কষ্টের প্রেমের গল্প

অনন্যময়ী – একটি করুণ প্রেমের গল্প

করুণ প্রেমের গল্প

অনন্যময়ী – একটি করুণ প্রেমের গল্প: ডিভোর্স এমন একটি শব্দ যা অনেক দিন, অনেক বছর এমনকি অনেক যুগ পেরিয়ে আসা সঙ্গীকেও ছাড়তে বাধ্য করে। কি আজব! হ্যা, এমনি এক ছাড়াছাড়ির বেদনাময়ী গল্প এটি। ভালোবাসার মানুষটিকে হঠাৎ ত্যাগ করা তাও আবার একটা মেয়ে বাচ্চা সহ কতটা বেদনার হতে পারে একবার ভাবুন।

পর্বঃ ১

আজকে আমার প্রসবকালীন সময়ের পাঁচমাস হতে চলেছে। এই পাঁচ মাসে আমার স্বামী আমার একবারও খোঁজ নেয়নি। খোঁজ নেয়নি বললে ভুল হবে, খোঁজ নিয়েছে। গর্ভধারণ এর সময়ে শিশুর পুষ্টির জন্য দুধ, ডিম, ফল সকল কিছু সে পাঠিয়ে দিয়েছে তাদের বাড়ির ড্রাইভারের কাছে। নিজ শরীরে সে উপস্থিত হয়নি। কি ভাগ্য আমার! মাতৃত্বকালীন সময়ে পাশে সব থেকে বেশি দরকার যাকে সে এই পাঁচমাসে একটাবার আমার কাছে আসেনি। একসপ্তাহ পর আমার শ্বশুর এলেন। খুব সুন্দর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মনে হলো এ যেনো আমার নিজেরই বাবা। না সে সব কিছু ভুল প্রমান করে দিয়ে বলে উঠলেন,

প্রথম সন্তান নাতি চাই।

সন্তান সন্তানই হয়। ছেলে আর মেয়ে কি? আর ঘরে লক্ষী তো তখনই আসে যখন প্রথম সন্তান মেয়ে হয়। দেখতে দেখতে পাঁচ মাস কাটিয়ে ছয় মাসে পা দিলাম। হঠাৎ একদিন ফোনের শব্দে দুপুরের ঘুমটা ভেঙে যায়। কাঁচাঘুম ভেঙে গেলে বিরক্তিটা যে কি প্রবলভাবে হানা দেয় তা যার ঘুম ভেঙে যায় সে জানে। ঘুম ঘুম অবস্থাতে ফোনটা ধরলাম। নাম্বারটা অপরিচিত বটে। কিন্তু কে হতে পারে ভেবে ফোনটা কানে ধরলাম। ফোনের অপরপাশে খুব পরিচিত একটা কন্ঠস্বর।

লিয়া বলছো?

হ্যাঁ বলছি।

আমি জিহাদ।

জ্বী বলুন। সব আবেগের জাল ফেলে বলেই ফেললাম,

এতদিন পর?

হ্যাঁ, মা ফোন দিয়ে তোমার খবর নিতে বলেছে।

আমি অবাকের সর্ব সীমায় পৌঁছে গেছি। শুধুমাত্র তার মা আমার খবর নিতে বলেছে দেখে সে আমাকে ফোন দিলো। ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে সে রাখছি বলে ফোন কেটে দিলো।


আমার আব্বু, আম্মু হাজারবার প্রশ্ন করেছে, জামাই কেন এলোনা? তাদের আমি কি উত্তর দিবো ভেবে পাইনা। তাও বলি তোমার জামাই বড্ড ব্যস্ত মানুষ। সে বলেছে, একবারে বাচ্চাসহ আমাকে ঘরে তুলবে। মায়ের পাল্টা প্রশ্ন, তাই বলে এই এত মাসে একবারও সে তোর সাথে দেখা করতে আসলোনা? বিষয়টা হজম হচ্ছেনা ঠিক।

আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমার মাথা ব্যাথা করছে বলে উঠি। এতো স্ট্রেচ দিচ্ছো জানলে জামাই বড্ড রাগ করবে। মায়ের কপালে বিরক্তির ভাঁজটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। সে আর কিছু না বলে আমার রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

আজকে আমার ৯ মাস পূর্ন হয়েছে। আমার শ্বাশুড়ী আমাকে দেখতে আসেন। সাথে বাচ্চার জন্য বিভিন্ন খেলনা, খাবার, কৌটোর দুধ, জাফরান নিয়ে এসেছে। সে সংকোচহীনভাবে বলে উঠে, এগুলো সব আমার দাদু বা দিদুনের জন্য। কিন্তু তোমাকে কতবার বললাম আল্ট্রাসনোগ্রাফি করো, তা শুনলেনা। যাই হোক, ছেলে বা মেয়ে যে হোক খুব যত্ন করবে। নিজের খেয়াল রাখবে। কে বলেছে শ্বাশুড়ী মায়ের মতো হয়না? সে আমার মায়ের থেকে কোনো অংশে কম ভালবাসেনা। সব থেকে মজার কথা হলো আমার শ্বাশুড়ী ঘন্টা চারেক আমাদের বাসায় ছিলো, কিন্তু আমি কিংবা সে একবারও আমার বরের কথা তুলিনি।

মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা। বিয়ের ছয়মাসের বৈবাহিক জীবনে তার সাথে আমার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একবারের জন্যও গড়ে উঠেনি। কিন্তু তার দুইমাস পর কোনো এক দুর্ঘটনা ঘটে যার ফলে আমার ভিতরে আরেকটা সত্ত্বা তৈরি হয়। যখন আমি বুঝতে পারি আমার শরীরেই গড়ে উঠছে অন্য একটা সত্ত্বা আমি আমার বরকে জানাই। কোনো রকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই সে অ্যাবরশনের কথা বলে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে তার কথা শুনছি। একজন বাবা হয়ে কিভাবে সে এই কথা বলতে পারলো আমি ভেবে পাইনা। আমি বাচ্চাটা নষ্ট করিনা, যার ফলে তার সাথে আমার অশান্তি লেগেই ছিলো। বিয়ের আটমাসে তার সাথে আমার কখনও তুমুল ঝামেলা হয়নি। শুধুমাত্র বিয়ের পরেরদিন যখন আমার বাসর রাত ছিলো তখন তার কথা শুনে আমার মেজাজ সাত আসমানে চড়ে যায়। সে খুব সুন্দর করে আমার অবস্থানটা বুঝিয়ে দেয়। পরিবারের চাপে পড়ে আমাকে বিয়ে করেছে।

তার এই বিয়েতে একদম মত নেই। তার প্রেমিকা রিয়াকে সে প্রচন্ড ভালবাসে। আমি বিরক্তির সর্ব সীমায় পৌঁছে আমার সো কল্ড বরকে বলি,

যখন প্রেমিকা আছে আমাকে বিয়ে করলেন কেন? প্রেমিকার কথা মা-বাবাকে না বলে আমার জীবনটা নষ্ট করতে লজ্জা করলোনা?

সে বললো, ডিভোর্স দিয়ে দিবে এবং ঐ মেয়ে অন্য ধর্মের তাই পরিবার মানবেনা। ঐ যে তার সাথে কথা বলা শেষ করেছি এরপর প্রয়োজন ছাড়া কথা বলিনি। যেদিন রাতে তার সাথে আমার সম্পর্ক হয়েছিল, সেদিন সে তার প্রেমিকার উপরে রাগ করে এসব করেছিলো। ঐদিনও আমি চুপ ছিলাম। সময় যে সব কিছুর শোধ নিবে সে তো কারো অজানা নয়। যখন আমার গর্ভধারনের ৩ মাস তখন স্পষ্ট তার লাথি, হাত দোলানো অনুভব করতে পারতাম। ভেবে নিয়েছিলাম আমার সন্তান আমি একাই মানুষ করবো।

দশ মাস পূর্ন হয়ে আমার প্রসব ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। চল্লিশ সপ্তাহে প্রসব ব্যাথা উঠবে এটা আমার অজানা ছিলোনা। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম যখন তখন তিনি রজস্রাবের তারিখ অনুযায়ী প্রসব তারিখ দিয়েছিল। পাঁচদিন আগে পরে হতে পারে। যতবারই ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, ততবারই আমার স্বামী অনুপস্থিত ছিল। প্রসব বেদনা বেড়েই চলছে। রাত তখন ১ টা। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আর হাসপাতাল দূরে হওয়ায় বাচ্চাটা আমার নরমালে গাড়িতে জন্মলাভ করে। হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও আসে। সাতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। তার বাচ্চা তার শরীরের অংশ হয়েছে জেনেও সে আসলোনা। আমার অবশ্য তাতে খুব একটা আসে যায়না।

বাচ্চা হয়েছে একমাস হলো। আমার চাকুরীর জন্য আমাকে ঢাকা যেতে হবে। আমার হাতে ডিভোর্স পেপারও এসে গেছে। আমার বর অবশ্য এই এক সপ্তাহ আমাকে ফোন দিচ্ছে।

সেদিন এসে বাচ্চাটাকে দেখে গেছে। জানতে? চেয়েছিলো, বাচ্চার নাম কি রেখেছি। আমিও সুন্দর করে জবাব দেই, অনন্যময়ী তার নাম। সে জানতে চেয়েছিলো, অনন্যময়ী কেনো নাম রেখেছি। আমি তার উত্তর দেয়ার এতটুকু প্রয়োজন মনে করিনি। তার আমার এবং আমার বাচ্চার খোঁজ নেয়ার কারনটা বুঝতে আমার একটু অসুবিধা হচ্ছিলো। তাকে আমি নিজেই বলে উঠি,

আপনার প্রেমিকা রিয়ার কি খবর? জানলে রাগ করবেনা এখানে এসেছেন?

তখন সবটা জানতে পারি তার প্রেমিকা তার বাচ্চা হওয়াটা মানতে পারেনি। অন্য জায়গাতে বিয়ে করেছে। স্পষ্ট দেখলাম তার চোখ থেকে পানি ঝরছে।

আজকে আমি ঢাকা যাবো। আমার পরিবারকে সবটা জানিয়ে দেই। ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠিয়ে দিয়েছি গতকালকে। গাড়িতে উঠবো এমন সময় আমার এক্স স্বামী যার সাথে কাল আমার সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছি, সে হঠাৎ করে আমার হাত টান দেয়। আমি কিছু বলবো এর মধ্যে সে নিজেই আমাকে প্রশ্ন করে,

কোথায় যাচ্ছো?

আমি অবাক হয়ে তাকে প্রশ্ন করি,

যেখানেই যাই, আপনি এখানে কি করছেন?

সে আবারও বলে উঠে,

দেখো নিশু যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি ভুল করেছি। আমার বাচ্চা কেনো। শাস্তি পাবে? আমাকে মাফ করে দেও নিশু।

আমার হাসির উচ্চ শব্দে সারা রাস্তা কেঁপে উঠে। আমি তার দিকে একপলক তাকিয়ে বলা শুরু করি,

সেদিন জানতে চেয়েছিলেননা, কেন আমার বাচ্চার নাম অনন্যময়ী রেখেছি? জানেন কেনো? ও সত্যি অনন্যময়ী। ওর জন্ম খুবই অদ্ভুতভাবে হয়েছে। ওর বাবা ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। ওর বাবা চায়নি ও আসুক, পৃথিবীর মুখ দেখুক। ওর জন্ম হাসপাতালের জায়গাতে গাড়িতে। ও তো সত্যিই অনন্য।

চোখের পানি মুছে তাকে বলার সুযোগ না দিয়ে আবার বলা শুরু করি,

এতো গেলো বাবার দায়িত্ব। যখন আপনাকে আমার সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিলো তখন আপনি কোথায় ছিলেন? যখন মা হাজারবার আপনার কথা জিজ্ঞাসা করেছে তখন আপনি কোথায় ছিলেন? প্রসব ব্যাথায় যখন কাতর আমি, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

সে কিছু বলার আগে আমি চলে আসলাম। সে যোগাযোগের যথেষ্ট চেষ্টা করেছে।

আমি হয়তো তার সাথে ফিরে যেতে পারতাম। কিন্তু যে তার রক্তকে অস্বীকার করতে পারে, তাকে আর যা হোক ক্ষমা করা যায়না। কি দরকার তার সাথে ফিরে যাওয়ার?


পর্ব ২

ঢাকায় আমি খালার বাসাতে থাকতে শুরু করি। ভাড়া নিয়ে থাকি। ছোট একটা জব হয়েছে আমার। একটা নিউজপেপারের সাব-এডিটর। ৪ ঘন্টা কাজ করে চলে আসি। বাচ্চাটাকে তখন খালার কাছে রেখে যাই। খালাই দেখাশুনা করে।

একদিন অফিস থেকে এসে জিহাদকে দেখতে পাই। সে খালার বাসায় এসেছে। আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে খেলছে। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেই।

আপনি এখানে কি করছেন?

তোমাদের দেখতে এসেছি।

আপনি বোধহয় ভুলে গিয়েছেন আপনার সাথে আমার বা আমার বাচ্চার কোনো সম্পর্ক নেই।

তোমার আমার হয়তো সম্পর্ক নেই। বাচ্চাটাতো আমার।

আমি প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বললাম,

বাহ! সেদিন আপনার বাচ্চার অধিকার কোথায় ছিলো যেদিন এবরেশন করতে বলেছিলেন?

জিহাদ কিছু বললো না। ওর চুপ করে থাকা আমার একদম সহ্য হলোনা।

আপনি দয়া করে আর এ বাসায় আসবেননা।

তারপর বাচ্চা নিয়ে নিজের রুমে চলে এলাম। শাড়ি চেঞ্জ না করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। পাশে অনন্যময়ীকে বসিয়ে কখন ঘুমিয়েছি টের পাইনি। উঠে দেখি বাচ্চাটা আমার ঘুমিয়ে গিয়েছে। ওর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। বাচ্চাটা একদম জিহাদের মতো হয়েছে। মেয়েদের চেহারা নাকি বাবার মতো হলে ভাগ্যবতী হয়। কিন্তু ওর জন্মটাই তো দুর্ভাগ্য নিয়ে!

সোমবার দিন অফিস থেকে বের হয়ে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ করে একটা বাইক সামনে এসে দাঁড়ায়। হেলমেট খোলার পর বুঝতে পারি এটা জিহাদ।

আপনি এখানে?

তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

কেন?

সেটা কোথাও বসে বলি?

আমার বিরক্ত লাগছিলো। আমি বললাম বাসায় চলে যাবো। সে বললো এটাই শেষ। আর ডিস্টার্ব করবেনা। পাশের একটা কফিশপে গিয়ে বসি।

তো কি জন্য এসেছেন?

আগে বলো কি খাবে ঠান্ডা না গরম?

একটা হলেই চলবে।

জিহাদ দুটো কোল্ড কফি অর্ডার করে সোজা হয়ে বসে। হঠাৎ আচমকা আমার হাত ধরে। আমি হাত ছাড়িয়ে নিতে উদ্যত হলে সে আরো শক্ত করে ধরে।
কি করছেন? হাত ছাড়ুন।

দেখো লিয়া যা হওয়ার হয়েছে। পুরানো কথা ভুলে যাও। বাচ্চাটার কথা ভাবো।

বাচ্চার কথা ভেবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনি হাত ছাড়ুন।

আমি তোমাকে ভালো রাখবো। লিয়া ফিরে আসো। বাচ্চার তো বাবাকেও দরকার। আর ও মেয়ে। মাথায় ছায়া হিসেবে বাবা থাকাটা জরুরি।

হঠাৎ খেয়াল করলাম ওর হাত কিছুটা আলগা হয়ে গিয়েছে। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। আর কি বললো অনন্যময়ী মেয়ে সেজন্য ওর বাবা দরকার। আমি আমার মেয়েকে একা মানুষ করতে পারবো।

আমার মেয়ের জন্য আমি একাই যথেষ্ট। কোনো হীন মানসিকতার লোক আমার মেয়ের বাবা হতে পারেনা।

চলে আসার জন্য পা বাড়ালে জিহাদের একটা কথায় আমার মনে ধাক্কা লাগলো। সে তাহলে কোর্টে যাবে। আমার মেয়ের কাস্টডি তাকে দেয়ার জন্য। কতোটা পাষাণ হলে এমন কথা বলতে পারে!

কিন্তু বললেই কাস্টডি বাবা পেতে পারেনা। আমিও আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কিছুতেই অনন্যময়ীকে নিয়ে যেতে দিবোনা।

জিহাদ সত্যি সত্যি ফ্যামিলি কোর্টে আপিল করেছে বাচ্চার কাস্টডি যেনো তাকে দেয়া হয়। আমি প্রচুর অসহায় হয়ে পড়লাম। যদি কাস্টডি জিহাদ পায়, তাহলে আমার কি হবে?


চাইল্ড কাস্টডির জন্য আমাদের ডাকা হয়েছে। আমার বাচ্চার বয়স ২ বছর। এখন ওর মা দরকার। অতএব সন্দেহহীন যে আমার বাচ্চা আমার কাছে থাকবে। এমনটাই বলেছেন উকিল।

বাংলাদেশ পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এর ৫ ধারা মতে, সন্তানের কাস্টডির বিষয়ে একচ্ছত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের। আর কাস্টডি প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত কি কি বিবেচনা করবেন, সেটা গার্ডিয়ানস এন্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০ এর ১৭ ধারায় বিস্তারিত বলা হয়েছে। সুতরাং বাচ্চা আমার কাছে থাকবে। এখানে জিহাদের পরাজয় ঘটলো। কিন্তু জিহাদ আমার বাচ্চাকে দেখতে আসতে পারবে। যেহেতু অনন্যময়ী জিহাদেরও সন্তান।

একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখলাম অনন্যময়ীকে আমার খালাতো বোন মারছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম এটুকু বাচ্চাকে ও মারছে কেন? অনন্যময়ী কান্না করছে। জানতে পারলাম কালার পেন্সিল নষ্ট করেছে। মায়া মানে আমার খালাতো বোনের ১৩ বছর বয়স। ও বাচ্চা হলেও আমার মেয়ে তো আরও ছোট। আর খালা আমার মেয়েটাকে মায়ার কাছে দিয়ে ঘরের কাজ করছেন। প্রতিদিনই কি ও এভাবেই মার খায়! এরপরের সপ্তাহে বাসা পাল্টে ফেলি। খালার উপর অভিযোগ নেই। এতদিন দেখে রেখেছে তাই অনেক। কাজের লোকের উপর ভরসা করতে পারিনা, যেখানে নিজের লোকেরাই বিরক্ত হয়ে যায় সেখানে কাজের লোককে কিভাবে ভরসা করবো! আমার অফিসের সময় অনন্যময়ীকে ডে কেয়ারে রেখে যাই।

জিহাদ প্রায়ই বাসায় আসে বাচ্চাকে দেখতে। না করতে চাইলেও না করার অধিকার আমার নেই। একদিন জিহাদ এসে জানালো তার বাবা প্রচুর প্রেশার দিচ্ছে বিয়ের জন্য। লিয়া, তুমি তো জানো বাবা, মা এর বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমাকে বিয়ের জন্য বাবা প্রেশার দিয়ে যাচ্ছে।

তো বিয়ে করতে কে না করেছে?

লিয়া আমাদের একটা বাচ্চা আছে। ভুল করেছি সেদিন। ফিরে চলো।

সেটা তো সম্ভব নয়।

তুমি একা সন্তান মানুষ করতে পারবেনা। আর পারলেও সন্তানের জন্য তার বাবাকে দরকার।

এই কয়েকদিনে জিহাদের প্রতি আমার যে মায়া জন্মেনি সেরকম নয়। কিন্তু চাইলেও আত্মসম্মান বোধে কেমন জানি লাগে। আমার শ্বাশুড়ীও আমাকে কল দিয়ে বুঝিয়েছেন। কিন্তু আমার শ্বশুর একবারের জন্যও আমাকে কল দেয়নি। এর একটা কারন রয়েছে সে নাতি চেয়েছিলো। নাতনীর আশা তিনি করেননি। মোট কথা তিনিও অনন্যময়ীকে চাননি।


জিহাদ আমাকে অনেকবার বুঝানোর চেষ্টা করে এবং সফলও হয়। আমিও ফিরে যেতে না করলাম না। এরপর প্রায়ই জিহাদ আমার বাসায় আসে। কথা হয়েছে জিহাদের চাকুরী বদলি করে কুমিল্লা ওর বাসায় ফিরে যাবো। একদিন সন্ধ্যাতে জিহাদ বাসায় আসে। ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে যায়। হঠাৎ করে ওর ফোনে কল আসে। অনেকবার রিং হওয়ার পর আমি ফোন নিয়ে জিহাদকে দিবো তখন ফোনের স্কিনে একটা নাম স্পষ্ট ভেসে ওঠে, রিয়া।

বাহ! এখনও প্রেম চলে। প্রেম নয় এর নাম পরকিয়া বলা চলে। বিবাহিত দুজন মানুষ যারা বিয়ের আগে একে অপরকে ভালোবাসতো, কিন্তু দুজনই এখন ভিন্ন এবং অন্যের অর্ধাঙ্গ এবং অর্ধাঙ্গিনী তারা এখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছে। এটার আসলে কি নাম দেয়া যায় ভেবে পাইনা। অতএব ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমার পরিবার আমাকে অনেক বুঝিয়েছেন ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি ফিরে যাইনি।

আমার মেয়ের বয়স ৭ বছর চলছে। জিহাদও বিয়ে করেছে। নিজের ইচ্ছাতে হোক কিংবা পরিবারের ইচ্ছা বিয়ে সে করেছে। আমিও আমার মেয়েকে একা মানুষ করছি। অনন্যময়ীকে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করেছি। আর আমিও শিক্ষকতা করছি। প্রাইমারি স্কুলে জব হয়েছে। একটা স্থায়ী চাকুরী। মেয়েকে দেখতে জিহাদ মাসে একবার আসেন। জিহাদের বউয়েরও নাকি বাচ্চা হবে। ওরা সুখে থাকুক এই দোয়া করি।


শেষ পর্ব

অনন্যময়ী কখনও ওর বাবার জন্য বায়না করেনি। জিহাদ মাসে দুইবার বাসায় আসে। মেয়ের সাথে দেখা করে হোটেলে রাত কাটিয়ে চলে যায়। ওই একটা দিনের পর আর কখনও জিহাদের সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আর প্রশ্নও আসেনা। আমি কখনও জিহাদকে রাতে থাকার জন্য বলিওনি। নারী, পুরুষ যারা অতীতে স্বামী-স্ত্রী ছিলো, কোনো এক ভুলে তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো সেটার পুনরাবৃত্তি আমি চাইনা বলেই জিহাদকে কখনও রাতে থাকতে বলিনি।

একদিন সকালে মেয়েকে তৈরি করছিলাম স্কুলের জন্য, হঠাৎ করে কেউ বাসার দরজায় নক করলো। দরজা খোলার পর দেখতে পাই জিহাদ এসেছে। বসতে বললাম ওকে।

কি ব্যাপার তুমি এখন? অসময়ে?

আসলে কথাটা কিভাবে বলবো বুঝতেছিনা। রিমু মানে আমার স্ত্রী কাপড়ে পেঁচিয়ে পড়ে গিয়েছিলো। আমাদের বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

আমার শুনে খুবই খারাপ লাগলো। একটা বাচ্চা যার ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু সে পৃথিবীর আলোই দেখতে পেলোনা। এর থেকে করুণ প্রেমের গল্প আর কি হতে পারে!

তোমার স্ত্রী এখন কেমন আছে?

ওর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। রুম থেকে বের হয়না। আলো জ্বালেনা। শুধু কান্না করে।

ইশ! এখন কি করবে?

সেজন্যই তোমার কাছে আসা।

বুঝলাম না।

চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। সে বলেছে রিমু একটা মানসিক ট্রমাতে আছে। দ্বিতীয়বার বাচ্চা নিলে সেটা দূর করা সম্ভব। কিন্তু…!

কিন্তু?

রিমুর যেই অবস্থা এই মুহূর্তে ওর সাথে ওই সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং?

আমি অনন্যময়ীকে কয়েকটা দিনের জন্য আমার সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি।

আমার বুকটা ধক্ করে উঠলো। এ কি বলছে জিহাদ? আমি অনন্যময়ীকে ছাড়া এক মুহূর্ত কল্পনা করতে পারিনা। সেখানে আমার সন্তান যে কিনা জিহাদেরও সন্তান সেখানে আমি কি করে বাঁধা দিতে পারি? কিন্তু পারি। সেই অধিকার আমার আছে। আর অনন্যময়ীর এই যাওয়াটা যদি চিরজীবনের জন্য হয়? না আমি আর কিছু ভাবতে পারছিনা।

জিহাদ আমাকে একটু সময় দেও। অনন্যময়ীকে স্কুলে দিয়ে আসতে হবে।

হ্যাঁ চলো। আমিও সাথে যাচ্ছি।

না। তার দরকার নেই।

কেন আমি গেলে কি সমস্যা?

এমনিই। তুমি ক্যাফে নাইন্টিতে ওয়েট করো। ঘন্টা তিন পর আমি সেখানে আসবো।

অনন্যময়ীকে স্কুল গেটে পৌঁছে দিয়ে আমি রেস্টুরেন্টে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখলাম জিহাদ অপেক্ষা করছে। আমি ওর সামনের চেয়ারটাতে গিয়ে বসলাম।

তো কি জানি বলছিলে?

অনন্যময়ীকে আমার দরকার।

কিন্তু অনন্যময়ীর তো তোমাকে দরকার নেই।

এভাবে বলছো কেন?

অনন্যময়ী তোমার সাথে যাবেনা।

কেন যাবেনা? কয়েকটা দিনের জন্য যদি অনন্যময়ী আমার সাথে যায় তাহলে কি সমস্যা? রিমু একটু সুস্থ হলে ওকে নিয়ে আসবো।

না জিহাদ সেটা সম্ভব নয়।

ও আমারও বাচ্চা। আমার অধিকার আছে।

ঠিকাছে লিগ্যাল নোটিশ নিয়ে আসো পারিবারিক কোর্ট থেকে। আমি অনন্যময়ীকে যেতে দিবো।

আমি চলে এলাম। আমি জানি জিহাদ সেটা পারবেনা। কেননা অনন্যময়ী কখনওই জিহাদের কাছে যাবেনা। ৭ বছরের বাচ্চা যারা বাবাকে ছাড়াই বলতে গেলে বড় হয়েছে, তারা অনেক কিছুই বোঝে। আর অনন্যময়ী তাদের মধ্যে একজন। কখনও বাবার জন্য বায়না করেনা। জিহাদ যে দুইদিন আসে অনন্যময়ীর যতটুকু কথা বলার দরকার ততটুকু বলে। যা জিজ্ঞাসা করে ঠিক ততটুকুর উত্তর দেয়।

কিন্তু জিহাদ সত্যিই লিগ্যাল নোটিশের জন্য কোর্টে গেলো। অনন্যময়ী অপ্রাপ্ত বয়সের বাচ্চা। তাই ও আমার কাছেই থাকবে। এটাই কোর্টের আদেশ। তাও শুধু জানার জন্য অনন্যময়ীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কার কাছে যেতে চাচ্ছো?

অনন্যময়ীর উত্তর ছিলো, মা।

জিহাদ দুইমাস আর অনন্যময়ীর সাথে দেখা করতে আসেনি।

একদিন মা কল দিয়ে বললো সে অসুস্থ। ওইদিন অফিসে জরুরি জানিয়ে ছুটি নিয়ে মেয়ের স্কুলে যাই। ওকে নিয়ে কুমিল্লা চলে যাই। ৪ ঘন্টা পরে বাসায় গিয়ে দেখলাম মা কাজ করছে।

মা, তুমি না বললা অসুস্থ?

আগে ফ্রেশ হয়ে নে। তারপর সব বলছি।

অনন্যময়ী আর আমি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম। এরপর মা জানালো আমার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে। ছেলের বিয়ে হয়েছিলো। ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি যেনো একবার দেখা করি। আমি কোনো কথা বললাম না। পরেরদিন সকালে না বলে চলে এলাম। আমি আমার বাচ্চার জন্য একাই যথেষ্ট। অনন্যময়ীর জন্য আমি অন্ধকার তৈরি করতে চাইনা। যদি স্বামী নামক লোকটা আমার বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর হয়? বলা তো যায় না! বিশ্বাস একটা বড় জিনিস যেটা সবার প্রতি করা যায়না।

আমার মেয়েটার বয়স এখন ১৬ হয়েছে। জিহাদ বাসায় আসলে সৌজন্যের জন্য যতটুকু কথা বলা উচিৎ ও বলে। আমি কখনও জিহাদ সম্পর্কে ওর কাছে খারাপ কিছু বলিনি। তাও জিহাদকে অনন্যময়ী পছন্দ করেনা।

একদিন জিহাদ অনন্যময়ীকে ওর বাসায় যাওয়ার জন্য বলে। অনন্যময়ী সেদিন বলেছিলো,

আপনি আমার বাবা ভালো কথা। বাসায় আসবেন। আপত্তি করবোনা। এর থেকে বেশি কিছু আশা করবেন না।

জিহাদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো আমি নাকি এসব ওর মাথায় ঢুকিয়েছি। অনন্যময়ী প্রতিবাদ করলো।

আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার মা এর একটা ডায়েরী আছে। সেই ৭ বছর বয়স থেকে আমি সেটা মায়ের অজান্তে পড়ি। প্রতিটা দিনের ঘটনা সেখানে লেখা আছে। মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তা আমি পড়ি। আমাকে বড় করার জন্য কি কি ত্যাগ স্বীকার করেছে সব লেখা আছে। কত নোংরা চোখ থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে তা লেখা আছে। সেই ৭ বছর বয়সে আমি কিছুই বুঝতাম না। যা তখন আমার কাছে অস্পষ্ট, এখন সেগুলো আমার কাছে স্পষ্ট।

জিহাদ সবগুলো কথা চুপচাপ শুনছিলো। একটাও কথা বলেনি। অনন্যময়ীর শেষ একটা কথা হয়তো জিহাদকে অনেক বেশি আঘাত করেছে।

শুনলাম আপনাদের নাকি আর কখনও বাচ্চা হবেনা। আপনার স্ত্রী নাকি কোনো একটা দুর্ঘটনায় মা হওয়ার ক্ষমতা হারায়। আপনি ভালো আছেন তো?

সমাপ্ত

অনন্যময়ী লেখাঃ লিয়া

আরো পড়ুনঃ কষ্টের ভালবাসার গল্প

Related posts

হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসার গল্প – বেলা শেষে পর্ব ৪ | Love Story

valobasargolpo

হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসার গল্প – বেলা শেষে পর্ব ৫ | Love Story

valobasargolpo

Leave a Comment

error: Content is protected !!