রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

তুমি আমি (শেষ খণ্ড) – Valobashar romantic premer golpo bangla

তুমি আমি – Valobashar romantic premer golpo bangla: সকালের মৃত্যুতে প্রেম গভীর শোক পেয়েছে, গভীর দুঃখের মাঝে প্রেম নিশুকে জড়িয়ে নিয়েছে, ছায়া খুঁজেছে, সেটা যে আফিফ নিজ চোখে দেখেছে।


পর্ব বারো

আফিফ ফুলবাড়ি এসেছে। মাঝের বেঞ্চটায় এক কোণে এসে বসে। পাশেই দীপ্ত এসে বসে। চারপাশে এক নজর চোখ বুলিয়ে আফিফের কাঁধে হাত রাখে।
চারপাশে ফুলের সমাহার। হৃদয় ছোঁয়া ঘ্রাণ। উপরে মস্ত বড় নীল আকাশ। অনেকক্ষণ মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে দেখে আফিফ।

এখানে তার সুখের স্বর্গ ঘুমিয়ে আছে। আফিফ ভাবে, আজ মা বেঁচে থাকলে হয়ত জন্মদাতা পিতা তার কাছে থাকত। একটি সুখের পরিবার হতো। নতুন কোনো সদস্য আসত, হয়ত দীপ্তের মত ভাই নয়ত নেহালের মত আদরে ছোট ভাই, আর বোন হতো।

ফুলবাড়িতে দুজন মালি ফুল গাছের পরিচর্যা করে। বাড়ির মালিক এসেছে দেখতে পেয়ে ভিতর থেকে জল~ খাবার এনে দিলেন মালি মনু মিয়া।
~ সাহেব, ম্যামসাহেবা কেছা হে?

দীপ্ত, আফিফ ভ্রু কুঁচকে ওঠল। মনু মিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। বেশ অমায়িক ভাব চেহারায়। বয়স আনুমানিক কত তা সে নিজেও জানে নাহ্। খেটেখুটে খাওয়া মানুষ সে। দুজনের চমকানোর বিষয় লোকটি হিন্দি বলছে!

মনু মিয়া দুজনের চাহনি দেখে ফিক করে হেসে ওঠলেন। তিনি সহাস্যে জবাব দিলেন,
~ আসলে, আমি অনেকক্ষণ যাবত দেখতেছি, আপনেরা অন্যমনস্ক। ভাই ভাবলাম কিছু বলে চমকে দেয়া যাক। এই বুড়ো মাথায় যা আইছে, তাই খাটাইলাম।
দীপ্ত সহসা উঁচু স্বরে হেসে ওঠে, আফিফও হাসে। মনু মিয়া আপ্লুত হয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

বিষয়টি দুজনের বেশ মনে ধরেছে। ফুলবাড়িতে এসে আসলেই মন খারাপ মানায় নাহ্। চারপাশে এত এত সৌন্দর্যের সমারোহ। এক বার চোখ বুলালেই মনে প্রাণে আন্তরিকতায় ভরে যায়। এক মুহূর্ত মনে হয়, যদি গোলাপ হতাম এক মুহূর্তের জন্য, তবে হয়ত প্রিয়তমের হৃদয়ের স্থান মিলত।
~ মনু চাচা, বাগানে আরো কিছু গোলাপের চারা এনে রেখো।

আফিফের কথায় মনু মিয়া সহাস্যে জবাব দেয়। তার মুখে সব সময় উজ্জীবিত হয়ে থাকে, হেসে হেসে কথার জবাব দেয়া তার স্বভাব।
~ আচ্ছা সাহেব।

আফিফ মুচকি হেসে আরো কিছু বলার মাঝে দীপ্ত সহসা উঁচু স্বরে বলে ওঠে,
~ আহ্ মনু চাচু। কী সব পুরনো আমলের মত সাহেব, বাবু বলছ। কিছু নিউ ভার্সন বলো, শুনি।
মনু মিয়া উজ্জ্বল হাসলেন। হাসি তামাশা করতে তার ভীষণ ভালো লাগে। এতে করে সব সময় আনন্দে থাকা যায়, মজাদার সময় কেটে যায়। বেশ রসিকতার মানুষ সে। দীপ্তের সাথে সে মজায় মেতে ওঠে।

~ আচ্ছা, মনু চাচা, বলো তো। এই হিন্দি ভাষা তুমি শিখলে কীভাবে।

~ সে অনেক আগের দিনের কথা, বহুত কাহিনি। তোমরা শুনলে, আমিভি বলতে রাজি।
দীপ্ত সহসা হেসে বলে,
~ হ্যাঁ বলো বলো। শুনছি।

~ শুনেন তবে, তখন দেশে যুদ্ধ চলে, সাল ১৯৭১। আমার বয়স ভারি হলেও কিশোর বয়স হবে, তোমরা যারা বলো। স্কুল কলেজের পাশেই ছিল টিনের চালের ঘর। মায় ছিলনা, আমি আর বাপে মিলে কোনোরকম খেটেখুটে বেঁচে থাকতাম। এর মাঝেই মেলেটারি আসল। প্রাণ যাওনের ভয়ে বাপে মেলেটারির সঙ্গ দিল।

আমিও বাপের কথা মত কিছু টুকটাক কাজ~ কাম করে দিতাম তাগো, মানে মেলেটারিগো। এই চা আনা, এইটা আনা, ওইটা করা। পয়সাও দিত, দু~ আনা, এক আনা।

দীপ্ত বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আর মনু মিয়ার ভাব ভঙ্গি দেখছিলো।
~ বাহ্, বেশ ইন্টারেস্টিং তো। তারপর

আফিফ দুজনের আড্ডায় যোগ দিল। তার আগের দিনের গল্প শুনতে বেশ ভালোই লাগে। দাদির থেকে সে কতরকম ভাষায় গল্প শুনেছে।
মনু মিয়া ভালোই শুদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। লেখাপড়া না জানলেও চালচলনে বেশভূষা ভালোই। তার মাঝে কোনো জটিলতা নেই, সংশয় নেই। নিজের অবস্থান নিয়েও সে অনেক সুখীভাব।

মনু মিয়া উৎসাহিত হয়ে হাসিমুখে আবার বলতে লাগলেন,
~ তারপর, আমি তাগো লগে পাক্কা ৬মাস ছিলাম। মুখে মুখে এমন আজব ভাষা শুনেছি। আমার বাপে তো সম্পূর্ণ ভাবে হিন্দি বলা শিখে গেছিলো। আমিভি বহুত কুছ শেখা। বাপের কাছ থেইকাও মেলা কিছু শিখছি, কথা বলতে কি যে মজা লাগত। এহনো মনে আছে আমার। বহুত কুছ। তবে আমি যুদ্ধও করেছি তাগো লগে।

দীপ্ত খুশি হয়ে হাত তালি দিয়ে বলল,
~ বাহ্, বাহ্, তারপর কী কী পারো বলতো শুনি।

দীপ্ত বন্ধুপ্রতিম মানুষ। আনন্দ থাকতে বেশ পছন্দ করে। এমুহূর্তে সে আফিফের জন্য হাসি তামাশা করছে, যাতে আফিফ একটু প্রশান্তি পায়।
আফিফও মন খুলে হাসল মনু মিয়ার কথায়। কিছুক্ষণ যাবত হেসে, অনেক কথা বলার মাঝে নিজেকে ব্যাস্ত রাখল। বেশ সাচ্ছন্দ্যে সময় কেটে যাচ্ছে তার। মন হালকা হলো। শরীর সতেজ হতে থাকল ধীরে ধীরে। দাদিমা বুঝি এই জন্যই এখানে আসতে বলেছিল।

মনু মিয়া ভিতর থেকে প্লেটে কিছু পিঠা এনে দীপ্তের সামনে দিল, দীপ্ত তো মহাখুশি। আহ্, সকাল সকাল মজার পিঠা!
~ আব্বে মনু কাক্কু, তুমি তো কামাল করে দিছো।
দীপ্ত সহসা পিঠা তুলে খেয়ে নিল।

~ ওয়াও, হোয়াট এ টেস্টি! এই পিঠার নাম কি চাচা?
মনু সাহেব সহাস্যে দুলে দুলে বললেন,
~ নাড়ো আর তক্তি বানিয়েছি, গাছের নারকেল দিয়ে।
~ তুমি বানিয়েছ?

দীপ্ত অবাক হলো। মনু মিয়া গর্বিত ভাবে প্রকাশ করল,
~ হ্যাঁ, সাহেব। খুবই সহজ।
~ বাহ্, বেশ স্বাদ লাগছে।

মনু মিয়া উজ্জ্বল হাসলেন। আপ্লুত হলেন। সহাস্যে বললেন,
~ ধন্যবাদ সাহেব। তক্তিটা মুখে দিন।

দীপ্ত সহসা এক টুকরো তক্তি মুখে দিল,
~ ওয়াও, লা জবাব। এই আফিফ এই নে। হা কর।

~ তুই গেল। সারারাস্তা আমার মাথা খেয়েছিস। এখন পিঠা চাবা।
দীপ্ত নাড়ো মুখে দিতে দিতে বলল,
~ এই শুন, সারা রাস্তা আমায় হাঁটিয়ে এনেছিস। সকাল বেলা পিচঢালা ঝকঝকে রাস্তায় হাঁটার মজাই অন্যরকম। তোর এই অন্যরকম আনন্দের ঠেলায় আমি ক্লান্ত। খুবই ক্লান্ত ভাই।

আফিফ কিছু বলেনা। দীপ্তের বকবক শুনে। মনে হয় কতদিন সে এসব শুনেনি। তার ভালো লাগে শুনতে।
আফিফকে ঝাঁকি দিয়ে দীপ্ত বলে,
~ এই আফিফ, তোকে এসব কে শিখেযেছে রে?
~ নিশান্তিকা।

আফিফ আপন মনে বিরবির করে। নিশান্তিকার কথা ভাবে। কী করছে এখন সে? কেমন আছে? বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে। এই সময় নিশু থাকলে কতই না মজা হতো। পাগলিটা এখানে আসলে কত খুশি হয়। এক ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে তার প্রিয়তমের দ্বারে।
আফিফ চুপ দেখে দীপ্ত আবার ঝাঁকি দিয়ে উঁচু স্বরে বলে,
~ এই আফিফ, চেহারার কি হাল করেছিস।

আফিফ এরিয়ে যাওয়ার মত বলে,
~ দাদিমার মত কথা বলা বাদ দে তো।

~ আমি যদি জানতাম প্রেমে পড়লে তুই এমন কাহিল হয়ে যাবি, তাহলে কখনোই প্রেমে পরতে দিতাম নাহ্।
আফিফ আবার এরিয়া যাওয়া সুরে বলে,
~ তোর খাওয়া শেষ হলে এবার আমরা উঠি।

~ আরেকটু বসি প্লিজ। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। কতটা পথ হেঁটে এসেছি একবার ভাব।

আফিফ বিরক্ত প্রকাশ করে। এখনাে বসে থাকলে তার নিশান্তিকার কথা মনে পরবে। মায়ের কথা মনে পড়বে। খুব বেশি যন্ত্রণা হবে বুকে।
দীপ্তের কাঁধে হাত রাখে আফিফ। মিটমিট করে হেসে ওঠে। হাসি হাসি মুখে দীপ্তকে ইশারায় গেটের দিকে তাকাতে বলে।

গেট দিয়ে একটি সুশীলা মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তা দেখে দীপ্তের গলায় নাড়ো আটকে যায়। কাঁশকে থাকে খকখক করে।
মেয়েটি আশায় দীপ্ত খুব বিরক্ত হয়। কিছুতেই সে এখন আফিফের থেকে কাছ ছাড়া হবে না। কোনো বাহানায় নাহ, আফিফের কথাও শুনবে না। দীপ্ত মন স্থির করে, সে এখন আফিফকে নিয়ে এখান থেকে অন্যকোথাও চলে যাবে।


তেরো পর্ব

দীপ্তের কাঁধে হাত রাখে আফিফ। মিটমিট করে হেসে ওঠে। হাসি হাসি মুখে দীপ্তকে ইশারায় গেটের দিকে তাকাতে বলে।
গেট দিয়ে একটি সুশীলা মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তা দেখে দীপ্তের গলায় নাড়ো আটকে যায়। কাঁশকে থাকে খকখক করে।
মেয়েটি আসায় সে খুব বিরক্ত হয়।

কিছুতেই সে এখন আফিফের থেকে কাছ ছাড়া হবে না। কোনো বাহানায় নাহ, আফিফের কথাও শুনবে না। দীপ্ত মনস্থির করে, সে এখন আফিফকে নিয়ে এখান থেকে অন্যকোথাও চলে যাবে।

আফিফ বাঁকা ঠোঁটে হেসে দীপ্তের কাঁধে হাত রেখে বলে,
~ চল, এবার শান্তিতে বসে থাক।

আফিফ মিটমিট করে হাসতে থাকে। দীপ্তের চুপসানো মুখটা দেখতে তার ভালোই লাগে। দীপ্ত বিরক্ত প্রকাশ করে বলে,
~ ও এখানে কি করছে?

~ আমি কি জানি, তোর খোঁজেই এসেছে। আমায় কেন বলছিস!

মেয়েটি এগিয়ে এসে মিষ্টি হাসে। দীপ্ত মিনমিনিয়ে বসে থাকে। আফিফ সহাস্যে হাত নাড়িয়ে বলে,
~ হেই, হাই ইতু। হোয়াট’স অ্যাপ?

~ হ্যালো আফিফ। আই এম ফাইন।

আফিফ মুচকি হেসে দীপ্তের কাঁধে হাত রেখে বলে,
~ সো, মিস ইতু। ডাক্তারি রেখে হঠাৎ ফুলবাড়িতে পদার্পণ করলে যে?

ইতু অপ্রস্তুত হাসে। দাঁড়িয়ে থাকতে অসস্থি হয়। তবুও ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বলে,
~ আসলে, দীপু, আ দীপের সাথে কিছু বিষয়ে কথা ছিল।

আফিফ দু’বার কেশে ভাব নিয়ে বলে,
হুমম দীপু, ওয়াও দীপ। হোয়াট এ নেম। বাই দি ওয়ে, এখানে দীপু কে?

এই বলে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। ভাবটা এমন সে দীপু নামে কাউকে চিনে নাহ্।

দীপ্ত সহসা কঠিন হয়ে হাতের কনুই দিয়ে আফিফের পেটে গুতা দিলে, আফিফ হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে থাকে।

ইতু পাশে বসে দীপ্তের মুখের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল। দীপ্তের কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে চারপাশের হাসির শব্দে। রাগ হচ্ছে নিজের কর্মকাণ্ডে।
দীপ্ত রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, আফিফ।

দীপ্তের ধমক খেয়েও আফিফ হাসি থামায় না।

ইতুর হাত ধরে দীপ্ত হেঁটে চলছে পিচঢালা ঝকঝকে রাস্তায়। নিজের লজ্জা লুকাতে যখন সে ব্যার্থ হলো, তখন ইতুর হাত ধরে টেনে ফুলবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।

আফিফ চেঁচিয়ে বলে,
~ এই দীপু, এই দীপ, লাল গোলাপ ফুলটা নিয়ে যাহ্। কাজে লাগবে।
ইতু থামিয়ে বলে,

~ আরে আফিফ ডাকছে, ফুলটা নিয়ে আসো।
দীপ্ত আরো ক্ষেপে যায়।

~ চলো বলছি। আফিফকে পড়ে দেখছি আগে তোমায় দেখি নেই।

ইতু মনে মনে খুব খুশি হয়। কিন্তু বান্দর টা একবারও তার দিকে তাকাচ্ছে না। এত সুন্দর করে সে সেজে এসেছে। দেখবে বলেও দেখবে না, সে জানে। তবুও, দীপ্তের ভালোবাসার কাঙাল ইতু। একটু ভালোবাসলে কি হয়! এই ছেলের কাছে নাকি ভালোবাসার সময় নেই। ভালোবাসতে নাকি সময়ের প্রয়োজন হয়।
একটি খোলা মাঠের কোণে এসে দুজনে দাঁড়ায়।

~ এই এই ঋতুর বাচ্চা।

এই
ইতু সহসা মুখ গোমড়া ভাবে বলে,
ইতু, আমার নাম ইতু।

দীপ্ত চোখ গরম করে তাকায় এক নজর, ইতু মাথা নিচু করে নেয়। দীপ্ত এক ধমক দিয়ে বলে,
~ তোকে বলেছিলাম আফিফের সামনে হাজির হতে। বলেছিলাাম।

~ উহু, তুমি বলেছিলি,
~ তাহলে তুই কেন ফুলবাড়িতে গেলি। আফিফের সামনে ফাইলটা দিতে চাইছিলি তুই, বল। গাধি একটা।

দীপ্তের আরেক দফা ধমক খেয়ে ইতু একেবারে চুপ হয়ে যায়। মাথা নিচু করে রাখে। সে চায়নি ফুলবাড়ি যেতে। প্রথমে বাসায় গিয়েছিল, দাদিমা জোর করে ফুলবাড়িতে পাঠিয়ে দিল। বলল, ওখানে গেলে ভালো লাগবে, যাও। আর সে কি এতটাই বোকা, আফিফের সামনে সিক্রেট ফাইল ধরিয়ে দিত।
দীপ্ত হাত বাড়িয়ে বলে,

~ দে ফাইলটা দে আমায়।

ইতু ব্যাগ থেকে একটি নীল রঙের ফাইল এগিয়ে দেয়।
~ এটা কপি ফাইল।

দীপ্ত ফাইলটা ছোঁ মেরে নিয়ে বলে,
~ আসলটা কোথায়।

~ নিশান্তিকা আপুর কাছে।

~ হোয়াট? রিপোর্ট নিশান্তিকা সাবমিট করেছে?

~ হ্যাঁ, নিশু আপু করেছে। দাও, রিপোর্ট বুঝিয়প দেই।
~ নিশান্তিকা যেহেতু রিপোর্ট সাবমিট করেছে, আমি বুঝতে পারব। তোর মত গাধি নই।

ইতু ক্ষেপে যায় সহসা। তার কাজ নিয়ে কেউ কথা বললে বিরক্ত হয়। কিন্তু সে দীপ্তের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারবে না। করলেও দীপ্ত আমলে নেবে না, তাই অযথা এখন আর সে রাগ দেখায় না। ইতু কঠিন হয়ে বলে,
~ নিশু আপু শুধু রিপোর্ট সাবমিট করেনি।

~ মানে?
দীপ্ত অবাক হয়, চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে ইতুর দিকে।

~ হ্যাঁ, নিশান্তিকা আপু হসপিটালে গিয়েছিল, হেড হিসেবে জয়েন করেছে। সকালের ডেডবডি তার আন্ডারে।
~ বাহ্, এত দারুণ হয়েছে। নিশু আমায় জানায় নি কেন। ওয়েট ফোন দিচ্ছি।
~ পরে দিও তুমি। এখন আমার কথা শুনো।
দীপ্ত সহসা উঁচু স্বরে বলে,

~ তুই আবার কি বলবি।
ইতু সহসা উত্তেজিত হয়ে উঁচু স্বরে বলে,
~ মানে আমি ওই হসপিটালের একজন রেসপন্সিবল ডক্টর। এটা করা ঠিক হচ্ছে কি?
দীপ্ত চোখ পাকিয়ে নরম সুরে আদরে গলায় বলে,
~ তাহলে কি তুই আমার সাথে থাকবি নাহ্।
ইতু থমথমে খেয়ে যায়। নরম হয়ে বলে,
~ সে তো থাকবই, এমনি বললাম।

দীপ্ত সহসা হেসে ওঠে। নিজেকে বাহবা দেয়। কখন কোন মেডিসিন দিতে হয়, সে খুব ভালো করেই জানে।
এটা সকালের মেডিক্যাল রিপোর্ট। দীপ্ত মন দিয়ে ভেবে বলে, এখন কিছুটা মাথায় আসছে। সকালের মৃত্যুর কারণ এটা হতেই পারে না। আরো বিশেষ কিছু আছে, যা আমাদের নজরে পরছে না।

দীপ্ত ভাবছে প্রেম খুনি, সপটা প্রমাণ করে দিবে। আফিফ, নিশান্তিকার জবন থেকে প্রেমকে বহু দূরে নির্বাসন দিবে। সেই চেষ্টায় দীপ্ত উদ্যম। অন্যদিকে নিশান্তিকা আসল অপরাধীকে খোঁজার চেষ্টা করছে। সে বিশ্বাস করে না, প্রেম নিজের ভালোবাসার মানুষকে মেরে ফেলবে। প্রেমকে আগলে রেখে যে করেই হোক সে আসল সত্য সবার প্রকাশ্যে আনবে।

ইতু দূরে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে, তাদের প্রতিই যেন নজর। তবে ইতু আমলে নিল না। যে কেউ হতে পারে। সে দীপ্তের কথায় মনোযোগ দেয়।
~ কিন্তু দীপ, তুমি আফিফকে এসবের থেকে আড়ালে রাখছ কেন।

~ সেটা তোর বুঝার বয়স হয়নি।
দীপ, আমি একজন সফল গাইনোলজিস্ট। একজন ডাক্তার হয়ে গেছি, তুমি বলছ বয়স হয়নি।
~ হ্যাঁ, তো, নিশান্তিকার থেকে বড় ডক্টর তো হয়ে যাসনি। ভাবের ডিব্বা। হুহ্।

ইতু মনে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করে। অস্থির হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অদূরে দূটি ছায়ায় চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীপ্ত মোবাইল নিয়ে কি যেন করছে, আর ফাইলে চোখ বুলাচ্ছে। এমন একটা ভাব, যেন ডাক্তার ~ পুলিশের মত তদন্ত করছে।

নিশান্তিকা টেরেসের এক কোণে চেয়ারে বসে আছে। নেহাল বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে।

পশ্চিমা আকাশে গোধূলির আলোয় রাঙিয়ে নিয়েছে। নীল সাদা আকাশের রক্তিম বর্ণের গোটা গোটা রঙের মেলা বসেছে। সেই আলোয় শহরের আনাচে~ কানাচে ছেয়ে গেছে, রক্তিম বর্ণের রঙের মেলা বসেছে শহরে।
এ যেন এক শান্তির ছোঁয়ার শিহরণ। অনুভবের এক অন্যরূপ জাগরণ।

নিশান্তিকা গোধূলির আলোয় নিজেকে রাঙিয়ে আপন মনে আফিফের কথা ভাবছিল।

ছেলেটি তাকে পাগলের মত ভালোবাসে। সে বুঝেছিল সকালের মৃত্যুর দিন থেকে। কথা ছিল, এমনি এক গোধূলির বিকেলে পিচঢালা রাস্তায় দুজনে হাতে হত রেখে হাঁটবে, গোধূলির অপরপ্রান্তে কি আছে, তারা দেখতে যাবে। গোধূলির অপরপ্রান্তে এই রঙিন দুনিয়ার ঝলসানো রক্তিম আলোর ছায়া থাকে নাকি বিশাল এক অন্ধকারের পাহাড় থাকে। অথচ

এ দু দিন যতটা সম্ভব অদূরে থেকে পাশে থাকার চেষ্টা করেছে আফিফ। নিজের পরিবার মেনে আগলে রেখেছে। প্রেমের পাশে ভাইয়ের মতো থেকেছে।
সব থেকে বড় বিষয়, নিশান্তিকার ভালোবাসার প্রতি সে বিশ্বাস রেখেছে। প্রেমের পাশে থাকতে, খেয়াল রাখতে বলেছে, । বুঝিয়ে দিয়েছে, কাউকে ভালোবেসে তাকে পাওয়াটাই সব নয়, বিশ্বাস করে অন্যর ভালোর জন্য ছেড়ে দেওয়াটা ভালোবাসার বিশাল এক ত্যাগ।

নেহাল বল খেলায় মত্ত ছিল। হটাৎ প্রেমের কথা জানতে চাইল। নিশান্তিকা অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সে ভাবেই নি, প্রেম কোথায় যে গেল!
আবার সকালের বাড়িতে যাইনি তো, তাহলে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে। নিশান্তিকা ঘাবড়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তখন প্রেমকে আটকানো উচিত ছিল।
নিশান্তিকা আবার বসে পড়ে, দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে চারপাশ,
~ উফফ্ প্রেম কোথায় তুমি!


পর্ব _১৪

সন্ধ্যা নেমেছে শহরে প্রায়। গোধূলির শেষ বেলা। আকাশে রক্তিম বর্ণের ছায়াপথের মেলা মিলেছে।
আফিফ গেট দিয়ে প্রবেশ করার পথে বাগানের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়।

আফিফের হাতে কিছু ফুলের টব ছিল, ভৃত্য এসে টবগুলো নিয়ে বাগানের এক কোণে নিয়ে রাখে।
আফিফ বলে দেয় গাড়িতে আরো কিছু টব আছে।

আফিফ হেঁটে এসে বাগানের মাঝে একটি চেয়ার টেনে বসে। মুখে তার গম্ভীর ভাব। সে প্রথমেই লক্ষ্য করেছে দাদিমাসহ নিশু আর নেহাল বসে ছিল।
~ আয় দাদুভাই, ।

আনোয়ারা বেগম মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন আফিফের।
~ কেমন কাটালে সময়?
~ ভালো দাদিমা।
~ এখন ভালো লাগছে!

~ হুমম
আফিফ মাথা নেড়ে হুমম বলে। আনোয়ারা বেগম লম্বা এক নিঃশ্বাস নেয়। নাতির ভালো থাকায় সেও খুশি।
নিশান্তিকা চুপিসারে বসে ছিল, কথা বলার স্পেসিফিক কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। তবে, তার মনে হাজার কথার আনাগোনা। যা সে ব্যক্ত করার জন্য ভিতরে ভিতরে ছটফট করছে।
আনোয়ারা বেগম নেহালকে কাছে টেনে বলল,
~ দাদুভাই, নিশুরা এসেছে কিছুক্ষণ হলো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আফিফ চোখ পিটপিট করে নিশান্তিকার দিকে তাকায়। ধূসর রঙের লং থ্রি~ পিস পরেছে আজ। বা~ পাশে কালো রঙের উড়না টানানো। একপাশে চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। চোখে গাঢ় কাজল। ঠোঁট জুড়া গোলাপি রঙের দেখাচ্ছে। চোখ মুখে এক অস্থির লজ্জা ভাব। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে আবার নীচে নামিয়ে রাখে।
আফিফ মুচকি হাসল। প্রয়িতমার দর্শন পেয়ে মন প্রফুল্ল হলো। আনোয়ারা বেগম দুবার কেঁশে ওঠলেন। দুজনেই একটু নড়েচড়ে বসল। নিশু কানের নিচে চুলগুলো গুজে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। আফিফ আবারও গম্ভীর মুখে বসে রইল।
দাদিমা নেহালকে নিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন।

~ দাদুভাই, তোমরা কথা বল। ছোট দাদুভাই চলো আমরা ভিতরে যাই।
~ ভিতরে কেন যাব আমরা।

~ কারণ, সন্ধ্যা নামছে৷ চারপাশে অন্ধকার হবে, এরপর ভূত আসবে।

নেহাল জড়োসড়ো হয়ে আনোয়ারা বেগমের হাত ধরে ভিতরে চলে গেল। ভূতে তার ভিষণ ভয়। এর চেয়ে ভালো ভিতরে গিয়ে হালুয়া খাওয়া।
আফিফ উঠে দাঁড়িয়ে বাগানের একপাশে বেঞ্চের কোণে বসল। পিছনে হালকা ঝুঁকে পা দুটো নীচের দূর্বা ঘাসের ওপর এলিয়ে দিল।
নিশান্তিকা কথা বলার প্রস্তুতি নিয়ে, একটি শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে আফিফের পাশে গিয়ে বসল।
ব্যাগটি এগিয়ে দিয়ে নরম সুরে বলল~ এটা তোমার জন্য।

আফিফ ক্ষানিক হেসে ব্যাগটা নিয়ে প্রতিত্তোরে বলল,
~ কেমন আছো?
~ ভালো
~ হঠাৎ, এ বিকেলে এখানে?

নিশান্তিকা কথা বলতে দ্বিধাবোধ করল এখন। গলা আটকে আসল। কি বলবে সে? প্রেম বাসায় নেই, একপ্রকার প্রেমকে খুঁজতে বেরনোই ছিল তার উদ্দেশ্য। হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসে পৌঁছেছে।

তবুও যা সত্য সেটা সাহস করে বলতেই হবে। অনন্ত মিথ্যার আশ্রয় নিবে না সে। আফিফ নিশ্চয় সাহায্য করতে পারবে। প্রেমকে খুঁজে পাওয়া ভিষণ জরুরি এখন।
আচমকা আফিফ এক হাত শক্ত করে ধরে নিশান্তিকার।

~ বুঝতে পারছি, বসে বসে কারণ খুঁজছ, পাচ্ছনা। কারণ আমার কাছে আসতে তোমার কারণের দরকার হয় না। ভালোবাসো তাই।
নিশান্তিকার দু চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। তাকে এক নজর দেখার জন্য সারাক্ষণ ছটফট করেছে সে।
আফিফ কোমল সুরে আবার বলে,

~ ভালোবাসায় কোনো স্পেসিফিক কারণ থাকতে নেই। কিন্তু তুমি আমার কাছে আসতে গিফট দেওয়ার বাহানা খুঁজছ।
নিশু অবাক হয় এ কথায়। কি বুঝাতে চায় সে, আমি তাকে ভালোবাসো বলে মোহ দেখাচ্ছি। এত ঠুকনো ভাবনা সে ভাবছে। নিশান্তিকার অভিমান হলো। নিশান্তিকা নিজ ইচ্ছায় তো কাছে এসে বলেনি, ভালোবাসো। সে তাকে ভালোবাসতে আহ্বান করেছে।

নিশান্তিকার মাঝে রাগ হয়, ভিষণ। একপ্রকার দুঃখ ও হয়। কেন সে এখানে আসতে গেল! সেই ভেবে আফসোস করে, এখানে না আসলে আফিফের এসব কথা হয়ত তার শুনতে হত না।

~ কি ভাবছ?
~ তুমি কি বলতে চাচ্ছ, তোমাকে দেখার জন্য আমি বাহানা খুজব। এমনটা কখনোই হবে না।
~ আমি জানি। তুমি খুঁজবে না।

~ হ্যাঁ, খুঁজব না। আমি তোমায় ভালোবাসি। যখন খুশি তখন আসব।

~ বারন করলেও আসবে।
~ হ্যাঁ অবশ্যই। তোমার মুখের বারন আমি কেন শুনব। যেখানে আমি আমার মনের বারন শুনছি নাহ।

আফিফ প্রশান্তি হাসে। নিশান্তিকা গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। ভালোবাসি বলে কি, সে আজ বেহায়ার মত কথা শুনাবে। তবে, কেন সে ভালোবাসা শিখালো।
আফিফ মুচকি হেসে নিশান্তিকার মাথা নিজ কাঁধে রাখে। শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে। নিশান্তিকার গলা পাকিয়ে আসে কান্নায়।
~ তোমাকে ভালোবাসার যোগ্য না আমি, তবুও ভালোবাসি। কেন এমন করো আমার সঙ্গে।

~ আমি দুঃখিত নিশু। সেদিনের ব্যবহারের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আমি তোমাকে ভালোবাসি এ কথা মিথ্যে নয় যদিও
নিশান্তিকা মাথা তুলে ঠায় বসে থাকে। আফিফকে বুঝার অনুভব করে। আফিফ কি বলছে এসব। আফিফ একদিন তাকেই বলেছিল, যদি দুজনের মাঝে একজন ভুল করে, তবে সে ভুল অন্যজনের ধরতে নেই। ভালোবেসে মেনে নিতে নয়। রাগ, অভিমান বাড়াতে নেই। যতবার পারো বলো, ভালোবাসি। ভালোবাসায় কোনো ক্লান্তি রেখো না। মনের মত তাকে মানিয়ে নেও।
~ নিশু।

~ হুমমম
~ তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুমি নিজ দায়িত্বে পরিস্থিতি সামলে ওঠ। আমি তোমার পাশে সব সময় থাকতাম। কিন্তু তুমি সেদিন যা আবদার করেছিলে, সেটা মানলে প্রেমের প্রতি অন্যায় হত।

নিশান্তিকা কিছু বলে না। আফিফ আবার নিশান্তিকার মাথা কাঁধে মিশিয়ে রাখে।
~ তুমি পারবে তো?

~ জানি না।
~ প্রেমের পাশে এখন তোমাকে প্রয়োজন।
~ জানি, তাই তুমি দূরে ঢেলে দিয়েছ।

আফিফ মুচকি হেসে চুপ করে বসে থাকে। নিশান্তিকাকে অনুভব করে। হৃদয়ের মাঝে প্রশান্তি খুঁজে পায়। মনে হয়, কত জনম বাদে সে নিজেকে সুখী অনুভব করছে।

~ নিশু
~ হুমম
~ কিছু বলবে আমায়।
~ হ্যাঁ
~ বলো।

~ তোমার দেখা পাই না, কত ঘন্টা হয়েছে, গুনেছ? আমি গুনেছি!
আফিফের মনে বিষন্ন ভাব আসে। নিশুকে সে যে অনেক বেশি মনে করেছে, সেটা যে নিশু জানে নাহ্। যদি জানত, তবে ভালোবাসায় কোনো মান, অভিমান থাকত না।

~ নিশু
~ হুমম
~ আমি সারাদিন ফুল বাড়িতে ছিলাম। আজ মায়ের মৃত্যু বার্ষিকি ছিল।

নিশান্তিকা শীতল হয়ে লেপ্টে থাকে আফিফের বুকে। আফিফের কথায় সে থমকে যায়। আজ আফিফের মায়ের মৃত্যু বার্ষিক, আর সেটা তাকে জানালো না। একবার! সে কি পারত না ফুলবাড়ি যেতে, তাও আজকের দিনে।

নিশান্তিকা ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে ফিরে হাঁটে। আফিফ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, নিশু, কি হলো।
~ তুমি আমায় একবারও জানালে না। এখন শেষে সন্ধ্যায় বলছ।

~ না, আসলে আমি চাই নি এসবের মাঝে তুমি
~ হ্যাঁ, আমি তো তোমার কেউ না। তোমার কষ্টে আমার কি আসে যায়। তোমার কষ্ট দেখতে তো আমার খুব খুশি লাগে।
নিশান্তিকার চাপা কান্না বেরিয়ে আসে সহসা। কথা বলতে পারেনা। আফিফ এসে নিশুকে বুকে জড়িয়ে নেয়। আফিফকে ঝাপটে ধরে নিশান্তিকা কেঁদে ওঠে।
~ বোকা মেয়ে, সামনে বছর তোমায় ঠিক নিয়ে যাব। কাঁদে না।

~ তুমি আমায় সব সময় মিথ্যে আশ্বাস দাও। আমার খুব ক্লান্ত লাগে মাঝে মাঝে।

আফিফের চোখে জল ভরে আসে। এমন দিন সে দেখতে চায় নি। এমনটা কেন হলো তার সাথে ! আজ তাদের বিয়ের দুদিন, অথচ একে অপরের কত দূরে তারা। তার ভাগ্য কি সুখের ছোঁয়া আসবে না কখনো। নিশান্তিকাকে নিয়ে ভালোবাসার ছোট্ট একটি ঘর বাঁধার স্বপ্ন কি তবে স্বপ্নই থেকে যাবে। এ ভাবেই কি তবে মনের দূরত্ব বাড়তে থাকবে।

বড় ভয় হচ্ছে মনে। সেদিন কি সে একটু স্বার্থপর হলে খুব খারাপ হতো। নিশান্তিকারও আবদার পূর্ণ হতো। এ বাড়ির বউ সেজে গুজে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াত তার সামনে দিয়ে। সুখী সংসার হতো। কেন সে স্বার্থপর হলো না!

আচ্ছা, স্বার্থপর হলেই কি কালো ছায়া দূর হতো। প্রেম কি তাদের জীবনে ফিরে আসত না। আর সেদিন কীভাবে সে প্রেমকে ছন্নছাড়া ছেড়ে দিত একা রাস্তায়। নিশান্তিকাকে যে তখন প্রেমের খুব দরকার ছিল।

সকালের মৃত্যুতে প্রেম গভীর শোক পেয়েছে, গভীর দুঃখের মাঝে প্রেম নিশুকে জড়িয়ে নিয়েছে, ছায়া খুঁজেছে, সেটা যে আফিফ নিজ চোখে দেখেছে। এরপরও প্রেমের থেকে নিশুকে সে কীভাবে আলাদা করত। যেটা উচিত ভেবেছে, সেটাই করেছে সে। প্রেম সামলে ওঠলে নিশান্তিকা তার একদিন হয়ে যাবে। এটা তার বিশ্বাস, সেদিনের অপেক্ষায় সে থাকবে।

পর্ব _১৫

সন্ধ্যা নেমেছে শহরে,
অন্ধকার গাঢ় হয়ে অন্ধকারের শহরে চারপাশ বুকে জড়িয়ে নিয়েছে। পিচঢালা রাস্তা, পাশে দাঁড়ানো ল্যামপোস্টের ক্ষীণ আলো।
আফিফের হাতে হাত রেখে নিশান্তিকা আপন মনে হেঁটে চলছে, নিশান্তিকার বাড়ির পথে।

নেহালকে প্রেম এসে নিয়ে গিয়েছে। প্রেম সম্ভবত হসপিটালে গিয়েছিল, সকালের মৃত্যুর খবর জানতে, এটা নিশান্তিকার ধারণা।
~ নিশু,

নিশান্তিকা ঘেঁষে দাঁড়ায় আফিফের, মাথা তুলে অন্ধকারে আফিফের মুখের দিকে তাকিয়ে চেয়ে দেখে।
~ হুমমম বলো,

আফিফ হাতটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। কিছু সময় চুপ থেকে হাঁটার সময় সহসা বলে ওঠে,
~ আমাদের এখনো বাসর হয়নি!

নিশান্তিকা অন্ধকারে মাঝেও লজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। হাত পা শক্ত হয়ে আসে।

ঘটনাক্রমে সেদিন আফিফের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলেও, তাদের বাসর এখনো হয়নি। এটা মনে করা যতটা না লজ্জাকর ছিল, তার থেকেও বেশি লজ্জা পেল আফিফের কথায়।

বিয়েটা হলো ঠিকই, অথচ দুজন ব্যতিত কেউ জানে না। নিশান্তিকা খুশিতে কত উত্তেজিত হয়ে ভেবেছিল, কখন প্রেমকে বলবে, আজ সেও প্রিয় মানুষকে আপন করে পেয়েছে।
দুঃখজনক হলেও মানতে হয়েছে, এসেই দাঁড়াতে হয়েছে সকালের মৃতদেহের সামনে!

~ নিশু,
~ হুমম
নিশান্তিকা প্রথমে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল, আফিফের ডাকে তড়িঘড়ি করে আবার হাঁটতে থাকে।
~ নিশু, আমি জানি। তুমি লজ্জা পাচ্ছ। তুমি লজ্জা পেলে খুব মায়াবতী লাগে।

আফিফের কথায় নিশান্তিকা দাঁড়িয়ে যায়। কষ্ট ভরা মনে আফিফের দিকে চেয়ে দেখে। বুকের মাঝে ধরফর করে ওঠে। ভাবে, তার জন্য নিষ্পাপ মানুষটি কষ্ট ভোগ করছে।

ল্যামপোস্টের ক্ষীণ আলোয় নিশান্তিকার বেদনাভরা, বিষন্ন চাহনি দেখে আফিফের মনে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। নিজের প্রতি বিরক্ত হয়। এ মুহূর্তে কেন সে এমন কথা বলল। এতে করে নিশান্তিকা দূর্বল হয়ে যেতে পারে, নিজের লক্ষ্য স্থির রাখতে হবে তাকে।
~ নিশু, তুমি ঠিক আছো। আমি কিন্তু তোমায় কথাটি এমনি বলেছি। তুমি চাপ নিও না।
নিশান্তিকা সহসা উঁচু স্বরে বলে,
~ আফিফ, আমি তোমায় খুব কষ্ট দিয়েছি, তাই না। খুব বিরক্ত করেছি তোমার জীবনে এসে।

আফিফ ফিক করে হেসে ওঠে। কি বোকা বোকা কথা বলছে নিশান্তিকা!
~ কি হলো, হাসছ কেন। বলো, আমি তোমায় কষ্ট দিয়েছি তাই না।

আফিফ মুচকি হাসে, চেষ্টা করে বুকের মাঝে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাওয়ার, কারণ ভালোবাসার মানুষ কাছে থেকেও দূরে, এর চেয়ে যন্ত্রনা আফিফ এর আগে কখনো পায় নি।

~ বোকা মেয়ে, কি সব বলছ তুমি। আমি তোমায় পেয়ে খুব খুশি।
নিশান্তিকা সহসা বলে ওঠে,

~ আমি জানি। আমি জানি তোমার কষ্ট হয়। ভালোবাসার মানুষ কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ। কবুল মেনে বিয়ে করা বউকে হারানোর এক ভয়ের যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে। আমি বুঝতে শিখেছি এখন আফিফ। তুমি কতটা যন্ত্রণাময় মুহূর্ত কাটাচ্ছ। আমার জীবনের সাথে লড়ে যাচ্ছ তুমি, সঙ্গী হয়ে সব সময় পাশে আছো। অথচ সেই আমি, তোমার কপালের ঘামটুকু মুচে দেয়ার সময় পাশে থাকি না। তুমি এ জীবন ডিজার্ভ করো না।
~ নিশু, আমার কথা শুনো।

~ আমি জানি তুমি কি বলবে আফিফ। বলবে যে তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী চলছ তুমি। কিন্তু আমি,
~ নিশু, আমি তোমায় ভালোবাসি। বিশ্বাস করি, ভরসা রাখি। আমি এটাও জানি, তুমি আমায় হাজারও প্রতিকুলের মাঝে দূরে ঢেলে দিবে না। আমি ব্যতিত তুমি যেমন অপূর্ণ, তেমনি তুমি ব্যতিতও যে আমি অপূর্ণ। এখন এসব ভুলভাল কথা বলা বন্ধ করো, বোকা মেয়ে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
~ ঠিক হবে? প্রেম কি স্বাভাবিক হতে পারব বল না।

আফিফ বুকের মাঝে জড়িয়ে নেয় নিশান্তিকাকে।

~ ইনশাআল্লাহ হবে। এখন আমাদের প্রেমের পাশে দাঁড়ানো খুব প্রয়োজন।

~ আমি আর প্রমের কষ্ট দেখতে পারছি না। সব কিছু তছনছ করে দিল প্রেমের মৃত্যুতে।
~ একদিন সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ভরসা রাখো নিয়তির উপর।
আফিফের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে ভাবে নিশান্তিকা।

প্রেম নিজেকে সামলে নিচ্ছে একটু একটু করে। জীবন থেমে যাওয়ার নয়। থমকে দাঁড়ালেই দুনিয়া থেমে যায় না। সময় বয়ে চলে, আর সময়ের সঙ্গে চারপাশে চলাচল থেকেই যায়। একই সময় কত বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে যায় পৃথিবীর বুকে।

একটা সময় সকাল হয়। ভোরের আলো নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। প্রশান্তির রাত শেষে জেগে ওঠে শুভ্র সকাল। সময়ের কাঁটা বাড়তে বাড়তে মানুষের কোলাহল বাড়ে পিচঢালা রাস্তায়। ভর দুপুরে ছুটে চলে নিজ নিজ গন্তব্যে, জীবম বাঁচানোর তাগিদে।

একটা সময় সন্ধ্যা নামে, অন্ধকার ঘিরে ধরে চারপাশে। তবুও শহরে কোলাহলের শেষ থাকে না। রাত ক্রমশ গভীর হয়। সকলে প্রশান্তিরর নিদ্রায় ডুবে যায়।
এভাবেই প্রেমকে মানিয়ে নিতে হবে পৃথিবীর বুকে। গ্রহণ করতে হবে নিজের নিয়তিকে। সাদরে আগলে নিতে হবে বুকের জমানো কষ্ট। কারণ, এ কষ্ট যে নিজের, নিজের ভিতরের। অন্যর উপর এ কষ্ট না বর্তিত যায় আর না ভাগ করে নেওয়া যায়। যাই থাকে, সবটা নিজেরই থাকে।

অনেক সময় হলো, এ জীবন নিয়ে সে দোটানায় ভুগছে। আর নয়, এবার তাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সকাালের খুনিকে সঠিক শাস্তি দিতে হবে।

পর্ব _১৬

সুখপাখি ভবন,
ভোরের সময়। দু~ বার কলিং বেল বেজে ওঠল।

নিশান্তিকা মাত্রই ফ্রেশ হয়ে নীচে নেমেছে। গতরাতে প্রেমের সঙ্গে হাজারো কথা বলার চেষ্টা করেও পারেনি, প্রেম একবারও মুখ খুলেনি।
শেষমেশ নিশান্তিকা নিজেই বিরক্ত হয়ে নেহালকে নিজের কাছে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

কলিং বেলের শব্দ শুনে নিশান্তিকা আরো বিরক্ত হলো। এত সকালে কে আসতে পারে?
একমাত্র প্রেমই আসত যখন তখন। কিন্তু প্রেম তো এখন এ বাসাতেই আছে।

নিশান্তিকা ডোর খুলে দেখল, অপরিচিত এক মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।

নিশান্তিকা একটু চমকেই ওঠল। অপরিচিত কাউকে সে সহ্যই করতে পারে নাহ।
নিশান্তিকাকে দেখা মাত্রই যেন মহিলার ফ্যাকাসে মুখে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা দিল।
~ কে আপনি?

~ ভিতরে আসতে পারি মা, তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা ছিল।
~ আমার সঙ্গে আপনার কিসের কথা?

~ তুমি নিশান্তিকা, তাই না?

নিশান্তিকা অবাক হয়ে শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। আশ্চর্য, মহিলা তাকে চেনে অথচ
মধ্যবয়সী মহিলাটি এক দীর্ঘ দম নিয়ে বললেন,
~ আমি সকালের জন্মদাত্রী জননী।

নিশান্তিকার পিলে চমকে ওঠল। সকালের মা! তার কাছে এসেছে কি কারণে? আমার সাথে এনার কি এমন কথা যার মাঝে এত উৎকন্ঠা!
~ নিশু কে এসেছে?

প্রেমের কথা শুনেই নিশান্তিকা ডোর চাপিয়ে দেয়। ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে তাকায়।
~ কেউ না, তুমি এত জলদি নীচে এসেছ?

~ হ্যাঁ, আসলে ভেবেছি একটু হাঁটতে যাব বাহিরে।

প্রেমের কথায় নিশান্তিকা এবার বিরক্ত না হয়ে ভয় পেল। বাহিরে যাওয়ার সময় সকালের মাকে দেখতে পেলে, যদি কোনো অঘটন! প্রেমকে সে কারো সামনে আসতে দিবে না। সকালের মায়ের সামনে তো নয়ই, সকালের মা৷ কেন এসেছে সে জানে না। কিন্তু প্রেমের সামনেও পরতে দেওয়া যাবে নাহ্। তাই রাগি স্বরে প্রেমকে ধমকালো।

~ প্রেম, পাগলের মত প্রলাপ বকো না। তুমি এখনো সিক। যাও উপরে আর চুপচাপ রেস্ট নিবে। গতকাল না বলে চলে গেছ কিছু বলিনি, আজ কিন্তু
প্রেম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবে তখনি নিশান্তিকা ধমকে ওঠে,
~ যাও উপরে, নেহালের ঘুম ভেঙে যাবে।

প্রেম আর কথা না বাড়িয়ে উপরে চলে গেল। নিশান্তিকা সকালের মাকে ভিতরে এনে শোফায় বসালো। খুব নীচু সুরে কথা বলতে চাইল তার সাথে যাদে উপরে কেউ শুনতে না পায়।

~ আপনি বসুন। আপনি এখানে কেন এসেছেন?
আমার কথা বলা আছে তোমার সাথে।

নিশান্তিকা সহসা উঁচু স্বরে বলে ওঠে,
~ আপনার আসল পরিচয় বলুন
~ আমার নাম সায়রা খাতুন। সকাল আমার মেয়ে। মেয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পেরে আমি আর থাকতে পারলাম নাহ্।

সকালের মা কথা বলার সময় চাপা গলায় কুঁকড়ে ওঠলেন। চোখের জল মুছে আবার বললেন,
~ তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে মা। সকালের মৃত্যুর খবর পেয়েই আমি একদিন আগে বিদেশ থেকে ফিরলাম।
নিশান্তিকা নিচু স্বরে বলল,
~ আমায় আপনার কি প্রয়োজন।

~ এসেই খোঁজ~ খবরে জানতে পারলাম, সেদিন সকালের বিয়ে হওয়ার ছিল, আর সেদিনই আমার মেয়েটা এভাবে পৃথিবী ত্যাগ করবে আমি ভাবতেও পারিনি।
সায়রা খাতুন আবারো চাপা স্বরে কাঁদতে থাকেন। নিশান্তিকা বেশ বিপদে পড়ে যায়। না পারছে বলতে আর না পারছে সহ্য করতে। প্রেম যদি আবার নিচে নামে!
~ আন্টি শান্ত হোন। সকালের মৃত্যুতে আমরা সকলে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

~ দোষটা আমারই, মেয়েটা আমারই জন্য আজ পৃথিবীতে বাঁচতে পারল নাহ্।

নিশান্তিকা চুপিচুপি মহিলার কথা শুনে যায়। এই মুহূর্তে সে কি বা করতে পারে, ফ্যাক নয়ত। মাথা কাজ করছে না নিশান্তিকার। এ সব ন্যাকামি নয়ত!উফফ্
প্রেম নিচে নামলেই ভালো হবে।

~ মামুনি, তোমার কাছে আমি কেন এসেছি, জানো।
~ হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন।

~ তোমার আর প্রেমের সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। আমার মেয়ে সকাল এমনি মরেনি, খুন হয়েছে।
নিশান্তিকার যেন দম আটকে আসল সায়রা খাতুনের কথায়। উত্তেজনায় শিরা উপশিরায় রক্ত টগবগিয়ে ছুটছে,
~ কি কি বলছেন এসব আন্টি!
~ হ্যাঁ, আমি সঠিক বলছি।

নিশান্তিকা কোনোভাবে নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না। সায়রা খাতুন যেন তা বুঝতে পারল।
~ শান্ত হও মা, আমি তোমার ক্ষতি চাই না। তুমি শুধু আমার কথা মন দিয়ে শুনো।

নিশান্তিকা শুধু মৃদু হাসল। ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে থাকলো। কি বলবে তিনি। এমন কিছু নয়ত যা শুনার জন্য নিশান্তিকা অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে। কিন্তু তাকে যে এখন শান্ত থাকতেই হবে।

র কাছে ব্যাক্ত করে। নিশান্তিকা শুধু চুপিচুপি শুনে যায়, আর মাথা নাড়ে। কিছুটা বুঝতে পারে৷ ইনি আসলেই সকালের জন্মদাত্রী মা। সায়রা খাতুন তাদের একটি ফ্যামিলি ফটো, আর সকালের ছোট বড় হওয়ার ফটো দেখালো।
~ আসলে, তোমায় আমি শুরু থেকে বলছি, আমার সঙ্গে সকাল~ সন্ধ্যার বাবার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। আমরা সুখী দম্পতি ছিলাম নাহ্। যার কারণে আমাদের বিচ্ছেদ হয়।

নিশান্তিকা একটু চমকে ওঠল, সহসা আলে ওঠল,
~ আপনি এখনি কি বললেন? সকাল~ সন্ধ্যা! সন্ধ্যা কে?

~ সন্ধ্যা আমার আরেকটা মেয়ে, সম্পর্কে সকালের আপন বোন হয়।
~ ওহ আচ্ছা।

~ সন্ধ্যা আমার সঙ্গে থাকে। ছোট থেকে। বিচ্ছেদের সময় সকাল ওর বাবার সঙ্গে থেকে যায়। বাবাকে ও খুব ভালোবাসত।
সায়রা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে, সন্ধ্যার পিক দেখালেন।
~ সকাল~ সন্ধ্যা জমজ বোন। আমার জমজ মেয়ে।

নিশান্তিকার শরীরে হিম শীতল হাওয়া বয়ে গেল। হুবহু এক চেহারার গঠন, তবে একটু বেশি স্মার্ট। সকালের চেহারার মত আরেকটা মেয়ে জীবত আছে, এটা যদি প্রেম জানতে পারে!

পর্ব _১৭

~ সন্ধ্যা এখন কোথায় আছে আন্টি?

সায়রা খাতুন একটু অবাক হলেন নিশান্তিকাকে উদ্বীগ্ন দেখতে পেয়ে।
~ সন্ধ্যা আমার সঙ্গে এসেছে দেশে। ও এখন হোটেলে আছে।
নিশান্তিকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

~ আন্টি একটা কথা বলি, হাইপার হবেন না। সিরিয়াসলি নিবেন বিষয়টা।
~ কি এমন কথা নিশান্তিকা?
আন্টি, সকাল কারো শিকারী হয়েছে এ বিষয়ে আমিও জানি। আমার মনে হচ্ছে, সন্ধ্যার জীবনেও ঝুঁকি আছে। আপনি সন্ধ্যাকে হোটেল থেকে বের হতে বারণ করবেন। সব সময় চোখে চোখে রাখবেন।

সায়রা খাতুন নির্বাক চেয়ে আছে নিশান্তিকার দিকে। নিশান্তিকা এক টানে কথা গুলো বলে লম্বা দম নিল। এখন হালকা লাগছে কথাগুলো বলে।
তুমি এসব কি বলছ?
নিশান্তিকা আবার বুঝিয়ে বলে,

~ আন্টি আপনি এক মেয়েকে হারিয়েছেন বলে দুঃখ, দ্বিতীয় মেয়েকে মৃত্যুসজ্জায় না দেখতে চাইলে, প্লিজ আমার কথা মানুন।
সায়রা খাতুন মলিন মুখে বসে থাকে।

আন্টি, আপনি দুঃখ পাবেন না। সকালের মৃত্যুর সঠিক খুনিকে আমি খুঁজে বের করব। সকালের পোস্টমটম আমি করেছি। কিছু তথ্য আর প্রমাণ আমার হাতে আছে।
সায়রা খাতুন ডুকরে কেঁদে ওঠলেন।

~ আমি আমার মেয়েটাকে শেষ দেখাও দেখতে পারলাম নাহ।
দেখতে পারবেন আন্টি, ভরসা রাখুন।

সায়রা খাতুন চোখের জল মুছে অবাক নয়নে নিশান্তিকার দিকে চেয়ে থাকে। মেয়েটি তাকে কতটা বিশ্বাস করেছে, সহজেই। তিনি এবার নিজেকে শান্ত করে, কিছু কথা বলল, যা শুনে নিশান্তিকার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।
সায়রা খাতুনকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখতে পারল না নিশান্তিকা। প্রেম যেকোনো সময় নিচে আসতে পারে। তাকে বিদায় দিয়ে নিশান্তিকা ট্রে নিয়ে ওপরের রুমে চলে গেলো।

প্রেম ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল, নিশান্তিকা ছোট করে ডাক দিল,
প্রেম

~ হ্যাঁ, এসেছ তুমি। এতক্ষণ লাগে আসতে। দেখো নেহাল ওয়াশরুমে আছে।
~ তুমি জাগিয়েছ?

~ নো, নিজেই জেগেছে কিছুক্ষণ হলো। হি ইজ স্টিল গুড ম্যান।
হ্যাঁ, দেখতে হবে তো কার ভাই!

প্রেম হাসলো। তবে জিগ্যেস করল না, কার ভাই বলতে কাকে বুঝাল, প্রেম নাকি নিশান্তিকা?
(এটার উত্তর পাঠকরাই দিবে নাহয়)

নিশান্তিকা টেবিলের উপর নেহালের দুধের গ্লাস রাখল, প্রেমের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
~ নিজের কাজ এখন নিজেই করতে শিখেছে। তোমার কফি।

~ নেহাল বড় হচ্ছে। তাছাড়া, তুমি নেহালকে সময় দিচ্ছ কোথায়। সারাদিন তো হসপিটালেই ঘেঁষে থাকো।

নিশান্তিকা শুধু প্রতিত্তোরে মৃদু হাসল। প্রেম খুব স্বাভাবিক হয়ে কথা বলছে এখন। নিশান্তিকা যদিও অবাক কম হচ্ছে, কারণ সে দেখেছে, গতদিন থেকে প্রেম অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে চলাফেরা করছে।

প্রেম আর নিশান্তিকা দো~ তালার ছাদে এসে বসল।
~ প্রেম, একটা কথা জিগ্যেস করব।

~ হ্যাঁ, একটা কেন, আরো বেশি করো।
~ না একটাই করব।

~ সকালের কোনো বোন আছে তোমার জানা মতে।
~ হ্যাঁ, আছে তো।

নিশান্তিকা চমকালো, তবে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন করল,
~ ওহ আচ্ছা। তুমি সব জানো তবে, সকাল বলেছে?
~ এটা আরেকটা প্রশ্ন হয়ে গেল।

নিশান্তিকা হাসল। প্রেমও মৃদু হাসল।

~ আচ্ছা, তবে আরেকটা করলাম। তুমি শুধু উত্তর দাও।
~ ওকে, উহু, সকাল বলেনি।

~ তাহলে,
প্রেম হেসে বলল, শুনবে তুমি?

~ হ্যাঁ, বলো। জানার জন্যই তো জিগ্যেস করেছি।
~ ফেসবুক একাউন্ট থেকে প্রথমে জেনেছি। আইডি রিম্যামবারিং করার সময়।
~ তারপর?

~ তারপর, গতকাল দুপুরের পর যখন বের হলাম। তখন সামনা সামনি দেখেছি।
~ হোয়াট! তুমি রিয়াক্ট করো নি।

~ সেই ঘটনা আজ নয়, অন্যদিন বলব। এখন প্রেসার দিও না, আর নিও না। বুঝলে।
নিশান্তিকা মাথা ঝুলালো।
~ হুমম, আচ্ছা।

নিশান্তিকা উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে ওঠল,
~ এই, তুমি কি বললে!

প্রেম তো অবাক~ কি কি বললাম।
~ একটু আগে বললে?
~ কি বলেছি?

~ আরে, বোকা। একটু আগে বললে না যে সকালের আইডি রিম্যামবারিং করেছ।
~ হ্যাঁ, তো। এত খুশি হওয়ার
~ তারমানে তুমি পাসওয়ার্ড জানো।

~ হ্যাঁ, দিয়েছিল সকাল। কখনো কাজে লাগেনি। ওর মৃত্যুর পর লাগলো।
~ এখন কাজে লাগবে, খুব কাজে লাগবে।

~ মানে, কি কাজে?
~ তুমি আমায় আগে কেন বলোনি। সকালের ফেবু আইডির পাসওয়ার্ড আছে!
~ বললে কি হতো।

~ বোকা ছেলে৷, ম্যাসেন্জার অন করো। তারপর বলছি, আই থিঙ্ক আমরা কোনো বিশেষ তথ্য পেতে পারি।
প্রেম হাবলার মত চেয়ে রইল নিশান্তিকার দিকে।

~ এই প্রেম, করো কুয়েকলি।

~ কিন্তু নিশান্তিকা, এটা কীভাবে করি। সকালের পার্সোনাল বিষয় থাকতে পারে। আমি তোমায় এভাবে ঘাটতে দিতে পারি নাহ।
~ ওরে আমার লয়াল ছেলে রে। আমায় সময় তো ঠিকই পাসওয়ার্ড চাইতা। ভুলে গেলি ভন্ড।

~ দেখো নিশু, তখন আমরা আবেক বয়সী ছিলাম। এখন আমি ম্যাচিউড। এখন আমি স্বয়ং সম্পূর্ণ একজন যুবক।
~ ও হো, প্রেম। ট্রাস্ট মি। আমি পার্সোনাল বিষয় ঘাটব না। জাস্ট দেখব, কোনো তথ্য বা ক্লু আছে কিনা। সুযোগের সত ব্যবহার রা উচিত সঠিক সময়ে। আমাদের সকালের মৃত্যুর সঠিক খবর বের করতেই হবে। ট্রাস্ট করো ইয়ার।

প্রেম তবুও আমলে নিলো না। অনেকটা সময় বাদে প্রেম রাজি হলো। কিন্তু সময় ১০মিনিট মাত্র। ল্যাপটপ এ ম্যাসেন্জার অন করে নিশান্তিকার দিকে এগিয়ে দিল।
নিশান্তিকা ল্যাপটপ স্কিনে চোখ রাখতেই বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠল।

বারংবার বাজতেই চলল

পর্ব _১৮

নিশান্তিকা ল্যাপটপ স্কিনে চোখ রাখতেই বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠল।
বারংবার বাজতেই চলল

~ এই যে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস, কলিং বেলের শব্দে আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে, কেউ দরজা খুলবে নাকি,
নেহালের কথায় নিশান্তিকা~ প্রেম হাবলার মত মুখ চাওয়া চাওয়ি করে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠল। নেহালও হেসে দিল।
~ এখনি খুলছি মাই ডিয়ার ব্রাদার।

~ হ্যাঁ, যাও যাও, সারাজীবন আমায় তোমাদের দুজনকে পরিচালনা করতে হবে!

নিশান্তিকা আবারও হাসল প্রাণ খুলে। নেহাল এসব কথা মাঝে মাঝেই বলে। কারণ, ও মনে করে এটা ওর পরিবার সারাজীবন এভাবেই থাকবে।
প্রেম এগিয়ে এসে নেহালকে জড়িয়ে ধরে বলে,
~ আহা, মাই ডিয়ার ব্রাদার, মনের কথাগুলো বললে তুমি, তোমার বোনকে বলো, বৃদ্ধ বয়সেও যেন আমায় এভাবে কেয়ার করে।
~ আপু, তোমায় কেয়ার করে কোথায়, তোমায় তো সারাদিন ডাটে।

~ সেই ডাটাটাই আমি চাই বাবুনি, কারণ, এটাই ভালোবাসা।

~ ডাটা খাবে, খুব মজা। নেহাল ~ প্রেম উচ্চ স্বরে হেসে ওঠে। নেহাল হাসতে হাসতে বসে যায়।
নিশান্তিকা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। প্রেম এসব কি ভাবছে, আর কি সব বলছে। প্রেমের চোখ মুখে আনন্দে ঝর্ণা ঝড়ছে, যা নিশান্তিকার চোখ এড়িয়ে যায় নি। এই ভাবনাটুকু কি আদৌও সম্ভব হবে!

নেহালকে কোলে করে প্রেম পাশ কাটিয়ে চলে গেল, যাওয়ার আগে নিশান্তিকার নাকটা টেনে দিলো, হালকা জড়িয়ে নিয়ে কানের লতিতে ছোট্ট একটা চুমু খেলো।

আফিফ এসেছে। সাথে দীপ্তও ছিল। দীপ্ত কিছুক্ষণ এক সঙ্গে কথা বলে বেড়িয়ে গেল। বলে গেলো, অগ্যাতো ফলো করা ছেলে দুটিকে আটক করা হয়েছে।
নিশান্তিকা কথার ফাঁকে সকালের ম্যাসেন্জার ঘেঁটে নিল মন দিয়ে।
প্রেম বিদায় নিয়ে নেহালকে স্কুলে ড্রপ করতে চলে গেল। প্রেম এখন খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। যেন, ওর জীবনে সব কিছু স্বাভাবিক, সাজানো গোছানো।

আফিফ আর নিশান্তিকা একান্ত বসে রইল। নিশান্তিকা মনে মনে বেশ কিছুক্ষণ ভাবল। অতপর, রেলিং ঘেঁষে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
~ আফিফ, আমায় যদি একটা সময় ছেড়ে দিতে হয় তোমাকে! তাহলে কি করবে তুমি, মানবে?

আফিফ দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ, এরপর খুব উচ্চ স্বরে হেসে ওঠল। ওর হাসিতে যেন নিশান্তিকা সহ আকাশ পাতাল কেঁপে কেঁপে ওঠছে। এমন হাসি সে কখনো হাসেনি। হাসতে হাসতে আফিফ দাঁড়ানো থেকে বসে পড়ল।

নিশান্তিকা অস্থির হয়ে আফিফের হাসি মাখানো মুখের দিকে চেয়ে দেখছে, একটা কথায় আফিফের এত হাসির অর্থ কি!
~ আফিফ, হাসছ কেন?
তবুও আফিফ হাসতে থাকে। যেন খুব মজার কথা শুনেছে।

আফিফ এগিয়ে এসে নিশান্তিকার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত চেপে বলে,
~ বোকা মেয়ে। তুমি আমার একমাত্র বউ, বিয়ে করা বউকে কীভাবে কেউ ছাড়তে পারে বলো তো? আমি আমার বউকে ছাড়ব না। কোনো কালেই নাহ্। হ্যাঁ, তুমি যদি আমার প্রেমিকা হতে তাহলে ভেবে দেখতাম। কিন্তু, তোমার কপালে এই আফিফ আগেই ঘাপটি মেরে বসে আছে।
আফিফ আবারো উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে।

নিশান্তিকার শিরা উপশিরায় হীম শীতল হাওয়া বয়ে যায়। গলার স্বর আটকে যায়, কোনো কথা খুঁজে পায় না সে!
আফিফের বউ সে, এ কথা তাকে এত প্রশান্তি দিচ্ছে যে! অথচ সে কতটা স্বার্থপরের মত কথা বলছিল, প্রেমের কথায় সে এতটাই মগ্ন ছিল, যার প্রভাবে আফিফকে সে এত বড় কথা বলে দিল!

নাহ্, এ ভাবে চলে না। আফিফের সঙ্গে মোকাবেলা যখন হয়েই গেল, তাহলে সে প্রেমের সঙ্গেও করবে।
আফিফকে সে ভালোবাসে, খুব বেশি। আফিফকে ছাড়া সে বাঁচার কথা আর ভাববে নাহ্
~ এই নিশু

~ হ্যাঁ,
~ তারপর, তুমি আমায় এমন কথা বললে কেন?

~ আসলে আফিফ, সকালের মৃত্যুর পর আমায় মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়, যদি কখনো আমিও সেভাবে মরে
~ নিশু, এমন কিছুই হবে নাহ্। আমি হতে দিব না।

~ আফিফ, আমরা চাইলেই মৃত্যুকে ফিরাতে
~ এবার ঠাঠিয়ে এক চর দিব। ভুলেও এসব মাথায় আনবে নাহ।

নিশান্তিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রেমের কথা সে এড়িয়ে গেল, তা নয়। এই ভয় সে সকালের মৃত্যুর দিন থেকেই পেয়ে আসছে। আমরা কেউ জানি নাহ্, সামনে কি হবে।
আফিফ বলে, ~ এই নিশু।
~ হ্যাঁ, বলো।

~ আমি ভেবেছিলাম প্রেম তোমায় কিছু বলেছে।
নিশান্তিকা এক ধ্যানে চেয়ে থাকে সামনে।

~ তোমার এমন মনে হলো কেন?

আফিফ মুচকি হেসে বলে,
~ সকালের মৃত্যুর পর প্রেমের একজন সঙ্গী দরকার ছিল, আর সেটা তুমি ছাড়া অন্যকেউ হতে পারত নাহ। তাই, ও হয়ত তোমায় এখন চাচ্ছে জীবন সঙ্গী হিসেবে।

~ আমি ছাড়াও আরো একজন আছে।
~ হ্যাঁ? কে সে?

~ সময় হলে বলব তোমায়। এখন চলো তো।
~ কোথায়?

~ ভুলে গেলে, আজ সকালের ডেড বডি রিলিজ দেওয়ার শেষ তারিখ।
~ ওহ হ্যাঁ, চলো।
~ হ্যাঁ, চলো।

নিশান্তিকা হসপিটালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল। আজ সবার জন্য খুব বড় চমক অপেক্ষা করছে, বিশেষ করে স্পেশাল একজনের জন্য।
নিশান্তিকার ঠোঁটের বাঁকা হাসির দিকে আফিফ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখে। আপাতত সে কিছু একটা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে আছে।

পর্ব _১৯

নিশান্তিকা হসপিটালে এসেছে। সকালের মৃতদেহ রিলিজ দেওয়া হবে আজকে।

এই পাঁচ দিন সকালের মৃতদেহ নিশান্তিকার আন্ডারে ছিল। পোস্টমর্টেম নিজেই করেছে। তবে, মুখটা কাটাকাটি করা হয়নি। নিশান্তিকা চেয়েছিল, যেন শেষ মুহূর্তে প্রেম শেষ বারের মত দেখতে পারে।

নিশান্তিকা শেষ বারের মত সকালের মুখের দিকে তাকালো, সকালের ডান গালে একটি তিল আছে। যেটা সন্ধ্যার গালে নেই।
সন্ধ্যা আজ প্রথম তার জমজ বোনকে দেখল, সেটাও কবরস্থানে। অদ্ভুত অনুভূতির চাদরে জড়িয়ে নিল তার অবশ মন। এতদিন সে জানতও না তারই মত একই চেহারার একজন মেয়ে আছে, যে এখন মৃত।

সন্ধ্যা মায়ের দিকে চেয়ে দেখল, তার মা কেমন নিসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ এতদিন সে চোখের জলে স্নান করেছে। ছটফট করেছে। আর এখন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে শুধু সকালের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

সন্ধ্যা অদূরে চেয়ে দেখলো, তার পিতা সরোয়ার হোসেন দাঁড়িয়ে আছে, চোখে জল আছে কিনা বুঝতে পারছে না সে।
এই অচেনা লোকটির সঙ্গে তার কিছুক্ষণ হলো পরিচয় হয়েছে। অথচ, এতদিন সে জানতো তার ফাদার মৃত।

সন্ধ্যার দম আটকে আসছে ক্রমশ। চারপাশের সবকিছু অসহ্য লাগছে, দূরে কোথায় পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।

সন্ধ্যা মেয়েটি খুবই চঞ্চল। বিদেশের হাওয়ায় বড় হয়েছে। চাল~ চলন খুবই উন্নত। বেশ সুন্দরী। বিদেশি বিদেশি একটা ভাব থাকে সব সময়। খুব স্মার্ট। সব সময় ইংলিশে কথা বলে। বাংলা ভাষা খুব একটা বুঝে না। যতটুকু মায়ের থেকে শুনা আর কি।

তবে, খুব নরম ভদ্র। কারো সাথে শত্রুতা করার মন মানসিকতা তার মাঝে নেই। জটিল মুক্ত তার জীবনের পথচলা।

প্রেমের সঙ্গে তার পরিচয় এই তো সেদিন। কিন্তু সেদিনই জানতে পারল৷ তার বোনের বেটার হাফ প্রেম।

এরপর খুবই আন্তরিক ভাবে কথা বলা শুরু করে। প্রেমও কথা বলে। সন্ধ্যা অনেকটা সময় কথা বলে, আর প্রেম মাঝে মাঝে হু, হ্যাঁ বলে। কারণ, প্রেম দেখছিল, তার সামনে আরেকটা সকাল বসে আছে। কি সুন্দর ভাবে কথা বলছে।

প্রেমের খুব ভালো লাগে সন্ধ্যার সঙ্গে কথা বলতে। সন্ধ্যাকে বলতে ইচ্ছে করে, তুমি কি সকাল হয়ে আমার সাথে বাসা বাধবে, না ঐ দূর আকাশে উড়ে যাবে!
পরেরদিন,

নিশান্তিকা ডোর খুলে ঘরে প্রবেশ করল। মাত্রই নেহালকে স্কুলে ছেড়ে এসেছে।

আফিফ সরাসরি দো~ তালায় গিয়ে বসলো। নিশান্তিকা রিপোর্ট টা ড্রয়ারে রেখে আফিফের পাশে গিয়ে বসলো।
~ প্রেম এখনো বাসায় ফিরেনি?

~ উহু, আগামীকাল থেকেই গায়েব।

~ হুমম, এখনো সামলে উঠতে পারেনি সকালের আকস্মিক মৃত্যু!
~ হ্যাঁ, দেখে মনে হয় স্বাভাবিক। যাইহোক, শুনো কিছু তথ্য কালেক্ট করেছি।
~ কী জানতে পারলে রিপোর্ট থেকে?

~ অনেক কিছু। আগামী দিন খুব সাবধানে থাকতে হবে।
~ কেন?
~ আগামী দিনই সকালের মৃত্যুর উদঘাটন করব আমি।

~ খুনি কিন্তু আঁচ করতে পেরেছে। খুব দ্রুত হামলাও করতে পারে।
~ সে আর বলতে। প্রেমকে নিয়ে ভয়!
~ ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ লক্ষ্য রাখবেন বলেছে।

~ হুমম, তবে যাই বলো, গত রাতের মিশনে ইমতিয়াজ আহমেদ হেল্প না করলে খুব বড় ঝামেলা হয়ে যেত।
গতরাতের কথা মনে পড়তেই নিশান্তিকার গায়ে কাঁটা দিল। কতটা রিস্ক নিয়েছিল তারা।

দীপ্ত ~ ইতু গিয়েছিল কাজির বাসায়। এ কয়দিন নজরে নজরে রাখা হয়েছিল কাজির বাড়ি। আগামীকাল গিয়েছিল তথ্য কালেক্ট করতে, অনেকটা শিউর হতে।
অন্যদিকে, নিশান্তিকা ~ আফিফ গিয়েছিল সকালের বাসায়। সঙ্গে ছিল ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ। যিনি ইতুর একমাত্র ভাই। সকালের বাসায় তল্লাশি করার বাহানায় তারা কারো মুখের শান্ত চাহনির রহস্য খুঁজতে গেছিল।
~ নিশু
~ হু বলো

~ তোমায় একটা কথা বলা হয়নি।

কি কথা। নিশান্তিকা ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আফিফের দিকে তাকিয়ে আছে।
~ একটা খারাপ ঘটনা ঘটে গেছে।

নিশান্তিকা অস্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে।

হোয়াট! কীভাবে। তুমি আমায় এখন বলছ, কি লুকাচ্ছ বলো তো।

~ দীপ্তের সাথে ইতু জেদ করে না গিয়ে পারল না। দীপ্তকে বাঁচাতে গিয়ে ইতুর ইনজুরি হয়। ইমতিয়াজ যাতে না জানে তাই ইতু কাউকে বারণ করেছে। তবে, দীপ্ত সামলে নিয়েছে।
~ ইশশ্, ভালোবেসে মেয়েটি কতটা সাহস দেখালো। অথচ, তোমার বন্ধু সেটা বুঝল না।

~ এখন বুঝবে।
আফিফ মুচকি হাসে। নিশান্তিকা হাসির অর্থ বুঝে নেয়।

নিশান্তিকার এক হাত নিজ হাতের মুঠোয় নিয়ে আফিফ বলে,
~ তোমায় নিয়েও আমার খুব ভয় হয়। নিজের এক্সের জন্য কতটা রিস্ক নিচ্ছ।

নিশান্তিকা একপ্রকার ফোঁস করে ওঠে।
~ আফিফ, প্রেম আমার এক্স নয়, আমার কাজিন ভাই হয়।
আফিফ হেসে বলে, বুঝেছি মহারাণী, এভাবে তাকিয়ে গিলে ফেলবে নাকি।

নিশান্তিকা মাথা নিচু করে বলে,
~ তুমি আছো তো পাশে, এক্স কেন, এক্সের ভূত ও আমায় কিছু করতে পারবে নাহ্।

ইতু বেডে শোয়া থেকে ওঠে বসল। দীপ্ত সাহায্য করল। ইতু এখন সুস্থ আছে।
দীপ্তের চোখ~ মুখ ফোলে একাকার। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, তার প্রেয়সীকে এই বুঝি চিরতরে হারিয়ে ফেলল।
ইতু, খুব ভালোবাসি।

বিস্ময়ে চোখ ফেরাতে পারছে না ইতু। এতটুকু শুনার জন্য সে কতটা মরিয়া হয়ে থাকত সব সময়।
এই ইতু, হারাতে পারব না কখনো। যদি হারাতে হয়, আমি বাঁচতে পারব না।

ইতুর চোখে জল টলমল করছে। বেশ কিছু প্রমাণ কালেক্ট করতে গিয়ে সে যে ভয়ংকর রিস্ক নিয়েছিল, এর জন্য সে এখন আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে।
এই ইতু, রাগ করেছিস। বিশ্বাস কর, তোকে আমি পরিচয়ের দিন থেকে ভালোবাসি।

ইতুর চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে,
বোকা প্রেমিক, ভালোবাসিস বলেই তো তোর সঙ্গে আঠার মতো লেগে থেকেছি। হারানোর ভয় যে আমারও আছে।
দীপ্তের মাঝে তোলপাড় যেন এক নিমিষে নিভে গেল। এই পাগলীকে সে খুব ভালোবাসে।

পরম আবেশে বুকে জড়িয়ে নেয়। কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এই কপালে সে কতবার ইতুর ঘুমন্ত অবস্থায় চুমু খেয়েছে, সেটা ইতুও জানতে পারিনি কখনো।

পর্ব _২০

ভোরের সময়,

দিনের আলোয় উজ্জ্বল রশ্মিতে ফুটে ওঠেছে চারপাশ। প্রেম বেঞ্চের এক কোণে বসে সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় পৃথিবীর সকল মেয়েদের মাসুম লাগে, ঠিক সন্ধ্যার মতো। কতটা সুন্দর, নিষ্পাপ।

বেলা বাড়ছে, ওদের এখন বাসায় ফেরা উচিত। প্রেম এবার সন্ধ্যাকে ডাকতে গিয়েও থেমে যায়। মেয়েটি ঘুমচ্ছে, এভাবে ডাকা উচিত হবে না।
গত দুপুর থেকে দুজনে এক সঙ্গে আছে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে এসেছে। একটা গার্ডেন দেখতে পেয়ে সন্ধ্যা বায়না করে সেখানে যেতে। গার্ডেনের ভিতর একটা বেঞ্চ পেয়ে সন্ধ্যা খুশিতে লাফিয়ে বসে পড়ে,
থ্যাক্স গড, নাউ আই ফিল রিল্যাক্সড।

প্রেম হেসে পাশে বসে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে অসংখ্য ফুলের টপ। ফুলের সুবাস ছড়িয়ে চারপাশে অন্যরকম আবেশ তৈরি করেছে।
প্রেম লক্ষ্য করল, গার্ডেনের ঠিকানা নাম ফুলবাড়ি। এই সেই ফুলবাড়ি, যার জন্য নিশান্তিকা একপ্রকার উন্মাদ। এত এত প্রশংসা শুনেছে যে সকাল কতবার এখানে আসার বায়না করেছে, অথচ হয়ে ওঠেনি। আর আজ অদ্ভুত ভাবে সন্ধ্যাকে সঙ্গী বানিয়ে এই বাড়িতে পদার্পণ করল। জীবনের মোরে ঘুরে ফিরে কতকিছু ঘটে যায়, নিজেদের অজানতেই।
~ ওয়াও, হোয়াট এ বিউটিফুল প্লেস!

সন্ধ্যার আকর্ষণ দেখে প্রেম শুকনো হাসলো।

~ সন্ধ্যা, এই সন্ধ্যা।
সন্ধ্যা ঘুম ঘুম চোখে নির্বাক তাকিয়ে দেখে। তার বুঝতে সময় লাগে, কোথায় আছে সে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, ধীরে ধীরে উঠে বসে।
~ ওহ মাই গড, মর্নিং!

সন্ধ্যা বোকার মতো বসে রইল, সকাল হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফিরলে মামুনি নিশ্চয় বকা দিবে।
~ বাসায় ফিরবে?

সন্ধ্যা হতাশ হয়ে মাথা নাড়ায়। এখানে এতটা মুগ্ধ হয়ে সময় কাটাচ্ছিল যে বাড়ি ফেরার কথা মনেই হয়নি।
সুখপাখি ভবনে কলিং বেল বেজে ওঠল।

নিশান্তিকা এসে দরজা খুলে দিল। ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ এসেছেন। উপর থেকে প্রেমও নিচে নেমে এলো।
~ হাই নিশান্তিকা, প্রেম। হোয়াট’স আপ?

প্রেম বাঁকা চোখে ইমতিয়াজ আহমেদকে দেখে সোজা শোফায় গিয়ে বসে পড়ল।
নিশান্তিকা কিছুটা হতাশ হয়ে শুকনো হাসি দিয়ে ইমতিয়াজ আহমেদকে বসতে দিলেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ হাসি মুখে বললেন,

প্রেম এমন ভাবে তাকালো যেন তিনি অপ্রাসঙ্গিক কোনো প্রশ্ন করেছেন। প্রেমের মনে হলো তাকে খোঁচা মেরে কথা বলা হচ্ছে।
~ আমার মনে হয় সরাসরি মূল প্রসঙ্গে যাওয়া উচিত। আপনার আগমন সম্পর্কে জানতে পারলে খুশি হতাম।
নিশান্তিকা চোখ রাঙিয়ে প্রেমের হাত চেপে বলে,
~ প্রেম, কি হচ্ছে এসব।

প্রেম কিছু বলে না। শক্ত হয়ে বসে থাকে। এই লোকটাকে তার একদমই পছন্দ নয়। কেমন বাঁকা ত্যাড়া কথা বলে। প্রেমের এখনো মনে আছে, সকালের মৃত্যুর দিন তাকে কীভাবে হেনস্তা করেছিল। এমন ভাবে বলছিল, যেন প্রেমকে খুনী প্রমাণ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আছে।
ইমতিয়াজ আহমেদ হেসে জবাব দিলেন,
~ প্রেম সাহেব৷ হাইপার হবেন না। আপনি অযথা হাইপার থাকেন, শান্ত থাকুন। আমার আগমন সম্পর্কে অবশ্যই জানতে পারবেন। আপাতত একটি নিউজ দিতে এসেছি।

প্রেম তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
~ এর জন্য বাড়ি বয়ে আসতে হয় বুঝি।
ইমতিয়াজ আহমেদ হাসলেন।

~ প্রেম সাহেব, নিউজটা মুখোমুখি বলার মজাই আলাদা, সাথে গরম গরম ঘরোয়া চায়ের স্বাদ।

প্রেম রাগ কন্ট্রোল করে বলে,
~ ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমার নাম প্রেম সাহেব নয়, প্রেমানুভ মাহমুদ, ডাক নাম প্রেম। আর আপনার সামনে চা নয়, কফি পড়ে আছে।
নিশান্তিকা এবার প্রেমকে থামিয়ে বলল,
~ ইমতিয়াজ ভাই, আমাদের মন মানসিকতা কারো ঠিক নেই, আপনি প্লিজ, প্রেমের কথায় হাইপার হবেন না।

ইমতিয়াজ আহমেদ হেসে বললেন,
~ মিস নিশান্তিকা, আমি সবটাই বুঝি। প্রেম অবুঝ প্রেমিক। ইটস ওকে।

প্রেম মনে মনে অনেকটা রাগ পুশে রাখল। অসহ্য লাগে এই লোকের হাসি দেখলে, নিশ্চয় কোনো শয়তানি লুকিয়ে আছে।
~ নিশান্তিকা, আমি তোমার সকল তথ্য ঘেঁটে দেখেছি, আমার মতে, সময় থাকতে রেট করা প্রয়োজন।
~ সরাসরি এ্যাকশন নিবেন। অনেক অশান্তি পেয়েছি ঐ বদমাশটার জন্য।
~ হ্যাঁ, অবশ্যই।

~ এর শেষ দেখতে চাই, যত দ্রুত সম্ভব।
~ অবশ্যই, আর কোনো সাহায্য লাগলে, বলবেন।
~ জি আচ্ছা।

ইমতিয়াজ আহমেদ দরজার কাছে এসে প্রেমের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি হাসি দিয়ে বলল,
~ প্রেম সাহেব, আসি তবে। সাবধানে থাকবেন।
প্রেম রাগ দেখিয়ে উপরে চলে গেল। নিশান্তিকা দরজা আটকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

পর্ব _২১ বা শেষপর্ব

~ তারপর বলুন মিসরোয়ার সাহেব, কী কারণে নিজের মেয়েকে হত্যা করলেন, একটুও অনুশোচনা হলো না৷ আপনার।
বাড়ির ভিতর পিনপতন নীরবতা চলছে, সবার মাঝেই উৎসুক ভাব। সকলে নিজেদের মাঝে চাওয়া চাওয়ি নিবেদন করছে। ইমতিয়াজ আহমেদের কথায় অনেকে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সরোয়ার হোসেন ঘামতে ঘামতে বসে পড়লেন।
~ এসব আপনি কি বলছেন। আমি আমার মেয়েকে হত্যা করেছি!

ইমতিয়াজ আহমেদ হাসলেন, সকালের দিকে দৃষ্টি নিবেদন করে বললেন
~ আমি জানি, আপনি এই জঘন্য তমো কাজটা করেন নি৷ বা করতেও পারবেন নাহ। কিন্তু, কে করেছে সেটা নিশ্চয় আপনি জানেন।
এবার তার টনক নড়ল, ভয়ে, অনুশোচনায় মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
~ কি সরোয়ার সাহেব, আপনি বলবেন না আমিই বলব।

প্রেম মাথা নিচু করে বসে ছিল, এবার মাথা উঁচিয়ে ইমতিয়াজ আহমেদকে দেখলো। অসহ্য লাগছে তার, এত হেঁয়ালি করছে কেন? যত ঢং। নিশান্তিকা, প্রেমের কাঁধে হাত রাখল।

দীপ্ত আর ইতু তখনি এসে পৌঁছালো। ইতুকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে।
সরোয়ার হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী একপর্যায়ে তীব্র স্বরে বললেন,

দেখুন অফিসার, আপনাদের হেয়ালি বন্ধ করুন, আসল কাহিনী ক্লিয়ার করুন, নয়ত চলে যান এখান থেকে অযথা সময় নষ্ট করবেন না আমাদের।
ওহ হো, ম্যাডাম সেটা আপনার ছেলেকেই জিগ্যেস করুন না হয়!

ইমতিয়াজ আহমেদ এখন ক্ষিপ্র গতিতে গিয়ে সরোয়ার হোসেনের ছেলে, সোহেলকে ঝাপটে ধরল,
আরে বাহ বাহ, খুন করেও এত সাহস তোমার, মানতে হবে। এখনো বসে আছো এখানে। আমি তো ভাবলাম দৌড় ঝাপ করতে হবে, তাই আজ সকালে জগিং করিনি, আসলে বেশি এনার্জি ওয়েস্ট করতে চাই নি।
সোহেল রেগে বলল,

ফাজলামি পাইছেন মিয়া, যাকে তাকে খুনী প্রমাণ করে দিচ্ছেন।
প্রমাণ ওহ হ্যাঁ, প্রমাণ। আমি কখন তোমায় খুনী প্রমাণ করলাম!
সোহেল আরো রেগে গেল,

~ দেখুন, ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আমার বাবার অনেক সম্পত্তি, যার একমাত্র মালিক আমি। আর আমার বাবার হাতও অনেক লম্বা। আমায় ঠিক নির্দোষ প্রমাণ করে ছাড়িয়ে আনবে।

~ তোর কোন বাপ বাঁচায় আমিও দেখব, জানোয়ার একটা।

সায়রা খাতুনের কথায় সবাই হকচকিয়ে গেল। তার রাগে মাথার তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। রাগে দুঃখে কান্নায় ভেঙে পরলেন তিনি।
এমন ছেলে জন্ম দিয়েছিলে তুমি, যে নিজের বড় বোনকে হত্যা করতে অনুশোচনা বোধ করে না।
সরোয়ার হোসেনের উদ্দেশ্য সায়রা খাতুন চেঁচিয়ে ওঠল।

ঐ মেয়েটা আমার সৎ বোন ছিল, আমার পথের কাঁটা ছিল, সম্পত্তির ভাগিদার ছিল, ওকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা বোধ নেই। কে জানত, আরেক ভাগিদার এসে জুটবে, না~ হলে এরও একই ব্যবস্থা করতাম।

সায়রা খাতুন, নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সোহেলের গালে চর বসিয়ে দিল। প্রেম উত্তেজিত হয়ে সোহেলের উপর ঝাপিয়ে পড়ল,
এই, এই সালা, একবার হাত লাগিয়ে দেখা সন্ধ্যার গায়। তোকে এখানেই পুতে দিব।
আফিফ এসে প্রেমকে থামালো, ছাড়ো প্রেম। এর ব্যবস্থা এখন আইন করবে।

~ রাখো তোমার আইন, কিসের কি করবে। আইনের উপর আমার কোনো ভরসা নেই। সালাটা এখন সন্ধ্যার দিকে নজর দিছে, কতবড় কলিজা ওর।
আফিফ বুঝিয়ে শুনিয়ে প্রেমকে ধরে রাখে। নিশান্তিকার দিকে তাকায় আফিফ। নিশান্তিকার ঠোঁটের হাসি আফিফকে সব কিছু বুঝিয়ে দেয়। প্রেমের নতুন জীবন সঙ্গী চলে এসেছে।
অফিসার, ওকে আপনারা নিয়ে যান।

সরোয়ার হোসেনের কথায় সোহেল হতবাক হয়ে যায়। বাবা, আমায় বিশ্বাস করো, আমি কিছু করিনি। এ এরা আমায় ফাঁসাচ্ছে।
সরোয়ার হোসেন তেড়ে এসে বলেন,
সেদিন তোর হাতে বিষের কৌটা দেখে যদি বুঝতাম, তুই আমার কলিজার টুকরো মেয়েকে হত্যা করার প্লান করছিস, তাহলে সেদিন সেখানেই তোকে আমি মেরে ফেলতাম।

সরোয়ার হোসেনের স্ত্রী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন,
কি বলছ তুমি, সোহেল আমাদের একমাত্র ছেলে, এই বংশের প্রদীপ।

আর সকাল, সকাল এ বংশের কেউ না! হ্যাঁ, ও কি আমার মেয়ে নয়। কি দিয়েছি আমি মেয়েটিকে, কতটুকু সুখ দিতে পেরেছি। কখনো কোনোদিন প্রয়োজন ব্যতিত মুখ ফুটে কিছু চায় নি পর্যন্ত। কেমন বাবা আমি! নিজের প্রতি নিজের রাগ হচ্ছে। অফিসার, নিয়ে যান আমার সামনে থেকে।

স্বামীর মুখের উপর কথা বলার সাহস পায় না সোহেলের জননী। সরোয়ার হোসেন হাত জোর করে মাথা নিচু করে সায়রা খাতুনের কাছে মাফ চায়।
ইমতিয়াজ আহমেদ, সোহেলের হাতে হাত কড়া পড়িয়ে নিয়ে যায়।
একে একে সকলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।

প্রেম এক নজর সন্ধ্যাকে দেখে, মেয়েটি অদ্ভুত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন অচিরে কাউকে খুঁজছে।
মেয়েটিকে দেখতে কতটা স্নিগ্ধ লাগছে।
প্রেম একা পথে বাসায় চলে যায়।

ইতুকে কোলে নিয়ে দীপ্ত বের হয়, ইতু গলা জড়িয়ে আদরে গলায় বলে,
এই দীপ, এবার ভাইয়াকে বলে, জলদি আমায় তোমার বউ করে নেও।
~ খুব শীঘ্রই তোমায় বউ বানাব মহারাণী, সিংগেল লাইফ নিয়ে এখন আমি ত্যানাত্যানা।
ইতু শরীর দুলিয়ে হাসতে থাকে।

নিশান্তিকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আপনমনে পিচঢালা রাস্তায় পা রাখে। প্রশান্তি হেসে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়।
~ আফিফ, আমার আজ খুব হালকা লাগছে।

আফিফ মুচকি হেসে নিশান্তিকার বা~ হাতটা চেপে ধরল।
নিশু, আমার হাতে হাত হাঁটবে, যাবে একবার ফুলবাড়ির আঙিনায়।

নিশান্তিকা একটু লজ্জা পেল। এখন সে আফিফের ভালোবাসায় জ্বলবে, বেশ বুঝতে পারছে।

~ এই নিশু,
~ হু,
~ বলো না একবার, যাবে?
~ হ্যাঁ, যাব।

~ তবে
নিশান্তিকা দাঁড়িয়ে একদম নিয়ে বলল,
~ আফিফ, আম্মু আব্বু বলেছে, তারা হজ্ব থেকে ফেরার পর যেন আমাদের বাসর হয়, এর আগে নয়।
আফিফ ক্যাবলার মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠে। নিশান্তিকা লজ্জায় কিছু বলতে পারে না।
~ তবে, চলো প্রেম করি বিন্দাস। এটাই বলতে চেয়েছিলাম মহারাণী।

নিশান্তিকা ঠোঁট উলটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আফিফ হেসে নিশান্তিকার হাত টেনে হাঁটতে থাকে।
গোধূলির বিকেল,

পিচঢালা ঝকঝকে রাস্তায় প্রেম আপন মনে হেঁটে চলছে। আজ মনের ভিতর বেশ ধুকধুক করছে, অস্থির লাগছে।
পাশে কারো অস্তিত্ব পেয়ে প্রেম তাকিয়ে দেখে সন্ধ্যা শাড়ি পড়ে হাঁটছে।
প্রেম ক্ষীণ হাসলো।

~ বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পড়লে বলে প্রেম নিবেদনের সময় হয়!
সন্ধ্যার কথায় প্রেম বেশ সময় নিয়ে হাসলো। সন্ধ্যা বোকার মত চেয়ে দেখছে প্রেমকে। তার কি বাংলা বলায় কোথায় ভুল হলো, মায়ের থেকে সে কত প্র্যাক্টিস করল!

~ আমার হাতে হাত রেখে হাঁটতে পারবে গোধূলির অপরপ্রান্তে। যেখানে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকারের বাসা বাঁধানো অন্ধকার।
~ হ্যাঁ, পারব হাঁটতে, ওহ নো, পারব হাঁটতে।
প্রেম হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিল,
~ তবে, ধরো শক্ত হয়ে।

সন্ধ্যা কি বুঝল, আর কি বা বুঝে বলল, প্রেম জানে না। সন্ধ্যা নিজেও জানে না। সে তো বাংলা বাক্যও সঠিক ভাবে বলতে পারে না।
শুধু জানে তার সঙ্গে প্রেম থাকলেই হলো। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলছে, দৃষ্টির অগোচরে।

লেখনীতে~ মেহরুন্নেছা সুরভী

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “তুমি আমি – Valobashar romantic premer golpo bangla” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – তুমি আমি (১ম খণ্ড) – Valobashar romantic premer golpo bangla

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!