রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

অবশেষে বৃষ্টি (১ম খণ্ড) – প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসার গল্প

অবশেষে বৃষ্টি – প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসার গল্প: সায়ানের পাশে শুয়ে সায়ানকে জাপটে ধরে রইল অর্পা। ফোন বের করে কৌশলে দুজনের কিছু সেলফি তুলে নিলো। খুব বেশি ঘনিষ্ঠ না হলেও সেলফিতে এটা স্পষ্ট যে দুজনে একইসাথে একই চাদরে খুব কাছাকাছি বিছানায় শুয়ে আছে।


পর্ব ১

~ “আপনার কাছে কি একটা সিগারেট ফ্লেভারের চুমু হবে?”
প্রশ্ন শুনে রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে ফিরে তাকালো সায়ান। এ কেমন অদ্ভুত প্রশ্ন! লাজ নেই, লজ্জা নেই, কি করে বললো এমন কথা!
মেয়েটা মাথা নামিয়ে চোখ এদিক সেদিক ঘুরাচ্ছে। সমানে দু’হাত কচলাচ্ছে আর মুখটা কাচুমাচু করে রেখেছে। সায়ান চোখ থেকে সানগ্লাস খুলতে খুলতে বললো, ‘কি বললেন? রিপিট রিপিট?’

মেয়েটা এবার আরো বেশি হাত কচলাতে কচলাতে বললো, আপনার কাছে কি একটা সিগারেট ফ্লেভারের চুমু হবে?
~ লাইক সিরিয়াসলি? চুমু? আমার কাছে? তাও আবার সিগারেট ফ্লেভারের?
~ হুমমমম।
~ আপনি চাইছেন?
~ হুমম।

~ কিভাবে দিবো? কাকে দিবো? আপনাকেই?
~ না মানে প্লিজ মাফ করবেন।
মেয়েটার গলা কাঁদো কাঁদো শোনালো। প্রায় কেঁদেই দিচ্ছিল মেয়েটা। সায়ান থামিয়ে দিয়ে বলল, এই এই কাঁদছেন কেন আপনি? কি সমস্যা?
মেয়েটা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলো। তারপর বললো, কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে আমি আপনাকে এ কথা বলেছি কিনা তাহলে তাকে বলবেন হ্যাঁ বলেছি। কিন্তু কেন বলেছি সেটা আপনি বলবেন না।

~ কেন বলেছেন তা তো আমিও জানিনা।
~ কয়েকটা বড় আপু আমাকে বলতে বলেছে।
~ তারমানে র‍্যাগিং? ভার্সিটিতে নতুন এসেছেন?
~ জ্বি। নিউ ফাস্ট ইয়ার।

মেয়েটা এবার থাকতে না পেরে কেঁদেই ফেললো। বোধহয় গ্রাম থেকে এসেছে। আর এটাও নিশ্চিত যে এর আগে এ ধরণের কথা কখনো উচ্চারণ ও করে নি। আপাদমস্তক লজ্জার আবরণে নীল হয়ে উঠেছে। মেয়েটা দেখতে মিষ্টি, মায়াবতী। চোখে মুখে একটা অপার মায়া আছে। চোখ দুটো যেন স্থির, ও চোখে সমুদ্র আছে। চোখ মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে রইলো মেয়েটা।

সায়ান বলল, তুমি যাও। কেঁদো না। তুমি আমাকে কি বলেছো সেটা কেউ জানবেও না।
~ সত্যি বলছেন তো? কেউ জানলে কিন্তু আমি এই ভার্সিটি ছেড়ে চলেই যাবো।
~ আরে এ কেমন কথা? ভার্সিটিতে নতুন এলে বড় মেয়েরা কত রকমের র‍্যাগ দেবে সেটা কল্পনাই করতে পারবে না। এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না কেমন? আর বাসায়ও জানিও না। নয়তো বাবা মা কষ্ট পাবে।
মেয়েটা বাচ্চাদের মত হাতের পিঠ দিয়ে গাল মুছতে মুছতে বলল, ওরা আমাকে আবার বকবে না তো?

~ না বকবে না। তুমি যাও।
মেয়েটা তবুও দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় পাঁচটা মেয়ে হাসতে হাসতে এসে সায়ানকে বলল, কি রে বন্ধু। কি বলে এই মেয়েটা? ও তো ফাস্ট ইয়ার।
~ মেয়েটা কি বলছে তোদেরকে কেন বলবো?

~ শুনি না কি বলল? প্রপোজ করল প্রপোজ? কি প্রপোজ করল রে শুনি?
বলেই হেসে উঠলো সবচেয়ে মোটা মেয়েটা। সায়ানের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এরাই নতুন মেয়েটিকে র‍্যাগ দিয়েছে। ভীষণ রাগ হল ওর। যদিও এর আগে নিজেও অনেক ছেলে, মেয়েকে র‍্যাগ দিয়েছে। কিন্তু আজকে এই মেয়ের নিষ্পাপ চাহনি আর চোখের জল দেখার পর কেন যেন মনটা বিষন্ন হয়ে উঠলো। সায়ান মেয়েটাকে বলল, তুমি এখন যাও।

মেয়েটা সিনিয়র আপুদের দিকে ভয় ভয় চোখে তাকাচ্ছিল। সায়ান ভরসা দিয়ে বলল, ওরা কিছু বলবে না। তুমি যাও।
মেয়েটা দ্রুত ছুটে চলে গেলো। একবারও পিছন ফিরে তাকালো না। সায়ান ওর বান্ধবীদের উদ্দেশ্য করে বলল, তোরা এই মেয়েটার সাথে এমন কেন করলি?
~ তোর কাছে একটা চুমু চেয়েছে। দিয়ে দিতিস। আমরা তো সেটাই দেখতে চাইছিলাম। আমাদেরকে তো আর দিবি না।

বলেই হেসে উঠলো রিদি নামের একটা মেয়ে। সায়ান বলল, তোরা কি জীবনে ভালো হবি না?
~ কেন রে দোস্ত? তুই বোধহয় খুব ভালো হয়ে গেছিস?
~ দ্যাখ, সবাইকে লাঞ্চিত করা ঠিক না। মেয়েটা ডিসিশন নিয়েছে ও ভার্সিটি ছেড়ে চলে যাবে।

~ তাই নাকি? তাহলে তো আবার র‍্যাগ দিতে হয়।
~ দ্যাখ রিদি, তোরা একদম ওর সাথে এসব করবি না।
~ কেন রে দোস্ত? একবার চুমু দিতে চাইল বলে এত দরদ? এখনো তো দেয় নাই।
সায়ান নিজের রাগ সামলে নিলো। এই দলটা ভার্সিটির টপ ডেঞ্জারাস গ্যাং। এদেরকে বলে লাভ নেই। ওরা শোধরাবার মানুষ নয়। তাই কথা না বাড়ানোই ভালো।
সায়ান মাথাটা দুদিকে নেড়ে বলল, আমার কাজ আছে।

চলে এলো সেখান থেকে। করিডোরে এসে সায়ানের চোখ দুটো শুধু সেই মেয়েটাকেই খুঁজছিল। শত শত মেয়ের মাঝে ওকে আবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু মেয়েটাকে কেন যে আবারও খুঁজছে সায়ান নিজেই বুঝতে পারছে না। আজ আর ক্লাসে মন বসবে না।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে দু চোখের পাতা এক হতে চাইছিল না সায়ানের। একটা তুচ্ছ ঘটনা, অথচ মনে দাগ কেটে বসে আছে। মেয়েটার শুকনো নিষ্পাপ মুখটাই বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কি এক মায়ায় মেশানো দৃষ্টি, তলোয়ারের মত ভ্রু যুগল। সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে তবে?

বিছানার উপর উঠে বসে সায়ান। নাহ, অস্থিরতা কমছে না। মেয়েটাকে বান্ধবীদের হয়ে সরি বলতে হবে। কিন্তু ওই মেয়ে আবার ভার্সিটিতে আসবে তো? এই প্রথম অতীতে করে আসা ভুল গুলোর জন্য অনুতাপ হচ্ছে সায়ানের। অতীতে নিজেই কত ছেলেকে এভাবে বোকা বানিয়েছে, ইনসাল্ট করেছে। আজ ভালো লাগছে না। একটা সামান্য ঘটনার কারণে নিজেকে কেমন অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে। আর কখনো কাউকে র‍্যাগ দেবে না সায়ান, মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করলো।

পরদিন ভার্সিটিতে এসেই মেয়েটার খোঁজে করিডোর, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস রুম সব খুঁজে খুঁজে দেখতে লাগল সায়ান। কিন্তু দেখা মিলল না। অবশেষে হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় দেখলো বারান্দার এক কোণে পিলারে হেলান দিয়ে বসে শুকনো মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। সায়ানের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। ও ধীরপায়ে হেঁটে মেয়েটার পাশে বসতে বসতে বলল, হ্যালো ম্যাম।
মেয়েটা পাশ ফিরে তাকাতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠলো। সায়ান হেসে বলল, কি দেখছো এভাবে?

~ আপনি!
~ ভয় পেও না। র‍্যাগ দিতে আসি নি। বন্ধুত্ব করতে এসেছি।
~ ঠিক বিশ্বাস হলো না।
~ তাই নাকি? বিশ্বাস না হলে নাই। ঝুলে থাকলাম।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, আমার সাথে বন্ধুত্ব কি জন্য? আপনি তো আমাকে চেনেন না।

~ চেনার জন্যই তো বন্ধুত্ব করতে চাইছি তাই নয় কি?
~ কিন্তু আপনি তো সিনিয়র ভাইয়া। আর তাছাড়া মাত্র একবার দেখেই বন্ধুত্ব করতে চাইলে আমি তো আপনাকে সন্দেহ করতে পারি।
~ সন্দেহ করো। আমি তো মানা করি নি।
~ আচ্ছা।

মেয়েটা এরপর অনেক্ষণ চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। সায়ান হেসে বলল, কি গো সন্দেহ করছো নাকি?
~ না মানে ভাবছি।
~ এত ভাবতে হবে না। আমি এসেছি সরি বলতে। গত কালের ঘটনাটার জন্য আমি আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।
~ সে কি! আমি তো লজ্জায় আপনাদের ওদিক দিয়ে আসাই বন্ধ করে দিয়েছি। আর আপনি কিনা তাদের হয়ে?

~ হ্যাঁ। ওরা তো তোমাকে জীবনে সরি বলবে না। যাইহোক ভুলে যাও ব্যাপারটা।
মেয়েটা চুপ করে রইলো। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই উঠতে উঠতে বলল, আমি যাই। আমার ক্লাস আছে।

~ যাবে তো। সরি একসেপ্ট করে যাও।
মেয়েটা কিছু বললো না। সায়ান উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমাকেও ওদের মত বাজে ভাবছো তো?
~ ভাবার সময় পাই নি।
~ বাব্বাহ!
~ আমি আসি।

সায়ান পিছন দিক থেকে ডাক দিলো, কোন ডিপার্টমেন্ট?
কোনো উত্তর এলো না। উত্তর না পেয়ে আবারও হতাশ হলো সায়ান। মেয়েটাকে ফলো করে এসে ওর ক্লাসরুম দেখে গেলো।

সায়ানের ভার্সিটি জুরে একটা সুনাম আছে। ভালো গান গাইতে পারে। কনসার্ট হলেই তো হলরুম জুরে ‘সায়ান, সায়ান’ কলরব ওঠে। মেয়েরাও হুমড়ি খেয়ে ক্রাশ খায় এই ছেলেটার উপর। কাজেই সায়ান মোটামুটি ধরণের ভাব নিয়ে চলাফেরা করে সবার সামনে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সায়ানের ভাব উবে গেছে আজকে। নিজে থেকে যেচে ফ্রেন্ডশিপ করতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে। ব্যাপারটা যেমন পীড়াদায়ক, তেমনি যন্ত্রণাদায়কও বটে।

সায়ানের বন্ধু মহল বেশ বড়। তন্মধ্যে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হচ্ছে অর্পা, সায়েম, নিবিড়, সোহানী, দিলরুবা ও ফাহমিনা৷ অর্পা আবার সায়ানের উপর দূর্বল। ওদের মধ্যে মিলটাও সবার চেয়ে একটু বেশি। সারাক্ষণ চ্যাটিং, ফোনালাপ, দেখা সাক্ষাৎ, ট্রিট সবকিছু থাকবেই। মাঝেমাঝে বাইক নিয়ে লং ড্রাইভেও যাওয়া হয়। মেয়েটার দেয়া কষ্টটুকু ভুলতে সায়ান অর্পাকে ফোন দিয়ে আসতে বলল।

অর্পা সায়ানের ডাকে পাখির মত উড়ে চলে আসে। সবসময়ই এ কাজটায় ও এগিয়ে। যেখানেই থাকুক না কেন, সায়ান ডেকেছে মানে আর দেরি করা যাবে না। যদিও এখনো সায়ানকে প্রপোজ করা হয়ে ওঠে নি। তথাকথিত ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ এর মতই এগোচ্ছে ব্যাপারটা।

অর্পা এসে দেখে সায়ান একটা কালো শার্ট পরে আছে। ফর্সা গালে চাপ দাড়ি সায়ানের। তার উপর কালো শার্ট ও কালো ব্রেসলেট এ ছেলেটাকে কি অপূর্ব যে লাগে। আরেকবার ক্রাশ খেয়ে অর্পা সায়ানের সামনে এসে বসলো। চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কখন এসেছিস?
~ মাত্র। আজ ভালো লাগছে না। বেড়াতে যাবি?
~ শিওর। আমাকে কখনো কোয়েশ্চেন করবি না। সোজা বলবি আজকে বেড়াতে যাচ্ছি।

~ ওকে বাবা। বাইক নিয়ে আসিনাই, রিকসায় যাইতে হবে।
অর্পা সায়ানের হাতের কনুইতে ধরে হাঁটা শুরু করে দিয়ে বলল, চল। শুনলাম গতকাল রিদিদের দল একটা নিউ ইয়ারের মেয়েকে র‍্যাগ দিয়েছে? তাও আবার তোকে এসে কি বলেছে?
~ হুম।

~ কি বলেছে বল না?
~ এসব ছোটখাটো ব্যাপার আমি আর মনে করতে চাইছি না।
দুজনে নির্দ্বিধায় ক্যাম্পাসে কাছাকাছি হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। অর্পা সায়ানের হাতের কনুইতে ধরে রেখেছে। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসলো কলেজে নতুন আসা মেয়েটা। এতক্ষণ ধরে সায়ানকেই পর্যবেক্ষণ করছিল ও। যদিও সায়ানের সাথে আচরণ খারাপ করেছে। কিন্তু সায়ান চলে আসার পর কেবল ওকেই খুঁজছিল। অর্পার সাথে ওকে দেখার পর হাসি এলো এবার। ও জানত এসব ছেলেদের বিশ্বাস নেই। প্রেমিকা রেখে আবার বন্ধুত্ব করতে আসে।


পর্ব ২

সায়ানের ফোনে টেক্সট এলো রিদির নাম্বার থেকে। মেসেজ দেখে চোখ কপালে উঠে গেলো সায়ানের। রিদি লিখেছে, toke aj khub hot lagchilo. Ekta chumu khawyar jonno pagol hoye jacchilam.
আজকাল কার মেয়েদের একেবারেই লাজলজ্জা নেই। সায়ানও মেয়েদের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশে। তবে শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে এখনো অনেক দূরত্ব বজায় রেখে চলে। মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও কেন যেন এই একটা বিষয়ে সায়ানের আগ্রহ কম। যার তার সাথে ঠিক ঘেষতে ইচ্ছে করে না ওর।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনেক্ষণ মেসেজিং চললো অর্পার সাথে। অর্পা দিনদিন সায়ানের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা দেখতে মারাত্মক। ফর্সা গাল দুটো রোদে গেলে একেবারে লাল হয়ে যায়। যা হ্যান্ডসাম লাগে, একেবারে সিনেমার নায়ক। সিনেমায় গেলে নিশ্চয়ই খুব যশ খ্যাতি হতো সায়ানের।
অর্পা সায়ানের কণ্ঠ শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। বললো, তোকে একবার কল দিই?
~ ভিডিও কল দে, তোকে দেখবো।
অর্পা গেঞ্জি পরে শুয়ে আছে। ভিডিও কলের কথা শুনে বুকের মাঝখান থেকে গেঞ্জিটা সরিয়ে ক্লিভেজ বের করে রাখলো। যাতে সায়ানের নজর সেখানে চলে যায়। পরক্ষণেই আবার উপরের গেঞ্জিটা খুলে হাতা কাটা গেঞ্জি পরে ভিডিও কল দিলো সায়ানকে।
সায়ান অন্যমনস্ক হয়ে কথা বলছিল। যখন খেয়াল করল অর্পার গায়ে হাতা কাটা গেঞ্জি, গলাটাও উন্মুক্ত। তখন শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো সায়ানের। ও মুচকি হেসে বলল, শুয়ে পরেছিস?
~ হ্যাঁ। বড্ড একা একা লাগে বিছানায় রে।

~ তাহলে মাকে বল বিয়ে দিয়ে দিক। আমাদেরও একটা বিয়ে খাওয়া হবে।
~ যা, ফাজিল।
~ সত্যি তোর বিয়েতে আমি অনেক মজা করবো।
~ অফ যা। তুই কি করছিলি?
~ রিদি আমাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে রে।
~ কেন?

~ কি সব আবোলতাবোল মেসেজ পাঠায়।
~ আমাদের রিদি? কি মেসেজ দিয়েছে দেখি।
সায়ান মুহুর্তেই মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে অর্পার নাম্বারে পাঠিয়ে দিলো। রিদির পাঠানো টেক্সট দেখে শরীরে জ্বালা শুরু হয়ে গেলো অর্পার। ও রেগেমেগে আগুন হয়ে বলল, ওই কুত্তির এত বড় সাহস? ওকে কালকে এমন ধোলাই দেবো না..
~ তুই এত জ্বলছিস কেন?
~ তোর কি খুব ভালো লাগছে?

~ মেয়েরা এমন মেসেজ পাঠালে ভালো লাগবে না বল?
~ তাহলে যা না গিয়ে রোমান্স কর ওর সাথে।
হেসে উঠলো সায়ান। হাসতে হাসতে বলল, তুই দেখি মহা খেপেছিস। যাক গে ওসব, আমার এক ফ্রেন্ড কল দিচ্ছে এখন রাখি রে।

অর্পার কল কেটে দেওয়ায় মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ওর। বিষন্ন মনে ফোনটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে লাগলো। মেয়ে ফ্রেন্ড দের সাথে সায়ান কথা বলে কি না এসব ভেবে টেনশনও করতে লাগলো। কিন্তু সায়ানের অর্পার কথা ভাবারও অবকাশ নেই।

ভার্সিটিতে সায়ানের বন্ধুরা গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। প্রচুর হাসাহাসির শব্দ আসছে সেখান থেকে। সায়ান ও তাদের সাথে গিয়ে যোগ দিলো। ওরা একটা মেয়েকে র‍্যাগ দিয়েছে সেটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। আজকে মেয়েটাকে পাঠিয়েছে অন্য আরেকটা ছেলের কাছে। সেদিন সায়ানকে যে মেয়েটা প্রপোজাল দিয়েছে সেই মেয়েটাই। কথাটা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সায়ান। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অজানা অচেনা এক মানুষের জন্য এরূপ হওয়ার কারণই বা কি তাও বুঝতে পারলো না। তবুও ছুটে গেলো সেই বন্ধুর কাছে।

গিয়ে দেখলো পৃথা নামের মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর তিনটা ছেলে মিলে হাসছে। তিনটা ছেলের একজনেরও চরিত্র ভালো না। সায়ান ছুটে এসে ওদের হাত থেকে রক্ষা করলো পৃথাকে।
পৃথা সায়ানকে দেখে কিছুটা ভরসা পেলেও সায়ানের দিকে তাকালো না। সায়ান বন্ধুদেরকে বিদায় দিয়ে পৃথাকে বলল, তুমি আবার ওদের ফাঁদে পা দিয়েছো?
~ কি করবো বলুন? ওরা যে আমাকে থ্রেড দেয়। বলেছে যদি ওদের কথা না শুনি তাহলে সিনিয়রদের সামনে আমাকে অপমান করবে।

~ তুমি আর ওদেরকে নিয়ে ভাব্বে না। ওদের ব্যবস্থা আমি নিচ্ছি। আমার সাথে আসো।
পৃথা সায়ানকে অতটাও ভরসা করতে পারছে না। একটা নেগেটিভ চিন্তা সায়ানের সম্পর্কে মনে গেঁথে গেছে। সায়ান এক রকম জোর পূর্বক পৃথাকে ওর বন্ধু মহলে নিয়ে এসে দাঁড় করালো। সবাই মজার ছলে নানান কথা বলতে শুরু করেছিল। সায়ান রীতিমতো রেগে বললো, শোন সবাই। এই মেয়েটা আমার পরিচিত।

গতকাল তোরা ওকে র‍্যাগ দিয়েছিস তবুও আমি কিছু বলি নি। কিন্তু আজকে আর না বলে পারলাম না। ওকে ফার্দার কেউ কখনো কোনোরকম র‍্যাগ দেবে না। মনে থাকবে?
রিদি বলল, তোর পরিচিত? তাই তো বলি তুই যেমন ছেলে। একটা সুন্দরী মেয়ে চুমু খেতে চাইলো আর তুই কি করে রিজেক্ট করলি? হা হা হা।
সবাই হেসে উঠলো রিদির কথা শুনে। কথাটাতে সবাই মজা পেলেও পৃথার কানে বিষের মত লাগলো। বিশেষ করে ‘তুই যেমন ছেলে’ লাইনটি। বন্ধু মহলে এই ছেলেটা কি তাহলে সেভাবেই পরিচিত? নাকি মজা করছে!

মনের প্রশ্ন মনেই রয়ে গেলো পৃথার। সায়ান ওকে নিয়ে ক্যান্টিনে চলে এলো। দু কাপ কফি অর্ডার দিয়ে পৃথার দিকে তাকালো। মুখটা শুকিয়ে গেছে পৃথার। চোখের টানা টানা কাজল দেখে পুলকিত হতে ইচ্ছে করে। সায়ান থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, তুমি কি কাজল পরতে খুব ভালোবাসো?
পৃথা লজ্জা পেয়ে বলল, হুম।

~ ওহ হো, তোমার নাম তো জানাই হয়নি। কি নাম তোমার?
~ পৃথা।
~ আমি সায়ান। আমার ফ্রেন্ড দের কথায় কিছু মাইন্ড কোরো না। ওরা এমনিই ওরকম দুষ্টুমি করে। নিউ কামার দেখলে আরো বেশি করে।
~ আমি কিছু মনে করি নি।

~ আমি কি তোমার ফেসবুক আইডি পেতে পারি পৃথা?
চমকে উঠে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো পৃথা। চেনাজানা নেই, হুট করে কারো কাছে ফেসবুক আইডি চাইছে। ব্যাপারটাকে সহজভাবে নিতে পারলো না পৃথা। চুপ করে রইলো ও। সায়ান বলল, তোমার প্রবলেম থাকলে দিতে হবে না। আমার আইডি নেম ইংলিশে সায়ান চৌধুরি। তোমার কখনো ইচ্ছে হলে একটা রিকুয়েষ্ট পাঠিও।

পৃথা চুপ করে রইলো। এবারও কোনো উত্তর দিতে পারলো না। গ্রামের মেয়ে পৃথা। গ্রামের কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে শহরের একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হয়েছে। এখানে পড়ার ইচ্ছে ওর ছিল না। পৃথার বাবা মেয়েকে ঢাকা শহরেই পড়াবেন। ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স হয়নি বলে আর কোথাও পরীক্ষা দিতে দেন নি। প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। পৃথা শহরের ছেলেদের সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছে কিন্তু কখনো সামনা সামনি কারো সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয় নি। তাই ও খুব বেশি জানেও না এসব ছেলেরা কেমন স্বভাব চরিত্রের হয়। শুধু লজ্জা পায় আর ইতস্তত বোধ করে।

সায়ান বললো, তুমি কি ভয় পাচ্ছো আমাকে?
পৃথা মনেমনে বলল, কি করে বুঝে গেলো আমি ওনাকে ভয়ই পাচ্ছি। তবুও মুখে প্রকাশ করল না। এমনকি ভাব ভঙ্গিতেও বুঝতে দিলো না পৃথা ভয় পাচ্ছে সায়ানকে।
সায়ান বললো, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ভয় পাচ্ছো। ভাবছো আমিও আমার ফ্রেন্ড দের মত করবো কিনা। আরে বোকা মেয়ে ভয়ের কিছু নেই। আমি ওরকম কিছু করবো না। বিলিভ মি, আমি তোমাকে ভালো মেয়ে মনে করেই তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি আর কোনো কান্ডই তোমার সাথে ঘটতে দিবো না।

পৃথা এবারও কিছু বলল না। সায়ান জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো?
পৃথা দুদিকে মাথা নাড়াল। সায়ান হেসে বললো, বিরক্ত না হও এটাই তো চাই। আচ্ছা তুমি কোথায় থাকো?
~ বসুন্ধরায়।
~ ওহ আচ্ছা। বাবা মায়ের সাথে?
~ না। খালার বাসায়।

~ যাতায়াতে কোনো প্রবলেম হয় না তো?
~ না।
~ হলে আমাকে বোলো কিন্তু।
~ জ্বি।
পৃথা মুখে জ্বি বললেও মনেমনে ভাবতে লাগল কোনো সমস্যা হলেও ওনাকে বা কিভাবে বলবে? ওনাকে খুঁজে পাবে কোথায়? তাছাড়া ওনাকেই কেন বলবে? কিছু তো প্রয়োজন নেই। উনি কে পৃথার! মনেমনে এসবই ভাবছিল পৃথা। সায়ান কফির কাপে একটা টোকা দিয়ে বলল, ওই হ্যালো, খাচ্ছো না কেন?
~ জ্বি খাচ্ছি।

সায়ানের দিকে তাকিয়ে কফির কাপে চুমুক দেয় পৃথা। কফি খাওয়া শেষ হলেও অনেক্ষণ পৃথাকে কথার জালে আটকে রাখে সায়ান। কথা শেষ হলে পৃথা চলে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হয়েছে এমন সময় অর্পা এসে সামনে দাঁড়ালো। সায়ানের কাছে এসে বলল, তুই এখানে? তুই জানিস না তোকে না দেখলে আমার কত চিন্তা হয়?
পৃথা দ্রুত সরে যেতে চাইলো। সায়ান ডেকে বলল, পৃথা ও হচ্ছে অর্পা। আমার ফ্রেন্ড। ইনফ্যাক্ট বেস্ট ফ্রেন্ড।

পৃথা স্বাগত হাসি জানিয়ে বিদায় নিলো সেখান থেকে। যাওয়ার সময় মনেমনে ভাবছিল, শুধুই কি ফ্রেন্ড? নাকি অন্য কিছু? একটু না দেখলেও টেনশন হয়, এমন ফ্রেন্ড থাকাটাও তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। বলেই মনেমনে হাসলো।

পৃথা রাত্রিবেলা সায়ানের ফেসবুক আইডি সার্চ করে ঘুরে ঘুরে ওর প্রোফাইল দেখতে লাগল। একেকটা ছবি কি চমৎকার! ছবিতে হাজার হাজার লাইক, রিয়েক্ট। আর কমেন্টের বন্যা বইছে। বেশিরভাগ কমেন্টই মেয়েদের। সায়ানের আইডিতে মেয়েদের সংখ্যাই যে বেশি সেটা নিশ্চিত হওয়া গেলো। তারা হোক বা বন্ধু কিংবা অন্যকিছু। কিন্তু এতগুলো মেয়ের কমেন্ট দেখে আর কথা বলা কিংবা রিকুয়েষ্ট পাঠানোর আগ্রহ পেলো না পৃথা। সায়ানের প্রত্যেকটা ছবিতেই অর্পার কমেন্ট। তাও আবার গার্ল ফ্রেন্ডদের মতন। অবশ্য আরো অনেক মেয়েরই ওরকম গায়ে পরে পুতুপুতু করতে আসা কমেন্ট চোখে পড়লো।

তবুও সায়ানের প্রোফাইলে থাকা সমস্ত ছবি দেখতে লাগল পৃথা। কোনো কারণ নেই, তবুও দেখতে লাগলো। সায়ান নিঃসন্দেহে অনেক হ্যান্ডসাম কিন্তু ওকে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে পৃথার। কোনো এক অজানা কারণেই হচ্ছে, বুঝতে পারছে না পৃথা।
দুদিন ভার্সিটিতে আসে নি পৃথা। দুদিন পর ভার্সিটি আসার পথে সায়ানের সাথে দেখা। পৃথা সায়ানকে দেখতে পায় নি। সায়ান দূর থেকে দেখে বাইক নিয়ে এসে রিকসার পাশে দাড় করালো। পৃথা চমকে উঠে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
সায়ান বললো, হাই পৃথা, কেমন আছো?
~ জ্বি ভালো।

~ রিকসা থেকে নামো।
~ কেন?
~ আহা নামো না। নামতে বলছি তো।
~ না।
~ তোমার ভালোর জন্যই বলছি। প্লিজ নামো।
~ আমি যাবো কি করে?
~ আমি বাইকে করে রেখে আসবো। তবুও প্লিজ নামো।
সায়ান কিছুতেই পথ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে না। পৃথা ভয়ে ভয়ে রিকসা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে রইলো। সায়ান এগিয়ে এসে পৃথার কানে কানে বলল, তোমার কাঁধের উপর ফিতা দেখা যাচ্ছে। ওটা ঠিক করে নাও।

লজ্জায় লাল হয়ে গেলো পৃথা। মাথাটা নিচু করে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল। সায়ান বলল, বাইকে ওঠো ভার্সিটিতে নামিয়ে দিবো।
পৃথা ইতস্তত করছিল। সায়ান জোর পূর্বক পৃথাকে বাইকে তুলে বাইক স্টার্ট দিলো। লজ্জার রঙে লাল হয়ে ওঠা পৃথা কেবল চুপ করে বাইকের পিছনে বসে রইলো। সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে বাইক। পৃথার চুল উড়ছে। সায়ানের কাঁধে হাত রাখতে হলো এক রকম বাধ্য হয়েই। লজ্জার আভা এখনো কাটছে না পৃথার।


পর্ব ৩

সায়ান মাঝেমাঝে ইচ্ছে করেই বাইকে ব্রেক কষে যার ফলে পৃথার শরীর সামনে এগিয়ে এসে ধাক্কা খায় সায়ানের শরীরের সাথে।
পৃথা ইতস্তত বোধ করছে। নিজেকে সংযত করে ও দূরে সরে বসে কিন্তু দূরে বসে টিকে থাকতে পারে না। সায়ান আবারও ইচ্ছেকৃত ভাবে ব্রেক কষে। পৃথার খারাপ লাগছে এবার। থাকতে না পেরে বলল, গাড়ি থামান আমি নামবো।
~ কেন?

~ নামবো আমি। আমার ভালো লাগছে না।
~ সমস্যাটা কোথায়?
~ আপনি থামাবেন কি না?
~ আমার তো ভালোই লাগছে।
~ আমার লাগছে না মিস্টার সায়ান। বাইক থামান প্লিজ।

সায়ান হেসে উঠলো। পৃথা আচমকা দিলো বাইক থেকে একটা লাফ। পাকা রাস্তায় উপুড় হয়ে পরে ব্যথায় চিৎকার দিয়ে উঠলো। হঠাৎ এমন একটা পরিস্থিতি ঘটিয়ে ফেলবে এটা কল্পনাই করতে পারে নি সায়ান। দ্রুত বাইক থামিয়ে ছুটে এসে পৃথাকে ধরলো ও। হাত ধরে পৃথাকে টেনে তোলার সময় পৃথা বলল, ছাড়ুন হাত ছাড়ুন। আমাকে স্পর্শ করবেন না।

সায়ান তবুও হাত ধরে তোলার চেষ্টা করলে পৃথা জোরপূর্বক সায়ানের হাত সরিয়ে দিলো। সায়ান পৃথার পায়ে হাত রেখে বলল, দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছো? কোথায় লেগেছে?
~ আপনার জানতে হবে না। আপনি চলে যান।
~ কেন?
~ বাসায় গিয়ে সারারাত এটাই ভাববেন যে আমি কেন আপনাকে বাইক থামাতে বলেছিলাম আর থামান নি বলে কেনই বা লাফ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম?
সায়ান মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল। কিছু বলতে যাবে এমন সময় পৃথা একটা রিকসা ডেকে কষ্ট করে উঠে পরল রিকসায়। সায়ান কিছুই বলার সুযোগ পেলো না। পৃথা ভীষণ ব্যথা পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করছে মেয়েটা।
সায়ানের খারাপ লাগছে খুব। পৃথার চোখ মুখে একটা বেদনা ভেসে উঠেছে। খুব কষ্ট পাচ্ছে বোধহয়। সায়ান এগিয়ে আসতে চাইলে পৃথা থামিয়ে দিয়ে বলল, আসবেন না। আপনি যেরকম মেয়েদের সাথে মেলামেশা করেন আমি সেরকম নই। সবাইকে সস্তা ভাববেন না। মামা আপনি যান।

রিকশা চলতে আরম্ভ করল। স্থির হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সায়ান। কি করবে বা কি বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। আজকের এই ঘটনাটা ওর জীবনের একটা বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। একটা সাধাসিধা মেয়ে হঠাৎ করেই কেমন তেজী হয়ে উঠলো! ভাবাই যায় না ব্যাপারটা।

সায়ান ভার্সিটিতে যেতে পারলো না। বাসায় ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে রইলো। মন বিষন্ন হয়ে আছে। পৃথাকে বারবার মনে পড়ছে ওর। মেয়েটা বাসায় পৌঁছতে পারলো কি না, পায়ে কতটুকু ব্যথা পেয়েছে সবকিছু ভাবাতে লাগল ভীষণ ভাবে। এক মুহূর্তও শান্ত হয়ে থাকতে পারলো না সায়ান। বিশেষ করে শেষ মুহুর্তে পৃথার বলে যাওয়া কথাগুলো বারবার কানে বেজে উঠছে আর যন্ত্রণা দিচ্ছে।
রাত্রিবেলা ব্যথা ভীষণ বেড়ে গেলো পৃথার। বিছানায় শুয়ে থাকতে পারছিল না। যে দিকেই কাৎ হয়ে শুচ্ছিল সেদিকেই ব্যথা পাচ্ছিল। পায়ে চামড়া উঠে গেছে, সাদা মাংস বেড়িয়েছে। ওষুধ লাগিয়েও ব্যথা সাড়েনি। রাতে আঘাত প্রাপ্ত জায়গায় টনটন করছিল। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল পৃথার।

পরবর্তী সাত/ আটদিন আর ভার্সিটিতে আসা হল না পৃথার। পা সারতে সময় লাগল। তাছাড়া মানসিক ভাবেও ভার্সিটিতে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল না ওর। এদিকে সায়ান প্রতিদিনই পৃথার ক্লাসে এসে ওর খোঁজ করতে লাগল। প্রত্যেকটা ক্লাসে, বারবার খুঁজতে লাগল পৃথাকে। ও আসেনি। বিষয়টা কষ্ট দিতে লাগল। যদি আর না আসে, সেই ভয়টাও জাগছিল মনে। তবুও প্রতিদিন মনে আশা নিয়ে ভার্সিটিতে আসত সায়ান। কিন্তু পৃথার দেখা মিলল না।

রাতগুলোতে ঘুমাতে পারল না সায়ান। দুচোখ বন্ধ করলেই পৃথার মুখ ভেসে উঠতো। সেদিন বারবার বাইক ব্রেক করা মোটেই উচিত হয় নি। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে লাগল ওর। কিভাবে পৃথার সামনে যাবে, কিভাবে ওকে মুখ দেখাবে ভাবতেই পারছিল না।

কয়েকদিন পর যেদিন পৃথা ভার্সিটিতে এলো সেদিন কোথ থেকে যেন ছুটে এসে পৃথার সামনে হাঁটুগেরে বসল সায়ান। সিনিয়ররা সবাই অবাক হয়ে দেখছিল ওর কান্ড। হাত জোর করে পৃথাকে বলল, আই এম সরি পৃথা। তোমার সাথে যে বেয়াদবি করেছি তা মোটেই উচিত হয় নি। প্লিজ ফরগিভ মি, প্লিজ।

জনসমুক্ষে সায়ানকে এভাবে ক্ষমা চাইতে দেখে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে সায়ানের বন্ধুরা। ওরা এগিয়ে আসার সাহস করল না। পৃথা সায়ানকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সায়ান মাথা নিচু করে বলল, আর কক্ষনো এই কাজ আমি করবো না। আমি লজ্জিত।

সায়ানকে দেখে সত্যিই অনুতপ্ত মনে হচ্ছে। পৃথা কিছুক্ষণ নিরব হয়ে রইল।
সায়ান বলল, বিলিভ মি। গত কয়েকটা দিন প্রত্যেকটা ক্লাসে আমি তোমাকে খুঁজেছি। প্রতি ঘন্টায় খুঁজেছি। তুমি আসো নি। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারি নি রে মেয়ে। এ কেমন আগুনে পোড়াচ্ছো আমাকে? প্লিজ মাফ করো।
পৃথা কিছুটা অবাক হয়ে বলল, উঠুন। আমাকে কেন খুঁজেছেন?
~ সরি বলার জন্য।

~ সরি বললেই কি আপনি ভালো হয়ে যাবেন?
~ আমি খারাপ নই পৃথা।
~ সেদিন অমন নোংরামি কেন করেছিলেন?
~ আমি তো বললাম সেটার জন্য আমি অনুতপ্ত। ভেরি মাচ এশামড।
~ ওকে। আমি কিছু মনে রাখবো না। কিন্তু আপনিও যেন ভুল করেও আর আমার সামনে এ ধরণের কিছু করবেন না। আর করলেও তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
~ যাক বাবা, ক্ষমা তো অন্তত করেছো। আমার এতেই হবে। এবার প্লিজ আমাকে একটু সময় দাও। কথা আছে।

~ মানে কি? এতক্ষণ আটকে রাখলেন আবার কথা কিসের?
~ তোমাকে আমি আমার ফিলিংস টা বোঝাতে পারবো না। তোমার সাথে আমি কথা বলতে চাই, অনেক কথা। তোমার নাম্বারটা আমাকে দাও প্লিজ।
পৃথা শব্দ করে হেসে বলল, আপনি নাকি খারাপ নন? ধরে নিলাম আপনি ভালো। একটা ভালো ছেলে একটা ভালো মেয়ের কাছে এভাবে ফোন নাম্বার চাইতে পারে না।
~ তুমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করে দেখো। মা জানে আমি কিভাবে কাটিয়েছি এই কয়েকটা দিন।

~ মা কেন? মাকেও জানিয়েছেন নিজের লজ্জার কথা?
~ না মানে তোমার কথা জানিয়েছি।
পৃথা এবার অবাক না হয়ে পারলো না। হা হয়ে বলল, আমার কথা!
~ হ্যাঁ।
~ প্রেমে পড়েছেন?

মুখের উপর সত্যি কথাটা শুনে সায়ান ভড়কে গেল। আমতা আমতা করে লজ্জিত মুখে বলল, আমি জানিনা। তবে তোমার সাথে কথা না বলে আমি রাতে ঘুমোতে পারবো না এ সত্য। তুমি আমাকে এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও।
~ প্রেমে কখন পড়েছেন? প্রথম দিন থেকেই তো লেগে আছেন আমার পিছনে।
~ না মানে প্রথম দিনেই হয়তো…
পৃথা হেসে বলল, আমাকে সময় দিন। যেদিন বুঝতে পারবো আপনি মানুষটা খারাপ নন, ভালো। সেদিন ভেবে দেখবো। তার আগে এটা নিয়ে ভাবতেও চাই না।
~ কি বলো এসব? এখন আমাকে ভালো ভালো কাজ করতে হবে?
~ কিছুই করত হবে না। কারো সাথে মিশলেই বোঝা যায় সে কেমন স্বভাবের মানুষ।
সায়ান এগিয়ে এসে বলল, তারমানে আমার সাথে মিশতে তো রাজি হচ্ছো?
~ উম হুমম কিছুটা।

সায়ান একটা লাফ দিয়ে উঠলো। তারপর শান্ত হয়ে বলল, ওকে ক্লাসে যাও। আমি বাইরে অপেক্ষা করবো।

সায়ানের এই কান্ডটার কথা দ্রুত বন্ধু মহলে ভাইরাল হয়ে গেলো। সবাই সায়ানের সাথে হাসাহাসি করছিল। কেউ কেউ তো বলে বসল, চুমুর প্রপোজাল বাস্তবায়ন করার জন্য কি কোমর বেঁধে লেগেছিস নাকি? সায়ান কারো কথাকে পাত্তা দিলো না।
সময় যেন আজ অতিবাহিত হতেই চাইছে না। আকাশে ঘন কালো মেঘ করে এসেছে। মেঘের ঘনঘটা দেখছে সায়ান। এই আবহাওয়ায় একলা দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। পৃথাকে ভীষণ মনে পড়ছে। ক্লাস টা এখনো কেন যে শেষ হচ্ছে না! ভালোই লাগছে না একেবারে। অপেক্ষার অভিজ্ঞতা নেই সায়ানের। আজই প্রথম।
ক্লাস শেষ হতেই পৃথাকে পাকড়াও করলো সায়ান। পৃথা অবাক হয়ে বলল, আপনি! আশ্চর্য তো!

~ আমি অপেক্ষা করছিলাম।
~ পাগল নাকি? অপেক্ষা করে লাভ নেই। আমি এখনই বের হয়ে যাবো। বৃষ্টি আসার আগেই আমাকে বাসায় যেতে হবে।
~ ওকে চলো তোমাকে পৌঁছে দেই।
~ না না। আমি উবার নিয়ে চলে যাবো।

সায়ান বলল, এখানে উবার এই সময়ে পাবে ও না। আর রিকশায় পৌঁছতে পারবে না। আমি বলছি আমার সাথে চলো।
~ না না।
~ তাহলে আসো বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি?
~ না। আমাকে বাসায় যেতে হবে।

সায়ান আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, তাহলে চলো। এত চিন্তা কিসের? আমি মানুষটা কেমন সেটা জানার জন্য হলেও তো আমার সাথে বেশি বেশি চলাফেরা করতে হবে তাই না?

পৃথা চুপ করে কি যেন ভাবলো। সেদিনের মত কাজটা সায়ান আর করবে না এটা নিশ্চিত। তবে করতেও পারে, ছেলেদের বিশ্বাস নেই। আকাশের অবস্থা ভালো না।
সায়ান বললো, চলো তো তারাতাড়ি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই।
পৃথা আর আপত্তি করতে পারলো না। বাইরে এসে সায়ানের বাইকে উঠে পড়লো। সায়ান দ্রুত গতিতে চালাতে লাগলো বাইক। কেউই কোনো কথা বলছে না। শুধু হাই স্পিডে চলছে বাইক। জ্যামে পড়ে সময় চলে গেলো অনেক্ষণ। এমন সময় নামলো ঝুম বৃষ্টি।

আশেপাশে বাইক নিয়ে দাঁড়াবার মত জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে ভিজতেই হবে। পৃথারও আজকে খুব ভিজতে ইচ্ছে করছিল। একটা গাছ দেখতে পেয়ে ও বলল, সামনে ওই ফাঁকা জায়গাটায় যান তো। ভিজবো।
সায়ান বাইক নিয়ে গিয়ে গাছের নিচে রাখল। পৃথা বলল, বাইক ভিজে যাবে তো।
~ সমস্যা নেই।
~ কেন?

উত্তরে সায়ান হাসলো।
বৃষ্টি দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভেজা শুরু করল পৃথা। নেমেছে ঝুম বৃষ্টি। আকাশে মেঘের গুরুম গুরুম আওয়াজ। পৃথার মনে আজ সাতরঙা রংধনুর মত রং উঠেছে যেন। শুধু নেচে নেচে ভিজতে ইচ্ছে করছে ওর।
বৃষ্টির ফোঁটা লেগে আছে পৃথার গালে, মুখে,ঠোঁটে। দেখলেই বুকটা দ্রিম দ্রিম করে উঠছে সায়ানের। একেকটা জলের বিন্দু দেখলেই সায়ানের নিজেরই বৃষ্টি হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।

পৃথা মনের আনন্দে ভিজছে। অনেকদিন এরকম মাতাল করা বৃষ্টি দেখে নি ও। সাথে আছে দমকা হাওয়া। মন পাগল হয়ে যেতে চায়। আজকে এ উদাসী হাওয়ায়!
সায়ান শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আর এই সাধাসিধা মেয়েটার বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য দেখছে। সুখ সুখ অনুভব করতে শুরু করেছে সায়ান। দৃশ্যটা বাঁধিয়ে রাখার মতন।

পর্ব ৪

পৃথিবী সবচেয়ে সুন্দর ও মোহময়ী দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রিয় মানুষের বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য।
বৃষ্টির ফোঁটা লেগে আছে পৃথার চিবুকে। ভেজা চুলে মন মাতানো সৌন্দর্যের মহিমা খেলা করছে। এত মিষ্টি, এত অপূর্ব লাগছে যে মুহুর্তের জন্যও চোখ ফেরাতে পারছে না সায়ান। নিজেও পৃথার কাছে এসে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল। আজ পৃথিবীতে আনন্দের বন্যা বইছে। সুখের জোয়ারে ভাসছে যেন ভুবন। এত আনন্দ, এত ভালোলাগা কখনো আসেনি সায়ানের জীবনে। অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করছে আজ।

বৃষ্টিতে ভেজার পর পৃথার পাতলা জামায় শরীরের কিছু অংশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সায়ানের বারবার তাকাতে ইচ্ছে করছিল এটা সত্যি। তবুও ও পৃথার কাছে এগিয়ে এসে বললো, একটা কথা বলবো কিছু মনে করবে না তো?
পৃথা বলল, জ্বি বলুন।

~ ওড়না দিয়ে শরীরটা ঢেকে নাও পৃথা।
পৃথা চমকে উঠে সায়ানের দিকে তাকাল। এই কথা সায়ান বলেছে এটা যেন বিশ্বাসই হতে চাইলো না ওর। চোখাচোখি হতেই সায়ান এমন ভাবে তাকাল যে চোখ আটকে গেল পৃথার। রীতিমতো ধুকধুকানি বেড়ে যাচ্ছিল বুকের। সায়ানের দৃষ্টি মারাত্নক। তীরের মত বুকে এসে বিঁধে।
বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমলে সায়ান পৃথাকে বলল, তুমি বরং রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যাও। একটা রিকশা ঠিক করে দেই?
~ সেটাই ভালো হবে।

রিকশায় ওঠার মুহুর্তে পৃথা সায়ানকে বলল, আজ ভিজতে এত ভালো লেগেছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মত শব্দ আমার ডিকশিনারিতে নেই।
সায়ান মুচকি হেসে কৃতজ্ঞতার সহিত বললো, এত সুন্দর সময় উপহার দেয়ার জন্য তোমাকে থ্যাংকস পৃথা।

পুরোটা বিকেল ঝুম বৃষ্টি হয়ে চললো। জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে কেবল বৃষ্টি উপভোগ করছিল পৃথা। বারবার সায়ানের বৃষ্টিস্নাত চেহারা মনে হচ্ছিল আর কেমন কেমন উচাটন লাগছিল। কিছু একটা ফিল করতে শুরু করেছে ও। ফেসবুকে লগ ইন করে সায়ানের আইডিতে ঘুরে এলো আরেকবার। কিন্তু রিকুয়েষ্ট বা মেসেজ কিছুই পাঠালো না।

সায়ান বাসায় এসে একটা ঘুম দিয়েছিল। হঠাৎ কারো হাতের স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায় ওর। চোখ মেলে দেখে অর্পা পাশে বসে আছে। অর্পার চুল ভেজা। ভেজা চুল মুখের উপর এসে লেপ্টে রয়েছে। ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে অর্পাকে। রুমের জানালায় পর্দা টেনে দেয়া, লাইট নেভানো। তাই আবছা আলো,আবছা অন্ধকার বিরাজমান। এই অন্ধকারে একে অপরকে এত কাছ থেকে দেখে শরীর শিউরে উঠলো সায়ানের।
বলল, তুই এখানে? এই বৃষ্টির মধ্যে কিভাবে এলি?

~ আসবো না তো কি করবো? তোকে কাল থেকে কতগুলো কল দিয়েছি ব্যাক করিস নি। গত কয়েকদিন ধরেই মেসেজের তেমন রিপ্লাই দিচ্ছিস না। আমার কি টেনশন হয় না? আজ ভার্সিটি গেছিস এটাও আমাকে বলিস নাই। তাই সোজা বাসায় চলে এলাম।
~ তাই তো দেখতে পাচ্ছি।
~ এবার বল তো কি হয়েছে তোর?

সায়ানের বুকের উপর হাত রেখে নিচু হয়ে এলো অর্পা। হার্টবিট বাড়ছে সায়ানের। এমনিতেই বৃষ্টিভেজা দিন। রোমান্টিক ওয়েদার। তার উপর এমন আবেদনময়ী চেহারায় অর্পা। উফফ মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছে।
অর্পা সায়ানের গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, তুই জানিস না তোকে এক মুহুর্ত না দেখলে আমি থাকতে পারি না? কথা না হলে আমি পাগল হয়ে যাই। জানিস না তুই?
~ কেন এমন হয় তোর?

~ এটাও কি বলে দিতে হবে? লাইফে তোর চেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্স আমি কাউকেই দেই নি।
~ তোর শরীর থেকে একটা মিষ্টি স্মেল পাচ্ছি অর্পা। কি পারফিউম মেরেছিস?
অর্পা দুষ্টুমি হাসি দিয়ে বললো, খুব ভালো লাগছে নাকি?
~ হুম। মারাত্মক।
~ এরকম মারাত্মক একটা পারফিউম দিয়ে তুই যখন আমার কাছে আসিস আমারও এমন লাগে।

~ তাই!
~ হুম। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছি। তোরও কি এমন হচ্ছে?
~ হুম। ঘোর ঘোর লাগছে। তুই এই ওয়েদারে কেন এলি বলতো?
~ ওয়েদার টাই পাগল করা। তোকেও পাচ্ছিলাম না। তাই চলে এলাম। তুই কেন এ কদিন ঠিকমতো কথা বলিস নাই সেটা বল আমাকে?
সায়ান অর্পার হাত সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বলল, আমি একটা ব্যাপার নিয়ে খুব টেনশনে ছিলাম। তাই আরকি।
~ টেনশন কমেছে?

~ হ্যাঁ। একেবারে শেষ।
অর্পা আরো ঝুঁকে এসে সায়ানের মুখের সামনে মুখ নিয়ে এলো। অর্পার গরম নিশ্বাসে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে সায়ানের। ও বলল, কি শুরু করলি তুই?
~ তোকে খুব সুন্দর লাগছে সায়ান।
~ তোকেও।
~ আরেকটু কাছে আসি?
সায়ান নিশ্চুপ হয়ে আছে।

অর্পা বললো, আমার মাঝেমাঝে তোর বুকের ভিতর ঢুকে যেতে ইচ্ছে করে।
সায়ান কিছু বলার আগেই অর্পা সায়ানের চাদরের ভিতরে ঢুকে গেলো। সায়ানের বুকের সাথে নাক ঘষতে লাগল। সায়ানের বুকে ঘন লোম। নাক ঘষতে আরাম লাগছে অর্পার। সুড়সুড়ি লাগছে সায়ানের। ও কেবলই কাঁপছিল। অর্পা বলল, তুই আমার বুকে এভাবে ঢুকে যেতে পারবি?
~ না।

~ কেন?
~ তোর বুকে ঢুকে গেলে বিস্ফোরণ হবে।
~ কেন রে? কি আছে এখানে?
অর্পা সায়ানের হাত টেনে নিয়ে নিজের বুকে রাখলো। বিদ্যুৎ খেলা করে গেলো সায়ানের সমস্ত শরীরে। সায়ান কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এতটাই পাগল পাগল লাগছে ওর। এগোবে নাকি থমকে যাবে তাও বুঝছে না। শরীরটা অর্পাকে চাইছে। কিন্তু মন বলছে এটা ঠিক হবে না। আজ পর্যন্ত কারো সাথে এরকম অভিজ্ঞতা হয় নি সায়ানের। অর্পার সাথে এভাবে আচমকা হয়ে যাক সেটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না।

সায়ান অর্পাকে সরানোর চেষ্টা করে বলল, এটা ঠিক হচ্ছে না অর্পা।
~ কেন ঠিক হচ্ছে না? আমরা তো দুজন দুজনকে চাই। চাই না?
~ আমি তোকে চাই কিন্তু এভাবে না। তুই আমার ফ্রেন্ড অর্পা।
~ আমি তোর জাস্ট ফ্রেন্ড? আর কিচ্ছু না?
~ না।

~ সায়ান?
~ অর্পা, প্লিজ। তুই তো জানিস আমার এসব করার এক্সপেরিয়েন্স নেই। কারো সাথে এখনো পর্যন্ত যাইনি আমি।
~ তুই তো ভীতু, কাপুরুষ। আমার মত একটা মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে কোনো ছেলেই পারবে না। তুই কাপুরুষ বলেই..
~ অর্পা। যাই বল প্লিজ এসব না।

অর্পা তবুও সায়ানের মুখ চেপে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু খেলো। সায়ান বাঁধা দেয়ার সুযোগ পেলো না। অর্পা বেশ বুঝতে পারলো সায়ানকে এভাবে টলানো যাবে না। আগে ওর সাথে ফর্মালি প্রেম শুরু করতে হবে। প্রেম হয়ে গেলে রোমান্টিক কথা চলতে থাকলে নিজে থেকেই রোমান্স করতে চাইবে, আরো হাজারো আবদার করবে। সবকিছুর আগে প্রেম। কিন্তু সায়ান ওকে প্রেমিকা হিসেবে আদৌ চায় কিনা সেটা জানেনা অর্পা। সায়ানের প্রেমিকা হতে চাইলে আগে সায়ানের মনের খবর জানতে হবে। ধীরে ধীরে প্রেমের দিকে আগাতে হবে। এভাবে আর থাকতে পারবে না অর্পা।

সায়ানকে ছেড়ে দিয়ে উঠে বসল ও। মুখ কালো করে বলল, আই এম সরি। স্যরি সায়ান। তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোকে কিস করাটা আমার উচিত হয় নি।
সায়ান কি করবে বুঝতে না পেরে স্বান্তনা দিয়ে বলল, আরে ধুর পাগলী। এসবের জন্য মন খারাপ করতে নেই। সামান্য চুমুই তো খেয়েছিস।
~ রাগ করিস নি তো?
~ না।

থ্যাংক ইউ সায়ান। সায়ানকে জড়িয়ে ধরল অর্পা। সায়ান ইতস্তত বোধ করছে। অর্পা ইমোশনাল হয়ে বললো, তুই তো জানিস তুই আমার কি? তুই আমার পৃথিবী। কেবল তোর জন্য আমি কারো সাথে রিলেশন করিনি।
~ জানি। তুইও তো জানিস তুই আমার কি?
~ সায়ান, আমার উপর রাগ করিস না। এমন ওয়েদারে নিজেকে সামলাতে পারিনি।
সায়ান ‘ইটস ওকে’ বলল। বেচারা বুঝতেও পারলো না এটা ছিল অর্পার অভিনয়। অর্পার চালাকি।

অর্পা বলল, তুই শুয়ে থাক। আমি বরং চলে যাই।
~ যেতে হবে না। থাক গল্প করি।
~ ভয় পাবি না তো?
~ ধুর পাগলী। ভয় পাবো কেন?
~ যাক বাবা বাঁচলাম।

সায়ানের পাশে শুয়ে সায়ানকে জাপটে ধরে রইল অর্পা। ফোন বের করে কৌশলে দুজনের কিছু সেলফি তুলে নিলো। খুব বেশি ঘনিষ্ঠ না হলেও সেলফিতে এটা স্পষ্ট যে দুজনে একইসাথে একই চাদরে খুব কাছাকাছি বিছানায় শুয়ে আছে। অর্পার চোখেমুখে আবেদন স্পষ্ট। সায়ানকেও খুব বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। সায়ানের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। শার্টও নেই গায়ে। অর্থাৎ সায়ান খালি গায়ে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে এই কয়েকটি সেলফি দিয়েই সায়ানকে হাতে রাখবে অর্পা, মনেমনে এই বুদ্ধি করে ফেললো। যদি সায়ান ভালোভাবে ওর প্রেমে না মজে, কিংবা বিয়ে করতে আপত্তি জানায়, তখন এই অস্ত্র দিয়েই ওকে নিজের করে নিতে পারবে। এই ভেবে ভীষণ শান্তির নিশ্বাস ফেললো অর্পা।

পর্ব ৫

পৃথা সায়ানকে ফেসবুকে একটা টেক্সট পাঠিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
সায়ান ফ্রেশ হয়ে নাস্তা দিতে বললো মাকে। নাস্তা খাওয়ার পর অর্পা চলে গেলো। এখনো বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু না যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সায়ান অর্পাকে বাসায় থেকে যেতে বলবে না এটা ও জানে। নিজে থেকে আজকে না যেতে চাওয়াটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। সায়ান তখন নিতে পারবে না ব্যাপারটা। অর্পা চলে গেলে ফেসবুকে ঢুকলো সায়ান। ঢোকার সাথে সাথেই মেসেঞ্জারে মেসেজ রিকুয়েষ্ট দেখে আর থাকতে পারলো না। আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। পৃথা মেসেজ পাঠিয়েছে! ও দ্রুত রিপ্লাই দিলো মেসেজের।

পৃথা বলল, কি করছিলেন?
~ একটা ফ্রেন্ড এসেছিল, ও চলে গেলো মাত্র।
~ মেয়ে ফ্রেন্ড নিশ্চয়ই?
সায়ান কি উত্তর দেবে বুঝতে পারলো না। পৃথাকে মিথ্যে বলত্র ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু এই মুহুর্তে ওয়েদারের যা অবস্থা। বৃষ্টির সন্ধ্যা, তার উপর রোমান্টিক পরিবেশ। এমন আবহাওয়ার দিনে একটা মেয়ে ফ্রেন্ড এসেছে শুনলে ও নিশ্চয়ই অন্য কিছু ভাব্বে। অর্পা ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল এটাও ওকে বলা যাবে না। অর্পার সম্মান নষ্ট করার অধিকার ও সায়ানের নেই। সায়ান বাধ্য হয়েই মিথ্যে বলল, ছেলে ফ্রেন্ড।
~ ওহ। চা খেয়েছেন?

~ না।
~ কেন? বিকেলে চা খান না?
~ আজ খাই নি।
~ আমি মাত্র চা নিয়ে বসলাম। ধোয়া উঠছে চায়ের কাপে।
~ ছবি দেখি?
পৃথা একটা ছবি তুলে পাঠালো সায়ানকে। সায়ান চায়ের ছবি দেখেই মুগ্ধ হয়ে বলল, তোমার চায়ের রং দেখেই মনে হচ্ছে খেতে দারুণ লাগবে। ইচ্ছে করছে খেতে।
~ কখনো বাসায় আসলে বানিয়ে খাওয়াবো।

~ কখনো বাসায় আসলে মানে? অবশ্যই তোমার বাসায় যাবো, নিয়ে যেতে চাও না?
~ এই বাসায় তো আনার সুযোগ নেই। থাকি খালার বাসায়। খালা যদি বুঝতে পারে আমার ছেলে বন্ধু আছে তাহলে বাবাকে বলে দেবে।
~ ওহ হো। তাহলে আমাদের বাসায় এসে বানিয়ে খাওয়াবে।
~ সে দেখা যাক।

পৃথা আরেকটা ছবি পাঠিয়ে দিলো। সায়ান ছবি দেখেই বলল, ওয়াও! ভুনা খিচুড়ি?
~ হুম। ভার্সিটি থেকে ফিরে রান্না করেছি।
~ তোমার এত প্রতিভা জানতাম না তো।
~ এটা আবার প্রতিভা হলো নাকি? মেয়েদেরকে রান্না জানতে হয়।
~ তাই নাকি? কই আমার ফ্রেন্ড রা তো কেউই রান্না জানে না।
~ আপনার অনেক মেয়ে ফ্রেন্ড তাই না?
~ না মানে কয়েকজন ফ্রেন্ড আছে। তবে গত এক সপ্তাহ কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হয়নি।

~ কেন হয়নি?
~ যোগাযোগ করিনি।
~ কেন?
~ তোমাকে হন্য হয়ে খুঁজছিলাম। পাচ্ছিলাম না কোথাও। এতটাই ডিপ্রেসড আর টেন্স ছিলাম যে কারো সাথে কথা বলার ইচ্ছে করেনি।
পৃথা অবাক হলো। কারণ সায়ানের কথাটা একটু হলেও বিশ্বাস হয়েছে। একবার মনে হল যে সায়ান মিথ্যেও বলতে পারে। মিথ্যে বলেই বা লাভ কি? নানান এলোমেলো ভাবনা আসতে লাগল পৃথার মনে।
সায়ান বললো, আমি কি তোমাকে ভিডিও কল দিতে পারি?
~ না মানে আমি কখনো কারো সাথে ভিডিও কলে কথা বলিনি। আসলে কেউ তো নেই আমার।

~ আজকে বলবে। আমি ছাড়া তোমার কেউ থাকবেও না। কল দিই প্লিজ? তোমাকে দেখার সাধ জাগছে খুব।
পৃথা উঠে গিয়ে দ্রুত মুখ ধুয়ে আসলো। দরজা লাগিয়ে দিলো রুমের। মুখে ক্রিম ও পাউডার দিলো, চুলগুলো আঁচড়ালো। তারপর মেসেজ দিলো, হ্যাঁ এখন কল দিন।
সায়ান উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিল। যদিও এর আগে কখনো কাউকে ভিডিও কল কিংবা কল দেয়ার আগে পারমিশন নেয়নি ও। এবারই প্রথম। আসলে কারো সাথে কথা বলার আগে পারমিশন নেয়ার প্রয়োজনও হয়নি। মেয়েরাই আগে ওকে কল দিতো।
সায়ান ভিডিও কলে পৃথাকে দেখে মুখে হাত দিয়ে চুপ করে রইলো। পৃথা বলল, কি দেখছেন?

~ তোমাকে। তোমাকে ভিডিও কলেও সুন্দর লাগে।
~ কি যে বলেন না! আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।
~ তাই নাকি? অবশ্য মেয়েরা বলে।
~ মেয়েরা? আচ্ছা মেয়েদের সাথে কত ওঠাবসা আপনার শুনি?
~ আগে প্রচুর ছিল। এখন কমিয়ে দিয়েছি।
~ ঠিক বিশ্বাস হল না।

~ বিশ্বাস করো। এই যে তোমাকে ছুঁয়ে বলছি।
সায়ান ফোনের স্ক্রিনের উপর হাত রাখলো। পৃথা হেসে ফেললো ওর কান্ড দেখে। সায়ান অবাক হয়ে ওর হাসি দেখছিল। পৃথা বলল, এখন কি করবেন?
~ তোমার সাথে কথা বলবো।
~ তারপর কি করবেন?
~ তোমার ছবি দেখবো।
~ কেন?

~ দেখতে ভালো লাগে তাই।
~ সত্যি করে বলুন তো আজকে বাসায় যাওয়ার পর থেকে একবারও দেখেছেন?
সায়ান কি বলবে বুঝতে পারলো না। অন্য কোনো মেয়ে হলে নিঃসন্দেহে মিথ্যে কথা বলে দিতো। কিন্তু পৃথাকে মিথ্যে বলতে ইচ্ছে করছে না। ভিডিও কলে লুকিয়ে যাওয়াও যায় না। ও বলল, না দেখার সুযোগ পাইনি। এসেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম থেকে উঠে দেখি বন্ধু এসেছে।
~ আচ্ছা। এখন তাহলে রাখি?
সায়ানের ফোন রাখার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। পৃথা রেখে দিতে চাইছে বলে বলল, আচ্ছা। রাতে কি আরেকবার কল দিতে পারি?
~ সে রাতে দেখা যাবে।

এভাবেই চলতে লাগলো কথোপকথন। কথা বাড়তে লাগল। বিভিন্ন কথা শেয়ার করা শুরু হল দুজনাতে। পৃথা নানান বিষয়ে গল্প করতে পছন্দ করে। রাতে ফোন নাম্বার আদান প্রদান হল, এরপর শুরু হল ফোনে কথা বলা। প্রথমদিনে খুব বেশি কথা হল না। পরেরদিন সকালে টুকটাক কথা হলো। পৃথা ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে এমন সময় সায়ান ফোন দিয়ে বলল, যেখানে আছো সেখানেই থাকো। আমি আসছি।
পৃথা বাঁধা দেয়ার সুযোগ পেলো না। সেদিন বাইক থেকে লাফ দেয়ার পর সায়ানের সুবোধ হয়েছে। আজকে সুষ্ঠু সুন্দর ভাবে বাইক রাইড করছে। ধীরেধীরে চালাচ্ছে যাতে কোনো ধাক্কা না লাগে। পৃথা মনেমনে হাসছে। সেইসাথে আজকে আরেকটা ব্যাপার ঘটছে। সেদিন বাইকে উঠে কেমন অচেনা একটা টেনশন কাজ করছিল। কিন্তু আজ কোনো টেনশন হচ্ছে না। বরং মনটা রঙিন হয়ে উঠেছে। যা দেখছে তাই ভালো লাগছে।

রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে সায়ান হাওয়াই মিঠাই কিনে পৃথাকে দিলো। পৃথা দুটো রঙের হাওয়াই মিঠাই নিয়েছে, গোলাপি ও হলুদ। ধানমন্ডি লেকের পাশে বসে পা ঝুলিয়ে হাওয়াই মিঠাই খাচ্ছে দুজনে। কারোরই ক্লাসে যাওয়ার তাড়া নেই। আজকের সকালটা এতটাই সুন্দর যে ক্লাসে যেতে মনও চাইছে না।
রোদ ঝলমলে একটা দিন। সোনালী আলোয় গাছের পাতা চিকচিক করছে। গতকাল বৃষ্টি হওয়াতে গাছগুলো আরও সবুজ হয়ে গেছে। রোদের ঝলকানিতে ভালো লাগছে খুব। তেমন একটা গরম পড়েনি, হালকা ঠান্ডা বাতাস। এই সময়ে লেকের পাড়ে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে কার না ভালো লাগে!

গল্প করতে করতে বেলা বয়ে যেতে লাগলো। চারিদিকে লোকজন বাড়ছে। তবুও আজ ক্লান্তি নামছে না। দুপুর গড়িয়ে এলো একই জায়গায় বসে থেকে। এরপর সায়ান বলল, অনেক্ষণ বসে আছি। চলো না কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।
পৃথা রাজি হলো। চলে এলো রেস্টুরেন্টে। এখানেও আড্ডা চলতে লাগল। গত একদিনের ব্যবধানেই দুজনের মধ্যে এত বেশি কথা হয়েছে যে, দুজনের মাঝে বোঝাপড়া এতই ভালো মনে হচ্ছে, দুজনে একসাথে সারাজীবন চলতে পারবে। পৃথা প্রথমবার কোনো ছেলে বন্ধু পেয়েছে। তাই ওর মধ্যে উত্তেজনাবোধ বেশি। আর সায়ান এর আগে অজস্র মেয়ের সাথে মিশলেও কারো সাথে কথা বলে এতটা আনন্দ পায় নি। কারো সাথে কথা শেয়ার করে এত ভালো লাগে নি ওর। মেয়েটার মাঝে নেগেটিভ ধারণা কম।

কোনোকিছু নেগেটিভ মাইন্ডে নেয় না। কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। তাই হাজারো কথা ও গল্পে কখন সময় এত পেরিয়ে গেছে কেউ বুঝতেও পারে নি।
দুজনেরই বিরিয়ানি পছন্দ। বিরিয়ানি নিয়েও গল্প চললো। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আইসক্রিম আর জুস নিয়ে তর্ক বাঁধল। পৃথা আইসক্রিম খেতে চায়, সায়ান পৃথাকে জুস খেতে বলে। অবশেষে সায়ান বললো আগে জুস খাও তারপর আইসক্রিম।
এই থেকেই বোঝা গেলো সায়ান বউকে খুব আদর স্নেহ করবে। মনেমনে হাসলো পৃথা।
দুপুর পেরিয়ে গেলে পৃথা বাসায় যেতে চাইলো। সায়ান আর আটকালো না। সকাল থেকেই ওর সাথে আছে। আজকের জন্য যথেষ্ট হয়েছে।
বাসার কাছাকাছি পৃথাকে নামিয়ে দিয়ে এলো সায়ান। বলে এলো এখন থেকে প্রতিদিন সায়ানই পৃথাকে বাসায় রেখে আসবে আবার ভার্সিটিতে নিয়ে যাবে। কোনোকিছু প্রয়োজন হলেও পৃথা যেন সায়ানকে বলে।

সায়ানের মনোভাব ভালো লাগলো পৃথার।
সায়ানের ফোন সকাল থেকে সাইলেন্ট করে রেখেছিল। এখন ফোন নিয়ে দেখল অনেক গুলো কল এসেছে অর্পার নাম্বার থেকে। আগে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ অর্পার সাথে সায়ানের কথা হত। দুজনে অনেক কাছের বন্ধু। পারসোনাল সব কথা শেয়ার হতো, আড্ডা, ঘুরাঘুরি সবই হতো। হঠাৎ করে সায়ানের এমন পরিবর্তন অর্পাকে ভাবাচ্ছে। এরকম করার কারণ কি হতে পারে? সায়ান কি নতুন কাউকে পেয়েছে? চিন্তায় ডুবে গেছে অর্পা।
সায়ান কল ব্যাক করলে ওর চিন্তিত গলা শোনা গেল, তুই কোথায়?
~ এইতো বাসায় যাচ্ছি।

~ কোন জায়গায় আছিস বল? এক্ষুনি তুই আমার সাথে দেখা করবি। বাইক বাসায় রেখে ২৭ নাম্বারে আয়। আমি আসছি।
অর্পা গাড়ি নিয়ে এসেছে। সায়ানের সামনে গাড়ি ব্রেক কষে সায়ানকে গাড়িতে উঠতে বললো। গাড়িতে উঠতেই অর্পা সায়ানকে জাপটে ধরলো। জড়িয়ে ধরে রইলো অনেক্ষণ। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিলো।
সায়ান বললো, কোথায় যাচ্ছি?
~ যেখানে নিয়ে যাবো। তুই হঠাৎ করে চেঞ্জ হয়ে গেলি কেন বলতো?
~ মানে? কি চেঞ্জ হয়েছি?
~ তোর সবকিছুই বদলে গেছে।
সায়ান অন্যকিছু বলে বিষয়টাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। অর্পা দ্রুত গাড়ি চালিয়ে একটা শপিং মলে এলো। নিজে পছন্দ করে শার্ট, পাঞ্জাবি কিনে দিলো সায়ানকে। বললো, এটা তুই নিয়ে যা। যখন পরতে বলব, পরে আমার সামনে আসবি। ওকে?
~ ওকে বাবা। আমি তোকে একটা কিছু গিফট করি?
~ এটা আবার জিজ্ঞেস করে করতে হবে?
সায়ান একটা সুন্দর জামা গিফট করলো অর্পাকে। অর্পা দোকানে ঘুরেঘুরে অনেকগুলো কেনাকাটা করলো। সায়ান দাম দিতে গেলে বাঁধা দিচ্ছিল অর্পা।
কেনাকাটা শেষ করে রেস্টুরেন্টে এসে খাওয়াদাওয়া করলো। আড্ডা দিলো অনেক্ষণ ধরে। আড্ডার পর যে যার বাসায় চলে গেলো। চলে যাওয়ার সময় বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছিল অর্পাকে।

রাত ঠিক বারোটা পাঁচ মিনিটে অর্পা সায়ানকে কল দিলো। ফোন রিসিভ করতেই সায়ান শুনলো অর্পা কাঁদছে। অবাক হয়ে সায়ান বলল, কি হয়েছে পাগলী? কাঁদছিস কেন?
~ তুই আমাকে ফোন করলি না? একটা টেক্সট ও না?
~ কেন? দশটার দিকেই তো চ্যাট করলাম।
~ সায়ান, এই চ্যাটিংয়ের কথা বলছি না।
~ তাহলে?

~ আমার বার্থডে সায়ান। আজ আমার বার্থডে।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল সায়ান। এতকিছুর ভিড়ে অর্পার জন্মদিনের কথা ভুলে গিয়েছিল ও। বন্ধু বান্ধবীদের সাথে তেমন যোগাযোগ করছে না বলে জানতেও পারে নি। ও দুদিন ধরে পৃথাকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে একবার মনেও পরবনি আজ কত তারিখ! এত বড় ভুল হয়ে গেলো। সায়ান সরি সরি বলে কোনো কূল পেলো না।
অর্পা কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে রাখলো। সায়ান বাধ্য হয়ে এই রাত্রিবেলা একটা গিফট নিয়ে হাজির হল অর্পার বাসার সামনে। অর্পার ফোন বন্ধ। সায়ান অর্পার মাকে কল দিয়ে বলল অর্পাকে দিতে। অর্পা রিসিভ করলে সায়ান বলল, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাও।

এত রাতে সায়ান আসবে এটা ভাবতে পারেনি অর্পা। সবসময় ও সিনেমায় দেখেছে এমন হয়। ওর জন্য সায়ান ছুটে আসবে এটা ওর কাছে স্বপ্নের মত লাগছে।
অর্পা নিচে নেমে এলে সায়ান ছুটে গিয়ে অর্পার সামনে দাঁড়িয়ে ওর হাতে একটা ফুলের তোড়া দিলো৷ তারপর দিলো একটা গিফট ও একগাদা বেলুন।
অর্পা সায়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার কলিজা রে। কেন তোর সাথে রাগ করে আমি থাকতে পারি না?

~ কারণ তুই যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসিস তাই।
~ এটা তো ঠিকই বুঝিস। আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলিস না কেন?
~ এখন থেকে বলবো। কাল একটা পার্টি দিবো ফ্রেন্ডরা মিলে।
~ সত্যি!
~ হ্যাঁ।
~ সারপ্রাইজ দিলি আমাকে। থ্যাংকস রে। থ্যাংক ইউ সো মাচ।

পর্ব ৬

পৃথা অপেক্ষা করছে সায়ানের ফোনের জন্য। কারোর জন্য অপেক্ষাটাও এত মধুর হতে পারে এটা জানা ছিলো না পৃথার। জীবনে প্রথমবারের মত এই অনুভূতি। কারো একটা কলের জন্য এতটা সময় অপেক্ষা করা, কারো একটা টেক্সটের জন্য অপেক্ষা করা। প্রেমের স্পর্শ এমনই এক জিনিস, যা মানুষের মাঝে একবার ঢুকে পড়লে বিরক্তিকর জিনিসগুলোও আনন্দের হতে থাকে।

প্রেমে পড়লে দমকা হাওয়ায় মধুর লাগে, মনেহয় প্রেমের বাতাস। শীতল হাওয়াও মিষ্টি লাগে, যেন রঙিন প্রেমের মাতাল হাওয়া। প্রেম ব্যাপার টাই আশ্চর্যজনক। বসে বসে আনমনে এসব হাবিজাবি ভাবছিল পৃথা। সারে বারোটা বেজে গেলো, এখনো সায়ানের ফোন নেই৷ অথচ সায়ান বলেছিল ঘুমানোর আগে একবার ফোন করবে। হয়তো ভুলে গেছে। নয়তো ঘুমিয়ে গেছে। যে কারণেই হোক, ফোন না দেয়াটা অভিমানের জন্ম দিচ্ছে। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে পৃথার। কি জানি কেন এমন হয়! আবার একটু একটু টেনশনও হচ্ছে।

নিজে থেকে সায়ানকে কল দিতে যাবে এমন সাহস হচ্ছে না। আবার ভাব বেড়ে যায় যদি ছেলেটার। হাজার হলেও ছেলে মানুষ তো৷ বেশি গুরুত্ব দিলে মাথায় উঠে বসে। আর নামানো যায় না। অবশ্য মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই। পৃথা মনেমনে ভাবছে, আচ্ছা সায়ান আমাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে আমি কি ভাব নিচ্ছি? নাহ, ভাব নিলে তো পুরোটা সকাল ওর সাথে বসে থাকতাম না। আবার এও মনে হচ্ছে যে, এটা হয়তো ভাব নেয়াই হয়ে যাচ্ছে। কারণ ভাব না থাকলে তো নিজে থেকেই কল দিতো সায়ানকে।
শত হাবিজাবি ভাবনার পর অবশেষে সায়ানকে কল দিয়েই ফেললো। রিং হয়ে কেটে গেল, রিসিভ হলো না। পৃথার মনে হল দূর, এটা কোনো কাজ হলো। নিশ্চয় ই ও ব্যাটা ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মিনিট দশেক পর কল আসতেই লাফিয়ে উঠে তারাতাড়ি ফোন রিসিভ করলো পৃথা। সায়ান বললো, সরি সরি সরি ডিয়ার। কল দিতে লেট হয়ে গেছে। আসলে একটু বিজি ছিলাম তো তাই।
~ এত রাতে বিজি?
~ বন্ধুদের সাথে ছিলাম।
~ ওহ আচ্ছা। আপনারা ছেলেরা কত সৌভাগ্যবান। এত রাতেও বন্ধুদের সাথে বাইরে থাকতে পারেন। অথচ আমরা মেয়েরা পারি না।
~ কেন পারবে না? আমার মেয়ে ফ্রেন্ড রা অনেক রাতেও আমাদের সাথে আড্ডা দেয়, বাইরে থাকে। কেউ কেউ তো রাত দুইটা, তিনটা তেও বাসায় যায়।
পৃথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, কপাল লাগে। সবকিছুর জন্যই কপাল লাগে। আমার তো সেই কপাল নেই বুঝলেন।

সায়ান হাসতে হাসতে বললো, আহারে সোনাটা। আফসোস কইরো না, তুমি আমার বউ হলে যখন চাইবে তখনই বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবো।
এরপর দুজনেই অনেক্ষণ নিরব। শান্ত ফোনে শুধু নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। পৃথা লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জার চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে ও থমকে গেছে কথাটা শুনে। চুপ করে লাজুক মুখে হাসছে।

সায়ানও ওদিকে মুচকি হাসছে। বলল, কি গো, চুপ করে রইলে যে?
~ উহুম, আপনি বড়ই নির্লজ্জ। একটুও লজ্জা নেই।
~ এটা বুঝি লজ্জার মত কিছু হলো? এটা তো সিম্পল একটা ব্যাপার।
~ যাহ, দুষ্টু।

~ তুমি কি আমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলে?
~ হ্যাঁ, না না থাকবো কেন? আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো কেন?
~ দেখো, মুখ ফসকে কিন্তু সত্যিটাই বেরিয়ে আসে। বুঝলে?
সায়ান হাসছে। পৃথা লজ্জা পাচ্ছে শুনে। রাত ভর চললো কথা। পৃথা জানে না কিসের টানে এত কথা বলছে ও। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে যে ওর আনন্দ হচ্ছে। কথা বলতে ভীষণ সুখ সুখ অনুভব করছে ও।

বাতাসে আজ প্রেমের গন্ধ। দখিনা হাওয়া বইছে। সায়ানের বাইক ছুটে চলেছে শহর পেরিয়ে শহরের বাইরে যেখানে খোলা প্রান্তরে মন মাতাল হয়ে উড়তে চাইবে। শহরে চার দেয়ালের ভিড়ে অনেকদিন খোলা আকাশ দেখা হয় না। পৃথা সায়ানের বাইকের পিছনে। সায়ান অপেক্ষা করছে পৃথা কখন ওকে জাপটে ধরে। কিন্তু পৃথা ধরছে না। পৃথা ধরবেও না, এ নিশ্চিত সায়ান। তবুও পাগল মন অপেক্ষা করে।

কিছুদূর আসার পর রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে টং দোকানে চা খেলো দুজনে। পৃথা চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে ভালোবাসে। একবার বিস্কুট ভেজাতে গিয়ে পুরোটাই চায়ে পড়ে গেল। হো হো করে হেসে উঠলো সায়ান। সায়ানকে মারতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার জোগাড় পৃথা। পৃথাকে ধরে ফেলল সায়ান। এভাবেই চলতে লাগল ওদের খুনসুটি।
সারাদিন ঘুরাঘুরি করে মনের আকাশে রংধনু উঠলো। এভাবে কখনো স্বাধীন পাখির মত উড়তে পারেনি পৃথা। একদিকে ওড়ার আনন্দ, অন্যদিকে মনের মত একজন সঙ্গী। সায়ানকে কেন যেন ভীষণ ভালো লাগছে। বারবার ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।

দুজনে খোলা আকাশের নিচে বসে আছে। সায়ান উঠে গিয়ে দূর থেকে একটা দূর্বাঘাস ছিড়ে নিয়ে এলো। ঘাস দিয়ে একটা রিং বানিয়ে পৃথার হাতটা ধরল। এই প্রথম পৃথার হাত ধরেছে ও। পৃথা বাঁধা দিতে পারল না। ও দেখতে চায় সায়ান কি করে?
সায়ান পৃথার আঙুলে ঘাসের তৈরি রিং পরিয়ে দিলো। চমকে উঠে অনেক্ষণ হাতের দিকে তাকিয়ে রইল পৃথা।

সায়ান বলল, এ প্রাকৃতিক রিংটাই আমাদের বন্ধনকে অটুট রাখুক। সারাজীবনের মত তোমাকে যেন আমার পাশে পাই।
শিউরে উঠলো পৃথা। সায়ান পৃথার খুব কাছাকাছি এসে চোখের দিকে তাকালো। দখিনা হাওয়ায় চুল উড়তে লাগল পৃথার। ওড়না উড়ছে। পৃথা বুকে চেপে ধরে রেখেছে ওড়না। পৃথার উন্মুক্ত বুকটা দেখার আগ্রহ ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
পৃথা চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। পৃথা বললো, আমরা শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। এখনই রওনা না দিলে ঠিক সময়মত পৌঁছাতে পারবো না। আমাকে বাসায় যেতে হবে। দেরি হলে খালা বুঝে ফেলবে।

~ বাইকে বেশি সময় লাগবে না। তুমি চিন্তা কোরো না।
~ তবুও.. প্লিজ চলুন এখন রওনা দিই।
~ আরেকটু থাকি?
~ আচ্ছা। তবে বেশিক্ষণ নয় কিন্তু।
~ পৃথা, তুমি কি আমার কাঁধে একটু মাথা রাখবে?
পৃথা অনেক্ষণ কি যেন ভাবলো। তারপর মাথা রাখলো সায়ানের কাঁধে।
সায়ান বলল, কেমন লাগছে?

পৃথা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অনেক্ষণ পর ও উত্তর দিলো, খুব শান্তি শান্তি লাগছে।
~ পৃথা..
~ হুম বলুন।
~ এই যে তুমি আমার ভরসায় এতদূর এসেছো, আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। আমার কনফিডেন্স বেড়েছে। বিশ্বাস করো, তোমার এতটাও বিশ্বাসের যোগ্য হয়ে উঠতে পারবো ভাবিনি।

~ বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন, তাহলেই আমি খুশি।
~ আমার উপর ভরসার এই হাতটা সবসময় রেখো।
পৃথা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। দুজনে একসাথে বসে থেকে সূর্যাস্ত দেখলো। তারপর রওনা দিলো বাসার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু পথে বাঁধলো বিপত্তি। হাইওয়েতে ভীষণ জ্যাম। জ্যামের কারণে গাড়ি একটুও আগাচ্ছে না। যেটুকু এগোচ্ছে, আবার অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। রাত আট টার মধ্যে বাসায় ফিরলে খালাকে ম্যানেজ করা যাবে। কিন্তু যা জ্যাম, এই সময়ের মধ্যে পৌঁছানো যাবে তো?

সায়ান বলল, জ্যাম ছাড়লে দ্রুত পৌঁছে যাবো। তুমি চিন্তা কোরো না।
কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো না। জ্যাম ছাড়লো রাত আট টার পরে। সায়ান দ্রুত গাড়ি চালিয়ে নিয়ে আসছিল। হঠাৎ বাইক বন্ধ হয়ে গেলো। বুক শুকিয়ে গেলো পৃথার। আবার কি হলো!
বাইকে সমস্যা হয়েছে। কাছাকাছি গ্যারেজ আছে কিনা কে জানে। মহা বিপদে পড়া গেলো। এবার যে কি হবে!

সায়ান বললো, তুমি টেনশন কোরো না। কোনো সমস্যা হবে না।
~ সমস্যা অলরেডি হয়ে গেছে। আমি এখন কি করবো?
~ বাইকটা ঠিক না করে তো যেতেও পারবো না।
~ তাহলে উপায়? বাসায় কি বলবো আমি?
~ পৃথা, তুমি কি বাসে করে চলে যেতে পারবে? আমি তোমাকে বাসে তুলে দেই।
~ এই রাত্রিবেলা আমাকে একা বাসে তুলে দেবেন? কখনো একা বাসে উঠিনি আমি।
~ তাহলে কি করবো?

~ বাইকটাকে এখানে কোনো গ্যারেজে রেখে আমরা দুজনে বাসে করে চলে যাই?
~ হুমম, সেটা করা যায়। চলো দেখি কাছাকাছি কোথাও গ্যারেজ আছে কিনা।
দুজনে বাইক ঠেলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। পৃথার মুখ চিন্তায় শুকিয়ে গেছে। এমন সময় ফোনটাও বেজে উঠলো। খালা ফোন করেছে। ভয় হচ্ছে পৃথার। এখন কি বলবে খালাকে?

কয়েকবার কল কেটে গেলো। পৃথা রিসিভ করতে পারলো না। ভয়ে বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে। না জানি এবার কি হবে!
গ্যারেজে বাইক রেখে দুজনে এসে বাসে উঠলো। কিন্তু আবারও সেই জ্যাম। এই জ্যাম দশটার আগে ছাড়বে বলে মনে হয়না। উত্তেজিত হয়ে উঠছে দুজনে। টেনশন বাড়ছে হু হু করে।
সায়ান বুদ্ধি করে পৃথাকে বলল, আজকের রাতটা যদি বাইরে থেকে যাও তোমার সমস্যা হবে?

~ মানে কি? আমাকে বাসায় ঢুকতেই দেবে না আর। খালা আমাকে মেরে ফেলবে।
সায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, যেহেতু এখান থেকে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কাজেই আমরা একটা কাজ করতে পারি। একটা আইডিয়া পেয়েছি। আমি তোমার ফোন রিসিভ করে গুন্ডাদের গলায় খালাকে বলবো আমি তোমাকে কিডন্যাপ করেছি। পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে একটা ঠিকানা দিয়ে বলবো সেখানে চলে আসতে। খালা আসতে পারবে না। তার আগেই কাল সকালে আমরা বাসায় পৌঁছে যাবো।

~ খালাকে বলবো কি বাসায় গিয়ে?
~ বলবে তোমার বন্ধুরা ফোন করেছিল তাদেরকেও একই কথা বলেছে। তাই বন্ধুরা পুলিশ নিয়ে তোমাকে বাঁচিয়েছে।
~ এত বড় মিথ্যা? এটা ঠিক হবে না মোটেও। অনেক বড় অন্যায় হয়ে যাবে।
~ প্রেম করলে দু চারটা মিথ্যা বলতেই হয়। তাছাড়া উপায় নেই। এখন বাসায় যেতে রাত একটা বেজে যাবে। কিছু বললেই খালার বকা খাবে। এমনকি আরো বড় সমস্যাও হতে পারে।

পৃথা কি করবে ভেবে পেলো না। জীবনে কখনো মিথ্যে বলার প্রয়োজন হয়নি ওর। আজ একটা কাজে ফেঁসে গেছে। এখন মিথ্যে বলা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু খালাকে আর বাসার সবাইকে টেনশন দেয়াটা মোটেও উচিত হবে না। বাবা শুনলে তো নির্ঘাত হার্ট এটাক করবে।

সায়ান বললো, তুমি চিন্তা কোরো না। খালাকে এটাও বলতে পারো যে একদল ছেলে তোমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি কোনোমতে পালিয়ে সারারাত কোথাও আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে ছিলে। আর ফোনটা আমাকে দিয়ে দাও। বলবে ফোন তারা কেড়ে নিয়েছে। আর দুদিন পর তোমাকে একটা নতুন ফোন কিনে দেবো আমি।
সায়ান জানে তার আইডিয়া গুলো একদম ফালতু ছিলো। বাস্তবে এমন কিছু করলে পরিবারের লোকজন খুবই টেনশন করবে।

পৃথা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সায়ানের বুদ্ধিগুলো একদিকে খারাপ আবার খারাপ নয়। ও যদি কোনো সুযোগের জন্য এমন করে থাকে। কিন্তু সেটা করার সুযোগ নেই। কারণ জ্যাম তো একটা কোইন্সিডেন্ট। জ্যামের পিছনে সায়ানের হাত নেই, বাইক নষ্ট হওয়ার পিছনেও হাত নেই। সায়ানকে এখন আর খারাপ মনে হয়না। ওকে বিশ্বাস করা যায়। তবে কি ওর বুদ্ধিটাই কাজে লাগাবে পৃথা?

রাত বেড়ে যাচ্ছে। জ্যাম ছাড়ার কোনো নামগন্ধই নেই। শহরের ভিতরে আরো কত জ্যাম আছে কে জানে। না, কিছু একটা করতেই হবে।
পৃথা বলল, সারা রাত কি আমরা রাস্তায় থাকবো?
~ না। কাছাকাছি আমার এক বন্ধুর বাসা আছে। সেখানে যাবো। বন্ধুর বাসা আছে বলেই তো তোমাকে বললাম আজকে থেকে গেলে সমস্যা হবে কিনা?

পৃথা অনেক্ষণ চিন্তায় মগ্ন রইলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ঠিক আছে। আজকে আর বাসায় যাবো না। এরপর যা হবার হবে। ফোন বন্ধ করে রাখলাম।
দুজনে সাময়িক আবেগ কিংবা এডভেঞ্চারের বশে বাড়ির লোকদেরকে এত বড় দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো, অথচ তারা বুঝতেও পারলো না জীবনটা শুধুমাত্র এডভেঞ্চার আর পাগলামি নয়। জীবনটা অনেক কঠিন, অনেক ভয়াবহ

পর্ব ৭

রাত বাড়ছে। সায়ানের বন্ধু হাইওয়ে থেকে রিসিভ করে নিয়ে আসলো ওদেরকে। রাস্তা থেকে অনেক দূরে ক্ষেতের মাঝখানে একটা বাড়ি। দূর থেকে লাইটের আলো জ্বলজ্বল করতে দেখা যাচ্ছে। ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় ঝিঁঝির ডাক কানে আসছিল। পৃথার ভয় কেটে গেছে অনেকটা। কারণ সায়ানের বন্ধুকে দেখে বেশ ভালো মানুষ মনে হচ্ছে। আচার আচরণের বেশ বিনয়ী।

বন্ধুর নাম জিয়ান। বাসার দরজা খুলে দিলো জিয়ানের ছোট বোন। সায়ানকে দেখে সালাম জানালো। সায়ান জিজ্ঞেস করলো কেমন আছো?
মেয়েটা ‘ভালো আছি’ বলে পিছনে পৃথাকে দেখে বললো, আপু কেমন আছেন? পৃথার হাত ধরে ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলো জিয়ানের বোন। সায়ান কিছুটা চিন্তামুক্ত হলো। আর যাই হোক, অন্তত পৃথা এই মেয়েটাকে পেয়ে নিশ্চিত হয়েছে নিশ্চয়ই।
জিয়ানের আম্মু অনেক মিশুক মহিলা। সায়ান ও পৃথাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। সায়ানের ধারণা ছিল মহিলা পৃথাকে দেখে রাত্রিবেলা খিটমিট করবেন কিংবা আশ্রয় দিতে চাইবেন না। সেসবের কিছুই হলো না। বরং উনি খুব যত্নে পৃথাকে বরণ করে নিলেন।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে আলাপচারিতার পর্ব শেষ করে জিয়ানের আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের সম্পর্কের কথা বাসায় জানে?
সায়ান ই উত্তর দিলো, জ্বি আন্টি। আমার বাসায় জানে, ওর বাসায় এখনো জানানো হয়নি।
~ বিয়ের চিন্তা ভাবনা কবে তোমাদের?
~ এখনো চিন্তা করিনি ওটা নিয়ে।

মহিলা বললেন, বিয়ের চিন্তা না করে এভাবে ঘুরে বেড়ানো কি ঠিক? কিছু মনে কোরো না বাবা। আমি আমার ছেলেকেও একই কথা বলে রেখেছি। কারো সাথে সম্পর্ক গভীর হলে যেন আমাদেরকে জানায়। আমরা বিয়ের ব্যবস্থা করবো কিংবা কথা পাকা করে রাখবো। যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নেই, সেটাকে আগানো উচিত না। সম্পর্ক যাই হোক না কেন আগে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত।

সায়ান বললো, আন্টি আমার বাসা থেকে কোনো সমস্যা নেই। খুব শীঘ্রই পৃথার বাসাতেও জানাবো। আর পৃথা এ বছরই ফার্স্ট ইয়ারে উঠেছে, ওর বাসায় এখন জানালে প্রতিক্রিয়া খারাপ হবে।
আন্টি চুপ থেকে বললেন, তোমরা যে আজকে এখানে থেকে যাচ্ছো এটা নিশ্চয়ই বাসায় জানে না। পৃথার বাসায় দুশ্চিন্তা করবে না?

সায়ান বলল, আমরা ভেবেছিলাম সন্ধ্যার আগেই শহরে পৌঁছতে পারবো। কিন্তু আজকে সেটা সম্ভব হলো না। বাসায় বলেছে এখানে এক বন্ধুর বাসায় থেকে যাবে।
আন্টি পৃথার দিকে তাকালেন, তুমি মুখ শুকনো করে বসে আছো কেন? কোনো সমস্যা?
~ না আন্টি।
পৃথা হাসার চেষ্টা করলো। আন্টি আবারও বললেন, তুমি এক কাজ করো। তোমার মাকে ফোন দাও আমি কথা বলছি।
পৃথা ও সায়ান একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। এই পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেবে, চিন্তিত দেখালো পৃথাকে।

আন্টি বললেন, আমি তোমার মাকে বুঝিয়ে বলবো যে তোমরা একটা বিপদে পড়েছ। আমি আমার বাসায় রেখেছি, কোনো সমস্যা হবে না। আমি তো তোমার মায়েরই মত।
সায়ান বুদ্ধি করে বলল, কিন্তু আন্টি ওর বাসায় তো আমাদের সম্পর্কের কথা জানে না। আমার সাথে বেরিয়েছে শুনলে রেগে যাবেন। পৃথারও আর এখানে পড়াশোনা করা হবে না।

~ তুমি কি শিউর যে তুমি পৃথাকেই বিয়ে করবে? সেটা যখনই হোক? এরকম প্রতিশ্রুতি করতে পারো?
~ হ্যাঁ। আমি পৃথাকেই বিয়ে করবো সেটা যখনই হোক না কেন। সেই সৎসাহস আমার আছে।
পৃথা অবাক হয়ে সায়ানের দিকে চেয়ে রইলো। সায়ানকে অনেক আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। দৃঢ় কন্ঠে সায়ানের বলা কথাগুলো ভালো লাগলো ওর। এই কি সেই সায়ান যে বাইকে বসে বারবার ব্রেক কষছিল যাতে পৃথার শরীর ওর শরীরে ধাক্কা খায়? ছেলেটা কয়েকদিনের শোকে অনুতাপে একেবারে বদলে গেছে।

সায়ান ভাবছে, আন্টি যদি পৃথার মাকে কোনোভাবে ম্যানেজ করতে পারে তাহলে আর পৃথার খালাকে ফোন দিয়ে মিথ্যে বলতে হবে না। আর কিডন্যাপিং এর নামে টেনশন ও দিতে হবে না। যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে এগোয় তবে সরাসরি বিয়ের কথা বলবে ওর বাসায়। মনেমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে সায়ান বললো, আন্টি আপনি যদি ওর বাসায় ম্যানেজ করতে পারেন, সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আন্টি। নয়তো বিষয়টা চেপে যেতে হবে। পৃথার বাবা মা গ্রামে থাকেন।

আন্টি হেসে বললেন,আরে বোকা ছেলে বাসায় যাতে কোনো প্রবলেম ফেস করতে না হয় সেজন্যই তো আমি বলছি পৃথার বাসায় ফোন করো। আমি কথা বলবো। আমাকে কি তোমার এতটাই খারাপ মা মনে হয় যে আমি সব বলে দিবো?
সায়ান উঠে গিয়ে জিয়ানের মায়ের কোলের কাছে বসে পড়লো। হাত দুটো ধরে বলল, থ্যাংক ইউ আন্টি। থ্যাংক ইউ সো মাচ।

পৃথা সাহস পাচ্ছিল না বাসায় ফোন করার। কারণ বাবা মাকে না বলে কখনো কোথাও যায়নি ও। মাত্র ক’দিনেই শহরে এসে একা একা ঘুরতে শিখে গেছে শুনলে বাবা মা কি ভাব্বেন কে জানে। অবশ্য এটাও ঠিক যে কিডন্যাপ বা অন্যকিছুর নামে মিথ্যে বললে আরো হাজারটা মিথ্যে বলতে হবে। তারচেয়ে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে, এখন সত্যিটাই বলে দেয়া উচিত। সত্য সবসময়ই জিতে যায়। বাকিটা পরে দেখা যাবে। অন্তত বাসার মানুষদেরকে মিথ্যে টেনশন তো দিতে হবে না।

পৃথা ভয়ে ভয়ে ওর আম্মুর নাম্বার দিলো। জিয়ানের আম্মু কল দিলেন ওর বাসায়। সালাম দিয়ে বললেন, আপা ভালো আছেন?
ওপাশ থেকে কি বললেন বোঝা গেলো না। আন্টি বললেন, আমি আপনারই এক বোন বলছি। ঢাকা থেকে বলছিলাম।

আন্টি কথা চালিয়ে গেলেন। বললেন, পৃথা বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়েছিল, বাসায় বকা খেতে হবে জন্য বাসায় জানায়নি। কিন্তু বিপদে পড়ার কারণে সময়মত বাসায় পৌঁছাতে পারে নি। এখন আন্টি ওনাদের বাসায় রেখে দিয়েছেন। নিজের মেয়ের মত যত্নে রাখবেন, কোনো সমস্যা হবে না।

এ ধরণের নানান কথা গুছিয়ে বলার পর আন্টির মুখে হাসি দেখা গেলো। সায়ান ও পৃথা আন্টির দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছেন। পৃথার চোখেমুখে উদ্বেগ, কি যে হবে এবার! মা কি সহজভাবে নিতে পারবে? তবে আন্টি বলেননি ছেলে ফ্রেন্ড নাকি মেয়ে ফ্রেন্ড। সিস্টেমে কথা বলেছেন। মা কে ম্যানেজ করাও যেতে পারে। মনেমনে প্রার্থনা করছে পৃথা।

আন্টি পৃথার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার সাথে কথা বলবেন।
পৃথা ভয়ে ভয়ে ফোন হাতে নিয়ে কানে ধরলো। খুব টেনশন হচ্ছে ওর। কিন্তু ওপাশ থেকে মায়ের গলায় তেমন উদ্বেগ পাওয়া গেলো না। মা বললেন, তুই যেখানেই যাস আর যেখানেই থাকিস আমাকে জানিয়ে যেতে সমস্যা কোথায় বল তো?

~ মা, ভয় লাগছিল। কখনো তো তোমাকে না বলে কোথাও যাই নি।
~ এখন বড় হইছিস, ভার্সিটিতে পড়িস, বাইরে থাকিস। বন্ধুদের সাথে যাবি। কিন্তু আমাকে বললে আমি কি পারমিশন দিতাম না? কখনো কোথাও যেতে চাইলে আমি কি না করতাম?

~ না।
~ তাহলে? তোর বাবা শুনলে কেমন মন খারাপ করবে জানিস?
~ হুম। বাবাকে জানিও না মা। আর কক্ষনো আমি তোমাদেরকে না বলে কোথাও যাবো না।
~ ঠিক আছে। মনে থাকে যেন। যেখানেই যাস, আমাদেরকে বলে যাবি। তোর খালাকে জানিয়েছিস?
~ না। ভয় পাচ্ছি জানাতে। যদি বকা দেন?

~ আচ্ছা আমি ওকে ফোনে বলে দিবো যেন তোকে বকা না দেয়। কালকে সকাল সকাল বাসায় চলে যাবি। আর এখানে যে বান্ধবীর বাসায় আছিস, ওরা অনেক ভদ্র মানুষ কথা শুনে মনে হল। কোনোরকম বেয়াদবি করবি না। ভদ্র হয়ে থাকবি।
~ আচ্ছা মা।
~ নিজের যত্ন নিস। আর আমাকে ঘুমানোর আগে কল দিবি।
~ আচ্ছা মা।

মা ফোন রেখে দিলেন। পৃথার চোখ ছলছল করছে। কার জন্য, কিসের জন্য এভাবে বাড়ির বাইরে বেরনোর সাহস পেয়েছে ও? কখনো বাবা মাকে না বলে কোথাও যায়নি যে মেয়েটা, সে আজ অনেক বড় দুশ্চিন্তায় তাদেরকে ফেলে দিতে চেয়েছিল। অথচ মা কত সুন্দর করে কথা বললেন।

নিজের উপর অভিমান জমছে পৃথার। মা তো সন্তানদের ভালো চান, মাকে না জানিয়ে কোনো সন্তানেরই কিছু করা উচিত না। সায়ানের সাথে সম্পর্ক হলে তো মাকে জানাত অবশ্যই। কিন্তু সায়ানের সাথে কোনো সম্পর্কই তো হয়নি। যার সাথে কোনো সম্পর্কই নেই, তার সাথে এভাবে বের হওয়াটা একদম ঠিক হয়নি। অনেক বড় ভুল হতে পারত, এই ভেবে নিজের কাছে নিজেকেই খারাপ লাগছে পৃথার।

সায়ান বলল, আন্টি কি বললেন?
~ মা ভেবেছে আমি বান্ধবীর বাসায় আছি।
~ তোমাকে বকা দিয়েছেন?
~ না।

~ কিছু বলেননি?
~ বললেন কোথাও যাওয়ার আগে যেন মাকে জানিয়ে যাই।
~ উফফ বাবা, বাঁচলাম।
পৃথা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি একটু বাথরুম যাবো।

বাথরুমে এসে কল ছেড়ে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে কান্না করলো পৃথা। খুব কান্না আসছে। কার জন্য ও বাবা মাকে, খালাকে মিথ্যে বলতে যাচ্ছিল? কিডন্যাপের মত টেনশন দিতে যাচ্ছিল? শুধুমাত্র একটা ছেলের জন্য? কে হয় ছেলেটা ওর? যে বাবা মা ছোটবেলা থেকে আদর যত্নে মানুষ করেছেন, তাদেরকে না জানিয়ে একটা ছেলের প্রতি এত দরদ কেন আসছে? আর কক্ষনো সায়ানের সাথে বের হবে না ও। কাঁদতে কাঁদতে এই সিদ্ধান্ত নিলো পৃথা।

প্রত্যেকটা মেয়েরই তার পরিবারের কথা ভাবা উচিত। আবেগের বশে গা ভাসিয়ে দিয়ে জীবনকে নিজের ইচ্ছামত চালানো যায় না। এ জীবন বাবা মায়ের দান, সে জীবনকে নিয়ে খেলা করার অধিকার কোনো সন্তানের নেই। এখন বাবা মা হাতখরচ না দিলে যে সন্তানকে না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে, সে কি করে বাবা মাকে টেনশন দিতে চায়?
কাঁদছে পৃথা। কাঁদছে আর আপনমনেই বলছে, আমি আর কখনো বাবা মাকে মিথ্যে বলবো না। এ যাত্রায় বেঁচে গেছি। আর কোনোদিনো এরকম কাজ আমি করবো না।

অনেক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর জিয়ানের ছোটবোনের রুমে গেলো পৃথা। মেয়েটার নাম জিনিয়া। ও পৃথাকে দেখে বলল, আপু আসেন না। আমার সাথে ঘুমাতে কি সমস্যা হবে? নয়তো আমি আম্মুর রুমে চলে যাই।
~ আরে না না। আপনিও থাকুন। একসাথে গল্প করা যাবে।
এমন সময় দরজায় সায়ান এসে দাঁড়ালো। পৃথা নির্বিকার ভাবে তাকালো সায়ানের দিকে। সায়ান বলল, একটু আসবে?
~ সকালে কথা বলি?

সায়ান কিছু বললো না। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলো দরজায়। পৃথা বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, আসুন।
বারান্দায় এসে দাঁড়াল দুজনে। এখান থেকে বাইরে শুধুই অন্ধকার আর ঝিঁঝির ডাক। খুব নির্জন একটা বাড়ি। শান্ত, কোনো শব্দ নেই।
নির্জনতা ভেঙে সায়ান বললো, সরি পৃথা।
চমকে উঠলো পৃথা, সরি কেন?
~ তোমাকে কাঁদানোর জন্য।
~ কি করে বুঝলেন আমি কেঁদেছি?

~ তোমার চোখ দেখে। বাথরুমে এতক্ষণ কাঁদছিলে, সেটা কি বুঝতে অসুবিধা হবার কথা?
পৃথা চুপ করে রইলো। সায়ান বললো, আমাকে ভুল বুঝো না। তখন ওরকম একটা সিদ্ধান্ত নেয়াটা আমার উচিৎ হয় নি। সরি পৃথা। আর কখনো এরকম করবো না।

পৃথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ভুলটা তো আমারই। কেনই বা আপনার সাথে আসতে গেলাম।
সায়ান অবাক হয়ে তাকালো পৃথার দিকে। পৃথা বললো, বাদ দিন না। রাত অনেক হয়েছে। আমার খুব মাথা ব্যথা করছে। ঘুমাতে হবে।
সায়ান কিছু বললো না। কিছু শোনার অপেক্ষাও করলো না পৃথা। বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেলো ও। সায়ান অবাক হয়ে পৃথার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। পৃথা কি অভিমান করেছে! ভুল বুঝলো না তো!
বুকটা চিনচিন করে উঠলো সায়ানের।

পর্ব ৮

রাতে জিনিয়ার সাথে গল্প গুজব করে মন ভালো হয়ে গেলো পৃথার। জিনিয়া মায়ের অনেক প্রশংসা করলো। মানুষ হিসেবে তিনি যেমন ভালো ও উদার, তেমনি মা হিসেবেও। ছেলেমেয়েদের মন বুঝেন ঠিকই তবে আচরণ করেন বন্ধুদের মতন। যাতে বাচ্চারা কেউ খারাপ পথে না যায়। বাবা মা সবসময় বন্ধুর মত সহযাত্রী হয়ে পাশে থাকলে সন্তানও পাশে থাকবে।

পৃথাও নিজের মায়ের গল্প করলো, বাবার গল্প করলো। সময়গুলো কেটে গেলো নির্বিঘ্নে। পৃথা ফোন খুলে খালাকে একবার কল দিয়ে সরি বললো। ফোনে বারবার মেসেজ আসছে সায়ানের নাম্বার থেকে। কিন্তু এই মুহুর্তে মেসেজ দেখার ইচ্ছে একেবারেই হচ্ছে না। পৃথা ফোন উল্টো করে রেখে দিলো। সায়ান যত ইচ্ছে মেসেজ পাঠাক।

খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেলো। জিনিয়া সাথে নিয়ে হাঁটতে গেলো বাইরে। আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি না থাকায় খোলা প্রান্তরে কোনো সারাশব্দ নেই। সকালের হাওয়ায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেই মন সতেজ হয়ে উঠলো। বাসায় ফিরে এসে দেখলো আন্টি নাস্তা বানিয়ে ফেলেছেন।

মা ফোন দিলে কথা বলল পৃথা। মা তারাতাড়ি বাসায় যেতে বলেছেন। কিন্তু সায়ান এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি। জিয়ানও ওঠে নি। সায়ানকে ডাকতে হলে নিজেকেই যেতে হবে ওর রুমে। সায়ানের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে করছে না। রাত থেকে মন শুধু অনুতাপের আঁচলে ঠাই নিয়ে শান্তির ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছে। সায়ানকে এ ছায়ায় আশ্রয় দিতে চায় না পৃথা।

বাধ্য হয়ে জিয়ানের রুমে যেতে হলো। দরজায় শব্দ করলে জিয়ান এসে খুলে দিয়ে বলল, গুড মর্নিং।
পৃথা হাসিমুখে বলল, গুড মর্নিং ভাইয়া। উনি এখনো ওঠেননি?
~ না। ডেকে দিবো?

~ দিন না প্লিজ।
জিয়ান বিছানার কাছে গিয়ে সায়ানের নাম ধরে ডাকতে লাগলো। সায়ান চোখ মেলে তাকালো, এত সকালে কি?
জিয়ান পৃথাকে বলল, তোমরা কথা বলো। আমি বাইরে যাচ্ছি।
জিয়ান বাইরে চলে গেলে গুটিগুটি পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলো পৃথা। সায়ান আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল, কি গো? এত সকালে উঠেছো?
~ আমাদেরকে এখনই রওনা দিতে হবে। মা সকাল সকাল বাসায় যেতে বলেছে।
~ আচ্ছা উঠতেছি। তুমি কখন উঠলে?
~ কিছুক্ষণ আগে।

~ রাতে অনেক মেসেজ দিয়েছি কল দিয়েছি। বাট রিসিভ করলে না, নো রিপ্লাই। হোয়াই?
পৃথা চুপ করে থেকে উত্তর দিলো, মনটা ভালো ছিলো না।
~ মন খারাপের মুহুর্তটুকু আমার সাথে শেয়ার করতে পারতে না?
~ আমার ব্যাপারে জোর খাটাবেন না। পারসোনাল জোর খাটানো আমি পছন্দ করি না। ইচ্ছে হলে শেয়ার করবো, ইচ্ছে না হলে করবো না।
~ তাই?
~ অবশ্যই তাই।

~ পৃথা, আমাকে না বললে আমি কি করে তোমার মন ভালো করে দেবো?
~ আমি মন ভালো করে দেয়ার দায়িত্ব তো কাউকে দেইনি। আমার মন যেভাবে খারাপ হয়েছে, সেভাবে ভালো হবে। আপনাকে কে ভাবতে বলেছে?

~ আমি ভাব্বো না? এতটাও স্বার্থপর আমি নই।
~ এখানে স্বার্থপরতার কিছু নেই। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মন খারাপের কারণ থাকতে পারে। সবকিছু জানার চেষ্টা করা উচিত নয়।
~ আমি কি তোমার এতটাও কাছের কেউ নই যার সাথে ব্যক্তিগত ব্যাপার শেয়ার করা যাবে? নই?
পৃথা সায়ানের চোখে চোখ রেখে বললো, এখনো অতটাও কাছের কেউ হন নি।

সায়ান রেগে গেল, তাহলে আমার সাথে কেন এসেছো? এতদূর? কিসের ভরসায়? কিসের টানে? হোয়াই গার্ল হোয়াই? তোমরা মেয়েরা আসলে পরিস্থিতি যখন যেরকম থাকে সেই সুযোগের সাথে সাথে পাল্টে যাও। মেয়েদের ক্যারেক্টার টাই এরকম।
~ শুনুন, মেয়েদের ক্যারেক্টারের সাথে আমাকে মেশাবেন না। মানছি আমি মেয়ে কিন্তু তাই বলে যা ইচ্ছে তাই বলতে পারেন না।
~ তো কি বলবো? দুদিন আমার সাথে ঘুরলে, সারাদিন সময় কাটালে, পার্কে গেলে, রেস্টুরেন্টে গেলে, লং ড্রাইভে গেলে, রাত জেগে কথা বললে, এখন বলছো আমি তোমার ব্যক্তিগত কেউ নই? বাহ, ভেরি ফানি।

পৃথা ভীষণ অপমানিত বোধ করছে। কিন্তু দুদিন সময় দেয়ার কারণে সায়ান এভাবে কটুক্তি করবে তাও ও কখনো বুঝতে পারে নি।
পৃথার চোখ জলে ভরে উঠলো। বলল, আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনাকে বুঝতে। একজন মানুষকে না চিনে, না জেনে তার সাথে সম্পর্কে জড়ানো উচিৎ না। জানার জন্যই মিশেছি। এটাকে খারাপ চোখে দেখতে পারেন না। অবশ্য ভালোই হল, সম্পর্কে জড়ানোর আগেই আপনার আসল রূপটা বেরিয়ে এলো।

সায়ান উত্তেজিত হয়ে বলল, আসল রূপ মানে? আমি তোমাকে রাগ দেখাই নি৷ জাস্ট তোমার কথার পিঠে কথা বলেছি।
~ যথেষ্ট হয়েছে। নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন কতটা বেশি বলে ফেলেছেন?
সায়ান নিশ্চুপ। পৃথা বলল, আন্টি আমাদের অনেক উপকার করেছেন। তার সামনে আমাদের ইমেজ নষ্ট করার মানে হয় না। আমাদের ঝগড়া তর্ক এখানে বন্ধ রাখুন। তারাতাড়ি তৈরি হয়ে চলে যেতে হবে।

সায়ান বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওকে খুব রাগত দেখাচ্ছে। জানালার গ্লাসে আস্তে একটা ঘুষি দিয়ে বলল, শিট!
পৃথা কাছে এগিয়ে এসে বলল, রাগটাকে একটু সংযত করার চেষ্টা করবেন। একদিন কেউ না কেউ আপনার স্ত্রী হবে, সে হয়তো রাগটাকে পছন্দ নাও করতে পারে।

সায়ান পৃথার দিকে তাকালো। এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে রইলো না পৃথা। পাশের ঘরে গিয়ে দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নিলো। নাস্তার টেবিলে খেতে বসেও পৃথা একবারও সায়ানের দিকে তাকালো না। সায়ান কয়েকবার তাকালো, পৃথার সাথে চোখাচোখি হবার আশায়। কিন্তু চোখাচোখি হলো না। ও মনেমনে কষ্ট পেতে শুরু করেছে।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ওরা দুজন। বাইকে ওঠার সময় পৃথার হাতে হেলমেট দিয়ে সায়ান করুণ স্বরে বলল, স্যরি। সবকিছুর জন্য স্যরি পৃথা।

পৃথা কিছু না বলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। তারপর ছাড়লো একটা দীর্ঘশ্বাস। সায়ান বাইক ছাড়ল, এগিয়ে চললো দ্রুত গতিতে। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সায়ান জিজ্ঞেস করল, কিছু নেবে? চিপস? আইসক্রিম?
পৃথা বলল, না।

এর বাইরে আর কোনো কথা হল না। সায়ান জিজ্ঞেস করল, পানি?
~ না।
~ রোদে কষ্ট হচ্ছে?
~ না।

অনেক ভাবে সায়ান চেষ্টা করলো পৃথার সাথে আলাপ জমানোর। কিন্তু হলো না। এতদিনের প্রচেষ্টা, কাছে আসা, একটা সম্পর্ক গড়তে গিয়েও বোধহয় আর গড়া হলো না। নিমেষেই সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর আগে কোনো মেয়ের পিছনে এত পরিশ্রম দেয়নি সায়ান। আজ এতদিন ধরে ঘুরেও যদি ফলাফল শূন্য হয় তবে কিভাবে হবে! কিছুই ভালো লাগছে না সায়ানের।
পৃথাকে বাসার কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে সায়ান বলল, বাসায় কি বলে আমাকে জানিও। কোনো দরকার লাগলে ডেকো।
~ দরকার হবে না।

~ কাল ভার্সিটি যাবে?
~ জানিনা। নাও যেতে পারি।
~ আমি এখানে অপেক্ষা করবো।

~ লাগবে না। আমি রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারবো।
~ প্লিজ, প্লিজ এমন কোরো না। সামান্য ঝগড়া হতেই পারে। এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
~ আমি বুঝতে পারিনি স্রোতে গা ভাসিয়ে কোথায় ভেসে যাচ্ছিলাম। থ্যাংকস, আমার ভুলটা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য।
~ মানে!
~ ভালো থাকবেন।

পৃথা হাঁটা ধরলো। সায়ান বাইক রেখে ছুটে গেলো পৃথার সামনে। কথা বলার চেষ্টা করলো কিন্তু পৃথা পাত্তা দিলো না। রাগে নিজের মাথার চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছিল সায়ানের। পরবর্তীতে মনে হল এই রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। আর যেভাবেই হোক, পৃথার মন গলাবেই ও। অবশেষে বৃষ্টি নামবেই।

পরদিন ভার্সিটিতে এসে পৃথার পিছে পিছে লেগে রইল সায়ান। অনেক কে দিয়ে চিরকুট পাঠাতে লাগল৷ প্রত্যেকটা চিরকুটে লেখা, মাফ করা যায় না?
পৃথা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সায়ান দূর থেকে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলার জন্য পৃথা এগোতে লাগল এমন সময় অর্পা এসে সায়ানের কান টেনে ধরে নিয়ে যেতে লাগল। সায়ান অর্পার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পৃথার সামনে এসে দাঁড়াল। পৃথা বলল, উনি টেনে যাচ্ছিল। গেলেন না কেন?
~ কারণ আমার কাছে তুমি সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট।

~ কি লাভ এসব করে?
~ দেখো, আমাদের অনেক কথা হয়েছে। আমরা একসাথে অনেকটা সময় পার করেছি। আমি কিছুটা বুঝি তোমাকে। এভাবে নিজেকে কষ্ট দিও না।
পৃথা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, আপনার বুদ্ধিমত কাজ করলে কি হতো জানেন? আমার বাবা হার্ট এটাক করত।
~ ওটার জন্য তো স্যরি বলেছি। আর কক্ষনো তোমাকে শহরের বাইরে নিয়ে যাবো না।
~ কিন্তু এরকম সিচুয়েশনে যে কখনো পড়তে হবে না এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমি প্রেম টেমে জড়াতে চাইছি না। প্রচন্ড প্যারাদায়ক একটা জিনিস।

~ প্রেমে পড়লে একটু আধটু প্যারা নিতেই হবে। এটাকে এনজয় করতে হবে।
~ কোনো দরকার নেই। আপনি প্লিজ আমাকে আর প্রেমের কথা বলতে আসবেন না।
সায়ান হেসে বলল, আমি তোমার সাথে কথা না বললে কি তোমার ভালো লাগবে?
~ লাগবে।

~ ঠিকাছে। তাহলে কথা বলা বন্ধ। ভালো থেকো।
~ আপনিও ভালো থাকবেন।

পৃথা চলে যাচ্ছিল। সায়ান ওর হাত টেনে ধরে ওকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ধরে বললো, কই যাচ্ছো তুমি? একদম মেরে ফেলবো। তুমি আমার। এই কয়েকদিনে আমাকে একদম পাগল করে দিয়েছো। তোমাকে বউ না করে শান্তি পাবো না আমি।
~ কিহ? নাটক হচ্ছে?

~ নাহ। গল্প তৈরি করছি। তুমি যদি আমাকে এভোয়েড করে চলো তো আমাকে তোমার গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে দিবো।
পৃথা হেসে ফেললো। সায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেক্ষণ। সায়ানের চোখের চাহনি মারাত্মক, পৃথা তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর প্রেমে নতুন করে পড়তে আরম্ভ করেছে। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে অর্পা। সায়ানের বদলে যাওয়ার কাহিনি তাহলে এটাই। এবার তো একটা কিছু করতেই হবে। এই হাসির পরিণাম এই মেয়েকে দেখিয়ে ছাড়বে অর্পা।

পর্ব ৯

আকাশে তারার মেলা। দখিনা বাতাস বইছে। শিরশিরে হাওয়া শরীরে দোলা দিয়ে চলে যাচ্ছে। বেলকুনিতে বসে ইয়ারফোনে গান শুনছিলো পৃথা। আর আনমনে ভাবছিলো সায়ানের কথা।

ছেলেটা অনেক হ্যান্ডসাম, বড়লোক, ছাত্র হিসেবেও ভালো। এ ধরণের ছেলেরা সাধারণত খুব সহজে কারো প্রেমে পড়ে না। মাঝেমাঝে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হয় পৃথার। এক র‍্যাগিং এর সূত্রেই তার সাথে পরিচয়, অতঃপর সম্পর্ক গড়িয়ে চললো প্রণয়ের দিকে। আবার মাঝেমাঝে বুকের ভেতর অচেনা ভয় দানা বাঁধে। সবকিছুকে সাজানো নাটক মনে হয়, মিথ্যে মনে হয়। সেই ভয়ে কখনো কখনো ঘুম আসে না পৃথার।

গত দুদিন সায়ানের সাথে কথা খুব কম হয়েছে। তবে যা হয়েছে সেটা যথেষ্ট ছিল। দুজন দুজনের প্রতি এক ধরণের টান অনুভব করছে। গানের সুরের সাথে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল পৃথা। এমন সময় সায়ানের নাম্বার থেকে কল।
পৃথা ফোন রিসিভ করে বলল, হ্যালো।

সায়ান সুরে সুরে গেয়ে উঠলো,
রংধনু ভালো লাগে, নীলাকাশ ভালো লাগে,
ভালো লাগে মেঘে ডাকা চাঁদ,

তারচেয়েও ভালো লাগে তারার মুখোমুখি জেগে থাকা সেই রাত..
বন্ধু তোমায় মনে পড়ে, বন্ধু তোমায় মনে পড়ে..
গান থামালে পৃথা বললো, ভালোই তো গাচ্ছিলেন। থামলেন কেন? আরেকটু শুনান না।
~ নাহ, আর শুনাবো না। কি করছো?

~ বেলকুনিতে বসে আছি। এই রাতের সাথে গানটা একদম মিলে গেছে।
~ বেলকুনির পাশে রাস্তা আছে?
~ হ্যাঁ।

~ রাস্তার লোকজন দেখছো না তো?
~ না।
~ তোমাদের বাড়ির নাম্বার যেন কত? ১৩?
~ হ্যাঁ। কেন?

~ পাশেই তো মেইন রোড। নিশ্চয়ই রাস্তা দিয়ে যাওয়া ছেলেদের দেখছ।
~ আমার ওসব দেখার অভ্যেস নেই বুঝেছেন?
~ আচ্ছা। আমি তোমাকে একটু পরে কল দিই? মা ডাকছে তো।
~ আচ্ছা।

ফোন রেখে দিলো সায়ান। পৃথা কিছুক্ষণ আগে সায়ানের গাওয়া গানটা শুনতে লাগলো। মিনিট দশেক পরে হঠাৎ চোখ ঘুরাতেই অবাক হয়ে দেখে রাস্তায় সায়ান দাঁড়িয়ে। চোখ বড়বড় হয়ে গেলো পৃথার। ও বিস্ময়ে কথা বলতে পারলো না।
সায়ান ইশারায় বলল, কি?

পৃথা কল দিয়ে বললো, আপনি এখানে কিভাবে এলেন?
~ রাস্তা ফাঁকা ছিল। দ্রুত চলে এলাম।
~ পাগল! আপনি না বললেন মা ডাকছে?
~ তুমি যাতে বুঝতে না পারো তাই বলেছি।

পৃথা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। সায়ান বলল, মাথায় হাত দিও না কন্যা। চিন্তায় শুকিয়ে যাবে।
~ আপনি চলে যান। খালা দেখে ফেললে সমস্যা হবে।
~ নিচে নামতে পারবে না?

~ অসম্ভব। আমি চাইনা খালা কোনোভাবে বুঝে ফেলুক আমি কারো সাথে কথা বলি।
সায়ান হাসতে হাসতে বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দিলো। পৃথার বুক ধুকপুক করছে। সায়ান বাইক চালাতে লাগল আর গান শোনাতে লাগল পৃথাকে। রাতটা আরো মধুর হয়ে উঠলো দুজনার।

ভার্সিটিতে এসে পৃথা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে সায়ানকে খুঁজছিল। ফোন দিতে ইচ্ছে করছে না।
এমন সময় পিছন থেকে কারো কন্ঠ শোনা গেল, সায়ানকে খুঁজছো নিশ্চয়ই?
পৃথা পিছনে ঘুরে দেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। এর আগে কখনো মেয়েটাকে দেখেনি ও। কোনো উত্তর না দিয়্র অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ও। মেয়েটা বললো, আমাকে তুমি চিনবে না। তোমার ভালোর জন্য কয়েকটা কথা বলতে এসেছি।

~ বলুন। কিন্তু আপনার পরিচয়টা কি দেয়া যাবে না?
~ সেটা জানতে পারবে। তুমি কি সায়ানকে ভালোবাসো?
~ আপনাকে কেন বলবো সেটা?

~ কারণ আমি তোমার ভালোর জন্যই কথাগুলো বলতে এসেছি। আমার সাথে এসো।
মেয়েটা পৃথাকে দূরে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে গেলো। তারপর বললো, শোনো। আমি জানিনা সায়ানের সাথে তোমার সম্পর্ক কতদূর গড়িয়েছে। তবে যতদূর গড়াক, এখনই সেটা শেষ করে দাও। সায়ান বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে তোমার সাথে প্রেম করছে।
পৃথা অবাক হয়ে বলল, কিহ!

~ হ্যাঁ। ওর বন্ধুরা সবাই গোপন রেখেছে কথাগুলো। ওদের একটা মেসেঞ্জার গ্রুপ আছে যেটাতে আমি এড আছি। সেখানে কথা হয় তোমাকে নিয়ে। আমি যতদুর জানি তুমি অনেক ইনোসেন্ট একটা মেয়ে। তোমাকে ঠকতে দিতে চাই না।
পৃথার চোখ গরম হতে শুরু করেছে। কথাগুলো বিশ্বাস হতেই চাইছে না। সায়ান এমন হতে পারে না। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখেও মনে হচ্ছে না সে মিথ্যে বলছে। ও স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারলো না।

মেয়েটা বলল, সায়ানের সাথে অর্পার খুব ক্লোজ রিলেশন। যদিও ওরা স্বীকার করে না ওরা একে অপরের সাথে এত ইন্টিমেট। কিন্তু ঠিকই একসাথে শোয়া শুয়ি, ফোন সেক্স সবই করে।

পৃথার মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছে। ও মেয়েটার চোখে চোখ রেখে বললো, আপনি সত্যি বলছেন তার প্রমাণ কি?
~ এই দেখো।

মেয়েটা গ্যালারিতে কিছু ছবি বের করে দেখালো। ছবিতে সায়ান খালি গায়ে শুয়ে আছে, সাথে শুয়ে আছে অর্পা। অর্পার চোখেমুখে আবেদন। অর্পা জড়িয়ে রেখেছে সায়ানকে। সায়ানের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে খুব আনন্দিত। এত ক্লোজ হয়ে দুজনে একই চাদরে শুয়ে আছে যা দেখে নিজের চোখকেই অবিশ্বাস্য লাগছিল পৃথার। হতে পারে মেয়েটা মিথ্যে বলছে কিন্তু সায়ান এভাবে অর্পার সাথে শুয়ে আছে এটা তো মিথ্যে হতে পারে না।
মেয়েটা ফোনের মেসেঞ্জারে ঢুকে অর্পার সাথে হওয়া চ্যাট পৃথাকে দেখাতে লাগল৷ সেখানে অর্পা বলছে, জানিস সায়ান ইদানিং ওই গাইয়া মেয়েটার সাথে বেশি মেলামেশা করছে। আমার সহ্য হচ্ছে না। যদিও বাজি করে করছে, তবুও ওর ভাগ কাউকে দিতে পারি না আমি।
মেয়েটার রিপ্লাই ছিল, ভাবিস না। ও তো তোকেই লাভ করে।

অর্পা রিপ্লাই দিয়েছে, হুম। ১১ তারিখ রাত বারোটায় আমার বাসায় ছুটে এসেছে উইশ করতে। পাগল একটা।
পৃথা চিন্তায় পড়ে গেলো। ১১ তারিখ রাতে ও সায়ানের ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। সায়ান অনেক দেরি করে ফোন দিয়ে বলেছিল বন্ধুদের সাথে বাইরে ছিলাম। এত বড় মিথ্যে!

মেয়েটা আরো উপরে গিয়ে মেসেজগুলো দেখাতে লাগলো। দুদিন আগে অর্পা মেসেজ দিয়েছে, আজ আমি আর সায়ান খুব মাস্তি করলাম। বৃষ্টিতে ভিজে ওর বাসায় গিয়েছিলাম। আমাকে ছাড়তেই চাইছিলো না।

এই মেসেজ দেখার পর নিজেকে ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল পৃথার জন্য। সায়ান বৃষ্টির দিন বলেছিলো ওর ছেলে ফ্রেন্ড এসেছিল। তাই পুরোটা বিকেল ওকে অনলাইনে পাওয়া যায় নি। কিন্তু সেদিন আসলে অর্পার সাথে.. ছিঃছিঃ
পৃথার বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। কাকে বিশ্বাস করেছিল ও! ওইদিন রাতে নিশ্চয়ই সায়ান বুদ্ধি করে জিয়ানের বাসায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। রাতে বারবার ফোন দিয়ে হয়তো কোনো সুযোগ চাইছিল। ভাগ্যিস পৃথা রিসিভ করেনি। যে ছেলেটা বাইকে বারাবার ব্রেক কষে যাতে শরীরের সাথে শরীর ধাক্কা লাগে, সে ছেলেটা কিভাবে মুহুর্তেই ভালো হয়ে যায়! এটাই ছিল সায়ানের আসল রূপ! খুব কষ্ট হচ্ছে। অচেনা এক মায়া জন্মেছিল ওর প্রতি। খুব আপন ভাবতে শুরু করেছিল পৃথা। ভালোবাসতেও শুরু করেছিল। এভাবে সবকিছু মিথ্যে হয়ে যাবে এটা ভাবতেও পারছে না ও।

মেয়েটা ফোন ঘেঁটে আরেকটা চ্যাট বক্সে ঢুকে দেখাতে লাগলো মেসেজ গুলো। পৃথার দেখতে একদমই ইচ্ছে করছিল না। মেয়েটা জোরে জোরে পড়ে শোনাতে লাগল, সায়েমের মেসেজ ছিল এরকম, বাজি ধরে অবশেষে প্রেমটা করেই ফেললি? তাও একটা গাইয়া মেয়ের সাথে?
সোহানী রিপ্লাই দিয়েছে, ওর ভার্জিন লাগবে তাই। মেয়েটা ওর কাছে সিগারেট ফ্লেভারের চুমু চাইছে। কিউট না?
দিলরুবা লিখেছে, ড্যাম কিউট। গ্রামের হলেও টাটকা সবজি।
পৃথা চেঁচিয়ে বলল, চুপ করুন আপনি। আর একটাও না। যথেষ্ট হয়েছে। আপনাদের শহরটাই খারাপ, এখানে কোনো মানুষ বাস করে না। সবাই একেকটা কীট, জানোয়ার।

কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলে গেলো পৃথা। সায়ানের অভিনয়টার জন্য যতটা খারাপ লাগছে, তারচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে ওর বন্ধুদের করা অপমানগুলো। ওরা এভাবে ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে! ছিঃ
ভীষণ কষ্ট হচ্ছে পৃথার। ক্লাসে যেতে পারলো না ও। সোজা বাইরে বেরিয়ে এলো। উবার ডাকার জন্য ফোন বের করে দেখে সায়ানের নাম্বার থেকে কল এসেছিল। ওর ইচ্ছে করছিল ফোনটা আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলতে। উবার চলে এলে গাড়িতে উঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
গাড়ির ড্রাইভার অবাক চোখে মিররের দিকে তাকাচ্ছে। বুঝতে পেরে পৃথা চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। আবারও সায়ানের নাম্বার থেকে কল আসলে ফোন বন্ধ করে রেখে দিলো ব্যাগে।

বাসায় ফিরে অনেক্ষণ শাওয়ারের নিচে বসে রইলো। পানি ছেড়ে দিয়ে কাঁদছে হাউমাউ করে। বাইরে বেরিয়ে এসে মাকে ফোন দিয়ে বলল, মা, আমি বাসায় আসবো। আমার এখানে ভালো লাগছে না।
~ তোর বাবা গিয়ে নিয়ে আসবে? কবে আসতে চাস?

~ আজই। বাবাকে লাগবে না। খালাকে বলো আমাকে বাসে তুলে দিতে। বাবাকে বলে দিও আমাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যেতে।
বেশি কথা বলতে পারলো না পৃথা। অপমানজনক কথাগুলো বারবার কানে ভাসছে ওর। আর একমুহূর্ত এই শহরে থাকতে চায় না ও।

যেই পৃথা কখনো একা কোথাও যাওয়ার সাহস করেনি, কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সে একাই শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। এই শহর অনেক নিষ্ঠুরতা করেছে ওর সাথে। আর কখনো এ শহরে পা দিতে চায় না ও।

  • গল্প যেহেতু লিখছি অবশ্যই পরবর্তী পর্ব পাবেন। তবে সবার একটু সমালোচনা চাই। তাই নেক্সট না বলে একটু সমালোচনা করুন দেখি.. কার কি অভিমত?

পর্ব ১০

পৃথা অনেক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মেয়ে। কখনো কোনো অন্যায় ওর উপর চাপিয়ে দেয়া হলে মুখ বুজে সহ্য করবার মত মেয়ে সে নয়। আত্মমর্যাদাশীল হলেও অনেক আবেগী ও সরল মনের। মানুষকে দ্রুত বিশ্বাস করে ফেলে। আর ভালোবাসা কিংবা প্রেমের স্পর্শ ওর জীবনে আসার জন্য হাত বাড়ালেও পৃথা কাউকে গ্রহণ করার কথা ভাবে নি।

ওর একটাই টার্গেট ছিল, ভার্সিটি জীবন শুরু করার আগে কখনো প্রেমের সম্পর্কে জড়াবে না। ভার্সিটিতে পা দেবার আগে থেকেই মন উড়ুউড়ু করে উঠত, মনে হত আর কদিন পরেই স্বপ্নের জায়গায় পা রাখতে যাচ্ছে। মনকে মুক্ত পাখির মত খাঁচা ছাড়া করে দিবে, মন তার আপন গতিতে চলুক তাতে ওর দ্বিধা থাকবে না। অন্তত এই বয়সে এসে ভুল গুলো করবে না, এই আত্মবিশ্বাস ওর ছিল। তবুও একটা ভুল করে আরো ভুলের পথে পা বাড়াচ্ছিল সেটা ভেবেই কষ্ট হচ্ছে পৃথার।

মেয়েদের আঠারো বছর বয়সটা বড়ই বিপদজনক। এ বয়সে ধুপ করে এরা যে কারো প্রেমে পড়ে যেতে পারে। সারাজীবন মনকে শক্ত করে খাঁচায় বন্দি করে রাখা মেয়েটাও হুট করে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মন হয়ে যায় চির অচেনা। নিজের মনকে নিজেও চেনে না, মন আপন কথা শোনে না। হয়তো পৃথারও একই দশা হয়েছিল। ভালোবাসবে না, বাসবে না করেও সায়ানের সাথে যে গভীরতার সূত্র ঘটেছিল, তাতে মনের অর্ধেকটাই হয়তো ওর কাছে পড়ে আছে। আর নিজের অজান্তেই ওর প্রতি কতটা দূর্বলতা জন্মে গেছে পৃথা নিজেও তা টের পায় নি।

বাড়িতে পৌঁছে ‘মা, মা’ বলে ডাকতে লাগল পৃথা। মা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। চিন্তিত ছিলেন পৃথার কি হয়েছে সেটা নিয়ে। উনি ভেবেই পাচ্ছেন না এত দ্রুত সময়ের মধ্যে পৃথার কি হতে পারে। মাত্র কদিন তো হলো শহরে যাওয়ার। তাছাড়া দুদিন আগেও তো বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলো।

তবে কি এমন হলো হঠাৎ! মেয়েটাও বড় আবেগী। এখনো অবুঝ, হয়তো কারো বকা খেয়ে আর থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পৃথার ডাক শুনে কাজ ফেলে ছুটে এলেন। পৃথা মায়ের মুখ দেখামাত্রই নস্টালজিক হয়ে পড়লো। এই পৃথিবীতে একমাত্র মা – ই সবচেয়ে আপন, মাকে দেখলে বুকের ভেতর মুচড়ে ওঠে। মা, মা বলে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ফেললো।
মা পৃথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, কি হইছে তোর মা? কেউ কিছু বলেছে?

~ মা গো, ও মা। তোমরা আমাকে এ কোথায় পাঠিয়েছিলে গো? আমি আর কখনো ওখানে যাবো না।
~ আরে পাগলী আমাকে না বললে তো বুঝবো না কি হয়েছে?

~ মা, জানো আমি ভয়ানক এক ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। আমাকে মাফ করো আম্মু, আমাকে মাফ করো তুমি।
মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। কি বলে শান্তনা দেবেন তাও বুঝতে পারছেন না। উনি তো জানেনই না মেয়ের কি হয়েছে।
পৃথা চোখ মুছতে মুছতে বললো, তোমাকে পরে সব বলবো। আগে আব্বুকে দেখবো আম্মু। আব্বু কোথায়? আব্বু কি আমার উপর রেগে আছে?
~ রেগে থাকবে কেন?
~ আজ আমাকে একটু আদর করে গোসল করিয়ে দিবে আম্মু? মনেহচ্ছে আমি যেন তোমার ছোট্ট সেই খুকি হয়ে গেছি। আমাকে আগের মত একটু আদর করো না গো।

পৃথার দুই চোখের উপর চুমু খেয়ে মা ওকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তারপর হাতের ব্যাগটা নিয়ে পৃথাকে বাসার ভিতরে চলে গেলেন। মেয়ে যে খুব বড়সড় আঘাত পেয়েছে এটা বুঝতে পেরেছেন উনি।

পৃথাকে চুলে শ্যাম্পু করিয়ে দিয়ে, গা ঘষে দিয়ে গোসল করিয়ে দিলেন। পৃথা শিশুসুলভ আচরণ করছে। প্রতিটা মানুষের মাঝেই একজন শিশু লুকিয়ে আছে সেটা এখন মায়ের মনে হচ্ছে। কি সরল মেয়েটা, মায়ের বুকে গুটিশুটি মেরে লুকিয়ে থাকতে চাইছে। চোখ বন্ধ করলেই পৃথার মনে হচ্ছে সায়ান হাসছে, সায়ানের সেই কালো শার্ট পরে ওর সামনে বাইক থামিয়ে পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। কত স্মৃতি যে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে ভেতরে।
স্মৃতি এমন একটা বিষয়, চাইলেও যেটাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। স্মৃতির দরজা বন্ধ করার ও উপায় নেই। মনের ভেতর ঘুরপাক খেতেই থাকে। আর বিষিয়ে দেয় পুরো হৃদয় আর শরীর টাকে।

মা আজকে ভাত তুলে খাওয়ালেন পৃথাকে। খাওয়া দাওয়ার পর মায়ের কোলে মাথা রেখে বিছানায় শুয়ে রইলো ও। মা আস্তে আস্তে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি মা?

~ হুম।
~ তুই কি কাউকে ভালোবাসিস?
পৃথা অনেক্ষণ চুপ করে রইলো। মা ধীরেসুস্থে ঠান্ডা মাথায় বললেন, দ্যাখ আমিও প্রেম করে বিয়ে করেছি৷ আমি তোর বন্ধুর মত, কখনো তো কোনোকিছু আমার কাছে লুকাস নি। কিছু হয়ে থাকলে আমাকে বল। মা তোকে সব’চে বেশি ভালোবাসে।
~ আম্মু, আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল কি জানো? আমি এই বিষয়টা তোমাকে লুকিয়ে গেছি। কেন লুকিয়েছি জানিনা। হয়তো প্রতিটা মেয়েরই এমন হয়।
~ হুম। প্রেম ব্যাপারটা এমনই। বাবা মায়ের সাথে যতই ফ্রি হোক না কেন, প্রেমে পড়লে বা প্রেম হয়ে গেলে কোনো মেয়েই এটা কারো কাছে প্রকাশ করতে চায় না। এটা স্বাভাবিক।
~ আম্মু, আমার উপর রাগ করবে না তো?
~ করবো না। মাকে তুই চিনিস না?
~ সেদিন আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম। ঠিক বলিনি, তুমি যা বুঝেছিলে আসলে সেটা ভুল ছিল।
~ মানে!

~ সেদিন আমি বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে যাইনি।
~ বন্ধুর সাথে গিয়েছিলি তাই তো?
পৃথা চুপ করে রইলো। অনেক্ষণ নিরব রইল ও। মায়ের মুখ নীল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। মনেমনে ভয় পাচ্ছেন উনি। ভাবছেন নিশ্চয় ছেলে বন্ধুটা পৃথার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে পৃথাকে ছেড়ে দিয়েছেন। উনি শঙ্কায় নীল হয়ে বললেন, সবকিছু আমাকে খুলে বলবি? ছেলেটার সাথে তোর কি কি হয়েছে?

~ মানে?
~ গায়ে টায়ে হাত দিয়েছে? নাকি আরো বেশি কিছু?
~ কি বলছো মা, সেরকম কিছুই নয়। তুমি যা ভাবছো তা একেবারেই নয় আম্মু।
~ তাহলে কোনটা সত্যি? আমাকে খুলে বল? তুই এত ভেঙে পড়েছিস কেন?

পৃথা মায়ের হাত চেপে ধরে বললো, একটা ছেলে আমার পিছনে খুব ঘুরছিল। আমাকে নাকি খুব পছন্দ হয়েছে। পাগলের মত করছিল। ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে মাত্র। কিন্তু কালকে শুনলাম, ও বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে আমার সাথে প্রেম করতে চেয়েছে।
~ তাতে কি হয়েছে? তুই কাঁদছিস কেন?

~ কারণ আমিও মনেহয় ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম।
~ হুম বুঝলাম এতক্ষণে। এর জন্য বেশি ভেঙে পড়তে হবে? সবকিছু তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মনকে শক্ত কর, দেখবি খুব সহজে ও মন থেকে দূরে সরে গেছে। এই সময়টা কাটিয়ে ওঠাটাই একটু কষ্টকর। এটা কাটিয়ে উঠলে, দেখবি কিছুদিন পর আর ওকে মনেই পরবে না।

পৃথা মায়ের হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। বলল, আমি জানি ওকে ভুলতে পারবো। কিন্তু মা আমাকে নিয়ে ওরা খুব হাসাহাসি করেছে, আমাকে অপমান করেছে। বলেছে আমি নাকি গাইয়া মেয়ে। ক্ষ্যাত মেয়ে। আমি আর ওখানে ফিরে যাবো না আম্মু।
~ তোকে গাইয়া বলেছে? সেই ছেলেটা বলেছে?

~ না। ওর বন্ধুরা বলেছে। ও চুপচাপ শুনেছে কোনো প্রতিবাদ করেনি।
~ হুম।
~ আরেকটা সত্য জেনেছি। ওকে একটা মেয়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হতে দেখেছি। ওদের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে বোধহয়। ও হয়তো আমাকে ফাঁসিয়েও এসব করতে চেয়েছিল।

~ তোর ভাগ্য ভালো আগেই এসব জেনে গেছিস। এ জন্য শুকরিয়া আদায় কর। এত ভেঙে পড়িস না। তুই তো ভালো আছিস সোনা মা আমার।
পৃথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি সায়ানকে খুব বিশ্বাস করেছিলাম মা।
~ মানুষকে এত সহজে বিশ্বাস করতে নেই।

~ শহরের কাউকেই বিশ্বাস করতে নেই।
~ এটা ভুল কথা। আমি কি শহরের নই? শুধুমাত্র তোর বাবাকে ভালোবেসে সবকিছু ছেড়ে এই গ্রামে চলে এসেছি। এখন গ্রামেই থাকছি। আমার বাবা, ভাই কেউই খারাপ নয়। শহরের সবাই খারাপ হয় না মা। জীবনে চলার পথে ভালো, খারাপ দুটোরই দেখা পাবি। আমাদেরকে বুঝতে হবে কোনটা আমাদের জন্য ভালো আর কোনটা খারাপ।

পৃথা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো আনমনে।
মা বললেন, তুই আর একদমই কাঁদবি না। আর যেন তোকে কাঁদতে না দেখি। তুই বসে বসে ভাব তোর এখন কি করা উচিৎ। ঠিক কোন কাজটা করলে তোর অপমানের জবাব দিতে পারবি, কি করলে সবার সামনে মাথা উঁচু করে চলতে পারবি। এর সমাধান তুই ই জানবি। ডিপার্টমেন্টে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট তোকে করতে হবে। নিজেকে বদলে ফেলতে হবে।

তুই কিভাবে নিজেকে বদলাবি এটা তুই নিজেই ঠিক কর। পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়া, নিজেকে খাপ খাইয়ে চলাটাই জীবন। আমি শহর থেকে এসে নিজেকে মানিয়ে নেইনি? ভার্সিটি থেকে এমবিএ শেষ করে কোনো জব না করে সংসার করছি। এটাকে বলে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। তুই কেন পারবি না?

মা আরো বললেন, মেয়েদেরকে হতে হয় সাহসী, শক্তিশালী। এত সহজে ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়লে কিভাবে হবে? শক্ত হ। নিজেকে গড়ে তোল৷ তোকে যেভাবে কাঁদতে কাঁদতে শহর ছাড়া হতে হয়েছে, তার বদলা নে। নিজেকে আপন যোগ্যতায় দাঁড় করাতে হবে।

পৃথা অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো। মায়ের কথাগুলো ওর মনকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে অঙ্কুরিত হওয়ার মতন। এই মুহুর্তে এই কথাগুলোই ওর ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। ওর হেরে যাওয়া বা জিতে যাওয়াতে কারোরই কিচ্ছু যাবে আসবে না। বিশেষ করে সায়ানের তো নয় ই। কিন্তু এতে করে নিজের কাছে নিজেকে ছোট হতে হচ্ছে, এ জিনিসটাই ভয়ঙ্কর। মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই আজব জিনিস, এটা কুড়ে কুড়ে যন্ত্রণা দিতে থাকে।
মা বললেন, তুই ভার্সিটিতে যাবি। আমরা পয়সা খরচ করে তোকে সেখানে পড়তে পাঠিয়েছি। তুই পড়াশোনা শিখবি, আমাদের স্বপ্ন পূরণ করবি। তোকে মানুষ করতে পাঠিয়েছি, প্রেম করতে পাঠাই নি।

হঠাৎ করেই মায়ের কথাগুলো খুব কঠিন মনে হচ্ছে পৃথার কাছে। ও অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালো।
মা বললেন, সবাই শহরে গেলে প্রেম করে বেড়ায়। নতুন স্বাধীনতা পেলে যাচ্ছেতাই করে বেড়ায়। বাবা মাকে না জানিয়ে এখানে সেখানে যায়, প্রেমিকের সাথে ঘুরতে যায়। রাত কাটায়। পরে আঘাত পেলে বলে জীবন শেষ, ডিপ্রেশন, হতাশা হেন তেন। কেন রে? তোমাদেরকে কেউ কি বলেছিল এসব আজেবাজে কাজ করে বেড়াতে? বাবা মা কি এজন্যই সন্তানকে শিক্ষালয়ে পাঠায়? উচ্চশিক্ষার জন্য?

উচ্চশিক্ষার নামে তোমরা প্রেম শিক্ষা করে বেড়াও? কিভাবে মিথ্যে বলা যাবে, কিভাবে টাকা হাতানো যাবে, কিভাবে অন্যের জীবন নষ্ট করা যাবে। এসব কি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখানো হয়?

পৃথা অবাক হয়ে মাথা নিচু করে রইল। মা কাছে এসে বললেন, মন খারাপ হচ্ছে? হোক। মন খারাপ না হলে তো নিজেকে শোধরাতে পারবে না। একই ভুল আবারও করে বসবে। স্বপ্নকে মূল্যায়ন করতে শিখো। আমি তোমাকে হার্ট করার জন্য কিছু বলছি না। একজন মায়ের মত কথা বলছি। যা বলছি, মাথায় থাকে যেন।
মা চলে গেলেন ঘর থেকে। পৃথা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। চোখের পলক ফেলছে আর প্রতি পলকে পলকে জোরে জোরে হৃদস্পন্দন হচ্ছে।

পর্ব ১১

সায়ান পৃথার খালার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত চোখে চেয়ে আছে বেলকুনির দিকে। পৃথাকে সকাল থেকে কল দিয়ে ফোনে পায় নি ও। এমনকি নাম্বার টাও বন্ধ। সারাদিনের প্রচেষ্টা শেষে পৃথার খোঁজে সোজা ওর খালার বাসার সামনে চলে এসেছে।

কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। আবার পৃথার কোনো সমস্যা হয়ে না যায় এই ভয়ে। তার উপর ভীষণ দুশ্চিন্তা ও হচ্ছে পৃথার কিছু হয়েছে কিনা সেটা ভেবে। অনেক অপেক্ষা করেও যখন বেলকুনিতে পৃথার মুখ দেখা গেলো না, তখন আর থাকতে না পেরে বাসার গেটে চলে এলো সায়ান। দাড়োয়ানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘পৃথাকে চেনেন?’
~ না চিনি না। এ বাসায় থাকে?

~ হ্যাঁ।
~ কয়তলায় থাকে?
~ দোতলায়। ডানদিকের ফ্ল্যাটে।
দাড়োয়ান মনে করে বলল, ও। চিনতে পারছি। জিনাত আপার ভাগ্নী। লম্বা, ফর্সা, গোলগাল মুখ। চুলগুলো অনেক বড়।
~ জ্বি জ্বি, আমি ওর কথাই বলছি। ও কি আজকে বাসা থেকে বেরিয়েছে?

~ হ। বের হইছে তো। সকালের দিকে একটা ব্যাগ নিয়া বাহির হইয়া গ্যাছে। মনেহয় গ্রামে গ্যাছে।
বুকটা ধক করে উঠলো সায়ানের। ও কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইল, গ্রামে গেছে কেন? ওর গ্রামে কি কোনো সমস্যা হয়েছে? বা বিপদ?
~ সেইটা তো জানিনা।

মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করতে লাগলো সায়ান। পৃথার নাম্বার বন্ধ, ব্যাগ নিয়ে গ্রামে গেছে৷ কি হতে পারে ব্যাপারটা? নিশ্চয়ই ও কোনো সমস্যায় আছে। সমস্যায় থাকলে ফোনটা অন্তত খোলা রাখত। একবার ফোনে ওকে বলে দিলেও পারতো সে সমস্যা হয়েছে। তাহলে সায়ানের দুশ্চিন্তাও হতো না, সায়ান ফোনও করতো না। উফফ! আর ভাবতে পারছে না সায়ান। বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

বাড়ির সামনে কয়েকবার পায়চারি করলো সায়ান। শঙ্কা হচ্ছে যে পৃথার বিয়ে ঠিক হল কিনা। এ কারণে ফোন বন্ধ করে চলে গেছে। এ কথাটা সায়ানকে বলার মত মন মানসিকতা ছিল না। আবার এটাও হতে পারে যে সায়ানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইছে না। কিংবা এই ভার্সিটিতেই আর পড়তে চাইছে না। ওহ শিট! রাস্তায় পা দিয়ে জোরে আঘাত করল সায়ান।

তারপর গেটে এসে দাড়োয়ানকে বলল, মামা আমার একটা উপকার করতে পারবেন? পৃথা কবে আসবে? কিছু হয়েছে কিনা? ও আর ভার্সিটিতে পড়বে কিনা? যেকোনো একটা প্রশ্নের উত্তর আমাকে জানতে হবে। প্লিজ মামা, এই উপকার টুকু কইরেন।

দাড়োয়ানের হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট খুঁজে দিলো সায়ান। তারপর বলল, আইচ্ছা মামা আমি জাইনা লমু। আপনে কাইল আইসেন।
কিছুটা আশাজনক হলেও দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেলো সায়ানের। সারা রাত ঘুমই হবে না। পৃথা যদি সেচ্ছায় এই কাজ করে থাকে আর আবারও সায়ানের সাথে ওর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, তবে এর বদলা সায়ান নেবেই। ওকেও এভাবে একদিন টেনশনে ফেলে রাখবে। মনেমনে এই সিদ্ধান্ত নিলো সায়ান।

পৃথা ডেল কার্নেগীর রচনা সমগ্র নিয়ে বসেছে। মোটিভেশনাল বই। এইমুহুর্তে ওর সবচেয়ে বেশি দরকার মোটিভেশন। নিজেকে বদলে নেয়ার জন্য জ্ঞানের দরকার, সিদ্ধান্ত দরকার আর প্রয়োগ দরকার। কিন্তু সবকিছুর উপায় হচ্ছে বই। এই মুহুর্তে ঠিক কোন কাজটা করলে নিজের সম্মান রক্ষা করে চলতে পারবে সেই সূত্র খুঁজছে পৃথা। পৃথিবীতে বাঁচতে হলে বাঁচার মত বাঁচতে হবে। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। শহরে আবারও ফিরে যাবে ও। আর এবার সেই শহর একজন নতুন পৃথাকে দেখবে।

দুদিন পর …..

রাত বেড়েছে। রাতের খাবার খেয়ে সবাই বাসার আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। একটা টেবিল ল্যাম্পের আলো জ্বেলে বই পড়ছিল পৃথা। মনটা অনেকটাই শান্ত হয়েছে। এখন নিজেকে গড়ে তুলবার পালা। এমন সময় মা দরজায় শব্দ করলেন। পৃথা বলল, মা?
~ হ্যাঁ। দরজা খোল তো।

পৃথা দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলো, আসো। কিছু বলবে?
~ সায়ান ফোন করেছে।
~ কিহ!

রীতিমতো অবাক হয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইলো পৃথা। অবাক হয়ে জানতে চাইল, সায়ান তোমাকে ফোন করেছে?
~ হ্যাঁ।
~ নাম্বার কোথায় পেয়েছে?
~ তুই দিস নি?

~ না তো। আমি কেন ওকে তোমার ফোন নাম্বার দিতে যাবো?
~ তাহলে কোথ থেকে পেলো?
~ কি বলছে?

~ তোর সাথে কথা বলতে চায়। আমি বলেছি পৃথা ঘুমাচ্ছে। ও বলল ভীষণ জরুরি দরকার। কথা বলতেই হবে।
~ কি জানি কি বলবে আবার। কিন্তু ও তোমার ফোনে কল দেয়ার সাহস কি করে পেলো?

মা বললেন, আমি বারণ করেছি আর ফোন দিতে। তুই আগামীকাল চলে যাচ্ছিস৷ ছেলেটা নিশ্চয়ই আবারও যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। খুব সাবধানে থাকবি। আর যোগাযোগ করার যতই চেষ্টা করুক, এভোয়েড করবি। আমি তোকে নিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। বলতে চাই আমার মেয়ে একজন সত্যিকার মানুষ। আজেবাজে কাজে সময় নষ্ট না করলেই খুশি হবো আমরা।

মা চলে গেলে পৃথা বিছানায় এসে চিন্তিত মুখে বসে রইলো। সায়ান মায়ের নাম্বারে কেন ফোন দিলো? নিশ্চয়ই নাম্বারটা জোগাড় করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। শুধুমাত্র বাজি ধরে প্রেম করলে কি এত কষ্ট করে কেউ দুঃসাহস করে বাড়িতে ফোন দেয়? মনের মধ্য প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো পৃথার৷ পরক্ষণে আবার সায়ান ও অর্পার সেই ঘনিষ্ঠ ছবিটার কথা মনে পড়ে গেলো। সেটা মনে হতেই মন থেকে সায়ানের ভালো দিকটা মুছে ফেলার চেষ্টা করলো পৃথা। নাহ, ওকে নিয়ে আর একদমই ভাব্বে না।

পৃথা পরদিন শহরে এসে গোসল সেরে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে এক কাপ চা নিয়ে বেলকুনিতে এসে দাঁড়ালো। চোখ ঘোরাতেই দেখলো রাস্তায় সায়ান দাঁড়িয়ে আছে। পৃথার দিকে পাগলের মত চোখে তাকিয়ে আছে ও। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো পৃথা। সায়ান জোরে চিৎকার করে বলল, একবার নিচে আসো প্লিজ।
পৃথা রাগত চেহারা দেখিয়ে দ্রুত ভিতরে চলে গেলো। ফোনে বারবার নোটিফিকেশন আসছে। ব্লাকলিস্টে রাখা সায়ানের নাম্বার থেকে কল আসছে। মেসেজ আসছে। পৃথা বেলকুনিতে এসে ইশারায় বলল, চলে যান এখান থেকে। আর কখনো আসবেন না।

সায়ান হয়তো শুনতে পায় নি। ও ইশারায় বলল, প্লিজ একবার আসো৷ প্লিজ। কেন এমন করছো?
পৃথা বেলকুনির দরজা লাগিয়ে রুমের ভেতর চলে গেলো। মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে ও। কিন্তু বারবার একটা কথাই মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো, সায়ান যদি বাজি ধরেই প্রেম করবে তবে এত কষ্ট করে এই গরমে বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? আবার এও হতে পারে যে বাজিতে জেতার জন্যই এরকম করছে। পৃথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলো।

বই নিয়ে বসলো পড়ার জন্য। কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলো। অনেকদিন ফেসবুকে ঢোকা হয়নি। ওয়াইফাই অন করামাত্রই মেসেঞ্জারে সায়ানের আইডি থেকে অসংখ্য মেসেজ চলে আসলো। ও রীতিমতো অবাক। একটা ছেলে বাজিতে জেতার জন্য আর কত কিছু যে করবে!

পরদিন ভার্সিটিতে এসেও বিপাকে পড়লো পৃথা। ওড়নায় মুখ ঢেকে লুকিয়ে ক্লাসে চলে এসেও নিস্তার পেলো না। ক্লাস শুরু হওয়ার ঠিক দুই মিনিট আগে সায়ান ক্লাসে ঢুকে পৃথার সামনে এসে দাঁড়ালো। পৃথা মাথা নিচু করেই বলল, কেন এসেছেন এখানে? এটা আমার ক্লাস। লাইফটাকে সিনেমা নাটক ভাব্বেন না।
~ তোমার সমস্যাটা কোথায় জানতে পারি? কেন এরকম করছো? আমি কি অপরাধ করেছি যে আমাকে এভোয়েড করে যাচ্ছো? ভালোবেসেছি এটাই আমার অন্যায় হয়ে গেছে? খুব ভাব বেড়ে গেছে তাইনা?

~ আপনি জানেন না আপনার অন্যায় কোথায়? বাজিতে জেতার জন্য আর কত নিচে নামবেন? লজ্জা করেনা বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে? কোন সাহসে আমার মাকে কল দিয়েছেন আপনি?
~ ভালোবাসি তোমাকে। সেই দুঃসাহসে। আর বাজি মানে? কিসের বাজি? কার বাজি?
~ জানেন না তাইনা? আপনার অভিনয় দেখতে দেখতে আমি ফেড আপ। প্লিজ আমার সামনে আর আসবেন না।
~ পৃথা কিসের বাজি আমাকে ক্লিয়ার করে বলো?

এমন সময় ক্লাসে স্যার প্রবেশ করলেন। সায়ান পৃথাকে সরিয়ে দিয়ে ওর পাশের সিটে বসে পড়লো৷ পৃথা মৃদু স্বরে বলল, আমাকে জ্বালানোর জন্য এখানে বসে গেলেন আপনি?
~ উত্তর না পেয়ে আমি যাবো না। বলো কিসের বাজি?
~ বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছিলেন মনে নেই? আবার ন্যাকা সাজা হচ্ছে? শুনুন, আমার মত মেয়েকে সরল পেয়ে যাচ্ছেতাই ভাবে নাচাবেন না। আমরা কাউকে ঠকাই না, সত্যিকার ভাবে ভালোবাসতে চাই।

~ আমিও তো তাই চাই। তুমি কি ভাবছো আমি বাজি ধরে তোমাকে চাইছি?
~ অভিনয় বন্ধ করুন।
~ আমার কথা শোনো।
~ অভিনয় বন্ধ করুন।
~ তোমাকে শুনতে হবে।
~ আরেকবার কথা বললে স্যারকে বলে দিবো।

~ আমার উত্তর চাই পৃথা। আমাকে বলো কেন তুমি এমন করছো? কেন?
পৃথা দাঁড়িয়ে পড়লো। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলবে?
পৃথা কিছু বলার আগেই সায়ান ওর হাত ধরে টান দিলো। যাতে কিছু না বলে৷ কিন্তু পৃথা জেদ করে বলল, স্যার আমার পাশের ছেলেটা আমাকে ডিস্টার্ব করছে।
ক্লাস শুদ্ধ সবাই সায়ানের দিকে তাকালো। কয়েকটা মেয়ে সায়ানকে সিনিয়র ভাইয়া হিসেবে জানে। ওরা বিরবির করে বলল, সায়ান ভাইয়া!
সায়ান লজ্জায় পড়ে বলল, কেন বলতে গেলে এটা?
মাথা নিচু করে ফেলল সায়ান। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওকে ডিস্টার্ব কেন করছো?

সায়ানের কাছে কোনো উত্তর ছিলো না। ও চুপ করে ‘ইয়ে মানে, মানে’ করতে লাগল। পৃথাকে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কি করছে ও? খারাপ কিছু করছে?
পৃথা সবার সামনে ক্লাসে দাঁড়িয়ে বলল, ইয়েস স্যার। উনি বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে আমার সাথে রিলেশনশিপে যেতে চাইছেন। আমি বিষয়টা জেনে গিয়ে ওনাকে এভোয়েড করা শুরু করেছি। তাই উনি ক্লাসে এসে আমাকে ফোর্স করছেন। আমাকে সবসময় জ্বালাচ্ছেন। ওনার জন্য ক্লাসে আসতে ভয় পাই আমি। আর ওনার বন্ধুরা সবসময় আমাকে র‍্যাগ দেয়ার চেষ্টায় থাকে স্যার। আজেবাজে র‍্যাগিং দেয় আমাকে। সিনিয়র দেরকে আজেবাজে কথা বলতে বলে। আমি ভার্সিটি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম এদের জন্য। আমার মা চায় আমি পড়াশোনা করি, বড় হই তাই আবার আমাকে পাঠিয়েছেন।
পুরো ক্লাস স্তব্ধ। স্যার পৃথার কথা শুনতে শুনতে মুখ কঠিন করে ফেলেছেন। উনি সায়ানকে দাঁড়াতে বলে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ইয়ারে তুমি?
~ ফাইনাল ইয়ারে স্যার।

~ এক্ষুনি আমার সাথে দুজনে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে যাবে।
ক্লাসে কেউ কোনো কথা বলছে না। পৃথা সায়ানকে বের হতে বলে নিজে আগে আগে হাঁটা শুরু করলো। সায়ান কি করবে বা কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে ও। পৃথাকে বাজির এই মিথ্যে কথাটা কে বলেছে সায়ানের জানা নেই। কিন্তু স্যারদের সামনে এই প্রথমবার যাচ্ছে। কি যে বলবে বুঝতে পারছে না।
প্রিন্সিপাল স্যার সব কথা শুনে সায়ানের কাছে ওর বন্ধুদের নাম শুন সবাইকে ডেকে পাঠালেন। কয়েক মিনিটের মাথায় সবাই এসে হাজির হলো। সায়ানের সাথে পৃথাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছে সবাই। এই প্রথমবার স্যারের রুমে ডাক পড়েছে। সবাই বিব্রত, একইসাথে কৌতুহল।

স্যার পৃথাকে জিজ্ঞেস করলেন, এরা তোমাকে র‍্যাগ দিয়েছে?
পৃথা দেখিয়ে দিলো মেয়েগুলোকে। মেয়েগুলো এমনভাবে পৃথার দিকে তাকালো যে, এখান থেকে কোনোমতে বের হতে পারলে এরপর পৃথাকে দেখে নেবে ওরা। ভয়াবহ শিক্ষা দেবে ওকে। পৃথা ভয় না পেয়ে বরং চোখ পাকিয়ে ওদের দিকে চেয়ে রইলো।

পর্ব ১২

ভিসি স্যার প্রত্যেকের উপর নির্দেশ দিয়ে দিলেন যেন আর কোনোদিনও কোনো শিক্ষার্থীকে এভাবে র‍্যাগ না দেয়। পৃথাকে তো নয়ই। পৃথাকে বললেন আর কখনো ওরা বিরক্ত করলে সোজা স্যারকে জানাতে।

সায়ান সেই শুরু থেকেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। স্যার এসে ওকে বললেন, তোমাকে দেখলে ভদ্র ছেলে বলেই মনেহয়। এ বারের মত তোমাদেরকে ক্ষমা করা হলো। তবে ভবিষ্যতে আর কখনো মেয়েটাকে জ্বালাতন করবে না। বাজি ধরে প্রেম করা আবার কি হে? আমাদের সময়ে আমরা একজনকেই ভালোবাসতাম আর তার জন্য জীবন দিয়ে দিতেও দ্বিধা করতাম না। তোমরা এখনকার জেনারেশান একটা সুন্দর সম্পর্ক কে রীতিমতো খেলা ভাবছো। মজা করছো, বাজি ধরছো। শেম অন ইউ।
সায়ান এতক্ষণে মুখ খুললো, স্যার। বেয়াদবি না নিলে একটা কথা বলতে চাই।
~ বলো।

~ আমি পৃথার পিছনে লেগে আছি এটা স্বীকার করছি। কিন্তু বাজি ধরেছি এটা পুরোপুরি মিথ্যে। পৃথা বলেছে আমি আমার বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছি। এখানে সব বন্ধুরাই আছে। সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখুক, কারো সাথে আমার এখন যোগাযোগ ই নেই আর বাজি আসবে কেন স্যার?
পৃথা সায়ানের দিকে তাকালো। স্যার সায়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, ওর পিছনে আর লাগার দরকার নেই।
~ স্যার আমি ওকে ভালোবাসি। এটা সত্যি। এর জন্য লেগে থাকাটা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়। আমি এই জেনারেশানের হতে পারি কিন্তু আর সব ছেলেদের মত অন্তত নই।
~ হিরো সাজার চেষ্টা করছো?
স্যার হাসলেন। এরপর সায়ানের বন্ধুদের দিকে তাকালেন, তোমরাও দেখি ভালোই নাটক করতে পারো। তোমাদের বন্ধু তো হিরো আর তোমরা কি? বাজি ধরেছো কে কে?
ছেলেমেয়েরা বলল, স্যার আমরা কেউই বাজির ব্যাপারে জানি না।

স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ছেলেমেয়ে রা যা নাটক জানে। গড! আমরা জীবনে এসব ভাবতেও পারতাম না। এসব সিনেমাতেই দেখে এসেছি সবসময়। হা হা হা। ঘটনা যাই হোক, পৃথা তোমাদের উপর বিরক্ত। কাজেই কেউই আর ওকে ডিস্টার্ব করবে না। ওয়েল ইউর ওউন মেশিন। যাও সবাই।
সায়ানের বন্ধুরা সবাই ভিসি স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সবার শেষে বেরিয়ে এলো পৃথা। সায়ান পৃথার কাছে এসে বললো, বাজি ধরার কথাটা তুমি কার কাছে জেনেছো বলবে কি?
~ স্যার বলেছে আমাকে আর ডিস্টার্ব না করতে।
~ এরকম কোরো না পৃথা। তুমি আমাকে ভালো করে চেনো।
~ অভিনয় করলে কাউকেই চেনা যায় না।
~ আমি অভিনয় করছি এটার কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?

পৃথা হেসে বললো, আপনি এতটাই দক্ষ অভিনয় করেছেন যে আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তবে হ্যাঁ, আপনি অনেক ট্যালেন্ট এটা মানতেই হয়। কারণ যে মেয়েটা আমাকে আপনার আসল চরিত্র সম্পর্কে জানিয়েছে সেই মেয়েটা ছাড়া সবাইকে স্যারের রুমে হাজির করেছেন। গুড!
সায়ান অবাক হয়ে বললো, মানে! আমার এরা ছাড়া আর কোনো বন্ধু নেই। তুমি জানো না?
~ ওই মেয়েটা আপনাদের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে আছে। সেখানে আপনারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেন। সবাই আমাকে অপমান করে আর আপনি তাল মিলান।
~ থামো। আমাদের মেসেঞ্জার গ্রুপ কোথায় দেখলে? কে তোমাকে কি দেখিয়েছে? ক্লিয়ার করে বলো প্লিজ?
পৃথা কথার উত্তর না দিয়ে হনহন করে হাঁটা শুরু করলো। সায়ান এগিয়ে এসে পৃথার হাত টেনে ধরে বললো, আমার কথার উত্তর দিয়ে তারপর যাবে।
~ আমার বিরক্ত করা বন্ধ করুন।

~ স্যারকে ডাকবে? ডাকো। কিন্তু এর উত্তর আমার চাই ই। তুমি যা জেনেছো ভুল জেনেছো। আমি সবকিছু ক্লিয়ার করে দিতে চাই। প্লিজ আমাকে বলো।
পৃথা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, অনেক কিছুই তো করলেন। আমিও ভুল করেছিলাম আপনার সাথে চলাফেরা করে। এ বয়সে একটু ভুল নাকি সবাই করে। আর কোনো ভুল করতে চাই না। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে জানার ইচ্ছেও আমার নেই। যে কষ্টটা আমি পেয়েছি সেটা নিয়েই আমাকে থাকতে দিন। আমার একটা ভালো শিক্ষা হয়েছে।
সায়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেলো পৃথা। সায়ান পিছুপিছু ছুটল। পৃথাকে ডাকতে ডাকতে রাস্তা পর্যন্ত চলে এলো। পৃথা রিকশায় উঠলে সায়ান এসে রিকশা টেন ধরে দাঁড়াল। বলল, দাঁড়াও। আমার কথা না শুনে তুমি যাবে না।
~ আপনার কি লজ্জা নেই? বাজিতে জেতার জন্য আর কি করবেন আপনি?
~ চুপপপ।

সায়ান খুব জোরে রাগ দেখালো পৃথাকে। চারিদিকে ধ্বনিত হতে লাগল ওর আওয়াজ। সবাই অবাক হয়ে তাকালো ওদের দিকে। সায়ান পৃথার হাত ধরে রিকশা থেকে নামালো। পৃথা থতমত খেয়ে গেছে ওর রাগ দেখে। সায়ান বললো, অনেক কাহিনি করেছো। এখন আমি যা বলবো সবকিছু শুনে তারপর যাবে তুমি। তার আগে এক পা তুলেছো তো পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাসায় পাঠাবো।
পৃথা ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে রইলো। সায়ান বললো, বারবার এক কথা বলে যাচ্ছো, বাজি বাজি বাজি। আরে কে ভাই আমার কিসের ঠেকা পড়েছে বাজি ধরে প্রেম করবো? তাও তোমার সাথে। তোমার যা সরল মন, তাতে তো এমনিতেই তোমাকে গলানো সম্ভব। বাজি ধরতে হবে কেন? বাজি ধরলে তো ভার্সিটির সবচেয়ে ভয়ংকর সুন্দরী মেয়েটার জন্য বাজি ধরতাম। আমাকে দেখে তোমার এই বোধটুকুও জাগে নি?

পৃথা মৃদুস্বরে বললো, আমাকে অপমান করছেন আপনি।
~ রাখো তোমার অপমান। আমি নাকি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি? কি কষ্ট দিয়েছি বলো? এভোয়েড করেছি? ছ্যাঁকা দিয়েছি? কে কি বলেছে সেটা নিয়ে নাচ্ছো। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলে কোনটা সত্যি? আমার সাথে একবার কথা বলার প্রয়োজন মনে করেছিলে?

পৃথা চুপ করে রইলো। সায়ান বললো, দেখো আমি তোমার প্রেমে পড়ার পর থেকে বন্ধু বান্ধবদের সাথে মেশাই বন্ধ করে দিয়েছি। যোগাযোগ পর্যন্ত করিনা। আর ওদের সাথে মেসেঞ্জার গ্রুপ তো দূরের কথা। সিরিয়াসলি আমি কোনো গ্রুপে নেই। অনেক আগে ছিলাম,তোমার সাথে কথা হওয়ার পর লিভ নিয়েছি। কে তোমাকে এসব বলেছে আমাকে খুলে বলো?
পৃথা এবারও কোনো কথা বললো না। সায়ান বললো, আমাদের সম্পর্ক হোক বা না হোক, সত্যিটা প্রকাশ হওয়া দরকার। আর কে আমার নামে এই মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে সেটাও আমার জানা দরকার। চুপ করে থাকবে না। সত্যিটা জানা হয়ে গেলে আর তোমাকে বিরক্ত করবো না।

পৃথা বললো, আমি মেয়েটাকে চিনি না। তবে অর্পার সাথে ওর খুব কথা হয়। অর্পা ওকে বলেছে সায়ান অনেক হট, ইত্যাদি ইত্যাদি। কবে আপনার সাথে দেখা হয়েছে, কবে কি হয়েছে সবই ওকে বলেছে। এমনকি পারসোনাল ছবি পর্যন্ত শেয়ার করেছে। সেই মেয়েটিই আমাকে বলেছে যে আপনি বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে আমার সাথে প্রেম করতে চাইছেন।
সায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে বিশ্বাস করো আমি এসব কিছুই জানিনা।

~ ও আমাকে আপনাদের মেসেজ দেখিয়েছে। আপনার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আপনি তাল মিলিয়ে যান।
~ এটার রহস্য আমি উদ্ধার করবোই। প্রমাণ নিয়ে তারপর তোমার সামনে হাজির হবো।

~ বেশ। তবে প্রমাণ জানার পরও আমার কোনো ভাবান্তর হবে না আশাকরি।
~ পৃথা, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি।
~ আমাকে এটাও বলেছে যে আপনি অর্পাকে ভালোবাসেন। মানলাম আমাকে ভালোবাসেন। কিন্তু একসাথে কি দুজনকে ভালোবাসা যায়?
~ অর্পা ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।
~ বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে শুতে হয়? খালি গায়ে?
সায়ান কি বলবে বুঝতে পারলো না। পৃথা হেসে বললো, বেস্ট ফ্রেন্ড মানে সবকিছু শেয়ার করতে হবে, আবার বাস্তবেও ওসব করতে হবে। তাইনা? আমাকে এতটাই বোকা পেয়েছেন?
~ এটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি। আমাকে বিশ্বাস করো তুমি।
~ কি বলবেন? ও জোর করে আপনার সাথে শুয়েছে তাই তো? আপনি ধোয়া তুলসি পাতা?
~ আমি ধোয়া তুলসি পাতা নই। কিন্তু এতটাই খারাপ নই যে একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে শোবো। ও সেদিন রীতিমতো জোর করেই আমার বিছানায় শুয়ে ছবিগুলো তুলেছে। এটা দিয়ে ব্লাকমেইল করবে আমি ভাবতেও পারিনি।

~ ভালো। একটা মেয়ে চাইলেই একটা ছেলের পাশে শুতে পারে? নিশ্চয়ই আপনারও সম্মতি ছিল?
~ আমাকে ভুল বুঝো না৷ আমাদের মধ্যে সে ধরণের কোনো সম্পর্ক নেই।
পৃথা হাসতে হাসতে বলল, সবই বিশ্বাস করলাম। কিন্তু একটা কথা, সেদিন অর্পা আপনার বাসায় গিয়েছিল বৃষ্টিতে ভিজে। অথচ আপনি আমাকে বলেছেন ছেলে বন্ধু। আবার অর্পাকে উইশ করার জন্য রাত বারোটায় ওর বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছেন। আর আমাকে বলেছেন মিথ্যে কথা। আমি কোনো মিথ্যুকের সাথে কথা বলতে চাই না। সে কোনটা সত্যিকে মিথ্যা বানাবে, কোনটা মিথ্যাকে সত্যি বানাবে আমার জানা নেই। এটা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই না। আমাকে আমার মত থাকতে দিন। ভালো থাকবেন।

সায়ান এবার পৃথাকে আটকাতে পারলো না। কিছু বলার মত মুখ কিংবা সত্য মিথ্যার প্রমাণ ওর কাছে নেই। কেবলই নিরবতা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পৃথার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো সায়ান।
পৃথা রিকশা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। মনের মাঝে উথাল পাথাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একবার মনে হচ্ছে সায়ান সত্যিই ভালোবাসে, একবার মনে হচ্ছে সায়ান অপরাধী। আবার কখনো নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। সায়ান সত্যি বলে থাকলে ওকে এভাবে অপমান করাটা উচিৎ হয়নি। প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে নিয়ে যাওয়া, স্যারের কাছ থেকে কথা শোনানো, এসব বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। নিজের কাজটাও নিজের কাছে ভালো লাগছে না পৃথার। আজ থেকে সবকিছু ভুলে জীবনটাকে নতুন করে সাজাবে ও। সায়ান সত্যি মিথ্যা যাই হোক, ওকে নিয়ে আর ভাব্বে না। পৃথা শুধু নিজেকে ভালোবাসতে চায়। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চায়। কারণ বাবা মা অনেক স্বপ্ন নিয়ে এখানে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছেন। পড়াশোনা সবাই করে, সবাই তো মানুষ হতে পারে না। পৃথাকে মানুষ হতে হবে।

বারবার সায়ানকে মনে পড়ে যাচ্ছে পৃথার। একসাথে কাটানো সময়গুলো অনেক সুন্দর ছিল। প্রেম না হোক, দুজনের পথ চলাটা সুন্দর ছিল। বোঝাপড়া, কথা বলা, পাশে থাকার প্রত্যেকটা বিষয়ই মনের মতো ছিল। মনটা সায়ানের জন্যও টানে। কিন্তু এটাও সত্যি যে এখন মনকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে হবে। ক্যারিয়ার গড়ার সময়টাকে অন্যকিছুতে ব্যয় করলে ক্যারিয়ারটাও নষ্ট হয়ে যাবে। সায়ানকে ভুলতে পারাটা কষ্টকর হয়ে যাবে, কিন্তু সবকিছুর আগে নিজের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ। মনকে শক্ত করতে হবে, আরো অনেক বেশি শক্ত। তবুও অজান্তেই চোখের কোণা ভিজে উঠতে শুরু করেছে পৃথার। ঠোঁট চেপে ধরে কান্না সংবরণ করলো ও।

পর্ব ১৩

অনেক গুলো দিন কেটে গেলো। পৃথার নাম্বার বন্ধ। সায়ান অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারে নি। ফোনে, ফেসবুকে, ভার্সিটিতে কোথাও পৃথাকে দেখা গেলো না। পৃথা সারাদিন বাসায় বসে পড়াশোনা করে, গল্পের বই পড়ে, মুভি দেখে আর গাড়ি নিয়ে সোজা জিমে যায়। বাসার বেলকুনিতেও এসে দাঁড়ায় না ও। কারণ ওর মন বলে সায়ান এসেছে। সায়ান মাঝেমাঝেই বেলকুনির সামনে দাঁড়ায়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাতক পাখির মত তাকিয়ে থাকে। এটা অজানা নয় পৃথার। কিন্তু সায়ানের সাথে চোখাচোখি হলে, ওর মুখ দেখলে নিজেকে সামলানোটা পৃথার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই ইচ্ছে করেই বাইরে আসে না ও। জানালা দিয়েও কখনো উঁকি দেয় না। গাড়িতে করে জিমে যাওয়ার সময়ও কখনো জানালা দিয়ে তাকায় না। নিজের জন্যই এই সংগ্রাম বেছে নিয়েছে পৃথা।

কয়েকদিন ভার্সিটি তে না যাওয়াতে ভালোই হয়েছে পৃথার জন্য। মেয়েরা ওত পেতে ছিল পৃথাকে শাস্তি দেয়ার জন্য। কিছু একটা করে পৃথাকে শায়েস্তা করেই ছাড়তো। কিন্তু দীর্ঘদিন পৃথাকে না দেখায় ওদের মাঝ থেকে বদলা নেয়ার জিদ টা চলে গেলো ধীরেধীরে।

হঠাৎ একদিন ভার্সিটিতে সায়ান ও পৃথার মুখোমুখি দেখা। আচমকা এমন দর্শনের জন্য প্রস্তুত ছিলো না পৃথা। সায়ান পৃথাকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারে নি। এ কেমন অদ্ভুত পরিবর্তন! শুধু চোখ দুটোই বদলায়নি। নয়তো চেনাই যাচ্ছিল না পৃথাকে। চুলগুলো আগে কার্ল ছিল, এখন স্ট্রেইট। ভ্রু দুটো তলোয়ারের মত, মুখে যত্নের ছাপ৷ আগে এত যত্ন করতো না নিশ্চয়ই। হালকা মেকাপও করেছে। শরীরের গড়নে অদ্ভুত পরিবর্তন। আগের থেকেই আকর্ষণীয়, স্লিম দেখাচ্ছে। গাল দুটোও স্লিম হয়েছে বেশ। সায়ান কয়েকবার পলক ফেললো।
পৃথা সায়ানকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে চলে যাচ্ছিল। সায়ান বললো, দাঁড়াও।
থমকে দাঁড়াল পৃথা। সায়ান কাছে এসে বললো, কোথায় ছিলে এতদিন?

~ কেন?
~ তোমাকে অনেক খুঁজেছি। যাকে বলে পাগলের মত খোঁজা। একটা বড় হীরের টুকরো কেও কেউ এভাবে খুঁজবে না।
~ তাই? আপনাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছি, ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেছি, ভার্সিটিতে আসিনি। এমনকি ঘরের জানালাতেও ভুল করে উঁকি দেইনি। বুঝতে পারছেন না আমি যোগাযোগ রাখতে চাই নি?

~ সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু একটা সত্য কি জানো তো? কেউ যখন কাউকে খুব করে এভোয়েড করে, সে খুব আনন্দ পায়। এটাকে বলে পৈশাচিক আনন্দ। কিন্তু অপর পাশের মানুষটা, যাকে এভোয়েড করা হয়, কেবল সেই বুঝে অবহেলিত হওয়ার কি যন্ত্রণা।
~ শুনুন, এসব আমাকে বলবেন না। আমি আপনাকে এভোয়েড করতে চাইনি। ভুল করে জড়িয়েছিলাম। এটার জন্য ক্ষমা চেয়েছি। আমি এখন আমার মত থাকতে চাই।
~ আমিও চাই। কিন্তু তোমার জড়িয়ে যাওয়াটা ভুল করে হলেও আমার জড়ানোটা ভালোবাসা থেকে ছিল। তাই আমি চাইলেও ভুলতে পারি না।

~ শেষ কথা কি আপনার?
সায়ান বললো, তোমার ভুল ভাঙিয়ে দিতে চাই।
~ এটাই শেষ কথা?
~ হ্যাঁ।
~ বলুন?
~ তুমি যা জানতে সেটা ভুল। আমি অর্পার সাথে কথা বলেছি। এবং সত্যিটা জেনেছি।
~ কোন সত্যিটা?

সায়ান সবকিছু খুলে বললো পৃথাকে। অর্পা অনেক আগে থেকেই সায়ানকে ভালোবাসে। সায়ানের জন্য অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়ায় নি ও। অর্পা ভেবেছিল সায়ানও ওকে ভালোবাসে আর একইভাবে চায়। কিন্তু সায়ান কখনো অর্পাকে পছন্দই করে নি। অর্পাকে শুধুমাত্র কাছের একজন বন্ধু ভেবে এসেছে। পৃথাকে প্রথম দেখেই প্রেমে পড়ে যায় সায়ান। ঠিক প্রেমে পড়েনি কিন্তু মনের মাঝে অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। ভুলতে চায় পৃথাকে, মন থেকে সরাতে চেয়েছে অনেকবার। কারণ সায়ান যেমন মেয়েকে চায় পৃথা সেরকম নয়। তাছাড়া পৃথা গ্রামে থাকে, সায়ান ছোটবেলা থেকেই শহরে মানুষ। দুজনের মাঝে সম্পর্কটা বোঝাবুঝির পর্যায়ে আসবে না। বা একসাথে চলাফেরা করতেও সমস্যা হবে। কিন্তু মনকে আটকাতে পারে নি।

মন ঠিকই ছুটে গেছে পৃথার কাছে। পৃথার সাথে কথা বলার পর সায়ান বুঝতে পারে ও গ্রামের মেয়ে হলেও একেবারে আলাদা। আর মনের কথা বলে আরাম পাওয়া যায়, বুঝাবুঝি ভালো দুজনাতে। সায়ান পৃথাকে নিয়ে সিরিয়াস হতে শুরু করে। তাই সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমনই এক দিনে অর্পা হঠাৎ এসে হাজির হয় এক বৃষ্টির বিকেলে। সায়ান বরাবরের মতই ঘুমাচ্ছিল, তাও খালি গায়ে। অর্পা এসে নিজে থেকেই সায়ানকে কাছে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে। রুম ছিল অন্ধকার। তার উপর রোমান্টিক ওয়েদার। অর্পাকে জোর করে ঠেলে দিতে পারছিল না সায়ান। নিজের মাঝেও উত্তেজনা কাজ করছিল। কিন্তু যখন বুঝতে পারে এসব ঠিক না, একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে এভাবে মেলামেশা করতে পারবে না ও। ঠিক তখনই অর্পাকে সরিয়ে দেয়। অর্পা কষ্ট পায়। কারণ ও ভেবেছিল সায়ানও ওকে ওর মতই কাছে চায়। কিন্তু সায়ান অর্পাকে কাছে চায় না বুঝতে পেরে মন খারাপ করে ফেলে। সরি বলে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সায়ান বিষয়টাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বলে, ইটস ওকে। কিন্তু অর্পার শান্তি হচ্ছিল না। ও সায়ানের পাশে শুয়ে পড়ে আর রিকুয়েষ্ট করে৷ একটু জড়িয়ে ধরতে পারবে কিনা? সায়ান ইতস্তত করে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। কিন্তু অর্পা ওকে জড়িয়ে ধরে। কিছু ছবি তুলে নেয় ফোনে।

অর্পা যেদিন জানতে পারে সায়ান পৃথাকে ভালোবাসে, দুজনের একটা সম্পর্ক ও গড়ে উঠেছে, সেদিন থেকেই পরিকল্পনা আঁটতে থাকে কিভাবে সবকিছু ভেস্তে দেয়া যায়। অর্পার পরিচিত এক মেয়েকে ছবিগুলো পাঠিয়ে দিয়ে ওর সাথে বুদ্ধি করে রাজি করায় যাতে ও পৃথার কাছে এসে অর্পার শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো বলে দেয়। এরপর কয়েকটা ফেক আইডি খুলে সায়ানের বন্ধুদের নামে, তারপর একটা সিক্রেট কনভারসেশন গ্রুপ খুলে সবাই মিলে আড্ডা দেয়ার মত ভূয়া কনভারসেশন তৈরি করে। এই জিনিস গুলো দিয়েই পৃথাকে ভুল বুঝিয়েছে ওরা।

সব শুনে পৃথা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো৷ সায়ান বললো, অর্পার আচরণে আমার সন্দেহ হয়েছিল। ওর ফোন নিয়ে কৌশলে মেসেজগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে এই ফেইক কনভারসেশন গুলো পাই আমি। এরপর ফেসবুকে সার্চ দিয়ে দেখি সবার নামেই একাউন্ট খোলা। এমনকি আমার নামেও। আমি অর্পার থেকেই সব কথা বের করে আনি। যদি তোমাকে অপমান করে থাকে তাহলে আমি সবার হয়ে ক্ষমা চাইছি পৃথা। এই সত্যিটাই তোমাকে বলার ছিলো। আমার আর কিছু বলার নেই। সব জেনেও যদি দূরে সরে যাও, আমার আপত্তি নেই। আটকাতে তো পারবো না। তুমি যে কেমন জিনিস তা এই কয়দিনে বুঝে গেছি। শুধু দূর থেকেই চাইবো, ভালো থাকো৷

সায়ান চলে গেলো। পৃথা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। স্তব্ধ হয়ে। অনেক্ষণ চোখের পলকও ফেলতে পারলো না। এরকম কিছু হতেও পারে সেটা ওর মনেও এসেছিল। কিন্তু মন থেকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে ও।
অনেক দৃঢ় মনোভাব নিয়ে এতদিন চলছিল। আজকে হঠাৎ সায়ানকে দেখার পর, ওর কথাগুলো শোনার পর থেকে কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। অবচেতন মন কি তাহলে ওকে নিয়ে আবার ভাবতে শুরু করেছে?

পৃথা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। আবেগে গা ভাসানোর সময় এখন নয়। এখন নিজেকে ক্যারিয়ারের জন্য গড়ে তোলার সময়। মনটা বারবার চাইলেও ভুল করেও আগের আইডিতে ঢুকলো না পৃথা। ফোন নাম্বার বদলে ফেলেছে অনেক আগেই। সায়ান কোনোভাবেই ফোন দিতে পারবে না। আজকে মনটা চাইছে সায়ান কল করুক। কল রিসিভ না করলেও ভালো লাগতো পৃথার। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়।

পৃথা বই খুলে পড়তে বসে। পড়াশোনায় একদমই মন বসছে না। তবুও লেগে থাকে। কম্পিউটার খুলে গেমস খেলে, বই নিয়ে পাতা ওল্টায়। আজ কিছু ভালো লাগছে না।
এক কাপ চা হাতে বেলকুনিতে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু রাস্তাটা ফাঁকা। পৃথা জানে সায়ান আর এখানে কখনো আসবে না। ওর যা বলার ছিল সব বলা শেষ। এখন সবকিছু পৃথার হাতে। কিন্তু মাকে কথা দিয়ে এসেছে পৃথা। নিজেকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। সেই কথার গুরুত্ব রাখতে হবে তো।
বেলকুনিতে বসে ফাঁকা রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে পৃথা। মন ভালো হয়না, মন শান্তও হয় না। অবচেতন মন বারবার ছুটে যায় কার কাছে, পৃথা তীর খুঁজে পায় না।

দিনগুলো যাচ্ছে কেটে। পড়াশোনা করতে ভীষণ ভালো লাগে পৃথার। সবকিছুতেই যেন আনন্দ। আকাশে বাতাসে আনন্দের ঝর্ণা ধারা বইছে। পৃথার এখন একদমই সায়ানকে ভেবে কষ্ট হয় না। দিনরাত এক করে পড়াশোনা করে ও, জিমে যায়, বাসায় ওয়ার্ক আউট করে। সময়গুলো কিভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে টেরই পায় না। একটু গল্পের বই খুলে বসলেই আর সময় খুঁজে পায় না। নতুন বন্ধু হয়েছে ক্লাসে। তাদের সাথে আড্ডা, গল্প, কখনো ফুচকা খেতে যাওয়া। সবমিলিয়ে সময় বেশ কেটে যাচ্ছে।
এমন এক দিনে হঠাৎ মা ফোন করে জিজ্ঞেস করে, তুই কি এখন বিয়ে করতে চাস?
পৃথা খানিকটা অবাক হয়, কি বললে আম্মু?
~ তুই কি এখন বিয়ে করতে চাস?
~ দুঃস্বপ্নেও না, স্বপ্নেও না।
~ তাহলে বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিস কেন?
~ মানে কি? আমি পাঠিয়েছি? হাসালে আম্মু।
~ হেসেছি তো আমিও। আমাকে তো কিচ্ছু জানাস নি। তোর খালাকেও না।
~ আম্মু, লুকোচুরি না করে বলবে কে বিয়ের প্রস্তাব দিলো?
~ তুই কি আসলেই জানিস না?
~ একদমই না। সিরিয়াসলি বলছি আম্মু।
পৃথা হাসতে হাসতে বলে, উফফ মা তুমি কি বলছো এসব?
~ হ্যাঁ। আমি বলছি৷ ঘটক তোর খালাকে ধরেছে, খালুকে ধরেছে। একেবারে জাইত্তা ধরেছে। তোর খালু তো তোর বাবার কাছে বিয়ের জন্য একেবারে উঠেপড়ে লাগছে।
~ আম্মু, আমি এ সবের কিছুই জানিনা।

~ তোর খালার কাছে বিস্তারিত জিজ্ঞেস কর। আমাকে তোর আব্বু বললো মেয়ে তো বিয়ে দিতে হবে। পাত্র সম্বন্ধ এসেছে।
~ ভালো সম্বন্ধ আসলেই কি বিয়ে দিতে হবে নাকি? আব্বু না আমাকে মানুষ হওয়ার জন্য শহরে পাঠিয়েছে?
~ বিয়ের পর কি মানুষ হওয়া যায় না নাকি? হা হা হা।
~ তুমি বলছো এসব কথা? আম্মু? লাইক সিরিয়াসলি!

~ মেয়ে যদি নিজেই বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিতে বলে তখন বাবা মা এসব বলবেই তো।
~ ধেৎ, বারবার বলছি আমি কাউকে এমন কথা বলিনি।

~ ছেলের বাবা তো তোর খালুকে বলেছে তুই নাকি বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে বলেছিস?
~ আম্মু, আমি এরকম কাউকে বলিনি।
~ ছেলের নাম সায়ান।
~ কিহ!
~ এবার বল তুই বলিস নি?

~ আম্মু, এক মাসের বেশি হলো সায়ানের সাথে আমার যোগাযোগ নেই৷ ও কি করে এসব করলো আমি জানিনা। কিচ্ছু জানিনা।
~ তোর আব্বু তো ওর সাথেই বিয়ে দিবে বলছে।
~ কেন?
~ তুই চেয়েছিস তাই।
~ তুমি কিছু বললে না?

~ আমি বাঁধা দিতে চেয়েছিলাম। পরে ভাবলাম তোদের ঝামেলা হয়তো মিটে গেছে। হয়তো আবার এক হয়ে গেছিস।
~ আম্মু, মজা নিচ্ছো?
~ মজা তুই নিচ্ছিস। বিয়ে করতে চেয়ে এখন আবার পবিত্র সাজছিস।

~ আমি পবিত্র আম্মু। সায়ানের ব্যাপারটা আমি দেখছি। আর আব্বুকে বলো এ বিয়েতে আমার মত নেই। সায়ানকে আমি পাঠাই নি।
মায়ের কল কেটে দিলো পৃথা। বিছানার উপর টুপ করে বসে পড়লো। একটা ছেলে কতটা পাগলামো করতে পারে সায়ানকে না দেখলে বুঝতে পারতো না ও। ছেলেটা লেগে আছে তো আছেই৷ তার কোথাও ক্লান্তি নেই। দিনের পর দিন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, রোদে পুড়ে কত ঘন্টা সময় ব্যয় করেছে। এতদিন ধরে ফেসবুকে ব্লক করে রেখেছে পৃথা, ফোন নাম্বার বন্ধ রেখেছে। যোগাযোগের কোনো পথ খোলা রাখে নি। সে এখন বাসায় প্রস্তাব নিয়ে গেছে। মানে পৃথাকে তার চাই~ ই। এখন মেজাজ গরম হওয়ার কথা থাকলেও হচ্ছে না। আপন মনে হেসে উঠলো পৃথা। সায়ানটা এমন কেন! পাগল একটা।

পর্ব ১৪

বিয়ের ব্যাপারে বাবা মা দুজনেই ভীষণ সিরিয়াস সেটা বোঝা গেলো যখন পরদিন বিকেলেই তারা খালার বাসায় এসে হাজির হলেন। মা পৃথাকে দেখে রীতিমতো অবাক। মেয়ের এ কি পরিবর্তন হয়েছে এই দেড় মাসে। ও এমনিতেই স্লিম, এখন আরো বেশি স্লিম হয়ে গেছে। চুলগুলো সিল্কি, ভারি সুন্দর হয়েছে মেয়েটা। পৃথার ভেতরে দারুণ জেদ কাজ করে সেটা মা ভালো করেই জানেন।

পৃথা বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন। বিয়ে কিছুতেই এখন করবে না ও। আর বাবা মাকে বিয়ে নিয়ে উদ্বেগও দেখাচ্ছে না। ও দেখতে চায় তারা এখন কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।
মা পৃথাকে ডেকে নিয়ে বসলেন। বললেন, তোদের ব্যাপারটা কি হলো বলতো?

~ মা আসলে সায়ানই সঠিক ছিল। আমার ই ভুল হয়ে গিয়েছিলো।
~ কিরকম?

পৃথা পুরো ব্যাপারটা খুলে বললো মাকে। যদিও সায়ানের সম্পর্কে মায়ের কিছুটা খারাপ ধারণা জন্মেছিল, তবুও তিনি ছেলেকে অপছন্দ করতে পারেননি। কিন্তু এখন সবকিছু শুনে ছেলেটার প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো। বাস্তবে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন তিনি। পৃথা জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কি এ কারণে এসেছো? ছেলে দেখতে? আমাকে তো আসার আগে একবারও জানাও নি।
~ তোর বাবা কিচ্ছু জানায় নি। আমি ফোন দিয়েছিলাম, ধরিস নি।
~ এসেছো, ভালো করেছো। দুটো দিন তোমার সাথে ঘুমাতে পারবো।
~ দ্যাখ তোর আব্বু কিন্তু ওই ছেলের সাথেই বিয়ে দিবে। তার মন একেবারে গলিয়ে ফেলেছে।
~ কাহিনি কি আম্মু?

~ কাহিনি হচ্ছে ছেলেটা প্রতিদিন কল দিয়ে তোর আব্বুর সাথে কথা বলে। খোঁজ খবর নেয়। আরো কিসব আলাপ হয় ওরাই জানে।
পৃথা বাটিতে করে তেল নিয়ে এসে বসলো। মাকে বলল চুলে দিয়ে দিতে। মা পৃথার চুলে তেল লাগিয়ে দিতে দিতে দুজনাতে কথা হতে লাগলো। পৃথা মাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলো ও এখন কোনোভাবেই বিয়ে করবে না। তারপর উঠে বই নিয়ে বসলো।
পরেরদিন সকালে ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য পৃথা তৈরি হচ্ছিল। মা এসে জানালেন আজকে সায়ানের বাবা মা আসবেন। ভার্সিটি তে যাওয়ার দরকার নেই।
পৃথা চিন্তিত মুখে বললো, তোমরা আমার কথা কেন বুঝতে পারছো না আম্মু? আমার এখন বিয়ে করার একদমই ইচ্ছে নেই। তাছাড়া ওই ছেলেটাকে তো নয়ই।
~ কেন? সায়ানকে তোর পছন্দ নয়? ওর সাথে তুই সম্পর্কে জড়াচ্ছিলি।

~ কিন্তু মা আমি ওকে অনেক কষ্টে আমার মন থেকে সরিয়ে দিয়েছি। এখন আর ওকে নতুন করে জায়গা দিতে পারবো না। আমি আমার লাইফটাকে এনজয় করতে চাই।
~ বেশ। আমি তোর আব্বুকে বলছি। তবে সায়ানের বাবা মায়ের সাথে দেখা কর, তারপর সিদ্ধান্ত নিস।

মায়ের কথামত সায়ানের বাবা মায়ের সামনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল পৃথা। শাড়ি পড়ে, চুল আঁচড়ে,হালকা সাজুগুজু করে নিলো। পৃথা জানেনা সায়ান আসবে কিনা। মাকেও জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হয় নি। তৈরি হয়ে বাইরে আসার পর দেখলো সায়ানও আছে। দীর্ঘদিন পর সায়ানের সাথে দেখা। প্রথম চোখাচোখি হতেই সায়ান মুচকি হাসলো। সেই হাসি প্রশান্তির অর্থ বহন করে। অর্থাৎ সায়ান নিশ্চিত হয়েই আছে সে পৃথাকে পেয়ে গেছে। পৃথাও হাসলো, কিন্তু বিভ্রান্তিকর হাসি।
সায়ানের বাবা মা পৃথাকে দু একটা প্রশ্ন করার পর জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে বিয়ের দিন ক্ষণ নিয়ে কথা বলা যাক। পৃথা বলল, না। আমি আগে সায়ানের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
পৃথার রুমে এসে বসল সায়ান। পৃথা আগে কথা বলল, কেমন ছিলেন এতদিন?
~ তুমি যেমন রেখেছিলে।

~ হা হা, নিজের ভালো থাকা খারাপ থাকা বলে কিছু নেই?
~ ইয়ে মানে তোমার চিন্তায় চিন্তায় আমাকেই ভুলতে বসেছি।
~ এটা ভুল। আপনি আবেগে গা ভাসাচ্ছেন। আমিও সেই ভুল করতে বসেছিলাম। এখন নিজেকে শুধরে নিয়েছি।
~ তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়ে গেছো পৃথা।
~ আর চালাকও।

সায়ান হাসলো। পৃথা বলল, আমাকে না জানিয়ে আমার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে আপনি ঠিক করেন নি।
~ কেন? তুমি কি এটাই চাও নি? প্রেম করতে না হয় ভয় ছিল, বিয়েতেও?
~ আমি এখন বিয়ের জন্য প্রস্তত নই।

~ আমিও নই। আমরা প্রস্তুত হয়ে যাবো।
~ আমি এখন প্রস্তুত হতেও চাই না।
~ মানে কি?

পৃথা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, আমি আমাকে আরো অনেক সময় দিতে চাই। আমরা অনেক ইমম্যাচিউর। যেকোনো সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নিতে পারি না। আমরা বিয়ে করে ভালো থাকবো কিভাবে?
সায়ান উঠে দাঁড়াল, কি বলতে চাইছো তুমি?
~ আমার আরো বড় হওয়া দরকার। আপনারও।
~ আমরা যথেষ্ট বড় হয়েছি।

~ বাবা মাকে না জানিয়ে এক বন্ধুর বাসায় থেকে যাওয়া, আর বাড়িতে জানানো আমি কিডন্যাপড হয়েছি। এই বুদ্ধি যার মাথায় আসতে পারে সে ম্যাচিউর? যথেষ্ট ম্যাচিউর?
সায়ান উত্তরে কিছুই বলতে পারলো না। পৃথা তুচ্ছার্থক হাসি হেসে বললো, আপনি বাবার টাকাওয়ালা ছেলে। কিছু করলে বা না করলেও আপনার কিছু যাবে আসবে না। বাপের টাকায় সারাজীবন বসে বসে খেতে পারবেন। কিন্তু আমার বড় হওয়ার স্বপ্ন আছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা আছে।
~ আমি তোমাকে বড় হতে সাহায্য করবো।

~ কারো সাহায্য নিয়ে নয়, আমি নিজের যোগ্যতায় বড় হতে চাই।
~ তুমি যা চাইবে তাই হবে। তবে আমার স্ত্রী হলে তোমাকে কিছুই করার প্রয়োজন হবে না।
~ ঠিক সে কারণেই আমি এখন আপনার স্ত্রী হতে চাই না। আমি কারো ক্রেডিট চাই না সায়ান।
~ আমি এসব বুঝতে চাইনা। আমি শুধু তোমাকে চাই।

~ আমি এখন কারো হতে পারবো না। আমার মনটাও আপনাকে চাইত। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছি। আমি আমার যোগ্যতায় বড় হতে চাই। তার আগে বিয়ে করতে চাই না।
~ বিয়ে হলে তোমার বড় হওয়ার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবো না পৃথা।
পৃথা বললো, বিয়েটাই একটা বাঁধা। সংসার একটা বন্ধন। এখানে চাইলেই নিজের মত চলা যায় না। দু বছরের মাথায় একটা বাচ্চা নিয়ে বাচ্চা পালতে হবে, সংসার সামলাতে হবে, এক গাদা দায়িত্ব নিয়ে চলতে হবে। আমি অবশ্যই বিয়ে করতে চাই কিন্তু এখন নয়। আমি এখন দায়িত্ব নিতে চাই না, আমি পারবো না। আমার গ্রাজুয়েশন করতে আরো কয়েক বছর বাকি। এই কয়েক বছরে আমার নিজেকে উপভোগ করতে চাই, পৃথিবীটাকে উপভোগ করতে চাই। তারপর বিয়ে।
~ তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছো?

~ আপনার সামনে ফাইনাল এক্সাম পরে রয়েছে। আপনার একটা উজ্জ্বল ক্যারিয়ার পরে রয়েছে। তারপরও? এখন এ কোন নেশায় মেতেছেন আপনি?
সায়ান পৃথার বাহু চেপে ধরে বলল, নেশায় তো তুমি মাতিয়ে রেখেছো আমাকে। তুমিই বিভোর করে রেখেছো। কেন এভোয়েড করো আমাকে? কেন?
~ কারণ আমি আপনাকে চাই না। এখন এসবে ব্যয় করার মত সময় হাতে নেই। প্লিজ আমাকে জোর করবেন না।
~ জোর করবো না?

~ না।
~ ওকে, চলে যাচ্ছি। আর কোনোদিনো জোর করবো না।
~ এটা আগেও বলেছেন। তারপরও কেন এসেছেন? কেন?

পৃথা চেঁচিয়ে উঠলো। সায়ান মুহুর্তেই এগিয়ে এসে পৃথাকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ধরে পৃথার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। সায়ানের নরম ঠোঁটের গভীরে হারিয়ে গেলো পৃথার ঠোঁট। সায়ান এক হাত দিয়ে পৃথার চিবুক ধরে অন্য হাতে কোমরে ও পেটে জোরে চাপ দিতে লাগল। পৃথা অনেক চেষ্টা করেও সরাতে পারলো না। শেষে বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে ঠোঁট দুটোকে সমর্পণ করলো সায়ানের কাছে। সায়ান ইচ্ছেমত চুষতে লাগল। পাগলের মত কামড়াতে লাগল। পৃথা খামচি দিয়ে ধরল সায়ানকে। দীর্ঘ এক লম্বা চুম্বন শেষ করে সায়ান পৃথাকে ছেড়ে দিলো। তারপর হাত দিয়ে মুখ মুছে বলল, ছেড়ে দিলাম তোমায়। যে যন্ত্রণায় আমি পুড়ছি, তুমিও এখন যে দহনে দগ্ধ হবে। জানি পারবে না, তবুও বলি ভালো থেকো।

সায়ান দ্রুত পদে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। পৃথা আচমকা চুম্বনে স্থবির হয়ে গেছে। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে ওর। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল ও। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
বাইরে সবাই আড্ডা দিচ্ছেন। সায়ান এসে সোফার উপর বসে পড়ে। মা সায়ানের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন ছেলের মাথা গরম আছে। কেউ সায়ানকে রাগিয়ে দিলে ওকে এমন ভয়ংকর দেখায়। চোখ দুটো পুরো লাল হয়ে যায়। মা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে বাবা আমরা কবে বিয়ের দিন ঠিক করছি?
সায়ান কি বলবে বুঝতে না পেরে বলল, মা। পৃথা এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। আমার মনেহয় ওকে সময় দেয়া দরকার। ভালো হয় বিয়ের আলাপটা বন্ধ করে অন্য কিছু নিয়ে তোমরা আলাপ করো। কেমন?

সায়ান উঠে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। ওর দেহে, মনে সবখানে আগুন জ্বলছে। ভালোবাসার জ্বালা, ভালোবাসা পেয়েও হারাবার জ্বালা, কাছে পেয়েও দূরে সরে যাবার জ্বালা। এতদিন অনেক প্রচেষ্টা করে বাবা মাকে রাজি করিয়ে পৃথার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মামা, ঘটক সবার পিছনে টাকা ঢেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস করে তোলা হয়েছে। কত দুশ্চিন্তায় রাত কেটেছে, মুহুর্তের জন্য টেনশন দূর হয়নি। বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিল সায়ান। অথচ আজকে সবকিছু এক কথাতেই শেষ হয়ে গেল। যে পৃথা সায়ানের হাত ধরে দূরে হারিয়ে যেতে রাজি ছিল, সে পৃথা কতটা বদলে গেছে। মানুষ পারে দ্রুত বদলাতে। সায়ানও বদলেছে। কিভাবে একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য বারবার বাবা মাকে বলতে হয়, কিভাবে সবকিছু ঠিক করে ফেলতে হয়, সবকিছু পেরেছিল সে। কিন্তু আজকে বাবা মা অপমানিত হলো। বড় মুখ করে তারা এসেছিলেন বিয়ের তারিখ ঠিক করতে। তাদের মুখটা কোথায় ঢেকে গেলো! বড্ড খারাপ লাগছে সায়ানের। বুকটা ফেটে যেতে চাইছে হাহাকারে।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথা এভাবে দূরে ঠেলে দিলো। এটা হবে ভাবতেও পারেনি সায়ান। বাইরে গিয়ে দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে ফুকতে লাগল। সিগারেটের মাথায় আগুন দেখে মনটা কিছুটা শান্ত হলো।
বাবা মায়ের সামনে কিভাবে যাবে সেই চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো ও। যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে সেখানে আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কোন মুখেই বা যাবে। সায়ান সিগারেট শেষ করে সোজা বাড়িতে চলে গেলো। টানা এক ঘন্টা শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে বসে রইলো। মনেমনে ভীষণ ক্ষোভ জন্মাচ্ছে।

কতগুলো দিন ধরে সায়ান স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে পৃথাকে নিয়ে। দুজনের একটা সুখী সংসার হবে, বাইরে থেকে এসেই পৃথাকে জড়িয়ে ধরবে, বাইরে যাওয়ার আগে কপালে একটা ছোট্ট চুমু দেবে, বাইরে থেকে রোজ কিছু না কিছু নিয়ে আসবে ওর জন্য। বাচ্চাদের মত আদর করবে ওকে। সবসময় ওর সব আবদার পূরণ করবে। বিয়ের পরে দেশের বাইরে হানিমুন ট্রিপ তো থাকছেই। কত শত পরিকল্পনা, সবকিছু শেষ হয়ে গেলো! যেন হঠাৎ আসা ঝড় এলোমেলো করে দিলো সব।

পর্ব ১৫

পৃথা শান্ত হয়ে ঘরে বসে আছে। বাবা অনেক্ষণ ধরে কথা শোনালেন পৃথাকে। বিয়ের মতামত না থাকলে আগেই সেটা বলে দিলে হতো। তাহলে এভাবে গ্রাম থেকে শহরে এসে তাদেরকে হয়রানি হতে হতো না। তারচেয়েও বড় কথা সায়ানের বাবা মা অনেক মন খারাপ করে চলে গেছেন। এভাবে অপমান করাটা একদমই পৃথার উচিৎ হয়নি।
পৃথা সব শুনে একটা কথাই বলল, ‘আব্বু, আমি সায়ানের যোগ্য নই। সায়ান আমার চেয়েও দেখতে ভালো, টাকাওয়ালা, ভালো ফ্যামিলির চেয়ে। আজ বিয়ে হলে দুদিন পর সে নিজেও আমার যোগ্যতা নিয়ে কথা তুলতে পারে। আমি এ সুযোগ কাউকে দিতে চাই না। আগে নিজেকে ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যাতে কেউ আমাকে নিয়ে টু শব্দ ও উচ্চারণ করে আমাকে কথা শোনাতে না পারে।’
পৃথার কথা শুনে বাবা আর কিছু বললেন না। বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। মা বললেন, তুই যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস নিশ্চয়ই বুঝে শুনেই নিয়েছিস। যেটা বলছিস, সেটা করে দেখাবি এটাই আশা করি। নয়তো এত বড় মুখ করে বলা কথাগুলো সব মূল্যহীন হয়ে যাবে।
~ আমার উপর ভরসা রাখো মা।

~ সায়ানকে এভাবে ফিরিয়ে দিয়ে তোর খারাপ লাগছে না পৃথা?
~ একটুও না আম্মু। গতকাল ভালো লেগেছিল ও বিয়ে পর্যন্ত চেষ্টা করেছে বলে। কিন্তু সারা রাত ভেবে নিজের মনকে শক্ত করে নিয়েছি আমি।
~ তুই যা ভালো মনে করিস।

মাও বেরিয়ে গেলেন। পৃথা বিছানায় শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। এরপর বই খুলে পড়তে বসল। আজ একটা বড় ঝামেলা মিটে গেছে। আশাকরি এরপর আর কোনো ঝামেলা হবে না। এখন শুধুই নিজেকে সময় দেয়া আর নিজের জন্য ভাবা।
রাত ঠিক সারে এগারো টায় একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো। পৃথা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রিসিভ করে বলল, হ্যালো। কে বলছেন?
~ এই অপমান করে তুমি ঠিক করোনাই পৃথা। একদিন সাফার করতে হবে এটার জন্য।
~ সায়ান, এত রাতে কেন কল দিয়েছেন?

~ তুমি নিজেকে কি ভাবো? আমাকে কি ভাবো? ছাগলের বাচ্চার মতন আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে আর আমি ঘুরবো?
~ আপনার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? নেশা করেছেন? ছিহ, সামান্য একটা ব্যাপারে কেউ এসব খায়?

~ জাস্ট শাট আপ মিস পৃথা। আমি ড্রিংক্স করেছি মনের জ্বালা কমাতে। আমার বাবা মাকে কতকিছু করে রাজি করিয়েছিলাম তোমার ধারণা আছে?
সায়ান বলতে শুরু করলো কিভাবে ওর বাবাকে ম্যানেজ করতে হয়েছে। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ওনার ব্যবসায়ে হাত দেবেন। সমস্ত কাজ সায়ানকে বুঝিয়ে দিয়ে বাবা অবসর নিয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে বেরাতেন। এজন্য ছেলেকে প্রস্তুত করছেন এখন থেকেই। সায়ানের বাবা যেভাবে ছেলের হাতে ব্যবসা তুলে দিচ্ছেন ওনার বাবা কিন্তু সেভাবে ওনার হাতে তুলে দেয়নি। সায়ানের দাদার পরিবার খুবই অসচ্ছল ছিল।

নিজের প্রচেষ্টায় সায়ানের বাবা এতদূর এসেছেন। পুরো পরিবারকে সাহায্য করেছেন। তিনি চান তার প্রতিষ্ঠানকে তার ছেলে আরো অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিয়ের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ বা ছেলেকে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছেটাও ওনার ভেতরে ছিল না। বিয়ে হয়ে গেলে ছেলেরা একটা দায়বদ্ধতায় জড়িয়ে গিয়ে জীবনের লক্ষ্য থেকে সরে যেতে পারে। এই ভয়টাই পেতেন উনি। ছেলেকে বলে দিয়েছিলেন যেন কারো সাথে সম্পর্কে জড়ালেও শারীরিক কিছু না করে, যার অজুহাতে কেউ ধরে বেঁধে বিয়ে দেবে। এরকম কোনো ঘটনাকে প্রশ্রয় দেবেন না উনি। সায়ানও ছোট থেকে বাবার কথা শুনেই বড় হয়েছে। বাবা স্বপ্ন দেখেন সায়ান একদিন ব্যাবসাকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিয়ে যাবে। সেই ছেলে অনার্স শেষ করার আগেই যদি বাবাকে এসে নিজের মুখে বলে, ‘আব্বু আমি বিয়ে করতে চাই’ তখন বাবার মানসিক অবস্থা কেমন হবে? বাবা অনেক ভেঙে পড়েছিলেন।

ছেলের উপর থেকে ভরসা হারাচ্ছিলেন তিনি। সায়ান একটু একটু করে বাবাকে বুঝিয়েছে যে পৃথাকে ছাড়া ওর একেবারেই চলবে না। বরং পৃথাকে কাছে পেলে আরো সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। দুজনেই পড়াশোনা শেষ করবে, এরপর দুজনেই ব্যবসায় মন দেবে। কত রকমের প্রতিশ্রুতি বাবাকে দিয়েও রাজি করানো যায় নি।

শেষে সিনেম্যাটিক পন্থা ধারণ করতে হয়েছে। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকা, খাবার খেতে অনীহা, গোসল না করা, চুল দাড়ি কাটতে অবহেলা এসব করার পর অবশেষে বাবা সম্মত হয়েছেন ছেলের বিয়ে দিতে। তবে বড় ধরণের অনুষ্ঠান এখন করতে পারবেন না। সায়ান তাতেও রাজি হয়েছিল। এরপর আপত্তি সাধলেন মা। এত সুন্দর রাজপুত্রের মত ছেলের সাথে একটা গ্রামের মেয়ের বিয়ে তিনি দেবেন না। সায়ান মাকে বুঝিয়েছে পৃথা গ্রামের মেয়ে হলেও সবার থেকে আলাদা। ওর মানসিকতা সুন্দর, আচার আচরণ সুন্দর। শহরের মেয়ের থেকে শত গুণে সমৃদ্ধ। মাকে রাজি করাতেও বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে সায়ানকে।

পৃথার বাবাও শুরুতে রাজি হতে চান নি। প্রতিদিন ফোনে কথা বলে তাকে ইমপ্রেসড করেছে সায়ান। সমস্ত পরিশ্রম বৃথা হয়ে গেলো এটা যেমন সত্যি, তেমনি বাবা মা ভীষণ অপমানিত বোধ করছেন এটা তারচেয়েও বেশি সত্যি। সায়ান বাবা মায়ের কাছ খুব ছোট হয়ে গেছে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার মত মুখ ওর আর নেই।

সবকিছু পৃথাকে বলে দিলো সায়ান। পৃথা চুপচাপ শুনে গেলো। কোনো আওয়াজ করলো না। ওর খারাপ লাগছে সায়ানের জন্য। সায়ান বলল, নিজের জেদ নিজের ইগো এসবের জন্য আমাকে সবার কাছে হাসির পাত্র বানিয়ে দিলে তুমি। আমি বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। আমার বাবা মা চেয়েছিল আজকেই পারলে কাবিন করিয়ে রাখতে। ওনারা ছেলের কষ্ট আর সইতে পারেননি। বাবা মায়ের অপমান বাদ দিলাম পৃথা, একটা ছেলে কতটা পাগল হলে এতকিছু করতে পারে ভাবতে পারো?
পৃথা নিশ্চুপ।

সায়ান বললো, আমি তোমাকে পাগলের মত ভালোবাসি পৃথা। পাগলের মত। তোমার ছবি দেখে দেখে আমার রাত কাটে, তোমার আগের পাঠানো মেসেজ পড়ে আমার দিন কাটে। আমি সারাক্ষণ তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকি। এমন কোনো সেকেন্ড হয়তো নেই যখন তোমার কথা ভাবি না। ঘুমের মাঝেও আমার মস্তিষ্ক তোমাকে নিয়েই ভাবতে থাকে। তোমার জন্য, কেবল তোমাকে ভালোবেসে আমি সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি ছিলাম। তুমি এটা কি করলে? কি করলে এটা?
পৃথা বলল, আমাকে এত ভালোবাসেন আগে কেন বলেন নি?

~ বলার সুযোগ দিয়েছিলে? তোমার নাম্বার চেঞ্জ করে ফেলেছো, ফেসবুক আইড়ি ডিএকটিভ করে রেখেছো, তোমার খালার বাসার বারান্দায় আসো না, বেলকুনিতে আসো না, ভার্সিটিতে গেলে আমার থেকে লুকিয়ে থাকো। আমি কিভাবে বোঝাবো তোমাকে কত ভালোবাসি? বলো আমাকে?
পৃথা নিশ্চুপ। ওর কাছে এর কোনো উত্তর নেই।
সায়ান বললো, আমি চেয়েছিলাম বাসর রাতে তোমাকে বুঝিয়ে বলবো সত্যিই কতটা ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। তোমার অবহেলা ধীরেধীরে আমার ভালোবাসাকে আরো খাঁটি করে তুলেছিল। নিশ্চিত ছিলাম আমার ফ্যামিলি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তুমি না করতে পারবে না। তুমি এটা কি করলা? কিভাবে পারলা পৃথা?

পৃথা আর সহ্য করতে পারছে না। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে ওর। ফোনটা কান থেকে সরিয়ে ফেললো ও। কিছুক্ষণ পর কল কেটে গিয় আবার কল এলো। অনেক্ষণ রিং হওয়ার পর রিসিভ করলো #পৃথা। সায়ান বলল, তোমার বাবার থেকে নাম্বারটা নিলাম শুধুমাত্র শেষ কথাগুলো তোমাকে বলার জন্য। আর কোনোদিনো এই সায়ান তোমাকে বিরক্ত করবে না। মরে গেলেও না।

সায়ান কল কেটে দিলো। প্রকৃতির পরিবেশ স্তব্ধ, শান্ত অথচ বুকের ভেতর শো শো শব্দে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। শরীর শিউরে উঠছ পৃথার। এমন করে কেউ কখনো ভালোবাসেনি। এমন করে কেউ কাছে আসতে চায় নি, কেউ কাছে টানে নি। কি অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর। না জেনে, ভুল বুঝে সায়ানকে কষ্ট দিয়ে ফেলাটা ঠিক হয় নি। আনমনা হয়ে পড়লো পৃথা। বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম আওয়াজ হচ্ছে। ভালোবাসা পেয়েও পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে দিলে,নিজের ভুলটা বুঝতে পারলে এমন লাগে। বড়ই যন্ত্রণাময় মুহুর্ত। একদিকে নিজের জেদ ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে নয়তো সবার কাছে নিজেকে ছোট হতে হবে, একদিকে সায়ানের অপমানের জন্য খারাপ লাগছে। তবে কি মনটা এখনো সায়ানের জন্য মায়া করে? এখনও কি ওকে ভালোবাসে?
রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ছাদের উপর চলে যায় পৃথা। তারপর শব্দ করে কাঁদতে থাকে। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকে ওর কান্না। পৃথা নিজেও জানেনা ও কেন কাঁদছে?
১২
বাবা মা বাড়িতে চলে গেলেন। পৃথার কিছু ভালো লাগে না। খুব মন খারাপ লাগে, সবকিছু এলোমেলো লাগে। পড়ায় মন বসে না, গান শুনতে ভালো লাগে না, খেতে ইচ্ছে করে না।
সারাদিন নিজের ঘরটাতে চুপটি মেরে বসে থাকে ও। কি যে হয়েছে নিজেও বোঝে না। খালা এসে খেতে ডাকে, ওঠার কথা মনে থাকে না। বেলা বয়ে যায়, গোসল করা হয় না। এভাবেই এলোমেলো ভাবে কেটে গেলো কতগুলো দিন।
এক বান্ধবী ফোন করে জানালো ক্লাস টেস্ট হবে। ভার্সিটিতে গিয়ে নোটগুলো সংগ্রহ করতে। পৃথা ভার্সিটিতে যায়, কখনো কখনো চোখ দুটো সায়ানকে খোঁজে। পায় না, আপন মনেই চোখ নামিয়ে নেয় পৃথা।

কয়েকদিন লেগে গেল পৃথার স্বাভাবিক হতে। ভার্সিটিতে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলো। ক্লাস, পড়াশোনা নিয়ে মেতে উঠলো। আবারও যাওয়া শুরু করলো জিমে। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়েই ভার্সিটি তে যাওয়া, ফিরে এসে গোসল দিয়ে খাওয়া, পত্রিকা পড়া, একটা ফ্রেশ ঘুম, জিম, বই পড়া এসব নিয়েই সময় কাটছে পৃথার। অনেকদিন বাবা ফোন করে না, মায়ের সাথে কথা হয় নিয়মিত। মাকেই জিজ্ঞেস করে বাবা কেমন আছে? কিন্তু বাবার সাথে কথা বলার সাহস পায় না পৃথা। বাবাটাও বড্ড অভিমান করে বসে আছে। নিজে থেকে ফোন দেয় না।

একজন নতুন বান্ধবী হয়েছে পৃথার। নাম অবন্তি। মেয়েটা খুব চঞ্চল, সারাক্ষণ বকবক করে। প্রচুর হাসে, অনর্গল কথা বলতে থাকে কোনো স্পেস ছাড়া। ক্লাস টাইম ছাড়া অবন্তির সাথে আড্ডা দিয়েই সময় কাটে পৃথার। অবন্তির সাথে মিশতে মিশতে ওর মতই হতে শুরু করেছে পৃথা। আজকাল পৃথাও বেশি কথা বলে। ছুটোছুটি করে, যেকোনো প্রোগ্রামে অংশ নিতে এগিয়ে যায়। কয়েকটা মেয়ে আবার পৃথার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। ওদের দুজনের এত দূরন্তপনা মেয়েদের ভালো লাগে না। পৃথার তাতে কিছুই আসে যায় না। সময়টাই তো তার, যে সবকিছুকে এড়িয়ে গিয়ে সামনে চলতে পারে।
নিয়মিত আউট বই পড়া শুরু করেছে পৃথা। ক্লাসে স্যার কোনো প্রশ্ন করলেই উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়। কেউ কেউ আড়ালে পৃথাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এভাবেই সময়গুলো অতিবাহিত হচ্ছে।
মাঝেমাঝে মনে হয় একবার সায়ানকে ফোন করে সরি বলতে। কিন্তু সেই রাতেই সায়ানের নাম্বারটা ফোন থেকে ডিলিট করে দিয়েছে পৃথা। কোনো এসএমএস ও রাখে নি। ফেসবুক আইডিটা আনব্লক করে নক দিলে হবে না, এতে করে যন্ত্রণা বাড়বে। আবার মাঝেমাঝে মনেহয় থাকুক না সে নিজের মত। সবকিছু শেষ হয়ে গেছেই যখন, তখন আর নতুন করে কনভারসেশন শুরু করার দরকার কি? থাকুক না সবকিছু এভাবে। কিন্তু সত্যিই কি সব শেষ হয়ে গেছে? শেষ হয়েও তো তার রেশ রয়ে গেছে। যে বাজনা এখনো বাজে বুকের ভেতর।

পর্ব ১৬

একদিন অবন্তি এসে জানালো ওর বড় বোনের বিয়ে। পৃথাকে এক সপ্তাহ আগেই ওর বাড়িতে যেতে হবে আর বৌ ভাত পর্যন্ত থাকতে হবে। যদিও বিয়ের অনুষ্ঠান হবে কমিউনিটি সেন্টারে। তবে গায়ে হলুদ হবে বাসাতেই। সব আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সবাই মিলে আনন্দ উল্লাস করার একটা মোক্ষম সুযোগ হচ্ছে বিয়ে বাড়ি। এই সুযোগ টাকে কেউই হাতছাড়া করতে চায় না। তাই বিয়ের প্রোগ্রাম কমিউনিটি সেন্টারে হলেও কাছের আত্মীয়রা সবাই বাসায় আসবেন। এক সপ্তাহ ধরে হৈ চৈ আর বিয়ে বাড়ির আমেজ ধরে রাখতে না পারলে কিসের আর বিয়ে বাড়ি?
পৃথা আমতা আমতা করে বলে দিলো, না রে আমার যাওয়া হবে না। আব্বু কোথাও যাওয়া পছন্দ করে না।

~ আমাকে এসব শুনাতে আসবি না। আব্বু যদি এটা অপছন্দই করতো তাহলে তোকে শহরে রাখত না।ওকে?
~ কিন্তু আমার যাওয়া হবে না রে। প্লিজ আমাকে জোর করিস না।
~ আমি করবো না জোর। তুই তোর বিবেক দিয়ে বলবি। যদি তোর বোনের বিয়েতে আমাকে ডাকতি আর আমি না যেতাম, কেমন লাগত?
~ বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার ব্যাপারটা বোঝ। আমাকে কেউই যাওয়ার পারমিশন দেবে না।
~ সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই আমাকে আন্টির নাম্বার দে। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বলবো।
~ হয়তো বিয়েতে যেতে বলবে কিন্তু এক সপ্তাহ থাকার অনুমতি দেবে না।
~ দেবে। সেটা তুই আমার উপর ছেড়ে দে।

পৃথা মায়ের নাম্বার দেয়ার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ এর আগে একবার মিথ্যা কথা বলে মাকে আবার সত্যিটা বলে দিয়েছে ও। এবার এমন কিছু বললে মা নিশ্চয়ই অন্যকিছু ভাব্বে। পৃথা কিছুতেই নাম্বার দিতে চাইলো না। অবন্তি রীতিমতো পৃথার ফোনটা কেড়ে নিয়ে আন্টির সাথে কথা বললো৷ আর দ্রুত রাজিও করে ফেললো ওনাকে। মা একবার পৃথাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে যাবি?
পৃথা বলল, না আম্মু। ও জোর করে নিয়ে যেতে চায়।
~ কবে বিয়ে?

~ বিয়ে আরো দশদিন বাকি। ও আমাকে এক সপ্তাহ আগেই নিয়ে যেতে চায়।
~ আচ্ছা যাস। ওকে বল যে যাবি। তবে পাঁচদিন আগে।
~ আম্মু! পাঁচদিন আগে যাবো। কি বলো এসব?
আশ্চর্য হয়ে গেলো পৃথা। এখনো এর প্রতি মায়ের এত বিশ্বাস!

মা বললেন, হুম। তবে একটা কথা বলে রাখি, আমার মান সম্মান নষ্ট হয় এমন কোনো কিছু কখনো করবি না মা।
~ তুমি আমার উপর ভরসা রাখতে পারো আম্মু। আব্বুকে বললে আব্বু কি পারমিশন দেবে?
~ ওটা আমার উপর ছেড়ে দে। এখন ভালোভাবে মনদিয়ে ক্লাস কর।

মা ফোন রেখে দিলেন। অবন্তি খুশিতে জড়িয়ে ধরলো পৃথাকে। ক্লাসের ফাঁকে পৃথা একবার ফিসফিস করে বলল, জানিস আমার খুব এক্সাইটেড লাগছে। কত্তদিন কোনো বিয়ে বাড়িতে যাই না।
~ আমারও এক্সাইটেড লাগছে। খুব মজা করবো আমরা।

~ সবাই কি এত আগে চলে আসবে?
~ না। শুধু কাজিনরা। আর ফুফুরা। আমার কিন্তু অনেক কাজিন। হেব্বি ফুর্তি হবে রে।
~ ছেলে না মেয়ে?
~ ওমা! ছেলের কথা জানতে চাইছিস কেন রে?
দুষ্টুমি হাসি হাসলো অবন্তি। পৃথা বলল, এমনি। আমার ছেলেরা থাকলে বিরক্ত লাগে।
~ বলিস কি রে? তুই তো শালা নিরামিষ। ছেলেরা থাকলে মজা আরো বেড়ে যায়।
~ যাহ! ফাজিল মেয়ে।

~ শিওর। তবে আমার মেয়ে কাজিন বেশি। ছেলে আছে দু চারটা। একেকটা হেভি হ্যান্ডসাম মাইরি। তুই ঘ্যাটাঘ্যাট ক্রাশ খাবি।
দুই বান্ধবী হেসে উঠলো ফিক করে। পরক্ষণেই মনে পড়লো ওরা এখন ক্লাসে আছে। হাসি চেপে গেলো ওরা। ভাগ্যিস স্যার দেখেন নি। দেখলে কি কেলেঙ্কারি টাই না হতো!

যথারীতি বিয়ের পাঁচদিন আগে অবন্তিদের বাসায় চলে এলো পৃথা। খুব বেশি লোকজন আসে নি। তবে কিশোরী ও যুবতী বয়সের পাঁচ/ছটা মেয়ে কে দেখা গেলো। ওদের মধ্যে দুজন এগিয়ে এসে পরিচিত হতে চাইলো পৃথার সাথে। পৃথার মনে হলো, সময়টা তাহলে ভালোই কাটবে।
সময়টা আনন্দেই কেটে যেতে লাগল। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা চললো। আড্ডা শেষ হবার আগেই পৃথা ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য বাসায় এসেছে। ছুটে নামতে গিয়ে হঠাৎ কি হয়ে গেলো বুঝতে সময় লাগলো ওর। অনেক্ষণ পর বুঝতে পারলো কারো সাথে ভীষণ জোরেসোরেই ধাক্কা খেয়েছে আর তাল সামলাতে না পেরে দেয়ালের উপর এসে পড়েছে। যার সাথে ধাক্কা লেগেছে সে পৃথার বাহুতে হাত রেখে বলল, সরি সরি। ব্যথা পেয়েছেন?
পৃথা বলল, হ্যাঁ। খুব ব্যথা পেয়েছি। হাতটা ছিলে গেছে।

~ দেখুন আপনি দিগ্বিদিক হয়ে ছুটছিলেন। আমি কিন্তু দেখেই চলছি। আপনি এসে ধাক্কা লাগিয়ে দিয়েছেন।
~ সরি। এটা একটা একসিডেন্ট।
~ দেখি কোথায় লেগেছে?

~ এইখানে…
পৃথা মুখ তুলে তাকালো। বেশ ড্যাশিং একটা ছেলে। গালে খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়ি। চোখ দুটো ছোট ছোট, ভ্রু দুটো বেশ ঘন। ও হন্তদন্ত হয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো। ছেলেটা পিছন থেকে বললো, আপনি কি বেশি ব্যথা পেয়েছেন?
~ ইটস ওকে। আর আপনাকে অনিচ্ছায় ধাক্কা দেয়ার জন্য আমি দুঃখিত।
পৃথা দ্রুত চলে আসলো সেখান থেকে। ফ্রেশ হয়ে রুমেই শুয়ে রইলো। খানিক বাদে অবন্তি এসে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বলল, কি রে? শুয়ে আছিস কেন?
~ এমনি। বেশি হৈ চৈ করলে আমার মাথা ধরে যায়।

~ হুশ৷ এটা কোনো কথা? এত পুতুপুতু হলে চলে নাকি? মেয়েদেরকে হতে হয় স্ট্রং। আমার মত হ বুঝলি।
~ আসলেই ভাই তুই একটা জিনিস।
~ তোকেও ঘষামাজা করে একটা জিনিস বানাই দিবো।

হেসে উঠলো দু বান্ধবী। পৃথা বলল, একটু আগে এক ছেলের সাথে ধাক্কা খেয়েছি।
~ মারহাবা। প্রথম দিনেই ধাক্কা! হা হা হা।
~ ধুর হাসবি না। ব্যথা পেয়েছি খুব।

~ ইস রে। এরকম ব্যথা দিয়েই শুরু হয়। আমার কোন ভাইয়ের সাথে ধাক্কা খেলি বলতো?
~ চিনি নাকি আমি? শোন আগেই বলে রাখি একটা কথা। ধাক্কাতেই যেন শেষ হয়ে যায় ব্যাপার টা। এটা নিয়ে ফাজলামো করলেও আমি এলাও করবো না।
~ এত্ত সিরিয়াস ক্যান তুই?
~ আমার এসব ভালো লাগে না।
পৃথা উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালো। অবন্তি হেসে পৃথাকে পিছন দিক থেকে ধরে বললো, কখনো কাউকে ভালোবেসেছিস?
~ না।

~ না বাসলে বুঝবি কি করে ভালোবাসায় কি মধু?
~ তাই নাকি? আমার একদমই এসব ভালো লাগে না।
~ আমার খুব ভালো লাগে। নির্ঝর কে নিয়ে আজ অনেক গল্প করবো।

দু বান্ধবী শুয়ে গল্প শুরু করে দিলো। নির্ঝর অবন্তির প্রেমিকের নাম। দুজনের কিভাবে পরিচয়, পরিচয় থেকে প্রেমের সূচনা, প্রেম গভীর হওয়া সবকিছুই শোনালো ওকে। দু মাস পরপর ওরা একসাথে ট্যুরে যায়। সে সময়টা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কাটে, এমন মন্তব্য করলো অবন্তি।
পৃথা বলল, কোথায় ট্যুরে যাস?
~ সাজেক, কক্সবাজার, বান্দরবান। চার/ পাঁচদিন থাকি।
~ বাসায় কিভাবে ম্যানেজ করিস?

~ বাসায় ট্যুরের কথা বলেই যাই। গ্রুপ ট্যুরে যাই। কিন্তু কেউ জানেনা গ্রুপে গিয়েও আমরা কাপল ট্যুর দেই। হি হি।
অবন্তি খিলখিল করে হাসতে লাগলো যেন খুব মজার ব্যাপার ঘটেছে।

পৃথা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মনের মত একজন সঙ্গী পেলে নিশ্চয়ই অনেক মজা হয়!
~ আর বলিস না। প্রতিদিন ওয়েট করি আর প্লান করি আবার কবে যাবো। জানিস ওকে কাছে পেলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না। সারা রাত আমরা জড়াজড়ি করে উফফফ!
পৃথা অবাক হয়ে বলল, জড়াজড়ি মানে! তোরা একসাথে থাকিস?
~ তো?
~ সিরিয়াসলি!
অবাক হয়ে হা করে রইলো পৃথা। অবন্তি ওর হা বন্ধ করে দিয়ে বলল, মুখে মশা ঢুকে যাবে ইয়ার। ট্যুরে তো সবাই যায়। ট্যুরে গেলে দেখবি খালি কাপল আর কাপল।
~ একসাথে থাকা যায়? কিভাবে থাকিস?

~ পাগলী। কিভাবে আবার থাকবো? লাইক হানিমুন।
~ রোমান্স করিস?
~ কেন নয়?
~ ওরে বাবা রে!

আৎকে উঠল পৃথা। অবন্তি পৃথাকে জড়িয়ে ধরে পৃথার বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, যা দারুণ লাগে রে ওর বুকে ঘুমাতে!
~ যাহ আর বলিস না। আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করবে।
~ তোর তো আর বয়ফ্রেন্ড নেই৷ একা গেলে এনজয় করতে পারবি না।
~ বয়ফ্রেন্ড আর হবেও না আমার রে। বিয়ের পর বরকে নিয়ে যাবো।
~ মিস করবি দোস্ত মিস করবি।

অবন্তি গল্প শোনালো কিভাবে ওরা জার্নি করে, কিভাবে আনন্দ করে, পাহাড় দেখে, সমুদ্র দেখে। গল্প শুনে উৎসুক হয়ে পৃথা বলল, আমাকে একবার নিয়ে যাবি ট্যুরে? আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছে।
~ ওকে। বাট আমার সাথে থাকার জেদ ধরবি না আবার।
~ না না। কাবাবে হাড্ডি হবো কেন? আমি একা এক রুমে থাকবো।
~ আচ্ছা। আপুর বিয়েটা শেষ হোক, এরপর যাবো কেমন?

অনেক রাত অব্দি দু বান্ধবী গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো। সকালবেলা হৈ চৈ আর শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো পৃথার। ও মুখ তুলে দেখে জানালা দিয়ে আলো ঢুকে পড়েছে। অবন্তি এখনো ঘুমে বিভোর। বাইরে খুব হৈ চৈ হচ্ছে। ও উঠে ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হলো।
ড্রয়িং রুমে এসে দেখে মেঝেতে বসে অনেকে একসাথে নাস্তা করছে। ওরও বসে যেতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু অবন্তি তো এখনো ঘুমে। গতকাল রাতে পরিচিত হওয়া একটা মেয়ে ওকে টান দিয়ে পাশে বসিয়ে নিলো। নাস্তা করতে করতে নানান লোকে নানান গল্পগুজব আর হাসি তামাশা করছিলো।

পৃথা আচমকা দৃষ্টি ঘোরাতেই গত রাতের ছেলেটার সাথে চোখাচোখি হলো। ছেলেটা মুচকি হাসছে। পৃথা আবারও চোখ নামিয়ে নিলো।
খাওয়া শেষে ঘরে ঢোকার সময় দেখলো ছেলেটা অবন্তির সাথে কথা বলছে। পৃথা ঘরে ঢুকলে অবন্তি পরিচয় করিয়ে দিলো। ওর নাম আবির। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে কিছুদিন আগে চাকরিতে জয়েন করেছে। পৃথা সৌজন্যসূচক হাসি দিলো।

আবির জিজ্ঞেস করল, আপনার ব্যথা কমেছে?
~ এখন নেই।
~ আমি তো আপনার ব্যথার চিন্তার ঘুমের মাঝেও দুশ্চিন্তা করছিলাম। কি অন্যায় হয়ে গেছিল মাইরি।হা হা হা।
~ না না। দোশ তো আমারই।

অবন্তি বলল, গতকাল ধাক্কাটা ওর সাথেই খাওয়া হয়েছিল? হা হা।
~ তোর বান্ধবীর গায়ে জোর আছে বলতে হবে। শুকনা হলেও তেজ আছে।
হেসে উঠলো অবন্তি। আবির বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। পৃথা জিজ্ঞেস করল, এটা কে রে?
~ আবির ভাইয়া। বড় খালার ছেলে।
~ ওহ আচ্ছা।
~ এরপর ওর বিয়ের সানাই বাজাবো।
~ কথাটা কি আমাকে বললি?

অবন্তি ফিক করে হেসে বলল, নাহ তোকে কেন বলবো? ওর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে বলেছিল খালা। তাই আরকি।
আজকে কিছু মেহমান আসলো বাসায়। এখন একটা বেশ বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি ভাব চলে এসেছে। কেউ হাসছে, কেউ খেলছে, কেউ রান্নাঘরে, কেউবা আড্ডায় বসে গেছে। বেশ জমেছে বটে।

রাত্রিবেলা মেয়েরা যখন অবন্তির রুমে আড্ডা দিচ্ছিল তখন আবির সেখানে এসে বসল। কয়েকবার চোখাচোখি হলো পৃথার সাথে। যতবার ই চোখাচোখি হয়, আবির মুচকি হাসে। পৃথাও হাসির বিনিময়ে হাসি ফেরত দেয়।
আজকের আড্ডায় গান চললো। সবাই চলে গেলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো পৃথা। কিছুক্ষণ পর মৃদু স্বরে শুনতে পেলো অবন্তির গলা। ও কাকে যেন বলছে, প্লিজ এখন না। কেউ দেখে ফেললে আপুর আগে আমারই বিয়ে হয়ে যাবে। প্লিজ প্লিজ।

পৃথা কৌতুহলী এসে দেখে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে অবন্তি ফোনে কথা বলছে। ওকে কথা বলতে দেখে নিজে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সবকিছু হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। একটু আগেও হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকা বাড়িটা শান্ত হয়ে গেছে। কেমন যেন একা একা লাগছে পৃথার। মনে হচ্ছে আজ একটা প্রেমিক থাকলে সেও কত কথা বলত!

লেখা – নীলাভ্র নেহাল

চলবে

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “অবশেষে বৃষ্টি – প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসার” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – অবশেষে বৃষ্টি (শেষ খণ্ড) – প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসার গল্প