেলো এখন পর্যন্ত তার স্বামী রুমে আসছেনা।

সোনিয়ার মাথা বেয়ে ঘাম পরছে। বুঝতে পারছে তার সাথে বড় ধরণের প্রতারণা করা হয়েছে। কিন্তু কী প্রতারণা করা হয়েছে সেটা জানা নেই তার। তাই তো অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে জানার জন্য।

সোনিয়ার কিছুক্ষণ আগেই বিয়ে হয়েছে মির্জা খানের বড় ছেলে সাহিল খানের সাথে। সাহিলের বাবা আবার গ্রামের চেয়ারম্যান। বিয়ের সাহিলের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে অনেকেই আফসোস করেছে এমন কচি মেয়ের সাথে এমন ছেলেকে মানায় না যার কিনা! পুরো কথাটা কারো মুখ থেকেই জানতে পারলো না সোনিয়া।

সোনিয়া সবে মাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলো আর সাথে সাথে বিয়ে হয়ে গেলো তার।
সোনিয়ার বাবা কৃষি কাজ করে বলে মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিলো চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে।
সোনিয়ার এই বিয়েতে কোন মত ছিলোনা। কিন্তু পরিবারের চাপের কারণে বিয়েটা করতে বাধ্য হয়। বিয়ের পরে যখন একটু আধটু কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিলো সোনিয়ার তখনি সন্দেহ হয়েছিলো কিন্তু কিছু জানতে পারেনি।

সোনিয়া প্রচুর পরিমাণে ঘামছে।
মাথার উপরে ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে তবুও তার মাথা বেয়ে তরতর করে ঘাম ঝরছে।
বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

আচমকাই দরজা খোলার শব্দে ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে যায় সোনিয়া। রুমের ভিতরে সমস্ত লাইট অফ করা শুধুমাত্র ডিম লাইটের হালকা আলোয় ঘর আলোকিত।
মায়া ঘোমটার ভিতর থেকে লোকটিকে দেখার চেষ্টা করলো। দেখার চেষ্টা করবে না কেনো?

বিয়ে হওয়ার আগে বা পরে এখন পর্যন্ত লোকটির চেহারা দেখেনি।
যার সাথে বিয়ে হয়েছে যার সাথে সারাজীবন থাকবে তাকে দেখার জন্য প্রতিটা মেয়েই এক্সাইটেড থাকে।
সোনিয়া ভালো করে লক্ষ্য করছে লোকটি একটু একটু করে ঢুলছে আর হাতে কিছু একটা আছে। যেটা বুকের সাথে চেপে সামনের দিকে আসছে।

লোকটি এসে বিছানার উপরে বসলো।
সোনিয়া
নাম শুনে মাথা তুলে তাকায় সে।
ধীর গলায় বললো, জ্বী।

~ তোমাকে কিছু বলার ছিলো।
~ হ্যাঁ বলুন।
~ আমার সম্পর্কে তুমি কিছু শুনেছো?
~ মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলো সোনিয়া।
~ কিচ্ছু শোননি।

~ না।
~ তাহলে তো সমস্যা।
~ তাই। ভয়ে ভয়ে বললো, আচ্ছা একটা কথা বলি যদিও বলাটা ঠিক না তবুও বলছি আপনার পেটের ভিতরে যা যা আছে সব কিছু আমাকে বলে ফেলেন তারপর সব শুনে আপনাকে বলছি কী করা যায়।
সোনিয়ার কথা শুনে বড় বড় চোখ করে তাকায় সাহিল। খুব হতভম্ব হয়ে যায় সে।

আমতা আমতা করে রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
আমার পেটের ভিতরে অনেক কিছু আছে। তাই যদি তুমি সবকিছু শুনে ফেলো তাহলে হার্ট এ্যাটাক ও করতে পারো।
কথাটা শুনেই সোনিয়া পুরো স্তব্দ হয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারছেনা।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাত অনেক হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পরেন।

আমার অনেক ঘুম পেয়েছে।
সাহিল সোনিয়ার কোলে কিছু একটা দিয়ে রুমের লাইট অন করে দিলে সোনিয়া চিৎকার দিয়ে ওঠে।
হঠাৎ সোনিয়ার কোলে থাকা বাচ্চাটা ও কেঁদে উঠলো।
প্রচন্ড ভয়ে ভয়ে সাহিলের দিকে তাকায় সে।

আমতা আমতা করে বললো,
বাচ্চাটা কার?
সাহিল মাথা নিচু করে থাকে।
সোনিয়া আবার ও বললো,
বাচ্চাটা কার?
~ নিশ্চিুপ সাহিল।

এবার রেগে গিয়ে খুব জোরে চিল্লাইয়ে বললো,
আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞাস করছি উত্তর দিচ্ছেন না কেনো?
মায়ার চিল্লানিতে খান বাড়ির সমস্ত মেহমান একত্রে জড় হলো।
দরজা ধাক্কার শব্দে সাহিল গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো।

মাকে দেখে সাহিল বলে উঠলো,
সোনিয়া জানতে চাচ্ছে বাচ্চাটা কার?
সাহিলের মা মাথা নিচু করে ধীর গলায় বললো,
সাহিল তোর চোখে মুখে চিন্তার ছাপ কেন? তোর তো কোন দোষ নেই। যে দোষ করেছে সে হলো সোনিয়ার বাবা। কারণ আমরা তো বারবারই সত্যিটা বলতে বলেছি কিন্তু সোনিয়ার বাবা কিছুতেই সত্যিটা বলতে দেয়নি।

সাহিলের মা রুমের ভিতরে ঢুকে সোনিয়ার দিকে এগিয়ে গেলো।
সোনিয়া বাচ্চাটা সাহিলের ছেলে। ২ মাস বয়সে তার মা বাচ্চাটাকে রেখে খালাতো ভাইয়ের সাথে পালিয়ে গেছে। ৭ দিন পর সাহিলকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়।
ডিভোর্স দেয়ার ২ মাসের মাথায় বাচ্চার দোহাই দিয়ে আবার ও সাহিলের বউ হয়ে আসতে চেয়েছিলো আর তখনি রাস্তায় তোমাকে দেখে আমার পছন্দ হয়।

তারপর তোমার খোঁজ খবর নিয়ে তোমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে তারা ও সব কিছু শুনে রাজি হয়ে যায় সাহিলের সাথে তোমার বিয়ে দিতে। আমি মানছি বিয়ের আগে তোমাকে সব জানানো উচিত ছিলো কিন্তু তোমার বাবার অনুরোধে আর জানানো হলো না। সোনিয়া তুমি কী পারবেনা সব জেনে শুনে মা হারা বাচ্চাটার মা হতে?

সাহিলের মা বাচ্চাটাকে সোনিয়ার কোলে দিয়ে নিজের আঁচল সামনের দিকে রেখে হাঁটু ভাজ করে বসলো।
মা রে তোর কাছে মায়ের আঁচল পেতে ভিক্ষা চাই এই বাচ্চাটাকে তুই নিজের করে নে কথাটা বলেই দুচোখ বেয়ে কান্না বেড়িয়ে আসে সাহিলের মা শাহানা বেগমের।
সোনিয়া ও নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটাকে।
মা প্লিজ আপনি কাঁদবেন না আজ থেকে এই বাচ্চার মা আমি।

সাহিলের মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।
সাহিল পুরোই স্তব্দ হয়ে যায়। তারপর বিছানার উপরে ওপাশ ফিরে শুয়ে পরলো।
সাহিলের চোখ বেয়ে কান্না ঝরছে। আজ তানহার কথা বারবার মনে পরছে। কি না করেছে তার জন্য। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো তানহাকে। বিয়ের ১ বছর ও ভালোই ছিলো কিন্তু বাচ্চাটা জন্ম হওয়ার পর থেকেই আস্তে আস্তে বদলে গেলো।

কত করে বুঝিয়েছিলাম পা পর্যন্ত ধরেছিলাম শুধুমাত্র বাচ্চাটার জন্য। কিন্তু না বাচ্চাটার প্রতি কোন মায়াই ছিলোনা তানহার। পরোকিয়ার জন্য পাগল হয়ে স্বামী, সংসার, বাচ্চা সব ছেড়ে চলে গিয়েছে।

সুখ কী এতই সহজ?
সুখের জন্য নাকি আমাদের সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলো সে। কিন্তু আদৌ কী সেই সুখ সে পেয়েছে?
খুব জানতে ইচ্ছা করে সাহিলের।
পুরানো কথা মনে করে শোয়ার বালিশ ভিজিয়ে ফেলে সাহিল। খুব কষ্ট লাগছে অতীতগুলো মনে পরলে।


পর্ব ২

সোনিয়া বিছানায় বসে এক ধ্যানে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাচ্চাটা কিছুক্ষণ আগে ও কেঁদে ওঠেছিলো কিন্তু সোনিয়ার কোলে আসার পর থেকে আবার কান্না বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরেছে। খুব ছোট বাচ্চা।
ভীষণ মায়াবী চেহারা। সোনিয়া বাচ্চাটার হাত ধরছে বারবার। কী নরম হাত?

সোনিয়া ভাবছে কী নিষ্পাপ দেখতে বাচ্চাটা। এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কোন মা কী করে পারে চলে যেতে সেটাই তো বুঝতে পারছেনা। এরা কী মা নাকি অন্য কিছু। সত্যিকারের মা যত কষ্টই হোক সন্তানকে ছেড়ে কখনো যেতে চায়না তাতে শ্বশুরবাড়িতে যত কষ্টেই থাকুক না কেনো। খুব কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাটাকে দেখে। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমো খেলো।
তারপর ধিক্কার জানাচ্ছে এই সমস্ত মায়েদের প্রতি। যারা পরোকিয়ার টানে নিজের নাড়ি ছেড়া সন্তানকে রেখে পরপুরুষের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। কী নোংরা মনমানসিকতা এদের।

কী হবে এই দুদিনের দুনিয়ায় থেকে?
মরার পরে তো পাপকর্মের প্রতিটা হিসাব দিতে হবে তাকে। দুদিনের দুনিয়ার সামান্য সুখের জন্য নিজের সন্তানকে ছেড়ে পাপ কাজের জন্য চলে যেতে পারে আর হাশরের ময়দানের এই পুরো কাজের হিসাব দিতে হবে তাকে সেদিকে কী একটুও খেয়াল নেই।
সোনিয়া কথাগুলো বলতে বলতে মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে পানি পরছে।

~ ‘সোনিয়া তোমার না ঘুম পেয়েছে তাহলে এখনো সজাগ আছো কেনো?
ঘুমিয়ে পরো। সানিকে বালিশের উপরে শুয়ে দিয়ে তুমি তার পাশে শুয়ে পরো।
কল্পনার রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে সোনিয়া বললো,
জ্বি ঘুমাচ্ছি। আপনি শুয়ে পরেন আমার ঘুম আসলে তখন আমি ঘুমিয়ে পরবো।
~ ঠিকাছে।

সোনিয়া পায়ের উপরে বালিশ রেখে তারপর সানিকে তার উপরে শুইয়ে দিয়ে খাটের সাথে হেলায় দিয়ে বসলো।
ঘড়ির কাটা ঘুরছে আপন মনে কিন্তু সোনিয়ার যে ঘুম আর আসছেনা চোখে। হয়তো অতিরিক্ত চিন্তা আর শকডের কারণে এমনটা হচ্ছে।

সকালের সূর্য্যের প্রখর তীব্র আলো চোখে পরতেই সোনিয়ার ঘুম ভেঙে গেলো। আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৮৫০ বাজে।
তড়িঘড়ি করে লাফিয়ে উঠে বিছানার উপরে বসলো সে। এই মা, এত বেলা হয়ে গেলো যে। কিন্তু আমার ঘুম ভাঙলো না কেনো এতক্ষণ!
উহ্ সবাই জানলে কী ভাববে আল্লাই জানে।
আচমাকাই পায়ের দিকে তাকালো।

দেখলো পায়ের উপরে সানি নেই। রুমের চারিদিকে একবার করে চোখ বুলায় কিন্তু সানিকে কোথায় ও দেখতে পেলো না। বিছানা দিয়ে নেমে পায়ে জুতটা পরে দরজার কাছে যাবে তখনি সাহিল সানিকে কোলে নিয়ে রুমের ভিতরে আসলো।

সক্কাল সক্কাল সাহিলকে দেখে কিছুটা হতবাক হয়ে যায় সোনিয়া। তবুও নির্বিকারে ধীর গলায় বললো,
সানিকে কখন নিলেন আমার কাছ থেকে টের পাইনি যে।
কিছুক্ষণ আগে ছাদে উঠেছিলাম আর এখন নামলাম। জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,
বাহিরে কতটা রোদের তাপ আপনি কী দেখেননি?

কী করে এই কড়া রোদের ভিতরে এতটুকু একটা বাচ্চাকে নিয়ে ছাদে গেলেন। তা বলি কি আপনার কমনসেন্স বলে কী কিছু নেই নাকি?(সোনিয়া)
~ এই যে হ্যালো মিসেস সোনিয়া। তুমি এবার তোমার মুখে লাগাম টানো। আমার কমনসেন্স আছে কি নাই সেটা তোমাকে নির্ধারন করতে হবেনা। আমার ভালোই জ্ঞান আছে। তাছাড়া আমার সন্তানকে কী করলে তার ভালো হবে সেটা আমি বাবা হয়ে ভালোই জানি।
সো বি কেয়ারফুল। নেক্সটে এমন উল্টা পাল্টা বলার আগে একশো বার ভেবে বলবে।

~ হুম বুঝতে পারছি তো। আপনি হলেন মহাপুরুষ যে সব কিছুই বোঝে। তা এতই যখন বোঝেন তাহলে আপনার প্রথম স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে গেলো কেনো?
ধরে রাখতে পারলেন না কেনো?
সোনিয়ার এমন কথায় সাহিল বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কিছু বলার মত ভেবে পায় না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মাথা নিচু করে।
চোখদুটো পানিতে ছলছল করতে থাকে। তারপর আস্তে গিয়ে সানিকে বালিশের উপরে শুইয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।

সন্ধ্যা ৬১০ মিনিটে সাহিলের মা এসে বললো,
বউমা আমার ভাই কিছুক্ষণ আগে এক্সিডেন্ট করেছে। তাই তাকে দেখতে আমরা তাদের বাসায় যাচ্ছি। আজকে আর বাসায় আসা হবেনা কারণ অনেক দূরে তাদের বাসা। তাই রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিবো। তুমি সাহিল আর সানিকে দেখে রেখো।
~ ঠিকাছে মা।

রাত প্রায় পৌনে ১১ টা বাজে। সোনিয়া সানিকে পাশে নিয়ে শুয়ে আছে। সাহিল এখনো আসছেনা দেখে একটু চিন্তা হচ্ছে তার।
সোনিয়া ভাবছে মনে হয় আজকে উনাকে অনেক বেশী বলা হয়ে গেছে। উফ আমি ও না মাঝে মাঝে যে এমন বোকার মত কাজ করে ফেলি না। তাই হয়তো সে রাগ করেছে।

আজকে বাসায় কেউ নেই অথচ বাহিরে পুরোই অন্ধকার হয়ে আছে। মেঘ করেছে খুব। সাথে খুব বাতাস। মনে হচ্ছে কালবৈশাখী ঝড় হবে। চৈত্র মাসে যে প্রচন্ড গরম পরেছে। তাতে বৃষ্টি আর বাতাসের খুবই প্রয়োজন। হঠ্যাৎ করেই রহমতের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। গত সপ্তাহে মসজিদে মসজিদে বৃষ্টির জন্য দু’আ করা হয়েছে। তাই আজ আল্লাহর অশেষ রহমতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
বৃষ্টির সাথে সাথে মেঘের গর্জন ও শোনা যাচ্ছে।

সোনিয়ার খুব ভয় করছে এত বড় বাড়িতে একা থাকতে।
উনাকে ও দেখতে পাচ্ছেনা। যদি বিদুৎ চলে যায় তাহলে কী হবে?
ভয়ে হাত পা থরথর করে কাঁপছে।

সোনিয়া ভাবছে উনি সেই যে গেলো এখন পর্যন্ত আর সে রুমে এলোনা।
এদিকে সাহিল গেস্ট রুমে ফ্লোরে বসে আছে। হাতে সিগারেট। তার পাশেই পরে আছে অনেকগুলো ফিল্টার। পুরো রুম সিগারেটের আলোয় অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। বাহিরে বাতাসে রুমের পর্দাগুলো উড়ছে।
সাহিলের চোখ লাল হয়ে আছে। অস্থির লাগছে তার।

পাশেই দু প্যাকেট ব্যানসন সিগারেটের খালি বক্স পরে আছে। প্রতি প্যাকেটে ২০ পিচ করে সিগারেট থাকে।
হয়তো আর হাতে গোনা দু চারটে সিগারেট আছে তাতে। আর বাকীগুলো পুরোটাই খেয়ে ফেলেছে সাহিল।

হঠ্যাৎ বিদুৎ চলে গেলে সোনিয়া চিৎকার দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। তার কানের কাছে সাহিলের কন্ঠে বলে উঠলো,
সোনিয়া চোখ খোল।
সাহিলের কন্ঠ শুনে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে সাহিল ক্যান্ডেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সোনিয়ার
দিকে তাকালে সে হাসলো।

সাহিল ক্যান্ডেলটা ড্রয়ারের উপরে রেখে বললো,
ভয় নেই আলো জ্বালিয়ে দিলাম।
~ আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?

~ চোখ মুছতে মুছতে সাহিল বললো,
কাজ ছিলো তাই গেস্ট রুমে ছিলাম।
~ গেস্ট রুমে আবার কী কাজ ছিলো?

~ ছিলো তুমি বুঝবেনা।
~ আপনি এসমোকিং করেছেন?
~ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো,
হ্যাঁ করেছি।
~ এত রাতে?

~ হুম। এসমোকিং করতে আবার এত রাতের কী আছে? যখন মন চাইবে তখন করবো।
~ আপনার সাথে তর্কে যেতে চাইনা। বাসায় যে কেউ নেই আপনি জানেন?
~ নাহ্। তাছাড়া জানার প্রয়োজন ও মনে করিনা।
~ ওহ্। তাহলে কী আপনি এই পরিবারের সদস্য না?

~ সদস্য ঠিকাছে কিন্তু তাই বলে কী সব কিছু জানতে হবে নাকি?
~ হুম জানতে হবে। কারণ পরিবারের সবার মতামত নিয়েই একটি পরিবারের ভালো মন্দ তৈরী হয় তাই সব কিছু সবার জানা উচিত।
দুজনেই চুপ করে তাকিয়ে থাকে।


পর্ব ৩

সাহিল ওয়াশরুমে ঢুকলো। পানির কল ছেড়ে চোখে মুখে ভালো করে পানি ছিটিয়ে দিলো। তারপর আয়নার দিকে এক নজরে তাকিয়ে থেকে চোখের জল ছেরে দিলো। মনটা তার ভীষণ অস্থির লাগছে। মাথা বেয়ে তরতর করে ঘাম পরছে। বাহিরে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বইছে। বিদুৎ চমকানোর আলোয় পুরো রুমটা আলোয় ভরে যাচ্ছে। বাতাসের সাথে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।
এরকম পরিস্থিতিতে ও তার বড্ড গরম লাগছে। এটা খুবই চিন্তার বিষয়।

প্রায় মিনিট বিশেক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর আস্তে আস্তে রুমে ঢুকে টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছে বিছানার উপরে বসলো।
বিছানার উপরে বসে করুণ দৃষ্টিতে সোনিয়ার দিকে তাকায় সাহিল।
সোনিয়ার চোখ সাহিলের দিকে পরতেই সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিলো সে। সাহিল বিছানার উপরে এক পাশ করে শুয়ে পরলো।
~ কী ব্যাপার আপনি শুয়ে পরলেন কেনো?
খাবেন না।

~ খিদে নেই।
~ খিদে নেই বললেই হলো খেতে চলুন।
~ বললাম না খিদে নেই।
~ আপনি বললেই হবে নাকি জলদী চলুন।

~ সাহিল চোখ মুখ লাল করে ধমক দিয়ে বললো,
তুমি কী বয়রা নাকি? বলছি না খাবো না তবুও জোর করছো কেন? তাছাড়া কোন অধিকারে তুমি আমার প্রতি জোর খাটাচ্ছো?
সাহিলের ধারালো কথার আঘাতে সোনিয়া পুরোই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তারপর দীর্ঘ একটা নিশ্বাঃস ছেড়ে বললো,
যদি বলি আপনার বউয়ের অধিকারে তাহলে।
~ সাহিল শোয়া ছেড়ে উঠে বসলো। তারপর সোনিয়ার দিকে তাকায়।

বউ। কার বউ?
~ কেনো আপনার।
~ তুমি কী আমাকে তোমার স্বামী হিসাবে মেনে নিয়েছো?
সোনিয়া এবার পুরো নিশ্চুপ হয়ে যায়। বেশকিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আমতা আমতা করে বললো, রাত অনেক হয়েছে শুয়ে পরেন।
~ এটা আমার প্রশ্নের উত্তর না।
সোনিয়া কোন কথা না বলে অন্যপাশ ফিরে তাকায়।

আস্তে আস্তে চোখদুটো বন্ধ করে ফেলে।
কখন যেনো ঘুমের দেশে চলে যায়।
সাহিল শুয়ে আছে কিন্তু চোখের কোণে ঘুম নেই। মাথার উপরে ফ্যান চলছে বাহিরে ঠান্ডা আবহাওয়া তবুও প্রচন্ড গরম লাগছে তার।

সাহিল ভাবছে সোনিয়ার বয়স খুবই কম। খুব ছোট একটা মেয়ে। সাহিল বিয়ের আগে জানতো না যে সোনিয়ার বয়স কত। কারণ সমস্ত বিয়ের আয়োজন তার মা ই করেছে। সোনিয়াকে বাসর ঘরেই সে প্রথম দেখে। সাহিল যদি বিয়ে আগে একবার ও সোনিয়ার বয়সটা জানতে পারতো তাহলে সে কখনো এই বাল্যবিবাহ করতো না। সাহিল তার প্রথম স্ত্রী তানহাকে এখনো ভুলতে পারছেনা তবুও প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে ভোলার জন্য। কিন্তু কতদিন বা কত বছর লাগবে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছেনা সে।

সাহিল ভাবছে অতীতকে ভুলে যেতেই হবে যেভাবেই হোক। তাছাড়া সোনিয়াকে তার মেনে নেয়া উচিত। যেহেতু সোনিয়াকে সে বিয়ে করেছে। বিয়েটা কোন ছেলে খেলা না যে ইচ্ছা করলে খেলবো নতুবা ফেলে চলে যাবো। এটা একটা পবিত্র বন্ধন।
কিন্তু হুট করে কী সোনিয়াকে মেনে নেয়া সম্ভব?
নাকি ভালোবাসা সম্ভব?

অথচ এটাকে মেনে নিতে ও হবে আর ভালোবাসতে ও হবে না হলে যে সোনিয়ার প্রতি অন্যায় করা হবে তার।
এই দুটো বিষয় ভেবেই মাথাটা এলোমেলো হয়ে যায় তার।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মনের অজান্তেই চোখের জল পরছে।
রাত যত গভীর হচ্ছে সাথে ঠান্ডা ও বাড়তে থাকে।
প্রচন্ড শীত লাগছে সাহিলের। বাহিরে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে।

সাহিল শোয়া ছেড়ে উঠে জানালাগুলো আটকে দিয়ে ওয়াডড্রব থেকে কম্বল বের করলো। ভালো করে খেয়াল করে দেখলো যে, সোনিয়া শীতে কাঁপছে। তাই কম্বলটা সোনিয়ার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পরলো।
সকাল হলে সাহিল উঠে ফ্রেশ হয়ে বাহিরে গেলো। নাস্তা কিনে এনে টেবিলে সাজালো। তারপর সোনিয়াকে ডাক দিয়ে নাস্তা খেতে বললো।
~ সোনিয়া অনেক বেলা হয়ে গেছে এখুনি উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করো।
আড়মোড়া দিয়ে উঠে গায়ে কম্বল দেখে কিছুটা চমকে উঠলো সে।

মনে মনে কী যেনো একটা চিন্তা করে ওয়াশরুমে ঢুকলো।
ততক্ষণ সাহিল গিয়ে সানির পাশে বসলো।
একটুপর সোনিয়া বেরিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে নাস্তা বেরে চেয়ার টেনে বসলো।

সাহিল সানিকে কোলে নিয়ে এসে টেবিলে বসলো।
~ একি আপনি সানিকে নিয়ে আসলেন কেনো?
~ সানির ঘুম ভেঙে গেছে তাই নিয়ে আসলাম।
~ ও।

~ হুম।
সাহিল বসলে সোনিয়া খাবারের প্লেটটা তার সামনে দিয়ে সানিকে কোলে তুলে নিলো।
সাহিল সোনিয়ার দিকে তাকায়।
ভ্রু কুঁচকে সাহিলের দিকে তাকায় সোনিয়া। তারপর বললো, এভাবে তাকিয়ে না থেকে খাবার শেষ করেন।
~ ও হ্যাঁ।
সাহিল দ্রুত খাওয়া শেষ করলো। দাঁত ব্রাশ করে ড্রইং রুমে ঢুকলো।

সোনিয়া ও পিছু পিছু গেলো।
এই যে শোনেন।
~ জ্বি কিছু বলবে।
~ হুম।
~ বলো।

~ আপনি না এই মাত্র দাঁত ব্রাশ করে নাস্তা করলেন। তাহলে নাস্তা করে আবার ও দাঁত ব্রাশ করলেন যে।
~ আসলে আমি না একটু পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি তাই তো নাস্তা করে দাঁত ব্রাশ করলাম যাতে দাঁতগুলো পরিষ্কার থাকে।
~ বাহ্ বাহ্। তা এতবার যখন দাঁত ব্রাশ করছেন তবুও তো দাঁতের হলদে ভাবটা কমছেনা।
সোনিয়ার কথা শুনে সাহিলের হাসি মাখা মুখটা কালো হয়ে গেলো।
তাড়াতাড়ি করে আয়নার সামনে যায়।
হা করে দাঁত দেখছে।

পিছন থেকে সোনিয়া এসে বললো,
কী দেখছেন মশাই?
মুখটা ঘুরিয়ে সোনিয়ার দিকে তাকায় সাহিল।
সাহিলের তাকানোর ভঙ্গিমা দেখে হো হো করে হেসে উঠলো সে। এভাবে তাকালে না আপনাকে দারুণ লাগছে। চিন্তিত মুখটা একদম লাল টমেটোর মত হয়ে যায় আপনার।
দাঁত খিটমিট দিয়ে সোনিয়ার দিকে এগিয়ে এসে হাতটা চেপে ধরে। কী বলছিলে জানি?

আবার বলো।
উহ্ লাগছে তো ছাড়ুন বলছি।
~ ছাড়বো না।
~ অনেক লাগছে। প্লিজ ছাড়ুন না।
~ চুপপপ একদম চুপপপ। একটু ও ছাড়বো না।

~ ঠিকাছে। ছাড়তে হবেনা আপনাকে। ধরেই রাখেন।
~ হুম ধরেই রাখবো।
~ যদি হাত না ছাড়েন তাহলে সারাজীবন কিন্তু এই হাত ধরে রাখতে হবে। পারবেন তো?
সাহিল সোনিয়ার হাত ছেড়ে দিলো।

~ জানতাম হাত ধরে রাখতে পারবেন না।
কথাটা বলেই চলে যায় সোনিয়া।
সাহিল ফ্লোরে ধপাস করে বসে পরলো। চোখ মুখে কেনো জানি চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে আজ।
খুব টেনশন কাজ করছে মনের ভিতরে। আবার ভয় ও লাগছে কোন কিছু হারাবার।
কিন্তু কী ভয় সেটা অনুভব করতে পারছেনা সে।

সাহিল বসা ছেড়ে উঠে নিজের রুমে যায়। ভিতরে ঢুকতে কেমন জানি লজ্জা লাগছেনা। জীবনে এই প্রথম কোন মেয়ের সামনে দাঁড়াতে লজ্জা পাচ্ছে সে।
সোনিয়া খাটের সাথে হেলান দিয়ে আধা শোয়া অবস্থায় শুয়ে আছে। সাহিলের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে বসলো।
সাহিল লক্ষ্য করলো সানিকে পাশে রেখেই বসে আছে সোনিয়া। মনে মনে খুব সন্তুষ্টি লাগছে তার। বাচ্চাটাকে নিয়ে এতদিন চিম্তার ভিতরে ছিলো কিন্তু আজ অনেকটা টেনশন মুক্ত হয়েছে। সোনিয়ার দ্বারা সানির কোন ক্ষতি হবেনা এতটুকু বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে সোনিয়া।

সানি ও সোনিয়ার পাশে থাকলে কান্নাকাটি কম করে।
খুব ভালো লাগছে এমন পরিবেশ লক্ষ্য করে।
সাহিল সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর আস্তে করে বললো,
মা কখন আসবে তা কী বলে গিয়েছে?

~ ওভাবে শিউর দিয়ে কিছু বলেনি তবে আজকে আসবে বলেছে।
কথার মাঝেই সাহিলের ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো।
ফোনটা হাতে নিয়ে নাম্বারটা দেখেই মেজাজটা বিগড়ে গেলো তার। কলটা কেটে মোবাইলটা সুইচ অফ করে দিয়ে বিছানার উপরে ছুরে মেরে রুম থেকে বেরিয়ে যায় সাহিল।
সাহিল চলে গেলে সোনিয়া মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে।

পর্ব ৪

সাহিল চলে গেলে বিছানার উপর দিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলো সোনিয়া। বেশ কৌতুহলি হয়েই ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ যাবৎ ফোনটা হাতের মুঠোয় রাখলো। তারপর এক ধ্যানে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফোনের পাওয়ার বাটনের উপরে হালকা করে চাপ দিতেই সুইচ অন হয়ে যায়। ফোনটা ওপেন হওয়ার সাথে সাথেই ফোনে আবার ও কল আসলো।

রিংটোন বাজার সাথে সাথে ভয়ে লাফিয়ে উঠে সোনিয়া। দরজার দিকে এক পলক তাকিয়ে ফোনের দিকে তাকায়। নাম্বারটা সেইভ ছিলোনা। অপরিচিত নাম্বার। সোনিয়া ফোনটা টেবিলের উপরে রেখে ওয়াশরুমে ঢুকলো।
মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে এসে ঘরের ভিতরে পায়চারী করতে লাগলো।

আচমকাই ফোনটা আবার ও বেজে উঠলো। সোনিয়া ফোনের কাছে যায়। স্ক্রিনের দিকে বারবার তাকায়। সেই একই নাম্বার শেষে ৭০।
সোনিয়া বেশ কৌতুহলি হয়ে ফোনটা হাতে নিলো। আরেকবার কল দিলে সে কলটা রিসিভ করবে এমন চিন্তা করলো। প্রয়োজন না হলে তো কেউ এতবার কল দেয়না। যাই হোক কথাটা ভেবেই ফোনটা টেবিলের উপরে রেখে জগ দিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে কয়েক ঢোক খেতেই ফোনে একসাথে ৩ টা ম্যাসেজ আসলো। প্রতিটা ম্যাসেজের সময় সীমা ১ সেকেন্ড।

সোনিয়া ফোনটা আবার ও হাতে নিলো। সাহিলের ফোনে তো পাসওয়ার্ড দেয়া যা সোনিয়া জানেনা। তবুও ফোনের পাওয়ার বাটনে ক্লিক করতেই স্ক্রিনের উপরে ম্যাসেজ গুলো দেখা যাচ্ছে। ম্যাসেজ গুলো ঐ নাম্বার থেকে আসছে। ম্যাসেজ পুরোটা দেখা না গেলে ও অল্প করে দেখা যাচ্ছে।
সেখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।
জান আমার ভুল হয়ে গেছে প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও সানির দিকে তাকিয়ে
আর কিছু পড়া যাচ্ছিলো না।

হঠ্যাৎ পিছন থেকে সোনিয়ার হাত থেকে মোবাইল টা টেনে নিয়ে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললো,
আমার মোবাইলে হাত দেয়ার পারমিশন কে দিলো তোমায়?
~ নিশ্চুপ সোনিয়া।
~ চুপ করে আছো কেন?
টেল মি। আমার মোবাইল ধরেছো কেনো?

~ কিছুটা ভয়ে ভয়ে বললো,
মোবাইল টা ধরেছি তাতে কী মহাভারত অসুদ্ধ হয়েছে নাকি?
এত রাগ দেখাচ্ছেনা কেনো?
রাগের তো কিছু হয়নি। আমি আপনার স্ত্রী তাই আপনার সব কিছুতে হাত দেয়ার অধিকার আমার আছে।

~ না নেই। আমি তোমাকে এখনো পারমিশন দেইনি।
~ পারমিশন! কীসের পারমিশন?
~ আপনার কোন কিছু ধরতে অন্ততপক্ষে আমার কোন পারমিশন লাগবেনা। কারণ আপনি আমাকে বিয়ে করেছেন। যদি আমাকে পারমিশন না দিবেন তাহলে বিয়ে করেছেন কেনো?শোনেন আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী তাই আমার সাথে এসব বেমানান কথা চলবেনা।

সাহিল তো রাগে কটমট করছে। এতরাগ জমে আছে মনে হচ্ছে পারলে সোনিয়াকে কাঁচা খেয়ে ফেলতো।
সাহিল মোবাইলের দিকে তাকায়। মোবাইলটা দেখছে।
সোনিয়া তুমি কী ম্যাসেজগুলো দেখেছো?

~ হ্যাঁ দেখেছি।
~ তারপর।
~ তারপর আর কী? দেখলাম আপনার এক্স ওয়াইফ ম্যাসেজ করেছে তার ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিতে। অল্প করে দেখেই বুঝতে পেরেছি আরো হয়তো বিস্তারিত আছে পুরো ম্যাসেজগুলো তে। যাই হোক এসব নিয়ে আমার কোন চিন্তা ভাবনা নেই। শুধু আপনার কাছে একটাই রিকুয়েস্ট দয়া করে পিছনের অতীতকে মনে রেখে বর্তমানের কোন ক্ষতি করবেন না। অতীত ভুলে গিয়ে বর্তমানকে নিয়ে থাকবেন। আপনি এটা ভাববেন না যে আমি আমার কথা বলছি বা আমাকে আপনার স্ত্রীর অধিকার দিতে বলছি। আমাকে যদি আপনি আপনার স্ত্রীর অধিকার না দিন তাতে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই।

আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি। আপনার সাথে যেদিন আমার বিয়ে হয় সেদিনই আপনাকে আমার স্বামী হিসাবে মেনে নিয়েছি। যেভাবেই হোক আপনার সাথে আমার বিয়েটা হয়েছে। আমি আপনার ঘরে এসে মা হতে পেরেছি এর চেয়ে আমার কাছে আনন্দের কিছু নেই। কারণ জন্ম না দিয়ে ও আমি সানির মা হয়েছি।
আল্লাহর কাছে শুধু একটাই ফরিয়াদ যতদিন বাঁচবো সানির মা হয়েই যেন বাঁচতে পারি। কত মা একটা বাচ্চার জন্য কান্নাকাটি করে আর আমার ভাগ্যটা কত ভালো।

আমি কান্নাকাটি করার আগেই আল্লাহর অশেষ রহমতে সানির মত একটা সন্তানের মা হতে পেরেছি। দয়া করে আমার ইচ্ছাগুলোকে মেরে ফেলবেন না।
সাহিল সোনিয়ার কথা শুনে পুরোই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কথাবলার মত ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মোবাইলটা টেবিলের উপরে রেখে ওয়াশরুমে ঢুকলো। পানির কল ছেড়ে দিয়ে ঝড়ণার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে। প্রায় দু ঘন্টা ভিজে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে।

সাহিল বেরিয়ে আসলে সোনিয়া ভালো করে লক্ষ্য করলো। কোন কিছু বললো না। শুধু এতটুকু বললো, এতক্ষণ না ভিজলে ও পারতেন। কারণ যদি জ্বর, ঠান্ডা লাগে তাহলে কষ্ট করে আমাকেই আপনার দেখাশুনা করতে হবে আর সেটা হয়তো আপনি চাইবেন না।
সাহিল কোন উত্তর না দিয়ে বিরক্তিকর সুরে বললো,
আপাতত আমার চিন্তা তোমাকে না করলে ও চলবে। আমি আমার ভালো মন্দ বুঝতে পারি। এতদিন যেমন পেরেছি আজও তেমনি পারবো। কারো সাহায্যের আমার দরকার নেই।

~ এত বড় গলায় কোন মানুষকে কথা বলা মানায় না। কাকে কখন প্রয়োজন হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। মানুষদের হিংসা, দোমাগের জন্য মানুষের এত অধঃপতন। তাই এসব পরিহার করুণ। আল্লাহকে ভয় করুণ দেখবেন সমস্ত বিপদআপদ চলে যাবে।
সাহিল রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
পরেরদিন সকালে সানিকে গোসল করিয়ে বাহিরে আসলো সোনিয়া। তারপর খিঁচুরি এনে অল্প অল্প করে চামুচ দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে সোনিয়া। তখনি সাহিলের মা রুমে আসলো।

সোনিয়া আমার শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে মা তাই বিকালে আমি ডক্টরের কাছে যাবো। তুই সানির দিকে খেয়াল রাখিস।
~ আপনি একা যাবেন?
~ না। ড্রাইভার সাথে যাবে।
~ ওহ্। আমি কী আপনার সাথে আসবো মা।
~ না রে মা। আমি একাই যেতে পারবো তুই বাসায় বসে বিশ্রাম নে।

~ ঠিকাছে মা। আপনি ও নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন।
~ হুম।
বিকালে সোফায় বসে টিভি দেখছে সাহিল। সোনিয়া কফি বানিয়ে নিয়ে আসলো সাহিলের জন্য।
সোনিয়ার হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে আড়চোখে তাকালো সাহিল।
সোনিয়া বিষয়টা খেয়াল করলো তবুও না বোঝার ভান করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সাহিল একের পর এক টিভির চ্যানেল ঘুরাচ্ছে।
~ আপনি নামাজ পরেছেন?
~ মুখটা তুলে সোনিয়ার দিকে তাকায়।
~ এভাবে না তাকিয়ে আগে বলুন নামাজ পরেছেন?
~ কাপা কন্ঠে বললো, না।
~ কেনো নামাজ পরেননি?

~ নিশ্চুপ সাহিল।
~ দেখেন আপনি সব কাজ করতে পারেন কিন্তু নামাজ কেনো পরতে পারেননা। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরতে কী অনেক সময় লাগে? একটু ও লাগেনা। তাহলে কেনো নামাজ পরেন না। নামাজ পরলে মন পবিত্র হয়। নামাজ ছাড়া কোন মুসলমানের মূল্য নেই। আপনি এই যে বসে আছেন এক সেকেন্ড ও সময় লাগবেনা আজরাইলের আসতে। আর এসেই জান কবজ করতে। কারণ প্রতিটা মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। তাই মৃত্যুর থেকে কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারবেনা।
আপনি হয়তো ভাববেন আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি কিন্তু না আমি আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি না শুধু নামাজের দাওয়াত দিচ্ছি।

একটু পরে মাগরিবের আজান দিবে তাই অজু করে মাগরিবের নামাজের সাথে আসরের নামাজ ও কাযা করে পরে নিয়েন। আর প্রতিদিন যত কাজই থাকুক না কেনো প্লিজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরে নিবে।
আমি এখন যাচ্ছি অজু পরে নামাজ পরতে।
আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।

সোনিয়া চলে গেলে টিভি অফ করে অজু করে নামাজ পরলো সাহিল।
নামাজ পরে এসে সোফার উপরে বসলো। সোনিয়া নুডলস রান্না করে সাহিলের পাশে বসলো।
রাতে কী খাবেন?
~ নুডলস খেতে খেতে সাহিল বললো,
তুমি যা খাওয়াবে তাই খাবো।

~ আবারও ভুল বললেন, খাওয়ানোর মালিক হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ। আমি উছিলা মাত্র।
~ হুম। তুমি যা তৈরী করবে তাই খাবো।
~ ঠিকাছে। আপনি তাহলে বসেন আমি ডিনারের বন্দোবস্ত করি।
সোনিয়া চলে গেলো রান্না ঘরে।

রাতের খাওয়ার জন্য আলু ভাজি, ডিম পোঁচ আর পরোটা বানালো।
রাত ১০ টা বেজে ১০ মিনিট সাহিলের মা এখনো আসেনি ডক্টর দেখিয়ে। অনেক টেষ্ট দিছে তাই রিপোর্ট আনতে দেরী। সোনিয়া এসে মায়ের কথা জিজ্ঞাস করলে সাহিল বললো মায়ের আসতে দেরী হলে মামার বাসায় যাবে আর যদি ১১ টার ভিতরে কাজ শেষ হয় তাহলে বাসায় আসবে।
~ ওহ্।
খাবার রেডী করেছি টেবিলে আসেন
~ হুম।

সাহিল উঠতে নিলে,
দরজায় কলিং বেল বাজলো। সাহিল খুলতে গেলে সোনিয়া বাঁধ সাঁধলো।
সোনিয়া দরজা খুলে চমকে উঠলো। একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। আউলা ঝাউলা চুল। সমস্ত মুখ লাল হয়ে আছে। গালদুটো ফুলে আছে।
সোনিয়া তো পুরোই অবাক।
কে তুমি?

~ আমাকে তুমি চিনবে না। কিন্তু তুমি কে?
~ আমি সোনিয়া।
~ এ বাড়িতে এত রাতে তুমি কী করছো? তোমাকে তো আগে কখনো দেখিনি।
~ আমার কথা বাদ দাও। এখন বলো তুমি কে? আর এত রাতে এখানে কী চাও?
~ সাহিল আছে। আমি সাহিলের কাছে আসছি। সাহিলকে একটু ডেকে দাও।

~ সাহিলকে ডাকার আগে আমাকে বলো তুমি কে?
~ এবার রাগান্বিত হয়ে মেয়েটি বললো, তুমি সামনে থেকে সরো আমি ভিতরে যাবো?

~ আমি এখান থেকে এক বিন্দু ও সরবো না। তুমি তোমার পরিচয় দাও।
ভিতর থেকে সাহিল বেরিয়ে এসে বললো,
তানহা তুমি এখানে কী চাও?
সোনিয়া সাহিলের দিকে তাকায়।

পর্ব ৫

সাহিল তুমি এসে গেছো। দেখো না এই মেয়েটা আমাকে ভিতরে আসতে দিচ্ছেনা। আর তোমাকে ডেকে দিতে বললাম সেটা ও দিচ্ছেনা।
সাহিল তুমি কেমন আছো?

তোমাকে কতবার কল দিলাম, কিন্তু তুমি একবার ও রিসিভ করছোনা। কতটা টেনশনে ছিলাম তোমাকে বোঝাতে পারবোনা।
~ তানহা তুমি এখানে কেনো এসেছো? আর এত রাতে আমার বাসার সামনে কী চাচ্ছো?
~ আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। সানি কোথায় সাহিল?
সানিকে নিয়ে এসো।
না থাক আমি নিজেই ভিতরে গিয়ে দেখছি।

~ তুমি কোথায় যাচ্ছো?
~ সামনে থেকে সরো আমি ভিতরে যাবো। আমি আমার ছেলেকে দেখেতে যাবো।
~ আমি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি তুমি তাহলে সানির মা। চেহারা তো দেখতে মাসআল্লাহ। কিন্তু এতবড় নোংরা কাজ কী করে করলে তুমি? সানির মত এতটুকু দুধের বাচ্চা যে কিনা মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতে পারতো না ঠিক সেই মূহুর্তে বাচ্চাটাকে ফেলে দিয়ে পরকিয়ার টানে স্বামী সংসার সব ফেলে চলে গিয়েছিলে। বাহ্ তোমাকে তো গোল্ড মেডেল দেয়া উচিত ছিলো সরকারের।

এত বড় একটা মহৎ কাজ করেছো যে। ভাবতে ও অবাক লাগছে।
তা হঠ্যাৎ করে কী কারণে সানির কথা মনে পরলো। যার সাথে পালিয়ে গিয়েছিলে সে এখন কোথায়?
~ দেখো আমি তোমার সাথে কোন কথা বলতে চাইনা। সরো সামনে থেকে। সাহিল তুমি কিছু বলছোনা কেনো?
~ সাহিল কী বলবে?

তুমি যা বলার আমাকে বলো।
~ আমি তোমার সাথে কোন কথা বলতে চাইনা। সাহিল তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছো?
কিছু বলছো না কেনো?
কে এই মেয়ে? আর এত রাতে তোমার বাসায় কী করছে?

~ তানহা তুমি এত রাতে এখানে কেনো এসেছো? এটা ভদ্র লোকের বাসা। তোমার মনসম্মান না থাকতে পারে কিন্তু আমাদের আছে।
এতরাতে একজন ভদ্র লোকের বাসায় এসে চিল্লাচিল্লি করাটা মোটে ও ঠিক হয়নি তোমার।
তুমি তোমার হাজবেন্ডের কাছে ফিরে যাও।
~ না আমি ওর ঘরে যাবোনা। আমি একেবারে তোমার কাছে চলে এসেছি। প্লিজ আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিওনা। অনেক আসা করে রানাকে ছেড়ে তোমার কাছে চলে এসেছি।

~ রানাকে ছেড়ে আমার কাছে কেনো চলে এসেছো?
~ আমি তোমাকে আর সানিকে ছাড়া থাকতে পারবোনা। তাই রানাকে ছেড়ে চলে এসেছি।
~ তানহা তুমি ফিরে যাও।
~ আমি কোথায় ও যাবোনা।

~ কোথায় ও যাবেনা মানে? এখনি এখান থেকে চলে যাও না হলে বের করে দিতে বাধ্য হবো।
~ সাহিল তুমি এই মেয়ের কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছো। আমাকে একের পর এক অপমান করে যাচ্ছে আর তুমি সেটা দেখেও কোন প্রতিবাদ করছো না।
সাহিল তুমি বোবা হয়ে গেলে নাকি।
আর এই মেয়ে যে এতকিছু বলছে কোন অধিকারে।

~ কেন অধিকারে আবার?
আমার বউয়ের অধিকারে!
~ বউয়ের অধিকার মানে? সাহিল তুমি বিয়ে করেছো? আর কবে করেছো? আর আমাকে তো বলোনি।

~ বিয়ে করেছি অনেকদিন হয়েছে। আর তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করিনি। তোমাকে বলেই বা কী হবে শুধু শুধু অশান্তি ডেকে আনবো। এই যেমন আমি তোমার কল ধরিনি বলে তুমি বাসা পর্যন্ত চলে এসেছো। আর যদি আমার বিয়ের খবরটা জানতে তাহলে তো সেই কবে এসেই হামলা করতে আমার বাসায়।
~ সাহিল আমি তোমার কাছে চিরদিনের জন্য চলে এসেছি তুমি এই মেয়েকে ডির্ভোস দাও। আর আমাকে আবার বিয়ে করো। আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যাবোনা।

~ তাহনা বেশী হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
~ না সাহিল বেশী না। তুমি না আমাকে তোমার চেয়েও বেশী ভালোবাসতে তাহলে।
~ ভালোবাসতাম। এখন আর বাসি না। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। প্রচন্ড ঘৃণা করি।

তুমি যেদিন আমাকে আর সানিকে একা রেখে রানার কাছে চলে গিয়েছিলে সেদিনই আমার কাছে তুমি মৃত হয়ে গিয়েছো। আমার ভালোবাসাকে আমি সাথে সাথে কবর দিয়েছি। এখন তোমার প্রতি আছে শুধু বুক ভরা ঘৃণা। তোমার জন্য আমি কী না করেছিলাম?
কিন্তু তুৃমি তার যোগ্য ছিলেনা। তুমি আমার লাইফটাকে এলোমেলো করে ফেলেছো। তাই তোমার প্রতি আমার মনে বিন্দু মাত্র ফিলিংস নাই কোন মানবতার খাতিলে ও। বুঝতে পারছো আমি কী বলতে চাচ্ছি।

তানহা প্লিজ তুমি এখান থেকে যাও। না হলে আমি রানাকে কল করে ডেকে আনতে বাধ্য হবো।
~ সাহিল রানাকে কল করে আনলে ও কোন লাভ নেই। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবোনা বলেই ঘরের ভিতরে ঢুকতে নিলে মায়া তাতে বাঁধ সাধলো।

তুমি তো বেহায়া মেয়ে দেখছি। প্রথম স্বামীকে ছেড়ে পরকিয়ার টানে অন্য একজন পরপুরুষের সাথে পালিয়ে গিয়েছো। তারপর তাকে বিয়ে করে সংসার ও করেছো। এখন কয়েকমাস করে হঠ্যাৎ করেই সেই প্রথম স্বামী আর সন্তানের কথা মনে পরায় দ্বিতীয় স্বামীকে ছেড়ে চলে এলে। বাহ্ তোমাকে তো স্বর্ন দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা উচিত।
তোমাদের মত নোংরা মেয়ে মানুষের জন্য সমাজে আজ ভালো মেয়েদের ও কোন মূল্য নেই। একজনের জন্য একশ জনের বদনাম হচ্ছে।
~ তানহা রাগে ফোসাতে থাকে।

তবুও আমাকে সরিয়ে ভিতরে আসতে নিলে আমিও তানহাকে ধাক্কা দিয়ে গেইটের বাহিরে বের করো গেইট আটকে দেই।
পাশের ফ্লাটের লোকজন উপর থেকে উঁকি ঝুঁকি মারতে থাকে।
তানহার চেঁচানিতে পাড়ার মোটামুটি সব লোকেরা রাস্তায় এসে জরো হলে সাহিল রানাকে কল দিয়ে পুরো ঘটনা বলে তানহাকে বাসা থেকে নিয়ে যেতে বলে। আর যদি রানা না আসে তাহলে পুলিশ ডাকবে সেটা ও বলে দিলো।

এদিকে রানার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। মনে মনে নিজেকে বেশ অপরাধী লাগছে। আজ নিজের অন্যায়ের কারণেই সে এসবের জন্য ভুক্তভোগি। কথায়ই তো আছে পাপে বাপকে ও ছাড়েনা।
অন্যের বউকে ভাগিয়ে নিয়ে সুখে সংসার করতে চেয়েছিলো কিন্তু সেই সুখ তো আর বেশীদিন স্থায়ী হবেনা এটাই স্বাভাবিক। রানা ভীষণ অনুশোচনা করছে আজ। নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে লজ্জিত লাগছে।

তানহাকে বিয়ে করে না পেলো স্বামীর অধিকার আর না পেলো মা বাবার কাছে ছেলের মর্যাদা। তানহাকে পাওয়ার জন্য বিদেশ থেকে দেশে এসে থাকতে লাগলো। তবুও যদি তার মন পেতো। সব কিছু বিষর্জন দিয়েও তানহার মনে জায়গা করতে পারলো না।
যখনি ভালোবেসে কাছে যেতে চেয়েছে তখনি তানহা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু যতদিন যাচ্ছে ততই সে সাহিলের কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। সাহিলকে ছাড়া সে কিছুই বুঝছেনা।

এক পর্যায়ে রানা ও ঠিক করে তানহাকে ডির্ভোস দিবে কিন্তু দু’দিন আগে রিপোর্টে জানতে পারলো সে প্রেগন্যান্ট।
তাই ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েও পরবর্তিতে সিদ্ধান্ত চেইঞ্জ করতে বাধ্য হয়।
রানা গাড়ি বের করলো। চোখ দিয়ে পানি পরছে তার। হয়তো এতটা কষ্ট সে কখনো পায়নি। গাড়ি স্টার্ট দিলো। খুব জোরে জোরে ড্রাইভ করছে সে।
এদিকে তানহা উচ্চস্বরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। গেইট জোরে জোরে ধাক্কাচ্ছে আর বলছে সাহিল প্লিজ গেইট খোল। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমাকে একবার সানিকে দেখতে দাও।

আল্লাহর দোহাই লাগে একবার দেখতে দাও। তবুও গেইট করছেনা সাহিল। গেইট ধাক্কাতে ধাক্কাতে দুহাতে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে তবুও সে শান্ত হচ্ছেনা।
কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেছে। গলা থেকে কথা বের হচ্ছেনা।
পুরো পাড়ার লোকেরা তামাশা দেখছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

ঘরের ভিতরে সাহিল সহ আমি পুরোই টেনশনে কাটাচ্ছি। মেয়েটা অবশেষে পাগল হয়ে না যায়।
খুব বিরক্ত ফিল করছিলাম দুজনে।
একে তো পুরো পাড়ার লোক বাহিরে বেরিয়ে তামাশা দেখছে অন্য দিকে ঘরের ভিতরে থেকে ও মনকে স্থির করতে পারছেনা তারা।

পর্ব ৬
রানা ঝড়ের গতিতে গাড়ি টানছে। গাড়ি চালাতে চালাতে মনে হচ্ছে এত বড় রাস্তা কিছুতেই শেষ হচ্ছেনা। রানার বাসা থেকে সাহিলের বাসায় যেতে ২০~ ২৫ মিনিট সময় লাগে। জ্যাম না থাকলে ১৫ মিনিটের ভিতরেই পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু আজ গাড়ি চালাচ্ছে ঝড়ের গতিতে। রাস্তায় জ্যাম ও কম তবুও মনে হচ্ছে সময় বেশী লাগছে। রানা হাত ঘড়ি দেখছে বারবার। সময় তো সময়ের মতই চলছে।

রানার গাড়ি এসে সাহিলের বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। তানহা খুব জোরে জোরে গেইট ধাক্কাচ্ছে। রানা খুব হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
তাড়াতাড়ি গাড়ি দিয়ে নেমে গেইটের কাছে যায়। তানহাকে টানা হেঁচড়া করছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু তবুও পারছেনা নিতে। মনে হচ্ছে তানহার গায়ের শক্তি তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অনেকবার চেষ্টা করে ও ব্যর্থ হচ্ছে রানা। আশেপাশের মানুষগুলো তামাশা দেখছে আর হাসছে। খুব লজ্জা লাগছে রানার। এমন পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে পারলে বোঁধ হয় ভালো হতো। না এভাবে চলতে থাকলে তানহা আরো অসুস্থ হয়ে পরবে।
রানা বাধ্য হয়ে সাহিলকে ডাক দিলো।

ভাই প্লিজ দরজারটা খুলে গেইটটা খুলে দে। তানহা শান্ত হলে বাসায় নিয়ে যাবো।
সাহিল দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো।
তার সাথে সাথে আমি ও বেরিয়ে আসলাম।
দরজা খুলতেই তানহা গেইট ধাক্কানো বন্ধ করে সাইড করে দাঁড়ালো।

সাহিল গেইট খুলে দিয়ে রানাকে ভিতরে আসতে বললো,
রানা তানহার হাত ধরে ভিতরে ঢুকলো। খুব লজ্জা লাগছে তার। জীবনে এটাই দেখার বাকী ছিলো হয়তো।
সারাটা জীবন সুখে কেটেছে কিন্তু আজ তানহাকে বিয়ে করে কষ্টে দিন কাটছে আমার। জীবনটা এলোমেলো হয়ো গেলো।

তানহাকে ভালোবেসে বিয়ে করাটাই মনে হয় আমার জীবনে পাপ ছিলো। আর সেই পাপের সাজা আজ হারে হারে টের পাচ্ছি।
দরজার কাছে গেলে তানহা রানার কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো।
ঘরে পা রাখতেই তানহা দৌঁড়ে গেলো সানির রুমে। সাথে সাথে আমি ও ঠুকলাম রুমের ভিতরে।
সানি ঘুমাচ্ছে প্লিজ কোন শব্দ করোনা তাহলে ওর ঘুম ভেঙে যাবে। রাতে আর ছেলেটা ঘুমাবেনা।

ভয় নেই শব্দ করবোনা।
তানহা বিছানার এক কোণে বসে সানিকে দেখছে।
তুমি কিছুক্ষণের জন্য বাহিরে যাবে আমি সানিকে মন ভরে দেখবো। কতদিন হয়েছে ছেলেটাকে দেখিনা।
তোমার পায়ে ধরি এতটুকু দয়া করো আমার উপরে। কথা দিচ্ছি কিছুক্ষণ পরে আমি নিজে থেকেই বাসায় চলে যাবো।

রানা প্রচন্ড রকমে ঘামছে। কপাল বেয়ে তরতর করে ঘাম পরছে। সাহিল রুমের এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিয়ে রানার পাশে বসলো।
রানার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।
চোখ দিয়ে পানির ফোটা বের হচ্ছে।

রানা পানি খাবে?
দু’বার জিজ্ঞাস করলো সাহিল।
রানার গলা থেকে কোন আওয়াজ বের হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে কেউ তার গলাটা চেপে ধরেছে। খুব কষ্ট হচ্ছে তার। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে যদি কষ্টটা একটু হালকা হয়।
আমি সানির কাছে তানহাকে রেখে ড্রইং রুমে আসলাম। আমি জানি তানহার কাছে সানিকে রেখে আসলে ও সানির কোন ক্ষতি হবেনা। যতই হোক না কেনো নিজের সন্তান বলে কথা।

রুমে ঢুকেই,
~ আসসালামু আলাইকুম। (সোনিয়া)
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম। খুব করুণ সুরে সালামের জবাব দিলো রানা।
ভাবী আসলে আমি খুব দুঃখিত এত রাতে আপনাদেরকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য। কথাগুলো বলছে আর কাঁদছে রানা।
~ ইটস ওকে। কিন্তু আপনি তানহাকে একটু বোঝাতে পারেন না। যাই হোক যেভাবেই হোক আপনার সাথে ওর বিয়েটা হয়েছে। সাহিলের সাথে ডিভোর্সের পরেই তো আপনাকে স্বামী হিসাবে মেনে নিয়েছে তাই না?

তাতে তো কোন সন্দেহ নেই।
তাহলে এই পাগলামীর কোন মানে আমি তো দেখছিনা।
মানলাম সাহিলকে সে ভুলতে পারছেনা। আর না ভোলাটাই স্বাভাবিক। যেখানে নিজের সন্তান আছে।

মায়েরা সব ছাড়তে পারলে ও সন্তানকে ছাড়তে পারেনা। কিন্তু আমি এটা শুনে হতবাক হয়েছি দুমাসের বাচ্চা কতটুকু? কী বোঝে?
তাকে ছেড়ে কী করে একজন মা চলে যেতে পারে?
সব কিছু মানলাম আমি। কিন্তু আপনাকে ভালোবেসে সবার মায়া ত্যাগ করে তো আপনার কাছে চলে গিয়েছিলো। তারপর আপনাকে বিয়ে করেছে। আর এখন এরকম করাটা তো একদম বেমানান।

তানহা তো আর বাচ্চা না। সব বোঝার ক্ষমতা তার আছে।
সময় কারো জন্য থেমে থাকেনা। আর কোন মানুষ একা থাকতে পারেনা।
অবশেষে, সাহিলের মা আমার সাথে সাহিলের বিয়ে ঠিক করে।

সাহিল ও রাজি হয়ে যায় এবং আমাকে বিবাহ করে।
আমাদের বিয়ের বয়স কয়েকমাস হলো মাত্র। যদি সাহিল অবিবাহিত থাকতো তাহলে না হয় ব্যাপারটা ভিন্ন হতো। তখন না হয় তানহাকে মেনে নিতে পারতো বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়ে।
কিন্তু তাহলে আপনার কী হতো?
সোনিয়া এক সেকেন্ড। তোমার মাঝে আমি একটু কথা বলি।

~ হুম বলেন।
রানা তোমার জন্য পানি নিয়ে আসি। শুরু থেকে বলছি পানি খাওয়ার কথা।
~ ঠিকাছে তবে ঠান্ডা পানি নিয়ে আসো।
~ হুম।
তোমরা কথা বলো আমি পানি নিয়ে আসি।

সাহিল দৌঁড়ে গিয়ে ফ্রিজ খুলে পানি বের করে গ্লাসে ঠেলে নিয়ে সাথে কিছু ফল কেটে ট্রেতে করে নিয়ে আসলো।
ট্রেটা রানার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো,
নাও পানিটা খেয়ে তারপর ফলগুলো খেয়ে নাও।
গলাটা শুকিয়ে পুরো কাঠ হয়ে আছে। প্রচন্ড গরম পরেছে আজ। চৈত্রের শেষে দিকে চলে এসেছে।

রানা পানিটা ঢকঢক করে খেয়ে নিলো যেনো পানিটা খেয়ে খুব সস্থি অনুভব করছে।
আমি তাকিয়ে দেখছি রানার পানির খাওয়ার দৃশ্য। দেখে মনে হয় কয়েক মাস হলো সে পানি খায়না।
মুখটা মুছে মাথাটা নিচু করে রয়েছে রানা।
~ একটা কথা বলবো?(সোনিয়া)

~ মুখটা তুলে তাকালো রানা। জ্বি ভাবী বলেন।
~ পার্সোনাল প্রশ্ন করতাম একটা।
~ আচ্ছা করুণ।
~ তানহাকে তো আপনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তাহলে হঠ্যাৎ কেনো এমনটা হলো বলুন তো!
খুব জানতে ইচ্ছা করছে।

~ ভাবী আজ তিন(৩) দিন ধরে আমি পানি ও মুখে দেইনি। তানহা প্রেগন্যান্ট ভাবী। যেদিন শুনতে পারলো ও প্রেগন্যান্ট সেদিন থেকেই বাচ্চাটা এর্বোশন করানোর জন্য উঠে পরে লেগেছে। তিনটা দিন আমার কত যে কষ্ট হয়েছে আপনাকে বুঝাতে পারবোনা। তানহাকে এই তিনদিনে এক ফোঁটা পানি ও খাওয়াতে পারিনি। তানহা খেয়েছে না আমি খেয়েছি।

ভাবী ওকে বিয়ে করে আমি একটুও শান্তিতে নেই। মানুষ না খেয়ে থাকলে ও শান্তিতে থাকে কিন্তু আমার সব আছে তবুও ঘরে শান্তি নেই।
আমার পরিবার আমাদের আজও মেনে নেয়নি ভাবী। তারা বলেছে যদি তানহাকে ডিভোর্স দিয়ে একা ওদের কাছে যাই তাহলে ওরা আমাকে মেনে নিবে। আমি কয়েকবার ই স্টেপ নিয়েছিলাম তানহার সাথে ডিভোর্সে যাবো কিন্তু সেদিন ওর প্রেগন্যান্সির ব্যাপারটা জানতে পেরে সিদ্ধান্ত চেইঞ্জ করতে বাধ্য হয়েছি।
ভেবেছি যদি এই মূহুর্তে ছেড়ে চলে যাই তাহলে আল্লাহ ও আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না।
রানা কথাগুলো বলছে আর কাঁদছে।

আপনি হাত মুখ ধুয়ে আসেন আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।
~ গলা দিয়ে আমার খাবার নামবেনা ভাবী। আপনি পারলে তানহাকে কিছু খাওয়ান তাতেই আমার পেট ভরে যাবে।
আমি দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিলাম আপনাকে সান্ত্বণা দেয়ার মত কোন ভাষা জানা নেই আমার। কী বলবো কিছুই বুঝতে পারছিনা।
শুধু এতটুকু বলবো, সেদিন তানহাকে আপনার বিয়ে করা উচিত হয়নি। আপনি কী জানতেন না যে তানহা বিবাহিত?
ওর দু’মাসের একটা সন্তান আছে।

রানা মাথাটা নিচু করে রাখে।
ভাবী আমি অন্যায় করেছি হয়তো এটাই আমার শাস্তি।
~ এবার জলদী উঠে হাত মুখ ধুয়ে আসুন আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।
~ ভাবী তানহা।
~ আপনি কোন চিন্তা করবেন না আমি তানহাকে নিয়ে আসছি।

সাহিল সোফার উপরে মুখ ভার করে বসে আছে।
এদিকে রানার মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায় রানা।
তাদের বিয়ের পরে এই প্রথম তার বাবা তাকে নিজে থেকে কল দিয়েছে। কতবার বাবাকে কল করেছি কিন্তু রাগ করে বাবা কল রিসিভ করেনি। করবেই বা কেনো এত যত্ন করে লালন পালন করে শেষমেষ যদি শোনে তার ছেলে একাএকা বিয়ে করেছেন। তা ও যদি মেনে নেয়ার মত হতো তাহলে ও ভুল করে হলেও মেনে নিত।
কিন্তু এমন একটা কাজ করেছি আমি যেটা কোন পরিবারের পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব না। অন্যের ঘরের বউকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছি। আরে দেশে কী মেয়ের অভাব পরেছে?

সব দিক থেকেই রানা আজ ভুল প্রমাণিত হলো। সমাজে মুখ দেখানোর মত পরিস্থিতে সে নেই।
না পারছে সহ্য করতে না পারছে গিলে ফেলতে।
ভয়ে ভয়ে কলটা রিসিভ করে।
আসসালামু আলাইকুম বাবা।

কেমন আছো?
~ ওয়ালাইকুম আসসালাম।
বাবা তুই এখন কোথায়?

তোর মা ভীষণ অসুস্থ? বাঁচবে কিনা আল্লাহই ভালো জানে। তোকে খুব দেখতে চাচ্ছে। বাবা আমি তোদের মেনে নিলাম বাবা। তুই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আয়। তুই আমার একমাত্র সন্তান। মরে গেলে খাটিয়াল ধরার মত তুই ছাড়া কেউ নেই বাবা।
তুই যা বলবি আমি তাই করবো। তবুও বাবা তুই বাড়িতে চলে আয়।

বাবার মুখে কথাটা শোনা মাত্রই মনটা খুশিতে ভরে গেলো। ঠিকাছে বাবা আমি আসছি।
~ আয় বাবা। তোর মা তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
কলটা কেটে দিয়ে কাঁদতে লাগলো রানা।
মা মা বলে চিৎকার দিয়ে কাঁদলো।

পর্ব ৭

রানা বসে বসে কাঁদছে।
~ রানা হাত মুখে ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। না হলে আমার বউ আবার রেগে যাবে।
সাহিলের দিকে তাকায় রানা।

তারপর বললো, ওয়াশরুমটা কোথায়?
~ সোজা গিয়ে ডান পাশে।
~ ধন্যবাদ।
রানা উঠে ওয়াশরুমে ঢুকলো।

আমি সানির কাছে গিয়ে দেখলাম তানহা বসে বসে কাঁদছে। কাঁদারই কথা কেউ জেনে শুনে যদি নিজের পায়ে নিজে কুঁড়াল মারে তাহলে তো আর কিছু বলার থাকেনা। আমার কয়েক মাসের বিয়েতে সাহিলকে আমি যতটুকু চিনেছি ওর মত মানুষ হয়না। আমাদের বিয়ের প্রায় দুমাস হয়ে গেছে আজ পর্যন্ত আমাকে টার্চ পর্যন্ত করেনি সে। তাহলে বুঝাই যায় মানুষটা কী ধরণের?

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি তানহাকে। ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম।
~ তানহা, রাত অনেক হয়েছে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে এসো আমি খাবার দিচ্ছি।
~ আমি খাবোনা। আমার খিদে নেই।
~ খাবোনা বললেই হবে নাকি? জলদী উঠো।

তানহা আর কোন কথা না বলে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
ওয়াশরুম কোথায়?
আমার সাথে আসো দেখিয়ে দিচ্ছি।
তানহা আমার পিছনে গেলো।
ওয়াশরুমে ঢুকে চোখে মুখে ভালো করে পানি ছিটিয়ে দিলো।

তারপর হাত মুখ মুছে বিছানার পাশে দাঁড়ালো।
~ তানহা সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।
আমার দিকে তাকিয়ে কোন উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমে গেলো।
টেবিলে সাহিল আর রানা বসে আছে। তানহা গিয়ে সাহিলে পাশের চেয়ারে বসতে নিলে আমি বাঁধ সাধলাম।

এখানে আমি বসবো। তুমি রানা ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসো। অনিচ্ছা শর্তে ও রানার পাশের চেয়ারে বসলো তানহা।
আমি প্লেটে প্লেটে খাবার বেরে দিয়ে সাহিলের পাশে বসলাম।
রানা মাথা নিচু করে বসে থাকে অনেকক্ষণ।
~ খাবার সামনে নিয়ে অপেক্ষা করতে নেই। জলদী খেতে থাকেন।

তানহা সাহিলের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে মেজাজটা বিগড়ে যাচ্ছে আমার। ইচ্ছা করছে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেই।
নিজেকে খুব কষ্টে সামলে নিয়ে খাওয়া আরম্ভ করলাম।
সবার খাওয়া হয়ে গেলে সোফার উপরে বসলো রানা আর সাহিল।
তানহা উঠে সানির রুমে গেলো।

~ মনে মনে খুব রাগ উঠলো। এই মেয়েকে আর সহ্য হচ্ছেনা। এখনো যাচ্ছেনা কেনো? অসহ্য লাগছে খুব।
এদিকে রকিং চেয়ারে বসে বসে সিগারেট টানছেন রানার বাবা। মনের ভিতরে এক বুক কষ্ট জমা হয়ে আছে তার।
ভাবছেন, রানা এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে যার জন্য সমাজে মুখ দেখানো দায় হয়ে পরেছে। সবাই ধিক্কার জানায়।

যদি ভিখারির মেয়েকে ও বিয়ে করতো তাহলে ও মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। কিন্তু সেটার ও কোন সুযোগ নেই। একেরপর এক সিগারেট ফুঁকছেন রানার বাবা।
আজ রানার মা তার একমাত্র ছেলেকে কাছে না পেয়ে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়ে অসুস্থ হয়ে পরেছেন। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো বেশীদিন বাঁচবে বলে মনে হয়না।
এতদিন নিজের জেদকে রক্ষা করতে গিয়ে রানার মাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি। আর পারছিনা এত কিছু সহ্য করতে। আর করার মত ক্ষমতা ও আমার নেই। আমার এত প্রোপার্টি কে খাবে?

যদি আমার ছেলেই না থাকে। মানুষের হায়াৎ কতদিন? আজ চোখ বন্ধ করলে মাটি দেয়ার মত ও কাউকে পাশে পাবোনা।
অফিসের ম্যানেজার রবি এসে বললো,
আংকেল আসবো?
~ হ্যাঁ রবি আসো। কিছু বলবে?

~ আংকেল, আপনি ঠিকমত অফিসে যাচ্ছেন না কেনো? অফিসের কাজ ও দেখাশুনা করছেন না। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে তো একসময় কোম্পানি বন্ধ করে দিতে হবে। মার্কেটে অনেক টাকা ঋণ জমে গেছে।
~ বাবা আমার এখন এসব নিয়ে কোন চিন্তা নেই। আমার ছেলেটা এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

~ রানাকে খবর দিয়েছেন অবশেষে? অনেক দেরী করে হলেও রানাকে যে ক্ষমা করেছেন এটাই অনেক কিছু।
~ হ্যাঁ বাবা, কী করবো বলো,
আমার একটা মাত্রই ছেলে। রানা ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
~ আংকেল। আমি তাহলে যাচ্ছি পরে আবার আসবো।

~ রবি তুমি ডিনার করেছো?
~ না, আংকেল। এখন রুমে গিয়ে রান্না করে তারপর খাবো।
~ তোমার রান্না করা লাগবেনা। আমি ও ডিনার করিনি। আসো দুজনে একসাথে ডিনার করি।
~ না আংকেল। আমি রান্না করে খেয়ে নিবো।

~ রানা আমি এখন তোমার অফিসের বস না। আমি তোমার চাচা হিসাবে আদেশ করছি এখন আমার সাথে ডিনার করবে।
~ ঠিকাছে।
তানহা সানির রুমে গিয়ে বসে আছে। বাসার যাবার কোন নাম ও নিচ্ছেনা।

আমি গিয়ে রানা ভাই আর সাহিলের সাথে সোফার উপরে বসলাম।
ভাবী তানহা কোথায়?
রাত তো অনেক হয়েছে।
বাসায় যেতে হবে।

ঘড়ির দিকে তাকালাম।
অনেক রাত হয়ে গেছে। পৌনে ১ টা বাজে। এতরাতে আপনি তানহাকে নিয়ে কীভাবে যাবেন? তাছাড়া তানহা তো এখন যাবে বলে মনে হয়না।
~ আপনার কথা ঠিকাছে কিন্তু আপনাদের বেশী ঝামেলা দিয়ে ফেললাম আজ। প্লিজ ক্ষমা করে দিবেন।
~ কী যে বলেন না। মানুষ তো মানুষের জন্যই। এখানে আপনাকে উপকার করতে পেরে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করছি।

করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে,
রানা আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। ভাবী আমি তানহাকে বড্ড ভালোবাসি। আমি ওর জন্য কী না করেছি। সারাটা দিন ওকে খুশি রাখার চেষ্টা করছি।
আমি তো ওর কাছে শুধু ভালোবাসাটাই চেয়েছি আর তো কিছু না। কিন্তু সেই ভালোবাসাটা ও আমার কপালে জুটল না।
মাঝেমাঝে নিজেকে রাস্তার কুকুর বিড়াল মনে হয়। কুকুরদের ও একটা মানবতা আছে। প্রভুর কথা মেনে চলে সব সময়।

কিন্তু তানহাকে আমি এত ভালোবাসি কিন্তু সেই ভালোবাসা ওর কাছে কোন মূল্য নেই।
আমার সব কিছু আছে কিন্তু আজ শুধুমাত্র ওর জন্য আমি নিঃস্ব। যার বাবার নিজস্ব কোম্পানি আছে যেখানে হাজার হাজার কর্মচারী কাজ করে আর আমি সেখানে পরের কোম্পানিতে কর্মচারী হিসাবে কাজ করি। ভাবলে ও কষ্টে বুকটা হাহাকার করে। তবুও যদি একটু ভালো থাকতে পারতাম। জানেন না ভাবী যেখানে আমার আত্মীয় স্বজন আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলার মত সাহস পেতো না এমনকি বন্ধু বান্ধবরা আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতো। কিন্তু আজ সেখানে সবাই আমাকে ঘৃণার চোখে দেখে। সব সময় আমাকে নিয়ে হাসি তামাশা করে।

বন্ধুরা ফোন করে বলে,
কী রে দোস্ত বিয়াত্ত আর এক বাচ্চার মায়ের সাথে ঘুমাতে কী মজা বেশী রে?
তাইলে বল না আমি ও এমন মেয়েকে আমার রক্ষিতা হিসাবে রেখে রাত কাটাবো। দেখবো কত্ত মজা রাত কাটাতে।
আর দোস্ত এদের নিয়ে রাত কাটাবো কিন্তু সংসার করবোনা। কারণ তোর মত আমি না।

তখন শরীর পুরো জ্বলে কিন্তু কী বলবো আমার কাছে জবাব দেয়ার মত উত্তর ছিলোনা। নিরবে শুনে যেতাম আর চোখের জল ফেলতাম।
কথাগুলো শুনে যখন ওর কাছে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য হাত বাড়াতাম তখন আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে এক বুক যন্ত্রণা উপকার দেয়।
তখন চোখ দিয়ে পানি পরতো কিন্তু সেই পানি দেখার মত কেউ থাকতোনা।

সারাদিন কষ্ট করে স্বামীরা বাসায় এলে বউয়েরা কত যত্ন করে। ভালোবেসে পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়ায় এটাই সব সময় শুনে এসেছি সবার মুখে।
কিন্তু তানহাকে বিয়ে করে ওর কাছ থেকে এমন কিছু আসা করাটাই বোকামি ছাড়া আর কিছুনা।
রানার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে আমার। চোখের কোণে পানি চলে এসেছে। তবুও কষ্ট করে রানাকে বেঝানোর চেষ্টা করলাম।
ভাই সবার জীবনে কী সুখ হয়?

দেখেন না কোটি কোটি টাকা আছে তবুও ঘরে একটা সন্তান নেই। একটা সন্তানের জন্য হাউমাউ করে কাঁদে কত পরিবার। আবার রিক্সা চালিয়ে সামান্য ইনকাম করে তবুও তাদের ঘরে শান্তির অভাব নেই।
আসলে ভাই সব হলো কাপল। কাপলে সুখ থাকলে এমনি আসে।
রানা মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলছে।

পর্ব ৮

সাহিল সোফার সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে।
আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। সাহিলের মনের ভিতরে কাল বৈশাখী ঝড় বইছে। বড়ই কষ্ট পাচ্ছে আজ।
বুঝতেছি কিন্তু তবুও কিছু করতে পারছিনা ওর জন্য।

রানা ভাইকে বললাম,
আপনি মন খারাপ না করে দেখেন তানহাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন কিনা!
কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।
তারপর খুব কষ্ট করে বললো,
আচ্ছা তানহা কোথায়?

যদি একটু বলেন।
~ আসুন আমার সাথে।
আমার সাথে করে রানা ভাইকে নিয়ে গেলাম তানহার কাছে।
তানহা সানির পাশে মাথা রেখে শুয়ে আছে।

আস্তে আস্তে রুমের ভিতরে ঢুকে বললাম,
ঐ তো তানহা। আপনি কথা বলুন। আমি সামনে আছি।
রানা গিয়ে বিছানার উপরে বসে তানহার গায়ে হাত রেখে ধীর গলায় ডাকলো,
তানহা।

~ নিশ্চুপ তানহা।
রানা আবার ও বললো,
তানহা অনেক রাত হয়েছে বাসায় চল।
রানার দিকে এক পলক তাকায়।

রাত অনেক হয়েছে তুমি সাহিলের সাথে ঘুমিয়ে পড়। কালকে সকালে বাসায় যাবো।
~ তানহা সাহিলের বাসায় এভাবে থাকতে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। বুঝতে পারছো না তুমি?
যাকে ছেড়ে রাতের আধারে আমার কাছে পালিয়ে গিয়েছিলে আর আজ তার সামনাসামনি হতে কী তোমার এতটুকু অনুশোচনা হচ্ছেনা।
আমার তো লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে সাহিলের আর ভাবীর দিকে তাকাতে।

তানহা তুমি কী কিছু বলবেনা?
~ রানা বেশী প্যানপ্যান করোনা। এসব আমার একদমই পছন্দ না। তুমি এখান থেকে যাও না হলে আমি রেগে গেলে কিন্তু খবর আছে।
~ ঠিকাছে। আমি এখন যাচ্ছি কিন্তু তুমি ও কান খুলে শুনে রাখ কাল সকালে আমার সাথে কিন্তু তোমার যেতে হবে।
তোমার কারণে আমি সব কিছু হারিয়েছি। তোমাকে এতদিন বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু তুমি কোন কিছুই বুঝতে চাচ্ছো না। তাই আমি ও আমার রাস্তায় চলবো।

তোমার গর্ভে যে আমার সন্তান তার জন্য তোমার সব অন্যায় আবদার এতদিন মেনে নিয়েছি কিন্তু এখন আর নিবোনা।
তানহা রাগান্বিত হয়ে শোয়া ছেড়ে উঠে বসে। রাগে চোখদুটো লাল হয়ে গেছে।
কী করবে আমাকে মারবে তুমি?
গায়ে হাত দিবে?

রিক্সাওয়াদের মত মারবে।
ঠিকাছে পারলে মারো। আমি ও তোমার শেষ দেখে ছাড়বো।
আর হ্যাঁ তোমাকে তো আমি ডিভোর্স দিতে বলেছি দিচ্ছোনা কেনো?
দাও।

কেনো আমার শরীরটা ছাড়া কী অন্য কারো শরীর পছন্দ হচ্ছেনা।
কী পেয়েছো আমার এই শরীরে?
কিচ্ছু নাই আমার শরীরে। এটা এখন শুধু জীবন্ত লাশ।
লাশ চিনো লাশ। আমি তো সেই কবেই মরে গেছি। এখন শুধু আমার এই শরীরটা আছে।

শরীরটাই তো দরকার তাই তো!
নাও এসো আর যেমনভাবে খুশি ভোগ করো। কিচ্ছু বলবোনা। কারণ তোমার তো আবার প্রতিদিন লাগে তাই না!
আজকে তো পাবেনা তাই চিন্তায় পড়ে গেছো। দাঁড়াও আমি তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

সাহিল, সাহিল।
বাহিরে দাঁড়িয়ে আমি সব কিছু শুনলাম। সাহিলকে ডাকলে আমি দৌড়ে ভিতরে গেলাম।
~ রানা ভাই কী হয়েছে?
কিছু লাগবে?

~ না ভাবী। চলুন আমরা বাহিরে যাই।
~ এই রানা ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছো বুঝি?
জলদী আসো সারারাত তোমাকে না হয়
দূরে আসার কারণে পরেরটুকু আর শুনতে পেলাম না আমরা।

রানা এসে সোফার উপরে বসলো।
হাত দিয়ে চোখ মুখ মুছে নিলো।
ভাবী
~ জ্বি বলেন।
~ তানহা কালকে সকালে যাবে বলেছে।

~ হুম।
~ আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে তানহাকে আমি আর জোর করবোনা। কালকে সকালে নিয়ে যাবো।
~ না ভাই। আপনি থাকেন তানহাকে নিয়ে। কালকে সকালেই চলে যেয়েন।
~ সাহিল তোমার তো কোন সমস্যা নেই।
রানার কথায় ঘুমের ঘোর কেটে কী কী বলে লাফিয়ে উঠে সাহিল।

কী হয়েছে রানা কোন সমস্যা?
~ স্যরি ভাই বুঝতে পারিনি যে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে।
~ সোনিয়া তুমি মায়ের রুমে ঘুমিয়ে পড়বে। আমি আর রানা সোফায় ঘুমিয়ে রাতটা পার করে দিবো।

~ আচ্ছা।
সাহিল তোমরা নিজের বাসা রেখে ভাড়া বাসায় থাকতেছো কেনো?
~ এমনি।
~ নিজেদের এত বড় বিশাল বাড়িটা রেখে ভাড়া বাসায় না থাকলে ও পারতে।
প্রতিমাসে শুধু শুধু কতগুলো টাকা ভাড়া দেয়া লাগছে।

~ তাহলে কী করতাম? ওখানে বসে বসে দমবন্ধ হয়ে মরে যেতাম।
তানহার সাথে জড়ানো সমস্ত স্মৃতি রয়ে গেছে ও বাড়িতে। যেখানেই তাকাতাম সেখানেই শুধু তানহাকেই দেখতাম।
আমি মরতে মরতে বেঁচে উঠলাম। অবশেষে মা আমাকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। যেখানে মায়ের কষ্ট হবে থাকতে তবুও আমার জন্য এই ভাড়া বাড়িতে চলে আসলো।

বিয়ে হওয়ার পর থেকেই মা তার শ্বশুড় বাড়িতে থাকতো শুধুমাত্র আমার সুখের জন্য বাসা ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।
~ বুঝলাম সাহিল। আমাকে তুমি মাফ করে দিও। আমারই দোষ। আমার যখন তানহাকে ভালো লাগে তখন সত্যি আমি জানতাম না যে তানহা বিবাহিত। আমাদের প্রায় ১ বছর সম্পর্ক ছিলো। আমার সাথে তানহার প্রথম ফেইজবুকে পরিচয় হয়। তারপর অল্প অল্প করে কথা বলতে বলতে কখন যেনো তানহার প্রেমে পড়ে যাই নিজের অজান্তে। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ফ্রেন্ডশীপ থেকে রিলেশনে জড়াই।
আমি তো বাহিরে থাকতাম তাই আমি জানতাম না যে তানহা বিবাহিত।

তানহা ও আমাকে কখনো বলেনি ও ম্যারেড।
যদি তখন জানতাম আমি কখনো এমন রিলেশনে জড়াতাম না।
একদিন হঠ্যাৎ করে বলে ও প্রেগন্যান্ট। তখন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি ফাঁকা হয়ে গেছিলো।
মনে হয়েছিলো আমি তাতে এখনি ঢুকে পড়ি।

কিন্তু আমি তানহকে এতবেশী ভালোবেসে ফেলেছিলাম যে ওকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব।
তারপর ওর বেবী হলো।
একদিন আমি তানহাকে বললাম চলো আমরা পালিয়ে যাই।
আর তানহা ও রাজি হয়ে যায়।

আর এটাই ছিলো আমার সব থেকে বড় ভুল আর পাপ কাজ। আমি এখন বুঝতে পারছি আমি কত বড় অন্যায় করেছি। আর তার শাস্তি হিসাবে এখন আমরা তোমারই বাসায়।
যার এত বড় ক্ষতি করলাম আজকে তার বাসায় এসেই আশ্রয় নিলাম। কথাগুলো বলতে বলতেই কেঁদে দিলো রানা।

সাহিল বললো, রানা প্লিজ এভাবে কাঁদবে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তানহা চলে যাওয়ার কারণে আল্লাহ আমাকে সোনিয়ার মত একজন লক্ষ্মী বউ দিয়েছেন।
সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা। তাই পিছনের কথা ভুলে যাও। দোয়া করি তানহাকে নিয়ে সুখি হও।
রানা অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পড়।
~ হুম।
~ সোনিয়া তুমি গিয়ে মায়ের রুমে শুয়ে পড়।

আমি চলে আসলাম মায়ের রুমে।
বিছানার উপরে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ তানহার কথাগুলো মনে পড়লো। খুব খারাপ লাগছে রানার জন্য। কিন্তু এটা রানার প্রাপ্য। কারণ সে ও সমান দোষে অপরাধী।

কথায় তো আছে কারো মনে কষ্ট দিয়ে কেউ সুখি হতে পারেনা।
রাত অনেক হয়ে গেছে।
বালিশের উপরে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ভোর হতেই বিছানা ছেড়ে নেমে সানির কাছে গেলাম।
তানহা সানিকে কোলে নিয়ে বসে আছে।

সানি ও খেলছে তানহার কোলের ভিতরে। যতই হোক মায়ের কোল বাচ্চারা ঠিকি চিনতে পারে।
সেখান থেকে এসে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে রান্না ঘরে ঢুকে শর্টকাট নাস্তা বানালাম।
নাস্তা বানানো শেষ হলে সাহিল আর রানাকে নাস্তা খেতে ডাকালাম।
তারপর গিয়ে তানহাকে ডাকলাম।

তানহা এসে টেবিলে বসলো।
আমি সানির কাছেই বসে থাকতাম।
একটুপরে তানহা এসে বললো,
সরো আমি সানির কাছে বসবো।
এবার আমার ভীষণ রাগ উঠলো।

রাগকে আর কন্টোল করতে পারলাম না।
নাস্তা করা হয়েছে?
~ হ্যাঁ। সরো তো বলছি।
~ যদি নাস্তা করা হয়ে থাকো তাহলে বাসায় চলে যাও।
~ আগে সরো তো বলছি।

~ একদম সরবোনা। রাত থেকে তোমার সব কথা মেনে নিয়েছি এবার সকাল হয়েছে তুমি তোমার স্বামীকে নিয়ে চলে যাও।
~ এখন যাবোনা। পরে যাবো।
~ তানহা একদম কোন কথা না বলে ভালো ভাবে বলছি আমার বাসা ছেড়ে চলে যাও। রাতে মানবতার কারণে থাকতে দিয়েছি বলে এখন আর এক মিনিট ও তোমাকে সহ্য করবোনা। তোমার মুখ দেখলেও লজ্জা লাগছেনা।

তানহা আমাকে সরিয়ে সানির পাশে বসতে নিলে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিলাম।
~ তুমি আমাকে ধাক্কা মারলে কোন সাহসে?
আমি এখান থেকে কোথায় ও যাবোনা। তুই এখান থেকে যা। সানি আমার সন্তান।

~ সানি তোর সন্তান ছিলো এখন আমার সন্তান। তুই তো রানার কাছে চলে গেছিলি আর তোর পেটে আরো একটা বাচ্চা আছে।
তাহলে যা গিয়ে তোর পেটের যে সন্তানটা আছে ওটাকে নিয়ে সুখে থাক। শুধু শুধু ঝামেলা পাকাচ্ছিস কেন?
রানা রানা।

তানহার ডাকে রানা দৌড়ে আসলো।
আমার ছেলেকে আমার কাছে দিয়ে ঐ মেয়েকে এ বাড়ি থেকে বের করে দাও।
পিছন থেকে সাহিল এসে রানার কাঁধে হাত রেখে বললো,
রানা তুমি যদি তোমার বউকে নিয়ে,
, কী বলেছি শুনেছো
তোমার বউকে নিয়ে যদি এখুনি এই মূহুর্তে এখান থেকে চলে না যাও তাহলে আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো।

রানা হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলো তারপর তানহাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো।
তানহা তো যেতে চাচ্ছেনা। খুব শক্ত করে এটা ওটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
রানা এবার তানহাকে কোলে নিয়ে দ্রুত গিয়ে গাড়িতে বসালো।

তারপর গাড়ি স্টার্ট দিলো।
তানহা কী মার টাই না মারছে রানাকে। হাত কাঁমড়ে ফুঁটো করে দিয়েছে। যেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে। গালে তো চড় থাপ্পর মারতেই লাগলো। চুল টেনে একবার নিচু করে আবার ঝাঁকাতে লাগলো।
তবুও রানা কোন কিছু বলছেনা গাড়ি দ্রুত টানছে।

পর্ব ৯

গাড়ি খুব জোড়ে জোড়ে টানছে রানা তবুও মনে হচ্ছে গাড়ির গতি খুব ধীর হয়ে গেছে। এদিকে হাউমাউ করে কাঁদছে তানহা। রানা তানহার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু ভয়েও সান্ত্বনা দিচ্ছেনা। কিছুদূর যাওয়ার পরে রানা গাড়িটা সাইড করে রাস্তার একপাশে রাখলো।
তানহাকে বুকে টেনে নিতে গেলে এবার হাত মুখ খামছে রক্ত বের করে দিলো রানার।

তবুও তানহাকে সান্ত্বনা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করছে রানা।
তানহার হাত যেনো থামছেই না। কিল ঘুষি সব মারতে থাকে রানার শরীরে।
শার্টের কলার টেনে ধরে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে বললো,
আমাকে নিয়ে এলে কেনো?

আমি সাহিলের কাছে যাবো। আমাকে এখনি সাহিলের বাসায় দিয়ে আসো। আমি তোমার সাথে থাকতে চাইনা। আমার সানিকে চাই। সানি আমার সন্তান। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবোনা।
দিশাবিশা না পেয়ে রানা তানহাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে তারপর গাড়ি থেকে নেমে দরজা আটকে দিলো।
গাড়ির দরজার সাথে পা ঠেকিয়ে মাথাটা হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

আর সহ্য হচ্ছেনা রানার। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। বুকের ভিতরটা ছটফট করছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
কাঁদতে পারলে ভালো হতো মনের কষ্ট আর যন্ত্রণাগুলো কিছুটা হলেও হালকা হতো।
তারপর জোড়ে চিৎকার করে কাঁদলো রানা।
কিছুক্ষণ পরে চোখ মুখে গাড়িতে বসলো। গাড়ি দ্রুত টেনে নিয়ে বাসায় এসে তানহাকে রুমে বসালো।
ফ্রিজ খুলে লেবুর শরবত করে তার ভিতরে
কয়েকটুকরা বরফ কুচি দিয়ে তানহার জন্য নিয়ে আসলো।

শরবতের গ্লাসটা তানহার মুখে কাছে ধরলো।
~ নাও প্রচন্ড গরম পড়েছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও দেখবে ভালো লাগবে।
~ রানা আমি কিচ্ছু খাবোনা। এগুলো সব নিয়ে যাও। আমি সাহিলের কাছে যাবো।
দীর্ঘ একটা কষ্টের নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার বললো, শরবতটা খেয়ে নাও।
~ বললাম না খাবোনা বলেই হাত থেকে গ্লাসটা ফেলে দিলো তানহা।

খুব রাগ হলো রানার। ধৈর্য্যের সবটুকু সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে তানহা।
তবুও নিজের রাগকে যতটা পারছে কন্টোল করে চোখ বন্ধ করে বললো,
তুমি কোন মুখ নিয়ে সাহিলের কাছে যেতে চাচ্ছো। তোমার কী একটু ও লজ্জা করছেন?
~ না। কীসের লজ্জা? আমি আমার স্বামীর কাছে যাবো তাতে আবার লজ্জা কীসের?
~ স্বামীর কাছে যাবে মানে?

সাহিল কী এখনো তোমার স্বামী আছে? সাহিলের সাথে তোমার ডিভোর্স হওয়ার পরেই তো তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। তাই বর্তমানে আমি তোমার স্বামী। আর সাহিল তোমার এক্স হাজবেন্ড।
~ আমি এসব ডিভোর্স মানি না। সাহিল আমার স্বামী এটাই সত্যি।

আমি সাহিলের কাছে যাবো প্লিজ আমাকে যেতে দাও।
~ কখনো যেতে দিবোনা। তোমার পেটে আমার সন্তান। আর তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী। তাই তুমি আমার সম্পত্তি। সাহিলের নাম তুমি ভুলে যাও। সাহিল এখন শুধুমাত্র তোমার অতীত আর কিছুনা।
~ না আমি এসব কিচ্ছু শুনতে চাইনা। সাহিল আমার স্বামী ছিলো এবং আছে।
রানা বুঝতে পারলো তানহা এখন স্বাভাবিক নেই। তাই এভাবে কথা বলাটা উচিত হবেনা। বিকালে মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তার দ্রুত ট্রিটমেন্ট করতে হবে।

রানা ড্রইং রুমে এসে তার বাবাকে কল দিলো।
আসসালামু আলাইকুম বাবা। কেমন আছেন?
~ আলহামদুলিল্লাহ। তুই কেমন আছিস? তোকে না বাসায় আসতে বললাম তাহলে আসলি না কেনো?

~ সন্ধ্যার পরে আসবো বাবা। তানহার শরীরটা বেশী ভালো না তাই বিকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। সেখান থেকে বাসায় যাবো এটা ভেবে রেখেছি।
~ তানহার নামটা শুনে মেজাজটাই গরম হয়ে গেলো রানার বাবার। এই নামটাই অভিশপ্ত একটা নাম। যে নামের সাথে অনেক কিছু জড়ানো আছে। নিজের ছেলেকে পর করে দিয়েছে এই নামের মানুষটা।

যে ছেলে কখনো আমার কথা ছাড়া কিছু করতো না। আজ সে ছেলে আমাকে দূরে রেখে একা থাকছে। কিছুতেই এসব মেনে নিতে পারছেনা রানার বাবা। যখন এই মেয়ে তার সামনে থেকে হাঁটা চলা করবে তখন কী করে এসব সহ্য করবে।
মোবাইলের ওপাশ থেকে রানার ডাকে হুশ ফিরে এসে বললো,
হ্যাঁ বাবা।

~ বাবা তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে আমি কত করে তোমাকে ডাকলাম।
~ নেট সমস্যা মনে হয়। আজকাল যা শুরু করেছেনা সীম কম্পোনিগুলো। শুধু মুখেই বলে নেটওয়ার্ক একদম ক্লিয়ার, সব জায়গায় আমরা।
আসলে ওসব শুধু মানুষকে দেখানো আর কিছুনা। দেখিস না দিনদিন সীম কোম্পানিগুলো তাদের কল রেট দিনদিন বাড়িয়ে চলেছে।
কিন্তু তবুও কথা ক্লিয়ার শুনা যায়না।
আচ্ছা বাবা তুমি তাহলে এখন রেস্ট নাও। সন্ধ্যার পরে দেখা হবে।

~ ঠিকাছে বাবা। তোর অপেক্ষায় থাকবো।
কলটা কেটে দিয়ে রকিং চেয়ারের সাথে মাথাটা হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লো রানার বাবা। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে সিগারেট বের মুখে নিয়ে লাইটার দিয়ে ধরালো।
জোড়ে জোড়ে সিগারেট টানছেন আর কান দিয়ে ধোঁয়া বের করছেন। ধোঁয়া দেখে মনে হচ্ছে এগুলো স্বাভাবিক ধোঁয়া না। যেনো সব কষ্টগুলো ধোঁয়ার সাথে বেরিয়ে আসছে।

রানা কথা বলা শেষ করে বেডরুমে আসলো। এসেই পুরো হতভম্ভ হয়ে গেলো, তানহা চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে ফ্যানের সিলিংয়ের সাথে ওড়না বাঁধছে।
মোবাইল টা হাত থেকে ফেলে দিয়ে দৌড়ে চেয়ার থেকে তানহাকে নামালো।
এই তানহা তুমি কী পাগল হয়ে গেছো?

কী করছো এসব?
~ রানা প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও আমি মরতে চাই। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছা করছেনা।
সাহিলকে না পেলে বেঁচে থেকে কোন লাভ নেই।
রানা তানহাকে বুঝানো খুব চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই তানহা বুঝার নামই নিচ্ছেনা।
এবার আর সহ্য করতে না পেরে তানহার গালে কয়েকটা থাপ্পর মারলো রানা।

তারপর,
কিছুক্ষণ চুপ করে অন্যদিকে ফিরলো রানা।
জ্ঞান ফিরে আসলো তানহার।
রানার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো।
রানা আমাকে ভুল বুঝনা আমার মাথায় কাজ করছেনা। প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দাও।

আমি একটু একা থাকতে চাই! প্লিজ একা থাকতে চাই বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে তানহা।
রানা দরজা আটকে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে সোফার পাশে ফ্লোরে বসলো।
দুপা মেলে দিয়ে সোফার পাশে বসে পড়ল রানা। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে গড়িয়ে গড়িয়ে। বসা ছেড়ে উঠে ড্রয়ার খুলে সিগারেট বের করলো। প্যাকেটসহ ছাদে উঠলো।
ছাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাচ্ছে।

ভাবছে যদি ছাদ থেকে লাফিয়ে নিজেকে শেষ করে দেই তাহলে আর এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হবেনা। তানহাকে বিয়ে করার পর থেকেই যেনো সব সুখ আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। মানুষকে দেখতাম ঘরে খাবার থাকতো না তবুও শান্তির অভাব ছিলোনা। কিন্তু আমার সব থেকেও আজ আমি নিঃস্ব। একবিন্দু ও সুখ নেই।
টাকা পয়সা দিয়ে কখনো সুখ পাওয়া যায়না। সিগারেট ধরিয়ে শুধু টানছে আর চোখের জল ফেলছে রানা।
এদিকে মনের ভিতরে স্বস্তি ফিরলো আমার। খুব ভালো লাগছে তানহা চলে যাওয়াতে। যতক্ষণ এখানে ছিলো মনে হয়েছিলো এখনি আমার সংসার ভেঙে দিবে। তানহাকে বিশ্বাস নেই। আর পুরুষ মানুষকে তো একদমই না।

পুরুষরা হলো সাপের থেকেও বিষাক্ত। সুযোগ বুঝে যখন খুশি কামড়ে দিতে পারে। সে আমার নিজের বাপ হলেও আমি একই কথা বলবো।
তানহা তার প্রথম স্ত্রী আর প্রথম ভালোবাসা। এত সহজেই প্রথম ভালোবাসা ভোলা যায়না।
সাহিল মুখে যতই বলুক তানহাকে সে সহ্য করতে পারেনা কিন্তু মনের ভিতরে একটু হলেও কষ্ট লাগে।
সব থেকে বড় কথা সেটা হলো তানহার সন্তান এবাড়িতে তাই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও সাহিল ওকে ক্ষমা করে দিতে পারে। আমাকে বিয়ে করেছে তবুও এটা কোন ব্যাপার ছিলোনা যদি সাহিল চায়।

হয়তো বা আমার ধারণা ভুল ও হতে পারে কিন্তু আমি কোন রিস্ক নিতে রাজি নই।
আমি #আমার_সংসারকে যেভাবেই হোক আগলে রাখবো।
কোন মেয়েই চাইবেনা তার সংসার ভেঙে যাক তেমনি আমিও চাইবোনা আমার সংসার ভাঙুক।

যেভাবেই হোক সন্তানসহ হলেও উনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। তাছাড়া এই বিয়ে নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই। সাহিল ব্যক্তি হিসাবে অনেক ভালো মনের একজন মানুষ। এর বেশী একজন স্ত্রী কী আসা করতে পারে। আমার উনার সাথে সংসার করতে কোন আপত্তি নেই।
সানি ঘুম থেকে উঠে কাঁদছে। দৌঁড়ে গিয়ে দুধ গরম করে নিয়ে এসে সানিকে খাইয়ে দিচ্ছি তখনি দরজায় কলিং বেল বাজলো।
ভাবলাম মা এসেছে মনে হয়। সমস্যা নেই সাহিল তো ড্রইং রুমেই আছে সে খুলে দিবে।

সাহিল গিয়ে দরজা খুললো।
মা, তুমি এত দেরী করে এলে যে?
~ আরে বলিস না বাবা, রাস্তায় কোন রিক্সা পাইনি তাই হেঁটে হেঁটে আসা লাগছে।
~ কী বলো মা? এই গরমের ভিতরে তুমি হেঁটে এসেছো?

এটা কিন্তু একদম ঠিক করোনি। আমাকে কল করতে আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম।
~ তোকে এতটা কষ্ট দিতে চাইনি বাবা। এমনিতেই তুই অনেক কষ্ট পেয়েছিস।
সাহিল সোনিয়া কোথায়?
তোরা কী নাস্তা খেয়েছিস?

~ হ্যাঁ মা। আর সোনিয়া রুমেই আছে। যাও গিয়ে দেখে আসো।
কী রে সাহিল বাসায় কেউ কী এসেছিলো?
~ গলার ভিতরে ঢোক গিললো সাহিল।
বলার জন্য মুখ খুলবে তখনি ভিতর থেকে আমি বেরিয়ে এসে বললাম।

না মা কে আসবে? আমরাই তো।
~ তাহলে বেসিনের উপরে এতগুলো প্লেট কেন?
~ মা, রাতে খাওয়ার পরে প্লেট ধুয়ে রাখতে মনে ছিলোনা। আর সকালে নতুন প্লেটে খেয়েছি তাই এতগুলো জমে গিয়েছে। আপনি একটু সানিকে সামলান আমি সব ধুয়ে দিচ্ছি।

~ ঠিকাছে।
মা সানির রুমে চলে গেলো।
~ সাহিল আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে।
~ আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?
~ তুমি মায়ের সাথে মিথ্যে বলেছো কেনো?
~ মিথ্যে বলবোনা তাহলে কী সত্যি বলবো?

আপনার কী আক্কেল জ্ঞানের অভাব পড়েছে নাকি?
মা যদি জানতে পারে তানহা এখানে এসেছিলো আর রাতে ও এখানে ছিলো তাহলে কী হবে একবার ভাবেন তো?
সাহিল মুখ ভার করে চেয়ারের উপরে বসে পড়লো।

তারপর বললো,
মাকে সত্যিটা বলোনি ঠিকাছে কিন্তু যখন সে সত্যিটা জানবে যে, তুমি তাকে মিথ্যা বলেছো তখন তোমার প্রতি সব আস্তা একেবারে উঠে যাবে তার।
বুঝতে পারছো আমি কী বলছি?
সোনিয়া আমার মনে হয় মাকে সত্যিটা বলা উচিত ছিলো?

পর্ব ১০

সাহিল রুমে চলে গেলো।
আমি ও মায়ের কাছে গেলাম। মা সানিকে কোলে নিয়ে আদর করছে। আমাকে দেখে বললো,
কাল রাতে সানি তোকে শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি তাই না!
~ দিয়েছেতো। রাতে তো সানি একবার ও ঘুম থেকে উঠেনি।

আর একটু ও বিরক্ত করেনি।
মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো,
তাহলে তোর চোখ লাল হয়ে আছে কেন? দেখে তো মনে হয় তুই সারারাত জেগে ছিলি।
সোনিয়া সত্যি করে বলতো সানি যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে কে তোকে ঘুমাতে দেয়নি।

~ মা আসলে
~ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মা বললো,
তাহলে কী ছেলের বাপ জ্বালিয়েছে।
ছেলের বাপের কথা শুনে তো লজ্জায় আমি শেষ হয়ে গেলাম।

আমতা আমতা করতেই মা বলে উঠলো যা হয়েছে বুঝতে পারছি আমাকে আর বলা লাগবেনা। এবার আমার জন্য কড়া লিকার দিয়ে এক কাপ দুধ চা করে নিয়ে আয়।
~ মা আপনি যা ভাবছেন তেমন কিছুনা বলতেই আমার পাশে এসে সাহিল দাঁড়ালো।

~ সাহিল কিছু বলবি।
~ মা বলছিলাম কী কয়েক মাসই তো হলো আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকছি। তাহলে চলো না আমরা আমাদের নিজের বাসায় যাই। ভাড়া বাড়িতে থাকতে ভালো লাগছেনা।
~ তোর জন্যই তো ভাড়া বাসায় এলাম। তাহলে আজ হঠ্যাৎ করে নিজের বাসায় যাওয়ার কথা বললি যে?
~ আসলে মা নিজের বাড়িতে থাকার অনুভূতিটাই অন্য রকম। ভালো লাগে নিজের বাসায় থাকতে। মা প্লিজ নিজের বাসায় চলোনা।
~ ঠিকাছে। আগামী মাসে যাবো।

~ এই তো আমার লক্ষ্মী মা।
আমি রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পিছন থেকে সাহিল বলে উঠলো আমার জন্য ও এক কাপ চা করে এনো।
মাথাটা উপর নিচ ঝাকিয়ে দৌড়ে রান্না ঘরে গেলাম।
চায়ের পাতিল চুলোয় দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি এক সাইড করে। বুকটা ধরফর ধরফর করছে।
লজ্জায় তো কুকড়ে যাচ্ছি আমি।

মা কী বুঝাতে চেয়েছে?
ওহ্ ভাবলেও মনের ভিতরে দোলা দিয়ে যায়।
ছেলের বাপ তো আমাকে জ্বালায়নি। যদি এমনটা হতো তাহলে তো নাচতে থাকতাম আমি।
চায়ের পানি ফুটে এলে চা~ পাতা দিয়ে কড়া লিকার দিয়ে দু’কাপ চা বানিয়ে মগে করে নিয়ে গেলাম মায়ের কাছে।
রুমে ঢুকে মায়ের হাতে একটা মগ দিয়ে তারপর সাহিলের হাতে আরেকটা মগ দিলাম।

চায়ের মগে চুমুক দিয়ে বললো,
সোনিয়া চা খুব ভালো হয়েছে।
অনেকদিন পর এত ভালো চা খেতে পেলাম।
~ আসলেই মা দারুণ হয়েছে। (সাহিল)

মা তাহলে আপনারা কথা বলেন আমি রান্না ঘরে যাচ্ছি।
সোনিয়া দুপুরে কী রান্না করবি ঠিক করেছিস?
~ না মা।
~ অনেকদিন হয়ে গেলো বাসায় ভালো মন্দ কিছু রান্না করা হয়না।

তাই বলছিলাম কী যদি একটু রেস্টুরেন্ট টাইপের খাবার রান্না করতি তাহলে মনে হয় ভালো হতো।
~ ঠিকাছে মা বুঝছি। আমাকে আর বুঝাতে হবেনা আমি নিজের মত করে রান্না করছি। আপনি সানিকে সামলান আমি যাচ্ছি।
~ হুম যা।

রান্না ঘরে গেলাম। কী রান্না করবো ভাবছি। ফ্রিজ খুলে গরুর গোশত, মুরগীর গোশত, ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ বের করে পানিতে ভিজালাম।
সব ধরণের মসলা বিলিন্ডার করে বাটিতে রেখে তারপর পিয়াজ কুঁচি আর কাঁচামরিচ ফালি করে রাখলাম।
পিয়াজ তেলে ভেজে তারপর পোলাউ বসিয়ে পরিমাণ মত পানি দিয়ে ঢেকে দিলাম। পাশের চুলায় মুরগি ভেজে রোস্ট করলাম।
ইলিশ মাছ ভাজি করে টেবিলে রাখলাম। তারপর গোল গোল করে বেগুন তেলে ভাজলাম। পোলাউয়ের সাথে ভালো লাগার মত একটা খাবার।
চিংড়ি মাছ ভেজে মসলা দিলাম।
সব রান্না কম্পিলিট করে টেবিলে সাজালাম।

শসা, টমেটো, পিয়াজ, কাঁচামরিচ কেটে বাটিতে রাখলাম।
আলমারী খুলে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকলাম।
অনেকদিন শ্যাম্পু করিনি।
তাই এক ঘন্টা ধরে শাওয়ার নিয়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলাম। দরজাটা খুলে বাহিরে পা রাখতেই দেখি সাহিল দাঁড়িয়ে আছে।
সাহিলকে দেখে কিছুটা ভয় পাবার মত চমকে উঠি।

~ আপনি,
~ সাহিল কিছুটা পিছনে সরে দাঁড়িয়ে আড়চোখে আমাকে দেখছে।
গলার ভিতরে ঢোক গিলে বললো, হ্যাঁ আমি।
তুমি যে ওয়াশরুমে আছো আমি তো বুঝতে পারিনি। আমি শাওয়ার নেয়ার জন্য দরজার কাছে এসেছি।
~ হুম। আচ্ছা তাহলে সাইড করেন আমি ভিতরে ঢুকবো।

~ আমি তো সাইড করে দাঁড়িয়ে আছি।
~ আরো সাইড করেন।
~ ঠিকাছে। সাহিল আরেকটু সাইড করে দাঁড়ায়। আমি ভিতরে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোপা থেকে টাওয়ালটা খুলে নিয়ে চুলগুলো ঝারতে থাকি। আয়নার দিকে চোখ পড়লো। দেখি সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তাড়াতাড়ি বেলকুনিতে গেলাম।

টাওয়ালটা শুকাতে দিয়ে আবার রুমে আসলাম। রুমে ঢুকে দেখি সাহিল ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
আস্তে আস্তে বিছানায় উপরে বসলাম।
~ আপনি গোসলে যাননি।
~ কল্পনার রাজ্য থেকে বেড়িয়ে আসলো সাহিল,
হ্যাঁ যাচ্ছি। সোনিয়া তোমাকে না আজ খুব ভাল্লাগছে।

কথাটা বলেই সাহিল ওয়াশরুমে ঢুকলো।
~ আমি তো পুরাই শকড হলাম। কী বললো সে?
আমাকে ভাল্লাগছে! এভাবে বলবে এটা কখনো আসা করিনি।
মনের ভিতরে এই কথাটা বারবার ভাবতে থাকি।

প্রায় ত্রিশ মিনিট পরে শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে আসলো সাহিল।
সোনিয়া রান্না কী হয়েছে? ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার।
~ হ্যাঁ হয়েছে। আপনি টেবিলে গিয়ে বসেন আমি মাকে ডেকে আনছি।
মাকে ডেকে টেবিলে আনলাম। আমার কোলে সানি।

টেবিলে বসতেই মা বললো,
সোনিয়া খাবারের গন্ধেই তো আমার পেট ভরে যাচ্ছে না জানি খেতে কত টেস্ট হবে।
আমি খাবার বেড়ে দিতে নিলে সাহিল বাঁধ সাধলো।
সোনিয়া তুমি সানিকে নিয়ে থাকো।

আমরা নিজেরা নিয়ে খাচ্ছি।
~ না থাক আমি বেড়ে দিচ্ছি।
~ একটা কথা ও বলবেনা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।

~ সোনিয়া সাহিল যা বলছে তাই শোন।
~ ঠিকাছে মা।
সাহিল মায়ের প্লেটে খাবার বেড়ে দিলো।
খাবারের আইটেম দেখে মা তো পুরোই অবাক।

সোনিয়া এত কিছু তুই কী করে করলি! তা ও আবার একাএকা রান্না। বুঝতে পারছিনা সেটা ও এত সংক্ষিপ্ত সময়ে। আমাকে ডাক দিতে ও তো পারতি। এই গরমে একা একা রান্না করা যে কতটা কষ্টের সেটা আমার থেকে কেউ জানেনা।
~ সোনিয়া বলনা আমাকে কেনো ডাকলি না।
~ মা কোন সমস্যা হয়নি। আমি একাই পেরেছি। যদি সমস্যা হতো আপনাকে অবশ্যই জানাতাম।
~ হুম। তোকে আমার খুব মারতে ইচ্ছা করছে। কোন সমস্যা হয়নি বলায়।

মা খেয়ে নিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবেনা। আর আপনি সালাদটা একটু বিট লবন দিয়ে মাখিয়ে নিন তাহলে আরো ভালো লাগবে খেতে।
~ তা ঠিক বলেছিস। মা বিট লবন দিয়ে সালাদ মেখে নিলো।
মা এক লোকমা মুখে তুলে দিয়েই বললো, মাসআল্লাহ সোনিয়া খাবারটা তো বেশ হয়েছে। তুই তো ভালো রান্না করতে পারিস। একদম রেস্টুরেন্ট টাইপের মত।
সাহিল মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে কোন কথা বলছেনা।

~ কী রে সাহিল তুই তো খেয়েই যাচ্ছিস। সোনিয়া যে এত ভালো করে খাবার রান্না করলো তার তো কোন প্রশংসাই করছিস না।
রান্না কী তোর পছন্দ হয়নি?
~ কী যে বলোনা মা। অনেক ভালো হয়েছে তাই তো চুপচাপ খাচ্ছি। খাওয়ার সময় কথা বললে বেশী খাওয়া যায়না। তাই আস্তে আস্তে খেতে হয় যাতে বেশী করে খাওয়া যায়। তবে মা সোনিয়াকে একটা রেস্টুরেন্ট খুলে দিলে কেমন হয় বলতো?
অনেক কাস্টমার আসবে খেতে।

~ যাক। ভালোই হলো আমার ছেলের ও মন জয় করতে পারলি অবশেষে।
সাহিল এক লোকমা মুখে তুলতে যাবে তখনি থমকে গেলো মায়ের কথা শুনে।
~ কী রে সাহিল খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো যে?

আমি কী কিছু ভুল বললাম। তোর তো রেস্টুরেন্ট টাইপের খাবার অনেক পছন্দ। আর সোনিয়ার সবগুলো আইটেমই দারুণ হয়েছে।
~ মা এত প্রশংসা করোনা তোমার বউমা শেষে ফেটে যাবে।
~ আমি ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকালাম।
খাওয়া শেষ করে সাহিল বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে রুমে যেতে নিলে মা ডাক দিলো।

বাবা সানিকে নিয়ে যা। সোনিয়া খাওয়া শেষ করে আসতেছে।
~ ঠিকাছে মা। সাহিল মায়ের কোল থেকে সানিকে নিয়ে রুমে গেলো।
সোনিয়া আমার পাশে বস।
আমি মায়ের পাশে চেয়ার টেনে বসলাম।
আমি প্লেট নিয়ে খাবার বাড়তে নিলে মা বাঁধ সাধলো।

তারপর মা খাবার মেখে আমাকে খাইয়ে দিলো।
আমি অবাক হয়ে খেতে লাগলাম।
মা আর না! আমি আর খেতে পারবোনা।
~ খেতে পারবোনা বললেই হলো, তুই হা কর আমি খাইয়ে দিচ্ছি তুই শুধু খেয়ে ফেল। তুই খাবার এত মেপে মেপে খাস বলেই তো এত শুকনা।
তুই এখন থেকে আমার সামনে বসে খাবি। আমি দেখবো তুই এত কম খেয়ে কী করে থাকিস বলেই হেসে ফেলে মা।

আমার ও খুব ভালো লাগলো মায়ের মুখের হাসিটা। চোখ দিয়ে পানি পড়লো। হঠ্যাৎ নিজের মায়ের কথা মনে পড়লো খুব।
মা চোখে পানি দেখার আগেই আমি
চোখ মুছে ফেললাম।

খাওয়ানো শেষ করে মা মুখ মুছে দিয়ে বললো,
সোনিয়া এখন গিয়ে বিশ্রাম নে। পারলে ঘুম দে। আমি সানিকে দেখছি।
মাকে যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।

পর্ব ১১

ডাইনিং টেবিল ছেড়ে রুমে গিয়ে চেয়ারে বসলাম। প্রচন্ড পরিমাণে গরম। মাথার উপরে ফ্যান চলছে তবুও মাথা বেয়ে তরতর করে ঘাম পড়ছে। সাহিল বিছানার উপরে আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে শুয়ে মোবাইল টিপতেছে।
আমি জানালার পাশে দাঁড়ালাম। বাহিরে রৌদ্রের প্রখর তাপ। তাকানো যাচ্ছেনা। তবুও এক ধ্যানে তাকিয়ে আছি।
~ সোনিয়া,
~ জ্বি।

~ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বাহিরে তো অনেক রোদ।
তুমি বিছানার উপরে এসে ফ্যানের নিচে বসো। কারেন্ট নেই যার কারণে এসি অন করতে পারছিনা।
শুধু আই পি এস চলছে।
~ সমস্যা নেই।

~ সমস্যা নেই বললেই হবে তুমি এখানে আসো।
বারবার সাহিল ডাকার কারণে আমি
জানালার পাশে দাঁড়াতে পারলাম না।
বিছানার উপরে এসে এক কোণে বসলাম।

~ এভাবে বসে না থেকে শুয়ে পড়। আর দেখো ঘুমাতে পারো কিনা!
~ আপনি ঘুমিয়ে পড়েন। আমি সানির কাছে যাচ্ছি।
~ সানি মায়ের কাছে থাকবে তুমি রুমে আসার আগ মূহুর্তে মা সানিকে নিয়ে তার রুমে চলে গেছে। যাওয়ার সময় বলে গেলো সানি তার কাছে থাকবে।
আর যেতে যেতে বলে গেছে তোমাকে ঘুমাতে।

আমি যেনো কোনমতে তোমাকে না জ্বালাই।
~ আচ্ছা সোনিয়া, মা এভাবে কেনো বললো যে, আমি যেনো তোমাকে না জ্বালাই। তুমি কী মাকে কিছু বলেছো?
সাহিলের কথা শুনে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছিলো।
ইয়ে মানে বলছিলাম কী?

~ হুম বলো।
~ মা অন্য কিছু ভাবছে তাই এমন কথা বলছে।
~ অন্যকিছু মানে? মা কী ভেবেছে?
~ জানিনা। আমি এখন ঘুমাবো। আপনি চুপ করে থাকেন। যদি ঘুমাতে না পারি তাহলে কিন্তু মায়ের কাছে নালিশ করবো। আর বলবো আপনার ছেলে আমাকে জ্বালায়।

~ বাহ্ রে। তুমি এভাবে বলো কেন?
আমি কী কোন অন্যায় করেছি?
শুধু জানতে চেয়েছি মা ঐ কথা বললো কেনো?
~ নিশ্চুপ আমি।

সোনিয়া, সোনিয়া।
~ আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি মায়ের কাছে যাবো।
~ আচ্ছা শোনো। আমি আর কিছু বলবোনা। তুমি ঘুমাও।
~ মুখ চেপে ধরে হাসলাম। আচ্ছা ধন্যবাদ।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো।
ঘুম ঘুম চোখে তাকালাম। মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছে। বাহিরে খুব বাতাস হচ্ছে। সাথে মেঘ করে আছে।
ধীরে ধীরে উঠে বিছানার উপরে বসলাম। মাথার একপাশে চিনচিন করে ব্যাথা করছে।
আহ্ উহ্ করছি ব্যাথায়। চোখে এখনো ঘুমের লাই। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে আবার ও ঘুমাই। ভাবতেই শুয়ে পড়লাম বালিশের উপরে।
সাহিল রুমে এসে লাইন জ্বালালো।

সোনিয়া সন্ধ্যা হয়ে এসেছে উঠবেনা।
আমি অন্যপাশে কাৎ হয়ে শুয়ে আছি।
আড়মোড়া দিয়ে সাহিলের দিকে তাকালাম।
সাহিলের দু’হাতে দুটো মগ। কিছুটা চমকে উঠলাম।

~ তারপর শোয়া থেকে উঠে বসলাম।
~ যাও হাত মুখ জলদী ধুয়ে এসো আমি কফি বানিয়ে এনেছি।
~ ঠিকাছে। কিন্তু আপনি বানাতে গেলেন কেনো আমাকে বলতেন আমি বানিয়ে নিয়ো আসতাম।
~ আমি বুঝি বানাতে পারিনা। আগে যাও তারপর এসে কফি খেতে খেতে কথা বলবে।
~ হুম।

বিছানা দিয়ে নেমে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। চোখে মুখে পানি ছিটয়ে কুলি করে বেরিয়ে আসলাম।
চোখে এখনো ঘুম।
একরাত না ঘুমালে সারাদিন ঘুমালে ও সেই রাতের ঘুমের সমান হয়না।
রাতের ঘুম ছয় ঘন্টা ঘুমালেই যথেষ্ঠ।
দিনের ঘুম বারো ঘন্টা ঘুমালে ও মনে হয় ঘুমাইনি।

ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে দেখি সাহিল টাওয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টাওয়ালটা নিয়ে হাত মুখ মুছে টেবিলের উপরে বসলাম।
সাহিল কফির মগটা এগিয়ে দিলো।

নাও গরম গরম কফিটা খেয়ে নাও।
মগে চুমুক দিতে দিতে ঘুমের ঘোর অনেকটা কাটলো।
কফিটা প্রায় শেষের দিকে। পুরো এক মগ ভর্তি করে বানিয়েছে সাহিল।
মগটা টেবিলে উপরে রাখলাম।
সানি কী ঘুম থেকে উঠেছে?

~ সানি অনেক আগেই উঠেছে মা রয়েছে সানির কাছে।
তোমার চিন্তা করা লাগবেনা। তুমি রেস্ট করো।
মগ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাহিল বললো,
তোমার চোখে তো এখনো ঘুম দেখছি। আবার তাহলে আরেকবার ঘুম দাও।

~ সাহিলের দিকে তাকিয়ে বললাম,
এখন যদি ঘুমাই তাহলে আর রাতে ঘুমাতে পারবোনা।
একটু হাঁটাহাঁটি করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
~ বেশ তাহলে তাই করো।

সাহিল বেরিয়ে গেলে আমি বিছানা থেকে নামলাম।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে রানীর নাম্বারে কল করলাম। রানী আমার ছোটবেলার বান্ধবী। আমার বিয়ের পরে রানীর সাথে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। ভীষণ রাগ করেছে আমার সাথে।
~ হ্যালো রানীদোস্ত কেমন আছিস? জানি তুই আমার উপরে অনেক রেগে আছিস। প্লিজ আমার সাথে একটু কথা বল।
~ আপনি কে?
~ আমি তোর মা।

~ এটা কী ধরণের কথা? কে বলছেন?
~ রানী এবার কিন্তু মেজাজ খারাপ হবে তুই আমার নাম্বার চিনিস না।
~ আমি রানী না।

~ ‘দেখ রানী মজা করার একটা লিমিট আছে। মানলাম বিয়ের পরে তোর সাথে আমি যোগাযোগ করতে পারিনি। তাই বলে তুই এভাবে কথা বলবি। তোর কথা শুনে তো মনে হচ্ছে তুই আমাকে চিনিসই না। বাপের জন্মেও আমার নাম্বারে কল করিসনি।
~ আপনি কোথায় ও ভুল করছেন আমি রানী না। আমি তুবা।
~ শোন রানী আমি কলটা রাখছি। কালকে আমি তোর বাসায় আসতেছি। সামনাসামনি এসে তোর কান ছিঁড়ে ফেলবো। আমার সাথে মজা করার ফল কালকে টের পাবি।

মাত্র তো কয়েক ঘন্টার ব্যাপার বলেই কলটা কেটে দিলাম।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৭৩০ বাজে। এদিকে আকাশের অবস্থা তেমন ভালোনা।
মায়ের রুমে ঢুকলাম। মা সানির পাশে বসে আছে।
~ মা আসবো।

~ আয়।
~ সানি ঘুমিয়ে পড়েছে আবার।
~ হুম। খিদা লেগেছিলো তাই উঠছিলো। দুধ বানিয়ে খাইয়ে দিলাম। এরপর নিজেই ঘুমিয়ে পড়লো।
~ ‘হুম। আবার উঠলে আমাকে ডাক দিয়েন। সানিকে আমার রুমে নিয়ে যাবো।
~ আগে বল, তোর শরীর কেমন এখন?
~ আলহামদুলিল্লাহ।

~ তাহলে সানিকে তোর রুমে নিয়ে যাওয়া লাগবেনা। কয়েকদিন আমার কাছে থাক তুই পুরোপুরি সুস্থ হও তারপর নিস।
~ আমি তো পুরোই সুস্থ মা।
~ হুমম। তুই পুরোপুরি সুস্থ না। সবার চোখ ফাঁকি দিতে পারবি কিন্তু মায়ের চোখ না। বুঝতে পারছিস।
~ ঠিকাছে মা। আপনি যা বলবেন তাই হবে।
~ হুম। সানির ঘুম ভাঙলে তোকে ডাক দিবো।

~ আচ্ছা।
রাত ১০ টায় মা সানিকে নিয়ে রুমে আসলো।
সোনিয়া সানি উঠে গেছে তাই তোর কাছে নিয়ে আসলাম।
~ সানিকে দেখে মায়ের কাছ থেকে কোলে নিলাম। কপালে চুমো খেলাম। আব্বু তুমি এসেছো?
সানি কোলের ভিতরে হাত পা নড়ে চড়ে হাসছে আর খেলছে।

সানির হাসি দেখে মনটা ভিষণ খুশিতে ভরে গেলো।
সোনিয়া সানিকে তোর কাছে কিছুক্ষণ রাখ আমি পরে এসে নিয়ে যাবো।
~ মা, আজকে রাতটা আমার কাছে থাক। আমি এখন ঠিকাছি।

~ মা হাসিমাখা মুখে বললো,
আমি জানতাম তুই সানিকে পেলে এমন কথাই বলবি। খুব ভালো লাগছে তুই সানিকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিয়েছিস। বুঝতে পারিনি তুই এত তাড়াতাড়ি সানিকে নিজের করে নিবি। আসলেই তুই খুব ভালো একটা মেয়ে। আমি সারাজীবন তোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো মা।
~ মা এভাবে বলবেন না প্লিজ। তাহলো নিজেকে ছোট মনে হয়। সানি তো আমার সন্তান তাহলে এমন করে বলছেন কেনো?
আপনি চাইলে আমি কখনো সন্তান নিবোনা।

~ সোনিয়া এতক্ষণ যা বলেছিস সব ভালো ছিলো কিন্তু এখন যেটা বললি সেটা মেনে নিতে পারলাম না।
সোনিয়া একটা মেয়ের জীবনে সব থেকে দামী জিনিস কী জানিস?
নিজের সন্তান। তুই এখন বলতে পারিস সানি তো তোর সন্তান। হ্যাঁ আমি তো মানছি সানিকে তুই তোর সন্তান হিসাবে মেনে নিয়েছিস। কিন্তু তাই বলে নিজে সন্তান নিবিনা এটা হতে পারেনা।

অবশ্যই নিতে হবে। কারণ প্রতিটি মেয়েরই এটা একটা স্বপ্ন থাকে যে সে ও মা হবে। তাই আমি যেটা বলছি সেটা শুনে রাখ। আগামী বছর আমি যেনো দাদীর মুখ দেখতে পারি সেই ব্যবস্থা কর কেমন।
~ মায়ের কথা শুনে আমার হা করা মুখটা বন্ধ হয়ে গেলো।

বলার মত কিছু খুঁজে পেলাম না।
দরজার সামনে চোখ পড়তেই দেখি সাহিল দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে তো এবার আমি আরো বেশী লাজুক হয়ে গেলাম। সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সরে গেলো।
আমার ও একটু আধটু লজ্জা লাগলো।
সোনিয়া সানি ঘুমিয়ে পড়লে খেয়ে নিস। না হলে শরীর খারাপ করবে। বেশী রাত করে খাওয়া ঠিক নয়।
~ আচ্ছা মা।

মা চলে গেলে আমি সানির পাশে বসি। সানি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত ও কম হয়নি প্রায় এগারোটা ছুঁই ছুঁই। আজ কেনো জানি মনের ভিতরে ভালোলাগা দোলা দিয়ে যাচ্ছে। বাহিরে এখনো বাতাস বইছে। যতই সময় গড়াচ্ছে বৃষ্টি আরো জোড়ে জোড়ে পড়ছে। জানালা দিয়ে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকছে। ফ্যানের বাতাস যেনো গায়ে লাগছেন। বাহিরের বাতাস অনুভব করছি খুব।
সানির গায়ে কাঁথা দিয়ে দিলাম। আমার ও ভালোই ঠান্ডা লাগছে।
সানিকে শুইয়ে দিয়ে কয়েল জ্বালিয়ে ফ্যানের পাওয়ার কমিয়ে দিয়ে জানালা আটকে দিলাম।

সাহিল রুমে আসলো।
সোনিয়া খুদা পেয়েছে খেতে দাও।
~ হুম। আপনি টেবিলে গিয়ে বসুন আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।
~ সানি তো ঘুমিয়ে গেছে তাই তুমি খাবার রুমে নিয়ে এসো দুজনে রুমে বসে খাই। সানিকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবেনা।
~ আচ্ছা।

আপনি সানির পাশে বসুন আমি এখনি যাবো আর আসবো।
~ যাও।
রান্না ঘরে গিয়ে দুপুরে খাওয়ার পরে অবশিষ্ট খাবার গরম করলাম।
ট্রেতে করে গরম করা খাবার নিয়ে আসলাম।

রুমে ঢুকে খাবারের ট্রেটা ছোট টেবিলের উপরে রাখতেই সাহিল বললো, সোনিয়া এত দেরী হলো যে?
~ আমার না খেয়াল ছিলোনা যে পোলাউ আর গোশত গরম করতে হবে। তাই খাবারগুলো গরম করতে যেয়ে দেরী হয়ে গেলো।
~ ঠিকাছে। মা কে খেতে বলেছো।

~ এখানে নিয়ে আসার আগে মায়ের খাবার তাকে দিয়ে আসলাম। তারপর আমাদের জন্য নিয়ে আসলাম। গুরুজনকে রেখে কী আমরা আগে খেতে পারি।
~ সোনিয়ার কথা শুনে খুশিতে মনটা ভরে গেলো। সোনিয়ার প্রতি সম্মান আরো তিন গুণ বেড়ে গেলো। বুঝতে পারলাম স্ত্রী কেমন হয়? শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য্য থাকলেই তাকে সুন্দর বলা যায়না।
যার মন সুন্দর প্রকৃতপক্ষে তাকেই সুন্দর বলে।

আমি প্লেটে খাবার বাড়লাম।
আপনি কী হাত ধুয়েছেন?
~ না।
~ তাহলে খেতে বসেছেন কেনো?
~ জান হাত ধুয়ে আসেন।
সাহিল চেয়ার ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকলো। হাত ধুয়ে বেড়িয়ে এসে চেয়ার টেনে বসলো।

সোনিয়া তুমি ও বসো।
~ আপনি খেয়ে নিন তারপর আমি খাবো।
~ আগে বসো। দুজনে এক সাথে খাই।
সাহিল আরেকটা প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে বললো, নাও এবার খেয়ে উঠ।

বাহিরে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ছে খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়। কারেন্ট যে কবে আসবে তার ঠিক নেই। কিছুক্ষণের জন্য এসে আবার ও চলে গেলো।
আই পি এস যে কোন সময়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
~ দুজনে তৃপ্তিমত খেলাম। খুব ভালো লাগছে আমার উনার সাথে খেতে।
খাওয়া শেষ করে সব গুছগাছ করে মায়ের রুমে ঢুকলাম।
মা খাওয়া শেষ হয়েছে?

~ হ্যাঁ সোনিয়া।
তুই গিয়ে শুয়ে পড়।
~ আচ্ছা মা। আপনি ও সাবধাণে থাকবেন। কিছুর দরকার হলে আমাকে বলবেন।
~ হুম।
রুমে ঢুকে দেখি সাহিল শুয়ে পড়েছে মাঝখানে সানি।

আমি গিয়ে সানির পাশে শুয়ে পড়লাম।
চোখ বন্ধ করে রাখলাম।
রানীর ব্যাপারটা মাথার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কন্ঠটা ও রানীর মত লাগছিলোনা।

তাহলে রানীর সীম ঐ মেয়ের কাছে গেলো কী করে?
কালকে তথ্যটা আমাকে জানতেই হবে।
ভাবতে ভাবতে কখন জানি ঘুমিয়ে গেলাম।

পর্ব ১২

হঠ্যাৎ সাহিলের ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম সোনিয়া ঘুমুচ্ছে। চোখের পলক যেনো কিছুতেই পড়ছেনা। সাহিলের আজ কেনো জানি সোনিয়ার প্রতি একটু বেশী আর্কষন করছে। বারবার চুম্বকের মত টানছে। ডিম লাইটের হালকা আলোতে সোনিয়ার মুখটা আলোকিত হয়ে গেছে। সোনিয়াকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে সাহিলের।
মনে হচ্ছে অনেকদিন পরে আজ পুরুষত্ব জেগে উঠেছে।

না না কী করছি আমি। ভুলে ও এমন কাজ করা যাবেনা। সোনিয়া তো আমাকে আদৌ ভালোবাসে কথাটা বলেনি তাহলে কোন মুখে আমি আগ বাড়িয়ে ভালোবাসতে তার কাছে যাবো। যেভাবেই হোক নিজেকে সামলাতে হবে। সাহিল ওপাশ করে শুয়ে পড়লো।
এদিকে আমার ও ঘুম ভেঙে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই।
ভাবছি সবাই কত সুখি। বিয়ের পরে সবাই তার স্বামীর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ভরে যায় কিন্তু আমার বিয়ের আজ চার মাস চলছে তবুও স্বামীর ভালোবাসা পেলাম না।

সাহিল তুমি কী আমাকে কখনো তোমার কাছে টেনে নিবেনা?
কখনো কী বলবেনা সোনিয়া আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
জানি হয়তো সেদিন কখনো আসবেনা। তবুও মিথ্যে হলেও মনকে সান্ত্বনা দিয়ে যাওয়াই আমার কর্তব্য।

সবার ভাগ্যে তো স্বামীর সুখ জোটে না তেমনি হয়তো আমার ভাগ্যে ও জুটবেনা।
কথাগুলো ভাবছি আর চোখের কোণে পানি জমে যাচ্ছে। বুকটা হাহাকার করছে আমার। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলি সাহিল আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। বেশী কিছু চাই না আমি চাই শুধু তোমার একটখানি ভালোবাসা।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে রাখলাম।

সকালবেলা,
আমি উঠে দেখি সাহিল আমার পাশে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চোখ পড়তেই তার চোখ নামিয়ে নিলো।
কিছুটা সংকোচ বোধ করলো সাহিল। তারপর বললো, সোনিয়া তুমি উঠে গেছো।
~ হ্যাঁ উঠে গেছি।

~ আপনি ও উঠে গেছেন দেখছি।
~ ঘুম ভেঙে গেছে ফজরের পরেই।
~ ওহ্। তাহলে এখানে বসে আছেন যে?
~ এমনি।
~ মা কী উঠে গেছে?

~ জানিনা। আমি মায়ের কাছে যাইনি।
~ ওহ্ আচ্ছা।
কথা বলা শেষ করে গায়ে ওড়নাটা ঠিকঠাক করে বিছানা দিয়ে নামলাম। ওয়াশরুমে ঢুকে আবার বেড়িয়ে আসলাম। টুথ পোস্ট তো শেষ! দাঁত ব্রাশ করবো কী দিয়ে?

~ শেষ!
~ হুমমম। কেনো আপনি দাঁত ব্রাশ করেননি।
~ না।
~ কী বলেন? ফজরের পরে ঘুম থেকে উঠে এখনো বাসি মুখে বসে আছেন আবার কথা ও বলছেন। এহহহ বমি আসেনা আপনার।
~ এই সোনিয়া কী সব বলছো তুমি? বমি আসবে মানে টা কী হুমমম?

রাতে তো দাঁত ব্রাশ করে ঘুমিয়েছি তারপর কী কোন কিছু খেয়েছি।
~ খাননি তাতে কী হয়েছে? আমুখ ধোঁয়া এভাবে কেউ বসে থাকেনা।
জলদী পেস্ট দিন আমি দাঁত ব্রাশ করবো। বেশিক্ষণ থাকলে বমি আসবে।
মুখটা ভেংচি কেটে হনহন করে রুম থেকে বেড়িয়ে যায় সাহিল।

এদিকে আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা হয়ে গেছে। মানুষটা কে একটু মজা করে বললাম সে খুব সিরিয়াস ভাবে নিয়েছে। বাহব্বা। একটু মজা ও করা যায়না তার সাথে। দেখলে মনে হয় সমস্ত শরীরে রাগ ভরা। মাঝেমাঝে আমার নিজেরই ভয় লাগে।
একটুপর আবার পেস্ট নিয়ে এসে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকলো।
~ একি কী করছেন আপনি ভিতরে ঢুকছেন কেনো?

~ বেশ করেছি। তুমি সরো আমি দাঁত ব্রাশ করবো।
~ ইশশশশ রে মামার বাড়ির আবদার পেয়েছেন নাকি? আমি আগে এসেছি তাই আমি আগে করবো।
~ না আমি পেস্ট এনেছি তাই আমি আগে করবো।
~ একদম না। এতক্ষণ তো বেশ বিছানার উপরে বসে ছিলেন হঠ্যাৎ আমি বলাতে এখুনি চলে এলেন কেনো? আপনি এত রিসু কেন বলুন তো?

~ সোনিয়া বেশী কথা বললে কিন্তু
~ থামলেন কেনো কিন্তু কী?
~ কিছুনা সরো আমি আগে।
~ না আমি আগে।

বেশ তো তাহলে দুজনে একসাথে করি।
~ উক্কে।
আমি হাসতে লাগলাম। ওদিকে উনি রাগতে লাগলো।
দুজনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাঁত মাজতে লাগলাম। প্রায় ২০ মিনিট মাজার পরে আমি পানির কল ছাড়তে নিবো ওমনি সে আমার হাত চেপে ধরলো।
আমি আগে কুলি করবো।
~ আমার মুখে তো পেস্ট ভর্তি তাই কথা বলতে পারলাম না।

সাহিল হাত মুখ ধুয়ে তারপর দাঁতগুলো বের করে হাসলো।
এবার দেখো আমার দাঁতগুলো কত সাদা। আর তোমার দাঁত দেখো হলদেটে বলেই ওয়াশরুম থেকে এক লাফে বেরিয়ে গেলো।
সাহিল বের হলে আমি ভালো মত হাত মুখ ধুয়ে বেড়িয়ে আসলাম।
মুখ মুছতে মুছতে বললাম,
আপনি তো আস্ত একটা বদের হাড্ডি।

~ চোখ দুটো বড়বড় করে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়।
কী বললে আমি বদের হাড্ডি?
~ তা নয়তো কী? আপনি একটু আগে যে কাহিনীটা করলেন সেটা কোন বাচ্চাও করবেনা। তাহলে আপনাকে বদের হাড্ডি টাইটেল দেওয়া ছাড়া আর কোন কিছু আমার মাথায় আসেনি।

~ হুমম। এখন বলার সময় তোমার। তাই ইচ্ছামত বলে যাও। সময় যখন আমার আসবে তখন সুদেআসলে উশুল করে নিবো বলে দিলাম।
~ বয়েই গেছে। আপনি আমার ছলটুডা করবেন। বলেই দৌঁড় দিয়ে বের হয়ে গেলাম।
কিচেনে ঢোকার জন্য পা বাড়াতেই
মা বললো,
সোনিয়া,
~ পিছনে ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে,
আসসালামু আলাইকুম মা।

~ ওয়ালাইকুম আসসালাম।
~ মা, আপনি এত সকালে উঠে গেলেন যে? রাতে কী ঘুমাতে পারেননি? আপনার কী শরীর খারাপ?
~ মধ্যরাতে হঠ্যাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুমাতে অনেক চেষ্টা করা সত্বেও ঘুম আসেনি।
নামাজ পড়ে ছাদে গিয়ে একটু হাঁটলাম। এখন ভালো লাগছে।
~ হুম। মা তাহলে নাস্তা কী বানাবো?
~ নাস্তা বানানো হয়ে গেছে।

~ কখন বানালেন? আর আমাকে ডাকলেন না কেনো? তার মানে আমাকে আপনি এখনো আপন করতে পারেননি তাই তো! আচ্ছা ঠিকাছে আমি ও আর কিছু বলবোনা।
~ আহ্ সোনিয়া থাম না। আমার পুরো কথাটা শুনে তারপর যা বলার বলিস।
~ থাক মা এখন আর আমাকে বলে লাভ কী? মিথ্যা সান্ত্বনা আমার আর প্রয়োজন নেই।

~ সোনিয়া, এবার থাম না হলে থাপ্পর মেরে তোর দাঁত ফেলে দিবো।
আমি কোন নাস্তা বানাইনি। আমাদের বাসায় যে মেয়েটা থাকতো সে আজ সকালে আসছে। এতদিন সে ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলো তার মায়ের অসুখ ছিলো। সাতদিন আগে তার মা মারা গেছে। তার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে কালকে লঞ্চে করে রওনা দিয়ে আজকে ভোরেই আমাদের বাসায় আসলো।
~ ওহ্। আচ্ছা মা স্যরি।

~ স্যরি বলিস না। পারলে এককাপ চা খাওয়াক
~ কড়া লিকার দিয়ে তাই তো।
~ ঠোঁটের কোণে হাসির ঝলক দিয়ে হাসলো সাহিলের মা শাহানা বেগমের।
~ সোনিয়া, তুই আসলেই জিনিয়াস।

জলদী যা তোর হাতের চা খাওয়ার জন্য পরাণটা ছটফট করছে।
~ আচ্ছা যাচ্ছি। কিচেনে ঢুকতেই মেয়েটি এসে সামনে পড়লো। নতুন ভাবী মনে হয়। ভালো আছেন আপনি?
~ হুম আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?
~ আমি তো ভালোই আছি। তবে মনটা ভীষণ খারাপ।

~ হুম জানি। তোমার আম্মা মারা গেছে।
~ হুম। জানেন খুব ইচ্ছা ছিলো ভাইজানের বিয়েতে থাকবো কিন্তু থাকতে পারলাম না।
~ আমি তো মেয়েটির কথাশুনে রীতিমত অবাক হলাম। বাড়িতে কাজ করে কিন্তু খুব শুদ্ধ করে কথা বলছে। দেখতেও বেশ পরিপাটি।
আচ্ছা তোমার নাম কী?
~ বর্তমান নাম তাহিয়া। কিন্তু মা নাম রেখেছিলো রাহিমা।

~ বর্তমান নাম আর মায়ের দেয়া নাম মানেটা বুঝলাম না।
আচ্ছা তোমার কথা শুনছি দুই মিনিট ওয়েট।
চুলোয় চায়ের কেটলিটা বসিয়ে দিয়ে চার কাপ পানি দিলাম।
চা হয়ে গেলে দুধ চিনি দিয়ে কাপে ঢেলে ট্রেতে করে মায়ের রুমে গেলাম তারপর সাহিলকে দিয়ে আবার ও কিচেনে এলাম।
এসে দেখি তাহিয়া সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
কাশি দিয়ে কিচেনে আসলাম।

তাহিয়ার দিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলাম। আমার দিকে তাকায়।
তারপর বললো, ভাবী আমাকে দিছেন?
~ এই কিচেনে তুমি আর আমি ছাড়া আর তো কেউ নেই তাহলে নিশ্চয়ই তোমাকেই দিলাম তাই না।
~ আশেপাশে চোখ বুলায় তাহিয়া।
ওভাবে কী দেখছো? চায়ের মগটা আগে নাও। আমার হাত যে গরম হয়ে যাচ্ছে।

~ আচ্ছা স্যরি ভাবী।
চায়ের মগটা নিয়ে চেয়ারের উপরে বসলো। মগে চুমুক দিয়ে বললো, ভাবী আপনি তো ভালো চা বানান। তাই তো বলি খালাম্মা কেনো আপনাকে চা বানাতে বলেছেন। তিনি তো কারো হাতের চা খায়না। নিজের চা নিজেই বানিয়ে খায়।
~ তাই। জানতাম না তো।
~ এখন তো জানলেন।

~ হুম।
আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাস করবো।
~ হ্যাঁ ভাবী করেন।
~ তুমি এবাড়িতে কাজ করো কবে থেকে?
~ আমি খুব ছোটবেলায় এবাড়িতে এসেছি। আমার বাবা মারা যাওয়ার পরে মা আবার বিয়ে করে। একটু বড় হলে আমাকে এবাড়িতে কাজের জন্য নিয়ে আসে। তারপর থেকেই এ বাড়িতে আছি।

কিন্তু ভাবী বিশ্বাস করো সাহিল ভাইজান আর খালাম্মা আমাকে খুব ভালোবাসে। জানেন ভাবী খালাম্মার মেয়ে সানজানা আর আমি এক বয়সী। সানজানা আর আমাকে খালাম্মা কখনো আলদা ভাবতেন না। আমাকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়িয়েছেন। তারপর আমি নিজেই আর পড়িনি কারণ পড়াশুনাটা আমার বেশী ভালো লাগতোনা। আমি পড়াশুনায় ভীষণ দূর্বল ছিলাম। আর আমার নাম তাহেরা সানজিদা রেখেছিলো।
সানজিদা পড়াশুনা করতে বাহিরে গেছে। এবার ঈদের পরে আসার কথা।

~ ওহ্ আচ্ছা। তাই তো বলি তুমি এত শুদ্ধ করে কীভাবে কথা বলো।
~ সাহিল ভাইয়ের অর্ডার অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা যাবেনা।
~ হুম এটা ঠিক। ভদ্র পরিবারে অশুদ্ধভাবে কথা বলাটা বেমানান।
~ আচ্ছা ভাবী অনেকটা সময় গড়িয়ে গেলো। দুপুরের জন্য কী রান্না করবেন ঠিক করেন ততক্ষণে আমি সানির কাছে যাই।
~ আচ্ছা যাও। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে তুমি আসায় আমার সময়টা ভালোই যাবে।

~ ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তাহিয়া।
কিচেন থেকে বেড়িয়ে সোজা নিজের রুমে ঢুকলাম। রুমে ঢুকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি সাহিল পেপারের ভিতরে মুখ গুজে দিয়ে বসে আছে।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে পেপারটা মুখ থেকে নামিয়ে পায়ের উপরে রেখে এমন ভাব করছে যেনো সমস্ত পেপারের নিউজের হেডলাইন মুখুস্থ করতে বসেছে। আমি দেখেও না দেখার ভান করেই রুমে ভিতরে এগিয়ে গেলাম।

তারপর সাহিলের তামশা দেখে কথা না বলে আর থাকতে পারলাম না।
~ আচ্ছা কয়েকদিন ধরেই দেখছি আপনি অফিসে যাচ্ছেন না। তা সারাদিন এভাবে বসে না থেকে আমাকে নিয়ে কোথায়ও তো ঘুরে আসতে পারেন। নাকি আমাকে সাথে নিয়ে গেলে আপনার মানসম্মান থাকবেনা। আমি তো দেখতে সুন্দরী নই তাই হয়তো আপনার ইগোতে বাঁধে।
পেপারটা দুহাতের তালুতে নিয়ে মোঁড়াতে লাগলো।
~ আচ্ছা আমার রাগগুলো পেপারকে দিচ্ছেন কেনো বলুন তো?
যদি পারেন আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।

~ রাগে ফসফস করতে লাগলো সাহিল। মনে হচ্ছে আমাকে এখনি গিলে পেটের ভিতরে ভরবে।
~ কী হলো কথা বলুন?
~ বিকালে বের হতাম। সকালে বলবো করে কিন্তু তোমাকে তো পাওয়াই যায়না তাই তো আর বলা হয়না।
তাছাড়া তুমি আমার সাথে বের হবে কিনা সেটা ও তো আমি জানিনা।
যদি তোমাকে বের হতে বলি তখন যদি তুমি না বলে দাও তাহলে তো লজ্জায় আমার মরে যেতে হবে।

তাই তো কখনো বলার সাহস হয়ে ওঠেনি।
~ বাহ্ রে। আমি কী আপনার পর নাকি যে আমাকে বলতে আপনার লজ্জা লাগবে। আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী এই একটা শব্দ দয়া করে মনে রাখবেন তাহলে আর কোন সংকোচ থাকবেনা।
~ নিশ্চুপ সাহিল।
~ আচ্ছা বিকালে আমাকে একটু বাবার বাসায় নিয়ে যাবেন। খুব আর্জেন্ট ছিলো।

~ আচ্ছা যাবো।
তুমি বিকাল ৫ টার ভিতরে রেডী হয়ে থাকবে আমি সময়ের আগে চলে আসবো।
~ সময়ের আগে চলে আসবেন মানে? আপনি কী কোথায় ও বের হবেন?

~ জরুরী একটা কাজ আছে। তাই বাহিরে বের হতে হবে। তুমি কোন চিন্তা করোনা। ৫ টার আগেই চলে আসবো।
~ ঠিকাছে

পর্ব ১৩

সাহিল বেরিয়ে যাওয়ার পরে কেমন জানি মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে। কয়েক রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়ার পরিণামেই এমনটা লাগছে। জীবনে এই প্রথম রাত জাগা হলো আমার। হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে রাতগুলো। শরীরটা মেজমেজ করছে। ভালো লাগছেনা কোন কিছুই। কিছুক্ষণ বাদেই তাহিয়া এসে দরজায় ঠকঠক করে বললো,
~ ভাবী আসতে পারি।

~ মাথায় ওড়ণাটা টেনে দিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বললাম,
আসো। অনুমতির কোন প্রয়োজন নেই। আমার কথাটা শুনে মনের ভিতরে সাহস পেলো তাহিয়া।
~ তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ভিতরে আসো।
~ জ্বী ভাবী। ভিতরে আসলো তাহিয়া। তারপর আমার পাশে বসলো।
~ কিছু বলবে?

~ অনেকটা সময় তো পেরিয়ে গেলো দুপুরের কী রান্না করবেন তাই আপনার কাছে আসা।
~ হ্যাঁ করবো তো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বললাম, ইশশশ এত সময় পেরিয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না। তুমি ফ্রিজ থেকে মাংস আর ইলিশ মাছ ভিজিয়ে রাখো। আমি এসে দেখছি তরকারি কী রান্না করা যায়। সাহিলকে বলতে মনে ছিলোনা ফ্রিজে তেমন সবজি নেই।

যাক এখন রান্না করি। রাতে তরকারির কথা বললে কালকে সকালের বাজার থেকে তাজা সবজি নিয়ে আসবে। এখন বললে বাসি সবজি পাবে।
~ ঠিকাছে ভাবী। আপনি যেমনটা বলেছেন আমি তাই করছি।
~ হুম।

ওয়াডড্রবের ড্রয়ার খুলে মাথা ব্যাথার ওষুধ এক্স~ পা~ সি বের করলাম। গ্লাসে পানি ঢেলে তারপর ওষুধটা খেয়ে নিলাম। দশ মিনিটের ভিতরে ইনশাআল্লাহ ব্যাথা কমে যাবে।
বলেই দ্রুততার সাথে কিচেনে গেলাম।
তাহিয়া মাংস আর মাছ ভিজিয়ে মাত্রই উঠলো। আমাকে দেখেই বললো, ভাবী সব ভিজিয়ে রাখলাম। এবার কী করতে হবে বলুন।
~ তুমি পিয়াজ কুচি আর কাঁচা মরিচ ফালি করে বাটিতে রাখো।
আমি ভাত বসিয়ে দিচ্ছি।

~ আমি চাল ধুয়ে দেই। (তাহিয়া)
~ না তোমাকে যা বলছি তাই করো আমি চাল ধুয়ে ভাত বসিয়ে দিচ্ছি।
চাল ধুয়ে ভাত বসিয়ে দিলাম। ততক্ষণে তাহিয়ার সব কাটা শেষ।
তাহিয়া দেখতো মাংস বা মাছ কোনটার বরফ ছেড়েছে।
~ দেখছি ভাবী।

ভাবী দুটোরই বরফ ছেড়ে দিয়েছে। আপনি রান্না করতে পারেন।
~ হুম।
আমি মাংসটা আগে কষিয়ে নিলাম ভালো করে। কষানো হয়ে গেলে দুইটা আলু কেটে মাংসে দিয়ে পরিমাণ মত পানি দিয়ে ঢেকে দিলাম। ভাত হয়ে গেলে নামিয়ে নিলাম। সেই চুলোয়া ইলিশ মাছ ফ্রাই করলাম।

রান্না কম্পিলিট করে সানির কাছে গেলাম। মা সানিকে গোসল করিয়ে বেলকুনিতে রোদে বসিয়ে রেখেছে। আর পাশে সে ও বসে আছে।
~ মা রান্না তো শেষ সানিকে আমার কাছে দিয়ে আপনি গোসলে যান।
তাহিয়া এসে বললো, সানি আমার কাছে থাক আপনারা দুজনেই গোসলে যান।
শাহানা বেগম আমার দিকে তাকায়। তারপর দুজনে হাসতে লাগলাম। আমাদের হাসি দেখে তাহিয়া ও হাসলো। খালাম্মা অনেকদিন পরে আপনার মুখে হাসি দেখলাম।

খুব ভালো লাগছে আমার শ্বাশুড়ি বউয়ের মিল দেখে।
~ তাহিয়া তুই তো দেখছি বাড়িতে গিয়ে বেশ চালাক হয়ে এসেছিস।
তাহলে তো জলদী তোকে বিয়ে দিতে হয়। পাত্র দেখা শুরু করবো নাকি!
খালাম্মা আমি এখন আসছি কাজ আছে বলেই বেরিয়ে গেলো।

~ দেখছিস সোনিয়া তাহিয়া লজ্জায় একেবারে গুলুমুলু হয়ে গেছে।
~ ঠিকি বলেছেন মা। বিয়ের কথা শুনলেই মেয়েরা লজ্জাবতী হয়ে যায়।
~ হুম। তবে আজকাল মেয়েদের লজ্জা শরম অনেক কমে গেছে। নিজের বিয়ের কথা নিজেরাই বাবা মায়ের কাছে বলে।

~ তা ঠিক মা। তবে যারা বাবা মাকে সম্মান করে তারা এসব কথা কখনো বলেনা।
খালাম্মা, সানিকে আমার কাছে রেখে আপনারা গোসলে যান।
~ তানিয়া এদিকে আয়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তাহিয়া।
~ জ্বী, খালাম্মা।

~ বিয়ের কথা বলতে ওভাবে চলে গেলি যে?
~ ইয়ে মানে, খালাম্মা।
~ বুঝলাম। এখন তোর ইয়ে মানে মানে রাখ। এগিয়ে এসে সানিকে কোলে নিয়ে রুমে ঢোক। দুধ বানানো আছে দেখ খায় কিনা! যদি খায় তাহলে খাইয়ে পায়ের উপরে রেখে ঘুম পাড়া।
~ আচ্ছা খালাম্মা।

সানিকে তাহিয়ার কাছে রেখে আমি আর মা বেরিয়ে আসলাম।
রুমে ঢুকে আলমারী খুলে কামিজ বের করলাম। কামিজের ভাজ খুলে ওড়ণাটা দেখছিনা। সারা ওয়াডড্রব তন্নতন্ন করে খুঁজলাম তবুও কোথায়ও পাচ্ছিনা। ওড়ণাটা খুঁজে না পেয়ে মনটাই খারাপ লাগছে। কারণ থ্রিপিচ টা রানীর গিফট ছিলো। ওড়ণাটা না পেয়ে রাগ লাগছে খুব। মেজাজ গরম করে কামিজটা আবার রেখে দিলাম।
মুডটাই নষ্ট হয়ে গেলো। কামিজটা পড়ে রানীর বাসায় যাবো ভাবছিলাম কিন্তু এখন আর ওটা পড়ে যাওয়া হবেনা।

ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসলাম। চুলগুলো আজ ভিজাইনি। বিকালে বাবার বাসায় যাবো তাই। বাবার পাশেই রানীর বাসা। অনেকদিন পরে রানীকে দেখতে পাবো ভাবতেই ভালো লাগছে খুব।
ফ্যান ছেড়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসলাম।

তাহিয়া এসে বললো, ভাবী খাবার টেবিলে রেখেছি খেতে আসেন।
~ তুমি যাও আমি এখুনি আসছি।
~ জ্বি।

চুলটা খোঁপা করে মাথায় ওড়ণা দিয়ে ডাইনিং রুমে গেলাম। মা কে দেখতে না পেয়ে সোজা তার রুমে গেলাম।
~ মা আসবো।
~ হুম আয়।
~ মা খেতে চলুন।

~ হুম। তাহিয়াকে ডেকে নিয়ে আয়। সানিকে ওর কাছে রেখে আমরা খেয়ে আসি তারপর ও খাবে।
~ আচ্ছা মা।
তাহিয়াকে ডাকার জন্য পা বাড়াতেই তাহিয়া নিজেই রুমে এসে হাজির হলো।
ভাবী আমি চলে এসেছি খালাম্মা আর আপনি গিয়ে খেয়ে নিন ততক্ষণ আমি সানির কাছে আছি।
~ ঠিকাছে।

মায়ের সাথে ডাইনিং রুমে আসলাম।
আমি খাবার বেড়ে দিয়ে মায়ের পাশে বসলাম।
~ সোনিয়া খাওয়া শুরু কর। খাবার নিয়ে বসে থাকতে নেই।

~ মা বিকালে বাবার বাসায় যাবো।
~ আলহামদুলিল্লাহ। গিয়ে ঘুরে আয়। বিয়ের পর তো আর কোথায় ও যাসনি। তাছাড়া বাবা মায়ের সাথে দেখা করলেই মনটা ভালো লাগবে।
আমি ও বলবো করে সাহিলকে যে তোকে যেনো ঘুরিয়ে নিয়ে আসে।

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম মায়ের কথা শুনে। চোখদুটো জলে ছলছল করছে।
~ সোনিয়া সাহিলকে বলেছিস।
~ হ্যাঁ মা।
~ হুম। যাবে বলেছে।
~ বললো তো যাবে কিন্তু কী করে বুঝতে পারছিনা।

~ যাবে যখন বলেছে তাহলে যাবে।
শোন যাওয়ার সময় সাহিলকে বলে দিবো যেনো মিষ্টি, দই, ফল ফ্রুট কিনে নিয়ে যায়। কখনো তো শ্বশুড়বাড়ি যায়নি তাই রীতি রেওয়াজ হয়তো জানেনা।
~ নিশ্চুপ আমি। বলার মত কোন ভাষা ছিলোনা। মায়ের কথা শুনে নিজেকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে যে আমি এমন একজন শ্বাশুড়ির পুত্রবধু হয়ে এসেছি।
~ সোনিয়া সাহিল কখন আসবে কিছু বলে গেছে।

~ আমাকে রেডী হয়ে থাকতে বলেছে ৫ টার আগে চলে আসবে।
~ ওহ্ আচ্ছা।
খাওয়া শেষ করে সানির রুমে ঢুকলাম। তাহিয়া সানি আমার কাছ থাক তুমি গিয়ে খেয়ে নাও।
~ আচ্ছা ভাবী।

আমি সানির পাশে বসলাম।
মা এসে বললো, সোনিয়া তুই গিয়ে বিশ্রাম নে। আমি সানির কাছে আছি।
~ আপনি বিশ্রান নিন মা। তাছাড়া বিকালে তো বাবার বাসায় যাবো তখন তো সানিকে আপনার কাছে রেখে যেতে হবে। তাই এখন না হয় আমার কাছে থাকুক।
~ সোনিয়া একটা কথা ও বলবিনা। এখনি তোর ঘোরাফেরার বয়স তাই যদি এখন না ঘুরিস তাহলে কবে ঘুরবি।
মায়ের কথা শুনে আমি কখনো কিছু বলতে পারিনা।

বারবার বলতে যেয়েও বলতে পারিনা।
তিনি এত ভালোবাসেন যে মনের ভিতরে সমস্ত কষ্ট ভুলে যাই।
মায়ের রুম থেকে সোজা নিজের রুমে ঢুকলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি দুইটা বেজে পঁয়তাল্লিশ বাজে।
বিছানার উপরে আঁধা শোয়া অবস্থায় শুয়ে আছি। মোবাইলটা অন করে ফেইজবুকে ঢুকলাম। কিছুক্ষণ থেকে বেড়িয়ে আসলাম।

পিছন থেকে সাহিল এসে বললো,
সোনিয়া, ঘুমিয়ে পড়েছো?
~ এপাশ ফিরে তাকালাম।
না।

সাহিলের হাতে দুইটা ব্যাগ।
আমি শোয়া থেকে উঠে বসলাম।
সাহিল ব্যাগ দুটো আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
~ কী আছে ব্যাগে?

~ খুলে দেখো।
~ আমি সাহিলের হাত থেকে ব্যাগ দুটো নিলাম। তারপর একটা ব্যাগ খুললেই দেখি শাড়ি।
শাড়ি।
~ হুম শাড়ি।

~ আরেকটা ব্যাগ খুলতেই দেখি চুড়ি, লিপস্টিক আর জুতা।
কী ব্যাপার এগুলো আপনি কখন কিনলেন?
~ আগে বলো পছন্দ হয়েছে?
~ আপনি এনেছেন আর পছন্দ হবেনা। খুব পছন্দ হয়েছে।
কিন্তু মার্কেটে কখন গেলেন। তাছাড়া এত টাকা খরচ করার তো কোন প্রয়োজন ছিলোনা।

~ আর বলোনা। আমার বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে আজ শপিং করেছে তাই ওর সাথেই গিয়েছিলাম।
দোকানে গিয়ে তোমার জন্য পছন্দ হলো তাই নিয়ে আসলাম।
আরেকটা কথা, সোনিয়া টাকার কথা আজ বলেছো মেনে নিলাম কিন্তু ফর্দার যদি এমন কথা বলো, তাহলে তোমার খরব আছে বলে দিলাম। তাছাড়া তোমাকে এমন কী এনে দিয়েছি? সামান্য কিছু জিনিস। কতই বা আর দাম হবে।

~ ঠিকাছে আর বলবোনা। তবে আপনার কাছে সামান্য টাকা হলে আমার কাছে লাখ টাকা। আমি তো বড়লোক ঘরের মেয়েনা।
~ দেখো তুমি এখন এবাড়ির বউ। তাই পিছনের কথা মনে করে কষ্ট পাও সেটা আমি চাইনা। অতীত ভুলে যাও আমার মত।
আর শোন আমার বন্ধুর বিয়ে শুক্রবার। আর গায়ে হলুদ বুধবার। অনেক অনুরোধ করেছে যেনো ভাবীকে নিয়ে পুরো প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকি।
আজ তো রবিবার। তাই কাল অথবা পরশুদিন শপিং করতে যাবো। বিয়ের পরে তোমাকে তেমন কিছু কিনে দেয়া হয়নি। তাছাড়া এত বড় বিয়ের অনুষ্ঠান সেখানে আমার পরিচিত সব বন্ধ বান্ধব আসবে।

বুঝতেই তো পারছো।
~ হুম বুঝতে পেরেছি।
~ আচ্ছা সোনিয়া এখন এই শাড়িটা পড়ে রেডি হও। এটা পড়েই বাবার বাসায় যাবে।
~ আচ্ছা।

সাহিল গিয়ে বিছানার উপরে বসলো।
আমি শাড়ি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
কিছুক্ষণ বাদে সাহিল আমার দিকে তাকিয়ে বললো, সোনিয়া রেডি হচ্ছোনা কেনো?

~ ‘মানে হবো কিন্তু
~ কিন্তু কী? তাড়াতাড়ি রেডি হও। তোমার হয়ে গেলে আমি ও রেডি হবো।
সোনিয়া,
~ হুমম।
~ না থাক, পরে বলবো।

~ আচ্ছা।
সাহিল মোবাইল টিপছে শুয়ে শুয়ে। কিছুক্ষণ বাদে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, সোনিয়া তোমার মন কোথায় রেডি হচ্ছোনা কেনো? যদি বাসায় বসেই সন্ধ্যা করে ফেলো তাহলে ওখানে গিয়ে তো বেশী টাইম বসতে পারবোনা। একটু বোঝার চেষ্টা করবো।
আমি এবার আর দিশাবিশা না পেয়ে রুমে বসেই গলা থেকে ওড়ণাটা খুলে
চেয়ারের সাথে রাখলাম। থ্রি~ পিচ টা গলা থেকে হাত তুলে খুলতে নিলেই সাহিল বলে উঠলো,
সোনিয়া এক মিনিট।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।

সাহিল মোবাইলটা বালিশের উপরে রেখে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।
আমি বুঝতে পারলাম সে লজ্জা পেয়েছে। এভাবে কখনো দেখেনি তাই এমনটা লাগছে।
সাহিল বেড়িয়ে গিয়ে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের সামনে শুধু সোনিয়ার মুখটা ভেসে উঠছে।
মনের ভিতরে ভালোবাসার ঝড় উঠেছে। তানহা বাদে জীবনে এই প্রথম কোন নারীর প্রতি এতটা আবেগ কাজ করছে। সোনিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারছেনা। ইচ্ছে করে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরে আদর করি।

সোনিয়ার কাছে যতবারই যাই নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হয়। পুরুষত্ব বারবার জাগ্রত হচ্ছে।
বিবাহিত পুরুষের একাকীত্ব জীবনটা খুব কষ্টের। একবার এ বন্ধনে আবদ্ধ হলে একা থাকা অসম্ভব।
শত হলে ও আমরা মানুষ। আমাদের ও মন এবং শরীর বলে কিছু আছে।

কিছু ভাবতে পারছেনা।
তাড়াতাড়ি ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানি বের করে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললো। চোখ মুখ মুছে নিয়ে সোফার উপরে বসলো। দীর্ঘ এক নিঃস্বাস টেনে নিয়ে সোফার সাথে গাঁ এলিয়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো।
আমি ড্রেস চেইঞ্জ করে শাড়ি পড়লাম। কুচিগুলো ঠিক করে পেটে গুজে দিলাম।

ভাবলাম কী অদ্ভত না? এক সাথে থাকছি, স্বামী~ স্ত্রী তবুও কেউ কাউকে ভালোবাসতে পারছিনা।
ভালোবাসা বড়ই অদ্ভুত। সাহিলের প্রতি দিনদিন ভালোবাসা বেড়েই চলেছে। হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে শুধু সাহিলেরই নাম। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, সাহিল আমাকে তোমার ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দাও। পূর্ন স্ত্রীর মর্যাদা দাও। তোমার বুকে একটু ঠাই দাও।
কবে আসবে সেই অপেক্ষার প্রহর।
কবে কাটবে একাকীত্ব জীবন।

লেখাঃ নুসরাত জাহান

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার সংসার – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – আমার সংসার (শেষ খণ্ড) – ভালবাসার সুখ দুঃখের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button