কষ্টের প্রেমের গল্প

অপ্রকাশিত প্রেমের গল্প (শেষ খণ্ড) – তোমাকে আজও খুজে বেড়াই

অপ্রকাশিত প্রেমের গল্প – তোমাকে আজও খুজে বেড়াই: নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে হলেও শালীনতা বজায় রাখতে হবে, শালীন পোশাক পড়তে হবে। কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে তার সম্পূর্ণ দোষ তো আমরা পুরুষকেই দেই৷


পর্ব ১৬

সকালে আযানের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় ফাতেমার। হাত বাড়িয়ে পাশে থাকা নিঝুমকে বার কয়েক ধাক্কা দেয়। নিঝুম নড়াচড়া করে আবার ঘুমিয়ে যায়। তাই দেখে নিঝুমের মুখে পানি ছিটিয়ে দেয় ফাতেমা। নিঝুম ঘুমঘুম চোখে তাকানোর চেষ্টা করলে ফাতেমা ধরে বসে দেয়।

~ “ঐ সমস্ত নামাযীদের জন্য দুর্ভোগ অপেক্ষা করে আছে, যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে উদাসীন। উঠে পড়ো নিঝুম। শয়তানের বিরুদ্ধে প্রথম জয় হল ফজরের সালাত আদায়।”

এক মুহুর্তেই যেন ঘুম পালিয়ে যায় নিঝুমের চোখ থেকে। স্বাভাবিক হয়ে যায় সে।

~ “সালাতে অমনোযোগী বা উদাসীন বলতে ঐ সমস্ত মানুষকে বোঝানো হয়, যারা মোটেই সালাত পড়ে না অথবা প্রথম দিকে পড়ত অতঃপর তাদের মধ্যে অলসতা এসে পড়েছে অথবা সালাত যথাসময়ে আদায় করে না।

বরং যখন মন চায় তখন পড়ে নেয় অথবা দেরী করে আদায় করতে অভ্যাসী হয় অথবা বিনয়~নম্রতার (ও একাগ্রতার) সাথে নামায পড়ে না ইত্যাদি। কেউ যদি সত্যিই বিশ্বাস করে জাহান্নামের আগুনে পুড়তে হবে, আর মৃত্যুর পরের জীবন দুনিয়ার জীবনের মতোই আরেকটা জীবন, বরং সময়ের দিক থেকে সেটাতো অনন্ত, তাহলে অবশ্যই যত ব্যস্ততাই থাকুক অন্তত ফরয সালাতটা হলেও আদায় করার চেষ্টা করা উচিত। যার জন্য নির্দিষ্ট সময় নিয়ে আমাদের এই দুনিয়াতে আসা, তাঁকেই ব্যস্ততা দেখিয়ে সময় দেই না! আমরা কতোই না অকৃতজ্ঞ…!”

এক একটা বাক্য যেন ধিক্কার জানাচ্ছে নিঝুমকে। অযু করে দুজনের সালাত আদায় করে। নিঝুম ফাতেমার বইয়ের সংগ্রহ থেকে বই খুঁজতে থাকে পড়ার জন্য। তাই দেখে ফাতেমা তার হাতে কয়েকটি বই তুলে দেয় আর সেগুলোই আগে পড়তে বলে। একজন দ্বীন না মানা মুসলিম যখন দ্বীন বুঝে মানতে শুরু করে তখন সে নওমুসলিম এর মতোই হয়ে থাকে।

এক মগ কফি সাথে নিয়ে নিঝুম ইসলামিক বইগুলোর একটা নিয়ে পড়তে শুরু করে। এক পৃষ্ঠা, এক পৃষ্ঠা করে এগোতে থাকে সামনের দিকে। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের কাহিনী। কত প্রতিকূলতাই না সহ্য করতে হয়েছে তাদেরকে, যারা জীবনের কোন এক সময়ে এসে নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তবুও পিছপা হয়নি। নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে।

অনুতাপের আগুনে পুড়তে শুরু করে নিঝুম। নিজেকে বড়ই অকৃতজ্ঞ মনে হতে থাকে। যে আল্লাহর এত নিয়ামতের কারণে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে, সেই আল্লাহকে কিভাবে ভুলে থাকতে পারলো সে?

সালাত সাওম পালনে আবেগ কখনো অনুভব করেনি। সালাতে দাঁড়িয়ে কখনও চোখে পানি আসে নি। জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্ম পেয়েছে ঠিকই কিন্তু ধর্ম নিয়ে খুব গভীরভাবে ভেবে দেখেনি কখনো। সালাত পড়তে হয় তাই পড়েছে, সাওম রাখতে হয় তাই রেখেছে। কিন্তু আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা, আনুগত্য নিয়ে হয়তো পালন করে নি। নিঝুম মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, মন দিয়ে সালাত আদায় করার, সাওম পালন করার জন্য।

নিঝুম বইটিতে মাহরাম, গায়রে মাহরাম আর পর্দা বিষয়ক লেখা পড়ে। লেখাগুলো পড়ে পুরো শরীর যেন ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। আল্লাহর শাস্তির ভয়ে, জাহান্নামের ভয়ে, তার এতদিনের পাপকাজের ভয়ে।

বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই আয়াতটি ~

“আল্লাহ তাদের মন ও শ্রবণ~শক্তির ওপর ‘মোহর’ অঙ্কিত করে দিয়েছেন। এবং তাদের দৃষ্টিশক্তির ওপর আবরণ পড়েছে; বস্তুত তারা কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।”

তবে কি আল্লাহ আমার মনের ওপর মোহর অঙ্কিত করে দিয়েছেন? ঠিকমত সালাত আদায় করি নি, পর্দা করি নি, সাওম পালন করি নি। কুরআন পড়েছি অর্থ বোঝার চেষ্টা করিনি। কথাগুলো মনে মনে ভেবেই শিউরে ওঠে নিঝুম,
~ “ওহ আল্লাহ! কী হয়েছিল এতোদিম আমার!”

কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা টেনে নিয়ে ছেলে বন্ধুদের নাম্বার ব্লকলিস্টে দিয়ে দেয়। ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা ডিএকটিভ করে দেয়। ফোন থেকে নিজের সবগুলো ছবি ডিলেট করে দেয়।

~ “জানি আমার চলার পথ সহজ হবে না। তবুও আমি আর পিছনে ফিরে তাকাবো না।”

এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ফাতেমা এসে ঘুরে গেছে রুম থেকে। নিঝুমকে মনোযোগ সহকারে বই পড়তে দেখে অযথা আর তাকে বিরক্ত করতে চায় নি ফাতেমা। কিন্তু বেলা দশটা বাজতে চললো। সকালের খাবার এখনো খাওয়া হয়ে ওঠে নি সকলের। তাই এবার না পারতে নিঝুমকে ডাকতে আসে ফাতেমা। সকালের খাবার খেতে ডেকে নিয়ে যায় তাকে।

ফাতেমার মা, ফাতেমা আর নিঝুম খেতে বসেছে একসাথে। রান্নাঘরের মাটিতে মাদুর বিছিয়েই খাচ্ছে সকলে। টেবিল থাকলেও টেবিলে বসে খায় না কেউই। আদহাম আরও আগে নাস্তা করেই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। স্থানীয় এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আদহাম। পাশাপাশি আউটসোর্সিং এর টুকটাক কাজও না~কি করে। তার সাথে বাবার রেখে যাওয়া জমাজমির দেখাশোনাও করে। ফাতেমার থেকে এটুকুই শুনেছে নিঝুম।
ফাতেমার পরিবার সম্পর্কে আরও কিছু জেনেছে নিঝুম।

ফাতেমার বাবা না~কি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। বাবা, মায়ের শিক্ষায় বড় হয়েছে দু’জনে। তাদের দু’জনের নিরলস চেষ্টায় আদহাম এবং ফাতেমা ধার্মিক এক পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নিজেদেরকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে এবং এখন যথাসম্ভব শরীয়ত মোতাবেক জীবনযাপন করার চেষ্টা করছে।

দুপুরের খাবার খাওয়ার সময়ও আদহামকে দেখেনি নিঝুম। এমনকি গতকাল রাতেও দেখেনি। শুধুমাত্র বাড়ির দরজা খোলার সময়ে একবার দেখেছিল। মনে মনে খুবই আনন্দিত হয় ফাতেমার নিজের এবং তার মা, ভাই এর দ্বীনদারিতায়। এমন এক পরিবেশে আসতে পেরে আরও গভীরভাবে নিজের পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করছে সে।

বিকেলের দিকে দু’একজন করে আত্মীয় স্বজন আসতে শুরু করে ফাতেমাদের বাড়িতে। নিঝুম উৎসুক হয়ে দেখে। ফাতেমা তাকে ঘরে বসিয়ে রেখেছে, সে নিজেও ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে দু’তিনজন গায়রে মাহরামও আছেন, তাই এত সতর্কতা।

নিঝুমের উৎসুক দৃষ্টি অবলোকন করে ফাতেমা। কিন্তু কিছুই বলে না। শুধু মৃদু মৃদু হাসে। শেষ পর্যন্ত নিজের কৌতুহলী মনকে দমিয়ে রাখতে না পেরে ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,
~ “আপু আজকে আপনাদের বাসায় লোকজন আসছেন কেনো?”

ফাতেমা শব্দ করে হেসে জবাব দেয়,
~ “কারণ তোমার আপুর আগামীকাল বিয়ে।”
বিস্ফোরিত নয়নে ফাতেমার দিকে তাকিয়ে থাকে নিঝুম। যেন কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না তার। মাথার ওপর দিয়ে গেল সবকিছু।

ফাতেমা বুঝতে পেরে বললো,
~ “হ্যা ঠিকই শুনেছো। একটুও ভুল শুনোনি।”
~ “আপু আপনার পড়ালেখা তো শেষ হয়নি। তার আগেই বিয়ে!”

তাকে থামিয়ে দিয়ে ফাতেমা বলে,
~ “শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কি বলো তো? “
তাসনিয়া বিজ্ঞের মতো জবাব দিলো,
~ “জ্ঞান অর্জন করা।”

ফাতেমা চট করে বললো,
~ “রাইট! কিন্তু ঠিক কয়জন এই উদ্দেশ্যে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে যায়? সবাই তো স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে যায় একটা সার্টিফিকেটের জন্য। চাকরির এবং বিয়ের বাজারে অনেক অনেক সার্টিফিকেট যাদের আছে, তাদের কদর বেশি। আজকাল পড়ালেখা বলতে পাঠ্যপুস্তকের পাঠ গিলে ফেলা আর পরীক্ষার হলে গিয়ে সেটা বমি করে আসা।

এরপর সেই পাঠ ভুলে গেলেও চলে। গাড়ি, বাড়ি, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এসবের জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে ৩০ ~ ৩২ বছর পেরিয়ে যায়। বাংলাদেশে সম্ভাব্য গড় আয়ু যদি ৭০ বছর হয়, তবে জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় দুনিয়ার পিছনে ছুটতেই চলে যায়। জীবনের এতটা সময় দুনিয়ার পিছনে ছুটলে পরকালের জন্য নিজেকে তৈরি করবো কখন?

মানুষের মৃত্যুর তো কোন সময় অসময় নেই। আর যৌবনকালের ইবাদত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। আর স্কুলে এসএসসি লেভেল পর্যন্ত যে ইসলামিক শিক্ষা বই পড়ানো হয়, সেই বই পড়ে বেশি কিছু জানা যায় না। অন্য বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বেগম রোকেয়া বলেছেন, নারী ও পুরুষ হলো একটি গাড়ির দুটি চাকার মত। গাড়ির দুটি চাকা যদি দুরকম হয়, একটি ছোট এবং অন্যটি বড় হয় তবে গাড়িটি যেমন চলতে পারে না ঠিক তেমনই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীশক্তিকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়।

দেশের উন্নতিতে অবদান শুধুমাত্র পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করলেই রাখা যায়? আজকের ছোট ছোট শিশুরা কি দেশের ভবিষ্যৎ না? নারী যদি পুরুষের সাথে বাইরে কাজ করতে যায় তবে ঘরে সন্তান লালন পালন করবে কে? এই ছোট্ট শিশুরা, দেশের ভবিষ্যতের কর্ণধারকে গড়ে তুলবে কে? মা’ই তো সন্তানের প্রথম শিক্ষক হয়। দেশের ভবিষ্যতের কর্ণধারকে ভালোভাবে মানুষ করা কি দেশের উন্নতিতে অবদান রাখা নয়?

সব নারীই যদি বাইরে বেরিয়ে পড়ে তবে বাবা মা, স্বামী, শশুড় শাশুড়ী, সন্তানের হক আদায় করবে কে? আমি নিজেও একসময় ভাবতাম এত পড়াশোনা করে ঘরে বসে থালাবাসন মাজবো? কখনোই না। কিন্তু যখন থেকে আমি বুঝতে পেরেছি তখন থেকে আল্লাহর ইবাদত এবং পরিবারকেই ফার্স্ট প্রায়োরিটি দিয়েছি।

নিজের জীবন বিশ পঁচিশটা বছর পড়াশোনার পিছনে খেটে পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে খাটবো? আর এভাবেই একদিন মৃত্যু এসে যাবে। তাহলে জীবনটা উপভোগ করবো কখন? পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করবো কখন? যে মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরির জন্য, সমাজে সম্মানিত হওয়ার জন্য চাকরি করে তাদেরকে তুমি বোকা বলবে না কি অতি চালাক? আমি তো বোকাই বলবো। ‘সুখে থাকতে ভুতে কিলায়’ কথাটা শুনেছো তো? ব্যাপারটা তেমনই! পেটের দায়ে কাজ করতে হলে, উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পরিবারে না থাকলে সেটা আলাদা কথা।

মা থাকা সত্ত্বেও সন্তান কেনো আয়া বা অন্যদের কাছে বড় হবে? একটা শিশু তার জন্মের পর থেকে পরিবারের সকলের ছত্রছায়াতেই বড় হয়। তাদের আচার আচরণ সেই শিশুটির ওপরও প্রতিফলিত হয়। এখন, একটা শিশু যদি ছোট থেকে কোন আয়ার কাছে বড় হয়, তবে সে সামাজিক, ধার্মিক শিক্ষাগুলো শিখবে কী করে?

যেসব সন্তানেরা বাবা মা এর সান্নিধ্য ছাড়া বড় হয় তারা কি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে? শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকলেও তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত থাকে। মেয়েদের মর্যাদা কি শুধু বাইরে কর্মক্ষেত্রে তার অবদানেই? এমন অনেক মানুষও আছে যারা স্বামী সন্তান পরিবার না পেয়ে হাহাকার করে। সমাজে পরকীয়া বাড়ছে, যিনা ব্যপাক প্রসার লাভ করেছে।

আজ যদি নারী নারীবাদী মন মানসিকতা পোষণ না করতো, দলবেঁধে কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে না পড়তো, নিজেদের সৌন্দর্য বাইরের পরপুরুষকে প্রদর্শন করে না বেড়াতো, ঘরে নিজেকে আবদ্ধ রেখে দায়িত্ব পালন ও ইবাদতে মশগুল থাকতো, তবে এই সমস্যা গুলো কি সৃষ্টি হত?

মহান আল্লাহর নিকট পর্দাশীল, স্বামীর আনুগত্যকারী, অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারী অধিক মর্যাদাবান৷ কিন্তু তাঁর কাছে মর্যাদাবান হতে চায় না আজকের নারী…!

যখন পার্থিব জগতের পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ভাববে তখনই হতাশা তোমাকে গ্রাস করবে। এই দুনিয়া কয় দিনের বলো তো? সুখ জিনিসটা আপেক্ষিক বলতে পারো। কোন একটা মানুষ যখন রাস্তায় কোনো ভিখারীকে ভিক্ষা করতে দেখে বা ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে, তখন সে নিজেকে সুখী মনে করে।

কিন্তু সেই মানুষটিই যখন বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত কোন ধনীকে দেখে, তখন সে নিজেকে দুঃখী বলে মনে করে। তাই সব মানুষই সুখী তবে তা উপলব্ধি করতে পারলেই৷ আমি মনে করি, আল্লাহর ইবাদত এবং পরিবারের সকলের খেয়াল রাখার মধ্যে, দায়িত্ব পালনের মধ্যেই আমার সুখ।”

এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে ফাতেমার কথা শুনছিল নিঝুম কত কিছুই যে তার জানার আছে। চোখের কোণে অশ্রু এসে ভীড় করেছে! ফাতেমার গলা শুকিয়ে গেছে। পানি পান করা প্রয়োজন। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। পিছনে ফেলে গেল তৃপ্ত একটি মন…!


পর্ব ১৭

সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আদহাম। একমাত্র ছোট্ট বোনের বিয়ে বলে কথা। তার ওপর আবার বাবা নেই। আদহাম এবং তাদের মা’ই ফাতেমার অভিভাবক। অবশ্য মামা~মামী, মামাতো ভাই ও এসেছেন ফাতেমার বিয়েতে। পাত্র আদহামের অপরিচিত কেউ নয়। আদহামেরই বন্ধু জাহিদ।

শহরের বেসরকারি একটা কলেজে শিক্ষকতা করছে জাহিদ। তার উপার্জন কম নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে জাহিদ খুবই শান্ত শিষ্ট, ভদ্র একটা ছেলে। ধার্মিকও যথেষ্ট। মা নেই। ছোট এক বোন আর বৃদ্ধ বাবা আছেন ঘরে। জাহিদের সততা, দায়িত্বশীলতায় মুগ্ধ হয়ে জাহিদকে বোনের জন্য পছন্দ করে ফেলে আদহাম।

নিজেই বোনের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেয় বন্ধুর কাছে। তারপর পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হয় জাহিদ ফাতেমার।

আদহামের মনটা সকাল থেকেই খারাপ হয়ে আছে। আদরের ছোট্ট বোনটা পরের ঘরে যাবে আজ। কত আয়োজন করে আদরের বোনকে পরের বাড়ি পাঠাতে হবে। তবুও মন খারাপের কারণটা সাইডে রেখে কাজে লেগে পড়ে সে। বোনের বিয়ে সে শরীয়ত মেনেই দেবে। জাহিদেরও একই ইচ্ছা। বাড়িতেই জনকয়েক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে।

বরপক্ষের লোকজন এবং কনেপক্ষের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও বাড়িতেই করা হচ্ছে। ভোরেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সবজি, মাছ, মাংস কিনে এনেছে আদহাম। তার মা আর মামী মিলে রান্নাবান্নার দিকটা দেখছেন।
বিয়েবাড়িতে হইচই বা সাজানোর কোন লক্ষণ না দেখে নিঝুম ফাতেমাকে বললো,

~ “আপু এইটা বিয়েবাড়ি বলে মনেই হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাড়িতে শোক চলছে। আমাদের গ্রামেও তো এর চেয়ে ভালো করে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আপনার তো গায়ে হলুদও হল না।”

নিঝুমের কথার জবাবে ফাতেমা বললো,
~ “নিঝুম, হাদিসে আছে, যে বিয়েতে খরচ কম হয় সেই বিয়েই বরকতময়। তাহলে জেনে শুনে সেই বরকতকে অবজ্ঞা করবো কেনো বলো তো? নতুন জীবনের শুরুটাই যদি আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে শুরু করি, তাহলে বাকিটা জীবন কিভাবে কাটবে ভাবতে পারো? আমাদের তো তেমনভাবেই চলা উচিত যেমনভাবে আমাদের নবী রাসূলরা চলেছেন এবং আমাদের চলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

আমাদের সবসময় কুরআন এবং হাদিসের অনুসরণ করা উচিত। আজকাল তো বলতে গেলে এক সপ্তাহ ধরে বিয়ের অনুষ্ঠান চলতে থাকে। মেহেদী উৎসব, সংগীত, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাত আরও কত কিছু। এত এত অনুষ্ঠান করতে গিয়ে কোনো কোনো বাবার ঘাড়ে ঋণের বোঝাও চেপে যায়।”

নিঝুম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
~ “বিয়ের নিয়মও বলা হয়েছে?”

ফাতেমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে নিঝুম ফের জিজ্ঞেস করলো,
~ “তাহলে কী বলা নেই?”

ফাতেমা হেসে ফেললো,
~ “একজন মানুষের জীবনযাপনের জন্য, বেঁচে থাকার তাগিদে যা কিছু প্রয়োজন সব কিছুরই সঠিক উপায়, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কুরআনে। কুরআন অপরিবর্তনশীল একটি নির্দেশনা। মানবজাতির জন্য নির্দেশনা স্বরুপ এবং সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে মহান আল্লাহ তায়ালা আল~কুরআন নাযিল করেছেন। ইসলাম শুধু একটা ধর্ম নয়। ইসলাম একজন মানুষের জীবনে চলার সুনির্দিষ্ট পথ।

ইসলাম হল জীবনব্যবস্থা।”
~ “আমি তো কিছুই জানিনা দেখছি!”

~ “হতাশ হচ্ছো কেনো! যত পড়বে, তত জানবে। জানার আগ্রহ থাকলে পথ ঠিকই তৈরি হবে। ধীরে ধীরেই হবে ইনশাআল্লাহ। এজন্য হতাশ হবে না। যতক্ষণ শ্বাস চলবে ততক্ষণ শয়তানের ওয়াসওয়াসা থাকবেই।

হতাশার অন্যতম কারণ হল দুনিয়ামুখী হওয়া, এই দুনিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, পার্থিব জিনিস চাওয়া পাওয়ার আশা করা আরও অনেক কিছু। মানুষ যখন দুনিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, দুনিয়াতে পাওয়া না পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন শয়তান আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখে তাকে। মানুষ যখন ইসলামের ছায়াতল থেকে সরে আসে, আল্লাহর ইবাদতে মশগুল না থাকে তখন শয়তান তাদের দুঃখ, কষ্ট, বিষণ্নতায় জড়িয়ে রাখে।

শয়তান এভাবেই খুশি হয়। তবুও এই চরম কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যহারা ও সংযমহীন হতে নেই এবং আল্লাহর অসীম কৃপার আশা ছাড়তে নেই। যে কোনো পরিস্থিতি তে আল্লাহ কে ভরসা করতে হবে প্রবলভাবে।”

ফাতেমা এবং নিঝুমের কথাবার্তার মাঝেই ফাতেমার মা সালেহা খানম কয়েকটা শাড়ি, গয়নার বাক্স, আর একটি কাপড়ের প্যাকেট নিয়ে হাজির হলেন। তিনি শাড়িগুলোকে পাশে রেখে গয়নার বাক্সগুলো খুলে এক একটা গয়না মেয়েকে পড়িয়ে দিয়ে দেখতে লাগলেন। তার চোখের কোণে পানি জমতে শুরু করে। সালেহা খানম মেয়েকে দেখছেন আর ভাবছেন, মেয়েটা তার এত বড় হয়েছে যে এখন পরের বাড়িতে পাঠাতে হচ্ছে।

বাবা মা তাদের ভালোবাসা, শিক্ষা, আদর্শ দিয়ে একটা মেয়েকে ছোট থেকে বড় করে তোলেন। আবার তাদের সেই কলিজার টুকরো মেয়েকে পরের হাতে তুলেও দেন। কিন্তু এটা যে কতটা কষ্টকর তা হয়তো যারা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু এটাই যে সমাজের নিয়ম।

ফাতেমা মাকে জিজ্ঞেস করে,
~ “মা এতগুলো গয়না….!”

সালেহা খানম জবাব দিলেন,
~ “তোর বাবা এই গয়নাগুলো তোর জন্য গড়িয়েছিলেন। মানুষটা তো আজ আর নেই। কিন্তু তোর জন্য রেখে যাওয়া গয়না গুলো আছে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে গেলেন তিনি। ফাতেমাও আর কথা বাড়ালো না। এতোক্ষণ ধরে তাদের দুজনকে নীরবে দেখছিলো নিঝুম।

এরপর উনি কাপড়ের প্যাকেটটা নিঝুমের দিকে বাড়িয়ে বললেন,
~ “এতে একটা জামা আর বোরকা~খিমার আছে। আমি ফাতেমার থেকে সব শুনেছি। আমার খুব ভালো লেগেছে তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছো, নামাজ পড়তে শুরু করেছো বলে। তোমার পর্দা আমার এই উপহারটুকু দিয়ে শুরু হলে ক্ষতি কী! বরং তাতে আমার খুব ভালো লাগবে। তাই তোমার আপুর বিয়ে উপলক্ষে তোমার জন্য আমার পক্ষ হতে সামান্য এই উপহার।”

নিঝুম ফাতেমার দিকে তাকালে ফাতেমা ইশারায় প্যাকেটটি নিতে বলে। নিঝুমও হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটি নেয় এবং মনে মনে অনেক শুকরিয়া আদায় করে রবের কাছে। এই পরিবারের মানুষগুলোর জন্যও দোয়া করে।

ফাতেমার মা সালেহা খানম একজন বিচক্ষণ মহিলা। তিনি ফাতেমাকে কিছু উপদেশ দিতে শুরু করলেন। যা প্রত্যেক মেয়েরই বিয়ের সময় তাদের মায়েদের দেওয়া উচিত বলেই মনে হয়। সালেহা বেগম বললেন,
~ “মেয়ে হয়ে জন্মাইছিস যখন, শশুড় বাড়ি তো যেতেই হবে৷ জাহিদের পরিবারের মানুষগুলো অনেক ভালো বুঝলি। তারা অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে তোকে বাড়ির বউ করছে।

আদহামের পরিচিত, বন্ধু মানুষ। বুঝতেই পারিস তোর ভাইয়ের ওপর ভরসা করেই জাহিদের বাবা এবং জাহিদ বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। তুই তাদের এই আশা আর স্বপ্নকে অপূর্ণ করিস না। তাদের সাথে কখনো কোনো প্রকার খারাপ ব্যবহার করবি না। যদিও আমার মেয়ের ওপর আমার যথেষ্ট ভরসা আছে। তবুও মনে করিয়ে দিচ্ছি। অন্যের কথা শুনে, না বুঝে নিজেদের মধ্যে অশান্তি করবি না। কখনো শশুড় শাশুড়ীর বিরুদ্ধে কারো কথা যাচাই না করেই বিশ্বাস করবি না। ভালোবাসা দিয়েই জয় করে নিবি সকলের মন।

এমন কিছু কখনোই করিস না যাতে তোর প্রতি জাহিদ কিংবা ওর পরিবারের কারো বিশ্বাস ভেঙে যায়৷ একবার বিশ্বাস ভাঙলে পুনরায় তাদের বিশ্বস্ত হতে পারবি না। এখন জাহিদই তোর সবচেয়ে কাছের মানুষ। কাউকে কষ্ট দিস না কখনো। জাহিদের ভেঙ্গে যাওয়া পরিবারকে তোকেই আগলে রাখতে হবে ভালোবাসার শক্ত বাঁধনে। পারবি না?”
ফাতেমা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বললো,
~ “ইনশাআল্লাহ।”

নিঝুম মনে মনে ভাবে,
~ “ইশ! এনারা মা মেয়ে এত সুন্দর কথা কিভাবে বলে!”

মেয়ের কপালে ভালোবাসার পরশ দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন ফাতেমার মা।

সেদিনের পড়ন্ত বিকেলে অনাড়ম্বরভাবে বাড়িতেই জন দশেক মানুষের উপস্থিতিতে ফাতেমা জাহিদের বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল। বিদায়বেলা মা, বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেসে গেল ফাতেমা। দূরে ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে এমন এক বিষাদবেলার সাক্ষী হয়ে থাকলো নিঝুম নিজেও। তার চোখও ভেজা। দুচোখ দিয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। ফাতেমা মেয়েটা যে তার অনেক প্রিয়, ভালোবাসার।

মেয়েটার ওসিলাতেই সে হারাম থেকে বেরিয়ে এসেছে, বুঝতে শিখেছে অনেককিছু। এখন যে তাকে আর পাশে পাবে না, তার কাছে একথা সেকথা জানতে চেয়ে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলাও আর হবে না।

অবশেষে সেই সময় এলো। ফাতেমা নিঝুমের কাছে এসে নিঝুমকে বুকে জড়িয়ে নিলো। ফাতেমার স্নেহের পরশে খুব বেশিক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না নিঝুম, আটকে রাখতে পারলো না চাপা কান্না। নিঝুমের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে ফাতেমা বললো,
~ “এত কাঁদছো কেনো পাগলি মেয়ে।”

নিঝুম ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললো,
~ “তোমাকে আর দেখতে পাবো না।”

ফাতেমা নিঝুমের গালে হাত রেখে বললো,
~ “ইনশাআল্লাহ দেখতে পাবে। আর ফোনে তো কথা হবেই তাইনা। যখনই তোমার আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করবে তখনই ফোন করবে, কেমন?”

নিঝুম আর কিছু বললো না। ফাতেমা নিঝুমের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। মা, ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললো,
~ “নিঝুমকে পৌঁছে দিও ওর বাড়িতে।”

~ “চিন্তা করিস না মা।”
ফাতেমার মায়ের কাছে গিয়ে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে জাহিদ বললো,
~ “মা, আপনি এত কাঁদবেন না। আমাদের বাড়ি তো খুব বেশি দূরে নয়। যখনই আপনার মেয়েকে দেখতে ইচ্ছে করবে, তখনই চলে যাবেন মেয়েকে দেখতে।”

ফাতেমার মা জাহিদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন কিছু না বলে। অতঃপর জাহিদ, তার বাবা, চাচা ফাতেমাকে নিয়ে তাদের বাড়ির পথে রওয়ানা দেয়।

আত্মীয় স্বজনরাও চলে গেল ফাতেমা জাহিদের যাওয়ার পরপরই। ফাতেমার মামা মামী আর মামাতো ভাই একটা অজুহাত দেখিয়ে চলে গেছে। এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। ওয়ালিমার ব্যবস্থা করা হবে মাসখানেক পর। অনেকক্ষণ ধরে কান্না করার ফলশ্রুতিতে মাথায় যন্ত্রণা করতে শুরু করে দেয় ফাতেমার মায়ের। তিনি বসার ঘরের সোফাতেই মাথা ধরে বসে পড়েন।

নিঝুম বিষয়টা খেয়াল করে তাকে জোর করেই রুমে নিয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে দিয়ে মাথায় ব্যাথানাশক মলম লাগিয়ে দেয়। মাথা, কপালের আশেপাশে টিপে দিতে থাকে।

নিঝুমের একটুখানি যত্নে সালেহা খানমের ব্যাথা কমে গিয়ে দু চোখের পাতায় ঘুম ভর করে। সালেহা খানমকে ঘুমাতে দেখে নিঝুম শব্দ না করে ধীরে ধীরে পা ফেলে ঘরের বাহিরে চলে আসে। সালেহা খানমের ঘরের দরজা চাপিয়ে দিয়ে এসে বসার ঘরেরই এক কোণার টেবিলের ওপর রাখা গ্লাস প্লেটগুলো রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে বেসিনে রাখে।

আদহাম বাহিরেই ছিল। বাড়িতে ফিরে এসে সদর দরজা লাগিয়ে দিল। রান্নাঘরে প্লেট গ্লাসের টুংটাং আওয়াজ পেয়ে ভাবে তার মা রান্নাঘরেই আছেন। কিন্তু রান্নাঘরে প্রবেশ করেই বিস্মিত হয়ে যায় সে। আদহামের উপস্থিতি যদিও বুঝে উঠতে পারে নি নিঝুম।

~ “আপনি এখানে কেনো? আর এসব কি করছেন?”

আদহামের কঠিন স্বরে নিঝুম মৃদু কেঁপে ওঠে। হাতের চামচটা বেসিনে পড়ে যায়। পিছনে তাকিয়ে আদহামকে দেখে নিঝুম। ঘটনার আকস্মিকতায় তার মুখে কোন শব্দ জোগালো না। আদহাম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের কাছেই নিজের খারাপ লাগতে শুরু করে নিঝুমের। পর্দা রক্ষার ব্যাপারে এখনও সচেতন হয়ে উঠতে পারেনি বলে।

নিঝুম মনে মনে ভাবছে,

~ “কি যে মনে করছেন উনি আমাকে। নিশ্চয়ই আমাকে একটা খারাপ মেয়ে বলে ভাবছেন।”
আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করতে লাগলো। আদহাম আবারো জিজ্ঞেস করলো,
~ “মা কোথায়?”

~ “আন্টি ঘুমিয়েছেন।”

মায়ের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বিচলিত হয়ে উঠলো আদহামের মন। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল মায়ের ঘরের দিকে। ততক্ষণে সালেহা খানমও রুম থেকে বেরিয়ে এসেছেন। মাকে দেখে চিন্তিত হয়ে আদহাম বললো,
~ “মা, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? এখনই ঘুমিয়ে পড়লে?”

~ “না একটু মাথা টা ধরেছিল। মেয়েটা এত সুন্দর করে মাথা টা টিপে দিল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এই অল্পক্ষণের বিশ্রামেই শরীরটা খুব ঝরঝরে লাগছে। গেল কোথায় মেয়েটা। দেখছিনা যে..!”

উনি এদিক ওদিক তাকিয়ে আবারো বললেন,
~ “ঘরে গিয়েছে বোধহয়। ঘুমিয়ে পড়লো নাকি? খাওয়া দাওয়া তো করেনি। যাই আমি গিয়ে দেখি।”
~ “দেখো রান্নাঘরে গিয়ে, কি করছে তোমাদের অতিথি!”

বলেই নিজের রুমে চলে গেল সে। সালেহা খানম আর দেরি না করে রান্নাঘরে চলে আসেন। রান্নাঘরে এসে অবাক হয়ে যান তিনি। নিঝুমকে বাসন মাজতে দেখেই বলে উঠলেন,
~ “আরে আরে কি করছো তুমি! রাখো এসব।”

তিনি ঘোর আপত্তি জানালেও নিঝুম শুনলো না।

~ “ইশ! মা, তুমি তো আমাদের বাড়ির অতিথি। তোমাকে দিয়ে কি এসব করানো যায়? তুমি এসব করতে গেলে কেনো? ঘুম থেকে উঠেই তো এসব পরিষ্কার করে নিতাম।”

~ “আমি ভাবলাম আপনাকে সাহায্য করে একটু সওয়াব কামিয়ে নেই।”

~ “বাহ্ মেয়ের বুদ্ধি তো কম না! এর ওপর তো কোনো কথাই চলে না!”

মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে আবারও কাজে মনোযোগ দিল নিঝুম। সালেহা খানম নিজেও সাহায্য করতে লাগলেন, গল্প করতে লাগলেন।

প্রায় আধাঘণ্টা পর থালাবাসন ধোঁয়ার কাজ শেষ হয়। সালেহা মন থেকে কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন নিঝুমের প্রতি। আত্মীয় স্বজনরা তো সটকে পড়েছে। মেয়েটা না থাকলে সে একা এতোটা কুলাতে পারতো না। ঘরদোর পরিষ্কার করে রাতের খাবার একসাথেই খেয়ে নিলো সালেহা আর নিঝুম। আর আদহাম তো ঘরের মধ্যেই ছিল। নিঝুম আসায় তাকে ঘরেই খাবার দিয়ে আসতে হয়।

শরীয়ত মোতাবেক বিবাহ হওয়ায় জাহিদের বাড়িতে বাড়তি কোন ঝামেলা পোহাতে হলো না তাদের। এই যেমন গেট ধরে বরের থেকে টাকা আদায় করা, টাকা না দেওয়া অবদি বরকে বাসর ঘরে যেতে না দেওয়া, আরও কিসব খেলারও আয়োজন করা হয় দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে।


পর্ব ১৮

পরদিন সকালে নাস্তা করে একেবারে তৈরি হয়ে নেয় নিঝুম। আজ নিঝুম ফাতেমার মায়ের দেওয়া সেই বোরকা, খিমার পড়েছে। আজই ফাতেমার সাথে কথা বলে ঠিক করে নিয়েছে বাড়িতে যাবে নিঝুম। আম্মা আব্বার জন্য মন পোড়াচ্ছে তার। আব্বা আম্মা ভাইকে চোখের দেখা, না দেখা পর্যন্ত নিঝুমের অশান্ত মন আর শান্ত হবে না।

তৈরি হয়ে নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ফাতেমা আপুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নিঝুম। ফাতেমার মায়ের ঘরের দরজায় নক করলে তিনি বেরিয়ে আসেন। নিঝুমকে দেখে তিনি বললেন,
~ “মাশাআল্লাহ। চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল আমার। তুমি বসো, আমি আসছি।”

আদহাম বেরিয়েছে বলে তিনি আর নিঝুম বাড়িতে একা। নিঝুম সোফায় বসলো। অপেক্ষা এখন আদহামের। সে টিকেট কাটতে গিয়েছে। নিঝুমকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে সে নিজেই। সালেহা বেগমের হাঁটুর ব্যথাটা হঠাৎই বেড়েছে। তার পক্ষে নিঝুমকে রাখতে যাওয়া সম্ভব নয়।

নিঝুম সোফায় বসার কিছুক্ষণ পরই ফাতেমার কল এল। কল রিসিভ করলো সে। সন্তুষ্টচিত্তে সালাম জানালো,
~ “আসসালামু আলাইকুম আপু।”

~ “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”

~ “আপু আমি বাড়িতে যাওয়ার জন্য বেরোবো কিছুক্ষণ পর।”

~ “নিঝুম, বোন আমার! সাবধানে যেও। তবে কিছু কথা বলে রাখি তোমাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, পর্দা করবে। নিজেকে একটু মূল্য দিতে শেখো। লোহা যেমন যেখানে সেখানে পড়ে থাকে, সোনা~হীরা কিন্তু যেখানে সেখানে পড়ে থাকে না। এর কারণ কী তার তো তুমি জানোই। এর একটাই কারণ।

আর তা হলো সোনা~হীরা লোহা অপেক্ষা অধিক মূল্যবান বস্তু। আর যা কিছু মূল্যবান সবকিছুই সংরক্ষিত রাখতে হয়, গোপন রাখতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের উচিত আমাদের সেই সৌন্দর্যকে যত্রতত্র প্রদর্শন না করা। একবারেই সব পারবে না তা আমি জানি।

এটা সম্ভবও নয়। হঠাৎ করে দ্বীন মানতে শুরু করলে অনেক বাধা বিপত্তি আসবে ঠিকই, তবে শুরু তো করতেই হবে, আর অবিচল থাকতে হবে দ্বীনের পথে। দ্বীনকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে হবে এই পৃথিবীতে। হৃদয়ঘটিত জটিলতা হতে মুক্ত হতে হবে আখিরাতে সর্বোত্তম পুরস্কার জান্নাত লাভের জন্য।

শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে নারী পুরুষ এর গঠন আলাদা। তাই পুরুষ হওয়ার চেষ্টা করাটাই বৃথা। পুরুষের মতো শার্ট প্যান্ট পড়লেই পুরুষ হওয়া যায় না। মেয়েদের পোশাকেই মেয়েরা সুন্দর। স্রষ্টার দান সৌন্দর্য। এতে মানুষের কোনো ক্রেডিট নেই। তাই নিজের সৌন্দর্য অন্যদের দেখিয়ে বেড়ানোতে কোনো মর্যাদা নেই। বরং তা লুকিয়ে রাখাতেই মর্যাদা আছে।

নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে হলেও শালীনতা বজায় রাখতে হবে, শালীন পোশাক পড়তে হবে। কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে তার সম্পূর্ণ দোষ তো আমরা পুরুষকেই দেই৷ তবে এতে নারীরও কম দোষ নেই। শালীনতা বজায় রাখলে কেউ তাকে অসম্মান করার কথা ভাববেও না।

আর এরপরও যদি অসম্মান করে তবে বুঝে নিতে হবে যে তারা বিকৃত মস্তিষ্কের কিছু ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। আজ নারীর লজ্জা নেই বললেই চলে। আর থাকলেও তা খুব কম নারীরই আছে। অথচ লজ্জা নারীর ভূষণ।
নারীরা আজ তাদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। নারী মানেই স্নেহময়ী, লজ্জাশীল। যাদের ব্যবহারে সবসময় কোমলতা থাকা উচিত, রুক্ষতা নয়।

একটা কথা মনে রাখবে সবসময়, তোমার মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বইছে, তার আঁচ তোমার বাবা মায়ের ওপর দিয়ে যেতে দিবে না। নিঝুম জানো তো, আমরা সকলেই অনেক বড় বড় অভিনেতা~অভিনেত্রী। বড় পর্দায় যারা অভিনয় করে তারা হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, পারিশ্রমিকের জন্য অভিনয় করে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যাই। কাছের মানুষ গুলোকে একটু ভালো রাখতে অথবা তাদেরকে সুখে রাখতে, মুখে হাসি দেখতে ভালো থাকার অভিনয়ও কখনো কখনো করতে হয়। তীব্র রকমের মন খারাপের সময়ও মুচকি হেসে ভালো থাকার অভিনয় করতে হয়, কারোর ওপর রাগ, ক্ষোভ থাকলেও কিছুই হয় নি ভাব নিয়ে তার সাথেই হাসিমুখে কথা বলতে হয়, পৃথিবী নামক মঞ্চটিতে ভালো থাকার মিথ্যে অভিনয় করতে হয়। বুঝতে পেরেছো? কি বুঝাতে চেয়েছি?”
নিঝুমের দু’চোখ ছলছল। ছোট্ট করে উত্তর দিলো নিঝুম,
~ “ইনশাআল্লাহ আপু। আমি…..!”
আর কিছু বলার আগেই সালেহা খানম উপস্থিত হলেন সেখানে। নিঝুমকে তাগাদা দিতে লাগলেন বেরোনোর জন্য৷
~ “নিঝুম, আদহাম বাইরে অপেক্ষা করছে মা। আল্লাহর নাম নিয়ে এবার রওনা হয়ে যাও।”
মাথা নাড়িয়ে ফোনের ওপাশে ফাতেমাকে বললো,
~ “আচ্ছা আপু। রাখছি এখন। পরে কথা হবে ইনশাআল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম।”
নিঝুম ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। সালেহাও নিঝুমের সাথে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত আসে নিঝুমকে এগিয়ে দিতে।
সালেহা খানম একজন জন্মদাত্রী মা এর মতোই নিঝুমকে পরামর্শ দিতে লাগলেন। মূল দরজার বাইরে এসে নিঝুম দেখলো দুইটা রিকশা দাড় করানো আছে। আদহাম দূরে দাঁড়িয়ে। আদহাম সেখান থেকেই বললো,
~ “মা, ওনাকে এবার ছাড়ো। অনেকক্ষণ হলো ওনাদের দাড় করিয়ে রেখেছি। এখন রওনা দেওয়া উচিত।”
নিঝুম সালেহা খানমের থেকে বিদায় নিয়ে একটা রিকশাতে উঠে পড়লো। অন্যটাতে আদহাম উঠে রিকশাওয়ালাদের বাস স্টেশনে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। মিনিট বিশেক পর বাস স্টেশনে এসে রিকশা থামলো। আদহাম নিঝুম দুজনেই নামলো রিকশা থেকে। রিকশাওয়ালাদের তাদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে দিয়ে নিঝুমকে তার পিছু পিছু আসতে বললো আদহাম।
ভিড় এড়িয়ে নিঝুমকে নিয়ে যাচ্ছে সে। নিঝুমের নিজেকে অনেক নিরাপদ মনে হলো। কিছুক্ষণ আগেই ভয় হচ্ছিলো অচেনা শহরে অচেনা মানুষের সাথে পথ চলার জন্য। বাসে উঠে নিঝুমকে একজন মহিলার পাশে বসিয়ে দিলো। আর সাথে কিছু চিপস, পানির বোতল, চকোলেট, বিস্কুটের প্যাকেটও দিলো। ক্ষুধা লাগলে এসব খেয়ে নিতে বললো নিঝুমকে। নিঝুম সাথে সাথেই বললো,
~ “এগুলোর কোন দরকার নেই। আন্টি খাবার দিয়েছেন সাথে।”
আদহাম কোন উত্তর না দিলে নিঝুম কিছুটা অপমানিত বোধ করে। যাওয়ার আগে আদহাম বললো,
~ “আমি সামনেই আছি। ভয় পাবেন না।”
নিঝুম মাথা নিচু করে বললো,
~ “আমি একা যেতে পারবো।”
~ “হয়তো পারবেন। কিন্তু এখন আপনি আমার দায়িত্ব। আপনাকে আমাদের বাড়িতে আনা হয়েছে। তেমনি আপনাকে নিজ দায়িত্বে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে।”
আদহাম আর কিছু না বলে বাসের দুই সিট সামনে গিয়ে বসলো। সেদিকে তাকিয়ে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেললো নিঝুম।
একটা লম্বা সময় সফরের পর নিঝুম নিজ গ্রামে এসে পৌঁছায়। আদহাম তাকে গ্রামের ভেতরে, বাড়ি হতে কিছুটা দূরত্বে রেখেই চলে যায়। নিঝুম বাড়িতে যেতে বললেও সে শুধু ‘না’ বলেই চলে যায়। নিঝুম আদহামের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে।
আদহামের ব্যক্তিত্ব যে কাউকে মুগ্ধ করতে সক্ষম। নিঝুম নিজেও মুগ্ধ! কাউকে নিয়ে ভাবা অন্তরের যিনা কথাটা মনে হতেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মনে মনে তওবা করতে থাকে সে। গ্রামের চারদিকে চোখ বুলায় নিঝুম। গ্রামের নদীনালা, রাস্তাঘাট পানিতে ভরে গেছে। সম্ভবত গতকাল রাতেও একচোট ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। পথঘাট এখনো ভেজা। বৃষ্টিতে পুনর্জীবন প্রাপ্তির আনন্দে চারিদিক ভরপুর।
নিঝুম বছর ছয়েক আগের স্মৃতিতে চলে যায়। সে বার এমন ঝড় হয়েছিল যা মনে রাখার মতো! ঝড় যে মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেটা সেইবারই প্রথম বুঝেছিল সে। সেদিনের অভিজ্ঞতা কখনো ভোলার নয়! মেঘে ঢাকা ছিল পুরো আকাশ। প্রবল বাতাসের ধাক্কায় মাঠের মধ্যে মহসিন আর নিঝুম পড়ে যাচ্ছিলো বারবার। মনে হচ্ছিলো বাতাস যেন কোন অদৃশ্য শক্তির হাত যা ওদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো।
মৃত্যুভয় জেঁকে বসেছিলো সেদিন নিঝুমের মনে। গাছতলায়ও দাঁড়াতে পারছিলো না। গাছের ডাল মরমর করে ভেঙ্গে উড়ে যাচ্ছিলো। বজ্রপাত হলে উঁচু গাছের ওপরই পড়বে। তাই গাছের নিচে না থেকে মাঠের দিকেই ছিল ওরা৷ দুজনে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার ভয়ে ওরা দু’জন দুজনের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলো, তবুও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েও হাত ছাড়েনি।
স্মৃতির গভীর থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির ভিতরে পা বাড়ালো নিঝুম। পিছনে রেখে গেল ক্রুর হাসিতে মেতে থাকা এক যুবককে।
নিঝুম বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে পড়লো। সেখান থেকেই ডেকে উঠলো,
~ “বাবলু…! আম্মা…!”
নিঝুমের আম্মা শাহেদা বাড়িতেই ছিলেন। তিনি ঘর হতে নিঝুমের গলা পেয়ে বাইরের দুয়ারে এলেন৷ নিঝুম ততক্ষণে নেকাব খুলেছে। মেয়েকে দেখে দৌড়ে এলেন শাহেদা। তার হাত থেকে ব্যাগটা টেনে নিয়ে বললেন,
~ “মাগো তুই আইছিস। চল চল ভেতরে চল। কতদূর থেকে আসছিস!”
~ “আব্বা আর বাবলু কই?”
~ “তোর আব্বার শরীরটা ভালো না। ঘুমাইছে একটু। কাজেও যায় নি। আর বাবলু টা স্কুলে গেছে।”
~ “কি হয়েছে আব্বার?”
শাহেদা বললেন,
~ “কি যে হইছে। ডাক্তার দেখান লাগে তো! কিন্তু তোর বাপ আমার কথা শুনলে তো। যায়ই না ডাক্তার দেখাতে। বটতলাতেই তো তোর হাকিম চাচা বসে। সে তো ডাক্তারি পাশ দিছে। তারে দেখালেই পারে। কিন্তু তোর বাপ চরম একগুঁয়ে। নিজে যা ভালো মনে করবে তাই করবে। তার না কে হ্যাঁ করার সাধ্য আমার নেইকো বাপু। আর তোর ভাই, সে তো সারাদিন মাঠ ঘাট চষে বেড়াবে। আর একটু পর পর এসে খাই খাই করবে। জীবনটা শেষ করলো আমার এই দুইটা মানুষ।”

শাহেদা এতদিন পর মেয়েকে পেয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নালিশ করতে লাগলো মহসিন এবং বাবলুর নামে। নিঝুম ভিতর ঘরে এসে ঘুমন্ত মহসিনকে দেখলো। হাজার বিপদে শক্ত মানুষটার প্রাণশক্তি যেন অসুস্থতা অনেকখানি নিঙড়ে বার করে নিয়েছে। মহসিনকে দেখেই বোঝা যায় তার মধ্যে আলাদা ধরনের ব্যক্তিত্ব আছে।

তার চেহারার বিশেষ বৈশিষ্ট্য না থাকলেও তার ধূসর বর্ণের চোখের মণি আর অন্যের সাথে কথা বলার সময় প্রখর দৃষ্টি তার অবয়বে অন্যরকম কাঠিন্যতা প্রকাশ করতো।

কিন্তু অসুস্থতার কারণেই সেই মুখখানি এখন শুকিয়ে গেছে, বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে। সবসময়ের মতো তার পড়নে লুঙ্গি ও ফতুয়া। নিজের বাবার এমন শীর্ণ অবস্থা দেখে চোখ দুটো ভিজে এলো নিঝুমের। গতবার ঈদে এসে মহসিনকে অসুস্থ দেখেছে নিঝুম। তবে এখন আরও বেশি অসুস্থ দেখাচ্ছে মহসিনকে।

কী এমন হলো তার আব্বার! নিঝুম ভাবলো তাকেই এবার কিছু করতে হবে। সে জানে তার আব্বা কতোটা চাপা স্বভাবের। নিজের কথা কখনো তিনি ভাবেন না!


পর্ব ১৯

মেয়ে অনেকদিন পর বাড়ি ফিরেছে বলে ঘুম থেকে জাগার পরপরই মহসিন অসুস্থ শরীর নিয়েই বাজারে গেলেন বাবলুকে সাথে নিয়ে। শাহেদা সেগুলো রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। যত্ন করে মেয়ের জন্য ডাল, ছোট মাছের তরকারি, করলা ভাজি আর টমেটোর চাটনি বানালেন। নিঝুম তৃপ্তি সহকারে অনেকদিন পর মায়ের হাতের রান্না করা খাবার খাচ্ছে৷ তাও আবার পরিবারের সকলের সাথে।

কিন্তু নিঝুম সবসময়ই স্বল্পাহারী, সকল পদ একটু একটু করে খেয়ে দেখছে। খেতে খেতেই মহসিন বললেন,
~ “পেট ভরে খেয়ে নে মা। শহরের খাবার দাবার কি ভালো নাকি? সবই তো বাসি কিংবা ভেজাল। গ্রামের মতো টাটকা জিনিস তো আর শহরে পাওয়া যায় না। তেমন কিছু কিনতেও হয় না।

আমাদের নিজেদের ক্ষেতের চাল, বাড়ির গরু ছাগলের দুধ, আলু, পটল, বেগুন, করলা, পেঁপে সবকিছুই বাগানে হয়।”
নিঝুম আর কিছু বললো না, তবে দু বার মাথা ঝাকালো যার অর্থ তিনি যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন। মহসিন আরও দুই একটি কথা বললো কিন্তু নিঝুমের তাতে মন নেই। কানে পৌঁছলো না নিঝুমের। নিঝুম ভাবতে থাকলো, সত্যিই শহরের খাবারে ভেজাল আছে।

শাকসবজি, ফলমূল, মাছ সবকিছুতেই ফর্মালিন, অধিক মুনাফা লাভের আশায় মশলাতেও ভেজাল দিতে বাদ রাখে না। এসব খেয়েই তো যত রকম জটিল অসুখ হচ্ছে মানুষের। কিডনির সমস্যা, ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা তো বেশি হচ্ছে। আর হোস্টেলের খালার রান্না তো মুখেই তোলা যায় না। না পারতে বেঁচে থাকার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে খেতে হয়। কখনও লবন বেশি, কখনও ঝাল বেশি, কখনও হলুদ বেশি।

কিছু না কিছু কমতি থাকবেই।
রাতের খাবার সেরে পারিবারিক গল্পের আসরে বসে সবাই। বাবলুর মতো অমনোযোগী, উৎশৃঙ্খল ছেলেটাও যেন আজকে মনোযোগী শ্রোতার মতো বড় বোন নিঝুমের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে। মহসিন অনেকদিন পর মেয়েকে পেয়েছেন। শহরে পড়তে যাওয়ার পর থেকে এই নিয়ে মাত্র দুইবার গ্রামে এসেছে সে। মহসিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েকে পড়ালেখার খবর, কলেজের খবর জিজ্ঞেস করছেন। নিঝুমও জবাব দিচ্ছে।

মহসিনের আজ নিজেকে উৎফুল্ল লাগছে। শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে ঠিকই, তবে মনের আনন্দ সে যন্ত্রণাকে চেপে রাখতে পারছে। গল্পের মাঝপথে নিঝুমের ঘর থেকে মোবাইলের রিংটোনের সুর ভেসে আসতে থাকলো।
মহসিন নিজেই বললেন,
~ “যা মা দেখে আয়। কে কল দিল!”

নিঝুম চলে গেল নিজের ঘরটায়। মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে আনিশার নামটা। রিসিভ করে আনিশাকে সালাম দিল নিঝুম, তাও প্রথমবারের মত।

~ “আসসালামু আলাইকুম আপু।”

~ “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
~ “কেমন আছো আপু?”
~ “ভালো। তুমি?”
~ “আলহামদুলিল্লাহ।”
~ “তোমাকে একটা খবর দিতে কল করলাম। আর তিনদিন পর চারদিনের দিন আমার বিয়ে।পরশু থেকে অনুষ্ঠান শুরু হবে। প্রথমদিন মেহেদী দেওয়া, সঙ্গীতের আয়োজন, গায়ে হলুদ আর তার পরদিন বিয়ে। আর বিয়ের পরদিনই রিসিপশন। আসবে কিন্তু তুমি।

কালকেই আসতে হবে তোমাকে। আমি ঠিকানা দিয়ে….”
আনিশার কথা শেষ হওয়ার আগে আগেই নিঝুম বলে উঠলো,
~ “নাহ আপু আমি যেতে পারবো না। আব্বা অসুস্থ। তাছাড়া অনেকদিন পর বাড়িতে এসেছি। বোঝোই তো। আমি একা তোমার বাসায় যেতে পারবো না।”

~ “ওহ….! আচ্ছা তাহলে কী আর করার। ভালো থেকো! রাখছি ওকে? বাই…!”
~ “আসসালামু আলাইকুম।”

আনিশার বিয়েটা বর্তমান সময়ের আর পাঁচটা বিয়ের মতোই হৈ~হুল্লোড় করেই হবে। এক সপ্তাহব্যাপী নানা রকম মনগড়া অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। এ ধরনের বিয়েতে গিয়ে নিজের গুনাহ বাড়ানোর কী দরকার! পর্দা রক্ষা হবে না, গান বাজনার কারণে পাপের বোঝা বাড়বে বৈ কমবে না। আর তথাকথিত আধুনিক সমাজের হাসির খোরাকও হতে হবে। তার থেকে না যাওয়াই উত্তম। তবে আগের এই সুযোগ পেলে মোটেও হাতছাড়া করতো না সে।

তবে এখন আর মন চলে না হৈ হুল্লোড়ে। না জেনে পাপ করা আর জেনে পাপ করার মধ্যে তফাত তো রয়েছেই।

নিস্তব্ধ রাত, ক্ষণে ক্ষণে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দুই একটা কুকুর অদূরে হাঁক পাড়ছে। পুরো গ্রাম ঘুমন্ত। কোথাও হয়তো কেউ জেগে নেই। সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে সবাই এখন ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। কিছুদিন আগে হলে নিঝুমও হয়তো ঘুমিয়েই থাকতো। নয়তো ফোনালাপে ব্যস্ত থাকতো। কিন্তু নিঝুমের হৃদয় এখন রবের ডাকে সাড়া দিতে চায়।

রাতের শেষ প্রহরে না ঘুমিয়ে রবের কাছে মনের কথা তুলে ধরে, রবের দুয়ারে কড়া নাড়ে ক্ষমা পাওয়ার প্রত্যাশায়। তাহাজ্জুদের সালাত শেষে, ফজরের আযান হলে ফজরের সালাত আদায় করে নেয়। তারপর জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়ে নিঝুম।

চারিদিকে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে, মোরগের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যায় নিঝুমের। গ্রামে আসায় ভোরে আজকাল পাখির ডাকেই ঘুম ভাঙ্গে। শহরে তো তা সম্ভব নয়। শহরে নিঝুমের অবাধ্যতার জীবনে সকাল হতোই সাতটা, আটটায়। আর সেখানে ঘুম ভাঙতো অ্যালার্মের শব্দে, নয়তো কোলাহল কিংবা গাড়ির হর্ণের আওয়াজে। শহরে পাখি বলতে সচরাচর কাকের হদিসই পাওয়া যায়।

মহসিনকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চাইলেও মহসিন গেলেন না। নিঝুমের মা স্বামীকে ছেলেমেয়ের সামনেই কথা শুনিয়ে দিলেন, নিঝুম হাত ধরে টেনেও তাকে নিয়ে যেতে পারলো না। তার আব্বার একটাই কথা সামান্য জ্বর এসেছে, ঠিক হয়ে যাবে। এত চিন্তা করার কিছু নেই। দুটো দিন পেরিয়ে গেল এভাবেই। নিঝুম বাবা মায়ের সাথে সময় কাটিয়ে আরও বেশি অনুতপ্ত হয়। কিভাবে তাদেরকে ঠকিয়েছে! সে কথা ভাবলেই হৃদয়ে হাহাকার করে ওঠে।

আজ আনিশার গায়ে হলুদ। বিয়ে উপলক্ষ্যে কাছের আত্মীয় স্বজনেরা আনিশাদের বাড়িতে মেহেদী এবং সঙ্গীত অনুষ্ঠানের দুই তিন দিন আগে থেকেই আসা শুরু করেছিল। এখনও আসছে। আনিশার বাবা মায়ের ব্যস্ততার শেষ নেই। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। একমাত্র মেয়ের খুশির জন্যই মেয়ের পছন্দের ছেলের সাথেই মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন তারা। তবে আনিশার চাচা, চাচী, মামা, মামী রা সাহায্য করছেন বলেই তারা ব্যস্ততার হাত থেকে একটু রক্ষা পেয়েছেন। তাদের সবাইকে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই কাজের তদারকি করছেন।

ডেকোরেশন, লাইটিং, খাবারের মেনু আরও কত কি! পুরো বাড়ি জুড়ে আত্মীয় স্বজন, বাচ্চা কাচ্চার হৈ চৈ আনন্দঘন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সকলের আগমনে বিয়ে বাড়িতে আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

ছোট ছোট বাচ্চারা আনিশার কাছে গিয়ে ভীড় করছে। বিকেল হতেই আনিশার চাচাতো, মামাতো, খালাতো ভাই বোনেরা বাড়ির সামনে বাগানের ফাঁকা জায়গায় স্টেজ সাজিয়ে গায়ে হলুদের সকল ব্যবস্থা করে ফেলে।

গায়ে হলুদে শুধুমাত্র আনিশার বাড়ির লোকজনেরাই থাকবে। রায়হানের পরিবার থেকে কেউ আসছে না আনিশাকে হলুদ লাগাতে। রায়হানের হলুদ ওদের বাড়িতেই হবে। সেখানে আনিশাদের বাড়ি থেকেও কেউ যাচ্ছে না।
গায়ে হলুদে মেয়েরা সকলে হলুদ শাড়ি পড়েছে আর ছেলেরা হলুদ পাঞ্জাবি। তবে আনিশা কে অন্যদের থেকে বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। আনিশাকে ফুলের তৈরি গহনা পড়ানো হয়েছে। হাতে, কানে, গলায় আর মাথায়।

যাতে করে এতগুলো মেয়ের মাঝে খুব সহজেই তাকে আলাদা করা যায়। আনিশাকে স্টেজের ওপর বসিয়ে রাখা হয়েছে। তার সামনে হরেক রকমের ফল, মিষ্টি আর পায়েসও রাখা হয়েছে। একে একে মেয়েরা আনিশাকে হলুদ লাগিয়ে ফল, মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছে আর নিজেরাও খাচ্ছে।

গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত সকল অনুষ্ঠানের ভিডিও করার দায়িত্ব পড়েছে আনিশার মামাতো ভাই রাফির ওপর। রাফি তাই ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করতে লেগে পড়েছে। সকলেই আনিশার রুপের খুব প্রশংসা করছে, আর আনিশা লজ্জা পাচ্ছে। আনিশা তো এভাবেই ঘটা করে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। তার স্বপ্ন এবার পূরণ হতে চলেছে। অন্যদিকে রায়হানেরও গায়ে হলুদ হয়ে যায়।

সন্ধ্যা হতে না হতেই চারিদিকে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আনিশাদের বাড়ির চারিদিক আলোয় আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। কয়েকজন ছেলে মেয়ে আবার নাচে গানে আসর জমিয়ে ফেলেছে একদম। ছোট ছোট বাচ্চারাও শাড়ি পড়ে দু হাত ভর্তি করে সারা বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পরদিন বিয়ে…!
আনিশাকে লাল বেনারসী আর ভারী ভারী গহনা দিয়ে সাজানো হয়েছে। বরপক্ষ থেকে আগেই মেয়ের জন্য শাড়ি, গহনা, কসমেটিকস সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লাগেজে করে পাঠিয়ে দিয়েছে।

পার্লার থেকে দুজন মেয়েকে বাড়িতে ডেকে আনা হয়েছে। তারাই সাজিয়ে দিয়ে গেছে আনিশাকে। আনিশাকে আজকে চেনাই যাচ্ছে না। তবে অন্য রকম সুন্দর লাগছে তাকে। সন্ধ্যার কিছু সময় পর “বর এসেছে”, “বর এসেছে” আওয়াজ পেয়ে আনিশাকে ফেলে আনিশার বোনেরা সকলেই গেট ধরতে চলে গিয়েছে।

আনিশার কাছে বসে রয়েছে আনিশার দূরসম্পর্কের এক খালা আর ছোট ছোট সব বাচ্চারা। তাদেরও কয়েকজন আবার বর দেখবো, বর দেখবো বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।

গেটে শুধুমাত্র বর ও তার সাথের কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়েছে। বরের আত্মীয় স্বজনরা বিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেছে। অবশেষে বরকে মিষ্টি খাইয়ে আনিশার পাঁচ বোনের জন্য দশ হাজার টাকা নিয়ে তবেই গেট ছেড়ে বরকে বিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠান বাড়িতেই করা হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে ছাদে।

বরপক্ষের অনেকেই খাওয়ার সময় খাবারের খুঁত, ডেকোরেশন এর খুঁত ধরতে লাগলো। মাংস বেশি সিদ্ধ হয়েছে, সবজিতে লবণ বেশি হয়েছে আরও নানা রকম কথাবার্তা বলতে লাগলো। আনিশার বাবা মা তাদের এহেন কথায় মনে কষ্ট পেলেও মুখে তাদের ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন। বিয়ে বাড়িতে এমন একথা সেকথা হয়েই থাকে। তাই ভেবে বরপক্ষের কথাগুলো মুখ বুঁজেই সহ্য করে নিলেন তিনি।

অবশেষে আত্মীয় স্বজন সকলের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে দেনমোহর দশ লক্ষ টাকা ধার্য করে আনিশা আর রায়হানের বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।

বিয়ে পড়ানোর পর উপস্থিত সকলকে মিষ্টিমুখ করানো হল। তখনও আনিশা আর রায়হানের খাওয়া বাকি। রায়হান ও আনিশাকে খাওয়ানোর জন্য একসাথে বসিয়ে দেওয়া হল। খাওয়ার পর্ব শেষ হলে তাদের দুজনকে স্টেজে বসানো হলো। ফটোসেশন পর্ব শেষ হলে, আত্মীয় স্বজন, বাবা মা এর দোয়া নিয়ে যখন বিদায়ের পালা এল তখন আনিশা, আনিশার বাবা মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ততক্ষণে আনিশার বোনেরা রায়হানের জুতা লুকিয়ে ফেলেছিল।

আবারও পাঁচ হাজার টাকা আদায় করেই জুতা ফেরত দিয়েছিলো ওরা। অবশেষে আনিশা ও রায়হানকে বিদায় দিল আনিশার বাবা মা। কলিজার টুকরো একমাত্র মেয়েকে বিদায় দিয়ে আনিশার বাবা মা ভেঙ্গে পড়লেন। আত্মীয় স্বজনরা তাদের স্বান্তনা দিতে লাগলেন।

মেয়েরা একটা সময় পর্যন্ত বাবা মায়ের বাড়ি আলোকিত করে, আবার একটা সময় পর পরের ঘরে গিয়ে সেই বাড়িটাকে আলোকিত করে। নিজের মনে করে বাড়ির সবাইকে আগলে রাখে।

পরেরদিন শহরের নামি দামি কমিউনিটি সেন্টারে আনিশা আর রায়হানের রিসেপশনের আয়োজন করা হয়।

আয়োজনে বরপক্ষও কম যায় না। সময়মত মেয়ে পক্ষের সকলে গিয়ে উপস্থিত হয় কমিউনিটি সেন্টারে। রায়হান নিজে গেটে দাঁড়িয়ে আনিশার বাড়ির লোকদের ভেতরে নিয়ে আসলো। আনিশাকে সাজিয়ে স্টেজের ওপর বসিয়ে রাখা হয়েছে। আনিশার বাবা মা, ভাই বোনেরা একে একে আনিশার সাথে কথা বলে, দেখা করে খেতে চলে যায়।

অনুষ্ঠান শেষে আনিশার বাবা মা আনিশা, রায়হান ও রায়হানের কয়েকজন কাজিনকে সাথে নিয়েই বাড়ি ফিরলেন। মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আনন্দে সকলেই আনন্দিত।


পর্ব ২০

সকালের খাওয়া শেষে শাহেদা নিঝুমকে নিয়ে বাড়ির বাহিরে পুকুর পাড়ে, ফসলের জমিতে এসেছেন শাক লতা তুলতে। অবহেলায়, অযত্নে বেড়ে ওঠা কিছু শাক লতা গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের ক্ষুধা নিবারন করতে পারে।

যাওয়ার পথে ময়না আপাদের বাড়ির ভিটে পড়ে। নিঝুম দেখে বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। উঠোনে একটা ভাঙ্গা চেয়ার, পাতিল, বালিশ ছড়িয়ে রাখা। মায়ের থেকে শুনেছে ময়নার মা সন্তান এবং স্বামীর মৃত্যুশোকে পাগল হয়ে গেছেন। বাড়ির বাড়িতে ভাইদের কাছে পাগলীর জায়গা হয় নি। আপনমনে ছুটে বেড়ায় সে। এ গ্রাম ও গ্রাম কখন কোথায় থাকে কেউ তার হদিস জানে না। কেউ খেতে দিলে খেতে পায় নইলে কী করে সেই জানে।

এরই মধ্যে বাড়ির বাইরে কারো গলা পাওয়া গেল। কেউ মহসিনকে বাইরে থেকে ডাকছেন।
~ “ও মহসিন মিয়া, বাড়ি আছোনি? বাবলুর মা, ও বাবলু…..!”

মহসিন ক্লান্ত পায়ে হেঁটে উঠোনে চলে গেলেন হাঁক শুনে। আজকাল জ্বর যেন জেঁকে বসেছে। দু’দিন পরপরই জ্বর হয়। বাইরে গিয়ে দেখেন স্বয়ং চেয়ারম্যান সাহেব তার বাড়িতে।

সাথে তার ছোট ছেলে স্বপন ও তার লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। মহসিন বললেন,
~ “আরে চেয়ারম্যান সাব আপনি! আপনি তাও এই গরীবের বাড়িতে?”

পিছনের লোকজনকে দেখে নিয়ে আবার বললো,
~ “কী মনে করে আজ আমার বাড়িতে চেয়ারম্যান সাব! কোথায় যে বসতে দেই আপনাদের…!”
চেয়ারম্যান উঠোনে পানের পিক ফেলে বললেন,
~ “শুনলাম, তোমার মাইয়াডা নাকি শহর থাইকা গ্রামে আইছে।”

মহসিন সম্মতি জানিয়ে বললেন,
~ “হ আপনে ঠিকই শুনছেন।”

চেয়ারম্যান লোকটি এবার কিছুটা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,
~ “তয় একখান কতা আছিলো আমার।”

মহসিন জানতে চাইলেন,
~ “কি কথা চেয়ারম্যান সাব?”

চেহারায় রাগী রাগী ভাব এনে বললেন,
~ “তোমার মাইয়া তো শহরের কোন এক পোলার লগে আইলো। তা হেই পোলাডা কেডা? আত্মীয় কোনো? নাকি তোমার মাইয়ার নাগর!”

মহসিন আলি হতভম্ব হয়ে গেলেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন,
~ “মানে?”

চেয়ারম্যান বিশ্রী হাসি দিয়ে বললেন,
~ “ওরে আল্লাহ! মাইয়া কার লগে আইলো খোঁজ নেও নাই! কয়ও নি তোমাগো? ভালা ভালা! যা বোঝা গেল তোমার মাইয়ার চরিত্রের দোষ আছে। নাগর জুটাইছে শহর গিয়া। নষ্ট মেয়ে মানুষ।”

মহসিন আঁৎকে উঠলেন এমন কথায়। রাগে গা রিরি করছে। চেয়ারম্যান লোকটাকে তিনি ভালো চেনেন। লোকটা ভাব ধরা ভালো মানুষ। মুখোশের আড়ালে নোংরা চরিত্রের এক মানুষ। তার নামে অনেক কথা শোনা যায়। তার বিপক্ষে কোনো কথা বললে তিনি তার অবস্থা খারাপ করে ফেলেন৷ লোক চক্ষুর অগোচরে গ্রামের মানুষদের শোষণ করেন তিনি। কেউ সাহস পায় না তার বিরুদ্ধে কথা বলার।

~ “একি কইলেন! আমার মেয়ে এমন করতে পারে না৷ “
~ “তোমার মাইয়ারেই জিগাও। আমাগো চোখ ভুল দেখে না। তয় এই গ্রামের একখান সম্মান আছে। তোমার মেয়ের জন্য সেই সম্মান তো হারানো যাইবো না। তোমার মাইয়া ঐ পোলারে জুটালো কোই থাইকা? একখান কথা শুনো মিয়া। আমার সোহেল তোমার মাইয়ারে খুব পছন্দ করে। তাই যদি তোমার মাইয়ার আর তোমার সম্মান বাঁচাবার চাও তো মেয়ের বিয়ে দিয়া দাও। আমার কোনো দাবি দাওয়া নেই। তুমি কইলে আজি এক কাপড়ে তোমার মেয়েরে ঘরে তুলে নিমু। আমার পোলার পছন্দ না হইলে এমন মাইয়ারে ঘরে তোলার কথা অবশ্য ভাইবতামও না। তোমার মাইয়া যে ঘটনা ঘটাইছে তার পরও যে আমার বাড়ির বউ করতে চাইতাছি, এই তোমার সাত পুরুষের ভাগ্য।”

~ “আপনার পোলার তো একবার বিয়া হইছে চেয়ারম্যান সাব।” আমতা আমতা করে বললেন মহসিন।

~ “আরে আমাগো ধর্মে পুরুষের চারটা বিয়া করা জায়েজ বলা আছে। আরে মিয়া এইডা কোনো সমস্যা না! তোমার মাইয়া রাজরাণী হইয়া থাকবো আমাগো বাড়িত। কলঙ্কের বোঝা টাইনা বেড়ানির চাইয়া এইডা কি ভালা হইবো না?”

মহসিন কী বলবেন খুঁজে পেলেন না। তার কী বলা উচিত? আগে তো মেয়ের থেকে সবটা শুনতে হবে। না জেনে, না শুনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। আর স্বপনের মত উশৃঙ্খল, বাজে স্বভাবের বিবাহিত ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। আপাতত সময় দরকার এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার জন্য।

~ “আমারে সময় দেন চেয়ারম্যান সাব!”

~ “কাল পরশু সিদ্ধান্ত জানাবা। আমি অহন আসি। তয় আশা রাখি সিদ্ধান্তটা আমাগো পক্ষেই হইবো। আর না হইলে তুমি জানোই কী হইবো! তোমার মাইয়ার কুকীর্তি তখন চাপানির কিছু থাকবো না। ময়নার কথা মনে আছে তো? কী পরিণতি হইছিলো মাইয়াটার। বড় কষ্ট লাগে!

আমিও বা কী করি! গ্রামের সম্মান নষ্ট হইবো এমন কাম যেই করুক, তার কোনো ছাড় নাই। কিন্তু এইবার পোলার কথা ফেলতে পারলাম না মিয়া, বুঝছো! চললাম আমরা। পরশুর মধ্যে সিদ্ধান্ত জানায়া আসবা। এই চল তোরা।”
বাঁকা হেসে ছেলে আর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বেরিয়ে গেলেন চেয়ারম্যান।

মহসিন তখনও সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। এতক্ষণ কী হলো এসব? স্বপ্ন না বাস্তব! কিছু সময় পেরিয়ে গেল। মহসিন তখনও একই স্থানে দাঁড়িয়ে।

ততক্ষণে বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নিঝুম। শাহেদাও স্বামীর চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে। মহসিন জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন।

~ “তুই কার সাথে গ্রামে ফিরছিস মা?”
নিঝুম ভীত চোখে তার আব্বার দিকে তাকিয়ে বললো,

~ “আব্বা, বিশ্বাস করো ঐ লোকটা আমাকে পৌঁছে দিতে এসেছিল। আমাদের হোস্টেলের ফাতেমা আপুর বিয়ে ছিল। আপু খুব ভালো একটা মানুষ। আপু আমাকে ওনার বিয়েতে নিজের সাথেই নিয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষার পর ছুটি ছিল আর আপুর কথা না শুনে আমি থাকতে পারি নি। ওনার ভাই আমাকে গ্রামে পৌঁছে দিলেন।

আমি অনেকবার বলেছিলাম আমি একাই আসতে পারবো। কিন্তু ওনারা কেউ শুনে নি। ওনারা বলেছিলেন, আমাকে দায়িত্ব নিয়ে ওনাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল, তাই দায়িত্ব নিয়েই পৌঁছে দিয়ে যাবে। আমি কি ভুল করেছি আব্বা? কেউ কিছু বলেছে তোমাকে?”

ফোঁপাতে লাগলো নিঝুম।

মহসিন মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
~ “আমি জানি, আমার মেয়ে কখনও কোনো ভুল করতে পারে না।”

নিঝুম তার দিকে একনজর তাকালো। তার আব্বার এই একটা বাক্যই নিঝুমের হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। হায় আল্লাহ! কী করেছে সে! তাকে এত ভরসা, বিশ্বাস করে তার আব্বা! আর সে নিজে কী করেছে? নিজেকে নিজের কাছে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। অনুতাপের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে।

মহসিন আলি মেয়েকে আর কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। স্ত্রীকে বললেন,
~ “আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাবো। আযান দিলে ডেকে দিও।”

মহসিন চলে গেলেন ঘরে। স্ত্রী শাহেদা আর মেয়ে নিঝুম সেদিকে তাকিয়ে। বাবলু তো পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতেই পারলো না। কথা শেষ হওয়ার একটু আগেই সে বাড়িতে এসেছে।

শাহেদা উনুনে ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে দিলেন। নিঝুম উঠোনে শাক লতা বাছতে শুরু করেছে। আজ সেগুলোই রান্না হবে। বাবলু অদূরে তার ভাঙ্গা ছোট্ট বাস গাড়িটা দিয়ে খেলছে।

মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছেন। মুয়াজ্জিনের আযানের শব্দ ভেসে আসছে চারিদিক থেকে। শুক্রবারের দিন আজ। জুমুআর সালাত আদায় করতে মসজিদে যাবেন নিঝুমের আব্বা।

তার লুঙ্গি পাঞ্জাবি ধুয়ে শুকোতে দিয়েছিলেন শাহেদা। নিঝুম সেগুলো তুলে আব্বা আম্মার ঘরের দিকে গেল। আব্বাকে এখনি জাগাতে হবে। গোসল করে তৈরি হতে সময় লাগবে তার। পাছে মসজিদে যেতে দেরি না হয়ে যায়।

নিঝুম ঘরে গিয়ে মহসিনকে দু’তিনবার ডাকার পরও যখন তার আব্বার জেগে ওঠার কোন লক্ষণ দেখলো না, তখন তার গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে গিয়ে জোরে এক চিৎকার করে উঠলো,
~ ” আম্মা…..!”


পর্ব ২১

শাহেদা ছুটে এসে দেখলেন মহসিনের শরীরটা কেমন যেন শক্ত হয়ে আছে! মনের মধ্যে উল্টাপাল্টা ভাবনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নিঝুম তার পাশেই কাঁদছে আর বলছে,

~ “আম্মা, আব্বার কী হল? আম্মা বলো না আম্মা। কি হল আব্বার হঠাৎ! হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

কাঁপা কাঁপা হাতে স্বামীর নাকের কাছে হাত নিয়ে গেলেন শাহেদা। নাহ উনি নিঃশ্বাস ফেলছেন, তাও অনেক দেরিতে। তার মানে তিনি বেঁচে আছেন। মহসিনকে তোলার চেষ্টা করলেন অনেকবার, কিন্তু সফল হলেন না।
বালতি এনে মাথায় পানি ঠালা শুরু করলেন। অন্যদিকে নিঝুম বাইরে গিয়ে চিৎকার করে লোক ডাকাকাকি করছে।
~ “কেউ আসেন, আমার আব্বার কী যেন হয়েছে! আব্বা অসুস্থ হয়ে গেছেন। কেউ আসেন।”

বাবলুও ছুটে এসেছে। মহসিনকে এমন অবস্থায় দেখে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তিন চারজন পুরুষ এলেন নিঝুমদের বাড়িতে। তারাই ধরাধরি করে মহসিনকে আবুলের ভ্যানে শোয়ালেন। ভ্যানে নিঝুম, শাহেদা, বাবলুও বসে পড়ে।

ভ্যানগাড়ি চলতে শুরু করে তিন~চার কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে। পিছনে আসতে লাগলেন বাকি লোকজন।
নিঝুম চট করে তার মামাকে কল দেয়। কেঁদে কেঁদে আব্বার অবস্থায় কথা জানিয়ে সাথে কিছু টাকা নিয়ে হাসপাতালে চলে আসতে বলে।

হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন মহসিন স্ট্রোক করেছেন। তার অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তাররা তাদের মত করে চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। তবে ভালো কিছুর আশা করা যাবে না সেটাও বলেছেন।

হাসপাতালে ঔষধ, পরীক্ষা নিরীক্ষার পেছনে যত খরচ হচ্ছে তা নিঝুমের মামা দিলেন। মহসিন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে। তাকে ঘিরে নিঝুম, শাহেদা বসে। নীরবে চোখের জল ফেলছে। বাবলুকে নিয়ে মামা হোটেলে গেলেন ওকে কিছু খাওয়াতে।

রাত পেরোলো। সকালের দিকে মহসিনের শরীর কালচে হতে থাকলো। নল দিয়ে তরল খাবার খাওয়ানোর অনুমতি দিয়েছে ডাক্তার। শাহেদা তাই করছেন।

সময় পেরোলেও মহসিনের অবস্থার কোনো উন্নতি চোখে পড়লো না।

দিন পেরিয়ে রাত নামে। মধ্যরাতে মহসিনের গোঙ্গানি শুনে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কাটে শাহেদার। গত দুটো দিন রাত জেগে বসে থাকার কারণে নিঝুম মেঝেতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। শাহেদার ‘ডাক্তার, নার্স আপা’ বলে চাপা আর্তনাদে ঘুম ভাঙ্গে নিঝুমের।

নিঝুম ডাক্তারকে ডাকতে যায়। তবে পায় না। ডিউটিরত নার্স চলে আসে। তবে মহসিন ততক্ষণে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন।
~ “ইয়া আল্লাহ…!”
মুহুর্তেই ভারী হয়ে উঠলো হাসপাতালের পরিবেশ।

একা নিঝুমের মামার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে বোন, ভাগিনা আর ভাগ্নীকে সামলানো। অশ্রুসজল নয়নে তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইয়াতীম হয়ে গেল বাচ্চারা!

ভোরবেলা এম্বুলেন্সে করে মহসিনের লাশ বাড়িতে আনা হয়। হ্যাঁ লাশ! শরীর হতে রুহ বেরিয়ে গেলেই তার নাম হয়ে যায় লাশ। যতোই প্রিয়জন হোক তাকে আর মাটির ওপরে রাখার অনুমতি পাওয়া যায় না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাটির নিচে রেখে আসার ব্যবস্থা করা হয়।

ক্রন্দনরত নিঝুমের দিকে তাকিয়ে আছে ফাতেমা আর সালেহা খানম। বাইরে বাবলুকে ধরে আছে আদহাম। নিঝুম মাটিতে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন এসে ভীড় করেছে তাদের বাড়িতে। আত্মীয় স্বজন বলতে নিঝুমের মামার বাড়ির লোকজন। নিঝুমের মামা~মামি আর তাদের ছেলেপুলেরা।

নিঝুমের বাবার কোন ভাই না থাকায় নিঝুমের কোনো চাচা নেই। এক কথায় তাদের দাদার বাড়ির দিককার কোন আত্মীয় স্বজনই নেই। ফাতেমা, আদহাম, সালেহা বেগম সকাল বেলাতেই এসে পৌঁছেছেন।

জাহিদ আসতে পারে নি। কোনো এক জরুরি কাজে আটকা পড়েছে। কিন্তু সে আসতে চেয়েছিল। আর ফাতেমা সে তো নিঝুমের এমন সময়ে না এসে থাকতেই পারতো না। নিঝুম রাতেই মেসেজ করে আব্বার মৃত্যুসংবাদ দিয়েছিল ফাতেমাকে। তারা নিজেরা না জানিয়েই চলে এসেছে নিঝুমের এমন দুঃসময়ে।

জন্মসূত্রে কিংবা রক্তের কোন সম্পর্ক না থাকলেও আত্মিক একটা সম্পর্ক যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল নিঝুম আর ফাতেমার মধ্যে। ফাতেমা নিঝুমকে নিজের ছোট বোনের মতোই মনে করে সবসময়।

উঠোনের এক কোণায় চৌকির ওপর শোয়ানো হয়েছে মহসিনের নিথর দেহটাকে। গায়ে পাতলা চাদর জড়িয়ে রাখা হয়েছে। ওপর দিয়ে মশারীও টাঙ্গানো হয়েছে। একটু পরেই গোসল করানো হবে তাকে। জীবনের প্রথম আর শেষ গোসলটা অন্য কাউকেই করিয়ে দিতে হয়। গতকাল রাতেই পরকালের পথে পাড়ি জমান তিনি।

একলা রেখে চলে যান স্ত্রী, পুত্র আর কন্যাকে। নিঝুমের চিৎকারে ঘরে গিয়ে স্বামীকে স্পর্শ করেই শাহেদা বুঝতে পারেন তার স্বামীর মারাত্মক কিছু একটা হয়েছে। হার্ট এট্যাক করেছে ভেবেছিল শাহেদা। কারণ অনেকদিন আগে থেকেই মহসিনের বুকের ব্যথাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা ডাক্তারের চিকিৎসা নেওয়ার কথাও তিনি ভাবেন নি।

শেষ পর্যন্ত তাকে পরকালের বাসিন্দা হয়ে যেতে হল। শাহেদা গতকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে দুর্বল হয়ে গিয়েছেন। বেশ কয়েকবার অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন চুপচাপ তাকিয়ে আছেন। যেন এক অনুভূতিশূণ্য রোবট কিংবা পুতুল!

বাবলু উঠোনে বাবার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে আর নিঝুম ঘরের মধ্যে। রবের নিকট বাবার জন্য দুআ করতে থাকে সে। বাবা নামক বটবৃক্ষের ছায়াটা মাথার ওপর থেকে হারিয়ে ফেললো চিরদিনের মতো। তার জীবনে একের পর এক ঝড় বয়েই চলেছে।

নিঝুম যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তার আব্বা আর নেই। মনে হচ্ছে ও একটা ঘোরের মধ্যে আছে, খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখছে। এক্ষুণি ঘুম ভেঙ্গে গেলেই খারাপ স্বপ্নটা ও ভেঙ্গে যাবে। তৎক্ষণাৎ তার আব্বাও সশরীরে দাঁড়িয়ে যাবেন। নিঝুমকে ডাকবেন, বাবলুকে ডাকবেন।

তাদের সাথে গল্প করবেন। সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু হায়! এটা কোন স্বপ্ন নয়। এটা বাস্তব। সূর্যের আলোর মতো, দিনের মতো, রাতের মতো। চারিদিকে শূণ্যতা বিরাজ করছে। হাহাকার করে উঠছে ভিতরটা!
ফাতেমা নিঝুমকে ধরে বিছানায় বসিয়ে খুব জোর করে এক গ্লাস পানি খাইয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে গলা শুকিয়ে গেছে মেয়েটার। ফাতেমার কাঁধে নিঝুমের মাথা।

ফাতেমা তাকে সাহস দেওয়ার জন্য, শক্ত রাখার জন্য বলতে লাগলো,
~ “মৃত্যু কারো বয়স মানে না নিঝুম। আর মানুষ যে মরণশীল।

এ এক চিরসত্য! মৃত্যু সকলের জন্য সুনিশ্চিত। ধৈর্য ধরো নিঝুম। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় কেউই চিরস্থায়ী নয়। এই দুনিয়ার সবাইকেই একদিন মরতে হবে। কেউ কয়দিন আগে মরবে আর কেউ কয়দিন পরে। আমরা সবাই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই পৃথিবীতে এসেছি। এই সময়ের এক সেকেন্ডও কম বেশি হবে না আমাদের বেঁচে থাকার। আল্লাহ তায়ালা কারো মৃত্যুর ফয়সালা ধার্য করলে, তাকে কেউ বাঁচাতে পারে না৷ আর এটাই তাকদ্বীর। তাকদ্বীরে বিশ্বাস না করলে ঈমান থাকবে না।

মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আখিরাত বা পরকাল। দুনিয়া হচ্ছে পরকালের সঞ্চয় জমানোর স্থান। এ স্থানে মানুষ সুনির্দিষ্ট সময় অবস্থান করে উত্তম আমল ও আখলাকের মাধ্যমে চিরস্থায়ী জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করে। এ দুনিয়ার জীবন খেল~তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আখিরাতের সম্বল সংগ্রহে মানুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দুনিয়াতে একটা সময় বেঁধে দিয়েছেন। কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভাল~মন্দ সংমিশ্রণ করে বিবেক বা জ্ঞানের পরীক্ষায় ফেলেছেন। দুনিয়ার কাজ~কারবার, স্ত্রী~পুত্র, বন্ধু~বান্ধব, ধন~সম্পদ, রং~তামাশা ও সংসার দিয়েছেন।

আবার এ জীবন~সংসারকে সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য বিধান দিয়েছেন। অন্তরে দুনিয়ার প্রেম~মোহব্বত খুব বেশি দিয়েছেন। এর সবই মানুষের জন্য পরীক্ষা। দুনিয়া নামক এই পরীক্ষাগারে মানুষের জীবনাচারই প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়; বরং মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হল আখিরাত তথা পরকাল।”
নিঝুম কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে। গলার স্বরও কিছুটা পাল্টে গেছে অতিরিক্ত কান্নার কারণে।

সে ফাতেমাকে বললো,
~ “আমি কি শুধু কষ্টই পাবো আপু? সুখ কি আসবে না জীবনে? একের পর এক প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলছি আমি৷”

ফাতেমা তাকে বললো,
~ “এমন ভাবে না বোন। তাকদ্বীরে বিশ্বাস রাখো। ইসলাম প্র্যাক্টিস করা, মুত্তাকী, মুমিন মানেই এই নয় যে সে দুনিয়াতে সুখই পাবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা:) কে ভালোবাসেন মানে এই নয় যে দুনিয়ার কোনো কষ্ট তাকে স্পর্শ করবে না। বরং যারা মুত্তাকী তাদেরকেই দুঃখ, কষ্ট বেশি স্পর্শ করে, তারাই দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। আল্লাহ তাদেরই দুঃখ, কষ্টে নিপতিত করে পরীক্ষা নেন, যাদেরকে তিনি বেশি ভালোবাসেন৷

বাস্তবে দ্বীনদারদের দুনিয়াবি জীবনে সবসময় হ্যাপি এন্ডিং হয় না। তবে আখিরাতে ইন শা আল্লাহ অবশ্যই হ্যাপি এন্ডিং হবে। তার জন্য ধৈর্য ধরা খুব বেশি প্রয়োজন। তাই আমাদের বুঝে নিতে হবে দ্বীনদার মানেই সুখী নয়।

আমাদের সবার জীবনেই দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, না পাওয়ার বেদনা রয়েছে। তবুও আমাদের আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে হবে৷ কারণ আমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত বেশি বৈ কম নয়৷ আল্লাহর নিয়ামত অগণিত৷ তুমি এভাবে কাঁদলে তোমার বাবার আযাব হবে। তার চেয়ে ভালো হবে যদি তুমি নামায পড়ে তোমার বাবার জান্নাত লাভের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো।”

নিঝুমের গলা হঠাৎ আটকে আসছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। চোখ দুটো ও খুব জ্বালা করছে অতিরিক্ত কান্নার ফলে। মাথা ব্যাথা ও করছে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে,
~ “এ কী ছেলেমানুষী করছি আমি, বাস্তবকে কেনো মেনে নিতে পারছি না?”

হুহু করে কেঁদে ফেললো। ফাতেমা আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে তাকে। নিঝুম ফাতেমার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে মায়ের কাছে অন্য ঘরে গেল। মাকে এই মুহুর্তে নিঝুমের সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে।

সে দেখে তার মা শাহেদা একেবারে নিষ্প্রাণ, শীতল হয়ে গেছেন। চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন।

মহসিনকে গোসল করিয়ে, কাফনের কাপড় পড়ানো হয়েছে৷ যোহরের নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে মহসিনের জানাজার নামাজ পড়ানো হয়। তারপর তাকে কবরস্থ করা হয়।

মহসিনকে কবর দেওয়ার সময় বাবলু পাগলের মতো করছিল৷ বাবলু তার আব্বাকে মাটির নিচে রাখতে দেবে না। আদহাম অনেক কষ্ট করে সামলিয়েছে বাবলুকে।
মাটি দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হলে সবাই সবার মতো চলে গেল। খুব নিকট আত্মীয়রাও কিছু উপদেশ, পরামর্শ দিয়ে চলে গেল। কেউ কেউ এমন অভিভাবকবিহীন থাকার চেয়েছে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পরামর্শও দিয়ে গেলেন শাহেদাকে। মেয়ে উপযুক্ত হয়েছে, তার ওপর বাবা নেই। এখন গ্রামের অনেকেই অনেক রকম ভাবে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে, হেনস্তা করার চেষ্টা করবে। তার থেকে সম্মান নিয়ে মেয়েকে পরের বাড়ি পার করাই ভালো।

আরও কত কী বলে গেলেন কিছু নামধারী শুভাকাঙ্ক্ষী।

মহসিনের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণে কয়েক দিন নিঝুমের সাথে সোহেলের বিয়ের কথাটা আর না এগোলেও মহসিনের মৃত্যুর দু’দিন পর চেয়ারম্যান দলবল সমেত হাজির হলেন নিঝুমদের বাড়ির ভিটেতে। গতকাল মহসিনের জানাজার সময়ে, এমনকি সকাল থেকেই আদহামকে খেয়াল করেছেন তিনি।

সেই ছেলেটা আবারো গ্রামে এসেছে। গ্রামের আরও দু চারজন গন্যমান্য ব্যক্তিকে আদহাম আর নিঝুমের সম্পর্কে দু তিনটে উল্টোপাল্টা কথা বুঝিয়ে সাথে নিয়ে এসেছেন চেয়ারম্যান।

সাথে তার গুনধর পুত্র সোহেলকেও এনেছেন। আজ বিয়ে পড়িয়ে দেবেন বলেই মন ঠিক করে এসেছেন তিনি।

সাথে করে কাজী সাহেবকেও ধরে নিয়ে এসেছেন। তার একমাত্র ছেলের পছন্দ বলে কথা। তার বংশের বাতি, তার পুত্র যখন এই মেয়েকে একবার বিয়ে করতে চেয়েছে, তখন সেই মেয়েকে তার ছেলের করে দেওয়ার দায়িত্ব চেয়ারম্যানের নিজের।

তবে এতজন লোককে নিজেদের বাড়িতে দেখে ভয় পেল শাহেদা, নিঝুম। বাড়িতে তারা দু’জন মেয়ে মানুষ, আর ছেলে বলতে বাবলুই। চেয়ারম্যানের এ বাড়িতে আসার কী কারণ হতে পারে ভেবে পায় না শাহেদা। তার জানামতে মহসিন কারো থেকে কোনো ধার করেন নি। তার চিকিৎসার জন্য খরচ হওয়া টাকাগুলোই এখন ধার হিসেবে আছে। তাহলে!


পর্ব ২২

নিঝুমদের বাড়ির ছোট্ট উঠোনেই ছোটখাটো একটা বৈঠক বসেছে। শাহেদা বেগম বারান্দার এক কোণায় মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাশেই কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে নিঝুম দাঁড়িয়ে আছে।

চেয়ারম্যান নিজেই কথা শুরু করলেন। বললেন,
~ “মহসিন তো মইরা গেল। তা মরার আগে তোমাগো কিছু কয়া যায় নাই? যেদিন ওয় স্ট্রোক করলো হেইদিন আইছিলাম তোমাগো বাড়িত। জানো?”

কথ শেষ করে শাহেদার দিকে তাকালেন চেয়ারম্যান।

শাহেদা ভীত চোখে তাকিয়েই বললেন,
~ “নাহ নাহ কিছু বলে নাই। আপনি কিসের কথা বলছেন?”

চেয়ারম্যান হাসিমুখে বললো,
~ “আমার পোলা সোহেলের সাথে তোমার মাইয়া নিঝুমের বিয়ের প্রস্তাব দিছিলাম।”

শাহেদা সহসা চমকে উঠলেন,
~ “এইটা কি কন আপনে! আপনের পোলার তো বউ আছে।”

সোহেলের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো। বার বার এই বুড়া বুড়ির এই এক কথা তার সহ্য হচ্ছে না। আগে যদি নিঝুমকে চোখে পড়তো তাহলে নিঝুমকেই বিয়ে করতো।

~ “পুরুষ মাইনষের দু এক বিয়া ব্যাপার না।”

শাহেদা চট করে বললেন,
~ “আমি আমার মেয়ের বিয়ে আপনার পোলার সাথে দেব না।”

চেয়ারম্যান শব্দ করে হাসলেন কিছুক্ষণ। তার পেছনে দাঁড়ানো লোকগুলোও হাসলো। সকলের হাসি দেখে ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে পড়লো শাহেদা।

~ “ইয়া আল্লাহ! মানুষটা দুনিয়া ত্যাগ করতে না করতেই দুনিয়ার মানুষ তাদের স্বরুপ প্রকাশ করতে শুরু করে দিয়েছে!”

তার মেয়ের জীবনে এ কোন নতুন ঝড় আসতে চলেছে তাই নিয়েই উদ্বিগ্ন শাহেদা।

~ “আরে নিঝুমের মা, তোমার অনুমতি নিতে আইছি মনে করছো? তোমাগো অনুমতির তোয়াক্কা কে করে?
মহসিনের লগে আমার পাকা কথা হয়াই রইছে। কাজি নিয়া আইছি। বিয়া পড়াইয়া এখনি নিয়া যামু আমার বাড়ির বউরে।”

অতি চালাকির সাথে তার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা অন্যরকম ভাবে বৈঠকে উপস্থিত সকলের সামনে তুলে ধরলেন। তিনি অকপটে বলে ফেললেন মহসিনের সাথে বিয়ে সংক্রান্ত তার সব পাকা কথা হয়েই গিয়েছে। পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক ঠিক হয়েছিল বিয়ের। এখন যেহেতু মহসিন বেঁচে নেই, তাই মানবিকতার খাতিরে যৌতুকের টাকা মাফ করবেন তিনি।

এদিকে এমনতর মিথ্যা কথা শুনে শাহেদা মোটেও চুপ থাকতে পারলেন না। ভরা বৈঠকে চেয়ারম্যানকে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করলেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে বললেন চেয়ারম্যানের সব কথাই মিথ্যা। তিনি হয়তো বিয়ের প্রস্তাব রেখেছিলেন কিন্তু সে বিষয়ে কোন কথাই বলেন নি মহসিন। রাজি হলে, পাকা কথা দিয়ে থাকলে তাদের জানাতেন নিশ্চয়ই।

চেয়ারম্যান ক্ষুণ্ণ হলেন। গর্জে উঠে বললেন,
~ “তোমার মাইয়ার মতো চরিত্রহীন মাইয়ারে যে আমি আমার পোলার বউ বানাবার চাইছি এই তো ঢের। এ মেয়েকে তো কোনো ভালো ঘরের ভালো পোলাই বিয়ে করবে না। কিন্তু মাইয়ার মা আমাকে যেভাবে অপমান করলা সকলের সামনে ভালো করলা না।”

এবার নিঝুম মুখ খুললো,
~ “আপনি আমাকে চরিত্রহীন কিভাবে বলেন? আর আমার পরিবারের সম্পর্কেই বা এত খারাপ মন্তব্য করার সাহস আপনার হলো কী করে? আপনি চেয়ারম্যান বলে যেখানে সেখানে আপনি নিজের ক্ষমতা জাহির করতে পারেন না। অন্যায়ভাবে আমাকে বিয়ে করতে জোর করতে পারেন না। আমি বিয়ে করবো না আপনার ছেলেকে।”
চেয়ারম্যান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিঝুমের দিকে তাকিয়ে,

~ “বিয়ে কেন করবানা? তোমার ঐ নাগরের জন্যে?”
~ “আপনি কার কথা বলছেন? আমার কোনো প্রেমিক, নাগর নেই!”

~ “না থাকলে বিয়াতে সমস্যা কী? বিয়া করবানা, তাহলে বিয়া না করেই আমার পোলার লগে থাকবা?”
চেয়ারম্যান বিশ্রী হাসি দিলেন।

নিঝুম কিছু বলতে যাবে এমন সময় শাহেদা পিছন থেকে টেনে ধরলেন মেয়েকে। তার ভীষণ ভয় হচ্ছে। তাদের সাথে পুরুষ বলতে কেউ নেই। কী করবে এখন সে!

শাহেদা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

~ “ঠিক আছে, আপনাদের সাথে লড়াই করে তো টিকতে পারবো না আমরা। আপনি হলেন গন্যমান্য ব্যক্তি।
তাছাড়া মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত আমি। কখন মরে টরে যাই। তার আগে মেয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। আমার মেয়ে সুখে থাকলেই হল। আপনার ছেলের আগের বউ কি রাজি হবে এই বিয়েতে? আমার মেয়ের জীবনে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে না তার কি গ্যারান্টি? আপনি যদি তা নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে সমস্যা নাই।”

~ “এই তো, মায়ের মতো কথা! হের বউ টু শব্দ করবার সাহস পাইবো না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। তাহলে বিয়ে পড়ানো শুরু করা যাক!”

শাহেদা কাতর স্বরে বললেন,
~ “এখনই! কত শখ ছিল মেয়ের বিয়ে দিব আয়োজন করে। মানুষটা মরে গেছে তো কী হয়েছে। আমি তো বেঁচে আছি।”

চেয়ারম্যান বিরক্ত হয়ে বললেন,
~ “পরে আয়োজন করা যাইবো। আজ বিয়া হয়া যাইবার দেও। পরে পুরা গ্রামের মানষেক খাওয়ানির দায়িত্ব আমার। তোমাগো কোনো খরচই করা লাগবো না।”

~ “তা কী করে হয়! আগামীকাল সকালে বিয়েটা পড়ালে হয় না বেয়াই?”

নিঝুম এতক্ষণ চুপচাপ চেয়ারম্যান ও তার মায়ের কথোপকথন শুনছিলো। এবার আর চুপ থাকতে পারলো না।

~ “আম্মা এসব কী বলো। আমি বিয়ে করবো না ঐ বেটারে..! দরকার হলে মরে যাব তবুও বিয়ে করবো না ঐ এক বউওয়ালা সোহেলকে। আমার দায়িত্ব নিতে না পারলে বলো দাও, আমি চলে যাব। তবুও আমাকে বিয়ে করতে বলবে না।”

শাহেদা জোরেই থাপ্পড় মারলেন মেয়েকে। নিঝুম পড়ে গেল মাটিতে।

~ “তুই করবি না, তোর ঘাড় করবে।”

গালে হাত দিয়ে অশ্রুসজল নয়নে মায়ের দিকে তাকিয়ে ঘরে চলে গেল নিঝুম। দরজা লাগিয়ে কাঁদতে থাকলো।
চেয়ারম্যান চতুর লোক। শাহেদা এত সহজে সব মেনে নিল এটা তার মোটেও ভালো লাগছে না। তবে শাহেদার বেয়াই ডাক আর মেয়েকে মারার কথা ভেবে সন্তুষ্ট হলেন।

~ “আহ..! আবার মারধোর কেন! তোমার কথাই রাখলুম নেও। কাল সক্কাল সক্কাল বিয়া। মাইয়ার দরকারি জিনিসপত্র সব পাঠায়া দিবনে। এখন তবে চলি..!”

চেয়ারম্যান যাওয়ার আগে তার দুজন লোককে বাড়ির বাহিরে থাকার নির্দেশ দিয়ে গেলেন। শাহেদার চোখমুখ জুড়ে চিন্তার রেশ। এবার কী করবেন তিনি! এই লোকদুটো পাহাড়া দিলে পালিয়ে যাবে কিভাবে!

নিঝুমের মনে হল তার সাহায্য চাই। কার থেকে সাহায্য নিবে সে! কে সাহায্য করতে পারে তাকে! মামা আসলে তিনি কি কিছু করতে পারবেন? এ গ্রামের কারো থেকেও সাহায্য পাওয়া যাবে না।

তাহলে কী করবে এখন সে?
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। শাহেদা মেয়েকে বুঝিয়ে দিলেন তার পরিকল্পনা! মায়ের প্রতি যে অভিমান নিঝুমের ছিল, তা এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। ঠিক যেমন করে সূর্যের তাপে শিশির দূরীভূত হয়।
কিন্তু এত পরিকল্পনাও যেন বিফলে গেল। নিঝুম দুআ করে যাচ্ছে আল্লাহর কাছে। আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছে পরীক্ষা করেন। হয়তো এটাও তাঁর একটি পরীক্ষা!

শাহেদা রাতের খাবার নিয়ে বসে। বাবলু খেতে শুরু করেছে। নিঝুম এখনো আসছে না। হঠাৎ নিঃস্তব্ধতার প্রাচীর ভেঙ্গে নিঝুমের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ফাতেমা আপুর নাম ভাসছে। নিঝুম যেন অথৈ সাগরের মাঝে এক টুকরো খড়কুটোর সন্ধান পেল। কল রিসিভ করলো নিঝুম।

~ “আপু আসসালামু আলাইকুম!”
~ “ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কি খবর? কেমন আছো? আন্টি, তোমার ভাই কেমন আছে?”
নিঝুম এক নিঃশ্বাসে আজকের সব ঘটনা তুলে ধরলো নিঝুমকে। ফাতেমাকে সবটা বলার পরও কেমন অস্থির অস্থির লাগছে নিঝুমের! তার সমস্যা অযথা ফাতেমাকে বলা কি ঠিক হল?
ফাতেমা বেশি কিছু বললো না। শুধু বললো,

~ “আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো। আর দুআ করতে থাকো। দুআ মুমিনের অস্ত্রস্বরুপ। দুআ কে ক্ষুদ্র ভাববে না। দুআর দ্বারা পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। বিগলিত অন্তর, হৃদয় কাঁপানো অনুভূতির সহিত আল্লাহর কাছে দুআ করে যাও। ইন শা আল্লাহ তোমার জন্য যা কল্যাণকর তাই হবে।”

তাদের কথা এটুকুই হল! ফাতেমা আপুর সাথে কথা বললে আল্লাহর প্রতি ভরসা যেন হাজারগুণ বেড়ে যায় নিঝুমের। আল্লাহর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নিঝুম খেতে গেল। যাওয়ার সময় পাহারাদার দুজনকে দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুকের গভীর থেকে।

আল্লাহর পরিকল্পনা যদি সোহেলের সাথে নিঝুমের বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে নিঝুমকে সেটা মেনে নিতে হবে। হয়তো এতেই তার কল্যাণ থাকবে!

আগামীকাল সকালের চিন্তায় শাহেদা, নিঝুম দুজনের কেউই আর খেতে পারলো না। রাতটাও নির্ঘুমে, অস্বস্তিতে কেটে গেল। অন্ধকারের চাদর সরিয়ে পূর্বাকাশে উঁকি দিল সূর্যটা। সূর্যের সোনালী রঙের আলোকরশ্মি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়লো। সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার দূর হল ধরা থেকে।

চিন্তায় হাত পা অসার শাহেদার। কিছুক্ষণ পর পর মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন তিনি। নিঝুমকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না তার ভিতরে কী চলছে! চেয়ারম্যান লোক পাঠিয়েছেন বাড়িটাকে সাজাতে। রঙ বেরঙের কাগজ, ফুল দিয়ে বাড়িটা সাজানো হচ্ছে। বাড়ির বাহিরে উনুন বসিয়ে রান্নার ব্যবস্থাও চেয়ারম্যানের লোকজনই করছে। এতসব আয়োজন দেখে শাহেদা আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। শেষ! তার মেয়ের জীবনটা শেষ…!

বাবলু তো বোনের বিয়ের কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা। সকাল আটটা নাগাদ কনের সাজের সরঞ্জামাদি নিয়ে বরবেশে সোহেল হাজির হল তার বাবার সাথে। আনন্দে আত্মহারা সোহেল। নিঝুমকে স্ত্রীরুপে পাওয়ার আনন্দ জেঁকে বসেছে! সোহেলের সাথে তার মা, ভাবীরা এমনকি তার প্রথম স্ত্রীও এসেছে। মনমরা ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সোহেলের বাড়ির মেয়ে বউরা নিঝুমকে সাজিয়ে দেয়।

অতঃপর বিবাহের কার্য শুরু হয়। কাজী সাহেবকে নিয়ে কয়জন মুরুব্বি ঘরে প্রবেশ করেছেন। কাজী সাহেব সামনে কাগজ মেলে ধরে কী যেন বলছেন..! নিঝুমের কর্ণকুহরে কোনো কথাই প্রবেশ করছে না। মনে হচ্ছে তার কানের কাছে এক ঝাঁক মাছি ভনভন করে যাচ্ছে। একহাতে কান চেপে ধরে রাখে নিঝুম।

পাশ থেকে কারোর ধাক্কায় সম্বিত ফেরে নিঝুম। খুব ধীরে কেউ যেন বলছে,
~ “স্বাক্ষর দেও…!”


পর্ব ২৩

~ “না! স্বাক্ষর দিবে না নিঝুম।”
ভীড় ঠেলে ভিতরে এল ফাতেমা। ফাতেমার কন্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টি নামার মতো অনুভূতি হল নিঝুমের। চোখ তুলে চাইলো সেদিকে। ফাতেমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে জাহিদ।
চেয়ারম্যান দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ফাতেমার দিকে। চেয়ারম্যান বুঝছেনা কে এই মেয়ে! মহসিনের আত্মীয় নাকি কোনো!

~ “এই মাইয়া, কেডা তুমি? স্বাক্ষর দিবো না মানে?”

চেয়ারম্যানের কর্কশ গলায় ফাতেমা দমলো না। সে পিছনে ফিরে জাহিদকে ইশারা করলো। জাহিদ চলে গেল। কিন্তু কয়েক মুহুর্ত পরেই ফিরে এল একজন মধ্যবয়সী লোককে নিয়ে। যিনি পুলিশের পোশাক পরিহিত ছিলেন।

চেয়ারম্যান খানিকটা ভয় পেল বটে! তবে মুখাবয়বে তা প্রকাশ করলো না। আগেই মতোই বলতে থাকলো,
~ “কারা তোমরা? কী করতাছো এইসব? বাঁধা দিতাছো ক্যারে? আমার পোলার বিয়া হইতাছে এইহানে।”

পুলিশ লোকটি চেয়ারম্যানের সামনে আসলেন। বললেন,
~ “জোর জবরদস্তি আপনি কোনো মেয়েকে নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারেন না।”

চেয়ারম্যান খেঁকিয়ে উঠলেন,
~ “জোর? কিসের জোর? কোনো জোর জবরদস্তি হয় নাই। হের মায়ের সম্মতিতেই বিয়া হইতাছে। মাইয়ারও সম্মতি আছে বিয়াতে।”

~ “তাই? ঠিক বললেন উনি?”

নিঝুমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো লোকটি।
নিঝুম অনবরত মাথা নাড়িয়ে বললো,

~ “না না, আমি বিয়ে করতে চাই না ঐ লোকের ছেলেকে। জোর করছে আমাদের সাথে। হুমকি দিয়েছে, ভয় দেখিয়েছে।”

শাহেদাও সায় দিলেন। ফাতেমা এসে বললো,
~ “মামা এই লোকটাকে নিয়ে যাও। কয়েক বছর জেল খাটলে ক্ষমতা দেখিয়ে অন্যায় করার শখ মিটে যাবে!”
চেয়ারম্যান হকচকিয়ে গেলেন,

~ “নিয়া যাইবো মানে! আপনে কেডা? কোন গেরামের পুলিশ?”

~ “গ্রামের না চাচা, আমি রংপুর শহর থেকে এসেছি আপনাকে জেলহাজতে সম্মানের সহিত নিয়ে যেতে!”
~ “এই গেরামে আমার নিয়ম খাটে। আর কাউর না।”

তৎক্ষনাৎ সোহেলের স্ত্রী এসে জাহিদের মামার পায়ে পড়লেন।

~ “সাহেব, আপনে এই বিয়া হইতে দিয়েন না। আমি সতীনকাঁটা চাই না সাহেব। আমার শউর আর স্বামী মিইলা আমারে পিটায়া রাজি করাইছে। আমার স্বামী আবার বিয়া করার লাইগা লাফাইতাছে। আর ঐ মাইয়ার সত্যই ইচ্ছা নাই। ওরেও জোর করতাছে আমার শউর। আপনে কিছু করেন সাহেব। এই বিয়া আটকান সাহেব। কিছু করেন!”

হুংকার দিয়ে উঠলো সোহেল। পরিস্থিতি হাতের বাহিরে চলে গেছে। বউয়ের চুল টেনে তুললো সোহেল। সেখানেই থাপ্পড় বসালো বউয়ের গালে। তারপর টেনে হিঁচড়ে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলো তাকে।

উপস্থিত সকলের মাঝে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। দু তিনজন বয়স্ক লোক এসেও বলছে মাইয়ার মত না থাকলে বিয়েটা না হওয়াই উচিত। তবে একবার বিয়ো ভাঙ্গলে পরে তাকে কে বিয়ে করবে? কলঙ্ক লেগে যাবে! দোষ না থাকলেও তাকে দোষী করা হবে। এই ভয়টা কাজ করছে উপস্থিত কিছু লোকের মাঝে।

তবে শাহেদা এসব ভাবছে না। মেয়েটাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করাটাই তার এই মুহুর্তের একমাত্র চাওয়া।
চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে পুলিশটি বললেন,

~ “কী এখনো এখানে থাকবেন? করাবেন আপনার রাজপুত্রের বিয়ে?

এখান থেকে এই মুহুর্তে লোকজন নিয়ে না চলে গেলে আপনাকে আমি জেলখানায় নিয়ে যেতে বাধ্য হব। আর একটা কথা মনে রাখবেন আজকের এই ঘটনার শেষ এখানেই। এর জের টানলে পস্তাতে হবে আপনাকে। তখন আপনাকে সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করবো। ওদের কোনো রকম ক্ষতি করার চেষ্টা করবেন না। আপনার ওপর নজরদারি করার জন্য লোক রাখবো আমি। আর এখানকার পুলিশ অফিসারের সাথেও কথা বলবো। দেখি ঠিক কোন কারণে আপনার অন্যায় তারা হাসিমুখে মেনে নেয়, প্রতিবাদ করে না।”

চেয়ারম্যান অপমানিত হয়ে চলে গেল। তবে মনে মনে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। আস্তে আস্তে বাড়ি ফাঁকা হল। নিঝুম হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ফাতেমা গিয়ে জড়িয়ে ধরলো নিঝুমকে। নিঝুমের শরীর এখনো মৃদু কাঁপছে।
~ “আপু…!”

কাঁদতে কাঁদতে ফাতেমার বুকেই লুটিয়ে পড়লো নিঝুম। দিনটা তার জীবনের ভয়াবহ এক দিন হয়ে রইবে।
দুপুরেই নিঝুম চলে গেল হোস্টেলে। শাহেদা বাবলুকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়ি গেলেন। আপাতত কিছুদিন তাদের এখানে থাকা ঠিক হবে না। চেয়ারম্যান ক্ষেপে আছেন। যে কোনো ভাবে আক্রমণ করে বসতে পারে। সেজন্য তাদের প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ফাতেমা, জাহিদও নিজেদের বাড়ি ফিরে গেল।

=====
এক সপ্তাহ পার হয়েছে নিঝুম বগুড়ায় এসেছে। আদনানের চলে যাওয়া, আব্বার মৃত্যু, সোহেলের সাথে বিয়ের ঘটনা এই তিন তিনটা ঘটনা তার সমস্ত মনোবল কেড়ে নিয়েছিল। জীবনীশক্তির কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না তখন।
আবার ইসলাম সম্পর্কে একটু একটু করে জানার পর দুনিয়ার সম্পর্কে আর ভাবতে ইচ্ছা করে না নিঝুমের।

জীবনীশক্তি বৃদ্ধি পায় গুনাহের কথা ভাবলেই। এতসব গুনাহের জন্য তাওবা না করে, আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করে তা আদায় করে না নেওয়ার আগে তার মৃত্যু এসে গেলে কী হবে! এই ভয়টাই প্রতিনিয়ত বাঁচার আশা দেয় নিঝুমকে।

এই দুনিয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাটা অনর্থক মনে হয় মাঝে মাঝে। দুনিয়াবি পড়ালেখাকে সময় নষ্ট ছাড়া কিছুই মনে হয় না। যে মেয়েটা একসময় পড়ালেখার শেষ ধাপ অবদি যেতে চাইতো সেই মেয়েটাই এখন আর লেখাপড়া করতে চায় না। তবে উপার্জন করতে হলেও পড়ালেখা করে সার্টিফিকেট অর্জন করা চাই। নইলে আম্মা, বাবলুর দায়িত্ব নেবে কে!

আজ অনেকদিন পর কলেজে উপস্থিত হয়েছে নিঝুম। গত এক সপ্তাহ নিজেকে ধাতস্থ করতেই কেটে গেল। কয়দিন কলেজে ক্লাস করতে না আসার কারণে প্রিন্সিপাল বরাবর একটা দরখাস্তও জমা দিতে হলো তাকে।

কলেজের ক্লাস রুম, ছেলে মেয়ের অবাধ চলাচল, কথাবার্তা, পুরো পরিস্থিতিটাই এখন নিঝুমের কাছে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। না পারতে কলেজে উপস্থিত হয়েছে মাত্র। সহ্য করতে না পারলেও সহ্য করে যাচ্ছে।

নিঝুম কলেজ ড্রেসের কালার মিল রেখে কলেজে পড়ে আসার জন্য বোরকা, হিজাব বানিয়ে নিয়েছে। কলেজে সেই বোরকা, হিজাব পরেই আসলো সে। পড়ানোর সময় তৃতীয় বেঞ্চে নিঝুমের দিকে চোখ পড়ে গেল ম্যাডামের। দাঁড় করালো নিঝুমকে। ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বললো,
~ “এসব কি পড়ে এসেছো?”

অশালীন ছোট পোশাক পড়লে কাউকে এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। কিন্তু পর্দা মানার নিয়ত থেকে বোরকা কিংবা জিলবাব পড়া শুরু করলে তাকে এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাও যদি আবার হঠাৎ করে শুরু করা হয়। মনে মনে কষ্ট পেলেও মুখে কিছু না বলে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো নিঝুম।

তাকে নিশ্চুপ দেখে ম্যাডাম আবারো বললেন,
~ “বোরকাওয়ালীরা আগে নিজেদের চরিত্র ঠিক করো। সন্ধ্যার পরও আজকাল অনেক বোরকাওয়ালীকে আমতলায় জামতলায় বসে থাকতে দেখা যায় ছেলেদের সাথে।”

আর কোনো কথা বললেন না তিনি। নিঝুমকে বসতে বললেন। নিঝুমকে দাঁড় করিয়ে কথাটা বললেও ক্লাসের বোরকা পড়া মেয়েদের উদ্দেশ্যেই ছিল কথাটা। তিনি সহ্যই করতে পারেন না এসব! অন্য ধর্মাবলম্বী বলেই কিনা কে জানে!

নিঝুমের বন্ধুরা তাকে প্রথমে চিনতে পারে নি। কিন্তু পরে ক্লাস এটেন্ডেন্স নেওয়ার পেপারে নিঝুমের সিগনেচার দেখে তারা বুঝে ফেলে নিঝুম ক্লাসে উপস্থিত। এদিকে ওদিকে তাকিয়েও তাকে খুঁজে না পেলে ক্লাস শেষ নিঝুমকে ঠিকই বের করে ফেলে।

পিয়ালী অবাক হয়ে বললো,

~ “কি রে এমন সেজেছিস কেনো?এভাবে আসলে তোকে কে চিনবে?”

নিঝুম সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
~ “মুসলিম মেয়েদের এভাবেই চলতে হয়। কেউ আমাকে না চিনুক এটাই চাই আমি।”
পিয়ালী মুখ বাঁকিয়ে বললো,
~ “ওহ তুই তো তাহলে একাই মুসলিম। আমরা তো তাহলে অমুসলিম।”

নিঝুম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
~ “আমি সেটা কখন বললাম। আমি শুধু বলেছি মুসলিম মেয়েদের এভাবেই চলা উচিত। কারণ পর্দা করা ফরজ। আমাদের কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়াদের জন্য এটা কঠিন হলেও আমাদের এভাবেই চলার অভ্যাস করা উচিত।

কারণ এটা আমাদের রবের নির্দেশ। আর আমি তাঁর নির্দেশ পালন করছি মাত্র। খোলা খাবারে যেমন মাছি বসবেই ঠিক তেমনি খোলামেলা পোশাকে চলাফেরা করলে, বেপর্দা হয়ে চললে মানুষ তাকাবেই। মেয়েদের জান্নাত লাভের জন্য পর্দা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি নিজেদের সুরক্ষিত রাখতেও এটা প্রয়োজনীয়তা অতুলনীয়।

আর মেয়েদের সৌন্দর্য তার স্বামীর জন্য, যা মেয়েদের নিকট আমানত স্বরুপ ৷ কিন্তু আমরা কী করি? সেই আমানতের খিয়ানত করি। পরপুরুষকে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ করে দেই। এটা কি ঠিক? আল্লাহ যে কাজের নির্দেশ আমাদের দিয়েছেন তা আমাদের অমান্য করা উচিত নয়।”

এবারে লিজা বললো,
~ “তুই কি কোন ছাত্রদলের সাথে যুক্ত হয়েছিস?”

নিঝুম চরম অবাক হলো। আর বিস্ময় নিয়েই বললো,
~ “ইসলামের বিধিনিষেধ মানতে হলে কোনো ছাত্র দলের সাথে যুক্ত হতে হবে কেন? আমি ফরজ বিষয়গুলো মানছি বলে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম? এসব আমি বুঝি না! কিসের দলবল!”

রাকিব জিজ্ঞেস করলো নিঝুমকে,
~ “তুই আমাদের নাম্বার ব্লক লিস্টে রেখেছিস কেনো?”

~ “গায়রে মাহরামদের সাথে পূর্ণ পর্দা করে চলতে হয়। তাদের সাথে অনর্থক কথাবার্তা, চ্যাটিং, ফোনে কথা বললেও পাপ হবে। আর আমি যখন একবার আমার ভুলগুলো ধরতে পেরেছি, তখন আমি পুনরায় সেই ভুলগুলো করবো না। আমি নিজেকে শুধরে নিতে চাই।”

রাইসা বললো,
~ “কি শুরু করছিস এসব? দেখবোনি কয়দিন থাকে তোর এইসব ঢঙ। কয়দিন পর ঠিকই আবার আগের মতো হয়ে যাবি। চল তো তোরা। বিরক্ত লাগছে আমার!”

নিঝুমের বন্ধুরা সবাই তার ওপর বিরক্ত হয়ে চলে গেল। আর সে ভাবতে লাগলো,
~ “সবাই যদি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয় কিন্তু আল্লাহ যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, তবে আমার আসলে কি অর্জন হবে? কিছুই হবে না! কিন্তু আল্লাহ যদি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন কিন্তু বাকি সবাই আমার প্রতি নারাজ থাকে, আমার ওপর বিরক্তবোধ করে তবে আমি কি আদৌ কিছু হারিয়েছি?

না আমি কিছুই হারাইনি। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির দিশা। আমার সকল কাজ আমার সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই, আমার সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই। তাই আমার ওপর কোন মানুষের অনর্থক অসন্তুষ্টি নিয়ে আমার ভাবা উচিত নয়। আমার কিছু যায় আসে না তোদের বিরক্তবোধে।”
কলেজে সবগুলো ক্লাস করে, প্রাইভেট পড়েই হোস্টেলে ফিরলো নিঝুম।


পর্ব ২৪

পেরিয়ে গেছে মাসখানেকেরও বেশি। নিঝুমের ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। নিঝুম খুব কম নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। তবুও পাশ করতে পেরেছে বলে নিঝুম আল্লাহর নিকট বারংবার শুকরিয়া জানায়। তার প্রস্তুতি এত খারাপ ছিল যে পাশ করাটাই তার কাছে অনেক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শাহেদা নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। কতদিনই বা ভাইয়ের বাড়িতে থাকা যায়! মাসের পর মাস ভাইয়ের বাড়িতে থাকতে গেলে দেখা যাবে যতটুকু ভালো সম্পর্ক আছে ভাই~ভাবীর সাথে, তা অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। তিক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটবে সুন্দর স্বাভাবিক সম্পর্কটাতে।

মহসিনের জমিজমা শাহেদা নিজেই দেখাশোনা করছেন। লোক লাগিয়ে চাষাবাদ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাড়িতে যে তিনটে ছাগলছানা ছিল সেগুলো এতদিনে আরও একটু বড় হয়েছে। এগুলো বিক্রি করে ভাইয়ের ধারের টাকাটা শোধ করতে হবে তাকে। আবার জমিতে চাষাবাদ করতেও খরচ।

কাউকে দিয়ে করে নিলে তাকেও টাকা দিতে হবে! সবমিলিয়ে বেশ চিন্তায় আছে শাহেদা। নিঝুমের পড়াশোনারই বা কী হবে!

ফাতেমার বাবার বাড়িতে এবং শশুড় বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইছে ফাতেমার মা হওয়ার খুশিতে। সবাই খুশি নতুন শিশুর আগমনে। শিশুটির চঞ্চল পা ছুটে বেড়াবে বাড়িময়! সারা বাড়িজুড়ে তার ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হাঁটাহাঁটি করে বেড়াবে, আধো আধো ভাষায় কথা বলবে, শিশুটির হাসিতে ভরে উঠবে পুরো বাড়ি আর সকলের মন।

খুশির খবরটা পেয়েই বাড়ি ফিরলো জাহিদ। কলেজে প্রিন্সিপালকে বলে ছুটি নিয়ে এসেছে সে। সাথে কয়েক কেজি মিষ্টি। সে পারে না উড়ে চলে আসতে! এমনই তার মনের অনুভূতি, আনন্দ!

ফাতেমা আজকেই জানতে পেরেছে তার প্রেগন্যান্সির কথাটা। সাথে সাথে জাহিদ আর সালেহা খানমকে জানিয়ে দিয়েছে। জাহিদ নিজের খুশি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না। ‘আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!’ বলে চলেছে মিনিটে কয়েকবার। বাড়ি ফিরেই দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছে সে।

ফাতেমা জাহিদের আনন্দ দেখে বলে,
~ “কী? পাগল হয়ে যাবেন নাকি আনন্দে?”

জাহিদ ফাতেমার কপালে ভালোবাসার পরশ দিয়ে বললো,
~ “হতেও পারি৷”

ফাতেমা দুষ্টুমি করে বললো,
~ “পৃথিবীতে বুঝি আপনিই প্রথম বাবা হচ্ছেন?”

জাহিদ জবাব দেয়,
~ “উহুম! প্রথম হয়তো নয়, তবে প্রথমবার বাবা হচ্ছি তো।”

দুজনেই হেসে ফেললো।

বগুড়া আসার পর ফাতেমার সাথে নিঝুমের কথা হয়েছে তিনবার, সালেহা খানমের সাথেও কথা হয়েছে। নিঝুমের কলেজ সরকারি হওয়ার কলেজে শুধু পরীক্ষার ফি দিতে হয়। আর তাই খরচ বলতে নিঝুমের প্রাইভেট আর হোস্টেল ভাড়া। নিঝুম বাড়ি থেকে ফিরে এসে আর প্রাইভেট পড়তে যায় নি। এত সব ব্যয়ভার কে বহন করবে!

এখন বারবার মনে পড়ে যায় মিথ্যা বলে আব্বার থেকে টাকা নেওয়ার দিনগুলোর কথা!

উপার্জন করতে আব্বার কতোই না কষ্ট হয়েছে! আর নিঝুম কী করেছে! সে মিথ্যা বলেছে তার আব্বাকে। আব্বার কষ্টে অর্জিত অর্থ অকাজে ব্যয় করেছে। একবার, দু’বার নয়, বহুবার!

ফাতেমা নিঝুমের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল। তবে নিঝুম সেটা মেনে নেয় নি। মানবতার খাতিরে ফাতেমা হয়তো সাহায্য করতে চাইছে, কিন্তু আত্মসম্মান নামক জিনিসটার কারণে নিঝুম তার এই সাহায্য নিতে অপারগ।

ফাতেমাও সেটা বুঝতে পেরেছে। আর তাই তার ক্লাসমেটের চাচাতো ছোট ভাইবোনকে পড়ানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। নিঝুমও এতে রাজি হয়েছে। সরাসরি আর্থিক সাহায্য আর নিতে হল না তাকে! ফাতেমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা পায় না নিঝুম। কতোই না সাহায্য করলো এ জীবনে! সাহায্যের ভার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজেকে কেন যেন খুব ঋণী মনে হয় নিঝুমের!

শাহেদাও নিশ্চিন্ত হয়েছেন। নিঝুম যদি নিজের খরচটা নিজেই উপার্জন করতে পারে, তাহলে তারা মা ছেলেতে কোনো এক রকমভাবে চালিয়ে নিতে পারবেন। তবে সমস্যা যা তৈরি হয়েছে তা হলো রাতের বেলা টিনের চালে ঢিল ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেছে। কে করে শাহেদা জানেন না। তবে চেয়ারম্যানের ছেলের চ্যালাপ্যালা হবে মনে করেন শাহেদা।

কলেজে নিঝুম বেশ কয়েকবার পিয়ালী, লিজা, সাথি, রাইসার সাথে কথা বলেছে ইসলাম, দ্বীন, ঈমান এসব নিয়ে। তাদেরকে পর্দা এবং ইসলামের ফরজ বিধান সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু তার এই প্রচেষ্টার ফলাফল সর্বদাই শূণ্য।

হীতে বিপরীত হয়ে গেছে। পিয়ালী, রাইসা, সাথি আর লিজা তো নিঝুমের সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে। ওরা এখন তার থেকে অনেকটা দূরে দূরে থাকে। যেন নিঝুমের ছায়া মাড়াতেও রাজি নয় তারা।

নিঝুমের ওপর বিরক্ত হয় তার উপদেশ দেওয়ার কারণে। তবে এতে নিঝুম মোটেও কষ্ট পায় না। কেননা কেউ চাইলেই তো কাউকে হেদায়েত দিতে পারে না। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত দেন। কিন্তু মানুষকে তো হেদায়েতের জন্য প্রার্থনা করতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট হেদায়েত চাইতে হবে।

নিঝুমও আজকাল ওদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত কোনো কথা বলে না, কিন্তু খোঁজ খবর রাখে৷

জীবনে বন্ধু নির্বাচনে খুব সতর্ক হওয়া উচিত। যে পথের দিশা নিঝুম পেয়েছে, সে পথ আর হারাতে চায় না শুধুমাত্র এমন বন্ধুদের সাহচর্যে পড়ে, যাদের মধ্যে দ্বীনের ছিটেফোঁটাও নেই।

‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ বাক্যটি সমাজের বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ। একজন দ্বীনদার বন্ধু যেমন নাজাতের ওসীলা হতে পারে, ঠিক তেমনি একজন দ্বীনহীন বন্ধু জাহান্নামী হওয়ার কারণও হতে পারে।

কেননা সেই বন্ধুর প্রভাব পড়তে পারে জীবনে। হাজারো বন্ধু থাকা সত্বেও তো একাকিত্ব ঘুচবে না যদি না আল্লাহ সাথে থাকেন।

যাদের সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের সাথে সম্পর্ক রেখে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করতে পারবে না। যেটুকু তাদের জানানো উচিত বলে মনে হয়েছে, তা জানিয়েছে। এর অতিরিক্ত সে কিছুই করতে পারবে না।
যত দিন পেরিয়ে যেতে লাগলো নিঝুম কলেজে ততোই হেনস্তা হতে থাকলো। প্রাকটিক্যাল ক্লাসে তাকে স্যার এসব পোশাক পড়ে যেতে নিষেধ করলো।

কেননা কেমিস্ট্রি প্রাকটিক্যাল করতে গেলে আগুন লেগে যাওয়া বা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নিঝুম তার নিজ সিদ্ধান্তে অটল। আর পাপের বোঝা বাড়াতে চায় না সে৷

বর্তমানে তার বেশিরভাগ সময় কলেজ কাটলেও বাকি সময়টা নিঝুম ইবাদত বন্দেগী এবং ইসলামি জ্ঞান অন্বেষণেই কাটায়। ফেসবুকের অনেক সহিহ ইসলামি গ্রুপ, পেজের ইসলামি পোস্ট, ইউটিউবের নানা রকম প্রশ্ন উত্তরের ভিডিও, অনেক আলেম, বক্তার ভিডিও দেখেই সময় কাটে তার। সহিহ জ্ঞান অর্জন করাই তার এখন মূল উদ্দেশ্য।

পাশাপাশি নিজের চেষ্টায় একাডেমিক পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে যে দায়িত্ব নিতে হবে।
নিঝুমের মাঝে মাঝে চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে,
~ “দায়িত্বের বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়ে কোথায় গেলে আব্বা!”

রিযিকের মালিক আল্লাহ। রিযিকদাতাই রিযিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। জমিজমাগুলো বন্ধক দিয়ে, গরু, ছাগল আর মুরগি পালন করে, উঠোনের একপাশে সবজি চাষ করে দিনাতিপাত করছেন শাহেদা। যখন কারো শক্তি হচ্ছে আল্লাহ তায়া’লা, তখন কোনকিছুই তাকে আটকাতে পারবেনা।

সময় আর পরিস্থিতি যখন প্রতিকূলে থাকে তখন দু’আই একমাত্র ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে শুধু চাইতে হবে। কুরআনের যেসমস্ত আয়াতে দুঃখের কথা বলা হয়েছে, পরবর্তী কিছু আয়াতেই সুখের সুসংবাদও দেওয়া হয়েছে।।

এপ্রিল মাসের প্রায় মাঝামাঝি সময়। আগামীকাল ১৪ই এপ্রিল। ছুটির দিন। কলেজে ক্লাস নেই, প্রাইভেটও পড়াতে যেতে হবে না। তবে কলেজে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আছে। কিন্তু যেদিন থেকে নিঝুম জেনেছে এগুলো অনুষ্ঠান পালন করা জায়েজ নয়, সেদিন থেকে এসব অনুষ্ঠানে যাওয়ার ইচ্ছাকে দমন করেছে সে। তাই আজ রনি, সুমিকে একটু বেশিই পড়াচ্ছে নিঝুম।

রনি পড়ে ক্লাস থ্রি তে, আর সুমি ক্লাস ফাইভে পড়ে। এ বয়সের ছেয়েমেয়েরা স্বভাবতই দুষ্টু, চঞ্চল প্রকৃতির হয়ে থাকে। তবে রনি সুমি স্বাভাবিকের তুলনায়ও অনেক বেশি শান্তশিষ্ট ছেলে মেয়ে।

নিঝুম পড়ানো শেষে বললো,
~ “কাল তো তোমাদের স্কুল নেই। কাল তাহলে পরীক্ষা নিয়ে নেই?”

~ “না আপু”, দুজনেই বলে উঠলো।

~ “না কেনো? আমি যা পড়িয়েছি তার মধ্যে থেকেই পরীক্ষা নেব। তাহলে সমস্যা কী? আরও সময় লাগবে তোমাদের?”

সুমি রনি দুজনের মাথা নিচু করে বসে আছে। আড়চোখে নিঝুমের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল সুমি। আর বললো,
~ “কালকে আব্বু আম্মু মেলায় নিয়ে যাবে। আমরা ঘুরবো, অনুষ্ঠানে যাব আরও কত কী! আপু কালকে প্লিজ পড়াতে আসবে না। প্লিজ।”

~ “কালকেই কেনো ঘুরতে হবে? অন্য কোনো দিন ঘুরতে পারতে না?”

রনি চট করে বলে ফেললো,
~ “আম্মুর সময় নেই যে!”

দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিঝুম। একেতো বিল্ডিং বাসায় থাকাতে খেলাধুলার জন্য খোলামেলা পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায় না। তার ওপর বাবা মা দুজনই যদি জব করে তাহলে বাচ্চাদের ছোটবেলা শেষ! এর ফলে বাচ্চারা আসক্ত হচ্ছে টিভিতে বিভিন্ন কার্টুন শো দেখায় নয়তো মোবাইলে গেমসে খেলায়। এসব বাচ্চাদের শৈশব কি বাবা মায়েরাই নষ্ট করছে না?

উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
~ “ঠিক আছে, কাল আসবো না। তাহলে পরশু পরীক্ষা নেব।”

দুজনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়লো চিবুকে, চোখে, পুরো মুখে। খুশিমনে উত্তর দিলো দুজনে,
~ “আচ্ছা আপু।”

নিঝুম বেড়িয়ে এল ওদের বাসা থেকে। পনের মিনিট হাঁটতে হবে তাকে। রনি, সুমিদের বাসা জলেশ্বরীতলায়। গ্রামীণফোন কাস্টমার কেয়ারের অপজিটের একটা বিল্ডিংয়ে। সেখান থেকে সেউজগাড়ী হেঁটে আসতে তার সময় লাগে। বিকেলের এই সময়টায় অত্যধিক ক্লান্তবোধ করে নিঝুম। দুপুরে হোস্টেলে খাবার নেওয়া বন্ধ করেছে নিঝুম। একেতো না খাওয়া তার ওপর হেঁটে যাতায়াত। শরীর আর কুলোয় না তার!

হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে তাকিয়ে দেখছিলো নিঝুম। শো রুমগুলোতে পহেলা বৈশাখের জন্য প্রচুর ভীড়। সাদা লালের পোশাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ম্যানিকুইনগুলো।

নিউ ইয়ার, পহেলা বৈশাখ এসব অনুষ্ঠান পালন ইসলাম সমর্থন করে না। নববর্ষ উৎযাপন করা মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়। বরং এটা হচ্ছে বিজাতীয়~বিধর্মীয় কাফির, মুশরিকদের সংস্কৃতি। আর তাদেরকে অনুসরণ, তাদের উৎসব পালন তো সরাসরি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ নাকি মুসলিম প্রধান দেশ। এই তার নমুনা! পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণই আজ মুখ্য। ধর্ম পালন এখন গৌণ বিষয়ের মত! যারাও বা পালন করে তারা ব্যাকডেটেড আখ্যায়িত হয়।


পর্ব ২৫

ফাতেমার প্রতি জাহিদের যত্ন বাড়তেই থাকলো। এখন শুধু বউ নয়, সাথে বাচ্চাও আছে। আর তাই তো যত্ন, ভালোবাসার ডোজ বাড়িয়ে দিয়েছে জাহিদ।

সময়ের সাথে সাথে ফাতেমার শরীর খারাপ হতে শুরু করে, খাওয়ার রুচি কমে যায়, কিছু খেলেই সাথে সাথে বমি। পরিবারের সকলে অস্থির হয়ে পড়ে! জাহিদ ফাতেমার কষ্টটা অনুভব করে হৃদয়ের গভীর থেকে।

আপ্রাণ চেষ্টা করে কী খেলে ফাতেমার ভাল লাগবে তা জোগাড় করা, সেভাবে রান্না করার চেষ্টা করা, সময় মত ঔষধগুলো তাকে খাইয়ে দেওয়া, কখনো মেঝেতে বমি করে ফেললে নিজেই পরিষ্কার করে দেয়া, পোশাক নোংরা করলে পাল্টে দেওয়া, ধুয়ে দেওয়া, কলেজ থেকে বারবার ফোন দিয়ে ফাতেমা আর তার অনাগত সন্তান এর খবর নেওয়া। প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার আনন্দে অন্যরকম এক দায়িত্ববোধ অনুভব করতে থাকে জাহিদ।

তাছাড়া বাড়িতে অভিজ্ঞ কোনো মহিলা নেই। জাহিদের তো মা নেই যে ফাতেমার এ সময়ে পাশে থাকবে। জাহিদের অতিরিক্ত চিন্তার কারণে ফাতেমা তাকে বলেছিল সে মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে। কিন্তু জাহিদ ফাতেমার কথা শুনতে নারাজ। তাই ফাতেমাও থেকে গেল জাহিদের কাছেই। বাড়ির কাজগুলো করতে জাহিদের বোন ফাতেমাকে অেক সাহায্য করে। আর তাছাড়া সময় পেলে জাহিদও নিজের কাজগুলো নিজেই করে নেওয়ার চেষ্টা করে।

আনিশার ইনকোর্স পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষা দিতে হোস্টেলে ফিরে এসেছে আজ। আনিশা এসে নিঝুমের এই ব্যাপক পরিবর্তনে হতবাক।

আনিশা তাকে ঠাট্টা করে বলছে,
~ “তুমি তো দেখি পুরোদমে হুজুরনি হয়ে গিয়েছো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো, বাইরেও তেমন যাওনা, ঘোরাফেরা করো না, বাইরে বন্ধু দের সাথে আড্ডা দেও না, বাইরে গেলেও বোরকা পড়ো বয়স্ক মহিলাদের মতো। বলেছিলাম নিজেকে পরিবর্তন করতে! আপডেটেড হতে বলেছি কিন্তু তুমি তো আরও ব্যাকডেটেড হয়ে গেছো! একদম ফাতেমা আপুর মতো। কিন্তু ফাতেমা আপুকে তো দেখলাম না। তা কোথায় সে? হোস্টেল ছেড়ে চলে গেল নাকি?”
নিঝুম জবাব দিল,

~ “আপু শশুড়বাড়ি তে।”

~ “ও মা! বিয়েও হয়ে গেছে তার! ভালো। এখন রান্নাঘর, সংসার সামলাচ্ছে নিশ্চয়ই। এজন্য পড়ালেখা বন্ধ।”
মশকরা করে উঠলো আনিশা। নিঝুমের পছন্দ হল না আনিশার কথা বলার ধরন।

আনিশা ফের জিজ্ঞেস করলো,
~ “হঠাৎ এতো পরিবর্তন যে?”

নিঝুম উদাসীন হয়ে বললো,
~ “এই পরিবর্তন টা অনেক আগেই আসতে হতো। জীবনের কিছু সংকট থেকে মুক্ত থাকতাম ইসলামিক জ্ঞান যদি থাকতো।”
~ “তবে যাই বলো, এই গরমের দিনে এভাবে……..”
আনিশাকে থামিয়ে দিল নিঝুম।

~ “আমরা মনে করি পর্দা করা কঠিন, তাই কঠিন। যদি না মনে করি তাহলে ঠিকই সহজ। অসুস্থতার কারণে ডাক্তার যদি কোনো কিছু খেতে নিষেধ করে, তবে আমরা কিন্তু সেটা ঠিকই মানি। উল্টো প্রশ্নও করি না যে এতে কী সমস্যা হবে! নীরবে মেনে চলি। কেনো? কারণটা এর সাথে আমাদের সুস্থতা জড়িয়ে আছে তাই।

কিন্তু পর্দার ক্ষেত্রে কেনো এত প্রশ্ন? পর্দা তো প্রতিটি মুসলিম নারীর ওপর ফরজ বিধান, আল্লাহর হুকুম৷ সেক্ষেত্রে কেনো আমরা প্রশ্ন তুলি?

নিজেদের সুস্থতার জন্য ডাক্তারের নির্দেশ পালন যদি সহজ হয়ে থাকে তাহলে এই বিশ্বজগতের মালিক, যিনি কেবলমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য আমাদের এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাঁর নির্দেশ মানা কঠিন কেনো হবে?

এর সাথে কি আমাদের সফলতা জড়িয়ে নেই? আল্লাহর হুকুম না মানলে জাহান্নামে যেতে হবে, তার বেলা? আমরা এখন পশ্চিমা সভ্যতার অনুকরণ, অনুসরণ করে থাকি।

তাই আমাদের ধর্ম পালন এখন ব্যাকডেটেড লাগে সবার কাছে।

আমাদের রোল মডেলরা হলো শাহরুখ খান, মেসি, ভিরাট কোহলি, অরজিৎ সিং, নেহা কাক্কার, কাজল, দীপিকা আরও কত! এনাদের অনুসরণ করলে ভালো কী হবে তা জানিনা তবে খারাপ নিশ্চয়ই কিছু হবে। অনুসরণ অনুকরণ যদি করতেই হয় তাহলে একজনকেই করা উচিত। তিনি হলে আমাদের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যিনি ছিলেন মানবীয় সকল সুন্দর গুণের অধিকারী।

তাঁর অনুসরণ করলে ইহকাল পরকাল দুই জায়গাতেই আমাদের সফলতা অপেক্ষা করে থাকবে। তবে কেনো করবো না তাঁর অনুসরণ? ব্যাকডেটেড মনে করলে ব্যাকডেটেডই। এমনই থাকতে চাই।”

আনিশা চোখ বড় বড় করে নিঝুমের কথাগুলো শুনলো। নিঝুম কথা শেষ করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
আনিশার প্রতিক্রিয়া সহ্য করার মানসিকতা এখন তার নেই। তার থেকে এই সময় এটাই ভালো হয় যে, নিঝুম আনিশার সামনে না থাকুক। মুডটা খারাপ হয়ে গেছে। ফাতেমা আপুর সাথে কথা বলা যেতে পারে, ভাবলো নিঝুম।

যেমনটা ভাবা তেমনটাই কাজ। ফাতেমা কল দিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গেই। ফাতেমাও যেন ফোনটা হাতে নিয়েই বসেছিল। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না নিঝুমকে।

ফাতেমা কল রিসিভ করার সাথে সাথেই আপু কেমন আছেন? ছোট্ট বাবুটা কেমন আছে, বাবু কি নড়াচড়া করে নাকি আরও কত সব প্রশ্নের ঝাপি খুলে বসলো নিঝুম! বাবুকে নিয়েই যত আগ্রহ তার। ফাতেমাকে সময়টাও দিল না সালামের উত্তর দেওয়ার।

বাবুর প্রতি নিঝুমের এত আগ্রহ দেখে ফাতেমা বলেই ফেললো,
~ “এত বাবুর শখ কেনো নিঝুম? বিয়ের পর শশুর বাড়ীতে কি সারা ঘরে বাচ্চা শুধু কিলবিল কিলবিল করবে?”
ফাতেমার কথায় নিঝুম বেশ লজ্জা পেল। লজ্জায় আর কথাই বলতে পারলো না। ফোনটাই রেখে দিল।

সময় বহমান তার নিজস্ব গতিতে। কারো ভালো হওয়া, না হওয়া, কারোর দ্বীনে ফেরা, না ফেরা, কারো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করা, না করার অপেক্ষা সময় করে না। একটা একটা করে দিন পেরোতে থাকলো। বাবুর অপেক্ষায় দিন গুণতে থাকলো তার পরিবারের সদস্যরা।

সবাই ভালো আছে। শুধু ভালো নেই আনিশা। আজকাল রায়হানের সাথে কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যায় তার। প্রেমের সম্পর্ক নাকি দারুণ হয়, কথাটা তো অতি আধুনিক মানুষদের বাণী। তবে তাদের পরিণতি এমন কেনো!
ভালো খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে সাতটা মাস পেরিয়ে গেছে। নিঝুমের টেষ্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে গতকালই।
পুরোদমে ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে নিঝুম। আদনানের সাথে রাস্তায় একবার দেখা হয়েছিল। আদনান অবশ্য নিঝুমকে চিনতে পারে নি।

খানিকক্ষনের জন্য অতীতের না পাওয়ার কষ্ট ফিরে এসেছিল যদিও। কিন্তু যে অন্তর একবার আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, দুনিয়া তার কাছে মিছে হয়ে যায়৷ দুনিয়ার সকল পাওয়া না পাওয়া তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। দুনিয়ার মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার থাকে না।

জাহিদের অতিরিক্ত যত্নের অত্যাচারে মাঝে মাঝে বিরক্তই হয় ফাতেমা। এভাবে শোয়া যাবে না বাবু ব্যথা পাবে, এটা করো না বাবুর কষ্ট হবে, এটা খেতেই হবে, আমার বাবুর ক্ষুধা লেগেছে আরও কত রকমের কথা’ই যে সারাদিন বলতে থাকে জাহিদ।

কী মুশকিল ! এক কদম পা বাড়াতেই ভয় পায় ফাতেমা। ফাতেমার মা সালেহা খানম অনেকগুলো কাঁথা সেলাই করে রেখেছেন ফাতেমার সন্তানের জন্য। পরিবারের সবার মাঝে আনন্দ বিরাজ করছে। সবাই যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এক নতুন প্রাণকে অভিবাদন জানানোর জন্যে।

ছোট্ট বাবুর কম্বল, কাপড়, মশারি, দোলনা আরও কত কিছু যে জাহিদ খুঁজে খুঁজে পছন্দ করে কিনতে থাকে। আদহামও কম যায় না। কিছু কিছু খেলনা সেও কিনে রেখেছে বোনের সন্তানের জন্য। তৃতীয় একজনের আগমন হতে যাচ্ছে ফাতেমা আর জাহিদের জীবনে, এ আনন্দের তো কোন অবকাশই নেই! স্বপ্নের মত সুন্দর দিনগুলো কাটতে থাকে সবার!

আজ শুক্রবার। জাহিদ তাই বাড়িতেই আছে। নিজেই রান্না করছে। সকাল থেকে প্রচন্ড পেটে ব্যাথা করছে ফাতেমার। থেকে থেকে মোচড় দিতে থাকে। মনে হয় দম বন্ধ হয়ে এখনি মারা যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা করে সে! ভাবে এমনিই ঠিক হবে। তাই জাহিদকেও বলে না।

কিন্তু অবস্থার ক্রমশ অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় ফাতেমাকে। খবর দেওয়া হয় ফাতেমার পরিবারকে। ছুটে চলে আসে আদহাম, সালেহা খানম। দীর্ঘ সময় অপারেশন টেবিলে ফাতেমাকে রাখা হয়।

ছোট্ট শান্ত একটা মেয়ে বাবুকে কোলে নিয়ে বসে আছে ফাতেমা। থেকে থেকে শব্দ করে চুমু দিচ্ছে বাবুর গালে। দূর থেকে দৃশ্যটা মুগ্ধ হয়ে দেখছে জাহিদ, আদহাম আর সালেহা খানম। মায়ের কোলে সন্তান এমন এক দৃশ্য নিঃসন্দেহে নজরকাঁড়া।

তবে এমন নজরকাঁড়া দৃশ্য তাদের কারোরই দেখতে ইচ্ছে করছে না। তাদের কারোরই ফাতেমার কাছে যেতেও ইচ্ছে করছে না। বলা ভালো সাহস হচ্ছে না তাদের। হয়তো তারা কেউই নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না ফাতেমার কাছে গেলে।

তাদের সকলের চোখ পানিতে ভরপুর। যেন চোখের পাতা নড়ালেই টুপ করে ঝরে পড়বে৷ যেমনটা হয় বৃষ্টির থামার পর কিংবা গাছের প্রস্বেদনের কারণে। সবাইকে দেখতে পেয়ে ফাতেমা ডাকে তাদেরকে, কাছে যেতে বলে।
সকলে কাছে যেতেই সালেহা খানমকে ফাতেমা বললো,
~ “আমার বাবুটা জান্নাতে চলে গেছে, তাই না মা?”

গলাটা ভার হয়ে আসে ফাতেমার। সাথে সালেহা খানমেরও। কোনো জবাব দিতে পারেন না মেয়েকে। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন ফাতেমার মলিন মুখের দিকে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন কসময়। জাহিদের চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে। সে চোখের পানি আড়াল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে আস্তে করে কোলে তুলে নেয় তাকে। নরম, তুলতুলে শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে বাবার কোলে।
ফাতেমা অসুস্থ থাকলেও তাকে হাসপাতালে জোর করেও রাখা যায় নি। বাড়ি ফিরে এসেছে। বিছানায় একা শুয়ে শুয়ে ভাবে,
~ “গতকালও হাত পা নেড়ে তার শরীরের ভেতর নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছিল যে, আজ সে নেই!”

ওদিকে বগুড়ায় হোস্টেলে একা একা কাঁদছে নিঝুম। বাবুটাকে ঘিরে তার স্বপ্নও বাবুর বাবা মা অপেক্ষা কম ছিল না। প্রথম আর শেষ বারের মতো বাবুকে দেখতে যেতে চেয়েও যেতে পারলো না। ফাতেমা নিজেই নিষেধ করেছে একা একা এতোটা পথ যেতে।

শিশুসন্তানকে কবরে শুইয়ে ফাতেমার কাছে গেল জাহিদ। জাহিদের বাবা বয়স্ক মানুষ। তিনি মৃত নাতনিকে দেখে কষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার যত্ন নিচ্ছে জাহিদের ছোট বোনটা। জাহিদেরও কষ্ট হচ্ছে ভীষণ, চিৎকার করে কাঁদতেও ইচ্ছা করছে, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছে সে।

জাহিদ ঘরে এসে দেখে ফাতেমা বাবুর জন্য আনা জিনিসপত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে আর নীরবে চোখের পানি ফেলছে। জাহিদ তার পাশে এসে বসে। আর বলতে থাকে,
~ “ফাতেমা আমাদের মেয়ে তো জান্নাতী হয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ।”

ফাতেমা কোনো জবাব দেয় না। একটু থেমে জাহিদ আবারো বলতে শুরু করলো,
~ “জানো, একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এক সাহাবী, শিশু পুত্রের মৃত্যুতে খুব মুষড়ে পড়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তুমি কি তার দ্বারা পার্থিব সুখ পাওয়া পছন্দ করো, না কাল কেয়ামতে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে তুমি প্রবেশ করতে চাও সে দরজায় তাকে দেখা পছন্দ করবে?”

ফাতেমা মন দিয়ে শোনে জাহিদের কথা। জাহিদ আরও বলতে থাকে,
~ “যাদের সন্তান এভাবে মারা যায়, তাদের সেই সন্তান নাকি তার বাবা মাকে জান্নাতে নিয়ে যায়। সেই বাবা মা জাহান্নামী হলেও। সেই বাচ্চাটি নাকি বাবা মাকে ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে চায় না। কাপড় ধরেই টেনে নিয়ে যায়।
এমনি হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। চিন্তা করো কত ভালো জায়গায় আমাদের মেয়েটা আছে!”
~ “আলহামদুলিল্লাহ”

অস্ফুটস্বরে বললো ফাতেমা। দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হল না। রুমের মধ্যে পিন পতন নীরবতা বিরাজ করছে। মাঝে মাঝে কারো দীর্ঘশ্বাস ফেলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।


পর্ব ২৬

অফিস থেকে ফিরে মা’কে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করতে দেখে মেজাজ চড়ে গেল রায়হানের। গলায় টাইটা লুজ করতে করতে নিজের ঘরে গেল। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মনোযোগ দিয়ে ফোনে কী যেন দেখছে আনিশা।
আনিশার দিকে খানিকটা ঝুঁকে রায়হান দেখার চেষ্টা করলো সে কী দেখছে এত মনোযোগ সহকারে। এতোটা মনোযোগ দিয়েছে যে রায়হানের উপস্থিতিও সে টের পায় নি।

~ “মেইকআপ টিউটোরিয়াল! বাহ্ শুয়ে শুয়ে আরাম করে মেইকআপ টিউটোরিয়াল দেখা হচ্ছে!” মনে মনে কথাটা বলে আনিশার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেয় রায়হান। মুহুর্তেই ফোনটা আছড়ে পড়ে রায়হানের বিপরীত পাশের দেয়ালে। তারপর তার জায়গা হয় ঝা চকচকে ফ্লোরে।

আঁতকে ওঠে আনিশা। নিজের প্রিয় ফোনের সেটটার এমন করুণ পরিনতি মোটেই মানা যায় না। এমনকি সেটা উচিতও নয়। আনিশা রায়হানের ওপর চেঁচিয়ে ওঠে।

~ “কী করলে এটা?”

~ “তুমি এখানে শুয়ে শুয়ে মেইকআপ টিউটোরিয়াল দেখছো, আর আমার মা ওখানে অসুস্থতা নিয়েও রান্না করে যাচ্ছে। তুমি জানো একটানা তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তবুও তোমার মায়া লাগে না? এটা তো তোমার নিজের সংসার। নিজের সংসারের কাজও কি তুমি করতে পারো না?”
রায়হানের শান্ত স্বরে ভড়কে গেল আনিশা।

অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিন আনিশার অভিযোগ, ঝগড়াঝাটিতে রায়হান যথেষ্ট বিরক্ত। আনিশা ও রায়হানের সম্পর্কে শিথিলতা চলে এসেছে। দুজন যেন দু’মেরুর বাসিন্দা।

আনিশার চিৎকার চেঁচামেচি শোনার ইচ্ছে নেই রায়হানের। তাই কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল সে। আনিশা একা একা কিছুক্ষণ বকবক করে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। ফোনটার তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। স্ক্রিন প্রোটেক্টরটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কেবল!

রায়হান রাতের খাবার খেয়ে যেই না বিছানায় শরীরটা রেখেছে আনিশা শুরু করে দিয়েছে নিত্যদিনের মতো।
~ “তুমি ছুটি নিয়েছো?”

রায়হান মাথার ওপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। আনিশার কথায় রায়হানের কোনরকম পরিবর্তন হলো না। যেন আনিশার কথা কানেই তুলছে না রায়হান। রায়হান জবাব দিলো,
~ “না৷ নেই নি।”
আনিশার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গিয়েছে, মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে রায়হানের কথা শুনে। আনিশা চেঁচাচ্ছে আর বলছে,
~ “তোমাকে আর কতবার ছুটি নিতে বলবো? আর কতবার ছুটি নিতে বললে তুমি ছুটি নিবে?

বিয়ের পর থেকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওনি আমাকে। মা বাবার কাছেও নিয়ে যাওনি সেভাবে। আর গেলেও দু’একদিনে চলে আসতে হয়েছে। রায়হান, তুমি বদলে গিয়েছো। অনেক বদলে গিয়েছো। আমাকে একটু সময় দাও না। প্রয়োজনবোধ করো না আমাকে সময় দেওয়ার৷ আমার সন্দেহ হয় আসলে অফিস থেকে ছুটি দিচ্ছে না নাকি তুমিই নিচ্ছো না। বিয়ের আগে না কত কথাই বলতে। মুখ দিয়ে যেন মিষ্টি ঝরতো। আর এখন!”

রায়হান বলে উঠলো,
~ “আর এখন? “

আনিশা রেগে গিয়ে বললো,
~ “এখন করলার রস ঝরে, করলার রস। আমি বলেই তোমার সংসারে আছি এখনো। আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে কবেই তোমাকে ছেড়ে চলে যেত। বিয়ে করেছি বলে কি বেডরুম আর কিচেনটাই আমার জগৎ হয়ে গিয়েছে নাকি? বেডরুম আর রান্নাঘরের মধ্যেই বন্দি করে রেখেছো আমাকে।”

রায়হান উঠে বসে শান্তভাবে বললো,
~ “তোমার ইচ্ছে হলে তুমি যেতে পারো। আমি তো তোমাকে আটকে রাখিনি। ধরে বেঁধেও রাখিনি। রেখেছি কি? সামনে থেকে যাও এখন। কানের কাছে প্যান প্যান করো না দয়া করে।”

আনিশা অভিমান করে বললো,
~ “আমি চলে গেলে তুমি খুশি হবে?”

~ “যে চলে যেতে চায়,
তাকে চলে যেতে দিতে হয়।

মানুষ মাত্রই স্বাধীনতাকামী
বন্দিত্ব তার মোটেও পছন্দ নয়।”

রাগে আনিশার চোখে পানি চলে আসলো। বিছানার ওপর থেকে বালিশটা নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে মারলো। তারপর রুম থেকে চলে গেলো। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রায়হান। বিবাহিত জীবনটা বড় বোঝা মনে হচ্ছে তার কাছে।
নিত্যদিনের সাংসারিক অশান্তি তার আর সহ্য হচ্ছে না। মুক্তি চাই এই অশান্তি থেকে। পাশের রুম থেকে আনিশার শশুড় শাশুড়ী ঝগড়ার আওয়াজ পায়। তারাও ছেলে আর ছেলের বউ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

পরদিন রায়হান অফিসে যাওয়ার পরপরই আনিশা শশুড় শাশুড়ীকে বলে, রায়হানকে না জানিয়ে একা একাই বাবার বাড়ি চলে গেলো। অনেকদিন পর মেয়েকে বাড়িতে দেখে আনিশার বাবা মা যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেলেন।

বাবা মা এর খুশি দেখে আনিশা আর তার এ বাড়িতে রাগ করে চলে আসার ব্যাপার টা তাদেরকে জানালো না।

এ দিকে রায়হান বাবা মা এর থেকে আনিশার বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা শুনে প্রথমদিকে রাগ করলেও পরে মনে মনে বেশ স্বস্তিও পেলো। এখন কয়টা দিন যদি আনিশার ঝগড়া হতে তারা বাঁচে!

বিকেলের দিকে আনিশা তার ভাবী ফারিয়ার সাথে গল্প গুজবে মেতে উঠলো। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আনিশা বলে সে রায়হানের সাথে ঝগড়া করে এখানে চলে এসেছে। ঝগড়াঝাটি হয়েছে মূলত রায়হানের আনিশাকে সময় না দেওয়ার কারণে। আনিশার রায়হানের প্রতি অনেক অভিযোগ।

আনিশার সকল কথা শুনে ফারিয়া আনিশাকে বললো,
~ “আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই। তুমি শুনবে?”

আনিশা সম্মতি জানালে ফারিয়া বলতে শুরু করলো,
~ “আমরা মেয়েরা অনেকেই বিয়ের আগে ফ্যান্টাসীর মধ্যে থাকি। সবসময় নাটক, সিরিয়াল, সিনেমা দেখে মনের মানুষটাকে, ভবিষ্যৎ স্বামীকে নাটক, সিরিয়াল, সিনেমার নায়কদের সাথে তুলনা করে ফেলি। মনে করি সেই মানুষটাও সিনেমার নায়কদের মত রোমান্টিক হবে, ডাকার সাথে সাথেই সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে সামনে হাজির হয়ে যাবে, সারাজীবন দেশের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে ঘুরতে নিয়ে যাবে, সারারাত একসাথে বসে আকাশের চাঁদ, তারা দেখে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই জীবনটা নাটক কিংবা সিনেমা নয়।

সিনেমার নায়কদের চেয়ে বাস্তব জীবনের নায়করা অনেক বেশি রোমান্টিক। কিন্তু তার চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল।

পরিবারের মানুষগুলোর সকল চাহিদা, দায় দায়িত্ব সেই মানুষটার ওপরই থাকে। তাদেরও একটা ব্যক্তিগত জীবন থাকে সকল দায়িত্ব কর্তব্য এর বাহিরে। তুমি বললে রায়হান ভাই তোমাকে আর আগের মতো সময় দেয় না, ঘুরতে নিয়ে যায় না, রোমান্টিকতা দেখায় না, সকাল থেকে রাত অব্দি অফিসেই থাকে। তাহলে বুঝো।

সারাদিন কাজের পর ক্লান্তি নামে। ক্লান্ত শরীরে চাঁদ, তারা দেখে সময় কাটানো, রোমান্টিক কথাবার্তা বলার মতো মন মানসিকতা কি থাকবে? তুমি তো পারো ভাইয়ের সাথে ঝগড়াঝাঁটি না করে ভাইয়ার যত্ন নিয়ে, সুন্দর কথা বলে ভাইয়ার ক্লান্তি দূর করে দিতে। ভাইয়াকে মানসিক শান্তি দিতে, সুখ দিতে। জীবনটাকে নাটক সিনেমা ভাবলে তো আর হবে না।

যে মানুষটা তোমার সকল চাহিদা পূরণের জন্য এত খাটাখাটুনি করে, তোমার কি উচিত নয় তার সাথে মনোমালিন্যে না জড়িয়ে তার যত্ন নেওয়া, তাকে একটু বোঝা, তার পাশে থেকে তাকে উৎসাহিত করা, তার ভালো মন্দের খেয়াল রাখা? তুমি কি ঘোরাঘুরির মধ্যেই সুখ খুঁজে পাও? পরিবার, স্বামীর যত্নে, তাদের সাথে ভালো সময় কাটিয়ে সুখ খুঁজে পাও না?”

আনিশা অবাক হয়ে শুনছিলো ফরিয়ার কথা। ইশ! এভাবে তো কখনো ভেবে দেখিনি!

~ “বিয়ে মানেই ঘোরাফেরা, রোমান্টিকতা নয়। বিয়ে শুধুমাত্র একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান এবং হাত ধরে কয়েকটি সেলফি তোলার নামও নয়। এটি হল পারস্পরিক ত্যাগ, আনুগত্য এবং সম্মান এবং দায়িত্ব কর্তব্য এর মাধ্যমে একটি সুন্দর বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। তোমার অনেক দায়িত্ব এখন। দায়িত্বজ্ঞান হারিয়ে শুধু জীবনটাকে উপভোগ করতে চাইলে হবে না। সুখ খুঁজে চলেছো অসুখের ভেতরে!”

ফারিয়া আরও বললো,
~ “প্রতিটি স্ত্রীরই উচিত তার স্বামীকে সম্মান করা চাই সে যেমনই হোক না কেনো। আমাদের রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর পরে আমি যদি কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতাম তবে স্ত্রীদের বলতাম তাদের স্বামীকে সিজদা করার জন্য! কারন আল্লাহ নারীদের উপর পুরুষকে আধিপত্য দিয়েছেন। কিন্তু কোনো মানুষকে সিজদা করা হারাম।

বুঝলে? একজন স্ত্রীর জান্নাতে যাবার শর্তগুলোর মধ্যে তার স্বামীর আনুগত্য করাও একটি শর্ত। তুমি যদি তোমার স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করো, সংসারে শান্তি বজায় না রাখো, শুধু ঝগড়াঝাঁটি করো, তবে তোমার স্বামী তোমার প্রতি বিরক্ত হয়ে বাইরের পরনারীর দিকে মনোযোগী হতে পারে। পরকীয়ার এটাও কিন্তু একটা কারণ।”
আনিশা নিচুস্বরে বললো,
~ “আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি ভাবী।”

~ “রায়হান ভাইকে তোমার বোঝা উচিত আনিশা। ছেলে এবং মেয়েদের সাইকোলজি ভিন্ন হয়। একই বিষয়কে তারা ভিন্নভাবে দেখে। তার ওপর দায়িত্ব আছে তার বাবা মায়ের এবং তোমার। সাথে তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও তাকে এখনি মাথায় রাখতে হবে। তুমি যে বিষয়টাকে সহজভাবে নিচ্ছো, তিনি সেটা সহজভাবে নিতে পারছেন না।

তার ওপর চেঁচিয়ে, ঝগড়া করে সমস্যার সমাধান মিলবে না। সরাসরি কথা বলে দেখতে পারো। নিজেরা নিজেদের ইগো ধরে রেখে সম্পর্কটা ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দিও না। সংসারে নিজের দায়িত্ব বুঝে নাও।”

আনিশা আবেগী স্বরে বললো,
~ “আমি এতদিন কতোই না ভুল ছিলাম ভাবী। ভুলে গিয়েছি ‘বিবাহ’ নামক বন্ধনের সাথে কিছু দায়িত্ব কর্তব্য এর সাথে জড়িয়ে গিয়েছি আমি। বিয়ের আগে ও পরে দুটো সময়ের অনেক পার্থক্য!”


পর্ব ২৭

রাতে নয়টার সময় বাসায় ফিরে আনিশাকে দেখতে পেল রায়হান। আনিশাকে দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলো সে। আনিশা যে আজকেই ফিরবে সেটা রায়হান ভাবতেও পারে নি। রায়হান তো ভেবেছিলো মাসখানেক থেকে তবেই ফিরবে আনিশা।

তবে রায়হান আনিশার উপস্থিতির কারণে তার চমকে যাওয়া প্রকাশ করলো না। রায়হান “ডোন্ট কেয়ার” ভাব নিল। আনিশার সাথে কথাও বললো না। যেন আনিশার থাকা না থাকাতে তার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু এতে করে আনিশার অভিমান আরও একধাপ বেড়ে যায়।

একে তো মানুষটা আজ কোনো খবর নেয় নি। তার ওপর ওকে দেখেও কথা বললো না। জানতেও চাইলো না কেনোই বা আনিশা গিয়েছিলো আবার কেনোই বা ফিরে এল। মুখটা পেঁচার মতো করে রেখেছে রায়হান। অথচ আনিশা বাবা মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও ফিরে এল শুধুই রায়হানের জন্য।

তবে রাগ, অভিমানকে দূরে ঠেলে স্বাভাবিক আচরণ করতে লাগলো আনিশা। রায়হান ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। আনিশা তোয়ালেটা রায়হানের দিকে এগিয়ে দিলো।

রায়হান তোয়ালে দিয়ে হাতমুখ মোছার মধ্যেই আনিশা আদা চা করে নিয়ে এল রায়হানের জন্য। রায়হান হাত থেকে তোয়ালে রাখার হাতের চা এর কাপটা বাড়িয়ে দিলো আনিশা। রায়হান আনিশাকে দেখে অবাক। রায়হান ভাবছে, “কি হলো মেয়েটার। অন্য কোনো পরিকল্পনা নেই তো মনে। এত খাতির যত্ন করছে। কি চায়!”

মনের কথা মনেই রেখে দিলো। চা শেষ করে চায়ের কাপ বিছানার পাশে রাখা ছোট্ট টেবিলটায় রাখার আগেই আনিশা হাতে নিয়ে নিল। রায়হান বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলো। একটু বিশ্রাম নিতে চায় সে। প্রায় মিনিট বিশেক পর আনিশা এসে আবার ডাক দিলো,
~ “রায়হান, রায়হান। ঘুমিয়েছো?”

রায়হান চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে আনিশার দিকে তাকালো। ঘুম ঘুম ভাব আসতে না আসতেই ডেকে দিতে হলো মেয়েটার। রায়হান আনিশাকে বিরক্তির সাথে বললো,
~ “কি হয়েছে?”
আনিশা উত্তর দিলো,
~ “বাবা মা অপেক্ষা করছেন খাবার টেবিলে….!”
বাবা মা এর কথা শুনে রায়হান উঠে ভদ্র ছেলের মত খেতে চলে গেল। আজ আনিশা রায়হানের পছন্দমত খাবার রান্না করেছে। সবাইকে পরিবেশন করে দাঁড়িয়ে থাকলো আনিশা। নিজে আর খাবার খেতে বসলো না। শাশুড়ীর কথাতেও বসলো না।

রায়হান সব কিছু লক্ষ্য করলো বটে, তবে কিছুই বললো না। কেন যেন এসব কিছুই মেকি লাগছে তার। নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য পটাচ্ছে তাদের। রায়হানেরই বা দোষ কী! আনিশার আচরণই তাকে এমনটা ভাবতে বাধ্য করেছে।

সবার খাওয়া শেষ হলে আনিশা অল্প কিছু খেয়ে নেয়। রুমে গিয়ে দেখে ততক্ষণে রায়হান ঘুমিয়ে পড়েছে। আনিশাও গুটি গুটি পায়ে রায়হানের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়তে উঠলে আনিশা রায়হানকেও ডেকে দেয়। কিন্তু রায়হান চেঁচিয়ে ওঠে,
~ “এখন কি তোমার জন্য ঘুমাতেও পারবো না আমি? আর কত মানসিক অত্যাচার করবে তুমি আমার ওপর?”
আনিশার চোখে পানি চলে আসে রায়হানের কথা শুনে। আনিশা ছোট্ট করে জবাব দিল,
~ “নামাজ পড়ার জন্য ডেকেছিলাম।”

রায়হান শুনেও ঘুমিয়ে পড়ে। আনিশা ছলছল নয়নে রায়হানকে একবার দেখে৷ আর ভাবতে থাকে তাদের সম্পর্ক টা আজ কোন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

আনিশা নামাজ পড়ে সংসারের কাজে লেগে পড়ে। আজ থেকে তার নতুন মিশন রায়হানের মনে নতুন করে জায়গা করে নেওয়া। তার প্রতিটা বিষয়ের খেয়াল রাখা। সত্যিকার অর্থেই ঘরণী হয়ে উঠতে হবে তাকে।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল এভাবেই। ফাতেমার হৃদয়ে সন্তান হারানোর ক্ষত শুকোতে শুরু করেছে। সন্তান হারানোর বেদনা কেউ একেবারে ভুলতে না পারলেও বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, সুস্থ সুন্দর জীবনযাপন এর জন্য ভুলে থাকতে হয়।

জগৎ সংসার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কাঁদতে থাকলে হয় না। এজন্যই বুঝি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগেই অবহিত করেন না। আমরা ভবিষ্যতে কী হবে, না হবে তা আগে থেকেই জানতে পারি না।

নিঝুমের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন হলো। সে ফিরে গেছে গ্রামে। মহসিনের মৃত্যুর পর বাবলু কিছুটা শান্ত হয়ে গেছে। বাবার মৃত্যুতে খুব ভয় পেয়েছে বাবলু। এখন সে মা বোনের সব কথাই শোনে।
সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে লাগলো। বাবলু বাহির থেকে দৌড়ে এল চেঁচাতে চেঁচাতে,
~ “বুবু, আম্মা, দেখো কারা আইছে!”
নিঝুম উঠোনে বসে সবজি কাটছিলো। শাহেদা গোয়ালঘরে গরুকে খড় দিতে গেছে। নিঝুম সবজি কাটা বন্ধ করে বাবলুর দিকে তাকালো। জিজ্ঞেস করলো বাবলুকে,
~ “কে আসছে?”
বাবলু উচ্ছ্বসিত হয়ে তার হাতের চিপসের প্যাকেটগুলো দেখালো। তারপর আঙ্গুল তাক করলো দরজার দিকে। তখনই প্রবেশ করলো বোরকা পরিহিতা দুজন নারী। সুমিষ্ট কন্ঠে সালাম পেশ করলো,
~ “আসসালামু আলাইকুম প্রিয় বোন।”

চেহারায় আনন্দের ছাপ পড়ে গেল নিঝুমের। তাদেরকে চিনতে তার ভুল হল না। তারা আর কেউ নয়, ফাতেমা এবং তার মা সালেহা। চিৎকার করে শাহেদাকে ডাকলো,
~ “আম্মা জলদি আসো। মেহমান আসছে বাড়িতে।”

নিঝুম উঠে ফাতেমা এবং সালেহা খানমকে ভিতরে নিয়ে এসে বসালো। শাহেদা খানম কথা বলতে বলতে এলেন,
~ “ও নিঝু………!”
ফাতেমা এবং সালেহা খানমকে দেখে শাহেদা চমকে গেলেন। এ সময়ে তাদেরকে কোনোভাবেই আশা করেন নি তিনি।
হাত দেখিয়ে আবছা হেসে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

~ “পরিষ্কার হয়ে আসি।”
ফাতেমা হেসে বললো,
~ “জ্বী চাচী! অস্থির হবেন না।”
শাহেদা হাতমুখ ধুয়ে এসে বাবলুকে সাথে নিয়েই বাজারের দিকে ছুটলেন। চা, বিস্কুট, চানাচুর, সেমাই, আটা, মাছ, মাংস আনলেন। ফিরে এসে দেখলেন নিঝুমের ঘরে বসে তিনজনে দারুণ আড্ডা দিচ্ছে।
কিছুটা সময় নিয়ে যত্ন করে নাস্তা তৈরি করেই তিনি ঘরে নিয়ে গেলেন। সালেহা খানম ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন,
~ “আরে আপা কী দরকার ছিল এসবের! আমরা কি পর? এতকিছুর আয়োজন কেনো করেছেন। দরকার ছিল না এসবের!”
~ “কোথায় এত কিছু বুবু। এ তো অল্পই।”

~ “আমরা কিন্তু আপনার সাথে অতি দরকারী একটা কথা বলতে এসেছি।”
~ “দরকারী কথা…!”
~ “হ্যাঁ বসুন এখানে। জরুরি কথাটা সেরে নেই এখনি।”

~ “আগে খেয়ে নেন বুবু৷ তারপর কথা হবে ক্ষণ। মা তুমি নাও।”
ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন শাহেদা।

~ “একসাথেই হবে। বসেন আপনি।” সালেহা খানম বললেন৷
শাহেদা নিঝুমকে তাড়া দিয়ে বললেন,

~ “উঠোনে মাছ মাংস রাখা। ওখানে যা। বলা যায় না কুকুর বিড়াল মুখ দিতে পারে। বাবলুকে বসিয়ে রেখে এসেছি। ওর তো ঠিক নাই। খেয়ালই করবে না হয়তো!”

নিঝুম চলে গেল। সালেহা খানম চানাচুর খেতে খেতে বললেন,
~ “আপনার মেয়েটাকে আমি নিয়ে যেতে চাই আপা।”

~ “নিয়ে যাবেন মানে! এখন এসময় কোনো অনুষ্ঠান আছে?”
ফাতেমা মুচকি মুচকি হাসছিল। মা’কে তাগাদা দিয়ে বললো,
~ “ওহ হো! মা, সোজাসাপটা বলে দাও না! এত পেঁচাচ্ছো কেনো?”
সাহেদা সেখানে উপস্থিত থেকেও যেন কিছুই বুঝছিলেন না।

ফাতেমা শাহেদার মুখাবয়ব দেখে তাকে আর চিন্তায় না ফেলে, মায়ের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বলে ফেললো,
~ “চাচী, মানেটা হল যে, আপনার মেয়েকে আমার ভাইয়ের বউ করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। আপনি কি এবার বুঝতে পেরেছেন?”

শাহেদার মনে হল তিনি যেন স্বপ্ন দেখছেন। এমন কিছু যে হতে পারে এটা তার ধারণার বাহিরে। এটা এমন হল যে, না চাইতেই ভালো কিছু তার হাতের নাগালে চলে এল। শাহেদার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকেন সবসময়। বিয়ে ভাঙ্গার মত ঘটনা ঘটলে গ্রাম বাংলায়, তা মেয়ের কলঙ্ক হিসেবেই দেখা হয়!

সমস্যা কার, কোন পক্ষের তা বড় কথা নয়। কথা হল মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। ‘বিয়ে ভেঙ্গে গেছে’ এটুকু শুনেই পাত্রপক্ষ বিয়ের কথা আর এগোতেও চায় না। ঘটনা কী? কেনো এমন হয়েছে সেটাও জানার চেষ্টা করে না। উল্টো মেয়ের চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দেয়!

এজন্যই নিঝুমের বিয়ে নিয়ে শাহেদার চিন্তা অমূলক নয়। মেয়ের মা হিসেবে তার চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। ভালো কোনো ঘর হতে বিয়ের সম্বন্ধ আসবে না, এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। নিঃসন্দেহে আদহাম ভালো ছেলে এবং তার পরিবারও। এতদিনে এটুকু তিনি বুঝতে পেরেছেন। তার মেয়ে সেখানে খারাপ থাকবে না। এটা তার বিশ্বাস।
শাহেদাকে নীরব দেখে সালেহা খানম জিজ্ঞেস করলেন,
~ “কী হয়েছে বুবু? আপনি চুপ কেনো? আদহামকে কি আপনার পছন্দ নয়? মেয়ে~জামাই হিসেবে আদহামকে কি আপনার ভালো লাগে না?”

~ “না না, আপা। কি বলেন আপনি! আপনার ছেলে ভদ্র, ধার্মিক, শান্ত, কর্মঠ। এমন ছেলেকে কি প্রত্যাখান করা যায়? আমি তো ভেবেছিলাম নিঝুমরে বিয়েই দিতে পারবো না! একবার বিয়ে ভাঙলো তারপর কেই বা ওকে বিয়ে করবে! কোন পরিবারই বা ওকে বউ করে নিয়ে যাবে! আপনাদের অনেক বড় মন বলেই….!”

আলগোছে চোখ মুছলেন শাহেদা।

~ “কি যে বলেন আপা! বিয়েটা তাকদ্বীরেই লেখা আছে। ফাতেমার ওয়ালিমার সময়েই আমরা ভেবেছিলাম নিঝুম আর আদহামের বিয়ের ব্যাপারে। আদহামকেও জানিয়েছিলাম। আমরা তিনজনেই ইস্তেখারা সালাত আদায় করার পর পজিটিভ রেজাল্ট পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। আর তাই প্রস্তাব নিয়ে আসলাম আমরা।”

~ “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহু আকবার।”

অশ্রুসজল নয়নে শাহেদা উচ্চারণ করলেন।

ফাতেমা উঠে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো শাহেদাকে। তারপর বললো,
~ “চাচী, আজ তবে আমরা আসি।”

~ “চলে যাবে মানে!”
~ “আগামীকালই ছোট্ট পরিসরে বিয়েটা সেরে নিতে চাইছি আমরা। তাই এখন আর না বসি। আগামীকাল এসে একবারে ছেলের বউ নিয়ে যাব বেয়াইন।”

হেসে বললেন সালেহা খানম।
~ “কালকেই?” বিস্ময় প্রকাশ করলেন শাহেদা।

আবারো বললেন,
~ “কালকে হল কিভাবে হয়? এদিকের ব্যবস্থা…ইয়ে মানে…লোকজনের খাবারের ব্যবস্থা, বাড়িঘর সাজানো….! মানে নিঝুমের মামাকে ডাকলেও তিনি আসতে পারবেন কি না! আগে থেকে না বলে রাখলে! আমি একা হাতে কিভবে কী করি…!”

~ “চাচী, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা শুধুমাত্র পাঁচ~ছয় জন আসবো। খাবার দাবার, বাড়ি সাজানো এসব কিছুই করতে হবে না। মসজিদে বিয়ে হবে। তারপর খেজুর নইলে খুরমা দেওয়া হবে। এটুকুই যথেষ্ট!”
~ “তা কী করে হয় মা! নিঝুমের আব্বা বেঁচে থাকলে তিনি কখনোই মেয়ের বিয়ে এভাবে হতে দিতেন না!” ইতস্তত করে বললেন শাহেদা।

~ “আপা, আপনি চিন্তা করবেন না। যে বিয়েতে কম খরচ হয়, সে বিয়েতে বরকত বেশি। তছাড়া ওয়ালিমা করবো তো আমরা। মেয়ের পোশাক আমরাই সাথে আনবো। আদহামকে সাজিয়েই আনবো।”
সালেহা খানম বললেন।

~ “আপনি আর দ্বিমত করবেন না চাচী! ওদের নতুন জীবনের শুরুটা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমেই শুরু করা উচিত চাচী। শুরুটা যদি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে হয়, তাহলে ওদের পরবর্তী সময়গুলো কিভাবে কাটবে! আর আপনিও হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না।”

ফাতেমা এবং সালেহা খানমের আন্তরিকতায় অদ্ভুত আনন্দে ছেয়ে গেল শাহেদার মন। চোখে একরাশ কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটিয়ে তাকিয়ে থাকলো সে।


পর্ব ২৮

ফাতেমা, সালেহা খানম চলে গেলেন। নিঝুম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে দেখলো সবটা। তাদেরকে জোর করেও আটকানো গেল না। কি একটা জরুরি কাজ আছে বললেন।

তারা চলে যাওয়ার পর শাহেদাও থম মেরে বসে রইলেন কিছু সময়। নিজেকে ধাতস্থ করতে সময় নিলেন। এখনো নিজেকে ঘোরের মধ্যে মনে হচ্ছে। এত সুন্দর ঘটনা ঘটলো! সত্যিই!

কখনো কখনো এমন হয় যে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে কোনো কাজ করতে গেলে তা ব্যর্থ হয়। আবার হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তে কাজ করতে গেলেও সফলতা আসে। সবই আল্লাহর ইচ্ছে!

মনের মধ্যে ভাবনার ঝড় বইছে। নিঝুম ডাকছে তার আম্মাকে, তবে শাহেদা সাড়া দিচ্ছেন না। চিন্তার সাম্রাজ্যে বিভোর তিনি। নিঝুম হালকা ধাক্কা দিল শাহেদাকে।

ব্যকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

~ “আম্মা, বলো না কেন! ওনারা এমন হুট করে এসে হুট করে চলে গেলেন কেনো? আর তোমাকেই বা কী বললেন? কী কথা ছিল তোমার সাথে?”

~ “সে অনেক কথা। পরে বলবো।”

শাহেদা চলে গেলেন। দুপুরের খাবার রান্না করা এখনো বাকি! কত কাজ তার এখন! নিঝুম চলে গেল কলপাড়ে। বাবলুকে গোসল করিয়ে জামা প্যান্ট পড়িয়ে কলপাড় থেকে বের করে দিল নিঝুম। কিন্তু বাবলু আবারও ছুট লাগালো বাহিরে খেলতে।

নিঝুম বকে যাচ্ছে,
~ “এই গায়ে ময়লা লাগাবি না। নইলে মারতে মারতেই সোজা করে ফেলবো।”
দুপুরে খাবার খেতে খেতে শাহেদা কথা তুললেন।

~ “নিঝুম, কয়টা কথা বলি শোন।”
নিঝুম শুধু একবার মায়ের মুখের দিকে তাকালো। জবাবে কিছু বললো না। শাহেদা নিজের মত বলতে শুরু করলো,
~ “তোর আব্বা বেঁচে নেই। আমিও আজ আছি, কাল হয়তো থাকবো না। মানুষের কখন মৃত্যুচিঠি এসে যায় তা আগে থেকে উপলব্ধি করতে পারে না। তোকে আর বাবলুকে নিয়েই আমার যত চিন্তা। আমি মরে গেলে কী হবে তোদের! চারিদিকে চিল শকুনেরা হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে। বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমি না থাকলে তোদের ছিঁড়ে খেতে তাদের সময় লাগবে না।”

কণ্ঠরোধ হয়ে আসে শাহেদার। নিঝুম তখনো চুপ। এক টুকরো সান্ত্বনার বানী তাকে আরও ভেঙ্গে দিতে পারে ভেবে চুপ করেই শুনতে থাকলো।

~ “বাবলু ছোটো। তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস। তোর একটা ব্যবস্থা করে যেতে পারলে মনটা একটু হলেও শান্ত হত! শান্তিতে মরতেও পারতাম! তাই আমি তোর বিয়ে দিতে চাই।”

~ “আম্মা…!”
অবাকের চূড়ান্তে নিঝুম।
নিঝুমের দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করেই শাহেদা বললেন,

~ “কাল তোর বিয়ে।”
~ “কী? কালই…! আম্মা এটা কী ঠিক হলো? কার সাথে বিয়ে? আর এখনই বিয়ের কথা কেনো? আমি পড়তাম, তারপর চাকরি নিতাম। তোমার আর বাবলুর দায়িত্বও নিতাম।”

নিঝুম যদিও এই প্রশ্নগুলো মায়ের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করলো। তবে নিঝুমের মন আল্লাহর ওপর ভরসা করতে জানে! ভবিষ্যৎ পথ এটাই যদি হয়ে থাকে, তবে নিঝুম সে পথেই হাঁটবে।

~ “এত কিছু বলতে পারছি না। তারা ভালো মানুষ। বিয়ের পর পড়াশোনা করাতে পারে। আল্লাহ মিলাইছে। আমাদের নিয়ে তোর এত ভাবতে হবে না।”

শাহেদা সংক্ষেপে বিয়ে সম্পর্কে বললেন। তাদের দুই পরিবারই স্বল্প আয়োজনে বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়। যদিও শাহেদা বেগম অনুষ্ঠান করেই মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তবুও তারা রাজি হয় নি। তারা চেয়েছেন সুন্নাহ মেনে বিয়ে টা হোক।

বরকে মসজিদে নেওয়া হবে আর মেয়ে বাড়িতে থাকবে। এভাবেই বিয়েটা হবে। এরপর ওয়ালিমা বরের বাড়িতেই করতে চায়। কোনো কমিউনিটি সেন্টারে নয়। শাহেদাও আর জোর করেন নি। তিনি জোর করবেনই বা কিসের ভরসায়। তাদেরই তো কষ্ট করে দিন চলে যায়। তবুও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে ভোলেন না।

নিঝুম মনে মনে খুশি হল জেনে যে বিয়েটা সুন্নাহ মেনে হবে। আল্লাহর দয়া এবং রহমতের প্রমাণ জীবনের বাঁকে বাঁকে মেলে। তবুও অনেকে অন্ধের মতো দিন কাটায়। কিন্তু নিঝুম তো বুঝতে পারছে। আল্লাহর রহমত তার চোখে অশ্রু এনে দিয়েছে। জীবনটা স্বপ্নের মত লাগছে!

শাহেদা একবারও বললেন না কার সাথে তার বিয়ে।

এ গ্রামের কেউ নাকি অন্য গ্রামের! নিঝুমের জিজ্ঞেস করতেও কেমন লজ্জা লাগছে। তবে একটা ঘটনা মেলাতে পারছে না। ফাতেমা আপুরা আসার পরই আম্মা হুট করে প্রস্তাব পেয়ে গেলেন? বিশ্বস্ত মানুষ না হলে, কারো প্রস্তাব খতিয়ে না দেখেই রাজি হবার মতো মানুষ তো শাহেদা নন। তাহলে কী প্রস্তাব নিয়ে এসেছে ফাতেমা আপুরাই?
মনের মধ্যে জাগরিত প্রশ্নটা মায়ের সামনে উপস্থাপন করে নিঝুম।

~ “বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ফাতেমা আপু আর আন্টি এসেছিলেন তবে?”
~ “হুম”

শাহেদার এমন উত্তর শুনে নিঝুম হতাশ হল। তবে ভালোও লাগছে এটা জেনে যে ফাতেমা আপু জড়িয়ে আছে বিয়েটায়।

দিনের বাকিটা অস্থিরতার মধ্যেই কাটলো নিঝুমের। কখনো কান্না আসে, কখনো লজ্জা লাগে, কখনো হাসি পায়। কী মুশকিল! প্রত্যেকের বিয়ের আগেই কী এমন হয়? আম্মা, বাবলুকে ছেড়ে যেতে হবে ভাবলেই হাপুস নয়নে কাঁদতে ইচ্ছে করে। অচেনা কিছু মানুষ তার আপনজন, পরিবার হবে। নিজেকে অচেনা মানুষের ভীড়ে ভাবতে গেলে ভয় করে।

আর তার অর্ধাঙ্গ! তার কথা ভাবতে গেলে লজ্জাবতীর লতার ন্যায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে মন চায়। রাতটাও না ঘুমিয়েই কাটলো নিঝুমের।

শাহেদা তার ভাইকে জানিয়েছিলেন বটে। তবে বিয়েটা আত্মীয় স্বজন, দলবল সমেত হবে না। তার শশুড় শাশুড়ী, শ্যালক, শ্যালিকাকে ডাকা হবে না বলে ব্যস্ততা দেখিয়ে কেটে পড়েছে। এই সিদ্ধান্ত যে নিঝুমের মামীর, সেটা শাহেদা ভালোই বুঝতে পেরেছেন। কারণটা এমনটা পূর্বে তার বাবা মা বেঁচে থাকাকালীন পারিবারিক অনুষ্ঠানাদিতে ঘটতো!

তবে আল্লাহ যার পাশে থাকেন, তার আর কাকে প্রয়োজন হয়! শাহেদা নিজেই বাজার করে আনলেন গ্রামের অদূরে উপশহর থেকে। পাশের বাড়ির দুজন মহিলা তাকে রান্নাবান্নার কাজে সাহায্য করলেন। নিঝুম আনমনা হয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে সময়।

আজ তার বিয়ে! নিঝুমের আজ খুব বেশি মনে পড়ছে তার আব্বাকে। ভোরবেলায় আব্বার কবরের নিকটে গিয়েছিল সে। এমন একটা দিনে তার আব্বা নেই ভাবতেই ভিতরটা হুহু করে কেঁদে উঠছে।
ওদিকে সকাল পেরোতেই ফাতেমা, আদহাম, জাহিদ, সালেহা খানম, আদহামের মামা~মামি রওনা দিয়েছেন নিঝুমদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

ফাতেমারা পৌঁছালে তাদের আপ্যায়ন করেন শাহেদা। ফাতেমা, সালেহা খানম, আর ফাতেমার মামি নিঝুমের কাছেই বসে ছিল পুরো সময়টা। শাড়ি পড়া, সাজগোজ করা কিছুই হল না নিঝুমের। ফাতেমা তার হাতে বটল গ্রীন রঙের জিলবাব, স্কার্ট ধরিয়ে দিয়েছে। বলেছে বাড়ি গিয়ে সাজগোজ হবে! তখনো নিঝুম জানতো না স্বয়ং আদহাম বর সেজে এসেছে তাকে বিয়ে করতে।

অবশেষে আসরের নামাজের পর মসজিদে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয় নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা মোহরানা ধার্য করে। যেহেতু শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে পড়ানো হয়েছে তাই মোহরানাও কম ঠিক করা হয়েছে। এ নিয়ে কারো কোনো আপত্তিও ছিল না। বিদায়বেলা কম বেশি সকলের চোখেই পানি ছিল। সবচেয়ে বেশি কেঁদেছে বাবলু।

নিঝুম কেঁদেছে ভয়ে। যখনই বরবেশে আদহামকে কে দেখেছে ভয়ে কাঠ হয়ে আছে নিঝুম। অজানা কারণে মানুষটাকে নিঝুমের ভয় লাগে। খুব ভয়! হয়তো আদহামের গম্ভীর হয়ে থাকাটাও এই ভয়ের একটা কারণ!

রাত প্রায় নয়টায় রংপুরে আদহামদের বাড়িতে পৌঁছে সকলে। ফাতেমা নিঝুমকে নিয়ে যায় ভেতরে। নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে তাকে ফ্রেশ করিয়ে আগে কিছু খেতে দেয়। কৃতজ্ঞতায় দুআ চলে আসে ফাতেমার জন্য। নিঝুম হ্যাঁ, না বলতে বলতে খেয়ে নেয়। চিন্তায়, ভয়ে, অস্থিরতায় সামনে খাবার পেয়েও খেতে পারে নি সারাদিন।

ইশার সালাত আদায় করে নেয়। তারপর নিঝুমের জন্য কিনে আনা লাল বেনারসী, সোনার গয়না দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হলো তাকে। একেবারে নতুন বউয়ের সাজ দিয়েই ক্ষান্ত হলো ফাতেমা। বড় আয়নার সামনে তাকে বসিয়ে রেখে আয়নাতে নিঝুমকে দেখে বললো,
~ “মাশাআল্লাহ। আমার ভাইয়ের নজর সরবে না আজ।”

লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো নিঝুম।

এদিকে পাড়া প্রতিবেশীরা বসার রুমে ভীড় করেছে নতুন বউকে দেখার জন্য। ফাতেমা নিঝুমকে রুমেই বসিয়ে রেখে এসেছে। সালেহা খানম মহিলাদের বউ দেখতে ঘরেই পাঠিয়ে দিলেন। সবাই বউ দেখলেন এবং একে একে বউ সম্পর্কে মন্তব্য করে গেলেন।

কারো কাছে মেয়ের বয়স বেশি মনে হয়েছে তো কারো কাছে কম। আবার কারো কাছে মেয়ের নাক বোচা, তো কারো কাছে মেয়ে শ্যামলা কিংবা কালো। মহিলাদের গুজুরগুজুর ফুসুরফাসুর নিঝুম লক্ষ্য করলেও তেমন একটা পাত্তা দিল না।

কারণ আসার আগেই আম্মা বলে দিয়েছে বিয়েবাড়িতে অনেকে অনেক কথা বলে। বিয়েতে আট ~ দশ কথা হয়েই থাকে। সেগুলোকে অত গায়ে মাখলে চলবে না। নিজেরই কষ্ট হবে!

অবশেষে সকল বাধা পেরিয়ে নিঝুমকে রাত এগারোটার দিকে আদহামের রুমে রেখে আসা হয়। নিঝুম একা একা বসে থাকতে অস্বস্তিবোধ করে। নিজেকে সবচেয়ে অসহায় একটা মেয়ে বলে মনে হচ্ছে তার৷ ভয়, শঙ্কায় গায়ে কাঁপন ধরে গিয়েছে রীতিমতো।

অস্থিরতা কাঁটাতে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের মধ্যে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে সে। এক জায়গায় বসে থাকতে পারছে না।

‘খট’ করে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখলো আদহাম অতি বিস্ময় নিয়ে তাকে দেখছে।
ইশ! লোকটা কী মনে করছে তাকে! এভাবে উঠে হাঁটাহাঁটি না করলেও হত! ভাবলো নিঝুম।

আদহাম ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। নিঝুম যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল৷ নিঝুমের কাছাকাছি গিয়ে আদহাম অস্ফুটস্বরে বললো,
~ “মাশাআল্লাহ।”

নিঝুমের অস্থিরতা তার চেহারাতেও বোধহয় ফুটে উঠেছিল। হয়তো সে কারণেই আদহাম বলে ফেলে,
~ “অস্বস্তি হলেও কিছু করার নেই। আমি আজ দেখবো, অনেকক্ষণ দেখবো আমার সামনে দাঁড়ানো এই মেয়েটাকে। যাকে দেখার অনুমতি, যার সঙ্গে জীবন কাটানোর সার্টিফিকেট আমি পেয়ে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ।”

নিঝুম লজ্জা পেয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে থাকলো। তার শরীর ক্রমাগত কাঁপছে।

~ “চলো শুকরিয়া নামাজ পড়ে নেই।”

আদহামের কথা শুনে তাতে সম্মতি জানিয়ে দুজনে নামাজ পড়ে নিল।

বিছানার ঠিক মাঝখানে বসে আছে নিঝুম। আর তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে আদহাম। কোলে মাথা রেখেই কথা বলতে শুরু করলো সে। কতশত কথা জমিয়ে রেখেছে এতদিন! ভবিষ্যৎ জীবনটা দেখতে লাগলো দুজন দুজনের চোখে।

নিঝুম আদহামের বিয়েতে কোনো গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি, কানের পর্দা কাঁপিয়ে তোলা হারাম গানের মিউজিক বাজেনি, নৃৎ শিল্পের আড়ালে কাউকে নিজের হায়া আর লজ্জা ফেলে দিতে হয়নি।

ওয়েডিং ফটোগ্রাফির নামে স্রেফ আনন্দ উল্লাসের খাতিরে আর শো~অফের অসুস্থ খেলায় ওরা নষ্ট করেনি লাখ লাখ টাকা। ওরা মানুষকে দেখিয়ে নয় বরং আল্লাহ কে সন্তুষ্ট রেখে বিয়ে এবং পরবর্তী জীবন শুরু করতে চেয়েছে।

আদহাম নিঝুম কিংবা তার পরিবারের কেউই কল্পনাও করতে পারে নি যে, তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর মূল্যবান অধ্যায়টা শুরু করবে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে। বিয়ের মতো একটা বিশাল নিয়ামতের শুরুটাই যদি করে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে, সেটা তাদের জন্যে কী পরিমাণ অকল্যাণ বয়ে আনতে পারে! তার ধারণা তাদের কারোরই নেই।

পরদিন তাদের ওয়ালিমার আয়োজন করা হয়। পর্দার খেলাফ না হবার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। ছেলে~মেয়েদের বসার জায়গা ছিল আলাদা। এভাবেই একটা আলোকিত সন্ধ্যা কেটে যায়। যাতে কোনো রকম শো~অফ ছিল না। চাকচিক্যতাও ছিল না। তবুও ছিল অনেক আনন্দের, সম্মানের!


পর্ব ২৯

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই নিঝুম বুঝে গেছে আদহামের গম্ভীর ভাবটা অন্যদের জন্য। তার কোমল হৃদয়ের কোমলতাটুকু শুধুই নিঝুমের জন্য। চার দেয়ালের বাহিরে যে মানুষটা স্ট্রং পার্সোনালিটি ক্যারি করে, চার দেয়ালের ভিতরে সেই মানুষটাই একটা বাচ্চার থেকে কোনো অংশে কম নয়। যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানুষ!

আদহামের সাথে নিঝুমের নতুন দিনগুলো কাটতে লাগলো স্বপ্নের মত! রাগ, অনুরাগ, শাসন, আদর, আহ্লাদ সবকিছুই তাতে উপস্থিত।

অন্যদিকে আনিশা এতোদিনেও রায়হানের মধ্যে একটুও পরিবর্তন আনতে পারে নি। তবে আনিশা হতাশ নয়। আনিশা থেমে যায় নি৷ পূর্ণ উদ্যমে রায়হানকে অনুভব করানোর চেষ্টা করে যে সে আর আগের মতন নেই। স্বামী, সংসারের দায়িত্ব সে নিতে শিখেছে!

তবে যে নিজে থেকে বুঝতে চায় না, তাকে বোঝানো যায় না। যে নিজে থেকে শিখতে চায় না, তাকে শেখানো যায় না। যে শুনেও না শোনার ভান করে, যে জেনেও না জানার ভান করে তার সাথে আসলেই কি পেরে ওঠা সম্ভব?

আনিশার পরিবর্তনে আনিশার শশুড় শাশুড়ী খুশিই হয়েছে। তারাও চায় তাদের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেটা আধুনিকতার নামে শো~অফ এর শিকল থেকে বেরিয়ে এসে একটু সংসারী হোক। আনিশার সাথে সকল মনোমালিন্য মিটে যাক। আনিশার কোল জুড়ে একটা শিশু আসুক।

আজ রায়হান বাড়িতেই আছে। দুপুরেই ছুটি নিয়ে এসেছে অফিস থেকে। এক বেলার ছুটি। কারণ আজ রায়হানের একটা পুরনো বন্ধুর বিয়ে। সেই বিয়েতেই যাবে রায়হান। অবশ্য আনিশাকে সাথে নিয়েই যাবে। আনিশাকে তৈরি হতে বলে কোন একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলো রায়হান।

ফিরে এসে আনিশাকে দেখে বিস্ময়ের উচ্চতর স্থানে পৌঁছে যায়। আনিশা কালো রঙের বোরকা পড়েছে। একদম মুখ টাও দেখা যাচ্ছে না। আনিশাকে দেখে রাগে রায়হান বলতে লাগলো,
~ “এসব কি পড়েছো?”

আনিশা আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে বললো,
~ “কেনো ভালো লাগছে না। আমি তো পর্দা করার চেষ্টা করছি।”

রায়হান বললো এগুলো পাগলামি বন্ধ করে শাড়ি পড়ে সুন্দর করে সাজতে। কিন্তু আনিশা তাতে রাজি নয়। আনিশা যদি যায় তবে এভাবেই যাবে।
রায়হান ক্ষেপে গিয়ে বললো,

~ “কি হয়েছে তোমার? আগে তো এমন বেশভূষা ছিল না তোমার। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছো ভালো কথা কিন্তু এসব বাদ দাও। এভাবে তোমাকে সাথে নিয়ে গেলে লোকে কী বলবে?”

আনিশা কোমলসুরে বললো,
~ “কিন্তু আমি যে পারবো না।”

~ “তাহলে আমার সাথে আর যেতে হবে না। তোমার সাথে নিয়ে গিয়ে আমি হাসির পাত্র হতে পারবো না। দিন দিন তোমার অবাধ্যতা তোমাকে আমার কাছে বিরক্তিকর একটা মানুষে পরিণত করে দিয়েছে। তোমার সাথে থাকাটা আমার কাছে বোঝা মনে হচ্ছে। আমাকে তোমার নিজের মতো করে চালাতে চাওয়ার প্রচেষ্টা করাটাও অতিরিক্ত মনে হচ্ছে। আমার কথা না শুনলে এ বাড়িতে তোমার থাকাও আর হবে না। আমি তোমার স্বামী।

আমার কথা তোমাকে শুনতে হবে। আমার সাথে থাকতে গেলে এসব বেশভূষা পাল্টাতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা। আর যদি তা না পারো তবে আমাকে মুক্তি দাও। তারপর নিজের মতো থাকো।”

রায়হান যদি একবার পিছনে ঘুরে দেখতো। তাহলে আনিশার অশ্রুভেজা নয়ন দুটি দেখতে পেত। রায়হান চলে যাওয়ার পর আনিশাও চলে যায় বাড়ি থেকে। রেখে যায় রায়হানের জন্য একটি চিঠি।
হুট করে না জানিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায়। শশুড় শাশুড়ীও বাড়িতে ছিলেন না৷ তারা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছেন। আনিশার হুট হাট বাড়িতে চলে আসার ব্যাপারে আনিশার বাবা মা যদিও অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তবুও এবারের ব্যাপারটা অন্য বার গুলোর থেকে আলাদা।

এবার বাড়ি এসে কারো সাথে কোনো কথা না বলেই মেয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে নাক টানার আওয়াজ আসছে। আনিশার বাবা মা কয়েকবার ডাকার পর আনিশা তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করে আর একটু একা থাকতে চায় বলে দেয়।

বেশ রাত করেই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আসে রায়হান। বাড়ির দরজা খুলে দেয় গ্রাম থেকে নিয়ে আসা ১২~১৩ বছর বয়সী জেমী। রায়হান জেমীকে ঘুমাতে বলে নিজের ঘরে চলে যায়। ঘরে এসে আনিশাকে দেখতে না পেয়ে বুঝেই নিলো আনিশা চলে গেছে।

আনিশার ঘাড়ত্যাড়ামি থেকে রায়হানের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। রায়হান বুঝতে পারে না বিয়ের আগে এই মেয়ের মধ্যে কী দেখেছিল। আজকাল আনিশাকে কেন যেন সহ্যই করতে পারে না সে।
রায়হান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ভাবলো,
~ “মুক্তি দিয়ে গেলো নাকি?”

ফ্রেশ হয়ে ঘুমোতে গেলে বালিশের ওপর একটা ভাজ করা কাগজ দেখতে পায়। অপ্রয়োজনীয় কাজ ভেবে ছুড়ে ফেলার আগে কী যেন ভেবে খুলে দেখে ওটা একটা চিঠি। আনিশার লেখা চিনতে অসুবিধা হয় না রায়হানের।

বিয়ের আগে প্রেম চলাকালীন সময়ে অনেক চিঠির আদান~প্রদান করতো তারা। যদিও আজকালকার যুগে চিঠির ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে একে অন্যকে হঠাৎ হঠাৎ চমকে দিতে একে অপরের জন্য চিঠি লিখতো আনিশা আর রায়হান।

কিন্তু তখন চিঠি লিখতোও ভালোবেসে, পড়তোও ভালোবেসে, অপেক্ষা ও করতো ভালোবেসেই। তবে আজকের ব্যাপারটা আলাদা। অনাকাঙ্ক্ষিত এই চিঠি। আনিশা ও রায়হান দুজনের জন্যই। একজন তার বুক ভরা কষ্ট নিয়ে চিঠিটা লিখেছে আর অন্যজন অবহেলা, তাচ্ছিল্য নিয়ে পড়ছে।

রায়হান চিঠি টা পড়তে শুরু করে,
রায়হান,
তোমার নামের পূর্বে প্রিয় শব্দটা বসালাম না। মনে হয় শব্দটা ব্যবহার করার জন্য যতটুকু জোর, অধিকারের দরকার ছিল তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার আচরণেই হোক কিংবা তোমার ব্যস্ততা আর অবহেলাতেই হোক না কেনো, আমাদের দুজনের মধ্যে বিস্তর শূণ্যতা তৈরি হয়েছিল। প্রেমময় সম্পর্কটায় তিক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।

আমি চেষ্টাও করেছিলাম আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে। কিন্তু তুমি সাড়া দাওনি কিংবা দিতে চাও নি।

দুনিয়ার যার যত সমস্যা, সব সমস্যার সমাধান সব সময় পাওয়া যায় না। দুনিয়াতে সবাই সুখী হয় না। আমিও না হয় তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। তবুও তো নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবো এই বলে যে, আমি চেষ্টা করেছিলাম!

তুমি আমার স্বামী। তোমার আদেশ পালন করতে আমি বাধ্য, তবে অন্যায় আদেশ পালনে নয়। আমি তোমার সকল আদেশ ভালোবেসে পালন করতাম, কিন্তু তোমার অন্যায় আদেশ পালন করার মতো সাহস আমার নেই।

জানো, দাইয়্যুস হলো সেই পুরুষ, যে তার অধীনস্ত নারীদের (মা, বোন, স্ত্রী) ব্যভিচার, ফাহেশা কাজে বাধা দেয় না। তারা পর্দা করছে না, এটা তার গায়ে লাগে না। তার স্ত্রী পরপুরুষের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে, এতে তার গা জ্বলে না। সে এমন ব্যক্তি, যে তার পৌরুষ হারিয়েছে।

আমি তো আমার স্বামী, আমার বাবা কিংবা ভাইকে দাইয়্যুস হিসেবে দেখতে চাই না। প্রত্যেক বেপর্দা, রূপের প্রদর্শনকারী নারীই অন্য নারীর সংসার ভাঙ্গার পেছনে একটু হলেও দায়ী। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দায়ী, নিজের অজান্তেই দায়ী।

যেদিন থেকে নিজের মূল্য বুঝতে পেরেছি সেদিন থেকেই নিজেকে যত্রতত্র প্রদর্শন করে বেড়ানো বন্ধ করেছি, নিজেকে পরপুরুষের চোখ আর মনের খোরাক হওয়া থেকে দূরে রেখেছি, আমার সকল সৌন্দর্য শুধু তোমার জন্যই সংরক্ষিত রেখেছি। তোমার কি একটুও খারাপ লাগবে না, নিজের স্ত্রী এর সৌন্দর্য অন্য পুরুষ উপভোগ করলে?

বাহির থেকে মানুষ যতোই ভাবুক আমাদের মধ্যে সব ঠিক আছে, তুমি আমি জানি কতোটা ভেঙ্গেছে আমাদের সম্পর্ক। এভাবে ভাঙ্গা একটা সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো বিচ্ছেদের থেকেও অনেক বেশি কষ্টকর। আমিও আর পারছি না। হয় আমাকে আপন করে নাও ঠিক আগের মতন করে, নয়তো ডিভোর্স দিয়ে দাও। ডিভোর্স এর কাগজপত্র পাঠিয়ে দিও। স্বাক্ষর দিয়ে দেব।

ভেবো না আমি খুব কষ্টে থাকবো কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নেব। দুনিয়ার এই সমস্যা, কষ্ট, দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে আখিরাতকে সমৃদ্ধ করতে, আখিরাতে সুখী হওয়ার প্রতি মনোনিবেশ করবো। আমি সেই পথ বেছে নিলাম যে পথে আমি আল্লাহকে পাব।
কী হবে দুনিয়াতে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এর কাছে নিজেকে সুন্দরী হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন সৌন্দর্যকে লুকায়িত রাখতে। কী হবে দুনিয়ার মানুষের সামনে নিজেকে সুখী উপস্থাপন করে, যেখানে আমার মনে সুখানুভূতিই নেই!

শো~অফের এই দুনিয়ার সবকিছুই শো~অফ। কিছুই নেই নিজেদের। আমরা নিজেদের ব্যক্তিত্ব খোয়াতে বসেছি। পড়াশোনা করতে গেলে ভাবি, ভালো রেজাল্ট না করলে মানুষ কী বলবে? সাজগোজের সময় ভাবি, কেমন করে সাজলে মানুষের চোখে আমায় ভালো লাগবে? এই অনুষ্ঠান করবো আমি, কেমন করে করলে লোকে প্রশংসা করবে!

বাসায় কিছু বলিনি কারণ তারাও বলবে ‘ডিভোর্স নিলে লোকে কী বলবে? ডিভোর্সী আখ্যায়িত করবে মানুষ। ভালো চোখে দেখবে না আরও কত কী!’ আমি ক্লান্ত! বিশ্বাস করো, আমি ক্লান্ত। আমি বাঁচতে চাই নিজের মত করে। ‘লোকে কী বলবে?’ নামক প্রশ্নের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।

জানো রায়হান, আমি আগে কখনও এসব নিয়ে এত ভাবতাম না। আমার পিচ্চি রুমমেটটা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। ওর ওসিলায় আল্লাহ আমাকে ভুল পথ থেকে ঠিক পথে আহ্বান করেছেন। আমি কী করে প্রত্যাখান করি সেই নীরব আহ্বান। বলতো পারো?

তাই একবার যে ইবাদতের স্বাদ পেয়েছি তা থেকে নিজেকে কখনোই বিরত রাখবো না ইনশাআল্লাহ।

ইতি,
তোমার তিক্ত বর্তমান


পর্ব ৩০

বিকেলবেলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফাতেমা। পাশের বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলার ওপর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। মহিলাটির কোলে বছরখানেক বয়সের একটি মেয়ে শিশু। শিশুটি মহিলাটির চুল ধরে টানছে, মুখে হাত দিচ্ছে।

মহিলাটি বিরক্ত হওয়ার বদলে মিষ্টি হেসে বাচ্চাটির হাত হতে চুল সরিয়ে নিচ্ছে। বাচ্চাটা পুনরায় নতুন উদ্যমে চুল টেনে ধরছে। মহিলাটা বাচ্চাটিকে নিচে নামিয়ে দিলেন। নিচে নামার সাথে সাথেই মেয়ে বাচ্চাটা এলোমেলো পায়ে ছুটতে শুরু করে দিল।

পা বাড়ানোর সাথে সাথেই তার জুতোর ভিতরে শব্দ করে উঠছে আর আলো জ্বলছে। শব্দ শুনে হেসে উঠছে মেয়েটি। মহিলাটিও তার পাশে পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে।

এ দৃশ্য দেখে হাহাকার করে ওঠে ফাতেমার বুকটা। আজকাল যথাসম্ভব স্বাভাবিক হয়ে গেলেও স্মৃতির পাতায় ছোট্ট মেয়ের মুখটা প্রায়ই ভেসে ওঠে।

হয়তো ফাতেমার কোলজুড়ে আর একটি শিশু আসলে তবেই কিছুটা ভুলতে পারবে। তবে চাইলেও তো আর মা হওয়া যায় না। জাহিদ অনেকক্ষণ হল ফাতেমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফাতেমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে নি।

পাশের ছাদের দৃশ্যটা জাহিদও খেয়াল করে। ফাতেমার কাছে গিয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে জাহিদ বললো,
~ “রেডি হবে কখন? ও বাড়িতে যাওয়ার কথা আজ! তুমি কি ভুলে গেলে?”

~ “ওহ, না। আমি তৈরি হচ্ছি।”

ফাতেমা চলে গেল। জাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

সন্তান নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর তরফ হতে মাতা~পিতার প্রতি এক অনন্য উপহার। বিয়ের পর সকল দম্পতির কামনা থাকে যে, কোলজুড়ে ফুটফুটে সন্তান আসবে। কিন্তুু সবার আশা পূরন হয় না। সন্তান দেয়া না দেয়ার একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ।

এর জন্য আল্লাহর ওপর কতশত অভিযোগ মানুষের। মানুষ আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতেই পারে, এটা করা যায়। তবে আল্লাহর ওপর অভিযোগ করা অনুচিত। অগণিত নিয়ামতের ভীড়ে দু একটা না পেলেই তাঁর ওপর অভিযোগ করলে তাকে অকৃতজ্ঞ ছাড়া আর কী বলা যায়!

নিঝুম সংসারেই মন দিয়েছে। পড়ালেখায় আর মন বসে না তার। গতকালই আদহামকে নিঝুম তার ইচ্ছের কথা জানিয়েছে যে সে এডমিশন পরীক্ষা দেবে না। স্থানীয় মহিলা কলেজেই ভর্তি হবে। আদহামও নিঝুমের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছে। নিঝুম যেমনটা চায়, তেমনটিই হবে।

অনেকেই মনে করে সংসার করা মানেই হল বন্দিদশাকে আপন করে নেওয়া। আর চাকরি করে, পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে চলে তাদেরকে নারীদের যোগ্যতা, ক্ষমতা, সামর্থ্য সম্পর্কে অবহিত করা হল নারীদের অধিকার।
আর তা না করতে দিলেই নাকি সেটা বৈষম্য করা হয়। নিঝুম ঘরের বাইরে বেরিয়ে নিজেকে জাহির করতে চায় না। তাই পড়ালেখা করবে, তবে চাকরি করার ইচ্ছে নেই নিঝুমের।

গত কয়েক দিনে রায়হান আনিশার একবারও খোঁজ নেয় নি। আর আনিশা চেয়েও পারে নি। তবে আনিশার শশুড় শাশুড়ী অবশ্য খোঁজ নিয়েছেন। আনিশা বাবা মা এর থেকে পুরো ঘটনাটি গোপন করেছে। বাবা মাকে কিছু একটা বুঝিয়ে সামলে নিয়েছে।

আনিশা দিনের বেশিরভাগ সময় জায়নামাজে পড়ে থেকেছে, রায়হানের হেদায়েতের জন্য দুআ করেছে। এখনও করছে। রায়হানকে সে ভালোবাসে। কোনো মেয়েই নিজের সংসার, ভালোবাসার মানুষ অকারণে ছাড়তে চায় না। আনিশাও চায় না তার ভালোবাসার মানুষ, তার স্বামী রায়হানকে ছাড়তে, ডিভোর্স দিতে।

রায়হানকে আনিশা একটু বুঝতে চেয়েছিল। রায়হান কি সত্যিই আর তাকে মেনে নিতে পারছেনা, নাকি এটা সাময়িক মন কষাকষি! আর তাই ডিভোর্সের কথা তুলেছে। আর তাই তো, আল্লাহর কাছে রায়হানের ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করছে।

অন্যদিকে গত কয়েক দিনে রায়হান ভালোভাবেই আনিশার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছে। একটা মানুষ যদি আরেকটা মানুষের সাথে সবসময় থাকে, তাদের মধ্যে ভালোবাসা না থাকলেও মায়ার সৃষ্টি হয়েই থাকে।
আর আনিশা তো রায়হানের ভালোবাসা, অভ্যাস। এতোদিন অবুঝের মতো থেকেছে বলেই আনিশার পরিবর্তন, আনিশার ত্যাগ ও ভালোবাসা রায়হানকে নতুন করে স্পর্শ করেনি।

আসলে দাঁত থাকলে দাঁতের মর্যাদা কেউই বোঝে না।

রায়হান ও নিজের জীবনে আনিশার উপস্থিতির গুরুত্ব বোঝে নি। সাতটা দিন অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়েছে রায়হান। রাতের একাকিত্ব অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতো।

সবসময় মনে হতো কিছু একটা নেই। ফাঁকা ফাঁকা লাগতো হৃদয়টা। কিন্তু আর দেরি নয়। আজই আনিশাকে ফিরিয়ে আনবে সে।

সকালের খাবার খেয়ে নিজের রুমে একটি বই নিয়ে বসেছে আনিশা। নিঝুমের থেকে কয়েকটি বই এর নাম শুনে নিয়েছে। সময় করে কিনেও এনেছে এ বাড়িতে আসার পর। কিন্তু সময় করে আর পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই আজ বইটা পড়তে বসেছে আনিশা।

বইটির কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে তার মনের অস্থিরতা দূর হয়। অশান্তি দূর হয়ে প্রশান্তি ভর করে। সত্যিই তো এ দুনিয়া মুমিনদের জন্য জেলখানা। তবে এটা তো দুনিয়া, জান্নাত তো নয়। কষ্ট, যন্ত্রণা তো থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক।
রায়হান আনিশার বাবার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

না জানি কেমন পরিস্থিতিতে তাকে পড়তে হয়! যদিও আনিশা চিঠিতে বলেছে ডিভোর্সের ব্যাপারে পরিবারকে জানাবে না। ডিভোর্সের কথা না জানালেও তাদের দুজনের মধ্যেকার ঝামেলার ব্যাপারে কি আনিশা কিছু বলেছে?
দোটানা সাথে নিয়েই বাড়িতে ঢুকলো রায়হান। ভিতরে গিয়ে দেখে আনিশার বাবা জাফর সাহেব চা পান করছেন আর পত্রিকা পাঠ করছেন। সালাম দিয়ে শশুড়ের পাশে দাঁড়ালে আনিশার বাবার নজর পড়ে তার ওপর।

আনিশা বাবা জামাইকে দেখে খুব খুশি হলেন।

~ “কেমন আছো বাবা? আনিশা বললো তুমি নাকি খুব ব্যস্ত থাকো আজকাল। তাই ওকে রাখতে আসতে পারো নি!”
রায়হান একটু হাসার চেষ্টা করে বললো,

~ “হ্যাঁ ঐ আর কি!”
~ “আরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বসো বসো। আরে আনিশার মা দেখো জামাই এসেছে। ফারিয়া মা, কোথায় গেলে তোমরা?”

~ “বাবা, আপনি ব্যস্ত হবেন না।”

শশুড়ের ডাক শুনে ফারিয়া উপস্থিত হল সেখানে। রায়হানকে দেখে চমকে যায় ফারিহা। ফারিয়া বুঝেছে তার ননদ নিশ্চয়ই স্বামীর সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে চলে এসেছে। যদিও বাড়িতে কাউকে বুঝতে দেয় নি। তবে তার নীরবতা বলে আনিশা ও রায়হানের মধ্যে কিছু না কিছু ঝামেলা এখনো চলছেই।

তবে আজ রায়হানকে এ বাড়িতে দেখে বুকের ওপর থেকে বোঝাটা যেন নেমে যায়। এবার এ দুটোর যদি মান ভাঙ্গে। রায়হানের জন্য খাবার সাজাতে বললেন জাফর সাহেব। আর রায়হানকে আনিশার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললেন।

রায়হানও ছাড়া পেয়ে খুশি মনে আনিশার মান ভাঙ্গাতে চলে যায়। ফারিয়া শাশুড়ীর সাথে রান্নাঘরে চলে যায় খাবারের আয়োজন করতে। তারা সকলে সকালের খাবার খেয়েছে। পাতিলে আর একজনের মত খাবারও অবশিষ্ট নেই। শাশুড়ী, বউমা মিলে দ্রুত খাবার রান্নার চেষ্টা চালাচ্ছে। ফারিয়া সবজি কেটে দিচ্ছে, আনিশার মা জাহানারা রান্না করছেন।

খুব গম্ভীরমুখে আনিশার রুমে প্রবেশ করে রায়হান। ধীর পায়ে হেঁটে আনিশার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাতে রাখা খামটা বাড়িয়ে ধরে আনিশার সামনে রাখা বইয়ের ওপর। হঠাৎ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় মাথা উঁচু করে চশমার ওপর দিয়েই তাকায় আনিশা৷

রায়হানকে দেখে এক মুহুর্তের জন্য ভেবেই নেয় রায়হান বুঝি ওকে ডিভোর্স পেপার দিতে এসেছে। বুকের ভিতরে ধক করে ওঠে। খামটিতে কি ডিভোর্স পেপার রাখা আছে? রায়হান তাকে সত্যি সত্যিই ডিভোর্স দিয়ে দেবে? তার মনে আনিশার জন্য ভালোবাসার অনুভূতির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই তাহলে? রায়হান কি তার থেকে মুক্তি চায়?
মনের মাঝে প্রশ্নেরা জাল বুনতে শুরু করেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা নিয়ে নিচু গলায় তবুও রায়হানকে জিজ্ঞেস করলো,
~ “কি আছে এতে?”

রায়হানও সোজাসাপটা উত্তর দিলো,
~ “কেনো? ডিভোর্স পেপার।”

রায়হান আনিশার মুখের দিকে তাকিয়ে অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টায়। আনিশার বুকটা চিনচিন করতে থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। চোখের কোণে অশ্রু ভীড় করে। হয়তো খুব শীঘ্রই তারা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করেবে।

আনিশা খামটা খোলে। আনিশার হাত কাঁপছে, মৃদু ঘামছেও সে। আনিশা খাম খুলে দেখে খামের ভেতরে দুটো বাসের টিকিট। যাত্রাস্থল কক্সবাজার। কিছু বুঝতে না পেরে রায়হানের দিকে তাকায় আনিশা।

ততক্ষণে রায়হান আনিশার সামনে এসে বসেছে। রায়হান আনিশার মুখটা দু’হাতে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
~ “হানিমুনের টিকিট। দুজন যাব, আল্লাহ চাইলে তিনজন হয়ে ফিরবো।”

আনিশা ফিক করে হেসে ফেলে। সাথে রায়হানও। লজ্জাবনত হয়ে জবাব দিল,
~ “তিনজনই আছি!”

রায়হান হতভম্ব হয়ে বললো,

~ “কীহ….!”
~ “কী নয় জনাব। বলুন জ্বী।”
আনিশার কপালে কপাল মিশিয়ে রায়হান বললো,
~ “কবে জানলে?”

~ “গত পরশু।”

রায়হান অভিমানের ভাব ধরে বললো,
~ “আমাকে জানাও নি তুমি! ভেরি ব্যাড! জানিনা, আমি না ফিরলে তুমি কত ভয়ানক অ্যাকশন নিতে! আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। তুমি আমাকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলে।”

আনিশা মৃদু শব্দ করে বললো,
~ “আ’ম সরি..! তবে আমি কাউকেই বলিনি এখনো। বিলিভ মি! তবে আমি চেয়েছিলাম তুমি আমার উপস্থিতি অনুপস্থিতি বুঝতে পারো। বুঝতে পারো রাগ, অভিমানের ওপরে আমাদের ভালোবাসার স্থান।”
~ “স্যরি বউ!”

আনিশা নাক টেনে বললো,
~ “আমিও”
রায়হান আনিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
~ “আই লাভ ইউ বাবুর আম্মু।”

আনিশা কপট রাগ দেখিয়ে বললো,
~ “বাট আই হেইট বাবুর আব্বু। “
হেসে মুখ লুকালো রায়হানের বুকে।


পর্ব ৩১

খাবার টেবিলে চুপচাপ বসে আছে রায়হান৷ আনিশা তার পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই চেহারাতেই অর্থপূর্ণ হাসির ছাপ। যে হাসি আনন্দের, প্রাপ্তির এবং পরিপূর্ণতার। তাদের দুজনকে একসাথে বেঁধে রাখতে, সম্পর্কের বাঁধন শক্ত করতে একজন অতিথি আসতে চলেছে।

ফারিয়া এসে একে একে সবগুলো খাবারের বাটি সামনে এনে রাখলো। আনিশা শুধু দেখে গেল। সব খাবার টেবিলে আনা হলে ফারিয়া আনিশাকে বললো সে নিজেই যেন রায়হানকে খাবার পরিবেশন করে।

ফারিয়া তাদের দুজনকে একলা রেখে চলে গেল। কিছুদিন আলাদা থাকার পর তাদের এখন সময় দেওয়া উচিত। তাছাড়া সকলেরই সকালের খাবার খাওয়া হয়ে গেছে। তাই এই সুযোগটা আনিশা ও রায়হানকে দেওয়া উচিত ভেবে ফারিয়া এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করলো।

~ “তুমিও বসো।”
একটা প্লেটে খাবার সাজাতে গেলে রায়হান উক্তিটি করলো।
~ “আমি খেয়েছি সকালে।”

~ “এখন বেশি বেশি খেতে হবে তোমাকে। একটু পর পর খাবে।”

~ “একটু পরই দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হবে। তখনই খেয়ে নেব একবারে।”

~ “অসম্ভব!”

আনিশাকে টেনে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিল রায়হান। নিজেই আরেকটা প্লেট টেনে খাবার পরিবেশন করলো তাতে। ভাত মেখে আনিশার মুখের সামনে ধরলে আনিশা চুপচাপ মুখে নিল। রায়হানের এই যত্নটুকু সে ভীষণভাবে উপভোগ করছে।

আজ রায়হানের নিজেরও খুব সুখী মনে হচ্ছে নিজেকে। আসলেই সুখী হতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না।

রায়হান মনে মনে ভাবে, ঘরের সুখকে পায়ে ঠেলে আমরা পুরুষেরা বাহিরে ছুটে চলি সুখের খোঁজে। অথচ সুখের পাহাড় নিয়ে ঘরে অপেক্ষা করে বসে থাকে স্ত্রী, বাবা, মা। তাদের যত্ন, আদর, ভালোবাসা, স্নেহ যতোটা সুখ দিতে পারে, অর্থ ততোটা পারেনা। বেঁচে থাকার জন্য অর্থেরও প্রয়োজন। তবে অবশ্যই তা অর্জন করতে গিয়ে দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার ভোলা যাবে না।

অর্থ, সম্পদকে সুখের চাবিকাঠি মনে করে এগুলোর পেছনে ছুটতে ছুটতে যখন মনে হয় ‘হ্যাঁ, আমি সুখ অর্জন করতে পেরেছি’ তখনই হয়তো মালাকুত মউত এসে হাজির হয়ে যায়। নয়তো বাবা মা থাকে না সময় কাটানোর জন্য।

এমন মানুষও পাওয়া যাবে যারা হয়তো বাবা মায়ের সাথে সময় কাটানোর জন্য তড়পায়। কিন্তু তারা বাবা মাকে চিরদিনের মত হারিয়েছে। এমন অনেক স্ত্রীকেও হয়তো পাওয়া যাবে যে স্বামীর সময়, মনোযোগ না পেয়ে অন্যদিকে মন দিয়েছে, অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, পর পুরুষের মাঝে না পাওয়া পাওনাগুলো খুঁজতে চেয়েছে।

যে মিথ্যে সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে পরিবার, আত্মীয়কে সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না, সেই সুখই অনেকসময় উপভোগ করার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় না কিংবা মানুষগুলো থাকে না। তাহলে কী লাভ হয় আসলে?
বেশ কয়েক লোকমা নিজের প্লেট থেকে আনিশাকে খাইয়ে দিল রায়হান। নিজে এখনো খাবার মুখেই তোলেনি রায়হান।

খেতে খেতেই আনিশা জিজ্ঞেস করলো,
~ “সকালে কী খেয়েছো?”

~ “খাইনি।”
সত্য কথাই বললো রায়হান।

~ “কেনো?”
~ “তোমার চিন্তায় ছটফট করেছি ক’দিন। গতকাল রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম আজ সকালেই আসবো এখানে। তাই সকাল সকাল না খেয়েই বেরিয়ে পড়েছি।”
আনিশা কথা বলতে পারলো না। রায়হান আগেই তার মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। মুখের খাবার শেষ হলে আনিশা বললো,

~ “তুমি খাও এখন। আমি প্লেট থেকে নিয়ে খাচ্ছি।”

রায়হান হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। রায়হানেরও মনে হচ্ছে তার এখন খাওয়া দরকার। দুপুর হয়েই এল। ঘড়ির কাঁটা একটা ছুতে চলেছে। সকালে না খেয়ে আসায় এখন তাকে ‘Brunch’ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ‘Breakfast’ এবং ‘Lunch’ একসাথে।

যদিও জানে একটু পরই আবার খেতে বসতে হবে তাকে। শশুড় বাড়ি আসবে আর জামাই আদর পাবে না, তা হয় না। ক্ষুধা না থাকলেও এখানে হাজার পদের খাবার তাকে একটু পর পর খেতেই হবে।

এক লোকমা খাবার পাকস্থলীতে প্রবেশের পরই রায়হান টের পেল তার পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিড কেমন পরিস্থিতি প্রস্তুত করে রেখেছে! কোনোমতে অল্প করে খাবার খেয়ে নিল রায়হান।

আনিশা খাওয়া শেষ করে রায়হানের পাশেই বসে ছিল তার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত। রায়হানকে ঘরে রেখে আনিশা গেল ফারিয়ার কাছে। নক না করেই রুমে ঢুকলো আনিশা। ফারিয়া মোবাইলে কারো সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। সম্ভবত আনিশার ভাই সাব্বিরের সাথেই কথা বলছে সে।

ফারিয়া আনিশাকে দেখে ফোন রাখলো। বললো,
~ “কী ব্যাপার? জামাইকে রেখে আমার কাছে কী?”

~ “দূর ভাবী! এমন বলো কেনো? তোমার কথা বলায় ডিস্টার্ব করলাম সেটা বলো না কেন! আমি আসলাম একটা কথা বলতে।”

~ “ইয়ে আসলে আমি….!”
আমতা আমতা করতে লাগলো আনিশা।

আনিশার কেন যেন ফারিয়াকে কথাটা বলতে লজ্জা করছে। মা’কেও কথাটা বলতে পারছেনা। তবে মনে হল কথাটা জানানোর জন্য ফারিয়াই উপযুক্ত মানুষ।

~ “আসলে নকলে না করে মূলকথা বলো।”
ফারিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনিশাকে দেখছে। যতদিন হলে আনিশাকে দেখছে, এভাবে লজ্জায় নুয়ে পড়তে কখনো দেখেনি। কেমন যেন সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকালো ফারিয়া।

তাকে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আনিশা বলেই ফেললো,
~ “ভাবী, আমি… আমি….প্রে.. গ.. নে.. ন্ট।”

~ “কিহ….!”
বিস্ময়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো ফারিয়া।

~ “ভাবী, আস্তে!”
আনন্দ লুকাতে পারছে না ফারিয়া। সেও চায় মা হতে, তবে সাব্বিরের নাকি এখনো বাবা হওয়ার সময় হয় নি। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলাও হয় বেশ!

~ “আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।”

পরের ঘটনাগুলো বেশ দ্রুতই ঘটে গেল বলে মনে হল আনিশার। ফারিয়া গিয়ে আনিশার মা’কে আনিশার মা হওয়ার কথাটা জানিয়ে দিল। আর তিনি আনিশার বাবাকে, রায়হানের বাড়িতেও সুসংবাদটা পৌঁছে দিলেন। ও বাড়ির মানুষগুলো আনিশা ও রায়হানের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে লাগলো।

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে তারা রওনা হল ফিরে আসার জন্য। যদিও আনিশার বাবা মা চেয়েছিল রায়হান যেন এ বাড়িতে দুটো দিন কাটিয়েই যায়। কেননা রায়হান তেমন সময় পায় না এ বাড়িতে আসার। তাই এবার যখন এসেই পড়েছে, তখন একটা না হয় দুটো দিন থেকে যেতে বললেন।
কিন্তু রায়হান থাকলো না। ঐদিকে আবার রায়হানের বাবা মা ওদেরকে ফেরার জন্য তাড়া দিতে লাগলো।


পর্ব ৩২ (অন্তিম)

ফেরার পথে বাসস্ট্যান্ডে নেমে বাকিটা রাস্তা দুজনে রিকশায় করে যাবে বলে মনস্থির করলো রায়হান। আকাশটা মেঘলা। হুট করেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে যখন তখন। তবুও এই সময়টাকে স্মৃতির আঙিনায় গাঢ় ছাপ রাখার মত অতি স্মরণীয়, উপভোগ্য করে রাখাই যায়!

হুড খোলা রিকশায় বসে আছে আনিশা ও রায়হান। রিকশাওয়ালা ধীরে ধীরেই এগোচ্ছে গন্তব্যের পানে। আনিশা ও রায়হান, দুজনই নিশ্চুপ। তবে মনে মনে কতশত কথা বলে যাচ্ছে, ভাবের আদান~প্রদান হচ্ছে! দুজনেই নীরবে সময়টা, নিজেদের অনুভূতিকে অনুভব করছে।

বিয়ের আগে যতটা সময় তারা একত্রে কাটিয়েছে তার তুলনায় বিয়ের পর কিছুই হয় নি। রায়হানের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলোর মধ্যে আজকের বিকেলটা আনিশার কাছে সবচেয়ে আনন্দঘন বিকেল বলে মনে হচ্ছে। রায়হানের হাতের মুঠোয় আনিশার হাত। রায়হানের ডান হাতটা আঁকড়ে ধরে আছে আনিশা।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টির সূক্ষ্ম ফোঁটা আনিশার জিলবাবে হালকা ছাপ ফেলে যাচ্ছে। শরীরজুড়ে অনুভূতির ঝড় বইছে। শিরায় শিরায় অনুভূতিরা ছোটাছুটি করছে। রক্তে তাদের মিছিল চলছে। এত কেন ভালো লাগছে আনিশার! অতি সুখে মরেই যাবে নাকি সে?

রায়হান একটু পরপর তাকাচ্ছে আনিশার দিকে।
~ “হুডটা তুলে দেব?”

~ “নাহ, খোলাই থাকুক।”
~ “বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে যাচ্ছো।”

~ “বেশি না।”
~ “জ্বর হতে পারে!”

~ “হোক!”
রায়হান ফের তাকালো আনিশার দিকে। বললো,
~ “কিন্তু….!”

~ “ভালো লাগছে ভীষণ।”

নিচুস্বরে কথাটা বললো আনিশা। আনিশার কথাটা রায়হানের কানে সুরের মত বাজতে লাগলো। মায়ায় ভরা, ভালোবাসায় ভরা, অনুভূতি জড়ানো সেই শব্দ, সেই কন্ঠ!

আজ সালেহা খানমের আনন্দের কোনো সীমা পরিসীমা নেই। গতকাল মেয়ে জামাই এসেছে বাড়িতে। জাহিদের বোনও এসেছে তাদের সাথে। কিন্তু জাহিদের বাবা আসলেন না, বাড়ি একেবারে ফাঁকা হয়ে যাবে বলে। তাছাড়া তিনি বয়স্ক মানুষ। ঘর থেকে তেমন একটা বেরোতেই চান না।

আজ এসেছে নিঝুমের মা শাহেদা এবং বাবলু। সালেহা খানম নিঝুমের মা’কে নিমন্ত্রণ করেছেন মেয়ের নতুন সংসার দেখে যাওয়ার জন্য। কিভাবে তাঁর মেয়েটা সংসারটাকে নিজের করে নিতে শুরু করেছে তা দেখাতে।
বাড়িটা ভরা ভরা লাগছে। তবে শূণ্যতাও আছে। একটা বাচ্চার শূণ্যতা ঘিরে ধরেছে বাড়িটাকে। বাড়িতে একটা বাচ্চার খুব অভাববোধ হয়। হয়তো ফাতেমার মেয়েটা আজ নেই বলেই এই শূণ্যতা!

রান্নাঘরে নিঝুম সকলের জন্য পিঠার আয়োজন করতে ব্যস্ত। তাকে সাহায্য করছে শাহেদা। নিঝুম নিজেই বায়না ধরেছে আজ সবার জন্য সে একাই পিঠা বানাবে। নিঝুম গ্রামের মেয়ে। রান্নাবান্নার কাজটা তার কাছে কঠিন কোনো বিষয় নয়।

আদহাম, জাহিদ আর বাবলু মসজিদে আসরের নামাজ পড়তে গেছে। নিঝুম ও শাহেদা মিলে কয়েক রকমের পিঠা বানালো। মসজিদ থেকে ওরা ফিরে বসলে, বাড়ির মহিলারা আসরের সালাত আদায়ের পর সকলে নাস্তা করতে বসে গেছে।

মেয়েরা মেয়েরা, আর ছেলেরা ছেলেরা আড্ডা দিল কিছু সময়। মাগরিবের আযানের শব্দে পুরো শহরটা যখন মুখরিত, আড্ডা ভেঙ্গে গেল। সকলে রবের ডাকে সাড়া দিতে চলে গেল।
সারা বাড়িতে আজ খুশির আমেজ। যেন খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সবার মধ্যেকার ভাব ভালোবাসা, আনন্দ উল্লাস, পারস্পরিক বন্ধনে সালেহা খানম খুশি এবং সাথে নিশ্চিন্তও। সবাইকে নিয়ে এই তো তাঁর সুখের সংসার৷ তাঁর সুখের নীড় ‘সুখনীড়’। যেন দুনিয়ায় বুকে এক টুকরো জান্নাত এই সুখের নীড়।

রাত সাড়ে দশটা। খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই। শুধুমাত্র নিঝুম বাদে। নিঝুম রান্নাঘরে খাবার গরম করছে আর টেবিলে রেখে যাচ্ছে। খাবার টেবিলে বসে সকলেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছে।

আদহাম কারো কোনো কথাতে নেই। আদহাম চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরে চলে গেল। শাহেদা আড়চোখে ব্যাপারটা খেয়াল করেন। তার মন ভরে গেল। মন বলছে তাঁর মেয়ে সুখে আছে, সুখে থাকবে।

নিঝুম মাংসের তরকারীটা গরম করছে। মাঝে মাঝে চামচ দিয়ে নাড়া দিচ্ছে। আদহাম গিয়ে দাঁড়ালো তার পাশে।
~ “আপনি?”

~ “হ্যাঁ, আমি।”
~ “হ্যাঁ, তো এখানে কেনো আপনি? মানে রান্নাঘরে কেনো এলেন? কোনোকিছু দরকার?”
~ “হুম অনেক দরকার।”

~ “কী দরকার? ক্ষুধা লেগেছে খুব? হয়েই গেছে আমার। মাছের তরকারীটা গরম করবো শুধু। আপনি গিয়ে বসুন। আমি আসছি। আর দু তিন মিনিট লাগবে।”

~ “আরে না, ক্ষুধা নয়।”
~ “তাহলে?”
~ “নিঝুম তুমি খুব বোকা জানো?”

নিঝুম হতবিহ্বল হয়ে আদহামের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

আদহাম প্লেট থেকে শশার এক টুকরো মুখে পুড়ে বললো,
~ “আমিও বা কী বলছি! যে বোকা সে কিভাবে জানবে সে বোকা!”

~ “মানে?”
না চাইতেও প্রশ্ন করে ফেললো নিঝুম। মনে হচ্ছিলো প্রশ্ন করা মানেই আবারো নিশ্চয়ই কোনো বোকামি করা। তবুও করেই ফেললো নিজেকে আটকাতে না পেরে।

~ “মানে হল এখানে আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। সবাই ওখানে গল্প করছে। আর তুমি এখানে একা একা….!”

~ “এখানে আপনার সাহায্য নেওয়ার মত কোনো কাজ পড়ে নেয়।”

~ “তাহলে আর কী? দাঁড়িয়ে থাকি, গল্প করি। সময় দিচ্ছি তোমাকে। আর তুমি অযথা প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করছো।”
নিঝুম আর কিছু বললো না। এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে সময় দেওয়ার কী দরকার! অদ্ভুত মানুষ আদহাম।
বিবাহিত জীবনের গত দিনগুলোতে নিঝুম যে কোনো রকম ভুল করেনি তা নয়। করেছে ভুল। আদহাম শুধরে দিয়েছে। রেগে নয়, ভালোবেসে বুঝিয়েছে।

স্বামী স্ত্রী একে অপরের পোশাক। তারা একে অপরের সব কমতি, খুঁতগুলো লুকিয়ে রাখে নিজেদের মধ্যে। নিজেরাই শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে, শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যত্র বলে বেড়ায় না, গোপন রাখে।

নিঝুম দেখেছে রাতের পর রাত আনিশা ও রায়হানের একে অপরকে ভালোবাসি বলা। নিঝুম তাদের ভালোবাসাময় মুহুর্ত সম্পর্কে জেনেছে। তবে আদহাম কোনো ভাবেই রায়হানের মতো নয়।

তার ছেলেমানুষী, নিঝুমের প্রতি তার যত্নই প্রকাশ করে নিঝুমকে সে কতোটা ভালোবাসে। মুখে যতোই উচ্চারণ না করুক ‘ভালোবাসি’ শব্দটা। আদহামের আচরণ নিঝুমকে তা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম৷

কি হয়েছিল আদনানের সাথে তার সম্পর্কের শেষ পরিণতি! বিচ্ছেদই তো! কিন্তু সেই সম্পর্কে মিনিটে মিনিটে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা দুজনের একজনের মুখ হতে উচ্চারিত হতোই। কিন্তু টিকে তো থাকলো না। কী লাভ তবে ভালোবাসি বলে?

‘ভালবাসি’ শব্দটা না বললে কি ‘ভালবাসা’ হয় না? ‘ভালবাসি’ বলার চেয়ে ভালবাসা অনুভব করানোই কি যথেষ্ট না? মুখে হাজার বার ‘ভালবাসি’ বলা সহজ। কিন্তু সারাজীবন ভালবেসে যাওয়া কঠিন! সারাজীবন পাশে থেকে ভরসা, বিশ্বাস জুগিয়ে যাওয়া কঠিন। আর এই কঠিন কাজটাই আদহাম করে যাচ্ছে।

তাহলে ক্ষতি কী? থাকুক না সে তার মত করে। না বলুক ‘ভালোবাসি’ শব্দটা। তবুও তো সে ভালোবাসে। তার চোখে ভালোবাসার গভীর সমুদ্র তো নিঝুমের কাছে দৃশ্যমান। সেই সমুদ্রের যত গভীরেই যাওয়া হোক না কেনো পথ শেষ হবার নয়! মাটির খোঁজ পাওয়া সম্ভব নয়।

আর তাই,

কিছু দেখা অদেখাই থাক,
কিছু জানা অজানাই থাক,
কিছু চেনা অচেনাই থাক,
কিছু কথা না বলাই থাক,
কিছু ভালোবাসা অপ্রকাশিতই থাক!
সকলের অগোচরেই রয়ে যাক একটি অলিখিত, অপ্রকাশিত প্রেমের উপাখ্যান….!

লেখা – সাদিয়া আফরোজ মীম

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “অপ্রকাশিত প্রেমের গল্প ~ তোমাকে আজও খুজে বেড়াই” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অপ্রকাশিত ভালোবাসার গল্প (১ম খণ্ড) – তোমাকে আজও খুজে বেড়াই