মিষ্টি প্রেমের গল্প

আমার তুমি (সিজন ২: শেষ খণ্ড) – Notun hot bangla love story

আমার তুমি (সিজন ২: শেষ খণ্ড) – Notun hot bangla love story: তোমার সবগুলা কথাই সত্যি মা। ঐ মাইয়া আমগোরে কাম দেওনের লোভ দেখাইয়া তোমার ক্ষতি করাইছে। আমারে মাইরা ফালানির ভয় দেখাইয়া আমার মাইয়ারে দিয়া তোমার ক্ষতি করাইছে। আমগোরই ভুল ছিল এই ডাইনীরে বিশ্বাস করা।


পর্ব ১৬

মাত্র ৪দিন পরই মুসকানের ১ বছর পূর্ণ হবে। ভাবতেই কেমন জানি অবাক লাগছে। দেখতে দেখতে সময়গুলো কিভাবে পাড় হয়ে গেল। আমিও এবাড়িতে আসছি এক বছর হয়ে গেল। সাতদিনের সেই ছোট্ট মুসকানকটাকে আমি আমার নিজের মেয়ের মত বড় করেছি। মেয়েটার সামনে ছোট দাঁত হয়েছে। একটু একটু হাঁটা শিখছে। যখন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে আর আধো বুলিতে মা মা বলে তখন মনে হয় প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। এরচেয়ে শান্তি মনে হয় আর দুনিয়াতে নেই। জন্ম না দিয়েও যে নাড়ির টান পাওয়া যায় তা হয়তো মুসকানকে না পেলে বুঝতামই না। তুর্যর ইচ্ছা মুসকানের জন্মদিন খুব বড় করে করবে। একমাত্র মেয়ে বলে কথা।

তুর্য অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বেশিরভাগ সময়টা মুসকান আমার আর বকুলের সাথে কাটায়। অল্প সময়েও বকুলকেও আপন করে নিয়েছে। বকুলও খুব সহজেই আমাদের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। তুর্যর কাছে এখন খুব একটা যেতে চায় না মুসকান। এই ছোট্ট বয়সে কিসের এত অভিমান মেয়েটার আল্লাহ্ জানে! ঐদিন তুর্য অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হতে যায়। মুসকান তখন আমার কোলে। তুর্য ফ্রেশ হয়ে এসে মুসুকে কোলে নিতে চাইলে মুসু যায় না। মুসুকে জোর করে কোলে নিয়ে বলে,

মুসু নিশ্চুপ।
“আচ্ছা বাবাইকে মেরে দাও তো!”
মুসুর হাত টেনে তুর্য গালে নেয় কিন্তু মুসু হাত গুটিয়ে নিয়ে আমার দিকে তাকায়। তুর্য আমার দিকে তাকিয়ে বললো,

“বিষয়টা কি?”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
“মায়ের দায়িত্ব।”
“মানে?”
“মানে এইযে আপনি বললেন, বাবাইকে মারো। এখন যদি আপনাকে মারতো তাহলে ওর এই সাহস আর অভ্যাসটা হয়ে যেত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেটা বৃদ্ধি পেতো। একটা বাচ্চাকে আপনি ছোট থেকে যেই শিক্ষা দিবে, সেটাই সে শিখবে। পরিবার থেকেই একটা শিশু প্রথম শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। ওকে এখন থেকে যা শিখাবো ও তাই শিখবে।”
“তুমি আসলেই মুসুর উপযুক্ত বেষ্ট মা।”
“হয়েছে। এখন চলেন খাবেন।”
“তোমরা খেয়েছো?”

“বকুল আর মুসকানকে খাইয়েছি।”
“আচ্ছা চলো।”
মুসকানকে বকুলের কাছে দিয়ে আমি তুর্যর কাছে গেলাম। তুর্য কয়েক লোকমা খাইয়ে দিতেই আমার পেট ভরে যায়। আমি পানি খেয়ে রুমে চলে আসি। রুমে গিয়ে দেখি বকুল গল্পের বই ঘাটছে আর দেখছে।
“কি দেখছিস?”

বকুল থতমত খেয়ে বইটা রেখে বললো,
“কই কিছু না তো”
“ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তোকে খেয়ে ফেলবো নাকি?”
বকুল মাথা নিচু করে বললো,
“না মানে ভাবী গল্পের বই দেখছিলাম।”
আমি বিছানায় বসে মুসকানকে কোলে নিয়ে বললাম,

“তুই পড়তে পারিস?”

“আমার কাছে তো নেই ভাবী। স্কুলেই আছে সেগুলো।”
“আবার স্কুলে ভর্তি হবি?”
কথাটা শুনে বকুলের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সংকোচে যে কিছু বলতে পারছে না সেটাও বুঝতে পারছি। আমি আবারও বললাম,
“পড়ার ইচ্ছা আছে?”
“আছে ভাবী।”
“আচ্ছা মুসকানের জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ হোক। তারপর আমি তোকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো।”
“কিন্তু ভাইয়া?”
“ভাইয়া কি?”
“ভাইয়া কিছু বলবে না?”
“কি বলবে রে? তুই জানিসনা ঘরের মন্ত্রী বউরা হয়?”

আমার কথা শুনে বকুল হেসে দিলো।
“তুমি সত্যিই অনেক ভালো ভাবী।”
“তোর ভাইয়াও অনেক ভালো। শুধু একটু রাগী এই আরকি।”
“তোমার সামনে তো ভেজা বিড়াল হাহাহা।”
তুর্য পেছন থেকে এসে বললো,
“ঐ কি বললি?”

বকুল কিছু বলার আগে আমি বললাম,
“বিড়ালকে গোসল করালে যে ভিজে যায় সেটাই বলছিল।”
“পরী তুমি বলেছিলে ননদ ভাবী মিলে নাকি চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করবে এখন তো দেখছি ননদ-ভাবীর গলায় গলায় প্রেম।”
“হিংসে হচ্ছে বুঝি?”
তুর্য বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,
“হাহ্! হলেই বা কি? আমায় তো একটু ভালোবাসো না। আদরও করো না।”

“কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানেন না?”
“কোথায় কি বললাম? বকুল কি বাহিরের মানুষ নাকি। ভাবীরা তো ননদের সাথে কতকিছু শেয়ার করে শুনেছি।”
“আপনাকে”
পুরো কথা বলার আগে বকুল বললো,
“ও ভাবী আমি আগে যাই। তারপর যা করার করো।”
কথাটা বলে বকুল দৌড়ে চলে গেল। সব কয়টা একদম তুর্যর মতই হয়েছে।

রাতে আমার শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে। হুট করে এমন জ্বর আসার মানে কি বুঝলাম না। বিছানা ছেড়ে উঠতেও পারছিনা। মনে হচ্ছিল বিছানা আমায় দুই হাত-পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে। তুর্য ঘুম থেকে উঠে বললো,
“পরী উঠবে না?”
আমি নির্লিপ্ত গলায় বললাম,
“শরীরটা ভালো লাগছে না।”
“কেন? কি হয়েছে?”

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তুর্য আমার গালে কপালে হাত রেখে বলে,
“ওহ গড! তোমার তো জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে।”
তুর্য উঠে বকুলকে ডাকে। বকুল রুমে আসার পর তুর্য বললো,
“বকুল তোর ভাবীর কাছে একটু বস। আমি ডক্টর নিয়ে আসি।”
“কি হয়েছে ভাবীর?”

“জ্বর আসছে।”
“তাড়াতাড়ি যাও।”
তুর্য বাইরে যাওয়ার পর বকুল বাটিতে করে পানি এনে জলপট্টি দিয়ে দেয়। এরমধ্যে মুসকানও ঘুম থেকে ওঠে পড়ে। আমার শরীর এত গরম যে মুসু আমার শরীরের তাপও সহ্য করতে পারবে না। বকুলকে বললাম,
“তুমি মুসকানকে আগে কোলে নাও। আগে ওরে কিছু খাওয়াও।”
বকুল মুসকানকে কোলে নিতে নিতে তুর্য ডাক্তার নিয়ে চলে আসে। ডাক্তার চেকআপ করে কতগুলো ওষুধ দিয়ে যায় আর বেডরেস্টে থাকতে বলে। ঠিকমত খেতে বলে। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর তুর্য শ্বাশুরী মাকে ফোন দিয়ে আসতে বলে। বকুলের উদ্দেশ্যে বললো,
“মা আসার আগ পর্যন্ত একটু কষ্ট করে মুসকানকে রাখ বোন। আমি ওর মাথায় পানি দিয়ে দিচ্ছি।”
আমি চুপ করে শুয়ে আছি। তুর্য মাথায় পানি দিয়ে দিচ্ছে। বকুল মুসকানকে কোলে নিয়ে ড্রয়িংরুমে হাঁটছে। মুসকান যে কাঁদছে সেটা আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমি তুর্যকে বললাম,

“মুসকানকে আমার কাছে নিয়ে আসতে বলেন।”
“ও তোমায় জ্বালাবে পরী।”
“নিয়ে আসতে বলেন।”

তুর্য বকুলকে ডাক দেয়। মুসকানকে আমার পাশে বসিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট উল্টে কেঁদে দেয়। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
“কি হয়েছে আম্মু?”
মুসকান ঠোঁট উল্টে কাঁদছে আর আধো আধো বুলিতে মা মা বলছে। ওর কান্না মনে হয় আমার বুকে সুঁচের মত বিঁধে। আমার গায়ের উড়নাটা ভাজ করে বুকের ওপর দিয়ে মুসকানকে আমার বুকের ওপর শোয়ালাম। যাতে ওর তাপটা কম লাগে। বুকে নিতেই কান্না থামিয়ে দেয়। বকু্ল হেসে দিয়ে বলে,

“মা পাগলী মেয়ে।”
উত্তরে তুর্য আর আমিও হাসি। মাথায় পানি দেওয়া শেষ হলে তুর্য আমায় ধরে বসায়। তোয়ালে দিয়ে চুল পেঁচিয়ে দেয়। গরম দুধ, ডিম, রুটি নিয়ে আসে। খাবার দেখেই আমার বমি আসছে। একদম খেতে ইচ্ছে করছিলো না। কিন্তু ডক্টর বলেছে কিছু খেয়ে যেন ওষুধ খাই। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেলাম। সব খাবারই তেঁতো লাগছিল। খাওয়া শেষে মুসকানকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম।

সারাদিন তুর্য এভাবেই আমার সেবা করছিল। দুই ভাই বোন মিলে রান্না করেছে আজ। বিকালের দিকে শ্বাশুরী মা বাসায় আসে। এতক্ষণ দুই ভাই-বোন আর কি জোর করে খাওয়াচ্ছিল! আমার শ্বাশুরী মা পারে তো পাতিলের সব খাবারই আমায় খাইয়ে দেয়। রাতের বেলায়ও এই কাহিনী ঘটলো। আমি বললাম,
“মা এত খেলে বমি আসবে। সব তেতো লাগছে।”
“জ্বরের মুখ তো তাই তেতো লাগছে। আর বমি আসলে আসুক। পেট খালি হবে। আরো বেশি বেশি খেতে পারবা।”

“না মা আর পারবো না।”
“চুপ! কিসের না? একটুপর পরই খেতে হবে। এমনেই তো শরীরে একটু মাংস নাই। অসুস্থ হওয়ায় তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
রাতে ভাত, ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মুসকান আর বকুলকে নিয়ে অন্যরুমে শুয়েছে। আমি বারবার বললাম,
“মা মুসকানকে আমার কাছে রেখে যান।”উত্তরে মা বললো,
“না। তুমি তো এক অসুস্থ মানুষ। ওরে সামলাবে কিভাবে?”
“তবুও।”

“তোমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাবো না পাগলী। আগে তুমি সুস্থ হও। আর তুর্য রাতে অবস্থা বেগতিক হলে আমায় ডাকবি কিন্তু।”
তুর্য বললো,
“আচ্ছা মা।”
শ্বাশুরী মা চলে যাওয়ার পর তুর্য ডিম লাইট জ্বালিয়ে দরজা লক করে দিলো। দুজনের মাঝেই যথেষ্ট দূরত্ব। আমি তুর্যর গা ঘেষে শুয়ে পড়লাম। তুর্যও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। এবার আমার চোখে ঘুম এসে পড়েছে। আমি তুর্যকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। তুর্যও শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধরলো।


পর্ব ১৭

তুর্যকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি। মাঝরাতেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। ঘুমাতেও পারছিনা। বমি বমি ভাব হচ্ছে। তুর্যর শার্ট জোরে খামচি দিয়ে ধরতেই তুর্যর ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ খুলেই আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কোনো সমস্যা?”
“উহু।”
“কিছু খাবে?”
“উহু!”

“মাথায় পানি দিবে?”
“উঁহু।”
“সবকথায় শুধু উঁহু উহু করছো কেন? মুখে কি হয়েছে?”
তুর্যকে কি করে বলবো যে মুখ তেতো হওয়ায় তেতো পানি জমে আছে মুখে। তুর্য আবার বললো,
“তোমার কি বমি আসছে?”

“হু।”
“উঠো।”
তুর্য আমাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেলো। কতক্ষণ ধরে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু বমি আসছে না। শুধু থুথু ফেলছি। বমি আসবে আসবে করেও যখন আসেনা এরচেয়ে বিরক্তিকর আর কিছু হয়না। তুর্য আমার দুই বাহু ধরে আছে। আমি উদাস হয়ে ওর দিকে তাকাতেই বললো,
“বমি আসছে না?”
“না।”
“আচ্ছা।”
তুর্য আমার মাথায় হালকা পানি দিয়ে দিলো। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে মাথায় নারিকেল তেল দিয়ে দিলো। রান্নাঘরে গিয়ে দুধ গরম করে আনে। আমি বললাম,
“না প্লিজ আমাকে দুধ খেতে দিবেন না। বমি করে দিবো তাহলে।”

“বমি হলেই তো ভালো। তাহলে একটু সস্তি পাবে।”

“না, না প্লিজ।”
“আমার লক্ষী বউ না করে না।”
আমার দুই গাল ধরে জোর করে খাইয়ে দেয়। এবার যেন বমি বমি ভাবটা বেড়ে গেল। আমি চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। তুর্যও লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো। আমার গায়ে হাত রাখতেই হাত সরিয়ে দিলাম। তুর্য বললো,
“যাহ্ বাব্বাহ! ভালো চাইলেও দোষ।”

“হুহ্।”
কিছুক্ষণ পর আমি দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসলাম। আমার সাথে তুর্যও উঠে গেল। কিছু বলার আগেই গড়গড় করে তুর্যর গায়ে বমি করে দিয়েছি। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি নিজেই বেকুব হয়ে গেছি। না জানি আজ কপালে কি আছে আমার। তুর্য উঠে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। রাগি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। আমাকে হালকা ধমক দিয়ে বললো,
“যা করার তা তো করেই ফেলছেন। এখন উঠেন মহারাণী।”
আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। তুর্যর সাথে আমার কাপড়ও নষ্ট হয়েছে। দুজনে একসাথেই ওয়াশরুমে গেলাম। তুর্য আমার হাতে কাপড় দিয়ে বললো,

“চেঞ্জ করো।”
আমি কন্ঠস্বর নিচু করে বললাম,
“আপনার সামনে?”
“হ্যাঁ আমার সামনে।”
“না।”
তুর্য কিছু বলতে গিয়েও হেসে দিলো। তারপর বললো,

“আমি ঐদিক ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। তুমি চেঞ্জ করো।”
তুর্য ঐদিক ঘুরে দাঁড়ানোর পর আমি চেঞ্জ করে নেই। তুর্য আমার সামনেই শার্ট খোলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“শার্ট খুলছেন কেন?”

“তোমায় আদর করবো তাই।”
“এমা! ছিহ্।”
“বমি করে আমার শার্ট আস্ত রাখছো? তুমি চেঞ্জ করেছো আমি করবো না?”
“ওহ হ্যাঁ তাইতো!”
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তুর্য মাথা নাড়িয়ে ইশারা করলো,
“কি?”

আমিও ইশারায় বললাম,
“কি?”
“তুমি এখানে কি করছেন?”
“আপনি যা করছেন।”
“আমার চেঞ্জ করা দেখবা?”
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম,
“হ্যাঁ।”
তুর্য অবাক হয়ে বললো,

“হ্যাঁ?”
আমার হুস আসতেই বললাম,
“না, না!”
“না কি আবার? দাঁড়াও।”
“ঐ না, সরেন।”
“কিসের সরাসরি? চুপ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকো।”
আমি দুই হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। তুর্য মুচকি মুচকি হাসছে।

“চোখ খোলো।”
“না।”
“খোলো বলছি।”
“প্লিজ না।”
“আরে খোলোই না।”
“ছিঃ না।”

তুর্য এবার ধমক দিয়ে বললো,
“চোখ খোলো!”
আমি আতকে উঠে দুই হাত সরিয়ে চোখ খুললাম।
“একি! এখনো চেঞ্জ করেননি?”
“আমার যেই অবস্থা করেছেন, গোসল করা ছাড়া উপায় নেই আমার ম্যাম।”
“আমি কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো?”
তুর্য চোখ মেরে বললো,

“গোসল করাও দেখবে?”
“সরেন।”
তুর্যকে সরিয়ে আমি রুমে চলে আসলাম। আর তুর্য হাহা হিহি হোহো করে হাসছে। কেমন বজ্জাত ভাবা যায়! অসুস্থ বউকে এভাবে নাজেহাল! যাক বাবা, বেশি ক্ষেপানো যাবে না। এমনিই বমি করে যা করেছি, যদি বকা দেয়। তার আগেই চুপ করে শুয়ে পড়ি। আমি কাঁথা গায়ে দিয়ে চুপ করে শুয়ে আছি। তুর্য গোসল করে রুমে আসে। শরীরে শুধু একটা টাওয়াল প্যাঁচানো। কি বডি মাইরি! আমি আবার কচ্ছপের মত কাঁথার ভেতর ঢুকে গেলাম। তুর্য একটা টাউজার আর ব্লু টি-শার্ট পড়ে। চুল থেকে তখনো পানি পড়ছে। লাইট অফ করে তুর্য শুয়ে পড়ে। আমি একটু একটু করে তুর্যর কাছে এগিয়ে যাই। তুর্য এক ঝটকায় আমায় বুকে নিয়ে বললো,
“এমন পিঁপড়ার মত কতদিনে কাছে আসতে?”

তুর্যর কথা শুনে আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। তুর্যর বুকে মুখ লুকিয়ে একটা কামড় দিলাম।
“উফফ! কামড় দিলে কেন?”
“ইচ্ছে হলো তাই।”
“আমিও দেই?”

“একদম না।”
তুর্য মুচকি হেসে আমার কপালে চুমু খেয়ে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

মুসকানের জন্মদিনের আগেই আমি সুস্থ হয়ে যাই। বাড়িতে বড় করে আয়োজন করা হয়েছে। এত সাজসজ্জা যে আমি কনফিউজড হয়ে যাচ্ছি, এটা জন্মদিনের অনুষ্ঠান নাকি কোনো বিয়ে বাড়ি। আচ্ছা গণ্ডারটা আবার না জানিয়ে বিয়ে করছে না তো? উমম! জানতে হবে বিষয়টা! কিন্তু গন্ডারটা কোথায়? আমি হাঁটতে হাঁটতে এদিক-ওদিক যাচ্ছি কিন্তু তুর্যকে পাচ্ছি না। ঐদিকে তাকাতেই দেখি তুর্য যেন কার সাথে কথা বলছে। আমাকে ওর কাছে এগিয়ে যেতে দেখেই লোকটাকে বিদায় দিয়ে আমার কাছে এসে বলে,
“কিছু হয়েছে?”
“হওয়ার আগেই আটকাতে চাচ্ছি।”

“মানে?”
“মানে কি? বোঝাচ্ছি দাঁড়ান।”
তুর্যকে টেনে আমি আড়ালে নিয়ে গেলাম। তুর্যর শার্টের কলার চেপে ধরলাম। কিন্তু মুখোমুখি হতে পারছিনা। হবো কি করে? না, বলেন আমায় কি করে হবো? ওমন আইফেল টাওয়ারের নাগাল পাওয়া কি আর মুখের কথা? তাই উপায় না পেয়ে পা দুটো একটু উঁচু করলাম। এবার একটুসখানি মুখোমুখি হতে পেরেছি। তুর্য আমার হাত ধরে বললো,
“কি করছো? কলার ছাড়ো।”
“কলার ছাড়বো? কেন ছাড়বো?”
“কি হয়েছে তোমার?”

“মাথা ঠিক আছে তোমার?”
“মাথা তো আপনার ঠিক নাই। নাহলে কি আর এমন নাদুসনুদুস বউ থাকতে আবার বিয়ে করতে চান?”
“পাগল হয়ে গেছো তুমি। আমি আবার কেন বিয়ে করবো? আর এসব কে বললো তোমায়?”
“বলতে হবে কেন? একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এমন বিয়ে বাড়ির মত আয়োজন কেন হুম?”
“উফফ পরী! মুসকান আমাদের একমাত্র মেয়ে। আর এটা ওর প্রথম জন্মদিন।”

“অন্যকিছু না তো আবার?”
তুর্যর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হতেই বললো,
“অন্যকিছু হলেই বা কি?”
“খুন করে ফেলবো।”
“কেন?”

“কারণ আমি”
“তুমি?”
“আপনার!”
“আমার তুমি?”
“হু।”
কলার থেকে আমার হাত সরিয়ে তুর্য আমায় দেয়ালের সাথে চেপে ধরে।
“আমার তুমিকে একটু আদর করে দেই?”
“আপনি সব সময় এমন পঁচা পঁচা কথা বলেন কেন বলেন তো?”
“কই পঁচা কথা বললাম?”

“এইযে বললেন!”
“তাহলে রুমে চলো পঁচা কাজটা করে ফেলি।”
“শয়তান, কুত্তা সরেন।”
আমি তুর্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আসি। তুর্য হিহি করে হাসছে তখনো।

পর্ব ১৮

মুসকানের জন্মদিন খুব ভালোভাবেই শেষ হয়ে যায়। আমার ছোট্ট মুসকানটা এক বছরে পা ফেললো। এতসব আয়োজন দেখে মুসকানের সেকি আনন্দ! রাত হতেই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সব মেহমান বাড়িতে চলে যায়। আমি রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নিই। মুসকান এতক্ষণ আমার শ্বাশুরী মায়ের কাছে ছিল। আমি শ্বাশুরীর রুমে যাওয়ার জন্য এগোতেই তুর্য আমার পথ আটকে দাঁড়ায়। আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,

“কি?”
তুর্য মুচকি হেসে বলে,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে।”
“কিহ্?”
“হুহ।”

“খুব সাহস হয়ে গিয়েছে তাই না?”
“সাহস ছিল না কবে?”
“তাই? খুব সাহস? আচ্ছা দেখি কেমন সাহস তোমার।”
তুর্য আমার সামনে আগাতে থাকে আর আমি পিছিয়ে যাই। পিছাতে পিছাতে বললাম,
“কি হচ্ছেটা কি?”
“সাহসের পরীক্ষা নিচ্ছি।”

“ধুর! সরেন তো।”
তুর্য আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে বললো,
“সরবো কেন?”
“অনেক টায়ার্ড আমি। মুসকানকে ঐ রুম থেকে এনে ঘুমাবো।”
“মুসকান তো ঘুমাচ্ছে।”
“তো?”

“তো ও মায়ের কাছে থাকুক।”
“না। আমার কাছেই থাকবে।”
“ঠিক আছে যাও। আজ টায়ার্ড বলে কিছু বললাম না।”
“হুহ্।”
তুর্যকে সরিয়ে দিয়ে আমি শ্বাশুরীর রুমে যাই। গিয়ে দেখি দরজা ভেতর থেকে লক করা। ঘুমিয়ে পড়লো নাকি! দরজায় নক করে মাকে ডাকলাম,
“মা?”

ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আরো কয়েকবার ডাকলাম। কিন্তু এবারও কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই আর বিরক্ত না করে চলে আসলাম।
রুমে ঢুকতেই কিছু একটার সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। আমার কোমড় বুঝি এবার গেলো রে! ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছি। চোখ খুলতে দেখি তুর্য আমায় ধরেছে। তার মানে আমি পড়িনি! কিন্তু আমি হোঁচট খেলাম কিভাবে!
“এখনো হাঁটা শিখোনি?”
“কিহ্?”
“বললাম এখনো হাঁটা শিখোনি?”
“সেটা তো অনেক আগেই শিখেছি।”
“তাহলে হোঁচট খাও কিভাবে হুম?”

“সেটাই তো ভাবছি।”
“ভাবতে হবেনা। আমি শিখাবো।”
“কি?”
“হাঁটা।”

“কি বলেন না বলেন? আমি কি হাঁটতে পারিনা নাকি?”
“সেটা তো দেখতেই পেলে।”
তুর্য আমায় ছেড়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। আমার কোমড়ে হাত রেখে বললো,
“পায়ের ওপর পা দাও।”
“না।”

“কি শুরু করলেন বলেন তো?”
“বউকে ভালোবেসে হাঁটা শেখাচ্ছি।”
তুর্যর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তুর্য কোমড়ে হাত রেখে যখন হাঁটা শুরু করলো তখন আমি তুর্যর শার্ট দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলাম। আমি এখন তুর্যের অনেক কাছাকাছি। তুর্যর প্রতিটা নিঃশ্বাস আমার চোখেমুখে পড়ছে। পায়ের ওপর নিয়ে সারা রুমে হাঁটছে আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখের ভাষা অনেক গভীর। যেখানে এক রাশ ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি আমি। পায়ের উপর থেকে নামিয়ে কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দিলো। লাইট অফ করে আমার পাশে শুয়ে পড়লো। বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বললো,
“আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি তুমি ঘুমাও।”

কেন জানিনা তুর্যর বুকে সব সুখ খুঁজে পাই। যখন আমার মা বেঁচে ছিল তখন আমার একমাত্র শান্তির জায়গা ছিল মায়ের কোল। মায়ের কোলে মাথা রাখলে আমার মনে হতো দুনিয়াতেই বুঝি আমি স্বর্গ পেয়ে গেয়েছি। আর এখন আমার সুখ শান্তির জায়গাটা তুর্যর বুকে লুকায়িত। তুর্যকে ছাড়া আমার বাঁচাটাই বোধ হয় মুশকিল হয়ে যাবে। রিয়া সবসময় বলতো, তুই বিয়ের পর অনেক সুখী হবি। তখন ওর কথা তাচ্ছিল্যর হাসিতে উড়িয়ে দিতাম আর ভাবতাম, পোড়া কপালে কি আর সুখ জোটে! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রিয়া ঠিকই বলতো। তুর্য আর মুসকানের মধ্যেই আমার সব সুখ নিহিত। মুসকানকে হয়তো আমি জন্ম দেইনি এটা সত্যি কিন্তু মুসকান আমার মেয়ে। এতসব ভাবতে ভাবতে কখন যে গুটিসুটি হয়ে তুর্যর বুকে ঘুমিয়ে পড়লাম! তুর্য আমার কপালে চুমু খেয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলো। ডিম লাইটের আবছা আলোয় মায়ার ছবিটা দেখা যাচ্ছে। মায়ার ছবির দিকে তাকিয়ে তুর্য বলছে,

“মায়া আমি কি কোনো ভুল করছি? তুমি কিন্তু আমায় ভুল বুঝো না। তোমার জায়গা তোমারই আছে। শুধু এই মেয়েটা ওর জন্য মনের ভেতর আলাদা একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেছি ওর থেকে দূরে থাকার কিন্তু পারিনি। কি করে পারতাম বলো তো? এই মেয়েটা তো আস্ত একটা ভালোবাসা। ওকে ভালোবেসে না থাকাটা যে অসম্ভব। ওর থেকে নিজেকে দূরেও রাখতে পারিনা। মনে হয় ওর মায়াতে সিক্ত আমি। না চাইতেও অনেক বেশিই ভালোবেসে ফেলেছি। ওর বাচ্চামো স্বভাব, মুসকানের জন্য মা হয়ে ওঠা এইসবকিছুই যেন আমায় খুব বেশি টানে ওর প্রতি। ভালোবেসে ফেলেছি আমি ওকে।”

সকালে পাখির কিচিরমিচির শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে ফ্রেশ হয়ে সকলের জন্য নাস্তা তৈরি করে মাকে ডাকলাম। দরজা খোলার পর দেখি আমার বাচ্চা মেয়েটা এখনো ঘুমাচ্ছে। ওকে ঘুম থেকে তুলে কপালে, গালে, মুখে চুমু খেলাম। চোখ খুলেই খিলখিল করে হেসে দিলো। ওকে বিছানায় বসিয়ে বললাম,
“মাকে একটা চুমু দাও তো সোনা।”

আমি গালটা বাড়িয়ে দিতেই মুসু চুমু দিয়ে হাসা শুরু করলো। আমি মুসুর গালে চুমু খেয়ে বললাম,
“আমার লক্ষী মেয়েটা।”
মুসকানের মুখ মুছে ওকে খাইয়ে দিলাম। খাবার টেবিলে তখন মা, বকুল আর তুর্য খাচ্ছিলো। আমি বকুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“খেয়ে রেডি হয়ে নে।”

বকুল কিছু বলার আগেই তুর্য বললো,
“কোথায় যাবে?”
“ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো।”
“কোন ক্লাসে?”
“এইটে।”
“ওর ফাইভের সার্টিফিকেট আছে?”

“স্কুলে নাকি আছে। সেগুলো স্কুল থেকে আনতে হবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
খাওয়া শেষে রেডি হয়ে তুর্যর সাথে বকুলকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। মুসকানকে মায়ের কাছে রেখে এসেছি। গাড়ির রাস্তায় ওকে নিয়ে বের না হওয়াই ভালো। তুর্যর এক পরিচিত স্কুলেই বকুলকে ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পৌঁছে দিয়ে তুর্য অফিসে চলে গেলো।
অফিসকক্ষে গিয়ে ওর ভর্তির জন্য সব কার্যাবলি শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম। আজ আর বকুল ক্লাস করবেনা। কাল থেকে ক্লাস করবে। মেইন রোডের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এত গাড়ি যে রাস্তা পাড় হতেই পারছিনা। গাড়ি চলাচল যখন কিছুটা কম তখন আমি এগোচ্ছিলাম। অর্ধেক গিয়ে দেখি বকুল দাঁড়িয়ে আছে। আমি বকুলকে ডেকেই যাচ্ছি কিন্তু আমার কথা ও শুনছেই না। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার ফিরে আসলাম কিন্তু লোকজনের ভিড়ে বকুল কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
আরে এখানেই তো ছিল! ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। কোথায় চলে গেল বকুল। এমনিতেই দেশের অবস্থা ভালো না। ভিড়ের মধ্যেই কে যেন হাত টান দিয়ে বললো,
“ভাবী”
আমি পিছনে ঘুরে তাকানোর আগেই কারো ধাক্কায় চলন্ত সিএনজির সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলাম। মাথায় প্রচন্ড পরিমাণ আঘাত পেয়েছি। শুধু ঝাপসা চোখে দেখতে পেলাম বকুলকে

পর্ব ১৯

জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাসপাতালে। মাথাটা প্রচন্ড রকম ব্যথা করছে। পাশে তাকাতেই দেখি বকুল আর তুর্য বসে আছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই বকুল তুর্যকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,
“ভাইয়া, ভাবীর জ্ঞান ফিরেছে!”
তুর্য আমার দিকে এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললো,
“এখন কেমন আছো?”

“হুম ভালো।”
সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা লাগছিল। কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে ভালো করে তাকালাম তুর্যর দিকে। তুর্যর চোখে পানি একদম স্পষ্ট ছিল। তুর্যকে এড়িয়ে এবার আমার চোখ বকুলের দিকে গেলো। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে। ইশারায় আমি বকুলকে কাছে ডাকলাম। বকুল আমার কাছে এসে বললো,
“কিছু বলবে ভাবী?”
আমি কিছু বলার আগেই তুর্য আমায় থামিয়ে দিয়ে বললো,
“এখন আর কিছু বলার দরকার নেই। তুমি এখন অসুস্থ পরী। তোমার এখন রেষ্ট নেওয়া দরকার। আগে সুস্থ হও তারপর যতখুশি কথা বলো কেমন!”

তুর্যর মুখের ওপর আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। বকুলকে নিয়ে তুর্য বাহিরে চলে গেলো। মনের ভেতর কেমন যেন খচখচ করছে! মনে হচ্ছে কিছু তো একটা গণ্ডগোল নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা কি?!
আশেপাশে ঘড়ি না থাকায় বুঝতে পারছিলাম না এখন কোন সময়। মুসকানকে দেখার জন্য মনটা খুব কাঁদছিল। না জানি কেমন আছে আমার এঞ্জেলটা! আল্লাহ্ যা করে ভালোর জন্যই করে। ভাগ্যিস মুসকানকে সাথে নেইনি। এতসব চিন্তাভাবনায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে ব্যথায়। বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছি। কিছুক্ষণ পরই আমার শ্বশুর-শ্বাশুরী,মুসকান, তুর্য, বকুল, মা, ছোট ভাই প্লাবন, রিয়া, জয় আর অথৈ আপু আসে। একসাথে এত সবাইকে দেখে আমি রীতিমত চমকে গেলাম। সবাই নিশ্চুপ। আগে বাবা জিজ্ঞেস করলো,
“এখন কেমন আছিসরে মা?”
“জ্বী বাবা ভালো আছি।”

আমার শ্বাশুরী করুণস্বরে বললো,
“রাস্তাঘাটে দেখে চলতে পারো না? যদি বড় কিছু হয়ে যেত?”

তখন মা বললো,
“শুধু হাতে-পায়েই বড় হয়েছে। হাঁটাচলা কিছু শিখেছে এখনো!”
হাঁটার কথা মনে হতেই ঐদিন রাতের কথা মনে পড়ে গেল। তুর্য যে আমায় পায়ের ওপর নিয়ে হাঁটা শেখাচ্ছিল! তখন মনে হয় তুর্য ঠিকই বলেছিল। কথাটা মনে হতেই আমি ফিক করে হেসে দিলাম। হুট করে এভাবে হাসার কারণে সকলেই আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আমি মুসকানের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলাম। মুসকান মুখে এক আঙ্গু্ল ঢুকিয়ে দিয়ে মা, মা বলছে। মুসকান তুর্যর কোলে ছিল। মুসকানকে কোলে নিতেই মনের ভেতর শান্তি ফিরে পেলাম মনে হচ্ছে। একদম বুকের সাথে লেগে শুয়ে আছে।
তখন ডক্টর এসে বললো,
“এবার আপনারা প্লিজ বেড়িয়ে যান। উনার যথেষ্ট বিশ্রাম নেওয়া দরকার। খুব বেশি প্রেশার উনাকে দিবেন না প্লিজ।”

ডাক্তারের রিকোয়েস্টে অথৈ, জয় আর তুর্য বাদে সকলেই বের হয়ে গেলো। জয় আমার কাছে এসে বললো,
“তুই সংসার করিস কিভাবে বলতো?”
জয়ের এমন প্রশ্নের কি উত্তর হতে পারে বুঝতে পারছিনা। আমাকে চুপ থাকতে দেখে জয় বললো,
“এরকম ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছিস কেন?”
“কি বলবো ভাবছি!”
“থাক, আর ভাবতে হবে না। নিজের খেয়াল রাখিস প্লিজ। আর হ্যাঁ ঠিকমত ওষুধ খাবি, নিজের যত্ন নিবি। ঠিক আছে?”

আমি মাথা সামান্য দুলিয়ে বললাম,
“হুম।”
“লক্ষী মেয়ে।”
জয় চলে যেতেই অথৈ আপু কাছে এসে বসলো। মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“মেয়ে তো দেখছি ভীষণ মা ভক্ত হয়েছে।”
উত্তরে আমি শুধু মুচকি হাসলাম।

“সবাই তো সব বলে ফেললো। এখন আমি কি বলবো বলো তো?”
“যা ইচ্ছে।”
“হুম। বেশি প্রেশার নিয়ো না কেমন। বেশি টেনশন করলে মাথায় সমস্যা হবে। ভাগ্য ভালো যে সিএনজি স্লো মোশনে চলছিল। একবার ভাবো যে ওটা যদি সিএনজি না হয়ে কোনো বাস বা ট্রাক হতো? তখন কি হতো? তখন তো স্লো মোশনে চললেও জীবন নিয়ে ফিরতে হতো না। আল্লাহ্ অল্পতেই বাঁচিয়েছে তোমায়। রাস্তাঘাটে এবার থেকে দেখেশুনে চলবে। মনে থাকবে তো?”
“থাকবে।”
“আচ্ছা আজ তাহলে আসি। টেক কেয়ার।”

তুর্য এবার চেয়ারটা টেনে বসলো। আমি তুর্যর দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আপনি কিছু বলবেন না?”
“আগে সুস্থ হও তুমি।”

তিনদিন পরই হাসপাতাল থেকে আমায় রিলিজ করে দিলো। এই তিনদিন তুর্য আমার সাথেই হাসপাতালে ছিল। দিনে আমার শ্বাশুরী আর মা থাকলেও রাতে তুর্য কাউকে থাকতে দিতো না। মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে হয় এটা ভেবে যে তুর্যর মত একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছি আমি।
বাসায় এসেও আমায় সারাদিন বিছানায় বসে থাকতে হয়। বাড়ির সবাই আমার দেখাশোনা করে। আমি শুধু মুসকানকে নিয়ে শুয়ে বসে থাকি। আমি খুব অবাক হই যে, এখন মুসকান আমায় একটুও জ্বালায় না। শুধু চুপটি করে বুকের সাথে লেগে শুয়ে থাকে। মেয়েটা কি বুঝে যে আমি অসুস্থ?! মুসকানের কপালে,গালে চুমু খেয়ে বুকের সাথে শক্তর করে জড়িয়ে ধরি। ছোটবেলার কথা আমার স্পষ্ট মনে না থাকলেও এতটুকু মনে আছে যে, মায়ের শরীরের ঘ্রাণ আমার খুব প্রিয় ছিল। আমি যখন অসুস্থ হতাম তখন চুপটি করে মায়ের সাথে লেগে শুয়ে থাকতাম। মাকে ছাড়তামই না। এইসব কথা আমায় বাবা বলতো। ছোটবেলার কতশত কথা যে মনে পড়ে গেলো। একা একাই হাসছিলাম। তখন তুর্য রুমে এসে বললো,
“একা একা হাসছো যে?”

“এমনিই। ছোটবেলার কথা মনে করে হাসছিলাম।”
“তা কি মনে করে হাসছিলে শুনি?”
“সে তো অনেক কথা।”
“তুমি ছোটবেলায় অনেক দুষ্টু ছিলে তাইনা?”

“সবাই তো তাই বলে।”
“এখনও কিন্তু তুমি খুব দুষ্টু আছো।”
“হিহিহি।”

পাশেই ফোনটা বেজে ওঠলো। রিয়া ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিয়া বললো,
“আমার জানটা কেমন আছে?”
“ভালো আছি।”
“ইশ! তোর কথা কে বলছেরে?”
“ঐ মাইয়া তোর জান কে তাহলে?”
“আমি তো মুসকানের কথা বললাম।”

“ওহ আচ্ছা! আমি এখন পর তাই না?”
তুর্য হাত থেকে ফোনটা নিয়ে লাউড স্পিকার দিলো। ওপাশ থেকে রিয়া বললো,
“মজা করলাম জান। তুই তো আমার জান। আর মুসকান হলো আমার কলিজা।”
এপাশ থেকে তুর্য বললো,
“তাহলে আমি কি শালিকা?”
রিয়া হেসে বললো,

“আপনি হৃৎপিণ্ড দুলাভাই।”
এবার একসাথে সবাই হেসে দিলাম। তুর্য বললো,
“শালিকা কি সিঙ্গেল আছো?”
“একদম পিওর সিঙ্গেল দুলাভাই। কেন ছোট কোনো ভাই আছে নাকি?”
“আমি থাকতে আবার ছোট ভাই লাগবে কেন? আমি কি দেখতে সুন্দর না?”
“আপনি তো আমার জানের।”

“তোমার জান আমায় ভালোবাসে না শালিকা।”
“ইশ! কি দুঃখ।”
“অনেক দুঃখ।”
আমি ফোন নিয়ে বললাম,
“সরেন তো।”
রিয়াকে বললাম,

“এই বিয়ে করছিস না কেন এখনো?”
“মনের মত তো কাউকে পাচ্ছিই না।”
“আর কবে পাবি শুনি?”
“যেদিন নতুন একটা বাচ্চা গিফ্ট করবি।”
“যাহ্ শয়তান! আমি নিজেই তো বাচ্চা।”
“ইশ আমার বাচ্চাটা!”
“বিয়ে করে একটা সারপ্রাইজ দে না।”

“সব সারপ্রাইজ একসাথে দিবো।”
“অপেক্ষায় রইলাম।”
রিয়ার সাথে কথা বলা শেষ হতেই রুমের লাইট অফ হয়ে গেলো। মুসকান ভয় পেয়ে আমায় জোরে জড়িয়ে ধরলো।
“সারপ্রাইজ তো এবার আমি দিবো মিসেস তুর্য চৌধুরী!”

পর্ব ২০

সারপ্রাইজ আমার বরাবরই পছন্দ। কিন্তু এই অসময়ে কি সারপ্রাইজ হতে পারে সেটাই ভেবে পাচ্ছিনা। আমি বললাম,

“কোথায় সারপ্রাইজ?”
“ছাদে।”
“তাহলে রুমের লাইট অফ করলেন কেন?”

“কারণ আছে। এখন যে তোমায় কষ্ট করে একটু ছাদে যেতে হবে।”
“মুসকানকে নিয়ে এই রাতে ছাদে যাওয়া ঠিক হবেনা।”
“ওকে মায়ের কাছে রেখে যাবো।”

“উহু! মুসকানকে ছাড়তে ইচ্ছে করছেনা। কতদিন পর কাছে পেলাম।”
“প্লিজ!”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
“মুসকানকে আমার কাছে দাও। দিয়ে আসি মায়ের কাছে।”

মুসকানকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেলো তুর্য। মায়ের কাছে রেখেই আমার কাছে আসলো। আমার হাত ধরে বললো,
“চলো।”
তুর্য আমার হাত ধরেই নিয়ে যাচ্ছে। রুম থেকে বের হতেই দেখলাম ড্রয়িংরুমের লাইটও অফ। অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা! সব এমন অন্ধকার করে রাখার মানে কি! সিঁড়ির কাছে আসতেই একটা কালো কাপড় দিয়ে তুর্য আমার চোখ বেঁধে দিলো। আমি বললাম,
“চোখ বাঁধছেন কেন?”
“নয়তো সারপ্রাইজ দিবো কিভাবে?”

“চোখ বাঁধলে আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠবো কিভাবে?”
“সেটা না হয় আমার উপরে ছেড়ে দাও।”
চোখ বাঁধা শেষেই তুর্য আমায় কোলে তুলে নিলো। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তুর্য সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তুর্যর গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণটা পাচ্ছি। ছাদে নিয়ে আমায় দাঁড় করালো। বললাম,
“এবার তো চোখটা খুলে দিন।”
“দিবো তো! এত অস্থির হচ্ছো কেন?”

“সারপ্রাইজ দেখবো বলে।”
“পাগলী! দিচ্ছি।”
চোখের বাঁধন খুলে দিতেই সব ঝাপসা দেখছিলাম। ভালোমত চোখ কচলিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলাম সামনের একটা ছোট্ট টেবিলে ছোট্ট একটা লাভ কেক। পাশে দুইটা বেতের চেয়ার। ছাদের প্রত্যেকটা ফুলগাছের কাছে একটা করে প্রদীপ জ্বালানো। কেকের চারপাশে মোমবাতির আলোয় ঝিকিমিকি করছে। আমি একটু ভাবার চেষ্টা করলাম আজ কি আমার জন্মদিন? নাকি তুর্যর? তুর্য হঠাৎই আমায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কি ভাবছো?”
“ভাবছি আজ কার জন্মদিন।”

“কারোরই না।”
“তাহলে কেক কেন?”
“লেট ম্যারিজ এ্যানিভারসারি পালন করছি।”
“মানে?”
“মানে হচ্ছে তোমার এক্সিডেন্টের জন্য তখন পালন করা হয়নি। মুসকান জন্মের তিনদিনের দিন তুমি এই বাসায় বউ হয়ে এসেছিলে মনে আছে?”
“সব মনে আছে। আমায় দেওয়া প্রথম থাপ্পড়টার কথাও মনে আছে।”

তুর্য এবার আমায় ছেড়ে দিয়ে আমার সামনে দাঁড়ালো। আমার দুগালে হাত রেখে বললো,
“সব ভুলে কি নতুন করে জীবনটা সাজানো যায় না পরী? আমি জানি আমি যেটা করেছি তোমার প্রতি অন্যায় করেছি। খুব বেশিই। কিন্তু আমি কি করতাম বলো? আমার তখনকার সিচুয়েশন নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। মায়াকে হারানোর কষ্ট, আবার মায়ার জায়গায় অন্য কাউকে এইসব কিছু মেনে নেওয়া খুব বেশি কষ্টের ছিল আমার জন্য। কিন্তু বাবা আর মুসকানের কথা ভেবে আমি কিচ্ছু বলতে পারিনি। আমি মুসকানের জন্য শুধু একটা মা চেয়েছিলাম। কিন্তু কখন যে কিভাবে তুমি ওর মা হওয়ার পাশাপাশি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছো আমি সেটা বুঝতেই পারিনি। যখন তুমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও ঠিক তখন থেকেই আমি তোমার অনুপস্থিতি, তোমার দুষ্টুমি সব উপলব্ধি করতে পারি। আমি এটাও বুঝে যাই যে, তোমায় ইগনোর করার সাধ্য আর আমার নেই। তোমায় ভালো না বেসে আমি কখনোই থাকতে পারবো না। বিশ্বাস করো, তুমি এমন একটা মেয়ে যে যাকে ভালো না বেসে থাকা যাবে না। আমি বাবার উপর বিশ্বাস করে ভুল করিনি। খাঁটি রত্ন পেয়েছি। মায়াকে হারিয়ে আমি আমার একটা তুমি পেয়েছি। আর সেই তুমিটা আমার পরী, আমার তুমি!”
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। কেন জানি চোখ থেকে পানি পড়ছে। চোখের পানি লুকানোর জন্য আমি তুর্যের বুকে ঝাপিয়ে পড়লাম। তুর্য জড়িয়ে ধরে বললো,

“যা কান্না করার আজই করে নাও। আজকের পর থেকে আর কোনো পানি আমি তোমার চোখের দেখতে চাই না।”
আমি তখনও কিছু বলতে পারছিলাম না। কিই বা বলতাম? সারপ্রাইজ পাবো জেনেছিলাম। কিন্তু এমন একটা সারপ্রাইজ পাবো সেটা আমি ভাবতেও পারিনি। তুর্য আমায় বুক থেকে উঠিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে একটা চুমু খেলো। হাত ধরে বললো,
“এসো।”

আমার হাত ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো। অপর চেয়ারটিতে তুর্য বসলো। চাকু নিয়ে দুজনে একসাথে কেক কাটলাম। তুর্য আগে আমাকে কেক খাইয়ে দিলো। তাতেই কি আর তার শান্তি? মুখে দিতে গিয়ে ইচ্ছে করে গালেও লাগিয়ে দিয়েছে। আমি কেক খাওয়াতে যাওয়ার সময় বললো,
“উহুম! এই কেক খাবো না।”
“তবে?”

“তবে! তবে দেখাচ্ছি।”
তুর্য চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। হাত দিয়ে আমার মাথাটা সামান্য নিচু করে গালে লেগে থাকা কেক চুষে খেয়ে নিলো। কিযে লজ্জা লাগছিল তখন আমার! লজ্জায় তো আমি তুর্যর দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। তুর্য বললো,
“বাব্বাহ্! আমার বউটা দেখি লজ্জাও পায়।”
লজ্জায় আমি আর ওর সামনে থাকতে পারিনি। চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালাম। তুর্যও সাথে সাথে ওঠে আমার হাত টেনে ধরে বললো,
“সারপ্রাইজ এখনো শেষ হয়নি।”

আমি পেছনে তাকানোর সাথে সাথে তুর্য হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে একগুচ্ছ গোলাপ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“আমার বেঁচে থাকার প্রতিটা নিঃশ্বাসের কারণ হবে তুমি? আমার ভালোবাসার রাণী হবে তুমি? যদি বলি ভালোবাসি, তাহলে কি দ্বিগুণ ভালোবাসা দিবে তুমি? হবে কি আমার তুমি?”
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। শুধু পাথরের মত দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। অনুভূতিরা সব জড়োসরো হয়ে এসেছে। এত সুখ একসাথে পাবো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমাকে চুপ থাকতে দেখে তুর্য বললো,
“ভালোবাসি তোমায় পরী, অনেক বেশিই ভালোবাসি।”
আমি তুর্যের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে তুর্যর হাত ধরে দাঁড় করালাম। আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারছিলাম না। তুর্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। কান্নাজড়িত কন্ঠেই বললাম,

“আমিও আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। থাকতে পারবো না কখনো আপনাকে ছাড়া। আমি হতে চাই আপনার একমাত্র তুমি। ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি।”
“কখনো ছেড়ে যাবে না তো?”
“একদম না। কখনো না।”
“ভালোবাসি পাগলী।”
“অনেক বেশিই ভালোবাসি।”

“কাকে?”
“কাকে আবার? আপনাকে।”
“আপনি না। এখন থেকে তুমি করে বলবে।”
“উঁহু! না।”
“হ্যাঁ।”

“আমার লজ্জা লাগে।”
“আমার লজ্জাবতীরে। সুস্থ হও আগে তারপর সব লজ্জা ভেঙ্গে দিবো।”
“কিভাবে?”
“আদর করে করে। এত এত আদর করবো যে তখন আর লজ্জাই থাকবে না আমার কাছে।”
“সবসময়ই শুধু পঁচা পঁচা কথা।”
“হাহাহা।”

আমি তুর্যকে আরেকটু জোরে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তুর্য চুলগুলো সরিয়ে আমার গালে চুমু খেয়ে বললো,
“পরী।”
“হু।”
“আরেকটা সারপ্রাইজ আছে।”
“আরো সারপ্রাইজ?”
“হুম।”
“কোথায়?”
“তোমার একটা উইশ বলা চলে এটা।”

“আমার উইশ?”
“হ্যাঁ।”
“কি সেটা?”
“ফানুশ। তোমার না অনেক ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর স্বামীর সাথে ফানুশ উড়াবে?”
“হায় আল্লাহ্! আপনি এটাও জানেন?”
“আরো অনেক কিছুই জানি।”

“কে বলেছে?”
“রিয়া। এখন চলো দুজনে একসাথে ফানুশ উড়াবো।”
আমি আর তুর্য মিলে অনেকগুলো ফানুশ উড়িয়েছি। দুজনের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি আকাশের দিকে তাকিয়েই বললাম,
“কি সুন্দর লাগছে তাই না? শূন্য আকাশটা পূর্ণ হয়ে গেল।”
“হুম তা হলো। কিন্তু তোমার শূন্য গলাটা তো পূর্ণ করা দরকার।”
“মানে?”
“মানে? মানে এটা।”

তুর্য আমার গলায় একটা চুমু দিলো। আমি অন্যপাশে ঘুরে বললাম,
“কি করছেন।”
তুর্য পেছন থেকে কিছু একটা আমার সামনে ধরলো। সামনে তাকাতেই দেখলাম চেইনসহ একটা লকেট। তুর্য বললো,
“কেমন?”
“অনেক সুন্দর।”
“এটা আমার বউয়ের শূন্য গলা এবার পূর্ণ করবে।”

আমার চুলগুলো একপাশে সরিয়ে তুর্য চেইনটা পড়িয়ে দিলো। ঘাড়ে একটা চুমু খেয়ে বললো,
“এবার শূন্য গলায় এক টুকরো নক্ষত্র পূর্ণতা দিয়ে গেলো।”
আমি যেন প্রতিটা সারপ্রাইজেই ভাষা হারিয়ে ফেলছিলা

পর্ব ২১

ড্রয়িংরুমে গিয়ে আরো একবার সারপ্রাইজ পেলাম। বাবা-মা, বকুল মিলে পুরো ড্রয়িংরুম বেলুন আর ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। মা পছন্দের সব রান্না করেছে। কিন্তু এতসব কখন করলো। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। সত্যিই এমন শ্বশুর-শ্বাশুরী আর স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি নয়তো আমার মা যে কেউ একজন হয়তো পূণ্য করেছিলো যার স্বর্গীয় সুখ আমি এখন পাচ্ছি। ড্রয়িংরুমে সবার সাথে কিছু সময় কাটিয়ে ঘুমানোর জন্য রুমে চলে গেলাম। আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই তুর্য আসে। আমি তখন বিছানায় বসে ছিলাম। তুর্য বললো,
“কি ব্যাপার? বসে আছো যে?”
“আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
“তুমি শুয়ে পড়ো।”

“উহু। আপনি আগে আসেন।”
তুর্য দরজা বন্ধ করে পাশে বসে বললো,
“এবার বলো।”
আমি কিছু না বলে একটা বালিশ তুর্যের কোলের ওপর রেখে কোলে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়লাম। তুর্য পরম আবেশে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। আমি শুয়েই তুর্যের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“কখনো ছেড়ে যাবেন না তো?”
“কখনো না।”
তুর্য আমার এক হাত ওর হাতের মুঠোয় নিয়ে হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে বললো,

“তোমায় হারিয়ে ফেললে যে আমি আমার পুরো দুনিয়াটাই হারিয়ে ফেলবো।”
আমি তুর্যর পেট জড়িয়ে ধরলাম। তুর্য আদুরে গলায় বললো,
“পাগলীটা।”

দেখতে দেখতে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাই। সেই সাথে কেটে যায় দিন, সপ্তাহ্, মাস, বছর। হুম আমাদের সম্পর্কের তিন বছর পাড় হয়ে গিয়েছে। আমাদের সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিতে এসেছে। যদিও তুর্য আমায় আগে থেকেই তুমি বলতো। সমস্যাটা হতো আমায় নিয়ে। আপনি তুমি সব গুলিয়ে-মিলিয়ে বলতাম। এখনো মাঝে-মাঝে এই ভুলটা করে ফেলি। আমাদের বেডরুমে মায়া আপুর ছবির পাশে আমারও একটা মস্তবড় ছবির স্থান হয়েছে। মায়া আপুর ছবির আরেক পাশে আমার, তুর্যর আর মুসকানের একসাথে তোলা একটা ছবি। বেডসাইড টেবিলে ছোট ফটো ফ্রেমে আমার আর তুর্যর ছবি। সেই ছবিটাতে তুর্য আমায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার পাশেই আরেকটা ফ্রেমে আমার বাচ্চাটার ছবি। ওহহো! আমার বাচ্চাটার কথা তো বলাই হয়নি। আমার বাচ্চাটা এখন এখন অনেক বড় হয়েছে। কথা বলতে পারে, হাঁটতে পারে, দৌঁড়াতে পারে। সারাক্ষণ যে তার কতশত কথা বাবারে! মনে চায় আদর করতে করতে আমার ভেতর লুকিয়ে রাখি।

দরজার কাছে তাকিয়ে দেখি আমার বাচ্চাটা হাজির। একটা পুতুল নিয়ে দৌঁড়ে আসে আমার কাছে। আমি কোলে নিয়ে বললাম,
“কি হয়েছে আম্মু?”
মুসকান একটু তুতলিয়ে তুতলিয়ে বললো,
“আমায় একতা পুতুল এনে দাও।”
“নতুন পুতুল লাগবে তোমার? তোমার বাবাকে বলবো অনেকগুলা পুতুল এনে দিতে কেমন?”
মুসকান খিলখিল করে হেসে বললো,

“মানুছ পুতুল।”
“মানুষ পুতুল?”
মুসকান মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললো,
“হুমমম।”
“মানুষ পুতুল আবার কেমন?”
তুর্য দরজার কাছে এসে বললো,

“তোমার কোলে এখন যেমন মানুষ পুতুলটা কথা বলতেছে।”
তুর্যর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চোখে-মুখে দুষ্টুমির হাসি। আমি বললাম,
“ওহ্ আচ্ছা! তাহলে তুমিই ওকে শিখিয়ে দিয়েছো তাই না?”
“শিখিয়ে দিয়েছি সেটা ঠিক। আচ্ছা তুমিই একটা কথা ভেবে দেখো তো এখন মুসকানের একটা খেলার সাথী প্রয়োজন কি না?”
“খেলার জন্য অসংখ্য পুতুল আছে।”

“কাম অন জান। এমন একটা পুতুল দরকার যার ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা থাকবে, সারা বাড়ি মুসকানের সাথে দৌঁড়াবে। মুসকানকে আপু বলে ডাকবে।”
“যাও সরো তো।”
তুর্য আমার কোল থেকে মুসকানকে নিয়ে বকুলের কাছে দিয়ে আসলো। আমি তখন রুমে কাপড় গুছাচ্ছিলাম। তুর্য পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“দাও না।”
“কি দিবো?”
“একটা বাবু দাও।”
“বাবু কি চাইলেই পাওয়া যায়?”
“না, না। তা হবে কেন?”

“বাবু আসার জন্য যা যা করা লাগবে সব করবো। আমি এখনই একদম প্রস্তুত চলো।”
আমি তুর্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বললাম,
“সবসময় শুধু উল্টাপাল্টা কথা। কাজ নাই কোনো?”
“যাহ্ বাবা! ভুল কি বললাম? তোমার মনে নেই আমাদের প্রথম সেই রাতের কথা? তুমি আমায়”
আমি তুর্যর মুখ চেপে ধরে বললাম,
“দোহাই লাগে! মুখটাকে একটু কন্ট্রোল করো। আল্লাহ্ কি একটু লাজ-লজ্জা দেয়নি তোমায়?”
“বউয়ের কাছে কিসের লজ্জা আমি সেটাই বুঝিনা।”
“বুঝতে হবেনা। যাও মুসকানের সাথে যাও।”
“হুহ্ যাচ্ছি। একটু ভেবে দেইখো।”

“এই যাও তো।”
তুর্য চলে যাওয়ার পর একা একাই হাসছিলাম। কি এক পাগলের পাল্লায় যে পড়েছি আল্লাহ্। কাপড় গুছিয়ে আলমারিতে রাখার সময় তুর্যর শাদা শার্টটা চোখে পড়লো। কাপড়গুলো রেখে শার্টটা হাতে নিলাম। এবার সত্যিই সত্যিই সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। এই শার্টটা সেদিন পড়েছিল তুর্য। চুমু খেয়েছিলাম সেই লিপস্টিকের দাগ এখনো আছে। শার্ট’টা ধুতে দেয়নি আর পড়েওনি। যত্ন করে রেখে দিয়েছে পাগলটা। সেদিন ছিল ওর জন্মদিন
পরিবারের সদস্যরা মিলেই জন্মদিনের আয়োজন করেছিলাম। ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ইউটিউব দেখে দেখে কেক বানিয়েছিলাম। ছোট্ট একটা রুমাল বানিয়েছিলাম। যেখানে সুই সুতা দিয়ে নকশা করে এঁকেছিলাম”আমার তুমি”। নিজের জমানো টাকা দিয়ে ওর জন্য আংটি কিনেছিলাম। এই সামান্য উপহারেই পাগলটা এত বেশি খুশি হয়েছিল যে বলার বাহিরে। জন্মদিন পালন করে যখন রুমে গেলাম তুর্য তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমি যেতেই হাত ধরে টেনে বুকে নিয়ে গেলো। এক হাত দিয়ে দরজা লক করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। তখনো আমায় জড়িয়ে ধরে আছে। আমি বললাম,
“কি?”

তুর্য কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখের কোণে পানি চিকচিক করছিল। এরপর আমাকে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। তুর্যর পিঠে হাত বু্লিয়ে বললাম,
“এই পাগল কাঁদছো কেন? তাও আবার আজকে?”
“জানিনা। তবে এই কান্না কোনো কষ্টের না পরী। এটা আনন্দের কান্না। যেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।”
“চুপ! আর কোনো কান্না করতে হবেনা। আমাদের প্রথম ম্যারেজ এ্যানিভারসারিতে তোমাকে দেওয়া কথা কিন্তু আমি রেখেছি। আমি কিন্তু আর কাঁদিনি। তাহলে তুমি কেন কাঁদছো? কেঁদো না প্লিজ। আমার কষ্ট হচ্ছে।”
তুর্য আমায় ছেড়ে দিয়ে চোখের পানি মুছে বললো,
“একদম না। একদম কষ্ট পাবেনা তুমি।”

আমি একটু উঁচু হয়ে তুর্যর কপালে চুমু খেয়ে বললাম,
“তোমার হাসিতেই যে আমার হাসি।”
তুর্য আমার হাত টেনে বিছানায় বসালো। নিজে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো। আমার দুই হাত ওর হাতের মুঠোয় নিয়ে আমার কোলের ওপর রাখলো। কান্নায় ওর গলা ধরে আসছিল। কথা বলতে পারছিল না। আমার এক হাত ওর কপালে ঠেকিয়ে কাঁদছিল। আমি বললাম,
“আবার কাঁদছো তুমি?”

“রাগ করোনা প্লিজ। আনন্দগুলোই কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।”
“এখন যে আমারও কান্না পাচ্ছে।”
“এই না। ভুলেও না। তোমার চোখের পানি সহ্য করতে পারবো না।”
“তাহলে আর কেঁদো না প্লিজ।”
তুর্য আমার হাতে চুমু খেয়ে বললো,

“এইতো আর কাঁদছি না।”
আমি তুর্যর হাত ধরে উঠিয়ে বিছানায় বসিয়ে বললাম,
“ঠান্ডার মধ্যে ফ্লোরে বসে থাকার কোনো মানে হয়না।”
তুর্য মুচকি হাসলো। আমার গলায় হাত রেখে বললো,
“একটা অনুরোধ করবো আজ?”

“বলো।”
“আজ থেকে সম্পূর্ণভাবে আমার হয়ে যাবে?”
আমি তুর্যর চোখের দিকে তাকালাম। সেই চোখ এখন আবেনদনময়। আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে তুর্য বললো,
“প্লিজ আজ আর বাঁধা দিয়ো না।”
আমি শুধু চোখের ইশারায় সম্মতি জানান দিলাম। তুর্যর চোখে-মুখে তখন হাসির ছাপ স্পষ্ট।
শুরু হয়েছিল সেদিন নতুন একটি ভালোবাসার অধ্যায়

পর্ব ২২

তুর্যর বলা কথাগুলো আমি ভাবতে লাগলাম। সত্যিই কি মুসকানের জন্য একটা ভাই/বোন প্রয়োজন? ইশ! ভাবতেই তো কেমন যেন লজ্জা লাগছে। দুপুরের দিকে তুর্য অফিস থেকে বাসায় আসে। আমাকে নিশ্চুপ দেখে তুর্য বললো,
“কি ভাবছো?”

“মুসকানের ভাই নাকি বোন লাগবে সেটা।”
“৩ মাস ধরে তো ভেবেই যাচ্ছো। এখনো ভাবা হয়নি তোমার?”
“আচ্ছা একটা কথা বলো তো!”
“কি?”
“অথৈ আপু এখনো বিয়ে করছে না কেন?”

“অথৈ এর ভূত কেন চাপলো তোমার মাথায়?”
“আরে ভূত চাপার কি হলো? তুমি বিয়ে করে ফেলেছো, বাচ্চাও আছে আবার আরেকটা হবেও অথচ অথৈ আপু এখনো বিয়ে করলো না!”
তুর্য অবাক হয়ে বললো,
“আরেকটা হবে মানে?”
আমি একটু লজ্জামিশ্রিত হাসি দিয়ে বললাম,
“বুঝোনা তুমি।”

“মানে? তুমি প্রেগন্যান্ট?”
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
“হুম।”
তুর্য খুশিতে কি করবে বুঝতে পারছিল না। খুশিতে ওর চোখে পানি এসে পড়েছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে সারা মুখে চুমু এঁকে দিলো। আমার দুই গালে হাত রেখে বললো,
“আমি বিশ্বাসই করতে পারছিনা পরী। আরেকটা পুচকু আসবে আমাদের ঘরে।”
আমি লজ্জায় তুর্যর বুকে মুখ লুকালাম।
তুর্য মিষ্টি আনতে চলে গেল। সারা বাড়ি আনন্দে মেতে ওঠেছে। মুসকান আমার কাছে এসে বললো,
“মাম্মাম কে আসবে আমাদের বাড়িতে?”

আমি মুসকানের গালে চুমু খেয়ে বললাম,
“তোমার সাথে যে খেলবে। যাকে কোলে নিয়ে তুমি আদর করবে।”
“কে সে?”
“তোমার ভাই অথবা বোন।”
মুসকান বিছানার ওপর উঠে দাঁড়ালো। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,

“তখন কি তুমি আর আমায় ভালোবাসবে না মাম্মাম?”
আমি মুসকানকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
“না সোনা এরকমটা কখনো হবেই না। তুমি তো আমার প্রথম সন্তান লক্ষী। তোমার ভালোবাসা কেউ নিতে পারবে না।”
মুসকান আমার গালে চুমু খেয়ে বললো,

“আমার বেষ্ট মাম্মাম।”
মুসকানের সাথে দুষ্টুমি করার সময় সবাই এসেছিল। মা, প্লাবন, রিয়া, জয়, অথৈ আপু সবাই আমায় অভিনন্দন জানিয়েছে। আমি মুখ ফস্কে অথৈ আপুকে বলে ফেললাম,
“তুমি বিয়ে কবে করবে আপু?”
অথৈ আপু ম্লান হেসে বললো,

“খুব শিঘ্রয়।”
“তোমার কোনো ভালোবাসার মানুষ নেই?”
“আছে তো।”
“কে সে?”
“বিয়ের সময় দেখিয়ো।”
“হুম অপেক্ষায় থাকলাম।”

দেখতে দেখতে আরো এক মাস কেটে গেলো। আমি শ্বাশুরী মায়ের সাথে বসে টিভি দেখছিলাম। তখন শুনতে পেলাম বকুল কার সাথে যেন ফোনে চেঁচামেচি করছে। আমি বকুলের রুমে যখন গেলাম দেখলাম বকুল বলছে,
“না আমি এটা পারবো না। প্লিজ সম্ভব না। এমন করো না আমার সাথে।”
আমি বকুলকে বললাম,
“কি পারবিনা?”
বকুল ফোনটা কেটে দিয়ে বললো,
“ভাবী তুমি। বসো বসো।”

“না বসবো না। আগে বল কি পারবিনা?”
“আসলে ভাবী কলেজের এক ছেলে আমায় পছন্দ করে। তো রিলেশনের জন্য জোড়াজুড়ি করছিলো। তাই বলছিলাম রিলেশন করতে পারবো না।”
“কেন? ছেলেটিকে তোর পছন্দ নয়?”
“না।”

“অন্য কাউকে ভালোবাসিস?”
“এমন কিছু না ভাবী।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। কাউকে ভালো লাগলে আমাকে কিন্তু জানাবি।”
“হ্যাঁ অবশ্যই।”

রাতের বেলায় তুর্যর ল্যাপটপে গান শুনছিলাম। তুর্য আমার জন্য স্যুপ বানাচ্ছিল মায়ের হেল্প নিয়ে। মুসকান আমার কোলে বসে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে। গানের মধ্যে দেখলাম ছেলেটা সিগারেট খাচ্ছে। তখন মনে হলো তুর্য কি সিগারেট খায়? কখনো তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। উমম! জিজ্ঞেস করতে হবে। মুসকানকে বললাম,
“আম্মু তোমার বাবাইকে ডেকে আনো তো।”
মুসকান”আচ্ছা”বলেই দিলো দৌড়। মেয়েটা এত আমার পাগল আর বাধ্য। একদম আমার মত হয়েছে। মুসকান রান্নাঘরে গিয়ে বললো,
“বাবাই মাম্মাম তোমায় ডাকে।”

“এইতো সোনা হয়ে গেছে। চলো।”
মুসকান আগেই দৌড়ে চলে আসলো। বিছানায় উঠেই আমার কোলে বসলো। তুর্য ট্রে তে করে দুই বাটি স্যুপ নিয়ে আসলো। আমার সামনে বসে ল্যাপটপ বন্ধ করলো। মুসকানকে কোল থেকে নামিয়ে তুর্যর পাশে বসালাম। আমি মুসকানকে খাইয়ে দিচ্ছিলাম আর তুর্য আমায় খাইয়ে দিচ্ছিলো। অনেকক্ষণ ধরেই পেটের ভেতর প্রশ্নটা আকুপাকু করছে। কিন্তু কিভাবে করবো প্রশ্নটা সেটাই বুঝতে পারছিনা। অবশেষে না পেরে বলেই ফেললাম,
“তুমি সিগারেট খাও?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“বলো না।”
“না।”
“কখনো খাওনি?”
“না।”
“মায়া আপুর মৃত্যুর পরও না?”

“জ্বী না। কারণ সাথে সাথেই তো আপনি আমার লাইফে এন্ট্রি নিলেন ম্যাম।”
“হুম তা ঠিক। জানো আমার না অনেক শখ আমি সিগারেট খাবো।”
তুর্য ধমক দিয়ে বললো,
“কিহ্? কি বললি তুই?
“না মানে!”
“শুধু সিগারেট কেন খাবি? সাথে মদ, গাঁজাও খাইস।”
“ইয়াক! ছিহ্। না।”

তুর্য কিছু না বলে বাহিরে চলে গেলো। পাঁচ মিনিট পর হাতে সিগারেট নিয়ে ফিরে আসলো। আমি বললাম,
“তুমি কি এখন সিগারেট খাবে?”
“না তোকে খাওয়াবো।”
“না আমি খাবো না।”
“বললি কেন অনেক শখ? এখন তোকে খেতেই হবে।”

আমি ভয়ে ঢোক গিলে বললাম,
“না। আমি খাবো না।”
“তুই খাবি তোর ঘাড়ও খাবে।”
আমার তখন কান্না কান্না ভাব। মুসকান উঠে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে বললো,
“খবরদার বাবাই আমার মাম্মামকে একদম বকবে না।”
তুর্য বললো,
“বাবারে! মাকে বাঁচানোর জন্য একদম প্রস্তুত!”

তুর্য আমাকে আর মুসকানকে বুকে নিয়ে বললো,
“আমার দুই পাগলী। একটা বউ পাগলী আরেকটা মেয়ে পাগলী। মেয়েটাও হয়েছে একদম তার মায়ের মত।”
ইদানীং বকুলকে সবসময় দেখি কি যেন ভাবে। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকে। কিছু শেয়ারও করেনা। কাছে গেলেই কেমন যেন করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে। বকুলকে একা থাকতে দেখে ওর কাছে যাচ্ছিলাম তখন কে যেন কলিংবেল বাজায়। দরজা খুলে কাউকেই দেখতে পেলাম না। দরজা লাগানোর আগেই কিভাবে যেন একদম গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলাম। যখন সিঁড়ি থেকে পড়ছিলাম প্রাণপণে চেষ্টা করছিলাম নিজেকে আঁটকানোর। কিন্তু পারছিলাম না। আমার দুনিয়া অন্ধকার আর ঝাপসা দেখছিলাম। এত কষ্ট হচ্ছিলো। পেট আঁকড়ে ধরেও শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। মা গো বলে কাঁছিলাম। আমার শেষ শব্দ ছিল আল্লাহ্!
তুর্য রুমেই ছিল। আওয়াজ শুনে দৌঁড়ে আসে। আমার এই অবস্থা দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। দৌঁড়ে আসে আমার কাছে। আমাকে ধরে ডাকছিল আর বলছিল,
“পরী, পরী!”

“আআমার অঅনঅনেক কষ্ট হচ্ছে”
“কিচ্ছু হবেনা পরী তোমার কিচ্ছু হবেনা। এক্ষুণী তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।”
আমি তুর্যের শার্ট আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

পর্ব ২৩

হাসপাতালের বেডে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছি। চোখের কোণে পানি জমাট বেঁধে আছে। এখন কষ্টগুলো চোখের পানির মাধ্যমেও আর প্রকাশ পায় না। আজ দুইদিন হলো আমি হাসপাতালে। সবটা চোখের সামনে ভাসছে। আনমনেই হাতটা পেটে দিলাম। পরিপূর্ণ পেটটা এখন পুরোপুরি শূন্য। খুব বেশি অপরাধী লাগছে নিজেকে। এই দুইদিন তুর্য আমার সামনে আসেনি। একেবারেই যে আসেনি তা নয়, এসেছে কিন্তু আমি যখন ঘুমে ছিলাম তখন। শুয়ে শুয়ে ভাবছি তুর্যর বলা স্বপ্নগুলোর কথা। কত স্বপ্ন ছিল নতুন বাবুকে নিয়ে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তুর্য দাঁড়িয়ে আছে। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। তুর্য আমার কাছে এগিয়ে আসলো। তুর্যর দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুখটা একদম শুকিয়ে গিয়েছে। চোখ দুইটা ফুলে লাল হয়ে আছে। আমি এবার কেঁদেই দিলাম। বললাম,
“আমায় তুমি মাফ করে দিয়ো তুর্য। আমি পারলাম না তোমার স্বপ্নটা পূরণ করতে।”

তুর্য আমার পাশে বসে হাত ধরে বললো,
“তোমার কোনো দোষ নেই পরী। আসলে আমিই তোমার প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।”
“তুমি কেঁদো না। সব দোষ তো আমার। আমি যে এত সুখের অধিকারি ছিলাম না। আমার সাথে তোমার জীবন জড়িয়ে তুমিও সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছো।”
তুর্য আমার হাতে মুখ গুঁজে কেঁদে কেঁদে বললো,

“নিজেকে এভাবে অপরাধী ভেবো না পরী।”
“নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে আমার। আমি কেন এত হতভাগী বলো তো। আল্লাহ্ তো বাচ্চার জায়গায় আমাকে নিলেও পারতো।”
“চুপ! এসব কথা আর শুনতে চাই না। মায়ার মত আমি তোমায় হারাতে চাইনা।”
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তুর্য।”
তুর্য আমার বুকে মাথা রেখে বললো,

“সব ঠিক হয়ে যাবে জান। তুমি একদম কষ্ট পেয়ো না। নিজেকে অপরাধী ভেবো না।”
আর কিছু বলতে পারছিলাম না। শুধু অঝোরে চোখ থেকে পানি পড়ছিল। হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিলো যেদিন সেদিন তুর্য অনেকক্ষণ ডাক্তারের সাথে কথা বললো। ডাক্তার বলেছিল,
“জানি, কথাটা সত্যিই খুব কষ্টের কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সবাইকেই মেনে চলতে হবে। আপনার ওয়াইফ আর কখনোই মা হতে পারবেনা এই কথাটা প্লিজ এখন কোনোমতেই যেন সে জানতে না পারে সেটা খেয়াল রাখবেন। তার যথাযথ কেয়ার নিবেন। বেশি বেশি সময় দিবেন। আরেকটু সুস্থ হলে বাহিরে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। পারলে তাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে আসুন। কোনো মতেই যেন সে ডিপ্রেশনে না পড়ে।”
“জ্বী আচ্ছা।”

সময়গুলো কেমন যেন ছন্নছাড়া মনে হয়। শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে আমি খুবই দূর্বল। মনের মধ্যে এখন আর কোনো প্রশান্তি পাইনা। খেতে ভালো লাগেনা, ঘুমাতে ভালো লাগেনা, আলো ভালো লাগেনা। মুসকানকেও এখন আর সময় দেওয়া হয়না। সারাক্ষণ একা একা অন্ধকারে থাকতেই ভালো লাগে। জানালা বন্ধ করে, ঘরের দরজা চাপিয়ে দিয়ে অন্ধকারে ফ্লোরে বসে ছিলাম। দরজা খোলার আওয়াজে তাকিয়ে দেখলাম, মুসকান গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। আমি নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে আছি। পেছন পেছন আমার শ্বাশুরী মাও আসে। রুমের লাইট জ্বালিয়ে দেয়। মুসকানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুখটা কেমন মলিন আর শুকনো। বুকের ভেতর আমার মোচর দিয়ে ওঠে। যে দুনিয়ার আলো দেখেইনি তার জন্য আমার মুসকানকেও কষ্ট দিচ্ছি! কিন্তু আমি কি করবো? আমি তো মা। গর্ভে ধরেছিলাম তো তাই পারছিনা হাজার চেষ্টা করেও ভুলতে। মুসকান আমার কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
“মাম্মাম তোমার কি অনেক কষ্ট হচ্ছে?”

আমি চুপ করে আছি। মুসকান আবার বললো,
“আমি তোমায় আদর করে দেই? তুমি আর কষ্ট পেয়ো না গো মাম্মাম। আমারও কষ্ট হয়। বাবাই না অনেক কান্না করে।”
আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মুসকানকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কাঁদছিলাম।
“স্যরি রে সোনা। আর কষ্ট দিবো না তোদের।”

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চারটা বাজে। পাঁচটার দিকে তুর্য আসবে। আমি একটা লাল টুকটুকে শাড়ি নিয়ে শাওয়ার নিতে গেলাম। গোসল সেরে এসে ভেজা চু্লগুলো ভালোমত মুছে নিলাম। মুখে হালকা মেকাপ করলাম। চোখে গাঢ় করে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিলাম। দুই হাত ভর্তি লাল চুড়ি। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজেকে বললাম,
“অপ্রকাশিতকে প্রকাশ করে আলোর ছায়া নিয়ে আসার সময় হয়ে গিয়েছে এবার।”
কলিংবেল বাজতেই রুম থেকে জোরে চেঁচিয়ে বললাম,

“বকুল দরজাটা খোল তো।”
তুর্য রুমে আসতেই আমি পেছন থেকে তুর্যকে জড়িয়ে ধরি। তুর্য আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
“হঠাৎ এত সাজ?”
“সাজতে ইচ্ছে হলো।”
“কার জন্য?”

“তোমার জন্য।”
“আমার জন্য নাকি জয়ের জন্য?”
“মানে কি তুর্য? জয়কে কেন টানছো এখানে?”

“কেন? সেটা কি তোমার অজানা?”
তুর্য কয়েকটা ছবি আমার দিকে ছুঁড়ে দিলো। ফ্লোর থেকে ছবিগুলো তুলে দেখলাম আমার আর জয়ের ছবি।
ছবিগুলো হাতে নিয়ে বললাম,
“কি?”
“ছবিগুলো দেখার পরও মনে পড়েনা কি? জয় তোমাকে চুড়ি পড়িয়ে দিচ্ছে, শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিচ্ছে এরপরও বলো কি?”
“জয় আমার বেষ্টফ্রেন্ড তুর্য। আর এগুলো বিয়ের আগের ছবি।”
“বেষ্টফ্রেন্ড নাকি বয়ফ্রেন্ড?”
“বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলতেছো না?”

“বাড়াবাড়ি কি আমি করছি নাকি তুমি?”
“অবশ্যই তুমি। অথৈ আপুকে নিয়েও তো তোমার কাহিনীর শেষ নেই। কই আমি তো কখনো কিছু বলিনি তোমায়।”
“বিয়ের প্রথম থেকেই দেখতেছি অথৈকে নিয়ে তোমার খুব সমস্যা।”
“একদমই না। আমি তোমার কথার প্রেক্ষিতেই বলেছি।”
“না, কিছু তো কারণ আছে।”

“কি শুনতে চাচ্ছো তুমি? তোমাদের মধ্যে কিছু আছে বা চলে এমন কিছু?”
“হলেও বা তোমার কি?”
“আশ্চর্য তুর্য! আমি তোমার ওয়াইফ। আর তুমি বলছো আমার কি?”
“হাহ্!”
“আজ যখন কথা উঠলোই তখন ভালো করে বলছি শুনো, জয়ের সাথে আমি কোনো যোগাযোগ রাখবো না আর তুমিও অথৈ এর সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবেনা।”
“তোমার কথামত আমাকে চলতে হবে?”

“প্রয়োজনে তাই করবে।”
“তোমার হুকুমের গোলাম নই আমি। অথৈকে নিয়ে খুব বেশি পেইন হলে জয়ের হাত ধরে চলে যেতে পারো।”
“তুর্য! এসব কি ধরণের কথাবার্তা?”
“সত্যি কথা তেতোই লাগে।”
“তোমার অথৈকে প্রয়োজন হলে তাকে নিয়ে আসতে পারো।”

“প্রয়োজনে তাই করবো।”
“তাই?”
তুর্য অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বললাম,
“সত্যি কি না?”
“তোমার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছাই নাই আমার।”
“বেশ! বাচ্চা? বাচ্চার জন্য এমন করতেছো তাই না? চলে যাচ্ছি বাড়ি থেকে তবে সেটা একা। জয়ের হাত ধরে নয়।”
ঐ অবস্থায় আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। আমাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বকুল ড্রয়িংরুম থেকেই সব শুনছিল। শ্বাশুরী মা আর শ্বশুর মুসকানকে নিয়ে দোকানে গিয়েছিল। তাই বকুলকে বললাম,
“মা আসলে বলিস আমি চলে যাচ্ছি।”
“ভাবী প্লিজ এভাবে চলে যেয়ো না।”
আমি আর কিছু না বলে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসলাম বাড়ি থেকে।

পর্ব ২৪

আমি বাড়িতে আসার এক ঘন্টা পরই আমার শ্বশুর-শ্বাশুরী, তুর্য, মুসকান আর বকুল আমাদের বাসায় এসেছে। ড্রয়িংরুমে সকলেই উপস্থিত। ওরা মূলত আমাকে নিতে এসেছে। তুর্যর বাবা বললো,
“ঝগরা করো ভালো কথা। কেননা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান থাকবেই। কিন্তু তাই বলে বাড়ি ছেড়ে চলে আসার মানে কি?”
“আমি তো ইচ্ছে করে আসিনি বাবা। আপনার ছেলে আমাকে বের করে দিয়েছে।”
“তোমাদের মধ্যে যা হওয়ার হয়েছে। এখন বাড়ি ফিরে চলো।”

“মাফ করবেন বাবা। আমি আর ঐ বাড়ি যাবো না।”
“এমন পাগলামি করেনা মা। অন্তত মুসকানের কথাটা ভেবে চলো।”
“মুসকানকে নিয়ে কোনো ইমোশোনাল ব্লাকমেল করবেন না বাবা। ও আমার মেয়ে। ব্লাকমেল করার কোনো ইস্যু নয়। আপনারা চাইলে মুসকানকে আমি আমার কাছে রাখবো।”
“এটা কিভাবে হয়? তুমি আর তুর্য আলাদা থাকবে?”
“হ্যাঁ। অনেক স্বামী-স্ত্রীরই তো সেপারেশন হয়। সেক্ষেত্রে বাচ্চা তো যেকোনো একজনের কাছেই থাকে।”

মুসকান তুর্যের কোলে ছিল। তুর্য মুসকানকে কোলে করেই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“তুমি ভাবলে কি করে মুসকানকে আমি তোমার কাছে রেখে যাবো?”
“বেশ তো! তুমি যদি মুসকানকে রাখতে পারো তোমার কাছে তাহলে রাখো। আমার কোনো সমস্যা নেই।”
তুর্য দাঁত কটমট করে মুসকানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। সবাই মিলে আমায় হাজার বুঝিয়েও কোনো ফল পায়নি। কেনোই বা যাবো আমি? আমার কি কোনো আত্মসম্মান নেই নাকি! মেয়ে বলে সব কেন মুখ বুজে সহ্য করতে হবে অদ্ভুত!
শেষমেশ শ্বশুর-শ্বাশুরী আর বকুল চলে গেল। আমি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছিল না বিধায় একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছাদে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। মনটা ভালো লাগছিল না। মুসকানের কথা খুব বেশিই মনে পড়ছিল। না জানি কি করছে মেয়েটা। ঠিকমত খায় নাকি তারও তো কোনো ইয়ত্তা নেই। ঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি গোসল করে নিলাম। রেডি হচ্ছিলাম মা তখন রুমে আসে।আমার কাছে এসে বললো,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“রিয়ার বাসায়।”
“কেন?”
“এমনিই মনটা ভালো লাগছে না।”

“আমি বলছিলাম যে”
মাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
“প্লিজ মা ঐ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কোনো কথা বলো না।”
মা আর কিছু বললো না। রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আমিও রেডি হয়ে রিয়ার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
রিয়ার বাসায় গিয়ে দেখি ও ঘুমাচ্ছে। ওকে টেনে তুললাম। রিয়া ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে বলে,
“আল্লাহ্! এত্ত সকালে তুই? কি মনে করে?”

“কেন আসতে পারিনা?!
“একশো বার পারিস।”
“এখন যা ফ্রেশ হয়ে আয়।”
“আচ্ছা তুই বস।”
রিয়া ফ্রেশ হতে চলে যায়। আমি ওর বিছানা গুছিয়ে দিচ্ছিলাম। কি হাল করে রেখেছে বিছানার। বই-খাতা, ডায়েরী সব বিছানার ওপর। কি যে এত লিখে, পড়ে বুঝিনা।
কিছুক্ষণ পর রিয়া ফ্রেশ হয়ে দুজনের জন্য কফি নিয়ে আসে। আমার পাশে বসে বললো,
“এবার বল তোর খবর কি?”

“আমার আর খবর!”
“কেন কি হয়েছে?”
রিয়াকে সব খুলে বললাম। রিয়া হতাশ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে ওর কিছু বলার ভাষা নেই। তাই আমিই বললাম,
“জয়কে ডাক দে।”
“কেন?”
“আজ তিনজনে একটু ঘুরতে বের হবো।”
“আচ্ছা।”
রিয়া কিছু সময়ের মধ্যেই জয়কে নিয়ে হাজির হয়। জয় অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলো তখন। আমি ঘুরতে যাবো শুনে অফিস বাদ দিয়ে আমাদের সাথে ঘুরতে যাচ্ছে। তিনজনে মিলে দিয়াবাড়ি গেলাম। খোলামেলা জায়গা হাঁটাহাঁটির জন্য চমৎকার। গল্প করছিলাম আর হাঁটছিলাম তিনজনে। জয় বললো,
“ফুসকা খাবি?”
“এটাতে কি কখনো না করেছি?”

জয় হেসে দিলো। বললো,
“চল।”
তিনজনে একটা ফুসকার দোকানে বসলাম। জয় ফুসকা অর্ডার দিলো। আমরা কথা বলছিলাম। তখন কোথা থেকে যেন তুর্য এসে হাজির। সাথে তুর্যর একটা ফ্রেন্ড। আমার কাছে এসে বললো,
“ভালোই তো মজা মাস্তিতে আছো।”
আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,
“তুমি এখানে?”
“এসে খুব বড় ভুল করে ফেললাম মনে হয়? না আসলে তো এত পিরিতও দেখতে পারতাম না।”
“মুখ সামলে কথা বলো।”

“মাথা সামলাতে পারছিনা আর তো মুখ।”
তুর্য আমার হাত ধরলো। আমি বললাম,
“কি হচ্ছে এটা?”
“বাড়ি চলো।”
“না আমি বাড়ি যাবো না।”
“আমি বলছি বাড়িতে চলো।”
“বললাম না যাবো না।”

“সত্যিই যাবেনা?”
“না, না, না যাবো না। আর কতবার বলবো যাবো না?”
তুর্য আমার হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বললো,
“জয়ের সাথে থাকতেই খুব ভালো লাগছে তাই না? এর ব্যবস্থা করতেছি আমি। তুমি শুধু দেখে যাও আমি কি করি।”

তুর্য ওখান থেকে চলে গেলো। আমি কাঁদতে কাঁদতে চেয়ারে বসে পড়লাম। জয় আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
“কাঁদবিনা একদম।”
আমরা আর ওখানে বসলাম না। অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তখনো কাঁদছিলাম। তুর্য আমার দুই গালে হাত রেখে বললো,
“তাকা আমার দিকে। এভাবে বাচ্চাদের মত কাঁদছিস কেন?”
“কি করবো আমি বল? দেখলি তো কেমন আচরণ করে তুর্য।”

রিয়ার ফোন আসায় জয় আর কিছু বললো না। রিয়া বললো,
“মা ফোন করেছে। আমাকে বাসায় যেতে হবে। আমি যাই কেমন? আর জয় তুই পরীকে একটু বুঝা প্লিজ।”
রিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“একদম কাঁদবিনা পঁচা মেয়ে। আমি বিকেলে তোর বাসায় যাবো।”
রিয়া চলে যাওয়ার পর জয় আমায় শান্তনা দিচ্ছিলো, বোঝাচ্ছিল। দুপুরের দিকে আমরা বাড়িতে ফিরে যাই।

বাড়িতে গিয়েই আমি শুয়ে পড়েছিলাম। হাঁটাহাঁটি করায় ঘুম পাচ্ছিল খুব। কখন যে ঘুমিয়েছি টেরও পায়নি। বিকালে রিয়া এসে আমার ঘুম ভাঙ্গায়। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললাম,
“সকালে তোর ঘুম ভাঙ্গিয়েছি বলে কি এখন তুই শোধ নিলি?”
রিয়া হেসে বললো,
“তুই কত ব্রিলিয়ান্ট রে। এখন যা মুখ ধুয়ে আয়।”
মুখ ধুয়ে এসে রিয়াকে নিয়ে ছাদে যাই। দুজনে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। সূর্যাস্ত দেখছিলাম দুজনে। পাখিরা কিচিরমিচির করতে করতে তাদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। মনোযোগ সহকারে দৃশ্যটা উপভোগ করছিলাম তখন প্লাবন এসে বললো,
“আপুনি একজন লোক তোমার জন্য পার্সেল নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি নিচে আসো।”
“আমার জন্য পার্সেল! কে পাঠালো?”

“জানিনা। আসো তুমি।”
“হুম যা। আসছি। রিয়া চলতো দেখি।”
“চল।”
নিচে গিয়ে সিগনেচার করে পার্সেলটা নিলাম। তুর্য পাঠিয়েছে পার্সেলটা।দরজা লাগিয়ে দিয়ে পার্সেলটা খু্লছিলাম। খুবই পাতলা। খুলে দেখলাম একটা পেপার আর সাথে একটা চিঠি। আগে চিঠিটা খুললাম। তাতে লিখা ছিল,
“তোমার অতিরিক্ত সুখের রাস্তাটা দেখিয়ে দিলাম। পারলে এখনই সেটা নিয়ে নিতে পারো।”
চিঠির আগামাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাই পেপারের কাগজটা খু্ললাম। যা দেখলাম আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না নিজের চোখকে। কি করে হতে পারে এটা! পাশ থেকে মা বললো,
“কিরে ওটা?”
“ডিভোর্স পেপার

পর্ব ২৫

ডিভোর্স পেপারের কথা শুনে মা অনেক রেগে যায়। কাছে এসে বলে,
“পেয়েছেটা কি তুর্য? যা ইচ্ছে হবে তাই করবে? ডিভোর্স কি মুখের কথা? আমি এক্ষুনী ওর বাবার কাছে যাচ্ছি।”
“না মা।”
“না মানে? না মানে কি? এত সহজে ছেড়ে দিবো ভাবছিস? তুই ঐ পেপারে সাইন করবিনা।”
“কি করবে গিয়ে? যে আমার সাথে থাকতে চায়না তার সাথে জোর করে কিভাবে থাকবো?”

“কিন্তু”
“বাদ দাও না মা। তুর্য যদি আমাকে ছাড়াই ভালো থাকতে পারে তাহলে থাকুক না ভালো। ওর সুখেই আমার সুখ।”
“এত ভালো মানুষী দেখাবি না বলে দিলাম। নিজের দিক না ভেবে ওর সুখের কথা ভাবতেছিস।”
“আমার এখন ভালো লাগছেনা। আমি ঘরে গেলাম।”

কাউকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আমি সোজা রুমে চলে গেলাম। বসে বসে ভাবতে লাগলাম কি থেকে কি হয়ে গেলো।
তুর্যর সাথে আমার যোগাযোগ নেই একমাস হবে। কিন্তু আমার শ্বশুর-শ্বাশুরীর সাথে প্রায়ই কথা হয়। মাঝে মাঝে মুসকানের সাথে দেখাও করি। তুর্যর শূন্যতা খুব পোড়ায় আমায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তুর্যর কাছে চলে যাই। কিন্তু মাঝখানে এত্ত বড় দেয়াল যে, যেটা টপকানোর ক্ষমতা আমার নেই।
এভাবে বসে বসে সময়ও কাটেনা। আরো পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে যাচ্ছি। একটা চাকরীর ব্যবস্থা করতে হবে। জয়ের কাছে বললে একটা চাকরীর ব্যবস্থা হয়েই যাবে।
সন্ধ্যার দিকে জয়ের বাসায় গেলাম। জয় আর রিয়া এক বাড়িতেই থাকে। রিয়া আমাকে ছাদ থেকে দেখে নিচে নেমে আসে। সিঁড়ি বেয়ে আসায় হাঁপিয়ে গিয়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“তুই এখানে?”
“জয় বাড়িতে?”
“জানিনা তো। যাইনি আজ ওদের ফ্লাটে।”
“আচ্ছা এখন চল।”
“কোনো দরকার?”

“কি?”
“একটা চাকরীর খুব দরকার।”
কথা বলতে বলতে জয়ের ফ্লাটের সামনে গিয়ে কলিংবেল বাজালাম। দরজা খুলে দিলো জয়ের মা। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কেমন আছিস পরী?”
“ভালো আছি আন্টি। তুমি কেমন আছো?”
“কি করে ভালো থাকি বলতো? রিয়ার কাছে আসিস অথচ একবারও আমার সাথে দেখা করতে আসিসনা। আমরা কি পর হয়ে গিয়েছি?”

“না আন্টি। আপন আপনই থাকে। বরং সুসময়ের কিছু মানুষ আপন হয়ে জীবনে আসে।”
“মন খারাপ করিসনা সোনা। ভিতরে আয়।”
আমি ভিতরে যেতে যেতে বললাম,
“জয় কোথায়?”
“ওর ঘরেই আছে।”

“আচ্ছা আমি ওর সাথে দেখা করে আসি।”
“যা।”
জয় শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছিল। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো।
“এই সময়ে তুই?”
“চলে যাবো?”
“একটা থাপ্পড় দিবো। আমি কি যেতে বলেছি নাকি।”

“আচ্ছা বাদ দে। একটা দরকারে এসেছিলাম।”
“কি দরকার?”
“তোদের অফিসে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?”
“তুই চাকরী করবি?”
“এছাড়া আর উপায় নেই।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি কথা বলে জানাবো।”

“আচ্ছা।”
আমি, রিয়া আর জয় তিনজনে মিলে সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ গল্প করলাম। রাত আট’টার দিকে আমি বাড়ি ফিরছিলাম। সাথে রিয়া আর জয়ও ছিল। আমাকে এগিয়ে দিতে এসেছিল।
বাড়ির সামনে আসতেই রিয়া আমাকে একটু দূরে নিয়ে বললো,
“কাল জয়ের বার্থডে মনে আছে তো?”

“হুম আছে।”
“কোনো প্ল্যানিং তো করলাম না।”
“সবকিছুর এরেঞ্জমেন্ট তোরই করতে হবেরে। আর বাকিটা রাতে হোয়াটসএপে ডিসকাস করবো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
জয় চেঁচিয়ে বললো,
“তোরা কি ফিসফিস করিস রে?”
দুজনেই উত্তর দিলাম,
“তোর মাথা।”

এরপর তিনজনেই হেসে দিলাম। আমাকে বাড়িতে দিয়ে ওরা দুজন বাড়িতে চলে যায়।
রাত ১০ টার দিকে আমি আর রিয়া হোয়াটসএপে কথা বলছিলাম। রেষ্টুরেন্ট বুক করলাম বার্থডে সেলিব্রেট করার জন্য। রেষ্টুরেন্ট রিয়াই সিলেক্ট করেছে। আমি শুধু সব বলে দিচ্ছিলাম, কিভাবে কি সাজাবে। শেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, আগামীকাল সন্ধ্যায় ঐ রেষ্টুরেন্টে জয়কে নিয়ে সারপ্রাইজ দিবো।

ইদানীং তুর্যর বাসার সবাই মনমরা হয়ে থাকে। যেই বাড়িটা এতদিন হাসি-খুশিতে মেতে থাকতো। সেই বাড়িটা এখন নির্জন। ব্যালকোনিতে তুর্য দাঁড়িয়ে ছিল। তখন শ্বাশুরী মা রুমে এসে তুর্যকে বললো,
“কি করছিস?”
তুর্য মায়ের দিকে ঘুরে বললো,
“কিছুনা। কিছু বলবে?”
“মুসকান বাড়িতে থাকতে চাচ্ছেনা। ওকে নিয়ে কোথাও থেকে কাল একটু ঘুরে আয়। ওরও মন ভালো হবে আর তোরও হবে।”
“উমম! আইডিয়াটা খারাপ না। কিন্তু শুধু আমি আর মুসকান নয় সাথে বাড়ির সবাই যাবে। কাল আমি অফিস থেকে ফিরে সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে যাবো।”
“তোর যা ভালো মনে হয়।”
পরেরদিনঃ

বাড়ির সবাইকে নিয়ে বিকালের দিকে ঘুরতে বের হয় তুর্য। চারপাশে এত মানুষ, গাড়ি দেখে মুসকানের সেকি খুশি। ঘুরাঘুরি শেষে রেষ্টুরেন্টে যায় খাওয়ার জন্য।
সন্ধ্যার দিকে আমি, জয় আর রিয়া রেষ্টুরেন্টে যাই। সারপ্রাইজ পেয়ে জয় খুব খুশি হয়। বার্থডে সেলিব্রেট করার পর জয় বললো,
“আমারও একটা সারপ্রাইজ আছে তোদের দুজনের জন্য।”
আমি বললাম,

“কি?”
“আগে রিয়াকে দিবো। তুই রিয়ার চোখ দুইটা ধরতো।”
“আচ্ছা।”
আমি দুই হাত দিয়ে রিয়ার চোখ ধরলাম। তুর্য একটা প্যাকেট রিয়ার হাতে দিয়ে বললো,
“এবার চোখ ছেড়ে দে।”
চোখ ছাড়ার পর রিয়া বললো,
“এটা কি?”

“খুলেই দেখ।”
রিয়া প্যাকেট’টা খুলে দেখলো শাড়ি।
রিয়া খুশি হয়ে বললো,
“শাড়ি! থ্যাঙ্কিউ থ্যাঙ্কিউ সো মাচ ডিয়ার।”
জয় মুচকি হাসলো। রিয়াকে বললো,

“এবার তুই পরীর চোখ ধর।”
“আচ্ছা।”
রিয়া আমার চোখ ধরার কিছুক্ষণ পর জয় বললো,
“চোখ ছেড়ে দে।”
রিয়া চোখ ছাড়ার পর দেখলাম, জয় হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে আছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। জয় একটা রিং আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“তোর অতীত নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমি তোকে আগেও ভালোবেসেছি আর এখনোও ভালোবাসি। আমার হবি তুই?”
আমি তখনো চুপ। জয় আবারও বললো,
“এবার অন্তত আমায় ফিরিয়ে দিস না প্লিজ। উইল ইউ বি মাইন?”
আমি বেশকিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,

“ইয়েস। আই উইল।”
খুশিতে জয়ের চোখে পানি চলে আসে। আমার হাতে রিং পড়িয়ে দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে। আমি রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আমাদের আনন্দের সময় তুই দূরে কেন? তুইও আয়।”
তিনজন তিনজনে একসাথে জড়িয়ে ধরলাম। এর সবটাই দূর থেকে দেখছিল তুর্য।

ছাদে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তুর্য আর অথৈ। অসম্ভব রকম মন খারাপ আর জেদ চেপে আছে তুর্যর মাথায়। নিরবতা কাটিয়ে অথৈ বললো,
“আর কতক্ষণ চুপ থাকবি? কিছু তো বল।”
তুর্য নিশ্চুপ। অথৈ আবারও বললো,
“বেশ! কি বলার জন্য ডেকেছিস সেটা তো বল?”
তুর্য এবার অথৈ এর দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমায় বিয়ে করবি?”
অথৈ অবাক হয়ে বললো,

“কিহ্? মাথা ঠিক আছে তোর তুর্য?”
“আছে।”
“তাহলে এসব কি বলছিস?”
“আমার উত্তর চাই আমি।”
“তুর্য তুইতো পরীকে ভালোবাসিস।”
“তুই আমায় ভালোবাসিস?”
অথৈ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তুর্য আবার বললো,

“বল? আমায় ভালোবাসিস?”
“এটা নতুন কি তুর্য? আমি যে তোকে ভালোবাসি এটা তো তোর অজানা নয়। কিন্তু পরী তোকে অনেক ভালোবাসে।”
“না বাসে না সে আমায় ভালো। এখন পরী অন্য কারো।”
“মানে?”
“মানে? বলছি।”

এরপর তুর্য রেষ্টুরেন্টের সব ঘটনা অথৈকে বললো। অথৈ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“কিছু বলার ভাষা নেই আমার।”
তুর্য অথৈর হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“বিয়ে করবি আমায়?”
ছলছল চোখে তাকিয়ে অথৈ উত্তর দিলো,
“হুম।”

পর্ব ২৬

পার্লার থেকে লোক এসেছে সাজানোর জন্য। আমার দুই হাতে তারা মেহেদী দিয়ে দিচ্ছিলো। রিয়া আমার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আমি রিয়াকে ইশারায় পাশে বসতে বললাম। রিয়াও বসলো। পার্লারের একটা আপুকে বললাম,
“রিয়ার হাতে মেহেদী দিয়ে দিন।”
রিয়া বললো,
“আমি মেহেদী কেন লাগাবো?”
“বাহ্ রে! আমার বিয়ে আর তুই মেহেদী পড়বি না?”
“নারে। আমার ভাল্লাগেনা।”
“ভালো না লাগলেও আজ পড়বি।”

রিয়া আর কিছু না বলে রাজি হয়ে যায়। বিকেলের দিকে যখন বউ সাজাবে তখন জয় বিয়ের শাড়ি নিয়ে আসে। আমাকে পাশ কাটিয়ে শাড়িটা রিয়াকে দেয়। রিয়া অবাক হয়ে বলে,
“আমাকে কেন? পরীকে দে।”
“শাড়িটা তোর।”
“পাগল হলি নাকি? আজ তোর আর পরীর বিয়ে।”
“বিয়ে আজ ঠিকই। তবে আমার সাথে পরীর নয়। তোর সাথে আমার বিয়ে।”
“মানে?”
আমি রিয়ার দিকে একটা ডায়েরী এগিয়ে দিয়ে বললাম,
“মানে এটা।”

রিয়া ভয়ে ঢোক গিললো। অস্থির হয়ে বললো,
“তুই এটা কোথায় পেলি? ডায়েরীর লিখাগুলো কিন্তু এমনিতেই লিখেছি।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
“আরে অস্থির হচ্ছিস কেন? থাম।”
রিয়া আমার হাত ধরে বললো,
“বিশ্বাস কর এমন কিছুই না।”
আমি রিয়ার দুই বাহু ধরে বললাম,

“এতদিন বিশ্বাস করতাম। এই মুহুর্তটার পরও বিশ্বাস করবো। কিন্তু এখন যা বলছিস সেগুলো বিশ্বাসের অযোগ্য।”
“শোন”
“চুপ! এখন আমি বলবো আর তুই শুনবি। নিজের ভালোবাসাকে এভাবে মাটিচাপা কেন দিচ্ছিলি? কেন বলিসনি তুই জয়কে ভালোবাসিস?”
রিয়া চিৎকার করে বললো,
“কি আবোল তাবোল বলছিস? আমি জয়কে ভালোবাসিনা।”
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতো জয়কে তুই ভালোবাসিস না।”

রিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আবারও বললাম,
“কি হলো বল?”
“হ্যাঁ বাসি। আমি জয়কে ভালোবাসি। কিন্তু কি করতাম বল? জয়ের ধ্যানজ্ঞান বলতে শুধু তুই’ই ছিলি। যতবার আমি ওর সামনে গিয়েছি ততবার ওর মুখে তোর নাম শুনেছি।”
“তাহলে আমার বিয়ের পর কেন বলিসনি?”
“সাহস হয়নি।”
“ভুল করেছিলি। আর এখনো ভালোবাসাটাকে বিসর্জন দিচ্ছিলি?”
“জয় তোকে ভালোবাসে পরী।জয় শুধু তোর সাথেই সুখী হবে।”
“উহুম। জয় এখন থেকে তোকেই ভালোবাসবে।”

“কি যা তা বলছিস!”
“যা তা নয়! সব সত্যি।
শোন, সেদিন যে আমি তোর বাসায় গেলাম মনে আছে? তুই ফ্রেশ হতে যাওয়ার পর তোর বিছানা আমি গুছিয়ে দিচ্ছিলাম তখন তোর এই ডায়েরীটা পাই। অনুমতি ছাড়া কারো ডায়েরী পড়তে হয়না। তাই আমারও পড়ার কোনো ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু যখন ডায়েরীটা আমি টেবিলের ওপর রাখতে যাই তখন আমার হাত থেকে ডায়েরীটা পড়ে যায়। সাথে ডায়েরীর ভেতরে থাকা কলমটাও বের হয়ে যায় আর ডায়েরীটা মাঝখান থেকে খুলে যায়। কলম ডায়েরীর ভেতরে রাখতে গিয়ে একটা লাইন চোখে পড়ে। লাইনটা ছিল,”তুই আমার কখনো হবি না জেনেও আমি তোকেই ভালোবাসি। আচ্ছা তুইকি কখনো জানবি না আমি তোকে কতটা ভালোবাসি?”এরপর আমার কৌতুহলটা বেড়ে যায়। তাই অনুমতি ছাড়াই ডায়েরীর বেশ কয়েকটা পেজ পড়ি।

যার সারসংক্ষেপ ছিল তুই জয়কে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসিস। তাই আর কিছু না ভেবে ডায়েরীটা আমি ব্যাগে ভরে নিই। আর ঐদিন জয়ের সাথে আমার দেখা করাটাও ছিল আমার প্ল্যান। আমার উদ্দেশ্যে ছিল জয়কে সবটা জানানো। তাই তোকে বলেছিলাম, জয়কে বল আমরা ঘুরতে যাবো। আমি চেয়েছিলাম ঐদিনই তোর না বলা কথাগুলো জয়ের কাছে তোর সামনেই জানিয়ে দিবো। মাঝখান থেকে তুর্য আসায় আমার কান্নাকাটি শুরু হয়। নিজেকে কন্ট্রোল করে যে সব সমাধান করবো সেই সুযোগটাও তুই সেদিন দিসনি। জয় যখন আমার গালে হাত রেখে বললো,”কাঁদবিনা”তখন তোর খুব কষ্ট হচ্ছিলো তাই না? আর তাইতো ফোন আসার অজুহাত দেখিয়ে তুই বাড়িতে চলে আসিস।
তুই চলে আসার বেশকিছুক্ষণ পর আমি নিজেকে কন্ট্রোল করি। এরপর জয়কে তোর কথা জানাই। জয় প্রথমে এসব বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিলো না। পরে তোর লিখা ডায়েরীটা বের করে ওকে দেখাই। ডায়েরীর লেখাগুলো পড়ে জয় স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখগুলো ছলছল করছিল। আমি তখন জয়কে বলেছিলাম,
“রিয়া তোকে অনেক ভালোবাসে।”

জয় নিশ্চুপ।
“আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস। তবে আমার মনে হয় এই ডায়েরীটা পড়ার পর তোর আমাকে নয় বরং রিয়াকে ভালোবাসা উচিত। দেখ দোস্ত, আমি শুধু তোকে আমার বেষ্টফ্রেন্ডই ভাবতাম। এর বেশিকিছু আমি কখনোই তোকে ভাবিনি। আমি তোকে ভালোবাসি তবে এজ লাইক মাই বেষ্টফ্রেন্ড। কোথায় যেন পড়েছিলাম,”তুমি তাকেই ভালোবাসো যে তোমাকে ভালোবাসে। তুমি তাকে ভালোবেসো না যাকে তুমি ভালোবাসো।”কথাটা ভীষণ জটিল তাই না? আমাদের তাকেই ভালোবাসা উচিত যারা আমাদের ভালোবাসে। এর কারণ হলো তার থেকে আমরা চাওয়ার আগেই দ্বিগুণ ভালোবাসা পাবো। আর আমরা যাদের ভালোবাসবো তাদের কাছে আমরা শুধুই মূল্যহীন। আমি তোকে কি বলতে চাচ্ছি তুই বুঝতেছিস তো?”
জয় চোখ দুইটা কচলিয়ে বললো,

“হুম।”
“রিয়াকে তোর জীবনসঙ্গিনী করে নে জয়। অনেক অনেক বেশিই সুখী হবি দেখিস। হয়তো চাইলেই ভালোবাসা যায়না কিন্তু ভালোবাসাটা সৃষ্টি হয়ে যাবে। শুধুমাত্র আমার কথা রাখার জন্য যে বিয়ে করবি বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। আমি চাই তুই ওকে ভালোবেসেই বিয়ে কর।”
জয় তখন আমার এক হাত ধরে ভরসা দিয়ে বললো,

“তোর চাওয়াটাই পূরণ হবে।”
সেদিন এত্ত বেশি খুশি হয়েছিলাম যে কি বলবো! এরপর দুজনে মিলে রেষ্টুরেন্টের ঐ প্ল্যানিংটা করলাম। তুই জানিস জয় তোকে যেই শাড়িটা দিয়েছে সেটা জয়ের টাকা দিয়ে কেনা। আর জয় আমাকে যে আংটি পড়িয়ে দিয়েছিল ঐটা আমারই আংটি ছিল। রেষ্টুরেন্টে যাওয়ার আগে ওর কাছে দিয়েছিলাম পড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম তখন অন্তত নিজের মনের কথাটা বলবি। কিন্তু তুই সেদিনও বলিসনি।”
রিয়া মুখে কিচ্ছু বললো না। কাঁদতে কাঁদতে আমায় জড়িয়ে ধরলো। আমি বললাম,
“হয়েছে আর কাঁদতে হবেনা।”

রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“তুই এমন কেন বলতো? তোকে বোঝা বড্ড কঠিন। অনেক ভালোবাসি তোকে পরী।”
আমি রিয়াকে সামনে দাঁড় করিয়ে বললাম,
“শুধু আমাকেই? নাকি জয়কেও?”
রিয়া মাথা নিচু করে লজ্জামিশ্রিত হাসি দিলো। আমি বললাম,
“এবার জয়ের সাথে একটু কথা বল। আমি আসতেছি। তাড়াতাড়ি কথা বলবি।সাজতে হবে কিন্তু।”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে বড় একটা শ্বাস নিলাম।একটু শান্তি পেলাম। অন্তত একটা সত্যিকারের ভালোবাসা তো মেলাতে পারলাম। কিছুক্ষণ পর রিয়াকে সাজাতে সাহায্য করলাম। রিয়ার চোখেমুখে আজ হাসির ছাপ স্পষ্ট। ভালোই ভালোই বিয়েটাও মিটে যায়। রিয়াকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় হাসির ঘটনা ঘটলো। একই বাসায় থাকে ওরা। শুধু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। এটা নিয়ে বিয়ে বাড়িতে হাসাহাসির শেষ নেই।

রাত ১২ টার দিকে আমি ঘুমাতে যাই। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। ক্লান্ত থাকার কারণে বিছানায় গা এলাতেই ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন মোবাইলটা হাতে নিই কয়টা বাজে দেখার জন্য। ঘুমঘুম চোখে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি নয়টা বাজে। সাথে স্ক্রিনে তুর্যর ম্যাসেজ। ম্যাসেজটা গতকাল বিকাল চারটার দিকে করেছিল।লক খুলে ম্যাসেজটা পড়ছিলাম। ম্যাসেজটা ছিল,
“নতুন জীবনের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো। কাল আমার আর অথৈ এর বিয়েতে এসো জয়কে নিয়ে। দাওয়াত রইলো তোমাদের।

পর্ব ২৭

ম্যাসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। আসলে আমার কি করা উচিত বা কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। পরক্ষণেই মনে হলো আজ রিয়ার বৌভাত। যা করার বৌভাতের অনুষ্ঠানের শেষেই করতে হবে।

রিয়াকে আবারও পার্লার থেকে সাজাতে এসেছে। এবার রিয়া একা নয় সাথে আমিও সেজেছি বৌ সাজ। লাল-খয়েরী একটা লেহেঙ্গা। দুই হাত ভর্তি লাল চুড়ি। খোঁপায় ফুল। মুখে মেকাপ, চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক। আয়নায় নিজেই নিজেকে দেখে ক্রাশ খাচ্ছি। শালা তুর্য ব্যাটা তোকে বিয়ে করাচ্ছি আমি। সন্ধ্যার দিকে সবাইকে নিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে গেলাম। ওখানেই ওদের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চারদিকে ফুল আর লাইটিং দিয়ে ভর্তি। সাথে গান-বাজনা আর হৈ-হুল্লোড় তো আছেই। এক কথায় যাকে বলে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে।

ভেতরে যেতেই দেখলাম অথৈ এর হাসিমাখা মুখ। হাসিমুখে সবার সাথে সেল্ফি নিচ্ছে। খুব সুন্দর করে বউ সেজেছে। আমাকে দেখতেই গান-বাজনা বন্ধ হয়ে গেল। সবাই এখন চুপচাপ। কেউ কেউ কানাকানি করছে,”এক্স হাজবেন্ডের বিয়েতেও কেউ আসে। এই মেয়ে তো বেশ সাংঘাতিক!”সকলের কথাকে উপেক্ষা করে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। তুর্য অথৈ এর পাশেই ছিল। অথৈ আমার কাছে এগিয়ে এসে বললো,

“আমাদের বিয়ে খেতে এসেছো? বউ সাজে কিন্তু তোমায় দারুণ লাগছে।”
আমি চারপাশে একবার ঘুরেফিরে তাকিয়ে দেখলাম যে কে কে আছে এখানে। এখানে উপস্থিত আছে, আমার মা, ভাই, রিয়া, রিয়ার পরিবার, জয়, জয়ের পরিবার, আমার শ্বশুর-শ্বাশুরী, মুসকান, বকুল,তুর্যর সব ফ্রেন্ড সার্কেল, আত্মীয়,অফিসের কর্মচারী, অথৈ এর পরিবার, ফ্রেন্ডস, আত্মীয়রা সবাই। আমাকে চুপ থাকতে দেখে অথৈ আবারও বললো,
“কাউকে খুঁজছো?”
“না। দেখছি।”
“কাকে?”

“তোমার পরিচিতদের।”
“সবাইকে তুমি চিনবেনা পরী। এখানে অধিকাংশ মেম্বারই আমার রিলেটিভ। আসলে কি বলো তো? ভালোবাসার মানুষটিকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পাচ্ছি তো তাই দুইদিনের পরিচিত ফ্রেন্ডকেও ইনভাইট করতে ভুলিনি। সবচেয়ে বেশি অবাক আর খুশি হয়েছি তুমি এসেছো বলে। তুমি সত্যিই অনেক ম্যাচিউর। না হলে কি কেউ তার স্বামীর বিয়ে অন্য কারো সাথে দেখতে পারে? যতই ডিভোর্স হোক একসময় তো তোমরা একসাথেই ছিলে। তুমি চিন্তা করো না তোমার যত্নের কোনো ত্রুটি হবে না।”
আমি মুচকি হেসে বললাম,

“সেই তো নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলে।”
“স্যরি? বুঝলাম না।”
“বুঝাচ্ছি।”

ওয়েটারকে ইশারা করলাম একটা চেয়ার এনে দিতে। ওয়েটার একটা চেয়ার এনে দিলো। জয়ের শার্টের সাথে সানগ্লাস আটকানো ছিল। সানগ্লাসটা আমি চোখে দিয়ে চেয়ারে বসলাম পায়ের ওপর পা দিয়ে। অথৈ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম,
“এত নাটক করো কেমনে অথৈ আপু?”
অথৈ হেসে বললো,
“শোকে পাগল হয়ে গেলে নাকি?”

আমি মুচকি হাসলাম। তুর্যর দিকে তাকিয়ে বললাম,
“তোমায় তো আমি পরে দেখতেছি গণ্ডার। বিয়ে করে শখ মিটেনা তাইনা?”
অথৈ রাগে গজগজ করতে করতে বললো,

“মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ পরী। ভুলে যেও না সে এখন তোমার এক্স হাজবেন্ড আর আমার উডবি হাজবেন্ড।”
আমি দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অথৈ এর গালে সজোরে থাপ্পড় দিলাম। এতক্ষণ চারপাশে কানে কানে ফিসফিসিয়ে কথা চললেও এবার সব একদম চুপ হয়ে যায়। অথৈ চেঁচিয়ে বললো,
“তোমার এত্ত বড় সাহস।”

আমি অথৈ এর গালে আরেকটা থাপ্পড় দিয়ে হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে বললাম,

“আওয়াজ নিচে। নয়তো জিহ্বা টেনে একদম ছিঁড়ে ফেলবো।”
এরপর অথৈকে ধাক্কা দিয়ে বললাম,
“এইখানে সব মানুষ এখন চুপ থাকবে। শুধুমাত্র আমি বলবো।”
অথৈ এর মা বললো,

“সমস্যাটা কি? এরকম থার্ডক্লাশ মেয়েদের মত আচরণ করছো কেন?”
“শাট আপ। চুপ একদম চুপ। আমি যদি সত্যিই ভুলে যাই যে, আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে আর আপনার কথামত থার্ডক্লাশ মেয়ে তাহলে আমি এটাও ভুলে যাবো আপনি আমার গুরুজন। তখন এমন অবস্থা করবো না কাউকে বলার মত মুখও থাকবে না। আর সমস্যা কি? সেটাই তো আজ বলবো। এই যে আপনার গুণধর রাক্ষসী মেয়েকে দেখছেন? সে আসলে মানুষ না একটা জানোয়ার। রাক্ষসী! আমার বাচ্চাটাকে খেয়ে ফেলছে এই রাক্ষসী।”
সানগ্লাসটা খুলে কিছুক্ষণ দম নিলাম। তখনও সবাই নিশ্চুপ। আমি বলা শুরু করলাম,

“অথৈকে আমার সন্দেহ হতো আমার বিয়ের শুরু থেকেই। ওর আচরণ, ওর কথাবার্তা সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত লাগতো। পরে আবার এটা ভাবতাম, ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্টটা হয়তো অনেক। এরপর থেকে আমার ধারণা ভাঙ্গে। অথৈ আমার সাথে ভালো মানুষীর নাটক করে যেটাতে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি অথৈ আমার শত্রু নয়। এরপর অথৈ ছক কষা শুরু করলো। খুব সুন্দর একটা ছক কষলো যেটাতে অথৈ এর নাগাল পাওয়া ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। মানে বিষয়টা হচ্ছে এমন, সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙ্গবে না। অথৈ শুরু করে একটা নতুন খেলা। আর এই খেলার গুটি বানায় বকুলকে।”
এতটুকু বলে আমি থামলাম। আমার শ্বাশুরী মা অবাক হয়ে বললো,

“বকুল?”
“হ্যাঁ মা বকুল। আমিও এটা বিশ্বাস করতে পারিনি। যেদিন আমার এক্সিডেন্ট হয় সেদিনই আমি বকুলকে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছিল এটা আমার ভ্রান্ত ধারণা। হয়তো কারো সাথে ধাক্কা লেগে আমি পড়ে গিয়েছিলাম। তাই বিষয়টা নিয়ে আমি আর ঘাটাইনি। বাকিসব আবার আগের মত চলতে থাকে। এরপর আসে সেই সময়টা। আমার মা হওয়ার সময়টা। এর আগের সময়টাতে অথৈ চুপ ছিল। যখনই শুনলো আমি প্রেগন্যান্ট। ব্যাস এই সময়টাকেই কাজে লাগালো। আমি যেদিন সিঁড়ি থেকে পড়ে যাই সেদিন না আমি নিজে পা পিছলে পড়েছিলাম আর না অন্য কেউ আমায় ধাক্কা দিয়েছিলো। ঐদিন আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো বকুল! আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম সেটা। কিন্তু বাঁচাতে পারিনি আমার বাচ্চাটাকে। যখন শুনলাম বাচ্চাটাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি সেদিন থেকেই আমি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ি।

কাউকে কিছু বলার মত ক্ষমতা আমার ছিল না। কিন্তু আমার অনুপ্রেরণা জোগায় আর রাস্তা দেখায় আমার প্রথম সন্তান, আমার বাচ্চা মুসকান। বন্ধ ঘরে আলোর দিশা নিয়ে এসেছিল ওর শুকনো মুখে বলা প্রতিটা কথা। তৎক্ষণাৎ আমি বকুলের কাছে যাই। বকুলের রুমে গিয়ে দেখি খাটের সাথে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছে। আমি বকুলের কাছে গিয়ে ওকে দাঁড় করাই।ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার কথা মনে হতেই প্রচন্ড জেদ এসে ভর করে আমার ওপর। গায়ের সব শক্তি দিয়ে ঠাটিয়ে দুই গালে এলোপাথাড়ি থাপ্পড় মারতে থাকি। চুলের মুঠি ধরে বলেছিলাম,

“কেন করলি এটা আমার সাথে? বল কেন করলি? নিজের ছোট বোনের মত ভালোবেসেছি তোকে। নিজের হাতে খাইয়েছি তোকে। রাস্তা থেকে এনে নতুন একটা জীবন দিয়েছে তুর্য। আর তুই আমাদের জীবন থেকে খুশির আলোটাই কেড়ে নিলি? বল কেন করলি? কীসের লোভে করলি এটা?”

বকুল কাঁদতে কাঁদতে হাত জোর করে বলেছিল,
“আমায় যতখুশি মারো। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যিটা বলার একটা সুযোগ দাও আমায় প্লিজ। নইলে যে আমি মরেও শান্তি পাবো না।”
“তোকে তো আমি মেরেই ফেলবো। বল মরার আগে কি বলতে চাস তুই।”

বকুলকে ছেড়ে দেওয়ার পর ফুঁপাতে ফু্ঁপাতে বললো,
“বিশ্বাস করো ভাবী আমি তোমার বা তোমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি আমি। এই সব আমায় অথৈ আপু করতে বাধ্য করেছে।”
“অথৈ!”
“হ্যাঁ অথৈ আপু। আমি আর বাবা মিলে রাস্তায় ফুল বিক্রি করতাম। ঐ সামান্য টাকায় আমাদের সংসার চলতো না। একদিন অথৈ আপুর সাথে আমার দেখা হয়। অথৈ আপু আমাকে ডেকে নিয়ে বলে,
“তোর নাম কি?”
“বকুল।”

“কি করিস?”

“ফুল বিক্রি করি।”
“তোর পরিবারে কে কে আছে?”
“বাবা আর আমি।”
“আর কেউ নেই?”

“না।”
“কাজ করবি?”

“আমায় কাজ দিবো কে?”
“আমি দিবো। আর অনেক টাকাও দিবো। তখন তোকে আর ফুল বিক্রি করে খেতে হবেনা।”
“সত্যিই?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা আমি রাজি। কি কাজ করতে হইবো আমায়?”

বকুলের কান্নাটা অনেক থেমেছে। আমি বললাম,

“তারপর অথৈ কি বললো?”
“তারপর অথৈ আপু তুর্য ভাইয়ার অফিসের সামনে বাবাকে নিয়ে কয়েকদিন ফুল বিক্রি করতে বললো। এরপর বললো একটা মিথ্যা নাটক করতে হবে। আর সেটা হলো, আমায় বলতে হবে আমার বাবা মারা গিয়েছে। আমি প্রথমে রাজি হইনি এই মিথ্যা বলতে। এরপর অথৈ আপু আমাকে অনেক বোঝায়। আমার বাবা নাকি তার কাছে অনেক ভালো থাকবে। ভালো খাবে, ভালো পোশাক পড়বে। তখন আমি রাজি হই। আর আমাদের প্ল্যান সফলও হয়। আমি তোমাদের বাড়িতে ঢুকতে সক্ষম হই। আমার কাছে একটা ছোট্ট ফোন ছিল যেটা আমি লুকিয়ে রাখতাম। আর বাড়ির সব খোঁজ-খবর অথৈ আপুকে দিতাম। এরপর আস্তে আস্তে তোমাদের সাথে থাকতে থাকতে তোমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠি। আমি তখনও জানতাম না আমার এমন একটা জঘন্য কাজ করতে হবে। আমি মনে মনে অথৈ আপুকে অনেক ধন্যবাদ দিতাম এমন একটা কাজ দেওয়ার জন্য। কেননা এই কাজের জন্যই তো এমন একটা পরিবার পেয়েছি। এরপর এলো সেইদিন যেদিন আমি তোমায় গাড়ির সামনে ধাক্কা দেই।

সেই ধাক্কাটা আমি ইচ্ছে করে দেইনি বিশ্বাস করো। ভিড়ের মধ্যে অথৈ আপু আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো আর বলেছিল তোমায় গাড়ির সামনে ধাক্কা দিতে। তখন অথৈ আপুর কথা শুনে আমি এত্ত অবাক হই যে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। আমি বারবার বলি, আমি এটা পারবো না। কিছুতেই না। এরপর অথৈ আপু আমার বাবাকে নিয়ে আমায় ব্লাকমেল করে। তারপর তুমি যখন আমায় খুঁজতে খুঁজতে আমার কাছে চলে আসো তখন অথৈ আপু রাস্তার ঐপাশে চলে যায়। বারবার ইশারায় তোমায় ধাক্কা দিতে বলে আর হুমকি দেয়। তোমায় না মারলে আমার বাবাকে নাকি মেরে ফেলবে। তাই আমি বাবাকে বাঁচাতে বাধ্য হয়েই তোমায় ধাক্কা দেই। আমার নিজের প্রতিই এত বেশি ঘৃণা হচ্ছিলো। ইচ্ছে করছিল মরে যাই। আমি বারবার অথৈ আপুকে বলেছিলাম আমায় মুক্তি দিতে। কিন্তু অথৈ আপু বলেছিল যতদিন না সে তুর্য ভাইয়াকে পায় ততদিন সে আমায় মুক্তি দিবেনা। আর আমি পালাতেও পারতাম না কারণ আমার বাবা অথৈ আপুর কাছে বন্দি ছিল। এ কারণে হাজার বার চেয়েও তোমায় বলতে পারিনি। এরপর আমার প্রতিটা দিন কাটতে থাকতো ভয়ে ভয়ে। না জানি আবার কবে কোন ক্ষতি করতে বলে।

কিন্তু ভয়গুলো অনেকটা দূর হয় কারণ কোনো ক্ষতি করতে বলেনি। কিন্তু ভালো সময়টা আর ভালো থাকলো না। তোমার প্রেগনেন্সির খবর পেয়ে অথৈ আপু মেতে ওঠলো এক জঘন্যতম খেলাম। যে খেলায় দাবার গুটি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছিল আমায়। অথৈ আপু বলেছিল যেভাবেই হোক এই বাচ্চাটাকে যেন আমি নষ্ট করি। প্রয়োজনে খাবারের সাথে যেন বিষ মেশাই। আমি যে একদিন ফোনে চেঁচামেচি করে বলেছিলাম না? পারবো না আমি পারবো না? সেটা অথৈ আপুর সাথেই ফোনেই বলেছিলাম। কিন্তু তোমায় বলেছিলাম মিথ্যা কথা। আমি অথৈ আপুর পায়েও ধরি কিন্তু তার মায়া হয়না। ভিডিও কল দিয়ে বাবার গলায় ছুরি দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান আর থাকে না। একটু ভালো থাকার আশায় যে এক গহীন ফাঁদে আটকে গিয়েছিলাম সেটা আমি হারে হারে বুজতে পারি। আর কোনো উপায় না দেখে সেদিন তোমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই।”

এতটুকু বলে বকুল আবার কাঁদতে শুরু করেছিল। আর আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। কিছুতেই আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এসব। একটা মানুষ কি করে এতটা জঘন্য হতে পারে সেটা এই অথৈকে না দেখলে জানতামই না। বকুলকেও তখন আমি বের করে দিতে পারিনি। কেননা তাহলে বকুল ওর বাবাকে পেতো না।”
সবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সবার চোখে-মুখে বিষ্ময়। অথৈ চেঁচিয়ে বললো,

“এইসব মিথ্যা কথা। এগুলো পরীর বানোয়াট কথাবার্তা। তুর্য তুই বিশ্বাস কর, পরী আমায় হিংসে করে এসব কথা বলছে। ওর কথা তুই বিশ্বাস করিস না। সব মিথ্যা সব।”
বকুল এগিয়ে এসে বললো,
“সব সত্যি কথা। পরী আপু একটাও মিথ্যা বলেনি। বরং এখনো মিথ্যা নাটক করে যাচ্ছো তুমি।”
“প্রমাণ কি এসবের?”
আমি একটু জোরে হেসেই বললাম,

“প্রমাণ? প্রমাণ চাই তোমার? ঐ যে বকুলের পাশের লোকটাকে দেখছো? তাকে নিশ্চয়ই ভালো চিনো তুমি?”
আমি সবার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“উনিই হচ্ছে বকুলের বাবা।”
আমি বকুলের বাবার সামনে গিয়ে বললাম,

“কোনটা সত্যি আংকেল?”
“তোমার সবগুলা কথাই সত্যি মা। ঐ মাইয়া আমগোরে কাম দেওনের লোভ দেখাইয়া তোমার ক্ষতি করাইছে। আমারে মাইরা ফালানির ভয় দেখাইয়া আমার মাইয়ারে দিয়া তোমার ক্ষতি করাইছে। আমগোরই ভুল ছিল এই ডাইনীরে বিশ্বাস করা।”
আমি এবার মুচকি হেসে অথৈর সরাসরি দাঁড়ালাম। বললাম,
“আরো প্রমাণ চাই?”

এরপর আমি আমার ফোন থেকে কয়েকটা ভিডিও, ফোন রেকর্ড আর স্ক্রিনশট দেখাই। যেগুলোতে অথৈ বকুলকে ব্লাকমেল করে আমার ক্ষতি করতে বাধ্য করেছে। আমার চোখে-মুখে আগুন জ্বলছিল। যেই আগুনে নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাবে এই অথৈ। অথৈ এর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললাম,

পর্ব ২৮

অথৈ আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তুর্যর কাছে গেলো। তুর্যর হাত ধরে বললো,
“তুর্য তুই এসব বিশ্বাস করিসনা প্লিজ। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না। আমি তোকে অনেক ভালোবাসি।”
তুর্য হেসে বললো,
“আমিও ভালোবাসি। তবে তোকে নয় পরীকে।”

“মানে?”
আমি পেছন থেকে বললাম,

“মানেটা আমি বলি?”
তুর্য অথৈ এর কাছ থেকে আমার কাছে এসে হাত ধরে অথৈকে উদ্দেশ্যে করে বললো,
“এই মেয়েটাকে ভালোবাসি। তোর মত একটা মেয়ে কিভাবে আমার বেষ্টফ্রেন্ড হতে পারে আমি তো সেটাই বুঝতে পারছিনা। তোর ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে যে একটা শয়তান লুকানো সেটা পরী আমায় আগেই বলেছিল।”
অথৈ চেঁচিয়ে বললো,

“মানে কি এসবের?”
আমি বললাম,
“আরে আরে এত হাইপার হচ্ছো কেন? পানি খাবে? আরে কেউ ওকে পানি দাও।”

অথৈ রাগে ফুঁসতেছে সাথে চোখে পানি। আমি বললাম,
“যেদিন তোমার সব কাহিনী ফাঁস হয় সেদিন আমি তুর্যকে সব বলি। কিন্তু তুর্য তোমাকে এতটাই বিশ্বাস করতো যে, এটা ভাবতেই পারেনি তুমি এত বড় ক্ষতি করতে পারো। আমি সেদিন চাইলেই সব প্রমাণ দিয়ে তুর্যকে বিশ্বাস করাতে পারতাম কারণ আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল বকুল। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কেন করিনি জানো? করিনি এইজন্যই যে, আমি চেয়েছিলাম সবার সামনে তোমার এই মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। তখন তুর্যকে বলেছিলাম,

“বেশ এখন তোমায় বিশ্বাস করতে হবে না। প্রমাণ তোমায় স্বচক্ষে দিবো। তুমি শুধু তাই তাই করবে যেটা আমি তোমায় বলবো। ব্যাস তুর্য সেটাই করেছে। বকুল যখন আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল তখনই বুঝেছিলাম এর পেছনে কোনো কারণ আছে। আর যেই ক্ষতিটা করতে চেয়েছিল সেটা আমার বাচ্চার ক্ষতি করতে চেয়েছিল। তুমি শুনে অনেক বেশি অবাক হবে যে, আমি কোনোদিন মা হতে পারবো না এটা সম্পূর্ণই মিথ্যা কথা ছিল। এমনকি তুর্যও জানতো না এটা। সেই ডক্টর ছিল আমার পরিচিত। আমিই তাকে এটা শিখিয়ে দিয়েছিলাম। কেননা আমি জানতাম এই খবরটা বকুলের কানে যাবে। এখন যদি বকুল নিজ ইচ্ছায় আমার বাচ্চার ক্ষতি করতে চাইতো তাহলে ও ভাবতো ও সাক্সেলফুল। কারণ আমি তো তখন জানতাম না যে এর পেছনে তুমি রয়েছো। তবে খবরটা তোমার কানেও পৌঁছিয়েছিল। এরপর সেদিন বাড়িতে যে ঝগরাগুলো হলো?

সেগুলোও ছিল নাটক। ঐ ঝগরা করে আমি শুধু বাড়ি থেকে বের হয়েছি আজকের এই দিনটার জন্য। এই খবরটাও বকুলের মাধ্যমে তোমার কাছে পৌঁছে যায়। ওহ হ্যাঁ, বকুলও কিন্তু আমাদের অনেক সহযোগীতা করেছে। তোমার গুটিকে দিয়ে তোমাকেই মাত দিয়েছি বলতে পারো। তারপর আমি, জয় আর রিয়া যে ঘুরতে বের হয়েছিলাম এই খবরটা তুর্যকে আমিই দিয়েছিলাম আর বলেছিলাম ঐখানে আমার সাথে সিনক্রিয়েট করতে কারণ আমি জানতাম এই খবরটাও তুমি পাবে। কিন্তু তুর্য তখনও শিওর হয়নি মেইন কালপ্রিট তুমি। এরজন্য আমরা কি করলাম জানো? তুর্যকে বললাম একটা উইল করতে সম্পত্তির। এক ভাগ আমার নামে আরেক ভাগ মুসকানের নামে। সেদিন তুর্য আমার শেখানো কথাগুলোই তোমায় বলেছিল।”
আমার শ্বশুর জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলেছিল?”

“তুর্য অথৈকে বলেছিল,
“এই খামটা পরীর বাড়ির ঠিকানায় পার্সেল করে দিস তো।”
“কি আছে এটায়?”

“দলিল।”
“কিসের?”
“প্রোপার্টির। পরীর আর মুসকানের নামে।”
আমি ৯৮% শিওর ছিলাম অথৈ এই সুযোগটাকে কাজে লাগাবে। অথৈ করেছিলও তাই। তুর্যর সাইন নকল করে ডিভোর্স পেপার তৈরি করে আমার বাসায় পাঠায়। তুর্যর কাছে সেদিনই ওর আসল চেহারা প্রকাশ পায়। তুর্য তখন অথৈ এর ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
আমি ডিভোর্স পেপারটা ছিঁড়ে অথৈ এর গায়ে ছুঁড়ে ফেলে বললাম,

“তুমি ভাবলে কিভাবে এই পেপারে আমি সাইন করবো?”
অথৈ এবার ছটফট করতে লাগলো। আমি বললাম,
“তারপর আরো শুনবে? ঐ রেষ্টুরেন্টে তুর্যকে আমিই আসতে বলেছিলাম। তোমাকে ছাদে তুর্য যেসব কথা বলেছিল সেগুলো আমারই শেখানো কথা ছিল। তুর্য কখনোই তোমাকে ভালোবাসেনি। তুর্য শুধু আমার। আর আমার থেকে তুর্যকে আলাদা করার মত কোনো ক্ষমতা নেই তোমার।”
অথৈ রাগে তুর্যর পাঞ্জাবির কলার ধরে বললো,

“চিটার! বিশ্বাসঘাতক।”
তুর্য কলার ছাড়িয়ে নিয়ে অথৈ এর গালে সজোরে থাপ্পড় দেয়। তৃতীয় থাপ্পড় দেওয়ার সময় আমি হাত আটকে ধরে বলি,
“আমি থাকতে তুমি কেন গায়ে হাত তুলবে? এই মেয়ে গিরগিটির মত রং বদলায়। বলা তো যায় না কখন আবার কি বলে বসে।”
অথৈ বললো,

“নাটক করছো তোমরা আমার সাথে নাটক। আমার ইমোশন নিয়ে খেলছো।”
আমি অথৈকে এলোপাথাড়ি থাপ্পড় মারতে মারতে বললাম,
“তোর ইমোশোন নিয়ে খেলেছি আমরা? তুই মানুষ নাকি যে তোর ইমোশোন নিয়ে খেলবো? তুই তো অমানুষ, শয়তান, রাক্ষসী, খুনী। খুন করেছিস আমার বাচ্চাটাকে।”
জয় এসে আমাকে আটকায়।
“ছেড়ে দে পরী। ওকে মেরে নিজের হাত নষ্ট করিস না।”

আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অথৈকে বললাম,
“তোর মনে প্রশ্ন জাগে না এতদিন ধরে কেন এই নাটক করলাম? শোন তাহলে, আজ তোর বিয়ে হওয়ার কথা। বিয়ে নিয়ে প্রত্যেকটা মেয়েরই একটা স্বপ্ন থাকে। তোরও ছিল। তুই তো আরো বেশি এক্সাইটেড ছিলি। আর বিয়ের দিনে বিয়ে না হওয়ার অপমান বুঝিস তুই? না বুঝলেও এবার থেকে বুঝবি। রাস্তা দিয়ে গেলেই লোকে তোর দিকে আঙ্গু্ল তুলে বলবে, ঐ দেখ ঐ মেয়েটার বিয়ের দিন বিয়ে হয়নি। মেয়েটা ওর ফ্রেন্ডের বউয়ের বাচ্চাকে মেরে ফেলছে। তুই এগুলা সহ্য করতে পারবি তো? একটা মেয়ের কাছে এরচেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে? আর তোর কাছের মানুষগুলোও তোর আসল চেহারা দেখলো। প্রতিটা মানুষের কাছে এখন থেকে তুই ঘৃণিত হবি। কেউ তোকে বিশ্বাস করবে না।

ভালোই ভালো এখান থেকে বের হ বলছি। নয়তো জীবন নিয়ে হয়তো ফিরতে পারবিনা। যাকে ভালোবেসে এত কিছু করলি তার হাতেই যেন তোর জীবন না যায় আবার। বের হয়ে যা বলছি।”
আমার শ্বাশুরী অথৈ এর ঘাড় ধরে বের করে দেয়। অথৈ এর আত্মীয়-স্বজনদের মুখ ছোট হয়ে গিয়েছিল অনেক। তারা সবাই শুধু মলিন মুখে বলে গিয়েছিল,”স্যরি পরী। লজ্জা হয় ওর রিলেটিভ বলে আমরা। ওর হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি। পারলে মাফ করে দিয়ো।

পর্ব ২৯

দরজার আড়ালে চুপ করে লুকিয়ে আছি। তুর্য রুমে ঢোকা মাত্রই খবর আছে। তুর্য রুমে এসে দরজা আটকানোর সময় হুট করে আমায় দেখে ভয় পেয়ে যায়।
আমি কিছু না বলে তুর্যকে ধাক্কা দিয়ে বিছানার ওপর ফেলে দেই। ওর পেটের ওপর উঠে বসে বললাম,
“শালা বিয়ের অভিনন্দন জানাস আমাকে? সবকিছু জানার পরও অভিনন্দন? কেন রে? খুব শখ হয়েছিল অথৈকে বিয়ে করার?”

“উফফ! কি করছো পরী? উঠো।”
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে।”
“আমি পাঠাইনি ঐ ম্যাসেজ।”
“তাহলে কে পাঠিয়েছে?”
“অথৈ।”
“সত্যি তো?”
“তিন সত্যি বাবা।”

“আমি তোর বাবা?”
“না তুমি আমার বউ। আর কিসব তুই-তোকারি করছো।”
“ওলে বাবালে! কি বলবো তাহলে?”
“আদর করে কথা বলবা। তুমি করে বলবা।”
“ইশ! কি শখ।”
“শখের কি হলো হুম? কতগুলো দিন দূরে থাকতে হয়েছে কোনো হিসেব আছে তোমার?”
“তো কি হয়েছে?”

তুর্যর পেটের ওপর থেকে আমাকে নামিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কি হয়েছে মানে? কিন্তু জানো পরী, এই কয়টা দিনে অনেক বেশিই এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি যে আমি তোমায় কত্তটা ভালোবাসি।”
“আমি কি তোমায় কম ভালোবাসি?”
“ইহুম। আমি জানি, তুমি আমায় আমার থেকেও বেশি ভালোবাসো।”

“বাসবোই তো। তুমি যে আমার।”
“হুম আমি তো শুধু তোমারই। মৃত্যু ছাড়া কেউই আলাদা করতে পারবেনা আমাদের।”

হানিমুনের ব্যবস্থা করা হয়েছে রিয়া, জয়, আমার আর তুর্যর। আমার আর তুর্যর ট্রিপল হানিমুন। মানে মুসকানও আমাদের সাথে যাবে। হানিমুনে যাওয়ার জন্য বেশ তোড়জোড় চলছিল। মুসকান তো মনে হয় আরো বেশি খুশি। ঘুরতে ওর এত ভালো লাগে। তবে বাচ্চা মানেই তো জানার আগ্রহ বেশি। প্রায় একমাস সময় নিয়ে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। তুর্যর ইচ্ছে ছিল দেশের বাহিরে কোথাও যাওয়ার। আমিই রাজি হইনি। কারণ আমি চাই, মুসকান বাংলাদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য আগে উপভোগ করুক।

আমরা প্রথমে গিয়েছিলাম কক্সবাজারে।
প্রথমদিন যেতে যেতে রাত হয়ে যায়। এত বেশি ক্লান্ত ছিলাম যে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন বাহিরে মৃদু মৃদু আলো। পাশে তাকাতেই দেখলাম মুসকান ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তুর্য নেই। কোথায় গেল! মুসকানের গায়ের কাঁথাটা টেনে দিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। ওয়াশরুমে গিয়ে দেখলাম নেই। অদ্ভুত! কোথায় গেল এত সকালে। ব্যালকোনিতে গিয়ে পেয়ে গেলাম। বসে বসে ফোনে বাচ্চাদের ভিডিও দেখছে। আমি গিয়ে বললাম,

“কি করছো?”
“ঘুম আসছিল না তাই এখানে বসে আছি।”
“এত জার্নি করে এলে তাও ঘুম পাচ্ছে না।”
“উহু।”
“নিশাচর নাকি?”
“উহু। তোমার ভালোবাসার পাগল।”
“তোমায় এতটাই ভালোবাসি যে, ভাষায়ও প্রকাশ করতে পারবো না।”
তুর্য আমার হাত ধরে কোলে বসিয়ে বললো,

“কি?”
“স্বামীকে নিয়ে সব মেয়েরই আলাদা একটা ইচ্ছে থাকে। স্বামীর সাথে একটু আলাদা সময় কাটাবে, একটু ঘুরবে ফিরবে। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে আলাদা। বিয়ের পর থেকেই বাচ্চা ফ্রি পেয়েছো। যেখানেই যাও ওকে নিয়ে যেতে হয়। ইভেন এবারও নিয়ে আসতে হলো। এসব বিষয়ে তোমার কখনো রাগ হয়না?”
“এতদিনে কি তুমি এই চিনলে আমায়? তোমার কাছ থেকে আমি প্রথমে অবহেলা আর অপমান ছাড়া কিছুই পাইনি। কিন্তু মুসকানকে ভালোবেসে ওর থেকে ভালোবাসাটা প্রথম থেকেই পেয়েছি। আচ্ছা জন্ম দিলেই কি শুধু মা হওয়া যায়? তাছাড়া কি মা হওয়া যায় না?”
“যায় পরী যায়। আর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছো তুমি। তোমাকে না দেখলে হয়তো কখনোই এটা বিশ্বাস করতে পারতাম না।”
“অনেক ভালোবাসি তোমায় তুর্য। ততটাই ভালোবাসি মুসকানকে। আমি যদি মরে যাই তাহলে তুমি মুসকানকে আগলে রেখো।”
“চুপ! কিসব আজেবাজে কথা বলছো?”
“আজেবাজে কেন হবে? আচ্ছা শোনো না।”

“কি?”
“আমি মরে গেলে তুমি কি আবার বিয়ে করবে?”
তুর্য দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,
“হুম করবো তো।”
“কিহ্? করাবো তোমায় বিয়ে। বিয়ে করলে ভূত হয়ে এসে তোমার ঘাড় মটকাবো। তুমি শুধু আমার।”

তুর্য আমায় বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো,
“হুম আমি শুধু তোমার।”
পুরো একমাস জুড়ে আমরা সবাই অনেক আনন্দ করেছি। অনেক জায়গায় ঘুরেছি, মজা করেছি। সময়গুলো এত তাড়াতাড়ি কেটে গেলো, বুঝতেই পারিনি। বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটছিলাম। বাসে উঠার আগে কিছু খাবার দোকান থেকে কিনে নিচ্ছিলো তুর্য আর জয়। মুসকান রিয়ার কোলে। ৫/৬ বছরের একটা ছোট্ট বাচ্চা বল নিয়ে খেলতে খেলতে রাস্তার মাঝখানে চলে যায়। রাস্তায় এত্ত গাড়ি চলাচল করছে বাচ্চাটা খেয়ালই করেনি। আমি বারবার চিৎকার করে বলছিলাম, তুমি এসো না এখানে। ওখানেই দাঁড়াও। বাচ্চাটার সাথেও কাউকে দেখছিলাম না। ভয়ে কান্না করে দেয়। শেষে আমিই যাই ওকে আনতে। মুসকান আমার ওড়না টেনে ধরেছিল। আমি সেটা উপেক্ষা করেই ছুটে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিই।

১৯ বছর পরঃ
আজ মুসকানের গায়ে হলুদ। খুব সুন্দর একটা হলুদ শাড়ি পড়েছে। হাতে, মাথায়, গলায়, কোমড়ে ফুল। সুন্দর করে সাজিয়েছে মুসকানকে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা ছয়টায়। পাঁচটার মধ্যেই মুসকানকে সাজানো হয়ে যায়। বিশাল বাড়িটা আজ অনেক বছর পর নতুন রূপে সেজেছে। অনেক বছর পর বাড়িতে হৈ-হুল্লোড় হচ্ছে। বাচ্চারা দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। এত মানুষের ভীড়ে মুসকানের চোখ দুটো শুধু তুর্যকে খুঁজছে।
তৎক্ষণাৎ মুসকান মনে মনে বললো,

“বাবাই নিশ্চয়ই এখন ছাদে আছে।”
মুসকানও ছাদে চলে গেলো। ছাদে গিয়ে দেখলো গোলাপফুলের টপ কোলে নিয়ে গোলাপের দিকে তাকিয়ে আছে। মুসকান পেছন থেকে গিয়ে বললো,
“বাবাই।”
তুর্য মুসকানের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারছেনা। মুসকান গিয়ে তুর্যর পাশে বসলো।

“এভাবে কি দেখছো?”
“দেখছি আমার মেয়েকে। আমার ছোট্ট মেয়েটা কত বড় হয়ে গিয়েছে। অপরূপ লাগছে তোকে।”
“তুমি কিন্তু এখনো অনেক ইয়ং বাবাই। আমার শ্বাশুরীর সাথে তোমার হিল্লেটা করিয়ে দিবো বুঝলে।”
তুর্য একটু শব্দ করে হাসলো।
“তুই একদম তোর মায়ের মত হয়েছিস। তোর মাও এমন দুষ্টু ছিল।”

“তুমি মাকে অনেক ভালোবাসো তাই না?”
“আমি বাসলে কি হবে? তোর মা তো আমায় একটুও ভালোবাসে না। ভালোবাসলে কি আর আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারতো বল?”
“ভালো তো তুমিও আমায় বাসো না বাবাই। ভালোবাসলে কি ১৫টা বছর আমায় তোমার থেকে দূরে রাখতে পারতে?”

“আমায় ভুল বুঝিস না রে মা। আমি চাইনি তুই কষ্টটা উপলব্ধি করিস। তাই তুই একটু বড় হতেই তোর দাদা-দাদুসহ তোকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
“কিন্তু আমি তো এসব চাইনি বাবাই। আমি তোমার সাথে থাকলেই হয়তো বেশি ভালো থাকতাম। বিদেশের মাটিতে আমি পাইনি মায়ের ভালোবাসা, পাইনি তোমার ভালোবাসা।”
“চেয়েই কি আর সব পাওয়া যায়রে মা। আমিও তো চেয়েছিলাম, পরীকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে। নতুন জীবন পাড়ি দিতে। কিন্তু পেয়েও হারিয়ে ফেললাম।
সেদিন আমরা বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছিলাম। পরী একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে ছুটে যায়। তোর বাঁধাও সে শোনেনি। শুনলে হয়তো আজ দিনটাই থাকতো অন্যরকম। পরীর দোষ দিবো না। মানুষ হিসেবে ওর জায়গায় আমি থাকলে আমারও উচিত ছিল ছোট্ট বাঁচ্চাটাকে বাঁচানোর। পরী বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ফিরে আসার পথেই দ্রুতগামী একটা ট্রাক এসে চাপা দিয়ে যায় পরী আর বাচ্চাটাকে।”
“উফফ আল্লাহ্!”

“চোখের সামনে সবটা ঘটতে দেখেও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না নিজের চোখকে। কিছু করতেও পারিনি। মনে হচ্ছিলো আমি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। হাজার বার করে চাইছিলাম ঘুমটা ভেঙ্গে যাক। কিন্তু স্বার্থপর ঘুমটা তো তখন আসেইনি ভাঙ্গবে কি করে! ঘটনাস্থলেই মারা যায় পরী আর ঐ বাচ্চাটা। এতবার ডাকার পরও ফিরে আসেনি তোর মা। আমায় ছেড়ে চলে যায়। ও চলে যাওয়ার পরই আমি মানসিকভাবে অনেক ভেঙ্গে পড়ি। জানিস, যেদিন আমরা ব্যাক করবো, সেদিন সকালে পরী আমার বুকে এসে বলেছিল, এই জায়গাটা আমার। অনেক ভালোবাসি তুর্য। বারবার ওর এই কথাটা আমার কানে ভাসতো। কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না। ইচ্ছে হতো আমিও মরে যাই। কিন্তু পারতাম না তোর মুখের দিকে তাকিয়ে। পরীকে কবর দেওয়া হয়েছিল আমাদের বাড়ির বাগানেই। একদিন রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি তুই নেই। সারা বাড়ি সবাই মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাইনি। বাড়ির বাইরে গিয়ে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যাই। একটা সময় পর মনে হলো, আমি বোধ হয় তোকেও হারিয়ে ফেললাম। বুকে খুব ব্যথা হচ্ছিল। তখন পরীর কবরের কাছে গিয়ে দেখি, তুই কবের ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছিস। আমি বুঝতেই পারছিলাম না এত ছোট বয়সে তোর এত সাহস কিভাবে হয়েছিল। তবে মায়ের জায়গাটা যে ফাঁকা তোর সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। সেই রাতে তোকে বুকে নিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম। এরপরই তোকে বাবা-মায়ের সাথে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

তুর্য কাঁদছে। পুরুষদের নাকি কারো সামনে কাঁদতে নেই। কিন্তু মেয়ের সামনে কান্নাগুলো আর লুকাতে পারছেনা। মুসকান কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“তাহলে তুমি আর বিয়ে করলে না কেন?”

“কি করে করতাম বলতো? পরী যে ছিল আমার শেষ ভালোবাসা। পরীর মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর অথৈ আমার কাছে এসেছিল। ওর করা কাজকর্মের জন্য মাফ চেয়েছিল। বিয়ে করতে চেয়েছিল। সেদিন আমি এটাই বলেছিলাম যে, মায়া ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা আর পরী আমার শেষ ভালোবাসা। শেষের পর আর কোনো শেষ আসেনা। পরী মরেনি। পরী বেঁচে আছে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, আমার হৃদস্পন্দনে। হৃদস্পন্দনে শুধু একটা নামই প্রকাশ পায়। আর সে হচ্ছে পরী। হ্যাঁ আমি শুধুই পরীর। আর বাকিটা জীবন আমি পরীরই থাকবো।”

মুসকান কাঁদতে কাঁদতে এবার তুর্যর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তুর্যকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“বাবাই তুমি এত ভালো কেন বলো তো? কেউ কাউকে এত ভালোবাসতে পারে? সত্যিই মা অনেক লাকী যে, কম সময়ের জন্য হলেও তোমায় জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল। তোমায় একা করে গিয়েও তোমায় মায়ের করে রেখেছে।”

“ঐ অল্প সময়ের পরীর ভালোবাসা নিয়েই আমি বাকিটা জীবন পাড় করতে পারবো। সাথে তুই তো আছিস আমানত। তুই মায়ার না, পরীর আমানত।”
“জানো বাবা, কারো প্রথম ভালোবাসা হওয়া যতটা সহজ ঠিক সেভাবেই কারো শেষ ভালোবাসা হওয়া ততটাই কঠিন।মা সেই কঠিন কাজটাই করে দেখিয়েছে।”
তুর্য এবার হুহু করে কেঁদে দেয়। মুসকানও কাঁদতে কাঁদতে তুর্যর চোখের পানি মুছে দেয়।
“একদম কাঁদবেনা তুমি। আজকের দিনেও যদি তুমি কাঁদো তাহলে কিন্তু আমি অনেক কষ্ট পাবো বাবাই।”
তুর্য জোর করে মুখে হাসি টেনে বললো,
“পাগলী মেয়ে। পরীর কার্বনকপি। কাঁদবোনা একদম কাঁদবোনা।”

তুর্য একটা গোলাপ ছিঁড়ে মুসকানের খোঁপায় গেঁথে দিলো। মুসকান বললো,
“তুমি তো কাউকে এই ফুল গাছগুলো ধরতেই দাও না। আর আজ ফুল ছিঁড়ে আমার খোঁপায় দিলে?”
“এই ফুলগাছগুলো পরী লাগিয়েছিলো। প্রতিদিনই ফুল ফোঁটে। আজ লাল টুকটুকে একটা গোলাপ ফুটেছে। এটা তোর মায়ের দোয়া।”
মুসকান বাকি ফুলগুলোয় ঠোঁটের পরশ দিয়ে বললো,
“ভালোবাসি মা।”
তুর্যও চুমু খেয়ে বললো,
“আমার ভালোবাসা।”
কথা বলতে বলতে ৬টা প্রায় বেঁজে যায়। তবুও মুসকান কিছুক্ষণ তুর্যর কাঁধে মাথা রেখে আকাশপানে তাকিয়ে থাকে। হয়তো মনে মনে দুজনই বিশেষ কাউকে খোঁজে। একজন তার মাকে আর অপরজন তার ভালোবাসার মানুষটিকে। কিছু ভালোবাসা যেন শেষ হয়েও হয়না শেষ।

লেখা – মুন্নি আক্তার প্রিয়া

সমাপ্ত

(পাঠক আপনাদের ভালোলাগার উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত আমাদের লেখা। আপনাদের একটি শেয়ার আমাদের লেখার স্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই পর্বের “আমার তুমি (সিজন ২: শেষ খণ্ড) – Notun hot bangla love story” গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। পরবর্তী গল্প পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম। ধন্যবাদ।)

আরো পড়ূন – সিজন ২: ১ম খণ্ড) – Notun hot bangla love story

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!