কষ্টের প্রেমের গল্প

এ এক রূপকথার গল্প – কষ্টের লাভ স্টোরি

এ এক রূপকথার গল্প – কষ্টের লাভ স্টোরি: তোমার মনে পড়ে? একদিন আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা? সত্যি বলছি আজ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর এটাই আমার জীবনের বড় পাথেয়।


পর্ব ১

রুমি যা ভয়টা পাচ্ছিল ঠিক সেটাই হলো। স্যার তার পেটের উপর হাত দিয়েছে। স্যারের এমন কাজকর্মে আনইজি লাগছে। কিছু বলতে চেয়েও পারছে না সে। শরীরে যেমন শিহরণ উঠেছে তেমনি নিজের সতীত্ব বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতদিন শুধু ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকাতো। ভালোবাসার কথা বলতো। যেগুলো সহ্য করা গেলেও আজকে সরাসরি এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করার মতো না।

স্যার রুমির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘রুমি তুমি যে কত সুন্দর তা তুমি নিজেও জানো না।
সব থেকে বেশি সুন্দর তোমার চোখ দু’টো। তোমার ঠোঁটে যখন হালকা লিপস্টিক দাও তখন মনে হয় তোমার ঠোঁটে হারিয়ে যাই। আর যখন কপালে সবুজ রঙের টিপটা পরো তখন তোমার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। আর শাড়িতে তোমাকে পরীর মতো লাগে।’

স্যারের প্রশংসা শুনে রুমি বুঝতে পারে নিশ্চয়ই তিনি এখন শারিরীক সম্পর্কের দিকে আহ্বান করবেন। কিন্তু এ শরীরটা শুধু তার স্বামীর জন্যই বরাদ্দ। যে তাকে টোপর পরে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। সারাটা জীবন অনেক ভালোবাসবে আর আদর করবে।
পেটের উপর থেকে স্যারের হাতটা সরিয়ে ফেললো সে। একটু পিছিয়ে গিয়ে বললো,
‘স্যার আমার আনইজি লাগছে। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। সব স্টাফ চলে গেছে।’
রুমির কণ্ঠে অনুরোধের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু স্যার তার দিকে এগিয়ে আসতেই হাত জোর করে ওঠে সে।

‘স্যার দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে এবার বাড়ি ফিরতে হবে। মায়ের ওষুধ খাবার সময় হয়ে গেছে।’
স্যারের কানে এসব কথা ঢোকে না। তার দৃষ্টি এখন রুমির শরীরের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে। রুমিকে এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয়। এক হাত দিয়ে পিঠটা ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে ওর ঠোঁট দু’টো স্পর্শ করে বলতে থাকে, ‘তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসতে চাই রুমি।’

রুমির হৃদপিণ্ডটা খুব জোরে চলছে। স্যারের শক্তির কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতেই পারছে না। লোকটার গায়ে ভীষণ জোর। উপায়ন্তর না দেখে ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। চোখ দিয়ে পানি বের হওয়া দেখতেই স্যার তাকে ছেড়ে দেয়। একটু রাগী ভাব নিয়ে বলে,
‘দিলে তো রোমান্সটা নষ্ট করে।’
টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা মুখে দিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাস সাবাড় করে দেয়। রুমাল দিয়ে পুরো মুখটা মুছতে মুছতে বলে,
‘যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। রাত অনেক হতে চললো। তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আমি বাসায় ফিরবো।’
রুমি যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। স্যার পেছন থেকে ফের ডাকে, ‘রুমি?’

রুমি মুখ ঘোরায়। গাল বেয়ে এখনো পানি ঝরছে। স্যার রুমাল দিয়ে চোখের পানিগুলো মুছে দিয়ে বলে,
‘তোমার চোখে পানি একদম মানায় না। কখনো কাঁদবে না।’
রুমি হ্যাঁ বলে মাথা ঝোকায়।
‘তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি গাড়িতে ওয়েট করছি তোমার জন্য।’

দ্রুত পায়ে স্যারের রুম থেকে বের হয় সে। কোনোমতে আজকে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে সে। কিন্তু কাল বা পরশু! কী করবে সে? চাকরিটা চলে গেলে খাবে কী? প্যারালাইজড মায়ের ওষুধ কিনবে কী দিয়ে? ছোট ভাইয়ের স্কুলের বেতন, টিউশন ফি দিবে কীভাবে? অনেকগুলো প্রশ্নই মাথায় ঘোরপাক খায় তার। হুট করে চাকরিটা ছাড়তেও পারছে না। অনেক জায়গায় ইন্টারভিউ দিলেও সবাই রিজেক্ট করে দিয়েছে, আবার কেউ পরে ডাকার আশ্বাস দিয়েছে। যতদিন অন্য কোথাও জব হবে না ততদিন এ অফিসেই জব করতে হবে। উপায় নেই। অনেকগুলো প্রশ্ন প্রতিদিনই মাথাচাড়া দেয়। বেসিনে মুখখানা দেখেই চমকে ওঠে সে। শুকিয়ে গেছে। পানি ছেড়ে দিয়ে মুখটা ধুয়ে নেয় আর ভাবে, স্যার অপেক্ষা করছে নিচে। বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। বাড়িতে হয়তো খাবারও শেষ হয়ে গেছে, রান্নাও চাপাতে হবে।

ফ্রেশ হয়ে পার্সটা হাতে নিয়ে নিচে নামে রুমি। বুকের ভেতর কাঁপুনিটা এখনো আছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্যারের গাড়িতে বসে সে। স্যারের গাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও করার কিছুই নেই। এত রাতে গাড়ি হয়তো পাওয়া যাবে না। রুমিকে পেছনের সিটে বসতে দেখে রোমান সাহেব বলেন,
‘পেছনে কেন? সামনে আসো। আমার পাশে বসো।’
মাথা নিচু করে সামনেই বসে সে। চুপচাপ থাকে। রোমান সাহেব গাড়ি ছাড়েন। সেই সাথে রোমান্টিক গানও। রুমিকে চুপচাপ দেখে রোমান সাহেব বলেন,
‘চুপ আছো যে? কিছু তো বলো।’

‘কী বলবো?’
‘বলার মতো কি কিছুই নেই রুমি?’
রুমি রোমানের প্রশ্নে তবুও চুপচাপ থাকে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। সাড়ে এগারোটা! অথচ মায়ের ওষুধ খাওয়ার সময় ছিল দশটা। বড্ড দেরি হলো আজ।
‘তোমার বাড়িতে কে কে আছে রুমি?’
‘মা, আমি আর ছোট ভাই রোহান।’

‘ওহ। আমার কথা কিছু জানতে চাইবে না?’
রুমি না সূচক মাথা ঝাঁকায়। স্মিত হাসে রোমান সাহেব। গানের ভলিওমটা একটু বাড়িয়ে দেয়। বাজতে থাকে,
”তোমার খোলা হাওয়া, লাগিয়ে মনে, তোমার খোলা হাওয়া।”
‘এখানে রাখেন। এটাই আমার বাড়ি।’
‘ঠিক আছে।’

গাড়ি দাঁড় করায় রোমান সাহেব। রুমি দ্রুত নেমে যেন হাঁফ ছেড়ো বাঁচে। যাওয়ার সময় মলিনমুখে বলে,
‘ধন্যবাদ স্যার।’
মুচকি হাসে রোমান সাহেব। কী মনে করে যেন ডাকে,
‘রুমি?’
রুমি পেছনে ফিরে তাকায়। কোনো কথা বলে না।
‘আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসতে চাই।’

স্যারের এমন কথায় ভীষণ রাগ হয় তার। দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। রোমান সাহেব বাইরেই গাড়ির ভেতর বসে থেকে বাড়ির পথ ধরে। যদি এক কাপ চা খেতে ডাকতো, তাহলে হয়তো মন্দ হতো না। মেকি হাসেন তিনি।

পার্সটা টেবিলে রেখে চার পাখার ফ্যানটা চালিয়ে দেয় রুমি। খুব ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। মাথা এলিয়ে দেয় বালিশটায়। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায় মা আর রোহান না খেয়েই আছে। মাকে ওষুধ খাওয়ানোই হয়নি। চোখ লেগে আসে তার। হঠাৎ কার যেন স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায়।
‘রোহান?’
‘বুবু ক্ষুধা পাইছে।’
ক্ষুধার কথা শুনে ঝটপট বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরে ছোটে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই। ভাত বসিয়ে দেয় রাইস কুকারে। সবজি কাটতে থাকে। রোহানের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। রান্নার ফাঁকে মাকেকে একবার দেখে আসে রুমি।

‘মা ঘুমিয়েছ?’
অভুক্ত রাহেলা চোখ মেলে তাকায়। মেকি হেসে বলে, ‘না মা।
আজ দেরি হলো যে?’
মাকে কীভাবে সত্যিটা বলে দেবে সে। কী দরকার মাকে চিন্তায় ফেলা। সমস্যা তাকেই সমাধান করতে হবে। জীবনটা তো তারই।
‘অফিসে কাজ ছিল মা। তাই দেরি হয়েছে। তুমি একটু জেগে থেক। আমি রান্না বসিয়েছি।’
বলেই রুমি ঘর থেকে বের হয়। রাহেলা বেগম নিরবে অশ্রুকণা ফেলতে থাকে। যে বয়সে মেয়েরা একটু আনন্দ-ফূর্তি আর পড়াশোনায় মত্ত থাকে সে বয়সেই লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছে।

‘রোহান, ভাই আমার। ঘুমাস না। ভাত হলো বলে।’
রোহান বুবুর পাশে বসে থাকে। পেটটা ক্ষুধায় সমানে চোঁচোঁ করছে। তার নিজেরও যে ক্ষুধা পেয়েছে সেটা কার কাছে প্রকাশ করবে? নিজের চিন্তা আপাতত সে করে না। সব চিন্তা এখন এই ছোট্ট পরিবারটিকে নিয়ে।
রান্না হলে মাকে খাইয়ে রোহানকে খেতে দেয় সে। ওষুধটাও মায়ের মুখে তুলে দেয়। তারপর নিজে খেয়ে বিছানায় নিজেকে সোপর্দ করে। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে যেন। নোমান সাহেবের সেই কথাগুলো বারবার ভাবাচ্ছে। এমন কথা ভাবতেই ফোনটা বেজে ওঠে। এত রাতে কে?


পর্ব ২

এত রাতে নোমান স্যার কেন ফোন দেবে? কী কারণ থাকতে পারে? লোকটা ভারী বিরক্ত করছে। কবে যে এ দশা থেকে মুক্তি মিলবে, কে জানে?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা তোলে।
‘হ্যালো?’
ওপাশ থেকে আওয়াজ আসলো,
‘ঘুমিয়েছ তুমি?’
রুমি বিরক্ত হয়ে বলে,
‘স্যার রাত একটা পার হয়েছে। এখন অন্যকিছু করার সময়?’
‘ঠিক তো। তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল তাই ফোন দিলাম।’

‘স্যার আপনি জরুরী কিছু বললে বলুন। নাহলে ফোনটা রাখুন। খুব টায়ার্ড লাগছে। ভোরে আবার উঠতে হবে।’
‘ঠিক আছে রুমি। তুমি ঘুমাও।’

বলেই ফোনটা কেটে দেয় নোমান সাহেব। ফোনটা হাতে নিয়ে নড়াচড়া করতে থাকে সে। মনে মনে খুব রাগ হয় তার। ইচ্ছে হয় ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে। যাতে কেউ তাকে আর বিরক্ত করতে না পারে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। অফিস থেকে বা কলেজ থেকে যেকোনো সময় ফোন আসতে পারে। অগত্যা ফোনটা বালিশের পাশে রেখে চোখ বুজে ঘুমাবার চেষ্টা করে। চোখ বুজার সাথে নানান চিন্তা মাথায় ঘিরে বসে। সামনে সবই অন্ধকার দেখে। সামান্য বেতনের চাকরি। সংসারে তিনজন মানুষ। প্যারালাইজড মায়ের ওষুধ, ভাইয়ের পড়াশোনা, নিজের পড়াশোনাসহ আর কত খরচ। এই সামান্য বেতনে যেন কুলাতে পারছে না। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। মুখটা শুকিয়ে যায়। এত দায়িত্বের মাঝে অতল গহ্বরে দিনদিন তলিয়ে যাচ্ছে সে।

ঘুম আসে না তার। অফিস থেকে ফিরেই মিনিট বিশের জন্য ঘুম পেয়ে গিয়েছিল। সে ঘুমটাই মনে হয় যথেষ্ট হয়েছে। তা না হলে এত ক্লান্তির মাঝে ঘুম কেন আসবে না। বিছানার দিক বারবার পরিবর্তন করেও লাভ নয় না। বিছানার ওপরে উঠে বসে। ডিম লাইটটা অন করে। বাথরুম থেকে সোজা মায়ের ঘর। মা অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। নিশব্দে একটা চেয়ার টেনে মায়ের পাশে বসে। মায়ের মায়াবী মুখখানার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। গত দু’বছর হলো মা বিছানায় শয্যাশায়ী। উঠতে পর্যন্ত পারেন না। মাঝেমাঝে নিশব্দে মায়ের চোখের জল তার দৃষ্টিগোচর হয়। মা বেরুতে চায়, জানালার পাশে বসে অশান্ত পৃথিবীটাকে দেখতে চায়। কিন্তু হয় না।

রুমি ভেবেছিল এবার কোনোভাবে যদি কিছু টাকা ম্যানেজ করা যেত তবে মায়ের জন্য একটা হুইল চেয়ার সে কিনবে। মা ইচ্ছে হলেই জানালার পাশে বসে থাকবে। তখন আর এক ঘেঁয়েমি লাগবে না। তাদের বড় করতে কত কষ্ট করেছে এই জননী, তার ইয়ত্তা নেই। এখন তার দেখভাল করা তারই দায়িত্ব। বড় ভাই থাকলে হয়তো তারই কাঁধে পড়তো। যেহেতু তার কোনো অবকাশ নেই সেহেতু সেই এখন রাহেলা বেগমের বড় ছেলে।

এসব ভাবতে ভাবতে ঘড়ির কাঁটার ঢংঢং শব্দে ঘোর কাটে রুমির। তিনটা বেজে গেছে। মায়ের পাশ থেকে উঠে ছোট ভাইটার ঘরে উঁকি দেয়। ভাইটারও চাহিদা ঠিকমতো পূরণ করা হয় না। এতটুকু ছেলে এই বয়সে সবটাই বোঝে। সংসারে টানাপোড়নের কথাটা মাথায় রেখে আবদার করে। এই তো সেদিন বুবুর গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, ‘বুবু?’

রুমি তখন হেসেছিল। ছোট ভাইটার এই ডাকটাই তার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। প্রশান্তি এ নে দেয়। বিনিময়ে কোনোকিছুই দিতে পারে না।
‘কী রে সোনা? কিছু বলবি?’
বুবু অভয় দেয়া সত্ত্বেও কাচুমাচু করতে থাকে সে। মায়ের সামনে আবদার করা বোকামি। নিশ্চয়ই মা তার আবদারের বিরোধিতা করবেন।
‘বুবু, স্কুলে পিকনিক। সব বন্ধুরাই এটেন্ট করবে।

আমারও’রোহানের কথা শেষ না হতেই রাহেলা বেগম সত্যি সত্যি রেগে ওঠেন। একটু রাগ দেখিয়ে বলেন,
‘ওসব পিকনিকে আমাদের কাজ নেই। বাড়িতে খাচ্ছিস তবুও পিকনিক করা লাগবে কেন?’
সোহাগ তখন মাথা নিচু করে বসেছিল। মন খারাপ করে কিছুক্ষণ পর বলেছিল,
‘বুবু আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম এটেন্ট করবো কী না। তুই হ্যাঁ বললে করবো না হলে না।’
রুমি তখন হেসে বলেছিল, ‘কত টাকা সোনা?’

‘দেড়শ টাকা বুবু।’
‘ঠিক আছে ভাই। কাল নিয়ে যাস। কেমন? এবার খুশি তো?’
খুব খুশি হয়ে বুবুর গালে একটা চুমু খেয়েছিল সে। রাহেলা বেগম বলেই যাচ্ছিল,
‘একদিনের বাজারের টাকা। নষ্ট করার কী দরকার মা।’
জবাবে রুমি বলেছিল, ‘থাক না মা। একদিন নাহয় ভর্তা-ভাত খাবো। তবুও ও আনন্দে থাক। কিছুই তো দিতে পারি না ওকে।’

এ কথা শোনার পর রাহেলা বেগমের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে। মেয়েটা সবাইকে নিয়ে কত ভাবে।
এ কথা মনে হতেই দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে দেয় রুমি। ওড়না দিয়া চোখটা মুছে নেয়। রোহানের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গালে একটা চুমু খেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে।

এখন নিশ্চয়ই আর চোখ ঘুম আসবে না। সেজন্য ওজু করে তাহাজ্জুদে বসে রুমি। মুনাজাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে নানান অভিযোগ পেশ করতে থাকে। এ সংসার টিকিয়ে রাখতে তার সাহায্য কামনা করে। হুজুর সাহেব বলেছিলেন এ সময় নাকি কারও দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। সৃষ্টিকর্তা নিজেই বান্দাদের আহ্বান করে তার কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য বলে। রুমি তাই করে। অনেককিছুই চায়। সংসার ভালো রাখার জন্য তার ভরসা কামনা করে।

দূরের এক মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসে। ফজরের নামাজটা আদায় করে ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। নির্ঘুম রাত কাটার কষ্ট অনেকদিনই টের পেয়েছে সে। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হলেও এখন আর তেমন হয় না। সয়ে গেছে সবটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পাশে চেয়ার টেনে বসে। আলে ফুটতে শুরু করেছে। নামাজ পড়ার পর আর ক্লান্তি লাগে না তার। ফ্রেশ লাগে নিজেকে। শরীরে অদ্ভুত রকমের শক্তি ফিরে পায়। বাইরে দু’একটা লোকেরও চলাচল শুরু হয়ে গেছে। হয়তো এভাবেই বাড়তে বাড়তে প্রতিদিনকার মতো জনসমাগমে পরিণত হবে। লোকেরা নিজ নিজ কর্মস্থল বা গন্তব্যে পোঁছানোর জন্য ছোটাছুটি করবে।

বাসার কাজ সেরে মাকে খাইয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে রুমি। রোহান সকাল সকাল প্রাইভেট পড়ে ওদিক দিয়েই স্কুলে যায়। সারাদিন রাহেলা বেগম ঘরেই শুয়ে থাকে। টিভির রিমোটটা তার পাশেই দেয়া থাকে। ইচ্ছে হলেও অন করে না। ভালো লাগে না তার। তবে খুব একঘেয়েমি লাগলে অন করেন।
অফিসে যাওয়ার জন্য বাস ধরে রুমি। মনে মনে ভাবে, বেতন বাড়ানোর জন্য একটা এপ্লিকেশন দিতে হবে। যদিও গ্রান্টেড হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ চাকরিতে জয়েন হওয়ার ছয়টা মাস হয়েছে মাত্র। এক বছর হলেও একটা কথা ছিল। তবুও ট্রাই করতে চায় সে। যদি হয়ে যায় সেই আশায়। কারণ অফিসের সব কাজই সে খুব মনোযোগ দিয়ে করে, প্রশংসাও পেয়েছে বেশ কয়েকবার।

অফিসের পিয়ন মামুন ভাই এসে বলে,
‘রুমি ম্যাডাম। স্যা আপনাকে ডেকেছেন।’
রুমি ফাইল থেকে মুখ তুলে মামুন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আপনি যান, আমি আসছি।’

এ কয়েকদিনে স্যার কয়েকবার তার কাছাকাছি আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। নোমান সাহেব বিভিন্ন স্পর্শ কাতর স্থানে হাত দিলে শারীরিক সম্পর্কের জন্য কখনো জোরাজুরি করেনি। চাকরি বাঁচার তাগিদে রুমিই কখনো কথা বলেনি। এভাবে প্রায়ই মামুন ভাই ডাকতে আসে। উপায়ন্তর না দেখে যেতে হয় তাকে।
‘স্যার আসবো?’
পিসি থেকে মাথা তুলে দেখে রুমি। রোমান সাহেব তাকে বসতে বলে। রুমি বসে। স্যার হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে তার পাশে এসে বসবে। তারপর অনেক কথাই বলবে।
‘তুমি বেতন বাড়ানোর জন্য অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছিলে?’
রুমি উত্তর দেয়,

‘জ্বি স্যার। বেতনটা বাড়লে খুব খুশি হতাম। যা বেতন পাই তাতে সংসার চালানো কষ্টকর হয়।’
‘দেখো, তুমি জয়েন করেছ ছয়মাস। আমাদের এমন কোনো নিয়ম নেই যে এক বছরের আগে বেতন বাড়ানোর। আমি এটা পারবো না। এটা নিয়মবিরুদ্ধ হবে।’
মনটা খারাপ হয় রুমির। চেয়ার থেকে নিজের ডেক্সের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। স্যার ফের ডাকে,
‘রুমি?’

রুমি পেছনে ফিরে তাকায়। দাঁড়িয়ে পরে। আশায় বুক বাঁধে। নোমান সাহেব চেয়ার থেকে উঠে রুমির সামনে এড়িয়েছে দাঁড়ায়। খুব বেশি চমকে ওঠে না সে। এ রকম প্রায়ই হয়। রুমির হাতটা ধরে বলে,
‘তুমি চাইলে আমি তোমাকে অন্যভাবে সাহায্য করতে পারি। আর আমি সেটা চাই। সুযোগ দেবে?’
রুমি এবার অবাক হয়। কেন সাহায্য করতে চান তিনি। কী কারণে সাহায্য করবেন? প্রতিদানে তিনি কী চান? বারবার তিনি কেন তাকে বিরক্ত করছেন?


পর্ব ৩

রুমি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
‘কী চান আপনি?’
রুমির টেনসন দেখে হোহো করে হেসে ওঠে রোমান সাহেব। পানির গ্লাসটা রুমির সামনে ধরে বলে,
‘তোমাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। নাও পানি খাও।’
গ্লাসটা হাতে নিয়ে আড় চোখে ওর দিকে তাকায়।

তারপর ঢকঢক করে অর্ধেক গ্লাস পানি খেয়ে বাকিটা টেবিলের ওপর রাখে। অর্ধেক পানির গ্লাসটা মুখে দিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নেয় রোমান সাহেব। স্যারের এমন ব্যবহারে কী বলবে ভেবে পায় না রুমি। শুধু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। রোমার সাহেব রুমির এমন তাকানো দেখে হেসে ফেলে। তারপর বলে,

‘এটা কী জানো?’
মাথা ঝাকিয়ে না বলে জবাব দেয় রুমি। রোমান সাহেব বলে,
‘আমি তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দেব। তখনই সব বলবো। এখন কাজ করো।’
রুমির মনে মনে চিন্তা বাড়তেই থাকলো। কী বলতে চান স্যার? এসবের মানে কী? কী হচ্ছে এসব। দ্রুত পায়ে নিজের ডেক্সের দিকে এগিয়ে যায় সে।

কাজে একদম মন বসাতে পারছিল না রুমি।

চুপচাপ ফাইলগুলো নড়াচড়া করছিল। মাথাটা হালকা ব্যথাও করছিল। কয়েকদিন ধরে খুব বেশি স্ট্রেস যাচ্ছে কিনা! এক কাপ চা খেলে মন্দ হয় না। টেবিলের ওপরে রাখা বেলটা বাজায়। গত ছয়মাসে একটা দিনও এ বেলটা বাজাতে হয়নি। নিয়মমতো এক বেলা চা পেয়েছে। কিন্তু আজ আরেক কাপ চায়ের ভীষণ প্রয়োজন।
‘আপা, ডেকেছেন?’

মহব্বত মিয়ার দিকে তাকায় সে।
‘মহব্বত ভাই, আরেক কাপ চা দিতে পারবেন? মাথাটা বড্ড ধরেছে।’
হাস্যেজ্বল মুখে মহব্বত মিয়া বলে,
‘আচ্ছা আপা। আমি আনতেছি।’
‘হুম।’

মহব্বত ভাই চা আনার জন্য চলে গেল। রুমি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাববার চেষ্টা করে। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। চোখের কোণে পানিও জমে যায়। রুমাল দিয়ে মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে ওঠে। হাতে নিয়ে দেখে স্যারের নামটা ভাসছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধরতে হয়।
‘জ্বি বলেন।’
ওপাশ থেকে মিষ্টি একটা আওয়াজ শোনা যায়,
‘তোমাকে এখনো এত টেনস লাগছে কেন?’
‘তেমন কোনো ব্যাপার নয়।’

‘শরীর খারাপ থাকলে বাসায় চলে যাও।’
‘আমি ঠিক আছি স্যার।’
‘হুম। আপাতত কাজে মন দাও। আমার জন্য অপেক্ষা করো।’
রুমি আর কোনো কথা বলে না। লাইনটা কেটে যায়। স্যারের ঘরে সিসিটিভি অন আছে। কোন এমপ্লোয়ি কী করছে সবটা তাকে ওবজারভেশন করতে হয়। সেখান থেকেই হয়তো দেখেছে সে আনমনা। মহব্বত ভাই চা নিয়ে আসে।
‘আপা চা।’

‘ধন্যবাদ মহব্বত ভাই।’
চায়ের কাপে চুমুক দেয় রুমি। মহব্বত ভাই অনেক সুন্দর চা বানায়। প্রতিদিনই তার চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই কাজ শুরু হয়। কাজের আজ চাপ নেই বলেই অনেকটা রিল্যাক্সে থাকতে চায় সে। কাজ নেই বললে ভুল হবে, যে কাজ আছে তার বেশি অর্ধেকই শেষ। খুব দ্রুত কাজ জমা দিতে হবে তার কোনো তাড়া নেই। এখন চলে গেলেও ছুটি পেতে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু অফিসের নিয়ম বলেও তো একটা কথা আছে। আগেভাগে অফিস থেকে বের হয়ে গেলে অনেকেই অনেক কথা বলতে পারে। তাছাড়া এখন বাড়ি ফিরে কাজ নেই। মাকে একটা ফোন করা দরকার। মায়ের বালিশের পাশেই ফোনটা রাখা। নিশ্চয়ই ফোন ধরতে তার কোনো অসুবিধা হবে না।
‘মা?’

‘হ্যাঁ মা।’
‘রোহান ফিরেছে?’
‘হ্যাঁ মা, ফিরেছে।’
‘তোমাকে খাবার দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ মা। দু’জনে এক সাথে খেয়েছি। এখন খেলতে গেছে মনে হয়।’
‘ঠিক আছে মা।
‘তুই কখন ফিরবি?’

‘ঠিক সময়েই ফিরবো মা। তুমি টেনশন করো না। শুয়ে থাকো। নাহলে রোহান ফিরলে তাকে বলো বালিশ উঁচু করে দেবে, তুমি বসে থেক।’
মায়ের সাথে এ কথা বলেই ফোনটা কেটে দেয় রুমি। রুমি এদিকে যেমন মায়ের, সংসারের চিন্তা করে ঠিক তেমনি রাহেলা বেগম তার অভাগী মেয়ের চিন্তায় মগ্ন থাকে। দুজনের চিন্তার প্রকৃতি একই রকম।

অফিস আওয়ার শেষ করে এমপ্লোয়িরা বাড়িতে ফিরতে শুরু করে। রুমি মনমরা হয়ে বসে থাকে। দু’জন এমপ্লোয়ি কথা বলতে থাকে, যা রুমির কানে এসে পৌঁছায়,
‘কী রে জানিস, রোমান স্যারের সাথে রুমির হেব্বি চলছে।’
‘তাই নাকি? জানতাম না তো।’

‘তুই জানবি কী করে। আমিই জানতাম না। দু’দিন হলো শুনেছি। দেখছিস না সবাই চলে যাওয়ার পরও বসে আছে। সম্ভবত স্যারের গাড়িতে যাবে।’
‘স্যারের তো বউ আছে। একটা সন্তানও আছে।’
‘হুম। এসব মানুষেরা মেয়ের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তারপর অনেককিছুই করে। নিজের সাধ মেটানোর পর ছুঁড়ে ফেলে দেয়।’
‘এসব বলিস না। স্যার শুনলে চাকরি আর থাকবে না। চুপচাপ থাকাই ভালো।’
‘ঠিক বলেছিস। চল।’
‘হুম, চল।

এমপ্লোয়ি দু’জন হাসতে হাসতে চলে যায়। সবটাই রুমির কানে পৌঁছায়। এসব শুনে তার চোখে পানি চলে আসে। কয়েক ফোঁটা পানি টেবিলে স্পর্শ করে। এমন সময় নিঝুম তার পাশে বসে। চোখের পানি মুছে মেকি হাসার চেষ্টা করে। এই অফিসে নিঝুম মেয়েটার সাথে তার ঢের সখ্যতা। মেয়েটা অনেক ভালো। রুমিকে বোঝে।
‘সবাই অনেক কথাই বলাবলি করছে রুমি।’
রুমির হাত দুটো ধরে সে।
‘শুনলাম।’

‘কতটা সত্যি? আমাকে বল।’
রুমির চোখে পানির বাঁধ মানে না। ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। নিঝুমকে কী বলবে বুঝতে পারে সে। স্যারের সাথে সম্পর্কটা কী সেটা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। এ সম্পর্কের নাম কী? কী বলবে নিঝুমকে?
‘কাঁদিস না। বল আমাকে।’

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না নিঝুম। স্যার আমার সাথে টাইম পাস করেন, ভালোবাসার কথা বলেন। আমার শরীরের অনেক স্থানে স্পর্শ করেন কিন্তু শারীরিক সম্পর্কে আসেন না। শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। আমি এখনও বুঝতে পারিনি কী বলবো এটাকে।
‘আমি বলি কী, তুই চাকরিটা ছেড়ে দে। অন্য কোথাও জয়েন কর। তুই হয়তো জানিস, এমডি স্যারের সংসার আছে। তার বউ আছে একটা বাচ্চাও আছে। তোর সাথে খেলা করছেন শুধু।’
‘চাকরি কোথায় পাবো বল? চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমি। তুই তো জানিস আমার সম্পর্কে। এ বেতন দিয়ে টানাটানি করে সংসারটা চালাচ্ছি। ছেড়ে দিলে কী করবো আমি?’

রুমির চোখ পানিতে ছলছল করে ওঠে। নিঝুম আর কোনো কথা বলে না। রুমিকে অভয় দেয়। রুমির সাথে কথোপকথন স্যার হয়তো সিসিটিভিতে দেখছেন। আর কোনো কথা বলে না সে। রুমির চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
‘থাক। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে।’
‘হুম, ঠিক আছে।
যা।’
নিঝুম চলে গেল। ঘড়িতে দেখে প্রায় দশটা বাজে। স্যার এখনো আসছে না। এদিকে বাড়িতে ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। স্যার কি তার সমস্যাটা বোঝে না? কেন তাকে এভাবে বারবার বিরক্ত করছে। কী চায় তার কাছে? কেনই বা এত টেককেয়ার! স্যার যা চায় তা স্পষ্ট করে কেন বলছে না? সত্যিকারের ভালোবাসা নাকি তার দেহ?

কিছুক্ষণ পর তাড়াহুড়ো করে আসে রোমান সাহেব।
‘রুমি চলো। একটু দেরি হয়ে গেল।’
রুমি কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। রোমান সাহেব রুমির হাত ধরে। রুমির অস্বস্তিতে ভোগে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। চুপচাপ স্যারের সঙ্গ দেয়। স্যারের মুখের হাসি দেখে মনে হয় না তিনি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। তবে সরলতার ভেতরে কালপিট লুকিয়ে থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।
রুমি গাড়িতে বসে, স্যারের পাশে। রোমান সাহেব গাড়ি স্টার্ট দেন। এক হাত দিয়ে গাড়ি চালান আর এক হাত তিনি রুমির ডান হাতের ওপরে রাখেন। রুমির শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। গা ঘামতে থাকে তার। স্যারের মুখে হাসি লেগেই থাকে।


পর্ব ৪

রোমান সাহেব একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামায়। রুমিকে নামতে বলে নিজেও নামে। চারদিক প্রায় জনমানবশূন্য। মাঝেমাঝে দু’য়েকটা কুকুড়ের ডাক ভেসে আসছে। দূরের বাড়ি বা কর্মস্থল থেকে আলো দেখা যাচ্ছে। রোমান সাহেব যেখানে গাড়ি থামিয়েছেন সেখানেও নিয়নের আলো জ্বলছে। স্পষ্ট নাহলেও মোটামুটি স্পষ্ট সবকিছু।

রুমির বুকের ভেতরের ধুঁকপুকানি বেড়ে গেছে। কী বলতে চান স্যার? রোমান সাহেব রুমির পাশে এসে দাঁড়ায়। রুমি নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে, স্বাভাবিক হতে চায়।
‘রুমি, তোমার সম্পর্কে আমি সবকিছুই জানি। আর তোমার পরিবার সম্পর্কেও। তোমার দরকার টাকার, আর আমার দরকার তোমার মতো একজনের সঙ্গ।’
স্যারের কথা শুনে খানিকটা ইতস্ততবোধ করে সে।

‘অফিসে তো অনেক মেয়ে আছে। সবাই কত সুন্দরী, স্মার্ট। মার্জিত ভাষী। আপনি তাদের ছেড়ে আমার মতো গেঁও হাবাগোবা একটা মেয়ের সঙ্গ কেন চান? আমি ওত সুন্দরীও নই, স্মার্টও নই। আমি সাদামাটা থাকতে পছন্দ করি।’

রুমির কথায় হোহো করে হেসে ওঠে রোমান সাহেব। রুমির হাতটা খপাত করে ধরে ফেলে। স্যার ইদানীং কারণে-অকারণে তার হাত ধরে যেটা তার পছন্দ না। কিন্তু ভাগ্যের কাছে হেরে যায় সে। কিছুই বলার থাকে না।

‘দেখো রুমি, আমি স্মার্ট, সুন্দরী বা মার্জিত ভাষী মেয়েকে চাই না। তোমার মতো একজন মেয়েকে চাই, যে আমাকে অনেক ভালোবাসবে। আমাকে তার চোখের আড়াল হতে দেবে না।’

‘কিন্তু কেন? আপনি এত বড় কোম্পানীর এমডি। এ রকম মেয়েকে আপনার পাশে মানাবে না। তাছাড়া শুনেছি, আপনার স্ত্রী এডুকেটেড, যথেষ্ট সুন্দরী আর মর্ডান। তবুও কেন?’
রুমির এমন কথায় মুখটা কালো হয়ে যায় রোমান সাহেবের। কীভাবে তাকে বুঝাবে যে তিনি ভালো নেই। স্বামীরা যা চায় সব স্ত্রী তা দিতে পারে না। তিনিও সেই স্বামীদের একজন। যার স্ত্রী ফাংশন, পার্টি, শপিং নিয়ে সবসময় বিজি থাকে। তার দিকে আর তার সন্তানের দিকে দেখার মতো সময় তার নেই। একটু ভালোবাসা পাওয়ার কাঙ্গাল রোমান সাহেব কত জায়গায় যে ভালোবাসাটুকু পাওয়ার মানুষ খুঁজেছে তার ইয়ত্ত্বা নেই।

‘মর্ডান বা স্মার্ট হলেই স্ত্রী হওয়া যায় না রুমি। আমার সব আছে, বাড়ি-গাড়ি, চাকর-বাকর, স্ত্রী-সন্তান। কিন্তু আমি সুখী নই। আমি আমার স্ত্রীর সাথে থাকি শুধু আমার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে। আমার স্ত্রী লিমাকে আমি কবেই ছেড়ে দিতাম, কিন্তু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে তা পারছি না। কারণ আমি চাই না ও কষ্ট পাক।’

কথাগুলো বলছে আর কাঁদছে রোমান সাহেব। সত্যি তো, টাকা-পয়সা বা গাড়ি-বাড়িতেই প্রকৃত সুখ নেই। প্রকৃত সুখ সেখানেই যেখানে একটু টুকরো ভালোবাসা থাকবে। যদিও সেখানে টাকা-পয়সা বা গাড়ি-বাড়ির অভাব থাকে না কেন। এই ভালোবাসার এমন শক্তি যে মানুষকে সে পরিবর্তন করে দিতে পারে, মানুষের জীবনযাত্রাকে পরিবর্তন করতে পারে। এই ভালোবাসার অভাব মানুষ বুঝতে পারলে জীবনবে নরক মনে হয়। একাকী লাগে, ভীষণ একাকী লাগে।

স্যারের চোখে পানি দেখে মনটা ভীষণভাবে নাড়া দেয় রুমিকে। কী করবে কিছুই বুঝতে পারে না। চোখের এ পানিই বুঝে দিচ্ছে মানুষকে কত একাকী। ভালোবাসার অভাবে তিলেতিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার জন্য কী বা করতে পারে সে। তারও তো পরিবার আছে, সংসার আছে, পরিবারের জন্য ভাবনাও আছে।
‘রুমি কিছু বলবে না?’
‘আমি কী বলবো স্যার?’

‘তোমার কি কিছুই বলার নেই?’
‘আমি কী বা করতে পারি আপনার জন্য? আপনি জানেন আমার পরিবার সম্পর্কে। কত টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় আমাকে। তার ওপর লেখাপড়া কম্পিলিট করার আরেকটা চাপ। আমি নিজেই তো শেষ হয়ে যাচ্ছি স্যার।’
‘তুমি কি আমাকে একটুও ভালোবাসতে পারো না রুমি? বিনিময়ে যা চাইবে তাই পাবে।’
‘ভালোবাসা কি এতই ঠুনকো স্যার?’

‘তাহলে এই ভালোবাসাকে আমি পরিপূর্ণ পূর্ণতা দিয়ে পাকাপোক্ত করতে চাই।’
স্যারের এ কথাটা ভালো করে বুঝতে পারে না রুমি। ভালোবাসাকে পূর্ণতা দেয় কীভাবে। অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
‘মানে? বুঝলাম না।’
‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’

বিয়ের কথা শুনে মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে রুমির। হাত দিয়ে কপালটা একটু চেপে ধরে। তাহলে সত্যি কি স্যার তাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। লোকমুখে বড়লোকদের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে অবগত সে। অফিসের কলিগদের কথাগুলো এখন মনে পড়ছে, বড়লোকটা মেয়েদের বিয়ের ফাঁদে ফেলে তাদের কুমারীত্ব নষ্ট করে মজা লুটে নেয়। যখন তাদেরকে ব্যবহার করা শেষ হয়ে যায় তখন ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ময়লার মতো। তার সাথেও কি এটাই ঘটতে চলেছে?

‘রুমি জবাব দাও। আমি তোমাকে আমার ছোট স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাই। তুমি বললে এখনি কাজী অফিসে চলো।’
‘না না। স্যার আপনি এসব স্বপ্ন আমাকে দেখাবেন না দয়া করে। আমি গরিব, আমার ছোট্ট পরিবার। তারাই আমার কাছে সব। আপনি এসব আমাকে আর বলবেন না দয়া করে। আমি বাঁচতে চাই স্যার, শান্তিতে একটু বাঁচতে চাই।’

‘রুমি আমাকে তুমি ভালোবাসো না? সত্যিটা বলো। আমার প্রতি কি তোমার কোনো দুর্বলতা নেই?’
রুমি এক কথায় উত্তর দেয়,
‘না।’

রুমি না বলেই চুপসে যায়। রোমান সাহেবের প্রতি কি তার আদৌ দুর্বলতা আছে? সত্যি কি তাকে মনে মনে ভালোবাসে? যদি তা না থেকে থাকে তাহলে স্যার এ কথা কোন ইঙ্গিতে বললো।
‘মিথ্যা বলছো তুমি রুমি। আমি জানি আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা আছে। যদি না থেকে থাকতো তবে তোমাকে এত বিরক্ত করার কথা সবাইকে তুমি বলতে। তোমার শরীরে স্পর্শ করার কথা, তোমার হাত ধরার কথা তুমি সবাইকে বলে দিতে। আমার মতো খারাপ মানুষকে তুমি সমাজের সামনে সহজেই হেয় করতে পারতে। আমি বিশ্বাস করি না যে তুমি মনে মনে আমাকে ভালোবাসো না।’

‘আমি সত্যি আপনাকে ভালোবাসি না। আমি শুধু আমার পরিবারকে ভালোবাসি। আমার মাকে ভালোবাসি, আমার ছোট ভাই রোহানকে ভালোবাসি।’
রুমির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
‘ঠিক আছে, আমাকে ভালোবাসতে হবে না। শুধু তোমার সংস্পর্শে থাকার সুযোগ চাই। দেবে না?’
রোমান সাহেবের মুখে সারল্যতার ছাপ। কিন্তু এ সারল্যতার পেছনে অন্যকোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে নেই তো?
‘আমি বাড়ি যেতে চাই স্যার। অনেকটা দেরি হয়ে গেল।’
‘ঠিক আছে। চলো।’

রুমি গাড়িতে গিয়ে বসে। রোমান সাহেবও গাড়ি ড্রাইভ করার জন্য বসে পড়ে। গাড়ি চলতে থাকে, শোঁশোঁ করে। আজ আর গান চলে না। নিজেকে খুব ফ্রেশ লাগে রোমান সাহেবের। এতদিনের দুঃখের জমানো কথাগুলো আজ বলে দিয়েছে। হয়তো রুমি বিশ্বাস করেনি। সবটা নাহলেও কিছুটা বিশ্বাস করলেই তার স্বার্থকতা। মেয়েটার মায়াবী মুখ বারবার মুগ্ধ করে তাকে। পরিবারের অশান্তির মধ্যে এই মেয়েটার এইটুকু সঙ্গ তার মনকে তৃপ্তি দেয়। সেটা রুমি কি বুঝে না? নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকে সে। হয়তো তার বয়সটা একটু বেশি। তাই বলে বুড়ো হয়ে যাননি। যৌবনের রঙ এখনো শেষ হয়নি। গত ১০ ডিসেম্বর চল্লিশ পেরিয়ে এক চল্লিশে পা দিয়েছেন তিনি।
গাড়ি চালানো অবস্থায় রুমির দিকে আড় চোখে তাকায়। মিষ্টি করে বলে,
‘তোমার হাতটা একটু দেবে?’

রুমি স্যারের দিকে তাকায়।
‘কেন?’
‘একটু ধরবো। তবে তোমার ইচ্ছে।’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় রুমি। আর তো কিছুক্ষণ। তারপর বাড়ি। এতটুকু সময়ের জন্য লোকটা যদি সুখ পায়, শান্তি পায়, তবে তাই হোক।
রুমির বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড় করায় রোমান সাহেব। রুমি নামে। গ্লাসটা নামিয়ে রুমিকে দেখতে থাকে। রুমিও একবার স্যারের দিকে তাকায়। তারপর হাঁটা দেয়।
‘রুমি? এক কাপ চা খেতে ডাকবে না?’

রুমি ইতস্তত করতে থাকে। কী বলা উচিত তার? এত রাতে বাসায় ডাকাটা কি ঠিক হবে? কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে।


পর্ব ৫

রুমির কাচুমাচু দেখে রোমান সাহেব হেসে ওঠে। হাসিমুখে বলে,
‘এত রাতে কাউকে বাসায় ডাকাটাও সেভ নয়। মজা করলাম। তবে একদিন তোমাকে না বলেই চলে আসবো, সেদিন তোমার হাতের বানানো চা খাবো। এখন ভেতরে যাও, আমি তোমার যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে চাই।’
রুমি স্যারের একটু কাছে আসে। তারপর বলে,
‘কেন পাগলামী করছেন বলুন তো?’

রুমির কথা শুনে না হেসে পারে না রোমান সাহেব।
‘এই পাগলামীটুকু ভালোবাসার জন্যই। তোমার সাথে কাটানো সময়টুকু আমার একাকীত্ব দূর করে। আমাকে ভালোবেসো না, তবে তোমার থেকে দূরে সরিয়েও দিও না। এটা তোমার কাছে আমার অনুরোধ বলতে পারো। এখন যাও। এমনিতে তোমার দেরি হয়ে গেছে।’
রুমি হাঁটা দেয়। রোমান সাহেব গাড়ির গ্লাসের বাইরে মুখ বের করে মেয়েটার যাওয়া দেখে। মেয়েটা তাকে একেবারে সরে যেতে বলছে না কেন? এত বিরক্তবোধ করেও তাকে একটু হলেও সঙ্গ দিচ্ছে। নাকি সত্যি সত্যি তার প্রতি ওর দুর্বলতা আছে। তখনকার বলা কথাগুলো মানে তার প্রতি ওর ভালোবাসা বা দুর্বলতার কথা বানানো।

ওকে এসব বলে সত্যিটা বের করে আনার জন্য। ওর উত্তরে তার কিছুটা হলেও পজেটিভ মনে হয়েছে। কী এমন আছে মেয়েটার মধ্যে, যার পরশে তার একাকী জীবনের কিছুটা হলেও পূর্ণতা পাচ্ছে।
রুমি সিঁড়িতে ওঠার সময় পেছন ফিরে তাকায়। মানুষটা এখনও তাকে দেখছে। রুমি তারপর দ্রুত পায়ে ওপরে চলে যায়। রোমান সাহেব গাড়ি ব্যাক করার সময় ঘড়িতে লক্ষ্য রাখে, প্রায় এগারোটা। দ্রুত গাড়ি চালাতে থাকে। লিমা বাড়িতে না থাকলে মেয়েকে ঘুম পাড়াতে হবে। অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই ওকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। লিমা বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, পার্টিতে। ফেরে মধ্য রাত্রিতে। মাঝেমাঝে মাতাল হয়ে ফেরে। মাতাল হয়ে ফিরলেও তার কাছে কোনো কৈফিয়ত চায় না সে। রোমান সাহেবকে এরই মধ্যে তাকে ঘুমাতে হয়, সকালে উঠতে হবে বলে। দু’জনের বিছানাই আলাদা। লিমা এক ঘরে ঘুমায় তো সে এক ঘরে। একই ছাদের তলায় থাকলেও দু’জনের জীবন বেশ বিচিত্রময়। কী করে তার জীবনটা পাল্টে গেল সেটা সে বুঝতেই পারেনি। বড়লোক বাবার মেয়েকে বিয়ে করার ফল এটা? যখন যা খুশি তাই করবে?

রুমি ব্যাগটা রেখে মায়ের ঘরে উঁকি দেয়। মা টিভি দেখছেন। রাহেলা বেগম রুমিকে দেখে বলেন,
‘আয় মা।’
রুমি চুলগুলো বাঁধতে বাঁধতে বলে ওঠে,
‘তুমি টিভি দেখো মা। আমি রান্নাটা বসিয়ে দেই।’
রাহেলা বেগম বলে ওঠেন,
‘রোহান মনে হয় ভাতটা রেঁধে ফেলেছে মা।’
‘ভাত রেঁধেছে মানে?’

রুমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
‘রাইস কুকারে তো বসালেই হয়ে যায়। আমি ওকে বললাম, ও বসিয়ে দিলো। এতক্ষণে মনে হয় হয়ে গেছে।’
রুমি রান্নাঘরে ছোটে। সত্যি তো, ভাত হয়ে গেছে। ফ্লাগটা নামিয়ে রাখে। রোহানের ঘরে গিয়ে দেখে ও পড়ছে। ওর মাথায় হাত বোলাতেই বলে ওঠে,
‘বুবু?’
‘তোর খুব ক্ষুধা পেয়েছে, না রে?’

‘না বুবু। মা সহ মুড়ি খেয়েছি। আমার মনে হলো আজও তোমার দেরি হবে।’
নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না রুমি। তার একটু দেরির জন্য মাকে, রোহানকে না খেয়ে থাকতে হয়। কত কষ্টই না পেয়েছে তারা। খাওয়াটা যেন তাড়াতাড়ি হয় সেজন্য ভাতের কাজটাও এগিয়ে রেখেছে।
‘কী তরকারি করবো ভাই?’

রোহান হাস্যেজ্বলমুখে বলে,
‘তোমার যেমন ইচ্ছে বুবু।’
‘ডাল আর ভাজি করি? নাহলে ডাল ভর্তা?’
‘হুম বুবু। খুব মজা হবে।’
রুমি রোহানের কপালে একটা চুমু খেয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। রোহান ডাকে, ‘বুবু?’

রুমি পেছন ফিরে তাকায়। মলিন মুখটাতে হাসি আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে,
‘হুম।’একটা ডিম ভাজবি? তিনজনে ভাগ করে খাবো।’
রুমি মেকি হাসে। বলে, ‘আচ্ছা সোনা।’
রুমি রান্নাঘরে হাত দ্রুত চালায়। সকলের ক্ষুধা পেয়েছে, তারও। পেটটা চোঁচোঁ করছে। রান্না করার সময় ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে স্নেহার নাম ভাসছে। স্নেহা ওর কলেজের বান্ধুবী। এক সময় অনেক বেশি সখ্যতা থাকলেও এখন সময়ের কাছে হার মেনে তেমনটা আর হয় না। দু’জনেই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে।
‘কী রে স্নেহা, কেমন আছিস?’

‘ভালো আছি রে। তুই?’
‘আল্লাহ যে অবস্থায় রেখেছেন অনেক ভালো রেখেছেন।’
‘শোন, তুই কি বই কিনেছিস?’
‘না রে। ক্যান বলতো?’
‘পরীক্ষার ডেট হয়ে গেছে। জানিস না?’

‘না তো।’
‘বলিস কী। বেশি সময় নেই তো।’
‘রুটিনটা মেসেজ করতো।’
ভালো-মন্দ কথা দু’জন দু’জনের সাথে শেয়ার করে। রান্নার সাথে সাথে প্রাণের প্রিয় বান্ধুবীর খোঁজ-খবরও নেয়ার চেষ্টা করে। স্নেহা ওর বয়ফ্রেন্ডের কথা বলে। ছেলেটা নাকি বড়লোক বাবার ছেলে। স্নেহাকে দেখে তাদের পছন্দও হয়েছে। ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলেই তাদের বিয়ে। আরও অনেক কথা।
রান্না শেষ হয়ে যায়। মায়ের রুমে বসে রুমি আর রোহান। মাকে ধরে ওঠায় রোহান। রুমি খাবার বাড়তে থাকে। ডিম ভাজিটা তিন টুকরো করে তিনজনের পাতে দেয় সে। রোহান মজা করে খায়।

‘মা, আমাকে একটু খাইয়ে দেবে?’
রাহেলা বেগমের চোখে পানি চলে আসে। এই মেয়েটা ছিল তার বড় আদুরে। তার হাতে ছাড়া ভাতই খেত না। আর আজ! তার কাঁধেই সংসারের পুরো দায়িত্ব। তিনি রুমিকে খাইয়ে দেন। রোহানও বায়না করে সেও মায়ের হাতে খাবে। তিনজনের ভাত আর তরকারি এক সাথে করে। মায়ের কষ্ট হলেও তিনি দু’জনকে খাইয়ে দেন, তারপর নিজে মুখে দেন। তিনজনে মজা করে খায়।। রুমি ভাবে, তার কষ্টের বিনিময়ে যা পাচ্ছে এটাই বা কম কীসে! তার চোখে পানি ছলছল করতে থাকে। হয়তো এ পানি সুখের।

মাকে ওষুধ খাইয়ে দেয় রুমি। রোহান নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পরে। দু’জনেরই ঘরের লাইট অফ হয়ে যায়। রুমি নিজের ঘরে ফেরত এসে দরজাটা আটকে দেয়। লাইট অফ করে না। নিজের মাটির ব্যাংকটা বের করে। বেশ ভারী মনে হচ্ছে। গত ছয়মাস থেকে দশটাকা, পাঁচটাকা বা কখনো পঞ্চাশ টাকা করে ফেলছে। মাটির ব্যাংকটা কেনার উদ্দেশ্যে সংসারের উচ্ছিষ্ট টাকাগুলো এখানে ফেলা। তারপর মায়ের জন্য একটা হুইল চেয়ার কেনা। আজকে ব্যাংকটাকে ভাঙতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। কিন্তু ব্যাংকটাকে সে ভাঙে না।
বই কেনা হয়নি। মায়ের হুইল চেয়ারও লাগবে। কোনটা বেশি দরকার বুঝতে পারে না সে।

বই কেনা না হলে পরীক্ষা দিতে পারবে না। আবার মা সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকাটাও তার কাছে কষ্ট লাগে।
দোটানার মধ্যে পরে যায় সে। চিন্তায় ডুবে যায়। অবশেষে মনে হলো, মাস তো প্রায় শেষ। বেতন পাবে দু’তিন তারিখের দিকে। সেখান থেকে কিছু টাকা নিলে নাহয় কোনোমতে হয়ে যাবে। সে মাসটা টানাটানি যাবে একটু, তবে চালিয়ে নিতে পারবে।

ব্যাংকটা তাহলে বেতন পাবার পরই ভাঙবে সে। ব্যাংকে কত টাকা জমেছে তার ওপরই বেতনের টাকা থেকে কিছু নিতে হবে। এসব ভেবে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দে। বাইরে বাতাস হচ্ছে খুব। আজকেও ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। দিনকে দিন শরীরটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইলটা টুং করে বেজে উঠলো। মেসেজ আসার শব্দ। এই সিম অফিসগুলোও না, রাত নেই দিন নেই শুধু অফারের মেসেজ দেবে। মাঝেমাঝে খুব বিরক্ত লাগে তার। মেসেজগুলো ডিলেট দেয়ার সময় স্নেহার মেসেজটা চোখে পড়ে। কপি করে রেখে দেয়। আবারও অপ্রয়োজনীয় মেসেজ ডিলেট করতে থাকে। ফের মেসেজ আসে। নতুন মেসেজ?
রোমান স্যারের নাম্বার থেকে। মেসেজটা ওপেন করে। মেসেজটা পড়ে চোখের কোণায় পানি জমে যায়। লোকটা পাগল, সত্যিই পাগল। কিছুই বোঝে না।


পর্ব ৬

রোমান সাহেবের মেসেজটা ছিল,
‘I love you Nipa I really love you’
রুমি মেসেজটা ডিলেট করে না। বারবার মেসেজটা দেখতে থাকে। লোকটাকে ঠিকমতো পাত্তা না দেয়া সত্ত্বেও কেন এত পাগলামী করছে? উনি কি বুঝতে চাচ্ছেন না যে আমি আনকমফোর্ট ফিল করছি। নাকি আমি সত্যি সত্যি মনে মনে তাকে ভালোবাসি বলে তিনি আমার জীবন থেকে চলে যাচ্ছেন না। সত্যি কি তাকে আমি ভালোবাসি? তার তো সংসার আছে। বউ আছে। মেয়ে আছে। হোক না তার বউ মর্ডান, স্মার্ট, বউ তো।
নাকি লোকটা আমার সাথে নিঁখুত অভিনয় করছে। কোনোকিছুই মাথায় আসে না রুমির। জানালা থেকে বিছানায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে। ঘুমাতে চায় সে। সকালে সকাল উঠতে হবে।

রুমি আর রোমান সাহেবের সম্পর্ক সেভাবেই চলতে থাকে যেভাবে চলছিল। রুমি সবকিছু মুখ বুঝেই মেনে নিয়েছিল। হয়তো মধ্যবয়সী লোকটাকে মনে ধরেছে। এরই নাম কি ভালোবাসা? রুমি বুঝতে পারে না আসলে এটা কী? এর আগে এ রকম পরিস্থিতে পড়তে হয়নি তো সেজন্যই। তবে এতটুকু ঢের বুঝতে পারে লোকটার জন্য আজকাল বেশি মায়া জন্মেছে। তাকে না দেখলে মনটা খুঁতখুঁত করে। জীবনটা ফাঁকা লাগে যেন কোনোকিছুই হারিয়ে গেছে। কখনও কখনও মোবাইলের মেসেজগুলো চেক করে, যদি পাগল লোকটা কোনো মেসেজ পাঠিয়েছে। ছোট্ট করে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে।

রুমি মায়ের জন্য হুইল চেয়ার কিনেছিল। সাথে বইও কিনতে হয়ছে। হুইল চেয়ারটা পেয়ে মা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন,
‘টাকা কোথায় পেলি মা?’
রুমি স্বাভাবিকভাবে জবাব দেয়,
‘মাটির ব্যাংকে জমিয়েছিলাম মা। তোমার জন্য হুইল চেয়ার কিনবো বলে। কতদিন আর শুয়ে থাকবা। এখন ইচ্ছে হলে জানালার কাছে গিয়ে রোদকে বা বৃষ্টিকে নাহয় ছুঁয়ে দিয়ো।’

মেয়ের ইচ্ছে আর আশা দেখে চোখের কোণে পানি জমে যায় রাহেলা বেগমের। রুমিকে বুকে জড়িয়ে চুমুতে ভরিয়ে দেন সারা মুখ। রুমিও তৃপ্তি পায়।
সে মাসটা একটু টানাটানি গেছে, তবে সেটা সামলে নিয়েছে সে। পরীক্ষার জন্য আলাদা চাপও বেড়েছে। রাতে ফিরে রান্নার পর পড়াশোনা করতে হয়। প্রায়ই রোমান সাহেব গুড নাইটের মতো মেসেজ পাঠায়। রুমি মেকি হাসে কিন্তু উত্তর দেয় না। মেসেজগুলো বারবার দেখে।

স্যারের রুমে নিঝুমের ডাক পরে। রোমান স্যার নিঝুমকে প্রশ্ন করে,
‘রুমির কী হয়েছে নিঝুম? অফিসে আসছে না কেন?
‘নিঝুম উত্তর দেয়,
‘স্যার ওতো ছুটিতে আছে।’
‘ছুটিতে আছে মানে? কবে নিয়েছে ছুটি?’
রোমান সাহেব কিছুটা অবাক হয়।
‘স্যার ওর ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। বিনা বেতনে এক মাসের ছুটি নিয়েছে।’
“ঠিক আছে, তুমি যাও।’

নিঝুম চলে যায়। রুমি এক মাসের ছুটি নিয়েছে অথচ তাকে একবারও বলেনি। মনটা খারাপ হয়ে যায় রোমান সাহেবের। তার অফিসে এমন স্টুডেন্টদের জন্য পড়ালেখার সুযোগ থাকে। পরীক্ষার সময় কনসিডার করা হয়। রুমিও সে সুযোগ লুফে নিয়েছে। ছুটির বিষয়টা রাফাত সাহেব দেখাশোনা করে। রোমান সাহেব আর কিছু ভাবতে পারে না। একটা মাস! অনেকটা সময়। এ সময় বেতন না পেলে রুমির নিশ্চয়ই সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়বে।
ঘড়িতে দেখে দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে। ফাইলগুলো বন্ধ করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজকে এত দ্রুত অফিস থেকে চলে যাওয়া দেখে এমপ্লোয়িরা একটু অবাকই হয়েছে। কত ইমার্জেন্সী কাজ পড়েছে তার ইয়ত্ত্বা নেই।

ফোনটা বাজে। রাফাত সাহেবের ফোন,
‘স্যার কোথায় যাচ্ছেন? আপনার তো একটায় মিটিং আছে।’
‘আজকে পোস্টপোন করে দিন।’
‘আপনার শরীর ঠিক আছে তো স্যার?’

‘আমি ঠিক আছি। আপনি অফিসটা সামলাবেন। ভালো লাগলে অফিস ফেরত আসবো।
বলেই লাইনটা কেটে দেয় রোমান সাহেব। গাড়িতে বসে ড্রাইভ করতে লাগলো। প্রথমবার যাচ্ছে, তাই একটু ইতস্তত লাগছে।

কলিং বেলটা বেজে ওঠে। রোহান আজ বাড়িতেই ছিল। দরজাটা খুললো সে। একজন মধ্যবয়সী লোক। রোহান বললো,
‘কাকে চান?’

‘এটা কি রুমির বাড়ি?’
‘আমার বুবু।’
‘তুমি তাহলে রোহান?’
‘হুম।’
‘ভেতরে আসতে বলবে না?’
‘আসুন। কিন্তু বুবু তো বাসায় নেই। পরীক্ষা দিতে গেছে।’

সাথে করে আনা মিষ্টি, বিস্কুট, ফ্রুটসগুলো টেবিলের ওপরে রাখেন তিনি। রাহেলা বেগমকে দেখে সহজেই চিনে ফেলেন। রুমি তার কথা বহুবার বলেছে। রোমান সাহেব রাহেলা বেগমকে সালাম দেয়। রোহান একটা চেয়ার এনে বসতে দেয়। পকেট থেকে কিছু চকলেট বের করে রোহানের হাতে ধরিয়ে দেয়। রোহান চকলেট পেয়ে ভীষণ খুশি হয়। এত দামী চকলেট সে আগে কখনো খায়নি। সুস্বাদু ছিল বটে।
‘আপনাকে তো চিনলাম না বাবা।’
রোমান সাহেব হাসে। বলেন,

‘আমি আপনার বয়সে ছোট হবো। তুমি করে বললে খুশি হবো। আর আমাকে আপনি চিনবেন না। বলতে পারেন আমি রুমির কলিগ।’
‘ওহ।’
‘রুমি কয়েকদিন অফিসে যায়নি। ভাবলাম শরীর খারাপ করেছে। ওর ফোনটাও অফ।’
‘ওর ফাইনাল পরীক্ষা চলছে তো বাবা। সেজন্যই ছুটি নিয়েছে। হয়তো কিছুক্ষণে মধ্যে ফিরে আসবে। বুঝলে বাবা, মেয়েটা আমার খুব সহজ-সরল। সংসারের জন্য খুব বেশি পরিশ্রম করে। ‘

‘জানি আন্টি। ওর মতো মেয়েই হয় না।’
রোমান সাহেব বুঝতে পারে বাড়িটা ছোট হলেও বেশ সাজানো। জিনিসপত্র খুব বেশি নেই, যতটুকু আছে তাতেই ঘর তিনটে সেজেছে।
‘বাবা আমার পা দু’টো প্যারালাইজড। তোমাকে কী করে চা খাওয়াই বলো তো!’

‘মন খারাপ করবেন না। আমি আছি তো, রুমি আসুক। ওর হাতের বানানো চা খাওয়ার শখ ভীষণ।’
বলেই হাসতে লাগলো রোমান সাহেব। রাহেলা বেগম মেকি হাসেন। রোহান শুধু মা আর ভদ্রলোকের কথা শুনতে থাকে।
কলিং বেল বেজে ওঠে। রোহান দরজা খুলতে যায়। রাহেলা বেগম বলে,
‘রোহান, তোর বুবু আসলো মনে হয়।’

রোহান দরজা খুলে দেয়। রুমি এসেছে। স্যারকে দেখে চমকে যায় না। বাইরে গাড়ি দেখেই বুঝেছে লোকটা বাড়ির ভেতর ঢুকে পরেছে। রুমিকে দেখে খুশি হয় রোমান সাহেব।
‘কেমন হলো পরীক্ষা?’
মেকি হাসে রুমি।
বলে, ‘ভালোই।
কখন এসেছেন আপনি?’
‘আধা ঘন্টার মতো হবে।’

রাহেলা বেগম বলেন, ‘মা, হাত-মুখ ধুয়ে উনাকে একটু চা করে দে।’
‘আচ্ছা মা।’
নিজের ঘরের দিকে যায় রুমি। রোমান সাহেব তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

রুমি চা করছিল। রোমান সাহেব পাশে দাঁড়ায়।
‘রাগ করেছ?’
‘কী জন্য?’
‘আমি এসেছি বলে?’
কাজ করতে করতে জবাব দেয়, ‘অবাক হইনি। আমি জানি আপনি আসবেন।’
‘জানো? কেমনে?’
‘মন বলছিল, তাই।’

রুমি চা বসিয়ে ময়দাগুলাতে লাগলো। কয়েকটা পিঠা ভাজবে বলে।
‘আমাকে তো একবার বলতে পারতে। আমার কত টেনশন হচ্ছিল। জানো?
‘মিছিমিছি কেন চাপ নিচ্ছেন স্যার।’
রুমি স্যারের দিকে তাকিয়ে মেকি হাসে। হঠাৎ করে রোমান সাহেব রুমির ময়দা মাখানো হাতটা ধরে বলেন,
‘তুমি জানো আমি কেন চাপ নেই, কেন টেনশনে থাকি।’
‘আপনি পিঠা পছন্দ করেন?’

‘অনেকদিন খাইনি।’
প্রসঙ্গ পাল্টায় রুমি। পকেট থেকে হাজার দশেক টাকা বের করে রুমির বা হাতে ধরিয়ে দেন তিনি।
‘এটা রাখো। এ মাসে তো আমার বেতন হবে না।’
‘এটার দরকার নেই। আমি সামলে নেব।
টাকাটা ফেরত দিতে উদ্ব্যত হয় রুমি।

‘রুমি, বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু। তুমি জানো আমি কেন তোমাকে এটা দিচ্ছি। আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও। তুমি এটা বোঝো না কেন?’
টাকাটা সত্যি তার খুব দরকার ছিল। জোরাজুরির করার ফলে টাকাটা নিলো সে।
‘এখন রান্না বসাবো। আপনি চাইলে দুপুরে আমাদের সাথে লাঞ্চ করতে পারেন। তবে ছোট মাছ আর ডালের বেশি পদ দিতে পারবো না।’
রুমির কাছে এগিয়ে আসে রোমান সাহেব। ফিসফিস করে বলে,
‘এটাই অমৃত খাবার রুমি। আমি লাঞ্চও করতে চাই।’

রুমি যে মনে মনে তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল সেটা এখন সে ভালোই বুঝতে পারে। সেজন্য ইশারায় অনেক কথাই বোঝায়। রোমান সাহেব সেদিন লাঞ্চ করে। অনেকদিন পর তৃপ্তি ভরে খেয়েছে। যাওয়ার সময় রোহানের হাতে দু’টো পাঁচশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বলে,
‘খাতা-কলম কিনে নিও।’
গাড়িতে বসে রুমির দিকে তাকান। রুমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। গাড়ি ছাড়ার আগে একটা কথাই বলেন,
‘অনেকদিন পর তৃপ্তি নিয়ে খেলাম রুমি।’
রুমি স্মিত হাসে। রোমান সাহেব খুশিমনে গাড়ি ছাড়ে।


পর্ব ৭

পরীক্ষার পর ফের অফিস যাওয়া শুরু করে রুমি। রুমির সাথে রোজ দেখা না হলেও রোজ ফোন দিতে ভুল করে না রোমান সাহেব। রুমি স্যারের ফোনের অপেক্ষায় থাকে। সেদিনের পর থেকে প্রত্যেকটা পরীক্ষায় পরীক্ষা সেন্টারের সামনে রুমিকে নিতে যেত রোমান সাহেব। প্রথমবার রুমি অবশ্য অবাক হয়েছিল,
‘আপনি এখানে?’
হাস্যেজ্বল মুখে রোমান সাহেব বলে,
‘তোমাকে পিক আপ করতে এসেছি। উঠে বসো।’
‘শুধু শুধু কষ্ট কাঁধে তুলে নেন কেন?’

‘তোমার জন্য কোনো কষ্টই কষ্ট মনে হয় না রুমি। এটাই সত্যি।’
রুমি সেদিন কোনো কথা বলেনি। তারপর প্রায়ই রুমিকে পিকআপ করতে আসতো রোমান সাহেব। মুখে না বললেও রুমির বেশ ভালোই লাগতো।

সেদিন বিমর্ষ হয়ে ডেক্সের সামনে বসে ছিল রুমি। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করছে সে। টিস্যু পেপার দিয়ে বারবার চোখ মুছছে। অনেক কাজ পরে আছে অথচ কোনো কাজেই মন বসছে না। হঠাৎ মামুন এসে বললো,
‘ম্যাডাম, স্যার আপনাকে ডাকছেন।’
রুমি ডেক্স থেকে মাথা তুলে বলে,
‘জ্বি, যাও, যাচ্ছি।’

মামুন ভাই চলে যায়। রুমি স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে স্যারের রুমে যায়।
‘রুমি তুমি হয়তো জানো না, এই সিসিটিভিতে প্রায় সময় আমি তোমাকেই ফলো করি। কেন কাঁদছিলে? বলো আমায়।’
রোমান সাহেব নিজের টেবিল থেকে উঠে রুমির পাশে বসে। রুমির কাঁধে হাত রাখে। রুমি কিছু বলতে চায় না। না বলেও উপায় নেই। কী করবে, কোথা থেকে শুরু করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তাকে সাজেস্ট করার মতোও কেউই নেই। তাছাড়া এতগুলো টাকার ব্যাপার। কোথায় পাবে সে!
‘রুমি, কাম ডাউন। প্লিজ বলো।’

রুমির চোখে পানি জমে যায়। কেঁদে ফেলে। চোখের পানিতে গাল ভিজে যায়। রোমান সাহেব বুঝতে পারে বিষয়টা সিরিয়াস।
‘রুমি বলো। আমার টেনশন হচ্ছে। তোমার চোখে পানি দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে। তোমাকে তো বলেছিলাম তোমার সবকিছুর ভাগিদার আমিও।’
রুমি নিজেকে সামলে নেয়। সবকিছু বলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। নিজেকে এক দম দিয়ে বলে,
‘গতকালকে মাকে হসপিটালে ভর্তি করিয়েছি। ডাক্তার বলেছে ব্রেস্টে টিউমার। এটা সাধারণ টিউমার নাকি ব্রেস্ট ক্যান্সার তারা এখনও বুঝতে পারছে না। অপারেশন করে ওখানকার মাংস পরীক্ষা করে দেখার পর বলতে পারবে।

‘ওহ নো। তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?’
রোমান সাহেবের চোখেমুখে চিন্তার রেখা দেয়া যায়।
রুমি কাঁদতে থাকে। চোখের পানি বাঁধ মানে না। গত রাত থেকে কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। নিজের বলতে মায়েই তার সব, আর ছোট ভাইটা।
‘আপনার কাছে হাতজোর করছি। আমার একটা উপকার করবেন? এর বিনিময়ে আপনি যা চান তাই পাবেন।’
রুমি কেঁদে ওঠে।

‘এভাবে বলছো কেন রুমি? তোমাকে ভালোবাসি আমি।’
‘আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিবেন? আপনি যা বলবেন সবটাতেই আমি রাজি।’
‘তোমাকে কিছুই করতে হবে না রুমি। আমি কালকে টাকা দিয়ে আসবো। আর মায়ের সুস্থ হওয়া অবধি ছুটি নাও। আর একটা এপ্লিকেশন দাও।’
রুমি স্বপ্ন দেখছে না তো! যে টাকার চিন্তায় গতকাল থেকে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। সেই টাকাটা স্যার দিতে চাইছে! রুমি নিজের ডেক্সে বসে কাজে মনোযোগ বসাতে চেষ্টা করে।

পরদিন রুমির বাড়ি গিয়ে হাজির রোমান সাহেব। রুমি তখন হসপিটালের দিকে বের হচ্ছিল। রাতে মায়ের অপারেশন হবে। স্যারকে দেখে একটু খুশি হলো সে। স্যার নিশ্চয়ই টাকা নিয়ে এসেছে। টাকা নিয়ে আসারই তো কথা। তিনি টাকা দেবে সেটাই তো বলেছিল।
‘রুমি চলো, তোমাকে হসপিটালে নামিয়ে দেই।’
‘হুম।’

রুমি স্যারের পাশে বসে। অভ্যাস হয়ে গেছে তার। লোকটাকে যেরকম ভেবেছিল সেরকম নন তিনি। একটা ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করায় রোমান সাহেব।
‘রুমি একটু নামবে?’
‘হুম।’

রাস্তা দিয়ে মাঝেমাঝে শাঁইশাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। হালকা বাতাসও বইছে। রুমি বুঝতে পারে না স্যার হঠাৎ কেন গাড়ি থামালেন।
‘রুমি আমি এখন যা বলবো তা হয়তো শোনার জন্য তুমি প্রস্তুত নও। তবে আমাকে বলতেই হবে। এটা সত্যি যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর এটাও সত্যি গত দু’বছর যাবত আমি আমার স্ত্রীর সাথে শারিরীক সম্পর্কও করিনি। আফটার অল আমরা সবসময় আলাদা ঘুমাই। রুমি তুমি জানো, আমি সংসার ধর্মটা ভীষণ মিস করি। আমারও ইচ্ছে হয় শান্তিতে সংসার করতে। কিন্তু লিমার জন্য সেটা সম্ভব না। ওকে নিয়ে আমি সংসার করতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম, কিন্তু সে সঠিক পথে ফেরত আসেনি।

আমি যে তোমাকে মাঝেমাঝে ছুঁই সেটা আমার ভালো লাগা থেকে। আমি জানি আমি ইচ্ছে করলে তোমার সাথে জবরদস্তি করে জয়ী হতে পারি। কিন্তু আমি সেটা করি না, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার দাবি নিয়ে বলছি তুমি কি একটা দিন আমার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করবে? একজন স্ত্রী তার স্বামীর জন্য যা যা করে সবটা? তুমি যেহেতু বলেছো টাকার জন্য তুমি সবটা করবে আমি তোমাকে সবটা করতে বলবো না, টাকাটা দেবো, অবশ্যই দেবো। তুমি আমার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় না করলেও। আমার মনে হয় বাকিটা তুমি বুঝবে।’

এ কথা বলে টাকার বান্ডেলটা রুমির হাতে ধরিয়ে দেয় রোমান সাহেব। তারপর গাড়িতে গিয়ে বসে। রুমি কী বলতে ঠিক বুঝতে পারে না। তার কী বা উচিত, তাও না। গাড়িতে বসে পরে। রোমান সাহেব গাড়ি ছেড়ে দেয়। হসপিটালের গেটে এসে গাড়ি থামায়। রুমি গাড়ি থেকে নেমে বলে,
‘আমি একদিন আপনার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি।’
রোমান সাহেব খুশি হয়। রুমি চলে যায়। মায়ের কাছে থাকা ভীষণ দরকার।

রাহেলা বেগম আপাতত সুস্থ। অপারেশনের পর একটু ভালো লাগছে। বাড়িতে এসেছেন তিনি। বায়োপসির রিপোর্ট আসতে কয়েকদিন দেরি হবে। রুমি মায়ের সুস্থ হওয়াতে খুশি হলেও স্যারের বিষয়টা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। একদিন রাতে কথা বলার সময় রোমান সাহেব বলে,
‘ডেট কি ফিক্সড করেছো?’
‘আপাতত ভাবিনি, আপনি যখন ডাকবেন তখন।’
‘ঠিক আছে আগামী পরশুদিন। আমি তোমাকে নিতে আসবো। আমার বাগানবাড়িতেই সবকিছুই ঠিক করছি।’

‘হুম।’
‘রুমি?’
‘হুম।’
‘নীল শাড়ি পরবে?’
‘হুম।’
‘একটা নীল টিপও দিয়ো। আর শোনো, লিপস্টিক দিয়ো না। তোমার ঠোঁটে লিপস্টিক মানায় না। এমনিতেই তোমার ঠোঁট দু’টো অনেক সুন্দর।’
রুমি আর কোনো কথা বলে না। চুপচাপ ভাবতে থাকে।

সারাদিন আর রাতের খাবার রান্না করে রাখে রুমি। মাকে কাজের কথা বলেছে সে। সে রকম হলে তরকারিটা গরম করে নেবে রোহান। আগের থেকে রান্নাতে কিছুটা হাত লাগায় সে। নিশ্চয়ই তরকারি গরম করতে সমস্যা হবে না।

রোমান সাহেব আসে। রুমি নীল শাড়ি পরেছে, সাথে নীল টিপ। হালকা ইমিটিশনের গহনা। রুমি যখন স্যারের গাড়ির সামনে দাঁড়ালো তখন খানিকক্ষণ অবাক হয়েছিল রোমান সাহেব। গাড়ি চলার সময় বলেই ফেললো,
‘ভয়ঙ্কর সুন্দর তুমি।’

গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটা বাড়ির সামনে। সুন্দর বাড়িটা। ছোট হলেও বাইরে থেকে বেশ দেখতে। স্যারের পেছন পেছন ভেতরে যায় রুমি। বুকটা তার কেঁপে ওঠে। অজানা সংশয়ে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সারাদিন রান্নাবান্না আর দু’জনের খুনসুটিতে ভরে থাকলেও রুমির মনটা অস্থির লাগে। স্যারের সঙ্গ দেয়া কি ঠিক হচ্ছে? কেন করছে সে এটা? লোকটার কোনো অন্য উদ্দেশ্য নেই তো? শরীরটা মাঝেমাঝে কাঁপছে। সে একটু ভয়ে থাকলেও স্যারকে ভীষণ খুশি মনে হচ্ছে আজ। এমন খুশি হতে সে আর কখনো তাকে দেখেনি। নিজের হাতে রোমান সাহেবকে খাইয়ে দেয়ার সময় কামড় দিয়েছিল লোকটা। বুড়ো হচ্ছে অথচ রোমান্সেরর ছিটেফোঁটাও কমেনি। রাত হয়ে আসে। রুমির ভয় করতে শুরু করে।


পর্ব ৮

রোমান সাহেব তার দিকে চেয়ে আছে। রুমিও লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছে না, একটু ভয় করছে। লোকটা তাকে মেরে ফেলবে না তো। এ রকম অনেক আজগুবি কথা সে শুনেছে। রোমান সাহেব তাকে অপলক দৃষ্টিতে দেখছে। কী বলবে ভেবে পায় না রুমি। সারাদিন রান্নাবান্না বা তার সাথে গল্প করে এখন একটু ক্লান্ত লাগছে। এখন রাত। স্ত্রীরা এ সময় স্বামীদেরকে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেয়। রুমি কী করবে সেটা নিয়ে ইতস্তত করতে থাকে।

শেষপর্যন্ত নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করার পর শরীরের কাপড়গুলো খুলতে শুরু করে। প্রতিজ্ঞা যেহেতু করেছে সেহেতু সবটা করা উচিত। হাজার হলেও তাকে অনেক টাকা দিয়েছে, সাহায্য করেছে। তার জন্য শুধু এতটুকু করবে না? এই শরীরটা ছাড়া আর কী বা দিতে পারে তাকে। রুমির এভাবে কাপড় খুলতে দেখে রোমান সাহেব এগিয়ে যায়। রুমির বুকটা দুরুদুরু করতে শুরু করে। হঠাৎ রুমি অবাক হয়ে যায়। লোকটা তার জামাকাপড় তাকেই পরিয়ে দিচ্ছে।
‘এসব খোলার দরকার নেই রুমি।’

‘আপনি তো!’
‘না রুমি। এখন না। সহবাসের জন্য কাপড় খোলার দরকার পরে না। তুমি যদি মনে করো এতে তোমার বিরাট ক্ষতি হবে তাহলে আমি তোমায় জোর করবো না। শুধু আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে একটা রাত ঘুমাতে চাই। যেখানে কোনো লালসা থাকবে না, থাকবে না কোনো কামনা। তোমার অনুমতি ছাড়া আমার ভালোবাসাকে আমি অপবিত্র করতে পারি না।’
রুমি কাঁদছে। লোকটাকে যতই দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। কী চায় লোকটা। সত্যি কি শুধু সঙ্গ চায়? এমন সঙ্গ যেখানে কামনা থাকবে নেই। লোকটা সত্যি পাগল।
রোমান সাহেব লাল বেনারসি শাড়ি আর কিছু গহনা রুমির হাত ধরিয়ে দিয়ে বলে,

‘এগুলো পরে নাও। তারপর আমরা ছাদে যাবো। অনেকরাত পর্যন্ত চাঁদ দেখবো।’
রুমি জিনিসগুলো হাতে নেয়। একদিনে স্ত্রীর অভিনয় করতেই হাঁপিয়ে ওঠে সে। স্যারের দেয়া জিনিসগুলো দিয়ে সাজতে থাকে। তারপর দু’জনে ছাদে যায়। অনেকটা সময় পার করে। হঠাৎ রোমান সাহেব জিজ্ঞেস করে,
‘শারিরীক সম্পর্কে তোমার আপত্তি নেই তো?’
রুমি মাথায় ঝাঁকিয়ে বলে,
‘না।’

রোমান সাহেব আলতো করে জড়িয়ে ধরে রুমিকে। তারপর দু’জন দু’জনের অনেক কাছে চলে আসে। এতটাই কাছে যেখানে ভালোবাসার পরশে মানুষ সিক্ত হয়।

সকাল সকাল গোসল শেষে নাস্তা তৈরি করে রুমি। স্যারকে ডেকে দেয়। রোমান সাহেবের মনটা একটু খারাপ। গতকাল যা হয়েছে তাতে এতটা খুশি অনেকদিন পরই হয়েছে। নাস্তা শেষ করে রুমি বলে,
‘আমাকে এবার বাড়ি ফিরতে হবে।
‘হুম। এখনই পৌঁছে দেব। আজ তোমার অফিসে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। রেস্ট নিও।’
রুমি কোনো কথা বলে না। গতকালের শাড়িটা পরে নেয়। যাতে মা তাকে ভুল না বোঝে। রুমির শরীরে পুরাতন শাড়িটা দেখে বলে,
‘নতুন শাড়িটা পরলে না?’

‘পরে পরবো। মা সন্দেহ করতে পারে।’
‘ঠিক আছে।’
গাড়ি চলতে থাকে। রুমিকে ফ্রেশ লাগে অনেকটা। স্যারের মনটা গতকাল খুব ভালো ছিল, আজ একটু খারাপ। আপনার হাতটা ধরি? রুমির মুখে এমন কথা শুনে অবাক না হয়ে পারে না রোমান সাহেব।
‘কী বলছো রুমি? কেন নয়?’

তিনি নিজেই রুমির হাতটা জাপটে ধরে। চোখে পানি চলে আসে তার। পুরুষ লোকদের কাঁদতে নেই। তাই নিজের চোখের পানি আড়াল করে ফেলে। রুমি বলে,
‘আড়াল করলেন কেন?’
মুচকি হাসে রোমান সাহেব। স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। বলে,
‘কালকের দিনটা আমার জীবনের সেরা দিন ছিল রুমি। যদি বারবার এমন দিন আসতো তাহলে আমার স্ট্রেস থাকতো না। তোমাকে ধন্যবাদ আমাকে খুশি রাখার জন্য।’
‘আপনাকেও ধন্যবাদ, আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন বলে।’
বাড়ির সামনে চলে আসে রুমি। গাড়ি থামে। রুমি আজ অফার করে,

‘চা খেয়ে যান।’
‘না রুমি। এতটুকু সহানুভূতির জন্য কৃতজ্ঞতা।’
রুমি স্মিত হেসে ঘরের দিকে হাঁটা দেয়। রোমান সাহেব ডাকে,
‘রুমি।’
রুমি গাড়ির কাছে চলে আসে,
‘আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমায় ভালোবাসো?’
রুমি মুচকি হেসে দ্রুত পায়ে হাঁটা দেয়। আর পেছন ফিরে তাকায় না। গাড়ির ভেতর বসে না থেকে অফিসের দিকে যাত্রা করে সে। রুমির জন্য সে তার ভালোবাসাটুকু কখনোই পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারেনি।

আল্লাহর দিন থেমে থাকে না। একের পর এক চলতেই থাকে। জীবনচক্রে রুমিও তার পরিবার নিয়ে বেশ খুশি। স্যারের সঙ্গ তার মনকে তৃপ্তি দেয়। মাঝেমাঝে ঘুরতে বের হওয়া ছাড়াও ফোনে সবসময় কথা হয়। জীবনের যে অংশটুকু ফাঁকা ছিল রোমান সাহেবের, সেটুকু রুমিকে পেয়েই পূর্ণতা লাভ করেছে। আগের থেকে স্ট্রেস কম। শান্তিতে বাঁচতে পারছে। লিমার জীবনের পরিবর্তন আসেনি। সে তার নিজের ইচ্ছেমতো চলছে।

সেদিন মামুন ভাই নিঝুমের কাছে এসে বললো
‘নিঝুম ম্যাডাম?’
‘জ্বি মামুন ভাই।
‘এমডি স্যার আপনাকে ডাকছেন।’
‘আচ্ছা যাচ্ছি।’

হঠাৎ এমডি স্যার তাকে ডাকবে কেন? কাজ ফেলে স্যারের রুমে ঢোকে সে। সালাম দেয়,
‘নিঝুম, রুমি আসেনি কেন? ফোনটা সুইড অফ।’
‘আপনাকে বলেনি ও?’
‘না মানে, গতকাল মিটিংয়ে ছিলাম। সারাদিন ফোন অফ ছিল। কী হয়েছে বলো তো?’
‘গতকালকে ওর মা মারা গেছে।’

‘ওহ নো! ঠিক আছে নিঝুম, তুমি যাও।’
মনটা খারাপ হয়ে যায় রোমান সাহেব। চোখের কোণে পানি জমে যায়। মেয়েটাকে যেমন ভালোবাসে তেমনি তার প্রতি খুব মায়া। মা চলে যাওয়াতে হয়তো খুব শকড হয়েছে। আর দেরি করে না। গাড়ি বের করে রুমির বাড়ির দিকে ড্রাইভ করে।

‘রুমি?’
রুমি মায়ের হুইল চেয়ারটা ধরে কাঁদছিল। মুখটা শুকিয়ে গেছে। চোখ দু’টোও ফোলা ফোলা। স্যারকে দেখে চোখের পানি মুছে ফেলে। নিজেকে কনট্রোল করার চেষ্টা করে।
‘সরি রুমি। আমি এখনই জানতে পারলাম। কাল সারাদিন মিটিংয়ে ছিলাম।’
‘আমি তো একা হয়ে গেলাম স্যার।’
এ কথাটা বলেই রোহানকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। রোহানও কান্নায় যোগ দেয়। রুমিকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে ভাষা খুঁজে পায় না সে। সত্যি তো, মেয়েটা একা হয়ে গেল। হঠাৎ কী যেন চিন্তা করে বলে,
‘রুমি চলো।’

‘কোথায়?’
‘চলো। রোহান, তুমি বাসায় থাকো। আমরা আসছি।’
রুমির হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে বসায়। রুমি বুঝতে পারে না কী হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সবটা ক্লিয়ার হয়ে যায় সে। কাজী অফিস!
‘আমি হয়তো তোমাকে খুব বেশি সময় দিতে পারবো না। তুমি সবটা জানো আমার ব্যাপারে। তবে তোমাকে একা হতেও দিবো না। সবসময় তোমার সাথে থাকতে চাই, আরও কাছাকাছি। তোমার কি দ্বিমত আছে?’

রুমির কাছে সবটা স্বপ্নের মতো মনে হয়। কী বলবে সে? লোকটাকে মনে মনে ভালোও বাসে। তার সাথে পরিণয়! হোক না ছোট বউ। নাহয় বাকি জীবনটা তার স্মৃতিগুচ্ছ নিয়েই পার করে দেবে।
রুমি মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে উত্তর দেয়। নিঝুম আসে, বিয়ের সাক্ষী হয়ে। রোমান সাহেবের এক বন্ধুও আসে। বিয়েটা হয়ে যায়। রুমি কাঁদতে থাকে। সে জানে এ বিয়েটা অনিশ্চিতের বিয়ে, তবুও লোকটাকে ভালোবাসে বলেই সম্মতি দেয়া। রোমান সাহেবও খুশি হয়। দু’জন দু’জনের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে। দু’জনের চোখেই তখন ভালোবাসার পরশ খেলা করছে। দু’জন দু’জনকে আরও ভালোভাবে চেনার চেষ্টা করছে। আদৌ কি সেটা সম্ভব?


পর্ব ৯ (শেষ পর্ব)

নিঝুম ছাড়া অফিসের কেউ জানে না স্যারের সাথে রুমির বিয়ে হয়ে গেছে। নিঝুম রুমির অনেকটাই ক্লোস বিধায় সবকিছুই সে তার সাথে শেয়ার করতো। সেখান থেকেই বিয়ে সাক্ষী হয়েছিল। রোমান সাহেবের সাথে রুমির বিয়ের কয়েকমাস কেটে গেছে। ভালোই যাচ্ছিল সবকিছু। সপ্তাহে দু’তিনদিন রুমির সাথে থাকতে হয়। দু’জনের ভালোবাসায় ঘরটা ভরা থাকে। রোহানও দুলাভাইয়ের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পায়। সংসারে আর আগের মতো টানাপোড়ন নেই। রোমান সাহেবই সংসারের খরচ দেয়। রুমির টাকা ব্যাংকে জমা থাকে।

‘এখানে রুমি কে?’
সকাল সকাল অফিসে এসে বসতে না বসতেই মর্ডান ধাঁচের একজন মহিলা চিৎকার শুরু করেছে। কে যেন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলছে, ‘এটা এমডি স্যারের স্ত্রী।’
রুমি লিমাকে চিনতো না। মহিলার এমন চিৎকারে রুমি বলে উঠলো,
‘আমি রুমি। কেন বলুন তো?’

বলার সাথে সাথে রুমির দিকে এগিয়ে এসে ঠাস ঠাস করে দুগালে দুটো চড় বসিয়ে দেয়। রুমি অবাক হয়ে যায়। এই মহিলা কেন তাকে মারছে। বাকি এমপ্লোয়িরা চুপচাপ রুমির দিকে তাকিয়ে আছে। রুমি লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকে। মহিলা বলতে শুরু করে,
‘আমার স্বামীর সাথে তোর কীসের এত লটরপটর? কতদিন থেকে চলছে এসব? আর কোনোদিন যদি শুনি আমার স্বামীর পেছনে ঘুরছিস তবে তোকে আমি পুলিশে দেবো। আমার সংসারে আগুন দেয়ার মজাটা বোঝাব তোকে।’

এ কথা বলে মহিলা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন। নিঝুম এগিয়ে যায়। মহিলা যা করলো তা ঠিক করলো না।
‘এই যে শুনছেন?’
লিমা পেছনে ঘোরে। নিঝুম এগিয়ে যায়। বলে,
‘আপনি জানেন, কার গালে আপনি থাপ্পড় মেরেছেন?’
‘মানে?’

‘মানে বোঝাতে পারবো না। শুধু এতটুকু কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, যার গালে থাপ্পড় মারলেন সে আপনার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। মাস সাতেক হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। আমি রুমির সাক্ষী ছিলাম। বিশ্বাস না হলে সুন্দরগঞ্জ কাজী অফিসে গিয়ে খোঁজ নেন। আর পারলে আপনার স্বামীকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। আর হ্যাঁ, আপনি সবার সামনে যা করলেন ঠিক করেননি। আপনার স্বামী যে ওই অভাগী মেয়েটার পেছনে ঘুরে ঘুরে তাকে বাগিয়েছিল সে কথা অফিসের সবাই জানে।’

এ কথা বলেই নিঝুম চলে আসলো। নিজের ডেক্সে বসে চায়ের জন্য মহব্বত ভাইকে ডাকতে লাগলো।
রুমির চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। গালে থাপ্পড়ের দাগ বসে গেছে। কোনোকিছুই ভাবতে পারছে না। কী যেন মনে করে সাদা পাতা বের করে কিছু লিখে নিঝুমের হাতে দিয়ে বললো,
‘তুমি আমার অনেক উপকার করেছো। তোমার ঋন আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। কখনো দেখা হলে কথা হবে। ভুলো না আমায়।’
এ কথা বলেই সাইট ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত চলে গেল সে। নিঝুম কোনোকিছুই বলার সুযোগ পেল না। শুধু হা করে তাকিয়েই থাকলো।

ফোনটা বাজছে রোমান সাহেবের। হাতে নিয়ে দেখে রুমির নাম্বার। কাল বিলম্ব না করে রিসিভ করে।
‘তুমি কি দুপুরে খেতে আসবে?’
‘হুম। কেন বলো তো?’
‘না এমনি জিজ্ঞেস করলাম। ঠিক দেড়টায় চলে এসো। মনে রেখ, ঠিক দেড়টা।’

‘কিন্তু হয়েছে’
টুটটুটটুট। ফোনটা কেটে গেল। কয়েকবার ট্রাই করেও নাম্বার বন্ধ পেল রোমান সাহেব। অযথা আর ট্রাই না করে অফিসের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। লিমা আসছে। তারদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে গাড়িতে বসে পরে। লিমা ডাকে,
‘রোমান?’
‘জরুরী কিছু বলবে?
‘হ্যাঁ। তোমার সাথে জরুরী কথা আছে আমার।

‘কী বলবে বলো। অফিসের লেট হয়ে যাচ্ছে।’
‘রুমি কে?’
‘সে প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই আমি।’
আর কোনো কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট দিলো।
লিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

স্যারকে দেখে ঠোঁট বাঁকা করে হাসে নিঝুম। লোকটা যে আসলে কী এখনো সে বুঝতে পারেনি। রুমি কি পেরেছিল বুঝতে? নাকি সেও ব্যর্থ ছিল? মনের ভেতর নানান কথা ঘোরপাক খায় নিঝুমের। রুমির দেয়া খামটা নিয়ে স্যারের রুমে ঢোকে।
‘আসবো স্যার?’
‘নিঝুম, আসো আসো।’

নিঝুম খামটা স্যারের হাত দিয়ে বললো,
‘সকালে আপনার প্রথম ওয়াইফ এসেছিলেন।’
‘কেন?’
‘রুমির থাপ্পড় মারার জন্য।’
‘মানে?’

‘মানেটা তার কাছেই শুনে নেবেন।’
আর কোনো কথা না বলে স্যারের রুম থেকে চলে গেল নিঝুম। রোমান সাহেব খামটা খোলে। খামের ওপর রুমির নাম লেখা। খানিকটা অবাক হয় সে। হঠাৎ খাম কেন? আরও অবাক হয় যখন খামের ভেতরের সাদা পেজটা পড়ে। রিজাইন দিয়েছে রুমি। মাথা ঘুরতে থাকে তার। কী হচ্ছে এসব।
রুমিকে ফোন দেয়। ফোনটা অফ বলছে। মাথায় হাত দিয়ে কী যেন চিন্তা করতে থাকে। লাঞ্চে গেলেই নিশ্চয়ই তার সাথে কথা হবে। সে আশায় আপাতত দু’য়েকটা ফাইল দেখার কাজ শুরু করে।

একটা বাজতে আর বেশি সময় নেই। নিজের প্রয়োজনীয় জিনিপত্র একটা ব্যাগে গুছিয়ে নেয় সে। তারপর রোহানকে বলে,
‘তাড়াতাড়ি কর সোনা। দেরি হয়ে যায় যে।’
‘হয়েছে বুবু।’
বাসায় তালা দিয়ে মালিকের হাতে চাবি তুলে দেয়। তার চোখে জল স্পষ্ট।
‘চাচা, আমার স্বামী আসলে এই টিফিন ক্যারিয়ারটা আর এই চিঠিটা দেবেন? দিলে খুব উপকার হতো।’
‘ঠিক আছে মা।’

‘ও হয়তো একটু পরই আসবে।’
চোখের কোণা বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে তার। এই বাড়িতে কত স্মৃতি! কত খুনসুটি! সবচেয়ে বড় কথা মা এখানে ছিলেন।
‘বুবু, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
রোহানের কথার কোনো উত্তর খুঁজে পায় না সে। তবুও এক বুক কষ্ট চেপে বলে ওঠে,
‘ঘুরতে।’
‘কোথায়?’

‘জানি না ভাই।’
‘দুলাভাই যাবে না?’
‘না।’
রুমি আর কোনো কথা বলে না। রোহানও চুপ করে থাকে। রুমি নিজের পেটের দিকে একবার তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

একটা বাজতেই রুম থেকে বের হয়ে গাড়ি বের করে রুমির বাসার দিকে যায়। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে বাসাটা খালিখালি। অন্যরকম লাগছে। কিছু কি হয়েছে? মনের ভেতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।
ঘরের সামনে যেতেই দেখে, তালা ঝুলছে। কোথায় গেল রুমি? খানিকটা অবাক হয়। এমন সময় বাড়িওয়ালা এসে বলেন,
‘বাবা?’
রোমান সাহেব পেছনে ঘুরে তাকায়।
‘জ্বি চাচা।’

‘এই চিঠিটা আর এই টিফিন ক্যারিয়ারটা রুমি দিয়েছে।’
এ কথা বলেই লোকটা চলে যায়। রোমান নিজের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে,
প্রিয় স্বামী,

যখন তুমি এই চিঠিটা পড়ছো তখন আমি তোমার জীবন থেকে অনেকটা দূরে। যেতে না চাইলেও যেতে হচ্ছে গো। আমার জীবনে তুমি গোল্ড কয়েনের মতো। তুমি আসার পর থেকেই আমি বদলে গেছি। সবসময় সাহায্য করেছো আমায়, ভালোবেসেছো। এটাই বা আমার জন্য কম কীসে। আজ যখন তোমার বউ এসে তোমার প্রতি অধিকার দেখালো তখন অবাক হয়েছি। হয়তো সে তোমার জীবনে ভালোভাবেই ফিরে আসবে। একটু সময় তাকেও দাও। তোমার মনে পড়ে? একদিন আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা? সত্যি বলছি আজ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর এটাই আমার জীবনের বড় পাথেয়।

কারণ সে ভালোবাসার ফুল আমার পেটের মধ্যে চার মাস ধরে আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। তাকে কাছে রেখেই বাকি জীবনটা পার করে দেবো। তুমি আমার জীবন ছিলে রোমান। খুব মিস করবো তোমাকে। আমাকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা করো না। আমি হয়তো ভালো থাকবো। আর হ্যাঁ, টিফিন ক্যারিয়ারে তোমার পছন্দের ছোট মাছের চচ্চড়ি, মশুর ডাল, আর আলু ভর্তা আছে। শেষবারের মতো খেয়ে নিও। আর এই অভাগীকে মাফ করে দিও।
ইতি
রুমি

চিঠিটা পড়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো রোমান। কী করবে কিছুই বুঝতে পারে না। শুধু এতটুকু বুঝতে পারে তার হৃদয়ের একটা পাশ খালি হয়ে গেছে। ধপাস করে মাটিতে বসে মাথা নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর গাড়িতে চড়ে রাস্তার ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় সে, উদ্দেশ্য তার স্পন্দনকে খুঁজে পেতে হবে। আর সেটা যেকোনো মূল্যেই।

লেখা – সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “এ এক রূপকথার গল্প – কষ্টের লাভ স্টোরি”গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ুন – ম্যাডামের সাথে প্রেম – লোভনীয় ভালবাসার গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!